প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ মার্চ ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ মার্চ ২০২৬
বারুদের বাজারে শান্তির সেল
ফকর উদ্দিন মানিক ||
পৃথিবী যেন আবার এক পুরনো শব্দের কাছে ফিরে গেছে; বিস্ফোরণ। আকাশে ধোঁয়ার রেখা, সংবাদে জরুরি ব্রেকিং, আর কূটনীতির ভাষায় ন্যস্ত সতর্কবার্তা। ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- এই ত্রিমুখী সমীকরণে উত্তাপ শুধু সীমান্তের নয়; তা আমাদের মানসিক আবহাওয়াকেও দগ্ধ করছে। প্রতিটি পক্ষই নিজেদের যুক্তি তুলে ধরছে; নিরাপত্তা, প্রতিরোধ, ভারসাম্য। তিন ভাষ্য, কিন্তু বারুদের গন্ধ একটাই। গোলাপ ফোটে না; ফোটে কেবল শোকসংবাদ।যুদ্ধের নিজস্ব নন্দনতত্তব আছে ভয়াবহ অথচ আকর্ষণীয়। মানচিত্রে তীরচিহ্ন, বিশ্লেষণে কৌশল, টেলিভিশনের পর্দায় চলমান গ্রাফিক্স সব মিলিয়ে যেন সমকালীন নাট্যমঞ্চ। আগুনের রঙ উজ্জ্বল, ধোঁয়ার ছায়া ঘন। কিন্তু মঞ্চের আলোর বাইরে অন্ধকার; ভাঙা ঘর, আতঙ্কিত শিশু, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ইতিহাস শিখিয়েছে অস্ত্রের ঝলকানি যতই চোখ ধাঁধাক, শান্তির আলো ততই ক্ষীণ।ইসরায়েলের নিরাপত্তা-চিন্তা তার ভূগোলের ভেতরেই নিহিত; চারপাশে সন্দেহ, অতীতের স্মৃতি, ভবিষ্যতের আশঙ্কা। যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়। ইরান তার সার্বভৌম অবস্থান ও আঞ্চলিক প্রভাবকে আত্মমর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে দেখে। এই ভিন্ন বোধের সংঘাতে তৈরি হয়েছে অবিশ্বাসের ঘূর্ণিঝড়। প্রত্যেকেই নিজেকে রক্ষাকর্তা ভাবছে; কিন্তু রক্ষার নামে যে আগুন জ্বলে, তা প্রায়ই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।যুদ্ধের অর্থনীতি আরেকটি নীরব বাস্তবতা। প্রতিটি উত্তেজনায় জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, শেয়ারবাজারে প্রতিক্রিয়া, প্রতিরক্ষা বাজেটে নতুন বরাদ্দ। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো এক প্রান্তে বিস্ফোরণ ঘটলে তার প্রতিধ্বনি দূরদেশের বাজারে শোনা যায়। উন্নয়নশীল অর্থনীতির কাঠামো কেঁপে ওঠে। ক্ষেপণাস্ত্র কেবল স্থাপনা ধ্বংস করে না; তা অদৃশ্যভাবে বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।দক্ষিণ এশিয়ার পাহাড়ি সীমান্তেও উদ্বেগের ছায়া। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা স্মরণ করিয়ে দেয় সন্দেহের রাজনীতি সর্বত্র একই রকম। সীমান্তরেখা কখনও কেবল মানচিত্রে নয়, মানুষের মনে আঁকা হয়। পারস্পরিক আস্থা ক্ষয়ে গেলে ভয় কাঁটাতারের চেয়েও তীক্ষè। সেই ভয়ই সংঘাতের ভাষাকে উসকে দেয়।যুদ্ধের ভাষা সহজ, শান্তির ভাষা কঠিন। যুদ্ধ তাৎক্ষণিক দৃশ্যমানতা দেয়- শক্তির প্রদর্শন, দৃঢ়তার ঘোষণা। শান্তি চায় ধৈর্য, সংলাপ, আপস। আপস রাজনৈতিক অভিধানে প্রায়ই দুর্বলতার সমার্থক। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- সর্বশ্রেষ্ঠ স্থিতিশীলতা আলোচনার টেবিল থেকে এসেছে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নয়।আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দ্বৈততা স্পষ্ট। একদিকে সামরিক প্রস্তুতি, অন্যদিকে ক‚টনৈতিক আহ্বান। বিবৃতিতে শোনা যায়- ‘উত্তেজনা প্রশমন জরুরি।’ কিন্তু উত্তেজনা অস্ত্রের মাধ্যমে প্রকাশ পেলে প্রশমন জটিল হয়। আস্থা একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করতে সময় লাগে; ক্ষেপণাস্ত্রের গতির চেয়ে বহু গুণ বেশি সময়।মানবিক মূল্য সবচেয়ে উচ্চ। সীমান্তবর্তী মানুষ প্রতিদিন অনিশ্চয়তার ভেতর বাস করে। শিক্ষা ব্যাহত, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দুর্বল, জীবিকা অনিশ্চিত। শরণার্থী শিশুটি জানে না ভ‚রাজনীতির মানচিত্র, কিন্তু জানে ক্ষুধা ও ভয়। কোনো পক্ষই ন্যায়বান নয়; কেবল আকাশের শব্দ ভীতিকর।‘বারুদের বাজারে শান্তির সেল’ এই রূপক আমাদের সময়ের বৈপরীত্যকে স্পষ্ট করে। আমরা নিরাপত্তা চাই, কিন্তু সেই নিরাপত্তা অর্জনের পথ হিসেবে বেছে নিই শক্তির প্রদর্শন। আমরা স্থিতিশীলতা চাই, কিন্তু স্থিতির ভিত্তি হিসেবে আস্থাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিই না। ফলে সংঘাতের চক্র ঘুরতেই থাকে।বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন সংযম ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি। পারমাণবিক ও সামরিক ইস্যুতে স্বচ্ছতা, আঞ্চলিক সংলাপের পুনরুজ্জীবন, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলাÑ এসবই উত্তেজনা প্রশমনের অপরিহার্য শর্ত। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যকর ভ‚মিকা এবং মধ্যস্থতার উদ্যোগ সময়ের দাবি।শেষ প্রশ্নটি নৈতিক। শক্তির প্রদর্শন কি সত্যিই নিরাপত্তা দেয়, না কি নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়? ইতিহাস বলছে, যুদ্ধের প্রতিটি অধ্যায় শেষে মানুষই শান্তির পথ খুঁজেছে। আগুন দীর্ঘস্থায়ী নয়; ছাই দীর্ঘস্থায়ী। সেই ছাই থেকে ভবিষ্যৎ নির্মাণ কঠিন।বিশ্ব এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অগ্নিকুণ্ডকে আরও প্রজ্বলিত করা সহজ; নিবিয়ে ফেলা কঠিন। তবু মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রা প্রমাণ করে- কঠিন পথই টেকসই। বারুদের বাজারে যদি কোনো সেল দিতে হয়, তা হোক অবিশ্বাসের ওপর; কম দামে বিক্রি হোক অহংকার, বিনামূল্যে বিতরণ হোক সংলাপ। শান্তির বিকল্প নেই- এ সত্য যত দ্রæত উপলব্ধি করা যাবে, ততই আগুনের বদলে আলোয় ভরবে বিশ্বমঞ্চ।[লেখক : সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]
সম্পাদক ও প্রকাশক : আলতামাশ কবির
কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত