,

অবশেষে প্রাণ ফিরল বাণিজ্যমেলায়

২৩তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা শুরু হলেও মেলার প্রাণ ক্রেতা-দর্শনার্থীদের তেমন একটা সাড়া মিলছিল না গত চার দিনেও। অবশেষে পঞ্চম দিন শুক্রবার সরকারী ছুটির দিন থমকে থাকা মেলায় প্রাণ সঞ্চার হয়েছে হাজার হাজার ক্রেতা-দর্শনার্থীর আগমনে। সেই সঙ্গে ক্রেতাদের আগমনে হাসি ফুটতে শুরু করেছে বিক্রেতাদের মুখেও। যদিও ‘ধাক্কাধাক্কির’ ভিড় এখনও হয়নি। তবে মেলা সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন আগামী ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থী বৃদ্ধি শুধু নয়, উপচে পড়া ভিড় হবে।

গত সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার মেলায় দর্শনার্থী বলতে ছিল সামান্যই। তবে শুক্রবার সেই অবস্থার পরিবর্তন আসে।

ছুটির দিনে অফিস ও কাজের চাপ না থাকায় অনেকেই পরিবার নিয়েও মেলায় আসেন। এছাড়াও স্কুল, কোচিংয়ের বিড়ম্বনা না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী দল বেঁধে আসছেন মেলায়

ঘুরতে। নানা বয়সের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে প্রাণ ফিরে পায় মেলার মাঠ। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, সকালের দিকে তেমন একটা মানুষ মেলামুখী হয়নি। তবে পৌষের মিষ্টি বিকেলের দিকে ভিড় তুলনামূলক বাড়তে থাকে। সন্ধ্যায় শীতের পোশাক গায়ে জড়িয়ে প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে মেলা ঘুরে দেখেন হাজারও মানুষ। বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী কিংবা বন্ধুদের আড্ডাস্থল হয়ে ওঠে মেলার প্রতিটি প্যাভিলিয়ন ও স্টল। কেউ কেউ সেলফিতে আড্ডার স্মৃতি ধরে রাখতেও দেখা গেছে। এবারের বাণিজ্যমেলার প্রথম শুক্রবার ছিল এটি। এদিন কেনার চেয়ে বিভিন্ন স্টল প্যাভিলিয়নে ঘুরেই দেখেছেন দর্শনার্থীরা। কোন প্যাভিলিয়ন বেশি সুন্দর হয়েছে সেটিও ছিল আলোচনায়।

মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, গৃহস্থালি এবং শিশু ও নারী সামগ্রীর স্টলগুলোতে ভিড় একটু বেশি। এছাড়াও ইলেকট্রনিক্স পণ্য, রান্নার সামগ্রী ও পোশাকের দোকানগুলোতেও এদিন চোখে পড়ার মতো ক্রেতা-দর্শনার্থী ছিল।

সবজি কাটার স্টলগুলোতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে সবজি কাটা দেখছেন। এদিন বেশি কেনাকাটা না থাকায় ঘুরে ফিরে ক্লান্ত হয়ে বেশিরভাগই বাচ্চাদের পার্ক ও মিনি সুন্দরবনের সামনে দাঁড়িয়ে সময় কাটান। এছাড়ও খাবারের স্টলগুলোতে ছিল বেশ ভিড়।

মেলায় দর্শনার্থী আব্দুল আমজাদ সরকারী চাকরি করেন। ছুটির দিনই তার পরিবার নিয়ে বের হওয়ার সময় হয়। তিনি বলেন, বন্ধের দিন বলেই তো পরিবারের সবাইকে নিয়ে মেলায় আসতে পারলাম। কিছু পণ্য ভাল লেগেছে তবে কেনা হয়নি। সামনের কোন ছুটির দিনে আবার আসব।

এদিকে, বন্ধুদের সঙ্গে মেলায় এসেছে তৌহিদ আদনান। নতুন নতুন ডিজাইন সংবলিত কিছু ব্লেজার ও কিছু নতুন পণ্যে আকৃষ্ট হয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, আজ অল্প কিছু কিনলাম আর বন্ধুদের সঙ্গে সেলফিতে খাওয়া দাওয়া করে সময় পার করলাম। এদিকে, বিভিন্ন বয়সীদের সেলফির উৎসব দেখা যায় এদিন। বিশেষ করে বাণিজ্যমেলার প্রধান ফটক পদ্মাসেতুর আদলে হওয়ার কারণে সবাই এর সামনে সেলফি উঠাতে মুখিয়ে ছিল। এছাড়াও বঙ্গবন্ধু প্যাভিলিয়নে, বিভিন্ন ফোয়ারার সামনে ও নান্দনিক ডিজাইনের প্যাভিলিয়নগুলোর সামনেও সেলফি উৎসব দেখা যায়।

এদিকে, মেলায় এদিন সকাল থেকেই প্রচুর নিরাপত্তা বলয় দেখা গেছে। মেলায় নিরাপত্তা নিয়োজিত একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ছুটির দিনগুলোতে বেশি দর্শনার্থীর চাপ থাকে। তাই অন্য দিনের চেয়ে নিরাপত্তাও বেশি থাকে।

ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ায় বিক্রেতাদেরও মুখে হাসি ফুটেছে। গত কয়েক দিন দর্শনার্থীরা শুধু ঘুরেই দেখেছেন বেশি তবে এদিন কিছু কিছু কেনাকাটা করার কারণেই বিক্রেতাদের এই খুশির কারণ। আপন ফ্যামনের এক বিক্রেতা বলেন, ‘দর্শক বেশি থাকলে কম বেশি বেচা কেনা হয়ই।’ ব্লেজার বিক্রেতা হাসুনুল বলেন, আজ ছুটির দিন হওয়ায় কিছুটা ভিড়ও যেমন বাড়ছে আমাদের বিক্রিও কিছুটা বাড়ছে। সামনের দিনগুলোতে বিক্রি বাড়বে এমন প্রত্যাশা তার।

এছাড়াও মেলায় খেলনা বিক্রিও ছিল দেখার মতো। যাদের সঙ্গে শিশু রয়েছে তারাই বেশি আমাদের শিশুদের খেলনার স্টলে যান। বিক্রেতা আলী আহসান বলেন, শিশুদের খেলনা এবং মহিলাদের সাজগোজের সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে বেশি। এর মধ্যে মহিলাদের চুরি ও চুলের খোপা, নেইলপলিশ, কানের দুল বিক্রি হচ্ছে বেশি। এ ছাড়া শিশুদের খেলনার মধ্যে পিস্তল, ডেমিন কার্ড, রিমোট কন্ট্রোল হেলিকপ্টার ও রেসিং কার বেশি বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও এদিন মিনি শিশুপার্কেও বেশ ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সবাই তার সন্তানকে আনন্দ দিতে আবদার পূরণ করতে বিভিন্ন রাইডে চড়িয়েছেন।

তরুণ তরুণীরাও বেশ উচ্ছ্বসিত ছিল মেলায়। এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা ঘুরে দেখেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গড়ে উঠা প্যাভিলিয়নটি। এর বাইরে তরুণরা ভিড় করেছেন বিভিন্ন ব্লেজারের স্টলগুলোতে। ব্লেজার ছাড়াও তারা বিদেশী প্যাভিলিয়ন ঘুরে দেখেন। বিভিন্ন ব্যান্ডের মানিব্যাগ, বেল্ট ও ঘড়ির স্টলগুলোতে ভিড় করেন। এদিকে, তরুণীদের ভিড় ছিল বিভিন্ন ফ্যাশন স্টলগুলোতে। যেখানে শোভা পাচ্ছে হরেক রং বেরঙের ও নানা ডিজাইনের থ্রি-পিস। এর বাইরে তারা ঘুরে দেখেন বিভিন্ন সাজসজ্জার স্টলগুলো। নাক-কানের দুল, বিভিন্ন পাখর বসানো চুড়ি বা খোপা বিভিন্ন রিং গলার মালা কিনতেও ব্যস্ত ছিলেন তারা।

এদিকে, মেলায় বসানো ডিজিটাল স্কীনটিও বেশ সাড়া ফেলেছে। বিভিন্ন বয়সের বিশেষ করে তরুণরা স্ক্রীন চেপে দেখছেন কোন প্যাভিলিয়ন বা স্টলের অবস্থান ঠিক দেখাচ্ছে কিনা। মেলায় বিভিন্ন ফুলের বাগান থাকায় এগুলোকে কেন্দ্র করেও বিনোদন খুঁজেছেন মেলায় আগতরা।

ইপিবি সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাণিজ্যমেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৫৮৯ স্টল ও প্যাভিলিয়ন থাকছে। দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য থাকছে দুটি শিশুপার্ক, সুন্দরবনের আদলে একটি ইকোপার্ক। নিরাপত্তায় মেলায় পুলিশ ও র‌্যাবের ওয়াচ টাওয়ারসহ আনসার ও ভিডিপি, পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং র‌্যাব সদস্যরা মোতায়েন থাকছে। সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য ১০০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বাণিজ্যমেলায় কোন সাপ্তাহিক ছুটি নেই। সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকবে। প্রবেশ ফি প্রতিজন ৩০ টাকা। ছোটদের জন্য ২০ টাকা। মেলায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া, ইরান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, নেপাল, হংকং, জাপান, আরব আমিরাত, মরিশাস, ঘানা, মরক্কো ও ভুটান। অংশগ্রহণকারী দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উৎপাদিত পণ্য প্রদর্শন করছে।

ইপিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, এদিন প্রথম শুক্রবার ছিল। তবুও আগত দর্শনার্থী ছিল আশানুরূপ। সামনের প্রতিটি ছুটির দিন উপচে পড়া ভিড় থাকবে বলে প্রত্যাশা করছেন তারা। আর উপচে পড়া ভিড় হলে বিক্রিও হবে বেশ জমজমাট সে আশা বিক্রেতাদের। আর শহুরের বদ্ধ জীবন আর ব্যস্ততার শহরের দর্শনার্থীরা খুঁজে ফেরেন শুধুই বিনোদন। বিনোদনের সঙ্গে কেনাটা তাদের একটা ঐচ্ছিক অংশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর