,

চৈত্রসংক্রান্তি ও লোকবিশ্বাস

প্রতিটি বাংলা মাসের সঙ্গেই আমাদের স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্য। আষাঢ়-শ্রাবণ মাস কল্পনার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের স্মৃতিতে ঝমঝম করে উঠে বৃষ্টির শব্দ! জ্যৈষ্ঠ মাস মনে উঠলেই আম-কাঁঠালের শুধু ছবিই না, অচেতন মনে কিছুটা গন্ধও পাই! মাঘ মাসের নাম নিলেই প্রচণ্ড শীতে শরীর একটু শিরশির করে ওঠে। মাঘের পরেই রুক্ষ ঊষর প্রকৃতি তার খোলস পাল্টে নতুন রূপ ধারণ করে। এ সময় পরিবর্তিত হয় প্রকৃতির সুর এবং রূপ, গাছে গাছে কচি সবুজ পাতা, আমের বোলের ম ম গন্ধে কবি, সাহিত্যিক, গীতিকারও মাতোয়ারা হন। এই সময়টা বসন্তকাল। আমরা পহেলা ফাল্গুনে বসন্ত উৎসব করে বসন্তকে বরণ করি। আর এই বসন্তকাল শেষ হয় চৈত্রসংকান্তি উৎসবে—আমরা প্রস্তুত হই ভয়াল রুদ্র বৈশাখকে বরণ করার জন্য। চৈত্রের প্রচণ্ড দাবদাহ ও খরা-রৌদ্রের পরে বৈশাখ আসে শীতল জলধারা নিয়ে। এই জলে উর্বর হয় ঊষর ভূমি আর বৃক্ষগুলো হয় আরো সতেজ ও সবুজ।

বাংলা মাস যেমন প্রকৃতিঘেঁষা, তেমনি বাংলার বেশির ভাগ উৎসব-অনুষ্ঠান ধর্মঘেঁষা। এ দেশে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান মোগল আমলে অনেকটা সর্বজনীনতা পায়। আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরীতে বলেছেন, ভারতবর্ষে প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত সব উৎসব-অনুষ্ঠান বাদশাহ বজায় রেখেছেন। তিনি জানেন, আমোদ-আহ্লাদ ও উৎসব মাঝেমধ্যে না হলে মানুষ দীর্ঘজীবী হয় না। প্রতিটি জাতিই নিজ নিজ জাতীয় প্রচলন অনুযায়ী উৎসবে মত্ত হতো। সম্রাট আকবরের সময় উৎসব ব্যয় সরকারি ভাণ্ড থেকে দেওয়া হতো। সেই সময়ে সরকারি প্রণোদনার ফলে ধর্মীয় উৎসবও অনেকটা ধর্মের গণ্ডি ভেঙে ফেলে।

চৈত্র মাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চিত্রা নক্ষত্রের নাম আর বৈশাখ নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশাখা নক্ষত্রের নাম। চিত্রা নক্ষত্র বিশাখায় স্থানান্তরের আগে যে সংক্রান্তি বা চক্র, তা-ই চৈত্রসংক্রান্তি। সংক্রান্তি মানে এক ক্রান্তি থেকে অপর ক্রান্তিতে যাওয়া। ক্রান্তির সঞ্চার বা সাঁতার। আমাদের গ্রহ-নক্ষত্র একটা নির্দিষ্ট চক্রে ঘুরে চক্র পূর্ণ করে থেমে থাকে না, ক্রমাগত ঘুরতেই থাকে পরের চক্র পূর্ণ করার জন্য। আমাদের ঋতুর চক্র, মাসের চক্রও চরকার মতো ঘুরে পুরনো নতুনের ভেতর ঢোকে কিংবা নতুন পুরনোর ভেতর। বঙ্গাব্দের হিসাবকে নাক্ষত্রিক বলে। এটা সূর্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে সময়ের শেষ বা শুরু বলে কিছু নেই। বারো মাসের বছরের শেষ মাস চৈত্রেও বছরের শেষ হয় না।

চৈত্রে সংক্রান্তি হয় আগামী বছরের সঙ্গে। এ অনুষ্ঠানের শুরুতে কোনো এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্য শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়, একজন শিব ও গৌরী সেজে নৃত্য করে এবং অন্য সব ভক্ত নন্দিভৃঙ্গি, ভূতপ্রেত, দৈত্যদানব প্রভৃতি সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলে। ভারতবর্ষে বহু প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন ধরনের তন্ত্রমন্ত্র বা ভাগ্য গণনার লোকবিশ্বাস প্রচলিত। চৈত্রসংক্রান্তির অনুষ্ঠানাদিকে একদিকে বলা যায় এসব লোকবিশ্বাস থেকে ধর্মে উত্তরণ কিংবা আবার ধর্মবিশ্বাসকে লোকবিশ্বাসের অবতরণও বলা যেতে পারে! তন্ত্রমন্ত্র, ভাগ্য গণনার পাশাপাশি শিবপূজা, গাজনের মেলাসহ বিভিন্ন ধরনের উৎসব-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় চৈত্রসংক্রান্তিতে। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি জড়িয়ে আছে চৈত্রসংক্রান্তির অনুষ্ঠানে, তা হলো কৃষিজীবী মানুষের জীবন ও জীবিকার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা। চৈত্রের প্রচণ্ড তাপে মাঠঘাট ফেটে চৌচির হয়ে উঠলে কৃষককুল চৈত্র মাসজুড়ে বর্ষার আগমন প্রার্থনা করতে থাকে আর শেষ দিনে নানা উপাচার ও নৈবেদ্য দিয়ে সন্তুষ্ট করতে চায় সূর্য দেবতাকে। তারা এ সময় নিজের ও প্রকৃতির খোঁজ নেয়।

প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল অভিজ্ঞ পোড় খাওয়া কৃষকরা বেঁচে আছে তাদের প্রজ্ঞার কারণে! এই অভিজ্ঞতা থেকেই প্রকৃতির খোঁজ নেওয়ার দায়িত্ব দেয় একজন নারীর ওপর, যিনি কিনা পুরুষ অপেক্ষা একটু বেশি সেনসেটিভ; যদিও বলা হয় কৃষিসভ্যতার জন্মই হয়েছে নারীদের হাত ধরে। আদিমকালে পুরুষরা যখন শিকারে বেরোত নারীরা তখন ঘরে বসে থাকত না। তারা সেই সময় তাদের আবাসের আশপাশে বিভিন্ন ফল ও শস্যের বীজ রোপণ করে উত্পাদনব্যবস্থার যাত্রা শুরু করেছিল। প্রকৃতির খোঁজ নেওয়ার জন্য সেই নারীর ওপর নির্ভরতা নিঃসন্দেহে প্রজ্ঞার পরিচায়ক। এই দিনে শাস্ত্র ও লোকাচার অনুসারে স্নান, ব্রত, দান, উপবাস প্রভৃতি ক্রিয়াকর্মকে পুণ্যের কাজ মনে করা হয়। চৈত্রসংক্রান্তিতে গ্রামাঞ্চলে মেলা বসে। গ্রামীণ মেলা মানেই মেয়ে-জামাইসহ নিকটাত্মীয়কে বাড়িতে দাওয়াত এবং পোশাক-আশাকসহ বিভিন্ন উপহারসামগ্রী প্রদান করা হয়। পাশাপাশি এ ধরনের ধর্মীয় উৎসবের ভেতর সাধারণ মানুষ খুব বেশি ধর্মকে দেখে না, মেলাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সব ধর্মের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। এদিন মেলা ছাড়াও হালখাতা, লাঠিখেলা, সঙযাত্রা, রায়বেশে নৃত্য, শোভাযাত্রা, ভূত তাড়ানো অনুষ্ঠান, শূলফোঁড়া, বাণফোঁড়া, বড়শিগাঁথা, চড়কগাছে ঘোরা প্রভৃতি দৈহিক কলাকৌশল প্রদর্শিত হয়। আর এগুলো মানুষ শুধু উপভোগ করেই না, ধীরে ধীরে তা আমাদের ঐতিহ্যেরও অংশ হয়ে যাচ্ছে। সনাতন ধর্মের লোকজন ছাড়াও বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী এই দিনটিকে নানা উৎসব-অনুষ্ঠানের মধ্যে পালন করে। এর মধ্যে বিজু ও বৈসাবি উৎসব অন্যতম। বিশেষ করে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙামাটি অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ অনেক আগে থেকেই বিজু ও বৈসাবি উৎসবে মেতে ওঠে।

উৎসবে যখন মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে তখন তারা উৎসবটা উৎসব হিসেবেই নেয়—হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি এমনটিই নির্দেশ করে। নানা আয়োজনে যখন চৈত্রসংক্রান্তি উৎসব শেষ হয় তখন মানুষ আরো বৃহৎ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলা নববর্ষ পালনে মাতোয়ারা হয়। এটা মোগল আমলের খাজনা প্রদানের উৎসব নয়, বাঙালি উৎসমূল গৌরব ও ঐতিহ্য খোঁজার উৎসব। আর এটাতে কোনো ধর্ম নেই!

ধর্ম যেখানে হানাহানি, রক্তপাত, সাম্প্রদায়িকতা ও রাজনীতির বিষপাপে জর্জরিত, সেখানে এ ধরনের লোকোৎসবগুলো সব ধর্মের মানুষের সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিকে বৃদ্ধি করে চলে। কাজেই অসাম্প্রদায়িক যে বাংলাদেশের স্বপ্নের কথা বলা হয়, সেই স্বপ্নের বীজ লুকিয়ে আছে চৈত্রসংক্রান্তির মতো লোকোৎসবগুলোর ভেতর, যার সৃষ্টিই হয়েছে লোকবিশ্বাস থেকে।

লেখক : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর