সংবাদ

ধর্ষণের বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধে ৫ দফা


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১১:৫৯ পিএম

ধর্ষণের বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধে ৫ দফা
শিশু নিপীড়ন ও ধর্ষণের বিচারহীনতা ‘আর না’: নাগরিক সমাজের ৫ দফা

রাজধানীতে শিশু নিপীড়ন, ধর্ষণ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধের দাবিতে রাজপথে নেমেছে নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। ‘শিশু নিপীড়ন, ধর্ষণ ও বিচারহীনতা আর না’ শীর্ষক এক প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করাসহ ৫ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।

রোববার (২৪ মে) বিকেলে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই রাজধানীর শাহবাগে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে ঢাকার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন। কর্মসূচির শুরুতে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আনিশা আন্দোলনের ৫ দফা দাবি পাঠ করে শোনায়।

সমাবেশে বক্তারা সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে ‘ডিউ প্রসেস’ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের পাশাপাশি বিচারিক কার্যক্রম সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে শেষ করার দাবি জানান।

সমাবেশে আইনজীবী প্রিয়া হাসান চৌধুরি বলেন, “সুষ্ঠু বিচার হয়েছে কি না তা নিয়ে যেন প্রশ্ন না ওঠে, সেজন্য আমাদের ‘ডিউ প্রসেস’ মানা দরকার। আমরা যদি ইমোশনে এসে বলি যে ডিফেন্স থাকতে পারবে না, তবে বিচার প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে।”

তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে তিনি বলেন, “কয়টি অভিযোগ আসছে আর কতগুলো মামলা হিসেবে নেওয়া হচ্ছে, তার সঠিক তথ্য আমাদের কাছে নেই। ইনভেস্টিগেশন কেন শেষ হতে পারে না, কোথায় বাধা-সেগুলোর প্রতি নজর দেওয়া দরকার। প্রতিটা মামলা একই রকম নয়, তাই কোয়ালিটি মেইনটেইন না করে দ্রুত তদন্ত শেষ করতে চাইলে পুরো বিচার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যেতে পারে।”

ধর্ষণ আইন সংস্কার জোটের সমন্বয়ক আইনজীবী মশিউর রহমান বলেন, “আমরা দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার চাই। অতীতে আসিয়া বা নুরজাহান হত্যার বিচার হলেও সেই শাস্তি কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এই বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণেই ধর্ষকরা আজকে বুক ফুলিয়ে সমাজে চলতে পারছে।”

গণবিপ্লবী উদ্যোগের সংগঠক আরিফ সোহেল সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “আমরা আর চটকদার বক্তব্য দেখতে চাই না। নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল বা ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলো এখন আর কার্যকর নেই। আমরা রক্ত পানি করা শ্রমের খাজনা দিয়ে এই রাষ্ট্র ও আদালত চালাই, অথচ আমাদের সন্তান ও মায়েরা নিরাপত্তা পায় না। রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে না পারলে তার অস্তিত্বের কোনো যৌক্তিকতা নেই।”

শিক্ষার্থী সানজানা আফিফা অদিতি বলেন, “ধর্ষণ হলে প্রধানমন্ত্রী বা উপদেষ্টারা ভিকটিমের বাসায় যান, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়। আধিপত্য মানেই পুরুষত্ব-ছেলেদের এই শিক্ষা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল ও আত্মরক্ষা শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।”

উত্থাপিত ৫ দফা দাবি:

১. দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা: ধর্ষণের মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে ট্রায়াল শেষ করতে হবে। কোনো মামলা সালিশ বা আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যাবে না এবং অগ্রগতি ডিজিটাল ডেটাবেজে প্রকাশ করতে হবে।

২. নারী নিরাপত্তা ও পুলিশের জবাবদিহি: প্রশিক্ষিত মহিলা পুলিশ ইউনিট, ২৪ ঘণ্টার জাতীয় হটলাইন ও দ্রুত লোকেশন শনাক্তের ব্যবস্থা করতে হবে। অভিযোগ নিতে অস্বীকারকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল: হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সংগঠনে কার্যকর যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ ও অভিযোগ নিষ্পত্তি সেল সক্রিয় করতে হবে।

৪. সুরক্ষা ও আত্মরক্ষা শিক্ষা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বয়স-উপযোগী ‘ভালো স্পর্শ, খারাপ স্পর্শ’ সচেতনতা এবং আত্মরক্ষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৫. প্রমাণ সংগ্রহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা: জেলা সদর হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলোকে (ঙঈঈ) প্রয়োজনীয় জনবল, ফরেনসিক সরঞ্জাম ও আইনি সহায়তার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ করতে হবে।

প্রতিবাদ কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য রাখেন ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস’ (এনপিএ) এর সংগঠক অনিক রায় এবং মেডিকেল শিক্ষার্থী আজওয়াথ নিশা। সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা ও সাবেক ছাত্রনেতা বাকি বিল্লাহ।

সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা ‘আর না বিচারহীনতার সংস্কৃতি’, ‘আর না ভুক্তভোগীকে দোষারোপ’, ‘আর না সালিশের নামে বিচার আড়াল করা’ সম্বলিত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬


ধর্ষণের বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধে ৫ দফা

প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬

featured Image

রাজধানীতে শিশু নিপীড়ন, ধর্ষণ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধের দাবিতে রাজপথে নেমেছে নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। ‘শিশু নিপীড়ন, ধর্ষণ ও বিচারহীনতা আর না’ শীর্ষক এক প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করাসহ ৫ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।

রোববার (২৪ মে) বিকেলে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই রাজধানীর শাহবাগে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে ঢাকার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন। কর্মসূচির শুরুতে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আনিশা আন্দোলনের ৫ দফা দাবি পাঠ করে শোনায়।

সমাবেশে বক্তারা সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে ‘ডিউ প্রসেস’ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের পাশাপাশি বিচারিক কার্যক্রম সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে শেষ করার দাবি জানান।

সমাবেশে আইনজীবী প্রিয়া হাসান চৌধুরি বলেন, “সুষ্ঠু বিচার হয়েছে কি না তা নিয়ে যেন প্রশ্ন না ওঠে, সেজন্য আমাদের ‘ডিউ প্রসেস’ মানা দরকার। আমরা যদি ইমোশনে এসে বলি যে ডিফেন্স থাকতে পারবে না, তবে বিচার প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে।”

তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে তিনি বলেন, “কয়টি অভিযোগ আসছে আর কতগুলো মামলা হিসেবে নেওয়া হচ্ছে, তার সঠিক তথ্য আমাদের কাছে নেই। ইনভেস্টিগেশন কেন শেষ হতে পারে না, কোথায় বাধা-সেগুলোর প্রতি নজর দেওয়া দরকার। প্রতিটা মামলা একই রকম নয়, তাই কোয়ালিটি মেইনটেইন না করে দ্রুত তদন্ত শেষ করতে চাইলে পুরো বিচার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যেতে পারে।”

ধর্ষণ আইন সংস্কার জোটের সমন্বয়ক আইনজীবী মশিউর রহমান বলেন, “আমরা দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার চাই। অতীতে আসিয়া বা নুরজাহান হত্যার বিচার হলেও সেই শাস্তি কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এই বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণেই ধর্ষকরা আজকে বুক ফুলিয়ে সমাজে চলতে পারছে।”

গণবিপ্লবী উদ্যোগের সংগঠক আরিফ সোহেল সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “আমরা আর চটকদার বক্তব্য দেখতে চাই না। নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল বা ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলো এখন আর কার্যকর নেই। আমরা রক্ত পানি করা শ্রমের খাজনা দিয়ে এই রাষ্ট্র ও আদালত চালাই, অথচ আমাদের সন্তান ও মায়েরা নিরাপত্তা পায় না। রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে না পারলে তার অস্তিত্বের কোনো যৌক্তিকতা নেই।”

শিক্ষার্থী সানজানা আফিফা অদিতি বলেন, “ধর্ষণ হলে প্রধানমন্ত্রী বা উপদেষ্টারা ভিকটিমের বাসায় যান, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়। আধিপত্য মানেই পুরুষত্ব-ছেলেদের এই শিক্ষা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল ও আত্মরক্ষা শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।”

উত্থাপিত ৫ দফা দাবি:

১. দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা: ধর্ষণের মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে ট্রায়াল শেষ করতে হবে। কোনো মামলা সালিশ বা আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যাবে না এবং অগ্রগতি ডিজিটাল ডেটাবেজে প্রকাশ করতে হবে।

২. নারী নিরাপত্তা ও পুলিশের জবাবদিহি: প্রশিক্ষিত মহিলা পুলিশ ইউনিট, ২৪ ঘণ্টার জাতীয় হটলাইন ও দ্রুত লোকেশন শনাক্তের ব্যবস্থা করতে হবে। অভিযোগ নিতে অস্বীকারকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল: হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সংগঠনে কার্যকর যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ ও অভিযোগ নিষ্পত্তি সেল সক্রিয় করতে হবে।

৪. সুরক্ষা ও আত্মরক্ষা শিক্ষা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বয়স-উপযোগী ‘ভালো স্পর্শ, খারাপ স্পর্শ’ সচেতনতা এবং আত্মরক্ষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৫. প্রমাণ সংগ্রহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা: জেলা সদর হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলোকে (ঙঈঈ) প্রয়োজনীয় জনবল, ফরেনসিক সরঞ্জাম ও আইনি সহায়তার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ করতে হবে।

প্রতিবাদ কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য রাখেন ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস’ (এনপিএ) এর সংগঠক অনিক রায় এবং মেডিকেল শিক্ষার্থী আজওয়াথ নিশা। সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা ও সাবেক ছাত্রনেতা বাকি বিল্লাহ।

সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা ‘আর না বিচারহীনতার সংস্কৃতি’, ‘আর না ভুক্তভোগীকে দোষারোপ’, ‘আর না সালিশের নামে বিচার আড়াল করা’ সম্বলিত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত