,

মুক্তিযুদ্ধ আর্কাইভ থেকে নেওয়া ছবি।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পিএইচডি মাত্র ৪০

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গত ৪৭ বছরে ৪০টি পিএইচডি গবেষণা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টিই হয়েছে বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোয়। বাংলাদেশিরা বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে করেছেন—এমন পিএইচডির সন্ধান পাওয়া গেছে পাঁচটি।

বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধের যে ব্যাপ্তি ও বহুমাত্রিকতা, সেই তুলনায় উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রে বড় গবেষণা বা পিএইচডির এ সংখ্যাকে নগণ্য বলে মনে করেন গবেষকেরা। তাঁরা মনে করেন, শিক্ষকদের অনীহা, বিভাজিত দলীয় রাজনীতি, প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব এবং তথ্যপ্রাপ্তিতে সরকারি পর্যায়ে বাধা দান পিএইচডি কম হওয়ার কারণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘যুদ্ধ বা এর মতো বড় ঘটনার পরপরই বড় গবেষণা হওয়া জটিল। তবে আমরা মুক্তিযুদ্ধের পর অনেকটা সময় পার হয়ে এসেছি। এত দিন আমাদের উচ্চশিক্ষার গবেষণার স্তরে মুক্তিযুদ্ধের উপস্থাপন এত কম হওয়া কিছুটা হতাশাব্যঞ্জক।’

বাংলাদেশে এ–যাবৎ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হওয়া গবেষণার দুটি তালিকা পাওয়া গেছে। এর একটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস গবেষণা কেন্দ্রের বই ‘বাংলাদেশে ইতিহাস গবেষণা’। অপরটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) কাজী মামুন হায়দারের সম্পাদিত বই ‘মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা : সটীক গ্রন্থ ঘটনাপঞ্জী’।
এই দুই বইয়ের তথ্যগুলো দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করছেন—এমন গবেষকদের কাছে থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণা হয়েছে। এর পাশাপাশি হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজে (আইবিএস)। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও আইবিএস মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি ১৭টি পিএইচডি হয়েছে। এরপরই আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে নয়টি পিএইচডি হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি এবং কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়েছে একটি।

ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন মনে করেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের যে বিশালত্ব, সে তুলনায় পিএইচডির সংখ্যা বেশ কম। এর পেছনে কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এর মধ্যে আছে এ নিয়ে গবেষণা যাঁরা করাবেন, সেসব শিক্ষাবিদের অনীহা। মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ৫০ বা ৬০-এর দশকে যেসব শিক্ষক যোগ দিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁদের একধরনের অনীহা এবং উন্নাসিকতা ছিল। তবে পরের প্রজন্মের শিক্ষকেরা এ বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন।’

বিভাগের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি হয়েছে ইতিহাস বিভাগে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে হওয়ার পিএইচডির সংখ্যা ১৩। এরপরই আছে বাংলা বিভাগ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই বিভাগে পিএইচডি হয়েছে ছয়টি। অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে আছে ইসলামের ইতিহাস, চারুকলা, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব। ভূগোল ও সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি হয়েছ একটি করে।

মানবিকবিদ্যার ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পিএইচডি যতটা হয়েছে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে সেই তুলনায় এ সংখ্যা একেবারে নগণ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান, লোকপ্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা সমাজবিজ্ঞানে মুক্তিযুদ্ধের পিএইচডি হয়নি। খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হওয়া পিএইচডির সংখ্যা তিন।

মুক্তিযুদ্ধের সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক গবেষণা কম হওয়া হতাশাজনক বলে মনে করেন গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সালাউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের যে অনীহার কথা বললেন, তাঁর সঙ্গে অধ্যাপক আমিনুজ্জামানও একমত। তবে গবেষণা কম হওয়ার পেছনে কিছু প্রায়োগিক কারণ ছিল বলেও মনে করেন তিনি। এর একটি হলো, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মেধাবী শিক্ষকদের একটি বড় অংশ রাষ্ট্র বিনির্মাণের কাজে লেগে যান। তিনি বলেন, দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষকদের শ্রমের ফসল। এভাবে মেধাবীদের একটি অংশ রাষ্ট্রীয় কাজে অংশ নেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মেধাবীদের যে অংশ দেশের বাইরে গিয়ে পিএইচডি বা অন্যান্য গবেষণা করেছে, তাদের গবেষণার বিষয়ও মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। কেন? এর কারণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আমিনুজ্জামান মনে করেন, পাকিস্তান আমলে একজন মেধাবীর পক্ষে দেশের বাইরে যাওয়াটা ছিল স্বপ্নের মতো। দেশ স্বাধীনের পর সেই সুযোগ তৈরি হলেও তখন পিএইচডির দাতা দেশগুলোর শর্ত মেনেই কাজ করতে হতো। তখনকার সময়ে গ্রাম উন্নয়ন, উন্নয়ন ছিল তাদের প্রাধান্যের তালিকায়। ১৯৯০-এর দশকের পর এসব গবেষণার ক্ষেত্রে দাতা দেশগুলোর শর্ত কিন্তু শিথিল হয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ে বাইরে পাঠানো হয়। সে ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধকে পছন্দ করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারপরও এ নিয়ে কাজ হচ্ছে না কেন, সে বিষয়টি ভাবনার বলে মনে করে সালাউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান।

গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের প্রাপ্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত গবেষণার ক্ষেত্রে এমন তথ্যের যথেষ্ট ঘাটতি আছে বলেই গবেষকদের মত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ এ প্রসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে যান। তাঁর ইচ্ছে ছিল গবেষণার বিষয় হবে বাংলাদেশ। কিন্তু দেখা গেল, এ-সংক্রান্ত বইপত্রের পরিমাণ অনেক কম। অথচ ভারত বা এ অঞ্চলের একাধিক দেশ নিয়ে বইয়ের পাহাড়। ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘শেষতক বাংলাদেশের বাইরের একটি বিষয় নিয়ে কাজ করতে হলো। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে আমাদের প্রয়োজনীয় গবেষণার রসদের অভাব রয়েছে।’

যে ৪০টি পিএইচডির সন্ধান পাওয়া গেছে, এর মধ্যে ২১টিই হয়েছে ২০০৭ সালের পর থেকে গত বছর পর্যন্ত। আশির দশকে এ নিয়ে কোনো পিএইচডির সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কয়েকজন গবেষক বলেছেন, সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ইতিবাচক অবস্থানের ফলে গত এক দশকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার পরিমাণ বেড়েছে বলেও মনে করেন তাঁরা। মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু—এই দুই নাম রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রায় নিষিদ্ধ ছিল। সেখানে বড় ধরনের গবেষণা হবে কী করে?’

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষণার বড় উৎস হতে পারে সেই সময়ের দলিল বা নথি। তবে এমন অসংখ্য নথি আছে, যা সরকার দেয় না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এসব নথি মানুষ পায় না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ধারাবাহিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন আফসান চৌধুরী। নিজের অভিজ্ঞতা তিনি বললেন, ‘আমি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে কোনো তথ্য পাইনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে যে তথ্য আছে, তারাও সেগুলো দিতে আগ্রহী না।’

আফসান চৌধুরী মনে করেন, এখন সময় হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের দলিল প্রকাশের। এ ক্ষেত্রে জাতীয় আর্কাইভ এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ভূমিকা নিতে পারে। তবে জাতীয় আর্কাইভে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে থাকা দলিল জমা দেওয়ার জন্য একাধিকবার বলা হলেও এ নিয়ে কাজ এগোয়নি। এ তথ্য জানান মুনতাসীর মামুন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম। অধ্যাপক কাশেম বলেন, ‘আমি জাতীয় আর্কাইভের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলাম। বারবার তাগাদা দিয়েও দলিল জোগাড় করতে পারিনি। এ ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা একটি বড় সমস্যা।’

মুক্তিযুদ্ধের দলিল একত্র করা এবং তা প্রকাশের জন্য কতটুকু তৎপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়? জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এমন দলিল যদি থেকে থাকে, তবে সেগুলোর অনুসন্ধান এবং জোগাড় করব। এসব মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরেই রাখতে পারি। এসব মুক্ত করতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।’

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক এযাবৎ হওয়া কিছু কিছু পিএইচডির মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। যত পিএইচডি হয়েছে, এর মধ্যে পাঁচটিই বিভিন্ন জেলায় মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অবস্থার বিশ্লেষণ। আবার সাহিত্য, নাট্যকলা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। সংবাদপত্রের ভূমিকা নিয়ে একাধিক গবেষণা আছে। অধ্যাপক ইমতিয়াজ মনে করেন, পিএইচডির মতো গবেষণার উদ্দেশ্য নতুন কোনো ধারণা সৃষ্টি করা। কিন্তু কয়েকটি গবেষণায় সেই চেষ্টা দেখা যায়নি। শুধু ধারাবাহিক বর্ণনা আছে সেগুলোয়।

ভালো গবেষণা না হওয়ার ক্ষেত্রে এই বিশাল ঘটনাকে দলীয় রাজনীতির মোড়কে ঠাসার চেষ্টাকেও দায়ী করেন গবেষকেরা। রাজশাহী বিভাগের একটি সরকারি কলেজের শিক্ষক এই প্রতিবেদককে জানান, তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে পিএইচডি করতে গিয়ে নিরস্ত হন তাঁর অধ্যক্ষের কথায়। অধ্যক্ষ তাঁকে জানান, যদি সরকার পরিবর্তন হয়, তবে হয়তো তাঁকে বিপদে পড়তে হবে। আর এ জন্য তিনি এ পথে আর এগোননি।

সরকারি আনুকূল্য পাওয়া বা না পাওয়া নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণার চর্চা আবর্তিত হচ্ছে বলে মনে করেন আফসান চৌধুরী। আর তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে আমরা আবেগ থেকে মেধার পরিসরে উত্তীর্ণ হইনি। একে আমরা দেশপ্রেমের অংশ বলে মনে করি। বিদ্যাচর্চার অংশ অনেক ক্ষেত্রেই মনে করি না।’
(এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর