সংবাদ
তামাকের নীল বিষে বিপন্ন তারুণ্য

তামাকের নীল বিষে বিপন্ন তারুণ্য

চার কোটিরও বেশি মানুষ আসক্ত ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস তামাক ও ধোঁয়ায় ৭ হাজারেও বেশী ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে মেট্রোরেলের নিচে নামলে তামাকের দোকান বন্ধের দাবি মৃত্যুদূতের ছদ্মবেশ ও দুই আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত আত্মহননএকটি জ্বলন্ত কাঠি, এক টুকরো সাদা কাগজ, আর তার ভেতরে মোড়ানো কিছু শুকনো পাতা। প্রথম প্রথম এটি হয়তো শুরু হয় নিছক কৌতুহল, বন্ধুদের প্ররোচনা, কিংবা কৈশোরের অহেতুক খেয়ালিপনায়। কেউবা আবার নিসঙ্গতা দূর করতে, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কিংবা আধুনিকতার ভুল চিন্তায় মগ্ন হয়ে দুই আঙুলের ফাঁকে তুলে নেয় এই মৃত্যুবান। কিন্তু এই সাময়িক ভালো লাগার আড়ালে যে কত বড় অন্ধকার লুকিয়ে আছে, তা যখন একজন তামাকসেবী বুঝতে পারেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।তামাক আজ কোনো সাধারণ নেশা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুদূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রতিদিন আমাদের চারপাশে কতশত তরুণের স্বপ্ন, সম্ভাবনা আর তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে এই তামাকের নীল বিষে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।রবিবার দেশব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হলো ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’। প্রতিবছরের মতো এবারও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে দিবসটি উদযাপন করেছে। এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি’।এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখেই দেশজুড়ে তামাক বর্জনের নানা উদ্যোগ, প্রচারণা, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, আইন আর প্রচারণার আড়ালে তামাকের মরণ থাবা দিন দিন আরও বিস্তার লাভ করছে।তামাকের আদি ইতিহাস ও এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত রসায়নতামাক মূলত একটি কৃষিজাত পণ্য, যা ‘নিকোটিনা টাবাকাম’ বা ‘নিকোটিনা রাসটিকা’ শ্রেণীভূক্ত উদ্ভিদ। যার পাতা, ফসল, শিকড়, ডাল বা যেকোনো অংশ বিশেষ তামাক হিসেবে মানুষ নানাভাবে ব্যবহার করছে। এর আদি উৎস সুদূর আমেরিকা হলেও আজ এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ কখনো ধোঁয়া তৈরি করে, আবার কখনো চিবিয়ে এই মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদানটি গ্রহণ করছে।বাংলাদেশের জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের তথ্য অত্যন্ত চমকপ্রদ ও ভয়াবহ। তামাক এবং বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়ায় ৭ হাজারেরও বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭০টি রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি মানুষের শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টিতে সক্ষম। এই বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে রয়েছে নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, বেনজোপাইরিন, ফরমালডিহাইড, অ্যামোনিয়া এবং পোলোনিয়ামের মতো বিপজ্জনক উপাদান।তামাকজাত দ্রব্যের মধ্যে ধোঁয়াযুক্ত ও ধোঁয়াবিহীন, দুই ধরনের তামাকই মানবদেহের জন্য সমান ক্ষতিকর। ধোঁয়াযুক্ত তামাকের মধ্যে রয়েছে সিগারেট, বিড়ি, চুরুট, পাইপ ও হুক্কা। অন্যদিকে, ধোঁয়াবিহীন তামাকের মধ্যে জর্দা, সাদাপাতা, গুল, নস্যি ও খৈনী অন্যতম। তামাকের এই বহুমুখী রূপ সমাজের সর্বস্তরে বিষ ছড়াচ্ছে।পরিসংখ্যানের ভয়ানক চিত্রআমাদের দেশে তামাক ব্যবহারের ব্যাপকতা চোখ কপালে তোলার মতো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪ কোটি ১৩ লাখের এক বিশাল অংশ কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করছে। এর মধ্যে ২ কোটি ১২ লাখ পুরুষ এবং ৭ লাখ নারী সরাসরি ধূমপান করছেন। অন্যদিকে, ধোঁয়াবিহীন চর্বণযোগ্য তামাক ব্যবহার করছেন ১ কোটি ২৫ লাখ পুরুষ এবং ১ কোটি ৩৪ লাখ নারী।সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, যারা নিজেরা ধূমপান করেন না, তারাও এর ভয়ানক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রে ১ কোটি ১৫ লাখের বেশি মানুষ প্রতিদিন পরোক্ষ ধূমপানের (সেকেন্ড হ্যান্ড স্মোকিং) শিকার হচ্ছেন।অর্থাৎ, অন্যের আনন্দের খেসারত দিতে হচ্ছে নিরপরাধ অধূমপায়ীদের। এই তামাক ব্যবহারের কারণে মানুষের হৃদরোগ, মস্তিষ্কে স্ট্রোক, পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস, ফুসফুসের ক্যান্সার, ফুসফুসে যক্ষ্মা, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, হাঁপানি এবং মুখের স্বরতন্ত্র, শ্বাসনালী বা খাদ্যনালীর ক্যান্সার হচ্ছে। এছাড়াও বিবর্ণ ও ক্ষয়প্রাপ্ত দাঁত, ক্ষতিগ্রস্ত মাড়ি, গর্ভবতী নারীদের সময়ের আগে সন্তানের জন্ম দেওয়া, কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়া কিংবা গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যুর মতো বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।ধ্বংসের মুখে খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের ভারসাম্যতামাক কেবল মানুষের শরীরই ধ্বংস করছে না, এটি গ্রাস করছে আমাদের প্রকৃতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও দেশের অর্থনীতিকেও। খাদ্য উৎপাদনের উর্বর জমিতে তামাক চাষ করার ফলে দেশে খাদ্য ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। জমিতে দীর্ঘদিন তামাক চাষের কারণে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা হ্রাস পায়।তামাক চাষে ব্যাপকভাবে রাসায়নিক সার ও বিপজ্জনক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদীর দু'ধারে তামাক চাষ করায় বর্ষাকালে সেই ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে সরাসরি নদীতে মিশে পানি দূষিত করছে। এর ফলে জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ছে।তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ আরও এক বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে। মাত্র এক টন তামাক পাতা পোড়াতে ও শুকাতে প্রয়োজন হয় প্রায় ৫ টন জ্বালানি কাঠ। এই বিপুল পরিমাণ কাঠ সংগ্রহের জন্য নির্বিচারে কাটা হচ্ছে বনের গাছপালা, যার ফলে দেশের বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।অর্থনীতিতে তামাকের নেতিবাচক প্রভাব ও কর বৃদ্ধির দাবিসিগারেট কেনা ও ধূমপানের কারণে দেশের অর্থনীতিতে এর এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতি বছর শুধু সিগারেট ক্রয়ের পেছনেই দেশের মোট উৎপাদনের শতকরা ১ ভাগ (১%) অর্থ অপচয় হয়। আর প্রতি বছর বিড়ি ক্রয়ের পেছনে ব্যয় হয় দেশের মোট জিডিপির জিরো পয়েন্ট ৪ ভাগ (০.৪%)।দেশে প্রতি বছর প্রায় ৮,০০০ কোটি শলাকা সিগারেট এবং প্রায় ৫,০০০ কোটি শলাকা বিড়ি উৎপাদিত হচ্ছে। এই বিশাল খরচের কারণে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় কমছে এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের বোঝা বাড়ছে। এই ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে দেশের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ লোক তামাকের ওপর উচ্চহারে কর বৃদ্ধি করার পক্ষে জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন।দুই আঙুলের ফাঁকে সিগারেট: তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গের গল্পঅনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষ আজ তামাকের নেশায় আসক্ত। বিশেষ করে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ধূমপানের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৈশোরের অহেতুক খেয়ালিপনা, বন্ধুদের চাপ, জীবনে কোনো ব্যর্থতা কিংবা একাকীত্ব থেকে রক্ষা পেতে অনেকেই অজান্তে সিগারেটের নেশায় জড়িয়ে পড়ে। কিছুদিন পর এই অভ্যাসই পরিণত হয় এক দুর্ভেদ্য দেয়ালে, যা ভাঙা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।ধূমপান দিয়ে মূলত তামাক সেবন শুরু হলেও পরবর্তীতে এই তরুণদের অনেকেই পর্যায়ক্রমে গাঁজা, চরস, ফেনসিডিল, হেরোইন এবং পেথিডিনের মতো মারাত্মক মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘ইয়াবা’ ট্যাবলেট নামক আরেকটি মাদক তরুণ সমাজকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছে।ধনী ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণদের কাছে ইয়াবা বেশ পরিচিতি পেলেও এর ভয়াবহ ক্ষতি ইতোমধ্যে অনেকের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে। যে তরুণ সমাজের আগামী দিনে দেশের হাল ধরার কথা, তারা আজ তামাক ও মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে নিজেদের সোনালী ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে।তামাক ছাড়লে শরীরে যে জাদুকরী পরিবর্তন ঘটেচিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক কখনো মানুষের বন্ধু হতে পারে না এবং সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে কোনো রোমাঞ্চ বা আধুনিকতা থাকতে পারে না। তবে আশার কথা হলো, একজন মানুষ যখনই তামাক বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন, তার শরীর অত্যন্ত দ্রুত ইতিবাচক সাড়া দিতে শুরু করে।বিশেষ করে ২০ মিনিট পর শরীর থেকে তামাকের প্রভাব কমতে শুরু করায় রক্তচাপ ও শিরার গতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। ৮ ঘণ্টা পর রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা একদম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমতে থাকে। ২৪ ঘণ্টা পর শরীর ক্ষতিকর কার্বন মনোক্সাইড থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়। ৪৮ ঘণ্টা পর রক্তে নিকোটিনের মাত্রা শূন্যে নেমে আসে, ফলে মুখ ও শরীরের তামাকের দুর্গন্ধ দূর হয়ে যায়।৭২ ঘণ্টা পর ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়ায় শ্বাসকষ্ট কিছুটা কমে এবং শরীরের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ১ থেকে ৯ মাস পর মানুষ স্বাভাবিকভাবে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে। ১ বছর পর হৃদরোগের বড় কোনো সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি একজন নিয়মিত ধূমপায়ীর তুলনায় অর্ধেক হয়ে যায়। ৫ বছর পর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি একজন অধূমপায়ীর সমপর্যায়ে নেমে আসে।১০ বছর পর ফুসফুসে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার ধূমপায়ীদের তুলনায় অর্ধেক হয়ে যায় এবং অন্যান্য ক্যান্সারের ঝুঁকিও হ্রাস পায়। ১৫ বছর পর হৃদরোগ ও ক্যান্সারের সামগ্রিক ঝুঁকি একজন সাধারণ অধূমপায়ীর মতো সমপর্যায়ে চলে আসে।তাছাড়া তামাক ত্যাগ করলে খাবারের আসল স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতি স্বাভাবিক হয়, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার মতো দৈনন্দিন কাজগুলো সহজেই করা যায়। তামাক পরিত্যাগকারীরা ক্রমাগত তামাক ব্যবহারকারীদের চেয়ে অনেক দীর্ঘায়ু লাভ করেন। এমনকি গর্ভবতী মায়েরা তামাক পরিত্যাগ করলে সুস্থ ও স্বাভাবিক ওজনের শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। তামাক ছাড়ার প্রথম ১ থেকে ৪ সপ্তাহ কিছু শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তি (উইথড্রয়াল সিম্পটম) থাকলেও ৭ থেকে ৮ দিনের মধ্যে এর অধিকাংশ উপসর্গ কেটে যায়।আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগের অভাব ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগদেশে তামাকের ব্যবহার কমাতে এবং এর বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করতে কঠোর আইন করা হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। তামাকের ক্ষতিকর দিকগুলো সিগারেটের প্যাকেটে বাধ্যতামূলকভাবে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হলেও আসক্তদের ওপর এর প্রভাব পড়ছে কম।রাস্তায় চলতে ফিরতে অনেকেরই হেটে হেটে সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে। এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সাধারণ পথচারীরা বলেন, "অনেকে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ে। সেই বিষাক্ত ধোঁয়া পেছনে থাকা অন্যদের মুখে-নাকে ঢোকে। এর প্রতিবাদ করলে উল্টো অনেকেই ক্ষেপে যান। রাস্তায় এভাবে প্রকাশ্যে ধূমপান করা পুরোপুরি বন্ধ হওয়া উচিত।"চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। একজন প্রখ্যাত বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ বলেন, "তামাকমুক্ত আইন আছে কিন্তু তা ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তামাকের কারণে ফুসফুস, মুখমণ্ডল ও শ্বাসনালীতে ক্যান্সারসহ নানা রোগ হয়। ধূমপানজনিত কারণে শ্বাসনালীতে স্থায়ী বাধা বা সিওপিডির মতো রোগ হয়। এই রোগগুলোর চিকিৎসা করে মানুষকে পুরোপুরি সুস্থ করা সম্ভব হয় না। তাই প্রথম কাজ হলো ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।"একই সুর মেলালেন একজন সিনিয়র মেডিসিন বিশেষজ্ঞও। তিনি বলেন, "ধূমপানকারী কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হলে তার অপারেশন এবং অপারেশনের পরবর্তীতে নানা জটিলতা দেখা দেয়। এর মধ্যে শ্বাসনালীতে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। এছাড়া ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, লিভার ও খাদ্যনালীতেও মারাত্মক সমস্যা হয়। এই ভয়ানক পরিণতি থেকে বাঁচতে হলে ধূমপান বন্ধ করার কোনো বিকল্প নেই।"বাংলাদেশের প্রচলিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও কঠোর শাস্তির বিধানতামাকের ক্ষয়ক্ষতি থেকে জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে বাংলাদেশ সরকার ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন’ প্রণয়ন করেছে। এই আইন অনুযায়ী, দেশের সব পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি এই আইন অমান্য করে এসব স্থানে ধূমপান করেন, তবে তিনি অনধিক ৩০০ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আইনের আওতাভুক্ত পাবলিক প্লেসগুলোর মধ্যে রয়েছে: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অফিস এবং বেসরকারি অফিস, গ্রন্থাগার, লিফট এবং আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্র, হাসপাতাল ও ক্লিনিক ভবন, আদালত ভবন, রেলওয়ে স্টেশন ভবন, বাস টার্মিনাল ভবন, যাত্রীদের অপেক্ষার নির্দিষ্ট সারি, সিনেমা হল, প্রদর্শনী কেন্দ্র, থিয়েটার হল ও বিপণী ভবন (শপিং মল), চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ রেস্তোরাঁ, পাবলিক টয়লেট, শিশু পার্ক, মেলা বা জনসাধারনের সম্মিলিতভাবে ব্যবহার্য অন্য যেকোনো স্থান।একইভাবে মোটর গাড়ি, বাস, রেল গাড়ি, জাহাজ, লঞ্চসহ সব ধরনের যাত্রীবাহী জনযানবাহনে ধূমপান নিষিদ্ধ। আইনের শাসন বজায় রাখতে পাবলিক প্লেস বা পাবলিক পরিবহনের মালিক, তত্ত্বাবধায়ক বা ম্যানেজারকে তাদের আওতাধীন এলাকা ধূমপানমুক্ত রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা যদি এই ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, তবে অনধিক ৫০০ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়াও নিজ নিজ নিয়ন্ত্রনাধীন স্থানে ‘ধূমপান হতে বিরত থাকুন, ইহা শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ সম্বলিত সতর্কীকরণ নোটিশ বাংলা ও ইংরেজিতে প্রদর্শন না করলে ১,০০০ টাকা দণ্ডের বিধান রয়েছে। ধূমপানমুক্ত এলাকায় কোনো ধরনের ছাইদানি (অ্যাশট্রে) রাখাও আইনত অপরাধ।বিজ্ঞাপন ও নাবালকদের কাছে বিক্রি নিষিদ্ধআইনে তামাকজাত দ্রব্যের যেকোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিজ্ঞাপন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তামাক ব্যবহারে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোনো প্রকার দান, পুরস্কার, বৃত্তি প্রদান, কোনো টুর্নামেন্ট বা খেলার আয়োজন করা কিংবা বিনামূল্যে নমুনা প্রদান করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই আইন লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব ৩ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।একই সঙ্গে, তামাকজাত দ্রব্যের মোড়ক বা প্যাকেটে কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ (৫০%) জায়গা জুড়ে ছবিসহ বিধিবদ্ধ সতর্কবাণী মুদ্রণ করা বাধ্যতামূলক। এই নিয়ম না মানলে অনূর্ধ্ব ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া হতে পারে। দেশের কোমলমতি শিশুদের সুরক্ষায় ১৮ বছর বয়সের নিচে কারো কাছে বা কারো দ্বারা তামাকজাত দ্রব্য বিপণন বা বিক্রয় করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই আইন অমান্য করলে অনধিক ৫,০০০ টাকা অর্থদণ্ড দিতে হবে। এই আইনের অধীনে কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা বারবার একই অপরাধ করলে, প্রতিবারের জন্য দণ্ডের পরিমাণ দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পাবে।তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত সরকারি টাস্কফোর্স ও তামাকমুক্ত থানাআইন বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল নিয়মিত জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে টাস্কফোর্সের সভা এবং দেশব্যাপী মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। আইন বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে কর্মকর্তাদের নিয়ে নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে।ধূমপানমুক্ত এলাকার পরিধি বাড়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০১০ সালের আগস্ট মাসে দেশের সব থানায় ‘ধূমপানমুক্ত সাইন বোর্ড’ স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে সারাদেশের প্রতিটি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদকে ধূমপানমুক্ত এলাকা ঘোষণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।এর ফলে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে সতর্কতামূলক নোটিশ প্রদর্শনের কাজ চলছে। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত ইউনিয়ন পর্যন্ত এই আইন ও আদেশের শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব হলে দেশ বহুলাংশে ক্যান্সারসহ তামাকজনিত মারাত্মক রোগ থেকে মুক্ত থাকবে।তামাকমুক্ত সমাজ গঠনে পরিবারের ভূমিকাই প্রধানআইন, মোবাইল কোর্ট কিংবা সরকারি প্রজ্ঞাপন দিয়ে সাময়িকভাবে তামাকের গতি কমানো গেলেও, একে সমাজ থেকে চিরতরে উপড়ে ফেলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো পরিবার।চিকিৎসা বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, তামাকের এই মরণ থাবা থেকে একজন তরুণকে সবার আগে ফেরাতে পারে তার নিজের পরিবার। অনেক পরিবারে দেখা যায়, বাবা বা বড় ভাইদের প্রকাশ্যে সিগারেট টানতে দেখে সন্তান বা ছোট ভাইয়েরা অনায়াসে এই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে। এভাবে একটি পুরো পরিবার পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সিগারেটের বিষাক্ত জালে জড়িয়ে যায়।তাই পরিবারের প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ সদস্যরা যদি একটু সচেতন হন এবং নিজেরা ধূমপান ত্যাগ করে কঠোর অবস্থান নেন, তবে পুরো পরিবারকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, তাদের মানসিক হতাশা বা নিঃসঙ্গতার সময়ে পাশে দাঁড়ানো এবং বন্ধুদের খোঁজখবর রাখার মাধ্যমেই তরুণ সমাজকে এই অন্ধকারের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তামাক নামক এই বৈশ্বিক মহামারি ও মৃত্যুদূতের মুখোশ উন্মোচন করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে আজ সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’ তখনই সফল ও সার্থক হবে, যখন দেশের প্রতিটি নাগরিক মন থেকে তামাককে ‘না’ বলবেন এবং প্রতিটি পরিবার হবে সম্পূর্ণ ধূমপানমুক্ত। দুই আঙুলের ফাঁকে জ্বলতে থাকা সিগারেটটি নিভিয়ে দেওয়ার এখনই সময়, কারণ এই আগুন শুধু তামাক পোড়ায় না, পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় একটি জীবন, একটি পরিবার এবং একটি দেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ।
৪ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

গতিশীলতা থেকে মৃত্যুঝুঁকি: ই-রিকশার সস্তা ব্যাটারির চড়া মাশুল

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা (যা ই-রিকশা বা ইজি-বাইক নামে পরিচিত) চলাচল করছে। বিশেষ করে ঢাকার মতো শহরগুলোতে এই যানবাহনগুলো লাখো মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। যানবাহনের সংখ্যাটি বিশাল হলেও, এই খাতটি এখনো বড় অংশ অনিয়ন্ত্রিত রয়ে গেছে। ফলে এর ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে।ধারণা করা হয়, বাংলাদেশের ৪০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রায় সবকটিতেই বর্তমানে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রস্তুতকারক থেকে শুরু করে কিছু সরকারি উদ্যোগও স্বীকার করে যে, এই খাতে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারিই প্রধান প্রযুক্তি।বাংলাদেশে ই-রিকশায় লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহারের মূল কারণ হলো এগুলো তুলনামূলক সস্তা এবং সহজলভ্য। দেশের রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ানো স্বল্পমূল্যের রিকশাগুলোর জন্য এটিই সবচেয়ে ব্যবহারিক পছন্দ। যদিও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে অনেক সুবিধা রয়েছে, তবুও কম প্রাথমিক খরচ এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর কারণে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারিই আধিপত্য বজায় রেখেছে।সাধারণত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আয়ু লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, প্রায় ৩ থেকে ৪ গুণ। লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির আয়ু সাধারণত ৩-৫ বছর হলেও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ১০ বছর বা তার বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ই-রিকশার লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির আয়ু সাধারণত ২ বছরেরও কম হয়। এর পেছনে প্রতিকূল অপারেটিং পরিবেশ, ত্রুটিপূর্ণ চার্জিং ব্যবস্থা এবং নিম্নমানের ব্যাটারি দায়ী। একটি ই-রিকশায় সাধারণত ৪ থেকে ৬টি ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। যদি আমরা লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির গড় আয়ু ৪ বছর ধরি এবং রিকশা প্রতি ৪টি ব্যাটারি হিসাব করি, তবে বছরে প্রায় ৪০ লাখ ব্যাটারি অকেজো হয়ে পড়ছে। বাস্তবে এই সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি।লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং বা পুনর্প্রক্রিয়াজাতকরণের চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। পিওর আর্থ এবং ইউনিসেফ-এর ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবহৃত লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির মাত্র ৩০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক বা বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে রিসাইকেল করা হয়। বাকি ৭০ শতাংশই অনিয়ন্ত্রিত এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে কোনো ধরনের নিরাপত্তা মান না মেনেই প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে।যখন ব্যাটারিগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে রিসাইকেল করা হয়, তখন এর প্রায় সবটুকু সীসা ধূলিকণা, ধোঁয়া এবং দূষিত বর্জ্যের মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা মারাত্মক দূষণ ঘটায়। বিপরীতে, নিয়ন্ত্রিত ও বৈধ উপায়ে রিসাইক্লিং করলে ৯৫ শতাংশের বেশি সীসা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, যা দূষণের হার ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনে।ইউনিসেফ-এর মতে, বাংলাদেশে আনুমানিক ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম এর বেশি, যা অনুমোদিত সীমার ওপরে। অনিরাপদ ব্যাটারি রিসাইক্লিং থেকে সৃষ্ট সীসা দূষণকে এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মনে করা হয়।পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর অধীনে সুনির্দিষ্ট বিধিমালা এবং এসআরও (SRO) জারি করা হলেও এর প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। স্থানীয় সরকারগুলোর কাছে প্রায়ই এই অনিবন্ধিত রিকশাগুলো নিয়ন্ত্রণ করার বা অবৈধ রিসাইক্লিং কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সক্ষমতা বা আইনি ম্যান্ডেট থাকে না। এছাড়া একটি কেন্দ্রীয় তদারকি ব্যবস্থা না থাকায় ব্যাটারি বর্জ্য নিরাপদে সংগ্রহ ও অপসারণ নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।সীসা দূষণ কেবল জনস্বাস্থ্য সমস্যাই নয়, এটি একটি বড় অর্থনৈতিক বোঝাও বটে। ইউনিসেফ ও পিওর আর্থ-এর তথ্যমতে, সীসা দূষণের ফলে বাংলাদেশে বার্ষিক প্রায় ১৫.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়, যার মূল কারণ উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং চিকিৎসা ব্যয়ের বৃদ্ধি। আনুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থা, নিরাপদ ব্যাটারি বিকল্প এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সীসা দূষণ রোধ করা গেলে তা কেবল স্বাস্থ্যই রক্ষা করবে না, বরং বিশাল অর্থনৈতিক সুফলও দেবে।ই-রিকশার অনিয়ন্ত্রিত প্রসারের ফলে সৃষ্ট সীসা দূষণ সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।প্রথমত, ক্ষতিকর ও অবৈধ রিসাইক্লিং বন্ধে বিদ্যমান ব্যাটারি অপসারণ বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি নজরদারি ও জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো জরুরি।দ্বিতীয়ত, সকল ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় এনে পৌরসভা বা স্থানীয় সরকার পর্যায়ে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।তৃতীয়ত, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার বিভাগের তত্ত্বাবধানে আনুষ্ঠানিক ও নিরাপদ রিসাইক্লিং অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।চতুর্থত, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি কমাতে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবর্তে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতো আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করতে হবে।সবশেষে, রিকশা মালিক, চালক এবং ব্যাটারি বিক্রেতাদের মাঝে সীসা দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে, যাতে একটি জনবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়। ই-রিকশার উত্থান মানুষের যাতায়াত সহজ করেছে এবং অনেকের জীবিকার সংস্থান করেছে, কিন্তু এটি একই সাথে একটি নীরব স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা তৈরি করেছে। এখনই যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে, যে যানবাহনটি আমাদের সাশ্রয়ী যাতায়াতের কথা ছিল, সেটিই হয়তো আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বিষ হয়ে দাঁড়াবে।

“সমঝোতার ইঙ্গিত না কৌশলগত বার্তা? ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় সতর্ক আশাবাদ”

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সাম্প্রতিক বক্তব্যে যে ইঙ্গিত মিলেছে—ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক সমঝোতা ঘনিয়ে এসেছে—তা প্রথম দর্শনে যতটা বড় “ব্রেকথ্রু” মনে হচ্ছে, বাস্তবে ছবিটা অনেক বেশি জটিল এবং কৌশলনির্ভর। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “there will be no nuclear weapons,” এবং দাবি করেছেন যে Iran এই বিষয়ে সম্মত হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির অভিজ্ঞতায় এমন সরল সম্মতি সচরাচর দেখা যায় না। বরং এখানে ভাষার সূক্ষ্ম ব্যবহার এবং ব্যাখ্যার জায়গা খোলা রাখাই বেশি সম্ভাব্য। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, কিন্তু একই সঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার ব্যাপারে তারা কখনোই স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ফলে ট্রাম্পের এই দাবি আসলে একটি রাজনৈতিক বার্তা—যার উদ্দেশ্য আমেরিকার অভ্যন্তরীণ জনমত এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের আশ্বস্ত করা।একই সঙ্গে ট্রাম্প যে কৌশলটি ব্যবহার করছেন, সেটি হল “deal এবং threat”—একদিকে তিনি বলছেন একটি “very good deal” খুব কাছাকাছি, অন্যদিকে সরাসরি ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক বিকল্পও প্রস্তুত রয়েছে। ইউনাইটেড স্টেটস-এর এই দ্বিমুখী অবস্থান নতুন নয়; এটি বহুদিনের পরীক্ষিত কূটনৈতিক চাপের পদ্ধতি, যেখানে আলোচনার দরজা খোলা রাখা হয়, কিন্তু একই সঙ্গে প্রতিপক্ষকে ভয়ের মধ্যে রাখা হয়। এর ফলে ইরান আলোচনার টেবিল ছাড়তে পারে না, আবার পুরোপুরি নিজের অবস্থান থেকেও সরে আসে না। এই টানাপোড়েনই আসলে বর্তমান আলোচনার মূল বৈশিষ্ট্য।তবে এই সমঝোতার প্রভাব শুধু ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। ইজরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো চাইছে স্থিতিশীলতা এবং সংঘাতহীন পরিবেশ। ফলে ট্রাম্পের এই বক্তব্য একধরনের বহুমুখী বার্তা—একদিকে ইজরায়েলকে আশ্বস্ত করা যে ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে আরব দেশগুলোকে বোঝানো যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে না। অর্থাৎ এটি শুধুমাত্র একটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনা নয়, বরং একটি আঞ্চলিক কৌশলগত সমীকরণের অংশ।অর্থনৈতিক দিকটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প যে “মাড়িটাইম রুটস ” পুনরায় সচল হওয়ার কথা বলেছেন, তা সরাসরি হরমুজ প্রণালীর সঙ্গে সম্পর্কিত—যেখান দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল পরিবাহিত হয়। ইরান-আমেরিকা উত্তেজনা কমে গেলে এই রুট নিরাপদ হবে, তেলের দামের উপর চাপ কমবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসতে পারে। তাই এই চুক্তি কেবল পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—এই আলোচনার মূল কারিগরি দিকগুলো এখনও অনির্ধারিত রয়ে গেছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা কী হবে, ইতিমধ্যে সমৃদ্ধ করা উপাদান কোথায় যাবে, এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের কাঠামো কীভাবে কাজ করবে—এই প্রশ্নগুলোর কোনও স্পষ্ট উত্তর এখনও সামনে আসেনি। এই বিষয়গুলো নিষ্পত্তি না হলে কোনও চুক্তিকেই কার্যকর বা দীর্ঘস্থায়ী বলা যায় না। ফলে “breakthrough” শব্দটি এখানে কিছুটা আগেভাগেই ব্যবহার করা হচ্ছে বলেই মনে হয়।সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে বলা যায়—একটি নিয়ন্ত্রিত আশাবাদ এবং কৌশলগত চাপের মিশ্রণ। আলোচনার অগ্রগতি আছে, কিন্তু চূড়ান্ত সমাধান এখনও দূরে। ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে রাজনৈতিকভাবে সাফল্যের বার্তা দিতে চাইছে, অন্যদিকে বাস্তবে কঠোর অবস্থান বজায় রেখে ইরানের উপর চাপ অব্যাহত রাখছে। এই দ্বৈত কৌশল কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কারা কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত এবং সেই ছাড় কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত করা যায় তার উপর।

ত্যাগের ঈদ, না প্রদর্শনের?

কোরবানির ঈদ মুসলমানদের জন্য শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি আত্মত্যাগ, সংযম, মানবতা ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের এক গভীর শিক্ষা। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই যুগ যুগ ধরে মুসলমানরা কোরবানির মাধ্যমে নিজেদের ভেতরের অহংকার, লোভ ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে বিসর্জনের শিক্ষা গ্রহণ করে এসেছে।কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উৎসব পালনের ধরনও বদলেছে। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি ব্যক্তিগত অনুভূতি ও ধর্মীয় অনুশীলনের ভেতরেও এক নতুন ধরনের প্রদর্শন প্রবণতা তৈরি করেছে। এখন কুরবানির ঈদ এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় গরুর ছবি, ভিডিও, লাইভ, দাম নিয়ে আলোচনা ও ব্যক্তিগত প্রদর্শনের নানা উপস্থাপনায়। কোথাও বিশাল আকৃতির গরুর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি, কোথাও “সবচেয়ে দামি গরু” কেনার গল্প, আবার কোথাও কোরবানির মুহূর্তকে রিল বানিয়ে প্রচার। প্রশ্ন জাগে কোরবানি কি ধীরে ধীরে ত্যাগের চেয়ে প্রদর্শনের উৎসবে পরিণত হচ্ছে?একসময় কোরবানির আনন্দ ছিল পরিবার ও প্রতিবেশীকে ঘিরে। বাড়ির উঠানে গরু আসত, শিশুরা আনন্দ করত, পরিবারের সবাই মিলে প্রস্তুতি নিত। কোরবানির মূল গুরুত্ব ছিল ভাগাভাগি ও সহমর্মিতায়। মাংসের একটি বড় অংশ দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হতো, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হতো। এখনো সেই চর্চা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তবে তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি বিষয় নিজেকে দৃশ্যমান করে তোলার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে যেন প্রতিটি অনুভূতিকেই “দেখাতে” হয়। কী খাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি, কী কিনছি- সবকিছুই প্রকাশের প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠেছে। কোরবানির ঈদও সেই সংস্কৃতির বাইরে নেই। অনেকে গরু কেনার আগেই পরিকল্পনা করেন কীভাবে সেটি ফেসবুকে উপস্থাপন করবেন। গরুর নাম, ওজন, দাম সবকিছু যেন সামাজিক মর্যাদার এক অলিখিত প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।অবশ্য সবাই প্রদর্শনের জন্য এমনটি করেন না। অনেকেই আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য ছবি দেন। কিন্তু সমস্যাটি তখনই তৈরি হয়, যখন ধর্মীয় একটি অনুশীলন সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। কারণ কোরবানির মূল শিক্ষা কখনোই বাহ্যিক আড়ম্বর নয়; বরং আত্মার পরিশুদ্ধি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” অর্থাৎ কোরবানির প্রকৃত মূল্য নিহিত রয়েছে মানুষের নিয়ত ও আত্মিক চেতনায়।আজকের সমাজে এই বিষয়টি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ওপর এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু যখন দেখে কোরবানির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে গরুর দাম, আকার বা সামাজিক মর্যাদা, তখন তার মনেও ধর্মীয় অনুশীলনের একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হতে পারে। সে হয়তো ভাবতে শুরু করে বড় কোরবানি মানেই বড় সম্মান। অথচ ইসলাম কখনো সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে প্রতিযোগিতা করতে বলেনি।এই প্রদর্শন সংস্কৃতির আরেকটি সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। সমাজে এখনো এমন বহু মানুষ আছেন, যারা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কোরবানি দিতে পারেন না। কেউ কেউ সামর্থ্য না থাকলেও সামাজিক চাপে পড়ে ঋণ করে কোরবানি দেন। কারণ আশপাশের মানুষের চোখে ছোট হয়ে যাওয়ার ভয় কাজ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন একের পর এক “বিলাসী কোরবানির” ছবি ভেসে আসে, তখন নিম্ন আয়ের মানুষের ভেতরে এক ধরনের মানসিক অস্বস্তি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।আমি দেখেছি, অনেক মানুষ সারা বছর শহরে সীমিত আয়ে কষ্ট করে জীবনযাপন করলেও কোরবানির ঈদে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান এক ধরনের সামাজিক প্রদর্শনের মানসিকতা নিয়ে। বড় একটি গরু কিনে গ্রামের মানুষকে দেখানো, আত্মীয়স্বজনের প্রশংসা পাওয়া কিংবা “তারা এখন বেশ ভালো অবস্থায় আছে” এই ধারণা তৈরি করার এক অদৃশ্য চাপ কাজ করে। অথচ সেই একই মানুষ হয়তো শহরে ফিরে সন্তানের টিউশন ফি, সংসারের খরচ কিংবা নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খান। অনেক সময় আত্মসম্মান রক্ষার জন্য মানুষ নিজের বাস্তব কষ্টটুকুও আড়াল করে রাখেন। প্রশ্ন হলো, এই অতিরিক্ত সামাজিক প্রতিযোগিতা কি সত্যিই কোরবানির চেতনার সঙ্গে যায়? যে উৎসব মানুষকে ত্যাগ, সংযম ও বিনয়ের শিক্ষা দেয়, সেটি যদি অন্যের চোখে নিজের অবস্থান প্রমাণের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে সেখানে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন থেকেই যায়। ধর্মীয় উৎসবের সবচেয়ে সুন্দর দিক হওয়া উচিত অন্তর্ভুক্তি ও সহমর্মিতা। কিন্তু যদি সেটি তুলনা, প্রতিযোগিতা ও আত্মপ্রদর্শনের জায়গায় চলে যায়, তাহলে তার মানবিক সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোরবানির ঈদের মূল শিক্ষা ছিল নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার মানসিকতা অর্জন। অথচ এখন অনেক সময় দেখা যায়, ত্যাগের চেয়ে প্রদর্শনের অংশটিই বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।ডিজিটাল সংস্কৃতি মানুষের মনস্তত্ত্বেও পরিবর্তন এনেছে। এখন “দেখানো” যেন এক ধরনের সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার উপায়। একটি ছবি কত লাইক পেল, কে মন্তব্য করল, কার পোস্ট বেশি ভাইরাল হলো এসব বিষয় মানুষের আত্মতৃপ্তির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে ধর্মীয় অনুভূতিও অনেক সময় ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতার জায়গা থেকে সরে এসে প্রকাশ্য সামাজিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে পড়ে।তবে এই বাস্তবতার মধ্যেও আশার জায়গা রয়েছে। এখনো বহু মানুষ নীরবে কোরবানি করেন, গোপনে সাহায্য করেন, দরিদ্র মানুষের ঘরে মাংস পৌঁছে দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রচার না করেও মানবিকতার চর্চা করে যাচ্ছেন। তারাই আমাদের মনে করিয়ে দেন কোরবানির আসল সৌন্দর্য শব্দে নয়, প্রদর্শনে নয়; বরং নীরব আন্তরিকতায়।আমাদের মনে রাখতে হবে, ইসলাম কখনো সৌন্দর্য বা আনন্দ প্রকাশকে নিষিদ্ধ করেনি। উৎসব মানুষ উদযাপন করবে, আনন্দ ভাগাভাগি করবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আনন্দ যদি অন্যের মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি করে কিংবা আত্মপ্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে সেখানে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন আছে।কোরবানির ঈদ মূলত মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দেওয়ার শিক্ষা দেয়। এটি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং নিজের অহংকার, লোভ, হিংসা ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে কোরবানি করার আহ্বান। সমাজে সহমর্মিতা, সাম্য ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য উপলক্ষ।হয়তো আমাদের আবার নতুন করে ভাবতে হবে আমরা কোরবানির মাধ্যমে কী প্রকাশ করতে চাই? নিজের সামাজিক অবস্থান, নাকি নিজের বিশ্বাস? আমরা কি মানুষের প্রশংসা অর্জনে বেশি আগ্রহী, নাকি স্রষ্টার সন্তুষ্টিতে?হয়তো তাই কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশে নয়, অনুভবে। ত্যাগের এই উৎসব আমাদের শিখিয়েছে বিনয়। শিখিয়েছে মানুষের পাশে দাঁড়াতে। শিখিয়েছে হৃদয়ের ভেতরকার অহংকারকে ভেঙে ফেলতে। তাই কোরবানির ঈদ যদি শুধুই সামাজিক প্রদর্শনের মঞ্চ হয়ে যায়, তাহলে তার আধ্যাত্মিক গভীরতা হারিয়ে যাবে।তাই কুরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশে নয়, অনুভবে।” সময়ের সঙ্গে সমাজ বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, উৎসব পালনের ধরনও বদলাবে। কিন্তু কোরবানির মূল চেতনা যেন না বদলায়। কারণ কোরবানির সবচেয়ে বড় শিক্ষা গরুর আকারে নয়, ছবির সংখ্যায় নয়, বরং মানুষের হৃদয়ের বিনয়ে।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক।

অনুপ্রবেশ ও নিরাপত্তা প্রশ্নে কেন্দ্রের পদক্ষেপ: অমিত শাহ-এর ঘোষণায় নতুন সমীকরণ

অনুপ্রবেশ, জনবিন্যাস এবং তার রাজনৈতিক প্রভাব এই ইস্যুটি বর্তমানে দেশের অন্যতম বিতর্কিত ও সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রের তরফে উচ্চস্তরীয় কমিটি গঠনের ঘোষণার পর এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিতশাহ-এর ঘোষণায় স্পষ্ট, কেন্দ্র এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক ভারসাম্য এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অনুপ্রবেশের ফলে জনসংখ্যার গঠন অস্বাভাবিকভাবে বদলাচ্ছে, যার প্রভাব আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদী-এর “ভিশন ডেমোগ্রাফি” ধারণার বাস্তবায়ন হিসেবেই এই কমিটি গঠনকে দেখা হচ্ছে। বিজেপির যুক্তি হল, দীর্ঘদিন ধরে কিছু রাজ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে অনুপ্রবেশ বেড়েছে, এবং এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।অন্যদিকে, বিরোধী শিবির এই পুরো বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছে। কংগ্রেসের বক্তব্য অনুযায়ী, জনবিন্যাস পরিবর্তনের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে সামনে এনে শাসক দল আসলে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়াতে চাইছে। তাদের অভিযোগ, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, বেকারত্ব বা মূল্যবৃদ্ধির মতো বাস্তব সমস্যাগুলি থেকে জনমানসের দৃষ্টি সরাতে এই ধরনের ইস্যু তুলে ধরা হচ্ছে। একই সুর শোনা গেছে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফেও। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল দাবি করেছে, “অনুপ্রবেশ” ইস্যুটি অনেক ক্ষেত্রেই অতিরঞ্জিত এবং এর মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। তাদের মতে, কেন্দ্র রাজ্যের উপর দায় চাপিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।বামপন্থী দলগুলি আরও কড়া ভাষায় এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, “ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ” একটি জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া, যাকে সরলভাবে অনুপ্রবেশের সঙ্গে যুক্ত করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। জন্মহার, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, শিক্ষা ও আর্থসামাজিক পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলিও জনসংখ্যার গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে, পর্যাপ্ত তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ছাড়া এই ধরনের সিদ্ধান্ত সমাজে বিভ্রান্তি এবং উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে এই ইস্যুর প্রভাব আরও গভীর। অসম বা ত্রিপুরার মতো রাজ্যে অনুপ্রবেশ নিয়ে বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন হয়েছে। ফলে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে সেখানে একাংশ সমর্থন করলেও, অন্য অংশ এটিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই দেখছে। একই সঙ্গে NRC বা ডিটেনশন ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে অনেকেই মানবাধিকার এবং আইনি জটিলতার বিষয়টিও তুলে ধরছেন।বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ বলছেন, “জনবিন্যাস পরিবর্তন” বিষয়টি অত্যন্ত বহুমাত্রিক এবং সংবেদনশীল। শুধুমাত্র অনুপ্রবেশকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বোঝা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক সুযোগের খোঁজে মানুষের স্থানান্তর, শহরায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি—সব মিলিয়েই জনসংখ্যার গঠন বদলে যায়। তাই তারা মনে করছেন, কেন্দ্রের গঠিত কমিটির কাজ হবে তথ্যনির্ভর ও স্বচ্ছ বিশ্লেষণ তুলে ধরা, যাতে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যায়।সব মিলিয়ে, অনুপ্রবেশ ও জনবিন্যাসের এই বিতর্ক এখন শুধুমাত্র প্রশাসনিক বা নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে। শাসক দল যেখানে এটিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে, বিরোধীরা সেখানে এটিকে রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। আগামী দিনে কেন্দ্রের কমিটির রিপোর্ট এবং তার ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, এই বিতর্ক কোন দিকে এগোবে এবং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে তার কী প্রভাব পড়বে।

ঈদুল আজহার সমাজবাস্তবতার অন্তর্গত পাঠ

বাংলাদেশে ঈদুল আজহা প্রতি বছর কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবে আসে না; এটি সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শ্রেণীবিন্যাস, পারিবারিক সম্পর্ক এবং নৈতিকতার একটি গভীর প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে শহর ও গ্রামজুড়ে শুরু হয় প্রস্তুতি, পশুর হাট জমে ওঠে, ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে, বাজারে বাড়ে ব্যস্ততা, পরিবারগুলোতে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। কিন্তু এই উৎসবের অন্তরালে এমন কিছু সামাজিক বাস্তবতা থাকে, যা আমাদের সমকালীন বাংলাদেশের গভীর সংকট, পরিবর্তন এবং সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসে। ঈদুল আজহা তাই কেবল আনন্দ, ভোজন বা ধর্মীয় আচার নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের সমাজকে নতুনভাবে দেখতে পারি।ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা নিহিত রয়েছে আত্মত্যাগের দর্শনে। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর আত্মসমর্পণ, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং প্রিয়তম বস্তুকে ত্যাগ করার মানসিকতা এই উৎসবের কেন্দ্রীয় বার্তা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আজকের বাংলাদেশে ঈদের এই আত্মিক শিক্ষা কতটা সামাজিক বাস্তবতায় প্রতিফলিত হচ্ছে? আত্মত্যাগ কি এখনও নৈতিকতার প্রশ্ন, নাকি ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠছে সামাজিক মর্যাদা ও প্রদর্শনের অংশ?বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের সঙ্গে ঈদুল আজহার চরিত্রও বদলেছে। গত দুই দশকে নগরায়ণ, প্রবাসী আয়, ভোক্তাশ্রেণীর বিস্তার এবং মধ্যবিত্তের জীবনধারার পরিবর্তন ঈদের সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করেছে। একসময় গ্রামে কোরবানির আয়োজন ছিল সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, এমনকি আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলোও সম্মিলিতভাবে অংশ নিত। এখন শহুরে জীবনে কোরবানি অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক, প্রতিযোগিতামূলক এবং সামাজিক প্রতীকের অংশ হয়ে উঠছে।বিশেষত শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে কোরবানির পশু এখন অনেক সময় ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও দেখা দেয়। পশুর দাম, ওজন, জাত, আকার কিংবা বিরলতা নিয়ে সামাজিক আলোচনার এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পশুর ছবি, দাম বা ‘বিশেষত্ব’ তুলে ধরা যেন নীরবভাবে একটি বার্তা দেয়—আমি কতটা সক্ষম। এখানে প্রশ্ন সম্পদের নয়; প্রশ্ন হলো ধর্মীয় অনুশীলন কি প্রদর্শনের সংস্কৃতির ভেতরে হারিয়ে যাচ্ছে? আত্মত্যাগের উৎসব যদি সামাজিক মর্যাদার প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়, তবে তার নৈতিক ভিত্তি কতটা অক্ষুণ্ন থাকে?তবে ঈদুল আজহাকে শুধুই ভোগবাদ বা প্রদর্শনের আলোকে দেখা অন্যায় হবে। কারণ বাংলাদেশে এই উৎসব এখনও সামাজিক সংহতি ও বণ্টনের অন্যতম শক্তিশালী উপলক্ষ। কোরবানির মাংস ভাগাভাগির যে সংস্কৃতি আছে, তা আমাদের সমাজে নৈতিক অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। বহু দরিদ্র পরিবার বছরের এই সময়টাতেই হয়তো প্রথম পর্যাপ্ত মাংস খাওয়ার সুযোগ পায়। নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর, গৃহকর্মী, বিধবা, একাকি বৃদ্ধ কিংবা অনিশ্চিত জীবনে থাকা পরিবারগুলোর জন্য ঈদুল আজহা এখনও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে।বাংলাদেশের সমাজে এখনও এক ধরনের নীরব মানবিকতা টিকে আছে। অনেক পরিবার প্রচার ছাড়া, সামাজিক স্বীকৃতি ছাড়া, নীরবে অসচ্ছল প্রতিবেশীদের ঘরে মাংস পৌঁছে দেয়। এই অদৃশ্য দয়ার চর্চাগুলোই প্রকৃতপক্ষে ঈদের সামাজিক সৌন্দর্য। এগুলো প্রমাণ করে যে ধর্মীয় অনুশীলনের গভীরে এখনও সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সহমর্মিতা কাজ করে।ঈদুল আজহার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মাত্রা হলো অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের বাস্তবতা। প্রতি ঈদে লাখো মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরে। কারখানার শ্রমিক, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অফিসকর্মী কিংবা নিম্নআয়ের নগরবাসী দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছিন্নতার পর পরিবারে ফিরে যায়। এই যাত্রা কেবল ভৌগোলিক নয়; এটি আবেগেরও প্রত্যাবর্তন। যারা বছরের বড় সময়টুকু নগরের ব্যস্ততা, নিঃসঙ্গতা ও অনিশ্চয়তায় কাটায়, তাদের জন্য ঈদ পারিবারিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ।নগরজীবনের একটি বড় বৈপরীত্য এখানেই—মানুষ আয় বাড়ায়, কিন্তু সামাজিক সম্পর্ক হারায়। বিশেষ করে ঢাকার ছাদঘেরা জীবন, ভাড়াবাড়ির সংকুচিত সম্পর্ক, বিচ্ছিন্ন পারিবারিক কাঠামো এবং ব্যস্ত পেশাজীবনের মধ্যে ঈদ এখনও মানুষকে সাময়িকভাবে সমাজে ফিরিয়ে আনে। গ্রামের বাড়ি হয়ে ওঠে পরিচয়ের জায়গা, শেকড়ের স্মারক এবং আবেগের নিরাপদ আশ্রয়।তবে ঈদুল আজহা বাংলাদেশের বৈষম্যকেও নগ্নভাবে দৃশ্যমান করে। সমাজের এক অংশ যেখানে বিপুল ব্যয়ে কোরবানি করে, সেখানে অন্য অংশ মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বৈষম্যের দৃশ্যমানতাকে আরও তীব্র করে। সমৃদ্ধ জীবনের প্রদর্শন অনেক সময় নীরবে বঞ্চিত মানুষের মনে অসমতা, কষ্ট কিংবা অস্বস্তির অনুভূতি তৈরি করে। ফলে উৎসব কখনও কখনও আনন্দের পাশাপাশি শ্রেণীগত ব্যবধানের অনুভূতিকেও জোরালো করে তোলে।এই বাস্তবতায় একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে— বৈষম্যময় সমাজে কোরবানির প্রকৃত অর্থ কী? যদি ঈদের শিক্ষা হয় ত্যাগ, তবে সেই ত্যাগ কি কেবল পশু কোরবানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি আধুনিক সমাজে এর অর্থ হতে পারে অপচয় কমানো, শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা, অভাবী আত্মীয়কে সহায়তা করা, কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি শক্তিশালী করা? হয়তো আজকের বাংলাদেশে কোরবানির গভীরতর অর্থ হলো— নিজের ভোগের কিছু অংশ ত্যাগ করে অন্যের মর্যাদা নিশ্চিত করা।ঈদুল আজহা নগর ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত সচেতনতারও পরীক্ষা নেয়। বিশেষত ঢাকার মতো বড় শহরে কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ড্রেন বন্ধ হওয়া, রক্ত ও বর্জ্যের কারণে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া কিংবা নাগরিক অসচেতনতা শহরের জীবনকে সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত করে। অথচ পরিচ্ছন্নতা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অংশ। তাই ধর্মীয় অনুশীলনের সঙ্গে নাগরিক দায়িত্ববোধের সংযোগও নতুনভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।একই সঙ্গে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সংস্কৃতিও ঈদের চরিত্র বদলে দিচ্ছে। এখন অনেকে অনলাইনে পশু কেনেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কোরবানির অর্থ পাঠান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কোরবানি সম্পন্ন করেন কিংবা অনলাইন দান কার্যক্রমে অংশ নেন। নতুন প্রজন্মের কাছে ঈদ ক্রমশ প্রযুক্তিনির্ভর ও সংগঠিত রূপ নিচ্ছে। তবে এর মধ্যেও মানবিক সম্পর্কের জায়গা যেন সংকুচিত না হয়, সেটিই বড় প্রশ্ন।নারীদের শ্রমের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের আনন্দের অন্তরালে বিপুল গৃহস্থালি শ্রম অনেক সময় নারীদের কাঁধেই গিয়ে পড়ে। রান্না, সংরক্ষণ, অতিথি আপ্যায়ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা—সবকিছু সামলাতে গিয়ে অনেক নারী উৎসব উপভোগের চেয়ে দায়িত্বের ভার বেশি বহন করেন। পরিবারকেন্দ্রিক আনন্দের কথা বলা হলেও গৃহস্থালি দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্ন এখনও প্রাসঙ্গিক।সবচেয়ে বড় কথা, ঈদুল আজহা এখনও বাংলাদেশের সমাজে সাময়িক সামাজিক সংহতি সৃষ্টি করতে পারে। সম্পর্কের দূরত্ব কমে, মান-অভিমান ভুলে অনেকে একত্রিত হয়, সামাজিক বিভাজন সাময়িকভাবে নরম হয়। রাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক চাপ, নগর নিঃসঙ্গতা এবং সামাজিক মেরুকরণের সময়ে এই সংহতির গুরুত্ব আরও বেশি।তবে উৎসবের মানবিকতা যদি তিন দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়, তবে তার সামাজিক শক্তি সীমিত থেকে যায়। গরিব মানুষের প্রয়োজন শুধু মৌসুমি সহানুভূতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি ন্যায়বিচার। শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজন কেবল ঈদের বোনাস নয়, সারা বছরের মর্যাদা। অভাবী মানুষের প্রয়োজন কেবল একদিনের মাংস নয়, টেকসই জীবিকার নিশ্চয়তা। ঈদের চেতনা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সামাজিক দায়িত্ববোধে রূপ নেয়।আজকের বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, নগর নিঃসঙ্গতা এবং বাড়তে থাকা বৈষম্যের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ঈদুল আজহা কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি নৈতিক আত্মসমালোচনারও সময়। আমরা কীভাবে উদযাপন করি, কীভাবে ভাগ করি, কীভাবে সহমর্মিতা দেখাই—এসব প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের ভবিষ্যৎ।ঈদুল আজহা আমাদের শেখায়—একটি সমাজ কেবল সম্পদ দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা এবং ভাগাভাগির সংস্কৃতির ওপর। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের ভেতরের অহংকার, লোভ, বৈষম্য এবং উদাসীনতাকে ত্যাগ করার আহ্বান। বাংলাদেশ যদি এই শিক্ষা ধারণ করতে পারে, তবে ঈদুল আজহা কেবল একটি উৎসব হবে না; এটি হয়ে উঠতে পারে আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের এক নৈতিক প্রেরণা।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

এআই যুগের বিপজ্জনক রূপান্তর

ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন রণক্ষেত্রে কোনো নতুন প্রযুক্তি কেবল একটি যন্ত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা, রাষ্ট্রের আচরণ এবং যুদ্ধের চরিত্র বদলে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে মেশিনগানকে অনেকে কেবল দ্রুত গুলি ছোড়ার একটি কার্যকর অস্ত্র বলে মনে করেছিল। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি ইউরোপের যুদ্ধনীতিকে বদলে দেয়। ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের কাদামাখা ট্রেঞ্চে একটি পুরো প্রজন্মের মৃত্যু সেই পরিবর্তনের নির্মম মূল্য হয়ে দাঁড়ায়। পারমাণবিক বোমার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। যুক্তি ছিল— এটি যুদ্ধ শেষ করবে। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল, তা হলো পৃথিবী প্রবেশ করল এক দীর্ঘ ভয়ের যুগে, যেখানে পরস্পরকে ধ্বংস করার সক্ষমতাই হয়ে উঠলো বৈশ্বিক স্থিতাবস্থার ভিত্তি। আজও বিশ্ব রাজনীতি সেই আতঙ্কের ছায়া থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। এখন মানবসভ্যতা আরেকটি পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এবার প্রযুক্তিটির নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এটি আর ভবিষ্যতের কোনো পরীক্ষামূলক ধারণা নয়; ইতোমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। বাস্তব মানুষের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্তে অ্যালগরিদম ভূমিকা রাখছে। কোন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হবে, কোন গাড়ি সন্দেহজনক, কোথায় সম্ভাব্য শত্রু লুকিয়ে আছে— এসব নির্ধারণে এখন এআই কাজ করছে মানুষের আগেই। প্রশ্নটা তাই আর এই নয় যে, এআই যুদ্ধ বদলে দেবে কি না? সেটি ইতোমধ্যেই বদলে দিচ্ছে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—আমরা কি বুঝতে পারছি যুদ্ধের চরিত্র কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে? এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এই পরিবর্তনের জন্য কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ আদৌ সম্মতি দিয়েছে কি?মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত ‘প্রজেক্ট মেভেন’-এর সূচনা হয়েছিল খুব বাস্তব একটি সমস্যার কারণে। আফগানিস্তান, ইরাক কিংবা সিরিয়ার মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন থেকে প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণ ভিডিও ও নজরদারি তথ্য আসছিল যে মানব বিশ্লেষকদের পক্ষে সেগুলো সামাল দেয়া কঠিন হয়ে উঠেছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, ভুল হতো, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে যেত। তখন ধারণা এল—মানুষের চোখের চাপ কমাতে কিছু কাজ এআইকে দেয়া হোক। মোটরসাইকেলের গতিবিধি শনাক্ত করা, সন্দেহজনক চলাচল পর্যবেক্ষণ করা কিংবা নির্দিষ্ট আচরণের ধরণ চিহ্নিত করার মতো কাজ যন্ত্র করবে, আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মানুষ। শুনতে বেশ যুক্তিসঙ্গত। ইতিহাসে প্রায় সব সামরিক প্রযুক্তিই এভাবেই শুরু হয়েছে—একটি সীমিত ব্যবহার এবং বাস্তবসম্মত একটি ব্যাখ্যা দিয়ে। কিন্তু প্রযুক্তির একটি নিজস্ব গতি আছে। একবার কোনো ব্যবস্থাকে কার্যকর বলে প্রমাণ করা গেলে সেটি দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। আজ পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এআই ব্যবহারের মাধ্যমে দিনে শত শত নয়, হাজার হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পর্যন্ত প্রকাশ্যে বলছে, ভবিষ্যতে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল যুক্ত হলে সেই সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বাড়তে পারে। সমস্যা এখানেই। একজন মানুষ হয়তো দিনে পঞ্চাশটি ছবি গভীর মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারে। কিন্তু যখন দিনে পাঁচ হাজার লক্ষ্যবস্তু বিশ্লেষণ করা হবে, তখন মানুষের ভূমিকা আসলে কতটুকু থাকে? ‘হিউম্যান ইন দ্য লুপ’ বা ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মানুষের উপস্থিতি’—এই পরিভাষাটি এখন অনেক সময় বাস্তব নিরাপত্তার নিশ্চয়তার চেয়ে রাজনৈতিক আশ্বাস হিসেবেই বেশি শোনায়। কারণ বাস্তবতা হলো, যখন গতি অত্যন্ত দ্রুত হয়ে যায়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নয়, বরং মেশিনের অনুমোদনদাতা হয়ে দাঁড়ায়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস একবার বলেছিলেন, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সক্ষমতা কখনোই কৌশলের বিকল্প নয়। এই কথাটি আজ আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, সেটি নিজে বলে দিতে পারে না— যুদ্ধের রাজনৈতিক লক্ষ্য কী, সেই লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে কি না, কিংবা যুদ্ধ আদৌ পরিস্থিতিকে ভালো করছে কি না। ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর যুদ্ধ চালিয়ে শেষ পর্যন্ত এই কঠিন বাস্তবতা বুঝেছিল। সামরিকভাবে অসংখ্য সফল অভিযান চালানো সম্ভব, কিন্তু তাতে রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত হয় না। এখন এআই সেই পুরনো ভুলকে নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনার ঝুঁকি তৈরি করছে। গতি ও নির্ভুলতাকে কৌশলগত প্রজ্ঞা বলে মনে হওয়ার এক বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানগুলো এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এআই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় কয়েক দিন থেকে কয়েক সেকেন্ডে নামিয়ে এনেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এর ফলে রাজনৈতিকভাবে কী অর্জিত হয়েছে? ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। আঞ্চলিক বাস্তবতায় নাটকীয় কোনো পরিবর্তনও আসেনি। অর্থাৎ প্রযুক্তি দ্রুত কাজ করেছে, কিন্তু কৌশলগত ফলাফল স্পষ্ট নয়। বেসামরিক মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। যুদ্ধের ইতিহাসে ভুল হামলা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এআই যুগে একটি ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটছে—মানবিক বিপর্যয়কে প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোনো স্কুলে হামলা হলে বা নিরীহ মানুষ মারা গেলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে, ‘অ্যালগরিদম ঠিকভাবে প্রশিক্ষিত ছিল কি না’ অথবা ‘ডেটা সঠিকভাবে লেবেল করা হয়েছিল কি না।’ এখানে মানুষের মৃত্যু যেন ধীরে ধীরে সফটওয়্যারের ‘বাগ’-এ পরিণত হচ্ছে। এই মানসিক পরিবর্তন অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ যুদ্ধের আইন, বেসামরিক সুরক্ষা কিংবা অনুপাত রক্ষার মতো নীতিগুলো হঠাৎ তৈরি হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং অসংখ্য মানবিক বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা থেকে এসব নীতির জন্ম হয়েছে। এগুলো দুর্বলতার প্রকাশ নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে টেকসই যুদ্ধ পরিচালনার ন্যূনতম শর্ত। তবে এআই ব্যবহারের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিও রয়েছে, যা অস্বীকার করা যায় না। ইতিহাসে যুদ্ধক্ষেত্রে ভুল তথ্য, ক্লান্তি এবং বিভ্রান্তির কারণে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা নিজেদের ˆসন্যদের ভুলবশত হত্যা করার ঘটনা বহুবার ঘটেছে। যদি এআই সত্যিই এসব ভুল কমাতে পারে, তাহলে সেটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হবে। প্রজেক্ট মেভেনের পেছনে কাজ করা অনেক সেনা কর্মকর্তা আসলে যুদ্ধকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও কম প্রাণঘাতী করতে চেয়েছিলেন। সমস্যা হলো, প্রযুক্তি খুব কম ক্ষেত্রেই নিজের মূল সীমার মধ্যে থাকে। শুরুতে যে এআই কেবল মোটরসাইকেল শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল, সেটিই ধীরে ধীরে আরও বড় সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে উঠছে। কোনো এলাকায় কতজন বেসামরিক মানুষ থাকতে পারে—এ ধরনের অনুমানেও এআই ব্যবহারের চিন্তা শুরু হয়েছিল। যদিও শুরুতে অনেক কর্মকর্তা দ্বিধায় ছিলেন, কারণ মেশিনের অনুমানের ওপর নিজের দায়িত্ব নিতে তারা প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দ্রুততার চাপ এবং সামরিক প্রতিযোগিতার মধ্যে সেই সতর্কতা শেষ পর্যন্ত কতদিন টিকে থাকবে?এই জায়গায় ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে। তাদের ‘ডেল্টা’ সিস্টেম যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য দ্রুত সমš^য় করতে সাহায্য করছে, কিন্তু চূড়ান্ত হামলার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি মানুষের হাতেই থাকছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি তথ্য সরবরাহ করছে, কিন্তু হত্যার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। এই মডেলটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, এআই ব্যবহারের একমাত্র পথ স্বয়ংক্রিয় হত্যাযন্ত্র তৈরি করা নয়। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা অবশ্য প্রযুক্তিগত নয়, রাজনৈতিক। এআই-নির্ভর যুদ্ধব্যবস্থা নিয়ে জনগণের মধ্যে কোনো বড় বিতর্ক হয়নি। কংগ্রেসে দীর্ঘ আলোচনা হয়নি। ভোটারদের জিজ্ঞেস করা হয়নি, তারা আদৌ এমন যুদ্ধব্যবস্থাকে সমর্থন করে কি না। ইতিহাস বলছে, প্রযুক্তি প্রায়ই গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার চেয়ে দ্রুত এগোয়। ড্রোন যুদ্ধও প্রথমে নীরবে বিস্তৃত হয়েছিল। পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক কাঠামো পরে এসেছে, প্রযুক্তি আগে। এআই সেই পুরনো ধারা আরও দ্রুত গতিতে পুনরাবৃত্তি করছে। সবশেষে প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়, মানুষের। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত কি ধীরে ধীরে অ্যালগরিদমের হাতে চলে যাচ্ছে? যুদ্ধ কি এমন এক যান্ত্রিক গতিতে পরিচালিত হবে, যেখানে রাজনৈতিক বিবেচনা, মানবিক দ্বিধা কিংবা নৈতিক চিন্তার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে? সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো— এই পরিবর্তনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ সিদ্ধান্ত নেয়নি। কোনো জনগণ ভোট দেয়নি। কিন্তু পরিবর্তন তবুও ঘটছে। আর ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, যুদ্ধের চরিত্র বদলে গেলে তার পরিণতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না; শেষ পর্যন্ত সেটি পুরো সভ্যতার ওপর প্রভাব ফেলে। [লেখক: প্রাবন্ধিক]

প্রবাসে ঈদ ও কোরবানি

মুসলিমদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবাদির মধ্যে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ অন্যতম। বাংলাদেশে যেদিন উৎসবটি পালিত হয়, আমরা যারা মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ বা সমসাময়িক ভৌগলিক দেশগুলোতে বসবাস করি তারা একদিন আগেই দিনটি পালন করি। এখানে সরকারি ভাবে দিনটি ছুটির আওতায় নেই বলে আমরা পরিবার পরিজন নিয়ে যারা আছি তারা আগে থেকেই স্বীয় কর্মস্থলের ডিপার্টমেন্ট প্রধানকে বলে ওইদিন অফ ডে বা হলিডের ব্যবস্থা করে থাকি। যারা একা আছেন তাদের বেলায় একটু ব্যতিক্রম। ঈদ বা কোরবানি নিয়ে খুব বেশি একটা মাতামাতি করতে তাদের দেখা যায়না। প্রবাসে কোরবানির ধরন একটু ভিন্ন রকমের। এখানে দেশের মতো হাটে গিয়ে দশটা পশু দেখে যাচাই বাচাই করে পছন্দমতো কোন গরু বা ছাগল কেনার বিশেষ কোন ব্যবস্থা নেই। আমি যেখানে বসবাস করি অর্থাৎ আয়ারল্যান্ডের কথাই ধরা যাক। এ দেশে অবস্থানরত মুসলিমরা সাধারনত দু’-তিনটি উপায়ে কোরবানি সম্পন্ন করে থাকেন। প্রথমত যারা ঝামেলা বিহীন ভাবে কোরবানি দিতে চান তারা স্থানীয় মুসলিম গ্রোসারি শপের সহায়তায় কাজটি সেরে ফেলেন। আমি যে এলাকায় আছি সেখানে বাঙালি ছাড়াও রয়েছে আফগানি, পাকিস্তানি ও মধ্যপ্রাচ্যের মালিকানা ভিত্তিক দোকান। এসব দোকানে প্রতি নামের জন্য একেকটি ভেড়ার দাম হিসেবে ১৮০ থেকে ২শ’ ইউরো ও গরুর জন্য ভাগ প্রতি ৩শ’ থেকে ৩৫০ ইউরো পর্যন্ত দেয়া হয়ে থাকে। দোকানের মালিক ফার্মে গিয়ে ভেড়া বা গরু জবাই করে নিয়ে আসবেন যা দু’একদিন পর বিলি করা হয়। যারা একটু সৌখিন বা যাদের হাতে সময় থাকে তারা বিভিন্ন খামার ঘুরে দেখেশুনে একটি গরু কোরবানি দিতে পারেন। তবে ওইসব খামারে গরু কেবল জবাই করা যায় কিন্তু আধুনিক পদ্ধতিতে ছোট করে কাটার কোন সরঞ্জমাদি নেই। ফলে কোরবানিকৃত গরুকে কেবল কয়েক টুকরো করে যে কোন একজনের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সেখানে বউ-বাচ্চাসহ সবাই অবস্থান করে। ফলে গরু কাটার পাশাপাশি সারাদিন চলে খোশগল্প ও সুস্বাদু খাবারের রসালো আয়োজন। এ পদ্ধতিতে কোরবানি সম্পন্ন করতে বেশ কায়িক পরিশ্রম হয় বটে, তবে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে নিঃসন্দেহে। কেউ কেউ আছেন যারা শারিরিক পরিশ্রমে রাজি নন। তারা যান ওইসব ফার্মে যেখানে গরু জবাইসহ মাংস কাটাকাটি ও ভাগাভাগিরও ব্যবস্থা করা যায়। এ পদ্ধতিতে নিজ হাতে মাংস কাটার আনন্দ থেকে যেমন বঞ্চিত হতে হয় তেমনি খরচও একটু বেশি পড়ে। তবে কোরবানিকে প্রাণবন্ত করে তোলার জন্য মাংস ভাগাভাগি করার আগেই যে কোন একজনের বাড়িতে কিছু মাংস পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে অবস্থানরত মহিলারা মিলেমিশে ধুমছে রাবান্না করতে থাকে। যা কিনা উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। একটি জিনিস না বললেই নয়। কোরবানির মাংসকে তিন ভাগ করে এক ভাগ গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার যে রেওয়াজ তা বাস্তবায়নের সুযোগ এ দেশে নেই। কারণ মাংস দেবার বা নেবার মতো কোন গরিব এখানে নেই। তবে পরিচিতদের মাঝে যদি কেউ কোন কারনে কোরবানি দেয়া থেকে বিরত থাকে তাদেরকে ব্যক্তিগত ভাবে কিছু মাংস দেয়া হয়ে থাকে। ঘুরে ঘুরে মাংস বিতরনের সময় বা পরিবেশ কোনটাই এখানে নেই। তাই গরিব মানুষের ভাগের মাংসের টাকাটা হিসেব করে দেশে পাঠিয়ে দিয়ে অনেকেই কোরবানিকে সহি করার চেষ্টা করে। কোরবানির পশুর চামড়া বা এর টাকা বিলিয়ে দেয়ারও কোনো সুযোগ এখানে নেই। কারণ চামড়ার কোনো টাকাই আমাদের হাতে আসেনা। চামড়া বিষয়ক টাকা নিয়ে খামার মালিককে এ পর্যন্ত কোন প্রশ্নও আমরা করিনি কিংবা তার কাছ থেকেও এ ব্যপারে কোন পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায়নি। বস্তুত মুসলিম নিয়ন্ত্রিত বা পরিচালিত তেমন কোন খামার আয়ারল্যান্ডে গড়ে না উঠায় এসব ছোটখাট সমস্যাসহ কোরবানি সম্পন্ন করতেও মাঝে মধ্যে বেশ বেকায়দায় পড়তে হয়। এ প্রসঙ্গে বছর কয়েক আগের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করা যায়। সম্ভবত ২০১৯ সাল। সাপ্তাহিক ছুটির দিন রোববারে ইদুল আজহা উদযাপিত হয়েছিল। ছুটির দিন থাকায় শত চেষ্টা করেও ওইদিন কোরবানি দিতে পারিনি। কারণ অফিস আদালতের মতো ওখানকার পশুর খামার গুলোও সাপ্তাহিক ছুটির আওতাধীন। আমরা যারা নিজ হাতে কোরবানির গরু জবাই করতে উৎসাহী ছিলাম তারা খামার মালিককে প্রতি গরু হিসেবে বেশ কিছু উপরি দেয়ার লোভ দেখানোর পরও রোববারে খামার খুলতে রাজি হয়নি। হেলথ ইন্সপেক্টরের অনুপস্থিতি ও হাইজিন গত বিবিধ সমস্যার কথা বলে আমাদের প্রস্তাবকে নাকোচ করে দেয়। বাংলাদেশের মতো এখানে যত্র তত্র গরু, মেষ, ছাগল এমনকি মুরগি পর্যন্ত জবাই করা যায়না। কিছু দিন আগে আমার এক প্রতিবেশি বন্ধুকেই মুরগি জবাইয়ের খেসারত হিসেবে ১৫০ ইউরো জরিমান দিতে হয়েছিলো। অগত্যা কি আর করা! ঈদের সারাটা দিন গোমড়া মুখ করে কাটাতে হয়েছিল। অবশ্যি পরদিন সবাই বউবাচ্চা নিয়ে ৪০-৫০ মাইল দূরের খামারে গিয়ে গরু কোরবানি দিয়ে নিজেরাই মাংস কেটে ভাগাভাগি করে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু ঈদের দিন কোরবানি দিতে না পারা কিংবা দেশীয় স্টাইলে কোরবানির মাংস না খেতে পারার বেদনা এখনও আমাকে পোড়ায়। প্রবাসে আমাদের ধর্মীয় উৎসবাদি পালনে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে বটে তবে এ উৎসবকে কেন্দ্র করে কোরবানির পশু বা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আচমকা বেড়ে যাবার কোন শঙ্কা নেই। সপ্তাহ খানেক আগে কথা হয়েছিল আমার বড় ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি কোরবানির গরু কেনা ও দ্রব্য মুল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে বেশ শঙ্কায় আছেন। বস্তুত এ শঙ্কা যে কেবল আমার ভাইয়ের একার তা নয়, দেশের অনেক সাধারন মানুষের। সাধারণত এসব দেশে ধর্মীয় বা যে কোন উৎসবাদির ক্ষেত্রে জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে দেয়া হয়। দোকানপাটে চলে বিশেষ মুল্যহ্রাস। অথচ আমাদের দেশে ঠিক উল্টো, যা খুবই দুঃখজনক। কোরবানি আমাদের জন্য ত্যগের বার্তা নিয়ে আসে। এ ত্যগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক আমাদের সমাজ, আমাদের দেশ তথা গোটা বিশ্ব। [লেখক: আয়ারল্যান্ড প্রবাসী কবি]

গরু নিয়ে রাজনীতি

দুই বাংলায় এবারের ঈদে আলোচিত বিষয় হলো গরু কোরবানি। ভারতের ক্ষমতাসীন সরকার গরুকে ‘গো-মাতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ফলে দেশটিতে গো-হত্যাকে অনেক ক্ষেত্রে অন্যায় হিসেবে দেখা হয়। তাই বিভিন্ন স্থানে গরু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যদিও বিষয়টি মূলত পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক, তবে তার আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মাবল¤^ীরা বিষয়টি ভালো চোখে দেখছেন না। অন্যদিকে কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের জন্য এটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছে বিজেপি। বিধানসভার দলনেতা নির্বাচিত হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি এখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার কয়েক দিন আগে একটি নির্দেশনা জারি করে। এতে বলা হয়, অনুমতি ছাড়া রাজ্যে কোনো গরু ও মহিষ জবাই করা যাবে না। এছাড়া গরুর বয়স কমপক্ষে ১৪ বছর হতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে এবার ঈদুল আজহার আগে অনেক মুসলিম গরু কেনা বন্ধ রেখেছেন। এতে সেখানকার হিন্দু গরু ব্যবসায়ীরাও বিপদে পড়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে বড় করা গরু বিক্রি করতে না পেরে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তবে যে গো-মাংস নিয়ে এত বিতর্ক, হানাহানি ও উত্তেজনা, সেই গো-মাংস রপ্তানিতে ভারতের অবস্থান বিশ্বে অন্যতম শীর্ষে। গোটা পৃথিবীতে যে পরিমাণ গো-মাংস রপ্তানি হয়, তার প্রায় ১৬ শতাংশ ভারত থেকে আসে। রাষ্ট্রসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক সমীক্ষা অনুযায়ী, গো-মাংস সরবরাহকারী দেশের তালিকায় ভারত তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ব্রাজিল প্রথম এবং অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় স্থানে। ভারতে গো-হত্যা ঠেকাতে কেন্দ্র সরকার কঠোর আইন চালু করেছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, পশুহাট বা পশুমেলায় বেআইনিভাবে পশুর মাংস বিক্রির অনুমতি দেয়া হবে না। তবে বিরোধীদের দাবি, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা মেনেই পশুহাটে বেআইনি মাংস বিক্রি বন্ধে নতুন আইন করা হয়েছে বলে সরকার দাবি করলেও সমালোচকদের মতে, এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। ক্ষমতায় আসার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গরুর মাংস রপ্তানির কড়া সমালোচনা করেছিলেন। তিনি কংগ্রেস আমলের এই বাণিজ্যকে ‘পিঙ্ক রেভল্যুশন’ বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তার শাসনামলে গরু ও মহিষের মাংস রপ্তানি প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে এই খাত থেকে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের ‘মুসলিম মিরর’ নামের একটি ওয়েবসাইটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটি প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ ৩০ হাজার টন গরু ও মহিষের মাংস রপ্তানি করে। এ থেকে আয় হয় প্রায় ৪৩০ কোটি মার্কিন ডলার। বৈশ্বিক মাংস বাজারে ভারতের অবস্থানও শক্তিশালী হচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম মাংস রপ্তানিকারক ব্রাজিলের পর ভারতের অবস্থান রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। ভারতের পরে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এই পরিসংখ্যান দেখায়, মাংস রপ্তানি ভারতের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। ভারতে রাজ্যভেদে গরু জবাই নিয়ে বিভিন্ন বিধিনিষেধ থাকলেও জাতীয়ভাবে একক কোনো আইন নেই। ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক শিথিল বিধির রাজ্যগুলো থেকে গরু সংগ্রহ করে রপ্তানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতাই এই খাতের সম্প্রসারণে বেশি ভূমিকা রাখছে। ভারতে বর্তমানে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ মহিষ এবং ৭ কোটি ৬০ লাখের বেশি গরু রয়েছে। ভারতে গরু বা মহিষের মাংস রপ্তানি কোনো একক ব্যক্তির হাতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো আল্লানা গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এস. আর. আল্লানা ও ফয়জান আল্লানা। এছাড়া আল কবির এক্সপোর্টস এবং আরও কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান এই খাতে সক্রিয়। ভারতের শীর্ষ মাংস রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘আল্লানা গ্রুপ’ দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে ৩০ কোটি রুপি অনুদান দিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে ভারত বিশেষ করে ইসলামি দেশগুলোতে হালাল মাংসের বাজার সম্প্রসারণের চেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় মহলেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতের মাংস রপ্তানি খাত, বিশেষ করে গরু ও মহিষের মাংস, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস। নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক বক্তব্যের পরও এই খাত গত এক দশকে টিকে থাকার পাশাপাশি আরও বিস্তৃত হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এত কিছুর পরও গরু নিয়ে ভারতের ক্ষমতাসীনদের কঠোর অবস্থানের কারণ কী? ভারতে প্রায় ২৬ কোটি মুসলমান বসবাস করে। দেশটিতে গরু ও মহিষের মাংসের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও ব্যাপক। বিশাল জনসংখ্যা ও প্রোটিনের চাহিদার কারণে এটি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যে পরিণত হয়েছে। এই চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় ছোট ও প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদিত গবাদিপশু থেকে। ভারতের অনেক রাজ্য কৃষিনির্ভর। এসব অঞ্চলে কৃষিকাজের পাশাপাশি গৃহস্থালি পর্যায়ে গরু পালন মানুষের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সমালোচকদের মতে, কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে গরু বিক্রি কমে গেলে ছোট খামারিরা বড় কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। তখন বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বড় করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে। এ কারণেই অনেকে মনে করেন, ধর্মীয় আবেগের আড়ালে এখানে অর্থনৈতিক স্বার্থও সক্রিয় রয়েছে। ভারতে গরু নিয়ে চলমান বিতর্ক তাই শুধু ধর্মীয় নয়; এর সঙ্গে রাজনীতি, অর্থনীতি, রপ্তানি বাণিজ্য এবং করপোরেট স্বার্থও গভীরভাবে জড়িত। [লেখক: উন্নয়নকর্মী]

অর্থনৈতিক আগ্রাসন: সংস্কৃতির বিপন্নতা ও অস্তিত্বের লড়াই

একটি জাতির সংস্কৃতি কেবল তার নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ—গীত, নৃত্য বা উৎসবের অলংকারিক আবরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রকৃত উৎস প্রোথিত থাকে সেই জাতির জীবনসংগ্রাম এবং উৎপাদন ব্যবস্থার সুগভীর মৌল কাঠামোর মধ্যে। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের দর্পণ সাক্ষ্য দেয় যে, কৃষিই ছিল তার প্রাণস্পন্দন ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। তবে সমকালীন বিশ্বে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের যবনিকা ঘটলেও এক সূক্ষ্ম ও সর্বগ্রাসী ‘অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ’ আমাদের গ্রাস করছে। এই প্রক্রিয়ার নিগূঢ় লক্ষ্য হলো— একটি জাতিকে তার স্বকীয় উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে বিচ্যুত করে পরনির্ভরশীল করে তোলা এবং নিজস্ব ঐতিহ্যকে হীনম্মন্যতার চশমায় দেখতে বাধ্য করা। মানব সভ্যতার ইতিহাসে আধিপত্য বিস্তারের কৌশল সর্বদা একরৈখিক থাকেনি। একদা যা ছিল উন্মুক্ত তলোয়ার আর কামানের গর্জন, কালক্রমে তা রূপান্তরিত হয়েছে সূক্ষ্মতর এক মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে, যাকে আন্তোনিও গ্রামসি ‘সাংস্কৃতিক হেজিমনি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই প্রক্রিয়ায় শোষক গোষ্ঠী কেবল ভৌগোলিক সীমানা দখল করে ক্ষান্ত হয় না, বরং তারা অবদমিত জাতির অবচেতন মনে এক প্রকার ‘স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি’ উৎপাদন করে। সাম্রাজ্যবাদের এই নব্য রূপটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এখানে শোষিত মানুষটি তার শিকলকে অলঙ্কার মনে করতে শেখে। যখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তার জীবনদর্শন, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাককে ‘আধুনিকতার মাপকাঠি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, তখন প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীগুলো নিজেদের অজান্তেই হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করে এবং নিজের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ‘অনগ্রসর’ মনে করে তা বর্জন করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শেকড় প্রোথিত থাকে অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের মধ্যে। কার্ল মার্ক্স বর্ণিত ‘ভিত্তি’ ও ‘উপরি কাঠামো’র সম্পর্কের দিকে তাকালে দেখা যায়, যখন কোনো জাতির উৎপাদন পদ্ধতি বদলে যায়, তখন তার সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গিও বদলে যেতে বাধ্য। বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির মেরুদণ্ড ছিল কৃষি। কিন্তু বর্তমান বিশ্বায়িত পুঁজিতন্ত্রের যুগে সেই কৃষিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে কৃষককে এক অন্তহীন পরনির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফলে সমাজব্যবস্থা ‘উৎপাদন’ থেকে সরে গিয়ে ‘ভোগবাদে’ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কনজ্যুমারিজমের প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষকে সৃজনশীল উৎপাদক থেকে নিষ্ক্রিয় ক্রেতায় পরিণত করা। আর এই পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটে আমাদের উৎসবে; যেখানে নবান্ন বা হালখাতা ছিল মাটির সঙ্গে মানুষের সংযোগ, সেখানে আজ ‘বার্থ ডে ’ বা ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’-র মতো কর্পোরেট দিবসগুলো প্রাধান্য পাচ্ছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্রিটিশ শাসক লর্ড মেকলে ভারতে ইংরেজি শিক্ষানীতি প্রবর্তন করেছিলেন এমন এক ‘বাদামী চামড়ার সাহেব’ শ্রেণী তৈরি করতে, যারা রক্তে ভারতীয় হলেও রুচি ও বুদ্ধিতে হবে ইংরেজ। আজ কয়েক দশক পরেও আমরা সেই ছায়া থেকে মুক্ত হতে পারিনি। এটিই হলো ফ্রাঞ্জ ফ্যানোন বর্ণিত কালো চামড়া ও সাদা মুখোশের সংকট। উপনিবেশবাদ যখন কোনো জাতির ওপর চেপে বসে, তখন সে সেই জাতির ইতিহাসকে বিকৃত করে তাকে আত্মবিস্মৃত করে তোলে। ফলে অবদমিত মানুষটি মুক্তি বলতে বোঝে শোষকের মতো হওয়াকে। এই মনস্তাত্ত্বিক খাঁচায় বন্দী হওয়ার ফলে আধুনিক বিশ্বে আমরা দেখছি এক ধরনের স্বেচ্ছাধীন দাসত্ব, যেখানে কোনো শেকল দৃশ্যমান নয়, কিন্তু চিন্তার স্বাধীনতা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। ভাষার প্রশ্নটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো যেমনটা দেখিয়েছেন, কোনো জাতির মনোজগৎকে উপনিবেশমুক্ত করতে হলে আগে তার ভাষাকে উপনিবেশমুক্ত করতে হবে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ঘর। যখন কোনো জাতি তার নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান বা উচ্চতর জ্ঞানচর্চা থেকে বিচ্যুত হয়ে বিদেশি ভাষার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সে আসলে তার পূর্বপুরুষদের জ্ঞানতাত্ত্বিক উত্তরাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান যুগে এই ‘ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম’ আরও তীব্রতর হয়েছে। অ্যালগরিদম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সময়ে পশ্চিমা মানদণ্ডকেই একমাত্র সত্য হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, ফলে আমাদের নিজস্ব মিথ, লোকগাথা, লোকসাহিত্য ও গ্রামীণ প্রজ্ঞাগুলো আধুনিক ‘স্মার্ট’ সংস্কৃতির ভিড়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বায়নের এই প্রক্রিয়ায় আর একটি ভয়াবহ দিক হলো ‘ম্যাকডোনাল্ডাইজেশন’। এর লক্ষ্য হলো বৈচিত্র্যময় পৃথিবীকে একটি একঘেয়ে একক বাজারে পরিণত করা। এই প্রক্রিয়ায় ছোট জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব পোশাক, আঞ্চলিক খাদ্যাভ্যাস এবং লোকসংগীতকে হয় বিলুপ্ত করা হচ্ছে, নয়তো ‘সাংস্কৃতিক পণ্য’ হিসেবে বাণিজ্যিকীকরণ করা হচ্ছে। আজ বাউল গান বা আদিবাসী নৃত্য তার আদি দ্রোহ এবং আধ্যাত্মিক গভীরতা হারিয়ে কেবল পর্যটন শিল্পের বিনোদনের উপাদানে পরিণত হয়েছে। সংস্কৃতির এই রূপান্তর আসলে এক প্রকার ‘ডি-কালচারাইজেশন’, যেখানে সংস্কৃতি তার যাপিত জীবনের সত্যতা হারিয়ে কেবল প্রদর্শনের বস্তুতে পরিণত হয়। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল হলো ‘অ্যালিয়েনেশন’ বা বিচ্ছিন্নতাবোধ। মানুষ যখন তার নিজের ঐতিহ্যকে অন্যের চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করে, তখন সে এক গভীর আত্মপরিচয় সংকটে নিমজ্জিত হয়। সে তার নিজের মাটির গন্ধে লজ্জা পায়, নিজের লোকজ ঐতিহ্যকে ‘খেত’ বা ‘অনগ্রসর’ মনে করে ঘৃণা করতে শেখে। এটিই হলো সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত বিজয়, যেখানে শোষিত নিজেই নিজের সত্তাকে অস্বীকার করে শোষকের প্রতিকৃতি হতে চায়। এডওয়ার্ড সাঈদ তার ‘ওরিয়েন্টালিজম’ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন কীভাবে পশ্চিমা জগত প্রাচ্যের এক কৃত্রিম এবং নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। সেই ভাবমূর্তি ভাঙতে হলে আমাদের ‘কাউন্টার-ডিসকোর্স’ বা পাল্টা বয়ান তৈরি করতে হবে। প্রতিরোধের এই লড়াইয়ে হোমি কে ভাবা’র ‘হাইব্রিডিটি’ বা সংকরায়ণ তত্ত্বটি আমাদের নতুন দিশা দেখাতে পারে। সাম্রাজ্যবাদ যখন তার সংস্কৃতি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়, তখন আমরা তাকে হুবহু গ্রহণ না করে আমাদের নিজস্ব ছাঁচে রূপান্তর করতে পারি। যেমন, পশ্চিমা বিজ্ঞানকে আমরা বর্জন করব না, বরং তাকে আমাদের গ্রামীণ কৃষি-প্রজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত করব। এই সমন্বয়ই হবে আমাদের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ। জ্ঞান-উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যখন আমরা আমাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটকে প্রাধান্য দেব, তখনই শুরু হবে প্রকৃত বিনির্মাণ। যখন আমরা বিদেশি ব্র্যান্ডের বদলে দেশজ শ্রমের ফসল বেছে নিই, তখন আমরা আসলে বিশ্বপুঁজির শৃঙ্খলকেই আঘাত করি। পরিশেষে, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ রুখতে হলে আমাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের লড়াইকে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সাংস্কৃতিক লড়াই মানে হলো নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মাটির সঙ্গে মানুষের নাড়ির টান বজায় রেখে নিজস্ব মৌলিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনে নিমগ্ন হওয়া। এটিই হলো এই সময়ের প্রধান রাজনৈতিক সংগ্রাম। আমরা যদি আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে শক্তিশালী করতে পারি, তবেই আমাদের উপরি কাঠামো বা সংস্কৃতি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। শিকড়চ্যুত এই উন্নয়ন আসলে এক প্রকার মরূকরণ; তাই মাটির গভীর থেকে রসদ সংগ্রহ করেই আমাদের ডালপালা মেলতে হবে বিশ্বের আকাশে। নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদাবোধের মেলবন্ধনেই রচিত হতে পারে উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বের প্রকৃত স্বাধীনতার ইশতেহার। এই সংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী এবং নিরন্তর, যেখানে প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি উৎসব হবে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ত্রিশাল কারিগরী কলেজ, ময়মনসিংহ]

ভিডিও আরও দেখুন

টাইব্রেকারে আর্সেনালকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী পিএসজি

২০১৬ সালে মিলান ফাইনালের পর ফুটবলপ্রেমীরা হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন যে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালও ৯০ মিনিটের বেশি স্থায়ী হতে পারে। এক দশক পর বুদাপেস্টের পুসকাস অ্যারেনায় উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল আবারও দেখল নির্ধারিত সময় পেরিয়ে অতিরিক্ত সময় এবং শ্বাসরুদ্ধকর টাইব্রেকার। শনিবার (৩০ মে) রাতে ইংলিশ ক্লাব আর্সেনালকে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপ সেরার মুকুট মাথায় পরল ফরাসি জায়ান্ট প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। ২০২৫ সালের আগপর্যন্ত একটি শিরোপার জন্য হাহাকার করা প্যারিসের ক্লাবটি এখন টানা দুটি ট্রফি জিতে ইউরোপীয় ফুটবলের রাজকীয় মঞ্চে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করল।ম্যাচের শুরুটা অবশ্য দুর্দান্ত ছিল গানারদের। খেলার মাত্র ষষ্ঠ মিনিটেই পিএসজি ডিফেন্ডার মারকিনিওসের একটি ক্লিয়ারেন্স আর্সেনালের লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ডের গায়ে লেগে চলে যায় কাই হাভার্টজের সামনে। সেই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জার্মান ফরোয়ার্ড বুলেট গতির শটে গোল করে আর্সেনালকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। পিএসজি গোলরক্ষক সাফোনভের তখন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। প্রথমার্ধের বিরতির ঠিক আগে হাভার্টজ নিজের দ্বিতীয় গোলটি প্রায় পেয়েই যাচ্ছিলেন, তবে মারকিনিওসের দৃঢ়তায় সে যাত্রা রক্ষা পায় পিএসজি।গত বছরের চ্যাম্পিয়ন দলের ১০ জন খেলোয়াড়কে নিয়ে মাঠে নামা পিএসজি শুরুতে গোল হজম করলেও অভিজ্ঞতার কারণে মোটেই আড়ষ্ট হয়ে পড়েনি। গোল পাওয়ার পর আর্সেনাল রক্ষণাত্মক কৌশলে চলে গেলে উসমান দেম্বেলে, ফ্যাবিয়ান রুইস ও দিজিয়ের দুয়েরা আক্রমণের ধার বাড়ান।দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। বিরতি শেষে মাঠে ফিরতে দুই মিনিট দেরি করায় এবং পরে সময় নষ্ট করার অপরাধে হলুদ কার্ড দেখেন আর্সেনালের ক্রিস্টিয়ান মস্কেরা। ম্যাচের ৬৫ মিনিটে এই মস্কেরাই বক্সে ঢোকা পিএসজির কাভারাস্কেইয়াকে ফাউল করে বসেন। পেনাল্টি থেকে নিখুঁত শটে গোল করে পিএসজিকে ১-১ সমতায় ফেরান উসমান দেম্বেলে।সমতায় ফেরার পর পিএসজির দাপট আরও বাড়ে। তবে কাভারাস্কেইয়ার শট পোস্টে লাগা এবং বারকোলার দুটি সহজ সুযোগ মিসের কারণে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে টিম্বার ও গিওকেরেস আর্সেনালের পক্ষে দারুণ কিছু সুযোগ তৈরি করলেও গোল করতে ব্যর্থ হন। ফলে খেলা শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে রূপ নেয়।টাইব্রেকারেও নাটকীয়তার শেষ ছিল না। আর্সেনালের দ্বিতীয় শট নিতে আসা এবেরেচি এজের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার পর পিএসজির নুনো মেন্দেসের শট ঠেকিয়ে দেন গানার কিপার দাভিড রায়া। ফলে প্রথম ৪ শট শেষে সমতা বিরাজ করছিল। তবে শেষ শটে পিএসজির লুকাস বেরালদো সফলভাবে জাল খুঁজে পেলেও আর্সেনালের ব্রাজিলিয়ান সেন্টারব্যাক গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস বল মারেন বারের ওপর দিয়ে।আর তাতেই ৪-৩ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করে রিয়াল মাদ্রিদের পর ইতিহাসের দ্বিতীয় দল হিসেবে টানা দুবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার অনন্য কীর্তি গড়ল পিএসজি।

টাইব্রেকারে আর্সেনালকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী পিএসজি
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৭৮ জন