সংবাদ

শীর্ষ কর্মকর্তা জানেন, অথচ মন্ত্রী জানেন না?


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ৯ জুন ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

শীর্ষ কর্মকর্তা জানেন, অথচ মন্ত্রী জানেন না?
ছবি : সংগৃহীত

‘বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিল হচ্ছে’-এমন শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় মঙ্গলবার (৯ জুন) প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বন্ধ করে সেগুলোকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে’।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে হৈচৈ পড়ে যায়। নেটিজেন ছাড়াও শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে শঙ্কা ও ক্ষোভ। ফেসবুকে প্রতিবেদনটি শেয়ার করে লেখক, চলচ্চিত্র সমালোচক, সাংবাদিক ও শিক্ষক বিধান রিবেরু ক্যাপশনে লেখেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য কি কেবল কেরানি তৈরি করা? তার পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় সংবাদ উপস্থাপক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা শবনব ফেরদৌসী লিখেছেন, মানে কি! কেন? এই নিয়ে কোন আলাপ নেই কেন! সাংবাদিক, কলামিস্ট, সাহিত্যিক মিলু সামস লিখেছেন, ‘খুব খারাপ উদ্যোগ। যদি সত্যিই হয়।’

তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আলোচনা, সমালোচনার দিক পাল্টে যায়। প্রতিক্রিয়া জানান খোদ শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি সাংবাদিকদের কাছে সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমি জানি না এ নিউজ কোথা থেকে আসল।’ তিনি দাবি করেন, বাংলা, ইতিহাস, দর্শন বাদ দেওয়ার মতো কোনো সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ে নেওয়া হয়নি।

একইসঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলা হয়, কোনো অনার্স কোর্স বন্ধের সিদ্ধান্ত নেই। প্রশ্ন হলো- এমন একটা আলোচনা বা সিদ্ধান্তের কথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শীর্ষ কর্মকর্তা’ জানেন। যিনি প্রতিবেদকের কাছ বিষয়টা প্রকাশ করেছেন। অথচ একই বিষয় সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রী জানেন না!

ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা’র উল্লেখ আছে, কিন্তু নাম প্রকাশ করা হয়নি। গণমাধ্যমে ‘বেনামী সূত্র’ কোনো নতুন বিষয় নয়। কিন্তু এত বড় ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্তের খবর যখন নাম প্রকাশ না করে দেওয়া হয়, তখন সেটির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করাটা জরুরি হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন মন্ত্রী নিজে তা অস্বীকার করেন।

সম্ভাব্য কারণ হতে পারে- কর্মকর্তাটি হয়তো সরকারের ‘চূড়ান্ত অনুমোদনহীন খসড়া পরিকল্পনার’ কথা বলেছেন, যা গণমাধ্যম ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ হিসেবে পরিবেশন করেছে। অথবা ভবিষ্যৎ শিক্ষাক্রম সংস্কারের কোনো প্রস্তাবে ‘বিষয় বাদ দেওয়ার’ কথাটি ভিন্ন প্রসঙ্গে উঠেছিল, যা প্রসঙ্গান্তরে ‘অনার্স বাতিল’ আকারে প্রকাশ পেয়েছে।

খোদ শিক্ষামন্ত্রী যে বিষয়টা জানেন না, সে বিষয়টা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা জানলেও কীভাবে গণমাধ্যমে প্রকাশ করেন। মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিজের দায়িত্বে মিডিয়ায় বলেন, তা সরকারের নিজস্ব নীতি ও তথ্য প্রকাশনীতির বিপরীত হয়ে যায়।

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য পরিষ্কার- তিনি সাংবাদিকদের সামনেই বলেছেন, ‘আমার জানামতে এ রকম কোনো আলোচনা হয়নি। বাংলা মাতৃভাষা, এটা কি বাদ দেওয়া যেতে পারে?’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাকে বা ইতিহাসকে বাদ দেওয়ার বিষয় নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা হয়নি।’

অর্থাৎ, মন্ত্রী পুরো ঘটনাকে যখন ‘ভিত্তিহীন’ দাবি করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে প্রতিবেদনের বক্তব্য কীভাবে এলো।বিশেষ করে শিক্ষাকাঠামো পরিবর্তনের এত বড় সিদ্ধান্ত সরাসরি কোটি শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছে। সে কারণেই তারা পৃথক বিজ্ঞপ্তি জারি করতে বাধ্য হয়েছে।

নীতিগত দিক থেকে, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ বাড়াতে প্রযুক্তিনির্ভর বিষয় যেমন এআই, সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ ইত্যাদি যুক্ত করার যে পরিকল্পনা, তা স্বাগত জানিয়েছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। এতে শুধু ডিগ্রি নয়, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে। কিন্তু সেই সংস্কারের অর্থ এই নয় যে বাংলা, ইতিহাস বা দর্শনের মতো মৌলিক ও মানবিক বিষয়গুলোকে সরিয়ে দেওয়া হবে।

শিক্ষামন্ত্রীও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ‘মার্কেট ডিমান্ড অনুযায়ী আমরা নতুন কোর্স ইন্ট্রোডিউস করছি। বাট বাংলাকে বাদ দিয়ে ইতিহাসকে বাদ দিয়ে আমরা কিছু করছি না।’

অন্যদিকে, বাংলা, ইতিহাস, দর্শনসহ ছয় বিষয়ে স্নাতক (অনার্স) থাকবে না, এটা মনে করেন না প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর আগপর্যন্ত, এ রকম নিউজকে গুরুত্ব না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ–সংক্রান্ত খবরের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘এসব বিষয়ে অনার্স থাকবে না, এটা আমি মনে করি না। তবে আমরা কতগুলো জায়গায় রাখব, কয়টা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে, সে আলাপগুলো হয়তো হতে পারে। কারণ, আমরা বারবার বলছি, আমাদের দক্ষ জনগোষ্ঠী প্রয়োজন।’ 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬


শীর্ষ কর্মকর্তা জানেন, অথচ মন্ত্রী জানেন না?

প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬

featured Image

‘বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিল হচ্ছে’-এমন শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় মঙ্গলবার (৯ জুন) প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বন্ধ করে সেগুলোকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে’।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে হৈচৈ পড়ে যায়। নেটিজেন ছাড়াও শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে শঙ্কা ও ক্ষোভ। ফেসবুকে প্রতিবেদনটি শেয়ার করে লেখক, চলচ্চিত্র সমালোচক, সাংবাদিক ও শিক্ষক বিধান রিবেরু ক্যাপশনে লেখেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য কি কেবল কেরানি তৈরি করা? তার পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় সংবাদ উপস্থাপক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা শবনব ফেরদৌসী লিখেছেন, মানে কি! কেন? এই নিয়ে কোন আলাপ নেই কেন! সাংবাদিক, কলামিস্ট, সাহিত্যিক মিলু সামস লিখেছেন, ‘খুব খারাপ উদ্যোগ। যদি সত্যিই হয়।’

তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আলোচনা, সমালোচনার দিক পাল্টে যায়। প্রতিক্রিয়া জানান খোদ শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি সাংবাদিকদের কাছে সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমি জানি না এ নিউজ কোথা থেকে আসল।’ তিনি দাবি করেন, বাংলা, ইতিহাস, দর্শন বাদ দেওয়ার মতো কোনো সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ে নেওয়া হয়নি।

একইসঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলা হয়, কোনো অনার্স কোর্স বন্ধের সিদ্ধান্ত নেই। প্রশ্ন হলো- এমন একটা আলোচনা বা সিদ্ধান্তের কথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শীর্ষ কর্মকর্তা’ জানেন। যিনি প্রতিবেদকের কাছ বিষয়টা প্রকাশ করেছেন। অথচ একই বিষয় সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রী জানেন না!

ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা’র উল্লেখ আছে, কিন্তু নাম প্রকাশ করা হয়নি। গণমাধ্যমে ‘বেনামী সূত্র’ কোনো নতুন বিষয় নয়। কিন্তু এত বড় ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্তের খবর যখন নাম প্রকাশ না করে দেওয়া হয়, তখন সেটির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করাটা জরুরি হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন মন্ত্রী নিজে তা অস্বীকার করেন।

সম্ভাব্য কারণ হতে পারে- কর্মকর্তাটি হয়তো সরকারের ‘চূড়ান্ত অনুমোদনহীন খসড়া পরিকল্পনার’ কথা বলেছেন, যা গণমাধ্যম ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ হিসেবে পরিবেশন করেছে। অথবা ভবিষ্যৎ শিক্ষাক্রম সংস্কারের কোনো প্রস্তাবে ‘বিষয় বাদ দেওয়ার’ কথাটি ভিন্ন প্রসঙ্গে উঠেছিল, যা প্রসঙ্গান্তরে ‘অনার্স বাতিল’ আকারে প্রকাশ পেয়েছে।

খোদ শিক্ষামন্ত্রী যে বিষয়টা জানেন না, সে বিষয়টা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা জানলেও কীভাবে গণমাধ্যমে প্রকাশ করেন। মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিজের দায়িত্বে মিডিয়ায় বলেন, তা সরকারের নিজস্ব নীতি ও তথ্য প্রকাশনীতির বিপরীত হয়ে যায়।

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য পরিষ্কার- তিনি সাংবাদিকদের সামনেই বলেছেন, ‘আমার জানামতে এ রকম কোনো আলোচনা হয়নি। বাংলা মাতৃভাষা, এটা কি বাদ দেওয়া যেতে পারে?’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাকে বা ইতিহাসকে বাদ দেওয়ার বিষয় নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা হয়নি।’

অর্থাৎ, মন্ত্রী পুরো ঘটনাকে যখন ‘ভিত্তিহীন’ দাবি করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে প্রতিবেদনের বক্তব্য কীভাবে এলো।বিশেষ করে শিক্ষাকাঠামো পরিবর্তনের এত বড় সিদ্ধান্ত সরাসরি কোটি শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছে। সে কারণেই তারা পৃথক বিজ্ঞপ্তি জারি করতে বাধ্য হয়েছে।

নীতিগত দিক থেকে, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ বাড়াতে প্রযুক্তিনির্ভর বিষয় যেমন এআই, সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ ইত্যাদি যুক্ত করার যে পরিকল্পনা, তা স্বাগত জানিয়েছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। এতে শুধু ডিগ্রি নয়, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে। কিন্তু সেই সংস্কারের অর্থ এই নয় যে বাংলা, ইতিহাস বা দর্শনের মতো মৌলিক ও মানবিক বিষয়গুলোকে সরিয়ে দেওয়া হবে।

শিক্ষামন্ত্রীও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ‘মার্কেট ডিমান্ড অনুযায়ী আমরা নতুন কোর্স ইন্ট্রোডিউস করছি। বাট বাংলাকে বাদ দিয়ে ইতিহাসকে বাদ দিয়ে আমরা কিছু করছি না।’

অন্যদিকে, বাংলা, ইতিহাস, দর্শনসহ ছয় বিষয়ে স্নাতক (অনার্স) থাকবে না, এটা মনে করেন না প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর আগপর্যন্ত, এ রকম নিউজকে গুরুত্ব না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ–সংক্রান্ত খবরের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘এসব বিষয়ে অনার্স থাকবে না, এটা আমি মনে করি না। তবে আমরা কতগুলো জায়গায় রাখব, কয়টা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে, সে আলাপগুলো হয়তো হতে পারে। কারণ, আমরা বারবার বলছি, আমাদের দক্ষ জনগোষ্ঠী প্রয়োজন।’ 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত