সংবাদ
মিরপুরে ২ হাজার কোটি টাকার সরকারি জমি উদ্ধার

মিরপুরে ২ হাজার কোটি টাকার সরকারি জমি উদ্ধার

রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে উচ্ছেদ অভিযান নেপথ্যে পুড়িয়ে মারার নির্মম চক্রান্তচল্লিশোর্ধ্ব এক নারী গত তিন দশক ধরে বাউনিয়াবাঁধ এলাকার যে ঝুপড়ি ঘরে সপরিবারে বাস করছিলেন, সেটি আসলে ছিল এক বিশাল সিন্ডিকেটের অবৈধ সাম্রাজ্যের অংশ। তিনি জানতেনও না, যে মাটির ওপর তার সংসার, তার প্রকৃত মালিক রাষ্ট্র। বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী একদল ভূমিদস্যু এই অসহায় মানুষদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি করে আসছিল। অবশেষে ভাঙল সেই অন্ধকার সাম্রাজ্য।রাজধানীর মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার করেছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ (জাকৃ)। তবে এই মুক্তির আনন্দ সহজে আসেনি; এর পেছনে মিশে আছে রাতের আঁধারে গরিবের বস্তি পুড়িয়ে দেওয়ার নির্মম চক্রান্ত, সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর রক্তক্ষয়ী হামলা আর শত শত ছিন্নমূল মানুষের দীর্ঘশ্বাস।৭৭০ কাঠা জমির অবসান: ৩০ বছরের জবরদখল মুক্তদীর্ঘ ৩০ বছর ধরে পল্লবীর বাউনিয়াবাঁধ এলাকায় ১২ দশমিক ৮৩ একর, যা পরিমাপে প্রায় ৭৭০ কাঠা; সরকারি জমি প্রভাবশালী মহলের কব্জায় ছিল। ঢাকা শহরের বুকে এই বিশাল ভূখণ্ডের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। পবিত্র কোরবানি ঈদের ঠিক আগে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশাল বহর নিয়ে এই অবৈধ সাম্রাজ্যে হানা দেয় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। বুলডোজারের প্রতিটি আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা অবৈধ টিনশেড ঘর, পাকা স্থাপনা আর চাঁদাবাজির আখড়া। উদ্ধারকৃত এই জমিতে এখন স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের মাথার গোঁজার ঠাঁই হিসেবে ‘স্বপ্নচূড়া’ নামক একটি পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায়।কর্মকর্তাদের ওপর হামলা ও রাতে বস্তিতে আগুন: বেকায়দায় ফেলার ‘ঘৃণ্য’ ছকউদ্ধার অভিযানটি মোটেও সহজ ছিল না। গত ২০ ও ২১ মে যখন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়, তখন ক্ষিপ্ত ভূমিদস্যু ও তাদের ভাড়াটে বাহিনী চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এই আকস্মিক হামলায় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ১০ থেকে ১২ জন কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। ভাঙচুর করা হয় ঘটনাস্থলে থাকা একাধিক সরকারি যানবাহন।কিন্তু দস্যুদের নির্মমতার এখানেই শেষ ছিল না। গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষকে সামাজিকভাবে হেয় করতে এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে গত ২৫ মে রাতের আঁধারে কালশী বস্তিতে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা কেড়ে নেয় ৭০ থেকে ৭৫টি পরিবারের শেষ সম্বল। ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকটি ইউনিট আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, উচ্ছেদের ক্ষোভ গরিব মানুষের ওপর ঝেড়ে এবং দোষটা প্রশাসনের ঘাড়ে চাপাতেই এই পৈশাচিক অগ্নিকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল। এই ঘটনায় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদ বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার পর পুলিশ নাজমুল হাসান মনি নামে এক যুবককে আটক করেছে, তবে নেপথ্যের মূল হোতারা এখনো অধরা।সিন্ডিকেটের থাবা বনাম এক সাহসী নারীর লড়াইশুধু পল্লবীই নয়, অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিরপুরের বিভিন্ন সেকশনে হাউজিং এস্টেটের প্রায় ১৫০ একর বা ৯ হাজার কাঠা জমি এখনো প্রভাবশালী দলবাজদের দখলে রয়েছে। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা থাকলেও, সরকারি জমি লুটে নেওয়ার ক্ষেত্রে সব দলের স্থানীয় প্রভাবশালীরা একতাবদ্ধ। কেউ দুয়ারীপাড়ায় ৪০ ফুটের সরকারি রাস্তা বন্ধ করে লোহার পাইপ ও টিন দিয়ে দখল করে রেখেছে, কেউ আবার মিরপুর ১ নম্বরের প্রধান সড়কে ‘জিরো পয়েন্ট ৬২ একর’ জায়গা দখল করে আস্ত সুপার মার্কেট বানিয়ে ফেলেছে।এই বিশাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বর্তমান চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম। তার কঠোর ও আপসহীন নির্দেশনার কারণেই একের পর এক অভিযান সফল হচ্ছে। নিজের কাজের প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করে চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “সরকারি সম্পদ উদ্ধার, গৃহায়ণ অফিসকে দালাল মুক্ত এবং ফাইল ঠেকিয়ে ঘুস খাওয়া বন্ধ করতে আমি কাজ করছি। এ কারণে একটি সিন্ডিকেট আমার নামে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। এরপরও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশদেশে আমি কঠোর অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করছি।”তার এই অনড় অবস্থানের কারণে বর্তমানে গৃহায়ণ অফিস অনেকটাই দৃশ্যমান দালাল মুক্ত হয়েছে। সাধারণ মানুষ যাতে কম সময়ে ও কম কষ্টে সেবা পায়, সে লক্ষ্যে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা।ধ্বংসস্তূপের মাঝে নতুন স্বপ্নের বুনিয়াদউদ্ধার বাউনিয়াবাঁধের জমিতে এখন কাঁটাতারের বেড়া ও স্থায়ী সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা প্রহরী। মিরপুর-৭ নম্বরের চলন্তিকা বস্তির ২৩ একর, ৯ নম্বর সেকশনের ৬০ একরসহ বিভিন্ন জোনে পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ চালিয়ে ৪টি ধাপে বৃহৎ ফ্ল্যাট প্রকল্প বাস্তবায়নের মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। ওই নারীর মতো হাজারো মানুষ, যারা এতদিন দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতি মাসে অবৈধ ভাড়া ও চাঁদা গুনতেন, তারা এখন স্থায়ী সুশাসনের আশা করছেন। এই অভিযান শুধু জমি উদ্ধারের গল্প নয়; এটি রাষ্ট্রের সম্পত্তি আমজনতার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার এবং দুর্নীতিগ্রস্ত এক অন্ধকার সিন্ডিকেটের টুঁটি চেপে ধরার মানবিক ও আইনি লড়াইয়ের জীবন্ত উপাখ্যান।
১ ঘন্টা আগে

বিশ্বকাপ সময়সূচি: দেখতে ক্লিক করুন

মতামতমতামত

শাস্তির প্রদর্শন নয়, বিচার নিশ্চিত হোক

গত ১৯ মে ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ৮ বছরের রামিসা আক্তার স্কুলে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়। আর ফেরেনি। পাশের ফ্ল্যাটের সোহেল রানা তাকে ডেকে নিয়ে বাথরুমে ধর্ষণ করে, ধামাচাপা দিতে গলা কেটে হত্যা করে, মাথা আলাদা করে বালতিতে লুকিয়ে রাখে। রামিসাই বাংলাদেশে প্রথম শিশু নয়, তার আগে এবং পরেও অনেক শিশুর এমন করুণ পরিণতি হয়েছে। রামিসার পরেই একটি মাদ্রাসার বাথরুমে একটি মৃতশিশু পাওয়া যায়, যার পায়ুপথ রক্তাক্ত ছিল ! আছিয়া, পথশিশু আয়েশা— প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণ, গণপিটুনি, প্রকাশ্যে খুনের খবর আসছে। ধর্ষণ এবং খুনের নৃশংসতা দেখে অনেকেই দেশে শরিয়া আইন চায়। শরীয়া আইনে ‘ধর্ষণ’ বলতে কোন শব্দই নেই, আছে জেনা, ব্যভিচার। জেনা, ব্যভিচার হচ্ছে সম্মতি-অসম্মতি নির্বিশেষে বিবাহ বহির্ভূত যৌনকর্ম, আর ধর্ষণ হচ্ছে সম্পূর্ণ অসম্মতিতে যৌনকর্ম। জেনার শরিয়া বিধান ধর্ষণেও প্রয়োগ করা যায় কি-না আমার জানা নেই, প্রয়োগ করা গেলে সেই ক্ষেত্রে ধর্ষিতাকেই ৪ জন মুসলমান সাক্ষী হাজির করতে হবে। কেবল ৪ জন সাক্ষী হলেই হবে না, চোর-ডাকাত-চরিত্রহীন-মিথ্যুক সাক্ষী গ্রহণযোগ্য নয়, সাক্ষীকে হতে হবে সাচ্চা ইমানদার, সত্যবাদী ও চরিত্রবান। কারো কাছে শুনে সাক্ষী দিলে হবে না, ধর্ষণকর্ম স্বচক্ষে দেখেছে এমন সাক্ষী লাগবে। কিন্তু ধর্ষক কি কখনো ৪ জন ইমানদার লোককে সম্মুখে বসিয়ে রেখে ধর্ষণ করে ? আবার নারী সাক্ষী নয়, ৪ জন পুরুষ সাক্ষী লাগবে, নারী সাক্ষী হলে সম্ভবত ৮ জন লাগবে। সাক্ষী হাজির করতে না পারলে মিথ্যা অভিযোগ আনার দায়ে ধর্ষিতাকেই শাস্তি পেতে হয়। কারণ ধর্ষিতার বিচার করে শাস্তির দিতে সাক্ষীর প্রয়োজন হয় না, কারণ ধর্ষিতা তার গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ লুকাতে পারে না। ধর্ষক বা খুনি স্বীকারোক্তি দিলে সাক্ষী ব্যতিরেকেও শাস্তি দেয়া যায়। এই ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে নির্যাতন করেও স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। বাংলাদেশের এমন একটি ঘটনা বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে দিয়েছিল, ২০২০ সনে নারায়ণগঞ্জের এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে মর্মে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়; কিন্তু কিছুদিন পর মেয়েটি ফেরত আসে এবং এতে পুরো বিচার কাজ প্রশ্নের মুখে পড়ে। ততদিনে খুনির ফাঁসি হয়ে গিয়েছিল কি-না তা আর মনে নেই। বারবার রিমাণ্ডে নিয়ে নির্যাতন করা না হলে এমন স্বীকারোক্তি দেয়ার কথা নয়। তাই শুধু স্বীকারোক্তি অপরাধ নিরূপণে একমাত্র নিয়ামক হওয়া উচিত নয়। শরিয়া আইনের অপরিহার্য ৪ জন পুরুষ সাক্ষীর অভাবে পাকিস্তানে ১৯৭৯ সন থেকেই ধর্ষণের প্রায় সব মামলাই ঝুলে গেছে, অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। ডিএনএ বা ফরেনসিক পরীক্ষার কথা শরিয়া আইনে নেই, কারণ এগুলো সাম্প্রতিককালের আবিস্কার। দ্বিতীয়ত শরিয়া আইনের সঙ্গে মনুষ্য আবিস্কৃত ফরেনসিক পরীক্ষা যোগ করা কতটুকু শরিয়া সম্মত তা আমার জানা নেই, কারণ মানুষ সৃষ্ট আইন হচ্ছে ‘তাগুত’, যা ইসলাম ধর্মমতে পরিত্যজ্য। মনুষ্য সৃষ্ট তাগুত আইন দ্বারা বিচারকার্য পরিচালনা করার কারণে বাংলাদেশের কয়েকটি আদালতে বোমাও মারা হয়েছিল। শরিয়া আইন থাকলেই যে হত্যা-খুন-ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে তা কিন্তু প্রমাণিত সত্য নয়। বহু মুসলিম দেশে শরিয়া আইন আছে, তারমধ্যে আফগানিস্তান, সৌদি আরব, ইরানে শরিয়া আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, কিন্তু এই তিনটি দেশেও ধর্ষণ-খুন বন্ধ হয়নি। আফগানিস্তানে তালেবানের আমলে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড, হাত-পা কাটা হচ্ছে, কিন্তু অপরাধ থামেনি। সউদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বিশ্বে সর্বোচ্চ, কিন্তু গার্হস্থ্য সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ কমেনি। সউদি আরব দরিদ্র দেশগুলো থেকে গৃহকর্মী নিয়ে ধর্ষকদের মুখে ঠেলে দেয়। সউদি আরবে পিতা-সন্তান পালাক্রমে গৃহকর্মীদের ধর্ষণ করে। এই কারণেই ফিলিপিন্স, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া মাঝে মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দেয়। শরিয়া শাসিত দেশে গৃহকর্মী ধর্ষণের নানা করুণ চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এলেও আজ পর্যন্ত কোন ধর্ষকের শরিয়া আইনে বিচার হয়েছে বলে শোনা যায়নি। বাংলাদেশে শরিয়া আইন না থাকলেও আলেমদের মনে তা গেঁথে থাকার কথা, তারা শরিয়া আইন পড়ান, নিয়মিত শরিয়া আইন চালুর পক্ষে কথা বলে থাকেন। যারা শরিয়া আইনের পক্ষে কথা বলছেন তাদের অনেকেই আবার ধর্ষকও। ‘তারাও মানুষ, তাদেরও যৌনাকাঙ্খা আছে’ - এমন বয়ান ইদানীং শোনা যাচ্ছে। কওমী মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ স্বাধীন। মাদ্রাসার ভেতরে শরিয়ার মত কঠোর আইন অনুসৃত হয়। কওমী মাদ্রাসায় কোন রকম সরকারী হস্তক্ষেপ চলে না, স্ব-স্ব মাদ্রাসা তাদের নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হয়, মাদ্রাসায় কী পড়ানো হবে তাও তারাই নির্ধারণ করে থাকেন। এমন একটি পরিবেশে ইসলামী জীবনযাপনে অভ্যস্ত আলেমগণও যদি ধর্ষণ এবং বলাৎকার থেকে বের হতে না পারেন তাহলে শরিয়া আইন কীভাবে শিশু শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দেবে ? মাদ্রাসার শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম ধর্ষক হলে তার বিরুদ্ধে ৪ জন সাক্ষী যোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। কারণ কোরআন-হাদিসে মুসলমানদের দোষত্রুটি গোপন রাখতে বলা হয়েছে। আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে একটি নাম হচ্ছে ‘আস-সিত্তির’, যার অর্থ যিনি দোষত্রুটি গোপন রাখেন। মানুষ যখন বিচার পায় না, তখন তারা বিকল্প খোঁজে- কেউ শরিয়া আইন চায়, কেউ গণপিটুনিতে ন্যায় বিচার খুঁজে বেড়ায়। বাংলাদেশে একটি ধর্ষণ মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে ৫-৭ বছর লাগে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০২৩ সনের তথ্য অনুযায়ী ধর্ষণ মামলায় সাজা হয় মাত্র ৩-৪ শতাংশের। রামিসা হত্যার পর প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং স্বারাষ্ট্রমন্ত্রীর তৎপরতায় বিচার ব্যবস্থার আড়মোড়া কেটেছে, আইনমন্ত্রী ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৫-৭ দিনে বিচার শেষ হওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন। তবে এত দ্রুত বিচার সম্ভব নয়। এত তাড়াহুড়োও ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। যত নিকৃষ্ট অপরাধীই হোক না কেন, তারও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। ভিক্টিম ও অপরাধী উভয়ই যখন ন্যায় বিচার পায় শুধু তখনই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই, অভাব আছে আইনের দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। নির্ভয়া কাণ্ডের পর ভারতে গঠিত ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের মতো বাংলাদেশেও কোর্ট গঠন করা যায়, যেগুলো ৬ মাসের মধ্যে রায় দিতে বাধ্য থাকবে। ভিডিও কনফারেন্সে সাক্ষ্য, সাক্ষী সুরক্ষা আইনের বাস্তব প্রয়োগও জরুরি। জনগণ যদি দেখে যে রাষ্ট্র অপরাধীকে ছাড় দেয় না, তাহলে মানুষ প্রচলিত আইনের বিকল্প খুঁজবে না। তবে শাস্তি প্রদানে তদন্ত, প্রমাণ ও বিচার প্রক্রিয়া নির্ভরযোগ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। জনসম্মুখে বিভৎস ও নৃশংস কায়দায় শাস্তি দেয়ার বিধান প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহাকে তৃপ্ত করলেও সভ্য দুনিয়া তা গ্রহণ করেনি। কারণ প্রতিশোধ আর বিচার এক নয়। কপালে পট্টি বেঁধে সিনেমার নায়কের মতো প্রতিশোধ নেওয়ার হুঙ্কার সমর্থন করা আদালতের কাজ নয়। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

‘দূষণ’ হয়ে উঠছে সম্পদ

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে দাঁড়ালে যা দেখা যায় তা শুধু দূষণ নয়, সেখানে আসলে কোটি টাকার কাঁচামালও ভাসছে। প্রতিটি পানির বোতল, প্রতিটি পলিথিন ব্যাগ, প্রতিটি প্লাস্টিকের চেয়ার- শুধু বর্জ্য নয়, এক একটি নতুন শিল্পের ভিত্তি হতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে ‘দূষণকে’ সম্পদে পরিণত করেছে। অথচ বহুমুখী দূষণে ভারাক্রান্ত বাংলাদেশের এই অপার সুযোগ এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে।বিষয়টি শুধু পরিবেশ সুরক্ষার নয়, বরং তিনস্তরীয় একটি ব্যবসায়িক মডেল। যেখানে একই প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে একসঙ্গে তিনটি আয়ের উৎস তৈরি করা সম্ভব। প্রথমত, ফার্নিচার হিসেবে বিক্রি করা যাবে। দ্বিতীয়ত, কার্বন ক্রেডিট হিসেবে বিক্রি করা যাবে। আর তৃতীয়ত সরকারি পরিবেশ প্রণোদনা। এসব মিলিয়ে যে মডেল দাঁড়ায়, তা বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য এক অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। একটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক চেয়ার তৈরিতে যতটুকু কার্বন ডাই-অক্সাইড সাশ্রয় হয়, তা কার্বন ক্রেডিট হিসেবে বিক্রি করলে চেয়ারের দামের অতিরিক্ত ২০-৩০ শতাংশ আয় আসতে পারে।প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে ফার্নিচার তৈরির মূল প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে সহজ। সংগ্রহ করা এইচডিপিই (উচ্চ ঘনত্বের পলিইথিলিন) ও পিপি (পলিপ্রোপিলিন) ধরনের প্লাস্টিক প্রথমে পরিষ্কার করা হয়। তারপর নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় গলিয়ে মোল্ডে ঢালা হয়। ঠান্ডা হলে বেরিয়ে আসে মজবুত ফার্নিচার, যা কাঠের চেয়ে টেকসই, পানিরোধী এবং পোকামাকড়মুক্ত।এসব পণ্যের বিশেষত্ব হলো এগুলো পুনরায় গলিয়ে নতুন করে ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ এটি সত্যিকারের সার্কুলার ইকোনমি বর্জ্য। যা শেষ হয় না, রবং রূপান্তরিত হয়।বাজারে এই পণ্যগুলোর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। স্কুল, হাসপাতাল, সরকারি অফিস ও পার্কে এই ধরনের টেকসই ফার্নিচারের জন্য ক্রয় নীতি তৈরি হচ্ছে। ইউরোপে এসব পণ্যের বাজার ইতোমধ্যে বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশেও রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। বিশেষত কম দামের কারণে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অনেক বেশি। দ্বিতীয় পর্যায়ে আসে কার্বন ক্রেডিটের কথা। যা পরিবেশ রক্ষার আন্তর্জাতিক মুদ্রা। যখন কোনো উদ্যোগ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হ্রাস করে বা কার্বন শোষণ করে, তখন সেই পরিমাণটি একটি ক্রেডিট হিসেবে স্বীকৃতি পায়। যা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা যায়। প্রতিটি ক্রেডিটের অর্থ হচ্ছে এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সাশ্রয়।প্রশ্ন হচ্ছে, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং এখানে কীভাবে কাজ করছে। মূলত, নতুন প্লাস্টিক তৈরিতে যে কার্বন ডাই-অক্সাইড খরচ হতো, তা রিসাইক্লিং দিয়ে বাঁচানো হচ্ছে। এই ‘বাঁচানো’ কার্বন ডাই-অক্সাইড-ই হলো ক্রেডিটের উৎস।  এক টন প্লাস্টিক রিসাইকেল করলে প্রায় ১ দশমিক পাঁচ থেকে দুই টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সাশ্রয় হয় অর্থাৎ সমপরিমাণ ক্রেডিট। কার্বন ক্রেডিট বিক্রির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে স্বীকৃত দুটি সংস্থা হচ্ছে- গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড এবং ভেরা (ভিসিএস-ভেরিফায়েড কার্বন স্ট্যান্ডার্ড)। সংস্থা দুটো প্রকল্প যাচাই করে সার্টিফিকেট দেয়। একবার সার্টিফিকেট পেলে ‘এক্সপ্যানসিভ’, ‘সাউথ পোল’ বা ‘ক্লাইমেট ট্রেডের’ মতো আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে ক্রেডিট বিক্রি করা যায়।অবশ্য, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া বেশ জটিল হলেও অসম্ভব নয়। একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ৬-১২ মাসের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করা সম্ভব। সহজ বিকল্প হিসেবে দেশীয় বহুজাতিক কোম্পানি যেমন গার্মেন্টস রপ্তানিকারক বা ব্যাংক তাদের ইএসজি (পরিবেশ, সমাজ ও সুশাসন) লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরাসরি কার্বন ক্রেডিট কিনতে পারে। বেশি নয়, মাত্র ৫-১০ লাখ টাকা বিনিয়োগে দেশে প্লাস্টিক ফার্নিচার ইউনিট চালু করা সম্ভব। যেখানে প্রথম বছর ফার্নিচার বিক্রিতে মনোযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয় বছরে এসে শুরু করতে হবে উৎপাদন ডেটা সংগ্রহ। তৃতীয় বছরে কার্বন ক্রেডিট নিবন্ধনের আবেদন করা যেতে পারে। এভাবে তিন বছরের রোডম্যাপ অনুসরণ করলে দেশেই একটি স্থায়ী ও লাভজনক সবুজ ব্যবসা দাঁড় করানো সম্ভব।বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে সরকার ক্রমেই সবুজ উদ্যোগকে নীতিগত সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন ‘সবুজ সাপ্লাই চেইন’ চাইছেন। বিশেষত ইউরোপীয় ক্রেতারা পণ্যের কার্বন ফুটপ্রিন্ট দেখছেন। এই প্রেক্ষাপটে প্লাস্টিক থেকে ফার্নিচার ও কার্বন ক্রেডিটের মডেলটি শুধু একটি ব্যবসা নয় দেশের বৃহত্তর পরিবেশগত রূপান্তরেরই একটি অংশ। যেসব উদ্যোক্তা এই পথে হাঁটবেন, তারা কেবল মুনাফাই করবেন না, হয়ে উঠবেন একটি নতুন শিল্পের পথপ্রদর্শকও।বর্জ্য বিষয়ে আমাদের গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গি সত্যিই বদলাতে হবে। সময়েরও দাবি সেটাই।কারণ বর্জ্য এখন আর আমাদের সমস্যা নয়, বরং সম্ভাবনাময় এক শিল্পের কাঁচামাল।  লেখক: সহকারী অধ্যাপক, পানি ও জলবায়ু গবেষক।

ভারত-ব্রিটেন বাণিজ্য চুক্তি: নতুন গতি, কূটনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ভারত ও ব্রিটেন তাদের কম্প্রোরেন্সিভ ইকোনমিক এন্ড ট্রেড এগ্রিমেন্ট বাস্তবায়নে নতুন গতি আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। মঙ্গলবার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে চুক্তির অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয় এবং দ্রুত বাস্তবায়নের পথ খোঁজা হয়।ভারতের বাণিজ্য সচিব রাজেশ আগরওয়াল ব্রিটেনের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি আমান্ডা ব্রুকস-এর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই বৈঠকে চুক্তির বাস্তবায়নে থাকা জটিলতা ও নতুন সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়।অন্যদিকে, ব্রিটেনের ব্যবসা ও বাণিজ্য সচিব পিটার কাইল বর্তমানে ভারতে সফরে রয়েছেন। তিনি কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পিয়ূষ গোয়াল-এর সঙ্গে বৈঠক করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা করেন।বর্তমানে ভারত-ব্রিটেন বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন পাউন্ড। সিইটিএা কার্যকর হলে এই পরিমাণ আরও দ্রুত বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।ব্রিটিশ সরকারের মতে, এই চুক্তির ফলে বছরে অতিরিক্ত ২৫.৫ বিলিয়ন পাউন্ড বাণিজ্য বৃদ্ধি পেতে পারে এবং উভয় দেশের এউচ প্রায় ৫ বিলিয়ন পাউন্ড করে বাড়তে পারে।বিশ্ব বাণিজ্যে অস্থিরতা, বিশেষ করে স্ট্রেইট অফ হরমুজে অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতির মধ্যেও এই চুক্তি দুই দেশের জন্য একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে।সব মিলিয়ে, ভারত ও ব্রিটেন ঈঊঞঅ-কে শুধু বাণিজ্য চুক্তি ঢ়নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব হিসেবে দেখছে এবং দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট।

তোফায়েল আহমেদ: হারিয়ে যাবেন না

একজন অসাধারণ বাগ্মী, মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে উঠে আসা বিরলপ্রজ রাজনীতিক, জাতীয় নেতা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তোফায়েল আহমেদ বেঁচে থাকবেন। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, ইতিহাসের উত্থান-পতন ও নানা বাঁক বদলে একজন নেতা হিসেবে তিনি কখনো বিস্মৃতির অতল অন্ধকারে হারিয়ে যাবেন না।সরকারি চাকরির সুবাদে তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখেছিলাম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বকালীন তাঁর সঙ্গে মোট সাড়ে তিনবছর কাজ করেছি। তখনই তাঁর সান্নিধ্যে যাবার এক অপার সুযোগ আসে। স্মার্ট, পরিপাটি এবং অসামান্য স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি। দাপ্তরিক  নথি, নোটাংশ, সারসংক্ষেপ, ক্ষণ, তারিখ ইত্যাদি বিস্ময়করভাবে মনে রাখতে পারতেন। নথিতে সিদ্ধান্ত দিতেন ব্যক্তিগত দায় নিয়ে। কোনো জটিল বিষয়ে কর্মকর্তাগণ সিদ্ধান্তে দোদুল্যমান হয়ে গেলে বা মৌনতা অবলম্বন করলে তিনি বলতেন, -নথিটা দাও আমি নিজেই লিখে দিচ্ছি। ভবিষ্যতে সমস্যা হলে সেটা আমি দেখবো।তিনি সবসময় হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করতেন। তাঁর মুখের ওপর বিষণ্ণতার কালোছায়া কখনো দেখি নি। হঠাৎ  মেজাজ দেখেছি, তবে তা একেবারে  হারাতে দেখি নি। হয়তো তাঁরও অনেক দুঃখবোধ ছিল যা প্রকাশিত নয় এবং অফিসারদের কাছে কখনো ভাগ করার ছিল না। তাঁর মধ্যে চাপা, প্রচ্ছন্ন এবং দৃঢ়চেতা মানুষের নানাবিধ গুণাবলী ছিল।বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য-শৌর্য ও বিদ্যায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়।  আলাদা একজন। তখনকার বাণিজ্য সচিব আপাদমস্তক বিনয়ী মানুষ হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন এবং আমি মাঝেমধ্যে তাঁর সামনে উপবিষ্ট হয়ে বলতাম, -স্যার, আমরা কিন্তু বাইরে গিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করি তা কখনো বলি না, বরঞ্চ বলে থাকি, আমরা তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে আছি। এমন কথায় তিনি মনে মনে আনন্দিতবোধ করতেন। আবার সস্নেহে বলতেন,-নিশ্চয় তোমরা কোনো একটা মতলব নিয়ে এসেছো।পোশাক-আশাকে এত রুচিবান, পরিচ্ছন্ন, শৌখিন ও অভিজাত এদেশের মন্ত্রীদের মধ্যে সচরাচর দেখা যেত না। পাজামা, পাঞ্জাবি, মুজিবকোট, স্যুট, ব্লেজার, জুতো পরতেন নামি দামি ব্র্যান্ডের। ব্যতিক্রম মানের হিসেবে সহজেই বুঝা যেত। এ বিষয়ে তিনি ছিলেন উদার এবং দরাজ স্বভাবের মানুষ।মনে পড়ে, তখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস হবে। দুপুরের পরপর অফিসে ঢুকে তিনি বললেন,-দ্যাখো, বাইরে কেমন প্রচন্ড দাবদাহ চলছে। গাড়ি থেকে নামাই যায় না। বাইরে তাকানো মুশকিল। গুমোট পরিবেশ। বৃষ্টি-বাদল হওয়া জরুরি। ঢাকার আবহাওয়াটা কেমন যেন বদলে গেছে। তাছাড়া আমি তো আবার সানগ্লাস পরি না। তাৎক্ষণিক জিজ্ঞেস করলাম,-কেন স্যার? তিনি বললেন,-সিরাজ ভাই একবার (সিরাজুল আলম খান) মানা করেছিলেন। তিনি বলতেন, 'সানগ্লাস নাকি এদেশের  গণমানুষের রাজনীতির সঙ্গে মানানসই নয়'। সেই থেকে সানগ্লাস বাদ দিয়েছিলাম, আর কোনোদিন পরি নি।২.একদিন অপরাহ্নে অফিসে এসেই আমাকে ইন্টার-কমে কল করলেন।  'এখুনি উপরে আস'। এভাবে তিনি আমাকে প্রায়ই ডেকে পাঠাতেন। কিন্তু  সেদিনের কণ্ঠস্বরটা কেমন যেন ছিল!  আমি বের হয়ে লিফটের দরজায় দাঁড়ালাম। চারতলার দক্ষিণ প্রান্তে মন্ত্রীর কক্ষ, আমি দোতলায়। কাজেই লিফটেই যেতে চাই। ভাবছিলাম, কোন বিষয়ে জানতে চাচ্ছেন, বুঝতে পারছি না। তাঁর কক্ষে প্রবেশের মুখে পৌঁছাতেই ব্যক্তিগত স্টাফরা বললো, -শিগগিরই ঢুকেন স্যার, এরমধ্যেই কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছেন আপনি কোথায়?দরজার ভেতরে পা রেখেই সালাম জানালাম, দেখি মন্ত্রীর নির্ধারিত চেয়ারে বসে আছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু।আমি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে। কী, আশ্চর্য! পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, তোফায়েল আহমেদ সোফায় সহাস্যে বসে আছেন। আমি খানিকটা অপ্রস্তুত হলাম। তিনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন,-আমু ভাই, ওর কথাই বলেছিলাম, সে চট্টগ্রামের ডিসি ছিল। আমু সাহেব বললেন, -হ্যাঁ আপনাকে দেখেছি বলে মনে হয়, সবাই তো চিনে-জানেও ।এবার কাজের কথা। মন্ত্রী বললেন, -দেখো, আমু ভাই আমার নেতা। সেই বরিশালের বি,এম কলেজ থেকেই আমি আমু ভাইয়ের সাথে আছি। তোমার কাছে আমু ভাইয়ের একটা কাজ আছে। এটা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাড়াতাড়ি করে দিতে হবে।সেদিন এক সঙ্গে চা খেয়ে আমি নিচে নেমে আসি। পরদিন আবার মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা। তিনি নিজে থেকেই  হাসিমুখে বললেন, -শোন মান্নান, গতকাল আমু ভাইকে একটু বেশি সম্মান দেখালাম আর কি! তিনি আমার নেতা, ঠিকই আছে। তবে '৭০ এ তিনি প্রাদেশিক পরিষদের নেতা ছিলেন। একই সময়ে আমি কিন্তু ছিলাম পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে।আমি বললাম, -জ্বি স্যার, আপনি নাকি তখন বয়সের দিক থেকে সর্ব কনিষ্ঠ এমএনএ ছিলেন?৩.আরও একদিনের ঘটনা। মুন্সিগঞ্জের জনৈক হিন্দু এমপি একটা ওষুধ প্রস্তুতকারী সংগঠনের আসন্ন নির্বাচনে তাঁর লোককে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য আমাকে একটি অনৈতিক ও গর্হিত প্রস্তাব করে বসেন। আমার রুমে বসেই তিনি এমন লোভনীয় প্রস্তাব দেন। তখন মহামান্য হাইকোর্ট থেকে আমাকে ঐ সংগঠনের ‘প্রশাসক’ নিয়োগ করা হয়েছিল। আমি তাঁর কথা শুনতে চাই নি। এমনকি আমার রুম থেকে তাঁকে দয়া করে চলে যেতে বলেছিলাম। সেদিন তিনি বেশ রাগান্বিত বদনে আমার কক্ষ ত্যাগ করেছিলেন। পরে জানতে পারি, সেদিনই তিনি সরাসরি মন্ত্রীর কক্ষে ঢুকে আমার সম্পর্কে আজেবাজে মন্তব্য করেন। এবং বলেছিলেন, - তোফায়েল ভাই, কোত্থেকে যে এসব জামায়াতি অফিসার খুঁজে পান জানি না। সেদিন মন্ত্রী তাঁর কথা শুনেছেন বটে। যদিও তেমন কিছু মন্তব্য করেন নি। তবে দুয়েকদিন পরে, হঠাৎ করে অনেকের উপস্থিতিতে বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলে ওঠলেন, -সেদিন তো মান্নানকে একজন এমপি জামায়াতের লোক বলে গেল। তখন কেউ কথা বলছেন না। সবাই চুপ,বিব্রত। নীরবতা ভেঙে আমি নিজেই বললাম, -স্যার, আমি এই প্রথম এমনটা শুনলাম। অবশ্য আগে আমাকে জাসদ, বাসদ, ছাত্রদল, নাস্তিক অনেক কিছু বলা হয়েছে। এবারই একেবারে চুড়ান্ত অভিধায় অভিষিক্ত হলাম স্যার! মন্ত্রী বললেন, -যাক এসব। আমি বুঝতে পেরেছি। তুমি তাকে কোনো পাত্তাই দাওনি মনে হয়। ৪.তিনি অসুস্থ। একদিন সন্ধ্যা বেলায় তাঁর বনানীর বাসায় দেখতে যাই। জানলাম তিনি উপরে রেস্ট নিচ্ছেন। ইদানিং তিনি বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে থাকেন। আমি ঘুরে ঘুরে বাসার নিচ তলায় সাজানো তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের দুর্লভ আলোকচিত্র ও সাদাকালো ফটোগ্রাফগুলি দেখছিলাম। যার সঙ্গে '৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়-স্মৃতির অমূল্য ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এমন সময় বাসায় প্রবেশ করলেন আরেক কিংবদন্তী ও জাতীয় ব্যক্তিত্ব তোফায়েল আহমেদের ঘনিষ্ঠ রাজনীতি-সহচর প্রয়াত নেতা আবদুর রাজ্জাকের পুত্র নাহিন রাজ্জাক। কথা বলছিলাম রাজ্জাক তনয়ের সঙ্গে। খানিক পরে তিনি শারীরিক অসুবিধা নিয়েই স্টিক হাতে ড্রয়িং রুমে নেমে আসলেন। নাহিনকে দেখে,- আরে তুই কখন আসলি?আমি লক্ষ করলাম, একজন বাবা ছেলেকে যেমন আদরের সুরে বলেন, তেমনি করে নাহিনকে বললেন এবং তাদের পারিবারিক খোঁজ-খবর নিলেন। তাঁর আম্মার কথা জিজ্ঞেস করলেন। সেদিন আমি এবং নাহিন এক সাথেই তাঁর সামনে বসেছিলাম।  কী আশ্চর্য, সেদিনও তিনি আমার মেয়ের নতুন সংসার এবং জামাতার কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলেন নি।৫.মন্ত্রীর সামনে বসে দাপ্তরিক নানা বিষয়ে কথা বলার সময় প্রায়ই একটি বিষয় লক্ষ করতাম, তাঁর চেয়ার বরাবর পেছনের দেয়ালে ঝুলছে সাদা কাগজের ওপর কাঁচা হাতে আঁকা ফুল, পাখি, নীল আকাশ, নদী, বৃক্ষ ইত্যাদির নানান দৃশ্য। এগুলো তাঁর ছোট্ট নাতনির হাতের আঁকা। কাগজগুলি বাতাসে নড়ে গেলে তিনি নিজের হাতে সযত্নে দেয়ালে সেঁটে দিতেন। সেই ক্ষুদে অংকন শিল্পী তাঁর একমাত্র কন্যার মেয়ে। চেয়ার ঘুরিয়ে দেখতেন এবং নাতনির সঙ্গে হাসিমুখে আলাপ করতেন। মনে হয়, একজন সংবেদনশীল, কোমলপ্রাণ, শিশুবান্ধব মানুষ হিসেবেও তিনি অতুলনীয় ছিলেন। ৬.২০১৭ সালের শেষের দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হতে বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম হিসেবে বদলি হয়ে যাই। যাওয়ার আগে তিনি বললেন,-মান্নান তুমি তো চলে যাচ্ছ। তোমার স্থলাভিষিক্ত করে সেখানে কাকে দিব? আমি বললাম,- স্যার, এটা আপনার একান্ত পছন্দ।  অনেকেই তো আছেন। - আচ্ছা, দেখি, কী করা যায়।চট্টগ্রামে চলে আসার মাস-দুই পরে একদিন রাত ১০টার দিকে হঠাৎ তাঁর ফোন। আমি কমিশনার বাংলোর ভেতরের ওয়াকওয়ে ধরে হাঁটছিলাম। রাতে হাঁটাহাঁটির অভ্যাস আমার বহু বছরের। হাঁটার অভ্যাসটা বোধকরি জীবিত কর্মক্ষম মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তোফায়েল আহমেদ বললেন,- মান্নান 'আই মিস ইউ'। তোমার মেয়েটা কোথায়? ও কি এখন ভালো আছে?আমি বিস্মিত হয়ে যাই। কথা বলতে পারছিলাম না। সঙ্গে সঙ্গে চোখে জল আসার মতন অবস্থা হলো।-স্যার আপনি ভালো আছেন?-খুব ভালো নেই। তোমার কাজটা এখন আগের মতো ওরা করতে পারছে না। তুমি করে দিতে পারতে।- স্যার, ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো কিছু দিন সময় লাগবে।ফোন শেষ করে মনে মনে বলছিলাম, ‘আই মিস ইউ’ এমন একটা বাক্য সারা জীবনে আমাকে আর কেউ কোনোদিন বলেনি। এটাই প্রথম এবং শেষ। ৭.আরেক দিনের কথা। তখন ২০২০ সাল। আমি করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। শারীরিক অবস্থা ভালো নেই। কয়েক মাস আগেই আমার স্ত্রী করোনায় মৃত্যুবরণ করেন। হাসপাতালে থাকাবস্থায় আমাকে বদলি করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হলো। বিষয়টি খুব অমানবিক ছিল। তবু কর্তৃপক্ষের ইচ্ছায় তা হয়েছিল। আমার কোনো কিছু বলার ছিল না। দু’দিন পরে হঠাৎ তোফায়েল আহমেদের ফোন।-মান্নান তোমাকে ওরা বদলি করে দিয়েছে? যাক্ কষ্ট নিও না। ওরা তোমাকে চিনতে পারে নি। থাকো কিছু দিন। দেখা যাবে।পরে শুনেছিলাম, সংসদেও তিনি আমার বদলির বিষয়টি তুলেছিলেন।৮.পৃথিবীর প্রতিটি কিংবদন্তির বাহ্যিক আচরণ ও অবয়বের আড়ালে একান্ত নিভৃতে, হৃদয়ের গহীন ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক মানবীয় কোমলপ্রাণ সত্তা। যা সহজে চোখে পড়ে না। সচরাচর বাইরে অদৃশ্য হয়ে থাকে তাঁর ভেতরের ভিন্নতর এমন রূপ। আর এসব গুণই কালক্রমে তাঁকে সাধারণ থেকে বিশেষ করে তোলে। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন সমগ্র দেশ, জাতি ও গণমানুষের বিবেক তথা মুখপাত্র। তখন তাঁর পরিচয় হয়ে যায় তিনি একজন জাতীয় নেতা বা জাতীয় ব্যক্তিত্ব। রাজনীতিবিদ এর ব্যক্তিক চরিত্রের ভালো মন্দ ছাপিয়ে গিয়ে, একজন ধ্রুবতারা নেতা, প্রাণবন্ত মানুষ তোফায়েল আহমেদের আত্মার চিরশান্তির জন্যে প্রার্থনা করছি। লেখক: সাবেক সচিব ও গল্পকার

বিভাজনের রাজনীতি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঐক্যের প্রশ্ন

ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘকাল ধরে সমাজকে বিভিন্ন বর্ণ ও শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রচলিত বর্ণব্যবস্থায় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এই চারটি শ্রেণীর কথা উল্লেখ করা হয়। ব্রাহ্মণদের জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে, ক্ষত্রিয়দের শাসন ও প্রতিরক্ষার সঙ্গে, বৈশ্যদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে এবং শূদ্রদের সেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত করা হতো। ঐতিহাসিকভাবে শূদ্রদের সমাজের নিম্নস্তরে অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের অচ্ছুত বা অস্পৃশ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। প্রথাগতভাবে চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুত, ঝাড়ু দেয়া, মলমূত্র অপসারণসহ বিভিন্ন শ্রমনির্ভর পেশায় শূদ্র শ্রেণীর মানুষদের নিয়োজিত রাখা হতো। ভারতে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অবস্থা পর্যালোচনার জন্য ১৯৭৯ সালে বিহারের সাবেক মন্ত্রী ও নেতা শ্রী বিন্দেশ্বরী প্রসাদ মণ্ডলের নেতৃত্বে মণ্ডল কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের প্রতিবেদন ১৯৮০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভারতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনে অনগ্রসর ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়। অনেকের মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত ও দুর্বল রাখার জন্য বিভিন্ন উপগোষ্ঠী, পদবি ও সামাজিক পরিচয়ের বিস্তার ঘটানো হয়েছে। এর ফলে একই ধরনের পেশা বা সামাজিক অবস্থানের মানুষদের মধ্যেও পারস্পরিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন পরিচয়, বিশ্বাস ও প্রথার কারণে তারা একক সামাজিক শক্তিতে পরিণত হতে পারেনি। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকার কারণে বহু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছে। মৌলিক অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত ছিল। জীবিকার তাগিদে এবং চরম দারিদ্র্যের কারণে তাদের অনেককে অত্যন্ত কষ্টকর জীবন পার করতে হয়েছে। নানা ধরনের সামাজিক বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনা সহ্য করেও তারা টিকে আছে। যারা জুতা তৈরি, মেরামত বা বুট পালিশের কাজ করেন, তাদের মধ্যে বিভিন্ন পদবি দেখা যায়। যেমন—মুচি, চামার, ঋষি, রবিদাস, মেঘওয়াল, সৎনামী, দাস, অন্ত্যজ প্রভৃতি। একই ধরনের পেশায় যুক্ত হলেও এসব সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সামাজিক রীতি-নীতি অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। ফলে তাদের মধ্যে আত্মীয়তা বা সামাজিক যোগাযোগ সীমিত থাকে। এই বিভক্ত অবস্থার কারণে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব অর্জনও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে ‘হরিজন’ পরিচয়ের আওতায় থাকা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যেও নানা পদবি ও সামাজিক বিভাজন বিদ্যমান। ডোম, হাড়ি, বাল্মিকী, বাঁশফোর, লালবেগী, হেলা, ভক্তসহ বিভিন্ন সম্প্রদায় একই ধরনের পেশায় নিয়োজিত হলেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখে। ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ঐক্য গড়ে তোলা কঠিন হয়ে ওঠে। আদিবাসী পরিচয় নিয়েও দেশে-বিদেশে নানা বিতর্ক রয়েছে। সাধারণভাবে যারা প্রাচীনকাল থেকে নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করে নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনধারা বজায় রেখেছে, তাদের আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশে সরকারিভাবে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী’ বা ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী এসব জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, প্রথা ও সামাজিক কাঠামো একে অন্যের থেকে ভিন্ন। সমতলে সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, রবিদাসসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বসবাস করে। অন্যদিকে ময়মনসিংহ অঞ্চলের গারো জনগোষ্ঠী নিজেদের ‘আচিক’ পরিচয়ে পরিচিত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীরও স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই পদবির মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ, আবার কোথাও আত্মীয়তার নিজস্ব নিয়ম বিদ্যমান। এসব সামাজিক রীতিনীতি তাদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করলেও বৃহত্তর ঐক্যের পথে কিছু বাধা তৈরি করে। সমাজে আবার এমন একটি অংশ রয়েছে যারা নিজেদের সংখ্যালঘু পরিচয়ে চিহ্নিত করেন, কিন্তু দলিত, আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত মনে করেন না। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরও বৈচিত্র্য ও বিভাজন সৃষ্টি হয়। অনেকের মতে, এই বিভাজন শাসন ও নিয়ন্ত্রণকে সহজ করে তোলে। প্রশ্ন হলো, এই ধরনের বিভক্তি কি সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ বয়ে আনে? বাস্তবতা হলো, বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সমর্থনের ঘাটতি তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নকে দুর্বল করে। ফলে তারা প্রায়ই উন্নয়নের মূল ধারা থেকে পিছিয়ে থাকে এবং বঞ্চনার শিকার হয়। এই পরিস্থিতিতে পারস্পরিক দোষারোপ না করে সংলাপ, সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। বিভিন্ন পরিচয় ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান বজায় রেখেও সাধারণ স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করা সম্ভব। সামাজিক ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংহতি আরও জোরদার করা জরুরি। [লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: সুবিধার প্রবাহ বাড়লেও আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতায় রয়ে গেছে বড় প্রশ্ন

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ পরিচালিত হয় এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৬ হাজার ৯৩টি এবং এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৮৯৮ জন। দেশের মোট শিক্ষার্থীর বিশাল অংশ এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করে। রাষ্ট্রও এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার বা এমপিও ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার বড় একটি অংশ বহন করে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকার বেতন-ভাতা, উৎসব বোনাস ও অন্যান্য সুবিধাও বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- সুবিধা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কি আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? নাকি সরকারি অর্থের প্রবাহ বাড়লেও নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার জায়গাটি এখনও রয়ে গেছে দুর্বল ও অবহেলিত? একটা সময় ছিল, যখন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবন ছিল সীমাহীন আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভরা। মূল বেতন ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো সুবিধা ছিল না বললেই চলে। বাড়িভাড়া ভাতা ছিল নামমাত্র, চিকিৎসা ভাতা ছিল অপ্রতুল, খুবই নগণ্য হারে উৎসব ভাতা দেয়া হতো, ছিল না বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের সুবিধাও। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, দেন-দরবার, মানববন্ধন, স্মারকলিপি এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক দাবির মুখে সরকার ধীরে ধীরে এ খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত কোনো বেতন স্কেল ছিল না। তৎকালীন পাকিস্তান আমলে তারা সরকারি কোষাগার থেকে স্বল্প পরিমাণ মাসিক ভাতা পেতেন। স্বাধীনতার পর ভাতার পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও দীর্ঘদিন একই পদ্ধতি বহাল ছিল। ১৯৭৭ সালে শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকরা প্রথমবারের মতো জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় আসেন ১৯৮০ সালে। সে সময় থেকেই তারা মূল বেতনের শতকরা ৫০ ভাগ সরকারি তহবিল থেকে পাওয়া শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এমপিও প্রথা চালু হয় এবং সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। ধীরে ধীরে সরকারি অংশও বৃদ্ধি পেতে থাকে- সরকার ১৯৮৪ সালে ৬০ শতাংশ, ১৯৮৬ সালে ৭০ শতাংশ, ১৯৯৫ সালে ৮০ শতাংশ, ২০০০ সালে ৯০ শতাংশ এবং ২০০৬ সালে এসে ১০০ শতাংশ মূল বেতন প্রদান শুরু করে। এটি ছিল বেসরকারি শিক্ষকদের দীর্ঘ সংগ্রামের একটি বড় অর্জন। বিভিন্ন সময়ের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালে চালু হয় অবসর সুবিধা ও উৎসব ভাতা। শুরুতে মূল বেতনের ২৫ শতাংশ হারে উৎসব ভাতা প্রদান করা হলেও বর্তমানে তা ৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এমনকি এটিকে ১০০ শতাংশে উন্নীত করার বিষয়েও সরকারের নীতিগত চিন্তাভাবনা রয়েছে। ২০১৮ সালের জুলাই থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও সরকারি কর্মচারীদের মতো নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেতে শুরু করেন। পাশাপাশি প্রতি বছরের জুলাই মাসে মূল বেতনের ১০ শতাংশ হারে বিশেষ সুবিধাও তাদের বেতনে যুক্ত হচ্ছে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর সম্প্রতি বাড়ি ভাড়া ভাতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত নভেম্বর থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের ৭.৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া ভাতা পাচ্ছেন, যা আগামী জুলাই থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২১ এবং ২০২৫-এর মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীদের টাইমস্কেল সুবিধা চালু করা হয়েছে; পদোন্নতি ব্যবস্থাও তুলনামূলক সহজ করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এসব পদক্ষেপ শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করেছে এবং শিক্ষকতা পেশাকে কিছুটা হলেও মর্যাদার জায়গায় নিয়ে গেছে। কারণ একজন আর্থিকভাবে অনিরাপদ শিক্ষক থেকে কখনও মানসম্মত শিক্ষা আশা করা যায় না। শিক্ষক যদি ন্যূনতম মর্যাদা ও আর্থিক স্বচ্ছলতা না পান, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার ভিতও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই সরকারের এসব উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে, যা খুব কমই আলোচনায় আসে। সরকার যখন হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াচ্ছে, তখন এই আর্থিক সুবিধার বিপরীতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি সরকারি আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে?সরকারের প্রাপ্য ভ্যাট, ট্যাক্স ও আয়কর কি যথাযথভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে? শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে আদায়কৃত অর্থের স্বচ্ছ হিসাব কি সংরক্ষিত হচ্ছে? বাস্তবতা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তরগুলো আশাব্যঞ্জক নয়। সরকার ২০২৩ সালে ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিসংক্রান্ত নীতিমালা’ প্রণয়ন করে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত সরকারি আর্থিক বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত সব ধরনের ফি ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করার নির্দেশনা রয়েছে; নগদ অর্থ গ্রহণ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে বলা হয়েছে, এক খাতে আদায়কৃত অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করা যাবে না এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ভ্যাট ও আয়কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টিউশন ফি নীতিমালা-২০২৪’-নীতিমালায়ও একই ধরনের নির্দেশনা রয়েছে। এ নীতিমালায় মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ২৫টি এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৬টি খাত অর্থ আদায়ের জন্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে- মাসিক বেতন, ভর্তি ফি, পরীক্ষার ফি, ম্যাগাজিন ফি, পরিচয়পত্র ফি, দরিদ্র তহবিল, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ফি, রোভার স্কাউট, বিএনসিসি প্রভৃতি। এতেও খাতভিত্তিক হিসাব সংরক্ষণ ও ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্ধারিত খাতের বাইরেও বিভিন্ন নামে সৃষ্ট খাতে ফি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সব খাতের টাকা এক বা দুইটি ব্যাংক হিসাবের মধ্যেই ঘুরপাক খায়। পৃথক হিসাব রেজিস্টার বা ক্যাশবই নিয়মিত সমন্বয় না করার ফলে কোন খাতে কত টাকা আদায় হলো, কত ব্যয় হলো, কত অবশিষ্ট আছে- তার সুনির্দিষ্ট হিসাব অনেক সময় পাওয়া যায় না। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য সংগৃহীত অর্থ, ম্যাগাজিন প্রকাশের অর্থ কিংবা সহশিক্ষা কার্যক্রমের অর্থ অনেক সময় কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে ম্যাগাজিন প্রকাশ হয় না, নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয় না, সাংস্কৃতিক চর্চাও হারিয়ে যায় আনুষ্ঠানিকতার ভিড়ে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকারের প্রাপ্য ভ্যাট ও কর আদায়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের নীরব অনিয়ম চলমান। বিভিন্ন পণ্য ও সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ৫-১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট পরিশোধের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কর্তনেরও নিয়ম আছে। কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব নিয়ম কার্যত উপেক্ষিত। বিভিন্ন উন্নয়ন ব্যয় কিংবা অবকাঠামো নির্মাণে চচজ নীতিমালা অনুসরণ করা হয়না। এমনকি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিভিন্ন সম্মানির ক্ষেত্রেও উৎসে কর কর্তনের সংস্কৃতি প্রায় অনুপস্থিত। পাবলিক পরীক্ষার প্রত্যবেক্ষণ, পরীক্ষা কমিটির কাজ, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন কিংবা ব্যবহারিক পরীক্ষার দায়িত্ব পালনের বিপরীতে শিক্ষকরা যে সম্মানি পান, সেখান থেকেও নিয়ম অনুযায়ী উৎসে আয়কর কর্তনের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে তা অনুসরণ করা হয় না। ফলে বছরের পর বছর বিপুল অঙ্কের সম্ভাব্য রাজস্ব কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সম্প্রতি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিভিন্ন পরিদর্শনে ১ম দফায় ৪৭১ জন ও ২য় দফায় ২৬২ জন জাল সনদধারী শিক্ষকের তালিকা প্রকাশ করেছে। এর আগে ২০২৩ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৬৭৮ জন জাল সনদধারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান ও পরিচালনা কমিটির যথাযথ তদারকির অভাবে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশ্রয় কিংবা যোগসাজশে জাল সনধধারী শিক্ষকরা সরকারের বিপুল অর্থ অবৈধভাবে গ্রহণ করেছেন। এখন তাদের এমপিও ও অবসর সুবিধা বাতিলের প্রস্তাব করা হলেও বাস্তবে তা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডিকে ঘিরেও দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, ¯ে^চ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বাস্তবে এসব কমিটি অনেক ক্ষেত্রে একটি প্রায় স্বায়ত্তশাসিত ক্ষমতা কাঠামো হিসেবে পরিচালিত হয়। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, বরখাস্ত, বাজেট প্রণয়ন, আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাদের প্রভাব থাকে নিরঙ্কুশ। তাত্ত্বিকভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসন এসব কমিটির কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব পালন করলেও মাঠপর্যায়ে সেই নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি অনেক সময় সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি কার্যত ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ক্ষমতার বলয়ে পরিণত হয়, যেখানে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি বা রাজনৈতিক প্রভাবই মুখ্য হয়ে ওঠে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে এসব কমিটির গঠন ও ক্ষমতার ভারসাম্যও পরিবর্তিত হয়। এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। শিক্ষক রাজনীতি, দলীয় আনুগত্য এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শিক্ষার পরিবেশ ও মান- উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি করে। এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও আর্থিক শৃঙ্খলার গভীর দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর অনেক সময় পরিদর্শন ও প্রতিবেদন তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু অনিয়ম প্রতিরোধ, আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কিংবা জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য যে শক্তিশালী ও কার্যকর তদারকি কাঠামো প্রয়োজন, বাস্তবে তার ঘাটতি এখনও স্পষ্ট। রাষ্ট্র যখন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াচ্ছে, তখন একইসঙ্গে প্রয়োজন আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। খাতভিত্তিক ব্যাংক হিসাব বাধ্যতামূলক করা, ডিজিটাল আর্থিকব্যবস্থাপনা চালু করা, নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করা এবং ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধে কঠোর নজরদারি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজনে শিক্ষা প্রশাসন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মধ্যে সমন্বিত তদারকি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কারণ শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ কেবল ব্যয় নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাষ্ট্রের বিনিয়োগ। সেই বিনিয়োগের প্রতিটি টাকার সঠিক ব্যবহার এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান- সবার যৌথ দায়িত্ব। অন্যথায় সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও আর্থিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন থেকেই যাবে, আর সেই প্রশ্নের ভার শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকেই। (লেখকদের নিজস্ব মত) [লেখকদ্বয় শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ সিভিল এডুকেশন সার্ভিস বিষয়ক থিংকার্স প্ল্যাটফর্ম দি অ্যাডভাইজর্স-এর সদস্য]

গ্রামে ঈদ এবং কোরবানির চামড়া

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব কোরবানির ঈদের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। তবে গ্রামেগঞ্জে এখনো এর আমেজ রয়ে গেছে। রাস্তা ঘাটে হাজার হাজার তরুণ তরুণীর অবাধ চলাফেরা, হোন্ডার পিঠে চেপে  ছুটছে এদিক ওদিক। চারদিকে হর্ণ বাজছে নিরন্তর। ধীরে ধীরে গ্রামও হয়ে উঠেছে যান্ত্রিক শহুরে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিজলি বাতি, চা, কফির দোকান হয়েছে, চলছে অন্তহীন আড্ডা। এখন জাতীয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাঠশালা এগুলো। বাহ্যিক ভাবে দেখলে মনে হবে, মানুষ ভাবলেশহীন, নির্ভার প্রাণোচ্ছল জীবন কাটাচ্ছে। নিত্য দুর্ঘটনা মাথায় নিয়ে যন্ত্রচালিত দ্বিচক্রযানে সয়লাব হয়ে গেছে সারাদেশ। এর সহজলভ্যতা যদি উন্নয়নের মাপকাঠি হয় তবে  বর্তমান বাংলাদেশ নিশ্চয় একটা উন্নত দেশ। বলা যায়, ঘরে ঘরে জনপ্রতি একটি হোন্ডার দেশ। একসময় গণচীনকে বলা হত, যত মানুষ তত বাইসাইকেলের দেশের আরেক নাম মহাচীন।২.ঈদের পরে গ্রামজুড়ে একটা করুণ চিত্র দেখলাম। পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থোকা থোকা পড়ে আছে জবাই করা গোরুর চামড়া। দুয়েকজন গ্রাম্য ছোট ক্রেতা চামড়া কিনতে আসলেও খুব বেশি আগ্রহভরে নয়। এসে দাম বলতেও নারাজ ভাব প্রদর্শন করছে। যেন এটা মূল্যহীন এক পঁচনশীল বস্তু। হয় সামান্য দামে বিক্রি করুন অথবা দুর্গন্ধময় পরিবেশ সৃষ্টি করন। চোখের সামনে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার গোরুর চামড়া নিয়ে গেল ৫শ’ টাকায়। তা-ও ক্রেতার দয়ার বদৌলতে বাড়ির আঙিনার পরিবেশকে বাসযোগ্য করা গেল। ফলে ক্রেতা অল্প পুঁজিতে অনেক সংখ্যক চামড়া ক্রয় করতে সক্ষম হলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, সে ক্রয়কৃত চামড়াগুলোতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ লবন সংযোগ না করে অপেক্ষাকৃত বড় ক্রেতার জন্যে বসে থেকে চামড়ার গুণাবলি নষ্ট করে ফেলেছে। ফলে ছোট চামড়া ব্যবসায়ীরা প্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পথে পড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চামড়া নিয়ে বিড়ম্বনার চিত্র ভেসে আসছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোনো এক এলাকায় কোরবানির অসংখ্য  চামড়া ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেওয়ার সংবাদ পড়ে বেদনার্ত হলাম। অবস্থা যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে মনে হয়, আগামী দিনগুলোতে গোরুর দাম ক্রমাগত বেড়ে চলবে আর বিপরীতক্রমে চামড়ার মূল্য ২০০/১০০ টাকায় নেমে আসবে। এবং মানুষ হতাশ হয়ে বিক্রি না করে এগুলোকে মাটিতে সমাধিস্থ করে দিবে।৩.পশুর চামড়ার ভাগ্যে পাটের পরিণতির ভয়ংকর চিত্রকল্প দিব্য চোখে ভাসছে। একসময় এ পূর্ববঙ্গ পরিচিত ছিল সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে। এদেশের পাটের খ্যাতি ছিল বিশ্বব্যাপী। এদেশ থেকে পাট নারায়ণগঞ্জ হয়ে নৌপথে  ইংল্যান্ডের ডান্ডিতে পৌঁছে যেত। কথিত আছে বৃটিশরা রেলপথ আবিষ্কার করেছিল মূলত পাট পরিবহনের জন্যে। দুনিয়ার বাহারি বস্ত্র আর পাটজাত পণ্য তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ছিল এই সোনালি আঁশ। এদেশেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে পৃথিবীর সেরা পাটকল আদমজী। এর লভ্যাংশ দিয়ে গড়ে উঠেছিল লতিফ বাওয়ানী, করিম, ইউএমসি’র মতন আরও অনেক  বিখ্যাত জুটমিলস। কালক্রমে পাটের গুরুত্ব কমে যায়, জাতীয়করণ নীতি, শ্রমিক ফেডারেশন/ ইউনিয়নের অপ রাজনীতি, সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়া, আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি,পাটের বিকল্প দ্রব্য সৃষ্টি হওয়া এসব নানাবিধ কারণে দেশের পাট এবং পাট-শিল্পের অপমৃত্যু ঘটে।একই কথা শোনা গেল সরকারের একজন মন্ত্রীর মুখ থেকেও। চামড়ার মূল্যহীনতা বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘এটা আমার কাজ নয়, আমার কাজ জবাইয়ের আগের। আমি প্রাণিসম্পদ’। তিনি আরও বলেছেন, ‘পৃথিবীতে চামড়ার বিকল্প সিনথেটিক জাতীয় দ্রব্যের চাহিদা বেশি থাকায় এর উপযুক্ত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না'। এতে দেখা গেল, পাটের সঙ্গে এর একটা অদ্ভুত ও চমৎকার মিল আছে। পাট শিল্পের মতো চামড়াও বিশ্ববাজারের আধুনিক  প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে যাচ্ছে। অথচ এদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্য বলতে একসময় পাটের পরে চামড়ার নাম ছিল। বর্তমানে পোশাকশিল্পের কথা বাদ দিলে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ শতকোটি ডলার আয় করতে পারতো। চামড়া বা লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর অধিকতর জোর দেয়া হতো। বলা বাহুল্য, বর্তমান সরকার ঈদের আগে কোরবানির চামড়ার ফুট প্রতি একটা মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এতে শহরে এবং গ্রামের সর্বনিম্ন দাম বলা হয়েছিল। কোনো কিছুই কাজ করেনি চামড়ার সঠিক মূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে। বিগত কয়েক বছর ধরে যে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত ছিল কোরবানির চামড়া এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। একটা ˆদনিক পত্রিকার সংবাদে প্রাপ্ত এমন তথ্য যে, ‘এক কাপ চায়ের দামে মিলেছে ছাগলের কাঁচা চামড়া। দেশের কিছু এলাকায় কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয়ের কোনো ক্রেতাই পাওয়া যায় নি।  বিক্রি করতে না পেরে শত শত কাঁচা চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা ঘটেছে’।৪.চামড়ার মূল্য বিপর্যয়ের এমন দুর্বিষহ অবস্থার জন্যে দায়ী কে? সাধারণ মানুষ কাকে দায়ী করবে, তারা যাবে কোথায়? জানা যায়, এবারে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় তারল্য সংকটের কারণে। ট্যানারি কারখানাগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর কোনো না কোনো অযুহাতকে সামনে নিয়ে এসে দাঁড়ায়। তারা বলছে, ব্যাংক থেকে তারা প্রয়োজনীয় টাকা ঋণ হিসেবে পায়নি। পূর্বের তুলনায় এক চতুর্থাংশ টাকাও ব্যাংক সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে গ্রাম পর্যায়ে তারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে অর্থ সরবরাহ করতে পারেনি। দেশের মানুষও চামড়ার যথোপযুক্ত দাম পায়নি। এখন বাজেট প্রনয়ণ ও ঘোষণার সময় সরকার বাজেট নিয়ে ত্রস্তব্যস্ত। বড় বাজেটই সব। কোরবানির আগেই চামড়া বাঁচানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি ছিল বলে সচেতন সমাজ মনে করে। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রনালয় থেকে যথেষ্ট পূর্বেই সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা করা হয়নি। ফলে সারা দেশে বিপুল সংখ্যক কাঁচা চামড়ার এমন অপচয় ও অবর্ণনীয় আর্থিক ক্ষতি হলো। এটা ব্যক্তিক নয় জাতীয় ক্ষতি। এর দায় সরকারকে নিতে হবে এবং দিন শেষে সবই সরকারের ক্ষতি। সাধারণ মানুষের নয়।সরকার আসে সরকার যায়। মানুষ একবুক আশা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। এবার নতুন কিছু হবে, আমূল পরিবর্তন আসবে। জনপ্রশাসনে, নীতিতে, শাসণে, সুশাসনের সর্বত্র মঙ্গলছায়ায় জনসাধারণ সিক্ত হবে। এটা বেশি কিছু চাওয়া নয়, খুব স্বাভাবিক চাওয়া। মানুষ গতানুগতিক ধারা থেকে বের হতে চায়। এটাও মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। এদেশে অনেকদিন যাবৎ একই ধারার সমাজ বাস্তবতা, রাজনীতি, অর্থনীতি আর অপ-সংস্কৃতি চলমান আছে। মানুষ এই বৃত্ত থেকে বের হয়ে বাইরের  জগতের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হতে চাইবে, এটা কোনো অভিনব বিষয় নয়।৫.দেশে উৎপাদিত কাঁচা চামড়াকে বাঁচাতে হবে, জরুরি রপ্তানিতে কাজে লাগাতে হবে। চামড়াজাত পণ্য জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ছাড়াও নানা প্রকার অভিজাত দ্রব্যাদি তৈরিতে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। ট্যানারি শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ঈদুল আজহার মৌসুমের পর্যাপ্ত কাঁচা চামড়ার সঠিক ব্যবহার করতে না পারা রাষ্ট্রীয় ও জাতীয়  ব্যর্থতার শামিল হবে। সিন্ডিকেট করে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করা যায় না। এটা পাপের পর্যায়ে পড়ে। তাছাড়া কোরবানির চামড়ার মূল্যের প্রকৃত মালিক হল সমাজের গরিব, মিসকিন, অসহায় মানুষ। তারাই এর হকদার। এদেরকে ঠকানোর অর্থ ধর্মীয় বিধান ও অনুশাসনকে অমান্য করা। এ বিষয়ে দলমতের ঊর্ধে ওঠে সকলকে সোচ্চার হতে হবে, সচেতন হতে হবে। চোখের সামনেই পশুর চামড়াজাত পণ্যে সারা দুনিয়া চলছে। মানুষের হাতে হাতে এ-সব পণ্য। বিজ্ঞান প্রযুক্তির উৎকর্ষতার চূড়ান্ত পর্যায়েও পৃথিবীর দেশে দেশে আভিজাত্যের প্রতীক মানে চামড়ার তৈরি ব্যবহার্য জিনিসপত্র। সেখানে এদেশে কাঁচা চামড়াকে অপ্রয়োজনীয় বস্তুতে পরিণত করে ভাগাড়ে ফেলে দেয়া কী স্বাভাবিক কোনো ঘটনা? কাজেই একটুও বিলম্ব না করে, সরকারকে এখনই ভাবতে হবে, কোরবানি থেকে পাওয়া কোটি কোটি কাঁচা চামড়ার ভবিষ্যৎ সদ্ব্যবহার কেমন করে  হবে?[লেখক: গল্পকার]

ইন্দো-প্যাসিফিকে শক্তির নতুন সমীকরণ: সর্বোচ্চ উচ্চতায় ভারত-অস্ট্রেলিয়া প্রতিরক্ষা জোট

​ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দ্রুত বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দুই দেশই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, এই অংশীদারিত্ব এখন শুধু সাধারণ কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, বরং কৌশলগত নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ভারত–অস্ট্রেলিয়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সংলাপে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানো, প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ বিনিয়োগ এবং ইন্দো-প্যাসিফিকে নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ এবং অস্ট্রেলিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মারলেসের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে স্পষ্ট হয়েছে যে, দুই দেশের কৌশলগত জোট এখন এই অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণের বড় হাতিয়ার হয়ে উঠছে।​বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের পর থেকে দুই দেশের এই সম্পর্কের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। যৌথ সামরিক মহড়া, নৌ-সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের মতো সব ক্ষেত্রেই দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে। এই সংলাপ এখন দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, বাণিজ্য রুট এবং সামরিক ভারসাম্য—সবকিছুই এখন এই অঞ্চলের ওপর নির্ভর করছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার এমন ঘনিষ্ঠতা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।​অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকেও এই সম্পর্ক নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো বার্তা দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে অস্ট্রেলিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মারলেস বলেন, "ভারত ও অস্ট্রেলিয়া এখন কখনও এতটা কৌশলগতভাবে একমত ছিল না।" তার এই মন্তব্যকে বিশেষজ্ঞরা শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ভাষা হিসেবে দেখছেন না, বরং একে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি পরোক্ষ অবস্থান হিসেবেই বিবেচনা করছেন। ​বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে—বিশেষ করে যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে। এতে শুধু দুই দেশের নিরাপত্তাই বাড়বে না, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি শক্তিশালী বিকল্প শক্তি গড়ে উঠবে। সব মিলিয়ে, ভারত–অস্ট্রেলিয়া প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন আর শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে, যা আগামী দিনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।

ব্যাংক সংস্কার নাকি পুরনো মালিকদের পুনর্বাসন?

কিছুদিন আগে সংসদে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন সাবেক মালিকরা, তাও তুলনামূলক সহজ শর্তে। ফলে নতুন সরকারের এই পদক্ষেপকে অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাংক সংস্কার উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখছেন।ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণ এবং একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেয়ায় ওয়াকিবহাল মহলে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল যে বিএনপি সরকার সম্ভবত পুঁজি-লুটেরা ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের পথে হাঁটতে যাচ্ছে। সম্প্রতি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ইসলামি ধারার পাঁচ ব্যাংকের একীভূত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি তিনি এ-ও জানিয়েছেন, নামমাত্র শর্তে পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ দেয়া হবে না।তবে ব্যাংক উদ্যোক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সংশোধিত আইনের ধারায় যাঁরা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে গেছেন, তাদের ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ নিয়ে তারা শঙ্কিত। তাদের মতে, অতীতে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আবার ফিরে এলে খাতে নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।কারা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে গেছে, তা সাধারণ মানুষও জানে। তাই তাদের ফেরার সুযোগ দেয়া হলে ব্যাংক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমে যেতে পারে। এতে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের আরও গভীরভাবে ভাবা উচিত। যদিও গভর্নর ব্যাংক মালিক-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠকে আশ্বস্ত করেছেন যে সংশোধিত আইনের শর্ত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে সাবেক মালিকদের ফেরার সুযোগ হবে না। একই সঙ্গে পাঁচটি ব্যাংকের চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে।এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। তাহলে সিদ্ধান্তগুলো আরও গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হতো।বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। একদিকে খেলাপি ঋণের পাহাড়, অন্যদিকে মূলধন ও নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতির তীব্র চাপ। এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধিত) আইন’ এবং এর বিশেষ কিছু ধারা নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের মধ্যে। বিশেষ করে, যারা একসময় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ বা লুটপাট করে চলে গেছেন, আইনি ফাঁকফোকরে তাদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ থাকা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো বাংলাদেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এমন সময়ে জবাবদিহির দুর্বলতা প্রকাশ পেলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি গভর্নরকে দেয়া চিঠিতে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সংস্কার প্রস্তাব পেশ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির জন্য মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার আদলে একটি পেশাদার ‘জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে স্থগিতাদেশের অপব্যবহার রোধ ও ফাস্ট-ট্র্যাক রিকভারি বেঞ্চ চালু করা।সংগঠনটি সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহভাতা বন্ধ না করার অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে দক্ষ জনবল ধরে রাখা সম্ভব হয়। ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে স্টক লভ্যাংশের ওপর অতিরিক্ত কর থেকে অব্যাহতি দাবি করেছে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলোকে সরাসরি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে না পাঠিয়ে একটি বিশেষ ‘ট্রান্সফরমেশন ক্যাটাগরিতে রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে।বিএনপি সরকার একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মালিকানা আবার পুরোনো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার সুযোগ রেখে আইন তৈরি করেছে। এটি একটি ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।১৯৮২ সাল থেকে দেশে বেসরকারি মালিকানায় ব্যাংক স্থাপিত হতে শুরু করে। বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে এখন মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৬১। অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, দেশে এতগুলো ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থে অতীতের সরকারগুলো বিপুলসংখ্যক বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়েছে। বাংলাদেশের ৫৫ বছরে যেসব ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ধনবান হয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশ কোনো না কোনো ব্যাংকের মালিক বা পরিচালক। তারা নিজেদের ব্যাংক থেকে খুব বেশি ঋণ নিতে না পারলেও একে অন্যের ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এভাবে তারা দেশের ব্যাংকঋণের ওপর প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশের খেলাপি ঋণের বড় অংশ তাদের কাছেই আটকে রয়েছে।বাংলাদেশের অধিকাংশ ধনকুবেরের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকের মালিকানা-বিতরণ ছিল সেই পৃষ্ঠপোষকতার অন্যতম মাধ্যম।সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ মোট ব্যাংকঋণের বড় অংশ। এই বিপুল খেলাপি ঋণ উদ্ধারের বিষয়ে বর্তমান সরকার কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বিশেষ করে পুরনো মালিকদের ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায়।দেশের দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকিং খাতকে পুনরুদ্ধারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এর মূল লক্ষ্য ছিল অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং দায়ীদের স্থায়ীভাবে মালিকানা থেকে অপসারণ করা। কিন্তু অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেয়ার সময় নতুন ধারা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।সব মিলিয়ে নতুন আইনটি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রক্রিয়াকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।আগের অধ্যাদেশে যেখানে দায়ীদের জন্য কোনো ধরনের ছাড় ছিল না, সেখানে এখন কিস্তিতে মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে এটি ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটে জড়িতদের জন্য এক ধরনের সুবিধা বা প্রণোদনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।নতুন আইনের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের নিয়ে ব্যাংকপাড়ায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। খাতসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা সতর্ক করে বলেছেন, একবার কোনো ব্যাংক সাবেক মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। যাদের কারণে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের হাতেই আবার নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়া সুশাসনের পরিপন্থী। অতীতে যেসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও ব্যাংককে মূলধন সংকটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে, তারা যদি আবার নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে, তাহলে সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এমনকি আতঙ্কিত হয়ে আমানতকারীরা অর্থ তুলে নেয়ার চেষ্টা করলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।সাবেক মালিকরা পুনরায় নিয়ন্ত্রণে এলে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা কাঠামো এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টিও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি তাদের প্রত্যাবর্তন চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকেও বিঘ্নিত করতে পারে।যেসব ব্যক্তি আগে ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার বা অনিয়মিত ঋণ গ্রহণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা যদি সামান্য অংশ পরিশোধ করে আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরতে পারেন, তবে তা আর্থিক খাতে দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। এতে অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার বদলে দায়ীদের কার্যত পুরস্কৃত করা হবে এবং ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

ভিডিও আরও দেখুন

‘বিশ্বকাপে ডুববে ব্রাজিল, জিতবে ফ্রান্স’

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবার হতাশ করবে। আর ফ্রান্সের জার্সিতে যুক্ত হবে তৃতীয় তারকা। সম্প্রতি এক জরিপে এমনটাই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন অর্থনীতিবিদরা। রয়টার্সের করা এই জরিপে অংশ নিয়েছেন বিশ্বের ১৬০ জন অর্থনীতিবিদ।যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট আর মুদ্রাস্ফীতির হিসাব করতে করতে একটু বিরতি নিয়েছেন তাঁরা। ফুটবল নিয়ে মেতে উঠেছেন। আর সেই মেজাজেই দিয়েছেন ভবিষ্যদ্বাণী।১১ মে থেকে ৫ জুনের মধ্যে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সকে চ্যাম্পিয়ন করতে চান। অল্প ব্যবধানে দ্বিতীয় স্থানে আছে স্পেন- ৩১ শতাংশ ভোট পেয়েছে তারা।তালিকায় পরের দলগুলো হলো- বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল ও ইংল্যান্ড।লন্ডনের এক সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ক্যাথাল কেনেডি বলেন, ‘২০২২ সালের ফাইনালে হারার পর ফ্রান্স এবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য খুব ভালো দল গড়েছে।’তিনি আরও বলেন, ‘গত বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলা অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা সেরা ফর্মে আছেন। এর সঙ্গে পিএসজির দারুণ সব তরুণ খেলোয়াড় যুক্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, টুর্নামেন্টে একজন ফুরফুরে কিলিয়ান এমবাপেকে পাবে ফ্রান্স।’জরিপের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ফল ব্রাজিলের জন্য। এক-তৃতীয়াংশ অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, বড় দলগুলোর মধ্যে ব্রাজিলই এবার সবচেয়ে বেশি হতাশ করবে।বিখ্যাত কোচ কার্লো আনচেলত্তি দায়িত্ব নেওয়ার পরেও দলটির প্রতি আস্থা বাড়েনি। গত বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরেছিল ব্রাজিল।এই জরিপে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় (গোল্ডেন বল) ও সর্বোচ্চ গোলদাতা (গোল্ডেন বুট)—দুই পুরস্কারের দাবিদার কিলিয়ান এমবাপে। তিনি ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে পেছনে ফেলে শীর্ষে আছেন।দুজনের সামনেই বড় রেকর্ড গড়ার সুযোগ। বিশ্বকাপে এমবাপের গোল ১২টি, কেইনের ৮টি। জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজার সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ড ভাঙার লড়াইয়ে আছেন তারা।নরওয়েকে চমক দেখানোর দাবিদার মনে করছেন ২১ শতাংশ অর্থনীতিবিদ। এই তালিকায় ১৫ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে জাপান।জরিপে ২ শতাংশ জাপানকে, ১ শতাংশ মেক্সিকোকে এবং ১ শতাংশ মরক্কোকে চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছেন। ৭৩ শতাংশ মানুষ স্বীকার করেছেন, প্রিয় দলের প্রতি টান থেকেই তাঁরা ভোট দিয়েছেন।মাঠের লড়াই যতই রোমাঞ্চকর হোক না কেন, দর্শকদের পকেটে তা চাপ ফেলবে নিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজিত এবারের বিশ্বকাপ হচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। ৪৮ দল খেলবে ১০৪টি ম্যাচ।টিকিটের চড়া দাম, হোটেল ভাড়া ও আন্তঃদেশীয় বিমান ভাড়া দর্শকদের ইতিমধ্যেই দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।জরিপে অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশের বেশি অর্থনীতিবিদ বলেছেন, ফুটবল বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ভবিষ্যদ্বাণীর চেয়ে মুদ্রাস্ফীতির হিসাব করা সহজ।তুরস্কের এক ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ওজান জান তুর্কমেন বলেন, ‘আমরা অন্তত নিশ্চিতভাবে জানি বিশ্বকাপ কবে শেষ হবে। কিন্তু জ্বালানি সংকট বা মুদ্রাস্ফীতি কবে শেষ হবে, তা কেউ জানে না।’

‘বিশ্বকাপে ডুববে ব্রাজিল, জিতবে ফ্রান্স’
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৮২ জন