বৃষ্টি ও শীতে দুর্ভোগে নিম্ন আয়ের মানুষেরা

সকাল থেকেই ঢাকাসহ সারা দেশে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অগ্রহায়ণের এ বৃষ্টিকে অনেকেই বলছেন শীত নামানোর বৃষ্টি। আর এমন বৃষ্টিতে ঠান্ডা অনুভূত হওয়ায় ধোঁয়া ওঠা গরম খিচুড়িতে মজেছেন অনেকে। কেউবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসময়ের এই বৃষ্টিকে হাস্যরসে ঠাঁই দিয়েছেন। তবে খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য হিসাবটা একেবারেই ভিন্ন। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি তাদের জন্য বয়ে এনেছে সীমাহীন দুর্ভোগ। টানা বৃষ্টিতে যেমন আয়ে টান পড়েছে, তার চেয়েও বেশি কষ্টে ফেলেছে ঠান্ডা ও শীতল আবহাওয়া। বৃষ্টির ঠান্ডা পানিতে ভিজে অসুস্থ হওয়ার উপক্রম অনেকের। তবুও জীবন-জীবিকার তাগিদে ভিজে ভিজেই কাজ করছেন তারা।

বৃহস্পতিবার (৭ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, ধানমন্ডি ও কলাবাগান এলাকা ঘুরে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বৃষ্টির কারণে কর্মব্যস্ত এবং কর্মচঞ্চল নিউমার্কেট ও আশেপাশের এলাকায় তেমন লোকজনের উপস্থিতি নেই। রাস্তা-ঘাটও কিছুটা ফাঁকা। বিভিন্ন মোড়ে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রিকশাচালক ও হকাররা। যারা রাস্তায় ঘুরে বাসে পান, সিগারেট ও পানি বিক্রি করেন, আজ তারাও তেমন সুবিধা করতে পারছেন না। আর এসব এলাকার ফুটপাতও ফাঁকা। নেই ভ্রাম্যমাণ দোকানিদের আনাগোনা বা হাঁকডাক।

নীলক্ষেত এলাকায় আশেপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ছাড়া নেই অন্যান্য দিনের মতো জমজমাট অবস্থা। আর ধানমন্ডি এবং কলাবাগান এলাকার মূল সড়কে স্বাভাবিক গাড়ি চলাচল ও মানুষের উপস্থিতি বেশি থাকলেও অনেকটা সুনসান আবাসিক এলাকা।

সকাল থেকে বৃষ্টির জন্য কাঙ্ক্ষিত যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান রিকশা চালক মনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, বৃষ্টিতে রাস্তায় সকাল থেকেই মানুষজন কম। অন্যদিন ছাত্র-ছাত্রীরা সকাল-সকাল বের হয়। আজকে বৃষ্টির কারণে অনেকেই বের হয়নি। যার কারণে সকাল থেকে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ আয় করার কথা ছিল তার কিছুই হয়নি। আর ঠান্ডা তো আছেই৷ কষ্ট হচ্ছে। হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। তারপরও ঘরে বসে থাকলে তো আর পেট চলবে না।

আরো পড়ুন  শাহবাগে ছেলেকে কোলে নিয়ে প্রতিবাদে সেই ঝলসানো মা!

আবার বৃষ্টির পানিতে যেন ঠান্ডা না লাগে সেজন্য অনেক রিকশাচালককে মাথায় ছোট পলিথিন এবং শরীর বড় পলিথিন কেটে শরীরে পরতে দেখা যায়। আনু মিয়া নামের এক রিকশাচালক বলেন, বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের অভ্যাস আছে। বর্ষাকালের বৃষ্টিতে কাপড় ভিজে আবার গায়েই কাপড় শুকায়। আল্লাহর রহমতে কিছুই হয় না। কিন্তু এখনকার বৃষ্টি ভয়ংকর। কারণ অল্পতেই ঠান্ডা লেগে যায়। তাই মাথায় যেন বৃষ্টি না পড়ে সেজন্য পলিথিন দিয়ে রাখছি।

বৃষ্টি কষ্ট বাড়িয়েছে উল্লেখ করে শামীম নামের আরেক রিকশাচালক বলেন, আমি মোহাম্মদপুরে এক গ্যারেজে থাকি। রাতের ঠান্ডায় এমনিতেই অসুস্থ হয়ে গেছি। তার ওপর আবার সকাল থেকে বৃষ্টিতে ভিজে অবস্থা খারাপ। সকাল থেকে ৫০০ টাকার মতো ইনকাম হয়েছে৷ একটু পরে চলে যাব৷ এই বৃষ্টিতে ভিজলে অসুস্থ হয়ে যাব। তাছাড়া রাস্তা-ঘাটে আজ মানুষের সংখ্যা কম ও রিকশা বেশি। সেজন্য ভাড়াও বেশি পাওয়া যায় না।

ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে বেশ বিপাকে পড়েছেন খাবার ডেলিভারির কাজ করা ফুড রাইডার ও বাইক রাইডাররাও। বৃষ্টির কারণে যাত্রী পাচ্ছেন না বাইক রাইডাররা। আর বৃষ্টিতে তেহারি, বিরিয়ানি, খিচুড়ি ও কাচ্চিসহ মুখরোচক খাবারের চাহিদা বাড়ায় বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ছুটতে হচ্ছে ফুড রাইডারদের।

তারা বলছেন, ফুড রাইডিংয়ের কাজটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের। সারাদিনে যতটি খাবার অর্ডার প্লেস করা যায়, সে হিসেবে টাকা পাওয়া যায়। তাই বৃষ্টির কথা চিন্তা করে বসে থাকলে অর্ডার মিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে যত দ্রুত একটি অর্ডার পূরণ করা যায়, তত দ্রুত আবার আরেকটি খাবার অর্ডার নেওয়া সম্ভব হয়। সেজন্য রোদ ও ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে যেভাবেই হোক অর্ডার দ্রুত গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়াটাই বড় মনে করেন তারা।

আরো পড়ুন  আদম তমিজীকে ‘মানসিক পরীক্ষা’ করতে পাঠাল ডিবি

ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট এলাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানির ফুড রাইডার হিসেবে কাজ করেন জুয়েল রানা। তিনি বলেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আমি ২০টির বেশি খাবারের অর্ডার পৌঁছে দিয়েছি৷ বৃষ্টির কারণে মানুষজন কম বের হচ্ছেন। আর বৃষ্টিতে আমাদের কষ্ট তো স্বাভাবিক বিষয়। তাছাড়া কষ্ট না করলে এই চাকরিতে টিকে থাকাও কঠিন।

এদিকে, বৃষ্টির কারণে যাত্রী পাচ্ছেন না বলে জানান বাইক রাইডাররা। খিলক্ষেত বাস স্টপেজের পাশে ফুট ওভার ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায় বেশ কয়েকজন বাইক রাইডারকে। মিলন আহমেদ নামের এক রাইডার বলেন, বৃষ্টিতে যাত্রী পাওয়া যায় না। কারণ বাইকে ছাতা নিয়ে বসাটা কঠিন। আবার সবার তো রেইনকোটও রেই। অধিকাংশ মানুষই বাসে যাচ্ছে। অন্যান্য দিন সকাল থেকে যে পরিমাণ আয় হতো আজকে তার কিছুই হয়নি। মাত্র দুইজন যাত্রী পেয়েছি। আয় হয়েছে মাত্র আড়াইশো টাকা৷

আবহাওয়া অফিস বলছে, বৃষ্টিপাতের এ ধারা বৃহস্পতিবার (৭ ডিসেম্বর) দিনভর অব্যাহত থাকবে। শুক্রবার (৮ ডিসেম্বর) বৃষ্টি কমে যাবে। তবে বৃষ্টি কমে গেলেও আকাশ মেঘলা থাকবে। একইসঙ্গে আজ দিন ও রাতের তাপমাত্রা ২ থেকে ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত কমতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।

এছাড়া, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময়ে দেশের সর্বোচ্চ ২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে। এদিকে বৃষ্টি হওয়ায় তাপমাত্রা কমে গিয়ে আজ গত কয়েকদিনের তুলনায় শীত একটু বেশি অনুভূত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *