সংবাদ
এবার ৪ বিভাগে ‘অতি ভারী’ বর্ষণ, ১০ অঞ্চলে ঝড়

এবার ৪ বিভাগে ‘অতি ভারী’ বর্ষণ, ১০ অঞ্চলে ঝড়

আগের দিন শনিবার দেশের তিন বিভাগ রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। চব্বিশ ঘণ্টা পর এবার ময়মনসিংহ ও সিলেটসহ আরও দুই বিভাগ ঢাকা ও চট্টগ্রামে অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিল আবহাওয়া অধিদপ্তর।পূর্বভাসে বলা হয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন অংশে মাঝারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি হতে পারে।বিশেষ করে ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের সব জেলায় কোথাও কোথাও ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে।আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক জানান, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের সব জেলায় মাঝারি থেকে ভারি, কোথাও কোথাও অতি ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম এবং ঢাকা বিভাগের পূর্বাঞ্চলের নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলাতেও একই ধরনের বৃষ্টি হতে পারে।খুলনা বিভাগে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বরিশাল বিভাগে তুলনামূলকভাবে কম বৃষ্টি হতে পারে বলে জানান আবহাওয়াবিদ।রোববার (৩ মে) সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বিরাজমান লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ হতে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর প্রভাবে ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।এ ছাড়া ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে। এ সময়ে সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।ভারী বর্ষণের পাশাপাশি ঝড়নদীবন্দরের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, রোববার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ঢাকা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার অঞ্চলের ওপর দিয়ে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫-৬০ কিলোমিটার বেগে বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টিসহ অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দ্বীপে দেশের সর্বোচ্চ ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময়ে ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে ২৮ মিলিমিটার।সাধারণত ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে তাকে ‘ভারি’ বৃষ্টি বলা হয়। আর ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলে তাকে ‘অতি ভারি’ বর্ষণ বলা হয়।
২৪ মিনিট আগে

এবার ৪ বিভাগে ‘অতি ভারী’ বর্ষণ, ১০ অঞ্চলে ঝড়

এবার ৪ বিভাগে ‘অতি ভারী’ বর্ষণ, ১০ অঞ্চলে ঝড়

ওয়াসার কারণে গুলশান-বনানীতে গ্যাস সংকট

ওয়াসার কারণে গুলশান-বনানীতে গ্যাস সংকট

আদালতকক্ষে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ: মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ সাংবাদিকদের

আদালতকক্ষে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ: মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ সাংবাদিকদের

পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম শুরুর পথে ঢাকা-দিল্লি

পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম শুরুর পথে ঢাকা-দিল্লি

চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ডিএমপির সাঁড়াশি অভিযান জোরদার

চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ডিএমপির সাঁড়াশি অভিযান জোরদার

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রেজাউল করিমের পদত্যাগ

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রেজাউল করিমের পদত্যাগ

ঈদের আগে রাত ৯টা পর্যন্ত শপিংমল খোলা রাখার দাবি ব্যবসায়ীদের

ঈদের আগে রাত ৯টা পর্যন্ত শপিংমল খোলা রাখার দাবি ব্যবসায়ীদের

যুক্তরাষ্ট্রে নিহত শিক্ষার্থী বৃষ্টির জানাজা বুধবার, মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে

যুক্তরাষ্ট্রে নিহত শিক্ষার্থী বৃষ্টির জানাজা বুধবার, মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে

'এই সরকারকে উচ্চৈঃস্বরে বকা দেওয়া যায়': জাহেদ উর রহমান

'এই সরকারকে উচ্চৈঃস্বরে বকা দেওয়া যায়': জাহেদ উর রহমান

ইয়েমেন উপকূলে ফের তেলবাহী জাহাজ ছিনতাই করল সোমালিয়ার জলদস্যুরা

ইয়েমেন উপকূলে ফের তেলবাহী জাহাজ ছিনতাই করল সোমালিয়ার জলদস্যুরা

মতামতমতামত

উন্নয়নশীলের পথে বিরতি: সিদ্ধান্তের পেছনের প্রশ্ন

চলতি বছর নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত’ দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে ‘উন্নয়নশীল’ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরদিনই স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। বিএনপি সরকার তাদের চিঠিতে উল্লেখ করেছে যে, দেশি-বিদেশি নানাবিধ অভিঘাতের ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে,- জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, কর-জিডিপি অনুপাত কমেছে, কমেছে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানি। আরও আছে, যেমন- সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়ায় মানুষ কর্মহীন বা বেকার হয়েছে ব্যাপকভাবে, সুশাসনের অভাবে ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে।অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে সারা পৃথিবীর দেশগুলোকে জাতিসংঘ উন্নত ও উন্নয়নশীল এই দুই শ্রেণীতে বিভাজন করতো। উন্নয়নশীল তালিকার পেছনের দুর্বল দেশগুলোকে নিয়ে ১৯৭১ সনে প্রথম আরেকটি তালিকা করা হয়, নাম দেয়া হয় স্বল্পোন্নত দেশ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ এতো ব্যাপক ছিল যে, বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই ছিল কঠিন। এই অবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায়ও ছিল না, এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৭৫ সনে, বঙ্গবন্ধুর আমলে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভের পর বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল হয়, বাংলাদেশের ওপর বিভিন্ন দেশের আস্থা তৈরি হয়, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারিত হতে থাকে।১৯৭৫ সন থেকে বিগত পাঁচ দশক ধরে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় রয়ে গেছে বাংলাদেশ। পরনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকার এই অবস্থা দেশ ও দেশের জনগণের মানমর্যাদার জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। কিছুদিন আগেও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো আমাদের সম্বোধন করতো ‘মিসকিন’ নামে ; আর উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশকে চিনতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত প্লাবনের দেশ হিসেবে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় স্থান পাওয়ার পর দেশের ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল হলেও স্বল্পোন্নত দেশও গরীব, নুন আনতে পান্তা ফুরায়। স্বল্পোন্নত দেশের অধিকাংশ মানুষের খাবার থাকে না, থাকে না বসতিঘর, শিক্ষা, চিকিৎসার নিশ্চয়তা। স্বল্পোন্নত দেশের কৃষি সম্পূর্ণ প্রকৃতির খেয়ালখুশির উপর নির্ভরশীল, শিল্প উৎপাদনে বিরাজ করে অস্থিরতা। বর্তমানে এই তালিকায় যে ৪৪টি দেশ রয়েছে তার মধ্যে ৩২টি দেশের অবস্থান আফ্রিকা মহাদেশে। এশিয়া মহাদেশের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, কম্বোডিয়া, পূর্ব তিমুর, লাওস, মিয়ানমার, নেপাল, ইয়েমেন এবং বাংলাদেশ। ১৯৭১ সন থেকে অদ্যাবধি মালদ্বীপ এবং ভুটানসহ ৮টি দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেছে।১৯৭৫ সন থেকেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভের প্রত্যাশায় তার আর্থ-সামাজিক অবস্থান উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে এবং এই প্রচেষ্টার স্বীকৃতি আসে ২০১৮ সনে, এই বছর বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রাথমিক সুপারিশ করা হয়। বিভিন্ন সরকারের আমলে বিশেষ করে ২০০৮ সনে থেকে বাংলাদেশে দরিদ্র ও হতদরিদ্রের সংখ্যা কমতে থাকে, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়তে থাকে, মাথাপিছু আয় ও দেশজ সম্পদ বৃদ্ধি পেতে থাকে, জন্ম ও মৃত্যুহার কমতে থাকে, শিক্ষার হার বাড়তে থাকে, সুষম খাবার ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হওয়ায় মানুষের আয়ুও বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, অভ্যন্তরীণ ও বিশ্বের নানাবিধ দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে থাকার সক্ষমতাও এই সময়ে বাংলাদেশের বেড়ে গিয়েছিল। সক্ষমতা বেড়েছিল বলেই করোনার সময়ও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৮ শতাংশ, অথচ তখন বহু উন্নত দেশের প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক। দুর্যোগ মোকাবিলা করার সামর্থ বৃদ্ধি পেয়েছিল বলেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার মতো দেউলিয়া হয়ে যায়নি।কোনো দেশ ইচ্ছে করলেই তার অবস্থানগত শ্রেণী পরিবর্তন করতে পারে না, কোন দেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হবে তা নির্ধারণ করে জাতিসংঘের ‘কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি’ বা সিডিপি। প্রতি তিন বছর পরপর স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ৩টি সূচক- মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা মূল্যায়ন করা হয়, পরপর দু’টি ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে নির্ধারিত মান অর্জন করলে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের করার জন্য সুপারিশ করে কমিটি। সুপারিশের পরও সংশ্লিষ্ট দেশকে প্রস্তুতির জন্য তিন বছর সময় দেয়া হয় এবং তিন বছর পর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অনুমোদনের পর উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওঠে যায়। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সনের দুইটি ত্রিবার্ষিক মানদণ্ডের মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। ফলে ২০২১ সনের সুপারিশের ভিত্তিতে তিন বছর পর ২০২৪ সনে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে আসার কথা, কিন্তু করোনার কারণে প্রস্তুতির জন্য আরও দুই বছর পিছিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু ইউনূসের সৃষ্ট অরাজকতার কারণে ২০২৬ সনেও বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হতে পারলো না।অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশ এত দ্রুত পেছনের দিকে হেঁটেছে যে বর্তমান বিএনপি সরকারের আবেদনে প্রার্থীত আগামী তিন বছরেও বাংলাদেশকে আগের পর্যায়ে আনা কঠিন হবে। বিএনপি আবেদন করে ঠিক কাজটি করেছে, এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হলে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে প্রাপ্ত শুল্ক সুবিধা আর পাবে না, রপ্তানি তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে, ওষুধ আবিস্কারক বিদেশি কোম্পানিগুলোকে রয়্যালটি দিতে হবে, রয়্যালটি দিলে বাংলাদেশে ওষুধের দাম বেড়ে যাবে, কোন পণ্যে ভর্তুকি দেয়া যাবে না, প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে নগদ সহায়তা দেয়ার ব্যাপারে আপত্তি ওঠবে, কম সুদ ও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া যাবে না, শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক বৃত্তি কমে যাবে, জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রদেয় চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যাবে। অথচ এই সব বাধাবিপত্তি কাটানোর সক্ষমতা দুই বছর আগেও বাংলাদেশের ছিল, ইউনূস এই সক্ষমতা তলানিতে নামিয়ে দিয়ে গেছেন। এটা আমার কথা নয়, ইউনূস সাহেবের গর্বের শ্বেতপত্রের কথা।বাংলাদেশ হলো একমাত্র ও প্রথম দেশ, যে দেশ তিনটি সূচকেই জাতিসংঘের দু’টি ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য উত্তীর্ণ হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ও অর্থ পাচার নিয়ে মোহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়েছে তাতে তিনটি সূচকেই বাংলাদেশের উত্তীর্ণ হওয়ার স্বীকৃতি রয়েছে। শ্বেতপত্র রচয়িতা বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদদের অভিমত ছিল, এলডিসি বা স্বল্পোন্নত পর্যায় থেকে উত্তরণের পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক এবং যে সব সূচকের ওপর ভিত্তি করে এলডিসি থেকে উত্তরণ হয়, তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সুসংহত। শ্বেতপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘বাংলাদেশ মানদণ্ডের বিচারে অনেক ওপরে আছে’। বিগত ১৭ বছরের উন্নয়ন নিয়ে শ্বেতপত্রের প্রধান কাণ্ডারি দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেছেন, ‘আমরা আবেদন করে যোগ্য হইনি, আন্তর্জাতিক বিচারে প্রতিষ্ঠিত মাপকাঠিতে যোগ্য হয়েছি।’এভাবেই বিগত ১৭ বছর ধরে দেশকে ধ্বংস করার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে মোহাম্মদ ইউনূসের ৪০০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

বজ্রপাত: কেন অরক্ষিত প্রান্তিক জনজীবন?

আকাশে বিদ্যুৎ চমকালেই এখন বুক কাঁপে। প্রকৃতি যেন হঠাৎ ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গত কয়েক বছরে বজ্রপাত এক ‘নীরব মহামারিতে’ পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও অসচেতনতার কারণে বজ্রপাত আজ এক বড় দুর্যোগ। ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসেই দেশে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। চলতি বছরের শুরুর চিত্র আরও উদ্বেগজনক। কেন এই মৃত্যু? কেন কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষই এর প্রধান শিকার হচ্ছেন? বজ্রপাতে কেন অরক্ষিত প্রান্তিক জনজীবন? এখন এই উত্তর খোঁজা জরুরি।বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়ে ছিল ২৯৭ জন। চলতি ২০২৬ সালের চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক। বছরের প্রথম চার মাসেই (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল) মৃত্যু হয়েছে ৬৭ জনের। কেবল এই এপ্রিল মাসেই বজ্রপাতে প্রাণ গেছে ২৮ জনের। এর মধ্যে গত ১৮ এপ্রিল দেশের ছয়টি জেলায় (সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, রংপুর, নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ ও হবিগঞ্জ) মোট ১২ জন নিহত হন। এর আগে গত ১৬ এপ্রিল মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীতেও দুই জনের মৃত্যু ঘটে। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল গত রোববার। এদিন সাত জেলায় শিশু ও নারীসহ অন্তত ১৪ জন প্রাণ হারান। গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নাটোর ও বগুড়ায় ঘটে এই মর্মান্তিক প্রাণহানি। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দুই ছাত্রীসহ সারাদেশে আরও ৭ জন আহত হয়েছেন। পরিসংখ্যানগুলো কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়। এগুলো একেকটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের করুণ আখ্যান।বজ্রপাতে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলো মধ্যে দেখা গেছে, ধান কাটা, ঘাস কাটা, মাছ ধরা ও হাঁস চরানো অন্যতম। চা-পাতা সংগ্রহ বা গবাদি পশু আনতে গিয়েও অনেকে মারা যাচ্ছেন। রান্নার সময় বা বৃষ্টির ভেতর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকাও বিপজ্জনক। এমনকি নামাজ পড়ে বাড়ি ফেরার পথেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। মূলত মাঠকর্মী, দিনমজুর ও মৎস্যজীবীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। তাদের কাজের ক্ষেত্র প্রকৃতির কাছাকাছি। খোলা মাঠ, নদীর চর বা ফসলি জমিতে তাদের অবস্থান। বজ্রপাতের সময় উঁচু স্থান ও পানির কাছে থাকা প্রাণঘাতী হতে পারে। পানি বিদ্যুৎ পরিবাহী। নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ না মেলায় মাঠের মানুষগুলো সহজেই বিদ্যুৎ-আঘাতের শিকার হন।আবহাওয়াবিদরা জানান,বজ্রঝড়বাহী মেঘে প্রচুর স্থির বিদ্যুৎ জমা হলে বজ্রপাত হয়। মেঘের ভেতর বরফকণা ও শিলাবৃষ্টির সংঘর্ষে আধান পৃথক হয়ে যায়। পজিটিভ চার্জ মেঘের উপরে থাকে। নেগেটিভ চার্জ জমা হয় নিচে। মেঘের এই নেগেটিভ আধান ভূপৃষ্ঠের ইলেকট্রন সরিয়ে দেয়। ফলে ভূমি পজিটিভ চার্জযুক্ত হয়। বৈদ্যুতিক বিভেদ যখন বায়ুর রোধ ক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়, তখন মেঘ থেকে নেগেটিভ চার্জের অদৃশ্য আলোকরেখা নিচে নেমে আসে। একে স্টেপড লিডার বলা হয়। একই সঙ্গে ভূমি থেকে পজিটিভ বিদ্যুৎ-প্রবাহ উপরে ওঠে। দুইয়ের মিলনে বৈদ্যুতিক বর্তনী সম্পন্ন হয়। তখন ভূমি থেকে মেঘের দিকে তীব্র গতির রিটার্ন স্ট্রোক ধাবিত হয়। এটিই আমাদের চোখে দৃশ্যমান বজ্রপাত। এই প্রক্রিয়ায় চারপাশের বাতাস প্রায় ৫০ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উত্তপ্ত হয়। ওই প্রচণ্ড উত্তাপে তৈরি হওয়া শকওয়েভ আমরা বজ্রধ্বনি হিসেবে শুনি। এটি পদার্থবিজ্ঞানের এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও অসতর্কতায় তা মানুষের জন্য ঘাতক হয়ে দাঁড়ায়।দেশের বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে- শ্রীমঙ্গল, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ ও গাইবান্ধা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আর্দ্র ও শুষ্ক বাতাসের সংঘর্ষে ক্যুমুলোনিম্বাস মেঘের সৃষ্টি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বেড়েছে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বল্প সময়ে অতি তীব্র বজ্রঝড় তৈরি হচ্ছে। আগে কেবল এপ্রিল-মে মাসে বজ্রপাত হতো। এখন মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এর বিস্তার বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গাছপালা কমে যাওয়া। খোলা মাঠে নিরাপদ আশ্রয় নেই। মানুষ যখন মাঠে থাকে, তখন কাছাকাছি কোনো উঁচু দালান বা ঘন বন থাকে না। মাঠের মধ্যে একক কোনো উঁচু গাছ থাকলে তার নিচে আশ্রয় নেয়া আরও ভয়াবহ। গাছের মাধ্যমে বিদ্যুৎ দ্রুত মাটিতে প্রবাহিত হয়। সচেতনতার অভাবও এখানে বড় ফ্যাক্টর। বজ্রপাতের সময় করণীয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষ এখনও অন্ধকারের ভেতর আছে। ভেজা মাঠে শুয়ে পড়া বা পানির নিচে আশ্রয় নেয়া মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। মোবাইল ফোন বা ধাতব বস্তুর ব্যবহারও এই বিপদ বাড়ছে।আধুনিক প্রযুক্তি এখন ২০-৩০ মিনিট আগেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তর লাল সতর্ক সংকেত বা মোবাইল বার্তার ব্যবস্থা করেছে। তবে এই তথ্য প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায় না। এতে প্রাণহানি কমানো যাচ্ছে না। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে থাকা, দৌড়ানো বা ধাতব সরঞ্জাম ব্যবহার করা ঠিক নয়। অনেকে ধান ঘরে তোলার তাড়ায় জীবনের ঝুঁকি নেন। নদী বা খালে নামা বজ্রপাতকালে চরম বিপজ্জনক। লোহার ফ্রেমের ছাতা ব্যবহার করাও ঝুঁকিপূর্ণ।বজ্রপাত প্রতিরোধে বাস্তবমুখী সমাধান প্রয়োজন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সস্তা বজ্রপাত শনাক্তকারী যন্ত্র লাগানো যেতে পারে। প্রতিটি ফসলি মাঠের পাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে বজ্রনিরোধক পাকা ঘর নির্মাণ করা দরকার। এসব ঘরে অবশ্যই মেটাল রড ও সঠিক গ্রাউন্ডিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষা পাঠ্যক্রমে বজ্রপাতের ঝুঁকি ও সুরক্ষা নিয়ে পৃথক অধ্যায় রাখা জরুরি। পরীক্ষা পদ্ধতিতে এই বিষয় অন্তর্ভুক্ত করলে সচেতনতা বাড়বে। কৃষি ও মৎস্যজীবীদের সংগঠনের মাধ্যমে কাজের সময় পরিবর্তন করা যেতে পারে। বিকেলের ঝুঁকিপূর্ণ সময়টুকু কাজ এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সরকারি ভবন, স্কুল ও বড় মার্কেটে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন বাধ্যতামূলক করা উচিত। বজ্রপাত কোনো অভিশাপ নয়। এটি প্রকৃতির এক বিজ্ঞানসম্মত আচরণ। অভিশাপ হলো আমাদের অজ্ঞতা ও প্রস্তুতির অভাব। প্রতিবছর বিভিন্ন সময় বজ্রপাতের খবর সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়। কিছুদিন পর মানুষ সব ভুলে যায়।বজ্রপাত কোনো অভিশাপ নয়। এটি প্রকৃতির এক বিজ্ঞানসম্মত আচরণ। অভিশাপ হলো আমাদের অজ্ঞতা ও প্রস্তুতির অভাব। কৃষকের কাছে সুরক্ষা প্রযুক্তি পৌঁছে দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। খোলা জায়গা, উঁচু গাছ আর পানি এড়িয়ে চলার শিক্ষা সবার থাকা চাই। সঠিক পরিকল্পনা ও সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে। সচেতনতাই হোক আমাদের একমাত্র রক্ষাকবজ। নিরাপদ থাকুক বাংলার মাঠ আর মেহনতি মানুষ।[লেখক: আহ্বায়ক, মুভমেন্ট ফর নেচার]

বুদ্ধ পূর্ণিমা: শান্তি ও মৈত্রীর আহ্বান

আজ শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা, ২৫৭০ বুদ্ধাব্দ। তাই সবাইকে শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার মৈত্রীময় শুভেচ্ছা জানাই। সেই সঙ্গে বিশ্ববাসী রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে উদাত্ত আহ্বান জানাই যে, বিশ্বে যে অস্ত্রের ঝনঝনানির ব্যবহার চলছে তা পরিহার করে যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই, হিংসা নয়, মৈত্রী চাই এই জিনিসটি নিজের মনের মধ্যে সঠিকভাবে অনুধাবন-অনুকরণ এবং অনুশীলনের দ্বারা প্রয়োগ করা হলে তাহলে সর্বসাধারণের কাছে শান্তির বার্তা পৌঁছে দিতে বেশি সময় লাগবে না। এ বছর বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পড়েছে। মহাকারণিক ভগবান তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ তার এই ধর্মের সর্বোত্তম বাণী হলোÑ ‘সব্ব পাপস্সা অকরণং কুসালস্স উপসম্পদা/ চিত্তা পরিয়োদপনং এতং বুদ্ধানসাসনং’ ধম্মপদ- ১৮৩ অর্থাৎ, সব প্রকার পাপকর্ম না করা, কুশল বা পুণ্য কর্ম সম্পাদন করা এবং নিজ নিজ চিত্ত সুন্দর বা পরিশুদ্ধ করা-এ সবই হলো বুদ্ধগণের অনুশাসন। এটাই হলো মহাকারুণিক ভগবান বুদ্ধের সর্বজনের প্রতি অহিংসার মৈত্রী ভাব। এ মহান পবিত্র ‘বৈশাখি পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমা’ বৌদ্ধ বিশ্বেও একটি অন্যান্য ধর্মোসৎসবের দিন। বৈশাখি পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমা বিশ্বের বৌদ্ধ সমাজে এক মহান পবিত্রতম দিন। ভগবান তথাগত বুদ্ধ, তার জীবন ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় তিনটি ঘটনাবলি তথা ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত বিদ্যমান জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ, এবং মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত এই তিনটি ঘটনাকেই নিয়ে বৈশাখি পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধ সমাজে তথা বিশ্বের প্রধান দেশে এই দিনটি-কে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ সহকারে উদ্?যাপন করে আসছে। জাতিসংঘ ২০০০ সালে, আন্তর্জাতিকভাবে ‘ভেসাক ডে’ দিবসটি তার সদর দপ্তর এবং অন্যান্য অফিসে পালন করার প্রস্তাব গ্রহণ করে। মহামানব গৌতম বুদ্ধের জীবনে সংঘটিত ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত বুদ্ধ পূর্ণিমাকে ‘ভেসাক ডে’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই থেকে প্রতিবছর যথাযথ মর্যাদা সহকারে উদ্?যাপন ও পালনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে জাতিসংঘ। তারপর থেকেই বিশ্বের প্রধান রাষ্ট্রসমূহে বিপুল সমারোহে এবং জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো সরকারিভাবে এ দিবসটি ভেসাক ডে পালন করছে। জগতে মহাপুরুষের আবির্ভাব অত্যন্ত দুর্লভ। শুভ বৈশাখি পূর্ণিমায় তৎকালীন ভারতবর্ষেও কপিলাবস্তুর লুম্বিনী কাননে শালবৃক্ষের তলায় রাজ কুমার সিদ্ধার্থের জন্ম। তখনি সিদ্ধার্থ ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই সপ্ত পদ হেঁটে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন ‘জেট ঠোহস্মিং সেট্ ঠোহস্মিং অয়মন্তিমা জাতিসংঘ’ অর্থাৎ আমিই জোষ্ট, আমিই শ্রেষ্ঠ, এবং এটাই আমার অন্তিম জন্ম। এছাড়াও এ ঐতিহাসিক বর্ষে শুভ বৈশাখি পূর্ণিমা তিথিতে রাজ কুমার সিদ্ধার্থের জন্মসহ একই সঙ্গে তথাগত বুদ্ধের প্রধান সেবক আনন্দ, সাস্ত্রী কালুদায়ী, সহধর্মিণী যশোধরা, সারথি চন্দক, বেগবান, অশ্ব কনক, চারিনিধিকুম্ভ, বিজ্ঞান লাভের মহাবোধি বৃক্ষ, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহপরিনির্বাণ প্রাপ্ত। তাই বিশ্বের বৌদ্ধ সমাজে বৈশাখি পূর্ণিমার গুরুত্ব ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ। ঋতুর মধ্যে প্রধান হলোÑ বসন্ত, তাই বসন্তকে ঋতুরাজ বলে থাকে। তিথির মধ্যেও পূর্ণিমা শ্রেষ্ঠ। মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধ এই বৈশাখি পূর্ণিমার তিথিতেই তার জন্ম-বুদ্ধত্ব লাভ-মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। সেই বৈশাখি পূর্ণিমায় ভগবান তথাগত বুদ্ধের ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত ঘটনা পরিলক্ষিত হয়। চারটি সত্যের কথা ভগবান বুদ্ধ প্রচার করে গেছেন। সেই চার সত্যকে বলা হয় চার আর্যসত্য। যথা: দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখ নিরোধ ও দুঃখ নিরোধের উপায়। দুঃখ নিরোধের উপায় হিসেবে ৮টি পথ নির্দেশ করেছেন। সেই আট পথকে বলা হয় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এগুলো হলো: সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। বুদ্ধ প্রবর্তিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মধ্যমপন্থা। পন্থা মানে হলো পথ। এই পন্থা একদিকে ভোগ-সুখময় এবং অন্যদিকে কঠোর তপস্যাময় জীবন থেকে সরিয়ে মানুষকে শান্তির পথে, জ্ঞানমার্গে, প্রজ্ঞার পথে, বোধি লাভের পথে, পরম সুখ নির্বাণ লাভের পথে পরিচালিত করে। মধ্যমপন্থা প্রকৃতপক্ষে একটি নৈতিক বিধান, সব মানুষের কাছে যা গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। সম্যক জীবনাচরণের ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছিলেন বুদ্ধ। জগতের অনিত্যতা সম্পর্কে জ্ঞান অনুধাবন করলেই মানুষ দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারে। ‘বুদ্ধ’ ও ‘বৌদ্ধ’ শব্দ দ্বারা অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়েন। ‘বুদ্ধ’ বলতে জ্ঞানচক্ষু, জ্ঞানলোকে, প্রাজ্ঞ, প্রবুদ্ধ, সম্বুদ্ধ, পরমজ্ঞান, জ্ঞানী অর্থে বোঝায়। ‘বৌদ্ধ’ অর্থে সাধারণত বুদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরকে বলা হয়। বুদ্ধ নির্দেশিত বিনয় নীতির ওপর ধর্ম অনুসরণ করে তার জ্ঞান সাধনায় রত থেকে অনুকরণ, অনুশীলন এবং অনুধাবন করে যারা আচরণ করেন তারাই হলেন বৌদ্ধ। জন্মসূত্রে বৌদ্ধ হয় না, কর্মসূত্রেই বৌদ্ধ। বৌদ্ধ একটি সমষ্টিবাচক শব্দ, এই শব্দ দ্বারা একটি পরিবার, সমাজ, সম্প্রদায়, জাতি বোঝায়। কিন্তু বৌদ্ধ জাতিগত অর্থে নয়, জ্ঞান আহরণ অর্থে বোঝায়। বৈশাখি পূর্ণিমা বৌদ্ধ সমাজে কত বড়ো তাৎপর্যময় তা বোঝাবার নয়। ভগবান তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ, তার অন্তিমকালে বলেছিলেন ‘হন্দদানি ভিখকবে আমন্তযামি বো, বয়ধম্ম সঙ্খারা অপ্পমাদেনা সম্পাদনার’ অর্থাৎ ‘হে ভিক্ষুগণ, তোমাদের পুনঃ বলছি, সংস্কার ধর্মসমূহ একান্ত ক্ষয়শীল; তোমরা অপ্রমত্তহয়ে স্বীয় কর্তব্য সম্পাদন করো।’ এটাই বুদ্ধের অন্তিম বাণী। বর্তমান বিশ্বের মধ্যে যে হানাহানি-মারামারি, অস্ত্রের ঝনঝনানি হচ্ছে এবং সেগুলো জীবের সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ দ্বারা সম্পাদন করা হচ্ছে। সেই জন্য মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধের নীতি এখনই অনুসরণ-অনুকরণ এবং অনুশীলনের অতীব প্রয়োজন হয়েছে। তথাগত বুদ্ধ এই ৫টি বাণিজ্য বা ব্যবসা না করার নির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন- (১) অস্ত্র ব্যবসা (২) প্রাণী ব্যবসা (৩) নেশা জাতীয় দ্রব্য ব্যবসা (৪) বিষ ব্যবসা (৫) মাংস ব্যবসা। এ পাঁচটি বাণিজ্য পরিহার করে সম্যক (সম্যক জীবিকা মানে সঠিক জীবিকা) জীবিকা করার জন্য তথাগত বুদ্ধ তার দেশনায় উপদেশ দিয়েছেন। এই দিনে দান, ধর্মালোচনা, শীল আচরণ ও ধ্যান-সাধনা একাগ্রচিত্তে সম্পাদন করে থাকেন বৌদ্ধ নরনারীর। পরিশেষে দেশের এবং বিশ্বের সব প্রাণীর হিত সুখ ও মঙ্গলার্থে প্রার্থনা করি, সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করুন। সবাই নিরাপদে অবস্থান করুক। অশান্ত বিশ্বে শান্তি বর্ষিত হোক, জগতের সব প্রাণী সুখী হোক। [লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাঙামাটি]

গার্মেন্টস ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিকদের বাস্তবতা

মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতীক। প্রতি বছর ১ মে বিশ্বজুড়ে শ্রমিকরা এই দিনটি পালন করেন নিজেদের অধিকার আদায়ের ইতিহাস স্মরণ করে এবং নতুন করে ন্যায্য জীবনের দাবি তুলে ধরতে। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকরা অমানবিক কর্মঘণ্টা ও শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। দিনে ১২-১৬ ঘণ্টা কাজের পরিবর্তে ‘৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম ও ৮ ঘণ্টা নিজের জন্য’-এই দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে। সেই আন্দোলনে বহু শ্রমিক জীবন দিয়েছিলেন। তাদের আত্মত্যাগের স্মৃতিই আজকের মে দিবস। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কাজের ধরনও পাল্টেছে। কিন্তু শ্রমিকের শোষণ, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা শেষ হয়নি। বরং বর্তমান বিশ্বে শ্রমিকদের সংকট আরও জটিল হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে শ্রমজীবী মানুষের জীবন এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম মজুরি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আটকে আছে। আর এই সংকট সবচেয়ে বেশি বহন করছেন নারী শ্রমিকরা। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর একটি হলো তৈরি পোশাকশিল্প। এই শিল্পে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, যাদের বড় অংশই নারী। গ্রাম থেকে আসা নিম্নআয়ের অসংখ্য নারী নিজেদের পরিবার বাঁচাতে গার্মেন্টসে কাজ করছেন। তাদের শ্রমেই দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, বৈদেশিক মুদ্রা আসে, উন্নয়নের গল্প তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তবে তাদের জীবনের গল্প অনেক কঠিন। বর্তমানে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫শ’ টাকা। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আয়ে একটি পরিবারের সম্মানজনক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব। ঢাকার মতো শহরে বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটাতে গিয়ে অধিকাংশ শ্রমিককে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয়। অনেক শ্রমিক বাধ্য হয়ে ওভারটাইম করেন, তবুও মাস শেষে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। গত কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট, করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশের শিল্পখাতেও পড়েছে। অনেক কারখানায় অর্ডার কমেছে, উৎপাদন কমেছে, আবার কোথাও কোথাও কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিক ছাঁটাই বেড়েছে, বেতন বকেয়া থেকেছে, অনেক শ্রমিক ক্ষতিপূরণ ছাড়াই কাজ হারিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারী শ্রমিকরা। কারণ সংকটের সময় মালিকরা প্রথমেই নারী শ্রমিকদের চাকরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেন। অনেক নারী শ্রমিক মাতৃত্বকালীন সুবিধা পান না, অসুস্থ হলেও ছুটি নিতে পারেন না, এমনকি কর্মক্ষেত্রে মানসিক ও যৌন হয়রানির শিকার হন। কর্মক্ষেত্রে তাদের কণ্ঠস্বর এখনও দুর্বল। গার্মেন্টস শিল্পের বাইরে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক নারী অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। যেমন-গৃহশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, বিউটি পার্লারের কর্মী, রাস্তার হকার, বাসা-বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইটভাটা, চা-দোকান কিংবা ছোট কারখানায় কাজ করা নারী। তাদের অধিকাংশেরই কোনো নিয়োগপত্র নেই, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, ছুটি নেই, স্বাস্থ্যসুরক্ষা নেই, এমনকি কাজ হারালে আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও নেই। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এই শ্রমিকদের অনেকেই শ্রম আইনের সুরক্ষার বাইরে। ফলে তারা প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটান। নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই অনিশ্চয়তা আরও বেশি। অনেক নারী দিনের পর দিন কম মজুরিতে কাজ করলেও তারা ‘শ্রমিক’ হিসেবেই স্বীকৃতি পান না। ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তির বিস্তার শ্রমবাজারেও বড় পরিবর্তন এনেছে। এখন অনেক তরুণ-তরুণী অনলাইনভিত্তিক কাজ, ডেলিভারি সেবা বা অ্যাপভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। কাজ আছে, কিন্তু চাকরির নিরাপত্তা নেই। আয় আছে, কিন্তু সামাজিক সুরক্ষা নেই। ফলে নতুন অর্থনীতিতেও শ্রমিকের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অটোমেশনের কারণে ভবিষ্যতে বহু শ্রমিক কাজ হারানোর ঝুঁকিতে আছেন। তৈরি পোশাকশিল্পেও ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এতে উৎপাদন বাড়লেও কম দক্ষ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে এখন শ্রমিক আন্দোলনের দাবি শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষতা উন্নয়ন, পুনঃপ্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রশ্নও। মে দিবস আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয় নিরাপদ কর্মপরিবেশের অধিকার। রানা প্লাজা ধসের মতো মর্মান্তিক ঘটনা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমিকের জীবনকে অবহেলা করলে উন্নয়নের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে যায়। এখনও অনেক কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা পর্যাপ্ত নয়। দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত শ্রমিকদের পরিবারও অনেক সময় ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পায় না। নারী শ্রমিকদের জন্য কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা শুধু শ্রমিক নন, একই সঙ্গে পরিবার ও সন্তানের দায়িত্বও বহন করেন। অথচ অনেক কর্মক্ষেত্রে এখনও মাতৃত্বকালীন ছুটি, ডে-কেয়ার সুবিধা বা স্বাস্থ্যসেবার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সমান কাজের জন্য সমান মজুরিও বাস্তবে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। বর্তমান সময়ে শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো সংগঠিত হওয়ার সীমাবদ্ধতা। অনেক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের চেষ্টা করলে হয়রানি, চাকরিচ্যুতি বা চাপের মুখে পড়েন। যদিও শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে কিছু সুযোগ বাড়ানো হয়েছে, বাস্তবে শ্রমিক সংগঠনের স্বাধীনতা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। অথচ শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হওয়ার বিকল্প নেই। মে দিবস তাই আজ শুধু অতীতের ইতিহাস স্মরণের দিন নয়; এটি বর্তমান বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর দিন। এটি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার এবং মানবিক মর্যাদার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিন। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি শ্রমিকের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু সেই শ্রমিক যদি ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা ও বৈষম্যের মধ্যে বেঁচে থাকেন, তাহলে উন্নয়নের সেই গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই পরিবর্তিত বিশ্বে মে দিবসের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আজকের মে দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় শ্রমিকের অধিকার মানে শুধু মজুরি নয়; এটি নিরাপত্তা, মর্যাদা, সমতা এবং মানবিক জীবনের অধিকার। আর সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই এখনও শেষ হয়নি। [লেখক: সভাপতি, জাতীয় নারী শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র]

রম্যগদ্য : সকেট জাম্পার

“এইটা আবার কি রে, সকেট জাম্পার! খায় না, মাথায় দেয়! এ-সব কী বলছিস, সকেট জাম্পার!”“ভাইডি, আপনের এই সকেট জাম্পার নাই বইলাই আজ বাংলাদেশের এই অবস্থা।”“সকেট জাম্পার না রকেট জাম্পার, তো এর সাথে তোর বাংলাদেশের কী সম্পর্ক? সকেট জাম্পার না রকেট জাম্পারের সঙ্গে বাংলাদেশের ˆনতিকতার অবক্ষয়ের মাজেজা কী? গর্ভবতী মাকে অত্যচার করে তার পেটের সাত মাসের বাচ্চাকে কেটে টুকরো করা, এই ˆপশাচিকতার সঙ্গে তোর সকেট জাম্পারের কি সর্ম্পক তার কিছুইতো বুঝতে পারছি না!”“বুঝবেন ক্যামনে, আপনেরতো মিয়া বাংলাদেশেরই সকেট জাম্পার নাই, তাই আপনে ভি, বাঙালিগো এই সারমেয় ব্যাভিচারের মাজেজা ধরা পারতাছেন না!”“বাংলাদেশের সকেট জাম্পার...!”“আরে স্ত্রীর কনিষ্ঠভ্রাতা আপনে বুঝেন না, ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সকেট জাম্পারের অভাবে ধরা খাইলো। আজকে এই মরে, কালকে সেই, বণিক মরে, ˆসনিক মরে, মরে অফিসার, অফিসারগো বৌ-এর বেণি খুললো হাজার বার...”“মানে কিরে? ১৯৭৫ সালে তো নির্মেলেন্দু গুণের ‘কোন এক কবি’ বাংলাদেশের কতিপয় দুষ্টু লোকের হাতে খুন হয়েছিলেন, যিনি নাকি স্বাধীনতা শব্দটা আমাদের দিয়ে গেছেন?”“কবি কন আর যাই কন ওই হত্যাতো আপনের সকেট জাম্পার হজম করতে পারেন নাই। তার লাগি অ্যখোনো বাংলাদেশে এ্যতো অনাচার।”“ও কি রে, তুই শক অ্যাবজরভারকে এতক্ষণ সকেট জাম্পার বলছিলি?”“শক অ্যাবজরভার কী, এইডা তো হোইলো সকেট জাম্পার।”“ওরে পাগলা ওটা সকেট জাম্পার না, শব্দটা হলো শক অ্যাবজরভার, মানে যে যন্ত্রটা, গাড়ি বা মোটর সাইকেল যদি গর্তে পড়ে তাহলে যে শক বা ঝাঁকুনিটা অনুভূত হবে, সেটা যাতে যাত্রীকে বিব্রত না করে, সে জন্যে স্প্রিং বা বড় বড় বাস ট্রাকে পাতলা পাতলা স্টিলের পাত দিয়ে তৈরি শক অ্যাবজরভার লাগানো থাকে।”“আরে ভাই, ওইডাই, ওইডাই সকেট জাম্পার।”“বুঝলাম অ্যাবজরভার, তোর মুখে সকেট জাম্পার, কিন্তু বাংলাদেশের সকেট জাম্পারের মানে শক অ্যাবজরভার নেই, এই বক্তব্যের অর্থ কি?”“ক্যান বোঝেন না, ১৯৭৫-এ, কবি কন আর যাই কন, সেই ভুল কি আপনেরা অ্যাবজরভার করা পারছেন?এক কবির হত্যার পর লগে লগে কতোগুলা হত্যাকাণ্ড ঘটলো। সব ভুইল্লা গেছেন?”“না না, ভুলবো ক্যানো। তোর সপরিবারে কবি হত্যার পর, সব বাঘা বাঘা মুক্তিযোদ্ধা, চৌকস এয়ারফোর্স, আর্টিলারি বাহিনির কত বাঙালি ভাই নিহত হলেন। জেলের ভেতরে যেয়ে পর্যন্ত বাঙালি হয়ে নিরস্ত্র বাঙালি কয়েদীদের গুলি করে হত্যা করলো!”“জী¡ অয়, বাংলাদেশের সকেট জাম্পার থাকলে বাংলাদেশ এই যাতনা মানে এই শক সহ্য কোইরা, আপনের ভাষায় এই শক অ্যাবজরভার কোইরা দেশরে আ¹ুয়া নিতে পারতো। যেহেতু সকেট জাম্পার নাই তাই পদে পদে বাংলাদেশ তিন চাক্কার ব্যাটারি চালিত, মোটরাইজড রিকশার মতো খানা খন্দে পড়লে, খালি ফাল পাড়ে, আর ফাল পাড়ে। মইধ্যখানে আম পাবলিকের জান যায়।”“বাংলাদেশ আবার কখন খানা খন্দে পড়ছে যে সকেট জাম্পার লাগবে?”“আপনে মিয়া কানা না অন্ধ! চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে গুল্লি মারলেন, আবার হোমো এরশাদরে নিয়া গাতায় পড়লেন, তারপর ওয়ান ইলেভেন, শ্যাষ ম্যেষ ভাতের হোটেলের মালিকের হাতে...”“থাক থাক তোকে আর ক্রনলজিক্যাল অর্ডারে বাংলাদেশের গর্তে পড়ার বিবরণ দিতে হবে না তার চেয়ে বল, এই অবস্থা থেকে বেরুবি কবে?”“আর বাইরাচ্ছেন! আপনের নোবেল লোরিয়েট’ শান্তির পায়রা যে চুক্তি কোইরা দিছে, এইবার এইডার ঠ্যালা সামলান। ক্যামনে জানি শুদ্ধ কোইরা কোইলেন, “থাক থাক তোকে আর ক্রনলজিক্যাল অর্ডারে বাংলাদেশের গর্তে পড়ার বিবরণ দিতে হবে না তার চেয়ে বল, এই অবস্থা থেকে বেরুবি কবে?” আমি কোই কী, জাঁ-পল সাঁত্র, “নো-এক্সিট” পালাবার পথ নাই, ও তোর যম আছে পিছে।”“ওও-ওম্মা, তোরা তখন সব বঙ্গসন্তান কত বলাবলি করলি, নোবেল লোরিয়েট’ শান্তির পায়রা স্যার আপনে পাঁচ বছর থাকেন, স্যার আপনে দশ বছর থাকেন, অনেকেতো বলল আপনে যেহেতু পদ্মানদীতে চুবনি খান নাই আপনে এবার আমরণ প্রধান মন্ত্রী থাকেন। তো এখন আবার নোবেল লোরিয়েট’ শান্তির পায়রাকে, ধূর্ত শৃগাল মনে হচ্ছে কেনো?”“হ্যেরে শিয়াল মনে হোইবো না, হ্যেয় খালি হ্যের ৬০০কুটি টাকার সুদ মওকুফ করছে। আর আমেরিকান চুক্তির ঠ্যেলায় বাঙ্গালী অহন বরাহ অবতারের মাংস আমদানি কোইরা পাবলিকরে খাওয়াইবো।”“কেবল কি বরাহ অবতারের মাংস, চুক্তিতে আর কিছু নেই?”“চুক্তির কথা আমি কমু ক্যামনে, আপনে নোবেল লোরিয়েট’ শান্তির পায়রা সাধারণ নির্বাচনের মাত্র ৭২ ঘন্টা আগে এনডিএ মানে “নন ডিসক্লোসার অ্যাগ্রিমেন্ট” সই করলেন...”“তো! “নন ডিসক্লোসার অ্যাগ্রিমেন্ট” সই করলেন তো কী হলো?”“কী আবার হোইবো, যা হোইবার তাই হোইলো, পাবলিকে এই চুক্তির কিছু জানা পারবো না। কারণ এইডা “নন ডিসক্লোসার অ্যাগ্রিমেন্ট।”“তাহলে বাংলাদেশ আবার গর্তে! তোর ভাষায় বাংলাদেশের সকেট জাম্পার নেই তাই ঝাঁকুনি খেতেই হবে!”“ঝাঁকুনি খাইবেন না কুন্নি খাইবেন, হেইডা ধীরে ধীরে টের পাইবেন। অহন বাংলাদেশের লাই¹া চট জলদি একটা সকেট জাম্পার জোগাড় করেন, তয়লে ব্যেবাগতে বাঁচবেন নইলে মরণ।”“জানি না কপালে কী আছে। তবে সব কথার শেষ কথা, ও মহান নোবেল লোরিয়েট স্যার, আপনে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ আমেরিকার লগে যে “নন ডিসক্লোসার অ্যাগ্রিমেন্টে” সই করলেন তার জন্য বাংলাদেশের নাগরিকরা আপনাকে কেয়ামত থেকে কেয়ামত পর্যন্ত স্মরণ রাখবে।”“হ্যেরে কেয়ামত থেইকে কেয়ামত পর্যন্ত স্মরণ করার আগে, লাগলে চায়নিজ বা ইন্ডিয়ান সকেট জাম্পার আনেন, নাইলে আপনেগো কেয়ামত হোইতে বাকি থাকবো না। ব্যাটারি চালিত টেসলার রিকশার মতুন গত্তে পইড়া, খালি ফাল পাড়বেন আর ফাল পাড়বেন! মইধ্যখানে আম পাবলিকের যান যাইবো...”“ওকে দেন, ইম্পোর্ট সকেট জাম্পার ফ্রম ইন্ডিয়া অর চায়না।”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

