মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের হবিগঞ্জ সড়কের ব্যস্ততার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে ভগ্নপ্রায়, অথচ গৌরবময় অতীতের স্মারক ত্রিপুরা মহারাজার কাচারি বাড়ি। শতবর্ষী এই স্থাপনাটি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি শ্রীহট্ট অঞ্চলের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
উনিশ শতকের শেষভাগে ডাউকি ফল্টে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর তৎকালীন ত্রিপুরা রাজপরিবার এ অঞ্চলে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য দেববর্মন বাহাদুরের আমলে শ্রীমঙ্গলের কেন্দ্রস্থলে প্রায় পৌনে ২ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয় এই কাচারি বাড়ি। প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় ও স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
পরে ত্রিপুরা মহারাজ বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের শাসনামলে কাচারি বাড়িটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। সে সময় শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, ভানুগাছ ও শমশেরনগরসহ বৃহত্তর এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ ত্রিপুরা রাজপরিবারের অধীন ছিল। বর্তমান ত্রিপুরা বলতে যে পার্বত্য অঞ্চলকে বোঝানো হয়, তার বাইরেও শ্রীহট্টের বিস্তীর্ণ জনপদ একসময় ত্রিপুরা মাণিক্য রাজাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এর উল্লেখ রয়েছে অচ্যুৎচরণ চৌধুরীর ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ এবং কৈলাশ চন্দ্র সিংহ রচিত ‘রাজমালা’ গ্রন্থে।
১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর কাচারি বাড়িটির মালিকানা পরিবর্তিত হয়। পরে পাকিস্তান সরকার ভবনটি অধিগ্রহণ করে এবং ধীরে ধীরে এটি সরকারি প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে। বর্তমানে ভবনটি শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এর প্রাচীন অংশের বড় একটি অংশ অবহেলায় পড়ে আছে।
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকেও একতলা ভবনটি অনন্য। প্রায় ৩০ ফুট প্রস্থ ও ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কাঠামোটিতে রয়েছে তিনটি কক্ষ, আটটি দরজা ও নয়টি জানালা। এক ফুট পুরু দেয়াল, চুন-সুরকির গাঁথুনি এবং সূক্ষ্ম কারুকাজ ভবনটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক ও দেশীয় স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণ দেখা যায়। এখনো দেয়ালের অলংকরণে সেই শৈল্পিক ছাপ স্পষ্ট।
তবে সময়ের নির্মমতায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্য। দেয়ালজুড়ে বড় বড় ফাটল, ছাদের ক্ষয় এবং শেওলায় ঢাকা গাঁথুনি দীর্ঘদিনের অবহেলার চিত্র তুলে ধরছে। কোথাও আংশিক, কোথাও আবার সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি।
একসময় যে কাচারি বাড়ি প্রজাদের পদচারণায় মুখর ছিল, খাজনা আদায়ের দিনে যেখানে থাকত উৎসবমুখর পরিবেশ, আজ সেখানে নেমে এসেছে নীরবতা। ইতিহাসের সেই ব্যস্ত দিনগুলো যেন এখন কেবল স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাচারি বাড়িটি শুধু ত্রিপুরা রাজপরিবারের প্রশাসনিক কার্যক্রমের নিদর্শন নয়; এটি শ্রীহট্ট অঞ্চলের উপনিবেশিক ও দেশীয় শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগসূত্রও। তাই দ্রুত এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন উঠেছে, একসময় একটি অঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত এই স্থাপনাটি কি এভাবেই সময়ের অতলে হারিয়ে যাবে, নাকি যথাযথ উদ্যোগে ফিরে পাবে তার প্রাপ্য মর্যাদা?
শ্রীমঙ্গলের এই কাচারি বাড়ি আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে, সংরক্ষণের প্রত্যাশায়।

রোববার, ২৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের হবিগঞ্জ সড়কের ব্যস্ততার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে ভগ্নপ্রায়, অথচ গৌরবময় অতীতের স্মারক ত্রিপুরা মহারাজার কাচারি বাড়ি। শতবর্ষী এই স্থাপনাটি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি শ্রীহট্ট অঞ্চলের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
উনিশ শতকের শেষভাগে ডাউকি ফল্টে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর তৎকালীন ত্রিপুরা রাজপরিবার এ অঞ্চলে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য দেববর্মন বাহাদুরের আমলে শ্রীমঙ্গলের কেন্দ্রস্থলে প্রায় পৌনে ২ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয় এই কাচারি বাড়ি। প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় ও স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
পরে ত্রিপুরা মহারাজ বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের শাসনামলে কাচারি বাড়িটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। সে সময় শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, ভানুগাছ ও শমশেরনগরসহ বৃহত্তর এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ ত্রিপুরা রাজপরিবারের অধীন ছিল। বর্তমান ত্রিপুরা বলতে যে পার্বত্য অঞ্চলকে বোঝানো হয়, তার বাইরেও শ্রীহট্টের বিস্তীর্ণ জনপদ একসময় ত্রিপুরা মাণিক্য রাজাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এর উল্লেখ রয়েছে অচ্যুৎচরণ চৌধুরীর ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ এবং কৈলাশ চন্দ্র সিংহ রচিত ‘রাজমালা’ গ্রন্থে।
১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর কাচারি বাড়িটির মালিকানা পরিবর্তিত হয়। পরে পাকিস্তান সরকার ভবনটি অধিগ্রহণ করে এবং ধীরে ধীরে এটি সরকারি প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে। বর্তমানে ভবনটি শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এর প্রাচীন অংশের বড় একটি অংশ অবহেলায় পড়ে আছে।
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকেও একতলা ভবনটি অনন্য। প্রায় ৩০ ফুট প্রস্থ ও ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কাঠামোটিতে রয়েছে তিনটি কক্ষ, আটটি দরজা ও নয়টি জানালা। এক ফুট পুরু দেয়াল, চুন-সুরকির গাঁথুনি এবং সূক্ষ্ম কারুকাজ ভবনটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক ও দেশীয় স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণ দেখা যায়। এখনো দেয়ালের অলংকরণে সেই শৈল্পিক ছাপ স্পষ্ট।
তবে সময়ের নির্মমতায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্য। দেয়ালজুড়ে বড় বড় ফাটল, ছাদের ক্ষয় এবং শেওলায় ঢাকা গাঁথুনি দীর্ঘদিনের অবহেলার চিত্র তুলে ধরছে। কোথাও আংশিক, কোথাও আবার সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি।
একসময় যে কাচারি বাড়ি প্রজাদের পদচারণায় মুখর ছিল, খাজনা আদায়ের দিনে যেখানে থাকত উৎসবমুখর পরিবেশ, আজ সেখানে নেমে এসেছে নীরবতা। ইতিহাসের সেই ব্যস্ত দিনগুলো যেন এখন কেবল স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাচারি বাড়িটি শুধু ত্রিপুরা রাজপরিবারের প্রশাসনিক কার্যক্রমের নিদর্শন নয়; এটি শ্রীহট্ট অঞ্চলের উপনিবেশিক ও দেশীয় শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগসূত্রও। তাই দ্রুত এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন উঠেছে, একসময় একটি অঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত এই স্থাপনাটি কি এভাবেই সময়ের অতলে হারিয়ে যাবে, নাকি যথাযথ উদ্যোগে ফিরে পাবে তার প্রাপ্য মর্যাদা?
শ্রীমঙ্গলের এই কাচারি বাড়ি আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে, সংরক্ষণের প্রত্যাশায়।

আপনার মতামত লিখুন