সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
টাঙ্গাইল থেকে শুরু হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি

টাঙ্গাইল থেকে শুরু হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখে দেশব্যাপী ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করতে টাঙ্গাইল যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই হবে টাঙ্গাইলে তার প্রথম সফর। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য কৃষকদের অধিকার রক্ষা, তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং কৃষিখাতকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা।সোমবার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে কৃষি ও কৃষিজাত শিল্পায়নে বিনিয়োগকারীদের সাথে মতবিনিময় শেষে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ‘নির্বাচনী বিজয়ের মাত্র দুই মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তার ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো একে একে বাস্তবায়ন করছেন। এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো কৃষকদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা।’প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও প্রটোকল অফিস সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল ৮টায় সড়ক পথে টাঙ্গাইলের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ১০টায় টাঙ্গাইলের সন্তোষে পৌঁছে মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর কবর জিয়ারত করবেন। সকাল সাড়ে ১০টায় টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে দেশব্যাপী প্রাক-পাইলটিং হিসেবে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন এবং কৃষক সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন। দুপুর সোয়া ১২টায় টাঙ্গাইল পৌর উদ্যানে আয়োজিত কৃষি মেলার উদ্বোধন করবেন।কৃষি কার্ডটি মূলত একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড, যা সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখার মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা ১০ ধরনের বিশেষ সুবিধা পাবেন বলে জানা গেছে। এরমধ্যে রয়েছে, ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি, সাশ্রয়ী সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা সরাসরি গ্রহণ, মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাজার তথ্য, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ, কৃষি বিমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধা এবং পিওএস মেশিনের মাধ্যমে সার, বীজ ও মৎস্য/প্রাণিখাদ্য কেনা। এছাড়াও ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের এই কার্ডের মাধ্যমে বছরে ২,৫০০ টাকা নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, প্রথম পর্যায়ে দেশের ১০টি জেলার ১১টি ব্লকে এই প্রাক-পাইলটিং কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এই পর্যায়ে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। আগামী চার বছরের মধ্যে সারা দেশে তিন ধাপে এই কার্ড বিতরণ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, যার মাধ্যমে প্রায় ৩০ লাখ কৃষক এই সুবিধার আওতায় আসবে। টাঙ্গাইলের উদ্বোধনী দিনে ১৫০০ জন কৃষকের হাতে ব্যক্তিগতভাবে এই কার্ড তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী।আমাদের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইল জেলাজুড়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশীদ ইতোমধ্যেই প্রস্তুতি পরিদর্শন করতে সেখানে অবস্থান করছেন।কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, প্রাক-পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতার আলোকে আগামী আগস্ট থেকে পাইলট কার্যক্রম এবং পরবর্তীতে দেশব্যাপী কার্যক্রম শুরু হবে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার। এর আগে ১০ মার্চ নারীপ্রধান পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে, যার আওতায় ৩৭,৫৬৭ জন উপকারভোগী মাসিক ২,৫০০ টাকা করে পাচ্ছেন। ৩০ মার্চ ১২৯ জন ক্রীড়াবিদকে ‘ক্রীড়া কার্ড’ ও বেতন কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। ১৪ মার্চ ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মানী ও ভাতার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
২ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

পহেলা বৈশাখ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক আত্মা

পহেলা বৈশাখ এলে আমরা লাল-সাদা পোশাকে রঙিন হয়ে উঠি। “শুভ নববর্ষ” বলে একে অপরকে আলিঙ্গন করি। মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিই। বাইরে থেকে দেখলে এটি নিছক একটি আনন্দের দিন। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, এই দিনটি শুধু উৎসব নয় এটি আমাদের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ পথচলার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।বাংলা নববর্ষের সূচনা মূলত মুঘল আমলে, সম্রাট আকবরের সময়। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে রাজস্ব আদায় সহজ করার জন্যই বাংলা সনের প্রবর্তন। সেই সময় থেকেই পহেলা বৈশাখ ছিল নতুন হিসাব, নতুন ফসল, নতুন আশার দিন। “হালখাতা” সেই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা, যেখানে ব্যবসায়ীরা পুরনো দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন বছরের সূচনা করেন। অর্থাৎ, শুরু থেকেই এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি, উৎপাদন ও জীবিকার সম্পর্ক।আজকের বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ কেবল সাংস্কৃতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বৈশাখকে কেন্দ্র করে দেশের পোশাক, হস্তশিল্প, মাটির পণ্য, খাদ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন হয়। হাজার হাজার মানুষ এই সময় অস্থায়ীভাবে কাজের সুযোগ পান। ঢাকার রমনা বটমূল থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার মেলা সবখানেই এক ধরনের ক্ষুদ্র অর্থনীতি সক্রিয় হয়ে ওঠে।তবে পহেলা বৈশাখের গুরুত্ব শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তান আমলে এই উৎসব ধীরে ধীরে বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। ধর্মীয় বিভাজনের বিপরীতে একটি অসাম্প্রদায়িক, বাঙালি পরিচয়ের ঘোষণা হিসেবে এটি শক্তিশালী হয়ে দাঁড়ায়। স্বাধীনতার পর এই উৎসব হয়ে ওঠে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক- যেখানে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে মানুষ একসঙ্গে উদযাপন করে।এই প্রেক্ষাপটে “মঙ্গল শোভাযাত্রা” একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রা আজ শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, শুভ শক্তির আহ্বান এবং সামাজিক সংহতির প্রতীক। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। যা প্রমাণ করে, পহেলা বৈশাখ কেবল বাংলাদেশের নয়, বিশ্বমানবতারও একটি সম্পদ।কিন্তু এই উজ্জ্বল ছবির ভেতরেও কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পহেলা বৈশাখ ক্রমেই বাণিজ্যিকীকরণের দিকে এগোচ্ছে। ফ্যাশন ব্র্যান্ড, করপোরেট প্রচারণা, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রদর্শনী- সব মিলিয়ে উৎসবের একটি বড় অংশ এখন বাজারকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। এতে অর্থনীতি চাঙা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এর মূল সাংস্কৃতিক আত্মা আড়ালে চলে যাচ্ছে।আরেকটি বাস্তবতা হলো শহর ও গ্রামের বৈশাখ উদযাপনের পার্থক্য। শহরের বৈশাখ অনেকটাই আয়োজননির্ভর, কখনো কখনো কৃত্রিম; আর গ্রামের বৈশাখ এখনও অনেকটাই সহজ, প্রাণবন্ত, প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত। এই ব্যবধান আমাদের ভাবতে বাধ্য করে আমরা কি আমাদের শিকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছি?নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। বড় আয়োজনের সঙ্গে বাড়ছে নিরাপত্তা শঙ্কা, ফলে উৎসবের স্বাভাবিকতা অনেক সময় সীমিত হয়ে যায়। অথচ এই দিনটি তো ছিল মুক্তির, উন্মুক্ততার, একসঙ্গে থাকার দিন।তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায় পহেলা বৈশাখ কি শুধু একটি দিন, নাকি একটি দীর্ঘ ইতিহাসের বহমান ধারা?সম্ভবত এর উত্তর আমাদেরই ঠিক করতে হবে। যদি আমরা এটিকে শুধু পোশাক, ছবি আর খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তাহলে এটি একদিনের উৎসব হয়েই থাকবে। কিন্তু যদি আমরা এর ভেতরের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করি, তাহলে এটি হয়ে উঠবে আমাদের জাতীয় পরিচয়ের শক্তিশালী ভিত্তি।সমাধান খুব জটিল নয়, কিন্তু সচেতনতা দরকার। নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে বৈশাখের ইতিহাস, এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় সংস্কৃতি, গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকজ উপাদানগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে উৎসবটি কেবল শহরকেন্দ্রিক না হয়ে ওঠে। আর বাণিজ্যিক দিক থাকলেও সেটি যেন সংস্কৃতিকে ছাপিয়ে না যায় এই ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।আমরা উন্নয়নের গল্প বলি, আধুনিকতার কথা বলি। কিন্তু একটি জাতির শক্তি তার শিকড়ে, তার ইতিহাসে, তার সংস্কৃতিতে। পহেলা বৈশাখ সেই শিকড়েরই স্মারক। তাই পহেলা বৈশাখ শুধু একটি নতুন বছর নয়, এটি একটি জাতির দীর্ঘ ইতিহাস, সংগ্রাম, অর্থনীতি ও আত্মপরিচয়ের ধারাবাহিকতা। এই উৎসব বেঁচে থাকুক শুধু ক্যালেন্ডারে নয়, আমাদের চেতনায়।আজ যখন আমরা বৈশাখ উদযাপন করি, তখন মনে রাখতে হবে এই উৎসব কোনো এক দিনের সাজ নয়, এটি একটি ধারাবাহিক চেতনা। যে চেতনায় আছে কৃষকের ঘামের গন্ধ, আছে লোকজ সুর, আছে প্রতিবাদের ইতিহাস, আছে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক আত্মা।আমরা যদি এই বৈশাখকে শুধু ছবির ফ্রেমে বন্দি করি, তাহলে হয়তো আনন্দ থাকবে, কিন্তু আত্মা থাকবে না। আর যদি আমরা এর ভেতরের ইতিহাস, মানুষের জীবনসংগ্রাম আর সংস্কৃতিকে ধারণ করি তাহলেই বৈশাখ সত্যিকারের বেঁচে থাকবে।পহেলা বৈশাখ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আমরা শুধু নতুন বছরকে নয় নিজেদেরও নতুন করে খুঁজে পাই।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গবেষক

এআই যুগে ওয়ার্ডপ্রেস ও শপিফাই: পরিবর্তনের ঢেউ ও টিকে থাকার লড়াই

ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, বরং একটি মৌলিক রূপান্তরের শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে| গত কয়েক বছরে এআই এমনভাবে এগিয়েছে যে এটি এখন ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, ই-কমার্স এবং সফটওয়্যার ব্যবসার প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলছে| বিশেষ করে ওয়ার্ডপ্রেস প্লাগইন এবং শপিফাই অ্যাপ ব্যবসার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান|বিশ্বব্যাপী বর্তমানে প্রায় ৪৩% ওয়েবসাইট ওয়ার্ডপ্রেস দিয়ে তৈরি, যা এটিকে সবচেয়ে বড় কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে| অন্যদিকে শপিফাই বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, যেখানে লক্ষাধিক ব্যবসা প্রতিদিন লেনদেন করছে| কিন্তু এআই-এর আগমনের ফলে এই দুই ইকোসিস্টেমের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে- এই ব্যবসাগুলো কি আগের মতো থাকবে, নাকি পুরোপুরি বদলে যাবে?ওয়ার্ডপ্রেস: সংকুচিত হচ্ছে কি বাজার?ওয়ার্ডপ্রেস প্লাগইন ব্যবসার একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে নির্ভর করেছে টাইম সেভিং টুলস এর ওপর| যেমন- বেসিক এসইও অপ্টিমাইজেশন, সিম্পল ফরম বিল্ডার্স, কনটেন্ট জেনারেটরস বা ইমেজ অপটিমাইজেশন টুলস| কিন্তু এআই এখন এই কাজগুলো মুহূর্তেই করে ফেলতে পারছে| একটি এআই টুল এখন কয়েক সেকেন্ডে এমন কনটেন্ট তৈরি করতে পারে, যা আগে একজন মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ধরে করতে হতো|এর ফলে সহজ ও একমাত্রিক প্লাগইনগুলো বাজারে তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারাতে শুরু করেছে| পাশাপাশি এআই-পাওয়ার্ড ওয়েবসাইট বিল্ডার্স (যেমন Wix AI বা অন্যান্য অটোমেটেড বিল্ডার) নতুন ব্যবহারকারীদের ওয়ার্ডপ্রেস-এর বাইরে নিয়ে যাচ্ছে| একজন নতুন উদ্যোক্তা এখন আর ওয়ার্ডপ্রেস শিখতে আগ্রহী নাও হতে পারেন; বরং তিনি এআই-কে নির্দেশ দিয়ে কয়েক মিনিটেই একটি সম্পূর্ণ ওয়েবসাইট তৈরি করে ফেলতে পারেন|তবে এর মানে এই নয় যে ওয়ার্ডপ্রেস প্লাগইন ব্যবসা শেষ হয়ে যাচ্ছে| বরং এটি একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে| যেসব প্লাগইন জটিল ওয়ার্কপ্লো, সিস্টেম ইন্ট্রিগেশন বা এন্টারপ্রাইজ লেভেল সমস্যার সমাধান করে- সেগুলোর চাহিদা এখনো শক্তিশালী| উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মেম্বারশীপ সিস্টেম, লর্নিং মেনেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস), WooCommerce-এর অ্যাডভান্সড এক্সটেনশন, বুকিং সিস্টেম বা মাল্টি প্ল্যাটফর্ম পাবলিশিং টুলস| এই ধরনের সিস্টেমগুলো শুধু এআই দিয়ে সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়, কারণ এখানে দরকার নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনা|শপিফাই: কেন এগিয়ে?শপিফাই তুলনামূলকভাবে একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, কারণ এটি মূলত লেনদেনভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত| একটি ই-কমার্স সিস্টেম শুধু ওয়েবসাইট ˆতরি নয়; এখানে ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট, পেমেন্ট গেটওয়ে, শিপিং, ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স এবং কাস্টমার ডাটা- সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে| এই জটিল কাঠামো এআই দ্বারা পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা কঠিন|শপিফাই ইতোমধ্যেই তাদের প্ল্যাটফর্মে এআই অন্তর্ভুক্ত করেছে- প্রোডাক্ট ডেসক্রিপশন জেনারেশন, অটোমেটেড মার্কেটিং টুলস, এআই-পাওয়ার্ড সার্চ ইত্যাদির মাধ্যমে| ফলে ব্যবহারকারীরা আলাদা করে এআই টুল খোঁজার প্রয়োজন অনুভব করেন না| এছাড়া শপিফাই-এর একটি বড় সুবিধা হলো এর ব্যবহারকারীরা ব্যবসায়িক মানসিকতার এবং তারা প্রয়োজন হলে মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি দিতে প্রস্তুত| অনেক শপিফাই অ্যাপ মাসে ২৯ থেকে ২৯৯ ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে, যা ওয়ার্ডপ্রেস প্লাগইন ব্যবসার তুলনায় বেশি লাভজনক|নতুন হুমকি: এআই শপিং এজেন্টতবে শপিফাই-এর জন্যও একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে| ভবিষ্যতে যদি ক্রেতারা সরাসরি এআই এসিসটেন্টকে ব্যবহার করে পণ্য কেনা শুরু করে- যেমন ‘আমাকে ১০০ ডলারের মধ্যে সেরা জুতা খুঁজে কিনে দাও’ তাহলে ট্রেডিশনাল অনলাইন স্টোর ব্রাউজিং কমে যেতে পারে| এতে করে ব্র্যান্ডিং, ইউআই/ ইউএক্স এবং স্টোরফ্রন্ট-এর গুরুত্ব কিছুটা কমে যেতে পারে|ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাএই পরিবর্তনের মাঝে একটি বিষয় স্পষ্ট- এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং একটি শক্তিশালী টুল হিসেবে গ্রহণ করতে হবে| ভবিষ্যতের সফল ওয়ার্ডপ্রেস প্লাগইন বা শপিফাই অ্যাপ হবে সেগুলো, যেগুলো এআইকে নিজেদের সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করবে|উদাহরণ হিসেবে বলা যায়:*এআই-ড্রিভেন কনটেন্ট রিপারপোসিং* প্রেডিক্টিভ এনালাইটিকস (বেস্ট টাইম টু পোস্ট বা সেল)* এআই-বেসড কাস্টমার সাপোর্ট* পারসোনালাইজড ইউজার এক্সপেরিয়েন্সএই ধরনের ফিচারগুলো ব্যবসাকে শুধু সহজ করে না, বরং আরও কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে|বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটবাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন একটি বড় সুযোগ| দেশের অনেক ডেভেলপার ইতোমধ্যেই ওয়ার্ডপ্রেস প্লাগইন এবং শপিফাই অ্যাপ তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করছেন| যদি তারা সময়মতো এআই ইন্টিগ্রেশন করতে পারে, তাহলে তারা বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে|কিন্তু যদি তারা পুরনো মডেলে আটকে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে| কারণ বৈশ্বিক বাজারে এখন গতি, দক্ষতা এবং ইনোভেশন- এই তিনটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ|এআই কোনো প্ল্যাটফর্মকে ধ্বংস করছে না; বরং এটি একটি নতুন মানদন্ড তৈরি করছে| ওয়ার্ডপ্রেস এবং শপিফাই- উভয় ক্ষেত্রেই যারা পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে, তারাই টিকে থাকবে|ডিজিটাল ব্যবসার ভবিষ্যৎ এখন আর কেবল কোড বা টুলের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে কত দ্রুত এবং কত দক্ষভাবে একটি ব্যবসা নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে পারে তার ওপর|সবশেষে বলা যায় এআই আর কোনো বিকল্প নয়, এটি এখন একটি অপরিহার্য বাস্তবতা| যারা এটি বুঝবে এবং কাজে লাগাবে, ভবিষ্যৎ তাদেরই|[লেখক: পরিচালক (লোকাল অপারেশনস অ্যান্ড অ্যাডমিন), স্টারটাইজ লিমিটেড]

বৈসাবি উৎসবে মাতোয়ারা তিন পার্বত্যজেলা

‘কাট্টোল পাযোগ বিজু এজোক্র--অর্থাৎ কাঁঠাল পাঁকবে বিজু বা চৈত্র সংক্রান্তি আসবে| এ বচন দিয়ে লেখা শুরু করছি| যখন বউ কথা কউ পাখিটি ডাকতে শুরু করে, কোকিল যখন কুহু কুহু ডাকবে, তখনি বিজু বা চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবের আগমনের বার্তা নিয়ে আসে| বিজুর আগমনের প্রতীক্ষায় আবেগ নিবিড় হয়ে অতিবাহিত করতে হয়| কখন যে বিজু আসবে? এভাবে দিনের পর যেতে এমনি মুহূর্তে হঠাৎ চলে আসে বিজু বা ‘বৈসাবি নামক উৎসবটি’| গতকাল চৈত্র মাসের ৩০ তারিখ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শেষ দিন| আগামীকাল থেকে শুরু হবে নতুন বঙ্গাব্দ| অর্থাৎ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১ বৈশাখ| পাহাড়িরা চৈত্র মাসের শেষ দিনকে ‘বৈসাবি উৎসব হিসেবে পালন করে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে| পাহাড়ের তিন সম্প্রদায় আজকের দিনের জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে| পাহাড়ে বসবাসরত সকল মানুষের মাঝে প্রতি বছর এক আনন্দের বন্যা আসে, যা জাতিগত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে একে অন্যের স্নেহ ভালোবাসার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলে| তাই বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, ‘বৈসাবি অহিংসার প্রতীক, বন্ধুত্বের প্রতীক, মৈত্রীর প্রতীক| বৈসাবি অর্থ- ‘বৈ’ এই প্রথম অক্ষর দিয়ে বৈশাখীও বলতে পারি| বৈ+সা+বি= বৈসাবি, অর্থাৎ ‘বৈ’ মানে ‘বৈষু’- এটি চাকমা সম্প্রদায়ের ভাষা| ‘সা’ মানে ‘সাংগ্রাই’- এটি মার্মা সম্প্রদায়ের ভাষা| ‘বি’ মানে ‘বিঝ’-এটি চাকমা সম্প্রদায়ের ভাষা| সুতরাং বছরের প্রথম দিনকে ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈষ’, মার্মা সম্প্রদায় ‘সাংগ্রাই’, চাকমা সম্প্রদায় ‘বিষু’ নামে অভিহিত করে থাকে| তিন সম্প্রদায়ের আদি অক্ষর দিয়ে গঠিত হয়েছে ‘বৈসাবি’| এখন এ বিষয়ে আলোকপাতে যাচ্ছি কোন সম্প্রদায় কীভাবে বৈসাবি উদযাপন করে| বষু: পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী ত্রিপুরা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনকে ‘বৈষ’ বলে| এরা মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী| এ দিনে এরা অনাগত দিনগুলোতে সুখে শান্তিতে বসবাস করার জন্যে মন্দিরে গিয়ে পরম করুণাময়ের নিকট প্রার্থনা করে| কিশোর-কিশোরীরা এ দিনে প্রতি বাড়িতে গিয়ে ফুল বিতরণ করে এবং যুবক-যুবতীরা তার প্রিয়জনকেও ফুল দিয়ে ভালোবাসার শুভেচ্ছা জানায়| ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈষু’ তিনটি পর্বে উদযাপন করে| হারি বৈষু, বিষুমা বৈষু ও বিসিকাতাল বৈষু| এ উৎসবে তারা জাতি ভেদাভেদ, হিংসাবিদ্বেষ, শত্রুতা সবকিছু ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়| বৈষু দিনে এরা পাচন, সেমাই, পিঠা ইত্যাদি খাবারের আয়োজন করে থাকে| গরু-মহিষের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ তিতিক্ষার ফলে তাদের দ্বারা বছরের অন্ন সংস্থান হয় বলে এ দিনে গরু, মহিষকে স্নান করিয়ে দেয়া হয় এবং গলায় ফুলের মালা পড়িয়ে দেয়া হয়| ধূপ, প্রদীপ জেলে শ্রদ্ধা নিবেদন করার মধ্য দিয়ে তারা বৈষু পালন করে| সাংগ্রাই: সাংগ্রাই, এটি মার্মা ভাষা| মার্মা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনকে সাংগ্রাই নামে অভিহিত করে থাকে| বৈশাখের প্রথমদিন তারা সাংগ্রাই উৎসব পালন করে| পিঠা, পাচন, সেমাইয়ের আয়োজন থাকে| সব বয়সী লোকেরা বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়ায় ও আনন্দ উৎসব করে| তবে দিনের প্রধান আকর্ষণ জলোৎসব| মার্মা ভাষায় এটিকে বলে ‘রিলংপোয়ে’| জলখেলার জন্যে আগে থেকে প্যান্ডেল তৈরি করে| এখানে যুবক-যুবতীরা একে অন্যকে লক্ষ্য করে জলছিটিয়ে কাবু করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়| বয়োবৃদ্ধরা এ দিনে ধর্মীয় প্রথা অনুসারে বিহারে বা মন্দিরে গিয়ে ধর্মীয় কাজে লিপ্ত হয়| ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা অতর্কিত জল ছিটিয়ে দিয়ে আনন্দ উল্লাস করে সাংগ্রাই উৎসবকে বিদায় জানায়| বিজু: বিজু, এটি চাকমা ভাষা| চাকমারা বিজু উৎসবকে তিন পর্বে ভাগ করে উপভোগ করেন| বছরের শেষ অর্থাৎ ˆচত্র মাসের ২৯ তারিখ ফুল বিজু, ৩০ চৈত্রকে মূল বিজু ও নববর্ষের প্রথমদিন অর্থাৎ ১ বৈশাখ ‘গজ্যাপজ্যা’ বিজু হিসেবে উৎসব পালন করে| ফুল বিজু: ফুল বিজুর দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে নানা রকমের ফুল সংগ্রহে নেমে পড়ে কিশোর-কিশোরীরা| ফুল সংগ্রহ করার পর চারভাগে ভাগ করে একভাগ দিয়ে নিজের মনের মতো করে বাড়ি সাজায়, অন্য একভাগ দিয়ে বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে সমবেতভাবে বুদ্ধের উপাসনা করে এবং ভিক্ষুদের নিকট থেকে পঞ্চশীল গ্রহণপূর্বক ধর্মদেশনা শোনেন| অন্য একভাগ দিয়ে ছড়া বা নদীতে বা পুকুরপাড়ে পূজামণ্ডপ তৈরি করে প্রার্থনা করে যেনো সারা বছর পানির ন্যায় অর্থাৎ পানি যেমন শান্তশিষ্ট সেরূপ নিজেও শান্তশিষ্ট বা ভালোভাবে জীবনযাপন অতিবাহিত করতে পারে| আর একভাগ ফুল নিয়ে প্রিয়জনকে ভালোবাসার উপহার দেয়| কেউ কেউ ফুল দিয়ে বন্ধুকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়| মূল বিজু: মূল বিজু হচ্ছে বিজুর প্রথমদিন| ফুল বিজুদিনে মূল বিজুর প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়| এ দিনে ঘরের মহিলারা খুবই ব্যস্ত থাকে| তারা ৩০-৪০ প্রকার তরিতরকারি মিশ্রণে ঘন্ড বা পাচন তৈরি করা হয়| প্রচলিত আছে-এ দিন যে যতো বাড়িতে গিয়ে যতোবেশি পাচন খাবে ততোবেশি মঙ্গল হবে| পাচন ছাড়াও নানা ধরনের পিঠা, বিনিধানের খই, লাড়ু, সেমাই, মদ ইত্যাদির আয়োজন করে| এ দিনে সবার বাড়ির দরজা খোলা থাকে, যখন যার ইচ্ছে আসতে কোনো বাঁধা নেই| যারা বেড়াতে আসে তাদের বাড়ির মালিক যথাযথ আপ্যায়নের কোনো কমতি রাখে না| উপরে উল্লিখিত আইটেম পরিবেশন করা হয়| সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে বাড়ির দরজা, উঠানে, গো-শালায়, বৌদ্ধ বিহারে প্রদীপ জ্বালিয়ে মঙ্গল কামনা করা হয়| গজ্যাপজ্যা বিজু: নববর্ষের প্রথমদিনটিকে চাকমারা গজ্যাপাজ্যা বিজু হিসেবে উদযাপন করে| এই দিন বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে বিশ্রামের সঙ্গে দিনটিকে অতিবাহিত করা হয়| ছোটরা বড়দের নমস্কার করে এবং স্নান করিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে| সন্ধ্যায় স্থানীয় বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে পঞ্চশীল গ্রহণ করে অনাগত দিনগুলো যাতে সকলের জন্যে মঙ্গলময় হয় এই প্রার্থনা শেষের পর গজ্যাপজ্যা বিজুর পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়| ‘বৈসাবি হিংসা বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের উৎসব| এই উৎসবের মধ্যদিয়ে অতীতের সব দুঃখ, গ্লানি, বেদনা, ক্ষোভ, উঁচু- নিচু, ধনী-গরিব বৈষম্য পরিহার করে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়| একদিকে যেমন ধর্মীয় বিধান, অন্যদিকে সামাজিকতার বহিঃপ্রকাশও ‘বৈসাবি বহন করে| এটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উৎসব হলেও সবার অংশগ্রহণে পুরো আয়োজন সফলতা লাভ করে|  [লেখক: প্রাবন্ধিক]

বৈশাখ, কৃষি ও বাংলার পরিবর্তিত সময়চিত্র

বাংলা নববর্ষ উদযাপন বাঙালির জীবনে শুধু একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়; এর গভীরে নিহিত রয়েছে কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থা, প্রকৃতির চক্র এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস| বৈশাখের আগমন মানেই নতুন বছরের সূচনা, কিন্তু এই সূচনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফসল, পরিশ্রম, প্রাপ্তি ও অনিশ্চয়তার বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা| সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার রূপান্তর ঘটেছে, আর তার প্রভাব পড়েছে বৈশাখের অর্থ ও তাৎপর্যের ওপরও| তাই বৈশাখকে সত্যিকারভাবে বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান বাস্তবতাকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি|আগেকার দিনে বাংলা নতুন বছরের সূচনা বৈশাখ মাসে ছিল না| অগ্রহায়ণ মাসে নতুন বছর শুরু হতো| আর সে সময়ই আমন ধান ঘরে তোলা হতো এবং সেটিই ছিল সে সময়ের প্রধান ফসল| বর্তমানেও আমন ধান তার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে—উৎপাদনের বিচারে বোরো ধানের পরেই এর অবস্থান| সে সময় নতুন ধান ঘরে ওঠার আনন্দে কৃষকরা ‘নবান্ন’ উৎসব পালন করতেন, যা ছিল কৃষিনির্ভর জীবনের প্রাচুর্যের প্রতীক| তবে এই উৎসব নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ ছিল না; ধান ওঠার পর সুবিধাজনক সময়ে তা উদযাপিত হতো| অনেক ক্ষেত্রে এই আয়োজন পৌষ মাস পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় একে ‘পৌষ পার্বণ’ও বলা হতো|বর্তমানেও নবান্ন পালিত হয় তবে সরকারি উদ্যোগে এবং সেটা পয়লা অগ্রহায়ণে| আধুনিক কৃষিপদ্ধতির কারণে আমন ধান আগেই কাটা সম্ভব হওয়ায় এখন আর পৌষ মাস পর্যন্ত অপেক্ষার প্রয়োজন পড়ে না|নতুন বছর অগ্রহায়ণ থেকে পিছিয়ে বৈশাখে প্রবর্তনের একটি প্রেক্ষাপট আছে| মুঘল সম্রাট আকবর তার খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ফসলি-সন প্রবর্তন করেন এবং বৈশাখ মাসকে বছরের সূচনা হিসেবে নির্ধারণ করেন| ফসলি-সন বলা হলেও সুবে বাংলায় উৎপাদিত ফসলের সঙ্গে এর তেমন সম্পর্ক ছিল না| কারণ ঐ সময় ছিল চৈতালী ফসল তোলার শেষ সময়| কিন্তু সে ফসলগুলো তেমন অর্থকরী ফসল ছিল বলে মনে হয় না| তাই অতীতের বৈশাখ ছিল অনেকাংশে কষ্ট ও দায়বদ্ধতার সময়| চৈত্রের তীব্র দাবদাহের পর বৈশাখে বৃষ্টিপাত কম থাকত এবং কৃষকের ঘরে খাদ্যসংকট দেখা দিত| সে সময় বোরো ধান সারা দেশে বিস্তৃত না থাকায় অধিকাংশ কৃষকের প্রধান ভরসা ছিল আউশ, আমন ও অন্যান্য মৌসুমি ফসল| কিন্তু এসব ফসলও পর্যাপ্ত না হলে খাজনা পরিশোধ একটি বড় চাপ হয়ে দাঁড়াত| ফলে ˆবশাখের আনন্দ তখন অনেকাংশেই সীমিত হয়ে পড়তো| যাই হোক এবং যেভাবেই হোক সময়ের সঙ্গে এটিই এক সময় বাংলা সন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং বছরের প্রথম দিন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও প্রশাসনিক দিনে পরিণত হয়| এর সঙ্গে খাজনা আদায় ও হালখাতার প্রথার সূচনা ঘটে|একসময় পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে কৃষি বর্ষপঞ্জির একটি নতুন চক্রের সূচনা হতো, যখন আউশ ধান, জলি আমন ও পাট চাষের প্রস্তুতি নেয়া ছিল কৃষকের নিয়মিত কর্মপরিকল্পনার অংশ| কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই চিত্রে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে| বর্তমানে বৃষ্টিনির্ভর আউশ ও জলি আমনের চাষ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে সেচনির্ভর বোরো ধানই প্রধান ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে; অনেক ক্ষেত্রেই আগের আউশের জমি এখন বোরো চাষের আওতায় এসেছে|তবুও কৃষিনির্ভর এই ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি; বরং পরিবর্তিত রূপে তা এখনও সংস্কৃতির ভেতরে বিদ্যমান| এখন বৈশাখ মাসই হয়ে উঠেছে নতুন ধান ঘরে তোলার প্রধান সময়| ফলে আগের মতোই এই সময়টি ফসল ঘরে ওঠার আনন্দ বহন করে, যদিও তার প্রেক্ষাপট ভিন্ন| এই কৃষিভিত্তিক আবহের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন একটি মাত্রা—ডিজিটাল ‘কৃষিকার্ড’ চালুর উদ্যোগ| এর মাধ্যমে কৃষকের একটি স্বীকৃত পরিচয় নিশ্চিত হবে, যা ব্যবহার করে তারা সহজেই সরকারি ভর্তুকি, প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারবেন| এর ফলে কৃষি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে| এভাবে নববর্ষ আবারও কৃষিকেন্দ্রিক বাস্তবতার সঙ্গে নতুনভাবে সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে|আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে দেশের কৃষিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে| উন্নত সেচব্যবস্থা, উচ্চফলনশীল বীজ এবং গবেষণালব্ধ জ্ঞানের প্রয়োগে এখন চৈত্র-বৈশাখেই সারা দেশে বোরো ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে| এতে কৃষকের ঘরে সময়মতো নতুন ফসল পৌঁছায় এবং বৈশাখ অনেক ক্ষেত্রেই প্রাপ্তি ও স্বস্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে| ফলে সামগ্রিকভাবে কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থারও উন্নতি লক্ষ করা যায়|তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যেও হাওর অঞ্চলের বাস্তবতা ভিন্ন মাত্রা যোগ করে| দেশের কৃষিতে হাওরের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও এখানকার কৃষিজীবন এখনও প্রকৃতিনির্ভর এবং ঝুঁকিপূর্ণ| বছরের অধিকাংশ সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকার কারণে বোরো ধানই এখানে প্রধান ফসল| কৃষকরা দীর্ঘ সময় পরিশ্রমের পর চৈত্রের শেষে ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি নেন, কিন্তু একই সময়ে পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা দেখা দেয়, যা মুহূর্তেই পাকা ধান তলিয়ে দিতে পারে| এই কারণে হাওরের কৃষকদের জন্য বৈশাখ সবসময় স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে না; বরং তা অনেক সময় অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের প্রতীক হয়ে ওঠে| ফলে তাদের জীবনে এই সময়টি এক দ্বৈত অভিজ্ঞতা বহন করে—একদিকে নতুন ফসলের আশা, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা| এই দ্বন্দ্বই বৈশাখকে হাওর অঞ্চলের কৃষকের কাছে এক অনন্য, বহুমাত্রিক বাস্তবতায় পরিণত করেছে|সারা দেশে বোরো ধানের বিস্তারের ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে এর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে| বিশেষ করে ফসলের বৈচিত্র্য আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষির জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে| তদুপরি, বোরো ধানের জমি দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ থাকায় মিথেন গ্যাসের নির্গমন বাড়ছে, যা পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে| তাই কৃষি উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে|তবে এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা আজ অনেকাংশে বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল| উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবনের ফলে উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি খাদ্যাভ্যাসেও কিছু বৈচিত্র্য এসেছে| এর পাশাপাশি শহরাঞ্চলে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে পান্তাভাত খাওয়ার যে নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা এখন এক ধরনের প্রতীকী ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে| যদিও গ্রামীণ জীবনে এটি বরাবরই সাধারণ খাবার ছিল, তবুও শহুরে উদযাপনের মাধ্যমে এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে|বর্তমান বাস্তবতায় বৈশাখ মাসেই যখন নতুন ধান ঘরে ওঠে, তখন নবান্ন উৎসবের মতো একটি কৃষিভিত্তিক উদযাপন এই সময়েও চালু করা যেতে পারে| এর মাধ্যমে কৃষকের পরিশ্রমের স্বীকৃতি দেয়া সম্ভব হবে এবং নববর্ষের সঙ্গে কৃষিজীবনের সম্পর্ক আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে|বৈশাখ আজ বহুমাত্রিক অর্থে সমৃদ্ধ একটি সময়| এটি যেমন নতুন বছরের সূচনা, তেমনি কৃষির অর্জন, সম্ভাবনা এবং অনিশ্চয়তার এক সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি| ঐতিহ্যগত প্রথা, কৃষির পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং কৃষিকার্ডের মতো আধুনিক উদ্যোগ—সবকিছু মিলিয়ে ˆবশাখ এখন বাংলাদেশের কৃষি ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক| এই সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই নববর্ষ তার প্রকৃত তাৎপর্য লাভ করুক এবং বাঙালির জীবনযাত্রার সঙ্গে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠুক|[লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট]

পথশিশু: সংখ্যার আড়ালে হারানো জীবন

২০২৬ সালেও পৃথিবীর কোটি কোটি শিশু নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা ও মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রাস্তায় জীবনযাপন করছে| তাদের কাছে ˆশশব মানে খেলাধুলা বা ¯^প্ন নয়—বরং বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম| প্রতি বছর ১২ এপ্রিল পালিত হয় আন্তর্জাতিক পথশিশু দিবস আমাদের সামনে এমন এক বাস্তবতা তুলে ধরে, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই| দিবসটি কেবল একটি প্রতীকী আয়োজন নয়; এটি মানবিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার আহ্বান, নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা এবং সমাজের জন্য আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত| পথশিশু বলতে সাধারণত সেইসব শিশুদের বোঝায়, যারা জীবিকার প্রয়োজনে বা পারিবারিক ভাঙনের কারণে রাস্তায় বসবাস করে কিংবা দিনের অধিকাংশ সময় রাস্তায় কাটায়| কেউ সম্পূর্ণ পরিবারহীন, আবার কেউ পরিবার থাকা সত্ত্বেও দারিদ্র্য, সহিংসতা, অবহেলা বা সামাজিক ˆবষম্যের কারণে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে| এদের জীবন অনিশ্চয়তা, শোষণ, নিরাপত্তাহীনতা ও বঞ্চনায় পরিপূর্ণ| আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বে আনুমানিক ১৫-২০ কোটি শিশু কোনো না কোনোভাবে রাস্তায় বসবাস বা কাজ করতে বাধ্য| দক্ষিণ এশিয়া, সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি প্রকট| প্রায় ৪০% পথশিশু কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় নেই| প্রায় ৩০% শিশু নিয়মিত শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার| ২০% এর বেশি শিশু অপরাধচক্র, মাদক বা বিপজ্জনক কাজে জড়িয়ে পড়ে| উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু মানবপাচার ও শোষণের ঝুঁকিতে থাকে| এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; এগুলো প্রতিটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া নিরাপত্তা, শিক্ষা ও সম্ভাবনার করুণ প্রতিচ্ছবি| বাংলাদেশেও পথশিশু সমস্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চ্যালেঞ্জ| বিভিন্ন গবেষণা ও বেসরকারি সংস্থার তথ্যমতে— দেশে আনুমানিক ১০-১৫ লাখ পথশিশু রয়েছে| রাজধানী ঢাকায় রয়েছে প্রায় ৫-৬ লাখ পথশিশু| প্রায় ৬৫% শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত| প্রায় ৫০% শিশু কোনো না কোনো শিশুশ্রমে নিয়োজিত| দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুতি, নদীভাঙন, বন্যা, নগরায়ণ এবং গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন—এসব কারণ পথশিশু বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে| এছাড়া নগর জীবনের ব্যয়বৃদ্ধি ও সামাজিক ˆবষম্যও এ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে| পথশিশুদের প্রতিদিনের জীবন এক অনিশ্চিত ও কঠোর বাস্তবতার মধ্যে সীমাবদ্ধ| তারা খাবার, আশ্রয়, নিরাপত্তা—প্রতিটি মৌলিক চাহিদার জন্য সংগ্রাম করে| অনেক শিশু হকারি, ভিক্ষাবৃত্তি, আবর্জনা সংগ্রহ বা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত| তারা ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড বা উন্মুক্ত স্থানে রাত কাটায়| সহজেই তারা মাদকাসক্তি, অপরাধচক্র, যৌন নির্যাতন ও পাচারের শিকার হয়| ¯^াস্থ্যঝুঁকি তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ| অপুষ্টি, ত্বকের রোগ, শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, ডায়রিয়া, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা তাদের ¯^াভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে| অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবার বাইরে থাকে| শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার হলেও পথশিশুরা এই অধিকার থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত| জীবিকার তাগিদে তারা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না| তাদের দক্ষতা ও জ্ঞান বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়| ভবিষ্যতে স্থায়ী ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে| দারিদ্র্যের চক্র প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে থাকে| অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম কিছুটা সহায়তা করলেও তা পর্যাপ্ত নয়| অনেক ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে না| বাংলাদেশ সরকার পথশিশুদের পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে| সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে আশ্রয়কেন্দ্র, শিক্ষা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে| তবে বাস্তবতায় কিছু সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট— পর্যাপ্ত বাজেট ও অবকাঠামোর অভাব| প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা ও সমš^য়ের ঘাটতি| দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার অভাব| উপকারভোগীদের সঠিকভাবে চিহ্নিতকরণে সমস্যা| ফলে এসব উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে পুরোপুরি সফল হতে পারছে না| পথশিশু সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সমšি^ত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য| পথশিশুদের জন্য পৃথক জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে| ফ্রি ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার আওতায় পথশিশুদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে| ভ্রাম্যমাণ স্কুল, রাতের স্কুল এবং নমনীয় শিক্ষা পদ্ধতি চালু করতে হবে| সম্ভব হলে শিশুদের পরিবারে ফিরিয়ে এনে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে| ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে| নিয়মিত ¯^াস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টি কর্মসূচি এবং মানসিক সহায়তা প্রদান জরুরি| গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে সমাজ পথশিশুদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়| নির্ভুল পরিসংখ্যান সংগ্রহ ও গবেষণার ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করতে হবে| পথশিশুরা সমাজের বোঝা নয়; তারা একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ| তাদের প্রতি অবহেলা মানে একটি সম্ভাবনাকে ধ্বংস করা| একজন পথশিশুর পাশে দাঁড়ানো মানে একটি জীবনকে নতুন পথে এগিয়ে নেয়া| সমাজের প্রতিটি মানুষের ছোট ছোট উদ্যোগ—যেমন শিক্ষা সহায়তা, মানবিক আচরণ, সচেতনতা সৃষ্টি—এই শিশুদের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে| তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি| [লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]

কেন মঙ্গল শোভাযাত্রা নয়?

বাংলা নববর্ষ ১ বৈশাখ| এটি একটি উৎসব| এই উৎসবটি বাংলা জনপদের বসবাসরত সব মানুষের| কারণ এই উৎসবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ-গোত্র বা সম্প্রদায়গত কোনো বিভাজন থাকে না| তাই বাংলা নববর্ষ একটি সার্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসব| বাংলা জনপদে বসবাসরত সব জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের মানুষের মেল বন্ধন হলো পহেলা ˆবশাখ| হাজার হাজার বছরে ধরে এই জনপদের মানুষ পহেলা বৈশাখকে সাড়াম্বরে পালন করে আসছে| বাংলা জনপদে মুসলিম শাসন শুরুর পর মোগলরা খাজনা আদায়ের এর ব্যবহার ঘটায়| সর্বোপরি, বাংলা জনপদের মানুষের প্রাণের উৎসব হলো বাংলা নববর্ষ| বাংলাদেশের রাজধানীসহ সারাদেশে জাতির মঙ্গল কামনায় এই উৎসবটি পালিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে| তবে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে, এই উৎসবকে কেন্দ্র করে চলছে এক প্রকার অপরাজনীতি| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বাংলা নববর্ষের দিনে প্রতি বছর যে শোভাযাত্রা হয়, ফের সেটির নতুন নাম নির্ধারণ করা হয়েছে| এতদিন এটি ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত থাকলেও এবার থেকে এর নাম ‘ˆবশাখী শোভাযাত্রা’ করার কথা জানিয়েছে সরকার| অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন কওে সুখ-শান্তি আর সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় বর্তমানে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়| তবে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতায় নানা পরিবর্তন এসেছে| অনেকেই মনে করেন যে, মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে বাংলা সন গণনা শুরু হওয়ার পর খাজনা আদায়ের পর যে উৎসব হত, তা থেকে এর উৎপত্তি| আর তখন থেকে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে| প্রশ্ন হচ্ছে এই শোভা যাত্রাটাত বছরের শুরুতে হচ্ছে তার নামটা কি ˆবশাখী শোভা যাত্রা দেয়া খুবই প্রয়োজন? যেহেতু বছরটা শুরু হয় এই দিনের এই উৎসব দিয়ে, তাই জনপদের মঙ্গল কামনা করে শোভা যাত্রাটি বের করলে কার কি ক্ষতি? কেন এই শোভা যাত্রাটাকে মঙ্গল শোভা যাত্রা বলা যাবে না? মঙ্গল নামটি কি কোন গোষ্ঠি, ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি? এটি একটি সার্বজনীন শব্দ| এই উৎপত্তি বাংলা জনপদ থেকে| বাংলা নববর্ষ উৎযাপনের ধারাবাহিকতায় কখনও আগের বিভিন্ন নিয়ম বাদ দেয়া হয়েছে, আবার কখনও নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে এই উৎসবের সঙ্গে| ধীরে ধীরে বাঙালি সংস্কৃতি আর রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে এই উৎসব| ‘মঙ্গল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো— কল্যাণ, শুভ, ভালো বা হিত| এটি একটি সংস্কৃত থেকে আসা শব্দ, যার অর্থ উপযুক্ত বা শুভপ্রদ| সাধারণ অর্থ: কল্যাণ, শুভ, মঙ্গলময়| হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা সাহিত্য অকাদেমী থেকে প্রকাশিত বঙ্গীয় শব্দকোষ (প্রথম খণ্ড)| ২০০১ থেকে জানা যায় যে মঙ্গল অর্থ কল্যাণপ্রদায়ক| এর সমার্থক শব্দাবলি হলোকল্যাণ, মঙ্গল, ভালো, শুভ| তবে শোনা যায় যে, মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে আপত্তির মূল কারণ ধর্মীয় বিশ্বাস| কেউ কেউ বলছেন যে, বিভিন্ন ইসলামপন্থী সংগঠনের মতে এটি হিন্দু সংস্কৃতি ও ইসলামী আকিদার পরিপন্থী|| শোভাযাত্রায় বিভিন্ন জীব-জন্তুর প্রতিকৃতি বা মোটিফ ব্যবহার, শব্দটির ব্যবহার এবং নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণকে তারা অনৈসলামিক ও বিজাতীয়সংস্কৃতি বলে মনে করেন| তবে ধর্মের নামে এই মঙ্গল শব্দের অপব্যাখাগুলো ঠিক না| তারপর দেখা যাচ্ছে যে, ১. অনেক ইসলামপন্থী দল মনে করে, মঙ্গল শোভাযাত্রার বিভিন্ন মোটিফ ও জীব-জন্তুর প্রতিকৃতি হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যামুসলিম সংস্কৃতির বিরোধী| ‘মঙ্গল’ শব্দটি দিয়ে অশুভ দূর করে মঙ্গল কামনা করা হয়, যা ইসলামী দৃষ্টিতে সৃষ্টিকর্তার (আল্লাহ) ওপর ভরসা বা তওহীদের ধারণার পরিপন্থী বলে তারা মনে করেন| ৩. পহেলা ˆবশাখে বিভিন্ন জীব-জন্তুর মূর্তি, মুখে উল্কি আঁকা এবং নারী-পুরুষের একসঙ্গে চলার বিষয়টিকে তারা ‘বিজাতীয়’ ও ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী বলে গণ্য করেন| ৪. অতীতে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী বা সংগঠন এই আয়োজনের বিরোধিতা করে একে ‘হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি’ বলে আখ্যায়িত করেছে (বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে)| ৫. আপত্তির মুখে অনেক সময় এর নাম পরিবর্তন করে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘ˆবশাখী শোভাযাত্রা’ করা হয়| এই সমস্ত আপত্তি কেন? এটা তো কোন বিশেষ ধর্মের অনুষ্ঠান না| এর এর প্রচলনটা কোন ধর্মানুসারে হয় নাই| তবে বাংলাদেশের মানুষের ধর্মঅনুভুতিকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করার জন্য উল্লেখিত অপব্যাখ্যাগুলো দেয়া হচ্ছে| সারা বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশের পহেলা ˆবশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মনে করে একটি অসাম্প্রদায়িক সার্বজনীন অনুষ্ঠান| তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই উৎসবটি ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর মাধ্যমে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে| ১৯৬০-এর দশক থেকে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষকে বরণ করে আসছে ছায়ানট| ঢাকার রমনা পার্কে ছায়ানট আয়োজন করে প্রাত্যোষিক সঙ্গীতানুষ্ঠান| এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হতো অন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা| এর ফলে সাধারণ মানুষ নিবিড়ভাবে আকৃষ্ট হয় এই উৎসবে| নাগরিক আবহে সার্বজনীনপহেলা বৈ শাখ উদযাপনে নতুন মাত্রা যোগ করে ছায়ানট| ১৯৮০-র দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরূদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একইসঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ প্রবর্তিত হয়| পরের বছরও চারুকলার সামনে থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়| তবে ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে চারুপীঠ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যশোরে প্রথমবারের মতো নববর্ষ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে| যশোরের সেই শোভাযাত্রায় ছিল- পাপেট, বাঘের প্রতিকৃতি, পুরানো বাদ্যযন্ত্রসহ আরও অনেক শিল্পকর্ম| শুরুর বছরেই যশোরে শোভাযাত্রা আলোড়ন ˆতরি করে| পরবর্তীতে যশোরের সেই শোভাযাত্রার আদলেই ঢাকার চারুকলা থেকে শুরু হয় বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা| শুরু থেকেই চারুকলার শোভাযাত্রাটির নাম মঙ্গল শোভাযাত্রা ছিল না| ১৯৯৬ সাল আনন্দ শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামকরণ করাহয়| ১৯৮৯ সালে প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রায় ছিল বিশালকায় চারুকর্ম পুতুল, হাতি, কুমির, লক্ষ্মীপেঁচা, ঘোড়াসহ বিচিত্র মুখোশএবং সাজসজ্জা, বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য| ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের মঙ্গল শোভাযাত্রায়ও নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি স্থান পায়| ১৯৯১ সালে চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিল্পীদের উদ্যোগে হওয়া সেই শোভাযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর, বিশিষ্ট লেখক, শিল্পীরাসহ সাধারণ নাগরিকরা অংশ নেয়| শোভাযাত্রায় স্থান পায় বিশালআকার হাতি, বাঘের প্রতিকৃতির কারুকর্ম| কৃত্রিম ঢাক আর অসংখ্য মুখোশখচিত প্ল্যাকার্ড| মিছিলটি নাচে গানে উৎফুল্ল পরিবেশ সৃষ্টি করে| এর প্রাচীন ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পহেলা উৎসব পালন করা হত বছরের প্রথম দিনে তার কারণটি ছিল আগত বছরটি যেন প্রতিটি মানুষের জন্য কল্যান বয়ে আনে| প্রাচীন বাংলার মানুষ একটি কথা বিশ্বাস করতেন, শুরুটা যদি মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে করা যায় তাহলে সারাটা বছরই মঙ্গলময় হবে| সুতরাং এই ধারণা থেকে শোভা যত্রাটার নাম মঙ্গল শোভা যত্রা করা হয়েছে| মঙ্গল শোভাযাত্রাটাকে কেউ বিশেষ মহলের দিকে ঠেলে দেন তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক| মঙ্গল শোভা যাত্রাটা উৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে কোন রাজনৈতিক ধর্মীয় বা কোন সম্প্রদায়ের উপাদান বা সংশ্রবতা খুজে পাওয়া যায় না| এটা বাংলার একটি প্রাচীন উৎসব থেকে আগত| তাই এর রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অপব্যাখা দেয়া ঠিক না|[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

বাঙালির লোকসংস্কৃতি

বাঙালি উৎসব ও আনন্দপ্রিয় জাতি| পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা উপলক্ষে তারা আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে| সেসবের মধ্যে ব্যতিক্রমী হয়ে আবির্ভূত হয় বাংলা নববর্ষ, যার ¯^াদ, গন্ধ ও আবেদন অন্যান্য উৎসব থেকে একেবারেই আলাদা| জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ, সব বাঙালি সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একই হৃদয়াবেগে একটি মোহনায় মিলিত হয়ে পালন করে এই সর্বজনীন উৎসব| চিরায়ত বাঙালিত্বের অহঙ্কার আর সংস্কৃতির উদার আহ্বানে জাগরুক হয়ে নাচে-গানে, গল্পে-আড্ডায়, আহারে-বিহারে চলে নতুন বছরকে বরণ করার পালা| বাংলা নববর্ষ তাই বাঙালির জীবনে সবচেয়ে বড় সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব| এর মাধ্যমে জাতি তার ¯^কীয়তা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার শক্তি সঞ্চয় করে; সচেষ্ট হয় আত্মপরিচয় ও শিকড়ের সন্ধানে|বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য হলো বাংলা বর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ| আর বাঙালির কাছে বাংলা নববর্ষ বরণ একটি প্রাণের উৎসব| বাংলা নববর্ষের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা| এমন নববর্ষই বাঙালি জাতিকে ইস্পাত-কঠিন ঐক্যে আবদ্ধ করেছিল, শক্তি ও সাহস জুগিয়েছিল স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে| চট্টগ্রাম অঞ্চলে শত বছর ধরে গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক হয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘জব্বারের বলী খেলা’| চট্টগ্রাম শহরের লালদীঘির মাঠে বিভিন্ন কুস্তিগীর বা বলীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই স্বতঃস্ফূর্ত আয়োজন আজও দর্শকদের কাছে দারুণ আকর্ষণের বিষয়| প্রতিবছর ১২ বৈশাখ উৎসবমুখর পরিবেশে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়|বাঙালি নারীর প্রধান পোশাক শাড়ি| যেকোনো উৎসবে-পার্বণে নারীর প্রথম পছন্দ এটি| শাড়ির নানা ধরন রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম জামদানি| এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ| জামদানি শাড়ি তুলা দিয়ে প্রস্তুতকৃত এক ধরনের শাড়ি, যা মসলিনের উত্তরাধিকার বহন করে| বাংলার মধ্যযুগে মসলিন ছিল অত্যন্ত মূল্যবান কাপড়| পরবর্তীতে মসলিন বিলুপ্ত হলেও জামদানির বিকাশ ঘটে| জনশ্রুতি আছে, ব্রিটিশরা মসলিন শিল্প ধ্বংস করতে কারিগরদের আঙুল কেটে দিয়েছিল| যদিও এ নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, তবু বাস্তবতা হলো— মসলিনের অবসানের পর জামদানি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে| নকশিকাঁথা আমাদের লোকশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ| সাধারণ কাঁথার ওপর নানান নকশা করে এটি ˆতরি করা হয়| পুরনো কাপড়ের সুতা খুলে কিংবা নতুন সুতা কিনে কাঁথা সেলাই করা হয়| ফুল, লতা, পাতা ইত্যাদি নকশা এতে ফুটে ওঠে| ময়মনসিংহ, রাজশাহী, ফরিদপুর ও যশোর অঞ্চলে নকশিকাঁথা বিশেষভাবে বিখ্যাত| তবে এই শিল্পও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে|একসময় গ্রামীণ জীবনে শিকা, চাঁদোয়া, শীতলপাটি ছিল অপরিহার্য| এখন এগুলো বিলুপ্তির পথে| মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শীতলপাটির কারিগর কমে গেছে| প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্যের চাপে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প টিকে থাকতে পারছে না| একইভাবে বিয়ের গীত, বৃষ্টি ডাকার গান, ছাদ পেটানোর গান—এসব লোকজ সংস্কৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে| আধুনিক প্রযুক্তি ও ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে নতুন প্রজন্ম এসবের সঙ্গে সংযোগ হারাচ্ছে|লোকজ সংস্কৃতির পরিবর্তন স্বাভাবিক, কিন্তু সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা উদ্বেগজনক| বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমরা নিজের শিকড় ভুলে যাচ্ছি| কাঁসা-পিতলের বাসন, ঢেঁকি, জাঁতা—এসব হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট শব্দ, ভাষা ও জীবনধারা| চট্টগ্রামের মেজবান সংস্কৃতি এখনও শক্তভাবে টিকে আছে| এটি শুধু খাবার নয়, সামাজিক বন্ধনেরও প্রতীক| ধারণা করা হয়, ১৬০০-১৮০০ সালের মধ্যে এই সংস্কৃতির প্রচলন শুরু হয়| ‘মেজবান’ শব্দটি ফারসি উৎসের| এই আয়োজন চট্টগ্রামের স্বতন্ত্র্যকে তুলে ধরে| সংস্কৃতি হলো মানুষের আত্মার প্রকাশ| নৃবিজ্ঞানী Edward Burnett Tylor-এর মতে, সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত আচরণ, বিশ্বাস, শিল্প, আইন, নীতি—সবকিছুর সম্মিলিত রূপই সংস্কৃতি| সংস্কৃতি প্রবহমান; এর স্থবিরতা মানেই ক্ষয়| তাই বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে আমাদের সচেতন হতে হবে|বাংলাদেশ ও বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ঐতিহ্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি|[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

অনিয়ন্ত্রিত অটো: সমন্বিত নীতি জরুরি

রাজধানী ঢাকা একসময় প্রাণচঞ্চল নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল| আজ তা ধীরে ধীরে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের জটে আটকে পড়া শহরে পরিণত হচ্ছে| বিশেষ করে রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অপ্রতিরোধ্য বিস্তার নগরের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করছে| এটি শুধু যানজটের সমস্যা নয়; এর প্রভাব অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামোর গভীরে ছড়িয়ে পড়ছে| এই বাস্তবতায় অটো নিয়ন্ত্রণ এখন আর বিলাসিতা নয়, অপরিহার্য জাতীয় দাবি| ঢাকার সড়কগুলো মূলত পরিকল্পিত হয়েছে মোটরযান চলাচলের জন্য| নির্দিষ্ট গতিতে যানবাহন চলবে—এমন ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এই কাঠামো গড়ে উঠেছে| কিন্তু বাস্তবে রিকশা ও অটোর দখলদারিত্ব সেই কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে| ধীরগতির যানবাহন প্রধান সড়কে চলাচল করায় বাস, কার ও অ্যাম্বুলেন্স আটকে যাচ্ছে| জরুরি সেবাও ব্যাহত হচ্ছে| এর ফলে মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে| অফিসগামী মানুষ সময়মতো পৌঁছাতে পারছে না, শিক্ষার্থীরা ক্লাস মিস করছে, ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছে| দীর্ঘস্থায়ী যানজট দেশের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে| ব্যাটারিচালিত অটোর বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের ওপর চাপও বাড়ছে| প্রতিটি অটো প্রতিদিন চার্জ নিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, যা সম্মিলিতভাবে জাতীয় গ্রিডে বড় চাপ ˆতরি করছে| এই অতিরিক্ত চাহিদা পরিকল্পিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে| গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে এর প্রভাব আরও তীব্র| অর্থাৎ, একটি অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থা পুরো দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে| যানজট সময়ের অপচয় ঘটানোর পাশাপাশি জ্বালানির অপচয়ও বাড়ায়| ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন ধীরগতিতে চলায় পেট্রল ও ডিজেল অকারণে পুড়ে| এতে ˆবদেশিক মুদ্রা ব্যয় বাড়ে, কারণ জ্বালানির বড় অংশ আমদানিনির্ভর| একই সঙ্গে বায়ুদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করছে| ক্ষতিকর গ্যাসের নিঃসরণ নগরের বায়ুকে বিষাক্ত করে তুলছে, বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও অন্যান্য রোগ| ফলে এটি অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশগত সংকটও ˆতরি করছে| একসময় ঢাকার মানুষ ¯^ল্প দূরত্ব হাঁটতে অভ্যস্ত ছিল| এখন অটোর সহজলভ্যতা সেই অভ্যাস কমিয়ে দিয়েছে| এক কিলোমিটার পথও অনেকের কাছে হাঁটার অযোগ্য মনে হয়| এতে মানুষ শারীরিক পরিশ্রম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে| শিশু-কিশোরদের মধ্যেও এই প্রবণতা বাড়ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক| এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যে| ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের মতো রোগ বাড়ছে| এই প্রবণতা জাতীয় স্বাস্থ্যখাতেও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে| অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের সংখ্যা বাড়াও একটি বড় ঝুঁকি| পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্সিং ব্যবস্থা না থাকায় অনেক অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তি এই পেশায় যুক্ত হচ্ছে| এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্কদেরও অটো চালাতে দেখা যায়| ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সীমিত জ্ঞানের কারণে তারা নিয়ম ভাঙে| হঠাৎ দিক পরিবর্তন, সিগন্যাল অমান্য করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা| এতে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে এবং মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে| নিয়ন্ত্রণহীন অটো এখন সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ| হঠাৎ মোড় নেয়া বা উল্টো পথে চলার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে| এতে প্রাণহানি যেমন হচ্ছে, তেমনি অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হচ্ছেন| এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও গভীর| তবুও এই খাতের সঠিক পরিসংখ্যান নেই| কতসংখ্যক অটো চলাচল করছে—তার নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব নীতিনির্ধারণকে দুর্বল করছে| অটো সহজ আয়ের উৎস হওয়ায় গ্রাম থেকে শহরে মানুষের আগমন বাড়ছে| কৃষিতে অনিশ্চয়তা ও কর্মসংস্থানের সংকট মানুষকে শহরমুখী করছে| ফলে নগরে চাপ বাড়ছে—আবাসন সংকট, বস্তির বিস্তার, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যা তীব্র হচ্ছে| একই সঙ্গে গ্রাম হারাচ্ছে কর্মক্ষম জনশক্তি| কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে বা কম উৎপাদন হচ্ছে| শহরের বিস্তারে উর্বর জমিও কমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে| ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনা ছিল সমšি^ত ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে| কিন্তু অটোর অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার সেই পরিকল্পনাকে ব্যাহত করেছে| বড় যানবাহনের চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় গণপরিবহন কার্যকারিতা হারাচ্ছে| ফলে মানুষ ছোট যানবাহনের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা একটি দুষ্টচক্র ˆতরি করছে| এতে মেট্রোরেল বা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের মতো প্রকল্পের সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে পড়ছে| এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত জাতীয় নীতি প্রয়োজন| অটোর নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং বাধ্যতামূলক করতে হবে| একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ ˆতরি করে যানবাহনের সংখ্যা ও চলাচলের তথ্য সংরক্ষণ জরুরি| নির্দিষ্ট রুট ও জোন নির্ধারণ করে প্রধান সড়কে অটোর প্রবেশ সীমিত করতে হবে| পাশাপাশি গণপরিবহনকে আধুনিক ও সহজলভ্য করতে হবে, যাতে মানুষ বিকল্প পায়| অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি| একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে| ঢাকার সড়কে অটোর অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার এখন বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে| এটি শুধু যানজট নয়, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে| সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সমস্যা আরও জটিল হবে| একটি পরিকল্পিত, টেকসই ও কার্যকর নগর গড়তে হলে অটো নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই| এখন প্রয়োজন সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত ও তার বাস্তবায়ন| [লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, নারায়ণগঞ্জ জেলা সমিতি]

নিরাপদ খাদ্য, সুস্থ ভবিষ্যৎ

খাদ্য নিরাপত্তা একটি দেশের জন্য স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভোক্তার আস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি| খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবেশনের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে খাদ্যদূষণ ও খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়| আধুনিক বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ‘খামার থেকে খাবার টেবিল’ পদ্ধতিতে বিবেচনা করা হয়, যেখানে পুরো খাদ্য শৃঙ্খলকে একসঙ্গে নজরদারির আওতায় আনা হয়| খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি (হাইজিন) এবং জন্য স্বাস্থ্যের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে— স্বাস্থ্যবিধির অভাব খাদ্যদূষণ ঘটায় এবং রোগের বিস্তার ঘটায়, আর সঠিক স্বাস্থ্যবিধি জন¯^াস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখে|ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিশ্বে সবচেয়ে উন্নত ও ˆবজ্ঞানিকভাবে শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত| সেখানে জেনারেল ফুড ল’ এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে যে বাজারে আসা প্রতিটি খাদ্য মানুষের জন্য নিরাপদ হতে হবে| ইউরোপিয়ান ফুড সেফটি অথরিটি ¯^াধীনভাবে ˆবজ্ঞানিক গবেষণা ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে, যার ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ করা হয়| পাশাপাশি র‌্যাপিড অ্যালার্ট সিস্টেম ফর ফুড অ্যান্ড ফিড দ্রুত খাদ্যঝুঁকি শনাক্ত করে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করে এবং ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য বাজার থেকে সরিয়ে নেয়| ফলে ইউরোপে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় সমšি^ত, ¯^চ্ছ এবং ˆবজ্ঞানিক উপায়ে, যা জনগণের মধ্যে উচ্চ আস্থা ˆতরি করেছে|যুক্তরাজ্যের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সুসংগঠিত| ফুড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সি এই ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়| যুক্তরাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ˆবশিষ্ট্য হলো ফুড হাইজিন রেটিং সিস্টেম (এফএইচআরএস), যা সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য প্রতিষ্ঠানের ¯^াস্থ্যবিধির মান সহজভাবে তুলে ধরে| এই ব্যবস্থায় রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, হোটেল ও অন্যান্য খাদ্য ব্যবসাকে ০ থেকে ৫ পর্যন্ত স্কোর দেয়া হয়—৫ মানে অত্যন্ত ভালো এবং ০ মানে গুরুতর ঝুঁকিপূর্ণ| এই রেটিং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশপথে প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক (বিশেষত ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে) এবং অনলাইনে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে| ফলে ভোক্তারা সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে কোথায় নিরাপদ খাবার পাওয়া যাবে, এবং ব্যবসায়ীরাও ভালো রেটিং পেতে ¯^াস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য হয়|খাদ্য নিরাপত্তা যুক্তরাজ্যে খাতভিত্তিকভাবে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়| উৎপাদন শিল্পে এইচএসিসি পদ্ধতি বাধ্যতামূলক, যা খাদ্যের ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে| ক্যাটারিং খাতে—যেমন রেস্টুরেন্ট ও হোটেলে—কর্মীদের প্রশিক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সঠিক রান্না ও সংরক্ষণ তাপমাত্রা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| খুচরা বিক্রয় খাতে খাদ্যের লেবেলিং, অ্যালার্জেন তথ্য প্রদান এবং কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়| এই সমšি^ত ব্যবস্থার ফলে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি কম এবং জনগণের মধ্যে খাদ্যের প্রতি আস্থা বেশি|অন্যদিকে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো উন্নয়নশীল পর্যায়ে রয়েছে| ২০১৩ সালের খাদ্য নিরাপত্তা আইন এবং বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি প্রতিষ্ঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও বাস্তবায়নে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে| পরিদর্শন ও আইন প্রয়োগের সক্ষমতা এখনও দুর্বল, আধুনিক পরীক্ষাগারের সংখ্যা কম, এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমš^য়ের অভাব রয়েছে| দেশের বড় একটি অংশে অনানুষ্ঠানিক খাদ্য ব্যবসা পরিচালিত হওয়ায় নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে| খাদ্যে ভেজাল—যেমন ক্ষতিকর রাসায়নিক, কৃত্রিম রং ও সংরক্ষণকারী পদার্থের ব্যবহার—একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে|এই পার্থক্যের প্রভাব সরাসরি জন¯^াস্থ্যে প্রতিফলিত হয়| ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে খাদ্যবাহিত রোগের হার তুলনামূলক কম এবং জনগণের মধ্যে খাদ্যের প্রতি আস্থা বেশি| কিন্তু বাংলাদেশে খাদ্যদূষণের কারণে ডায়রিয়া, খাদ্যবিষক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি ¯^াস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ¯^াস্থ্যখাত ও অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে|বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা উন্নয়নের জন্য একটি সমšি^ত উদ্যোগ প্রয়োজন| প্রথমত, বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমš^য় বাড়াতে হবে| দ্বিতীয়ত, আইন প্রয়োগ জোরদার করতে হবে—নিয়মিত পরিদর্শন, কঠোর শাস্তি এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে| তৃতীয়ত, আধুনিক পরীক্ষাগার ও কোল্ড চেইন অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি| আন্তর্জাতিক মান যেমন এইচএসিসিপি ও কোডেক্স অ্যালিমেনটেরিয়াস অনুসরণ করলে খাদ্যের মান বৃদ্ধি পাবে এবং রপ্তানির সুযোগও বাড়বে|খাতভিত্তিক উন্নয়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| খাদ্য উৎপাদন শিল্পে মাননিয়ন্ত্রণ ও ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে| রেস্টুরেন্ট ও ক্যাটারিং খাতে যুক্তরাজ্যের মতো ফুড হাইজিন রেটিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে, যেখানে প্রতিটি খাদ্য প্রতিষ্ঠানের মান জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে| এতে ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়বে এবং ব্যবসায়ীরা নিয়ম মেনে চলতে উৎসাহিত হবে| খুচরা বাজারে সঠিক লেবেলিং, সংরক্ষণ এবং বিশেষ করে স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের নিয়মের আওতায় আনতে হবে| একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও শিক্ষার মাধ্যমে ভোক্তাদের সচেতন করা জরুরি|সবশেষে বলা যায়, খাদ্য নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার| যুক্তরাজ্যের ফুড হাইজিন রেটিং সিস্টেমের মতো ¯^চ্ছ ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ দেখিয়ে দেয় যে সঠিক নীতি ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব| বাংলাদেশ ইতোমধ্যে যাত্রা শুরু করেছে, এখন প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, সচেতনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা| নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি সুস্থ ও নিরাপদ জাতি গড়ে তুলতে|[লেখক: যুক্তরাজ্যের স্যালুটিভিয়া নামক একটি খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিতে ইনোভেশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন]

ভিডিও

ম্যানসিটিতে ভাঙনের ইঙ্গিত

ক্যারাবাও কাপ জয়ের আনন্দ এখনো ভোলেননি ম্যানচেস্টার সিটি সমর্থকেরা। কিন্তু ট্রফি হাতে পেপ গার্দিওলা ও বের্নাদো সিলভার উজ্জ্বল হাসির পেছনে যেন লুকিয়ে আছে অশনি সংকেত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, সিলভার ভবিষ্যৎ নিয়ে গার্দিওলার ‘গ্রাম্পি’ (খিটখিটে) মনোভাব দলের ভেতরে অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।দীর্ঘদিন ধরে সিটির মিডফিল্ডের অপরিহার্য অংশ বের্নাদো সিলভা। প্রতিটি ম্যাচে তার অদম্য দৌড়, টেকনিক ও ফুটবল বুদ্ধি দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সম্প্রতি পর্তুগিজ এই তারকার ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা বেড়েছে। গার্দিওলার সাম্প্রতিক আচরণ বিশ্লেষকদের চোখে পড়েছে, যা ভাঙনের ইঙ্গিত বহন করছে।গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিলভা প্রসঙ্গে গার্দিওলার মনোভঙ্গি ‘বিরক্তিকর। যদিও সরাসরি কোনো মুখোমুখি সংঘাতের খবর নেই, কিন্তু পর্দার আড়ালে নাকি পরিস্থিতি খুব একটা স্বাভাবিক নয়। সিলভা বহুবারই ইউরোপের অন্য ক্লাবে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। বার্সেলোনা ও পিএসজির মতো ক্লাবগুলোতে তার নাম জড়িয়েছে বারবার। এই নিয়েই নাকি গার্দিওলার সঙ্গে মতপার্থক্য দেখা দিচ্ছে।প্রিমিয়ার লিগের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসেছে এই অস্থিরতার খবর। সিটি এখনও শিরোপা দৌঁড়ে আছে। কিন্তু দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়দের একজনকে নিয়ে এই অনিশ্চয়তা পছন্দ করবেন না গার্দিওলা। অন্যদিকে, সিলভা হয়তো চান ক্যারিয়ারের শেষভাগে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে।ম্যানসিটি ভক্তদের জন্য বড় প্রশ্ন হলো- সিলভা কি থাকছেন, না কি যাচ্ছেন? যদি তিনি চলে যান, তাহলে তার জায়গা কে নেবে? আর পেপ কি সত্যিই ‘গ্রাম্পি’ নাকি এটা কেবলই গুঞ্জন? উত্তর মিলবে হয়তো আগামী কয়েক সপ্তাহের ট্রান্সফার বাজারে। 

ম্যানসিটিতে ভাঙনের ইঙ্গিত
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ১৯ জন