বাণিজ্য, স্বচ্ছতা ও রূপান্তর

বাংলাদেশকে প্রায়শই এশিয়ার অন্যতম সফল উন্নয়নের দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়। অর্ধশতাব্দীর মধ্যে দেশটি দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র পীড়িত থেকে একটি বৃহৎ উৎপাদন কেন্দ্র, শীর্ষস্থানীয় পোশাক শিল্পের অবস্থান এবং যার অর্থনৈতিক উত্থান অনেক সংশয়বাদীকে অবাক করেছে। কিন্তু সফলতা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। স্বল্পব্যয়ভিত্তিক প্রবৃদ্ধি চিরকাল যথেষ্ট নয়। দেশগুলোকে একসময় কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়: তারা কি যত দ্রুত কারখানা সম্প্রসারণ করেছিল, তত দ্রুত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক করতে পারে?বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও শ্রম সংস্কারের উদীয়মান কাঠামো একটি উত্তর ইঙ্গিত করে। যদি এগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এ ব্যবস্থাগুলো কেবল কূটনৈতিক চুক্তি নয়, বরং বাংলাদেশ কীভাবে বাণিজ্য, শ্রম, প্রযুক্তি ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব পরিচালনা করে, সেই ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন চিহ্নিত করবে। এটি ওয়াশিংটনকে খুশি করার চেয়ে বাংলাদেশকে জাতীয় উন্নয়নের পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুত করার সম্ভাবনা বেশি। সংস্কারের কেন্দ্রে রয়েছে একটি দীর্ঘদিনের অগ্রাহ্য সত্য: শ্রমিকের মর্যাদা ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি অস্থিতিশীল অগ্রগতি। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রপ্তানি সচল রেখেছে এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বিদেশে এই শিল্পটি দুর্বল শ্রমিক সুরক্ষা, বিতর্কিত মজুরি ও ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে প্রতিবন্ধকতার প্রতীকও হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগকারীরা কিছুদিন অদক্ষতা সহ্য করতে পারে, কিন্তু সুনামের ঝুঁকি তারা অনির্দিষ্টকাল সহ্য করে না। আর এজন্যই বাংলাদেশ শ্রম আইনে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর গুরুত্ব এত গভীর। ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মীদের হার ২০ শতাংশে কমানো শুধু একটা ছোটখাটো নিয়ম পরিবর্তন নয়। এর মাধ্যমে বড় কারখানাগুলোতে আইনগতভাবে ইউনিয়ন করা যে প্রায় অসম্ভব ছিল, সেই বাধাই দূর হয়েছে। নিবন্ধনের শর্তগুলো সহজ করা (যেমন কারখানার আইডি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন গ্রহণ করা) এবং এই বাস্তবতাকেই মেনে নেওয়া যে, আমলাতন্ত্র প্রায়শই নীরব ভেটো হিসেবে কাজ করে। আর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোর (ইপিজেড) মধ্যেও যদি প্রকৃত শ্রম অধিকার বাড়ানো যায়, তাহলে সেই ˆদ্বত ব্যবস্থার অবসান ঘটবে, যেখানে কিছু শ্রমিক সুরক্ষা পেত, যা অন্যদের থেকে অস্বীকার করা হতো। ইতিহাস এখানে একটি পরিষ্কার শিক্ষা দেয়। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান কেবল বেশি পণ্য রপ্তানি করে উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়নি। তারা ধীরে ধীরে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত শ্রম সুরক্ষা ও একটি বিস্তৃত সামাজিক চুক্তি গড়ে তুলেছিল। সুরক্ষা পাওয়া শ্রমিকরা আরও উৎপাদনশীল, দক্ষ এবং তুলনামূলক কম অস্থিরতাপ্রবণ হয়। বাংলাদেশের সেই শিক্ষাটি যত্নসহকারে পাঠ নেয়া উচিত। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হলো ২০২৩ সালের মজুরি প্রতিবাদের সঙ্গে যুক্ত ফৌজদারি মামলাগুলোর সমাধানের প্রতিশ্রুতি। সরকারের শৃঙ্খলা রক্ষার অধিকার রয়েছে। কিন্তু যখন শ্রমবিরোধ আক্ষরিক অর্থে অপরাধী করে ফেলে, তখন বিশ্বাস ভেঙে যায়। ভয়ের মাধ্যমে একটি কারখানা ব্যবস্থাপনা দক্ষতার সঙ্গে করা যায় না। এটি কেবল বৈধতার মাধ্যমেই পরিচালিত হতে পারে। এরপর আসে দ্বিতীয় স্তম্ভ: নিয়ন্ত্রক আধুনিকীকরণ। ওষুধ ও মেডিকেল সরঞ্জামের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ-র অনুমোদন বাংলাদেশ মেনে নিতে রাজি হয়েছে। এর ফলে অহেতুক দাপিয়ে বাণিজ্য বন্ধ রাখার জায়গা থেকে সরে আসার একটা ইতিবাচক সংকেত। বিশ্বস্ত বিদেশি অনুমোদন যদি মানসম্মত ওষুধ ও স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিতে দ্রুত প্রবেশের পথ খুলে দেয়, তাহলে ভোক্তারা লাভবান হন এবং ব্যবসায়ীরা পান আশার আলো। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ির সুরক্ষা মান স্বীকার করার মাধ্যমে যানবাহনের উন্নত মান নিয়েও একই যুক্তি খাটে। মানগুলোর সামঞ্জস্যতা মানে সার্বভৌমত্ব ছেড়ে দেয়া নয়। বরং কাগজপত্রের জটিল অনুষ্ঠানের চেয়ে দক্ষতা বেছে নেয়া। অনেক উন্নয়নশীল দেশ ভুল বোঝে—তারা মনে করে নিয়মকানুন বাড়ালেই অগ্রগতি হয়। তারা ফর্ম, লাইসেন্স আর অনুমোদনের পাহাড় দাঁড় করায়, আর জটিলতাকে দক্ষতা বলে ভ্রম সৃষ্টি করে। আসল নিয়মকানুন জনগণকে রক্ষা করে। ভুয়া নিয়মকানুন রক্ষা করে দালালচক্রকে। কৃষিতে আরেকটি সুযোগ। পোকা-মাকড় আর রোগবালাই সংক্রান্ত নিয়ম একীভূত করা, মাংস ও জলজ পণ্যের বৈজ্ঞানিক সার্টিফিকেট প্রচলন করা, এবং ˆজবপ্রযুক্তির জন্য নিয়ম তৈরি করা—এসব বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা কমাতে পারে ও একইসঙ্গে দেশের খাদ্য ব্যবস্থার উন্নতি করতে পারে। যেসব দেশ বিজ্ঞানভিত্তিক নিয়ম প্রত্যাখ্যান করে, তারা প্রায়ই তা করে জাতীয়তাবাদের নামে। শেষ পর্যন্ত তাদের দেশেই দেখা দেয় অভাব, উচ্চমূল্য আর দারিদ্রতা। ডিজিটাল অর্থনীতির সংস্কারগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হতে পারে। বাংলাদেশ এখন এমন এক যুগে পা রাখছে, যেখানে তথ্য ব্যবস্থাপনা (ডেটা গভর্নেন্স) ঠিক ততটাই জরুরি, যতটা জরুরি ছিল একসময় বন্দরের অবকাঠামো। সীমান্ত পেরিয়ে তথ্যের গোপনীয়তার নিয়ম মেনে নেয়া এবং হস্তক্ষেপকারী সাইবার নিরাপত্তা বিধিগুলো পুনর্বিবেচনা করা—এটাই নির্ধারণ করবে যে, বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের অংশীদার হিসেবে দেখবে, নাকি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলার মাথাব্যথা হিসেবে। বিনিয়োগকারীরা সেই বাজার খোঁজে যেখানে তথ্য নিরাপদে চলাচল করতে পারে, বক্তব্য যুক্তিসঙ্গত মাত্রায় সুরক্ষিত থাকে, আর এনক্রিপশনকে সহজেই দুর্বল করা হয় না। শেষের কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। এনক্রিপশনে ব্যাকডোর বা সীমাহীন প্রবেশাধিকার দাবি করা আমলাতন্ত্রের কাছে কার্যকরী মনে হতে পারে, কিন্তু তা সবার জন্য আস্থা কমিয়ে দেয়। একবিংশ শতাব্দীতে ডিজিটাল আত্মবিশ্বাস একটি জাতীয় সম্পদ। একইভাবে, বড় বড় আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে মেধাসম্পদ সুরক্ষা জোরদার করা বাংলাদেশকে ঠিকাদারি উৎপাদন (কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং) থেকে সরে এসে উদ্ভাবনের পথে এগোতে সাহায্য করবে। দেশগুলো আকস্মিকভাবে শিক্ষিত অর্থনীতিতে পরিণত হয় না। তারা আইনি ব্যবস্থা গড়ে তোলে—যেখানে ধারণা, ব্র্যান্ড আর আবিষ্কারগুলোর রক্ষণীয় মূল্য থাকে। তারপর রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক মাত্রা—যা কম আলোচিত, কিন্তু উপেক্ষা করা অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি, গম ও সয়াবিন তেলের ক্রয় বাড়ানোর দিকে ঝোঁক বাংলাদেশের জন্য একটি বৈচিত্র্যকরণ কৌশলের প্রতিফলন। একই কথা যায় মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার উপর বেশি নির্ভরতা এবং লগিংক-এর মতো চীনা ডিজিটাল লজিস্টিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ, অন্যান্য মধ্যম শক্তির মতো, শিখছে যে সস্তা নির্ভরশীলতা ব্যয়বহুল দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে। এর মানে চীনের প্রতি বিদ্বেষ নয়। এটা বাস্তববাদ। দেশগুলো তখনই লাভবান হয় যখন তারা ব্যাপকভাবে বাণিজ্য করে কিন্তু কারও ওপর অতি মাত্রায় নির্ভরশীল হয় না। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন গড়ে উঠে নানা বিকল্পের মাধ্যমে। কিছু সমালোচক বলবেন এই সংস্কারগুলো বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া। এটা ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। বাইরের চাপ সংস্কারের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু টেকসই করতে হবে দেশের নিজের স্বার্থেই। মুক্ত ট্রেড ইউনিয়ন, কঠোর নিয়মকানুন, স্বচ্ছ নীতিনির্ধারণ, বা শক্তিশালী দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা। বাংলাদেশের এগুলোর দরকার কারণ আমেরিকা চায় এজন্য নয় বরং এগুলোর দরকার বাংলাদেশের নিজের ভবিষ্যৎ সেগুলো চায়। বিদেশি বিনিয়োগের কথা ভাবুন। বিনিয়োগকারীরা দেশ তুলনা করে শুধু মজুরির ভিত্তিতে নয়, বরং পূর্বানুমানের ভিত্তিতেও। বিবাদ কি ন্যায্যভাবে মীমাংসা হয়? নিয়মকানুন কি স্বচ্ছ? গোপন ব্যবসায়িক তথ্য কি সুরক্ষিত? ঘুষ বা রাজনৈতিক সুপারিশ ছাড়া কি অনুমোদন পাওয়া যায়? যেসব দেশ ‘হ্যাঁ’ উত্তর দেয়, তারা দীর্ঘমেয়াদি মূলধন টানে। যেসব দেশ ‘না’ বলে, তারা শুধু সুযোগসন্ধানী লোভীদের টানে। পরিবেশগত বিষয়গুলোর প্রতিও নজর দেয়া জরুরি। বন উজাড়, বন্যপ্রাণী পাচার আর অপচয়ী উৎপাদন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পদক্ষেপগুলোকে প্রায়ই উড়িয়ে দেয়া হয় অভিজাত শ্রেণীর উদ্বেগ বলে। এটা ঠিক নয়। পরিবেশের ক্ষয়ের বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্য আছে—বন্যা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, রফতানি বাধা, আর জমির অবক্ষয়। বৃত্তাকার অর্থনীতি (সার্কুলার ইকোনমি) ফ্যাশনের শব্দ নয়; এটা সম্পদের শৃঙ্খলা। তবে, এসব সংস্কার যদি শুধু অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কিছুতেই লাভ হবে না। বাংলাদেশ আগেও সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে। এখন পার্থক্য গড়ে দিতে হবে কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। শ্রম পরিদর্শকদের প্রয়োজনীয় সংস্থান দিতে হবে। আদালতের দরকার স্বাধীনতা। মন্ত্রণালয়গুলোর উচিত খসড়া নিয়মাবলি উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করা। সংস্থাগুলোকে ‘বিবেচনাধীন ক্ষমতা’ কে আয়ের উৎস বানানোর বদঅভ্যাসকে চিরতরে ত্যাগ করতে হবে। সংস্কার সফল হয় যৌথ বিবৃতিতে নয়, বরং ˆদনন্দিন প্রশাসনিক কাজে। এটাই আসল পরীক্ষা। বাংলাদেশ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যা অনেক উদীয়মান দেশের কাছে পরিচিত: একটি প্রবৃদ্ধির মডেল বজায় রাখা—যা গড়ে উঠেছে সস্তা দাম, অস্বচ্ছতা আর ব্যবস্থাপকের নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে, নাকি সেটাকে উন্নত করে গড়ে তোলা হবে উৎপাদনশীলতা, স্বচ্ছতা ও আস্থার ভিত্তিতে। প্রথম মডেল চালাতে পারে এক দশক। দ্বিতীয় মডেল চালাতে পারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। যদি এই সংস্কারগুলো প্রতীকী নয়, বরং কঠিন আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সম্পর্ক গভীর করবে না—বরং নিজেকেই আধুনিক করে তুলবে। আর সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রাবন্ধিক]

ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি: বাজারে সংকট ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন

সাম্প্রতিক সময়ে সয়াবিন তেলের বাজারে যে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহজনিত চাপ দেখা যাচ্ছে, তা সাধারণ ভোক্তার জীবনকে যেমন প্রভাবিত করছে, তেমনি বাজার ব্যবস্থার ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্বচ্ছতা, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং প্রভাবশালী বাজার শক্তির উপস্থিতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ জনগণের প্রত্যাশা থাকে একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক বাজার কাঠামোর, যেখানে নীতি কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব প্রয়োগে প্রতিফলিত হয়। তাই এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি একইসঙ্গে নীতিগত সক্ষমতা ও দায়িত্বশীল শাসনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা: সংখ্যার আড়ালে সংকেত : লিটারপ্রতি চার টাকা করে সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধি আপাতদৃষ্টিতে একটি স্বাভাবিক বাজার সমন্বয় হিসেবে উপস্থাপিত হলেও এর অন্তর্নিহিত বাস্তবতা অনেক গভীর। কারণ, এই মূল্যবৃদ্ধি একক কোনো সিদ্ধান্তের ফল নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বাজার প্রক্রিয়ার প্রতিফলন, যেখানে আন্তর্জাতিক আমদানি নির্ভরতা, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব একত্রে কাজ করে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাজারে পাম ও সয়াবিন তেলের দামে ওঠানামা থাকলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে তার প্রতিফলন প্রায়শই অস্বাভাবিক মাত্রায় ঘটে, যা নীতিনির্ধারণী স্বচ্ছতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। সংকটের সূচনা: পরিকল্পিত নাকি প্রাকৃতিক? গত কয়েক মাসে বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বোতলজাত তেলের সরবরাহ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। রমজান ও ঈদের পরবর্তী সময়ে, যখন সাধারণত সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কথা, তখনও সংকট অব্যাহত থাকে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার প্রভাব নয়; বরং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। ফলে প্রশ্ন থেকে যায় এই সংকট কি স্বাভাবিক বাজার প্রক্রিয়ার ফল, নাকি পরিকল্পিত কোনো বাজার কৌশলের অংশ?পুরনো কৌশলের পুনর্জাগরণ : বাংলাদেশের বাজার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে সংকট সৃষ্টি করে মূল্যবৃদ্ধির একটি পুনরাবৃত্তিমূলক ধারা রয়েছে। ডিম, পেঁয়াজ, চিনি কিংবা ভোজ্যতেল—প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। সরবরাহ কমিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয় এবং পরবর্তীতে উচ্চ দামে তা স্থিতিশীল করা হয়। এই প্রক্রিয়া কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা, যেখানে বাজার নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। ডিলারদের সংকট: নীরব শোষণের বাস্তবতা : ডিলাররা সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী স্তর হলেও বর্তমানে তারা চাপে রয়েছে। বিভিন্ন বাজার সূত্রে জানা যায়, তাদের জন্য নির্ধারিত ইনসেনটিভ বা কমিশন সুবিধা কমিয়ে দেয়া হয়েছে এবং বাকিতে পণ্য সরবরাহের প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে ডিলারদের কার্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং তারা বাজারে স্বাভাবিক ভূমিকা রাখতে পারছেন না। এটি সরাসরি সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা তৈরি করছে। আইন ও বাস্তবতার ফারাক : প্রতিযোগিতা আইন ২০১২ অনুযায়ী বাজারে একচেটিয়া প্রভাব বা বাধ্যতামূলক প্যাকেজ বিক্রয় নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে এই আইনের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের প্রক্রিয়া থাকলেও ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা কম থাকায় তারা অভিযোগ করতে আগ্রহী হন না। ফলে আইনের অস্তিত্ব থাকলেও তার বাস্তব প্রভাব সীমিত থেকে যাচ্ছে। ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি : বাজার অংশীদারদের মধ্যে একটি সাধারণ মনোভাব লক্ষ্য করা যায়—অভিযোগ করলে ব্যবসায়িক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। এই ভয় একটি নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে অনিয়ম সম্পর্কে জানা থাকলেও কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। এটি একটি সুস্থ বাজার ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক সংকেত। খোলা তেলের উত্থান: বিকল্প নাকি বাধ্যতা? বোতলজাত তেলের সংকটের ফলে খোলা তেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে হোটেল, রেস্তরাঁ এবং বড় ভোক্তারা এই দিকে ঝুঁকছেন। তবে খোলা তেলের ক্ষেত্রে গুণগত মান, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ভেজালের আশঙ্কা অনেক বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, খোলা তেলের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। [লেখক: প্রশিক্ষক, গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বরিশাল]

বজ্রপাতে এত মৃত্যু কেন?

