৯ই চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

March 23, 2020, 8:07 am

পঞ্চগড়ে কীটনাশক মুক্ত সবজির চাষ,দাম পেয়ে খুশি কৃষক

পঞ্চগড় প্রতিনিধিঃ পঞ্চগড়ের বিষমুক্ত সবজি চাষ শুরু হয়েছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকমুক্ত সবজি চাষে চাষিরা ব্যবহার করছেন জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক। এই পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে বেশ সাড়া পেয়েছেন চাষিরা। এতে কম খরচে তারা যেমন উৎপাদিত সবজির ভালো দাম পাচ্ছেন, তেমনি ক্রেতারাও পাচ্ছেন বিষমুক্ত সবজির স্বাদ।
চারদিকে যখন ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ছড়াছড়ি, তখন আশার আলো জুগিয়েছে পঞ্চগড়ের কয়েকটি গ্রামে বিষমুক্ত সবজি চাষ। সদর উপজেলার কামাতকাজলদীঘি ইউনিয়নের ঘটবর, পঞ্চগড় ইউনিয়নের ভাবরঙ্গী ও শিংপাড়া, হাঁড়িভাসা ইউনিয়নের পাইকানী ও হাফিজাবাদ ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামে এখন কৃষকরা বিষমুক্ত সবজি চাষ করছেন। এতে তারা রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বদলে জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করছেন।
গ্রামগুলোতে গেলেই দেখা মিলবে ক্ষেতে ঝুলছে নানা ধরনের জৈব বালাইনাশক। মিষ্টি কুমড়া, লাউ, শসা, পটল, পেঁয়াজ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটোসহ নানা শাকসবজি ক্ষেতে বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা এইসব জৈব বালাইনাশক শোভা পাচ্ছে। সবজির জন্য ক্ষতিকারক পোকামাকড় দমন করতে সেক্স ফেরোমন ট্রাপ, কালার ট্রাফ ও আকর্ষণ ফাঁদ ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি কাকতারুয়াও বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে পোকা দমনে কেবল সেক্স ফেরোমন ট্রাপ ও আকর্ষণ ফাঁদ ব্যবহার করা হলেও নতুন করে যুক্ত হয়েছে কালার ট্রাপ।
পুরনো প্লাস্টিকের জারে হলুদ রং করে তাতে মোবিল মাখিয়ে ক্ষেতের মধ্যে খানিক উঁচুতে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। এতে জাব পোকা, সাদা মাছি, থ্রিপিসসহ শোষক পোকা হলুদ রঙে আকৃষ্ট হয়ে মোবিলে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। মাত্র ১৫ থেকে ২০ টাকা খরচে এই জৈব বালাইনাশক তৈরি করা যায়।
জৈব বালাইনাশক প্রয়োগে কীটনাশক ছাড়াই খুব অল্প খরচে পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করছেন চাষিরা। কৃষি কর্মকর্তারাও চাষিদের বিষমুক্ত সবজি চাষে পরামর্শ ও সহযোগিতা করছেন। এই পদ্ধতিতে শাকসবজি চাষে উৎপাদন খরচ অর্ধেকে নেমে এসেছে। সেইসঙ্গে বাজারে বিষমুক্ত সবজির ব্যাপক চাহিদা থাকায় দাম ভালো পাচ্ছেন চাষিরা। এমনকি চাষিদের শাকসবজি বিক্রি নিয়ে কোনো বিড়ম্বনা পোহাতে হয় না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্ধারিত বিষমুক্ত সবজির দোকানের মাধ্যমে এসব সবজি বিক্রি করা হচ্ছে। বাজারে রাসায়নিকে উৎপাদিত সবজির তুলনায় বিষমুক্ত সবজি বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে। এতে চাষিরা যেমন খুশি, তেমনি ক্রেতারাও পাচ্ছেন বিষমুক্ত সবজির স্বাদ।
পঞ্চগড় ঘটবর এলাকার চাষি রাজু আহম্মেদ বলেন, আমরা আমাদের গ্রামে একটি কৃষক সমবায় সমিতি করেছি। এই সমিতির প্রত্যেক সদস্যই বিষমুক্ত সবজি চাষাবাদ করছে। বাজারে আমাদের সবজির চাহিদা বেশি। তাই বিক্রি করতে কোনো সমস্যা হয় না। ভালো দামও পাওয়া যায়।
ওই গ্রামের কৃষক ফজলুল হক বলেন, বিষমুক্ত সবজি চাষ করতে আমরা মূলত জৈব সার ও বিভিন্ন জৈব বালাইনাশক যেমন ফেরোমন ট্রাপ, আকর্ষণ ট্রাপ ও কালার ট্রাপ ব্যবহার করছি। এসব ব্যবহার করেই পোকা দমন করা যাচ্ছে। তাই কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। বাজারে এখন সার ও কীটনাশকের দাম অনেক। তাই আমাদের উৎপাদন খরচ অনেক কমে আসছে। সেইসঙ্গে বিষমুক্ত সবজি চাষ করে আমরা নিজেরাও খেতে পারছি ক্রেতারাও নিরাপদ সবজি খেতে পারছেন। এটাই আমাদের কৃষকদের আনন্দের বিষয়।
পঞ্চগড় সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহ আলম মিয়া বলেন, শাকসবজি ও ফসলের ক্ষতিকারক যেসব শোষক পোকা রয়েছে সেসব থেকে জৈব বালাইনাশক দিয়েই রক্ষা পাওয়া যায়। এসব এক একটি বালাইনাশক তৈরি করতে মাত্র ১৫ থেকে ২০ টাকা খরচ হয়। আগে সেক্স ফেরোমন ট্রাপ ও আকর্ষণ ট্রাপ ব্যবহার করেছেন চাষিরা। হলদে কালার ট্রাপটির আইডিয়া আমার। এখন কৃষকরা এই কালার ট্রাপ ব্যবহার করেও পোকা হাত থেকে ফসলকে রক্ষা করতে পারছেন। দিন দিন এই পদ্ধতিতে বিষমুক্ত সবজি চাষের পরিমাণ বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা আবু হোসেন বলেন, নিরাপদ সবজি চাষের জন্য আমরা চাষিদের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। নিরাপদ সবজি উৎপাদন করতে তারা যেসব উপকরণ ব্যবহার করতে তাতে খরচ কমে আসছে। এছাড়া বাজারে আমাদের নির্ধারিত সবজির দোকানে নিজেদের উৎপাদিত সবজি বিক্রি করতে পারছে। সেখান থেকে ক্রেতারা বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি কিনতে পারছে। আশা করি সামনে বিষমুক্ত সবজি চাষের পরিধি আরো বাড়বে।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর