,

মাদরাসা শিক্ষা এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা

মাদ্রাসা শিক্ষা শুধুমাত্র সনদে সমমান হয়েছে, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৯৮৬ সালের ২৩ শে ফেব্রুয়ারি “মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে সাধারণ শিক্ষার সমমান নির্ধারন” শীর্ষক একটি পরিপত্র জারি করে যার স্মারক নং শা৯/৬ এনসি ১৩/৮৪/১৪২(৪০)- শিক্ষা, তাং- ২৩/০২/১৯৮৬ইং। এই পরিপত্রে মাদ্রাসা শিক্ষার এবতেদায়ী, দাখিল ও আলিমকে সাধারণ শিক্ষার যথাক্রমে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সমমান ঘোষনা করা হয়। শুরু হয় ফাজিল/কামিল সমমান পাওয়ার প্রতিক্ষার পালা। প্রতিক্ষার অবসান ঘটে ২০০৬ সালে। ২০০৬ সালে তৎকালীন সরকার মাদ্রাসার ফাজিল ও কামিলকে সমমান ঘোষনা করেন এবং Islamic university (amendment) act – ২০০৬ অনুসারে ফাজিল মাদ্রাসা ১০৮৬টি, কামিল মাদ্রাসা ১৯৮টি, সর্বমোট ১২৮৪টি মাদ্রাসাকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয় এবং সিদ্ধান্ত হয় ২০০৬ সাল থেকে মাদ্রাসার ফাজিল/কামিল পরীক্ষা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রন করবে এবং দাখিল/আলিম পরীক্ষা পূর্বের ন্যায় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড নিয়ন্ত্রন করবে। এখানেই সমমানের গল্প শেষ, আর কোন ক্ষেত্রেই সমমানের নাম মাত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। ২০০৬ সালের পরে যারা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে ফাজিল/কামিল সনদ অর্জন করেছেন তাদের ক্ষেত্রে সমমান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু ২০০৬ সালের পূর্বে অর্জিত ফাজিল/কামিল সনদ দিয়ে(মাদ্রাসা বোর্ড প্রদত্ত) মাদ্রাসায় প্রশাসনিক (সহ-সুপার, সুপার,উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ) পদে চাকুরী করা কতটা যৌক্তিক? এছাড়া কর্মকর্তা/কর্মচারীগণের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পদ মর্যাদা মূল্যায়ন করে জাতীয় বেতন স্কেলে গ্রেড নির্ধারন করে সরকারী আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়। তাহলে মাদ্রাসার প্রশাসনিক পদে সমমানহীন সনদধারী যে সকল কর্মকর্তা সরকারের আর্থিক সুবিধা ভোগ করছেন, তাঁদের আর্থিক সুবিধা প্রাপ্তির বৈধতা কতটুকু ভেবে দেখা দরকার। অথচ দুঃখজনক বিষয় হলো দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী জেনারেল শিক্ষকগণ মাদ্রাসার প্রশাসনিক পদে নিয়োগ নিতে পারেন না কারণ মাদ্রাসার জনবল কাঠামোতে এই সুযোগ রাখা হয়নি। উল্লেখ্য- ২০১২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারীকৃত পরিপত্রে মাদ্রাসায় উপাধ্যক্ষ পদে জেনারেল শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ ছিল কিন্তু ২০১৩ সালের সংশোধিত পরিপত্রে তা স্থগিত করা হয়। এছাড়া জনবল কাঠামোতে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় কলেজ পর্যায়ে প্রতিটি আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক বিষয়ে প্রভাষক/সহঃ অধ্যাপক পদ সংখ্যা ২টি করে, বিজ্ঞান বিভাগের প্রতিটি বিষয়ে ১জন করে প্রদর্শক ও ল্যাব পিয়ন এর পদ আছে কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় কলেজ পর্যায়ে প্রতিটি আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক বিষয়ে প্রভাষক/সহ: অধ্যাপক পদ সংখ্যা ১টি করে এবং প্রদর্শক ও ল্যাব পিয়ন পদ নেই। আবার সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা ১৩০০ নম্বরের পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে কিন্তু মাদ্রাসায় সমমানের আলিম পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা ১৭০০ নম্বরের পাবলিক পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে। ফলে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়ন করতে চায় না, বিজ্ঞান চর্চা মুখ থুবড়ে পড়েছে। যেখানে সরকার জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়তে চায় এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে নিরলস ভাবে কাজ করছেন। দেশ উন্নয়নের সকল সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক এমন সময়ে মাদ্রাসায় এই মধ্যযুগীয় সিলেবাস অপ্রত্যাশিত। এই সিলেবাস বিজ্ঞানমনস্ক, সংস্কৃতিবান, অসম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ সৃষ্টির পরিপন্থী। এই সিলেবাস প্রনয়নের নেপথ্যে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্থ করার কোন ষড়যন্ত্র আছে কিনা খতিয়ে দেখা দরকার। এমতবস্থায়, মাদ্রাসার জনবল কাঠামো ও সিলেবাস সংশোধন করে যুগোপযোগী জনবল কাঠামো ও সিলেবাস প্রণয়নের মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় সত্যিকারের সমমান নিশ্চিত করা সম্ভব।

লেখক: প্রভাষক জহির উদ্দিন হাওলাদার
মহাসচিব
বাংলাদেশ মাদ্রাসা জেনারেল টিচার্স এসোসিয়েশন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর