সংবাদ
ঢাকায় ২০০ চেকপোস্টে তৎপর পুলিশ, গ্রেপ্তার ১৭৯

ঢাকায় ২০০ চেকপোস্টে তৎপর পুলিশ, গ্রেপ্তার ১৭৯

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শুক্রবার ককটেল বিস্ফোরণ এবং কাফরুল থানার সামনে ফাঁকা বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথ এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোয় চেকপোস্ট বসিয়ে সন্দেহভাজনদের তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পথচারীদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি সঙ্গে থাকা ব্যাগ ও মোবাইল ফোন তল্লাশি করা হচ্ছে।ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, “নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ২০০টিরও বেশি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।”শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত রাজধানীর একাধিক স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ও ট্রাফিক পুলিশ বক্সের কাছে পরপর পাঁচটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মো. ইবাদুর রহমান (২৬) নামের এক অটোরিকশাচালক আহত হন। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।এরপর মগবাজার চৌরাস্তা, মিরপুরের কাফরুল, মহাখালী, আগারগাঁও, মালিবাগ, পুরান ঢাকার বাবুবাজার, গুলিস্তান ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। কাফরুলে রাত ১০টার দিকে থেমে থাকা একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারীরা। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট কাজ করে।এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক বা শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।এর আগে গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশান এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মিছিল করেন। মিছিলটি ঠেকাতে গেলে পুলিশের দিকে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। এ ঘটনায় গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেন এবং গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকে প্রত্যাহার করা হয়।ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী জানান, গুলশানের ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৭৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
১২ মিনিট আগে

মতামতমতামত

আকাশ যখন স্কুলের দরজা বন্ধ করে দেয়

বাংলাদেশের কোনো গ্রামে বন্যার পানি যখন স্কুলের গেট ছাড়িয়ে উপরে উঠতে থাকে, তখন সেখানে এক বিশেষ নিস্তব্ধতা নেমে আসে। পাঠদান বন্ধ হয়ে যায় এবং শিশুরা তাদের পরিবারের সাথে উঁচু কোনো স্থানে আশ্রয় নেয়। দুর্যোগ মোকাবিলার হিসাব-নিকাশের এক পর্যায়ে শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত স্কুল ভবনটি নীরবে আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ দেশের বর্ষাকাল প্রত্যক্ষ করা মানুষের কাছে এই দৃশ্যটি অত্যন্ত পরিচিত; তবে ইউনিসেফের নতুন এক বিশ্লেষণে বিষয়টিকে এক চমকপ্রদ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়েছে। এর পরিসংখ্যানগুলো কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, বরং নীতিনির্ধারকদেরও গভীর ভাবনায় ফেলার মতো।“লার্নিং ইন্টারাপ্টেড: গ্লোবাল স্ন্যাপশট অফ ক্লাইমেট-রিলেটেড স্কুল ডিসরাপশনস ইন ২০২৫” শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধুমাত্র গত বছরেই বিশ্বজুড়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের অন্তত ১৭ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা জলবায়ু-জনিত দুর্যোগের কারণে ব্যাহত হয়েছে। ১০৬টি দেশ বা অঞ্চলের স্কুলগুলো এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর মধ্যে ৪০টি দেশে বছরের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার এমন বিঘ্ন ঘটেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছরই এই সংকটের মুখোমুখি হতে হয় এবং তথ্য-উপাত্ত বলছে যে, এই সংকট ক্রমশ আরও তীব্র হচ্ছে।২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রতি দশজন শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্তত একজনের পড়াশোনা জলবায়ু-জনিত দুর্যোগের কারণে ব্যাহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ কোটি ১০ লাখ শিশুর মধ্যে ৭৫ শতাংশই বাস করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে—অর্থাৎ সেই সব দেশে, যারা এই সংকট সৃষ্টিকারী নিঃসরণের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী এবং যাদের এই সংকটের প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতাও সবচেয়ে কম। জলবায়ু বিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মৌলিক অবিচারটিকেই এখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইউনিসেফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই বিঘ্নের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের আজীবন আয়ের ক্ষেত্রে অন্তত ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর ক্ষেত্রে গড়ে আঠারো দিন স্কুল বন্ধ থাকা এবং পাঠদানের সময় নষ্ট হওয়া ও ভবিষ্যৎ আয় কমে যাওয়ার সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই এই হিসাব করা হয়েছে।বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটানোর ক্ষেত্রে ঝড় ছিল সবচেয়ে বড় দুর্যোগ; এতে আনুমানিক ১০ কোটি ৯০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পরেই রয়েছে বন্যা (৭ কোটি শিক্ষার্থী) এবং তাপপ্রবাহ (অন্তত দশটি দেশে প্রায় ৫ কোটি শিশু)। বিশ্বব্যাপী আগস্ট মাসটি ছিল সবচেয়ে বিপর্যয়কর; মূলত বন্যার কারণেই ওই মাসে ২ কোটি ৮০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, অক্টোবর মাসে দক্ষিণ এশিয়ায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় 'মন্থা'র প্রভাবে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে হারিকেন 'মেলিসা'র কারণে ৩০ লাখের বেশি শিশু শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকতে বাধ্য হয়। ২০২৫ সালে অন্তত এগারোটি দেশে দেশজুড়ে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে ১১ লাখ ২৫ হাজার ৭২৬ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বন্যাকে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই সংখ্যাটি একটি রক্ষণশীল হিসাব। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানেও আগস্ট মাসে মৌসুমি বন্যার কারণে ২ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে স্কুলে ফিরতে পারেনি। একইভাবে নাইজারে বন্যার কারণে ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর স্কুল শুরু হতে দুই সপ্তাহ দেরি হয়েছে।বিশ্বজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশকে সরাসরি স্কুল বন্ধের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে; অন্যদিকে ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে ফিরতে বিলম্বের শিকার হয়েছে কারণ তাদের স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল অথবা সেগুলোকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। স্কুলে যাওয়ার রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাওয়া কিংবা শ্রেণিকক্ষে বাস্তুচ্যুত পরিবার আশ্রয় নেওয়ায় কোনো শিশু যদিকয়েক সপ্তাহ পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে পানি সরে যাওয়ার পর সে আগের অবস্থান থেকে পড়াশোনা শুরু করতে পারে না। সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার এই ঘাটতি বাড়তেই থাকে। যারা আগে থেকেই প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে—যেমন রক্ষণশীল গ্রামীণ পরিবারের মেয়েশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং অত্যন্তদরিদ্র পরিবারের সন্তান—তাদের ক্ষেত্রে মাত্র একটি শিক্ষাবর্ষের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়া মানেই হতে পারে শিক্ষা থেকে চিরতরে ছিটকে পড়া। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়া শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা ২.৫ শতাংশ কমে যায় এবং এতে মেয়েশিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।বাংলাদেশে স্কুল ভবনগুলো প্রায়শই কোনো এলাকার সবচেয়ে মজবুত কাঠামো হওয়ায় এগুলো একই সাথে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিঃসন্দেহে এই ব্যবস্থা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন বাঁচিয়ে আসছে, তবে শিক্ষার ধারাবাহিকতার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। যেমন জ্যামাইকায় হারিকেন মেলিসার সাত মাস পরেও শত শত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় মেরামত করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে অনেক শিক্ষার্থী সপ্তাহে মাত্র দুই বা তিন দিন ক্লাসে অংশ নিতে পেরেছে। এর সমাধান স্কুলগুলোর সুরক্ষামূলক ভূমিকা কেড়ে নেওয়া নয়, বরং শ্রেণিকক্ষ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও বিশেষায়িত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে জরুরি ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা; যাতে ঘূর্ণিঝড়ের সময় জীবন রক্ষা এবং শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।আরেকটি নীরব হুমকি হলো তীব্র তাপপ্রবাহ। ২০২৫ সালে অন্তত দশটি দেশের প্রায় ৫ কোটি শিশুর পড়াশোনা তাপপ্রবাহের কারণে ব্যাহত হয়েছে; যার মধ্যে দক্ষিণ সুদান টানা দ্বিতীয় বছরের মতো দেশজুড়ে স্কুল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি বেলজিয়াম, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডস মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ শিশু তাপমাত্রাজনিত কারণে পরিবর্তিত সময়সূচির মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশেও বর্ষা-পূর্ববর্তী তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাঝেমধ্যেই স্কুলের সময়সীমা কমিয়ে আনতে বা ক্লাস স্থগিত করতে হচ্ছে। অত্যধিক তাপ প্রারম্ভিক শিশু-বিকাশকে ব্যাহত করে এবং সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতার মতো মৌলিক ভিত্তি দুর্বল করে দেয়, যা তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।বিশ্বের সবচেয়ে তীব্র মানবিক সংকটের সম্মুখীন ২১টি দেশের মধ্যে ১৯টি দেশই ২০২৫ সালে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের শিকার হয়েছে। ইউনিসেফের সম্পূরক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির মতো পরিস্থিতির কারণে এসব এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রায় ৯০ লাখ বেশি হতে পারে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবে বাংলাদেশকে এই সতর্কবার্তাটি বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানটি হলো—বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সংক্রান্ত মোট অর্থায়নের মাত্র ১.৫ শতাংশ শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের ফলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আনুমানিক আরও ৬০ লাখ শিশু স্কুল-বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যাদের এক-তৃতীয়াংশই মানবিক সংকটের শিকার। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ফোরামগুলোতে জলবায়ু অভিযোজন এবং ‘ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি’ সংক্রান্ত অর্থায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষাকে যেন কেবল মানবিক সহায়তার সাথে জুড়ে দেওয়া কোনো গৌণ বিষয় না ভেবে একটি ‘অগ্রাধিকার খাত’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—সেই দাবি বাংলাদেশের জোরালোভাবে তোলা উচিত।জলবায়ু-সহনশীল স্কুল অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা নীতিতে দুর্যোগ প্রস্তুতির বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং জলবায়ু বিষয়ক পরিকল্পনায় তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এর মধ্যে রয়েছে দেশের প্রথম ‘জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষা কাঠামো’ প্রণয়নে ইউনিসেফের সহায়তাও। এখনকার কাজ হলো সহনশীলতাকে শ্রেণিকক্ষের গভীরে পৌঁছে দেওয়া, যাতে পরবর্তী কোনো দুর্যোগের কারণে দেশের শিক্ষার্থীদের কেবল কয়েক দিনের স্কুলই বন্ধ না হয়, বরং কোনো শিশুর ভবিষ্যতের মূল্যবান বছরগুলো যেন হারিয়ে না যায়।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।]

রিয়া সরেনের মৃত্যু যে প্রশ্নগুলো রেখে গেল

বাংলাদেশের মানচিত্রে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ একটি সুপরিচিত শিল্পাঞ্চল। কলকারখানার ধোঁয়া, যন্ত্রের গর্জন আর হাজার হাজার শ্রমিকের ব্যস্ততা এই অঞ্চলের চেনা অবয়ব। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হতদরিদ্র মানুষ দুমুঠো ভাতের আশায় এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এই শিল্পনগরীতে ছুটে আসেন। তাদেরই একজন ছিলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার কুশদহ ইউনিয়নের বাঘদাবডা গ্রামের সাঁওতাল পরিবারের তরুণী রিয়া সরেন। তার বয়স ১৯ বছর বলে উল্লেখ করা হলেও কোনো কোনো তথ্যে বয়স ১৪ বছর বলা হয়েছে। বিধবা মায়ের একমাত্র ভরসা রিয়া প্রায় সাত-আট মাস আগে রূপগঞ্জের মুরাপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালি এলাকায় এসে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। সেখানে স্থানীয় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এসিআই সল্ট লিমিটেডে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু গত ৭ সেপ্টেম্বর সকালে সেই ভাড়া বাসা থেকেই উদ্ধার করা হয় তার নিথর দেহ।রিয়ার আকস্মিক ও সন্দেহজনক মৃত্যু আমাদের সামনে কিছু কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এটি কি আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে রয়েছে হত্যাকাণ্ড? পরবাসে কাজ করতে আসা প্রান্তিক আদিবাসী নারীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।রিয়া সরেনের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রথম থেকেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঘটনার দিন সকালে তার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের পর রূপগঞ্জ থানা পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করে। পুলিশের বক্তব্য ছিল, আলামত দেখে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলেই মনে হয়েছে। তবে রিয়ার পরিবার, স্বজন ও স্থানীয় আদিবাসী অধিকারকর্মীদের দাবি ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সময় রিয়ার মা রিবিকা মুরমু দিনাজপুরের গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। রিয়া বাসায় একা ছিলেন।লাশ উদ্ধারের পর রিয়ার শরীর ও ঘটনাস্থলের কিছু আলামতে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে স্বজনদের দাবি। তাদের অভিযোগ, মৃত্যুর আগে রিয়ার কর্মস্থল বা আবাসন এলাকায় এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকতে পারে, যা তাকে চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আবার তাকে শ্বাসরোধ করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলেও তারা সন্দেহ করছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনার কয়েক দিন পর রিয়ার পরিবার রূপগঞ্জ থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি বলে গণমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগে তারা হত্যা মামলা নিতে পারছে না। এই অবস্থান ও মামলার বিষয়ে অনিশ্চয়তা নিহতের পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস তৈরি করেছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফল পাওয়ার আগেই ঘটনাটিকে হত্যা বা আত্মহত্যা হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা উচিত নয়।রিয়া সরেনের মৃত্যুর ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কাজ করতে আসা আদিবাসী, বিশেষ করে সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, মালপাহাড়িয়া, কোল, কোডা, রাজোয়াড়, তুরী ও পাহান নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে জীবিকার তাগিদে আসা এসব মানুষ ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তিক। নতুন পরিবেশে তাদের কয়েকটি বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।প্রথমত, ভৌগোলিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতি ছেড়ে একজন আদিবাসী নারী রূপগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলে এলে তাকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে অপরিচিতি এবং পরিচিত সামাজিক সহায়তার অভাব তাকে অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্র ও আবাসনে হয়রানির ঝুঁকি। প্রান্তিক নারী শ্রমিকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কর্মক্ষেত্র, আবাসন কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে কেউ হয়রানি বা নির্যাতন করতে পারে। সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক হওয়ার কারণে অনেকে এসব ঘটনার প্রতিবাদ বা অভিযোগ জানাতেও সংকোচ বোধ করেন। ফলে কোনো কোনো ঘটনা আড়ালেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।তৃতীয়ত, আইনি সহায়তার সীমাবদ্ধতা। কোনো আদিবাসী নারী অন্যায়ের শিকার হলে ভাষাগত সমস্যা, আইনি জ্ঞানের অভাব, আর্থিক সংকট এবং থানা-পুলিশের কাছে যাওয়ার ভয় তার অভিযোগ জানানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। রিয়া সরেনের পরিবারের ক্ষেত্রেও দূর দিনাজপুর থেকে এসে নারায়ণগঞ্জে আইনি লড়াই চালানো কঠিন। তাই দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য সহজলভ্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।রিয়া সরেনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং সাঁওতালসহ দেশের সব প্রান্তিক শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, প্রশাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। রিয়া সরেনের মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপের বাইরে থেকে তদন্ত করতে হবে। ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য এবং রিয়ার কর্মস্থল ও আবাসনসংক্রান্ত তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করতে হবে।পরিবারের অভিযোগের আইনগত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। রিয়ার পরিবার যদি হত্যার অভিযোগ করে থাকে, তবে প্রচলিত আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজন হলে দরিদ্র পরিবারটিকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিতে হবে। কোনো পরিবারের আর্থিক অক্ষমতা যেন ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা না হয়।শিল্পাঞ্চলে আদিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। রূপগঞ্জসহ দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কতজন আদিবাসী শ্রমিক কাজ করছেন, তাদের কর্মস্থল ও আবাসনের অবস্থা কী—এসব তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আবাসন এলাকায় নিরাপত্তা, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে।মানবাধিকার ও আদিবাসী সংগঠনগুলোর নজরদারি বাড়াতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সংশ্লিষ্ট আদিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো ঘটনাটির ওপর নজর রাখতে পারে। রিয়ার সহকর্মী, প্রতিবেশী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার প্রকৃত তথ্য সামনে আনার ক্ষেত্রেও নাগরিক সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।কর্মক্ষেত্রে কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। এসিআই সল্ট লিমিটেডসহ সব কারখানায় নারী ও প্রান্তিক শ্রমিকদের জন্য কার্যকর অভিযোগ সেল থাকা প্রয়োজন। সেখানে শ্রমিকরা যাতে নিরাপদে হয়রানি, নির্যাতন বা বৈষম্যের অভিযোগ জানাতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের প্রতিকারও হতে হবে স্বচ্ছ ও দ্রুত।সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় তাদের পূর্বপুরুষেরা সংগ্রাম করেছেন। অথচ আজও তাদেরই একজন তরুণীকে জীবিকার সন্ধানে নিজ এলাকা ছেড়ে এসে এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে—এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।রিয়া সরেনের মৃত্যু হত্যা হয়ে থাকলে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি এটি আত্মহত্যা হয়ে থাকে, তাহলে কী কারণে একজন তরুণী এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন, তার ওপর কোনো চাপ বা প্ররোচনা ছিল কি না—সেসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ আত্মহত্যার ঘটনাও অনেক সময় বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।আমরা উন্নত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। সেই বাংলাদেশে প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনও সমান মূল্যবান হতে হবে। রূপগঞ্জের মঙ্গলখালির সেই অন্ধকার ঘরের রহস্য উদঘাটন করে রিয়া সরেনের পরিবারকে ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। কোনো শ্রমিকের জীবন যেন তার দারিদ্র‍্য, জাতিগত পরিচয় বা ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে কম মূল্যবান হয়ে না পড়ে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

সমান সুযোগের অর্থনীতি চাই

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার কঠিন পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতিকে উত্তরণের চেষ্টা করছে এবং এ কাজে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের কথাও বলেছেন। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণতন্ত্র শুধু রাজনৈতিক অধিকার ও নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সমতা, সামাজিক ন্যায় এবং সুযোগের সমতাও জড়িত।অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা। এর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানি ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক সেবায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভূমি, ঋণ, আর্থিক সম্পদ, কর্মসংস্থান ও তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগেও বৈষম্য কমাতে হবে। নাগরিকদের জীবনে প্রভাব ফেলে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ যথেষ্ট নয়; দরিদ্র, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরও নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পেতে হবে।বাংলাদেশের বাস্তবতায় অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের প্রয়োজন আরও বেশি। অঞ্চল, গ্রাম-শহর, নারী-পুরুষ এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণির মধ্যে এখনো বড় বৈষম্য রয়েছে। দারিদ্র‍্যরে হারও বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্পদ ও আয়ের বণ্টনে বৈষম্য প্রকট। মূল লেখায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ, বিপরীতে নিচের ৫০ শতাংশের হাতে মাত্র ৪ শতাংশ। উচ্চ ও নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে শিশু মৃত্যুর হারেও বড় পার্থক্য রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগেও একই ধরনের বৈষম্য দেখা যায়।নারীর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় অনেক কম। ব্যবস্থাপনা পর্যায় ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ সীমিত। এর সঙ্গে রয়েছে কর্মক্ষেত্র ও ঘরে নানা ধরনের হয়রানি ও সহিংসতা। ফলে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে নারী-পুরুষের সুযোগের বৈষম্য কমানো জরুরি।তবে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন। ব্যাংক খাত, আমদানি-রপ্তানি এবং বড় প্রকল্পে গুটিকয়েক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাজারে প্রতিযোগিতা সীমিত হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়েন। রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ব্যবহার করে ঋণ নেওয়া, ঋণখেলাপি হওয়া কিংবা অর্থ পাচারের প্রবণতা থাকলে তা অর্থনীতিতে বৈষম্য আরও বাড়ায়। তাই ব্যাংক খাতের সংস্কার, সুশাসন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা জরুরি।প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির জন্য সামাজিক সহায়তা ও বিভিন্ন কার্ডভিত্তিক কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এসব কর্মসূচির পাশাপাশি মূল অর্থনৈতিক কাঠামোতেও সংস্কার প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত করা, পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা নিশ্চিত করা দরকার। সরকারি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়ানো যেতে পারে।অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের জন্য একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানব্যবস্থা অপরিহার্য। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছতা ছাড়া বৈষম্য কমানোর নীতি কার্যকর করা কঠিন। দরিদ্র, নারী, প্রতিবন্ধী, প্রবীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করে নীতি প্রণয়ন করতে হবে। অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে মানুষের সক্ষমতা ও মর্যাদাকে।রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পাশাপাশি অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের সুফল যদি সমাজের একটি সীমিত অংশের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারে না। সরকারের সামনে তাই শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর নয়, সুযোগ ও সম্পদের বৈষম্য কমানোরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সুস্পষ্ট লক্ষ্য, কার্যকর সংস্কার, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ বাস্তব রূপ পেতে পারে।[লেখক: সাবেক ব্যাংকার]

রম্যগদ্য: “দাড়ি না দাঁড়ি?”

হেঁ হেঁ হেঁ, দাড়ি না দাঁড়ি। দাড়ির লগে চন্দ্রবিন্দু দি আন্নেনি ক্রুসেড লাগাইবার চান! বাংলাদেশে আন্নে আর ক্রুসেড লাগাইতে পারবেন না। বাঙালি অহন বহুত সেয়ানা। হ্যাতারা প্রফিট না পাইলে ক্রুসেড কোইরতো ন’ বুইচেননি।নাহ্ তোর মতো উড়ঝুড়ে বাঙাল নিয়ে আর পারা যাবে না। আমি বলছি শব্দটা “দাড়ি না দাঁড়ি” আর তুই দাড়ির উপর ক্রুসেড মানে ধর্মযুদ্ধ শুরু করলি।আন্নে জানেন না মিয়া। ইউরোপে দুই খ্রিষ্টান ক্যাথোলিক আর প্রটেষ্টানরা ছত্রিশ বছর ক্রুসেড কোইরা তারপর ১৬৪০ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির মাইধ্যমে এই ক্রুসেড বন্ধ কোরছে। আপনে আবার দাড়ি না দাঁড়ি লই মাইরপিট করবেন নি?আরে বাঙাল, আমি বাঙলা একাডেমির এক প্রখ্যাত লেখকের লেখার পৃষ্ঠা দশে দেখলাম যে, “চুলগুলো উশকোখুশকো, দাঁড়ি কাটেননি কতদিন কে জানে।”তো। আন্নের অসুবিধা কী? হ্যাতারা বাঙলা একাডেমি। হ্যাতারা কোনায়  হ্রস্ব “”ি দিবো কোনায় র্দীঘ “ী” দিবো, এইসব আন্নেরে কোইবোনি? হ্যাতেগো প্রতিবছরের সরকারে থোক বরাদ্দ কত টিয়া দেয়, হ্যেইডা আন্নে জানেননি?মানে কী?   হ্রস্ব “”ি, র্দীঘ“ী” এর সাথে থোক বরাদ্দের কী সম্পর্ক!মিয়া বোজেন না! আন্নেতো মিয়া বাপের নাম বেঁচি খান। এক “মাছের রাজা ইলিশ আর বাত্তির রাজা ফিলিপস” বানাই নিজেরে ইয়াবড়া চুয়ালওয়ালা ইন্টেলেকচ্যুয়াল ভাবেন! আরে মিয়া ইন্টেলেকচ্যুয়াল হোইলো বাঙলা একাডেমির চৌকোস অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ ইন্টেলেকচ্যুয়ালস, যারা কেবল ফোকলোরের ফান্ড ব্যাবহার করি মোঘল সুলতানের মতুন জীবন যাপন করের। উঁহ্, খালি মোঘল সুলতানের কথা বলছিস, আর তোমার প্রিয় স্বয়ং বজ্জাত স্যারের কথা বলবি না, যিনি মাল খেয়ে মৃত মানুষ ছেড়ে জীবিত মানুষের রচনাবলী বের করেছে। কিন্তু ২৭ বছর ধরে বাংলাদেশের অন্যতম কথাশিল্পী শওকত ওসমানের রচনাবলী ছাপেননি!এইডা আবার কী কন, আমি নিজে দেখছি বাঙলা একাডেমির মহাপরিচালক, অধ্যাপক মোহাম্মদ আযম স্যার নিজে লিখিত আদেশ দিছেন যে কথাশিল্পী শওকত ওসমান স্যারের জেষ্ঠপুত্র বুলবন ওসমানের সম্পাদনায় কথাশিল্পী শওকত ওসমানের রচনাবলী ছাপতে। উপপরিচালক ড. এ. কে. এম. কুতুবউদ্দিন স্যার অলরেডি মিটিং করি কাম আগার।আরে ভাই সে তো এই জুম্মা জুম্মা সাত দিনের ব্যাপার, তুই বিগত ২৭ বছরের কথা ভুলে গেলি।হেই কথা কোইলে তো, আন্নের ফ্যাসিস্ট সরকাররে জিগান। আইঁ কোই কী, বেটার লেট দ্যান নেভার। আকামে কথা বাড়ায়েন না। বাঙলা একাডেমির মহা পরিচালক, অধ্যাপক মোহাম্মদ আযম স্যাররে ধন্যবাদদি, রচনাবলীর কাজটা শেষ করেন।ঠিক আছে বেটার লেট দ্যান নেভার। কিন্তু তাই বলে বাঙলা একাডেমি, দাড়ি, মানে গন্ডলোম অর্থাৎ শ্মশ্রুকে দাঁড়ি বললে তাও মেনে নিতে হবে? দাঁড়ি মানে পূর্ণচ্ছেদ সূচক দন্ডায়মান রেখা। এখন দাড়ি আর দাঁড়িকে এককরে একাকার করবো?না না, হ্যেইডা আমি কমু না। আন্নে দাড়ি আর দাঁড়িকে একাকার কইরেন না। আন্নে দাড়ি মানে গন্ডলোম অর্থাৎ শ্মশ্রুকে শ্মশ্রুই কন, আর দাঁড়িরে পূর্ণচ্ছেদ সূচক দন্ডায়মান রেখাই কন। আপনে এই দুইটারে এক কোইরেন না।কিন্তু ভাইরে তুই যে এক করতে বারণ করছিস অথচ কলকাতায়, মুসলিম পুলিশ কর্মীরা দাড়ি রাখতে পারবে না! বাহ্ তা হয় নাকি! পুলিশ তো সমাজের ব্যাবাগ ব্যাক্তির স্বার্থ রক্ষা করবো, হ্যারা মানবতা রক্ষা করবো, ব্যাক্তি স্বাধীনতায় হাত দিলে বাধা দিবো। আর আন্নে কন ভারতীয় সরকার পুলিশের ব্যাক্তি স্বধীনতায় হাত দিছে! দাড়ির লগে পুলিশের ডিউটির কী সম্পর্ক?জ্বী, পুলিশের দাড়ির সাথে ডিউটির সম্পর্ক আছে রে আছে।মানে কী? দাড়ি দেখলে চুরে আরোও চুরি করবো।আরে না, বৃটিশ আমলে সাহেবরা দেখলো যে অনেক মৌলানা বলেন মুসলমানদের দাড়ি রাখা সুন্নত।ঠিকই তো কয়।ঠিকতো কয়। কি›তু বৃটিশরা দেখলো যে মুসলমান পুলিশ দাড়ি রেখেও ঘুষ খায়, উৎকোচ গ্রহণ করে। কিন্তু ইসলামে ঘুষ খাওয়া হারাম। তাই বৃটিশ সরকার ইসলামের পবিত্রতা রক্ষার জন্য পুলিশদের দাড়ি রাখা বন্ধ করলেন। কিন্তু শিখ পুলিশ দাড়ি রাখতে পারবেন।ওম্মারে একই যাত্রায় পৃথক ফল! পুলিশ ঠিকমতো ডিউটি করের কিনা হ্যাইডা না দ্যেইক্ষা পুলিশে কোথায় দাড়ি রাখছে হ্যেইডা দেখারলাই ভারত সরকার বোই আচে! আইশ্চার্য্য! তায়লে এই যে হিন্দু ধর্মালম্বী ঋষি এ্যাকরোয়েড অরবিন্দ ঘোষ, শ্রী শ্রী রাম কৃষ্ম পরমহংস দেব হ্যাগোতো দাড়ি আছিলো? হেঁ হেঁ উনারা যদি ভারতীয় পুলিশে যোগ দিতেন তাহলে দাড়ি কাটতে হোতো।আমার মনে লয় এইসব দাড়ি কাটাকাটি, পুলিশের দাড়িরাখি ঘুষ খাওয়া এইসবের একটা দাঁড়ি দেওয়া উচিৎ।ঠিক ঠিক তুই ঠিক বলেছিস, সব ঘুষ খাওয়ার, সব অন্যায়ের একটা দাঁড়ি মানে, পূর্ণচ্ছেদ সূচক দন্ডায়মান রেখা দিয়ে এবার এগুলো থামানো মানে শেষ করা উচিৎ।আন্নে ঠিকই কোইছেন মিয়া ভাই অহন ব্যেবাগ অন্যায়ের দাঁড়ি দিবেন না কি দিবেন হ্যেইডা আপনেরা মানে জনগণই ঠিক করেন.... দাঁড়ি দিবেন না কী দিবেন?[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

হিমবাহ ধস এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা

গত ১ সেপ্টেম্বর নেপাল সরকার কর্তৃক প্রকাশিত প্রাথমিক পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুসারে, ২৬ আগস্ট ২০২৬-এ হিমালয়ে একটি ভয়াবহ হিমবাহ ধসের ফলে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত বরাবর বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস দেখা দেয়, যাতে শত শত বিদেশি পর্যটকসহ ১,২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ৪,০০০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ হন এবং ১৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। চীন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী ১৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ২৬১ জন বিদেশিসহ নিখোঁজ ৫৪৬ জনের সন্ধান অব্যাহত রয়েছে। দৈনিক কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে যে জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) রাসুয়া এবং নুয়াকোটকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ধাদিঙ, গোর্খা এবং চিতওয়ানকে মাঝারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।নেপাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র বিবিসিকে জানিয়েছে যে গ্রামগুলো সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তারা আরও উল্লেখ করেছেন যে, ‘নদীতে ২০ মিলিয়ন ঘনমিটার অতিরিক্ত পানি ছিল এবং তা ছিল আকাশ থেকে নেমে আসা সুনামির মতো।’ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই অঞ্চলের নদীগুলোতে ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ বিপজ্জনক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে পরবর্তীতে আরও আকস্মিকভাবে বন্যার সৃষ্টি হতে পারে। আমরা দেখেছি যে, যখন শিলা ও বরফের বিশাল স্তূপ এমন বিস্ফোরণের সঙ্গে মাটিতে আঘাত করে, তখন তা পানিতে রূপান্তরিত হয়। ২,০০০ ফুট চওড়া শিলায় সঞ্চিত সমস্ত স্থিতিশক্তি খুব অল্প সময়ের মধ্যে গতিশক্তি এবং তরলে রূপান্তরিত হয়।হিমালয় অঞ্চলে এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত জুলাই মাসে, লেন্ডে খোলা নদীর সীমান্তে একটি ‘হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা’ নদীর পানির স্তরে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটায়। ২০২৩ সালে ভারতে প্রায় ১৭,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত দক্ষিণ লোনাক হ্রদে একটি ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট বন্যা বাংলাদেশের তিস্তা নদী বরাবর ৩৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। ২০২১ সালে, ভারতেরই চামোলির কাছে একটি বিশাল বরফ-পাথরের ধস প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ঘন লিটার পানি নদীপথে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং এতে ৭০ জন নিহত হন।জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, নেপালে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকাল ক্রমশ উষ্ণ হতে থাকায় ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন দশকে হিমবাহগুলো তাদের বরফের আয়তনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। এটি উল্লেখ্য যে, ভূমিকম্প এবং ভূমিধসের মতো অন্যান্য প্রাকৃতিক কার্যকলাপ থেকে সৃষ্ট ভূকম্পীয় সংকেত একই রকম হয় না। মূল পার্থক্য হলো, ভূমিকম্পে পি-তরঙ্গ নামে পরিচিত তীক্ষ্ণ, আকস্মিক প্রাথমিক সংকেত এবং এস-তরঙ্গ নামে পরিচিত স্পষ্ট উচ্চ কম্পাঙ্কের গৌণ সংকেত উৎপন্ন হয়। অন্যদিকে, বিস্ফোরণের মতো অন্যান্য ঘটনায় আরও শক্তিশালী সংকোচন ঘটে এবং আগ্নেয়গিরি বা ভূমিধসে একটানা, ধীর গড়গড় শব্দে সংকেত পাওয়া যায়। কিন্তু নেপালি কর্তৃপক্ষ যে ভূকম্পীয় সংকেত পেয়েছিল, তা ভূমিকম্পের সঙ্গে মেলেনি, যা জনসাধারণকে সতর্ক করতে পারত, এবং ভাটির নদীগুলোর জলমাপক যন্ত্রগুলোও কোনো ভয়াবহ বন্যার জন্য তৈরি করা হয়নি। যদি কোনো যোগাযোগ টাওয়ার ভেঙে পড়ত, তাহলে নেপালি কর্তৃপক্ষকে বাসিন্দাদের সতর্ক করার জন্য বাড়ি বাড়ি যেতে হতো। বর্তমান আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতের দুর্যোগে জীবন বাঁচাতে হিমালয় অঞ্চলজুড়ে বন্যা সেন্সর স্থাপন করতে হবে।দ্য নেচার পত্রিকা তাদের ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংখ্যায় জানিয়েছে যে, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সেন্টিনেল-১ স্যাটেলাইট থেকে ৮ জানুয়ারি থেকে ১৮ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে সংগৃহীত রাডার ডেটা থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, দৃশ্যমান ধস এলাকার কাছে হিমবাহ-শিলা ব্যবস্থাটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসছিল, যার গতিবেগ ছিল প্রতি মাসে প্রায় ১০ মিলিমিটার। প্রকৃতপক্ষে, এটি ধসে পড়ার এবং একটি মারাত্মক আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত করার মাত্র কয়েক দিন আগে একটি হিমবাহ-শিলাপুঞ্জের ত্বরান্বিত গতিকে প্রকাশ করে। আমরা দুটি পরিস্থিতি সম্পর্কে ভাবতে পারি। হয় দুর্যোগটি একটি বিশাল ভূমিধসের মাধ্যমে শুরু হতে পারে, যা হিমবাহের একটি অংশকে নিচের দিকে টেনে নিয়ে যায়, অথবা হিমবাহটি প্রথমে ভেঙে যেতে পারে, যার ফলে শিলাগুলো অস্থিতিশীল হয়ে ভূমিধসে পরিণত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলের পরিস্থিতি বিবেচনা করে, আমি দ্বিতীয় বিকল্পটিই ধরে নিচ্ছি; এর অর্থ হলো প্রথমে হিমবাহের ধস।যেহেতু বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে, এই ধরনের দুর্যোগ আবার ঘটতে পারে। এই বছর, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) ‘লিমিটিং ওভারশুট’ (২০২৬) শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির যুগে প্রবেশের পরিণতি এবং উপলব্ধ বিকল্পগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি একটি গতিশীল পথ, যা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম, সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন এবং পরবর্তী তাপমাত্রা হ্রাসকে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রতিবেদনটিতে উচ্চ মাত্রার উষ্ণায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি ও প্রভাব, সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন সীমিত করতে এবং তাপমাত্রা হ্রাসে সক্ষম করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশমন পথ, এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন ও হ্রাসের পথে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজন ও উন্নয়ন পদ্ধতিগুলোকে কীভাবে সাড়া দিতে হবে, তা অন্বেষণ করা হয়েছে। প্রমাণগুলো ধারাবাহিকভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, উচ্চতর সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি মানুষ ও প্রকৃতির জন্য বৃহত্তর ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।ইউএনইপির প্রতিবেদনে হিমালয় এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে, যার মধ্যে নেপালও অন্তর্ভুক্ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এতে পূর্ব হিমালয়ের হিমবাহের পশ্চাদপসরণ, পানিসম্পদ এবং বাস্তুতন্ত্রের সেবা সম্পর্কিত গবেষণা এবং পার্বত্য অঞ্চলে পানি, শক্তি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হিমবাহের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্য হিমালয়ে অবস্থিত হওয়ায় এবং কৃষি, জলবিদ্যুৎ ও পানীয় জলের জন্য হিমবাহের গলিত জলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই গবেষণাগুলো নেপালের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। নেপালে কৃষি ব্যবস্থাপনায় হিমবাহের গলিত পানির প্রয়োজন হলেও, দেশটি এর আকস্মিক বিস্ফোরণ চায় না। সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে শুধুমাত্র নেপালেই আনুমানিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। নেপাল সরকার জলবায়ু দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য জাতিসংঘের তহবিলের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে।সর্বোপরি, এই ধরনের ঘটনা মোকাবিলার জন্য বিদ্যমান পর্যবেক্ষণ কৌশল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট নয়। নেপালের জন্য একটি জাতীয় দুর্যোগ পূর্বাভাস কর্তৃপক্ষ থাকা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি, চীন, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশকে নিয়ে গঠিত একটি বহুজাতিক হিমালয় অঞ্চল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পূর্বাভাস বোর্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যে অঞ্চল থেকে এই দুর্যোগের সূত্রপাত হয়েছে, তা নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি বা তার ওপারে অবস্থিত। এটি একটি আন্তঃসীমান্ত পরিস্থিতি, যেখানে কার্যকর সতর্কবার্তা দেশগুলোর মধ্যে পর্যবেক্ষণ এবং বিপদ সম্পর্কিত তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদানের ওপর নির্ভর করে।[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী অধ্যাপক]

৫৫ বছরেই নিঃস্ব, ৫১০ বছরেও সমৃদ্ধ

যুক্তরাজ্যের ‘রয়্যাল মেল’ পার করে ফেলেছে আস্ত পাঁচ-পাঁচটি শতাব্দী। ৫১০ বছর বয়সেও তারা আধুনিক ও লাভজনক। আর মাত্র ৫৫ বছরে পা দিয়েই নিঃশ্বাসের শেষ টান গুনছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। বিভাগীয় শহর থেকে জেলা, উপজেলা হয়ে একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম ছড়িয়ে রয়েছে দেশের প্রায় ১০ হাজার ডাকঘর। সঙ্গে হাজার হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর নিজস্ব সম্পদ। খাতায়-কলমে যা এক সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য; বাস্তবে তা কেবল অতীত গৌরবের এক ফাঁকা কঙ্কাল। ডাক বিভাগ আজ এক চরম দেউলিয়াত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক হাহাকারের নামান্তর মাত্র।বিলেতের রয়্যাল মেল যেখানে পুরো লজিস্টিকস ও কুরিয়ার খাতকে নিজের ছাতার তলায় এনে ব্যবসার অভিমুখ বদলে নিল, সেখানে বাংলাদেশে উল্টো ছবি। ডাক বিভাগের ছায়ায় বেসরকারি কুরিয়ারের ভাড়া রমরমা বাড়ল, আর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগকে ঠেলে দেওয়া হলো অন্ধকূপের দিকে। এমন স্বর্ণপ্রসূ নেটওয়ার্ক হাতে থাকা সত্ত্বেও কেন আজ মৃত্যুঘণ্টা বাজছে সরকারি ডাক সেবার? এ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের পতন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের এক নির্মম, নীরব নিধনযজ্ঞ।এখানে প্রশ্ন ওঠে, এই করুণ পরিণতি কি শুধুই ব্যর্থতা, নাকি বেসরকারি কুরিয়ার ব্যবসাগুলোকে চাঙ্গা করতে ডাক বিভাগকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার কোনো ষড়যন্ত্র? যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেইল যেভাবে পুরো দেশের লজিস্টিকস ও কুরিয়ার খাতকে যুগোপযোগী ব্যবসায় রূপান্তর করেছে, বাংলাদেশেও ডাক বিভাগের অধীনেই বেসরকারি কুরিয়ারগুলোকে পরিচালনা করে বিশাল রাজস্ব আয়ের সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে না লাগিয়ে উল্টো সরকারি ডাক বিভাগকে তিল তিল করে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর সেই খালি মাঠে রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসগুলো। এমন সুসংগঠিত তৃণমূল নেটওয়ার্ক ও প্রাচুর্য থাকার পরও ডাক বিভাগ কেন আজ নিঃস্ব ও মৃত্যুপথযাত্রী?বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সংকটকে কেবল একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত রাষ্ট্রের একটি বিশাল সম্পদকে অকার্যকর করে রাখার গল্প। পৃথিবীর অনেক দেশ নতুন করে জাতীয় লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। আর বাংলাদেশ এমন একটি নেটওয়ার্কের মালিক, যা স্বাধীনতারও আগে থেকে গড়ে উঠেছে, কিন্তু সেটিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। বাংলাদেশের ডাক বিভাগ একই সময়ে সেই গতিতে এগোতে পারেনি। প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। বহু ক্ষেত্রেই সময়োপযোগী সংস্কার, ডিজিটাল রূপান্তর এবং নতুন সেবা চালুর উদ্যোগ প্রত্যাশিত গতিতে বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলে দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত সরকারি সেবা নেটওয়ার্ক হওয়া সত্ত্বেও ডাক বিভাগের বিশাল সম্ভাবনা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়নি। যে প্রতিষ্ঠানটি ই-কমার্স, জাতীয় লজিস্টিকস এবং ডিজিটাল জনসেবার প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারত, সেটি আজও তার প্রকৃত সক্ষমতা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। তাই এখন প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, দক্ষ ও উদ্ভাবনী প্রশাসনিক নেতৃত্ব, প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যাতে বাংলাদেশ ডাক বিভাগও রয়্যাল মেইলের মতো সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি আধুনিক ও লাভজনক জাতীয় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারে।যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেইল আজ শুধু একটি ডাক সেবা প্রতিষ্ঠান নয়; প্রচলিত চিঠি পরিবহনের গণ্ডি পেরিয়ে তারা পার্সেল ডেলিভারি, ই-কমার্স লজিস্টিকস, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার, রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, স্বয়ংক্রিয় সোর্টিং, ব্যবসায়িক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সেবাকে একীভূত করে নিজেদের একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছে। সময়ের পরিবর্তনকে তারা সংকট হিসেবে নয়, নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সামনেও একই সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত। দেশের প্রায় ১০ হাজার ডাকঘরকে কেন্দ্র করে ই-কমার্স পণ্য পরিবহন, সরকারি ও বেসরকারি নথি সরবরাহ, কৃষিপণ্য ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্যের বিপণন, পোস্টাল ব্যাংকিং, সরকারি ভাতা বিতরণ, ইউটিলিটি বিল গ্রহণ, ডিজিটাল সরকারি সেবা, এমনকি গ্রামীণ লজিস্টিকস হাব গড়ে তোলার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানকে একটি আধুনিক বহুমুখী সেবাকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। প্রয়োজন কেবল দূরদর্শী পরিকল্পনা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সঠিক সংস্কার ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশ ডাক বিভাগও শুধু লোকসানের গ্লানি থেকে মুক্তিই পাবে না, বরং রাষ্ট্রের অন্যতম লাভজনক ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে সক্ষম হবে। দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলা, ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাকঘরের উপস্থিতি রয়েছে। এমন বহু এলাকা আছে, যেখানে কোনো বড় বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী শাখা নেই; কিন্তু ডাক বিভাগের নিজস্ব অফিস রয়েছে। এই ভৌগোলিক বিস্তারই ডাক বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি। অথচ এই শক্তিকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করার পরিবর্তে বছরের পর বছর অব্যবহৃত রাখা হয়েছে।একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। আজ যদি সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, নতুন করে সারা দেশে ১০ হাজার অফিস, হাজার হাজার কর্মী এবং প্রতিটি গ্রামে পৌঁছানোর মতো একটি জাতীয় লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে, তাহলে কত অর্থ ব্যয় হবে? জমি অধিগ্রহণ, ভবন নির্মাণ, জনবল নিয়োগ, যানবাহন, প্রযুক্তি ও পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে সেই ব্যয় হবে কয়েক লাখ কোটি টাকা। অথচ সেই অবকাঠামোর বড় অংশ আজ রাষ্ট্রের হাতেই রয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিপুল সম্পদের অনেকটাই অলস পড়ে আছে। বহু ডাকঘরের ভবন জরাজীর্ণ, অনেক স্থানে পর্যাপ্ত জনবল নেই, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত, আর যেখানে প্রযুক্তি পৌঁছেছে, সেখানেও তার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে জনগণের আস্থা কমেছে, আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে বেসরকারি খাত।প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি কেবল অবহেলা, নাকি দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতার ফল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ রাষ্ট্রের সম্পদ যতদিন অব্যবহৃত থাকবে, ততদিন তার আর্থিক মূল্যই শুধু কমবে না; জনগণের আস্থাও ক্ষয় হবে।আজ বিশ্বব্যাপী লজিস্টিকস শিল্পকে আগামী অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ই-কমার্সের বিস্তার, অনলাইন ব্যবসা, কৃষিপণ্য বিপণন এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের কারণে প্রতিদিন কোটি কোটি পার্সেল পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছে। এই বাজারে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রস্তুত প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল ডাক বিভাগ। কারণ তাদের রয়েছে অবকাঠামো, জনবল, অভিজ্ঞতা এবং সারা দেশে বিস্তৃত উপস্থিতি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হতে পারত, সেটিই আজ নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্ভাগ্য নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্যও এক গভীর অর্থনৈতিক ক্ষতি। বাংলাদেশ ডাক বিভাগকে যদি নতুনভাবে ভাবা যায়, তাহলে এটি কেবল একটি ডাক পরিবহনকারী সংস্থা থাকবে না; এটি হতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় লজিস্টিকস করপোরেশন, সবচেয়ে বড় গ্রামীণ ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সরকারি ডেলিভারি নেটওয়ার্ক। বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যেই সেই পথেই হাঁটছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত?বাংলাদেশের ডাক বিভাগের ইতিহাস শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্রের জনগণের সঙ্গে সংযোগের ইতিহাস। একসময় গ্রামবাংলার মানুষের কাছে ডাকঘর ছিল আস্থা, নির্ভরতা এবং রাষ্ট্রের উপস্থিতির প্রতীক। চাকরির নিয়োগপত্র থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি চিঠি, আদালতের সমন, মানি অর্ডার, সঞ্চয়পত্র কিংবা প্রবাসী স্বজনের পাঠানো সংবাদ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল ডাকঘর। আজ সেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় অস্তিত্বসংকটে। অথচ এই সংকট অবকাঠামোর নয়। দেশের প্রায় ৯,৮৮৬টি ডাকঘর, ৪০ হাজারের বেশি জনবল এবং হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি জমি ও স্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ এখনো দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত সরকারি নেটওয়ার্ক। নতুন করে এমন একটি অবকাঠামো গড়তে গেলে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। কিন্তু বিদ্যমান সম্পদকে যুগোপযোগী করার পরিবর্তে বছরের পর বছর অবহেলা করা হয়েছে।অনেকে মনে করেন, স্মার্টফোন, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ডাক বিভাগের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। চিঠির সংখ্যা কমেছে, কিন্তু পার্সেল, ই-কমার্স এবং লজিস্টিকস সেবার চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। প্রযুক্তি ডাক বিভাগের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং প্রযুক্তিই ডাক বিভাগের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো সেটিই প্রমাণ করেছে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেইল, ভারতের ইন্ডিয়া পোস্ট, জাপান পোস্ট কিংবা জার্মানির ডয়চে পোস্ট সবাই নিজেদের আধুনিক লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছে। তারা শুধু চিঠি বহন করে না; তারা পার্সেল পরিবহন, ই-কমার্স, আর্থিক সেবা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং গ্রাহকসেবার সমন্বিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।বাংলাদেশেও সেই সুযোগ ছিল এবং এখনো আছে। কিন্তু বিভিন্ন মহল দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ডাক বিভাগকে আধুনিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়নি। একই সময়ে বেসরকারি কুরিয়ার খাত দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাড়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে তারা লাভ করছে অথচ ডাক বিভাগের নিজস্ব সম্পদ থাকার পরও সেটা হচ্ছে না। কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো কার্যকরভাবে ব্যবহার না হলেও বেসরকারি খাত বিশাল বাজার দখল করেছে। এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন, কারণ রাষ্ট্রের নিজস্ব সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত জনগণকেই দিতে হয়।আজ দেশের ই-কমার্স বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ পার্সেল দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাজারের কতটুকু রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে? উত্তর অত্যন্ত হতাশাজনক। অথচ সরকারের সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, আদালত, শিক্ষা বোর্ড, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, ভূমি অফিস এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র ও পার্সেল ডাক বিভাগের মাধ্যমে বাধ্যতামূলকভাবে প্রেরণের ব্যবস্থা করা গেলে প্রতিবছর বিপুল রাজস্ব অর্জন সম্ভব। এর পাশাপাশি প্রতিটি ডাকঘরকে ই-কমার্সের পিক-আপ ও ড্রপ-অফ সেন্টারে পরিণত করা যেতে পারে। গ্রামের কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা কিংবা হস্তশিল্প প্রস্তুতকারক সহজেই তাঁদের পণ্য দেশের যেকোনো স্থানে পাঠাতে পারবেন। এতে যেমন গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, তেমনি ডাক বিভাগও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে। শুধু পার্সেল নয়, ডাকঘরকে ডিজিটাল আর্থিক সেবার কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা সম্ভব। বিশ্বের বহু দেশে পোস্টাল ব্যাংকিং অত্যন্ত সফল। বাংলাদেশেও ডাকঘরের সঞ্চয়ী কার্যক্রমকে আধুনিক ডিজিটাল পোস্টাল ব্যাংকে রূপান্তর করা গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও সহজ হবে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। প্রতিটি পার্সেলের জন্য রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহক যেন মুহূর্তেই জানতে পারেন তাঁর পার্সেল কোথায় রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে সেবা নিশ্চিত করতে হবে। গাফিলতির ক্ষেত্রে কঠোর জবাবদিহি এবং দক্ষতার জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।একটি বাস্তবসম্মত পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে ডাক বিভাগকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। প্রথম বছরে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা, দ্বিতীয় বছরে সরকারি ডাক পরিবহনের মূল দায়িত্ব ডাক বিভাগের হাতে দেওয়া, তৃতীয় বছরে ই-কমার্স লজিস্টিকস হাব হিসেবে ডাকঘরগুলোকে গড়ে তোলা এবং পরবর্তী দুই বছরে পোস্টাল ব্যাংকিং ও পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা চালুর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে স্বাবলম্বী করা যেতে পারে। বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানেরও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিযোগিতা থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিযোগিতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানকে সমান সুযোগ দেওয়া হয়। একটি ঐতিহাসিক সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল রেখে বাজারকে একতরফাভাবে অন্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া কোনো দূরদর্শী রাষ্ট্রনীতির পরিচায়ক হতে পারে না।বাংলাদেশ ডাক বিভাগ কোনো অতীতের স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি দেশের অন্যতম মূল্যবান কৌশলগত সম্পদ। এই সম্পদকে পুনরুজ্জীবিত করা মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানো নয়; বরং গ্রামীণ অর্থনীতি, ডিজিটাল বাণিজ্য, সরকারি সেবা এবং জাতীয় লজিস্টিকস ব্যবস্থাকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। এর জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, স্বচ্ছ প্রশাসন, আধুনিক প্রযুক্তি, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা।ডাক বিভাগের পুনর্জাগরণ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের পুনরুত্থান নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের উন্নয়ন, সুশাসন এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা পুনর্গঠনের এক নতুন অধ্যায়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রাবন্ধিক]

ইলিশ কি সত্যিই বেড়েছিল?

খাতায়-কলমে ইলিশ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। তাহলে জেলের জাল কেন প্রায়ই খালি ফেরে, আর বাজারে ইলিশ কেন সোনার দরে বিকোয়? ইলিশের গল্প বাংলাদেশের নদী, মানুষ ও সংস্কৃতির গল্প। জেলের জালে রুপালি ঝিলিক উঠলে শুধু একটি মাছ ধরা পড়ে না—হাসি ফোটে জেলে পরিবারে, প্রাণ ফিরে পায় ঘাট ও আড়ত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে চেনা দৃশ্যটি বদলে যাচ্ছে। ভরা মৌসুমেও জেলেরা ফিরছেন প্রায় খালি নৌকা নিয়ে; বড় ইলিশ ক্রমেই দুর্লভ; বাজারে দাম উঠে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।অথচ দুই দশকের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন গল্প। ২০০২ু০৩ অর্থবছরের প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার টন থেকে ২০২২ু২৩ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে, অর্থাৎ প্রায় ১৮৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। এই সংখ্যা বহু বছর ধরে ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জাটকা সংরক্ষণ, মা-ইলিশ রক্ষা, অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা ও জেলেদের সহায়তা কর্মসূচি যে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে, তা অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক দ্রুত পতন একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে—আমরা কি ইলিশের প্রকৃত মজুত বৃদ্ধি পরিমাপ করেছি, নাকি বেড়ে যাওয়া আহরণের একটি আনুমানিক হিসাবকেই সম্পদের উন্নতি বলে ধরে নিয়েছি?পরিসংখ্যানে তিনটি অধ্যায়মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে দুই দশকের চিত্রে তিনটি পৃথক অধ্যায় স্পষ্ট। প্রথমত, ২০০২ু০৩ থেকে ২০১৫ু১৬—ধীর কিন্তু ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, ২০১৬ু১৭ সাল থেকে, যখন এক বছরেই আহরণ প্রায় এক লাখ টন বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, ২০২০ু২১-এর পর—প্রথমে স্থবিরতা, এরপর দ্রুত পতন।২০০২ু০৩ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩২ টন। ২০১৫ু১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৯৫১ টন। পরের অর্থবছর ২০১৬ু১৭-তে আহরণ আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৭ টনে। ২০২০ু২১ অর্থবছরে আহরণ ছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার ১৮৩ টন। ২০২২ু২৩ অর্থবছরে তা সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টনে পৌঁছায়। এরপর ২০২৩ু২৪ অর্থবছরে আহরণ কমে প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে এবং ২০২৪ু২৫ অর্থবছরে প্রাথমিক হিসাবে তা আরও কমে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে আসে।২০১৬ু১৭ সালের উল্লম্ফন: ব্যাখ্যা প্রয়োজন২০১৫ু১৬ সালে আহরণ ছিল ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৯৫১ টন। পরের বছরই তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৭ টনে—এক বছরে প্রায় ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি। অনুকূল বৃষ্টিপাত, সফল প্রজনন কিংবা সংরক্ষণ ব্যবস্থার সম্মিলিত সুফলে এমন বছর আসতেই পারে, কিন্তু এত বড় এক বছরের লাফের আলাদা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দরকার। সেই বছর জাটকার বেঁচে থাকার হার কতটা বেড়েছিল? নৌকা, জালের সংখ্যা বা মাছ ধরার দিন কি বেড়েছিল? নমুনা কাঠামো বা সম্প্রসারণ-গুণকে কোনো পরিবর্তন হয়েছিল কি? এসব প্রশ্নের সদুত্তর ছাড়া এই বৃদ্ধির কতটা প্রকৃত জৈবিক উন্নতি আর কতটা পরিসংখ্যানগত প্রাক্কলনের ফল, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। লক্ষণীয়, ২০১৬ু১৭ সালের প্রায় ৫ লাখ টনের সঙ্গে ২০২৪ু২৫ সালের প্রায় ৫ লাখ টন তুলনা করলে আট বছরে নিট বৃদ্ধি প্রায় শূন্য—অর্থাৎ দুই দশকের ‘সাফল্যরেখা’র বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি বিশেষ বছরের উল্লম্ফনের ওপর।‘উৎপাদন’ আর ‘আহরণ’ এক নয়ইলিশ চাষ করা হয় না; এটি নদী ও সাগরের প্রাকৃতিক সম্পদ। তবু সরকারি প্রচারে ‘ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি’ শব্দবন্ধ এমনভাবে ব্যবহৃত হয়, যেন তা পুকুরের মাছ চাষের মতো। প্রাকৃতিক জলাশয়ে মোট আহরণ বাড়ার পেছনে অন্তত তিনটি ভিন্ন কারণ থাকতে পারে—মাছের প্রকৃত মজুত বেড়েছে, নৌকা-জাল-প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বেড়েছে, অথবা তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও আওতা বদলেছে। ধরা যাক, ১০০টি নৌকা যে পরিমাণ ইলিশ ধরত, এখন ২০০টি নৌকা একই পরিমাণ ধরছে—মোট আহরণ অপরিবর্তিত থাকলেও প্রতি নৌকার আহরণ অর্ধেক হয়ে গেছে, যা মজুতের অবনতিরই ইঙ্গিত। তাই মোট আহরণের পাশাপাশি প্রতি ইউনিট আহরণচেষ্টায় প্রাপ্তি, মাছের গড় আকার, প্রজননক্ষম মাছের অনুপাত ও জাটকার রিক্রুমেন্ট নিয়মিত জানা জরুরি। মোট টনের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ সূচক, কিন্তু তা সম্পদের সুস্থতার পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ নয়।পুরোনো নমুনা কাঠামো, নতুন বাস্তবতাজাতীয় হিসাব তৈরি হয় নির্বাচিত গ্রাম, মাছ ধরার ইউনিট ও অবতরণকেন্দ্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করে, তারপর নির্ধারিত ‘রেইজিং ফ্যাক্টর’ প্রয়োগ করে। এ পদ্ধতি বিশ্বজুড়েই ব্যবহৃত হয় এবং তা দুর্বল নয়—তবে এর নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করে নমুনা কাঠামো হালনাগাদ কি না, তার ওপর। মৎস্য অধিদপ্তরের নিজস্ব ২০১৬ু১৭ সালের ইয়ারবুকেই উল্লেখ ছিল, ব্যবহৃত স্যম্পলিং ফ্রেইম মূলত ১৯৮৫ সালের। চার দশকে নদীর গতিপথ বদলেছে, নতুন চর জেগেছে, নৌকার যান্ত্রিকীকরণ বেড়েছে, নতুন অবতরণকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এত পুরোনো কাঠামো দিয়ে আজকের জটিল মৎস্যব্যবস্থা পরিমাপ করলে প্রাক্কলনে অনিশ্চয়তা থাকা স্বাভাবিক। তাই সরকারি পরিসংখ্যানকে সরাসরি বাতিল করার কারণ নেই, আবার প্রশ্নাতীত ধরে নেওয়াও বিজ্ঞানসম্মত নয়—প্রয়োজন পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও স্বাধীন যাচাই।সংখ্যা কি ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়ানো হয়েছিল?প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই—তার জন্য কাঁচা জরিপ ফরম, হিসাব সংশোধনের ইতিহাস ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন। তবে একটি বাস্তবতা বিবেচ্য: উন্নয়ন প্রশাসনে প্রায়ই কর্মসূচির সাফল্য নির্দিষ্ট সংখ্যাগত লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে, ফলে অজান্তেই ক্রমবর্ধমান সংখ্যাকে সম্পদের প্রকৃত স্বাস্থ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এটি কারও অসততার প্রশ্ন নয়, বরং সূচক নির্বাচনের সীমাবদ্ধতা। বেশি মাছ ধরা আর বেশি মাছ থাকা সব সময় এক কথা নয়।পতনের আগেই ছিল স্থবিরতার সংকেত২০২১ু২২ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ০.২৫ শতাংশ, ২০২২ু২৩ সালে ০.৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ বড় পতনের আগে অন্তত দুই বছর সরকারি পরিসংখ্যানেই স্থবিরতার সংকেত ছিল। এরপর ২০২৩ু২৪ সালে আহরণ প্রায় ৪২ হাজার টন কমে, এবং পরের অর্থবছরেও পতন অব্যাহত থেকে আহরণ প্রায় ৫ লাখ টনে নামে—দুই বছরে হ্রাস প্রায় ৭০ হাজার টন। বড় ইলিশের স্বল্পতা, প্রতি নৌকায় কম আহরণ, বেশি সময়-জ্বালানি ব্যয় ও নদীতে অনিয়মিত উপস্থিতি একসঙ্গে দেখলে এটি নিছক একটি খারাপ মৌসুম নয়, বরং মজুতের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। নদীতে পর্যাপ্ত পানির অভাব, মোহনায় পলি জমা, অভিপ্রয়াণপথে অতিরিক্ত জাল, জাটকা ও অবৈধ কারেন্ট জাল আহরণ, লবণাক্ততার বিস্তার এবং সাগরে অনিয়ন্ত্রিত আহরণচাপ—এসব একসঙ্গে ইলিশকে নদী থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।নদী কেন হারাচ্ছে ইলিশ?ইলিশের জীবনচক্র নদী ও সাগরের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে। সাগরে বেড়ে ওঠা ইলিশ প্রজননের জন্য মোহনা পেরিয়ে মিঠাপানির নদীতে আসে—নদীর প্রবাহ, তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও স্রোতের সংকেত অনুসরণ করেই এই অভিপ্রয়াণ ঘটে। এই সূক্ষ্ম চক্রটি এখন একযোগে একাধিক দিক থেকে চাপের মুখে। দূষণ এর মধ্যে সবচেয়ে উপেক্ষিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শিল্পকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য, ট্যানারি ও ডায়িং শিল্পের বিষাক্ত নির্গমন, কৃষিজমির সার-কীটনাশক-মিশ্রিত পানি, নৌযান থেকে তেল-গ্যাস নিঃসরণ এবং নগর এলাকার অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো ইলিশের প্রধান বিচরণক্ষেত্রে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে গেলে ইলিশ সেই নদীপথ এড়িয়ে চলে—যেমনটা একসময়ের সমৃদ্ধ ইলিশক্ষেত্র বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যায় ইতিমধ্যে ঘটেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, যা মাছের খাদ্যচক্র ও প্রজননক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষকেরা আশঙ্কা করছেন।করণীয়: একটি সংখ্যা নয়, সূচকের সমন্বয়ইলিশ ব্যবস্থাপনার সাফল্য মূল্যায়নে মোট আহরণের পাশাপাশি অন্তত কয়েকটি সূচক নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন: প্রতি নৌকা বা মাছ ধরার দিনে আহরণের পরিমাণ, ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য-ওজন, প্রজননক্ষম ইলিশের অনুপাত, জাটকার রিক্রুটমেন্ট ও বেঁচে থাকার হার, নদী-সামুদ্রিক আহরণের পৃথক প্রবণতা এবং আহরণচেষ্টার (নৌকা-জাল-দিন) সামগ্রিক হিসাব। এ ছাড়া প্রয়োজন—২০০২ু০৩ থেকে এ পর্যন্ত সিরিজের স্বাধীন কারিগরি পুনর্মূল্যায়ন; নৌকা-জাল-জেলে-অবতরণকেন্দ্রের নতুন জাতীয় শুমারি; প্রতিটি প্রাক্কলনের সঙ্গে নমুনার আকার ও কনফিডেন্স ইন্টার্ভাল প্রকাশ; গুরুত্বপূর্ণ অবতরণকেন্দ্রে ডিজিটাল ওজন ব্যবস্থা, জিপিএস/ভিএমএস ও ই-লগবুক চালু; এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জেলে প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা।সংখ্যা নয়, নদীতে ফিরুক ইলিশইলিশের পরিসংখ্যান ভুল ছিল কি না—এর সরল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কিছু বছরে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সংরক্ষণ কার্যক্রম সুফল দিয়েছে; একই সঙ্গে পুরোনো তথ্য-কাঠামো, আহরণচেষ্টার অসম্পূর্ণ হিসাব ও এক বছরের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন যৌক্তিক প্রশ্নও তৈরি করেছে। সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো—সরকারি সিরিজ একটি গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি নির্দেশক, কিন্তু একে ইলিশের প্রকৃত মজুতের নির্ভুল পরিমাপ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। অতীতের সাফল্যকে সম্মান করেই এখন পদ্ধতি বদলাতে হবে। লক্ষ্য শুধু ঊর্ধ্বমুখী একটি গ্রাফ নয়; লক্ষ্য নদী, মোহনা ও সাগরে একটি সুস্থ ইলিশসম্পদ ধরে রাখা—একজন জেলে আগের চেয়ে কম খরচে কত মাছ পেলেন, মাছের গড় আকার কত হলো, আর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কত প্রজননক্ষম ইলিশ বেঁচে থাকল। পরিসংখ্যান রাষ্ট্রের আয়না; আয়না স্বচ্ছ হলে অর্জন ও সংকট দুটোই সময়মতো ধরা পড়ে। তাই এখন প্রয়োজন দোষারোপ নয়, হিসাবকে আরও আধুনিক, উন্মুক্ত ও বিজ্ঞানভিত্তিক করা। সত্যিকার সাফল্যের প্রমাণ মিলবে কাগজের টনে নয়—জেলের জালে, নদীর প্রাণে এবং সাধারণ মানুষের পাতে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ঢাকা]

শিক্ষা দিবস: বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থার দাবি

১৭ সেপ্টেম্বর আমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দিনটির তাৎপর্য সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানেন। ১৯৬২ সালের এই দিনে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার ছাত্রসমাজ যে রক্তাক্ত আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তা পরবর্তী সময়ে বাঙালির স্বাধিকার ও মুক্তির আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।তখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছিল। ছাত্রসমাজ সেই ক্ষোভকে সংগঠিত করে রাজপথে নিয়ে আসে। তাদের দাবি ছিল গণমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা। তাদের কাছে শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় পাস বা সার্টিফিকেট অর্জনের বিষয় ছিল না; শিক্ষা ছিল মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শক্তি।১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করার পর শিক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর এস এম শরীফকে প্রধান করে শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। কমিশন ১৯৫৯ সালের আগস্টে ২৪ অধ্যায়ে বিভক্ত একটি শিক্ষা প্রতিবেদন দেয়। এর বিভিন্ন সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ছাত্রদের আশঙ্কা ছিল, প্রস্তাবিত শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষা থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে সরিয়ে দেবে এবং বৈষম্য আরও বাড়াবে।এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসংগঠনগুলো রাজপথে নামে। ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করা হয়। ছাত্রদের সঙ্গে শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে সংহতি জানান। সেদিন পুলিশের গুলিতে মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ, বাবুলসহ অনেকে নিহত হন। টঙ্গীতে ছাত্র-শ্রমিক মিছিলে পুলিশের গুলিতে সুন্দর আলী নামে এক শ্রমিক নিহত হন। আহত ও গ্রেপ্তার হন বহু মানুষ। রক্তের বিনিময়ে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত আইয়ুব সরকারের শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে ১৭ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা পায় শিক্ষা দিবস হিসেবে।শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি, কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান ও সমতা নিশ্চিত করতে পারিনি। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে গণমুখী, সার্বজনীন ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে, কাঠামোগত পরিবর্তনও এসেছে। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি।শহর ও গ্রামের শিক্ষার সুযোগে পার্থক্য রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধায় রয়েছে বড় বৈষম্য। একই দেশের শিক্ষকদের আর্থসামাজিক মর্যাদাতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। অথচ শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, শিক্ষক সেই শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শিক্ষকদের মর্যাদা ও জীবনমান নিশ্চিত না করে মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠা কঠিন।আরেকটি বড় সমস্যা হলো শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষা যেন ক্রমেই জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মানবিকতা অর্জনের পরিবর্তে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল, সার্টিফিকেট ও চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হয়ে উঠছে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, সহমর্মিতা ও মানবিকতার চর্চা প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না। শিক্ষা মানুষকে শিক্ষিত করতে পারে, কিন্তু সুশিক্ষিত মানুষ হতে হলে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা জরুরি।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, সুশিক্ষার লক্ষণ হলো তা মানুষকে মুক্তি দেয়। সেই মুক্তি শুধু অর্থনৈতিক নয়; চিন্তা, বিবেক ও মানবিকতারও মুক্তি। তাই শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি একজন দায়িত্বশীল, মানবিক ও সুনাগরিক তৈরি করা। পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—তিন ক্ষেত্রেই এ দায়িত্ব রয়েছে।আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, শিক্ষার বিস্তারও ঘটেছে। কিন্তু মান নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে। পাঠ্যক্রমের ঘন ঘন পরিবর্তন, শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার চাপ এবং শিক্ষা নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু চাকরির জন্য নয়, জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের মূল শিক্ষা ছিল—শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, এটি মানুষের অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। শিক্ষা হতে হবে গণমুখী, সার্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন। শিক্ষার মধ্য দিয়ে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিকতার বিকাশ ঘটাতে হবে।শিক্ষা দিবস তাই শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন। যে ছাত্রসমাজ রক্ত দিয়ে শিক্ষার অধিকার ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থার দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল, তাদের আত্মত্যাগকে যথাযথভাবে স্মরণ করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে সেই ইতিহাস জানাতে হবে।৬৪ বছর পরও ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের অনেক আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ। সেই অপূর্ণতা পূরণের দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। শিক্ষা যেন শুধু জীবিকা অর্জনের মাধ্যম না হয়ে মানুষ হওয়ার পথ দেখায়—শিক্ষা দিবসে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: শিক্ষক, কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম]

বাংলা জনপদের ছাতা পরব

শাশ্বত বাংলার সংস্কৃতি হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও লোকায়ত জীবনের সমন্বিত রূপ। এই সংস্কৃতি বাংলার মানুষের আবেগ ও চেতনাকে ধারণ করে আসছে। বাংলা ভাষা ও সমৃদ্ধ সাহিত্য এর প্রাণকেন্দ্র হলেও এটি কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। নদীমাতৃক প্রকৃতির মতোই এ সংস্কৃতি প্রবহমান, উদার ও মানবিক। প্রাচীন জনগোষ্ঠীর জীবনাচার ও বিশ্বাসও বাংলা সংস্কৃতির মূল শিকড়ের অংশ। এ সংস্কৃতির নানা উপাদান ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে।বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘ছাতা পরব’ বা ‘ছত্তাবোঙ্গা’ নামে একটি লোকউৎসবের প্রচলন রয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও ঝাড়খণ্ডের মানভূম এলাকায় এটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। উত্তরবঙ্গের কোনো কোনো এলাকাতেও সাঁওতালরা এ ধরনের উৎসব পালন করেন। মূলত বর্ষার শেষ, শস্য ও বৃক্ষকে কেন্দ্র করে এ উৎসবের আয়োজন হয়। বাঁশ বা শালগাছের সঙ্গে তালপাতা কিংবা বিশেষ প্রতীক যুক্ত করে ছাতার মতো কাঠামো তৈরি করে বিভিন্ন আচার পালন করা হয়।সাঁওতাল বিশ্বাসে ‘বোঙ্গা’ হলো নৈসর্গিক আত্মা। তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে বোঙ্গার গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। আদি দেবতা নিরাকার—এমন বিশ্বাসও তাদের মধ্যে প্রচলিত। পার্থিব জীবনের মঙ্গল-অমঙ্গল, প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন আবর্তিত।পুরুলিয়ার চাকলতোড় গ্রামের ‘ছাতা পরব’ এ উৎসবের অন্যতম বড় আয়োজন। ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে এখানে বিশাল মেলা বসে। কয়েকশ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবে পঞ্চকোট রাজবংশের উত্তরসূরিরা ছাতা উত্তোলনের সংকেত দেন। রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হলেও উৎসবকে ঘিরে এক দিনের প্রতীকী রাজতন্ত্রের ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। একসময় এই অঞ্চলের শাসক ছিলেন পঞ্চকোট রাজবংশের সদস্যরা। সেই ঐতিহ্যের স্মৃতি ধারণ করেই প্রতিবছর উৎসবটি আয়োজন করা হয়।ছাতা পরবের সঙ্গে শস্য ও বৃক্ষের সম্পর্ক রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, জ্যৈষ্ঠের রোহিণী পরবে বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্রের মর্ত্যে আগমন ঘটে। তিন মাস পৃথিবীতে অবস্থান করে তিনি রুক্ষ জমিকে শস্যশ্যামল করে ভাদ্র পূর্ণিমায় স্বর্গে ফিরে যান। তার প্রত্যাবর্তনের পর ভাদ্র সংক্রান্তিতে ছাতা তোলা হয়। এ কারণে অনেকেই ছাতা পরবকে শস্য ও প্রকৃতির উৎসব হিসেবে বিবেচনা করেন।এই উৎসবের সঙ্গে আদিবাসী সমাজের সামাজিক জীবনও গভীরভাবে যুক্ত। মেলা হয়ে ওঠে বৃহৎ মিলনমেলা। ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, বিহার ও ছত্তিশগড় থেকেও অনেকে এতে অংশ নেন। নাচ, গান, মাদল, লোকাচার ও আনন্দের পাশাপাশি অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের পারস্পরিক পরিচয় ও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সুযোগও তৈরি হয়। ফলে ছাতা পরব কেবল ধর্মীয় বা লোকাচারভিত্তিক উৎসব নয়, আদিবাসী সমাজের সামাজিক সম্পর্ক ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।পুরুলিয়ার চাকলতোড় ছাড়াও সরবাড়ি, মালথোর, সঁটরা, বলরামপুর, বোঙ্গাবাড়ি, বান্দোয়ান ও চিতোড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ছাতা পরবের আয়োজন হয়। একইভাবে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম ও বিষ্ণুপুরের বিভিন্ন এলাকায় ‘ইঁদ পরব’-এরও প্রচলন রয়েছে। লোকমুখে তাই শোনা যায়—‘বরাবাজারের ইঁদ আর চাকলতোড়ের ছাতা রে,/ মেলা দেখিতে লোক চলে কাতারে কাতারে।’চাকলতোড়ের ছাতামেলার সঙ্গে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যের কথা বলা হয়। চুয়াড় বিদ্রোহের সময় আদিবাসীদের সঙ্গে নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে কাশীপুরের রাজা প্রথম ছাতা তুলেছিলেন—এমন একটি লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করে উৎসবের ঐতিহ্য আজও বহমান।এই উৎসবের আরেকটি তাৎপর্য আদিবাসী নারীদের সামাজিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, চাকলতোড়ের ছাতামেলায় অংশ নেওয়া সাঁওতাল কন্যাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পর্যায় সম্পন্ন হয়। মেলায় অনেক সময় পাত্র-পাত্রীর পরিচয় ও বিয়ের সিদ্ধান্তও হয়। ফলে এটি আদিবাসী সমাজে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।হাজার বছর ধরে হিন্দু ও মুসলমান সমাজের পাশাপাশি বসবাস করেও সাঁওতাল সমাজ তাদের স্বাতন্ত্র‍্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। প্রকৃতি, লোকবিশ্বাস, নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক রীতিনীতি তাদের জীবনযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ছাতা পরব সেই ঐতিহ্যেরই একটি উজ্জ্বল প্রকাশ।ছাতা পরব তাই শুধু একটি লোকউৎসব নয়; এটি বাংলা জনপদের বহুত্ব, আদিবাসী সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র‍্য এবং প্রকৃতিনির্ভর জীবনদর্শনের এক জীবন্ত নিদর্শন। সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও এই ঐতিহ্য টিকে থাকা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র‍্যরে শক্তিকেই তুলে ধরে।[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

ভিডিও আরও দেখুন

শতক হাঁকিয়ে রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে বিদায় মিরাজদের দল

এক পাশে শিমরন হেটমায়ারের বিধ্বংসী শতক, অন্য পাশে শেষ দিকে রভম্যান পাওয়েলের মারকুটে ইনিংস–সব মিলিয়ে টানটান উত্তেজনার এক ক্লাসিক ম্যাচের সাক্ষী হলো বার্বাডোজ। শেষ ওভারের নাটকীয়তায় গায়ানা অ্যামাজন ওয়ারিয়র্সকে ৫ উইকেটে হারিয়ে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (সিপিএল) ফাইনালে উঠে গেছে জ্যামাইকা কিংসম্যান। আর এই পরাজয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হলো মেহেদী হাসান মিরাজদের।কেনসিংটন ওভালে টস হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় গায়ানা। ২০ রানের মাথায় ফেরেন দুই ওপেনার মোহাম্মদ হারিস ও মাভেন্দ্র দয়াল। এরপর গায়ানাকে টেনে তোলার দায়িত্ব নেন শাই হোপ ও শিমরন হেটমায়ার। মাত্র ২০ বলেই হাফসেঞ্চুরি হাঁকানো হেটমায়ার চার-ছক্কার বৃষ্টি নামান মাঠে। হোপ ৩৩ বলে ৪০ রান করে আউট হলেও শেষ বল পর্যন্ত তাণ্ডব চালান হেটমায়ার। মাত্র ৪৫ বলে ৪টি চার ও ৮টি ছক্কায় ১০২ রানের ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন তিনি। নির্ধারিত ২০ ওভারে ৪ উইকেটে ২০৬ রানের বিশাল পুঁজি দাঁড় করায় গায়ানা। বল হাতে কোনো অবদান না রাখা মিরাজ ব্যাটিং নামারই সুযোগ পাননি।২০৭ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিল জ্যামাইকা। পাকিস্তানি ব্যাটার মাজ সাদাকাত ১৭ বলে ৪১ রানের ঝোড়ো সূচনা এনে দেন। কেসি কার্টি ৪০ বলে ৫৬ রান করে আউট হলে জ্যামাইকার সমীকরণ কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ ৩ ওভারে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৪ রান।ঠিক সেই মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন জ্যামাইকা অধিনায়ক রভম্যান পাওয়েল। ইমরান তাহির ও শামার জোসেফের টানা দুই ওভারে চার-ছক্কার তাণ্ডবে সমীকরণ নেমে আসে মাত্র ৬ রানে। শেষ ওভারের প্রথম বলেই আন্দ্রে রাসেলকে ফিরিয়ে রোমারিও শেফার্ড নতুন রোমাঞ্চের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, কিন্তু পরের বলেই ক্যাচ ফসকে গেলে সুযোগ হাতছাড়া হয় গায়ানার। শেষ পর্যন্ত ১৭ বলে ৪০ রানে অপরাজিত থেকে জ্যামাইকাকে ফাইনালে পৌঁছে দেন পাওয়েল। গায়ানার হয়ে প্রিটোরিয়াস ২টি উইকেট নিলেও মিরাজ ৪ ওভারে ৪৩ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি।

শতক হাঁকিয়ে রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে বিদায় মিরাজদের দল