সংবাদ
প্রধান লেকগুলোর দূষণ ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা

প্রধান লেকগুলোর দূষণ ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা

রাজধানীর সৌন্দর্য রক্ষা ও পরিবেশগত মান উন্নয়নে গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন ও ধানমন্ডি লেকের দূষণ বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।লেকগুলোতে সরাসরি পয়ঃবর্জ্য ফেলা বন্ধ, জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ, নিজস্ব পয়ঃশোধন প্ল্যান্ট বা স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন তিনি।আজ বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব নির্দেশনা প্রদান করেন।বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ জানান, "রাজধানীর লেকগুলোর বর্তমান অবস্থা, দূষণের প্রধান কারণ ও তা থেকে উত্তরণের নানা পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠকে সার্বিক আলোচনা হয়েছে।"​বৈঠকে গুলশান লেকে বর্জ্য প্রবেশের মূল কারণ হিসেবে ছয়টি প্রাইমারি ও ছয়টি সেকেন্ডারি পয়েন্ট চিহ্নিত করার কথা জানানো হয়, যেগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন দূষিত পানি লেকে গিয়ে পড়ছে। সমস্যা সমাধানে গঠিত কারিগরি কমিটির পক্ষ থেকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়। ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত ভবনগুলোতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজস্ব এসটিপি স্থাপন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।বাসাবাড়ি বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পয়ঃনিষ্কাশন লাইন অবৈধভাবে বৃষ্টির পানির ড্রেন বা লেকের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করে দ্রুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।এছাড়া, লেকের পানি পরিষ্কার রাখতে ভাসমান বর্জ্য সংগ্রহের যান্ত্রিক নৌকার সংখ্যা দুইটির বদলে বাড়িয়ে ১০টিতে উন্নীত করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। ​একই সঙ্গে ধানমন্ডি লেকের সংস্কার, তলার কাদা ও স্লাজ অপসারণ এবং পাইলট প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। লেকের পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতে এরেটর যন্ত্র বসানো, দুর্গন্ধ দূর করতে জৈবিক ও রাসায়নিক পদ্ধতি ব্যবহার এবং রাজউকের আওতাধীন লেকগুলোর পরিচর্যায় ৪২ সদস্যের পাঁচটি বিশেষ টিম নিয়োজিত থাকার বিষয়টি বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের উপস্থিতিতে আয়োজিত এ বৈঠকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
৫৫ মিনিট আগে

মতামতমতামত

ইলিশ কি সত্যিই বেড়েছিল?

খাতায়-কলমে ইলিশ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। তাহলে জেলের জাল কেন প্রায়ই খালি ফেরে, আর বাজারে ইলিশ কেন সোনার দরে বিকোয়? ইলিশের গল্প বাংলাদেশের নদী, মানুষ ও সংস্কৃতির গল্প। জেলের জালে রুপালি ঝিলিক উঠলে শুধু একটি মাছ ধরা পড়ে না—হাসি ফোটে জেলে পরিবারে, প্রাণ ফিরে পায় ঘাট ও আড়ত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে চেনা দৃশ্যটি বদলে যাচ্ছে। ভরা মৌসুমেও জেলেরা ফিরছেন প্রায় খালি নৌকা নিয়ে; বড় ইলিশ ক্রমেই দুর্লভ; বাজারে দাম উঠে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।অথচ দুই দশকের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন গল্প। ২০০২ু০৩ অর্থবছরের প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার টন থেকে ২০২২ু২৩ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে, অর্থাৎ প্রায় ১৮৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। এই সংখ্যা বহু বছর ধরে ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জাটকা সংরক্ষণ, মা-ইলিশ রক্ষা, অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা ও জেলেদের সহায়তা কর্মসূচি যে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে, তা অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক দ্রুত পতন একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে—আমরা কি ইলিশের প্রকৃত মজুত বৃদ্ধি পরিমাপ করেছি, নাকি বেড়ে যাওয়া আহরণের একটি আনুমানিক হিসাবকেই সম্পদের উন্নতি বলে ধরে নিয়েছি?পরিসংখ্যানে তিনটি অধ্যায়মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে দুই দশকের চিত্রে তিনটি পৃথক অধ্যায় স্পষ্ট। প্রথমত, ২০০২ু০৩ থেকে ২০১৫ু১৬—ধীর কিন্তু ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, ২০১৬ু১৭ সাল থেকে, যখন এক বছরেই আহরণ প্রায় এক লাখ টন বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, ২০২০ু২১-এর পর—প্রথমে স্থবিরতা, এরপর দ্রুত পতন।২০০২ু০৩ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩২ টন। ২০১৫ু১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৯৫১ টন। পরের অর্থবছর ২০১৬ু১৭-তে আহরণ আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৭ টনে। ২০২০ু২১ অর্থবছরে আহরণ ছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার ১৮৩ টন। ২০২২ু২৩ অর্থবছরে তা সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টনে পৌঁছায়। এরপর ২০২৩ু২৪ অর্থবছরে আহরণ কমে প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে এবং ২০২৪ু২৫ অর্থবছরে প্রাথমিক হিসাবে তা আরও কমে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে আসে।২০১৬ু১৭ সালের উল্লম্ফন: ব্যাখ্যা প্রয়োজন২০১৫ু১৬ সালে আহরণ ছিল ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৯৫১ টন। পরের বছরই তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৭ টনে—এক বছরে প্রায় ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি। অনুকূল বৃষ্টিপাত, সফল প্রজনন কিংবা সংরক্ষণ ব্যবস্থার সম্মিলিত সুফলে এমন বছর আসতেই পারে, কিন্তু এত বড় এক বছরের লাফের আলাদা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দরকার। সেই বছর জাটকার বেঁচে থাকার হার কতটা বেড়েছিল? নৌকা, জালের সংখ্যা বা মাছ ধরার দিন কি বেড়েছিল? নমুনা কাঠামো বা সম্প্রসারণ-গুণকে কোনো পরিবর্তন হয়েছিল কি? এসব প্রশ্নের সদুত্তর ছাড়া এই বৃদ্ধির কতটা প্রকৃত জৈবিক উন্নতি আর কতটা পরিসংখ্যানগত প্রাক্কলনের ফল, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। লক্ষণীয়, ২০১৬ু১৭ সালের প্রায় ৫ লাখ টনের সঙ্গে ২০২৪ু২৫ সালের প্রায় ৫ লাখ টন তুলনা করলে আট বছরে নিট বৃদ্ধি প্রায় শূন্য—অর্থাৎ দুই দশকের ‘সাফল্যরেখা’র বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি বিশেষ বছরের উল্লম্ফনের ওপর।‘উৎপাদন’ আর ‘আহরণ’ এক নয়ইলিশ চাষ করা হয় না; এটি নদী ও সাগরের প্রাকৃতিক সম্পদ। তবু সরকারি প্রচারে ‘ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি’ শব্দবন্ধ এমনভাবে ব্যবহৃত হয়, যেন তা পুকুরের মাছ চাষের মতো। প্রাকৃতিক জলাশয়ে মোট আহরণ বাড়ার পেছনে অন্তত তিনটি ভিন্ন কারণ থাকতে পারে—মাছের প্রকৃত মজুত বেড়েছে, নৌকা-জাল-প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বেড়েছে, অথবা তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও আওতা বদলেছে। ধরা যাক, ১০০টি নৌকা যে পরিমাণ ইলিশ ধরত, এখন ২০০টি নৌকা একই পরিমাণ ধরছে—মোট আহরণ অপরিবর্তিত থাকলেও প্রতি নৌকার আহরণ অর্ধেক হয়ে গেছে, যা মজুতের অবনতিরই ইঙ্গিত। তাই মোট আহরণের পাশাপাশি প্রতি ইউনিট আহরণচেষ্টায় প্রাপ্তি, মাছের গড় আকার, প্রজননক্ষম মাছের অনুপাত ও জাটকার রিক্রুমেন্ট নিয়মিত জানা জরুরি। মোট টনের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ সূচক, কিন্তু তা সম্পদের সুস্থতার পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ নয়।পুরোনো নমুনা কাঠামো, নতুন বাস্তবতাজাতীয় হিসাব তৈরি হয় নির্বাচিত গ্রাম, মাছ ধরার ইউনিট ও অবতরণকেন্দ্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করে, তারপর নির্ধারিত ‘রেইজিং ফ্যাক্টর’ প্রয়োগ করে। এ পদ্ধতি বিশ্বজুড়েই ব্যবহৃত হয় এবং তা দুর্বল নয়—তবে এর নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করে নমুনা কাঠামো হালনাগাদ কি না, তার ওপর। মৎস্য অধিদপ্তরের নিজস্ব ২০১৬ু১৭ সালের ইয়ারবুকেই উল্লেখ ছিল, ব্যবহৃত স্যম্পলিং ফ্রেইম মূলত ১৯৮৫ সালের। চার দশকে নদীর গতিপথ বদলেছে, নতুন চর জেগেছে, নৌকার যান্ত্রিকীকরণ বেড়েছে, নতুন অবতরণকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এত পুরোনো কাঠামো দিয়ে আজকের জটিল মৎস্যব্যবস্থা পরিমাপ করলে প্রাক্কলনে অনিশ্চয়তা থাকা স্বাভাবিক। তাই সরকারি পরিসংখ্যানকে সরাসরি বাতিল করার কারণ নেই, আবার প্রশ্নাতীত ধরে নেওয়াও বিজ্ঞানসম্মত নয়—প্রয়োজন পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও স্বাধীন যাচাই।সংখ্যা কি ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়ানো হয়েছিল?প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই—তার জন্য কাঁচা জরিপ ফরম, হিসাব সংশোধনের ইতিহাস ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন। তবে একটি বাস্তবতা বিবেচ্য: উন্নয়ন প্রশাসনে প্রায়ই কর্মসূচির সাফল্য নির্দিষ্ট সংখ্যাগত লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে, ফলে অজান্তেই ক্রমবর্ধমান সংখ্যাকে সম্পদের প্রকৃত স্বাস্থ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এটি কারও অসততার প্রশ্ন নয়, বরং সূচক নির্বাচনের সীমাবদ্ধতা। বেশি মাছ ধরা আর বেশি মাছ থাকা সব সময় এক কথা নয়।পতনের আগেই ছিল স্থবিরতার সংকেত২০২১ু২২ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ০.২৫ শতাংশ, ২০২২ু২৩ সালে ০.৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ বড় পতনের আগে অন্তত দুই বছর সরকারি পরিসংখ্যানেই স্থবিরতার সংকেত ছিল। এরপর ২০২৩ু২৪ সালে আহরণ প্রায় ৪২ হাজার টন কমে, এবং পরের অর্থবছরেও পতন অব্যাহত থেকে আহরণ প্রায় ৫ লাখ টনে নামে—দুই বছরে হ্রাস প্রায় ৭০ হাজার টন। বড় ইলিশের স্বল্পতা, প্রতি নৌকায় কম আহরণ, বেশি সময়-জ্বালানি ব্যয় ও নদীতে অনিয়মিত উপস্থিতি একসঙ্গে দেখলে এটি নিছক একটি খারাপ মৌসুম নয়, বরং মজুতের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। নদীতে পর্যাপ্ত পানির অভাব, মোহনায় পলি জমা, অভিপ্রয়াণপথে অতিরিক্ত জাল, জাটকা ও অবৈধ কারেন্ট জাল আহরণ, লবণাক্ততার বিস্তার এবং সাগরে অনিয়ন্ত্রিত আহরণচাপ—এসব একসঙ্গে ইলিশকে নদী থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।নদী কেন হারাচ্ছে ইলিশ?ইলিশের জীবনচক্র নদী ও সাগরের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে। সাগরে বেড়ে ওঠা ইলিশ প্রজননের জন্য মোহনা পেরিয়ে মিঠাপানির নদীতে আসে—নদীর প্রবাহ, তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও স্রোতের সংকেত অনুসরণ করেই এই অভিপ্রয়াণ ঘটে। এই সূক্ষ্ম চক্রটি এখন একযোগে একাধিক দিক থেকে চাপের মুখে। দূষণ এর মধ্যে সবচেয়ে উপেক্ষিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শিল্পকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য, ট্যানারি ও ডায়িং শিল্পের বিষাক্ত নির্গমন, কৃষিজমির সার-কীটনাশক-মিশ্রিত পানি, নৌযান থেকে তেল-গ্যাস নিঃসরণ এবং নগর এলাকার অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো ইলিশের প্রধান বিচরণক্ষেত্রে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে গেলে ইলিশ সেই নদীপথ এড়িয়ে চলে—যেমনটা একসময়ের সমৃদ্ধ ইলিশক্ষেত্র বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যায় ইতিমধ্যে ঘটেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, যা মাছের খাদ্যচক্র ও প্রজননক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষকেরা আশঙ্কা করছেন।করণীয়: একটি সংখ্যা নয়, সূচকের সমন্বয়ইলিশ ব্যবস্থাপনার সাফল্য মূল্যায়নে মোট আহরণের পাশাপাশি অন্তত কয়েকটি সূচক নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন: প্রতি নৌকা বা মাছ ধরার দিনে আহরণের পরিমাণ, ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য-ওজন, প্রজননক্ষম ইলিশের অনুপাত, জাটকার রিক্রুটমেন্ট ও বেঁচে থাকার হার, নদী-সামুদ্রিক আহরণের পৃথক প্রবণতা এবং আহরণচেষ্টার (নৌকা-জাল-দিন) সামগ্রিক হিসাব। এ ছাড়া প্রয়োজন—২০০২ু০৩ থেকে এ পর্যন্ত সিরিজের স্বাধীন কারিগরি পুনর্মূল্যায়ন; নৌকা-জাল-জেলে-অবতরণকেন্দ্রের নতুন জাতীয় শুমারি; প্রতিটি প্রাক্কলনের সঙ্গে নমুনার আকার ও কনফিডেন্স ইন্টার্ভাল প্রকাশ; গুরুত্বপূর্ণ অবতরণকেন্দ্রে ডিজিটাল ওজন ব্যবস্থা, জিপিএস/ভিএমএস ও ই-লগবুক চালু; এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জেলে প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা।সংখ্যা নয়, নদীতে ফিরুক ইলিশইলিশের পরিসংখ্যান ভুল ছিল কি না—এর সরল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কিছু বছরে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সংরক্ষণ কার্যক্রম সুফল দিয়েছে; একই সঙ্গে পুরোনো তথ্য-কাঠামো, আহরণচেষ্টার অসম্পূর্ণ হিসাব ও এক বছরের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন যৌক্তিক প্রশ্নও তৈরি করেছে। সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো—সরকারি সিরিজ একটি গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি নির্দেশক, কিন্তু একে ইলিশের প্রকৃত মজুতের নির্ভুল পরিমাপ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। অতীতের সাফল্যকে সম্মান করেই এখন পদ্ধতি বদলাতে হবে। লক্ষ্য শুধু ঊর্ধ্বমুখী একটি গ্রাফ নয়; লক্ষ্য নদী, মোহনা ও সাগরে একটি সুস্থ ইলিশসম্পদ ধরে রাখা—একজন জেলে আগের চেয়ে কম খরচে কত মাছ পেলেন, মাছের গড় আকার কত হলো, আর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কত প্রজননক্ষম ইলিশ বেঁচে থাকল। পরিসংখ্যান রাষ্ট্রের আয়না; আয়না স্বচ্ছ হলে অর্জন ও সংকট দুটোই সময়মতো ধরা পড়ে। তাই এখন প্রয়োজন দোষারোপ নয়, হিসাবকে আরও আধুনিক, উন্মুক্ত ও বিজ্ঞানভিত্তিক করা। সত্যিকার সাফল্যের প্রমাণ মিলবে কাগজের টনে নয়—জেলের জালে, নদীর প্রাণে এবং সাধারণ মানুষের পাতে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ঢাকা]

শিক্ষা দিবস: বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থার দাবি

১৭ সেপ্টেম্বর আমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দিনটির তাৎপর্য সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানেন। ১৯৬২ সালের এই দিনে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার ছাত্রসমাজ যে রক্তাক্ত আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তা পরবর্তী সময়ে বাঙালির স্বাধিকার ও মুক্তির আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।তখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছিল। ছাত্রসমাজ সেই ক্ষোভকে সংগঠিত করে রাজপথে নিয়ে আসে। তাদের দাবি ছিল গণমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা। তাদের কাছে শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় পাস বা সার্টিফিকেট অর্জনের বিষয় ছিল না; শিক্ষা ছিল মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শক্তি।১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করার পর শিক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর এস এম শরীফকে প্রধান করে শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। কমিশন ১৯৫৯ সালের আগস্টে ২৪ অধ্যায়ে বিভক্ত একটি শিক্ষা প্রতিবেদন দেয়। এর বিভিন্ন সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ছাত্রদের আশঙ্কা ছিল, প্রস্তাবিত শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষা থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে সরিয়ে দেবে এবং বৈষম্য আরও বাড়াবে।এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসংগঠনগুলো রাজপথে নামে। ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করা হয়। ছাত্রদের সঙ্গে শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে সংহতি জানান। সেদিন পুলিশের গুলিতে মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ, বাবুলসহ অনেকে নিহত হন। টঙ্গীতে ছাত্র-শ্রমিক মিছিলে পুলিশের গুলিতে সুন্দর আলী নামে এক শ্রমিক নিহত হন। আহত ও গ্রেপ্তার হন বহু মানুষ। রক্তের বিনিময়ে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত আইয়ুব সরকারের শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে ১৭ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা পায় শিক্ষা দিবস হিসেবে।শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি, কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান ও সমতা নিশ্চিত করতে পারিনি। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে গণমুখী, সার্বজনীন ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে, কাঠামোগত পরিবর্তনও এসেছে। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি।শহর ও গ্রামের শিক্ষার সুযোগে পার্থক্য রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধায় রয়েছে বড় বৈষম্য। একই দেশের শিক্ষকদের আর্থসামাজিক মর্যাদাতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। অথচ শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, শিক্ষক সেই শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শিক্ষকদের মর্যাদা ও জীবনমান নিশ্চিত না করে মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠা কঠিন।আরেকটি বড় সমস্যা হলো শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষা যেন ক্রমেই জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মানবিকতা অর্জনের পরিবর্তে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল, সার্টিফিকেট ও চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হয়ে উঠছে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, সহমর্মিতা ও মানবিকতার চর্চা প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না। শিক্ষা মানুষকে শিক্ষিত করতে পারে, কিন্তু সুশিক্ষিত মানুষ হতে হলে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা জরুরি।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, সুশিক্ষার লক্ষণ হলো তা মানুষকে মুক্তি দেয়। সেই মুক্তি শুধু অর্থনৈতিক নয়; চিন্তা, বিবেক ও মানবিকতারও মুক্তি। তাই শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি একজন দায়িত্বশীল, মানবিক ও সুনাগরিক তৈরি করা। পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—তিন ক্ষেত্রেই এ দায়িত্ব রয়েছে।আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, শিক্ষার বিস্তারও ঘটেছে। কিন্তু মান নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে। পাঠ্যক্রমের ঘন ঘন পরিবর্তন, শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার চাপ এবং শিক্ষা নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু চাকরির জন্য নয়, জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের মূল শিক্ষা ছিল—শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, এটি মানুষের অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। শিক্ষা হতে হবে গণমুখী, সার্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন। শিক্ষার মধ্য দিয়ে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিকতার বিকাশ ঘটাতে হবে।শিক্ষা দিবস তাই শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন। যে ছাত্রসমাজ রক্ত দিয়ে শিক্ষার অধিকার ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থার দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল, তাদের আত্মত্যাগকে যথাযথভাবে স্মরণ করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে সেই ইতিহাস জানাতে হবে।৬৪ বছর পরও ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের অনেক আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ। সেই অপূর্ণতা পূরণের দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। শিক্ষা যেন শুধু জীবিকা অর্জনের মাধ্যম না হয়ে মানুষ হওয়ার পথ দেখায়—শিক্ষা দিবসে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: শিক্ষক, কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম]

বাংলা জনপদের ছাতা পরব

শাশ্বত বাংলার সংস্কৃতি হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও লোকায়ত জীবনের সমন্বিত রূপ। এই সংস্কৃতি বাংলার মানুষের আবেগ ও চেতনাকে ধারণ করে আসছে। বাংলা ভাষা ও সমৃদ্ধ সাহিত্য এর প্রাণকেন্দ্র হলেও এটি কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। নদীমাতৃক প্রকৃতির মতোই এ সংস্কৃতি প্রবহমান, উদার ও মানবিক। প্রাচীন জনগোষ্ঠীর জীবনাচার ও বিশ্বাসও বাংলা সংস্কৃতির মূল শিকড়ের অংশ। এ সংস্কৃতির নানা উপাদান ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে।বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘ছাতা পরব’ বা ‘ছত্তাবোঙ্গা’ নামে একটি লোকউৎসবের প্রচলন রয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও ঝাড়খণ্ডের মানভূম এলাকায় এটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। উত্তরবঙ্গের কোনো কোনো এলাকাতেও সাঁওতালরা এ ধরনের উৎসব পালন করেন। মূলত বর্ষার শেষ, শস্য ও বৃক্ষকে কেন্দ্র করে এ উৎসবের আয়োজন হয়। বাঁশ বা শালগাছের সঙ্গে তালপাতা কিংবা বিশেষ প্রতীক যুক্ত করে ছাতার মতো কাঠামো তৈরি করে বিভিন্ন আচার পালন করা হয়।সাঁওতাল বিশ্বাসে ‘বোঙ্গা’ হলো নৈসর্গিক আত্মা। তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে বোঙ্গার গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। আদি দেবতা নিরাকার—এমন বিশ্বাসও তাদের মধ্যে প্রচলিত। পার্থিব জীবনের মঙ্গল-অমঙ্গল, প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন আবর্তিত।পুরুলিয়ার চাকলতোড় গ্রামের ‘ছাতা পরব’ এ উৎসবের অন্যতম বড় আয়োজন। ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে এখানে বিশাল মেলা বসে। কয়েকশ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবে পঞ্চকোট রাজবংশের উত্তরসূরিরা ছাতা উত্তোলনের সংকেত দেন। রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হলেও উৎসবকে ঘিরে এক দিনের প্রতীকী রাজতন্ত্রের ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। একসময় এই অঞ্চলের শাসক ছিলেন পঞ্চকোট রাজবংশের সদস্যরা। সেই ঐতিহ্যের স্মৃতি ধারণ করেই প্রতিবছর উৎসবটি আয়োজন করা হয়।ছাতা পরবের সঙ্গে শস্য ও বৃক্ষের সম্পর্ক রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, জ্যৈষ্ঠের রোহিণী পরবে বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্রের মর্ত্যে আগমন ঘটে। তিন মাস পৃথিবীতে অবস্থান করে তিনি রুক্ষ জমিকে শস্যশ্যামল করে ভাদ্র পূর্ণিমায় স্বর্গে ফিরে যান। তার প্রত্যাবর্তনের পর ভাদ্র সংক্রান্তিতে ছাতা তোলা হয়। এ কারণে অনেকেই ছাতা পরবকে শস্য ও প্রকৃতির উৎসব হিসেবে বিবেচনা করেন।এই উৎসবের সঙ্গে আদিবাসী সমাজের সামাজিক জীবনও গভীরভাবে যুক্ত। মেলা হয়ে ওঠে বৃহৎ মিলনমেলা। ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, বিহার ও ছত্তিশগড় থেকেও অনেকে এতে অংশ নেন। নাচ, গান, মাদল, লোকাচার ও আনন্দের পাশাপাশি অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের পারস্পরিক পরিচয় ও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সুযোগও তৈরি হয়। ফলে ছাতা পরব কেবল ধর্মীয় বা লোকাচারভিত্তিক উৎসব নয়, আদিবাসী সমাজের সামাজিক সম্পর্ক ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।পুরুলিয়ার চাকলতোড় ছাড়াও সরবাড়ি, মালথোর, সঁটরা, বলরামপুর, বোঙ্গাবাড়ি, বান্দোয়ান ও চিতোড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ছাতা পরবের আয়োজন হয়। একইভাবে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম ও বিষ্ণুপুরের বিভিন্ন এলাকায় ‘ইঁদ পরব’-এরও প্রচলন রয়েছে। লোকমুখে তাই শোনা যায়—‘বরাবাজারের ইঁদ আর চাকলতোড়ের ছাতা রে,/ মেলা দেখিতে লোক চলে কাতারে কাতারে।’চাকলতোড়ের ছাতামেলার সঙ্গে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যের কথা বলা হয়। চুয়াড় বিদ্রোহের সময় আদিবাসীদের সঙ্গে নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে কাশীপুরের রাজা প্রথম ছাতা তুলেছিলেন—এমন একটি লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করে উৎসবের ঐতিহ্য আজও বহমান।এই উৎসবের আরেকটি তাৎপর্য আদিবাসী নারীদের সামাজিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, চাকলতোড়ের ছাতামেলায় অংশ নেওয়া সাঁওতাল কন্যাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পর্যায় সম্পন্ন হয়। মেলায় অনেক সময় পাত্র-পাত্রীর পরিচয় ও বিয়ের সিদ্ধান্তও হয়। ফলে এটি আদিবাসী সমাজে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।হাজার বছর ধরে হিন্দু ও মুসলমান সমাজের পাশাপাশি বসবাস করেও সাঁওতাল সমাজ তাদের স্বাতন্ত্র‍্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। প্রকৃতি, লোকবিশ্বাস, নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক রীতিনীতি তাদের জীবনযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ছাতা পরব সেই ঐতিহ্যেরই একটি উজ্জ্বল প্রকাশ।ছাতা পরব তাই শুধু একটি লোকউৎসব নয়; এটি বাংলা জনপদের বহুত্ব, আদিবাসী সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র‍্য এবং প্রকৃতিনির্ভর জীবনদর্শনের এক জীবন্ত নিদর্শন। সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও এই ঐতিহ্য টিকে থাকা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র‍্যরে শক্তিকেই তুলে ধরে।[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

সিস্টেম শুধু সংবাদকর্মীদের ব্যবহার করে, বিপদে পাশে দাঁড়ায় না

২০২৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা নেমে এসেছে বরিশাল নগরীর ব্যস্ত প্যারারা রোডে। চারপাশের কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে খাঁ খাঁ করছে দৈনিক সমকাল-এর ব্যুরো কার্যালয়। অফিসের পিয়ন ছুটিতে থাকায় চারপাশ সুনসান নিস্তব্ধ। এককালের চেনা নিউজরুমের ভেতরে প্রবেশ করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি। দেড় দশকের কাজের স্মৃতিঘেরা সেই চেনা অফিসে প্লাস্টিকের দড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তার নিথর দেহ।পকেটে পাওয়া যায় হাতে লেখা পাঁচটি আলাদা সুইসাইড নোট। যে মানুষটি সারাজীবন বরিশালের প্রগতিশীল আন্দোলন ও সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে প্রদীপ জ্বেলেছেন, তার মৃত্যুর পূর্বে রেখে যাওয়া চিরকুটের প্রতিটি অক্ষর যেন বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চাকচিক্যময় পর্দার আড়ালে লুকানো এক অন্ধকার শোষণের প্রমাণ। স্ত্রী ও মেয়ের উদ্দেশে লেখা তার শেষ আকুতি “পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না”। আর সমকালের সহকর্মী সুমন চৌধুরীর কাছে লেখা শেষ চিরকুটে ফুটে ওঠে এক চরম প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনার চিত্র ‘যদি পারো সমকালে আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বউদির হাতে দিও’।সুদীর্ঘ দেড় দশকের কাজের জায়গায় বসে, মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়েও পরিবারের ভবিষ্যৎ অনটন নিয়ে এমন আকুতি এক গভীর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতকে দৃশ্যমান করে তোলে। পুলক চ্যাটার্জির এই করুণ পরিণতি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি দেশের গণমাধ্যম শিল্পের নীরব এক কাঠামোগত ধসের করুণ বহিঃপ্রকাশ। গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রয় ১ ডজন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী চরম হতাশায় আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। প্রবীণ থেকে শুরু করে সম্ভাবনাময় তরুণ নিউজ রুম সম্পাদক বা গ্রাফিক ডিজাইনার প্রায় সবাই হতাশার শিকার।আজকের পত্রিকার প্রবীণ সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার যখন নিজের অসুস্থতা, পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট আর বেতন না বাড়ার কষ্টে মেঘনা নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার আগে লেখেন- “দুঃখই হোক আমার জীবনের শেষ সঙ্গী। আর পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক”, তখন তা পুরো সাংবাদিক সমাজের বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, কিন্তু বিচার হবে কার, বিচার করবে কে?একইভাবে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট হাতিরঝিল লেক থেকে উদ্ধার করা হয় গাজী টিভির ৩২ বছর বয়সী নিউজ রুম এডিটর সারা রাহানুমার ভাসমান মরদেহ। মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারার শেষ পোস্টটি ছিল  ‘মরার মতো বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো’।এই নিভে জাওয়া প্রাণ গুলো প্রমাণ করে যে, নিউজরুমের জমকালো বাতির নিচে প্রতিদিন তিল তিল করে রক্তক্ষরণ ঘটছে শত শত সংবাদকর্মীর।স্বপ্নের পেশায় ছাঁটাই, অনাহার ও ওয়েজবোর্ডের ফাঁকিসাংবাদিকতা কি পেটের ভাত জোগানোর জন্য সবচেয়ে অনিশ্চিত পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে? পুলক চ্যাটার্জি ২০২৩ সালের মে মাসে সমকাল থেকে আকস্মিকভাবে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ ১৬ মাস বেকার ছিলেন। বয়স বাড়ার পর অন্য কোথাও পুনর্নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। দীর্ঘদিনের পিঠের তীব্র ব্যথার চিকিৎসা করানোর মতো ন্যূনতম আর্থিক সংস্থানও তাঁর হাতে ছিল না। বাস্তবতা হলো, দেশের সিংহভাগ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করেনি। মাসের পর মাস বেতন না দেওয়া এবং কোনো নোটিশ ছাড়াই ছাঁটাই করা নিত্যদিনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি বিএফইউজে (BFUJ) ও ডিইউজে (DUJ) নেতৃবৃন্দ “No Wage Board, No Media” দাবিতে রাজপথে অনশন ও বিক্ষোভ সমাবেশ পরিচালনা করছেন। যেখানে উঠে এসেছে কীভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে সংবাদকর্মীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।গণমাধ্যম মালিকদের এই চরম শ্রম শোষণের আন্তর্জাতিক রূপ দেখা যায় প্রতিবেশী দেশ ভারতেও-যেখানে তামিলনাড়ুর ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়ার (UNI) ৫৬ বছর বয়সী জ্যেষ্ঠ ফটোসাংবাদিক টি কুমার টানা ৬০ মাস (৫ বছর) বেতন না পেয়ে এবং মেয়ের বাগদানের আর্থিক সংস্থান করতে না পেরে অফিসের নিউজরুমেই আত্মহনন করেছিলেন।অর্থনৈতিক সংকটের সাথে যুক্ত হয়েছে আইনি দণ্ড ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ভয়াল থাবা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের (CSA) কালো খড়গের কারণে সাংবাদিকদের সর্বক্ষণ তটস্থ থাকতে হয়।রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৮২ থেকে ২৬৬ জন সাংবাদিককে গণ-অভ্যুত্থানের হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) ৩২ জন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে উসকানির মামলা হয়েছে। হ্যাঁ, এখানে সাংবাদিকদের কিছুটা হলেও দায় রয়েছে। তবে ভেবে দেখতে হবে প্রতিটি নিউজ হাউজের নিজস্ব পলিসি থাকে, সেই পলিসির বাইরে সাংবাদিকরা যেতে পারেন না। তাই তাদের লেখায় নিউজ হাউজের ছাপ থাকে যায়। আর সেই প্রাতিষ্ঠানিক দায় নিতে হয় ব্যক্তি সাংবাদিককে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই ৮৫ থেকে ১০৭ জন সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব তলব ও ফ্রিজ করেছে। এছাড়া ১৬৭ জন পেশাদার সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে। মালিকপক্ষকে চাপ দিয়ে সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুত করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। রিপাবলিকান উইদাউট বর্ডারস (RSF) ২০২৬ সালের প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম স্থানে (শোচনীয় ক্যাটাগরি) নামিয়ে দিয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমের এই ভয়াবহ বাস্তবতার আন্তর্জাতিক দলিল।অন্যদিকে, মাঠে কাজ করতে গিয়ে আসাদুজ্জামান তুহিনের মতো তরুণ সাংবাদিকদের চাঁদাবাজ ও দুষ্কৃতকারীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হতে হয়। গাজীপুরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে তুহিনকে হত্যা করা হয় শুধুমাত্র একটি অপরাধের ভিডিও রেকর্ড করার কারণে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনির চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন আদালত ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১২৯ বার পিছিয়েছে, যা দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে স্পষ্ট করে।সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ফিল্ড রিপোর্টারদের প্রতিনিয়ত লাশ, দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ট্রমার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু নিউজ রুমে তাদের মানসিক সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. মুহাম্মদ আনোয়ারুস সালাম ও মো. রইসুল ইসলাম পরিচালিত ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক গবেষণায় ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে:• ১০ শতাংশ ফিল্ড সাংবাদিক প্রবেবল PTSD (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার)-এ ভুগছেন, আর ফ্রন্টলাইন রিপোর্টারদের ক্ষেত্রে এই হার ২০ শতাংশ ।• ১৫ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত এবং মোট ৬৫ শতাংশ সাংবাদিকের মধ্যেই বিষণ্ণতার লক্ষণ বিদ্যমান। নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে তীব্র বিষণ্নতার হার পুরুষদের তুলনায় দশগুণ বেশি।• ২০ শতাংশ তীব্র উদ্বেগজনিত ব্যাধি এবং ৩০ শতাংশ চরম মানসিক ক্লান্তি বা বার্নআউটে জর্জরিত।• পেশাগত ট্রমা নিরসনে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে ৩০ শতাংশ সাংবাদিক মাদকাসক্তি এবং ৫৫ শতাংশ সমাজবিচ্ছিন্নতার মতো ক্ষতিকর কোপিং পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন।এত বড় মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের বিপরীতে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে শূন্য শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা কাউন্সেলিং সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। মাত্র ২ শতাংশ সাংবাদিক জীবনে কখনো মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছেন। নিউজরুমে নিজের ট্রমা বা কান্না প্রকাশ করাকে অদক্ষতা বা দুর্বলতা বলে খোটা দেওয়া হয়। বিপদের সময় কোথায় থাকে প্রেস ক্লাব, ডিআরইউ কিংবা বিএফইউজে? পুলক চ্যাটার্জি নিজে বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন । অথচ চাকরি হারানোর পর যখন তিনি আর্থিক অনটনে তিল তিল করে নিঃশেষ হচ্ছিলেন, তখন প্রাতিষ্ঠানিক সংহতির তীব্র অভাব তাকে চরম পেশাগত একাকীত্বে ঠেলে দেয়।সাংবাদিক সংগঠনগুলো যখন দলীয় মেরুকরণে ব্যস্ত, তখন একজন সাধারণ সাংবাদিক চাকরি হারালে বা আইনি জটিলতায় পড়লে পুরোপুরি একাকি হয়ে যান। নিউজ রুমের সহকর্মীরাও নিজের চাকরি বাঁচানোর ভয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেন। পুলক চ্যাটার্জি চাকরি হারানোর পরও প্রায় প্রতিদিন নিজের কাছে থাকা অতিরিক্ত চাবি দিয়ে সমকালের ফাঁকা অফিসে এসে সংবাদপত্র পড়তেন-যা তার পেশার প্রতি গভীর মানসিক টান এবং তীব্র একাকীত্ব কাটানোর এক আকুল ব্যাকুলতাকে নির্দেশ করে।হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরাপুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর পর তার স্ত্রী অশ্রুসজল প্রশ্ন কিংবা আসাদুজ্জামান তুহিনের ছোট দুটি সন্তানের হাহাকার প্রমাণ করে যে সিস্টেম কেবল সংবাদকর্মীদের ব্যবহারই করে, বিপদের সময় তাদের পাশে দাঁড়ায় না। একটি সমাজ কতটা স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক, তার সবচেয়ে বড় মানদণ্ড হলো সেই সমাজের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা। যে কলম প্রতিদিন সমাজের অন্যায়, দুর্নীতি ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরে, সেই কলমের পেছনের মানুষটির অনাহার, ট্রমা ও নীরব কান্না শোনার মতো কান যদি আমাদের নিউজ রুম, সংগঠন ও রাষ্ট্রকাঠামোর না থাকে, তবে প্রেস ফ্রিডমের কথা বলা নিছক এক ভণ্ডামি ছাড়া কিছুই নয়।আজ যদি গণমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, রাজনৈতিক দল ও নীতি-নির্ধারকেরা নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন না করেন-তবে কাল হয়তো আরও একজন পুলক চ্যাটার্জি, আরও একজন সারা রাহানুমা কিংবা বিভুরঞ্জন সরকারের নিথর মরদেহ আমাদের সংবাদকক্ষের দরজায় ঝুলবে। আর সেই দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ এই সমাজ বা গণমাধ্যমের থাকবে না।

ক্ষমতার জৌলুস নয়, মানুষের আস্থা

রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট তখনই তৈরি হয়, যখন শাসক আর শাসিতের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। ক্ষমতার প্রাসাদ যত উঁচু হয়, মানুষের বাস্তব জীবন থেকে নেতৃত্ব তত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক সত্যটি খুবই সরলু ক্ষমতা মানুষের জন্য, মানুষ ক্ষমতার জন্য নয়।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গত ছয় মাসের রাজনৈতিক আচরণ ও কিছু সিদ্ধান্তকে এই বাস্তবতার আলোকে দেখলে একটি ব্যাপক পরিবর্তনের ধারা চোখে পড়ে। বিষয়টি শুধু তার সাদামাটা পোশাক বা ব্যক্তিগত জীবনযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দাপ্তরিক কাজে নিজের নাম ও পদের আগে ‘মাননীয়’ বা এ ধরনের সম্মানসূচক শব্দের ব্যবহার পরিহার করতে বলেছেন, সেইসাথে অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল ও আড়ম্বর কমানো, সরকারি প্রচারণায় ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এড়ানো, তার ছবি সংবলিত কোন ব্যানার ব্যবহার না করা, নিজে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দেখা, সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত করে রাস্তা বন্ধ না করা, আহত সেনাসদস্য বা দলীয় কর্মিদের হাসপাতালে দেখতে যাওয়াু এসব ছোট ছোট পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের মতো একটি প্রাক-উপনিবেশিক রাষ্ট্রের মধ্যে পাচ দশকের অধিককাল চলমান ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত প্রচলিত দূরত্ব ও জৌলুসকে কমিয়ে আনার একটি বার্তা দিচ্ছেন।একইরকম বার্তা পাওয়া যায় তার ব্যক্তিগত আচরনের ক্ষেত্রেও। পোশাকের সাধারণত্ব, জনসমক্ষে অনাড়ম্বর উপস্থিতি এবং আচরণে তুলনামূলক সংযমকে তাই কেবল তার ব্যক্তিগত রুচি হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। একজন প্রধানমন্ত্রী কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন, সেটিও ক্ষমতা সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির একটি বহিঃপ্রকাশ। তিনি যখন ক্ষমতার দৃশ্যমান চাকচিক্য কমান, নিজেকে বিনয়ের ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেন, তখন সাধারণ নাগরিক ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বও অনেকাংশে কমে যায়।তবে গত ছয় মাসে সম্ভবত আরও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে তার রাজনৈতিক ভাষায়। বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, হুমকি, বিদ্রূপ এবং প্রতিপক্ষকে প্রায় শত্রু হিসেবে উপস্থাপনের ভাষায় অভ্যস্ত। সেই বাস্তবতায় সংসদ কিংবা সংসদের বাহিরে বিরোধী পক্ষের অমার্জিত কটাক্ষ, সমালোচনা ও উদ্বেগের জবাবে তারেক রহমানের তুলনামূলক সংযত, শালীন ও গঠনমূলক শব্দচয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন এবং জনমনে তার রুচি ও শিষ্টাচার বোধের এক ব্যতিক্রমি উদাহরন সৃষ্টি করেছে। তিনি রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে ব্যক্তিগত শত্রুতার ভাষায় না নিয়ে রাজনৈতিক ভাষাতেই মোকাবিলা করার যে প্রবণতা দেখাচ্ছেন, তা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ডিসকোর্সে (আলাপ) আগামী দিনে একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি হতে পারে।তবে এর প্রভাব শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। ক্ষমতার শীর্ষে ব্যবহৃত ভাষা ধীরে ধীরে তৃনমূলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করে। নেতা যদি প্রতিপক্ষকে অপমান করেন, মাঠ পর্যায়ের কর্মীরাও সেটিকেই রাজনৈতিক আচরণের মডেল হিসবে অনুশীলন করে। বিপরীতে শীর্ষ নেতৃত্ব যদি সংযত থাকে, ভিন্নমতকে রাজনৈতিক পরিসরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে এবং বিরোধীদের উদ্বেগের জবাব শালীনভাবে দেয়, তবে দলের তৃণমূলেও একটি ভিন্ন বার্তা যায়। বাংলাদেশের সংঘাতপ্রবণ রাজনীতিতে তারেক রহমানের এই পরিবর্তিত ‘টোন-সেটিং’-এর সম্ভাব্য প্রভাব তাই ব্যক্তিগত শিষ্টাচারের চেয়ে অনেক বড়। সুক্ষভাবে অনুসরন করলে, এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে । সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ কিংবা মাঠ পর্যায়ের কর্মিদের মধ্যেও ভাষা কিংবা আচরণের মধ্যে ক্রমাগত শালিনতা এবং বিনয়ের ভাব ক্রমান্বয়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে।ইতিহাসের শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্টু আড়ম্বর দিয়ে সাময়িক বিস্ময় তৈরি করা যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আস্থা সৃষ্টি করা যায় না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ধারার একটি শক্তি ছিল মানুষের কাছে যাওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়নে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্রমাগত প্রচেষ্টা। শহীদ জিয়া দেশের প্রতিটি প্রান্তরে প্রান্তরে মানুষের কাছে ছুটে গিয়েছেন, নিরন্তর ছিল তার পথচলা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যেও সেই ক্ষমতাকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক দর্শনের একটি আধুনিক প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ: রাজনীতি তাহলে কাদের জন্য?এই প্রশ্নের উত্তরও শুধু বক্তৃতায় নয়, কাজে দিতে হয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের গত ছয় মাসে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন ইত্যাদি উদ্যোগের কেন্দ্রে তাই আরেকটি বিষয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, সেটা হলো, সরকারকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া। প্রশাসনকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করা, মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা, জনসেবা সহজ করা। সরকারের কর্মকাণ্ডকে মানুষের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগগুলো সফল হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন ঘটতে পারে, তা হলু রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার দূরত্ব কমে যাওয়া।কারণ বাংলাদেশের মানুষ এখন বক্তৃতার চেয়ে ফলাফল চায়। তারা জানতে চায় না সরকার কী বলছে, তারা দেখতে চায় সরকার কী করছে। একজন কৃষক সার, কীটনাশক পাচ্ছে কি না, তার উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না, একজন তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন কি না, একজন ব্যবসায়ী অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ছাড়া কাজ করতে পারছেন কি না, একজন সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা ও সরকারি সেবা পাচ্ছেন কি না, মানুষ বিদ্যুৎ, গ্যাস পাচ্ছে কি নাু এসবই শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিনয়ের সম্ভবত আরও তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ হলো সরকারের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার না করা। ১৫ বছরের অধিক একটা স্বৈরশাসনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ করে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব ক্ষেত্রে সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি, বিদ্যুত-গ্যাস এর প্রকত সমস্যা রয়েছে। সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি এ ধরনের বাস্তবতা স্বীকার করার রাজনৈতিক মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রচলিত ক্ষমতার সংস্কৃতিতে সরকার সাধারণত নিজের সাফল্য তুলে ধরে, ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা স্বীকারের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। সেই জায়গায় তারেক রহমান অকপটে প্রকৃত অবস্থা শিকার করে বিভিন্নমুখি পদক্ষেপ গ্রহনের সংসদে জানিয়েছেন এবং জনগণের কাছে আরও সময়, সহযোগিতা চেয়েছেনু এটা কোন দুর্বলতা নয় বরং এটি রাজনৈতিক বিনয়ের একটি শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। এই ক্ষমতার মানবিকীকরণ বাংলাদেশের মতো অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বিশাল বিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।সুতরাং তারেক রহমানের সাদামাটা পোশাক, প্রটোকলে সংযম, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি পরিমিত ভাষা কিংবা সরকারের সীমাবদ্ধতা স্বীকারু এ সবগুলোকে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে সম্ভবত পুরো চিত্রটি অনুধাবন করা মুশকিল। বাংলাদেশের মতো একটি সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একসঙ্গে দেখলে এগুলো ক্ষমতা সম্পর্কে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারণার ইঙ্গিত বহন করে। তারেক রহমানের এই ক্ষমতাকে প্রদর্শন না করে পরিমিত ব্যবহার করা, প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান না করে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবিলা করা এবং নিজের অবস্থানকে অভ্রান্ত না ভেবে জনগণের কাছে জবাবদিহি করাু এই ধারনা প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে এক সম্ভাবনাময় সূর্যের আভা দৃশ্যমান হবে। সুতরাং, তারেক রহমানের বিগত ছয় মাসকে শুধু একটি নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস হিসেবে দেখলে সম্ভবত এর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক উপেক্ষিত হবে।ইতিহাস কোনো সরকারের গাড়িবহর, প্রটোকল কিংবা ক্ষমতার জৌলুস মনে রাখে না। ইতিহাস মনে রাখে, কে ক্ষমতাকে মানুষের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, কে তাদের কণ্ঠ শুনেছিল এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি ছিল, কে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সাহস দেখিয়েছিল এবং কে রাষ্ট্রের শক্তিকে নিজের মর্যাদা বাড়ানোর পরিবর্তে মানুষের মর্যাদা বাড়াতে ব্যবহার করেছিল।তাই আজকের রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ক্ষমতা কার হাতে, তা নয়। তারেক রহমানের গত ছয় মাসের পদক্ষেপগুলো অন্তত একটি সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছেু বাংলাদেশের রাজনীতি হয়তো ধীরে ধীরে ক্ষমতার জৌলুস থেকে মানুষের আস্থার দিকে, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে প্রতিষ্ঠানমুখিতার দিকে এবং কথার রাজনীতি থেকে কাজের রাজনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কারণ ক্ষমতার সবচেয়ে বড় অলংকার কোনো বিশেষণ নয়, ক্ষমতার সবচেয়ে বড় অলংকার হলো মানুষের আস্থা।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা।]

শিক্ষা যখন ক্ষমতার নয়, মুক্তির হাতিয়ার

একটি জাতির ভবিষ্যৎ মূলত নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার চরিত্র, দর্শন ও উদ্দেশ্য দ্বারা। অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রযুক্তি কিংবা সামরিক শক্তি কোনো রাষ্ট্রকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী করে তুলতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির সভ্যতা, মানবিকতা, নৈতিকতা এবং সৃজনশীল সক্ষমতার ভিত্তি নির্মাণ করে জাতীয় আদর্শ ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি সুপরিকল্পিত ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যেসব জাতি শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং মুক্তবুদ্ধির বিকাশকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে পেরেছে, তারাই টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ অর্জনে সফল হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার অবক্ষয়, জ্ঞানচর্চার সংকোচন এবং বৌদ্ধিক স্বাধীনতার অবরুদ্ধতা প্রায়শই একটি জাতির সামগ্রিক পশ্চাৎপদতার পূর্বলক্ষণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই কারণেই শিক্ষার সংকট মূলত জাতির সংকট, আর শিক্ষার মুক্তি মানেই জাতির মুক্তির সম্ভাবনা। শিক্ষা কেবল কর্মসংস্থানের উপযোগী মানবসম্পদ তৈরির প্রক্রিয়া নয়; এটি মানুষের চিন্তা, বিবেক, বিচারবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নাগরিক চেতনা গঠনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। একটি জাতি কী ধরনের মানুষ গড়ে তুলতে চায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কী ধরনের মূল্যবোধ হস্তান্তর করতে চায় এবং রাষ্ট্রকে কোন আদর্শিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায় তার প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় তার শিক্ষানীতিতে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় সেটার বাস্তব প্রয়োগে।বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাই একটি কঠিন কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রশ্ন সামনে আসে: আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও মানবিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে, নাকি ধীরে ধীরে তারা রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, কারণ সমস্যাটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সময়পর্বের নয়; বরং এটি শিক্ষা, রাষ্ট্র এবং ক্ষমতার সম্পর্ককে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি গভীর কাঠামোগত বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রীয় পরিধিতে শিক্ষা ও রাজনীতির সম্পর্ক নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রাচীনকালের গ্রীক দার্শনিক প্লেটো (খ্রিস্টপূর্ব ৪২৭-খ্রিস্টপূর্ব ৩৪৭) থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের মার্কিন শিক্ষাবিদ জন ডিউই (১৮৫৯-১৯৫২) কিংবা ব্রাজিলীয় শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি (১৯২১-১৯৯৭) পর্যন্ত প্রায় সকল শিক্ষাচিন্তকই শিক্ষা ও নাগরিক জীবনের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। মানুষ সমাজে বসবাস করে, রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে জীবনযাপন করে; ফলে শিক্ষা কখনোই সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির বাইরে অবস্থান করতে পারে না। বরং একটি সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের সচেতন, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে তারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারে।কিন্তু রাজনৈতিক সচেতনতা এবং দলীয় আনুগত্য এক বিষয় নয়। নাগরিক শিক্ষা মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং যুক্তির আলোকে মতামত গঠন করতে সক্ষম করে। পক্ষান্তরে দলীয়করণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের অনুগত কাঠামোয় আবদ্ধ করে ফেলে, যেখানে স্বাধীন চিন্তা ও সমালোচনামূলক বোধের পরিবর্তে আনুগত্য, অনুসরণ এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক অবস্থান অধিক গুরুত্ব পায়। এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি এবং সংকট নিহিত। যখন রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরির পরিবর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তখন শিক্ষা তার মৌলিক উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়। আর যখন শিক্ষা তার মৌলিক উদ্দেশ্য হারায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় কেবল শিক্ষাব্যবস্থা নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি জাতির ভবিষ্যৎ, তার বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি এবং তার সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির সম্ভাবনা। আমাদের মনে রাখতে হবে যে শিক্ষা কেবল তথ্য মুখস্থ করার নাম নয়, আর শিক্ষিত হওয়া মানেই কেবল সনদ অর্জন নয়। প্রকৃত শিক্ষা হলো মানুষকে চিন্তা করতে শেখানো, প্রশ্ন করতে শেখানো, সত্য অনুসন্ধানের সাহস জাগিয়ে তোলা এবং নিজের বিবেকের সঙ্গে সংলাপ করার সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করা। শিক্ষা মানুষের মস্তিষ্ককে যেমন সমৃদ্ধ করে, তেমনি তার নৈতিক বোধ, মানবিকতা এবং বিচারক্ষমতাকেও বিকশিত করে। একটি সমাজে শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় কতজন মানুষ তথ্য জানে তার দ্বারা নয়; বরং কতজন মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম হয়, তার দ্বারা।পাওলো ফ্রেইরি তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘অত্যাচারিতের শিক্ষা’ (পেডাগোজি অব দ্যা অপ্রেসড)-এ দেখিয়েছিলেন যে, শিক্ষা যদি কেবল তথ্য জমা রাখার একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়, তাহলে তা মুক্ত মানুষ নয়, বরং অনুগত মানুষ তৈরি করে। তিনি এই পদ্ধতিকে ‘শিক্ষার ব্যাংকিং মডেল’ (ব্যাংকিং মডেল অব এডুকেশন) নামে অভিহিত করেছিলেন, যেখানে শিক্ষার্থীকে একটি খালি পাত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং শিক্ষক তার মধ্যে তথ্য জমা করেন। এই ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর চিন্তা, প্রশ্ন, সৃজনশীলতা কিংবা অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য থাকে না। ফলে শিক্ষা জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে কর্তৃত্বের পুনরুৎপাদনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। ফ্রেইরির মতে, প্রকৃত শিক্ষা হলো সংলাপভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক এবং মুক্তিকামী; যা মানুষকে বিদ্যমান বাস্তবতাকে বোঝার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে তাকে পরিবর্তন করার সক্ষমতাও প্রদান করে। প্রকৃতপক্ষে প্রশ্ন করার ক্ষমতাই মানবসভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের (খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০ুখ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯) অনুসন্ধিৎসু প্রশ্ন, গ্যালিলিওর বৈজ্ঞানিক কৌতূহল, ইংরেজ বিজ্ঞানী আইজাক নিউটনের (১৬৪৩ু১৭২৭) পর্যবেক্ষণ, ব্রিটিশ ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১ু১৯৪১) মুক্তচিন্তা কিংবা ব্রিটিশ ভারতীয় বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর (১৮৫৮-১৯৩৭) গবেষণামনস্কতা সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস। জ্ঞান কখনো স্থির নয়; এটি ক্রমাগত অনুসন্ধান, পরীক্ষা, বিতর্ক এবং পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে বিকশিত হয়। তাই যে শিক্ষাব্যবস্থা প্রশ্ন করাকে নিরুৎসাহিত করে, ভিন্নমতকে সন্দেহের চোখে দেখে কিংবা সমালোচনামূলক চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সে শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনশক্তিকে দুর্বল করে ফেলে।দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হলো, অনেক ক্ষেত্রেই আমরা শিক্ষাকে জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে আনুগত্যের অনুশীলনে পরিণত করি। শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় কীভাবে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হবে, কিন্তু সবসময় শেখানো হয় না কীভাবে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে হবে। তারা শিখে কীভাবে নির্ধারিত উত্তর পুনরুৎপাদন করতে হয়, কিন্তু শিখে না কীভাবে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করতে হয়। তারা শিখে কীভাবে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে সফল হতে হয়, কিন্তু অনেক সময় শিখে না কীভাবে জটিল সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা নৈতিক সমস্যার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করতে হয়। ফলে শিক্ষা ধীরে ধীরে অনুসন্ধিৎসু মনের বিকাশের পরিবর্তে মুখস্থনির্ভর সাফল্যের সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অল্প বয়স থেকেই এমন একটি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়, যেখানে ক্ষমতার প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যকে গুণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তারা শেখে কীভাবে ক্ষমতাবানকে খুশি রাখতে হয়, কিন্তু শেখে না কীভাবে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হয়। তারা শেখে কীভাবে প্রচলিত কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়, কিন্তু শেখে না কীভাবে অন্যায়, বৈষম্য বা ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যুক্তিপূর্ণ অবস্থান নিতে হয়। অথচ ইতিহাসের প্রতিটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের পেছনে ছিল এমন মানুষ, যারা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার সামনে নত না হয়ে সত্য, ন্যায় এবং মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছিল।এই বাস্তবতায় শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যকে নতুন করে স্মরণ করা জরুরি। শিক্ষা যদি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা, নৈতিক সাহস এবং সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ ঘটাতে না পারে, তাহলে তা কেবল দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারলেও সচেতন নাগরিক তৈরি করতে পারবে না। আর যে সমাজে সচেতন, চিন্তাশীল ও নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল নাগরিকের সংখ্যা কমে যায়, সেখানে গণতন্ত্র দুর্বল হয়, উদ্ভাবন থেমে যায় এবং জাতীয় উন্নয়নও দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হয়। তাই শিক্ষার প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার সাহস, সত্য অনুসন্ধানের আগ্রহ এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সক্ষমতা গড়ে তোলার মধ্যেই। শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিকীকরণ আজ আমাদেরকে এক গভীর ও বহুমাত্রিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর প্রভাব কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা রাষ্ট্র, সমাজ এবং জাতির ভবিষ্যৎ বিকাশের ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান দায়িত্ব হলো মুক্তবুদ্ধির বিকাশ, জ্ঞানচর্চার প্রসার এবং মানবিক ও দক্ষ নাগরিক গড়ে তোলা। কিন্তু যখন শিক্ষাঙ্গন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দলীয় প্রভাব বিস্তার কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্র দখলের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, তখন শিক্ষা তার মৌলিক উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়। এর ফলে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বৌদ্ধিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে তার নৈতিক ও একাডেমিক বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে শুরু করে।ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়ো (১৯৩০ু২০০২) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেবল জ্ঞান বিতরণের স্থান হিসেবে দেখেননি; বরং তিনি বিশ্লেষণ করেছিলেন কীভাবে শিক্ষা অনেক সময় বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোকে পুনরুৎপাদন করে। তাঁর ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ এবং ‘সামাজিক পুনরুৎপাদন’ তত্ত্ব দেখায় যে, শিক্ষা সবসময় নিরপেক্ষভাবে কাজ করে না; অনেক ক্ষেত্রে এটি সমাজে বিদ্যমান ক্ষমতা, মর্যাদা এবং সুযোগের অসম বণ্টনকে নতুন রূপে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ যে সমাজে বৈষম্য, পক্ষপাত বা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রয়েছে, সেই সমাজের শিক্ষাব্যবস্থা যথাযথভাবে সংস্কার ও সুরক্ষিত না হলে অনিচ্ছাকৃতভাবেও সেই বৈষম্য ও ক্ষমতাকাঠামোকেই দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই বিশ্লেষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। যখন শিক্ষাঙ্গনে দলীয় পরিচয়, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা গোষ্ঠীগত সংশ্লিষ্টতা মেধা, নৈতিকতা, পেশাগত দক্ষতা ও যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার বৌদ্ধিক স্বাধীনতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। নিয়োগ, পদোন্নতি, নেতৃত্ব নির্বাচন, গবেষণা সুযোগ কিংবা একাডেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যদি যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে ধীরে ধীরে একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এতে মেধাবী ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিরা নিরুৎসাহিত হন, আর আনুগত্যভিত্তিক সংস্কৃতি ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় শিক্ষার মূল চরিত্রের ওপর। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর পরিচয় তখন আর প্রধানত জ্ঞানচর্চাকারী, গবেষক কিংবা অনুসন্ধিৎসু নাগরিক হিসেবে থাকে না; বরং তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত অবস্থানের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। শিক্ষাঙ্গনের সম্পর্কগুলোও তখন একাডেমিক সহযোগিতা ও বৌদ্ধিক বিনিময়ের পরিবর্তে ক্ষমতা ও প্রভাবের সমীকরণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। ফলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এমন এক পরিবেশের জন্ম হয়, যেখানে মতের বৈচিত্র‍্যকে সম্পদ হিসেবে না দেখে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়, আর ভিন্নমতকে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিতর্কের বিষয় হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। এই পরিস্থিতির একটি স্বাভাবিক পরিণতি হলো বিভক্ত শিক্ষাঙ্গনের সৃষ্টি। সেখানে প্রশ্নের পরিবর্তে স্লোগান, যুক্তির পরিবর্তে আনুগত্য এবং গবেষণার পরিবর্তে অবস্থানগত পক্ষপাত প্রাধান্য পেতে শুরু করে। জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করার পরিবর্তে মানুষ পূর্বনির্ধারিত মতাদর্শিক অবস্থান থেকে বিচার করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে জ্ঞানচর্চার যে উন্মুক্ত পরিবেশ একটি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ বা বিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি হওয়ার কথা, তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যায়। গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কারণ নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন মুক্ত বিতর্ক, ভিন্নমতের সহাবস্থান এবং প্রশ্ন করার স্বাধীনতা।ইতিহাস আমাদের বারবার দেখিয়েছে, যে সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, সেখানে জ্ঞানচর্চা দুর্বল হয় এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পক্ষান্তরে যে সমাজগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ক্ষমতার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে যথাসম্ভব মুক্ত রেখে একাডেমিক স্বাধীনতা, গবেষণার স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করেছে, তারা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অধিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। কারণ জ্ঞান বিকশিত হয় স্বাধীন পরিবেশে; নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নয়। তাই শিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিকীকরণের প্রশ্নটি কেবল কোনো প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক সমস্যা নয়; এটি মূলত জাতির বৌদ্ধিক ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি জাতীয় প্রশ্ন। যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা জ্ঞান, গবেষণা ও মুক্তবুদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে না পারি, তাহলে আমরা হয়তো সনদধারী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারব, কিন্তু এমন নাগরিক গড়ে তুলতে পারব না যারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং জাতির দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে সৃজনশীল অবদান রাখতে সক্ষম।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

প্রত্যাবর্তন না প্রত্যর্পণ! রাজনীতির নতুন ধন্ধ

বাংলাদেশের আইসিটিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন বা প্রত্যর্পণ সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত বিষয়। সরকার এবং সরকারের বর্তমান সহযোগী কাম বিরোধী পক্ষ উভয়েই প্রত্যাবর্তন বা প্রত্যর্পণ কোনোটাই চায় বলে মনে হয় না। কেননা শেখ হাসিনার দেশে উপস্থিতি, কারাগারেই হোক বা ফাঁসির মঞ্চে তা কার্যকলাপ নিষিদ্ধ দলকে অনেকটাই রাজনীতির উন্মুক্ত মঞ্চে নিয়ে আসবে — যা তরুণ তুর্কি দলের জন্য বিব্রতকর। এবং সে পরিস্থিতিতে জামায়াতও বিরোধী দল হিসেবে শুধু কাগজে-কলমে বা অনেকটা আওয়ামী লীগ আমলের জাতীয় পার্টির মতো অবস্থানে যেতে হতে পারে। ইউনূস ঘোষিত ‘দানবী’র ফিরে আসাটা ইউনূসের জন্যও বিব্রতকর হতে পারে।শাসকদলের জন্যও এটা একটা বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এই মুহূর্তে তারা জামায়াত-এনসিপি এবং ইউনূস সমর্থক স্টাবলিশমেন্টকে সরাসরি প্রতিপক্ষ বানাতে চায় না। তাই জামায়াত-এনসিপির সুরে তারাও বলছেন কিসের প্রত্যাবর্তন, বন্দী বিনিময় চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করতে হবে। কারণ তারা জানেন প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং নানা আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া পার হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত হয়। আর এ ভাবেই সময় পার হবে। তারা যদি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে আইনের আওতায়ই আনতে চান তবে প্রত্যাবর্তন বা প্রত্যর্পণ বা তিনি বিমানে আসবেন না স্থলপথে আসবেন কোনোটাতেই আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু মুখে যে যাই বলুক, ফাঁসির রায় প্রতীকী ব্যবস্থা হিসেবে রেখে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি ও দেশের বাইরে রাখাতেই বর্তমান শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের সহযোগী বিরোধী দল অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। শেখ হাসিনা শুধুমাত্র প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যকলাপে যুক্ত হলে বা মিডিয়াতে বক্তব্য দিলে কিছুদিন বাদ-প্রতিবাদ চলে। এবং আপাতত লংমার্চের নামে লংড্রাইভ মার্কা কর্মসূচি দিয়ে সরকারকে চাপে রাখা যাতে এ বিষয়ে দিল্লির সাথে ঢাকার কোনো সমঝোতা না হয়। এবারের লংড্রাইভে সে দিক থেকে কিছু কাজও হয়েছে। তবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইস্যুতে ছাড় পেতে পেতে জামায়াতের যে বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে তাও বিএনপির জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।জুলাই আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তৃতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তার অনুপস্থিতিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। অন্যদিকে কার্যকলাপ নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ উক্ত ট্রাইব্যুনালকে একটি “ক্যাংগারু আদালত” বলে নিন্দা জানায় এবং এই বিচারকে “মুক্তিযুদ্ধবিরোধী” শক্তির রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য পরিকল্পিত একটি “প্রহসন” বলে অভিহিত করে।শেখ হাসিনা কি আসলেই ফিরছেন — এ প্রশ্নে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নানা মত। একাংশের ধারণা শেখ হাসিনা রাজনৈতিকভাবে নিজের গুরুত্ব বজায় রাখা, সমর্থকদের ধরে রাখা এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে আবার সক্রিয় করার মরিয়া চেষ্টা হিসেবে শুধু এমনটা বলছেন। আবার কেউ বলছেন তিনি দেশি-বিদেশি আইনজীবীদের সাথে পরামর্শ করে আটঘাট বেঁধেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনেক সময় আন্তর্জাতিক প্রভাব বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। সেই আন্তর্জাতিক মহলের চাপ, তাপ এবং প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি ফেরার পরিকল্পনা করছেন। তবে শেখ হাসিনা বলছেন, তিনি জনগণের উপর ভরসা করেই দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে এবং আইনি লড়াই করতে প্রস্তুত।তিনি আরও বলছেন, ‘যদি মৃত্যু আসে, আমি আমার নিজের মাটিতেই মরতে চাই’।তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে জুলাই আন্দোলন পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে তার ব্যর্থতা, আন্দোলন দমনে চরম নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, অসংখ্য মৃত্যু এবং তার কর্তৃত্ববাদী দীর্ঘ শাসন আমলে গণতন্ত্রকে সংকুচিত করা, ভোটের অধিকারকে খর্ব করা ইত্যাদি বিষয়ে ন্যূনতম কোনো আত্মপর্যালোচনা নাই। গত ৫ আগস্ট তিনি দিল্লিতে যে অনলাইন সংবাদ সম্মেলন করলেন সেখানেও তিনি জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর নিজে না দিয়ে উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব সজীব ওয়াজেদ জয়ের দিকে ঠেলে দিলেন। উত্তরে জয় যা বললেন তার সারকথা হলো ‘৫ আগস্টের আগে পরে অনেক আওয়ামী লীগ কর্মী ও পুলিশ হত্যা সংঘটিত হয়েছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী শাসকরা যদি এক পক্ষকে সম্পূর্ণ ছাড় দিতে পারেন, তবে অপর পক্ষকে এককভাবে অপরাধী বা দোষী সাব্যস্ত করার নৈতিক অধিকার তাদের থাকে না।’ প্রশ্ন হলো, একটা অন্যায়ের উদাহরণ দিয়ে আরেকটি অন্যায় ঢাকার প্রচেষ্টা কি মানুষের কাছে গ্রহণীয় হবে? মানুষ তো কথার মারপ্যাঁচ নয়, সরাসরি উত্তর চায়। শুধুমাত্র ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করে আওয়ামী লীগ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারবে বলে মনে হয় না।নেতৃত্ব আত্মপর্যালোচনা না করায় কর্মী সমর্থকরাও পুরনো পথেই হাঁটছেন। তাই তো আমাদেরকে দেখতে হলো দেশের বাইরে চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের ও দেশের চলচ্চিত্রের প্রতিনিধিত্ব করতে যেয়ে সুদূর ইতালিতে হামলা ও হেনস্তার শিকার হলেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। জুলাইয়ের আগে আওয়ামী লীগের সাথে থাকলেও এবং বিতর্কিত নির্বাচনসমূহে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালালেও জুলাই আন্দোলনের অসংখ্য মৃত্যু তাকে টেনে এনেছিলো রাজপথের প্রতিবাদে। সে কারণে তখন আওয়ামী লীগ সরকারের কট্টরপন্থী সমর্থকরা তার এই রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। আবার ৫ আগস্টের পরে তিনি যখন মব উল্লম্ফনের বিরুদ্ধে, নারী স্বাধীনতাকে সংকুচিত করার প্রয়াসের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেন তখন ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ ধর্মীয় উগ্রবাদী অংশ ও উগ্রপন্থী সাইবার গ্রুপগুলো তার স্বাধীনচেতা জীবনযাপন, পছন্দের পোশাক, অভিনয় এবং খোলামেলা রাজনৈতিক ও সামাজিক বক্তব্যের বিরুদ্ধে লাগামহীন নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছে। আবার এখন জুলাই’২৪-পূর্বের তার একসময়ের মিত্ররা সোশ্যাল মিডিয়ায় অশোভন ভাষায় তাকে আক্রমণ করে চলেছেন।বাঁধনের কাছাকাছি অবস্থানে শাওনও। অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের যৌক্তিকতার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন। রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। ১৯৭১ সালের রাজাকারদের নৃশংসতার কথা মনে করিয়ে ও বিষয়টির ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতা তুলে ধরে, তিনি বলেন শিক্ষার্থীরা কি পরিস্থিতিতে নিজেদের ক্ষোভ থেকে এই স্লোগান দিয়েছে, তা আমাদের বুঝতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর আন্দোলনের পরবর্তী গতিপ্রকৃতি ও ধর্মীয় উগ্রবাদীদের উত্থান দেখে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে আন্দোলনটি পূর্ব-পরিকল্পিত ছিল। আর এ কথা বলার সাথে সাথেই তিনি তীব্র সামাজিক মব ট্রায়াল ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হন। নাটকের টিয়া পাখির মুখে বলা সেই দেশ আলোড়ন সৃষ্টিকারী সংলাপ ‘তুই রাজাকার’ - এর প্রতিশোধ আজ রাজাকারের দোসররা হুমায়ুন আহমেদের অনুপস্থিতিতে শাওনের উপর নিচ্ছেন। তা হলে কি কেউ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে না?প্রকৃতপক্ষেই আমাদের সমাজে স্বাধীন চিন্তার পরিসর ও সহিষ্ণুতা ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। যার কারণে জাতীয় সংসদে ভিন্নমত প্রকাশ করায় রুমিন ফারহানাকে তার একসময়ের সতীর্থদের কাছ থেকেই অকথ্য ভাষায় গালাগালির শিকার হতে হচ্ছে কিংবা সরকার দলীয় আইনজীবী নেতার আচরণে বিচারপতিকে এজলাস ত্যাগ করতে হচ্ছে।ইতালির ঘটনায় আমাদের তথ্য উপদেষ্টা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে গোটা আওয়ামী লীগ দলকে মাফিয়া গ্যাং হিসেবে আখ্যায়িত করে পরিস্থিতি আরো উসকে দিলেন। এ ধরনের উক্তি করার আগে আয়নার দিকে তাকানো উচিত। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের দলের কর্মীদের বড় একটা অংশের কি ভূমিকা ছিল? দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও হামলার যে উন্মত্ত চেহারা সে সময় দেশবাসী দেখেছে তাকে তথ্য উপদেষ্টা কি উপাধি দিবেন? অভিনয়শিল্পী সিদ্দিকুর রহমান (যিনি নাটক ও টিভি পর্দায় সিদ্দিক নামে বহুল পরিচিত) এর উপর যখন তার দলের তরুণরা মব হামলা করলো, প্রকাশ্য রাস্তায় পিটিয়ে পিটিয়ে তার পরিধানের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে থানায় নিয়ে, ২টি খুনের মামলায় নাম ঢুকিয়ে ১১ মাস যাবত তাকে আটক রাখার ব্যবস্থা করলো তখন তার এই কণ্ঠস্বর কোথায় ছিলো? জুলাই অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় দায়ের করা একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তার করা হলো, তখন কিন্তু তার বিবেকের ডাক শোনা যায় নাই। ইতালির ঘটনায় সরকারের দায়িত্ব - দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দূতাবাসকে সক্রিয় করা, উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করা নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতির দিকে এগোনোর পরিবর্তে রাজনীতি আরও অসহিষ্ণু ও সহিংস হয়ে উঠে — এমন মন্তব্য থেকে সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের বিরত থাকা উচিত।আলোচনা চলছিলো প্রত্যাবর্তন ও প্রত্যর্পণ নিয়ে। সেখানেই ফেরা যাক। শেখ হাসিনা ফিরলে তাকে আপিলের সুযোগ দেওয়ার প্রশ্ন উঠবে এবং বিলম্ব মার্জনা চেয়ে আপিল আবেদন করার ক্ষেত্রে তার শক্তিশালী যুক্তিও আছে যা আদালতকে বিবেচনায় নিতে হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল রাজনীতির ভাষায় যাই বলুন না কেন আইন অনুযায়ী আপিল করা আসামির অধিকার, যা থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না। শেখ হাসিনাকে ভারতবর্ষে পাঠিয়েছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিমানে উড়িয়ে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ভারত আসামি হিসেবে নয়, অতিথি হিসাবে তাকে আশ্রয় দিয়েছে। তাই তার ফেরার বিষয়টি শুধুমাত্র তার ইচ্ছাধীন বলে মনে হয় না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় সরকারকেই একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।তিনি ফিরলে আপিল আদালতে নানা প্রশ্ন ও যুক্তিতর্ক উঠবে। যেমন ১৯৭১ সালে দেশের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর দোসরদের নয় মাসব্যাপী যে হত্যাযজ্ঞ, নারী ধর্ষণ, সংখ্যালঘু হত্যা ও নিপীড়ন — ইত্যাদি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। ২০২৪ - এর জুলাই আন্দোলন দমনে ও আইনশৃঙ্খলা জনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের বাড়াবাড়ি ও নির্বিচার গুলির কারণে যে অসংখ্য মৃত্যু সংঘটিত হয়েছিলো তার বিচার আয়োজন সেই একই ট্রাইব্যুনাল ও আইনে যথাযথ কিনা? ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জামায়াত নেতাদের আইনজীবী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর নিযুক্ত হওয়ায় প্রতিশোধের বিচার আয়োজন হয়েছে কিনা - ইত্যাদি নানা প্রশ্ন উঠবে।মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার সাথে সাথেই এইচআরডব্লিউ তাদের প্রতিবেদনে উদ্বেগ জানিয়ে উল্লেখ করেছিলো ‘দুজনার অনুপস্থিতিতে হওয়া এ বিচার আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে’। অপরদিকে অ্যামনেস্টি তাদের প্রতিবেদনে বলেছিলো ‘এই বিচার ও সাজা কোনোটিই সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত হয়নি’। অনুপস্থিতিতে বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া পুরোপুরি বজায় রাখা হয়েছে কি না, তা নিয়ে জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও প্রশ্ন তোলা হয়েছিলো এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছিলো।যুক্তরাজ্যভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক ডেভিড বার্গম্যান যিনি ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ে আলোচনার পাদপীঠে ছিলেন, তিনিও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্যান্যদের বিচার প্রক্রিয়া এবং এর স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সুনির্দিষ্ট কিছু আইনি ও পদ্ধতিগত উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ডেভিড বার্গম্যান বিচারিক কাঠামোর ত্রুটি, আইনি সহায়তার দুর্বলতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন, যা নিয়ে দেশ-বিদেশে আইনি ও রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বার্গম্যান এমনও সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, বিচারকরা স্বাধীনভাবে রায় প্রস্তুতের সময় পেয়েছিলেন কি না, নাকি রাজনৈতিক বা বাহ্যিক কোনো চাপের কারণে তাড়াহুড়ো করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়েছে।অনুপস্থিতির বিচারে এবং আসামি নিজে আইনজীবী নিযুক্ত করতে না পারলে অনেক কিছুই আদালতের নজরে আসার সুযোগ থাকে না। শেখ হাসিনা কর্তৃক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সরাসরি প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার টেলিফোন কলরেকর্ড প্রমাণ হিসাবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা বলে থাকেন, ‘আরও মৃত্যু ও রক্তপাত ঘটিয়ে তিনি ক্ষমতায় থাকতে চান না, রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান কে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে বলেছেন’ — শেখ হাসিনার এ ধরনের কলরেকর্ডও রয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেলে হয়তো তার পক্ষ থেকে যে সব যুক্তি দেয়া হবে যা ইতিপূর্বে ট্রাইব্যুনালে দেয়া হয় নি। সে সব বিষয় আপিল আদালতকে বিবেচনায় নিতে হবে।তবে প্রত্যাবর্তন হোক আর প্রত্যর্পণই হোক সরকারকে সমগ্র বিষয়টি বাস্তবতার আলোকে রাজনৈতিকভাবেও বিবেচনা করতে হবে। অতি সম্প্রতি ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপ বাংলাদেশে তার সাম্প্রতিক সফরকালে বলেছেন, সমাজে স্থায়ী শান্তি ও অগ্রগতির জন্য ন্যায়বিচারের পাশাপাশি রাজনৈতিক পুনর্মিলন অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা অপরিহার্য। পূর্বাপর বিবেচনা না করে প্রতিহিংসার আগুন জ্বালালে, সে আগুনে একদিন নিজেকে জ্বলতে হতে পারে।প্রসঙ্গত ২০২৬-এর ২১ জানুয়ারি দেয়া ট্রাইব্যুনালের একটি আদেশের কথা মনে পড়ছে। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর রুকন আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল সেই রায় দিয়েছিলো। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি ২০২৫ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তান থেকে আকাশপথে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে আসলেও তখন তাকে আইনের আওতায় আনা হয় নি। যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্তির ঠিক তেরো বছর পর ইউনূস আমলের একেবারে শেষ সময়ে ২০২৬-এর ২১ জানুয়ারি আত্মসমর্পণ করলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, ‘তিনি এখন যেভাবে আছেন সেভাবে থাকবেন’ এমন একটি আদেশ দিয়েছিলো। শেখ হাসিনা আত্মসমর্পণ করে আপিল ও জামিনের আবেদন জানালে ক্ষমতাসীন ও সহযোগী বিরোধী দলের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে ট্রাইব্যুনাল ‘আপিল ও জামিন শুনানির পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ না করা পর্যন্ত তিনি এতদিন যেখানে ছিলেন সেখানেই থাকবেন, বিমান প্রস্তুত!’ — এমন আদেশ না দিয়ে দেয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর শুনুক রাষ্ট্র

