সংবাদ

সাহিত্য

দিলারা হাফিজের কবিতা

সত‍্যি কি কোনো বন্ধু নেই?পত্রহীন গাছের ভঙ্গিতে না হয় একলা দাঁড়িয়ে আছি— আইসবোট টেরেসের রক্তিম চত্বরে…কে বলে…টরন্টো সিটিতে আমার আর কোনো বন্ধু নেই!লিডা নেই ঠিকই— হারিয়ে গেছে সে জলরঙ ছবির প্রস্তুরযুগে,উবে গেছে স্বাস্থ‍্য ও আনন্দের-সুবর্ণ-রেখা!সময়ের পথ-বেয়ে ফিরে আসবে সাকি ও সুরাএখনো এমন তো কেউ আছে যার জন‍্যে অপেক্ষাশব্দটি বুকের ভেতর খুব গোপনে চৌচির করে আমাকে!জল আমার জীবন-মরণের আশৈশব বন্ধু বটেবৃক্ষেরা অভয়াশ্রমের প্ল‍্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়ায় সমুখে সবুজ তৃণলোক— পায়ের নিচে জাজিম হয়ে ঘুমায়!নীলাকাশ আমার মাথার-পরে আলতো হাত রাখে…মিউজিক পার্ক?— সেও সপ্তপর্ণা আমার খুব ভালো,বন্ধু,প্রতিদিন  আমাকে উইলোর সবুজ ছায়ায় ডেকে নেয়—হাত ধরে টেনে নিয়ে অন্টারিওর নীল জলের বেঞ্চে বসতে দেয় তুমুল উচ্ছ্বাসে…সুপারস্টার ড্রেকের নতুন এ‍্যালবাম খুলে  র‍্যাপ সঙ্গীত শোনায়— সকল শোক যেন আমার  দুঃখরূপে ভেসে যায় টিমহর্টন ক‍্যাফের ধোঁয়ায়,ড্রামের বেদনাহত শব্দে—দুজনার গল্প শেষ হলে স্প্রিংমেপলের ব্লোসম ছিটিয়ে দেয় মেসাঞ্জারের নোটিফিকেশনে হঠাৎ চমকে দিয়ে পাশ থেকে ডেকে নেয় ব্র‍্যাডফোর্ড  পিয়ার— কী যে জাদু তার পল্লবিত মোহময় মুকুলে!দেহজুড়ে যেন বসন্তের শ্বেত-শুভ্র নৃত‍্যের-মাদল… আহা! কী অভিমানী সে ইশারা…আমার সাধ‍্য কি তার হৃদয় না ছুঁয়ে নিজের কাছে ফিরে আসি?১৯/৫/২৬ সাবওয়ে প্ল‍্যাটফর্ম সেইন্ট মাইকেল হাসপাতাল থেকে ম‍্যামোগ্রাম শেষ হলে মনোরম ডানডাস মোড় থেকে সাবওয়ে ধরে ইউনিয়ন স্টেশনে যাবো বলে দ্রুত দাঁড়িয়েছি এসে!যাওয়া-আসার এই প্ল‍্যাটফর্মে আমিও অচেনা আগন্তুক!সাবওয়ের অপেক্ষা ঘিরে নানা বর্ণ ও গন্ধের মানুষ,অগ্রগণ‍্য শাদা কানাডিয়ান ও বাদামীর পাশেদু’চারজন মেঘ-মল্লার কালো-মানুষও আছেউজ্জ্বলবর্ণে দৃষ্টি তারা কেড়ে নেয় অনধিক যাত্রীর—কফিকাপ হাতে— সদ‍্য ক‍্যাফে থেকে সরাসরি এসে দাঁড়ায় গুটিসুটি হোমলেস, কাঁধের মস্তব‍্যাগে তারপুরো জীবনের ছেঁড়া-খোঁড়া তৈজস-মায়ার বিড়‌ম্বনা!পোশাকে তার ধুলো-ময়লার সঙ্গে ভূমিহীন স্মৃতিচিহ্ন…তরুণ-তরুণী-বৃদ্ধ যে যার মতো সুশোভন বসেছে সিটেসতর্ক উদাসীনতা টেনে নিয়েছে নিজের নিরাপত্তা ঘিরে।মনের দুর্গম রাস্তায় ঘুরছি আমি স্ট্রিটকার ফাইভ-টেনে,ওয়েস্ট বাউন্ড ধরে শেষ পর্যন্ত আমাকে নামতে হবে ব্রেমনার বুলেভার্ড — আমিও যে ওখানে অচ্ছুতেরবেড়াজালে বন্দী এক হোমলেস, পৃথিবীর অন‍্যতমবিদীর্ণ হিয়া!২২/৫/২৬   মাতাল ঘামে গন্ধজুঁইসবার অলক্ষ্যে—তোমার স্নিগ্ধ-মাতাল ঘামের গন্ধ খুঁজে ফিরি,তোমাকে খুঁজি না আর!এই সাত বছরে সাত সাতটি জনম পার করে জেনে গেছি, দুচোখে আমার দুই অশ্রুসমুদ্রপেরিয়ে তুমি আর কখনো ফিরবে না...আমার প্রশ্বাস যতক্ষণ করতলে আছে সুনিবিড়যতকাল মায়াময় এপৃথিবীতে ছিন্ন দেহকাব্য আছেঅধরা আত্মার অক্ষর-শব্দে সাজাবো সচল কবিতা—তুমি তবু আর আসবে না ফিরে, শুনবে না গীত-গজলএই ক্ষুব্ধ অভিমানে আমিই বরং ফিরে যাবো তারাদের দেশে, তোমার অনন্ত ঠিকানার উদ্দেশে...এই যে আমার থাকা, না থাকা বিপন্ন এই বিরহ নগরেএমন একাকী নিঃসঙ্গে যায় কি থাকা দুস্থ এই পরবাসে|তুমি তো কখনো বিরতি-প্রণয়ে একাকী ছিলে না,তুমি জানো না, বোরো ধানের কতটা তুষ পোড়ালেহৃদয়-দহনে ধোঁয়া ওঠে— আগুন নিজেই ঢুকে যায়রক্ত-মাংসের নিকুঞ্জ বিহারে, মন পোডে় উনুনে|আমাকে নিয়ে দৃশ্যমান যত তোমার প্রেমের কবিতা— এমন কি “প্রতীক্ষা” যা কেবল আমারই জন্যে নিবেদিত ছিলো এতকাল— এই প্রতীক্ষা প্রপাতে, ধূসর বনাঞ্চলেওসবই আজ পাবলিক প্রোপার্টি, বাচিক শিল্পীর গান|বড্ড নিঃস্ব হয়ে পডে়ছি, এমন নয় যে, চারপাশে কেউ নেইপ্রযুক্তি প্রাবল্যে হাজার বন্ধু-তালিকায় কত অদৃশ্য প্রিয়মুখ-স্বীয়-স্বজন-জ্ঞানী-শিক্ষক-শিক্ষার্থী—তরুণ কবি সহযাত্রীর কেউবা আমার অপার শূন্যতাকেসামান্য হলেও পরান্নে প্রভূত নেভাতে চায়, পাশে দাঁড়ায়,সান্ত্বনায় সরোবরে ফোটা যেমন শ্বেতপদ্ম ঝিলে ও বিলে|তবু কিছুতেই কিছু নয়, সর্বগ্রাসী প্রণয়-বিধুর বিপন্নতায় আজো তুমি একমাত্র সর্বেশ্বর, উজ্জ্বল উদ্ধার আমার|আমি জানি না, কেন এমন হয়, আমি জানি না আজোস্মৃতি-পিঁপীলিকা গৃহে আর কতকাল এভাবে কাটাবো?আমি তো প্রেমের সাম্পানে-আনন্দে-অধরা মানুষ,সন্তানের চোখে তাকালে কনক-কাঞ্চনে সোনা হয়ে উঠিদুচোখে অহম অবনীর স্বপ্ন কাজলে তোলপাড় করিঅভিন্ন অব্যয়ের সকাতর হাসি ধরে রাখি অধরোষ্ঠে,তবু কেন এমন বেতালে বাঁধি বৈবতালিক এই সপ্তসুর?কে বলবে, আমাকে? সবার অলক্ষ্যে আজো কেন আমিতোমার স্নিগ্ধ-মাতাল ঘামের গন্ধ খুঁজে ফিরি অহেতু!১৪/০১/২৪ধানমণ্ডি, ঢাকা সতর্কীমূলক প্রেমের কবিতাকখনো এমন কারো প্রেমে পড়বে না,যে ছেলেটি বইপড়া— দূরে থাক, ই-বুকও পডে় না, চিন্তায় অস্থিতিশীলএবং জ্ঞানে গুগোল সর্বস্বরূপবান ও তীব্র নার্সিসাস যে ছেলেতাকে ভালোবাসতে যেয়ো না,চকিতে চোখ তার ছোটে দিগ্বিদিকসে,না—দেবে নিরাপদ লক্ষণ-রেখানা হবে  বিশ্বাসের বর্ষাতি...এমন পুরুষের ভালোবাসায় ভুলো নাযে কথার লাবণ্যে চতুর ও বাকপটু সৌন্দর্যে বিভ্রান্ত ও মোহগ্রস্তমিথ্যে-প্রতিশ্রুতির আডে়-মোডে় তোমাকে বসিয়ে রাখে যত্নহীন অপেক্ষায়...এমন পুরুষকে কাছেই আসতে দিয়ো না যে গান শোনে না, জীবনে কখনো ফুল কেনেনিএকটি গোলাপ অথবা দু‘টাকার বাদাম,ভালোবেসে কুন্তলগুচ্ছে গুঁজে দেয়নিএমন কি একটি কুঁডি়ও...যার সঙ্গে তোমার ভালোবাসা— সে যদি তোমার রাঙা অভিমানকে জ্যোৎস্নার গন্ধে ভাসিয়ে দিতে না পারে,সময় থাকতে তার হাত ছেডে় দিও|কবি বা কোনো শিল্পীকে যদি ভালোবাসো, তার ছায়া-নিবাস থেকে দূরে যাও,কেননা প্রসংশা-পাগল তার ভালোবাসা থেকে কখনো তুমি বেরুতে পারবে না আর!উপরন্তু এ পরশ পাথর সয় না সকলের! এরকম পুরুষের সঙ্গে কথা না বলাই ভালোমন-মঞ্জিলের চেয়ে শরীরই মন্দির যার—যে খুব বেশি ব্যস্ত ও খোলা মাঠ,ডোম্বীর প্রান্তিক কুডে় ঘরে  যেশিশির জলের নিরুপায় অতিথি...মাকে ভালোবেসে যে সন্তান বড় হয়েছেতাকে মোটে ভয় পেয়ো নামাকে ভালোবাসে বলেই নিশ্চিতসে-ই হবে তোমার উজ্জ্বল উদ্ধারস্বাস্থ্য ও আনন্দের আধার|এমন পুরুষের বাগদত্তা হয়ো নাগৃহ প্রবেশের আগেই রাস্তায় ছেডে় যাবে যে!১৪/১২/২৩ধানমণ্ডি, ঢাকা

দিলারা হাফিজের কবিতা