সংবাদ
লাভের ফাঁদে মারা পড়ছে সুন্দরবনের হরিণ

লাভের ফাঁদে মারা পড়ছে সুন্দরবনের হরিণ

সুন্দরবনের সবচেয়ে পরিচিত ও নিরীহ প্রাণী চিত্রা হরিণ। এরা সাধারণত দলবদ্ধভাবে থাকে এবং প্রধানত ঘাস, লতাপাতা ও ফলমূল খেয়ে বাঁচে। কিন্তু লাভের লোভে সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার কিছু চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই নিরীহ প্রাণী শিকার করে আসছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বরগুনার পাথরঘাটা এলাকা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নৌপথে নেছারাবাদে হরিণের মাংস পাচার করা হচ্ছে। কাঠ, গোলপাতা ও মাছবাহী ট্রলারে অত্যন্ত সুকৌশলে এসব মাংস আনা হয়। পরে তা পৌঁছে দেওয়া হয় স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে।এমনকি দীর্ঘদিন সংরক্ষণের ফলে পচে যাওয়া মাংস কিংবা হরিণের মাংসের সঙ্গে অন্য প্রাণীর মাংস মিশিয়ে বিক্রির অভিযোগও করেছেন অনেকে।সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে পিরোজপুরের নেছারাবাদে অভিযান চালিয়ে ২২০ কেজি হরিণের মাংসসহ দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে নৌপুলিশ। উপজেলার ভরতকাঠি খেয়াঘাট এলাকার বেলুয়া নদীতে একটি কাঠবাহী ট্রলারে তল্লাশি চালিয়ে এসব মাংস উদ্ধার করা হয়।গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন– বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার খাসতবক গ্রামের মো. খলিল (৪১) এবং একই উপজেলার তাফালবাড়িয়া গ্রামের বাবুল ফরাজি (৪২)।দৈহারী নৌপুলিশ ফাঁড়ি সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার দুপুরে ভরতকাঠি খেয়াঘাট এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় একটি সন্দেহভাজন ট্রলার থামিয়ে তল্লাশি করা হলে বস্তাভর্তি ২২০ কেজি হরিণের মাংস পাওয়া যায়। পরে মাংস পরিবহনের দায়ে ট্রলারে থাকা খলিল ও বাবুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।দৈহারী নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. নিয়াজ মোর্শেদ জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে । জব্দকৃত মাংসের বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।সুন্দরবন থেকে বন্যপ্রাণী পাচার শুধু হরিণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, দেশের বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসা দিন দিন বড় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পাচারকারীচক্রের কাছে বন্যপ্রাণীর অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ । পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীদের একটি বড় অংশের উৎস সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা। পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীদের তালিকায় রয়েছে বাঘ, কুমির, হরিণ, সাপ, তক্ষক, কচ্ছপ ও হাঙ্গর।হরিণের মাংসের দামও এই পাচারের অন্যতম কারণ। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় হরিণের প্রতি কেজি মাংস ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়, আর জেলা শহরে প্রতি কেজি হরিণের মাংসের দাম ১,০০০ টাকা থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় । গরু ও খাসির মাংসের তুলনায় হরিণের মাংসের দাম কম হওয়ায় সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় এই বন্যপ্রাণীর মাংসের চাহিদা বাড়ছে।বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ অনুযায়ী, হরিণ শিকার ও পাচারের শাস্তি সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড । একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।যদিও এই আইনের কঠোরতা থাকলেও, এলাকাবাসীর দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মাঝেমধ্যে পাচারকারীরা ধরা পড়লেও মূল হোতারা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি হরিণ শিকারি ও পাচারকারী পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।হরিণ শিকার বন্ধে তথ্য প্রদানকারীকে বনের ভেতরের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং বনের বাইরে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা রয়েছে। কিন্তু তথ্য প্রদানের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার অভাবে অনেকেই এগিয়ে আসছেন না। সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান টিকিয়ে রাখতে এই নিরীহ প্রাণীদের রক্ষা করা জরুরি।
৩৯ মিনিট আগে

মতামতমতামত

একটি দিঘি হারানোর গল্প

পৃথিবীতে প্রতিদিন লক্ষ কোটি প্রাণী ও জীববৈচিত্রে‍্যর মধ্যে  পরিবর্তন সংঘটিত হয়ে চলেছে। প্রকৃতিতে এমন দৃশ্যমান ও অদৃশ্যে বদলে যাওয়ার ভেতর দিয়েই সৃষ্টি ও ধ্বংসের খেলায় মেতে থাকছে মানুষ। চারপাশে অনবরত ঘটে চলেছে হাজারো পরিবর্তন যার সবকিছু মানুষের চর্মচোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু পরিবর্তন অব্যাহত থাকছে। প্রকৃতির এমন নিগূঢ় রহস্যাবৃত বিষয় নিয়ে ভাববার অবকাশ সাধারণ মানুষের থাকে না। এগুলো যেন  জীববিজ্ঞান তথা  প্রকৃতিপ্রেমীদের নিত্যনব পরীক্ষা ও গবেষণার বিষয়।২.এদেশের সর্বত্র জীবন ও প্রকৃতির সহায়ক-শক্তি হিসেবে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্টি হওয়া বিল-ঝিল, হাওর-বাউর,নদী-নালা, জলাশয়, পুরানো পুকুর, জলের বিচিত্র উৎসস্থল সবকিছুকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে, বিলীন করে চলেছে মূলত একশ্রেণীর অবিমৃষ্যকারী, অদেশপ্রেমী,আবেগপ্রবণ তথা ক্ষমতাধর মানুষের হটকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। এসব নতুন নয়, চলে এসেছে বহু বছর ধরে। সরকার আসে, সরকার যায়, নতুন নতুন নীতিমালা হয়,আইন পাশ হয়, কঠোরতার মহড়া হয়, প্রচার হয়। তবে খুব বেশি কার্যকর কিছু হয়ে ওঠে না। যা হয় তা নেহায়েত লোকপ্রদর্শনের নিমিত্ত। আর এ ধরনের আত্মহত্যার সমান  পরিবেশ বিধ্বংসী সিদ্ধান্তগুলো আসে ক্ষমতাসীন শিক্ষিত মানুষের পক্ষ থেকে। দেশের জন্য এটাই মনে হয় সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য ও দুর্ভাবনার কারণ।৩.কিশোরগঞ্জ জেলায় আমাদের গ্রামের বাড়ির অতি নিকটে একটা ঐতিহ্যবাহী বিশালাকৃতির পুকুর ছিল। তাই এটাকে পুকুর না বলে দিঘি বলা যায়। অভিধানের ভাষায়  বড় পুকুরকে দিঘি বলা হয়। সে এখন অর্ধেক মৃত। ট্রেনে কাটা পড়া দেহের মতন একাংশ নিয়েই সচল আছে। এর আয়তন কমপক্ষে ১৫ একর হবে। দিঘিটা আমার কাছে আজন্ম লালিত বিস্ময়জাগানো এক অদ্ভুত বস্তুর মতো ছিল। এর বিশালত্ব, চৌহদ্দির জঙ্গলাকীর্ণ গাছ আর বাঁশঝাড়ের দৃশ্য, চারপাশের ঘরবসতি, সবুজ ও লালচে রঙের কচুরিপানায় চাপাপড়া তার দীর্ঘ দেহ ইত্যাদি যা আমাকে শৈশব-কৈশোর অবধি ভাবিয়ে তুলেছিল। এমন পাড়াগাঁয়ে যেখানে হিন্দু রাজা জমিদারের অস্তিত্ব নেই কিন্তু এত বড় দিঘি  কিভাবে হল? কারা ছিল এর খননকারী? জায়গা জমির প্রকৃত মালিকই বা কারা ছিল? এসব প্রশ্নও আমাকে কম ভাবায় নি।দিঘিটার উত্তর পার্শ্বে একখানা দরগাহ বা চুনের মাজার আছে। যার সৃষ্টির পেছনের ইতিহাস সুস্পষ্ট ভাবে লেখায় কোথাও পাওয়া যায় না। তবে জনশ্রুতি আছে, ইসলাম ধর্ম প্রচারের লক্ষে ভারত উপমহাদেশে আগত এবং কথিত ১৬০ জন আউলিয়ার অন্যতম একজন হযরত মিয়াচান শাহ (র.) এর মাজার এটি। কেউ কেউ মনে করেন, দিঘিটা মাজারের সমান বয়েসী বা মাজারকে ঘিরেই দিঘি অস্তিত্ববান হয়ে টিকে আছে। আমার পূর্ববর্তী দুই পুরুষের জবানিতে পাওয়া তথ্য মতে এবং স্হানীয় শত বছরের বৃদ্ধের বক্তব্যে জানা গেছে, পুকুরটা ইতোমধ্যে  কয়েক শতাব্দীর পথ পেছনে ফেলে এসেছে। আমার কৈশোরের  কোমলপ্রাণ স্মৃতি হাতড়িয়ে এখনো দিব্যি চোখে দেখি, দিঘিজুড়ে শুধু দল-ধামে ভরা, নানা জাতের পাখপাখালির কিচিরমিচির শব্দ, লতাপাতায় পাখির বাসা, বিশেষ করে বক জাতীয় পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল এ দিঘি। সেকালে  যুগের পর যুগ চলে যেত এগুলো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ কেউ নিতেন না। তাছাড়া মাজারের জিন্দাপীরের পছন্দ অপছন্দ বলেও একটা মিথ চালু আছে। কাজেই গ্রামবাসী সচরাচর কোনো ঝুঁকি নিতেন না। কৈশোরে দেখেছি, অতিবৃষ্টিতে পুকুর ভরে গেলে পূর্বপাড় দিয়ে সরু ড্রেন করে পানি নামানো হত, সঙ্গে বড় বড় কৈ, শিং, মাগুরের মিছিল নেমে আসতো। এলাকাবাসী আনন্দ উল্লাসে মাছ ধরে নিত। দিঘিতে সারাবছরই বেশ গভীর পানি থাকতো। চৈত্রের খরতাপে যখন মাঠ-ঘাট, বন-বাদার বিরান, দাউ-দাউ আগুনের ফুলকি তখনও কচুরিপানা ঠেলে সে দিঘি থেকে শীতল জলের অমৃত সুধার পরশ পেত এলাকাবাসী। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুরে নিজেও কতবার যে এর কাকচক্ষু স্বচ্ছ জলে সিক্ত হয়েছি সে কথা কবে কে গুণে রাখে? এসব এখন শুধু নস্টালজিক, পেছনে ফেলে আসা স্মৃতির ধূসর বিবর্ণ দিনলিপি।৪.দিঘির উত্তর পাড়ে অলৌকিক ভাবে গড়ে ওঠা কয়েক শতাব্দীর প্রাচীন যে দরগাহ শরীফ রয়েছে। এক সময়ে হযরত মিয়াচান শাহ'র চুনের দরগাহ নামে এর ব্যাপক পরিচিতি ছিল। এখন মাজার হিসেবে সুপরিচিত নাম। এক বিশাল বটবৃক্ষের নিচে দরগাহ'র গোলাকৃতির প্রধান গুম্বজসহ পাশে একাধিক কবরের আদলে তৈরি সাদা গুম্বজ রয়েছে। পরিস্কার পাক-পবিত্র টিলার চারদিকে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন দূরদূরান্তর থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষ দু-হাত তুলে প্রার্থনা করে। তারা নিভৃতে নানা কিছু মানত করে এবং অপেক্ষায় থাকে। এ সকল জিয়ারতকারীর গোপন চাওয়া-পাওয়ার গল্প ক’জন জানে? কথিত আছে, এই চুনের মাজারে মানত হিসেবে সাদা মনে কোনো কিছু দান করার বাসনা যেন রাতারাতি ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে। এমন বিশ্বাস আর আস্থাশীল মানুষের আগমন এলাকাটিকে কালক্রমে লোক সমাগমে পরিণত করছে।যা চল্লিশ, পঞ্চাশ বছর আগেও কল্পনাতীত বিষয় ছিল। আজকাল শিক্ষিত, অশিক্ষিত, নারী পুরুষ সকল শ্রেণির মানুষই মাজারের স্মরণাপন্ন হচ্ছেন। নির্বাচন, পরীক্ষা, চাকরি প্রার্থীরাও অবলীলায় মানত করে তাদের কাজ শুরু করেন। এটা কিসের আলামত বোঝা দায়! উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক কালে আমাদের কিশোরগঞ্জের 'পাগলা মসজিদে'র দানবাক্স খোলার আয়োজন আর কিছুদিন পরপর কোটি কোটি টাকা গণনার মিডিয়া চিত্র তো দেশবাসীকে অবাক করেই চলেছে। এক সময়ে দরগাহ জিয়ারতে আসা মানুষ দিঘির পানিতে হাত লাগিয়ে অজু করে উপরে উঠে জিয়ারত করতেন। অজু করার সুবিধার্থে বিভিন্ন সময়ে পাকা ঘাটলা করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি মাজারের এক পাশে পৃথক নামাজের ব্যবস্হা করাও আছে। বলাবাহুল্য, স্মরণাতীত কাল থেকে একটা অভিন্ন বিষয় লক্ষণীয় যে, ভারতবর্ষের যেখানেই পীর-দরবেশের এমন মাজার গড়ে ওঠেছে, সেখানেই সংলগ্নে আগত ভক্তবৃন্দের পবিত্রতার অবলম্বন হিসেবে একটা জলাশয় বা পুকুরের ব্যবস্হা রয়েছে। এটা যেন একে অপরের পরিপূরক এক আদি ব্যবস্হাপনা। দরগাহ'র চারপাশে বেশ কয়েকটি প্রবীণ বৃক্ষ ছিল। যার ডালে বাস করতো শতবর্ষী শকুনেরা। রাতের বিভিন্ন প্রহরে এরা গলা ছেড়ে ডাক ছাড়তো।  শৈশবে দেখেছি, একটা বড় বটগাছের শাখার ছায়া যেন দশদিগন্তে ছড়িয়ে ছিল। কোথাও বাতাস না থাকলেও বট গাছের তলে শনশন করে দেহজোড়ানো  বাতাস বয়ে যেত। বিশাল একটা জাম গাছও ছিল। মাজারের উপরে ওঠে জাম পারতে গিয়ে কারও কারও মৃত্যুর ঘটনা আজও গল্প হয়ে আছে। মনে পড়ে, ভর বর্ষা মৌসুমে সামনের হাওরের ভাসমান নৌকার মাঝিরা অন্ধকার রাতে সেই উঁচু বটগাছের মাথা দেখেই দিক নির্ণয় করতো।৫.বছর পাঁচ আগের কথা। একদিন  শুনলাম, সেই স্বপ্নময় দিঘিটাকে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। তাৎক্ষণিক সশরীরে দেখতে গেলাম। আহা! অবাক বিস্ময়ে ভাবছিলাম, এটা কেন করা হলো? কোনো সদুত্তর পেলাম না। বালু ব্যবসায়ী বসন্তের কোকিলরা এমপি সাহেবকে বোঝাতে সক্ষম  হয়েছে, মাজারে ওয়াজ মাহফিলের জন্য উন্মুক্ত স্থান নেই। একমাত্র দিঘিটা ভরাট করেই তা করা যাবে। যদিও মাজারের দু'পাশে এসব মাহফিল আয়োজন করার মত স্থান ছিল। সেদিকে কে তাকায়?  বালু ভরাটের কাজে স্হানীয় মধ্যস্হতাকারীদের পকেটেও কিছু আর্থিক সুবিধা পৌঁছে গেল এবং যথাসময়ে তাই করা হলো। তাদের আগ্রহে অপরিকল্পিত তথা হটকারিতায় হাওরের মূল্যবান ফসলি জমিকে গভীর গর্ত করে বালু এনে অর্ধেক দিঘি ভরাট করা হলো। মাজারের আয় থেকে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করা হলো। ফলে এতে এখন নিত্যদিনের ওয়াজ-মাহফিলের ব্যবস্থা হলো। সঙ্গে  গো বিচরণেরও একটা বিহিত হলো। আবার পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে যাদের বাড়িতে উঠোন ছিল না তারাও এর বহুমাত্রিক ব্যবহার করে চলেছে। এবং এ কাজে মোটামুটি সবাই খুশি, বাহবা দেয়ার মতন একটা প্রশংসনীয় কাজ হয়েছে । কিন্তু কেউ ভাবলো না, ইতিহাসের অমূল্য ধন, অপরূপ সুন্দর দিঘিটি কিভাবে চিরতরে হারিয়ে গেল। অথচ এরা দিঘিটাকে কত বিচিত্র সাজে রূপান্তর করতে পারতো! প্রথমে দেশের অভিজ্ঞ পরিবেশবিদদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারতো। তিন দিকের প্রতিটা বাড়ির পশ্চাদভাগে সোজাসুজি ছোটছোট ঘাটলা করে নামিয়ে দেওয়া যেত। উপরের অংশে প্রাতঃভ্রমণ ও সান্ধ্যকালীন হাঁটার জন্য দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে দিতে পারতো। পুকুরে প্রয়োজনীয় মাছ ছেড়ে এর যথাযথ রক্ষণা-বেক্ষন করে এক পর্যায়ে লটারি পদ্ধতিতে কাছে-দূরের মৎস শিকারীদের সুযোগ দিতে পারতো। বছরে লাখ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন কর্মে অংশ নিতে পারতো। তখন পুরো এলাকাটা বিবেচিত হত এক অনন্য পর্যটন কেন্দ্রের স্পট হিসেবে। কিন্তু  দিনের শেষে এসব কিছুই হলো না, মধ্য থেকে শতাব্দীর স্মারক ও ঐতিহ্যের ধারক দিঘিটার একটা অংশকে ভরে দিয়ে এক দৃষ্টিকটু আজব বদ্ধ-জলাশয়ে পরিণত করা হলো।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার]

নেপালে ফ্ল্যাশ ফ্লাড বাংলাদেশের জন্য সতর্কতা

আকস্মিক বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড হলো এমন এক ধরনের বন্যা যা কোনো পূর্ব প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সংগঠিত হয়। আকষ্মিক বন্যা সংগঠিত হওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে হিমবাহ ধস ও পাথরে শিলার ধস অন্যতম কারণ। এছাড়া মুশলধারায় ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধস, নদীর উপর থাকা বাঁধ বা স্লুইস গেইট ভেঙে পড়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন ইত্যাদি কারণে আকষ্মিক বন্যা হয়ে থাকে। নেপালে আকষ্মিক যে বন্যা সংগঠিত হয়েছে সেটা হিমবাহ ধস ও পাথরে শিলা ধসের কারণে সংগঠিত হয়েছে। নেপাল-চীন সীমান্তের উত্তরে যে ভূকম্পন শনাক্ত হয়েছে সেটি আসলে হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ। আর এ কারণেই হঠাৎ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে ভাবা হয়েছিল ভূমিকম্প সংগঠিত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বোঝা গেলো এটা আসলে ডাউনস্ট্রিম বিপর্যয়। নেপাল-চীন সীমান্তের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চলে বরফ ও পাথুরে শিলার বড় ধরনের ধস হয়। এতে আশপাশের নদীতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষসহ পানির ঢল ও প্রবাহ তৈরি হয়। যার আঘাতে নেপালে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি সংগঠিত হয়। নেপালে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সংবাদ মাধ্যম থেকে যতটুকু জানা যায়, এখন পর্যন্ত সাড়ে ছয় শত জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ১ হাজার ৪৭৩ জন। বন্যায় তীব্র স্রোতে অনেক মরদেহ ভেসে গেছে। গত বুধবারের ভয়াবহ বন্যায় নেপালে আনুমানিক ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি)। বাড়িঘর, প্রাণ ও প্রকৃতির ক্ষয়ক্ষতি বলে হয়তো শেষ করা যাবে না। পরিবার ও স্বজন হারানো মানুষগুলোর অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্টের ক্ষত থাকবে দীর্ঘদিন। আমাদের বাংলাদেশেও মাঝে মাঝে এ ধরনের ফ্ল্যাশ ফ্লাড হয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশে ফ্ল্যাশ ফ্লাড হয় পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে। গত বছরের বন্যা এ কারণেই সংগঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশের উত্তরে মেঘালয়ের পাহাড় সমূহ, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলের পাহাড় ও পর্বত থাকায় ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মূলত ফ্ল্যাশ ফ্লাড সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে যে ফ্ল্যাশ ফ্লাড হয় সেটা হয়তো আর দশটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সহনীয় হিসাবেই মনে করা হয়। কেননা, ভৌগোলিক অবস্থানগতভাবে ধরেই নেয়া হয়েছে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রবন দেশ। এগুলো হয় এবং আমাদের মোকাবিলা করেই জীবন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। কিন্তু নেপালে ঘটে যাওয়া হিমবাহ ধস এবং এর ফলে সৃষ্ট ফ্ল্যাশ ফ্লাড আমাদেরও বিপদের কথা স্বরণ করিয়ে দেয়। ভৌগোলিক অবস্থানগতভাবে আমাদের বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পর্বতমালা হিমালয়ের দক্ষিণদিকে অবস্থিত। হিমালয় থেকে সৃষ্ট নদীর প্রবাহ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক গঠন পললভূমির। নদী বাহিত পলি বালি কাঁদার স্তর জমে এ ভূমি গঠিত হয়েছে। এখনও হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে হিমালয়ের দূরত্ব খুব বেশি নয়। হিমালয় অঞ্চলে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটলে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বাংলাদেশ থেকে হিমালয় পর্বতমালা ও এর প্রধান শৃঙ্গগুলোর দূরত্ব স্থানভেদে হয়তো ভিন্ন ভিন্ন। দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে দূরত্ব সবচেয়ে কম। তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দূরত্ব মাত্র ১১ কিলোমিটার। মাউন্ট এভারেস্ট এর দূরত্ব ৭৫ কিলোমিটার। পার্শ্ববর্তী অন্যান্য স্থান কমবেশি ১০০ কিলোমিটার এর মধ্যে অবস্থিত। তেঁতুলিয়া থেকে নেপালের দূরত্ব মাত্র ৬২ কিলোমিটার। এতে বোঝাই যায়, বড় ধরনের হিমবাহ ধস হলে বাংলাদেশের এই রকম আকষ্মিক বন্যা হয়ে যেতে পারে। এর কারণও আছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি হিমালয়ের বরফের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রতিবছর বরফ কমছে বাড়ছে হিমবাহ প্রবাহ। বরফ গলে গিয়ে যে পানি বের হয়ে আসছে সেগুলো জমা হচ্ছে- হিমালয় অঞ্চলের লেকগুলোতে। বড় ধরনের শিলা চ্যুতি বা হিমবাহ ধস হলে জমে থাকা পানি নিচে নেমে আসবে একযোগে। সঙ্গে পাহাড়ি ভারী বর্ষণ যোগ হলে ফ্ল্যাশ ফ্লাড হবেই। আর এর প্রভাব আমাদের বাংলাদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। হঠাৎ অস্বাভাবিক মাত্রায় পানির প্রবাহ হলে বাংলাদেশের নদনদীগুলো পানি বহন করতে মোটেও সক্ষম হবে না। কারণ বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর নাব্যতা অনেক আগেই হ্রাস পেয়েছে। নেপালের বন্যায় যে ক্ষতি হয়েছে তারচেয়েও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হবে বাংলাদেশে। হিমালয় থেকে সৃষ্ট বাংলাদেশে প্রবাহিত নদী হচ্ছে - গঙ্গা (পদ্মা), ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা। গঙ্গা (পদ্মা) ভারতের উত্তরাখণ্ডের গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ থেকে এর উৎপত্তি। এটি ভারত ও বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। ব্রক্ষ্মপুত্র তিব্বতের কৈলাস শৃঙ্গের কাছে জিমা ইয়ংজং হিমবাহ থেকে উৎপন্ন লাভ করে। তিব্বতে এর নাম সাংপো এবং এটি ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। যমুনা নদী হিমালয়ের যমুনোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে গঙ্গার অন্যতম প্রধান শাখায় পরিণত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। হিমালয় অঞ্চল থেকে প্রবাহিত নদীর পানির প্রায় ৮০ ভাগ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে হিমালয় অঞ্চলে বড় ধরনের হিমবাহ ধস হলে বাংলাদেশেও প্রভাব পড়তে পারে। ফ্ল্যাশ ফ্লাডের প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে সুরক্ষার জন্য আগাম প্রস্তুতি অবলম্বন করা অপ্রয়োজনীয় নয়। এর জন্য নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা হতে পারে প্রধান কাজ ও সতর্কতার পূর্ব প্রস্তুতি। ফ্ল্যাশ ফ্লাড এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যার আগাম সতর্কতা জারি করাও সম্ভব হয় না। প্রকৃতি শুধু হেয়ালি নয় প্রকৃতি অনেক সময় অপ্রতিরোধ্য। প্রকৃতি আমাদের যেমন উজাড় করে দেয় তেমনি প্রকৃতি আমাদের নিঃস্ব করে। প্রকৃতির খেয়াল বোঝা বড় দায়। প্রকৃতি আমাদের শিখায়। প্রকৃতির শিক্ষাই হচ্ছে বড় শিক্ষা। [লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

মাদক মামলা: অপরাধী কেন পার পায়

একটি ফৌজদারী মামলার জয়-পরাজয় কেবল অভিযোগের সত্যতার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে বিচারিক আদালতে উভয় পক্ষের সাক্ষ্য উপস্থাপন, আলামত প্রমাণ এবং আইনি কৌশল প্রয়োগের দক্ষতার ওপর। অনেক সময় সুস্পষ্ট অপরাধীও প্রসিকিউশনের সামান্য ত্রুাটর কারণে খালাস পেয়ে যায়, আবার অনেক সময় আসামির আইনজীবীর কৌশলগত ভুলের কারণে আসামি শাস্তির মুখে পড়ে। একটি মাদক মামলার রায় বিশ্লেষণ করে বিচারক, প্রসিকিউশন, আসামীপক্ষের আইনজীবী এবং আইন শিক্ষার্থীদের জন্য কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক দিক নিচে তুলে ধরা হলো।আসামিপক্ষের আইনজীবীর কৌশলগত ত্রুটিমাদকের মামলায় আসামীকে আইনি সুরক্ষা দিতে গিয়ে আইনজীবীরা প্রায়শই কিছু সাধারণ ভুল করে থাকেন। উক্ত মামলায় আসামীপক্ষের যে সমস্ত দুর্বলতা ফুটে উঠেছে তার মধ্যে অন্যতম স্বতন্ত্র সাক্ষীর বৈরী হওয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা হওয়া। প্রসিকিউশনের পাবলিক সাক্ষী বৈরী হওয়ায় আসামীপক্ষ ধরে নিয়েছিল মামলা দুর্বল হয়ে গেছে। কিন্তু এটি একটি মারাত্মক ভুল কৌশল। উচ্চ আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত হচ্ছে পাবলিক সাক্ষী সাক্ষ্য না দিলেও বা বৈরী হলেও, সরকারি/অফিসিয়াল সাক্ষীদের যেমন: র‌্যাব বা পুলিশ সদস্য বস্তুনিষ্ঠ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা দেয়া সম্পূর্ণ আইনসম্মত। (৮ বি.এল.টি ৩৫২, ১৫ এম.এল.আর (এ.ডি) ৭৭) অফিসিয়াল সাক্ষীদের জেরা করতে ব্যর্থতাডিএডি, এস.আই এবং সার্জেন্ট এই তিন সরকারি সাক্ষীর সাক্ষ্য অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। আসামীপক্ষ তাদের বিস্তারিত জেরা করলেও এমন কোনো অসঙ্গতি উদঘাটন করতে পারেনি যা এজাহারের ঘটনাকে মিথ্যা প্রমাণ করে।টেন্ডার সাক্ষীদের জেরা না করারাষ্ট্রপক্ষ যখন কেবল ‘টেন্ডার’ করেছিল, তখন আসামীপক্ষ তাদের জেরা করতে অস্বীকৃতি জানায়। এটি আসামীপক্ষের একটি বড় ভুল। টেন্ডার সাক্ষীদের জেরা করে ঘটনার স্থান, আলামত জব্দ বা সময় সংক্রান্ত অসঙ্গতি বের করার একটি সুযোগ আসামীপক্ষ হাতছাড়া করেছে।প্রসিকিউশন ও তদন্তকারী কর্মকর্তার ত্রুটিঅপরাধী পার পেয়ে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রসমূহ যদিও এই মামলায় আসামিরা বদলি হয়েছে, তথাপি তদন্ত ও প্রসিকিউশনের কিছু পদ্ধতিগত ত্রুটি এখানে স্পষ্ট, যা একটু বিচক্ষণ বিচারে আসামীকে খালাসের সুযোগ করে দিতে পারত। যেমন ঘটনাস্থলে আলামত সীলগালা না করা। সাক্ষীদের জবানবন্দিতে প্রকাশ পায় যে, আলামত অর্থাৎ ইয়াবা ঘটনাস্থলে কেমিক্যাল পরীক্ষার জন্য আলাদাভাবে সীলগালা বা বিশেষ মার্কিং করা হয়নি। মাদকের মামলায় আলামতের ‘চেইন অব কাস্টডি’ অক্ষুণ্ন রাখা বাধ্যতামূলক। আলামত সীলগালা না করা প্রসিকিউশনের একটি মারাত্মক গাফিলতি।স্থানীয় ও নিরপেক্ষ সাক্ষী না নেয়াঘটনাস্থলটি ছিল কুমারখালী বাসস্ট্যান্ডের মতো একটি জনবহুল এলাকা। সেখানে বহু বাস কাউন্টার, যাত্রী ও ব্যবসায়ী থাকা সত্ত্বেও তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনো বাস কাউন্টারের লোক বা স্থানীয় নিরপেক্ষ কাউকে সাক্ষী করেননি। রাসায়নিক পরীক্ষককেও সাক্ষী করা হয়নি। অভিযোগপত্রে যে ৩ জন পাবলিক সাক্ষীকে রাখা হয়েছিল, তারা আদালতে গিয়ে মামলা সমর্থন করেননি। তদন্তকালে সাক্ষীদের স্থায়ী ঠিকানা সঠিকভাবে নিশ্চিত না করা এবং তাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত না করার কারণে প্রসিকিউশন কেবল সরকারি সাক্ষীর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়।অফিসিয়াল বনাম প্রাইভেট সাক্ষীর সাক্ষ্যগত মূল্যউচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে বিজ্ঞ আদালত সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে ‘সাক্ষীরা সরকারি কর্মচারী বা ইন্টারেস্টেড হলেই তাদের সাক্ষ্য বাতিল করা যায় না, যদি তারা সত্যবাদী হন।’ স্থানীয় সাক্ষীরা ভয়ে বা প্রভাবে পড়ে নিরপেক্ষ নাও থাকতে পারে, কিন্তু অফিশিয়াল সাক্ষীদের বক্তব্য পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে তা গ্রহণের আইনি ভিত্তি রয়েছে।রাসায়নিক পরীক্ষা ও ওজনের সঠিক হিসাবমাদকের ধরণ ও সাজা নির্ধারণে রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট মুখ্য ভূমিকা পালন করে। জব্দকৃত আলামতে ‘মিথাইল অ্যাম্ফিটামিন’ পাওয়া গেছে এবং প্রতি ট্যাবলেটের গড় ওজন ০.১ গ্রাম ধরে আসামী রাশেদের ক্ষেত্রে ২০০ গ্রাম এবং মালেকের ক্ষেত্রে ১২০ গ্রাম অ্যাম্ফিটামিন হিসাব করে আইন অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।শিক্ষণীয় সার সংক্ষেপ:১। আসামীপক্ষ অফিশিয়াল সাক্ষীদের মধ্যে সময়ের ব্যবধান, ঘটনাস্থলের দূরত্ব ও আলামতের ধরণ নিয়ে জবানবন্দীতে অসঙ্গতি ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।।২। কেবল পাবলিক সাক্ষী বৈরী হয়েছে এই যুক্তির ওপর ভরসা করে অফিশিয়াল সাক্ষীদের জেরা শিথিল করা মোটেও ঠিক হয়নি।৩। প্রসিকিউশন ও ঘটনাস্থলেই জব্দকৃত আলামত নিরপেক্ষ সাক্ষীদের উপস্থিতিতে সীলগালা করা ও মার্কিং করতে ব্যর্থ হয়েছেন।৪। জনবহুল স্থানে অভিযান চালিয়ে স্থানীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সাক্ষী করা থেকে বিরত থাকাও পেশাদারিত্বের পরিচয় নয়।৫। ৮ বি.এল.টি ৩৫২ পৃষ্ঠায় উল্লেখিত বিল্লাল মিয়া বনাম রাষ্ট্রের মামলায় মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ এর সিদ্ধান্ত হতে জানা যায় যে, স্থানীয় সাক্ষীরা প্রভাবশালী আসামীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে চাননা। সেকারনে রাষ্ট্রপক্ষের সরকারী সাক্ষীদের অবিশ্বাস করার কোন কারন নেই বরং ১৫ এম.এল.আর (এ.ডি) ৭৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখিত জায়েদুল ইসলাম জাবেদ বনাম রাষ্ট্রের মামলায় দেয়া মাননীয় আপীল বিভাগের সিদ্ধান্ত হতে জানা যায় যে, জব্দতালিকার সাক্ষীরা রাষ্ট্রপক্ষের মামলা সমর্থন করে সাক্ষ্য না দিলেও কেবলমাত্র সরকারী সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আসামীকে দোষী সাব্যস্থ করা আইনসম্মত। অনুরূপ মনোভাব ব্যক্ত করা হয়েছে ৫ বি.এল.সি (এ.ডি) ৪১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রাষ্ট্র বনাম ফুলমিয়া মামলায়। ফৌজদারী বিচারে কেবল সন্দেহের বশে কাউকে সাজা দেওয়া যায় না, আবার পদ্ধতিগত ছোটখাটো ত্রুটির সুযোগ নিয়ে অপরাধীকে পার পেতে দেয়াও ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামীপক্ষ উভয় পক্ষই যদি নিজ নিজ পেশাদারিত্ব ও আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি করে, তবেই ফৌজদারী বিচারব্যবস্থায় প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু

মক্কায় স্বাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এবার বাস্তবায়নের পথে এগোল। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় প্রথম Strategic Political and Defence Committee বৈঠক আজ সোমবার ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হয়েছে।বৈঠকের পর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ঘোষণা করেছেন, তিন দেশের এই নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোর আনুষ্ঠানিক নাম হবে “Makkah Defence Alliance”। একই সঙ্গে জোটটির প্রথম Secretary-General পাকিস্তান থেকে আসবেন বলেও জানানো হয়েছে।গত ৭ আগস্ট মক্কায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বে যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, আজকের বৈঠক তার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।ওই চুক্তির মূল নীতির মধ্যে রয়েছে—তিন দেশের কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা।ইস্তাম্বুলের বৈঠকে শুধু রাজনৈতিক সমন্বয় নয়, তিন দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বা interoperability, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, যৌথ উৎপাদন ও গবেষণা এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।অর্থাৎ মক্কা চুক্তিকে কেবল একটি রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে না রেখে ধীরে ধীরে একটি কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিণত করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে।বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই জোট ভবিষ্যতে আরও দেশের জন্য উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে। হাকান ফিদান জানিয়েছেন, অন্য দেশগুলো কীভাবে এই যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অংশ নিতে পারবে, সে বিষয়ে একটি Roadmap তৈরির কাজ চলছে। ফলে বর্তমানের তিন দেশের কাঠামো ভবিষ্যতে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোটে পরিণত হতে পারে, এমন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও স্পষ্ট হয়েছে যে, আঙ্কারা এই উদ্যোগকে নতুন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা কাঠামোর সূচনা হিসেবে দেখছে। তাঁর মতে, এই জোটের লক্ষ্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বাড়ানো এবং নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কমানো।অর্থাৎ পশ্চিম এশিয়া ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি, পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা এবং তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও কৌশলগত অবস্থানকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা স্পষ্ট হচ্ছে।আজকের বৈঠকের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা। প্রথম Secretary-General পাকিস্তান থেকে আসার সিদ্ধান্ত তিন দেশের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের একটি প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করেছে।একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ Secretariat, সমন্বয় ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও আলোচনা এগোচ্ছে। ফলে ৭ আগস্টের চুক্তির পর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জোটটি ঘোষণার পর্যায় পেরিয়ে প্রতিষ্ঠান তৈরির পর্যায়ে প্রবেশ করল।তবে এই জোটকে এখনই ন্যাটোর সমতুল্য একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। চুক্তিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার মূল নীতি থাকলেও কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া নেওয়া হবে, তার বিস্তারিত প্রক্রিয়া এখনও গড়ে তোলা হচ্ছে। আজকের বৈঠকের বড় অংশ তাই সেই কাঠামোকে কার্যকর করার প্রাতিষ্ঠানিক ও সামরিক রূপরেখা তৈরির দিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।এই জোটের বিস্তারের সম্ভাবনা ইতিমধ্যেই আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন হিসাব তৈরি করেছে। বাংলাদেশও মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশ করেছে বলে আজকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে ভবিষ্যতে জোটের পরিধি বাড়লে দক্ষিণ এশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং তুরস্ককে ঘিরে একটি নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।সব মিলিয়ে, আজকের ইস্তাম্বুল বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—মক্কা চুক্তি এখন আর শুধু একটি ঘোষণাপত্র নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা জোটে রূপ নেওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। নাম পেল “Makkah Defence Alliance”, প্রথম Secretary-General আসছেন পাকিস্তান থেকে, নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির Roadmap তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, সামরিক সমন্বয় ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতাকে কাঠামোবদ্ধ করার কাজ শুরু হয়েছে। এর ফলে পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন এক ত্রিপাক্ষিক শক্তির আবির্ভাব ঘটল, যার প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে আগামী দিনে জোটটি কতটা প্রাতিষ্ঠানিক ও সামরিকভাবে কার্যকর হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত কতটি দেশ এতে যুক্ত হয়।

সময়ের আয়নায় জীবনের দর্শন

যদি অতীত হয় বর্জ্য কাগজ, বর্তমান হয় সংবাদপত্র, আর ভবিষ্যৎ হয় টিস্যু পেপার, তবে জীবন কী?প্রশ্নটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের অস্তিত্ব, সভ্যতা এবং সময়ের এক গভীর দর্শন। অতীতকে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, যেন সেটি বর্জ্য কাগজ। বর্তমানকে আঁকড়ে ধরি সংবাদপত্রের মতো, যা সকালে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই তার মূল্য কমে যায়। আর ভবিষ্যৎকে আমরা এমনভাবে ব্যবহার করি, যেন সেটি টিস্যু পেপার, প্রয়োজন শেষ হলে যার আর কোনো গুরুত্ব থাকে না। কিন্তু জীবন কি সত্যিই এতটাই সামান্য?এই পৃথিবীকে দেখুন। কত নিখুঁত একটি সৃষ্টি। নদী তার নিজস্ব ছন্দে বয়ে চলে, বৃক্ষ নীরবে অক্সিজেন বিলিয়ে যায়, পাখিরা প্রতিদিন নতুন ভোরের গান গায়, ঋতুগুলো একে অন্যের হাত ধরে পৃথিবীকে রঙিন করে তোলে। প্রকৃতি কখনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না, যতক্ষণ না মানুষ তার স্বাভাবিক ভারসাম্যে হস্তক্ষেপ করে। অথচ মানুষ, যে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী বলে দাবি করে, সেই মানুষই প্রতিনিয়ত এই সৌন্দর্যকে অসুন্দর করে তুলছে। উন্নয়নের নামে বন কাটা হচ্ছে, ভোগের নামে নদী দূষিত হচ্ছে, ক্ষমতার নামে যুদ্ধ তৈরি হচ্ছে, আর অগ্রগতির নামে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের মানবিকতাকেই বিসর্জন দিচ্ছে। আমরা প্রায়ই বলি, পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কার পৃথিবী এগিয়েছে?কিছু মানুষের জীবন নিঃসন্দেহে আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। প্রযুক্তি, চিকিৎসা, যোগাযোগ এবং অর্থনীতিতে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবন কি একইভাবে বদলেছে? কোটি কোটি মানুষ এখনও ক্ষুধা, যুদ্ধ, বৈষম্য, বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে আছে। তাহলে উন্নয়নের এই গল্প কি সবার গল্প, নাকি মাত্র কয়েকজনের?আমরা সংবাদপত্রে যাদের দেখি, তাদের অধিকাংশই ক্ষমতার কেন্দ্রের মানুষ। তাদের সিদ্ধান্ত, তাদের সাফল্য, তাদের সংঘাতই শিরোনাম হয়। কিন্তু সেই কৃষকের গল্প কোথায়, যিনি খরার সঙ্গে যুদ্ধ করে খাদ্য উৎপাদন করেন? সেই শ্রমিকের গল্প কোথায়, যার ঘামে শহর দাঁড়িয়ে থাকে? সেই শিশুর গল্প কোথায়, যে প্রতিদিন স্বপ্ন দেখার আগেই বাস্তবতার কাছে হার মানে?আরও একটি প্রশ্ন আমাদের নিজেদেরই করা উচিত। আমরা কি শুধু মানুষের পৃথিবীর কথা ভাবছি, নাকি পৃথিবীরও কথা ভাবছি?এই গ্রহ শুধু মানুষের নয়। অসংখ্য প্রাণী, উদ্ভিদ, বন, নদী, পাহাড় এবং সমুদ্রেরও সমান অধিকার রয়েছে এই পৃথিবীতে। অথচ তাদের হয়ে কথা বলার কেউ নেই। তারা আদালতে যায় না, সংবাদ সম্মেলন করে না, নির্বাচনে ভোট দেয় না। তাই তাদের নীরবতাকে আমরা দুর্বলতা ভেবে বসেছি। কিন্তু প্রকৃতির নীরবতারও একটি সীমা আছে। যখন সেই সীমা অতিক্রম হয়, তখন খরা, বন্যা, দাবানল, ঝড় কিংবা অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের মাধ্যমে প্রকৃতি তার ভাষায় উত্তর দেয়। সভ্যতার সবচেয়ে বড় সংকট প্রযুক্তির ঘাটতি নয়, বিবেকের অসম বণ্টন। আমরা জ্ঞান অর্জন করেছি, কিন্তু প্রজ্ঞা অর্জন করতে পারিনি। আমরা সম্পদ সৃষ্টি করেছি, কিন্তু ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে পারিনি। আমরা পৃথিবীকে বদলানোর ক্ষমতা অর্জন করেছি, কিন্তু নিজেদের বদলানোর সাহস এখনও পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি। তাহলে জীবন কী?জীবন শুধু জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের হিসাব নয়। জীবন হলো দায়িত্ব। জীবন হলো শেখা, বোঝা এবং রেখে যাওয়া। অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া, বর্তমানকে অর্থবহ করে তোলা এবং ভবিষ্যৎকে যত্নের সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার নামই জীবন। যদি অতীত সত্যিই বর্জ্য কাগজ হয়ে যায়, তবে আমাদের ভুলগুলোও হারিয়ে যাবে। যদি বর্তমান কেবল সংবাদপত্রের মতো একদিনের গল্প হয়ে থাকে, তবে মানবতার কোনো স্থায়ী মূল্য থাকবে না। আর যদি ভবিষ্যৎকে আমরা টিস্যু পেপারের মতো ব্যবহার করি, তবে একদিন আমাদের সন্তানদের হাতে তুলে দেয়ার মতো একটি সুস্থ পৃথিবীও আর থাকবে না। জীবনের প্রকৃত অর্থ হয়তো এখানেই। পৃথিবীকে শুধু ব্যবহার করার জন্য নয়, তাকে আরও সুন্দর করে রেখে যাওয়ার জন্যই মানুষের জন্ম। কারণ একটি সুন্দর পৃথিবীতে জন্ম নেয়া সৌভাগ্য, কিন্তু সেই পৃথিবীকে সুন্দর রেখে যাওয়া দায়িত্ব। কিছু দিন আগে ছিল ৫ আগস্ট। সারা বাংলাদেশ নানা আয়োজন, আলোচনা, স্মৃতিচারণ এবং শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাবলিকে স্মরণ করেছে। যারা জীবন দিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, যারা নিজেদের বিশ্বাস ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের প্রতি সম্মান জানানো হয়েছে। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিনই স্মরণীয় হওয়া উচিত, কারণ কোনো জাতি তার স্মৃতিকে অস্বীকার করে টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু একটি প্রশ্ন কি আমরা নিজেদের করেছি? আমরা কী পেলাম? আমরা কী শিখলাম? আমরা কী অর্জন করলাম? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আমরা কোথায় যাচ্ছি?একটি দিন উদযাপন করা সহজ। একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করাও সহজ। কিন্তু একটি জাতির চরিত্র নির্মাণ করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। ইতিহাস শুধু অতীতকে স্মরণ করার জন্য নয়, ভবিষ্যৎকে সংশোধন করার জন্যও। যদি ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়া যায়, তবে ইতিহাস কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হয়ে থাকে। ৫ আগস্টের পরের দিন ছিল ৬ আগস্ট। ৫ আগস্টের স্লোগান থেমে গেছে, মঞ্চ গুটিয়ে গেছে, সংবাদপত্রে নতুন শিরোনাম এসেছে। কিন্তু মানুষের জীবনে কী বদল এসেছে? সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ, এসব কি এক ধাপও এগিয়েছে? নাকি আমরা আবারও এমন এক ভবিষ্যতের অপেক্ষায় আছি, যেখানে পুরোনো প্রশ্নগুলোর ওপর নতুন রঙ লাগানো হবে?সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিন বদলেছে, কিন্তু প্রশ্নগুলো কি বদলেছে? ৫ আগস্টের স্মৃতি আজও আমাদের সামনে সেই একই প্রশ্ন রেখে যায়, আমরা কি সত্যিই নিজেদের পরিবর্তন করতে পেরেছি, নাকি শুধু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উদযাপনের ভাষা পরিবর্তন করেছি?আগামী দিন কোনো রহস্য নয়। আগামীকাল তৈরি হয় আজকের সিদ্ধান্ত, আজকের সততা এবং আজকের দায়িত্ব থেকে। যে জাতি প্রতিটি ঘটনার পর আত্মসমালোচনা করতে শেখে, সে জাতি এগিয়ে যায়। আর যে জাতি শুধু উদযাপন করে, কিন্তু শিক্ষা গ্রহণ করে না, সে একই বৃত্তে বারবার ঘুরে ফিরে আসে। সম্ভবত আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি আন্দোলন নয়; প্রয়োজন একটি জাগ্রত বিবেক। এমন একটি বিবেক, যা দল, ব্যক্তি, ক্ষমতা কিংবা মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে সত্য এবং অন্যায়কে অন্যায় বলতে শেখে। কারণ কোনো জাতির প্রকৃত মুক্তি কেবল শাসকের পরিবর্তনে আসে না; আসে মানুষের চিন্তার পরিবর্তনে, মূল্যবোধের পরিবর্তনে এবং দায়িত্ববোধের বিকাশে। তাই প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে, যদি অতীত হয় বর্জ্য কাগজ, বর্তমান হয় সংবাদপত্র, আর ভবিষ্যৎ হয় টিস্যু পেপার, তবে জীবন কী?আজ আমার উত্তর আরও স্পষ্টজীবন কোনো কাগজ নয়। জীবন একটি অঙ্গীকার। এমন এক অঙ্গীকার, যেখানে ইতিহাসকে শুধু স্মরণ করা হয় না, সেখান থেকে শিক্ষা নেয়া হয়; বর্তমানকে শুধু আলোচনা করা হয় না, তাকে সৎ কর্মে রূপ দেয়া হয়; আর ভবিষ্যৎকে শুধু কল্পনা করা হয় না, তাকে যত্ন, ন্যায়, মানবতা এবং দায়িত্ব দিয়ে নির্মাণ করা হয়। যেদিন আমরা একটি জাতি হিসেবে এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পারব, সেদিন ৫ আগস্ট, কিংবা অন্য যেকোনো ঐতিহাসিক দিন, শুধু উদযাপনের দিন হবে না; সেদিনগুলো হয়ে উঠবে আমাদের বিবেক জাগরণের দিন। আর তখনই আমরা বলতে পারব, আমরা শুধু ইতিহাস রচনা করিনি, ইতিহাস থেকে শিখতেও পেরেছি। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন]

মেঘমল্লারের নীল উপাখ্যান

মাতামুহুরী, স্মৃতি ও বর্ষার অন্তর্লোককিছু ঋতু মানুষের অন্তর্জগতে জন্ম নেয়। বর্ষা তেমনই এক ঋতু। সে শুধু আকাশে মেঘ ডেকে আনে না; বহুদিন নীরব হয়ে থাকা স্মৃতির জানালাও খুলে দেয়। আষাঢ়ের প্রথম বাতাস বইলেই মানুষের অন্তরে যেন কোনো সুপ্ত নদী আবার জেগে ওঠে। পার্বত্য জনপদের নদীগুলোর মধ্যে মাতামুহুরী এমনই এক প্রবহমান স্মৃতিধারা। পাহাড়ের ছায়া, অরণ্যের স্নিগ্ধ গন্ধ এবং মেঘের কোমল আলোকে সঙ্গী করে সে নিরবচ্ছিন্নভাবে বয়ে চলে। এই নদীর তীরে দাঁড়িয়েই বহু মানুষ প্রথম বর্ষাকে কেবল দেখেনি; ধীরে ধীরে তাকে অনুভব করতেও শিখেছে। কারণ বর্ষা দৃশ্যের চেয়ে অনুভবের বিষয়ই বেশি। পাহাড়ে মেঘ নামারও একটি নিজস্ব ভঙ্গি আছে। দূরের শৈলশিরা ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে যায়। কুয়াশা ও মেঘ মিলে নির্মাণ করে এক অপার্থিব আবরণ। মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজের মুখটি নিঃশব্দে ঢেকে নিয়ে গভীর আত্মমগ্নতায় নিমগ্ন হয়েছে। চারদিকে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। আছে কেবল এক নীরব রূপান্তর। বর্ষার সঙ্গে সঙ্গে নদীর ভাষাও বদলে যায়। শুষ্ক ঋতুর চঞ্চলতা মিলিয়ে গিয়ে তার প্রবাহ হয়ে ওঠে গভীর, ধীর এবং বিস্তৃত। তখন মনে হয়, নদীর বুক বেয়ে কেবল জল নয়, সময়ও প্রবাহিত হচ্ছে। মানুষ দীর্ঘক্ষণ সেই স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকে। পরে উপলব্ধি করে, প্রকৃতির কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্য সব সময় উত্তর খোঁজা নয়; অনেক সময় নিজের অন্তর্লোকের নীরবতাকে চিনে নেয়াও। শৈশবের বহু শিক্ষা ভাষায় প্রকাশিত হয় না; তারা অনুভূতির স্তরে জমা থাকে। বর্ষার জলে একটি ফোঁটা পড়ে। জলের বুকে জন্ম নেয় একটি বৃত্ত। কিছুক্ষণ পরে তা মিলিয়ে যায়। কিন্তু মিলিয়ে যাওয়ার আগে সে জলের মুখে এক মুহূর্তের কম্পন রেখে যায়। প্রকৃতির এই সামান্য দৃশ্যই মানুষের জীবন সম্পর্কে গভীর শিক্ষা বহন করে। তখন বোঝা যায়, স্থায়িত্বের চেয়ে স্পর্শ অনেক সময় অধিক অর্থবহ। মানুষের জীবনও অনেক ক্ষেত্রে তেমনি অস্তিত্বের দৈর্ঘ্যরে চেয়ে তার রেখে যাওয়া অনুরণনই অধিক মূল্যবান। বর্ষার গন্ধেরও একটি স্মৃতিলোক আছে। ভেজা মাটি, কচি ঘাস, বাঁশপাতা এবং অরণ্যের সজল সুবাস মিলিয়ে যে অনুভূতির জন্ম হয়, তার কোনো অভিধানগত নাম নেই। কিন্তু বহু বছর পরও সেই গন্ধ মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে শৈশবের দরজায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সম্ভবত স্মৃতিরও নিজস্ব ঋতু আছে। সেই ঋতুর নাম বর্ষা। পাহাড়ি বর্ষণ সমতলের বর্ষার মতো নয়। এখানে বৃষ্টি স্তরে স্তরে অবতীর্ণ হয়। কখনো মিহি পর্দার মতো। কখনো অবিরাম গম্ভীর ধ্বনিতে। আবার কখনো হঠাৎ থেমে গিয়ে চারদিকে এমন এক নিস্তব্ধতা রেখে যায়, যেন প্রকৃতি নিজেই নিজের হৃদস্পন্দন শুনছে। বর্ষার দিনে নদীর ঘাটে বসে ভেসে চলা একটি শুকনো পাতার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকা অনেকেরই পরিচিত অভিজ্ঞতা। কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে না। কোনো ব্যাখ্যাও থাকে না। শুধু মনে হয়, পৃথিবীর সবকিছুই চলমান। নদী চলছে। মেঘ চলছে। বাতাস চলছে। মানুষও চলমান। অথচ এই নিরবচ্ছিন্ন গতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর স্থিতি। জীবনের পথ বিস্তৃত হতে থাকে। মানুষ সাহিত্য পাঠ করে। সংগীত শোনে। দর্শনের নানা ধারা সম্পর্কে জানতে শেখে। তখন একসময় পরিচয় ঘটে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বর্ষামুখর রাগ মেঘমল্লার-এর সঙ্গে। কিন্তু এই রাগের প্রকৃত অনুভব অনেকের কাছে সংগীতশালায় নয়; বরং প্রকৃতির মধ্যেই প্রথম ধরা দেয়। মাতামুহুরীর বর্ষাসন্ধ্যা, পাহাড়ের মেঘছায়া কিংবা নদীর গম্ভীর প্রবাহ যেন বহু আগে থেকেই সেই রাগের নীরব অনুশীলন করে আসছে। মানুষের কণ্ঠ উচ্চারণ করার বহু পূর্বেই প্রকৃতি যেন নিজের ভাষায় মেঘমল্লার গেয়ে চলেছে। এই কারণেই মেঘমল্লার কেবল একটি রাগের নাম নয়। এটি এক গভীর অনুভূতির নাম। এমন এক অন্তর্লোকের অবস্থা, যখন প্রকৃতি মানুষের অদৃশ্য হৃদয়তন্ত্রীতে আলতো স্পর্শ রাখে। তখন কোনো উচ্চারণের প্রয়োজন হয় না। এক ধরনের নীরব সুর অন্তরে জন্ম নেয়। সেই সুর কানে শোনা যায় না; অনুভূত হয় আত্মার গভীরে। বর্ষা ফিরে এলেই মানুষের স্মৃতিতে প্রথম যে দৃশ্যটি জেগে ওঠে, তা অনেক সময় আকাশ নয়; কোনো নদী, কোনো পাহাড়, কোনো শৈশব কিংবা কোনো বিস্ময়ে ভরা প্রথম পৃথিবী। সময় মানুষকে বহুদূর নিয়ে যায়। জীবন বদলে যায়। কিন্তু বিস্ময়ের সেই প্রথম আলো পুরোপুরি নিভে যায় না। বর্ষার প্রথম মেঘ তাকে আবার নিঃশব্দে জাগিয়ে তোলে। সম্ভবত মানুষের সবচেয়ে স্থায়ী ঠিকানা তার অনুভূতি। সেই অনুভূতির ভেতরেই জন্মভূমি, নদী, পাহাড়, মানুষ এবং শৈশব এক অদৃশ্য ঐক্যে বেঁচে থাকে। মাতামুহুরী তাই কেবল একটি নদীর নাম নয়; এটি একটি স্মৃতি-ভূগোল, একটি সাংস্কৃতিক চেতনা এবং মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর নন্দনপ্রতীক। তখন উপলব্ধি জন্মায় নদী কেবল জলধারা নয়। পাহাড় কেবল ভূপ্রকৃতি নয়। বর্ষাও কেবল একটি ঋতু নয়। এরা মিলিত হয়ে মানুষের স্মৃতির এমন এক ভূগোল নির্মাণ করে, যেখানে সময়ের হিসাব মুছে যায়, কিন্তু অনুভূতির প্রতিধ্বনি থেকে যায়। হয়তো এ কারণেই পৃথিবীর কিছু গল্প কখনো শেষ হয় না। তারা নদীর মতোই প্রবাহিত হয়। ঋতুর পর ঋতু। প্রজন্মের পর প্রজন্ম। মাতামুহুরীর জলরেখায়, পাহাড়ের মেঘছায়ায় এবং মানুষের অন্তর্জগতের গভীরে। সেই অবিরাম প্রবাহেরই এক নন্দনময় নাম মেঘমল্লারের নীল উপাখ্যান। [লেখক: প্রধান শিক্ষক, অসতি ত্রিপুরা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলীকদম, বান্দরবান]

নেপাল ও তিব্বতের বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশের কী শিক্ষা নেয়ার আছে

নেপাল ও তিব্বতের সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক দুর্যোগ প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। সেখানে হিমবাহ ধসজনিত আকস্মিক ঢল, কাদা ও পাথরের মিশ্রিত তীব্র প্রবাহ নিমেষেই ভাসিয়ে নিয়েছে বহু জনপদ, বসতি, সেতু ও জাতীয় মহাসড়ক। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ ইউএসজিএস নিশ্চিত করেছে, ভূমিকম্প নয়, বর্ষার পানিতে সম্পৃক্ত পলির ওপর একটি হিমবাহখণ্ড ধসে পড়াই এর কারণ। সাধারণ প্লাবনের বাইরে গিয়ে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথরের সেই ধ্বংসাত্মক স্রোত বহু মানুষকে গৃহহীন করেছে এবং যোগাযোগব্যবস্থাকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। যখন এটি লিখছি, মৃতের সংখ্যা ছয় শত পার হয়েছে এবং নিখোঁজ কয়েক হাজার, তবে উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় এই সংখ্যা প্রতিদিনই বদলাচ্ছে। হিমালয়ের কোলে ঘটা এই মর্মান্তিক ঘটনা পার্শ্ববর্তী প্রতিটি দেশের জন্যই একটি সতর্কবার্তা। স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে, বাংলাদেশ কি পাহাড়ি এলাকার এমন আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি নিরাপদ?এই প্রশ্নের উত্তরে কোনো অমূলক আতঙ্ক ছড়ানো যেমন অনুচিত, তেমনই আত্মতুষ্টিতে ভোগারও সুযোগ নেই। ভৌগোলিক গঠনের দিক থেকে বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চল নেপালের সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালার মতো নয়। তাই নেপালের ভূতাত্ত্বিক ঘটনার হুবহু পুনরাবৃত্তি বাংলাদেশের সমতলে ঘটার আশঙ্কা কম। তবে আমাদের পাহাড়ি অঞ্চলে যে তীব্র আকস্মিক ঢল, পাহাড়ধস এবং কাদা মিশ্রিত পানির প্রবাহ তৈরি হতে পারে না, এমন ধারণা একেবারেই ভিত্তিহীন। ভৌগোলিক কাঠামোর ভিন্নতা থাকলেও দুর্যোগ সৃষ্টির প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের জন্যও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং বিপজ্জনক। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ভূখণ্ড এই ঝুঁকির একেবারে সম্মুখভাগে রয়েছে। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের পাহাড়ি জনপদগুলো ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই অঞ্চলের পাহাড়গুলো মূলত নরম বেলেপাথর ও পলিমাটি দিয়ে গঠিত। পাহাড়ি ছড়া, ছোট নদী ও সংকীর্ণ উপত্যকাগুলোর মধ্য দিয়ে যখন দ্রুতগতিতে বৃষ্টির পানি নেমে আসে, তখন তা আশপাশের আলগা মাটি ও গাছপালা ভাসিয়ে নিয়ে আসে। সংকীর্ণ পাহাড়ি পথ দিয়ে সেই কর্দমাক্ত পানির স্রোত যখন তীব্র বেগে নিচের বসতিতে আছড়ে পড়ে, তখন তা বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব। উ‘ বায়ুমণ্ডল তুলনামূলকভাবে বেশি জলীয়বাষ্প ধরে রাখতে পারে। এর ফলে স্বাভাবিক ধারাবাহিক বৃষ্টির বদলে খুব অল্প সময়ে চরম মাত্রার অতিবৃষ্টি বা ক্লাউডবার্স্ট সদৃশ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। অল্প সময়ে অস্বাভাবিক পরিমাণ বৃষ্টি হলে পাহাড়ের মাটি দ্রুত পানি শোষণ করে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। মাটির ধারণক্ষমতা শেষ হয়ে গেলে তার বাঁধন আলগা হয় এবং ভূমিধস ঘটে। জলবায়ু পরিবর্তন একক কোনো ঘটনার একমাত্র কারণ না হলেও এটি চরম বৃষ্টিপাতের তীব্রতা ও ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে। প্রকৃতির এই চরম রূপের চেয়েও বড় বিপদ তৈরি করছে মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড। বছরের পর বছর ধরে নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বনাঞ্চল উজাড় করা এবং পাহাড়ের খাঁড়া ঢালে বসতি গড়ে তোলার প্রবণতা ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বিপজ্জনকভাবে ঘরবাড়ি তৈরি করা হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক ছড়া ও নালা দখল করে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে। এছাড়া সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণের সময় পাহাড়ের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করায় বৃষ্টির পানি আটকে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। সেই পানি যখন মাটির চাপ ভেঙে হঠাৎ নেমে আসে, তখন তা নিচে থাকা জনপদকে গুঁড়িয়ে দেয়। প্রকৃতির বিরূপ আচরণের সঙ্গে মানুষের তৈরি দুর্বলতা যুক্ত হয়ে সাধারণ বৃষ্টিকে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপান্তর করছে। নেপাল ও তিব্বতের সাম্প্রতিক দৃশ্য দেখার আগে বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসও আমাদের বারবার এই সতর্কবার্তা দিয়েছে। ২০০৭ ও ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের স্মৃতি আজও অমলিন। প্রতি বর্ষায় পাহাড়ি ঢল ও কাদার স্রোতে প্রাণহানি এবং সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে সম্ভাব্য বিপদের পদধ্বনি আমরা অতীতেও প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের বর্তমান প্রস্তুতিতেও বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে ‘ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে” এমন সাধারণ পূর্বাভাস দেয়া হলেও ঠিক কোন পাহাড়ি ঢালটি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে কিংবা কোন ছড়া দিয়ে আকস্মিক কাদার ঢল নামতে পারে, সেই সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যের ঘাটতি এখনও স্পষ্ট। বৃষ্টিপাতের নির্দিষ্ট পরিমাপ পর্যবেক্ষণ করে স্থানীয় পর্যায়ে ভূমিধসের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ কমিউনিটির কাছে দ্রুত মোবাইল মেসেজ বা সাইরেনের মাধ্যমে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার সমন্বিত ব্যবস্থা থাকা দরকার। দেশে ভূতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র বা হ্যাজার্ড ম্যাপ তৈরি করা হলেও নীতি নির্ধারণ ও মাঠপর্যায়ের নগর পরিকল্পনায় তার প্রয়োগ খুব কম। যেসব এলাকা পাহাড়ধসের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত, সেখানেও অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা নতুন বসতি স্থাপন বন্ধ করা যায়নি। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী প্রান্তিক মানুষদের স্থায়ীভাবে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা আজও দৃশ্যমান নয়। গবেষণা ও মানচিত্র যদি নথিপত্রের ভেতরেই আটকে থাকে, তবে তা সাধারণ মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে না। আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিতেও মৌলিক রূপান্তর প্রয়োজন। দুর্যোগ ঘটার পর উদ্ধার অভিযান চালানো, শুকনো খাবার বিতরণ ও সাময়িক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রচলিত ধারণায় আটকে থাকলে চলবে না। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের দিকে মনোযোগ দিয়ে একটি প্রতিরোধমূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে। সঠিক ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত করা, পাহাড় কাটা কঠোর হাতে বন্ধ করা, আধুনিক পূর্বাভাস দেয়া এবং টেকসই নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে বিপদ আসার আগেই জীবনহানির আশঙ্কা কমিয়ে আনা সম্ভব। পাহাড় ও পরিবেশ নিয়ে আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। পাহাড়কে কেবল পর্যটন, আবাসন, রিসোর্ট কিংবা বাণিজ্যিক রাস্তা বানানোর খালি জায়গা মনে করার প্রবণতা মারাত্মক আত্মঘাতী। পাহাড়ের নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নষ্ট করে তথাকথিত উন্নয়ন অব্যাহত রাখলে তা দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনবে। উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশগত সুরক্ষার ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে সেই অবকাঠামো নিজেই ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নেপাল ও তিব্বতের ঘটনা থেকে বাংলাদেশের জন্য প্রধান শিক্ষা হলো, চরম মাত্রার কোনো প্রাকৃতিক আচরণকে অসম্ভব ধরে বসে থাকার সুযোগ নেই। পাহাড়ি অঞ্চলে পানি নিষ্কাশনের সামান্য ব্যর্থতাও যে মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা অনুধাবন করতে হবে। একইসঙ্গে শুধু সাধারণ আবহাওয়া বার্তা নয়, বরং সম্ভাব্য প্রভাবভিত্তিক সতর্কবার্তা চালু করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে মানুষের বসতি নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি। নেপাল ও তিব্বতের পাহাড় আমাদের পাহাড় নয়, তাদের নদী আমাদের নদী নয়। কিন্তু দুর্যোগের সংকেত চিনে আগে থেকেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে। নেপাল ও তিব্বতের মাড ফ্লাড এর মতো বিধ্বংসী ঘটনা বাংলাদেশে হবে কি না, সেই তাত্ত্বিক বিতর্কে সময় শেষ। আমাদের উচিত নিজেদের পাহাড়ি জনপদগুলো এমন চরম দুর্যোগ মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্নের বাস্তব সমাধান খোঁজা এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি। [লেখক: শিক্ষার্থী, দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর]

গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ?

বাংলাদেশে গ্যাসের সংকট নতুন কোনো ঘটনা নয়। বহু বছর ধরেই গ্যাসের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি যেন সেই পুরনো সমস্যাকে নতুন করে ভয়ংকর করে তুলেছে। সিএনজি স্টেশনের সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারি, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সংকট, বাড়তে থাকা লোডশেডিং, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কোথাও কোথাও কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, সব মিলিয়ে গ্যাসের সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নেই। এটি ধীরে ধীরে দেশের অর্থনীতির সমস্যা হয়ে উঠছে। তবে এই সংকটকে শুধু এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা ভুল হবে। দুর্ঘটনাটি হয়তো বর্তমান সংকটকে আরও তীব্র করেছে, কিন্তু সংকটের বীজ অনেক আগে থেকেই বপন করা হয়েছিল। দেশের পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে, নতুন গ্যাসের সন্ধান প্রত্যাশিত গতিতে হচ্ছে না, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, অথচ সেই আমদানি সামাল দেয়ার মতো অবকাঠামোও যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের গ্যাস সংকট আসলে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতি, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা সম্পর্কে দুর্বল প্রস্তুতির ফল। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক উৎপাদন ১, ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি। একই সময়ে এলএনজি আমদানির পরিমাণ প্রায় ৪৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ দেশের মোট গ্যাসের চাহিদা এর চেয়ে অনেক বেশি। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়েও প্রতিদিন প্রায় ১, ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। অর্থনীতির একটি বড় অংশ যখন গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তখন এই ঘাটতি খুব দ্রুত অন্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা যাচ্ছে শিল্পে। একটি কারখানায় গ্যাস না থাকলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। শ্রমিক কাজ করতে পারে না, মেশিন বন্ধ থাকে, কাঁচামাল পড়ে থাকে, বিদেশি ক্রেতার অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করা যায় না। অথচ ব্যাংকের ঋণের কিস্তি থেমে থাকে না। শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, গুদাম ভাড়া, কাঁচামালের খরচ, সুদ, কর সব চলতে থাকে। বাংলাদেশে এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে একজন উদ্যোক্তা ভালো ব্যবসা করেও জ্বালানির অভাবে সমস্যায় পড়তে পারেন। তিনি হয়তো ঋণ নিয়েছেন, বিনিয়োগ করেছেন, শ্রমিক নিয়োগ করেছেন, রপ্তানির অর্ডার পেয়েছেন। কিন্তু উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস যদি না থাকে, তাহলে তার সব পরিকল্পনা থেমে যেতে পারে। অর্থাৎ গ্যাসের পাইপলাইনের সংকট একসময় ব্যাংকের ঋণখেলাপির সংকটে পরিণত হতে পারে। আমরা সাধারণত ঋণখেলাপি হলে উদ্যোক্তার দিকে আঙুল তুলি। ব্যবসায় ভুল হয়েছে কি না, ব্যবস্থাপনা দুর্বল ছিল কি না, ঋণ নেওয়ার সময় ঝুঁকি ঠিকমতো বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, এসব প্রশ্ন করি। কিন্তু যদি কারখানা চালানোর মতো গ্যাসই না থাকে, তাহলে সেই ব্যবসার ব্যর্থতার দায় কতটা উদ্যোক্তার এবং কতটা রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত ব্যর্থতার, সেটিও আমাদের ভাবতে হবে। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে শিল্পায়নের কথা বলছে। নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে, নতুন কারখানা হচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ আনার চেষ্টা চলছে। কিন্তু একটি কারখানা তৈরি করা আর সেটিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানো এক বিষয় নয়। বিনিয়োগকারীকে শুধু জমি, কর সুবিধা বা ঋণ দিলেই হয় না। তাকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পরিবহন ও বন্দর সুবিধাও দিতে হয়। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় বাংলাদেশ ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করে। সমুদ্রে দুটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ স্থাপন করা হয়। দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১.১ বিলিয়ন ঘনফুট। তখন এটি ছিল প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যবস্থা কি দেশের ভবিষ্যৎ চাহিদার জন্য যথেষ্ট ছিল?না। কারণ দুটি টার্মিনালের একটি সমস্যায় পড়লেই সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। একটি টার্মিনাল দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি শুধু শিল্পে নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এক দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ৩, ৭০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর বাংলাদেশের বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। ফলে গ্যাস কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে, বিদ্যুৎ কমলে শিল্প উৎপাদন কমে এবং শিল্প উৎপাদন কমলে অর্থনীতিতে আবার নতুন চাপ তৈরি হয়। এটি অনেকটা ফড়সরহড় বভভবপঃ-এর মতো। একটি জায়গায় ধাক্কা লাগে, তারপর একে একে অন্য জায়গাগুলোও পড়ে যায়। দেশের গ্যাস উৎপাদন যে কমছে, সেটি বহু বছর ধরেই জানা। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই সময়ের সঙ্গে কমে আসে। নতুন কূপ খনন না করলে এবং নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার না করলে উৎপাদন আরও কমবে, এটিও নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়। তারপরও নতুন অনুসন্ধানের গতি চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। একসময় বাংলাদেশকে গ্যাসসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে দেখা হতো। গ্যাসের ওপর নির্ভর করে শিল্প গড়ে উঠেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, সার কারখানা চালু হয়েছে, শহরের যানবাহনে সিএনজি জনপ্রিয় হয়েছে। অর্থাৎ গ্যাসকে কেন্দ্র করে আমরা একটি বড় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছি। কিন্তু সেই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে একই সময়ে যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। এখন আমরা সেই পুরোনো সিদ্ধান্তগুলোর মূল্য দিচ্ছি। সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন সরকার অফশোর ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। ১৫০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। চীনের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে। মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজও এগোচ্ছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দরকার। কিন্তু সমস্যাটা হলো, এগুলোর কোনোটিই আজ কিংবা আগামীকাল গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে পারবে না। একটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করলেই পরদিন সেখান থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে ঢুকবে না। অনুসন্ধান, আবিষ্কার, মূল্যায়ন, উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং উৎপাদন শুরু করতে কয়েক বছর সময় লাগে। সমুদ্রের ক্ষেত্রে সময় আরও বেশি লাগতে পারে। নতুন এফএসআরইউ নির্মাণ বা রূপান্তরেও সময় প্রয়োজন। অর্থাৎ আজকের সংকটের সমাধান এবং আগামী দশকের সমাধান এক জিনিস নয়। সরকারকে এই দুই কাজ একই সঙ্গে করতে হবে। প্রথমে বর্তমান সংকট সামাল দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত সচল করা জরুরি। বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প ও অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহের অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে অতিরিক্ত উৎপাদনের সুযোগ আছে কি না, তা খুঁজে দেখতে হবে। ভোলার গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে আনার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। কিন্তু এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাজ থামানো যাবে না। এখানে অনশোর বা স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৭ সালের পর আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে স্থলভাগে বড় ধরনের অনুসন্ধান হয়নি বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। যদি দেশের মাটির নিচে এখনও বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস থাকে, তাহলে সেটি খুঁজে বের করার কাজ আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে সমুদ্রেও অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা রয়েছে। সেখানে কী পরিমাণ গ্যাস বা অন্যান্য জ্বালানি সম্পদ আছে, তার পূর্ণ চিত্র এখনও আমাদের হাতে নেই। অনুসন্ধান না করে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করা কোনো দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি হতে পারে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এর অংশ এখনও সীমিত। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বিদ্যুৎ আমদানি এবং অন্যান্য জ্বালানি উৎসকে বাস্তবসম্মতভাবে জাতীয় পরিকল্পনায় আনতে হবে। কোন উৎস কতটা সাশ্রয়ী, কতটা নির্ভরযোগ্য এবং পরিবেশের জন্য কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটি বিবেচনা করে একটি বৈচিত্র্যময় জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হলো, আমরা অনেক সময় চাহিদা বাড়ার পর সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। অথচ জ্বালানি পরিকল্পনার কাজ হওয়া উচিত উল্টো। আগে ভবিষ্যতের চাহিদা অনুমান করতে হবে, তারপর সেই চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। তাই গ্যাসের সংকটকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখতে হবে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: শিক্ষক, আইইউবিএটি]

সহিংসতার ক্ষত সারাতে প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

সহিংস পরিস্থিতির কারণে মানুষের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, আতঙ্ক ও আসন্ন সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে প্রাত্যহিক জীবনে ঘুমাতে না পারা, খাওয়া-দাওয়ার প্রতি অনীহা এবং দৈনন্দিন কাজে স্বাভাবিক সামঞ্জস্য বজায় রাখতে না পারার মতো বহুমাত্রিক জটিলতা দেখা দিয়েছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নানা ধরনের ডিসঅর্ডার তথা মানসিক জটিলতা। মানুষ হয়ে পড়ছেন ‘ট্রমাটাইজড’। এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে দেখা দিতে পারে ‘ডিপ্রেশন’ ও ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’-এর মতো মানসিক সমস্যা। মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের মতে, বর্তমানে চলমান অশান্তি ও উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মধ্যে যে মনোদৈহিক ও মনোসামাজিক বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা তাদের শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। এর ফলে বিনষ্ট হচ্ছে তাদের স্বতঃস্ফূর্ততা ও সৃজনশীলতা। সৃজনশীলতার পূর্বশর্ত হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ততা। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে মানুষ যখন স্বতঃস্ফূর্ত থাকতে পারেন না, তখন তাদের সৃজনশীলতাও ব্যাহত হয়। এতে দৈনন্দিন কাজকর্মে আচরণগত বিক্ষিপ্ততা ও অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। এমন অবস্থায় অপরিচিত মুহূর্তগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তথা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ছেন। তারা এমন সব আচরণ করছেন, যা সুস্থ ও গ্রহণযোগ্য সামাজিকতা এবং মানবিকতার পরিপন্থী। অতিউৎসাহী হয়ে মানুষ নেতিবাচক কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। অংশগ্রহণ করছেন অনৈতিক ও অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ডে। ভেঙে পড়ছে সামাজিক স্থিতিশীলতা। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এসব আচরণ মনোবৈকল্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মানুষ অসামাজিক কাজ করছেন। এতে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্য। সহনশীলতা হারিয়ে অনেকে হয়ে পড়ছেন অসহিষ্ণু। করে ফেলছেন অমানবিক ও ধ্বংসাত্মক কাজ। বিরুদ্ধ মতের রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মী, কার্যালয়, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত কর্মী ও থানায়ও হামলার ঘটনা ঘটছে। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অস্থিতিশীল পারিপার্শ্বিকতা, যা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এটি একটি ভঙ্গুর সমাজকাঠামো গড়ে তুলছে। যে সমাজকাঠামো আমাদের কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাশিত নয়। আনুপূর্বিক এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে আমাদের সমাজবাস্তবতা আরও অশান্ত পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাবে, যা ভয়ঙ্কর পরিণতির জন্ম দিতে পারে। তবে ইতিবাচক আত্ম-উপলব্ধির কারণে অনেকে লুটপাটের মাধ্যমে নেয়া বস্তুগত সম্পদ ইতোমধ্যে ফেরত দিচ্ছেন। এই ইতিবাচক উপলব্ধিকে উপজীব্য করে জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নেতিবাচক ও ইতিবাচক পরিস্থিতিকে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সামাজিকীকরণের ধারায় প্রবাহিত করতে অনতিবিলম্বে মনোবৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। লক্ষ্য জনগোষ্ঠীভিত্তিক মনোস্বাস্থ্যসেবা চালু করা প্রয়োজন, যাতে মানুষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে জন্ম নেয়া নেতিবাচক মনস্তত্ত্বকে ইতিবাচকভাবে রূপান্তর করতে পারেন এবং মনোবৈকল্য থেকে বেরিয়ে এসে ইতিবাচক ও মানবিক আচরণে অভ্যস্ত হতে পারেন। পর্যায়ক্রমিক এই মনোদৈহিক ও মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ইতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক সেবা একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সমাজকাঠামো গড়ে তুলতে পারে। সৃষ্টি হতে পারে একটি মানবিক সমাজ। আর মানুষ হয়ে উঠতে পারেন প্রশান্ত মন ও মননের মানবিক মানুষ। এই মানবিক মানুষের মননশীল ও ইতিবাচক আচরণ নিশ্চিত করতে পারে একটি সহনশীল ও সম্প্রীতিপূর্ণ সামাজিক অবকাঠামো। এর জন্য প্রয়োজন মনোবৈজ্ঞানিক মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা কাঠামো। আর তা তখনই সম্ভব হবে, যখন মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রকে সহজলভ্য ও প্রশস্ত করা হবে, যাতে মানুষ বাধাহীনভাবে আচরণবিজ্ঞানের এই সেবা গ্রহণ করতে পারেন। সামগ্রিক অবস্থা ও প্রয়োজনীয়তার নিরিখে তাই নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত বিবেচনার জন্য দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশে একটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ কর্মসূচি গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে নিম্নোক্ত কর্মপ্রস্তাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে। উল্লিখিত কর্মপ্রস্তাবনা গ্রহণ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আমরা একটি প্রশান্ত ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারব- মনোবিজ্ঞানী জ্যাকব লেভি মোরেনো যাকে ‘থেরাপিউটিক সোসাইটি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। জাতীয়ভাবে ঔষধবিহীন তথা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডভিত্তিক মনোচিকিৎসা পদ্ধতিকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ‘জাতীয় মনোবৈজ্ঞানিক সেবা পরিকাঠামো ও অবকাঠামো’ গড়ে তুলতে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। কেননা প্রচলিত সাইকোথেরাপির পাশাপাশি ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ অনুশীলনের মাধ্যমে স্বল্প সময় ও আর্থিক বিনিয়োগে অধিক মানুষের জন্য মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ একটি দলীয় মনোস্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক মানুষের মানসিক সুস্থতা ও ইতিবাচক অভিব্যক্তি বিকাশে কাজ করা যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশের জনসংখ্যার জনমিতি ও বয়সভিত্তিক বৈচিত্র্য এবং নিম্ন আয়ের মানুষের পরিসংখ্যান বিবেচনায় দ্রুততম সময়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’কে চলমান স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা একটি যৌক্তিক ও কার্যকর কর্মপ্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা ‘কিশোর গ্যাং’-এর সদস্যদের তালিকাভুক্ত করে সংশোধনাগারের কাঠামোয় এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপিভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করা গেলে তাদের একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক মনোবৃত্তিসম্পন্ন জনসম্পদে পরিণত করা সম্ভব হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত সহিংসতায় দেখা গেছে, ‘কিশোর গ্যাং’ হিসেবে পরিচিত এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ব্যাপক হারে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল এবং এখনও আছে। সুবিধাবাদীরা তাদের ব্যবহার করছে নিজস্ব চাহিদা পূরণের নেতিবাচক অভিপ্রায়ে। অনুরূপভাবে, মনোবৈকল্যে ভুগছেন এমন নাগরিকদের চিহ্নিত করে তাদের অংশগ্রহণে ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ সেশন আয়োজনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ইতিবাচক মনস্তত্ত্বসম্পন্ন দক্ষ ও কর্মক্ষম জনসম্পদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এই জনসম্পদকে আমরা গঠনমূলক কাজে এবং দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারি। তারা তাদের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারবেন। এটি ভঙ্গুর সমাজকাঠামো পুনর্গঠনে জনহিতকর ভূমিকা রাখবে। কারণ ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ অভিব্যক্তিমূলক একটি মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন ও ইতিবাচক মনোভাব গঠনের প্রক্রিয়া। এর তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণশৈলী। এই শৈলী মানুষের অভিব্যক্তিকে তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে ইতিবাচক ও গঠনমূলক খাতে প্রবাহিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক তথা দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাদের কাছে বিনীত অনুরোধ— দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রস্তাবিত কর্মকৌশল ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ প্রদানের জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি লক্ষ্য জনগোষ্ঠীভিত্তিক সেবা প্রদানের জন্য স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চলমান সহিংস পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি একটি গঠনমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত হয়। [লেখক: সাধারণ সম্পাদক, মেন্টাল হেলথ অ্যাডভোকেসি অ্যাসোসিয়েশন]

ভিডিও আরও দেখুন

১৯ বছরেই ইতিহাসের সেরা মাইলফলকে ইয়ামাল

কিছুদিন ধরে ছন্দহীনতায় ভুগছিলেন, গোল পাচ্ছিলেন না ৮ ম্যাচ ধরে। তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামালকে নিয়ে যখন ফুটবল বিশ্বে মৃদু সমালোচনা শুরু হয়েছিল, তখনই যেন রাজসিকভাবে স্বরূপে ফিরলেন তিনি। রায়ো ভায়েকানোর বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে ৫-২ ব্যবধানের বড় জয় এনে দেওয়ার পাশাপাশি ইউরোপীয় ফুটবলের ইতিহাস ওলটপালট করে দিয়েছেন এই ফরোয়ার্ড।ম্যাচের শুরুটা অবশ্য বার্সেলোনার জন্য সুখকর ছিল না। ১২ মিনিটেই সার্জিও কামেলোর গোলে পিছিয়ে পড়ে হান্সি ফ্লিকের দল। চলতি মৌসুমে বার্সার জালে এটিই প্রথম গোল। তবে সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে খুব বেশি সময় নেয়নি কাতালানরা। ১৯ মিনিটে রাফিনিয়ার গোলে সমতায় ফেরার পর ২১ মিনিটে শুরু হয় ‘ইয়ামাল শো’। মার্ক বের্নালের পাস থেকে চমৎকার এক গোলে দলকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি।এই গোলের মাধ্যমেই ইতিহাস গড়েন ইয়ামাল। বার্সেলোনার মূল দলের হয়ে এটি ছিল তার ৫০তম গোল। মাত্র ১৯ বছর ৪৯ দিন বয়সে এই মাইলফলক ছুঁয়ে তিনি ভেঙে দিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ডের রেকর্ড। ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগের মধ্যে এমবাপ্পে ১৯ বছর ২৪১ দিনে এবং হালান্ড ২০ বছর ১৯৬ দিনে এই কীর্তি গড়েছিলেন। ইয়ামাল এখন এই তালিকার শীর্ষে।ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে রায়োর লেজেউনের আত্মঘাতী গোল ব্যবধান ৩-১ করে। পরে রায়োর কামেলো আরও একটি গোল করে লড়াই জমিয়ে তোলার চেষ্টা করলেও রাফিনিয়া এবং ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ইয়ামাল নিজের দ্বিতীয় গোলটি করলে বার্সার বড় জয় নিশ্চিত হয়। ৯০ মিনিটে কারিম আদেয়েমির পাসে লক্ষ্যভেদ করে নিজের ৫১তম গোলটি করেন ইয়ামাল।এই জয়ের ফলে তিন ম্যাচের তিনটিতেই জিতে ৯ পয়েন্ট নিয়ে লা লিগার শীর্ষস্থান দখল করল বার্সেলোনা।/ 

১৯ বছরেই ইতিহাসের সেরা মাইলফলকে ইয়ামাল