সংবাদ
যেখানে জীবনানন্দ দাশের বিয়ে আর রবিঠাকুরের পদধূলি পড়েছিল

যেখানে জীবনানন্দ দাশের বিয়ে আর রবিঠাকুরের পদধূলি পড়েছিল

পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি আর চিরচেনা কোলাহলের মাঝে পাটুয়াটুলীতে হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়াতে হয় একটি লাল রঙের ব্রিটিশ স্থাপত্যের সামনে। উচ্চতায় প্রায় দোতলার সমান হলেও, এটি আসলে একতলা একটি ভবন। এটি কোনো সাধারণ প্রাচীন বসতবাড়ি নয়; এটি হলো ঐতিহাসিক ব্রাহ্মসমাজ মন্দির।১৮৬৯ সাল থেকে কালের খেয়ায় চড়ে আজ অবধি দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং এটি তৎকালীন ঢাকার সমাজ সংস্কার, মুক্তবুদ্ধির চর্চা আর আধুনিক শিক্ষার এক অনন্য বাতিঘর হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে।ইতিহাসের গন্ধমাখা ইট আর মণীষীদের পদচারণাআজ থেকে দেড়শত বছরেরও বেশি সময় আগে, ১৮৬৯ সালে ব্রজ সুন্দর মিত্র ও দীননাথ সেনের নেতৃত্বে এই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই কেন্দ্রে বসেই সে যুগের চিন্তাবিদেরা ঢাকার বুকে আধুনিক শিক্ষার আলো ছড়ানোর স্বপ্ন বুনেছিলেন। বর্তমানের ঐতিহ্যবাহী ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়’-এর আদি রূপ তথা ‘ব্রাহ্ম স্কুল’-এর পথচলা শুরু হয়েছিল এই চত্বর থেকেই।শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, ঢাকার প্রথম সাধারণ পাঠাগার ‘রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি’ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল এই প্রাঙ্গণেই। এই মন্দিরের প্রতিটি ইটের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের সব কিংবদন্তিদের নাম। ১৯২৬ সালে খোদ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে এসে এক মহতী নারী সমাবেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। আবার ১৯৩০ সালের মে মাসে বাংলা সাহিত্যের নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশ ও লাবণ্য দাশের চার হাত এক হয়েছিল এই মন্দিরের শান্ত সুনিবিড় পরিবেশেই।নিরাকার উপাসনার অলিন্দে সুরের মূর্ছনাঐতিহাসিক এই মন্দিরের ভেতরে পা রাখলেই চোখ জুড়িয়ে যায় এক বিশাল হলঘর দেখে। চারপাশের সুপ্রশস্ত বারান্দা থেকে ভেতরের মূল হলঘরে প্রবেশের জন্য রয়েছে ১৬টি তোরণ বা পথ। ব্রাহ্মরা যেহেতু নিরাকার একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করেন, তাই মন্দিরের ভেতরে কোনো দেব-দেবীর মূর্তি বা প্রতিমা নেই। চারদিকের দেয়ালজুড়ে কেবল এক শান্ত ও গম্ভীর আবহ। মন্দিরের উত্তর দিকের শ্বেতপাথরের বেদিতে বসে প্রতি রবিবার সন্ধ্যায় এখনো নিয়মিত চলে বিশেষ প্রার্থনাসঙ্গীত আর তত্ত্বকথা আলোচনা।একাত্তরের দগদগে ক্ষত আর বর্তমানের একাকীত্বজ্ঞানের যে বিপুল আধার নিয়ে রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরিটি আলো ছড়াত, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর দেওয়া অগ্নিসংযোগে তার বহু দুষ্প্রাপ্য বই ও পাণ্ডুলিপি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেই ধ্বংসযজ্ঞের পর লাইব্রেরিটি আর আগের গৌরব ফিরে পায়নি; এখন সেখানে বইয়ের পাতা ওল্টানোর মতো কোনো পাঠক চোখে পড়ে না।প্রতি রবিবার যখন শূন্য হলঘরে ‘সকাতরে ওই কাঁদিছে’ কিংবা ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ গানগুলো সুরের সুতোয় বেজে ওঠে, তখন মুহূর্তের জন্য মনে হয় সময়টা যেন অতীতে ফিরে গেছে। তবে প্রার্থনা শেষ হতেই যখন বাতিগুলো একে একে নিভে যায়, তখন ইতিহাসের এই মহান সাক্ষীটি জনাকীর্ণ পুরান ঢাকায় যেন আবার বড় বেশি একা হয়ে পড়ে। সুমনা হাসপাতালের কাছে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই লাল দালানটি আজও জানান দিচ্ছে— জাঁকজমকপূর্ণ কোনো বড় আয়োজন না থাকলেও, তারা টিকে আছে পরম পরিপাটি হয়ে, ইতিহাসের এক বুক নীরব দীর্ঘশ্বাস নিয়ে।
৪৩ মিনিট আগে

বিশ্বকাপ সময়সূচি: দেখতে ক্লিক করুন

মতামতমতামত

সুশাসনের চাবিকাঠি: নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়, চাই নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ

আজকের পরিবর্তনশীল বিশ্বে ‘সুশাসন’ বা ‘গভর্ন্যান্স’ শব্দবন্ধটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যখনই কোনো রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা নিয়ে কথা ওঠে, তখনই অবধারিতভাবে সুশাসনের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আমরা সাধারণত সুশাসনকে পরিমাপ করি স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব, দক্ষ আমলাতন্ত্র, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং আইনের কঠোর শাসনের পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু এই পুরো সমীকরণ বা কাঠামোর ভেতরের সবচেয়ে প্রাণবন্ত এবং অপরিহার্য উপাদানটি প্রায়শই আমাদের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় উপেক্ষিত থেকে যায়; আর তা হলো সাধারণ নাগরিকের সক্রিয় সম্পৃক্ততা। রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিকরা যদি কেবল পাঁচ বছর পর পর ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আঙুলে কালির দাগ লাগিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করেন এবং বাকি সময়টা নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকেন, তবে পৃথিবীর কোনো সরকারের পক্ষেই একা সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গণতন্ত্র বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তখনই সবচেয়ে কার্যকর হয়, যখন সাধারণ মানুষ জনজীবনে অংশ নেয়, প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ওপর কড়া নজর রাখে এবং নীতি নির্ধারণে নিজের কণ্ঠস্বরকে যুক্ত করে। নাগরিক সম্পৃক্ততা মূলত শাসনব্যবস্থাকে একটি ওপর-থেকে-নিচ প্রশাসনিক আদেশের বৃত্ত থেকে বের করে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার একটি দ্বিমুখী সহযোগিতামূলক সামাজিক চুক্তিতে রূপান্তরিত করে। নাগরিক সম্পৃক্ততার এই ধারণাটি কোনো আধুনিক বিলাসিতা নয়, এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত গভীর তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ফরাসি রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অ্যালেক্সিস ডি টকভিল তার যুগান্তকারী ‘ডেমোক্রেসি ইন আমেরিকা’ গ্রন্থে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে আমেরিকার তৎকালীন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তির মূল উৎস ছিল সেখানকার মানুষের ছোট ছোট স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও নাগরিক সমিতি। নাগরিকরা যখন নিজেদের উদ্যোগে সংগঠিত হয়ে স্থানীয় সাধারণ সমস্যার সমাধান করতে শেখে, তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও যৌথ দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। টকভিলের মতে, এই সুশীল সমাজই মূলত ব্যক্তি এবং বিশাল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সংযোগকারী সেতু হিসেবে কাজ করে, যা স্বৈরতন্ত্রের উত্থানকে রোধ করে। আধুনিক সময়ে এই তত্ত্বকে আরও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট ডি. পুটনাম। তার বিখ্যাত ‘বোলিং অ্যালোন’ এবং ‘মেকিং ডেমোক্রেসি ওয়ার্ক’ গ্রন্থে তিনি ‘সামাজিক পুঁজি’ বা সোশ্যাল ক্যাপিটালের ধারণাটি প্রবর্তন করেন। পুটনামের কাজ দেখায় যে সমাজে পারস্পরিক আস্থা, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং নাগরিক অংশগ্রহণ যত বেশি, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তত বেশি কার্যকর এবং দুর্নীতি তত কম হয়, কারণ সচেতন নাগরিকরা সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করেন এবং ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। একইভাবে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ এলিনর অস্ট্রম তার ‘গভর্নিং দ্য কমন্স’ গ্রন্থে রাষ্ট্র বা বাজারের বাইরে গিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সাধারণ মানুষ যখন কোনো জনসেবা বা সরকারি সম্পদের নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা না হয়ে এর সহ-উৎপাদক হিসেবে ভূমিকা রাখে, তখন সেই ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যায়। সমসাময়িক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাই সহযোগিতামূলক শাসনের কোনো বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, জটিল নগর পরিকল্পনা কিংবা বৈশ্বিক মহামারির মতো সংকটগুলো কোনো সরকারের পক্ষে একা আমলাতান্ত্রিক ফাইল চালাচালি করে সমাধান করা সম্ভব নয়। ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নরওয়ের মতো নর্ডিক দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা এর বাস্তব প্রমাণ পাই। এই দেশগুলো বিশ্ব শাসন সূচকে এবং জনগণের আস্থার দিক থেকে প্রতিনিয়ত শীর্ষে অবস্থান করে। এর মূল রহস্য কেবল তাদের শক্তিশালী অর্থনীতি বা দক্ষ আমলাতন্ত্র নয়, বরং নীতিনির্ধারণের প্রতিটি স্তরে সাধারণ মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল প্রযুক্তি নাগরিক সম্পৃক্ততার সুযোগকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ই-গভর্নেন্স প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন গণপরামর্শ, অংশগ্রহণমূলক বাজেট, ডিজিটাল পিটিশন এবং উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহের কারণে আজ ঘরে বসেই সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো জনমত গঠনের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে এই প্রযুক্তির একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। ভুল তথ্যের অবাধ প্রবাহ, তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ডিজিটাল বিভাজন-অর্থাৎ প্রযুক্তির সুবিধার অসম বণ্টন নাগরিক অংশগ্রহণের গুণগত মানকে অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই প্রযুক্তিকে সুশাসনের হাতিয়ার করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত করা জরুরি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে নাগরিক সম্পৃক্ততার গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেশি। এসব দেশে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আইনের শাসনের ঘাটতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষের পক্ষে সরকারি সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সামাজিক জবাবদিহিতার উদ্যোগগুলো দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও ওইসিডির বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার যেসব দেশে সাধারণ নাগরিকদের সামাজিক নিরীক্ষা, কমিউনিটি স্কোরকার্ড এবং অংশগ্রহণমূলক বাজেট প্রণয়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, সেখানে সরকারি ব্যয়ে অপচয় ও দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এটি স্থানীয় পর্যায়ে একচেটিয়া ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা রুখে দিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল সুশাসনের ক্ষেত্রে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে কিছু প্রশংসনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে। আইনগতভাবেই ইউনিয়ন পরিষদের উন্মুক্ত বাজেট সভা, ওয়ার্ড সভা এবং অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার বিধান রাখা হয়েছে। গ্রামীণ পর্যায়ে স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি এবং কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনা দলগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া দেশের সুশীল সমাজ, যুব সংগঠন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠী সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্যোগ মোকাবিলা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশ আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো থাকা সত্ত্বেও বাস্তব ক্ষেত্রে নাগরিক সম্পৃক্ততার গভীরতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। আমাদের দেশের শাসনব্যবস্থায় এখনও কিছু কাঠামোগত অন্তরায় বা চ্যালেঞ্জ প্রকটভাবে দৃশ্যমান। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি গণপরামর্শ বা বাজেট সভাগুলো কেবল কাগজে-কলমে বা আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার জন্য করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিমালার মূল জায়গায় পরিবর্তন আনার নজির বেশ কম, যাকে বলা চলে প্রতীকী অংশগ্রহণ। এর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত তীব্র রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ভিন্নমতাবলম্বী বা সাধারণ নাগরিকদের একটি বড় অংশ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখে। তথ্য অধিকার আইন থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পৌঁছায় না এবং তথ্যের এই অসামঞ্জস্যতা নাগরিক তদারকিকে দুর্বল করে দেয়। সবচেয়ে বড় কথা, নারী, যুবসমাজ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর অনেক সময়ই এসব আনুষ্ঠানিক সভায় উপেক্ষিত থেকে যায়। এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে যদি আমরা সত্যিকার অর্থেই একটি সুশাসিত রাষ্ট্র গঠন করতে চাই, তবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমত, সরকারকে নাগরিক সমালোচনা বা ভিন্নমতকে হুমকি হিসেবে না দেখে নীতি সংশোধনের একটি অত্যন্ত মূল্যবান এবং নিখরচায় পাওয়া উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রশাসন যখন নাগরিকদের উদ্বেগের প্রতি স্বচ্ছভাবে ও দ্রুত সাড়া দেবে, তখনই রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নাগরিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একজন নাগরিক যদি তার সাংবিধানিক অধিকার, রাষ্ট্রের প্রতি তার কর্তব্য এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে না জানেন, তবে তার পক্ষে গঠনমূলক অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রম থেকেই এই সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং অনুসন্ধিৎসু গণমাধ্যমই পারে প্রশাসনের ভেতরের ত্রুটিগুলো সামনে এনে নাগরিক সমাজকে সচেতন করতে এবং জনবিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করতে। নাগরিক অংশগ্রহণের সুফল কেবল রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজের গভীরের সংহতিকে শক্তিশালী করে। যেসব দেশে নাগরিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী, তারা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক ধাক্কা কিংবা জাতীয় সংকটে অনেক বেশি সহনশীলতা প্রদর্শন করে, কারণ সেখানে মানুষ সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে পারস্পরিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। একবিংশ শতাব্দীর এই জটিল সময়ে দাঁড়িয়ে কোনো দেশের সুশাসনের মানদণ্ড কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে মাপা যাবে না। শাসনব্যবস্থা তখনই সফল হবে যখন রাষ্ট্র জনগণের কথা শুনবে, প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকের প্রয়োজনে সাড়া দেবে এবং নাগরিকরা অধিকার আদায়ের পাশাপাশি দায়িত্বশীলভাবে রাষ্ট্রের চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। নিষ্ক্রিয় প্রজা নয়, বরং সচেতন ও সংগঠিত নাগরিক সমাজই হলো একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং স্থায়ী গণতান্ত্রিক সুশাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর। [লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।]

সাঁওতাল বিদ্রোহে নারীর বীরত্ব

আজ সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৭১তম বার্ষিকী। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের আদিবাসী সাঁওতালরা গভীর শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে সাঁওতাল বিদ্রোহের শহীদদের স্মরণে র‍্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। ইতিহাসের নানা দিক উন্মোচিত হলেও পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণ ও বীরত্বপূর্ণ অবদান বারবারই আড়ালে থেকে গেছে। শুধু সাঁওতাল বিদ্রোহ নয়, উপমহাদেশের প্রায় সব আদিবাসী বিদ্রোহেই নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। পুরুষদের সাহস ও মনোবল জোগাতে যেমন নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি প্রতিরোধযুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। ফুলো মুরমু ও ঝানো মুরমুর নেতৃত্ব সেই ইতিহাসেরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভারতের ঝাড়খণ্ডের ভগনাডিহি, দুমকাসহ বিভিন্ন স্থানে ফুলো ও ঝানো মুরমুর আবক্ষ ভাস্কর্য আজও সেই বীরত্বগাথার সাক্ষ্য বহন করছে। ইতিহাসে আদিবাসী সাঁওতাল নারীদের অবদান দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকলেও এসব স্মারক সেই সত্যকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে সমগ্র ভারতবর্ষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই দুর্ভিক্ষের অভিঘাতে বহু সাঁওতাল নিজ নিজ গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। একই সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও বিভিন্ন শ্রমনির্ভর কাজে আদিবাসীদের নিয়োজিত করতে শুরু করে। ফলে ধীরে ধীরে সাঁওতালরা ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ এবং বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। বর্তমানে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম আদিবাসী জনগোষ্ঠী হলো সাঁওতাল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৮৩২ সালে সাঁওতালদের ‘দামিন-ই-কোহ’ অঞ্চলে বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। ফারসি ভাষায় ‘দামিন-ই-কোহ’ অর্থ পাহাড়ের প্রান্তদেশ। সাহেবগঞ্জ, গোড্ডা, দুমকা, দেওঘর, পাকুড় এবং জামতাড়ার কিছু অংশ নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত হয়। পাশাপাশি বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, ভাগলপুর, বরাভূম, মানভূম, পালামৌ ও ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত সাঁওতালদেরও সেখানে বসবাসের সুযোগ দেয়া হয়।  ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের দেশীয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব, ফুলো ও ঝানো মুরমুর নেতৃত্বে সাঁওতাল সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ব্রিটিশ শাসকদের দেশীয় সহযোগীদের মধ্যে ছিল জমিদার, জোতদার, মহাজন, দারোগা এবং উচ্চবর্ণের প্রভাবশালী শ্রেণী। সাঁওতালরা নিজেদের শ্রমে পাহাড়ি বনভূমি পরিষ্কার করে আবাদযোগ্য জমি তৈরি করলেও পরে নানা কৌশলে সেই জমি তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত খাজনা আদায়, ঋণের ফাঁদ, ব্যক্তিগত নির্যাতন এবং নানা ধরনের ধারাবাহিক শোষণ তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন প্রায় ৪০০টি গ্রামের সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা করেন। এই বিদ্রোহে ফুলো ও ঝানো মুরমুর নেতৃত্বে প্রায় এক হাজার নারী যোদ্ধার একটি বাহিনী গড়ে ওঠে। সিধু মুরমুর স্ত্রী সুমি মুরমুও সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সিধু ও কানুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সাঁওতাল নারীরা গ্রামে গ্রামে সংগঠিত হন। বিদ্রোহের চেতনা তাদেরও সমানভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল। নারীরা শুধু পুরুষ যোদ্ধাদের সহায়ক হিসেবেই কাজ করেননি; অনেক ক্ষেত্রেই তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। বিদ্রোহীদের জন্য খাদ্য সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং রাতের অন্ধকারে ব্রিটিশ শিবিরে আকস্মিক হামলা চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি-এসব ক্ষেত্রেই তাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। যুদ্ধের খবর ও নির্দেশনা ছড়িয়ে দিতে নারীরা এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে শালগাছের পাতা ও ডাল পাঠাতেন। সাঁওতালি ভাষায় এই সংকেতকে ‘গিরা’ বলা হতো। এর মাধ্যমে বিদ্রোহের ডাক এবং যুদ্ধের সময়সূচি গোপনে পৌঁছে দেয়া হতো। আবার অনেক নারী বাজারে জ্বালানি কাঠ বা ফল বিক্রেতার ছদ্মবেশে ঝুড়ির নিচে তীর-ধনুক, পাথরসহ বিভিন্ন যুদ্ধসামগ্রী লুকিয়ে যোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। গুলতিতে ব্যবহারের জন্য পাথরও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রসামগ্রী। সাঁওতাল পরগনা ও বীরভূমের স্পেশাল কোর্টের নথিতে আরও কয়েকজন নারীর নাম ও তাদের ভূমিকার উল্লেখ পাওয়া যায়। অভিযোগ ছিল, তারা ব্রিটিশদের নির্মিত রেললাইন ধ্বংস, যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা, যুদ্ধের জন্য তীর তৈরি এবং লুণ্ঠিত সামগ্রী বহনে অংশ নিয়েছিলেন। এসব অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তারও করা হয়। ক্ষুব্ধ সাঁওতাল নারীরা দলবদ্ধভাবে রেললাইন উপড়ে ফেলা, কোম্পানির গুদাম থেকে খাদ্যশস্য উদ্ধার এবং পুরুষ যোদ্ধাদের কাছে গোপন তথ্য পৌঁছে দেয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নির্ভীকভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। অভিযুক্তদের মধ্যে সিংগি, বারকি, সোনা ও মণির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তৎকালীন ব্রিটিশ আদালতের বন্দি তালিকায় রাধা ও হীরা নামের দুই বীর নারীর নাম স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত রয়েছে। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় বন্দি হন। বন্দি হওয়ার পরও তারা ব্রিটিশ শাসকদের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি বা নতি স্বীকার করেননি। ভগনাডিহি অঞ্চলে আজও লোকমুখে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, ফুলো ও ঝানো মাত্র ২১ জন সাঁওতাল নারীকে সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতে ছদ্মবেশে ব্রিটিশ শিবিরে প্রবেশ করেন এবং তিনজন উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ সেনাকে হত্যা করেন। ঘটনাটি লিখিত ইতিহাসে সর্বত্র সমভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলেও সাঁওতাল লোকস্মৃতিতে এটি তাদের অসাধারণ সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে বেঁচে আছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সমগ্র সাঁওতাল সমাজে নতুন উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। রাধা, হীরা, সিংগি, বারকি ও সোনাসহ অনেক নারীকে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের পর বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে কয়েকজন নারী পরবর্তীকালে মুক্তিও পান। ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, সিধু ও কানু গ্রেপ্তার হওয়ার পর আন্দোলনে নেতৃত্বের সংকট দেখা দেয়। সেই সময় গ্রামের মাঝিদের (মোড়ল) স্ত্রীরা, অর্থাৎ মাঝিয়ানরা, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে গ্রামের প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এটি প্রমাণ করে যে, সাঁওতাল বিদ্রোহে নারীরা কেবল সহযোদ্ধাই ছিলেন না; প্রয়োজনে নেতৃত্বও দিয়েছেন। ফুলো ও ঝানো মুরমুর সাংগঠনিক দক্ষতায় প্রায় এক হাজার নারী যোদ্ধার একটি সুসংগঠিত বাহিনী গড়ে ওঠে। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এটি নারীদের সংগঠিত প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। সাঁওতাল সমাজে ডাইনি-সংক্রান্ত বিশ্বাস আজও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। বিদ্রোহের শেষ পর্যায়ে যখন সাঁওতাল যোদ্ধারা ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন এবং গ্রামে গ্রামে মহামারির প্রকোপ দেখা দিয়েছিল, তখন সেই বিপর্যয়ের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের দায়ী করা হয়। তাদের ‘ডাইনি’ আখ্যা দিয়ে নানা ধরনের নিপীড়ন ও কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হয়। ফলে বহিরাগত শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের পাশাপাশি সমাজের অভ্যন্তরীণ কুসংস্কারও নারীদের জন্য আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আজ, সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৭১তম বার্ষিকীতে ফুলো মুরমু, ঝানো মুরমু, সুমি মুরমু, রাধা, হীরা, সিংগি, বারকি, সোনা, মণিসহ অসংখ্য পরিচিত ও অপরিচিত নারী সংগ্রামীর অবদান নতুন করে স্মরণ করা জরুরি। তাদের ইতিহাস কেবল সাঁওতাল সমাজের নয়, সমগ্র উপমহাদেশের প্রতিরোধ সংগ্রামের এক অমূল্য সম্পদ। ইতিহাসের মূলধারায় তাদের যথাযথ স্থান নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাদের বীরত্বগাথা তুলে ধরাই হবে সাঁওতাল বিদ্রোহের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। [লেখক: কলামিস্ট]

নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বাস্তবতা ও বাধা

সম্প্রতি ঘোষিত জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেয়ার ইতিহাস বাংলাদেশের এই প্রথম। গত অর্থবছরের (২০২৫-২৬) সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে থাকে, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা উচিত। তবে এই প্রথমবার ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে এবার স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অতীতে এমনও দেখা যায়নি। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। সর্বশেষ সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী দেশের সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে প্রায় ১, ১৫,০০০-১, ২৫,০০০ নিবন্ধিত চিকিৎসক রয়েছেন। নার্স ও মিডওয়াইফের সংখ্যা প্রায় ১, ১০,০০০-১, ২০,০০০ জন। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট,রেডিওগ্রাফার, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার কল্যাণ সহকারী এবং অন্যান্য প্যারামেডিকসহ কয়েক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩,০০০-এর বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক, ৪৯০-এর বেশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৬৪টি জেলা হাসপাতাল এবং জাতীয় ও বিশেষায়িত হাসপাতালসহ বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে এসব জনবল স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। দেশের স্বাস্থ্যখাতে জনবল কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো জনবলের ঘাটতি ও অসম বণ্টন। শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীর ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি হলেও গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় চিকিৎসক, নার্স ও বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট এখনও উল্লেখযোগ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এ পরিস্থিতিতে দেশের স্বাস্থ্য ব্যাবস্থার উন্নয়নে প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বাজেটে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী হবে- এমন ঘোষণা সত্যিই চমকপ্রদ। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নের বাস্তবিক উদ্যোগ। তবে এর বাস্তবতা ও সম্ভাবনার সঙ্গে এবং বহুবিধ চ্যালেঞ্জ সম্পর্কিত। বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কর্মী, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী, মিডওয়াইফ, পুষ্টিকর্মী এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের বড় অংশই নারী। নতুন নিয়োগের অধিকাংশ যদি এসব পদে হয়, তাহলে ৮০ শতাংশ নারী নিয়োগ অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশে নার্সদের মধ্যে নারী ও পুরুষের অনুপাত প্রায় ৯০:১০। অর্থাৎ, নার্সিং পেশায় শতকরা ৯০ ভাগের বেশি নারী এবং পুরুষ নার্স রয়েছেন প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ। উপরন্তু দেশের নিবন্ধিত নার্সদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক নারী। নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগে যদি নার্স ও মিডওয়াইফদের বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে নারী অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য খাতে নারীরা বৈশ্বিক কর্মীবাহিনীর প্রায় ৬৭% এবং চিকিৎসা শিক্ষা গ্র্যাজুয়েটদের ৫৯% হলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বা শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ মাত্র ২৫%। নার্সিং এবং মিডওয়াইফারি খাতে নারী স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাধিক্য থাকলেও, লিঙ্গবৈষম্য, বেতন বৈষম্য এবং পেশাগত প্রতিবন্ধকতার মতো সমস্যাগুলো এখনো দৃশ্যমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক কর্মীবাহিনীর বেশিরভাগ অংশই নারী, যা তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে বৃহৎ বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোতে প্রধান পদে নারীদের উপস্থিতি বেশ কম (প্রায় ৩০%)। তাছাড়া, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো থেকে শীর্ষ পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ৫%। স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা খাতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২৪% কম উপার্জন করেন। স্বাস্থ্য খাতে নারীরা অবৈতনিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সিংহভাগই সম্পন্ন করে থাকেন। এছাড়া নারীরা তুলনামূলকভাবে কম বেতনভুক্ত নার্সিং ও মিডওয়াইফারি পেশায় বেশি নিয়োজিত। নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রায়শই কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হন, যা তাদের কর্মদক্ষতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাজেটে ঘোষিত স্বাস্থ্যকর্মী বলতে কি চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, টেকনোলজিস্ট, স্বাস্থ্য সহকারী, নাকি সব মিলিয়ে বোঝানো হয়েছে- এটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। যদি ১ লাখের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ চিকিৎসক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও বিশেষায়িত জনবল হয়, তাহলে ৮০ শতাংশ নারী নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। ১ লাখ জনবল নিয়োগের পূর্বে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, শিক্ষক, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং মানসম্মত কারিকুলাম। দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করলে দক্ষতার প্রশ্ন উঠতে পারে। নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পর তাদের নিরাপদ আবাসন, যাতায়াত ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করলে প্রত্যন্ত গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি পদায়ন কঠিন হবে। শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশাসনিক, ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। ১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ৮০ শতাংশ নারী করার লক্ষ্য অসম্ভব নয়, তবে এটি মূলত সম্ভব হবে যদি নিয়োগের বড় অংশ নার্স, মিডওয়াইফ, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী পদে হয়। অন্যদিকে, যদি এই সংখ্যা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য পেশাজীবীদেরও সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে লক্ষ্য অর্জন অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে যদি পরিকল্পনাটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে-মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে সহায়ক হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হবে। গ্রামীণ নারীদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের হার বাড়বে। নারী কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে এবং স্বাস্থ্য খাতে লিঙ্গ বৈষম্য কমাতে সাহায্য করবে। অতএব, ঘোষণাটি প্রশংসনীয় হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে কোন পদে নিয়োগ হবে, কীভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে এবং কোথায় তাদের কাজে লাগানো হবে-তার ওপর।[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

উদার গণতন্ত্র এবং প্রান্তিকের স্বপ্ন

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এর পেছনে সুশাসনের ঘাটতি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা। স্বাধীনতার পর থেকে যেসব রাজনৈতিক দল দেশ শাসনের ভার নিয়েছে, তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার ফল হিসেবেই গণুআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান আমাদের ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কারণও ছিলো সুশাসন এবং গণতন্ত্র বাস্তবায়নের ব্যর্থতা। নির্মোহ ভাবে বলতে গেলে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির কারণ হলো কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণ। আওয়ামীলীগের পতনের পর সাধারণ প্রান্তিক মানুষেরা স্বপ্ন দেখেছিলো অন্তর্চভুক্তি মূলক সমাজ ও রাজনীতির। স্বপ্ন দেখান কিন্তু রাজনৈতিক দলের নেতারা কিন্তু স্বপ্ন ভঙ্গের যাতনা ভোগ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক মানুষের দল। কী হলো আওয়ামী লীগ পতনের পর। আকুল আগ্রহ এবং কৌতূহল নিয়ে নাগরিকেরা অপেক্ষা করলেন, অবলোকন করলেন। আমাদের আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে যা দেখতে পেলাম তা মোটেই স্বস্তিদায়ক ছিলনা। সংবদ্ধ সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলটি নাগরিকদের জন্য অস্বস্তিদায়ক ছিল। তবে চব্বিশের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার একটি বড় সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন অনেকেই। বিশেষত সাধারণ মানুষ। প্রান্তিক বা সাধারণ মানুষ কিন্তু ‘ছাত্রজনতা’, ‘তৌহীদী জনতা’ নয়। তারা তকমাহীন নিবেদিত প্রাণ দেশ প্রেমিক নাগরিক। পঞ্চান্ন বছর ধরে তারা স্বপ্ন দেখছেন আর স্বপ্ন ভাঙ্গার বেদনা বুকে নিয়ে জীবনকে যাপন করছেন। আমার মতো অনেকেই এরজন্য গণতন্ত্রহীনতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। যদিও আমরা ডান, বাম, মধ্যপন্থী এমন কী ধর্মাশ্রয়ী দলের নেতারা যখন মেঠো বক্তৃতা দিয়ে থাকেন তখন তাদের কাছ থেকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের কথা শুনে থাকি। পঞ্চান্ন বছর বয়সী বাংলাদেশে এখনও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হিসেবে গণতন্ত্রকে দেখতে পাইনা। অথচ গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম নিয়েছিলো। বায়ান্ন, থেকে উনসত্তর, একাত্তর হয়ে চব্বিশের আন্দোলনে রাজনৈতিক দল গুলো নাগরিক সমাজকে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়ে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করেছে। বাংলাদেশের জনগণ অত্যন্ত উদার, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ, আবেগপ্রবণ যা উদার গণতন্ত্রের উপাদানের সঙ্গে সামজস্য-পুর্ণ। এ কারণেই সুবর্ণ পলিমাটির এ’দেশে মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নানা ভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছে। আধুনিক পৃথিবীতে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য শাসনতান্ত্রিক মতবাদ হচ্ছে গণতন্ত্র। পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ দেশে রয়েছে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। নব্বইয়ের দশকে স্নায়ুযুদ্ধের পতনের পরে পৃথিবির অধিকাংশ দেশেই স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটে, বিকাশ লাভ করে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। কিন্তু, পৃথিবীর প্রায় সবগুলো দেশই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে নিজেদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন বিকল্পসহ গ্রহণ করেছে। ফলে, পৃথিবীর যে দুই-তৃতীয়াংশ দেশে গণতন্ত্র রয়েছে, তার মধ্যে একদেশের গণতন্ত্রের সঙ্গে আরেক দেশের গণতন্ত্রের হুবহু মিল পাওয়া কার্যত অসম্ভব। প্রত্যেক দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই কিছু স্বাতন্ত্র্য দেখা যায়। আমাদের দেশেও স্বকীয় বৈশিষ্ঠ নিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো। রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা, নিবেদন, এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের যতোটুকু ত্যাগের প্রয়োজন ছিল আমরা সেরকম রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি এখনও। উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, পাপ এবং দুঃখের এই বিশ্বে অনেক ধরনের সরকার ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা এবং পরীক্ষা, নিরীক্ষা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এরকম পরীক্ষা বহমান থাকবে। গণতন্ত্র প্রেমীরা এ’কথা বলেনা যে গণতন্ত্র নিখুঁত বা সব চেয়ে ভালো রাজনৈতিক ব্যবস্থা। গণতন্ত্র নিয়ে বলা হয়, গণতন্ত্র হলো সরকারের অন্যতম খারাপ রূপ, তবে অন্য সব রকমের সরকার ব্যবস্থা থেকে খারাপ বা দুর্বল নয়। প্রকৃতপক্ষে এটি একমাত্র সরকারব্যবস্থা, যা বেশির ভাগ জাতি গণতন্ত্রের ত্রুটি এবং অন্তর্নিহিত দুর্বলতা সত্ত্বেও পেতে চায়। গণতন্ত্র যতোটূকু গণমুখী, জন কল্যাণকর তার থেকে গণতন্ত্রের ত্রুটি কিছুটা হলেও বেশি। অগণতান্ত্রিক দেশের তুলনায় গণতান্ত্রিক শাসনে জনগণের অংশগ্রহণ বেশি থাকে, যার ফলে জনসাধারণের সেবার কাঠামো গঠন করা হয়, যা জনগণের কল্যাণের জন্য প্রকৃত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। এসব আলোচনার মর্ম কথা হলো গণতন্ত্র নিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারে অনেক সমালোচনা করা যায় কিন্তু গণতন্ত্রের বিকল্প তৈরি করা যায়না। গণতন্ত্র হলো এ’ যাবত কালে পরীক্ষিত সর্বোত্তম রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বৈচিত্র্যময় বিতর্ক আর চর্চার রাজনীতির মধ্যেও, গণতন্ত্রের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ভ্যারিয়েন্টটি হচ্ছে উদার গণতন্ত্র। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গণতন্ত্র বলতে উদার গণতন্ত্রকেই বুঝানো হয়। মানুষের প্রতি শাসকের সমদৃষ্টি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। গণতান্ত্রিক অধিকার মূলত মানুষের জন্মগত মৌলিক অধিকারের কথাই বলে থাকে। আর এই মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারে সুশাসন। এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক রায়ের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের অবজ্ঞা ও অস্বীকৃতিই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল। অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রকে এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া যায়নি। আমরা আশা করি, বর্তমান সংসদের সরকারি দল ও বিরোধী দল দুই পক্ষই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এবং জাতীয় সংসদকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলবে। সুশাসনের জন্য প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থা। সুশাসন ন্যায় ও সমতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। যখন প্রশাসন দলীয়রূপ ধারণ করে তখন আমলাতন্ত্র শাসকদলের লেজুড়বৃত্তি করে। দুর্নীতি ও লাল ফিতার দৌরাত্মে প্রশাসন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। জনসমর্থন না থাকলে শাসকগোষ্ঠী আমলা নির্ভর হয়ে পড়ে এবং দেশ পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। শাসকবর্গ যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে প্রশাসনে ও বিচারালয়ে নিজেদের অনুগত লোকদেরকে নিয়োগ দেয় যাতে এদের সমর্থনে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে। ফলে প্রশাসন দুর্নীতিবাজ, অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ আমলাদের আখড়ায় পরিণত হয়। এসব কারণে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি শ্লথ হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি না থাকলে শাসকদলের নেতা-কর্মীদের দৌরাত্ম বেড়ে যায়, তারা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সমস্ত সমাজ জুড়ে এক ধরণের নীরবতার সংস্কৃতি নেমে আসে। অল্প সংখ্যক মানুষের দাপুটে অবস্থানকে শাসকদের কাছে মূল্যবান হয়ে পড়ে কারণ তাদের চেতনা এবং শাসকদের চেতনার একটি দৃশ্য অদৃশ্য সামঞ্জস্য লক্ষ করা যায়। প্রান্তজনের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন বিভিন আন্দোলন থেকে ওঠে আসা জনগণের স্বপ্নের বাস্তবায়ন। ছেষট্টি থেকে চব্বিশ পর্যন্ত সকল আন্দোলনের মূল কথা ছিলো সমতার বাংলাদেশ, বৈষম্যহীন মানবিক বাংলাদেশ। এই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য আমাদের পেছন ফিরে তাকাতে হবে। স্বপ্নের অনুবাদ করার দক্ষতা, যোগ্যতা এবং নিবেদন প্রয়োজন। এপ্রসঙ্গে, একটি জাতীয় সংবাদপত্রে জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার জনাব হাফিজ উদ্দীন আহমদ এর একটি সাক্ষাৎকারের অংশ তুলে ধরে লেখাটি সমাপ্ত করতে চাই। তিনি বলেছিলেন ‘আমাদের বহু সাফল্যের পেছনে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বিজয় একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। সেই শক্তি ও চেতনাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। আর একটি বিষয় হলো—গণতান্ত্রিক, মুক্তমনা সমাজ গড়ে তোলা; যেখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল সামাজিক সুবিচার, সাম্য ও মানবিক চেতনা প্রতিষ্ঠা করা। এসব মূল্যবোধকে আবার রিস্টোর করতে হবে। বৈষম্য কমাতে হবে—ধনী-গরিবের বৈষম্য, অঞ্চলভেদে বৈষম্য, নারী-পুরুষের বৈষম্য—সবই কমাতে হবে।’ আমরা কী পারবো প্রান্তজনের বাংলাদেশ প্রতিষথা করতে। আইনের শাসন ভেঙে গেলে দেশ প্রেমিক নাগরিকদের মধ্যে এক ধরণের ভীতি সৃষ্টি হয়। এর ফলে সমাজে অরাজকতার সৃষ্টি হয়। গুম, খুন, সন্ত্রাস, সরকারী অর্থ লোপাট ও সম্পদের অপচয় বৃদ্ধি পায়। সমাজ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মিডিয়া ও সুশীল সমাজ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলে। এ অবস্থা যেকোন দেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র মানুষের মৌলিক অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নের রক্ষাকবচ। এ ধরনের গণতন্ত্র সুশাসনকে নিশ্চিত করে। প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতি এবং সমাজ আমাদের কাঙ্ক্ষিত। আমরা ফেব্রিয়ারির নির্বাচনের পূর্বে অন্তর্ভুক্তি মূলক রাজনীতি এবং সমাজের কথা শুনেছিলাম। আমরা চব্বিশের আন্দোলনের পূর্বে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার কথা শুনে আশান্বিত হয়েছিলাম। বৈষম্যহীনতার কথা আমরা খুব কম শুনে হতাশ হই। জাতীয় ভাবে আমরা কিজবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র ও সুশাসন উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আমাদেরকে গণতন্ত্র ও সুশাসনের পথে হাঁটতে হবে এবং উন্নত অবকাঠামো তৈরীতে আরও মনোযোগি হতে হবে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও নাগরিক অংশগ্রহণ গণতন্ত্রকে সুসংহত করবে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করবে। সপ্তদশ শতাব্দীর বৃটিশ সমাজ বিজ্ঞানী জন লকের ’সোশিয়াল কন্ট্র্যাক্ট’ বা সামজিক চুক্তি মতবাদ এ মতটিকেই সমর্থন করে। তার মতে একনায়কতন্ত্র বা একদলীয় শাসন কখনও গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক নয়, কেননা তা জনগণের অধিকারকে খর্ব করে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। স্বৈরতন্ত্র নাগরিকের সব অধিকারকে শুধু খর্বই করে না, উন্নয়নের ধারাকেও রুদ্ধ করে দেয়। স্বৈরাচারী আমলে এর অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে। জন লক রাষ্ট্রের এ ধরনের অপরিমেয় সাংবিধানিক ক্ষমতার বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে জনগণ রাষ্ট্রকে ক্ষমতার লাইসেন্স প্রদান করে না। তৃণমূল জনগণের অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। বিকেন্দ্রীকরণ তৃণমূল পর্যায়ের জনগণকে সচেতন, দায়িত্বশীল ও স্বনির্ভর করে তোলে। সুশাসনের জন্য প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থা। সুশাসন ন্যায় ও সমতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। যখন প্রশাসন দলীয়রূপ ধারণ করে তখন আমলাতন্ত্র শাসকদলের লেজুড়বৃত্তি করে। দুর্নীতি ও লাল ফিতার দৌরাত্মে প্রশাসন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। জনসমর্থন না থাকলে শাসকগোষ্ঠী তখন আমলা নির্ভর হয়ে পড়ে এবং দেশ পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। শাসকবর্গ যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে প্রশাসনে ও বিচারালয়ে নিজেদের অনুগত লোকদেরকে নিয়োগ দেয় যাতে এদের সমর্থনে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে। ফলে প্রশাসন দুর্নীতিবাজ, অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ আমলাদের আখড়ায় পরিণত হয়। এসব কারণে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি শ্লথ হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি না থাকলে শাসকদলের নেতা-কর্মীদের দৌরাত্ম বেড়ে যায়, তারা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আইন ও বিচারের ধরা-ছোঁয়ার ঊর্দ্ধে এরা অবস্থান করে। ফলে আইনের শাসন ভেঙ্গে পড়ে, অরাজকতার সৃষ্টি হয়। গুম, খুন, সন্ত্রাস, সরকারী অর্থ লোপাট ও সম্পদের অপচয় বৃদ্ধি পায়। সমাজ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মিডিয়া ও সুশীল সমাজ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলে এবং কলম ও মুখ বন্ধ রাখে। এভাবে দেশের বিরোধীদল, বিচারক, মিডিয়া, বুদ্ধিজীবি ও সুশীল সমাজ অপারগ হয়ে পড়ে। এ অবস্থা যেকোন দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র মানুষের মৌলিক অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নের রক্ষাকবচ। এ ধরনের গণতন্ত্র সুশাসন কে নিশ্চিত করে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

বৈদেশিক ঋণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার: সামনে কঠিন বাস্তবতা

বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে তিন বছর মেয়াদি নতুন ঋণ কর্মসূচির আবেদন করেছে। এ লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে আইএমএফকে আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠানো হয়েছে। ঋণের সম্ভাব্য পরিমাণ সম্পর্কে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও বিভিন্ন সূত্রে ধারণা করা হচ্ছে, এর পরিমাণ ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদ। আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেয়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। অর্থনৈতিক চাপের মুখে বিশ্বের অনেক দেশই সংস্থাটির সহায়তা নেয়। কারণ, তুলনামূলক কম সুদে ঋণ পাওয়া যায়। তবে এই ঋণের সঙ্গে কঠোর সংস্কার-শর্তও যুক্ত থাকে। সেই শর্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে ঋণের কিস্তি স্থগিত হওয়ার নজিরও রয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে বাজারভিত্তিক পদ্ধতি চালু করাসহ বেশ কয়েকটি নীতিগত পরিবর্তন আইএমএফের শর্তের অংশ হিসেবেই বাস্তবায়িত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হওয়ার পর ২০২৩ সালে তৎকালীন সরকার আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। কিন্তু সংস্কার-শর্ত পূরণে অগ্রগতি সন্তোষজনক না হওয়ায় ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড় আর সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ আলোচনা সত্ত্বেও আইএমএফকে রাজি করানো যায়নি। বর্তমান সরকার এমন সময়ে নতুন ঋণ কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে, যখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। তবে এই উন্নতির বড় কারণ আমদানি কমে যাওয়া। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হয়ে আমদানি বাড়লে রিজার্ভ আবারও চাপে পড়তে পারে। একই সময়ে বড় বাজেট বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ব্যয় এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারের অতিরিক্ত অর্থেরও প্রয়োজন রয়েছে। ফলে নতুন ঋণ কর্মসূচির উদ্যোগকে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। সরকার আইএমএফকে জানিয়েছে, আগের কর্মসূচি গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন পরিবর্তিত হয়েছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে কয়েকটি সংস্কার নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার সংস্কার থেকে সরে আসতে চায় না; বরং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের কথা বলেছে। আগামী মাসে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে এসে নতুন কর্মসূচির সম্ভাবনা, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাতের সুশাসন, বিনিময় হার, ঋণ নীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের রাজস্ব আহরণের হার দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত নিম্ন। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও প্রায় ৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম। চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব ঘাটতি বড় আকার ধারণ করতে পারে। ফলে উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহে সরকারকে ক্রমেই বেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি ঋণের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে সামনে রয়েছে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের বাস্তবতা। এর ফলে ভবিষ্যতে আগের মতো সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমে যাবে। বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের বড় অংশই রেয়াতি হলেও আগামী বছরগুলোতে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ফলে ঋণ ব্যবস্থাপনায় এখন থেকেই আরও সতর্ক ও দূরদর্শী নীতি গ্রহণের বিকল্প নেই। রাজস্ব ঘাটতির পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বলতাও অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সরকারের মোট ঋণের বড় অংশই এখন দেশীয় উৎস, বিশেষ করে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নেওয়া হচ্ছে। অথচ একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণের বিস্তার, বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক আস্থার ঘাটতির কারণে নতুন বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতায়। কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ায় বেকারত্বও ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকও মিশ্র চিত্র তুলে ধরছে। রপ্তানি আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। অন্যদিকে প্রবাসী আয় আশাব্যঞ্জক হলেও এককভাবে তা অর্থনীতির সব দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট নয়। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য রপ্তানি, বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ এবং উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই সমান অগ্রগতি প্রয়োজন। এই বাস্তবতায় নতুন ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার একদিকে বৈদেশিক অর্থায়নের নিশ্চয়তা চায়, অন্যদিকে আগের কর্মসূচিতে অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়া সংস্কারগুলো নতুন বাস্তবতার আলোকে এগিয়ে নিতে আগ্রহী। তবে আগের কর্মসূচি কেন কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি, তার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি। জ্বালানি মূল্যের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়, রাজস্ব সংস্কার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং ব্যাংক খাতের সুশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়াই মূল বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আইএমএফও ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। তাই নতুন কর্মসূচিতে আগের শর্তগুলো হুবুহু বহাল রাখার পরিবর্তে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সংস্কার এজেন্ডা পুনর্গঠনের সুযোগ রয়েছে। এ লক্ষ্যে সংস্থাটির একটি প্রতিনিধিদল সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করে অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা, সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পর্যালোচনা করবে। নতুন কর্মসূচির আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, কর-ছাড়ের যৌক্তিকীকরণ, ভ্যাটব্যবস্থার সংস্কার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, ব্যাংক খাতের সুশাসন এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ। এসব সংস্কার দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়নের গতি ছিল ধীর। ফলে নতুন কর্মসূচিতেও একই বিষয়গুলো আবার সামনে আসবে। তবে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা যতটা বাস্তব, এর সামাজিক প্রভাবও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। করের আওতা বৃদ্ধি, ঋর্ণুকি হ্রাস, জ্বালানি মূল্যের সমন্বয় কিংবা বিনিময় হার আরও বাজারনির্ভর হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে পারে। তাই সংস্কার বাস্তবায়নে এমন ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে, যাতে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হয়, আবার নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপও সৃষ্টি না হয়। এদিকে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে অর্থ আসছে, তার বড় অংশই এখন অতীতে নেয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। ফলে বৈদেশিক অর্থায়ন থেকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নতুন করে যে সম্পদ যুক্ত হওয়ার কথা, তার পরিমাণ দ্রুত কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন ঋণ, অনুদান এবং অর্থছাড়—সব ক্ষেত্রেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অর্থায়নের জন্য উদ্বেগের বিষয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের তথ্য বলছে, বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে যে অর্থ এসেছে, তার প্রায় পুরো অংশই ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহারযোগ্য নিট বৈদেশিক অর্থায়নের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এটি সরাসরি ঋণ নিয়ে ঋণ শোধ করার পরিস্থিতি না হলেও সামগ্রিক অর্থপ্রবাহের দৃষ্টিকোণ থেকে একই ধরনের চাপের ইঙ্গিত দেয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের ব্যয় প্রতিবছর বাড়ছে। গত এক দশকে বাস্তবায়িত বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অনেক ঋণের অবকাশকাল শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন যুক্ত হওয়ায় একই পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতেও সরকারকে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে ঋণের চাপ শুধু ডলারের হিসাবে নয়, দেশীয় মুদ্রার হিসাবেও দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি এবং অর্থছাড় কমে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রতিশ্রুত অর্থ সময়মতো ছাড় হচ্ছে না। এর ফলে উন্নয়ন অর্থায়নের ভারসাম্য দুর্বল হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নেও অর্থসংস্থানের চাপ বাড়তে পারে। বাংলাদেশ এখনও বৈদেশিক ঋণসংকটে পড়েনি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দেশের বৈদেশিক ঋণের অনুপাত এখনও সহনীয় পর্যায়েই রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রবণতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ঋণ ব্যবস্থাপনায় আগের মতো নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ আর নেই। নতুন ঋণের প্রবাহ কমছে, অনুদান হ্রাস পাচ্ছে, ঋণ পরিশোধের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে এবং রেয়াতি ঋণের সুযোগও ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসছে। ফলে অর্থনীতির জন্য এটি সতর্ক হওয়ার সময়। এই বাস্তবতায় আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচিকে কেবল অর্থসংস্থানের উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, অর্থনীতির দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করার সুযোগ হিসেবে এই কর্মসূচিকে কাজে লাগানো। রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, করব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ব্যাংক খাতের সুশাসন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি—এসব সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সংস্কারের সাফল্য কেবল শর্ত পূরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। তাই সংস্কার এমনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি না হয় এবং উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের গতি বাধাগ্রস্ত না হয়। ঋণ গ্রহণ নিজেই কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয় না বা তা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। তাই এখন প্রয়োজন ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা নয়, বরং প্রতিটি ঋণের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ফল নিশ্চিত করা। যে প্রকল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে, অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত সেই প্রকল্পই। বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। স্বল্পমেয়াদি ঋণনির্ভর সমাধানের পরিবর্তে যদি কার্যকর সংস্কার, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে বর্তমান চ্যালেঞ্জই ভবিষ্যতের টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় ঋণের বোঝা, রাজস্ব দুর্বলতা ও ব্যাংক খাতের সংকট মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। এখন প্রয়োজন বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত, দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং সংস্কার বাস্তবায়নে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। [লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

বার্ধক্যের নতুন বাস্তবতা

সত্তরোর্ধ্ব নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের পর সবাই হতবাক। ঘরভর্তি আবর্জনা, স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে ছত্রাক, ছোট খাটে পড়ে ছিল অর্ধগলিত দেহ। কবে মারা গেছেন কেউ জানে না, সন্তানরাও না। রান্নাঘর দেখে বোঝা যায় বছর ধরে চুলা জ্বলেনি। এই নোংরা পরিবেশই বলে দেয় কতটা অবহেলায় ছিলেন তিনি। বৃদ্ধার এক ছেলে যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক। মেয়ে স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক। মায়ের সঙ্গে মেয়েই থাকতেন। সাড়া না পেয়ে মেয়ে ক্লিনিক থেকে নার্স ডাকেন, নার্সই পুলিশে খবর দেয়। সুস্থ মানুষ এমন পরিবেশে থাকতে পারেন না। মেয়ের মানসিক অসুস্থতা না থাকলে মায়ের লাশের গন্ধও তিনি টের পেতেন।বাংলাদেশে সাধারণত সন্তানই মা-বাবাকে দেখে। তবুও ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন হয়েছে। সেখানে সামর্থ্যবান সন্তানকে বাবা-মায়ের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, সঙ্গ ও সেবা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। আইন ভাঙলে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মুম্বাইয়ে আমেরিকা প্রবাসী ছেলেকে মা অনুরোধ করেছিলেন আমেরিকায় নিতে অথবা বৃদ্ধাশ্রমে রাখতে। ছেলে সময় পায়নি। কোটি টাকার ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় কঙ্কাল। আজ মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের সন্তানেরা উচ্চশিক্ষা ও অভিবাসনের জন্য বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। দেশের ভেতরেও স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চাকরি করেন। ফলে মা-বাবা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। গৃহকর্মীর কাছে বৃদ্ধ মা-বাবাকে রেখে যাওয়া সবসময় নিরাপদ নয়। সামাজিক মাধ্যমে দেখা গেছে, বিছানায় প্রসাব করার অপরাধে গৃহকর্মী বৃদ্ধাকে চড় মারছে। তবু সমাজের ভয়ে আমরা ঘরেই রাখি, কারণ ধর্মীয় মূল্যবোধে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো পাপ মনে করি।অথচ বহু সন্তান চাইলেও দায়িত্ব নিতে পারে না। নিজের খাবার জোগাড় করতে না পেরে কেউ ছিনতাই করে, কেউ চুরি করে, কেউ দেহ বিক্রি করে। কখন জেলে যায় বা হাসপাতালে পড়ে থাকে মা-বাবাও জানেন না। দিনরাত খেটেও স্ত্রী-সন্তানের মুখে ভাত তুলে দিতে না পারলে বৃদ্ধ মা-বাবার গুরুত্ব কমে যায়। অনেক পরিবারে প্রতিবন্ধী বা দুরারোগ্য সন্তান আছে, যারা আজীবন অন্যের ওপর নির্ভরশীল। যেসব পরিবারে শুধু মেয়ে, সেখানে বিবাহিত মেয়ের পক্ষে মা-বাবাকে সেবা দেয়া কঠিন। আবার অসংখ্য প্রবীণের সন্তান নেই, আত্মীয় নেই। সম্পদ না থাকলে ভাড়া করা লোক রাখাও সম্ভব নয়। এরাই রাস্তায় ভিক্ষা করে, স্টেশন বা ফুটপাতে ঘুমায়, পুলিশের লাঠি খায়। তাই সব মা-বাবা সন্তানের নির্যাতনে ঘর ছাড়েন, এই কথা সত্য নয়।দেশে এখনো দশ শতাংশ মানুষ চরম দরিদ্র। বসতি নেই, বস্ত্র নেই, চিকিৎসা নেই, খাবারের নিশ্চয়তা নেই। ত্রিশ শতাংশ মানুষের তিন বেলা ভাত জোটে না। অর্থনীতি যতই বাড়ক, সবাইকে কাজ দেয়া কোনো সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কোটি মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনিতে এনে সহায়তা দেয়াও সম্ভব নয়। ফলে রোজগারের আশায় সন্তানেরা বৃদ্ধ মা-বাবাকে ফেলে বিদেশে যাচ্ছে। যাদের সে সামর্থ্য নেই তারা শহরে এসে ফুটপাতে কচু, লতি, পিঠা বিক্রি করছে। স্বল্প আয়ের এই মানুষগুলোর কাছ থেকেও পুলিশ আর মাস্তান চাঁদা নেয়। রাস্তায় প্রায়ই দেখা যায়, রোগে কাতর বা স্মৃতিভ্রষ্ট বৃদ্ধ নারী-পুরুষ ফুটপাতে পড়ে আছে। ফেইসবুকে পোস্ট দেয়া পথিকেরা তাদের ডিঙিয়ে চলে যায়। জীবিত না মৃত, খোঁজ নেয়ার তাগিদও থাকে না। ধর্মের দোহাই দিয়ে লাভ নেই। পুলিশ আর দারোয়ানের গুঁতা খাওয়া এই মানুষগুলোর কাছে ফুটপাতের চেয়ে বৃদ্ধাশ্রম স্বর্গ।নিঃস্ব বিধবা, নিঃসন্তান, বিপত্নীক বা অকৃতদার প্রবীণদের জন্য বৃদ্ধাশ্রমই উত্তম জায়গা। দেশের অধিকাংশ বৃদ্ধাশ্রম দুস্থ ও অসহায় প্রবীণের বিনা পয়সায় থাকা-খাওয়ার স্থান। সহায়-সম্বলহীন বয়োবৃদ্ধদের নিশ্চিত জীবনযাপনের একমাত্র আশ্রয় এটিই। মূল্যবোধ বদলাচ্ছে। বৃদ্ধাশ্রমে রাখা মানেই মা-বাবাকে ফেলে দেয়া নয়। প্রয়োজনের কাছে ধর্মের বাণীও অশ্রুত থাকছে। অভাবের তাড়নায় প্রবীণদের শ্রদ্ধা করার তাগিদও কাজে আসছে না।এখন ভালো বৃদ্ধাশ্রমকে কমিউনিটি লিভিং প্লেস বলা যায়। এখানে সমবয়সীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, ভাব বিনিময় হয়, যা অনেক সময় পরিবারেও মেলে না। চার হাজার বছর আগে চীনে অসহায় প্রবীণদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। সেই প্রয়োজন আজও ফুরায়নি, বরং বেড়েছে। পাশ্চাত্যে সাবালক সন্তানেরা আলাদা থাকে, মা-বাবাও তাদের জীবনে বাধা হতে চান না। অনেকে বৃদ্ধাশ্রমে নিজের জগৎ গড়ে নেন। সব বৃদ্ধাশ্রম বিনা খরচে নয়, কোথাও প্রচুর অর্থ লাগে। তবু মানুষ সঙ্গ পায়, গল্প করে, টেলিভিশন দেখে সময় কাটায়। প্রতি বছর দল বেঁধে দেশ-বিদেশে ঘুরতে যায়। নিজেরাই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। সেলিব্রিটিরা উপহার নিয়ে আসেন। সন্তানেরাও দেখতে যায়। তাই উন্নত বিশ্বে প্রবীণ নিবাস আরামদায়ক। বৃদ্ধাশ্রম মানেই এতিমখানা নয়, এটি নিঃসঙ্গতা কাটানোর উত্তম স্থান।আমাদের দেশেও বৃদ্ধাশ্রমের প্রতি আতঙ্ক কমছে। অনেক বৃদ্ধাশ্রমে এখন নিরাপত্তা, চিকিৎসা, বইপড়া, বিনোদন, ভ্রমণের সুবিধা আছে। ঘরে সন্তান বা আত্মীয়ের সান্নিধ্য না পেলে সমবয়সীদের সঙ্গে বৃদ্ধাশ্রমে থাকাই শ্রেয়। পাশ্চাত্যে যারা বৃদ্ধাশ্রমে যান না তারা নিঃসঙ্গতা কাটাতে কুকুর-বিড়াল পোষেন। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ ও দরিদ্র দেশ হওয়ায় প্রবীণদের সমস্যা ব্যাপক। সরকার বয়স্ক ভাতা চালু করলেও তা পর্যাপ্ত নয়। সরকারি-বেসরকারি বৃদ্ধাশ্রমও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। যে পরিবারে সন্তানের সামর্থ্য নেই, সেসব মা-বাবার ভরণপোষণ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেয়া উচিত। নচিকেতার গান শুনে যারা কেঁদেছেন, সামর্থ্যবানদেরও বৃদ্ধাশ্রম গড়ার শপথ নেয়া দরকার।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

তরুণ সমাজের চিন্তার মাধ্যমে দেশ গঠন সম্ভব

একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি সামাজিক পরিবর্তনের একটি প্রধান চালিকাশক্তি। মানুষ তাদের ˆদনন্দিন জীবনে সেই অগ্রগতির প্রভাব অনুভব করে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পারস্পরিক সম্পর্ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি দরিদ্র দেশ, তার পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেনো, সাধারণত যুদ্ধ বা সংঘাতের দ্বারা ব্যাহত না হলে এগিয়ে চলতে থাকে। নেতৃত্বের গুণমান এবং জনগণের সৃজনশীলতা ও পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে সেই অগ্রগতি ধীর বা দ্রুত হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিশ্বায়নের শক্তি। বাংলাদেশের ১৬০ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে সবসময় এমন স্বপ্নদ্রষ্টারা রয়েছেন, যারা নিজেদের জীবন এবং অন্যদের জীবন উন্নত করতে চান। এই সম্মিলিত শক্তিই ব্যাপক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির মধ্যেও দেশ ও অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। মানুষ গ্রাম, শহর এবং পল্লীসমাজ সবখানেই অগ্রগতির আদর্শ অনুসন্ধান করে। কিন্তু মৌলিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মানুষ প্রায়ই এক ধরনের উদাসীনতা প্রদর্শন করে। তবে আমি মনে করি, বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রে রূপান্তরমূলক পরিবর্তন নিয়ে বিদ্যমান নীরবতার পেছনে দু’টি কারণ রয়েছে। আমি মনে করি, একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে মৌলিক পরিবর্তন দুইভাবে ঘটতে পারে। প্রথমত, মানুষকে এই বিষয়ে আশ্বস্ত হতে হবে যে প্রতিশ্রুত পরিবর্তন বাস্তবেই ঘটবে এবং যারা সেই পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলছেন তারা বিশ্বাসযোগ্য। বিশ্বাস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এটি শুধু শিক্ষা ও দক্ষতার বিষয় নয়; বরং সততা, নৈতিকতা এবং সক্রিয় সম্পৃক্ততার সঙ্গেও সম্পর্কিত। মানুষ সাধারণত দেখতে চায় যে যারা পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছেন, তারা বৃহত্তর স্বার্থে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করেছেন, ঝুঁকি নিয়েছেন এবং অবিচল অঙ্গীকার প্রদর্শন করেছেন। দ্বিতীয়ত, পরিবর্তন ঘটতে পারে যদি দুঃশাসন নিজস্ব ভারেই ভেঙে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে একটি বড় সংকট সৃষ্টি হয় এবং লাখো সাধারণ মানুষ হঠাৎ করেই তাদের জীবিকা নিয়ে গুরুতর হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং অত্যন্ত অস্থির একটি দেশ শাসন করা সহজ নয়। এই কারণেই দীর্ঘমেয়াদি কর্তৃত্ববাদী শাসন শেষ পর্যন্ত টেকসই হয় না। কেউ কেউ এমন একটি পতনের অপেক্ষায় থাকতে পারেন। কিন্তু তার পরিণতি হতে পারে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য, যা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন সৃষ্টি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত, এমন একটি পরিবর্তনের সুফলও আবার ভিন্ন একটি অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে।স্বাধীনতার জন্য জনগণের নিজস্ব সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই। এমন সংগ্রাম দীর্ঘ, কঠিন এবং নানাবিধ বাধায় পরিপূর্ণ। দুর্ভাগ্যবশত, খুব কম মানুষই সেই পথে হাঁটতে ইচ্ছুক। যারা হাঁটেন, তারাই শ্রদ্ধার যোগ্য হয়ে ওঠেন। তারাই প্রকৃত নেতা হয়ে ওঠেন। তবে নেতৃত্ব নিজেই সামাজিক রূপান্তরের সমগ্র প্রক্রিয়ার কেবল একটি অংশ। একজন নেতার আবির্ভাব দীর্ঘ সময়ের পরীক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং ভুল-শুদ্ধির মধ্য দিয়ে ঘটে। বাংলাদেশে যারা বছরের পর বছর গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছেন যদিও অনেক সময় আপসও করেছেন তারা মূলত পূর্ববর্তী প্রজন্মের মানুষ। বর্তমান রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলো অনেক দিক থেকেই সেই আগের সংগ্রামের সুফলভোগী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সমকালীন নির্বাচনী গণতন্ত্রের ব্যবস্থা সেইসব সংগ্রামেরই ফল। দেশকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে বিকল্প নেতৃত্ব এবং একটি নতুন বয়ান নির্মাণ প্রয়োজন, যার কোনোটিই রাতারাতি সৃষ্টি হতে পারে না। একজন ব্যক্তি নিজের জীবনমান উন্নত করার জন্য জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় ব্যয় করতে পারেন। কিন্তু একটি সমাজের মূল্যবোধ পরিবর্তন করতে হলে শত শত, হাজার হাজার মানুষের শিক্ষা, অভ্যাস এবং আচরণ পরিবর্তন করতে হয়। এ কারণেই একটি সামাজিক ব্যবস্থা এক, দুই কিংবা দশ বছরের মধ্যে পরিবর্তিত হয় না। প্রজন্ম পেরিয়ে যায়। একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক রূপান্তর হলো শত শত ও হাজার হাজার সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘটিত অসংখ্য ক্ষুদ্র পরিবর্তনের সমষ্টি।এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের কেন্দ্রীয় বয়ানে পরিণত হয়েছিল, যা পরে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ নামে পুনঃব্র্যান্ডিং করা হয়। এটিকে উন্নয়নের প্রতীক, জনসেবা সম্প্রসারণের একটি পদ্ধতি এবং নাগরিক ক্ষমতায়নের একটি মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। আমাদের বলা হয়েছিল যে ডিজিটাল সংযোগ মানেই অগ্রগতি, মোবাইল ব্যাংকিং মানেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সিসিটিভি ক্যামেরা মানেই নিরাপত্তা এবং জাতীয় ডাটাবেস মানেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা। কিন্তু বাস্তবে এই কাঠামো ধীরে ধীরে এমন একটি নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার যন্ত্রে পরিণত হয়, যেখানে প্রযুক্তি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নয়, বরং নীরব আনুগত্য গড়ে তোলার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নয়, বরং প্রশ্নহীন আনুগত্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা জোরদার করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের রাষ্ট্র নির্মাণ কৌশলের একটি অংশ। এর মাধ্যমে প্রযুক্তিকে আধুনিকতার বাহ্যিক চিত্র তুলে ধরার জন্য ব্যবহার করা হলেও মানুষকে আরও গভীর অন্ধকারে রাখা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, যার মাধ্যমে সামান্য ভিন্নমতও কঠোরভাবে দমন করা হতো; বহু ক্ষেত্রে মানুষ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কারাবরণ, গুম এবং এমনকি মৃত্যুর শিকার হয়েছে।এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্প কার্যত এমন একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করেছে যারা তথ্য গ্রহণ করে, কিন্তু সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করে না। এই নাগরিকরা স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে, ফরম পূরণ করে এবং ক্যামেরার সামনে দাঁড়ায়, কিন্তু খুব কমই রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে। তারা সার্ভারের আপডেট নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে, কিন্তু গণতন্ত্রের ধারণা সম্পর্কেই উদাসীন থাকে। এই একমাত্রিক নীরবতার বিপরীতে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব একটি মোড় ঘোরানোর মুহূর্তের ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল রাজপথের একটি আন্দোলন ছিল না; বরং ডিজিটাল পরিসরেও একটি বিকল্প বয়ানের সূচনা করেছিল। ভিডিও, ইনফোগ্রাফিক, প্রামাণ্যচিত্র, অনুবাদ এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ চিন্তাশীল ডিজিটাল প্রতিরোধের নতুন রূপ নির্মাণ শুরু করে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে তথ্যপ্রযুক্তি কেবল রাষ্ট্রের নজরদারির বাহন হওয়ার প্রয়োজন নেই; এটি বিকল্প সংগঠন এবং সম্মিলিত কর্মকাণ্ডেরও একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। আন্তোনিও গ্রামশির ভাষায়, তারা ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’-এ পরিণত হয়েছে—এমন ব্যক্তি, যারা বিদ্যমান ব্যবস্থার ভাষা পুনরাবৃত্তি না করে, প্রতিরোধের নতুন বয়ান সৃষ্টি করতে সক্ষম।তরুণরা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে একটি স্মার্টফোন শুধু টিকটকের জন্য ব্যবহৃত একটি যন্ত্র নয়; এটি রাষ্ট্র সম্পর্কে চিন্তা করার একটি মোবাইল প্ল্যাটফর্মও হতে পারে। একটি ফেইসবুক পোস্ট একটি ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হতে পারে। একটি টেলিগ্রাম চ্যানেল বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। তাদের অনেকেই শুধু প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ নয়; নৈতিকভাবে দৃঢ় এবং রাজনৈতিকভাবেও সচেতন। এই অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে রাষ্ট্র সম্পর্কে একটি বিকল্প কল্পনার পথ উন্মুক্ত করে—যাকে আমরা বলি ক্রিটিক্যাল বাংলাদেশ: এমন একটি চিন্তাশীল, নৈতিক এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের কল্পনা, যা প্রচলিত উন্নয়নের মিথের বাইরে বিকল্প বাস্তবতা নির্মাণ করতে চায়। এটি কোনো সরকারি প্রকল্প নয়। এটি এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন, যা চিন্তাশীল, জবাবদিহিমূলক, নৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে মুক্ত। এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনার স্থান নয়, বরং বিতর্ক ও মতভেদের ক্ষেত্র। যেখানে গণমাধ্যম প্রচারণার যন্ত্র নয়, সত্য অনুসন্ধানের প্ল্যাটফর্ম। যেখানে তরুণরা কেবল ভোটার নয়, বরং ধারণা সৃষ্টির সহ-নির্মাতা।প্রযুক্তি নাগরিকদের সহযোগী হতে পারে, কিন্তু যখন এটি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা গণতন্ত্রের শত্রু হয়ে ওঠে। প্রশ্নহীন উন্নয়ন আধুনিক দাসত্বের এক ধরনের রূপ। মৌলিক প্রশ্ন হলো: আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই? এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে এক ক্লিকেই নাগরিকদের নীরব করে দেয়া যায়, নাকি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে একটি মাত্র প্রশ্নই পুরো ব্যবস্থাকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে পারে? বাংলাদেশের বহু তরুণ এখনও রাজনীতি থেকে দূরে রয়েছে, কারণ তাদের ˆশশব গড়ে উঠেছে ভয়, নজরদারি এবং প্রোপাগান্ডার মধ্যে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম তাদের সামনে এমন একটি আদর্শ উপস্থাপন করেছিল, যেখানে বিরোধিতা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহ, প্রশ্ন তোলা মানেই ষড়যন্ত্র, আর সমালোচনা মানেই বিদেশি স্বার্থের সেবা করা। সুতরাং, সমালোচনামূলক চিন্তা বনাম ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’—এটি এমন একটি নিয়ন্ত্রিত তথ্যব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল, যা বাহ্যিক আলোকচ্ছটায় উজ্জ্বল হলেও জ্ঞান ও সমালোচনামূলক চিন্তার অনুপস্থিতিতে অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। তবুও এখনও এমন তরুণ রয়েছে, যারা শুধু ডিজিটাল দক্ষতাই নয়, সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতাও অর্জন করছে। তারা জানে কীভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে হয়, সত্যতা যাচাই করতে হয় এবং নিজেদের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হয়। এই তরুণদের মাধ্যমেই একটি নতুন নাগরিক সমাজ গড়ে উঠতে পারে—যা শুধু কাগজে-কলমে নয়, বরং নৈতিক সাহস, বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে প্রযুক্তি বিচ্ছিন্নতার নয়, সংযোগের হাতিয়ার। যেখানে প্রতিটি মোবাইল ফোন শুধু সেলফি তোলার যন্ত্র নয়, বরং সত্যের সাক্ষী। এই অর্থে, ক্রিটিক্যাল বাংলাদেশ কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়; এটি সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পুনর্গঠনের একটি প্রকল্প। এটি মানুষকে রাষ্ট্রের বয়ানকে প্রশ্ন করতে, গণমাধ্যমের বার্তা যাচাই করতে এবং নিজেদের অবস্থান থেকে নতুন বয়ান নির্মাণ করতে আহ্বান জানায়—এমন বয়ান, যা প্রতিক্রিয়াশীল নয়; বরং মুক্তিকামী, ভবিষ্যতমুখী এবং সৃজনশীল।আমাদের যুব সমাজ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে একটি নতুন বাংলাদেশের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, এবং সেই আশার কেন্দ্রে রয়েছে এই বিপ্লবী চিন্তার প্রজন্ম। যদি রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব এই প্রজন্মের হাতে ন্যস্ত হয়, তবে উন্নয়ন হবে অংশগ্রহণমূলক, গণতন্ত্র প্রশ্ন করার সংস্কৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে এবং প্রযুক্তি স্বাধীনতার পথে পরিণত হবে। নতুন প্রজন্মের প্রতি একটাই আহ্বান: নীরব থেকো না। নীরবতা অন্যায়ের সঙ্গে এক ধরনের সহযোগিতা। প্রশ্ন করো—কারণ প্রশ্নহীন উন্নয়ন এক ধরনের নীরব মৃত্যু। আর সেই মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতা একমাত্র প্রশ্নেরই রয়েছে। কোনো পেশার প্রক...ত মর্যাদা তার সামাজিক ক্ষমতা বা প্রভাব দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় তার দায়বদ্ধতা, আত্মশুদ্ধির সক্ষমতা এবং জনগণের আস্থা অর্জনের ক্ষমতা দিয়ে। অপমানের ভাষা সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা কখনও সমস্যার সমাধান দেয় না। সমাধান আসে সংলাপ, আত্মসমালোচনা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকে। এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে কথায়, আচরণে এবং আত্মসমালোচনায়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