৬ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে রাষ্ট্রপতি জনাব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সবকিছুকে ছাপিয়ে যে কথাটি সবার হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে গেছে, তা হলো আদিবাসী প্রতিনিধি ও নারী নেত্রী আরতি মার্ডীর আবেগঘন ও যৌক্তিক বক্তব্য। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি তুলে ধরেছেন প্রান্তিক মানুষের নানা দাবি ও আকাঙ্ক্ষা। হাজারো মানুষের করতালি ও স্লোগান ছাপিয়ে তখন একটি পরম সত্যই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—তা হলো প্রান্তিক মানুষের অন্তহীন আকুতি।আরতি মার্ডী যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন, তখন তিনি কেবল ব্যক্তি আরতি ছিলেন না; তিনি ছিলেন সমগ্র উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল, উরাঁও, কোল, কোডা, মাহালী, মুণ্ডা, মালপাহাড়ি, রাজোয়াড়, তুরি, পাহানসহ ত্রিশাধিক জাতিগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর। নিজ জেলার একজন কৃতী সন্তান, যিনি সাংবিধানিকভাবে দেশের সর্বোচ্চ পদে সমাসীন, তাকে সামনে পেয়ে আরতি মার্ডী আদিবাসীদের বঞ্চনা, অধিকার এবং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। তিনি যেমন রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে গর্ব ও গৌরব প্রকাশ করেছেন, তেমনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আমাদের দেশের সমতলের আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার। ভূমির অধিকার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা—সব ক্ষেত্রেই তারা পিছিয়ে রয়েছেন। একটি গণতান্ত্রিক সরকারই আদিবাসীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসরে তাদের সম-অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশে জাতিগত ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির কতটা প্রয়োজন, তার বক্তব্যে সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।মৌলিক অধিকার ও শিক্ষা: আদিবাসী শিশুদের জন্য নিজস্ব মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং ঝরে পড়া রোধে বিশেষ উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশে ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাই আদিবাসীদের উন্নয়নের মহাসড়কে সামিল করার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।কর্মসংস্থান: আদিবাসীরা কর্মঠ ও বিশ্বস্ত—এ বিষয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসীদের মধ্যে দারিদ্র‍্য বাড়ছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে অনেক আদিবাসী পরিবার উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও সরকারি চাকরিতে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে সামাজিক পরিসরে তাদের সম-অধিকার দেওয়া জরুরি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো গেলে আদিবাসীরা নিজেদের অস্তিত্ব ও মর্যাদা নিয়ে টিকে থাকার শক্তি পাবেন।ভূমির অধিকার ও নিরাপত্তা: সমতলের আদিবাসীদের জমি জবরদখল একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। তাদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনি ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।আদিবাসী ও আদিবাসী নারীর ক্ষমতায়ন: আদিবাসীরা এখনও সমাজের নানা স্তরে অবহেলা ও উপেক্ষার শিকার। তৃণমূল পর্যায় থেকে সরকারের বিভিন্ন কাঠামোতে যদি সংরক্ষিত আসন বা পদে আদিবাসীদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে তাদের মধ্যে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও অংশগ্রহণ বাড়বে। একই সঙ্গে তাদের মেধা ও মনন বিকাশের সুযোগও তৈরি হবে।আরতি মার্ডী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন। মঞ্চে বসা রাষ্ট্রপতি শুধু তা শোনেনইনি, বরং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আরতির কথাগুলো নিজের ডায়েরিতে নোট করছিলেন। প্রান্তিক একজন নারীর প্রতিটি কথা রাষ্ট্রের অভিভাবক এভাবে লিপিবদ্ধ করছেন—এই দৃশ্য প্রতীকী অর্থে অত্যন্ত গভীর। এটি যেন প্রমাণ করে, রাষ্ট্র কেবল ওপরতলার মানুষের কথা শোনার প্রতিষ্ঠান নয়; তৃণমূলের অবহেলিত মানুষের কণ্ঠস্বরও ধারণ করতে পারে। বক্তব্য শেষে মঞ্চে থাকা আরতি মার্ডীকে রাষ্ট্রপতি হাত তুলে সালাম জানিয়ে যে সম্মান প্রদর্শন করেছেন, তা দেশের সৌহার্দ্য ও মানবিক রাজনীতির একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৯ কোটি আদিবাসী নারী সমাজ ও পরিবেশ রক্ষা, ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীলতা তৈরিতে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছেন। অথচ আমাদের সমাজের বাস্তবতায় সমতলের আদিবাসী নারীরা এখনও নানামুখী বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার। ভূমির অধিকারসংকট, অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব যেন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির এই আন্তরিক আচরণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আশার সঞ্চার করবে।রাষ্ট্রপতিও তার বক্তব্যে অতীতে দেশের মানুষের ওপর হওয়া নির্যাতন ও বঞ্চনার কথা উল্লেখ করেছেন এবং একটি সুষম ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। রাষ্ট্রপতির এই সদাশয়তা এবং একজন আদিবাসী নারীর সাহসী কণ্ঠের মেলবন্ধন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উন্নয়ন তখনই টেকসই ও অর্থপূর্ণ হয়, যখন সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষটিও অনুভব করেন যে তার কথা শোনার মতো কেউ একজন আছেন। রাষ্ট্রপতির ডায়েরিতে টুকে নেওয়া সেই দাবিগুলো যেন কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃত নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয়—এটাই আদিবাসী সমাজের মূল প্রত্যাশা।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

বোয়িং কেনার রাজনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াুবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর জানিয়েছেন, বাংলাদেশ বোয়িং থেকে আরও উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে নতুন এই চুক্তি আগের চেয়ে বড়। গর বলেন, ‘বাংলাদেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে’। এই ঘোষণার পরই আবার আলোচনায় এলো বিমানের উড়োজাহাজ কেনার রাজনীতি।স্মর্তব্য যে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে ক্ষমতায় বসেই বিএনপি সরকার আমেরিকার বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা খরচ করে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। সার্জিও গর বলেছেন, নতুন চুক্তি আগের চেয়ে বড়। কিন্তু কত বড় তা কেউ প্রকাশ করছে না। প্রশ্ন হলো, বোয়িং কেনার প্রধান উদ্দেশ্য কি শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানো? নাকি ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার কূটনীতিও এর পেছনে আছে?আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকার চাপকে অনেকে হস্তক্ষেপ হিসেবেই দেখে। বর্তমান বিশ্বে দুর্বলচিত্তের শাসকদের মনে আমেরিকা একটি আতঙ্ক তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে। ভেনিজুয়েলার সরকারপ্রধানকে ডনাল্ড ট্রাম্প সস্ত্রীক অপহরণ করে আমেরিকায় নিয়ে গেছেন। তৃতীয় বিশ্বের সরকার পরিবর্তনে আমেরিকার অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও নতুন নয়। তাই আমেরিকা তুষ্ট থাকলে ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকা সহজ হয়। অনেকে বলেন, মুহাম্মদ ইউনূসকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল আমেরিকা, তাই তিনি দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে আমেরিকার সঙ্গে তড়িঘড়ি করে একটি চুক্তি করেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, মুহাম্মদ ইউনূসের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার আকাঙ্ক্ষাও ছিল, কিন্তু জনসমর্থন না থাকায় সম্ভবত আমেরিকা মাথা ঘামায়নি।নতুন করে আবার বোয়িং কেনার চুক্তি হওয়ায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প খুব খুশি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি চিঠি পাঠিয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতে দেখা করার আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এই চুক্তির পেছনে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার প্রসঙ্গও ঘুরছে। শেখ হাসিনা তার প্রত্যাবর্তনের কথা না বললে হয়তো আমেরিকার এই বাণিজ্যিক তৎপরতা এতটা সামনে আসত না। সার্জিও গরের বাংলাদেশ সফরকে অনেকে সেভাবেই দেখেছিল। তবে এখন মনে হচ্ছে, তিনি এসেছিলেন মূলত ব্যবসার স্বার্থেই।আমেরিকা বিএনপি সরকারের কোন দুর্বলতাকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে না তো?এদিকে সাতাশটি দেশ নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের বোয়িং কেনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলছে, শুধু আমেরিকার বোয়িং নয়, ইউরোপের এয়ারবাসকেও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ দিতে হবে। একটি প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাবও দিয়েছে তারা। অথচ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পূর্বে আওয়ামী লীগ সরকার ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ইউনূস সরকার ‘স্বচ্ছতা নেই, দাম বেশি’ বলে সেটা বাতিল করে। এখন কিন্তু বিএনপি সরকার টেন্ডার ছাড়াই সরাসরি বোয়িং কেনার পথেই হাঁটছে। একই অজুহাতে এয়ারবাস বাতিল করে বোয়িং কেনা—এটা কি দ্বিমুখী নীতি নয়?শুধু বোয়িং নয়, চুক্তির শর্ত মোতাবেক কৃষিপণ্যসহ আরও বহু জিনিস বেশি দরে বিনা টেন্ডারে আমেরিকা থেকে কিনতে হতে পারে। তার চেয়ে বড় কথা, চুক্তির শর্তে যদি বাংলাদেশের কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেশের ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হয়, তবে তা হবে জাতীয় স্বার্থের জন্য বুমেরাং। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের গার্মেন্টসের সবচেয়ে বড় বাজার। আমেরিকার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি কেনে তারা। তারা যদি পাল্টা চাপ দেয়, তবে বিএনপি সরকারের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হবে।শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই। দেশে বিনিয়োগ প্রায় স্থবির, জ্বালানির তীব্র ক্রাইসিস, বন্ধ হচ্ছে কলকারখানা, কর্মহীন হচ্ছে প্রান্তিক মানুষ, মূল্যস্ফীতি প্রায় ডাবল ডিজিটে, খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি আর মব আতঙ্ক, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত। সরকার চলছে ঋণ নিয়ে। শুধু আমেরিকাকে তুষ্ট করলে হবে বলে মনে হয় না, দেশের অভ্যন্তরে অরাজকতা ও উত্তেজনার উচ্ছেদ না হলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘প্ল্যান’-এর বাস্তবায়ন জটিল হয়ে যাবে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বড় অংশ যদি বিদেশি চাপে ব্যয় হয়, তবে অভ্যন্তরীণ সংকট সরকার সামাল দেবে কীভাবে? বোয়িং আকাশে উড়বে, কিন্তু দেশের অর্থনীতির ডানা মেলবে তো?(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

ভিডিও আরও দেখুন

না খেলেই এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে বাংলাদেশ

জাপানের নাগোয়ায় বৃষ্টির কারণে মাঠ খেলার অনুপযোগী থাকায় চীনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে আইসিসি টি-টোয়েন্টি র‍্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকার সুবিধায় কোনো বল না খেলে সরাসরি এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল।বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) নিগাতানি নিশিনের কোরিগি অ্যাথলেটিক পার্কে নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও টানা বৃষ্টির কারণে আউটফিল্ড প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। এমনকি নিয়মানুযায়ী কোনো সুপার ওভার ম্যাচ আয়োজন করা সম্ভব না হওয়ায় দুই দলের আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং বিবেচনায় আনা হয়। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ নারী দলের অবস্থান যেখানে ১০ নম্বরে, সেখানে চীনের অবস্থান ৩৭তম (অন্য খবরে ৩৬তম)। র‍্যাঙ্কিংয়ের এই বিশাল ব্যবধানের কারণে নিগার সুলতানা জ্যোতির দল সরাসরি শেষ চার নিশ্চিত করে।আগামী ২০ সেপ্টেম্বর ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। সেমিফাইনালে টাইগ্রেসদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে যাচ্ছে এশিয়ার পরাশক্তি ভারত। শুক্রবার কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক জাপানের মুখোমুখি হবে ভারতীয় নারী দল।এর আগে এশিয়ান গেমসে দুটি রৌপ্য ও একটি ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। কদিন আগে এশিয়া কাপের সেমিফাইনালে ভারতের কাছে হারের তিক্ততা ভুলে এবার এশিয়ান গেমসের মঞ্চে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ।/ 

না খেলেই এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে বাংলাদেশ