সিলেট বিভাগে নৌকার মাঝি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে যারা

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ১৬৩ জন প্রার্থী। এই প্রার্থীদের মধ্যে কে পাবেন দলীয় মনোনয়ন তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে রোববার (২৬ নভেম্বর) বিকেলে মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। এবার বর্তমান সংসদ সদস্যদের কয়েকজন বাদ পড়ছেন বলে জানিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, এবার প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এমন নেতাকে প্রাধান্য দিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে নৌকা প্রতীকে নতুন নতুন মুখের সম্ভাবনা রয়েছে। এখন মনোনীত প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগমুহূর্তে নির্বাচনী আলোচনায় তৃণমূল পর্যায়েও চলছে নানা চুলছেঁড়া বিশ্লেষণ।

সিলেটের ছয়টি সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছেন ৫২ জন নেতা। এর মধ্যে সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনে সবচেয়ে বেশি ১৫ জন প্রার্থী মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। চারটি মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন সিলেট-১ আসনের প্রার্থীরা। সিলেটের ছয় আসনের মধ্যে পাঁচটির সংসদ সদস্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। এর মধ্যে সিলেট-৫ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাফিজ আহমদ মজুমদার এবার নির্বাচন করছেন না। বাকি চারটিতে বর্তমান সংসদ সদস্যরা ফরম জমা দিয়েছেন।
সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সিলেট সদর ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসনে এবারও দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন ৪ জন। দলের একাধিক সূত্র ও নেতাকর্মীরা বলছেন, বতর্মান সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের বিকল্প এই আসনে আর কেউ নেই। ড. এ কে আব্দুল মোমেনই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন এটা মোটামুটি নিশ্চিত।
সিলেট-২ (ওসমানীনগর ও বিশ্বনাথ উপজেলা) সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছেন দলের সাত নেতা। যদি এ বছর এই আসন ছেড়ে দেওয়া না হয় তবে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান চৌধুরী অথবা সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আখতারুজ্জামান চৌধুরী জগলু এই দুইজন থেকে একজন চূড়ান্ত মনোনয়ন পেতে পারেন।
সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) সংসদীয় আসনে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ১০ জন। বর্তমান সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান যদি মনোনয়ন দৌড়ে পিছিয়ে পড়েন তবে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলালই হবেন এই আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী।
সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) সংসদীয় আসনে দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ৯ নেতা।দলের একাধিক নেতাকর্মী ও এই সংসদীয় আসনের ভোটাররা মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার আস্থাভাজন ও দলের হেভিওয়েট প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদের আহমদই বরাবরের মতো পাবেন দলীয় মনোনয়ন।
সিলেট-৫ (কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ) সংসদীয় আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হাফিজ আহমদ মজুমদার আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি আর নির্বাচন করবেন না। সে অনুযায়ী তিনি এবার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেননি। এই আসনে ৭ জন মনোনয়নপত্র কিনলেও সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ অথবা সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ড. আহমদ আল কবীর পেতে পারেন দলীয় মনোনয়ন।
সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার) সংসদীয় আসন সবচেয়ে বেশি ১৫ জন নেতা আছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌড়ে। বর্তমান সংসদ সদস্য ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ছাড়াও এখানে দলের মনোয়ন চান কানাডা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সরওয়ার হোসেন, গোলাপগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মঞ্জুর কাদির চৌধুরী শাফিসহ আরও ১২ জন। দলীয় হাইকমান্ড ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় এই তিনজন থেকে যেকোন একজন নমিনেশন পাবেন বলে মনে করেন এই আসনের নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
মৌলভীবাজার
মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি ওমর ফারুক নাঈম জানিয়েছেন, জেলার ৪টি আসনে মনোনয়ন কিনেছেন ৩০ জন। তাদের মধ্যে মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য ও পরিবেশ বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন মনোনয়ন পেতে পারেন। তবে এগিয়ে আছেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন।
মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য সুলতান মনসুর ও প্রধানমন্ত্রী প্রটোকল অফিসার আবু জাফর রাজু মনোনয়ন পাওয়ার গুঞ্জন আছে।
মৌলভীবাজার-৩ আসনে (সদর-রাজনগর) বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নেছার আহমদ মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন। আলোচনায় আছেন শিল্পপতি জিল্লুর রহমান ও সাবেক ভিপি আব্দুল মালিক তরফদার সুয়েব।
মৌলভীবাজার-৪ আসনে (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) বর্তমান সংসদ সদস্য সাবেক চিপ হুইপ আব্দুশ শহীদ মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে মনোনয়ন প্রত্যাশী আছেন আরও কয়েকজন।
হবিগঞ্জ
হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি আজহারুল ইসলাম মুরাদ জানিয়েছেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে হবিগঞ্জ জেলার চারটি সংসদীয় আসনে ৩৩ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ৩৩ জনের নাম জানা গেছে।
হবিগঞ্জ-১ (বাহুবল-নবীগঞ্জ) বর্তমান সংসদ সদস্য গাজী শাহনওয়াজ মিলাদ গাজী, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. আলমগীর চৌধুরী, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. মুশফিক হুসেন চৌধুরী ও সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী।
হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ) আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল মজিদ খান ও হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ময়েজ উদ্দিন শরীফ রুয়েল।
হবিগঞ্জ-৩ (হবিগঞ্জ সদর-লাখাই ও শায়েস্তাগঞ্জ) আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির ও হবিগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোতাচ্ছিরুল ইসলাম।
হবিগঞ্জ-৪ (মাধবপুর-চুনারুঘাট) আসনে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. মাহবুব আলী এমপি, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ জাকির হোসেন চৌধুরী অসীম ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।
সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি সোহানুর রহমান সোহান জানিয়েছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জ থেকে আওয়ামী লীগের প্রায় অর্ধশত মনোনয়ন কেনা হয়েছে। হিসেব অনুযায়ী ৫ আসন থেকে এবার এমপি হতে ৪৮ জন মনোনয়ন কিনেছেন। সবচেয়ে বেশি রেকর্ড সংখ্যক ১৭ টি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে জমা দিয়েছেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের নেতারা।
সুনামগঞ্জ-১ (ধর্মপাশা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর) সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ আসন এটি। এ আসনে টানা ৩ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। তবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ক্যাসিনো, বালুমহলসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় বাদ পড়ার সম্ভাবনা আছে বলে ধারণা তৃণমূলের। তৃণমূল বলছে সুনামগঞ্জে পরিবর্তনের চিন্তা থাকলে সেই তালিকায় সবার আগে সুনামগঞ্জ-১ আসন রয়েছে। তাই এরপরই এগিয়ে আছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও জেলা শ্রমিক লীগের সদ্য সাবেক সভাপতি সেলিম আহমেদ। জনসাধারণের কাছে ব্যপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তিনি। একই সঙ্গে এগিয়ে বর্তমান সংরক্ষিত সংসদ সদস্য শামিমা আক্তার খানম। কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদক তিনি। এছাড়াও মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে সিলেট জেলা আওয়ামিলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রঞ্জিত সরকার।
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই ও শাল্লা)
প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনের আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে বর্তমানে সংসদ সদস্য হয়েছেন তার স্ত্রী জয়া সেন গুপ্তা। বর্তমান এমপিকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকায় এবার বাদ পড়ার তালিকায় তিনিও আছেন বলে মনে করেন দিরাই-শাল্লার মানুষ। এই সুযোগ কাজে নিয়ে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ চৌধুরী (আল আমিন চৌধুরী)। তিনি বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দল্লাহ আল মামুনের সহোদর।
সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ)
এটি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের আসন। সজ্জন ব্যক্তি হিসেনে এখানে এবারের জাতীয় সংসদেও তিনি এগিয়ে। সুনামগঞ্জের উন্নয়নের আমূল পরিবর্তনের দাবিদার হিসেবে তিনি এগিয়ে আছেন। এছাড়া শক্ত অবস্থানে আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য আজিজুস সামাদ আজাদ ডন। তিনি সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের ছেলে।
সুনামগঞ্জ-৪ (সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্বর)
বার বারই এই আসন শরীক দল জাতীয় পার্টিকে দিয়ে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। টানা দুবার এমপি আছেন বিরোধী দলীয় হুইপ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ। তবে এবার সাবেক পিএসসি চেয়ারম্যান ড. সাদিক আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কেনায় পাল্টে গেছে জেলার রাজনীতি। সবার মুখে মুখে এখন ড. সাদিকের মনোনয়ন দৌড়ে জয়ী হওয়ার কথা। এছাড়াও এই আসনে জেলা আওয়ামিলীগের সাবেক ও বর্তমান সভাপতি-সেক্রেটারিরাও মনোনয়ন প্রত্যাশী।
সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক ও দোয়ারাবাজার)
এই আসনে একক আধিপত্য বর্তমান সংসদ সদস্য মুহিবুর ইসলাম মানিকের। জনশ্রুতি আছে প্রধানমন্ত্রীর খুব কাছের ও পছন্দের মানুষ তিনি। সংসদীয় এলাকায়ও তার বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি বলেই ভাবছেন সুনামগঞ্জ ৫ আসনের ভোটাররা। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নিশ্চিত বলেই ধারণা নেতাকর্মীদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *