সংবাদ

নরওয়ের দুই ব্রাত্য বীরের রূপকথা

জীবন কখনো কখনো সেরা চিত্রনাট্যকারকেও হার মানায়। যেখানে ট্র্যাজেডি আর গ্লানি মিলেমিশে একাকার হয়ে জন্ম দেয় এমন এক মহাকাব্যের, যা রূপকথাকেও হার মানাতে বাধ্য। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে বিদায় করে নরওয়ের কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার গল্পটা ঠিক তেমনই।তবে এই জয়ের নায়ক কোনো প্রতিষ্ঠিত মহাতারকা নন; একজন ডেনিশ আদালতের দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আর অন্যজন ক্লাবহীন, প্রায় ‘বেকার’ এক গোলকিপার। অন্ধকার অতীত আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে পায়ে ঠেলে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা চমক উপহার দিলেন আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ ও অরিয়ান হাস্কিয়োল্ড নাইল্যান্ড।কারাগারের সাজা ভুলে ৪৫ মিনিটের জাদুতে ব্রাজিল বধের নায়ক শেলদেরুপকয়েক মাস আগেও যার ফুটবল ক্যারিয়ার পড়ে গিয়েছিল ঘোর অনিশ্চয়তায়, সেই আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপই এখন নরওয়ের চোখের মণি। নভেম্বর ২০২৫-এ অপ্রাপ্তবয়স্কদের একটি আপত্তিকর ভিডিও শেয়ার করার অপরাধে ডেনিশ আদালত তাকে ১৪ দিনের স্থগিত কারাদণ্ড (সাসপেন্ডেড সেন্টেন্স) দিয়েছিল। কলঙ্কের সেই বোঝা মাথায় নিয়ে বিশ্বকাপে রিজার্ভ বেঞ্চে বসেই শুরু করেছিলেন ব্রাজিলের বিপক্ষের ম্যাচটি। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে কোচ স্টেল সলবাকেন যখন তাকে মাঠে নামান, মাত্র ৪৫ মিনিটে খোলস বদলে এক রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন এই ফরোয়ার্ড।মাঠে নেমেই নিজের জাদুকরী পাসিংয়ে ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেন শেলদেরুপ। তার নিখুঁত ক্রস থেকেই বুলেট হেডে প্রথম গোল করেন ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড। এর কিছুক্ষণ পর আবারও বাঁ প্রান্ত দিয়ে একক নৈপুণ্যে বল বাড়িয়ে দেন হালান্ডকে, যা থেকে ব্যবধান ২-০ হয়। ডেনিশ লিগের ক্লাব এফসি নর্ডসিল্যান্ড থেকে বেনফিকায় নাম লেখানো এই তরুণ বুঝিয়ে দিলেন, সবুজ মাঠের জেদ কীভাবে আদালতের অন্ধকার অতীতকে মুছে দিতে পারে।ফুটবল ছেড়ে গলফ কোর্টে আশ্রয় নেওয়া ‘বেকার’ গোলকিপারের বাজপাখি হয়ে ওঠাযদি শেলদেরুপ নরওয়ের আক্রমণের ধার হন, তবে রক্ষণভাগের শেষ প্রাচীর ছিলেন অরিয়ান হাস্কিয়োল্ড নাইল্যান্ড। ৩৫ বছর বয়সী এই গোলকিপারের বর্তমানে কোনো ক্লাবই নেই! স্প্যানিশ ক্লাব সেভিয়া চলতি মৌসুম শেষে তাকে রিলিজ করে দেয়। পুরো ২০২৬ সালে খেলেছেন মোটে নয়টি ম্যাচ। ফুটবল মাঠে ব্রাত্য হয়ে পড়া নাইল্যান্ড যখন বিষণ্ণতা লুকাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গলফ খেলার ভিডিও পোস্ট করছিলেন, কেউ ভাবেনি এই মানুষটাই ব্রাজিলের বিশ্বসেরা আক্রমণভাগকে স্তব্ধ করে দেবেন।মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নাইল্যান্ড যা করলেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। প্রথমার্ধে ব্রাজিলের ব্রুনো গিমারেসের পেনাল্টি রুখে দিয়ে যিনি শুরু করেছিলেন, দ্বিতীয়ার্ধে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের একের পর এক জোরালো শট চিতার বেগে রুখে দেন তিনি। ম্যাচের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মুহূর্তটি আসে শেষ দিকে, যখন নিজেদের ডিফেন্ডার আয়েরের ভুল লব গোললাইনের ওপর থেকে অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ফিস্ট করে ফিরিয়ে দেন নাইল্যান্ড। অনুশীলনের তীব্র ঘাটতি থাকা এই ক্লাবহীন ‘বাজপাখি’ একাই যেন পুরো ব্রাজিল দলকে কাঁদিয়ে ছাড়লেন।ব্রাজিল এক গোল শোধ করলেও ভাইকিংদের মহাকাব্যিক জয় আটকাতে পারেনি। যে সেভিয়া নাইল্যান্ডকে ছুড়ে ফেলেছিল, আজ হয়তো তারাই কপাল পুড়ছে। অন্যদিকে কারাদণ্ডের গ্লানি ভুলে শেলদেরুপ এখন বিশ্বফুটবলের নতুন সেনসেশন। ফুটবল বিশ্ব আজ দেখল, ভাগ্য যাদের এক কোণে ঠেলে দিয়েছিল, তারাই আজ বিশ্বজয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে লিখলেন নতুন ইতিহাস।

নরওয়ের দুই ব্রাত্য বীরের রূপকথা
পর্তুগাল পর্তুগাল
-
০৭ জুলাই - ০১ এএম
স্পেন স্পেন
যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র
-
০৭ জুলাই - ০৬ এএম
বেলজিয়াম বেলজিয়াম
আর্জেন্টিনা আর্জেন্টিনা
-
০৭ জুলাই - ১০ পিএম
মিসর মিসর
সুইজারল্যান্ড সুইজারল্যান্ড
-
০৮ জুলাই - ০২ এএম
কলম্বিয়া কলম্বিয়া
ভারতে কারাভোগ শেষে ট্রাভেল পারমিটে দেশে ফিরলেন ৫০ বাংলাদেশি

ভারতে কারাভোগ শেষে ট্রাভেল পারমিটে দেশে ফিরলেন ৫০ বাংলাদেশি

ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ শেষে বিশেষ ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে দেশে ফিরেছেন ৫০ বাংলাদেশি।র‌বিবার রাত নয়টার দিকে ভারতের পেট্রাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তর করে। এরপর বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে সূত্রে জানা গেছে, ফেরত আসাদের মধ্যে ৪৬ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী রয়েছেন। তাদের বাড়ি যশোর, ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, সাতক্ষীরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ ও চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায়। সীমান্তে হস্তান্তরের সময় দুই দেশের পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও মানবাধিকার সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।ফেরত আসা ব্যক্তিদের একজন ফিরোজ মাহমুদ বলেন, ভালো কাজের প্রলোভনে পড়ে দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথে তিনি ভারতের তামিলনাড়ু গিয়েছিলেন। সেখানে বাসাবাড়ি, পোশাক কারখানা ও ইটভাটায় কাজ করার সময় ভারতীয় পুলিশের হাতে আটক হন। অনুপ্রবেশের দায়ে আদালত তাকে তিন বছরের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠান। কারাভোগ শেষে ভারতের একটি বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা তাকে জেলখানা থেকে ছাড়িয়ে নিজেদের শেল্টার হোমে রাখে। পরে দুই দেশের দূতাবাসের সহযোগিতায় ও বিশেষ ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে তিনি দেশে ফিরতে পেরেছেন।বেনাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুর রহমান বলেন, ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ফেরত আসা ৫০ বাংলাদেশিকে বেনাপোল বন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। সেখান থেকে সাধারণ ডায়েরির (জিডি) মাধ্যমে দুটি মানবাধিকার সংস্থার জিম্মায় তাদের দেওয়া হয়।মানবাধিকার সংস্থা যশোর ‘জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার’-এর আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক অপূর্ব কুমার সাহা জানান, অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে তামিলনাড়ু পুলিশের হাতে আটক হওয়া এই ব্যক্তিদের ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ফেরত আসাদের মধ্যে ৪ জন নারীকে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার এবং ৪৬ জন পুরুষকে ‘রাইটস যশোর’ নামে আরেকটি মানবাধিকার সংস্থা গ্রহণ করেছে। সংস্থা দুটি তাদের নিজ নিজ পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে।
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের নব্য সমাজতত্ত্ব: আকাঙ্ক্ষা ও উদ্বেগের এক জটিল সমীকরণ

বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি স্বতন্ত্র ও গৌরবোজ্জ্বল স্থান রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে এই শ্রেণীটি ছিল শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিয়ে গঠিত—এমন একটি সামাজিক গোষ্ঠী যারা কেবল তুলনামূলক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই ভোগ করত না, বরং জাতীয় জনমত গঠন, গণতান্ত্রিক আদর্শের সুরক্ষা এবং দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশকে লালন করত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে জাতির নৈতিক ও নাগরিক মেরুদণ্ড হিসেবে গণ্য করা হতো। তবে সেই পরিচিত চিত্রটি এখন এক মৌলিক ও গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সমসাময়িক বাংলাদেশি মধ্যবিত্ত শ্রেণী দেশের ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে আকারে বৃহত্তর, অধিক বৈচিত্র্যময়, ডিজিটালভাবে অধিক সংযুক্ত এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে অনেক বেশি সমন্বিত। তবুও এটি অর্থনৈতিকভাবে অধিক নিরাপত্তাহীন, সামাজিকভাবে খণ্ডিত এবং রাজনৈতিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত। এটি এখন আর শুধুমাত্র আয় বা প্রথাগত পেশার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় না; বরং এর চরিত্র ক্রমশ নির্ধারিত হচ্ছে জীবনধারা, ভোগের ধরন, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধার আকাক্সক্ষা দ্বারা। সুতরাং, মধ্যবিত্তের এই ‘নতুন সমাজতত্ত্ব’ বোঝা সমকালীন বাংলাদেশকেই বোঝার জন্য অপরিহার্য। বিগত তিন দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেশের শ্রেণী কাঠামোকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন এবং ২০২২ সালের পারিবারিক আয়-ব্যয় শুমারি অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্য নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়ে ১৮.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও জাতীয় দারিদ্র্যের হার এখন অনেক বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, প্রবাসী রেমিট্যান্স এবং কৃষি উৎপাদনশীলতার ওপর ভর করে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এই অর্থনৈতিক রূপান্তর লাখ লাখ পরিবারকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে প্রবেশাধিকার দিয়েছে। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা যুক্তি দেন যে, শ্রেণীকে কেবল উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। এই ব্যাপকতর ধারণাটি প্রথম উঠে এসেছিল ম্যাক্স ওয়েবারের ‘অর্থনীতি ও সমাজ’ (১৯২২) গ্রন্থে, যেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন যে সামাজিক শ্রেণী কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ দ্বারাই নয়, বরং ‘মর্যাদা’ ও ‘ক্ষমতা’ দ্বারাও গঠিত হয়। আজকের বাংলাদেশে একই রকম আয় থাকা সত্ত্বেও দুটি পরিবার সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক অবস্থানে থাকতে পারে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, একজন কর্পোরেট নির্বাহী এবং একজন সফল অনলাইন নারী উদ্যোক্তার আয় তুলনামূলকভাবে সমান হতে পারে, কিন্তু সমাজ-মানসে তাদের সামাজিক পরিচয়, আকাক্সক্ষা এবং প্রভাবের ধরন যথেষ্ট ভিন্ন। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ো তার অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পুঁজির তত্ত্বের মাধ্যমে এই ধারণাটিকে আরও প্রসারিত করেছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডিস্টিংশন’ (১৯৭৯)-এ বুর্দিয়ে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, শ্রেণী কেবল সম্পদের মাধ্যমে নয়, বরং শিক্ষা, ভাষা, সাংস্কৃতিক পছন্দ এবং প্রতীকী মর্যাদার মাধ্যমে পুনরূৎপাদিত হয়। সমসাময়িক বাংলাদেশে অভিভাবকরা ক্রমবর্ধমানভাবে ইংরেজি-মাধ্যম শিক্ষা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিদেশি ডিগ্রি এবং ডিজিটাল দক্ষতায় বিপুল সম্পদ বিনিয়োগ করছেন—কেবলমাত্র সন্তানদের আয় বাড়ানোর জন্য নয়, বরং একটি উচ্চতর সামাজিক মর্যাদা বা ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ নিশ্চিত করার জন্য। প্রথাগত মধ্যবিত্তের প্রধান বৈশিষ্ট্য যদি হয়ে থাকে স্থিতিশীলতা, তবে বর্তমানের নব্য মধ্যবিত্তের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অনিশ্চয়তা ও তীব্র প্রতিযোগিতা। এই রূপান্তরটি ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্থনি গিডেন্সের ‘দ্য কনসিকোয়েন্সেস অফ মডার্নিটি’ (১৯৯০) গ্রন্থে বর্ণিত আধুনিক সমাজের চিত্রকে মনে করিয়ে দেয়, যেখানে দ্রুত সামাজিক পরিবর্তনের মাঝে ব্যক্তিকে ক্রমাগত তার জীবন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করতে হয়। জীবন এখন আত্ম-উন্নয়নের এক অবিরাম ও ক্লান্তিকর প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। এই রূপান্তর শ্রমবাজারে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের মতে, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অনলাইন ফ্রিল্যান্স কর্মী উৎসে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এমন সব পেশাগত কাজকে নতুন রূপ দিচ্ছে, যা একসময় মধ্যবিত্তের জন্য নিরাপদ কর্মজীবন হিসেবে বিবেচিত হতো। স্প্যানিশ সমাজবিজ্ঞানী ম্যানুয়েল ক্যাস্টেলস তার ‘দ্য রাইজ অফ দ্য নেটওয়ার্ক সোসাইটি’ (১৯৯৬) গ্রন্থে এই পরিবর্তনগুলোর পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। আজকের মধ্যবিত্তরা ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে বসেই সরাসরি বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করছেন। কিন্তু এই ডিজিটালাইজেশন প্রতিযোগিতাকে বিশ্বব্যাপী তীব্রতর করেছে, যার ফলে ঢাকার একজন গ্রাফিক ডিজাইনারকে ভারত, ফিলিপাইন বা পূর্ব ইউরোপের ফ্রিল্যান্সারদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে আকাশছোঁয়া জমির দাম এবং অ্যাপার্টমেন্টের খরচের কারণে শহরগুলোতে বাড়ির মালিকানা তরুণ পেশাজীবীদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বেসরকারি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন এবং ডিজিটাল সংযোগ এখন পারিবারিক বাজেটের সিংহভাগ গ্রাস করছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ অনুযায়ী, ক্রমাগত মুদ্রাস্ফীতি মধ্যবিত্তের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করেছে। এই অবস্থাটি অর্থনীতিবিদ গাই স্ট্যান্ডিং-এর ‘দ্য প্রিকারিয়েট: দ্য নিউ ডেঞ্জারাস ক্লাস’ (২০১১) গ্রন্থে বিকশিত ‘প্রিকারিয়েট’ ধারণার সঙ্গে মেলে—যেখানে উচ্চ শিক্ষিত একটি শ্রেণী অস্থিতিশীল কর্মসংস্থান, অনিশ্চিত আয় এবং সীমিত দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী উলরিখ বেক তার ‘রিস্ক সোসাইটি’ (১৯৮৬) গ্রন্থে যেমনটি বলেছিলেন, আধুনিক সমাজ নতুন সুযোগের পাশাপাশি নতুন ঝুঁকিও তৈরি করে; বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী আজ ঠিক সেই ঝুঁকির আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্তমান মধ্যবিত্তের পরিচয় কেবল আয়ের সূচকে নয়, বরং ভোগের সংস্কৃতির মাধ্যমেও প্রকাশিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো (যেমন ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম) ভ্রমণ, ফ্যাশন, রেস্তরাঁ ও গ্যাজেটের অবিরাম প্রদর্শনের মাধ্যমে সাফল্যের এক কৃত্রিম সংজ্ঞা তৈরি করছে। বুর্দিয়োর ভাষায়, এটি হলো ‘প্রতীকী স্বাতন্ত্র্যের অন্বেষণ’। স্কুল, ক্যাফে, স্মার্টফোন বা ছুটির গন্তব্যের পছন্দ ক্রমবর্ধমানভাবে সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সংকেত বহন করে। ফলস্বরূপ, একটি নির্দিষ্ট জীবনধারা বজায় রাখার এই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ পরিবারগুলোকে ভোক্তা ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলছে। এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর কেবল মধ্যবিত্তের পকেট বা জীবনযাত্রাকে বদলে দেয়নি, বরং দেশের নাগরিক সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক আচরণকেও নতুন রূপ দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে—এই নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণী কি তাদের ঐতিহাসিক নাগরিক ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করছে, নাকি ধীরে ধীরে একে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভোগবাদের কাছে সমর্পণ করছে?জার্মান দার্শনিক ইয়ুর্গেন হাবারমাস তার ‘দ্য স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফরমেশন অফ দ্য পাবলিক স্ফিয়ার’ (১৯৬২) গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, একটি সুস্থ গণতন্ত্র নির্ভর করে এমন এক সচেতন জনগণের ওপর, যারা রাষ্ট্র ও বাজারের বাইরে যুক্তিসঙ্গত বিতর্কে অংশ নিতে সক্ষম। ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের তথ্যে প্রবেশাধিকার অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। কিন্তু এই তথ্যের প্রাচুর্য সবসময় অর্থপূর্ণ নাগরিক সম্পৃক্ততা তৈরি করছে না; বরং জনআলোচনা অনেক সময় খণ্ডিত, মেরুকৃত এবং ভুল তথ্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ছে। অবশ্য এর ইতিবাচক দিকও রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পুটনামের ‘বোলিং অ্যালোন’ (২০০০) গ্রন্থের সামাজিক পুঁজি হ্রাসের তত্ত্বকে কিছুটা কাউন্টার করে বাংলাদেশে ডিজিটাল সক্রিয়তা, ক্রাউডফান্ডিং, স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ এবং পরিবেশ বা সড়ক নিরাপত্তার মতো সামাজিক আন্দোলনগুলো অনলাইনে শুরু হয়ে পরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। তরুণ মধ্যবিত্তরা প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে বিষয়ভিত্তিক নাগরিক সম্পৃক্ততা প্রকাশ করছেন। অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক অমর্ত্য সেন তার ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম’ (১৯৯৯) গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন যে, উন্নয়নকে কেবল আয় বৃদ্ধি হিসেবে না দেখে মানুষের সক্ষমতার সম্প্রসারণ হিসেবে বোঝা উচিত। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি’র মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২৫-২৬ অনুযায়ী বাংলাদেশ মানব উন্নয়নে অগ্রগতি বজায় রাখলেও সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্য এখনও প্রকট। একটি ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী তখনই জাতীয় টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে, যখন তারা মানসম্মত শিক্ষা, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সমান সুযোগ পাবে। অন্যথায়, উচ্চ শিক্ষিত স্নাতকদের দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব শিক্ষার ওপর জনগণের ঐতিহ্যবাহী আস্থা ও আশাবাদকে ভেঙে চুরমার করে দেবে। একই সঙ্গে, মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান ভোগ নগরের পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ সম্পদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। তাই টেকসই নগর পরিকল্পনা, দক্ষ গণপরিবহন এবং পরিবেশগতভাবে দায়িত্বশীল ভোগের নীতি প্রণয়নে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভূমিকা অপরিহার্য। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নতুন সমাজতত্ত্ব কেবল একটি পরিবর্তনশীল শ্রেণীর গল্প নয়; এটি আসলে একটি উন্নয়নকামী জাতির আত্ম-পুনর্নির্ধারণের মহাকাব্য। মধ্যবিত্ত শ্রেণী আজ আকাঙ্ক্ষা ও উদ্বেগ, সমৃদ্ধি ও অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক সুযোগ ও স্থানীয় দায়িত্বের এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই শ্রেণীটি কি আরও বেশি নাগরিক-সচেতন ও সাম্যবাদী হবে, নাকি কেবলই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভোগবাদে নিমজ্জিত হবে—তা-ই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক প্রাণশক্তি এবং সামাজিক সংহতিকে। যদি সরকারি নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে মেধা, সৃজনশীলতা এবং উদ্যোক্তা সত্তাকে পুরস্কৃত করা যায়, তবে এই নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীই হবে একটি সাম্যভিত্তিক, স্থিতিস্থাপক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি। [লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী ]

দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি

দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের লড়াই সাধারণত দুটি পথে পরিচালিত হয়। একটি হলো আইন প্রয়োগ, তদন্ত ও বিচার; অন্যটি প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ, যার ভিত্তি জনসচেতনতা, নৈতিকতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ। প্রথম পথটি অপরিহার্য হলেও দ্বিতীয় পথটি দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। কারণ দুর্নীতি কেবল আইনের বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক আচরণ, যা তখনই বিস্তার লাভ করে যখন সমাজে অনিয়মকে মেনে নেয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সম্প্রসারণের উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করেছে। বর্তমানে মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যে কমিটিগুলো কাজ করছে, সেগুলোর কার্যক্রম এবার ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক উদ্যোগের একটি নতুন পরিসর তৈরি হতে পারে। প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি কোনো তদন্তকারী সংস্থা নয় এবং এটি দুদকের বিকল্পও নয়। এই কমিটির সদস্যদের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার, তদন্ত পরিচালনার কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই। এর মূল দায়িত্ব হলো জনসচেতনতা সৃষ্টি, সততা ও নৈতিকতার চর্চা উৎসাহিত করা, নাগরিকদের সরকারি সেবা সম্পর্কে অবহিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করা। দুদকের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি হবে সাত সদস্যবিশিষ্ট। সদস্যদের সমাজের সৎ, দায়িত্বশীল ও স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বেছে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য রাখার বিধানও রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য, জনপ্রতিনিধি, সরকারি চাকরিজীবী, ঋণখেলাপি কিংবা ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সদস্যপদ থেকে বিরত রাখার নীতিও গ্রহণ করা হয়েছে। নীতিগতভাবে এটি একটি ইতিবাচক কাঠামো। তবে এর সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সদস্য নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয় তার ওপর। ইউনিয়ন পর্যায়ে এ ধরনের কমিটির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি সরকারি সেবার মুখোমুখি হন স্থানীয় পর্যায়ে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, ভূমি-সংক্রান্ত সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কৃষি প্রণোদনা, সরকারি অনুদান, বিভিন্ন ভাতা, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের নানা সেবার সঙ্গে জনগণের প্রতিদিনের সম্পর্ক। এসব ক্ষেত্রেই মাঝেমধ্যে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, স্বজনপ্রীতি কিংবা অস্বচ্ছতার অভিযোগ ওঠে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ জানেন না কোন সেবা বিনামূল্যে পাওয়ার কথা, কোথায় অভিযোগ করতে হবে বা সরকারি বিধান কী। এই অজ্ঞতা দুর্নীতির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এখানেই দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নিয়মিত জনসচেতনতামূলক সভা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা, নাগরিক অধিকার বিষয়ে প্রচার, সরকারি সেবার তথ্য সহজভাবে তুলে ধরা এবং স্থানীয়ভাবে সততার সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক চাপ তৈরি হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে আরও কার্যকর হয়। অবশ্য এই সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু বাস্তব প্রশ্নও রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, স্থানীয় পর্যায়ের অনেক কমিটি সময়ের সঙ্গে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। কোথাও নিয়মিত কার্যক্রম হয়নি, কোথাও সদস্য নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব কমিটির স্বাধীনতাকে সীমিত করেছে। ফলে নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি। এই প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বের দাবিদার। তার মতে, অতীতের দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে নতুন কাঠামো তৈরি করা গেলে উদ্যোগটির সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়বে। এই মন্তব্য কেবল একটি পরামর্শ নয়; বরং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা। ইউনিয়ন পর্যায়ের দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি সুফল পেতে পারেন সাধারণ নাগরিকরা। বিশেষ করে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কৃষি সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, খাদ্য সহায়তা এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত সুবিধাভোগীরা অধিক স্বচ্ছতার পরিবেশে সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে সরকারি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে অনিয়মের শিকার হলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে এবং কীভাবে নাগরিক অধিকার রক্ষা করা যায়, সে সম্পর্কেও মানুষের সচেতনতা বাড়বে। তবে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, কেবল কমিটি গঠন করলেই দুর্নীতি কমে যাবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক উদ্যোগ তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। আর সেই আস্থা গড়ে ওঠে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে। সদস্য নির্বাচন যদি বিতর্কিত হয়, কার্যক্রম যদি কেবল আনুষ্ঠানিক সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকে, অথবা কমিটি যদি স্থানীয় ক্ষমতার বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে উদ্যোগটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। আরও একটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারি সেবার বড় অংশ ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। কিন্তু ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রেও নানা ধরনের প্রতারণা, তথ্যগোপন, দালালচক্র কিংবা প্রযুক্তিগত অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিগুলো যদি ডিজিটাল সেবা গ্রহণে নাগরিকদের সহায়তা, তথ্যপ্রদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কাজেও সম্পৃক্ত হয়, তাহলে তাদের কার্যক্রম আরও সময়োপযোগী হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির কার্যকারিতা বাড়াতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সদস্য নির্বাচন প্রক্রিয়াকে উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক করা, নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ও মূল্যায়ন প্রকাশ করা এবং স্থানীয় সাংবাদিক, শিক্ষক, নারী সংগঠন, তরুণ সমাজ ও নাগরিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত অবহিত করলে এর প্রতি আস্থা ও অংশগ্রহণ দুটিই বাড়বে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সুশাসনের ভিত্তি শক্তিশালী হয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সম্প্রসারণ সেই যৌথ প্রয়াসকে আরও বিস্তৃত করার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে তখনই, যখন আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজও অনিয়মের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেয়। ইউনিয়ন পর্যায়ের এই উদ্যোগ সেই অবস্থানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারলে এর সুফল কেবল প্রশাসনিক কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা সুশাসন, ন্যায়সংগত সেবা এবং নাগরিক আস্থার ভিত্তিকেও আরও সুদৃঢ় করবে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সংবাদকর্মী]

বাংলা কিউআর: এমডিআর ও নগদ অর্থের সরবরাহ কমাতে হবে

১ জুলাই ২০২৬ থেকে বাংলাদেশের সার্বজনীন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত গ্রাহক এবং মার্চেন্ট কোনো পক্ষ থেকেই খুববেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। ২০২১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট সর্বপ্রথম ‘বাংলা কিউআর’ এর নির্দেশিকা প্রকাশের পর ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ‘বাংলা কিউআর’ চালু করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দৈনন্দিন লেনদেনে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে লেনদেনকে সহজ ও দ্রুততর করা। পাশাপাশি লেনদেনকে স্বচ্ছ ও নিরাপদ রাখা। অতি সম্প্রতি এর সঙ্গে আরও কিছু উদ্দেশ্য যুক্ত হয়েছে। যেমন— নগদ টাকা ছাপানোর খরচ হ্রাস করা, সমস্ত প্রকার লেনদেনকে ব্যাংকিং ও আর্থিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা, ট্রানজেকশন ট্র্যাকিং এর মধ্য দিয়ে পর্যায়ক্রমে সবাইকে করের আওতায় নিয়ে আসা। সারা বিশ্ব এখন একটি ডিজিটাল রুপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে কেন? সর্বস্তরে ‘বাংলা কিউআর’ চালু করার প্রধান পূর্বশর্ত হলোমুদ্রাবাজারে নগদ টাকার সরবরাহ কমিয়ে আনা। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এটি বেশ চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব কিছু নয়। লেনদেন ডিজিটালাইজেশন নিয়ে প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে মুদ্রাবাজার থেকে নগদ টাকা উঠিয়ে নিয়ে বিনিময়ে ডিজিটাল ফরম্যাটে (ই-মানি/ডিজিটাল কারেন্সি) বাজারে সরবরাহ করা। এব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করলে যারা ব্যাংকিং সেবার বাহিরে আছে তারা ব্যাংক ও এমএফএস হিসাব খুলে নগদ টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে জমা দিতে বাধ্য হবে। এভাবে মুদ্রাবাজারে নগদ টাকার সরবরাহ কমানো সম্ভব হবে। নগদ টাকা ছাপানো একেবারেরই সীমিত পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনের মতো দেশগুলোতে নগদ টাকার ব্যবহার খুবই কম। এসব দেশে ৭০-৮০ শতাংশ লেনদেনই হয়ে থাকে ডিজিটাল মাধ্যমে এবং এসব দেশের ব্যাংকগুলোতেও নগদ লেনদেন হয়না বললেই চলে। ‘বাংলা কিউআর’ জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রতিবন্ধকতা হলো মার্চেন্ট পয়েন্টে এর চার্জ অত্যন্ত বেশি। গত ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-২ এর জারি করা সার্কুলার মোতাবেক ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে সংঘটিত প্রতিটি লেনদেনে মার্চেন্ট পয়েন্ট চার্জ সর্বনিম্ন ১% নির্ধারণ করা হয়েছে যা মার্চেন্টদের নিরুৎসাহের অন্যতম কারণ। এই সিদ্ধান্ত বাংলা কিউআর এর উদ্দেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই চার্জ সর্বোচ্চ ১% হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ঘোষণা অনুযায়ী মোবাইল ডাটা ছাড়াই ব্যাংক ও এমএফএস এর এ্যাপ ব্যবহার করে বাংলা কিউআর এর মাধ্যমে পেটেন্ট করার যে সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। পাশাপাশি যারা স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না তাদের জন্য USSD (Unstructured Supplementary Service Data) কোড ব্যবহার করে P2P ও P2B লেনদেন করার বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। মার্কেটিং পলিসি হিসেবে বানিজ্যিক ব্যাংকগুলো (একোয়ারিং ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান) নিজ নিজ মার্চেন্ট হিসাবধারীদের প্রনোদনা দিতে পারে যা এই নতুন ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সর্বোপরি, বাংলা কিউআর-কে দেশের মুদ্রাবাজারের একটি সার্বজনীন প্ল্যাটফরম হিসেবে জায়গা করে নিতে একটি বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে। [লেখক: প্রিন্সিপাল অফিসার, পূবালী ব্যাংক পিএলসি]

মাজার-বাজারের দেশ

এদেশটা যেন মাজার আর বাজারের দেশ। রাজধানীতে, শহরে, গ্রামে-গঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায় সর্বত্র মাজার বিরাজমান। যেখানে জনবসতি, গণযোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থা আছে সেখানেই  প্রথমে চুনের দরগাহ পরে সময়ের পরিবর্তনে পূর্ণাঙ্গ মাজারে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে মাজারকে কেন্দ্র করে নানা জনশ্রুতি ছড়িয়ে পড়ে এবং এগুলো নিভৃতে ছড়ানো হয়। যা ধর্মভীরু মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করার মোক্ষম হাতিয়ার। তখনই মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আগরবাতি, মোমবাতি আর আতরের গন্ধ পেয়ে আসতে শুরু করে। কালক্রমে মাজারটি জমজমাট, লোকারণ্য হতে থাকে এবং নিত্য আয় রোজগারের এক নির্ভেজাল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।এ কথা সত্য যে, পীর-ফকির, আউল-বাউল, বারো আউলিয়ার দেশ এই বাংলাদেশ। স্মরণাতীত কাল থেকে এখানকার মাটি পীর-পয়গম্বরদের পদধূলিতে পবিত্র হয়েছে। বাংলার ৬০ জন দরবেশ ও আউলিয়ার নাম সর্বজন স্বীকৃত। ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্ম প্রচারের মানসে তারা অপরিমেয় ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করেছিলেন। পূর্ববঙ্গের নানা স্থানে এদের রয়েছে যুদ্ধবিগ্রহের বিচিত্র  গৌরবগাথা তথা কিংবদন্তি। সিলেটের হজরত শাহজালাল (রা.) ছিলেন এদের অন্যতম প্রধান।২.এদেশে মাজারের সংখ্যা কত? এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। কোনগুলো মাজার আবার কোনটা মাজার নয় এ নিয়েও মতবিরোধ আছে, বিতর্ক আছে। কৃত্রিমভাবে   চোখের সামনে রাতারাতি গড়ে উঠা সব মাজারকে মাজার বলা যায় না।তবুও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে দেশে ২০ হাজার ৭০টি মাজার রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় ১,৫৮৮টি এবং চট্টগ্রামে ২,৫৭৭টি। সবচেয়ে বেশি মাজার চট্টগ্রামে। তবে বড় প্রসিদ্ধ মাজারের সংখ্যা বলা হয়েছে ৯৫০টি। মোটামুটি দেশের ৬৪ জেলাতেই মাজার আছে। নেই কেবল পার্বত্য বান্দরবান এবং রাঙামাটিতে। দেশব্যাপী দিন দিন মাজারের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যাথা নেই। সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আর্থিক লেনদেনের হেরফের নিয়ে। সারাদেশের কয়টা মাজার সরকারি নীতিমালার আওতায় বা ওয়াকফ আইনের ভেতরে পরিচালিত হচ্ছে তার সুস্পষ্ট তথ্য উপাত্ত নেই। যতদুর জানা যায়, বহুল আলোচিত মাজারগুলো যেমন, বাগেরহাটের খান জাহান আলী (রা.) এর মাজার, রাজশাহীর শাহ মখদুম (র.) মাজার, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী, খরমপুরের গেছু দরাজের মাজার ইত্যাদি। এর বাইরে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দান বাক্সসহ কতিপয় মাজার শরীফের ওপর জেলা প্রশাসন বা সরকারি নজরদারি রয়েছে। কিন্তু দেশের বিপুল সংখ্যক মাজার আর্থিক হিসাব নিকাশের বাইরে আছে। মাজারের আয়-ব্যয়, দান-খয়রাত নিয়ে স্থানীয় জনগণ নানা দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলার ঘাঁটিতে পরিণত হয়ে আছে। বলা যায়, যুগযুগ ধরে ধারাবাহিকভাবে বা পরম্পরায় একই গোষ্ঠী বা বংশের হাতে দানের অর্থ আদায়ের এখতিয়ার নিয়ে সামাজিক দ্বন্দ্বের শেষ নেই। বর্তমানে সারাদেশে শতাধিক মাজারের কার্যক্রমের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলেও জানা যায়।৩.দেশের ছোট বড় মাজারগুলোর ওপর দখল ও আধিপত্য নিয়ে রীতিমতো দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার চলছে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসীন হয়, সঙ্গে সঙ্গে সে দলের স্থানীয় পদধারীরা এর কর্মকর্তা বনে যায়। তখন চর দখলের মত সবকিছুর হাত বদল হয়ে যায়। আজকাল গ্রামীণ জনপদে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটি যেমন পরিবর্তন হয়ে যায় তেমনি মাজারও এর বাইরে থাকছে না। আয়ের কথা বা আর্থিক লেনদেন বিবেচনায় আনা হলে স্কুল বা কলেজের চেয়ে এসব মাজারের হিসাব নিকাশে ঝুঁকি নেই বললেই চলে। ধরা যাক  গ্রামের মাজারগুলোতে কমিটি কর্তৃক একটা ছোট্ট পাঞ্জাখানা মসজিদ, সঙ্গে একটা অজুখানা তৈরি করে দিয়ে বছর তিনেক সাচ্ছন্দ্যে চলা যায়। সাথে দুয়েকজনকে রেখে ভাগাভাগি করে দিব্যি কয়েকবছর পার করা যায়। এতে কারও কিচ্ছু বলার নেই, কমিটি উন্নয়ন কাজ করে চলেছে। এতে স্কুল কলেজের মতন বিল ভাউচার দাখিল করে পাশ করার ঝামেলা থাকে না। সারাদিন ধরে মানতকারী বিশ্বাসীদের কাছ থেকে যা পাওয়া গেল তাই লাভ। দেখা যায়, একজন মানতকারী ব্যক্তি গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁসমুরগি যা-ই কিছু মানত করলেন এটা নিমিষেই উধাও। আবার মাজারের মুখচেনা দালালরা বছরের পর বছর  এগুলো কম দামে ক্রয় কওে বেশি দামে বিক্রি করে চলেছে।এসময়ে যে কোনো একটা মাজার কমিটির সভাপতি হওয়া মানে খুবই লোভনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কাজেই এদেশে যদি দুই হাজার মাজার থাকে তাহলে অন্তত দুই হাজার ব্যক্তিকেও একটা করে পদ দেয়া যায়। এবং তা নিয়ে সে সুখে শান্তিতে দিনযাপন করতে পারে।৪.আরেকটা বিষয় হলো, দেশের প্রতিটা মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছে ছোটখাটো একেকটা বাজার। সঙ্গে মুদির দোকান এবং একাধিক চা স্টল। মোমবাতি, চুন, পান, বিড়ি সিগারেট, মধ্যরাত অবধি আড্ডা। যদিও মাজারে মানতকারীরা অতি সাধারণ, তারা সবাই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নয়। কিন্তু ধর্মকর্ম, বিশ্বাস বা সংস্কার কুসংস্কারে পুরোপুরি আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তারা যেখানে নিজের সন্তানের জন্যে নুন্যতম আমিষ বা প্রোটিনের যোগান দিতে পারে না, সেখানে মানত করা ঘরের বড় মোরগটা সযত্নে নিয়ে যায় বাবার মাজারে। মোরগটা কিন্তু দিয়ে আসে মাজারের জনৈক সিন্ডিকেট সদস্যের হাতে। আর ফিরে আসার পূর্বে সে অবনতমস্তকে এবং  কায়মনোবাক্যে অশ্রুসজল হয়ে বলে আসে, তার সন্তানটি যেন পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে বা চাকরির পরীক্ষায় পাশ করে যায়  ইত্যাদি। কী বিচিত্র এই দৃশ্য।সময় এসেছে গ্রামীণ জনপদেও শতশত মাজারকে অবিলম্বে সরকারের তত্ত্বাবধানে এনে এর আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায়  পরিচালনার পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এতে জনমনে জমে থাকা দীর্ঘ  অসন্তোষ ও সংশয় যেমন দূরীভূত হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতিরও সবিশেষ উন্নতি হবে। বলাবাহুল্য, মাজারগুলোর বেশির ভাগই সরকারের ওয়াকফ এস্টেটের অধীনে পরিচালিত হওয়ার কথা। এগুলো ধর্ম মন্ত্রনালয়ের রুটিন  কাজের মধ্যে পড়ে। তারা মতোয়ালি নিয়োগ দিয়ে তা করতে পারে, আবার ক্ষেত্র বিশেষে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাৎসরিক খোলা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পরিচালনা করতে পারে। এতে করে সরকারের রাজস্ব যেমন বৃদ্ধি পাবে একইসঙ্গে মাজারে মানতকারীরাও অধিকতর আস্থাশীল হবে। বর্তমান সরকারকে বিষয়টি নিয়ে এখনই ভাবতে হবে, প্রয়োজনে জাতীয় সংসদে এতদসংক্রান্ত আইন পাশ করিয়ে এর ভবিষ্যতকে জনগণ বান্ধব করতে হবে। মাজারের সার্বিক পবিত্রতাও রক্ষা করতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার]

মেধা হারানোর নীরব মহামারি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংকট

বাংলাদেশ আজ এক গভীর ও নীরব সংকটের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, যা চোখে সরাসরি দেখা না গেলেও রাষ্ট্রের উন্নয়ন কাঠামোর ভেতরে ধীরে ধীরে ফাটল তৈরি করছে। উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ ও সম্ভাবনাময় তরুণদের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গঠনের সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ ক্ষয়, যা কৃষি, গবেষণা, প্রশাসন, নীতি- নির্ধারণ এবং সামগ্রিক উন্নয়ন সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। নীরব মেধা ক্ষয়ের বাস্তবতা: দেশে প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। কৃষি, প্রকৌশল, চিকিৎসা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উন্নয়ন অধ্যয়নসহ নানা ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই অর্জন যতটা না আশাব্যঞ্জক, তার চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক হলো বাস্তবতার চিত্র। এই মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ মনে করছে না। ফলে ধীরে ধীরে একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে, শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণদের বিদেশে পাড়ি জমানো। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার ফল। কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, গবেষণার দুর্বল পরিবেশ, পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং স্বীকৃতির অভাব এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তার চাপ: দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে উচ্চ। লাখ লাখ তরুণ ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের উপযুক্ত কাজের সুযোগ সীমিত। অনেকেই নিজের যোগ্যতার সঙ্গে মিল রেখে চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে তরুণদের মধ্যে একটি গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। শুধু তরুণদের মধ্যেই নয়, বাংলাদেশের সমাজে সব বয়সের মানুষের মধ্যেই এক ধরনের গভীর হতাশা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কর্মজীবী, মধ্যবয়সী এবং বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত, মেধাবী ও পিএইচডি-ধারী পেশাজীবীরাও আজ গভীর অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ অধ্যয়ন, গবেষণা ও দক্ষতা অর্জনের পরও অনেকেই দেশে কাক্সিক্ষত মর্যাদা, স্থিতিশীলতা ও পেশাগত নিরাপত্তা পাচ্ছেন না। প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী কাজ, সীমিত গবেষণা সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ার অনুভূতি ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ফলে ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি কমে যাচ্ছে এবং পেশাগত জীবনে এক ধরনের স্থায়ী চাপ তৈরি হচ্ছে, যা মেধাবী মানবসম্পদ ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অনিশ্চয়তা তাদের মনে বারবার প্রশ্ন জাগায়, এই দেশে থেকে ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনেকে উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন, যেখানে কর্মসংস্থান, গবেষণা এবং জীবনমান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। মর্যাদা ও স্বীকৃতির ঘাটতি: বিদেশমুখিতার প্রধান কারণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মর্যাদা ও স্বীকৃতির সংকট। অনেক তরুণ পেশাজীবী ও গবেষক মনে করেন, দেশে তাদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব, ধীর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কখনো কখনো অদৃশ্য চাপ তাদের কাজের পরিবেশকে সীমিত করে তোলে। যোগ্যতার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রভাব বা আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, এই ধারণা সববয়সীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। ফলে তারা এমন পরিবেশ খোঁজে, যেখানে পরিশ্রম ও মেধার সরাসরি প্রতিদান পাওয়া যায়। কৃষি খাতে ক্রমবর্ধমান হতাশা: বাংলাদেশের কৃষি খাত দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলেও এখানে দক্ষ মানবসম্পদের জন্য কাক্সিক্ষত পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর অনেক গ্র্যাজুয়েট বের হলেও বাস্তবমুখী ইন্টার্নশিপ, গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে ডিগ্রি শেষের আগেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং তারা বিদেশমুখী হয়ে পড়ে। দেশে তাৎক্ষণিক ক্যারিয়ার, গবেষণা সুযোগ ও মর্যাদার অভাব এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তুলছে। অনেক তরুণ কৃষিবিদ মনে করেন, দেশে গবেষণার চেয়ে প্রশাসনিক জটিলতা বেশি প্রাধান্য পায়। নতুন ধারণা বাস্তবায়ন করতে গেলে ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সীমিত গবেষণা তহবিল এবং নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়। আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রকল্পের অভাবও একটি বড় বাধা। ফলে যারা উচ্চশিক্ষা বা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যান, তাদের একটি বড় অংশ আর ফিরে আসেন না। এতে কৃষি খাতে উদ্ভাবন ও আধুনিকায়নের গতি ক্রমশ কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। উন্নয়ন খাত ও রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা: শুধু কৃষি নয়, উন্নয়ন খাতেও একই ধরনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দক্ষ পেশাজীবীরা কাজ করলেও তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন বিদেশে স্থায়ী হওয়ার পথে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, উন্নয়ন খাতের পেশাজীবীদের মধ্যেবিদেশমুখিতা প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যম স্তরের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। এর প্রধান কারণ হলো চাকরির অনিশ্চয়তা, প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী নিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার নিরাপত্তার অভাব। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেখানে স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ, গবেষণা সহায়তা এবং উন্নত সুবিধা প্রদান করে, সেখানে দেশে অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত মনে করেন এবং বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হন। এই পুরো প্রক্রিয়া কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতার স্পষ্ট প্রতিফলন। বাংলাদেশের গবেষণা ও উন্নয়নে জিডিপির মাত্র প্রায় ০.৩% ব্যয় হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক অবকাঠামো ও ল্যাব সুবিধার ঘাটতি রয়েছে, পাশাপাশি মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব ও ধারাবাহিক পরিকল্পনার ঘাটতি, যা মেধা ধরে রাখার পরিবর্তে পরোক্ষভাবে দেশত্যাগকে উৎসাহিত করছে। অদৃশ্য প্রেরণার চাপ ‘সাইলেন্ট পুশ’: বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি উদ্বেগজনক চিত্রও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নতুন সরকার আসলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনও অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতার যথাযথ প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়। প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে অভিজ্ঞতা ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের ঘাটতির অভিযোগও শোনা যায়, যা নীতি বাস্তবায়নকে ধীর করে দিচ্ছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। উচ্চশিক্ষার নামে সন্তানদের বিদেশে পাঠানো এখন অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ ভবিষ্যৎ ও সম্ভাব্য স্থায়ী বসবাস এর সুযোগ পাওয়ার কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে, যা সামাজিক বাস্তবতায় নতুন চাপ তৈরি করছে। সংস্কারের প্রয়োজন: এই সংকট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন অবশ্যই সম্ভব। প্রথমত, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কৃষি, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং খাদ্যব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। তরুণদের মধ্যে এই আস্থা তৈরি করতে হবে যে দক্ষতা ও পরিশ্রমের মূল্য দেশে নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, বিদেশফেরত গবেষক ও পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ অনুদান, গবেষণা তহবিল এবং ক্যারিয়ার সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’ নীতির মাধ্যমে সফল হয়েছে। চতুর্থত, উন্নয়ন ও গবেষণা খাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী চাকরির পরিবর্তে স্থিতিশীল পেশাগত কাঠামো তৈরি করা জরুরি। ভবিষ্যতের জন্য বড় প্রশ্ন: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু সেই জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে দক্ষ অংশ যদি একে একে দেশ ছাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের উন্নয়ন কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে। উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; এটি জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। সেতু, রেল বা প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক না কেন, মেধা ছাড়া কোনো জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কি আমাদের সেরা মেধাগুলোকে ধরে রাখতে পারব, নাকি তারা অন্য দেশের উন্নয়নের ভিত্তি হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলা, উন্নয়নের গতি এবং জাতীয় সক্ষমতার প্রকৃত শক্তি।  [লেখক: রিসার্চ কোঅর্ডিনেটর, ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি; সহকারী অধ্যাপক, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি]

ওজনে প্রতারণা: প্রতিকার কী?

একসময় ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষেত্রে দাঁড়িপাল্লা অপরিহার্য ছিল। দাঁড়িপাল্লার ঐতিহ্যবাহী যুগ থেকে ডিজিটাল স্কেলের যুগে রূপান্তর পরিমাপের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। যেখানে পুরনো দিনে সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পণ্যদ্রব্যের ওজন পরিমাপের জন্য বাটখারা ও কাঁটার ওপর নির্ভরশীল দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করা হতো, সেখানে এখন নিখুঁত ও দ্রুত ফলাফল প্রদান করে এমন ডিজিটাল সেন্সরযুক্ত স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও দাঁড়িপাল্লা একসময় নির্ভরযোগ্যতা এবং নিরপেক্ষতার প্রতীক ছিল, তবে আধুনিক যুগের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ওজন পরিমাপের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা এবং গতির কারণে ডিজিটাল স্কেল এখন অপরিহার্য। অনেক সময় ওজনে কারচুপি করার জন্য ডিজিটাল স্কেলের নিচের অংশে শক্তিশালী চুম্বক লুকিয়ে রাখা হয়। লোহার তৈরি পণ্য ওজন করার সময় চুম্বকের আকর্ষণে ওজন বেশি দেখায়। ডিজিটাল স্কেলের প্লেটের নিচে অদৃশ্য সুতা বা স্প্রিং বেঁধে নিচের দিকে টেনেও পণ্যদ্রব্যের ওজন বাড়ানো হয়। ডিজিটাল স্কেলের ওজন সেটআপ করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ওজন দিয়ে ক্যালিব্রেশন করা হয়, যেমন; ৯০০ গ্রামের একটি বাটখারাকে সফটওয়্যারে ১ কেজি হিসেবে সেট করা হয়। এর ফলে স্কেলটি সবসময় প্রতি কেজিতে ১০০ গ্রাম কম ওজন দেবে। বাতাস ও ফ্যানের বাতাস ব্যবহার করেও ডিজিটাল স্কেলের ওজনে কারচুপি করা হয়। পরিমাপের সময় ডিজিটাল স্কেলের ওপর বা পাশ থেকে তীব্র বাতাস বা ফ্যানের বাতাস দেয়া হয়। বাতাসের চাপের কারণে স্কেলের রিডিংয়ে ওজন বেশি প্রদর্শন করে। ডিজিটাল স্কেলে চার্জ কম থাকলে বা ত্রুটিপূর্ণ ব্যাটারি ব্যবহার করা হলে অথবা অনেক সময় ডিজিটাল স্কেলের ব্যাটারির ভোল্টেজ কমে গেলে রিডিং ভুল দেখায়। অসাধু বিক্রেতারা ইচ্ছাকৃতভাবে কম চার্জে ডিজিটাল স্কেল চালিয়ে ক্রেতাকে ঠকায়। অনেক সময় অসাধু বিক্রেতারা ডিজিটাল স্কেলের সামনের স্ক্রিন নষ্ট করে রাখে তখন ক্রেতারা চাইলেও স্কেলের রিডিং দেখতে পারে না। অনেক সময় অসাধু বিক্রেতারা এমন স্থানে ডিজিটাল স্কেল রাখে যেখান থেকে ক্রেতাদের ডিজিটাল স্কেলের রিডিং দেখা সম্ভব হয় না। অসাধু ব্যবসায়ীরা ডিজিটাল স্কেলের কারসাজির মাধ্যমে ওজনে কম দিয়ে সাধারণ জনতাকে প্রতিনিয়ত ঠকাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির আড়ালে ক্যালিব্রেশন পরিবর্তন, রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার বা চতুর কৌশলে ওজন পরিমাপে কম দেয়ার এই প্রতারণা রুখতে সঠিক পরিমাপ ও কারচুপির উপায়গুলো জানা অত্যন্ত জরুরি। অসাধু বিক্রেতাদের ডিজিটাল স্কেলের ওজনে কারচুপি মাধ্যমে ঠকতে না চাইলে পণ্যদ্রব্য ক্রয় করার সময় কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে। ডিজিটাল স্কেলের প্রতারণা বা ওজনে কারচুপি থেকে বাঁচতে পণ্য পরিমাপের সময় সোজাসুজি ডিজিটাল স্কেলের ডিসপ্লের দিকে তাকাতে হবে, পণ্য ওজন করার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে, ডিজিটাল স্কেলের রিডিং ‘০.০০’ দেখাচ্ছে কিনা। কোনো পাত্রে পণ্য মাপার সময় পাত্রের ওজন বাদ দেয়ার জন্য 'ঞধৎব' বা 'তবৎড়' বোতাম চেপে স্কেল শূন্য করা হয়েছে কিনা তা দেখতে হবে। বাজারের ব্যাগে একটি আদর্শ ও প্রমাণিত ওজনের বস্তু (যেমন: ৫০০ গ্রাম বা ১ কেজি ওজনের নির্দিষ্ট পাথর বা প্যাকেটজাত পণ্য) রাখা যেতে পারে। প্রয়োজনে সন্দেহ হলে তা দিয়ে ডিজিটাল স্কেলটি পরীক্ষা করে নেয়া যাবে। অনেক সময় ডিজিটাল স্কেলে আগে থেকেই ১০০-১৫০ গ্রাম ওজন বাড়িয়ে বা কমিয়ে সেট করা থাকতে পারে। এটি ধরার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সবসময় নিজের পকেটে থাকা স্মার্টফোনটির ওজন আগে থেকে জেনে রাখা এবং প্রয়োজনে তা মেশিনে মেপে দেখা যেতে পারে। পণ্যদ্রব্য পরিমাপের সময় মেশিনটি যেন কাঠের বা পাথরের সমতল ও শক্ত জায়গায় থাকে তা খেয়াল রাখতে হবে। বাঁকা বা নড়বড়ে জায়গায় ডিজিটাল স্কেল বসালে সঠিক ওজন আসে না। মাছ, মাংস বা সবজির ক্ষেত্রে ওজন করার সময় বিক্রেতা যেন তার হাত দিয়ে মেশিন বা বস্তুর ওপর চাপ না দেয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পণ্য কেটে-কুটে পরিষ্কার করার আগে ওজন মেপে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ। পরিমাপে কারচুপি হচ্ছে মনে হলে আশপাশের অন্য কোনো দোকানে বা যাচাই করার জন্য আলাদা ডিজিটাল স্কেলে পণ্যের ওজন পুনরায় মেপে নেয়া যেতে পারে। যে দোকানে বিক্রেতার ডিজিটাল স্কেলের মনিটর নষ্ট বা চার্জ নেই সেই দোকান থেকে পণ্যদ্রব্য না কেনাই ভালো। পণ্যদ্রব্য ক্রয় করার সময় যদি দেখা যায় যে, বিক্রেতার ডিজিটাল স্কেলের মনিটর অন্য দিকে ফেরানো তাহলে বিক্রেতাকে ডিজিটাল স্কেলের মনিটর ক্রেতার দিকে ফেরাতে বলতে হবে। পণ্যদ্রব্য পরিমাপের সময় ডিজিটাল স্কেলের চারপাশ পরিষ্কার আছে কিনা এবং নিচে কোনো অতিরিক্ত তার বা সুতা ঝুলছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। বিক্রেতার ব্যবহৃত ডিজিটাল স্কেলে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন-এর সিল বা ভেরিফিকেশন স্টিকার লাগানো আছে কিনা তা পরিমাপের সময় পরীক্ষা করে দেখতে হবে। ডিজিটাল স্কেলে কারসাজি করে ওজনে কম দেয়া হলে তা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ডিজিটাল স্কেল বা ওজনে কারচুপি ও এর মাধ্যমে প্রতারণার বিষয়টি মূলত বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন-এর আইন এবং সাধারণ দন্ডবিধির আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ওজন ও পরিমাপ মানদন্ড আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, বাটখারা বা ওজন পরিমাপের যন্ত্রে (যেমন: ডিজিটাল স্কেল) কারচুপি, সিল টেম্পারিং বা ডিজিটাল প্রোগ্রামে পরিবর্তন এনে ওজনে কম দেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রথম বার অপরাধের জন্য শাস্তি ১ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হতে পারে। দ্বিতীয় বা পরবর্তী অপরাধের জন্য শাস্তি সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড, ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডি করা হতে পারে। ডিজিটাল স্কেলে ডিজিটাল ডিভাইস বা প্রোগ্রামিং ব্যবহার করে প্রতারণার আশ্রয় নিলে তা সাইবার আইনের আওতাভুক্ত অপরাধ হতে পারে। ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার করে প্রতারণা করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। ১৮৬০ সালের পেনাল কোডের ৪২০ ধারা অনুযায়ী, প্রতারণার মাধ্যমে কারও থেকে অর্থ বা সম্পত্তি আত্মসাৎ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ওজনে কম দিয়ে পণ্যের বেশি দাম নেয়া এই ধারার অধীনে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ৪৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো বিক্রেতা প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনে পণ্য সরবরাহ করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এতে জেল, জরিমানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার বিধান রয়েছে এবং আরোপকৃত জরিমানার ২৫% তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগকারী ভুক্তভোগীকে প্রদান করা হয়ে থাকে। পণ্যদ্রব্য ক্রয়ের সময় বিক্রেতা কর্তৃক ওজনে কম দেওয়া বা ডিজিটাল স্কেলে পণ্যদ্রব্য পরিমাপের ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রমাণ (যেমন- পণ্যের ওজনসহ ছবি, ভিডিও, রসিদ) সংরক্ষণ করতে হবে। ওজন বা পরিমাপের প্রতারণা থেকে প্রতিকার পেতে সরাসরি বিএসটিআই-এর জেলা কার্যালয়ে অথবা বিএসটিআই-এর হটলাইন নম্বর ১৬১১৯ এ যোগাযোগ করে অভিযোগ দাখিল করা যেতে পারে। এছাড়া সরাসরি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এর জেলা কার্যালয়ে বা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এর হটলাইন নম্বর ১৬১২১ এ যোগাযোগ করে অথবা এই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে অভিযোগ দাখিল করা যেতে পারে[লেখক: উপপরিচালক, মানিলন্ডারিং শাখা, দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রধান কার্যালয়, ঢাকা]

কুকুরের কান্না, মানুষের নীরবতা

অতি সম্প্রতি নরসিংদীর নাগরিয়াকান্দি সেতু থেকে একটি জীবন্ত কুকুরের গলায় ইট বেঁধে মেঘনায় ফেলে দেয়ার ভিডিও দেখে স্তব্ধ হয়নি কে? নদীতে ফেলে দেয়ার পরও অসহায় প্রাণীটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্যাতনকারীদের দিকেই তাকিয়ে ছিল। সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ছাগল কামড়ানোর ‘অপরাধে’ প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ২টি কুকুরকে হত্যা এবং একটি কুকুরকে জখম করার ঘটনাও জুন ‘২৬ মাসে ঘটে। প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ এর ৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো পশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, আঘাত বা হত্যা করলে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। অথচ অস্ট্রেলিয়ার আদালত সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রাণিবিদ অ্যাডাম ব্রিটনকে ৬০টির বেশি কুকুরের ওপর পাশবিক নির্যাতনের দায়ে ২৪৯ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। বাংলাদেশে শাস্তিটা কেন তত ভারী নয়? অপরাধ একই, অথচ আইনের দাঁত-নখের ফারাক এত বেশি। পশু-পাখির ভোট নেই, বাকশক্তি নেই। তাই তাদের পক্ষে সংসদে বিল ওঠে না, রাজপথে মিছিল হয় না। তাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে কিছু মানুষের বিবেকের ওপর। কিন্তু সেই বিবেকটাই যদি শিশুকাল থেকে পাথর হয়ে যায়, তাহলে একটি জাতির ভবিষ্যতও পাথর হয়ে যায়। কারণ যে শিশু আজ অবলার যন্ত্রণা দেখে আনন্দ পায়, সে কাল মানুষের যন্ত্রণায় উদাসীন হবে। এখন অনেক শিশু-কিশোর বন্যার পানিতে আটকা ইঁদুর, বেজি, শিয়ালকে পিটিয়ে মারাকে ‘খেলা’ বানিয়েছে। রাস্তার কুকুর দেখলেই ইট ছোড়ে, লাথি মারে। অথচ প্রাণিবিদ্যা বলে, কোনো পশুই অকারণে আক্রমণ করে না। আমরা ভয় দেখিয়ে, কষ্ট দিয়ে তাদের আক্রমণাত্মক বানিয়ে দিই। তারপর সেই দাঁত-নখের দোষও তাদের ঘাড়েই চাপাই। এই নিষ্ঠুরতার উল্টো পিঠে আছে এক গভীর বন্ধন। কুকুর হলো পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভুভক্ত প্রাণী। সে মনিবের জন্য জীবন দিতে পারে। পরিবারকে চোর-ডাকাত থেকে আগলে রাখে, বিপদে ঘেউ ঘেউ করে সতর্ক করে। মনিব অসুস্থ হলে পাশে বসে থাকে, মনিব মারা গেলে কবরের পাশ ছাড়ে না। এই কারণেই পৃথিবীর বহু দেশে কুকুর শুধু ‘পোষা প্রাণী’ নয়, পরিবারের সদস্যও। বিদেশে শিশু লালন-পালনে কুকুরের ভূমিকা চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানে শিশুর জন্মের পর থেকেই বাড়িতে কুকুর রাখা হয়। গবেষণা বলে, কুকুরের সঙ্গে বড় হওয়া শিশুরা কম অ্যালার্জিতে ভোগে, তাদের ইমিউনিটি ভালো হয়। মানসিকভাবেও তারা বেশি সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। কারণ একটি অবলা প্রাণীর খাবার দেয়া, গোসল করানো, হাঁটানো এসবের মধ্য দিয়েই শিশু প্রথমবারের মতো ‘যত্ন’ শব্দটা শেখে। কুকুর তাই শিশুর কাছে খেলার সাথীও, আবার প্রথম শিক্ষকও। কুরআনে পাঁচ বার কুকুরের কথা এসেছে, কোথাও কুকুরকে অপবিত্র বা মন্দ বলা হয়নি। সহিহ হাদিসে কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক পাপী নারীর অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার কথা আছে। বিস্ময়ে হতবাক হতে হয় যখন রাস্তার ফকির তার ভিক্ষার খাবার কুকুরকে ভাগ করে দেয়। কিন্তু আমরা আতরমাখা ভদ্রলোকেরা কী করছি? আল্লাহর সৃষ্টি কুকুর দেখলেই আঘাত করছি, গরম পানি গায়ে ঢেলে দিচ্ছি, ‘নাপাক’ বলে ঘৃণা করছি। কুরআন নয়, হাদিস বলছে কুকুরের লালা নাপাক। কিন্তু মানুষের লালাও নাপাক, জীবানুতে ভর্তি। লালা জামায় লাগবে এই ভয়ে কুকুর দেখলে যমের মতো ভয় করি, কিন্তু ঘুষখোর, সুদখোর, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, খুনি, মিথ্যুক ‘নাপাক’ নয় কেন? কুকুর ঘুষ খায় না, সুদ খায় না, বিশ্বাসঘাতকতা করে না- তারপরও সে নাপাক। দেশের প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ অনুযায়ী পাগলা কুকুর মারতেও অনুমতি লাগে। শুধু তাই নয়, মোরগ-মুরগিকে পা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখাও ফেরিওয়ালার শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সমাজে এই সব অপরাধের গুরুত্ব নেই। গুরুত্ব থাকার কথা নয়, কারণ যেখানে শত শত মানুষের সামনে গলায় ছুরি ধরলেও কেউ এগিয়ে আসে না, সেখানে অবলা প্রাণীদের রক্ষা করার গরজ থাকবে কেন। এই নির্লিপ্ততার বীজ বপন হয়েছে অনেক আগে থেকেই। কোরবানির সময় জবাইয়ের রক্তাক্ত দৃশ্য শিশুরা উপভোগ করে। সেই শিশুই বড় হয়ে গুলশান হোলি আর্টিজানের মতো জায়গায় মানুষকে টুকরো টুকরো করে। যখন একটি অসহায়, অবলা কুকুরের গলায় ইট বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়াকে শিশুরা ‘মজা’ ভাবে, যখন সে রক্ত দেখে উল্লাস করে, তখন তার ভেতরের মায়াটাই মরে যায়। চেঙ্গিস-হালাকুর যুগ শেষ হয়নি, শুধু পোশাক বদলেছে। আমরা প্রায়ই বলি, ‘এটা তো একটা কুকুরই’। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, যারা প্রথমে কুকুরের ওপর হাত তুলেছে, তারাই পরে মানুষের ওপরও তুলেছে। জার্মানিতে নাৎসিরা প্রথমে পাগলা কুকুর নিধনের নামে বিষ ছড়িয়েছিল, তারপর গ্যাস চেম্বার বানিয়েছিল মানুষ মারার জন্য। পশুর প্রতি দয়া তাই বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের নিজের নিরাপত্তার বীমা। যে সমাজ অবলার আর্তনাদকে উপেক্ষা করতে শেখে, সে সমাজ একদিন নিজের সন্তানের আর্তনাদও শুনতে পায় না। নরসিংদীর কুকুরের গলার ইট আসলে আমাদের সমাজের পচনের প্রতীক। একটি সভ্য সমাজকে মাপা হয় সে তার দুর্বলতম সদস্যের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তা দিয়ে। কুকুরের ওপর নিষ্ঠুরতা তাই শুধু পশুর সমস্যা নয়, এটি মানুষের ভেতরের মানুষটাকে মেরে ফেলার শুরু। একটা কুকুরের গলায় বাঁধা ইট আসলে আমাদের বিবেকের গলায় বাঁধা পাথর। অথচ এই প্রাণীটিই মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বন্ধু। ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ খুঁজে বের করে রেসকিউ কুকুর। তুষারধসে হারিয়ে যাওয়া পথিকের প্রাণ বাঁচায় সেন্ট বার্নার্ড জাতের কুকুর। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় সামরিক কুকুর। অন্ধ মানুষের চোখ হয়ে সারাজীবন পথ দেখায় গাইড ডগ। করোনার সময় হাসপাতালে রোগীর পাশে সেবাদানকারী থেরাপি ডগ মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। আর পুলিশ-বিজিবির ডগ স্কোয়াড মাদক আর বিস্ফোরক শনাক্ত করে হাজারো প্রাণ বাঁচায়। এত নিঃস্বার্থ সেবার পরও আমরা তাকে ‘নাপাক’ বলে দূরে সরাই, নির্যাতন করে সুখ পাই, গাড়ি চাপা দিয়ে আনন্দ করি।আমরা যদি আজ অবলার চোখের ভাষা বুঝতে না শিখি, কাল মানুষের চোখের জলও আমাদের স্পর্শ করবে না। সভ্যতা মানে উঁচু বিল্ডিং নয়, সভ্যতা মানে দুর্বলের প্রতি দয়া। যে সমাজ তার সবচেয়ে প্রভুভক্ত বন্ধুকেই নিরাপদে বাঁচতে দিতে পারে না, সে সমাজ তার কোনো সন্তানকেই নিরাপদ রাখতে পারবে না। তাই যে গলায় আমরা ইট বাঁধছি, সেই গলায় বাঁধা চেইনটাই খুলে দিই, যাতে তারা নিশ্চিন্তে মনুষ্য সমাজে নিরাপদে ঘুরতে পারে। স্মতর্ব্য যে, মানুষ যখন তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাথীর চেয়েও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, তখন এই পৃথিবীটা বসবাসের অযোগ্য হয়ে যায়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

এলডিসি-উত্তর বাংলাদেশ: সুবিধা হারানোর আগে সতর্ক প্রস্তুতি

একটি দেশের জন্য স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে আসা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। বাংলাদেশ যখন প্রায় পাঁচ দশকের ‘স্বল্পোন্নত’ পরিচয় ঘুচিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পা রাখতে যাচ্ছে, তখন এই অর্জন আমাদের জাতীয় আত্মবিশ্বাসের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু অর্জনের আনন্দের পাশাপাশি একটি প্রশ্নও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হচ্ছে—এই উত্তরণ কি আমাদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে, নাকি প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে দীর্ঘমেয়াদে নতুন নতুন সংকটের দরজা খুলে দেবে?উত্তরণের দীর্ঘ পথপরিক্রমাজাতিসংঘ ১৯৭১ সালে এলডিসির তালিকা প্রণয়ন করে, এবং বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এই তালিকায় যুক্ত হয়। মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা—এই তিনটি সূচকে ধারাবাহিক অগ্রগতির সুবাদে বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথমবার এবং ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় দ্বিতীয়বার উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করে। মূল পরিকল্পনায় ২০২৪ সালে উত্তরণ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও কোভিড-১৯ মহামারির প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত প্রস্তুতির সময় বিবেচনায় নিয়ে সেই সময়সীমা পিছিয়ে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়।সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত: প্রস্তুতিকাল কি আরও বাড়ছে?২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৬ সালেই উত্তরণ সম্পন্ন করার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করে সরকার জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠায়। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) গত ২ জুন ২০২৬ এই আবেদন ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করেছে, যার ফলে উত্তরণের প্রস্তুতি পর্ব ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সিডিপি স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই বর্ধিত সময়ে বাংলাদেশকে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে উল্লেখযোগ্য অভ্যন্তরীণ সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে— অর্থাৎ সময় বাড়লেও সংস্কারের দায়বদ্ধতা থেকে কোনো অবকাশ মিলছে না।উল্লেখ্য, সিডিপির মূল্যায়নে বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই নির্ধারিত মানদণ্ডের তুলনায় যথেষ্ট ভালো অবস্থানে রয়েছে—মাথাপিছু আয়ে নির্ধারিত মানদণ্ড ১,২৪২ মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের অর্জন প্রায় ২,৭৯৩ ডলার; মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ পয়েন্টের মানদণ্ডের বিপরীতে অর্জন ৭৭ দশমিক ৩ পয়েন্ট; এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে ৩২ পয়েন্টের সীমার নিচে থাকার শর্তে বাংলাদেশের অবস্থান ২৬ দশমিক ৬ পয়েন্ট। অর্থাৎ, বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই; প্রশ্নটি কেবল সময়সীমা ও প্রস্তুতির পরিমিতি নিয়ে।প্রাপ্তি ও সম্ভাবনার দিকউত্তরণ একটি মর্যাদার প্রশ্নও। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বাড়বে, যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থনৈতিক সক্ষমতার এই স্বীকৃতি ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি ঋণ নেয়ার সুযোগও তৈরি করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাগুলো তখনই বাস্তব ফল দেবে, যখন আমরা ঋণ ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে যথেষ্ট দায়িত্বশীল থাকতে পারবো; অন্যথায় সহজে ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়তি ঋণভারে রূপ নিতে পারে।ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের জায়গাগুলোএলডিসি মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত বহু বাণিজ্য সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে আসবে উত্তরণের পর। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার—দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৪৮ শতাংশ পণ্য ইইউতে যায়, এবং এলডিসি সুবিধার কারণে এর প্রায় ৯৩ শতাংশই বিনা শুল্কে প্রবেশ করে। গ্রাজুয়েশনের পর এই শুল্কমুক্ত সুবিধা ধাপে ধাপে কমে আসবে; রূপান্তরকালীন তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর শুল্কহার সাধারণ আমদানিকারক দেশগুলোর নীতি অনুযায়ী বাড়তে পারে। স্বস্তির খবর হলো, বিশ্লেষকদের মতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বাজারগুলো উত্তরণের পরও প্রায় তিন বছর অতিরিক্ত অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এই বাড়তি সময়ও স্থায়ী সমাধান নয়—একদিন এই সুবিধাও শেষ হবে, এবং তখন রপ্তানি খাত, বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পকে দামভিত্তিক প্রতিযোগিতার বদলে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতাভিত্তিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে।এর বাইরেও কঠিন শর্তের বাণিজ্য আলোচনার চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে একটি শুল্কহার ৩৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হলেও, এর বিনিময়ে নানা কঠিন শর্ত মেনে নিতে হয়েছে—যা ভবিষ্যতের বাণিজ্য আলোচনায় বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পাশাপাশি, এলডিসি মর্যাদা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ শিল্পে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত যে ছাড় (ট্রিপস ওয়েভার) এতদিন পাওয়া যেত, তা-ও সীমিত হয়ে আসবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মূল্যে এবং সাধারণ মানুষের ওষুধ প্রাপ্তির সুযোগে।রাজস্ব খাতেও চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। বর্তমানে জাতীয় রাজস্বের একটি বড় অংশ আমদানি শুল্ক থেকে আসে, এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই শুল্ক-নির্ভরতা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার সুপারিশ এসেছে। এই নির্ভরতা কমানোর অর্থ হলো অভ্যন্তরীণ কর আদায় ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা—যা সহজ কাজ নয়, বিশেষ করে প্রত্যক্ষ কর আদায়ের ভিত্তি এখনো প্রশস্ত না হওয়ায়। একইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও মূলধন পাচার রোধে সুশাসন নিশ্চিত করাও জরুরি, কেননা দুর্বল অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা উত্তরণ-পরবর্তী ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।প্রস্তুতির রূপরেখা: স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজিএই বাস্তবতা মাথায় রেখে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস)’ প্রণয়ন করে, যেখানে পাঁচটি মূল স্তম্ভ—সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ, বাণিজ্য সুবিধা ও রূপান্তরকালীন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জোরদার করা—এর অধীনে ৩০টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র ও ১৫৭টি সময়সীমাবদ্ধ কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও এই এসটিএস কাঠামো বহাল রেখে উত্তরণ ইস্যুতে সক্রিয় হয়; নতুন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির শপথ নেওয়ার পরপরই জানান, উত্তরণের সময়সীমা পেছাতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হবে, এবং সরকার জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর আবেদন জানায়—যুক্তি দেখানো হয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও একের পর এক সংকটে নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতি পর্ব ‘গুরুতরভাবে ব্যাহত’ হয়েছে। জাতিসংঘের সিডিপিও এই এসটিএস প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু একটি ভালো কৌশলপত্র প্রণয়ন বা সরকার পরিবর্তনের পরও তা বহাল রাখাই যথেষ্ট নয়— সরকারি পরিবর্তনের এই ক্রান্তিকালে কর্মসূচিগুলোর ধারাবাহিকতা, সফল বাস্তবায়ন, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।করণীয়: সতর্ক ও সুচিন্তিত পদক্ষেপপ্রথমত, রপ্তানি বহুমুখীকরণে বাস্তব অগ্রগতি জরুরি। একক পণ্য তৈরি পোশাকের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি সম্ভাবনা বিকশিত করতে হবে।দ্বিতীয়ত, রপ্তানি প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এলডিসি-উত্তর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মকানুন মেনে নতুন পথ খুঁজতে হবে। সরাসরি নগদ প্রণোদনার পরিবর্তে প্রযুক্তি তহবিল, উদ্ভাবন তহবিল বা স্টার্টআপ তহবিলের মতো বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব নীতি-আলোচনায় উঠে এসেছে, যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে হবে। আমদানি শুল্কনির্ভর রাজস্ব কমে এলে তার ঘাটতি পোষাতে প্রত্যক্ষ কর আদায় ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও স্বচ্ছ করা ছাড়া বিকল্প নেই।চতুর্থত, দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে রপ্তানি খাত মূল্যভিত্তিক প্রতিযোগিতা থেকে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা-ভিত্তিক প্রতিযোগিতার দিকে অগ্রসর হতে পারে।পঞ্চমত, ওষুধ শিল্পকে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত নতুন বাস্তবতার জন্য আগেভাগে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ ও মূল্য সাধারণ মানুষের সামর্থ্যরে মধ্যে থাকে।ষষ্ঠত, এই পুরো প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। এলডিসি গ্রাজুয়েশন বিষয়ে কাজ করা প্ল্যাটফর্মগুলো সরকারের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পৃক্ততা তৈরি করে উত্তরণ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জনবান্ধব রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষ—তাই নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তাদের কণ্ঠস্বর অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।শেষ কথাবাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের সূচনা বিন্দু। প্রস্তুতির সময় তিন বছর বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সংস্কারের কাজ পিছিয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই—জাতিসংঘ নিজেই এই শর্ত জুড়ে দিয়েছে। সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজ—সবাইকে একই লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে এই উত্তরণ সত্যিকার অর্থেই একটি অগ্রগতির গল্প হয়ে ওঠে, ক্ষতির আখ্যান নয়। সতর্কতা ও সুচিন্তিত পদক্ষেপই হতে পারে আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক বিনির্মাণের মূল চালিকাশক্তি।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: অ্যাডভোকেসি অফিসার, নাগরিক উদ্যোগ]

খেলার মাধ্যমে শেখা: শ্রেণীকক্ষে প্রাণ ফেরানোর কৌশল

বাংলাদেশের গ্রামীণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি সাধারণ দৃশ্যের কথা ভাবুন— শিক্ষক বোর্ডে লিখছেন, শিক্ষার্থীরা নোট তুলছে, আর ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে। পড়ানো হচ্ছে, কিন্তু শেখা হচ্ছে কি? গবেষণা বলছে, শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা যখন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, খেলার ছলে শেখে — তখন তাদের মস্তিষ্কে তথ্য গভীরে গেঁথে যায়। কিন্তু এই ‘খেলার মাধ্যমে শেখা’ মানে ক্লাসে বিশৃঙ্খলা নয়। এর অর্থ হলো— এমন কার্যকলাপ যা শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহল জাগায়, চিন্তাশক্তি বাড়ায় এবং শ্রেণীকক্ষকে একটি প্রাণবন্ত শিক্ষা-পরিবেশে পরিণত করে। বিশেষত গ্রামীণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য— যেখানে প্রযুক্তিগত সুবিধা সীমিত, সেখানে এই কৌশলগুলো কোনো বাড়তি খরচ ছাড়াই প্রয়োগ করা সম্ভব।আসুন, এমন ১০টি কৌশল দেখি যা যেকোনো গ্রামীণ শ্রেণীকক্ষে সহজেই ব্যবহার করা যায়।১. পপকর্ন কৌশল এই কৌশলে শিক্ষার্থীরা যেকোনো মুহূর্তে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উত্তর দিতে পারে— ঠিক যেভাবে তেলের কড়াইতে পপকর্ন হঠাৎ ফুটে ওঠে। শিক্ষক একটি প্রশ্ন করেন, এবং যে কেউ হাত তোলা ছাড়াই উত্তর দিতে পারে। উত্তর দেয়ার পর সে পরবর্তী প্রশ্ন করতে পারে বা অন্যকে নাম ধরে ডেকে সুযোগ দিতে পারে।উদাহরণ: বিজ্ঞান ক্লাসে শিক্ষক বললেন, ‘সালোকসংশ্লেষণে কী কী লাগে— যে জানো বলো!’ রিমা বলল ‘সূর্যের আলো’, তারপর সে বলল ‘করিম, তুমি বলো আরেকটি।’ করিম বললো ‘পানি’, এবং এভাবে পুরো ক্লাস সক্রিয় হয়ে উঠলো। এই পদ্ধতিতে লাজুক শিক্ষার্থীরাও ধীরে ধীরে সাহস পায়।২. স্নোবল আলোচনা প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি কাগজে তার মতামত বা উত্তর লেখে, তারপর সেটা বলের মতো গোল করে ভাঁজ করে ক্লাসে ছুঁড়ে দেয়। প্রত্যেকে একটি কাগজ তুলে পড়ে এবং সেই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। এই পদ্ধতিতে পরিচয় গোপন থাকে বলে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে মতামত লিখতে পারে।উদাহরণ: বাংলা ক্লাসে শিক্ষক প্রশ্ন করলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের ভূমিকা কেমন ছিল বলে তুমি মনে করো?’ শিক্ষার্থীরা লিখে কাগজ ছুঁড়ে দিল। তারপর যে কাগজ পেল সে জোরে পড়ল। অনেক অপ্রত্যাশিত দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এলো — যা সরাসরি প্রশ্ন করলে হয়তো আসত না।৩. ভাবো-জুটি বাঁধো-ভাগ করো তিনটি ধাপে এই কৌশল চলে। প্রথমে শিক্ষার্থী একা ভাবে (৩০ সেকেন্ড), তারপর পাশের সহপাঠীর সঙ্গে আলোচনা করে (১ মিনিট), তারপর পুরো ক্লাসে সেই ধারণা শেয়ার করে। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি শিক্ষার্থী চিন্তা করার সুযোগ পায়, একেবারে চুপ থেকে পার পাওয়ার উপায় থাকে না।উদাহরণ: গণিত ক্লাসে শিক্ষক বললেন, ‘লাভ-ক্ষতির সমস্যাটি নিজে একবার চেষ্টা করো।’ তারপর ‘পাশের জনকে তোমার সমাধান বুঝিয়ে দাও।’ সবশেষে দুটো জুটির সমাধান তুলনা করা হলো। ভুল হলেও শিক্ষার্থী লজ্জা পেল না — কারণ সে শুধু নিজের জুটিকে বলেছিল।৪. গ্যালারি ওয়াক শ্রেণীকক্ষের দেয়ালে বা বেঞ্চে বিভিন্ন পোস্টার বা প্রশ্নকার্ড লাগানো হয়। শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে ঘুরে ঘুরে প্রতিটি কার্ডের কাছে যায়, পড়ে, মতামত যোগ করে এবং পরের দলের জন্য ছেড়ে যায়। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যায়— শুধু কয়েকটি কাগজ ও কলম দরকার।উদাহরণ: সামাজিক বিজ্ঞান ক্লাসে ৫টি কাগজে লেখা হলো— ‘বন্যার কারণ’, ‘বন্যার ক্ষতি’, ‘বন্যা প্রতিরোধ’, ‘সরকারের ভূমিকা’, ‘আমাদের করণীয়’। প্রতিটি দল একটি করে পয়েন্ট যোগ করে এগিয়ে গেল। ক্লাস শেষে পুরো বিষয়টি একটি সমৃদ্ধ মানচিত্রে পরিণত হলো।৫. হট সিট একটি চেয়ার ‘হট সিট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একজন শিক্ষার্থী সেখানে বসে একটি ঐতিহাসিক চরিত্র, বিজ্ঞানী বা গল্পের পাত্র হওয়ার ভান করে। বাকি শিক্ষার্থীরা সেই চরিত্রকে প্রশ্ন করে। এটি রোল-প্লে ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি একসঙ্গে বিকাশ করে।উদাহরণ: ইতিহাস ক্লাসে একজন শিক্ষার্থী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকায় হট সিটে বসলো। অন্যরা প্রশ্ন করলো— ‘আপনি ৭ মার্চের ভাষণে কেন সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন না?’ শিক্ষার্থীকে উত্তর দিতে গিয়ে তার পড়া জ্ঞান প্রয়োগ করতে হলো।৬. স্পিড চ্যাটিং শিক্ষার্থীরা দুই সারিতে মুখোমুখি বসে। শিক্ষক একটি প্রশ্ন দেন এবং ২ মিনিটের জন্য তারা কথা বলে। সময় শেষ হলে এক সারি এক আসন সরে যায়, নতুন জুটি তৈরি হয়, নতুন প্রশ্ন আসে। এটি বিশেষত ভাষা শেখা ও মৌখিক দক্ষতা বিকাশে চমৎকার।উদাহরণ: ইংরেজি ক্লাসে প্রশ্ন ছিল ‘হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু বি ইন দ্যা ফিউচার?’ প্রতিটি জুটিতে দুজন ইংরেজিতে উত্তর দিল। প্রথমে ভুল হলেও তৃতীয়-চতুর্থ রাউন্ডে শিক্ষার্থীরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল।৭. জিগস পাজল পদ্ধতিএকটি বড় বিষয়কে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি দল একটি ভাগ পড়ে বিশেষজ্ঞ হয়। তারপর দল ভেঙে নতুন মিশ্র দল তৈরি হয়, যেখানে প্রতিটি বিশেষজ্ঞ তার অংশ বাকিদের শেখায়। এতে প্রত্যেকে একই সাথে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক  দুটো ভূমিকা পালন করে।উদাহরণ: বিজ্ঞান ক্লাসে ‘মানব পাচনতন্ত্র’ পড়ানো হচ্ছে। চার দলকে চারটি অঙ্গ দেয়া হলো  পাকস্থলী, যকৃৎ, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্র। প্রতিটি দল তাদের অংশ পড়ে নোট করলো। পরে মিশ্র দলে প্রত্যেকে নিজের অংশ বুঝিয়ে দিল  পুরো পাচনতন্ত্র জানা হয়ে গেল।৮. চার কোণা বিতর্ক শ্রেণীকক্ষের চারটি কোণায় লেখা থাকে  ‘সম্পূর্ণ একমত’, ‘একমত’, ‘দ্বিমত’, ‘সম্পূর্ণ দ্বিমত’। শিক্ষক একটি বিতর্কিত বিবৃতি দেন এবং শিক্ষার্থীরা তাদের মতামত অনুযায়ী কোণায় গিয়ে দাঁড়ায় ও কারণ ব্যাখ্যা করে। এটি সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ও যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতা তৈরি করে।উদাহরণ: নাগরিক শিক্ষা ক্লাসে বিবৃতি দেয়া হলো — ‘মোবাইল ফোন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি করে।’ কেউ সম্পূর্ণ একমত, কেউ দ্বিমত হলো। প্রত্যেককে কারণ বলতে হলো। শেষে অনেকে অবস্থান বদলাল  এটাই প্রকৃত শিক্ষা।৯. গল্পের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানবাস্তব জীবনের একটি সমস্যাকে ছোট গল্পের আকারে উপস্থাপন করা হয়। শিক্ষার্থীরা চরিত্রের ভূমিকায় সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদ্ধতিতে পাঠ্যবইয়ের তত্ত্ব বাস্তব জীবনের সাথে যুক্ত হয়, তাই শেখাটা অর্থবহ হয়।উদাহরণ: গণিত ক্লাসে গল্প  রহিম চাচা ১০ বিঘা জমি তার ৩ ছেলেকে ভাগ করে দিতে চান। বড় ছেলে বলল তার দরকার মোটের ৪০%, মেজো বললো ৩৫%। ছোট ছেলে কতটুকু পাবে এবং প্রত্যেকের জমি কত বিঘা?’ এই গল্পের মাধ্যমে শতকরা হিসাব সহজ হয়ে গেল।১০. এক্সিট টিকেট ক্লাস শেষ হওয়ার ৫ মিনিট আগে প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি ছোট কাগজে (এক্সিট টিকেট) তিনটি জিনিস লেখে— আজ কী শিখলাম, কোন জায়গাটা এখনও বুঝিনি, পরের ক্লাসে কী জানতে চাই। এটা শুধু মূল্যায়ন নয়, শিক্ষার্থীকে নিজের শেখার বিষয়ে সচেতন করে তোলে।উদাহরণ: ক্লাস শেষে শিক্ষক বললেন, ‘বের হওয়ার আগে কাগজে লেখো  একটি জিনিস যা আজ শিখলে।’ শিক্ষক কাগজগুলো সংগ্রহ করলেন। পরের দিন দেখলেন ১২ জন এখনও বুঝতে পারেনি পরের ক্লাস সেই বিষয় দিয়েই শুরু হলো।শেষ কথা: শ্রেণীকক্ষ হোক আনন্দের জায়গাওপরের দশটি কৌশলের কোনোটিতেই বাড়তি সরঞ্জাম বা প্রযুক্তি লাগে না। লাগে শুধু একটু পরিকল্পনা, সাহস এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশ্বাস। গ্রামীণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিদিন যে সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করেন, সেখানে এই কৌশলগুলো আলোর মশাল হতে পারে।একটি শিশু যখন হেসে, খেলে, বিতর্ক করে, গল্প বলে শেখে, তখন সে শুধু তথ্য মনে রাখে না  সে চিন্তা করতে শেখে, সমস্যা সমাধান করতে শেখে, মানুষের সঙ্গে মিলে কাজ করতে শেখে। এই দক্ষতাগুলো তাকে পরীক্ষায় নম্বর দেবে না হয়তো, কিন্তু জীবনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেবে।আমাদের শ্রেণীকক্ষকে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতির জায়গা না বানিয়ে, এটিকে পরিণত করি এমন একটি জায়গায় যেখানে প্রতিটি শিশু প্রতিদিন আসতে চায়, কারণ এখানে শেখা মানেই আনন্দ।[লেখক: প্রশিক্ষক ও সহকারী অধ্যাপক, সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, ময়মনসিংহ]

ভিডিও আরও দেখুন

পেলের পায়ের জাদুতে থেমে গিয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ!

ফুটবলের রাজার সামনে নত হয়েছিল কি সত্যিই যুদ্ধের শক্তি? ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমান্টিক কিংবদন্তি- পেলে যখন নাইজেরিয়ায় পা রাখেন, তখন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন দুই শত্রুপক্ষ। সত্যি নাকি মিথ্যে?১৯৬৯ সাল। নাইজেরিয়া জ্বলছে। পূর্বাঞ্চলের ইগো জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘বিয়াফ্রা প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করেছে, আর কেন্দ্রীয় সরকার তা মেনে নিতে রাজি নয়। রক্তক্ষয়ী এই গৃহযুদ্ধে তখন প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ।ডিপ্লোম্যাটদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ। সেখানে হাজির হন ‘ও রেই’- ফুটবলের সম্রাট পেলে। আর সাথে সাথেই ম্যাজিক ঘটে যায়! বিশ্বমাধ্যম খবর দেয়- যুদ্ধরত দুই পক্ষ ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়, শুধু পেলের খেলা দেখার জন্য।খবরটি ২০০৫ সালে টাইম ম্যাগাজিনে এসেছে এভাবে: ‘দুই বছর ধরে কূটনীতিকরা যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে সফল হলেন পেলে। ১৯৬৯ সালে নাইজেরিয়ায় এলেন ব্রাজিলের ফুটবল সম্রাট- এবং এলো তিন দিনের যুদ্ধবিরতি!’কিন্তু ইতিহাস যত গভীরে যায়, কিংবদন্তি তত ধোঁয়াশায় ঢেকে যায়। গবেষকরা যখন নাইজেরিয়ার সংবাদপত্রের আর্কাইভ ঘাঁটলেন- সেখানে তখনকার ‘নাইজেরিয়ান ডেইলি টাইমস’ ও ‘অবজারভার’- কোনো যুদ্ধবিরতির উল্লেখ নেই! যা অবিশ্বাস্য, কারণ সান্তোসের প্রতিটি পদক্ষেপ তখন সংবাদপত্রে উঠে এসেছে।পেলে নিজেও দ্বিধায় ছিলেন। ১৯৭৭ সালের প্রথম আত্মজীবনীতে এই কিংবদন্তির কথা নেই। ২০০৭ সালের আত্মজীবনীতে এসে তিনি লেখেন, ‘নিশ্চিত নই পুরোপুরি সত্যি কিনা... তবে নাইজেরিয়ানরা নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করেছিল বিয়াফ্রানরা যেন লাগোসে হামলা না করে, যতক্ষণ আমরা সেখানে আছি।’তাহলে আসলে কী ঘটেছিল? ইতিহাসবিদ জোসে পাওলো ফ্লোরেঞ্জানোর গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। সান্তোসের খেলা বসেছিল লাগোস ও বেনিন সিটিতে- যুদ্ধের মূলক্ষেত্র থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে। সেখানকার পরিস্থিতি ছিল তুলনামূলক নিরাপদ। যুদ্ধবিরতির কোনো প্রয়োজনই ছিল না। বরং পেলেকে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘প্রোপাগান্ডা টুল’ হিসেবে। নাইজেরিয়া সরকার চেয়েছিল বিশ্বকে দেখাতে- দেশে যুদ্ধ চললেও স্বাভাবিক জীবন আছে। মানুষ ফুটবল উপভোগ করছে। তাই সান্তোসকে আবার ফিরিয়ে আনা হলো বেনিন সিটিতে। স্থানীয় গভর্নর স্যামুয়েল ওগবেমুডিয়া পাবলিক হলিডে ঘোষণা করেন, যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে ব্রিজ খুলে দেওয়া হয়- যাতে মানুষ খেলা দেখতে পারে। পেলের সতীর্থ এডুর ভাষ্য, ‘আমাদের দল যুদ্ধ বন্ধ করবে- এমন কথা কেউ বলেনি।’ তবে সেই সাক্ষীও আছেন, যারা এখনও স্বপ্ন দেখেন। স্থানীয় ফুটবলার গডউইন ইজিলেইন বিবিসিকে বলেছেন, ‘ম্যাচের দিন কেউ আর বন্দুকের কথা ভাবেনি।’ পেলের দল যখন খেলা শেষে বিমানে উঠল, তখন নিচ থেকে ভেসে এল গুলির শব্দ- যুদ্ধ আবার শুরু হয়েছে।সেটাই হয়তো আসল সত্যি- কিংবদন্তি শুধু যুদ্ধ থামায়নি; আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধের মাঝে মানুষকে ফিরিয়ে দিয়েছিল স্বাভাবিক জীবনে, ৯০ মিনিটের জন্য হলেও।

পেলের পায়ের জাদুতে থেমে গিয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ!
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ১১১ জন