১০ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

September 25, 2020, 6:46 am

করোনা বিপর্যয়ের মধ্যেই আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল

পঙ্গপাল মূলত এক প্রকার পতঙ্গ। এটি আর্কিডিডি পরিবারে ছোট শিংয়ের বিশেষ প্রজাতি যাদের জীবন চক্রে দল বা ঝাঁক বাঁধার পর্যায় থাকে। এই পতঙ্গগুলো সাধারণত একা থাকে। তবে বিশেষ অবস্থায় তারা একত্রে জড়ো হয়।  পঙ্গপাল ও ঘাস ফড়িংয়ের মধ্যে কোন পার্থক্যগত শ্রেণীবিন্যাস পরিলক্ষিত হয় না।

১৯৯৩ সালে ব্যাপক আকারে পঙ্গপালের আক্রমণের মুখে পড়ে পাকিস্তান। এই ধাপে ২০১৯ সালের মার্চে পাকিস্তানে প্রথম পঙ্গপালের আক্রমণ শনাক্ত হয়। পরে এটি সিন্ধু, দক্ষিণ পাঞ্জাব ও খাইবার পাখতুনওয়া প্রদেশের ৯ লাখ হেক্টর এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কোটি কোটি রুপি মূল্যের ফসল ও গাছপালা।নতুন ধরনের পঙ্গপালের ১০ লাখ পতঙ্গের একটি ঝাঁক একদিনে ৩৫ হাজার মানুষের খাবার খেয়ে ফেলতে পারে। আগামী এপ্রিলে এই পঙ্গপাল নতুন করে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এ সময়টিকে পঙ্গপালের বংশবৃদ্ধির সময় বলে বিবেচনা করা হয়।

ভারত-পাকিস্তানের বাইরে সৌদি আরবও পঙ্গপালের আক্রমণের মুখে পড়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, পতঙ্গটির আক্রমণ দেশটির কৃষি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।আফ্রিকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে ৭ কোটি ডলারের অনুদান চেয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন। সংস্থাটির প্রধান মার্ক লোকক বলেন, আফ্রিকায় এই ভয়াবহ পঙ্গপাল উদ্বেগজনক হারে ফসল ধ্বংস করছে। ইতোমধ্যেই খাদ্য স্বল্পতায় থাকা পরিবারগুলো তাই আরও বিপাকে পড়েছে।

