৮ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

September 23, 2020, 7:56 am

শান্তিময় সমাজ গঠনে চাই সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চাঃ মুহাম্মদ নাজমুল হক

উল্লাপাড়া প্রতিনিধিঃ  অনেক রস বৈচিত্রে, অজস্র গঞ্জ-গাঁথায় পরিপূর্ণ আমাদের এই মাতৃভূমি বাংলাদেশ। সহজ সরল গ্রাম-গঞ্জের মানুষের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্যনাট্য, শিল্প, ধর্ম, বিশ্বাস, উৎসব-পার্বণ, অভ্যাস, সংস্কার-কুসংস্কার ইত্যাদি নানা লৌকিক প্রতিবেশের ঋদ্ধ ইতিহাস ঐতিহ্যের রূপকথা দ্বারা নির্মিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের পরিচয়। আমাদের পুরো দেশটিই একটা গ্রামীণ সংস্কৃতির দেশ। লোক ঐতিহ্যের দেশ। এখানে রয়েছে ভাটিয়ালির ভাটির স্রোতের গান, শাশ্বত বাংলার ফসল তোলার গান। আছে নানা রকমের লোকজ উৎসবসহ লোকজীবনের বহু বিচিত্র অভিব্যক্তি। নগর জীবনেও আমাদের সুস্থ সংস্কৃতির বাস্তব প্রতিভাস একেবারে অনুপস্থিত নয়। গ্রাম-বাংলার আবহমান সাংস্কৃতিক জীবনের নানা প্রতিচ্ছবির আনাগোনা আধুনিকতম শহুরে জীবনেও অনেক খানি উপস্থিত বলে প্রতীয়মান হয়। তাই অকৃত্রিম এই আবহমান গ্রাম-বাংলার সংস্কৃতিকে নিবিড়ভাবে জানা প্রয়োজন।
আর তা জানতে হলে আমাদের শেকড় সংস্কৃতি, গ্রামীণ মানুষ, তার ভাষা-সাহিত্য, লৌকিক শিল্প প্রকৃতি, গ্রামীণ সমাজ, সবকিছুকে অন্তরদৃষ্টি মেলে নিরীক্ষণ করা চাই। বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী ম্যাকাইভার তার সংস্কৃতির সংজ্ঞা প্রসঙ্গে আমাদের যা কিছু আছে তাই আমাদের সংস্কৃতি। অথার্ৎ কোন স্থানের মানুষের আচার-ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য, নাট্যকলা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতি-নীতি, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় তাই-ই সংস্কৃতি। সংস্কৃতির মূলকথা নিজেকে সুন্দর করা, সভ্য করা।
প্রেম ও সৌন্দর্য সংস্কৃতির মূল আশ্রয়। এ আশ্রয় থেকে বিচ্যুত হলে সংস্কৃতি ধ্বংস হয়, হারিয়ে যায়। আর যখন একটি জাতি তার সংস্কৃতিকে হারিয়ে ফেলে তখন সে জাতিরও মৃত্যু ঘটে। কেননা একটি দেশের সংস্কৃতি সেই জাতির পরিচয় বহন করে। জাতিগত ভাবে আমাদের বাংলাদেশেরও একটি নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। সেটাই আমাদের পরিচয়। এখন বিশ্বায়নের সময়ে আমরা আছি। খুব সহজেই সংস্কৃতির বিনিময় হচ্ছে।
ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, স্যাটেলাইট চ্যানেল ইত্যাদি অনুষঙ্গের দ্বারা আমাদের মুহুর্তেই জানিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের খেঁাজ-খবর, চিন্তা-ধারা। সেখানকার জীবনাচরণ। কখনো আমরা নিয়ে নিচ্ছি সেই সংস্কৃতির অনেকটাই। আর এটাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক এবং বৈশ্বিক ব্যাপারই কখনো কখনো আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। যেটাকে আমরা বলছি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এই আগ্রাসনের কারণে যখন কোন সংস্কৃতি অন্য কোন সংস্কৃতির উপর প্রভাবক হিসাবে চেপে বসে এবং সেই সংস্কৃতিকে গ্রাস করে নিতে চায় তখন সেটা হয়ে ওঠে কোন জাতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের আগামী প্রজন্মকে সুস্থ সংস্কৃতির মূল ধারায় নিয়ে আসা জরুরি। একটি দেশের অন্যতম মৌলিক শক্তি হলো সে দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম। তাই একটি শান্তিময় ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে তরুণ প্রজন্মকে মাদক, ইন্টারনেট বা প্রযুক্তি আসক্তি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের ভয়াবহ কালো ছোবল তথা অন্ধকার জীবনের হাতছানি থেকে বাঁচাতে হবে। দেশের সর্বত্র শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার প্রসার ঘটাতে হবে। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটাতে হবে।
সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে তরুণদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে হবে। তাহলেই মাদকমুক্ত, জঙ্গিবাদমুক্ত, সন্ত্রাস ও দুনর্ীতিমুক্ত এক মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। কেননা অন্ধকার মনে অন্ধকারের শক্তি কাজ করে, যে শক্তি মানবকে দানবে পরিণত করে। যে দানব সমাজকে ধ্বংস করে। তাই সমাজে দানবের প্রভাব ঠেকিয়ে মানবের সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে আমাদের মনের আলো জ্বালাতে হবে। নবীন শিক্ষার্থীদের সুস্থ সংস্কৃতির ছোঁয়ায় আধুনিক ও পরিশীলিত করে গড়ে তুলতে হবে। আর এজন্য সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার কোন বিকল্প নেই। সংগীত ও শিল্পকে অনুভব করার শক্তি, সংস্কৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করার শক্তিই হচ্ছে আলোকিত সমাজ গড়ার মূলমন্ত্র। একটা মুক্তমনা, মানবিক ও সহনশীল সমাজ গড়তে হলে সুস্থ সংস্কৃতি হৃদয়ে লালন করতে হবে। সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমেই সমাজের সকল প্রকার অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশের পরিণত করার লক্ষ্য স্থির করেছে।
সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আমাদের একটি মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য সামাজিক সুস্থতা নিশ্চিত করা জরুরি। আর এই সামাজিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হলে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সারাদেশে সামাজিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার মতো সহশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একজন সংস্কৃতিবান মানুষ কখনো জঙ্গিতৎপরতা কিংবা মানুষ হত্যা ও সন্ত্রাসী কাজে অংশ নিতে পারে না। বরং সে একজন মানবদরদী জ্যোতির্ময় মানুষ হিসেবে সমাজে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। সমাজ উন্নয়নের অংশীদার হবে।
আমাদের বর্তমান প্রজন্ম এক অস্থির সময় অতিবাহিত করছে। কিশোরদের মধ্যে অনৈতিক ও অপরাধমূলক কাজের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। খুন, ধর্ষণ, ইভটিজিং এর মতো ভয়ঙ্কর ও পৈশাচিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতে আগামী তরুণ প্রজন্মকে সংস্কৃতির সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে এনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনুপ্রাণিত করতে হবে। তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেম ও মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে তাদের গড়ে তুলতে হবে পরিশুদ্ধ, মানবিক এবং আলোকিত মানুষ হিসেবে। তবেই সমাজের সকল অন্যায়-অসংগতি এবং সব অপশক্তি দূর হবে। গড়ে উঠবে অসাম্প্রদায়িক, সন্ত্রাস-দুর্নীতিমুক্ত শান্তিময় এক মানবিক সমাজ।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর