সংবাদ

চীনের পর্যটন ক্যানভাস: লাল স্মৃতিস্তম্ভ, সবুজ পর্বত, সোনালি ঐতিহ্য


মোহাম্মাদ সোহাইব
মোহাম্মাদ সোহাইব
প্রকাশ: ৯ জুন ২০২৬, ১০:২২ এএম

চীনের পর্যটন ক্যানভাস: লাল স্মৃতিস্তম্ভ, সবুজ পর্বত, সোনালি ঐতিহ্য
চীনের টেরাকোটা যোদ্ধা। ১৯৭৪ সালে সি’আনের কয়েকজন কৃষক আবিষ্কার করেন প্রায় ২ হাজার ২০০ বছর পুরনো এই নিদর্শন

কেন আমার চোখ প্রায়ই অশ্রুসিক্ত হয়? কারণ আমি এই ভূমিকে গভীরভাবে ভালোবাসি”- ১৯৩৮ সালে আই চিং যিনি চীনের অন্যতম প্রভাবশালী কবি, মাতৃভূমির বিদ্যমান দূরাবস্থা এবং তার প্রতি ভালবাসায় অনুপ্রাণিত হয়ে উক্তিটি করেছিলেন। পাঁচ হাজারের বছরেরও বেশি পুরনো একটি সভ্যতা, অনেক উত্থান- পতন পেরিয়ে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা অতিক্রম করে আজ সারা বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। চীনের উত্থানের এই ইতিহাস একে একটি জীবন্ত ক্যানভাসে পরিণত করেছে। চীনের ইতিহাসের রঙিন পাতায় ঘুরে বেড়ালে মনে হয় এ যেন এক অমীমাংসিত কবিতা এবং এই কবিতার মীমাংসা হল নিজেকে উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছে নিয়ে যাওয়া। যার ফলে চীনের মত একটি দেশে ভ্রমন করা এবং এর সৌন্দর্য উপভোগ করা যেকোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য যেন এক গুপ্তধন খুঁজে পাওয়ার মতো। ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি, আধুনিকতা- প্রত্যেকটি বিষয়েরই এক সুন্দর মিলনমেলা চীনে বিদ্যমান। আর্চি টাওয়ারের লাল সংগ্রামের ইতিহাস থেকে শুরু করে, ঝাংঝিয়াজির ভাসমান পাহাড় অতিক্রম করে, বেইজিং এর কেন্দ্রীয় অক্ষরেখার সোনালি ইতিহাস- এই তিন রঙেই ফুটে উঠেছে আজকের চীনের পর্যটন ক্যানভাস। শুধু পর্যটক হিসেবেই নয়, এদেশকে জানা দরকার একজন শিক্ষার্থীর মতো, একজন ভাবুকের মতো। তাছাড়া চীন নিজের ঐতিহ্য ধরে রেখে যেভাবে উন্নতিকে আলিঙ্গন করতে পেরেছে তাতে রয়েছে প্রত্যেক বাংলাদেশির জন্যই এক জীবন্ত শিক্ষা। 

প্রথমেই লিখতে চাই টেরাকোটা যোদ্ধা নিয়ে। ১৯৭৪ সালে সি’আনের কয়েকজন কৃষক আবিষ্কার করেন প্রায় ২ হাজার ২০০ বছর পুরনো এই নিদর্শন। অখণ্ড চীনের প্রথম সম্রাট চিন শিংহুয়া এর মৃত্যুর পর তার সমাধির সাথে পোড়ামাটির তৈরি ৫.৮ থেকে ৬.৫ ফুট উচ্চতার এই মূর্তিগুলো সমাধিস্থ করা হয়। তারা বিশ্বাস করতেন- এই পোড়ামাটির যোদ্ধা সম্রাটকে পরকালীন যেকোনো বিপদ থেকে বাঁচাবে । মূর্তিগুলোর কারুকার্য এতটাই নিখুঁত যে দেখে মনে হয় যেন প্রতিটি যোদ্ধাই জীবন্ত এবং তাদের সেনাপতির ডাকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত। টেরাকোটা যোদ্ধার পর চীনের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আরেক উজ্জ্বল নাম তাং রাজবংশ। এই রাজবংশের পুরোটা সময় জুড়েই চীন- শিল্প, কবিতা, সাহিত্যে ব্যাপক উন্নতি দেখতে পেড়েছে। একে শিল্পের স্বর্ণযুগ ও বলা হয়। তাং রাজবংশের রাজধানী ছিল চাং’আন (বর্তমান সি আন) যা ছিল প্রাচীন সিল্ক রোড এর প্রাণকেন্দ্র। এই পথ ধরেই সারা বিশ্বে আদান প্রদান হতো রেশম, কাঁচ অর শিল্প। একসময় পুরো বিশ্বের মহানগরী বলা হতো এই তাং বংশকে। বর্তমান সময়ে চীনের এই গৌরবময় ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে চীনের রাজধানী বেইজিং এর সেন্ট্রাল এক্সিস। এটি ৭০০ বছরের পুরনো প্রাচীন নগর পরিকল্পনার নিদর্শন। এটি ১৫ টি ঐতিহাসিক স্থান নিয়ে গঠিত, উত্তর থেকে দক্ষিণে ৭.৮ কিলোমিটার বিস্তৃত। ১৫ টি স্থানের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো নিষিদ্ধ শহর(ফরবিডেন সিটি) তথা প্রাসাদ জাদুঘর যা ছিল মিং ও ছিং রাজবংশের ২৪ জন সম্রাটের বাসস্থান। এছাড়া স্বর্গের মন্দির, ঘণ্টা ও ঢোল টাওয়ার, তিয়েনআনমেন স্কয়ার ও ইয়েংডিংমেন গেট যা সারা বিশ্বে পর্যটনের জন্য বেশ জনপ্রিয়। রাজধানীর এই জায়গাটি প্রাচীন চীনা দর্শনের বাস্তব রূপ হওয়ায় বেইজিং সেন্ট্রাল এক্সিস ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

গৌরবময় অতীতের পাশাপাশি চীনের রয়ছে সংগ্রামের ইতিহাস। সেই সংগ্রামের এক জীবন্ত সাক্ষী চীনের হেনান প্রদেশের রাজধানী ঝেংঝুর আরচি মেমোরিয়াল টাওয়ার। ১৯২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির বেইজিং-হানকৌ রেলপথের শ্রমিক ধর্মঘটের স্মরণে এটি তৈরি করা হয় যা ছিল চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন প্রথম বড় শিল্প আন্দোলন। ৬৩ মিটার উঁচু টাওয়ারে সবুজ চকচকে টালির ছাদ ও প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী প্রত্যেক পর্যটকেরই নজর কাড়ে। ১০ তলা বিশিষ্ট জাদুঘর ও ঐতিহাসিক প্রদর্শনী, শীর্ষ থেকে শহরের প্যানরমিক দৃশ্য, রাতের আলোকসজ্জাই হলো পর্যটক দের মূল আকর্ষণ। এই টাওয়ারের খুব কাছেই রয়েছে শিয়াওলোউ মসজিদ যেখানে চীনা মুসলামানের পাশাপাশি বিদেশী মুসলিম রাও জুম্মা, ইদ সহ নানবিধ ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। মসজিদ আমার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশ নিকটবর্তী হওয়ায় আমার সেখানের একাধিকবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে।

চীনের ক্যানভাসে শুধু লাল আর সোনালি রঙ নয়, সাথে রয়েছে সবুজেরও এক রাজত্ব। হুনান প্রদেশের ঝাংজিয়াজি জাতীয় বন তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৯৯২ সালে ইউনেস্কো ঝাংজিয়াজির উলিংইয়ুয়ান এলাকাকে ওয়ার্ল্ড ন্যাচেরাল হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে। হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক জেমস ক্যামেরন এর নির্মিত আভাটার সিনেমার বিস্ময়কর ঝুলন্ত পাহাড় এই বন থেকেই অনুপ্রাণিত। এই বনের উল্লেখযোগ্য স্থান হল ইউয়ানজিয়াজি (মিস্টি পাহাড়ের মতো দৃশ্য) এবং চিয়ানকুন স্তম্ভ ( দেখে মনে হয় বাতাসে ভাসমান )। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই অপরূপ লীলা প্রতিটি মানুষকেই বিস্মিত করে তোলে। মেঘ ভেদ করে চলা পাহাড়চূড়া, কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা উচ্চশৃঙ্গ এবং তারই সাথে ঝরনার কলরব অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। সাথে রয়েছে ৩৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত দুই পর্বতশৃঙ্গের মধ্যে অবস্থিত প্রাকৃতিক পাথরের সেতু। এই উঁচু স্থানে ওঠার জন্য রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ও দ্রুততম আউটডোর এলিভেটর ( মাত্র ৯২ সেকেন্ডে ৩২৬ মিটার উঁচুতে উঠতে সক্ষম)। এখানে গেলে প্রতিটি ব্যাক্তিই ভাবতে বাধ্য সে যেন এক কল্পনার রাজ্যে এসে পৌঁছেছে। সোনালি ঐতিহ্য ও লাল স্মৃতি পেরিয়ে দেখলাম চীনের সবুজ নয়নাভিরাম পাহাড়। চীনের সৌন্দর্য এখানেই ক্ষান্ত নয়, সামনে রয়েছে বরফের সাদা আর আলোর নীল মিশেলে তৈরি এক কৃত্রিম বিস্ময়- হারবিনের বরফ জগৎ। এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ বরফ ও তুষার থিম পার্ক। এই পর্যটন কেন্দ্রটি ১২০ হেকটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত যা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। প্রধান আকর্ষণ- সুপার আইস স্লাইড (বিশ্বের দীর্ঘতম), স্নোফ্লেক ফেরিস হুইল (১২০ মিটার), রোজ আইসফল - যা ব্যাক্তিমাত্রকেই রূপকথার গল্পের দেশে নিয়ে যেতে বাধ্য। কৃত্রিমভাবে তৈরি বরফের এই অপরূপ লীলাভূমিতে এক মৌসুমে সাড়ে ৩ লাখেরও বেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন। প্রকৃতি আর মানুষের হাতের এমন অসাধারণ মিলন-মেলা দেখে চীনকে এক বিস্ময়ের দেশ বলাই যায়।

এর পরে আসে চীনের ঐতিহ্য ও পর্যটন এর অন্যতম দিক- শাওলিন মন্দির। হেনান প্রদেশের সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থানটি যেন সময়ের সাক্ষী। এই পর্যটন কেন্দ্রটি চীনের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক। তবে পাথরের দেয়াল, প্রাচীন স্থাপত্য পেড়িয়ে যেই বিষয়টি শাওলিন মন্দির কে বিশ্বের দরবারে খ্যাতিমান করে তুলেছে তা হলো কুংফু। কুংফু সম্বন্ধে জানেন না এমন মানুষ খুব কমই আছেন। প্রচলিত আছে যে ১৫০০ বছর আগে এক ভারতীয় বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শাওলিন মন্দির এ এসে ধ্যান ও শরীরচর্চার একটি রীতি চালু করেছিলেন যা পরবর্তীতে কুংফুর ভিত্তি স্থাপন করে। এ স্থানে ভ্রমণ করতে আসা প্রত্যেক ব্যাক্তিরই মূল আকর্ষণ থাকে এই বিশেষ ধরনের শারীরিক কলা। তাই শাওলিন কুংফু কে অত্যন্ত জমজমাট পরিবেশে উপভোগ করতে চাইলে প্রতিযোগিতার মৌসুমেই যাওয়া সবচেয়ে উত্তম। প্রতিবছর অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত হয় ঝেংঝু আন্তর্জাতিক শাওলিন উশু উৎসব। যেহেতু অনেক মানুষের সমাগম হয় এই অনুষ্ঠানে তাই আগে থেকেই টিকিট কেটে সুন্দর একটি জায়গায় বসে পরাই উত্তম। চীনের আরেক ঐতিহ্য রয়েছে যা মন আর আত্মাকে উৎসবের রঙে মাতিয়ে রাখে আর তা হল ড্রাগন বোট রেস। ২০০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন এই উৎসবটি প্রতিবছর চন্দ্র ক্যালেন্ডারের পঞ্চম মাসের পঞ্চম দিন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময়ে নদীর বুকে ২০ মিটার লম্বা ড্রাগন আকৃতির নৌকা, নাবিকদের উদ্যমতা, চিৎকার আর করতালির শব্দে যেন আকাশ ফেটে পরে। বোট রেসের পাশাপাশি এ দিনটিতে থাকে নাচ, গান, খাবার তৈরি সহ আর অসংখ্য কার্যক্রম যা সেখানকার সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ হিসেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হচ্ছে। ২০২৫ সালে, গুয়াংজু ইন্টারন্যাশনাল ড্রাগন বোট রেসে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মোট ১১৬ টি দল অংশ নেয় যা প্রমাণ করে এই উৎসবটি বর্তমান সময়ে একটি আন্তর্জাতিক রূপ নিয়েছে। চীনের বৈচিত্র্যপূর্ণ এই দিক প্রমাণ করে যে এদেশের পর্যটন ক্যানভাস যেন শেষই হয় না।

চীনের ইতিহাস বা এর নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক—সব মিলিয়ে চীন যেন এক জীবন্ত ক্যানভাসের নাম। এখানে প্রতিটি স্থাপনা শুধু ইট-পাথরের নিদর্শন নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আত্মবিশ্বাসের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। শাওলিন মন্দিরের আধ্যাত্মিকতা থেকে ড্রাগন বোট উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য—সবকিছুই প্রমাণ করে যে চীন শুধু নিজের ঐতিহ্যকে ধারণ করেই থেমে থাকেনি, বরং তাকে সঙ্গে নিয়েই আধুনিকতার পথে এগিয়ে গেছে। তাই চীনকে দেখা মানে শুধু কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা নয়; বরং একটি জাতির হাজার বছরের আত্মা, সংগ্রাম, সৌন্দর্য ও স্বপ্নকে অনুভব করা। চীনের এই রঙিন ক্যানভাস তাই প্রতিটি ভ্রমণপিপাসু মানুষকে শুধু বিস্মিতই করে না, ইতিহাস ও সভ্যতাকে নতুনভাবে অনুভব করতেও শেখায়। আরও শেখায় কিভাবে নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ধারণ করে উন্নতির উচ্চশিখরে পৌঁছানো সম্ভব।

[লেখক: শিক্ষার্থী, প্রথমবর্ষ, ক্লিনিক্যাল মেডিসিন, ঝেংঝো বিশ্ববিদ্যালয়, চীন] 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬


চীনের পর্যটন ক্যানভাস: লাল স্মৃতিস্তম্ভ, সবুজ পর্বত, সোনালি ঐতিহ্য

প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬

featured Image

কেন আমার চোখ প্রায়ই অশ্রুসিক্ত হয়? কারণ আমি এই ভূমিকে গভীরভাবে ভালোবাসি”- ১৯৩৮ সালে আই চিং যিনি চীনের অন্যতম প্রভাবশালী কবি, মাতৃভূমির বিদ্যমান দূরাবস্থা এবং তার প্রতি ভালবাসায় অনুপ্রাণিত হয়ে উক্তিটি করেছিলেন। পাঁচ হাজারের বছরেরও বেশি পুরনো একটি সভ্যতা, অনেক উত্থান- পতন পেরিয়ে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা অতিক্রম করে আজ সারা বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। চীনের উত্থানের এই ইতিহাস একে একটি জীবন্ত ক্যানভাসে পরিণত করেছে। চীনের ইতিহাসের রঙিন পাতায় ঘুরে বেড়ালে মনে হয় এ যেন এক অমীমাংসিত কবিতা এবং এই কবিতার মীমাংসা হল নিজেকে উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছে নিয়ে যাওয়া। যার ফলে চীনের মত একটি দেশে ভ্রমন করা এবং এর সৌন্দর্য উপভোগ করা যেকোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য যেন এক গুপ্তধন খুঁজে পাওয়ার মতো। ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি, আধুনিকতা- প্রত্যেকটি বিষয়েরই এক সুন্দর মিলনমেলা চীনে বিদ্যমান। আর্চি টাওয়ারের লাল সংগ্রামের ইতিহাস থেকে শুরু করে, ঝাংঝিয়াজির ভাসমান পাহাড় অতিক্রম করে, বেইজিং এর কেন্দ্রীয় অক্ষরেখার সোনালি ইতিহাস- এই তিন রঙেই ফুটে উঠেছে আজকের চীনের পর্যটন ক্যানভাস। শুধু পর্যটক হিসেবেই নয়, এদেশকে জানা দরকার একজন শিক্ষার্থীর মতো, একজন ভাবুকের মতো। তাছাড়া চীন নিজের ঐতিহ্য ধরে রেখে যেভাবে উন্নতিকে আলিঙ্গন করতে পেরেছে তাতে রয়েছে প্রত্যেক বাংলাদেশির জন্যই এক জীবন্ত শিক্ষা। 

প্রথমেই লিখতে চাই টেরাকোটা যোদ্ধা নিয়ে। ১৯৭৪ সালে সি’আনের কয়েকজন কৃষক আবিষ্কার করেন প্রায় ২ হাজার ২০০ বছর পুরনো এই নিদর্শন। অখণ্ড চীনের প্রথম সম্রাট চিন শিংহুয়া এর মৃত্যুর পর তার সমাধির সাথে পোড়ামাটির তৈরি ৫.৮ থেকে ৬.৫ ফুট উচ্চতার এই মূর্তিগুলো সমাধিস্থ করা হয়। তারা বিশ্বাস করতেন- এই পোড়ামাটির যোদ্ধা সম্রাটকে পরকালীন যেকোনো বিপদ থেকে বাঁচাবে । মূর্তিগুলোর কারুকার্য এতটাই নিখুঁত যে দেখে মনে হয় যেন প্রতিটি যোদ্ধাই জীবন্ত এবং তাদের সেনাপতির ডাকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত। টেরাকোটা যোদ্ধার পর চীনের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আরেক উজ্জ্বল নাম তাং রাজবংশ। এই রাজবংশের পুরোটা সময় জুড়েই চীন- শিল্প, কবিতা, সাহিত্যে ব্যাপক উন্নতি দেখতে পেড়েছে। একে শিল্পের স্বর্ণযুগ ও বলা হয়। তাং রাজবংশের রাজধানী ছিল চাং’আন (বর্তমান সি আন) যা ছিল প্রাচীন সিল্ক রোড এর প্রাণকেন্দ্র। এই পথ ধরেই সারা বিশ্বে আদান প্রদান হতো রেশম, কাঁচ অর শিল্প। একসময় পুরো বিশ্বের মহানগরী বলা হতো এই তাং বংশকে। বর্তমান সময়ে চীনের এই গৌরবময় ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে চীনের রাজধানী বেইজিং এর সেন্ট্রাল এক্সিস। এটি ৭০০ বছরের পুরনো প্রাচীন নগর পরিকল্পনার নিদর্শন। এটি ১৫ টি ঐতিহাসিক স্থান নিয়ে গঠিত, উত্তর থেকে দক্ষিণে ৭.৮ কিলোমিটার বিস্তৃত। ১৫ টি স্থানের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো নিষিদ্ধ শহর(ফরবিডেন সিটি) তথা প্রাসাদ জাদুঘর যা ছিল মিং ও ছিং রাজবংশের ২৪ জন সম্রাটের বাসস্থান। এছাড়া স্বর্গের মন্দির, ঘণ্টা ও ঢোল টাওয়ার, তিয়েনআনমেন স্কয়ার ও ইয়েংডিংমেন গেট যা সারা বিশ্বে পর্যটনের জন্য বেশ জনপ্রিয়। রাজধানীর এই জায়গাটি প্রাচীন চীনা দর্শনের বাস্তব রূপ হওয়ায় বেইজিং সেন্ট্রাল এক্সিস ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

গৌরবময় অতীতের পাশাপাশি চীনের রয়ছে সংগ্রামের ইতিহাস। সেই সংগ্রামের এক জীবন্ত সাক্ষী চীনের হেনান প্রদেশের রাজধানী ঝেংঝুর আরচি মেমোরিয়াল টাওয়ার। ১৯২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির বেইজিং-হানকৌ রেলপথের শ্রমিক ধর্মঘটের স্মরণে এটি তৈরি করা হয় যা ছিল চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন প্রথম বড় শিল্প আন্দোলন। ৬৩ মিটার উঁচু টাওয়ারে সবুজ চকচকে টালির ছাদ ও প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী প্রত্যেক পর্যটকেরই নজর কাড়ে। ১০ তলা বিশিষ্ট জাদুঘর ও ঐতিহাসিক প্রদর্শনী, শীর্ষ থেকে শহরের প্যানরমিক দৃশ্য, রাতের আলোকসজ্জাই হলো পর্যটক দের মূল আকর্ষণ। এই টাওয়ারের খুব কাছেই রয়েছে শিয়াওলোউ মসজিদ যেখানে চীনা মুসলামানের পাশাপাশি বিদেশী মুসলিম রাও জুম্মা, ইদ সহ নানবিধ ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। মসজিদ আমার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশ নিকটবর্তী হওয়ায় আমার সেখানের একাধিকবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে।

চীনের ক্যানভাসে শুধু লাল আর সোনালি রঙ নয়, সাথে রয়েছে সবুজেরও এক রাজত্ব। হুনান প্রদেশের ঝাংজিয়াজি জাতীয় বন তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৯৯২ সালে ইউনেস্কো ঝাংজিয়াজির উলিংইয়ুয়ান এলাকাকে ওয়ার্ল্ড ন্যাচেরাল হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে। হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক জেমস ক্যামেরন এর নির্মিত আভাটার সিনেমার বিস্ময়কর ঝুলন্ত পাহাড় এই বন থেকেই অনুপ্রাণিত। এই বনের উল্লেখযোগ্য স্থান হল ইউয়ানজিয়াজি (মিস্টি পাহাড়ের মতো দৃশ্য) এবং চিয়ানকুন স্তম্ভ ( দেখে মনে হয় বাতাসে ভাসমান )। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই অপরূপ লীলা প্রতিটি মানুষকেই বিস্মিত করে তোলে। মেঘ ভেদ করে চলা পাহাড়চূড়া, কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা উচ্চশৃঙ্গ এবং তারই সাথে ঝরনার কলরব অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। সাথে রয়েছে ৩৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত দুই পর্বতশৃঙ্গের মধ্যে অবস্থিত প্রাকৃতিক পাথরের সেতু। এই উঁচু স্থানে ওঠার জন্য রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ও দ্রুততম আউটডোর এলিভেটর ( মাত্র ৯২ সেকেন্ডে ৩২৬ মিটার উঁচুতে উঠতে সক্ষম)। এখানে গেলে প্রতিটি ব্যাক্তিই ভাবতে বাধ্য সে যেন এক কল্পনার রাজ্যে এসে পৌঁছেছে। সোনালি ঐতিহ্য ও লাল স্মৃতি পেরিয়ে দেখলাম চীনের সবুজ নয়নাভিরাম পাহাড়। চীনের সৌন্দর্য এখানেই ক্ষান্ত নয়, সামনে রয়েছে বরফের সাদা আর আলোর নীল মিশেলে তৈরি এক কৃত্রিম বিস্ময়- হারবিনের বরফ জগৎ। এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ বরফ ও তুষার থিম পার্ক। এই পর্যটন কেন্দ্রটি ১২০ হেকটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত যা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। প্রধান আকর্ষণ- সুপার আইস স্লাইড (বিশ্বের দীর্ঘতম), স্নোফ্লেক ফেরিস হুইল (১২০ মিটার), রোজ আইসফল - যা ব্যাক্তিমাত্রকেই রূপকথার গল্পের দেশে নিয়ে যেতে বাধ্য। কৃত্রিমভাবে তৈরি বরফের এই অপরূপ লীলাভূমিতে এক মৌসুমে সাড়ে ৩ লাখেরও বেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন। প্রকৃতি আর মানুষের হাতের এমন অসাধারণ মিলন-মেলা দেখে চীনকে এক বিস্ময়ের দেশ বলাই যায়।

এর পরে আসে চীনের ঐতিহ্য ও পর্যটন এর অন্যতম দিক- শাওলিন মন্দির। হেনান প্রদেশের সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থানটি যেন সময়ের সাক্ষী। এই পর্যটন কেন্দ্রটি চীনের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক। তবে পাথরের দেয়াল, প্রাচীন স্থাপত্য পেড়িয়ে যেই বিষয়টি শাওলিন মন্দির কে বিশ্বের দরবারে খ্যাতিমান করে তুলেছে তা হলো কুংফু। কুংফু সম্বন্ধে জানেন না এমন মানুষ খুব কমই আছেন। প্রচলিত আছে যে ১৫০০ বছর আগে এক ভারতীয় বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শাওলিন মন্দির এ এসে ধ্যান ও শরীরচর্চার একটি রীতি চালু করেছিলেন যা পরবর্তীতে কুংফুর ভিত্তি স্থাপন করে। এ স্থানে ভ্রমণ করতে আসা প্রত্যেক ব্যাক্তিরই মূল আকর্ষণ থাকে এই বিশেষ ধরনের শারীরিক কলা। তাই শাওলিন কুংফু কে অত্যন্ত জমজমাট পরিবেশে উপভোগ করতে চাইলে প্রতিযোগিতার মৌসুমেই যাওয়া সবচেয়ে উত্তম। প্রতিবছর অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত হয় ঝেংঝু আন্তর্জাতিক শাওলিন উশু উৎসব। যেহেতু অনেক মানুষের সমাগম হয় এই অনুষ্ঠানে তাই আগে থেকেই টিকিট কেটে সুন্দর একটি জায়গায় বসে পরাই উত্তম। চীনের আরেক ঐতিহ্য রয়েছে যা মন আর আত্মাকে উৎসবের রঙে মাতিয়ে রাখে আর তা হল ড্রাগন বোট রেস। ২০০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন এই উৎসবটি প্রতিবছর চন্দ্র ক্যালেন্ডারের পঞ্চম মাসের পঞ্চম দিন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময়ে নদীর বুকে ২০ মিটার লম্বা ড্রাগন আকৃতির নৌকা, নাবিকদের উদ্যমতা, চিৎকার আর করতালির শব্দে যেন আকাশ ফেটে পরে। বোট রেসের পাশাপাশি এ দিনটিতে থাকে নাচ, গান, খাবার তৈরি সহ আর অসংখ্য কার্যক্রম যা সেখানকার সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ হিসেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হচ্ছে। ২০২৫ সালে, গুয়াংজু ইন্টারন্যাশনাল ড্রাগন বোট রেসে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মোট ১১৬ টি দল অংশ নেয় যা প্রমাণ করে এই উৎসবটি বর্তমান সময়ে একটি আন্তর্জাতিক রূপ নিয়েছে। চীনের বৈচিত্র্যপূর্ণ এই দিক প্রমাণ করে যে এদেশের পর্যটন ক্যানভাস যেন শেষই হয় না।

চীনের ইতিহাস বা এর নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক—সব মিলিয়ে চীন যেন এক জীবন্ত ক্যানভাসের নাম। এখানে প্রতিটি স্থাপনা শুধু ইট-পাথরের নিদর্শন নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আত্মবিশ্বাসের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। শাওলিন মন্দিরের আধ্যাত্মিকতা থেকে ড্রাগন বোট উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য—সবকিছুই প্রমাণ করে যে চীন শুধু নিজের ঐতিহ্যকে ধারণ করেই থেমে থাকেনি, বরং তাকে সঙ্গে নিয়েই আধুনিকতার পথে এগিয়ে গেছে। তাই চীনকে দেখা মানে শুধু কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা নয়; বরং একটি জাতির হাজার বছরের আত্মা, সংগ্রাম, সৌন্দর্য ও স্বপ্নকে অনুভব করা। চীনের এই রঙিন ক্যানভাস তাই প্রতিটি ভ্রমণপিপাসু মানুষকে শুধু বিস্মিতই করে না, ইতিহাস ও সভ্যতাকে নতুনভাবে অনুভব করতেও শেখায়। আরও শেখায় কিভাবে নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ধারণ করে উন্নতির উচ্চশিখরে পৌঁছানো সম্ভব।

[লেখক: শিক্ষার্থী, প্রথমবর্ষ, ক্লিনিক্যাল মেডিসিন, ঝেংঝো বিশ্ববিদ্যালয়, চীন] 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত