,

জ্যোতি বসুর কিছু অজানা কথা

জ্যোতি বসু আর তার ঠিক আগে যিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, সেই সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এতটাই ছিল, যার সঙ্গে এখনকার মুলায়ম সিং যাদব আর মায়াবতীর দ্বন্দ্বের তুলনা করা চলে। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাদের দুজনের মধ্যে ছিল ততটাই সখ্যতা। সেই নৈকট্য শব্দে বর্ণনা করা কঠিন।

সেই সময়ে জ্যোতি বসু ছিলেন বিধানসভার এক সাধারণ সদস্য। বেতন পেতেন মাসে ২৫০ টাকা। সেটারও বেশীরভাগ অংশ তিনি পার্টির কাজে দিয়ে দিতেন।

সিদ্ধার্থশঙ্কর যখন জ্যোতিবাবুর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন, তখন মাঝে মাঝেই উঁকি মেরে আসতেন তার রান্নাঘরের দিকে। সেদিন কী রান্না হয়েছে, সেটা এক নজরে দেখে নিতেন। একেবারেই সাধারণ রান্নাবান্না হত- ডাল, ভাত আর বেগুন ভাজা। পরে, যখন জ্যোতি বসু বিরোধী দলনেতা হলেন, তখন অবস্থার সামান্যই উন্নতি হয়েছিল। তার বেতন বেড়ে হয়েছিল মাসে ৭৫০ টাকা। সেই সময়েও জ্যোতি বসুর স্ত্রী কমলা বসু মাঝে মাঝেই সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কাছে অনুযোগ করতেন যে তিনি যেন তার বন্ধুকে একটু বোঝান যে সংসারটা কীভাবে চলছে!

সেই সময়েও মাসিক বেতনের প্রায় পুরো অংশটাই পার্টিকে দিয়ে দিতেন জ্যোতি বসু। মিসেস বসু বলতেন, “দুবেলা রান্নাবান্না করাই কঠিন হয়ে পড়ছে।”

একবার চন্দননগর থেকে কলকাতায় আসার সময়ে জ্যোতি বসু আর সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে কয়েকজন অল্পবয়সী মেয়ে ঘিরে ধরেছিল। জ্যোতি বাবু সেই সময়ে রীতিমতো স্টার নেতা। তাই অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল।

কিন্তু ওই মেয়েরা জ্যোতি বাবুর হাতের লেখায় ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারে নি। তারা চাইছিল সইয়ের সঙ্গেই তিনি যদি কয়েকটা লাইনও লিখে দেন। জ্যোতি বসু আর কিছু লিখতে চান নি, শুধু সই করে দিয়েছিলেন।

গাড়িতে ফিরে আসার পরে সিদ্ধার্থশঙ্কর মজা করে বলেছিলেন, “এত সুন্দরী মেয়েগুলোকে তুমি এক কথায় মানা করে দিলে? রবীন্দ্রনাথের কোনও লেখা থেকে একটা দুটো লাইন লিখে দিতে পারতে।” জ্যোতি বসু জবাব দিয়েছিলেন, “জানলে তো লিখব।”

বাংলাদেশ যুদ্ধের কিছুদিন আগে সিদ্ধার্থ শঙ্কর ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর বাড়িতে জ্যোতি বসুর একটা গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করেছিলেন।

কেউ যাতে জানতে না পারে, সেই জন্য রাত এগারোটায় বৈঠকের সময় ঠিক হয়েছিল। নজর এড়াতে নিজের স্ত্রী মালা রায়ের ফিয়াট গাড়িতে জ্যোতি বসুকে বসিয়ে নিজেই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর বাড়ি ১ নম্বর সফদরজং রোডে নিয়ে গিয়েছিলেন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়।

ঘণ্টাখানেকের ওই বৈঠকের পরে বাইরে বেরিয়ে রাস্তা গুলিয়ে ফেলেন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। অনেকক্ষণ ধরে দিল্লির রাস্তায় চক্কর কাটার পরে তিনি ঠিক করেন কোনও একটা থানায় গিয়ে সাহায্য চাওয়া উচিত।

জ্যোতি বসু বলেছিলেন, “তুমি কি বোকা নাকি! গোটা দুনিয়াকে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে জানাতে চাও যে আমি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে তার বাড়িতে গিয়েছিলাম?”

ঘটনাচক্রে মি. রায় ঠিক রাস্তা খুঁজে পেয়েছিলেন কিছুক্ষণ পরে, তাই আর সে যাত্রায় থানায় যাওয়ার দরকার পড়ে নি।

রাজনৈতিক বিরোধ থাকার স্বত্ত্বেও জ্যোতি বসু কংগ্রেসের আরেক বড় নেতা এ বি এ গণি খান চৌধুরীকে নিজের পরিবারের সদস্য বলেই মনে করতেন।

সবাই যখন মি. খান চৌধুরীকে ‘বরকতদা’ বলে ডাকত, জ্যোতি বাবু তাঁকে ‘সাহেব’ বলেই সম্বোধন করতেন।

মি. খানচৌধুরীর বোন প্রতি দুসপ্তাহে একবার করে বিরিয়ানি রান্না করে পাঠাতেন জ্যোতি বাবুকে। নিয়মের ব্যতিক্রম হলে জ্যোতি বসু ফোন করে তাঁকে জিজ্ঞাসা করতেন, “কী পাঠাওনি কেন?”

পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক তরুণ গাঙ্গুলি একটা মজার ঘটনা শোনালেন। একবার জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতাকে ডেকে বললেন, “বিধানসভার ভেতরে কিছু ইস্যু তুলে ধরতে পার না যাতে সরকার একটু বিব্রত হয়? একটু কড়া কড়া ভাষায় বলবে ইস্যুগুলো।”

এই কথা বলে তিনি কাগজ কলমে লিখে দিলেন যে পরের দিন বিধানসভায় কোন কোন ইস্যুতে সরকারকে আক্রমণ করতে পারে কংগ্রেস।

সীতারাম ইয়েচুরি বলছিলেন, ১৯৯৩ সালে জ্যোতি বসুকে কিউবায় যান। একদিন রাতে যখন ঘুমোতে যাবেন, সেই সময়ে খবর আসে যে ফিদেল কাস্ত্রো দেখা করতে চান জ্যোতি বসুর সঙ্গে।

সীতারাম ইয়েচুরি বর্তমানে সি পি আই এম দলের সাধারণ সম্পাদক।

মি. ইয়েচুরিকে সঙ্গে নিয়ে জ্যোতিবাবু মাঝ রাতে ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে দেখা করতে পৌঁছলেন।

“প্রায় দেড় ঘন্টা চলেছিল ওই বৈঠক। জ্যোতিবাবুকে ফিদেল একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছিলেন। যেমন ভারতে কয়লার উৎপাদন কত, কোথায় কীরকম লোহা পাওয়া যায়, ইত্যাদি। একটা সময়ে জ্যোতিবাবু বাংলায় আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ কি আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছে না কি?”

পরের দিন জ্যোতি বসু যখন হাভানা বিমানবন্দরে পৌঁছিয়েছেন ফেরার বিমান ধরার জন্য, তখন জানা গেল ফিদেল কাস্ত্রো তাঁকে বিদায় জানাতে সেখানে এসেছেন।

সীতারাম ইয়েচুরি জ্যোতি বসুর সঙ্গে প্রথম বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন ১৯৮৯ সালে, নেপালে।

তিনি নেপাল সরকারের রাষ্ট্রীয় অতিথি ছিলেন। তাই জ্যোতি বসুর সফরসূচীতে পশুপতিনাথ মন্দির দর্শনও রাখা হয়েছিল।

ইয়েচুরি জ্যোতি বসুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যে মন্দিরে যাওয়ার ব্যাপারে মানা করে দিলেন না কেন?

তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “ভারতে আসা প্রত্যেক বিদেশী অতিথিকে রাজঘাটে (গান্ধীজির স্মারকস্থল) নিয়ে যাওয়া হয় – সেই অতিথির গান্ধীর মতাদর্শে বিশ্বাস থাক বা না থাক। সেই একই ভাবে নাস্তিক হওয়া স্বত্ত্বেও আমাদের পশুপতিনাথ মন্দিরে যাওয়া উচিত।”

জ্যোতি বসুর পুত্রবধূ ডলি বসু বলছিলেন, “আমার বিয়ের একদিন পরেই আমি জ্বরে পড়ি। পরের দিন আমি তখনও বিছানায় শুয়ে আছি, রান্নাঘর থেকে কয়েকটা বাসনপত্রের আওয়াজ পেলাম। আমার শ্বশুরমশাই একটা বাসনে জল গরম করছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, “তোমার গরম জল লাগবে, না হলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”

অসুস্থ পুত্রবধূর জন্য নিজেই চা বানিয়ে এনেছিলেন।

ডলি বসু বলছিলেন, “ওই ঘটনার পর থেকে আমার সঙ্গে উনার এমন একটা সম্পর্ক হয়ে গেল যেটা উনার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিল।”

এটা হয়তো অনেকেই জানেন না যে জ্যোতি বসু ২১ বছর বয়সে জীবনে প্রথমবার চা খেয়েছিলেন। তাঁর বাবা চা খেতে মানা করেছিলেন।

একবার চেন্নাইয়ের লায়োলা কলেজের একটা অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেখানে ভাষণ দিতে গিয়ে মি. বসু একটা মজার ঘটনা বলেছিলেন।

কলকাতার ধর্মতলার লরেটো স্কুলে যখন পড়তেন তিনি, সেই সময়ে গোটা ক্লাসভর্তি মেয়েদের মধ্যে একমাত্র তিনিই ছিলেন ছেলে।

এই কথা শুনে লায়োলা কলেজের অনুষ্ঠানে খুব হাততালি পড়েছিল। কয়েকজন সিটিও বাজিয়েছিল এটা শুনে।

অনেক সাহস করে একটি ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, “স্যার, ক্লাসের এতগুলো মেয়ের সঙ্গে আপনি কী করেছিলেন?”

জ্যোতি বসুর মুখে হাসি দেখতে পাওয়াটা খুবই দুর্লভ ছিল।

লায়োলা কলেজের অনুষ্ঠানে ওই প্রশ্ন শুনে সেই দুর্লভ হাসিটা মুখে খেলে গিয়েছিল তাঁর।

বলেছিলেন, “ওই বয়সে কী-ই বা করতে পারে কেউ!”

জ্যোতি বসুর সুরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন এম কে সিং। একটা মজার ঘটনা বলেছিলেন তিনি।

জ্যোতি বসু যখনই হিন্দী বলতেন তার মধ্যে প্রায় সবসময়েই কয়েকটা উর্দু শব্দও ব্যবহার করতেন। যার মধ্যে ‘নুমায়েন্দা’ তার বেশ প্রিয় শব্দ ছিল।

বামফ্রন্টের বাকি সব মন্ত্রীদের মিলিত হিন্দি জ্ঞানের থেকেও জ্যোতি বসুর হিন্দি অনেক ভাল ছিল।

কিন্তু তাঁর ভাষণের বৈশিষ্ট্য ছিল অসম্পূর্ণ বাক্য।

আর যে কোনও বৈঠক – তা সে জনাপাঁচেক লোকের বৈঠক হোক বা বিধানসভায় কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ – একটা কাগজে বক্তব্যের মূল পয়েন্টগুলো লেখা থাকত, যাতে কোনও পয়েন্ট ভুলে না যান। কিন্তু সেই সব পয়েন্টগুলো ইংরেজীতে লেখা থাকত।

জ্যোতি বসুর মন্ত্রীসভার সদস্য ছিলেন অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র।

নিজের আত্মকথায়, ড. মিত্র লিখেছেন “একবার আমি জ্যোতি বাবুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো ইংরেজীতে কেন লেখেন? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘কী করব? আমি শুধু ইংরেজীতেই লিখতে পারি। তোমার মতো আমার শিক্ষা তো সম্পূর্ণ হয়নি।” সূত্র: বিবিসি বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর