সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
“একটি জাতির জন্ম” নিবন্ধে কী লিখেছিলেন জিয়াউর রহমান

“একটি জাতির জন্ম” নিবন্ধে কী লিখেছিলেন জিয়াউর রহমান

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তদানীন্তন উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম-এর লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ প্রবন্ধটি দৈনিক বাংলায় ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বিচিত্রা’য় পুনঃ প্রকাশিত হয়েছিল।প্রবন্ধে জিয়া লিখেছিলেন, “৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রীন সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্তরূপ দিলাম।...তারপর এলো সেই কালো রাত। ২৫ ও ২৬ মার্চের মধ্যবর্তী কালো রাত। ২৬ শে মার্চ। ১৯৭১ সাল। রক্ত অক্ষরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে এই দিনটিকে। স্মরণ রাখতে ভালোবাসবে। এই দিনটিকে তারা কোনো দিন ভুলবে না। কো-নো-দি-ন না।”পুরো নিবন্ধটি পাঠ করলে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া ও মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে একজন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা বীরোত্তম জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বাপর প্রসঙ্গে যথোচিত ও নৈর্ব্যক্তিক মূল্যায়ন অনুধাবন করা যায়। এখানে পুরো নিবন্ধটি উপস্থাপন করা হলো।“পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতে মি. জিন্নাহ যেদিন ঘোষণা করলেন, উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, আমার মতে ঠিক সেদিনই বাঙালি হৃদয়ে অংকুরিত হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। জন্ম হয়েছিল বাঙালি জাতির। পাকিস্তানের স্রষ্টা নিজেই ঠিক সেদিনই অস্বাভাবিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের ধ্বংসের বীজটাও বপণ করে গিয়েছিলেন- এই ঢাকার ময়দানেই। এই ঐতিহাসিক নগরী ঢাকাতেই মি. জিন্নাহ অত্যন্ত নগ্নভাবে পদদলিত করেছিলেন আমাদের জনগণের জন্মগত অধিকার। আর এই ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতেই চূড়ান্তভাবে খন্ড বিখন্ড হয়ে গেলো তার সাধের পাকিস্তান। ঢাকা নগরী প্রতিশোধ নিল জিন্নাহ ও তার অনুসারীদের নষ্টামীর। প্রতিশোধ নিল যোগ্যতমভাবেই। মহানগরী ঢাকা চিরদিন ছিল মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানবিক মুক্তি সাধনের পীঠস্থান। সে এবারও হয়েছে মুক্তির উৎসরূপে সুপ্রতিষ্ঠিত। সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবার বিশ্বের নির্যাতিত জনতার গর্বের শহর আশার নগরী রূপে।অতি প্রিয় মাতৃভূমির মুক্তির আশায় ঢাকা নগরীর বীর জনতা সংগ্রাম করেছে বীরত্বের সাথে। সংগ্রাম করেছে হানাদার, দখলদার, দস্যু বাহিনীর বিরুদ্ধে। দস্যু বাহিনীর নৃশংসতা আর হত্যার বিরুদ্ধে শির উঁচু করে রুখে দাঁড়িয়েছে ঢাকার মানুষ। সংগ্রাম করেছে দৃঢ়তার সাথে। বর্বর পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছে এই ঢাকা নগরীতেই। এই বীর নগরীর পবিত্র ভূমিতে ফিরে এসেছি আমি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের দিন কয়েকের মধ্যেই। বীর নগরীর পবিত্র মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রথমেই আমি সংগ্রামী ঢাকা ও ঢাকাবাসীর উদ্দেশ্যে শির নত করেছি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধায়। পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের সপ্তাহখানেক পরে একজন সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন, সেই দুঃস্বপ্নে ভরা দিনগুলো সম্পর্কে কিছু স্মৃতিকথা লিখতে। আমি একজন সৈনিক। আর লেখা একটি ঈশ্বর প্রদত্ত শিল্প। সৈনিকরা স্বভাবতই সেই বিরল শিল্পক্ষমতার অধিকারী হয় না। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ছিল এমনই আবেগধর্মী যে, আমাকেও তখন কিছু লিখতে হয়েছিল। কলম তুলে নিতে হয়েছিল হাতে। ভারত ভেঙে দু’ভাগ হয়ে সৃষ্টি হয়েছিল অস্বাভাবিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের। আর তার অব্যবহিত পরেই আমরা চলে গিয়েছিলাম করাচি। সেখানে ১৯৫২ সালে আমি পাস করি ম্যাট্রিক। যোগদান করি পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে। অফিসার ক্যাডেটরূপে। সেই থেকে অধিকাংশ সময়ই বিভিন্ন স্থানে আমি কাজ করেছি পাকিস্তানী বাহিনীতে।  স্কুল জীবন থেকেই পাকিস্তানীদের দৃষ্টিভঙ্গির অস্বচ্ছতা আমার মনকে পীড়া দিতো। আমি জানতাম, অন্তর দিয়ে ওরা আমাদের ঘৃণা করে। স্কুল জীবনেই বহুদিনই শুনেছি আমার স্কুল বন্ধুদের আলোচনা। তাদের অভিভাবকরা বাড়িতে যা বলতো তাই তারা রোমন্থন করতো স্কুল প্রাঙ্গণে। আমি শুনতাম মাঝে মাঝেই, শুনতাম তাদের আলোচনার প্রধান বিষয় হতো বাংলাদেশ আর বাংলাদেশকে শোষণ করার বিষয়। পাকিস্তানী তরুণ সমাজকেই শেখানো হতো বাঙালিদের ঘৃণা করতে। বাঙালিদের বিরুদ্ধে একটা ঘৃণার বীজ উপ্ত করে দেওয়া হতো স্কুল ছাত্রদের শিশু মনেই। শিক্ষা দেয়া হতো তাদের, বাঙালিকে নিকৃষ্টতম মানবজাতি রূপে বিবেচনা করতে। অনেক সময়ই আমি থাকতাম নীরব শ্রোতা। আবার মাঝে মধ্যে প্রত্যাঘাত হানতাম আমিও। সেই স্কুল জীবন থেকেই মনে মনে আমার একটা আকাঙ্ক্ষাই লালিত হতো, যদি কখনো দিন আসে, তাহলে এই পাকিস্তানবাদের অস্তিত্বেই আমি আঘাত হানবো। সযত্নে এই ভাবনাটাকে আমি লালন করতাম। আমি বড় হলাম। সময়ের সাথে সাথে আমার সেই কিশোর মনের ভাবনাটাও পরিণত হলো। জোরদার হলো। পাকিস্তানী পশুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার, দুর্বারতম আকাঙ্ক্ষা দুর্বার হয়ে উঠতো মাঝে মাঝেই। উদগ্র কামনা জাগতো পাকিস্তানের ভিত্তি ভূমিটাকে তছনছ করে দিতে। কিন্তু উপযুক্ত সময় আর উপযুক্ত স্থানের অপেক্ষায় দমন করতাম সেই আকাঙ্ক্ষাকে। ১৯৫২ সালে মশাল জ্বললো আন্দোলনের। ভাষা আন্দোলনের। আমি তখন করাচিতে। দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন। পাকিস্তানী সংবাদপত্র, প্রচার মাধ্যম, পাকিস্তানী বুদ্ধিজীবী, সরকারি কর্মচারী, সেনাবাহিনী, আর জনগণ সবাই সমানভাবে তখন নিন্দা করেছিল বাংলা ভাষার। নিন্দা করেছিল বাঙালীদের। তারা এটাকে বলতো বাঙালি জাতীয়তাবাদ। তাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তারা এটাকে মনে করেছিল এক চক্রান্ত বলে। এক সুরে তাই তারা চেয়েছিল একে ধ্বংস করে দিতে। আহ্বান জানিয়েছিল এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের। কেউ বলতো -ভেঙে দাও এর শিরদাড়া। এর থেকেই আমার তখন ধারণা হয়েছিল, পাকিস্তানিরা বাঙালিদের পায়ের তলায় দাবিয়ে রাখতে চায়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে তারা চায় বাঙালিদের উপর ছড়ি ঘুরাতে। কেড়ে নিতে চায় বাঙালিদের সব অধিকার। একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক রূপে বাঙালিদের মেনে নিতে তারা কুণ্ঠিত। ১৯৫৪ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হলো নির্বাচন। যুক্তফ্রন্টের বিজয় রথের চাকার নীচে পিষ্ট হলো মুসলিম লীগ। বাঙালীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক যুক্তফ্রন্টের বিজয় কেতন উড়লো বাংলায়। আমি তখন দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্যাডেট। আমাদের মনেও জাগলো তখন পুলকের শিহরণ। যুক্তফ্রন্টের বিরাট সাফল্যে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে আমরা সবাই পর্বতে ঘেরা অ্যাবোটাবাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, আমরা বাঙালি ক্যাডেটরা আনন্দে হলাম আত্মহারা। খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করলাম সেই বাধভাঙ্গা আনন্দের তরঙ্গমালা। একাডেমি ক্যাফেটরিয়াল নির্বাচনী বিজয় উৎসব করলাম আমরা। এ ছিল আমাদের বাংলা ভাষার জয়, এ ছিল আমাদের অধিকারের জয়, এ ছিল আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষার জয়, এ ছিল আমাদের জনগণের, আমাদের দেশের এক বিরাট সাফল্য। এই সময়েই একদিন কতগুলো পাকিস্তানি ক্যাডেট আমাদের জাতীয় নেতা ও জাতীয় বীরদের গালাগাল করল। আখ্যায়িত করল তাদের বিশ্বাসঘাতক বলে। আমরা প্রতিবাদ করলাম। অবতীর্ণ হলাম তাদের সাথে এক উষ্ণতম কথা কাটাকাটিতে। মুখের কথা কাটাকাটিতে এই বিরোধের মীমাংসা হলো না, ঠিক হলো এর ফয়সালা হবে মুষ্টিযুদ্ধের দ্বন্দ্বে। বাঙালিদের জন্মগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে বক্সিং গ্লাভস হাতে তুলে নিলাম আমি। পাকিস্তানি গোয়ার্তুমীর মান বাঁচাতে এগিয়ে এলো এক পাকিস্তানি ক্যাডেট। নাম তার লতিফ (পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অর্ডিন্যান্স কোরে এখন সে লেফটেন্যান্ট কর্নেল)। লতিফ প্রতিজ্ঞা করলো, আমাকে সে একটু শিক্ষা দেবে। পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে যাতে আর কথা বলতে না পারি সেই ব্যবস্থা নাকি সে করবে।  এই মুষ্টিযুদ্ধ দেখতে সেদিন জমা হয়েছিল অনেক দর্শক। তুমুল করতালির মাঝে শুরু হলো মুষ্টিযুদ্ধ। বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের দুই প্রতিনিধির মধ্যে। লতিফ আর তার পরিষদ দল অকথ্য ভাষায় আমাদের গালাগাল করল। হুমকি দিলো বহুতর। কিন্তু মুষ্টিযুদ্ধ স্থায়ী হলো না ত্রিশ সেকেন্ডের বেশি। পাকিস্তানপন্থী আমার প্রতিপক্ষ ধূলায় লুটিয়ে পড়ল। আবেদন জানাল, সব বিতর্কের শান্তিপূর্ণ মীমাংসার জন্যে। এই ঘটনাটি আমার মনে এক গভীর রেখাপাত করেছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতেও বাঙালি অফিসারদের আনুগত্য ছিল না প্রশ্নাতীত। অবশ্য গুটি কয়েক দালাল ছাড়া। আমাদের ওরা দাবিয়ে রাখতো, অবহেলা করতো, অসম্মান করতো। দক্ষ ও যোগ্য বাঙালি অফিসার আর সৈনিকদের ভাগ্যে জুটতো না কোনো স্বীকৃতি বা পারিতোষিক। জুটতো শুধু অবহেলা আর অবজ্ঞা। আখ্যায়িত করতো আমাদের আওয়ামী লীগের দালাল বলে। একাডেমির ক্লাসগুলোতেও সব সময় বোঝানো হতো, আওয়ামী লীগ হচ্ছে ভারতের দালাল। পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্ট করতেই আওয়ামী লীগ সচেষ্ট। এমন কি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবেই ক্যাডেটদের শেখানো হতো, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন ওদের রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু।বাঙালি অফিসার ও সৈনিকরা সব সময়ই পরিণত হতো পাকিস্তানি অফিসারদের রাজনৈতিক শিকারে। সব বড় বড় পদগুলো আর লোভনীয় নিয়োগপত্রের শিকাগুলো বরাবরই ছিঁড়তো পাকিস্তানিদের ভাগ্যে। বিদেশে শিক্ষার জন্য পাঠানো হতো না বাঙালি অফিসারদের। আমাদের বলা হতো ভীরু কাপুরুষ। আমাদের নাকি ক্ষমতা নেই ভালো সৈনিক হওয়ার। ঐতিহ্য নেই যুদ্ধের, সংগ্রামের।  এরপর এলো আইয়ুবী দশক। আইয়ুব খানের নেতৃত্বে চালিত এক প্রতারণাপূর্ণ সামরিক শাসনের কালো দশক। এই তথাকথিত উন্নয়ন দশকে সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল বাঙালি সংস্কৃতিকে বিকৃত করার। আামদের জাতীয়তা খাটো করার। বাংলাদেশের বীর জনতা অবশ্য বীরত্বের সাথে প্রতিহত করেছে এই হীন প্রচেষ্টা। এ ছিল এক পালাবদলের কাল। এখান থেকেই আমাদের ভাষা সাহিত্য ও শিল্প গ্রহণ করেছে এক নতুন পথ। আমাদের বুদ্ধিজীবীমহল, ছাত্র-জনতা আর প্রচার মাধ্যমগুলো সাংস্কৃতিক বন্ধনকে দৃঢ় করার জন্য পালন করেছে এক বিরাট ভূমিকা। আমাদের দেশের বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আসন্ন সশস্ত্র সংগ্রামের ক্ষেত্র প্রস্তুতিতে জনগণ ও সৈনিকদের মনোভাবকে গড়ে তোলা আর আন্দোলনে দ্রুততর গতি সঞ্চরণে এদের রয়েছে এক বিরাট অবদান। জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলার একমাত্র উপাদান হচ্ছে এর সংস্কৃতি। ১৯৬৩ সালে আমি ছিলাম সামরিক গোয়েন্দা বিভাগে। সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের তদানীন্তন পরিচালক মেজর জেনারেল নওয়াজেশ আলী মালিক এক সময় আমার এলাকা পরিদর্শন করেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল একদিন। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কিছুটা উন্নতর করবার সরকারি অভীপ্সা সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ করছিলেন তিনি। একপর্যায়ে এ ব্যাপারে তিনি আমার অভিমত জানতে চাইলে আমি বললাম, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যদি ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করা না হয়, তাহলে দেশে প্রশাসন ব্যবস্থা চালু রাখা সরকারের পক্ষে কঠিন হবে। এর জবাবে তিনি বললেন, বাংলাদেশ যদি স্বয়ম্ভর হয় তাহলে সে আলাদা হয়ে যাবে। পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্তাদের বাংলাদেশ সম্পর্কে এটাই ছিল মনোভাব। অথচ তারাই তখন দেশটা শাসন করছিলেন। তারা চাচ্ছিলেন বাংলাদেশটাকে অর্থনৈতিক দিকে দিয়ে দেউলিয়া করে রাখতে। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হচ্ছে আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। সে সময়ে আমি ছিলাম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যার নামে গর্ববোধ করত তেমনি একটা ব্যাটেলিয়ানের কোম্পানি কমান্ডার। সেই ব্যাটেলিয়ান এখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীরও গর্বের বস্তু। খেমকারান রণাঙ্গনের বেদিয়ানে তখন আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। সেখানে আমাদের ব্যাটেলিয়ান বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিল। এই ব্যাটেলিয়ানই লাভ করেছিল পাকবাহিনীর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক বীরত্ব পদক। ব্যাটেলিয়ানের পুরস্কার বিজয়ী কোম্পানি ছিল আমার কোম্পানি আলফা কোম্পানি। এই কোম্পানি যুদ্ধ করেছিল ভারতীয় সপ্তদশ রাজপুত উনবিংশ মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি ষোড়শ পাঞ্জাব ও সপ্তম লাইট ক্যাভালরীর (সাজোয়া বহর) বিরুদ্ধে। এই কোম্পানির জওয়ানরা এককভাবে এবং সম্মিলিতভাবে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে, ঘায়েল করেছে প্রতিপক্ষকে। বহুসংখ্যক প্রতিপক্ষকে হতাহত করে, যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক করে এই কোম্পানি অর্জন করেছিল সৈনিক সুলভ মর্যাদা, প্রশংসা পেয়েছিল তাদের প্রীতির। যুদ্ধবিরতির সময় বিভিন্ন সুযোগে আমি দেখা করেছিলাম বেশকিছুসংখ্যক ভারতীয় অফিসার ও সৈনিকের সাথে। আমি তখন তাদের সাথে কোলাকুলি করেছি, হাত মিলিয়েছি। আমার ভালো লাগতো তাদের সাথে হাত মেলাতে। কেননা আমি তখন দেখেছিলাম, তারাও অত্যন্ত উঁচু মানের সৈনিক। আমরা তখন মতবিনিময় করেছিলাম। সৈনিক হিসেবেই আমাদের মাঝে একটা হৃদ্যতাও গড়ে উঠেছিল, আমরা বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলাম। এই প্রীতিই দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে পাশাপাশি ভাইয়ের মতো দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করতে উদ্বুদ্ধ করেছে আমাদের। পাকিস্তানিরা ভাবতো বাঙালিরা ভালো সৈনিক নয়। খেমকারানের যুদ্ধে তাদের এই বদ্ধমূল ধারণা ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। পাকিস্তানি বাহিনীর সবার কাছেই আমরা ছিলাম তখন ঈর্ষার পাত্র। সে যুদ্ধে এমন একটা ঘটনাও ঘটেনি যেখানে বাঙালি জওয়ানরা প্রাণের ভয়ে পালিয়ে গেছে। ভারতের সাথে সেই সংঘর্ষে বহুক্ষেত্রে পাকিস্তানিরাই বরং লেজ গুটিয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বেঁচেছে। সে সময় পাকিস্তানিদের সমন্বয়ে গঠিত পাকবাহিনীর এক প্রথম শ্রেণির সাঁজোয়া ডিভিশনই নিম্নমানের ট্যাংকের অধিকারী ভারতীয় বাহিনীর হাতে নাস্তানাবুদ হয়েছিল। এসব কিছুতে পাকিস্তানিরা বিচলিত হয়ে পড়েছিল। বাঙালি সৈনিকদের ক্ষমতা উপলব্ধি করে হৃদকম্পন জেগেছিল তাদের।এই যুদ্ধে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বাঙালি পাইলটরাও অর্জন করেছিল প্রচুর সুনাম। এসব কিছুই চোখ খুলে দিয়েছিল বাঙালি জনগণের, তারাও আস্থাশীল হয়ে উঠেছিল তাদের বাঙালি সৈনিকদের বীরত্বের প্রতি। বাঙালি সৈনিকের বীরত্ব ও দক্ষতার প্রশংসা হয়েছিল তখন বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদপত্রে, উল্লেখ করা হয়েছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নাম। এ নাম আজ বাংলাদেশেরও এক পরম প্রিয় সম্পদ। এসব কিছুর পরিণতিতে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বাহিনী গ্রহণ করলো এক গোপন পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা ঠিক করলো প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বাঙালিদের আনুপাতিক হার কমাতে হবে। তারা তাদের এই গোপন পরিকল্পনা পুরোপুরিভাবে কার্যকরী করলো। কিন্তু এই গোপন তথ্য আমাদের কাছে গোপন ছিল না। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছিল আমাদের মনে। বাঙালি সৈনিকদের মনে। বিমানবাহিনীর বাঙালি জওয়ানদের মনে। আমরা তখনই বুঝেছিলাম, বিশ্বের যেকোনো বাহিনীর মোকাবিলাই আমরা সক্ষম। জানুয়ারি মাসে আমি নিযুক্ত হয়েছিলাম পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষকের পদে। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি একদিন শিক্ষক হলাম। মনে রইলো শুধু যুদ্ধের স্মৃতি। সামরিক একাডেমিতে শুরু হলো আমার শিক্ষক জীবন। পাকিস্তানিদের আমি সমরবিদ্যায় পারদর্শী করে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করলাম। আর সেই বর্বররা এই বিদ্যাকে কাজে লাগালো আমারই দেশের নিরস্ত্র জনতার বিরুদ্ধে এক পাশবিক যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়ে। সামরিক একাডেমিতে থাকাকালে আমি সম্মুখীন হয়েছি শুধু নিকৃষ্ট অভিজ্ঞতার। সেখানে দেখেছি বাঙালি ক্যাডেটদের প্রতি পাকিস্তানিদের একই অজ্ঞতার ঐতিহ্যবাহী প্রতিচ্ছবি। অবৈধ উপায়ে পাকিস্তানিদের দেখেছি বাঙালি ক্যাডেটদের কোণঠাসা করতে। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন যেমন, আমি যখন শিক্ষক হলাম তখনো তেমনিভাবেই বাঙালি ক্যাডেটদের ভাগ্যে জুটতো শুধু অবহেলা, অবজ্ঞা আর ঘৃণা। আন্তঃসার্ভিস নির্বাচনী বোর্ডে গ্রহণ করা হতো নিম্নমানের বাঙালি ছেলেদের, ভালো ছেলেদের নেওয়া হতো না ক্যাডেটরূপে। রাজনৈতিক মতাদর্শ আর দরিদ্র পরিবারের নামে প্রত্যাখ্যান করা হতো তাদের। এর সবকিছুই আমাকে ব্যথিত করতো। এই সামরিক একাডেমিতেই পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে আমার মন বিদ্রোহ করলো। একাডেমির গ্রন্থাগারে সংগৃহিত ছিল সব বিষয়ের ভালো ভালো বই। আমি জ্ঞানার্জনের এই সুযোগ গ্রহণ করলাম। আমি ব্যাপক পড়াশোনা করলাম ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ সম্পর্কে, বৃটিশ ঐতিহাসিকরা এটাকে আখ্যায়িত করেছিল বিদ্রোহ হিসেবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা বিদ্রোহ ছিল না, এটা ছিল এক মুক্তিযুদ্ধ। ভারতের জন্যে স্বাধীনতার যুদ্ধ।পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তথাকথিত সামরিক যুদ্ধজীবীদের সাথেও মাঝে মাঝে আমার আলোচনা হতো। তাদের পরিকল্পনা ছিল আরো কয়েক দশক কোটি কোটি জাগ্রত বাঙালিকে দাবিয়ে রাখার। কিন্তু আমি বিশ্বাস করলাম, বাংলাদেশের জনগণ আর ঘুমিয়ে নেই। তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারের পরিণতিই ছিল এর জ্বলন্ত প্রমাণ।  স্বাধীনতার জন্য আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে এটাও ছিল একটা সুস্পষ্ট অঙ্গুলি সংকেত। এই মামলার পরিণতি এক করে দিল বাঙালি সৈনিক, নাবিক ও বৈমানিকদের। বাংলাদেশের জনগণের সাথে একাত্ম হয়ে গেল তারা। তাদের উপর পাকিস্তান সরকারের চাপিয়ে দেওয়া সব বিধিনিষেধ ঝেড়ে ফেলা হলো। এক কণ্ঠে সোচ্চার হলো তারা মাতৃভূমির স্বাধীনতার দাবিতে। ইসলামাবাদের যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং অস্ত্র তুলে নেওয়ার মধ্যেই যে আমাদের দেশের, বাংলাদেশের কল্যাণ নিহিত তাতে আর কোনো সন্দেহই ছিল না আমাদের মনে। এটাও আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামের আরেক দিকদর্শন। এ সময় থেকেই এ ব্যাপারে আমরা মোটামুটিভাবে খোলাখুলি আলোচনাও শুরু করেছিলাম। ১৯৬৯ সালের এপ্রিল মাসে আমাকে নিয়োগ করা হলো জয়দেবপুরে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দ্বিতীয় ব্যাটেলিয়নে আমি ছিলাম সেখানে সেকেন্ড ইন কমান্ড। আমাদের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল আবদুল কাইয়ুম ছিল একজন পাকিস্তানি। একদিন ময়মনসিংহের এক ভোজসভায় ধমকের সুরে সে ঘোষণা করলো, বাংলাদেশের জনগণ যদি সদাচরণ না করে তাহলে সামরিক আইনের সত্যিকার ও নির্মম বিকাশ এখানে ঘটানো হবে। আর তাতে হবে প্রচুর রক্তপাত। এই ভোজসভায় কয়েকজন বেসামরিক ভদ্রলোকও উপস্থিত ছিলেন। তাদের মাঝে ছিলেন ময়মনসিংহের তদানীন্তন ডেপুটি কমিশনার জনাব মোকাম্মেল। লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাইয়ুমের এই দম্ভোক্তি আমাদের বিস্মিত করলো। এর আগে কাইয়ুম এক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিল। ইসলামাবাদে পাকিস্তানি নীতি নির্ধারকদের সাথে সংযোগ ছিল তার। তার মুখে তার পুরনো প্রভুদের মনের কথাই ভাষা পেয়েছে তাই আমি ভাবছিলাম। পরবর্তী সময়ে এ ব্যাপারে আমি তাকে অনেকগুলো প্রশ্ন করি। এবং তার কথা থেকে আমার কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সে যা বলেছে তা জেনেশুনেই বলেছে। উপযুক্ত সময়ে কার্যকরি করার জন্য সামরিক ব্যবস্থার এক পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। আর কাইয়ুম সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। আমি এতে আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ি। এই সময়ে আমি একদিন চতুর্দশ ডিভিশনের সদর দফতরে যাই। জিএসও-১ (গোয়েন্দা) লে. কর্নেল তাজ আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের কয়েকজন সম্পর্কে আমার কাছে অনেক কিছু জানতে চায়। আমি তার এসব তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য কি জিজ্ঞাসা করি। সে আমাকে জানায় যে, তারা বাঙালি নেতাদের জীবনী সংক্রান্ত তথ্যাদি সংগ্রহ করছে। আমি বারবার তাকে জিজ্ঞোস করি, এসব খুঁটিনাটির প্রয়োজন কি? এই প্রশ্নের জবাবে সে জানায়, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিধারায় এগুলো কাজে লাগবে। গতিক যে বেশি সুবিধার নয়, তার সাথে আলোচনা করেই আমি তা বুঝতে পারি। সেই বছরেরই সেপ্টেম্বর মাসে চার মাসের জন্য আমি পশ্চিম জার্মানী যাই। এই সময়ে বাংলাদেশের সর্বত্র এক রাজনৈতিক বিক্ষোভের ঝড় বয়ে যায়। পশ্চিম জার্মানীতে অবস্থানকালে আমি একদিন দেখি সামরিক অ্যাটাচি কর্নেল জুলফিকার সে সময়ের পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কারিগরি অ্যাটাচির সাথে কথা বলছিল। এই ব্যক্তিটি ছিল এক সরলমনা পাঠান অফিসার। তাদের সামনে ছিল করাচির দৈনিক পত্রিকা ডনের একটা সংখ্যা। এতে প্রকাশিত হয়েছিল ইয়াহিয়ার ঘোষণা, ১৯৭০ সালেই নির্বাচন হবে। সরলমনা পাঠান অফিসারটি বলছিল, নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ব্যাপকভাবে নির্বাচনে জয়ী হবে, আর সেখানেই হবে পাকিস্তানের সমাপ্তি। এর জবাবে কর্নেল জুলফিকার বললো, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারে। কিন্তু কেন্দ্রে সে ক্ষমতা পাবে না। কেননা, অন্যান্য দলগুলো মিলে কেন্দ্রে আওয়ামী লীগকে ছাড়িয়ে যাবে। আমি এটা জেনে বলছি। এ সম্পর্কে আমার কাছে বিশেষ খবর আছে। এরপর আমি বাংলাদেশে ফিরে এলাম। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে আমাকে নিয়োগ করা হলো চট্টগ্রামে। এবার ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটেলিয়নের সেকেন্ড ইন কমান্ড। এর কয়েকদিন পর আমাকে ঢাকা যেতে হয়। নির্বাচনের সময়টায় আমি ছিলাম ক্যান্টনমেন্টে। প্রথম থেকেই পাকিস্তানি অফিসাররা মনে করতো, চূড়ান্ত বিজয় তাদেরই হবে। কিন্তু নির্বাচনের দ্বিতীয় দিনেই তাদের মুখে আমি দেখলাম হতাশার সুস্পষ্ট ছাপ। ঢাকায় অবস্থানকারী পাকিস্তানি সিনিয়র অফিসারদের মুখে দেখলাম আমি আতংকের ছবি। তাদের এই আতংকের কারণও আমার অজানা ছিল না। শীঘ্রই জনগণ গণতন্ত্র ফিরে পাবে, এই আশায় আমরা বাঙালি অফিসাররা তখন আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলাম।চট্টগ্রামে আমরা ব্যস্ত ছিলাম অষ্টম ব্যাটেলিয়ানকে গড়ে তোলার কাজে। এটা ছিল রেজিমেন্টের তরুণতম ব্যাটেলিয়ন। এটার ঘাঁটি ছিল ষোলশহর বাজারে। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে এই ব্যাটেলিয়নকে পাকিস্তানের খারিয়ানে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এর জন্য আমাদের সেখানে পাঠাতে হয়েছিল দু’শ জওয়ানের এক অগ্রগামী দল। অন্যরা ছিল একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের সৈনিক। আমাদের তখন যে সব অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে ছিল তিনশ পুরনো ৩০৩ রাইফেল, চারটা এলএমজি ও দুটি তিন ইঞ্চি মর্টার। গোলাবারুদের পরিমাণও ছিল নগণ্য। আমাদের এন্টি ট্যাংক বা ভারী মেশিনগান ছিল না। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বাংলাদেশে যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিস্ফোরনোস্মুখ হয়ে উঠছিল, তখন আমি একদিন খবর পেলাম, তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের সৈনিকরা চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিহারীদের বাড়িতে বাস করতে শুরু করেছে। খবর নিয়ে আমি আরো জানলাম, কমান্ডোরা বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র আর গোলাবারুদ নিয়ে বিহারী বাড়িগুলোতে জমা করেছে এবং রাতের অন্ধকারে বিপুল সংখ্যায় তরুণ বিহারীদের সামরিক ট্রেনিং দিচ্ছে। এসব কিছু থেকে এরা যে ভয়ানক রকমের অশুভ একটা কিছু করবে তার সুস্পষ্ট আভাসই আমরা পেলাম। তারপর এলো ১লা মার্চ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদাত্ত আহ্বানে সারা দেশে শুরু হলো ব্যাপক অসহযোগ আন্দোলন। এর পরদিন দাঙ্গা হলো। বিহারীরা হামলা করেছিল এক শান্তিপূর্ণ মিছিলে, এর থেকেই ব্যাপক গোলযোগের সূচনা হলো। এই সময়ে আমার ব্যাটেলিয়নের এনসিওরা আমাকে জানালো প্রতিদিন সন্ধ্যায় বিংশতিতম বালুচ রেজিমেন্টের জওয়ানরা বেসামরিক পোশাক পরে, বেসামরিক ট্রাকে করে কোথায় যেন যায়। তারা ফিরে আসে আবার শেষ রাতের দিকে। আমি উৎসুক হলাম। লোক লাগালাম খবর নিতে। খবর নিয়ে জানলাম প্রতি রাতেই তারা যায় কতগুলো নির্দিষ্ট বাঙালি পাড়ায় নির্বিচারে হত্যা করে সেখানে বাঙালিদের। এই সময় প্রতিদিনই ছুরিকাহত বাঙালিকে হাসপাতলে ভর্তি হতেও শোনা যায়।এই সময়ে আমাদের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জানজুয়া আমার গতিবিধির উপর লক্ষ্য রাখার জন্যেও লোক লাগায়। মাঝে মাঝেই তার লোকেরা যেয়ে আমার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে শুরু করে। আমরা তখন আশংকা করছিলাম, আমাদের হয়ত নিরস্ত্র করা হবে। আমি আমার মনোভাব দমন করে কাজ করে যাই এবং তাদের উদ্যোগ ব্যর্থ করে দেয়ার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করি। বাঙালি হত্যা ও বাঙালি দোকানপাটে তাদের অগ্নিসংযোগের ঘটনা ক্রমেই বাড়তে থাকে।আমাদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করা হলে আমি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করবো কর্নেল (তখন মেজর) শওকতও আমার কাছে তা জানতে চান। ক্যাপ্টেন শমসের মবিন এবং মেজর খালেকুজ্জামান আমাকে জানান যে স্বাধীনতার জন্য আমি যদি অস্ত্র তুলে নেই তাহলে তারাও দেশের মুক্তির জন্য প্রাণ দিতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না, ক্যাপ্টেন ওলি আহমদ আমাদের মাঝে খবর আদান প্রদান করতেন। জেসিও এবং এনসিওরাও দলে দলে বিভক্ত হয়ে আমার কাছে বিভিন্ন স্থানে জমা হতে থাকলো। তারাও আমাকে জানায় যে কিছু একটা না করলে বাঙালি জাতি চিরদিনের জন্যে দাসে পরিণত হবে। আমি নীরবে তাদের কথা শুনতাম। কিন্তু আমি ঠিক করেছিলাম, উপযুক্ত সময় এলেই আমি মুখ খুলবো। সম্ভবত ৪ঠা মার্চে আমি ক্যাপ্টেন ওলি আহমদকে ডেকে নেই। আমাদের ছিল সেটা প্রথম বৈঠক। আমি তাকে সোজাসুজি বললাম, সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে। আমাদের সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। ক্যাপ্টেন আহমদও আমার সাথে একমত হন। আমরা পরিকল্পনা তৈরি করি এবং প্রতিদিনই আলোচনা বৈঠকে মিলিত হতে শুরু করি। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রিন সিগন্যাল বলে মনো হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্তরূপ দিলাম। কিন্তু তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে তা জানালাম না। বাঙালি ও পাকিস্তানি সৈনিকদের মাঝেও উত্তেজনা ক্রমেই চরমে উঠছিল।১৩ই মার্চ শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর সাথে ইয়াহিয়ার আলোচনা। আমরা সবাই ক্ষণিকের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আমরা আশা করলাম পাকিস্তানি নেতারা যুক্তি মানবে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাকিস্তানিদের সামরিক প্রস্তুতি হ্রাস না পেয়ে দিন দিনই বৃদ্ধি পেতে শুরু করলো। প্রতিদিনই পাকিস্তান থেকে সৈন্য আমদানি করা হলো। বিভিন্নস্থানে জমা হতে থাকলো অস্ত্রশস্ত্র আর গোলাবারুদ। সিনিয়র পাকিস্তানি সামরিক অফিসাররা সন্দেহজনকভাবে বিভিন্ন গ্যারিসনে আসা যাওয়া শুরু করলো। চট্টগ্রামে নৌ-বাহিনীরও শক্তি বৃদ্ধি করা হলো। ১৭ই মার্চ স্টেডিয়ামে ইবিআরসির লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম আর চৌধুরী, আমি, ক্যাপ্টেন অলি আহমদ ও মেজর আমিন চৌধুরী এক গোপন বৈঠকে মিলিত হলাম। এক চূড়ান্ত যুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করলাম। লে. কর্নেল চৌধুরীকে অনুরোধ করলাম নেতৃত্ব দিতে। দু’দিন পর ইপিআর-এর ক্যাপ্টেন (এখন মেজর) রফিক আমার বাসায় গেলেন এবং ইপিআর বাহিনীকে সঙ্গে নেয়ার প্রস্তাব দিলেন। আমরা ইপিআর বাহিনীকে আমাদের পরিকল্পনাভুক্ত করলাম। এরমধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীও সামরিক তৎপরতা শুরু করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করলো। ২১ শে মার্চ জেনারেল আবদুল হামিদ খান গেল চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে। চট্টগ্রামে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের চূড়ান্ত পরিকল্পনা প্রণয়নই তার এই সফরের উদ্দেশ্য। সেদিন ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের ভোজসভায় জেনারেল হামিদ ২০তম বালুচ রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফাতমীকে বললো, ফাতমী, সংক্ষেপে, ক্ষিপ্রগতিতে আর যত কম সম্ভব লোক ক্ষয় করে কাজ সারতে হবে। আমি এই কথাগুলো শুনেছিলাম। ২৪ শে মার্চ ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ঢাকা চলে এলেন। সন্ধ্যায় পাকিস্তানী বাহিনী শক্তি প্রয়োগে চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার পথ করে নিল। জাহাজ সোয়াত থেকে অস্ত্র নামানোর জন্যেই বন্দরের দিকে ছিল তাদের এই অভিযান। পথে জনতার সাথে ঘটলো তাদের কয়েকদফা সংঘর্ষ। এতে নিহত হলো বিপুলসংখ্যক বাঙালি। সশস্ত্র সংগ্রাম যেকোনো মুহূর্তে শুরু হতে পারে, এ আমরা ধরেই নিয়েছিলাম। মানসিক দিক দিয়ে আমরা ছিলাম প্রস্তুত। পরদিন আমরা পথের ব্যারিকেড অপসারণের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তারপর এলো সেই কালো রাত। ২৫ ও ২৬ মার্চের মধ্যবর্তী কালো রাত। রাত ১টায় আমার কমান্ডিং অফিসার আমাকে নির্দেশ দিলো নৌবাহিনীর ট্রাকে করে চট্টগ্রাম বন্দরে যেয়ে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করতে। আমার সাথে নৌবাহিনীর (পাকিস্তানি) প্রহরী থাকবে তাও জানানো হলো। আমি ইচ্ছা করলে আমার সাথে তিনজন লোক নিয়ে যেতে পারি। তবে আমার সাথে আমারই ব্যাটেলিয়নের একজন পাকস্তানি অফিসারও থাকবে। অবশ্য কমান্ডিং অফিসারের মতে সে যাবে আমাকে গার্ড দিতেই। এ আদেশ পালন করা আমার পক্ষে ছিল অসম্ভব। আমি বন্দরে যাচ্ছি কিনা তা দেখার জন্য একজন লোক ছিল। আর বন্দরে শিকারীর মতো প্রতীক্ষায় ছিল জেনারেল আনসারী। হয়তোবা আমাকে চিরকালের মতোই স্বাগত জানাতে।আমরা বন্দরের পথে বেরোলাম। আগ্রাবাদে আমাদের থামতে হলো। পথে ছিল ব্যারিকেড। এই সময়ে সেখানে এলো মেজর খালেকুজ্জামান চৌধুরী। ক্যাপ্টেন ওলি আহমদের কাছ থেকে এ বার্তা এসেছে। আমি রাস্তায় হাঁটছিলাম। খালেক আমাকে একটু দূরে নিয়ে গেল। কানে কানে বলল, ‘তারা ক্যান্টনমেন্ট ও শহরে সামরিক তৎপরতা শুরু করেছে। বহু বাঙাললিকে ওরা হত্যা করেছে।’এটা ছিল একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত সময়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমি বললাম, আমরা বিদ্রোহ করলাম। তুমি ষোলশহর বাজারে যাও। পাকিস্তানি অফিসারদের গ্রেপ্তার করো। অলি আহমদকে বলো ব্যাটেলিয়ন তৈরি রাখতে, আমি আসছি। আমি নৌবাহিনীর ট্রাকের কাছে ফিরে গেলাম। পাকিস্তানি অফিসার, নৌবাহিনীর চিফ পেটি অফিসার ও ড্রাইভারকে জানালাম যে, আমাদের আর বন্দরে যাওয়ার দরকার নেই। এতে তাদের মনে কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না দেখে আমি পাঞ্জাবী ড্রাইভারকে ট্রাক ঘুরাতে বললাম। ভাগ্য ভালো, সে আমার আদেশ মানলো। আমরা আবার ফিরে চললাম। ষোলশহর বাজারে পৌঁছেই আমি গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে একটা রাইফেল তুলে নিলাম। পাকিস্তানি অফিসারটির দিকে তাক করে বললাম, হাত তোল। আমি তোমাকে গ্রেপ্তার করলাম। নৌবাহিনীর লোকেরা এতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লো। এক মুহূর্তের মধ্যেই আমি নৌবাহিনীর অফিসারের দিকে রাইফেল তাক করলাম। তারা ছিল আটজন। সবাই আমার নির্দেশ মানলো এবং অস্ত্র ফেলে দিল। আমি কমান্ডিং অফিসারের জিপ নিয়ে তার বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। তার বাসায় পৌঁছে হাত রাখলাম কলিংবেলে। কমান্ডিং অফিসার পাজামা পরেই বেরিয়ে এলো। খুলে দিল দরজা। ক্ষিপ্রগতিতে আমি ঘরে ঢুকে পড়লাম এবং গলাশুদ্ধ তার কলার টেনে ধরলাম। দ্রুতগতিতে আবার দরজা খুলে কর্নেলকে আমি বাইরে টেনে আনলাম। বললাম, বন্দরে পাঠিয়ে আমাকে মারতে চেয়েছিলে? এই আমি তোমাকে গ্রেপ্তার করলাম। এখন লক্ষ্মীসোনার মতো আমার সঙ্গে এসো। সে আমার কথা মানলো। আমি তাকে ব্যাটেলিয়নে নিয়ে এলাম। অফিসারদের মেসে যাওয়ার পথে আমি কর্নেল শওকতকে (তখন মেজর) ডাকলাম। তাকে জানালাম, আমরা বিদ্রোহ করেছি। শওকত আমার হাতে হাত মিলালো।ব্যাটেলিয়নে ফিরে দেখলাম, সমস্ত পাকিস্তানি অফিসারকে বন্দী করে একটা ঘরে রাখা হয়েছে। আমি অফিসে গেলাম। চেষ্টা করলাম লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম আর চৌধুরীর সাথে আর মেজর রফিকের সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু পারলাম না। সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। তারপর রিং করলাম বেসামরিক বিভাগের টেলিফোন অপারেটরকে। তাকে অনুরোধ জানালাম, ডেপুটি কমিশনার, পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট, কমিশনার, ডিআইজি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের জানাতে যে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্টম ব্যাটেলিয়ন বিদ্রোহ করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করবে তারা। এদের সবার সাথেই আমি টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কাউকেই পাইনি। তাই টেলিফোন অপারেটরের মাধ্যমেই আমি তাদের খবর দিতে চেয়েছিলাম। অপারেটর সানন্দে আমার অনুরোধ রক্ষা করতে রাজি হলো।সময় ছিল অতি মূল্যবান। আমি ব্যাটেলিয়নের অফিসার, জেসিও, আর জওয়ানদের ডাকলাম। তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলাম। তারা সবই জানতো। আমি সংক্ষেপে সব বললাম এবং তাদের নির্দেশ দিলাম সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। তারা সর্বসম্মতিক্রমে হৃষ্টচিত্তে এ আদেশ মেনে নিলো। আমি তাদের একটা সামরিক পরিকল্পনা দিলাম। তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬ শে মার্চ। ১৯৭১ সাল। রক্ত অক্ষরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে এই দিনটিকে। স্মরণ রাখতে ভালোবাসবে। এই দিনটিকে তারা কোনোদিন ভুলবে না। কো-নো-দি-ন না।”
৩ ঘন্টা আগে

সিঙ্গাপুরে পৌঁছেছেন হামজা-শামিতরা

সিঙ্গাপুরে পৌঁছেছেন হামজা-শামিতরা

তেল সংকটে দরিদ্র দেশগুলোর দুর্দশা, জাতিসংঘ মহাসচিবকে জানালেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

তেল সংকটে দরিদ্র দেশগুলোর দুর্দশা, জাতিসংঘ মহাসচিবকে জানালেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধ গবেষকদের জন্য দলিল: প্রধানমন্ত্রী

‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধ গবেষকদের জন্য দলিল: প্রধানমন্ত্রী

নিউজিল্যান্ড সিরিজে তারুণ্যের চমক: ফিটনেস ক্যাম্পে ঘাম ঝরাচ্ছেন ক্রিকেটাররা

নিউজিল্যান্ড সিরিজে তারুণ্যের চমক: ফিটনেস ক্যাম্পে ঘাম ঝরাচ্ছেন ক্রিকেটাররা

৫৫ বছর পর আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেই অপশক্তি

৫৫ বছর পর আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেই অপশক্তি

ক্যারিয়ারের শুরুতে আপত্তিকর প্রস্তাবের শিকার রণবীর সিং!

ক্যারিয়ারের শুরুতে আপত্তিকর প্রস্তাবের শিকার রণবীর সিং!

“একটি জাতির জন্ম” নিবন্ধে কী লিখেছিলেন জিয়াউর রহমান

“একটি জাতির জন্ম” নিবন্ধে কী লিখেছিলেন জিয়াউর রহমান

 রেলক্রসিংয়ে বাসের তেল শেষ, টাঙ্গাইলে ট্রেনের ধাক্কায় নারী-শিশুসহ নিহত ৫

রেলক্রসিংয়ে বাসের তেল শেষ, টাঙ্গাইলে ট্রেনের ধাক্কায় নারী-শিশুসহ নিহত ৫

নারী মাদক কারবারির রান্নাঘরে লুকানো ছিল গাঁজার ভাণ্ডার

নারী মাদক কারবারির রান্নাঘরে লুকানো ছিল গাঁজার ভাণ্ডার

এক মঞ্চে ১৭৫ শিল্পীর ‘শতধ্বনিতে স্বাধীনতার ঝংকার’

এক মঞ্চে ১৭৫ শিল্পীর ‘শতধ্বনিতে স্বাধীনতার ঝংকার’

মতামতমতামত

স্বাধীনতা দিবস: সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি ও গণমানুষের বঞ্চনা

২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং জাতীয় জীবনে একটি গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্যবাহী মুহূর্ত। দিনটি আমাদের জন্য একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং একটি চলমান, কিন্তু এখনো অসমাপ্ত জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রগঠনের প্রকল্পের মূর্তপ্রতীক। ১৯৭১ সালের এ দিনে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে রক্তাক্ত সংগ্রামের পথ ধরে আমরা অর্জন করি বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয়ের মাধ্যমে আমাদেরকে দু’বার স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছিল। আমাদের এ অর্জন ছিল উপনিবেশিক এবং উপনিবেশ-উত্তর শাসনব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক মুক্তির ঘোষণা। সেই ঘোষণার মধ্যে নিহিত ছিল একটি ন্যায্য, সমতাভিত্তিক এবং মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে প্রশ্নটি আজ আরও তীক্ষ্ণ, আরও অনিবার্য হয়ে ওঠে, সেটি হলো, এই রাষ্ট্র কি সত্যিই জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, নাকি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কেবল শাসকের হাতবদল ঘটেছে, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র অপরিবর্তিত থেকেছে, আর প্রান্তিক মানুষ রয়ে গেছে একই বাস্তবতায় আবদ্ধ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের ধারণাকে কেবল আবেগের আলোকে নয়, বরং তাত্ত্বিক ও দার্শনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা জরুরি।ইংরেজ চিন্তক টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) তার ‘লেভিয়াথান’-এ রাষ্ট্রকে একটি সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যার প্রধান দায়িত্ব হলো বিশৃঙ্খলা রোধ করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। তার দৃষ্টিতে, মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা ছিল সংঘাতপূর্ণ; তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব অপরিহার্য। কিন্তু এই ধারণা পরবর্তীকালে অপর ইংরেজ চিন্তক জন লক (১৬৩২-১৭০৪) সংশোধন করেন। লক যুক্তি দেন যে রাষ্ট্রের বৈধতা কোনো পরম ক্ষমতায় নয়, বরং জনগণের সম্মতি ও তাদের প্রাকৃতিক অধিকার তথা জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র যদি এই মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের সেই রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, সুইস চিন্তক জাঁ-জাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮) ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল)-র ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, প্রকৃত সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে নয়; এটি নিহিত থাকে জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা ও অভিন্ন স্বার্থে। রাষ্ট্র তখনই বৈধ ও কার্যকর হয়ে ওঠে, যখন তা এই সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে স্পষ্ট হয় যে, যদি রাষ্ট্র জনগণের প্রত্যাশা, প্রয়োজন ও অধিকারকে প্রতিফলিত না করে, তবে তা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে, অর্থাৎ নামমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান থাকে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সার্বভৌম হয় না।বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে এক গভীর ও স্পষ্ট বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মালিকানা গণমানুষের হাতে ন্যস্ত হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের ভিন্ন এক চিত্র দেখায় যেখানে ক্ষমতা ধীরে ধীরে একটি সীমিত, কেন্দ্রাভিমুখী গোষ্ঠীর ভেতরে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া এবং সম্পদ বণ্টনের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণ প্রায়ই প্রতীকী স্তরে সীমাবদ্ধ থেকেছে। কার্যত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রটি থেকে তারা বহুলাংশে বিচ্ছিন্ন। এই প্রেক্ষাপটে ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘হেজিমনি’ (আধিপত্য)-র ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি দেখিয়েছেন, শাসকশ্রেণী কেবল বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রীয় দমননীতির মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে না; বরং তারা সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এমন এক সম্মতিনির্ভর বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে তাদের আধিপত্য স্বাভাবিক, এমনকি অপরিহার্য বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আধিপত্য কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষা, গণমাধ্যম, প্রশাসন এবং সামাজিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়েও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ফলে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে যে, তা অনেকের কাছেই প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়।এখানে ফরাসী ঐতিহাসিক ও চিন্তক মিশেল ফুকোর (১৯২৬-১৯৮৪) ‘ক্ষমতা তত্ত্ব’ (পাওয়ার থিওরি) এই আলোচনাকে আরও গভীরতা প্রদান করে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ক্ষমতা কোনো একক কেন্দ্র বা শীর্ষস্তরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহুমাত্রিক, বিস্তৃত এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে থাকে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনব্যবস্থা, এমনকি ভাষা ও দৈনন্দিন চর্চার মধ্য দিয়েও ক্ষমতা নিজেকে ক্রমাগত পুনরুৎপাদন করে। ফলে ক্ষমতার দৃশ্যমান রূপ, যেমন সরকার বা নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও, অদৃশ্য কাঠামোগত সম্পর্কগুলো অপরিবর্তিত থেকে যেতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতিতে একটি লক্ষণীয় ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এই ধারাবাহিকতা আমাদের সামনে একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের ব্যর্থতা নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক জটিলতা, যেখানে ক্ষমতার বিন্যাস এমনভাবে স্থায়ী রূপ পেয়েছে যে, তা সহজে পরিবর্তিত হয় না। ফলে স্বাধীনতার পর যে রাষ্ট্র জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন হওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে এক সীমাবদ্ধ ক্ষমতার পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে জনগণের মাঝে পরিবর্তনের প্রত্যাশা বারবার জাগ্রত হলেও, কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে তা পূর্ণতা পায় না।ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলার শাসকগোষ্ঠীর গণবিচ্ছিন্নতা কেবল সাম্প্রতিক কোনো বাস্তবতা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ার ফল, যা বর্তমান সংকটকে আরও গভীর ও জটিল করে তুলেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে যে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা মূলত একটি ‘শোষণমূলক রাষ্ট্র’ যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশ থেকে সম্পদ আহরণ এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতার স্বার্থ সংরক্ষণ। এই কাঠামোয় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য, আর প্রশাসন ছিল জনগণের সেবক নয়, বরং শাসকের হাতিয়ার। পাকিস্তান আমলেও এই একই ধারা বহুলাংশে অব্যাহত থাকে, যেখানে পূর্ব বাংলার জনগণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় থেকে যায়। স্বাধীনতার মাধ্যমে সেই শোষণমূলক কাঠামো ভেঙে দিয়ে জনগণের মনে একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল এক গভীর ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই প্রত্যাশার কেন্দ্রে ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হবে এবং উন্নয়ন ও সম্পদের সুফল দেশের সব মানুষের মাঝে সমভাবে বণ্টিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের দেখিয়েছে ভিন্ন এক চিত্র। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বহু ক্ষেত্রে সেই পুরনো শোষণমূলক প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদ একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত থেকে গেছে, আর সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত অধিকার ও সুযোগ থেকে সবসময়ই বঞ্চিতই রয়ে গেছে।বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক দুর্বলতা হলো দলীয় ও পরিবারতান্ত্রিক বৃত্তবদ্ধতা, যা সর্বস্তরের মানুষের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে প্রকৃত অর্থে সীমিত করে ফেলে। এ প্রসঙ্গে জার্মান বংশোদ্ভুত সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট মিখেলসের (১৮৭৬-১৯৩৬) ‘অলিগার্কের লৌহ আইন’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, যে কোনো সংগঠন, তা যতই গণতান্ত্রিক আদর্শে প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ক্ষমতাবান এই গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান সংরক্ষণে এমন সব কলাকৌশল অবলম্বন করে, যা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ক্রমশ সংকুচিত করে ফেলে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এই তত্ত্বের এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এখানে দলীয় কাঠামোর ভেতরেই এমন এক অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ গড়ে উঠেছে, যেখানে নেতৃত্বের পরিবর্তন বা বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ অত্যন্ত সীমিত, এমনকি প্রায় অসম্ভব। পরিবারতান্ত্রিক প্রভাব, আনুগত্যভিত্তিক রাজনীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন- এসব উপাদান মিলিয়ে একটি সংকীর্ণ বৃত্ত তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রবাহকে সাধারণ জনগণের দিকে না নিয়ে সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই আবদ্ধ রাখে। ফলে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও, তার কার্যকারিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট কেবল সাময়িক বা ব্যক্তিনির্ভর নয়; এটি গভীরভাবে প্রোথিত একটি ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা, যেখানে শোষণমূলক কাঠামো এবং অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ একে অন্যকে শক্তিশালী করে চলেছে। এর ফলে স্বাধীনতার মৌলিক প্রতিশ্রুতি তথা জনগণের ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্রের সর্বত্র সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা আজও পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি।সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে এই দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে তা কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘটনারূপে নয়, বরং গণমানুষের সঞ্চিত বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং প্রত্যাশার এক প্রতীকী বিস্ফোরণ হিসেবে প্রতিভাত হয়। এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপেক্ষিত মানুষরা নিজেদের অস্তিত্ব, অধিকার এবং অংশগ্রহণের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এই অর্থে, ঘটনাটিকে জাঁ-জাক রুশোর ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল) অর্থাৎ জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য দাবির এক ধরনের পুনরুত্থান হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার পুনরায় উচ্চারিত হয়েছে। তবে এই জাগরণ, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তা রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রত্যাশিত প্রতিফলন পায়নি। অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে অনীহা, বিলম্ব এবং নানা কৌশলগত তালবাহানার আশ্রয় নেয়া ইঙ্গিত দেয় যে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকে ভেঙে তা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অনিচ্ছুক, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধী। রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও পারস্পরিক প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে যে পরিবর্তনের দাবি যতই জোরালো হোক না কেন, ক্ষমতার বর্তমান বিন্যাস তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত নয়।এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ‘পথের উপর নির্ভরতা’ (পাথ ডিপেন্ডেন্সি) তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, অতীতের প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার বিন্যাস এমন এক ধারাবাহিকতা তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথগুলোকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। ফলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলেও তা সহজে বাস্তবায়িত হয় না, কারণ বিদ্যমান কাঠামো নিজেকে টিকিয়ে রাখতে নানা কলাকৌশলের প্রয়োগ ও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোতেই নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণ, নীতিনির্ধারণের ধরণ এবং ক্ষমতার চর্চার মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি হয় অর্থাৎ ব্যক্তি, পরিবার বা দল পরিবর্তিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের শাসনের ধরন অপরিবর্তিত থেকে যায়। গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক রূপ বিদ্যমান থাকলেও, তার ভেতরকার চর্চা ও কার্যকারিতা ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে অনেকাংশে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা যায়, যেখানে গণতন্ত্রের ভাষ্য বজায় রেখেই এক ধরনের কাঠামোগত স্বৈরতন্ত্র পুনরুৎপাদিত হয় যা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেয় মুক্তির, কিন্তু বাস্তবে তাদের আবদ্ধ করে রাখে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক, পরিত্রাণহীন নিয়তির মধ্যে।এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন একটি মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন যা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর আংশিক পরিবর্তনের প্রয়াসে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, রাজনৈতিক দর্শন এবং ক্ষমতার বিন্যাসের একটি সামগ্রিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করবে। এখানে প্রশ্নটি কেবল কে শাসন করবে, তা নয়; বরং কিভাবে শাসন পরিচালিত হবে এবং সেই শাসনের উদ্দেশ্য কী হবে- এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর পুনর্বিবেচনা অপরিহার্য। মার্কিন চিন্তক জন রলস (১৯২১-২০০২) তার ‘ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায় বিচার’ (জাস্টিস এজ ফেয়ারনেস) তত্ত্বে যে ধারণা তুলে ধরেছেন, তা এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তার মতে, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গঠিত হওয়া উচিত, যাতে তা সর্বপ্রথম এবং সর্বাধিকভাবে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে। অর্থাৎ উন্নয়ন, নীতি এবং সম্পদ বণ্টনের মানদণ্ড নির্ধারিত হবে ক্ষমতাবানদের সুবিধা নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে। এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অপরিহার্য হয়ে ওঠে। একটি সক্রিয়, সচেতন এবং সংগঠিত নাগরিক সমাজই পারে রাষ্ট্রের ওপর কার্যকর জবাবদিহিতা আরোপ করতে, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে জনমত গড়ে তুলতে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলন- এই সবগুলো ক্ষেত্র সম্মিলিতভাবে একটি সমালোচনামূলক নাগরিক চেতনা নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে, যা রাষ্ট্রকে তার প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধ রাখতে সক্ষম হবে।এই প্রেক্ষাপটে আমাদের স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য নতুন করে অনুধাবন করা প্রয়োজন। এটি কেবল জাতির জন্য অতীতের গৌরবময় অর্জন স্মরণের দিন নয়; বরং একটি অসমাপ্ত সংগ্রামের পুনঃঘোষণা, একটি নৈতিক দায়বদ্ধতার নবায়ণ। স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধানের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হবে যেখানে মানুষ নিজেকে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হিসেবে অনুভব করবে, এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাইরের প্রভাব ও আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকবে। অতএব, স্বাধীনতা দিবসে গণমানুষের ভাগ্যের প্রকৃত পরিবর্তনই হোক আমাদের স্বাধীনতার মূল অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সর্বোপরি একটি জাগ্রত, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক নাগরিক সমাজ। অন্যথায় স্বাধীনতা একটি প্রতীকী অর্জন হিসেবেই থেকে যাবে, কিন্তু তার বাস্তব রূপ চিরকালই আমাদের নাগালের বাইরে রয়ে যাবে। তাই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক- স্বাধীনতাকে কেবল অতীতের একটি সাফল্য হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান, ক্রমবিকাশমান প্রকল্প হিসেবে দেখা; এবং সেই প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে গণমানুষের মুক্তি, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ

স্বাধীনতা যেকোনো জাতির জীবনে শ্রেষ্ঠ অর্জন। ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই স্বাধীনতা লাভ করতে বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছে। সব জাতির স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ প্রয়োজন হয়নি। বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ করেছে— নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম, যেখানে ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে। দুই লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছে এবং কোটি কোটি মানুষ অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছে। তারপর এই স্বাধীনতা লাভ করেছে।সুতরাং, বাঙালির এই স্বাধীনতা বিষয়টি অন্য দেশের স্বাধীনতা লাভের চাইতে অবশ্যই একটু আলাদা। পৃথিবীর অনেক জাতি সংগ্রাম করে স্বাধীনতা লাভ করেছে। আবার অনেক দেশ শুধু অধ্যাদেশের বা ঘোষণার মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে। কোনো কোনো দেশ ঔপনিবেশিক বা অন্যান্য রাজকীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে— রাজতান্ত্রিক বা শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে।ভারত বিভাগ, অর্থাৎ ব্রিটিশদের কাছ থেকে যে ভারত বিভাজিত হয়, সেটিও ঠিক আক্ষরিক অর্থে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে হয়নি। বাঙালি জাতিকে ৪৭-এর বিভাজনের পরে খুব সঙ্গতভাবেই এদেশের মানুষ উপলব্ধি করেছে যে তারা প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করেনি। এই স্বাধীনতা লাভ না করার পেছনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য তো ছিলই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জাতিগত সংকট বা জাতীয়তাবাদের চেতনার সংকট।বাঙালি জাতির এই ভূমি থেকে উৎসারিত যে চেতনা, যে মনন, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, জীবনাচার দিয়ে তৈরি হয়েছে— সেটি দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বিভাজিত পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিকভাবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে মানুষ অনুশীলন করতে পারেনি, চর্চা করতে পারেনি। স্বাভাবিকভাবে বাঙালির যে জাতীয়তাবাদী পরিচয়, সেই পরিচয় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেনি পাকিস্তানে।এই অনানুষ্ঠানিক বাঙালিয়ানার শক্তিকে পাকিস্তানিরা ভয় পেত এবং হিংসা করত। তারা বাঙালিকে শুধু চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার করেনি, শুধু অর্থনৈতিকভাবে বৈষম্যের শিকার করেনি, শিক্ষার ক্ষেত্রেও বৈষম্য করেছে। তার সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে— তার গান, নৃত্য বা ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে শত শত বছর ধরে চলে আসা বাঙালির উৎসব ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড— সেগুলোকেও তারা অপছন্দ করত। এমনকি তারা এর চর্চাকে ভয় পেত।কারণ তারা মনে করত, বাঙালি যদি তার নিজস্ব পরিচয়ে সমৃদ্ধ হয়, তাহলে একদিন তারা যে বৈষম্যমূলক শাসন, শোষণ ও নিপীড়ন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানবাসীর ওপর পরিচালনা করছিল, সেটি বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তারা বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে সবসময় ভয় করত, হিংসা করত এবং এ ধরনের সামাজিক ও জাতীয় কর্মকাণ্ডকে শুধু নিরুৎসাহিতই নয়, কখনও কখনও বাধাগ্রস্তও করত।রবীন্দ্রসংগীত চর্চার ক্ষেত্রে তারা অনেক বিধিনিষেধ তৈরি করেছিল। ঠিক তেমনই নাট্যকলা চর্চার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ ছিল। নজরুলের অনেক কবিতা, প্রবন্ধ ভজন, কীর্তনসহ অনেক কালজয়ী সংগীতকেও এদেশে অলিখিতভাবে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হতো। বাংলা ভাষাকেও তারা ভয় পেত। সে কারণেই ভাষার দাবিতে বাঙালিকে আন্দোলন করতে হয়। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের কথা এই জাতি সবসময় শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ রাখে।তাই বাঙালি যে মুক্তিযুদ্ধ করেছে— সেটি শুধু মানচিত্র পরিবর্তন বা শুধু একটি পতাকা পরিবর্তনের জন্য নয়। শুধু কোনো বিশেষ উর্দুভাষী ব্যক্তির পরিবর্তে বাঙালি নামের কোনো মানুষের দ্বারা শাসিত হওয়ার জন্যও নয়। আসলে আকাঙ্ক্ষা ছিল আমাদের নিজস্ব মাটির ওপর দাঁড়িয়ে, নিজস্ব সংস্কৃতির চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বাঙালির সম্ভাবনাকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করা।বাঙালির অনেক সমৃদ্ধ শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য ছিল এবং তার বিচ্ছিন্ন অবয়ব এখনও বিরজমান। সেগুলোকে ধারণ করে, চর্চা করে এবং আমাদের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও মানবসম্পদ ব্যবহার করে এবং দীর্ঘদিন বিজাতীয়দের দ্বারা শাসিত ও শোষিত বাঙালির ব্যর্থতা ও সম্ভাবনার দ্বান্দ্বিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা তুলে দাঁড়ানোর যে আকাঙ্ক্ষা, যা কোনো একক ব্যক্তির ছিল না, কোনো একক দলেরও ছিল না। এটি ছিল গোটা বাংলার ভূখণ্ডের সব মানুষের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সেই চেতনার সমৃদ্ধ জাতি নির্মাণের।এখানে বাংলা ভাষাভাষী তো বটেই, যারা অন্য ভাষাভাষী নৃগোষ্ঠী , তারাও একটি উদার রাষ্ট্রনীতি চাইতেন— যেখানে সব ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমান সুযোগ ভোগ করে রাষ্ট্রীয় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করবে। সেটি ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা।এটি কোনো লিখিত দলিলের প্রয়োজন ছিল না। এটি ছিল গোটা বাংলাদেশের এই ভূখণ্ডের মানুষের একটি অলিখিত ঐকমত্য (কনসেনসাস)— সমস্ত বাঙালির একটি স্বাভাবিক জনমত। সেই আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে বাঙালি নয় মাসের মরণপণ যে যুদ্ধ করেছিল, সেটিই হলো মুক্তিযুদ্ধ।সেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা লাভ করা— এটি আসলে শুধু কোনো অধ্যাদেশের মাধ্যমে কোনো নতুন রাষ্ট্রের স্বাধীন পরিচয় লাভ করা নয়। এটি বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের হৃদয়ে লালিত স্বপ্নে ভরা এক বিশাল শক্তিমত্তায় ঋদ্ধ আকাঙ্ক্ষা।সে আকাঙ্ক্ষা হলো— বাঙালি পৃথিবীর কোনো জাতির চাইতে ছোট নয়। সুতরাং আমাদের স্বাধীনতা শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তনের স্বাধীনতা নয়। এ স্বাধীনতা বাঙালির হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা, এটি বাঙালির চিরায়ত জাতীয়তাবাদী চেতনার আকাঙ্ক্ষা, মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে পরিচিত লাভের আকাঙ্ক্ষা।এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা, কোনো গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতা বা কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক সংকীর্ণতা এই আকাঙ্ক্ষাকে দমন করতে পারে না, খণ্ডিত করতে পারে না। বরং এটি হলো তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি মানুষের এই ভূখণ্ডের মানুষের আকাঙ্ক্ষা, আজকের দিনের আঠারো কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা।কাজেই আজকে যে স্বাধীনতা দিবস— এই স্বাধীনতা দিবস বাঙালির ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের যে আকাঙ্ক্ষা, সে আকাঙ্ক্ষার ফসল। প্রকৃত স্বাধীন, মুক্ত, উদার বাঙালি জাতীয়তাবাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা— সে আকাঙ্ক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় আজকের স্বাধীনতা দিবস।এই স্বাধীনতা দিবসকে কোনো সংকীর্ণ দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। এটি আঠারো কোটি বাঙালির সম্পদ। এই স্বাধীনতার আস্বাদন প্রতিটি বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে— এটি হলো আজকের দিনের অঙ্গীকার।বাঙালি অতীতে কখনই কোনো সংকীর্ণ স্বার্থের কাছে বা কোনো দাম্ভিক শক্তির কাছে হার মানেনি এবং ভবিষ্যতেও কখনও হার মানবে না। বাঙালি উদার বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ করবে— সেটিই আজকের দিনের স্বাধীনতা দিবসের আমাদের সবার আকাঙ্ক্ষা।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক : সাবেক প্রোভাইস চ্যান্সেলর, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়]

ফোরকান আপা

এখন মার্চ মাস। তাকে স্মরণ করছি। মার্চ মুক্তিযুদ্ধের মাস, স্বাধীনতার মাস, বাঙালির আত্মত্যাগে মহিমান্বিত মাস। তিনি একজন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের বীরনারী সংগঠক ছিলেন। তিনি ছিলেন ’৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের এক অকুতোভয় সাহসী ছাত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক প্রায় সব আন্দোলন সংগ্রামের নারী নেতৃত্বে যিনি ছিলেন এক অগ্রগামী সৈনিক। রূপগঞ্জে নিজের গ্রামে গড়ে তুলেছিলেন মুক্তি বাহিনী। একপর্যায়ে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেন এবং সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে সংগঠিত মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান ছিল অনন্য ও অপরিসীম।তাকে আমরা ফোরকান আপা বলে ডাকতাম। প্রথম দিকে বুঝতে পারতাম না তাকে। আজিমপুর সরকারি কলোনির অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে লেডিস ক্লাবের কাছের কোয়ার্টারে বাস করতেন। তার ঘরসংসার ছিল না বা হয়ে ওঠেনি। আজীবন সমাজসেবামূলক কাজে জড়িত ছিলেন। কেউ কেউ বলতেন তিনি বীরাঙ্গনা বা অন্যকিছু ছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকারি চাকরি পেয়েছিলেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে। তবে প্রায় সারাজীবনই সচিবালয়ে কাটিয়ে গেছেন। ১৯৭৩ সালের মুক্তিযোদ্ধা ব্যাচের সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছিল সুসম্পর্ক। আমার মতো অনেকেই জানতেন না তার চাকরি কী এবং কোথায়? কিন্তু প্রতিদিন অফিস সময়ে তিনি সবার সঙ্গে বের হয়ে সচিবালয়ে যেতেন।মুখের ওপর হাসি লেগেই থাকত। শ্যামলা চেহারার বিদুষী নারী বলতে যা বোঝায়। তিনি তা-ই ছিলেন। তাকে কখনও মন খারাপ অবস্থায় দেখেছি বলে মনে পড়ে না। আজিমপুরে তিনি আমার স্ত্রীকেও চিনতেন। আজও দিব্যি চোখে ভাসছে আমি বাসা থেকে বের হয়ে গাড়িতে বাংলাদেশ সচিবালয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি ফোরকান আপা দাঁড়িয়ে, ‘এই মান্নান, আমাকে নিয়ে যান।’ বলতাম, ‘উঠুন আপা’। তিনি সচিবালয়ে নেমে যাচ্ছেন কিন্তু কোন মন্ত্রণালয়ে তার চাকরি— তা কখনও জিজ্ঞেস করিনি। এটুকুই জানতাম তিনি নন-ক্যাডার কোনো পদে কাজ করেন। কিন্তু তাকে সবাই সমীহ করে কথা বলতেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার অবদানের কথা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অনেকেই জানতেন। সচিবালয়ে কর্মচারীদের যেকোনো দাবিদাওয়া বিষয়ক সভা সমিতিতে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত হয়েই অংশ নিতেন।এক অসাধারণ অদ্ভুত চরিত্রের নারী ছিলেন ফোরকান আপা। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে জাসদের প্রবীণ নেতা ও ডাকসুর তৎকালীন ভিপি আ স ম আবদুর রবের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, স্বাধীনতার প্রস্তুতি পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কয়েকজন ছাত্রী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন ফোরকান বেগম তাদের অন্যতম। যিনি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক তার বিষয়ে ব্যাপক তল্লাশি শুরু হলে ফোরকান বেগম ভারতে আশ্রয় নিয়ে লেম্বুছড়া ক্যাম্পে থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন। দেশে প্রবেশ করে যুদ্ধের পাশাপাশি তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেয়ারও ব্যবস্থা করেন।বলাবাহুল্য, ১৯৬৯ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের আন্দোলন, মিছিল, মিটিং ইত্যাদির যেকোনো সাদা-কালো ফুটেজে মনোযোগ দিয়ে তাকালেই পাওয়া যায় সেই দুঃসাহসিক নারী রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফোরকান বেগম সেখানে আছেন। সে সময়ের ধূসর বিবর্ণ হয়ে আসা ছবিতে ফোরকান আপাকে দেখলে গর্বে মনটা ভরে যায়। অথচ মুক্তিযুদ্ধের যাদের কোনো চিহ্ন নেই, অস্তিত্ব নেই, তারাও বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা বিষয়ে পরাক্রমশালী ভূমিকা পালন করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধে না গিয়েও সব সুযোগ-সুবিধার নেতৃত্ব তারাই দিয়ে গেছেন। আর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি করে অনেকেই সমালোচিত হয়েছেন।আ স ম আবদুর রবের কথা থেকে আরও জানা গেল, ৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মাহেন্দ্র সময়েও সেই মঞ্চের সামনের সারিতে বসা ছাত্রী নেত্রীদের মধ্যে মমতাজ বেগম ও ফোরকান বেগম প্রমুখের উপস্থিতি ছিল। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। সেদিন তার নেতৃত্বে ছাত্রীরা রেসকোর্সের সেই সভায় যোগদান করেছিল। তখনকার সমাজ বাস্তবতায় একজন নারীর এমন ভূমিকা পালন একেবারেই স্বাভাবিক ছিল না। আজকাল আমার নিজের কাছেই প্রশ্ন জাগে ফোরকান আপারা এদেশ থেকে কী পেয়েছিলেন? তিনি কি সরকারের বড় কোনো পদস্থ, জনগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন? তার কি বাড়ি, গাড়ি, ধনদৌলত, ক্ষমতা কিছু ছিল? তার কী কোনো খেতাব ছিল? তিনি কি কিছু পাওয়ার জন্যে স্বাধিকারের স্বপ্নে বিভোর হয়ে মহতি ছাত্র জীবনকে বাজি রেখে ছিলেন? তার মধ্যে কি বৈষয়িক লোভ লালসার কোনো ভাবনা ছিল? নিশ্চয়ই এসব কিছু তাকে কখনও প্রভাবিত করতে পারেনি।বছর তিনেক আগে ২০২৩ সালের শেষের দিকে ফোরকান আপার জীবনাবসান হয়। বলা যায়, নীরবে নিভৃতে, সাধারণের অজান্তেই তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটা বেড থেকে তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।জয়তু ফোরকান আপা।[লেখক : গল্পকার]

কালরাত আর কত দীর্ঘ হবে?

বাংলাদেশ বিশ্বমানচিত্রে মাথা তুলে দাঁড়ানো দেশ। এই অর্জনের পিছনে রয়েছে আন্দোলন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের বিরল গাঁথা। ৩০ লক্ষাধিক মানুষের আত্মবলিদান, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি। কেবলই ত্যাগ নয়, একটা উপাখ্যান। স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাস রচিত হওয়ার পিছনে সামনে থেকে লড়ে যাওয়া কোটি কোটি মুক্তিকামী জনতার অকুতোভয় আকাঙ্ক্ষা নিছক কোন গালগল্প নয়। হাজার বছরের ইতিহাসে বিরল এক যুদ্ধ। যার ফলে আমরা পেয়েছি স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি লাল-সবুজ পতাকা, একটি মানচিত্র ও প্রাণের আকুতি মিশ্রিত একটি জাতীয় সঙ্গীত।যার নেতৃত্বে অবিচল আস্থায় সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এই দেশের মুক্তিকামী জনতা, তিনি জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।এই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে জড়িয়ে রয়েছে তৎকালীন পাকিস্তান নামক একটি বর্বর রাষ্ট্র কর্তৃক নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞের রক্তাক্ত এক অধ্যায়। সেই সঙ্গে বিশ্ব দেখলো দমন-পীড়নের বিরুদ্ধেও কিভাবে রুখে দাঁড়াতে হয়। ছিনিয়ে আনা যায় স্বাধীনতা।তৎকালীন পাকিস্তানের আগ্রাসী হওয়ার একটি নজিরবিহীন ঘটনার কাল ছিল সেই রাত। ১৯৭১ সালে নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের দিন সেই কালরাত। সংঘটিত হয়েছিল ২৫ মার্চ রাতে। যার সাংকেতিক বা ছদ্মনাম দেয়া হয়েছিল 'অপারেশন সার্চলাইট।’ তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই দিনটি ঘৃণ্য, বর্বরোচিত, পৈশাচিক উন্মত্ততায় ভরা, নারকীয় তাণ্ডবলীলার উল্লম্ফ মঞ্চায়নের দিন। সেদিন শুধু ঢাকা শহরেই নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছিল ১০ হাজারেরও অধিক লোককে। সঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের। গুমের শিকার হওয়া অসংখ্য বুদ্ধিজীবীর লাশ পর্যন্ত না পাওয়া যাওয়ার খবরে আজও গুমরে কেঁদে যায় পরিবার, স্বজন।আজও মানুষ ভয়ে কুঁকড়ে ওঠে সেই সেদিনের কথা মনে করে। আজও মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে নিহত সেই শহীদদের। বাংলাদেশ দিনটিকে পালন করে আসছে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে। ইতিহাসের পাতায় দিনটি ঠাঁই পেয়েছে ‘ভয়াল কালো রাত’ হিসেবে।সেই রাতে হামলার উদ্দেশ্য ছিল স্বাধিকার আন্দোলন দমিয়ে রাখা। স্বাধীনতার দাবিকে স্তিমিত করে দেয়ার পরিপূর্ণ নীলনকশার বাস্তবায়ন। যা ছিল নিন্দনীয়, ন্যাক্কারজনক, নজিরবিহীন! বিশ্বের ইতিহাসে বিরল রক্তক্ষরণের ইতিহাস। একটি উদ্ভট রাষ্ট্রতত্ত্ব থেকে দুই মেরুর দুই ভূখণ্ড দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল একই শাসন ক্ষমতায় পরিচালিত একটি দেশ! অবাস্তব, অবৈজ্ঞানি, কাল্পনিক আর হঠকারী চালের কারণে অভ্যুদয় থেকেই বঞ্চিত, নিগৃহীত, নিষ্পেষিত হয়ে আসতে থাকা একটি দেশের জনগণের। যাদের ভাষাগত, সংস্কৃতিগত, ঐতিহ্যগত, চিন্তাগত, ভৌগোলিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ প্রাত্যহিক কত-শত অমিল নিয়ে গঠিত হওয়া কাল্পনিক কাঠামোর বাস্তব রূপ দানকারী একটি দেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই একের পর এক একপেশে মনোভাবের প্রতিফলন ঘটাতে শুরু করে আধিপত্য বিস্তারে দমন-পীড়ন। যা তৎকালীন সময়েও এই ভূখণ্ডের মানুষজন কখনোই মেনে নেয় নি। ফলশ্রুতিতে ৪৭ সালে উদ্ভট তত্ত্বের দেশভাগ। বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের সূতিকাগার মূলত ৫২ সালের মাতৃভাষা আন্দোলন। যখন বাংলা নয় উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এমন ঘোষণায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের ছাত্র-জনতা। আন্দোলন আর রক্ত ঝরিয়ে সে দাবি বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে পিছু হটিয়ে দিয়েছিল, উর্দুভাষী শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যাবার দিন!তারপরও পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী বাংলাদেশকে শাসনের নামে শোষণ করেই যাচ্ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে আইয়ূব খান পদত্যাগে বাধ্য হয়। ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হতে না দেয়া। ধারাবাহিকতায় তীব্রতর হতে থাকে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের দাবি তখন আরও জোরালো হয়ে ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর পেশিশক্তির নির্মম প্রদর্শনে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার আর তাদের এদেশীয় মিত্র রাজাকার, আলবদর, আল শামস নিয়ে গঠিত দোসররা।বেসামরিক সেইসব বাহিনী, যার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকে জামায়াতে ইসলামী নামক দলটির নেতারা। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া দলটি ১৯৭১ সালে তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা কিংবা দায় স্বীকার করে ক্ষমা পর্যন্ত চায়নি। উপরন্তু তারা দম্ভ করে বলে বেড়িয়েছে, দেশে কোন মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, হয়েছে গৃহযুদ্ধ! এই আস্ফালনও জাতিকে চেয়ে দেখতে হয়েছে। তারচেয়েও তামাশার বিষয় হচ্ছে, স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেও স্বাধীন বাংলাদেশের বুকে জাতীয় পতাকা লাগানো গাড়িতে ঘুরে বেড়িয়েছে। এর চেয়ে হুমকির আর কী হতে পারে?উল্টো স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে লাগাতার কটাক্ষ করা, নেতৃত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরিতে লাগাতার মিথ্যাচার রটানো, জাতীয় সঙ্গীত পাল্টানোর উপর্যুপরি ঔদ্ধত্যের আস্ফালন দেখিয়ে বিষোদগার করাই শেষ নয়। ২৪ সালের সরকার পতনকে ২য় স্বাধীনতা বলে চালানোর কূটচাল, শঠতা তো চলেছেই, আরও দেখতে হলো এই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জন্মদিন পালন করা। এই ২০২৬ সালের স্বাধীনতার মাসেই ২৩ তারিখে পাকিস্তান দিবস পালনের স্পর্ধা দেখানো! তার ওপর মিডিয়া কাভারেজ পাওয়া! অথচ প্রতিবাদ হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে। আশ্চর্য মুলুকে আছি আমরা!যেখানে বুক ফুলিয়ে হাঁটে রাজাকার, আর লাঞ্ছিত অপমানিত হতে হয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের!১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়ে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যে সশস্ত্র অভিযান পরিচালনা করে, তারই নাম অপারেশন সার্চলাইট। সেই অভিযানের নির্দেশনামা তৈরি করে পাকিস্তানের দুই সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। সেই নির্দেশনামার কোনো লিখিত নথি রাখা হয়নি। গণহত্যার সেই পুরো নির্দেশ মুখে মুখে ফরমেশন কমান্ডার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো হয়। অথচ এই গণহত্যার একক, একতরফা ও একচেটিয়া দায় তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর। কিন্তু হত্যাযজ্ঞ নিয়ে তাদের কোন ধরণের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি! জাতিসংঘও ২৫ মার্চের তথা সারা ৭১ সাল জুড়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য কোনরূপ বিচারের উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ উত্থাপিত করা কিংবা বিচার কিংবা বিধিনিষেধ আরোপ করার কথা আজও শোনা যায়নি। তার মানে কি দাঁড়ায়? তৎকালীন সময়ে আমেরিকা পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর পক্ষে থাকায় জাতিসংঘ নির্বিকার ছিল! বলেও আমরা ধরে নিতে পারি!শোনা যাচ্ছে আমেরিকার পার্লামেন্টে বাংলাদেশে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞকে 'গণহত্যা' হিসেবে অভিহিত করতে বিল উত্থাপিত হয়েছে।১৯৭১ সালের একতরফা সেনাঅভিযান শুরু করে। সেই রাতের ঘটনাটি খোদ পাকিস্তানের সেনা অফিসার নিজের লেখা আত্মজৈবনিক বইয়ে বর্ণনা করেন, ২০১২ সালে, মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ‘এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’ নামে আত্মজীবনী প্রকাশ করেন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রকাশিত সে আত্মজীবনীতে প্রথমবারের মতো অপারেশন সার্চলাইট সম্পর্কে কিছু তথ্য প্রকাশিত হয়। অপারেশন সার্চলাইট কীভাবে পরিকল্পিত হয়, ১৯৭১ সালের সেই স্মৃতিচারণ করে রাজা লিখেছেন, ‘১৭ মার্চ, সকাল প্রায় ১০টা বাজে। টিক্কা খান আমাকে ও মেজর জেনারেল ফরমানকে কমান্ড হাউসে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে খবর পাঠান। খবর পেয়ে আমরা দুজন টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করি। গিয়ে দেখি, সেখানে জেনারেল আবদুল হামিদ খানও রয়েছেন। টিক্কা খান আমাদের বলেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে শেখ মুজিবের সমঝোতা আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট চান আমরা যেন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করি এবং সে অনুযায়ী একটা পরিকল্পনা তৈরি করি। এছাড়া আর কোনো মৌখিক বা লিখিত নির্দেশনা আমরা পাইনি। আমাদের বলা হয়, পরদিন ১৮ মার্চ বিকেলে আমরা দুজন যেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ওই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করি।'পরদিন সকালেই খাদিম হোসেন রাজা তার কার্যালয়ে রাও ফরমান আলীকে নিয়ে বসেন। তারাই গণহত্যার এ অভিযানের নাম দেন অপারেশন সার্চলাইট। যদিও অপারেশনটিতে ঠিক কতজনকে হত্যা করা হয়েছে সেই কথা তিনি উল্লেখ করেননি। যাতে তার সম্পৃক্ততার কথা স্পষ্ট করলেও কোন দায় নেয়ার কথা তিনি স্বীকার করেননি। কিন্তু মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চ রাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সেই রাতে ৭০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার করা হল আরও ৩ হাজার লোক। ঢাকায় ঘটনার শুরু মাত্র হয়েছিল। সমস্ত পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে সৈন্যরা বাড়িয়ে চললো মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করলো ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট। লুট আর ধ্বংস যেন তাদের নেশায় পরিণত হল। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শেয়ালের খাবারে পরিণত হল। সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠলো শকুন তাড়িত শ্মশান ভূমি।’ লাশগুলো হয়ে উঠলো শকুনের খাবার। এত এত লাশ দেখে শকুনও যেন বিলাসী হয়ে উঠেছিল। তারা যেনে বেছে বেছে খেতে চাইলো! আর তাই, নিজের লেখা কবিতার পঙক্তিতে বলতে পারি, ‘ঝড় এসে থেমে গেলে, মানুষটা বনে যায় বিলাসী শকুন!’ যদি এখানে রূপক অর্থে মানুষ বলা হয়েছে। আদতে শকুন এত এত খাদ্য তথা মনুষ্য দেহ একসাথে আগে দেখেনি। তাই লাশ পেয়ে অনেক লাশের শরীর তাদের টানেনি। আর এ জন্যেই শকুনও বিলাসী হয়ে উঠেছিল। সংখ্যার বিচারে একরাতেই ঢাকায় ১০ হাজারের অধিক, সারাদেশের পরিমাণ কি ছিল তা-ও অনুমেয়। নিরীহ বেসামরিক লোক হত্যার দৃষ্টান্ত বিশ্বের ইতিহাসে এতই বিরল যে, অবলীলায় এটিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সারাদেশের সঠিক হিসেব পাওয়াটা ছিল একটু কঠিনই। তবে ক্ষমতার পালাবদল না ঘটিয়ে চালানো হয়েছিল নির্মম হত্যাযজ্ঞ। আর এতে করেই বাঙালিদের মন বিষিয়ে ওঠে।প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অপারেশন সার্চ লাইট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সব পদক্ষেপ চূড়ান্ত করে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করে করাচি চলে যায়। যা ছিল অত্যাচারী শাসকের শেষ অস্ত্র! বাঙালিরা সেদিন দুর্বৃত্ত সেই শাসকের ওপর আস্থা হারিয়েছিল। সেনা অভিযানের শুরুতেই হানাদার বাহিনী বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে। আর এতে করেই দাবানলের মতো মানবস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে দেশের আনাচে-কানাচে। গ্রেপ্তারের আগে ২৬ মার্চ (২৫ মার্চ মধ্যরাতে) বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং যে কোন মূল্যে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বীর বাঙালিরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র লড়াই শেষে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পূর্ণ বিজয় অর্জন করে। অভ্যুদয় ঘটে নতুন রাষ্ট্রের। যার বলে বলীয়ান হয়ে, যে মন্ত্রে উদ্দীপিত হয়ে লড়াই আর সংগ্রামে অর্জিত হয় বিশ্বমানচিত্রে নতুন একটি দেশ।পরিশেষে বলা যায়, ২৫ মার্চের গণহত্যা আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করার মতো অপরাধ হলেও ৩০ লাখ নিরস্ত্র মুক্তিকামী বেসামরিক লোকজনকে হত্যা প্রত্যক্ষ করলেও মুসলিম বিশ্বই শুধু নয় তাবৎ মানবাধিকারের দেশও থেকেছে নিশ্চুপ! জাতিসংঘ থেকেছে কোমায়। তাই সময় এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজেদেরই সুসংহত করার।স্বাধীন বাংলাদেশে যদি পাকিস্তান দিবস উদযাপিত হয়, তবে প্রশ্ন রেখেই আর শিরোনামের সঙ্গে মিলিয়ে বলি বাংলাদেশে কালরাত আর কত দীর্ঘ হবে?(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ফেনী]

জাকাত: দান নয়, একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

জাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি। এটি ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূলভিত্তি। জাকাতের উদ্দেশ্য হলো, সহায়তার মনোভাব পোষণ ও অথনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়ন। দারিদ্র্য বিমোচন ও মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ কমিয়ে আনা। মাহে রমজানের সঙ্গে জাকাতের রয়েছে ঐতিহ্যগত সম্পর্ক। যেহেতু জাকাত চন্দ্রবর্ষ দ্বারা হিসাব করা হয়; সেহেতু আমাদের দেশে অধিকতর কল্যাণের আশায় সাধারণত রমজান মাসেই জাকাত আদায় করা হয়। সুতরাং, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক কল্যাণ সাধনে জাকাত আদায় ও বণ্টনের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ইসলামের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কারা জাকাত আদায় করবেন, কোন কোন জিনিসের জাকাত আদায় করবেন, জাকাতের সঠিক হিসাব কীভাবে করবেন, কোন কোন খাতে কীভাবে জাকাত আদায় করবেন এবং জাকাতের হকদাররা কীভাবে জাকাত গ্রহণ করবেন— এ সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা জাকাত দাতা ও জাকাতগৃহীতা তথা সব মুসলিম নর-নারীর জন্যই ফরজ বা একান্ত অপরিহার্য। সঙ্গে সঙ্গে জাকাত আদায় না করা বা লোক দেখানো আদায় করার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কেও সবাইকে অবহিত, সচেতন ও সতর্ক করাও ইমাম, মুয়াল্লিম, মুবাল্লিগ ও উলামায়ে দ্বীনগণের পবিত্র জিম্মাদারি দায়িত্ব। জাকাত ব্যবস্থাই হলো বিশ্বের প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সমাজের অসহায়, দরিদ্র, নিপীড়িত ও পিছিয়ে পড়া জনগণকে অভাব ও অর্থনৈতিক দৈন্যদশা থেকে মুক্তি দিয়ে সচ্ছল ও স্বাবলম্বী করার জন্য ইসলামে জাকাতের বিধান করা হয়েছে। তাই জাকাত হলো গরিবের সামাজিক নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি ও তাদের অর্থনৈতিক রক্ষাকবচ। সামাজিক সাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজের সার্বিক উন্নয়ন ও একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথই হচ্ছে জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা। এ পৃথিবীর সব কিছুর মালিক মহান আল্লাহ। মানুষ তার প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর সব ধন-সম্পদ ভোগ করে মাত্র। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি জানো না, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব ও আধিপত্য কেবল আল্লাহরই, আর আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক কিংবা সাহায্যকারী নেই।’ (সূরা বাকারা, ১০৭) এই ভূমণ্ডল সৃষ্টির পরে তিনি মানুষকে ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু, সাদা কালো ইত্যাদি  তে ভাগ করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। এটিও তার সৃষ্টি রহস্যের একটি। এর মাধ্যমে তিনি তার বান্দাকে পরীক্ষা করেন। কাউকে তিনি ধন-সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করেন আবার কাউকে দারিদ্র্য দিয়ে। ধনীদের পরীক্ষা করার জন্য জাকাত আল্লাহর একটি উপলক্ষ মাত্র। এর মাধ্যমে সম্পদশালী ব্যক্তির আত্মার যেমন পরিশুদ্ধি আসে, তেমনই তার ধন-সম্পদ পবিত্র ও হালাল হয়। আর সমাজের অসহায়, ফকির, মিসকিন, দরিদ্ররা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়। জাকাতের মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। ইসলামে সম্পদ বণ্টনব্যবস্থায় ধনীরা তাদের সম্পদের কিছু অংশ জাকাত দিলে গরিবদের সম্পদ কিছুটা বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা মহানবী (সা.)-এর আদর্শ মদিনা রাষ্ট্র, খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য বিমোচন করে মুসলিম উম্মাহকে সমকালীন বিশ্বে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত জাতিতে পরিণত করেছিল। এভাবে জাকাত ফান্ডের অর্থ দিয়ে যদি অভাবীদের একটি তালিকা তৈরি করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশটি পরিবারকে বাছাই করে প্রত্যেক পরিবারকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে উপার্জনযোগ্য কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয় এবং যে পরিবারের কর্তা একজন শক্তিমান পুরুষ তাকে একটি ভ্যান বা মাঝারি নৌকা কিনে দেয়া হয়, যে পরিবারের কর্তা একজন বয়োবৃদ্ধ পুরুষ তাকে একটি ছোট পান-চায়ের দোকান করে দেয়া হয়, আর যে পরিবারের প্রধান একজন বিধবা নারী তাকে একটা ভালো সেলাই মেশিন কিনে দেয়া হয়— তাহলে এর সুষ্ঠু ও সঠিক ব্যবহার করে তারা দৈনন্দিন রোজগার করে সংসার চালাতে পারবে। এভাবে প্রতি বছর যদি বিশটি পরিবারকে স্বাবলম্বী করা যায় তাহলে মদিনায় যেমন খেলাফতে রাশেদিনের শেষ দিকে জাকাত নেয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যায়নি— তেমনই ২০ বছর পর হয়তো ওই মহল্লায়ও জাকাত নেয়ার মতো কোনো লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। এজন্য প্রয়োজন হবে সম্মিলিত সামাজিক অঙ্গীকার। আমরা বলতে পারি যে, আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাকাত এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জাকাত ব্যবস্থায় সমাজের অথনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় হয়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিরসনে এটি এক উত্তম ব্যবস্থা। সাম্য ও সমতার বিধান ছাড়া সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা সুরক্ষা হয় না। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণ হলেই সমাজ স্থিতিশীল হয়। অপরাধ কমে আসে। তাই এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, জাকাত সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসনে এক অপরিসীম ভূমিকা পালন করে থাকে। ইদানীং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলামী ব্যাংকগুলো সমাজে বিদ্যমান অসহনীয় দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনকল্পে জাকাতের অর্থ পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ করে তহবিল গঠন এবং সেই তহবিল থেকেই দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কার্যপরিকল্পনা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ইসলামী ব্যাংকগুলো নিজেদের তহবিলের জাকাত ছাড়াও তাদের গ্রাহকদের দেয়া জাকাত নিয়ে গড়ে তুলেছে জাকাত ফাউন্ডেশন। মূলত নগদ সাহায্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন এই তিনটি বৃহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এই তহবিলের অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে। অনুরূপভাবে কোনো এলাকার বিত্তবান লোকজন যদি জাকাতের তহবিল গঠন করে গরিব মানুষের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়, তাহলেও গ্রামবাংলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহজতর হবে। নতুবা জাকাত সরকারি জাকাত ফান্ডে জমা দিতে হবে এবং সেখান থেকে জনকল্যাণের প্রয়োজনীয় কার্যকর ভূমিকা নিলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। সরকারের বাস্তবমুখী উদ্যোগ, প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং কার্যকর ভূমিকা ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার পাশাপাশি ১৮ কোটি জনতা অধ্যুষিত এ দেশে যারা সাহেবে নিসাব; তারা সবাই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নিয়মিত জাকাতের অর্থ পরিকল্পিতভাবে ব্যয়ের জন্য উদ্যোগী হলে দেশে গরিব জনগণের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে। সরকারের রাজস্ব ফান্ডও হবে সমৃদ্ধ আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি হবে আরও বিস্তৃত। এজন্য প্রয়োজন সদিচ্ছার ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার। তাই রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় বাড়ানো আর জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার সব স্তরে জাকাত বিষয়ক ইসলামী অর্থনীতির শিক্ষা চালু করা; সর্বস্তরের মানুষের কাছে জাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা; সব মুসলিম দেশে সরকারিভাবে জাকাত আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।ইসলামে সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থায় ধনীরা তাদের সম্পদের কিছু অংশ জাকাত দিলে গরিবদের সম্পদ কিছুটা বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা মহানবী (সা.)-এর আদর্শ মদিনা রাষ্ট্র, খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য বিমোচন করে মুসলিম উম্মাহকে সমকালীন বিশ্বে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত জাতিতে পরিণত করেছিল। জাকাত আক্ষরিক অর্থেই সম্পদকে অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করে এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে সম্পদের পরিধি বৃদ্ধি করে। জাকাত দাতার মন থেকে লোভ-লালসা, অহংকার ও কৃপণতা দূর করে তাকে আত্মশুদ্ধি অর্জনে সহায়তা করে। এটি ধনীদের সঙ্গে দরিদ্রদের সুসম্পর্ক স্থাপন করে এবং সমাজে ন্যায়বিচার ও সামাজিক সংহতি রক্ষা করে। জাকাতের মাধ্যমে অভাবী, ঋণগ্রস্ত এবং অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিদের সাহায্য করে তাদের স্বাবলম্বী করা হয়। এটি একটি অবশ্য পালনীয় আর্থিক ইবাদত, যা ইসলামের মৌলিক ভিত্তিগুলোর অন্যতম। জাকাত কেবল দরিদ্রকে অর্থ দেয়া নয়, বরং এটি সম্পদ ও আত্মার পবিত্রতা অর্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের এক মহান মাধ্যম। এজন্য প্রয়োজন হবে সম্মিলিত সামাজিক অঙ্গীকার। পরিশেষে আমরা বলতে পারি, আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাকাত এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জাকাত ব্যবস্থায় সমাজের অথনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় হয়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিরসনে এটি এক উত্তম ব্যবস্থা। সাম্য ও সমতার বিধান ছাড়া সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা সুরক্ষা হয় না। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণ হলেই সমাজ স্থিতিশীল হয়। অপরাধ কমে আসে। তাই এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য, জাকাত সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসনে এক অপরিসীম ভূমিকা পালন করে থাকে। মোট কথা ইসলামী সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় জাকাত একদিকে যেমন গরিব অসহায়তা অবসানের গ্যারান্টি রাখে তেমনি অর্থনৈতিক চাকাকে গতিশীলও রাখে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও সুদৃঢ় ও সমুন্নত করে। এ সব কারণে জাকাতের আর্থসামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। [লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

স্কুল-কলেজ পরিচালনা কমিটিতে শিক্ষিত মানুষই প্রয়োজন?

সদ্য বিদায় নেয়া আলোচিত ও বিতর্কিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের মানুষ ক্রমাগত আশাহত হয়েছে। মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দিনগুলোতে দেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা ছিল অন্যরকম। মানুষ মুখিয়ে ছিল অভিনব কিছু দেখবে বলে। রাষ্ট্র পরিচালনায় এদের বছরদেড়েক সময়ের মধ্যে সংস্কার সংস্কার বলে যে আওয়াজ গণমানুষের কানে বেজে চলেছিল, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সে আওয়াজ যেন বন্যার জলের স্রোতের মতো ভেসে গেছে অনেক দূরে। সে অনভিজ্ঞ সরকার অনেক কিছুতে হাত দিলেও কাজের কাজ তেমন কিছু হয়নি। এমন বান্ধা ও শ্বাসরুদ্ধকর সময়ে যে দুয়েকটা ভালো উদ্যোগ তারা গ্রহণ করেছিল এর মধ্যে দেশের স্কুল-কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের পরিচালনা কমিটির প্রধানের শিক্ষাগত যোগ্যতা বেঁধে দেয়া ছিল অন্যতম। এটা করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকেই। কারণ পটপরিবর্তনে অব্যবহিত পরেই দেশব্যাপী স্কুল-কলেজ দখলে নেয়ার এক হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ/এমএ করার প্রজ্ঞাপন জারি করার পর গ্রাম-গঞ্জে, জনমনে একটা স্বস্তির পরিবেশ ফিরে এসেছিল। সরকার সঠিক কাজ করেছে বলে সাধারণ মানুষের মন্তব্যও শোনা গেছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠির শর্তের ফলে শিক্ষক-কর্মচারীও তা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিয়েছে।২.অতি সম্প্রতি নতুন সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর এক আকস্মিক  মন্তব্যের জের ধরে সমালোচনার ঝড় যেন স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দেশব্যাপী। রাস্তাঘাটে, হাটে-বাজারে, চায়ের দোকানে সর্বত্র কথা হচ্ছে। তিনি বলেছেন, স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা হবে। অমনি পত্রপত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমে শত শত ট্রল, বাঁকা মন্তব্য, রম্য নাটক, সংসদেও রাজনৈতিক নেতাদের কড়া বক্তব্য চলমান থাকে। এতে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে। কারণ হতে পারে যে, এই মন্ত্রীর কাছ থেকে গণমানুষের প্রত্যাশা তুলনামূলকভাবে বেশি। আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে তিনি ছিলেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। তখনকার দিনে দেশের পরীক্ষা কেন্দ্রগুলো থেকে নকল বন্ধ করার পেছনে তার জাদুকরী পদক্ষেপ, ঝটিকা সফর তথা অভূতপূর্ব শ্রমের কথা এতদিন পরেও মানুষ হয়তো ভুলে যায়নি। তখন মানুষ তার নাম দিয়েছিল হেলিকপ্টার মন্ত্রী। তাছাড়া আজকে যখন দেশের মানুষের শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭২%, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫ কোটির কাছাকাছি আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণ হারে। মন্ত্রীর নিজের দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষাসহ পিএইচডি ডিগ্রিধারী হওয়া ইত্যাদিও মানুষের নজর এড়ায়নি। তিনি শপথ নিয়েই শিক্ষা খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব তথা প্রাধান্য দেয়ার আশার বাণী শুনিয়েছেন। সেখানে তার মুখেই যদি সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতায় শিথিলতার বিষয় উত্থাপন করা হয়— তা দেশের মানুষকে হতাশ করবে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাছাড়া আগের তুলনায় মানুষ এখন অনেক বেশি সমাজ সচেতন অধিকতর তথ্যবান্ধব ও সমালোচনাপ্রিয় হয়েছে। মানুষ তর্কপ্রিয় তো বটেই।৩.এমনিতেই আধুনিক বিশ্বের বহুমাত্রিক প্রযুক্তি নাগালের মধ্যে পাওয়া এবং ব্যবহারের কারণে তা নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে চলেছে। গত কয়েক বছরে গ্রামীণ জনপদে অবস্থিত প্রায় সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি এর প্রভাব পড়েছে। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠ গ্রহণে বা পরীক্ষায় অংশ নিতে অনীহা প্রদর্শন করছে। যদিও বছরান্তে নিয়ম অনুযায়ী ফরম পূরণ করা হচ্ছে, ফি প্রদান করা হচ্ছে। পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তারা বেশিরভাগই ভালো কিছু লিখতে পারছে না। অথচ পাসের হার দেখানো হয়েছে অধিকতর। এটা ছিল আত্মতুষ্টির ফলাফল আর শিক্ষার হার বৃদ্ধির গোপন রহস্য। অন্যদিকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির পদ্ধতিতে নানা গবেষণা করার কারণে ছাত্রছাত্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। সংকট দেখা দেয় গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষকের। এমনকি বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। দেশে এমন নানাবিধ সমস্যা প্রকটভাবে বিরাজমান রয়েছে। অথচ গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বলা যায়, শুধু এমপিওভুক্তির আশীর্বাদ নিয়েই টিকে আছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ভালো শিক্ষকের আকাল ও দুঃসময়ের মধ্যে ম্যানেজিং কমিটির চাপে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হয়েছে। অনেক সময় যোগ্যতাসম্পন্ন জনপ্রিয় শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে কমিটি আরও বেশি স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে।এক্ষেত্রে স্কুল-কলেজের উন্নয়ন, শিক্ষার মান, লেখাপড়ার পরিবেশ, বাৎসরিক রেজাল্ট, শ্রেণিকক্ষের অবস্থা, ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি, অভিভাবক সম্মিলন এসব খেয়াল না করে এ ধরনের কমিটির নজর থাকে মূলত নিয়োগ প্রক্রিয়ার দিকে। আর নিয়োগ মানে টাকার বিনিময়ে অযোগ্য বেকারকে চেয়ারে বসানো। তখনই প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে নিত্য রুজিরোজগারের এক ব্যাংক। অনেক সময় শোনা গেছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য একদিন তার নিবেদিতপ্রাণ জনৈক কর্মীকে বলেছেন, ‘তোমার জন্য কিছু করতে পারিনি, তোমাকে একটা স্কুল/কলেজ দিয়ে দিচ্ছি। এটা দিয়েই তোমার চলে যাবে।’৪.এখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, স্কুল-কলেজে সভাপতি এবং এ জাতীয় কমিটির প্রয়োজন কী?কমিটি না থাকলে কী কোনো সমস্যা হতে পারে? বাস্তবতা হলো, ঐতিহ্যগতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয় অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত একটা কমিটি রয়েছে; যা মূলত শিক্ষার পরিবেশ এবং অন্যায়, অনিয়ম, অনাচার ইত্যাদি হচ্ছে কি না— তার নজরদারি করাই এ কমিটির কাজ। কিন্তু কালক্রমে তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দলের বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আধিপত্য প্রদর্শনের এক নিরাপদ স্থান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ কমিটির অস্তিত্ব না থাকলেও কিছু যায় আসে না। প্রত্যেক উপজেলা পর্যায়ে রয়েছে সব স্তরের জন্যে পৃথক পৃথক সরকারি কর্মকর্তার পদায়ন। প্রতিষ্ঠান সুপারভিশনের দাপ্তরিক দায় মূলত তাদের। তারাই ভালো মন্দের রিপোর্টিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। তথাপি এ কমিটির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে সর্বময় ক্ষমতা। এখানে লাগাম টেনে ধরতে পারলে বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন আশা করা যায়। অন্যথায় মাঠ পর্যায়ের গতানুগতিক ধারার শিক্ষা কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো ছাপ পড়বে না।কমিটির সভাপতি পদের জন্য অবশ্যই উচ্চ শিক্ষিত, গ্রহণযোগ্য, সৎ সাহসী মানুষ প্রয়োজন। তিনি হতে পারেন একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক ছাত্র, চাকরিরত বা অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সরকারি, বেসরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, শিল্পপতি ইত্যাদি পদাধিকারী। অর্থাৎ সমাজসেবা যার ব্রত। তবে তাকে অবশ্যই শিক্ষকগণের চেয়ে কম ডিগ্রিধারী হলে বিবেচনায় আনা যাবে না। কারণ এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। উচ্চশিক্ষিত সাবেক ছাত্ররা তার নিজের স্মৃতি-জাগানিয়া, নস্টালজিক প্রতিষ্ঠানের অমঙ্গল কখনও করতে পারে না। তাই সভাপতি হওয়ার জন্যে এদের অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে।৫.যতদূর জানা যায়, সরকার ম্যানেজিং কমিটির জন্যে শিক্ষাগত যোগ্যতার শৈথিল্যের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বা আরও পরিশীলিত কোনো আদেশ দানের অপেক্ষায় আছে। আসল কথা হলো, সভাপতি পদের জন্যে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বহাল রাখা হচ্ছে। দিনশেষে তা-ই যেন হয়। তবে তা যেন শতভাগ রাজনৈতিক বিবেচনায় না করা হয়। বরং দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহকে অন্তত একজন সজ্জন, বিদ্যানের হাতে দেয়া হয়। ভাবতে হবে, গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে আসার এটাই উপযুক্ত সময়। নতুন সরকারের কাছে দেশের জনগণ এমনটাই প্রত্যাশা করবে।[লেখক : গল্পকার]

প্রবাসীর ঈদ: এক দ্বৈত অনুভূতির সংমিশ্রণ

মুসলিমদের যে কয়টি ধর্মীয় উৎসব রয়েছে তার মধ্যে ঈদুল ফিতর অন্যতম। এটি ইসলামী বর্ষপুঞ্জির খুবই গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যা মুসলিমদের জন্য আনন্দের ও ধর্মীয় শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বিশেষ দিন। বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে যেখানে ঈদ উৎসবের আনন্দে পরিবার, বন্ধু এবং স্বজনরা একত্রিত হয়, সেখানে প্রবাসীদের জন্য ঈদ অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করে। প্রবাসে ঈদ পালন করার সময় প্রবাসীদের মাঝে এমন কিছু মিশ্র অনুভূতি পরিলক্ষিত হয়, যা তাদের এক ধরনের মানসিক চ্যালেঞ্জর মুখোমুখি নিয়ে দাঁড় করায়, আবার কখনও কখনও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা বিশেষ উষ্ণতা এবং নতুন কিছু সৃষ্টি বা আয়োজনের উপলক্ষ হিসেবেও কাজ করে।প্রবাস জীবনে ঈদ উদযাপন সত্যিকারার্থে খুব বেশি একটা সুখকর নয়। দেশে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ পালন করার যে আনন্দ— তা মোটেও প্রবাসে পাওয়া যায় না। এ না পাওয়ার দুঃখ কিছুটা হলেও হৃদয়ে দাগ কাটে। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে আজকাল প্রবাসীরা ভিডিও কল, সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য ডিজিটাল মাধ্যমে তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করার মাধ্যমে কিছুটা কষ্টের লাঘব ঘটাতে পারলেও একাকীত্বের অনুভূতি কিন্তু থেকেই যায়। প্রবাসীরা যখন তাদের মাতৃভূমি, পরিবারের মধ্যে ঈদ উৎসবের আনন্দঘন পরিবেশ দেখে, তখন তাদের ভেতরে যে আবেগ-অনুভূতির সৃষ্টি হয় তা প্রকাশ করা সত্যি কঠিন। কারও কারও মাঝে আবার নস্টালজিয়া এসে ভিড় করে; যা কি না নিয়ে যায় তাদের শৈশবের মধুর স্মৃতিবিজড়িত ঈদের আনন্দঘন মুহূর্তের মাঝে।প্রবাসে ঈদ উৎসবের প্রস্তুতিতে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। যেহেতু পরিবারের সব সদস্যরা কিংবা আত্মীয়-স্বজন কাছাকাছি থাকে না, তাই তাদের একাকী অথবা ছোট একটি প্রবাসী কমিউনিটির মধ্যে ঈদ উদযাপন করতে হয়। সেখানেও থাকে বিশেষ কিছু আয়োজন। সর্বপ্রথম সবাই ঘুম থেকে উঠেই ঈদের নামাজটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। একেকটি এলাকায় সাধারণত একেকটি মসজিদে ঈদের নামাজের আয়োজন করা হয়, সেখানে সবাই একত্রিত হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। আজকাল আবহাওয়া সদয় হলে অধিক সংখ্যক লোকের অংশগ্রহণের সুবিধার্থে কোনো কোনো এলাকায় খোলা মাঠেও ঈদের নামাজ আদায় করা হয়ে থাকে।নামাজ শেষে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানোর যে একটি রেওয়াজ ছিল, তা এখন নেই বললেই চলে। এর প্রথম কারণ, ঘুরে ঘুরে একদিনে সবার বাসায় যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায় না। দ্বিতীয়ত, কখনও কখনও দেখা যায় লোকজন ঘুরে-ফিরে কেবল নির্দিষ্ট কিছু বাড়িতে যায় শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য। এতে ওইসব বাড়ির লোকজন আর সেজেগুজে বাইরে বেরুনোর সুযোগ পান না। ফলে উৎসবমুখর দিনটি তাদের কাছে মাটি হয়ে যায়। তাই ঈদের দিনের আনন্দ থেকে যাতে কাউকে বঞ্চিত হতে না হয়, সেই চিন্তা-ভাবনা থেকে কমিউনিটির সদস্যরা একে অন্যকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে ইদানীং একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মিলিত হন। একই সঙ্গে সেখানে থাকে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। ঈদ উপলক্ষে প্রতিটি পরিবার নিজেদের জন্য যা রান্নাবান্না করেন তাই তারা সঙ্গে করে নিয়ে যান। ফলে অনুষ্ঠানস্থল বিশাল খাদ্যের সমাহারে পরিণত হয়। সেমাই, মিষ্টি, পায়েস, চটপটি, হালিম, কোর্মা-পোলাও, বিরিয়ানিসহ এমন কোনো ঐতিহ্যবাহী খাবার নেই যা সেখানে পাওয়া যায় না। সত্যিকারার্থে খাবারের দিক থেকে প্রবাসের অনুষ্ঠানগুলো এখন আর দেশীয় অনুষ্ঠানের তুলনায় কোনো অংশেই কম নয়।আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাসে ঈদ উদযাপন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের দেশে ঈদ করতে না পারার দুঃখ ভুলে থাকা ও নতুন প্রজন্মের মাঝে ঈদের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও ঐতিহ্যগত দিক তুলে ধরার জন্য ঈদের অনুষ্ঠান আয়োজন করা বেশ জরুরি। তাছাড়া ঈদ যে উৎসব বা ঐতিহ্যের বাইরে আমাদের ‘একাত্মতার প্রতীক’ এ জিনিসটি ফোটিয়ে তোলার জন্যও এসব অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই।তবে একটি সত্য কথা না বললেই নয়। প্রবাসে যতই জাঁকজমকভাবে অনুষ্ঠান পালন করা হোক না কেন, তবু প্রবাসীদের মন ভরে না।পারিবারিক স্মৃতির অনুপস্থিতি তাদের তাড়া করে বেড়ায়। এই দিনগুলোতে প্রবাসীরা তাদের পরিবারের সঙ্গে একত্রিত হতে না পারায় হৃদয়ের ভেতরে এক অজানা শূন্যতা অনুভব করেন। দেশের গ্রামের বাড়ি কিংবা শহরের দিকে মন ফিরে যায়, যেখানে তাদের প্রিয়জনরা ঈদ উদযাপন করে থাকে। এই সময় তাদের মধ্যে একটি প্রবল আবেগানুভূতি তৈরি হয়। বস্তুত একদিকে পরিবার ও স্বজনবিহীন নিঃসঙ্গতা এবং অন্যদিকে বন্ধু ও কমিউনিটির মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতা প্রবাসীদের মাঝে একটি দ্বৈত অনুভূতির সংমিশ্রণ ঘটায়।[লেখক : আয়ারল্যান্ড প্রবাসী]

শেখ হাসিনার মনস্তত্ত্ব ও তার রাজনীতি এবং ক্ষমতার ব্যবহার

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই বলে থাকেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ট্রাজেডির পর শেখ হাসিনা ট্রমায় আক্রান্ত হলেও তা তিনি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিদেশে থাকায় তারা দুই বোন ছাড়া, রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন বঙ্গবন্ধুর শিশু সন্তান ও দুই পুত্রবধূসহ মুজিব পরিবারের সব সদস্যকেই ঘাতকরা হত্যা করেছিল। এমন নৃশংসতা ইতিহাসে বিরল। ঘাতকরা বিদেশের মাটিতেও মুজিব পরিবারের জীবিত দুই সদস্যের ওপর হামলার যে পরিকল্পনা বা প্রচেষ্টা নেয়নি— সে সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ ধরনের এক পরিস্থিতিতে ট্রমায় আচ্ছন্ন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর এবং এরশাদ আমলের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণসংগ্রামের দীর্ঘযাত্রা পথে রাজনীতির নানা বাঁক বদলে ভূমিকা রেখে তিনি রাজনীতি অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন। ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসেন।কিন্তু ২০০৪ সনের ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পরে শেখ হাসিনার মনে এমন এক ধারণার সৃষ্টি হয় যে, বিরোধীদের হাতে তার জীবন বিপন্ন। তার পিতা-মাতাসহ প্রায় পুরো পরিবার হত্যাযজ্ঞের শিকার হওয়ায়, তার ওপরও একাধিকবার হত্যা প্রচেষ্টা হওয়ায় এবং হত্যা প্রচেষ্টার যথাযথ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া অগ্রসর না হওয়ায় এ ধারনা তার বিশ্বাসে পরিণত হয়। কার্যত ধীরে ধীরে তিনি ‘ট্রমাটাইজড’ হয়ে পড়েন। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন, কতৃত্ববাদ ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ ঘটনা অন্যতম উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।তবে ছাত্র জীবনে এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময়ে তাকে আমার এমনটা মনে হয়নি। ১৯৮৩- ৮৪ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সঙ্গে একযোগে, আবার ১৯৮৮-৮৯ সালে ১৫ দলীয় জোটের ২-৩টি বৈঠকে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলার ও আলোচনার সুযোগ হয়েছে। পারিবারিক কতক ঘটনায় শেখ পরিবারের সঙ্গে সংযোগ থাকায়— যা শেখ হাসিনা কখনও জানতেন না, তারপরেও তার সঙ্গে একটা নৈকট্য অনুভব করতাম। তাই হয়তোবা তার কতৃত্ববাদী মনোভাব আমার চোখে নাও ধরা পড়ে থাকতে পারে।তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের আগেই একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম ১৯৮১ সনের শেষ দিকে ছাত্র ইউনিয়নের জাতীয় সম্মেলনে। সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে আরও অনেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে দর্শক আসনে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদ। উদ্বোধনী অধিবেশনে যে শোক প্রস্তাব উত্থাপিত হয় সেখানে শুরুতেই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের এবং ১৫ আগস্ট ও তৎপরবর্তীতে যে হত্যা-ক্যু-পাল্টা ক্যু’র রাজনীতির শুরু তার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করা হয় এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই জরুরি ভিন্ন কাজ আছে বলে রাজ্জাক ভাই এবং তোফায়েল ভাই সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন। আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি শোক প্রস্তাবটি বা শোক প্রস্তাবের ভাষা তাদের পছন্দ হয়নি বা তাদের নেত্রীর পছন্দ নয়। সম্মেলনের কিছুকাল পরেই সামরিক শাসন এবং জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখল।জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের গোড়ার দিকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা প্রথমবার শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সব শীর্ষ নেতারাই ছিলেন। শেখ হাসিনা কোনো সাহায্যকারী ছাড়া একাই ছিলেন। আমরা ভবনের অভ্যন্তরে সভার জন্য অপেক্ষা করছি। শেখ হাসিনা তার কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, চলেন আমরা লনে গিয়ে বসি। শেখ হাসিনাসহ আমরা লনের সবুজ ঘাসের ওপর সবাই গোল হয়ে বসি, যেমনটা অনেক সময় পার্কে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বন্ধুবান্ধবরা আড্ডাচ্ছলে বসে গল্প করি। শেখ হাসিনা ৩২ নম্বরে কর্মরত কর্মচারীদের বললেন, সরিষার তেল আর পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে মেখে মুড়ি আর চা দিতে। সেদিন কি আলোচনা হয়েছিল তার কিছুই মনে পড়ছে না। শুধু তার সারল্য, ঝালমুড়ি আর হাসিমাখা মুখটি স্মৃতিতে ভেসে আছে।এরপরের বৈঠকটি ছিল অভাবনীয়। সম্ভবত ১৯৮৫-এর শেষে বা ’৮৬-এর শুরুতে একদিন তৎকালীন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ আমাকে বললেন, শেখ হাসিনা আপনার সঙ্গে কিছু বিষয়ে কথা বলতে চান। আপনি যোগাযোগ করে কথা বলবেন। ওই সময়ে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন চলছিল। আমি একদিন দুপুরে গেলাম ৩২ নম্বরের বাড়িতে। গিয়ে দেখি দুপুরের খাওয়ার আয়োজন চলছে। ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী আর ছিলেন পরমাণু বিজ্ঞানী এমএ ওয়াজেদ। ছাত্রলীগের নেতারা ড. ওয়াজেদকে দুলাভাই সম্বোধন করে নানা রসিকতা করছেন। আমার সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি শুধু বললেন ‘ইপসু’। এর মধ্যে খাওয়া শুরু হলো। মাছ-ভাত আর সবজি ও ডাল। তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক আমাকেও জোর করে বসালেন।দুপুরের খাওয়া শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরে নানক ভাই আমাকে বললেন, নেত্রী আপনাকে ডাকছেন। তিনি আমাকে শেখ হাসিনার বসার ছোট কক্ষটিতে পৌঁছে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের আলোচনা হলো। মনে হলো উনি যেসব বিষয় যেভাবে আলোচনা করবেন বলে মনে করেছিলেন পরবর্তীতে সম্ভবত কিছুটা মত পরিবর্তন করেছিলেন। কুশল বিনিময়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক শক্তি সম্পর্কে আমার মতামত, আমার বিবেচনায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কার কেমন গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি বিষয় জানতে চাইলেন। আমি অনেকক্ষণ নীরব থাকায় তিনি নাম ধরে কয়েকজনের সাংগঠনিক দক্ষতা, ছাত্রদের মধ্যে, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি বিষয়ে কিছু প্রশ্ন করলেন। আমার নিজেরই ছাত্রদের মধ্যে পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল না, তাই এসব প্রশ্নে আমি খুবই বিব্রত বোধ করেছিলাম। তবে আমার বলা কথাগুলো তিনি শুধু শুনলেন। পাল্টা কোনো প্রশ্ন বা কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইলেন না। ফরহাদ ভাই আমাকে আগে থেকেই বলে দিয়েছিলেন শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে আমি যাতে আর কারো সঙ্গে আলোচনা না করি। এমনকি উনিও কোনো দিন জানতে চাননি। ছাত্রলীগেরও কেউ আমাকে কখনও কোনো প্রশ্ন করেননি। তবে শেখ হাসিনা আমার সঙ্গে একান্তে কথা বলায় ছাত্রলীগের মধ্যে আমার কদর বেড়ে গেল। ছাত্র আন্দোলনে থাকা অবস্থায় এর পরে আর কখনও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি।ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নেয়ার পরে আর একদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে পাশে গিয়েছিলাম। তখন শেখ হাসিনা গৃহবন্দী। ১৫ দলীয় ঐক্যজোটের নেতারাও গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে। একদিন সন্ধ্যায় ফরহাদ ভাই তার সাময়িক ডেরাতে ডেকে পাঠালেন। আমার হাতে একটা চিরকুট দিয়ে বললেন এটা শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছাতে হবে। পৌঁছানোর পথও তিনি বাতলে দিলেন। ৩২ নম্বরে পাশের বাড়িটি ছিল বেগম বদরুন্নেসা আহমদের। আমাকে বলা হলো সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ওই বাড়ির গেটে পৌঁছে পরিচয় দিলে আমাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হবে। ওই বাড়ির সঙ্গে ৩২ নম্বর বাড়ির একটা ছোট সংযোগ গেট রয়েছে, সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেই হবে। সে অনুযায়ী ঠিক সময়ে আমি পৌঁছে গেলাম সংযোগ গেটে। জায়গাটায় একটা ঘুটঘুটে অন্ধকার বিরাজ করছিল। দাঁড়াতেই শেখ হাসিনা এলেন, খুব স্পষ্টভাবে চেহারা দেখা যাচ্ছিল না। চিরকুট নিয়ে বললেন, একটু দাঁড়ান। আমি ২-৩ মিনিট অপেক্ষা করতেই তিনি একটি খাম আমার হাতে দিয়ে বললেন পৌঁছে দেবেন। যে পথে এসেছিলাম সে পথেই বিদায় হলাম।এরপর আরেকদিন দেখা হয়েছে ড. ওয়াজেদের মহাখালীর সরকারি কোয়ার্টারে। ১৫ দলের অধিকাংশ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া। কোনো একটি কর্মসূচি গ্রহণকে কেন্দ্র করে সম্ভবত সভাটি ছিল। অন্যান্য দলের আর কে কে ছিলেন, মনে পড়ছে না। শেখ হাসিনা কথা বলছিলেন। এমন সময় বরিশালের আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রবেশ করলেন। হাতে সেই আগেকার দিনের খালোই (বাঁশ দিয়ে তৈরি মাছ রাখার এক ধরনের ছোট ঝুড়ি)। ঢুকেই এক গাল হাসি দিয়ে বললেন, গ্রাম থেকে কৈ মাছ নিয়ে এসেছেন। হাসিনাও দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, আপনারা আলোচনা করেন। আমি এখন কৈ মাছ রান্না করব। আপনারা না খেয়ে কেউ যাবেন না। হয়ে গেলো কৈ উৎসব!আমি এভাবেই ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। অবশ্যই এ দেখা রাজনৈতিক বা শ্রেণীগতভাবে দেখা নয়। আমার চোখে ওই সময়ের একজন মানুষকে দেখা। অবশ্য এ সব দেখা সাক্ষাতে যেহেতু কোনো গভীর রাজনৈতিক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়নি তাই আমার দেখাটা একরকমের। ১৫ দল বা ৮ দলের শীর্ষ নেতরা যখন তার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনা করেছেন বিশেষত বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় ঐক্যজোটের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি, বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে একমঞ্চ থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা যায় কি না বা নির্বাচনী কৌশল কী হবে— তখন হয়তোবা তার রাজনৈতিক সংকীর্ণতার প্রকাশ ঘটেছে। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সেটা বুঝতাম। এ পরিস্থিতির ঐতিহাসিক কারণও ধারণা করতাম। কিন্তু সামনাসামনি তাকে যতটুকু দেখেছি সাধারণভাবে তার ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়েছি।১৯৯১ সনে রাজনৈতিক জীবনে ইতি টানার পর থেকে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা সাক্ষাৎ ছাড়া রাজনৈতিক কোনো নেতা এমনকি ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতাদের সঙ্গেও আর সেরকম কোনো যোগাযোগ নেই। শেখ হাসিনার সঙ্গেও আর কোনোদিন দেখা হয়নি। তাই পত্রপত্রিকার সংবাদ দেখে যতটুকু রাজনৈতিক ধারণা পেয়েছি সেটুকুতেই সন্তুষ্ট থেকেছি। দ্বিদলীয় রাজনীতির ধারায় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে পালাক্রমে একবার বিএনপি এবং একবার আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করে আসছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজিত নির্বাচনে বাই ডিফল্ট বিরোধী দল নির্বাচনে সুবিধা পায়। কেননা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেয়ার পরে সরকারি দলের সাজানো বাগানে পরিবর্তন আনে। শামিম ওসমান, জয়নাল হাজারী বা গিয়াসউদ্দীন আল মামুন, সিলভার সেলিমরা তখন আর যা খুশি তা করতে পারে না। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বড় ধরনের জনবিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়নি। যদিও শামিম ওসমান, জয়নাল হাজারীরা ‘স্বমহিমায় উজ্জ্বল’ ছিলেন, মায়ার ছেলে দীপু চৌধুরী, হাসানাত আবদুল্লার ছেলে সাদিক আবদুল্লাহ কিংবা ডা. এইচবিএম ইকবালের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দেশজুড়েই সমালোচিত ছিল। বড় ধরনের জনবিচ্ছিন্নতা না থাকলেও নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। এ নির্বাচনের আগে পরে সংখ্যালঘু অধিষ্ঠিত এলাকাগুলোতে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নির্যাতনের অভিযোগ আছে। তবে সাধারণভাবে ফ্লোটিং ভোট একবার আওয়ামী লীগ পরেরবার বিএনপি, সেই ধারায়ই নির্বাচন হয়েছে বলে মনে হয়।কিন্তু নির্বাচনের পরে শেখ হাসিনার কিছু বক্তব্য শুনে মনে হলো আমার দেখা একযুগ আগের শেখ হাসিনা আর নাই। শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার গোপালগঞ্জে গেলে তাকে যেন ‘আদর যত্ন করে বিদায় করা হয়’। ওই নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন আমার মামা আবু সাইদ। তিনি ডাকসাইটে গোছের আমলা ছিলেন। ওনার ভাই-বোন বা আমরা ভাগ্নে-ভাগ্নিররা তার কাছে ঘেষতে সাহস পেতাম না। শেখ হাসিনার মনে একটা অভিমান ছিল সাইদ সাহেবের বাড়ি গোপালগঞ্জ, সাইদ সাহেবের বাবা অর্থাৎ আমার নানা আব্দুল হাকিম ও তার দাদা শেখ লুৎফর রহমান বন্ধু ও চাকরি ক্ষেত্রে সহকর্মী ছিলেন, দুই বাসায় যাতায়াত ছিল। তারপরও তিনি দাপ্তরিক সভা বা প্রয়োজন ছাড়া কখনও ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন না। তার এ অভিমানের কথাটা আমি তোফায়েল ভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছি। শেখ হাসিনা আবু সাইদকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করতে গররাজী ছিলেন। বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের বিশেষ আগ্রহের কারণে শেখ হাসিনা রাজি হয়েছিলেন।আমার মা মাঝে-মধ্যেই গর্ব করে বলতেন, জানিস আমার বিয়ের রান্না করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর বাবা। ভাবতাম এগুলো কথার কথা। পরে এসব কথার সত্যতা পেলাম বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ে। বইয়ের ১০ম পৃষ্ঠার বঙ্গবন্ধুর ভাষ্য থেকে উদ্ধৃতি করছি, ‘আমার আব্বাকে আমি খুব ভয় করতাম। আর একজন লোককে ভয় করতাম, তিনি আব্দুল হাকিম মিয়া। তিনি আমার আব্বার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। একসঙ্গে চাকরি করতেন, আমাকে কোথাও দেখলেই আব্বাকে বলে দিতেন, অথবা নিজেই ধমকে দিতেন। যদিও আব্বাকে ফাঁকি দিতে পারতাম, তাকে ফাঁকি দিতে পারতাম না। হাকিম সাহেব বেঁচে নেই। ... তার এক ছেলে সিএসপি হয়েছে।’ সেই সিএসপি অফিসারই ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। আর বঙ্গবন্ধুর বাবা প্রকৃত অর্থেই আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের বাড়িতে খাবারের বড় আয়োজন হলে তার তদারকি করতে পছন্দ করতেন, বাবুর্চিদের সঙ্গে নিজেও রান্নায় হাত লাগাতেন। যাক সেসব কথা।২০০১ সনের নির্বাচনের সপ্তাহ খানেক পরেই আমার নানি অর্থাৎ আবু সাইদের মা ঢাকায় মারা যান। নানির শবদেহ নিয়ে মামার সঙ্গে আমরা গোপালগঞ্জে রওনা হলাম। যেহেতু শেখ হাসিনা আদর-যত্ন করার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন, তাই প্রায় পুরো রাস্তায়ই মনে হলো পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা ছিল। যাওয়ার পথে মামা আমাকে একাধিকবার প্রশ্ন করছিলেন, আনোয়ার, এ রকম খারাপ ফলাফল কীভাবে হয়? তোফায়েল আহমেদ কীভাবে হারে? আমি বললাম মোট ভোটে দুই দলের পার্থক্য তো খুবই সামান্য। এই সামান্য ভোট পার্থক্য নিয়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিএনপির বিজয় তো কোনো হিসাবেই মিলছে না। রসিকতা করে বললাম, হারুন ভাই, (তার খুব বিশ্বস্ত পিএস ছিলেন এবং বিএনপির কড়া সমর্থক ছিলেন। স্কুল জীবনে আমাদের সিনিয়র ভাই ও নামকরা ক্রীড়াবিদ ছিলেন) হয়তো বলতে পারবেন।গোপালগঞ্জে থানা পাড়ার বাসায় পৌঁছানোর পর দেখলাম সিপিবির সম্পাদক আমার মামা আবু হোসেন সিপিবির ২০-২৫ জনসহ অপেক্ষা করছেন। আর ডিসি এসপিসহ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা আছেন। আমরা বসে আছি কিন্তু তেমন কোনো লোকজন আসে না। অথচ এই থানা পাড়ায় একসময় প্রতি ঘরে ছাত্র ইউনিয়ন ছিল। কলেজ সংসদে ছাত্র ইউনিয়ন জয়লাভ করত। কিন্তু অধিকাংশই একটা সময়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। নারী অধিকার কর্মী হিসেবে নানি গোপালগঞ্জে জনপ্রিয় মুখ ছিলেন। এদের সবাই একবার হলেও নানির হাতের খাবার খেয়েছেন। এরা অনেকেই আমার মামাদের স্কুল কলেজ জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু কেউ আসছে না। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা অতিক্রান্ত হওয়ার পর হঠাৎ দেখি গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু ভাইয়ের (আসলে সম্পর্কে মামা) নেতৃত্বে অনেকটা মিছিল আকারে ৪০০-৫০০ জন উপস্থিত হলেন। সেখানে আমার পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন ছিলেন। তারা আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে বললেন, প্রায় ৪৫ মিনিট যাবত নেত্রীর সঙ্গে তর্ক বিতর্ক হলো। তার কড়া নির্দেশ আবু সাইদ উপস্থিত থাকলে কেউ জানাজায় যেতে পারবা না। অনেক তর্কাতর্কীর পর তিনি বললেন, ‘পরিস্থিতি অনুযায়ী যা ভালো মনে হয় করো, তবে আমার সায় নেই।’ ধারণা করলাম ট্রমাচ্ছন্ন না হলেও ভারসাম্যের সমস্যা হয়েছে। অবশ্য বিএনপি সরকারের সঙ্গেও সাঈদ সাহেবের দিন ভালো যায়নি। কয়েকটি উপনির্বাচনে তার ভূমিকা পছন্দ না হওয়ায় আইনি মারপ্যাঁচে তার বেতন বন্ধ করে দেয়া হয়। যতদিন ছিলেন, বেতনবিহীন ছিলেন। এ দায়িত্ব থেকে বিদায় নিয়ে ড. কামাল হোসেনকে দিয়ে মামলা লড়ে বকেয়া বেতন আদায় করেন।এতক্ষণ বললাম শুধু আমার ব্যক্তিগত পারিবারিক অভিজ্ঞতা। শেখ হাসিনার বিগত শাসনকালে যা ঘটেছে তাতে এ সব ঘটনা তো অতি তুচ্ছ। বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে তিন তিনটি নির্বাচনের চেয়েও ভয়ানক সব ঘটনা হলো গুম-খুন। একটা উদাহরণই যথেষ্ট। নারায়নগঞ্জের ত্বকী হত্যা গোটা দেশের বিবেককে নাড়া দিলেও, ওসমান পরিবার বাদে দল, মত নির্বিশেষে মেয়র আইভীসহ গোটা নারায়ণগঞ্জবাসী এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করলেও খুনিরা শেখ হাসিনার প্রশ্রয়ে ওসমান পরিবারের ছত্রছায়ায় নির্বিঘ্নে ছিল। এ রকম ঘটনা তো একটি দুটি নয়। খুন হওয়া, গুম হওয়া পরিবারগুলোর অসহায়ত্ব মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে, সমাজের মাঝে ধীরে ধীরে বারুদ জমা হচ্ছিল। সামান্য অ্যাকাউন্টস ট্রিটমেন্টের ভ্রান্তিকে ব্যবহার করে বেগম জিয়াকে কারাগারে প্রেরণ এবং কথায় কথায় তাকে ‘এতিমের টাকা চোর’ বলে অপমান করা শেখ হাসিনার একটি রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়— যা মানুষ ভালোভাবে নেয়নি, প্রতিহিংসা হিসেবে বিবেচনা করেছে। খালেদা জিয়াকে ছোট করতে যেয়ে নিজেই ছোট হয়েছেন।এ সব কাজই শেখ হাসিনার ট্রমাটাইজড হওয়ার পরিণতি। নির্বাচনী পরাজয়ে ট্রমাচ্ছন্ন না হলেও ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার পর থেকে তিনি ট্রমাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এক-এগারোর সময়ে তার দলের গোটা সিনিয়র নেতৃত্ব সহ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতারা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তিনি পুরোপুরি ট্রমাটাইজড হয়ে যান। এরপর ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পরে তিনি মনে করেছিলেন ক্ষমতাই তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। ইতিহাসের পাঠ থেকে শিক্ষা না নিয়ে এই ক্ষমতাকে কুক্ষীগত রাখার জন্য তিনি ন্যায়-অন্যায় করে গিয়েছেন তার বিবেচনামতো। তিনি কাউকেই বিশ্বাস করতেন না। স্তুতি বাক্য ছাড়া ভিন্ন কিছুই তিনি সন্দেহের চোখে দেখতেন। আমার এক রাজনৈতিক বন্ধু সাবেক সংসদ সদস্য, যিনি ১৪ দলের শীর্ষ নেতাদের একজন এবং শেখ হাসিনারও ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার বাসাও ছিল গণভবনের কাছাকাছি। জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই গণভবনে যেতেন। সরকার পতনের দিন পাঁচেক আগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সামনে বললেন, একটার পর একটা গ্যারিসন মিটিংয়ে একই আওয়াজ উঠছে যে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ করা প্রয়োজন। শেখ হাসিনা উত্তর দিলেন, এ সব বাজে খবর নিয়ে এখানে আসেন কেনো? তিনি ধারণা করতেন যে, তিনি অপরাজেয়।কোনো ক্ষমতাই অপরাজেয় নয়। রাজনীতি নীতির পাশাপাশি কৌশলের খেলাও বটে। ক্ষমতাকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনে অনেক সময় ক্ষমতা ছেড়েও দিতে হয়। ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ইন্দিরা গান্ধি আমলে জরুরি আইন জারী একটি বিতর্কিত এবং কালো অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে নির্বাচন ঘোষণার মাধ্যমে সেই কালো অধ্যায়ের অবসান ঘটে এবং ইন্দিরা গান্ধী ও কংগ্রেস দল নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। কংগ্রেস জিতেছিল মাত্র ১৫৩টি এবং হেরেছিল ১৯৭টি আসন। ইন্দিরা গান্ধী ও তার ছেলে সঞ্জয় গান্ধী উভয়েই পরাজয় বরণ করেছিলেন। পরাজয়কে মেনে নিয়ে ইন্দিরা গান্ধী জনসংযোগে নেমে পড়েন। ভুল স্বীকার করে সারাদেশে জনসংযোগে তার আওয়াজ ছিল— ‘মাফি মাংতি হু’। জনতার কাছে ক্ষমা চাওয়ার শিক্ষা হচ্ছে ১৯৮০ সালেই লোকসভা নির্বাচনে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি ক্ষমতায় ফিরে আসেন। রাজনীতির মাঠে তিনি পূর্বাপেক্ষা শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। আমরা তো এ সব পত্রপত্রিকায় পড়েছি। আর শেখ হাসিনা ওই সময়ে ভারতবর্ষে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকায় খুব কাছ থেকেই দেখেছেন। কিন্তু কী শিখলেন?আন্দোলনের নেতৃত্বে যে শক্তিই থাকুক কোটা আন্দোলনের ন্যায্য দাবি মেনে না নিয়ে তা দমন করতে যাওয়া কি সঠিক ছিল? তারপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে পুলিশ বাহিনী এবং তার দলের বাড়াবাড়িতে রক্তাক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পরেও তার সামনে সুযোগ ছিল— জনতার আদালতে দাঁড়িয়ে বলা, ‘মাফি মাংতি হু’ এবং নতুন করে জনতাকে পছন্দের সরকার বেছে নিতে সুযোগ করে দেয়া। সে পথে অগ্রসর না হওয়ায়, পরের ইতিহাস তো সবারই জানা। তিনি গেলেন এবং যাওয়ার আগে শুধু তার নিজ দল নয়, তার বিরোধী তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী বিকৃতি থেকে মুক্ত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ধারায় দেশকে অগ্রসর করতে চায় এমন সব শক্তির মুখেও চুনকালি মেখে তিনি গেলেন। আওয়ামী লীগকে ভারতে আশ্রয়পুষ্ট দলের বদনাম নিয়ে অনিশ্চয়তার গিরিখাতে ধুঁকতে হচ্ছে। আর দেশের বুকে এক উগ্র ধর্মান্ধ ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান হয়েছে। কিন্তু আজ অবধি তাদের কোনো অনুশোচনা নাই, নাই কোনো আত্মসমালোচনা।তবে যত বড় অপরাধই আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব করে থাকুক বাংলাদেশের ইতিহাসের গভীরে শিকড় প্রোথিত আছে ৭৫ বছরের পুরনো এই দলটির। রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে আওয়ামী লীগকে সহজে মুছে ফেলা যাবে না। কিন্তু যে ভুল তারা করেছেন তিন তিনটি নির্বাচন একতরফাভাবে করে, বিরোধীদের দমন পীড়ন করে, গণতন্ত্রকে সংকুচিত করে স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করে এবং জুলাই আন্দোলনে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করে— এর জন্য জনতার কাছে তাদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। তা নাহলে রাজনীতির মাঠে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা কঠিন হবে। আবার যে ধরনের প্রতিহিংসা মূলক বিচার চলছে তার বিপরীতে অভিযুক্তদের আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ করে না দিলে, জামিন পাওয়ার অধিকারকে মেনে না নিলে দেশে কিন্তু এক ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হবে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে তাকে ‘মজলুম’ বানানো হয়েছে। মজলুমের প্রতি কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের সহানুভূতি তৈরি হয়। তাই নির্বাচিত সরকারের উচিত হবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর যে স্থগিতাদেশ জারী আছে তা অবিলম্বে তুলে নেয়া এবং প্রতিহিংসামূলক বিচারের পরিবর্তে, শাসকদলের পছন্দমতো নয়, বরং সার্বজনীন ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা।রাজনীতিতে শেষ কথা না থাকলেও অনেকে এটা ধরেই নিয়েছেন শেখ হাসিনা তার জীবদ্দশায় বাংলাদেশে ফিরছেন না। দেশের রাজনীতিতে তার পুনরাগমন এবং ভবিষ্যতে দেশে ফিরতে পারার সুযোগ যথেষ্টই কম। তাহলে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন কি থেমে থাকবে? এই বয়সে প্রবাসে বসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আঁকড়ে রাখলে আওয়ামী লীগের ক্ষতিই করা হবে। কোনো নেতা বা নেত্রী, তা তিনি যত ক্ষমতাধরই হন না কেন, অপরিহার্য নন। আওয়ামী লীগের ভাগ্য নির্ধারণের ভার আওয়ামী লীগ কর্মীদের হাতে ছেড়ে না দিলে নেতৃত্বের এ সমস্যার সুরাহা হবে না।১৯৭৫ সালের ট্র্যাজেডি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব গঠনে একটি কেন্দ্রীক ভূমিকা পালন করেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হলো ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের কাছে পরাস্ত হয়ে, যাকে তিনি প্রতিপক্ষ হিসেবে কল্পনা করতেন তিনিই বাস্তবে ১৮ মাসের জন্য ক্ষমতায় আসীন হলেন। যদিও অ্যামনেস্টি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ‘এই বিচার ও সাজা কোনোটিই সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত হয়নি’, তারপরও ইউনূস আমলের প্রতিশোধমূলক বিচারে ফাঁসির আদেশ মাথায় নিয়ে তার এখন প্রবাস জীবন। রাজনীতি কখনও কখনও এমনই নির্মম! আর যে বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে এমনকি প্রধান বিরোধী দল হওয়া থেকেও দূরে রাখতে একের পর এক সাজানো নির্বাচনী আয়োজন করা হলো সেই বিএনপিই এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। ট্রমাচ্ছন্ন অবস্থা থেকে বের হওয়ার সুযোগ কই? তারপরেও আজ যখন রাস্তার দেয়ালে বিক্ষুব্ধ তরুণদের আঁকা তার বিকৃত ছবি দেখি, মনে প্রশ্ন জাগে- সেই ’৮২ সনের প্রথম দেখায় যে শেখ হাসিনাকে দেখেছিলাম সেই ছবি কেন হারিয়ে গেল!(সংবাদ-এর মতামত নয়, এটি লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা] 

বারুদের গন্ধে ঈদের চাঁদ: অস্থির বিশ্ব রাজনীতি ও মানবিকতার শাশ্বত আহ্বান

রমজান মাসের এক মাসব্যাপী আত্মসংযম ও সিয়াম সাধনার সমাপ্তিতে সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর দুয়ারে সমাগত হয় ঈদুল ফিতর। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং আত্মিক শুদ্ধি, সামাজিক সংহতি এবং মানবিক সহমর্মিতার এক গভীর ও ব্যঞ্জনাময় প্রতীক। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন আমরা ঈদের আনন্দ নিয়ে আলোচনা করি, তখন আমাদের চারপাশের পৃথিবী আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল, অস্থির এবং কণ্টকাকীর্ণ। বিশেষ করে ইরান, আমেরিকা এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ত্রিমুখী উত্তেজনা ও সংঘাতের ছায়া আজ গোটা মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের কিনারে দাঁড় করিয়েছে। এই টালমাটাল বৈশ্বিক বাস্তবতায় ঈদুল ফিতরের অন্তর্নিহিত চেতনা-শান্তি, ন্যায়বিচার এবং সাম্যের ডাকÑনতুন করে এবং আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।ঈদুল ফিতরের ধর্মতাত্ত্বক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তিটি নিহিত রয়েছে পবিত্র রমজানের কৃচ্ছসাধনের মধ্যে। রোজা কেবল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার বর্জন নয়, বরং এটি মানুষের নফস বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার এক কঠিন প্রশিক্ষণ। এই দীর্ঘ এক মাস মানুষ নিজের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অনাহারী মানুষের কষ্টকে অনুভব করতে শেখে। ইসলামের দৃষ্টিতে এই আত্মিক পরিশুদ্ধিই মানুষকে প্রকৃত মানবিক গুণাবলিতে ভ‚ষিত করে। ঈদ হলো সেই অর্জিত নৈতিক বিজয়ের এক সামষ্টিক উদযাপন। ঈদের নামাজ, ফিতরা আদায় এবং পারস্পরিক আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়, তা মূলত বিভেদহীন এক সমাজ গঠনেরই মহড়া।আজকের এই আনন্দ উৎসবকে যখন আমরা বৃহত্তর বৈশ্বিক ক্যানভাসে দেখি, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিষণ্ন ছবি। মধ্যপ্রাচ্য আজ এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমর্থন ও হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গাজা উপত্যকায় দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়, লেবানন সীমান্তে অস্থিরতা এবং লোহিত সাগরে উত্তেজনার কারণে লাখ লাখ মানুষের জীবন আজ বিপন্ন। যে শিশুটির হাতে আজ নতুন রঙিন জামা থাকার কথা ছিল, অনেক ক্ষেত্রে তার হাতে আজ একমুঠো ত্রাণের রুটি জোটে না। গাজা বা রাফাহর মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের ধ্বংসস্তূপের ওপর যখন ঈদের চাঁদ ওঠে, তখন তা আনন্দ নয়, বরং হারানো স্বজনদের জন্য দীর্ঘশ্বাস বয়ে আনে। সেখানে ‘ঈদ মোবারক’ ধ্বনি ছাপিয়ে বোমা হামলার ভয়ঙ্কর শব্দ আর ড্রোন হামলার আতঙ্ক মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই বৈশ্বিক হাহাকার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ঈদের প্রকৃত আনন্দ কেবল নিজের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হলো আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানো এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার সংকল্প গ্রহণ করা।ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা কেন্দ্রিক এই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব অনুভ‚ত হচ্ছে সুদূর উত্তর আমেরিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত। বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি তেল, যার বড় একটি অংশ উৎপাদিত ও পরিবাহিত হয় এই অঞ্চল দিয়ে। পারস্য উপসাগর বা হরমুজ প্রণালী যদি যুদ্ধের কারণে অচল হয়ে পড়ে, তবে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যমূল্য এবং পরিবহন খরচের ওপর। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই অস্থিরতা থেকে মুক্ত নয়। জ্বালানি বাজারের ওঠানামা আমাদের মতো দেশের মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষের ঈদ উদযাপনের বাজেটে টান পড়ে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য ঈদের সেমাই বা নতুন পোশাক আজ বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা ঈদের সাম্যের বার্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবুও এই সংকটের মাঝেও মানুষ যে হাসিমুখে একে অন্যের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেয়, সেখানেই লুকিয়ে আছে ঈদুল ফিতরের আসল মহিমা।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদুল ফিতর কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাড়ির টানে শহর থেকে গ্রামে ফেরার যে জনস্্রে আমরা প্রতি বছর দেখি, তা পৃথিবীর অন্য কোথাও বিরল। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, আধুনিক যান্ত্রিকতা সত্তে¡ও আমাদের পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক শেকড়ের টান কতটা শক্তিশালী। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত নগরীগুলো যখন ফাঁকা হয়ে যায়, আর নিভৃত পল্লী যখন উৎসবে মুখর হয়, তখন তৈরি হয় এক অনন্য মেলবন্ধন। এই যাতায়াত কেবল শরীরের নয়, বরং এটি আত্মার এক পুনর্মিলন।ইসলামী জীবনদর্শনে ‘যাকাতুল ফিতর’ বা ফিতরা আদায়ের বাধ্যবাধকতা ঈদের আনন্দকে সর্বজনীন করার একটি চমৎকার মাধ্যম। এটি কোনো দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি দরিদ্র মানুষের প্রাপ্য অধিকার। যখন সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দুস্থদের হাতে তুলে দেন, তখন সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়। আজকের চরম পুঁজিবাদী বিশ্বে, যেখানে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান আকাশচুম্বী, সেখানে ঈদের এই দানশীলতার সংস্কৃতি একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের অনুপ্রেরণা হতে পারে। বিশেষ করে প্যালেস্টাইন বা ইয়েমেনের মতো ক্ষুধার্ত জনপদের জন্য বৈশ্বিক যাকাত ও ফিতরা তহবিল হতে পারে জীবনরক্ষাকারী এক মাধ্যম।বিশ্বায়নের এই যুগে ঈদের রূপরেখাও পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমানে লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। মরুভ‚মির তপ্ত বালুচর থেকে শুরু করে ইউরোপের তুষারপাত-সবখানেই প্রবাসী ভাই-বোনরা ঈদ পালন করেন। তাদের কাছে ঈদ মানে একরাশ নস্টালজিয়া। প্রযুক্তির কল্যাণে ভিডিও কলে হয়তো পরিবারের সবার মুখ দেখা যায়, কিন্তু মায়ের হাতের সেমাইয়ের স্বাদ বা ছোটবেলার সেই পাড়া-বেড়ানো আনন্দ কি ডিজিটাল পর্দায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব? প্রবাসীদের এই ত্যাগ এবং দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈদের পরিধি ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে আজ বিশ্বময়।বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষতগুলোর একটি হলো শরণার্থী সমস্যা। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আজ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ নিজেও এই মানবিক সংকটের সরাসরি সাক্ষী। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে যখন ঈদের চাঁদ ওঠে, তখন তা আমাদের মানবিকতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। যুদ্ধের কারণে যারা নিজ ভ‚মি হারিয়েছে, তাদের জন্য ঈদ মানে কেবল একবেলা পেটভরে খাওয়ার স্বপ্ন। ঈদের শিক্ষা হলো মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানো। যদি আমরা আমাদের উৎসবের সময় এই নিঃস্ব মানুষগুলোর কথা ভুলে যাই, তবে আমাদের রোজা ও ঈদ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে।বর্তমান সময়ে অতি-ভোক্তাবাদ বা ‘কনজিউমারিজম’ ঈদের আধ্যাত্মিকতাকে কিছুটা হলেও গ্রাস করছে। ঈদের বাজার করা বা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা অনেক সময় উৎসবের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দেয়। দামি পোশাক বা বিলাসিতা নয়, বরং আত্মসংযম এবং বিনয়ই হওয়া উচিত ঈদের ভূষণ। আধুনিকতার এই জোয়ারে আমাদের মনে রাখা দরকার যে, ঈদের মূল সার্থকতা নিহিত রয়েছে অন্তরের পবিত্রতায়, বাইরের চাকচিক্যে নয়। যখন মধ্যপ্রাচ্যে মানুষ জীবন বাঁচানোর লড়াই করছে, তখন আমাদের অতি-বিলাসিতা হওয়া উচিত পরিমিত ও সংবেদনশীল।ঈদুল ফিতরের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ক্ষমা। দীর্ঘ এক বছরের রেষারেষি, মান-অভিমান এবং তিক্ততা ভুলে যাওয়ার দিন হলো ঈদের দিন। রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতার এই যুগে ক্ষমার সংস্কৃতি অত্যন্ত জরুরি। আমরা যদি ব্যক্তি পর্যায়ে একে অপরকে ক্ষমা করতে না শিখি, তবে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। ইরান, ইসরায়েল বা আমেরিকা-রাষ্ট্রনায়করা যদি একে অপরের প্রতি প্রতিহিংসা ত্যাগ করে সমঝোতার পথে হাঁটতেন, তবে আজ হাজার হাজার নিরপরাধ প্রাণ বেঁচে যেত। ঈদ আমাদের অন্তরকে প্রশস্ত করার এবং ঘৃণা ত্যাগের দীক্ষা দেয়।পরিবর্তনশীল ও অস্থির এই বিশ্বে ঈদুল ফিতর আমাদের জন্য একটি আশার প্রদীপ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকার যত গভীরই হোক না কেন, ত্যাগের পর আনন্দের সূর্য উদিত হবেই। রমজানের কঠোর সাধনা যেমন আমাদের ধৈর্য শেখায়, ঈদ তেমনি আমাদের সেই ধৈর্যের মিষ্টি ফল উপহার দেয়। আজকের অশান্ত পৃথিবীতে যেখানে সংঘাত ও ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে, সেখানে ঈদের সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বার্তা হতে পারে নিরাময়ের মহৌষধ। ঈদের সকালে যখন ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে সিজদাবনত হয়, তখন পৃথিবীর সব কৃত্রিম আভিজাত্য চূর্ণ হয়ে যায়। এই সাম্যই ইসলামের সৌন্দর্য এবং এটাই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। আমরা যদি ঈদের এই চেতনাকে কেবল একদিনের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছরের পাথেয় করতে পারি, তবেই পৃথিবীটা হবে বাসযোগ্য ও শান্তিময়।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

ভিডিও

সিঙ্গাপুরে পৌঁছেছেন হামজা-শামিতরা

এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের শেষ ম্যাচে অংশ নিতে ভিয়েতনাম থেকে সিঙ্গাপুর পৌঁছেছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল।আগামী ৩১ মার্চ স্বাগতিক সিঙ্গাপুরের মুখোমুখি হবে লাল-সবুজ প্রতিনিধিরা। দুই দলের জন্য এই ম্যাচের সমীকরণ ভিন্ন ভিন্ন।সিঙ্গাপুর এরই মধ্যে টুর্নামেন্টের মূল পর্বে খেলা নিশ্চিত করে ফেললেও বাংলাদেশের বিদায় আগেভাগেই নিশ্চিত হয়ে গেছে। এখন কেবল সম্মান বাঁচানোর লড়াইয়ে মাঠে নামবে জামাল ভূঁইয়া ও হামজা চৌধুরীরা।বাছাইপর্বের আগের ৫ ম্যাচে বাংলাদেশের অর্জন ৫ পয়েন্ট। ঘরের মাঠে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে প্রথম সাক্ষাতে ২-১ গোলে হেরেছিল লাল-সবুজের দল। ফিরতি লেগের এই ম্যাচে জয় পেলে বাংলাদেশের পয়েন্ট হবে ৮, যা এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের মিশনে একটি সম্মানজনক সমাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।এবারের বাছাইপর্বে অ্যাওয়ে ম্যাচে বাংলাদেশের রেকর্ড বেশ আশাব্যঞ্জক। ভারতের বিপক্ষে গোলশূন্য এবং হংকংয়ের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে অপরাজিত থাকার আত্মবিশ্বাস নিয়েই সিঙ্গাপুরের মাঠে নামছে দল।তবে মূল ম্যাচের আগের প্রস্তুতিটা মোটেও ভালো হয়নি বাংলাদেশের। সিঙ্গাপুর সফরের আগে ভিয়েতনামের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিলো হামজা-শামিতরা। হ্যানয়ে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছে ক্যাবরেরার শিষ্যদের। এই হার দলের মানসিকতায় কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।সব ছাপিয়ে এখন মূল আলোচনায় স্প্যানিশ কোচ হ্যাভিয়ের ক্যাবরেরার ভবিষ্যৎ। আগামী এপ্রিলে বাফুফের সঙ্গে তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।গুঞ্জন রয়েছে, সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচের ফলের ওপরই নির্ভর করছে তার চুক্তি নবায়ন। ক্যাবরেরা নিজে বাংলাদেশে কাজ চালিয়ে যেতে আগ্রহী হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গ্যালারিতে ফুটবল ভক্তদের ক্ষোভের মুখে আছেন তিনি। সমর্থকদের বড় একটি অংশ তাকে আর কোচের পদে দেখতে রাজি নয়। ফলে সিঙ্গাপুর মিশন কেবল দলের সম্মান রক্ষার নয়, বরং কোচের গদি টিকিয়ে রাখারও কঠিন এক পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে।

সিঙ্গাপুরে পৌঁছেছেন হামজা-শামিতরা
১৭ মার্চ ২০২৬, ০৩:১৬ পিএম
এবার বাংলাদেশে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর কবে হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

এবার বাংলাদেশে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর কবে হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

  ২০ মার্চ ২০২৬
  ২১ মার্চ ২০২৬
  নিশ্চিত নই
মোট ভোটদাতাঃ ১২ জন