সংবাদ

বাজেট ও বাজার: জনগণের কাঁধে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা


এম ইউ আহমেদ ফরিদ
এম ইউ আহমেদ ফরিদ
প্রকাশ: ৯ জুন ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম

বাজেট ও বাজার: জনগণের কাঁধে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা

বাজেটের আগে বাজার, বাজারের আগে আতঙ্ক। 

দিন যায় কথা থাকে গানের মতো প্রতিবছরই বাজেট আসে বাজেট যায়। প্রতিবছরই এপ্রিল-মে মাসে শুরু হয় বাজেটা প্রণয়নের তুমুল তোড়জোর। অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘাম ছুটে যায় বাজেট তৈরি করতে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কর্মকর্তাদের দ্বি-পক্ষীয়, ত্রি-পক্ষীয়, বহুপক্ষীয় সভা। সেখানে নানা ধরনের আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক আর দর কষাকষির পর পূর্বের বছরের তুলনায় শতকরা পাঁচ বা দশভাগ বরাদ্দ বাড়িয়ে যা তৈরি করা হয় তারই নাম বাজেট। 

প্রতিবছর জুন মাসের প্রথম বৃহস্পতিবারে বাংলাদেশের সংসদে বাজেট উপস্থাপনের একটা রীতি রয়েছে। তবে এর যে হেরফের হয় না এমন নয়। 

অর্থমন্ত্রী তার ব্রিফকেসে করে বাজেটের সকল কাগজপত্র নিয়ে সংসদে হাজির হন। সেই ব্রিফকেসে থাকে অনেক ডকুমেন্ট যাদেরকে বলা হয় বাজেট ডকুমেন্ট। সেই ডকুমেন্টটা চটের ব্যাগে করে আগেই সংসদ সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী যে বইটি রিডিং পড়েন তার নাম বাজেট বক্তৃতা। সে কয়েক ঘণ্টার ইতিহাস। বাজেট বক্তৃতা করতে করতে মন্ত্রীকে কয়েকবার পানি পান করতে হয়। সংসদসদস্যগণের অনেকই বক্তৃতা শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে হাই তুলতে থাকেন, যাদের বয়স একটু বেশি তারা ঘুমিয়ে পড়েন। তারপর মাসব্যাপী সেই বাজেটের ওপর সংসদে আলোচনা হয়, পাশ হয় বাজেট। বিরোধীদলের সদস্যরা বাজেটকে গণবিরোধী বলে তুলোধূনা করেন আর সরকারি দলের লোকজন বলেন ইতোপূর্বে এ ধরণের জনবান্ধব বাজেট জাতীয় সংসদে আর উপস্থাপিত হয়নি। মাঝেমধ্যে বাজেট রেখে অন্যবিষয় নিয়েও তুমুল বকাবকি হয়ে থাকে। টকশোওয়লাদের কাছে বাজেট এক আনন্দ উৎসব। টেলিভিশনে তাদের কদর বেড়ে যায়। তাদের আলোচনা-সমালোচনায় দর্শকদের কান ঝালাপালা হয়ে উঠে। 

দীর্ঘ ষোলো বছর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে কাজ করার সুবাধে এমনটিই দেখেছি। যা বলছিলাম, গানের সেই কথার মতোই বাজেটের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট থেকে যায় কিংবা আরও বাড়ে। সাধারণ মানুষের কাছে বাজেট কিছু দুর্বোধ্য সংখ্যা, কর বাড়ানোর এক মোক্ষম হাতিয়ার আর জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে যাবার আতঙ্ক। আর তাদের আশঙ্কা সত্য করে দিয়ে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায় আমাদের চোখের সামনেই। অধিকাংশ ক্ষেত্র এটি ঘটে বাজেট প্রণয়ের বেশ আগেই। ধান্দাবাজ ব্যবসায়ীরা তক্ষে তক্ষে থাকে যে কোনো অছিলায় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিতে। 

বাজেটের আগে একবার বাড়ায়, আর বাজেটের পরে আর একবার। অর্থাৎ বাজেটের অছিলায় আমাদের দেশে দুইদফা জিনিস-পত্রের দাম বাড়ানো হয়ে থাকে। বাজেটের আগে ব্যবসায়ী এবং মজুতদারা বাজারে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে। কৃত্রিমভাবে জিনিসপত্রের সরবারাহ বাজারে কমিয়ে ফেল। বাজারে জিনিসপত্রের স্বাভাবিক সরবরাহ না থাকলে খোলাবাজার নীতির নিয়ম অনুযায়ী জিনিসত্রের দাম বেড়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক এবং হচ্ছেও তাই। তারা গুজব ছড়ায় বিভিন্ন পণ্যের আমদানি শুল্ক বেড়ে যাবে, নতুন কর আরোপ করা হবে, আর আমদানি শুল্ক ও কর বেড়ে গেলে বেড়ে গেলে দাম বেড়ে যাবে। হয়তো দেখা গেল খুব কমসংখ্যক পণ্যের উপর বাজেটে আমদআনি শুল্ক বাড়ানো হয়েছ, কিন্তু দাম বেড়ে গেলো প্রায় সকল আমদানিকৃত পণ্যের। আমদানি শুল্ক তখন ও কিন্তু বাড়ানো হয়নি, শুধু বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছ। 

এর জন্য আপনি কাকে দায়ী করবেন। গ্রাম অঞ্চলে একটা কথা আছে- আঁধার ঘরে সাপ, পুরো ঘরে সাপ। ঘর অন্ধকার থাকলে ঘরের যেকোনো জায়গাই সাপ থাকার সম্ভাবানা থাকে। তাই বলে ঘরের সবজায়গায় সাপ থাকে না। সবজায়গায় না থাকলেও আপনি কিন্তু ঘরের মেঝের কোথাও পা ফেলতে সাহস করবেন না। 

বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নে প্রচণ্ড রকমের লুকোচুরি করা হয়। বাজেট প্রণয়ন কওে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। বাজেট প্রণয়নের একমাস আগ থেকই সেখানে সাংবাদিক, সাধারণ জনগণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। যে ফ্লোরে বাজেট তৈরি করা হয় সেই ফ্লোরের কলাপসিবল গেইটে তালা মেরে রাখা হতো। গেইটে সশস্ত্র প্রহরী। এক যুদ্ধংদেহী অবস্থা। সাংবাদিকগণ ঘুর ঘুর করছেন বাজেটের তথ্য সংগ্রহের জন্য। নানা কায়দায় তারা তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা চালিয়ে যান। অনির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তারা ‘নির্ভরযোগ্য’ তথ্যে পত্রিকার পাতা ভরে ফেলেন। সেখানে সত্যের সঙ্গে আধা-সত্যেও কিংবা মিথ্যার একটা মিশেল থাকে। তাদের পত্রিকার শিরোনাম থেকে আপনার মনে হতেই পারে আসন্ন বাজেটে বাজারে আগুন লাগানোর সকল আয়োজন রাখা হয়েছে যে আগুনে আপনার সাজানো সংসার পুড়ে ছারখার হয়ে যেতে পারে। বাজেটের সঙ্গে অনেক পণ্যের হয়তো কোনো সরাসরি সমপৃক্তাই নেই, তবুও দাম বাড়ছে। আপনিও তেল, ডাল, গুড়া দুধের পিছনে ছুটে সেগুলোর দাম বাড়াতে যে একটা ভূমিকা রাখছেন সেটি হয়তো বুঝতে পারছেন না। 

বাজেট তৈরিতে এই গোপনীয়তা কেনো? তার কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে। এটি কি একটা ট্যাবু যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে? পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও কি বাজেট তৈরিতে এতো গোপনীয়তা পালন করা হয়? হয়তো হয়, হয়তো না। গোপনীয় জিনিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ চিরন্তন। যেকোনো গোপনীয় জিনিস নিয়ে মানুষ কল্পনার জাল বুনে, নানা রকমের অনুমান আন্দাজ তৈরি করে। সেই অনুমান, আন্দাজ সেই রহস্যময়তা ফ্যাক্ট বা সত্য তথ্য বিকৃতি ঘটায়। 

বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেট প্রণয়নে গোপনীয়তার যে রীতি প্রচলিত আছে তার যুক্তিসংগতভাবে গোপনীয়তার খোলস থেকে বের করে আনা যায় কিনা তা অর্থ মন্ত্রণালয় ভেবে দেখতে পারে। 

এবার আসুন বাজেট তৈরির পরের কাহিনীতে। বাজেট তো পাস হলো। কিছু কিছু পণ্যেও উপর সত্যি সত্যিই আমদানি শুল্ক বাড়ানে হলো, কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয় তো নতুন ট্যাক্স আরোপ করা হলো কিংবা বাড়ানো হলো। এবার শুরু হলো পণ্যের দাম বাড়ানোর নতুন ঢেউ। ব্যবসায়ীদের দাবি তাদের এখন আর করার কিছু নেই। সরকার শুল্ক বাড়িয়ে দিয়েছে, ট্যাক্স বাড়িয়ে দিয়েছ তাদের করার কী আছে?

সত্যিই তাদের করার কিছু নেই? সরকার হয়তো শুল্ক বাড়িয়েছ শতকরা একভাগ, তারা সেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিল শতকরা দশভাগ। সরকার হয়তো দশটা পণ্যের ওপর ট্যাক্স বাড়িয়েছে তারা বাড়িয়ে দিলেন একশ একটা পণ্যের দাম। 

আপনি বাজারে গিয়েছেন মাছ কিনবেন, তিতাস নদীর সেই মাছে যেটি আপনি দুই দিন আগে কিনেছেন তিনশ টাকা কেজি দরে আজেকে আপনাকে কিনতে হচ্ছে চারশ টাকা কেজি। মাছ তো আর আমদানি হয়ে আসেনি তবু তার দাম বেড়েছ। দোকানিকে জিজ্ঞেস করলে তার নিরীহ জবাব- বাজেটে দাম বেড়েছে। একই ক্রিছা মুরগিওয়ালার ক্ষেত্রেও। দেশি মুরগি খাওয়া আপনি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছন ট্যাকের জোর নেই বলে এবার ব্রয়লারটাও ছাড়তে হবে। ছাড়তে ছাড়তে একসময় দেখা যাবে আপনাকে সবকিছুই ছাড়তে হচ্ছে। ছাড় দেয়ার আর কিছুই নেই। তখন আর কী করবেন! কী আর করবেন- যা করার বাজেটই করবে। মাছের দাম কিংবা মুরগির দাম বেড়ে গিয়েছে কেনো এমন প্রশ্নের জবাবে দোকানি আপনাকে যে জবাব দেবে তা শুনে হয় তো আপনি লা-জবাব। 

নন্দঘোষের মত সব দোষ বাজেটের। 

আপনি একজন সীমিত আয়ের মানুষ, ছোটো একটা চাকরি করেন, আপনার উপরি আয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই কিংবা আপনি একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারি প্রতিবছরের বাজেট আপনার জীবনীশক্তিকে খেয়ে দিচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়াকে আপনি লাগাম পড়াতে না পেরে আপনার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন, প্রোটিন আর পুষ্টিকর খাদ্য বাদ দিয়ে আপনি ঝুঁকছেন গাদা গাদা কার্বহাইড্রেটের দিকে। অকালেই আপনি বুড়িয়ে যাচ্ছেন কিংবা রোগো শোকো পতিত হচ্ছেন। 

কিন্তু এর জন্য দায়ী কারা? শুধু ব্যবসায়ীরা?

ব্যবসায়ীরাতো বটেই। তবে পুরোপুরি নয়। এদেশে ব্যবসার সঙ্গে নীতি-নৈতিকতার মেলবন্দন তেমন ঘটেনি। আগেও ছিলো না। বাইন্যা (স্বর্ণকার) নিজ মায়ের স্বর্ণ চুরি করত এধরণের কাহিনী, প্রবাদ আমাদের পুরনো সাহিত্যে আছে। সুতারাং তাদের কাছ থেকে আপনি সহজে নিস্তার পেয়ে যাবেন এমনটা আশা করা বাতুলতা মাত্র। 

এক্ষেত্রে সরকারের একটা ভূমিকা আছে। বাজার নজরদারী করে সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু বাজার নজরদারীতে সরকার কতটুকু দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছে, সরকারের সক্ষমতা কতটুকু? সিন্ডকেটের বিরুদ্ধে সরকার সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। মাঝে মধ্যেই মনে হয় সরকার দেশ চালায় না, দেশ চালায় বিভিন্ন সিন্ডিকেট। যিনি রানীতি করেন তিনিই আবার ব্যবসায়ী, তিনিই আবার ঠিকাদার। এ অবস্থায় কে কারে সামলাবে? এ যেনো সার্টের চেয়ে গেঞ্জি বড় অর্থাৎ সরকারের চেয়ে সিন্ডিকেট বড়। 

রাশান একটা জোক মনে পড়ে গেলো। সেকালে রাশান শাশুড়িদের খুব বদনাম ছিল। তাদের দাপটে বেচারি স্বামী সবসময় কেঁচু হয়ে থাকত। শুধু জামাই-ই (নিজের ও মেয়ের) না, জামাইকুলের চৌদ্দগুষ্টি ভয়ে ইচামাছ হয়ে থাকত। 

এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলছে- ধর, তোর শ্বাশুড়ি এক গহীন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। এমনসময় একটা বাঘ হালুম করে তার সামনে এসে পড়লো। বলো তো বাঘটি তোর শ্বাশুড়িকে কী করবে?

দ্বিতীয় বন্ধুর উত্তর- বাঘে আমার শ্বাশুড়িকে কী করবে? যা কিছু করার আমার শ্বাশুড়িই তো বাঘকে করবে। 

বেচারি বাঘ। 

দ্রব্যমূল্য বাড়বে, আপনার আমার কী করার আছে। সেই রাশান শ্বাশুড়ির মতো বাজেটই কিংবা ব্যবসায়ীরাই কি যা কিছু করার করবে?

[লেখক: সাবেক অতিরিক্ত সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬


বাজেট ও বাজার: জনগণের কাঁধে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা

প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬

featured Image

বাজেটের আগে বাজার, বাজারের আগে আতঙ্ক। 

দিন যায় কথা থাকে গানের মতো প্রতিবছরই বাজেট আসে বাজেট যায়। প্রতিবছরই এপ্রিল-মে মাসে শুরু হয় বাজেটা প্রণয়নের তুমুল তোড়জোর। অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘাম ছুটে যায় বাজেট তৈরি করতে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কর্মকর্তাদের দ্বি-পক্ষীয়, ত্রি-পক্ষীয়, বহুপক্ষীয় সভা। সেখানে নানা ধরনের আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক আর দর কষাকষির পর পূর্বের বছরের তুলনায় শতকরা পাঁচ বা দশভাগ বরাদ্দ বাড়িয়ে যা তৈরি করা হয় তারই নাম বাজেট। 

প্রতিবছর জুন মাসের প্রথম বৃহস্পতিবারে বাংলাদেশের সংসদে বাজেট উপস্থাপনের একটা রীতি রয়েছে। তবে এর যে হেরফের হয় না এমন নয়। 

অর্থমন্ত্রী তার ব্রিফকেসে করে বাজেটের সকল কাগজপত্র নিয়ে সংসদে হাজির হন। সেই ব্রিফকেসে থাকে অনেক ডকুমেন্ট যাদেরকে বলা হয় বাজেট ডকুমেন্ট। সেই ডকুমেন্টটা চটের ব্যাগে করে আগেই সংসদ সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী যে বইটি রিডিং পড়েন তার নাম বাজেট বক্তৃতা। সে কয়েক ঘণ্টার ইতিহাস। বাজেট বক্তৃতা করতে করতে মন্ত্রীকে কয়েকবার পানি পান করতে হয়। সংসদসদস্যগণের অনেকই বক্তৃতা শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে হাই তুলতে থাকেন, যাদের বয়স একটু বেশি তারা ঘুমিয়ে পড়েন। তারপর মাসব্যাপী সেই বাজেটের ওপর সংসদে আলোচনা হয়, পাশ হয় বাজেট। বিরোধীদলের সদস্যরা বাজেটকে গণবিরোধী বলে তুলোধূনা করেন আর সরকারি দলের লোকজন বলেন ইতোপূর্বে এ ধরণের জনবান্ধব বাজেট জাতীয় সংসদে আর উপস্থাপিত হয়নি। মাঝেমধ্যে বাজেট রেখে অন্যবিষয় নিয়েও তুমুল বকাবকি হয়ে থাকে। টকশোওয়লাদের কাছে বাজেট এক আনন্দ উৎসব। টেলিভিশনে তাদের কদর বেড়ে যায়। তাদের আলোচনা-সমালোচনায় দর্শকদের কান ঝালাপালা হয়ে উঠে। 

দীর্ঘ ষোলো বছর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে কাজ করার সুবাধে এমনটিই দেখেছি। যা বলছিলাম, গানের সেই কথার মতোই বাজেটের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট থেকে যায় কিংবা আরও বাড়ে। সাধারণ মানুষের কাছে বাজেট কিছু দুর্বোধ্য সংখ্যা, কর বাড়ানোর এক মোক্ষম হাতিয়ার আর জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে যাবার আতঙ্ক। আর তাদের আশঙ্কা সত্য করে দিয়ে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায় আমাদের চোখের সামনেই। অধিকাংশ ক্ষেত্র এটি ঘটে বাজেট প্রণয়ের বেশ আগেই। ধান্দাবাজ ব্যবসায়ীরা তক্ষে তক্ষে থাকে যে কোনো অছিলায় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিতে। 

বাজেটের আগে একবার বাড়ায়, আর বাজেটের পরে আর একবার। অর্থাৎ বাজেটের অছিলায় আমাদের দেশে দুইদফা জিনিস-পত্রের দাম বাড়ানো হয়ে থাকে। বাজেটের আগে ব্যবসায়ী এবং মজুতদারা বাজারে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে। কৃত্রিমভাবে জিনিসপত্রের সরবারাহ বাজারে কমিয়ে ফেল। বাজারে জিনিসপত্রের স্বাভাবিক সরবরাহ না থাকলে খোলাবাজার নীতির নিয়ম অনুযায়ী জিনিসত্রের দাম বেড়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক এবং হচ্ছেও তাই। তারা গুজব ছড়ায় বিভিন্ন পণ্যের আমদানি শুল্ক বেড়ে যাবে, নতুন কর আরোপ করা হবে, আর আমদানি শুল্ক ও কর বেড়ে গেলে বেড়ে গেলে দাম বেড়ে যাবে। হয়তো দেখা গেল খুব কমসংখ্যক পণ্যের উপর বাজেটে আমদআনি শুল্ক বাড়ানো হয়েছ, কিন্তু দাম বেড়ে গেলো প্রায় সকল আমদানিকৃত পণ্যের। আমদানি শুল্ক তখন ও কিন্তু বাড়ানো হয়নি, শুধু বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছ। 

এর জন্য আপনি কাকে দায়ী করবেন। গ্রাম অঞ্চলে একটা কথা আছে- আঁধার ঘরে সাপ, পুরো ঘরে সাপ। ঘর অন্ধকার থাকলে ঘরের যেকোনো জায়গাই সাপ থাকার সম্ভাবানা থাকে। তাই বলে ঘরের সবজায়গায় সাপ থাকে না। সবজায়গায় না থাকলেও আপনি কিন্তু ঘরের মেঝের কোথাও পা ফেলতে সাহস করবেন না। 

বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নে প্রচণ্ড রকমের লুকোচুরি করা হয়। বাজেট প্রণয়ন কওে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। বাজেট প্রণয়নের একমাস আগ থেকই সেখানে সাংবাদিক, সাধারণ জনগণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। যে ফ্লোরে বাজেট তৈরি করা হয় সেই ফ্লোরের কলাপসিবল গেইটে তালা মেরে রাখা হতো। গেইটে সশস্ত্র প্রহরী। এক যুদ্ধংদেহী অবস্থা। সাংবাদিকগণ ঘুর ঘুর করছেন বাজেটের তথ্য সংগ্রহের জন্য। নানা কায়দায় তারা তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা চালিয়ে যান। অনির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তারা ‘নির্ভরযোগ্য’ তথ্যে পত্রিকার পাতা ভরে ফেলেন। সেখানে সত্যের সঙ্গে আধা-সত্যেও কিংবা মিথ্যার একটা মিশেল থাকে। তাদের পত্রিকার শিরোনাম থেকে আপনার মনে হতেই পারে আসন্ন বাজেটে বাজারে আগুন লাগানোর সকল আয়োজন রাখা হয়েছে যে আগুনে আপনার সাজানো সংসার পুড়ে ছারখার হয়ে যেতে পারে। বাজেটের সঙ্গে অনেক পণ্যের হয়তো কোনো সরাসরি সমপৃক্তাই নেই, তবুও দাম বাড়ছে। আপনিও তেল, ডাল, গুড়া দুধের পিছনে ছুটে সেগুলোর দাম বাড়াতে যে একটা ভূমিকা রাখছেন সেটি হয়তো বুঝতে পারছেন না। 

বাজেট তৈরিতে এই গোপনীয়তা কেনো? তার কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে। এটি কি একটা ট্যাবু যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে? পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও কি বাজেট তৈরিতে এতো গোপনীয়তা পালন করা হয়? হয়তো হয়, হয়তো না। গোপনীয় জিনিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ চিরন্তন। যেকোনো গোপনীয় জিনিস নিয়ে মানুষ কল্পনার জাল বুনে, নানা রকমের অনুমান আন্দাজ তৈরি করে। সেই অনুমান, আন্দাজ সেই রহস্যময়তা ফ্যাক্ট বা সত্য তথ্য বিকৃতি ঘটায়। 

বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেট প্রণয়নে গোপনীয়তার যে রীতি প্রচলিত আছে তার যুক্তিসংগতভাবে গোপনীয়তার খোলস থেকে বের করে আনা যায় কিনা তা অর্থ মন্ত্রণালয় ভেবে দেখতে পারে। 

এবার আসুন বাজেট তৈরির পরের কাহিনীতে। বাজেট তো পাস হলো। কিছু কিছু পণ্যেও উপর সত্যি সত্যিই আমদানি শুল্ক বাড়ানে হলো, কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয় তো নতুন ট্যাক্স আরোপ করা হলো কিংবা বাড়ানো হলো। এবার শুরু হলো পণ্যের দাম বাড়ানোর নতুন ঢেউ। ব্যবসায়ীদের দাবি তাদের এখন আর করার কিছু নেই। সরকার শুল্ক বাড়িয়ে দিয়েছে, ট্যাক্স বাড়িয়ে দিয়েছ তাদের করার কী আছে?

সত্যিই তাদের করার কিছু নেই? সরকার হয়তো শুল্ক বাড়িয়েছ শতকরা একভাগ, তারা সেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিল শতকরা দশভাগ। সরকার হয়তো দশটা পণ্যের ওপর ট্যাক্স বাড়িয়েছে তারা বাড়িয়ে দিলেন একশ একটা পণ্যের দাম। 

আপনি বাজারে গিয়েছেন মাছ কিনবেন, তিতাস নদীর সেই মাছে যেটি আপনি দুই দিন আগে কিনেছেন তিনশ টাকা কেজি দরে আজেকে আপনাকে কিনতে হচ্ছে চারশ টাকা কেজি। মাছ তো আর আমদানি হয়ে আসেনি তবু তার দাম বেড়েছ। দোকানিকে জিজ্ঞেস করলে তার নিরীহ জবাব- বাজেটে দাম বেড়েছে। একই ক্রিছা মুরগিওয়ালার ক্ষেত্রেও। দেশি মুরগি খাওয়া আপনি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছন ট্যাকের জোর নেই বলে এবার ব্রয়লারটাও ছাড়তে হবে। ছাড়তে ছাড়তে একসময় দেখা যাবে আপনাকে সবকিছুই ছাড়তে হচ্ছে। ছাড় দেয়ার আর কিছুই নেই। তখন আর কী করবেন! কী আর করবেন- যা করার বাজেটই করবে। মাছের দাম কিংবা মুরগির দাম বেড়ে গিয়েছে কেনো এমন প্রশ্নের জবাবে দোকানি আপনাকে যে জবাব দেবে তা শুনে হয় তো আপনি লা-জবাব। 

নন্দঘোষের মত সব দোষ বাজেটের। 

আপনি একজন সীমিত আয়ের মানুষ, ছোটো একটা চাকরি করেন, আপনার উপরি আয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই কিংবা আপনি একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারি প্রতিবছরের বাজেট আপনার জীবনীশক্তিকে খেয়ে দিচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়াকে আপনি লাগাম পড়াতে না পেরে আপনার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন, প্রোটিন আর পুষ্টিকর খাদ্য বাদ দিয়ে আপনি ঝুঁকছেন গাদা গাদা কার্বহাইড্রেটের দিকে। অকালেই আপনি বুড়িয়ে যাচ্ছেন কিংবা রোগো শোকো পতিত হচ্ছেন। 

কিন্তু এর জন্য দায়ী কারা? শুধু ব্যবসায়ীরা?

ব্যবসায়ীরাতো বটেই। তবে পুরোপুরি নয়। এদেশে ব্যবসার সঙ্গে নীতি-নৈতিকতার মেলবন্দন তেমন ঘটেনি। আগেও ছিলো না। বাইন্যা (স্বর্ণকার) নিজ মায়ের স্বর্ণ চুরি করত এধরণের কাহিনী, প্রবাদ আমাদের পুরনো সাহিত্যে আছে। সুতারাং তাদের কাছ থেকে আপনি সহজে নিস্তার পেয়ে যাবেন এমনটা আশা করা বাতুলতা মাত্র। 

এক্ষেত্রে সরকারের একটা ভূমিকা আছে। বাজার নজরদারী করে সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু বাজার নজরদারীতে সরকার কতটুকু দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছে, সরকারের সক্ষমতা কতটুকু? সিন্ডকেটের বিরুদ্ধে সরকার সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। মাঝে মধ্যেই মনে হয় সরকার দেশ চালায় না, দেশ চালায় বিভিন্ন সিন্ডিকেট। যিনি রানীতি করেন তিনিই আবার ব্যবসায়ী, তিনিই আবার ঠিকাদার। এ অবস্থায় কে কারে সামলাবে? এ যেনো সার্টের চেয়ে গেঞ্জি বড় অর্থাৎ সরকারের চেয়ে সিন্ডিকেট বড়। 

রাশান একটা জোক মনে পড়ে গেলো। সেকালে রাশান শাশুড়িদের খুব বদনাম ছিল। তাদের দাপটে বেচারি স্বামী সবসময় কেঁচু হয়ে থাকত। শুধু জামাই-ই (নিজের ও মেয়ের) না, জামাইকুলের চৌদ্দগুষ্টি ভয়ে ইচামাছ হয়ে থাকত। 

এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলছে- ধর, তোর শ্বাশুড়ি এক গহীন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। এমনসময় একটা বাঘ হালুম করে তার সামনে এসে পড়লো। বলো তো বাঘটি তোর শ্বাশুড়িকে কী করবে?

দ্বিতীয় বন্ধুর উত্তর- বাঘে আমার শ্বাশুড়িকে কী করবে? যা কিছু করার আমার শ্বাশুড়িই তো বাঘকে করবে। 

বেচারি বাঘ। 

দ্রব্যমূল্য বাড়বে, আপনার আমার কী করার আছে। সেই রাশান শ্বাশুড়ির মতো বাজেটই কিংবা ব্যবসায়ীরাই কি যা কিছু করার করবে?

[লেখক: সাবেক অতিরিক্ত সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত