সংবাদ
বেইজিংয়ে বাংলাদেশ-চীন নতুন অধ্যায়, ১৩ স্মারক সই

বেইজিংয়ে বাংলাদেশ-চীন নতুন অধ্যায়, ১৩ স্মারক সই

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের দ্বিতীয় দিনে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা, নদী খনন, নদীভাঙন রোধ, সেচ ও নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বিকেলে বেইজিংয়ের ঐতিহ্যবাহী ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে দুই দেশের শীর্ষ নেতার উপস্থিতিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বিষয়ক ১৩টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে।এর আগে বিকেলে বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বর্ণাঢ্য ‘লাল গালিচা’ সংবর্ধনা ও ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করেন চীনের প্রিমিয়ার লি ছিয়াং। দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও চুক্তি স্বাক্ষর শেষে চীনের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের সম্মানে একটি রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজন করেন।দুপুরে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোয়োইংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ সুরক্ষা ও পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে দেশে চলমান নদীখনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় চীন সরকারের সহযোগিতা চান। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীন সরকারের কারিগরি সহায়তা প্রত্যাশা করেন। দুই শীর্ষ নেতা আলোচনা শেষে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা, নদী খনন, নদীভাঙন রোধ, সেচ ও নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীন সরকারের কারিগরি সহায়তা প্রত্যাশা করলে চীনা পানিসম্পদমন্ত্রী সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং এ খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণের আহ্বান জানান।বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকালে চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অফ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিসিপিআইটি) এবং বিডার (বিআইডিএ) যৌথ উদ্যোগে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি বিশেষ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে চীনের প্রথম সারির ৮০ জন শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রধান উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তারেক রহমান বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে এবং ১৫ দিনের কম সময়ে নতুন লাইসেন্স প্রদান করা হবে।প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে চীনের সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাত থেকেই বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিপুল আশ্বাস পাওয়া গেছে। এছাড়া ‘চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন এজেন্সি’, ‘চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন’ এবং ‘চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন’ এর প্রধানগণ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি ‘পার্টি-টু-পার্টি’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সাথে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। চীনা পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে মাথায় রেখে চীন সফর করছেন প্রধানমন্ত্রী। এই সফরে অপচয় রোধে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে মাত্র ২৫ জন রয়েছেন, যার মধ্যে মন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদমর্যাদার ১১ জন আছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং পরবর্তীতে খালেদা জিয়া যে সম্পর্ক সুদৃঢ় করেছিলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সেই পারিবারিক ও দলীয় ঐতিহ্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন।সফরের শেষ দিন শুক্রবার (২৬ জুন) চীনের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় (বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৮টায়) গ্রেট হলে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই বৈঠকে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব ও বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে বলে জানা গেছে। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজই ঢাকার উদ্দেশে বেইজিং ছাড়ার কথা রয়েছে সরকারপ্রধান তারেক রহমানের।
২ ঘন্টা আগে

বিশ্বকাপ সময়সূচি: দেখতে ক্লিক করুন

মতামতমতামত

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য

দেশের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্য যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের কোন বিকল্প নেই। আধুনিক অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদকে অধিক মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীই একটি দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। এ কারণেই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো শিক্ষাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। ইউনেস্কোসহ বেশ কিছু উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শিক্ষায় বিনিয়োগ দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মানুষের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কেবল নিজেদের জীবনমান উন্নত করে না; তারা জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। অর্থনীতিবিদদের প্রদত্ত ‘মানবসম্পদ তত্ত্ব’ (হিউম্যান ক্যাপিটাল থিওরি) অনুসারে শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও কর্মক্ষমতাকে উন্নত করে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের অর্থনৈতিক লাভে পরিণত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি অতিরিক্ত বছর একজন ব্যক্তির আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। শিক্ষিত মানুষ সাধারণত উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করে, নতুন প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করতে পারে এবং পরিবর্তিত শ্রমবাজারের সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জাতীয় উৎপাদন, কর রাজস্ব, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির (টেকনোলজি-বেইস&ড নলেজ ইকোনোমি) দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, অটোমেশন, বিগ ডেটা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ অর্থনীতি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশ্ব শ্রমবাজারের কাঠামোকে আমূল পরিবর্তন করছে। ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ক্রমশ এমন দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, যা প্রচলিত শিক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান, ডিজিটাল সাক্ষরতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আজীবন শেখার সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের নিশ্চয়তার পাশাপাশি গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি এবং দক্ষ শিক্ষক প্রস্তুতির উদ্যোগ। বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী যথাযথ শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেলে দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। কিন্তু যদি তাদের আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ অর্থনীতি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী জ্ঞান ও দক্ষতায় শিক্ষিত করা না যায়, তাহলে এই সম্ভাবনাময় জনশক্তি বেকারত্ব, অর্ধবেকারত্ব এবং দক্ষতার ঘাটতির কারণে জাতীয় অর্থনীতির জন্য বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। অর্থনীতিতে যাকে ‘জনসংখ্যাগত সুবিধা’ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) বলা হয়, তা তখন ‘জনসংখ্যাগত বোঝা’ (ডেমোগ্রাফিক বার্ডেন)-য় রূপ নিতে পারে। বার্ষিক জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি কেবল শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রশ্ন নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রশ্ন। যে রাষ্ট্র তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে যুগোপযোগী শিক্ষা ও দক্ষতায় সজ্জিত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই আগামী দিনের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। অন্যদিকে শিক্ষায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে ব্যর্থতা একটি জাতির উন্নয়ন সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত করে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ভিত্তিও শিক্ষা। রাষ্ট্রের নাগরিকদের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, তেমনি সেই নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজন সচেতন, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিকসমাজ। শিক্ষা সেই নাগরিকসমাজ গঠনের প্রধান মাধ্যম। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব, অপরাধপ্রবণতা, মাদকাসক্তি, চরমপন্থা, শিশুবিবাহ, লিঙ্গবৈষম্য এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। কারণ শিক্ষা মানুষকে কেবল তথ্য ও দক্ষতা প্রদান করে না; এটি তার বিচারবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। ফলে শিক্ষিত ব্যক্তি নিজের জীবন ও পরিবারের কল্যাণে যেমন ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাজবিজ্ঞানীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সামাজিক সংহতি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইমের (১৮৫৮-১৯১৭) মতে, শিক্ষা সমাজের অভিন্ন মূল্যবোধ, নৈতিক আদর্শ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ নতুন প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করে। অন্যদিকে অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও সামাজিক বঞ্চনা প্রায়শই অপরাধ, সহিংসতা, উগ্রবাদ এবং সামাজিক অস্থিরতার উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। যে সমাজে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তৃত হয়, সেখানে নাগরিকরা অধিকতর আইনমান্যকারী, সহনশীল এবং গণতান্ত্রিক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগকে কেবল একটি উন্নয়নমূলক উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিকনিরাপত্তা ও জাতীয় স্থিতিশীলতার কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত। এ কারণেই শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল কখনোই শিক্ষা খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ইতিবাচক প্রভাব স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবার পরিকল্পনা, নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক সম্প্রীতি, উৎপাদনশীলতা, আইনশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় সেবার গুণগত মান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। একজন শিক্ষিত মা তার সন্তানের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষার বিষয়ে অধিক সচেতন হন; একজন শিক্ষিত নাগরিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন; একজন দক্ষ শিক্ষিত কর্মী অর্থনীতিতে অধিক অবদান রাখেন; আর একজন সচেতন ভোটার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেন। ফলে শিক্ষায় ব্যয়িত প্রতিটি অর্থ রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রতিফলন সৃষ্টি করে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কেবল শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করাই চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং সেই বরাদ্দের কার্যকর, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হলো পরিকল্পনার ধারাবাহিকতার অভাব, প্রকল্পভিত্তিক চিন্তার আধিক্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং গুণগত মানের প্রশ্নে দীর্ঘস্থায়ী উদাসীনতা। ফলে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও যদি তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হয়, কিংবা মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে রাষ্ট্রীয় অর্থের নয়ছয়ে শুভঙ্করের ফাঁকিটাই প্রধান হয়ে ওঠে, তবে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করা সম্ভব হবে না। এজন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, নৈতিক ও নাগরিক শিক্ষা শক্তিশালীকরণ এবং প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সমতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বিকাশের পরিবর্তে পরীক্ষাকেন্দ্রিক সনদ অর্জনের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়লেও দক্ষ ও উদ্ভাবনী মানবসম্পদের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে তা কেবল চাকরিপ্রার্থী তৈরি না করে; বরং সমস্যা সমাধানে সক্ষম, প্রযুক্তি-সচেতন, উদ্ভাবনী, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করে। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে কতজন মানুষ চাকরি খুঁজছে তার ওপর নয়; বরং কতজন মানুষ নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে, নেতৃত্ব দিতে এবং সমাজের কল্যাণে ইতিবাচক অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে তার ওপর। অতএব শিক্ষায় অধিক বরাদ্দ এবং সেই বরাদ্দের কার্যকর ব্যবস্থাপনা- এই দুটি বিষয়কে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষা যদি মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রসংস্কারের ভিত্তি হয়, তবে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে আর কোনো টেকসই বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্বে যেসব দেশ মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা এবং সুশাসনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, তাদের উন্নয়নের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তারা প্রায় সবাই শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক জনশক্তির চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত, সম্পদস্বল্প কিংবা ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ অনেক দেশও শিক্ষায় ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে যেসব রাষ্ট্র শিক্ষাকে অবহেলা করেছে, সেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং জাতীয় ঐক্য দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইতিহাস তাই বারবার প্রমাণ করেছে যে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান দ্বারা। টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো শিক্ষা। কারণ শিক্ষাই মানুষকে অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে, নির্ভরশীলতা থেকে আত্মনির্ভরতার দিকে, সংকীর্ণতা থেকে মানবিকতার দিকে এবং বিভক্তি থেকে জাতীয় ঐক্যের দিকে নিয়ে যায়। একটি রাষ্ট্র যত বেশি শিক্ষিত, দক্ষ এবং সচেতন নাগরিক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি তত বেশি শক্তিশালী হয়। সুতরাং রাষ্ট্রীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি কোনো নির্দিষ্ট খাতকে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছি, যেখানে রাষ্ট্রসংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের ব্যাপক জনআকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কেবল আইন, নীতি বা প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে এই আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী করে তুলতে হলে প্রয়োজন এমন এক নাগরিকসমাজ, যারা জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ। আর সেই নাগরিকসমাজ গড়ে তোলার প্রধান ভিত্তি হলো একটি মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা। জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে, তাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষাসংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষার আত্মঘাতী রাজনীতিকরণ, জাতীয় দর্শনের আলোকে শিক্ষানীতির ধারাবাহিক উৎকর্ষ ও প্রয়োগের অভাব, শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি, গবেষণায় অনাগ্রহ এবং দক্ষতা উন্নয়নের সীমাবদ্ধতার মতো বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করে শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ (ন্যূনতম জিডিপির ৫%) নিশ্চিত করতে হবে এবং সেই বরাদ্দের স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে কেবল বিদ্যালয়, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ নয়; এটি মানুষের সম্ভাবনায় বিনিয়োগ, জাতীয় ঐক্যে বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। বর্তমান বিশ্বে একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, বরং তার মানবসম্পদে নিহিত। একটি দেশের সড়ক, সেতু বা অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার নাগরিকদের জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের ওপর। যে জাতি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেই জাতিই টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সুশাসনের পথে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রসংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন জ্ঞানসমৃদ্ধ, দক্ষ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিকসমাজ। আর সেই নাগরিকসমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি হলো একটি মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা। তাই শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং জনশক্তির চাহিদাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। শিক্ষাকে ব্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষাখাতে ন্যূনতম জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেই অর্থের স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষিত, দক্ষ, সৃজনশীল ও নৈতিক নাগরিকরাই একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে আজ আমরা শিক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি তার ওপর। [লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

ডিজিটাল যুগে মানুষের অস্থিরতা ও মনোজগতের পরিবর্তন

আজকের পৃথিবীকে অনেকে ‘hyper-connected world’ বা ‘অতি-সংযুক্ত বিশ্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তথ্য, প্রযুক্তি ও যোগাযোগের অভূতপূর্ব বিস্তার মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি তার ভেতরে তৈরি করেছে এক নতুন ধরনের মানসিক চাপ ও অস্থিরতা। ইতিহাসে পরিবর্তন সবসময় ছিল, কিন্তু বর্তমান সময়ের মতো এত দ্রুত, এত ধারাবাহিক এবং এত সর্বব্যাপী পরিবর্তন আগে কখনো দেখা যায়নি। এই পরিবর্তনের ভেতরেই মানুষ ক্রমশ নিজের মনোজগতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, এটাই আজকের সবচেয়ে বড় সামাজিক বাস্তবতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার গত দুই দশকে প্রায় ২৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে ১৮-৩৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে মানসিক চাপ ও অনিদ্রাজনিত সমস্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির যুগে এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে, উন্নয়ন কি সত্যিই মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাচ্ছে, নাকি তা নতুন ধরনের সংকট তৈরি করছে? প্রযুক্তি বিপ্লব ও মনোযোগের সংকট: স্মার্টফোন, সামাজিক মাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আজ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গড়ে একজন মানুষ দিনে ৪-৬ ঘণ্টা মোবাইল বা ডিজিটাল স্ক্রিনে ব্যয় করছে, এমন তথ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। এই ধারাবাহিক তথ্য প্রবাহ, নোটিফিকেশন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল কনটেন্ট মানুষের মনোযোগের স্বাভাবিক গঠনকে বদলে দিচ্ছে। স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, মস্তিষ্ক স্বল্পমেয়াদি ‘ডোপামিন রিওয়ার্ড’ অর্থাৎ দ্রুত আনন্দের প্রতি ক্রমশ বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখা, গভীরভাবে চিন্তা করা বা ধৈর্য ধরে কোনো কাজ সম্পন্ন করার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। একে অনেক গবেষক ‘attention fragmentation’ বা খণ্ডিত মনোযোগ সংকট হিসেবে উল্লেখ করছেন। ফলে আমরা একদিকে তথ্য বেশি জানছি, কিন্তু গভীরভাবে বোঝার ক্ষমতা হারাচ্ছি। এই দ্বন্দ্বই আধুনিক মানুষের মানসিক অস্থিরতার একটি মৌলিক উৎস। সামাজিক মাধ্যম ও তুলনার অদৃশ্য চাপ: সামাজিক মাধ্যম আজ কেবল যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম নয়, এটি এক ধরনের ‘সামাজিক প্রদর্শন মঞ্চ’। এখানে মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সফল বা আকর্ষণীয় অংশটিই উপস্থাপন করে। কিন্তু দর্শক সেই সাজানো বাস্তবতার সঙ্গে নিজের অসম্পূর্ণ বাস্তবতাকে তুলনা করতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার আত্মসম্মানবোধ কমিয়ে দিতে পারে এবং FOMO (Fear of Missing Out) বা পিছিয়ে পড়ার ভয় তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। এক ধরনের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যেখানে মানুষ নিজের জীবনকে ‘কম সফল’ মনে করতে শুরু করে। এই তুলনার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হতাশার জন্ম দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চাপ অনেক সময় ব্যবহারকারী নিজেও সরাসরি বুঝতে পারেন না, কিন্তু তার আচরণ ও মানসিক অবস্থায় এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিক্ষা, প্রতিযোগিতা ও শৈশবের চাপ: বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ফলাফলনির্ভরতা। পরীক্ষার নম্বর, গ্রেড এবং র‌্যাংকিংকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। ইউনেস্কো ও বিভিন্ন শিক্ষা গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা শিশুদের সৃজনশীলতা ও মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শৈশব থেকেই যখন সাফল্যের মানদণ্ড কেবল ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন শেখার আনন্দ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। শিশু শেখে ‘চাপের মধ্যে সাফল্য অর্জন’ করতে, কিন্তু ‘অন্বেষণের মাধ্যমে শেখা’ কমে যায়। এই মানসিক কাঠামো পরবর্তীতে কর্মজীবনেও অস্থিরতা ও অতিরিক্ত চাপ গ্রহণের প্রবণতা তৈরি করে। ফলে শিক্ষা আর কেবল জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র থাকে না, এটি এক ধরনের মানসিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়। তথ্যের অতিভার ও সিদ্ধান্তহীনতা: বর্তমান যুগকে তথ্যের যুগ বলা হলেও এর একটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের অতিভার (information overload)। প্রতিদিন মানুষ অসংখ্য সংবাদ, মতামত, ভিডিও ও বিশ্লেষণের মুখোমুখি হচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, অতিরিক্ত তথ্য মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং ‘decision fatigue’ তৈরি করতে পারে। ফলে ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত হয়, মানসিক ক্লান্তি অনুভব করে এবং এক ধরনের স্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে থাকে। তথ্য যত বাড়ছে, ততই মানুষ মানসিকভাবে স্থির হতে পারছে না, এটি আধুনিক জীবনের একটি মৌলিক বৈপরীত্য। তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির সংস্কৃতি ও মস্তিষ্কের পরিবর্তন: অনলাইন গেম, শর্ট ভিডিও এবং দ্রুত বিনোদনের সংস্কৃতি মানুষের মস্তিষ্ককে তাৎক্ষণিক পুরস্কারের প্রতি অভ্যস্ত করে তুলছে। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অভ্যাস মস্তিষ্কের ‘reward System’-কে পুনর্গঠন করছে, যার ফলে ধৈর্য এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। বাস্তব জীবনের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ধীর, ফলে সেটি অনেক সময় বিরক্তিকর মনে হয়। এই মানসিক পরিবর্তনের কারণে ভার্চুয়াল জগৎ যত বেশি আকর্ষণীয় হচ্ছে, বাস্তব জীবন তত বেশি জটিল ও অসহনীয় মনে হচ্ছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা মানুষের ভেতরে এক ধরনের স্থায়ী অসন্তোষ তৈরি করছে, যা আধুনিক অস্থিরতার আরেকটি বড় কারণ। অস্থিরতা একক নয়, জটিল বাস্তবতা: মানুষের এই অস্থিরতা কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি। এটি প্রযুক্তি, শিক্ষা, সামাজিক কাঠামো, তথ্যপ্রবাহ এবং জীবনযাত্রার সমন্বিত ফলাফল। আধুনিক সভ্যতা যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি মানসিক ভারসাম্যের ওপর নতুন চাপও সৃষ্টি করেছে। তবে এই বাস্তবতা অপরিবর্তনীয় নয়। গবেষণায় দেখা যায়, ডিজিটাল ডিটক্স, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো, মনোযোগ প্রশিক্ষণ (mindfulness practice) এবং সচেতন প্রযুক্তি ব্যবহার মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা। প্রযুক্তি বা আধুনিকতা নয়, বরং আমরা কীভাবে এর সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছি, সেটিই নির্ধারণ করবে আমাদের মানসিক ভবিষ্যৎ। আজকের মানুষ তাই কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং নিজের মানসিক স্থিতিরও রক্ষক। এই দায়িত্ব যত দ্রুত আমরা বুঝতে পারব, ততই অস্থির সময়ের ভেতরেও কিছুটা স্থিরতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে করণীয় ও নীতিগত সুপারিশ: সাম্প্রতিক স্নায়ুবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য এবং ডিজিটাল আচরণবিষয়ক গবেষণায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় জীবনযাত্রাভিত্তিক আচরণগত পরিবর্তন সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, ˆদনন্দিন স্ক্রিন ব্যবহার ২০-৩০ শতাংশ কমাতে পারলে মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই উদ্বেগজনিত চাপ এবং ঘুমের মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়। মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যা আমাদের চিন্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণা বলছে, নিয়মিত মনোযোগ অনুশীলন বা ধ্যানজাতীয় অভ্যাস এই অংশের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। প্রতিদিন অল্প সময়, প্রায় ১০-১৫ মিনিট, নিঃশব্দে শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি মনোযোগ দিলে মস্তিষ্কের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়। এছাড়া প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে অন্তত দুই ঘণ্টা প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটালে শরীরের কর্টিসল নামক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোনের মাত্রা কমে যায়। এর ফলে মানসিক চাপ হ্রাস পায় এবং আবেগীয় স্থিতিশীলতা বাড়ে। ঘুমের নিয়মিততা বা নির্দিষ্ট সময়সূচি মানসিক সুস্থতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। যাদের ঘুম-জাগরণের একটি স্থির রুটিন থাকে, তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রেও এখন বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং মনোযোগ স্বাস্থ্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে ‘ডিজিটাল বিরতি’ বা নির্দিষ্ট সময় পর পর পর্দা থেকে দূরে থাকা মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। সব মিলিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে, মানসিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের উপায় আমাদের ˆদনন্দিন অভ্যাসের মধ্যেই নিহিত। সচেতন জীবনযাপন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ, এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। [লেখক: রিসার্চ কোঅর্ডিনেটর, ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি; সহকারী অধ্যাপক, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি]

সুশাসনের নৈতিক অর্থনীতি

অর্থনৈতিক উন্নয়নের আলোচনায় সাধারণত মূলধন গঠন, শিল্পায়ন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মতো কারিগরি পরিভাষাগুলো প্রাধান্য পায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা আবার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহিতার ওপর জোর দেন। তবে এই সমস্ত কাঠামোগত ধারণার গভীরে একটি মৌলিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা নিহিত থাকে—তা হলো ‘আস্থা’। নাগরিকরা যখন বিশ্বাস করেন যে তাদের করের টাকা জনকল্যাণে ব্যয় হবে, বিনিয়োগকারীরা যখন চুক্তির সুরক্ষার নিশ্চয়তা পান, আর শ্রমিকরা যখন বিশেষাধিকারের বদলে যোগ্যতার মূল্যায়ন দেখেন, তখনই উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি তৈরি হয়। আস্থার এই মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ভিত্তিকেই বলা যায় ‘সুশাসনের নৈতিক অর্থনীতি’। শাসনব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে ‘নৈতিক অর্থনীতি’ হলো রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তির অধীনেই সরকার কর আদায় করে এবং জনসম্পদ পরিচালনার বৈধতা পায়, যার মূল শর্ত হলো এই ক্ষমতার ব্যবহার হবে জনকল্যাণে। যখন এই সামাজিক চুক্তি লঙ্ঘিত হয়, তখন প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা সংকটে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অগ্রগতি থমকে দাঁড়ায়। বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্যায়নে দেখা যায়, সুশাসন কেবল কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এটি একটি দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক সম্পদ। শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোসম্পন্ন দেশগুলো ভৌত অবকাঠামোসর্বস্ব দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্নেন্স ইন্ডিকেটরস’ ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ করেছে যে, সরকারি কার্যকারিতা, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতার মতো সূচকগুলোর সঙ্গে একটি দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক লেনদেন ব্যয় হ্রাস এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অর্জন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। দেশটি একটি ভঙ্গুর দশা থেকে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি জিডিপিসহ নিম্ন-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্য হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, নারী শিক্ষা এবং তৈরি পোশাক খাতের বিশ্বব্যাপী সাফল্য এর অন্যতম উদাহরণ। তবে এই অর্জনকে ধরে রেখে উচ্চ-মধ্যম আয়ের স্তরে পৌঁছানোর পথে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সুশাসনের ঘাটতি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ‘দুর্নীতি ধারণা সূচক ২০২৫’ (যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত)-এ বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৪, যা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে অনেক নিচে। এই সূচককে কেবল একটি ‘ধারণা’ বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই, কারণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী এবং ঋণদাতারা পুঁজি বিনিয়োগের আগে এই সুশাসনের ঝুঁকিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করেন। ফলে, দুর্নীতির এই নেতিবাচক ধারণা সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুর্নীতিকে কেবল নৈতিক স্খলন হিসেবে দেখলে এর পূর্ণাঙ্গ রূপ বোঝা যাবে না; এটি মূলত একটি বড় অর্থনৈতিক বিকৃতি। দুর্নীতি উৎপাদনশীল খাত থেকে সম্পদ সরিয়ে নেয় এবং সরকারি প্রকল্পের ব্যয় অন্যায়ভাবে বাড়িয়ে দেয়। দুর্নীতির কারণে অপচয় হওয়া প্রতিটি টাকা আসলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু অভিযোজনের মতো অতি জরুরি খাতগুলোর বরাদ্দে টান ফেলে। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হলো, এটি বাজারে এমন একটি অনিশ্চয়তা তৈরি করে যা দীর্ঘমেয়াদী দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা, যাদের রাজনৈতিক প্রভাব বা বাড়তি পুঁজি নেই, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যখন মেধার চেয়ে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বা প্রভাব খাটিয়ে বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হয়, তখন উদ্ভাবনী শক্তি নষ্ট হয় এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা স্থবির হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবৈধ আর্থিক প্রবাহ বা অর্থ পাচার। ভুল চালান, কর ফাঁকি এবং মুনাফা স্থানান্তরের মাধ্যমে প্রতি বছর দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ বাইরে চলে যাচ্ছে। এই বহিঃপ্রবাহ রাষ্ট্রকে তার অপরিহার্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে, যা অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে দুর্বল করে এবং সরকারকে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ক্ষতিকর বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা হলো জিডিপির তুলনায় করের অত্যন্ত নিম্ন অনুপাত, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও কর আদায়ের হার আশানুরূপ বাড়েনি। এর মূল কারণও সুশাসনের সংকট। কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের অভাব এবং করদাতাদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি কর পরিপালনকে ব্যাহত করে। নাগরিকরা যখন দেখেন যে তাদের করের টাকা স্বচ্ছতার সঙ্গে জনকল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে না, তখন কর ফাঁকির প্রবণতা বা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বৃদ্ধি পায়। একইভাবে, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সুশাসনের চরম ঘাটতি দৃশ্যমান। প্রকল্পের ভুল নির্বাচন, কেনাকাটায় অনিয়ম, বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্বল তদারকি সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে। অবকাঠামো খাতে (যেমন পরিবহন ও জ্বালানি প্রকল্প) ব্যাপক বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন হলেও, তা যদি অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীস্বার্থের ভিত্তিতে হয়, তবে তা উৎপাদনশীল সম্পদ না হয়ে উল্টো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিশাল ঋণের বোঝা বা দায়ে পরিণত হয়। বাংলাদেশের আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত দীর্ঘকাল ধরে সুশাসনের অভাবে ভুগছে। একটি সুস্থ অর্থনীতিতে ব্যাংকগুলো সঞ্চয় সংগ্রহ করে তা উৎপাদনশীল খাতে বরাদ্দ করে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন এবং তদারকির অভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। খেলাপি ঋণের এই সংস্কৃতি আর্থিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করছে এবং প্রকৃত উৎপাদনশীল উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা সংকুচিত করছে। আর্থিক খাতের এই দুর্বলতা বিনিয়োগ ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। এই শাসনতান্ত্রিক কাঠামোকে কার্যকর করতে আরেকটি অপরিহার্য উপাদান হলো দক্ষ জনপ্রশাসন ও স্বাধীন বিচার বিভাগ। জনপ্রশাসনে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও চুক্তি কার্যকরের জন্য আইনের শাসন এবং একটি পূর্বাভাসযোগ্য আইনি পরিবেশ অপরিহার্য। বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিশ্চয়তা ব্যবসার লেনদেন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আধুনিক প্রযুক্তি বা ডিজিটাল শাসন একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা, অনলাইন কর প্রশাসন এবং ডিজিটাল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমিয়ে দুর্নীতির সুযোগ অনেকাংশে হ্রাস করে। বাংলাদেশ ডিজিটালাইজেশনে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সব সংকট সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা। এখানেই গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্বাধীন সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সচেতন নাগরিকদের ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে বাধ্য করে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে না, একে নাগরিক সক্রিয়তার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। উন্নয়নের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি ও সম্ভাবনা উভয়ই সমান। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক বাজারে একীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য আমাদের এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন যা জটিলতা সামলাতে এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ইতিহাস দেখায় যে, সুশাসন সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতা। সুশাসনের নৈতিক অর্থনীতি কোনো বিমূর্ত দর্শন নয়; এটি সমাজ ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার এক বাস্তবসম্মত পথরেখা। টেকসই উন্নয়নের পথ শুধু উচ্চতর প্রবৃদ্ধির হার বা বড় বাজেটের চটকদার সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত ভিত্তি নিহিত রয়েছে স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং জনস্বার্থের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের মধ্যে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

গণপরিসর নামকরণে ব্যক্তিবাদী শখ এবং গণতন্ত্রের সংস্কৃতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার সবসময় বড় কোনো দুর্নীতি, অর্থলুট বা নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই দৃশ্যমান হয় না। এতে আরও কিছু বিষয়ও রয়েছে। অনেক সময় সেগুলো প্রকাশ পায় আপাতদৃষ্টিতে ছোট, কিন্তু প্রতীকীভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো কোনো ঘটনায়। বগুড়ার নবগঠিত কয়েকটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক তেমনই একটি ইঙ্গিত। এটি কেবল তিনটি ইউনিয়নের নাম নিয়ে বিতর্ক নয়; বরং রাষ্ট্র, ক্ষমতা, গণপ্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের রাজনৈতিক মানসিকতার স্বরূপ তুলে ধরে। ঘটনার বিবরণ এখন সবার জানা। নবগঠিত ইউনিয়নগুলোর নাম রাখা হয়েছিল ‘মীরবাড়ী’, ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’। পরে অভিযোগ ওঠে, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাড়ির নাম মীরবাড়ী এবং তার দুই ছেলের নাম সীমান্ত ও দিগন্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি জাতীয় সংসদেও ওঠে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেন এবং নতুন করে গণশুনানির উদ্যোগ নেয়া হয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আদৌ কি এসব নাম কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশে রাখা হয়েছিল? এর উত্তর হয়তো কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই জানেন। কিন্তু গণতন্ত্রে আরও বড় প্রশ্ন হলো- সাধারণ নাগরিকরা বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?যখন কোনো প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় তার পৈতৃক বাড়ির নামে একটি ইউনিয়ন এবং তার দুই সন্তানের নামের সঙ্গে হুবহু মিল থাকা আরও দুটি ইউনিয়নের নামকরণ হয়, তখন জনমনে সন্দেহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ গণতন্ত্রে শুধু অন্যায় না করাই যথেষ্ট নয়; এমন পরিস্থিতিও এড়িয়ে চলতে হয়, যা অন্যায়ের ধারণা সৃষ্টি করে। এতে স্বার্থসংঘাতের পবণতা দৃশ্যমান হয়। গণআস্থার জন্য এটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, এটি কাকতালীয়ভাবে ঘটেছে। তিনি রসিকতার সুরে সীমান্ত ব্যাংক, সীমান্ত এক্সপ্রেস কিংবা দিগন্ত টাওয়ারের উদাহরণও দিয়েছেন। কিন্তু সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু সেখানে নয়। সীমান্ত বা দিগন্ত শব্দ দুটি বাংলা ভাষার সাধারণ শব্দ হতে পারে; কিন্তু যখন একই সঙ্গে একজন মন্ত্রীর দুই সন্তানের নাম, তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম এবং তার নির্বাচনী এলাকার নতুন প্রশাসনিক ইউনিটের নাম এক হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন উঠবেই। সেই প্রশ্নকে কৌতুক দিয়ে উড়িয়ে দেয়া যায় না। বরং এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি পুরনো রোগের দিকে আঙুল তোলে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ, গণপ্রতিষ্ঠান ও জনপরিসরকে ব্যক্তিগত প্রভাবের প্রদর্শনক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে অহরহ। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদেও নামে সড়ক, সেতু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এমনকি প্রশাসনিক স্থাপনার নামকরণ হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা যেন ধীরে ধীরে রাষ্ট্রকে নিজের প্রতিচ্ছবিতে রূপান্তর করার একটি উপায় হয়ে উঠেছে। এতে গণতন্ত্রায়ন সঙ্কুচিত হয়। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে- আমরা কি সেই সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে পেরেছি?সংসদে এই বিষয়ে যে আপত্তি উঠেছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ আপত্তিকারীরা মূলত স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যে সংস্কৃতিকে অতীতে ‘ব্যক্তিপূজা’ বা ‘ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক চর্চা’ বলে সমালোচনা করা হয়েছে, ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই একই প্রবণতা ফিরে এলে জনগণের হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ইউনিয়ন পরিষদ আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নামকরণ করা যাবে না। আইন হয়তো সরাসরি লঙ্ঘিত হয়নি; কিন্তু আইনের ভাষাকে পাশ কাটিয়ে আইনের চেতনাকে দুর্বল করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক শাসনের মূল শক্তি শুধু আইনের অক্ষরে নয়, তার নৈতিক উদ্দেশেও নিহিত। এই ঘটনার আরেকটি শিক্ষণীয় দিক হলো প্রশাসনিক জবাবদিহি। যদি সত্যিই গণশুনানির মাধ্যমে এসব নাম নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল? কারা অংশ নিয়েছিলেন? কী কী বিকল্প নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল? প্রশাসন কি সম্ভাব্য বিতর্ক সম্পর্কে সচেতন ছিল না? নাকি ক্ষমতার নৈকট্য প্রশাসনিক বিচক্ষণতাকে দুর্বল কওে দিয়েছে?সবশেষে প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। অনেকেই এটিকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। নিঃসন্দেহে বিতর্কিত নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ স্বাগতযোগ্য। কিন্তু একটি সুস্থ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় প্রশ্ন হওয়া উচিত-এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো কেন? প্রতিটি বিতর্ক কি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সমাধান হবে? তাহলে স্থানীয় সরকার, জেলা প্রশাসন, মন্ত্রণালয় এবং গণশুনানির প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা কোথায়?গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কোনো নেতার সদিচ্ছায় নয়; বরং এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায়, যেখানে ব্যক্তির চেয়ে নীতি বড়, ক্ষমতার চেয়ে প্রক্রিয়া শক্তিশালী, আর আনুগত্যের চেয়ে জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ। গণপ্রতিষ্ঠান জনগণের। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, সড়ক, বিদ্যালয় কিংবা রাষ্ট্রীয় স্থাপনা কোনো রাজনৈতিক নেতা বা তার পরিবারের স্মারক নয়। এগুলো একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি ও সম্মিলিত পরিচয়ের বাহক। তাই গণপরিসরের নামকরণও হতে হবে সেই সামষ্টিক চেতনার প্রতিফলন। বগুড়ার এই ঘটনা হয়তো কয়েকদিনের মধ্যেই সংবাদ শিরোনাম থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু এটি আমাদের সামনে একটি স্থায়ী প্রশ্ন রেখে গেছে-আমরা কি সত্যিই ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছি, নাকি কেবল ব্যক্তির নাম বদলাচ্ছি, অথচ সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটছে না?এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র কতটা পরিণত, আর রাষ্ট্র কতটা জনগণের। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কবি ও সংবাদকর্মী]

রিহাভিলিটাশন আইনের সীমাবদ্ধতা

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জাতীয় দৈনিক সমূহে একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, যার মূল বক্তব্য হলো— বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে হলে একজন পেশাজীবীকে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করে নির্ধারিত বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। এই স্বীকৃতি ছাড়া কেউ পেশাগতভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করলে আইন অনুযায়ী এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। জানামতে, বাংলাদেশে এই শর্ত পূরণকারী ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। অন্যদিকে সরকারের ২০২১ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রায় ৪ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর সংখ্যাও চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে— বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কি শুধুমাত্র অল্পসংখ্যক ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের ওপর নির্ভর করে নিশ্চিত করা সম্ভব?পরিসংখ্যানগতভাবে বিষয়টি উদ্বেগজনক। যদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের আইনগত সুযোগ খুব সীমিত সংখ্যক পেশাজীবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেবার চাহিদা ও প্রাপ্যতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া; একজন পেশাজীবীর পক্ষে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে কার্যকর সেবা পৌঁছে দেয়া বাস্তবসম্মত নয়। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য চাহিদা বিবেচনা করলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বহুমাত্রিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মডেল নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। বিশ্বের বহু দেশে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের পাশাপাশি কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, ড্রামা থেরাপিস্ট, আর্ট থেরাপিস্ট, লাইসেন্সধারী কাউন্সেলর, সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার এবং কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্র্যাকটিশনাররা নির্দিষ্ট যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধনের আওতায় কাজ করেন। বাংলাদেশেও প্রতিবছর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাইকোলজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে অসংখ্য শিক্ষার্থী বের হচ্ছেন। পাশাপাশি নাট্যকলা, এক্সপ্রেসিভ আর্টস, কাউন্সেলিং, ট্রমা কেয়ার এবং মনোসামাজিক সহায়তা বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও বহু বছর ধরে দুর্যোগ, শরণার্থী সহায়তা, নারী ও শিশু সুরক্ষা, মাদক পুনর্বাসন এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রমে মনোসামাজিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। প্রশ্ন হলো— এই প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদের স্থান কোথায়?বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য আজ আর প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্ন। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মহত্যা, মাদকাসক্তি, পারিবারিক সহিংসতা, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের স্ট্রেস এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ট্রমা— সব মিলিয়ে দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮-এর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা নিয়ে পেশাজীবী মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের উদ্বেগ, যদি মনোসামাজিক স্বাস্থ্যসেবা ও সাইকোথেরাপি কার্যক্রমের আইনগত পরিসর এমনভাবে নির্ধারিত হয় যে বাস্তবে কেবল ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরাই এসব সেবা দিতে পারবেন, তাহলে দেশের বিদ্যমান মানবসম্পদের একটি বড় অংশ কার্যত সেবা প্রদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। বাংলাদেশেও হয়তো এখন সময় এসেছে ‘একটি পেশা বনাম অন্য পেশা’ বিতর্কের বাইরে গিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মশক্তি গঠনের কথা ভাবার। সরকার চাইলে বিভিন্ন স্তরের লাইসেন্সিং ও নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করতে পারে। যেমন— ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, এক্সপ্রেসিভ আর্টস থেরাপিস্ট, কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ ওয়ার্কার এবং সাইকোসোশ্যাল সাপোর্ট প্র্যাকটিশনারদের জন্য পৃথক নিবন্ধন কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একদিকে সেবার মান নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে দেশের বাস্তব চাহিদাও পূরণ হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করলেই দক্ষ পেশাজীবী তৈরি হয় না। প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, সুপারভিশন, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগগুলোতে আরও বেশি প্রায়োগিক ও ক্লিনিক্যাল উপাদান যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি ৩-৬ মাস মেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্সের মাধ্যমে প্রাথমিক মনোসামাজিক সহায়তা প্রদানকারী কর্মী তৈরি করা যেতে পারে, যারা কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করবেন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের কাছে রেফার করবেন। এই বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন। পেশাজীবী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে বসে একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক, গবেষণা প্রতিবেদন এবং নীতিপত্রের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনা যেতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কোনো একক পেশার এক্রছত্র ক্ষেত্র নয়; এটি জনগণের অধিকার। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—মান বজায় রেখে কীভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষকে নিরাপদ, বৈজ্ঞানিক এবং সহজলভ্য সেবা দেয়া যায়। ১৮-১৯ কোটি মানুষের দেশে যদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল অল্পসংখ্যক পেশাজীবীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেবার চাহিদা ও প্রাপ্যতার মধ্যে একটি গভীর বৈষম্য তৈরি হবে। সেই বৈষম্য দূর করতে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন এবং দক্ষ মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার। বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাত আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখনই সময় এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলার, যেখানে মান, নিরাপত্তা এবং সেবার বিস্তার—এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্ব পাবে। কারণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল একটি পেশাগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। [লেখক: প্রশিক্ষক, নাট্যকলা বিভাগ, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, চট্টগ্রাম]

ভোজ্যতেল আমদানিনির্ভরতা কমানোর এখনই সময়

ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার সাফল্য অর্জন করলেও ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও উদ্বেগজনকভাবে আমদানিনির্ভর। খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেশের অর্জন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু ভোজ্যতেল খাতের চিত্র ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলে। প্রতিবছর দেশের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে পাম অয়েল ও সয়াবিন তেল আমদানিতে, যা অর্থনীতির ওপর নীরব কিন্তু ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। সার্ক কৃষি কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার ৭০ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। এ জন্য বছরে প্রায় ২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তার এই সময়ে এমন উচ্চমাত্রার আমদানিনির্ভরতা শুধু অর্থনৈতিক ঝুঁকিই নয় বরং এটি জাতীয় খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্যও একটি কৌশলগত দুর্বলতা। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাম অয়েল ও সয়াবিন তেল আমদানিতে বাংলাদেশের মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সয়াবিন তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৩৩ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা এবং পাম অয়েলে ২২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৫৯ শতাংশই গেছে সয়াবিন তেলের পেছনে। এর আগের অর্থবছরের তুলনায় চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় পাম অয়েল আমদানিতে ব্যয় প্রায় ৩১ শতাংশ কমলেও সয়াবিন তেল আমদানির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৫০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা এবং আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি এ প্রবণতার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে সয়াবিন তেল আমদানিতে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ১৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে পাম অয়েল আমদানিতে সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে, প্রায় ৩ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েই ভোজ্যতেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৯১২ কোটি টাকা, যার ৭৮ শতাংশই পাম অয়েলের জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে, এত বিপুল অর্থ ব্যয় সত্ত্বেও কেন আমরা এখনও দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে পারছি না? সমস্যা কৃষকের সক্ষমতায় নয়, বরং নীতিগত অগ্রাধিকার ও বিনিয়োগের ঘাটতিতে। ধান উৎপাদনে দীর্ঘদিন ধরে যে ধরনের নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তেলবীজ খাত সে ধরনের গুরুত্ব পায়নি। ফলে সরিষা, সূর্যমুখী, সয়াবিন ও তিলের মতো ফসল এখনও অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তিক জমিতেই সীমাবদ্ধ। অথচ দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল তেলবীজের জাত উদ্ভাবন করেছে। বারি সরিষা-১৪, ১৫ ও ১৭-এর মতো স্বল্পমেয়াদি জাত ধানভিত্তিক ফসল বিন্যাসে সফলভাবে চাষ করা সম্ভব, যা খাদ্যশস্য উৎপাদন কমানো ছাড়াই তেলবীজ উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশে কৃষিজমি সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত। তাই একই জমি থেকে বেশি উৎপাদন নিশ্চিত করাই ভবিষ্যতের পথ। উন্নত জাত, মানসম্মত বীজ, যান্ত্রিকীকরণ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে তেলবীজ উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব। উপকূলীয় অঞ্চলও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভোলা, নোয়াখালী ও পটুয়াখালীর মতো জেলায় লবণাক্ততা সহনশীল সূর্যমুখীর চাষ ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক ফল দিচ্ছে। একইভাবে দক্ষিণাঞ্চলে উন্নত সয়াবিন ও তিলের জাত কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করছে। তবে গবেষণাগারের সাফল্য মাঠে পৌঁছানো না গেলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। বর্তমানে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানসম্পন্ন বীজের সংকট। অনেক কৃষক এখনও নিজস্ব সংরক্ষিত নিম্নমানের বীজ ব্যবহার করেন, যা উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়। তাই বিএডিসির বীজ উৎপাদন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তেলবীজ খাতকে জাতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, যন্ত্রপাতি, ভর্তুকি এবং বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ভোজ্যতেল প্রক্রিয়াজাত শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব, চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ, স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং স্বচ্ছ ক্রয়ব্যবস্থা কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় সরিষার তেলসহ স্থানীয় ভোজ্যতেলের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশ অতীতে বহু কৃষি চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, কার্যকর নীতি এবং কৃষকের পরিশ্রমের সমš^য়ে খাদ্য উৎপাদনে যে সাফল্য এসেছে, তেলবীজ খাতেও তা সম্ভব। ভোজ্যতেল আমদানিনির্ভরতা কমানো শুধু বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। [লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার, সার্ক কৃষি কেন্দ্র]

ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন: শিশু স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ

আগামীকাল থেকে দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন শুরু হতে যাচ্ছে। এবার ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী দুই কোটি ৩৫ লাখের বেশি শিশু এই ক্যাপসুল পাবে। দীর্ঘ ১৪ মাস পর এই ক্যাম্পেইন চালু হওয়ায় স্বস্তির বিষয়। ভিটামিন এ শিশুদের দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় এবং অপুষ্টিজনিত রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর অভাবে রাতকানা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে। নিয়মিত ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাই বছরে দুবার এই কর্মসূচি চালানোর পরিকল্পনা যথাযথ। গত বছরের মার্চ মাসের পর থেকে ক্যাপসুলের সংকটের কারণে ক্যাম্পেইন বন্ধ ছিল। এই দীর্ঘ বিল¤^ শিশু স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সরকারের উচিত এখন থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা সুদৃঢ় করা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো বিল¤^ না হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা যেমন বান্দরবানে এই ক্যাম্পেইন বাস্তবায়নে বাড়তি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরা ঘরে ঘরে পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন। এই প্রচেষ্টা প্রশংসাযোগ্য। সব এলাকায় সব শিশু যাতে ক্যাপসুল পায়, সেজন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। অভিভাবকদেরও উচিত নির্ধারিত কেন্দ্রে শিশুদের নিয়ে আসা। স্বাস্থ্য বিভাগের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই ক্যাম্পেইন শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের সাফল্য নির্ভর করবে এর ব্যাপকতা ও কার্যকারিতার ওপর। এ কর্মসূচি যেন সাময়িক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না থাকে সেটাই আমাদের চাওয়া। শিশুদের সুস্থ বিকাশ ও পুষ্টি নিরাপত্তার স্বার্থে ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা দরকার। 

আদিবাসী ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন

বর্তমানে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি রাষ্ট্রীয় ও আইনি পরিসরে বহুল ব্যবহৃত হলেও অনেক সম্প্রদায় নিজেদের পরিচয় হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করে। সাধারণভাবে আদিবাসী বলতে সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ও জীবনধারা বহন করে আসছে এবং যাদের ঐতিহ্যগত পরিচয় আজও টিকে আছে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বসতি স্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল। তারা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে অনাবাদি জমিকে কৃষিযোগ্য করে তোলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমি দখল ও বঞ্চনার নানা ঘটনা তাদের জীবনকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে ১৮৫৫-৫৬ সালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’। ভূমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে সংঘটিত এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কঠোরভাবে দমন করে। সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবসহ বহু নেতা প্রাণ হারান। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ৪৯ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভূমি সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া আদিবাসী মালিকানাধীন জমি হস্তান্তর করা যেত না। অবৈধভাবে সম্পত্তি ক্রয় করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হওয়ার বিধানও ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষা করা। পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ সালে প্রণীত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনেও আদিবাসী ভূমি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এই আইনের ৯৭ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমি হস্তান্তরের বিষয়ে বিশেষ বিধান রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনী এলেও মূল লক্ষ্য ছিল তাদের ভূমি অধিকার সংরক্ষণ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ভূমি সংক্রান্ত এসব আইনি কাঠামোর অনেক অংশ কার্যকর রয়েছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির পরিমাণ ক্রমশ কমে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সামাজিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি দখল, জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত জমি হারিয়েছে। ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন পাস করা হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ। তবে এই আইন সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত; ভূমি অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রণীত আইনগুলোর সঙ্গে এর উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধি এক নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার পাশাপাশি ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব বহন করে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ বসবাস করে। তাদের জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ হলেও দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিকার সুরক্ষা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং একটি কার্যকর ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি রাজশাহীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আদিবাসী নেতারা ভূমি সুরক্ষা, বেদখল জমি পুনরুদ্ধার এবং ভূমি কমিশন গঠনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারি প্রতিনিধিরাও ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের দাবি, ভূমি, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান আইন কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি। বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ, ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ জনগোষ্ঠীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতিকেও আরও শক্তিশালী করবে। [লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

শূন্যতার স্থাপত্য

মানুষের সবচেয়ে বড় ভ্রম সম্ভবত এই যে, সে ক্ষয়কে ধ্বংস বলে মনে করে। যা হারিয়ে যায়, তাকে সে অনুপস্থিতির অন্ধকারে নির্বাসিত করে; যা ভেঙে পড়ে, তাকে সে সমাপ্তির সমার্থক ভাবতে শেখে। অথচ প্রকৃতির গভীরতম ভাষা আমাদের অন্য এক সত্যের দিকে আহ্বান জানায়। সেখানে পতন মানে অবসান নয়, বরং রূপান্তর; শূন্যতা মানে নিঃশেষ নয়, বরং নতুন সৃষ্টির জন্য প্রস্তুত এক নীরব অবকাশ।জীবনকে যদি একটি দীর্ঘ পথযাত্রা ধরা যায়, তবে সেই পথের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বাইরের কোনো প্রাচীর নয়; বরং অন্তরের ধূলিকতা। এই ধূলি জমে থাকে অভ্যাসের অন্ধত্বে, অহংকারের আবরণে, ভ্রান্ত বিশ্বাসের স্তরে, এবং সেইসব মোহে, যাদের আমরা সত্য বলে আঁকড়ে ধরি। ধূলির স্বভাবই হলো দৃষ্টিকে মলিন করা। সে পথকে পরিবর্তন করে না, কিন্তু পথ দেখার ক্ষমতাকে আচ্ছন্ন করে। ফলে মানুষ পথ হারায় না, হারায় পথ চিনবার সামর্থ্য। এই কারণেই জীবনের বহু প্রতিকূলতা, যেগুলোকে আমরা অভিশাপ মনে করি, প্রকৃতপক্ষে সেগুলো এক একটি পরিশোধনের আয়োজন। সময় কখনো কখনো এমন নির্মমতার মুখোশ পরে আসে, যা আমাদের প্রিয় সব নিশ্চয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সম্পর্কের দেয়াল ভেঙে যায়, আকাঙ্ক্ষার প্রাসাদ ভস্মীভূত হয়, অর্জনের অলঙ্কার মলিন হয়ে পড়ে। তখন আমরা মনে করি, জীবন আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কিন্তু অনেক পরে, দীর্ঘ আত্মসমীক্ষার পর, উপলব্ধি হয়—সময়ের উদ্দেশ্য ধ্বংস নয়; তার উদ্দেশ্য ছিল আবরণ অপসারণ। প্রকৃতির দিকে তাকালে এই সত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বীজকে অঙ্কুরিত হতে হলে তার কঠিন আবরণ ভেদ করতে হয়। মুক্তো জন্ম নেয় এক যন্ত্রণাদায়ক ক্ষতের ভেতর। নদী তার সুর খুঁজে পায় বাঁধ ভাঙার পর। এমনকি নক্ষত্রও আলো ছড়ানোর পূর্বে অগণিত অভ্যন্তরীণ দহন অতিক্রম করে। সৃষ্টির ইতিহাস আসলে রূপান্তরের ইতিহাস; আর রূপান্তরের পূর্বশর্ত হলো কোনো না কোনো স্তরে ভাঙন। কিন্তু মানুষ ভাঙনকে ভয় পায়। কারণ ভাঙন তার পরিচিত সীমানাকে বিপন্ন করে। মানুষ পরিচয়ের চেয়ে সত্যকে কম ভালোবাসে। সে নিজের নির্মিত কারাগারকে স্বাধীনতার চেয়েও বেশি সুরক্ষিত মনে করে। ফলে যখন জীবনের কোনো অদৃশ্য কারিগর সেই কারাগারের প্রাচীরে আঘাত হানে, তখন সে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। অথচ যে দেয়াল ভেঙে পড়ছে, সেটিই হয়তো আকাশ দেখার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় ছিল। দর্শনের এক গভীর শিক্ষা হলো—অস্তিত্ব কখনো স্থির নয়। সবকিছুই প্রবাহমান। নদী যেমন একই থাকে না, মানুষও তেমনি প্রতিক্ষণে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু মানুষের মন স্থায়িত্বের মায়া সৃষ্টি করে। সে পরিবর্তনকে অস্বীকার করতে চায়, সময়কে থামিয়ে রাখতে চায়, ক্ষণস্থায়ীকে চিরস্থায়ী বলে বিশ্বাস করতে চায়। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় অধিকাংশ বেদনা। কারণ জীবন প্রবাহ, আর মানুষ তাকে পাথরে পরিণত করতে চায়। তবু বিস্ময়কর বিষয় হলো, আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান উপলব্ধিগুলো জন্ম নেয় অনিশ্চয়তার ভেতর থেকে। যখন সমস্ত বাহ্যিক ভরসা একে একে সরে যায়, তখনই মানুষ নিজের অন্তর্লোকের সঙ্গে পরিচিত হয়। কূন্যতা তখন আর ভয়াবহ থাকে না; বরং এক গভীর আয়নায় পরিণত হয়। সেখানে মানুষ প্রথমবারের মতো নিজেকে দেখে—সমাজের দেওয়া পরিচয়ে নয়, অর্জনের অলংকারে নয়, বরং অস্তিত্বের নগ্ন সত্যে। জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই। সে কখনো সরাসরি শিক্ষা দেয় না। সে রূপকের আড়ালে কথা বলে, প্রতীকের অন্তরালে ইঙ্গিত করে। একটি ঝরা পাতা, একটি শুকিয়ে যাওয়া নদী, একটি ভাঙা ঘর কিংবা একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন—সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে কোনো না কোনো মহৎ শিক্ষা। যারা কেবল ঘটনাকে দেখে, তারা কষ্ট পায়; যারা ঘটনার অন্তর্নিহিত অর্থকে দেখতে শেখে, তারা প্রজ্ঞা অর্জন করে। অতএব, জীবনের প্রতিটি হারানোকে অভিশাপ ভাবার আগে আমাদের থেমে ভাবা উচিত—এ কি সত্যিই ক্ষতি, নাকি কোনো অদৃশ্য পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়া? যে দরজা বন্ধ হয়েছে, সেটি কি আমাদের বন্দিত্বের কারণ ছিল না? যে সম্পর্ক চলে গেছে, সেটি কি আমাদের আত্মবিকাশকে থামিয়ে রাখেনি? যে ব্যর্থতা আজ অপমানের মতো মনে হচ্ছে, সেটিই কি আগামী দিনের উপলব্ধির ভিত্তি হয়ে উঠবে না?সময়ের সবচেয়ে সূক্ষ্ম শিল্প সম্ভবত এই যে, সে ধ্বংসের ছদ্মবেশে উন্মোচন ঘটায়। সে আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু নিয়ে যায়, কিন্তু তার বিনিময়ে ফিরিয়ে দেয় দেখার নতুন দৃষ্টি। আর একদিন, দীর্ঘ পথচলার শেষে, মানুষ আবিষ্কার করে—তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলো আসলে জন্ম নিয়েছিল সেইসব মুহূর্তে, যেগুলোকে সে একদিন সর্বনাশ বলে ভেবেছিল। তখন সে বুঝতে শেখে, জীবন কখনো পথ কেড়ে নেয় না; জীবন কেবল পথের ওপর জমে থাকা ধূলি সরিয়ে দেয়। আর সেই ধূলি সরে গেলে দিগন্ত হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নির্মল, প্রসারিত, আলোকময়। [লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]সম্পাদিত / অনন্তআদিবাসী ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্নবাবুল রবিদাসবর্তমানে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি রাষ্ট্রীয় ও আইনি পরিসরে বহুল ব্যবহৃত হলেও অনেক সম্প্রদায় নিজেদের পরিচয় হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করে। সাধারণভাবে আদিবাসী বলতে সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ও জীবনধারা বহন করে আসছে এবং যাদের ঐতিহ্যগত পরিচয় আজও টিকে আছে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বসতি স্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল। তারা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে অনাবাদি জমিকে কৃষিযোগ্য করে তোলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমি দখল ও বঞ্চনার নানা ঘটনা তাদের জীবনকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে ১৮৫৫-৫৬ সালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’। ভূমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে সংঘটিত এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কঠোরভাবে দমন করে। সিধু, কানু, চাঁদ ও ˆভরবসহ বহু নেতা প্রাণ হারান। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ৪৯ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভূমি সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া আদিবাসী মালিকানাধীন জমি হস্তান্তর করা যেত না। অবৈধভাবে সম্পত্তি ক্রয় করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হওয়ার বিধানও ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষা করা। পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ সালে প্রণীত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনেও আদিবাসী ভূমি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এই আইনের ৯৭ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমি হস্তান্তরের বিষয়ে বিশেষ বিধান রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনী এলেও মূল লক্ষ্য ছিল তাদের ভূমি অধিকার সংরক্ষণ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ভূমি সংক্রান্ত এসব আইনি কাঠামোর অনেক অংশ কার্যকর রয়েছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির পরিমাণ ক্রমশ কমে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সামাজিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি দখল, জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত জমি হারিয়েছে। ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন পাস করা হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ। তবে এই আইন সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত; ভূমি অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রণীত আইনগুলোর সঙ্গে এর উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধি এক নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার পাশাপাশি ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব বহন করে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ বসবাস করে। তাদের জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ হলেও দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিকার সুরক্ষা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং একটি কার্যকর ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি রাজশাহীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আদিবাসী নেতারা ভূমি সুরক্ষা, বেদখল জমি পুনরুদ্ধার এবং ভূমি কমিশন গঠনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারি প্রতিনিধিরাও ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের দাবি, ভূমি, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান আইন কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি। বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ, ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ জনগোষ্ঠীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতিকেও আরও শক্তিশালী করবে। [লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

ভিডিও আরও দেখুন

পাতাগোনিয়ায় ২৬ মিটার উঁচু মেসি!

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল জাদুকরকে নিয়ে বানানো হলো পৃথিবীর অন্যতম বড় ভাস্কর্য। প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলের কাট্রাল কো শহরে উন্মোচিত হলো লিওনেল মেসির ২৬ মিটার উঁচু বিশাল এক প্রতিকৃতি। যার ওজন ৭০ টন!যখন ফুটবল বিশ্বকাপের মাতম চলছে, আর আলজেরিয়া ম্যাচের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আর্জেন্টিনা, তখন এই ভাস্কর্যটি যেন ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গীয় উপহার।জাতীয় মহাসড়ক ২২ এবং ম্যানুয়েল সাভিও সড়কের সংযোগস্থলে বসে থাকা মেসির এই বিশাল মূর্তিটি বসে থাকা অবস্থায় তৈরি করা হয়েছে- যেন তিনি বিশ্বকাপ ট্রফির দিকে তাকিয়ে আছেন।এর ভেতরের অংশ তৈরি হয়েছে ইস্পাত দিয়ে, বাইরে তিন স্তরের কংক্রিটের আবরণ। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সি পরিহিত এই দৈত্যের বুকে জ্বলজ্বল করছে তিনটি সোনালি তারা- যেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের গৌরবগাথা। সামনে রাখা হয়েছে বিশ্বকাপ ট্রফির আদলে একটি অংশ, যা এই ভাস্কর্যকে আরও জীবন্ত করেছে।ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন অ্যালদো বেরোইসা নামে এক শিল্পী। কাট্রাল কো শহরের স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের সঙ্গে এক বছর ধরে কাজ করেছেন তিনি। উদ্বোধনের আগের রাত পর্যন্ত তারা শেষ মুহূর্তের খুঁটিনাটি কাজ করেছেন। মেসির স্বভাবসুলভ ভঙ্গি যেন ফুটে উঠেছে পুরোপুরি।মজার ব্যাপার হলো, শুরুতে মেসির প্রকৃত উচ্চতা অনুযায়ী ১.৭২ মিটার একটি ভাস্কর্য তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ভাস্করকে। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ২৬ মিটার উঁচু এই বিশাল মূর্তি বানানোর প্রস্তাব দেন। তার সেই কল্পনা আজ বাস্তবে রূপ পেয়েছে।এর আগে গত বছর কলকাতায় মেসির ২১ মিটার উঁচু একটি ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু প্রবল বাতাসে কাঠামোটির স্থিতিশীলতা নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর কর্তৃপক্ষ তা সরিয়ে ফেলে। সেই ভাস্কর্যের চেয়েও বড় এই ভাস্কর্যটি যেন মেসি ভক্তদের জন্য এক নতুন মাইলফলক।ফুটবলের জাদুকরের এই বিশাল মূর্তি দেখতে এখন পর্যটকদের ভিড় জমবে পাতাগোনিয়ায়। আর্জেন্টিনার জাতীয় গর্ব লিওনেল মেসি- যিনি বিশ্বকাপ জয় করেছেন, রেকর্ড গড়েছেন, এখন তিনি পাথর আর ইস্পাতে বন্দি হয়ে রয়েছেন প্যাটাগোনিয়ার বুকে। সত্যিই, ২৬ মিটার উঁচু এই মেসি যেন বলছে- আমি আসল মেসির চেয়েও বড়!

পাতাগোনিয়ায় ২৬ মিটার উঁচু মেসি!
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৯৮ জন