সংবাদ
আইএমএফের ঋণ চুক্তি বাতিল করে দিয়েছি: অর্থমন্ত্রী

আইএমএফের ঋণ চুক্তি বাতিল করে দিয়েছি: অর্থমন্ত্রী

রিজার্ভে বিদেশি মুদ্রার ঘাটতি সামলাতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে যে ঋণ চুক্তি করা হয়েছিল, তা বাতিল করার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, আইএমএফের আর কোনো শর্ত মানবে না বাংলাদেশ।রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।অনুষ্ঠানে আমির খসরু বলেন, ‘আইএমএফ টাকা দেবে, বিশ্ব ব্যাংক টাকা দেবে—এটা ভুলে যান। আমি আইএমএফের প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে দিয়েছি, আপনারা দেখেছেন। তাদের শর্ত আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আইএমএফের ঋণ চুক্তি বাতিল করে আমরা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। দাতা সংস্থার সাহায্য ছাড়াই ২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি।’বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আইএমএফের মতো দাতা সংস্থার অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে চায় না সরকার বলে জানান তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল আর্কিটেকচার, পাবলিক ফাইন্যান্স আর্কিটেকচার এবং প্রাইভেট সেক্টরের ফাইন্যান্সিং ব্যবস্থা পরিবর্তন করছি। বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ টাকা দেবে আর আমরা দেশ চালাব—এটা আর হবে না।’ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণের বদলে কম খরচে অর্থ পেতে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ক্যাপিটাল মার্কেট ইজ দ্য আন্সার, বন্ড মার্কেট ইজ দ্য আন্সার।’ভবিষ্যতে অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়নে পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা সেতু ও যমুনা সেতুকেও পুঁজিবাজারে আনার প্রক্রিয়া চলছে।’অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এক বছরের মধ্যে বদলে যাবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের চেহারা। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তা বলতে পারব না।’অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, ‘আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারকে এ অঞ্চলের অন্য বাজারগুলোর সঙ্গে তুলনীয় পর্যায়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। ’আগামী ১২ মাসে দেশের পুঁজিবাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে জানান তিনি। কনভার্টিবল বন্ড, রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (আরইআইটি), ইক্যুইটি স্টক অপশন এবং স্থানীয় মুদ্রায় বন্ডের মতো নতুন পণ্য নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।অনুষ্ঠানের আয়োজক বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, ‘তিন মাসের মধ্যে আমরা আইপিও অনুমোদন দেব। আমাদের টাইম হচ্ছে তিন মাস। তিন মাসের মধ্যে আমরা আইপিও অনুমোদন করবই।’আইপিও আবেদনের পর অনুমোদন পেতে যে দীর্ঘ সময় লাগে, নতুন প্রক্রিয়ায় তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হবে বলেও জানান তিনি।গত আড়াই বছর ধরে বাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না উল্লেখ করে সেই খরা আর বেশিদিন ‘চলতে দেওয়া যায় না’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। পুঁজিবাজারের সংস্কারের অংশ হিসেবে বেক্সিমকো লিমিটেডের পর্ষদ পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের বর্ণনা দিয়ে মাসুদ খান বলেন, কমিশনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজারের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।প্যানেল আলোচনায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে যত ধরনের সংস্কারই করা হোক না কেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’।অনুষ্ঠানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বীউনিক) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন উপস্থিত ছিলেন।উল্লেখ্য, আর্থিক সংকট সামাল দিতে ২০২২ সাল থেকে কয়েক দফা আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঋণের অঙ্ক বেড়ে সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার পায় বাংলাদেশ। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে।
৬ ঘন্টা আগে

আকাশেই গতিপথ বদলাতে সক্ষম এআই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া

আকাশেই গতিপথ বদলাতে সক্ষম এআই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ

গলিত লোহা ছিটকে চীনা প্রকৌশলীসহ ৩ জনের মৃত্যু

গলিত লোহা ছিটকে চীনা প্রকৌশলীসহ ৩ জনের মৃত্যু

মৃত্যু নিয়ে উল্লাসের অমানবিক সংস্কৃতি

মৃত্যু নিয়ে উল্লাসের অমানবিক সংস্কৃতি

অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সফরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান

অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সফরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান

যানজট কমাতে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের গতি বাড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

যানজট কমাতে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের গতি বাড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

মদিনায় ড্রোন হামলা : তীব্র নিন্দা জানাল বাংলাদেশ

মদিনায় ড্রোন হামলা : তীব্র নিন্দা জানাল বাংলাদেশ

ভুয়া রসিদে অর্থ লেনদেন: ডাচ-বাংলা ব্যাংকের সেই আউটলেট বন্ধ ঘোষণা

ভুয়া রসিদে অর্থ লেনদেন: ডাচ-বাংলা ব্যাংকের সেই আউটলেট বন্ধ ঘোষণা

আখতারুজ্জামানের জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ

আখতারুজ্জামানের জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ

সুন্দরবনে পর্যটকবাহী জাহাজে ডাকাতির চেষ্টা

সুন্দরবনে পর্যটকবাহী জাহাজে ডাকাতির চেষ্টা

মতামতমতামত

‘এআই’ উত্তর জানে, কিন্তু শিক্ষার্থীকে কে জানবে?

এখন আর কোনো শিক্ষার্থীকে একটি সংজ্ঞা জানার জন্য পরদিনের ক্লাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। কয়েকটি শব্দ লিখলেই কয়েক সেকেন্ডে উত্তর এসে যায়। অঙ্কের সমাধান, প্রবন্ধের খসড়া, ইতিহাসের সারাংশ, এমনকি পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নও প্রযুক্তি সাজিয়ে দিতে পারে।তাহলে কি এমন এক সময় আসছে, যখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক আর অপরিহার্য থাকবেন না? প্রশ্নটি প্রযুক্তির। কিন্তু উত্তরটি সম্ভবত মানুষের।কারণ শিক্ষা কি শুধু উত্তর জানার নাম? নিশ্চিতভাবেই না। শিক্ষা হলো কোন প্রশ্নটি করা উচিত তা বুঝতে শেখা, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে শেখা, ভুল থেকে উঠে দাঁড়াতে শেখা, অন্য মানুষের কথা শুনতে শেখা এবং জ্ঞানকে দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করতে শেখা। এই জায়গাগুলোতে একজন শিক্ষক এখনও অনন্য। আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাব্যবস্থাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। ইউনেস্কোর ২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আলোচনাতেও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে শিক্ষকতার নতুন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি স্পষ্টভাবে বলছে ভবিষ্যতের শিক্ষায় শিক্ষককে কেন্দ্রেই রাখতে হবে। তাদের সাম্প্রতিক প্রচারণার কথাটিও খুব অর্থবহ: “Teachers cannot be coded.” অর্থাৎ শিক্ষকের মানবিক ভূমিকাকে কোনো কোডে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা যায় না।একজন শিক্ষক হিসেবে বিষয়টি আমার কাছেও গভীরভাবে ভাববার।একটি শ্রেণিকক্ষে সব শিক্ষার্থী কখনো একরকম থাকে না। কেউ প্রশ্ন করতে ভালোবাসে, কেউ চুপচাপ শোনে। কেউ একটি বিষয় একবার বললেই বুঝে ফেলে, আর কারও কাছে একই বিষয় তিনবার অন্যভাবে বলতে হয়। আবার এমনও শিক্ষার্থী থাকে, যে পড়াটি না বোঝার কারণে নয়, হয়তো বাড়ির কোনো দুশ্চিন্তার কারণে সেদিন মনোযোগ দিতে পারছে না।একটি ‘এআই’ তার ভুল উত্তর ধরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীর মুখ দেখে সবসময় বুঝতে পারবে না আজ তার চোখ দুটি এত নিস্তেজ কেন। এইখানেই শিক্ষক। শিক্ষকের কাজ আসলে কখনোই শুধু তথ্য সরবরাহ করা ছিল না। কিন্তু দীর্ঘদিন আমরা শিক্ষকের ভূমিকাকে অনেকটাই তথ্য দেওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি। শিক্ষক বলবেন, শিক্ষার্থী লিখবে। শিক্ষক প্রশ্ন করবেন, শিক্ষার্থী উত্তর দেবে। এখন সেই ব্যবস্থাই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে।কারণ তথ্যের ওপর শিক্ষকের একচেটিয়া অধিকার আর নেই। আজকের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ক্লাস নেওয়ার আগেই একটি বিষয় সম্পর্কে পড়ে আসতে পারে। সে ভিডিও দেখতে পারে, ডিজিটাল বই পড়তে পারে, এআই-কে প্রশ্ন করতে পারে। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষক যদি শুধু বইয়ের কথাই পুনরাবৃত্তি করেন, শিক্ষার্থীর কাছে তার প্রয়োজন স্বাভাবিকভাবেই কমবে। কিন্তু এখানেই শিক্ষকের ভূমিকা যে শেষ, তা মনে করলে ভুল হবে বরং শিক্ষকের ভুমিকা নতুনভাবে শুরু।ভবিষ্যতের শিক্ষক সম্ভবত আর শুধুই “জ্ঞানদাতা” নন। তিনি হবেন জ্ঞানের পথপ্রদর্শক। তিনি বলবেন না শুধু “উত্তরটি এই”; বরং জিজ্ঞেস করবেন “তুমি এই উত্তরকে সত্য মনে করলে কেন?”এই একটি পরিবর্তনই শিক্ষাকে বদলে দিতে পারে।কারণ ‘এআই’ খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্যও দিতে পারে। একটি সুন্দর ভাষায় লেখা উত্তর সবসময় সঠিক উত্তর নয়। একটি সূত্র উল্লেখ করা মানেই সূত্রটি নির্ভরযোগ্য নয়। ফলে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগত দক্ষতাগুলোর একটি হবে যাচাই করার ক্ষমতা।কোন উৎস বিশ্বাসযোগ্য? কোন তথ্যের পেছনে প্রমাণ আছে? কোথায় পক্ষপাত কাজ করছে? কোথায় যুক্তির ফাঁক?এই বিচারবোধ তৈরি না হলে প্রযুক্তির যুগে একজন শিক্ষার্থী তথ্যসমৃদ্ধ হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানী নাও হতে পারে।আর এখানেই একজন শিক্ষকের দায়িত্ব আরও বড়। ইউনেস্কোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দক্ষতা কাঠামোতেও শিক্ষককে শুধু ‘এআই’ ব্যবহারকারী হিসেবে দেখা হয়নি বরং প্রযুক্তিকে কীভাবে মানবকেন্দ্রিক, নৈতিক ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে, সেই দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ‘এআই’ জানা যথেষ্ট নয় কিন্তু ‘এআই’ কোথায় ব্যবহার করতে হবে এবং কোথায় থামতে হবে, সেটিও জানতে হবে।বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই প্রশ্নটি খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।আমাদের শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই ‘এআই’ ব্যবহার করছে। কেউ অ্যাসাইনমেন্ট লিখছে, কেউ অনুবাদ করছে, কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আমরা কি তাদের শেখাচ্ছি কীভাবে এটি ব্যবহার করতে হবে?একজন শিক্ষার্থী যদি পুরো অ্যাসাইনমেন্ট ‘এআই’ দিয়ে লিখিয়ে জমা দেয়, তাহলে হয়তো সে সুন্দর একটি লেখা জমা দিল। কিন্তু সে কী শিখল?আবার বিপরীতভাবে ‘এআই’ নিষিদ্ধ করে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?সম্ভবত না।ক্যালকুলেটর আসার পরে গণিত বন্ধ হয়নি। ইন্টারনেট আসার পরে বই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি। একইভাবে ‘এআই’-কেও শিক্ষকের শত্রু  হওয়ার প্রয়োজন নেই। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি শিক্ষকের সহকারী হতে পারে। একজন শিক্ষক ‘এআই’ ব্যবহার করে একই বিষয়ের বিভিন্ন স্তরের পাঠ তৈরি করতে পারেন। দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য সহজ ব্যাখ্যা, অগ্রসর শিক্ষার্থীর জন্য কঠিন সমস্যা, ক্লাসের জন্য প্রশ্ন, উদাহরণ বা শেখানোর নতুন কৌশল বের করতে পারেন। ইউনেস্কোর শিক্ষক ও ‘এআই’-সংক্রান্ত আলোচনাতেও বলা হয়েছে, ‘এআই’ শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে তবে মানবিক বিচারবোধ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের জায়গা নিতে পারে না।তাই আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয় “এআই কি শিক্ষককে সরিয়ে দেবে?”বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত “এআই ব্যবহার করে একজন শিক্ষক কীভাবে আরও ভালো শিক্ষক হতে পারেন?”এ জন্য প্রথম প্রয়োজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ।আমরা শিক্ষার্থীদের নতুন প্রযুক্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারি না এমন শিক্ষকদের হাতে, যারা সেই প্রযুক্তির সুযোগ ও ঝুঁকি সম্পর্কে জানার সুযোগই পাননি। শিক্ষককে শুধু একটি সফটওয়্যার চালানো শেখালেই হবে না। তাকে বুঝতে হবে তথ্যের গোপনীয়তা, কপিরাইট, পক্ষপাত, ভুল তথ্য, একাডেমিক সততা এবং শিক্ষার্থীর অতিনির্ভরতার ঝুঁকি।আরেকটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। ‘এআই’-এর কারণে শিক্ষকের মানবিক দায়িত্ব কমবে না, বাড়বে। কারণ প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, শিশুর সামনে পৃথিবী তত দ্রুত খুলে যাবে। সে এমন বিষয় দেখবে, পড়বে, জানবে যা আগের প্রজন্ম অনেক পরে জানত। কিন্তু সে কি মানসিকভাবে সেই তথ্যের জন্য প্রস্তুত?তার সঙ্গে কে কথা বলবে? একজন ছাত্র পরীক্ষায় খারাপ করলে ‘এআই’ তাকে “কীভাবে ভালো ফল করতে হবে” তার দশটি পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু সে যখন মনে করে, “আমি আর পারব না” তখন তার পাশে একজন মানুষ দরকার।একজন শিক্ষক কখনও শুধু তো একটি বিষয়ের শিক্ষক নন। শিক্ষার্থীর জীবনের একটি সময়ে তিনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যাকে সে বিশ্বাস করতে শেখে।সেই সম্পর্কের মূল্য কোনো প্রযুক্তির মাপে ধরা কঠিন।আজ পৃথিবীতে শিক্ষকের প্রয়োজনও কমছে না। ইউনেস্কোর হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বে আরও প্রায় ৪৪ মিলিয়ন শিক্ষক প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষককে প্রশিক্ষিত, সমর্থিত এবং মর্যাদাবান রাখাকেও মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম শর্ত বলা হচ্ছে। এ তথ্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়।প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, পৃথিবী এখনো শিক্ষক খুঁজছে।তবে সেই শিক্ষককে বদলাতে হবে। আগামী দিনের শিক্ষককে সব উত্তর জানা মানুষ হতে হবে না। এমন দাবি এখন অবাস্তবও। তার চেয়ে বরং তাকে এমন একজন মানুষ হতে হবে, যিনি জানেন কোথায় উত্তর খুঁজতে হয়, কীভাবে তা যাচাই করতে হয় এবং কীভাবে শিক্ষার্থীকে নিজের উত্তর খুঁজে নিতে শেখাতে হয়।তাকে বলতে হবে “আমি জানি না, চল আমরা খুঁজে দেখি।”আর এই বাক্যটি হয়তো ভবিষ্যতের শিক্ষকতার অন্যতম সুন্দর বাক্য।কারণ একজন শিক্ষক যখন স্বীকার করেন যে শেখা কখনো শেষ হয় না, তখন তিনি শিক্ষার্থীকেও শেখান জ্ঞান মানে সব জানা নয়।জ্ঞান মানে শেখার সাহস রাখা। ‘এআই’ হয়তো একদিন আরও দ্রুত হবে। আরও নিখুঁত হবে। আমাদের ভাষা, অভ্যাস ও প্রয়োজন আরও ভালোভাবে বুঝবে।তবু একটি প্রশ্ন থেকে যাবে। কে একজন শিক্ষার্থীকে শেখাবে সততা? কে তাকে বলবে জ্ঞানকে অন্যের ক্ষতির জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়? কে বুঝিয়ে দেবে সফলতা শুধু নম্বর নয়? কে তার ব্যর্থতার দিনে তাকে মনে করিয়ে দেবে তার মূল্য একটি পরীক্ষার ফলের চেয়ে অনেক বড়?এসব প্রশ্নের উত্তর কোনো অ্যালগরিদমের মধ্যে পুরোপুরি ধরা যায় না। কারণ শিক্ষা শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। তাই ‘এআই’-এর যুগে শিক্ষককে বাঁচাতে প্রযুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে না। বরং শিক্ষককে প্রযুক্তির ওপরে তার সবচেয়ে বড় শক্তিটি ফিরে পেতে হবে মানুষকে বোঝার শক্তি।এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শুধু শিক্ষককে শুভেচ্ছা জানানোই যথেষ্ট নয়। আমাদের ভাবতে হবে, দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তির যুগে শিক্ষককে কীভাবে আরও দক্ষ, আরও স্বাধীন এবং আরও মানবিক ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করা যায়।কারণ ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘এআই’ থাকবে, প্রযুক্তি থাকবে, অসংখ্য ডিজিটাল সহায়তা থাকবে তবু শিক্ষার্থীর পাশে এমন একজন মানুষ প্রয়োজন হবে, যিনি শুধু তার উত্তর নয়, তার মানুষ হয়ে ওঠার পথটিও দেখবেন। ‘এআই’ উত্তর জানবে। কিন্তু শিক্ষার্থীর ভয়, স্বপ্ন, দ্বিধা, সম্ভাবনা আর নীরবতার ভাষা বুঝতে পাশে একজন মানুষই লাগবে। সেই মানুষটির নাম শিক্ষক।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, বরেন্দ্র কলেজ, রাজশাহী

মেধাতালিকায় প্রথম, নিয়োগে অনুপস্থিত

একজন শিক্ষার্থী যখন শৈশব থেকে পড়াশোনা শুরু করে, তখন তার সামনে থাকে একটি স্বপ্ন একদিন নিজের যোগ্যতায় নিজের একটি জায়গা তৈরি করবে। বছরের পর বছর বই পড়া, পরীক্ষা দেওয়া, ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করা এবং পরিবারের প্রত্যাশার সঙ্গে লড়াই করে যখন সে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেয়, তখন সেই পরীক্ষা তার কাছে শুধু একটি পরীক্ষা থাকে না; হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের মূল্যায়ন।প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-কে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই নতুন করে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে একজন প্রার্থীর মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন আসলে কোথায়?গত ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়েছিল। এর আগে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ৬৯ হাজার ২৬৫ জন মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে নির্বাচিতদের নিয়োগপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু ২৪ সেপ্টেম্বরের পর বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার তালিকা প্রকাশের সময় দেখা যায়, সুপারিশপ্রাপ্ত অনেক প্রার্থীর নামে নিয়োগপত্র ইস্যু করা হয়নি। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিভিন্নভাবে প্রায় দেড় হাজার প্রার্থীর বাদ পড়ার অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। তাদের বাদ দেওয়ার নির্দিষ্ট কারণও প্রকাশ্যে স্পষ্ট করা হয়নি; প্রার্থীদের অনেকে পুলিশ বা গোয়েন্দা যাচাইয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদনের কথা জানতে পেরেছেন।এই ঘটনাগুলোর মধ্যেই সামনে এসেছে তামান্না আক্তারের ঘটনা। তিনি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। নিজ উপজেলা চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণের মেধাতালিকায় তিনি প্রথম এবং পুরো চাঁদপুর জেলায় ১১তম হয়েছিলেন। তার দাবি, তিনি বা তার পরিবারের কেউ কোনো সময় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু ২৪ সেপ্টেম্বর তার নামে নিয়োগপত্র ইস্যু হয়নি। প্রতিবেদনে তার বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ ও এনএসআইয়ের ভেরিফিকেশনে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং তিনি এটিকে ‘পলিটিক্যাল ট্যাগ’-এর ফল হিসেবে দেখছেন।তামান্নার ঘটনা তাই শুধু একজন চাকরিপ্রার্থীর ব্যক্তিগত হতাশার গল্প নয়; এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে একজন মানুষ যদি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নিজের উপজেলায় প্রথম হন, তাহলে তার নিয়োগ আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কারণটি কি তার কাছে স্পষ্ট হওয়া উচিত নয়?সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই থাকা স্বাভাবিক। রাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠানে কাদের নিয়োগ দিচ্ছে, সে বিষয়ে আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করতেই পারে। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জনের পূর্বকার্যকলাপ, কাগজপত্র ও নথি যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছিল।কিন্তু যাচাইয়ের প্রশ্নের পাশাপাশি স্বচ্ছতার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে সেই আপত্তির ভিত্তি কী? কোন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? তথ্যটি কতটা নির্ভুল? সংশ্লিষ্ট প্রার্থী কি নিজের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন? ভুল তথ্য থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ আছে কি?বিশেষ করে যদি কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক মতাদর্শ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পুরোনো কোনো পোস্ট কিংবা পরিবারের কোনো সদস্যের রাজনৈতিক পরিচয়কে তার নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই ব্যক্তির নিজের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অন্যের রাজনৈতিক অবস্থানকে কীভাবে যুক্ত করা হলো?একজন মানুষের পরিবারে ভিন্নমতের মানুষ থাকতে পারেন। আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক মত তার নিজের মতের সঙ্গে এক নাও হতে পারে। তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজের কর্মকাণ্ড, নির্দিষ্ট প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনকে আলাদা করে দেখা জরুরি।এখানে ‘মেধা’ এবং ‘ভেরিফিকেশন’কে একে অপরের বিপরীতে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। একজন প্রার্থী পরীক্ষায় ভালো করেছেন এটি তার যোগ্যতার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। আবার রাষ্ট্রের আইনগত যাচাইয়ের প্রয়োজন থাকলে সেটিও হতে পারে। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই প্রশ্ন হলো—মানদণ্ডটি কী এবং সেটি কি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?একজন প্রার্থীর জন্য একটি সরকারি চাকরি শুধু একটি চাকরি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের বহু বছরের আশা, আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ। তাই বছরের পর বছর পড়াশোনা করে পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনের পর শেষ মুহূর্তে নিয়োগ আটকে গেলে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা তৈরি হয় শুধু সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার মাধ্যমেও। একজন নাগরিক যদি জানেন যে তার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তিনি কারণ জানতে পারবেন, নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন এবং ভুল হলে প্রতিকার চাইতে পারবেন, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তার আস্থা বাড়বে।তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কে চাকরি পেলেন, কে পেলেন না’ এখানে থেমে থাকা উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত কেন পেলেন না?যে প্রার্থী পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে সেই আপত্তির ভিত্তি কী? কোন প্রমাণের ভিত্তিতে তার নিয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছে? তাকে কি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে? একই মানদণ্ড কি প্রত্যেক প্রার্থীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে?(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

মৃত্যু নিয়ে উল্লাসের অমানবিক সংস্কৃতি

শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা। বাগেরহাটের মোল্লাহাটে কোদালিয়া ইউনিয়নের কচুড়িয়া মধ্যপাড়ায় একটি পানের বরজের পাশ থেকে পলিথিনে মোড়ানো বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হলো ৬ বছরের শিশু মুসলিমার গলাকাটা মরদেহ। বিকেলে বাড়ির আশপাশে সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে খেলছিল মেয়েটি। একপর্যায়ে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিহত মুসলিমা কচুড়িয়া গ্রামের ইসলাম শেখের মেয়ে। এই খবরটি কোনো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পারেনি। কেন পারেনি? কারণ আমরা এখন প্রতিদিনই এমন বস্তাবন্দি লাশ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে ভয়ংকর।ঠিক একই রকম অভ্যস্ততার শিকার হতে যাচ্ছিল ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাও। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিকেল ৩টা ১২ মিনিটে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা জঙ্গলে তাকে ডেকে নিয়ে যায় পরিচিত চারজন—তুহিন (১৯), ফাহাদ (১৫), কামরুল (১৬) ও সিয়াম (১৯)। পুলিশের ভাষ্য, একটি আইফোন ছিনতাইয়ের জন্য তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়। ছেলেটি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের সন্তান। ছবিতে যে মুখটি দেখা যায়—ফর্সা, ফুটফুটে, হাসিমাখা—তা দেখলে হৃদয় গলে যায়। এই বয়সে তো তার খেলার মাঠে থাকার কথা, মায়ের হাত ধরে স্কুল থেকে ফেরার কথা।এখানেই কঠিন প্রশ্নটি আসে। আসল ঘটনা কি শুধু মোবাইল? ১৩ বছরের শিশুর হাতে দামি আইফোন কেন? সে নির্জন পাহাড়ে ছবি তুলতে যাবে কেন? তার চেয়ে ৬ বছরের বড় তরুণদের সঙ্গে ঘুরবে কেন? তার লেখাপড়ার খোঁজ কতটা রাখা হচ্ছিল? সে কি মেধাবী ছাত্র ছিল, নাকি মা-বাবার অমনোযোগে বখাটে ছেলেদের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছিল? এটা মা-বাবাকে দোষারোপ নয়, আত্মসমালোচনা। আমরা সন্তানের হাতে ফোন তুলে দিয়ে দায়িত্ব শেষ ভাবি। কিন্তু ফোন তাকে কোন অন্ধকার জগতে টানছে, তার খোঁজ রাখি না। অপ্রতিমের ক্ষেত্রে সেই অবহেলার ছাপ আছে বলেই পুলিশ বলছে, বখাটে তরুণদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠেছিল। শিশুর হাতে আইফোন এখন বিলাসিতা নয়, বিপদ। মুসলিমার ক্ষেত্রেও একই—৬ বছরের শিশুকে বিকেলে খোলা মাঠে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো নিরাপত্তাবলয় নেই।এই হত্যা নিয়ে বিতর্ক আরেক দিকে মোড় নিয়েছে তার মায়ের রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে। ড. নাহিদা বেগম জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি আন্দোলনে অংশ নিতেই পারেন। কিন্তু অভিযোগ আছে, সেই সময় ও ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মৃত্যু নিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত অশালীন ভাষায় উপহাস করেছেন। এখন তার সন্তানের মৃত্যুতে আওয়ামী লীগের পক্ষের কিছু মানুষ প্রতিশোধমূলক ও অমানবিক মন্তব্য করছে। এই প্রতিশোধমূলক কথাবার্তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি শিশুর মৃত্যু নিয়ে উল্লাস সভ্য সমাজে চলতে পারে না। কিন্তু যাদের পরিবারের সদস্যরা জুলাই আন্দোলনে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বা এখন খুন হয়েছেন, তাদের কান্না যখন উপহাসের শিকার হয়, তখন তাদের ক্ষোভ থামানো কঠিন। আপনি যদি অন্যের সন্তানের লাশ নিয়ে উল্লাস করেন, তাহলে নিজের সন্তানের লাশের সামনে সংযম আশা করার নৈতিক জোর থাকে না।এই প্রতিহিংসার চক্র আজ হঠাৎ তৈরি হয়নি। জুলাই আন্দোলনের সময় থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যা, পিটিয়ে মারা, আগুন দিয়ে পোড়ানোর যে সংস্কৃতি শুরু হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা মব হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তখন প্রকাশ্যে বলা হয়েছে, মব করুন, আওয়ামী লীগের লোকদের ধরে নির্যাতন করুন। আর একদল মানুষ আলহামদুলিল্লাহ বলেছে। সেই মব নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলেও থামেনি, বরং আরও বেপরোয়া হয়েছে। আজ আওয়ামী লীগের লোক মরলে কাল সাধারণ শিশু মরছে। মুসলিমার মরদেহ উদ্ধারের পর বিক্ষুব্ধ জনতা যেমন পানের বরজের মালিকের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে, তেমনি প্রতিটি মৃত্যুর পর আমরা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছি। হত্যার লাইসেন্স একবার দিলে তা আর দল দেখে না। ঘুরে ঘুরে সবার ঘরে ঢোকে। অপ্রতিম ও মুসলিমা তারই শিকার।অপ্রতিম বা মুসলিমা একা নয়। এই সময়ে শিশুর মৃত্যু সর্বত্র। হামে এ বছর হাজারের বেশি শিশু মারা গেছে। এটা টিকার অবহেলায় এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা। এই দায় ড. মোহাম্মদ ইউনূস এবং তার অন্তর্বর্তী সরকারের। পুলিশের তথ্য বলছে, এ বছর ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে। যদিও বেশির ভাগ ফিরে এসেছে, তবু ২ হাজারের বেশি এখনও নিখোঁজ। এটা কি কোনো সুস্থ সমাজের পরিচায়ক? রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে তালাবদ্ধ ঘরে শ্বাসরোধ করে হত্যার মতো বীভৎস ঘটনা, যেখানে ১২ বছরের শিশু আয়ুষও ছিল, তা আমাদের সমাজের অধঃপতনই দেখায়। মাদারীপুরে এক কলেজছাত্রকে মোবাইলের জন্য প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, গাজীপুরে এক গার্মেন্টসকর্মীকে বাড়ি ফেরার পথে মেরে ফেলা, রাজশাহীতে এক বৃদ্ধ রিকশাচালককে ২০০ টাকার জন্য হত্যা করে ড্রেনে ফেলে রাখা—এমন শত শত খুন প্রতিনিয়ত হচ্ছে।এই অধঃপতন চলতে থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে বর্তমান বিএনপি সরকারেরই। একদিকে তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের চরম সংকট, দফায় দফায় দাম বাড়ছে, অন্যদিকে ছিনতাই, রাহাজানি, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না, জিডিপি প্রবৃদ্ধি খুব কম, প্রতিদিন মানুষ কর্মহীন হচ্ছে। ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ফেরার নিশ্চয়তা নেই। খুন আওয়ামী লীগ আমলেও হয়েছে, কিন্তু এত ব্যাপক ও বীভৎস ছিল না। সরকার চলছে ঋণের ওপর। দেশে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা থাকলে কোনো উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করতে আসবে না। মবই যখন আইন, তখন বিনিয়োগ আসে না। রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।এত হত্যার পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলে চলেছেন, আগের যেকোনো আমলের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা ভালো। সমস্যা স্বীকার না করলে সমাধান হবে কীভাবে? অপ্রতিমের হত্যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমরা একটি প্রতিশোধপরায়ণ সমাজ বানিয়েছি, যেখানে অন্যের মৃত্যুতে উল্লাস করা যায়, আর নিজের সন্তানের মৃত্যুতে আমরা ন্যায়বিচার চাই। এই দ্বিচারিতা থেকে বের হতে হবে। মুসলিমার জন্য, অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু তুহিন-ফাহাদ বা জাহাঙ্গীরদের শাস্তি নয়। ন্যায়বিচার মানে সেই মব সংস্কৃতির বিচার, যা তাদের খুন করতে শিখিয়েছে। ন্যায়বিচার মানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মৃত্যু নিয়ে উপহাস বন্ধ করা। না হলে আজ অপ্রতিম, কাল মুসলিমা, পরশু আপনার সন্তান। লাশের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো উন্নয়ন হয় না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

নারীর কর্মসংস্থানে বাধা কোথায়

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত নারীদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী। সংখ্যাটি শুধু শ্রমবাজারের পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার, কর্মসংস্কৃতি এবং উন্নয়নের ধারণার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রতিফলন। গত কয়েক দশক ধরে আমাদের বলা হচ্ছে, নারী শিক্ষা বেড়েছে, মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, পরীক্ষার ফল ভালো করছে, পেশাগত দক্ষতা অর্জন করছে। কিন্তু শিক্ষার দরজা পেরিয়ে কর্মক্ষেত্রের দরজায় এসে যদি অধিকাংশ নারী থেমে যান, তাহলে আমরা তাদের কীসের জন্য শিক্ষিত করছি?আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘দ্য জেন্ডার পে গ্যাপ ইন বাংলাদেশ: ট্রেন্ডস, কজেস অ্যান্ড পলিসি অপশনস’ প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের এই বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী হলেও তাদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী। একই সময়ে ২০২৩ সালে পুরুষের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ, নারীর ৪০ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেই ব্যবধান ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ।এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ৫ শতাংশ নয়, বরং বাকি ৯৫ শতাংশ। তারা কি কাজ করতে চান না? নাকি তাদের কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়নি? দুটো প্রশ্ন এক নয়। একটি সমাজ যদি শিক্ষিত নারীর বড় অংশকে শ্রমবাজারের বাইরে রাখে, তবে সেই অনুপস্থিতিকে ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ বলে ব্যাখ্যা করা সহজ। কিন্তু তাতে সমস্যার কাঠামোগত চরিত্রটি আড়াল হয়ে যায়।শিক্ষা যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং পেশাগত পরিচয়ে রূপান্তরিত না হয়, তাহলে শিক্ষার সামাজিক সুফল অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একজন শিক্ষিত নারী চাকরি করতে চাইলেন, কিন্তু শিশুর যত্ন, নিরাপদ যাতায়াত, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ কিংবা পরিবারের প্রত্যাশা তাকে নিরুৎসাহিত করল। আরেকজন নারী হয়তো চাকরি পেলেন, কিন্তু এমন পেশায় যেখানে তার শ্রমের মূল্য কম। এই ঘটনাগুলো আলাদা মনে হলেও বাস্তবে একই কাঠামোর ভিন্ন প্রকাশ।শ্রমের মজুরি ব্যবধান এই সমস্যাকে আরও গভীর করে। আইএলওর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যবেক্ষণযোগ্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও নারী ও পুরুষের উপার্জনে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান থাকে। সামগ্রিকভাবে নারীরা পুরুষের তুলনায় গড়ে ২২ থেকে ২৫ শতাংশ কম আয় করেন। সহজভাবে বলতে গেলে, পুরুষ যদি এক হাজার টাকা আয় করেন, নারীর আয় দাঁড়ায় প্রায় ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকা। তবে এই ব্যবধান সব ক্ষেত্রে একই থাকে না। পেশা, খাত, কর্মঘণ্টা, কাজের ধরন ও কর্মসংস্থানের বৈশিষ্ট্যও মজুরি নির্ধারণ করে।আইএলওর তথ্যমতে, মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানে থাকা নারীদের ৪১ শতাংশ উৎপাদন খাতে কাজ করেন, পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২৩ শতাংশ। নারীদের আরও ১৯ শতাংশ গৃহস্থালি কাজে এবং ১২ শতাংশ শিক্ষা খাতে নিয়োজিত। অর্থাৎ শ্রমবাজারে নারীর প্রবেশ ঘটলেও তাদের অবস্থান সমান ক্ষমতা বা সমান আয়ের জায়গায় হচ্ছে না। পোশাকশিল্পে নারীর বিপুল উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু উৎপাদন লাইনে নারীর সংখ্যা বেশি হওয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নারীর উপস্থিতি বেশি হওয়া এক বিষয় নয়।ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের পরিসংখ্যানটি তাই বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। দেশে ব্যবস্থাপনা পদে থাকা ব্যক্তিদের মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশ নারী। দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার ১০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বৈশ্বিক গড় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ নারী শুধু শ্রমবাজারে কম প্রবেশ করছেন না, প্রবেশ করলেও নেতৃত্বের সিঁড়িতে ওপরে ওঠার পথ সংকীর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মী অনেক থাকতে পারেন, কিন্তু যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পদে তাদের উপস্থিতি সামান্য হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার কাঠামো কতটা বদলেছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।নারীর কর্মসংস্থান বাড়াতে আমরা প্রায়ই দক্ষতা উন্নয়নের কথা বলি। দক্ষতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সব সমস্যার সমাধান প্রশিক্ষণ নয়। একজন নারীকে আরও একটি প্রশিক্ষণ দিয়ে যদি তাকে একই অনিরাপদ, কম মজুরির এবং সীমিত উন্নতির চাকরিতে পাঠানো হয়, তবে তার দক্ষতা বাড়বে, কিন্তু শ্রমের মূল্য বাড়বে না। দক্ষতার পাশাপাশি দরকার কাজের মান, মজুরি কাঠামো, নিরাপত্তা, পদোন্নতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রবেশাধিকার।আরও বড় অদৃশ্য বাধা রয়েছে ঘরের ভেতরে। বেতনভোগী নারীরা সপ্তাহে গড়ে ২৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন, পুরুষেরা করেন ৭ দশমিক ৬ ঘণ্টা। বেতনভোগী ও গৃহস্থালি কাজ মিলিয়ে নারীদের সাপ্তাহিক কাজের সময় দাঁড়ায় ৭৩ দশমিক ৭ ঘণ্টা, পুরুষদের ৫৯ ঘণ্টা। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার পরও নারীর দ্বিতীয় কর্মদিবস শেষ হয় না। অফিস থেকে ফিরে তার আরেকটি কর্মক্ষেত্র অপেক্ষা করে। সেই কাজের কোনো বেতন নেই, ছুটি নেই, পদোন্নতি নেই, বার্ষিক মূল্যায়ন নেই।একজন পুরুষের কর্মজীবনকে স্বাভাবিক পেশাগত যাত্রা এবং একজন নারীর কর্মজীবনকে পারিবারিক সমঝোতার ফল হিসেবে দেখা হয়। এর প্রভাব নিয়োগ থেকে পদোন্নতি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। সন্তান হবে, মাতৃত্বকালীন ছুটি লাগবে, পরিবারে যত্নের দায়িত্ব থাকবে, তাই নারী হয়তো কম সময়ের কাজ বেছে নেবেন বা ক্যারিয়ারের মাঝপথে বিরতি নেবেন। এরপর সেই বিরতিই আবার তার কম আয় বা পদোন্নতি না পাওয়ার যুক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে।এটি এক ধরনের চক্র। সমাজ নারীর ওপর পারিবারিক যত্নের দায়িত্ব যত বেশি দেয়, শ্রমবাজারে তার অংশগ্রহণ তত সীমিত হয়। অংশগ্রহণ সীমিত হলে অভিজ্ঞতা ও আয় কমে। আয় কম হলে পারিবারিক সিদ্ধান্তে তার অংশগ্রহণের ক্ষমতাও কমে যায়। তারপর বলা হয়, নারীর চাকরি না করাই হয়তো পরিবারের জন্য সুবিধাজনক। অর্থাৎ যে বাধা আমরা তৈরি করেছি, পরে সেটিকেই নারীর পছন্দ হিসেবে ব্যাখ্যা করি।বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেয় এবং শ্রম আইনেও সমান মজুরি ও কর্মপরিবেশের বিধান রয়েছে। কিন্তু কাগজে অধিকার থাকা এবং কর্মক্ষেত্রে তার বাস্তব মূল্য পাওয়া এক বিষয় নয়। আইএলও বলছে, সমান মজুরির বিধানের বাস্তব প্রয়োগ সীমিত। ন্যূনতম মজুরি কাঠামো সব খাতকে সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করে না। নারীর অংশগ্রহণ বেশি এমন কাজের মূল্যায়নে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত যথেষ্টভাবে বিবেচিত হয় না।এখানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নিয়োগকর্তারও দায় আছে। বেতন নির্ধারণ যদি অস্বচ্ছ হয়, পদোন্নতির মানদণ্ড যদি অস্পষ্ট হয়, একই ধরনের কাজের মূল্যায়ন যদি ভিন্নভাবে করা হয়, তাহলে আইন থাকা সত্ত্বেও বৈষম্য শনাক্ত করা কঠিন। তাই শুধু সমান মজুরির ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বেতন কাঠামোয় স্বচ্ছতা, কাজের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, শক্তিশালী শ্রম পরিদর্শন এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। আইএলওর সাম্প্রতিক নীতিগত আলোচনাতেও বেতন কাঠামোর স্বচ্ছতা, বস্তুনিষ্ঠ কাজের মূল্যায়ন, সামাজিক সুরক্ষা, পরিচর্যা নীতি এবং শ্রম পরিদর্শনের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।তবে এই সমস্যাকে কেবল নারীর সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একজন শিক্ষিত নারী যখন শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন না, তখন শুধু তার ব্যক্তিগত আয় হারায় না; দেশ হারায় তার দক্ষতা, করদাতা হিসেবে সম্ভাব্য অবদান, উৎপাদনশীলতা এবং উদ্ভাবনের সুযোগ। একজন মেধাবী নারী যদি বছরের পর বছর ঘরের অবৈতনিক কাজে আটকে থাকেন, তার শিক্ষা ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে জাতীয় সম্পদে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে নারী কর্মসংস্থান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্নও বটে।আমাদের উন্নয়নের ভাষাতেও তাই পরিবর্তন দরকার। শুধু কতজন মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো, কতজন পাস করল, কিংবা কতজন নারী শ্রমবাজারে ঢুকলেন, তা দিয়ে অগ্রগতি মাপা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে তারা কোন পেশায় ঢুকছেন, কত আয় করছেন, কত ঘণ্টা কাজ করছেন, নিরাপত্তা কেমন, পদোন্নতির সুযোগ কতটা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় কতজন পৌঁছাচ্ছেন। সংখ্যায় অংশগ্রহণ বাড়লেও যদি নারীরা নিচের সারিতে আটকে থাকেন, তাহলে সেটি পূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নয়।একটি দেশ যদি তার উচ্চশিক্ষিত নারীদের ৯৫ শতাংশের বড় অংশকে শ্রমবাজারের বাইরে রেখে দেয়, তবে সেটি শুধু অসমতাই নয়, এটি অর্থনৈতিক অপচয়ও। যে সমাজ মেয়েদের দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে বিনিয়োগ করে, কিন্তু কর্মজীবনে তাদের জায়গা দিতে পারে না, সে সমাজ নিজের তৈরি মানবসম্পদের একটি বড় অংশ ব্যবহার না করেই এগিয়ে যেতে চায়। আর যে নারী একই সঙ্গে চাকরি ও ঘরের কাজ করেন, কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই তার শ্রমের মূল্য কম, তার কাছে সমতা শব্দটি কোনো অর্থ বহন করে না।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নারীরা কাজ করবেন কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, তারা কেন কাজের বাইরে থাকবেন, কেন কম মজুরির কাজে বেশি থাকবেন, কেন নেতৃত্বে এত কম থাকবেন এবং কেন ঘরের কাজের ভার তাদের কাঁধেই বেশি থাকবে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বদলাতে পারলেই ৫ শতাংশের পরিসংখ্যানটি কেবল একটি হতাশাজনক সংখ্যা হয়ে থাকবে না; এটি একটি পুরোনো শ্রমবাজারকে নতুন করে ভাবার সূচনা হতে পারে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রভাষক, ইংরেজি ও আধুনিক ভাষা বিভাগ, আইইউবিএটি]

ফুটপাত দখলের নেপথ্যের শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে

রাজধানীর ফুটপাত দখল নতুন কোনো সমস্যা নয়। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযানও চালানো হয়। কিন্তু ফুটপাত আবার দখল হয়ে যায়। অভিযোগ আছে, ফুটপাত দখলের পেছনে একটি শক্তিশালী চক্র কাজ করে। রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মী, সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে হকারদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হলে দখল-চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণের হাত বদল হয় শুধু। দখল ও চাঁদাবাজির ব্যবস্থা ঠিকই থেকে যায়।অভিযোগ আছে, গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় ফুটপাতকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা চাঁদা ওঠানো হয়। বিভিন্ন ফুটপাতে ভাসমান অনেক দোকান বসে। দোকানের আকার অনুযায়ী দৈনিক চাঁদা নেওয়া হয়। কোথাও আবার বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য আলাদা টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়।ফুটপাত দখলের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ পথচারী। অনেক সময় ফুটপাতে জায়গা না পেয়ে তাদের ঝুঁকি নিয়ে সড়কে নেমে হাঁটতে হয়। আবার এটাও সত্য যে, হকাররা জীবিকার জন্য ফুটপাতে বসেন। তাই সমস্যার সমাধানে তাদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে তাদের উচ্ছেদ করলেই সমস্যার টেকসই সমাধান হবে না।ফুটপাতকে কেন্দ্র করে দখল ও চাঁদাবাজির যে ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে সেটা ভাঙা জরুরি। নইলে অভিযান চালিয়ে আজ কিছু হকার উচ্ছেদ করলে কিছুদিন পর আবার তারা ফিরে আসবে বা নতুন হকার ফুটপাতে বসবে। তাই ফুটপাতে বসা দোকানপাট থেকে কারা চাঁদা আদায় করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। দখল-চাঁদাবাজির পৃষ্ঠপোষক ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে আমলে নেওয়া চলবে না।ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ নীতি থাকা প্রয়োজন। কোথায় হকার বসতে পারবে, কোথায় পারবে না, তা স্পষ্ট করতে হবে। বৈধভাবে ব্যবসার সুযোগ থাকলে তার ব্যবস্থাও করতে হবে। ফুটপাত দখলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

বেলকুচি অটিজম স্কুল দ্রুত চালু হোক

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের সামাজিকীকরণ, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশও প্রয়োজন। সিরাজগঞ্জের বেলকুচি অটিজম স্কুল এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিল। দীর্ঘদিন ধরে স্কুলটি বন্ধ থাকায় ১০৮ জন শিশু শিক্ষা ও সামাজিক বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ নিয়ে সংবাদ-এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।২০১৪ সালে বেলকুচি সদর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে স্কুলটির কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি এলাকার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। পাঠদানের পাশাপাশি খেলাধুলা, সামাজিক মেলামেশা ও বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেত শিশুরা। এসব কার্যক্রম তাদের আচরণগত উন্নয়ন ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করত। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অনেক শিশুর পক্ষে সাধারণ বিদ্যালয়ের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া কঠিন। তাই তাদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। দীর্ঘদিন স্কুলের বাইরে থাকায় অনেক শিশু এখন ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছে। শিক্ষা ও সামাজিক মেলামেশা থেকে দূরে থাকায় তাদের স্বাভাবিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ থাকায় সেখানকার শিক্ষক ও কর্মচারীও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অব্যবহৃত পড়ে আছে শিক্ষা উপকরণ।বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা ও সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বেলকুচি অটিজম স্কুলটি দ্রুত চালুর জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক্ষত্রে কোনো জটিলতা থাকলে তার দ্রুত সমাধান করতে হবে।

শিশু-কিশোরের হাতে গাড়ি ও আইফোন: করুণ পরিণতির দায়

একজনের বয়স ১৭। আরেকজনের ১৩। একজন গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে দুর্ঘটনায় একজন শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনায় এখন শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে। অন্যজন মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়ে আর ঘরে ফেরেনি। পরে উদ্ধার হয়েছে তার মরদেহ।আলাদা দুটি ঘটনা। প্রেক্ষাপটও আলাদা। কিন্তু দুটিই আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়—শিশুদের হাতে আমরা কতটা ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও প্রযুক্তি তুলে দিচ্ছি, আর সেই সঙ্গে কতটা দায়িত্ব, সীমারেখা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি?বারিধারার ঘটনায় ১৭ বছরের কিশোরটির বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে। তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় ঘটনার পূর্ণ সত্য বেরিয়ে আসবে। একইভাবে অপ্রতিমের মৃত্যুর কারণ, কীভাবে তার মৃত্যু হলো এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত— সেটিও তদন্তেই নিশ্চিত হবে। তাই কোনো ঘটনার পুরো সত্য জানার আগে কাউকে দায়ী করে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এই ঘটনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে। বরং প্রশ্ন তোলাই জরুরি।গাড়ি, দামি ফোন— কিন্তু দায়িত্ববোধ?একটি গাড়ি শুধু একটি যানবাহন নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে চালকের দক্ষতা, বয়স, আইন মানার সক্ষমতা এবং অন্য মানুষের জীবনের প্রতি দায়িত্ববোধ। একইভাবে একটি স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়। এটি শিশুর সামনে খুলে দেয় বিশাল এক ভার্চুয়াল জগৎ— বন্ধুত্ব, বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগ, অজানা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, নানা ধরনের কনটেন্ট এবং কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কের দরজাও।সন্তানের হাতে গাড়ি বা আইফোন দেওয়া যাবে কি না— প্রশ্নটা শুধু এতটুকু নয়। প্রশ্ন উঠেছে- সন্তানের বয়স, মানসিক পরিপক্বতা, দায়িত্ববোধ এবং নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে অভিভাবকরা কীভাবে এসব সুবিধা দিচ্ছেন? সবচেয়ে কঠিন জায়গা এখানেই। সন্তানকে ভালোবাসা মানে তার প্রতিটি চাওয়া পূরণ করা নয়। কখনো ভালোবাসার অর্থ ‘হ্যাঁ’, আবার কখনো ভালোবাসার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শব্দটি ‘না’।অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের কী শেখায়?১৩ বছরের অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়েছিল। এরপর সে আর বাড়ি ফেরেনি। প্রায় ২০ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যুর পেছনে কী ঘটেছিল, কারা জড়িত ছিল— এসব তদন্তের বিষয়। কিন্তু একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের উৎকণ্ঠা এবং তাকে খুঁজে বের করার প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের ভাবায়।একটি শিশু যখন বাড়ি থেকে বের হয়, তার সঙ্গে কে আছে— আমরা কি জানি? সে কোথায় যাচ্ছে— আমরা কি সেটা জানি? তার বন্ধুরা কারা— সে খোঁজ কি নিয়েছি? এছাড়া সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে— সেসব বিষয়ে কোনো নজরদারি আমরা কি করছি? সে নিয়মিত কোথায় আড্ডা দেয়, কোন জায়গাগুলোতে যায়, তার চেয়ে বয়সে অনেক বড় কারও সঙ্গে মেলামেশা করছে কি না— এসব বিষয়ে আমরা কখনো তার সঙ্গে কথা বলি? এসব প্রশ্নের অর্থ এই নয় যে সন্তানকে সারাক্ষণ সন্দেহ করতে হবে। বরং এর অর্থ হলো— সন্তানের জীবনে অভিভাবকের উপস্থিতি থাকতে হবে।শুধু ‘পুলিশের দায়িত্ব’ বললেই কি শেষ?পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই— গত ৭ মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ জন শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। কিন্তু ২ হাজার ৩৮ জন শিশুর এখনো সন্ধান মেলেনি।এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার আছে। একজন মা আছেন, যিনি সন্তানের অপেক্ষায় দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন। একজন বাবা আছেন, যিনি হয়তো প্রতিদিন থানায় যোগাযোগ করছেন। ভাই-বোন আছে, যারা অপেক্ষা করছে— একদিন হয়তো দরজা খুলে তাদের আপনজন ফিরে আসবে।নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছবি, সর্বশেষ অবস্থান, মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য— যত দ্রুত এসব তথ্য কাজে লাগানো যায়, শিশুকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তত বাড়তে পারে। এ কারণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে দ্রুত, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক অনুসন্ধান নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে পরিবারকেও জানতে হবে, নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত কী পদক্ষেপ নিতে হবে।অভিভাবকের দায়িত্ব কোথায়?সন্তানকে ‘চোখে চোখে রাখা’ মানে তাকে বন্দি করে রাখা নয়। তার ব্যক্তিগত পরিসর ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মান রেখেই নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়। প্রথম কাজ সন্তানের বন্ধুদের চিনুন।সে কার সঙ্গে সময় কাটায়, তাদের বয়স কত, কোথায় যায় সেসব জানুন। সন্তানের বন্ধুদের সম্পর্কে জানতে চাওয়া মানেই তাদের ওপর অবিশ্বাস করা নয়। বরং সন্তানের নিরাপত্তার জন্য এটি স্বাভাবিক দায়িত্ব।দ্বিতীয়ত প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে জানুন। সন্তান কোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে, কী ধরনের ভিডিও দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে— এসব নিয়ে বন্ধুর মতো কথা বলতে হবে। শুধু ফোন কেড়ে নেওয়া বা বকাঝকা করলে অনেক সময় শিশু আরও গোপনীয় হয়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ম পরিবারেই স্পষ্ট হওয়া দরকার।তৃতীয় কাজ হলো তার বয়স অনুযায়ী সীমারেখা তৈরি করুন। যে বয়সে গাড়ি চালানোর অনুমতি নেই, সে বয়সে গাড়ির চাবি তুলে দেওয়া শুধু স্বাধীনতা নয়, অন্য মানুষের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। একইভাবে দামি ফোন দেওয়ার আগে ভাবতে হবে, শিশুটি সেটি ব্যবহারের দায়িত্ব ও ঝুঁকি বোঝে কি না।চতুর্থত তাকে সময় দিন। দামি স্কুল, পোশাক, ফোন, খেলনা কিংবা গাড়ি সন্তানের প্রয়োজনের একটি অংশ হতে পারে। কিন্তু সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তার কথা শোনা এবং তার পরিবর্তনগুলো বোঝার বিকল্প কোনো বস্তুগত সুবিধা হতে পারে না। প্রতিদিন কিছু সময় শুধু সন্তানের জন্য রাখা যেতে পারে। সেই সময়ে জিজ্ঞাসাবাদ নয়, কথা হোক। সে কী ভাবছে, কী নিয়ে আনন্দিত, কী নিয়ে ভয় পাচ্ছে, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে— এসব জানার চেষ্টা করা জরুরি।শুধু পরিবার নয়, সমাজেরও দায় আছেএকটি শিশুর নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু মা-বাবার নয়। স্কুল, শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী— সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।শিশুর আচরণে হঠাৎ বড় পরিবর্তন, অস্বাভাবিক বন্ধুত্ব, বাড়ির বাইরে দীর্ঘ সময় কাটানো, ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় যাতায়াত বা অনলাইনে অস্বাভাবিক যোগাযোগ— এসবকে শুধু ‘বয়সের দোষ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। আবার কোনো শিশুকে বিপথে যাওয়ার আশঙ্কা দেখলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও ঠিক নয়। শিশুর ক্ষেত্রে প্রয়োজন নজরদারির পাশাপাশি সহমর্মিতা, কাউন্সেলিং, শিক্ষা এবং নিরাপদ পরিবেশ।অপ্রতিমরা ফিরবে না, কিন্তু প্রশ্ন থাকবেঅপ্রতিম আর ফিরবে না। তার পরিবারের শোক কোনো ভাষায় পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা হয়ে থাকতে পারে— যদি আমরা শিক্ষা নিতে চাই।একইভাবে বারিধারার ঘটনায় ১৭ বছরের এক কিশোরের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং কীভাবে এলো, সেটিও তদন্তের পাশাপাশি অভিভাবক, সমাজ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।শিশুর হাতে গাড়ি তুলে দেওয়ার আগে আমরা কি তার দায়িত্ববোধ যাচাই করেছি? তার হাতে দামি স্মার্টফোন দেওয়ার আগে আমরা কি তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা শিখিয়েছি? সন্তান বাইরে গেলে সে কার সঙ্গে আছে, কোথায় আছে- সেসব বিষয়ে খোজ কী রাখছি? আর সবচেয়ে বড় কথা, সন্তানকে বাবা-মায়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কথা বলার মতো নিরাপদ পরিবেশ কি আমরা তৈরি করেছি?সন্তানকে ভালোবাসা মানে শুধু তার চাহিদা পূরণ করা নয়। ভালোবাসা মানে প্রয়োজনের সময় সীমা টেনে দেওয়া, ভুল থেকে ফিরিয়ে আনা, বিপদের আগে সতর্ক করা এবং এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যাতে বিপদে পড়লে সে সবার আগে মা-বাবার কাছেই ফিরে আসে।একটি আইফোন সন্তানের হাতে দেওয়া যায়, কিন্তু তার সঙ্গে দায়িত্ববোধ না দিলে সেটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। গাড়ির চাবি দেওয়া যায়, কিন্তু আইন ও জীবনের মূল্য না শেখালে সেটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে আমরা তাদের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু সেই পৃথিবীতে কীভাবে নিরাপদে চলতে হয়— সেটিও শেখাতে হবে। কারণ সন্তানকে চোখে চোখে রাখা মানে তাকে বন্দি করা নয়; তাকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব নেওয়া।অপ্রতিমের পরিবারের কান্না যেন শুধু একটি পরিবারের কান্না হয়ে না থাকে। বারিধারার ঘটনাও যেন কেবল একটি মামলার নথিতে আটকে না যায়। এই ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের প্রত্যেক মা-বাবার অন্তত একবার ভাবা উচিত— সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কী দেখে, কী করে? এছাড়া কোন কারণে বিপদে পড়লে, সে কি আমাকে সবকিছু সাহস করে বলতে পারবে?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে সচেতনভাবে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প অভিভাবকদের নেই।লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

বাংলাদেশের রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থার আয়না ফুটপাত

ঢাকার কোনো ব্যস্ত ফুটপাতে দাঁড়ালে একই সঙ্গে দুটি ছবি দেখা যায়। একদিকে পথচারীর ভিড়, যানজট, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার অসুবিধা। অন্যদিকে সারি সারি ছোট দোকান, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি, চা-নাশতার দোকান, কাপড়, জুতা, ফল, খেলনা কিংবা নানা রকম পণ্যের পসরা। একজনের কাছে এটি চলাচলের পথ, আরেকজনের কাছে সেটিই তার দোকান, সংসারের আয় এবং বেঁচে থাকার অবলম্বন।এই দুই বাস্তবতার মধ্যে দ্বন্দ্ব নতুন নয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ফুটপাতের সমস্যাটি শুধু নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, গ্রাম থেকে শহরে মানুষের আসা, রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো এবং চাঁদাবাজি। তাই ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। আবার হকারদের নামে ফুটপাত দখল করে পথচারীদের চলাচলের অধিকার কেড়ে নেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।আসল প্রশ্ন হলো, এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় হবে কীভাবে? এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশে রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল ও সমাজ—এই চারটির সম্পর্কও বুঝতে হয়।আইনের দৃষ্টিতে ফুটপাত সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা। সেখানে স্থায়ীভাবে দোকান বসানোর অধিকার কারও নেই। কিন্তু বাস্তব জীবনে ফুটপাত অনেক দিন ধরেই শহরের অর্থনীতির একটি অংশ।কারণ, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য ছোট ব্যবসা ও হকারি হচ্ছে জীবিকার পথ। দোকান ভাড়া নেওয়া, অগ্রিম টাকা দেওয়া, বিদ্যুৎ-পানি ও অন্যান্য খরচ বহন করা অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। ফুটপাত তাই তাদের কাছে সবচেয়ে সহজ প্রবেশের জায়গা। এই বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশের নয়। বিশ্বের অনেক শহরেই রাস্তার পাশে ছোট ব্যবসা আছে। ব্যাংককের রাতের বাজার, জাপানের বিভিন্ন শহরের ছোট রাস্তার দোকান কিংবা নিউইয়র্কের পথের খাবারের দোকান—সবই দেখায়, জনপরিসর ও ছোট ব্যবসার মধ্যে একটি সম্পর্ক আছে।পার্থক্য হলো, অনেক দেশে এই অর্থনীতিকে নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। কোথায় দোকান বসবে, কতক্ষণ বসবে, কতটুকু জায়গা ব্যবহার করা যাবে—এসব নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ব্যবস্থাটি এখনো দুর্বল। ফলে ফুটপাত একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পত্তি এবং সমাজের বাস্তব অর্থনৈতিক পরিসর হয়ে আছে।সমস্যাটা তখনই বড় হয়, যখন এর মধ্যে ঢুকে পড়ে রাজনীতি।হকারি নিজে অপরাধ নয়। ছোট ব্যবসা করাও অপরাধ নয়। কিন্তু যখন একজন হকারকে ফুটপাতে বসার জন্য স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নিয়মিত টাকা দিতে হয়, তখন বিষয়টি আর শুধু অর্থনীতির থাকে না। তখন তৈরি হয় একটি আলাদা ব্যবস্থা।কোথায় কে বসবে, কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হবে, কে কাকে ‘রক্ষা’ করবে—এসবের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের হাতে। এখানেই সমস্যার গভীরতা। রাষ্ট্রের আইন যেখানে বলে, ফুটপাত সবার, সেখানে স্থানীয় ক্ষমতার রাজনীতি বলে—এই জায়গা অমুকের, ওই জায়গা তমুকের। ফলে হকারের কাছে আইন নয়, অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কার সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে।‘পাতি নেতা’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?বাংলাদেশের স্থানীয় সমাজের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—অনেক বিরোধ বা প্রয়োজনের সমাধান আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে স্থানীয় মানুষ ও নেতাদের মাধ্যমে হয়। বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া বিরোধ, বাজারের ব্যবসায়ীদের ঝামেলা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে বিরোধ—অনেক ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো স্থানীয় নেতা বা মধ্যস্থতাকারী সেখানে উপস্থিত থাকেন।এই কারণে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা শুধু দলের কর্মী নন। অনেক সময় তিনি এলাকার ক্ষমতার মধ্যস্থতাকারীও। এই ব্যবস্থার ভালো ও খারাপ—দুই দিকই আছে। কোনো বিরোধ বড় সংঘাতে যাওয়ার আগে একজন স্থানীয় নেতা তা থামিয়ে দিতে পারেন। আবার সেই ক্ষমতাই ব্যবহার করে তিনি চাঁদা তুলতে পারেন, জায়গা দখল করতে পারেন বা নিজের অনুসারীদের সুবিধা দিতে পারেন।অর্থাৎ একই ব্যক্তি একদিকে বিরোধ ঠেকাতে পারেন, অন্যদিকে সেই ক্ষমতার ওপর নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থও তৈরি করতে পারেন। এটাই বাংলাদেশের স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য।সরকার আর দল এক নয়এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি হলো সরকার ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে। সরকারের দায়িত্ব নাগরিকদের জন্য নিয়ম তৈরি করা এবং তা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা। রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় সংগঠন সরকারি ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে ওঠে, তখন সমস্যা তৈরি হয়। হকার কোথায় বসবেন, কে তাকে রক্ষা করবে, কার কাছে অভিযোগ করবেন—এসবের উত্তর যদি প্রশাসনের বদলে স্থানীয় দলীয় নেতার কাছে পাওয়া যায়, তাহলে রাষ্ট্রের জায়গায় একটি অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামো তৈরি হয়। তখন হকারও সেই ব্যবস্থার অংশ হয়ে যান। তিনি টাকা দেন, বিনিময়ে জায়গা ও নিরাপত্তা পান। নেতা টাকা নেন, বিনিময়ে তার প্রভাব ধরে রাখেন।দুই পক্ষের এই সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। কারণ ফুটপাত তখন আর পুরোপুরি পথচারীর থাকে না। প্রশ্ন আসে, উচ্ছেদ করলেই কি সমস্যা মিটবে? এক কথায় উত্তর হচ্ছে, না। কারণ হকারকে সরিয়ে দিলে তার জীবিকার প্রশ্নটি থেকে যায়।উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কারওয়ানবাজারের রহিমা বেওয়ার মতো বয়স্ক নারী যদি ফুটপাতে ছোট দোকান করে সংসার চালান, তার দোকান ভেঙে দিলে শুধু একটি অবৈধ স্থাপনা সরানো হয় না; তার পরিবারের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।অন্যদিকে হকারের জন্য ফুটপাত ছেড়ে দিলে পথচারীর চলাচলের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাহলে সমাধান কোথায়? সমাধান হলো, দুটো সমস্যাকেই একই সঙ্গে স্বীকার করা। হকারের জীবিকা যেমন বাস্তব, পথচারীর চলাচলের অধিকারও তেমনই বাস্তব।বিশ্বের শহরগুলো কী করেছে?অনেক শহর এই সমস্যাকে উচ্ছেদ দিয়ে নয়, ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মোকাবিলা করেছে। ব্যাংককের উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে রাস্তার খাবার ও ছোট ব্যবসা শহরের জীবন ও পর্যটনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে সব জায়গায় সব সময় দোকান বসানোর অনুমতি নেই। কোথায় বসা যাবে, কখন বসা যাবে—এসব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নিয়ম করা হয়েছে। নিউইয়র্কেও রাস্তার ছোট ব্যবসার জন্য অনুমতি, নির্দিষ্ট স্থান ও ফুটপাত ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে। অর্থাৎ প্রশ্নটি ‘হকার থাকবে কি থাকবে না’—এমন নয়। প্রশ্ন হলো, হকার থাকবে কীভাবে। বাংলাদেশেও এই ভাবনাটিই দরকার।প্রথম কাজ হতে পারে ঢাকার সব গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাতের একটি পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি করা। কোথায় কতটুকু ফুটপাত আছে, কোথায় মানুষের চলাচল বেশি, কোথায় স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, মেট্রো স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ড—সব তথ্য এক জায়গায় থাকতে হবে। তারপর ঠিক করা যেতে পারে, কোন ফুটপাত পুরোপুরি পথচারীর জন্য থাকবে এবং কোথায় সীমিত পরিসরে হকার বসতে পারবেন। কিছু এলাকায় সময়ও ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে।ধরা যাক, দিনের কর্মঘণ্টায় ফুটপাত পুরোপুরি পথচারীর জন্য থাকবে। বিকেলের পর নির্দিষ্ট অংশে হকার বসতে পারবেন। রাত শেষে আবার সেই জায়গা খালি করতে হবে। এতে একই জায়গা দিনের এক সময়ে চলাচলের জন্য এবং অন্য সময়ে ছোট ব্যবসার জন্য ব্যবহার করা সম্ভব।স্থায়ী দোকান নয়, চলমান কার্টআরেকটি ব্যবস্থা হতে পারে স্থায়ী দোকানের বদলে চলমান ঠেলাগাড়ি বা ছোট কার্ট। হকারের নিবন্ধন থাকবে। পরিচয়পত্র থাকবে। কোন এলাকায় তিনি ব্যবসা করতে পারবেন, সেটিও নির্ধারিত থাকবে। দিন শেষে কার্ট রাখার জন্য এলাকায় সরকারি বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট জায়গা থাকতে পারে। তাহলে ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখল হয়ে থাকবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই নিবন্ধন যেন দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে না হয়। কে কোন দলের লোক, কার সঙ্গে কার সম্পর্ক—এসব যদি বিবেচনার বিষয় হয়, তাহলে নতুন ব্যবস্থাও পুরোনো চাঁদাবাজির ব্যবস্থায় পরিণত হবে। নিবন্ধনের ভিত্তি হতে হবে প্রয়োজন, জীবিকা ও স্বচ্ছ নিয়ম।আসল সংস্কার রাজনৈতিকতবে এখানেই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসে। হকারের জন্য পরিচয়পত্র দিলেই কি চাঁদাবাজি বন্ধ হবে? হবে না। কারণ চাঁদাবাজির যে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটি ভাঙা না গেলে হকারের ওপর পুরোনো চাপ ফিরে আসবে।একজন হকার তখন বলতে পারবেন—‘আমার সরকারি পরিচয়পত্র আছে।’ কিন্তু স্থানীয় নেতা যদি বলেন, ‘আমার টাকা না দিলে এখানে বসতে পারবে না’, তাহলে সেই পরিচয়পত্রের মূল্য খুব বেশি থাকবে না। তাই ফুটপাত ব্যবস্থাপনার সংস্কারকে শুধু সিটি করপোরেশনের কাজ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি রাজনৈতিক সংস্কারেরও প্রশ্ন।বাংলাদেশের জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রচিন্তাবাংলাদেশের রাষ্ট্রকে শুধু উচ্ছেদকারী রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে চলবে না। রাষ্ট্রের একটি কাজ হলো আইন প্রয়োগ করা। কিন্তু আরেকটি কাজ হলো সমাজের বাস্তবতাকে বুঝে সেই বাস্তবতার জন্য নিয়ম তৈরি করা। হকার আছে—এই বাস্তবতা অস্বীকার করে তাকে সরিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু তাতে হকারি বন্ধ হবে না। অন্য কোথাও গিয়ে আবার ফুটপাত দখল হবে। তাই রাষ্ট্রকে বলতে হবে—হকারি থাকবে, কিন্তু নিয়মের মধ্যে থাকবে। ফুটপাত থাকবে পথচারীর জন্য, কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গায় ও নির্দিষ্ট সময়ে ক্ষুদ্র ব্যবসাও থাকবে। রাজনৈতিক দল থাকবে, কিন্তু ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করবে না। স্থানীয় নেতা থাকবেন, কিন্তু প্রশাসনের বিকল্প হবেন না। হকারের সংগঠন থাকবে, কিন্তু চাঁদাবাজির হাতিয়ার হবে না। এই ভারসাম্য তৈরি করাই মূল কাজ।ফুটপাত বাংলাদেশের আয়না কীভাবেঢাকার ফুটপাতের দিকে তাকালে বাংলাদেশের সমাজের একটি বড় ছবি দেখা যায়। এখানে দরিদ্র মানুষের জীবিকার প্রয়োজন আছে। আছে নাগরিকের চলাচলের অধিকার। আছে অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি। আছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। আছে প্রশাসনের দুর্বলতা। আছে স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো।সবকিছু মিলেই ফুটপাত। তাই ফুটপাতের সমস্যার সমাধান শুধু ফুটপাত থেকে মানুষ সরিয়ে দেওয়া নয়। প্রশ্ন হলো, যে সমাজে কোটি মানুষের জীবিকা অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল, সেই সমাজকে আমরা কীভাবে নিয়মের মধ্যে আনব—তাদের জীবিকা নষ্ট না করে? এর উত্তর হয়তো উচ্ছেদে নয়, ব্যবস্থাপনায়।চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে, হকারি নয়ফুটপাত পথচারীর জন্য রাখতে হবে, কিন্তু হকারকে শত্রু  বানিয়ে নয়। রাজনৈতিক দলকে সংগঠিত হতে দিতে হবে, কিন্তু অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক হতে নয়। আর রাষ্ট্রকে শুধু আইন প্রয়োগকারী হিসেবে নয়, সমাজের বিভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে ন্যায়সংগত সমন্বয় তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে হবে। কারণ ফুটপাতের সংকট শেষ পর্যন্ত ফুটপাতের সংকট নয়। এটি প্রশ্ন তোলে—রাষ্ট্র কার জন্য, সরকার কার জন্য এবং শহরটি আসলে কার?

নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে!

আমরা আমাদের দু’চোখ দিয়ে গাছপালা, আকাশ, নদী, পাহাড়, পর্বত, মানুষজন—সবকিছুই দেখি। কিন্তু যে শক্তির কারণে আমরা দেখতে পাই, সেই পরম শক্তিকে আমরা দেখি না। কারণ সেই পরম শক্তি তো বাইরে নয়, রয়েছে আমাদের চোখের ভেতর—দৃষ্টি বা আলো হয়ে। রবীন্দ্রনাথ এ কথাই লিখেছিলেন কবিতার ভাষায়, আর গানের সুরে সুরে—‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।’ কিন্তু না, এবার আমরা ঠিকই দেখে ফেলেছি। চোখের সেই বিচ্ছুরিত আলোয় গোটা দেশবাসী এবার দেখতে পেল এক নয়নকে এবং তার পরম শক্তিমত্তাকে। হ্যাঁ, রবিউল ইসলাম নয়নকে আমরা নয়ন ভরে দেখতে পেয়েছি। দেখেছি, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ জাসদ কার্যালয় জয় করে বীরের বেশে কার্যালয়ের তিনতলার বারান্দা থেকে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় স্লোগান উচ্চারণ করছেন, আর নিচে দাঁড়ানো ভক্তকুল তার প্রতিধ্বনি করছেন।মাগুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্যসচিব নয়ন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মাত্র কয়েক দিনে তার ভাগ্য বদলে ফেলেন। সরকার বদলের পরপরই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। তার বিরুদ্ধে দখল ও চাঁদাবাজির নানা অভিযোগ পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে। তার দৃশ্যমান কোনো আয় নেই। তার ভাষায়, ‘এক মামা তার বাসা ভাড়ার টাকা দেন। আরেক ভাই তার যাতায়াতের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এবং বাকি খরচ তিনি শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় থেকে নির্বাহ করেন।’ তবে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তিনি ৫ আগস্ট-পরবর্তী মাত্র কয়েক দিনে দখল আর চাঁদাবাজির রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এ সময় তার নামে ইসলামী ব্যাংকে হামলা, একটি টেলিভিশন চ্যানেল দখলের প্রচেষ্টা ইত্যাদি অভিযোগ ওঠায় দলের মধ্যেও নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অবশ্য দলের চেয়ারপারসনের গাড়ির সামনে দৌড়ে দৌড়ে তিনি কিছুটা ড্যামেজ কন্ট্রোল করেন এবং কেন্দ্রীয় যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক পদেও অধিষ্ঠিত হন।হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সাংগঠনিক কর্মসূচি হিসেবে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গত ২৬ সেপ্টেম্বর একটি প্রতিনিধি সভা আহ্বান করে। ঘরোয়া হলেও সভাটি যেহেতু বড় আকারের ছিল, তাই তারা পুলিশকেও অবহিত করে সভাটির আয়োজন করে। জাসদ কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকায় নিশ্চয়ই পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা তৎপরতা আছে। তাই উক্ত সভাকে কেন্দ্র করে কোনো ষড়যন্ত্র বা নাশকতামূলক তৎপরতা সন্দেহ করলে পুলিশ নিশ্চয়ই সভা শুরুর আগেই তা বন্ধ করে দিত। কিন্তু সরকারের গোয়েন্দা তৎপরতা ব্যর্থ হতে পারে, নয়নের নয়ন তো ব্যর্থ হতে পারে না!নয়ন বলেছেন, তার নেটওয়ার্কে নাকি ধরা পড়েছে—জাসদের আড়ালে সেখানে আওয়ামী লীগের ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ জমায়েত হচ্ছিল। তিনি তার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ‘ষড়যন্ত্র’ রুখে দেওয়ার জন্য ঢাকা দক্ষিণের আওতাধীন এলাকা থেকে তার ভক্তকুলকে জাসদ অফিসের সামনে সমবেত করে প্রথমে এক দফা প্রতিনিধিদের ওপর হামলা ও হেনস্তার ব্যবস্থা করলেন। তারপর পুলিশ ডাকলেন। পুলিশ বাহিনীর কমান্ড নিজেই নিয়ে নিলেন। অতঃপর ২৮৯ জন প্রতিনিধিকে আটক করা হলো। আটক প্রতিনিধিরা পুলিশের গাড়িতে ওঠার সময় আরেক দফা তাদের হেনস্তার ব্যবস্থা করে তিনি উঠে গেলেন জাসদ কার্যালয়ের বারান্দায় এবং সেখান থেকে বিজয়ের স্লোগান দিয়ে ক্ষান্ত হলেন।জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার উচ্ছেদ করার পর এই হলো একেবারে ‘নির্ভেজাল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা’। সেই ‘গণতন্ত্রকে’ সমুন্নত রাখতে আবার রাতের মধ্যেই ২৭ জন বাদে অন্য সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ২৭ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, “জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে তারা জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন।”কিন্তু প্রশ্ন হলো, জাসদ অফিসের ভেতরে তারা যে ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিলেন’, এমন অভিযোগ কি জাসদ দিয়েছে? তাহলে কিসের ভিত্তিতে এ অভিযোগ? পুলিশ বা সরকার বলতে চায়, জয় বাংলা স্লোগান দেওয়াটাই বিশৃঙ্খলা বা গোলমাল সৃষ্টি। সরকারের বয়স তো সবে সাত মাস। জয় বাংলা স্লোগানকে তারা এত ভয় পেলে বাকি সময় দেশ চালাবেন কীভাবে?জয় বাংলা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ছিল। আমার মনে পড়ে, মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং সেন্টারে আমরা একটু নিজেদের স্বাতন্ত্র‍্য প্রকাশের জন্য স্লোগান দিতাম—‘জয় স্বাধীন বাংলা’। মর্মবস্তু তো একই। জয় বাংলা স্লোগানটা দলীয়করণ হয়ে যাওয়ায়, আবার যাতে করে স্বাধীন দেশে উগ্র জাত্যাভিমান সৃষ্টি না হয় এবং এর আড়ালে মানুষের রুটি-রুজির স্লোগান চাপা না পড়ে, সেজন্য হয়তো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দল এ স্লোগানকে আওয়ামী লীগের মতো দিবানিশি উচ্চারণ করে না। কিন্তু তারা কেউই জয় বাংলার বিরোধী নয়। তবে ন্যায়-অন্যায় সব ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মাহাত্ম্যকে মলিন করেছে। এখন সরকার, বিএনপি, এনসিপি, জামায়াত কি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে, যাতে মুক্তিযুদ্ধের এই রণধ্বনি আবার নতুন করে উচ্চারণ করতে সবাই বাধ্য হয়?শুধু একজন রবিউল ইসলাম নয়ন নন, শাসকদলের এলাকাভিত্তিক নেতাকর্মীদের একাংশ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন, যা কিন্তু প্রকৃতই দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। অতি সম্প্রতি মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। শত শত লোক এক্সকাভেটর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে এসব ভাঙচুরে অংশ নিলেন এবং এই দীর্ঘ সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখা মিলল না। সরকারি দল বিএনপির লোকজনের সম্পৃক্ততা থাকার কারণেই কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে তো বিএনপিরই একজন সংসদ সদস্য জড়িত থাকারও অভিযোগ উঠেছে। এটা প্রশংসনীয় যে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিএনপি হাইকমান্ড ওই সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি ইতোমধ্যে পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমাও দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম কোনো সংসদ সদস্যকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে পদত্যাগ করতে হলো।তবে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র আর মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই ‘দুই জন নয়ন’ বাংলাবাজারের ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্রে এসে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি বিক্রি করা নিয়ে আপত্তি তুলে বলেন, বইটি নিষিদ্ধ। একপর্যায়ে তারা আরও লোকজন জড়ো করে মব সৃষ্টি করলে পুলিশ এসে বিক্রয়কেন্দ্রের দুই কর্মীকে আটক করে। পরবর্তীতে এই বই আর বিক্রি করবে না—এই শর্তে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কেমন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি! বইটি নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু বিক্রি করা যাবে না। অনেকটা আওয়ামী লীগের মতো অবস্থা—অর্থাৎ ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ বই’!এনসিপি-জামায়াতের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে তো আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু ছিল না। ছিল মবের রাজত্ব। মাঝখানে সামান্য উন্নতির আভাস দেখা গেলেও আবার পূর্বাবস্থায় চলে গেছে। ইউনূস আমলে মবকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। ইউনূসের মুখপাত্র শফিকুল আলম বলেছিলেন, মব নয়, এদেরকে প্রেসার গ্রুপ বলা যেতে পারে। যেমনটা জাসদ অফিসে হামলাকে নয়ন এখন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন—‘তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন মানবিক সরকারের আমলে জাসদ অফিস থেকে আটক প্রতিনিধিদের ওপর বিক্ষুব্ধ জনগণ যাতে হামলা করতে না পারে, সেজন্য ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনি তার সমর্থকদের ডেকে এনেছেন এ পবিত্র দায়িত্ব পালনে।’জাসদ প্রতিনিধিদের জন্য তার এই দরদ দেখে জাসদ নেতৃবৃন্দও এখন ঠাওর করতে পারছেন না—তার ‘নয়ন ভরা জল আর দুহাত ভরা ফুল’ থেকে এখন ফুল নেবেন, না অশ্রু নেবেন! নয়নবাহিনী যে ব্যাখ্যাই দিক না কেন, দেশজুড়ে একটার পর একটা এ ধরনের ঘটনায় নাগরিক সমাজ, সাধারণ মানুষ—সবাই উদ্বিগ্ন। তাদের ‘দু নয়নে ভয় আছে, মনে সংশয় আছে’—এর শেষ কোথায়!(লেখকের নিজস্ব মত)লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা

ভিডিও আরও দেখুন

আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে শেষ অধ্যায়, দেশে ফিরলেন মেসি

আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরতরে বিদায় জানানোর শেষ মঞ্চ প্রস্তুত করে ফেলেছেন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি। জীবনের শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী জার্সি গায়ে জড়াতে শুক্রবার সকালে ব্যক্তিগত বিমানে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজের শহর রোসারিওর ইস্লাস মালভিনাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছেন ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা।ফুনেসের বাড়িতে সামান্য বিশ্রাম শেষে তিনি সরাসরি যোগ দিয়েছেন এজেইজা অনুশীলন কেন্দ্রে, যেখানে শুরু হয়েছে তার বিদায়ী ম্যাচের চূড়ান্ত প্রস্তুতি। আগামী সপ্তাহে রাজধানী বুয়েনস এইরেসের বিখ্যাত এস্তাদিও মনুমেন্তালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি খেলতে নামছেন তিনি।এর আগে আর্জেন্টিনার সফল কোচ লিওনেল স্কালোনি জানিয়েছিলেন যে বলিভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পরপরই মেসি দেশে ফিরবেন, তবে সব পরিকল্পনাকে ছাপিয়ে একটু আগেই প্রিয় মাতৃভূমিতে পা রাখলেন ফুটবল জাদুকর।ঠিক এক মাস আগে নিজের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডলে এক আবেগঘন বার্তায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। দারুণ এক মৌসুম কাটানোর পর তার এই বিদায়ী ঘোষণা বিশ্বজুড়ে ভক্তদের মনে বিষাদের সুর তুলেছে। মেসির এই ঐতিহাসিক বিদায়কে স্মরণীয় ও চিরস্মরণীয় করে রাখতে ইতোমধ্যে বিশেষ জার্সি তৈরি করেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ), যার গায়ে ১০ নম্বরের চারপাশে বিশেষ নকশা করা হয়েছে।আগামী মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর স্থানীয় সময় রাত আটটায় বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে মাঠে নামবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে ম্যাচ শুরুর আগেই মেসির বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের প্রতি সম্মান জানাতে এবং তাকে যথাযথ শ্রদ্ধা জানাতে নির্ধারিত সময়ের ঠিক এক ঘণ্টা আগে শুরু হবে বর্ণিল বিদায়ী অনুষ্ঠান।এই আবেগঘন ও অশ্রুসিক্ত আয়োজন সম্পন্ন হওয়ার পর আবারও যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাবেন এলএমটেন। সেখানে তিনি ইন্টার মিয়ামির হয়ে মেজর লিগ সকারের চলতি মৌসুমের বাকি ম্যাচগুলো শেষ করার প্রস্তুতি নেবেন।

আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে শেষ অধ্যায়, দেশে ফিরলেন মেসি