প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ মার্চ ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ মার্চ ২০২৬
পদত্যাগকারী প্রসিকিউটরের কোটি টাকা ঘুষ দাবির অডিও ফাঁস
সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট ||
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটকের অভিযোগের পর এবার আরেক পদত্যাগকারী প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে কোটি টাকা ঘুষ দাবির তথ্য সামনে এসেছে। ২৪ এর জুলাই আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামে কলেজ ছাত্র ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলা থেকে সাবেক এক সংসদ সদস্যকে খালাস করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে সদ্য পদত্যাগ করা প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে।অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্বে আসা এ প্রসিকিউটর সোমবার পদত্যাগ করেন। এদিনই তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর সাইমুম রেজার পদত্যাগের ঘণ্টা কয়েক পর ঘুষ দাবির অভিযোগের কথিত দুটি অডিও ফাঁস হয়েছে, যা বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ২৪-এ প্রচার করা হয়।কথিত দুটি অডিওতে সদ্য পদত্যাগ করা প্রসিকিউটর সাইমুম রেজাকে চট্টগ্রামের রাউজান থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের এক আইনজীবীর সঙ্গে ঘুষ দাবির দরকষাকষি করতে শোনা যায়।এ বিষয়ে ফজলে করিমের আইনজীবী রেজওয়ানা ইউসুফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খোলাখুলি কিছু বলতে রাজি হননি। তবে ঘুষ দেওয়া নিয়ে দর কষাকষির বিষয়টি অস্বীকারও করেননি। ফাঁস হওয়া কথিত অডিও রেকর্ডটি বাস্তবসম্মত কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যেহেতু এত বড় ঘটনা, সেখানে কোনো না কোনো সত্য থাকতে পারে।আর ঘুষ দাবির অভিযোগ ও অডিওর সত্যতা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন সাইমুম রেজা তালুকদার। তার দাবি, এটি একটি মহলের অপপ্রচার এবং অডিওগুলো মিথ্যা।ফাঁস হওয়া কথিত অডিও ক্লিপগুলোতে আর্থিক লেনদেনের পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক তদবিরের বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায়।সংবাদমাধ্যমের কাছে আসা সেই অডিওতে সাইমুম রেজা তালুকদারকে সরাসরি এক কোটি টাকা প্রত্যাশার কথা বলতে শোনা যায়। কথোপকথনে কিস্তিতে টাকা পরিশোধের আলোচনার পাশাপাশি, মামলা থেকে অব্যাহতির নিশ্চয়তা হিসেবে বিএনপির নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী অথবা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে দিয়ে তদবির করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে রিজনেবল উল্লেখ করে তার সমর্থন আদায়ে ওই রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ কাজে লাগবে বলেও অডিওতে বলতে শোনা যায়।তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সাইমুম রেজা সোমবার রাত ৯টা ৫ মিনিটে ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেন।নিজের দাবির সপক্ষে তিনি বলেন, আমার বিরুধ্বে চট্টগ্রামে জুলাই গণ অভ্যুত্থান ২০২৪ এর ঘটনায় একটি অভিযোগ এসেছে। অভিযোগটি এরকম যে একজন আসামীকে খালাস করিয়ে দেয়ার বিনিময়ে নারীর সাথে কথোপকথন এর দুইটি অডিও ক্লিপ, যেখানে আমি নাকি ১ কোটি টাকা দাবি করেছি, ১০ লক্ষ টাকা অগ্রিম চেয়েছি। এই দাবী ভিত্তিহীন ও অসত্য। এমন কিছু কখনও ঘটেনি, আমিও কারও থেকে উপরোক্ত কিছু চাইনি।ফেইসবুক পোস্টে সাইমুম রেজা বলেন এক একটা মামলা কয়েকজন প্রসিকিউটরের সমন্বয়ে গঠিত টিম এর অধীনে থাকে। তদন্ত সংস্থার তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে এবং চিফ প্রসিকিউটরের নেতৃত্বে প্রসিকিউশন টিমের সহায়তায় কয়েকটি স্তর পার করে মামলার নথি প্রস্তুত করা হয়। আদালতে উভয় পক্ষের শুনানি, সাক্ষ্য ও যুক্তি তর্ক শুনে মাননীয় আদালত সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের অর্ডার ও রায় প্রদান করেন। তাই একজন প্রসিকিউটরের পক্ষে কখনও একটি মামলায় কাউকে কোন বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেয়া সম্ভব নয়।পদত্যাগের কারণ হিসেবে সাইমুম রেজা তার আগের কর্মস্থল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় এবং গবেষণায় ফিরে যাওয়ার কথা তুলে ধরেন।তিনি লিখেন, আমি অনেকদিন ধরেই আমার প্রাক্তন কর্মস্থল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় ফেরার জন্য চিন্তা করছিলাম। আমি আবার গবেষণা ও লেখালেখিতে মনোনিবেশ করতে আগ্রহী। এবং আমার পরিবারকেও আরও বেশি সময় দিতে চাই। তাই পূর্বের কর্মক্ষেত্রে ফিরলাম।একই দিনে তার পদত্যাগ এবং ঘুষ চাওয়ার অডিও সামনে আসা কাকতালীয় কিনা জানতে চাইলে প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা বলেন, আমি আরও আগেই পদত্যাগ পত্র জমা দিয়েছি । কিন্তু গতকাল গৃহীত হয়েছে। আর বিকালে এই অবস্থা । এর বেশি কিছু আমার বলার নেই।ফাঁস হওয়া দুটি অডিওর একটি সাবেক চীফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের সময়কালের বলে জানা যায়। এ বিষয়ে সাবেক এই চীফ প্রসিকিউটর জানেন কিনা, এমন অডিও তিনি শুনেছেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, আমাকে কেউ কোনো রেকর্ডিং দেয়নি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার আগে আমি সেই রেকর্ডিংগুলো শুনিনি।তবে ডিজিটাল প্রমাণের আইনি গ্রহণযোগ্যতা এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর ও সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, অডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কি না, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। তবে কথোপকথনের শ্বাস নেওয়ার প্রক্রিয়া ও বাচনভঙ্গি বিশ্লেষণে এটি এআই জেনারেটেড না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।তিনি বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ ভয়েস স্যাম্পল, আইপিডিআর এবং সিডিআর বিশ্লেষণের মাধ্যমে ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত হলেই কেবল সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে কথোপকথনটি কাদের মধ্যে এবং কী উদ্দেশ্যে হয়েছিল।এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটকের অভিযোগ তুলেছিলেন প্রসিকিউশন টিমের সদস্য বিএম সুলতান মাহমুদ। তাজুল ইসলাম চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলেও তখন অভিযোগ করেছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। তবে এসব অভিযোগকে সর্বতোভাবে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছিলেন তাজুল।চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী জুলাই ২৪ আন্দোলনে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং বিভিন্ন নাশকতার অভিযোগে একাধিক মামলায় বর্তমানে কারাগারে আছেন। জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় এবং কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়াও ১১৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের একটি মামলার আসামি তিনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যা, অপহরণ, এবং ভাঙচুরের অভিযোগে অন্তত এক ডজনেরও বেশি মামলার আসামি সাবেক এই সংসদ সদস্য।২০২৪ সালে ১২ সেপ্টেম্বর সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্তের আবদুল্লাহপুর এলাকা থেকে এবিএম ফজলে করিমকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তিনি আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে অভিযোগ।এর আগে তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে ১৪টি মামলা হয়। এ সব মামলায় গ্রেফতার দেখানোর জন্য হেলিকপ্টারে করে তাকে ১৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে নেয়া হয়। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আলতামাশ কবির
কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত