ছোটবেলায় বাবার সাথে মাছ ধরতেন করতোয়া আর বাঙ্গালী নদী তীরের অমলেশ হাওলাদার। এ দিয়েই দিব্বি চলে যেত জীবন। কিন্তু বর্তমানে জীবিকা নির্বাহে তাকে অনেকটাই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্ষায় কিছু পরিমাণ মাছ ধরতে পারলেও, শুষ্ক মৌসুমে নদী প্রায় মাছশূন্য থাকে।
এ চিত্র কেবল অমলেশের নয়, বগুড়ার শেরপুরের করতোয়া ও বাঙ্গালী নদী পাড়ের প্রায় প্রতিটি মানুষের।
স্থানীয়রা জানায়, নাব্য সংকট আর ভয়াবহ দূষণে মৃতপ্রায় দুটি নদী।
এদিকে, নদীভিত্তিক জীবিকা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন জেলেরা। অচিরেই হয়তো মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে নদী দুটির অস্তিত্ব এমনটাই আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিন দেখা গেছে, এক সময়ের প্রমত্ত এই নদীগুলো এখন অনেক স্থানে সরু, ভরাট ও নাব্যহীন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও নদীর প্রস্থ এতটাই কমে গেছে যে শুকনো মৌসুমে হেঁটে পার হওয়া যায়। আবার কোথাও কোথাও পরিণত হয়েছে ময়লার ড্রেনে।
খানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আলম প্রামাণিক বলেন, ‘আগে নদীতে বড় বড় নৌকা চলত, এখন শুকনো মৌসুমে মানুষ পায়ে হেঁটে পার হয়।’ নদীর এই করুণ অবস্থার পেছনে রয়েছে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের অবহেলা ও অপরিকল্পিত কর্মকান্ড। শিল্পকারখানার বর্জ্য, পৌরসভার অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতি ভেঙে পড়েছে। শেরপুর পৌর এলাকার লক্ষাধিক মানুষের পয়ঃনিষ্কাশনের পানি সরাসরি করতোয়ায় পড়ছে। কোথাও কোথাও আবর্জনা ফেলে নদীর অংশ ভরাট করার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় দই-মিষ্টির কারখানা, রেস্তোরাঁ, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বর্জ্যও নদীতে মিশছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে করতোয়ার পানি ক্রমেই হয়ে উঠছে বিষাক্ত।
উত্তর সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আশুতোষ সরকার বলেন, ‘কারখানার বর্জ্য আর ড্রেনের পানিতে নদী দূষণে ভরে গেছে। কয়েক মাস আগে নদীতে মাছ ছাড়া হয়েছিল, কিন্তু পরদিনই সেগুলো মরে ভেসে ওঠে।’ স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম শেখ বলেন, ‘এই নদী একসময় বড় নৌপথ ছিল। গবাদি পশু, ধান, মাটির পণ্য, নারিকেল সবকিছুই নৌকায় আনা-নেওয়া হতো। এখন নদী ভরাট হয়ে গেছে, নৌকা চলে না।’
এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘নাব্য সংকট এবং দূষণের কারণে করতোয়া ও বাঙ্গালী নদী এখন মৃতপ্রায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে নদীগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।’
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বগুড়া কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুর উপজেলার প্রধান দুটি নদী করতোয়া ও বাঙ্গালী। গাইবান্ধার কাটাখালী নদী থেকে উৎপন্ন করতোয়া প্রায় ১২৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শেরপুরের কল্যাণী ঘাটে এসে বাঙ্গালী নদীতে মিলেছে। অন্যদিকে, গাইবান্ধার আলাই নদী থেকে উৎপন্ন বাঙ্গালী নদী প্রায় ২১৭ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে ‘ফুলজোর’ নাম ধারণ করে এবং শেষে হুরাসাগরে মিশে যায়।

শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মার্চ ২০২৬
ছোটবেলায় বাবার সাথে মাছ ধরতেন করতোয়া আর বাঙ্গালী নদী তীরের অমলেশ হাওলাদার। এ দিয়েই দিব্বি চলে যেত জীবন। কিন্তু বর্তমানে জীবিকা নির্বাহে তাকে অনেকটাই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্ষায় কিছু পরিমাণ মাছ ধরতে পারলেও, শুষ্ক মৌসুমে নদী প্রায় মাছশূন্য থাকে।
এ চিত্র কেবল অমলেশের নয়, বগুড়ার শেরপুরের করতোয়া ও বাঙ্গালী নদী পাড়ের প্রায় প্রতিটি মানুষের।
স্থানীয়রা জানায়, নাব্য সংকট আর ভয়াবহ দূষণে মৃতপ্রায় দুটি নদী।
এদিকে, নদীভিত্তিক জীবিকা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন জেলেরা। অচিরেই হয়তো মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে নদী দুটির অস্তিত্ব এমনটাই আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিন দেখা গেছে, এক সময়ের প্রমত্ত এই নদীগুলো এখন অনেক স্থানে সরু, ভরাট ও নাব্যহীন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও নদীর প্রস্থ এতটাই কমে গেছে যে শুকনো মৌসুমে হেঁটে পার হওয়া যায়। আবার কোথাও কোথাও পরিণত হয়েছে ময়লার ড্রেনে।
খানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আলম প্রামাণিক বলেন, ‘আগে নদীতে বড় বড় নৌকা চলত, এখন শুকনো মৌসুমে মানুষ পায়ে হেঁটে পার হয়।’ নদীর এই করুণ অবস্থার পেছনে রয়েছে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের অবহেলা ও অপরিকল্পিত কর্মকান্ড। শিল্পকারখানার বর্জ্য, পৌরসভার অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতি ভেঙে পড়েছে। শেরপুর পৌর এলাকার লক্ষাধিক মানুষের পয়ঃনিষ্কাশনের পানি সরাসরি করতোয়ায় পড়ছে। কোথাও কোথাও আবর্জনা ফেলে নদীর অংশ ভরাট করার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় দই-মিষ্টির কারখানা, রেস্তোরাঁ, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বর্জ্যও নদীতে মিশছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে করতোয়ার পানি ক্রমেই হয়ে উঠছে বিষাক্ত।
উত্তর সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আশুতোষ সরকার বলেন, ‘কারখানার বর্জ্য আর ড্রেনের পানিতে নদী দূষণে ভরে গেছে। কয়েক মাস আগে নদীতে মাছ ছাড়া হয়েছিল, কিন্তু পরদিনই সেগুলো মরে ভেসে ওঠে।’ স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম শেখ বলেন, ‘এই নদী একসময় বড় নৌপথ ছিল। গবাদি পশু, ধান, মাটির পণ্য, নারিকেল সবকিছুই নৌকায় আনা-নেওয়া হতো। এখন নদী ভরাট হয়ে গেছে, নৌকা চলে না।’
এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘নাব্য সংকট এবং দূষণের কারণে করতোয়া ও বাঙ্গালী নদী এখন মৃতপ্রায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে নদীগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।’
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বগুড়া কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুর উপজেলার প্রধান দুটি নদী করতোয়া ও বাঙ্গালী। গাইবান্ধার কাটাখালী নদী থেকে উৎপন্ন করতোয়া প্রায় ১২৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শেরপুরের কল্যাণী ঘাটে এসে বাঙ্গালী নদীতে মিলেছে। অন্যদিকে, গাইবান্ধার আলাই নদী থেকে উৎপন্ন বাঙ্গালী নদী প্রায় ২১৭ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে ‘ফুলজোর’ নাম ধারণ করে এবং শেষে হুরাসাগরে মিশে যায়।

আপনার মতামত লিখুন