প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ মার্চ ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ মার্চ ২০২৬
‘মোজতবাকে নেতা বানানো ইরানের বড় ভুল’
||
তেহরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়ে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের নবনির্বাচিত সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনিকে তিনি 'অগ্রহণযোগ্য' ও 'হালকা ওজনের' নেতা বলে আখ্যা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া এই নেতা বেশি দিন টিকবেন না।ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সম্প্রতি মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলায় নিহত হওয়ার পর, ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ (এক্সপার্টস অ্যাসেম্বলি) তার পুত্র মোজতবাকে নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে নারাজ। ট্রাম্প একাধিক সাক্ষাৎকারে এই নির্বাচনকে 'বড় ভুল' বলে উল্লেখ করেছেন।হামলার পটভূমি : যে হামলা বদলে দিল মধ্যপ্রাচ্যগত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে এক বৃহৎ সামরিক অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের প্রথম দিনেই তেহরানে হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি । তার মৃত্যুতে ইরানের শাসনব্যবস্থায় এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়।ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী, ৮৮ জন ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ নিয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ পরিষদের দায়িত্ব ছিল নতুন নেতা নির্বাচন করা। কিন্তু এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই ইসরায়েলি বাহিনী কোম শহরে পরিষদের সদস্যদের বৈঠকস্থলে হামলা চালায়, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে।এদিকে ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি কখনো প্রকাশ্যে রাজনীতি না করলেও, ইরানের রাজনীতির অন্দরমহলে তিনি অতি পরিচিত নাম। তাকে বহুদিন ধরেই 'পর্দার আড়ালের মিনি-সুপ্রিম লিডার' বলে চিহ্নিত করা হত। একসময়ের উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া মার্কিন কূটনৈতিক নথিতেও তাকে 'রোবের পেছনের ক্ষমতা' বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।মোজতবা কোমের ধর্মীয় স্কুলে পড়াশোনা করেছেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। তার বাবার শাসনামলে তিনি ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং শাসকগোষ্ঠীর বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণও ছিল তার হাতে। ২০১৯ সালে মার্কিন ট্রেজারি তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যদিও তখন তার কোনো সরকারি পদ ছিল না।মোজতবার নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প একের পর এক কড়া বার্তা দিয়ে আসছেন। প্রথমে তিনি বলেন, "খামেনেইর ছেলে আমার কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।" পরে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, নতুন নেতাকে মার্কিন অনুমোদন নিতে হবে, নইলে তিনি টিকবেন না। ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরো প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, যেভাবে সেখানে নেতৃত্ব নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিলেন, ইরানের ক্ষেত্রেও তেমনটাই করতে চান।মোজতবার আনুষ্ঠানিক নিয়োগের পর ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি এই সিদ্ধান্তে 'মোটেই খুশি নন'। টাইম ম্যাগাজিনকে তিনি বলেন, "আমি এত কিছু করতে এসেছিলাম না যাতে আরেকটি খামেনেই পাই।" এবার তিনি এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি ইরানের 'বড় ভুল' বলে আখ্যা দিয়েছেন।ট্রাম্পের সব হুঁশিয়ারি ও চাপ উপেক্ষা করে ইরানের জবাব :ট্রাম্পের সব হুঁশিয়ারি ও চাপ উপেক্ষা করেই মোজতবাকে নিয়োগ দিয়েছে ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের প্রতি তেহরানের এক কড়া জবাব। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই নিয়োগ ট্রাম্পের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ।ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে বলেছেন, ইরান ইসলামি বিপ্লবের লক্ষ্য থেকে এক বিঘতও পিছিয়ে আসবে না। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা চলতে থাকলে কোনো যুদ্ধবিরতি আলোচনার সম্ভাবনা নেই।এক কট্টরপন্থী ইরানি ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ হায়দারি আলেকাসি বলেন, ট্রাম্প যাকে মেনে নিতে পারছেন না, তিনিই আসলে সঠিক পথে আছেন। কারণ ইসলামি বিপ্লবের উচিত সেই নেতাকে অনুসরণ করা, যাকে শত্রুরা পছন্দ করে না।মোজতবা কি সত্যিই 'লাইটওয়েট'? ট্রাম্প তাকে 'হালকা ওজনের' বললেও ইরান বিশেষজ্ঞরা কিন্তু ভিন্ন মত দিচ্ছেন। প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আইরের মতে, মোজতবা তার বাবার চেয়েও বেশি কট্টরপন্থী এবং তিনিই আইআরজিসির পছন্দের প্রার্থী। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের পল সালেম বলছেন, এই মুহূর্তে নতুন নেতা যে-ই হোন না কেন, আমেরিকার সঙ্গে কোনো আপস সম্ভব নয়।রয়টার্স জানাচ্ছে, মোজতবা বহু বছর ধরে তার বাবার গেটকিপারের ভূমিকা পালন করেছেন। নিরাপত্তা প্রশাসন ও ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের ওপর তার দখল রয়েছে।মোজতবার নিয়োগের পরও থামেনি হামলা। তেহরান ও কোমে নতুন নতুন বিস্ফোরণের খবর আসছে। ইসরায়েলি হামলায় ইরানের তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলের জ্বালানি ডিপো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিষাক্ত ধোঁয়ায় রাজধানীর আকাশ ঢেকে গেছে।ইরানও কিন্তু বসে নেই। সৌদি আরবে ইরানি ড্রোন হামলায় দুই ব্যক্তি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তুরস্ক জানিয়েছে, ন্যাটোর বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া দ্বিতীয় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। কুয়েতে একটি মার্কিন কমান্ড সেন্টারে ড্রোন হামলায় সপ্তম মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার কথাও জানিয়েছে পেন্টাগন।ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি বলেছেন, যুদ্ধ চলতে থাকলে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হবে না, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা দিতে পারে।আন্তর্জাতিক মহল: সার্বভৌমত্বের সংকটট্রাম্পের এমন সরাসরি হস্তক্ষেপের হুমকি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি কোনো সার্বভৌম দেশের নেতৃত্ব নির্ধারণে এভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন? বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যে আগুন আরও লাগাতে পারে।ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ হরমুজ প্রণালী দ্রুত পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাজ্য সাহায্যের প্রস্তাব দিলেও ট্রাম্প তা 'প্রয়োজন নেই' বলে নাকচ করে দিয়েছেন।সূত্র : Axios, Reuters, TIME, Al Jazeera, CBS News, The Hill, Times of Israel, Newsweek, Iran International
সম্পাদক ও প্রকাশক : আলতামাশ কবির
কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত