সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নে ইউনিট গঠনের নির্দেশ

‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নে ইউনিট গঠনের নির্দেশ

দেশে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে সব ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও পেমেন্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ ইউনিট’ গঠনের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।এই ইউনিটের মাধ্যমে বাংলা কিউআর, পিওএস ও অনলাইন পেমেন্টসহ বিভিন্ন ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার, গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাজারভিত্তিক কার্যক্রম তদারকি করা হবে।সোমবার (১৬ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।এতে বলা হয়, দেশে নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে। বাংলা কিউআর, আন্তঃপরিচালনযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, পিওএস এবং অনলাইন পেমেন্টের বিস্তারের ফলে দেশে ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ দ্রুত বাড়ছে। এ প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিশেষ ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সব ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী, পেমেন্ট সার্ভিস প্রদানকারী এবং পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরদের প্রধান কার্যালয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ ইউনিট’ গঠন করতে হবে। ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই ইউনিটের তত্ত্বাবধানে থাকবেন পেমেন্ট সিস্টেম কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তা।এ ছাড়া ব্যাংকগুলোতে এই ইউনিটে কমপক্ষে চারজন কর্মকর্তা এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও পেমেন্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে দুইজন কর্মকর্তা নিয়োজিত রাখতে হবে। ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।নতুন ইউনিটের প্রধান কাজের মধ্যে থাকবে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, বিশেষ করে বাংলা কিউআর, পিওএস, অনলাইন ও কার্ড পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ানো। পাশাপাশি নিজস্ব অ্যাপ ব্যবহার করে গ্রাহক নিবন্ধন বৃদ্ধি এবং বাজারভিত্তিক ডিজিটাল পেমেন্ট কার্যক্রম তদারকি করতে হবে।প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে বাংলা কিউআর ব্যবহারের প্রসার, গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও সেমিনার আয়োজন, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা জোরদার এবং ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।এ ছাড়া প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ উদ্যোগের আওতায় পরিচালিত কার্যক্রমের ওপর একটি ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে সব ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ ইউনিট’ গঠন করে ইউনিটের তথ্য ফরওয়ার্ডিং লেটারসহ বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে। এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

বারুদের গন্ধে ঈদের চাঁদ: অস্থির বিশ্ব রাজনীতি ও মানবিকতার শাশ্বত আহ্বান

রমজান মাসের এক মাসব্যাপী আত্মসংযম ও সিয়াম সাধনার সমাপ্তিতে সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর দুয়ারে সমাগত হয় ঈদুল ফিতর। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং আত্মিক শুদ্ধি, সামাজিক সংহতি এবং মানবিক সহমর্মিতার এক গভীর ও ব্যঞ্জনাময় প্রতীক। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন আমরা ঈদের আনন্দ নিয়ে আলোচনা করি, তখন আমাদের চারপাশের পৃথিবী আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল, অস্থির এবং কণ্টকাকীর্ণ। বিশেষ করে ইরান, আমেরিকা এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ত্রিমুখী উত্তেজনা ও সংঘাতের ছায়া আজ গোটা মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের কিনারে দাঁড় করিয়েছে। এই টালমাটাল বৈশ্বিক বাস্তবতায় ঈদুল ফিতরের অন্তর্নিহিত চেতনা-শান্তি, ন্যায়বিচার এবং সাম্যের ডাকÑনতুন করে এবং আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।ঈদুল ফিতরের ধর্মতাত্ত্বক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তিটি নিহিত রয়েছে পবিত্র রমজানের কৃচ্ছসাধনের মধ্যে। রোজা কেবল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার বর্জন নয়, বরং এটি মানুষের নফস বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার এক কঠিন প্রশিক্ষণ। এই দীর্ঘ এক মাস মানুষ নিজের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অনাহারী মানুষের কষ্টকে অনুভব করতে শেখে। ইসলামের দৃষ্টিতে এই আত্মিক পরিশুদ্ধিই মানুষকে প্রকৃত মানবিক গুণাবলিতে ভ‚ষিত করে। ঈদ হলো সেই অর্জিত নৈতিক বিজয়ের এক সামষ্টিক উদযাপন। ঈদের নামাজ, ফিতরা আদায় এবং পারস্পরিক আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়, তা মূলত বিভেদহীন এক সমাজ গঠনেরই মহড়া।আজকের এই আনন্দ উৎসবকে যখন আমরা বৃহত্তর বৈশ্বিক ক্যানভাসে দেখি, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিষণ্ন ছবি। মধ্যপ্রাচ্য আজ এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমর্থন ও হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গাজা উপত্যকায় দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়, লেবানন সীমান্তে অস্থিরতা এবং লোহিত সাগরে উত্তেজনার কারণে লাখ লাখ মানুষের জীবন আজ বিপন্ন। যে শিশুটির হাতে আজ নতুন রঙিন জামা থাকার কথা ছিল, অনেক ক্ষেত্রে তার হাতে আজ একমুঠো ত্রাণের রুটি জোটে না। গাজা বা রাফাহর মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের ধ্বংসস্তূপের ওপর যখন ঈদের চাঁদ ওঠে, তখন তা আনন্দ নয়, বরং হারানো স্বজনদের জন্য দীর্ঘশ্বাস বয়ে আনে। সেখানে ‘ঈদ মোবারক’ ধ্বনি ছাপিয়ে বোমা হামলার ভয়ঙ্কর শব্দ আর ড্রোন হামলার আতঙ্ক মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই বৈশ্বিক হাহাকার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ঈদের প্রকৃত আনন্দ কেবল নিজের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হলো আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানো এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার সংকল্প গ্রহণ করা।ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা কেন্দ্রিক এই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব অনুভ‚ত হচ্ছে সুদূর উত্তর আমেরিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত। বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি তেল, যার বড় একটি অংশ উৎপাদিত ও পরিবাহিত হয় এই অঞ্চল দিয়ে। পারস্য উপসাগর বা হরমুজ প্রণালী যদি যুদ্ধের কারণে অচল হয়ে পড়ে, তবে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যমূল্য এবং পরিবহন খরচের ওপর। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই অস্থিরতা থেকে মুক্ত নয়। জ্বালানি বাজারের ওঠানামা আমাদের মতো দেশের মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষের ঈদ উদযাপনের বাজেটে টান পড়ে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য ঈদের সেমাই বা নতুন পোশাক আজ বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা ঈদের সাম্যের বার্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবুও এই সংকটের মাঝেও মানুষ যে হাসিমুখে একে অন্যের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেয়, সেখানেই লুকিয়ে আছে ঈদুল ফিতরের আসল মহিমা।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদুল ফিতর কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাড়ির টানে শহর থেকে গ্রামে ফেরার যে জনস্্রে আমরা প্রতি বছর দেখি, তা পৃথিবীর অন্য কোথাও বিরল। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, আধুনিক যান্ত্রিকতা সত্তে¡ও আমাদের পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক শেকড়ের টান কতটা শক্তিশালী। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত নগরীগুলো যখন ফাঁকা হয়ে যায়, আর নিভৃত পল্লী যখন উৎসবে মুখর হয়, তখন তৈরি হয় এক অনন্য মেলবন্ধন। এই যাতায়াত কেবল শরীরের নয়, বরং এটি আত্মার এক পুনর্মিলন।ইসলামী জীবনদর্শনে ‘যাকাতুল ফিতর’ বা ফিতরা আদায়ের বাধ্যবাধকতা ঈদের আনন্দকে সর্বজনীন করার একটি চমৎকার মাধ্যম। এটি কোনো দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি দরিদ্র মানুষের প্রাপ্য অধিকার। যখন সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দুস্থদের হাতে তুলে দেন, তখন সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়। আজকের চরম পুঁজিবাদী বিশ্বে, যেখানে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান আকাশচুম্বী, সেখানে ঈদের এই দানশীলতার সংস্কৃতি একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের অনুপ্রেরণা হতে পারে। বিশেষ করে প্যালেস্টাইন বা ইয়েমেনের মতো ক্ষুধার্ত জনপদের জন্য বৈশ্বিক যাকাত ও ফিতরা তহবিল হতে পারে জীবনরক্ষাকারী এক মাধ্যম।বিশ্বায়নের এই যুগে ঈদের রূপরেখাও পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমানে লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। মরুভ‚মির তপ্ত বালুচর থেকে শুরু করে ইউরোপের তুষারপাত-সবখানেই প্রবাসী ভাই-বোনরা ঈদ পালন করেন। তাদের কাছে ঈদ মানে একরাশ নস্টালজিয়া। প্রযুক্তির কল্যাণে ভিডিও কলে হয়তো পরিবারের সবার মুখ দেখা যায়, কিন্তু মায়ের হাতের সেমাইয়ের স্বাদ বা ছোটবেলার সেই পাড়া-বেড়ানো আনন্দ কি ডিজিটাল পর্দায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব? প্রবাসীদের এই ত্যাগ এবং দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈদের পরিধি ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে আজ বিশ্বময়।বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষতগুলোর একটি হলো শরণার্থী সমস্যা। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আজ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ নিজেও এই মানবিক সংকটের সরাসরি সাক্ষী। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে যখন ঈদের চাঁদ ওঠে, তখন তা আমাদের মানবিকতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। যুদ্ধের কারণে যারা নিজ ভ‚মি হারিয়েছে, তাদের জন্য ঈদ মানে কেবল একবেলা পেটভরে খাওয়ার স্বপ্ন। ঈদের শিক্ষা হলো মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানো। যদি আমরা আমাদের উৎসবের সময় এই নিঃস্ব মানুষগুলোর কথা ভুলে যাই, তবে আমাদের রোজা ও ঈদ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে।বর্তমান সময়ে অতি-ভোক্তাবাদ বা ‘কনজিউমারিজম’ ঈদের আধ্যাত্মিকতাকে কিছুটা হলেও গ্রাস করছে। ঈদের বাজার করা বা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা অনেক সময় উৎসবের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দেয়। দামি পোশাক বা বিলাসিতা নয়, বরং আত্মসংযম এবং বিনয়ই হওয়া উচিত ঈদের ভূষণ। আধুনিকতার এই জোয়ারে আমাদের মনে রাখা দরকার যে, ঈদের মূল সার্থকতা নিহিত রয়েছে অন্তরের পবিত্রতায়, বাইরের চাকচিক্যে নয়। যখন মধ্যপ্রাচ্যে মানুষ জীবন বাঁচানোর লড়াই করছে, তখন আমাদের অতি-বিলাসিতা হওয়া উচিত পরিমিত ও সংবেদনশীল।ঈদুল ফিতরের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ক্ষমা। দীর্ঘ এক বছরের রেষারেষি, মান-অভিমান এবং তিক্ততা ভুলে যাওয়ার দিন হলো ঈদের দিন। রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতার এই যুগে ক্ষমার সংস্কৃতি অত্যন্ত জরুরি। আমরা যদি ব্যক্তি পর্যায়ে একে অপরকে ক্ষমা করতে না শিখি, তবে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। ইরান, ইসরায়েল বা আমেরিকা-রাষ্ট্রনায়করা যদি একে অপরের প্রতি প্রতিহিংসা ত্যাগ করে সমঝোতার পথে হাঁটতেন, তবে আজ হাজার হাজার নিরপরাধ প্রাণ বেঁচে যেত। ঈদ আমাদের অন্তরকে প্রশস্ত করার এবং ঘৃণা ত্যাগের দীক্ষা দেয়।পরিবর্তনশীল ও অস্থির এই বিশ্বে ঈদুল ফিতর আমাদের জন্য একটি আশার প্রদীপ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকার যত গভীরই হোক না কেন, ত্যাগের পর আনন্দের সূর্য উদিত হবেই। রমজানের কঠোর সাধনা যেমন আমাদের ধৈর্য শেখায়, ঈদ তেমনি আমাদের সেই ধৈর্যের মিষ্টি ফল উপহার দেয়। আজকের অশান্ত পৃথিবীতে যেখানে সংঘাত ও ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে, সেখানে ঈদের সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বার্তা হতে পারে নিরাময়ের মহৌষধ। ঈদের সকালে যখন ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে সিজদাবনত হয়, তখন পৃথিবীর সব কৃত্রিম আভিজাত্য চূর্ণ হয়ে যায়। এই সাম্যই ইসলামের সৌন্দর্য এবং এটাই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। আমরা যদি ঈদের এই চেতনাকে কেবল একদিনের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছরের পাথেয় করতে পারি, তবেই পৃথিবীটা হবে বাসযোগ্য ও শান্তিময়।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

ভাওয়ালের বন আগুনে পোড়ে, দেখে না কেউ

প্রতি বছর মার্চ মাস আসলেই ভাওয়ালগড়ের বনভ‚মিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। কে বা কারা এই কাজটি করে তার কোনো হদিস পাওয়া যায় না। ভাওয়ালগড়ের বনভ‚মি পত্র পতনশীল বৃক্ষের বনভূমি। এখানের প্রায় সব গাছই শাল বৃক্ষ যা স্থানীয়ভাবে গজারি নামে পরিচিত। এই জন্য এই বনভ‚মিকে গজারি বৃক্ষের বনভূমিও ডাকা হয়। এই বৃক্ষের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে - শীতের শেষে সব পাতা ঝরে পড়ে।ভাওয়ালগড় মূলত বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক ভূমিরূপ প্লাস্টোসিন চত্বরের ভূমিরূপের অংশ যা গাজীপুর জেলায় অবস্থিত। প্লাস্টোসিন চত্বরের আরও কিছু অংশ রয়েছে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলায়। ভাওয়ালের বনভ‚মি গাজীপুর জেলার গাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়ালগড়, শ্রীপুর উপজেলার পশ্চিমাংশ এবং কালিয়াকৈর উপজেলার অংশ বিশেষ নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান।ভাওয়ালগড়ের বনভ‚মিতে দেখা যায় প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়গা আগুনে পুড়ছে। দেখেই বুঝা যায় আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। বিঘার পর বিঘা বনভূমি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে অথচ দেখার কেউ নেই।ভাওয়ালগড়ের বনভূমিতে যে গজারি বৃক্ষ জন্মে তার সব পাতা ফেব্রæয়ারীর শেষের দিকে কিংবা মার্চ মাসে ঝরে পড়ে। এই সব পাতা মাটিতে পড়ে জমা হয়। পুরো বন জুড়ে শুকনো পাতা ও ডালপালায় ভরে যায়। এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহল কিংবা অতি উৎসাহী অসচেতন মানুষ এই সব পড়ে থাকা শুকনো পাতা ও ডালপালায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এর ফলে বনভূমি আগুনে পুড়তে থাকে দাউদাউ করে। বনের পাশ দিয়ে গেলেই এই দৃশ্য দেখা যায়।বাংলাদেশে বনভূমি প্রতিনিয়ত কমছে। একক বনভূমি হিসাবে ভাওয়াল ও মধুপুরের গড় ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ আধার। দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এ বনভূমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে। অথচ এই বনভূমি আজ দখল, দূষণ ও আগুনে পুড়ে হুমকির সম্মুখীন।আগুন ধরিয়ে দেয়ার যতগুলো কারণ আছে এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে - কিছু মানুষের খামখেয়ালিপনা। বনের ভিতর বাইদ জমিতে গরুছাগল নেয়া হয় ঘাস খাওয়ানোর জন্য। গরুছাগল যারা দেখাশোনা করে তারাই বনে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আরও একটি বিষয় হচ্ছে- ভাওয়ালগড় ও শ্রীপুর অঞ্চল শিল্প অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় এখানে রয়েছে অসংখ্য মানুষের বসবাস। নিম্ন আয়ের মানুষ রান্নার জ্বালানি হিসাবে এ বনের পাতা লতা ও ডালপালা ব্যবহার করে। শুষ্ক মৌসুম আসলেই এরা বনে আগুন দেয় এবং পুড়ে যাওয়া ডালপালা গাছ সংগ্রহ করে নিয়ে যায় রান্নার জন্য।ভাওয়ালের বনে প্রতি বছর আগুন দেয়ার কারণে গাছ মরে যাচ্ছে, উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত্যু ঘটছে, নতুন বৃক্ষের জন্ম ও বেড়ে উঠা ব্যাহত হচ্ছে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। সর্বোপরি দিন দিন ভাওয়ালগড়ের আয়তন কমে আসছে।ভাওয়ালগড়ের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুই পাশের গাছগুলোর দিকে তাকালে এই দৃশ্য চোখে পড়ে। দুই পাশের গাছগুলো দিনদিন উজাড় হচ্ছে এবং বিভিন্ন রকমের দোকানপাট ও স্থাপনা গড়ে উঠছে। রাস্তার পাশের গাছগুলো মরে যাওয়ার পেছনে আগুন ধরিয়ে দেয়া যেমন কাজ করে তেমনি গাছের গোড়ায় গরম পানি ঢেলে দিয়ে মেরে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। আগুনের তাপে ছোট বড় সকল ধরনের গাছই জীবনী-শক্তি হারিয়ে আস্তে আস্তে মারা যায়। বিশেষ করে ছোট ছোট চারা গাছগুলো বড় হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে বন আগুন দেয়া।বনে আগুন দেয়ার কারণে প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। লোকমুখে কথিত আছে, ভাওয়ালগড়ে একসময় বাঘ বসবাস করতো। এছাড়া নানা রকমের পশুপাখি তো ছিলোই। কালের পরিক্রমায় ভাওয়ালগড়ে এখন বন্য প্রাণীর সংখ্যাও অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। প্রতিবছর বনে আগুন দেয়ার কারণে ছোট ছোট পোকামাকড় সাপ বেঁজি গুইসাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। গাছ মরে যাওয়ার কারণে বন্য প্রাণীগুলো খাদ্য সংকটে ভুগছে। প্রায় সময়ই দেখা যায় বনের বানরগুলো খাদ্য সংগ্রহ করতে লোকালয়ে চলে আসে।শুধুমাত্র বনে আগুন দেয়ার কারণে নতুন বৃক্ষের জন্ম ও বেড়ে উঠা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মার্চের এই সময়টাতে বনে আগুন দেয়ার কারণে বনের নিচে পড়ে থাকা লতাপাতা ও ডালপালা পোড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট গাছগুলোও পুড়ে যায়। চারাগাছ বড় হওয়ার জন্য প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবেশ প্রয়োজন। এভাবে আগুন দিয়ে বন পুড়িয়ে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যহত করা হচ্ছে প্রতিবছর।ভাওয়ালগড়ের বনে আগুন সন্ত্রাসের কারণে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সহাবস্থান ধ্বংস হচ্ছে প্রতি নিয়ত। নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। ভাওয়ালগড়ের স্থল, জল ও বায়ুতে বসবাসকারী উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীবের মধ্যে যে জিনগত, প্রজাতিগত এবং বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য বা ভিন্নতা দেখা যায় তাই এখানকার জীববৈচিত্র্য। এটি মূলত জীবকূলের ভিন্নতা ও জীবন ধারণের বৈচিত্র্যময়তাকে বোঝায়, যা প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। ভাওয়ালগড়ের বনভূমির জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন।ভাওয়ালগড়ের বনভূমিতে আগুন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বন বিভাগের দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। প্রয়োজনে জনবল বাড়িয়ে বাড়তি মনিটরিং এর ব্যবস্থা করা। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। এর জন্য বনে আগুন দেয়ার কুফল সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। বন বিভাগের উদ্যোগে বনে আগুন দেয়া প্রতিরোধে প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে। আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য ফায়ার সার্ভিসের তত্বাবধানও প্রয়োজন। প্রয়োজন প্রশাসনিক তদারকি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ।সুন্দরবনের পরেই একক বনভূমি হিসাবে ভাওয়ালের বনভূমির অবস্থান। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবশ্যই অবশ্যই ভাওয়ালের বনে আগুন দেয়া বন্ধ করতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ এবং সবার সচেতনতা বৃদ্ধি।[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

