সংবাদ

পৃথিবীর বৃহত্তম ঈদযাত্রা: ইন্দোনেশিয়ায় গ্রামে ফেরেন ১৬ কোটি


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম

পৃথিবীর বৃহত্তম ঈদযাত্রা: ইন্দোনেশিয়ায় গ্রামে ফেরেন ১৬ কোটি
জাকার্তা ফাঁকা করে ১৬ কোটি মানুষের ঈদযাত্রা: বাংলাদেশের চেয়েও বিশালঅ

পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় ঈদে ‘মুদিক’ নামে বিশাল এক জনযাত্রা ঘটে। প্রতি বছর রাজধানী জাকার্তাসহ বড় শহরগুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। আর গ্রামের পথে নামে কয়েক কোটি মানুষ। ইন্দোনেশিয়ার এই বাড়ি ফেরার ঢলের সামনে বাংলাদেশের ঈদযাত্রা অনেকটাই ছোট ।

বাংলাদেশি ঈদযাত্রীরা যখন সদরঘাটের লঞ্চ কিংবা কমলাপুরের ট্রেনের ছাদ দখল করতে ব্যস্ত, ইন্দোনেশিয়ার ‘মুদিক’ যাত্রীরা তখন লাখ লাখ গাড়ি আর মোটরসাইকেল নিয়ে পুরো জাভা দ্বীপ জুড়ে এক বিশাল জনসমুদ্র তৈরি করেন। 

শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, আয়োজন, অর্থনৈতিক প্রভাব আর সাংস্কৃতিক গভীরতার দিক থেকেও দেশটির মুদিক উৎসব সারা বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

‘মুদিক’ কী: ইন্দোনেশিয়ার ভাষায় ‘মুদিক’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘উজানে যাওয়া’ বা ‘গ্রামের বাড়ি ফেরা’। সুহার্তো শাসনামলে জাকার্তায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। গ্রামের হাজার হাজার মানুষ কর্মের সন্ধানে শহরমুখী হন। আর ঈদের সময় সেই মানুষজনের বাড়ি ফেরার ঢলই আজকের বিশাল মুদিকের ভিত্তি তৈরি করে।

ইন্দোনেশিয়ার সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শহরের কঠিন জীবনের চাপ, বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম; গ্রামের নির্জনতা আর পরিবারের স্নেহ-মমতা মানুষকে বাড়ি ফিরতে বাধ্য করে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুষঙ্গ নয়, বরং গ্রামীণ ইন্দোনেশীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যারা বাড়ি ফিরতে পারেন না, তাদের সমাজ ‘উৎপত্তি ভুলে যাওয়া’ হিসেবে দেখে।

বাংলাদেশের তুলনায় কয়েক গুণ বড়: ইন্দোনেশিয়ার মুদিকের জম্বো আয়োজন দেখলে চোখ কপালে ওঠার মতো। বাংলাদেশে ঈদের সময় যাত্রী চাপ বাড়ে ঠিকই, কিন্তু সেটি বাড়তি কিছু ট্রেন ও বাসের ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ইন্দোনেশিয়ায় দৃশ্যপট ভিন্ন। দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয়ের জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মুদিকযাত্রীর সংখ্যা রেকর্ড ১৯ কোটি ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

আর ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কিছুটা কমে হলেও, এখনও প্রায় ১৫ কোটি ৪৬ লাখ মানুষ বাড়ি ফেরেন। এই সংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় সমান! কল্পনা করুন, বাংলাদেশের সব মানুষ একসঙ্গে যদি ঈদের সময় বাড়ি ফেরেন, তবুও ইন্দোনেশিয়ার মুদিকযাত্রীদের সংখ্যার প্রায় কাছাকাছি যাবেন। এই বিশাল মানুষের ঢল সামলাতে ইন্দোনেশিয়া সরকার জাভা দ্বীপ জুড়ে অতিরিক্ত ট্রেন, শত শত বাস ও প্লেনের ব্যবস্থা করে ।

বাস্তব চিত্র: ইন্দোনেশিয়ার এই বাড়ি ফেরা যাত্রা মানে শুধু ট্রেন-বাস নয়। এখানে প্রধান বাহন হলো মোটরসাইকেল। হাজার হাজার মানুষ পরিবার নিয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে কয়েকশো কিলোমিটার পাড়ি দেন। জাভার ট্রান্স-জাভা টোলরোড ও নর্থ কোস্ট রোডে লম্বা লম্বা জ্যাম লেগে যায়। সম্প্রতি সরকার মোটরসাইকেলের বিকল্প হিসেবে ‘মুদিক গ্রাটিস’ বা বিনামূল্যে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা চালু করেছে ।

আরেক মজার তথ্য হলো, বাংলাদেশে ঈদযাত্রার চরম ব্যস্ততা থাকে ঈদের আগের তিন-চার দিন। ইন্দোনেশিয়ায় অবশ্য এক মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় ট্রেন ও প্লেনের টিকিট সংকট। ২০২৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের ‘ওয়ার্ক ফ্রম এনিহোয়ার’ নীতি ও স্কুলের ছুটি আগিয়ে দেওয়ায় যাত্রা শুরু হয় আরও আগে ।

অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব: মুদিক শুধু সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ নয়, এটি ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির চাকা সচল রাখে। ২০২৬ সালে মুদিকের সময় প্রায় ১৫৭ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ অর্থ সঞ্চালিত হয়। শহরে উপার্জিত টাকা যখন মানুষ গ্রামে নিয়ে যায়, তখন গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। ছোট ছোট দোকান থেকে শুরু করে পর্যটন খাত- সব জায়গাতেই এর প্রভাব পড়ে।

নৌপথে গ্রামে ফিরছেন ঈদযাত্রীরা

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঈদের সময় রেমিট্যান্স বাড়ে, সঞ্চালন বাড়ে, কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক ‘বুম’ এর তুলনায় তা নগণ্য। ইন্দোনেশিয়ায় টাকা হাতবদলের এই উৎসবকে ‘ট্রান্সফার অফ ওয়েলথ’ বললে ভুল হবে না। বাংলাদেশে যেখানে ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটার মৌসুম চলে, সেখানে ইন্দোনেশিয়ায় পুরো অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব সঞ্চালনের মধ্য দিয়ে যায়।

বাংলাদেশেও ঈদুল ফিতর মানে রাজধানী ঢাকা প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। লঞ্চ, ট্রেন ও বাসে চড়ে গ্রামের বাড়ির পথে যাত্রা শুরু করেন লাখ লাখ মানুষ। তবে বাংলাদেশের যাত্রী সংখ্যা ১-২ কোটির বেশি নয়। ইন্দোনেশিয়ার ১৫-১৯ কোটির তুলনায় এটি সত্যিই অনেক কম । এখানেই মূল পার্থক্য- পরিমাণ আর অবকাঠামোর প্রস্তুতি।

ইন্দোনেশিয়ার মুদিক একটি বার্ষিক ‘ফেস্টিভাল অব ম্যাস মাইগ্রেশন’। অথচ বাংলাদেশের ঈদযাত্রা এখনও ফাঁকফোকর দিয়ে ভরা। সড়ক দুর্ঘটনা, নৌকা ডুবি আর ট্রেনের ছাদে চড়া আমাদের নিত্যদিনের চিত্র। ইন্দোনেশিয়াতেও অবশ্য ঝুঁকি আছে, কিন্তু সরকারি উদ্যোগ ক্রমশ তা কমিয়ে আনছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ২৪ মে ২০২৬


পৃথিবীর বৃহত্তম ঈদযাত্রা: ইন্দোনেশিয়ায় গ্রামে ফেরেন ১৬ কোটি

প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬

featured Image

পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় ঈদে ‘মুদিক’ নামে বিশাল এক জনযাত্রা ঘটে। প্রতি বছর রাজধানী জাকার্তাসহ বড় শহরগুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। আর গ্রামের পথে নামে কয়েক কোটি মানুষ। ইন্দোনেশিয়ার এই বাড়ি ফেরার ঢলের সামনে বাংলাদেশের ঈদযাত্রা অনেকটাই ছোট ।

বাংলাদেশি ঈদযাত্রীরা যখন সদরঘাটের লঞ্চ কিংবা কমলাপুরের ট্রেনের ছাদ দখল করতে ব্যস্ত, ইন্দোনেশিয়ার ‘মুদিক’ যাত্রীরা তখন লাখ লাখ গাড়ি আর মোটরসাইকেল নিয়ে পুরো জাভা দ্বীপ জুড়ে এক বিশাল জনসমুদ্র তৈরি করেন। 

শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, আয়োজন, অর্থনৈতিক প্রভাব আর সাংস্কৃতিক গভীরতার দিক থেকেও দেশটির মুদিক উৎসব সারা বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

‘মুদিক’ কী: ইন্দোনেশিয়ার ভাষায় ‘মুদিক’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘উজানে যাওয়া’ বা ‘গ্রামের বাড়ি ফেরা’। সুহার্তো শাসনামলে জাকার্তায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। গ্রামের হাজার হাজার মানুষ কর্মের সন্ধানে শহরমুখী হন। আর ঈদের সময় সেই মানুষজনের বাড়ি ফেরার ঢলই আজকের বিশাল মুদিকের ভিত্তি তৈরি করে।

ইন্দোনেশিয়ার সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শহরের কঠিন জীবনের চাপ, বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম; গ্রামের নির্জনতা আর পরিবারের স্নেহ-মমতা মানুষকে বাড়ি ফিরতে বাধ্য করে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুষঙ্গ নয়, বরং গ্রামীণ ইন্দোনেশীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যারা বাড়ি ফিরতে পারেন না, তাদের সমাজ ‘উৎপত্তি ভুলে যাওয়া’ হিসেবে দেখে।

বাংলাদেশের তুলনায় কয়েক গুণ বড়: ইন্দোনেশিয়ার মুদিকের জম্বো আয়োজন দেখলে চোখ কপালে ওঠার মতো। বাংলাদেশে ঈদের সময় যাত্রী চাপ বাড়ে ঠিকই, কিন্তু সেটি বাড়তি কিছু ট্রেন ও বাসের ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ইন্দোনেশিয়ায় দৃশ্যপট ভিন্ন। দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয়ের জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মুদিকযাত্রীর সংখ্যা রেকর্ড ১৯ কোটি ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

আর ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কিছুটা কমে হলেও, এখনও প্রায় ১৫ কোটি ৪৬ লাখ মানুষ বাড়ি ফেরেন। এই সংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় সমান! কল্পনা করুন, বাংলাদেশের সব মানুষ একসঙ্গে যদি ঈদের সময় বাড়ি ফেরেন, তবুও ইন্দোনেশিয়ার মুদিকযাত্রীদের সংখ্যার প্রায় কাছাকাছি যাবেন। এই বিশাল মানুষের ঢল সামলাতে ইন্দোনেশিয়া সরকার জাভা দ্বীপ জুড়ে অতিরিক্ত ট্রেন, শত শত বাস ও প্লেনের ব্যবস্থা করে ।

বাস্তব চিত্র: ইন্দোনেশিয়ার এই বাড়ি ফেরা যাত্রা মানে শুধু ট্রেন-বাস নয়। এখানে প্রধান বাহন হলো মোটরসাইকেল। হাজার হাজার মানুষ পরিবার নিয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে কয়েকশো কিলোমিটার পাড়ি দেন। জাভার ট্রান্স-জাভা টোলরোড ও নর্থ কোস্ট রোডে লম্বা লম্বা জ্যাম লেগে যায়। সম্প্রতি সরকার মোটরসাইকেলের বিকল্প হিসেবে ‘মুদিক গ্রাটিস’ বা বিনামূল্যে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা চালু করেছে ।

আরেক মজার তথ্য হলো, বাংলাদেশে ঈদযাত্রার চরম ব্যস্ততা থাকে ঈদের আগের তিন-চার দিন। ইন্দোনেশিয়ায় অবশ্য এক মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় ট্রেন ও প্লেনের টিকিট সংকট। ২০২৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের ‘ওয়ার্ক ফ্রম এনিহোয়ার’ নীতি ও স্কুলের ছুটি আগিয়ে দেওয়ায় যাত্রা শুরু হয় আরও আগে ।

অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব: মুদিক শুধু সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ নয়, এটি ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির চাকা সচল রাখে। ২০২৬ সালে মুদিকের সময় প্রায় ১৫৭ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ অর্থ সঞ্চালিত হয়। শহরে উপার্জিত টাকা যখন মানুষ গ্রামে নিয়ে যায়, তখন গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। ছোট ছোট দোকান থেকে শুরু করে পর্যটন খাত- সব জায়গাতেই এর প্রভাব পড়ে।

নৌপথে গ্রামে ফিরছেন ঈদযাত্রীরা

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঈদের সময় রেমিট্যান্স বাড়ে, সঞ্চালন বাড়ে, কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক ‘বুম’ এর তুলনায় তা নগণ্য। ইন্দোনেশিয়ায় টাকা হাতবদলের এই উৎসবকে ‘ট্রান্সফার অফ ওয়েলথ’ বললে ভুল হবে না। বাংলাদেশে যেখানে ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটার মৌসুম চলে, সেখানে ইন্দোনেশিয়ায় পুরো অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব সঞ্চালনের মধ্য দিয়ে যায়।

বাংলাদেশেও ঈদুল ফিতর মানে রাজধানী ঢাকা প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। লঞ্চ, ট্রেন ও বাসে চড়ে গ্রামের বাড়ির পথে যাত্রা শুরু করেন লাখ লাখ মানুষ। তবে বাংলাদেশের যাত্রী সংখ্যা ১-২ কোটির বেশি নয়। ইন্দোনেশিয়ার ১৫-১৯ কোটির তুলনায় এটি সত্যিই অনেক কম । এখানেই মূল পার্থক্য- পরিমাণ আর অবকাঠামোর প্রস্তুতি।

ইন্দোনেশিয়ার মুদিক একটি বার্ষিক ‘ফেস্টিভাল অব ম্যাস মাইগ্রেশন’। অথচ বাংলাদেশের ঈদযাত্রা এখনও ফাঁকফোকর দিয়ে ভরা। সড়ক দুর্ঘটনা, নৌকা ডুবি আর ট্রেনের ছাদে চড়া আমাদের নিত্যদিনের চিত্র। ইন্দোনেশিয়াতেও অবশ্য ঝুঁকি আছে, কিন্তু সরকারি উদ্যোগ ক্রমশ তা কমিয়ে আনছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত