সংবাদ
গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৭ জনের মৃত্যু

গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৭ জনের মৃত্যু

সারাদেশে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজন নিশ্চিতভাবে হামে এবং বাকি ছয় জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।বৃহস্পতিবার (১৪ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই উদ্বেগজনক তথ্য জানানো হয়।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে আজ ১৪ মে পর্যন্ত দুই মাসে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৪৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৭০ জন এবং অবশিষ্ট ৩৬৯ জন মারা গেছেন সন্দেহজনক হাম বা এর উপসর্গ নিয়ে।গত ২৪ ঘণ্টার চিত্র: সন্দেহজনক রোগী: ১ হাজার ৩৬৩ জন। নিশ্চিত হাম রোগী: ১৫৫ জন। নতুন মৃত্যু: ৭ জন (১ জন নিশ্চিত, ৬ জন সন্দেহজনক)। দুই মাসের সামগ্রিক চিত্র (১৫ মার্চ - ১৪ মে): মোট সন্দেহজনক রোগী: ৫৪ হাজার ৪১৯ জন। মোট নিশ্চিত হাম রোগী: ৭ হাজার ৩০৫ জন। হাসপাতালে ভর্তি: ৩৯ হাজার ১৬০ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন: ৩৪ হাজার ৯৬৮ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আক্রান্তদের একটি বড় অংশই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে শিশুদের জ্বর বা শরীরে রেশ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।   
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

ইলিশের ঘরবাড়ি

ষাটের দশকের কথা। আমাদের ˆশশব-ˆকশোর কাল। বাংলার পাড়াগাঁয়ে বড় হয়েছি। বলতে পারি, গ্রামীণ জনপদের বিচিত্র সংস্কৃতির শাখা-প্রশাখায় বিচরণ করে এক পর্যায়ে এসে শহুরে পরিবেশ পেয়েছি এবং নাগরিক জীবনের বাঁধাধরা ছকে আবদ্ধ হয়েছি। গ্রামের বিল-ঝিল, মাঠ-ঘাট, খালের জলে ডুব দিয়েছি। দেশি জাতের মাছ ধরার বিচিত্র আনন্দস্মৃতির কথা জীবনকালে কখনও বিস্মরণের অবকাশ নেই। একসময় গ্রামের খালে বিলে নানা জাতের মাছ পাওয়া যেত। ছোট বড়ো বহু প্রজাতির মাছের সীমাহীন প্রাচুর্য ছিল। যা আজকের দিনে চিন্তা করাও অকল্পনীয়। সবই ছিল প্রাকৃতিক সুস্বাদু মিঠা পানির মাছ। তখন পর্যন্ত গ্রামবাংলার মানুষ মাছ চাষের কথা ভাবতেই শিখেনি। এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ এমন গৌরবের অভিধা কী সাধে মিলে ছিল?২.মনে পড়ে, এত সব মাছের ভিড়েও গ্রামের হাটবাজারে কদাচিৎ ইলিশের সাক্ষাৎ পাওয়া যেত। কালেভদ্রে কোনো একজন বিক্রেতা হয়তো দূর-দূরান্তর থেকে দু’চারটি ইলিশ নিয়ে বাজারে এসেছে। অমনি সহানীয় বিত্তবানদের কেউ কেউ তা কিনে নিয়েছে। বাকিরা শুধু দর্শন করেছে। কেনার সংগতি ছিল না বললেই চলে। তখনও ইলিশের দাম অন্য যেকোনো দেশি মাছের চেয়ে বেশি ছিল। কেননা ইলিশ গ্রামে কখনও সহজলভ্য ছিল না। তাই এরা সাধারণের নাগালের বাইরে ছিল। যে যা-ই বলুক, ইলিশ আসলে মাছের রাজাধিরাজ হিসেবেই এর গৌরবময় অতীত লালন এবং ধারণ করে এসেছে। এদের বংশানুক্রমিক আভিজাত্য, কৌলিন্য এবং অহংকারকে অবজ্ঞা করার সুযোগ কারো নেই। বাংলায় চিরকাল ইলিশের প্রতিদ্বন্দী কেবল ইলিশই। ৩.আমাদের ˆকশোরে ইলিশের এক রূপান্তরিত বাজারজাত প্রক্রিয়া দেখেছি। তা হলো— লবন-ছিটানো ও হালকা মশলা মাখানো ইলিশ। ইলিশ মাছকে চাক-চাক করে কেটে লবন লাগিয়ে উন্মুক্ত অবস্থায় বাজারে বিক্রি করা হতো। এটাকে লোনা ইলিশ বলা হতো। বর্ষাকালে গ্রামের হাটবাজারে সহজেই তা পাওয়া যেত। বাবার পছন্দের এক অন্যতম খাবার ছিল সেই লোনা ইলিশ। এ যেনো তাজা রূপালী ইলিশের পরিবর্তে পুরনো বাসি-পঁচা ইলিশের মনোহরা ঘ্রাণ নিয়ে মধ্যবিত্তের নাসিকাকে তৃপ্ত করা। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতন। ৪.ইলিশ বরাবরই অসূর্যস্পর্শা এক অভিমানী মৎস্য প্রজাতি। এরা স্বচ্ছ জলের বাসিন্দা। সমুদ্র বা বড় নদীর গভীর জলে বসবাসকারী এই মাছ নিজেদের স্বজন ছাড়া অন্য কারও মুখ দর্শন করতে চায় না। এরা সংঘবদ্ধ এবং গোষ্ঠীবদ্ধ। এদের কাছে অন্য জলজ প্রাণিকুল সবই যেনো অছ্যুত অস্পৃশ্য। এরা জলের ওপরে এক মিনিটের বেশি সময় বেঁচে থাকার পক্ষে নয়। এরা নিজের এমন পরাভূত অসহায় জীবনকে দেখাতে রাজি নয়। এমনকি এই সুন্দর পৃথিবীর আলো-বাতাসও এরা নিতে চায় না। এমনকি মানুষ নামের শ্রেষ্ঠ জীবকেও এরা এক নজর দেখে যেতে লজ্জাবোধ করে থাকে। ৫.ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর। এটা জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের স্লোগান। সেখানে একবার সরকারি চাকরিতে ছিলাম। পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়ার মোহনায় কিছুদিন বসবাস করে ইলিশদের কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। যদিও সেখানে ইলিশ ফেলনা কোনো জিনিস নয় বরং পরম আরাধ্য বস্তুর ন্যায়। মনের মতো ইলিশের চেহারা দেখতে চাইলে সেই চাঁদপুরেও অনেক কষ্টসাধ্য কাজ। আজকাল ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের কবলে গোটা দেশ। চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে পছন্দের আম কেনার চেয়ে রাজধানীতে যেমন সহজ এবং সুলভ, ইলিশের ক্ষেত্রে চাঁদপুরও তাই। জ্যান্ত ইলিশ মাছ ধরা সম্পর্কে একটা ঘটনার কথা বলি, দেশে তখন ১/১১’র তত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে আছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সরকারের নজরদারি জোরদার হয়েছে। ছায়া সামরিক শাসনের মতন একপ্রকার আবহ বিরাজমান। একদিন দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একজন অতিরিক্ত সচিব চাঁদপুর জেলা সফরে এসেছেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে এক নির্ধারিত মতবিনিময় সভায় যোগ দেন। দিনের কর্মসূচিতে ছিল মধ্যাহ্নভোজের পরে তিনি পদ্মা-মেঘনার সংযোগ স্থলের ভাটিতে গিয়ে জেলেদের ইলিশ মাছ ধরা সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন। এটা দাপ্তরিক নয়, তার একান্তই ব্যক্তিগত মনোবাঞ্ছা। আমার ওপর তার প্রটোকল এবং গাইড হওয়ার দায়িত্ব পড়ে। সার্কিট হাউস হতে সড়ক পথে নদীর ঘাট পর্যন্ত গিয়ে স্পিডবোটে চেপে বসি। চালকসহ তিনজন স্রোতের বিপরীতে খানিকটা ঝুঁকি নিয়ে মাঝ নদীতে গিয়ে হাজির হই। কিন্তু বিরূপ আবহাওয়া বা জোয়ার ভাটার কোনো অলৌকিক কারণে সেদিন জেলেদের জালে ইলিশ ধরা একেবারেই পড়ছিল না। আমরা জেলের নৌকার কাছাকাছি বোটখানা থামিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। অতিরিক্ত সচিবও আজ জ্যান্ত ইলিশের চেহারা না দেখে নদী ত্যাগ করবেন না। আমি রীতিমতো টেনশনে পড়ে গেলাম। এমন ভিআইপি অতিথিকে ইলিশ না দেখাতে পারলে কিসের এডিসি? খানিক পরে হঠাৎ একজন প্রবীণ জেলের জালে দুটো মাঝারি সাইজের রূপার মতন ঝকঝকে ইলিশের নৃত্য দেখে আমার মনের গহীনে আচমকা আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। অতিথির মুখেও তাৎক্ষণিক হাসির রেখা ফুটে উঠলো। তিনি জীবনে প্রথমবার একটি জীবিত ইলিশকে স্পর্শ করে দারুণ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। সেই মুহূর্তে ইলিশটি তার মুখ দর্শন করেছিল কিনা জানি না, তবে তার করতলেই এর জীবনাবসান হতে দেখেছিলাম। সেদিন খুশিতে তিনি বৃদ্ধ জেলের ভেজা হাতে একশো টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে পরম আত্মতৃপ্তি লাভ করেছিলেন। বলা বাহুল্য, সেই অতিরিক্ত সচিব জন্মসূত্রে চাঁদপুরের সন্তান ছিলেন। নিজে কখনও জীবন্ত ইলিশের গায়ে হাত বুলানোর সুযোগ পাননি, এমনটা তিনি হয়তো মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই তার আনন্দের সীমাহীন ছিল না। সেদিনই যেনো তার জীবন সার্থক হয়েছে। ৬.এদেশের ইলিশ কেবল বৈশাখ মাসের প্রথম দিনের পান্তা-ইলিশ নামেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। বৈশাখ আর ইলিশ যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে বেঁচে আছে। তবে পদ্মার ইলিশের বিচরণ এখন সারা পৃথিবীতে। সে কেবল আমাদের পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গ সফর কওে তা-ও সত্য নয়। এত সংক্ষিপ্ত সফর এদের কাছে মোটেও পছন্দের নয়। এরা মূলত দূরদেশি, দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়াতে হতে চায়। যদিও প্রতিবেশী দেশের কাছে এদেও বাধ্য হয়ে যেতে হয়। বাস্তবতা হলো— পৃথিবীর নানা দেশে এদের অবাধ প্রবেশাধিকার আছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা এদের কাছে কোনো বিষয় নয়। বলা যায়, ইলিশরা ভিসামুক্ত দুনিয়ার অধিবাসী। ভিসার জন্য এদেরকে কোনো দালাল ফরিয়ার দ্বারস্থ হতে হয় না। অ্যা¤ে^সির আরোপিত কোনো শর্তের ধার এরা ধারে না। আমাদের স্বদেশীয় লুটেরা, রপ্তানির দালালরাই এদের বিশ্বব্যাপী সফরকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করে দেয়। তখন এরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সজ্জিত কফিনের ভেতরে শুয়ে আরাম-আয়েশে রাজকীয় বেশে সাতসমুদ্র তের নদী পাড়ি দেয়। এবং আকাশ পথের দীর্ঘ সফর শেষে পরভূমে গিয়ে উপস্থিত হয়। বিশ্বব্রম্মান্ডের কোথাও এদের মানমর্যাদা ও সম্মান একবিন্দু কম নয়। বরঞ্চ এতদিন পাশের দেশের গরীব বাঙালিদের নিকট থেকে এরা অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদা পেয়ে এসেছে। আশা করা যায়, আগামী দিনগুলোতে ইলিশরাজ এদের হৃতগৌরব ফিরে পাবে। এবিষয়ে পদ্মা-মেঘনার ইলিশরা মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছে। জানা যায়, ইতোমধ্যে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে এরা স্মরণকালের বৃহৎ সলিল মিছিলে হর্ষধ্বনি দিয়েছে। আরেকটা ছোট্ট অভিজ্ঞতা। ২০০০ সালে অর্থাৎ মিলিনিয়াম বছরে জীবনে প্রথম মার্কিন মুল্লুকে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) সহকর্মীদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সেখানকার বিভিন্ন স্টেটে ঘোরাঘুরি করার এক সুবর্ণ সুযোগ হয়েছিল। সেখানেই দলের সদস্যদের কারও না কারও স্বজনের বাসায় আমন্ত্রিত হয়েছি। বিশেষ করে নিউইয়র্ক ও নিউজার্সিতে। দুটো বাসায় বেড়াতে গিয়ে অনেক কিছুর সঙ্গে ইলিশ দ্বারা আমরা সবাই আপ্যায়িত হয়েছিলাম। আপ্যায়নকারী হোস্ট বলেছিলেন, ' পদ্মার দুই কেজি ওজনের ইলিশ দেশে না পেলেও নিউইয়র্কে পাবেন’। সত্যি কথা বলতে, এমন বৃহদাকার ডিম্বজ ইলিশের টুকরো পরবর্তীতে না চাঁদপুরে না ঢাকায় কোথাও আর নজরে পড়েনি। এতে বোঝা যায়, ইলিশের প্রবীণ ও নেতৃস্থানীয় স্বগোত্রীয়রা এদের রাজসিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নিমিত্ত পাশের দেশ ভারত নয় বরঞ্চ পশ্চিমা দুনিয়াকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। ৭.ইলিশের আদি-ঠিকানা যদি বঙ্গোপসাগর বা পদ্মা-মেঘনার মতো বড় নদী হয়, স্বাভাবিকভাবেই এদের ওপর বাংলাদেশি মানুষের অধিকার সর্বাধিক। তাছাড়া এদের প্রজনন সময়ে কয়েক মাস ধরে এখানকার নদীবিধৌত গরীব মানুষগুলোই অপেক্ষার প্রহর গুণে থাকে। এটা ইলিশকুলও জানে। কিন্তু নানাবিধ সামাজিক, ভূরাজনৈতিক ও বৈশ্বিক কারণে কখনো কখনও আমাদের রূপালী চাঁদবর্ণ সুন্দরী ইলিশদের ব্যবহার করতে হয়েছে। ইতোপূর্বে এদের দিয়ে রাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপাক্ষিক কূটনৈতিক সাফল্যও লাভ করতে হয়েছে। এদিক থেকে ইলিশ কেবল আমাদের জাতীয় মাছ নয়, বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্রের উন্নয়ন এবং ঐক্যের প্রতীকও বটে। তবে অন্যরা যেভাবে যতই ভোগ করুক না কেন, দিনের শেষে ইলিশ আর বাংলাদেশ সমার্থক। কাজেই বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশির নীলাভ রেখায় ঝাঁকবেঁধে ক্ষীপ্র গতিতে ধাবমান ইলিশগুলো অনন্তকাল ধরে কেবল আমাদেরই সম্পদ হয়ে থাক। [লেখক: গল্পকার]

কৃত্রিম মোটাতাজাকরণ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি

কাজী রফিকুল ইসলামঈদুল আজহা মুসলিম বিশ্বে আত্মত্যাগ, সংযম ও মানবিকতার এক অনন্য প্রতীক। এই ঈদে কোরবানি কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি বৃহৎ প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে প্রতিবছর এই সময় ঘিরে গবাদিপশুর বাজারে যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়, তা দেশের কৃষি অর্থনীতি, পশুপালন খাত এবং জনস্বাস্থ্য—সবকিছুকেই স্পর্শ করে। কোরবানির মৌসুমে গরুর চাহিদা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ফলে খামার পর্যায়ে পশু উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর একটি চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপের সুযোগে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও খামারি দ্রুত লাভের আশায় অনৈতিক উপায় গ্রহণ করেন বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিমভাবে পশু মোটাতাজাকরণের প্রবণতা এই খাতে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কৃত্রিম মোটাতাজাকরণ: বাস্তবতা, প্রবণতা ও বৈজ্ঞানিক সতর্কতা : গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অত্যন্ত সুস্পষ্ট সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পরিচর্যা, সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা এবং ভেটেরিনারি তত্ত্বাবধান। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারে দ্রুত লাভের প্রতিযোগিতা এবং ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে কিছু অসাধু চক্র অস্বাভাবিক দ্রুত ওজন বৃদ্ধির জন্য হরমোন ও রাসায়নিক নির্ভর পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব অনিয়ন্ত্রিত চর্চায় বিভিন্ন ধরনের গ্রোথ প্রমোটিং হরমোন, কর্টিকোস্টেরয়েড, বেটা-অ্যাগোনিস্ট জাতীয় পদার্থ এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথ বারবার সতর্ক করে জানিয়েছে যে, প্রাণীতে অযৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার শুধু পশুর স্বাস্থ্য নয়, বরং মানবস্বাস্থ্যের জন্যও দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষত WHO-এর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স রিপোর্ট অনুযায়ী, পশু খাতে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে ব্যাকটেরিয়া ধীরে ধীরে ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণকেও প্রাণঘাতী করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত হরমোন ব্যবহারের ফলে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করা অবশিষ্টাংশ এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে যা বৈশ্বিকভাবে একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ।  পশুর দেহে জৈবিক পরিবর্তন ও অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয় :কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশুর ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে দ্রুত ওজন বৃদ্ধি দেখা গেলেও এর অন্তর্নিহিত জৈবিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গবেষণায় দেখা যায়, স্টেরয়েড বা হরমোন প্রয়োগের ফলে পশুর শরীরে অস্বাভাবিক লিপিড ও তরল জমা ঘটে, যার কারণে শরীর ফুলে ওঠে কিন্তু পেশির স্বাভাবিক ঘনত্ব তৈরি হয় না। এই প্রক্রিয়ার ফলে পেশি টিস্যু দুর্বল ও নরম হয়ে পড়ে, লিভার ও কিডনির ওপর অতিরিক্ত বিপাকীয় চাপ সৃষ্টি হয়, হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক পাম্পিং ক্ষমতা ব্যাহত হয়, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের শারীরিক চাপ পশুর দেহে মাল্টি-অর্গান ডিসফাংশন সিনড্রোম (গঙউঝ)-এর ঝুঁকি বাড়ায়, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণীর অকাল মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এছাড়া পশুর স্বাভাবিক আচরণগত পরিবর্তনও দেখা যায় চাঞ্চল্য কমে যাওয়া, পরিবেশের প্রতি উদাসীনতা এবং খাদ্য গ্রহণে অনিয়ম। এসব লক্ষণ প্রমাণ করে যে, বাহ্যিকভাবে স্বাস্থ্যবান মনে হলেও অভ্যন্তরীণভাবে পশুটি গুরুতর শারীরিক সংকটে থাকতে পারে। জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি: বৈশ্বিক গবেষণা ও বাস্তবতা : মাংস মানবদেহের অন্যতম প্রধান প্রাণিজ প্রোটিন উৎস হলেও এর গুণগত মান সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশুর মাংসে সাধারণত অতিরিক্ত পানি ও ফ্যাটের অনুপাত বৃদ্ধি পায়।বিপাকীয় অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে, অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের চিহ্ন থেকে যেতে পারে, বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্য শৃঙ্খলের যেকোনো পর্যায়ে রাসায়নিক অনিয়ম ঘটলে তা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার শরীরে প্রভাব ফেলে। এর ফলে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতালিভার ও কিডনি ফাংশনের ধীর অবনতি, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি, অন্ত্র ও হজমতন্ত্রে জটিলতা, ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে যাওয়া, বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যা শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং এটি একটি পাবলিক হেলথ ক্রাইসিস-এর সম্ভাব্য ইঙ্গিত বহন করে। কারণ খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এই ঝুঁকি সমগ্র জনগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রাকৃতিক পশুপালন: টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি : বর্তমান বৈশ্বিক কৃষি প্রবণতা ধীরে ধীরে টেকসই ও নৈতিক পশুপালনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশেও অনেক সচেতন খামারি এখন বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক পদ্ধতি অনুসরণ শুরু করেছেন, যা একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। প্রাকৃতিক পশুপালনের মূল উপাদানগুলো হলো সুষম ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা প্রদান, পর্যাপ্ত চলাফেরা ও স্ট্রেসমুক্ত পরিবেশ, পরিচ্ছন্ন খামার ও বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থাপনাভেটেরিনারি চিকিৎসকের নিয়মিত তত্ত্বাবধান, এই পদ্ধতিতে পশু ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, যার ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুস্থ থাকে এবং মাংসের গুণগত মানও উন্নত হয়। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিকভাবে পালিত পশুর মাংসে প্রোটিনের গুণগত মান বেশি থাকে, ফ্যাটের ভারসাম্য স্বাভাবিক থাকে, রাসায়নিক অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি প্রায় অনুপস্থিত থাকে, স্বাদ ও টেক্সচার তুলনামূলকভাবে উন্নত হয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই, কারণ রোগ কম হয় এবং উৎপাদন স্থিতিশীল থাকে। সাধারণ ক্রেতার সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব সমস্যা : বাংলাদেশের সাধারণ ক্রেতাদের বড় একটি অংশের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্বাভাবিকভাবে পালিত পশু এবং কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশুর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন। বাহ্যিকভাবে দুটি পশুই প্রায় একই রকম দেখাতে পারে। তবে কিছু সাধারণ পর্যবেক্ষণ সহায়ক হতে পারে। যেমন সুস্থ পশু সাধারণত সক্রিয় থাকে এবং পরিবেশে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখায়, খাবারের প্রতি আগ্রহ বেশি থাকে, চোখ ও নাক স্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার থাকে, চামড়ায় স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা থাকে। অন্যদিকে কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশু অনেক সময় নিস্তেজ, কম চলাফেরা করা এবং পরিবেশের প্রতি উদাসীন আচরণ করতে পারে। তবে শুধুমাত্র এসব লক্ষণ দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, ক্রেতাদের উচিত নির্ভরযোগ্য খামার, পরিচিত উৎস বা পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কোরবানির পশু নির্বাচন করা। বাজার ব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় তদারকির প্রয়োজনীয়তা :কোরবানির পশুর বাজার একটি বিশাল অর্থনৈতিক খাত, যেখানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু এই বাজারে যদি অনিয়ম ও ভেজাল প্রবেশ করে, তবে তা পুরো ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি নিয়মিত ভেটেরিনারি মনিটরিং, খামার পর্যায়ে ওষুধ ব্যবহারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, বাজারে পশু স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা, অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম, এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং ভোক্তা অধিকার সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নৈতিকতা ও দায়িত্বশীল খামার ব্যবস্থাপনা : পশুপালন শুধু ব্যবসা নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও বটে। একটি জীবকে খাদ্য উৎপাদনের জন্য লালন-পালন করার ক্ষেত্রে মানবিকতা ও বিজ্ঞান উভয়ের সমš^য় থাকা জরুরি। অল্প সময়ে অধিক লাভের জন্য পশুর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এমন পদ্ধতি গ্রহণ করা কেবল অনৈতিকই নয়, দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো শিল্পের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। বরং খামারিদের উচিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা, ভেটেরিনারি সাপোর্ট নিশ্চিত করা, টেকসই উৎপাদন মডেল গ্রহণ করা, কোরবানির সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা, কোরবানির মূল শিক্ষা ত্যাগ, সংযম ও মানবিকতার মধ্যে নিহিত। এই শিক্ষা তখনই পূর্ণতা পায় যখন কোরবানির পশু নির্বাচন থেকে শুরু করে মাংস বিতরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় ন্যায়, সততা ও দায়িত্বশীলতা বজায় থাকে। অসুস্থ বা অনৈতিকভাবে উৎপাদিত পশু কোরবানি কেবল ধর্মীয় উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। পরিশেষে, একটি সুস্থ ভবিষ্যতের আহ্বান: কোরবানির ঈদ আমাদের শুধু ধর্মীয় অনুশাসনের শিক্ষা দেয় না, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের বার্তাও বহন করে। পশু উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যদি সততা, বিজ্ঞান ও নৈতিকতা নিশ্চিত করা যায়, তবে কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে। একটি সুস্থ জাতি গঠনের জন্য নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা অপরিহার্য। আর সেই নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে দায়িত্বশীল পশুপালন, কঠোর নজরদারি এবং সচেতন ভোক্তা আচরণের মাধ্যমে। অতএব, কোরবানির আনন্দ যেন শুধু উৎসবেই সীমাবদ্ধ না থাকে তা যেন একটি নিরাপদ, নৈতিক ও সুস্থ সমাজ গঠনের পথে আমাদের সবাইকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে। [লেখক: ভাইস-চ্যান্সেলর, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়]

গণিতভীতি বনাম গণিতপ্রীতি

 সমস্যা, অনুসন্ধান, যুক্তি এবং সমাধান— এই চারের সমন্বিত রূপ গণিত। গণিতকে বলা হয় বিজ্ঞানের রাজা। বলা হয়, এই মহাবিশ্বের ভাষা হলো গণিত। গণিতের মাধ্যমেই একের পর এক রহস্য উদ্ঘাটন ও সমাধান করেছেন বিজ্ঞানীরা, যার ধারায় বিশ্ব আজ আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে। অথচ এশিয়া, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় গণিতের প্রতি ভীতি প্রবল। যেখানে গণিত খোলে মহাবিশ্বের কঠিন রহস্যের জট, সেই জট খোলার প্রাথমিক হাতেখড়িতেই আতঙ্কগ্রস্ত বাংলাদেশসহ এশিয়ার বহু দেশের শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতকে ভয়ের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে। শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, তাদের অভিভাবকরাও গণিতে প্রাপ্ত নম্বরের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এছাড়া সমাজেও প্রচলিত রয়েছে গণিত সবাই পারে না, এটি অনেক কঠিন বিষয়। এই ভয় ও মানসিকতা থেকেই বন্ধ হয়ে যায় গণিত জয়ের স্বপ্ন। ফলে অনেকেই তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে পিছিয়ে পড়েন। কিন্তু গণিত কি আসলেই ভয়ের কিছু? নাকি এর পেছনে রয়েছে পাঠ্যক্রমের অযৌক্তিক জটিলতা, আর পাঠদানের গতানুগতিক পদ্ধতি?গণিতের প্রতি ভয় সাধারণ কোনো বিষয় মনে হলেও গবেষণা বলছে, গণিতভীতি এক ধরনের মানসিক বাধা। গণিতভীতি বলতে এমন একটি মানসিক অবস্থাকে বোঝানো হয়, যাতে শিক্ষার্থী গণিতের কথা শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, গণিতের সমস্যা সমাধান করতে ভয় পায় এবং গণিতের প্রতি নিজের সক্ষমতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে। এটি সরাসরি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। অনেকের মাঝে সমস্যা সমাধানের স্বাভাবিক বুদ্ধি তৈরিতে বাধা তৈরি করে। শুধু তাই নয়, গণিতভীতি একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ‘অ্যাক্টা সাইকোলোজিকা’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতভীতি তাদের সামগ্রিক ফলাফলকে উল্লেখযোগ্যভাবে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। এছাড়া গবেষণায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা এসএসসি ও এইচএসসিতে দুর্বল ফল করেছিল, তাদের ৬৫.৭ শতাংশই ভুগছিল তীব্র গণিতভীতিতে। সেই সঙ্গে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এই ভীতির শিকার হয় প্রায় ৫৩ শতাংশ বেশি।২০২৪ সালে ৮৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪৮৬ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর চালানো একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, নেতিবাচক অতীত অভিজ্ঞতা ও শিক্ষকের অপর্যাপ্ত সমর্থন সরাসরি শিক্ষার্থীর নিজের কার্যক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। মূলত গণিতের ভিত্তিটাই থাকে দুর্বল। ‘ব্রিং লার্নিং টু লাইফ’ শীর্ষক এক ইউনিসেফ প্রতিবেদনে একটি তথ্য উঠে আসে— প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠে ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণীর অর্ধেক প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। অর্থাৎ ভিত্তি মজবুত না থাকায় তারা কেবল মুখস্থ করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল।আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হলো ‘মুখস্থ নির্ভরতা’। গণিতভীতি শুধু পাঠ্যক্রমের সমস্যা নয়, শিক্ষকের ভূমিকাও যথেষ্ট। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মাঝে শিক্ষকের কাছে প্রশ্ন করা ও শেখার মানসিকতা তৈরি হতে পারছে না। এর জন্য শিক্ষকের পাঠদান প্রক্রিয়া ও তার আচরণ অনেকাংশে দায়ী। শ্রেণীর অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে শুধু সময় পার করে অন্যমনস্কতা ও অবহেলায়। এছাড়া তারা পরীক্ষায় ভুল করলেও সেই ভুল শুধরে দেওয়ার সংস্কৃতি শিক্ষকের মাঝে নেই বললেই চলে, আর শিক্ষার্থীরাও সেটা জানতে আগ্রহ বোধ করে না। মূল সংকট তৈরি হচ্ছে পাঠদান প্রক্রিয়ায়। শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের কাছে গণিতকে সহজভাবে উপস্থাপনের দক্ষতার অভাবে ভুগছেন; এর জন্য প্রয়োজন ছিল যথেষ্ট প্রশিক্ষণ প্রদান। ফলে শিক্ষার্থীরা গণিতকে জটিল ও একঘেয়ে মনে করে। অন্যদিকে নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নকারীরা অভিযোগ করেন যে, বর্তমান শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নযোগ্য নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উচ্চ পর্যায়ের গণিত বাদ দিয়ে এবং বারবার সংস্কারের নামে অর্ধশিক্ষিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর ফলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে পারছে না।পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন করা জরুরি। গণিত শুধু সমাধানের পাশাপাশি বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা ও গল্প, খেলার মাধ্যমে গণিতের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য বাধ্যতামূলক শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বইয়ের পরিমার্জন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা করতে হবে। গণিতের ক্লাসে ভুল করা মানে আরও ভালো করে শেখা— এই ধারণা প্রচলন করতে হবে। এজন্য শিক্ষক ও অভিভাবককে শিক্ষার্থীর ভুল শুধরে দিতে উদ্যোগী হতে হবে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মতো ‘ভুল বিশ্লেষণ ক্লাস’ চালু করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থী নির্দ্বিধায় বলতে পারে, ‘আমি এটা কেন ভুল করলাম?’ যে শিক্ষার্থী এক ক্লাসে থাকা অবস্থায় গণিতের প্রতি পারদর্শিতা অর্জনের আগে তাকে কোনোমতে পাস করিয়ে পরবর্তী ক্লাসে উত্তরণের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে বইয়ের মতো হুবহু অঙ্ক পরীক্ষার প্রশ্নে দেয়া কমিয়ে আনতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করার পদ্ধতি থেকে বের হতে বাধ্য হয়। [লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

কারাগারে চিন্তার স্বাধীনতা

 মানুষ কারাগারে যায় শাস্তি প্রাপ্ত হয়ে। শাস্তির চারটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো—১. প্রতিশোধ: এটি সবচেয়ে পুরনো ধারণা। এখানে বলা হয়, অপরাধী তার কৃতকর্মের জন্য সমান বা উপযুক্ত মাত্রার কষ্ট ভোগ করবে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিশোধের অনুভূতি আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা। ২. প্রতিরোধ: এই উদ্দেশে অপরাধ ও তার শাস্তি অন্য লোকেদের জন্য একটি ভয়ঙ্কর উদাহরণ হিসেবে কাজ করে। শাস্তির কঠোরতা দেখে সাধারণ মানুষ অপরাধ করতে ভয় পায়। এটিকে আবার দুই ভাগেও ভাগ করা যায়—সাধারণ প্রতিরোধ: সমাজের সবাই যেন অপরাধ না করে। বিশেষ প্রতিরোধ: নির্দিষ্ট অপরাধী যেন পুনরায় অপরাধ না করে। ৩. অপসারণ: এখানে মূল লক্ষ্য অপরাধীকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা, যাতে সে তখন আর কোনো ক্ষতি করতে না পারে। জেলখানায় বন্দী করা বা মৃত্যুদণ্ড এর উদাহরণ। ৪. সংশোধন: এটি হচ্ছে আধুনিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। শাস্তির মাধ্যমে অপরাধীকে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ করে দিয়ে উপযোগী নাগরিক হিসেবে সমাজে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের জেলখানায় বই পড়ার অনুমতি দেয়াটাও সংশোধন প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। বাংলাদেশের কারাগার ব্যবস্থা তাত্ত্বিকভাবে ‘সংশোধন’-এর ওপরে গুরুত্ব দিলেও বাস্তবে আসলে কতটা কাজ করে তা ভেবে দেখার বিষয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হলো নেলুফার ইয়াসমিন-এর ÔRecidivism of Prisoners in Bangladesh: Trends and CausesÕ (২০২২)। (ইয়াসমিন ও মৌ, ২০২২)-এর মতে,’ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে, ভারতের বন্দীদের পুনরায় অপরাধের হার (Recidivism Rate) ২০১৩ সালে ৭.২% থেকে ২০১৪ সালে বেড়ে ৭.৮% হয় (রাইজ ফর ইন্ডিয়া, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)। পাকিস্তানে বন্দীদের এই হার ২০১২ সালে ছিল ২৬.৩% এবং ২০১৩ সালে ২৬.৮% (দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ২০১৪)। বাংলাদেশে কারাবন্দী জনসংখ্যার প্রবণতা হলো: ২০১২ সালে ৪৪%, ২০১৪ সালে ৪২% এবং ২০১৬ সালে ৪৫%। মোট জনসংখ্যার তুলনায় কারাবন্দীর হার ২০০৩ সালে ছিল ৬১.১%, ২০১০ সালে ৭৩.২%, ২০১৫ সালে ৭৩.৮% এবং ২০১৭ সালে ৭৭.৭% (ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফ, ডিসেম্বর ২০১৭)। সুতরাং, বাংলাদেশে বন্দীর হার দিন দিন বাড়ছে, যা আমাদের জন্য একটি সমস্যা এবং আমাদের দেশের জন্য একটি জ্বলন্ত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।’একাডেমিক জার্নালগুলোতে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায় যে, পুনর্বাসনমূলক বিচার পুনরায় অপরাধের হার কার্যকরভাবে কমাতে পারে। এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আসা যাক। কারাগারে চিন্তার স্বাধীনতার বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারাগারে বন্দীদের চিন্তার স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার, যা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে এর প্রয়োগ সীমিত কিনা তা খুঁজে দেখা উচিত। কারাগারে জ্ঞানচর্চার বিধান থাকলেও এর মান নির্ভর করে বন্দীর শ্রেণীর ওপর। প্রথম শ্রেণীর বন্দী: কাশিমপুর কারাগারের মতো জেলগুলোতে তাদের জন্য আলাদা লাইব্রেরি রয়েছে। সাধারণ বন্দী: লাইব্রেরি থাকলেও সংগ্রহ সীমিত। বেশিরভাগ সময়ই বইগুলো পুরনো, মানসম্মত নয়। এছাড়া চিন্তার স্বাধীনতা ও সেই স্বাধীন চিন্তাকে বিকাশের ও প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা ঠিক কতটা আছে তা খুঁজে দেখা দরকার। বর্তমান বিশ্বে, মুক্ত ইন্টারনেট ও অও তো দূরের কথা, বেশিরভাগ জেলখানাতেই মৌলিক ডিজিটাল অ্যাক্সেস আজও সীমিত। তবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অস্ট্রিয়ার কিছু কারাগার নিয়ন্ত্রিত ও প্রশিক্ষণের উদ্দেশে অও ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যুক্তরাষ্ট্র (ম্যাসাচুসেটস): ইন্টারনেট ছাড়াই কঠোর নিয়ন্ত্রিত ট্যাবলেটে চ্যাটবট ও অও রিজিউম বিল্ডার ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে, যা কর্মসংস্থানের জন্য সহায়ক। চীন (গুয়াংসি ও গুয়াংজু): জেল কর্তৃপক্ষ সীমিত পরিবেশে VR রিলিজ ট্রেনিং (গাড়ি ও ট্রেনের টিকেট কেনা শেখানো) চালু করেছে। অস্ট্রিয়া (স্টার্ন প্রকল্প): ২০২৫-২৭ সালের এই প্রকল্পের আওতায় নিয়ন্ত্রিত ভিডিও কল ও নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে অ্যাক্সেস দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে কারাগারগুলোতে বন্দীদের জন্য সীমিত মাত্রায় হলেও ডিজিটাল অ্যাক্সেস দেয়া কি সময়ের দাবি নয়? ভেবে দেখার বিষয়। অও চ্যাটবট বন্দীর শিক্ষাগত যোগ্যতার স্তর অনুযায়ী ব্যক্তিগত টিউটর হিসেবে কাজ করতে পারে, যা বন্দীর পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া তো উপায় নেই। আর বর্তমান পৃথিবীতে অও কে ছাড়া থাকার অর্থই হলো পৃথিবীর গতি থেকে পিছিয়ে পড়া। আর কারাবন্দীদের পজিটিভ এনগেইজমেন্ট ও জরুরি। আপনি তাকে শারীরিক ভাবে বন্দী করতে পারেন কিন্তু মানসিক ভাবে তো নয়। এবং বন্দীদের মানসিক প্রশান্তি ও বিকাশ বিঘ্নিত হলে শাস্তি প্রদানের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। [লেখক: প্রভাষক (দর্শন), বকশীগঞ্জ সরকারি কিয়ামত উল্লাহ কলেজ, জামালপুর]

সংবিধান সংশোধনের রাজনীতি

সংসদে ৭ মার্চের ভাষণ সংবিধান থেকে বাদ দেয়া কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এই বিষয়ে আরেকটি কলাম লেখার ইচ্ছে আছে। আজ শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু বিধান বাতিল করার তাৎপর্য তুলে ধরব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অনেক ‘আইনি প্রতারণা’ করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ সরকার ৫৪টি পরিবর্তন এনেছিল, এই ৫৪টির মধ্যে ৫ আগস্টের পর হাইকোর্ট বাতিল করেছে ৬টি, বর্তমান সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর বাকিগুলো ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এখন সংসদ বাকি বিধানগুলো বাতিল বা সংশোধন করবে, অথবা হুবুহু রেখে দেবে। তবে এক্ষেত্রে আরেকটি জটিলতা আছে, পঞ্চদশ সংশোধনীর সম্পূর্ণ বাতিল চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়েছে। হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোট পুনর্বহাল করেছে, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলকারীকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে, সংশোধন অযোগ্য সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলী সংশ্লিষ্ট ৭ ক এবং ৭ খ অনুচ্ছেদ এবং নিম্ন আদালতকে ক্ষমতা অর্পন সম্পর্কিত বিধান বাতিল করেছে।তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং পুনর্বহাল দুটোই করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। জনগণের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় ২০১১ সনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। অথচ ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর ২০ নভে¤^র, ২০২৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায়কে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বিবেচনায় অবৈধ ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ এক রায়ে বলা হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ, আরেক রায়ে বলা হয়ে অবৈধ ঘোষিত রায় ত্রুটিপূর্ণ ও অবৈধ। সর্বশেষ রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে পুনরুজ্জীবিত হয়ে গেল। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকার মিলেমিশে ১৮ মাস প্রশাসনকে ভাগবাটোয়ারা করে দেশ শাসন ও নির্বাচন করেছে। নিজেদের পছন্দমত লোক দিয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশন ও সরকার দ্বারা অনুষ্ঠিত নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অপরিহার্যতা কেন তা বোধগম্য হয় না।পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা আওয়ামী লীগ গণভোট বাতিল করেছিল, হাইকোর্টের রায়ে তা পুনর্বহাল হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গণভোট হয়েছে, কিন্তু বিএনপি গণভোটের রায় মানছে না। না মানার এই শক্তি বিএনপি পেয়েছে জনগণের কাছ থেকেই। কারণ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে জনগণই। সংসদ এবং গণভোট দুটোই সরকারের কাজের বৈধতা দেয়, রাষ্ট্রের জন্য আইন পাস করে। সংসদের কাজ সম্পাদিত হয় জনগণের প্রতিনিধির মাধ্যমে, আর গণভোটের মাধ্যমে আইন পাসকরণে জনগণ সরাসরি অংশগ্রহণ করে থাকে। গণভোট প্রক্রিয়ায় ভোটারদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে আইন পাসের ব্যবস্থা থাকলে সংসদ রাখার প্রয়োজন থাকে না। ভিন্ন বিবেচনায়, সংসদ থাকলে গণভোটেরও প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ দুটোর একটি থাকলেই হয়। অভিজ্ঞতা বলে সংসদ লাগবে, কারণ ঘন ঘন গণভোট আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। দ্বিতীয়ত অধিকাংশ ভোটারের আইন বিষয়ক জ্ঞান নেই। কিছুদিন আগে যে বিষয়ের ওপর গণভোট হয়েছে তার আগামাথা কেউ বোঝেনি, ভোট দাতারা অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছে। তাই সংসদ ও গণভোট দুটোর প্রয়োগ যুক্তিসঙ্গত বিবেচিত না হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে বাদ দিয়েছিল।পঞ্চদশ সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ সরকার ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়ে একটা গোঁজামিল তৈরি করেছিল। কারণ সংবিধানের প্রস্তাবনায় রাখা হয়েছে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’। ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে কোন একটি বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান সঙ্গতিপূর্ণ নয়, পরষ্পর বিরোধী। রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকে না, ধর্ম হয় মানুষের। ধর্ম নাযিল হয়েছে মানুষের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য নয়। ধর্ম হচ্ছে বিশ্বাস, সম্পর্ক সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে, সেই ধর্মকে রাষ্ট্রীয়করণ অয়ৌক্তিক। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্রের কোন ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকবে না। কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্রের নাগরিকরা ধর্মনিরপেক্ষ নয়, প্রত্যেক নাগরিক তার নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করার অধিকার রাখে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোন একটি ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া স্ববিরোধী এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নাগরিকের সমঅধিকার না থাকলে তা কখনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা হতে পারে না। তাই গোঁজামিলের ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে থাকা-না থাকা সমান।জোর করে ক্ষমতা দখল রোধে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে যে পরিবর্তন এনেছিল তাও অপ্রয়োজনীয়। এই পরিবর্তনে বলা হয়েছিল, কোন ব্যক্তির ক্ষমতাবলে অসংবিধানিকভাবে সংবিধান বাতিল, পরিবর্তন করলে বা পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র করলে তার অপরাধ হবে দেশদ্রোহিতার এবং শাস্তি হবে মৃত্যদণ্ড বা যাবজ্জীবন। পাকিস্তানের সংবিধান থেকে সম্ভবত এই পরিবর্তন নকল করা হয়েছে। পাকিস্তানের সংবিধানে একই বিধান থাকা সত্বেও পাকিস্তানে বারবার সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। পাকিস্তানের জেনারেল জিয়াউল হক জোর করে শাসন ক্ষমতা দখল করেছিলেন, কিন্তু তার কোন শাস্তি হয়নি, শাস্তি হয়েছিল এই আইনের প্রণেতা প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর, তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয়েছে। অস্ত্রের মুখে ক্ষমতা দখলকারী পাকিস্তানের জেনারেল পারভেজ মোশাররফের কোন বিচার হয়নি, বিচার হয়নি বাংলাদেশের হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের, বরং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যখন এই আইন পাস হয় তখন তিনি সংসদেই ছিলেন। আওয়ামী লীগের পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা সংবিধানে দণ্ডবিধি অন্তর্ভুক্ত করে অবৈধ ক্ষমতা দখল রোধ করা যায়নি, বরং আইন প্রণেতা আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। তাই এই বিধান রাখা বা বাতিল করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা আওয়ামী লীগ সংসদে নারী আসন ৪৫ থেকে ৫০টিতে উন্নীত করেছিল। মনে হচ্ছে এই পরিবর্তন বাতিল হবে না, বাতিল করার ইচ্ছে থাকলে বর্তমান সংসদে ৫০ জন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতেন না। সংরক্ষিত আসন নিয়ে কত কথা, শফিক রেহমানের সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এ এই নারী সাংসদদের ‘সংসদের শোভা ত্রিশ সেট অলংকার’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল। ১৯৮৬ সনে এরশাদ সাহেবের আমলে নারীদের জন্য ৩০টি আসন সংরক্ষণ রাখা হয়। দেশের নারীরাও তাদের জন্য এভাবে আসন সংরক্ষিত রাখার বিপক্ষে, তারা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হতে চায়, তারা চায় তাদের জন্য দেশব্যাপী ১শ’টি আসন নির্ধারণ করা হোক, তারা দলের মনোনয়ন নিয়ে বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। কিন্তু এই পরিবর্তন অদ্যাবধি হয়নি।রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশর জনগণের বিভাজন বিপরীতধর্মী, এই বিপরীত মনোভাব সংবিধান সংশোধন, পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। এক পক্ষ ক্ষমতায় এসে নিজের মনোভাব অনুযায়ী সংবিধানে যা যা সংযোজন-বিয়োজন করে, আরেক পক্ষ ক্ষমতায় এসে তা তা বাতিল করে সংবিধানে নিজেদের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটায়। তাই সংবিধানের কাটাছেঁড়া এভাবে চলতে থাকলে এক সময় সংবিধানের আদি রূপ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

ইংরেজি শিক্ষার এই দুর্দশা কেন

উচ্চমাধ্যমিক পাস কিংবা গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি নেয়া শিক্ষার্থীরা কি স্বতস্ফূর্তভাবে ইংরেজিতে কিছু বলতে পারেন, লিখতে পারেন? ইংরেজিতে কিছু শুনে বুঝতে পারেন? ইংরেজিতে লেখা কোন বিষয় থেকে মেসেজ গ্রহণ করতে পারেন? উত্তর সবারই জানা।অধিকাংশের ক্ষেত্রেই এটি একটি বড় না’। দু’চারজন ব্যতিক্রমী শিক্ষার্থী ছাড়া কেউই পারেননা যদিও উচ্চমাধ্যমিক এমনকি গ্রাজুয়েশন পর্যন্ত বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ইংরেজি পড়ে এসেছেন। এর সমাধান হিসেবে কেউ কেউ এমনসব পরামর্শ দিয়ে থাকেন যেগুলোর বাস্তবায়ন সহজে সম্ভব নয়। যেমন অনেকেই বলেন, সব বিদ্যালয়ে ভাষা শেখানোর ল্যাব বানাতে হবে, ইংরেজিতে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করা শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, শিক্ষকদের দীর্ঘ প্রশিক্ষন দিতে হবে, শিক্ষকদের বিদেশে পাঠিয়ে প্রশিক্ষিত করতে হবে, কেউবা আবার বলেন ন্যাটিভ স্পিকারদের নিয়ে এসে ইংরেজি শেখাতে হবে ইত্যাদি। এর কোনটিই কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে সহজ কাজ নয়। সব বিদ্যালয়ে ভাষা শেখানোর ল্যাব বানাতে বলা মানে হচ্ছে দেশে যেন আর কোন বিভাগ নেই, কাজ নেই। কাজ শিক্ষার্থীদের শুধুই ইংরেজি শেখানো! দ্বিতীয়ত, মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স মাস্টার্স পাস করা শিক্ষার্থীরা সেভাবে এখনও শিক্ষকতায় বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে আসছেন না। কলেজ থেকে পাস করা গ্রাজুয়েট যারা শিক্ষকতায় আসছেন অনন্য ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের নিজেদের অবস্থাই করুণ! তারা ইংরেজি পড়িয়ে শিক্ষার্থীদের স্কিল উন্নত করবেন সেটি ভাবা একটি অবান্তর কাজ কারণ আমি দেখেছি তারা দু’ চারটি গ্রামারের নিয়ম ও সেগুলোর ওপর কিছু ট্রানস্লেশন নিয়ে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শেখানোর কাজে নেমে পড়েন। কিছুদিন আগে একটি আর্টিকেলে লিখেছিলাম যে, ইংরেজি শেখা বা শেখানোর উদ্দেশের সঙ্গেই তাদের পরিচিতি নেই। তারপর আমাদের পাবলিক পরীক্ষায় ইংরেজিতে যে প্রশ্ন আসে, সেগুলো ইংরেজি ভাষা শিক্ষার্থী জেনেছে কিনা বা জানার চেষ্টা করছে কিনা সে রকম নয়। শুধু বিচ্ছিন্নভাবে কিছু খুঁটি পোতার চেষ্টা যার ছাদ নেই, বেড়া নেই, ফ্লোর কিছুই ঠিক নেই। সেটি ঘর নয়। উন্মুক্ত জায়গায় কিছু শক্ত কাঠের ছোট ছোট খুঁটি গাড়া অর্থাৎ বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গ্রামার জেনে ভিত মজবুত করার চেষ্টায় সবাই ব্যস্ত! ছাদ, বেড়া ইত্যাদি না থাকলে শুধু খুঁটি গেড়ে কি থাকার ঘর বানানো যায়? সে ঘর তো বাস করার পুরো অনুপযুক্ত! রোদ বৃষ্টিতে সব সময় সেই ঘর আক্রান্ত হয়, কেউ সেখানে বাস করতে পারেনা। আমাদের শিক্ষার্থীদের আমরা সরকারি, বেসরকারি, আধা-সরকারি ও ব্যক্তি পর্যাযে যে যেভাবেই ইংরেজি পড়াচ্ছি সেটি হচ্ছে বাক্য কিভাবে লিখতে হবে, কোনটি সঠিক আর কোনটি বেঠিক ইত্যাদি বিষয়গুলো শুধু আলাদা আলাদা খুঁটি পুতার মতো, পুরো একটি ঘর বা দালান বানানোর পরিকল্পনাও নেই, সে ধরনের প্রচেষ্টাও নেই। কাজেই আমরা সবাই কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার বারোটা বাজাতে সহায়তা করছি। তারমধ্যে বেশি বারোটা বাজাচ্ছে বাজারের কিছু গাইড যেগুলোতে পুরো বাংলা অর্থ ও শব্দের উচ্চারণ, অর্থ সবকিছুই দেয়া আছে অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের যেন কিছুই করার নেই। ভাষা শেখানোর সব প্রচেষ্টা থেকেই শিক্ষার্থীদের সরিয়ে রাখার পদ্ধতি! বাজারের একটি গাইড যা পুরো সোশ্যাাল মিডিয়ায় অনবরত বাজাচ্ছে যে, শিক্ষার্থীদেরইংরেজিতে পাস করা কত সহজ, পাসের বিভিন্ন পদ্ধতি ও গাইডটির গুণাগুন নিয়ে বর্ণায় ভর্তি এবং শিক্ষকদের, অভিভাবকদের এবং শিক্ষার্থীদের গাইডটি কেনো কিনতে হবে কেনো সেসব বিষয়গুলো বার বার প্রচার করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ‘ইংরেজি বইয়ের প্রতিটি লাইন ভেঙে ভেঙে অনুবাদ করে দেয়া, ঠিক শিক্ষক ক্লাসে যেভাবে পড়ান। শিক্ষার্থীদের বুঝাতে যত সহজভাবে অনুবাদ করা সম্ভব তার সবটুকুই আমরা করেছি এই বইয়ে। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সহজভাবে সাবলীল ভাষায় সাজিয়ে দিয়েছি আমরা।’ আপনারা ইংরেজি শেখানো এবংশেখার যে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন এবং বাজাচ্ছেন সেটি কি বুঝতে পারছেন? ইংরেজি ক্লাসে শিক্ষকদের প্রতিটি শব্দের বাংলা বলে দেয়া মানে ইংরেজি পড়ানো নয়। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটি করাতে হবে যার মাধ্যমে তারা শব্দ, শব্দ দিয়ে বাক্য তৈরি করা নিজেরা আয়ত্ত্ব করে ফেলেবে। এনসিটিবির বইয়ে ভোকাবিয়ুলারি টেস্টে ওয়ার্ড ম্যাকিং ইংরেজি থেকে ইংরেজি। সেটি সবাই না হলেও অনেক শিক্ষার্থীই কিন্তু পারছে কারণ এটি হচ্ছে ন্যাচারাল লার্ণিং। তারা যখন ওয়ার্ড থেকে ওয়ার্ড মোটামুটিকিংবা ভালোভাবে মেলাতে পারছে সেটিতে তাদের আন্ডারস্টান্ডিং সলিড হয়। সেটিই একটি বিদেশি ভাষা শেখার যতগুলো পদ্ধতি তার মধ্যে একটি কার্যকরী পদ্ধতি। এনসিটিবির বইয়েও অনেকের পরামর্শমতো আওয়ামী আমলে বাংলা অর্থ ও বাংলা দেয়া ছিল যা ইএলটি লার্ণিং-এর পুরোপুরি বিরোধী। ইংরেজি শিক্ষকরা যদি এটি না বুঝেন এবং শিক্ষার্থীদের না করান তা হলে ইংরেজি কি পড়াচ্ছেন? তাদেরকে কি বাংলা পড়াচ্ছেন? এভাবে করলে তো তারা বাংলাও শিখবে না। বাংরেজিও শিখবে না। কারণ তারা তো বুঝতেই পারছেন না যে, তারা কি করছে আর কি পড়ছে? সবই আপনারা করে দিচ্ছেন, সবই আপনারা বুঝিয়ে দিচ্ছেন তাহলে শিক্ষার্থীদের কাজ কি? তাদের ইংরেজি ভাষা রপ্ত করতে হবে বিভিন্নভাবে প্রাকটিস করে পারসোনালি এনগেজড হয়ে। তার সবই আপনারা করে দিচ্ছেন, তারা কি শিখছে? ‘প্রতিটি শব্দের সঠিক উচ্চারণসহ অর্থ, সমার্থক ও বিপরীতার্থক শব্দ উল্লেখ থাকায় এটি শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করে। প্রতিটি শব্দের অর্থ জানা থাকলে তা বোঝা সহজ হয়ে যায় এবং শিক্ষার্থীদের ইংরেজি বোঝার দক্ষতা বাড়ায়।’ শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝাচেছন আপনারা, ভুল মেসেজ দিচ্ছেন! দেখলাম সরকারি কলেজের শিক্ষকরা এসব কথা বলছেন। অবাক না হয়ে পারছিনা। [লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজ]

পিকেটির আয়নায় বাংলাদেশ: বৈষম্য ও উন্নয়নের দ্বন্দ্ব

দ্রুত প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান, উঁচু সেতু, নতুন নগর, প্রযুক্তির প্রসার এসব দেখে অনেক সময় মনে হয় উন্নয়ন যেন সবার দুয়ারে পৌঁছে গেছে। কিন্তু তবে সমাজের গভীরে একটি মৌলিক প্রশ্ন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়: এই উন্নয়নের ফল কার হাতে যাচ্ছে? কারা সম্পদশালী হচ্ছে, কারা কেবল শ্রম দিয়ে টিকে আছে, আর কারা জন্মসূত্রেই প্রতিযোগিতার বাইরে পড়ে যাচ্ছে? থমাস পিকেটির ‘একবিংশ শতাব্দীতে পুঁজি’ (ক্যাপিটাল ইন দ্যা টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি) ঠিক এই প্রশ্নগুলোকেই কেন্দ্র করে রচিত এক যুগান্তকারী গ্রন্থ। তিনি দেখান, বৈষম্য কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি ইতিহাস, রাজনীতি, যুদ্ধ, আইন, করনীতি এবং উত্তরাধিকার কাঠামোর ফল। ২০১৩ সালে ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত এবং ২০১৪ সালে ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলা এই বই মূলত সম্পদ বৈষম্য, পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং আধুনিক গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে রচিত। অর্থনীতির বই হয়েও এটি সাধারণ পাঠকের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে, কারণ পিকেটি কঠিন অর্থনৈতিক তত্ত্বকে ইতিহাস, সাহিত্য, রাজনীতি ও বাস্তব উদাহরণের সঙ্গে যুক্ত করে সহজবোধ্য ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। তার মূল বক্তব্য হলো ‘যখন পুঁজির আয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি হারে বাড়ে, তখন সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং সম্পদ ক্রমশ অল্প কয়েকজন মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়’। এই ধারণাকে তিনি বিখ্যাত সূত্র r > g দ্বারা প্রকাশ করেছেন। এখানে r  হলো পুঁজির ওপর আয় যেমন ভাড়া, সুদ, লভ্যাংশ বা সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি; আর g হলো জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি। যখন r, g-এর চেয়ে বড় হয়, তখন যারা আগে থেকেই সম্পদশালী, তারা দ্রুত ধনী হয়; আর যারা কেবল শ্রমের ওপর নির্ভরশীল, তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ে।এই তত্ত্ব বোঝার জন্য পিকেটি প্রথমেই পুঁজির অর্থ নতুনভাবে নির্ধারণ করেন। তার কাছে পুঁজি মানে শুধু কারখানা, যন্ত্র বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং জমি, বাড়ি, ব্যাংক আমানত, শেয়ার, বন্ড, ব্যবসায়িক মালিকানা, এমনকি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদও পুঁজির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ পুঁজি কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এটি সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নিয়ন্ত্রণের উৎসও বটে। এ কারণেই পিকেটির বিশ্লেষণে পুঁজির প্রশ্ন মানে ক্ষমতার প্রশ্ন। যাদের হাতে অধিক সম্পদ, তাদের সঙ্গে আসে আরও সুযোগ, উচ্চমানের শিক্ষা, সমাজে প্রভাবশালী অবস্থান এবং নিরাপদ ও নিশ্চয়তার সঙ্গে ভরা ভবিষ্যৎ। অর্থাৎ, সম্পদশালীদের জীবনযাত্রা শুধুই আর্থিক সমৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি তাদের ক্ষমতা, প্রভাব ও সামাজিক সুবিধার একটি সুদূরপ্রসারী জালে রূপান্তরিত হয়। এই জায়গায় তার ভাবনা কার্ল মার্ক্সের সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করে। মার্ক্স উৎপাদন সম্পর্ক ও শ্রেণী-সংঘাতকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন; পিকেটি সম্পদের বণ্টন, উত্তরাধিকার এবং করনীতিকে কেন্দ্র করেন। আবার সাইমন কুজনেটস মনে করেছিলেন উন্নয়নের এক পর্যায়ে বৈষম্য কমবে; পিকেটি দীর্ঘমেয়াদি তথ্য দিয়ে দেখান, বৈষম্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে না নীতিগত হস্তক্ষেপ ছাড়া তা আবার ফিরে আসে।থমাস পিকেটি ১৯৭১ সালে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন এবং অল্প বয়সেই অর্থনীতিতে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তিনি ইকোলি নরম্যাল সুপরিওর-এ অধ্যয়ন করেন এবং খুব কম বয়সে সম্পদ পুনর্বণ্টন বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি প্যারিস স্কুল অব ইকনোমিকসের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং আয় বৈষম্য, করনীতি ও সম্পদ বণ্টন বিষয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। ইমানুয়েল সেইজ, গ্যাব্রিয়েল জুখম্যান, আন্থনি অ্যাটকিনসন প্রমুখ অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কাজ করে তিনি বৈশ্বিক আয় ও সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলেন। এই কারণেই তার বইটি মতাদর্শনির্ভর স্লোগান নয়; বরং বহু শতাব্দীর তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ। পিকেটি দেখান যে ইতিহাস জুড়ে বৈষম্য কখনো স্থির ছিল না; বরং রাজনৈতিক ঘটনা, যুদ্ধ, বিপ্লব, সামাজিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ সম্পদের কাঠামোকে বারবার বদলে দিয়েছে। অর্থাৎ ধনীদের ধনী হওয়া কিংবা মধ্যবিত্তের বিস্তার দুটিই ইতিহাসনির্ভর। তিনি এই কারণেই অর্থনীতিকে ইতিহাসের ভেতরে ফিরিয়ে আনেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফরাসি বিপ্লবের দিকে ফিরে তাকান। ১৭৮৯ সালের সেই বিপ্লবকে আমরা প্রায়ই রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখি, কিন্তু এর গভীরে ছিল সম্পদের চরম বৈষম্য। বিপ্লব পূর্ব ফ্রান্সে জমি, কর ছাড়, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সামাজিক মর্যাদা মূলত অভিজাত শ্রেণী ও গির্জার হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। কৃষকরা উৎপাদন করত, কিন্তু কর, ভাড়া ও খাজনার বড় অংশ চলে যেত শাসকগোষ্ঠীর হাতে। যারা রাষ্ট্রের অর্থ জোগাত, তারাই রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে ফরাসি বিপ্লব শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল না; এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারেরও দাবি ছিল।এই বৈষম্য প্রসূত বিস্ফোরণের উদাহরণ শুধু ফ্রান্সেই সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়ার ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পেছনেও জমিদারি কাঠামো, কৃষকের দারিদ্র্য এবং শ্রমিক অসন্তোষ কাজ করেছিল। লাতিন আমেরিকার বহু দেশে ভূমি বৈষম্য দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। উপনিবেশিক ভারতেও জমিদারি প্রথা ও ভূমি রাজস্বনীতি কৃষকসমাজে গভীর অসাম্য সৃষ্টি করেছিল। অর্থাৎ যখন সম্পদ, ভূমি ও সুযোগ অল্প কয়েকটি পরিবারের হাতে বন্দী থাকে, তখন সমাজের স্থিতি ভঙ্গুর হয়ে ওঠে। পিকেটির বক্তব্য এখানে স্পষ্ট বৈষম্য কেবল ˆনতিক সমস্যা নয়, এটি রাজনৈতিক ঝুঁকিও। একইভাবে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের পুরনো ধনিকশ্রেণীকে দুর্বল করে দেয়। যুদ্ধের ধ্বংসে শুধু প্রাণহানি হয়নি; বহু প্রাসাদ, শিল্পকারখানা, রেলপথ, অবকাঠামো এবং ব্যক্তিগত সম্পদও ধ্বংস হয়। যুদ্ধোত্তর মুদ্রাস্ফীতিতে পুরনো বন্ড ও আর্থিক সম্পদের মূল্য পড়ে যায়। সরকারগুলো যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে এবং পুনর্গঠনের জন্য উচ্চ আয়কর, উত্তরাধিকার কর ও সম্পদ কর আরোপ করে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি সবখানেই কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা শক্তিশালী হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, শ্রমিক অধিকার ও আবাসননীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র মধ্যবিত্ত শ্রেণী গঠনে ভূমিকা নেয়। ফলে ’৪৫-’৭৫ পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যাপক উত্থান ঘটে। বহু শ্রমজীবী পরিবার প্রথমবারের মতো বাড়ি কেনে, সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায়, স্বাস্থ্যসেবা পায় এবং স্থায়ী চাকরির নিরাপত্তা ভোগ করে। এই সময়কে অনেকেই ‘পুঁজিবাদের সোনালি যুগ’ বলেন। কিন্তু পিকেটির মতে এটি বাজারের স্বাভাবিক ফল ছিল না; বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, শ্রমিক আন্দোলন, উচ্চ করব্যবস্থা এবং যুদ্ধ পরবর্তী সামাজিক চুক্তির ফল। অর্থাৎ বাজার একা সমতা আনে না; ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বৈষম্য কমাতে পারে।কিন্তু ১৯৮০-এর দশক থেকে রোন্যাল্ড রিগ্যান ও মার্গারেট থ্যাচারের নবউদারবাদী অর্থনীতি কর হ্রাস, বেসরকারিকরণ, আর্থিক উদারীকরণ ও বাজারমুখিতা বিশ্বে নতুন বৈষম্যের যুগ শুরু করে। বড় কর্পোরেশন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সম্পদমালিকরা দ্রুত ধনী হতে থাকেন, যখন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মজুরি সেই গতিতে বাড়েনি। আজকের ডিজিটাল অর্থনীতিতে এই বৈষম্য আরও নতুন রূপ নিয়েছে। প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম, তথ্যনিয়ন্ত্রণ, মেধাস্বত্ব, অ্যালগরিদমিক বাজার এবং বৈশ্বিক আর্থিক প্রবাহ এসবের মাধ্যমে সম্পদ আরও দ্রুত কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। জোসেফ স্টিগলিট বহুদিন ধরেই দেখিয়ে আসছেন, বাজার নিজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না; রাষ্ট্রীয় নীতি, করব্যবস্থা ও জনসেবাই সমতা আনে। অমর্ত্য সেন আবার মনে করিয়ে দেন, শুধু আয় নয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সক্ষমতা ও স্বাধীনতাও বৈষম্যের অংশ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পিকেটি, স্টিগলিটজ ও সেন তিনজনই ভিন্ন ভাষায় একই সতর্কবার্তা দেন। বইটির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, পিকেটি অর্থনীতিকে বোঝাতে সাহিত্য ব্যবহার করেছেন। তিনি অনরে দ্য বালজাকের পেরে গরিওট, জেন অস্টেনের প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডিস এবং চার্লস ডিকেন্সের ‘গ্রেট এক্সপেক্টেশনস’ উপন্যাস থেকে উদাহরণ এনে দেখিয়েছেন যে উনিশ শতকের ইউরোপে কঠোর পরিশ্রমের চেয়ে উত্তরাধিকার, বিবাহ ও পারিবারিক সম্পদ সামাজিক অগ্রগতির বড় মাধ্যম ছিল। পেরে গরিওট-এ তরুণ রাস্তিনিয়াক বুঝতে শেখে, শুধু মেধা নয় ধনী পরিবারে প্রবেশই সাফল্যের দ্রুত পথ। প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডিস-এ বিয়ে অনেকাংশে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠান। গ্রেট এক্সপেক্টেশনস-এ এক তরুণের জীবন বদলে যায় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদে। সাহিত্য এখানে কল্পনা নয়, সামাজিক বাস্তবতার দলিল। কারণ উপন্যাসের চরিত্ররা সেই সমাজের ভেতরের সত্য বলে, যা অনেক সময় পরিসংখ্যানের সারণি বলতে পারে না।পিকেটির আরেকটি গভীর তত্ত্ব হলো আধুনিক সবৎরঃড়পৎধপু বা মেধাতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা। আধুনিক সমাজ দাবি করে যে প্রতিভা ও পরিশ্রমই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। কিন্তু পিকেটি দেখান, অসম সমাজে এই দাবি অনেক সময় অর্ধসত্য। কারণ প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগেই অনেকের হাতে বাড়তি সুবিধা জমা থাকে। একজন শিশুর যদি জন্ম থেকেই ভালো পুষ্টি, নিরাপদ বাসস্থান, উন্নত স্কুল, ব্যক্তিগত শিক্ষক, প্রযুক্তি, বই, ভাষাগত দক্ষতা, সাংস্কৃতিক পরিসর এবং পারিবারিক যোগাযোগ থাকে, তবে সে পরীক্ষার হলে বসার আগেই এগিয়ে। অন্যদিকে আরেকজন শিশুকে যদি বিদ্যুৎহীন ঘরে পড়তে হয়, পারিবারিক আয়ের জন্য কাজ করতে হয়, কোচিংয়ের সুযোগ না থাকে, অপুষ্টিতে ভুগতে হয় তবে একই পরীক্ষায় অংশ নিলেও তাদের প্রতিযোগিতা সমান নয়। হার্ভাডে পড়ার স্বপ্ন এবং গ্রামের এক শিশুর সরকারি স্কুলের বাস্তবতা একই প্রতিযোগিতার মাঠ নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট। শহরের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার সুযোগ পায়; গ্রামের বহু শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকের পরই শ্রমবাজারে ঢুকে পড়ে। একজন উদ্যোক্তা ব্যর্থ হলে পরিবার থেকে আবার পুঁজি পায়; দরিদ্র পরিবারের উদ্যোক্তা একবার ব্যর্থ হলে বহু বছর পিছিয়ে যায়। অর্থাৎ উত্তরাধিকার শুধু টাকা নয়; উত্তরাধিকার হলো ভাষা, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক নেটওয়ার্ক, ব্যর্থ হওয়ার পরও আবার দাঁড়ানোর নিরাপত্তা। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিশ্বখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক ও ˆনতিকতাবিদ মাইকেল স্যান্ডেল যেমন বলেছেন, মেধাতন্ত্র অনেক সময় সফলদের অহংকার এবং ব্যর্থদের অপমান তৈরি করে। পিকেটির বিশ্লেষণও সেই সত্যকে অর্থনৈতিক ভাষায় প্রকাশ করে।তবে এত বিস্তৃত ও তথ্যসমৃদ্ধ কাজ হওয়া সত্ত্বেও পিকেটির বই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তার তথ্যভাণ্ডারের বড় অংশ ফ্রান্স, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও পশ্চিম ইউরোপকেন্দ্রিক। ইউরোপীয় সম্পদ-ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসংখ্যান তিনি যত নিখুঁতভাবে দেখাতে পেরেছেন, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা উপনিবেশিত বিশ্বের ক্ষেত্রে সেই গভীরতা তুলনামূলক কম। ফলে উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, দাসবাণিজ্য, জোরপূর্বক সম্পদ আহরণ, দুর্ভিক্ষ সৃষ্ট অর্থনীতি, বর্ণভিত্তিক শ্রমবাজার কিংবা ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো বইয়ে তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে থাকে। অথচ ইউরোপের বহু পুঁজিসঞ্চয়ের ইতিহাসই গড়ে উঠেছিল উপনিবেশিক শোষণের ওপর। ভারতীয় উপমহাদেশ, আফ্রিকার খনিজভাণ্ডার, ক্যারিবীয় চিনি-বাগান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যপথ এছাড়া ইউরোপীয় পুঁজির উত্থান পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা যায় না। ফলে, তার বইয়ের সীমাবদ্ধতা আসলে তার তত্ত্বের অস্বীকৃতি নয়; বরং সেই তত্ত্বকে আরও বিস্তৃত ভূগোলে প্রয়োগ করার আহ্বান।এই সীমাবদ্ধতার কারণে, পিকেটির বিশ্লেষণকে ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করলে সম্পদের সঞ্চয় ও বৈষম্যের একটি নতুন চিত্র সামনে আসে। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে ১৬শ’ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পর বাংলার রাজস্ব ও বাণিজ্যের ওপর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ স্থাপন হয়। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আহরণের অধিকার কোম্পানির হাতে চলে আসে। অর্থাৎ উৎপাদন স্থানীয় কৃষকের, কিন্তু উদ্বৃত্ত প্রবাহিত হতে থাকে বিদেশি শাসকের কোষাগারে। বহু অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদের মতে, আঠারো শতকের শেষভাগে বাংলার বিপুল সম্পদ ইউরোপে স্থানান্তরিত হয়, যা ব্রিটিশ শিল্পবিপ্লবের পুঁজিসঞ্চয়ে সহায়ক ছিল। পিকেটির ভাষায় বলতে গেলে, স্থানীয় সমাজে ম (জনগণের উৎপাদন বৃদ্ধি) যতটা ছিল, তার বড় অংশ r (সম্পদ-আয়) হিসেবে উপনিবেশিক শক্তির হাতে চলে যেত। ১৭৯৩ সালের স্থায়ী দেওয়ানি ব্যবস্থা জমিদারি কাঠামোকে স্থায়ী রূপ দেয়। জমির মালিকানা ও কর আদায়ের ক্ষমতা এক শ্রেণীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, কৃষক হয়ে পড়ে খাজনাদাতা প্রজা। ফলে উৎপাদক ও মালিকের বিচ্ছেদ তীব্র হয়। উনিশ শতক জুড়ে নীলচাষ, নগদকর, ঋতজাল, দুর্ভিক্ষ এবং বাজার নির্ভর কৃষিনীতি গ্রামীণ বৈষম্য বাড়ায়। ১৮৭০-এর দশক থেকে ১৯০০-এর দশক পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতে বারবার দুর্ভিক্ষ ঘটে; লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু খাদ্যশস্য রপ্তানি ও রাজস্বনীতি অব্যাহত থাকে। অর্থাৎ বৈষম্য শুধু আয়গত ছিল না; তা জীবন-মৃত্যুর ব্যবধানেও রূপ নেয়।১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান হয়নি; বরং নতুন রূপ নেয়। পূর্ব বাংলা জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ক্ষমতা, প্রশাসন, সামরিক নেতৃত্ব ও শিল্পপুঁজি পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক ছিল। ১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস ছিল পূর্ব বাংলার পাট রপ্তানি। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয়, শিল্পঋত, অবকাঠামো বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বড় অংশ যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। অর্থনীতিবিদদের বহু গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৬০-এর দশকে উন্নয়ন ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ পশ্চিম পাকিস্তান পেয়েছে, যখন বৈদেশিক আয়ের বড় অংশ এসেছে পূর্ব পাকিস্তান থেকে। মাথাপিছু আয় ব্যবধানও ক্রমে বাড়তে থাকে। ১৯৪৯-৫০ সালে দুই অংশের ব্যবধান তুলনামূলক কম থাকলেও ১৯৬৯-৭০ নাগাদ পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়ে যায়। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, নুরুল ইসলামসহ বহু চিন্তক ‘দুই অর্থনীতি’ ধারণা তুলে ধরেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার পেছনেও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন ছিল কেন্দ্রে। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কেবল সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক মুক্তির আন্দোলন ছিল না; তা ছিল বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও সংগ্রাম।স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ নতুন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বৈষম্য কমেনি বরং সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এসব কারণে প্রথম দশকেই সম্পদ বণ্টনের ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো শক্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ১৯৮০-এর দশক থেকে বাজারমুখী সংস্কার, বেসরকারিকরণ, নগরকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি এবং অনিয়ন্ত্রিত ভূমিমূল্য বৃদ্ধি নতুন বৈষম্য তৈরি করে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে প্রবৃদ্ধি প্রশংসনীয় গার্মেন্টস, প্রবাসী আয়, কৃষির উন্নয়ন, নারীর শ্রমঅংশগ্রহণ, অবকাঠামো উন্নয়ন সবই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। কিন্তু একই সঙ্গে সম্পদ কেন্দ্রীভবনও বেড়েছে। শহুরে জমির দাম, ব্যাংকঋণে প্রভাবশালী প্রবেশাধিকার, ব্যাবসায়ীদের সিন্ডিকেট, শেয়ারবাজারে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, কর ফাঁকি, খেলাপি ঋত, উত্তরাধিকারভিত্তিক ব্যবসা সম্প্রসারণ এসব মিলিয়ে উচ্চবিত্তের সম্পদ দ্রুত বেড়েছে। অন্যদিকে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় আটকে আছে। বিভিন্ন সময়ের জরিপে দেখা যায়, জাতীয় আয় বৈষম্যের গিনি সহগ স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোর তুলনায় এখন বেশি। শহর-গ্রাম সম্পদ ব্যবধান, ভূমিমূল্যের বিস্ফোরণ, ব্যাংকঋণে অসম প্রবেশাধিকার, শিক্ষার মানে দ্বৈততা এবং স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য সামাজিক স্তরবিন্যাসকে কঠিন করেছে।পিকেটির মতোই যদি আমরা ভারতীয় উপমহাদেশের অর্থনীতি বুঝতে সাহিত্যর দিকে তাকাই আমরা দেখবো ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্য কেবল গল্প নয়, এটি সামাজিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার জীবন্ত দলিল। ইউরোপের মতোই ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্যেও দেখা যায় কীভাবে জমি, শ্রেণী, জাত, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মানুষের জীবনের পথ নির্ধারণ করে দেয়। যেমন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা উপন্যাসে পরিচয়ের প্রশ্ন কেবল দার্শনিক নয় এটি সামাজিক স্তরবিন্যাসের গভীর প্রতিফলন। এখানে জাত, ধর্ম ও সামাজিক অবস্থান মানুষের সুযোগ সীমিত করে এবং বৈষম্যের সূক্ষ্ম ছাপ তৈরি করে। ছিন্নপত্র-এ রবীন্দ্রনাথ গ্রামীণ কৃষকের জীবন দেখান অনিশ্চিত অর্থনীতির উদাহরণ হিসেবে শ্রম আছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নেই, এবং উৎপাদনের ফল মানুষের হাতে আসে না। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ ও কপালকুণ্ডলা কেবল সাহিত্য নয়; এগুলো ঔপনিবেশিক সমাজে ক্ষমতা, উৎপাদন ও ˆনতিকতার সম্পর্ক বোঝার দলিল। বিশেষ করে আনন্দমঠ-এ অনাহার, কর ও রাষ্ট্রীয় শোষণের চিত্র আঠারো-উনিশ শতকের বাংলার অর্থনৈতিক বৈষম্যকে ফুটিয়ে তোলে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস, পল্লীসমাজ ও গৃহদাহ উপন্যাসগুলোতে বৈষম্য আরও ব্যক্তিগত এবং আবেগঘন রূপ নেয়। দেবদাস-এ শ্রেণী ও পারিবারিক মর্যাদা মানুষের প্রেম ও জীবন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। পল্লীসমাজ-এ জমি ও গ্রামের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখানো হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি, সম্পর্ক এবং ন্যায়বিচারকে গ্রাস করে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাঁসুলী বাঁক ও গণদেবতা-তে গ্রামীণ সমাজে জাত, জমি ও ঋণের জটিল কাঠামো মানুষের চলাচল ও সুযোগ সীমিত করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার ভেতরে বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা দেখায়, যেখানে মাছ ধরা, নৌকা চালানো এবং ঋত সবই এক ধরনের ধারাবাহিক সংগ্রাম। আধুনিক যুগে শওকত আলী ও ˆসয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস যেমন প্রদোষে প্রাকৃতজন ও লালসালু ধর্ম, ক্ষমতা ও গ্রামীণ অর্থনীতি একত্রে মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই উপন্যাসগুলো দেখায় যে বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার পুনরাবৃত্তি, যা মানুষের জীবনকে সীমিত করে এবং সামাজিক কাঠামোর মধ্যে প্রবেশের সুযোগকে সংকুচিত করে। প্রতিটি কাহিনী একসঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি সমন্বিত চিত্র ফুটিয়ে তোলে, যেখানে শ্রম, সম্পদ, ক্ষমতা ও ইতিহাসের সম্পর্ক গভীরভাবে স্পষ্ট হয়।পিকেটির বিশ্লেষণের বড় অংশই ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি কর-তথ্য, সম্পদ রেকর্ড এবং আয় পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যেখানে রাষ্ট্রীয় তথ্যভাণ্ডার দুর্বল, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বড়, নগদ লেনদেন বেশি, বা সম্পদ গোপন রাখা সহজ সেসব দেশের বাস্তবতা বইটিতে তুলনামূলক কম প্রতিফলিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বহু অর্থনীতি, বিশেষ করে বাংলাদেশে, জমি, সোনা, অনিবন্ধিত ব্যবসা, পারিবারিক সম্পদ, প্রবাসী আয়ের অনিয়মিত প্রবাহ এসব সবসময় পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। ফলে পিকেটির কাঠামো প্রয়োগ করতে গেলে স্থানীয় বাস্তবতার জন্য নতুন তথ্যসংগ্রহ অপরিহার্য। তার বিখ্যাত সূত্র r > g বৈষম্যের একটি শক্তিশালী ব্যাখ্যা দিলেও এটি সব সমাজের পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। কারণ বৈষম্য কেবল পুঁজির আয় ও প্রবৃদ্ধির পার্থক্য দিয়ে নির্ধারিত হয় না; শিক্ষা, প্রযুক্তি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, লিঙ্গবৈষম্য, সামাজিক পরিচয়, ভূমি দখল, শ্রমবাজারের কাঠামো এবং আইনের শাসনের দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে উদাহরণস্বরূপ, কেউ শুধু সম্পদের কারণে নয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রশাসনিক সুবিধা বা বাজারে প্রবেশাধিকার পেয়েও দ্রুত উত্থান ঘটাতে পারে। পিকেটির প্রস্তাবিত বৈশ্বিক সম্পদকর নীতিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন। উন্নত দেশগুলোর মধ্যেও করস্বর্গ, গোপন ব্যাংক হিসাব ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ বড় বাধা। বাংলাদেশের মতো দেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও সীমিত, কর প্রশাসন পুরোপুরি আধুনিক নয়, এবং সম্পদ মূল্যায়নের স্বচ্ছ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তাই তার নীতিকে হুবহু নয়, বরং স্থানীয় বাস্তবতায় রূপান্তর করে প্রয়োগ করতে হবে।তবুও বাংলাদেশের জন্য বইটির ধারণাগত প্রয়োগযোগ্যতা অত্যন্ত গভীর। কারণ বাংলাদেশ দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশ হলেও সম্পদ বণ্টনের প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শহরে যারা এক দশক আগে জমি, ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক সম্পত্তি কিনেছেন, তাদের সম্পদ মূল্য বহুগুণ বেড়েছে; অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের বড় অংশ ভাড়া, উচ্চ জীবনযাত্রা ব্যয় ও সীমিত সঞ্চয়ের চাপে আছে। এটি পিকেটির r > g তত্ত্বের স্থানীয় রূপ সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি শ্রমের আয়ের চেয়ে দ্রুত। গ্রামীণ বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা যায়। যাদের জমি আছে তারা কৃষিঋণ, সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ সুযোগে এগিয়ে থাকে; ভূমিহীন পরিবার শ্রম বিক্রি ছাড়া বিকল্প কম পায়। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, খরা বা লবণাক্ততা দরিদ্র পরিবারকে আরও সম্পদহীন করে। ফলে বৈষম্য শুধু আয় নয়, সম্পদ ও ঝুঁকির বৈষম্যও। শিক্ষাক্ষেত্রে তার মেরিটোক্রেসি-সমালোচনাও বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। রাজধানীর উন্নত স্কুল, ইংরেজি মাধ্যম, কোচিং, প্রযুক্তি সুবিধা ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এক শ্রেণীর হাতে বেশি কেন্দ্রীভূত; অন্যদিকে বহু মেধাবী শিক্ষার্থী গ্রাম বা নিম্নআয়ের পরিবার থেকে এসে শুরুতেই পিছিয়ে থাকে। তখন পরীক্ষার ফলাফলকে নিছক ‘মেধার জয়’ বলা অসম্পূর্ণ হয়ে যায়। পিকেটির ভাষায়, উত্তরাধিকার শুধু টাকা নয় সুযোগের উত্তরাধিকারও।এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য কিছু প্রয়োগযোগ্য শিক্ষা স্পষ্ট। বাংলাদেশে বৈষম্য হ্রাসের জন্য প্রথমেই করব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৮-১০ শতাংশে সীমিত থাকায়, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি করতে হলে এটি ধীরে ধীরে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। তবে শুধু কর বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; করের ধরনেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বর্তমান পরোক্ষ কর, বিশেষত ভ্যাট, সাধারণ ভোক্তার ওপর ডিসপ্রোপরশনেট চাপ ফেলে। তাই উচ্চ আয়, একাধিক সম্পত্তি, বিলাসী খরচের বস্তু এবং উত্তরাধিকারভিত্তিক বা অপ্রদর্শিত সম্পদের ওপর কার্যকর প্রত্যক্ষ কর আরোপ করতে হবে। এই পদক্ষেপ শুধু আয়ের সমতা বাড়াবে না, বরং রাষ্ট্রীয় নীতি ও ক্ষমতার মাধ্যমে সম্পদ কেন্দ্রীভবন কমাবে। পিকেটি বলতেন যেখানে সম্পদ সঞ্চিত, করনীতিও সেখানে পৌঁছাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং খেলাপি ঋত কমানো জরুরি। দীর্ঘমেয়াদী খেলাপি ঋত, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক স্বজনপ্রীতি (নেপোটিজম) এর কারণে অর্থনীতি প্রতিযোগিতামূলক থাকে না; বড় ঋণগ্রহীতা সুবিধা পায়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা কৃষক জামানতের অভাবে ঋণ পায় না। এই অর্থ কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, প্রযুক্তি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের দিকে সরানো হলে বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। রাজধানী ও শহরের উন্নত বেসরকারি শিক্ষা এবং গ্রামীণ স্কুলগুলোর মধ্যে মানের তফাৎ দূর করতে হবে। শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ৪-৬ শতাংশে উন্নীত করা, কারিগরি শিক্ষা ও জেলা-উপজেলায় মানসম্মত কলেজ এবং ডিজিটাল ল্যাব তৈরি করা, স্বাস্থ্যসেবা সার্বজনীন করা এগুলো সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। চতুর্থত, ভূমি ও নগর সম্পদের বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বড় শহরে জমির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় যারা আগে সম্পদ কিনেছে তারা আরও ধনী হচ্ছে, নতুন প্রজন্ম পিছিয়ে যাচ্ছে। খালি ফ্ল্যাট, অব্যবহৃত জমি এবং জল্পনামূলক সম্পদের ওপর কর আরোপ, সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প এবং জেলা ভিত্তিক শিল্পায়ন বাস্তবায়ন করতে হবে। পঞ্চমত, সামাজিক সুরক্ষা বিস্তৃত করতে হবে। বয়স্কভাতা, বিধবা ও প্রতিবন্ধী সহায়তা, বেকার প্রশিক্ষণ এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নগদ সহায়তা প্রণোদনা নিশ্চিত করলে দুর্বল শ্রেণীর মানুষ বৈষম্যের প্রভাব থেকে সুরক্ষা পাবে। ষষ্ঠত, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন অপরিহার্য; শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীভূত হলে উত্তরাঞ্চল, উপকূল, হাওর ও সীমান্ত জেলা পিছিয়ে থাকবে। শিল্পপার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল অবকাঠামো এবং রেল-লজিস্টিক নেটওয়ার্ক সব অঞ্চলে বিস্তার করতে হবে। সপ্তমত, শ্রমের মর্যাদা বাড়াতে হবে। ন্যূনতম মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা, মাতৃত্ব সুবিধা, অনানুষ্ঠানিক খাতের সুরক্ষা—এসব ছাড়া পুঁজির বিপরীতে শ্রম দুর্বলই থাকবে। সবশেষে, দূর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। সরকারি নীতি বা উন্নয়ন প্রকল্পে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে সুবিধা প্রভাবশালীদের দিকেই চলে যায়, সাধারণ মানুষ পিছিয়ে পড়ে। তাই কর সংস্কার, সম্পদ রেকর্ড, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকের ঋণ প্রবেশাধিকার সব পদক্ষেপকে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এই সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া শুধু অর্থনৈতিক নীতি যথেষ্ট নয়; কারণ দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বৈষম্যের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে।পরিশেষে, পিকেটির বই আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় বৈষম্য কোনো নির্ধারিত ভাগ্য নয়, এটি নীতি ও ব্যবস্থার ফল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেখানে নীতির মাধ্যমে সুবিধা-অসুবিধা তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমনি নীতির মাধ্যমে তা সমানভাবে বিতরণও করা সম্ভব। যদি বাংলাদেশ কেবল প্রবৃদ্ধির সংখ্যার গল্প না বলে, বরং ন্যায়সঙ্গত, সমতাভিত্তিক উন্নয়নের পথ বেছে নেয়, তবে প্রকৃত উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য, সংখ্যার জন্য নয়। উঁচু সেতু, ঝকঝকে নগর, বড় বাজেট এসব যতই চোখে পড়ে, তার চেয়েও বড় ও জরুরি প্রশ্ন একটাই: এই দেশের ভবিষ্যৎ কি সত্যিই সবার জন্য উন্মুক্ত, নাকি কেবল অল্প কয়েকজনের জন্য সংরক্ষিত? পিকেটির বিশ্লেষণের প্রকৃত মূল্য এখানেই নিহিত।[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়]

রক্তের দামে কেনা বিষণ্ণ জীবন

৮ মে, বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। কিন্তু বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের কাছে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি রক্তের জন্য চলমান এক নীরব যুদ্ধের প্রতীক। এই দিনে সারা বিশ্ব যখন থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের অঙ্গীকার নিয়ে আলোচনা সভা আর র‍্যালিতে মেতে ওঠে, তখন এদেশের কিছু নিভৃত কোণে কয়েক হাজার পরিবার এক অমানবিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। এটি কোনো সাধারণ যুদ্ধ নয়; এ যুদ্ধ এক ব্যাগ রক্তের জন্য, এ যুদ্ধ এক ফোঁটা নিশ্বাস কিনে নেওয়ার লড়াই।বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া কেবল একটি রক্তস্বল্পতার নাম নয়, এটি একটি অদৃশ্য সংকট। যা একটি সাজানো পরিবারকে মুহূর্তেই মরুভূমিতে পরিণত করতে পারে। যখন একটি শিশুকে প্রতি মাসে সুঁইয়ের কঠোর যন্ত্রণা সহ্য করে অন্যের রক্তে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়, তখন সেই লড়াই কেবল সেই শিশুর থাকে না, তা হয়ে দাঁড়ায় পুরো পরিবারের এক মরণপণ সংগ্রাম।রক্ত যখন অন্নের চেয়েও দামিবাংলাদেশের অসংখ্য পরিবার আজও স্মরণ করে সেই দিনটির কথা, যেদিন চিকিৎসকের রিপোর্টে প্রথম ‘থ্যালাসেমিয়া’ শব্দটি দেখেছিল। একটি ছোট্ট শিশুর ফ্যাকাশে হয়ে আসা মুখ, হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া শরীর, আর চিকিৎসকের গম্ভীর কণ্ঠ একটি পরিবারকে মুহূর্তেই বদলে দেয়।আজ সেই শিশুটির মতো হাজারো যোদ্ধা প্রতি মাসে কেবল বেঁচে থাকার আশায় হাসপাতালে যায়। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য রক্ত কেবল চিকিৎসা নয়, এটিই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র জ্বালানি।কিন্তু সমাজের এই অদৃশ্য সংকটের গভীরতা বোঝা যায় হাসপাতালের করিডোরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসে। ঈদের আনন্দ যখন শহরের প্রতিটি কোণে উপচে পড়ে, তখন একজন থ্যালাসেমিক সন্তানের বাবা মলিন মুখে বলেন, “মানুষ তো ঈদের নতুন জামাকাপড় কেনার চিন্তা করে, আর আমাদের ভাবতে হয় রক্ত কেনার টাকা আসবে কোত্থেকে? সন্তানের জন্য জামা নয়, আমি কি তার জন্য এক ব্যাগ নিশ্বাস কিনতে পারব?” যখন রক্ত কেনার টাকা জোগাতে গিয়ে ঘরের অন্ন কেনা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেই পরিবারের অবস্থা কেউ কি কল্পনা করতে পারে?২০২৪ সালের জাতীয় জরিপ ও স্বাস্থ্যখাতের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসার পেছনে মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে, যা অনেক নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের মোট আয়ের চেয়েও বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এদেশে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত পরিবারের আয়ের প্রায় ১৭ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যয় হয় শুধু রক্ত ও ওষুধের পেছনে।নিষেধের ঘেরাটোপে অমানবিক পরিশ্রমথ্যালাসেমিয়া রোগীদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি শরীরকে দ্রুত ক্লান্ত করে তোলে। হৃদপিণ্ড, লিভারসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।অথচ দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে অনেক রোগীকেই জীবনের প্রয়োজনে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। কোথাও একজন রোগী কলসি কাঁধে সিঁড়ি বেয়ে মানুষের বাসায় পানি পৌঁছে দিচ্ছে, কোথাও কেউ সারাদিন শ্রম বিক্রি করছে শুধুমাত্র পরবর্তী রক্ত নেওয়ার টাকা জোগাড় করতে।এক ভয়াবহ বৈপরীত্যবাঁচতে হলে রক্ত লাগবে, আর রক্ত কিনতে হলে যে পরিশ্রম করতে হবে, সেই পরিশ্রমই ওই শরীর নিতে পারছে না। এ এক অদ্ভুত মৃত্যুফাঁদ। ২০২৪ সালের সর্বশেষ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া পরিস্থিতির যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১.১৫ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এই রোগের বাহক। অর্থাৎ আমাদের চারপাশের প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে প্রায় ১ জন অজান্তেই এই জিন বহন করছেন। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার নতুন শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নিচ্ছে।সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো সচেতনতার অভাব। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ বাবা-মা সন্তান জন্মের আগে জানতেনই না থ্যালাসেমিয়া কী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিয়ের আগে কোনো স্ক্রিনিং বা রক্ত পরীক্ষা করা হয়নি। এই অজ্ঞতাই আজ থ্যালাসেমিয়াকে এদেশের অন্যতম বড় নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত করেছে। অথচ এটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য।সাইপ্রাস ও ইতালির লড়াইউন্নত বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একসময় সাইপ্রাসে প্রতি ৬ জনের ১ জন থ্যালাসেমিয়ার বাহক ছিল। পরে চার্চ, সরকার ও স্বাস্থ্যখাতের সমন্বয়ে বিয়ের আগে স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলাফল হলো আজ সেখানে নতুন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।ইতালির সার্দিনিয়া অঞ্চলও দীর্ঘমেয়াদি গণসচেতনতা, জিনগত পরীক্ষা এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের পাশের দেশ পাকিস্তানেও বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার আইন পাস হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এখনও বিষয়টি মূলত দিবসভিত্তিক আলোচনা আর সীমিত সচেতনতাতেই আটকে আছে।আশার আলোএই অন্ধকারের মাঝেও কিছু প্রতিষ্ঠান মানবিকতার বাতিঘর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ‘বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি হাসপাতাল’ তার অন্যতম উদাহরণ। ১৯৮৯ সালে মরহুম ইঞ্জিনিয়ার ওমর গোলাম রাব্বানী নিজের বাড়িতে মাত্র তিনটি বেড নিয়ে এই উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। আজ গ্রিন রোডের এই প্রতিষ্ঠান হাজারো রোগীর আশ্রয়স্থল।বর্তমানে এখানে প্রায় ৫ হাজাারের বেশি নিবন্ধিত রোগী রয়েছে এবং প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন রোগীর রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়। হাসপাতালটি যাকাত ফান্ডের মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের সহায়তা দেয় এবং অত্যন্ত কম খরচে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। এটি কেবল একটি হাসপাতাল নয়, মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতীক।মেধার স্বীকৃতি ও কোটার দাবিথ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত মানুষ শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে জীবনের নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়লেও মেধায় তারা পিছিয়ে নেই। নিয়মিত চিকিৎসা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেকেই প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে টিকে থাকতে পারেন না।তাই থ্যালাসেমিয়াকে একটি বিশেষ দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক জটিলতা হিসেবে বিবেচনা করে তাদের জন্য কর্মসংস্থান, শিক্ষাসহায়তা ও বিশেষ সুযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন। যদি তারা নিজের চিকিৎসার খরচ নিজে বহন করার সুযোগ পায়, তবে তারা সমাজের ওপর বোঝা না হয়ে দেশের সম্পদে পরিণত হতে পারে।মায়ের চোখের জলহাসপাতালের করিডোরে অনেক কথোপকথন পাথরকেও কাঁদাতে পারে। এক মা তার সন্তানকে বলছেন, “বাবা, আর একটু ধৈর্য ধর, সুঁইটা দিলেই শরীরটা আবার ভালো লাগবে।” সন্তান প্রশ্ন করে, “মা, আমি কেন অন্য বাচ্চাদের মতো দৌড়াতে পারি না? আমার শরীর এত দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায় কেন?” মা চোখের জল লুকিয়ে বলেন, “তুই তো বীরের মতো লড়াই করছিস বাবা।” এই কথোপকথনগুলো কোনো গল্প নয়; এটাই বাস্তবতা।  এক কিশোর রোগী তার মাকে বলছিল, “মা, আমার ঈদের জামা লাগবে না। তুমি শুধু রক্তের টাকাটা রেখে দিও।” আমাদের উৎসবের বিলাসিতা থেকে কি একটি ব্যাগ রক্তদানের জায়গা তৈরি করা যায় না?বিনীত নিবেদনথ্যালাসেমিয়া কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়; এটি মূলত অসচেতনতার ফল। আজ এই লেখা যখন আপনি পড়ছেন, তখন হয়তো কোনো শিশু হাসপাতালের বেডে পরবর্তী রক্তের অপেক্ষায় আছে। আপনি যদি নিয়মিত রক্তদান করেন, তবে হয়তো সেই শিশুটির জীবন আরও কিছুদিন এগিয়ে যাবে। আপনি যদি বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং নিশ্চিত করেন, তবে হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই কষ্ট থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।আসুন, এই ৮ মে আমরা শুধু দিবস পালন না করে দায়িত্ব গ্রহণ করি। নিয়মিত রক্তদান করি।বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা নিশ্চিত করি।  এই অদৃশ্য সংকটকে দৃশ্যমান করি। কারণ রক্ত শুধু শরীরে প্রবাহিত হয় না, এটি বাঁচিয়ে রাখে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি মায়ের প্রার্থনা, একটি শিশুর আগামী। সেই জীবন যেন অর্থাভাবে অকালে ঝরে না পড়ে এ দায় আমাদের সবার। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক

রম্যগদ্য: “ধুলোভাই জিন্দাবাদ”

“ধুলোভাই জিন্দাবাদ, দাদাবাবু জিন্দাবাদ...”“কী ব্যাপার হঠাৎ ধুলোভাই জিন্দাবাদ, দাদাবাবু জিন্দাবাদ দিচ্ছিস! দুলাভাই জিন্দাবাদ না হয় বুঝলাম কিন্তু তোর দাদাবাবুর তো দফারফা। তোর কামেরবেটি মার্কা দিদি আর নেই, ফলে তোর দাদাবাবুকে আর টনকা টন ঈলিশ মাছ খেতে হবে না।”“ধুর মিয়া আপনে আছেন আপনের টনকা টন ইলিশ মাছ রপ্তানিতে, হক্কল যায়গায় খালি ব্যবসা খোঁজেন! আমি কই কী, আর আমার সারিন্দায় কয় কী?”“কেন কেন, দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে টনকা টন ইলিশ মাছ রপ্তানীতে দোষ কোথায়?”“টনকা টন ইলিশ মাছ রপ্তানি নারে ভাই অহন রপ্তানি হোইতাছে বুলডোজার! ১৮৭৪ সালে নির্মিত কোলকাতা নিউমার্কেটের সামনে নেড়েগো গোশতের দোকান বুলডোজার দিয়া ভাইঙ্গা দিলো। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত সরকারের মদদপুষ্ট যোদ্ধারা। বুজলাইন, বাংলাদেশ অহন আর কচি শিশুটি নাই! হ্যারা অহন এক্সপোর্ট করে আর্ন্তজাতিক মানের বিজয় মিছিলের আইডিয়া- “দ্যা বুলডোজার!”“ক’দিন আগে না তোর মমতা দিদি আমাদের নারায়ণগঞ্জের বঙ্গসন্তান, শামীম ওসমানের “খেলা হবে” স্লোগানটা ইম্পোর্ট করেছিলেন...”“তো! আমাগো নারায়ণগঞ্জের পোলা, শামীম ওসমানের “খেলা হবে” স্লোগানটা ইম্পোর্ট করেছিলেন, তো দোষের কী হোইছে?”“না দোষের কিছু হয়নি, ৫ আগস্টের পরে শামীম ওসমানের যেমন জনগণ দরজার চৌকাঠ পর্যন্ত খুলে নিয়েছে, এবার পশ্চিমবঙ্গে পাবলিক তৃণমূলের কর্মীদের ধোলাই করছে, আর নিউমার্কেটের সামনে নেড়েদের গোশতের দোকান বুলডোজার দিয়া ভাঙছে।”“হেঁ হেঁ হেঁ, বুজেন না “গ্রেটম্যান থিংস অ্যালাইক...”“এ আবার কী? এখানে “গ্রেটম্যান থিংস অ্যলাইক” কথাটা আসছে ক্যানো?”“গ্রেটম্যান থিংস অ্যালাইক” কথাটা আইছে ক্যান হেইডা আপনে বুজেন না! দেড়বছর আগে আপনের তত্বাবধায়ক সরকার ক্যেমনে সব বুলডোজিং করতাছিলো ভুইল্লা গেছেন?”“না না এইসব অসভ্য বর্বর পৈশাচিকতা কেউ কখোনো ভুলবে? আর্শ্চয্য!”“জ্বী, মুদি সরকারভি ওই আমাগো গ্রেটম্যানের পথ ধইরা বুলডোজিং করতাছে! যতই কন মহাভারত মহাগণতন্ত্রের দেশ, আসলে যেই লাউ হেই কদু, ধর্মান্ধতার কাছে ট্রাম্প কন আর মুদিজী বেবাগতে সেইম সেইম।”“যাহ তা হয় নাকি, ভারতের সভ্যতা বেনারসের নগরের পত্তন সেতো হাজার হাজার বছরের বৈদিক সভ্যতা। তার সঙ্গে তোর এই অর্ধশতাব্দীর অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত কতগুলো মানুষ নামের জন্তু জানোয়ারে সমাজ পরিচালকের তুলনা কি মানায়?”“ক্যা, তুলনা হোইবো না ক্যান? ইভিএম ভোটে কারচুপি! এইডা ক্যাডা শিখাইছে? আপনে কন হাজার বছরের সভ্যতা! আমাগোটা অর্ধশতাব্দী না চুয়ান্ন বছর হেই তর্কে আমি যামুনা। তয় আমি কোইকি এইবার কলিকাতার বাঙালি মুসলমানগো খবর আছে। এইবারের পশ্চিমবঙ্গের ভোটার লিস্টে প্রায় নব্বই লাখ মুসলমানের নাম বাদ পড়ছে! ফলে কামের বেটি কন আর ফকিরনি মার্কা দিদি যাই কন হ্যের কিন্তু মোসলমান ভোট ব্যাংক দেওলিয়া হয়া গ্যেছেগা।”“তা বললে হবে নাকি ওই যে বাবারি মসজিদ ভাঙার পর, ঠিক বাবরি মসজিদের মতো নতুন মসজিদ গড়ার কারিগর জনাব হুমায়ুন কবির আম জনতা পাটি থেকে নিবার্চন লড়ে, তৃণমূল ও বিজেপিকে হারিয়ে জয় লাভ করেছে।”“বুঝছি বুজছি আপনে মিয়া কোইতে চান পশ্চিম বঙ্গের নির্বাচনের ফল আমাগো ওপর কিছুটা হোইলেও পরভাব ফেলবো। ঠিক আছে কিন্তু আমি কোই কি, যেসব পোলাপান মানে জেন-জীর লড়াকু পোলাগুলা যে মাল খায়া টাল হোইলো হ্যেরা যুদি আবার স্বজনপ্রীতি শুরু করে, তায়লে কোইলাম খবর আছে। দেশের আবার বারটা বাজবো!”“কিন্তু তুই কি করবি বল, দুলাভায়ের কাছে শালারা আবদার করবেনা? দুলাভাই যদি শালাদের কথা না শুনে তাহলেতো তোর ভাবীর কাছে দুলাভায়ের মুখ থাকবে না!”“ভাইনা ভালা, আপনে বিগত অর্ধশতাব্দী না চুয়ান্ন বছর হিসাব দিলেন, প্রতিবারই আপনেরা হয় পার্টির প্রধান মন্ত্রী নাইলে নিজ আত্মীয়গো পুরধান মন্ত্রী, কুনো সময় কিন্তু বাংলাদেশের মানে পুরা দেশের পুরধান মন্ত্রী হন নাই! আর পার্টি আর আত্মীয় দেখতে যায়া বার বার বাংলাদেশরে গাথায় ফ্যালাইছেন। এইবারও যদি আপনেরা ধুলো ভাই ধুলোভাই কয়া স্বজনপ্রীতির দিকে যাইতে কন তায়লে হেইতো আবার বাংলদেশরে লয়া গাথায় পড়বো। আবার কোনো হালায় বুলডোজার দিয়া হ্যের আত্মীয় স্বজনগো দরজার চৌকাঠ পর্যন্ত খুইল্লা নিবো।”“নাওে না, তুই এই ভয় আর করিস না, এই দুলাভাই মাছের রাজা ইলিশ আর বাত্তির রাজা ফিলিপস’এর দুলাভাই নয়, ইনি অনেক পরিপক্ক। ইনি আর ঝাপসা আলোয় কাঁটা কুটা কিচ্ছু দেখি না, দুলাভাই নয়। ইনি সব কিছুই ঠিক মতো দেখছেন। একযুগ পর দেশের মাটিতে নেমেই কিন্তু তোর এই দুলাভাই বলেছেন, বিশ্বের শোষিতের নেতা মার্টিন লুথার জুনিয়ারের মতো বলেছেন, “আই হ্যাভ এ, প্ল্যান” তাই তুই নিশ্চিন্তে থাক। কেবল একটু ধৈর্য্য ধর তাহলেই হবে।”“ঠিক আছে ভাই, ওই সব দাদা-দিদিগো চুলা-চুলি থুয়া, নিজেগো দেশটারে সুন্দরমোতো তৈয়ার করারা লাইগ্যা ব্যেবাগতে এক না হোইলে চলেনা। তয় আপনে কথাটা ঠিকই কোইছেন, ব্যেবাগতেওে একটু ধৈর্য্য ধরন লাগবো।”“এইতো বুদ্ধিমানের মতো কথা। দাদা-দিদিদের বুলডোজার রেখে আমরা সবাই ধৈর্য্য ধরে দেখি দেশের কী হয়।”“পুরা দেশের জনগণ, একলগে সবে কন, ধৈর্য্য শরণং গচ্ছামি।”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

ভিডিও আরও দেখুন

টানা পঞ্চম লিগ শিরোপা জিতল পিএসজি

​ড্র করলেই চলত, কিন্তু চ্যাম্পিয়নদের মতো দাপট দেখিয়েই লিগ শিরোপা ঘরে তুলল প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। লেন্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই টানা পঞ্চমবারের মতো ফরাসি লিগ ওয়ানের শিরোপা নিশ্চিত করেছে লুইস এনরিকের শিষ্যরা।​ম্যাচের শুরু থেকেই ঘরের মাঠে পিএসজিকে চেপে ধরার চেষ্টা করে লেন্স। ম্যাচের ২০ মিনিটের মাথায় তারা দুটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি করলেও গোলরক্ষক মাতভেই সাফোনভ দুর্দান্ত দুটি সেভ করে দলকে বিপদমুক্ত রাখেন। মূলত সাফোনভের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সই পুরো ম্যাচে পিএসজিকে মানসিকভাবে এগিয়ে রাখে।​লেন্সের চাপ সামলে ২৯ মিনিটে লিড নেয় প্যারিসের ক্লাবটি। মাঝমাঠ থেকে বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত আক্রমণে ওঠেন ওসমান দেম্বেলে। তার নিখুঁত পাস থেকে বল পেয়ে চমৎকার ফিনিশিংয়ে জাল কাঁপান জর্জিয়ান তারকা খভিচা কাভারাৎস্খেলিয়া। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে বিরতিতে যায় বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।​দ্বিতীয়ার্ধেও সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে লড়েছে লেন্স। একের পর এক আক্রমণ সামলাতে পিএসজি রক্ষণভাগকে বেশ হিমশিম খেতে হয়। তবে গোলপোস্টের নিচে সাফোনভ এদিন ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। লেন্সের প্রতিটি আক্রমণই তার বিশ্বস্ত হাতে গিয়ে শেষ হয়।​ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগ মুহূর্তে ব্যবধান দ্বিগুণ করে পিএসজি। অতিরিক্ত সময়ে তরুণ ফরোয়ার্ড ইব্রাহিম এমবায়ে একটি শক্তিশালী শট নেন, যা ক্রসবারে লেগে জালে জড়ায়। ২-০ ব্যবধান নিশ্চিত হতেই শিরোপা উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো গ্যালারি।​এই জয়ের ফলে লিগের এক ম্যাচ বাকি থাকতেই শিরোপা নিশ্চিত করল এনরিকের দল। ফরাসি ফুটবলে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে টানা পঞ্চম এবং ক্লাব ইতিহাসের অন্যতম সফল লিগ শিরোপা জয় করল প্যারিসের জায়ান্টরা।

টানা পঞ্চম লিগ শিরোপা জিতল পিএসজি
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৬১ জন