সংবাদ
রাতে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের পূর্বাভাস ১৭ জেলায়

রাতে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের পূর্বাভাস ১৭ জেলায়

ঢাকাসহ দেশের ১৭ জেলার ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এসব এলাকার নদীবন্দরকে এক নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।রোববার (১০ মে) দিবাগত রাত ১টা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য জারি করা সতর্কবার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।ঝড়ের সম্ভাবনা রয়েছে- পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট জেলায়।এসব জেলার ওপর দিয়ে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে অস্থায়ীভাবে দমকা ও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। সঙ্গে বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।আবহাওয়া অফিসের অন্য একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আগামীকাল সোমবারের (১১ মে) মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর প্রভাবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের সব বিভাগের দু’-এক জায়গায় বৃষ্টি ও ঝড় হতে পারে।সোমবার ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি। এর ২৪ ঘণ্টা পর রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে ঝড়বৃষ্টি হতে পারে।পরে আবার সব বিভাগেই বাড়তে পারে বৃষ্টির প্রবণতা। কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি বর্ষণের আশঙ্কাও রয়েছে।
১১ মিনিট আগে

মতামতমতামত

সংবিধান সংশোধনের রাজনীতি

সংসদে ৭ মার্চের ভাষণ সংবিধান থেকে বাদ দেয়া কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এই বিষয়ে আরেকটি কলাম লেখার ইচ্ছে আছে। আজ শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু বিধান বাতিল করার তাৎপর্য তুলে ধরব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অনেক ‘আইনি প্রতারণা’ করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ সরকার ৫৪টি পরিবর্তন এনেছিল, এই ৫৪টির মধ্যে ৫ আগস্টের পর হাইকোর্ট বাতিল করেছে ৬টি, বর্তমান সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর বাকিগুলো ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এখন সংসদ বাকি বিধানগুলো বাতিল বা সংশোধন করবে, অথবা হুবুহু রেখে দেবে। তবে এক্ষেত্রে আরেকটি জটিলতা আছে, পঞ্চদশ সংশোধনীর সম্পূর্ণ বাতিল চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়েছে। হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোট পুনর্বহাল করেছে, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলকারীকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে, সংশোধন অযোগ্য সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলী সংশ্লিষ্ট ৭ ক এবং ৭ খ অনুচ্ছেদ এবং নিম্ন আদালতকে ক্ষমতা অর্পন সম্পর্কিত বিধান বাতিল করেছে।তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং পুনর্বহাল দুটোই করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। জনগণের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় ২০১১ সনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। অথচ ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর ২০ নভে¤^র, ২০২৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায়কে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বিবেচনায় অবৈধ ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ এক রায়ে বলা হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ, আরেক রায়ে বলা হয়ে অবৈধ ঘোষিত রায় ত্রুটিপূর্ণ ও অবৈধ। সর্বশেষ রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে পুনরুজ্জীবিত হয়ে গেল। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকার মিলেমিশে ১৮ মাস প্রশাসনকে ভাগবাটোয়ারা করে দেশ শাসন ও নির্বাচন করেছে। নিজেদের পছন্দমত লোক দিয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশন ও সরকার দ্বারা অনুষ্ঠিত নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অপরিহার্যতা কেন তা বোধগম্য হয় না।পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা আওয়ামী লীগ গণভোট বাতিল করেছিল, হাইকোর্টের রায়ে তা পুনর্বহাল হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গণভোট হয়েছে, কিন্তু বিএনপি গণভোটের রায় মানছে না। না মানার এই শক্তি বিএনপি পেয়েছে জনগণের কাছ থেকেই। কারণ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে জনগণই। সংসদ এবং গণভোট দুটোই সরকারের কাজের বৈধতা দেয়, রাষ্ট্রের জন্য আইন পাস করে। সংসদের কাজ সম্পাদিত হয় জনগণের প্রতিনিধির মাধ্যমে, আর গণভোটের মাধ্যমে আইন পাসকরণে জনগণ সরাসরি অংশগ্রহণ করে থাকে। গণভোট প্রক্রিয়ায় ভোটারদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে আইন পাসের ব্যবস্থা থাকলে সংসদ রাখার প্রয়োজন থাকে না। ভিন্ন বিবেচনায়, সংসদ থাকলে গণভোটেরও প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ দুটোর একটি থাকলেই হয়। অভিজ্ঞতা বলে সংসদ লাগবে, কারণ ঘন ঘন গণভোট আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। দ্বিতীয়ত অধিকাংশ ভোটারের আইন বিষয়ক জ্ঞান নেই। কিছুদিন আগে যে বিষয়ের ওপর গণভোট হয়েছে তার আগামাথা কেউ বোঝেনি, ভোট দাতারা অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছে। তাই সংসদ ও গণভোট দুটোর প্রয়োগ যুক্তিসঙ্গত বিবেচিত না হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে বাদ দিয়েছিল।পঞ্চদশ সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ সরকার ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়ে একটা গোঁজামিল তৈরি করেছিল। কারণ সংবিধানের প্রস্তাবনায় রাখা হয়েছে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’। ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে কোন একটি বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান সঙ্গতিপূর্ণ নয়, পরষ্পর বিরোধী। রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকে না, ধর্ম হয় মানুষের। ধর্ম নাযিল হয়েছে মানুষের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য নয়। ধর্ম হচ্ছে বিশ্বাস, সম্পর্ক সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে, সেই ধর্মকে রাষ্ট্রীয়করণ অয়ৌক্তিক। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্রের কোন ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকবে না। কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্রের নাগরিকরা ধর্মনিরপেক্ষ নয়, প্রত্যেক নাগরিক তার নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করার অধিকার রাখে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোন একটি ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া স্ববিরোধী এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নাগরিকের সমঅধিকার না থাকলে তা কখনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা হতে পারে না। তাই গোঁজামিলের ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে থাকা-না থাকা সমান।জোর করে ক্ষমতা দখল রোধে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে যে পরিবর্তন এনেছিল তাও অপ্রয়োজনীয়। এই পরিবর্তনে বলা হয়েছিল, কোন ব্যক্তির ক্ষমতাবলে অসংবিধানিকভাবে সংবিধান বাতিল, পরিবর্তন করলে বা পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র করলে তার অপরাধ হবে দেশদ্রোহিতার এবং শাস্তি হবে মৃত্যদণ্ড বা যাবজ্জীবন। পাকিস্তানের সংবিধান থেকে সম্ভবত এই পরিবর্তন নকল করা হয়েছে। পাকিস্তানের সংবিধানে একই বিধান থাকা সত্বেও পাকিস্তানে বারবার সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। পাকিস্তানের জেনারেল জিয়াউল হক জোর করে শাসন ক্ষমতা দখল করেছিলেন, কিন্তু তার কোন শাস্তি হয়নি, শাস্তি হয়েছিল এই আইনের প্রণেতা প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর, তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয়েছে। অস্ত্রের মুখে ক্ষমতা দখলকারী পাকিস্তানের জেনারেল পারভেজ মোশাররফের কোন বিচার হয়নি, বিচার হয়নি বাংলাদেশের হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের, বরং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যখন এই আইন পাস হয় তখন তিনি সংসদেই ছিলেন। আওয়ামী লীগের পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা সংবিধানে দণ্ডবিধি অন্তর্ভুক্ত করে অবৈধ ক্ষমতা দখল রোধ করা যায়নি, বরং আইন প্রণেতা আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। তাই এই বিধান রাখা বা বাতিল করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা আওয়ামী লীগ সংসদে নারী আসন ৪৫ থেকে ৫০টিতে উন্নীত করেছিল। মনে হচ্ছে এই পরিবর্তন বাতিল হবে না, বাতিল করার ইচ্ছে থাকলে বর্তমান সংসদে ৫০ জন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতেন না। সংরক্ষিত আসন নিয়ে কত কথা, শফিক রেহমানের সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এ এই নারী সাংসদদের ‘সংসদের শোভা ত্রিশ সেট অলংকার’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল। ১৯৮৬ সনে এরশাদ সাহেবের আমলে নারীদের জন্য ৩০টি আসন সংরক্ষণ রাখা হয়। দেশের নারীরাও তাদের জন্য এভাবে আসন সংরক্ষিত রাখার বিপক্ষে, তারা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হতে চায়, তারা চায় তাদের জন্য দেশব্যাপী ১শ’টি আসন নির্ধারণ করা হোক, তারা দলের মনোনয়ন নিয়ে বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। কিন্তু এই পরিবর্তন অদ্যাবধি হয়নি।রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশর জনগণের বিভাজন বিপরীতধর্মী, এই বিপরীত মনোভাব সংবিধান সংশোধন, পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। এক পক্ষ ক্ষমতায় এসে নিজের মনোভাব অনুযায়ী সংবিধানে যা যা সংযোজন-বিয়োজন করে, আরেক পক্ষ ক্ষমতায় এসে তা তা বাতিল করে সংবিধানে নিজেদের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটায়। তাই সংবিধানের কাটাছেঁড়া এভাবে চলতে থাকলে এক সময় সংবিধানের আদি রূপ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

ইংরেজি শিক্ষার এই দুর্দশা কেন

উচ্চমাধ্যমিক পাস কিংবা গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি নেয়া শিক্ষার্থীরা কি স্বতস্ফূর্তভাবে ইংরেজিতে কিছু বলতে পারেন, লিখতে পারেন? ইংরেজিতে কিছু শুনে বুঝতে পারেন? ইংরেজিতে লেখা কোন বিষয় থেকে মেসেজ গ্রহণ করতে পারেন? উত্তর সবারই জানা।অধিকাংশের ক্ষেত্রেই এটি একটি বড় না’। দু’চারজন ব্যতিক্রমী শিক্ষার্থী ছাড়া কেউই পারেননা যদিও উচ্চমাধ্যমিক এমনকি গ্রাজুয়েশন পর্যন্ত বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ইংরেজি পড়ে এসেছেন। এর সমাধান হিসেবে কেউ কেউ এমনসব পরামর্শ দিয়ে থাকেন যেগুলোর বাস্তবায়ন সহজে সম্ভব নয়। যেমন অনেকেই বলেন, সব বিদ্যালয়ে ভাষা শেখানোর ল্যাব বানাতে হবে, ইংরেজিতে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করা শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, শিক্ষকদের দীর্ঘ প্রশিক্ষন দিতে হবে, শিক্ষকদের বিদেশে পাঠিয়ে প্রশিক্ষিত করতে হবে, কেউবা আবার বলেন ন্যাটিভ স্পিকারদের নিয়ে এসে ইংরেজি শেখাতে হবে ইত্যাদি। এর কোনটিই কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে সহজ কাজ নয়। সব বিদ্যালয়ে ভাষা শেখানোর ল্যাব বানাতে বলা মানে হচ্ছে দেশে যেন আর কোন বিভাগ নেই, কাজ নেই। কাজ শিক্ষার্থীদের শুধুই ইংরেজি শেখানো! দ্বিতীয়ত, মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স মাস্টার্স পাস করা শিক্ষার্থীরা সেভাবে এখনও শিক্ষকতায় বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে আসছেন না। কলেজ থেকে পাস করা গ্রাজুয়েট যারা শিক্ষকতায় আসছেন অনন্য ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের নিজেদের অবস্থাই করুণ! তারা ইংরেজি পড়িয়ে শিক্ষার্থীদের স্কিল উন্নত করবেন সেটি ভাবা একটি অবান্তর কাজ কারণ আমি দেখেছি তারা দু’ চারটি গ্রামারের নিয়ম ও সেগুলোর ওপর কিছু ট্রানস্লেশন নিয়ে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শেখানোর কাজে নেমে পড়েন। কিছুদিন আগে একটি আর্টিকেলে লিখেছিলাম যে, ইংরেজি শেখা বা শেখানোর উদ্দেশের সঙ্গেই তাদের পরিচিতি নেই। তারপর আমাদের পাবলিক পরীক্ষায় ইংরেজিতে যে প্রশ্ন আসে, সেগুলো ইংরেজি ভাষা শিক্ষার্থী জেনেছে কিনা বা জানার চেষ্টা করছে কিনা সে রকম নয়। শুধু বিচ্ছিন্নভাবে কিছু খুঁটি পোতার চেষ্টা যার ছাদ নেই, বেড়া নেই, ফ্লোর কিছুই ঠিক নেই। সেটি ঘর নয়। উন্মুক্ত জায়গায় কিছু শক্ত কাঠের ছোট ছোট খুঁটি গাড়া অর্থাৎ বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গ্রামার জেনে ভিত মজবুত করার চেষ্টায় সবাই ব্যস্ত! ছাদ, বেড়া ইত্যাদি না থাকলে শুধু খুঁটি গেড়ে কি থাকার ঘর বানানো যায়? সে ঘর তো বাস করার পুরো অনুপযুক্ত! রোদ বৃষ্টিতে সব সময় সেই ঘর আক্রান্ত হয়, কেউ সেখানে বাস করতে পারেনা। আমাদের শিক্ষার্থীদের আমরা সরকারি, বেসরকারি, আধা-সরকারি ও ব্যক্তি পর্যাযে যে যেভাবেই ইংরেজি পড়াচ্ছি সেটি হচ্ছে বাক্য কিভাবে লিখতে হবে, কোনটি সঠিক আর কোনটি বেঠিক ইত্যাদি বিষয়গুলো শুধু আলাদা আলাদা খুঁটি পুতার মতো, পুরো একটি ঘর বা দালান বানানোর পরিকল্পনাও নেই, সে ধরনের প্রচেষ্টাও নেই। কাজেই আমরা সবাই কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার বারোটা বাজাতে সহায়তা করছি। তারমধ্যে বেশি বারোটা বাজাচ্ছে বাজারের কিছু গাইড যেগুলোতে পুরো বাংলা অর্থ ও শব্দের উচ্চারণ, অর্থ সবকিছুই দেয়া আছে অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের যেন কিছুই করার নেই। ভাষা শেখানোর সব প্রচেষ্টা থেকেই শিক্ষার্থীদের সরিয়ে রাখার পদ্ধতি! বাজারের একটি গাইড যা পুরো সোশ্যাাল মিডিয়ায় অনবরত বাজাচ্ছে যে, শিক্ষার্থীদেরইংরেজিতে পাস করা কত সহজ, পাসের বিভিন্ন পদ্ধতি ও গাইডটির গুণাগুন নিয়ে বর্ণায় ভর্তি এবং শিক্ষকদের, অভিভাবকদের এবং শিক্ষার্থীদের গাইডটি কেনো কিনতে হবে কেনো সেসব বিষয়গুলো বার বার প্রচার করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ‘ইংরেজি বইয়ের প্রতিটি লাইন ভেঙে ভেঙে অনুবাদ করে দেয়া, ঠিক শিক্ষক ক্লাসে যেভাবে পড়ান। শিক্ষার্থীদের বুঝাতে যত সহজভাবে অনুবাদ করা সম্ভব তার সবটুকুই আমরা করেছি এই বইয়ে। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সহজভাবে সাবলীল ভাষায় সাজিয়ে দিয়েছি আমরা।’ আপনারা ইংরেজি শেখানো এবংশেখার যে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন এবং বাজাচ্ছেন সেটি কি বুঝতে পারছেন? ইংরেজি ক্লাসে শিক্ষকদের প্রতিটি শব্দের বাংলা বলে দেয়া মানে ইংরেজি পড়ানো নয়। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটি করাতে হবে যার মাধ্যমে তারা শব্দ, শব্দ দিয়ে বাক্য তৈরি করা নিজেরা আয়ত্ত্ব করে ফেলেবে। এনসিটিবির বইয়ে ভোকাবিয়ুলারি টেস্টে ওয়ার্ড ম্যাকিং ইংরেজি থেকে ইংরেজি। সেটি সবাই না হলেও অনেক শিক্ষার্থীই কিন্তু পারছে কারণ এটি হচ্ছে ন্যাচারাল লার্ণিং। তারা যখন ওয়ার্ড থেকে ওয়ার্ড মোটামুটিকিংবা ভালোভাবে মেলাতে পারছে সেটিতে তাদের আন্ডারস্টান্ডিং সলিড হয়। সেটিই একটি বিদেশি ভাষা শেখার যতগুলো পদ্ধতি তার মধ্যে একটি কার্যকরী পদ্ধতি। এনসিটিবির বইয়েও অনেকের পরামর্শমতো আওয়ামী আমলে বাংলা অর্থ ও বাংলা দেয়া ছিল যা ইএলটি লার্ণিং-এর পুরোপুরি বিরোধী। ইংরেজি শিক্ষকরা যদি এটি না বুঝেন এবং শিক্ষার্থীদের না করান তা হলে ইংরেজি কি পড়াচ্ছেন? তাদেরকে কি বাংলা পড়াচ্ছেন? এভাবে করলে তো তারা বাংলাও শিখবে না। বাংরেজিও শিখবে না। কারণ তারা তো বুঝতেই পারছেন না যে, তারা কি করছে আর কি পড়ছে? সবই আপনারা করে দিচ্ছেন, সবই আপনারা বুঝিয়ে দিচ্ছেন তাহলে শিক্ষার্থীদের কাজ কি? তাদের ইংরেজি ভাষা রপ্ত করতে হবে বিভিন্নভাবে প্রাকটিস করে পারসোনালি এনগেজড হয়ে। তার সবই আপনারা করে দিচ্ছেন, তারা কি শিখছে? ‘প্রতিটি শব্দের সঠিক উচ্চারণসহ অর্থ, সমার্থক ও বিপরীতার্থক শব্দ উল্লেখ থাকায় এটি শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করে। প্রতিটি শব্দের অর্থ জানা থাকলে তা বোঝা সহজ হয়ে যায় এবং শিক্ষার্থীদের ইংরেজি বোঝার দক্ষতা বাড়ায়।’ শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝাচেছন আপনারা, ভুল মেসেজ দিচ্ছেন! দেখলাম সরকারি কলেজের শিক্ষকরা এসব কথা বলছেন। অবাক না হয়ে পারছিনা। [লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজ]

পিকেটির আয়নায় বাংলাদেশ: বৈষম্য ও উন্নয়নের দ্বন্দ্ব

দ্রুত প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান, উঁচু সেতু, নতুন নগর, প্রযুক্তির প্রসার এসব দেখে অনেক সময় মনে হয় উন্নয়ন যেন সবার দুয়ারে পৌঁছে গেছে। কিন্তু তবে সমাজের গভীরে একটি মৌলিক প্রশ্ন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়: এই উন্নয়নের ফল কার হাতে যাচ্ছে? কারা সম্পদশালী হচ্ছে, কারা কেবল শ্রম দিয়ে টিকে আছে, আর কারা জন্মসূত্রেই প্রতিযোগিতার বাইরে পড়ে যাচ্ছে? থমাস পিকেটির ‘একবিংশ শতাব্দীতে পুঁজি’ (ক্যাপিটাল ইন দ্যা টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি) ঠিক এই প্রশ্নগুলোকেই কেন্দ্র করে রচিত এক যুগান্তকারী গ্রন্থ। তিনি দেখান, বৈষম্য কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি ইতিহাস, রাজনীতি, যুদ্ধ, আইন, করনীতি এবং উত্তরাধিকার কাঠামোর ফল। ২০১৩ সালে ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত এবং ২০১৪ সালে ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলা এই বই মূলত সম্পদ বৈষম্য, পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং আধুনিক গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে রচিত। অর্থনীতির বই হয়েও এটি সাধারণ পাঠকের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে, কারণ পিকেটি কঠিন অর্থনৈতিক তত্ত্বকে ইতিহাস, সাহিত্য, রাজনীতি ও বাস্তব উদাহরণের সঙ্গে যুক্ত করে সহজবোধ্য ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। তার মূল বক্তব্য হলো ‘যখন পুঁজির আয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি হারে বাড়ে, তখন সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং সম্পদ ক্রমশ অল্প কয়েকজন মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়’। এই ধারণাকে তিনি বিখ্যাত সূত্র r > g দ্বারা প্রকাশ করেছেন। এখানে r  হলো পুঁজির ওপর আয় যেমন ভাড়া, সুদ, লভ্যাংশ বা সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি; আর g হলো জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি। যখন r, g-এর চেয়ে বড় হয়, তখন যারা আগে থেকেই সম্পদশালী, তারা দ্রুত ধনী হয়; আর যারা কেবল শ্রমের ওপর নির্ভরশীল, তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ে।এই তত্ত্ব বোঝার জন্য পিকেটি প্রথমেই পুঁজির অর্থ নতুনভাবে নির্ধারণ করেন। তার কাছে পুঁজি মানে শুধু কারখানা, যন্ত্র বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং জমি, বাড়ি, ব্যাংক আমানত, শেয়ার, বন্ড, ব্যবসায়িক মালিকানা, এমনকি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদও পুঁজির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ পুঁজি কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এটি সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নিয়ন্ত্রণের উৎসও বটে। এ কারণেই পিকেটির বিশ্লেষণে পুঁজির প্রশ্ন মানে ক্ষমতার প্রশ্ন। যাদের হাতে অধিক সম্পদ, তাদের সঙ্গে আসে আরও সুযোগ, উচ্চমানের শিক্ষা, সমাজে প্রভাবশালী অবস্থান এবং নিরাপদ ও নিশ্চয়তার সঙ্গে ভরা ভবিষ্যৎ। অর্থাৎ, সম্পদশালীদের জীবনযাত্রা শুধুই আর্থিক সমৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি তাদের ক্ষমতা, প্রভাব ও সামাজিক সুবিধার একটি সুদূরপ্রসারী জালে রূপান্তরিত হয়। এই জায়গায় তার ভাবনা কার্ল মার্ক্সের সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করে। মার্ক্স উৎপাদন সম্পর্ক ও শ্রেণী-সংঘাতকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন; পিকেটি সম্পদের বণ্টন, উত্তরাধিকার এবং করনীতিকে কেন্দ্র করেন। আবার সাইমন কুজনেটস মনে করেছিলেন উন্নয়নের এক পর্যায়ে বৈষম্য কমবে; পিকেটি দীর্ঘমেয়াদি তথ্য দিয়ে দেখান, বৈষম্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে না নীতিগত হস্তক্ষেপ ছাড়া তা আবার ফিরে আসে।থমাস পিকেটি ১৯৭১ সালে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন এবং অল্প বয়সেই অর্থনীতিতে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তিনি ইকোলি নরম্যাল সুপরিওর-এ অধ্যয়ন করেন এবং খুব কম বয়সে সম্পদ পুনর্বণ্টন বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি প্যারিস স্কুল অব ইকনোমিকসের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং আয় বৈষম্য, করনীতি ও সম্পদ বণ্টন বিষয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। ইমানুয়েল সেইজ, গ্যাব্রিয়েল জুখম্যান, আন্থনি অ্যাটকিনসন প্রমুখ অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কাজ করে তিনি বৈশ্বিক আয় ও সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলেন। এই কারণেই তার বইটি মতাদর্শনির্ভর স্লোগান নয়; বরং বহু শতাব্দীর তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ। পিকেটি দেখান যে ইতিহাস জুড়ে বৈষম্য কখনো স্থির ছিল না; বরং রাজনৈতিক ঘটনা, যুদ্ধ, বিপ্লব, সামাজিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ সম্পদের কাঠামোকে বারবার বদলে দিয়েছে। অর্থাৎ ধনীদের ধনী হওয়া কিংবা মধ্যবিত্তের বিস্তার দুটিই ইতিহাসনির্ভর। তিনি এই কারণেই অর্থনীতিকে ইতিহাসের ভেতরে ফিরিয়ে আনেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফরাসি বিপ্লবের দিকে ফিরে তাকান। ১৭৮৯ সালের সেই বিপ্লবকে আমরা প্রায়ই রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখি, কিন্তু এর গভীরে ছিল সম্পদের চরম বৈষম্য। বিপ্লব পূর্ব ফ্রান্সে জমি, কর ছাড়, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সামাজিক মর্যাদা মূলত অভিজাত শ্রেণী ও গির্জার হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। কৃষকরা উৎপাদন করত, কিন্তু কর, ভাড়া ও খাজনার বড় অংশ চলে যেত শাসকগোষ্ঠীর হাতে। যারা রাষ্ট্রের অর্থ জোগাত, তারাই রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে ফরাসি বিপ্লব শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল না; এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারেরও দাবি ছিল।এই বৈষম্য প্রসূত বিস্ফোরণের উদাহরণ শুধু ফ্রান্সেই সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়ার ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পেছনেও জমিদারি কাঠামো, কৃষকের দারিদ্র্য এবং শ্রমিক অসন্তোষ কাজ করেছিল। লাতিন আমেরিকার বহু দেশে ভূমি বৈষম্য দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। উপনিবেশিক ভারতেও জমিদারি প্রথা ও ভূমি রাজস্বনীতি কৃষকসমাজে গভীর অসাম্য সৃষ্টি করেছিল। অর্থাৎ যখন সম্পদ, ভূমি ও সুযোগ অল্প কয়েকটি পরিবারের হাতে বন্দী থাকে, তখন সমাজের স্থিতি ভঙ্গুর হয়ে ওঠে। পিকেটির বক্তব্য এখানে স্পষ্ট বৈষম্য কেবল ˆনতিক সমস্যা নয়, এটি রাজনৈতিক ঝুঁকিও। একইভাবে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের পুরনো ধনিকশ্রেণীকে দুর্বল করে দেয়। যুদ্ধের ধ্বংসে শুধু প্রাণহানি হয়নি; বহু প্রাসাদ, শিল্পকারখানা, রেলপথ, অবকাঠামো এবং ব্যক্তিগত সম্পদও ধ্বংস হয়। যুদ্ধোত্তর মুদ্রাস্ফীতিতে পুরনো বন্ড ও আর্থিক সম্পদের মূল্য পড়ে যায়। সরকারগুলো যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে এবং পুনর্গঠনের জন্য উচ্চ আয়কর, উত্তরাধিকার কর ও সম্পদ কর আরোপ করে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি সবখানেই কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা শক্তিশালী হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, শ্রমিক অধিকার ও আবাসননীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র মধ্যবিত্ত শ্রেণী গঠনে ভূমিকা নেয়। ফলে ’৪৫-’৭৫ পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যাপক উত্থান ঘটে। বহু শ্রমজীবী পরিবার প্রথমবারের মতো বাড়ি কেনে, সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায়, স্বাস্থ্যসেবা পায় এবং স্থায়ী চাকরির নিরাপত্তা ভোগ করে। এই সময়কে অনেকেই ‘পুঁজিবাদের সোনালি যুগ’ বলেন। কিন্তু পিকেটির মতে এটি বাজারের স্বাভাবিক ফল ছিল না; বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, শ্রমিক আন্দোলন, উচ্চ করব্যবস্থা এবং যুদ্ধ পরবর্তী সামাজিক চুক্তির ফল। অর্থাৎ বাজার একা সমতা আনে না; ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বৈষম্য কমাতে পারে।কিন্তু ১৯৮০-এর দশক থেকে রোন্যাল্ড রিগ্যান ও মার্গারেট থ্যাচারের নবউদারবাদী অর্থনীতি কর হ্রাস, বেসরকারিকরণ, আর্থিক উদারীকরণ ও বাজারমুখিতা বিশ্বে নতুন বৈষম্যের যুগ শুরু করে। বড় কর্পোরেশন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সম্পদমালিকরা দ্রুত ধনী হতে থাকেন, যখন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মজুরি সেই গতিতে বাড়েনি। আজকের ডিজিটাল অর্থনীতিতে এই বৈষম্য আরও নতুন রূপ নিয়েছে। প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম, তথ্যনিয়ন্ত্রণ, মেধাস্বত্ব, অ্যালগরিদমিক বাজার এবং বৈশ্বিক আর্থিক প্রবাহ এসবের মাধ্যমে সম্পদ আরও দ্রুত কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। জোসেফ স্টিগলিট বহুদিন ধরেই দেখিয়ে আসছেন, বাজার নিজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না; রাষ্ট্রীয় নীতি, করব্যবস্থা ও জনসেবাই সমতা আনে। অমর্ত্য সেন আবার মনে করিয়ে দেন, শুধু আয় নয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সক্ষমতা ও স্বাধীনতাও বৈষম্যের অংশ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পিকেটি, স্টিগলিটজ ও সেন তিনজনই ভিন্ন ভাষায় একই সতর্কবার্তা দেন। বইটির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, পিকেটি অর্থনীতিকে বোঝাতে সাহিত্য ব্যবহার করেছেন। তিনি অনরে দ্য বালজাকের পেরে গরিওট, জেন অস্টেনের প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডিস এবং চার্লস ডিকেন্সের ‘গ্রেট এক্সপেক্টেশনস’ উপন্যাস থেকে উদাহরণ এনে দেখিয়েছেন যে উনিশ শতকের ইউরোপে কঠোর পরিশ্রমের চেয়ে উত্তরাধিকার, বিবাহ ও পারিবারিক সম্পদ সামাজিক অগ্রগতির বড় মাধ্যম ছিল। পেরে গরিওট-এ তরুণ রাস্তিনিয়াক বুঝতে শেখে, শুধু মেধা নয় ধনী পরিবারে প্রবেশই সাফল্যের দ্রুত পথ। প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডিস-এ বিয়ে অনেকাংশে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠান। গ্রেট এক্সপেক্টেশনস-এ এক তরুণের জীবন বদলে যায় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদে। সাহিত্য এখানে কল্পনা নয়, সামাজিক বাস্তবতার দলিল। কারণ উপন্যাসের চরিত্ররা সেই সমাজের ভেতরের সত্য বলে, যা অনেক সময় পরিসংখ্যানের সারণি বলতে পারে না।পিকেটির আরেকটি গভীর তত্ত্ব হলো আধুনিক সবৎরঃড়পৎধপু বা মেধাতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা। আধুনিক সমাজ দাবি করে যে প্রতিভা ও পরিশ্রমই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। কিন্তু পিকেটি দেখান, অসম সমাজে এই দাবি অনেক সময় অর্ধসত্য। কারণ প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগেই অনেকের হাতে বাড়তি সুবিধা জমা থাকে। একজন শিশুর যদি জন্ম থেকেই ভালো পুষ্টি, নিরাপদ বাসস্থান, উন্নত স্কুল, ব্যক্তিগত শিক্ষক, প্রযুক্তি, বই, ভাষাগত দক্ষতা, সাংস্কৃতিক পরিসর এবং পারিবারিক যোগাযোগ থাকে, তবে সে পরীক্ষার হলে বসার আগেই এগিয়ে। অন্যদিকে আরেকজন শিশুকে যদি বিদ্যুৎহীন ঘরে পড়তে হয়, পারিবারিক আয়ের জন্য কাজ করতে হয়, কোচিংয়ের সুযোগ না থাকে, অপুষ্টিতে ভুগতে হয় তবে একই পরীক্ষায় অংশ নিলেও তাদের প্রতিযোগিতা সমান নয়। হার্ভাডে পড়ার স্বপ্ন এবং গ্রামের এক শিশুর সরকারি স্কুলের বাস্তবতা একই প্রতিযোগিতার মাঠ নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট। শহরের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার সুযোগ পায়; গ্রামের বহু শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকের পরই শ্রমবাজারে ঢুকে পড়ে। একজন উদ্যোক্তা ব্যর্থ হলে পরিবার থেকে আবার পুঁজি পায়; দরিদ্র পরিবারের উদ্যোক্তা একবার ব্যর্থ হলে বহু বছর পিছিয়ে যায়। অর্থাৎ উত্তরাধিকার শুধু টাকা নয়; উত্তরাধিকার হলো ভাষা, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক নেটওয়ার্ক, ব্যর্থ হওয়ার পরও আবার দাঁড়ানোর নিরাপত্তা। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিশ্বখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক ও ˆনতিকতাবিদ মাইকেল স্যান্ডেল যেমন বলেছেন, মেধাতন্ত্র অনেক সময় সফলদের অহংকার এবং ব্যর্থদের অপমান তৈরি করে। পিকেটির বিশ্লেষণও সেই সত্যকে অর্থনৈতিক ভাষায় প্রকাশ করে।তবে এত বিস্তৃত ও তথ্যসমৃদ্ধ কাজ হওয়া সত্ত্বেও পিকেটির বই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তার তথ্যভাণ্ডারের বড় অংশ ফ্রান্স, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও পশ্চিম ইউরোপকেন্দ্রিক। ইউরোপীয় সম্পদ-ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসংখ্যান তিনি যত নিখুঁতভাবে দেখাতে পেরেছেন, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা উপনিবেশিত বিশ্বের ক্ষেত্রে সেই গভীরতা তুলনামূলক কম। ফলে উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, দাসবাণিজ্য, জোরপূর্বক সম্পদ আহরণ, দুর্ভিক্ষ সৃষ্ট অর্থনীতি, বর্ণভিত্তিক শ্রমবাজার কিংবা ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো বইয়ে তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে থাকে। অথচ ইউরোপের বহু পুঁজিসঞ্চয়ের ইতিহাসই গড়ে উঠেছিল উপনিবেশিক শোষণের ওপর। ভারতীয় উপমহাদেশ, আফ্রিকার খনিজভাণ্ডার, ক্যারিবীয় চিনি-বাগান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যপথ এছাড়া ইউরোপীয় পুঁজির উত্থান পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা যায় না। ফলে, তার বইয়ের সীমাবদ্ধতা আসলে তার তত্ত্বের অস্বীকৃতি নয়; বরং সেই তত্ত্বকে আরও বিস্তৃত ভূগোলে প্রয়োগ করার আহ্বান।এই সীমাবদ্ধতার কারণে, পিকেটির বিশ্লেষণকে ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করলে সম্পদের সঞ্চয় ও বৈষম্যের একটি নতুন চিত্র সামনে আসে। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে ১৬শ’ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পর বাংলার রাজস্ব ও বাণিজ্যের ওপর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ স্থাপন হয়। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আহরণের অধিকার কোম্পানির হাতে চলে আসে। অর্থাৎ উৎপাদন স্থানীয় কৃষকের, কিন্তু উদ্বৃত্ত প্রবাহিত হতে থাকে বিদেশি শাসকের কোষাগারে। বহু অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদের মতে, আঠারো শতকের শেষভাগে বাংলার বিপুল সম্পদ ইউরোপে স্থানান্তরিত হয়, যা ব্রিটিশ শিল্পবিপ্লবের পুঁজিসঞ্চয়ে সহায়ক ছিল। পিকেটির ভাষায় বলতে গেলে, স্থানীয় সমাজে ম (জনগণের উৎপাদন বৃদ্ধি) যতটা ছিল, তার বড় অংশ r (সম্পদ-আয়) হিসেবে উপনিবেশিক শক্তির হাতে চলে যেত। ১৭৯৩ সালের স্থায়ী দেওয়ানি ব্যবস্থা জমিদারি কাঠামোকে স্থায়ী রূপ দেয়। জমির মালিকানা ও কর আদায়ের ক্ষমতা এক শ্রেণীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, কৃষক হয়ে পড়ে খাজনাদাতা প্রজা। ফলে উৎপাদক ও মালিকের বিচ্ছেদ তীব্র হয়। উনিশ শতক জুড়ে নীলচাষ, নগদকর, ঋতজাল, দুর্ভিক্ষ এবং বাজার নির্ভর কৃষিনীতি গ্রামীণ বৈষম্য বাড়ায়। ১৮৭০-এর দশক থেকে ১৯০০-এর দশক পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতে বারবার দুর্ভিক্ষ ঘটে; লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু খাদ্যশস্য রপ্তানি ও রাজস্বনীতি অব্যাহত থাকে। অর্থাৎ বৈষম্য শুধু আয়গত ছিল না; তা জীবন-মৃত্যুর ব্যবধানেও রূপ নেয়।১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান হয়নি; বরং নতুন রূপ নেয়। পূর্ব বাংলা জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ক্ষমতা, প্রশাসন, সামরিক নেতৃত্ব ও শিল্পপুঁজি পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক ছিল। ১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস ছিল পূর্ব বাংলার পাট রপ্তানি। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয়, শিল্পঋত, অবকাঠামো বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বড় অংশ যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। অর্থনীতিবিদদের বহু গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৬০-এর দশকে উন্নয়ন ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ পশ্চিম পাকিস্তান পেয়েছে, যখন বৈদেশিক আয়ের বড় অংশ এসেছে পূর্ব পাকিস্তান থেকে। মাথাপিছু আয় ব্যবধানও ক্রমে বাড়তে থাকে। ১৯৪৯-৫০ সালে দুই অংশের ব্যবধান তুলনামূলক কম থাকলেও ১৯৬৯-৭০ নাগাদ পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়ে যায়। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, নুরুল ইসলামসহ বহু চিন্তক ‘দুই অর্থনীতি’ ধারণা তুলে ধরেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার পেছনেও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন ছিল কেন্দ্রে। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কেবল সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক মুক্তির আন্দোলন ছিল না; তা ছিল বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও সংগ্রাম।স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ নতুন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বৈষম্য কমেনি বরং সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এসব কারণে প্রথম দশকেই সম্পদ বণ্টনের ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো শক্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ১৯৮০-এর দশক থেকে বাজারমুখী সংস্কার, বেসরকারিকরণ, নগরকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি এবং অনিয়ন্ত্রিত ভূমিমূল্য বৃদ্ধি নতুন বৈষম্য তৈরি করে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে প্রবৃদ্ধি প্রশংসনীয় গার্মেন্টস, প্রবাসী আয়, কৃষির উন্নয়ন, নারীর শ্রমঅংশগ্রহণ, অবকাঠামো উন্নয়ন সবই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। কিন্তু একই সঙ্গে সম্পদ কেন্দ্রীভবনও বেড়েছে। শহুরে জমির দাম, ব্যাংকঋণে প্রভাবশালী প্রবেশাধিকার, ব্যাবসায়ীদের সিন্ডিকেট, শেয়ারবাজারে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, কর ফাঁকি, খেলাপি ঋত, উত্তরাধিকারভিত্তিক ব্যবসা সম্প্রসারণ এসব মিলিয়ে উচ্চবিত্তের সম্পদ দ্রুত বেড়েছে। অন্যদিকে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় আটকে আছে। বিভিন্ন সময়ের জরিপে দেখা যায়, জাতীয় আয় বৈষম্যের গিনি সহগ স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোর তুলনায় এখন বেশি। শহর-গ্রাম সম্পদ ব্যবধান, ভূমিমূল্যের বিস্ফোরণ, ব্যাংকঋণে অসম প্রবেশাধিকার, শিক্ষার মানে দ্বৈততা এবং স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য সামাজিক স্তরবিন্যাসকে কঠিন করেছে।পিকেটির মতোই যদি আমরা ভারতীয় উপমহাদেশের অর্থনীতি বুঝতে সাহিত্যর দিকে তাকাই আমরা দেখবো ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্য কেবল গল্প নয়, এটি সামাজিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার জীবন্ত দলিল। ইউরোপের মতোই ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্যেও দেখা যায় কীভাবে জমি, শ্রেণী, জাত, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মানুষের জীবনের পথ নির্ধারণ করে দেয়। যেমন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা উপন্যাসে পরিচয়ের প্রশ্ন কেবল দার্শনিক নয় এটি সামাজিক স্তরবিন্যাসের গভীর প্রতিফলন। এখানে জাত, ধর্ম ও সামাজিক অবস্থান মানুষের সুযোগ সীমিত করে এবং বৈষম্যের সূক্ষ্ম ছাপ তৈরি করে। ছিন্নপত্র-এ রবীন্দ্রনাথ গ্রামীণ কৃষকের জীবন দেখান অনিশ্চিত অর্থনীতির উদাহরণ হিসেবে শ্রম আছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নেই, এবং উৎপাদনের ফল মানুষের হাতে আসে না। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ ও কপালকুণ্ডলা কেবল সাহিত্য নয়; এগুলো ঔপনিবেশিক সমাজে ক্ষমতা, উৎপাদন ও ˆনতিকতার সম্পর্ক বোঝার দলিল। বিশেষ করে আনন্দমঠ-এ অনাহার, কর ও রাষ্ট্রীয় শোষণের চিত্র আঠারো-উনিশ শতকের বাংলার অর্থনৈতিক বৈষম্যকে ফুটিয়ে তোলে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস, পল্লীসমাজ ও গৃহদাহ উপন্যাসগুলোতে বৈষম্য আরও ব্যক্তিগত এবং আবেগঘন রূপ নেয়। দেবদাস-এ শ্রেণী ও পারিবারিক মর্যাদা মানুষের প্রেম ও জীবন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। পল্লীসমাজ-এ জমি ও গ্রামের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখানো হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি, সম্পর্ক এবং ন্যায়বিচারকে গ্রাস করে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাঁসুলী বাঁক ও গণদেবতা-তে গ্রামীণ সমাজে জাত, জমি ও ঋণের জটিল কাঠামো মানুষের চলাচল ও সুযোগ সীমিত করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার ভেতরে বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা দেখায়, যেখানে মাছ ধরা, নৌকা চালানো এবং ঋত সবই এক ধরনের ধারাবাহিক সংগ্রাম। আধুনিক যুগে শওকত আলী ও ˆসয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস যেমন প্রদোষে প্রাকৃতজন ও লালসালু ধর্ম, ক্ষমতা ও গ্রামীণ অর্থনীতি একত্রে মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই উপন্যাসগুলো দেখায় যে বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার পুনরাবৃত্তি, যা মানুষের জীবনকে সীমিত করে এবং সামাজিক কাঠামোর মধ্যে প্রবেশের সুযোগকে সংকুচিত করে। প্রতিটি কাহিনী একসঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি সমন্বিত চিত্র ফুটিয়ে তোলে, যেখানে শ্রম, সম্পদ, ক্ষমতা ও ইতিহাসের সম্পর্ক গভীরভাবে স্পষ্ট হয়।পিকেটির বিশ্লেষণের বড় অংশই ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি কর-তথ্য, সম্পদ রেকর্ড এবং আয় পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যেখানে রাষ্ট্রীয় তথ্যভাণ্ডার দুর্বল, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বড়, নগদ লেনদেন বেশি, বা সম্পদ গোপন রাখা সহজ সেসব দেশের বাস্তবতা বইটিতে তুলনামূলক কম প্রতিফলিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বহু অর্থনীতি, বিশেষ করে বাংলাদেশে, জমি, সোনা, অনিবন্ধিত ব্যবসা, পারিবারিক সম্পদ, প্রবাসী আয়ের অনিয়মিত প্রবাহ এসব সবসময় পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। ফলে পিকেটির কাঠামো প্রয়োগ করতে গেলে স্থানীয় বাস্তবতার জন্য নতুন তথ্যসংগ্রহ অপরিহার্য। তার বিখ্যাত সূত্র r > g বৈষম্যের একটি শক্তিশালী ব্যাখ্যা দিলেও এটি সব সমাজের পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। কারণ বৈষম্য কেবল পুঁজির আয় ও প্রবৃদ্ধির পার্থক্য দিয়ে নির্ধারিত হয় না; শিক্ষা, প্রযুক্তি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, লিঙ্গবৈষম্য, সামাজিক পরিচয়, ভূমি দখল, শ্রমবাজারের কাঠামো এবং আইনের শাসনের দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে উদাহরণস্বরূপ, কেউ শুধু সম্পদের কারণে নয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রশাসনিক সুবিধা বা বাজারে প্রবেশাধিকার পেয়েও দ্রুত উত্থান ঘটাতে পারে। পিকেটির প্রস্তাবিত বৈশ্বিক সম্পদকর নীতিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন। উন্নত দেশগুলোর মধ্যেও করস্বর্গ, গোপন ব্যাংক হিসাব ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ বড় বাধা। বাংলাদেশের মতো দেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও সীমিত, কর প্রশাসন পুরোপুরি আধুনিক নয়, এবং সম্পদ মূল্যায়নের স্বচ্ছ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তাই তার নীতিকে হুবহু নয়, বরং স্থানীয় বাস্তবতায় রূপান্তর করে প্রয়োগ করতে হবে।তবুও বাংলাদেশের জন্য বইটির ধারণাগত প্রয়োগযোগ্যতা অত্যন্ত গভীর। কারণ বাংলাদেশ দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশ হলেও সম্পদ বণ্টনের প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শহরে যারা এক দশক আগে জমি, ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক সম্পত্তি কিনেছেন, তাদের সম্পদ মূল্য বহুগুণ বেড়েছে; অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের বড় অংশ ভাড়া, উচ্চ জীবনযাত্রা ব্যয় ও সীমিত সঞ্চয়ের চাপে আছে। এটি পিকেটির r > g তত্ত্বের স্থানীয় রূপ সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি শ্রমের আয়ের চেয়ে দ্রুত। গ্রামীণ বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা যায়। যাদের জমি আছে তারা কৃষিঋণ, সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ সুযোগে এগিয়ে থাকে; ভূমিহীন পরিবার শ্রম বিক্রি ছাড়া বিকল্প কম পায়। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, খরা বা লবণাক্ততা দরিদ্র পরিবারকে আরও সম্পদহীন করে। ফলে বৈষম্য শুধু আয় নয়, সম্পদ ও ঝুঁকির বৈষম্যও। শিক্ষাক্ষেত্রে তার মেরিটোক্রেসি-সমালোচনাও বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। রাজধানীর উন্নত স্কুল, ইংরেজি মাধ্যম, কোচিং, প্রযুক্তি সুবিধা ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এক শ্রেণীর হাতে বেশি কেন্দ্রীভূত; অন্যদিকে বহু মেধাবী শিক্ষার্থী গ্রাম বা নিম্নআয়ের পরিবার থেকে এসে শুরুতেই পিছিয়ে থাকে। তখন পরীক্ষার ফলাফলকে নিছক ‘মেধার জয়’ বলা অসম্পূর্ণ হয়ে যায়। পিকেটির ভাষায়, উত্তরাধিকার শুধু টাকা নয় সুযোগের উত্তরাধিকারও।এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য কিছু প্রয়োগযোগ্য শিক্ষা স্পষ্ট। বাংলাদেশে বৈষম্য হ্রাসের জন্য প্রথমেই করব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৮-১০ শতাংশে সীমিত থাকায়, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি করতে হলে এটি ধীরে ধীরে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। তবে শুধু কর বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; করের ধরনেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বর্তমান পরোক্ষ কর, বিশেষত ভ্যাট, সাধারণ ভোক্তার ওপর ডিসপ্রোপরশনেট চাপ ফেলে। তাই উচ্চ আয়, একাধিক সম্পত্তি, বিলাসী খরচের বস্তু এবং উত্তরাধিকারভিত্তিক বা অপ্রদর্শিত সম্পদের ওপর কার্যকর প্রত্যক্ষ কর আরোপ করতে হবে। এই পদক্ষেপ শুধু আয়ের সমতা বাড়াবে না, বরং রাষ্ট্রীয় নীতি ও ক্ষমতার মাধ্যমে সম্পদ কেন্দ্রীভবন কমাবে। পিকেটি বলতেন যেখানে সম্পদ সঞ্চিত, করনীতিও সেখানে পৌঁছাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং খেলাপি ঋত কমানো জরুরি। দীর্ঘমেয়াদী খেলাপি ঋত, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক স্বজনপ্রীতি (নেপোটিজম) এর কারণে অর্থনীতি প্রতিযোগিতামূলক থাকে না; বড় ঋণগ্রহীতা সুবিধা পায়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা কৃষক জামানতের অভাবে ঋণ পায় না। এই অর্থ কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, প্রযুক্তি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের দিকে সরানো হলে বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। রাজধানী ও শহরের উন্নত বেসরকারি শিক্ষা এবং গ্রামীণ স্কুলগুলোর মধ্যে মানের তফাৎ দূর করতে হবে। শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ৪-৬ শতাংশে উন্নীত করা, কারিগরি শিক্ষা ও জেলা-উপজেলায় মানসম্মত কলেজ এবং ডিজিটাল ল্যাব তৈরি করা, স্বাস্থ্যসেবা সার্বজনীন করা এগুলো সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। চতুর্থত, ভূমি ও নগর সম্পদের বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বড় শহরে জমির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় যারা আগে সম্পদ কিনেছে তারা আরও ধনী হচ্ছে, নতুন প্রজন্ম পিছিয়ে যাচ্ছে। খালি ফ্ল্যাট, অব্যবহৃত জমি এবং জল্পনামূলক সম্পদের ওপর কর আরোপ, সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প এবং জেলা ভিত্তিক শিল্পায়ন বাস্তবায়ন করতে হবে। পঞ্চমত, সামাজিক সুরক্ষা বিস্তৃত করতে হবে। বয়স্কভাতা, বিধবা ও প্রতিবন্ধী সহায়তা, বেকার প্রশিক্ষণ এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নগদ সহায়তা প্রণোদনা নিশ্চিত করলে দুর্বল শ্রেণীর মানুষ বৈষম্যের প্রভাব থেকে সুরক্ষা পাবে। ষষ্ঠত, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন অপরিহার্য; শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীভূত হলে উত্তরাঞ্চল, উপকূল, হাওর ও সীমান্ত জেলা পিছিয়ে থাকবে। শিল্পপার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল অবকাঠামো এবং রেল-লজিস্টিক নেটওয়ার্ক সব অঞ্চলে বিস্তার করতে হবে। সপ্তমত, শ্রমের মর্যাদা বাড়াতে হবে। ন্যূনতম মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা, মাতৃত্ব সুবিধা, অনানুষ্ঠানিক খাতের সুরক্ষা—এসব ছাড়া পুঁজির বিপরীতে শ্রম দুর্বলই থাকবে। সবশেষে, দূর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। সরকারি নীতি বা উন্নয়ন প্রকল্পে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে সুবিধা প্রভাবশালীদের দিকেই চলে যায়, সাধারণ মানুষ পিছিয়ে পড়ে। তাই কর সংস্কার, সম্পদ রেকর্ড, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকের ঋণ প্রবেশাধিকার সব পদক্ষেপকে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এই সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া শুধু অর্থনৈতিক নীতি যথেষ্ট নয়; কারণ দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বৈষম্যের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে।পরিশেষে, পিকেটির বই আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় বৈষম্য কোনো নির্ধারিত ভাগ্য নয়, এটি নীতি ও ব্যবস্থার ফল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেখানে নীতির মাধ্যমে সুবিধা-অসুবিধা তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমনি নীতির মাধ্যমে তা সমানভাবে বিতরণও করা সম্ভব। যদি বাংলাদেশ কেবল প্রবৃদ্ধির সংখ্যার গল্প না বলে, বরং ন্যায়সঙ্গত, সমতাভিত্তিক উন্নয়নের পথ বেছে নেয়, তবে প্রকৃত উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য, সংখ্যার জন্য নয়। উঁচু সেতু, ঝকঝকে নগর, বড় বাজেট এসব যতই চোখে পড়ে, তার চেয়েও বড় ও জরুরি প্রশ্ন একটাই: এই দেশের ভবিষ্যৎ কি সত্যিই সবার জন্য উন্মুক্ত, নাকি কেবল অল্প কয়েকজনের জন্য সংরক্ষিত? পিকেটির বিশ্লেষণের প্রকৃত মূল্য এখানেই নিহিত।[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়]

রক্তের দামে কেনা বিষণ্ণ জীবন

৮ মে, বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। কিন্তু বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের কাছে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি রক্তের জন্য চলমান এক নীরব যুদ্ধের প্রতীক। এই দিনে সারা বিশ্ব যখন থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের অঙ্গীকার নিয়ে আলোচনা সভা আর র‍্যালিতে মেতে ওঠে, তখন এদেশের কিছু নিভৃত কোণে কয়েক হাজার পরিবার এক অমানবিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। এটি কোনো সাধারণ যুদ্ধ নয়; এ যুদ্ধ এক ব্যাগ রক্তের জন্য, এ যুদ্ধ এক ফোঁটা নিশ্বাস কিনে নেওয়ার লড়াই।বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া কেবল একটি রক্তস্বল্পতার নাম নয়, এটি একটি অদৃশ্য সংকট। যা একটি সাজানো পরিবারকে মুহূর্তেই মরুভূমিতে পরিণত করতে পারে। যখন একটি শিশুকে প্রতি মাসে সুঁইয়ের কঠোর যন্ত্রণা সহ্য করে অন্যের রক্তে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়, তখন সেই লড়াই কেবল সেই শিশুর থাকে না, তা হয়ে দাঁড়ায় পুরো পরিবারের এক মরণপণ সংগ্রাম।রক্ত যখন অন্নের চেয়েও দামিবাংলাদেশের অসংখ্য পরিবার আজও স্মরণ করে সেই দিনটির কথা, যেদিন চিকিৎসকের রিপোর্টে প্রথম ‘থ্যালাসেমিয়া’ শব্দটি দেখেছিল। একটি ছোট্ট শিশুর ফ্যাকাশে হয়ে আসা মুখ, হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া শরীর, আর চিকিৎসকের গম্ভীর কণ্ঠ একটি পরিবারকে মুহূর্তেই বদলে দেয়।আজ সেই শিশুটির মতো হাজারো যোদ্ধা প্রতি মাসে কেবল বেঁচে থাকার আশায় হাসপাতালে যায়। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য রক্ত কেবল চিকিৎসা নয়, এটিই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র জ্বালানি।কিন্তু সমাজের এই অদৃশ্য সংকটের গভীরতা বোঝা যায় হাসপাতালের করিডোরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসে। ঈদের আনন্দ যখন শহরের প্রতিটি কোণে উপচে পড়ে, তখন একজন থ্যালাসেমিক সন্তানের বাবা মলিন মুখে বলেন, “মানুষ তো ঈদের নতুন জামাকাপড় কেনার চিন্তা করে, আর আমাদের ভাবতে হয় রক্ত কেনার টাকা আসবে কোত্থেকে? সন্তানের জন্য জামা নয়, আমি কি তার জন্য এক ব্যাগ নিশ্বাস কিনতে পারব?” যখন রক্ত কেনার টাকা জোগাতে গিয়ে ঘরের অন্ন কেনা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেই পরিবারের অবস্থা কেউ কি কল্পনা করতে পারে?২০২৪ সালের জাতীয় জরিপ ও স্বাস্থ্যখাতের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসার পেছনে মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে, যা অনেক নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের মোট আয়ের চেয়েও বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এদেশে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত পরিবারের আয়ের প্রায় ১৭ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যয় হয় শুধু রক্ত ও ওষুধের পেছনে।নিষেধের ঘেরাটোপে অমানবিক পরিশ্রমথ্যালাসেমিয়া রোগীদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি শরীরকে দ্রুত ক্লান্ত করে তোলে। হৃদপিণ্ড, লিভারসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।অথচ দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে অনেক রোগীকেই জীবনের প্রয়োজনে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। কোথাও একজন রোগী কলসি কাঁধে সিঁড়ি বেয়ে মানুষের বাসায় পানি পৌঁছে দিচ্ছে, কোথাও কেউ সারাদিন শ্রম বিক্রি করছে শুধুমাত্র পরবর্তী রক্ত নেওয়ার টাকা জোগাড় করতে।এক ভয়াবহ বৈপরীত্যবাঁচতে হলে রক্ত লাগবে, আর রক্ত কিনতে হলে যে পরিশ্রম করতে হবে, সেই পরিশ্রমই ওই শরীর নিতে পারছে না। এ এক অদ্ভুত মৃত্যুফাঁদ। ২০২৪ সালের সর্বশেষ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া পরিস্থিতির যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১.১৫ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এই রোগের বাহক। অর্থাৎ আমাদের চারপাশের প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে প্রায় ১ জন অজান্তেই এই জিন বহন করছেন। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার নতুন শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নিচ্ছে।সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো সচেতনতার অভাব। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ বাবা-মা সন্তান জন্মের আগে জানতেনই না থ্যালাসেমিয়া কী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিয়ের আগে কোনো স্ক্রিনিং বা রক্ত পরীক্ষা করা হয়নি। এই অজ্ঞতাই আজ থ্যালাসেমিয়াকে এদেশের অন্যতম বড় নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত করেছে। অথচ এটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য।সাইপ্রাস ও ইতালির লড়াইউন্নত বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একসময় সাইপ্রাসে প্রতি ৬ জনের ১ জন থ্যালাসেমিয়ার বাহক ছিল। পরে চার্চ, সরকার ও স্বাস্থ্যখাতের সমন্বয়ে বিয়ের আগে স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলাফল হলো আজ সেখানে নতুন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।ইতালির সার্দিনিয়া অঞ্চলও দীর্ঘমেয়াদি গণসচেতনতা, জিনগত পরীক্ষা এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের পাশের দেশ পাকিস্তানেও বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার আইন পাস হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এখনও বিষয়টি মূলত দিবসভিত্তিক আলোচনা আর সীমিত সচেতনতাতেই আটকে আছে।আশার আলোএই অন্ধকারের মাঝেও কিছু প্রতিষ্ঠান মানবিকতার বাতিঘর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ‘বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি হাসপাতাল’ তার অন্যতম উদাহরণ। ১৯৮৯ সালে মরহুম ইঞ্জিনিয়ার ওমর গোলাম রাব্বানী নিজের বাড়িতে মাত্র তিনটি বেড নিয়ে এই উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। আজ গ্রিন রোডের এই প্রতিষ্ঠান হাজারো রোগীর আশ্রয়স্থল।বর্তমানে এখানে প্রায় ৫ হাজাারের বেশি নিবন্ধিত রোগী রয়েছে এবং প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন রোগীর রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়। হাসপাতালটি যাকাত ফান্ডের মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের সহায়তা দেয় এবং অত্যন্ত কম খরচে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। এটি কেবল একটি হাসপাতাল নয়, মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতীক।মেধার স্বীকৃতি ও কোটার দাবিথ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত মানুষ শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে জীবনের নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়লেও মেধায় তারা পিছিয়ে নেই। নিয়মিত চিকিৎসা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেকেই প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে টিকে থাকতে পারেন না।তাই থ্যালাসেমিয়াকে একটি বিশেষ দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক জটিলতা হিসেবে বিবেচনা করে তাদের জন্য কর্মসংস্থান, শিক্ষাসহায়তা ও বিশেষ সুযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন। যদি তারা নিজের চিকিৎসার খরচ নিজে বহন করার সুযোগ পায়, তবে তারা সমাজের ওপর বোঝা না হয়ে দেশের সম্পদে পরিণত হতে পারে।মায়ের চোখের জলহাসপাতালের করিডোরে অনেক কথোপকথন পাথরকেও কাঁদাতে পারে। এক মা তার সন্তানকে বলছেন, “বাবা, আর একটু ধৈর্য ধর, সুঁইটা দিলেই শরীরটা আবার ভালো লাগবে।” সন্তান প্রশ্ন করে, “মা, আমি কেন অন্য বাচ্চাদের মতো দৌড়াতে পারি না? আমার শরীর এত দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায় কেন?” মা চোখের জল লুকিয়ে বলেন, “তুই তো বীরের মতো লড়াই করছিস বাবা।” এই কথোপকথনগুলো কোনো গল্প নয়; এটাই বাস্তবতা।  এক কিশোর রোগী তার মাকে বলছিল, “মা, আমার ঈদের জামা লাগবে না। তুমি শুধু রক্তের টাকাটা রেখে দিও।” আমাদের উৎসবের বিলাসিতা থেকে কি একটি ব্যাগ রক্তদানের জায়গা তৈরি করা যায় না?বিনীত নিবেদনথ্যালাসেমিয়া কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়; এটি মূলত অসচেতনতার ফল। আজ এই লেখা যখন আপনি পড়ছেন, তখন হয়তো কোনো শিশু হাসপাতালের বেডে পরবর্তী রক্তের অপেক্ষায় আছে। আপনি যদি নিয়মিত রক্তদান করেন, তবে হয়তো সেই শিশুটির জীবন আরও কিছুদিন এগিয়ে যাবে। আপনি যদি বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং নিশ্চিত করেন, তবে হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই কষ্ট থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।আসুন, এই ৮ মে আমরা শুধু দিবস পালন না করে দায়িত্ব গ্রহণ করি। নিয়মিত রক্তদান করি।বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা নিশ্চিত করি।  এই অদৃশ্য সংকটকে দৃশ্যমান করি। কারণ রক্ত শুধু শরীরে প্রবাহিত হয় না, এটি বাঁচিয়ে রাখে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি মায়ের প্রার্থনা, একটি শিশুর আগামী। সেই জীবন যেন অর্থাভাবে অকালে ঝরে না পড়ে এ দায় আমাদের সবার। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক

রম্যগদ্য: “ধুলোভাই জিন্দাবাদ”

“ধুলোভাই জিন্দাবাদ, দাদাবাবু জিন্দাবাদ...”“কী ব্যাপার হঠাৎ ধুলোভাই জিন্দাবাদ, দাদাবাবু জিন্দাবাদ দিচ্ছিস! দুলাভাই জিন্দাবাদ না হয় বুঝলাম কিন্তু তোর দাদাবাবুর তো দফারফা। তোর কামেরবেটি মার্কা দিদি আর নেই, ফলে তোর দাদাবাবুকে আর টনকা টন ঈলিশ মাছ খেতে হবে না।”“ধুর মিয়া আপনে আছেন আপনের টনকা টন ইলিশ মাছ রপ্তানিতে, হক্কল যায়গায় খালি ব্যবসা খোঁজেন! আমি কই কী, আর আমার সারিন্দায় কয় কী?”“কেন কেন, দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে টনকা টন ইলিশ মাছ রপ্তানীতে দোষ কোথায়?”“টনকা টন ইলিশ মাছ রপ্তানি নারে ভাই অহন রপ্তানি হোইতাছে বুলডোজার! ১৮৭৪ সালে নির্মিত কোলকাতা নিউমার্কেটের সামনে নেড়েগো গোশতের দোকান বুলডোজার দিয়া ভাইঙ্গা দিলো। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত সরকারের মদদপুষ্ট যোদ্ধারা। বুজলাইন, বাংলাদেশ অহন আর কচি শিশুটি নাই! হ্যারা অহন এক্সপোর্ট করে আর্ন্তজাতিক মানের বিজয় মিছিলের আইডিয়া- “দ্যা বুলডোজার!”“ক’দিন আগে না তোর মমতা দিদি আমাদের নারায়ণগঞ্জের বঙ্গসন্তান, শামীম ওসমানের “খেলা হবে” স্লোগানটা ইম্পোর্ট করেছিলেন...”“তো! আমাগো নারায়ণগঞ্জের পোলা, শামীম ওসমানের “খেলা হবে” স্লোগানটা ইম্পোর্ট করেছিলেন, তো দোষের কী হোইছে?”“না দোষের কিছু হয়নি, ৫ আগস্টের পরে শামীম ওসমানের যেমন জনগণ দরজার চৌকাঠ পর্যন্ত খুলে নিয়েছে, এবার পশ্চিমবঙ্গে পাবলিক তৃণমূলের কর্মীদের ধোলাই করছে, আর নিউমার্কেটের সামনে নেড়েদের গোশতের দোকান বুলডোজার দিয়া ভাঙছে।”“হেঁ হেঁ হেঁ, বুজেন না “গ্রেটম্যান থিংস অ্যালাইক...”“এ আবার কী? এখানে “গ্রেটম্যান থিংস অ্যলাইক” কথাটা আসছে ক্যানো?”“গ্রেটম্যান থিংস অ্যালাইক” কথাটা আইছে ক্যান হেইডা আপনে বুজেন না! দেড়বছর আগে আপনের তত্বাবধায়ক সরকার ক্যেমনে সব বুলডোজিং করতাছিলো ভুইল্লা গেছেন?”“না না এইসব অসভ্য বর্বর পৈশাচিকতা কেউ কখোনো ভুলবে? আর্শ্চয্য!”“জ্বী, মুদি সরকারভি ওই আমাগো গ্রেটম্যানের পথ ধইরা বুলডোজিং করতাছে! যতই কন মহাভারত মহাগণতন্ত্রের দেশ, আসলে যেই লাউ হেই কদু, ধর্মান্ধতার কাছে ট্রাম্প কন আর মুদিজী বেবাগতে সেইম সেইম।”“যাহ তা হয় নাকি, ভারতের সভ্যতা বেনারসের নগরের পত্তন সেতো হাজার হাজার বছরের বৈদিক সভ্যতা। তার সঙ্গে তোর এই অর্ধশতাব্দীর অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত কতগুলো মানুষ নামের জন্তু জানোয়ারে সমাজ পরিচালকের তুলনা কি মানায়?”“ক্যা, তুলনা হোইবো না ক্যান? ইভিএম ভোটে কারচুপি! এইডা ক্যাডা শিখাইছে? আপনে কন হাজার বছরের সভ্যতা! আমাগোটা অর্ধশতাব্দী না চুয়ান্ন বছর হেই তর্কে আমি যামুনা। তয় আমি কোইকি এইবার কলিকাতার বাঙালি মুসলমানগো খবর আছে। এইবারের পশ্চিমবঙ্গের ভোটার লিস্টে প্রায় নব্বই লাখ মুসলমানের নাম বাদ পড়ছে! ফলে কামের বেটি কন আর ফকিরনি মার্কা দিদি যাই কন হ্যের কিন্তু মোসলমান ভোট ব্যাংক দেওলিয়া হয়া গ্যেছেগা।”“তা বললে হবে নাকি ওই যে বাবারি মসজিদ ভাঙার পর, ঠিক বাবরি মসজিদের মতো নতুন মসজিদ গড়ার কারিগর জনাব হুমায়ুন কবির আম জনতা পাটি থেকে নিবার্চন লড়ে, তৃণমূল ও বিজেপিকে হারিয়ে জয় লাভ করেছে।”“বুঝছি বুজছি আপনে মিয়া কোইতে চান পশ্চিম বঙ্গের নির্বাচনের ফল আমাগো ওপর কিছুটা হোইলেও পরভাব ফেলবো। ঠিক আছে কিন্তু আমি কোই কি, যেসব পোলাপান মানে জেন-জীর লড়াকু পোলাগুলা যে মাল খায়া টাল হোইলো হ্যেরা যুদি আবার স্বজনপ্রীতি শুরু করে, তায়লে কোইলাম খবর আছে। দেশের আবার বারটা বাজবো!”“কিন্তু তুই কি করবি বল, দুলাভায়ের কাছে শালারা আবদার করবেনা? দুলাভাই যদি শালাদের কথা না শুনে তাহলেতো তোর ভাবীর কাছে দুলাভায়ের মুখ থাকবে না!”“ভাইনা ভালা, আপনে বিগত অর্ধশতাব্দী না চুয়ান্ন বছর হিসাব দিলেন, প্রতিবারই আপনেরা হয় পার্টির প্রধান মন্ত্রী নাইলে নিজ আত্মীয়গো পুরধান মন্ত্রী, কুনো সময় কিন্তু বাংলাদেশের মানে পুরা দেশের পুরধান মন্ত্রী হন নাই! আর পার্টি আর আত্মীয় দেখতে যায়া বার বার বাংলাদেশরে গাথায় ফ্যালাইছেন। এইবারও যদি আপনেরা ধুলো ভাই ধুলোভাই কয়া স্বজনপ্রীতির দিকে যাইতে কন তায়লে হেইতো আবার বাংলদেশরে লয়া গাথায় পড়বো। আবার কোনো হালায় বুলডোজার দিয়া হ্যের আত্মীয় স্বজনগো দরজার চৌকাঠ পর্যন্ত খুইল্লা নিবো।”“নাওে না, তুই এই ভয় আর করিস না, এই দুলাভাই মাছের রাজা ইলিশ আর বাত্তির রাজা ফিলিপস’এর দুলাভাই নয়, ইনি অনেক পরিপক্ক। ইনি আর ঝাপসা আলোয় কাঁটা কুটা কিচ্ছু দেখি না, দুলাভাই নয়। ইনি সব কিছুই ঠিক মতো দেখছেন। একযুগ পর দেশের মাটিতে নেমেই কিন্তু তোর এই দুলাভাই বলেছেন, বিশ্বের শোষিতের নেতা মার্টিন লুথার জুনিয়ারের মতো বলেছেন, “আই হ্যাভ এ, প্ল্যান” তাই তুই নিশ্চিন্তে থাক। কেবল একটু ধৈর্য্য ধর তাহলেই হবে।”“ঠিক আছে ভাই, ওই সব দাদা-দিদিগো চুলা-চুলি থুয়া, নিজেগো দেশটারে সুন্দরমোতো তৈয়ার করারা লাইগ্যা ব্যেবাগতে এক না হোইলে চলেনা। তয় আপনে কথাটা ঠিকই কোইছেন, ব্যেবাগতেওে একটু ধৈর্য্য ধরন লাগবো।”“এইতো বুদ্ধিমানের মতো কথা। দাদা-দিদিদের বুলডোজার রেখে আমরা সবাই ধৈর্য্য ধরে দেখি দেশের কী হয়।”“পুরা দেশের জনগণ, একলগে সবে কন, ধৈর্য্য শরণং গচ্ছামি।”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

রবীন্দ্রমননে বিজ্ঞান: ‘সত্যের একত্ব’ অন্বেষণ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২৬৮ সালের ২৫ বৈশাখ (৭ মে ১৮৬১) কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীতে, আমি বিজ্ঞানে তার কতিপয় ভাবনার ওপর আলোকপাত করব।১৯১৩ সালে সুইডিশ নোবেল কমিটি উল্লেখ করেছিল যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল, ‘তার গভীর সংবেদনশীল, সতেজ এবং সুন্দর পদ্যের জন্য— যার মাধ্যমে তিনি অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে নিজের ইংরেজি শব্দে প্রকাশিত কাব্যিক চিন্তাকে পাশ্চাত্যের সাহিত্যের একটি অংশ করে তুলেছেন’। তার এই কাব্যিক চিন্তা কীভাবে তার সময়ে এবং তার পরেও আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে, তা ইউরোপের অনেক বিজ্ঞানী ও দার্শনিককে বিস্মিত করেছে।বিজ্ঞানের প্রতি রবীন্দ্রনাথের কৌতূহল ছিল আশৈশব। তার পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের দীক্ষা এবং পরবর্তীকালে জীববিজ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহ তাকে মহাবিশ্বের উৎপত্তির অনুসন্ধানে সক্ষম করে তোলে। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান ভালোবাসতেন এবং ইংল্যান্ডে থাকাকালীন গ্রিনিচ মানমন্দির পরিদর্শন করেন। প্রখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিদ মেঘনাদ সাহা তাকে ১৯৩৭ সালে ‘বিশ্ব-পরিচয়’ নামে একটি বই লিখতে অনুপ্রাণিত করেন— যা তিনি বোসন এবং বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানের জনক সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেন। তিনি তার এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিসের সঙ্গে কাজ করেছিলেন, যিনি ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। ইউরোপীয় বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞানমনস্ক দার্শনিকদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী আর্নল্ড সমারফেল্ড, যার সঙ্গে ১৯২৮ সালে কলকাতায় তার দেখা হয়েছিল। বিখ্যাত জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ওয়ার্নার হাইজেনবার্গও ১৯২৮ সালে কলকাতায় তার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। হাইজেনবার্গ ১৯৭২ সালে বলেছিলেন যে, পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক ধারণা তার সহায়ক হয়েছিল। হাইজেনবার্গ সেই পরিণত বয়সের কবির সঙ্গে আপেক্ষিকতা, অসামঞ্জস্যতা, আন্তঃসংযুক্তি এবং অনিত্যতা— এসব ভৌত বাস্তবতার মৌলিক দিক নিয়ে বেশ কয়েকবার আলোচনা করেছিলেন। কথোপকথনের পর তিনি বলেছিলেন, ‘কিছু ধারণা যা এত উদ্ভট মনে হয়েছিল, হঠাৎ করেই সেগুলোর অনেক অর্থ খুঁজে পাওয়া গেল। এটা আমার জন্য খুব সহায়ক ছিল।’রবীন্দ্রনাথ তার বিশ্ব-পরিচয় গ্রন্থ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেছিলেন। এই উৎসর্গপত্রে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন, ‘আমি বিজ্ঞানের সাধক নই, সে কথা বলা বাহুল্য। কিন্তু বালককাল থেকে বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিল না।’ বিজ্ঞান চর্চার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন, ‘বুদ্ধিকে মোহমুক্তি ও সতর্ক করবার জন্য প্রধান প্রয়োজন বিজ্ঞান চর্চার। জ্ঞানের এই পরিবেশন কার্যে পাণ্ডিত্য যথাসাধ্য বর্জনীয় মনে করি।’ আমরা লক্ষ্য করি বিশ্ব-পরিচয় গ্রন্থে বিজ্ঞানের নানা তত্ত্ব ও তথ্য যেমন পরমাণুলোক, নক্ষত্রলোক, সৌরজগৎ, ভূলোক— এভাবে ভাগ করা হয়েছে বিভিন্ন অধ্যায়ে। তা ছাড়া সহজ ভাষায় এবং অনেক ক্ষেত্রে নতুন পরিভাষা তৈরি করে এই গ্রন্থটি রচনা করা হয়েছে। সে সময় বাংলায় বিজ্ঞানের বইয়ের অভাব ছিল এবং সে অভাব দূরীকরণে তার যে সামান্য প্রচেষ্টা রবীন্দ্রনাথ নিজেই বইটির উৎসর্গপত্রে তা উল্লেখ করেছেন।আমরা আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নানা কথোপকথন সম্পর্কে জানি। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মানুষ থেকে আলাদা কিছু নয় বরং মহাবিশ্বের সঙ্গে মানুষের সম্প্রীতি সত্য সুন্দরের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে উল্লেখ্য, নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ইলিয়া প্রিগোজিন রবীন্দ্রনাথ এবং আইনস্টাইনের ‘বাস্তবতার প্রকৃতি’ সম্পর্কে যে ভিন্নমত রয়েছে, তা তার গ্রন্থ ‘Order out of choas: Men's new dialogue with nature’-এ উল্লেখ করেন, ‘Curiously enough, the present evolution of science is running in the direction stated by the great Indian poet. Whatever we call reality, it is revealed to us through the active construction in which we participate.’ অর্থাৎ প্রিগোজিন বলতে চেয়েছেন যে বিজ্ঞানের বর্তমান বিবর্তন রবীন্দ্রনাথের নির্দেশিত পথেই এগোচ্ছে।এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে যে রবীন্দ্র ভাবনায় পরিবেশ প্রাচীন ভারতের তপোবনের পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মহাকবি কালিদাস উজ্জয়িনীতে বসে বৈদিক যুগের তপোবন তথা বিশিষ্ট মুনির আশ্রমের যে বর্ণনা দেন, তাতে দেখা যায় যে, সে সময় তপোবনগুলোর পরিবেশ ছিল মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গাছপালাকে বাদ দিয়ে কোনো জীবন টিকে থাকতে পারে না। এই ধারণা সঞ্জাতবোধ রবীন্দ্রভাবনায় পরিলক্ষিত হয়। কলকাতার নগরায়ণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন প্রায় ১০০ বছর আগে। আমরা তার কবিতায় তাই দেখি তিনি লিখেছেন— ইটের পরে ইট, মাঝে মানুষ কীট/ নাইকো ভালোবাসা নাইকো খেলা।রবীন্দ্রনাথের ভাবনা-চিন্তায় ছিল পরিবেশ ও প্রকৃতি। তাই তার কবিতায় লক্ষ করি বৃক্ষকে বন্দনা করার কথা, যেমন— অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান,/ প্রাণের প্রথম জাগরণে তুমি বৃক্ষ, আধি প্রাণ। ‘আকাশ’ নামের কবিতায় কবি উল্লেখ করেন- শিশুকালের থেকে/আকাশ আমার মুখে চেয়ে একলা গেছে ডেকে।প্রকৃতির সঙ্গে মানব চেতনার একীভূত হওয়ার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের গভীর বিশ্বাস শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন তার পরিবেশ উপলব্ধির মধ্যে নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। শান্তিনিকেতনের আশ্রম ও তার পরিবেশ পর্যালোচনা করলে আমরা রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ চিন্তার যে স্বরূপ লক্ষ্য করি তা হলো এই যে কবি চেয়েছিলেন, ‘এখনকার কালের বিদ্যা ও তখনকার কালের প্রকৃতি’। তবে এটা সত্য যে রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদর্শ এবং আধুনিকতার মধ্যে সাযুজ্য বিধানের সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের অভিযোজনের চিন্তা-ভাবনাও করেছিলেন।রবীন্দ্রমননে বিজ্ঞান প্রাচীন ভারতের অধ্যাত্ম ভাবনার সঙ্গে মিশে এক চতুর্মাত্রিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। আইনস্টাইনের চতুর্থ মাত্রা হচ্ছে সময় বা কাল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের চতুর্থ মাত্রা হচ্ছে ভারতবর্ষের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক জীবন ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ের চেষ্টা রবীন্দ্রনাথ করেছেন। সমন্বয়ের এই রবীন্দ্র-দর্শন থেকে আমরা পেতে পারি প্রাণ ও অপ্রাণের মধ্যে ঐক্যের সন্ধান। রবীন্দ্রমননে এই ঐক্যই সত্যের একত্ব অন্বেষণের নিয়ামক।[লেখক: গবেষক ও অধ্যাপক, যুক্তরাজ্য]

শিক্ষক হেনস্তা কি চলতেই থাকবে

সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা আর স্নেহের এক পুণ্যবন্ধন। কিন্তু বর্তমান সময়ের অস্থিরতা সেই সম্পর্কের মূলে কুঠারাঘাত করছে। আমরা এক অদ্ভুত ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি, যেখানে জ্ঞানের মশালবাহী শিক্ষককে হতে হচ্ছে লাঞ্ছিত। এই অবক্ষয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং গোটা সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার এক অশনি সংকেত। সম্প্রতি উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পালের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়। ক্লাসরুমে তরুণ ছাত্র কর্তৃক একজন পিতৃসম শিক্ষকের ওপর যে শারীরিক লাঞ্ছনা চালানো হয়েছে, তা কেবল অপরাধ নয়, বরং পৈশাচিকতার বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের একাংশ কতটা নিচে নেমে যেতে পারে। শিক্ষার যে আঙিনায় মানুষ হওয়ার পাঠ পাওয়ার কথা ছিল, সেখানেই আজ অমানুষের আস্ফালন। দুঃখজনক বিষয় হলো, ছাত্রের এই কাজের পর সংশোধন করার বদলে তার পিতা নিজের পদের দাপট দেখিয়েছেন। একজন বিচারপতির আসনে বসে নিজের সন্তানের অপরাধ আড়াল করতে শিক্ষককে নিজ বাসায় তলব করা এবং উল্টো শিক্ষককেই ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা আইনের শাসনের এক প্রহসন। সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি’—সত্যিই আমরা অবাক হই যখন দেখি ন্যায়ের প্রদীপ যারা জ্বালাবেন, তারাই অন্ধকারের পক্ষ নিচ্ছেন। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ স্লোগান বা মন্তব্য আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ˆদন্যকেই তুলে ধরছে। একজন নারীকে বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে সম্বোধন করার সময় যে ন্যূনতম সৌজন্যবোধ প্রয়োজন, তা যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে এই গালিবাজ জেনারেশন বা প্রজন্মের ভাষা শুনলে মনে হয়, তারা যুক্তির চেয়ে অশ্লীলতাকে বেশি শক্তিশালী হাতিয়ার মনে করে। ‘এক দুই তিন চার’ কিংবা ‘টিনের চালে কাউয়া’র মতো স্থুল স্লোগানগুলো রাজনৈতিক উত্তেজনায় ব্যবহৃত হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে কিশোর মনের ওপর। তারা শিখছে যে, কাউকে আক্রমণ করতে হলে তার সম্মান বা মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে দেয়াটাই বীরত্ব। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা যেকোনো রাজনৈতিক পালাবদলের সময় যখন মব কালচার বা গণপিটুনির সংস্কৃতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যখন সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়, তখন বখাটে ছাত্র বা দাপুটে অভিভাবক ভয় পাওয়ার বদলে আস্কারা পায়। এই অস্থির সময়ে শিক্ষকরা হয়ে পড়েছেন সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত, অথচ তারাই ছিলেন জাতির আলোকবর্তিকা। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘শিক্ষা কি কেবলই তথ্য পরিবেশন? তা তো নয়, তা হলো পূর্ণতা দান।’ সেই পূর্ণতা আজ লাঞ্ছিত। শিক্ষক হেনস্তার এই ধারা যদি চলতে থাকে, তবে কোনো মেধাবী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ আগামীতে শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাইবেন না। যখন একজন শিক্ষক ক্লাসে প্রবেশের আগে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তখন পাঠদান প্রক্রিয়াই মুখ থুবড়ে পড়ে। রাষ্ট্র যদি এই অন্যায়ের গ্যারান্টি দিতে না পারে যে আগামীতে আর কোনো শিক্ষকের সঙ্গে এমন হবে না, তবে সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যত অন্ধকার। জীবনানন্দ দাশের কথায়, ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ।’পরিবার হচ্ছে নৈতিকতার প্রাথমিক বিদ্যাপীঠ। কিন্তু বিচারপতির সেই পুত্রের মতো যখন অভিভাবকরাই সন্তানের ভুলকে আস্কারা দেন, তখন সেই সন্তান সমাজের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়ায়। জনস্বার্থে আজ এটা বলা জরুরি যে, ক্ষমতার দাপট দিয়ে ন্যায়কে চাপা দেওয়া যায় না। প্রতিটি অন্যায়ের বিচার যদি দৃষ্টান্তমূলক না হয়, তবে সমাজের এই পচন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে আপনার এবং আমার ঘরের দরজায়। শিক্ষক এবং শিক্ষা মন্ত্রীর সম্মান রক্ষার বিষয়টি কেবল ব্যক্তির সম্মান নয়, বরং এটি একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা। যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে অশ্লীল কথাবার্তা বলা হয়, তখন তা বিদেশের মাটিতে আমাদের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে। এই গালিবাজ জেনারেশন তৈরি করার পেছনে যে কারিগররাই থাকুক না কেন, তাদের দায়ভার নিতে হবে। যে জাতির নৈতিক ভিত্তি যত দুর্বল, সেই জাতির উন্নয়ন তত বেশি ঠুনকো। আমরা দালানকোঠা আর অবকাঠামো দিয়ে সভ্যতা মাপতে চাই, কিন্তু মানুষের মনুষ্যত্ব যখন হারিয়ে যায়, তখন সেই ইট-পাথরের কোনো মূল্য থাকে না। দয়াল চন্দ্র পালের মতো শিক্ষকদের চোখের জল যদি শুকিয়ে যায়, তবে এই বাংলার মাটি তার উর্বরতা হারাবে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের সেই গুরুভক্তির দিনগুলো আজ কেবল বইয়ের পাতায় পড়ে আছে। মব কালচার বা গণউন্মাদনা এক ধরনের সাময়িক মানসিক বিকার। এটি আইনকে নিজের হাতে তুলে নিতে প্ররোচিত করে। এই মবের শিকার হয়ে যখন সম্মানিরা অপদস্থ হন, তখন অযোগ্যদের দাপট বেড়ে যায়। আজকের এই অস্থির সময়ে আমাদের তরুণ সমাজকে বোঝাতে হবে যে, বিপ্লব মানে অসভ্যতা নয়, পরিবর্তন মানে গালিবাজ হওয়া নয়। শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি যে ধরনের কুরুচিপূর্ণ সম্বোধন করা হয়েছে, তা নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী নেতৃত্বের প্রতি এক চরম অপমান। নারীরা যখন কোনো পদে আসীন হন, তখন তাদের মেধা নিয়ে সমালোচনা করা যায়, কিন্তু তাদের চরিত্র বা লিঙ্গ নিয়ে কুৎসিত ইঙ্গিত দেয়া বর্বরতা। সুলতানা রাজিয়া থেকে শুরু করে প্রীতিলতা পর্যন্ত যে সংগ্রামের ইতিহাস, তা এই অসভ্য আচরণের কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, ‘আর সেই মেরুদণ্ড যদি অপমানে নুয়ে পড়ে, তবে জাতি হিসেবে আমরা কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব না। শিক্ষার্থীদের শাসন আর গুণী শিক্ষকদের সম্মান ফিরিয়ে আনাই হোক আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা কী রেখে যাব? কেবল একরাশ ঘৃণা আর গালিবাজ স্লোগান? নাকি শ্রদ্ধাবোধ আর সহমর্মিতা? দয়াল চন্দ্র পালের সেই অপমানিত মুখখানা যেন আমাদের বিবেককে বারবার প্রশ্ন করে। এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে কাজের মাধ্যমে। সমাজ সংস্কারের আন্দোলন শুরু হোক ঘর থেকে, তারপর ছড়িয়ে পড়ুক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। শিক্ষকদের নিরাপত্তা কেবল পুলিশের লাঠি দিয়ে সম্ভব নয়, এটি দরকার সামাজিক সচেতনতা। প্রতিটি ছাত্রকে বুঝতে হবে, শিক্ষকের পায়ের তলায় বেহেশত না থাকলেও, তার আশীর্বাদের হাতটি মাথার ওপর থাকা ভাগ্যের ব্যাপার। শিক্ষক লাঞ্ছনার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। অভিভাবকের পদের দোহাই দিয়ে পার পাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হোক। শিক্ষা মন্ত্রীর সম্মান যেন কোনোভাবেই বাজারের সস্তা তর্কের বিষয় না হয়। চাই এমন এক সোনার বাংলাদেশ, যেখানে গুরুকে দেখলে শিষ্য শ্রদ্ধায় মাথা নত করবে, দম্ভে বুক ফোলাবে না। শিক্ষক হেনস্তা রুখতে হলে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। বিচারপতির পুত্র হোক বা প্রভাবশালী নেতা—শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার সাহস যেন কেউ না পায়, তেমন আইন ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্কুলের ছোট ক্লাসরুম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। ১৮টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত এই নিবন্ধের লক্ষ্য একটাই—বিবেককে জাগ্রত করা। অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো তত কাছে আসে। তবে সেই আলোর জন্য আমাদের লড়াই করতে হবে। মব কালচার আর গালিবাজ জেনারেশনকে প্রত্যাখ্যান করে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চা শুরু করতে হবে। [লেখক: প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল]

গ্রামের ধানকাটা ও প্রাসঙ্গিক কথা

এখন বৈশাখ মাস। গ্রামে আছি। কিশোরগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হিসেবে হাওরাঞ্চলেই বেড়ে উঠেছি। শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামের মাঠে-ঘাটে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ঝুলিটা বেশ বড়োই বলা যায়। এখন বোরোধান কাটার ভরা মৌসুম চলছে। ভাটি বাংলার মানুষের মূল ফসল এই বোরোধান। এটা বছরে একবার হয়। এর ওপরই চলে কৃষকের বারো মাসের ভালো-মন্দ জীবন। স্মরণাতীত কাল থেকেই ভাটির মানুষের সুখ-দুঃখ আয়-ব্যয়, আর আটপৌরে জীবন যাত্রার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে বিল-ঝিল আর হাওরের বোরো ধানের সোঁদাগন্ধ। বোরো ধানের ফলন বরাবরই ভালো হয়, বেশির ভাগ সময়েই বাম্পার ফলন হয়ে থাকে। যদিও এর সঙ্গে আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতন দুর্ভাগ্য লেগে থাকে। এতদস্বত্বেও হাওরের মানুষ অভ্যস্ত এবং অভিজ্ঞ। দুর্যোগ বলতে অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, হঠাৎ বাঁধ ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি হয়ে থাকে। কিন্তু এসবের ভেতরেও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কৃষকরা তাদের জীবিকার মতন ধান সংগ্রহ করে নিতে পারে। ২.দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এবারের দুর্যোগ সম্পূর্ণ অন্যরকম, মাত্র ৫-৬ দিনের অতিবৃষ্টি এসে তলিয়ে দেয় হাজার হাজার হেক্টর প্রায় পেকে ওঠা ধানের জমি। পানি সরে যাচ্ছে না কিছুতেই, কারণ নানা স্থানে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, ব্রিজ কালভার্টের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে, খাল, নালা, সংকোচিত হয়েছে যত্রতত্র। এবার স্বচোখে ধান লওয়া আর কৃষকের অবর্ণনীয় বিড়ম্বনা দেখে অশ্রুপাত করা ছাড়া যেন উপায় নেই। এমনিতেই বোরো ব্যয়বহুল ফসল। এর উৎপাদন অধিক হওয়ার পেছনে প্রয়োজন পড়ে পর্যাপ্ত পানি, সার, কীটনাশক প্রভৃতির। কৃষকরা লোন করে, এনজিওর কিস্তি পরিশোধের দায় নেয়, গ্রামীণ সুদের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান দিয়ে শোধ করার শর্তে টাকা এনে বোরো ধান চাষ করে থাকে। তাদের ভরসা ধান তুলে সব ঋণের বোঝা নামিয়ে স্বস্তির হাসি হাসবে। না, এবার তা হচ্ছে না, কৃষক ধান ওঠাতে পারছে না মূলত বিরূপ আবহাওয়া আর হাতে নগত টাকার অভাবে। ৩.আরেকটা অনির্বচনীয় দৃশ্য যা বিবেককে নাড়া দিয়ে যায়, তা হলো ধানের বাজার মূল্য। এর কোনো দাম নেই। মনে হয়, মানুষ শুধু চাল খায়, ধানের দরকার নেই। মাঠে মাঠে ভেজা ধান পড়ে আছে, কেনার কেউ নেই। আপাতদৃষ্টিতে সবচেয়ে ফেলনা বস্তুর নামই ধান। দেখা যায়, এক মণ ধানের দাম সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা। আর একজন দিনমজুর বা রোজ কামলার মজুরি ১৫০০-১৬০০ টাকা। বৃষ্টির কারণে জমিতে তারা বেশি সময় থাকতে পারছেনা। অথচ এদের জন্যে দু’বেলা খাবারও সরবরাহ করতে হচ্ছে কৃষককেই। যেখানে একজন মজুর দিনে ২০০০ টাকার ধান কাটতে পারছে না, তাকে দু’বেলা খাবার এবং ১৬শ’ টাকা দিতে হচ্ছে। কোন দিকে যাবে কৃষক আর জমির মালিকরা? তারা জমির তলিয়ে যাওয়া ধান আনবে নাকি জমিতেই বিলীন হতে দিবে তা স্থির করে ওঠতে পারছে না। সহানীয় একজন প্রবীণ কৃষক জানালেন, ‘গত ৫০ বছরে তিনি এমন আবহাওয়ার বিপর্যয় দেখেননি। গত এক সপ্তাহের মধ্যে দু’চার ঘণ্টার জন্যও সূর্যের আলোর দেখে নাই। কাটা ধানে চারা গজিয়ে উঠেছে, খর পচে গলে যাচ্ছে। এতে গরু-বাছুরের খাবারের সংকট দেখা দিবে। এবার ভাটি অঞ্চলের কৃষক ধান হারানোর পাশাপাশি গরু-মহিষও হারাবে’। সামনে অল্প ক’দিনের মধ্যেই গ্রামে গ্রামে কোরবানির হাট বসবে। ভাটি বাংলায় এবার যারা গরু লালন-পালন করছে বেশি দামের আশায় তারাও আশাহত হয়ে পড়েছে। কারণ গোখাদ্য সংকট দেখা দিবে। ৪.গ্রামে ক্রমেই কমে যাচ্ছে শ্রমজীবী দিনমজুরের সংখ্যা। নানাবিধ পেশায় তারা জড়িয়ে পড়েছে। যারা গ্রামে থাকছে তাদের একটা অংশ নিকটতম হাট-বাজারে ছোটখাটো ব্যবসা করছে, রিকশা বাইসাইকেল, চাস্টলসহ বিভিন্ন গ্যারেজে কাজ করছে। সামান্য কিছু অংশ বিদেশে, আরেকটা অংশ শহরে চলে গেছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামে জুতার কাজ বা রিকশা অটোরিকশা ইত্যাদিতে জড়িয়ে গেছে। বর্তমানে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, জমিওয়ালা কৃষকের তুলনায় দিনমজুরের সংখ্যা কম। ফলশ্রুতিতে তারা নিজেরাই নিজের মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে কৃষকদের জিম্মি করে ফেলেছে। কৃষকের অবস্থা এমন যে, হয় সে জমির ধান কেটে আনবে অথবা ফেলে দিবে। আবার কেউ কেউ বিঘা প্রতি চুক্তিতে দিয়ে দিচ্ছে। এক বিঘা জমির ধান কেটে দিতে তারা চাচ্ছে ১০ হাজার টাকা। এতে ধান হবে সর্বোচ্চ ১৮-২০ মণ। আর মধ্যস্বত্ব ভোগীরা সুযোগ বুঝে ভেজা ধানই ক্রয় করছে মণপ্রতি ৭০০ টাকা দামে। এ যেন গ্রামীণ কৃষকদের জন্যে এক করুণ ও হতাশার চিত্র। গ্রামের কৃষিতে দিনমজুরের এমন ভয়াবহ সংকট নিরসন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই ধরনের ˆনরাজ্যকর পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় চলতে পারে না। সরকারকে কৃষি কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এদিকে নজর দিতে হবে। দেশের শহরকেন্দ্রিক লাখ লাখ শ্রমিককে গ্রামে ফেরাতে হবে। বিশেষ করে রাজধানীতে যে কয়েক লক্ষাধিক অবৈধ রিকশা ও অটোরিকশা চালক রয়েছে এদের ফেরানোর একটা উদ্যাগ নিতে হবে। প্রয়োজনে আইন করে ফেরাতে হবে। কেননা, বলা হয়, ঢাকা শহরের বহুমাত্রিক অপরাধের সঙ্গে এরা জড়িত। মূলত মাদকাসক্ত, স্থানীয় মস্তান ও বখাটেদের সঙ্গে এদের ওঠাবসা। এরা অনেকে একাধিক ঘর সংসার করেছে। নারী নির্যাতন ও পাচারের মতন অপরাধেও তারা জড়িত এমন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হরহামেশাই বের হচ্ছে। আরেকটি অপরাধ হলো, শহরজুড়ে মোটর চালিত অটোরিকশার রাজত্ব কায়েম করেছে তারা। অবৈধ লাইনের বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে প্রতিদিন। তারা রাজনৈতিক মিছিল মিটিংয়ে ভাড়ায় যাচ্ছে, ভাঙচুরে অংশ নিচ্ছে। শহরের ভিভিআইপি রোডে রাত-বিরাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, প্রশ্রাব- পায়খানার দুর্গন্ধে ঢাকার রাস্তার ফুটপাত ধরে পথচারীদের চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এদিকে নজর দেয়া সরকার/সিটি করপোরেশনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, পৃথিবীর আর কোনো দেশের রাজধানী শহরের চিত্র এমনট নয়। নাগরিক সেবার প্রধান শর্ত হলো শহরবাসীর জন্য একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করা। এটা যেকোনো সরকারের জন্যে সুশাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করা হয়। কাজেই এ একটা মূল জায়গায় হাত দিলে হয়তো গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক ধারা ফিরে আসতে পারে। আজকাল কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে এতে সন্দেহ নাই তথাপি শ্রমিকের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তা কমেনি। বরং শ্রমিকের প্রাচুর্য থাকলে কৃষকরা বছরে তিনবার ফসল তুলতে পারতো। শ্রমিকেরও কর্মসংস্থান হতো। দেশে খাদ্যের আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পেত। এগুলো একটি অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত বিষয়। কাজেই নতুন সরকারকে গ্রাম, শহর, মহানগর, রাজধানী সবকিছু নিয়ে সামষ্টিক ভাবে ভাবতে হবে। আবহমান গ্রাম ও আদি কৃষককে বাঁচানোর জন্যে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। [লেখক: গল্পকার]

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ জয়

ভারতের পশ্চিম বঙ্গের নির্বাচন কে ‘রাজনৈতিক অলৌকিক ঘটনা’ বলার যথেষ্ট কারণ আছে। পনেরো বছর পর পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের পতন এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অভূতপূর্ব উত্থান প্রথম দেখায় যেন এক আকস্মিক বিপর্যয়ের মতো। কিন্তু রাজনীতি সচরাচর আকস্মিক বিপর্যয়ে কাজ করে না। বরং তা ধীরে ধীরে জমা হয়, জেগে উঠে, আর তারপর প্রায় নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গ এর আগেও এমন গল্প দেখেছে। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার চাপে কংগ্রেসের পতন ঘটে। ২০১১ সালে বামফ্রন্ট (একসময় যাকে অজেয় বলে মনে করা হতো) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে উদীয়মান জনপ্রিয়তার ঢেউয়ে তলিয়ে যায়। প্রতিটি পরিবর্তনকে তখন যুগান্তকারী মোড় হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি পরির্বতনই ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা ক্ষয়প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি। ২০২৬ সালে বিজেপির জয় সম্পূর্ণভাবে সেই ধারার মধ্যেই পড়ে। এখানে কোনো জাদু নেই—শুধু সময়ের সঞ্চিত গতিবেগই অবশেষে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছেছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে কাছের ব্যাখ্যাটি হলো ‘বিদ্বেষমূলক ভোট’। যেকোনো জায়গায় পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকা অনেক দীর্ঘ সময়; বাংলায় তা যেন চিরন্তন। প্রশাসন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে কুখ্যাত ‘কাটমানি’ সংস্কৃতি—দুর্নীতির অভিযোগ সাধারণ মানুষের আলোচনায় প্রাধান্য পেতে থাকে। একসময় যে কল্যাণ প্রকল্পগুলি দারুণ জনপ্রিয় ছিল, সেগুলো এখন আর রূপান্তরকর বলে মনে হয় না, বরং নিয়মিত কিছু বিষয়ে পরিণত হয়। ভোটাররা, বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও তরুণ সমাজ, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পুনরায় যাচাই করতে শুরু করে। একসময়ের কৃতজ্ঞতা বদলে গিয়ে প্রথমে ‘পাওনা’ মনে হয়, পরে সেটাই হয়ে ওঠে হতাশা। কিন্তু শুধু বিদ্বেষমূলক ভোটই ২০০-এর বেশি আসনে জয় এনে দিতে পারে না। আরও গভীর কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। বিজেপি নির্বাচনী অঙ্ক নিজেই নতুন করে সাজাতে সক্ষম হয়। অমিত শাহের কৌশলগত নির্দেশনায় এবং নরেন্দ্র মোদির বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে দলটি একটি পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর খেলার কৌশল প্রয়োগ করে: একটি ভোটব্যাংককে সংহত করা এবং অন্যটিকে ভেঙে দেওয়া। হিন্দু ভোটের সংহতকরণ (প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ৬৫%) এবং মুসলিম ভোটের আংশিক বিভাজনের ফলে গ্রামীণ ও আধা-শহুরে কেন্দ্রগুলোতে একটি সিদ্ধান্তমূলক সুবিধা তৈরি হয়। এটি ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়, কিন্তু বাংলায় এটি একটি গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দশকের পর দশক ধরে এই রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিজেকে গর্বিত করত প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ প্রতিরোধ করার জন্যে। সেই প্রতিরোধ এখন দুর্বল হয়েছে। বিজেপি শুধু একটি জাতীয় বয়ান আমদানি করেনি; বরং এটিকে স্থানীয় রূপ দিয়েছে। এটি পরিচয়ের রাজনীতির সঙ্গে কল্যাণের প্রতিশ্রুতি যুক্ত করেছে, তৃণমূলের সামাজিক কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করে বড় আকারের নগদ স্থানান্তর ও উন্নয়নের অঙ্গীকার দিয়েছে। এর মাধ্যমে এটি আদর্শিক সংহতি এবং বাস্তব প্রণোদনার মধ্যে রেখা অস্পষ্ট করে দিয়েছে। দলটির কৌশলগত শৃঙ্খলাও ছিল ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালের প্রচারণার তুলনায় (যেটি কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর অতিনির্ভরতা ও ব্যক্তিগত আক্রমণে ভরপুর ছিল) বিজেপি এবার কৌশল বদলায়। ব্যক্তিত্বের সংঘর্ষের বদলে তারা প্রশাসনের ব্যর্থতার দিকে নজর দেয়। স্থানীয় নেতৃত্বকে সামনে আনে, বুথ-স্তরের সংগঠনে ব্যাপক বিনিয়োগ করে এবং ১৭৭টি জয়-উপযোগী কেন্দ্রকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করে। এমনকি তাদের সাংস্কৃতিক বার্তাটিকেও পরিমার্জিত করা হয়: দল সচেতনভাবেই ‘বাঙালিয়ানা’কে গ্রহণ করে, ‘বাইরের লোক’ সেই তকমা ঝেড়ে ফেলে যা আগে তাদের জনপ্রিয়তাকে সীমিত করে রেখেছিল। ফলাফলটি নিছক রাজ্য-স্তরের জয় নয়; এটি ভারতের রাজনৈতিক ভূগোলে এক কাঠামোগত পরিবর্তন। পশ্চিমবঙ্গ ছিল বিজেপির প্রসারের বিরোধিতা করা শেষ বড় ঘাঁটিগুলোর একটি। এর পতন আসাম, ত্রিপুরা ও ওড়িশায় অর্জিত সাফল্যের সঙ্গে মিলে পূর্ব ভারতে দলটির একীকরণ সম্পূর্ণ করে। এর প্রভাব কলকাতার বাইরেও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। ভূরাজনৈতিক দিক থেকে, এর প্রভাব তাৎক্ষণিক এবং তা আর কোথাও বাংলাদেশের মতো প্রকট নয়। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের আর একটি রাজ্য মাত্র নয়; এটি ভারতের বাংলাদেশ-প্রবেশদ্বার। দেশটির সঙ্গে এর দীর্ঘ, উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে, এটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের একটি বড় অংশ সম্ভব করে এবং দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সেতু হিসেবে কাজ করে। তৃণমূল শাসনের অধীনে, অভিবাসন, নাগরিকত্ব আইন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে রাজ্য সরকার ও নয়া দিল্লির মধ্যে প্রায়ই এক সূক্ষ্ম টানাপড়েন ছিল। সেই টানাপড়েন কোনো না কোনোভাবে এক ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে কাজ করতো। কেন্দ্রের সঙ্গে সারিবদ্ধ একটি বিজেপি সরকার অবশ্যই সেই প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলে দিবে। প্রথম ও সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়টি হলো অভিবাসন। বাংলাদেশ থেকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ্র-এর বয়ানটি বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই জোর দিয়ে বলে আসছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং প্রস্তাবিত নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি)-র মতো নীতিগুলো এই বয়ানের সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িত। পশ্চিমবঙ্গে একটি রাজ্য সরকার যদি কেন্দ্রের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে একমত হয়, তাহলে তা কঠোর আইন প্রয়োগের পথ সুগম করতে পারে, কথায় বলা বিষয়গুলোকে প্রশাসনিক বাস্তবতায় রূপ দিতে পারে। ঢাকার জন্য এটি কূটনৈতিক ও মানবিক উভয় ধরনের উদ্বেগই বাড়ায়। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চোরাচালান, পাচার এবং সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়তে পারে—এই সব ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ মিলে যায়। তবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রায়শই সামাজিক মূল্য নিয়ে আসে। সীমান্তের জনপদগুলো, যারা ইতোমধ্যেই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বাস করে, নিরাপত্তা জোরদার করার এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সীমান্তের ছোটখাটো ঘটনাও দ্রুত রাজনৈতিক অগ্নিকাণ্ডের রূপ নিতে পারে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সম্পর্কটি এক বিপরীতমুখী পরিস্থিতি তৈরি করে। এক দিকে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার যোগাযোগের প্রকল্পগুলো (রেল সংযোগ, অভ্যন্তরীণ জলপথ, বন্দর উন্নয়ন) দ্রুত করতে পারে, যা দুই অর্থনীতির জন্যই লাভজনক। বিশেষ করে কলকাতা-ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডর অপরিসীম সম্ভাবনা ধারণ করে। অন্যদিকে, অভিবাসন বা পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে গেলে এই অর্থনৈতিক লাভগুলো হুমকির মুখে পড়তে পারে। বাণিজ্য চলে স্থিতিশীলতার ওপরে ভর করে; রাজনীতি প্রায়ই তাকে বিঘ্নিত করে। চতুর্থত, আছে উপলব্ধির প্রশ্নটি। বাংলাদেশে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নজর রাখা হয় ঘনিষ্ঠভাবে, প্রায়শই সন্দেহের চোখে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী সুরে বিজেপির জোর ইতোমধ্যেই অস্বস্তি তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আরও শক্তিশালী উপস্থিতি এই উদ্বেগগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, বিশেষ করে যদি নীতিগত পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশ বা তার নাগরিকদের প্রতি বিদ্বেষের ধারণাকেই শক্তিশালী করে। তা আবার বাংলাদেশের নিজস্ব ঘরোয়া রাজনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে, সেখানে ভারত-বিরোধী মনোভাব এখনও এক শক্তিশালী সংগঠনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তবে এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা ভুল হবে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, গত এক দশক ধরে, নিরাপত্তা সমন্বয়, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও আঞ্চলিক সংযোগের বাস্তবসম্মত সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই কাঠামোগত উপাদানগুলো একদিনে উধাও হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং, আরও সমন্বিত ভারতীয় রাজনৈতিক কাঠামো যা পরিকাঠামো ও বাণিজ্য সংক্রান্ত উদ্যোগে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজ করে দিতে পারে। আসল চ্যালেঞ্জ হলো এই বিপরীতমুখী পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। একটি সম্পর্ক যা অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল কিন্তু রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর, তার যত্নসহকারে পরিচালনা জরুরি। বাংলাদেশের জন্য এর মানে হলো, এমন একটি কৌশল নেয়া যা না অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াশীল, না উদাসীন। বাংলাদেশকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে, পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ফলাফল গঠনে রাজ্য-স্তরের রাজনীতির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকেও স্বীকার করে নিতে হবে। বিজেপির জন্যও চ্যালেঞ্জটি সমান তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনী সাফল্য বাড়তি প্রত্যাশা বয়ে আনে। পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা যেখানে রাজ্যের নিজস্ব শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয় এবং প্রতিরোধের ইতিহাস রয়েছে, অবশ্যই দলটির সক্ষমতার পরীক্ষা নেবে; তারা প্রচারণার প্রতিশ্রুতিগুলোকে টেকসই শাসনে রূপ দিতে পারে কিনা। যেসব শক্তি তাদের ক্ষমতায় এনেছে—বিদ্বেষমূলক ভোট, মেরুকরণ এবং উচ্চ প্রত্যাশা—সময়ের ব্যবধানে সেগুলোই তাদের বিরুদ্ধেও যেতে পারে। গণতন্ত্রের নিজস্ব একটি ধারা আছে যা বিজয়ীদের বিনীত করে দেয়। শেষ পর্যন্ত, পশ্চিমবঙ্গে যা ঘটেছে তা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটি একটি বড় রাজনৈতিক সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়: কোনো আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়, কোনো জোট অটল নয়। ভোটারদের মন বদলায়, বয়ান বদলায়, আর ক্ষমতা হাতবদল হয়। বিজেপির এই জয় একইসঙ্গে একটি চূড়ান্ত পরিণতি ও একটি সূচনা—এক দশকব্যাপী রাজনৈতিক প্রকল্পের চূড়ান্ত পরিণতি, এবং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা যার ফলাফল এখনও অনিশ্চিত। বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি পরিষ্কার কিন্তু জটিল। ভূগোল দূরত্বের সুযোগ দেয় না; রাজনীতি সতর্কতা দাবি করে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান আগামী দিনগুলোতে সম্পৃক্ততার পরিসীমা নির্ধারণ করবে। এটি সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যায় নাকি সহযোগিতার—অথবা আরও সম্ভাবনাময়, উভয়ের এক অস্বস্তিকর মিশ্রণ ঘটাবে—তা নির্ভর করবে নির্বাচনের উপর না, বরং তার ফলাফলগুলো কীভাবে সামলানো হয় তার ওপর। ইতিহাস, সর্বোপরি, কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে শেষ হয় না। বরং তা কেবল পাতা উল্টায়। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রাবন্ধিক]

ভিডিও আরও দেখুন

‘ওয়াকা ওয়াকা’র পর এবার ‘দাই দাই’, মাতাবেন শাকিরা

দেখতে দেখতে এক যুগ পেরিয়ে গেল। ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ‘ওয়াকা ওয়াকা’য় পাগল করেছিলেন শাকিরা। ২০২৬ সালের আসরের মঞ্চে ফিরছেন সেই লাতিন কুইন। ‘দাই দাই’ শিরোনামের গানটি এবার বিশ্বকাপের অফিসিয়াল থিম সং। টিজারেই দারুণ সাড়া পড়েছে।শনিবার (৯ মে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গানের একটি টিজার প্রকাশ করেন শাকিরা। ১৫ সেকেন্ডের এই টিজারে গানের আভাস দিয়েই দারুণ সাড়া ফেলে দিয়েছেন। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় ভিউ ছাড়িয়েছে কয়েক মিলিয়ন।২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে ‘হিপস ডোন্ট লাই’ গেয়েছিলেন শাকিরা। এরপর ২০১০ সালে এসে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের ‘ওয়াকা ওয়াকা’ তাকে পৌঁছে দেয় বিশ্বমঞ্চের একেবারে চূড়ায়। ২০১৪ সালে তিনি ‘লা লা লা’ গেয়েছিলেন। তবে সেটি অফিসিয়াল থিম সং ছিল না।২০২৬ সালের ‘দাই দাই’ হবে শাকিরার তৃতীয় অফিসিয়াল থিম সং। এর মাধ্যমেই ইতিহাস গড়বেন তিনি- ফিফা বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি অফিসিয়াল থিম সং গাওয়া শিল্পী হিসেবে।‘দাই দাই’ গানটির সুর ও কম্পোজিশন করেছেন শাকিরা ও তার দীর্ঘদিনের সহযোগী প্রযোজক। গানে থাকছে লাতিন আমেরিকান রিদম, মডার্ন সিন্থ-পপ মিউজিক আর শাকিরার চিরচেনা সিগনেচার ড্যান্স মুভস। লিরিক্সে উঠে এসেছে ঐক্য, বন্ধুত্ব আর ফুটবল উন্মাদনার গল্প।টিজারে দেখা গেছে, স্বাগতিক তিন দেশ- যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি, মেক্সিকোর আজটেকা স্টেডিয়াম ও কানাডার টরন্টোর মনোরম লোকেশনে হয়েছে গানের শুটিং।ফিফার এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘শাকিরার গান মানেই এক বৈশ্বিক উৎসব। এ গানে ২০২৬ বিশ্বকাপের স্বাগতিক তিন দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ছোঁয়া আছে।’শাকিরা নিজে এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, ‘ফুটবল আমাদের সবাইকে এক সুতোয় গাঁথে। ২০২৬ বিশ্বকাপের মিউজিক জার্নিতে আবারও আপনাদের সঙ্গে থাকতে পেরে শিহরিত।’১৪ মে মুক্তি পাবে গানটির পূর্ণাঙ্গ মিউজিক ভিডিও। বিশ্বকাপ শুরুর দেড় মাস আগে দাপটের সঙ্গেই শুরু হয়ে গেল সংগীতের মাঠের লড়াই।

‘ওয়াকা ওয়াকা’র পর এবার ‘দাই দাই’, মাতাবেন শাকিরা
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৫৯ জন