সংবাদ
ছাদ ও ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ: ওয়ালটনের প্রকল্পে অর্থায়ন করছে ইডকল

ছাদ ও ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ: ওয়ালটনের প্রকল্পে অর্থায়ন করছে ইডকল

দেশের বেসরকারি উৎপাদন খাতে অন্যতম বৃহৎ ছাদভিত্তিক ও ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজকে ১৪৪ কোটি টাকা অর্থায়ন করছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। ৫০ মেগাওয়াট (মেগাওয়াট) সক্ষমতার এই মেগা প্রকল্পের জন্য ইতিমধ্যে ৪৪ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইডকলের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মনিরুল ইসলাম।গাজীপুরের চন্দ্রায় ওয়ালটন ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স পরিদর্শনকালে এক ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) এবং ইডকলের যৌথ উদ্যোগে জ্বালানি খাতের সাংবাদিকদের জন্য এই পরিদর্শনের আয়োজন করা হয়।ইডকলের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মনিরুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে এক ইউনিট বিদ্যুতে সরকারকে ৫ টাকার মতো ভর্তুকি দিতে হয়। আমরা চেষ্টা করছি সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে। এ জন্য এনার্জি সাশ্রয়ী ভবন ব্যবহারের উদ্বুদ্ধ ও অর্থায়ন করছি। আমরা ২০০২ সালে যখন সৌরবিদ্যুতের কথা বলতাম, তখন অনেকেই কাছেই বিষয়টি ছিল বিষ্ময়ের। হাটে-বাজারে গিয়ে জনগণকে হাতে কলমে প্রমাণ দেখাতে হয়েছে। আমার মনে হয় এখন সৌর বিদ্যুৎ সম্পর্কে জানেন না এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। ২০০২ সালে ছিল বেসিক লাইটিং প্রোগ্রাম, এখন সৌর বিদ্যুৎ দিয়ে সবকিছু হচ্ছে।”এস এম মনিরুল ইসলাম বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে ১ কোটি ৬৩ লাখ বসতি রয়েছে। নানান শ্রেণির মধ্যে অর্ধেক বাদ দিলেও প্রায় ৮০ লাখ আবাসন রয়েছে। প্রত্যেক বাড়িতে ৪ কিলোওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলেও বিশাল আকার ধারণ করবে। আমরা একটি একটি স্ফুলিঙ্গ একত্র করে দাবানল তৈরি করতে চাই। আগামী গরমের মৌসুমে স্বস্তি পেতে এটি হতে পারে মোক্ষম হাতিয়ার। আমরা তারই পদক্ষেপ হিসেবে ডিআরএস কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। ইতোমধ্যেই বেশকিছু প্রকল্প চূড়ান্তের পথে রয়েছে। দেশবাসীর সহায়তা পেলে বড় কিছু করা সম্ভব।ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ আলী জানান, সৌর থেকে তাদের ইন্ডাস্ট্রিতে ৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর পরিধি বাড়ানোর কাজ অব্যাহত রয়েছে, খুব শিগগিরই ৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। তিনি বলেন, “মাসে যে বিদ্যুৎ পাচ্ছি, ডিজেল ব্যবহার করলে ৬৯ লাখ, ৭৯ হাজার ব্যারেল তেলের প্রয়োজন পড়তো। কার্বন ইমিশন কমেছে ৯ লাখ ৪৩ হাজার ১৬০ টন, যা ১১ লাখ ৭৮টি বৃক্ষ রোপনের সমান। মাসে প্রায় ৩২ লাখ ৬৪ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছি। এতে আমাদের বিশাল সাশ্রয় হচ্ছে, বাড়তি পাওনা হচ্ছে কার্বন ক্রেডিট।”সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আড়াই কিলোমিটার ফুটপাতের শেড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সৌরপ্যানেল। পথচারীকে রোদ-বৃষ্টি থেকে নিরাপত্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে ১.১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের যোগান দিয়ে যাচ্ছে শেডটি।সোলার প্যানেলের ফুটপাত ধরে এগিয়ে গেলে বিশাল জলাশয়, সেখানে ভাসছে ফ্লোটিং সোলার প্যানেল। মাছ চাষের পাশাপাশি ২.২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে তাতে। এছাড়া, বড় বড় ভবনগুলোর ছাদে রয়েছে সোলার প্যানেল। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।ইডকলের অর্থায়নে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি, ইএসএস ব্যাটারি এবং সোলার ইনভার্টার উৎপাদনের পথে রয়েছে ওয়ালটন। আগামী মাসেই লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টরা জানান, শিল্প খাতে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের দাম এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ওয়ালটন কর্তৃপক্ষ জানায়, সৌরবিদ্যুতের এই রূপান্তর জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা এবং তাদের বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে। পাশাপাশি রপ্তানির বাজারে ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ বা পরিবেশবান্ধব কারখানার শর্ত পূরণে এটি ওয়ালটনকে এগিয়ে রাখবে।উল্লেখ্য, ২০০২ সাল থেকে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রসারে কাজ করছে। সরকার সম্প্রতি সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়ায় শিল্প কারখানার ছাদে এবং ভাসমান সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ জোর দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
৪ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

সৌরবিদ্যুতের বড় লক্ষ্য, বাস্তবায়নে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎ এখন আর কেবল বিকল্প কোনো উৎস নয়, ভবিষ্যতের বিদ্যুৎব্যবস্থায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।বাড়ির ছাদ থেকে শিল্পকারখানা, সরকারি ভবন থেকে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র - বিভিন্ন ক্ষেত্রে সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সরকারও ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।কিন্তু বড় লক্ষ্য নির্ধারণ আর তা বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। সৌর প্যানেল স্থাপনের খরচ কে বহন করবে, উৎপাদিত বিদ্যুতের ন্যায্য দাম পাওয়া যাবে কি না, ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ মিলবে কি না - এসব প্রশ্নের সমাধান ছাড়া পরিকল্পনাটি কতটা এগোবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সাধারণ গ্রাহক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে, উৎপাদিত বিদ্যুৎ কার্যকরভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে এবং বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার বাস্তবসম্মত সুযোগ থাকবে।লক্ষ্যমাত্রা বড়, বাস্তবায়নের পথ কতটা মসৃণ?২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা থেকে এবং ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ভূমিভিত্তিক প্রকল্প থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বায়ুবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকেও অতিরিক্ত সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়বে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতেও সৌরবিদ্যুৎ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিল্পকারখানায় দিনের বেলায় বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি, সেখানে নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।তবে লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বর্তমান সক্ষমতা ও বাস্তব অগ্রগতির ব্যবধান বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। নতুন প্রকল্প ঘোষণা, সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ এবং বাস্তবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া বিদ্যুতের পরিমাণ এক নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রতিবছর কতটা নতুন সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে, বিনিয়োগ কোথা থেকে আসবে এবং কোন বাধাগুলো দূর করতে হবে, তার সুস্পষ্ট হিসাব প্রয়োজন।শুধু পরিকল্পনায় সক্ষমতার পরিমাণ উল্লেখ করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা, কার্যকর তদারকি এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা। পাশাপাশি বর্তমানে কত মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চালু রয়েছে, কতটি প্রকল্প নির্মাণাধীন এবং নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে কী ধরনের অগ্রগতি হচ্ছে - এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।ছাদে সৌর প্যানেল, কিন্তু বিনিয়োগের আগ্রহ কতটা?ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। শহরের আবাসিক ভবন, সরকারি স্থাপনা, বিপণিবিতান ও শিল্পকারখানার ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমে এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ সরাসরি ব্যবহার করা যায়।তবে সব ছাদ সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য সমান উপযোগী নয়। ছাদের আয়তন, নকশা, ছায়া, ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা, স্থাপনের নিরাপত্তা এবং বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিতে হয়। এসব বিষয় যাচাই না করে বিনিয়োগ করলে প্রত্যাশিত উৎপাদন ও আর্থিক সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে।ঢাকার বহুতল আবাসিক ভবনগুলোতে বিষয়টি আরও জটিল। একটি ভবনে একাধিক ফ্ল্যাটমালিক থাকেন। ছাদ যৌথ ব্যবহারের জায়গা হলেও সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপন, বিনিয়োগের অর্থ ভাগাভাগি এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের সুবিধা বণ্টন নিয়ে মতভেদ তৈরি হতে পারে। একজন বিনিয়োগ করলেন, অথচ অন্যরাও সুবিধা পেলেন - এমন পরিস্থিতিতে ন্যায্য হিসাবের ব্যবস্থা না থাকলে উদ্যোগটি টেকসই হবে না।এ কারণে আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে শুধু প্যানেল স্থাপনে প্রণোদনা দিলেই চলবে না। যৌথ বিনিয়োগের নিয়ম, বিদ্যুতের ব্যবহার ও ব্যয়ের হিসাব ভাগাভাগি এবং জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে ভবনমালিক ও ফ্ল্যাটমালিকদের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্ট করা প্রয়োজন।সাড়ে ১০ টাকায় বিদ্যুৎ বিক্রি: লাভের হিসাব কী বলছে?ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। নির্ধারিত শর্তে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপন করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করলে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ সুবিধা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। তবে এ প্রণোদনা পেতে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও কারিগরি শর্ত পূরণ করতে হবে।উদ্যোগটি গ্রাহকদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে। তবে বিদ্যুৎ বিক্রির মূল্য ও সুবিধার শর্তের পাশাপাশি উৎপাদনের মোট খরচ এবং বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হবে।সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, বৈদ্যুতিক সংযোগ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ - সবকিছুর পেছনে বিনিয়োগ প্রয়োজন। ব্যাটারি যুক্ত করলে ব্যয় আরও বাড়ে। ঋণ নিয়ে প্রকল্প স্থাপন করলে সুদের খরচও যুক্ত হয়। ফলে শুধু বিদ্যুৎ বিক্রির মূল্য বিবেচনা করে প্রকল্পের লাভজনকতা নির্ধারণ করা যায় না।প্রচলিত বাজারদরের একটি আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, তিন কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপনে দেড় লাখ থেকে এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে। ব্যাটারি যুক্ত করলে মোট বিনিয়োগ প্রায় পৌনে তিন লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে সরঞ্জামের মান, ব্যাটারির ধরন ও সক্ষমতা, স্থাপনের শর্ত এবং প্রকল্পের কাঠামোর ওপর প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে। এ হিসাবকে তাই নির্দিষ্ট বাজারদর নয়, আনুমানিক ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।এখন প্রশ্ন হলো, এই বিনিয়োগ থেকে কত দিনে অর্থ ফেরত আসবে? উৎপাদিত বিদ্যুতের কতটা নিজে ব্যবহার করা যাবে, কতটা গ্রিডে বিক্রি করা সম্ভব হবে এবং বিক্রির অর্থ কতটা নিয়মিত পাওয়া যাবে - এসব হিসাবের ওপর বিনিয়োগের লাভজনকতা নির্ভর করে।বিশেষ করে ছোট গ্রাহকদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট ব্যয় বেশি হলে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের বিক্রির পরিমাণ কম হলে প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট ক্রয়মূল্য ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের ব্যয়, ঋণের সুদ, নিজস্ব ব্যবহারের মাধ্যমে সাশ্রয় এবং প্রকল্পের আয়ুষ্কাল বিবেচনায় নিয়ে এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে গ্রাহক নিজের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করেও যুক্তিসংগত আর্থিক সুবিধা পান।শিল্পকারখানায় সম্ভাবনা বেশি, অর্থায়ন বড় বাধাবাংলাদেশের পোশাকশিল্পে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একদিকে বিদ্যুতের ব্যয় কমানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের শর্ত - দুই কারণে কারখানার মালিকদের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের আগ্রহ বাড়ছে।অনেক কারখানার বিশাল ছাদ রয়েছে। সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপন করে দিনের বেলায় বিদ্যুতের একটি অংশ নিজস্বভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। এতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন কমতে পারে এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি কারখানার কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য পূরণেও এটি সহায়ক হতে পারে।সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ২০ আগস্ট ২০২৬-এ প্রকাশিত এক সমীক্ষায় বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ছাদে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট-পিক (MWp) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। এ হিসাব কারখানাগুলোর ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নির্দেশ করে। বাস্তবে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ সূর্যালোক, আবহাওয়া ও ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে।এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু কারখানার মালিকদের আগ্রহ থাকলেও সব ক্ষেত্রে অর্থায়নের নিশ্চয়তা নেই। বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে এককালীন বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। ব্যাংকঋণের সুদ বেশি হলে বা ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে বিনিয়োগের পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে।এ ক্ষেত্রে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, প্রকল্পের শুরুতেই অর্থায়নের নিশ্চয়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোর জন্য সহজলভ্য সবুজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যেসব প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহী, তাদের জন্য ঋণ ও বিনিয়োগের ব্যবস্থা সহজ করা গেলে শিল্প খাতের সম্ভাবনাকে বাস্তব উৎপাদনে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।একই সঙ্গে সরকারি ভবন ও বড় বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোতেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এসব ভবনে পরিকল্পিতভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সম্ভব। সরকারি স্থাপনাগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন ও ছাদের উপযোগিতা যাচাই করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জমি কোথায়?ছাদভিত্তিক উৎপাদনের পাশাপাশি বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনও জরুরি। তবে এসব প্রকল্পের জন্য পর্যাপ্ত জমি পাওয়া বাংলাদেশের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাসন ও শিল্পায়নের চাপে কৃষিজমির ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য কৃষিজমি ব্যবহার করলে খাদ্য উৎপাদন ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।তাই জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। পতিত বা অনুপযোগী জমি, উপযুক্ত সরকারি জমি এবং অন্যান্য বিকল্প স্থান চিহ্নিত করে সেগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। জমির মালিকানা, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় না নিলে প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে।এ ছাড়া বড় প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া গেলেও বিদ্যুৎ সঞ্চালনের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। উৎপাদনকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন ও উপকেন্দ্র না থাকলে উৎপাদন বাড়িয়েও পুরো সুবিধা পাওয়া যাবে না। ফলে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনার সঙ্গে সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়নও সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।গ্রিডের সক্ষমতা না বাড়লে উৎপাদনের সুফল মিলবে কীভাবে?সৌরবিদ্যুতের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এর উৎপাদন সূর্যের আলো ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। দিনের বেলায় উৎপাদন বেশি হলেও সন্ধ্যার পর তা কমে যায়। ফলে জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থার সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের সমন্বয় করতে উন্নত গ্রিড ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।একই সময়ে অনেক এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে গেলে গ্রিডকে সেই বিদ্যুৎ গ্রহণ, সঞ্চালন ও বিতরণ করতে সক্ষম হতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও সঞ্চালন অবকাঠামো দুর্বল হলে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।এ ক্ষেত্রে স্মার্ট গ্রিড, উন্নত উৎপাদন পূর্বাভাস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ সংরক্ষণের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও এর জন্য বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাই সব প্রকল্পে একই ধরনের প্রযুক্তি প্রয়োগ না করে প্রকল্পের আকার, অবস্থান, উৎপাদনের ধরন ও বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী সমাধান নির্ধারণ করতে হবে।সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা ও নমনীয়তা বাড়ানো জরুরি। উৎপাদিত বিদ্যুৎ কীভাবে গ্রহণ, ব্যবস্থাপনা ও বিতরণ করা হবে, তার বাস্তব পরিকল্পনা ছাড়া শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আস্থা ফেরানো জরুরিপ্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। দেশীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো প্রকল্পে অর্থ দেওয়ার আগে নীতিমালার স্থিতিশীলতা, অনুমোদন প্রক্রিয়া, বিদ্যুৎ কেনার নিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করেন। এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যেতে পারে।বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে অতীতে অনুমোদিত কিছু প্রকল্প বাতিলের অভিজ্ঞতা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রশ্ন সামনে এসেছে। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ আইনের আওতায় অনুমোদিত একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের উদ্যোগ নেয়। তবে এ সিদ্ধান্তের ফলে নতুন বিনিয়োগ কতটা প্রভাবিত হয়েছে, তা নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।সাধারণভাবে বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রকল্প অনুমোদনের নিয়ম স্পষ্ট থাকবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অযথা বিলম্ব হবে না এবং বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারবেন।বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। সৌর প্যানেল স্থাপন, বৈদ্যুতিক প্রকৌশল, রক্ষণাবেক্ষণ ও গ্রিড ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল তৈরি করা না গেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও স্থানীয় সক্ষমতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।লক্ষ্যে পৌঁছাতে এখন কী করা দরকার?২০৩০ সালের সৌরবিদ্যুৎ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।প্রথমত, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আবাসিক গ্রাহক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য স্বল্প সুদের ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণের পরিমাণ, পরিশোধের সময়সীমা ও অন্যান্য শর্ত এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রকল্পের আর্থিক সাশ্রয় ও আয় দিয়ে বিনিয়োগের ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়।দ্বিতীয়ত, সৌর সরঞ্জামের ব্যয় কমাতে হবে। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের আমদানি এবং স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে হবে। শুল্ক ও করের কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে প্রকল্পের ব্যয় অযথা না বাড়ে। একই সঙ্গে সরঞ্জামের মান নিশ্চিত করা এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।তৃতীয়ত, উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য ও শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রকৃত ব্যয়, প্রকল্পের আকার এবং গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ, মিটারিং ও বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী করতে হবে।চতুর্থত, জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সঞ্চালন লাইন, উপকেন্দ্র, স্মার্ট গ্রিড এবং প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।পঞ্চমত, জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিজমি রক্ষা করে উপযুক্ত স্থানে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং ভবনের ছাদকে উৎপাদনের কাজে লাগানোর জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।ষষ্ঠত, বিনিয়োগ ও নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প অনুমোদন, বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নের নিয়ম স্পষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য হওয়া জরুরি। এতে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা সহজ হবে।সবশেষে, লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। কত মেগাওয়াট সক্ষমতা বাস্তবে যুক্ত হয়েছে, কতটি প্রকল্প নির্মাণাধীন এবং কোন বাধায় কাজ আটকে আছে - এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্ধারিত লক্ষ্যের বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতির তুলনামূলক হিসাব প্রকাশ করতে হবে। এতে পরিকল্পনার দুর্বলতা চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের দায়িত্বও স্পষ্ট করা যাবে।সৌরবিদ্যুতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বাস্তব পদক্ষেপের ওপরবাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্পকারখানা, সরকারি স্থাপনা ও আবাসিক ভবনের ছাদ ব্যবহার এবং উপযুক্ত জমিতে বড় প্রকল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিনিয়োগের সুযোগ, ন্যায্য বিদ্যুৎ মূল্য, উন্নত গ্রিডব্যবস্থা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা তাই শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের জ্বালানি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতারও পরীক্ষা। নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্য অর্জিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে ঘোষিত পরিকল্পনার কতটা বাস্তবে রূপ নেয় তার ওপর।বাংলাদেশের হাতে সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তরের প্রযুক্তি রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বাস্তবসম্মত উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। সম্ভাবনাকে অর্জনে রূপ দিতে পারলে সৌরবিদ্যুৎ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর অর্থায়ন, অবকাঠামো ও নীতিগত বাধা অমীমাংসিত থাকলে বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

কৃষকের ঘামে, কৃষিবিদের জ্ঞানে বদলে যাক কৃষি

“ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো”—কবি রফিক আজাদের এই পঙ্‌ক্তি বাংলা সাহিত্যের এক তীব্র আর্তনাদ। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি এক নির্মম প্রশ্ন। ভাতের অভাব যখন মানুষের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে, তখন স্বাধীনতার মানচিত্রও ক্ষুধার কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে উচ্চারিত এই পঙ্‌ক্তি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কেবল ভূখণ্ডের মুক্তি নয়; মানুষের মুখে অন্ন, জীবনে মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যেই স্বাধীনতার পূর্ণতা।একটি মানচিত্রের ভেতরে থাকে নদী, মাঠ, জনপদ, ইতিহাস ও মানুষের স্বপ্ন। কিন্তু সেই মানচিত্রের প্রতিটি ঘরে যদি অন্নের নিশ্চয়তা না থাকে, তবে স্বাধীনতার অর্জনও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই বাংলাদেশের কৃষির ইতিহাস শুধু ফসল উৎপাদনের ইতিহাস নয়; এটি ক্ষুধার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। এই ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছেন কৃষক, যার ঘামে মাটি উর্বর হয়। তাঁর পাশে রয়েছেন কৃষিবিদ, যার জ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি মাটির সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করে।বাংলাদেশের কৃষি আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তা কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রযুক্তির অর্জন নয়। এর পেছনে রয়েছে কৃষকের প্রজন্মান্তরের অভিজ্ঞতা, কৃষিবিদের গবেষণা ও উদ্ভাবন, কৃষি সম্প্রসারণকর্মীদের মাঠপর্যায়ের প্রচেষ্টা, কৃষিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অবদান এবং রাষ্ট্রের নীতি ও সহায়তা। কৃষক ও কৃষিবিদ—দুই ভিন্ন পরিচয়, কিন্তু লক্ষ্য এক: মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করা, কৃষিকে টেকসই করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উৎপাদনের ভিত্তি সুরক্ষিত রাখা। একজন অভিজ্ঞতার আলোকে মাটির ভাষা বোঝেন, অন্যজন গবেষণার মাধ্যমে সেই ভাষার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খোঁজেন। এই দুই জ্ঞানের সমন্বয়েই কৃষি হয়ে ওঠে শক্তিশালী, আধুনিক ও সম্ভাবনাময়।স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য জোগানো। সীমিত জমি, ঘনবসতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কৃষক উৎপাদনের লড়াই চালিয়ে গেছেন। কৃষিবিদ ও গবেষকেরা উন্নত জাত উদ্ভাবন, মানসম্মত বীজ উৎপাদন, সেচের সম্প্রসারণ, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির বিকাশে কাজ করেছেন। কৃষকের হাতে প্রযুক্তি পৌঁছেছে; কৃষক সেই প্রযুক্তিকে নিজের জমি, পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়োগ করেছেন। গবেষণাগারের জ্ঞান মাঠে প্রাণ পেয়েছে, আর মাঠের বাস্তবতা গবেষণাকে দিয়েছে নতুন দিকনির্দেশনা।এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। একসময় যে দেশকে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তাড়া করত, সেই দেশ আজ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তবে এই অর্জনকে আত্মতুষ্টির কারণ ভাবার সুযোগ নেই। কারণ, খাদ্যনিরাপত্তা শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। খাদ্য মানুষের নাগালে আছে কি না, ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে কি না, পুষ্টির চাহিদা পূরণ করছে কি না এবং দুর্যোগ কিংবা বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও সরবরাহ অব্যাহত থাকছে কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে ফসল ফললেই কৃষকের দায়িত্ব শেষ হয় না; সেই ফসলের ন্যায্য মূল্য, নিরাপদ সংরক্ষণ, কার্যকর বিপণন এবং ভোক্তার সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করাও খাদ্যব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।আজ কৃষির সামনে চ্যালেঞ্জের ধরন বদলেছে। জনসংখ্যা বাড়ছে, আবাদযোগ্য জমি কমছে, উৎপাদন উপকরণের ব্যয় বাড়ছে। কৃষিশ্রমিকের সংকট, বাজারের অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষকের ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলছে। কোথাও বন্যা, কোথাও খরা, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও লবণাক্ততা কৃষির প্রচলিত হিসাব পাল্টে দিচ্ছে। একদিকে উৎপাদন বাড়াতে হচ্ছে, অন্যদিকে মাটি, পানি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। অর্থাৎ আগামীর কৃষিকে একই সঙ্গে হতে হবে উৎপাদনশীল, লাভজনক, পুষ্টিসমৃদ্ধ, পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল।এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় কৃষকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে কৃষিবিদের বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানের সমন্বয় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। জলবায়ু-সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ফসলের জাত, মানসম্মত বীজ, পানি সাশ্রয়ী সেচ, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, সুষম সার প্রয়োগ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিযান্ত্রিকীকরণ কৃষিকে নতুন সক্ষমতা দিতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি উদ্ভাবনই শেষ কথা নয়; প্রযুক্তি কৃষকের কাছে কতটা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও ব্যবহারযোগ্য হয়েছে, সেটিই তার সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি। কৃষকের বাস্তব সমস্যা না বুঝে প্রযুক্তি চাপিয়ে দিলে তা মাঠে স্থায়ী হয় না। আবার বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও গবেষণাকে উপেক্ষা করলে কৃষি প্রকৃতির অনিশ্চয়তার কাছে আরও অসহায় হয়ে পড়বে।কৃষককে শুধু উৎপাদনের শ্রমিক হিসেবে দেখলে চলবে না; তিনি কৃষির জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনেরও অংশীদার। কোন জমিতে কোন ফসল ভালো হয়, কখন বীজ বপন করলে ফলন বাড়ে, কোন রোগের লক্ষণ কীভাবে প্রকাশ পায় কিংবা স্থানীয় আবহাওয়ার পরিবর্তনে ফসলের আচরণ কেমন হয়—এসব বিষয়ে কৃষকের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ অমূল্য। কৃষিবিদের দায়িত্ব সেই অভিজ্ঞতাকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা এবং কৃষকের সঙ্গে জ্ঞান বিনিময়ের পথ তৈরি করা। কৃষকের মাঠ ও গবেষণাগারের মধ্যে দূরত্ব যত কমবে, কৃষি গবেষণা তত বেশি বাস্তবমুখী হবে। কৃষককে বাদ দিয়ে কৃষির উন্নয়ন সম্ভব নয়; আবার কৃষিবিজ্ঞানকে সঙ্গে না নিয়ে ভবিষ্যতের খাদ্যচাহিদা পূরণ করাও কঠিন।কৃষকের মুখে হাসি না থাকলে খাদ্যনিরাপত্তার অর্জন পূর্ণতা পায় না। ফসল উৎপাদনের পর ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, সংরক্ষণের অভাবে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া কিংবা বাজারতথ্যের অসমতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া—এসব বাস্তবতা কৃষকের উৎপাদনে আগ্রহ দুর্বল করে। অথচ কৃষকই খাদ্যব্যবস্থার প্রথম ও অপরিহার্য স্তম্ভ। তাই কৃষকের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করতে সংরক্ষণাগার, হিমাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা, কৃষক সমবায়, সরাসরি বাজারসংযোগ এবং নির্ভরযোগ্য বাজারতথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সহজ শর্তে কৃষিঋণ, ফসলবিমা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও কৃষকের ঝুঁকি কমাতে পারে। কৃষক লাভবান হলে কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়বে; বিনিয়োগ বাড়লে খাদ্যব্যবস্থার ভিত্তিও হবে দৃঢ়।খাদ্যনিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো পুষ্টি। পেট ভরানো আর পুষ্টি নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। মানুষের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল ও তেলবীজসহ বৈচিত্র‍্যময় খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন ও জৈব-সমৃদ্ধকরণ পুষ্টির ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় জাত, দেশীয় ফল, শাকসবজি ও অন্যান্য জিনগত সম্পদ সংরক্ষণ করতে হবে। প্রকৃতির প্রতিটি বীজে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। কোনো কোনো স্থানীয় জাত হয়তো বর্তমানে কম উৎপাদন দেয়, কিন্তু তার মধ্যে থাকতে পারে খরা, লবণাক্ততা কিংবা রোগ প্রতিরোধের মূল্যবান বৈশিষ্ট্য। তাই জিনগত সম্পদ ও জীববৈচিত্র‍্য রক্ষা শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়; এটি আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তারও পূর্বশর্ত।আগামী দিনের কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপগ্রহের তথ্য, চালকবিহীন আকাশযান, সংবেদক ও নির্ভুল কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। এসব প্রযুক্তি ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, রোগবালাই শনাক্তকরণ, পানি ও সার ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন পরিকল্পনায় সহায়তা করতে পারে। তবে প্রযুক্তির সুফল যেন কেবল বড় কৃষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছানো, তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ডিজিটাল সেবা সহজলভ্য করা জরুরি। কৃষিতে নারীর অবদানও যথাযথ স্বীকৃতি ও সহায়তা দাবি করে। বীজ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে ফসল উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পারিবারিক পুষ্টি নিশ্চিত করা—বিভিন্ন পর্যায়ে নারীর শ্রম ও জ্ঞান কৃষির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁদের দক্ষতা, অধিকার ও অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে কৃষির অগ্রযাত্রা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বেসরকারি খাত এবং কৃষক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। মানসম্মত বীজ ও উপকরণের সময়মতো সরবরাহ, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, সেচ ও পানি সংরক্ষণ, গবেষণার ফল মাঠে পৌঁছানো, কৃষকের ন্যায্য মূল্য এবং বাজারব্যবস্থার উন্নয়ন—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কৃষি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে সাময়িক সাফল্য আসতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা।সবচেয়ে বড় কথা, কৃষির উন্নয়নকে কেবল উৎপাদন বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা যাবে না। কৃষি একটি জীবন্ত ব্যবস্থা, যেখানে মাটি, পানি, বীজ, জীববৈচিত্র‍্য, কৃষক, বিজ্ঞান ও বাজার পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই ব্যবস্থার কোনো একটি অংশ দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থাই ঝুঁকিতে পড়ে। তাই আজকের সিদ্ধান্তে আগামী দিনের মাটির উর্বরতা, পানির প্রাপ্যতা, বীজের বৈচিত্র‍্য এবং কৃষকের জীবিকার কথা বিবেচনায় নিতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের খাদ্য নিশ্চিত করতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই হতে হবে কৃষি উন্নয়নের মূল দর্শন।কবির সেই পঙ্‌ক্তি আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। কারণ, ক্ষুধার প্রশ্ন কখনো পুরোনো হয় না; শুধু তার রূপ বদলায়। একসময় প্রশ্ন ছিল, মানুষের মুখে ভাত জুটবে কি না। আজ প্রশ্ন—সেই ভাত কতটা নিরাপদ, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী; কৃষক কতটা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন; আর আগামী দিনের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আমাদের কৃষি কতটা প্রস্তুত। স্বাধীনতার মানচিত্রকে মর্যাদাবান রাখতে হলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে কৃষকের মাঠে, কৃষিবিদের গবেষণায় এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পরিকল্পনায়।মানচিত্র আমাদের স্বাধীনতার পরিচয়, আর অন্ন সেই স্বাধীনতার প্রাণ। মানচিত্রের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে মানুষের খাদ্য ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের ঘামকে দিতে হবে যথাযথ মূল্য, কৃষিবিদের জ্ঞানকে দিতে হবে গবেষণা ও প্রয়োগের সুযোগ, আর কৃষিকে দেখতে হবে জাতির দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে। কৃষক ও কৃষিবিদের এই পরিপূরক শক্তিই পারে ক্ষুধার আর্তনাদকে সম্ভাবনার উচ্চারণে রূপ দিতে। অতীতের সংগ্রাম আমাদের পথ দেখাক, বর্তমানের বিজ্ঞান আমাদের শক্তি জোগাক, আর ভবিষ্যতের কৃষি হোক জ্ঞান, শ্রম, প্রযুক্তি ও প্রকৃতির সমন্বিত সৃজন।কৃষকের ঘামে, কৃষিবিদের জ্ঞানে বদলে যাক বাংলাদেশের কৃষি—নিরাপদ হোক মানুষের অন্ন, সুরক্ষিত থাকুক প্রকৃতি, সমুন্নত হোক স্বাধীনতার মানচিত্র।[লেখক: ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)]

স্মৃতির পথে দুই কবির বাড়িতে

ফরিদপুরে এসে কবি জসীমউদ্দীনের বাড়িতে যাবেন না, এমন বেরসিক মানুষ পাওয়া কঠিন। এর আগেও দুয়েকবার কবির জন্মভিটায় এসেছি। এবার পরিবেশটা বেশ অতিথিবান্ধব বলে মনে হয়েছে। বাড়িটির ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেকগুলো ঘর এবং ঘরের বারান্দায় কবির স্মৃতিধর্মী লেখা ও কবিতা দিয়ে আঁকা আলপনার মতো উদ্ধৃতিগুলো আগ্রহী অতিথি ও পর্যটকদের একটু দাঁড়াতে বাধ্য করে। মধুকবি মাইকেলের ‘দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব বঙ্গে, তিষ্ঠ ক্ষণকাল’ পঙ্‌ক্তিটির মতো। কবি জসীমউদ্দীনের শৈশব-কৈশোরের কথা তার বাড়ির ঘরের বেড়ায় উৎকীর্ণ করা আছে। বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতা, ডালিমগাছ—এসবও সেখানে রয়েছে। গতকাল বিকেলটা শরতের মনোরম আবহাওয়ায় পল্লীকবির বাড়ির সামনের কুমার নদের পাড়ে বেড়াতে আসা নানা শ্রেণির মানুষের পদচারণা ও চা-চক্রের মধ্য দিয়ে বেশ ভালো কেটেছে। আমার কন্যা, নাতনি, ছোট ছেলে ও জামাতা সঙ্গে ছিল। জামাতা ফরিদপুর জেলা প্রশাসনে কর্মরত একজন কর্মকর্তা। সে সুবাদেই সেখানে বেড়াতে যাওয়া।পল্লীকবি জসীমউদ্দীন বাংলা ভাষার একজন মৌলিক কবি; তিনি ছিলেন মা, মাটি ও মানুষের কবি। বিশ, ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের পূর্ব বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির বাস্তব চিত্রকল্প উঠে এসেছে তার কাব্যে, ছন্দে ও গানে। তিনি ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ভাষাবিদ ও গবেষক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও ছিলেন। কলকাতা ও ঢাকায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন তিনি। দুজনের বয়স কাছাকাছি ছিল। তাদের জীবনাবসানও একই বছরে, ১৯৭৬ সালে। কবি হিসেবে নজরুল ইসলাম বেহিসাবি, অবৈষয়িক ও বোহেমিয়ান স্বভাবের হলেও জসীমউদ্দীন ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি সারা জীবন পরিকল্পিত পথে হেঁটেছেন এবং বিষয়-সম্পদের প্রতিও খেয়াল রেখেছেন।২.কথিত আছে, কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ পার্টিতে যোগ দেন। ১৯২৬ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ নির্বাচনে ঢাকা বিভাগের আওতাধীন এলাকা থেকে তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। সে সময় কাজী নজরুল ইসলাম পল্লীকবির সঙ্গে এই কুমার নদ দিয়ে নৌকায় তার বাড়িতে এসেছিলেন। সেই নির্বাচনে কাজী নজরুল পরাজিত হয়েছিলেন। এমনকি জামানতও হারিয়েছিলেন। কবির বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের মূল অভিযোগ ছিল, তিনি নাস্তিক, কাফের, শ্যামাসংগীত লেখেন ইত্যাদি। নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন ফরিদপুরের মুসলিম লীগ প্রার্থী মওলবি তমিজউদ্দীন আহমদ। অবশ্য কবিকে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন বন্ধু কমরেড মুজফ্‌ফর আহমদসহ অনেকে। তিনি তা শোনেননি, জেদ ধরেছিলেন। বলেছিলেন, মানুষ তার নামের ওপর ভোট দেবে। তবে নির্বাচনে আর্থিক সহযোগিতা করেছিলেন বিখ্যাত চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায়। নির্বাচনী সফরের প্রধান সঙ্গীদের অন্যতম ছিলেন কবি জসীমউদ্দীন।৩.ফরিদপুরে ভারতের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, কবি, লেখক ও রাজনীতিবিদ হুমায়ূন কবিরের পৈতৃক ভিটা দর্শন করলাম। জানলাম, শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রায় ১ একর ৬৩ শতক জমির ওপর নির্মিত বাড়িটি তার মৃত্যুর পর তার ভাইয়েরা মিলে ২৬ ডিসেম্বর ১৯৬৯ সালে নারীশিক্ষার সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ফরিদপুর পৌরসভার কাছে ‘কবিরবাগ’ নামে হস্তান্তর করে দেন। উল্লেখ্য, তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৮ আগস্ট ১৯৬৯ সালে। বেঁচেছিলেন মাত্র ৬৩ বছর। এখানে বর্তমানে সাজেদা কবির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বালিকা উচ্চবিদ্যালয় রয়েছে। বাড়িটি ঘুরে দেখলাম। প্রধান শিক্ষক জানালেন, এখানে হুমায়ূন কবিরের বাবা আবুল খায়ের কবিরউদ্দীন আহমেদের কবর রয়েছে। কবরটিও দেখা হলো। এপিটাফ থেকে জানা যায়, তিনি ১৯৫০ সালে পরলোকগমন করেন। তিনি ছিলেন খান বাহাদুর ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।হুমায়ূন কবির ১৯০৬ সালে ফরিদপুর শহরের অদূরে কোমরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার শিক্ষাজীবন ছিল অসাধারণ মেধার স্মারক ও কিংবদন্তিতুল্য। ছাত্রজীবনের সব স্তরেই তার ফলাফল ছিল ঈর্ষণীয়। তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিসহ একাধিক বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ইংরেজি ভাষায় তার পাণ্ডিত্য ছিল অপরিসীম।হুমায়ূন কবির স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ও জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদের একান্ত সচিব হিসেবে রাজনৈতিক মহলে প্রবেশ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় সর্বভারতীয় শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন। নেহরুর প্রয়াণের পর তিনি শিক্ষাসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ষাটের দশকে তিনি রাজ্যসভা ও লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।৪.বাঙালি ও মুসলিম হুমায়ূন কবির কংগ্রেসের রাজনীতিতে নীতিনির্ধারণী চিন্তক হওয়ার পাশাপাশি প্রচুর লেখালেখি করেছেন। শিক্ষা ও সমাজ গবেষণায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে তার কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল। ভারতে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন। শিক্ষা উপদেষ্টা, শিক্ষামন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান, বিজ্ঞান গবেষণা ও সংস্কৃতিমন্ত্রী—এমন নানা দায়িত্ব পালন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য নিয়ে গবেষণাধর্মী বই রচনা করেছেন। ১৯৪৩ সালে বাংলায় মুসলমানদের রাজনীতি বিষয়ে বই লেখেন। তার একমাত্র উপন্যাস ‘নদী ও নারী’ একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পূর্ব বাংলার ফরিদপুর অঞ্চলে পদ্মার চর ও প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনের আখ্যান এই উপন্যাসের সারবস্তু। মার্কসবাদ ও সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নিয়েও তার নিবিড় গবেষণা ছিল।কবি হিসেবে তার ব্যাপক পরিচিতি না থাকলেও ১৯৪৫ সালে ‘দ্য পোয়েট্রি অব বেঙ্গল’ নামে সমালোচনাগ্রন্থ লিখে কবি ও লেখক মহলে আলোচিত হয়েছিলেন। তার একাধিক কবিতার বই আজও বাঙালি পাঠকের নজরে রয়েছে। হুমায়ূন কবিরের ‘মেঘনায় ঢল’ কবিতাটি ষাট ও সত্তরের দশকে কে না পড়েছেন? কবিতাটি আজও প্রবীণ শিক্ষার্থীদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। জোয়ার-ভাটার নদী কত জীবন কেড়ে নিয়ে যায়, তার হিসাব কে রাখে? আমাদের শৈশবের সেই কবিতা—‘শোন্ মা আমিনা রেখে দে রে কাজ ত্বরা করি মাঠে চলএলো মেঘনার জোয়ারের বেলা এখনি নামিবে ঢল।’এ কথা সবাই জানেন, ইংরেজ কবি চার্লস কিংসলির ‘দ্য স্যান্ডস অব ডি’ কবিতার অনুসরণে কবি হুমায়ূন কবির ‘মেঘনায় ঢল’ কবিতাটি লিখেছিলেন। এমন আরও অনেক বিখ্যাত কবিতার স্রষ্টা কবি হুমায়ূন কবির। ভাবছিলাম, হুমায়ূন কবির কি আজকের প্রজন্মের কাছে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া এক অজানা বাঙালি কবির নাম?[লেখক: গল্পকার]

লবণাক্ততায় বিপন্ন উপকূলের জনস্বাস্থ্য

খুলনার দাকোপ কিংবা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কোনো একটি গ্রামের দৃশ্য কল্পনা করা যাক। গনগনে রোদের মধ্যে কলস কাঁখে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলেছেন একদল নারী। তাঁদের গন্তব্য এমন একটি পুকুর বা পানির ফিল্টার, যেখানে কিছুটা মিষ্টি পানি মিলতে পারে। একসময় এই জনপদে মিষ্টি পানির এত হাহাকার ছিল না। বাড়ির পাশের পুকুর বা নলকূপ থেকেই অনায়াসে মিলত তৃষ্ণা মেটানোর পানি। চারপাশের শিবসা, পশুর কিংবা কপোতাক্ষ নদের পানিতে এখন লবণের আধিক্য। খাবার পানিতে লবণের এই আগ্রাসন শুধু মানুষের তৃষ্ণাই বাড়াচ্ছে না, ক্রমে বিপন্ন করে তুলছে উপকূলের জনস্বাস্থ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বারবার আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় উপকূলের মিষ্টি পানির আধারগুলোকে লবণাক্ত করে তুলেছে। আইলা, আম্পান কিংবা রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড় চলে যাওয়ার পরও জমিতে রেখে যায় লবণের স্থায়ী ক্ষত। লবণাক্ততা এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি গভীর কাঠামোগত বৈষম্যেরও কারণ হয়ে উঠেছে।উপকূলের মানুষ এমনিতেই ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকেন। কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে ফসল উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে ঘরের পুরুষেরা কাজের সন্ধানে পাড়ি জমান শহরের ইটভাটায় কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলে যান গভীর সমুদ্রে। বাড়িতে থাকা নারীদের দিন কাটে চরম উৎকণ্ঠায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জীবিকা হারানোর ভয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে গবাদিপশুর মৃত্যু এবং আয় কমে যাওয়ার দীর্ঘস্থায়ী চাপ।সম্প্রতি স্প্রিঙ্গার নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং নিপোর্টের একটি গবেষণায় উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু লবণাক্ত পানিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ। গবেষণায় অংশ নেওয়া চার হাজারের বেশি নারীর প্রায় ৭৫ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার মানসিক চাপে রয়েছেন। পরিবেশগত অনিশ্চয়তা কোনো এককালীন দুর্যোগ নয়। এটি বারবার ফিরে এসে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ ও বিষণ্নতা তৈরি করে, যা স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। মানসিক চাপ ও অনিচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে।উচ্চমাত্রার লবণযুক্ত পানি দীর্ঘদিন পান করার পরিণতি উদ্বেগজনক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পানির অতিরিক্ত লবণ সরাসরি সব ক্ষেত্রে রোগ সৃষ্টি না করলেও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। আইসিডিডিআর,বির ওই গবেষণা অনুযায়ী, উপকূলের প্রায় ২৫ শতাংশ নারী উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। পানীয় জলে প্রতি লিটারে সোডিয়ামের মাত্রা ১০০ মিলিগ্রাম বাড়লে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি অন্তত ১০ শতাংশ বেড়ে যায় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। আর যেসব নারী একই সঙ্গে উচ্চমাত্রার লবণাক্ত পানি পান করছেন এবং তীব্র মানসিক চাপে ভুগছেন, তাঁদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি। গ্রামের পর গ্রাম মানুষ বুঝতেই পারছেন না, কেন তাঁদের রক্তচাপ বেড়ে যাচ্ছে। ঘাড়ব্যথা বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গকে তাঁরা সাধারণ দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে যান। অথচ সুপেয় পানির অভাব তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। প্রান্তিক এসব মানুষের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও সীমিত।লবণাক্ততার সবচেয়ে বড় শিকার উপকূলের নারীরা। গর্ভাবস্থায় উচ্চমাত্রার লবণযুক্ত পানি পান করলে প্রি-এক্লাম্পশিয়া ও গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন। এসব জটিলতা মাতৃস্বাস্থ্যকে গুরুতর ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। মাতৃত্বের পাশাপাশি নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য ও ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতাও হুমকির মুখে। সুপেয় পানির অভাবে বাধ্য হয়ে লবণাক্ত ও দূষিত পানি দিয়ে স্যানিটারি কাপড় ধুতে হচ্ছে তাঁদের। অনিরাপদ পরিচ্ছন্নতার কারণে নানা ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সচেতনতার অভাবে অনেক নারী দীর্ঘমেয়াদি স্ত্রীরোগে ভুগছেন। এসব সমস্যা উপকূলের নারীদের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।লবণাক্ত পানির এই আগ্রাসন থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও। প্রতিদিনের গোসল ও পানীয় জলে লবণের আধিক্য তাদের ত্বকের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি ডায়রিয়া, আমাশয় ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রকোপ উপকূলীয় এলাকায় জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ। বারবার অসুস্থ হওয়ার কারণে শিশুরা অপুষ্টির ঝুঁকিতে পড়ে। বাধাগ্রস্ত হতে পারে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। লবণাক্ত পানির কারণে স্থানীয় পর্যায়ে শাকসবজি ও দেশি ফলের উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উঠানের লাউ-কুমড়ার মাচাগুলো অনেক জায়গায় প্রায় শূন্য। ফলের গাছও মরে যাচ্ছে। ফলে শিশুদের পুষ্টির স্বাভাবিক উৎসগুলো একে একে সংকুচিত হয়ে পড়ছে।লবণাক্ততার এই সংকট সবার ওপর সমান প্রভাব ফেলে না। দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ওপর এর চাপ সবচেয়ে বেশি। খাদ্যে লবণের পরিমাণ মানুষ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও পানির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা অতিরিক্ত সোডিয়াম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা নিয়মিত বোতলজাত পানি কেনেন কিংবা গভীর নলকূপ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। দরিদ্র পরিবারগুলোর সেই সুযোগ নেই। সুপেয় পানির সন্ধানে দীর্ঘ পথ হাঁটতে গিয়ে নারীদের শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়, বাড়ে শারীরিক ক্লান্তি এবং কমে বিশ্রাম ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার সময়। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক দুর্দশা মিলিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ বোঝা চেপে বসছে। অভিযোজনের নামে যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়, সেগুলোর সুফলও অনেক সময় হতদরিদ্র মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না।বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু উচ্চ রক্তচাপের প্রচলিত চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা যুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং এলাকাভিত্তিক পানি শোধনাগার গড়ে তুলতে হবে। উপকূলীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত পরামর্শক নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যত বাড়বে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে। সুপেয় পানির অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে এবং উপকূলের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ব্যর্থ হলে জলবায়ু ন্যায়বিচারের আলোচনা ফাঁকা বুলি হয়েই থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উন্নত বিশ্বের ঐতিহাসিক দায় রয়েছে। অথচ এর চরম মূল্য আজও চুকিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের উপকূলের প্রান্তিক মানুষ।[লেখক:শিক্ষার্থী, দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

সাজেকে স্থিতিশীলতা ফেরানো জরুরি

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতে নিরাপত্তার কারণে পর্যটকদের প্রবেশ ও অবস্থান সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। এর আগে দুটি স্থানীয় পাহাড়ি সংগঠনের ডাকা সড়ক অবরোধের কারণে পর্যটকেরা ভোগান্তিতে পড়েন।সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এসব অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে তারা সড়ক অবরোধের কর্মসূচি দেয়। জেএসএস অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেছে, ইউপিডিএফের চাপে সংগঠন দুটি এই কর্মসূচি দিয়েছে। ইউপিডিএফও চাপ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।পাহাড়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের বিরোধ ও সশস্ত্র তৎপরতার প্রভাবে স্থানীয় মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। পর্যটনশিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাজেকের পর্যটনশিল্পের সঙ্গে স্থানীয় অনেক মানুষের আয়-রোজগার জড়িত। দীর্ঘ সময় পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকলে হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ, পরিবহন ও অন্যান্য ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।সাজেকে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনকে উল্লিখিত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। সেখানে কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠীর সশস্ত্র তৎপরতা, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই জনজীবনের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করা চলে না। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কথাও শোনা দরকার। পাহাড়ে বিরোধ নিরসনে কার্যকর সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা টেকসই  সমাধান নয়। টেকসই সমাধানের জন্য পাহাড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এবার কি আরও বড় সংঘাত?

১০ অক্টোবরের দিল্লি কি শুধুই একটি বিক্ষোভ আটকানোর চেষ্টা দেখল, নাকি গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে তৈরি হল আরও বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন? যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর পরিস্থিতি, পুলিশের ব্যাপক ধরপাকড় এবং সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত এখন নতুন মোড়ে।১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP। কিন্তু সেই কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীতে যে মাত্রায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যাতায়াতে বিধিনিষেধ এবং ধরপাকড় চালানো হয়, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। দিল্লি পুলিশের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই পদক্ষেপ। কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন, একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি আটকাতে কেন কার্যত রাজধানীর জনজীবন বিপর্যস্ত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হল?বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়। বন্ধ রাখা হয় একাধিক মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথ, ব্যাহত হয় রেল পরিষেবা এবং মধ্য দিল্লির কিছু এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাতেও বিধিনিষেধ জারি করা হয়। CJP-র নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকেও আটক করা হয়। ফলে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ শুধু একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা নাগরিকের চলাচলের অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক স্বাধীনতা নিয়ে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।এই পরিস্থিতিতে ১১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ তাৎপর্যপূর্ণ। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হওয়া ব্যক্তিদের বেআইনিভাবে আটক না করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে। আদালত দিল্লিতে মেট্রো পরিষেবা স্বাভাবিক রাখা এবং ইন্টারনেট পরিষেবা নির্বিচারে বন্ধ না করার বিষয়েও নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি, বিধিনিষেধ ও আটককে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্র, দিল্লি পুলিশ এবং দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশনের কাছে জবাব চেয়ে নোটিস জারি করা হয়। অর্থাৎ, আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের নামে প্রশাসনের পদক্ষেপ কতটা আইনসঙ্গত ছিল, সেই প্রশ্ন এবার বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায়।তবে আদালতের হস্তক্ষেপের অর্থ এই নয় যে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যাখ্যা দেয় এবং আদালত পরবর্তী শুনানিতে কী অবস্থান নেয়।এদিকে আটক হওয়া CJP নেতাদের মুক্তির পর আন্দোলন থেমে যাওয়ার বদলে নতুন করে জোরদার করার বার্তা দিয়েছে সংগঠনটি। ১১ অক্টোবর তাদের তরফে দিল্লিতে সমর্থকদের অবস্থান বজায় রাখার আহ্বানও জানানো হয়। অর্থাৎ, পুলিশি পদক্ষেপে নির্দিষ্ট দিনের কর্মসূচি বাধাপ্রাপ্ত হলেও আন্দোলনের রাজনৈতিক বার্তা মুছে যায়নি। বরং ধরপাকড়, পরিবহণে বিধিনিষেধ এবং শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপ—এই তিনটি বিষয় আন্দোলনকে আরও বড় রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে নিয়ে এসেছে।এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা SIR-কে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ও শাসকপক্ষের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে অভিযোগ ও পাল্টা যুক্তির নিষ্পত্তি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, তথ্যপ্রমাণ এবং যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনার মাধ্যমেই হওয়া জরুরি।কিন্তু এখানেই উঠে আসছে আরও বড় প্রশ্ন—পুলিশি ব্যবস্থায় একটি আন্দোলনের দৃশ্যমান জমায়েত আটকে দেওয়া সম্ভব হলেও, তার পেছনে থাকা ক্ষোভ ও রাজনৈতিক প্রশ্নকে কি আটকে রাখা যায়? প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে কোনও নির্দিষ্ট দিনের বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করা যেতে পারে, কিন্তু তাতে আন্দোলনের দাবিগুলির উত্তর দেওয়া হয়ে যায় না। আবার আন্দোলনকারীদেরও জনসমর্থন ধরে রাখতে হলে অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্পষ্ট দাবি এবং শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।আর এই জায়গাতেই বিরোধীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ককরোচ জনতা পার্টির মতো প্রচলিত রাজনীতির বাইরে থাকা একটি সংগঠন যদি তরুণদের মধ্যে ক্ষোভকে সংগঠিত প্রতিবাদের ভাষা দিতে পারে, তবে প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলগুলি কি সেই পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে? নাকি তারা এখনও বিবৃতি, স্মারকলিপি, সাংবাদিক সম্মেলন এবং প্রতীকী কর্মসূচির পুরনো ছকেই আটকে থাকবে?ইন্ডিয়া জোটের নেতারা সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন ও আন্দোলন ঘিরে তাঁদের উদ্বেগ তুলে ধরার উদ্যোগ নিলে, সেটিও এই বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে। তবে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া এবং রাজপথে জনসমর্থন তৈরি করা—দুটি আলাদা কাজ। একটির জন্য প্রয়োজন আইনি যুক্তি ও প্রমাণ, অন্যটির জন্য দরকার ধারাবাহিক জনসংযোগ, সংগঠন এবং বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব।সুতরাং, ১০ অক্টোবরের দিল্লি পর্বে প্রশাসন সাময়িকভাবে বিক্ষোভের বিস্তার আটকে দিতে পেরেছে কি না, সেটাই শেষ কথা নয়। আসল পরীক্ষা এখন তিন পক্ষের—প্রশাসনকে ব্যাখ্যা করতে হবে বিধিনিষেধের আইনগত ভিত্তি, আন্দোলনকারীদের প্রমাণ করতে হবে তাঁদের অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা, আর বিরোধীদের দেখাতে হবে তাঁরা এই ক্ষোভকে দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার মতো রাজনৈতিক সক্ষমতা রাখেন কি না।কারণ গণতন্ত্রে রাজপথের লড়াই কেবল জমায়েতের সংখ্যায় জেতা যায় না, আবার প্রশাসনিক বাধা দিয়েও সমস্ত প্রশ্নের অবসান ঘটানো যায় না। শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হয়ে ওঠে জনসমর্থন, প্রমাণ এবং সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন।দিল্লির যন্তর মন্তরে তাই লড়াই শুধু একটি বিক্ষোভের নয়—লড়াই প্রতিবাদের অধিকার, ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়েও।

আয়ের চেয়ে বাড়ে ব্যয়: সংকটের মুখে সাধারণ মানুষের অর্থনীতি

বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা বর্তমানে এক বড় ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। এই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে দেশের লাখ লাখ সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন বাজেটের টানাপোড়েন। বর্তমান সময়ে নীতি-নির্ধারকদের আলোচনা, গবেষণা প্রতিবেদন এবং সংবাদপত্রের পাতায় মূল্যস্ফীতির শতাংশ, প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস, আর্থিক খাতের সংস্কার কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিসংখ্যান প্রাধান্য পেয়ে থাকে। কিন্তু যেকোনো অর্থনৈতিক নীতি ও পুনরুদ্ধারের আসল এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল পরীক্ষাটি সাধিত হয় সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তবে। দেশের আপামর নাগরিক নিজেদের জমানো সঞ্চয় নিঃশেষ না করে, ঋণের জালে জড়িয়ে না পড়ে কিংবা দৈনন্দিন খাদ্য গ্রহণ না কমিয়ে তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা, বাসস্থান ও যাতায়াত ব্যয় নির্বাহ করতে পারছেন কি না—সেটিই হলো একটি সফল অর্থনীতির মূল মানদণ্ড। যখন দেখা যায় মানুষের আয় অর্জনের সক্ষমতা জীবনধারণের নিত্যনতুন ব্যয়ের হারের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে, তখন অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার সমস্ত চড়া মাশুল শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে দেশের সীমিত ও নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোর ঘাড়েই।পরিসংখ্যানের খতিয়ান এই অশুভ ও উদ্বেগের চিত্রটিকেই স্পষ্ট করে তুলে ধরছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ তথ্য ও হালনাগাদ মজুরি সূচক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও মৌলিক পরিষেবার দাম যে গতিতে বাড়ছে, সাধারণ শ্রমজীবী ও চাকরিজীবীদের পারিশ্রমিক বা মজুরি বৃদ্ধির হার তার সাথে কোনোভাবেই তাল মেলাতে পারছে না। পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতের ব্যয় বৃদ্ধি যখন লাগামহীন রূপ নেয়, তখন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় হতে থাকে। যদিও পরিসংখ্যানের পাতায় মূল্যস্ফীতির হারে সাময়িক সামান্য হ্রাস-বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে, তবে তার অর্থ এই নয় যে বাজারে পণ্য বা সেবার দাম বাস্তবে কমে গেছে। এর অর্থ কেবল এটাই যে দাম বাড়ার গতিটি সাময়িকভাবে কিছুটা ধীর হয়েছে। যে পরিবারগুলো ইতিমধ্যেই অতিপ্রয়োজনীয় ভোগ ছাঁটাই করেছে, পূর্বের জমানো টাকা খরচ করে ফেলেছে কিংবা ধারদেনা করে দিনাতিপাত করছে, মূল্যস্ফীতির সামান্য মন্দা তাদের জীবনে কোনো তাৎক্ষণিক স্বস্তি নিয়ে আসে না। প্রকৃত আয় বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ক্রয়ক্ষমতার এই অবক্ষয় থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।এই সংকটের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সমাজের সব শ্রেণীতে সমানভাবে পড়ে না, বরং এর বণ্টন অত্যন্ত অসম। উচ্চ এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ক্রমবর্ধমান খরচের ধাক্কা সামলাতে তাদের সঞ্চয়, পূর্ববর্তী বিনিয়োগ কিংবা অপ্রয়োজনীয় ভোগ কাটছাঁট করার সুযোগ পায়। কিন্তু নিম্ন-আয়, নির্দিষ্ট আয় এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী পরিবারগুলোর জন্য এই সুযোগ একদমই অনুপস্থিত। কারণ তাদের অর্জিত মোট আয়ের সিংহভাগই ব্যয় করতে হয় স্রেফ বেঁচে থাকার মৌলিক রসদ—যেমন চাল, ডাল, তেল, বাসা ভাড়া, ওষুধ এবং সন্তানদের স্কুলের বেতন মেটাতে। পণ্য নির্বাচনের ক্ষেত্র পরিবর্তন করে সস্তা বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ বা গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা ও পড়াশোনার খরচ অনিশ্চিতকালের জন্য স্থগিত রাখার সামর্থ্য তাদের থাকে না। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও একই চরম সত্য ফুটে উঠেছে—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উপার্জনের স্থবিরতার দরুন দেশের কোটি কোটি মানুষ নতুন করে দারিদ্রে‍্যর দিকে ঢলে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি কৃত্রিম বা সুবিধাজনক সূচক দিয়ে এই পারিবারিক ও সামাজিক সংকটকে আড়াল করা সম্ভব নয়।পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা কেবল কোনো দাতব্য বা সামাজিক কল্যাণমূলক বিষয় নয়, এটি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল রাখার প্রাথমিক শর্ত। যখন সাধারণ মানুষের পকেটে বাড়তি টাকা থাকে না বা প্রকৃত আয় কমে যায়, তখন তারা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বন্ধ করতে বাধ্য হন। এর ফলে তারা পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় কমাতে বাধ্য হন—যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় মানবসম্পদের গুণগত মান ও উৎপাদনশীলতা বিনষ্ট করে। পাশাপাশি, অভ্যন্তরীণ বাজারে সার্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্ষুদ্র খুচরা বিক্রেতা, স্থানীয় উৎপাদক, হস্তশিল্পজীবী ও ক্ষুদ্র সেবা প্রদানকারীরা। বাজারে বিক্রি কমে গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে, যার ফলে নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন না এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী ছাঁটাই বা কাজের সময় কমাতে বাধ্য হয়। এর ফলে বাজারে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং যারা কর্মরত আছেন তারাও চাকরি হারানোর চরম অনিশ্চয়তায় ভোগেন। এভাবে মূলধনের ঘাটতি এবং চাহিদার পতন একে অপরকে উসকে দিয়ে এক মারাত্মক ক্ষতিকর অর্থনৈতিক চক্রের জন্ম দেয়।বাংলাদেশের শ্রমবাজারের দিকে তাকালে দেখা যায়, এ দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী অনানুষ্ঠানিক খাত, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র পারিবারিক ব্যবসা কিংবা স্বকর্মসংস্থানের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। সরকারি গড় মজুরি সূচক বা প্রাতিষ্ঠানিক খাতের বেতনের তথ্য দিয়ে এই অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের কাজের অনিশ্চয়তা পুরোপুরি পরিমাপ করা যায় না। আবহাওয়া, ঋতুভিত্তিক কাজের সুযোগ কিংবা স্থানীয় বাজারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দিনমজুরদের আয় প্রতিদিন ওঠানামা করে। অনানুষ্ঠানিক খাতের কোনো শ্রমিক কাজ হারালে বা অসুস্থ হলে তার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক সুরক্ষা বা বেকারত্ব ভাতার সুযোগ থাকে না। পরের দিনের আয় নিশ্চিত হবে কি না—এই মানসিক দুশ্চিন্তার সাথে যখন জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতি যোগ হয়, তখন পারিবারিক জীবন চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। এর সাথে গৃহস্থালি ও সামাজিকভাবে নারীদের ওপর পড়া বাড়তি চাপের বিষয়টিও সংযুক্ত। পরিবারের আয় কমে গেলে বা কেউ বেকার হয়ে পড়লে সেই আর্থিক টানাটানির ধকল সবচেয়ে বেশি সামলাতে হয় নারীদের। তাদের অবৈতনিক সেবা শ্রম বেড়ে যায়, খাবারের পাতিল থেকে নারীদের নিজেদের পুষ্টি কাটছাঁট করতে হয় এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় বড় ধরনের আঘাত আসে।আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, কেবল সুদের হার বাড়িয়ে বা কঠোর মুদ্রানীতি প্রয়োগ করে এই মূল্যস্ফীতির প্রতিটি উৎস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে হয়তো বাজারে ঋণের প্রবাহ ও সামগ্রিক চাহিদায় কিছুটা টান ধরতে পারে, কিন্তু সুদের হার বৃদ্ধি একা কোনো কৃষি পণ্যের পচনশীলতা ঠেকাতে পারে না, সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থার তোলাবাজি বা যাতায়াত খরচ কমাতে পারে না, কিংবা বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধ করতে পারে না। মুদ্রানীতি রাতারাতি কোনো উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানও তৈরি করতে পারে না। তাই নীতিনির্ধারকদের চাহিদাজনিত চাপ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রেখে নীতি কৌশল সাজাতে হবে। বিশেষ করে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের বাজারে সরবরাহের ঘাটতি, পচনশীল পণ্যের হিমাগার অবকাঠামোর অভাব, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লোটার অপচেষ্টাগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। পাইকারি ও খুচরা মূল্যের ব্যবধান নিয়মিত তদারকি করা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে আইনি ক্ষমতার সঠিক ও ধারাবাহিক প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।একই সাথে, আমদানি নীতির ক্ষেত্রেও বিচক্ষণ সময়জ্ঞান ও সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। দেশীয় সরবরাহ যখন চাহিদার তুলনায় কমে যায়, তখন সময়মতো সুনির্দিষ্ট আমদানি শুল্ক ছাড় বা বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করে বাজার স্থিতিশীল রাখা যেতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ায় যেন দেশের কৃষক বা স্থানীয় উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। বাজারের ওপর যেকোনো ধরনের স্বেচ্ছাচারী প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বা হঠাৎ জারি করা কোনো বিধিনিষেধ উল্টো বৈধ ও সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। অসাধু সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ নীতি, নির্ভুল বাজার তথ্য এবং ধারাবাহিক আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগ।একটি টেকসই অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য দরকার মজুরি এবং উৎপাদনশীলতার মধ্যে সুষম সমন্বয়। নিছক নামমাত্র মজুরি বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে যদি না উৎপাদনশীলতা বাড়ে। তবে যেখানে জ্বালানি, গ্যাস, পরিবহন এবং কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে শিল্প ও ক্ষুদ্র কারখানাগুলোর উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে, সেখানে কারখানা মালিকদের পক্ষেও হঠাৎ শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই জটিলতা কাটাতে সরকারকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে বিশেষ প্রণোদনা, আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা, স্বল্প সুদে ঋণ এবং অবকাঠামোগত সুবিধা দিতে হবে, যাতে তারা নিজেদের কার্যক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে কর্মীদের উপযুক্ত মজুরি প্রদানে সক্ষম হয়। পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সরাসরি শিল্পকারখানার বাস্তব চাহিদার সাথে যুক্ত করতে হবে, যাতে তরুণরা কাজ পাওয়ার সাথে সাথে উপযুক্ত পারিশ্রমিক অর্জনে সক্ষম হয়ে ওঠে।সার্বিক স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা পর্যন্ত দেশের অসচ্ছল, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী টিকিয়ে রাখা জরুরি। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঠিক সুবিধাভোগী নির্বাচন সুনিশ্চিত করা, প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় খাদ্য সহায়তা কিংবা সরাসরি নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। পর্যাপ্ত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসম্পন্ন শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে পরিবারগুলোর পকেট থেকে বের হয়ে যাওয়া অতিরিক্ত চিকিৎসা ও পড়াশোনার খরচ এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে আসে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।আমরা বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা বা আন্তর্জাতিক পণ্যের দামের উর্ধ্বগতি থেকে বাংলাদেশকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখতে পারব না, তবে দেশের ভেতরের বাজার পরিচালনা, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং সীমিত আয়ের মানুষকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে আমাদের অভ্যন্তরীণ নীতির বিষয়। পরিশেষে, একটি দেশের অর্থনৈতিক নীতি ও প্রবৃদ্ধির সাফল্য কেবল নথিপত্রের পরিসংখ্যান বা প্রবৃদ্ধির অঙ্কে মাপা যায় না। যারা এই অর্থনীতির চাকা প্রতিনিয়ত সচল রাখেন—সেই সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, খাদ্য সুরক্ষা ও পারিবারিক বাজেটে শান্তি ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই সেই সাফল্যের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।]

ধান চাষে গুটি ইউরিয়া কেন নয়?

ইউরিয়া সার বিশ্বব্যাপী ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত অত্যাবশ্যকীয় রাসায়নিক সারগুলোর একটি। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ফসল উৎপাদনে ১৭ কোটি ৭০ লাখ থেকে ১৭ কোটি ৯০ লাখ টন ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়েছে। একই বছর বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি টন ধান উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টন ইউরিয়া সার। এর মধ্যে ২০ থেকে ২২ লাখ টন সার আমদানি করতে হয়েছে। সরকার প্রতি টন সার ৩৭৯ দশমিক ৫০ থেকে ৪১৮ দশমিক ৩৩ ডলার দরে আমদানি করেছে। ফলে ২০ থেকে ২২ লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা। সাধারণ পদ্ধতিতে জমিতে ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দিলে এর বড় একটি অংশ গাছের কাজে লাগে না; বরং বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ দেশে ইউরিয়া সারের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার একটি পরীক্ষিত প্রযুক্তি রয়েছে, যার নাম গুটি ইউরিয়া। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইউরিয়া সারের অপচয় ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব। সে হিসাবে বছরে প্রায় ৬ লাখ টন ইউরিয়া সার সাশ্রয় হতে পারে, যার আমদানি মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।ইউরিয়া সার মাটির গভীরে প্রয়োগের এই প্রযুক্তি ধান চাষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জলবায়ুবান্ধব পদ্ধতি। এটি গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন, বিশেষ করে মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের নির্গমন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে পারে। একই সঙ্গে নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ায় এবং ধানের ফলন বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে। জমিতে চারা রোপণের ৭ থেকে ১০ দিন পর মাটির ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার গভীরে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করা হয়। প্রতি চারটি ধানের গোছার জন্য ২ দশমিক ৭ গ্রাম ওজনের একটি গুটি ব্যবহার করা হয়। এতে এক বিঘা জমিতে প্রায় ২৪ কেজি গুটি ইউরিয়া লাগে এবং সাধারণত দ্বিতীয়বার ইউরিয়া সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। মাটির গভীরে গুটি স্থাপন করায় সার থেকে নাইট্রোজেন ধীরে ধীরে নিঃসৃত হয়। ফলে ধানের গাছ দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন পায়। এতে নাইট্রোজেনের ঘাটতি কমে, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ভালো হয়, কার্যকর কুশি ও শীষের সংখ্যা বাড়ে এবং ধানের দানা পুষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে ফলন বাড়তে পারে। গুটি ইউরিয়ার ব্যবহারে নাইট্রোজেন সারের অপচয় কমে এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবও হ্রাস পায়।বাংলাদেশের কৃষির অগ্রগতিতে সবচেয়ে বড় অবদান দেশের পরিশ্রমী কৃষকদের। তারা অনেক সময় নিজেদের প্রয়োজন উপেক্ষা করে ফসল উৎপাদনের উপকরণ কেনেন। অথচ উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হন। এই বাস্তবতায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর কার্যকর প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত নির্দেশিকায় গুটি ইউরিয়ার উল্লেখ থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রচার ও সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন ওঠে, গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার বাড়লে ইউরিয়া সারের মৌসুমভিত্তিক সংকট ও অতিরিক্ত চাহিদা কমতে পারে বলে কি এর সম্প্রসারণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না? তবে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, কৃষকের কাছে কার্যকর প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হলে তারা তা ব্যবহার করতে আগ্রহী হন। গুটি ইউরিয়ার ক্ষেত্রেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।একসময় কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে আইএফডিসি পাঁচ বছর মেয়াদি এগ্রো-বেইজড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পটির সময়কাল ছিল সম্ভবত ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল। সে সময় দেশের বিভিন্ন এলাকার সার ডিলারদের কাছে গুটি ইউরিয়া তৈরির যন্ত্র ছিল এবং এ জন্য তারা বিশেষ বরাদ্দে ইউরিয়া সার পেতেন। কিন্তু যথাযথ তদারকির অভাবে বরাদ্দ করা সারের বড় অংশ গুটি তৈরি না করে গুঁড়া সার হিসেবে বিক্রি করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কৃষকের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তির ব্যবহার কমে যায়। বর্তমানে দেশের অনেক এলাকায় গুটি ইউরিয়া সহজে পাওয়া যায় না। তাই আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কৃষকেরা এটি ব্যবহারের সুযোগ পান না। তবে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানকার কৃষকেরা বহু বছর ধরে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করছেন। তাদের চাহিদার কারণে বাজারটির কয়েকটি গুটি তৈরির যন্ত্র এখনো চালু রয়েছে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একবার গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করলে বারবার সার কেনার ঝামেলা কমে। তাদের অভিজ্ঞতায়, আগাছা কম হওয়ায় নিড়ানির শ্রম ও খরচও কম লাগে এবং ধানের ফলন ভালো হয়।বাংলাদেশে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের অন্যতম উৎস কৃষি। দেশের মোট নির্গমনে কৃষির অবদান প্রায় ৩৯ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিবিড় ধান চাষ, সার ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত নাইট্রোজেনযুক্ত সার ব্যবহার এবং জমিতে দীর্ঘ সময় পানি ধরে রাখা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৪-১৫ সালে ধান চাষের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়েছিল। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ কৃষি থেকে নির্গমনের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৭ কোটি ৬৭ লাখ ৯০ হাজার টন এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১০ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতিতে নাইট্রোজেন সারের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানোর পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানের আওতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে স্বাভাবিক প্রবণতার তুলনায় গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকার করেছে। এর মধ্যে ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ নিঃশর্ত এবং ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ আন্তর্জাতিক সহায়তা সাপেক্ষে অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। কৃষিতে গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার সম্প্রসারণ এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে। এতে সার আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, ধানের ফলন বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।দুঃখজনক হলেও সত্য, গুটি ইউরিয়ার উপকারিতা সম্পর্কে কৃষকদের অভিজ্ঞতা থাকলেও সরকারি পর্যায়ে এর সম্প্রসারণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ধানের মৌসুমে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ইউরিয়া সার কেনার অভিযোগও রয়েছে। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। সঠিক হিসাব ও ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা প্রয়োজন, গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে সাশ্রয় হওয়া অর্থ দিয়ে কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় বিনা মূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে এই সার সরবরাহ করা সম্ভব কি না। এ জন্য প্রথমেই এলেঙ্গা বাজারে গুটি ইউরিয়া তৈরির কার্যক্রম পরিদর্শন, ব্যবহারকারী কৃষকদের অভিজ্ঞতা যাচাই এবং বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা দরকার। গবেষণায় এর কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত হলে সরকারকে উৎপাদন, সরবরাহ ও প্রয়োগব্যবস্থা সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে সার উৎপাদন ও বিতরণে স্বচ্ছতা এবং যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের স্বার্থ, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় গুটি ইউরিয়ার মতো কার্যকর প্রযুক্তিকে কৃষিনীতি ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এর মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, সার আমদানিতে সাশ্রয় এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হতে পারে।[লেখক: কৃষিবিদ]

যৌতুক ও নারী নির্যাতন মামলা: সাক্ষ্য-প্রমাণের গুরুত্ব

আমাদের সমাজে পারিবারিক কলহ, বিশেষ করে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাকের পর, অনেক সময় ফৌজদারি মামলার রূপ নেয়। যৌতুক নিরোধ আইন বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো নারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি হলেও, কখনো কখনো এসব আইন ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে আদালত ও আইন একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে কীভাবে সুরক্ষা দেয়?ধরা যাক, ‘ক’ ও ‘খ’ নামে এক দম্পতির দীর্ঘদিনের সংসারে কলহ চলছিল। একপর্যায়ে স্বামী ‘ক’ তার স্ত্রী ‘খ’-কে তালাক দেন এবং তা যথাযথভাবে ডাকযোগে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে ও স্ত্রীর ঠিকানায় পাঠান। তালাকের প্রায় এক মাস পর ‘খ’ একটি মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ করা হয়, তালাকের দিনই তাকে যৌতুকের দাবিতে নির্মমভাবে মারধর করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।সাক্ষীরা একে অপরের বক্তব্যের সঙ্গে মিল রাখতে পারেননি; ঘটনার সময় ও তারিখ নিয়ে পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন।কোনো প্রতিবেশী বা নিরপেক্ষ সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তারা সবাই বাদিনীর নিকটাত্মীয়।চিকিৎসাসনদে নাম, বয়স ও অন্যান্য তথ্যে গরমিল পাওয়া যায়। যিনি রোগীকে শনাক্ত করেছেন, তিনি বাদী বা আসামি কারও প্রতিবেশীও নন।তদন্ত প্রতিবেদনে যৌতুক দাবির নির্দিষ্ট তারিখ বা সময় উল্লেখ নেই।এজাহার দায়েরে দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছে, যার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নেই।আসামিপক্ষ তালাকের বৈধ কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করেছেন, যা বাদীপক্ষ অস্বীকার করতে পারেননি।এমন পরিস্থিতিতে ফৌজদারি বিচারের প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলো কী বলে?১. আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর একটি হলো—সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক আসামিকে নির্দোষ বলে গণ্য করতে হবে। বিচারের প্রতিটি পর্যায়ে এই নীতি অনুসরণ করতে হয় (৪২ ডিএলআর ৩১, আপিল বিভাগ)।২. বিচারকার্যে আবেগ, অনুভূতি বা ব্যক্তিগত ধারণার কোনো স্থান নেই। ন্যায়বিচার অন্ধ—এখানে কেবল আইন ও নথিতে থাকা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় (১৮ বিএলটি ৪৬৫, আপিল বিভাগ)।৩. যখন মামলার সব সাক্ষীই বাদীপক্ষের আত্মীয়স্বজন এবং কোনো নিরপেক্ষ বা স্বার্থহীন সাক্ষীকে জেরা করে পরীক্ষা করা হয় না, তখন আদালত ওই সাক্ষ্য সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করেন। প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো—স্বার্থযুক্ত সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা দেওয়ার আগে সমর্থনকারী প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে হয়। আদালতের দায়িত্ব শুধু সাজা নিশ্চিত করা নয়, বরং প্রয়োজনে খালাস দেওয়াও (৪৮ ডিএলআর ১৮৪)।আইন আরও বলে, একজন অভিযোগকারী বা সংবাদদাতাও স্বার্থযুক্ত সাক্ষী হতে পারেন। স্বতন্ত্র ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দ্বারা তার বক্তব্য সমর্থিত না হলে তা সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন (৪৪ ডিএলআর ৫৫৪)।৪. সাক্ষীদের বক্তব্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অমিল, পরস্পরবিরোধিতা বা প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি থাকলে আসামি ‘সন্দেহের সুবিধা’ পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন। অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলে তাকে খালাস দেওয়া হয় (৪৩ ডিএলআর ৬, আপিল বিভাগ)।৫. ঘটনার পর সন্তোষজনক কারণ ছাড়া এজাহার দায়েরে বিলম্ব হলে আদালত তা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করেন। বিলম্বের সময় অভিযোগের কাহিনি সাজানো হয়ে থাকতে পারে কি না, তা-ও যাচাই করা হয় (৪৪ ডিএলআর ৪৯২)।৬. আসামিপক্ষের বক্তব্য, যেমন তালাকের ঘটনা, সম্পূর্ণ অকাট্যভাবে প্রমাণিত না হলেও তা যদি যুক্তিসংগতভাবে সত্য বলে বিবেচিত হতে পারে, তাহলে মামলার সামগ্রিক অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে আসামি সন্দেহের সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন। এটি করুণা নয়, বরং তার আইনগত অধিকার (৭ বিএলটি ০৩)।৭. সন্দেহ যতই তীব্র হোক না কেন, তা কখনো প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না। সামান্য বা ক্ষীণ সন্দেহের ভিত্তিতে নয়, বরং অভিযোগের বিষয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ থেকে গেলে আসামি খালাস পাওয়ার অধিকারী হন (৭ বিএলডি, আপিল বিভাগ, ২৬৫)।একটি ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ আনাই যথেষ্ট নয়; তা আইন ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রপক্ষের। যেখানে সাক্ষীরা পরস্পরবিরোধী কথা বলেন, স্বতন্ত্র সাক্ষী অনুপস্থিত থাকেন, চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রমাণে অসংগতি থাকে এবং এজাহার দায়েরে অস্বাভাবিক বিলম্ব ঘটে, সেখানে আদালতকে সব প্রমাণ সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করতে হয়। অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলে আসামি সন্দেহের সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হন।এই নীতিগুলো নারী নির্যাতনবিরোধী আইনের গুরুত্ব কমায় না; বরং নিশ্চিত করে যে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা যেমন ন্যায়বিচার পান, তেমনি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো নিরপরাধ ব্যক্তিও যেন অন্যায়ভাবে দণ্ডিত না হন। ন্যায়বিচার একটি পবিত্র দায়িত্ব। তা কেবল আইন, প্রমাণ ও যুক্তির নিরিখেই সম্পন্ন হতে পারে, আবেগ বা পূর্বধারণার ভিত্তিতে নয়।[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

ভিডিও আরও দেখুন

টি-টোয়েন্টিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়লেন অভিষেক শর্মা

ভারতের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নতুন এক ইতিহাস গড়েছেন মারকুটে ব্যাটার অভিষেক শর্মা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চলমান সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে ব্যাট হাতে ঝড় তুলে কেবল দলকেই জয় এনে দেননি, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুততম ২ হাজার রানের বিশ্ব রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন এই তরুণ। পেছনে ফেলেছেন সতীর্থ তারকা সূর্যকুমার যাদবকে।রবিবার (১১ অক্টোবর) ইন্দোরে সিরিজের তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে মাত্র ৩০ বলে ৬৯ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন অভিষেক। ১৮ বলে ফিফটি ছোঁয়ার পথে উইন্ডিজের বিপক্ষে যৌথভাবে তৃতীয় দ্রুততম অর্ধশতকের রেকর্ডও গড়েন তিনি। ম্যাচটিতে মাঠে নামার আগে দুই হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করতে তার প্রয়োজন ছিল মাত্র ৩৩ রান।এই রেকর্ড গড়তে অভিষেক খেলেছেন মাত্র ১ হাজার ২৪ বল। এর আগে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে দ্রুততম দুই হাজার রান করার ভারতীয় রেকর্ডটি ছিল সূর্যকুমার যাদবের দখলে, যিনি ১ হাজার ১৬৪ বল খেলে এই মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন। দুর্দান্ত এই অর্জনের মাধ্যমে রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, সূর্যকুমার যাদব, হার্দিক পান্ডিয়া ও লোকেশ রাহুলের মতো অভিজ্ঞদের গড়া ভারতের বিশেষ দুই হাজার রান সংগ্রাহকদের অভিজাত ক্লাবে নাম লেখালেন অভিষেক।চলতি বছরে দারুণ ছন্দে থাকা অভিষেক ৩২ ম্যাচে ৯২১ রান সংগ্রহ করেছেন, যার স্ট্রাইক রেট ২০৬.৫০। চলতি পঞ্জিকাবর্ষে ইতোমধ্যে তার ছক্কার সংখ্যা ৬৮টি, যা এক পঞ্জিকাবর্ষে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ভারতীয় হিসেবে সূর্যকুমার যাদবের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ। এছাড়া টি-টোয়েন্টির পাওয়ারপ্লেতে দারুণ সব ইনিংস খেলে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এই নিয়ে সপ্তমবারের মতো পাওয়ারপ্লে ওভারগুলোতে পঞ্চাশ বা তার বেশি রান করার কীর্তি গড়লেন এই ভারতীয় ওপেনার।

টি-টোয়েন্টিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়লেন অভিষেক শর্মা