গত ১৮ এপ্রিল শনিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বজ্রপাতে একদিনে এত মৃত্যু ২০১৬ সালে একবার ঘটেছিল। ওই বছর মে মাসের ১২ ও ১৩ তারিখে দুই দিনে সারাদেশে বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটে ৮১ জনের। বলা হয় এনিয়ে কারও কিছু করার নেই এ হলো প্রকৃতির মার। আসলে কি তাই নাকি আমাদের কিছু করনীয় আছে। সেকথায় পরে আসছি তার আগে আরো একটা হিসাব দেখা যাক। ২০১৫ সালে  বজ্রপাতে ১৮০ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল বলে পত্রপত্রিকায় খবর এসেছিল। কী ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতি ভাবলে গা শিউরে ওঠে। দুই দিনে যখন ৮১ জনের প্রাণহানি  ঘটে তখন আমি গ্রামে ছিলাম। এনিয়ে অনেক রকম কথা বলতে শুনেছি  তখন মানুষকে।আমাদের গ্রামীন জনপদে বজ্রপাতকে ঠাটাপড়া বা বাজপড়া বলা হয় অনেক এলাকায়। তবে যায়-ই বলা হোক এনিয়ে আতঙ্ক বাড়ছে মানুষের মনে। বৃষ্টিবাদল-ঝড়বাতাসের দিনে। গ্রামের মানুষ যারা মাঠে-ময়দানে  কাজেকামে অবস্থান করেন তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। মারাও পড়েন যেমন খবরে এসেছে। দেখা যায়  ঠাটাপড়া বা বাজপড়া এরকম দুটো ভয়ঙ্কর শব্দ সমাজে চলে এসেছে একটা অভিশাপ রূপে । এর থেকে বড় অভিশাপ আর কিছু হতে পারে না। যেমন ‘ও যেন ঠাটা পড়ে মরে’ বা ওর অমুক যেন ‘মাথায় বাজ পড়ে মরে’ এর চেয়ে বড় অভিশাপ আর হয় না। এখন অবশ্য মানুষ ওই অভিশাপ বা বদদোওয়া এসব আর তেমন আমলে নেয় না। বজ্রপাতে মানুষ মারা যাওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর ভয়াবহতার কথাও নতুন কিছু না। চোখের পলকে একটা সুস্থ-সবল মানুষ ঝলসে গিয়ে প্রাণ হারায় । ঝড়ঝঞ্ঝা জলোচ্ছাসে প্রলয় কাণ্ড ঘটতে পারে। বেশি ঘটাতে পারে ভূমিকম্প। কিন্তু এসবে মানুষের কিছু করণীয় নেই। বলা হচ্ছে বৈশ্বিক জলবায়ুর কারণে এগুলো বেড়ে গেছে। সেটা এখানে বিষয় না। বিষয় বজ্রপাত এবং বজ্রপাত নিয়ে লোকে কী বলে।শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে বজ্রপাতের আতঙ্ক কম। কারণ বহুতল ভবন বিনির্মাণে বজ্রপাত প্রতিরোধে এক ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। যেমন নির্মাণ কাজের শুরুতেই (ফাউন্ডেশনের আগেই) বোরিং করে একেবারে মাটির গভীরে নির্দিষ্ট কিছু মেটাল বসিয়ে দেয়া হয় এবং সেখান থেকে নির্দিষ্ট একটা বিশেষ তার ওপরে তুলে ভবনের আর্থিং করা হয়। এতে কাজ হয়। নাহলে আজকের দুনিয়ার চেহারা পাল্টে যেত। কারণ বাজ অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় পড়ে। ফাঁকা মাঠে একটা লোক দাঁড়িয়ে থাকলে সেখানে যদি বাজ পড়ে ওই লোকটার মাথায় পড়বে যেহেতু তার নিকটবর্তী তার থেকে উঁচু কিছু নেই। তাই বলা হয় এমন হলে একেবারে মাটিতে শুয়ে পড়তে হবে। আবার কোন গাছের একেবারে নিচে না দাঁড়িয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়াতে হবে। কেননা বাজ পড়লে ওই গাছটাতে পড়বে। এখানে আবার একটু কথা বলে, তাহলে ওই বড় বড় মহিরুহু বটবৃক্ষ-অশ্বত্থ উজাড় হয়ে যাওয়ার আগে ওদের ওপর তো বাজ পড়তে দেখা যায়নি। এখন লোকে বলছে সেই বিশাল বিশাল আকৃতির দিগন্তজোড়া বৃক্ষরাজি উজাড় হয়ে যাওয়ার কারণেই বজ্রপাতে প্রাণহানি বেড়ে গেছে। মনে করা হয় ওগুলোই হয়তো বজ্রপাত প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখত। এমন সব বৃক্ষরাজি বহুত ছিল আমরাই দেখেছি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে নদীর বাঁকে বাঁকে বিলের ধারে ধারে তারা ছিল যেন পাহারাদার। এলাকার ল্যান্ডমার্ক। আমাদের বিলের চার ধারে চারটা বিশাল আকৃতির বৃক্ষ ছিল। দেখে মনে হতো চারদিকে যেন চারটা মা গাছ দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে চোখের সামনে সব নিধন হয়ে গেল। নিধন  হয়ে গেল সেই যত্রতত্র থাকা তালগাছের সারি। দেখা গেছে ধারে কাছে তালগাছ থাকলে বজ্রপাত তার ওপরই ঘটেছে। মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। আমরাই দেখেছি ফাকা মাঠে যত্রতত্র ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে’ থেকেছে।  এখন সেই বড় বড় বট-অশ্বত্থ-ঝাউ-তাল ফুরিয়ে এলেও বেড়েছে সামাজিক বনায়ন যার ভেতর প্রধানত রয়েছে মেহগনি গাছ । আমাদের বৃহত্তর যশোর-খুলনা-কুষ্টিয়া এলাকায় এত পরিমাণে সামাজিক বনায়ন হয়েছে যে রাস্তার দুই ধারে সেই ধানক্ষেত-পাটখেত আর চোখে পড়ে না। মেহগনিগাছ দ্রুত বাড়ে। চাষবাসের ঝামেলা নেই। কয়েক বছর গেলেই একটা গাছের দাম হয়ে যায় হাজার হাজার টাকা। কাজেই চারদিকে এখন ওই মেহগনি গাছে ভরপুর। গ্রামবাসীই আবার বলছে এ গাছ নাকি মাটি থেকে পানি শোষণ করে বেশি। এমনিতেই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে গোটা দেশ—সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। আর যে বিষয়টা নিয়ে বলতে শোনা যায় তা হলো, এক সময় আমাদের দেশে মাঠে-ময়দানে বিল-খালে শিলাখণ্ড মাটিতে পোতা থাকতে দেখেছে মানুষ। আমিও দেখেছি। আমার বয়সের অনেকেই দেখে থাকবেন মনে করি। সেগুলো মাটি থেকে এক-দেড় হাত পরিমাণ উঁচু ছিল এবং প্রস্থে ছিল  মানান মতো। একবারের একটা ঘটনা বলি। আমরা ৫-৬ জন কিশোর-যুবক আনন্দে মেতে উঠেছিলাম বিলের মাঝে পানিতে। সেখানে ছিল এরকম একটা শিলাখন্ড। আমার দেখা অন্যগুলোর থেকে সেটা বেশ বড় ছিল। বিলের মাঝে বলে হয়তোবা আকারে বড় হয়ে থাকবে। সেটা ছিল বাঁকা হয়ে। সেখানে পানি ছিল আমাদের কোমর-বুক সমান হবে। কি খেয়াল হলো, একজন বলে উঠলো— ধরো দেখি ওটাকে সোজা করা যায় কি-না। শুরু হয়ে গেল দহরম মহরম। ২-৩ জন করে একেক বারে সেই কাদাপানিতে মাথা-মুখ ডুবিয়ে শুরু হলো কাজ।  কিন্তু না, কিছুতেই কিছু করা গেল না। এতে বোঝা যায় মাটির নিচেও তার অনেকখানি ছিল। যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলায় আমার বাড়ি। এটা ১৯৬৩-৬৪ সালের কথা।তারপর এক সময় সম্ভবত আশির দশকে কি তার একটু আগে-পরে হবে, শোনা গেল কারা না কারা ওইগুলো সব রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ঘটনা ঠিকই। তারপর দ্রুতই ওগুলো সারা দেশ থেকে উধাও হয়ে গেল। লোকমুখে শোনা গেল, ওগুলোর ভেতরে নাকি কোনো মূল্যবান ধাতব পদার্থ ছিল। এখন কিছু একটা যে ওর ভেতর ছিল তা বোধ হয় ধরে নেয়া যায়। তা না হলে দেখতে দেখতে ওগুলো এমন ভাবে উধাও হয়ে যাবে কেন। এখন গ্রামের কিছু মানুষ যাদের একটু বয়স হয়েছে তারা মনে করছেন ওগুলো সরিয়ে ফেলার কারণে বা না থাকার কারণে বজ্রপাতে হতাহতের পরিমাণ বেড়ে গেছে। কারণ তারা মনে করেন ওগুলোর ভেতরে এমন একটা কিছু ছিল যা বজ্রপাত টেনে বা শুষে নিত। তবে কেউ ভেতরের সেই জিনিসটা দেখেছে বলে শোনা যায়নি। সত্য-মিথ্যা এখানে বিষয় নয়। গুজবেও অনেক কিছু হয়। তবে ওই জিনিসটা যে বিভিন্ন স্থানে বসান ছিল এটা সত্য। সারাদেশ থেকে উধাও হয়ে গেল এটাও সত্য। তা বজ্রপাত থেকে  মানুষ বাঁচানোর উদ্দেশে কোন এক সময় ওগুলো বসান হোক আর জমির মৌজা-সীমানা নির্ধারণের জন্যই বসান হোক এখন সেগুলো নেই এটাও সত্য। গ্রামাঞ্চল থেকে সেই মহিরুহু বৃক্ষরাজি নিধন হয়ে গেছে এটাও সত্য।এঅবস্থায় সাধারণ মানুষের এরকম দুটো বিষয়কে সামনে নিয়ে আসার যুক্তি জানি না কেউ উড়িয়ে দিতে পারেন কি না।অন্যদিকে শহরের মানুষের জীবন রক্ষার্থে ভবনগুলোর সাথে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফল হওয়া গেছে তা মাঠে-ময়দানে কোনোভাবে যুক্ত করে সাধারণ মানুষের প্রাণ রক্ষার্থে কেউ এগিয়ে আসবেন কি না সেটাও দেখার বিষয়।[লেখক: প্রাবন্ধিক]

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি

বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের কথা ভাবুন— সিলেটের হাওরাঞ্চল কিংবা বরেন্দ্রের মাঠে ঘেরা কোনো জনপদ। সেখানকার কৃষক যখন বুকের ব্যথায় কাতর হন, তখন তার প্রথম গন্তব্য সরকারি হাসপাতাল নয়— স্থানীয় কবিরাজ বা হাকিম। এটা কেবল দারিদ্র্যের গল্প নয়, এটা বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং প্রাপ্যতার গল্প। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ মানুষ এখনও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। আর ২০২২ সালের বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশের মাত্র ৬১ শতাংশ মানুষ আধুনিক চিকিৎসার আওতায় আসতে পারেন, যা ১৬ কোটি মানুষের জন্য অপর্যাপ্ত।এই বাস্তবতায় ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন বা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কোনো পূর্ণাঙ্গ রূপ হতে পারে না। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই শক্তিকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে মূলধারার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একীভূত করতে পারবো, নাকি এই বিশাল সম্পদকে অবহেলায় নষ্ট হতে দেবো?বর্তমান চিত্র: দুই জগতের মাঝে এক জাতিবাংলাদেশে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের ধারাটি বহুস্তরীয়। ইউনানি, আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি এবং লোকচিকিৎসা — এই পাঁচটি ধারা যুগ যুগ ধরে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরপরই সরকার ইউনানি ও আয়ুর্বেদ চিকিৎসাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় এবং ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক সিস্টেম অব মেডিসিন বোর্ড গঠন করে।বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক সিস্টেম অব মেডিসিন বোর্ডের তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি চিকিৎসকের সংখ্যা ১২,০০০-এরও বেশি। এর পাশাপাশি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪০০-এরও অধিক বিকল্প চিকিৎসক কর্মরত আছেন। দেশে সরকার অনুমোদিত ১৫টি প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর প্রায় ৪০০ জন ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন প্র্যাকটিশনার তৈরি করছে। ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ২০৪টি আয়ুর্বেদিক এবং ২৮৫টি ইউনানি কোম্পানি মিলে ৭,০০০-এরও বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাম্প্রতিক (২০২৫) গবেষণা জামালপুরের দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের ওপর পরিচালিত হয়ে দেখিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী রোগীদের মধ্যে ৮.৩ শতাংশ শুধুমাত্র ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন ব্যবহার করেন এবং আরও ৫.২ শতাংশ আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন গ্রহণ করেন। গবেষণাটি আরও প্রকাশ করে যে, গ্রামীণ, স্বল্প আয়ের এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠী ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের প্রতি বেশি আগ্রহী।সংকটের মুখ: যখন বিকল্প পথই একমাত্র পথবাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ একটি গভীর দ্বন্দ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের ভার দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী রোগসমূহ মোট রোগের বোঝার প্রায় ৬১ শতাংশ এবং বার্ষিক মৃত্যুর ৫৪ শতাংশের কারণ। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগে অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে (এসডিজি ৩.৪)।অন্যদিকে জনসংখ্যার বয়স কাঠামো দ্রুত বদলাচ্ছে। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ ৬০ বছরের বেশি বয়সী, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ১১.৫ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ২১.৫ শতাংশে উন্নীত হবে। এই বার্ধক্যপ্রবণ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার চাপ সামাল দিতে শুধু আধুনিক হাসপাতাল যথেষ্ট নয়।ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার কারণ হিসেবে গবেষকরা এর কার্যকারিতা, সহজলভ্যতা, সাশ্রয়ী মূল্য এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কম ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন। এই বাস্তবতায় ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, সহযোগী হিসেবে দেখার সময় এসেছে।ভবিষ্যতের পথ: সমন্বয়ের পাঁচটি স্তম্ভপ্রথমত, জাতীয় নীতি ও আইনি কাঠামো সংহত করা। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতি দরকার যা ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূলধারায় নিয়ে আসবে, প্র্যাকটিশনারদের নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করবে এবং ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিমালা প্রণয়ন করবে।দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ। বাংলাদেশে ব্যবহৃত ওষুধি গাছপালার গবেষণায় ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টিআলসার গুণাবলি প্রমাণিত হয়েছে। এই গবেষণাগুলোকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নিয়ে যাওয়া এবং প্রমাণিত পদ্ধতিগুলোকে মানসম্পন্ন প্রোটোকলে পরিণত করা এখন সময়ের দাবি।তৃতীয়ত, সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা মডেল তৈরি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে জেলা হাসপাতাল — সব স্তরে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন প্র্যাকটিশনার ও আধুনিক চিকিৎসকদের পাশাপাশি কাজ করার একটি মডেল গড়ে তোলা যায়। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা মূলধারার চিকিৎসার পাশাপাশি পরিপূরক থেরাপি হিসেবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, তবে গুরুতর রোগে এটি আধুনিক চিকিৎসার বিকল্প হওয়া উচিত নয়।চতুর্থত, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ। ঐতিহ্যবাহী নিরাময়কারীদের জনসচেতনতা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা এবং সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার আলোকে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সামগ্রিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা প্রয়োজন।পঞ্চমত, ফার্মাকোভিজিল্যান্স ও মান নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে বহু অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান মানহীন ট্র্যাডিশনাল ওষুধ বাজারে ছাড়ছে। রোগীদের যেকোনো ওষুধ গ্রহণের আগে তা নিবন্ধিত কিনা যাচাই করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নজরদারি আরও শক্তিশালী করা অপরিহার্য।বৈশ্বিক উদাহরণ থেকে শিক্ষাচীন, ভারত এবং শ্রীলংকা ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একীভূত করে কার্যকর ফল পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে সরকারি হাসপাতালে বিকল্প চিকিৎসকদের নিয়োগ দেয়া শুরু করেছে এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতির জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। এটি সঠিক পদক্ষেপের সূচনা, কিন্তু পরিকল্পনা, গবেষণায় বরাদ্দ এবং নীতিমালার সমন্বয় ছাড়া এই উদ্যোগ টেকসই হবে না।বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার আরেক অদ্ভুত বাস্তবতা আছে —একই রোগী সকালে আধুনিক চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিয়ে বাড়ি ফেরেন, আর সন্ধ্যায় ভেষজ বা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার দ্বারস্থ হন। এই দ্বৈততা কোনো বিভ্রান্তি নয়; বরং এটি আমাদের স্বাস্থ্য সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতার প্রতিফলন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তাদেও ট্রেডিশনাল মেডিসিন স্ট্র্যাটিজি ২০১৯-২০২৫ -এ স্পষ্টভাবে বলেছে, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্যের একটি কার্যকর অংশ হতে পারে—যদি তা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়িত হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আয়ুর্বেদ, ইউনানি ও হোমিওপ্যাথির অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের সময় এখনই।বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সীমিত সম্পদে অসীম চাহিদা মেটানো। শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া নয়, বরং শিকড়কে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। ঐতিহ্যের জ্ঞানকে বিজ্ঞানের আলোয় পরীক্ষা করে, নিয়মের আওতায় এনে, আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পাশে দাঁড় করালেই কেবল একটি পূর্ণাঙ্গ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। কারণ সত্যিকারের সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা তখনই সম্ভব, যখন কোনো মানুষ— প্রত্যন্ত হাওর থেকে শুরু করে শহরের বস্তি পর্যন্ত— চিকিৎসার বাইরে থাকবেন না।[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]

ভিডিও আরও দেখুন

মেসির গোল-অ্যাসিস্টেও অবিশ্বাস্য হার, ৩-০ তে এগিয়ে থেকেও ডুবল মায়ামি

নিজেদের নতুন স্টেডিয়ামে প্রথম জয়ের স্বপ্ন যখন হাতের মুঠোয়, ঠিক তখনই অবিশ্বাস্য এক দুঃস্বপ্নের সাক্ষী হলো ইন্টার মায়ামি। ম্যাচের ৩৩ মিনিটের মধ্যে ৩-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ৪-৩ ব্যবধানে অরল্যান্ডো সিটির কাছে হেরে মাঠ ছেড়েছে লিওনেল মেসির দল।ইন্টার মায়ামির নতুন ‘নু স্টেডিয়ামে’ আজ শুরুটা ছিল রূপকথার মতো। ম্যাচের মাত্র ৪ মিনিটেই ইয়ান ফ্রের গোলে লিড নেয় স্বাগতিকরা। এরপর শুরু হয় ‘মেসি ম্যাজিক’। লিওনেল মেসির দুর্দান্ত একটি গোল এবং একটি অ্যাসিস্টে ৩৩ মিনিটের মধ্যেই ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় মায়ামি। গ্যালারিতে তখন নতুন স্টেডিয়ামে প্রথম জয়ের উৎসবের আমেজ।বিরতির ঠিক আগে ৩৯ মিনিটে মার্টিন ওহেদার গোলে ব্যবধান ৩-১ করে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দেয় অরল্যান্ডো সিটি। দ্বিতীয়ার্ধে যেন অন্য এক রুদ্রমূর্তি ধারণ করে তারা। ৬৮ মিনিট: মার্টিন ওহেদা নিজের দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান ৩-২ এ নামিয়ে আনেন। ৭৮ মিনিট: পেনাল্টি থেকে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে ম্যাচে সমতা (৩-৩) ফেরান এই আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার। অতিরিক্ত সময়: ম্যাচের শেষ মুহূর্তে টাইরিস স্পাইসারের গোলে ৪-৩ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে অরল্যান্ডো। মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) ইতিহাসে ৩-০ গোলে পিছিয়ে থেকে জয় পাওয়ার ঘটনা এটি মাত্র তৃতীয়। এর আগে ২০১৭ সালে সিয়াটল সাউন্ডার্স এবং ২০১৮ সালে এলএ গ্যালাক্সি এই কীর্তি গড়েছিল।এই হারের ফলে ইন্টার মায়ামির টানা ১১ ম্যাচের অপরাজিত যাত্রার অবসান ঘটল। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত অর্জনে উজ্জ্বল মেসি মায়ামির জার্সিতে নিজের ১০০তম ম্যাচে ৮৬তম গোল পূর্ণ করার মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।ম্যাচ শেষে মায়ামি ডিফেন্ডার ইয়ান ফ্রে বলেন, "আমরা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছি। ৩-০ তে এগিয়ে থাকার পর এমন ফলাফল কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।" নতুন স্টেডিয়ামে টানা চার ম্যাচ খেলেও জয়ের দেখা পেল না ইন্টার মায়ামি। বিপরীতে, শেষ ১৫ ম্যাচে মাত্র দুই জয় পাওয়া অরল্যান্ডো সিটির জন্য এই জয়টি এক বিশাল আত্মবিশ্বাসের রসদ হিসেবে কাজ করবে।

মেসির গোল-অ্যাসিস্টেও অবিশ্বাস্য হার, ৩-০ তে এগিয়ে থেকেও ডুবল মায়ামি
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৪৯ জন