মহাকালের আয়নায় নজরুল মানস
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বৃত্তাবদ্ধ করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় তার সক্রিয় সৃষ্টি জীবনের শুরু থেকেই। দ্রোহ, প্রেম, ও মানবিকতার বিচারে নজরুল একজন শ্রেষ্ঠ পুরুষ। অসম্প্রদায়িক চেতনা ও প্রগতির এক উজ্জল প্রেরণা কাজী নজরুল ইসলাম। পরাধীন ভারতে জন্মগ্রহণ করে নজরুল প্রকৃত ভাবে টের পেয়েছিলেন, পরাধীনতার যন্ত্রনা। যে কারণে বিদ্রোহের কবিতা বাণী ও সুরেও এনেছিলেন এক নতুন মাত্রা। এক্ষেত্রে নজরুল এক নবযুগের উন্মেষও ঘটিয়েছিলেন। নজরুলকে বৃত্তাবদ্ধ করার অর্থ হলো তার নামের পূর্বে একটি বিশেষণ বসিয়ে তাকে বৃত্ত বন্দি করে ক্ষুদ্র বা সংকীর্ণ করে তোলা। আমরা সব সময়েই এই প্রচেষ্টা লক্ষ্য করে থাকি। নজরুলের কবিতা, প্রবন্ধ অভিভাষণের স্বর কিছুটা ব্যতিক্রমী হওয়ার জন্য স্বরুপ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে নজরুল বিশেষজ্ঞরা এই কাজটি করে থাকেন। নজরুলকে গভীর ভাবে উপলব্ধি করার জন্য তার অন্তর ছেঁড়া অভিভাষণগুলো পাঠ করতে হয়। নজরুলের মাত্র ১৪টি অভিভাষণের সন্ধান আমরা পেয়ে থাকি। যার অধিকাংশ কবি প্রদান করেছেন তার অসুস্থ হওয়ার ৩-৪ বছরের মধ্যে। কবি উপলব্ধি করেছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষের উত্থান-পতনময় রাজনীতির ডামাডোলে হিন্দু-মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধে অনৈক্য, সাহিত্য-সংস্কৃতির গতি-প্রকৃতি সমাজ-সভ্যতার সংলগ্নতা থেকে অনেক দূরে নিমজ্জিত, যেখান থেকে এ জাতির মুক্তির একমাত্র উপায় ছিল উদার মানবিকতার পতাকাকে দৃশ্যমান করে এগিয়ে যাওয়া। সে কাজটিই করতে গিয়ে কবি নিজে হলেন অপরাধী। নিজ সমাজ হতে বিচ্যুত, হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে অচ্ছুৎ। পরাধীন ভারতবর্ষের শাসক ব্রিটিশরাজের কাছে ছিলেন রাষ্ট্রদ্রোহী, বিদ্রোহী। কবি তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তার সংবর্ধনার উত্তরে নিজেই ঘোষণা করেছেন নিজের পরিচয়- ‘বিংশ-শতাব্দীর অসম্ভবের যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরি অভিযান-সেনাদলের তূর্য-বাদকের একজন আমি— এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।’নজরুলের অভিভাষণ গুলো পাঠ করলে মনে হয় তিনি ত্রিকালদর্শী অতিমানব। তাকে কোন ভাবেই কোন বিশেষণের খাচায় বন্দী করার উপায় নেই। শুধু বর্তমানেই কালেই নয়, কাল থেকে মহাকালে সব অন্যায় অত্যাচার শোষণ ও বঞ্চনা, সামজিক বৈষম্য, যাবতীয় কুসংস্কার সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তার সাহিত্যকর্ম সব মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে। তার কবিতা, গান কী উপস্যাস, গল্পে সর্বত্রই মানবমুক্তির প্রেমময়বাণী আমাদেরকে সর্বদাই আলোর পথ দেখায়। তার অভিভাষণগুলোর মধ্যে তাৎপর্যময় দুটি অভিভাষন নিয়ে আলোচনা করলেই নজরুল চরিত্রের স্বরুপ কিছুটা হলেও উন্মোচন করা যায়। এর একটি ১৯৩২ সালের ৫ ও ৬ নভে¤^র সিরাজগঞ্জের নাট্যভবনে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম তরুণ সম্মেলনের সভাপতি হিসেবে কবির প্রদত্ত ভাষণ। এখানে কবি গোঁড়া মুসলিমদের পশ্চাৎপদতা, অশিক্ষা, অন্ধ কুসংস্কার এবং ইসলামের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে সঠিক তথ্যকে আড়াল করে সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপনের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। এই বক্তৃতায় কবি নিজ সমাজ ও দেশে যা কিছু মঙ্গলকর, তার উদ্দেশে লড়তে যুবসমাজকে স্বাগত জানিয়েছেন। কবি যৌবন এবং বার্ধক্যের অভূতপূর্ব ধারণা বাঙালি জাতির সামনে উপস্থাপন করতে সক্ষম হন। এই ধারণা শুধু মাত্র যৌবন এবং বার্ধ্যক্যের ধারনা মাত্র নয় এই ধারণা প্রচলিত জীর্ণ মতামত যার ভিত্তিতে শোষন, শাসন অব্যাহত থাকে এবং নব সৃষ্টির প্রেরণা ব্যহত হয় সে বিষয় গুলোর সংগঠিত রূপ। কী অসাধারণ বার্তা তার এই অভিভাষণে, যা পাঠ করে জড় চিন্তার মানুষেরাও নড়ে উঠতে বাধ্য। ‘বৃদ্ধ তাহারাই যাহারা নব অরুণোদয় দেখিয়া নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে দ্বার রুদ্ধ করিয়া পড়িয়া থাকে। আলোক-পিয়াসী প্রাণ চঞ্চল শিশুদের কল কোলাহলে যাহারা বিরক্ত হইয়া অভিসম্পাত করিতে থাকে, জীর্ণ পুঁতি চাপা পড়িয়া যাহাদের নাভিশ্বাস বহিতেছে, অতি জ্ঞানের অগ্নিমান্দ্যে যাহারা আজ কঙ্কালসার—বৃদ্ধ তাহারাই। ইহাদের ধর্মই বার্ধক্য। বার্ধক্যকে সবসময় বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না। বহু যুবককে দেখিয়াছি যাহাদের যৌবনের উর্দির নিচে বার্ধক্যের কঙ্কাল মূর্তি। আবার বহু বৃদ্ধকে দেখিয়াছি যাহাদের বার্ধক্যের জীর্ণাবরণের তলে মেঘলুপ্ত সূর্যের মতো প্রদীপ্ত যৌবন।’ অভিভাষণের এই অংশে আমরা সামাজিক স্থিতাবস্থার বিলোপ কামনাকারী একজন তরুণের কণ্ঠ শুনতে পাই। অটল সংস্কার দ্বারা আবদ্ধ সমাজ শোষন, তোষণের ধারাকে অব্যাহত রাখতে পারে, তাই তিনি মিথ্যা বার্ধক্যকে জড়িয়ে ধরে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা থেকে দূরে সরে থাকতে চান। তার কাছে বার্ধক্য হলো পুরনো ধ্যান ধারণার এক একটি রূপ। এই অভিভাষণেই আছে, ‘বার্ধক্য তাহাই—যাহা পুরাতনকে, মিথ্যাকে, মৃত্যুকে আঁকড়িয়া পড়িয়া থাকে, বৃদ্ধ তাহারাই—যাহারা মায়াচ্ছন্ন নব মানবের অভিনব জয় যাত্রার শুধু বোঝা নয়, বিঘ্ন; শতাব্দীর নব যাত্রীর চলার ছন্দে ছন্দ মিলাইয়া যাহারা কুচকাওয়াজ করিতে জানে না, পারে না;’। এই যে জেগে ওঠার প্রেরণা প্রদান, নতুন ধারণাকে গ্রহণ করার উৎসাহ তা’ শুধুমাত্র আমরা লক্ষ্য করি নজরুলের সৃষ্টিকর্ম এবং চরিত্রের মধ্যে। কবি তার জীবনের শেষ অভিভাষণ প্রদান করেন ১৯৪১ সালে। এই অভিভাষণটি পাঠ করলে মনে হয় একজন মহৎ দার্শনিক তার সমগ্র জীবনকে তুলে ধরছেন জাতির বিবেকের সামনে। নজরুল নিজেকে ভুলিয়ে দিতে চান, তার অভিমান, রাগ, অনুযোগ আমরা সমগ্র অভিভাষণটিতে লক্ষ্য করি। কবির মাত্র ২২ বছরের সাহিত্য সাধনায় তার এই অভিভাষণ কবির অসুস্থতার কিছু আগে প্রদত্ত। ফলে এ সময় কবিকে কী এক দূর লোকের মোহাচ্ছন্ন দার্শনিকতায় পেয়ে বসে। তিনি যেন বুঝে যান এই দেশ, এই সমাজ, এই জাতির মঙ্গল কামনায় তিনি যা চেয়েছেন, যেভাবে চেয়েছেন— বর্তমান সমাজব্যবস্থায় তা যেন দূর প্রহেলিকা। তাই তো কবি তার জীবনের শেষ অভিভাষণ ১৯৪১ সালের ৫ ও ৬ এপ্রিল কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সভাপতির বক্তব্যে বেদনায় ক্ষতবিক্ষত হূদয় নিয়ে বলেন, ‘যদি আর বাঁশি না বাজে আমি কবি বলে বলছিনে— আমি আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছিলাম সেই অধিকারে বলছি— আমায় ক্ষমা করবেন— আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুন, আমি কবি হতে আসিনি— আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম প্রেম পেতে এসেছিলাম— সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নীরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।’ এরপর প্রকৃতই সারা জীবন মানবতার জন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত কবি কাজী নজরুল ইসলাম চিরদিনের মতো মূক হয়ে গেলেন। নজরুলের বিদ্রোহের স্বরুপ আমরা পেয়ে যাই তার কণ্ঠ থেকে। তার বিদ্রোহ স্থিতাবস্থা, কুসংস্কার এবং মানব জাতিকে পিছনে টেনে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। সার্বিক ভাবে তিনি মানব মুক্তির একজন দূত। আবেগ মাখা তার শেষ অভিভাষণে আমরা তার অনুরোধ মিশ্রিত বাণী যেনো শুনতে পাই। ‘আমাকে বিদ্রোহী বলে খামখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। এ নিরীহ জাতটাকে আঁচড়ে-কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কোনদিনই নেই। আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, যা মিথ্যা-কলুষিত-পুরাতন-পঁচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে। ধর্মের নামে ভন্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে।’কবির জীবনের উদ্দেশ্য কী ছিল। তিনি তার নিজের বয়ানে তা’ স্বচ্ছ্ব ভাবে উপস্থাপন করেন। তিনি তার সৃষ্টি কর্মের মাধ্যমে কী বার্তা দিতে চেয়েছিলেন সে বিষয়টি সম্পর্কেও আমরা ধারণা পেয়ে যাই। কণ্ঠ কতো নিবেদিত, শব্দ কতো প্রাণময়, স্বর কতো নম্র। তিনি ইংরেজ কবি কীটসের মতো শুধু সুন্দরের সাধণা করতে আসেননি। সুন্দরের সঙ্গে অভেদ দূর করে পৃথিবীকে আরও সুন্দর করতে চেয়েছিলেন তিনি। এ বিষয়ে তার বয়ান হলো, “আমার কাব্যে সংগীতে কর্মজীবনে অভেদ ও সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। আমি যশ চাই না, খ্যাতি চাই না, প্রতিষ্ঠা চাই না, নেতৃত্ব চাই না। জীবন আমার যত দুঃখময়ই হোক, আনন্দের গান- বেদনার গান গেয়ে যাব আমি।’কাজী নজরুল ইসলামের এসব অভিভাষণের মধ্য দিয়ে তৎকালীন ভারতবর্ষের সমাজ-সভ্যতা, সাহিত্য-সংস্কৃতির এক চিত্ররূপ আমাদের সামনে উঠে আসে। এসবের মাধ্যমে কবি মূলত আপামর জনমানুষকে বিশেষত যুবসমাজের মধ্যে দেশ, জাতির সপক্ষে মুক্ত মানবতার মূলমন্ত্র প্রণোদনার মতো ছড়িয়ে দিয়েছেন। তার অভিভাষণ গুলোর প্রাসঙ্গিকতা লক্ষ্য করলে বিস্মিত হতে হয়। [লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]