ব্ল্যাঙ্ক চেক বা সিকিউরিটি চেক কি গলার ফাঁস?

ব্যবসায়িক লেনদেন, ব্যাংক লোন কিংবা ব্যক্তিগত ধারদেনার ক্ষেত্রে ‘সিকিউরিটি চেক’ বা ব্ল্যাঙ্ক চেক’ দেয়ার প্রচলন আমাদের সমাজে বেশ পুরোনো। অনেকেই বিশ্বাসের খাতিরে শুধু একটা স্বাক্ষর করে ফাঁকা চেক অন্য পক্ষের হাতে তুলে দেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখন, যখন সেই বিশ্বাসের অপব্যবহার করে চেকে ইচ্ছামতো মোটা অঙ্কের টাকা ও তারিখ বসিয়ে আদালতে এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা ঠুকে দেয়া হয়।হঠাৎ এমন আইনি মারপ্যাঁচে পড়ে অনেকেই দিশেহারা হয়ে যান। কিন্তু আইন কাউকে অন্ধভাবে শাস্তি দেয় না। আপনার দেয়া চেকটি যদি সত্যিই কেবল ‘সিকিউরিটি’ বা ‘নিরাপত্তা স্মারক’ হিসেবে দেয়া হয়ে থাকে এবং সেখানে যদি জালিয়াতি করা হয়, তবে আদালতে মুখের কথায় নয়, আইনি ও ˆবজ্ঞানিক যুক্তিতে লড়াই করতে হবে।আদালতে আসামিপক্ষে লড়াই করার এবং খালাস পাওয়ার প্রধান ৫টি আইনি অস্ত্র নিচে আলোচনা করা হলো:১. চেকের ভিন্ন হাতের লেখা ও ভিন্ন কালি (ধারা ৮৭)একটি চেকের মূল চরিত্র হচ্ছে এর সত্যতা। হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ৮৭ ধারা অনুযায়ী, চেকে যদি ড্রয়ারের (চেক দাতা) সম্মতি ছাড়া কোনো মৌলিক পরিবর্তন করা হয়, তবে সেই চেকটি বাতিল বলে গণ্য হবে। আপনার স্বাক্ষর যদি সঠিকও হয়, কিন্তু চেকের ভেতরের তারিখ, টাকার অঙ্ক এবং নাম যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন হাতের লেখায় এবং ভিন্ন কালিতে লেখা হয়, তবে তা আদালতে বড় একটি ডিফেন্স। বাদীকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, এই ভিন্ন লেখার পেছনে চেক দাতার সম্মতি ছিল।২. স্বাক্ষর থাকলেই কি তা ‘ইস্যু করা চেক’?আমাদের দেশের উচ্চ আদালতের একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত রয়েছে এম.এ মজিদ বনাম মো. আব্দুল মোতালেব (৫৬ ডিএলআর, ৬৩৬) মামলায়। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট বলেছেন:‘আসামির স্বাক্ষর, টাকার অঙ্ক এবং পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখায় থাকলে এর ধারা ৩ (ন) অনুসারে উহাকে ‘ইস্যুয়েন্স অব চেক’ বলা যাইবে না।’ অর্থাৎ, আপনি শুধু স্বাক্ষর দিয়েছেন মানেই এই নয় যে আপনি পুরো চেকটি ওই টাকা বসিয়ে আইনসম্মতভাবে ইস্যু করেছেন।৩. প্রমাণের দায় কার? (৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭):সাম্প্রতিক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির হলো এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র (৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭) মামলা। এই সিদ্ধান্তে মহামান্য হাইকোর্ট আরও কঠোরভাবে বলেছেন যদি ড্রয়ার নিজে চেক সম্পূর্ণ পূরণ না করেন এবং হস্তাক্ষরে স্পষ্ট অসঙ্গতি থাকে, তবে বাদীকে (যিনি মামলা করেছেন) অবশ্যই আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে, অন্যের দ্বারা চেকটি পূরণের ক্ষেত্রে চেক দাতার স্পষ্ট অনুমতি বা সম্মতি ছিল। বাদী এই ব্যাখ্যার সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারলে মামলার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়।৪. ফরেনসিক পরীক্ষা: আসামির মৌলিক অধিকারঅনেকেই ভাবেন, চেকে স্বাক্ষর যখন মিলে গেছে, তখন আর বাঁচার উপায় নেই। এটি ভুল ধারণা। সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী, চেকের লেখার বয়স এবং কালির ভিন্নতা পরীক্ষার জন্য সরকারি ফরেনসিক ল্যাবে (যেমন সিআইডি বা পিবিআই-এর হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞ) চেকটি পাঠানোর আবেদন করা আসামির আইনগত অধিকার।ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের দু’টি বিখ্যাত সিদ্ধান্তত্ম কল্যাণী ভাস্কর বনাম এম.এস. সম্পূর্ণম (২০০৭) এবং টি. নাগাপ্পা (২০০৮) মামলায় বলা হয়েছে, আইনে বাদীর পক্ষে প্রাথমিক অনুমানের সুযোগ থাকলেও, আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ বা ন্যায়বিচারের অধিকার কেড়ে নেয়া যাবে না। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যদি প্রমাণ হয় যে স্বাক্ষরটি ৫ বছর আগের আর ভেতরের লেখাগুলো ২ মাস আগের তবে জালিয়াতি সহজেই ধরা পড়বে।৫. সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার অপরাধ নয়মহামান্য আপিল বিভাগের একটি লিডিং জাজমেন্ট হলো হুমায়ুন রশিদ বনাম শাহিন আকন্দ (৭১ ডিএলআর (এডি))। এই মামলার মূল নীতি হলো কোনো ব্ল্যাঙ্ক চেক যদি শুধুমাত্র সিকিউরিটি বা জামানত হিসেবে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে পাওনাদার যদি নিজের ইচ্ছামতো বড় অঙ্ক বসিয়ে তার অপব্যবহার করে মামলা করে, তবে এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার অধীনে কোনো অপরাধ গঠিত হয় না।শেষ কথাআইন সচেতনতাই আইনি ফাঁদ থেকে বাঁচার প্রধান উপায়। কারো বিরুদ্ধে সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার করে মিথ্যা মামলা হলে, ভয় না পেয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে শুরুতেই চেকটি ফরেনসিক পরীক্ষার আবেদন করা উচিত এবং উচ্চ আদালতের এই চমৎকার নজিরগুলো যুক্তিতর্কের সময় উপস্থাপন করা উচিত। আইন যেমন অপরাধীকে সাজা দেয়, তেমনি কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যাতে জালিয়াতির শিকার না হন, তার সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।সতর্কতা: যেকোনো আইনি লেনদেনে ব্ল্যাঙ্ক চেক দেয়া থেকে বিরত থাকুন। যদি দিতেই হয়, তবে চেকে ‘সিকিউরিটি চেক’ লিখে দিন এবং কোনো চুক্তির অধীনে দিচ্ছেন তা লিখিত আকারে রাখুন।[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

রম্যগদ্য: ফ্যাসিস্ট খ্যাদাইলাম, ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম

“হি হি হি, আনন্দের আর সীমা নাই, দারুণ কোইছেন, “ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যাদাইলাম, ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম”। “ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যেদাইলাম, হেইডা তো, সিম্পেল, বুইজাইলচ্চি, কিন্তু ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম, এইডার মাজেজাটাতো ঠিক বুজা পারতাছিনা?”“ওম্মা, কচি খোকা! এই সামান্য জিনিসটা তুমি বুঝতে পারছো না! কথাটাতো একদম জলবৎ তরলং, ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যাদাইলাম, ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম। একজনকে তাড়ালাম আর একজনের ভয়ে পালালাম।”“একজনরে খ্যাদাইলেন, বুঝলাম, আর একজনের ভয়ে পলাইলেন? কিন্তু কখন পলাইলেন কার ভয়ে পলাইলেন, তার নাম কিতা? কিছুইতো বুজা পারতাছিনা?”“ওই জঙ্গল, ভাশুরের নাম কি মুখে নেয়া যায়?”“না, কহোনই না। ভাশুর তো শশুরেরই রিডিউস ফুটোকপি, হ্যার নাম মুখে ক্যান, স্বপ্নেও দ্যেহন যাইবো না। বুজছোইন!”“জ্বী, আমি ঠিকই বুঝেছি, তাই যার ভয়ে পালালাম তার নাম মুখে নিচ্ছিনা, আর প্রিন্ট মাধ্যমেও প্রকাশ করছি না।”“তয় আপনে যে এ্যতো ফুটানি মারতাছেন, ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যাদাইলাম, জনগনের সার্পুট না পাইলে, ফ্যাসিস্ট সরকাররে খ্যেদাইতে পারতেন?”“তুই কি, আজকাল ইউটিউব দ্যেখা ছেড়ে দিয়েছিস, ইউটিউবে দেখিসনি সবাই ক্যেমন গাল ফুলিয়ে বলছেন, যে আমরা জুলাইয়ের পুরো আন্দোলন পরিচালনা করেছি। আমাদের নাম প্রকাশ পেলে, জনগনের সাপোর্ট পাবনা বলেই আমাদের নাম প্রকাশ করিনি। আর জনগনও আমাদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে সংগ্রামকে বেগবান করে সহজেই সাম্রাজ্যবাদ কায়েম করলাম।”“কিন্তু আপনে তো, দেড় হাজার জীবন বলি দিয়া, এক ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যেদাইয়া আর এক ইউনুস ফ্যাসিস্ট সরকার আইন্না বসাইলেন। লাভটা কি হোইলো!’“অ্যাঁএ, ড. ইউনূস, ফ্যাসিস্ট! তুই ফ্যাসিস্টের মানে বোজো? ফ্যাসিস্ট হোইলো গোঁড়া জাতীয়তাবাদ, এক ব্যাক্তির ইচ্ছার ওপর দেশ চলবে। বিরোধী দলকে দমন, পীড়ন, মারণ, গুম-হত্যা, সেভেন মার্ডার, ব্যাক্তির কোনোই ইচ্ছা থাকবে না, গোষ্টির মতো চলতে হবে। যেটা বিগত কালে তোরা বাংলার বুকে দেখেছিস।”“ক্যা ইউনূসের সময় আপনে গুম-খুন করেন নাই?”“আরে ভাই ওই সময় গুমের কোনোই ইতিহাস নেই। আরে ব্যাটা বিশ্ব ইতিহাসে ফ্যাসিস্ট হচ্ছেন মাত্র দুইজন, বেনিতো মুসোলিনি (১৯২২-১৯৪৩) আর আমাদের জামার্নির এ্যাডলফ হিটলার (১৯৩৩-১৯৪৫) আর তোদেরটা সেই তুলনায় চুনোপুঁটি, নস্যিরে নস্যি। তোদের সময় এক সেনাসদস্য ভাষ্যানুসারে এক সেনা কর্মকর্তার গুম খুনের সংখ্যা আর কটা হবে, তিনশ’চারশ’ এক হাজার, দুহাজার, তিন হাজার-পাঁচ হাজার, কিন্তু এক হিটালেরর সময় সারা বিশ্বে মানুষ মারা গেছে ছয় (৬) কোটি। বুঝতে পারিস কোথায় চার-পাঁচ হাজার আর কোথায় ছয় কোটি! আর ড.ইউনুসের সময় কয়টা হাতে গোনা যায়।”“বুলডোজার দিয়া বাড়ির চৌকাঠ পর্যন্ত গুড়ায়া দিলেন, মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরাইলেন, চিফের গালে জুতার বাড়ি মারলেন, এইগুলা ফ্যাসিস্টের কাম না?”“শোন ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রতীক মাঝে একটি কুঠার, এই হচ্ছে ততকালীন ফ্যাসিস্টের প্রতীক। ড. ইউনূসের সময় এই প্রতীক দেখা যায়নাই। তিনি কখনোই তার ইচ্ছা মতো কাজ করেন নাই। জনগন যা চেয়েছে তিনি তাতে সাপোর্ট দিয়েছেন।”“হ’ নন ডিসক্লোজার এ্যাগ্রিমেন্ট তো জনগন চাইছিল?”“আরে এটাতো ততকালীন সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন, ড. ইউনূস কি করবেন। সবাই জনগণের ইচ্ছা।”“হ, জনগন শুয়োর খাওনের এ্যাগ্রিমেন্টে সই করবো! আন্নে হাগলনি কোনো!”“আমাকে এ’কথা বলে লাভ নেই, তোরা তখন ড.ইউনুসকে ক্যাপ্টেন বানিয়েছিস, ক্যাপ্টেন যা করবার তার লাইসেন্স তাকে তোরাই দিয়েছিস!”“আচ্ছা বুজছি বুজছি ড. ইউনূস ফ্যাসিস্ট হোইলে তারেও আপনেরা খ্যেদাইতেন, কিন্তু অহন কন আপনেরা ভাইগ্যা আইলেন কার ডরে?”“দ্যেখ একে ঠিক ভাইগ্যা আইলাম বা পালিয়ে এলাম বললে হবে না। এটা হচ্ছে মহান বাম পন্থীনেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেলিনের কথা, “ওয়ান স্টেপ ফরওর্য়াড, টু’স্টেপস ব্যাক” মানে যদিও তুমি সংগ্রামে একপা এগিয়েছো, তাহলে আরোও আগানোর জন্য প্রয়োজনে দু’পা পিছিয়ে আসতে পারো।”“ও! তার মানে আপনেরা এখন পলান নাই? ভ্লাদিমির ইলিচ লেলিনের কথা মত, “ওয়ান স্টেপ ফরওর্য়াড, টু’স্টেপস ব্যাক গিয়ার মারছেন। তারপর আবার ঝোপ বুইজ্ঝা কোপ দিবেন!”“ব্যাপারটা অনেকটা তাই। যেমন দ্যেখ বর্তমানে বাংলার জনগন প্রায় ৫৪ বছর ধরে লাঞ্ছনার গঞ্জনার বঞ্চনার শিকার হতে হতে তোরা আজ সরকারের প্রতি, নেতাদের প্রতি, মন্ত্রীদের প্রতি আস্থা হারিয়ে, আজ জীবন ছেড়ে মরণের পরে শুখে থাকার জন্য লালায়িত। আর এই লালসা তোদের জীবন বিমুখ করে, চুরি-ডাকাতি, খুন-জখম রাহাজানী, অবলা নারীর প্রতি অত্যাচার সব কিছুই সহজ ভাবে গ্রহণ করছিস, মেনে নিচ্ছিস। কিন্তু ক্যেন ক্যেন, ক্যেন সমাজে এই বিশৃঙ্খলা, কোনো সুস্থ্য মস্তিষ্ক কি অনাচার মেনে নিতে পারে!”“না না না, এইডা, এই অতিআচার মাইনষ্যে ক্যেমনে মাইন্না নিবো কন, কন, কন?”“কিন্তু তোরা তো সকাল-সন্ধ্যা সব মেনে নিচ্ছিস। বিগত ৫৪ বছর খালি এ’দল আর ও’দল করে মরলি। কাজের কাজ কিছুই হলোনা, তোরা যেই তিমিরে সেই তিমিরেই পড়ে রইলি।”“আমরা সাধারণ মাইনষ্যে কি করমু কন?”“খামাখা ফালতু কথা বলিস না, “আমরা সাধারণ মাইনষ্যে কি করমু কন!” আরে তোরা সাধারণ মানুষ এক হলে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনিস, তোরা সাধারণ মানুষ এক হলে ˆস্বরাচার হোমোকে ফেলতে পারিস, তোরা সাধারণ মানুষ এক হলে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়, আর তুই কিনা বলিস “আমরা সাধারণ মাইনষ্যে কি করমু কন!”“ক্যান এইবার তো ভুটে আমরা আমাগো মার্কায় ভুট দিছিলাম কিন্তু ফলতো পাইলাম না!”“কোন মার্কায় ভোট দিয়েছিলি গ্রীক গডেস মানে গ্রীসের দেবী থেমিসের বাঁ-হাতে ধরে রাখা প্রতীককে তুই আপামর জনসাধারণের মুক্তির প্রতীক ভেবেছিস?”“গ্রীসের দেবী কন আর যাই কন, হ্যেই যেইডা বাম হাতে ধইরালচ্চে, হেই মার্কাই আমাগো গরীবের মুক্তির মার্কা।”“আরে ভাই তুই একজন নারী, গ্রীসের দেবী থেমিসের মুর্তি হাইকোর্টের সামনে থেকে নিয়ে চিপায় ফেলে দিলি। কারণ তোর মতে নারী নেতৃত্ব হারাম! আবার সেই দেবী থেমিসেরই বাঁ-হাতে ধরে থাকা বস্তুটি, প্রতীকটি, মার্কাটি গরীবের মুক্তির মার্কা হয়ে উঠল! আশ্চর্য্য তুই যেই দেবীটাকেই ঘৃণা করিস আবার সেই দেবীর বাম’হাতে ধরে থাকা মার্কাকে মাথায় তুলে নাচিস! লজ্জা হয়না তোর!”“ভাই লাজ লজ্জা বুঝিনা, আমাগো দেশে নারী নেতৃত্ব চলবো না আমাগো লাগলে একটা হিটলার আইন্নাদেন হ্যেয়ই দেশ চালাক, গরীবরে বাঁচাক। কিন্তুক কুনো বেডি আইন্না দিয়েন না।”“দেবী থেমিসকে অপমান করে, তার বাঁ’হাতে ধরে থাকা প্রতীক নিয়ে নাচা নাচি করলে মহান সৃষ্টিকর্তা ব্যেজার হন। যার জন্য আমরা মানে মানে, চুপি সারে সরে এলাম। যদি কোনোদিন সত্যিকারে মানুষ হোই, মানুষকে মানুষ মনে করে শ্রদ্ধা করতে পারি, সেইদিন আবার আসবো মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে, ততদিন জনগণের চোখের আড়ালে বা লোক চক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে থাকি।”“দেখি আমরা যদি ব্যেবাগ গরীবরা এক হোইতে পারি, তায়লে দেবী থেমিসরে থুয়া কেবল হ্যের বাম হাতের মার্কা লয় নাচুমনা। নাচলে দেবীরে লয়া দেবীর মার্কালয়া নাচুম। কিন্তুক আপনি যে কোইলেন, “ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যেদাইলাম, ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম। তয় এই ভাশুরটা ক্যেডা?”“আরে বুঝিসনা ক্যেন, ভাশুরের নাম মুখে আনা নিষেধ।”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

ভিডিও আরও দেখুন

জিম্বাবুয়েতে বাংলাদেশের চরম বিপর্যয়

হারারেতে বাংলাদেশকে  ইনিংস ও ৮৫ রানে হারিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের সবচেয়ে বড় জয়ের রেকর্ড গড়েছে জিম্বাবুয়ে।আগের দিনের ১ উইকেটে ৪০ রান নিয়ে গতকাল দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে বাংলাদেশ মাত্র ৪৫ ওভারে ১৮৫ রানেই অলআউট হয়ে যায় তারা। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ১৪০ রানের জবাবে স্বাগতিকরা করে ছিল ৪১০রান। পাঁচ দিনের ম্যাচ শেষ আড়াই দিনেই।গতকাল দিনের দ্বিতীয় ওভারেই ২২ রান করে সাজঘরে ফেরেন ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়। ব্লেসিং মুজারাবানির গুড লেংথ থেকে লাফিয়ে ওঠা ডেলিভারি জয়ের ব্যাটের কানায় লেগে গালিতে সহজ ক্যাচে পরিণত হয়।প্রথম ইনিংসে হাফসেঞ্চুরি করে সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ গড়া মোমিনুল এই ইনিংসে ব্যর্থ হন। মুজারাবানির ফুল ডেলিভারি ঠেকাতে গিয়ে স্লিপে ব্র্যাড ইভান্সের দুর্দান্ত ক্যাচে বিদায় নেন তিনি। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিম ৬১ রানের জুটি গড়ে বিপর্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে বাংলাদেশের সংগ্রহ শতরান পার হয়। বড় স্কোরের ইঙ্গিত দেওয়া শান্ত ৩০ রান করে ফুলটস বলে ইনসাইড-এজ হয়ে আউট হন।কিছুক্ষণ পরই ৩৪ রান করে বিদায় নেন মুশফিকও। লেগ সাইডের একটি ডেলিভারি তার ব্যাটের কানা ছুঁয়ে উইকেটরক্ষকের হাতে জমা পড়ে। মধ্যাহ্ন বিরতি ৪ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ ১১৭/৫ রান। দ্বিতীয় সেশনেও কোনো স্বস্তি মেলেনি। ক্রিজে পা আটকে রেখে খেলতে গিয়ে মুজারাবানির বলে এজ হয়ে ৯ রানে আউট হন অভিষিক্ত তাওহিদ হৃদয়। রিচার্ড এনগারাভার শিকার হওয়ার আগে ২৫ রানের ইনিংস খেলার পথে কয়েকটি বাউন্ডারি হাঁকান অমিত হাসান। শেষ ব্যাটার হিসেবে হাসান মাহমুদ আউট হওয়ার মাধ্যমে ইনিংস ব্যবধানে বিশাল হার নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের।জিম্বাবুয়ের সবচেয়ে বড় টেস্ট জয়ের রূপকার মুজারাবানি ৬৫ রানে ৪ উইকেট নেন। অন্যদিকে এনগারাভা তিনটি ও নিয়ামহুরি দুটি উইকেট শিকার করেন।জিম্বাবুয়ের কাছে বাংলাদেশ ইনিংস ব্যবধানে সবশেষ হেরেছিল সেই ২০০১ সালে। দুই দলের প্রথম টেস্ট ছিল সেটি, টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের ছিল দ্বিতীয় ম্যাচ।জিম্বাবুয়ের টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয় এটি। আগের সেরা জয়টি ছিল ঠিক আগের টেস্টেই। গত অক্টোবরে আফগানিস্তানকে হারায় তারা ইনিংস ও ৭৩ রানে।দুই দল এখন খেলবে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ, যেটি শুরু আগামী সোমবার।

জিম্বাবুয়েতে বাংলাদেশের চরম বিপর্যয়
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ১০১ জন