পঙ্গপালের ইতিহাস বহু পুরনো। প্রাচীন মিসরীয়দের কবরে এর ছবি দেখা যায়। এছাড়া গ্রিসের ইলিয়াডে এই পতঙ্গের কথা উল্লেখ রয়েছে। বাইবেল এবং কোরআন এর মতো ধর্মগ্রন্থেও পঙ্গপালের কথা বলা হয়েছে। ধর্মগ্রন্থে এই পতঙ্গকে ঈশ্বরের শাস্তিস্বরূপ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা রয়েছে। পঙ্গপালের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা সাধারনত পঙ্গপাল নিয়ন্ত্রণে বাতাসে বা মাটিতে কীটনাশক ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তবে আফ্রিকায় পঙ্গপালের যে ভয়াবহতা তাতে শুধু কীটনাশক ব্যবহারে ফল মিলবে না বলে মনে করছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।বিশ্লেষকরা পঙ্গপালের আক্রমণে সৃষ্ট এই পরিস্থিতির জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন। জাতিসংঘের পঙ্গপাল পূর্বাভাস বিষয়ক কর্মকর্তা কিথ ক্রিসম্যান বলেন, ওমানের মরুভূমিতে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে অনেক বৃষ্টি হওয়ায় এই পঙ্গপালগুলো আফ্রিকায় চলে গেছে। তিনি বলেন, আমরা জানি ঘূর্ণিঝড় থেকেই এই পতঙ্গের আগমন ঘটে। বিগত ১০ বছরে ভারত সাগরে ঘূর্ণিঝড়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্ব জুড়ে পঙ্গপাল সংকট ১০ দেশের কয়েক লাখ মানুষকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দিতে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে আরব উপসাগরের ঊষর মরুভূমিতে পঙ্গপালের বংশবিস্তারকে নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে।বিশেষজ্ঞরা এমন দাবিই করেছেন বলে গার্ডিয়ানের খবরে জানা গেছে। গত পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনের পঙ্গপালের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ধ্বংস করে দিয়েছে। এতে আরব উপদ্বীপের দেশটিতে পতঙ্গটি ব্যাপকহারে বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।২০১৮ সালে ঘূর্ণিঝড় মেকুনু আঘাত হানলে সৌদি আরবের মরুভূমিতে আদ্র বালু ও গজিয়ে ওঠা উদ্ভিদের কারণে মরু পঙ্গপালের কয়েকটি প্রজন্মের বিস্তার ঘটে।জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পতঙ্গ বিশেষজ্ঞ কেইথ ক্রিসম্যানের মতে রুবয়া খালি নামে খ্যাত ইয়েমেন ও ওমানের  বালুময় মরুভূমিতে শস্যগ্রাসী ঝাঁকে ঝাঁকে পতঙ্গের জন্ম হয়। তিনি বলেন, যখন সেখানকার পরিবেশ শুষ্ক হয়ে যাচ্ছিল, তখন অঞ্চলটিতে একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এতে নতুন একটি প্রজন্মের পঙ্গপালের বিস্তার সহজ করে দেয়। কাজেই পতঙ্গটির বিস্তার সেখানে চারশ গুণ বৃদ্ধি না পেয়ে আট হাজার গুণ বেড়ে যায়।তার মতে, একটি ঘূর্ণিঝড় পঙ্গপালের বিস্তারকে অন্তত ছয় মাসের জন্য অনুকূলে এনে দেয়। এর পর যখন তার আবাস শুষ্ক হয়ে যায়, তখন পতঙ্গটির প্রজনন প্রতিকূলে চলে যায়। এর পর হয় তারা মারা যায় কিংবা অন্যত্র চলে যায়।ক্রিসম্যান বলেন, এ অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বেড়ে গেছে। যাতে ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপালের বিস্তার স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হুশিয়ারি, পঙ্গপালের কারণে অন্তত আড়াই কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ে যাবে। আর পঙ্গপাল পর্যবেক্ষণ বিভাগ লোকাস্ট ওয়াচের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অন্তত ১০ দেশে এই পতঙ্গটি দেখা গেছে। কেনিয়ার একটি এলাকায় এমন একটি ঝাঁক শনাক্ত হয়েছে। ওই এলাকাটি লুক্সেমবার্গের আকারের মতো হবে।কাজেই এই পতঙ্গের বিস্তারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ১৪ কোটি ডলার সহায়তা চেয়েছে সংস্থাটি। ধারনা করা হয়  জুন ২০২০  দিকে পঙ্গপালের বর্তমান সংখ্যা ৪০০ গুণ বেড়ে যাবে।কাজেই পরিস্থিতি  দীর্ঘ স্থায়ী মহামারীর মত ভয়াবহ হতে পারে  গত কয়েক দশকের তুলনায় । এ ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন ও ইয়েমেন যুদ্ধ বড় অনুঘটকের ভূমিকা রাখতে পারে।ক্রিসম্যান বলেন, পঙ্গপালের বিস্তারে সম্মুখসারির দেশ হচ্ছে ইয়েমেন। সেখানে বছরজুড়ে এই পতঙ্গের উপস্থিতি থাকে।কেনিয়ায় ফসলের ক্ষেতে পঙ্গপালের যে আক্রমণ তা এখন গোটা দেশকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে।
পবিত্র কোরআনে পঙ্গপালের বিবরন- পবিত্র কোরআন এবং অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থে পঙ্গপালকে মহান স্রষ্টার শাস্তির পদক্ষেপ হিসেবে বর্ননা করা হয়েছে।

সূরা ইব্রাহীমের ৪৪ নং আয়াতে আছে
وَأَنذِرِ النَّاسَ يَوْمَ يَأْتِيهِمُ الْعَذَابُ فَيَقُولُ الَّذِينَ ظَلَمُواْ رَبَّنَا أَخِّرْنَا إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ نُّجِبْ دَعْوَتَكَ وَنَتَّبِعِ الرُّسُلَ أَوَلَمْ تَكُونُواْ أَقْسَمْتُم مِّن قَبْلُ مَا لَكُم مِّن زَوَالٍ৪৪) মানুষকে ঐ দিনের ভয় প্রদর্শন করুন, যেদিন তাদের কাছে আযাব আসবে। তখন জালেমরা বলবেঃ হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে সামান্য মেয়াদ পর্যন্ত সময় দিন, যাতে আমরা আপনার আহবানে সাড়া দিতে এবং পয়গম্বরগণের অনুসরণ করতে পারি। তোমরা কি ইতোপূর্বে কসম খেতে না যে, তোমাদেরকে দুনিয়া থেকে যেতে হবে না?

সূরা সিজদা এর ২১ নং আয়াতে উল্লেখ আছে وَلَنُذِيقَنَّهُمْ مِنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ বাংলা আনুবাদ- আর অবশ্যই আমি সতাদেরকে গুরুতর আযাবের পূর্বে লঘু আযাব আস্বাদন করাব, যাতে সতারা ফিরে আসে। সূরা কামারের ৭ নং আয়াতে
خُشَّعًا أَبْصَارُهُمْ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ كَأَنَّهُمْ جَرَادٌ مُّنتَشِرٌ মানে হল- তারা তাদের দৃষ্টি অবনত অবস্থায় কবর থেকে বের হয়ে আসবে।মনে হবে তারা যেন বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল। They will come forth,- their eyes humbled – from (their) graves, (torpid) like locusts সূরা আল আ’রাফের ১৩২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
 وَقَالُوا مَهْمَا تَأْتِنَا بِهِ مِنْ آَيَةٍ لِتَسْحَرَنَا بِهَا فَمَا نَحْنُ لَكَ بِمُؤْمِنِينَ“তারা (তথা ফেরাউন ও তার দলবল মুসা-আ.কে) আরও বলল, আমাদের উপর জাদু করার জন্য তুমি যে নিদর্শনই নিয়ে আস না কেন আমরা কিন্তু তোমার উপর ঈমান আনব না।” 

সূরা আল আরাফের ১৩৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
 فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الطُّوفَانَ وَالْجَرَادَ وَالْقُمَّلَ وَالضَّفَادِعَ وَالدَّمَ آَيَاتٍ مُفَصَّلَاتٍ فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا مُجْرِمِينَ
“সুতরাং আমি (আমার ক্ষমতার নিদর্শন হিসেবে) তাদের উপর পাঠিয়ে দিলাম তুফান, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত (প্রবাহ) প্রভৃতি বহুবিধ নিদর্শন একের পর এক। তারপরেও তারা গর্ব করতে থাকল। বস্তুতঃ তারা ছিল অপরাধপ্রবণ।”
হাদীসে পঙ্গপালের বিবরনইবনে ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাঃ বলেছেনঃ খাদ্যরূপে ‘দু’প্রকারের মৃত প্রাণী এবং দু’প্রকার রক্তকে আমাদের মুসলিমদের জন্য হালাল করা হয়েছে। দু’প্রকার মৃত প্রাণী হচ্ছেঃ টিড্ডি (পঙ্গপাল) ও মাছ। এবং রক্তের দু’প্রকার হচ্ছে হালাল প্রাণীর কলিজা ও হৃৎপিণ্ড।বুখারী ৫৪৯৫, মুসলিম ১৯৫২, মুসলিম ১৮২১, ১৮২২, নাসায়ী ৪৩৫৬, ৪৩৫৭, আবূ দাউদ ৩৮১২, আহমাদ ১৮৬৩৩, ১৮৬৬৯, দারেমী ২০১০।

আমাদের আশংকা পাকিস্তান ও ভারতের পর বাংলাদেশেও আসতে পারে এই পঙ্গপাল। তবে আমরা যতটা বুঝতে পারি এ বছরে তেমন ঝুঁকি নাই, কিন্তু আগামী বছরের জন্য আমাদের সতর্ক হতে হবে।’এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন  যেহেতু পঙ্গপালের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বাতাসের উষ্ণতার গতি অনুযায়ী এরা চলাফেরা করে এবং এক জায়গার খাবার ফুরালেই নতুন জায়গার খোঁজ করে তারা, সে কারণে কৃষি অধিদপ্তরের আশংকা বাংলাদেশেও আক্রমণ হতে পারে পঙ্গপালের। বিশেষজ্ঞ ইবনে জাহান জানিয়েছেন, পঙ্গপালের সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকানোর জন্য সরকার, জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (ফাও) এর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন তারা।তবে তিনি জানিয়েছেন যে, গত ৫৫ বছরের মধ্যে পঙ্গপালের আক্রমণ হয়নি এ অঞ্চলে।যেহেতু এই পতঙ্গের ঝাঁক মরু এলাকা থেকে এসেছে, কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করেন বাংলাদেশে আক্রমণ হলে দেশের শুষ্ক ও খরাপ্রবণ এলাকায় সে ঝুঁকি বেশি থাকবে

পঙ্গপালের আক্রমণের শিকার হয়েছে সৌদি আরব। সৌদি আরবের প্রায় সব ক’টি অঞ্চলেই হানা দিয়েছে পঙ্গপাল। পঙ্গপালের আক্রমণে ইতোমধ্যে দেশটির জাজান, আসির, আল-বাহা, আল-লেখ, কুনফোদাহ ও মক্কার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঝাঁকবদ্ধ পতঙ্গ পঙ্গপালের তীব্র আক্রমণে বিপাকে পড়েছে পাকিস্তান। ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে জরুরি অবস্থা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ঢুকে পড়েছে পতঙ্গটি। এছাড়া সোমালিয়াতেও সম্প্রতি এ নিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। জাতিসংঘের এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, সোমালিয়াসহ পূর্ব আফ্রিকায় পঙ্গপালের আক্রমণে মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে। জিবুতি ও ইরিত্রিয়ায় ৩৬ হাজার কোটি পতঙ্গের আক্রমণে খাদ্য নিরাপত্তায় ভয়াবহ হুমকি তৈরি হয়েছে
পঙ্গপাল দমনে আমেরিকার ব্যর্থ চেষ্টা।১৯৩৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে পঙ্গপালের এক বিশাল স্রোত নির্মূল করতে চলন্ত ট্রেন থেকে আগুন নিক্ষেপ করেছিল সেনাবাহিনী। তবে তাদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। পঙ্গপাল সব বাধা অতিক্রম করে জমির সব ফসল খেয়ে ফেলে।৮০ বছরের বেশি সময় পরেও, ভয়ঙ্কর পঙ্গপালের ঝাঁক নিয়ন্ত্রণ করার কোন কার্যকরী উপায় বের করতে পারেনি আমেরিকা।

গত চার মার্চ ২০২০  থেকে  ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপালের আক্রমনের শিকার হচ্ছে ইসরাইল। ৪ ই মার্চ থেকে মিসর থেকে ইসরাইলি ভূখণ্ডে আক্রমণ চালিয়েছে এরা। মিশর বলছে এই সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। (খবর রয়টার্স)। পঙ্গপালের কারণে বাড়ির বাহিরে বের হতে পারছে না মানুষ । আক্রমণের কারণে ফসলের বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে স্থল ও বিমান থেকে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হচ্ছে। হজরত মুসার (আ.) আমলেও পঙ্গপালের আক্রমণ হয়েছিল।  হজরত মুসার বাণী মানতে অস্বীকার করলে ফেরাউনের ওপর ১০টি মহামারী নাজিল হয়েছিল। পঙ্গপালের আক্রমণ সেই ১০ টির মধ্যে অষ্টম নাম্বার। তারা মিসরের শস্যক্ষেত্রে আক্রমণ করেছিল। রয়টার্স জানায়,২০২০ সালের  মার্চ মাসের তিন প্রথম সপ্তাহ ধরে মিসর সীমান্ত থেকে ইসরাইলি ভূখণ্ডে ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল অনুপ্রবেশ করছে। এগুলোকে বাইবেলে বর্ণিত আল্লাহ্‌র গজব হিসেবে দেখছেন ইসরাইলিরা। ফেরাউনের ওপর গজব হিসেবে পঙ্গপালের আক্রমণ হয়েছিল। এ সময় কায়রো থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলীয় নেগেভ মরুভূমিতে অনুপ্রবেশ শুরু করে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, বাতাস ও জলবায়ুর পরিবর্তিত অবস্থার কারণে পঙ্গপালের আন্তঃসীমান্ত অনুপ্রবেশ বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য ইসরাইল পঙ্গপালের বিরুদ্ধে রণপ্রস্তুতি নিয়েছে। শরু হয়েছে স্থল ও বিমান হামলা। পঙ্গপালের গতিবিধি সম্পর্কে জানানোর জন্য খোলা হয়েছে হটলাইন।ইসরাইলের কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০০৫ সালের পর এই প্রথম ইসরাইলে পঙ্গপালের আক্রমণ হলো। তবে এবার যেভাবে হামলা হয়েছে ১৯৫০ এর দশকের পর এরকম হামলা আর হয়নি।

যে সকল স্থান শস্য এবং সবুজ তৃণগুল্ম বা গাছপালায় আচ্ছন্ন ছিল পঙ্গপালের আবির্ভাবের কয়েক ঘণ্টা পরেই দেখা গেল, সে সব স্থানের চেহারা একেবারে বদলে গেছে। কোনও স্থানেই আর সবুজের চিহ্ন মাত্র নেই। ঘাস-পাতা, শাক-সব্জির তো কথাই নেই, বড় বড় গাছপালা সকলই পত্রশূন্য অবস্থায় বিরাজ করছে। পঙ্গপালেরা বহু বিস্তীর্ণ প্রান্তরের যাবতীয় পত্র-পল্লব শস্যাদি নিঃশেষে উজাড় করে দেশকে মরুভূমিতে পরিণত করে উড়ে গেছে। মোটের উপর কোনও স্থানে পঙ্গপাল আবির্ভাবের পূর্বে এবং পরের অবস্থা দেখলে একথা সহজেই মনে হবে যেন কোনও অদ্ভুত যাদুবিদ্যাবলে দেশটা রাতারাতি এভাবে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। পঙ্গপালের উৎপাত সম্বন্ধে প্রাচীন মিশরের একটি বর্ণনায় উল্লেখিত আছে – পরমেশ্বর আমাদের দেশের উপর দিয়ে সারাদিন সারারাত পূর্ব দিকের বায়ু প্রবাহিত করালেন। প্রভাত হবার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ব বায়ু পঙ্গপালের আবির্ভাব ঘটলো। পঙ্গপালেরা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো। তারা যেন পৃথিবীর সর্ব স্থান ঢেকে ফেললো। কাজেই দেশ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। দেশের যেখানে লতাপাতা, শাক-সব্জি, গাছপালা ছিল, তা সবই নিঃশেষ করে ফেললো। বিস্তীর্ণ মিশরের কোথাও একটু সবুজের চিহ্নমাত্র রইলো না।

জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (ফাও) বলছে, এক বর্গকিলোমিটার আকারের পঙ্গপাল এক সঙ্গে যে খাবার খায় তা দিয়ে ৩৫ হাজার মানুষকে এক বছর খাওয়ানো সম্ভব। একটি বড় পঙ্গপাল দিনে ১২০ মাইল পর্যন্ত জমির ফসল খেয়ে ফেলতে পারে। কেবল খাবারই খায় নাজাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ২০ শতাংশ ভূমি পঙ্গপালের আক্রমণের শিকার হয়। বিশ্বের দরিদ্রতম ৬৫ টিরও বেশি দেশে এর প্রকোপ দেখা যায় এবং বিশ্বের জনসংখ্যার দশ ভাগের এক ভাগের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

বিজ্ঞানের এই অগ্রগতির যুগে আজও পঙ্গপালের উপদ্রব প্রতিকারের তেমন কোনও কার্যকর পন্থা আবিষ্কৃত হয়নি এখনো পর্যন্ত। ১৯২৮ সালে ডানাশূন্য অপরিণত বয়স্ক পঙ্গপালের আক্রমণে প্যালেস্টাইন এক প্রকার শ্মশানে পরিণত হয়েছিল। ১৯২৫ সালে মিশরে পঙ্গপালের আক্রমণ হয়। কিন্তু কীটতত্ত্ববিদ বৈজ্ঞানিকদের সমবেত প্রচেষ্টায় মিশর সে যাত্রায় অনেকটা আত্মরক্ষায় সক্ষম হয়েছিল। আলজিরিয়া, পারস্য, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও রাশিয়ার বহু স্থানে কয়েক বছর পর পর পঙ্গপালের উপদ্রব হয়। তার ফলে সেখানে খাদ্য-রেশনের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। ১৯২৬ সালে একমাত্র উত্তর ককেশাস প্রদেশেই প্রায় ৮০০০০ একর জমির গম, ভুট্টা, বজরা প্রভৃতি শস্য পঙ্গপালের কারনে ধ্বংস  হয়েছিল। এ থেকেই পঙ্গপালের উপদ্রবের ভয়াবহতার বিবরন সহজেই অনুধাবন করা যায়।

পঙ্গপালের দল এবার হানা দিল ভারতের রাজধানী দিল্লিতে৷ আজ শনিবার সকালে গুরুগ্রামের আকাশ ছেয়ে যায় পঙ্গপালে৷ কোটি কোটি পঙ্গপাল দখল নেয় গুরুগ্রাম৷ সেখান থেকে দুপুরেই কয়েক কোটি পঙ্গপাল হানা দিল দিল্লি৷ দক্ষিণ দিল্লির ছতরপুরে হামলা চালাল পঙ্গপালের দল৷

লেখকঃ ফিরোজ আলম, শিক্ষক ও কলামিস্ট

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর