সংবাদ
বুথে টাকা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা

বুথে টাকা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা

ঈদুল আজহার শেষ সময়ে বিকেলে এলিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন মল্লিকা শপিং সেন্টারে গিয়েছিলেন নাজিয়া পান্না নামের এক চাকরিজীবী।  প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে গিয়ে হাতের টাকা শেষ হয়ে যায়। দ্রুত তিনি পাশের একটি এটিএম বুথে যান টাকা তুলতে। কিন্তু গিয়ে পড়েন বিপাকে। কোনোভাবেই টাকা পাচ্ছিলেন। বার বার চেষ্টা করে অন্যসব বুথে ঘুরে শেষ বাসায় ফেরেন।ঠিক এমনি ঘটনা ঘটেছে আরেক চাকরিজীবী নেহাল আহমেদের বেলাতেও।  সন্ধ্যায় বসুন্ধরা সিটিতে কেনাকাটা করতে গিয়ে দরকার পড়ে কিছু টাকার।  এটিএম কার্ড নিয়ে ছুটে যান পাশের একটা বুথে।  কিন্তু বহুক্ষণ চেষ্টা করেও টাকা পাননি। অথচ তার ব্যাংক হিসাবে তোলার মতো যথেষ্ট টাকা রয়েছে।পান্না আর নেহালের মতোই ঈদের কেনাকাটা করা টাকা তুলতে এক বুথ থেকে আরেক বুথে ছুটছেন গ্রাহকরা। অনেক এটিএম বুথেই টাকা নেই। আবার কোনো বুথে টাকা থাকলেও অন্য ব্যাংকের কার্ড দিয়ে তোলা যাচ্ছে না। মঙ্গলবার (২৬ মে) রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় এমন চিত্র দেখা গেছে।শেওড়াপাড়ায় এবি ব্যাংকের বুথে টাকা নেই। উত্তরা ব্যাংকের বুথ বন্ধ। সিটি ব্যাংকের বুথে অন্য ব্যাংকের কার্ড কাজ করছে না। নিরাপত্তাকর্মী জানান, টাকা কম আসায় নিজেদের গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ফাস্ট ট্র্যাক বুথগুলোয় সাতটি এটিএম থাকলেও সেগুলোর বেশির ভাগ অকেজো। অন্য ব্যাংকের কার্ডে পাঁচ হাজার টাকার বেশি তোলা যাচ্ছে না। আগারগাঁওয়ে আইডিবি ভবনের পাশের বুথেও টাকা নেই।বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২১ মে এক নির্দেশনার মাধ্যমে এটিএম বুথ, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, পয়েন্ট অব সেলস (পস), কিউআর কোড ও অনলাইন ই-পেমেন্ট গেটওয়েতে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কোথাও কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত তা সমাধানের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।প্রতিবছর একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হলেও বন্ধের মধ্যে বিড়ম্বনার খবর পাওয়া যায়। এবার ঈদের বন্ধ শুরুর আগে থেকেই অনেক বুথে টাকা না পাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছিল। গ্রাহকরা বলছেন, আগের কোনো ঈদে এত ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি।কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী টাকা দেওয়া হয়েছে। এরপরও বুথে টাকা না পেলে দুঃখজনক। ঈদের পর ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বসা হবে।’
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

অনুপ্রবেশ ও নিরাপত্তা প্রশ্নে কেন্দ্রের পদক্ষেপ: অমিত শাহ-এর ঘোষণায় নতুন সমীকরণ

অনুপ্রবেশ, জনবিন্যাস এবং তার রাজনৈতিক প্রভাব এই ইস্যুটি বর্তমানে দেশের অন্যতম বিতর্কিত ও সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রের তরফে উচ্চস্তরীয় কমিটি গঠনের ঘোষণার পর এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিতশাহ-এর ঘোষণায় স্পষ্ট, কেন্দ্র এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক ভারসাম্য এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অনুপ্রবেশের ফলে জনসংখ্যার গঠন অস্বাভাবিকভাবে বদলাচ্ছে, যার প্রভাব আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদী-এর “ভিশন ডেমোগ্রাফি” ধারণার বাস্তবায়ন হিসেবেই এই কমিটি গঠনকে দেখা হচ্ছে। বিজেপির যুক্তি হল, দীর্ঘদিন ধরে কিছু রাজ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে অনুপ্রবেশ বেড়েছে, এবং এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।অন্যদিকে, বিরোধী শিবির এই পুরো বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছে। কংগ্রেসের বক্তব্য অনুযায়ী, জনবিন্যাস পরিবর্তনের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে সামনে এনে শাসক দল আসলে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়াতে চাইছে। তাদের অভিযোগ, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, বেকারত্ব বা মূল্যবৃদ্ধির মতো বাস্তব সমস্যাগুলি থেকে জনমানসের দৃষ্টি সরাতে এই ধরনের ইস্যু তুলে ধরা হচ্ছে। একই সুর শোনা গেছে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফেও। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল দাবি করেছে, “অনুপ্রবেশ” ইস্যুটি অনেক ক্ষেত্রেই অতিরঞ্জিত এবং এর মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। তাদের মতে, কেন্দ্র রাজ্যের উপর দায় চাপিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।বামপন্থী দলগুলি আরও কড়া ভাষায় এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, “ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ” একটি জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া, যাকে সরলভাবে অনুপ্রবেশের সঙ্গে যুক্ত করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। জন্মহার, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, শিক্ষা ও আর্থসামাজিক পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলিও জনসংখ্যার গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে, পর্যাপ্ত তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ছাড়া এই ধরনের সিদ্ধান্ত সমাজে বিভ্রান্তি এবং উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে এই ইস্যুর প্রভাব আরও গভীর। অসম বা ত্রিপুরার মতো রাজ্যে অনুপ্রবেশ নিয়ে বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন হয়েছে। ফলে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে সেখানে একাংশ সমর্থন করলেও, অন্য অংশ এটিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই দেখছে। একই সঙ্গে NRC বা ডিটেনশন ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে অনেকেই মানবাধিকার এবং আইনি জটিলতার বিষয়টিও তুলে ধরছেন।বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ বলছেন, “জনবিন্যাস পরিবর্তন” বিষয়টি অত্যন্ত বহুমাত্রিক এবং সংবেদনশীল। শুধুমাত্র অনুপ্রবেশকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বোঝা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক সুযোগের খোঁজে মানুষের স্থানান্তর, শহরায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি—সব মিলিয়েই জনসংখ্যার গঠন বদলে যায়। তাই তারা মনে করছেন, কেন্দ্রের গঠিত কমিটির কাজ হবে তথ্যনির্ভর ও স্বচ্ছ বিশ্লেষণ তুলে ধরা, যাতে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যায়।সব মিলিয়ে, অনুপ্রবেশ ও জনবিন্যাসের এই বিতর্ক এখন শুধুমাত্র প্রশাসনিক বা নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে। শাসক দল যেখানে এটিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে, বিরোধীরা সেখানে এটিকে রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। আগামী দিনে কেন্দ্রের কমিটির রিপোর্ট এবং তার ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, এই বিতর্ক কোন দিকে এগোবে এবং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে তার কী প্রভাব পড়বে।

ঈদুল আজহার সমাজবাস্তবতার অন্তর্গত পাঠ

বাংলাদেশে ঈদুল আজহা প্রতি বছর কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবে আসে না; এটি সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শ্রেণীবিন্যাস, পারিবারিক সম্পর্ক এবং নৈতিকতার একটি গভীর প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে শহর ও গ্রামজুড়ে শুরু হয় প্রস্তুতি, পশুর হাট জমে ওঠে, ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে, বাজারে বাড়ে ব্যস্ততা, পরিবারগুলোতে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। কিন্তু এই উৎসবের অন্তরালে এমন কিছু সামাজিক বাস্তবতা থাকে, যা আমাদের সমকালীন বাংলাদেশের গভীর সংকট, পরিবর্তন এবং সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসে। ঈদুল আজহা তাই কেবল আনন্দ, ভোজন বা ধর্মীয় আচার নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের সমাজকে নতুনভাবে দেখতে পারি।ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা নিহিত রয়েছে আত্মত্যাগের দর্শনে। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর আত্মসমর্পণ, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং প্রিয়তম বস্তুকে ত্যাগ করার মানসিকতা এই উৎসবের কেন্দ্রীয় বার্তা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আজকের বাংলাদেশে ঈদের এই আত্মিক শিক্ষা কতটা সামাজিক বাস্তবতায় প্রতিফলিত হচ্ছে? আত্মত্যাগ কি এখনও নৈতিকতার প্রশ্ন, নাকি ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠছে সামাজিক মর্যাদা ও প্রদর্শনের অংশ?বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের সঙ্গে ঈদুল আজহার চরিত্রও বদলেছে। গত দুই দশকে নগরায়ণ, প্রবাসী আয়, ভোক্তাশ্রেণীর বিস্তার এবং মধ্যবিত্তের জীবনধারার পরিবর্তন ঈদের সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করেছে। একসময় গ্রামে কোরবানির আয়োজন ছিল সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, এমনকি আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলোও সম্মিলিতভাবে অংশ নিত। এখন শহুরে জীবনে কোরবানি অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক, প্রতিযোগিতামূলক এবং সামাজিক প্রতীকের অংশ হয়ে উঠছে।বিশেষত শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে কোরবানির পশু এখন অনেক সময় ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও দেখা দেয়। পশুর দাম, ওজন, জাত, আকার কিংবা বিরলতা নিয়ে সামাজিক আলোচনার এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পশুর ছবি, দাম বা ‘বিশেষত্ব’ তুলে ধরা যেন নীরবভাবে একটি বার্তা দেয়—আমি কতটা সক্ষম। এখানে প্রশ্ন সম্পদের নয়; প্রশ্ন হলো ধর্মীয় অনুশীলন কি প্রদর্শনের সংস্কৃতির ভেতরে হারিয়ে যাচ্ছে? আত্মত্যাগের উৎসব যদি সামাজিক মর্যাদার প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়, তবে তার নৈতিক ভিত্তি কতটা অক্ষুণ্ন থাকে?তবে ঈদুল আজহাকে শুধুই ভোগবাদ বা প্রদর্শনের আলোকে দেখা অন্যায় হবে। কারণ বাংলাদেশে এই উৎসব এখনও সামাজিক সংহতি ও বণ্টনের অন্যতম শক্তিশালী উপলক্ষ। কোরবানির মাংস ভাগাভাগির যে সংস্কৃতি আছে, তা আমাদের সমাজে নৈতিক অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। বহু দরিদ্র পরিবার বছরের এই সময়টাতেই হয়তো প্রথম পর্যাপ্ত মাংস খাওয়ার সুযোগ পায়। নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর, গৃহকর্মী, বিধবা, একাকি বৃদ্ধ কিংবা অনিশ্চিত জীবনে থাকা পরিবারগুলোর জন্য ঈদুল আজহা এখনও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে।বাংলাদেশের সমাজে এখনও এক ধরনের নীরব মানবিকতা টিকে আছে। অনেক পরিবার প্রচার ছাড়া, সামাজিক স্বীকৃতি ছাড়া, নীরবে অসচ্ছল প্রতিবেশীদের ঘরে মাংস পৌঁছে দেয়। এই অদৃশ্য দয়ার চর্চাগুলোই প্রকৃতপক্ষে ঈদের সামাজিক সৌন্দর্য। এগুলো প্রমাণ করে যে ধর্মীয় অনুশীলনের গভীরে এখনও সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সহমর্মিতা কাজ করে।ঈদুল আজহার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মাত্রা হলো অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের বাস্তবতা। প্রতি ঈদে লাখো মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরে। কারখানার শ্রমিক, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অফিসকর্মী কিংবা নিম্নআয়ের নগরবাসী দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছিন্নতার পর পরিবারে ফিরে যায়। এই যাত্রা কেবল ভৌগোলিক নয়; এটি আবেগেরও প্রত্যাবর্তন। যারা বছরের বড় সময়টুকু নগরের ব্যস্ততা, নিঃসঙ্গতা ও অনিশ্চয়তায় কাটায়, তাদের জন্য ঈদ পারিবারিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ।নগরজীবনের একটি বড় বৈপরীত্য এখানেই—মানুষ আয় বাড়ায়, কিন্তু সামাজিক সম্পর্ক হারায়। বিশেষ করে ঢাকার ছাদঘেরা জীবন, ভাড়াবাড়ির সংকুচিত সম্পর্ক, বিচ্ছিন্ন পারিবারিক কাঠামো এবং ব্যস্ত পেশাজীবনের মধ্যে ঈদ এখনও মানুষকে সাময়িকভাবে সমাজে ফিরিয়ে আনে। গ্রামের বাড়ি হয়ে ওঠে পরিচয়ের জায়গা, শেকড়ের স্মারক এবং আবেগের নিরাপদ আশ্রয়।তবে ঈদুল আজহা বাংলাদেশের বৈষম্যকেও নগ্নভাবে দৃশ্যমান করে। সমাজের এক অংশ যেখানে বিপুল ব্যয়ে কোরবানি করে, সেখানে অন্য অংশ মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বৈষম্যের দৃশ্যমানতাকে আরও তীব্র করে। সমৃদ্ধ জীবনের প্রদর্শন অনেক সময় নীরবে বঞ্চিত মানুষের মনে অসমতা, কষ্ট কিংবা অস্বস্তির অনুভূতি তৈরি করে। ফলে উৎসব কখনও কখনও আনন্দের পাশাপাশি শ্রেণীগত ব্যবধানের অনুভূতিকেও জোরালো করে তোলে।এই বাস্তবতায় একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে— বৈষম্যময় সমাজে কোরবানির প্রকৃত অর্থ কী? যদি ঈদের শিক্ষা হয় ত্যাগ, তবে সেই ত্যাগ কি কেবল পশু কোরবানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি আধুনিক সমাজে এর অর্থ হতে পারে অপচয় কমানো, শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা, অভাবী আত্মীয়কে সহায়তা করা, কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি শক্তিশালী করা? হয়তো আজকের বাংলাদেশে কোরবানির গভীরতর অর্থ হলো— নিজের ভোগের কিছু অংশ ত্যাগ করে অন্যের মর্যাদা নিশ্চিত করা।ঈদুল আজহা নগর ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত সচেতনতারও পরীক্ষা নেয়। বিশেষত ঢাকার মতো বড় শহরে কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ড্রেন বন্ধ হওয়া, রক্ত ও বর্জ্যের কারণে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া কিংবা নাগরিক অসচেতনতা শহরের জীবনকে সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত করে। অথচ পরিচ্ছন্নতা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অংশ। তাই ধর্মীয় অনুশীলনের সঙ্গে নাগরিক দায়িত্ববোধের সংযোগও নতুনভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।একই সঙ্গে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সংস্কৃতিও ঈদের চরিত্র বদলে দিচ্ছে। এখন অনেকে অনলাইনে পশু কেনেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কোরবানির অর্থ পাঠান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কোরবানি সম্পন্ন করেন কিংবা অনলাইন দান কার্যক্রমে অংশ নেন। নতুন প্রজন্মের কাছে ঈদ ক্রমশ প্রযুক্তিনির্ভর ও সংগঠিত রূপ নিচ্ছে। তবে এর মধ্যেও মানবিক সম্পর্কের জায়গা যেন সংকুচিত না হয়, সেটিই বড় প্রশ্ন।নারীদের শ্রমের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের আনন্দের অন্তরালে বিপুল গৃহস্থালি শ্রম অনেক সময় নারীদের কাঁধেই গিয়ে পড়ে। রান্না, সংরক্ষণ, অতিথি আপ্যায়ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা—সবকিছু সামলাতে গিয়ে অনেক নারী উৎসব উপভোগের চেয়ে দায়িত্বের ভার বেশি বহন করেন। পরিবারকেন্দ্রিক আনন্দের কথা বলা হলেও গৃহস্থালি দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্ন এখনও প্রাসঙ্গিক।সবচেয়ে বড় কথা, ঈদুল আজহা এখনও বাংলাদেশের সমাজে সাময়িক সামাজিক সংহতি সৃষ্টি করতে পারে। সম্পর্কের দূরত্ব কমে, মান-অভিমান ভুলে অনেকে একত্রিত হয়, সামাজিক বিভাজন সাময়িকভাবে নরম হয়। রাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক চাপ, নগর নিঃসঙ্গতা এবং সামাজিক মেরুকরণের সময়ে এই সংহতির গুরুত্ব আরও বেশি।তবে উৎসবের মানবিকতা যদি তিন দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়, তবে তার সামাজিক শক্তি সীমিত থেকে যায়। গরিব মানুষের প্রয়োজন শুধু মৌসুমি সহানুভূতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি ন্যায়বিচার। শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজন কেবল ঈদের বোনাস নয়, সারা বছরের মর্যাদা। অভাবী মানুষের প্রয়োজন কেবল একদিনের মাংস নয়, টেকসই জীবিকার নিশ্চয়তা। ঈদের চেতনা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সামাজিক দায়িত্ববোধে রূপ নেয়।আজকের বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, নগর নিঃসঙ্গতা এবং বাড়তে থাকা বৈষম্যের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ঈদুল আজহা কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি নৈতিক আত্মসমালোচনারও সময়। আমরা কীভাবে উদযাপন করি, কীভাবে ভাগ করি, কীভাবে সহমর্মিতা দেখাই—এসব প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের ভবিষ্যৎ।ঈদুল আজহা আমাদের শেখায়—একটি সমাজ কেবল সম্পদ দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা এবং ভাগাভাগির সংস্কৃতির ওপর। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের ভেতরের অহংকার, লোভ, বৈষম্য এবং উদাসীনতাকে ত্যাগ করার আহ্বান। বাংলাদেশ যদি এই শিক্ষা ধারণ করতে পারে, তবে ঈদুল আজহা কেবল একটি উৎসব হবে না; এটি হয়ে উঠতে পারে আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের এক নৈতিক প্রেরণা।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

এআই যুগের বিপজ্জনক রূপান্তর

ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন রণক্ষেত্রে কোনো নতুন প্রযুক্তি কেবল একটি যন্ত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা, রাষ্ট্রের আচরণ এবং যুদ্ধের চরিত্র বদলে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে মেশিনগানকে অনেকে কেবল দ্রুত গুলি ছোড়ার একটি কার্যকর অস্ত্র বলে মনে করেছিল। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি ইউরোপের যুদ্ধনীতিকে বদলে দেয়। ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের কাদামাখা ট্রেঞ্চে একটি পুরো প্রজন্মের মৃত্যু সেই পরিবর্তনের নির্মম মূল্য হয়ে দাঁড়ায়। পারমাণবিক বোমার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। যুক্তি ছিল— এটি যুদ্ধ শেষ করবে। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল, তা হলো পৃথিবী প্রবেশ করল এক দীর্ঘ ভয়ের যুগে, যেখানে পরস্পরকে ধ্বংস করার সক্ষমতাই হয়ে উঠলো বৈশ্বিক স্থিতাবস্থার ভিত্তি। আজও বিশ্ব রাজনীতি সেই আতঙ্কের ছায়া থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। এখন মানবসভ্যতা আরেকটি পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এবার প্রযুক্তিটির নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এটি আর ভবিষ্যতের কোনো পরীক্ষামূলক ধারণা নয়; ইতোমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। বাস্তব মানুষের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্তে অ্যালগরিদম ভূমিকা রাখছে। কোন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হবে, কোন গাড়ি সন্দেহজনক, কোথায় সম্ভাব্য শত্রু লুকিয়ে আছে— এসব নির্ধারণে এখন এআই কাজ করছে মানুষের আগেই। প্রশ্নটা তাই আর এই নয় যে, এআই যুদ্ধ বদলে দেবে কি না? সেটি ইতোমধ্যেই বদলে দিচ্ছে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—আমরা কি বুঝতে পারছি যুদ্ধের চরিত্র কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে? এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এই পরিবর্তনের জন্য কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ আদৌ সম্মতি দিয়েছে কি?মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত ‘প্রজেক্ট মেভেন’-এর সূচনা হয়েছিল খুব বাস্তব একটি সমস্যার কারণে। আফগানিস্তান, ইরাক কিংবা সিরিয়ার মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন থেকে প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণ ভিডিও ও নজরদারি তথ্য আসছিল যে মানব বিশ্লেষকদের পক্ষে সেগুলো সামাল দেয়া কঠিন হয়ে উঠেছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, ভুল হতো, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে যেত। তখন ধারণা এল—মানুষের চোখের চাপ কমাতে কিছু কাজ এআইকে দেয়া হোক। মোটরসাইকেলের গতিবিধি শনাক্ত করা, সন্দেহজনক চলাচল পর্যবেক্ষণ করা কিংবা নির্দিষ্ট আচরণের ধরণ চিহ্নিত করার মতো কাজ যন্ত্র করবে, আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মানুষ। শুনতে বেশ যুক্তিসঙ্গত। ইতিহাসে প্রায় সব সামরিক প্রযুক্তিই এভাবেই শুরু হয়েছে—একটি সীমিত ব্যবহার এবং বাস্তবসম্মত একটি ব্যাখ্যা দিয়ে। কিন্তু প্রযুক্তির একটি নিজস্ব গতি আছে। একবার কোনো ব্যবস্থাকে কার্যকর বলে প্রমাণ করা গেলে সেটি দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। আজ পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এআই ব্যবহারের মাধ্যমে দিনে শত শত নয়, হাজার হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পর্যন্ত প্রকাশ্যে বলছে, ভবিষ্যতে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল যুক্ত হলে সেই সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বাড়তে পারে। সমস্যা এখানেই। একজন মানুষ হয়তো দিনে পঞ্চাশটি ছবি গভীর মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারে। কিন্তু যখন দিনে পাঁচ হাজার লক্ষ্যবস্তু বিশ্লেষণ করা হবে, তখন মানুষের ভূমিকা আসলে কতটুকু থাকে? ‘হিউম্যান ইন দ্য লুপ’ বা ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মানুষের উপস্থিতি’—এই পরিভাষাটি এখন অনেক সময় বাস্তব নিরাপত্তার নিশ্চয়তার চেয়ে রাজনৈতিক আশ্বাস হিসেবেই বেশি শোনায়। কারণ বাস্তবতা হলো, যখন গতি অত্যন্ত দ্রুত হয়ে যায়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নয়, বরং মেশিনের অনুমোদনদাতা হয়ে দাঁড়ায়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস একবার বলেছিলেন, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সক্ষমতা কখনোই কৌশলের বিকল্প নয়। এই কথাটি আজ আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, সেটি নিজে বলে দিতে পারে না— যুদ্ধের রাজনৈতিক লক্ষ্য কী, সেই লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে কি না, কিংবা যুদ্ধ আদৌ পরিস্থিতিকে ভালো করছে কি না। ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর যুদ্ধ চালিয়ে শেষ পর্যন্ত এই কঠিন বাস্তবতা বুঝেছিল। সামরিকভাবে অসংখ্য সফল অভিযান চালানো সম্ভব, কিন্তু তাতে রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত হয় না। এখন এআই সেই পুরনো ভুলকে নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনার ঝুঁকি তৈরি করছে। গতি ও নির্ভুলতাকে কৌশলগত প্রজ্ঞা বলে মনে হওয়ার এক বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানগুলো এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এআই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় কয়েক দিন থেকে কয়েক সেকেন্ডে নামিয়ে এনেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এর ফলে রাজনৈতিকভাবে কী অর্জিত হয়েছে? ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। আঞ্চলিক বাস্তবতায় নাটকীয় কোনো পরিবর্তনও আসেনি। অর্থাৎ প্রযুক্তি দ্রুত কাজ করেছে, কিন্তু কৌশলগত ফলাফল স্পষ্ট নয়। বেসামরিক মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। যুদ্ধের ইতিহাসে ভুল হামলা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এআই যুগে একটি ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটছে—মানবিক বিপর্যয়কে প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোনো স্কুলে হামলা হলে বা নিরীহ মানুষ মারা গেলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে, ‘অ্যালগরিদম ঠিকভাবে প্রশিক্ষিত ছিল কি না’ অথবা ‘ডেটা সঠিকভাবে লেবেল করা হয়েছিল কি না।’ এখানে মানুষের মৃত্যু যেন ধীরে ধীরে সফটওয়্যারের ‘বাগ’-এ পরিণত হচ্ছে। এই মানসিক পরিবর্তন অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ যুদ্ধের আইন, বেসামরিক সুরক্ষা কিংবা অনুপাত রক্ষার মতো নীতিগুলো হঠাৎ তৈরি হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং অসংখ্য মানবিক বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা থেকে এসব নীতির জন্ম হয়েছে। এগুলো দুর্বলতার প্রকাশ নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে টেকসই যুদ্ধ পরিচালনার ন্যূনতম শর্ত। তবে এআই ব্যবহারের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিও রয়েছে, যা অস্বীকার করা যায় না। ইতিহাসে যুদ্ধক্ষেত্রে ভুল তথ্য, ক্লান্তি এবং বিভ্রান্তির কারণে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা নিজেদের ˆসন্যদের ভুলবশত হত্যা করার ঘটনা বহুবার ঘটেছে। যদি এআই সত্যিই এসব ভুল কমাতে পারে, তাহলে সেটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হবে। প্রজেক্ট মেভেনের পেছনে কাজ করা অনেক সেনা কর্মকর্তা আসলে যুদ্ধকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও কম প্রাণঘাতী করতে চেয়েছিলেন। সমস্যা হলো, প্রযুক্তি খুব কম ক্ষেত্রেই নিজের মূল সীমার মধ্যে থাকে। শুরুতে যে এআই কেবল মোটরসাইকেল শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল, সেটিই ধীরে ধীরে আরও বড় সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে উঠছে। কোনো এলাকায় কতজন বেসামরিক মানুষ থাকতে পারে—এ ধরনের অনুমানেও এআই ব্যবহারের চিন্তা শুরু হয়েছিল। যদিও শুরুতে অনেক কর্মকর্তা দ্বিধায় ছিলেন, কারণ মেশিনের অনুমানের ওপর নিজের দায়িত্ব নিতে তারা প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দ্রুততার চাপ এবং সামরিক প্রতিযোগিতার মধ্যে সেই সতর্কতা শেষ পর্যন্ত কতদিন টিকে থাকবে?এই জায়গায় ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে। তাদের ‘ডেল্টা’ সিস্টেম যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য দ্রুত সমš^য় করতে সাহায্য করছে, কিন্তু চূড়ান্ত হামলার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি মানুষের হাতেই থাকছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি তথ্য সরবরাহ করছে, কিন্তু হত্যার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। এই মডেলটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, এআই ব্যবহারের একমাত্র পথ স্বয়ংক্রিয় হত্যাযন্ত্র তৈরি করা নয়। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা অবশ্য প্রযুক্তিগত নয়, রাজনৈতিক। এআই-নির্ভর যুদ্ধব্যবস্থা নিয়ে জনগণের মধ্যে কোনো বড় বিতর্ক হয়নি। কংগ্রেসে দীর্ঘ আলোচনা হয়নি। ভোটারদের জিজ্ঞেস করা হয়নি, তারা আদৌ এমন যুদ্ধব্যবস্থাকে সমর্থন করে কি না। ইতিহাস বলছে, প্রযুক্তি প্রায়ই গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার চেয়ে দ্রুত এগোয়। ড্রোন যুদ্ধও প্রথমে নীরবে বিস্তৃত হয়েছিল। পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক কাঠামো পরে এসেছে, প্রযুক্তি আগে। এআই সেই পুরনো ধারা আরও দ্রুত গতিতে পুনরাবৃত্তি করছে। সবশেষে প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়, মানুষের। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত কি ধীরে ধীরে অ্যালগরিদমের হাতে চলে যাচ্ছে? যুদ্ধ কি এমন এক যান্ত্রিক গতিতে পরিচালিত হবে, যেখানে রাজনৈতিক বিবেচনা, মানবিক দ্বিধা কিংবা নৈতিক চিন্তার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে? সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো— এই পরিবর্তনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ সিদ্ধান্ত নেয়নি। কোনো জনগণ ভোট দেয়নি। কিন্তু পরিবর্তন তবুও ঘটছে। আর ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, যুদ্ধের চরিত্র বদলে গেলে তার পরিণতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না; শেষ পর্যন্ত সেটি পুরো সভ্যতার ওপর প্রভাব ফেলে। [লেখক: প্রাবন্ধিক]

প্রবাসে ঈদ ও কোরবানি

মুসলিমদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবাদির মধ্যে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ অন্যতম। বাংলাদেশে যেদিন উৎসবটি পালিত হয়, আমরা যারা মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ বা সমসাময়িক ভৌগলিক দেশগুলোতে বসবাস করি তারা একদিন আগেই দিনটি পালন করি। এখানে সরকারি ভাবে দিনটি ছুটির আওতায় নেই বলে আমরা পরিবার পরিজন নিয়ে যারা আছি তারা আগে থেকেই স্বীয় কর্মস্থলের ডিপার্টমেন্ট প্রধানকে বলে ওইদিন অফ ডে বা হলিডের ব্যবস্থা করে থাকি। যারা একা আছেন তাদের বেলায় একটু ব্যতিক্রম। ঈদ বা কোরবানি নিয়ে খুব বেশি একটা মাতামাতি করতে তাদের দেখা যায়না। প্রবাসে কোরবানির ধরন একটু ভিন্ন রকমের। এখানে দেশের মতো হাটে গিয়ে দশটা পশু দেখে যাচাই বাচাই করে পছন্দমতো কোন গরু বা ছাগল কেনার বিশেষ কোন ব্যবস্থা নেই। আমি যেখানে বসবাস করি অর্থাৎ আয়ারল্যান্ডের কথাই ধরা যাক। এ দেশে অবস্থানরত মুসলিমরা সাধারনত দু’-তিনটি উপায়ে কোরবানি সম্পন্ন করে থাকেন। প্রথমত যারা ঝামেলা বিহীন ভাবে কোরবানি দিতে চান তারা স্থানীয় মুসলিম গ্রোসারি শপের সহায়তায় কাজটি সেরে ফেলেন। আমি যে এলাকায় আছি সেখানে বাঙালি ছাড়াও রয়েছে আফগানি, পাকিস্তানি ও মধ্যপ্রাচ্যের মালিকানা ভিত্তিক দোকান। এসব দোকানে প্রতি নামের জন্য একেকটি ভেড়ার দাম হিসেবে ১৮০ থেকে ২শ’ ইউরো ও গরুর জন্য ভাগ প্রতি ৩শ’ থেকে ৩৫০ ইউরো পর্যন্ত দেয়া হয়ে থাকে। দোকানের মালিক ফার্মে গিয়ে ভেড়া বা গরু জবাই করে নিয়ে আসবেন যা দু’একদিন পর বিলি করা হয়। যারা একটু সৌখিন বা যাদের হাতে সময় থাকে তারা বিভিন্ন খামার ঘুরে দেখেশুনে একটি গরু কোরবানি দিতে পারেন। তবে ওইসব খামারে গরু কেবল জবাই করা যায় কিন্তু আধুনিক পদ্ধতিতে ছোট করে কাটার কোন সরঞ্জমাদি নেই। ফলে কোরবানিকৃত গরুকে কেবল কয়েক টুকরো করে যে কোন একজনের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সেখানে বউ-বাচ্চাসহ সবাই অবস্থান করে। ফলে গরু কাটার পাশাপাশি সারাদিন চলে খোশগল্প ও সুস্বাদু খাবারের রসালো আয়োজন। এ পদ্ধতিতে কোরবানি সম্পন্ন করতে বেশ কায়িক পরিশ্রম হয় বটে, তবে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে নিঃসন্দেহে। কেউ কেউ আছেন যারা শারিরিক পরিশ্রমে রাজি নন। তারা যান ওইসব ফার্মে যেখানে গরু জবাইসহ মাংস কাটাকাটি ও ভাগাভাগিরও ব্যবস্থা করা যায়। এ পদ্ধতিতে নিজ হাতে মাংস কাটার আনন্দ থেকে যেমন বঞ্চিত হতে হয় তেমনি খরচও একটু বেশি পড়ে। তবে কোরবানিকে প্রাণবন্ত করে তোলার জন্য মাংস ভাগাভাগি করার আগেই যে কোন একজনের বাড়িতে কিছু মাংস পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে অবস্থানরত মহিলারা মিলেমিশে ধুমছে রাবান্না করতে থাকে। যা কিনা উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। একটি জিনিস না বললেই নয়। কোরবানির মাংসকে তিন ভাগ করে এক ভাগ গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার যে রেওয়াজ তা বাস্তবায়নের সুযোগ এ দেশে নেই। কারণ মাংস দেবার বা নেবার মতো কোন গরিব এখানে নেই। তবে পরিচিতদের মাঝে যদি কেউ কোন কারনে কোরবানি দেয়া থেকে বিরত থাকে তাদেরকে ব্যক্তিগত ভাবে কিছু মাংস দেয়া হয়ে থাকে। ঘুরে ঘুরে মাংস বিতরনের সময় বা পরিবেশ কোনটাই এখানে নেই। তাই গরিব মানুষের ভাগের মাংসের টাকাটা হিসেব করে দেশে পাঠিয়ে দিয়ে অনেকেই কোরবানিকে সহি করার চেষ্টা করে। কোরবানির পশুর চামড়া বা এর টাকা বিলিয়ে দেয়ারও কোনো সুযোগ এখানে নেই। কারণ চামড়ার কোনো টাকাই আমাদের হাতে আসেনা। চামড়া বিষয়ক টাকা নিয়ে খামার মালিককে এ পর্যন্ত কোন প্রশ্নও আমরা করিনি কিংবা তার কাছ থেকেও এ ব্যপারে কোন পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায়নি। বস্তুত মুসলিম নিয়ন্ত্রিত বা পরিচালিত তেমন কোন খামার আয়ারল্যান্ডে গড়ে না উঠায় এসব ছোটখাট সমস্যাসহ কোরবানি সম্পন্ন করতেও মাঝে মধ্যে বেশ বেকায়দায় পড়তে হয়। এ প্রসঙ্গে বছর কয়েক আগের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করা যায়। সম্ভবত ২০১৯ সাল। সাপ্তাহিক ছুটির দিন রোববারে ইদুল আজহা উদযাপিত হয়েছিল। ছুটির দিন থাকায় শত চেষ্টা করেও ওইদিন কোরবানি দিতে পারিনি। কারণ অফিস আদালতের মতো ওখানকার পশুর খামার গুলোও সাপ্তাহিক ছুটির আওতাধীন। আমরা যারা নিজ হাতে কোরবানির গরু জবাই করতে উৎসাহী ছিলাম তারা খামার মালিককে প্রতি গরু হিসেবে বেশ কিছু উপরি দেয়ার লোভ দেখানোর পরও রোববারে খামার খুলতে রাজি হয়নি। হেলথ ইন্সপেক্টরের অনুপস্থিতি ও হাইজিন গত বিবিধ সমস্যার কথা বলে আমাদের প্রস্তাবকে নাকোচ করে দেয়। বাংলাদেশের মতো এখানে যত্র তত্র গরু, মেষ, ছাগল এমনকি মুরগি পর্যন্ত জবাই করা যায়না। কিছু দিন আগে আমার এক প্রতিবেশি বন্ধুকেই মুরগি জবাইয়ের খেসারত হিসেবে ১৫০ ইউরো জরিমান দিতে হয়েছিলো। অগত্যা কি আর করা! ঈদের সারাটা দিন গোমড়া মুখ করে কাটাতে হয়েছিল। অবশ্যি পরদিন সবাই বউবাচ্চা নিয়ে ৪০-৫০ মাইল দূরের খামারে গিয়ে গরু কোরবানি দিয়ে নিজেরাই মাংস কেটে ভাগাভাগি করে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু ঈদের দিন কোরবানি দিতে না পারা কিংবা দেশীয় স্টাইলে কোরবানির মাংস না খেতে পারার বেদনা এখনও আমাকে পোড়ায়। প্রবাসে আমাদের ধর্মীয় উৎসবাদি পালনে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে বটে তবে এ উৎসবকে কেন্দ্র করে কোরবানির পশু বা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আচমকা বেড়ে যাবার কোন শঙ্কা নেই। সপ্তাহ খানেক আগে কথা হয়েছিল আমার বড় ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি কোরবানির গরু কেনা ও দ্রব্য মুল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে বেশ শঙ্কায় আছেন। বস্তুত এ শঙ্কা যে কেবল আমার ভাইয়ের একার তা নয়, দেশের অনেক সাধারন মানুষের। সাধারণত এসব দেশে ধর্মীয় বা যে কোন উৎসবাদির ক্ষেত্রে জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে দেয়া হয়। দোকানপাটে চলে বিশেষ মুল্যহ্রাস। অথচ আমাদের দেশে ঠিক উল্টো, যা খুবই দুঃখজনক। কোরবানি আমাদের জন্য ত্যগের বার্তা নিয়ে আসে। এ ত্যগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক আমাদের সমাজ, আমাদের দেশ তথা গোটা বিশ্ব। [লেখক: আয়ারল্যান্ড প্রবাসী কবি]

গরু নিয়ে রাজনীতি

দুই বাংলায় এবারের ঈদে আলোচিত বিষয় হলো গরু কোরবানি। ভারতের ক্ষমতাসীন সরকার গরুকে ‘গো-মাতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ফলে দেশটিতে গো-হত্যাকে অনেক ক্ষেত্রে অন্যায় হিসেবে দেখা হয়। তাই বিভিন্ন স্থানে গরু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যদিও বিষয়টি মূলত পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক, তবে তার আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মাবল¤^ীরা বিষয়টি ভালো চোখে দেখছেন না। অন্যদিকে কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের জন্য এটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছে বিজেপি। বিধানসভার দলনেতা নির্বাচিত হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি এখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার কয়েক দিন আগে একটি নির্দেশনা জারি করে। এতে বলা হয়, অনুমতি ছাড়া রাজ্যে কোনো গরু ও মহিষ জবাই করা যাবে না। এছাড়া গরুর বয়স কমপক্ষে ১৪ বছর হতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে এবার ঈদুল আজহার আগে অনেক মুসলিম গরু কেনা বন্ধ রেখেছেন। এতে সেখানকার হিন্দু গরু ব্যবসায়ীরাও বিপদে পড়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে বড় করা গরু বিক্রি করতে না পেরে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তবে যে গো-মাংস নিয়ে এত বিতর্ক, হানাহানি ও উত্তেজনা, সেই গো-মাংস রপ্তানিতে ভারতের অবস্থান বিশ্বে অন্যতম শীর্ষে। গোটা পৃথিবীতে যে পরিমাণ গো-মাংস রপ্তানি হয়, তার প্রায় ১৬ শতাংশ ভারত থেকে আসে। রাষ্ট্রসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক সমীক্ষা অনুযায়ী, গো-মাংস সরবরাহকারী দেশের তালিকায় ভারত তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ব্রাজিল প্রথম এবং অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় স্থানে। ভারতে গো-হত্যা ঠেকাতে কেন্দ্র সরকার কঠোর আইন চালু করেছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, পশুহাট বা পশুমেলায় বেআইনিভাবে পশুর মাংস বিক্রির অনুমতি দেয়া হবে না। তবে বিরোধীদের দাবি, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা মেনেই পশুহাটে বেআইনি মাংস বিক্রি বন্ধে নতুন আইন করা হয়েছে বলে সরকার দাবি করলেও সমালোচকদের মতে, এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। ক্ষমতায় আসার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গরুর মাংস রপ্তানির কড়া সমালোচনা করেছিলেন। তিনি কংগ্রেস আমলের এই বাণিজ্যকে ‘পিঙ্ক রেভল্যুশন’ বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তার শাসনামলে গরু ও মহিষের মাংস রপ্তানি প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে এই খাত থেকে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের ‘মুসলিম মিরর’ নামের একটি ওয়েবসাইটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটি প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ ৩০ হাজার টন গরু ও মহিষের মাংস রপ্তানি করে। এ থেকে আয় হয় প্রায় ৪৩০ কোটি মার্কিন ডলার। বৈশ্বিক মাংস বাজারে ভারতের অবস্থানও শক্তিশালী হচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম মাংস রপ্তানিকারক ব্রাজিলের পর ভারতের অবস্থান রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। ভারতের পরে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এই পরিসংখ্যান দেখায়, মাংস রপ্তানি ভারতের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। ভারতে রাজ্যভেদে গরু জবাই নিয়ে বিভিন্ন বিধিনিষেধ থাকলেও জাতীয়ভাবে একক কোনো আইন নেই। ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক শিথিল বিধির রাজ্যগুলো থেকে গরু সংগ্রহ করে রপ্তানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতাই এই খাতের সম্প্রসারণে বেশি ভূমিকা রাখছে। ভারতে বর্তমানে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ মহিষ এবং ৭ কোটি ৬০ লাখের বেশি গরু রয়েছে। ভারতে গরু বা মহিষের মাংস রপ্তানি কোনো একক ব্যক্তির হাতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো আল্লানা গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এস. আর. আল্লানা ও ফয়জান আল্লানা। এছাড়া আল কবির এক্সপোর্টস এবং আরও কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান এই খাতে সক্রিয়। ভারতের শীর্ষ মাংস রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘আল্লানা গ্রুপ’ দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে ৩০ কোটি রুপি অনুদান দিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে ভারত বিশেষ করে ইসলামি দেশগুলোতে হালাল মাংসের বাজার সম্প্রসারণের চেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় মহলেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতের মাংস রপ্তানি খাত, বিশেষ করে গরু ও মহিষের মাংস, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস। নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক বক্তব্যের পরও এই খাত গত এক দশকে টিকে থাকার পাশাপাশি আরও বিস্তৃত হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এত কিছুর পরও গরু নিয়ে ভারতের ক্ষমতাসীনদের কঠোর অবস্থানের কারণ কী? ভারতে প্রায় ২৬ কোটি মুসলমান বসবাস করে। দেশটিতে গরু ও মহিষের মাংসের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও ব্যাপক। বিশাল জনসংখ্যা ও প্রোটিনের চাহিদার কারণে এটি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যে পরিণত হয়েছে। এই চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় ছোট ও প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদিত গবাদিপশু থেকে। ভারতের অনেক রাজ্য কৃষিনির্ভর। এসব অঞ্চলে কৃষিকাজের পাশাপাশি গৃহস্থালি পর্যায়ে গরু পালন মানুষের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সমালোচকদের মতে, কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে গরু বিক্রি কমে গেলে ছোট খামারিরা বড় কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। তখন বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বড় করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে। এ কারণেই অনেকে মনে করেন, ধর্মীয় আবেগের আড়ালে এখানে অর্থনৈতিক স্বার্থও সক্রিয় রয়েছে। ভারতে গরু নিয়ে চলমান বিতর্ক তাই শুধু ধর্মীয় নয়; এর সঙ্গে রাজনীতি, অর্থনীতি, রপ্তানি বাণিজ্য এবং করপোরেট স্বার্থও গভীরভাবে জড়িত। [লেখক: উন্নয়নকর্মী]

অর্থনৈতিক আগ্রাসন: সংস্কৃতির বিপন্নতা ও অস্তিত্বের লড়াই

একটি জাতির সংস্কৃতি কেবল তার নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ—গীত, নৃত্য বা উৎসবের অলংকারিক আবরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রকৃত উৎস প্রোথিত থাকে সেই জাতির জীবনসংগ্রাম এবং উৎপাদন ব্যবস্থার সুগভীর মৌল কাঠামোর মধ্যে। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের দর্পণ সাক্ষ্য দেয় যে, কৃষিই ছিল তার প্রাণস্পন্দন ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। তবে সমকালীন বিশ্বে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের যবনিকা ঘটলেও এক সূক্ষ্ম ও সর্বগ্রাসী ‘অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ’ আমাদের গ্রাস করছে। এই প্রক্রিয়ার নিগূঢ় লক্ষ্য হলো— একটি জাতিকে তার স্বকীয় উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে বিচ্যুত করে পরনির্ভরশীল করে তোলা এবং নিজস্ব ঐতিহ্যকে হীনম্মন্যতার চশমায় দেখতে বাধ্য করা। মানব সভ্যতার ইতিহাসে আধিপত্য বিস্তারের কৌশল সর্বদা একরৈখিক থাকেনি। একদা যা ছিল উন্মুক্ত তলোয়ার আর কামানের গর্জন, কালক্রমে তা রূপান্তরিত হয়েছে সূক্ষ্মতর এক মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে, যাকে আন্তোনিও গ্রামসি ‘সাংস্কৃতিক হেজিমনি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই প্রক্রিয়ায় শোষক গোষ্ঠী কেবল ভৌগোলিক সীমানা দখল করে ক্ষান্ত হয় না, বরং তারা অবদমিত জাতির অবচেতন মনে এক প্রকার ‘স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি’ উৎপাদন করে। সাম্রাজ্যবাদের এই নব্য রূপটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এখানে শোষিত মানুষটি তার শিকলকে অলঙ্কার মনে করতে শেখে। যখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তার জীবনদর্শন, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাককে ‘আধুনিকতার মাপকাঠি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, তখন প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীগুলো নিজেদের অজান্তেই হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করে এবং নিজের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ‘অনগ্রসর’ মনে করে তা বর্জন করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শেকড় প্রোথিত থাকে অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের মধ্যে। কার্ল মার্ক্স বর্ণিত ‘ভিত্তি’ ও ‘উপরি কাঠামো’র সম্পর্কের দিকে তাকালে দেখা যায়, যখন কোনো জাতির উৎপাদন পদ্ধতি বদলে যায়, তখন তার সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গিও বদলে যেতে বাধ্য। বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির মেরুদণ্ড ছিল কৃষি। কিন্তু বর্তমান বিশ্বায়িত পুঁজিতন্ত্রের যুগে সেই কৃষিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে কৃষককে এক অন্তহীন পরনির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফলে সমাজব্যবস্থা ‘উৎপাদন’ থেকে সরে গিয়ে ‘ভোগবাদে’ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কনজ্যুমারিজমের প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষকে সৃজনশীল উৎপাদক থেকে নিষ্ক্রিয় ক্রেতায় পরিণত করা। আর এই পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটে আমাদের উৎসবে; যেখানে নবান্ন বা হালখাতা ছিল মাটির সঙ্গে মানুষের সংযোগ, সেখানে আজ ‘বার্থ ডে ’ বা ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’-র মতো কর্পোরেট দিবসগুলো প্রাধান্য পাচ্ছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্রিটিশ শাসক লর্ড মেকলে ভারতে ইংরেজি শিক্ষানীতি প্রবর্তন করেছিলেন এমন এক ‘বাদামী চামড়ার সাহেব’ শ্রেণী তৈরি করতে, যারা রক্তে ভারতীয় হলেও রুচি ও বুদ্ধিতে হবে ইংরেজ। আজ কয়েক দশক পরেও আমরা সেই ছায়া থেকে মুক্ত হতে পারিনি। এটিই হলো ফ্রাঞ্জ ফ্যানোন বর্ণিত কালো চামড়া ও সাদা মুখোশের সংকট। উপনিবেশবাদ যখন কোনো জাতির ওপর চেপে বসে, তখন সে সেই জাতির ইতিহাসকে বিকৃত করে তাকে আত্মবিস্মৃত করে তোলে। ফলে অবদমিত মানুষটি মুক্তি বলতে বোঝে শোষকের মতো হওয়াকে। এই মনস্তাত্ত্বিক খাঁচায় বন্দী হওয়ার ফলে আধুনিক বিশ্বে আমরা দেখছি এক ধরনের স্বেচ্ছাধীন দাসত্ব, যেখানে কোনো শেকল দৃশ্যমান নয়, কিন্তু চিন্তার স্বাধীনতা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। ভাষার প্রশ্নটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো যেমনটা দেখিয়েছেন, কোনো জাতির মনোজগৎকে উপনিবেশমুক্ত করতে হলে আগে তার ভাষাকে উপনিবেশমুক্ত করতে হবে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ঘর। যখন কোনো জাতি তার নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান বা উচ্চতর জ্ঞানচর্চা থেকে বিচ্যুত হয়ে বিদেশি ভাষার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সে আসলে তার পূর্বপুরুষদের জ্ঞানতাত্ত্বিক উত্তরাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান যুগে এই ‘ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম’ আরও তীব্রতর হয়েছে। অ্যালগরিদম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সময়ে পশ্চিমা মানদণ্ডকেই একমাত্র সত্য হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, ফলে আমাদের নিজস্ব মিথ, লোকগাথা, লোকসাহিত্য ও গ্রামীণ প্রজ্ঞাগুলো আধুনিক ‘স্মার্ট’ সংস্কৃতির ভিড়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বায়নের এই প্রক্রিয়ায় আর একটি ভয়াবহ দিক হলো ‘ম্যাকডোনাল্ডাইজেশন’। এর লক্ষ্য হলো বৈচিত্র্যময় পৃথিবীকে একটি একঘেয়ে একক বাজারে পরিণত করা। এই প্রক্রিয়ায় ছোট জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব পোশাক, আঞ্চলিক খাদ্যাভ্যাস এবং লোকসংগীতকে হয় বিলুপ্ত করা হচ্ছে, নয়তো ‘সাংস্কৃতিক পণ্য’ হিসেবে বাণিজ্যিকীকরণ করা হচ্ছে। আজ বাউল গান বা আদিবাসী নৃত্য তার আদি দ্রোহ এবং আধ্যাত্মিক গভীরতা হারিয়ে কেবল পর্যটন শিল্পের বিনোদনের উপাদানে পরিণত হয়েছে। সংস্কৃতির এই রূপান্তর আসলে এক প্রকার ‘ডি-কালচারাইজেশন’, যেখানে সংস্কৃতি তার যাপিত জীবনের সত্যতা হারিয়ে কেবল প্রদর্শনের বস্তুতে পরিণত হয়। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল হলো ‘অ্যালিয়েনেশন’ বা বিচ্ছিন্নতাবোধ। মানুষ যখন তার নিজের ঐতিহ্যকে অন্যের চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করে, তখন সে এক গভীর আত্মপরিচয় সংকটে নিমজ্জিত হয়। সে তার নিজের মাটির গন্ধে লজ্জা পায়, নিজের লোকজ ঐতিহ্যকে ‘খেত’ বা ‘অনগ্রসর’ মনে করে ঘৃণা করতে শেখে। এটিই হলো সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত বিজয়, যেখানে শোষিত নিজেই নিজের সত্তাকে অস্বীকার করে শোষকের প্রতিকৃতি হতে চায়। এডওয়ার্ড সাঈদ তার ‘ওরিয়েন্টালিজম’ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন কীভাবে পশ্চিমা জগত প্রাচ্যের এক কৃত্রিম এবং নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। সেই ভাবমূর্তি ভাঙতে হলে আমাদের ‘কাউন্টার-ডিসকোর্স’ বা পাল্টা বয়ান তৈরি করতে হবে। প্রতিরোধের এই লড়াইয়ে হোমি কে ভাবা’র ‘হাইব্রিডিটি’ বা সংকরায়ণ তত্ত্বটি আমাদের নতুন দিশা দেখাতে পারে। সাম্রাজ্যবাদ যখন তার সংস্কৃতি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়, তখন আমরা তাকে হুবহু গ্রহণ না করে আমাদের নিজস্ব ছাঁচে রূপান্তর করতে পারি। যেমন, পশ্চিমা বিজ্ঞানকে আমরা বর্জন করব না, বরং তাকে আমাদের গ্রামীণ কৃষি-প্রজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত করব। এই সমন্বয়ই হবে আমাদের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ। জ্ঞান-উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যখন আমরা আমাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটকে প্রাধান্য দেব, তখনই শুরু হবে প্রকৃত বিনির্মাণ। যখন আমরা বিদেশি ব্র্যান্ডের বদলে দেশজ শ্রমের ফসল বেছে নিই, তখন আমরা আসলে বিশ্বপুঁজির শৃঙ্খলকেই আঘাত করি। পরিশেষে, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ রুখতে হলে আমাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের লড়াইকে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সাংস্কৃতিক লড়াই মানে হলো নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মাটির সঙ্গে মানুষের নাড়ির টান বজায় রেখে নিজস্ব মৌলিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনে নিমগ্ন হওয়া। এটিই হলো এই সময়ের প্রধান রাজনৈতিক সংগ্রাম। আমরা যদি আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে শক্তিশালী করতে পারি, তবেই আমাদের উপরি কাঠামো বা সংস্কৃতি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। শিকড়চ্যুত এই উন্নয়ন আসলে এক প্রকার মরূকরণ; তাই মাটির গভীর থেকে রসদ সংগ্রহ করেই আমাদের ডালপালা মেলতে হবে বিশ্বের আকাশে। নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদাবোধের মেলবন্ধনেই রচিত হতে পারে উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বের প্রকৃত স্বাধীনতার ইশতেহার। এই সংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী এবং নিরন্তর, যেখানে প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি উৎসব হবে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ত্রিশাল কারিগরী কলেজ, ময়মনসিংহ]

নাম পরিবর্তনের কবলে দেশ

দু’দিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচিত্র সংবাদটি দেখলাম। অর্থাৎ একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছবিসহ বলা হলো, কিশোরগঞ্জের যশোদল গ্রামে অবস্থিত সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনে সরকারি সিদ্ধান্তের পত্র পাওয়া গেছে। জানা যায়, বিদ্যালয়টি স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সংগঠক, মুজিব-নগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম তার জন্মভিটা সংলগ্ন গ্রামে নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।২.সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯২৫ সালে যশোদল দামপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ৫০ বছরের বর্ণাঢ্য ও মহমান্বিত এক রাজনৈতিক জীবন ছিল তার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই তার রাজনীতির হাতেকড়ি হয়েছিল। তিনি ১৯৪৭-৪৮ সালের দেশভাগের ঐতিহাসিক সময়ে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৫১ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের লোভনীয় পদ ত্যাগ করে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে শিক্ষকতার মহৎ পেশায় যোগ দেন এবং ‘৫২ সালের মাতৃভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।‘৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ এবং অবদানের কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরে তৎকালীন জাতীয় চার নেতার অন্যতম প্রধান হয়ে জীবন বিসর্জনের কাহিনিও বাঙালির জানা। এদেশের একজন আপাদমস্তক সুশীল, সজ্জন, অবিতর্কিত রাজনীতিকের সাক্ষাৎ প্রতিকৃতি হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়।৩.এখানে নাম পরিবর্তনের হিড়িক পড়ে যায় মূলত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অব্যবহিত পর থেকেই। প্রথমদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ইউনূসকে দেশের মানুষ বুঝতে পারেনি। তার কথাবার্তা, গতিবিধি ও বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে নিজের দেশ সম্পর্কে নানাবিধ আশাজাগানিয়া মন্তব্য করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তা প্রকাশিত হতে থাকে ভিন্নতর রূপে। তিনিও তার স্বরূপে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন জনগণমনে। মব বেষ্টিত হয়ে তিনি তার স্বভাবসুলভ ঠান্ডা মাথায় ধ্বংসের লীলায় মেতে ওঠেন। এমনকি ধীরে ধীরে অভিশপ্ত মব সৃষ্টির এক বিস্ময়কর কারখানার ফ্লাডগেট খুলে দেন তিনি। এদের দিয়ে, এদের মুখ থেকে বলিয়ে, এদের দ্বারা কৃত্রিম আন্দোলন সৃষ্টি করে প্রথমে জাতীয় ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি ধ্বংস করা হয় এবং পরে পর্যায়ক্রমে নৈরাজ্যের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ, প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ওপর শারীরিক মানসিক নির্যাতন তথা নাম পরিবর্তনের সরকারি নির্দেশনা দিতে শুরু করেন। যার মাধ্যমে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও নাগরিকদের অনুভূতি বিষয়ে তার নিজের মনোজাগতিক হীনম্মণ্যবোধ প্রকাশ পায়। একইসঙ্গে তিনি হয়ে ওঠেন দেশে প্রথম মব বা উশৃংখল জনতার নিরঙ্কুশ আশ্রয়স্থল।৪.তবে এ পরিবর্তন বিষয়ে একটি আশার কথাও নজরে আসে। যশোদলের সামান্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনে স্থানীয় জনগণ দলমত নির্বিশেষে এর বিরোধিতা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দেখা গেলো, কিশোরগঞ্জে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের একজন দায়িত্বশীল এবং বেশ প্রভাবশালী নেতা বলেছেন, সৈয়দ নজরুল ইসলামের হাতে প্রতিষ্টিত স্কুলটির নাম যেনো কোনোক্রমেই পরিবর্তন না করা হয়। এটা বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক আদর্শ ও নীতির পরিপন্থী কাজ। যদিও তিনি এটাকে তার ব্যক্তিগত মতামত বলে তা পাবলিক কমেন্টস এর আওতায় ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে তিনি সাধারণ মানুষের স্বতস্ফূর্ত সমর্থন ও অনুকম্পা লাভ করে চলেছেন। বর্তমানে জনগণের নির্বাচিত সহিষ্ণু ও সংবেদনশীল সরকারের কাছ থেকে সাধারণ জনতা এমনটাই প্রত্যাশা করে। এটা কখনো মবশাসিত বিতর্কিত পূর্ববর্তী অস্থায়ী সরকারের অনুসারী হতে পারে না। তাহলে ভোট দিয়ে ম্যান্ডেট প্রদানকারী দেশবাসী আরও একবার হতাশ হবে। তাছাড়া সৈয়দ নজরুল ইসলামের জন্মস্থানে তার প্রতিষ্টিত একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করার মতো এমন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজে সরকারের মনোনিবেশ করার সময় কোথায়? সরকারকে কাজ করতে হয় বৃহত্তর জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে।৫.কিশোরগঞ্জের মানুষ হিসেবে ব্যক্তি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন ব্যাপক জনপ্রিয় নেতা। স্বাধীনতা পূর্বকালেই তিনি তার এলাকায় জাতীয় ব্যক্তিত্বের একক অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তিনি এই যশোদলের কাছাকাছি জায়গায় স্থাপন করেছিলেন কিশোরগঞ্জ টেক্সটাইল মিলস। যা দীর্ঘ সময় এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার এক বড় অবলম্বন হয়ে ওঠেছিল। যদিও মিলটি এখন আর অস্তিত্ববান নেই। এখনও সেখানে আবর্জনায় আকীর্ণ এর ভগ্নাংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। এসব গৌরবময় অতীত কর্মকাণ্ডই তাকে আজও সর্বজন শ্রদ্ধেয় করে রেখেছে। প্রসঙ্গত বলা যায়, যে মানুষটি স্বাধীন সার্বভৌম একটি জাতিরাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও প্রসব-বেদনার সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে আছেন, তার প্রতিষ্টা করা স্কুলের নাম বদল করা হলে সে গ্রামটি কী অধিকতর মর্যাদাবান হবে? না-কি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কিংবদন্তি হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলামের অপরিসীম অবদানে সামান্যতম কোনো হেরফের হবে? বলাবাহুল্য, ইতিহাস তার আপন কক্ষেপথ ধরে হেঁটে যায়। সে তার নিজস্ব ধারায় লিপিবদ্ধ করে যায় এক নৈর্ব্যক্তিক শিলালিপি। তার কোনো সহযোগী লিপিকার থাকে না। সে সত্য এবং স্বয়ংক্রিয়।৬.দেখলাম কোনো কোনো বেদনার্ত মন্তব্যকারী বলেছেন, দেশে, যেখানে হিমালয়সম স্থাপনা শেষ হয়ে গেল, সেখানে সামান্য একটা স্কুলে নাম থাকার দরকার কী? বরঞ্চ সময়ের রাক্ষসী উদরে সবকিছু বিলীন হয়ে যাক। এখানে কারও নাম-ধাম-ঠিকানা এসব থাকার প্রয়োজন নেই। পাথরের বুকে খোদাই করা চিহ্ন একদিন মুছে যায়, সরে যায় দিনরাত্রির খেলায়।বাংলাসাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটা উক্তি দিয়ে শেষ করা যায়।‘নদীর ভাঙ্গনে যাহার বহুতল অট্টালিকা বিলুপ্ত হইয়া গেল, সে কখনো দুই চারটি ইট রক্ষা করিতে যাইবে না।’(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার]

প্রকৃতির পুনর্জাগরণ, নগর নিষ্কাশনের অবহেলা: টেকসই উন্নয়নের অন্তর্দ্বন্দ্ব

বাংলাদেশে জলব্যবস্থাপনা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে ইতিবাচক উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা হয়েছে, তার মধ্যে খাল খনন একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। বহুদিন অবহেলিত খাল পুনরুদ্ধার, জলধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে সরকার পরিবেশ ও কৃষি উভয় ক্ষেত্রেই সুফল আনতে সচেষ্ট হয়েছে। কিন্তু এই প্রশংসনীয় উদ্যোগের পাশাপাশি এক ভয়াবহ বাস্তবতা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে নগর এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা। খাল খননের সাফল্য যতটা দৃশ্যমান, ড্রেন খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যর্থতা ততটাই নগরবাসীর জীবনে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।শহর মানেই কংক্রিটের জঙ্গল, পরিকল্পিত রাস্তা, আধুনিক অবকাঠামো এমন ধারণা বহুদিনের। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের অধিকাংশ শহরের চিত্র ভিন্ন। বর্ষা এলেই অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, রাস্তায় হাঁটুসমান পানি, নোংরা ড্রেনের উপচে পড়া দুর্গন্ধ এসব যেন নগর জীবনের অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে। অথচ এই সমস্যার সমাধান কোনো দুরূহ বিষয় নয়; প্রয়োজন কেবল সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দায়বদ্ধতার।ড্রেন খনন একটি চলমান প্রক্রিয়া হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নতুন ড্রেন নির্মাণ করা হলেও পুরনো ড্রেনগুলো অপরিষ্কার থেকে যাচ্ছে। কোথাও আবার খননের নামে খোঁড়াখুঁড়ি করে রেখে দেয়া হয়, যা দীর্ঘদিন ধরে জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও সঠিক সংযোগ না থাকায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জল জমে যায় এবং শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের আগে ড্রেন পরিষ্কার না করা একটি বড় অবহেলা। এই সময়ে যদি পরিকল্পিতভাবে ড্রেনগুলো পরিষ্কার করা হয়, আবর্জনা অপসারণ করা হয় এবং পানি প্রবাহের পথ সুগম করা হয়, তাহলে জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকাংশে কমে আসতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বর্ষা শুরু হওয়ার পর হঠাৎ করেই তড়িঘড়ি করে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়, যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়।নগরবাসীর ভোগান্তির আরেকটি বড় কারণ হলো ড্রেনে আবর্জনা ফেলা। সচেতনতার অভাব এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে ড্রেনগুলো দ্রুত ভরে যায়। প্লাস্টিক, পলিথিন, গৃহস্থালি বর্জ্য সবকিছুই গিয়ে জমা হয় এই ড্রেনগুলোতে। ফলে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। এই সমস্যা কেবল প্রশাসনের একার দায় নয়; নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।তবে দায়িত্বের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় অংশটি বর্তায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সিটি করপোরেশনের ওপর। নগর ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব তাদের হাতেই ন্যস্ত। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় স্থান পায় না। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ হলেও ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিত থেকে যায়। ফলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছায় না।ড্রেন খনন ও রক্ষণাবেক্ষণে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও নতুন নয়। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, পরিকল্পনাহীন কাজ এবং তদারকির অভাব এসব কারণে অনেক ড্রেন অল্প সময়ের মধ্যেই অকেজো হয়ে পড়ে। ফলে একই কাজ বারবার করতে হয়, যা একদিকে অর্থের অপচয়, অন্যদিকে জনগণের জন্য দুর্ভোগের কারণ।বর্তমান প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। অল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় নগর এলাকার দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়ছে। এই বাস্তবতায় পুরনো পদ্ধতিতে ড্রেন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ আর যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সমন্বিত উদ্যোগ।সমাধানের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন একটি সমন্বিত নগর ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান। শহরের প্রতিটি এলাকার জন্য আলাদা করে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যেখানে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য কার্যকর পথ নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে কোনো ড্রেন বন্ধ হয়ে গেলে তা দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়া যায়।দ্বিতীয়ত, বর্ষা মৌসুমের আগে বাধ্যতামূলকভাবে ড্রেন পরিষ্কারের একটি জাতীয় নির্দেশনা থাকা উচিত। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সব ড্রেন পরিষ্কার করতে হবে এবং এর অগ্রগতি জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। এতে একদিকে স্বচ্ছতা বাড়বে, অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।তৃতীয়ত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা অত্যন্ত জরুরি। ঘরে ঘরে বর্জ্য সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ ড্রেনেই আবর্জনা ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। তাই আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং নাগরিকদের সচেতন করা দু’টিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।চতুর্থত, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। জনগণের সমস্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এই বিষয়গুলোতে তাদের নজরদারি ও উদ্যোগ বাড়াতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শন, জনগণের অভিযোগ শোনা এবং দ্রুত সমাধান দেয়া এসবই হতে পারে একটি কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনার ভিত্তি।সর্বশেষে বলা যায়, খাল খননের মতো বড় প্রকল্পগুলো যেমন প্রশংসার দাবি রাখে, তেমনি ড্রেনেজ ব্যবস্থার মতো মৌলিক বিষয়গুলো অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। নগর জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে হলে এই খাতটিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় উন্নয়নের বড় বড় গল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে নাগরিক জীবনের নিত্যদিনের দুর্ভোগ।বর্ষা আসার আগেই যদি কার্যকর উদ্যোগ নেয়া যায়, তবে শহরবাসী কেবল নোংরা পানির যন্ত্রণা থেকেই মুক্তি পাবে না—বরং তারা অনুভব করবে একটি দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব প্রশাসনের উপস্থিতি। তখন প্রশংসার স্রোত বইবে স্বাভাবিকভাবেই, আর নগর জীবন ফিরে পাবে তার কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি।[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

মহাকালের আয়নায় নজরুল মানস

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বৃত্তাবদ্ধ করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় তার সক্রিয় সৃষ্টি জীবনের শুরু থেকেই। দ্রোহ, প্রেম, ও মানবিকতার বিচারে নজরুল একজন শ্রেষ্ঠ পুরুষ। অসম্প্রদায়িক চেতনা ও প্রগতির এক উজ্জল প্রেরণা কাজী নজরুল ইসলাম। পরাধীন ভারতে জন্মগ্রহণ করে নজরুল প্রকৃত ভাবে টের পেয়েছিলেন, পরাধীনতার যন্ত্রনা। যে কারণে বিদ্রোহের কবিতা বাণী ও সুরেও এনেছিলেন এক নতুন মাত্রা। এক্ষেত্রে নজরুল এক নবযুগের উন্মেষও ঘটিয়েছিলেন। নজরুলকে বৃত্তাবদ্ধ করার অর্থ হলো তার নামের পূর্বে একটি বিশেষণ বসিয়ে তাকে বৃত্ত বন্দি করে ক্ষুদ্র বা সংকীর্ণ করে তোলা। আমরা সব সময়েই এই প্রচেষ্টা লক্ষ্য করে থাকি। নজরুলের কবিতা, প্রবন্ধ অভিভাষণের স্বর কিছুটা ব্যতিক্রমী হওয়ার জন্য স্বরুপ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে নজরুল বিশেষজ্ঞরা এই কাজটি করে থাকেন। নজরুলকে গভীর ভাবে উপলব্ধি করার জন্য তার অন্তর ছেঁড়া অভিভাষণগুলো পাঠ করতে হয়। নজরুলের মাত্র ১৪টি অভিভাষণের সন্ধান আমরা পেয়ে থাকি। যার অধিকাংশ কবি প্রদান করেছেন তার অসুস্থ হওয়ার ৩-৪ বছরের মধ্যে। কবি উপলব্ধি করেছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষের উত্থান-পতনময় রাজনীতির ডামাডোলে হিন্দু-মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধে অনৈক্য, সাহিত্য-সংস্কৃতির গতি-প্রকৃতি সমাজ-সভ্যতার সংলগ্নতা থেকে অনেক দূরে নিমজ্জিত, যেখান থেকে এ জাতির মুক্তির একমাত্র উপায় ছিল উদার মানবিকতার পতাকাকে দৃশ্যমান করে এগিয়ে যাওয়া। সে কাজটিই করতে গিয়ে কবি নিজে হলেন অপরাধী। নিজ সমাজ হতে বিচ্যুত, হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে অচ্ছুৎ। পরাধীন ভারতবর্ষের শাসক ব্রিটিশরাজের কাছে ছিলেন রাষ্ট্রদ্রোহী, বিদ্রোহী। কবি তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তার সংবর্ধনার উত্তরে নিজেই ঘোষণা করেছেন নিজের পরিচয়- ‘বিংশ-শতাব্দীর অসম্ভবের যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরি অভিযান-সেনাদলের তূর্য-বাদকের একজন আমি— এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।’নজরুলের অভিভাষণ গুলো পাঠ করলে মনে হয় তিনি ত্রিকালদর্শী অতিমানব। তাকে কোন ভাবেই কোন বিশেষণের খাচায় বন্দী করার উপায় নেই। শুধু বর্তমানেই কালেই নয়, কাল থেকে মহাকালে সব অন্যায় অত্যাচার শোষণ ও বঞ্চনা, সামজিক বৈষম্য, যাবতীয় কুসংস্কার সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তার সাহিত্যকর্ম সব মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে। তার কবিতা, গান কী উপস্যাস, গল্পে সর্বত্রই মানবমুক্তির প্রেমময়বাণী আমাদেরকে সর্বদাই আলোর পথ দেখায়। তার অভিভাষণগুলোর মধ্যে তাৎপর্যময় দুটি অভিভাষন নিয়ে আলোচনা করলেই নজরুল চরিত্রের স্বরুপ কিছুটা হলেও উন্মোচন করা যায়। এর একটি ১৯৩২ সালের ৫ ও ৬ নভে¤^র সিরাজগঞ্জের নাট্যভবনে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম তরুণ সম্মেলনের সভাপতি হিসেবে কবির প্রদত্ত ভাষণ। এখানে কবি গোঁড়া মুসলিমদের পশ্চাৎপদতা, অশিক্ষা, অন্ধ কুসংস্কার এবং ইসলামের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে সঠিক তথ্যকে আড়াল করে সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপনের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। এই বক্তৃতায় কবি নিজ সমাজ ও দেশে যা কিছু মঙ্গলকর, তার উদ্দেশে লড়তে যুবসমাজকে স্বাগত জানিয়েছেন। কবি যৌবন এবং বার্ধক্যের অভূতপূর্ব ধারণা বাঙালি জাতির সামনে উপস্থাপন করতে সক্ষম হন। এই ধারণা শুধু মাত্র যৌবন এবং বার্ধ্যক্যের ধারনা মাত্র নয় এই ধারণা প্রচলিত জীর্ণ মতামত যার ভিত্তিতে শোষন, শাসন অব্যাহত থাকে এবং নব সৃষ্টির প্রেরণা ব্যহত হয় সে বিষয় গুলোর সংগঠিত রূপ। কী অসাধারণ বার্তা তার এই অভিভাষণে, যা পাঠ করে জড় চিন্তার মানুষেরাও নড়ে উঠতে বাধ্য। ‘বৃদ্ধ তাহারাই যাহারা নব অরুণোদয় দেখিয়া নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে দ্বার রুদ্ধ করিয়া পড়িয়া থাকে। আলোক-পিয়াসী প্রাণ চঞ্চল শিশুদের কল কোলাহলে যাহারা বিরক্ত হইয়া অভিসম্পাত করিতে থাকে, জীর্ণ পুঁতি চাপা পড়িয়া যাহাদের নাভিশ্বাস বহিতেছে, অতি জ্ঞানের অগ্নিমান্দ্যে যাহারা আজ কঙ্কালসার—বৃদ্ধ তাহারাই। ইহাদের ধর্মই বার্ধক্য। বার্ধক্যকে সবসময় বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না। বহু যুবককে দেখিয়াছি যাহাদের যৌবনের উর্দির নিচে বার্ধক্যের কঙ্কাল মূর্তি। আবার বহু বৃদ্ধকে দেখিয়াছি যাহাদের বার্ধক্যের জীর্ণাবরণের তলে মেঘলুপ্ত সূর্যের মতো প্রদীপ্ত যৌবন।’ অভিভাষণের এই অংশে আমরা সামাজিক স্থিতাবস্থার বিলোপ কামনাকারী একজন তরুণের কণ্ঠ শুনতে পাই। অটল সংস্কার দ্বারা আবদ্ধ সমাজ শোষন, তোষণের ধারাকে অব্যাহত রাখতে পারে, তাই তিনি মিথ্যা বার্ধক্যকে জড়িয়ে ধরে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা থেকে দূরে সরে থাকতে চান। তার কাছে বার্ধক্য হলো পুরনো ধ্যান ধারণার এক একটি রূপ। এই অভিভাষণেই আছে, ‘বার্ধক্য তাহাই—যাহা পুরাতনকে, মিথ্যাকে, মৃত্যুকে আঁকড়িয়া পড়িয়া থাকে, বৃদ্ধ তাহারাই—যাহারা মায়াচ্ছন্ন নব মানবের অভিনব জয় যাত্রার শুধু বোঝা নয়, বিঘ্ন; শতাব্দীর নব যাত্রীর চলার ছন্দে ছন্দ মিলাইয়া যাহারা কুচকাওয়াজ করিতে জানে না, পারে না;’। এই যে জেগে ওঠার প্রেরণা প্রদান, নতুন ধারণাকে গ্রহণ করার উৎসাহ তা’ শুধুমাত্র আমরা লক্ষ্য করি নজরুলের সৃষ্টিকর্ম এবং চরিত্রের মধ্যে। কবি তার জীবনের শেষ অভিভাষণ প্রদান করেন ১৯৪১ সালে। এই অভিভাষণটি পাঠ করলে মনে হয় একজন মহৎ দার্শনিক তার সমগ্র জীবনকে তুলে ধরছেন জাতির বিবেকের সামনে। নজরুল নিজেকে ভুলিয়ে দিতে চান, তার অভিমান, রাগ, অনুযোগ আমরা সমগ্র অভিভাষণটিতে লক্ষ্য করি। কবির মাত্র ২২ বছরের সাহিত্য সাধনায় তার এই অভিভাষণ কবির অসুস্থতার কিছু আগে প্রদত্ত। ফলে এ সময় কবিকে কী এক দূর লোকের মোহাচ্ছন্ন দার্শনিকতায় পেয়ে বসে। তিনি যেন বুঝে যান এই দেশ, এই সমাজ, এই জাতির মঙ্গল কামনায় তিনি যা চেয়েছেন, যেভাবে চেয়েছেন— বর্তমান সমাজব্যবস্থায় তা যেন দূর প্রহেলিকা। তাই তো কবি তার জীবনের শেষ অভিভাষণ ১৯৪১ সালের ৫ ও ৬ এপ্রিল কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সভাপতির বক্তব্যে বেদনায় ক্ষতবিক্ষত হূদয় নিয়ে বলেন, ‘যদি আর বাঁশি না বাজে আমি কবি বলে বলছিনে— আমি আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছিলাম সেই অধিকারে বলছি— আমায় ক্ষমা করবেন— আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুন, আমি কবি হতে আসিনি— আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম প্রেম পেতে এসেছিলাম— সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নীরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।’ এরপর প্রকৃতই সারা জীবন মানবতার জন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত কবি কাজী নজরুল ইসলাম চিরদিনের মতো মূক হয়ে গেলেন। নজরুলের বিদ্রোহের স্বরুপ আমরা পেয়ে যাই তার কণ্ঠ থেকে। তার বিদ্রোহ স্থিতাবস্থা, কুসংস্কার এবং মানব জাতিকে পিছনে টেনে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। সার্বিক ভাবে তিনি মানব মুক্তির একজন দূত। আবেগ মাখা তার শেষ অভিভাষণে আমরা তার অনুরোধ মিশ্রিত বাণী যেনো শুনতে পাই। ‘আমাকে বিদ্রোহী বলে খামখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। এ নিরীহ জাতটাকে আঁচড়ে-কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কোনদিনই নেই। আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, যা মিথ্যা-কলুষিত-পুরাতন-পঁচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে। ধর্মের নামে ভন্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে।’কবির জীবনের উদ্দেশ্য কী ছিল। তিনি তার নিজের বয়ানে তা’ স্বচ্ছ্ব ভাবে উপস্থাপন করেন। তিনি তার সৃষ্টি কর্মের মাধ্যমে কী বার্তা দিতে চেয়েছিলেন সে বিষয়টি সম্পর্কেও আমরা ধারণা পেয়ে যাই। কণ্ঠ কতো নিবেদিত, শব্দ কতো প্রাণময়, স্বর কতো নম্র। তিনি ইংরেজ কবি কীটসের মতো শুধু সুন্দরের সাধণা করতে আসেননি। সুন্দরের সঙ্গে অভেদ দূর করে পৃথিবীকে আরও সুন্দর করতে চেয়েছিলেন তিনি। এ বিষয়ে তার বয়ান হলো, “আমার কাব্যে সংগীতে কর্মজীবনে অভেদ ও সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। আমি যশ চাই না, খ্যাতি চাই না, প্রতিষ্ঠা চাই না, নেতৃত্ব চাই না। জীবন আমার যত দুঃখময়ই হোক, আনন্দের গান- বেদনার গান গেয়ে যাব আমি।’কাজী নজরুল ইসলামের এসব অভিভাষণের মধ্য দিয়ে তৎকালীন ভারতবর্ষের সমাজ-সভ্যতা, সাহিত্য-সংস্কৃতির এক চিত্ররূপ আমাদের সামনে উঠে আসে। এসবের মাধ্যমে কবি মূলত আপামর জনমানুষকে বিশেষত যুবসমাজের মধ্যে দেশ, জাতির সপক্ষে মুক্ত মানবতার মূলমন্ত্র প্রণোদনার মতো ছড়িয়ে দিয়েছেন। তার অভিভাষণ গুলোর প্রাসঙ্গিকতা লক্ষ্য করলে বিস্মিত হতে হয়। [লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

ভিডিও আরও দেখুন

চোটে মার্শ আউট, বাংলাদেশ সফরও হুমকির মুখে

অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। গোড়ালির চোটের কারণে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ থেকে ছিটকে গেছেন অধিনায়ক মিচেল মার্শ। এই চোটের ধরণ ও চিকিৎসার সময় দীর্ঘ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন টিম ম্যানেজমেন্ট। ফলে পাকিস্তান সফরের পর বাংলাদেশ সফরেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে তার খেলা নিয়ে।আগামী ৩০ মে থেকে পাকিস্তানের মাটিতে শুরু হতে যাচ্ছে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। মার্শের অনুপস্থিতিতে অজি দলকে নেতৃত্ব দেবেন উইকেটরক্ষক-ব্যাটার জশ ইংলিশ। সম্প্রতি আইপিএল শেষে ছুটি কাটছিলেন মার্শ। কিন্তু চোটের কারণে পার্থেই থেকে যেতে হয়েছে তাকে। সেখানে তার উন্নত চিকিৎসা ও শারীরিক পরীক্ষা চলছে।পাকিস্তান সিরিজ শেষের পর ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে আগামী ৯ জুন বাংলাদেশে পা রাখার কথা অজিদের। পাকিস্তানের বিপক্ষে যে দল ঘোষণা করেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া, সেই একই দল নিয়েই তারা বাংলাদেশ সফর করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে পাকিস্তান সফর মিস করলে বাংলাদেশ সফরে মার্শ পাওয়া যাবে না- এমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে।এর আগেই পেসার প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজেলউড ও মিচেল স্টার্ক দলের বাইরে রয়েছেন। মার্শ চোট পেয়ে বিদায় নেওয়ায় একের পর এক তারকা ছাড়াই পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলতে নামছে অস্ট্রেলিয়া। একই চিত্র বাংলাদেশ সিরিজেও দেখা যেতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ অনুষ্ঠিত হবে মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। ম্যাচগুলো ৯, ১১ ও ১৪ জুন। তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ অনুষ্ঠিত হবে চট্টগ্রামে। ম্যাচগুলো ১৭, ১৯ ও ২১ জুন।পাকিস্তান সফরের জন্য ঘোষিত অস্ট্রেলিয়া ওয়ানডে দল: জশ ইংলিশ (অধিনায়ক), অ্যালেক্স ক্যারি, নাথান এলিস, ক্যামেরন গ্রিন, ম্যাথিউ কুহনেম্যান, মার্নাস লাবুশেন, রাইলি মেরিডিথ, অলিভার পিক, ম্যাট রেনশ, তানভীর সংঘা, লিয়াম স্কট, ম্যাট শর্ট, বিলি স্ট্যানলেট ও অ্যাডাম জাম্পা।

চোটে মার্শ আউট, বাংলাদেশ সফরও হুমকির মুখে
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৭৬ জন