ব্যাংক খাতে কেন নারী কর্মী কমছে

বাংলাদেশ জনবহুল ছোট্ট একটি দেশ। জনসংখ্যার তুলনায় এখানে কর্মসংস্থানের বড়ই অভাব। ফলে বেকারত্বের হার অনেক বেশি। কর্মসংস্থান তৈরি করাই যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানে নারীদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন উপেক্ষিতই থেকে যায়। অতি সম্প্রতি গণমাধ্যমে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নারী ব্যাংকার কমেছে ৭৭০ জন’। বিষয়টি বড়ই উদ্বেগজনক। যেখানে নারীদের কর্মসংস্থান তৈরি করাই বড় কঠিন, সেখানে নারী কর্মীদের কর্মসংস্থান ধরে রাখা আরও বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটু ব্যাখ্যা করা যাক-ব্যাংকিং একটি সম্মানিত পেশা হওয়া সত্ত্বেও কেন নারীর সংখ্যা কমছে।নারীর ক্ষমতায়ন ঘটাতে গেলে নারীর কর্মসংস্থান অবশ্যই জরুরি। কর্মসংস্থান ব্যতীত নারীর ক্ষমতায়ন চিন্তা করাই অসম্ভব। কিন্তু কেন এমন একটি সম্মানিত পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন নারীরা? এর জন্য রয়েছে একাধিক কারণ। তবে প্রথম কারণ হিসেবে বলা যায়, ছোট্ট এই দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংক অনেক বেশি। ব্যাংকের সংখ্যা কেন বেশি, তার একটু ব্যাখ্যা দেয়া যাক। ২০১৯ ও ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র বলছে, বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল ৩২৩ বিলিয়ন ডলার, ভারতের ২ হাজার ৬৬০ বিলিয়ন ডলার, থাইল্যান্ডের ৫০০ বিলিয়ন ডলার এবং মালয়েশিয়ার ৩৩৭ বিলিয়ন ডলার। দেশগুলোর লাইসেন্সপ্রাপ্ত দেশীয় ব্যাংকের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে বাংলাদেশে ৫২টি, ভারতে ৩৪টি, থাইল্যান্ডে ১৮টি এবং মালয়েশিয়ায় ৮টি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এই তথ্য। আবার বিশাল অর্থনীতির দেশ চীনে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা মাত্র ১২টি। অথচ বাংলাদেশে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে এবং রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার জন্য কারণে-অকারণে ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। তাই ব্যাংকারদের গ্রাহক পর্যায়ে ও ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাছে কদর একদমই কম। গ্রাহক পর্যায়ে গিয়ে ব্যাংকার পরিচয় দিলে কিছু গ্রাহক বলেন একটু আগেই অমুক ব্যাংক এসেছিলেন। এখন আবার আপনারা আসলেন, কি বলবেন বলেন! যা এই অবস্থা নারী সহকর্মীরা মানতে পারে না।শুধু ব্যাংকিং খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা কম এমনটা নয়। দেশের অন্যান্য পেশাতেও তুলনামূলকভাবে নারীর সংখ্যা কম। যেমন বিক্রয় প্রতিনিধি এবং ফুটপাতের হকার। অনেকেই হয়তো উপহাস করবেন, কিন্তু বাস্তবতা থেকেই বলছি। ছোট্ট এই দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংক বেশি হওয়ায় ব্যাংকারদের সম্মানীয় পেশাটি এখন অনেকটা বীমা কোম্পানির প্রতিনিধিদের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা সময় ঢাকা শহরে দেখতাম, ফুটপাতে সিম কার্ড বিক্রির মতো একটি ছাতার নিচে একটি চেয়ার-টেবিল আর বক্স নিয়ে বসে গেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা ব্যাংক হিসাব খুলতে। সঙ্গে অফার দিচ্ছেন, হিসাব খুললেই ডেবিট কার্ড ফ্রি, আরও অনেক কিছু। বিষয়টি সত্যিই উপহাসের মতো মনে হয়। যেন ব্যাংকারদের হকার বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এছাড়াও শীর্ষস্থানীয় অনেক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অলিগলিতে দেখা যায়-সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন। সহজ কথায় যাকে বলে বাজারজাতকরণ। আবার প্রত্যেক ব্যাংকারকে একটি নির্দিষ্ট টার্গেট দেয়া হয়। সেই টার্গেট পূরণ করাও বাধ্যতামূলক। যেমন দিনের শুরুতেই জানতে চাওয়া হয়—আজ কতটি অ্যাকাউন্ট খুলবেন এবং কত টাকা ডিপোজিট আনবেন। দিন শেষে তার হিসাব নেয়া হয়। পারলে ভালো, না পারলে ভদ্রভাবে দু’একটি কথা শুনতে হয়। পরিস্থিতিটা অনেকটা স্কুলজীবনের মতো পড়া হলে ভালো, না হলে শিক্ষকের বেতের প্রহার সইতে হতো। এখানে পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, বেতের বদলে ভদ্রভাবে কিছু কথা শুনতে হয়। কিন্তু সেই কথাগুলোও অনেক নারী কর্মীর জন্য মানসিকভাবে কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। ফলে অনেকেই নীরবে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। অর্থাৎ তারা চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। অনেক নারী ব্যাংকারের মতে, এটিও নারী কর্মীর সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। যেসব নারীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছে, তাদের অনেকেই এমনটাই জানিয়েছেন। পরিচিত আরও অনেক নারী সহকর্মীও চাকরি ছেড়ে দেয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।দ্বিতীয় যে কারণটি রয়েছে, তা হলো ব্যাংকারদের কাজের চাপ অনেক বেশি। এই পেশায় নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে পৌঁছাতে হয়, কিন্তু ঠিক কখন বাড়ি ফেরা যাবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না। দিনের সব হিসাব মিলাতে হয় এবং সারাদিনে যে সেবাগুলো দেয়া হয়েছে, সেগুলোর কাজ একটি নির্দিষ্ট ফাইলে সংরক্ষণ করতে হয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে ব্যাংকারদের মধ্যেই উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। এর প্রধান কারণ অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং নীতিনির্ধারকদের অতিমাত্রায় চাপ। দীর্ঘ সময় ধরে একই চেয়ারে বসে সেবা প্রদান করাও এর একটি কারণ। সবকিছু মিলিয়ে এটি এক ব্যতিক্রমধর্মী পেশা যেখানে হয়তো অর্থ আছে, কিন্তু নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তেমন কোনো সময় থাকে না। মাঝেমধ্যে ছুটির দিনগুলোতেও অফিস করতে বাধ্য হতে হয়। এছাড়া এটি এমন একটি পেশা, যেখানে দেশের জরুরি অবস্থার মধ্যেও সেবা বন্ধ রাখা যায় না; অথচ সেই অনুযায়ী স্বীকৃতি খুব একটা পাওয়া যায় না।উপরোক্ত বিষয়গুলো সার্বিকভাবে তুলে ধরা হলেও এখানে নারীপুরুষের একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। পুরুষ সহকর্মীদের সাধারণত সংসারের কাজ সামলাতে হয় না। অর্থাৎ পুরুষ সহকর্মীদের সন্তান লালন-পালনে নারীদের তুলনায় খুব বেশি সময় না দিলেও চলে। কিন্তু একজন নারী একই সঙ্গে একজন ব্যাংকার, একজন মা এবং অনেক ক্ষেত্রে সংসারের প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তি। এসব দায়িত্ব একত্রে সামলানো একজন নারী কর্মীর জন্য, বিশেষ করে একজন নারী ব্যাংকারের জন্য, অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। সন্ধ্যা সাতটা বা আটটায় বাসায় ফিরে আবার সংসারের কাজ সামলানো এবং সন্তানের লালন-পালন করা এটি অনেক সময় এক ধরনের নির্মম জীবনযাপনের মতো হয়ে ওঠে। ফলে বাধ্য হয়েই অনেক নারী কর্মী স্বেচ্ছায় এই পেশা থেকে সরে দাঁড়ান। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই কর্মজীবী হলেও শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকেই কর্মক্ষেত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হয়। তিনি সন্তানের লালন-পালনে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেন, যাতে সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা যায়। কিন্তু একজন কর্মজীবী, বিশেষ করে একজন ব্যাংকার মায়ের পক্ষে এটি অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই বাধ্য হয়েই অনেক নারী ব্যাংকার স্বেচ্ছায় অবসরে যান।ফলে নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। অথচ আমরা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনের টক-শো থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে জোরালোভাবে কথা বলি। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে বিষয়টি খুব কমই বিবেচনা করি। নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন ঘটাতে গেলে উপরোক্ত বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় নিয়ে নারীদের পথ চলা আরও সহজ করতে হবে। তবেই হয়তো সম্ভব হবে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন। তখন রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। এতে নারী যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি দেশ ও জাতিও হবে আরও সমৃদ্ধ।[লেখক: ব্যাংকার]

ঘরে ঘরে পাটওয়ারী তৈরি হলে তবেই আমরা সভ্য হব!

এনসিপির পৃষ্ঠপোষক মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই সনদ ঘোষণার অনুষ্ঠানে বলেছিলেন এবার আমরা সভ্য হলাম। ইউনূসও রাজনীতিবিদদের মতো বক্তৃতা দিয়ে দিলেন। সেদিন এনসিপি ওই অনুষ্ঠান বর্জন করে এবং জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগ পর্যন্ত তারা ‘সনদে’ স্বাক্ষর দেয় নাই। এনসিপি-বিহীন অনুষ্ঠানে এনসিপির স্বাক্ষর ছাড়া সনদ ঘোষণা করা হলো। তাহলে আমরা কীভাবে সভ্য হলাম! না আমরা তখনও সভ্য হইনি। সভ্য হতে হলে আমাদের ঘরে ঘরে পাটওয়ারী লাগবে।এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বরিশালে এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেছেন, এখন থেকে ঘরে ঘরে পাটওয়ারী তৈরি হবে। কেন ঘরে ঘরে পাটওয়ারী তৈরি করতে হবে? কারণ এবারের নির্বাচনী প্রচার অভিযানে তার মতো পারঙ্গমতা আর কেউ প্রদর্শন করতে পারেননি। নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত সবার থেকে এগিয়ে ছিলেন ‘রাজুতে আয়’-এর পারঙ্গম শিল্পী হাসনাত আব্দুল্লাহ। কিন্তু নির্বাচনে হাসনাতের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাওয়ায় তাকে আর বিশেষ পারঙ্গমতা প্রদর্শন করতে হয়নি। অবশ্য সংসদ সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণের সময় সাধারণ পোশাকের বদলে স্পোর্টস জার্সি পরে এসে বুঝিয়ে দিলেন সংসদে তিনি ‘মব খেলোয়াড়’ হিসেবেই এসেছেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন জুলাই আন্দোলনের পরে কথায় কথায় রাত বিরাতে ‘রাজুতে আয়’ ডাক দিয়ে মব সৃষ্টিতে যে পারঙ্গমতা দেখিয়েছিলেন, সংসদেও ‘অপেশাদার’ ও ‘অসম্মানজনক’ আচরণের মধ্য দিয়ে তা তিনি অব্যাহত রাখবেন।তারপরও এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সভ্য-ভব্যতার প্রতীক হিসেবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকেই এগিয়ে রেখেছেন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নির্বাচনী অভিযানে জামায়াত-হেফাজতকে নিয়ে মাঠে নামলেও, গত বছরই ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পথরেখা’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় পাটওয়ারী জামায়াতে ইসলামীর ইসলামকে ‘মওদুদীর ইসলাম’ বলে আখ্যায়িত করেন। আর হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে বলেন, হেফাজত কওমি অঙ্গনে ঘুরে ঘুরে আলেমদের ‘ট্যাবলেট খাইয়ে’ ইসলামের নামে আগামী নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেয়ার পাঁয়তারা করছে। তিনি জামায়াত ইসলামকে দিল্লির এক্সটেনশন হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন ধর্মের নামে চেতনা ব্যবসা করছে জামায়াত ইসলাম। তারা অতীতে ধানের শীষে ভোট করেছে, এখন তাদের পাখনা গজিয়েছে।জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী বা আদর্শিক ঐক্য কোনোটাই তার এ সব বক্তব্যের সঙ্গে যায় না। আবার এ বছরের ১১ ফেব্রæয়ারি তিনি ফেসবুকে পোস্ট দেন, ‘১৩ ফেব্রুয়ারি ঘুম থেকে উঠে যদি দেখি জামায়াত আমির প্রধানমন্ত্রী হইছেন, সেটা আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হবে।’ বাহ্! দিল্লির ‘এক্সটেনশনের প্রতিনিধি’ প্রধানমন্ত্রী হলে তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হবে। আবার গত বছর ২১ মার্চ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেয়া একটি পোস্টে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লিখেছিলেন, ‘গত ৫৩ বছরে জামায়াতে ইসলামীকে বারংবার রাজনীতিতে পুনর্বাসন করার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। ‘সেনা-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল লুটকারী জিয়া’ জনগণের অভিপ্রায়ের তোয়াক্কা না করে গায়ের জোরে এ অবৈধ শক্তিকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়। জেনারেল জিয়ার হাত ধরেই এ অবৈধ কাজ সম্পন্ন হয়।’ সমালোচনার মুখে পড়ে অবশ্য পোস্টটি ডিলেট করেন তিনি।যা হোক নির্বাচনী মাঠে ও নির্বাচনের পরেও হাসনাতের মতো জার্সি না পরলেও তিনিই এনসিপির ক্যাপ্টেন। কিন্তু ক্যাপ্টেন কি সুস্থ আছেন? ওপরে উল্লেখিত তার স্ববিরোধী বয়ানসমূহ দেখে তো মনে হয় না তিনি সুস্থ মস্তিষ্কের। মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে তিনি নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছিলেন। হেরে গেলেও ভালো ভোট পেয়েছেন। কিন্তু লড়াইটা তো হতে হবে রাজনৈতিক। কে কত কুৎসা প্রচার করতে পারেন-সেটাই দেখছি তরুণ দলের নেতা হয়ে ওঠার প্রধান যোগ্যতা। বিএনপির প্রবীণ নেতা মীর্জা আব্বাস নিশ্চয়ই সাধু পুরুষ নন। তার অনেক সমালোচনা থাকতেই পারে। নিজ দলের মাঝেও আছে। তার সমালোচনা করা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু যেভাবে, যে পদ্ধতিতে, যে ভাষায় পাটওয়ারী সারাক্ষণ লেগে আছেন তাতে মনে হয়েছে তিনি পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া-ফ্যাসাদ বা বড় ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইছেন। এমনকি ইফতারি ও মিলাদ মাহফিলের বক্তব্যেও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একদিকে আল্লাহ খোদার নাম নিচ্ছেন, আর একই সঙ্গে ছাপার অযোগ্য অশ্লীল ভাষায় মীর্জা আব্বাসকে গালাগাল করছেন।এ সব বক্তব্য পাটওয়ারীর ব্যক্তিগত বক্তব্য নয়, গোটা এনসিপিরই বক্তব্য। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এনসিপি নামক দলটির আওয়ামী লীগ বিরোধিতা ছাড়া নিজের রাজনৈতিক আদর্শ কি-তা তারা নিজেরাই জানে বলে মনে হয় না। কখনও জামায়াতকে ‘পালিশ’ করছেন, আবার কখনও বিএনপিকে ‘ধোলাই’ করছেন। নির্বাচনের আগে দুই দলের কাছেই ধরনা দিলেন। বিএনপি অপেক্ষা জামায়াত আসন বেশি দেওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে গেলেন। বললেন, এটা শুধু নির্বাচনী ঐক্য, দল দাঁড়া করাইতে সংসদে সিট লাগবে, নির্বাচনের পরে বাউন্স ব্যাক করবেন। কিসের বাউন্স ব্যাক, জামায়াত জোটের হুইপ পদে আসীন হলেন। এটা তো সবাই বুঝে হুইপকে হুইপ করবে জামায়াত। অর্থাৎ এনসিপি অনেকটা প্রকাশ্যেই জামায়াতের বিটিমের ভূমিকায় নেমে গেল। এরই মাঝে জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যের বিরোধীতাকারী এনসিপি নেত্রী সামান্থা শারমিন সুর পাল্টিয়ে খুব গর্ব করে এক হাস্যকর দাবি করেছেন যে, ‘এনসিপিই এখন জামায়াতকে লিড দিচ্ছে’। জামায়াতের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য নানা টিম আছে। ইতোপূর্বে তারা বিপদ-আপদে প্রকাশ্য রাজনীতিতে যাতে থাকা যায় সেজন্য এবি পার্টি নামে ফ্রন্ট খুলেছিল। এনসিপিকে পেয়ে অবশ্য এবি পার্টির কদর কমে গেছে। তাই এনসিপিই এখন ‘লিডে’ আছে।এনসিপির লিডের দাবী অনুযায়ী এ কথা বলা কি ভুল হবে যে, জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই উত্থাপিত শোক প্রস্তাবে ’৭১-এর যুদ্ধ অপরাধীদের নাম সহ যে সব বিতর্কিত নাম জামায়াত প্রস্তাব করেছে তার খসড়া এনসিপিই প্রস্তুত করেছে? এমন লিডে আছে যে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই উত্থাপিত শোক প্রস্তাবে দন্ডপ্রাপ্ত ’৭১-এর যুদ্ধ অপরাধীদের নাম এসেছে।মুহাম্মদ ইউনূস তরুণ দলকে এবং তার নেতৃত্বকে কী পৃষ্ঠপোষকতা করলেন, যে দলটি ও দলের নেতারা এমন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে? এর দায় তো তাকেই নিতে হবে। হতে পারে তারা ট্রমায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাদের চিকিৎসার জন্য ‘রিহ্যাব সেন্টার’-এ না পাঠিয়ে তিনি তাদের বানিয়ে দিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা। তারা আরও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়লেন। ভারসাম্যহীন রোগীরা নিজ ইচ্ছায় চিকিৎসা নিতে চায় না। ক্ষেত্র বিশেষে বল প্রয়োগ করে চিকিৎসা স্থলে নিয়ে যেতে হয়। ইউনূস যে কাজটি করেননি, সে কাজটি কাউকে না কাউকে তো করতে হবে। তাদের ভারসাম্যহীনতাকে ব্যবহার না করে, তাদের বর্তমান মুরুব্বি জামায়াত ইসলামের আমির শফিকুল ইসলাম এ উদ্যোগটি নিতে পারেন। অন্যথায় তো এসব বিষয় আইন আদালত ও আইনানুগ কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। হাজিরার জন্য সমন জারি হয়েছে। আদালতে আবার এ সব অশ্লীল শব্দ নিয়ে উভয় পক্ষের আইনজীবীরা তর্ক-বিতর্ক করবেন এবং আরও দুর্গন্ধ ছড়াবে। আর আমরা প্রকৃতই সভ্য হয়ে উঠব!আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় আমরা পুরনো দিনের মানুষরা এনসিপির জুলাই যোদ্ধাদের ভাষা পড়তে ভুল করছি না তো। তাদের অশ্লীল এবং ঔদ্ধত্য শব্দভান্ডারই আধুনিক যুগের ভাষাকে সমৃদ্ধ করছে হয়তো বা। তাই পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে আমিও আমার এক বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথন তুলে ধরছি যা অশ্লীল না হলেও তার কাছাকাছি বা অপকথা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের বীরত্বগাথা, সরকারি-বেসরকারি বাহিনীর গুলি ও হামলায় অগণিত মৃত্যু, আহতের আর্তনাদ, স্বজনহারা পরিবারের মানুষগুলোর আহাজারি গোটা জাতির বিবেককে স্পর্শ করেছিল। এ পটভূমিতে আনু মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন নাগরিক সমাজ ও শিক্ষক নেটওয়ার্কের ডাকে ২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে দ্রোহযাত্রার ডাক দেয়া হয়। মিডিয়াতে প্রচারিত সংবাদে দ্রোহযাত্রার মিছিলে আমাকে দেখা যাওয়ায় আমার স্কুল জীবনের এক বন্ধু ফোনে আমাকে বলে, খুব তো মিছিল করছিস! পরিণতি ‘আজ বুঝবি না, বুঝবি কাল; পিছে থাবড়াবি, মারবি ফাল’। বিষয় হচ্ছে, গ্রাম দেশে ছেলেকে অতিরিক্ত শুকনো মরিচ ডলে পান্তা খেতে দেখে পিতা তাকে এ কথা বলে এটাই বুঝাতে চাইছেন যে, অতিরিক্ত শুকনা মরিচ দিয়ে পান্তা খাইতে খুব মজা লাগলেও আগামীকাল ভোরে মলত্যাগের সময় মলদ্বারের যন্ত্রণায় লাফ দিয়ে দিয়ে পেছন চাপড়াতে হবে। দ্রোহযাত্রায় যোগ দেয়ার এতদিন পরে কেন জানি বন্ধুর বলা অপকথাটি মনে পড়ছে। আমরা কি এখন ফাল মেরে পেছন চাপড়াতে চাপড়াতে সভ্য হয়ে উঠছি!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

ঈদ উৎসবের অর্থনীতি

উৎসব আমাদের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী উৎসব হলো এমন আনন্দঘন অনুষ্ঠান, যা সাধারণত ধুমধাম বা জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপিত হয়। এসব আয়োজনে সমাজের বড় একটি অংশ সম্পৃক্ত থাকে। উৎসবকে আড়ম্বরপূর্ণভাবে উদযাপন করতে মানুষ নানা ধরনের পণ্য ও সেবা ক্রয় করে এবং নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করে। উৎসব উপলক্ষে উপহার দেয়া-নেয়াও আমাদের সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতির অংশ।বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এ ধরনের উৎসবকে ঘিরে আবর্তিত হয়, যা সাধারণভাবে উৎসবের অর্থনীতি নামে পরিচিত। উৎসবকে কেন্দ্র করে শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য, আমদানিকৃত পণ্য এবং বিভিন্ন সেবা খাতে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। চাহিদা বাড়লে পণ্যের জোগানও বাড়ে, যা স্থানীয় উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। পণ্য আমদানি, উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে সরকারও বাড়তি রাজস্ব পায়। এই সমগ্র অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্যই উৎসবের অর্থনীতির অংশ।বাংলাদেশে প্রধানত দুটি ঈদ উদযাপিত হয়Ñ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এর মধ্যে ঈদুল ফিতরকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাÐ সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ঈদকে ঘিরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, সেবা খাতের চাহিদা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের প্রসার এবং বাজারে অর্থের প্রবাহÑসব মিলিয়ে অর্থনীতিতে এক ধরনের গতি সৃষ্টি হয়।ঈদকে কেন্দ্র করে কত পরিমাণ অতিরিক্ত পণ্য ও সেবা বিক্রি হয়, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। তবে এর ব্যাপ্তি যে বিশাল, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ব্যবসায়ীদের ধারণা, দেশের পোশাকশিল্পের বার্ষিক বিক্রির প্রায় ৬০ শতাংশই হয় দুই ঈদকে ঘিরে। ঈদের সময় মিষ্টিজাতীয় পণ্যের বিক্রিও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। গত এক দশকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঈদ উপলক্ষে উপহার বিতরণের প্রবণতাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।কৃষি, শিল্প, আমদানি, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, সেবা খাত, কর্মসংস্থান এবং সরকারের রাজস্ব আহরণÑসব ক্ষেত্রেই ঈদের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। উৎসবের সময় পোশাক, জুতা, গয়না, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই চাহিদা পূরণে উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যস্ত সময় পার করে।পোশাকশিল্পের কথাই ধরা যাক। দেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পোশাকের একটি বড় অংশ আসে রাজধানীর পুরান ঢাকা, কেরানীগঞ্জ ও কালীগঞ্জ এলাকার কারখানাগুলো থেকে। ঈদুল ফিতরের তিন-চার মাস আগে থেকেই এসব কারখানায় প্রায় ২৪ ঘণ্টা উৎপাদন চলে। পুরান ঢাকার বংশাল, সিদ্দিকবাজারসহ আশপাশের এলাকায় ছোট ছোট কারখানায় জুতা ও ব্যাগ তৈরিরও ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলে। একইভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা কুটিরশিল্প ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পকারখানাগুলোতেও উৎপাদন বাড়ে। তেল, চিনি, আটা, ময়দা, সেমাই, নুডলসসহ নানা ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যস্ততাও এ সময় বাড়ে।উৎসবের সময় শহরের বড় শপিংমল থেকে শুরু করে গ্রামের ছোট দোকান পর্যন্ত ক্রেতার ভিড়ে জমজমাট হয়ে ওঠে। এমনকি মুদিদোকানের বিক্রিও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের বিস্তার ঘটেছে। সময়ের অভাব, যানজট এড়ানো এবং যাতায়াত ব্যয় সাশ্রয়ের কারণে ক্রেতাদের মধ্যে এসব প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। উৎসবের সময় এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে পণ্য ও সেবার বিক্রি অনেক বেড়ে যায়, যা খাতটির বিকাশে সহায়ক ভ‚মিকা রাখছে।ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের চলাচলও বেড়ে যায়। অনেকেই পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে শহর থেকে গ্রামে বা গ্রাম থেকে শহরে যান। আবার অনেকে ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে ভ্রমণে বের হন। এতে পরিবহন ও পর্যটন খাতে সেবার চাহিদা বাড়ে।ঈদ কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখে এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থানের প্রায় ৬০ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতের ওপর নির্ভরশীল। এসব শিল্প অনেকাংশেই উৎসবকেন্দ্রিক চাহিদার ওপর ভর করে টিকে থাকে।এছাড়া ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের মাধ্যমে অসংখ্য তরুণ-তরুণী স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। উৎসবের সময় এসব প্ল্যাটফর্মে বিক্রি বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগও বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে কৃষক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকÑযেমন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, নৌকার মাঝি, মুটে বা ডেলিভারি কর্মীদের আয়ও বাড়ে।ঈদ গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন প্রাণসঞ্চার করে। উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ উৎপাদকদের পণ্য বিক্রি বাড়ে। আবার ঈদ সামনে রেখে শহর ও প্রবাসে থাকা মানুষজন স্বজনদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ পাঠান, যাতে তারা উৎসবের ব্যয় নির্বাহ করতে পারেন। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।ঈদের ছুটিতে লাখ লাখ মানুষ নাড়ির টানে গ্রামে ফিরে যান। তারা স্থানীয় বাজার থেকে নানা পণ্য কেনেন এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন। এতে বিনোদনশিল্পসহ আরও অনেক খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমনকি টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের মতো গণমাধ্যম শিল্পেও এর প্রভাব পড়ে। ঈদ উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল বিজ্ঞাপন দেয়, যা গণমাধ্যমের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।ঈদের বাজারে দেশীয় অনেক বস্ত্র ও পোশাক ভারতীয় বা পাকিস্তানি নাম ব্যবহার করে বিক্রি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার বিদেশি কিছু পণ্যও ঈদকে লক্ষ্য করে আগেভাগেই দেশের বাজারে প্রবেশ করেছে। বাস্তবে দেশীয় বস্ত্র ও পোশাকের অনেক আইটেমের মান ভারত বা পাকিস্তানের পণ্যের চেয়েও উন্নত। এ কারণেই দেশীয় পণ্যকে বিদেশি বলে চালিয়ে দেয়া অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয়েছে।তবে নানা কারণে এবারের ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাÑএসব বিষয় ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এতে কৃষক, শ্রমিক ও ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।তারপরও আশা করা যায়, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঈদুল ফিতর শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হবে এবং এর ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব সমাজের বিভিন্ন স্তরে পৌঁছাবে।[লেখক: সাবেক ডিন (ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ) ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]

নিরাপদ হোক ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক

ঈদ বাঙালির জীবনে আনন্দ, ভালোবাসা এবং পারিবারিক মিলনের এক অনন্য উৎসব। সারা বছর জীবিকার তাগিদে শহরের ব্যস্ত জীবনে ছুটে চলা মানুষগুলো ঈদের সময়টুকুর জন্যই অপেক্ষা করে। এই সময়েই তারা ফিরে যেতে চায় শৈশবের সেই পরিচিত গ্রামে, মা-বাবার স্নেহমাখা ছায়ায়, আপনজনদের সান্নিধ্যে। তাই ঈদযাত্রা কেবল একটি ভ্রমণ নয়; এটি আবেগ, স্মৃতি এবং পারিবারিক বন্ধনের এক গভীর প্রতীক। কিন্তু যখন সেই আনন্দময় যাত্রা আতঙ্কের রূপ নেয়, যখন প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয় এই বুঝি দুর্ঘটনা ঘটল, তখন সেই যাত্রা আর আনন্দের থাকে না; হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা ও ভয়ের প্রতীক। দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের কাছে ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক আজ অনেকটা তেমনই এক বাস্তবতার নাম। প্রতি ঈদেই এই সড়ক ধরে হাজার হাজার মানুষ ঘরে ফেরেন, কিন্তু তাদের অনেকের মনে আনন্দের চেয়ে উদ্বেগই বেশি কাজ করে - এই পথ কি নিরাপদ?দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণরেখা: ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা হয়ে মাদারীপুর, বরিশাল এবং পর্যটন নগরী কুয়াকাটা পর্যন্ত বিস্তৃত এই মহাসড়ক দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির প্রধান অবলম্বন। বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর এই ছয়টি জেলার মানুষ রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রধানত এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জের বিশাল জনগোষ্ঠীরও প্রধান যাতায়াতপথ এটি। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই মহাসড়কের গুরুত্ব অপরিসীম। দক্ষিণাঞ্চল দেশের অন্যতম কৃষি উৎপাদন অঞ্চল। এখানকার ধান, মাছ, সবজি এবং অন্য কৃষিপণ্য প্রতিদিন এই সড়কপথেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা হয়। একই সঙ্গে কুয়াকাটা দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র। ফলে পর্যটন শিল্পের বিকাশেও এই সড়কের ভ‚মিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।পদ্মা সেতুর সুফল, কিন্তু অসম্পূর্ণ প্রস্তুতি: পদ্মা সেতু চালুর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এসেছে। বহু বছরের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। এই সেতু দেশের অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।কিন্তু পদ্মা সেতুর পূর্ণ সুফল পেতে হলে সংযোগ মহাসড়কগুলোকে আধুনিক ও নিরাপদ করা অত্যন্ত জরুরি। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে-ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের অনেক অংশ এখনও সংকীর্ণ, ভাঙাচোরা এবং ঝুঁকিপূর্ণ।পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার যানবাহন এই মহাসড়কে চলাচল করে। কিন্তু সড়কের বড় অংশ এখনও মাত্র ১৮ থেকে ২৪ ফুট প্রশস্ত। ফলে দুই দিক থেকে দ্রæতগতির যানবাহন চলাচলের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।ভাঙ্গা থেকে বরিশাল: দুর্ভোগের দীর্ঘ পথ : ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত প্রায় ৯৭ কিলোমিটার পথের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নাজুক।অনেক জায়গায় রাস্তার বিটুমিন উঠে গিয়ে নিচের সুরকি বেরিয়ে এসেছে। কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও রাস্তা দেবে গিয়ে অসমান হয়ে গেছে। বরিশালের কাশীপুর চৌমাথা থেকে রহমতপুর, গৌরনদীর জয়শ্রী থেকে কাশেমাবাদ এবং মাদারীপুরের ভুরঘাটা থেকে মস্তফাপুর পর্যন্ত অংশে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ। এই গর্তগুলো অনেক সময় বৃষ্টির পানিতে ঢেকে যায়। ফলে চালকরা বুঝতেই পারেন না কোথায় গভীর গর্ত রয়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা বা ছোট যানবাহনের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।দুর্ঘটনার উদ্বেগজনক বাস্তবতা: বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুর অংশেই গত ছয় মাসে প্রায় ৪৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই মহাসড়কের প্রায় ৪৭ কিলোমিটার অংশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই পুরো মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত আটকে থাকে, যা আহতদের জন্য আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে।বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক, ভয়ঙ্কর বাঁকের ফাঁদ: ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশাপাশি বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কের অবস্থাও কম উদ্বেগজনক নয়। পটুয়াখালীর শাখারিয়া থেকে বরগুনার আমতলী উপজেলার বান্দ্রা পর্যন্ত প্রায় ৩৭ কিলোমিটার মহাসড়কে রয়েছে ১৭টি ভয়ঙ্কর বাঁক। এই বাঁকগুলোতে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। গত ছয় মাসে এখানে শতাধিক দুর্ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন এবং ৪৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।অনেক বাঁকে কোনো কার্যকর সংকেতচিহ্ন নেই। কোথাও থাকা সংকেতগুলোও বিবর্ণ হয়ে গেছে। রাতের বেলায় চালকরা বুঝতেই পারেন না সামনে কী অপেক্ষা করছে।বাসচালকরা বলছেন, বড় বাঁকগুলোতে কনভেক্স মিরর বা উন্নত সতর্কসংকেত স্থাপন করা হলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।বহু প্রতীক্ষিত ছয় লেন প্রকল্প : ২০১৫ সালে ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে ভ‚মি অধিগ্রহণের জন্য অর্থও বরাদ্দ দেয়া হয় এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়। কিন্তু নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়নের অভাবে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের আলো দেখেনি। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আজও অপেক্ষা করছে কবে শুরু হবে এই মহাসড়কের প্রকৃত উন্নয়ন। [লেখক: প্রশিক্ষক, গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বরিশাল]

কৈবর্ত বিদ্রোহ ও বরেন্দ্র অঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহ্য

বরেন্দ্র বিদ্রোহ বা কৈবর্ত বিদ্রোহ বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন। কৈবর্ত বিদ্রোহ ছিল সামন্ত রাজা দিব্যের নেতৃত্বে পাল রাজাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি বিপ্লবী আন্দোলন। তৎকালীন পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপালের (১০৭০-১০৭৫) শাসনের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ সংগঠিত হয়।দশম-একাদশ শতকে বরেন্দ্র অঞ্চলে ‘মাৎস্যন্যায়’ প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে সেখানে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। এই চরম অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন সামন্তশক্তি একত্রিত হয়। তাদের সম্মিলিত উদ্যোগেই বাংলার উত্তরাংশে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহের মাধ্যমে সামন্ত রাজা দিব্য বরেন্দ্রভ‚মিতে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।পাল আমলের সামন্ত রাজা দিব্য বিভিন্ন সামন্তরাজাদের একত্রিত হয়ে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানান। সামন্তরা তার ডাকে সাড়া দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা বাংলার বরেন্দ্র অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। রাজা দ্বিতীয় মহীপাল বিদ্রোহ দমন করতে এসে যুদ্ধে নিহত হন। ফলে পাল সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।দিব্য তার দক্ষ নেতৃত্বে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে বরেন্দ্রে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। দিব্যের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন তার ছোট ভাই রুদোক এবং পরে রুদোকের পুত্র ভীম (বরেন্দ্র রাজা)। ভীম নিজেকে একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং প্রায় ৩০ বছর বরেন্দ্র শাসন করেন। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বরেন্দ্রকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যান।ভীম সুবিধাভোগী ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে কর আদায় করতেন এবং সেই অর্থ সাধারণ প্রজাদের কল্যাণে ব্যয় করতেন। বর্তমান বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার দিবর ইউনিয়নে অবস্থিত দিবর দিঘি ও দিব্য বিজয়স্তম্ভ আজও এই রাজবংশের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়া বর্তমান ভারতের মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘিতেও বীর দিব্য ও ভীমের কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতিস্বরূপ একটি বিজয়স্তম্ভ ছিল, যা পরবর্তীকালে পাল রাজারা পুনরায় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পর ভেঙে ফেলে।রাজা ভীমের নানা কীর্তির মধ্যে ‘ভীমের সাগর’, ‘ভীমের জাঙ্গাল’, ‘ভীমের ডাইং’ ও ‘ভীমের পান্টি’ উল্লেখযোগ্য। দিনাজপুর, রাজশাহী ও বগুড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে এসব স্থাপনার নিদর্শন এখনও পাওয়া যায়।রামপাল সিংহাসনে আরোহণ করার পর ভীমের জনপ্রিয়তা, দক্ষতা ও উদারতা দেখে ভীত হয়ে পড়েন। তখন পাল রাজাদের ক্ষমতা সম্ভবত ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী বদ্বীপ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু শক্তিশালী রাজা ভীমের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামার সাহস রামপালের ছিল না। ভূমি হারানোর আশঙ্কায় তিনি প্রতিবেশী ও সামন্তরাজাদের বিপুল অর্থ ও ভূমি দান করেন এবং তাদের সহায়তায় ভীমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।ভীম বন্দী হওয়ার পর তার বিশ্বস্ত সহযোগী হরি পরাজিত সৈন্যদের একত্রিত করে রামপালের বিরুদ্ধে শেষ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেন। হরির নেতৃত্বে যখন সেনারা প্রায় বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন রামপাল বিপুল অর্থ বিতরণ করে তাদের একাংশকে নিজের পক্ষে টেনে নিতে সক্ষম হন। এর ফলে বরেন্দ্রের স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায় এবং অঞ্চলটি আবার পাল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।বিদ্রোহীরা যেন আর কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সে জন্য পাল রাজারা ভীমের প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করে। তার পরিবারের সদস্যদের তার সামনেই হত্যা করা হয় এবং পরে ভীমকেও হত্যা করা হয়।এই বিদ্রোহ সম্পর্কে দার্শনিক ও গবেষক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, কৈবর্ত বিদ্রোহের সঙ্গে সিদ্ধ আন্দোলনের সম্পর্ক ছিল এবং চুরাশি সিদ্ধের কাহিনি বিদ্রোহীদের অনুপ্রাণিত করেছিল। কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী লিখেছেন, কৈবর্তরা যদি পরাজিত না হতেন, তবে বাংলায় একটি শক্তিশালী দেশজ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে পারত।ঐতিহাসিক রায়োসুকে ফুরুই উল্লেখ করেছেন, কৈবর্ত বিদ্রোহ বাংলার আদি মধ্যযুগের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই বিদ্রোহ সাময়িকভাবে পালদের তাদের পৈতৃক অঞ্চল বরেন্দ্র থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং অধস্তন শাসকদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দেয়। এর ফলেই পরবর্তীকালে পাল শক্তির পতন এবং সেনাদের উত্থানের পথ প্রশস্ত হয়।বরেন্দ্র অঞ্চলের সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রাচীন। এই অঞ্চলে টেরাকোটা বা পোড়ামাটির শিল্প বাংলার ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। মাটি পুড়িয়ে তৈরি করা নকশাযুক্ত ফলক ও মূর্তিতে কৃষ্ণলীলা, রামায়ণ, সামাজিক জীবন এবং দেব-দেবীর কাহিনি ফুটে ওঠে। দিনাজপুর ও নওগাঁ জেলা এই শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।একইভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের মৃৎশিল্প হাজার বছরের প্রাচীন লোকশিল্প। অতীতে মাটির কলস, হাঁড়ি, পুতুল ও পূজার সামগ্রী তৈরি হতো। কিন্তু আধুনিকতার আগ্রাসন ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে।বরেন্দ্র অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির মূল উৎস আদিবাসী সমাজ। সাঁওতাল, ওরাঁও ও মুণ্ডা জনগোষ্ঠীর জীবনপ্রণালী প্রকৃতিনির্ভর ও কৃষিভিত্তিক। তাদের সমাজব্যবস্থা ‘মাঝি-পরগনা’ বা ‘পাঁচ মোড়ল’ দ্বারা পরিচালিত হয়। সোহরাই, বাহা ও কারাম তাদের প্রধান উৎসব। এসব উৎসবে নৃত্য-গীতি ও বাদ্যের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি প্রকাশ পায়।এছাড়া বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে গম্ভীরা ও আলকাপ গানও জনপ্রিয় লোকসংস্কৃতি।কিন্তু আজ বৈচিত্র্যময় বরেন্দ্র সংস্কৃতি নানা ধর্মান্ধ রাজনৈতিক প্রবণতার চাপে সংকুচিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাচীন সংস্কৃতিকে ‘বিধর্মীয়’ আচার হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে। ফলে কৈবর্ত বিদ্রোহের সেই সংগ্রামী ঐতিহ্যও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। অথচ কয়েক দশক আগেও এই অঞ্চলের মানুষ সংস্কৃতিকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন করত না।তাই বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাচীন সংস্কৃতি রক্ষায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনুশীলন আজ অত্যন্ত জরুরি।[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির রাজনীতি: প্রযুক্তি, ক্ষমতা ও মুসলিম বিশ্বের সংকট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ প্রায় ৫০ জন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি । অন্যদিকে ইসরায়েলের সৈন্য লেবাননের ভেতরে ঢুকে ইরানের সমর্থক হিজবুল্লাহদেরও হামাসের মতো নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। দেড় কোটি ইহুদি ২শ’ কোটি মুসলমানকে জিম্মি করে রেখেছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ১৯৭৩ সনে যুদ্ধে নেমে মিশর হঠাৎ যুদ্ধ থামিয়ে আপোষ করে ফেলে; কেন যুদ্ধ থামিয়ে দিল এই প্রশ্নের উত্তরে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারি, কিন্তু আমেরিকার বিরুদ্ধে নয়’। শুধু প্রযুক্তি আর অস্ত্র নয়, অর্থ সম্পদেও আমেরিকা বর্তমান বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দী। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রযুক্তি আমেরিকার চেয়েও উন্নততর। ইতোমধ্যে ইরানের নৌশক্তি ধ্বংস হয়ে গেছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তছনছ হয়ে গেছে, আমেরিকা এবং ইসরায়েলের বিমান খুশিমত ইরানের আকাশে ঘুরে ঘুরে ইচ্ছা মতো স্থাপনায় বোমা ফেলছে, সব তেল শোধনাগার জ্বলছে, ধোঁয়ায় তেহরান অন্ধকারাচ্ছন্ন ।ইরান যুদ্ধ করতে চায়নি, জোর করে এই যুদ্ধ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইরান বুঝতে পেরেছিল, ইসরায়েল এবং আমেরিকার তুলনায় ইরানের প্রযুক্তি জ্ঞান জিরো। আশির দশকের শুরুতে ইরান-ইরাকের ৮ বছর ব্যাপী যুদ্ধের অতন্দ্র সতর্কতার মধ্যেও ইসরায়েলের যুদ্ধ বিমান ইরাকের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দিয়েছিল, ইরাক টেরও পায়নি। ঠিক একইভাবে গত বছর জুন মাসে প্রায় ১৩ হাজার কেজির ‘বাঙ্কার বাস্টার’ মেরে ইরানের ৩টি পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসকরণে যে বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছে তা কেবল আমেরিকার কাছেই আছে, এই ‘বি-টু স্টেলথ বোমারু বিমান’ সনাক্ত করার ক্ষমতাও ইরানের ছিল না, ধ্বংস করে বিমানগুলো ফেরত যাওয়ার পর ইরান টের পেয়েছে। আমেরিকা তাদের ঘাতক অস্ত্র ‘গ্র্যাভিটি বোমা’ও ইরানের ওপর প্রয়োগ করার কথা ভাবছে; এই বোমা মজবুত বাঙ্কার এবং ভ‚গর্ভস্থ সামরিক স্থাপনাকে ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হয়।কিছুদিন আগে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়ার পরও ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। হয়নি বলেই ইরানের রেজিম চেঞ্জ জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল বিরোধী কোনো শাসক বা সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেয়া হচ্ছে না। আমেরিকা এবং ইসরায়েল নির্ধারণ করে দিচ্ছে কোন দেশ কে শাসন করবে। ইসরায়েলের বিরোধিতা করে সাদ্দাম হোসেন টিকেননি, মুয়াম্মের গাদ্দাফির হয়েছে করুণ মৃত্যু, রাশিয়ায় পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচাতে হয়েছে বশির আল আসাদকে। হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াহ এবং হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুও হয়েছে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়। শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বর্তমান পৃথিবীতে আমেরিকা আর ইসরায়েল ব্যতীত আর কোন দেশের স্বার্বভৌমত্বও নেই। ১৯৮৯ সনে লাতিন আমেরিকার দেশ পানামায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির তৎকালীন প্রধান জেনারেল ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ঠিক একইভাবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকেও অপহরণ করে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। কথা অগ্রাহ্য করায় শেখ হাসিনার পতনে আমেরিকা খরচ করেছে মাত্র ২৯ মিলিয়ন ডলার, আমেরিকার কথা না শোনায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখন জেলের ভেতর।পশ্চিমের দেশগুলোর সরকার ব্যবস্থায় এখন ধর্ম আর নিয়ন্তা নয়, খ্রিস্টান ধর্ম ও তার যাজকের জন্য ‘ভ্যাটিকান সিটি’ নামক একটি দেশ দিয়ে ধর্মকে ওখানে আবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। খ্রিস্টান ধর্ম ভ্যাটিকান সিটিতে আবদ্ধ থাকায় ইউরোপসহ পশ্চিমের দেশগুলোয় এখন আর ধর্ম ও সরকারের মধ্যে আগের মতো সংঘাত হয় না, সংঘাত হয় না বলেই অবাধে বিজ্ঞানচর্চা সম্ভব হচ্ছে, নতুন নতুন প্রযুক্তির আবিস্কারে ধর্ম প্রতিবন্ধক হচ্ছে না। রেজিম চেঞ্জ করা আমেরিকার লক্ষ্য হলেও ইরানে পশ্চিমা ধাঁচে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা তাদের লক্ষ্য নয়। আমেরিকা ইসলাম ধর্ম বিরোধী নয়, ইসলামের উগ্রপন্থারও বিরোধী নয়- বিরোধী হচ্ছে উগ্রপন্থার আমেরিকান স্বার্থ বিরোধী কর্মকাণ্ডের। মুসলমান পশ্চিমের মতো আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক হোক, এটাও আমেরিকা চায় না। চাইলে ধর্মনিরপেক্ষ সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মের গাদ্দাফি বা বশির আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় মোল্লাতন্ত্র কায়েমে আমেরিকা সহায়তা করতো না। ইরানের মতো ধর্মভিত্তিক বহু মুসলিম দেশের সঙ্গে আমেরিকার ঘনিষ্ট সম্পর্ক, হিজাব বিরোধী আন্দোলনে শতাধিক ব্যক্তিকে রাস্তায় প্রতিদিন ফাঁসি দিলেও আলী খামেনিকে হত্যা করা হতো না, যদি ইরান আমেরিকা এবং ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করতো।বাংলাদেশের মুসলিম বাঙালি ও চীনপন্থি বামেরা ইরানের ধর্মভিত্তিক সরকার ব্যবস্থার কড়া সমর্থক। চীনের সঙ্গে ভালো-খারাপ সম্পর্ক থাকা সাপেক্ষে আমাদের দেশের চীনপন্থিরা তাদের পছন্দ-অপছন্দ নির্ধারণ করে। অন্যদিকে আলেমদের তরফ থেকে শিয়াদের ‘কাফের’ বলার পরও তাদের প্রতি সাধারণ মুসলমানদের সমর্থনের কোন হেরফের হচ্ছে না, তারা প্রতি মুহুর্তে ইসরায়েলের ধ্বংস কামনা করছে। শুধু তাই নয়, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সমৃদ্ধ মুসলিম দেশগুলোতে ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র আঘাত হানলেও মুসলিম বাঙালিরা ঈদের খুশি উপভোগ করে। বিজ্ঞান বিচ্যুত মুসলমানদের অসহায়ত্ব এত গভীর হয়ে ওঠেছে যে, তারা মনে মনে ইরানের পক্ষে ‘আবাবিল’ পাখির আগমনও কামনা করে, এরা বিশ্বাস করে, ১৯৬৫ সনের যুদ্ধে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে ফেরেস্তারা লড়েছে। আজগুবি ক্ষমতায় বিশ্বাস করে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন মরেছেন, মরেছেন লিবিয়ার মুয়াম্মের গাদ্দাফিও। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন প্রভৃতি দেশে শিয়া মিলিশিয়াদের অস্ত্র সরবরাহ করে ইরান শুধু ইসরায়েলের শত্রু হয়নি, মুসলিম দেশগুলোরও শত্রæ হয়েছে। সৌদি আরব, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আমির আমিরাত প্রভৃতি দেশের শাসকেরা ইরানকে যমের মতো ভয় করে, ভয় ইরানের ক্ষেপনাস্ত্রে নয়, ভয় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের। এই ভয় থেকে লাভ হয়েছে ইসরায়েল এবং আমেরিকার,- আমেরিকা কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির সুযোগ পেয়েছে, সুযোগ পেয়েছে সামরিক ঘাঁটি করার। কী ইমানদার মুসলমান, একটি মুসলিম দেশ আরেকটি মুসলিম দেশের আক্রমণ থেকে রক্ষার পাওয়ার আশায় ‘নাসারাদের’ সামরিক ঘাঁটি রেখেছে। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস থাকলে ‘নাসারাদের’ সামরিক ঘাঁটি লাগে কেন? মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো ইসরায়েলকে ভয় করে না, ভয় করে ইরান, গাজার হামাস আর মিশরের ব্রাদারহুডদের। ১৯৯০ সনে সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত দখলের পর তাদের এই ভীতি আরও শতগুণে বেড়ে যায়, তাই তারা ইরানের পারমাণবিক শক্তি অর্জনকে তাদের জন্য অভিশাপ মনে করে। অধিকাংশ মুসলিম দেশ ইসলামের কট্টরপন্থা বা মৌলবাদ বিরোধী। তাই ১৯৭০ সনে পাকিস্তানি সৈন্য দিয়ে পিটিয়ে সশস্ত্র প্যালেস্টাইনিদের জর্ডান থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল, হামাসের করুণ পরাজয়ে কোনো মুসলিম দেশ কাতর হয়নি, মিশরের উগ্রপন্থী ব্রাদারহুডের ক্ষমতাচ্যুতি হলেও কোনো মুসলিম দেশের হাহুতাশ ছিল না। একইভাবে ইরানের অপমানজনক পরাজয়েও কোন মুসলিম দেশ আহা, উহু করবে না, কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মুসলিম বাঙালিদের মধ্যে চরম হতাশা নেমে আসবে। কারণ তারা আমারিকার ধ্বংসও চায়, আবার আমেরিকার ভিসাও চায়। তারা ভারতের বিনাশ চায়, আবার ভারতে পেঁয়াজ না হলেও চলে না।ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো মুসলমান দেশকে একসঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করার দিন শেষ, তাই মুসলমানদের হৃত গৌরবও আর ফিরে আসবে না। ভারতবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষা চালু করেছে ইংরেজরা। নাসারাদের সবকিছু পরিত্যজ্য হলেও মাদ্রাসা শিক্ষা বাংলাদেশে দিন দিন বাড়ছেই। কিন্তু এই শিক্ষা দিয়ে বর্তমান দুনিয়ায় অন্য জাতির প্রযুক্তির মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। পরিবেশ অনুক‚ল না থাকায় বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত লোকের অবদানও প্রায় জিরো। ইরান যদি যুদ্ধ কিছুদিন প্রলম্বিত করতে পারে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখতে পারে তাহলেই বাংলাদেশ আবার আরেকটি ঝাঁকুনি খাবে, ইতোপূর্বে করোনা আর ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের ঝাঁকুনি খেয়েছে, কিন্তু মোহাম্মদ ইউনূসের রেখে যাওয়া মুমূর্ষু বাংলাদেশ আর কোনো ঝাঁকুনি সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। অন্যদিকে ইরানের দুঃখজনক পরাজয়ে ইরানের তেল-গ্যাস ও হরমুজ প্রণালী স্থায়ীভাবে আমেরিকার কব্জায় চলে যাবে, বিশ্ব রাজনীতিতে পতন হবে রাশিয়া ও চীনের, কুর্দিরা ইরানের অংশ দখল করে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে, প্যালেস্টাইনিদের প্রতিরোধ সক্ষমতার অনুপস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে ফিরে আসবে ইসরায়েল প্রদত্ত অনুকম্পার শান্তি, আর জাতিসংঘ হবে মোহাম্মদ ইউনূসদের বনভোজনের বাগানবাড়ি, আর মুণ্ডহীন ধড়। [লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শিক্ষাপ্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব: শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে বিবেচ্য

সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের একটি প্রজ্ঞাপনের খবর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে কর্মরত ৮২ জন কর্মকর্তা যাদের মধ্যে সাঁট-লিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, হিসাবরক্ষণ কাম ক্লার্ক, উচ্চমান সহকারী ও প্রধান সহকারী রয়েছেন তাদের পদোন্নতি দিয়ে সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে কারও পদোন্নতিতে আপত্তি থাকার কথা নয়; বরং যে কোনো পেশাজীবনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ ক্যারিয়ার অগ্রগতির পথ থাকা অত্যন্ত জরুরি। একটি আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো তখনই কার্যকর হয়, যখন সেখানে কর্মরত মানুষ জানেন যে তাদের শ্রম, দক্ষতা ও সততার যথাযথ মূল্যায়ন একদিন পদোন্নতির মাধ্যমে স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু প্রশ্নটি আপত্তির নয়, বরং নীতিগত ও কাঠামোগত। সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের পদটি কি কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক পদ, যেখানে নথি যাচাই, অফিস ব্যবস্থাপনা বা দাপ্তরিক তদারকিই প্রধান কাজ? নাকি এটি মূলত এমন একটি একাডেমিক নেতৃত্বের অবস্থান, যার মাধ্যমে একটি উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান, শিক্ষার মান, শিক্ষকতার পেশাগত চর্চা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়? আধুনিক শিক্ষা-ব্যবস্থাপনা তত্তে¡ শিক্ষা কর্মকর্তাদেরকে কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দেখা হয় না; বরং তাদেরকে শিক্ষা-ব্যবস্থার শিখন-নেতৃত্বের ধারক (ইন্সট্রাকশানাল লিডার) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুতরাং এই পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি সরাসরি শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্ব কেবল দাপ্তরিক কাগজপত্র যাচাই বা প্রশাসনিক তদারকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি উপজেলার সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মান ও দিকনির্দেশনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাদের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে উপজেলার সব মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকি ও পর্যবেক্ষণ; শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা; স্থানীয় বাস্তবতা ও চাহিদা বিবেচনায় শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করা; এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা। অন্য কথায়, এই পদে কর্মরত ব্যক্তিকে একই সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষায় নেতৃত্ব এবং শিক্ষাবিষয়ক নীতিমালা বাস্তবায়নের সমন্বিত দায়িত্ব পালন করতে হয়। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব তত্তে¡ এ ধরনের পদকে কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্বের জায়গা হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটিকে শিখন নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিদ্যালয়ের পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা, পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং শিক্ষার পরিবেশ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা রাখতে হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে যে কেউ কি কেবল প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার জোরে এই একাডেমিক তদারকির দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারবেন? শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের পেশাগত সহায়তা প্রদান কিংবা বিদ্যালয়ের শিখন শেখার প্রক্রিয়া মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা মনোবিজ্ঞান, শিক্ষাক্রম তত্ত¡, পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার মৌলিক জ্ঞান। এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক নেতৃত্ব দেয়া কার্যত একটি জটিল দায়িত্ব, যা শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে পূরণ করা সবসময় সম্ভব নয়।আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও মানসিকতা’ নিয়ে কাজ করে এসেছে। ফলে শিক্ষাপ্রশাসন হয়ে উঠেছে সর্বত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের অংশ। ঔপনিবেশিক আমলে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল শাসন ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা; সৃজনশীল জ্ঞানচর্চা বা মানবিক বিকাশ তখন প্রশাসনিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল না। স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরেও সেই মানসিকতার ছাপ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রয়ে গেছে। বস্তুত, শিক্ষা প্রশাসনকেও অনেক সময় সাধারণ প্রশাসনের একটি সম্প্রসারিত শাখা হিসেবে দেখা হয়। তাই শিক্ষাপ্রশাসনের মূল কাজ মনে করা হয় দাপ্তরিক তদারকি, নিয়মনীতির প্রয়োগ এবং আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। কিন্তু শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্ব দিয়ে কাক্সিক্ষত ফল অর্জন করা যায় না।আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, শিক্ষা একটি বিশেষায়িত ও জ্ঞাননির্ভর ক্ষেত্র। এখানে শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত¡ বোঝা, শিক্ষাক্রমের দর্শন ও কাঠামো অনুধাবন করা, কার্যকর পাঠদান পদ্ধতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার ধারণা থাকা, এবং শিক্ষানীতির অন্তর্নিহিত লক্ষ্য বিশ্লেষণ করার মতো পেশাদার দক্ষতা প্রয়োজন। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান আমাদের শেখায় শিক্ষার্থীরা কীভাবে শেখে; শিক্ষাক্রম তত্ত¡ নির্দেশ করে জ্ঞানের সংগঠন ও উপস্থাপনের পদ্ধতি; আর শিক্ষাদর্শন আমাদের বলে দেয় শিক্ষা কেন এবং কোন সামাজিক ও নৈতিক উদ্দেশে পরিচালিত হবে। এসব জ্ঞান ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক তদারকি করা অনেকটা এমন, যেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা ছাড়াই একটি হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম মূল্যায়নের দায়িত্ব নেয়া। এ কারণেই সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে কেবল দাপ্তরিক অভিজ্ঞতাকে যথেষ্ট মনে করলে শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন প্রত্যাশা করা কঠিন। শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব সমস্যা বোঝা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর শিখন-শেখার প্রক্রিয়া মূল্যায়ন করা এবং বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক উন্নয়নে কার্যকর দিকনির্দেশনা দিতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মধ্যে শিক্ষাবিজ্ঞানের জ্ঞান ও পেশাগত নীতিনৈতিকতার উপলব্ধি থাকা অপরিহার্য। অন্যথায় শিক্ষাপ্রশাসন ধীরে ধীরে এমন একটি কাঠামোয় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, যেখানে নীতিমালা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিকতার বিকাশ পিছিয়ে পড়ে।বর্তমানে দেশে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিষয়ে চার বছর মেয়াদি অনার্স কোর্স থেকে প্রতিবছর শত শত গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজগুলোয় শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দীর্ঘদিন ধরেই চালু রয়েছে। এসব প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা সাধারণত ৩৫-৪০টি কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষাক্রম তত্ত¡ ও উন্নয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষা পরিকল্পনা, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষায় নেতৃত্ব, শিক্ষা গবেষণা পদ্ধতি, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে পদ্ধতিগত ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করেন। শুধু তাত্তি¡ক জ্ঞানই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তারা গবেষণা, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং প্র্যাকটিকামভিত্তিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো বোঝার সুযোগ পান। ফলে তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে নয়, বরং একটি জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক বিকাশের প্রক্রিয়া হিসেবে অনুধাবন করার সক্ষমতা অর্জন করেন। এছাড়াও দেশে এক বছর মেয়াদি অথবা পার্ট-টাইম দুই বছর মেয়াদি বিএড কোর্স থেকে পাশ করা বিপুলসংখ্যক শিক্ষক রয়েছেন, যারা পেশাগত প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘদিনের শ্রেণীকক্ষের অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজেদের কর্মজীবনে অগ্রসর হতে আগ্রহী। এই শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের বাস্তব পাঠদান প্রক্রিয়া, শিক্ষার্থীদের শেখার ধরণ, মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছেন। শিক্ষাতত্ত¡ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার এই সমন্বয় তাদেরকে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব ও একাডেমিক তদারকির ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করতে পারে। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে যেখানে শিক্ষাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদের এমন একটি সম্ভাবনাময় ভাÐার দেশে তৈরি হয়েছে, সেখানে শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তাদের দক্ষতা ও পেশাগত জ্ঞানকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে।পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যুগের চাহিদা মেটাতে শিক্ষা প্রশাসনকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করা এবং এতে পেশাদারত্বের ভিত্তি শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ মাঠপর্যায়ের পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাবিষয়ক পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। এ ধরনের পদে সরাসরি শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষা প্রশাসনে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও পেশাদার নেতৃত্বের ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে। কারণ শিক্ষাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা শিক্ষাক্রম, মূল্যায়ন, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষাব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে পদ্ধতিগত ধারণা রাখেন, যা বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক তদারকি ও উন্নয়নে কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে পারে।একই সঙ্গে পেশাগত উন্নয়ন ও পদোন্নতির সুযোগ দিতে বাস্তব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষকদের মধ্য থেকেও যারা সরকারি প্রশাসনে যেতে আগ্রহী তাদের নিয়োগের সুযোগ রাখা যেতে পারে। দীর্ঘদিনের শ্রেণীকক্ষ অভিজ্ঞতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার বাস্তব দক্ষতা এবং স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান তাদেরকে শিক্ষা প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত করতে পারে। এতে একদিকে যেমন পেশাগত অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত দক্ষতা সম্পন্ন নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি হবে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে শিক্ষাবিজ্ঞানের তাত্তি¡ক জ্ঞানের একটি কার্যকর সমন্বয় ঘটবে। পরবর্তীতে এই সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই ধাপে ধাপে পদোন্নতির মাধ্যমে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শিক্ষাপ্রশাসনের উচ্চতর পদগুলো পূরণ করা যেতে পারে। এমন একটি ধারাবাহিক পেশাগত সোপান গড়ে উঠলে শিক্ষা প্রশাসনে দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা সমাধানের প্রয়াস বৃদ্ধির মধ্যে দিয়ে দ্রæত শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে এটি একটি সুসংগঠিত পেশাগত ক্যারিয়ার কাঠামো তৈরি করবে, যেখানে শিক্ষা প্রশাসন আর কেবল দাপ্তরিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং জ্ঞাননির্ভর, দক্ষতাভিত্তিক ও পেশাদার নেতৃত্বের একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শিক্ষা কর্মকর্তার এই পদটি মূলত মাঠপর্যায়ের দায়িত্বনির্ভর। একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে হয়, শিক্ষকদের সঙ্গে পেশাগত আলোচনা করতে হয়, শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে হয় এবং বিভিন্ন বাস্তব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ নিতে হয়। অর্থাৎ এই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন উদ্যম, গতিশীলতা, পর্যবেক্ষণক্ষমতা এবং শিক্ষাবিষয়ক একটি সুস্পষ্ট পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষা প্রশাসনের আধুনিক ধারণায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরকে অনেক সময় ‘শিখন সহায়তার নেতা’ (ইন্সট্রাকশানাল সার্পোট লিডার) হিসেবে বিবেচনা করা হয় যারা বিদ্যালয়ের পাঠদান প্রক্রিয়া উন্নত করতে শিক্ষককে সহায়তা করেন, উদ্ভুত সমস্যার উৎস চিহ্নিত করেন এবং কার্যকর সমাধানের পথ নির্দেশ করেন। এই বাস্তবতায় কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে এসে কেবল প্রশাসনিক ধারার পদোন্নতির মাধ্যমে এই ধরনের মাঠমুখী পদে দায়িত্ব পাওয়া অনেক সময় কাক্সিক্ষত ফল বয়ে আনে না। কারণ দীর্ঘদিন দাপ্তরিক পরিবেশে কাজ করা কোনো কর্মকর্তার জন্য নিয়মিত বিদ্যালয়ভিত্তিক তদারকি, শিক্ষকদের সঙ্গে পেশাগত আলাপ-আলোচনা কিংবা শিখন-শেখার বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের মতো কাজগুলো নতুন করে গ্রহণ করা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এর সঙ্গে শারীরিক পরিশ্রম, নিয়মিত ভ্রমণ এবং দ্রæত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও যুক্ত থাকে, যা একটি গতিশীল কর্মপরিবেশ দাবি করে। অন্যদিকে, কর্মজীবনের একেবারে শেষদিকে এসে এই পদে নিয়োগ পেলে তাদের পক্ষে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ধাপে ধাপে উচ্চতর পর্যায়ে নেতৃত্বের ভ‚মিকা নেয়ার সুযোগও প্রায় থাকে না বললেই চলে।একটি কার্যকর ও টেকসই শিক্ষাপ্রশাসনের জন্য প্রয়োজন এমন একটি পেশাগত কাঠামো, যেখানে মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়ে একটি সুসংহত নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারেন। এতে প্রশাসনের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণের কালচার বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত শিক্ষাক্রম সংস্কার, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের মতো বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। নিঃসন্দেহে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু শিক্ষাপ্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে আড়ালেই থেকে যায়। অথচ শিক্ষার সমাজবিজ্ঞান ও প্রশাসন তত্তে¡র আলোকে বলা যায় কোনো শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা কেবল শিক্ষাক্রম বা নীতিমালার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই নীতিমালা মাঠপর্যায়ে কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার ওপরই শেষ পর্যন্ত শিক্ষার গুণগত মান নির্ধারিত হয়।যত উন্নত শিক্ষাক্রমই প্রণয়ন করা হোক না কেন, মাঠপর্যায়ে তা সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য যেমন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন, তেমনি তাদের পেশাগত দিকনির্দেশনা ও তদারকির জন্য দক্ষ শিক্ষাপ্রশাসকও অপরিহার্য। শিক্ষা ব্যবস্থাপনার আধুনিক ধারণায় প্রশাসনকে কেবল নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি একটি সহায়ক ও সক্ষমতাবর্ধক ব্যবস্থা যা শিক্ষকদের পেশাগত বিকাশে সহায়তা করে, সমস্যার সমাধানে দিকনির্দেশনা দেয় এবং বিদ্যালয়গুলোকে একটি ইতিবাচক শিখন কালচারের দিকে এগিয়ে নিতে ভ‚মিকা রাখে। এই বাস্তবতায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ভ‚মিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে তিনিই শিক্ষকদের জন্য প্রশাসনিক ও পেশাগত সহায়তার প্রথম আশ্রয়স্থল। কোনো বিদ্যালয়ে পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা, শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা বা প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিলে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানেরা সবার আগে এই দপ্তরের দ্বারস্থ হন। ফলে এই পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে কেবল দাপ্তরিক নিয়ম জানাই যথেষ্ট নয়; তার মধ্যে থাকতে হয় শিক্ষাবিষয়ক পেশাগত উপলব্ধি, সমস্যার বিশ্লেষণক্ষমতা এবং বাস্তবসম্মত সমাধান দেয়ার সক্ষমতা। এমন দক্ষ নেতৃত্বই মাঠপর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থাকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।যদি এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটিতে পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের যথাযথ সুযোগ না দেয়া হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই দক্ষ ও মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ শিক্ষকতা এবং শিক্ষাপ্রশাসন উভয় ক্ষেত্রেই আগ্রহ হারাতে পারেন। যেকোনো পেশার প্রতি আগ্রহ ও প্রতিশ্রæতি অনেকাংশেই নির্ভর করে সেখানে একটি সুস্পষ্ট পেশাগত স্বীকৃতি ও অগ্রগতির সম্ভাবনা থাকার ওপর। যদি শিক্ষাবিজ্ঞানে দীর্ঘ সময় ধরে অধ্যয়ন করা ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও সেই জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানোর উপযুক্ত ক্ষেত্র না তৈরি হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই অনেক তরুণ অন্য পেশার দিকে ঝুঁকবেন। এতে শিক্ষাখাত ধীরে ধীরে তার সম্ভাবনাময় মানবসম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। এর ফলাফল কেবল জনবল সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। শিক্ষাক্রম যত আধুনিকই হোক, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন উৎসাহী শিক্ষক, সহায়ক প্রশাসন এবং একটি পেশাদার পরিবেশ। কিন্তু যখন সেই কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নও হয়ে ওঠে খÐিত, অনুপ্রেরণাহীন এবং অনেক সময় বিশৃঙ্খল। নীতিমালা ও বাস্তবতার মধ্যে তখন একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয় কাগজে-কলমে সংস্কার থাকলেও শ্রেণীকক্ষের বাস্তবতায় তার প্রতিফলন দেখা যায় না। ফলে আমরা যে আধুনিক, মানবিক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি যেখানে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে তা বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়াতে পারে না। যথাযথ পেশাদার নেতৃত্ব ও সহায়ক প্রশাসনিক কাঠামো ছাড়া সেই স্বপ্ন অনেক সময় নীতিনির্ধারণের দলিল বা নীতিমালার পৃষ্ঠাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। তাই শিক্ষাব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নের জন্য পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত মানবসম্পদকে শিক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় স্থানে নিয়ে আসা এখন অত্যন্ত জরুরি।শিক্ষার জন্য নিবেদিত দুটো মন্ত্রণালয় কেবল সরকারের কার্যক্রম পরিচালনার দপ্তর নয়; এদুটো মূলত একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্প। উল্লেখ্য যে, উদ্ভুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার হাত থেকে রেহায় পেতে পূর্বে শিক্ষাপ্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণের ওপর একটি লেখায় দুটো মন্ত্রণালয়কে একীভ‚ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সে যাই হোক, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তি গড়ে ওঠে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অর্জন করেছে, তারা শিক্ষাকে কেবল প্রশাসনিক রুটিনের বিষয় হিসেবে দেখেনি; বরং জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়নে মাধ্যমে মানবসম্পদ এবং নৈতিক নাগরিক তৈরির একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করেছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা প্রশাসনের কাঠামোও হতে হয় সময়োপযোগী, পেশাদার এবং জ্ঞানভিত্তিক। কিন্তু যদি এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটিকে এখনও সেকেলে প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিচালিত করা হয়, তবে দেশের শিক্ষার গুণগত মান পরিবর্তন প্রত্যাশা করা বাতুলতা মাত্র।পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রশাসনকে নিয়ে নতুন করে ভাবার এবং তাকে পেশাদার ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর সুযোগ এসেছে। বিশেষ করে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার (এবং সহকারী কর্মকর্তাসহ) মতো গুরুত্বপূর্ণ মাঠপর্যায়ের পদগুলোতে শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকারমূলক নিয়োগ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রশাসনে এমন একটি পেশাদার নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে, যারা শিক্ষাবিজ্ঞানের জ্ঞান, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং শিক্ষানীতির লক্ষ্য এই তিনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হবে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত শিক্ষাপ্রশাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় নিয়োগ নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করে শিক্ষাবিষয়ক পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়া। কারণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাক্রম এবং শিক্ষানীতির মধ্যবর্তী যে প্রাতিষ্ঠানিক সেতুটি মাঠপর্যায়ে কাজ করে, সেটি মূলত শিক্ষাপ্রশাসনই। সেই সেতুটি যদি দুর্বল হয়, তবে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। আর যদি সেই সেতুটি জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে মজবুত করা যায়, তবে শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক রূপান্তরের পথও অনেকটাই সুগম হয়ে উঠবে। নতুন সরকারের এখনই সেই সেতুকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর উপযুক্ত সময়।[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

ভিডিও

রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তায় সিরিজ জিতল বাংলাদেশ

শেষ ওভারে ১৪ রানের সমীকরণ, হাতে মাত্র এক উইকেট। প্রতিপক্ষের ব্যাটে শাহিন আফ্রিদি- যে কোনো মুহূর্তে ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা। কিন্তু রিশাদ হোসেনের করা সেই ওভারেই যেন নাটকের মোড় ঘুরে গেল।  টেনশনের চরম মুহূর্ত পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ১১ রানের অবিশ্বাস্য জয়ে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নিল বাংলাদেশ। রোববার (১৫ মার্চ) শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে স্নায়ুক্ষয়ী এক লড়াই প্রত্যক্ষ করল দর্শকরা। টস হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে তানজিদ হাসানের ঝোড়ো সেঞ্চুরিতে (১০৭ বলে ১০৭) বাংলাদেশ তোলে ৫ উইকেটে ২৯০ রান। জবাবে পাকিস্তানও জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছিল সালমান আগাকে (৫২ বলে ৭৫) ঘিরে। কিন্তু শেষ দিকে তাসকিনের করা ৪৮তম ওভারে সালমানের বিদায়েই যেন খেই হারায় পাকিস্তান।তার আগে অবশ্য মোস্তাফিজকে নিয়ে একবার শঙ্কায় পড়তে হয়েছিল বাংলাদেশ শিবিরকে। ৪৯তম ওভারে শাহিন আফ্রিদির মারাত্মক শট লেগে হাঁটুতে গুরুতর আঘাত পান মোস্তাফিজ। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পরও তিনি ওভার শেষ করেন। শেষ বলে হারিস রউফকে ক্যাচ বানিয়ে বাংলাদেশকে এনে দেন বিপুল স্বস্তি।শেষ ওভারে বাংলাদেশকে নিয়ে আসেন রিশাদ। আগের ওভার শেষে পাকিস্তানের দরকার ছিল ১৪ রান। রিশাদের প্রথম বলেই আম্পায়ার ওয়াইড দিলে শঙ্কা আরও বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের তৎক্ষণাৎ রিভিউ নেওয়ায় সেই সিদ্ধান্ত বদলে যায়। বলটি ব্যাট ছোঁয়ায় ডিআরএসের পক্ষে প্রমাণিত হয়। এরপর আর রান নিতে পারেননি আফ্রিদিরা; বরং শেষ বলে স্টাম্পড হয়ে যান আফ্রিদি নিজেই।এর আগে বাংলাদেশের ইনিংসটা ছিল তানজিদের ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস। ৩০তম ওয়ানডেতে এসে প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নেন এই ওপেনার। ৭ ছক্কা ও ৬ চারে সাজানো তার ইনিংসটি বাংলাদেশের সংগ্রহকে ভিত শক্ত করে দেয়। সাইফ হাসানের (৩৭) সঙ্গে তার উদ্বোধনী জুটিতে আসে ১০৫ রান। পরে লিটন দাসের ৪১ ও তাওহিদ হৃদয়ের অপরাজিত ৪৮ রানে ভর করে বাংলাদেশ নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে পৌঁছে ২৯০ রানে।২০১৫ সালের পর দুই দলের প্রথম ওয়ানডে সিরিজে এমন রুদ্ধশ্বাস লড়াই উপহার দিয়ে জয় ছিনিয়ে নেওয়াটা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শুরুতে পাওয়ারপ্লেতে বিনা উইকেটে ৫০ রান তোলার পর শেষ ১০ ওভারে মাত্র ৭৭ রান- ব্যাটিংয়ে কিছু ধীরগতি থাকলেও শেষ হাসি বাংলাদেশের বোলাররাই হাসেন।

রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তায় সিরিজ জিতল বাংলাদেশ
১২ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাঝে চলমান ODI সিরিজে কে জিতবে ?

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাঝে চলমান ODI সিরিজে কে জিতবে ?

  বাংলাদেশ
  পাকিস্তান
  মন্তব্য করা কঠিন
মোট ভোটদাতাঃ জন