সংবাদ
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের তালিকায় বড় চমক

বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের তালিকায় বড় চমক

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ৩৬ জন প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সোমবার দুপুরে নয়াপল্টনে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই তালিকা ঘোষণা করেন। তবে এবারের তালিকায় নতুন মুখ ও চমকের ছড়াছড়ি থাকলেও সবাইকে অবাক করে দিয়ে বাদ পড়েছেন দলটির বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেত্রী ও আলোচিত ব্যক্তিত্ব।চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা না পাওয়া নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস এবং সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়ার অনুপস্থিতিকে।রাজপথের লড়াইয়ে সবসময় সরব থাকা এই দুই নেত্রীর বাদ পড়া নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে নানা বিশ্লেষণ। এছাড়াও বাদ পড়েছেন সাবেক মন্ত্রী ও প্রয়াত প্রভাবশালী নেতা মওদুদ আহমদের সহধর্মিণী হাসনা জসীমউদ্দীন মওদুদ ও মহিলা দলের সহ-সভাপতি নাজমুন নাহার বেবী।শুধু রাজনৈতিক নেত্রীই নন, সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে আসা আলোচিত মুখ কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা, বেবি নাজনীন এবং হালের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রুকাইয়া জাহান চমকও বিএনপির মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হয়েছেন।মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য দিয়ে রুহুল কবির রিজভী বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়ার আগে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দুই দিনব্যাপী বিস্তৃত সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সেই প্রক্রিয়া শেষে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মনোনয়ন বোর্ড চূড়ান্তভাবে ৩৬ জনকে মনোনীত করেছেন।গুলশান কার্যালয়ে গত শুক্র ও শনিবার দুই দফায় ৫৪৫ জন মনোনয়নপ্রত্যাশীর সাক্ষাৎকার নেয় দলটির মনোনয়ন বোর্ড। এই বোর্ডে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির চেয়ারপার্সন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবার মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীদের বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান এবং দলের প্রতি আনুগত্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি তাদের এই তালিকার মাধ্যমে অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতৃত্বের পাশাপাশি নতুনদেরও সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে হেভিওয়েটদের বাদ পড়া এবং নতুনদের প্রাধান্য দেওয়া দলটির ভেতরে আগামীর রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
৪৪ মিনিট আগে

মতামতমতামত

গ্রামীণ হাট-বাজারের কথা

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তরঙ্গে ভেসে আসা একটা ভিডিও ক্লিপ থেকে জানা গেল বাজারটির নাম আমতলী। আসলে কোন জেলার কোন আমতলীর   হাটের দৃশ্য তা পুরোপুরি ধরা যাচ্ছিল না। তবে নিজের গ্রাম, শৈশবকাল, বাড়ির কাছের রেলস্টেশন সংলগ্ন বাজার, কৃষিনির্ভর গ্রামবাসীর জীবন-জীবিকার কথা চোখে ভেসে উঠেছে। স্বাধীনতার পূর্বে এবং পরবর্তী কয়েক বছরও গ্রামের হাটবাজারে এমন রূপচিত্র দেখা গেছে। সাধারণ মানুষ হাঁস, মুরগি, কবুতর, ডিম নিয়ে বাজারের খোলা জায়গায় বসে আছে। ক্রেতা পছন্দ করলে কিনে নিবে। তবে এগুলো সংখ্যায় খুব কম ছিল, একটি বা দুটি। নিজেদের গৃহপালিত যত্নে পোষা প্রাণী। ক্রেতাও সাধারণ শ্রেণীর মানুষ। তারা এগুলো বিক্রি করে অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস  ক্রয় করতো। আজকাল এই দৃশ্যপট হারিয়ে গেছে বললেই চলে। এখন গ্রামেও পোল্ট্রি খামার, মাছের ফিশারি, হাইব্রিড প্রজাতি, কক, পাকিস্তানি, লেয়ার কত নাম হয়েছে। গ্রামের দোকানে দোকানে চিপস, ফ্যান্টা, স্প্রাইট, মোজো, পাউরুটি, চানাচুর আর নকল কারখানায় তৈরি নানা মুখরোচক দ্রব্যে সয়লাব হয়ে গেছে। ফলে  অফুরন্ত, অগণন এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার দেশে মানুষ যেখানে যা পাচ্ছে, তা-ই খাচ্ছে। দেশি অর্গানিক জাতের সেই তাজা মাছ, মুরগি, ডিম, দুধ, মাটির মটকিজাত চেপা শুটকি, শাকসবজি, ফলমূল কোনোটাই এখন আর গ্রামবাংলার মানুষেরও নাগালের মধ্যে নেই। মনে হয় শহরটা টুকরো টুকরো হয়ে চলে গেছে গ্রাম, গ্রামান্তরে। ২. বাস্তবতা হলো, গ্রামের হাট- বাজারগুলোও সেই সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে গেছে। একেবারে অজপাড়াগাঁয়ের মেঠো রাস্তার হাটও এখন উপজেলা পরিষদ/প্রশাসন থেকে ইজারার বন্দোবস্ত  করে নিয়ে আসা হচ্ছে। যেগুলোর হয়তো প্রয়োজনই ছিল না। থাকতে পারতো গ্রামের আটপৌরে  সাধারণের জন্যে উন্মুক্ত। কিন্তু গ্রামের এক শ্রেণীর অসাধু রাজনীতিসংশ্লিষ্ট (যখন যে দল ক্ষমতাসীন হয়) ব্যক্তিরা স্বউদ্যোগে রাজস্ব আদায়ের নামে এসব করে চলেছে। তারা গ্রামীণ হাট- বাজারকে নিলামে তুলে এনে সাধারণ কৃষক, গরীব, দিনমজুর শ্রেণীর ওপর আর্থিক চাপ ও মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে চলেছে। এদের প্রচ্ছন্ন চাঁদাবাজির কারণে কৃষক তার পণ্য যথাযথ মূল্যে বিক্রি করতে পারছে না। তারা স্বাধীনভাবে হাটে বসে বা দাঁড়িয়ে নিজের গৃহের আঙ্গিনায় উৎপাদিত  পণ্য বা শাকসবজি বিক্রি করতে গেলেও চাঁদা দিতে হচ্ছে। কারণ তারা ইজারাদার, সরকারকে রাজস্ব দিয়ে এনেছে। ফলশ্রুতিতে হাটে টাটকা জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয় না হয়ে বাজারের অভ্যন্তরীন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কম মূল্যে ক্রয় করে নিয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি করে  চলেছে। তারা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাজারে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে এবং ক্রেতাকে তাদের দামেই কিনতে বাধ্য করে। এক্ষেত্রে পঁচনশীল কাঁচা সবজি পর্যন্ত উচ্চ মূল্যে বিক্রি করা হয়ে থাকে। জানা যায়, কাঁচামাল বা সবজি বাসী বা পঁচে গেলেও তারা কম দামে বিক্রি করে না। প্রয়োজনে আবর্জনা হিসেবে ফেলে দিবে তবুও না। কাজেই মানুষ বাধ্য হয়েই চড়া দামে কিনে নেয়। অথচ অতীতের মতন বাজারে গ্রামের মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকলে ভালো টাটকা জিনিস কম মূল্যে ক্রয় করতে পারতো। অবস্থাদৃষ্ঠে দেখা যায়, সারাদেশেই এমন দুর্বিষহ সিন্ডিকেটের এক অভয়ারণ্য সৃষ্টি হয়ে আছে। একে স্পর্শ করে সাধ্য কার ? কে ভাঙতে পারে এমন প্রকাশ্যে দৌরাত্ম্য ও ˆনরাজ্য? ৩. গ্রামীণ জনপদে আরও একটি অদ্ভুত দৃশ্য নজর কাড়ে, তা হলো যত্রতত্র হাট বাজারের সৃষ্টি। বিগত দুই দশকে দেশজুড়ে সড়ক যোগাযোগের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আশীর্বাদে রাস্তার ওপর গড়ে ওঠছে বাজার। কোনো একটা সংযোগ সড়ক বা ছোটখাটো চৌরাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্টান ঘিরে  রাতের মধ্যে মাজার সৃষ্টি হওয়ার মত বাজার বসে যাচ্ছে। এ যেন হঠাৎ গজে ওঠা এক আশ্চর্য জনঅরণ্য। প্রাথমিকভাবে সঙ্গে দুয়েকটা চা স্টল, কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার, একজন পান সিগারেটের বাক্স নিয়ে বসে পড়লো, একপাশে ব্রয়লার মুরগির একটা উদাম চাল, সকালে দুধ বিক্রির জন্য দু'চারজন বৃদ্ধ কৃষক হাতে জগ নিয়ে হাজির। এসব নিয়েই হয়ে গেল আজগুবি এক বাজার। আর ঠেকায় কে? কারও অনুমতি নেয়ার অবকাশ নেই, সরকার, জনপ্রশাসন নীরব। রাস্তায় যানজট, দুর্ঘটনা, মৃত্যু, কলহ, মামলা মোকদ্দমার অবস্থা সবই নিত্যদিনের চিত্র। আর এজাতীয় পথবাজারগুলোও চাঁদাবাজির হাত থেকে মুক্ত নয়। হাটবাজারের জন্যে সরকারের বিদ্যমান নীতিমালা রয়েছে, যদিও এ-সবের তোয়াক্কা করছে না কেউ । গ্রামে রাস্তা দখল করে হাট বসানোর পেছনে থাকে স&হানীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য। আজকাল বাজার হাট, ছোটখাটো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ওয়ার্ড পর্যায়ের পদ-পদবি, রাস্তায় বুকচিতিয়ে দাঁড়িয়ে যানবাহনের টোকেন দেয়ার দায়িত্ব প্রদান ইত্যাদি বিতরণ করেই তৃণমূল রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। এগুলোই গ্রামীণ রাজনীতির মূলমন্ত্র হয়ে ওঠেছে। ধীরে ধীরে এটাই যেন দেশের জন্যে এক অপ্রতিরোধ্য নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর থেকে বেরিয়ে না আসা অবধি নির্বাচন, গণতন্ত্র, সুশাসন প্রত্যাশা করা নিরর্থক এবং অরণ্যেরোদন ছাড়া কিছু আর কিছু হবে না।  ৪. সকলের জানা আছে, গ্রামের বাজারগুলোতে নিজস্ব কমিটি রয়েছে। এদের প্রধান কাজ হলো অভ্যন্তরীন শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ কমিটির নির্বাচনেও সরকার দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এটা সবসময়ই কমবেশি ছিল। স&হানীয় নেতাদের মধ্য থেকে ভোটের মাধ্যমে বা ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন হয়ে থাকে। হাট-বাজারের জন্যে পাহারাদার, ঝাড়ুদার, সুইপার নিয়োগ করা এদের কাজ। যদিও পয়ঃপ্রণালী, পাবলিক টয়লেট, শেড, ভেতরের গলি মেরামতের দায়িত্ব সরকারের। এর জন্য সহানীয় সরকার বিভাগের বাৎসরিক বরাদ্দ আছে। তথাপি এ-সবের অজুহাতে বাজারের  সহায়ী দোকান এবং বাইরে বসা ভাসমান বিক্রেতাকেও চাঁদা গুনতে হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সভা-সমিতি, পূজা-পার্বন, উৎসব উদযাপন, নেতার আগমন, তোরণ নির্মাণ, সংবর্ধনা ইত্যাদি নানা কারণে চাঁদা তোলা হয়। এসব বাড়তি ব্যয় নির্বাহ করতে নিত্যকার পণ্যের ওপর মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। আজকাল লাখ করা গেছে, যে গ্রামে শাক-সবজি, কলা, পেপে, আনারস, কচুর লতি, তরমুজ প্রচুর পরিমানে উৎপাদিত হচ্ছে সেখানকার নিকটবর্তী হাটে এসবের দাম শহরের তুলনায় অধিকতর। তার মূল কারণ, পণ্যগুলো সরাসরি হাটে বিক্রি করার সুযোগ না থাকা। যা একসময়ে অবাধে হাটে প্রবেশ করতে পারতো ও বিক্রির সুবিধা ছিল। জনসাধারণ স্বাধীনভাবে যাছাই বাছাই করে কিনতে পারতো। ফলশ্রুতিতে এখন গ্রামে গিয়ে নির্ভেজাল, প্রাকৃতিক, তরতাজা সবুজ কিছু ক্রয় করে খাওয়ার দিনও ফুরিয়ে গেছে। ঘুরে ফিরে সমগ্র দেশ, সমুদ্র থেকে পাহাড়, উজান থেকে ভাটি পর্যন্ত কোনো একটা জনপদ চাঁদা তোলার নতুন নতুন উদ্ভাবনী কলাকৌশলের বাইরে যেতে পারছে না। মনে হয়, কেন্দ্র-প্রান্ত, ঊর্ধ্ব-অধো একাকার হয়ে সরবে, নিভৃতে চলছে একে অন্যের কাছ থেকে  তোলা চাঁদার মহোৎসব। সমাজের অন্য সবকিছু সত্য বা অর্ধ সত্য হলেও চাঁদা আদায় শতভাগ সত্য। যেন চারদিকে চাঁদার জয়জয়কার, চাঁদাই শক্তি। ৫. দেশে নতুন সরকার এসেছে। তাকে অনেক কিছু নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। তবে গতানুগতিকতা দিয়ে গণমানুষের আসহা, বিশ্বাস অর্জন করা কঠিন হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্টার লক্ষে গ্রাম এবং গ্রামীণ জনপদকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারের পরিবর্তন হলে জনগণও নড়েচড়ে বসে, এক আকাশ প্রত্যাশা বুকে লালন করে। একেবারে অভিনব, অভূতপূর্ব কিছুর আশা করে অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে সবকিছু যেন ধূসর বিবর্ণ আবছায়ায় পরিণত হয়। এদেশে দশকের পর দশক এটাই হয়ে আসছে। কাজেই দেশের সহানীয় সরকার ব্যবসাকে আরও গতিশীল, জোরদার এবং কার্যকর করার বিকল্প নেই। ভালো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়ে এদের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। এদের ওপর জাতীয় নেতৃত্বের সরাসরি খবরদারি থাকবে না। ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলাপরিষদে জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকেও তাৎক্ষণিক আইনের শাসনের অধীন করতে হবে। দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে এসবের ওপর দৃষ্টিপাত খুবই জরুরি। তবেই পরিবর্তন সম্ভব অন্যথায় নয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার]

জনস্বাস্থ্য সংকট ও নীরব হুমকি: বাংলাদেশের টিকা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র

ঢাকার শিশুদের কান্না আর গ্রামের মায়েদের দীর্ঘশ্বাস, এই নীরব শব্দগুলোই এখনও প্রতিধ্বনি করছে দেশের মনোজগতে। সাম্প্রতিক হাম (মিজলস) প্রাদুর্ভাব, যেখানে মাত্র এক মাসে শতাধিক শিশু প্রাণ হারিয়েছে এবং হাজারেরও বেশি আক্রান্ত হয়েছে, তা প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের টিকা ব্যবস্থাপনা আজ কেবল রোগ প্রতিরোধের হাতিয়ার নয়, এটি একটি জীবনের মূল্যবান জনস্বাস্থ্য পরীক্ষার মঞ্চ। এই পরীক্ষায়, যদি সরকারের মূল প্রতিশ্রুতি, প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মানুষের প্রতি মানবিক দায়িত্ব পরিমাপ করা হয়, তাহলে ফলাফলটি হবে উদ্বেগজনক। সারাদেশের শিশু, মায়েরা, প্রবীণরা আজ নীরব হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, কারণ টিকা কার্যক্রম প্রায় স্থগিত, মজুত নেই বা খুব কম, এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। গভীর সংকটের মুখে কর্তৃপক্ষ কতটা প্রস্তুত ছিল?বাংলাদেশ বছর দশেক ধরে সফলভাবে টিকাদান কর্মসূচি চালিয়েছে। ১৯৭৯ সালে মাত্র ২ শতাংশ থেকে আজ ৮১.৬ শতাংশ পর্যন্ত সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে। তবে এই কভারেজের ভেতর অন্তত ৪ লাখ শিশু এখনও সম্পূর্ণ টিকাযুক্ত নয়, এবং প্রায় ৭০ হাজার শিশু কোনো টিকা পায়নি, এটি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে বড় উদ্বেগের বিষয়। ঘাটতি এবং সংগঠনিক বিভ্রাটকরোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ে পরিকল্পনায় বিরতি, ইপিআই কর্মসূচির অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) স্থগিত, সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা এবং স্বাস্থ্যকর্মী সংকট, এসব মিলিয়ে টিকা বিতরণ প্রক্রিয়া ক্রমশ ঠেকছে। প্রায় ৪০ শতাংশ ভ্যাকসিনেশন পোস্ট শূন্য এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ৪৩ শতাংশ পদ এখনও পূরণ করা হয়নি, এটি একটি কার্যকর জনস্বাস্থ্য কাঠামো চলমান রাখার জন্য গুরুতর সংকেত। এখানে শুধু সংখ্যা নয়, মানবিক পরিণতি আছে: গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা না পেয়ে শিশুরা অসুস্থ হচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং প্রিয়জনদের চোখের সামনে জীবনের আলো নিভে যাচ্ছে। এই সংকট শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যর্থতা নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংগঠনিক ত্রুটি, দুর্নীতি ও সদিচ্ছার অভাবের প্রতিফলন, যেখানে সময়মতো সিদ্ধান্ত, পর্যাপ্ত মজুত ও কার্যকর সমন্বয় নেই। টিকা ও রোগ প্রতিরোধ: বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের রক্ষাকবচ কি ভঙ্গুর?টিকা মানবজীবনের অন্যতম রক্ষাকবচ, যা সমাজে রোগের আগ্রাসন ঠেকায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শক্ত রাখে। হাম, পোলিও, ডিফথেরিয়া, টিটেনাস, হেপাটাইটিস—এই রোগগুলোতে টিকাদানই একমাত্র মিত্র, একমাত্র নিরাপত্তা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে টিকাদানের সময়মতো শেষ ডোজ না পৌঁছানো, মজুদের অভাব ও সংগঠনিক ফাঁক-ফোকর শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে দিয়ে তাদের প্রাণকেন্দ্রিক ঝুঁকিতে ফেলছে। প্রচলিত তথ্যমতে পূর্ণ টিকাদান কভারেজ থাকলেও প্রায় ৪ লাখ শিশু এখনও সম্পূর্ণ টিকা পাননি এবং কয়েক হাজার শিশু এখনও আংশিক টিকাপ্রাপ্ত; এই গ্যাপগুলোই বর্তমানে হামের মতো সংক্রামক রোগের পুনরুত্থানে সহায়তা করছে। একটি সামান্য ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা, যেমন টিকা মজুতের গাফিলতি বা সময়মতো ডোজ না পৌঁছানো, সে কোনো ‘ছোট ভুল’ নয়। সাম্প্রতিক হাম মহামারী, যেখানে এক মাসের কম সময়েই ১০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু ঘটেছে এবং হাজারেরও বেশি শিশু আক্রান্ত হয়েছে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে প্রতিটি অনিয়ম, প্রতিটি অধ্যায় ভুলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাচ্ছে, এবং মহামারীর আশঙ্কা দিনে দিনে বেড়ে উঠছে। রোগ বিস্তারের কারণগুলো: একটি জটিল বাস্তব চিত্রপ্রতিটি মৃত শিশুর পেছনে সহজ কারণ নেই; এখানে জটিল বহু কারণ আছে, যার মধ্যে:অপর্যাপ্ত টিকাদান ও পরিকল্পনা: নিয়মিত কর্মসূচি ও বিশেষ টিকা উদ্যোগের মধ্যে বিরতি রোগ প্রতিরোধ কাঠামোকে দুর্বল করেছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে বড় টিকা ক্যাম্পেইন না হওয়ায় আগের মতো শক্ত ইমিউনিটি গড়ে ওঠেনি। জনসংখ্যার ঘনত্ব ও অপুষ্টি: তরুণ শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা ইমিউনিটি কমায়, রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়ায়। স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা: টিকা কেন্দ্রগুলোতে ভ্যাকসিন না থাকলেই শিশুর পরিবারগুলোকে ঘুরে বেড়াতে হয়; অনেক সময় সুবিধা মিলেও সময়মতো ডোজ পায় না। দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের ছায়া: সরবরাহ শৃঙ্খল সরল না থাকায় অসংগতি ও গড়বড়ের সুযোগ ˆতরি হয়, যা সেবায় বিলম্ব ও টিকা পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করে। জনসচেতনতার অভাব: অনেক অভিভাবক প্রথম ডোজ পেলেই চিন্তামুক্ত থাকেন; কিন্তু ডাক্তাররা বলছেন, ডোজ ছেদ ঘটলে রোগের বিরুদ্ধে সমগ্র নিরাপত্তাজাল ভঙ্গুর হয়ে যায়। সরবরাহ ও তথ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা: সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা শিশুদের টিকাদান ইতিহাসের তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ না হলে কোন শিশুর কোন ডোজ বাকি তা জানাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আগাম পদক্ষেপের জরুরি কারণ: বাংলাদেশ কেন এক নিঃশব্দ সংকটের মুখোমুখি?বাংলাদেশে জনসংখ্যার চাপ, পরিবেশগত ঝুঁকি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, এই তিনটির সমন্বয়ে একটি সংকট ˆতরি হয়েছে, যা দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলে দেশকে সংক্রামক রোগের পুনরুত্থান ও প্রাণহানির ঝাঁপটা ধরা অবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। শুধু সংখ্যাটুকু নয়, এই সংকটের পেছনে সামাজিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার বাস্তব চিত্রও রয়েছে। বাংলাদেশের মতো বিশ্বে অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশে প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি শিশু, প্রতিটি প্রান্তিক এলাকা, সবাইকে টিকাদানের আওতায় আনতে বিশাল উদ্যোগ প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হলো:দক্ষ জনশক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক দুর্বলতা প্রকৃত সমাধানের পথকে বারবার ব্যাহত করছে, যেখানে সিদ্ধান্তগ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাঝে ইচ্ছাশক্তি ও কর্মদক্ষতার ফাঁক বিরাজমান। দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের ছায়া টিকাদান ও সরবরাহ শৃঙ্খলে অসঙ্গতি ˆতরি করছে, যার ক্ষেত্রে কখনো ভ্যাকসিন বিলম্ব, কখনো পরিবহন ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা অমিলই বিভিন্ন অঞ্চলে টিকা পৌঁছাতে ব্যর্থতা সৃষ্টি করছে। জবাবদিহিতার ঘাটতি প্রশাসনিক ভুল, দেরি বা অনজরদারি কোথায় হচ্ছে, তা জানতে এবং সংশোধন করতে বাধা সৃষ্টি করছে, এটিই আজকের সংকটের বড় অন্তর্হিত কারণ। এই সব মিলিয়ে পরিস্থিতি শুধু ‘জটিল’ নয়, বরং এক আগাম পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা, যার প্রতিটি দিক এখনই শক্ত হাতে নেয়া উচিত। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার উপায়: পথের মানচিত্রপ্রতিটি দেশই আজ শিক্ষা নিচ্ছে, শুধু পরিকল্পনা করা নয়, পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেয়াই বাঁচিয়ে রাখে মানবজীবন। বাংলাদেশকে যদি সত্যিকারের নিরাপদ জনস্বাস্থ্য কাঠামো গড়ে তুলতে হয়, তাহলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলোকে আর অভিসন্ধি হিসেবে দেখা যাবে না, এগুলো এখনই বাস্তবায়নযোগ্য অপরিহার্য কর্মসূচি:১. শক্তিশালী জাতীয় টিকা নীতি প্রণয়নএকটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি নীতি ˆতরি করতে হবে, যা শুধু টিকা কেনা বা বিতরণের হিসাব রাখবে না; তা হবে সম্পূর্ণ টিকা জীবনচক্র ও রোগ প্রতিরোধ পরিকল্পনার একটি রূপরেখা, যাতে স্বচ্ছতা, নিরীক্ষণ ও ফলাফলের মাপ আছে। ২. ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও নজরদারি ব্যবস্থা চালুদেশব্যাপী টিকা গ্রহণ ও রোগের বিস্তারকে একক, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নজরদারি করলে জানতে সহজ হবে কোথায় গ্যাপ আছে, কোন খাতে অগ্রগতি কম, কারা এখনও সুরক্ষিত হয়নি। এটি শুধু তথ্য রাখবে না; এটি হবে অগ্রগতির পথনির্দেশক মানচিত্র। ৩. সরবরাহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নভ্যাকসিন স্টককে সঠিকভাবে ট্র্যাক করা, পরিবহনে জট কমানো, টিকা ফ্রিজ বা কোল্ড চেইন ব্যবস্থা সব জায়গায় শক্ত করা—এগুলো রোগ প্রতিরোধের নীরব ঘাতকগুলোকে অচল করে দেবে। ৪. স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাসরকারি ও ব্যক্তিগত খাতে যেসব অনিয়ম, সিন্ডিকেট বা দুর্নীতি আছে, তার বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতার কাঠামো ˆতরি করতে হবে। তখনই সরকারি প্রচেষ্টা জনমানুষের আস্থা ও অংশগ্রহণে রূপান্তরিত হবে। ৫. গবেষণা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বৃদ্ধিশুধু টিকা না কিনে, শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রের বিনিয়োগ বাড়ালে রোগের প্রকৃতি, বিস্তার ও প্রতিরোধ কৌশলগুলোর উচ্চ মানের বিশ্লেষণ সম্ভব হবে। এটি ভবিষ্যতের প্রস্তুতিও নিশ্চিত করবে। ৬. জনসচেতনতা ও অংশগ্রহণ বাড়ানোশিক্ষা আর বার্তা শুধু প্রদর্শনের কথা নয়; তা জনগণের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় ঢুকে যাবে, তখনই রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম সফল হবে, যেন প্রতিটি পরিবারই একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ৭. আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করাবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, গ্যাভি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় হলে শুধু টিকা পাওয়া নিশ্চিত হবে না; বিশ্বমানের পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও কার্যকর বাস্তবায়নও সুদৃঢ় হবে। সরকারের জন্য সুপারিশ: এখনই সময়শুধু সমস্যাগুলো জানলেই হবে না, এগুলো মোকাবিলার জন্য রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বকে নিচের পথগুলো শক্ত হাতে নিতে হবে। স্বাস্থ্যখাতে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন: একটি শক্ত, রাজনৈতিক প্রভাবহীন কমিশন গঠন করা, যাতে ভুল, গাফিলতি, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের উৎসগুলো নির্ধারণ করা যায় এবং সংশোধনের রোডম্যাপ ˆতরি হয়। বাজেট বৃদ্ধি ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার: শুধু বেশি টাকা বরাদ্দ নয়, যেটুকু বরাদ্দ হয়, তা অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক জায়গায় ও সময়মতো খরচ হওয়া নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করা: শুধুমাত্র পদাধিকারী নয়, দক্ষ, শিক্ষিত, মানবিক ও সতর্ক নেতৃত্ব টিকাদান কর্মসূচির সব স্তরেই প্রয়োজন। নেতৃত্ব দেবে এমন ব্যক্তি নির্বাচিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সুইডেনের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলোকে ভিত্তি করে জাতীয় নীতির কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেন সেটি শুধু নথিতে না থেকে বাস্তবে কার্যকর হয়। পরিশেষে: বাংলাদেশে নিরাপদ স্বাস্থ্য, একটি জাতির দায়িত্বমানবজীবনের সুরক্ষা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব। একটি কার্যকর টিকা কর্মসূচি কেবল সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের হাতিয়ার নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানুষের জীবনের মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যকে শক্তিশালী করতে আজ দরকার সৎ নেতৃত্ব, নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছ প্রশাসন। প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি নীতি এবং প্রতিটি কার্যক্রম যেন মানুষের জীবনে বাস্তব সুরক্ষা এবং বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটায়। সুইডেনের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক মানের নির্দেশনা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতি অনুসরণ করলে দেশটি গড়ে তুলতে পারবে একটি মানবিক, টেকসই ও নিরাপদ স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে রোগ প্রতিরোধ কেবল লক্ষ্য নয়; এটি হবে প্রতিটি শিশুর হাসি, প্রতিটি পরিবারের নিরাপত্তা এবং প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি। একটি নিরাপদ, সুস্থ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার, আমাদের দায়িত্ব এবং আমাদের সময়ের চূড়ান্ত পরীক্ষা। [লেখক: সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন]

প্রতারণা, জালিয়াতির আইনি প্রতিকার

বিশ্বয়ানের যুগে প্রতারণার ধরণ পাল্টেছে। চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে প্রতারণা, জমি নিয়ে প্রতারণা, ভুয়া, জাল কাগজপত্র দেখিয়ে প্রতারণা, অনলাইন প্রতারণা, ব্যাংকিং প্রতারণা ইত্যাদি। দণ্ডবিধির ৪১৭ ধারায় প্রতারণার শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, যদি কোন ব্যক্তি প্রতারণা করে তাহলে সেই ব্যক্তি এক বৎসর পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে কিংবা অর্থদণ্ডে কিংবা উভয়দন্ডেই দণ্ডিত হবে। আমাদের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা কথা বা ভুল তথ্য দিয়ে অন্যকে বিভ্রান্ত করে তার কাছ থেকে টাকা, সম্পদ, মালামাল বা কোনও সুবিধা আদায় করাকে সাধারণত প্রতারণা বলা হয়। আরও সহজ করে বলতে গেলে কারও বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাকে ক্ষতির মুখে ফেলা মানেই প্রতারণা। যেমন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেয়া, চাকরি দেয়ার নাম করে টাকা নেয়া, সরকারি প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে টাকা নেয়া, ভিসা, ইমিগ্রেশন দেয়ার কথা বলে টাকা নেয়া ইত্যাদি। আবার অনেকে পণ্য বা সম্পত্তি নিয়ে প্রতারণা করে থাকে। যেমন ভুল তথ্য দিয়ে জমি বিক্রি করা, ভাড়া বাড়ি দিতে গিয়ে ডাবল বুকিং করা, নকল পণ্যকে আসল বলে বিক্রি করা। অনেকে নথিপত্র জাল করে থাকে। যেমন-ভুয়া সনদ, ভুয়া পাসপোর্ট, ভুয়া কাগজ দেখিয়ে ব্যবসা বা লেনদেন করা, জাল স্বাক্ষর ব্যবহার ইত্যাদি। অনলাইনে প্রতারণার মধ্যে রয়েছে বিকাশ/নগদ/রকেট অটিপি নিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়া, অনলাইন শপে টাকা নিয়ে পণ্য না পাঠানো, ফেইসবুকে লটারি, গিফট বা অফারের নাম করে টাকা নেয়া ইত্যাদি। আর ব্যাংকিং বা আর্থিক প্রতারণার মধ্যে রয়েছে চেক জাল করা, হঠাৎ ‘আপনি লোন পেয়েছেন’ বলে টাকা হাতিয়ে নেয়া ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতারণা। যেমন পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা, অন্যের নাম বা আইডি ব্যবহার করে সুবিধা নেয়া। ভুয়া আইনজীবী, ভুয়া ডাক্তার পরিচয় ইত্যাদি। আপনি এ জাতীয় প্রতারণার শিকার হলে প্রতিকার চাওয়ার প্রধান উপায় হচ্ছে নিকটস্থ থানা। প্রতারণার প্রমাণ সংগ্রহ করে নিকটস্থ থানায় লিখিতভাবে এজাহার দায়ের করুন। আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে থানা কোনো অভিযোগ পেলে মামলা নিতে আইনত বাধ্য, কারণ এ ধরনের গুরুতর অপরাধে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই তদন্ত ও গ্রেপ্তার করতে পারে। পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল (পিআরবি), ১৯৪৩ এর ২৪৩, ২৪৩ (চ), ২৪৪ (ক) ও ২৪৫ প্রবিধান এবং ফৌজদারি কার্যবিধির, ১৮৯৮’র ১৫৪ ধারানুযায়ী, ‘আমলযোগ্য প্রত্যেক অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের সামনে প্রদত্ত প্রথম তথ্য রেকর্ড করতে হবে সেটা প্রাথমিকভাবে সত্য হোক বা মিথ্যা হোক কিংবা গুরুতর হোক বা ক্ষুদ্র হোক অথবা দণ্ডবিধি বা অন্য কোন স্পেশাল বা আঞ্চলিক আইনের অধীন শাস্তিযোগ্য যাহাই হোক না কেন। আবার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৭ (১) (গ) ধারায় বলা হয়েছে যে, থানার ওসি কাছে যদি এটা প্রতীয়মান হয় যে, মামলাটির পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই, তাহলে তিনি মামলাটির তদন্ত করবেন না। আবার দণ্ডবিধিতে উল্লেখিত ২১১ ধারায় মিথ্যা মামলা দায়েরের পাল্টা ব্যবস্থা রাখার ফলে থানায় মামলা রেকর্ড করার বিষয়টিকে ভারসাম্য করা হয়েছে। কোন কারণে থানা মামলা না নিলে আপনি সংশ্লিষ্ট জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে সরাসরি অভিযোগপত্র সি.আর মামলা দায়ের করতে পারবেন। আর অনলাইন প্রতারণার ক্ষেত্রে সাইবার ক্রাইম ইউনিট সিআইডি, সাইবার পুলিশের ওয়েবসাইটেও গিয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন। ব্যাংক, মোবাইল বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আপনি প্রতারিত হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইনে সাইবার ট্রাইবুনালে মামলা করে প্রতিকার পেতে পারেন। তবে মামলা করতে হলে অবশ্যই প্রমাণপত্র সংগ্রহ করতে হবে। প্রতারণার প্রমাণ হিসেবে স্ক্রিনশর্ট, রেকর্ডিং, চুক্তি, মেসেজ, টাকা লেনদেনের প্রমাণ (বিকাশ/ব্যাংক/চেক), ব্যক্তির নাম ঠিকানা, মোবাইল নম্বর (যতটুকু জানা হয়), সঙ্গে উপযুক্ত সাক্ষী-তাহলেই আপনি প্রতারককে শাস্তি দিতে পারবেন। [লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

দিল্লির নজরে ঢাকা পোস্টিং

হাইকমিশনার পদে নতুন মুখ, জল্পনায় দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার নিয়োগ ঘিরে জল্পনা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় বর্মা ২০২২ সাল থেকে ঢাকায় দায়িত্বে রয়েছেন। কূটনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন, তাঁকে শীঘ্রই বেলজিয়ামে পাঠানো হতে পারে।এই প্রেক্ষাপটে নতুন মুখ হিসেবে সামনে এসেছে এক চমকপ্রদ নাম দীনেশ ত্রিবেদী। যদিও এখনো পর্যন্ত ভারত সরকারের তরফে এই নিয়োগ নিয়ে কোনও সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি, তবুও দেশের একাধিক জাতীয় সংবাদমাধ্যমে এই সম্ভাবনার কথা প্রকাশ্যে এসেছে।আগেও দু’একজনের নাম ভেসে উঠেছিল, তবে এখন ফের আলোচনার কেন্দ্রে দীনেশ ত্রিবেদী।সাধারণত এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদে Indian Foreign Service-এর অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদেরই নিয়োগ করা হয়। সেই জায়গায় একজন সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে পাঠানোর সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই কূটনৈতিক মহলে বিস্ময় তৈরি করেছে।দীনেশ ত্রিবেদীর রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক। জনতা দল থেকে শুরু করে তৃণমূল কংগ্রেস—এবং পরবর্তীতে বিজেপি বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্ব অতিক্রম করেছেন তিনি। একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে দিল্লির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ২০০৯ সালে লোকসভায় নির্বাচিত হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এবং পরে রেলমন্ত্রী হন।তবে রেলভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয় এবং শেষপর্যন্ত ২০২১ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি সংসদের ডিজিটাল লাইব্রেরি সংক্রান্ত দায়িত্বে রয়েছেন।উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, দীনেশ ত্রিবেদী বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি এবং গুজরাতি চারটি ভাষাতেই সাবলীল, যা বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগে একটি বাড়তি সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।এই প্রসঙ্গে ত্রিবেদী নিজে জানিয়েছেন, “সরকার যদি আমাকে এই দায়িত্ব দেয়, তা হলে সেটা আমার জন্য সম্মানের। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নে আমি আমার সাধ্যমতো কাজ করব।”তবে সবশেষে বলা যায়, এখনও পর্যন্ত এই নিয়োগ পুরোপুরি জল্পনার স্তরেই রয়েছে। সরকারিভাবে কোনও ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।তবে এই সম্ভাব্য নিয়োগ যদি বাস্তবায়িত হয়, তা হলে এটি হবে একটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ কারণ কূটনৈতিক পরিষেবার বাইরে থেকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি মিশনে পাঠানো বিরল ঘটনা। এর ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের রাজনৈতিক মাত্রা আরও স্পষ্ট হতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।  

রাজনীতি, বাস্তবতা ও বার্তা কী দিলেন মোদি?

শনিবার রাত সাড়ে ৮টায় হঠাৎ দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছিল কৌতূহল ও জল্পনা। শেষ পর্যন্ত সেই ভাষণে ভার‌তের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্পষ্ট করেন, তার বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু মহিলা সংরক্ষণ বিল এবং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোয় নারীদের ভূমিকা।ভাষণের শুরুতেই তিনি বলেন, ভারত এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে উন্নয়ন শুধু অর্থনীতি বা পরিকাঠামোয় সীমাবদ্ধ নয়—সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও সমান অংশগ্রহণ জরুরি। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা অর্থাৎ মহিলাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হলে “বিকশিত ভারত” গড়া সম্ভব নয়।তিনি এই বিলকে একটি “ঐতিহাসিক দায়িত্ব” হিসেবে ব্যাখ্যা করে বলেন, গত ২৫-৩০ বছর ধরেই এই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল, কিন্তু নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।এখানেই তিনি বিরোধীদের দিকে পরোক্ষভাবে কটাক্ষ করে বলেন, যারা আজ প্রশ্ন তুলছেন, তাদেরই অতীতে সুযোগ ছিল এই ধরনের সংস্কার আনার। বর্তমান সরকার সেই দীর্ঘদিনের অপূর্ণ কাজ পূরণের চেষ্টা করছে। একইসঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন, এই বিল কার্যকর হলে কোনও রাজনৈতিক দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং দেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।ভাষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে ভার‌তের প্রধানমন্ত্রী পঞ্চায়েত স্তর থেকে উঠে আসা মহিলা নেতৃত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গ্রাম স্তরে ইতিমধ্যেই বহু মহিলা সফলভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এখন সময় এসেছে তাদের জাতীয় রাজনীতিতে বৃহত্তর ভূমিকা দেওয়ার। এই পরিবর্তন শুধু প্রতিনিধিত্ব বাড়াবে না, বরং নীতিনির্ধারণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও নিয়ে আসবে।তবে ভাষণের মধ্যে সবচেয়ে রাজনৈতিক বার্তা ছিল বিরোধীদের উদ্দেশে আবেদন। তিনি বলেন, এই বিষয়টিকে রাজনৈতিক রং না দিয়ে “বন্ধুত্বপূর্ণ পরামর্শ” হিসেবে দেখা উচিত এবং সব দলকে একসঙ্গে এগিয়ে এসে বিলটি পাশ করানো উচিত। দেশের মানুষ এই বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যারা নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাদের প্রতি জনমত কঠোর হতে পারে।অন্যদিকে, এই ভাষণের আগেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী অভিযোগ করেন, কেন্দ্র সরকার মহিলা সংরক্ষণ বিলকে সামনে রেখে ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চাইছে। তৃণমূল কংগ্রেস কখনওই বিলের বিরোধিতা করেনি, বরং বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েই তাদের আপত্তি।একইভাবে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বাদ্রা লোকসভায় বিল পাস না হওয়াকে “গণতন্ত্রের জয়” বলে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, বিরোধীদের ঐক্য সরকারকে আটকে দিয়েছে। এর পাল্টা হিসেবে বিজেপি নেতৃত্ব বিরোধীদের অবস্থানকে দ্বিচারিতা বলে আখ্যা দেয়।সংসদীয় অঙ্কের দিক থেকেও পরিস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ। সংবিধান সংশোধনী বিলটি পাসের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না পাওয়ায়, পক্ষে ২৯৮ এবং বিপক্ষে ২৩০ ভোট পড়ে বিলটি গৃহীত হয়নি। ফলে এই বিল এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে গেলেও তার বাস্তবায়ন অনিশ্চিত রয়ে গেছে।সব মিলিয়ে, শনিবার রাতের এই ভাষণ শুধু একটি নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাও বয়ে এনেছে। একদিকে সরকার এটিকে নারীর ক্ষমতায়নের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে বিরোধীরা বাস্তবায়নের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ফলে মহিলা সংরক্ষণ বিল এখন দেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করবে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও বাস্তব সিদ্ধান্তের উপর।

নির্বাচনী ধারাবাহিকতা না নির্বাচনপূর্ব ধারার এক্সটেনশন!

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমীন সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন ‘আমাদের সরকারের এই ৬০ দিনে সবচাইতে বড় অর্জন বাংলাদেশের জনগণ তারেক রহমানকে বিশ্বাস করেছেন এবং তারেক রহমান জনগণকে বিশ্বাস করেছেন।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী কয়েকদিন আগে ফেইসবুক পোস্টে বলেছেন, ‘পাহাড়সমান সমস্যার ভার এবং মানুষের সীমাহীন প্রত্যাশার মধ্যে যাত্রা শুরু করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তার বিনয়, রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হয়েও সহজ জীবনযাপন, একাগ্রতা ও সময়ানুবর্তিতা মানুষের মধ্যে আস্থা ও আশার সঞ্চার করেছে।’ সত্যতা থাকলেও এসব কথা বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের দু’মাস পার হওয়ার আগেই ব্যাকারনের বর্তমান কাল (প্রেজেন্ট টেন্স) থেকে অতীত কালে (পাস্ট টেন্স) পরিণত হতে চলেছে। অর্থাৎ তারেক রহমান মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন এবং মানুষের মধ্যে আশা ও আস্থার সঞ্চার করেছিলেন। কিন্তু অল্প সময়েই আশা ভরসার জায়গাটা নিম্নগামী।মানুষ প্রথমেই ধাক্কা খেলো তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের দিনেই বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেখে। ইউনূস মনে করেছিলেন ‘রাষ্ট্র নায়ক’ হিসেবে তার উপর যে বিশাল দায়িত্ব তা সামাল দেয়ার জন্য তারও একজন ‘অজিত দোভাল’ লাগবে। তাই চটজলদি মার্কিন মুলুক থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসা হলো খলিলুর রহমানকে। ব্যক্তি হিসেবে নিঃসন্দেহে তিনি বিনয়ী ও বন্ধুসুলভ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব পালনে তো বিনয়ী হলে চলে না। নিরাপত্তা ইস্যুর সঙ্গে তো দেশের পররাষ্ট্রনীতিও যুক্ত! তাই দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অনেকটা নিস্ক্রিয় করে পররাষ্ট্র বিষয়ক ইস্যুতেও তিনি তার হাতে স্টিয়ারিং তুলে নেন। করিডোর, বন্দর সহ নানা ইস্যুতে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রাখছিলেন। ঐ সময়ে বিএনপি নেতৃত্বও ছাত্র উপদেষ্টাদের সহ তার অপসারন দাবী করেছিলেন। আমেরিকার সঙ্গে যে দেশ বিরোধী গোপন বাণিজ্য চুক্তি তা সম্পাদনে তিনিই নেতৃত্ব দেন। তাকেই টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে দেখে সবাই টাসকি খেলো। বুঝে নিলো ইউনূস মার্কিনী স্বার্থের সঙ্গে দেশকে ১৮ মাসে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখে গেছেন যে সরকার বদল হলেও তার থেকে বের হওয়ার পথ নেই। হয়তোবা লন্ডন সমাঝোতার অপ্রকাশিত শর্তে এমনটা উল্লেখ ছিলো!বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেখেও সবাই বিষ্মিত হলো। বিশ্ববিদ্যালয় ভাইস চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন বা জেলা পরিষদে প্রশাসক সব ক্ষেত্রেই দলীয় বিবেচনা থেকে নিয়োগ দান বিএনপিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আর মানুষ ক্ষুব্ধ হলো, বিবেকের দংশনে জর্জরিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার সহযোগী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দন্ডপ্রাপ্তদের জন্য শোক প্রস্তাব গ্রহণের বহর দেখে। অথচ নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের দল দাবী করে নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি জনগণের কাছে ভোট প্রার্থনা করেছে। জামাতকে স্বাধীনতা বিরোধী আখ্যায়িত করে তাদেরকে পরাভূত করার আহ্বান জানিয়েছে। সংসদ নেতা তারেক জিয়ার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে যখন বিতর্কিত ঐ শোক প্রস্তাবসমূহ গৃহীত হিসেবে গণ্য হলো তখন মনে প্রশ্ন জাগছিলো ’৭১-এর ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করার পর জিয়াউর রহমান যদি নিরস্ত্র অবস্থায় এই নিজামী- মুজাহিদদের সামনে পড়তেন তার পরিনতি তখন কী হতো! কী পরিনতি হতো আজকের সংসদের স্পিকার সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধা বীর বিক্রম মেজর হাফিজ উদ্দিনের যদি তিনি ’৭১-এ জামাতীদের হাতে ধরা পড়তেন?ক্রিকেটপ্রেমী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিত। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই ক্রিকেট খেলা নিয়ে মানুষের আগ্রহ। ক্রিকেট বোর্ডের নতুন এডহক কমিটি গঠন দেখে সেই মানুষ হতবাক। কমিটিতে প্রাধান্য পেয়েছেন সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতারা উত্তরাধিকাররা। পত্রিকায় প্রকাশিত তাদের একমাত্র ক্রেডেনশিয়াল-কে কোনো মন্ত্রী বা নেতার ছেলে, মেয়ে বা ভাই-বোন। কমিটি দেখে ক্রিকেটপ্রেমীরা বলছেন বিশ্বকাপ আমাদের ঘরে এই এলো বলে! নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রধান আশা ছিলো যে সরকার কতৃত্ববাদ, দলবাজি ও পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে দল ও মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করবে। স্বাধীন বিচার বিভাগের ব্যবস্থা করে আইনের শাসন এবং নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলে সুশাসন নিশ্চিত করবে, সীমাহীন দুর্নীতির যে রাজত্ব কায়েম হয়েছে তার লাগাম টেনে ধরবে। কিন্তু প্রত্যাশাকে হতাশায় পরিণত করে সংসদের প্রথম অধিবেশনতো প্রায় শেষ হতে চলেছে।ইউনূস আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারী হয়েছিলো যার মধ্যে ১১৩টি অধ্যাদেশ চলতি অধিবেশনে গৃহীত হয়েছে। ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল বা তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, দুদক আইন সংশোধন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত জরুরি অধ্যাদেশ। অধ্যাদেশের কারনেই এগুলো আইনে পরিণত করতে হবে তা নয়। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, দলের ইশতেহার এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষা এসব বিবেচনায় অধ্যাদেশ সমূহ বা তা প্রয়োজন মতো সংশোধন করেও আইন করা যেতো। কিন্তু চলে আসা কতৃত্ববাদী ব্যবস্থায় আইন, বিচার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দুর্নীতি, মানবিক অধিকার সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়াদির উপর লাগাম বিএনপি সরকার দলীয় ভাবে রাখতে চায়। অথচ অতি নিকট অতীত আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে সর্বক্ষেত্রে কতৃত্ববাদ কি ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনে।বিএনপি সেই সব অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে সুপারিশ করেছে যেগুলো দলীয়ভাবে তার পক্ষে যায়। যেমন ইউনূস সরকার জনপ্রতিনিধিদের ইচ্ছেমতো বরখাস্তের সুযোগ রেখে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। বিএনপি সেটার সুযোগ নিয়ে ঐ অধ্যাদেশকে আইনে পরিনত করেছে। অতীতে সব সরকারই স্থানীয় সরকারকে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চেয়েছে। সেই প্রচেষ্টার বিপরীতে কিছু করা হলো না। আওয়ামী লীগ আমলেও জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ছিল প্রক্রিয়াভিত্তিক ও শর্তসাপেক্ষ। এখন আওয়ামী আমল অপেক্ষা খারাপ আইন হলো।ইউনূস সরকারের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বেআইনি ঘোষণার সময় বিএনপি বলেছিলো নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে তারা নয়। এ বিষয়ে জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে। এই রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েই তারা ভোটের সময় আওয়ামী সমর্থকদের কাছে যায় ও তাদের ভোট চায়। আওয়ামী লীগকে ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে জনগণকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন চব্বিশের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেখানেও রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ না করার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল। ইউনূস সরকার ঐ রিপোর্টকে বিচার প্রক্রিয়ায় এবং রাজনৈতিকভাবেও কাজে লাগালেন। কিন্তু রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না করার সুপারিশ মানলেন না। বিএনপিও পূর্বের ঘোষণা থেকে সরে এসে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আদেশকে আইনে পরিণত করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে রাখলো। সম্ভবত স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগকে দল গোছানোর সুযোগ না দেয়া এবং নৌকা সমর্থকদের যে ভোট এবার ধানের শীষে এসেছে তার একটা অংশ স্থায়ী করার লক্ষ্যে বিএনপির এ প্রচেষ্টা। আবার এ আইন ‘৭১ এর যুদ্ধাপরাধী দলের বিরুদ্ধে প্রয়োগের রাস্তাও কিন্তু খোলা থাকলো। কেননা বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বদল আনলেও এটা কিন্তু বহাল আছে যে, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন তারাই মুক্তিযোদ্ধা। অর্থাৎ দেশের আইন অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরোধী অবস্থানে রয়েছে জামাত।সংসদে কোনো সিদ্ধান্ত যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়, সেটি গণতন্ত্রের জন্য স্বস্তির সংবাদ হতে পারে না। আবার আওয়ামী লীগ নিয়ে পরিস্থিতিটা এমন, ‘যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়াপড়শীর ঘুম নাই’। তারা এ মূহুর্তে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান কিনা তাও স্পষ্ট নয়। দেশে যে বিরাট রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে গেছে, মানুষের বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মনোজগতে যে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে সেসব বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের হুঁশ আছে বলেও মনে হয় না। যাক আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগেরটা বুঝুক। কিন্তু ভয়টা অন্যখানে। ভয় হয় এ ধরনের আইন বুমেরাং না হয়ে আসে। এটাতো আমাদের অজানা নয় এক এগারোর ‘মাইনাস টু’ থিওরির প্রবক্তারা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে ক্রিয়াশীল ছিল এবং আছে। জুলাই অভ্যুত্থানে পরেও তারা কিন্তু সে লাইনে চেষ্টা করেছে। সেভাবে বয়ান সামনে এনেছে। কিন্তু পরিস্থিতির মোড় সে দিকে ঘুরানো সম্ভব না হওয়ায় ‘লন্ডন ˆবঠকের’ আয়োজনে যেতে হয়। বিএনপিরও তো অজানা নয়, এবারের নির্বাচনে জামাত আমীর এবং এনসিপির আহবায়কসহ কয়েকজনকে জিতিয়ে আনতে বিশেষ শক্তি যে কৌশলী ভূমিকা রেখেছে সে ক্ষেত্রে বিএনপিকে অসহায় মনে হয়েছে।তবে সবটা দেখে মনে হচ্ছে সরকারী দল ও বিরোধী দলের মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত সমঝোতার মধ্য দিয়েই সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হবে। সরকারী দল শোক প্রস্তাব, জুলাই যোদ্ধা দায়মুক্তি, জুলাই স্মৃতি ঘর প্রতিষ্ঠা, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখা ইত্যাদি বিষয়ে বিরোধী জোটকে খুশী করেছেন, বিপরীতে বিচারালয়, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, দুদক, মানবাধিকার বিষয়ক ব্যবস্থা নিজেদের কর্তৃত্বে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার লাগাম কতৃত্ববাদী পন্থায় আরো শক্তভাবে ধরতে চেয়েছেন। অবশ্য দুদক ও মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে আরও শক্তিশালী করে পরবর্তী সময়ে আইন করার প্রতিশ্রুতি বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। বিরোধী জোট যতটুকু অর্জন করেছে আপাত তাতেই খুশী। কিন্তু বিরোধী হিসেবে রাজনৈতিক স্টান্টবাজি অনুযায়ী যা যা বক্তব্য ও কর্মসূচী দেয়া প্রয়োজন তা বিরোধী জোট দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে। আসলে তারা কতৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরোধী নয় বরং কতৃত্ববাদী ব্যবস্থার মাধ্যমে উগ্রবাদী ও ধর্মান্ধ রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য— যেমনটা তারা করেছেন ইউনূসের কর্তৃত্ববাদী শাসনকে ব্যবহার করে। ‘সংস্কার’ শব্দটি তাদের দূরভিসন্ধি বাস্তবায়নের ঢাল মাত্র। তবে দায়মুক্তিসহ নানা বিষয় ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেয় বলা মুশকিল। ইউনূস আমলজুড়ে মব সন্ত্রাস সহ মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙা, মাজার ভাঙা, হত্যাকান্ড সংঘটিত করা, ছায়ানট-উদীচী ও সংবাদমাধ্যমে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় তো দায়মুক্তি দেয়া হয়নি। থানা থেকে অস্ত্র লুটের ঘটনায়ও দায় মুক্তি দেয়া হয়নি। কানে টান পড়লে মাথাও আসবে।ইউনূস আমল বা অনির্বাচিত আমলের সমাপ্তি হলেও যে কাউকে খুনের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে আটক করা, রিমান্ডে নেয়া ও জেলে পুরে রাখার ‘ ইউনূস - আসিফ নজরুল সংস্কৃতি’ বিএনপি আমলেও চালু আছে। প্রতিদিনই এ ধরণের গ্রেফতারি চলছে। ঘটনা কই আর গ্রেপ্তার কই— মানুষ মিলাতে পারে না। ঘটনার জন্য মামলা হচ্ছে, না মামলার জন্য ঘটনা সাজিয়ে রাখা আছে! বিএনপি আমলেও মাজারের উপর হামলা ও পীরকে পিটিয়ে মারার ‘তৌহিদী জনতা’ সংস্কৃতি চালু আছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ‘ডাস্টবিন শফিক’ এখনো ফেসবুকে উষ্কানিমূলক স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। জ্বালানি সংকটের এই সময়ে তিনি স্ট্যাটাস দিলেন আমাদের সময়ে এ পরিস্থিতি হলে ‘ওই চল যমুনা যাই!! ...... হতো।’ তিনি কি প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন (না থাকলেও সরকারিভাবে যমুনা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) ঘেরাও করার উষ্কানি দিলেন? অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মত, ২০০৮ সালের নির্বাচিত সরকারকে ক্রমান্বয়ে এক এগারো সরকারের এক্সটেনশনে পরিণত করা হয়েছিলো। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে জনমানসে প্রশ্ন জাগছে তাহলে ২০২৬-এ নির্বাচিত সরকারকেও কি ইউনূস সরকারের একধরনের এক্সটেনশনে পরিণত করার জন্য অপ্রকাশ্য কুশীলবরা সক্রিয়?(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

সংকটে তেল কমে, চরিত্রে তেলেসমাতি বাড়ে

বিশ্ব রাজনীতির আকাশে যুদ্ধের মেঘ ঘন হলে তার ছায়া শুধু সীমান্ত বা বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ঢুকে পড়ে রাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে, সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিটি হিসাব-খাতায়। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি প্রবাহে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, তেলের দাম ওঠানামা করে, বৈশ্বিক বাজারে উদ্বেগ ছড়ায়। একই সঙ্গে এই সংকট নতুন সম্ভাবনার দরজাও খুলে দেয়—বিকল্প জ্বালানি, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা এবং নীতিগত পুনর্গঠনের বাস্তব প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। অর্থনীতি তখন একদিকে সংকটে কাঁপে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের পথ খুঁজতে বাধ্য হয়।কিন্তু এই বৈশ্বিক আলোড়নের ভেতরে আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় আরেকটি অদৃশ্য প্রবাহ নীরবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক সংকট যত দৃশ্যমান হয়, ততই সমাজের ভেতরে এক ধরনের আচরণগত প্রাচুর্য বেড়ে যায়। এই প্রাচুর্যের নাম তেলেসমাতি— যা কোনো জ্বালানি নয়, বরং ক্ষমতা, সুবিধা ও টিকে থাকার এক সূক্ষ্ম সামাজিক কৌশল।রাষ্ট্র যখন সাশ্রয়ের আহ্বান জানায়, নাগরিক জীবন তখন হিসাব কষে সংকুচিত হয়। বাজারে দাম বাড়ে, চাপ বাড়ে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে ওঠে। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি সমান্তরাল বাস্তবতা চলতে থাকে— যেখানে সংকটের কোনো দৃশ্যমান প্রভাব নেই। সেখানে তেলের ঘাটতি নেই, বরং তেলেসমাতির প্রবাহ আরও স্বচ্ছন্দ ও বিস্তৃত।এই প্রবাহ কোনো শিল্পকারখানার উৎপাদন নয়, বরং মানুষের আচরণের উৎপাদন। এটি জন্ম নেয় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার আকাঙ্ক্ষা, সুবিধা নিশ্চিত করার কৌশল এবং সত্যকে আড়াল করে গ্রহণযোগ্যতার মোড়কে উপস্থাপনের অভ্যাস থেকে। এটি নরম, অদৃশ্য, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কার্যকর—এমন এক সামাজিক জ্বালানি, যা বহু কাঠামোকে নিঃশব্দে চালিয়ে নিয়ে যায়।রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এই তেলেসমাতির উপস্থিতি সবচেয়ে স্পষ্ট। মহান সংসদ থেকে প্রশাসনিক করিডোর পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে যুক্তির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অবস্থান, আর অবস্থানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সম্পর্কের সূক্ষ্ম সমীকরণ। কে কী বলছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কাকে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে। সত্য সেখানে উচ্চারিত হয় না; বরং তাকে সাজানো হয়, পরিমার্জিত করা হয়, এবং গ্রহণযোগ্যতার মোড়কে পরিবেশন করা হয়।এই সংস্কৃতি কেবল রাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি এখন সমাজের প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত। পরিবারে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে অনেক সময় সত্যকে নরম করা হয়, অসম্পূর্ণ রাখা হয় বা পরিস্থিতির সুবিধামতো রূপ দেয়া হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধার চেয়ে আচরণগত সামঞ্জস্য অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ে চিন্তার স্বাধীনতার পাশাপাশি গড়ে ওঠে সুবিধা-নির্ভর এক নীরব সমঝোতা, যেখানে প্রশ্নের চেয়ে নীরবতা অনেক সময় নিরাপদ।অনলাইন জগতে এই তেলেসমাতি আরও দ্রুত, আরও তীক্ষ্ণ এবং আরও নির্লজ্জভাবে কাজ করে। এখানে প্রশংসা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। জনপ্রিয়তা অনেক সময় সত্যের চেয়ে বড় মাপকাঠি হয়ে ওঠে। ফলে বাস্তবতা নয়, বরং উপস্থাপনাই নির্ধারণ করে কে গুরুত্বপূর্ণ, কে অপ্রাসঙ্গিক। এই ডিজিটাল তেলেসমাতি অফলাইনের চেয়েও অনেক বেশি আক্রমণাত্মক এবং প্রভাবশালী।এই বাস্তবতায় সমাজ ধীরে ধীরে এক উল্টো মূল্যবোধের দিকে অগ্রসর হয়। যেখানে সরলতা দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়, আর কৌশল দক্ষতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। যোগ্যতা অনেক সময় নীরব থাকে, কিন্তু তোষামোদ কথা বলে। সত্য আড়ালে যায়, আর সুবিধা সামনের সারিতে উঠে আসে। এভাবেই গড়ে ওঠে এক নীরব প্রতিযোগিতা— কে কত নিখুঁতভাবে তেল ব্যবহার করতে পারে।তেলের সংকট আমাদের শেখায় সীমাবদ্ধতা, বাস্তবতার কঠোর হিসাব। কিন্তু তেলেসমাতি শেখায় সেই সীমাবদ্ধতাকে কীভাবে অস্বীকার করা যায়, কীভাবে বাস্তবতাকে ভাষার কৌশলে আড়াল করা যায়। এই দুই শিক্ষা একসঙ্গে সমাজকে এক অদ্ভুত দ্বৈত অবস্থানে দাঁড় করায়—একদিকে বাস্তব চাপ, অন্যদিকে কৃত্রিম স্বস্তি। আর ধীরে ধীরে এই কৃত্রিম স্বস্তিই স্বাভাবিক বাস্তবতার রূপ নেয়।রাষ্ট্রীয় নীতি, সংসদীয় আলোচনা, পারিবারিক সম্পর্ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অনলাইন ও অফলাইন সামাজিক পরিসর—সবখানেই এই প্রবাহ একইভাবে কাজ করে। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নয়, কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী অদৃশ্য কাঠামো। এটি বন্ধ হয় না, কারণ এর জ্বালানি মানুষের ভয়, আকাঙ্ক্ষা, নিরাপত্তাহীনতা এবং সুবিধার প্রবণতা। এই অদৃশ্য চেইনই সমাজকে ভেতর থেকে চালিয়ে নিয়ে যায়—নিঃশব্দে, নিয়মিতভাবে।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কেবল অর্থনীতির নয়; এটি আমাদের চরিত্রের প্রশ্ন। আমরা কি শুধু জ্বালানির সংকটে ভুগছি, নাকি তার চেয়েও গভীর সংকটে—আমাদের আচরণগত জ্বালানির সংকটে?তেলের সংকট হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেটে যাবে, নতুন প্রযুক্তি আসবে, বিকল্প জ্বালানি তৈরি হবে, বাজার স্থিতিশীল হবে। কিন্তু যদি তেলেসমাতির এই সংস্কৃতি স্থায়ীভাবে সমাজের ভেতরে শিকড় গেঁড়ে বসে, তাহলে সংকট কেবল রূপ বদলাবে, সমাধান নয়।কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে শুধু তেল নয়, চালায় তার নৈতিক জ্বালানিও। আর সেই জ্বালানি যখন তোষামোদ, সুবিধা আর নীরব সম্মতির ওপর দাঁড়িয়ে যায়—তখন সংকট আর বাইরে থাকে না, তা ভেতরেই স্থায়ী হয়ে যায়।[লেখক : সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

পরিবর্তিত জলবায়ু ও বাড়তে থাকা রোগঝুঁকির বাস্তবতা

বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল শুরু হলেই তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এপ্রিল-মে মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা প্রায়ই ৩৮ ডিগ্রি থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। কোনো কোনো এলাকায় তা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। এই তীব্র তাপপ্রবাহ জনজীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে— বিশেষ করে শহরাঞ্চল, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ এবং নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য এটি হয়ে ওঠে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৪.৮ লক্ষ মানুষ তাপপ্রবাহজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। দক্ষিণ এশিয়ার মতো উষ্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে এই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে আরও বেশি। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপজনিত অসুস্থতা, হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী দশকে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণে বাড়তে পারে।তীব্র গরম শুধু অস্বস্তি নয়; এটি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে এবং একাধিক রোগের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। ফলে গ্রীষ্মকাল এখন আর কেবল মৌসুমি সময় নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সতর্কতার সময় হিসেবে বিবেচিত হওয়া জরুরি।মানবদেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৬.৫ ডিগ্রি থেকে ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। অতিরিক্ত গরমে শরীর ঘামের মাধ্যমে তাপ বের করে দেয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু দীর্ঘসময় রোদে কাজ করলে শরীর দ্রুত পানি ও লবণ হারায়।গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মাত্র ২ শতাংশ পানি কমে গেলে কর্মক্ষমতা প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। এই অবস্থায় দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমিভাব, অতিরিক্ত ঘাম, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। পরিস্থিতি গুরুতর হলে এটি হিটস্ট্রোকে রূপ নিতে পারে, যা দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতী হতে পারে।এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী গরম মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে— বিরক্তি, অনিদ্রা, ক্লান্তি এবং মনোযোগের ঘাটতি এই সময় অনেক বেড়ে যায়। গরমকালীন সময়ে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ না করলে ডিহাইড্রেশন দেখা দেয়। এতে রক্তচাপ কমে যায়, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ এই সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হন। দীর্ঘসময় রোদে কাজ করলে হিট এক্সহস্টশন ও হিটস্ট্রোক হতে পারে। ডব্লিউএইচওর মতে, তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে তাপজনিত মৃত্যুঝুঁকি ১-৩% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। গরমে জীবাণু দ্রুত বৃদ্ধি পায়। দূষিত পানি ও খাবারের কারণে ডায়রিয়া ও আমাশয় ছড়িয়ে পড়ে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বছরে প্রায় ৪ লক্ষাধিক শিশু ডায়রিয়ায় মারা যায়, যার বড় অংশ গরমকালে ঘটে। দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে টাইফয়েড দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে। ঘাম, ধুলাবালি ও আর্দ্র পরিবেশে ফুসকুড়ি, চুলকানি ও ছত্রাকজনিত রোগ বৃদ্ধি পায়। বায়ুদূষণ ও ধুলাবালির কারণে হাঁপানি ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ বেড়ে যায়। তীব্র গরমে শিশুদের শরীর দ্রুত পানিকূন্য হয়ে যায়। তাদের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে বিকশিত না হওয়ায় তারা সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় হিটস্ট্রোক, হৃদরোগ ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি। অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি রোগ গরমে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরম মা ও শিশুর উভয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পানিশূন্যতা ও শারীরিক চাপ প্রসবকালীন জটিলতা বাড়াতে পারে। তাই বিশেষ যত্ন অপরিহার্য। শহরাঞ্চলে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ পরিস্থিতি তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামাঞ্চলের তুলনায় ২ ডিগ্রি থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। কংক্রিটের ঘনবসতি, সবুজের অভাব, যানবাহনের ধোঁয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। বিদ্যুৎচালিত শীতলীকরণ যন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহার পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে এবং বিদ্যুৎচাপ বাড়ায়। ফলে নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠী— যারা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন— তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। ব্যক্তিগত দায়িত্বই প্রথম সুরক্ষা। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা উচিত। হালকা ও সুতির পোশাক ব্যবহার করতে হবে। দুপুর ১২টা-৩টা পর্যন্ত রোদ এড়িয়ে চলাই ভালো। বাসি ও খোলা খাবার পরিহার করা উচিত। তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় প্রশাসনকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। গণমাধ্যমে নিয়মিত হিটওয়েভ সতর্কতা প্রচার জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা দরকার। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ‘হিট অ্যাকশন প্ল্যান’ আরও শক্তিশালী করতে হবে। শ্রমিকদের জন্য কাজের সময় পুনর্বিন্যাস ও ছায়াযুক্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।[লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]

ধর্মের নামে সহিংসতা: কোথায় আমাদের সীমারেখা?

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নে ইসলাম ধর্ম বিকৃতির অভিযোগে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামে এক সুফি পীরকে পিটিয়ে হত্যা করেছে এলাকাবাসী। তার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করা হয়েছে। তাকে যেদিন হত্যা করা হয় সেদিন সকালে কিছু লোক গোপনে বৈঠক করে এবং বৈঠকের পর কাটছাঁট করা তার ৩৬ সেকেণ্ডের একটি ভিডিও তিনটি ফেইসবুক পেইজ ও চারটি ব্যক্তিগত আইডি থেকে প্রচার করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘সত্যের সন্ধানে ফিলিপনগর’। ভিডিওটি পুলিশের নজরে এলে তারা এলাকায় গিয়ে খোঁজ-খবরও নিয়েছে। দুপুরে জনা পঞ্চাশেক লোক শামীমের দরবারে উপস্থিত হয়ে পুলিশের সম্মুখেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে। পুলিশ ৫০ জন লোককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, অবশ্য পারার কথাও নয়। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় মব সৃষ্টির কাহিনী পুলিশ সম্যকভাবে অবহিত, তখন মব নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের এক্তিয়ার বহির্ভূত। বিএনপি সরকার মব নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিলেও তার নিয়ন্ত্রণ পুলিশের এক্তিয়ারভুক্ত কিনা তা তারা এখনো বুঝে ওঠতে পারছে না।দরবার ভাঙচুর ও হত্যায় অংশগ্রহণ করেছে যারা তাদের মধ্যে রয়েছে শিশু, কিশোর ও যুবক, দুয়েকজন ব্যতীত দাঙ্গাবাজদের কারো মুখে দাড়ি বা টুপি ছিল না। অনুভূতিতে আঘাত লাগার অজুহাতে আওয়ামী লীগ আমলেও যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সৃষ্টি করেছে তাদের বেশিরভাগ ছিল হাফপেন্ট আর লুঙ্গিপরা। তবে এদের যারা উত্তেজিত করে তারা ভিন্ন জগতের মানুষ, এদের বলা হয় ‘তৌহিদি জনতা’ বা ধর্মীয় ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ বিক্ষুব্ধ মুসলিম জনসমষ্টি। এই বিক্ষুব্ধ জনসমষ্টি প্রচলিত আইন মানে না, প্রশাসন মানে না, সরকারও মানে না। ভিকটিম শামীম রেজার যে ভিডিওটি পরিকল্পিতভাবে ঘটনার দিন প্রচার করা হয়েছিল তা ছিল ২০২১ বা ২০২৩ সনের, ওই ভিডিওতে তাকে কৃষ্ণ সাজে দেখা গেছে, তখন তার দাড়ি-চুল ছিল কালো।তিনি নাকি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সম্রাট আকবরের মতো একটা সমন্বয় করতে চেয়েছিলেন। ১৫৮২ সনে মুঘল সম্রাট আকবর তার প্রবর্তিত ‘দীন-ই-ইলাহি’র মাধ্যমে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে গেছেন। তার ওই মতবাদ কেউ গ্রহণ না করলেও মুসলিম ইতিহাসে তিনি কখনো ‘দীন-ই-ইলাহি’ প্রচারের জন্য অসম্মানিত হননি। শুধু তাই নয়, এবার পহেলা বৈশাখে মুসলিম বাঙালিরা ‘বৈশাখ-ই আকবর’ নামে একটি কর্মসূচিও পালন করেছে। শামীম রেজার ভিডিওটি ২০২১-২৫ সাল পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছিল। কিন্তু তাতে কোন অসুবিধা হয়েছে বলে কেউ অভিযোগ করেনি। কেউ তার ভিডিও দেখে ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলেও শোনা যায়নি। তাহলে ৫ বছর পর ২০২৬ সালে হঠাৎ কেন কিছু লোকের অনুভূতিতে আঘাত লাগলো?ধর্মীয় ইস্যুতে এমন বিক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠী বেশি দেখা যায় পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে। এই তিন দেশে ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষ ভিন্নমতের লোকদের হত্যা করার উন্মাদনায় উন্মত্ত। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতাকে নির্বিঘ্ন রাখতে এদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করে, তাই এদের বিরুদ্ধে লোক দেখানো ব্যবস্থা নিতেও গড়িমসি করে। বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভোট হারানোর ভয়ে বাম-ডান সব রাজনৈতিক দল এই উগ্রতাকে সমীহ করে, তাই গণতান্ত্রিক নির্বাচন এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তুলছে। সরকারের উদাসীনতা আর প্রশাসনের নির্লিপ্তায় ধর্মীয় ইস্যুতে বিক্ষুব্ধ এই জনগোষ্ঠী বেপরোয়া। ধর্ম নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টিকারীদের হত্যা করতে পারার মধ্যে তারা স্বর্গীয় সুখ পায়, জেহাদের উত্তেজনায় ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে জীবিত মানুষকে পুড়িয়ে মারে, কবর থেকে লাশ তুলে পিটাতে পিটাতে উল্লাস করে, মরদেহের ওপর ওঠে নৃত্য করে, পিটিয়ে মারা মৃতদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পোড়ায়।মানুষ পোড়ানো ইসলাম ধর্মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও এটাকে তারা ধর্ম অবমাননা মনে করে না। বিভিন্ন আলেম ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করলেও এদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে না, আঘাত বেশি লাগে যখন কোন সুফি বা হিন্দু ধর্ম নিয়ে কথা বলে। মানুষ হিংস্র বলেই খান জাহান আলী মাজারের পুকুর ঘাটে মানত করে বেঁধে রাখে ছাগল বা কুকুর, ছুঁড়ে মারে হাঁস-মোরগ, পুকুরের কুমিরগুলো যখন অসহায় প্রাণীগুলো খেতে থাকে তখন পাড়ে অপেক্ষমান জনতা আনন্দে হাত তালি দেয়। আনন্দ পায় বলেই নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেয়া হয়, আনন্দ পায় বলেই ২৮ বছর বয়সী পোষাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে শুধু পিটিয়ে হত্যা করা হয় না, গাছের ডালে টাঙিয়ে পুড়িয়েও দেয়া হয়। মানুষ হিংস্র। হিংস্র বলেই এক সময় হিংস্র পশুর খাঁচায় অপরাধীদের ফেলে দিয়ে তার বাঁচার আকুতি ও অসহায়ত্ব দেখে দর্শক আনন্দ পেত। এখনো সউদি আরবে গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর চোর-ডাকাত-ব্যভিচারীর হাত ও গর্দান কাটার সময় মুসল্লিদের আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা যায়। ৭০-৭২ খ্রিস্টাব্দে দুই গ্ল্যাডিয়েটরের আমৃত্যু লড়াইয়ে ভয়ঙ্কর মৃত্যুদৃশ্য দেখার জন্য রাজা-রাণীসহ ইতালির কলোসিয়ামে ৮০ হাজার দর্শকের সমাগম হতো। অনেক সময় বাঘ, সিংহের মতো হিংস্র প্রাণীর সঙ্গেও গ্লাডিয়েটরদের বদ্ধ খাঁচায় লড়াই করতে হতো, লড়াইরত গ্লাডিয়েটরের করুন মৃত্যু দেখে দর্শকরা কলোসিয়ামের গ্যালারিতে আনন্দে উল্লাস করতো। মানুষ হত্যায় যেই মানুষগুলো এত মজা পায় তারা সৃষ্টিকর্তার আশরাফুল মাখলুকাত হতে পারে না।ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে বাড়াবাড়ির খবর নতুন কিছু নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে যে রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে তা হিংস্র মানুষের বীভৎস রূপ। কোরআনে পা রাখার গুজব ছড়িয়ে জুয়েল নামে যে লোককে পিটিয়ে আর আগুনে পুড়ে হত্যা করা হয়েছিল তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না। অসুস্থ্য হলেও তিনি যে কোরআনে পা রাখেননি তা মসজিদের খাদেম বারবার উল্লেখ করেছেন। জুয়েল রোজা রাখত, নামাজ পড়ত, সেইদিনও নামাজ পড়ে মসজিদে রাখা কোরআন শরীফ দেখছিলেন। কোরআনে পা রাখার গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শত শত লোক এসে জুয়েলকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল। নিহত জুয়েলের দুই হাত, গলায় ও কোমরে রশি লাগিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর থেকে প্রায় ৪২০ মিটার দূরে টেনেহিঁচড়ে আন্তজেলা মহাসড়কে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পিটিয়ে হত্যা, টেনেহিঁচড়ে নেয়া ও আগুন লাগানোর কাজে উৎসাহীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ ছিল কিশোর।মব সৃষ্টি করে যে কোন মানুষকে বাংলাদেশে পিটিয়ে মেরে ফেলা সহজ। ‘ছেলেধরা’ অভিহিত করে বাংলাদেশে বহু লোককে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। রাস্তায় যে কোন লোককে দেখিয়ে চোর বা ছিনতাইকারী বললেই আশপাশের কেউ যাচাই না করেই পিটাতে শুরু করে দেয়। অনুভুতির মব যত্রতত্র। প্রতিটি সরকারের প্রশ্রয়ে এই জাতীয় দানবীয় কর্মকাণ্ডের জন্য ইসলাম শান্তির ধর্ম হয়ে উঠতে পারল না। এআই-এর ভয়ানক আধিপত্যে এখন বোঝা যায় না, কোনটি আসল বা কোনটি নকল। আসল হলেও পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে কেন? ধর্ম কি এতই ঠুনকো যে, কেউ কিছু একটা বললেই তা বিলীন হয়ে যাবে! মনে হচ্ছে আমাদের ধর্মীয় শিক্ষায় কোন গলদ আছে, নতুবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ ওঠলেই মানুষ এত হিংস্র হয়ে উঠে কেন ? বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ অন্যায় করে, ঘুষ খায়, মানুষ ঠকায়, মিথ্যা বলে, ধর্ষণ করে, বলাৎকার করে, কিন্তু কারো ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করার কথা শোনা মাত্রই প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে পড়ে। ব্যক্তি জীবনে হয়তো এদের কেউই ধর্মকর্মে একনিষ্ঠ নয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হলে শাস্তির বিধান আছে, কিন্তু দণ্ডবিধি বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘ধর্মীয় অনুভূতির’ কোন স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। অবশ্য সংজ্ঞা দেয়া সম্ভবও নয়, কারণ কোন কথায় কার অনুভুতিতে কিভাবে আঘাত লাগবে তা সুনির্দিষ্ট করা কঠিন।১৯৫৩ সনে পাকিস্তানে আহমদিয়া বিরোধী দাঙ্গায় ২ হাজার কাদিয়ানিকে হত্যা করা হয়, দাঙ্গায় উসকানি দেয়ার অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। আহমদিয়া বিরোধী দাঙ্গার পর পাকিস্তান সরকার এর তদন্তে লাহোর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ মুনিরকে প্রধান করে ‘পাঞ্জাব ডিস্টারবেন্সেস ইনকোয়ারি কোর্ট’ গঠন করে। ‘মুসলমান কাকে বলে’- মুনির কমিশনের এমন প্রশ্নের উত্তরে পাকিস্তানের নামকরা ১০ জন আলেম ১০ রকম সংজ্ঞা দেন এবং প্রত্যেক আলেমের সংজ্ঞা অনুযায়ী অন্য আলেমরা ‘কাফের’ হয়ে যান। মুনির রিপোর্ট আরও উল্লেখ করে যে, যদি সব আলেমের সংজ্ঞা একসাথে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে পাকিস্তানে কোনো মুসলমানই থাকে না। বাংলাদেশেও একজন আলেম আরেকজন আলেমকে ‘কাফের’ ফতোয়া দিচ্ছে। তারপরও ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লাগার অভিযোগ উত্থাপনের আইন বলবৎ আছে।শক্তি প্রয়োগে ভীতি সৃষ্টি হয়, কিন্তু মন জয় করা যায় না। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের দুইজন নামকরা আলেমের ভিসা বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া। জাপানে মসজিদ নির্মাণে বাধা দিচ্ছে স্থানীয় জাপানিরা। শুধু জাপান নয়, গ্রীস এবং ইতালিও মসজিদ করতে দিচ্ছে না। জাপান মুসলমানদের কবর দিয়ে জায়গা নষ্ট করারও ঘোর বিরোধী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলাম ধর্ম নিয়ে ফোবিয়া বা ভীতি রয়েছে। আমার এক সহকর্মীর নামের শেষ অংশে ‘ইসলাম’ থাকায় আমেরিকা ভিসা দেয়নি, বোম্বে সিনেমার অভিনেতা শাহরুখের নামের শেষে ‘খান’ থাকায় তাকে আমেরিকার বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা ধরে জেরা করা হয়েছে, অবসর নেয়ার পর ভারতের রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের মুসলিম নামের কারণে আমেরিকার বিমানবন্দরে তাকে নাজেহাল করা হয়। ২০২৪ সনের পিউ রিসার্চের রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে মুসলিমদের প্রতি সামাজিক ম্বৈরিতা ‘খুব উচ্চ’ পর্যায়ে রয়েছে। তাই ইসলাম ধর্মকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে সুরা নিসার ১৪০ নম্বর আয়াত মেনে চলা ফরজ, যাতে বলা হয়েছে, ‘যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করা হচ্ছে ও তাকে বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন তোমরা তাদের সঙ্গে বসবে না, যে পর্যন্ত না তারা অন্য কোনো প্রসঙ্গে লিপ্ত হবে’।[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

ভিডিও

টস হেরে ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশ

তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আজ সোমবার সকালে টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিউই অধিনায়ক টম ল্যাথাম। ফলে টস হেরে শুরুতে ফিল্ডিংয়ে নামছে স্বাগতিক বাংলাদেশ।সিরিজের প্রথম ম্যাচে ২৬ রানে হারার পর আজ শান্ত-মিরাজদের জন্য এটি এক বাঁচা-মরার লড়াই। সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচে জয়ের কোনো বিকল্প নেই টাইগারদের সামনে। বিপরীতে, আইপিএল ও পিএসএলের কারণে নিয়মিত একাদশের অনেক তারকাকে ছাড়াই খেলতে আসা নিউজিল্যান্ডের সামনে সুযোগ আজই সিরিজ নিশ্চিত করার।দুই দলের একাদশ:বাংলাদেশ আজ পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে মাঠে নামলেও কিউইরা খেলছে অনেকটা নতুন চেহারার দল নিয়ে।বাংলাদেশ একাদশ: তানজিদ হাসান তামিম, সাইফ হাসান, সৌম্য সরকার, নাজমুল হোসেন শান্ত, লিটন দাস, তাওহীদ হৃদয়, মেহেদী হাসান মিরাজ, রিশাদ হোসেন, তাসকিন আহমেদ, নাহিদ রানা ও শরীফুল ইসলাম।নিউজিল্যান্ড একাদশ: হেনরি নিকোলস, নিক কেলি, উইল ইয়ং, ডিন ফক্সক্রফ্ট, টম ল্যাথাম, মুহাম্মদ আব্বাস, জশ ক্লার্কসন, নাথান স্মিথ, ব্লেয়ার টিকনার, উইল ও'রুর্ক ও জেডেন লেনক্স।  

টস হেরে ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশ
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৩৪ জন