সংবাদ
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ‘সোনালি ৫০ বছর’: জলবায়ু মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগের আহ্বান

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ‘সোনালি ৫০ বছর’: জলবায়ু মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগের আহ্বান

মালয়েশিয়ায় দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গেছেন তিনি। সফরে তার সঙ্গে রয়েছেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বিদেশ সফর। বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ‘সোনালি ৫০ বছর’-এ প্রবেশের মুখে এই সফরকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টারা।সফরের প্রথম অংশে সোমবার (২২ জুন) স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইট দালিয়ান ঝুশুইজি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানান লিয়াওনিং প্রদেশের ভাইস গভর্নর এবং চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে হোটেল শাংগ্রি-লা’তে নিয়ে যাওয়া হয়।সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার (২৩ জুন) স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় চীনের দালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলোইস জভিংগি।সাক্ষাৎকারের শুরুতেই তিনি সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ডব্লিউইএফ-এর জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উদ্যোগের প্রশংসা করে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ডেল্টা রাষ্ট্র ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, ‘বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরে ২৫০ মিলিয়ন বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার ও বন্যার ঝুঁকি কমাতে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখনন করা হচ্ছে।’নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অগ্রগতি উল্লেখ করে তিনি জানান, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।প্রধানমন্ত্রীর এসব দূরদর্শী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে আলোইস জভিংগি বলেন, ‘বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করবে।’ তিনি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাকে বৈশ্বিক পরিসরে কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং ফোরামের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান।এই সৌজন্য সাক্ষাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।চীনে পৌঁছানোর আগে মালয়েশিয়া সফরের শেষ অংশে কুয়ালালামপুরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে এক একান্ত বৈঠকে মিলিত হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারক এবং দুটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।এছাড়া কুয়ালালামপুরের শাংগ্রি-লা হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিক শীর্ষ করপোরেট নেতার সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ‘এমএমসি পোর্টস’-এর চেয়ারম্যান সৈয়দ মোখতার আল-বুখারি বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানা স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ‘রবি আজিয়াটা গ্রুপ’-এর সিইও নিক রিজাল কামিল দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো ও দ্রুত ফাইভ-জি চালুর বিষয়ে আলোচনা করেন এবং বিনিয়োগবান্ধব বাজেটের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি ‘এয়ারএশিয়া’র গ্রুপ সিইও বো লিংগাম বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।#### বেইজিংয়ে মূল দ্বিপক্ষীয় সফর ও প্রতিনিধিদলের যোগদানদালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর বার্ষিক সভা ও জলবায়ু বিষয়ক সেমিনারে অংশ নেওয়া এবং চীনের স্টেট কাউন্সিলের প্রিমিয়ার কর্তৃক স্বাগত সংবর্ধনায় যোগ দেওয়া শেষে প্রধানমন্ত্রী বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। বেইজিংয়েই শুরু হবে এই সফরের মূল দ্বিপক্ষীয় কার্যক্রম।প্রধানমন্ত্রীর এই রাষ্ট্রীয় সফরে প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত হতে মঙ্গলবার রাতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এয়ার চায়নার একটি নিয়মিত ফ্লাইটে বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠিতব্য উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সভায় অংশগ্রহণ করবেন।সফরের অন্যতম প্রধান দিক হিসেবে, দুই দেশের শীর্ষ নেতার উপস্থিতিতে গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। তথ্যমন্ত্রী চীনের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)’ এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি’-এর সাথে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বিষয়ক কয়েকটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষর করবেন।বর্তমানে বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিসহ সরকারের আরও কয়েকজন মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যুক্ত রয়েছেন। সফর শেষে আগামী ২৬ জুন রাতে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
৫০ মিনিট আগে

বিশ্বকাপ সময়সূচি: দেখতে ক্লিক করুন

মতামতমতামত

সুশাসনের নৈতিক অর্থনীতি

অর্থনৈতিক উন্নয়নের আলোচনায় সাধারণত মূলধন গঠন, শিল্পায়ন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মতো কারিগরি পরিভাষাগুলো প্রাধান্য পায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা আবার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহিতার ওপর জোর দেন। তবে এই সমস্ত কাঠামোগত ধারণার গভীরে একটি মৌলিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা নিহিত থাকে—তা হলো ‘আস্থা’। নাগরিকরা যখন বিশ্বাস করেন যে তাদের করের টাকা জনকল্যাণে ব্যয় হবে, বিনিয়োগকারীরা যখন চুক্তির সুরক্ষার নিশ্চয়তা পান, আর শ্রমিকরা যখন বিশেষাধিকারের বদলে যোগ্যতার মূল্যায়ন দেখেন, তখনই উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি তৈরি হয়। আস্থার এই মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ভিত্তিকেই বলা যায় ‘সুশাসনের নৈতিক অর্থনীতি’। শাসনব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে ‘নৈতিক অর্থনীতি’ হলো রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তির অধীনেই সরকার কর আদায় করে এবং জনসম্পদ পরিচালনার বৈধতা পায়, যার মূল শর্ত হলো এই ক্ষমতার ব্যবহার হবে জনকল্যাণে। যখন এই সামাজিক চুক্তি লঙ্ঘিত হয়, তখন প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা সংকটে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অগ্রগতি থমকে দাঁড়ায়। বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্যায়নে দেখা যায়, সুশাসন কেবল কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এটি একটি দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক সম্পদ। শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোসম্পন্ন দেশগুলো ভৌত অবকাঠামোসর্বস্ব দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্নেন্স ইন্ডিকেটরস’ ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ করেছে যে, সরকারি কার্যকারিতা, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতার মতো সূচকগুলোর সঙ্গে একটি দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক লেনদেন ব্যয় হ্রাস এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অর্জন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। দেশটি একটি ভঙ্গুর দশা থেকে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি জিডিপিসহ নিম্ন-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্য হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, নারী শিক্ষা এবং তৈরি পোশাক খাতের বিশ্বব্যাপী সাফল্য এর অন্যতম উদাহরণ। তবে এই অর্জনকে ধরে রেখে উচ্চ-মধ্যম আয়ের স্তরে পৌঁছানোর পথে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সুশাসনের ঘাটতি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ‘দুর্নীতি ধারণা সূচক ২০২৫’ (যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত)-এ বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৪, যা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে অনেক নিচে। এই সূচককে কেবল একটি ‘ধারণা’ বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই, কারণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী এবং ঋণদাতারা পুঁজি বিনিয়োগের আগে এই সুশাসনের ঝুঁকিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করেন। ফলে, দুর্নীতির এই নেতিবাচক ধারণা সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুর্নীতিকে কেবল নৈতিক স্খলন হিসেবে দেখলে এর পূর্ণাঙ্গ রূপ বোঝা যাবে না; এটি মূলত একটি বড় অর্থনৈতিক বিকৃতি। দুর্নীতি উৎপাদনশীল খাত থেকে সম্পদ সরিয়ে নেয় এবং সরকারি প্রকল্পের ব্যয় অন্যায়ভাবে বাড়িয়ে দেয়। দুর্নীতির কারণে অপচয় হওয়া প্রতিটি টাকা আসলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু অভিযোজনের মতো অতি জরুরি খাতগুলোর বরাদ্দে টান ফেলে। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হলো, এটি বাজারে এমন একটি অনিশ্চয়তা তৈরি করে যা দীর্ঘমেয়াদী দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা, যাদের রাজনৈতিক প্রভাব বা বাড়তি পুঁজি নেই, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যখন মেধার চেয়ে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বা প্রভাব খাটিয়ে বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হয়, তখন উদ্ভাবনী শক্তি নষ্ট হয় এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা স্থবির হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবৈধ আর্থিক প্রবাহ বা অর্থ পাচার। ভুল চালান, কর ফাঁকি এবং মুনাফা স্থানান্তরের মাধ্যমে প্রতি বছর দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ বাইরে চলে যাচ্ছে। এই বহিঃপ্রবাহ রাষ্ট্রকে তার অপরিহার্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে, যা অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে দুর্বল করে এবং সরকারকে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ক্ষতিকর বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা হলো জিডিপির তুলনায় করের অত্যন্ত নিম্ন অনুপাত, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও কর আদায়ের হার আশানুরূপ বাড়েনি। এর মূল কারণও সুশাসনের সংকট। কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের অভাব এবং করদাতাদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি কর পরিপালনকে ব্যাহত করে। নাগরিকরা যখন দেখেন যে তাদের করের টাকা স্বচ্ছতার সঙ্গে জনকল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে না, তখন কর ফাঁকির প্রবণতা বা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বৃদ্ধি পায়। একইভাবে, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সুশাসনের চরম ঘাটতি দৃশ্যমান। প্রকল্পের ভুল নির্বাচন, কেনাকাটায় অনিয়ম, বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্বল তদারকি সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে। অবকাঠামো খাতে (যেমন পরিবহন ও জ্বালানি প্রকল্প) ব্যাপক বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন হলেও, তা যদি অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীস্বার্থের ভিত্তিতে হয়, তবে তা উৎপাদনশীল সম্পদ না হয়ে উল্টো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিশাল ঋণের বোঝা বা দায়ে পরিণত হয়। বাংলাদেশের আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত দীর্ঘকাল ধরে সুশাসনের অভাবে ভুগছে। একটি সুস্থ অর্থনীতিতে ব্যাংকগুলো সঞ্চয় সংগ্রহ করে তা উৎপাদনশীল খাতে বরাদ্দ করে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন এবং তদারকির অভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। খেলাপি ঋণের এই সংস্কৃতি আর্থিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করছে এবং প্রকৃত উৎপাদনশীল উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা সংকুচিত করছে। আর্থিক খাতের এই দুর্বলতা বিনিয়োগ ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। এই শাসনতান্ত্রিক কাঠামোকে কার্যকর করতে আরেকটি অপরিহার্য উপাদান হলো দক্ষ জনপ্রশাসন ও স্বাধীন বিচার বিভাগ। জনপ্রশাসনে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও চুক্তি কার্যকরের জন্য আইনের শাসন এবং একটি পূর্বাভাসযোগ্য আইনি পরিবেশ অপরিহার্য। বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিশ্চয়তা ব্যবসার লেনদেন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আধুনিক প্রযুক্তি বা ডিজিটাল শাসন একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা, অনলাইন কর প্রশাসন এবং ডিজিটাল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমিয়ে দুর্নীতির সুযোগ অনেকাংশে হ্রাস করে। বাংলাদেশ ডিজিটালাইজেশনে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সব সংকট সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা। এখানেই গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্বাধীন সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সচেতন নাগরিকদের ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে বাধ্য করে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে না, একে নাগরিক সক্রিয়তার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। উন্নয়নের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি ও সম্ভাবনা উভয়ই সমান। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক বাজারে একীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য আমাদের এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন যা জটিলতা সামলাতে এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ইতিহাস দেখায় যে, সুশাসন সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতা। সুশাসনের নৈতিক অর্থনীতি কোনো বিমূর্ত দর্শন নয়; এটি সমাজ ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার এক বাস্তবসম্মত পথরেখা। টেকসই উন্নয়নের পথ শুধু উচ্চতর প্রবৃদ্ধির হার বা বড় বাজেটের চটকদার সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত ভিত্তি নিহিত রয়েছে স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং জনস্বার্থের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের মধ্যে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

গণপরিসর নামকরণে ব্যক্তিবাদী শখ এবং গণতন্ত্রের সংস্কৃতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার সবসময় বড় কোনো দুর্নীতি, অর্থলুট বা নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই দৃশ্যমান হয় না। এতে আরও কিছু বিষয়ও রয়েছে। অনেক সময় সেগুলো প্রকাশ পায় আপাতদৃষ্টিতে ছোট, কিন্তু প্রতীকীভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো কোনো ঘটনায়। বগুড়ার নবগঠিত কয়েকটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক তেমনই একটি ইঙ্গিত। এটি কেবল তিনটি ইউনিয়নের নাম নিয়ে বিতর্ক নয়; বরং রাষ্ট্র, ক্ষমতা, গণপ্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের রাজনৈতিক মানসিকতার স্বরূপ তুলে ধরে। ঘটনার বিবরণ এখন সবার জানা। নবগঠিত ইউনিয়নগুলোর নাম রাখা হয়েছিল ‘মীরবাড়ী’, ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’। পরে অভিযোগ ওঠে, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাড়ির নাম মীরবাড়ী এবং তার দুই ছেলের নাম সীমান্ত ও দিগন্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি জাতীয় সংসদেও ওঠে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেন এবং নতুন করে গণশুনানির উদ্যোগ নেয়া হয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আদৌ কি এসব নাম কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশে রাখা হয়েছিল? এর উত্তর হয়তো কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই জানেন। কিন্তু গণতন্ত্রে আরও বড় প্রশ্ন হলো- সাধারণ নাগরিকরা বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?যখন কোনো প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় তার পৈতৃক বাড়ির নামে একটি ইউনিয়ন এবং তার দুই সন্তানের নামের সঙ্গে হুবহু মিল থাকা আরও দুটি ইউনিয়নের নামকরণ হয়, তখন জনমনে সন্দেহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ গণতন্ত্রে শুধু অন্যায় না করাই যথেষ্ট নয়; এমন পরিস্থিতিও এড়িয়ে চলতে হয়, যা অন্যায়ের ধারণা সৃষ্টি করে। এতে স্বার্থসংঘাতের পবণতা দৃশ্যমান হয়। গণআস্থার জন্য এটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, এটি কাকতালীয়ভাবে ঘটেছে। তিনি রসিকতার সুরে সীমান্ত ব্যাংক, সীমান্ত এক্সপ্রেস কিংবা দিগন্ত টাওয়ারের উদাহরণও দিয়েছেন। কিন্তু সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু সেখানে নয়। সীমান্ত বা দিগন্ত শব্দ দুটি বাংলা ভাষার সাধারণ শব্দ হতে পারে; কিন্তু যখন একই সঙ্গে একজন মন্ত্রীর দুই সন্তানের নাম, তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম এবং তার নির্বাচনী এলাকার নতুন প্রশাসনিক ইউনিটের নাম এক হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন উঠবেই। সেই প্রশ্নকে কৌতুক দিয়ে উড়িয়ে দেয়া যায় না। বরং এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি পুরনো রোগের দিকে আঙুল তোলে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ, গণপ্রতিষ্ঠান ও জনপরিসরকে ব্যক্তিগত প্রভাবের প্রদর্শনক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে অহরহ। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদেও নামে সড়ক, সেতু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এমনকি প্রশাসনিক স্থাপনার নামকরণ হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা যেন ধীরে ধীরে রাষ্ট্রকে নিজের প্রতিচ্ছবিতে রূপান্তর করার একটি উপায় হয়ে উঠেছে। এতে গণতন্ত্রায়ন সঙ্কুচিত হয়। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে- আমরা কি সেই সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে পেরেছি?সংসদে এই বিষয়ে যে আপত্তি উঠেছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ আপত্তিকারীরা মূলত স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যে সংস্কৃতিকে অতীতে ‘ব্যক্তিপূজা’ বা ‘ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক চর্চা’ বলে সমালোচনা করা হয়েছে, ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই একই প্রবণতা ফিরে এলে জনগণের হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ইউনিয়ন পরিষদ আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নামকরণ করা যাবে না। আইন হয়তো সরাসরি লঙ্ঘিত হয়নি; কিন্তু আইনের ভাষাকে পাশ কাটিয়ে আইনের চেতনাকে দুর্বল করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক শাসনের মূল শক্তি শুধু আইনের অক্ষরে নয়, তার নৈতিক উদ্দেশেও নিহিত। এই ঘটনার আরেকটি শিক্ষণীয় দিক হলো প্রশাসনিক জবাবদিহি। যদি সত্যিই গণশুনানির মাধ্যমে এসব নাম নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল? কারা অংশ নিয়েছিলেন? কী কী বিকল্প নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল? প্রশাসন কি সম্ভাব্য বিতর্ক সম্পর্কে সচেতন ছিল না? নাকি ক্ষমতার নৈকট্য প্রশাসনিক বিচক্ষণতাকে দুর্বল কওে দিয়েছে?সবশেষে প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। অনেকেই এটিকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। নিঃসন্দেহে বিতর্কিত নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ স্বাগতযোগ্য। কিন্তু একটি সুস্থ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় প্রশ্ন হওয়া উচিত-এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো কেন? প্রতিটি বিতর্ক কি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সমাধান হবে? তাহলে স্থানীয় সরকার, জেলা প্রশাসন, মন্ত্রণালয় এবং গণশুনানির প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা কোথায়?গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কোনো নেতার সদিচ্ছায় নয়; বরং এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায়, যেখানে ব্যক্তির চেয়ে নীতি বড়, ক্ষমতার চেয়ে প্রক্রিয়া শক্তিশালী, আর আনুগত্যের চেয়ে জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ। গণপ্রতিষ্ঠান জনগণের। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, সড়ক, বিদ্যালয় কিংবা রাষ্ট্রীয় স্থাপনা কোনো রাজনৈতিক নেতা বা তার পরিবারের স্মারক নয়। এগুলো একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি ও সম্মিলিত পরিচয়ের বাহক। তাই গণপরিসরের নামকরণও হতে হবে সেই সামষ্টিক চেতনার প্রতিফলন। বগুড়ার এই ঘটনা হয়তো কয়েকদিনের মধ্যেই সংবাদ শিরোনাম থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু এটি আমাদের সামনে একটি স্থায়ী প্রশ্ন রেখে গেছে-আমরা কি সত্যিই ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছি, নাকি কেবল ব্যক্তির নাম বদলাচ্ছি, অথচ সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটছে না?এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র কতটা পরিণত, আর রাষ্ট্র কতটা জনগণের। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কবি ও সংবাদকর্মী]

রিহাভিলিটাশন আইনের সীমাবদ্ধতা

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জাতীয় দৈনিক সমূহে একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, যার মূল বক্তব্য হলো— বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে হলে একজন পেশাজীবীকে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করে নির্ধারিত বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। এই স্বীকৃতি ছাড়া কেউ পেশাগতভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করলে আইন অনুযায়ী এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। জানামতে, বাংলাদেশে এই শর্ত পূরণকারী ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। অন্যদিকে সরকারের ২০২১ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রায় ৪ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর সংখ্যাও চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে— বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কি শুধুমাত্র অল্পসংখ্যক ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের ওপর নির্ভর করে নিশ্চিত করা সম্ভব?পরিসংখ্যানগতভাবে বিষয়টি উদ্বেগজনক। যদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের আইনগত সুযোগ খুব সীমিত সংখ্যক পেশাজীবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেবার চাহিদা ও প্রাপ্যতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া; একজন পেশাজীবীর পক্ষে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে কার্যকর সেবা পৌঁছে দেয়া বাস্তবসম্মত নয়। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য চাহিদা বিবেচনা করলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বহুমাত্রিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মডেল নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। বিশ্বের বহু দেশে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের পাশাপাশি কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, ড্রামা থেরাপিস্ট, আর্ট থেরাপিস্ট, লাইসেন্সধারী কাউন্সেলর, সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার এবং কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্র্যাকটিশনাররা নির্দিষ্ট যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধনের আওতায় কাজ করেন। বাংলাদেশেও প্রতিবছর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাইকোলজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে অসংখ্য শিক্ষার্থী বের হচ্ছেন। পাশাপাশি নাট্যকলা, এক্সপ্রেসিভ আর্টস, কাউন্সেলিং, ট্রমা কেয়ার এবং মনোসামাজিক সহায়তা বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও বহু বছর ধরে দুর্যোগ, শরণার্থী সহায়তা, নারী ও শিশু সুরক্ষা, মাদক পুনর্বাসন এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রমে মনোসামাজিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। প্রশ্ন হলো— এই প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদের স্থান কোথায়?বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য আজ আর প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্ন। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মহত্যা, মাদকাসক্তি, পারিবারিক সহিংসতা, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের স্ট্রেস এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ট্রমা— সব মিলিয়ে দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮-এর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা নিয়ে পেশাজীবী মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের উদ্বেগ, যদি মনোসামাজিক স্বাস্থ্যসেবা ও সাইকোথেরাপি কার্যক্রমের আইনগত পরিসর এমনভাবে নির্ধারিত হয় যে বাস্তবে কেবল ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরাই এসব সেবা দিতে পারবেন, তাহলে দেশের বিদ্যমান মানবসম্পদের একটি বড় অংশ কার্যত সেবা প্রদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। বাংলাদেশেও হয়তো এখন সময় এসেছে ‘একটি পেশা বনাম অন্য পেশা’ বিতর্কের বাইরে গিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মশক্তি গঠনের কথা ভাবার। সরকার চাইলে বিভিন্ন স্তরের লাইসেন্সিং ও নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করতে পারে। যেমন— ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, এক্সপ্রেসিভ আর্টস থেরাপিস্ট, কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ ওয়ার্কার এবং সাইকোসোশ্যাল সাপোর্ট প্র্যাকটিশনারদের জন্য পৃথক নিবন্ধন কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একদিকে সেবার মান নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে দেশের বাস্তব চাহিদাও পূরণ হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করলেই দক্ষ পেশাজীবী তৈরি হয় না। প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, সুপারভিশন, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগগুলোতে আরও বেশি প্রায়োগিক ও ক্লিনিক্যাল উপাদান যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি ৩-৬ মাস মেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্সের মাধ্যমে প্রাথমিক মনোসামাজিক সহায়তা প্রদানকারী কর্মী তৈরি করা যেতে পারে, যারা কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করবেন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের কাছে রেফার করবেন। এই বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন। পেশাজীবী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে বসে একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক, গবেষণা প্রতিবেদন এবং নীতিপত্রের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনা যেতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কোনো একক পেশার এক্রছত্র ক্ষেত্র নয়; এটি জনগণের অধিকার। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—মান বজায় রেখে কীভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষকে নিরাপদ, বৈজ্ঞানিক এবং সহজলভ্য সেবা দেয়া যায়। ১৮-১৯ কোটি মানুষের দেশে যদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল অল্পসংখ্যক পেশাজীবীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেবার চাহিদা ও প্রাপ্যতার মধ্যে একটি গভীর বৈষম্য তৈরি হবে। সেই বৈষম্য দূর করতে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন এবং দক্ষ মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার। বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাত আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখনই সময় এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলার, যেখানে মান, নিরাপত্তা এবং সেবার বিস্তার—এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্ব পাবে। কারণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল একটি পেশাগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। [লেখক: প্রশিক্ষক, নাট্যকলা বিভাগ, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, চট্টগ্রাম]

ভোজ্যতেল আমদানিনির্ভরতা কমানোর এখনই সময়

ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার সাফল্য অর্জন করলেও ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও উদ্বেগজনকভাবে আমদানিনির্ভর। খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেশের অর্জন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু ভোজ্যতেল খাতের চিত্র ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলে। প্রতিবছর দেশের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে পাম অয়েল ও সয়াবিন তেল আমদানিতে, যা অর্থনীতির ওপর নীরব কিন্তু ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। সার্ক কৃষি কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার ৭০ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। এ জন্য বছরে প্রায় ২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তার এই সময়ে এমন উচ্চমাত্রার আমদানিনির্ভরতা শুধু অর্থনৈতিক ঝুঁকিই নয় বরং এটি জাতীয় খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্যও একটি কৌশলগত দুর্বলতা। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাম অয়েল ও সয়াবিন তেল আমদানিতে বাংলাদেশের মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সয়াবিন তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৩৩ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা এবং পাম অয়েলে ২২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৫৯ শতাংশই গেছে সয়াবিন তেলের পেছনে। এর আগের অর্থবছরের তুলনায় চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় পাম অয়েল আমদানিতে ব্যয় প্রায় ৩১ শতাংশ কমলেও সয়াবিন তেল আমদানির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৫০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা এবং আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি এ প্রবণতার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে সয়াবিন তেল আমদানিতে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ১৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে পাম অয়েল আমদানিতে সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে, প্রায় ৩ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েই ভোজ্যতেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৯১২ কোটি টাকা, যার ৭৮ শতাংশই পাম অয়েলের জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে, এত বিপুল অর্থ ব্যয় সত্ত্বেও কেন আমরা এখনও দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে পারছি না? সমস্যা কৃষকের সক্ষমতায় নয়, বরং নীতিগত অগ্রাধিকার ও বিনিয়োগের ঘাটতিতে। ধান উৎপাদনে দীর্ঘদিন ধরে যে ধরনের নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তেলবীজ খাত সে ধরনের গুরুত্ব পায়নি। ফলে সরিষা, সূর্যমুখী, সয়াবিন ও তিলের মতো ফসল এখনও অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তিক জমিতেই সীমাবদ্ধ। অথচ দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল তেলবীজের জাত উদ্ভাবন করেছে। বারি সরিষা-১৪, ১৫ ও ১৭-এর মতো স্বল্পমেয়াদি জাত ধানভিত্তিক ফসল বিন্যাসে সফলভাবে চাষ করা সম্ভব, যা খাদ্যশস্য উৎপাদন কমানো ছাড়াই তেলবীজ উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশে কৃষিজমি সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত। তাই একই জমি থেকে বেশি উৎপাদন নিশ্চিত করাই ভবিষ্যতের পথ। উন্নত জাত, মানসম্মত বীজ, যান্ত্রিকীকরণ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে তেলবীজ উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব। উপকূলীয় অঞ্চলও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভোলা, নোয়াখালী ও পটুয়াখালীর মতো জেলায় লবণাক্ততা সহনশীল সূর্যমুখীর চাষ ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক ফল দিচ্ছে। একইভাবে দক্ষিণাঞ্চলে উন্নত সয়াবিন ও তিলের জাত কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করছে। তবে গবেষণাগারের সাফল্য মাঠে পৌঁছানো না গেলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। বর্তমানে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানসম্পন্ন বীজের সংকট। অনেক কৃষক এখনও নিজস্ব সংরক্ষিত নিম্নমানের বীজ ব্যবহার করেন, যা উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়। তাই বিএডিসির বীজ উৎপাদন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তেলবীজ খাতকে জাতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, যন্ত্রপাতি, ভর্তুকি এবং বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ভোজ্যতেল প্রক্রিয়াজাত শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব, চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ, স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং স্বচ্ছ ক্রয়ব্যবস্থা কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় সরিষার তেলসহ স্থানীয় ভোজ্যতেলের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশ অতীতে বহু কৃষি চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, কার্যকর নীতি এবং কৃষকের পরিশ্রমের সমš^য়ে খাদ্য উৎপাদনে যে সাফল্য এসেছে, তেলবীজ খাতেও তা সম্ভব। ভোজ্যতেল আমদানিনির্ভরতা কমানো শুধু বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। [লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার, সার্ক কৃষি কেন্দ্র]

ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন: শিশু স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ

আগামীকাল থেকে দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন শুরু হতে যাচ্ছে। এবার ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী দুই কোটি ৩৫ লাখের বেশি শিশু এই ক্যাপসুল পাবে। দীর্ঘ ১৪ মাস পর এই ক্যাম্পেইন চালু হওয়ায় স্বস্তির বিষয়। ভিটামিন এ শিশুদের দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় এবং অপুষ্টিজনিত রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর অভাবে রাতকানা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে। নিয়মিত ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাই বছরে দুবার এই কর্মসূচি চালানোর পরিকল্পনা যথাযথ। গত বছরের মার্চ মাসের পর থেকে ক্যাপসুলের সংকটের কারণে ক্যাম্পেইন বন্ধ ছিল। এই দীর্ঘ বিল¤^ শিশু স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সরকারের উচিত এখন থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা সুদৃঢ় করা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো বিল¤^ না হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা যেমন বান্দরবানে এই ক্যাম্পেইন বাস্তবায়নে বাড়তি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরা ঘরে ঘরে পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন। এই প্রচেষ্টা প্রশংসাযোগ্য। সব এলাকায় সব শিশু যাতে ক্যাপসুল পায়, সেজন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। অভিভাবকদেরও উচিত নির্ধারিত কেন্দ্রে শিশুদের নিয়ে আসা। স্বাস্থ্য বিভাগের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই ক্যাম্পেইন শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের সাফল্য নির্ভর করবে এর ব্যাপকতা ও কার্যকারিতার ওপর। এ কর্মসূচি যেন সাময়িক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না থাকে সেটাই আমাদের চাওয়া। শিশুদের সুস্থ বিকাশ ও পুষ্টি নিরাপত্তার স্বার্থে ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা দরকার। 

আদিবাসী ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন

বর্তমানে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি রাষ্ট্রীয় ও আইনি পরিসরে বহুল ব্যবহৃত হলেও অনেক সম্প্রদায় নিজেদের পরিচয় হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করে। সাধারণভাবে আদিবাসী বলতে সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ও জীবনধারা বহন করে আসছে এবং যাদের ঐতিহ্যগত পরিচয় আজও টিকে আছে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বসতি স্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল। তারা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে অনাবাদি জমিকে কৃষিযোগ্য করে তোলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমি দখল ও বঞ্চনার নানা ঘটনা তাদের জীবনকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে ১৮৫৫-৫৬ সালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’। ভূমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে সংঘটিত এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কঠোরভাবে দমন করে। সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবসহ বহু নেতা প্রাণ হারান। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ৪৯ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভূমি সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া আদিবাসী মালিকানাধীন জমি হস্তান্তর করা যেত না। অবৈধভাবে সম্পত্তি ক্রয় করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হওয়ার বিধানও ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষা করা। পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ সালে প্রণীত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনেও আদিবাসী ভূমি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এই আইনের ৯৭ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমি হস্তান্তরের বিষয়ে বিশেষ বিধান রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনী এলেও মূল লক্ষ্য ছিল তাদের ভূমি অধিকার সংরক্ষণ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ভূমি সংক্রান্ত এসব আইনি কাঠামোর অনেক অংশ কার্যকর রয়েছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির পরিমাণ ক্রমশ কমে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সামাজিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি দখল, জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত জমি হারিয়েছে। ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন পাস করা হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ। তবে এই আইন সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত; ভূমি অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রণীত আইনগুলোর সঙ্গে এর উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধি এক নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার পাশাপাশি ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব বহন করে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ বসবাস করে। তাদের জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ হলেও দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিকার সুরক্ষা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং একটি কার্যকর ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি রাজশাহীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আদিবাসী নেতারা ভূমি সুরক্ষা, বেদখল জমি পুনরুদ্ধার এবং ভূমি কমিশন গঠনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারি প্রতিনিধিরাও ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের দাবি, ভূমি, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান আইন কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি। বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ, ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ জনগোষ্ঠীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতিকেও আরও শক্তিশালী করবে। [লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

শূন্যতার স্থাপত্য

মানুষের সবচেয়ে বড় ভ্রম সম্ভবত এই যে, সে ক্ষয়কে ধ্বংস বলে মনে করে। যা হারিয়ে যায়, তাকে সে অনুপস্থিতির অন্ধকারে নির্বাসিত করে; যা ভেঙে পড়ে, তাকে সে সমাপ্তির সমার্থক ভাবতে শেখে। অথচ প্রকৃতির গভীরতম ভাষা আমাদের অন্য এক সত্যের দিকে আহ্বান জানায়। সেখানে পতন মানে অবসান নয়, বরং রূপান্তর; শূন্যতা মানে নিঃশেষ নয়, বরং নতুন সৃষ্টির জন্য প্রস্তুত এক নীরব অবকাশ।জীবনকে যদি একটি দীর্ঘ পথযাত্রা ধরা যায়, তবে সেই পথের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বাইরের কোনো প্রাচীর নয়; বরং অন্তরের ধূলিকতা। এই ধূলি জমে থাকে অভ্যাসের অন্ধত্বে, অহংকারের আবরণে, ভ্রান্ত বিশ্বাসের স্তরে, এবং সেইসব মোহে, যাদের আমরা সত্য বলে আঁকড়ে ধরি। ধূলির স্বভাবই হলো দৃষ্টিকে মলিন করা। সে পথকে পরিবর্তন করে না, কিন্তু পথ দেখার ক্ষমতাকে আচ্ছন্ন করে। ফলে মানুষ পথ হারায় না, হারায় পথ চিনবার সামর্থ্য। এই কারণেই জীবনের বহু প্রতিকূলতা, যেগুলোকে আমরা অভিশাপ মনে করি, প্রকৃতপক্ষে সেগুলো এক একটি পরিশোধনের আয়োজন। সময় কখনো কখনো এমন নির্মমতার মুখোশ পরে আসে, যা আমাদের প্রিয় সব নিশ্চয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সম্পর্কের দেয়াল ভেঙে যায়, আকাঙ্ক্ষার প্রাসাদ ভস্মীভূত হয়, অর্জনের অলঙ্কার মলিন হয়ে পড়ে। তখন আমরা মনে করি, জীবন আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কিন্তু অনেক পরে, দীর্ঘ আত্মসমীক্ষার পর, উপলব্ধি হয়—সময়ের উদ্দেশ্য ধ্বংস নয়; তার উদ্দেশ্য ছিল আবরণ অপসারণ। প্রকৃতির দিকে তাকালে এই সত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বীজকে অঙ্কুরিত হতে হলে তার কঠিন আবরণ ভেদ করতে হয়। মুক্তো জন্ম নেয় এক যন্ত্রণাদায়ক ক্ষতের ভেতর। নদী তার সুর খুঁজে পায় বাঁধ ভাঙার পর। এমনকি নক্ষত্রও আলো ছড়ানোর পূর্বে অগণিত অভ্যন্তরীণ দহন অতিক্রম করে। সৃষ্টির ইতিহাস আসলে রূপান্তরের ইতিহাস; আর রূপান্তরের পূর্বশর্ত হলো কোনো না কোনো স্তরে ভাঙন। কিন্তু মানুষ ভাঙনকে ভয় পায়। কারণ ভাঙন তার পরিচিত সীমানাকে বিপন্ন করে। মানুষ পরিচয়ের চেয়ে সত্যকে কম ভালোবাসে। সে নিজের নির্মিত কারাগারকে স্বাধীনতার চেয়েও বেশি সুরক্ষিত মনে করে। ফলে যখন জীবনের কোনো অদৃশ্য কারিগর সেই কারাগারের প্রাচীরে আঘাত হানে, তখন সে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। অথচ যে দেয়াল ভেঙে পড়ছে, সেটিই হয়তো আকাশ দেখার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় ছিল। দর্শনের এক গভীর শিক্ষা হলো—অস্তিত্ব কখনো স্থির নয়। সবকিছুই প্রবাহমান। নদী যেমন একই থাকে না, মানুষও তেমনি প্রতিক্ষণে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু মানুষের মন স্থায়িত্বের মায়া সৃষ্টি করে। সে পরিবর্তনকে অস্বীকার করতে চায়, সময়কে থামিয়ে রাখতে চায়, ক্ষণস্থায়ীকে চিরস্থায়ী বলে বিশ্বাস করতে চায়। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় অধিকাংশ বেদনা। কারণ জীবন প্রবাহ, আর মানুষ তাকে পাথরে পরিণত করতে চায়। তবু বিস্ময়কর বিষয় হলো, আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান উপলব্ধিগুলো জন্ম নেয় অনিশ্চয়তার ভেতর থেকে। যখন সমস্ত বাহ্যিক ভরসা একে একে সরে যায়, তখনই মানুষ নিজের অন্তর্লোকের সঙ্গে পরিচিত হয়। কূন্যতা তখন আর ভয়াবহ থাকে না; বরং এক গভীর আয়নায় পরিণত হয়। সেখানে মানুষ প্রথমবারের মতো নিজেকে দেখে—সমাজের দেওয়া পরিচয়ে নয়, অর্জনের অলংকারে নয়, বরং অস্তিত্বের নগ্ন সত্যে। জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই। সে কখনো সরাসরি শিক্ষা দেয় না। সে রূপকের আড়ালে কথা বলে, প্রতীকের অন্তরালে ইঙ্গিত করে। একটি ঝরা পাতা, একটি শুকিয়ে যাওয়া নদী, একটি ভাঙা ঘর কিংবা একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন—সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে কোনো না কোনো মহৎ শিক্ষা। যারা কেবল ঘটনাকে দেখে, তারা কষ্ট পায়; যারা ঘটনার অন্তর্নিহিত অর্থকে দেখতে শেখে, তারা প্রজ্ঞা অর্জন করে। অতএব, জীবনের প্রতিটি হারানোকে অভিশাপ ভাবার আগে আমাদের থেমে ভাবা উচিত—এ কি সত্যিই ক্ষতি, নাকি কোনো অদৃশ্য পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়া? যে দরজা বন্ধ হয়েছে, সেটি কি আমাদের বন্দিত্বের কারণ ছিল না? যে সম্পর্ক চলে গেছে, সেটি কি আমাদের আত্মবিকাশকে থামিয়ে রাখেনি? যে ব্যর্থতা আজ অপমানের মতো মনে হচ্ছে, সেটিই কি আগামী দিনের উপলব্ধির ভিত্তি হয়ে উঠবে না?সময়ের সবচেয়ে সূক্ষ্ম শিল্প সম্ভবত এই যে, সে ধ্বংসের ছদ্মবেশে উন্মোচন ঘটায়। সে আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু নিয়ে যায়, কিন্তু তার বিনিময়ে ফিরিয়ে দেয় দেখার নতুন দৃষ্টি। আর একদিন, দীর্ঘ পথচলার শেষে, মানুষ আবিষ্কার করে—তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলো আসলে জন্ম নিয়েছিল সেইসব মুহূর্তে, যেগুলোকে সে একদিন সর্বনাশ বলে ভেবেছিল। তখন সে বুঝতে শেখে, জীবন কখনো পথ কেড়ে নেয় না; জীবন কেবল পথের ওপর জমে থাকা ধূলি সরিয়ে দেয়। আর সেই ধূলি সরে গেলে দিগন্ত হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নির্মল, প্রসারিত, আলোকময়। [লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]সম্পাদিত / অনন্তআদিবাসী ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্নবাবুল রবিদাসবর্তমানে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি রাষ্ট্রীয় ও আইনি পরিসরে বহুল ব্যবহৃত হলেও অনেক সম্প্রদায় নিজেদের পরিচয় হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করে। সাধারণভাবে আদিবাসী বলতে সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ও জীবনধারা বহন করে আসছে এবং যাদের ঐতিহ্যগত পরিচয় আজও টিকে আছে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বসতি স্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল। তারা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে অনাবাদি জমিকে কৃষিযোগ্য করে তোলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমি দখল ও বঞ্চনার নানা ঘটনা তাদের জীবনকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে ১৮৫৫-৫৬ সালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’। ভূমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে সংঘটিত এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কঠোরভাবে দমন করে। সিধু, কানু, চাঁদ ও ˆভরবসহ বহু নেতা প্রাণ হারান। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ৪৯ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভূমি সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া আদিবাসী মালিকানাধীন জমি হস্তান্তর করা যেত না। অবৈধভাবে সম্পত্তি ক্রয় করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হওয়ার বিধানও ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষা করা। পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ সালে প্রণীত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনেও আদিবাসী ভূমি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এই আইনের ৯৭ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমি হস্তান্তরের বিষয়ে বিশেষ বিধান রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনী এলেও মূল লক্ষ্য ছিল তাদের ভূমি অধিকার সংরক্ষণ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ভূমি সংক্রান্ত এসব আইনি কাঠামোর অনেক অংশ কার্যকর রয়েছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির পরিমাণ ক্রমশ কমে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সামাজিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি দখল, জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত জমি হারিয়েছে। ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন পাস করা হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ। তবে এই আইন সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত; ভূমি অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রণীত আইনগুলোর সঙ্গে এর উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধি এক নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার পাশাপাশি ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব বহন করে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ বসবাস করে। তাদের জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ হলেও দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিকার সুরক্ষা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং একটি কার্যকর ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি রাজশাহীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আদিবাসী নেতারা ভূমি সুরক্ষা, বেদখল জমি পুনরুদ্ধার এবং ভূমি কমিশন গঠনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারি প্রতিনিধিরাও ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের দাবি, ভূমি, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান আইন কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি। বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ, ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ জনগোষ্ঠীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতিকেও আরও শক্তিশালী করবে। [লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

স্বাস্থ্য বাজেট: বরাদ্দ দ্বিগুণ, মাঠে কতটা?

একটা সংখ্যা দিয়েই শুরু করা যাক- ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। এটাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ, যা গত অর্থবছরের ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই বরাদ্দের ফলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশের গণ্ডি পেরিয়ে ১.১ শতাংশে পৌঁছেছে। সংখ্যাটি শুনতে চমকপ্রদ লাগলেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাস ঘাঁটলে একটা পুরনো প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে- বরাদ্দ আর ব্যয়ের মধ্যে কতটা ফারাক থাকে? গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত এই বাজেটে আরও একটি বড় উদ্যোগ যুক্ত হয়েছে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ, যা স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা। কাগজে-কলমে এ এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবায়নের ইতিহাস আমাদের সতর্ক হতে শেখায়। পুরনো রোগ: বরাদ্দ পড়ে থাকে, ব্যয় হয় না। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সংকট কখনোই কেবল অর্থের অভাব ছিল না, সংকট ছিল সেই অর্থ যথাসময়ে ও যথাযথভাবে ব্যয় করার সাংগঠনিক সক্ষমতায়। বিগত সাত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তার বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের গড়ে মাত্র ৭৬ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে। বাকি প্রায় এক-চতুর্থাংশ অর্থ অব্যবহৃত থেকে যায়, যে টাকায় হয়তো আরও কয়েকশ' কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া যেত, কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা যেত। এর পাশাপাশি মোট সরকারি ব্যয়ের অনুপাতে স্বাস্থ্য ব্যয় ৬.২ শতাংশ থেকে নেমে ৪.০৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল অর্থাৎ সামগ্রিক বাজেট বাড়লেও স্বাস্থ্যখাত ক্রমশ পেছনের সারিতে চলে যাচ্ছিল। এবারের বরাদ্দ বৃদ্ধি যেন সেই প্রবণতা উল্টে দেয়ার একটি সাহসী প্রচেষ্টা। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেই বলছেন, এই বাজেট তখনই বাস্তবমুখী প্রমাণিত হবে যখন কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধিই নয়, বরং প্রশাসনিক সংস্কার, জনগণের পকেট খরচ কমানো এবং অর্থ ব্যয়ের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জিত হবে। আজও দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে মানুষের নিজের পকেট থেকে, এই ভার দরিদ্র পরিবারগুলোকে বারবার অর্থনৈতিক সংকটে ঠেলে দেয়। এই বাস্তবতা বদলাতে দরকার উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ, পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ, ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং কার্যকর ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা। যে চিকিৎসা পদ্ধতি এখনও অবহেলিত। এই কাঠামোগত সংকটের মাঝে একটি বাস্তবতা আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি— বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ, বিশেষত গ্রামাঞ্চলের জনগোষ্ঠী, আজও ˆদনন্দিন স্বাস্থ্যসেবার জন্য আয়ুর্বেদ, ইউনানী ও হোমিওপ্যাথির ওপর নির্ভর করেন। যেখানে আধুনিক চিকিৎসকের নাগাল সীমিত, সেখানে এই ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থাই কোটি মানুষের প্রথম ও প্রধান ভরসা, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিজেই এই সত্যতা স্বীকার করেছে। তাদের ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন স্ট্র্যাটেজি ২০২৫-২০৩৪ সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে প্রমাণভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাকে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একীভূত করতে। গবেষণা শক্তিশালীকরণ, নিরাপদ চিকিৎসার নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গঠন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সংযুক্তির মধ্য দিয়ে। ভারতের অণটঝঐ মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্য মডেল— প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, গবেষণা অর্থায়ন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সংযুক্তির মাধ্যমে দেশটি তার স্বাস্থ্যসেবার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত করেছে। সমন্বয়ের পথে চারটি ধাপ:বাংলাদেশে এই সমন্বয় বাস্তবায়নে চারটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথমত, বিদ্যমান ইউনানী, আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথিক বোর্ডকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতায় শক্তিশালী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রশিক্ষিত ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসকদের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, দেশীয় ভেষজ সম্পদের ওপর প্রমাণভিত্তিক ক্লিনিক্যাল গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করতে হবে। চতুর্থত, মেডিকেল শিক্ষার পাঠ্যক্রমে ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিনের মৌলিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে আধুনিক চিকিৎসকরা সামগ্রিক চিকিৎসা পরিকল্পনায় দক্ষ হয়ে ওঠেন। ৬৯ হাজার কোটি টাকার এই বরাদ্দ একটি শুরু মাত্র, শেষ নয়। প্রকৃত পরীক্ষা হবে এই অর্থ মাঠ পর্যায়ে কতটা দক্ষতার সঙ্গে, কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং কতটা দ্রুততার সঙ্গে ব্যয় হয় তার ওপর। একই সঙ্গে প্রয়োজন স্বাস্থ্যসেবার একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ছেড়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতাকে আমলে নেয়া— যেখানে আধুনিক অ্যালোপ্যাথি ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে। এই দুই পথ একসঙ্গে নিলেই কেবল সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে — শুধু কাগজের বাজেট সংখ্যায় নয়, প্রতিটি বাংলাদেশির প্রকৃত সুস্বাস্থ্যে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]

আষাঢ়ের গল্প

বেশ ক’দিন ধরে গ্রামের বাড়িতে আছি। প্রকৃতি ভীষণ বেজার। দিনভর ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ছে। গাছপালা, পত্রপল্লব যেন স্নাত-স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। গাঢ় সবুজে শোভিত হচ্ছে গ্রামীণ জনপদ। সূর্যালোকের টানা অনুপস্থিতির কারণে ছোট ছোট পথে-ঘাটের ওপর খানিক জলাবদ্ধতা লেগেছে। এটা বর্ষা আর আষাঢ়ের চিরচেনা রূপ। আষাঢ় আসবে আবার নিভৃতে চলে যাবে, তা কী করে হয়? বাদলের ধারা বিহীন আষাঢ় শ্রাবণের কী মূল্য আছে ?রাজধানী শহরের কোলাহল ও যান্ত্রিকতাকে পেছনে রেখে হঠাৎ করে গ্রামে এসে আশ্রয় নিই। সেখানে স্বপ্রতিষ্ঠিত কলেজের পাঠদান বিষয়ে খোঁজ নিই, অফিসে বসে পুরনো বইয়ের পৃষ্ঠায় চোখ রাখি, না হয় লেখালেখিতে নিমগ্ন থাকি। এটা অনেকদিন যাবৎ করে চলেছি। নিভৃতচারী নিঃসঙ্গতা জয়ের জন্যে এর চেয়ে নিরাপদ আর কোনো মাধ্যম নেই। গ্রামে জন্ম, গ্রামে বেড়ে ওঠা এবং গ্রাম অন্তঃপ্রাণ মানুষ হিসেবে আর যাবই বা কোথায়? শহুরে নাগরিক জীবনের একগুঁয়েমির বিকল্প হল বিদেশ-বিভূঁই থেকে ঘুরে আসা। কিন্তু অনেকের জন্যে গ্রামই এর বিকল্প। তাছাড়া বিদেশে যাবার সুযোগ ও সামর্থ ক’জনের থাকে? বিদেশ ভ্রমণ মানে সহজ বিষয় নয়, চাইলেন আর যাত্রা করলেন। এমন সুবিধা বিশেষ কিছু মানুষের থাকলেও সকলের নয়। ভিসা, টিকিট, ফ্লাইট ইত্যাদি পেতে শত ঝামেলা পোহাতে হবে। আবার সবকিছু ঠিক করে বিমান বন্দর বা স্থল বন্দর যেখানেই গেলেন না কেন, শতভাগ গ্যারান্টি কোথায় আপনি সীমান্ত অতিক্রম করতে পারবেন? আপনি হয়তো কিছুই জানেন না, হঠাৎ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে আপনাকে বলা হল, ‘সরি স্যার, ইউ আর নট অ্যালাউড টু মুভ আউট। কারো কিছু করার নেই। সবাই নীরব দর্শক হয়ে থাকবে। উপরন্তু, মিডিয়া কোনো কর্মীর নজরে পড়লে তো বাইরের সকলকে জানানোর দায়িত্ব সে একাই নিয়ে নিবে। সুতরাং স্বদেশের ভেতরে থাকুন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বলয়ে থাকুন, পারলে যৎকিঞ্চিত সমাজকর্ম করুন, আপনজনের সান্নিধ্যে সময় কাটান। দেখবেন দেশের সবকিছু সহনীয়। ২.২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হয়েছে। শুরুর আগেই গ্রামে চলে আসি। ফুটবল বাঙালির আজন্ম শখের খেলা। গত এক শতাব্দীর হিসাবে সকল খেলাকে ছাপিয়ে ফুটবলই শীর্ষ স্থান দখল করে আছে। জনপ্রিয়তার বিচারে ইউরোপের পরে এশিয়ার স&হান হলেও বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ফ্যান, সমর্থকের দীর্ঘতম পতাকা, বৃহত্তম ফুটবল, বিচিত্র জার্সি, আনন্দ মিছিল, উল্লাসের মহোৎসব যতসব নজরকাড়া রেকর্ড বাঙালিরাই বেশি করছে। এখন গ্রামও এমন উন্মাদনার বাইরে নয়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানী, স্পেন, ইংল্যান্ড, ইতালির বাইরের দেশের নাম অনেকেই জানে না। কিন্তু বিশ্বের তারকা ফুটবলারদের নাম সকলের জানা। এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার যে, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সুযোগ হয়নি এমন অনেক গ্রামীণ তরুণ আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের আদ্যান্ত জানে। এমনকি এদের ক্লাবের নাম এবং ফুটবলের ইতিহাসও বলতে পারে। এর জন্যে এককভাবে ধন্যবাদ পাবে এদের হাতের শোভা এন্ড্রয়েড ফোন। এরা ফোনেও খেলার হালনাগাদ তথ্য কণিকা মুখস্থ করে চলেছে। গত দু'দিন ধরে সকলের মুখে মুখে লিওনেল মেসির নাম। বলা যায়, গোটা পৃথিবী এখন মেসিময়। ইতোমধ্যেই হ্যাট্রিক করা আর্জেন্টাইন এ তারকা বয়সের বিচারে ও বিশ্বকাপ ফুটবলের অভিজ্ঞতায় বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এক খেলোয়াড়ের নাম। ফুটবল ইতিহাসের অতীতে গড়া রেকর্ডসমূহকে অবলীলায় পদদলিত করার এক সুবর্ণ সুযোগও এখন তার নাগালের ভেতরে। সবকিছু যথারীতি চললে মেসি কোথায় গিয়ে থামবে তা কেবল তার সময়ই বলতে পারবে। লক্ষ্য করার বিষয় যে, গ্রামের ফুটবল প্রেমীরা আরও অনেক খ্যাতিমান ফুটবল তারকার নাম জানে। তারা রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে, নেইমার জুনিয়র এমনকি অখ্যাত এক দেশের ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার ভোজিয়ানের নামও জানে। ৩.মনে পড়ে, বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে দু’বার খেলা দেখার আনন্দ বেদনার কথা। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ সম্মানের ছাত্র ছিলাম। সাদাকালো টেলিভিশনের যুগ ছিল। ১৯৮৬ সালেও সেই ছাত্রত্ব বহাল ছিল। দুটো বিশ্বকাপের বেশ ক'টি ম্যাচ দেখেছিলাম মুহসীন হলের টিভি রুমের উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে। তখন উচ্ছ্বসিত উত্তেজনায় ফেটে পড়েছিল সবার তারুণ্য। সামনের চেয়ারে আসন পাওয়ার জন্যে চাবি রেখে স্থান দখলে নেয়ার কারণে প্রথমে কথা কাটাকাটি, হাতাহাতি এমনকি দুয়েকজন বন্ধু সহপাঠী শারিরীকভাবে লাঞ্চনারও শিকার হয়েছিল। যদ্দুর মনে পড়ে, ১৯৮২ সালেই বিশ্বকাপ ফুটবল সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম সাদাকালো টিভিতে। তবে সবচেয়ে জমজমাট বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচগুলো উপভোগ করেছিলাম ১৯৮৬ সালে। তখন গোটা পৃথিবী সন্মোহিত হয়ে পড়েছিল দিয়াগো ম্যারাডোনার যাদুতে। সেই থেকে আর্জেন্টিনা নামক দেশ এবং ম্যারাডোনা সমার্থক হয়ে ওঠে। তার দেয়া সেই বিতর্কিত গোল যাকে তিনি ‘ঈশ্বরের হাতে’ বলেছিলেন। মাঠের সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি আমরা লাইভ দেখেছিলাম। সে হিসেবে আমাদের প্রজন্মকে অধিকতর ভাগ্যবান বলা যেতে পারে। পরবর্তীতে তার সে গোলকে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। মনে হয়, আজকের বিশ্ব ফুটবল এবং আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা ম্যারাডোনারই সৃষ্টি। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার হাত ধরেই দেশটি বিশ্বকাপ জিতেছিল। তারপর তাদেরকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ৩৬ বছর। এখন মুখ্যত আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল শিবিরে বিভক্ত গোটা দুনিয়া। ৪.গ্রামে গ্রামে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে গল্প গুজবের ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। কে চেয়ারম্যান, কে মেম্বার পদে লড়বেন তা নিয়ে চায়ের দোকানে সকাল সন্ধ্যায় সংসদ বসছে, ভাঙছে, মুলতবী হচ্ছে। আলোচ্য বিষয়, দলীয় নেতা কর্মীদের প্রার্থীতা, দলীয় প্রতীক হবে কিনা, সকল দল নির্বাচন করতে পারবে কিনা ইত্যাদি। বিশেষ করে নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের সমর্থক বা কর্মী নির্বাচনে সুযোগ পাবে কিনা এটা বড় এক ইস্যু। এ প্রসঙ্গ সামনে আসছে মূলত বর্তমান সরকারের দু’একজন মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক নেতার মন্তব্যের সূত্র ধরে। একই সঙ্গে কয়েকজন তারকা টকশো ওয়ালার সাহসী বক্তব্যও এমন আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বিপক্ষে একটা জনমত রয়েছে। অধিকাংশ মানুষই চায় নির্বাচনে যেন সরকারি দল সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে। এর ফল পূর্বে যেমন ভালো হয়নি, ভবিষ্যতেও বিতর্কের জন্ম দিবে, সাধারণ মানুষকে হতাশ করবে। তারা চায় গ্রামের অবিতর্কিত দুর্নীতিমুক্ত ভালো মানুষ নির্বাচিত হয়ে আসুক। এর জন্যে দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে একটা উৎসবমুখর নির্বাচন হওয়ার আর কোনো বিকল্প নেই। আর যদি নিকট অতীতের সংস্কৃতির চর্চায় সবাই মনোযোগী হয়ে ওঠে তাতে জনগণের কিছু আসবে যাবে না। মঙ্গল অমঙ্গল, শুভ অশুভের দায় যাবে সরকারের ঘাড়ে। কাজেই স&হানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের মাধ্যম নয়, এটা সরকারের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা ও পরমত সহিষ্ণুতার প্রকাশ। আসন্ন স্থানীয় সরকারের সকল নির্বাচন সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ ও ভালো মানুষ চেনার নির্বাচন হোক। [লেখক: গল্পকার]

ভিডিও আরও দেখুন

পাতাগোনিয়ায় ২৬ মিটার উঁচু মেসি!

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল জাদুকরকে নিয়ে বানানো হলো পৃথিবীর অন্যতম বড় ভাস্কর্য। প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলের কাট্রাল কো শহরে উন্মোচিত হলো লিওনেল মেসির ২৬ মিটার উঁচু বিশাল এক প্রতিকৃতি। যার ওজন ৭০ টন!যখন ফুটবল বিশ্বকাপের মাতম চলছে, আর আলজেরিয়া ম্যাচের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আর্জেন্টিনা, তখন এই ভাস্কর্যটি যেন ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গীয় উপহার।জাতীয় মহাসড়ক ২২ এবং ম্যানুয়েল সাভিও সড়কের সংযোগস্থলে বসে থাকা মেসির এই বিশাল মূর্তিটি বসে থাকা অবস্থায় তৈরি করা হয়েছে- যেন তিনি বিশ্বকাপ ট্রফির দিকে তাকিয়ে আছেন।এর ভেতরের অংশ তৈরি হয়েছে ইস্পাত দিয়ে, বাইরে তিন স্তরের কংক্রিটের আবরণ। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সি পরিহিত এই দৈত্যের বুকে জ্বলজ্বল করছে তিনটি সোনালি তারা- যেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের গৌরবগাথা। সামনে রাখা হয়েছে বিশ্বকাপ ট্রফির আদলে একটি অংশ, যা এই ভাস্কর্যকে আরও জীবন্ত করেছে।ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন অ্যালদো বেরোইসা নামে এক শিল্পী। কাট্রাল কো শহরের স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের সঙ্গে এক বছর ধরে কাজ করেছেন তিনি। উদ্বোধনের আগের রাত পর্যন্ত তারা শেষ মুহূর্তের খুঁটিনাটি কাজ করেছেন। মেসির স্বভাবসুলভ ভঙ্গি যেন ফুটে উঠেছে পুরোপুরি।মজার ব্যাপার হলো, শুরুতে মেসির প্রকৃত উচ্চতা অনুযায়ী ১.৭২ মিটার একটি ভাস্কর্য তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ভাস্করকে। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ২৬ মিটার উঁচু এই বিশাল মূর্তি বানানোর প্রস্তাব দেন। তার সেই কল্পনা আজ বাস্তবে রূপ পেয়েছে।এর আগে গত বছর কলকাতায় মেসির ২১ মিটার উঁচু একটি ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু প্রবল বাতাসে কাঠামোটির স্থিতিশীলতা নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর কর্তৃপক্ষ তা সরিয়ে ফেলে। সেই ভাস্কর্যের চেয়েও বড় এই ভাস্কর্যটি যেন মেসি ভক্তদের জন্য এক নতুন মাইলফলক।ফুটবলের জাদুকরের এই বিশাল মূর্তি দেখতে এখন পর্যটকদের ভিড় জমবে পাতাগোনিয়ায়। আর্জেন্টিনার জাতীয় গর্ব লিওনেল মেসি- যিনি বিশ্বকাপ জয় করেছেন, রেকর্ড গড়েছেন, এখন তিনি পাথর আর ইস্পাতে বন্দি হয়ে রয়েছেন প্যাটাগোনিয়ার বুকে। সত্যিই, ২৬ মিটার উঁচু এই মেসি যেন বলছে- আমি আসল মেসির চেয়েও বড়!

পাতাগোনিয়ায় ২৬ মিটার উঁচু মেসি!
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৯৬ জন