সংবাদ
কারাগারে বসেই ‘এসপি-সার্জেন্ট’ হওয়ার ছক

কারাগারে বসেই ‘এসপি-সার্জেন্ট’ হওয়ার ছক

অটোরিকশার ব্যাটারি নিলামের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে জালিয়াত চক্র পুলিশের ওয়াকিটকি, ভিজিটিং কার্ড ও লোগো ব্যবহার করে চলত সাজানো নাটকঅপরাধের ধরন বদলে গেছে অবিশ্বাস্যভাবে। একসময়ের দুর্ধর্ষ ডাকাত ও ছিনতাইকারীরা এখন জেলের ভেতরে বসেই রপ্ত করছে প্রতারণার নতুন নতুন পাঠ। কারাগারে সাধারণ অপরাধীদের সাথে দেখা করে তারা তৈরি করছে বিশাল সিন্ডিকেট। এরপর জামিনে বেরিয়েই বদলে ফেলছে খোলস।ঢাকা ছেড়ে খুলনায় আস্তানা গেড়ে কখনো এসপি, কখনো ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আবার কখনো হাইওয়ে সার্জেন্ট সেজে সাধারণ মানুষের সাথে মেতে উঠছে কোটি টাকার প্রতারণায়। এমনই এক সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই চক্রটি নিজেদের বিশ্বস্ততা বাড়াতে পুলিশের ওয়াকিটকি, লোগো এবং পুলিশের নাম সম্বলিত ভিজিটিং কার্ড ব্যবহার করে আসছিল। এমনকি ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করত খুলনা বয়রা পুলিশ লাইন্সের নাম। তবে তাদের আসল আস্তানা ছিল শহরের নামী দামী আবাসিক হোটেলের বিলাসবহুল রুম। সেখানে বসেই তারা জালিয়াতির জাল বুনত। মূলত পুলিশের হাতে জব্দ হওয়া অটোরিকশার ব্যাটারি নিলামে কম দামে বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে রিকশা মালিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়াই ছিল তাদের প্রধান কাজ।ঘটনার সূত্রপাত হয় খুলনা জেলার সোনাডাঙ্গা থানাধীন শেখপাড়ার বাসিন্দা ও পেশায় পিকআপ চালক শুক্কর আলীর একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে। শুক্কর আলীর সাতটি অটোরিকশা রয়েছে যা তিনি ভাড়া দেন। গত ৮ জানুয়ারি তার এক চালক আরিফের সাথে পরিচয় হয় কথিত এক হাইওয়ে সার্জেন্টের। সেই ব্যক্তি নিজেকে তরিকুল ইসলাম পরিচয় দিয়ে একটি ভিজিটিং কার্ড দেন এবং জানান যে, পুলিশ লাইন্সে নিলামে কম মূল্যে ব্যাটারি বিক্রি করা হবে। সরল বিশ্বাসে শুক্কর আলী ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে তাকে আশ্বস্ত করা হয় এবং অগ্রিম হিসেবে বিকাশে ৩ হাজার টাকা দিতে বলা হয়।পরদিন ৯ জানুয়ারি তাকে সোনাডাঙ্গার আল ফারুক মোড়ে আসতে বলা হয়। সেখানে যাওয়ার পর আরেকজন নিজেকে পুলিশ পরিচয় দিয়ে ফোন করে একটি চালানের কপি নেওয়ার জন্য ৮২ হাজার টাকা দাবি করেন। শুক্কর আলী সেই টাকা পরিশোধ করে বয়রা পুলিশ লাইন্সের সামনে ব্যাটারি পাওয়ার আশায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর ওই সার্জেন্ট পরিচয়ধারী ব্যক্তি আরও টাকা দাবি করলে শুক্কর আলীর সন্দেহ হয়। এক পর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন তিনি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের কবলে পড়েছেন।এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী দ্রুত খুলনা জেলা পিবিআই অফিসে লিখিত অভিযোগ জানান। পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোস্তফা কামালের দিক-নির্দেশনায় এবং জেলা ইউনিট প্রধান এসপি রেশমা শারমিনের পরিকল্পনায় একটি বিশেষ টিম মাঠে নামে। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে গত ১২ জানুয়ারি মাগুরার ‘রয়েল আবাসিক হোটেল’ থেকে এসএম শাহিন, নাজমুল হাসান ও ওবায়েদুল বিশ্বাস নামের তিন প্রতারককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৪টি মোবাইল ফোন, একটি ওয়াকিটকি, পুলিশের লোগো সম্বলিত ফরম এবং তরিকুল ইসলাম নামীয় ভুয়া ভিজিটিং কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা ও খুলনার এসপি রেশমা শারমিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “এই চক্রের সদস্যরা মূলত ঢাকার আশুলিয়া ও সাভার এলাকার দুর্ধর্ষ ডাকাত এবং ছিনতাইকারী। তারা এর আগে ডাকাতি মামলায় জেলও খেটেছে। কারাগারে বসেই তারা পরিকল্পনা করে যে, জামিনে বেরিয়ে তারা পেশা বদলে প্রতারণা শুরু করবে। তারা খুলনায় এসে পুলিশের বড় কর্মকর্তা ও সার্জেন্ট পরিচয় দিয়ে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করত। কারাগারে বসেই এই জালিয়াতির ছক কষা হয়েছিল।” তিনি আরও জানান, এই চক্রে মোট ৫ জন জড়িত যার মধ্যে ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের ধরতেও অভিযান চলছে। মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সোহানুর রহমান জানান, আসামিরা তাদের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। তারা ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই জালিয়াতি চালিয়ে আসছিল। চক্রটি এতটাই চতুর ছিল যে, তারা পুলিশের প্রতিটি সরঞ্জাম নিখুঁতভাবে তৈরি করে নিয়েছিল। আসামিদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে একাধিক মামলা রয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে অর্থাৎ আগামী মাসেই আদালতে এই চাঞ্চল্যকর মামলার চার্জশিট দাখিল করা হবে। পিবিআই সূত্র জানিয়েছে, পলাতক বাকি দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা গেলে এই চক্রের জাল কতদূর বিস্তৃত তা আরও পরিষ্কার হবে।
৩৪ মিনিট আগে

মতামতমতামত

খাপড়া ওয়ার্ড জেল হত্যা দিবস

শিক্ষাবিদ প্রখ্যাত লেখক ও নোবেল বিজয়ী বারট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, শাসক যদি জনস্বার্থের বিপক্ষে থাকে সেই দেশে মানুষ,আর লেখক শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, যেখানে দেহের মৃত্যুর হিসাব রাখা কিন্তু মনের মৃত্যুর হিসাব রাখা হয়না সেমখানে ভালো মানুষ জন্মেনা। জ্ঞানীরা কোন কিছুকে প্রতিরোধ করে যুক্তি দিয়ে আর মূর্খরা প্রতিহত করে অস্ত্র দিয়ে। সাম্প্রতিককালে সুফি দর্শণের ফকিরদের উপর হামলা হত্যা, কবর থেকে লাশ উঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়াএবং তাদের মাজার ও খানকা ভেঙে দেয়ার ঘটনাই তার জলন্ত উদাহরণ। এ ধরনের পূর্বের ঘটনার কারণে ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহীর জেলখানায় খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল।বাঙালির প্রবাদে বলে ’গড়নের কালে যার ইস্পাত হয় চুরি, বালি দিলে ধার ওঠেনা খালি লোহার ছুরি’ অথবা হয়কাটে ধারে নয়কাটে ভারে’ ৭৬ বছরের ইতিহাসে দুটি বিষয়েরই সত্যতা প্রমানিত হয়েছে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। প্রথমটি ঘটেছে ১৯৭১ সালে পূর্বপাকিস্তানের নিকট পরাজিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আর ২০২৩ সালে এসে রাষ্ট্র হিসেবে দেওলিয়ার পথে পাকিস্তানের গতিপথ রচনা হয়ে। সামরিক শাসন, হত্যা- ক্যুর রাজনীতি পাকিস্তানের পিছু ছাড়ছেনা। জুলাই অভ্যত্থানের পর পাকিস্তানের সেই অচল তত্ব  অনেকেই সামনে আনার চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের  স¦তসিদ্ধ সত্যকে উপেক্ষা করে ধর্মের নাম ব্যবহার করে ১৯৪৭সালে সাধের যে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করেছিলো, সেই  ইসলামী রাষ্ট্রের আসল চরিত্র মানুষের সামনে ফুটে ওঠার কারণে ২২ বছরেই তার মৃতু ঘণ্টা বেজেছিল। ওরা শুধু পূর্ব বাংলার মানুষকে অর্থনৈতিকভাবেই বঞ্চিত করেনি,ভাষা ও সংস্কৃতি কেড়ে নিতে গিয়েছিলো, নারীদের পর্দার অন্তরালে রাখার ব্যবস্থা করেছিল, আজকে যেমনটি করছে আফগান তালেবান ও ইরানি শাসকের । ¯^াধীন মুক্ত চিন্তা ছিলো ওদের তরিকায় নাজায়েজ, এমনকি নারীদের  কপালে টিপ পড়াকে তারা বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল শহীদ মিনারে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, বাংলা নববর্ষ পালন ও বাংলা ভাষাকে ওরা হিন্দুয়ানি ভাষার তকমা দিয়ে তা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল। যারা এহেন কাজের সমালোচনা ও প্রতিবাদ করেছিল তাদেরকেই পাকিস্তান সরকার জেলে ঢুকিয়েছিল, জেলের সেলগুলো ভরেছিল সেই সব মানুষ এবং বামপন্থী নেতাকর্মীদের দ্বারা। বাইরে নির্যাতন যেমন ছিল জেলেও ছিল, তার প্রমাণ ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডের হত্যাকাণ্ড।কারাগার বা জেলখানা প্রত্যেক দেশের সরকারের একটি অতি প্রাচীন ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান। কারাগার ক্রিমিনাল জাস্টিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দেশের অপরাধ দমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। আদালত কর্তৃক প্রমানিত বিভিন্ন অপরাধে অপরাধী ব্যক্তি (কয়েদী) বিচারাধীন বিভিন্ন ব্যক্তি (হাজতি) এমন কি সমাজে নিরাপত্তাহীনতায় অবস্থানকারী মানুষের নিরাপত্তা বিধান করতে পুলিশ সেভ কাস্টোডি এবং জেলখানা গুলি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এটি একটি সংশোধনাগার হিসেবে পৃথিবীতে ব্যবহার হলেও আমাদের দেশে ভিন্ন চিত্র দেখা দেয়। যদিও ২০০৮ সালে বাংলাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় কারা সপ্তাহে (১৭-২৪) কারাগারগুলিকে সংশোধনাগার হিসাবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যাক্ত করেছিল। কারা সপ্তাহের শ্লোগান ছিল ‘রাখিব নিরাপদ দেখাবো আলোর পথ”।বৃটিশ ও পাকিস্তন আমলে তাদের দ্বারা পরিচালিত জেলখানা ও কারাগারগুলি ছিল টর্চার সেল। তাদের অন্যায় কাজের সমালোচনা করা নাগরিক অধিকার আদায়ে আন্দোলন করাকে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগে রাজনীতিকদের ঐ সকল জেলখানার অমানবিক পরিবেশে আটকিয়ে রেখে নির্যাতন চালানো হতো। একই সময় বৃটেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জেলখানাগুলো সংশোধনাগার হিসেবেই ছিল। একজন মানুষ অপরাধ করেছে, সেই অপরাধ করার কারণ কি ? সেটা বের করার জন্য জেলখানাগুলিতে মনোবিজ্ঞানীদের রাখা হতো। সঠিকভাবে কারণ অনুসন্ধান করে তার সমাধান দিত। এইভাবে কাজের মধ্য দিয়ে সমাজে অপরাধ প্রবনতা দুর করার উদ্দ্যোগ নেয়া হতো। অথচ আমাদের দেশের জেলখানাতে ছোটখাট অপরাধী গেলে বড় অপরাধী হয়ে বের হয়ে আসে। ভি, আই, পি, সেলে রাখা হয় দাগী সন্ত্রাসীকে, চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, হত্যাকারীর সাথে রাখা হয় রাজনৈতিক বন্দীদের ফলে পরিবেশগত ক্রুটি ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার জন্য আমাদের দেশের জেলখানাগুলো সংশোধনাগার হিসেবে এখনও গড়ে ওঠেনি। বন্দীদের দেখাশোনা করা বন্দীদের শতভাগ নিরাপত্তা বিধান করা এবং তাদের বিশৃঙ্খল জীবন থেকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রস্তুত করে তোলাই কারা প্রশাসনের মূল দায়িত্ব। তবে এ দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করার উপর লক্ষ্যের বাস্তবায়ন নির্ভর করবে। দুঃখজনক হলেও সত্য এই ভূ-খন্ডে ¯^াধীনতা প্রাপ্তির পরও জেলখানার সেফ কাস্টডিতে নির্মম হত্যা সংগঠিত হয়েছে, বীরের রক্তস্রোতে জেলখানার সেল ভেসেছে। ¯^াধীন পাকিস্তানে ১৯৫০ সালে রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে যেমন ঘটেছে, তেমনি ¯^াধীন বাংলাদেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেও ঘটেছে। প্রথমটি কারা কর্তৃপক্ষের দ্বারা ঘটেছে দ্বিতীয়টি কারা কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতায় ঘটেছে। তবে দুটি ঘটনাই রাষ্ট্রীয় শাসকের ইন্ধনে ঘটেছে।সামরিক সরকারের দ্বারাও জেলখানার বিচার ছাড়া অথবা প্রহসনমূলক বিচারে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ৩রা নভে¤^র জেল হত্যা দিবস সম্পর্কে আমাদের কিছু কিছু ধারণা থাকলেও অনেক ঘটনা সম্পর্কে আমরা জানিনা। বিষয়টি জানাতেই অতীত কিছু ঘটনার আলোকপাত করা দরকার। ১৯৫০ সালের জেলহত্যা দিবস: ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্থান ভাগ হওয়ার পর মুসলিম লীগসহ অনেকেই আনন্দে বলেছিল হাতমে ঘড়ি মুখমে পান, লরকে লেঙ্গে পাকিস্তান, অন্যদিকে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে করকাতার গড়ের মাঠে সমাবেশ করে  বলেছিল ‘লাখো ইনসান ভুখা হায়, ইয়া আজাদী ঝুটা হায়’ এটি বলার তথাকথিত অপরাধে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করাসহ সারাদেশ থেকে তিন হাজারের বেশি কমিউনিস্ট কর্মীদের জেলে ঢুকিয়ে রেখেছিল মুসলীম লীগ সরকার। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে ৩৯ জন বন্দীর ওপর মুসলিম লীগ সরকারের পুলিশ বাহিনীর গুলি বর্ষণে নিহত হয়েছিলেন ৭ জন। বাকিরা সবাই আহত হয়েছিলেন। ঐ সেলে ৩২ জন কমিউনিস্ট বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী বন্দী হিসেবে আটক ছিলেন ১৯৫০ সালের পাকিস্থানের নিরাপত্তা আইনে। ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতী তত্বের ভিত্তিতে ধর্মের আলোকে দেশ বিভাগের বিপক্ষে ছিলেন কমিউনিস্টরা। কোলকাতার গড়ের মাঠে বিশাল সমাবেশ কের কমিউনিস্টরা বলেছিল, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত হয়না, রাষ্ট্র বিজ্ঞানে এটাই বলে।তারা শ্লোগান তুলেছিল লাখো ইনসান ভূখা হায় ইয়াআজাদী ঝুটা হায়। বামপন্থীদের এহেন কার্যক্রমে মুসলিম লীগ সরকার কমিউনিস্ট পাটিকে শুধু নিষিদ্ধই করেনি কমিউনিস্ট কর্মীদের বিনা বিচারে জেলে ভরেছিল। পাকিস্থানের সরকারই শুধু নয় জেল কর্তৃপক্ষ কমিউনিস্ট বন্দীদের অভিহিত করতো  দেশদ্রোহী ভারতের পঞ্চম বাহিনী ও পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৯ টায় তৎকালীন জেল সুপার মি. বিল সাপ্তাহিক জেল পরিদর্শনে আসে, তার সঙ্গে ছিল জেল ডাক্তার, দুই জন ডেপুটি জেলার, হেড ওয়ার্ডরা, জেল কর্মকর্তা ও সিপাহীরা। খাপড়া ওয়ার্ডের বারান্দার জেল সুপারের নিকট ওয়ার্ডের বন্দীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন যশোরের কমরেড আব্দুল হক। জেলে খাদ্যের মান বৃদ্ধি পরিবেশগত উন্নয়নের দাবি জানালে জেলার তাদের ধমক দিয়ে মন্তব্য করে তোমরা দেশদ্রোহী, ভারতের পঞ্চম বাহিনী পাকিস্তানের শত্রু, তোমাদের এর চেয়ে ভাল খাবার দেয়া যাবে না। এই নিয়ে তর্কবির্তকের এক পর্যায়ে মি. বিলের হাতে থাকা বেত দিয়ে বন্দীদের মারতে উদ্যাত হয়। একজন বন্দী বিলের ঐ বেত ধরে ফেলে। ধস্তা ধস্তির এক পর্যায় মি. বিলসহ কয়েকজনকে ওয়ার্ডের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়া হয়। মি. বিল বের হয়ে আসেন এবং খাপড়া ওয়ার্ড তালাবদ্ধ করে পাগলা ঘণ্টা বাজানো হয়। জেলের সিপাহীরা জানালার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে অবিরাম গুলিবর্ষণ করে। রাজবন্দীরা ঘরের ভিতর থেকে নারিকেলের ছোবড়ার গদি, লোহার খাট চৌকি ইত্যাদি খাড়া করে ঘরের দরজা ও জানালা বন্ধ রাখার চেষ্টা করে কিন্তু গুলির নিকট এই প্রতিরোধ ব্যর্থ হয়। নিহত হোন ৭ জন কমিউনিস্ট রাজবন্দী। বাকিরা আহত হয়েছিল, যাদের সংখ্যা ৩২ জন। আহত রাজবন্দীদের চিকিৎসা না দিয়ে পুলিশি নির্যাতন চালানো হয়। রাজশাহীর জেলার তৎকালীন অবাঙালী জেলা প্রশাসক পাকিস্থান নামক শিশু রাষ্ট্রকে যারা ধ্বংস করতে চায়, তাদের প্রতি সঠিক ব্যবহার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করে। কথায় বলে শাসক পরিবর্তন হলেও শাসন পরিবর্তন হয়না,যার কারণে ¯^াধীন বাংলাদেশে ,¯^াধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী এবং জাতীয় চার নেতাকেও জেল হত্যার শিকার হতে হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হওয়া বেশ কিছু মুক্ত চিন্তার মানুষকে জেলের মধ্যে মৃত্যর শিকার হতে দেখা গেছে। বিরোধী দলে থাকার সময় যিনি মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন, ক্ষমতায় যেয়েই তিনি নিপিড়নের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, এটাতো আধুনিক সভ্য সমাজে কারো কাম্য নয়।মানুষের জন্য কমন কতগুলো ইস্যুতে সরকারি দল, বিরোধী দলের একটা কমন সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন। আশাকরি রাজনীতিকরা সেই বিষয়টা ভাববেন,নইলে এই অমানবিকতার শিকার সবাইকে হতে হবে, কাউকে দুদিন আগে বা দুদিন পরে, যার উদাহরণ র‌্যাব গঠন, যারা এটি ˆতরি করেছিলেন প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য আজ তারা শায়েস্তা হচ্ছেন। নির্বাহি আদেশে রাজনৈতিক দরের কার্যক্রম বন্ধ ইটও কোন গনতান্ত্রিক দেশের রাজনৈতিক কালচার হওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যত প্রজন্ম  এবং আগামী বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বিষয়টি ভাবনায় নিতে হবে।[লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি]

রম্যগদ্য: তেল নিয়ে তেলেসমাতি

“হেঁ হেঁ ইরান যতই তেল নিয়া, হুরমুজ প্রেণালী নিয়া তেলেসমাতি করুক, আমাগো নবানর্বাচিত সরকার ইরানের যুদ্ধের ঠ্যালা সামলাইতে সিদ্ধহস্ত। বাংলাদেশে পেট্রলপাম্পে তেলের কোনো কমতি নাই। প্রতিদিন ভারত থ্যেইক্কা হাজার হাজার লিটার তেল আইন্না সাপ্লাইচেন ঠিক রাখছে।”“বলিস কিরে! বাংলাদেশে পেট্রল, ডিজেল, কেরাসিন তেলের কোনো কমতি নেই?”“থকবো ক্যেমনে, রাশিয়ার তেল অহন ভায়া ভারত বাংলার মাটিতে।”“আশ্চার্য্য! তুই কার কাছ থেকে এইসব চাপাবাজী শুনেছিস যে, রাশিয়ার তেল এখন ভায়া ভারত বাংলার মাটিতে?” “ঠিক আছে আমি নাইলে চাপা মারতাছি, কিন্তু নবনির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধি যখন কয়, দেশে জ্বলানি তেলের অভাব নাই, কারণ হ্যারা কেবল পাবিলেকের কাছে মজুত করা ৫ লাখ ৪ হাজার ২৩৬ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করছে। মিয়া বুঝতে পারেন যে সব মজুত করা তেল ধরা পারে নাই, হেই তেলের পরিমান কত লক্ষ লিটার! মিয়া বুঝেন,বাংলাদেশ তেলের ওপর ভাসতাছে।”“শুনেছি তোদের দেশে নাকি আশির দশকে হরিরামপুরে তেলের রিজার্ভের খোঁজ পেয়েছিলি, তারপর শুনেছি তোদের তেল তুললে অন্যদের তেলও গড়িয়ে তোর দেশের রিজার্ভে যোগ হবে, তাই তখনকার হোমো সরকার তেল তুলতে সাহস করেনি?”“রাখেন মিয়া, তেল তুলতে সাহস পায় নাই! কন মিয়া তেল তুইল্লা কি বাংলাদেশ মরবনি?”“তেলের খনি থেকে তেল তুললে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে! ঠিক বুঝতে পারলাম না?”“এই সুজা কতা না বুঝনের কি আছে? বাংলাদেশ ত্যেলের উপর ভাসতাছে। এরপর যদি বাংলাদেশে আরও তেল তুলে তয় অতো ত্যেল রাখবো কোই? বাংলাদেশের তেলের বরকত যে কি হেইডা আপনে জানেন না? ছুট্টবেলায় পড়েন নাই?”“বাংলাদেশ তেলের উপর ভাসছে। বাংলদেশের তেলের বরকত! তুই এসব কি বলছিস আমার মাথা ঘুরছে। মাথা মুন্ডু তোর কথাতো কিছুই বুঝতে পারছিনা। তেলের বরকত?” “ক্যা মিয়া, ছুটো বেলায় পড়েন নাই, “এক পয়সার ˆতল/ কিসে খরচ হইল/ তোর দাড়ি, মোর পায়/ আরও দিছি ছেলের গায়/ ছেলে মেয়ের বিয়ে গেছে/ সাতরাত গান হয়েছে/ কোন অভাগী ঘরে এলো/ বাকি তেলটা ঢেলে নিলো” বুঝছেন মিয়া এই বাংলার এক পয়সার তেলরও বরকত কত? আর অহনতো জেন-জী’র যুগ। অগাষ্ট মুক্তিযোদ্ধারা ভাতা পাইবো মোটর সাইকেল থাকলে লিটারে লিটারে ত্যেল পাইবো, বাংলা ভাসে ত্যেলের ওপর।”“আচ্ছা পাম্পে যে হাজার হাজার মোটর সাইকেল, প্রাইভেট কার, মাইলকা মাইল লাইন ধরছে এটা কি শখে?”“শখ না ভাই, এইডা হোইলো বাঙ্গালিগো খাইসলত। হালারা লাইন ধইরা একবার তেল নিয়া আবার ঘুইরা যায়া লাইনে খাড়ায়। হেইলাই¹া আপনের মনে হয় লাইন আর শেষ হয়না। হোইবো ক্যেমতে, যেই হালায় তেল লোইছে, হ্যেয়তো আবার লাইনের শেষে যায়া খাড়াইছে।”“ধাৎ তা হয় নাকি? লাইনে সাত-আট ঘন্টা দাঁড়িয়ে ১০ লিটার তেল পেয়ে আবার ৭-৮ ঘন্টার জন্য লাইনে দাঁড়াবে? প্রকৃতির ডাকেও কি সাড়া দেবে না?”“প্রকৃতির ডাক! হালায় পেট্রল হোইল ওভাই পাবলিকের প্রাণভোমরা। হ্যায় পেট্রল না নিয়া প্রকৃতের উত্তর দিবো? আপনে হাগলনি কোনো!”“তুই কি বলছিস তেলের জন্য মানুষ নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দেবে?”“আপনে মিয়া আসলেই একটা আস্ত গাড়ল। ঠিক মতো তেল মারতে পারলে, ¯^াধীনতা পদক, একুশে পদক, বাংলা-পদক, আপনে দেখেন নাই আপনের দেশের তথাকথিত বুকে হাঁটা, পা’চাঁটা, মেরুদণ্ডহীন এইসব আঁতেলেকচুয়ালরা দেশকুত্তোমরে উত্তম রূপে ˆতল মর্দন কইরা ১টাকায় গুলশানে বাড়ি,পদ্মবিভূষণ, শত শত কোটি কোটি টাকা খরচ কোইরা, প্রতিটি ব্যাংকের কোনায় কোনায়, প্রতিটি বড় বড় কোম্পানির কোনায় কোনায়, মুসাফির কর্নার। তাই কোই ঠিকমতো ˆতল মর্দন কোরলে দ্বীন ও বেদ্বীন দুই যায়গায় খালি ট্যাকা আর ট্যাকা। ব&াংলাদেশের তেলে বরকত আছে বুঝলেন।”“সবইতো বুঝলাম যে ব&াংলাদেশের তেলে বরকত আছে। ঠিকমতো দেশিকুত্তোমকে তেল দিতে পারলে দিন-দুনিয়ার বাদশাহ& হয়ে ঘোরা যায়। কিন্তু বিশ্বাসকর সত্যি দেশে মনেহয় তেলের প্রবলেম আছে। যারজন্য গ্রামে গঞ্জে ইলেট্রিসিটির অভাবে লোড শেডিং’এর ঠেলায় গ্রামবাসীর প্রাণ ওষ্ঠাগত। জানিনা কবে বাংলার জনগণ এই নরক যন্ত্রণা তেকে রক্ষা পাবে?”“আপনেরতো মিয়া ওই গানের মতুন অবস্থা, “হায়রে কপাল মন্দ/ চোখ থাকিতে অন্ধ/ নিশিদিন জ্বইল্লা পুইড়া/ শ্যেষ তোহোইলাম না।”“আসলেইতো আমরা ইলেট্রিসিটির অভাবে নিশিদিন জ্বইল্লা পুইড়া মরতাছি।”“ধুর মিয়া আপনেরে আর, নিশিদিন জ্বইল্লা পুইড়া শ্যেষ হোইতে হোইবোনা। আমাগো নবানর্বাচিত সরকার তার প্ল্যান মাফিক অতি শীঘ্রই রুপরূপ পারমানবিক চুল্লি থ্যেইক্কা কারেন্ট ছাড়বো, ব্যাস তখন আর আদানি, পাদানি, মাদানি কাউরেও আর পুছন লাগবোনা। ইরান-আমেরকিা হাজার হাজার বছর যুদ্ধ করুক আমগেপ কুনোই অসুবিধা হোইবো না।”“সত্যি বলছিস আমাদের নবানর্বাচিত সরকার তার প্ল্যান মাফিক অতি শীঘ্রই রুপরূপ পারমানবিক চুল্লি থেকে কারেন্ট ছাড়বে?” “ছাড়বে!! আরে মিয়া, ছাড়বেতো ফিউচার টেনস, প্রেজেন্ট টেনস কন মিয়া, সামনের বাজেট ইয়ারে রুপরূপ পারমানবিক চুল্লি থ্যেইক্কা কারেন্ট পাইলেও পাইতে পারেন। দুইটা রিএক্টর রেডি।”“ভাই তোকে যে কি বলে ধন্যবাদ দিবো, তার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। রুপরূপ পারমানবিক চুল্লি থ্যেইক্কা কারেন্ট পেলে সারা বাংলাদেশের জনগন তোর জন্যে জান দিতেও প্রস্তুত থাকবে।” “জান দিতে হোইবোনা, আপনে খালি ঠিক মতো ঠিক যায়গায়  ˆতল মর্দন করেন তাইলেই রুপরূপ পারমানবিক চুল্লি থ্যেইক্কা কারেন্ট পাইবেন, কয়া দিলাম ব্যাস।”“সত্যিই তোর কথাই ঠিক, আসলেই বাংলাদেশের তেলের অনেক বরকত আছে।”“আমি কি আর এমনি কোইছি, তেল নিয়ে তেলেসমাতি!”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

দেশে ক্ষুদ্রঋণ বাস্তবতা

আসলে ঋণ কী? এই ব্যবস্থাটি কখন চালু হয়? ঋণের ইংরেজি শব্দ ‘ক্রেডিট’। ‘ক্রেডিট’ শব্দটি লাতিন creditum থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘বিশ্বাস’। অর্থাৎ এমন একটি বিশ্বাস, যার ভিত্তিতে একজন ব্যক্তি অন্যকে অর্থ বা সম্পদ দেন, যখন গ্রহীতা তাৎক্ষণিকভাবে তা পরিশোধ করতে সক্ষম না হলেও ভবিষ্যতে পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন। অন্যভাবে বলা যায়, ঋণ এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে আদান-প্রদান আইনানুগ, বিধিসম্মত এবং বহু অপরিচিত মানুষের মধ্যেও বিস্তৃত হতে পারে। এই বিশ্বাসই অর্থনৈতিক কার্যক্রমের একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।ইংরেজিতে ‘ক্রেডিট’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয় প্রায় ১৫২০ সালে। এটি মধ্যযুগীয় ফরাসি ‘credit’ (বিশ্বাস, আস্থা), ইতালীয় এবং লাতিন (বিশ্বাস করা) থেকে উদ্ভূত। ‘ক্রেডিটর’ শব্দটি ঋণদাতা অর্থে ১৫শ’ শতকের মধ্যভাগ থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ‘ক্রেডিট ইউনিয়ন’, ‘ক্রেডিট রেটিং’ প্রভৃতি শব্দেরও প্রচলন ঘটে, যা ঋণব্যবস্থাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোবদ্ধ করে তোলে।বাংলাদেশে ব্রিটিশ আমলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হলেও তা মূলত শহরকেন্দ্রিক ছিল। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব ছিল সীমিত। ফলে গ্রামে গ্রামে মহাজনি প্রথা বিস্তার লাভ করে। কৃষকরা চাষাবাদের জন্য কিংবা ˆদনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হতেন। এক মন ধান ঋণ নিলে দেড় মন ফেরত দেওয়া কিংবা কয়েক মাসের ব্যবধানে টাকার পরিমাণ দ্বিগুণের কাছাকাছি হয়ে যাওয়া—এসব ছিল তখনকার সাধারণ চিত্র। এতে কৃষকেরা ক্রমাগত ঋণের ফাঁদে আটকে পড়তেন এবং অনেক সময় জমি হারাতেন।এই বাস্তবতায় ‘কাবুলিওয়ালা’ ঋণব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এটি ছিল একটি অনানুষ্ঠানিক ও ব্যক্তিনির্ভর ঋণপ্রদান পদ্ধতি। মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ নিতে পারত, তবে এর শর্ত ছিল কঠোর। অনেক ক্ষেত্রে অলংকার বা মূল্যবান সম্পদ বন্ধক রাখতে হতো। সুদের হার ছিল অত্যন্ত বেশি এবং সময়মতো পরিশোধ না করলে চক্রবৃদ্ধি হারে ঋণ বৃদ্ধি পেত। ঋণ আদায়ে চাপ প্রয়োগ, এমনকি নির্যাতনের ঘটনাও অ¯^াভাবিক ছিল না। তবুও প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্পের অভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল।এই শোষণমূলক প্রথার বিপরীতে একটি মানবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০৫ সালে তিনি পতিসরে কালীগ্রাম কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে কৃষকদের ¯^ল্প সুদে ও জামানতবিহীন ঋণ দেয়া হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল মহাজনদের উচ্চ সুদের ঋণের ফাঁদ থেকে কৃষকদের মুক্ত করা এবং তাদের উৎপাদনশীল কার্যক্রমে সহায়তা করা। এই উদ্যোগ পরবর্তীকালে আধুনিক ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।¯^াধীনতা যুদ্ধের সময় এবং তার পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ¯ে^চ্ছাসেবী গোষ্ঠী সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে যুক্ত হয়। এদের অনেকেই পরবর্তীতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শিক্ষা, ¯^াস্থ্য, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে তারা কাজ শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।১৯৭৬ সালে চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত ব্যাংকে রূপ নেয়। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস এই উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণকে একটি ˆবশ্বিক মডেলে উন্নীত করেন। তার ধারণা ছিল—¯^ল্প পরিমাণ ঋণ, সহজ শর্তে এবং জামানত ছাড়াই প্রদান করলে দরিদ্র মানুষ নিজের উদ্যোগে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড শুরু করতে পারে।বর্তমানে বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির অধীনে শত শত প্রতিষ্ঠান এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোটি কোটি মানুষ, বিশেষ করে নারী, এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ক্ষুদ্রঋণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর উচ্চ আদায় হার, যা প্রায় শতভাগের কাছাকাছি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই বেশি।তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি কিছু জটিল বাস্তবতাও সামনে আসছে। দেশে দারিদ্র্যের হার সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়। একই সঙ্গে এমন ঘটনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে একজন ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করছেন। ফলে একটি ঋণ শোধ করতে আরেকটি ঋণ নেয়ার প্রবণতা ˆতরি হচ্ছে। সাপ্তাহিক কিস্তির চাপ সামাল দিতে গিয়ে অনেকেই ঋণের চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ছেন।ক্ষুদ্রঋণের কাঠামোগত ˆবশিষ্ট্যের কারণে এটি একটি ঘূর্ণায়মান প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। ঋণ পরিশোধের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ঋণ পাওয়া যায়, যা একদিকে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ ˆতরি করে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ঋণগ্রহণের ঝুঁকিও বাড়ায়। এতে দেখা যায়, একজন ঋণগ্রহীতার মোট দায় তার সম্পদের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়, যদিও তিনি নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করায় আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন না।এই পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে—ক্ষুদ্রঋণ কি সত্যিই দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যকর মাধ্যম, নাকি এটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন ধরনের ঋণনির্ভরতা ˆতরি করছে? এর উত্তর একমাত্রিক নয়। একদিকে এটি বহু মানুষের জীবিকা উন্নয়নে সহায়তা করেছে, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে ঋণের অতিরিক্ত চাপ নতুন সংকটেরও জন্ম দিচ্ছে।সুতরাং, ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাকে একপাক্ষিকভাবে মূল্যায়ন না করে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক বিবেচনায় নেয়া জরুরি। নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রয়োজন কার্যকর তদারকি, ¯^চ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক শিক্ষার ওপর জোর দেয়া। একই সঙ্গে ঋণের ব্যবহার উৎপাদনশীল খাতে হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।বর্তমান বাস্তবতায় বলা যায়, ঋণ একটি প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক উপকরণ হলেও এর সঠিক ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে তা ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাত সেই ˆদ্বত বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

টর্চ জ্বালিয়ে রাতে সংঘর্ষ কি আদিম রণকৌশল

রাত তখন গভীর। গ্রামবাংলার চিরচেনা শান্ত নিস্তব্ধতা হঠাৎ ভেঙে খানখান হয়ে যায় তীব্র আলোর ঝলকানিতে। মাদারীপুরের নয়ারচর গোলচত্বরে মঙ্গলবার রাতে দৃশ্যটি ছিল ঠিক এমনই। শত শত টর্চলাইটের আলোয় এলাকা যেন দিনের মতো ফর্সা হয়ে ওঠে। তবে সেই আলো কোনো উৎসবের নয়, বরং এক ভয়াবহ সংঘাতের সংকেত।গত কয়েক বছরে দেশের বিশেষ কিছু এলাকায় ‘টর্চলাইট জ্বালিয়ে সংঘর্ষের’ এই বিচিত্র ও ভয়ংকর দৃশ্য ডিজিটাল স্ক্রিনে নিয়মিত ভেসে উঠছে। কেন একদল মানুষ সংঘর্ষের রজনী রাতকে বেছে নেয়? কেন এই টর্চলাইটের ব্যবহার? এর পেছনে যেমন রয়েছে ভৌগোলিক বাস্তবতা, তেমনি রয়েছে গভীর আদিম ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি জেলায় এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা বেশি ঘটছে। সম্প্রতি ঘটেছে মাদারীপুর সদর উপজেলার নয়ারচরে। তাছাড়া একই ঘটনা দেখা গেছে, শরীয়তপুরের জাজিরা ও নড়িয়ায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল ও সদর এলাকায়, ফরিদপুরের সালথা, ভৈরব ও ভাঙ্গায় এবং মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি ও লৌহজং এলাকায়। এসব এলাকার সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো — এগুলো হয় চরাঞ্চল, না হয় হাওরবেষ্টিত দুর্গম জনপদ। এখানে যাতায়াত কঠিন। পুলিশ পৌঁছাতে সময় লাগে। আর সেই ফাঁকটাই কাজে লাগান সংঘর্ষকারীরা। আধিপত্য বিস্তার, জমির মালিকানা কিংবা পাওনা টাকার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বংশপরম্পরায় চলে আসা বিবাদগুলো রাতের অন্ধকারে নতুন মাত্রা পায়।এসব সংঘর্ষে টর্চের ব্যবহার শুধু ‘আলো ফেলার’ জন্য নয়, এটি একাধিক কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। রাতের অন্ধকারে প্রতিপক্ষের অবস্থান, বাড়ি বা দলনেতাকে চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট হামলার জন্য টর্চের আলো ব্যবহার করা হয়। এটি যেন এক ধরনের ‘স্পটলাইট’ — যার ওপর আলো পড়ে, তিনিই প্রথম আঘাতের শিকার হন। মাদারীপুরের ঘটনায় গোলাম মওলা সরদার ও সাগর ব্যাপারীকে চিহ্নিত করেই হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ।তীব্র টর্চের আলো সরাসরি চোখে ফেলা হলে প্রতিপক্ষ সাময়িকভাবে ‘ফ্ল্যাশ ব্লাইন্ডনেস’ অর্থাৎ ‘সাময়িক অন্ধত্বের’ শিকার হন। সে কিছুক্ষণের জন্য চোখে অন্ধকার দেখেন। দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এই কৌশলটি আক্রমণকারীর জন্য মারণাস্ত্রের মতো কাজ করে। একই সময়ে বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হয়, যেন এলাকা পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে যায়- শুধু টর্চের আলোয় ভাসে আক্রমণকারীরা। আবার, টর্চের আলো পিটপিট করে জ্বালিয়ে বা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ফেলে দলের সদস্যরা নিজেদের অবস্থান ও আক্রমণের দিক সম্পর্কে সংকেত দেয়। এটি এক ধরনের ‘সিগন্যালিং ডিভাইস’ - যা আদি যুগের আগুনের ধোঁয়ার মতো কাজ করে।অন্যদিকে, দেশীয় অস্ত্র যেমন টেঁটা, বল্লম, রামদা, ককটেল নিয়ে যখন দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়, তখন অন্ধকারে আপনজনকেও আঘাত করার আশঙ্কা থাকে। টর্চের আলো সেই ভুল এড়াতে সাহায্য করে। আলো যার ওপর পড়ে, সে ‘শত্রু’। মাদারীপুরের নয়ারচরের ঘটনাটি যেন টর্চ জ্বালিয়ে সংঘর্ষের কেইস স্টাডি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে নয়াচর এলাকার গোলাম মওলা সরদারের কাছ থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নেন একই এলাকার সাইদুল ব্যাপারী। গোলাম মওলার অভিযোগ, পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হলেও কাজ হয়নি। টাকা ফেরত চাইতে থাকেন তিনি।বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সালিশও হয়েছে। কিন্তু কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। এখানেই লুকিয়ে আছে সংঘর্ষের মূল কারণ- আইনি ব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাব। সালিশ ব্যর্থ হওয়ার পর আর কোনো পথ খোলা থাকে না। ফলে টাকা ফেরতের এই বিরোধ ধীরে ধীরে রূপ নেয় আধিপত্যের লড়াইয়ে।অভিযোগ গেল ২১ এপ্রিল সন্ধ্যায় নয়াচর গোলচত্বরে গেলে গোলাম মওলার ওপর হামলা চালায় সাইদুল ব্যাপারী ও তার লোকজন। খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাত সাড়ে ৮টার দিকে দেশীয় অস্ত্র আর টর্চলাইট হাতে দুই পক্ষ মুখোমুখি। শুরু হয় ইটপাটকেল, টেঁটা ও রামদার লড়াই।পুলিশের উপস্থিতিতেও থামেনি সংঘর্ষ। এতে উভয় পক্ষের অন্তত পাঁচজন আহত হন। শুধু সংঘর্ষ নয়, হামলাকারীরা নয়াচর এলাকার দুজনের দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে।ক্ষতিগ্রস্ত আকবর মোল্লা বলেন, “আমি কোনো দলের না। তবু একদল লোক টেঁটা, রামদা দিয়ে আমার দোকান ভাঙচুর করে সব মাল লুট করে নিয়ে গেছে। আমি গরিব মানুষ, এখন কী করে খাব? আমি এর বিচার চাই।”এটি টর্চ জ্বালিয়ে সংঘর্ষের আরেকটি ভয়াবহ দিক তুলে ধরে। যখন দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই হয়, তখন তার শিকার হন নিরীহ সাধারণ মানুষ। যারা কোনো পক্ষের নন- শুধু দিন আনে দিন খায় - তারাই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বড় শিকার।মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডি-ইন্ডিভিউডিয়েশন’ (দলীয় মনোভাবের কারণে ব্যক্তিগত দায়িত্বজ্ঞান লোপ পাওয়া) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে ভিড়ের মধ্যে বা অন্ধকারের সুযোগে মানুষের নিজের বিবেক ও লোকলজ্জার ভয় কমে যায়। দিনের আলোয় যে মানুষটি পরিচিত সমাজকে ভয় পায়, রাতের অন্ধকারে মুখ গামছায় বেঁধে টর্চের তীব্র আলোর আড়ালে সে হিংস্র হয়ে ওঠে।কারণটি সহজ: নাম বা পরিচয়হীনতার সুযোগ। সে মনে করে, অন্ধকারে তাকে কেউ চিনতে পারবে না। ফলে পুলিশের চার্জশিট বা সামাজিক বিচার থেকে সে বেঁচে যাবে। এই ‘নামহীনতা’ একজন শান্ত মানুষকেও দাঙ্গাবাজ করে তোলে। এছাড়াও দলগত চাপের কারণে একবার সংঘর্ষ শুরু হলে, পেছনে ফিরে তাকানোর সময় পান না কেউ। দলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার মানসিকতা যেকোনো বিবেকবান মানুষকেও নির্দয় করে তোলে।নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখলে, আদিম মানুষ রাতের আঁধারেই শিকার করত। শিকারের সময় তারা আলো (আগুনের লেলিহান শিখা বা মশাল) ব্যবহার করত শিকারকে চিহ্নিত করতে ও দলকে সংকেত দিতে। আর শিকার যখন জানতে পারত যে আলো এসেছে তার দিকেই - আতঙ্কে জমে যেত। এই প্যাটার্ন আজও অমলিন। টর্চলাইটের তীব্র আলো সরাসরি প্রতিপক্ষের চোখে ফেলা মানে - ‘তুমি আমার নিশানা, তুমি এখান থেকে নড়তে পারবে না’। এটি প্রতিপক্ষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব তৈরি করে। আক্রমণকারী তখন আরও নির্দ্বিধায় কাজ করতে পারে।মাদারীপুরের ঘটনায় গোলাম মওলা সরদার বলেন, “আমার মাথা ও চোখে আঘাত করেছে।” এই চোখে আঘাত করার পেছনে মূলত টর্চের আলো ও আঘাতের সমন্বয় ঘটেছে বলে ধারণা করা যায়। আদিম মানুষের শিকারের পদ্ধতিতে যেমন ‘ঘেরাও করে আলো ফেলে শিকার করা’ থাকত, আজকের গ্রামীণ সংঘর্ষেও দেখা যায়- প্রথমে এলাকা ঘিরে ফেলা, তারপর বিদ্যুৎ কেটে টর্চ জ্বালিয়ে হামলা। চরাঞ্চল বা হাওর এলাকায় যাতায়াত অত্যন্ত দুর্গম। দিনের বেলা পুলিশ বা প্রশাসনের নজরদারি এড়ানো কঠিন। তাই রাতের অন্ধকারকে বেছে নেওয়া হয়, যাতে সংঘর্ষ শেষে দ্রুত নৌকায় বা কাঁশবনের আড়ালে সটকে পড়া যায়। মাদারীপুরের নয়ারচর এলাকাটিও চরাঞ্চল। এখানে পুলিশ পৌঁছাতে দেরি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ এলাকায় এসেছিল, কিন্তু ততক্ষণে সংঘর্ষ চরম রূপ নিয়েছে। পুলিশের উপস্থিতিতেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। এসব এলাকায় প্রায়ই পুলিশের উপস্থিতি কম থাকে। থানা থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়। ততক্ষণে সংঘর্ষ শেষ, আহতরা হাসপাতালে, আর অন্ধকার গিলে নিয়েছে সব প্রমাণ।বর্তমান ডিজিটাল মিডিয়াগুলো এই সংঘর্ষগুলোকে কেবল ‘উত্তেজনাপূর্ণ ভিজ্যুয়াল’ হিসেবে প্রচার করে। যেটিকে ‘কসমেটিক সাংবাদিকতা’ বলা হচ্ছে। খবরের ভেতরের গভীরতা বা এর পেছনের দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিশ্লেষণ না করে কেবল ‘টর্চলাইটের রহস্যময় আলো’ আর ‘বোমা বিস্ফোরণের দৃশ্য’ দিয়ে ভিউ পাওয়ার প্রতিযোগিতা চলে।কিছু টেলিভিশন চ্যানেল তো সরাসরি রাতের সংঘর্ষের ‘লাইভ টেলিকাস্ট’ দেয়, যেন এটি একটি খেলা বা বিনোদন। তথ্যের গভীরতার চেয়ে উপস্থাপনার গ্ল্যামার বড় হয়ে ওঠায় পাঠকরা ঘটনার পেছনের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বুঝতে ব্যর্থ হন।সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, যখন কোনো সমাজে আইনি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় পৌঁছায় এবং গোষ্ঠীগত শক্তিই চূড়ান্ত সত্য বলে গণ্য হয়, তখন মানুষ এমন ‘গেরিলা স্টাইল’ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘যৌথ পরিবার থেকে ভাঙন’ ও ‘অর্থনৈতিক অস্বস্তি’। আগে গ্রামের বড় জমিদার বা মাতুব্বর বিবাদের মীমাংসা করে দিতেন। এখন সেই কাঠামো নেই। আইনি ব্যবস্থা জটিল ও ব্যয়বহুল। অনেকের ধারণা একমাত্র পথ — আত্মরক্ষার নামে দল গঠন আর রাতের আক্রমণ।বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে বলছেন, যেসব এলাকায় সংঘর্ষের প্রবণতা বেশি, সেখানে নিয়মিত রাতের টহল ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মসজিদের ইমামদের নিয়ে বিরোধ মীমাংসার কমিটি গঠন করা জরুরি। গ্রামের মানুষ যাতে বুঝতে পারেন, রাতে সংঘর্ষ ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ - সে বিষয়ে প্রচারণা চালানো।  সংঘর্ষপ্রবণ এলাকায় সিসি ক্যামেরা বসানো ও ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি করা সম্ভব। এতে হামলাকারীদের শনাক্ত করা সহজ হবে।গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা বাড়াতে হবে। সংঘর্ষের লাইভ টেলিকাস্ট বন্ধ করে বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ ও প্রতিরোধমূলক প্রতিবেদন প্রচার করতে হবে। সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। টর্চলাইটের এই সংঘর্ষ কেবল একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা। যেখানে আইন পৌঁছাতে পারে না, সেখানে মানুষ নিজের হাতে বিচার তুলে নিতে চায়। যার মাধ্যম হয়ে ওঠে টেঁটা, বল্লম ও ককটেল। টর্চের আলো প্রতিপক্ষকে দেখায় বটে, কিন্তু একই আলো আক্রমণকারীর মুখোশও উন্মোচন করে। অন্ধকারে জ্বলে ওঠা এই আলো সভ্যতার আলো নয়, বরং এক আদিম অন্ধকারেরই বহিঃপ্রকাশ। যতক্ষণ পর্যন্ত তৃণমূল পর্যায়ে আইনের শাসন নিশ্চিত না হবে এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা না যাবে, ততক্ষণ এই টর্চলাইটের রণকৌশল কেবল স্ক্রিনে ভিউ বাড়িয়ে যাবে। আসল ট্র্যাজেডি আড়ালেই থেকে যাবে।

কমিউনিস্ট মতাদর্শ ও সোভিয়েত বিপ্লবের মহানায়ক লেনিন কতোটা প্রাসঙ্গিক

মহান সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত বিপ্লবের মহানায়ক কমরেড ভ ই লেনিনের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে এবার।কমিউনিস্ট মতাদর্শের শ্রমিক শ্রেণীর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কমরেড লেনিন আজও প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য। মহান মার্কসবাদী এই বিপ্লবী নেতার জন্মদিনে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও অভিবাদন!।২২ এপ্রিল হলো কমরেড লেনিনের জন্মদিন। এই দিনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণ লেনিন দিবস হিসাবে পালন করে থাকে। ১৮৭০ সালের ২২ এপ্রিল কমরেড লেনিন রাশিয়ার ভলগা নদীর তীরবর্তী সিমবিস্ক শহরে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৯২৪ সালের ২১ জানুয়ারি মস্কোতে মৃত্যুবরণ করেন।কমরেড লেনিন কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রের উপর লেখাপড়া করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সময়েই তিনি জার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। এই ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার কারণে জার সরকার তাকে সাইবেরিয়াতে নির্বাসনে পাঠায়। লেনিন যে সময়ে রাশিয়াতে জন্মগ্রহণ করেন সেই সময়ে রাশিয়ায় নৈরাজ্যবাদী বাকুনিনপন্থীদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। এই বাকুনিনপন্থীরা ব্যক্তি সন্ত্রাসে বিশ্বাস করতো। তাদের ধারণা ছিল রাশিয়ার জনগণের সমগ্র দুর্দশার জন্য দায়ী হলো রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিচালনায় নিযুক্ত মুষ্টিমেয় কয়েকজন শীর্ষ কর্তা ব্যক্তি। তাই এই শীর্ষ কর্তাদের যে কোন পন্থায় অপসারণ করতে পারলেই জনগণের মুক্তির লড়াইয়ে বিজয় অর্জিত হবে। সেই প্রেক্ষিতেই তারা রাশিয়ার জারকে খুন করে। আর এই খুনের দায়ে লেনিনের বড় ভাইয়ের ফাঁসি হয়। কমরেড লেনিন সেই থেকে শিক্ষা নিয়ে নৈরাজ্যবাদ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে মার্কসবাদের পথ অনুসরণ করেন এবং রুশ দেশে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে অক্টোবর বিপ্লব সম্পন্ন করে পৃথিবীর বুকে প্রথম শোষণমুক্ত রাষ্ট্র ব্যবস্থা শ্রমিক শ্রেণীর রাষ্ট্ররূপ সোভিয়েতে রাষ্ট্রের সৃষ্টি করেন। তিনি শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশের গতিধারায় বিপ্লবী সংগ্রামের ভিতর দিয়ে পশ্চাৎপদ সমাজ ব্যবস্থা তথা জারতন্ত্রের উচ্ছেদ করে শ্রমিক শ্রেণীসহ অন্যান্য শোষিত জনগণের মুক্তির সংগ্রামকে অগ্রসর করতে ব্রতী হন।মানব জাতির ইতিহাসে উৎপাদন শক্তি বিকাশের প্রক্রিয়ায় আদিম সাম্যবাদী সমাজের ভাঙনের পর সৃষ্টি হয় শ্রেণী বিভক্ত সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র। এই শ্রেণী বিভক্ত সমাজ সৃষ্টির সাথে সাথে সমাজে দেখা দেয় শ্রেণী শোষণ ও শ্রেণী সংগ্রাম। শোষিত নিপীড়িত শ্রেণী তার ওপর চেপে বসা শোষণ থেকে মুক্তির জন্য শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে বার বার বিদ্রোহ ঘোষণা করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। কিন্তু শোষিত জনগণ শ্রেণী শোষণ থেকে মুক্তি অর্জন করতে পারেনি। ইতিহাসের গতিধারায় বুর্জোয়া ব্যবস্থা বিকাশের সাথে সাথে বুর্জোয়া শ্রেণীর বিপরীতে শ্রমিক শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। বুর্জোয়া শ্রেণী বিভিন্ন দেশে সামন্তদের হটিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। সৃষ্টি হয় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার। বুর্জোয়া ব্যবস্থার যত বিকাশ ঘটতে থাকে শ্রমিক শ্রেণীরও ততই বিকাশ ঘটে। বুর্জোয়া শ্রেণীর বিপরীতে শ্রমিক শ্রেণী ছাড়া বুর্জোয়া ব্যবস্থা তার অস্তিত্বের শর্ত হারায়। বুর্জোয়া ব্যবস্থায় গোটা উৎপাদন প্রক্রিয়া হলো সামাজিক, কিন্তু মালিকানা হলো ব্যক্তিগত। বুর্জোয়া ব্যবস্থায় জমি, বাড়ি, কলকারখানা সকল সম্পদের মালিক হচ্ছে বুর্জোয়া শ্রেণী। কিন্তু তারা উৎপাদন করে না, উৎপাদন করে শ্রমিক শ্রেণী। কিন্তু এই উৎপাদিত সামগ্রির মালিক হয় বুর্জোয়া শ্রেণী। ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে বুর্জোয়া শ্রেণীর বিপরীত শ্রেণী হিসাবে শ্রমিক শ্রেণী আবির্ভূত হয়। শ্রমিক শ্রেণী এমন একটি শ্রেণী যা বুর্জোয়া সমাজের কবর খননকারী। কিন্তু বুর্জোয়া সমাজে বুর্জোয়া শ্রেণীর বিপরীত শ্রেণী শ্রমিক শ্রেণীর অস্তিত্ব ছাড়া বুর্জোয়া উৎপাদন ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না। পুঁজিবাদী সমাজে এই পরস্পর বিরোধী স্বার্থযুক্ত দুই শ্রেণীর মধ্যে শুরু হয় তীব্র শ্রেণী সংগ্রাম।মার্কসবাদের তিনটি অপরিহার্য অংশ হলো (১) মার্কসীয় দর্শন- দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ; (২) সর্বহারা শ্রেণীর শ্রেণী সংগ্রামের মতবাদ; (৩) রাজনৈতিক অর্থনীতি। তৎকালীন ইউরোপের সবচেয়ে অগ্রসর তিনটি দিক জার্মান দর্শন, ফ্রান্সের শ্রেণী সংগ্রাম ও ইংল্যান্ডের বিকাশমান বুর্জোয়া অর্থশাস্ত্রের সারসঙ্কলন করে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন মার্কসবাদ। বুর্জোয়া ব্যবস্থার এই বিকাশের যুগে শ্রমিক শ্রেণীর শ্রেণী সংগ্রামের মতবাদ প্রচার করেন মহান মনীষী কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। মহান মনীষী মার্কস দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের আবিষ্কারক। দর্শনের ক্ষেত্রে তিনি হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি ও ফয়েরবাখের বস্তুবাদকে গ্রহণ করে সৃষ্টি করেন বিশ্বের বুকে সম্পূর্ণ নতুন দর্শন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। মার্কস ও এঙ্গেলস হেগেলের দ্বান্দ্বিকতার যুক্তিসঙ্গত সারভাগ গ্রহণ করেন এবং ভাববাদী জঞ্জাল বর্জন করেন। সেই সাথে ফয়েরবাখের বস্তুবাদের অন্তর্নিহিত সারভাগ গ্রহণ করেন এবং বর্জন করেন তার অধিবিদ্যক পদ্ধতিকে। মার্কস ও এঙ্গেলস ফয়েরবাখের বস্তুবাদী ভিত্তি এবং হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিকে উন্নত করে সমন্বিত করে এক গুণগত উন্নয়ন ঘটিয়ে সৃষ্টি করেন সর্বহারা শ্রেণীর মুক্তির দর্শন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। মহান মনীষী মার্কস দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের আলোকে সমাজ ব্যবস্থার বিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ করে দেখান যে, সভ্যতার ইতিহাস হলো শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। মহামনীষী মার্কস পুঁজিবাদী শোষণের মর্মবস্তুকে আবিষ্কার করেন। তিনি আবিষ্কার করেন উদ্বৃত্তের মূল্যতত্ত্ব। মহামনীষী মার্কস তার অবদান সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে ১৮৫২ সালের ৫ মার্চ লন্ডন থেকে ইয়ো. ভেইদেমেয়ারের কাছে লিখিত এক চিঠিতে তিনি নিজেই বলেছেন, “এখন আমার প্রসঙ্গে ধরলে, বর্তমান সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর অস্তিত্ব আবিষ্কারের বা তার মধ্যে সংগ্রাম আবিষ্কারের কৃতিত্ব আমার নয়। আমার বহু পূর্বে বুর্জোয়া ঐতিহাসিকেরা এই শ্রেণী সংগ্রামের ঐতিহাসিক বিকাশের ধারা এবং বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদেরা বিভিন্ন শ্রেণীর অর্থনৈতিক শরীরস্থান বর্ণনা করেছেন। আমি নতুন যা করেছি তা হচ্ছে এইটা প্রমাণ করা যে, (১) উৎপাদন বিকাশের বিশেষ ঐতিহাসিক স্তরের সঙ্গেই শুধু শ্রেণীসমূহের অস্তিত্ব জড়িত; (২) শ্রেণী সংগ্রামের অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে প্রলেতারীয় একনায়কত্ব; (৩) এই একনায়কত্বটা সমস্ত শ্রেণীর বিলুপ্তি ও শ্রেণীহীন সমাজে উত্তরণের পর্যায় মাত্র।” [মার্কস এঙ্গেলস রচনা সঙ্কলন- দ্বিতীয় খন্ড, দ্বিতীয় অংশ, পাতা ১৩৮, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো]।লেনিন শুধু মার্কস এঙ্গেলসের শিক্ষাকে কার্যকরী করেননি। তিনি ছিলেন এই শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষাকারী। তিনি সাম্রাজ্যবাদী যুগে বিকাশের নতুন পর্যায়ের সাথে, পুঁজিবাদের নতুন পর্যায়ের সাথে মার্কস ও এঙ্গেলসের শিক্ষাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে একে আরও বিকশিত করেন। এর অর্থ হলো শ্রেণী সংগ্রামের নতুন অবস্থাধীনে মার্কসবাদকে আরও বিকশিত করতে গিয়ে পুঁজিবাদের বিকাশের যুগে মার্কস ও এঙ্গেলস কর্তৃক যা সৃষ্ট হয়েছিল তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগে মার্কসবাদের জ্ঞানভান্ডারে নতুন নতুন অবদান যুক্ত করেন।মার্কস ও এঙ্গেলস তাদের মতবাদ প্রচার করেন প্রাক সাম্রাজ্যবাদের যুগে, পুঁজিবাদের বিকাশের যুগে। যখন পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের যুগে প্রবেশ করেনি। অর্থাৎ বিকশিত সাম্রাজ্যবাদের যখন জন্ম হয়নি, শ্রমিক শ্রেণী যখন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, শ্রমিক বিপ্লব যখন কার্যক্ষেত্রে আশু ও অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠেনি সেই প্রাক বিপ্লব যুগে মার্কস ও এঙ্গেলস তাদের কার্যকলাপ চালান। মার্কস ও এঙ্গেলসের সুযোগ্য শিষ্য লেনিন তার কাজ চালিয়েছেন বিকশিত সাম্রাজ্যবাদের যুগে, শ্রমিক বিপ্লব যখন আশু করণীয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস যখন শ্রেণী সংগ্রামের মতবাদ প্রচার করেন, তখন বিশ্বব্যাপী শ্রমিক শ্রেণীর সাথে বুর্জোয়া শ্রেণীর দ্বন্দ্বই ছিল মৌলিক দ্বন্দ্ব। আর লেনিন যখন তার কার্যকলাপ চালান তখন পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদী যুগে প্রবেশ করেছে। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদী যুগে প্রবেশের সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী তিনটি মৌলিক দ্বন্দ্ব ক্রিয়াশীল হয়। (ক) পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশে বুর্জোয়া শ্রেণীর সাথে শ্রমিক শ্রেণীর দ্বন্দ্ব; (খ) ঔপনিবেশিক দেশের নিপীড়িত জাতি ও জনগণের সাথে সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব; (গ) এক সাম্রাজ্যবাদী দেশের সাথে আর এক সাম্রাজ্যবাদী দেশের দ্বন্দ্ব।কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি ১৯১৭ সালে রুশ দেশে শ্রমিক বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল ও সাম্যবাদের লক্ষ্যে শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার পর আরও একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব যুক্ত হয়। তা হলো (ঘ) সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব। আবার ১৯৯১ সালে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বব্যাপী কোন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র না থাকায় সমাজতন্ত্রের সাথে পুঁজিবাদের দ্বন্দ্ব- এই দ্বন্দ্বের কোন অস্তিত্ব বর্তমানে নেই।মার্কসবাদ- লেনিনবাদের অন্যতম অনুসারি কমরেড স্তালিন লেনিনবাদের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘লেনিনবাদ হলো সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ। আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, লেনিনবাদ হলো সাধারণভাবে শ্রমিক বিপ্লবের মতবাদ ও রণকৌশল এবং বিশেষভাবে এ হলো শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্বের মতবাদ ও রণকৌশল। বিকশিত সাম্রাজ্যবাদের যখন জন্ম হয়নি, সর্বহারা শ্রেণী যখন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে শ্রমিক বিপ্লব যখন কার্যক্ষেত্রে আশু এবং অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠেনি সেই প্রাক বিপ্লব যুগে (এখানে আমরা শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবের কথাই বলছি) মার্কস আর এঙ্গেলস তাদের কার্যকলাপ চালাতেন। আর মার্কস-এঙ্গেলসের শিষ্য লেনিন তাঁর কাজ চালিয়েছেন বিকশিত সাম্রাজ্যবাদের যুগে, শ্রমিক বিপ্লবের বিকাশের যুগে- যখন শ্রমিক বিপ্লব একটি দেশে ইতিমধ্যে জয়যুক্ত হয়েছে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে চূর্ণ করে, শ্রমিক শ্রেণীর গণতন্ত্রের সোভিয়েততন্ত্রের যুগের সূত্রপাত করেছে। এই কারণেই লেনিনবাদ হলো মার্কসবাদের আরও বিকশিত রূপ।’ [লেনিনবাদের ভিত্তি- কমরেড স্তালিন]।মার্কস ও এঙ্গেলস প্রাক সাম্রাজ্যবাদের যুগে পুঁজি গ্রন্থে পুঁজিবাদের মূল ভিত্তিগুলোর বিশ্লেষণ প্রদান করেন। আর কমরেড লেনিন পুঁজি গ্রন্থের মূল নীতিমালার ভিত্তিতে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর সাম্রাজ্যবাদ গ্রন্থে- সাম্রাজ্যবাদের এক মার্কসবাদী বিশ্লেষণ উপস্থিত করেন। কমরেড লেনিন সাম্রাজ্যবাদকে সংজ্ঞায়িত করেন। কমরেড লেনিন বলেন যে, পুঁজিতন্ত্রের একচেটিয়া স্তরই হলো সাম্রাজ্যবাদ।’ তিনি সাম্রাজ্যবাদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদের ৩টি চরিত্র ও ৫টি বৈশিষ্ঠ্য আলোচনা করেন। তাঁর আলোচিত সাম্রাজ্যবাদের এই ৩টি চরিত্র হলো (১) সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে একচেটিয়া পুঁজিবাদ; (২) সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে ক্ষয়িষ্ণু বা পরজীবী পুঁজিবাদ; (৩) সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে মুমূর্ষু বা মৃতপ্রায় পুঁজিবাদ।লেনিন সাম্রাজ্যবাদের ৫টি মূলগত বৈশিষ্ঠ্য তুলে ধরেন। এই বৈশিষ্ঠ্যগুলি হলো-(১) উৎপাদন ও মূলধনের কেন্দ্রীভবন এমন উঁচু স্তরে উন্নীত হয়েছে যে, তা থেকে একচেটিয়া কারবারের উদ্ভব ঘটেছে আর এই সমস্ত একচেটিয়া কারবারই অর্থনৈতিক জীবনের অধিনিয়ন্তার ভূমিকা গ্রহণ করেছে;(২) ব্যাঙ্ক পুঁজির সাথে শিল্প পুঁজির সহমিলন ঘটেছে আর এই মহাজনি মূলধনের ভিত্তিতে মহাজনি মোড়লতন্ত্রের অভ্যুদয় ঘটেছে;(৩) পণ্য রপ্তানি থেকে স্বতন্ত্র যে মূলধন রপ্তানি তা অসাধারণ গুরুত্ব অর্জন করেছে;(৪) আন্তর্জাতিক একচেটিয়া পুঁজিবাদী সমাহারের আবির্ভাব ঘটেছে। আর এই সমস্ত সমাহার পৃথিবীকে নিজেদের মধ্যে বেঁটে নিতে শুরু করেছে;(৫) বৃহত্তম পুঁজিতান্ত্রিক শক্তিবর্গের মধ্যে সমগ্র বিশ্বের ভূখন্ড ভাগবাঁটোয়ারা পরিসমাপ্ত হয়েছে।সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার মার্কসীয় মৌলিক ভাবনার বাস্তবে রূপায়ন করেন। এক্ষেত্রে মার্কসবাদের জ্ঞান ভান্ডারে লেনিনের নতুন অবদান হলো-(১) তিনি সোভিয়েত ব্যবস্থাকে সর্বহারা শ্রেণীর শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রীয় রূপ হিসাবে আবিষ্কার করেন। এ প্রেক্ষিতে তিনি প্যারি কমিউন ও রুশ বিপ্লবের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান।(২) তিনি সর্বহারা শ্রেণীর মিত্রের সমস্যার দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বকে সংজ্ঞায়িত করেন পরিচালক হিসাবে সর্বহারা শ্রেণী আর পরিচালিত হিসাবে অসর্বহারা শ্রেণীসমূহের শোষিত জনগণের মধ্যেকার শ্রেণী মৈত্রীর বিশেষ রূপ হিসাবে।(৩) তিনি এই বাস্তব ঘটনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন যে, সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব হলো শ্রেণী বিভক্ত সমাজে গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ রূপ। সর্বহারা গণতন্ত্রের এই রূপ পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থকেই অভিব্যক্ত করে।তিনি প্রমাণ করেন, পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী পরিবেষ্টিত একটি দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে সাফল্যের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক বির্নিমাণ ও শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রযাত্রা সম্ভব।মার্কসবাদের মৌলিক নীতিমালার ভিত্তিতে তিনি সোভিয়েত রাষ্ট্রে সমাজতন্ত্র বিনির্মাণে বিশেষ সাফল্য স্থাপন করেন। এক্ষেত্রে মার্কসবাদের জ্ঞানভান্ডারে তার নতুন অবদান হলো-(১) তিনি প্রমাণ করেন যে, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহ কর্তৃক পরিবেষ্টিত সর্বহারা একনায়কত্বাধীন একটি দেশে পরিপূর্ণ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। (২) তিনি আবিষ্কার করেন অর্থনীতির কর্মনীতির সুনির্দিষ্ট গাইডগুলো, যার দ্বারা সর্বহারা শ্রেণী অর্থনীতির মূল অবস্থানগুলোর অধিকারী হওয়ার সুবাদে সমাজতান্ত্রিক শিল্পকে কৃষির সাথে সংযুক্ত করে সমগ্র জাতীয় অর্থনীতি সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে পরিচালিত হতে পারে।(৩) তিনি আবিষ্কার করেন সমবায়ের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মানের গতিপথে কৃষক সমাজের মূল অংশকে ক্রমান্বয়ে পরিচালনা করার ও টেনে নিয়ে আসার সুনির্দিষ্ট পন্থার, যে সমবায় হলো সর্বহারা একনায়কত্বের হাতে ক্ষুদে কৃষক অর্থনীতির রূপান্তর সাধনের ও সমাজতন্ত্রের ভাবধারায় কৃষক সমাজের মূল অংশকে পুনর্শিক্ষিত করে গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।তিনি মার্কস-এঙ্গেলসের মৌলিক গাইড লাইনের আলোকে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অবসান ও সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা নিপীড়িত জাতি ও জনগণের জাতীয় মুক্তি অর্জনের আকাঙ্খা বাস্তবায়নের সমস্যার সমাধান করেন। এই ক্ষেত্রে মার্কসবাদী জ্ঞানভান্ডারে তার নতুন অবদান হলো-(১) লেনিন সাম্রাজ্যবাদের যুগে জাতীয় ও ঔপনিবেশিক বিপ্লব সম্পর্কিত ধারণাগুলোকে একটি একক সামঞ্জস্যপূর্ণ পদ্ধতির মতামতে একত্রীভূত করেন।(২) তিনি জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্নকে সাম্রাজ্যবাদ উচ্ছেদের প্রশ্নের সাথে সম্পর্কযুক্ত করেন।(৩) তিনি জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক সর্বহারা বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে ঘোষণা করেন।লেনিনের এই সব গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে ধারণ করে আজও বিশ্বের দেশে দেশে সংগ্রামী শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণ শ্রেণী সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে অগ্রসর করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।লেনিনবাদ বিশ্বের দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণী ও নিপীড়িত জাতি জনগণের মুক্তির সংগ্রামে পথ নির্দেশিকা হিসাবে কাজ করে চলেছে। পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে সমাজতন্ত্র তথা সর্বহারা একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই ও নয়া ঔপনিবেশিক দেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় মুক্তির লড়াই এক ও অভিন্ন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক তথা সামগ্রিক সঙ্কটের উদ্ভব ঘটেছে বিশ্বের দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণ তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার দুর্বলতম গ্রন্থী ছিন্ন করার ফল হিসাবে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিক শ্রেণী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও নয়া ঔপনিবেশিক দেশের শ্রমিক শ্রেণী এবং জনগণ সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই কাজে শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণ তখনই সাফল্য অর্জন করতে পারবে যখন লেনিনবাদের মৌলিক অবদানসমূহকে ধারণ করে তা সাফল্যের সাথে প্রয়োগ করতে পারবে। বিশ্বের দেশে দেশে কমিউনিস্ট মতাদর্শে শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণ আজ সেই মহান বিপ্লবী ব্রত পালনের লক্ষ্যেই অগ্রসর হচ্ছে।[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি; সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন]

বালাইনাশকের অপব্যবহারে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ

বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণের লক্ষ্যে আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগেউচ্চফলনশীল (উফশী) ফসলের ব্যবহার শুরু হয়| এর পাশাপাশি কৃষিতে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান— যেমন সারও বালাইনাশকের—প্রচলন বাড়তে থাকে| এখানে বালাইনাশক বলতে মূলত কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ওআগাছানাশককে বোঝানো হয়েছে|উফশী যুগের শুরুর দিকে এসব বালাইনাশকের খুব বেশি প্রয়োজন হতো না; গাছের পুষ্টি ও পানির চাহিদা পূরণকরলেই ভালো ফলন পাওয়া যেত| কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে| ফসলের নিবিড়তা বাড়ারসঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বালাইয়ের আক্রমণও বেড়ে যায়| ফলে এসব বালাই থেকে ফসলকে রক্ষা করতেবালাইনাশকের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে|এর ফলে ফসল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের আর্থিক অবস্থারওউন্নতি হয়েছে| তবে এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জটিল ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা| বালাইনাশকেরসঠিক নিয়ম না মেনে ব্যবহার, মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ এবং নির্বিচার ব্যবহার মানুষের ¯^াস্থ্য,জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে| ¯^ল্পমেয়াদেখাদ্যচাহিদা পূরণের লক্ষ্যে শুরু হওয়া এই অপব্যবহার আজ ধীরে ধীরে আমাদের অস্তিত্বের জন্যই এক বড়হুমকি হয়ে উঠেছে|কীটনাশক মূলত জীবহত্যাকারী রাসায়নিক পদার্থ, যাদের কাজ হলো নির্দিষ্ট জীব বা পোকামাকড় ধ্বংস করা|কিন্তু বাস্তবে এই পদার্থগুলো নির্দিষ্ট ক্ষতিকর পোকামাকড় ছাড়াও নিরীহ ও উপকারী প্রাণীরও ক্ষতি করেথাকে| সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মানুষও এসব পদার্থের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রেহাই পায় না|কৃষিক্ষেত্রে যারা সরাসরি কীটনাশক ব্যবহার করেন— যেমন কৃষক ও শ্রমিক—তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতেথাকেন| কীটনাশক মিশ্রণ ˆতরি করা, স্প্রে করা বা সংরক্ষণ করার সময় তারা সরাসরি এইসব বিষাক্তপদার্থসমূহের সংস্পর্শে আসেন| ফলে তাদের মধ্যে তীব্র বিষক্রিয়া যেমন বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, চোখজ্বালা, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি ইত্যাদি লক্ষ্মণ দেখা দিতে পারে| এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে|তবে বিপদের সীমা শুধু কৃষিক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়| বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ খাদ্য, পানি এবং বাতাসেরমাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে| আমরা যে ফল, সবজি বা শস্য প্রতিদিন খাই, তারঅনেকগুলোতেই অল্প পরিমাণে কীটনাশকের উপস্থিতি অ¯^াভাবিক নয়| দীর্ঘদিন ধরে এই অল্পমাত্রার বিষগ্রহণ আমাদের শরীরে নানা ধরনের জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়| গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদিকীটনাশকের সংস্পর্শ পারকিনসনস রোগ, আলঝেইমার, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার (যেমন লিউকেমিয়া,লিম্ফোমা, প্রোস্টেট ক্যানসার), হরমোনজনিত সমস্যা এবং প্রজনন ক্ষমতার হ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত|শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে—তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হয়, বুদ্ধিমত্তাকমে যায় এবং মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়| গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক মানুষদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি,কারণ তাদের শরীর এসব বিষাক্ত পদার্থের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে দুর্বল|মানব¯^াস্থ্যের পাশাপাশি কীটনাশকের অপব্যবহার জীববৈচিত্র্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে|প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীই একটি বৃহৎ বাস্তুতন্ত্রের অংশ, যেখানে সবাই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল| কিন্তুকীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে ভেঙে দেয়| বিশেষ করে বিস্তৃত-প্রভাবী কীটনাশক শুধুক্ষতিকর পোকামাকড়ই নয়, বরং উপকারী পোকামাকড় ও অন্যান্য প্রাণীকেও ধ্বংস করে| উদাহরণ হিসেবেনিওনিকোটিনয়েড নামক এক ধরনের বালাইনাশককে ধরা যায়| এই বালাইনাশক গাছের শিকড় থেকে শুরু করেপাতা, ফুল এমনকি মধু ও পরাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে| ফলে মৌমাছি, ভ্রমর এবং অন্যান্য পরাগায়নকারীপোকামাকড় যখন এই গাছের সংস্পর্শে আসে, তখন তারা বিষক্রিয়ার শিকার হয়|পরাগায়নকারী পোকামাকড়ের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এটি ˆবশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও এক বড় হুমকি| পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য এইপরাগায়নকারীদের ওপর নির্ভরশীল| যদি এদের সংখ্যা কমে যায়, তাহলে ফসল উৎপাদনও কমে যাবে, যাভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের কারণ হতে পারে| এছাড়া পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে গেলে তাদের ওপর নির্ভরশীলপাখি, বাদুড় এবং অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যও কমে যায়| আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে অনেক ‘আপাত-অপ্রয়োজনীয়’ উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে যায়, যেগুলো আসলে অনেক উপকারী পোকামাকড়ের জন্য খাদ্য ওআশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করত| একইভাবে, ছত্রাকনাশক মাটির উপকারী ছত্রাক ধ্বংস করে, যা গাছের পুষ্টিগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| এভাবে ধীরে ধীরে একটি জটিল ও প্রাণবন্ত বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়েএবং তার জায়গায় ˆতরি হয় দুর্বল ও একঘেয়ে পরিবেশ|বালাইনাশকের পরিবেশগত প্রভাব এখানেই শেষ নয়; মাটি, পানি এবং বাতাসও বালাইনাশকের কারণে দূষিত হয়|ফসলের ওপর স্প্রে করা কীটনাশকের একটি বড় অংশ বাতাসে ভেসে বা বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে দূরবর্তীস্থানের মাটিতে বা জলাশয়ে পৌঁছে যায়| মাটিতে থাকা অগণিত ক্ষুদ্র জীব— যেমন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক,প্রোটোজোয়া এবং কেঁচো—মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| কিন্তু বালাইনাশকএই উপকারী জীবগুলোকে ধ্বংস করে, যার ফলে মাটির গঠন নষ্ট হয়, পুষ্টি চক্র ব্যাহত হয় এবং ধীরে ধীরেমাটির উর্বরতা কমে যায়|পানি দূষণের ক্ষেত্রেও বালাইনাশক একটি বড় সমস্যা| এগুলো নদী, হ্রদ এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে জলজপ্রাণীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে ওঠে| মাছসহ অনেক জলজ প্রাণী এতে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়,প্রজননে ব্যর্থ হয় বা আচরণগত পরিবর্তনের শিকার হয়| কিছু ক্ষেত্রে পানিতে অতিরিক্ত ˆশবাল জন্মায়, যাপরে পচে গিয়ে পানির অক্সিজেন কমিয়ে দেয়| এর ফলে ‘মৃত অঞ্চল’ ˆতরি হয়, যেখানে কোনো প্রাণ বাঁচতেপারে না|এই পুরো পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে—বালাইনাশকের ওপর অতিরিক্তনির্ভরশীলতা আমাদেরকে এক ধরনের ‘বালাইনাশক ট্রেডমিল’-এর মধ্যে ফেলে দিয়েছে| অর্থাৎ, পোকামাকড়ধীরে ধীরে এসব রাসায়নিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, ফলে একই ফল পেতে হলে আরও বেশি বা আরওশক্তিশালী বালাইনাশক ব্যবহার করতে হয়| এর ফলে খরচ বাড়ে, পরিবেশের ক্ষতি বাড়ে এবং মানুষের¯^াস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে থাকে| এই চক্র থেকে বের হওয়া না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে|সমাধানের পথ হিসেবে আমাদের কৃষি ব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি| বালাইনাশকের নির্ভরতাকমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পদ্ধতির দিকে এগোতে হবে| সমšি^ত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) একটিযুতসই ব্যবস্থা হতে পারে| এটা এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে প্রাকৃতিক উপায়, ˆজব নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজেনসঠিক মাত্রায় ¯^ল্পকালীন-জবংরফঁধষ প্রভাবসমৃদ্ধ বালাইনাশক ব্যবহার করে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করাহয়| এর পাশাপাশি ফসলের ˆবচিত্র্য বৃদ্ধি, উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ এবং মাটির ¯^াস্থ্য রক্ষা—এসববিষয়কে গুরুত্ব দেয়া জরুরি| প্রসঙ্গত এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অনেকেই ˆজবচাষের পরামর্শদিয়ে থাকেন| কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে গেছে যে সহসা ˆজবচাষের প্রচলন করতে গেলে দেশে প্রচণ্ডখাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পরে| এজন্য সবধরনের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিগুলো নিয়ে পরিকল্পনামাফিক ধীরেধীরে এগোতে হবে| তারপরেও সারাদেশের জন্য এই ধরনের চাষ প্রযোজ্য হতে পারে বলে মনে হয় না|একই সঙ্গে প্রয়োজন কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি| কৃষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ, নিরাপদসরঞ্জামের ব্যবহার এবং বালাইনাশকের সঠিক মাত্রা ও পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি|সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত বালাইনাশকের উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারিকরা|সবশেষে বলা যায়, বালাইনাশক সঠিকভাবে ও নিয়ম মেনে ব্যবহার করা হলে সাধারণত বড় কোনো সমস্যাহওয়ার কথা নয়; মূল সমস্যা ˆতরি হয় এর অপব্যবহার থেকে| কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা এখন সেই সঠিকঅবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছি| একটি সুস্থ কৃষি ব্যবস্থা শুধু বেশি ফসল উৎপাদনের মধ্যেইসীমাবদ্ধ নয়; বরং তা মানুষের ¯^াস্থ্য, পরিবেশের ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গে গভীরভাবেজড়িত| আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা আজ এসব বিষয়কে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি তার ওপর| তাইএখনই সময় সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার, এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যাওয়ার|[লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন]

ত্রিমুখী সংকটে জনজীবন: জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও বাজার

গ্রীষ্মের প্রখর খরতাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে এক অভূতপূর্ব ত্রিমুখী সংকট| একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন সংঘাতের উত্তাপে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচু¤^ী, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে কয়লা ও তেলের তীব্র সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন তলানিতে এসে ঠেকেছে| এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, যা দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের চুলায় হাঁড়ি চাপানোকেই আজ এক অনিশ্চিত ও কষ্টকর বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিয়েছে| ঢাকার মিরপুরের বিয়াল্লিশ বছর বয়সী ডেলিভারি রাইডার রশিদ আহমেদ যখন ভোররাতে তেলের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তিনি জানতেন না যে তার মোটরসাইকেলের চাকা থমকে যাওয়ার সুতাটি বাঁধা আছে হাজার মাইল দূরের হরমুজ প্রণালীতে| তিনটি ফুয়েল স্টেশন ঘুরেও তেল না পেয়ে রশিদ আহমেদের দিনটি যখন অসম্পূর্ণ ডেলিভারি আর শূন্য পকেটে শেষ হয়, তখন তা কেবল একজন ব্যক্তির দুর্ভোগ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে এক অবরুদ্ধ অর্থনীতির করুণ আর্তি| ‘গ্লোবাল ভয়েসেস’ এ উল্লিখিত রশিদের এই অভিজ্ঞতা আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটিই এখন বাংলাদেশের সেই নতুন সাধারণ বাস্তবতা, যেখানে অন্যের শুরু করা যুদ্ধ আমাদের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ঘরের আলো নিভিয়ে দিচ্ছে এবং রান্নাঘরের হাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে| পারস্য উপসাগরের সেই ভূ-রাজনৈতিক বিস্ফোরণ কেন বাংলাদেশের এক প্রান্তিক কৃষকের ভিটায় বা শহুরে শ্রমিকের ঘরে অন্ধকার নিয়ে আসে, তা বুঝতে হলে হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক গুরুত্ব অনুধাবন করা জরুরি| এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়| ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে শুরু হওয়া সংঘাতের প্রভাবে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১০২ থেকে ১১৪ ডলারের দিকে ছুটতে শুরু করেছে| বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম এই পরিস্থিতিকে কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এক কাঠামোগত আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে| বাংলাদেশের মতো দেশ, যা তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তার জন্য এটি একটি অস্তিত্বের সংকট| আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার মতে, এটি ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ˆবশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট| এই সংকটের ঢেউ যখন বাংলাদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ছে, তখন দেখা যাচ্ছে আমাদের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত এক গভীর পক্ষাঘাতের শিকার হয়েছে| সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি চরম আর্থিক সংকটের কারণে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল কেনার টাকা দিতে পারছেন না| সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পক্ষ থেকে পিডিবির কাছে বকেয়া পাওনার পরিমাণ এখন ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে| কয়লা ও তেলের এই তীব্র সংকটের প্রভাবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন সক্ষমতার অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে| দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে উৎপাদন ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘরে নেমে এসেছে| বাঁশখালীর ১৩২০ মেগাওয়াট এসএস পাওয়ার এবং মাতারবাড়ী ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন কয়লার অভাবে ধুঁকছে| এসএস পাওয়ারের উৎপাদন ৩০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে এবং মাতারবাড়ীর উৎপাদন ১৫০ মেগাওয়াটে ঠেকেছে| এসএস পাওয়ারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর কয়লাবোঝাই জাহাজের ভাড়া প্রতি টনে অন্তত ১০ ডলার বেড়েছে, যা সরকার বহন করতে না চাওয়ায় কয়লা আমদানি এখন লোকসানের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে| মাতারবাড়ী কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানি ব্যাহত হচ্ছে কারণ সে দেশের সরকার উৎপাদন পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে| এর ফলে, ১৬ এপ্রিল একটি কয়লার জাহাজ আসলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য| কয়লার পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও বকেয়া বিল না পাওয়া এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে| প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ২০ টাকা থেকে বেড়ে ২৬ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা পিডিবির লোকসান ও ভর্তুকির বোঝাকে আরও ভারী করছে| গত অর্থবছরে ৩৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়ার পরও পিডিবির লোকসান ছিল ১৭ হাজার কোটি টাকা; বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অঙ্ক কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা সহজেই অনুমেয়| বিদ্যুতের এই ঘাটতি এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য সরাসরি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের কৃষি ও সাধারণ মানুষের খাদ্য তালিকায়| হরমুজ প্রণালী কেবল তেলের নয়, বরং সারেরও এক সংকীর্ণ জীবনরেখা| কাতার, সৌদি আরব এবং ওমান থেকে আসা বিশ্বের বড় অংশের ইউরিয়া ও ফসফেট এই পথ দিয়েই বাংলাদেশে আসে| ২০২৬ সালের মার্চ মাসে কাতার এনার্জি ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করার পর পেট্রোবাংলা নিশ্চিত করেছে যে, পূর্বনির্ধারিত এলএনজি কার্গো সময়মতো পৌঁছাবে না| এর ফলে দেশের পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ করে দিতে হয়েছে| সেই সময়টি ছিল বাংলাদেশের বোরো ধানের মৌসুমের মাঝামাঝি—যখন কৃষকের ধানক্ষেতে সবচেয়ে বেশি সেচ ও সারের প্রয়োজন হয়| ডিজেলের মজুত কমে মাত্র নয় দিনের সরবরাহে এসে দাঁড়িয়েছিল| যদিও সরকার ভারত থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৫,০০০ মেট্রিক টন ডিজেল এনেছে, কিন্তু তা ছিল সাগরে এক ফোঁটা জলের মতো| এই সার ও সেচ সংকটের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে ধানের ফলনে, যা আগামী কয়েক মাস পর দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ সংকেত হয়ে দেখা দেবে| জ্বালানি সংকটের এই উত্তাপ এখন রান্নাঘরের চুলায় গিয়ে ঠেকেছে| এলপিজি সংকটের কারণে ১২.৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ১,৫০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে| বাংলাদেশের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি যেখানে ১২, ৫০০ টাকা, সেখানে আয়ের ১০ শতাংশই চলে যাচ্ছে কেবল রান্নার গ্যাসের পেছনে| পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নওগাঁ থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চাল পরিবহনের খরচ এক সপ্তাহেই ১৪,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ২২,০০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে| জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের এই সম্মিলিত প্রভাব বাজারে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দামকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে| কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে গরিবের মোটা ¯^র্ণা চাল এখন ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর সরু মিনিকেট চাল কিনতে ক্রেতার লাগছে ৮৫ টাকা| সবজির বাজারে উত্তাপ আরও ভয়াবহ; বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা, আর করলা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে| ৮০ টাকা কেজির নিচে বাজারে এখন কোনো সবজি মেলাই ভার| মাছ-মাংসের বাজারেও একই অস্থিরতা বিরাজ করছে| কেজিপ্রতি সোনালি মুরগি ৪০০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে| গরুর মাংসের দাম ৮০০ টাকা ছুঁয়েছে, যা নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তের জন্যও বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে| মুদি পণ্যের দোকানে সরু মসুর ডাল ১৫০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ২০৫ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে| এই ত্রিমুখী সংকটের ফলে বাংলাদেশের জনজীবন আজ দিশেহারা| রাজধানী ঢাকার বাইরে বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে দিনে-রাতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে| চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থেকে শুরু করে কুমিল্লা ও বরিশালের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু ও বৃদ্ধরা| চট্টগ্রামে ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬টি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে| লোডশেডিংয়ের কারণে বাসাবাড়িতে ওয়াসার পানি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না, ফলে তীব্র পানির সংকটে পড়েছেন নগরবাসী| কালুরঘাট ও বায়েজিদ বোস্তামী শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে| গার্মেন্টস মালিকরা জেনারেটর চালিয়েও উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন| বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশের উৎস ˆতরি পোশাক শিল্প আজ জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে, যার ফলে রপ্তানি আয় অন্তত ২ শতাংশ কমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে| এটি ˆবদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে, যা টাকাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে| দুর্বল টাকা মানেই হলো আমদানি করা প্রতিটি চালের দানা আর প্রতিটি ফোঁটা তেল আগের চেয়ে বেশি দামে কেনা| হরমুজ প্রণালীর যুদ্ধবিরতি সাময়িক ¯^স্তি দিলেও, আমাদের আমদানিনির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব আজ প্রতিটি ঘরকে অন্ধকার ও ক্ষুধার মুখে ঠেলে দিয়েছে| যে যুদ্ধ রশিদ আহমেদের আয়ের পথ বন্ধ করেছে, সেই একই যুদ্ধ আজ ভ্যানচালক এনায়েতউল্লাহর ডাল-ভাতের ¯^প্নকে কেড়ে নিচ্ছে| ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা এবং ৪২ হাজার কোটি টাকার বকেয়া পাওনার এই বোঝা নিয়ে আমরা কতদিন চলতে পারব, সেই প্রশ্ন এখন প্রতিটি লোডশেডিংয়ের অন্ধকার রাতে এবং প্রতিটি বাজারের অসহনীয় মূল্যে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে| পঁচানব্বই শতাংশ জ্বালানি আমদানির ওপর এই যে আকাশচু¤^ী নির্ভরশীলতা, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়| এটি আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি দক্ষতার প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার ফলাফল| পদ্ধতিগত সংস্কার, বাজার তদারকিতে কঠোর নজরদারি এবং দেশীয় জ্বালানি উৎসের কার্যকর ব্যবহার ছাড়া এই বহুমুখী সংকট থেকে মুক্তির আর কোনো সহজ পথ খোলা নেই| আমাদের এখন এমন এক অর্থনীতির দিকে যাত্রা করতে হবে যেখানে আমাদের রাতের খাবারের দাম পারস্য উপসাগরের কামান দাগানোর ওপর নির্ভর করবে না| পদ্ধতিগতভাবে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোই হলো এই অদৃশ্য যুদ্ধের হাত থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারকে বাঁচানোর একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী সমাধান| আপাতত, রশিদ আহমেদরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, আর মধ্যপ্রাচ্যের সেই আগুন আমাদের জাতীয় উন্নয়নের সোনালি ¯^প্নগুলোকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে| [লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী|]

জলবায়ু পরিবর্তন: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি

মানবসভ্যতা আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উন্নয়ন ও ধ্বংস প্রায় পাশাপাশি চলেছে| প্রযুক্তির অগ্রগতি মানবজীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে প্রকৃতির ওপর চাপও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে| এই বাস্তবতায় বিশ্ব ধরিত্রী দিবস আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ ˆতরি করে এবং ভবিষ্যতের জন্য দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানায়| ˆবজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর বা ৪৫৪ কোটি বছর| এই দীর্ঘ সময়ের শুরুতে পৃথিবী ছিল উত্তপ্ত গ্যাস ও অগ্নিময় এক গ্রহ| ধীরে ধীরে শীতল হয়ে এটি কঠিন ভূ-পৃষ্ঠ, পানি ও বায়ুমণ্ডল গঠন করে| প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে প্রথম এককোষী জীবের উদ্ভব ঘটে| এরপর দীর্ঘ বিবর্তনের ধারায় বহুকোষী জীব, উদ্ভিদ, সামুদ্রিক প্রাণী এবং পরবর্তীতে স্থলজ প্রাণীর বিকাশ ঘটে| এই বিবর্তন প্রক্রিয়াই পৃথিবীকে জীববৈচিত্র্যময় গ্রহে রূপ দিয়েছে| মানবজাতির আবির্ভাব পৃথিবীর ইতিহাসের তুলনায় অত্যন্ত সাম্প্রতিক—মাত্র প্রায় ৩ লাখ বছর আগে| অর্থাৎ পৃথিবীর পুরো বয়সের তুলনায় মানুষের উপস্থিতি একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র| বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৮০০ কোটি মানুষের বসবাস রয়েছে| এই বিশাল জনসংখ্যা সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে| পানি, খাদ্য, জ্বালানি ও ভূমি ব্যবহারের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পরিবেশগত ভারসাম্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে| বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীতে মোট ৮০ লাখেরও বেশি প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে| তবে এর মধ্যে বড় একটি অংশ এখনও অজানা| দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক প্রজাতি ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে এবং আরও বহু প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে| এই তথ্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য জানিয়ে দেয়—পৃথিবী কেবল মানুষের নয়, বরং কোটি কোটি জীবের এক যৌথ আবাস| পৃথিবী আমাদের একমাত্র আবাসভূমি, যার বিকল্প নেই| এই গ্রহের মাটি, পানি, বায়ু, বন, পাহাড় ও সমুদ্র—সব মিলিয়ে একটি সূক্ষ্ম ও জটিল পরিবেশগত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যার ওপর সকল জীবের অস্তিত্ব নির্ভরশীল| মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়, বরং প্রকৃতির অংশমাত্র| প্রকৃতির ওপর অবিবেচক হস্তক্ষেপ মানে নিজের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করা| উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা হতে হবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই| প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত নয়, বরং সহাবস্থানই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একমাত্র নিরাপদ পথ| বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক| দ্রুত শিল্পায়ন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভোগবাদী জীবনধারা পরিবেশের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে| বায়ুদূষণ এখন নগরজীবনের নীরব ঘাতক| কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন দূষিত বায়ু গ্রহণ করছে, যার ফলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, হৃদরোগ এবং ফুসফুসের রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে| পানিদূষণের ফলে নদী ও জলাশয়গুলো ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়ছে| কৃষিজমিতে রাসায়নিক ও শিল্পবর্জ্যের প্রভাব পড়ছে, যার ফলে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং খাদ্য উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে| জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে মানবজাতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি| ˆবশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার অ¯^াভাবিক পরিবর্তন এই সংকটের প্রধান লক্ষণ| বাংলাদেশসহ উপকূলীয় দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে| ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততা মানুষের জীবন ও জীবিকাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে| কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, মৎস্য সম্পদ কমে যাচ্ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে| জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে সামাজিক সংকট ˆতরি করতে পারে| বনভূমি পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম প্রধান উপাদান| কিন্তু নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, বন দখল এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বনভূমি দ্রুত কমে যাচ্ছে| গাছপালা কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশকে স্থিতিশীল রাখে| বন কমে যাওয়ায় এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ˆবশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে| অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে, যা পুরো বাস্তুতন্ত্রকে অস্থিতিশীল করে তুলছে| একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক আজ বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে| এটি সহজে পচে না এবং শত শত বছর ধরে পরিবেশে থেকে যায়| নদী ও সমুদ্রের প্লাস্টিক দূষণ সামুদ্রিক জীবের জন্য মারাত্মক হুমকি| খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এই ক্ষতিকর উপাদান মানবদেহেও প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ¯^াস্থ্যঝুঁকি ˆতরি করছে| অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ন পরিবেশের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে| কলকারখানার ধোঁয়া ও বর্জ্য বায়ু ও পানি দূষিত করছে| নগর এলাকায় সবুজের অভাব ‘শহুরে তাপ দ্বীপ’ সৃষ্টি করছে, যেখানে তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় অনেক বেশি| এটি জনজীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে| পরিবেশের অবক্ষয় সরাসরি মানুষের ¯^াস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে| বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসযন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ ও দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বাড়ছে| দূষিত পানি পান করার ফলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগ ছড়াচ্ছে| অতিরিক্ত তাপমাত্রা হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও ত্বকের রোগ বৃদ্ধি করছে| পরিবেশ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি| বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে| প্লাস্টিক ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব বিকল্প গ্রহণ করতে হবে| নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌর ও বায়ু শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে| বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে| নগর পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব নীতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে|  [লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]

মন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করে এমপি কেন পরীক্ষাকেন্দ্রে?

শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করে কুমিল্লার একটি এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ এবং সেখান থেকে ফেইসবুক লাইভ করেছেন একজন সংসদ সদস্য (এমপি)। প্রশ্ন উঠেছে, একজন আইন প্রণেতা হয়েও কেন তিনি শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা ভুলে গেলেন? এটা কি বিচ্ছিন্ন ভুল, নাকি জটিল মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার প্রতিফলন।  বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই মনে করেন, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তারা ‘সাধারণ মানুষ’ থেকে আলাদা হয়ে যান। তাদের কাছে আইন ও নির্দেশনা শুধুই ‘সাধারণ মানুষের জন্য’, তাদের জন্য নয়। ‘ক্ষমতার অহংকার’ তাদের চোখে পড়তে দেয় না যে, তারা ভুল করছেন।আবার অনেক এমপি মনে করেন, এলাকার মানুষ তাদের ‘বেশি সক্রিয়’ দেখতে চান। পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে লাইভ করাটা তাদের দৃষ্টিতে ‘দায়িত্ব পালন’। কারণ এটি ভোটারদের কাছে বার্তা দেয় যে ‘আমি আছি, আমি দেখছি, আমি অনেক বেশি তৎপর।’ অনেক এমপি এমন ‘ভোট-বান্ধব ইমেজ’ তৈরির তাড়নায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশের কথা ভুলে যান।অনেক এমপি মনে করেন শিক্ষামন্ত্রী তথা সরকারের নির্দেশ জাতীয় পর্যায়ের। সেক্ষেত্রে তারা ‘আমার এলাকায় আমার কর্তৃত্বই বড়’ মনে করেন।এমন মানসিকতা তাকে নির্দেশ অমান্য করতে উদ্বুদ্ধ করে। এমপি ভেবে বসেন, ‘মন্ত্রী ঢাকায় বসে নির্দেশ দিয়েছেন।কিন্তু আমি তো মাঠে আছি। তাই আমার সিদ্ধান্তটাই এখানে প্রাসঙ্গিক।’সরকার বা মন্ত্রীদের এমন নির্দেশনা অমান্য করার শাস্তি খুবই বিরল।শিক্ষাবোর্ড ‘খতিয়ে দেখার’ কথা বললেও সাধারণ জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির নজির নেই বললেই চলে। তাছাড়া দলীয় শৃঙ্খলাও খুব একটা কাজ করে না। ফলে ‘কিছুই হবে না’- এমন আত্মবিশ্বাস ভর করে তাদের ওপর।তাছাড়া দেশের প্রান্তিক সমাজে এখনও ‘বড়মানুষি’ মানসিকতা রয়ে গেছে। এমপিরা এলাকার ‘বড় মানুষ’ হিসেবে বিবেচিত হন। তাই প্রথাগত বা সামাজিক বিবেচনায় তারা মনে করেন সব জায়গায় বিনা বাধায় তাদের প্রবেশের অধিকার রয়েছে। পরীক্ষাকেন্দ্রকে তারা ব্যতিক্রম ভাবেন না। সামাজিকভাবে তাদের প্রত্যাশা থাকে ‘আমি এমপি, আমাকে তো কেউ আটকাবে না’।সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আবার ‘জনদরদি নেতা’ হওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। যে নেতা বা জনপ্রতিনিধি যত বেশি লাইভ করবেন, ছবি ছড়াবেন- তিনি তত বেশি সক্রিয় বলে বিবেচিত হন। পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘কুশল বিনিময়’ বা তাদের সঙ্গে ছবি তোলা কিংবা ভিডিও করা দায়িত্বশীল নেতার কাজ বলেই মনে করেন।  অনেক জনপ্রতিনিধি নিজের এলাকার পরীক্ষাকেন্দ্রকেও ‘নিজের প্রতিষ্ঠান’ ভেবে বসেন। ফলে সেখানে ঢোকার অনুমতি নেওয়ার দরকার মনে করেন না। কারণ তারা ভাবেন, ‘আমি তো ভালোর জন্যই যাচ্ছি’।কিন্তু ভালো উদ্দেশ্য যে কখনও অনিয়মকে জায়েজ করে না, সেটা তারা ভুলেই বসেন।সাধারণত দেখা যায়, অধিকাংশ পরীক্ষা কেন্দ্রের কর্মকর্তা জনপ্রতিনিধিকে ‘না’ বলতে সাহস পান না। জনপ্রতিনিধি বা এমপিরা ‘বিরক্ত’ হলে ভবিষ্যতে তাকে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেই ভয়ে কর্মকর্তারা চুপ থাকেন। এই নীরবতাই জনপ্রতিনিধির মনে শক্তি যোগায়।মনোবিজ্ঞানের পরিচিত ঘটনা হচ্ছে, ক্ষমতা মানুষের আচরণ পরিবর্তন করে দিতে পারে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ডেবোরি গ্রুনফেল্ড ও অন্যান্য গবেষকদের গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিয়ম ভাঙতে কম দ্বিধাবোধ করেন। তাদের মধ্যে ‘আমি আলাদা’ ও ‘আমার জন্য আলাদা নিয়ম’ এই ভাবনা তৈরি হয়।আবার দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘ইলিউশন অব ইনভালনারেবিলিটি’ (অভেদ্যতা বা অপরাজেয়তার ভ্রম) তৈরি হয়। তিনি মনে করেন, ‘আমার কিছুই হবে না, আমাকে কেউ কিছু বলতে পারবে না।’ এই ভ্রম থেকেই তিনি উপরের নির্দেশকেও ‘আমার জন্য প্রযোজ্য নয়’ ভাবেন।সেই জনপ্রতিনিধি নিজেকে বোঝান যে, ‘আমি তো পরীক্ষা দেখতে গিয়েছি- যেটা খারাপ কাজ নয়। যাওয়া যদি ভালো কাজ হয়, তাহলে নির্দেশ অমান্য করলেও তো সমস্যা নেই।’ তিনি নির্দেশের চেয়ে তার মতো করে নিজের কাজের ‘ভালো’ দিকটাকে বেশি গুরুত্ব দেন। অনেক সময় এলাকার মানুষের প্রত্যাশার চাপে পড়ে জনপ্রতিনিধিরা ‘বাড়তি’ কাজ করেন। কেউ তাকে বলতে পারেন, ‘এমপি সাহেব, পরীক্ষার হল একবার দেখে আসুন না।’ তিনি ‘না’ বলতে পারেন না। পরে নিজেকে বোঝান, ‘এটা তো আমার দায়িত্ব।’যে জনপ্রতিনিধি পরীক্ষাকেন্দ্র বা এমন কোনো জায়গায় ফেইসবুক লাইভ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তিনি মূলত ‘স্বীকৃতি’ চান।  অনেকটা এরকম, ‘আমি কত ভালো কাজ করছি, মানুষ দেখুক’। এই আত্মমুগ্ধতা তাকে ভুলিয়ে দেয় পরীক্ষাকেন্দ্রের পরিবেশের কথা। পরীক্ষার্থীদের কথা তার মাথায় আসে না, আসে শুধু নিজের ইমেজ।কোনো জনপ্রতিনিধির এমন আচরণ শিক্ষার্থীদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তারা নেতাবাচকভাবে প্রভাবিত হয়। শিক্ষার্থীরা যখন দেখে যে, আইন প্রণেতা নিজেই নির্দেশ অমান্য করছেন, তখন তাদের মনে ‘আইন কেবল ছোটদের জন্য, বড়রা যা খুশি করতে পারেন’ জাতীয় ধারণা তৈরি হয়। নির্দেশ অমান্যের এই ঘটনা আবার একটা ‘দৃষ্টান্ত’ বা ‘উদাহরণ’ তৈরি করে। ফলে অন্য জনপ্রতিনিধিরা বলেন, ‘অমুক তো গিয়েছে, আমিও যেতে পারি।’ এমন ধারণা থেকে শিক্ষার্থীরাও ভবিষ্যতে নিয়ম ভাঙতে কম দ্বিধাবোধ করবে।পাশাপাশি পরীক্ষাকেন্দ্রে অপরিচিত ক্যামেরা ও লাইভ সম্প্রচার শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। তারা পরীক্ষায় মনোয়োগের পরিবর্তে ক্যামেরার দিকে তাকায়। এটি পরীক্ষার ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।শুধু যে শিক্ষার্থীদের ওপরেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তা নয়, শিক্ষকদের কর্তৃত্বও হ্রাস করে দিতে পারে এমন চর্চা। যখন একজন এমপি কেন্দ্রের প্রধান শিক্ষককে ইশারায় সরে যেতে বলেন, তখন ওই শিক্ষকের কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীরা সেই শিক্ষককে কম গুরুত্ব দেবে।নির্দেশ অমান্যের বিষয়ে কড়া সতর্কতা জারি করতে হবে, শাস্তির ব্যবস্থাও করতে হবে- তা খুবই জরুরি। কারণ আইন প্রণেতারাই যদি আইন বা নির্দেশ অমান্য করতে শুরু করে তাহলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভারসাম্য নষ্ট হবে। যে কারণে শুধু ‘খতিয়ে দেখা’ নয়, যিনি নির্দেশ অমান্য করেছেন, তার বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সেজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষাবোর্ডের কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। বিশেষত, জনপ্রতিনিধিদের সংসদীয় আচরণবিধি ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। ‘আমি যা ইচ্ছা করতে পারি’- এই মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কীভাবে আইন ভঙ্গকারী জনপ্রতিনিধিকে ‘না’ বলতে হয়, তা শেখাতে হবে। তাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।গণমাধ্যমকে এমন ঘটনা তুলে ধরতে হবে জনপ্রতিনিধিদের ‘লজ্জিত’ করার জন্য। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন কাজ করতে সাহস না পান। তাছাড়া এমপি যে দলের প্রতিনিধিত্ব করছে সেই দলকেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা রাখতে হবে।মূলত, আইন প্রণেতা হয়েও নির্দেশ অমান্য বা আইন ভাঙা ‘ক্ষমতার অহংকারের’ ফলাফল। একজন এমপিকে মনে রাখতে হবে, তিনি প্রথমে একজন নাগরিক, পরে জনপ্রতিনিধি। শিক্ষামন্ত্রী তথা সরকারের নির্দেশ তার জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।

ভিডিও

পাকিস্তানের পর নিউজিল্যান্ডকেও হারাল টাইগাররা

পাকিস্তানের পর নিউজিল্যান্ডও টাইগারদের ঠেকাতে পারল না। চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের ‘অঘোষিত ফাইনালে’ নিউজিল্যান্ডকে ৫৫ রানে হারিয়ে টানা দুই সিরিজ জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ।এর আগে গত মাসে পাকিস্তানকে নিজেদের মাঠে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল মিরাজের দল। এবার ঘরের মাঠে একই ব্যবধানে হারাল কিউইদের। বৃহস্পতিবারের (২৩ এপ্রিল) এই জয়ে ধারাবাহিকতারও জানান দিল মেহেদি হাসান মিরাজের দল।ম্যাচে টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে দুর্দান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ে বাংলাদেশ। তবে দলীয় পতন সামলে দাঁড় করান নাজমুল হোসেন শান্ত ও লিটন দাস। শান্ত ১০৬ রানের সেঞ্চুরি করেন। অপর প্রান্তে লিটন দাস খেলেন ৭৬ রানের দারুণ এক ইনিংস। তাদের ব্যাটেই নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৬৫ রানের চ্যালেঞ্জিং সংগ্রহ গড়ে টাইগাররা।বড় সংগ্রহ তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় নিউজিল্যান্ড। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে তারা। বাংলাদেশের পক্ষে যেন আগুন ঝরালেন মোস্তাফিজুর রহমান। ৯ ওভার বোলিং করে মাত্র ৪৩ রান দিয়ে ৫টি উইকেট তুলে নেন। তার বিধ্বংসী বোলিংয়ে ৪৪ দশমিক ৫ ওভারেই অলআউট হয়ে যায় নিউজিল্যান্ড, স্কোর দাঁড়ায় মাত্র ২১০ রান।দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৭৫ রান করেন ডেন ফক্সক্রফট। তিনি শেষদিকে তাণ্ডব চালালেও দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিতে পারেননি। ৫৯ রান করেন ওপেনার নিক কেলি।টানা দুই সিরিজ জয়ের মধ্য দিয়ে ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার পথে আরও একধাপ এগিয়ে গেল টাইগাররা। বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলতে হলে আগামী বছরের ৩১ মার্চের মধ্যে আইসিসির ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষ ৮ দলের মধ্যে থাকতে হবে। এই জয় র‌্যাংকিংয়ের জন্য দারুণ ইতিবাচক।মিরাজের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন ধারাবাহিক জয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। ঘরের মাঠে পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে টাইগাররা জানান দিচ্ছে, বিশ্বকাপের আগে নিজেদের সেরা ছন্দে পৌঁছে যেতে তারা মরিয়া।

পাকিস্তানের পর নিউজিল্যান্ডকেও হারাল টাইগাররা
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৩৯ জন