সংবাদ
চাঁদাবাজি নির্মূলে আসছে নতুন আইন: আইজিপি

চাঁদাবাজি নির্মূলে আসছে নতুন আইন: আইজিপি

চাঁদাবাজি নির্মূলে শিগগিরই নতুন আইন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেছেন, ‘নতুন এই আইন পাস হলে ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ নিজে বাদী হয়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে।’শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে খুলনার বয়রায় কেএমপির পুলিশ লাইনসে খুলনা বিভাগের কমিউনিটি পুলিশিংবিষয়ক সুধী সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।আইজিপি বলেন, ‘প্রভাবশালী চাঁদাবাজদের ভয়ে সাধারণ মানুষ থানায় অভিযোগ করতে চান না বা সাক্ষ্য দিতে ভয় পান। এই বাধা দূর করতে এবং চাঁদাবাজি নির্মূলে শিগগিরই নতুন আইন হতে যাচ্ছে।’তিনি জানান, চাঁদাবাজির সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি, সন্ত্রাসী কিংবা ক্ষমতাবানরা জড়িত থাকায় অনেকেই ভয়ে অভিযোগ করতে চান না। ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ ও অপরাধের সূত্র ধরে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।এসময় আইজিপি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে বলপ্রয়োগ করলে পুলিশকে ফ্যাসিবাদী বলা হয়, আর বলপ্রয়োগ না করলে মানুষ দুর্বল মনে করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত ১৭ বছরে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে এবং সমাজে মাদককে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি নিরসনে কাজ করছে পুলিশ।’আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এর মাধ্যমে কমিউনিটি পুলিশিং পুলিশের একটি শাখা হিসেবে কাজ করবে।কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান চলছে জানিয়ে আইজিপি বলেন, ‘পুলিশকে মানবিক ও জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন। ’কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ক্ষমতা ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

নতুন আইন করলেই কি চাঁদাবাজি বন্ধ হবে?

ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই পুলিশকে মামলা করার সুযোগ দিতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন আইজিপি। কিন্তু চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইন থাকলেও কেন থামছে না অর্থ আদায়? রাজনৈতিক আশ্রয়, ভয়ের সংস্কৃতি, দুর্বল তদন্ত ও জবাবদিহির ঘাটতি দূর না হলে নতুন আইন কতটা কার্যকর হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। চাঁদাবাজির শিকার হয়েও থানায় যেতে চান না অনেক মানুষ। দোকান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি, ব্যবসা করতে না দেওয়ার ভয়, মারধর কিংবা পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তাদের নীরব থাকতে বাধ্য করে। অভিযোগ করলে বিপদ আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও কাজ করে। এই নীরবতার সুযোগেই চাঁদাবাজির একটি চক্র টিকে থাকে।এই বাস্তবতায় চাঁদাবাজি দমনে নতুন আইন করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) খুলনার বয়রায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পুলিশ লাইনসে কমিউনিটি পুলিশিংবিষয়ক সুধী সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘নতুন আইন পাস হলে ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ নিজে বাদী হয়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।’আইজিপির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রভাবশালী ব্যক্তি, সন্ত্রাসী কিংবা ক্ষমতাবানদের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে চান না, সাক্ষ্য দিতেও ভয় পান। এ বাধা দূর করতে ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ ও অপরাধের সূত্র ধরে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে আইনি কাঠামো তৈরির কথাও তিনি জানিয়েছেন।তবে নতুন আইন করার উদ্যোগ সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চাঁদাবাজি তো আগে থেকেই অপরাধ। তাহলে বিদ্যমান আইন দিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধা কোথায়? নতুন আইনে পুলিশের কী ক্ষমতা বাড়বে? আর সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা কী হবে?চাঁদাবাজি অপরাধ, আইনও আছেবাংলাদেশে চাঁদাবাজি নতুন কোনো অপরাধ নয়। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৮৩ থেকে ৩৮৯ ধারায় ভয় দেখিয়ে অর্থ বা সম্পদ আদায় এবং এ উদ্দেশ্যে কাউকে ভয়ভীতি দেখানোর বিভিন্ন অপরাধের বিধান রয়েছে। দণ্ডবিধির ৩৮৩ ধারায় চাঁদাবাজির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কারও ক্ষতি করার ভয় দেখিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে তাকে অর্থ, সম্পদ বা মূল্যবান জামানত দিতে বাধ্য করলে তা চাঁদাবাজির অপরাধ হতে পারে। ৩৮৪ ধারায় এ অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। অন্যদিকে, গুরুতর ক্ষতি বা মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের মতো অপরাধের জন্য পরবর্তী ধারাগুলোতে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এসব আইন সরকারের আইনভান্ডারে রয়েছে। অর্থাৎ চাঁদাবাজিকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নতুন আইন প্রয়োজন হচ্ছে না। আইজিপির ঘোষণায় যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো—ভুক্তভোগী সামনে না এলেও পুলিশ কীভাবে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে। এখানে একটি আইনি পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের কাছে অপরাধের তথ্য থাকা, মামলা নথিভুক্ত করা, তদন্ত শুরু করা, কাউকে গ্রেপ্তার করা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। প্রতিটি পর্যায়ের নিজস্ব আইনগত শর্ত রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে কোন পর্যায়ে কী পরিবর্তন আনা হবে, তা খসড়া প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।চাঁদাবাজি কেন থামছে নাচাঁদাবাজির বিস্তার বোঝার জন্য শুধু অপরাধীর সংখ্যা বা মামলা গণনা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, অর্থ আদায়ের নেটওয়ার্ক কীভাবে চলে এবং কেন তা ভাঙা কঠিন। রাজধানীতে চাঁদাবাজির ধরন নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে ফুটপাতের দোকান, বাজার, পরিবহন টার্মিনাল, নির্মাণকাজ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সেবাখাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে। কোথাও প্রতিদিন দোকানপ্রতি টাকা নেওয়া হয়, কোথাও মাসিক চাঁদা নির্ধারণ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে একাধিক গোষ্ঠী একই ব্যবসায়ী বা বাজার থেকে টাকা আদায় করে বলে অভিযোগ রয়েছে।২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকার বরাতে বলা হয়, রাজধানীতে চাঁদাবাজির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত হিসেবে ১২৮০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৪৮ জনকে সশস্ত্র অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এগুলো পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্দেহভাজনের সংখ্যা, আদালতে প্রমাণিত অপরাধীর সংখ্যা নয়।এ ধরনের তথ্য থেকে বোঝা যায়, চাঁদাবাজি সব সময় বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধীর কাজ নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর সঙ্গে ভয়ভীতি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ দখল, রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যবহার কিংবা সংগঠিত অপরাধের যোগসূত্র থাকতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে এসব সংযোগ আলাদাভাবে তদন্ত করে প্রমাণ করতে হবে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু কাউকে গ্রেপ্তার করা নয়; অর্থ আদায়ের পুরো ব্যবস্থাটি শনাক্ত করা। একজন টাকা সংগ্রহ করেন, আরেকজন তাকে নিয়ন্ত্রণ করেন, অন্য কেউ রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটান—এমন অভিযোগ থাকলে তদন্তে পুরো নেটওয়ার্কের ভূমিকা খুঁজে দেখা প্রয়োজন।ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না কেনচাঁদাবাজির অভিযোগ না করার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, নিরাপত্তার ভয়। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া, দোকানে হামলা, মারধর কিংবা পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। অভিযোগের পরও যদি ভুক্তভোগীকে একই এলাকায় থাকতে ও ব্যবসা চালাতে হয়, তাহলে তাঁর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।দ্বিতীয়ত, প্রতিশোধের আশঙ্কা। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হলে অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন থাকবে কি না, তদন্তের খবর অভিযুক্তের কাছে পৌঁছাবে কি না—এসব প্রশ্নও ভুক্তভোগীকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।তৃতীয়ত, আইনের প্রয়োগ নিয়ে অনাস্থা। অভিযোগ করার পরও যদি অপরাধীকে আটক করা না হয়, মামলা এগোয় না কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তি আবার ফিরে এসে অর্থ দাবি করেন, তাহলে অন্য ভুক্তভোগীরাও নীরব থাকার পথ বেছে নিতে পারেন।এই পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীর অভিযোগের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে পুলিশকে নিজস্ব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তের সুযোগ দেওয়া কার্যকর হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পুলিশকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।নতুন আইনে কী থাকা জরুরিআইজিপি যে উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন, তার বিস্তারিত খসড়া বা চূড়ান্ত আইন প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট বিধান সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে কার্যকর আইন তৈরির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।১. অভিযোগ ছাড়াই ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট শর্তপুলিশ কোন ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে মামলা বা তদন্ত শুরু করতে পারবে, তা আইনে পরিষ্কার থাকতে হবে। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিও, অডিও, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, ডিজিটাল যোগাযোগ কিংবা একাধিক স্বাধীন সূত্রের তথ্য কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তারও নিয়ম থাকা দরকার। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হলে নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হতে পারেন। তাই তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি ও তদন্তের নথি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।২. ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তাভুক্তভোগীকে অভিযোগ করতে বাধ্য করা যাবে না; আবার তিনি অভিযোগ না করলেও তার নিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করা যাবে না। পরিচয় গোপন রাখা, হুমকির অভিযোগ দ্রুত যাচাই, প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা সহায়তা এবং প্রতিশোধমূলক হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—এসবকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে পরিচয় গোপন রাখার প্রতিশ্রুতিও বাস্তবসম্মত হতে হবে। আদালতে সাক্ষ্য বা তদন্তের প্রয়োজনে পরিচয় প্রকাশের প্রয়োজন হলে কী সুরক্ষা দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা দরকার।৩. রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইন প্রয়োগচাঁদাবাজির সঙ্গে কেউ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করলে তার পরিচয় যেন তদন্তে বাধা না হয়। একইভাবে, কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রতিপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধীও ঘোষণা করা যাবে না। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মূল বিবেচনা হওয়া উচিত প্রমাণ, অপরাধে সংশ্লিষ্টতা ও আইনি দায়। প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং দুর্বল ব্যক্তিকে সহজে গ্রেপ্তার করা—দুই ধরনের বৈষম্যই আইনের প্রতি আস্থা নষ্ট করে।৪. পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাড়লে পুলিশের উদ্যোগে তদন্ত শুরু করার ক্ষেত্রও বাড়বে। এটি চাঁদাবাজি দমনে সহায়ক হতে পারে, তবে একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ব্যবসায়িক বিরোধ, জমিজমা নিয়ে বিরোধ বা ব্যক্তিগত শত্রুতাকে চাঁদাবাজির মামলা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনগত শর্ত মানতে হবে; অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।৫. অর্থের উৎস ও সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করাচাঁদা সংগ্রহকারীকে গ্রেপ্তার করলেই পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে যায় না। তদন্তে অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কার নির্দেশে সংগ্রহ হচ্ছে এবং অপরাধের সুবিধাভোগী কারা—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। ডিজিটাল লেনদেন, ফোনে যোগাযোগ, ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য আইনসম্মত তথ্য-প্রমাণ কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনগত সুরক্ষা বজায় রাখা জরুরি।তালিকা আছে, তবু ব্যবস্থা নিতে সমস্যা কোথায়চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য বিদ্যমান আইন প্রয়োগের বাস্তবতাও দেখা জরুরি। গত ২১ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় ৫৪৫ সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের একটি তালিকা তৈরি করে মহানগর পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধায় ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে বলা হয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছিল।এই তথ্যের তাৎপর্য হলো, সন্দেহভাজনের তালিকা তৈরি করা আর তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এক নয়। তদন্ত, গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র ও বিচার—প্রতিটি পর্যায়ে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক চাপ বা প্রতিশোধের ভয় যেন আইন প্রয়োগে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদি বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে পুলিশ প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারে, তাহলে নতুন আইন সেই সমস্যার কতটা সমাধান করবে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। নতুন আইন কার্যকর হতে হলে শুধু ক্ষমতা বাড়ানো নয়, সেই ক্ষমতা প্রয়োগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।কমিউনিটি পুলিশিং নতুন ঝুঁকি?আইজিপি জানিয়েছেন, কমিউনিটি পুলিশিংকে পুলিশের একটি শাখা হিসেবে কাজ করানোর জন্যও আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করেছেন, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ক্ষমতা ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল ধারণা হলো, পুলিশ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো। স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, অপরাধ প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীকে সহায়তা এবং পুলিশের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।কিন্তু কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও সীমা স্পষ্ট না থাকলে নতুন ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি এই ব্যবস্থাকে নিজেদের বিরোধীদের চাপে রাখা কিংবা অর্থ আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে যে সমস্যা সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিই আরও জটিল হতে পারে।তাই কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সদস্যদের নিয়োগ বা অন্তর্ভুক্তির মানদণ্ড, দায়িত্ব, আচরণবিধি, অভিযোগ গ্রহণের পদ্ধতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—সবকিছু স্বচ্ছ হওয়া দরকার। তাঁদের কোনো আইনগত ক্ষমতা দেওয়া হলে তার সুনির্দিষ্ট সীমা ও তদারকিও থাকতে হবে।চাঁদাবাজি বন্ধের আসল পরীক্ষাআইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগের মধ্যে আইজিপি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বলপ্রয়োগ করলে পুলিশকে ফ্যাসিবাদী বলা হয়, আর বলপ্রয়োগ না করলে মানুষ পুলিশকে দুর্বল মনে করে। তার বক্তব্যে গত ১৭ বছরে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কথাও উঠে এসেছে।এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপট যাই হোক, চাঁদাবাজি দমনের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ: পুলিশের কার্যকারিতা শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো, তা দিয়ে মাপা যায় না। কতজন ভুক্তভোগী নিরাপদে অভিযোগ করতে পারছেন, কতটি মামলায় নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে, কতজন অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রমাণসহ অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে এবং বিচার শেষে অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছেন কি না—এসবও দেখতে হবে। চাঁদাবাজি কমেছে কি না, তা বোঝার জন্য নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করা প্রয়োজন। কতটি অভিযোগ এসেছে, কতটি মামলা হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, কতটি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং কতটি মামলায় বিচার হয়েছে—এসব তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করলে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা সহজ হবে। অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে গেলেই যে অপরাধ বেড়েছে, তা-ও নয়; ভুক্তভোগীরা নিরাপদ বোধ করে বেশি অভিযোগ করলেও সংখ্যা বাড়তে পারে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চাঁদাবাজি বন্ধের নামে নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন। আইনের শাসন মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়; একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোও।নতুন আইন যদি ভুক্তভোগীর নীরবতার বাধা দূর করে, পুলিশের তদন্তকে তথ্য-প্রমাণনির্ভর করে এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে, তাহলে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ যদি নির্বাচিতভাবে হয়, প্রভাবশালীরা সুরক্ষা পান কিংবা পুলিশি ক্ষমতার জবাবদিহি না থাকে, তাহলে নতুন আইনও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারবে না।শেষ পর্যন্ত চাঁদাবাজি বন্ধের পরীক্ষা নতুন আইন পাসের দিন নয়; পরীক্ষা হবে সেই দিন, যেদিন একজন সাধারণ দোকানি, পরিবহনশ্রমিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও নিরাপদে নিজের কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন।

ইতিহাস আর ইতিহাসের ডাস্টবিন!

ষাটের দশকের প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের নেত্রী, ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদের ১৯৬১-৬২ শিক্ষাবর্ষের ভিপি, ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষের ডাকসুর জিএস এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মতিয়া চৌধুরীর মৃত্যুর পর দুটি বছর পার হয়ে গেল। নীরবে-নিভৃতে তার মৃত্যুদিন পার হলেও বারবার মনে পড়ছিল, এই বিশাল বাংলাদেশে ইউনূস আমলে মতিয়া চৌধুরীর মতো রাজনীতিবিদের নিজের জন্য আলাদা করে কবরের জায়গা হলো না, পেলেন না মুক্তিযোদ্ধার অন্তিম সম্মান। তার মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবন বা শহীদ মিনারের পাদদেশে নিতে দেওয়া হয়নি। এ দুঃখবোধ অনেককেই পীড়িত করে। হতে পারে, তিনি আওয়ামী লীগের নেত্রী ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তো শুধুমাত্র দুর্নীতিগ্রস্তদের দল নয়। মতিয়া চৌধুরীর মতো ব্যক্তি জীবনে সৎ বহু মানুষও এই দল করেন, এখনো দলকে ভালোবাসেন। আমাদের পছন্দ-অপছন্দ যা-ই থাকুক, এই দল তো বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। আর ইউনূসের অন্তর্বর্তী দেড় বছর এবং তৎপরবর্তী আট মাসের শাসন দেখে তো স্পষ্ট যে কর্তৃত্ববাদী মনোভাবে, দলবাজি আর দখলদারত্বে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বজায় রাখতে, অর্থনীতিতে লুটেরা ধারা অব্যাহত রাখতে—কেহ কারে নাহি পারে সমানে সমান।ষাটের দশকে মতিয়া চৌধুরীর অগ্নিঝরা বক্তৃতা সামরিক শাসক আইয়ুব খানের গদিতে কাঁপন ধরাত। ‘৬৭ সালে আপত্তিকর বক্তৃতা করার অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করার পর থেকে শেখ মুজিবের মুক্তি চাই স্লোগানের সঙ্গে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর মুক্তি চাই স্লোগানও ছাত্র আন্দোলন ও গণ-আন্দোলনের অন্যতম স্লোগান ছিল। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তার যে উদ্দীপ্ত ভাষণ, সেই উদ্দীপ্ত ভাষণ তাকে অগ্নিকন্যার রূপ দিয়েছিল। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে আশির দশকের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনসহ ইতিহাসের কিছু গৌরবান্বিত অধ্যায়ে তার নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে। আইয়ুব খানের আমলে তিনি চারবার কারাবরণ করেন। স্বাধীন দেশেও বিভিন্ন সামরিক সরকারের সময়ে তাকে একাধিকবার কারান্তরালে থাকতে হয়েছে।মতিয়া চৌধুরীকে প্রথম দেখেছি দূর থেকে ১৯৭০ সালে খুলনায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির এক জনসভায়। আর খুব কাছ থেকেও দেখি ১৯৭২ সালে গোপালগঞ্জের থানাপাড়ায় আমার মামাবাড়িতে। ন্যাপের জনসভা শেষে বিশ্রাম নিতে এসেছিলেন। মতিয়া চৌধুরীকে কাছ থেকে দেখার জন্য বাসা ও বাসার সামনের মাঠ লোকে লোকারণ্য। তাই কথা বলার মতো সুযোগ পাইনি।কথা বলার এবং তার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার সুযোগ হয় ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়ে। তখন জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী এবং সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি পদে আসীন জেনারেল জিয়ার বিরুদ্ধে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ঐক্য জোট’ মুক্তিযুদ্ধকালের মুক্তিবাহিনীপ্রধান মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীকে প্রার্থী করে। গণতান্ত্রিক ঐক্য জোটের কার্যালয় ছিল বঙ্গভবনের পেছনের দিকটায় ওয়ারীতে ঢোকার মুখের রাস্তায়। মতিয়া আপার বাসা সেখান থেকে খুব একটা দূরে নয়। পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডের নাসিরুদ্দিন লেনের একটি ভাড়া বাসায় তিনি দীর্ঘকাল বসবাস করতেন। মতিয়া আপা অধিকাংশ দিনই নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ঢাকার বাইরে থাকতেন। যেদিন ঢাকায় থাকতেন এবং সন্ধ্যায় ঐক্যজোট অফিসে আসতেন, তখন প্রায়ই আমার ডাক পড়ত মতিয়া আপাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এই পৌঁছে দেওয়ার পথে তার সঙ্গে পরিচয়টা গড়ে ওঠে।এরপর ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলের ছাত্র ইউনিয়ন সম্মেলনে মতিয়া আপাকে অতিথি করায় তাকে বাসা বা ন্যাপ অফিস থেকে নিয়ে আসতাম এবং পরে বাসায় পৌঁছে দিতাম। তখন রাজনীতি নিয়ে অনেক আলাপ হতো। আমার মতামত ওনার পছন্দ হতো না। ধমক দিতেন। ডাকসু নির্বাচনও তখন খুবই সন্নিকটে। ছাত্র ইউনিয়ন এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে শুনে তিনি আমাকে বকাঝকা শুরু করলেন—যেন আমিই নীতিনির্ধারক! যাহোক, আমার কাছ থেকে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনী কৌশল জানার পর কয়েক দিন আমার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেল। মতিয়া আপা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কয়েকটি হলের সম্মেলনে অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন।এর অল্প কিছুদিন পরেই তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। যোগদানের দু-এক দিন আগে সিপিবি অফিসে ফরহাদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। বের হওয়ার সময় দেখলাম, চোখ ছলছল। অন্য কারও সঙ্গে কথা বললেন না। ধীর পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। এরপর আর মতিয়া আপার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। এমনকি মগবাজার রমনা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে তার প্রতিবেশী হওয়ার পরও নয়। মন্ত্রীদের বাসায় যেতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম না। তবে মাঝেমধ্যেই বাসা থেকে সচিবালয় অভিমুখে তার গাড়ি যাওয়ার সময় দেখতাম, গাড়ির ভেতরে বসে আছেন। কোনো রকম পুলিশি প্রহরা ছাড়াই তিনি চলাচল করতেন।আওয়ামী লীগ আমলে মন্ত্রী হিসেবে এবং মন্ত্রণালয় পরিচালনায় তিনি যে সৎ, দক্ষ এবং সফল ছিলেন, তা তার রাজনৈতিক বিরোধীরাও বলে থাকেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে যে দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বে ছিলেন, সেই দল দেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে কারচুপি-কারসাজির ভোট অনুষ্ঠিত করে ক্ষমতা আঁকড়ে ছিল। মতিয়া চৌধুরীকে সেই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পক্ষে নিঃশর্ত ওকালতি করতে দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি, ব্যথিত হয়েছি। এটা তার জীবন ও সংগ্রামের সঙ্গে যায় না। তবে কোনো সুবিধাপ্রাপ্তির আশায় তিনি বাম আদর্শ ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেননি। এটা একান্তই তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। আমি পাঁচ বছর মগবাজার রমনা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে তার প্রতিবেশী ছিলাম। তিনি তখন মন্ত্রী। আমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কেরানি হয়েও থাকতাম ১,৬০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে। আর মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী থাকতেন ৮০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত নির্লোভ, সাদামাটা ও সততার প্রতীক হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন।মতিয়া চৌধুরীর মতো রাজনীতিবিদকে সম্মান না জানিয়ে সেদিন ইউনূস তার ছোট মনের পরিচয়কেই সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন। জীবন অবসানের পর পত্রপত্রিকায় মতিয়া চৌধুরীর সংগ্রামী ও নির্লোভ জীবন নিয়ে সংবাদ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হলে ইউনূস ডাস্টবিন শফিক হিসেবে খ্যাত তার প্রেস সচিবকে দিয়ে পত্রিকাগুলোকে ধমক দিয়ে ও উপহাস করে স্ট্যাটাস দেওয়ান যে, ‘মতিয়া চৌধুরীকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ ও নিবন্ধ দেখে মনে হচ্ছে একজন মুরিদ তার পীর সম্বন্ধে লিখছেন’।অবশ্য শুধুমাত্র মতিয়া চৌধুরী ইস্যু নয়, ক্ষমতাসীন হয়ে ইউনূস অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছোট মনের পরিচয় দিয়ে তার কিশোর বাহিনীর মাধ্যমে রাজনীতির ময়দানে ক্রোধ ও প্রতিহিংসা উসকে দিয়েছিলেন। ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভাঙাসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক ধ্বংস, সবকিছুই হয়েছে তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে ও সমর্থনে। তিনি বিদেশি সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকারে বললেন, তার সরকার রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের নীতিতে বিশ্বাসী নয়, কিন্তু নিষিদ্ধ আয়োজন সম্পন্ন করতে নিজ সরকারি বাসভবনের সামনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে তার কিশোর-তরুণ বাহিনী ও উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নামিয়ে দিলেন। তার সঙ্গে যার যত মতান্তর থাকুক না কেন, তিনি নোবেল বিজয়ী হয়ে নিজেকে একটা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। দেড় বছরের অন্তর্বর্তী শাসনকালে নিজেই তা আবার ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে গেলেন। তিনি ইতিহাসের রিসেট বাটনে চাপ দিয়ে এমন কিশোর-তরুণ বাহিনী সৃষ্টি করে গেছেন, যারা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ছবি কালি দিয়ে লেপ্টে দিচ্ছে। তারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে, তাদের ভীতসন্ত্রস্ত করে দুর্গাপূজা উৎসবের এই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে ‘গরু জবাই ও গরু ভোজের’ মহোৎসব করছে। ইউনূসীয় দীক্ষায় এ কোন তরুণদের আবির্ভাব হলো! এরা ঠিক যেন পশ্চিমবঙ্গের নবহিন্দুত্ববাদী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ইসলামী সংস্করণ। দেশকে ধর্মীয় বিভাজনের পথে নিয়ে যাওয়ার এ দায় প্রধানত ইউনূসের ওপরই বর্তায়। আর ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সব পথ বন্ধ করে দেওয়ায় সমাজে যে ধর্মীয় উগ্রপন্থার উত্থান হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করায় বিক্ষুব্ধ তারুণ্যের যে বিকৃত উত্থান হয়েছে—শেখ হাসিনা ও তার দলও কি এ দায় এড়াতে পারবেন?অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী এ দেশের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র আন্দোলনের সৃষ্টি। ইতিহাস মতিয়া চৌধুরীকে সমালোচনাসহ তার প্রাপ্য সম্মান দেবে। কিন্তু রিসেট ‘বাটন টেপনেওয়ালাদের’ জন্য হয়তো শেষ পর্যন্ত শফিকুল ইসলাম সাহেবই ইতিহাসের ডাস্টবিন প্রস্তুত করে যাবেন।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

ইলিশ সংরক্ষণে জেলেদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত হোক

ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের বিপুলসংখ্যক মৎস্যজীবীর জীবিকা, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা এবং জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহ নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই ইলিশের প্রজনন, বংশবৃদ্ধি ও উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে প্রশ্ন হলো, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রচলিত পদ্ধতি কতটা কার্যকর এবং এর সুফল কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে?ইলিশ সংরক্ষণে শুধু নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা, নদীতে অভিযান পরিচালনা, জাল জব্দ বা ধ্বংস করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে অংশগ্রহণমূলক, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। অর্থাৎ জেলেদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, ইলিশ সংরক্ষণের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।ব্যয় ও কার্যকারিতার মূল্যায়ন জরুরিইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী ও পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও বাহিনীকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। নদীতে অভিযান, নৌযান ব্যবহার, জনবল নিয়োগ, জাল জব্দ ও পাহারার মতো কার্যক্রমে অর্থ ও শ্রম ব্যয় হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগের বিপরীতে নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হচ্ছে, কতজন জেলে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকছেন এবং ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদনে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, তা নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।নদীতে অভিযান পরিচালনা করলেই নিষেধাজ্ঞা শতভাগ কার্যকর হয় না। একইভাবে, বিপুলসংখ্যক জাল জব্দ করাও সংরক্ষণ কার্যক্রমের সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে অবৈধ মাছ ধরা কমানো, ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি সুরক্ষিত রাখা, জেলেদের আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা উন্নত করার ওপর। তাই সরকারি অর্থ ও জনবল ব্যবহারের কার্যকারিতা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।জেলেদের সম্পৃক্ততা কেন প্রয়োজনইলিশ সংরক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন মৎস্যজীবীরা। নদীর গতিপ্রকৃতি, মাছের বিচরণক্ষেত্র ও স্থানীয় পরিবেশ সম্পর্কে তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে তাদের প্রধানত নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। নদী ও খালের বিস্তীর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক সরকারি নজরদারি ব্যয়সাপেক্ষ। স্থানীয় জেলেদের অংশগ্রহণ এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরতে না পারলে জেলেদের পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে সংকট দেখা দিতে পারে। বিকল্প জীবিকা ও পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষার অভাবে কেউ কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে বাধ্য হতে পারেন। তাই জেলেদের জীবিকা ও ইলিশ সংরক্ষণকে পরস্পরবিরোধী না ভেবে একই ব্যবস্থাপনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখতে হবে। ইলিশ সংরক্ষণে কয়েকটি প্রস্তাব:সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনস্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এতে মৎস্যজীবীদের প্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, মৎস্য অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। কমিটির দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি ও জবাবদিহি সুস্পষ্ট হতে হবে। প্রকৃত জেলেদের অংশগ্রহণ এবং তাদের পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে। এতে স্থানীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে।বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণইলিশের প্রজননচক্র, মৎস্য গবেষণা ও নদীর পরিবেশগত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করতে হবে। স্থানীয় কমিটি জেলে ও জনগোষ্ঠীর মতামত নিয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারে। তবে আইনগতভাবে নির্ধারিত নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবর্তনের ক্ষমতা যথাযথ কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সরকার, জেলে প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব স্পষ্ট করা প্রয়োজন।জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জাম নিরাপদে সংরক্ষণনিষেধাজ্ঞার সময় প্রকৃত জেলেদের মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম স্থানীয় কমিটির তত্ত্বাবধানে নিরাপদে সংরক্ষণের ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। এ জন্য জালের মালিকের পরিচয়, নিবন্ধন নম্বর, ধরন ও সংখ্যা উল্লেখ করে তালিকা তৈরি করতে হবে। জাল জমা ও ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে লিখিত রসিদ এবং স্বচ্ছ হিসাব রাখতে হবে। এ ব্যবস্থা চালুর আগে জেলেদের মতামত, নিরাপত্তা ও ব্যয় যাচাই করা জরুরি। কোনোভাবেই জেলেদের বৈধ সম্পত্তির অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না।নৌকা ও ঘাট ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় নজরদারিনিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরার নৌকাগুলো উপযুক্ত ও নিরাপদ ঘাটে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে নৌযান চলাচল, জোয়ার-ভাটা, বন্যা ও জরুরি চলাচলের বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক ঘাট নির্ধারণ করা যেতে পারে। নৌকার তালিকা তৈরি, ঘাটের নিরাপত্তা ও নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে বণ্টন করা সম্ভব। তবে এ ব্যবস্থা যেন নৌপথের স্বাভাবিক চলাচল ও নিরাপত্তায় বিঘ্ন না ঘটায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।প্রকৃত জেলে শনাক্তকরণ ও সামাজিক সুরক্ষানিবন্ধিত জেলেদের তালিকা নিয়মিত যাচাই করে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের শনাক্ত করতে হবে। মৎস্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, উপজেলা প্রশাসন ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এ কাজ করা যেতে পারে। তালিকা তৈরিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রকৃত জেলেরা বাদ না পড়েন এবং অযোগ্য কেউ সুবিধা নিতে না পারেন। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা, চিকিৎসা ও শিশুদের শিক্ষার বিষয় বিবেচনায় পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি সহায়তা যথাসময়ে ও সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছালে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার সক্ষমতা বাড়বে।বিকল্প আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিনিষেধাজ্ঞার সময় আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প আয় ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। জেলেদের আগ্রহ, দক্ষতা ও স্থানীয় বাজারের চাহিদা বিবেচনায় হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, সবজি চাষ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, জাল মেরামত এবং নৌযান মেরামতের মতো কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। প্রশিক্ষণের সঙ্গে আয়মূলক কাজ, প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা ও বাজারসংযোগের সুযোগও তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী ভাতা ও খাদ্যসহায়তা সময়মতো বিতরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে নিষেধাজ্ঞার সময়েও জেলেরা পরিবারের ব্যয় নির্বাহের সুযোগ পাবেন।সামাজিক প্রতিরোধ ও আইন প্রয়োগে সহযোগিতানিষেধাজ্ঞাকালে অবৈধ মাছ ধরা প্রতিরোধে স্থানীয় কমিটি সচেতনতা সৃষ্টি, তথ্য আদান-প্রদান ও সামাজিক উদ্যোগ নিতে পারে। নদীতে সন্দেহজনক কার্যক্রমের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করা হবে কমিটির অন্যতম দায়িত্ব। তবে প্রচলিত আইনে ক্ষমতা অর্পিত না থাকলে কমিটি কাউকে আটক, শাস্তি প্রদান কিংবা জাল ও নৌকা বাজেয়াপ্ত করতে পারবে না। আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যথাযথ কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নজরদারি ও সরকারি বাহিনীর পেশাগত সক্ষমতার সমন্বয় হলে অবৈধ মাছ ধরা প্রতিরোধ আরও কার্যকর হতে পারে।পরীক্ষামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে কার্যকারিতা যাচাইসহ-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে সব দায়িত্ব শুধু সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। তবে এ ব্যবস্থার জন্যও প্রশিক্ষণ, সমন্বয়, সরঞ্জাম সংরক্ষণ ও সামাজিক সুরক্ষায় অর্থের প্রয়োজন হবে। তাই একে ব্যয়হীন ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা না করে বিদ্যমান পদ্ধতির সঙ্গে এর ব্যয় ও কার্যকারিতার তুলনা করতে হবে।এ জন্য কয়েকটি উপযুক্ত নদী বা এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে সহ-ব্যবস্থাপনা চালু করা যেতে পারে। নিষেধাজ্ঞা পালনের হার, অবৈধ মাছ ধরার ঘটনা, ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য, জেলেদের আয় এবং সরকারি ব্যয়ের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সন্তুষ্টিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। স্বাধীন মূল্যায়নে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য এলাকায় এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।ইলিশ রক্ষায় চাই রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগইলিশ সংরক্ষণ শুধু মৎস্য অধিদপ্তর বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একক দায়িত্ব নয়। এটি রাষ্ট্র, মৎস্যজীবী, স্থানীয় সরকার, গবেষক, নাগরিক সমাজ ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত দায়িত্ব। শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই এ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার উপযোগী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে।একজন জেলে নদীতে মাছ ধরে নিজের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি দেশের খাদ্য সরবরাহ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। তাই তার জীবিকা সুরক্ষিত রেখে ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। জেলেরা যদি নিষেধাজ্ঞাকে কেবল জীবিকার ওপর বাধা হিসেবে না দেখে ইলিশের ভবিষ্যৎ রক্ষার যৌথ উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে সংরক্ষণ কার্যক্রমের স্থায়িত্ব বাড়বে।অতএব, প্রচলিত ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে জেলেকেন্দ্রিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক সহ-ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নিষেধাজ্ঞা ও আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জেলেদের অংশীদারত্ব, বিকল্প জীবিকা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জবাবদিহিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ সমন্বিত উদ্যোগই ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন সুরক্ষা এবং মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় টেকসই ভূমিকা রাখতে পারে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক প্রকল্প সমন্বয়কারী, ইকোফিশ বাংলাদেশ]

চলনবিলের অস্তিত্বের সংকট: প্রকৃতি বাঁচলেই বাঁচবে জীবিকা

একটি জলাভূমি হারিয়ে গেলে শুধু পানির পরিমাণ কমে যায় না; হারিয়ে যায় মাছের আবাস, কৃষির সম্ভাবনা, মানুষের জীবিকা এবং একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিচয়। চলনবিল আজ সেই বাস্তবতার মুখোমুখি। দখল, দূষণ, পানিপ্রবাহের সংকট ও নির্বিচার সম্পদ আহরণে বিপর্যস্ত এ জলাভূমির ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু পরিবেশের প্রশ্ন নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন।একসময় বর্ষায় দিগন্তজোড়া জলরাশি, দেশি মাছের প্রাচুর্য আর প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ছিল চলনবিল। বিস্তীর্ণ জলাভূমিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল কৃষি, মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদনের অর্থনীতি। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশিতে নৌকা চলত, আর শুষ্ক মৌসুমে বিলের পানি ও পলিকে কাজে লাগিয়ে চলত কৃষিকাজ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই পরিচিত দৃশ্যপট। নদী-খাল ভরাট, জলাভূমি দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো, পানির স্বল্পতা ও অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ চলনবিলের স্বাভাবিক পরিবেশকে চাপে ফেলেছে। এর মূল্য দিচ্ছে প্রকৃতি ও মানুষ—উভয়ই।আয়তনের হিসাব নয়, গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির ভবিষ্যৎচলনবিল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি। সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীবনযাত্রার সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বর্ষায় বিলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে যায়; শুষ্ক মৌসুমে অনেক স্থান কৃষিজমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই মৌসুমি পরিবর্তনই চলনবিলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও নথিতে চলনবিলের আয়তন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে এর আয়তন ৫৫০ বর্গমাইল বা প্রায় ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার উল্লেখ করা হয়েছিল। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘বাংলার ভ্রমণ’ গ্রন্থে আয়তন বলা হয় ৪৪১ বর্গমাইল বা প্রায় ১ হাজার ১৪২ বর্গকিলোমিটার। পরবর্তী বিভিন্ন প্রতিবেদনেও আয়তন কমে আসার কথা উঠে এসেছে। তবে বিভিন্ন সময়ের পরিমাপপদ্ধতি এক না হওয়ায় এসব সংখ্যা সরাসরি তুলনা করে আয়তন হ্রাসের নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করা যায় না। এ জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত জরিপ।আয়তনের হিসাব নিয়ে মতভেদ থাকলেও জলাভূমির ওপর চাপ অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কোথাও পলি জমে নদী-খালের গভীরতা কমেছে, কোথাও দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে পানিপ্রবাহ। কচুরিপানার বিস্তার এবং প্লাস্টিক, পলিথিনসহ নানা বর্জ্য পানিদূষণ বাড়াচ্ছে। কৃষিজমি সম্প্রসারণ ও অপরিকল্পিত সড়ক-অবকাঠামোও জলপ্রবাহে প্রভাব ফেলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।জলাভূমি সংকুচিত হওয়ার অর্থ শুধু পানির বিস্তার কমে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাছের বিচরণক্ষেত্র ও প্রজনন, জলজ উদ্ভিদ, পাখি এবং মানুষের জীবিকা। পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বাড়ে। একই সঙ্গে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হতে পারে। তাই চলনবিলকে শুধু মৌসুমি জলরাশি হিসেবে দেখলে চলবে না। এর নদী, খাল, জলাশয় ও সংযোগপথকে একই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।মাছ কমলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতিচলনবিলের সংকটের বড় দিক হলো মৎস্যসম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোথাও কোথাও নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে। প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ও পোনা আহরণের অভিযোগও রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা জলজ প্রাণীর আবাস সংকুচিত করতে পারে। নদী-খালের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, পানির গভীরতা কমে যাওয়া এবং দূষণও মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণে বাধা সৃষ্টি করে।মাছের উৎপাদন কমে গেলে ক্ষতি শুধু জেলেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মাছ ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, শুঁটকি উৎপাদক এবং মৌসুমি শ্রমিকেরাও এর প্রভাবের মুখে পড়েন। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল বহু মানুষের আয় কমে গেলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।এ কারণে মাছ রক্ষায় শুধু অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়। প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ, নদী-খালের পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং মৎস্যসম্পদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাছ আহরণে বিধিনিষেধের সময় জেলেদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে। মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা না করে কেবল নিষেধাজ্ঞা দিলে তা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর করা কঠিন হতে পারে।শামুক-ঝিনুক আহরণে জীবিকা ও পরিবেশের ভারসাম্যচলনবিলে শামুক-ঝিনুক আহরণ দরিদ্র মানুষের মৌসুমি আয়ের অন্যতম উৎস। সংগৃহীত শামুক-ঝিনুকের মাংস মাছের খাদ্য হিসেবে বিভিন্ন এলাকার ঘেরে সরবরাহ করা হয়। খোলস থেকে তৈরি হয় খাওয়ার চুন। এভাবে আহরণ, পরিবহন ও বেচাকেনাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতির একটি ক্ষুদ্র জীবিকাচক্র।স্থানীয়দের দাবি, তাড়াশের ২০ থেকে ২৫টি জলাভূমিতে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক নৌকায় শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়। স্থান ও সময়ভেদে প্রতি বস্তা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়; পাইকারি পর্যায়ে দাম ওঠে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। স্থানীয় সংগ্রহকারীদের হিসাবে, এ কাজে একজন মানুষ দিনে কয়েক শ টাকা আয় করতে পারেন। ফলে অনেক দরিদ্র পরিবারের কাছে শামুক-ঝিনুক আহরণ শুধু মৌসুমি পেশা নয়, সংসার চালানোরও একটি অবলম্বন।কিন্তু এই জীবিকার আড়ালে রয়েছে পরিবেশগত উদ্বেগ। শামুক-ঝিনুক জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ। নির্বিচারে আহরণে এদের প্রাকৃতিক মজুত কমে গেলে জলজ প্রাণীর খাদ্যপ্রাপ্তি ও পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আহরণের প্রকৃত মাত্রা এবং জলজ পরিবেশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া সমস্যার ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা কঠিন।তাই শামুক-ঝিনুক আহরণ পুরোপুরি বন্ধ করে দরিদ্র মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত করা যেমন সমাধান নয়, তেমনি পরিবেশগত প্রভাব উপেক্ষা করে নির্বিচারে আহরণের সুযোগ দেওয়াও যুক্তিসংগত নয়। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক জরিপের ভিত্তিতে আহরণের সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ, নিয়মিত নজরদারি এবং জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন। পাশাপাশি এ পেশার ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রকৃতি রক্ষা ও মানুষের জীবিকা—দুটিকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে টেকসই সমাধান।শুঁটকি শিল্পে উৎপাদন কমছে, চাপে হাজারো মানুষের জীবিকাচলনবিলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছে শুঁটকি উৎপাদন ও বাণিজ্য। বিলের মাছ শুকিয়ে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করার এ শিল্পে মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু কাঁচা মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্পটি এখন সংকটে।মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উল্লাপাড়া ও তাড়াশের ৬০টি শুঁটকি বাজারে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ৩০২ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১৮৫ দশমিক ১৭ মেট্রিক টনে। এক বছরে উৎপাদন কমেছে ১১৬ দশমিক ৮৩ মেট্রিক টন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ কম।তাড়াশের মহিষলুটিতে একসময় প্রায় ২৫টি শুঁটকি চাতাল চালু ছিল। এখন সেগুলোর প্রায় অর্ধেক বন্ধ হয়ে গেছে; সচল রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এ শিল্পে প্রায় ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই হাজারের বেশি পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ মৌসুমি আয়ের ওপর নির্ভরশীল। একজন শ্রমিকের দৈনিক আয় প্রায় ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা।চলনবিলের শুঁটকি দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এর বাজার রয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও দুবাইয়ের বাজারেও এ পণ্য যায়।মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর অঞ্চলে ২৭৫টি শুঁটকি চাতাল রয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪৫০ মেট্রিক টন এবং সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এ পরিমাণ শুঁটকি উৎপাদনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন কাঁচা মাছ প্রয়োজন।উৎপাদন কমে যাওয়ার এই চিত্র দেখিয়ে দেয়, প্রাকৃতিক সম্পদের সংকট কীভাবে একটি শিল্পকে দুর্বল করে দিতে পারে। কাঁচা মাছের জোগান কমলে চাতাল বন্ধ হয়, শ্রমিক কাজ হারান, ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন এবং পরিবারগুলোর আয় কমে যায়। ফলে শুঁটকি শিল্পকে বাঁচাতে শুধু উৎপাদনস্থলের উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; যে জলাভূমি থেকে মাছ আসে, সেটিকেও রক্ষা করতে হবে।শুঁটকি শিল্পের আধুনিকায়ন, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মাছ শুকানোর ব্যবস্থা, সংরক্ষণাগার, বাজারজাতকরণে সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া প্রয়োজন। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি মাছের প্রাকৃতিক উৎস রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে শিল্পটির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব হবে না।পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে প্রকৃতি রক্ষা করেবর্ষায় চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি, নৌভ্রমণ ও গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। পরিকল্পিত প্রচার ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা গেলে চলনবিলকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।সরকারি উদ্যোগে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। নিরাপদ নৌভ্রমণ, পরিচ্ছন্ন ঘাট, বিশ্রামাগার, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পণ্য বিক্রির বাজার গড়ে উঠলে নৌকার মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৎস্যজীবী ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কর্মসংস্থান বাড়তে পারে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব আয়ও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।তবে পর্যটনের নামে জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ কিংবা বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণের সুযোগ দেওয়া যাবে না। পর্যটনকেন্দ্র গড়তে হবে জলপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে। নৌযানের নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে পর্যটন গড়ার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সেই পর্যটনের আকর্ষণকেই নষ্ট করবে।চলনবিল রক্ষায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজনচলনবিলের সংকট বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। জলাভূমি ভরাট ও পানিপ্রবাহে বাধা মাছের আবাস ও প্রজননকে প্রভাবিত করে। মাছের উৎপাদন কমলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুঁটকি শিল্প ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিকেরা। অন্যদিকে, শামুক-ঝিনুকের নির্বিচার আহরণ জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এসব সমস্যা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিরাজগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক দীপক কুমার করের মতে, চলনবিলের মাছের মজুত, উৎপাদন, শুঁটকি শিল্প ও কর্মসংস্থানের প্রকৃত অবস্থা জানতে সমন্বিত জরিপ প্রয়োজন। মা মাছ ও পোনা রক্ষা, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ, নদী-খালের পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং দখল উচ্ছেদে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি শুঁটকি শিল্পের উন্নয়ন, সহজ শর্তে ঋণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও জরুরি।চলনবিল রক্ষায় প্রথমেই প্রয়োজন জলাভূমির সীমানা ও বর্তমান অবস্থা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য জরিপ। এরপর দখল ও দূষণ বন্ধ, নদী-খাল পুনরুদ্ধার, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; নিয়মিত তদারকি ও ফলাফল মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।একই সঙ্গে জলজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখতে হবে। জেলে, শামুক-ঝিনুক সংগ্রহকারী ও শুঁটকি শ্রমিকদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি না করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কার্যক্রম সফল করা কঠিন। স্থানীয় মানুষকে সমস্যার অংশ হিসেবে নয়, সমাধানের অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে হবে।চলনবিলকে ঘিরে কৃষি, মৎস্য, শুঁটকি শিল্প ও পর্যটনের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হলে আগে এর প্রাকৃতিক ভিত্তি রক্ষা করতে হবে। উন্নয়ন মানে জলাভূমি ভরাট কিংবা নির্বিচারে সম্পদ আহরণ নয়; উন্নয়ন হলো প্রকৃতিকে টিকিয়ে রেখে মানুষের জীবনমান উন্নত করা।চলনবিলের সংকট তাই এখনই গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। দখল-দূষণ বন্ধ, নদী-খালের প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, মা মাছ ও পোনা রক্ষা, শামুক-ঝিনুক আহরণ নিয়ন্ত্রণ এবং শুঁটকি শিল্পের আধুনিকায়নে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে। চলনবিল বাঁচানো মানে শুধু একটি জলাভূমি রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতি, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ।[লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)]

দুর্যোগসহনশীল কৃষিতে চাই বিজ্ঞানভিত্তিক ফসল পরিকল্পনা

শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধি, স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন জাতের সম্প্রসারণ এবং অঞ্চলভিত্তিক ফসল বিন্যাস পুনর্গঠনের মাধ্যমে কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল ও দুর্যোগসহনশীল করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষিতে এখন শুধু বেশি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ যথেষ্ট নয়। কখন, কোথায়, কোন ফসল এবং কোন জাত চাষ করলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমিয়ে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন নিশ্চিত করা যাবে, সেই সিদ্ধান্তই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বন্যা, আকস্মিক বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগ কৃষির প্রচলিত উৎপাদন ক্যালেন্ডারকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে। কখনো অনিয়মিত বৃষ্টিতে বীজতলা তৈরি ও ধান রোপণ ব্যাহত হচ্ছে, কখনো আগাম বন্যায় পাকা ধান তলিয়ে যাচ্ছে। আবার অতিবৃষ্টির কারণে একটি ফসল কাটার পর সময়মতো পরবর্তী ফসল আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কৃষির ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় উৎপাদন বাড়ানোর প্রচলিত ধারণার পাশাপাশি সময়ের সঠিক ব্যবহার, ফসলের জীবনকাল হ্রাস এবং দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।বাংলাদেশের সীমিত আবাদযোগ্য জমিতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণে শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধি দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। কিন্তু বছরে জমিতে কতটি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে, শুধু সেই হিসাব দিয়ে কৃষির সাফল্য বিচার করা যায় না। ফসলের সংখ্যা বাড়াতে গিয়ে মাটির উর্বরতা কমে গেলে, সেচের পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে কিংবা একটি ফসলের সঙ্গে অন্য ফসলের সময়গত সংঘাত তৈরি হলে সেই নিবিড়তা দীর্ঘ মেয়াদে সুফল বয়ে আনবে না। তাই প্রয়োজন পরিকল্পিত শস্যনিবিড়তা, যেখানে জমির উৎপাদনক্ষমতা, মাটির স্বাস্থ্য, পানির প্রাপ্যতা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজারের চাহিদা এবং দুর্যোগের সম্ভাব্য সময় একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ফসল ও জাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো অঞ্চলে দীর্ঘ জীবনকালসম্পন্ন ফসলের পরিবর্তে উপযোগী স্বল্পমেয়াদি জাত আবাদ করা গেলে ফসল সংগ্রহের সময় এগিয়ে আনা সম্ভব। এতে একদিকে আগাম বন্যা, খরা কিংবা মৌসুমি বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকির সঙ্গে ফসলের সংবেদনশীল পর্যায়ের সংঘাত কমানো যায়, অন্যদিকে একই জমিতে পরবর্তী ফসল আবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া যায়। তবে স্বল্প জীবনকাল মানেই সব পরিস্থিতিতে বেশি ফলন নয়। জাতের ফলনক্ষমতা, রোগবালাই প্রতিরোধ, স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজন এবং বাজারমূল্য যাচাই করেই জাত নির্বাচন করতে হবে।হাওরাঞ্চলের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সেখানে বোরো ধান কাটার আগেই আকস্মিক বন্যা দেখা দিলে কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রম মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই অঞ্চলভেদে উপযোগী স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ও আগাম পরিপক্ব ধানের জাত নির্বাচন, সময়মতো বপন বা রোপণ এবং দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বন্যাপ্রবণ এলাকায় পানিতে ডুবে থাকার সহনশীলতাসম্পন্ন জাত এবং খরাপ্রবণ এলাকায় খরাসহিষ্ণু জাতকে উৎপাদন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় স্বল্পমেয়াদি ও প্রতিকূলতা-সহনশীল জাতের ব্যবহার নিয়ে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যেমন, উপযুক্ত বন্যাপ্রবণ এলাকায় ব্রি ধান ৫১, ব্রি ধান ৫২ ও বিনা ধান ১১-এর মতো জাত এবং খরাপ্রবণ এলাকায় সংশ্লিষ্ট পরিবেশের উপযোগী খরাসহিষ্ণু জাত বিবেচনা করা যায়। তবে কোনো জাতের সুপারিশের ক্ষেত্রে স্থানীয় মাটি, পানি, মৌসুম ও কৃষি গবেষণার সর্বশেষ নির্দেশনা বিবেচনায় নিতে হবে।শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধির আরেকটি কার্যকর পথ হলো ফসলের জীবনকাল ও জমি খালি থাকার সময়ের মধ্যে সমন্বয় করা। ধান কাটার পর দীর্ঘ সময় জমি অনাবাদি থাকলে সেখানে উপযোগী স্বল্পমেয়াদি ডাল, তেলবীজ বা সবজি আবাদ করা যেতে পারে। ধানভিত্তিক ফসল বিন্যাসে সরিষা, মুগডাল, অন্যান্য ডাল ও উপযোগী সবজি অন্তর্ভুক্ত করা গেলে খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পুষ্টি, কৃষকের আয় এবং মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষত ডালজাতীয় ফসল মাটিতে জৈবিকভাবে নাইট্রোজেন সংযোজনে ভূমিকা রাখে। তবে এ ক্ষেত্রে নাইট্রোজেন সংযোজনের পরিমাণ নির্ভর করে ফসলের ধরন, অণুজীব, মাটির বৈশিষ্ট্য ও ব্যবস্থাপনার ওপর। ফলে একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষের পরিবর্তে পরিকল্পিত ফসল বৈচিত্র‍্য কৃষির ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।তবে সব অঞ্চলের জন্য একই ফসল বিন্যাস কার্যকর হবে না। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ জমি, দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এবং মধ্যাঞ্চলের বন্যাপ্রবণ নিম্নভূমির সমস্যা এক নয়। কোথাও পানি দ্রুত নেমে যায়, কোথাও দীর্ঘদিন জলাবদ্ধতা থাকে, আবার কোথাও সেচের পানির সংকটই প্রধান বাধা। তাই দেশের কৃষিকে অভিন্ন ক্যালেন্ডারে পরিচালনা না করে কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভিত্তিক ফসল পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিটি এলাকার জন্য প্রধান ফসল, বিকল্প ফসল, উপযুক্ত জাত, বপন ও রোপণের সময়, সম্ভাব্য সংগ্রহকাল এবং দুর্যোগের ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কৃষি আবহাওয়ার তথ্য, স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ ফলাফলের সমন্বয়ে এ পরিকল্পনা নিয়মিত হালনাগাদ করা গেলে কৃষক আগাম সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন।এ জন্য শুধু জাত নির্বাচন নয়, পুরো উৎপাদনব্যবস্থাকে সময়-সংবেদনশীল করে তুলতে হবে। সময়মতো বীজ সরবরাহ, উন্নতমানের বীজের প্রাপ্যতা, সেচ ও পানি নিষ্কাশন, কৃষিযন্ত্রের সহজলভ্যতা এবং ফসল কাটার পর দ্রুত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষত দুর্যোগের আশঙ্কাপূর্ণ এলাকায় অল্প সময়ে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য কম্বাইন হারভেস্টারসহ উপযোগী কৃষিযন্ত্রের প্রাপ্যতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, খরাপ্রবণ এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেচের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কেবল স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না; সেই জাতের বীজ সময়মতো কৃষকের হাতে পৌঁছানো এবং নির্ধারিত সময়ে ফসল সংগ্রহের সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।এ ক্ষেত্রে গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমকে অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় ঝুঁকি মোকাবিলায় উপযোগী, স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও মূল্যায়নে গুরুত্ব দিতে পারে। বীজ উৎপাদন ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য চাহিদা অনুযায়ী আগাম বীজ প্রস্তুত ও সরবরাহের পরিকল্পনা করতে পারে। অন্যদিকে সম্প্রসারণকর্মীরা কৃষককে সঠিক জাত নির্বাচন, ফসলের সময় নির্ধারণ এবং আবহাওয়ার সতর্কবার্তা অনুসরণে সহায়তা করতে পারেন। গবেষণাগারের প্রযুক্তি, মাঠের অভিজ্ঞতা এবং কৃষকের বাস্তব চাহিদার মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করতে পারলেই পরিকল্পনার সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছাবে।জাত উন্নয়নেও সময়ের গুরুত্ব বাড়াতে হবে। প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির পাশাপাশি যেখানে বৈজ্ঞানিকভাবে উপযোগী, সেখানে দ্রুত প্রজন্ম উন্নয়ন, জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্তকারী চিহ্নের সহায়তায় নির্বাচন এবং আধুনিক জিনগত বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প সময়ে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জাত উন্নয়নের গবেষণা জোরদার করা যেতে পারে। তবে দ্রুত জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি একাধিক স্থানে পরীক্ষা, ফলন যাচাই, রোগবালাই প্রতিরোধ এবং কৃষকের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। কারণ, দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর জাত বলতে শুধু দ্রুত পরিপক্ব জাতকে বোঝায় না; বরং যে জাত নির্দিষ্ট পরিবেশে নির্ভরযোগ্য ফলন দিতে পারে, সেটিই প্রকৃত অর্থে কৃষকের ঝুঁকি কমাতে সক্ষম।এই পরিকল্পনার সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য ও উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়টিও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। শস্যনিবিড়তা বাড়ানোর নামে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ, নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহার কিংবা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে কৃষিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। তাই মাটি পরীক্ষা করে সুষম সার প্রয়োগ, ফসলের অবশিষ্টাংশের যথাযথ ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং পানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ডালজাতীয় ফসলের অন্তর্ভুক্তি, জৈব পদার্থের সংযোজন ও প্রয়োজনভিত্তিক সেচের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে এখন প্রয়োজন একটি বাস্তবায়নযোগ্য জাতীয় দুর্যোগসহনশীল শস্যনিবিড়তা কর্মপরিকল্পনা। এর আওতায় কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভিত্তিক ফসল ক্যালেন্ডার প্রণয়ন, স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ও প্রতিকূলতা-সহনশীল জাতের তালিকা হালনাগাদ, বীজের চাহিদা নিরূপণ, কৃষিযন্ত্রের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এবং কৃষি আবহাওয়ার তথ্যের ব্যবহার সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। প্রথম পর্যায়ে হাওর, খরাপ্রবণ অঞ্চল, উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকা ও বন্যাপ্রবণ নিম্নভূমিতে পরীক্ষামূলকভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ফলন, উৎপাদন ব্যয়, কৃষকের নিট আয়, পানির ব্যবহার এবং দুর্যোগজনিত ক্ষতির পরিবর্তন মূল্যায়ন করা উচিত। সফল মডেলগুলো স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী অন্য এলাকায় সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।সবশেষে মনে রাখতে হবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি বন্ধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়; কিন্তু বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এর ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কৃষকের হাতে সঠিক জাত, সঠিক সময়ে বীজ, নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার তথ্য এবং উপযুক্ত উৎপাদন কৌশল পৌঁছে দেওয়া গেলে একই জমিতে উৎপাদনের সুযোগ বাড়বে, অনাবাদি সময় কমবে এবং ফসলহানির ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি হবে। শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধির প্রকৃত সাফল্য তাই শুধু বছরে অধিকসংখ্যক ফসল উৎপাদনে নয়, বরং সীমিত জমি ও সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে নিরাপদ, লাভজনক ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করার মধ্যে নিহিত। বাংলাদেশের কৃষিকে এখন উৎপাদননির্ভরতা থেকে পরিকল্পনানির্ভরতার দিকে এগিয়ে নিতে হবে।দুর্যোগের পর ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় না থেকে দুর্যোগের আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে ফসল নির্বাচন, জীবনকাল নির্ধারণ ও উৎপাদন ক্যালেন্ডার সাজানোই হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ। প্রকৃতির অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে নয়, বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিক ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই হোক আগামী দিনের কৃষির মূল দর্শন।[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন]

রম্যগদ্য: “আঁই কি কইচ্চি যে...?”

আঁই কি কইচ্চি যে, অর্থাৎ সাধূ ভাষায় বলিতে গেলে বলিতে হয় আমি কী করিয়াছি যে...?হ, আন্নে কী করচেন হেইডা আন্নে বুঝেন ন’?  হ’ বুইড়া খুকার পোলা, কচি খুকা, আঁই কি কইচ্চি যে? পুরা জাতির ইজ্জত মারি অহন বলচেন, আঁই কি কইচ্চি যে, লজ্জা শরম নাই মিয়া...ছুট্টু বেলায়, লজ্জা-শরম, হায়া- বেহায়া, সকলের মুন্ডু কেটে তা, বঙ্গপোসাগরে মা দূর্গার সাথে বিসর্জন দিয়েছি। তাই খামাখা লজ্জা শরম নাই মিয়া...কথাটি বলিয়া অযথা সময় নষ্ট করিয়া কি লাভ! এখন বর্তমানের কথা চিন্তা করেন। জাতির বারটা যা বাজার, তাতো আপনারা ফায়ার ব্রিগেডের ঘন্টার ন্যায় ঢং ঢং করিয়া বিগত প্রায় চুয়ান্ন বছরে বাজাইয়াছেন। এখন জাতি কি করবে সেই চিন্তা করবেন নাকি আজীবন, সরি, আমরণ ড্রইং রুমে, হা-হুতাশ করেই সময় কাটাবেন?হেঁ হেঁ যেই যায় লংকায় সেই হয় রাবণ। আমার দ্যেশের সুনার পোলারা যখনই দায়িত্ব পাইছে তখনই মাইনে লগে লগে, মাল কামানোর জন্য এ্যতোই ব্যাস্ত যে, নিজের আর পরিবারের কথা ভাবি, ফুলি ফাঁপি, চাকরের চারশ’ কোটি টাকা, জাতির কপালে তপ্তবালির টিকা পরাই দিছেন! আবার আপনারাই স্ত্রীর ছুটো ভাই, আপনেরা কন, “আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে / আসেনি কেহ অবনী পরে / সকলে আমরা সকলের তরে / প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।” এইনি আপনেগো সকলে আমরা সকলের তরে/ প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।” বাঙালী হোই বাঙ্গালিরে হিডি মারি হ্যালার! মায়ে মারে পোলারে, পোলায় মারে বাপেরে, কব্বর থুন লাশ তুলি পুড়ি হ্যেলার, এ্যান্নে আঁই হারিন’ পরীক্ষায় মাল্লেকাই ফেইল করচে, আবার হুনি শ্যাপারে হিডি মারি হ্যেলার, অখন বলেন আমি কি করবো যে?শোন এতো আর আজকের কথা নয়, এ তো সেই পনেরশ’ শতাব্দীর বৃটিশ আমলের কথা, “এ-দেশ আমার / এ-দেশ তোমার / করলো কারা রচনা / ভায়ে ভায়ে বিবাদ / কেনগেল না...” ভায়ে ভায়ে বিবাদ সেই বৃটিশ আমলের অভিশাপ আমরা আজও বয়ে ব্যেড়াচ্ছি!আরে মিয়া ভাই আপনে বৃটিশ আমলের পাপ লোই ঘুরেন আঁর কিচুই বলার নাই। দুনিয়ার সকল দেশে পাবলিকে মদ পান করের, এমোন কি আন্নের ঈলন মাস্ক, যেই ব্যাটা উড়ন্ত গাড়ি বানই দুনিয়া কাঁপার, হেই, ইলন মাস্কও মদ খায়। কিন্তু আন্নের দেশে মদ খাওন হারাম, তাই আমি গেলাম একটু মদখোর হারামী গুলারে শায়েস্তা করতে। আর আপনেরা  মদখোর হারামী গুলারে শায়েস্তা না করি আমারেই শায়েস্তা করলেন!! আমার বাপে আপনের দলের লাই মুরগীর রক্তমাখি রক্তাত পুষ্টার ছাড়ছে, আর সেই আমারেই বিলাতি মেম সাহেবের কথা হুনি, পাবলিকের সামনে বেইজ্জতি করলেন?আরে সোনা, এ’নিয়ে এ্যাতো মন খারাপ করিস না। মনে রাখবি এই যে চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজী, জামিন বাণিজ্য, মেডিকেলের চল্লিশ পার্সেন্ট কমিশন, আজ মন্ত্রী, কাল প্রতিমন্ত্রী, পরশু আম পাবলিক, এই সকলের মাঝেই তোমাদের মঙ্গল নিহিত রহিয়াছে।হ, মঙ্গল নিহিত রহিয়াছে, মুখ খারাপ করায়েন না মিয়া, সারা দেশের পাবলিকে অহন আমারে লোই টিটকারি মারের। আমারে কয়, চল্লিশ দিন তালামারি পাবলিকের ভাইগ্য মারছিলেন, অহন বিলাইতি মেমেরা, হেঁ হেঁ আপনের দক্ষিণ দুয়ারে তালামারি আপনের বাপ-দাদার, নানা দাদার না, বাপ-চাচার ভাইগ্য হিডি মারি হালার। এই দুঃখ আমি কারে কমু কন?আচ্ছা ভালো কথা তোরা সব, মানে যারা বিলাতি মেমে সাহেবের, চাপে পড়ে ত্রাহি মধুসূদন, ত্রাহি মধুসূদন, ত্রাহি কৃষ্ণ, ত্রাহি কৃষ্ণ, করছিস তারা আবার সবাই মিলে নতুন কোনো পার্টি খোলার কথা ভাছিস? নাকি অন্য কিছু বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মতো নিজের আখের গোছাবার জন্য বিরোধী দলে যোগ দিবি?আরে না, আন্নে আঁরে ভুল বুইঝেন না। ব্যেবাগ বীর মুক্তিযোদ্ধারা অহন সিনিয়র সিটিজেন। যারা দুই বছর বয়েসে যুদ্ধে গেছিলো তাগো বয়সও পঞ্চাশ পার। এইসব বুইড়া, কিডনি ফেইল ডাইলাইিসিস রুগী দিয়া আর যাই হোক, পলিটিক্যাল পার্টি চইলত’ন। মিছিলে দশ কদম হাঁটলেই হ্যাতাগো জিবলা বাইর হই যায়। অহন লাগবো জেন-জি, নিউ জেনারেশন।বুঝলাম তোরা জেন-জী, নিউ জেনারেশন, কিন্তু যেই জন্য, তোদের ভাষায় ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটলো, বাস্তবে তার তো কোনো পরিবর্তন দেখছিনা!হুনেন, আমাগোরেরও একটা প্ল্যান আছে, এই সমাজ বদলাবার জইন্নে আঁরা বাছি বাছি পোলা লোই সুইসাইড স্কোয়াড বানাই ব্যেবাগ মদখোর হারামী গো, মারি-হিডি দ্যেশের তন খ্যেদামু, লগে লগে বিলাইতে মেমেরে আলকাতরা মাখি নিগরু বানাই লন্ডনে পাঠামু। তাহলে দেশের উন্নয়ন, তৌবা তৌবা, উন্নয়ন না, উন্নয়ন না, দেশের ভালো করার জন্য তোরাও নিজেরা নিজেরা, মানে বাঙালী হয়ে বাঙালীকে হিডি মারবি!!হ্যেইডাতো আমাগো মানে জেন-জী’র, দোষনা। আপনেই তো বলেচেন, “এ-দেশ আমার / এ-দেশ তোমার / করলো কারা রচনা / ভায়ে ভায়ে বিবাদ কেন / গেল না...” ভায়ে ভায়ে বিবাদ সেই বৃটিশ আমলের অভিশাপ আমরা আজও বয়ে ব্যেড়াচ্ছি!!তাহলে তোরা জেন-জী, নিউ জেনারেশন, তোদের হাতেও বাঙালী হোয়ে বাঙ্গালি মার খাবে, মা মারছে ছেলেকে, ছেলে মারছে বাবাকে, কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলা, চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজী, জামিন বাণিজ্য, মেডিকেলের চল্লিশ পার্সেন্ট কমিশন, আজ মন্ত্রী, কাল প্রতিমন্ত্রী, পরশু আম পাবলিক, এই অবস্থার শেষ হবে না!জ্বী না, কেয়ামত থেকে কেয়ামত পর্যন্ত এই সিসটেম চলবো। আর শুনেন, অহন ভায়ে ভায়ের, সাথে বিলাইতি মেম আর দেশী বেগমও যুক্ত হোইবো। ছিঃ ছিঃ ছিঃ লজ্জা লজ্জা, শরম শরম...[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চাই ওয়ান হেলথভিত্তিক জাতীয় কৌশল

বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর কোনো সাময়িক বা নির্দিষ্ট ঋতুভিত্তিক স্বাস্থ্য সমস্যা নয়। এটি ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডের ২০ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষ (১,১৫,৬১৭ জন) এবং মোট মারা গেছেন ৩৫৭ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়ও ১,৩৬৬ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৫ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া চলতি সপ্তাহের (সপ্তাহ ৪২) হিসাব অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যা ৫,৩০৫ জন এবং সাপ্তাহিক মৃত্যু ১৫ জন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) তীব্র সংকট, প্লাটিলেটের জন্য স্বজনদের হাহাকার এবং প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় হাজারের বেশি নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট করে যে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা কিংবা মশা নিধনের সাময়িক অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন বছরব্যাপী প্রতিরোধ, বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারি এবং সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।ডেঙ্গুর এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত ও দ্রুত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা এবং দুর্বল নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সরাসরি ও গভীর ভূমিকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং অনিয়মিত পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অসময়ে অতিবৃষ্টি এবং বাতাসে উচ্চ আর্দ্রতা এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ও ভাইরাসের বিস্তারকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করছে। উপযুক্ত তাপমাত্রায় মশার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের বহিঃস্থ ‘ইনকিউবেশন পিরিয়ড’ বা ভাইরাস সংক্রমণক্ষম হয়ে ওঠার সুপ্তিকাল বহুলাংশে কমে আসে। ফলে একটি সংক্রমিত এডিস মশা তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যেই নতুন নতুন মানবদেহে দ্রুত সংক্রমণ ঘটানোর সক্ষমতা অর্জন করে। অন্যদিকে, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ভবন নির্মাণ এলাকা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পাত্র এবং বাসাবাড়ির ছাদবাগানে জমে থাকা পানি মশার আদর্শ প্রজননস্থলে পরিণত হচ্ছে। ফলে কেবল হাসপাতালমুখী চিকিৎসা দিয়ে এই জটিল পরিবেশগত ও বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট সামলানো একেবারেই অসম্ভব।আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতিগুলো মূলত ‘সংকট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ানিર્ભর’। মহামারি বা প্রাদুর্ভাব বাড়লে কেবল হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো কিংবা মশা নিধনে রাসায়নিক ওষুধ ছিটানোর সাময়িক তৎপরতা চোখে পড়ে। অথচ কোথায় মশার বংশবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে, কোন কোন এলাকায় প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে এবং সিটি করপোরেশন কর্তৃক ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা কতখানি বজায় রয়েছে, তা প্রতিনিয়ত বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা জরুরি। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া নির্বিচারে কীটনাশক ছিটানো কেবল বিপুল অর্থেরই অপচয় ঘটায় না, বরং পরিবেশগত ভারসাম্য ও অন্যান্য উপকারী পতঙ্গের চরম ক্ষতি সাধন করে। তাই লার্ভার উৎস নির্মূল, নিয়মিত পতঙ্গতাত্ত্বিক জরিপ, নগর বর্জ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিজ্ঞানসম্মত পরিবেশবান্ধব নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।এ ক্ষেত্রে ‘ওয়ান হেলথ’ বা এক স্বাস্থ্য পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই পদ্ধতি মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। ডেঙ্গু প্রাণী থেকে সরাসরি মানুষের মধ্যে ছড়ানো রোগ নয়; সংক্রমিত এডিস মশার মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়ায়। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ওয়ান হেলথের প্রয়োগ বলতে মানুষ, বাহক মশা, পরিবেশ ও জলবায়ুর সম্পর্ককে একসঙ্গে বিবেচনা করা বোঝায়। এর মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, কীটতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী, জলবায়ু গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘বিশেষ টাস্কফোর্স’ গঠন করেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। তবে কেবল কাগজ-কলমে বা প্রশাসনিক সমন্বয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে এই টাস্কফোর্সে কীটতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী ও ওয়ান হেলথ বিশেষজ্ঞদের সরাসরি যুক্ত করে ওয়ান হেলথ ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার তথ্য, মশার ঘনত্ব, প্রজননস্থলের অবস্থান এবং হাসপাতালের রোগীসংক্রান্ত তথ্য সমন্বয় করে একটি জাতীয় নজরদারি ও আগাম সতর্কীকরণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা এবং সংক্রমণ বৃদ্ধির আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি পরীক্ষা ও মূল্যায়নের ব্যবস্থাও করতে হবে, যেন মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়।পাশাপাশি নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, নিয়মিত বর্জ্য পরিষ্কার এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জনগণকে সচেতন হতে হবে। তবে নাগরিকদের ওপর দায় চাপিয়ে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নালা পরিষ্কার ও কার্যকর পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব।ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক উদ্যোগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণানির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক জাতীয় কৌশল প্রয়োজন। চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত নজরদারি ও আন্তমন্ত্রণালয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সাফল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত শুধু কতজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হলো, তার ভিত্তিতে নয়; বরং কতটি সংক্রমণ প্রতিরোধ করা গেল এবং কতটি জীবন রক্ষা করা গেল, তার ভিত্তিতে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতিবছর প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।[লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; ওয়ান হেলথ বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয় কমিটির সাবেক সদস্য]

নিরাপদ সড়ক: আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার

সড়ক যোগাযোগ একটি দেশের অর্থনীতি, উন্নয়ন ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই সড়কই যখন মানুষের অকালমৃত্যু, পঙ্গুত্ব ও পরিবারে স্থায়ী শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন উন্নয়নের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একটি দেশের সড়ক কত প্রশস্ত, কতটি সেতু নির্মিত হয়েছে কিংবা যানবাহনের গতি কত বেড়েছে, শুধু তা দিয়ে উন্নয়ন পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের অন্যতম মানদণ্ড হলো, মানুষ কতটা নিরাপদে চলাচল করতে পারছে এবং তার জীবন কতটা সুরক্ষিত। ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ আমাদের সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এখন প্রয়োজন প্রতিপাদ্যের বক্তব্যকে বাস্তব জীবনের নিরাপত্তায় রূপান্তর করা। এ জন্য চাই কার্যকর আইন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জবাবদিহি।জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বেদনাবিধুর ইতিহাস। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন নিহত হন। ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে ইলিয়াস কাঞ্চন নিরাপদ সড়কের দাবিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) আন্দোলন দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা, জনসম্পৃক্ততা ও গণমাধ্যমের সহযোগিতার মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তার দাবি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৭ সালে ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে দিবসটি দশমবারের মতো পালিত হচ্ছে। এই দিবস আমাদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করার পাশাপাশি অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় মূল্যায়নের সুযোগ করে দিয়েছে।জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালন, আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা, ব্যানার ও স্লোগানের পরও সড়কে মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কেন যথেষ্ট কমছে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সড়ক দুর্ঘটনাকে কেবল চালকের ভুল কিংবা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, আইন অমান্য, দুর্বল যান চলাচল ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক নকশা, অনিরাপদভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম, চালকের ক্লান্তি, পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ার মতো একাধিক কারণ কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকি একসঙ্গে উপস্থিত থাকে। ফলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শুধু একজন চালককে দায়ী করা, জরিমানা বাড়ানো কিংবা বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক প্রচার চালানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত, ধারাবাহিক ও প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশবিষয়ক একই বছরের প্রতিবেদনে দেশে সরকারি হিসাবে ৫ হাজার ৮৪ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মডেলভিত্তিক অনুমান ছিল প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক অনুমানের এই বড় ব্যবধান দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সংজ্ঞা, মৃত্যুর হিসাব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। তবে এসব সংখ্যা ২০২১ সালের তথ্য, ২০২৬ সালের বর্তমান মৃত্যুসংখ্যা নয়। এই পার্থক্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: সড়ক নিরাপত্তার কার্যকর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য, সমন্বিত ও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যব্যবস্থা অপরিহার্য। প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছাড়া দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং গৃহীত পদক্ষেপের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা কঠিন।সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিরাপদ সড়ক শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নাগরিক অধিকার, পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রীয় সুশাসনের অংশ। সরকার সড়ক নির্মাণ করবে, যানবাহন চলাচলের নিয়ম নির্ধারণ করবে, চালকের যোগ্যতা যাচাই করবে, পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণ করবে এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে যাত্রী, পথচারী, সাইকেলচালক ও মোটরসাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সড়ক নির্মাণের পর সেটি কতটা নিরাপদ থাকছে, পরিবহন আইন কতটা মানা হচ্ছে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো কত দ্রুত সংশোধন করা হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিরা সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, এসব বিষয়ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কাজের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে এবং তাদের কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেবে না।সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর কার্যকর ও ধারাবাহিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনকভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম, অতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য বহন এবং যান চলাচলের সংকেত অমান্যের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু আইন থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। আইন প্রয়োগে শিথিলতা, অনিয়ম, পক্ষপাত কিংবা দায়িত্বহীনতা থাকলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। কোনো বিশেষ দুর্ঘটনার পর কয়েক দিন অভিযান জোরদার করে পরে তৎপরতা কমিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। আইন প্রয়োগ হতে হবে নিয়মিত, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সব শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর। পরিবহন মালিক, চালক, শ্রমিক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি—কেউই যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ না পান। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা, অযৌক্তিক জরিমানা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগও বন্ধ করতে হবে।শুধু বিদ্যমান আইন প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বর্তমান বাস্তবতার আলোকে একটি সমন্বিত ও কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এমন আইনে সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের নিরাপত্তামান, যানবাহনের কারিগরি নিরাপত্তা, চালকের প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা, গতিসীমা, পথচারীর অধিকার, জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা, দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ, তদন্ত, নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। আইন প্রণয়নের আগে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞদের মতামত, গবেষণালব্ধ ফলাফল এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক, নাগরিক সমাজ ও সড়ক নিরাপত্তা সংগঠনগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আইনটি যেন শুধু অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের দলিল না হয়, বরং দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা গঠন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্ব নিশ্চিত করার কার্যকর কাঠামো হয়ে ওঠে।নতুন আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ পরস্পরের বিকল্প নয়। নতুন আইন তৈরি করতে সময় লাগলেও বর্তমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ থেমে থাকতে পারে না। আবার বিদ্যমান আইনে কোনো ঘাটতি থাকলে সেটি চিহ্নিত করে সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগও পিছিয়ে দেওয়া উচিত নয়। আইন প্রণয়নের পর বিধিমালা, দায়িত্ব বণ্টন, প্রয়োজনীয় জনবল, প্রযুক্তি, বাজেট এবং বাস্তবায়ন নির্দেশনা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভালো আইনও কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে। আইনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান বাস্তবায়নের জন্য কে দায়িত্ব পালন করবে, কীভাবে তা পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট থাকতে হবে। আইন প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি এবং স্থায়ী জবাবদিহি। আমাদের দেশে অনেক সময় কোনো বড় দুর্ঘটনা বা জনদাবির পর তৎপরতা বাড়ে, অভিযান চলে, সভা হয়, নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পর সেই তৎপরতা কমে গেলে আগের অনিয়ম আবার ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়। এভাবে চলতে থাকলে কোনো আইন, নির্দেশনা কিংবা কর্মসূচিই স্থায়ী ফল দিতে পারবে না। তাই সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে সাময়িক অভিযাননির্ভর না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে প্রতিটি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাজ, সময়সীমা, লক্ষ্যমাত্রা ও অগ্রগতি মূল্যায়নের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। নিয়মিত পর্যালোচনা সভা, মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন, ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রকাশ্য অগ্রগতি প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের অবস্থা যাচাই করা যেতে পারে।বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বিত দায়িত্ব বণ্টন থাকা প্রয়োজন। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিত হওয়ার পর সেটি নিরাপদ করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কোনো যানবাহন বারবার আইন লঙ্ঘন করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসাসেবা পৌঁছাতে কত সময় লাগছে এবং গৃহীত পদক্ষেপে দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ঝুঁকি কমেছে কি না, এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু কতটি অভিযান পরিচালিত হলো কিংবা কত টাকা জরিমানা আদায় হলো, সেটিই সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। প্রকৃত সাফল্য হলো দুর্ঘটনা ও গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি কমানো এবং মানুষের জীবন রক্ষা করা।সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নজরদারি ব্যবস্থা যেন ব্যক্তিনির্ভর না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো কর্মকর্তা বদলি হলে, প্রশাসনিক অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হলে কিংবা কোনো বড় দুর্ঘটনা গণমাধ্যমের আলোচনার বাইরে চলে গেলে সড়ক নিরাপত্তার কার্যক্রম যেন থেমে না যায়। এ জন্য আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে স্থায়ী দায়িত্ব নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা থাকতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কোথাও নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন না হলে তার কারণ জানতে হবে এবং সংশোধনী পদক্ষেপ নিতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে সড়ক নিরাপত্তা দিবসের কর্মসূচি শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সারা বছর ধরে বাস্তবায়িত হবে।চালকদের দক্ষতা ও কর্মপরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। পেশাদার চালকের হাতে বহু মানুষের জীবন নির্ভর করে। তাই লাইসেন্স দেওয়ার আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা যাচাই করা জরুরি। চালকের কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, ঘুমের সুযোগ এবং দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানো, ক্লান্ত অবস্থায় স্টিয়ারিং ধরা কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর অযৌক্তিক চাপ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শুধু চালকের ওপর সব দায় চাপিয়ে পরিবহন মালিক ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। চালক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত দক্ষতা যাচাই, পেশাগত আচরণ উন্নয়ন এবং পরিবহন পরিচালনায় নিরাপত্তানীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। চালকের ভুলের জন্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনায় ভূমিকা রাখা অন্যান্য কারণও তদন্ত করতে হবে।সড়কের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সড়কে পর্যাপ্ত ফুটপাত নেই, কোথাও ফুটপাত দখল হয়ে আছে, কোথাও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, শিল্পাঞ্চল এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পথচারীর ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সড়ক পরিকল্পনা করতে হবে। বিপজ্জনক বাঁক, দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হওয়া স্থান, অপর্যাপ্ত সড়কবাতি, ত্রুটিপূর্ণ নির্দেশক চিহ্ন ও সড়কচিহ্ন, অরক্ষিত সড়ক বিভাজক এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রবেশপথ চিহ্নিত করে সংশোধন করতে হবে। মহাসড়কে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে নিরাপদ পারাপার, সংযোগ সড়ক, সঠিক বাসস্টপ, গতিনিয়ন্ত্রণ এবং পথচারীবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান সড়কের নিরাপত্তা নিরীক্ষা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থান দ্রুত সংশোধনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার জন্য ‘নিরাপদ সড়কব্যবস্থা পদ্ধতি’ অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ধারণার মূল কথা হলো, মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই ভুল যেন অনিবার্যভাবে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের কারণ না হয়, সে অনুযায়ী পুরো পরিবহনব্যবস্থাকে সাজাতে হবে। নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা—এই উপাদানগুলোকে সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সচেতনতার প্রচার কিংবা শুধু শাস্তি দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। অবকাঠামো, আইন, যানবাহন, চালকের প্রশিক্ষণ, জরুরি চিকিৎসা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমানোর জাতিসংঘের বৈশ্বিক লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশকেও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ এবং অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে।দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক মিনিট অনেক আহত মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানো, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী পাওয়া, আহত ব্যক্তিকে সঠিকভাবে হাসপাতালে স্থানান্তর এবং উপযুক্ত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। তাই জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্যকর জরুরি সাড়াদানব্যবস্থা, সমন্বিত অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক, হাসপাতালগুলোর মধ্যে রোগী স্থানান্তরের ব্যবস্থা, গুরুতর আঘাতের চিকিৎসাসক্ষমতা এবং প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা জরুরি। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও হাসপাতালের মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনাস্থলে আহত ব্যক্তিকে অদক্ষভাবে টানাহেঁচড়া না করে প্রশিক্ষিত সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সাধারণ মানুষকেও সচেতন করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনায় দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর জীবন রক্ষার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আরেকটি বড় সমস্যা হলো দুর্ঘটনার তথ্যের বিচ্ছিন্নতা। পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তথ্য এক জায়গায় সমন্বিত না হলে দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, মৃত্যুর কারণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ণয় কঠিন হয়। তাই একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনা তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দুর্ঘটনার স্থান, সময়, যানবাহনের ধরন, সড়কের অবস্থা, হতাহত, চিকিৎসা এবং তদন্তের ফলাফল নিয়মিত নথিভুক্ত করতে হবে। তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এবং অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে পদ্ধতি ও সংজ্ঞার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান তুলনা ও বিশ্লেষণ করা যায়।সড়ক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় জনগণের দায়িত্বও অনস্বীকার্য। চালককে গতিসীমা মানতে হবে, বৈধ লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করতে হবে, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার করতে হবে এবং গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। মোটরসাইকেলে চালক ও যাত্রী উভয়ের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার জরুরি। পথচারীদের নির্ধারিত স্থানে রাস্তা পারাপার, ফুটপাত ব্যবহার এবং যান চলাচলের সংকেত মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে দায়িত্বশীল আচরণ, চালকের প্রশিক্ষণ এবং যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে জনসচেতনতার নামে রাষ্ট্র ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আড়াল করা যাবে না। নিরাপদ আচরণের সুযোগ তৈরি করতে হবে নিরাপদ অবকাঠামো, কার্যকর আইন এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যক্রমে বয়সোপযোগী সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা এবং জনসচেতনতামূলক প্রচার বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর প্রকাশের পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ, প্রতিরোধের উপায়, আইনের প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন থাকা প্রয়োজন। কোনো বড় দুর্ঘটনার পর সাময়িক আলোচনা করে থেমে না গিয়ে সড়ক নিরাপত্তার অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে। জনমত ও গণমাধ্যমের নজরদারি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক জনসচেতনতা সৃষ্টি ও নীতিগত পরিবর্তনের দাবিতে কাজ করে আসছে। সংগঠনটির প্রায় ১২০টি শাখার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকার চাইলে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, চালক প্রশিক্ষণ এবং সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় গড়ে তোলা গেলে উদ্যোগগুলো আরও কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও নজরদারির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ নাগরিক সংগঠনগুলোর মতামত গ্রহণ করা উচিত। সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হলে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের জনসম্পৃক্ততা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা কোনো একক সংস্থার কাজ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের তাৎপর্য তাই শুধু শোক স্মরণ বা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এই দিন হতে হবে সড়ক নিরাপত্তার অগ্রগতি পর্যালোচনা, ব্যর্থতার কারণ শনাক্ত এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের অঙ্গীকারের দিন। সরকারকে বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সমন্বিত আইন প্রণয়ন করতে হবে, নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, দক্ষ চালক তৈরি করতে হবে, জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি কর্মসূচির বাস্তব অগ্রগতি নিয়মিত যাচাই এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো দুর্ঘটনা বা দিবসকেন্দ্রিক তৎপরতা যেন কিছুদিন পর থেমে না যায়, সে জন্য সড়ক নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থের অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবেন, একজন শিক্ষার্থী নিশ্চিন্তে বিদ্যালয়ে যেতে পারবে এবং একজন শ্রমজীবী মানুষ জীবিকার সন্ধানে বের হয়ে সুস্থভাবে পরিবারের কাছে ফিরতে পারবেন। সড়কে মৃত্যু যেন স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া না হয়, প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হয় এবং একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। উন্নয়নের প্রকৃত সার্থকতা মানুষের জীবন রক্ষায়। তাই জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির বাইরে এসে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা, কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন, আইনের নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং স্থায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রণয়ন করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না, আবার আইন প্রয়োগের নামে সাময়িক তৎপরতা দেখিয়েও থেমে থাকা যাবে না। ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয়কে শুধু স্লোগানে নয়, বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ, সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন, নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)]

আলবার্টার গণরায় ও কানাডার ঐক্য

২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর কানাডার আলবার্টা প্রদেশে অনুষ্ঠিত গণভোট দেশটির কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক রাজনীতি, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং জাতীয় ঐক্য নিয়ে বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত করেছে। গণভোটের দশম প্রশ্নে ভোটারদের সামনে দুটি বিকল্প ছিল—আলবার্টা কানাডার প্রদেশ হিসেবে থাকবে, নাকি কানাডার সংবিধান অনুযায়ী প্রদেশটির বিচ্ছিন্নতা নিয়ে একটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। প্রকাশিত অনানুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী, প্রায় ৭৬.৫ শতাংশ ভোটার কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে এবং ২৩.৪ শতাংশ পরবর্তী বিচ্ছিন্নতা-প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে মত দিয়েছেন। ইলেকশন কানাডা সূত্রে জানা যায়, সরকারি ফল প্রকাশের নির্ধারিত তারিখ ২৯ অক্টোবর ২০২৬।এই ফলাফলকে শুধু একটি প্রাদেশিক ভোটের পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করলে এর পূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এটি একদিকে কানাডার জাতীয় ঐক্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংকেত, অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলীয় অসন্তোষ, প্রাদেশিক ক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে চলমান বিতর্কের সুস্পষ্ট প্রতিফলন। তবে এই গণভোটকে আলবার্টার বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। ভোটাররা সরাসরি স্বাধীনতার প্রশ্নে নয়, বরং ভবিষ্যতে সে বিষয়ে বাধ্যতামূলক গণভোটের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে কি না, সে বিষয়ে মত দিয়েছেন।গণভোটের সাংবিধানিক তাৎপর্যকানাডার সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী, কোনো প্রদেশ একতরফাভাবে গণভোটের ফল বা স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে আইনগতভাবে কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। ১৯৯৮ সালের ‘কুইবেকের বিচ্ছিন্নতা বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মতামত’ মামলায় কানাডার সুপ্রিম কোর্ট ব্যাখ্যা করেন, বিচ্ছিন্নতার পক্ষে স্পষ্ট প্রশ্নে সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়া গেলে তা সাংবিধানিক আলোচনার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এমন ফলাফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না।২০০০ সালের ‘স্পষ্টতা আইন’ও এই নীতির ওপর গুরুত্ব দেয়। গণভোটের প্রশ্নের স্পষ্টতা, বিচ্ছিন্নতার পক্ষে সমর্থনের ব্যাপকতা এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনার পাশাপাশি সাংবিধানিক আলোচনা, সম্পদ ও দায়ের বণ্টন, সীমান্ত, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।২০২৬ সালের গণভোটে ভোটাররা সরাসরি স্বাধীনতার পক্ষে বা বিপক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। তারা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, স্বাধীনতার প্রশ্নে পরবর্তী বাধ্যতামূলক গণভোটের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে কি না। তাই ফলাফলটির তাৎপর্য মূলত পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের সঙ্গে সম্পর্কিত। কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন দেয়নি। তবে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে ভবিষ্যৎ বিতর্কের অবসানও ঘটায়নি।অর্থনীতি ও বিচ্ছিন্নতার সম্ভাব্য প্রভাবআলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক বিষয়গুলো অপরিহার্য। প্রদেশটির তেল, গ্যাস, পেট্রোরসায়ন, কৃষি ও অন্যান্য শিল্প কানাডার অভ্যন্তরীণ বাজার, পরিবহনব্যবস্থা এবং আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। বিচ্ছিন্নতা বাস্তবায়িত হলে আন্তপ্রাদেশিক পাইপলাইন, বাণিজ্য, মুদ্রা, ব্যাংকিং, সরকারি ঋণ, পেনশন, কর এবং বিদ্যমান আর্থিক দায়বদ্ধতার বণ্টন নিয়ে জটিল আলোচনা প্রয়োজন হতো।একইভাবে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি শিল্পপ্রকল্পকে প্রভাবিত করতে পারত। তবে এগুলো সম্ভাব্য প্রভাব, নিশ্চিত ফল নয়। প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিণতি নির্ভর করত বিচ্ছিন্নতার শর্ত, নতুন আইনি কাঠামো, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং কানাডা ও আলবার্টার মধ্যকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপর।এখানে মৌলিক প্রশ্ন হলো, আলবার্টার অর্থনৈতিক স্বার্থ কানাডার যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে থেকে অধিক কার্যকরভাবে রক্ষা করা সম্ভব, নাকি রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন প্রয়োজন? গণভোটের ফলাফল বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তাবকে সমর্থন করেনি। ফলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় অর্থনৈতিক ক্ষমতা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বাস্তবসম্মত সমাধান বিশেষ গুরুত্ব পাবে।আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাআলবার্টার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় ফার্স্ট নেশনস বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার উপেক্ষা করা যায় না। কানাডার ক্রাউনের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক চুক্তি রয়েছে, যা ভূমি, সম্পদ, শাসনব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো নতুন রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন উঠলে এসব চুক্তির ধারাবাহিকতা ও অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।আলবার্টার বিচ্ছিন্নতার উদ্যোগ নিয়ে আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর উদ্বেগের একটি প্রধান দিক হলো, কানাডার সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তিগত অধিকার ভবিষ্যৎ ব্যবস্থায় কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে। তাদের অধিকার কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ওপর নির্ভরশীল কোনো বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত।অতএব, আলবার্টার স্বাধীনতার প্রশ্নকে শুধু প্রাদেশিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয় হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। ভূমির অধিকার, চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থান যেকোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকা উচিত।জাতীয় ঐক্য ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভবিষ্যৎআলবার্টার গণভোটের ফলাফল কানাডার জাতীয় ঐক্যের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত। তবে এই ফলাফলকে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। জাতীয় ঐক্য টেকসই করতে হলে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, নীতিগত সংলাপ এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের ন্যায্য সমন্বয় প্রয়োজন।প্রথমত, আঞ্চলিক অসন্তোষকে শুধু বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করলে এর অন্তর্নিহিত কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে। জ্বালানি নীতি, রাজস্ব বণ্টন ও প্রাদেশিক ক্ষমতা নিয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান প্রয়োজন।দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রাজনৈতিক দাবির প্রতি জনসমর্থনের পরিসর নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আলবার্টার ভোটাররা বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই সিদ্ধান্তকে সম্মান করার পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতার পক্ষে মত দেওয়া নাগরিকদের উদ্বেগও গণতান্ত্রিক আলোচনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।তৃতীয়ত, জাতীয় ঐক্য কেবল ঐতিহাসিক পরিচয় বা আবেগের ওপর নির্ভর করে না। নাগরিকদের বিশ্বাস করতে হবে যে তাদের অঞ্চল, অর্থনীতি ও অধিকার নীতিনির্ধারণে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই ঐক্য রক্ষার জন্য শুধু বিচ্ছিন্নতার বিরোধিতা নয়, কার্যকর যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থাও জরুরি।কুইবেক ও আলবার্টার অভিজ্ঞতার তুলনা এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। কুইবেকের আন্দোলনে ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় প্রধান ভূমিকা পালন করেছে; আলবার্টার আন্দোলনে অর্থনৈতিক স্বার্থ, জ্বালানি নীতি এবং প্রাদেশিক ক্ষমতার প্রশ্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই পার্থক্য দেখায়, কানাডার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলোকে একই রাজনৈতিক ছাঁচে বিচার করা যায় না।গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট, আঞ্চলিক স্বার্থ ও জাতীয় ঐক্যের ভারসাম্যআলবার্টার ১৯ অক্টোবর ২০২৬-এর গণভোট কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্রকাশিত অনানুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী, অধিকাংশ ভোটার কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন এবং বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে পরবর্তী বাধ্যতামূলক গণভোটের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই ফলাফলকে কানাডার জাতীয় ঐক্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংকেত হিসেবে দেখা যায়। তবে এটি আলবার্টার আঞ্চলিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি বিলুপ্ত করে না।কানাডার অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়: কোনো যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়িত্ব শুধু বিচ্ছিন্নতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে আঞ্চলিক ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তার ওপর। আলবার্টার অর্থনৈতিক গুরুত্ব, কুইবেকের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।এই গণরায় বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে জনম্যান্ডেট দেয়নি। এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার ও আলবার্টার প্রাদেশিক সরকার এই ফলাফলকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা, ন্যায্য ক্ষমতা বণ্টন এবং পারস্পরিক আস্থায় রূপান্তর করবে। আঞ্চলিক অসন্তোষকে উপেক্ষা না করে সাংবিধানিক সংলাপ ও গণতান্ত্রিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করাই হবে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রকৃত পরীক্ষা।আলবার্টার গণরায় কানাডার ঐক্যের পক্ষে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার বার্তা দিয়েছে। কিন্তু সেই ঐক্যের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, দায়বদ্ধ ও কার্যকর যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তোলার ওপর—যেখানে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং জাতীয় সংহতি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সাংবিধানিক সমঝোতার মাধ্যমে সহাবস্থান করতে পারে।[লেখক: কানাডাপ্রবাসী]

ভিডিও আরও দেখুন

১৮তম বারের মতো দেশের দ্রুততম মানবী যবিপ্রবির শিরিন আক্তার

‘কোকো ১৮তম জাতীয় সামার অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতা-২০২৬’-এ নারীদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে প্রথম স্থান অর্জন করে ১৮তম বারের মতো দেশের দ্রুততম মানবীর খেতাব জিতেছেন শিরিন আক্তার। তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অ্যাথলেট এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান (পিইএসএস) বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী।শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় ১২ দশমিক ০৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে ১০০ মিটার দৌড় শেষ করে শীর্ষস্থান অর্জন করেন তিনি। একই ইভেন্টে ১২ দশমিক ২৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শরিফা খাতুন এবং ১২ দশমিক ৩৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সুমাইয়া দেওয়ান।প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্মরণে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শুভ সূচনা করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করে শিরিন আক্তার জানান, খেলাধুলার পাশাপাশি যবিপ্রবিতে স্পোর্টস সায়েন্সে তার মাস্টার্স চলছে, যেখানে উপাচার্যসহ শিক্ষকরা তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন। মাস্টার্স শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পিএইচডি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানান তিনি। এর আগে গত মে মাসে অনুষ্ঠিত ৪৯তম জাতীয় অ্যাথলেটিকসে ১২ দশমিক ১০ সেকেন্ড সময় নিয়ে ১৭তম বারের মতো দ্রুততম মানবী হয়েছিলেন শিরিন আক্তার।

১৮তম বারের মতো দেশের দ্রুততম মানবী যবিপ্রবির শিরিন আক্তার