২৬শে আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

July 10, 2019, 9:07 pm

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ- সময় এখন নারীর

টাফ রিপোর্টার ॥ সাম্যের গান গাই-/ আমার চক্ষে পুরুষ-রমনী কোনো ভেদাভেদ নাই।/ বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে এই দিবসটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। জাতিসংঘ দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায়। নারীর সম-অধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার অভীপ্সা নিয়ে সেই থেকে গোটা বিশ্বে দিবসটি পালিত হচ্ছে। সে হিসেবে স্বীকৃতির ৪৩ বছর হয়ে গেল। এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সময় এখন নারীর: উন্নয়নে তারা, বদলে যাচ্ছে গ্রাম-শহরের কর্ম-জীবনধারা’। বাংলাদেশে দিবসটি ১৯৭১ সালের আগে থেকেই পালিত হওয়া শুরু হয়। ঘটা করে ’৭৫ সাল থেকে ধরা হলে ৪৩ বছর। আর এই ৪৩ বছরে কতটা সম-অধিকার পেয়েছে বাংলাদেশের নারীরা?

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট সিগমা হুদা জনকণ্ঠকে বলেন, সকল বাধা অতিক্রম করে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের নারীরা প্রমাণ করছে যে তারা পারে। তবে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। ঘরে বাইরে এখনও নারীদের বিভিন্ন সময়ে হয়রানির শিকার হতে হয়। এতে অনেক সময় তারা হতাশ হলেও, হতাশা ঠেলে সামনে এগিয়ে চলার চেষ্টা করে। কর্মক্ষেত্রেও বিভিন্নভাবে হয়রানি হয়। কাজ বেশি করেও পুরুষের চেয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে কম মজুরি পায়। রাস্তা ঘাটে চলাচলের সময় হয়রানির শিকার হয়। এক জরিপে দেখা গেছে, ধর্ষণ বেড়ে গেছে। পাচার বেড়েছে।

তিনি বলেন, পুরুষ শাষিত সমাজে নারীদের সম-অধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পুরুষদের আধিপত্য রয়ে গেছে। নারীদের পুরুষরা এখনও ভিন্ন চোখে দেখে। যতদিন পর্যন্ত পুরুষরা নারীদের নারী নয়, মানুষ হিসেবে না দেখবে, ততদিন পর্যন্ত সম-অধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হবে না। ২০১৮ সালে এসে কিছুটা দৃষ্টিভঙ্গি বদলালেও পুরোপুরি বদলায়নি। এজন্য পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

এদিকে নারী দিবসের আগে ব্র্যাকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গণপরিবহনে ৯৪ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়। ১৯ বছর থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব বয়সী পুরুষরা গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানি করে। ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস এ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচীর প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর হোসনে আরা বেগম বলেন, ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষদের দ্বারা গণপরিবহনে যৌন হয়রানি কিছুটা হলেও উদ্বেগের।

মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী জনকণ্ঠকে বলেন, সংবিধানে তো আমাদের সম-অধিকার দেয়া আছে। নারীরা এখন অনেক কর্মমুখী। গার্মেন্ট, ব্যাংক থেকে শুরু করে সব জায়গা। তবে সেখানে কিন্তু বড় বাধা। পরিবারে বাধা আছে, নারীরা কিন্তু বৈষম্যের শিকার। পারিবারিক নির্যাতন এখনও আছে। পারিবারিক সম্পত্তি ভাই যা পায়, বোন তার অর্ধেক পায়। তাও দিতে চায় না বা অনেক ক্ষেত্রে দেয়াও হয় না। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের পলিসি লেবেলে নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো ঘটে কিন্তু বিচার পায় না। এজন্য অনেক কারণ আছে। আমাদের জবাবদিহিতা নেই। গণতন্ত্র অত শক্তিশালী না। গণতন্ত্র যত শক্তিশালী হবে আইনের বিচার তত দ্রুত হবে।

এই সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে এই আইনজীবী বলেন, আইনের শাসন হলে অপরাধ অনেকটা কমে আসবে। বিচারের আওতায় আনা। বাড়ি রাস্তাঘাট, পুলিশ স্টেশন কর্মক্ষেত্রে শিক্ষাঙ্গনে নারী বান্ধব পরিবেশ থাকতে হবে। আর সেই সঙ্গে কমিউনিটি। কমিনিটির সচেতনতা অনেক বাড়াতে হবে। জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে। এসব না হলে নারীর ওপর বৈষম্য কমবে না। তিনি আরও বলেন, এই ধরনের সমস্যা শুধু আমাদের দেশে না, আমাদের দেশের বাইরে অন্যান্য দেশেও নারীরা তাদের জায়গাটা পায়নি। আমাদের আশা যেটা ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব নারী দিবসের যে আশা তা অর্জিত হবে।

জানা যায়, আফগানিস্তান, কিউবা, লাওস, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনিগ্রো, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, ইউক্রেনসহ মোট ২৪ দেশ আন্তর্জাতিক নারী দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারী ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। এছাড়া, চীন, মেসিডোনিয়াা, মাদাগাস্কার, নেপালে শুধু নারীরাই সরকারী ছুটি পেয়ে থাকেন। তবে বাংলাদেশে এমন কোন ব্যবস্থা নেই। নারী দিবসে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারী ছুটি নেই বা শুধু নারীরাও ছুটি পান না। তবে বেসরকারী কিছু প্রতিষ্ঠানে বা সংবাদ মাধ্যমের অফিসে এই একদিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর নারীদের দায়িত্ব দেয়া হয়ে থাকে।

নারী দিবসে সরকারী ছুটি তাগিদ দিয়ে সিগমা হুদা বলেন, এই ছুটিটার প্রয়োজন আছে। তাহলে নারীরা একত্র হতে পারবে। তাদের হতাশা নিয়ে কথা বলতে পারে। আনন্দ বেদনা সাফল্য শেয়ার করতে পারে। দিবসটা নারীদের, আর তারাই যদি অংশ নিতে না পারে তাহলে কেমন হয়? সরকারী ছুটি থাকলে এই দিবসে সকল নারীর সম্পৃক্ততায় একটা উৎসব মুখর পরিবেশের সৃষ্টি হবে।

‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৮’ উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত অনুষ্ঠান-জাতীয় প্রেসক্লাবের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের নারী সাংবাদিকদের সম্মাননা ও অভিজ্ঞতা বিনিয়ম সভা, কনফারেন্স লাউঞ্জ, সকাল ১০টায়। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনে বিশেষ আয়োজন করেছে বৈশাখী টেলিভিশন। আগামীকাল ৮ মার্চ ২০১৮, বৃহস্পতিবার বৈশাখী টেলিভিশন কার্যালয়ে কেক কেটে দিনব্যাপী এ আয়োজনের উদ্বোধন করবেন জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে পাঁচ কৃতী নারীকে সম্মাননা জানানো হবে বৈশাখী পরিবারের পক্ষ থেকে।এরা হলেন- কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, মানবাধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল, কণ্ঠশিল্পী ও মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠসৈনিক শাহীন সামাদ, দেশের প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাঃ দীপুমনি এবং তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে সকাল ১০টায় ‘ফ্রিডম স্যানিটারি ন্যাপকিন উইলফেস্ট’ অনুষ্ঠিত হবে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ৬ সফল নারীকে সম্মাননা দেবে উইমেন এন্ট্রাপ্রিনিওয়ার্স নেটওয়ার্ক ফর ডেভেলপমেন্ট এ্যাসোসিয়েশন (ওয়েন্ড)। রাজধানীর আইবিএ এ্যালামনাই ক্লাব, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর