সংবাদ
পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে মুখোশধারীদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে

পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে মুখোশধারীদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে

বিশৃঙ্খলার পেছনে সাধারণ শ্রমিকদের কোনো হাত নেইসড়ক-মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাগ্রেফতার শ্রমিকদের আইনি মুক্তির বিষয়টি দেখবে সরকারমজুরি বোর্ডের দ্রুত কাজ শুরু করার ঘোষণাপোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন ও সাম্প্রতিক অস্থিরতার পেছনে এক গভীর ষড়যন্ত্রের কথা প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্টভাবে মন্তব্য করেছেন, মুখোশধারী কিছু দুর্বৃত্ত সুকৌশলে পোশাক শ্রমিকদের এই আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে অহেতুক বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। সাধারণ শ্রমিক বা প্রকৃত শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে এই সহিংসতার কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাবি করেন।সোমবার সচিবালয়ে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘ পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাম্প্রতিক পরিস্থিতির নানা দিক তুলে ধরে বলেন, “পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সেখানে সাধারণ শ্রমিক কিংবা কোনো স্বীকৃত শ্রমিকনেতার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বরং কিছু মুখোশধারী ব্যক্তিকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে শ্রমিকদের এই আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করতে দেখা গেছে।”মন্ত্রী আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজপথে যে সহিংস আন্দোলনগুলো হয়েছে তার সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের কোনো সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। গত কয়েক দিনের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে, ওই মুখোশধারীদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ শ্রমিকদেরই জানমালের ক্ষতি ও তাদের মূল স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সার্বিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন সর্বাবস্থায় আলোচনার মাধ্যমে এবং শান্তিপূর্ণ সমঝোতার পথ ধরেই শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।আন্দোলনের এই উত্তাল সময়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া শ্রমিকদের বিষয়ে এক বড় আশার বাণী শুনিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনায় যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, সেইসব সাধারণ শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তির বিষয়টি সরকার আন্তরিকভাবে দেখবে।”এছাড়া বিগত আন্দোলন ও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনায় যারা আহত হয়েছেন, তাদের বিষয়েও যথাযথ ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেন।তবে একই সঙ্গে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়ে দেন, যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশের সড়ক-মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাবে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না এবং কঠোরতম আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তৈরি পোশাকশিল্প খাতের শ্রমিকদের বহুকাঙ্ক্ষিত ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য ইতিমধ্যে গঠিত মজুরি বোর্ড অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করবে বলে মন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।পরিশেষে, দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও শিল্পের স্বার্থে সব শ্রমিককে অবিলম্বে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার এবং কোনো ধরনের উসকানিতে পা না দিয়ে সড়ক-মহাসড়কে অস্থিরতা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
৩৮ মিনিট আগে

মতামতমতামত

আমি দেশপ্রেমিক, কিন্তু জাতীয়তাবাদী নই

সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হতে পারে যে ‘দেশপ্রেম’ (patriotism)  ও ‘জাতীয়তাবাদ’(nationalism)  এ দু’টো শব্দের অর্থ একই এবং তার দ্বারা একই কথা বোঝানো হয়। কিন্তু সেটি মোটেও সত্য নয়। আমি মার্কসবাদে দীক্ষিত একজন কমিউনিস্ট। আমি নিজেকে একজন ‘দেশপ্রেমিক’ বলে ভাবি, কিন্তু নিজেকে কখনোই একজন ‘জাতীয়তাবাদী’ বলে মনে করি না। কেন? এর কারণটি আমি এখানে সংক্ষেপে ব্যক্ত  করব।তার আগে, এ বিষয়ে যে ক্ষেত্রে গুরুতর ভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয় সেটি প্রথমে পরিস্কার করে নেয়া প্রয়োজন। আগেই বলেছি যে আমি ‘জাতীয়তাবাদী’ নই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ‘জাতীয়তাবাদ’ অথবা ‘জাতীয়তাবাদীদের’ প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি হলো শত্রুমূলক ও বৈরী। বরঞ্চ একথা আমি দৃঢ় প্রত্যয়ে বলবো যে—অনেক ক্ষেত্রেই, বিশেষতঃ একটি নিপীড়িত জাতির ক্ষেত্রে, জাতীয়তাবাদ প্রায়সই রাজনীতিতে ইতিবাচক এবং এমনকি কখনো কখনো প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করে। সুতরাং, এমন ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতি কমিউনিস্টদের মনোভাব যে বন্ধুসুলভ হবে সেটিই স্বাভাবিক। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে যেই সম্পর্ক গড়ে উঠতে পেরেছিল।কিন্তু এ তো গেলো জাতীয়তাবাদের প্রতি কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি কি হবে, সে বিষয়ে কথা। তার মানে কি তবে এই যে ‘কমিউনিস্ট’ আদর্শ ও ‘জাতীয়তাবাদের’ আদর্শ একই চরিত্রের? না! কারণ একটি হলো ভিন্ন আদর্শের প্রতি ‘দৃষ্টিভঙ্গির’ বিষয় এবং অপরটি হলো আদর্শগত ‘আত্মপরিচয়ের বিষয়। এই দু’টি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলার কারণে অনেক বিভ্রান্তির জন্ম হয়। ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রতি কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে যতো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই থাকুক না কেন, আদর্শগত আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে একজন কমিউনিস্ট কখনই ‘জাতীয়তাবাদী’ হতে পারে না। কেউ কেউ আবার বলছেন যে আমরা ‘জাতীয়তাবাদী’ নই ঠিকই, কিন্তু ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের মতো রণধ্বনি করে আমাদেরকে এখন লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পরতে হবে। কমিউনিস্টরা যেমন তাদের আত্মপরিচয়কে ‘জাতীয়তাবাদের’ দ্বারা চিহ্নিত করতে পারে না, তেমনি তারা তাদের সংগ্রামের মূল রণধ্বনিকে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দ্বারা নির্ধারণ করতে পারে না। কারণ তা হবে তার কমিউনিস্ট আত্মপরিচয় বিসর্জন দিয়ে ‘জাতীয়তাবাদী’ আদর্শ গ্রহণ করার মতো বিষয়।এবার তবে মূল কথায় ফেরা যাক। যেকোনো মানুষের জন্য দেশপ্রেম হলো একটি মহৎ গুণ। এটি হলো তার পরম গর্ব ও অহঙ্কারের বিষয়। নিজের জাতি ও নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসাই হলো দেশপ্রেম। দেশপ্রেমিক মানুষের স্বার্থবোধ ও চিন্তার পরিমণ্ডল ক্ষুদ্র ব্যক্তিসত্তার গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। ব্যক্তি ও পরিবারের সংকীর্ণ জগতকে অতিক্রম করে সে দেশ ও জাতির স্বার্থ ও সত্তার সাথে নিজেকে একাকার করে ফেলে। বিশ্ব জগতে সে তখন আর একক একটি ব্যক্তি মাত্র হয়ে থাকে না, সে হয়ে ওঠে সমষ্টির অঙ্গীভূত। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকের ক্ষেত্রে এই উত্তরণের প্রক্রিয়া ও সমষ্টি-বোধ তার স্বাভাবিক ধারায় তাকে পৌঁছে দেয় বিশ্ব মানবতার চেতনায়। এ কারণে তার নিজের দেশপ্রেম কখনোই অন্য আরেক ভিন্ন দেশ ও জাতির মানুষের দেশপ্রেমের বৈরী বা প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে না। সব জাতির মানুষের নিজ নিজ দেশপ্রেম হয়ে ওঠে একে অপরের পরিপূরক। একজন ‘প্রকৃত’ দেশপ্রেমিকের কাছে তার স্বদেশ ও স্বজাতি হয়ে ওঠে বিশ্বলোকের মহামানবের একটি অংশ, তারই সৌরভিত পুষ্পকাননের অন্যতম অলঙ্কার। দেশপ্রেমিকের স্বদেশ-প্রেমের স্বরূপ ঠিক এমনটাই।কবিগুরু তাই আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন—‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।’কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘জাতীয়তাবাদের’ তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি ছিলেন বিশ্ব-মানবের কবি। তিনি একইসাথে ছিলেন প্রবলভাবে দেশপ্রেমিক। কবিগুরু বলে গেছেন যে, ‘বিশ্ব-মানবের প্রতি ভালোবাসা-বোধের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যেমন কিনা প্রকৃত দেশপ্রেমের নিখুঁত স্ফুরণ ঘটতে পারে না, ঠিক তেমনি প্রগাঢ় দেশপ্রেমকে উপেক্ষা করে সত্যিকার মানবপ্রেম জাগরিত হতে পারে না।’স্বজাতি ও স্বদেশের প্রতি ভালোবাসাই হলো দেশপ্রেম। এখন প্রশ্ন হলো, এই স্বজাতি ও স্বদেশ ব্যাপারটি আসলে কী? এটা কি মানব জন্মের আদিলগ্ন থেকে মানবসত্তার অন্তর্গত একটি অন্তর্নিহিত উপাদান? নাকি তা ইতিহাসের ধারায় সুনির্দিষ্ট বাস্তবতায় আবির্ভূত একটি সামাজিক উপাদান? পরের কথাটি যদি সত্য হয় তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—কীভাবে ঘটেছে তার এই উদ্ভব?জাতিসত্তা-বোধ হলো ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা একটি উপলব্ধি, একটি চেতনা। বিস্তৃত ভূমণ্ডলে মানুষের উপস্থিতি বহুকালের। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষরা ক্রমে পরস্পরের সংস্পর্শে এসেছে, জীবন ধারণের প্রয়োজনে গোষ্ঠীবদ্ধ ও সমাজবদ্ধ হয়েছে। ইতিহাসের প্রত্যক্ষ প্রমাণ হলো এই যে, নানা উত্থান-পতন, বাঁধা-বিঘ্ন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত সত্ত্বেও মানুষ ক্রমাগতই একে অপরের নিকটবর্তী হয়েছে ও হচ্ছে। এই ক্রম-ধারাবাহিকতাতেই স্বজাতি-বোধের উদ্ভব। ইতিহাসের ধারাতেই নৃতত্ত্ব, ভূগোল ও প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলবায়ু ও আবহাওয়া, ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনাচার, অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থা— প্রভৃতি নানা উপাদানের যুগ যুগ ব্যাপী ধারাবাহিক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানব সমাজের পৃথক পৃথক গোষ্ঠীর মধ্যে নিজ নিজ স্বজাতি-বোধ গড়ে ওঠেছে। প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে এই নিবিড় বন্ধন সূত্রটি নাড়ির বন্ধনের মতোই তার জন্মলগ্ন থেকেই স্থাপিত হয়। এই স্বজাতি-বোধটা যেন তার মায়ের কোল, তার স্বাভাবিক শারীরিক-মানসিক আশ্রয়স্থল। নানা সূত্রের এক অদৃশ্য, কিন্তু বস্তুগত গাঁথুনি দ্বারা, স্বজাত্যবোধের এই অনুভূতি সৃষ্টি হয়।এই স্বজাতি-বোধের উৎপত্তি মানুষের ইচ্ছা নিরপেক্ষ। কিন্তু এই বোধের সৃজন অথবা তার পচন অনেকটাই নির্ভর করে একদিকে যেমন মানুষের নিজের উপর, তেমনি তা নির্ধারিত হয় স্বদেশ ও সমাজের চরিত্রের দ্বারা। চেতনায় এই স্বজাতি-বোধের গড়ে ওঠার ব্যাটারটি অগণন বাস্তব উপাদানের ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত এবং তা সময়ের পরিক্রমায় গভীরতর ভিত্তি পেয়েছে।এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় হলো— বিকাশের বৈচিত্রময়তার কারণেই একেকটি ভৌগলিক গণ্ডির মধ্যে বসবাসরত মানুষদেরকে নিয়েই পৃথক পৃথক স্বজাত্যবোধ বিকশিত হয়েছে। এভাবে জাতি-পরিচয় সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে নির্দিষ্ট ভৌগলিক এলাকার সাথে। রাজ্য-সাম্রাজ্যের ভাঙা-গড়া সত্ত্বেও জাতীয় আত্মপরিচয় নিয়ে পৃথিবীর একেকটি এলাকায় একেকটি জাতিসত্তার মানুষ যুগ যুগ ধরে বসবাস করেছে ও নিজ নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উদ্ভবের পর বিকাশ ঘটেছে জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। এভাবে স্বদেশ অনেকটা পরিমাণে একটি স্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক রূপ অর্জন করেছে। স্বজাতির চেতনার সাথে এভাবেই সংযুক্ত হয়েছে স্বদেশের অনুভূতি। “স্বজাতির” প্রতি নিবিড় আকর্ষণ ও ভালোবাসার আবেগ ক্রমেই রূপ পেয়েছে “স্বদেশের” প্রতি ভালোবাসায়। সেই ভালোবাসার নামই হলো দেশপ্রেম।কিন্তু এই স্বদেশ শুধু চিহ্নিত একটি ভূখণ্ড, তার গাছ-পালা, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, জলবায়ু-মৃত্তিকা প্রভৃতির সমাহারই কেবলমাত্র নয়। স্বদেশের শ্রেষ্ঠতম ও অমূল্য উপাদান হলো স্বদেশের মানুষ। স্বদেশের মানুষ নিয়েই স্বজাতির গঠন। তাই, দেশপ্রেমের প্রধান উপাদান, তার মর্মকথা হলো দেশের আপামর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশকে ভালোবাসতে হলে সর্বাগ্রে দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হয়।একটি দেশের সব মানুষ কিন্তু কোনো একক ও অখণ্ড সত্তা নয়। আদিম সাম্যবাদী সমাজের সময়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত মানবজাতির ইতিহাস হলো শ্রেণী বিভাজন ও শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। এক সময় সমাজ বিভক্ত ছিল মুষ্টিমেয় দাস মালিক ও অগণিত ক্রীতদাস— এই দুই শ্রেণীতে। তারপরে সমাজ বিভক্ত হয়েছে সামন্তপ্রভু ও ভূমিদাস অথবা প্রজাকুল হিসেবে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতেও সমাজে রয়েছে প্রধানত দুটি পরস্পর স্বার্থবিরোধী শ্রেণী— পুঁজিপতি ও শ্রমজীবী। রয়েছে শোষক শ্রেণী ও শোষিত শ্রেণী। শোষকরা মুষ্টিমেয়, হাতেগোনা গুটিকয়েক। শোষিতরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শোষক আর শোষিত— দু’পক্ষকেই একই সাথে ভালোবাসা যায় না। শোষিত মানুষকে ভালোবাসতে হলে যারা তাদেরকে শোষণ করে, সেই শোষকদের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। শোষক শ্রেণীর শোষণকে ঘৃণা করতে হয়।দেশপ্রেমের অভিপ্রকাশ যদি হয় স্বদেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা, তাহলে তার মূর্ত রূপ হতে হবে এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত দেশবাসীর প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু, সেই ভালোবাসা নিরর্থক ও নিষ্ফল—বন্ধ্যা হয়ে থাকবে যদি সেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী চিরদিন পুঁজিবাদের শোষণ জালে অর্থাৎ মজুরি-দাসত্বের শিকলে বাঁধা পড়ে থাকে। দেশৈর অগণিত মানুষের ওপর চলতে থাকা অমানবিক শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্যের জিঞ্জির মেনে নিয়ে দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। চলমান শোষণমূলক সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু থাকতে দিয়ে, সেই ব্যবস্থার গায়ে শুধু উপরভাসা সংস্কারের মলম লাগিয়ে মানুষের জীবন-জীবিকার যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা দিয়েও নির্ভেজাল দেশপ্রেম প্রদর্শিত হতে পারে না। প্রকৃত দেশপ্রেম দাবি করে শোষিত দেশবাসীর প্রতি ভালোবাসা এবং সেই ভালোবাসা দাবি করে শোষণমুক্তির সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা। তাই, প্রকৃত দেশপ্রেম স্বজাতি ও স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার তাড়নাতেই আমাদেরকে একই সাথে বিশ্ব মানবতার প্রতি উদার ভক্তি-শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় জাগরিত করে এবং সাথে সাথে শোষণমুক্তির সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে এবং এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। এসবই হলো প্রকৃত দেশপ্রেমের অন্যতম মর্মবাণী ও উপাদান। তদ্রুপ বিচারে আমি নিজেকে একজন দেশপ্রেমিক বলে বিবেচনা করি।এখন দেখা যাক, ‘জাতীয়তাবাদ’ কী? জাতীয়তাবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ যেখানে জাতীয় পরিচয়কে সামাজিক ঐক্যের সর্বোচ্চ ও শীর্ষরূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মতাদর্শে একথা ধরে নেয়া হয় যে, ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে এমন কিছু রয়েছে যার কাছে শ্রেণীস্বার্থ, শোষণ ব্যবস্থা থাকা-নাথাকা, সামাজিক বিভাজন জনিত স্বার্থবোধ—ইত্যাদি সবকিছু অধীনস্ত থাকে। তাছাড়া জাতীয়তাবাদী মতাদর্শকে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পটভূমি নির্বিশেষ স্থান-কালের বিবেচনার ঊর্ধ্বে, একটি অনাদিকালের জন্য স্থায়ী ভাবাদর্শ ও ব্যবস্থারূপে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।বস্তুত, জাতীয়তাবাদ ও জাতি-রাষ্ট্রের বিষয়গুলো মানব সভ্যতার ইতিহাসে তুলনামূলকভাবে নতুন সংযোজন। কালক্রমে, যখন মানব সমাজের পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটেছিল, তখন আর্থ-সামাজিক প্রয়োজনে স্বতন্ত্র স্বজাতি-বোধের উপাদানকে নতুন মাত্রিকতা ও গুরুত্ব দেয়াটা বিশেষভাবে প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল। এভাবে, ‘স্বজাতি-বোধের’ স্বাভাবিক উপলব্ধি উত্তরণ ঘটেছিল ‘জাতীয়তাবাদের’ মতাদর্শে। এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন জাতিকে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো।চার-পাঁচশ’ বছর আগেও রাজনীতি ও সমাজে জাতি-রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ভাবাদর্শ বলে তেমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। মানুষের স্বজাতি-বোধের। সাথে ভূ-রাজনীতির অথবা রাজনৈতিক আদর্শের কোনো শক্তিশালি ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না। রাজা-মহারাজারা যে ভূখণ্ড দখল করতে সক্ষম হতো, সেটাই হতো রাজ্যের (অর্থাৎ রাষ্ট্রের) ভূ-সীমানা ও ভৌগলিক গণ্ডি। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা দাস সমাজের ও সামন্তবাদী সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলার রাখার ক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় সৃষ্টি করত না। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা উদ্ভবের সাথে সাথে পুঁজির নিজস্ব স্বার্থেই বাজার দখল করা নিজ নিজ বাজার সংরক্ষণ এবং তা নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পুঁজিবাদের ‘বাজার-কর্তৃত্বের’ জন্য এই অন্তর্নিহিত তাগিদই জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের উন্মেষ ও জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব অনিবার্য করে তুলেছিল।  প্রথমাবস্থায় ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রগতিবাদী ভূমিকা ছিল সাধালণভাবে মুখ্য। কিন্তু স্থান-কাল-ভেদে এই ভূমিকা ক্রমেই ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিতে শুরু করেছিল। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতে উত্তরণের ক্ষেত্রে যেসব জাতি ও জাতি-রাষ্ট্র অগ্রবর্তী থাকতে সক্ষম হয়েছিল, তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়া জাতিগুলোকে পদানত করে সেখানে তাদের উপনিবেশ বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিল। এসব প্রভু-দেশ তাদের ঔপনিবেশিক শোষণ বিস্তারের জন্য জাতীয়তাবাদের মতাদর্শকে কাজে লাগিয়েছিল। এটি ছিল বৃহৎ শক্তির জাতীয়তাবাদ। আবার অন্যদিকে, পদানত ও ঔপনিবেশিক শাসনে আবদ্ধ জাতিগুলোর ক্ষেত্রে এই জাতীয়তাবাদী মতাদর্শই সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী বন্ধন মোচন করে স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ইতিবাচক আদর্শগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিল। তাই, এভাবে এবং আরো অন্য নানাভাবে “জাতীয়তাবাদের” দ্বিমুখী ভূমিকা ছিল বলে দেখা যায়।নির্দিষ্ট স্থান, কাল ও ঐতিহাসিক পটভূমিতে জাতীয়তাবাদের ইতিবাচক এবং এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে একটা প্রগতিশীল ভূমিকা ভাবাদর্শ হিসেবে জাতীয়তাবাদের নেতিবাচক ও এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল অভিঘাতের বিপদের আশঙ্কার কথাটিও ভালোভাবে হিসেবে রাখাটাও একান্তভাবে বাঞ্ছনীয়। জাতীয়তাবাদের কতগুলো নেতিবাচক দিক ও সম্ভাব্য বিপদের কথা আমি আবার এখানে উল্লেখ করছি।জাতীয়তাবাদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো জাত্যাভিমান। জাতি পরিচয়ই যে সহজাত কেন্দ্রিক বিষয়, এই তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠার জন্য এবং তার পক্ষে আরও শক্তকরণ তুলে ধরার জন্য অপর আরেকটি তত্ত্বও তার সাথে সাথে হাজির করা হয়। সেই তত্ত্ব হলো-‘জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্ব’। এ ক্ষেত্রে বলা হতে থাকলো যে, যেহেতু ‘আমাদের জাতিই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি’ তাই অন্যান্য ‘অনগ্রসর, অসভ্য জাতিগুলোকে মানুষ করার’ ইতিহাস প্রদত্ত দায়িত্ব এই শ্রেষ্ঠতর বা শ্রেষ্ঠতম জাতির দাবিদারদেরকে নিজেদের হাতে নিতে হবে। এই তত্ত্বের আলোকে একসময় বৃটিশরা ভারতীয়দেরকে ÒWhite mens burdenÓ  বলে আখ্যায়িত করতো। জাতীয়তাবাদের এহেন প্রয়োগ ঔপনিবেশিক মতবাদ ও ব্যবস্থাকে লালন করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছিল। জাত্যাভিমানের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রকাশ হলো ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ, জিয়নবাদ এবং অতি সম্প্রতি সৃষ্ট নয়া-ফ্যাসিবাদ, ‘সাদা মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব’ (White supremacy), America First  (সর্বাগ্রে আমেরিকা)  ইত্যাদি। এসবের অনুকরণে আমাদের দেশের বাঙালিদের মাঝেও জাত্যাভিমানের প্রকাশ দেখা যায়। তা দেখা যায় পার্বত্য এলাকার জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি, এবং এমনকি ভিন্ন কোনো তরিকার অনুসারী আউল-বাউল, মুরশিদ অনুগত সমতলের মুসলিম সম্প্রদায়, সংখ্যাালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি অনুসৃত দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে। জাত্যাভিমানে আচ্ছন্ন জাতি নিজের দোষ-ত্রুটি-দুর্বলতা-ঘাটতি-অপরাধগুলোকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে অন্ধ হয়ে থাকে, আর নিজের শক্তি-সামর্থ্য-ক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করে দেখে। ফলে, জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ও প্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে গিয়ে এরূপ জাত্যাভিমানে আচ্ছন্ন জাতি নানা সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং শেষমেষ অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়ে। জাত্যাভিমান থেকেই উৎসারিত হয় ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’। নিজ জাতির তথাকথিত স্বার্থরক্ষায় কোনো অন্যায় কাজকেই তখন আর অন্যায্য মনে করা হয় না। অন্য জাতির ওপর নিজ জাতির আধিপত্য চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে এই তত্ত্ব ও মতবাদের আশ্রয় নেয়া হয়। পৃথিবীতে জাতিতে জাতিতে সহ-অবস্থান ও শান্তি-ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ নষ্ট হয়।জাতীয়তাবাদের অন্যতম বড় বিপদ হলো তার অন্তর্নিহিত রক্ষণশীলতা। জাতীয় ঐতিহ্য ও জাতীয় ভাবধারা রক্ষার নামে নানা ধরনের বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও কূপমণ্ডূকতাকে সে লালন করে এবং উস্কে দেয়। জাতীয়তাবাদ এক ধরনের আত্মমুখীনতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার প্রবণতা ধারণ করে, যা কিনা বিশ্ব সভ্যতার অর্জন থেকে জাতির দূরত্বকে বাড়িয়ে দেয়। জাতীয়তাবাদ বিশ্ব সভ্যতার সাধারণ সর্বমানবিক ঐশ্বর্যময় সম্পদ থেকে আধার গ্রহণ করে স্বজাতিকে সমৃদ্ধ করার বদলে, ‘শ্রেষ্ঠ জাতির শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের’ নামে নিজের অতীত ও স্ব-গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখার প্রবণতা ধারণ করে। একটি জাতির মধ্যে তা ‘অতীতে ফিরে যাওয়ার’ (revivalism)  প্রবণতার জন্ম দেয়। এর ফলে, জাতি প্রগতিমুখীন না হয়ে রক্ষণশীল ও এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়ে।জাতীয়তাবাদ অন্ধ একমুখীনতা ও সংকীর্ণতাবাদী প্রবণতাও লালন করে। জাতীয়তাবাদ দাবি করতে চায় যে— সমাজের মধ্যে শ্রেণী বিভাজন, শ্রেণী সচেতনতা, ইতিহাস ও সমাজ রূপান্তরে শ্রেণীর ভূমিকা, শোষক ও শোষিতের মধ্যে মৌলিক অমোচনীয় দ্বন্দ্ব, শোষিত মানুষের ঐক্য, মানবিক ও শোষণমুক্ত নতুন সভ্যতা নির্মাণে বিশ্বের শ্রমিক সংহতি ও আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদি বিষয়গুলোর অন্যান্য সব বিষয়ের ঊর্ধ্বে এবং যা হলো সকলের কাছে সুপ্রিম গুরুত্ব সম্পন্ন বিষয়, তা হলো জাতির সার্বজনীন স্বকীয়তা।একট পর্যায়ে জাতীয়তাবাদ শ্রমিক শ্রেণীর শোষণমুক্তির সংগ্রামের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। এদেশেও আমরা বহু দিন ধরে দেখে এসেছি জাতীয়তাবাদী শক্তি কীভাবে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ সেøাগানের বিপরীতে ‘বাংলার মজদুর এক হও’ সেøাগান উত্থাপনের জন্য চেষ্টা করেছে। কিংবা তাদের মুখে অতীতে শুনেছি এবং বর্তমানে আবার খুব বেশি করে উচ্চারিত হতে শুনছি ‘শ্রমিক-মালিক ভাই-ভাই, বাঙালির একতার বিনাশ নাই’ ইত্যাদি ধরনের নসিহত। অন্যদিকে, বৃহৎ ও শক্তিমান জাতির ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ যে আগ্রাসী, আধিপত্যবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, উপনিবেশবাদী ও নয়া-উপনিবেশবাদী এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ফ্যাসিবাদী, নাৎসিবাদী, জিয়নবাদী, তালেবানি জঙ্গিবাদী, প্যান-ইসলামবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের চরম প্রতিক্রিয়াশীলতায় পর্যবসিত হতে পারে তা সমসাময়িক ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায়।এত তাত্ত্বিক কথায় না গিয়েও বাংলাদেশে ‘জাতীয়তাবাদের’ যে বাস্তব চেহারা আমরা দেখে চলেছি তা থেকেও এই আদর্শের স্বরূপ অনেকটাই স্পষ্ট হয়। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’— সেটা তো পাকিস্তানি ভাবাদর্শের একটি নরম সংস্করণ বৈ অন্য কিছু নয়। সে বিষয়ে বেশি আলোচনা না করলেও চলে। আর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ অনেক রকম ভূমিকাই আমরা দেখেছি, দেখে চলেছি। নিঃসন্দেহে একথা সত্য যে, বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় ও মুক্তিযুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আদর্শ ও জাতীয়তাবাদী শক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তার শীর্ষ পর্বে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এই জাতীয়তাবাদী শক্তির কোনো কোনো অংশ ’৭০-’৭১ সালেও হিটলারের মতো করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে বলে প্রচার চালিয়েছে, হিটলার রচিত ‘মেইন ক্যাম্ফ’ (আমার নেতা) বইটির আলোকে মতাদর্শ গ্রহণের ছবক দিয়েছে, আমেরিকা আমাদের স্বাধীনতার পাশে থাকবে বলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মোহগ্রস্ত থেকে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার সহায়তায় ‘স্বাধীনতা’ আনা যায় কিনা সেজন্য চেষ্টা করেছে। ইতিহাস এসব ঘটনার এবং এ ধরনের বহু ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে। সাম্রাজ্যবাদের মন যুগিয়ে চলার জন্য জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী বলে দাবিদার বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী, ব্যীক্ত পরস্পরের মধ্যে তাবেদারির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। আর মাঠে-ময়দানে বিভিন্ন ঘরানার জাতীয়তাবাদী নেতা-কর্মী-ক্যাডারদের বাস্তব কার্যকলাপ হিসেবে হালুয়া-রুটির ভাগবাটোয়ারা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, তদবিরবাজি, দখলবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে অসৎ পথে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদ-বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ-ইসলামী জাতীয়তাবাদ প্রভৃতির মধ্যে এবং তার প্রতিটির অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সমঝোতার খেলা চলছে। জাতীয়তাবাদীদের অব্যাহত খাই-খাই তৎপরতায় সাধারণ মানুষের জীবনে আজ নাভিঃশ্বাস উঠছে।ইতিহাসকে বিকৃত বা মুছে ফেলা যায় না। একথা ঠিক যে ‘জয় বাংলা’ মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ছিল। সাথে সাথে একথাও সত্য যে তা আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শের গর্ভ থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। এই রণধ্বনি দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং দেশবাসী তা গ্রহণ করেছিল। ১৯৭০ ও ১৯৭১ সাল ছিল মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত সম্পন্ন পর্ব ও তার তাৎক্ষণিক পূর্বের অধ্যায়। এই দুই বছর ‘জয় বাংলা’ যে আবেগের উৎস ছিল, একাত্তরের পর, স্বাধীন দেশের সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এই শ্লোগানকে ব্যবহার করে অনেক দুষ্কর্ম করেছে। ‘জয় বাংলা’-র সাথে ‘জয় বঙ্গবন্ধু’-কে যুক্ত করে এই রণধ্বনিতে পরিণত করেছে। তাছাড়া সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী অপশক্তির সাথে আপস করে তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে মদত দিয়ছে।দেশে আজ সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান একটি বড় রকম বিপদ। কিন্তু জনগণের ইহলৌকিক জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধান করার কাজে বাস্তব সাফল্য আনতে না পারলে এই উত্থান রোধ করা যাবে না। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ৈই তা সম্ভব এবং তা প্রতিষ্ঠা করাটা আওয়ামী লীগের বা বিএনপি, জাতীয় পার্পি, জামাতে ইসলামের দ্বারা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তির উত্থান। দেশের সামনে নতুন এজেন্ডা উপস্থিত হয়েছে। সেটিকে এগিয়ে নেয়ার মধ্য দিয়েই উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপদ দেউলিয়া হয়ে পরা শোষণ-লুটপাটের বুর্জোয়া শাসনের আশপাশ থেকে মুক্তি অর্জন করতে হবে। তাই, নিজের সম্পর্কে আমার বিনীত উচ্চারণ, আমি দেশপ্রেমিক বেট, কিন্তু জাতীয়তাবাদী নই। আমি ‘জয় বাংলা’-কে রণধ্বনি করে পথ চলার ‘জয় বাংলা’ পন্থী তো নয়ই। এ হলো আমার আদর্শগত আত্মপরিচয়ের প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য। কিন্তু যারা ‘জাতীয়তাবাদী’ অথবা ‘জয় বাংলা’ পন্থী-তাদের মতো করে কাজ করার অধিকার খর্ব করার যেকোনো প্রচেষ্টার আমি বিরোধী। শুধু বিরোধীই নই, তা রুখতে আমরা কমিউনিস্টরা রাজপথে আছি ও থাকবো।লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

বিনিয়োগে খরা, আস্থার সংকটে স্থবির অর্থনীতি

উদ্বৃত্ত তারল্য মানেই অলস অর্থ নয়। আমানত থেকে কোনো ব্যাংকের বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) সংরক্ষণের পর বাকি অর্থ উদ্বৃত্ত তারল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংককে মোট আমানতের ১৩ শতাংশ এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে ৪ শতাংশ এসএলআর রাখতে হয়। বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের বিপরীতে এই অর্থ রাখার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দুই ধরনের ব্যাংককেই নগদ জমা অনুপাত (সিআরআর) হিসেবে আরও ৪ শতাংশ অর্থ রাখতে হয়।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। আগের মাস জুলাই শেষে এর পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ২৩ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। গত জুনে ছিল ৪ লাখ ১৪ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, বিনিয়োগের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিকল্প হিসেবে এই অর্থের বড় অংশ দিয়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে ঋণ দেওয়ার চেষ্টা করছে ব্যাংকগুলো।পরিসংখ্যান বলছে, কম সুদের ঋণ দিতেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ব্যাংকাররা। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে কম সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক গত মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এই তহবিল থেকে গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। এই প্যাকেজের আওতায় বন্ধ শিল্প ও সেবাখাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে এ পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, সবুজ কারখানায় রূপান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানি এবং হিমায়িত চিংড়িসহ বিভিন্ন খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে এক টাকাও বিতরণ হয়নি।এবার কৃষি ও পল্লিঋণের চিত্রের দিকে তাকানো যাক। দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানে কৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ। প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। স্বাধীনতার পর থেকে কৃষি উৎপাদন তিন গুণের বেশি বেড়েছে। ধান, স্বাদুপানির মাছ, পাট ও আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব কৃষি খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।চলতি অর্থবছরের শুরুতে কৃষিঋণ বিতরণের গতি কিছুটা বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে ব্যাংকগুলো। এ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা পুরো অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১২ শতাংশ। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কৃষিঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে শস্য উপখাতে, যদিও তা আগের বছরের তুলনায় কম (সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন)।এবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য কৃষি ও পল্লিঋণ খাতে ৩৯ হাজার কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর নিজস্ব শাখা ও অন্যান্য ব্যবস্থার মাধ্যমে বরাদ্দের ৫০ শতাংশ ঋণ বিতরণ করতে হবে। এই ৫০ শতাংশের মধ্যে শস্য ও ফসল উপখাতে ৫৫ শতাংশ, প্রাণিসম্পদ উপখাতে ২০ শতাংশ এবং মৎস্য উপখাতে ১৫ শতাংশ বিতরণের কথা বলা হয়েছে। আগের নীতিমালায় শস্য ও ফসল উপখাতে ৬০ শতাংশ, প্রাণিসম্পদ উপখাতে ১৫ শতাংশ এবং মৎস্য উপখাতে ১৫ শতাংশ ঋণ বিতরণের কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ এবার প্রাণিসম্পদ উপখাতে ঋণের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে কমানো হয়েছে শস্য ও ফসল উপখাতে।বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—ব্যাংক খাতে তারল্য থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ বাড়ছে না। এর কারণ অর্থের অভাব নয়, বরং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের ঘাটতি। একজন উদ্যোক্তা নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে শুধু ঋণের সুদহার বিবেচনা করেন না। তিনি দেখেন, বাজারে চাহিদা কেমন, উৎপাদন ব্যয় কত, গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়মিত পাওয়া যাবে কি না, কর ও নিয়ন্ত্রক নীতি কতটা স্থিতিশীল এবং ভবিষ্যতে ব্যবসার পরিবেশ কেমন থাকবে। এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে ব্যাংকে অর্থ পড়ে থাকলেও উদ্যোক্তা ঋণ নিতে আগ্রহী হন না।উচ্চ সুদহার অবশ্যই বিনিয়োগের পথে একটি বড় বাধা। তবে শুধু সুদহার কমিয়ে সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ ঋণের ব্যয় কমলেও যদি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিশ্চয়তা না থাকে, বাজার দুর্বল থাকে, করব্যবস্থা জটিল হয় এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে সংশয় থাকে, তাহলে উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে যাবেন না। তাই বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা জরুরি।বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কর ও অন্যান্য প্রণোদনার ঘোষণা দিলেই হবে না। এসব সুবিধা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। কোন খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে, কোথায় বাধা রয়ে গেছে এবং কোন সরকারি সংস্থার কারণে প্রকল্প আটকে আছে—এসব বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যেসব অবকাঠামো সরাসরি উৎপাদন, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং অপচয় কমানোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সীমিত রাজস্ব দিয়ে বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো তৈরি করতে হলে ব্যয়ের প্রতিটি টাকার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক হিসাবের পাশাপাশি আস্থার ওপরও নির্ভর করে। উদ্যোক্তা যদি মনে করেন, তাঁর বিনিয়োগের পরিবেশ স্থিতিশীল থাকবে, জ্বালানি পাওয়া যাবে, ঋণ পাওয়া সহজ হবে, করনীতি পূর্বানুমানযোগ্য থাকবে এবং নীতি হঠাৎ বদলাবে না, তাহলে তিনি ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হবেন। একই নিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও দিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আবার গতিশীল করতে হলে শুধু বিনিয়োগের জন্য প্রণোদনা দিলেই চলবে না, বিনিয়োগের অনুকূল আস্থার পরিবেশ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলেই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের গতি বাড়বে এবং বাংলাদেশও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারবে।বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসালটিংয়ের অর্থায়ন ও সহায়তায় পরিচালিত ‘অনুমোদন বিষয়ে জনমত জরিপ ২০২৬’-এর ফলাফল গত ১৯ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্কদের একটি দলের ওপর পরিচালিত এই জরিপে ১০ হাজার ৪১৩টি ফোনকল করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে জনমতকে ‘সতর্ক আশাবাদ’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো থাকলেও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। উত্তরদাতাদের বড় একটি অংশ মনে করেন, আগের তুলনায় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কিছুটা খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে সাধারণ মানুষ তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সামগ্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের কার্যক্রমে সন্তুষ্টি থাকলেও দৈনন্দিন জীবনে প্রকৃত উন্নতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষ এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।ব্যাংক খাতের সংস্কার বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের আরেকটি পূর্বশর্ত। দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক। প্রকৃত খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি নির্ধারণ, সম্পদের গুণগত মান যাচাই, দুর্বল ব্যাংকের সময়বদ্ধ পুনর্গঠন এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভালো ঋণগ্রহীতা ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের একভাবে বিবেচনা করা যাবে না। উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংক খাতে আস্থা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে।এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। এসব প্রতিষ্ঠান কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়ে। জামানতের সীমাবদ্ধতা, ঋণের উচ্চ ব্যয়, জটিল কাগজপত্র এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি নিতে অনীহা তাদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে। তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রপ্তানিমুখী খাত, কৃষিভিত্তিক পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন বাড়াতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সিটি ইউনিভার্সিটি]

আয় নেই, রিটার্ন নেই, তবু টিআইএনধারীর জরিমানা কেন?

টিআইএন নিয়েছিলেন কয়েক বছর আগে। তখন প্রয়োজন ছিল। জমি কিনবেন, ব্যাংক হিসাব খুলবেন, ব্যবসা করবেন কিংবা অনলাইনে আয় করবেন, যে কারণেই হোক টিআইএন নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে আর আয় হলো না। কাজও হলো না। রিটার্নও দেওয়া হলো না। এভাবে বছর কেটে গেল। হঠাৎ একদিন কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ। তখনই প্রশ্ন, আয় যখন নেই, করই যখন দিতে হবে না, তাহলে জরিমানা কেন? এখানেই রয়েছে অনেক করদাতার বড় ভুল বোঝাবুঝি।কারণ রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আর কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এক বিষয় নয়। একজন ব্যক্তির করযোগ্য আয় শূন্য হতে পারে, কিন্তু আইন অনুযায়ী তার রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। আর নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে, কর না থাকলেও জরিমানার মুখে পড়ার সুযোগ রয়েছে।বাংলাদেশে টিআইএন নেওয়ার ঘটনা এখন খুবই সাধারণ। চাকরি, ব্যবসা, জমি কেনাবেচা, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা কিংবা বিভিন্ন আর্থিক কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনে মানুষ টিআইএন নিচ্ছেন। কেউ আবার ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আয় করবেন ভেবে আগেই টিআইএন নিয়েছেন। কিন্তু প্রয়োজন শেষ হওয়ার পর অনেকেই ধরে নেন, টিআইএন তো শুধু নিয়েছিলাম, আয়ই তো হয়নি, রিটার্ন দেওয়ারও দরকার নেই। এই একটি ধারণাই পরে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৬-এ নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তির রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর রিটার্ন দাখিলে বাধ্য হলে ধারা ১৭০ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করতে হয়। অর্থাৎ আয় নেই, এই কথাটিই সবসময় রিটার্ন না দেওয়ার বৈধ কারণ নয়। প্রথমে দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে বাধ্য কি না। যদি বাধ্য হন, তাহলে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।এখানেই আসে জরিমানার বিষয়টি। অনেকেই মনে করেন, করযোগ্য আয় নেই এবং কর পরিশোধযোগ্যও নেই, তাই রিটার্ন দিতে দেরি হলেও কোনো জরিমানা হবে না। কিন্তু রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে কর পরিশোধযোগ্য না থাকলেও জরিমানা প্রযোজ্য হতে পারে।ধরা যাক, একজন করদাতার করযোগ্য আয় নেই। হিসাব করে তার পরিশোধযোগ্য কর দাঁড়াল শূন্য টাকা। তিনি ভাবলেন, করই যখন নেই, রিটার্ন না দিলেও কিছু হবে না। কিন্তু যদি তিনি আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে বাধ্য হন এবং নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন না দেন, তাহলে শুধু কর শূন্য হওয়ার কারণে জরিমানা থেকে মুক্তি নিশ্চিত নয়।কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ পাওয়ার আগে বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করা হলে এবং কর পরিশোধযোগ্য না থাকলে ন্যূনতম জরিমানা ৫ হাজার টাকা হতে পারে। অন্যদিকে, নোটিশ পাওয়ার পর রিটার্ন দাখিল করলে প্রযোজ্য ন্যূনতম জরিমানা ১০ হাজার টাকা হতে পারে। অর্থাৎ নোটিশ আসার আগেই বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করলে জরিমানার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে আরও পরিষ্কার করা যায়। ধরা যাক, একজন করদাতার পরিশোধযোগ্য কর ৫০ হাজার টাকা। তিনি যদি কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ পাওয়ার আগে নিজ উদ্যোগে বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করেন, তাহলে ধারা ১৭৪(২) অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকার ১০ শতাংশ হয় ৫ হাজার টাকা। প্রযোজ্য ন্যূনতম জরিমানার বিধান বিবেচনায় তার জরিমানা হবে ৫ হাজার টাকা।অন্যদিকে একই করদাতা যদি কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ পাওয়ার পর রিটার্ন দাখিল করেন, তাহলে ধারা ১৭৪(৩) অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকার ১৫ শতাংশ হয় ৭ হাজার ৫০০ টাকা। তবে প্রযোজ্য ন্যূনতম জরিমানার কারণে তার জরিমানা হবে ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ একই করদাতা, একই করের পরিমাণ, কিন্তু সময়ের ব্যবধানেই জরিমানার অঙ্ক বদলে যেতে পারে।এখন প্রশ্ন, টিআইএন নেওয়ার যে প্রয়োজন ছিল, সেটি যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে কি রিটার্নের দায়িত্বও শেষ হয়ে যাবে? ধরা যাক, একজন ব্যক্তি জমি কেনার জন্য টিআইএন নিয়েছিলেন। পরে জমি কেনা হয়নি। আবার কেউ ব্যাংকিংয়ের প্রয়োজনে টিআইএন নিয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রয়োজন আর নেই। কেউ অনলাইন ব্যবসা বা ইউটিউব থেকে আয় করার পরিকল্পনায় টিআইএন নিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো আয় হয়নি। এ অবস্থায় টিআইএন নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য শেষ হয়ে গেলেই রিটার্ন দাখিলের আইনগত দায়িত্বও শেষ হয়ে যাবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।প্রথমে দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আয়কর আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে বাধ্য কি না। বাধ্য হলে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। অর্থাৎ টিআইএন কেন নেওয়া হয়েছিল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও রিটার্নের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণের একমাত্র বিষয় নয়।অনেক করদাতার প্রশ্ন, আমার তো কোনো করই নেই, তাহলে রিটার্ন দেব কেন? রিটার্নকে শুধু কর পরিশোধের কাগজ হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যায় না। একজন করদাতার আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় এবং অর্থের উৎসসহ বিভিন্ন আর্থিক তথ্য রিটার্নের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়।একজন ব্যক্তির নিজের উপার্জন না থাকলেও তার সম্পদ থাকতে পারে, পরিবারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন কিংবা নিজের নামে বিভিন্ন ব্যয় হতে পারে। তাই আমার আয় নেই এবং আমার রিটার্ন দেওয়ার প্রয়োজন নেই, এই দুটি বক্তব্য সবসময় একই অর্থ বহন করে না। করযোগ্য আয় না থাকলে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী করের পরিমাণ শূন্য হতে পারে। কিন্তু আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।এখন আসা যাক তাদের কথায়, যাদের টিআইএন কয়েক বছর আগে নেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত কোনো রিটার্ন দাখিল করা হয়নি। একসঙ্গে কী করতে হবে, এর উত্তর সবার ক্ষেত্রে একই নয়। টিআইএন গ্রহণের তারিখ, কোন করবর্ষ থেকে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়েছে, আগে কোনো রিটার্ন দাখিল করা হয়েছিল কি না এবং বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কর অবস্থা, এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।বিশেষ করে ১ জুলাই ২০২৫-এর পর টিআইএন নিয়েছেন কিন্তু এখনো রিটার্ন দেননি, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বর্তমান করবর্ষ থেকে নিয়মিত রিটার্ন দাখিল শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে আগের কোনো করবর্ষের রিটার্ন দিতে হবে কি না বা জরিমানা হবে কি না, তা ব্যক্তির পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইন দেখে নিশ্চিত হতে হবে। আর আগে থেকেই টিআইএন থাকলে কিন্তু কয়েক বছর রিটার্ন না দিয়ে থাকলে, কোন কোন বছরের রিটার্ন দেওয়া প্রয়োজন এবং কোনো জরিমানা প্রযোজ্য হবে কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করা উচিত।বিলম্বে রিটার্ন দাখিলের কারণে জরিমানা আরোপ হলে অনেকে ব্যক্তিগত অনুরোধের মাধ্যমে জরিমানা কমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত অনুরোধের ভিত্তিতে আইন নির্ধারিত জরিমানা কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই জরিমানা আরোপের আগে বা পরে প্রথমেই দেখতে হবে, কোন করবর্ষের জন্য জরিমানা হয়েছে, কেন হয়েছে এবং কোন আইনি বিধানের অধীনে হয়েছে।তবে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো জরিমানা হওয়ার অপেক্ষা না করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করা। টিআইএন নেওয়ার পর সেটিকে অপ্রয়োজনীয় ভেবে ফেলে রাখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি শুধু আয় নেই বলেও রিটার্নের বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়।প্রথমে নিজের কর অবস্থা যাচাই করতে হবে। আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, তা দেখতে হবে। থাকলে সময়মতো রিটার্ন দাখিল করতে হবে। আর দীর্ঘদিন রিটার্ন দাখিল না করে থাকলে পূর্ববর্তী করবর্ষগুলোর অবস্থাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।কর ব্যবস্থায় দায়িত্ব শুধু কর পরিশোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সঠিক তথ্য দিয়ে সময়মতো রিটার্ন দাখিল করাও একজন করদাতার গুরুত্বপূর্ণ আইনগত দায়িত্ব। তাই টিআইএন আছে অথচ রিটার্ন দাখিল করছেন না, এমন হলে বিষয়টি অবহেলা না করে নিজের কর অবস্থা যাচাই করা জরুরি। কারণ আজকের ছোট্ট অবহেলাই ভবিষ্যতে জরিমানা, নোটিশ এবং বাড়তি জটিলতার কারণ হতে পারে।মনে রাখতে হবে, করযোগ্য আয় নেই মানেই সব ক্ষেত্রে রিটার্নের প্রয়োজন নেই, এমন নয়। আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। আর সময়মতো রিটার্ন দাখিল করাই জরিমানা ও অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়ানোর সবচেয়ে নিরাপদ পথ।[লেখক: আয়কর আইনজীবী]

উচ্চশিক্ষা, আত্মপ্রবঞ্চনার এক মহাকাব্য

আমরা যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আমাদের কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন করা উচিত—আমাদের শিক্ষার মূল্য কে পরিশোধ করেছে, আর আমরা তার বিনিময়ে দেশকে কী ফিরিয়ে দিয়েছি? আমাদের মেধার পেছনে ব্যয় হওয়া অর্থ কোনো রাজকীয় কোষাগারের উত্তরাধিকার নয়। এর প্রতিটি টাকার সঙ্গে মিশে আছে একজন রিকশাচালকের ঘাম, একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের ওভারটাইম, একজন প্রবাসীর নির্বাসিত যৌবন এবং কোটি মানুষের না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পেছনে রাষ্ট্রের যে বিনিয়োগ, তার অর্থ এসেছে এই খেটে খাওয়া মানুষের কাছ থেকেই। যে রিকশাচালক নিজের সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে হিমশিম খান, তার উপার্জনের অংশ দিয়ে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বসেছি। যে প্রবাসী বছরের পর বছর পরিবারের মুখ দেখতে পান না, তার পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রায় আমাদের শিক্ষার অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। অথচ প্রশ্ন হলো, আমরা তাদের কতটুকু প্রতিদান দিতে পেরেছি? নাকি জনগণের অর্থে উচ্চশিক্ষিত হয়ে জনগণের কাছ থেকেই দূরে সরে যাওয়ার সামাজিক লাইসেন্স অর্জন করেছি?একটি স্বনামধন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর—উভয় পরীক্ষায় ৩.৮৬ সিজিপিএ অর্জন করেছেন একজন শিক্ষার্থী। ৪৪তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে। অথচ বিষয়সংশ্লিষ্ট চাকরির সাক্ষাৎকার দিতে লন্ডনে গিয়ে নিয়োগকর্তার কাছ থেকে যা শুনতে হয়েছে তা অপ্রত্যাশিত । এটি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কোনো আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক শিক্ষাগত সমতুল্যতার সিদ্ধান্ত নয়। তবু অভিজ্ঞতাটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়—পরীক্ষার ফলাফল আর বাস্তব দক্ষতার মধ্যে এত দূরত্ব কেন?এই সংকট যে নিছক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, পরিসংখ্যানও তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার এবং উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ১৩.৫৪ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক হলো, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের (১৫ু২৯ বছর) বেকারত্বের হার প্রায় ২৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আমরা একদিকে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়াচ্ছি, অন্যদিকে সেই ডিগ্রিকে কর্মক্ষেত্রের কার্যকর দক্ষতায় রূপান্তর করতে হিমশিম খাচ্ছি। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি মানবসম্পদ তৈরি করছি, নাকি শিক্ষিত বেকারত্বের এক বিশাল প্রদর্শনী সাজাচ্ছি?কেউ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তুলনা করেন, তখন অপমান লাগে, ক্ষোভ হয়। কিন্তু শুধু ক্ষোভের উত্তাপে আয়নাটি ভেঙে ফেললে নিজের মুখ দেখা যায় না। বরং প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমরা কি আমাদের প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যের সমান যোগ্যতা অর্জন করছি? নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটিকে ব্যক্তিগত দক্ষতার বিকল্প পরিচয়পত্র বানিয়ে ফেলেছি?আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি চিন্তাশীল মানুষ, গবেষক, উদ্ভাবক ও সমস্যা সমাধানকারী তৈরি করছে, নাকি জিপিএর কারিগরি দক্ষতায় পারদর্শী কিছু সনদধারী নাগরিক তৈরি করছে? পরীক্ষার খাতায় নির্ভুল উত্তর লিখতে পারলেই যদি মেধার চূড়ান্ত স্বীকৃতি মেলে, তবে বাস্তব পৃথিবীর অজানা সমস্যার সমাধান করবে কে?অবশ্য দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়। দায় সেই শিক্ষকেরও, যিনি পাঠ্যবইয়ের বাইরে জ্ঞানের জানালা খুলতে ভুলে গেছেন; সেই প্রশাসকেরও, যিনি গবেষণার চেয়ে আনুষ্ঠানিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেন; সেই নীতিনির্ধারকেরও, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ান, কিন্তু শিক্ষার মান ও কর্মমুখী দক্ষতার প্রশ্নে নীরব থাকেন। দায় আমাদেরও—আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় নিয়ে গর্ব করি, অথচ নিজেদের দুর্বলতা নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পাই।সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হলো, যে শ্রমিকের ঘামে আমাদের শিক্ষার প্রদীপ জ্বলে, তাকেই আমরা অশিক্ষিত বলে অবজ্ঞা করি। অথচ তার জীবনবোধ, শ্রমের শৃঙ্খলা, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই এবং দায়িত্ববোধের কাছে আমাদের অনেক তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের শেখার আছে। তিনি হয়তো ইংরেজিতে জীবনবৃত্তান্ত লিখতে পারেন না, কিন্তু জীবনের যে কঠিন পরীক্ষায় প্রতিদিন উত্তীর্ণ হন, তার কোনো জিপিএ আমাদের সনদে লেখা নেই।পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু সমাবর্তনের ছবি, পদকের ঝলক কিংবা বিসিএসের সুপারিশের সংখ্যায় মাপা যায় না। মাপতে হবে গবেষণার মানে, উদ্ভাবনে, কর্মক্ষেত্রে দক্ষতায়, নাগরিক দায়িত্ববোধে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে এর অবদানে।আমাদের আত্মসমালোচনা আত্মঅপমান নয়; এটি দায়বদ্ধতার প্রথম পাঠ। ডিগ্রি অর্জন ব্যক্তিগত সাফল্য, কিন্তু সেই ডিগ্রির পেছনে জনগণের বিনিয়োগ একটি সামাজিক আমানত। সেই আমানতের প্রতিদান দিতে না পারলে আমাদের অহংকারের মুকুট আসলে দায়মুক্তির মুখোশ ছাড়া কিছুই নয়।রাষ্ট্র আমাদের শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল, আমরা কি মানুষ হওয়ার দায়িত্ব পালন করেছি? জনগণ আমাদের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করেছিল মানুষ তৈরির আশায়; আমরা যদি কেবল সার্টিফিকেট তৈরি করি, তবে সমাবর্তনের আলোকসজ্জা যতই ঝলমলে হোক, তার আড়ালে যোগ্যতার জানাজাই অনুষ্ঠিত হবে।রাষ্ট্র মানুষ চেয়েছিল, আমরা সার্টিফিকেট হয়ে ফিরেছি—এই আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পাওয়ার দিনই হবে আমাদের প্রকৃত সমাবর্তন।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গণমাধ্যমকর্মী]

ধর্মের নামে মব, বিচারের নামে বর্বরতা

সৌদি আরবে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার সিতির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বাংলাদেশে অনেকেই মর্মাহত। কিন্তু এ তো শরিয়া আইনেরই প্রয়োগ। যারা এই যুক্তিতে দেশে তৌহিদী জনতার নামে পিটিয়ে মারা জায়েজ মনে করেন, তাদের এই কান্না ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়। শরিয়া আইনের বীভৎস রূপ দেখে হাহুতাশ করলে তো আর পুরো শরিয়া মানা হলো না। এমন মৃত্যুদণ্ড সৌদিতে অহর্নিশ হচ্ছে। সেখানে গড়ে বছরে ৩০০ জনের বেশি মানুষের শিরোচ্ছেদ হয়। তারপরও অপরাধ কমে না। এতে প্রমাণিত, প্রকাশ্য বীভৎস শাস্তি অপরাধ কমায় না।আমরা সৌদির শিরোচ্ছেদে মৃত্যুদণ্ডে কাঁদছি, কিন্তু বাংলাদেশের ভেতরে আমরা কী করছি? তৌহিদী জনতার নামে মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে, বস্তাবন্দি করে হত্যা করছি। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর এই জোশ আরও বেড়েছে। সর্বশেষ বলি সাতক্ষীরার দেবহাটার ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। ধর্ম অবমাননার একটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে প্রথম দফায় মারধর করা হয়। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করলে রাত সাড়ে আটটায় সেখানেও ঢুকে দ্বিতীয় দফায় পিটুনি দেওয়া হয়। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেলে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। পরিবারের ভাষ্য, এটি পরিকল্পিত হত্যা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে অনার্স-মাস্টার্স করা, দুই শিশু সন্তানের জনক শামীম মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। স্ত্রীর সঙ্গে কলহের কথোপকথন রেকর্ড করে ছড়ানো হয়। স্থানীয় জামায়াত অফিসে সংগঠিত হয়ে হামলা করা হয়। আর নিজেকে মুফতি পরিচয় দেওয়া ফজলুল হক আমিনী ফেসবুক লাইভে ডেকে মব তৈরি করেন।আমরা এখন প্রতিদিনই এমন বস্তাবন্দি লাশ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে ভয়ংকর। টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে, ঢাকায় এক সমাবেশে চরমপন্থীরা সরকারকে হুমকি দিয়েছে—ধর্ম অবমাননাকারীকে সরকার মৃত্যুদণ্ড না দিলে তারা নিজেরাই তা দেবে। এটি আইএস-আল-কায়েদার ভাষা। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনেক মিছিলে আইএসের পতাকা দেখা গেছে। রংপুরের তারাগঞ্জে মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ হয়েছে এক হুজুরের হুমকিতে। ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের সব সরকারই প্রশ্রয় দিয়েছে। টাইমের মতে, আওয়ামী লীগ একই সঙ্গে দমন ও তুষ্ট করেছে, ভোটের জন্য কওমি মাদ্রাসা ছড়িয়ে দিয়েছে, ব্লগার হত্যায় প্রথমে উদাসীন ছিল। আবার এই কঠোর অবস্থানের বিরোধিতা করেছে বিএনপি, এমনকি হলি আর্টিজানকেও নাটক বলেছে। ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত আমলে বাংলা ভাইয়ের উত্থান আমরা দেখেছি। প্রকাশ্যে হাত-পা বেঁধে উল্টো ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। ৩২টি লাশের পরিচয় মিলেছিল। সহায়তা করেছিল পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত নেতারা। তখন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন বাবর।আমাদের ধর্মীয় শিক্ষায় গলদ আছে কি না, ভাবতে হবে। অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ উঠলেই মানুষ এত হিংস্র হয় কেন? বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ অন্যায় করে, ঘুষ খায়, মানুষ ঠকায়। কিন্তু ধর্ম নিয়ে কটূক্তির কথা শুনলেই রাস্তায় নেমে পড়ে। অথচ ব্যক্তিজীবনে ধর্মকর্মে একনিষ্ঠ নয়। আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের শাস্তি আছে, কিন্তু ‘অনুভূতি’র কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই, দেওয়াও সম্ভব নয়। এই অস্পষ্টতার সুযোগেই চলছে হত্যার উৎসব। তালিকাটি দীর্ঘ। বাগেরহাটে ছয় বছরের শিশু মুসলিমার বস্তাবন্দি গলাকাটা লাশ, কুষ্টিয়ায় সুফি পীর শামীম রেজাকে পিটিয়ে হত্যা, ভালুকায় হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ মহাসড়কে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়া, গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পোড়ানো, পটিয়ায় পার্থ বিশ্বাস, পাটগ্রামে মানসিক ভারসাম্যহীন জুয়েলকে ৪২০ মিটার টেনে পুড়িয়ে হত্যা—যেখানে ৬৫ শতাংশ ছিল কিশোর।এই মবের চেহারা দেখুন। দরবার ভাঙচুর ও হত্যায় অংশ নেওয়াদের মধ্যে শিশু, কিশোর, যুবক—দু-একজন ছাড়া কারও মুখে দাড়ি-টুপি নেই। বেশির ভাগ হাফপ্যান্ট আর লুঙ্গি পরা। তবে এদের যারা উত্তেজিত করে, তারা ভিন্ন জগতের মানুষ। তাদের বলা হয় ‘তৌহিদী জনতা’। এই বিক্ষুব্ধ জনসমষ্টি প্রচলিত আইন মানে না, প্রশাসন মানে না। ধর্ম নিয়ে বিতর্ককারীদের হত্যায় তারা স্বর্গীয় সুখ পায়। জিহাদের উত্তেজনায় জীবিত মানুষকে পুড়িয়ে মারে, কবর থেকে লাশ তুলে উল্লাস করে। মানুষ পোড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও এটাকে তারা ধর্ম অবমাননা মনে করে না। এমন জনগোষ্ঠী বেশি দেখা যায় পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে। বাংলাদেশে ভোট হারানোর ভয়ে বাম-ডান সব দল এই উগ্রতাকে সমীহ করে। তাই গণতান্ত্রিক নির্বাচন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তুলছে।এখানেই গাজীপুরের আউচপাড়ার ঘটনাটি প্রাসঙ্গিক। সাত বছরের ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসাশিক্ষক মোসলেহ উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ‘চুমু’র কথা স্বীকার করতেই স্বজনরা চড় মেরে গণপিটুনি দেন। এরপর আলেম সমাজ বলতে শুরু করেছে, ‘আইন নিজের হাতে নেবেন কেন, শিক্ষক অপরাধ করলে আইন আছে।’ অথচ এই আলেম সমাজই এত দিন ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল। ন্যায্য ক্ষোভ থেকে যখন মানুষ আইন হাতে তুলে নেয়, তখন বিচার থাকে না, থাকে শুধু মব। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর—এই নয় মাসে মব সহিংসতায় ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান সাইদুর রহমান ২০২৫ সালের মূল্যায়নে বলেছিলেন, ‘সমাজে অভূতপূর্ব নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। সরকার মব সহিংসতা বন্ধে কোনো উদ্যোগই নেয়নি।’ উত্তরায় ছিনতাইকারীকে পিটিয়ে ঝুলিয়ে রাখা, টঙ্গীতে তরুণকে পিটিয়ে হত্যা তারই ধারাবাহিকতা।ইসলামে মুরতাদের শাস্তি নিয়ে হাদিস আছে—‘যে দ্বীন পরিবর্তন করবে, তাকে হত্যা করো’ (বুখারি ৬৯২২)। সূরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতে অশান্তি সৃষ্টিকারীর জন্য মৃত্যুদণ্ড, শূলবিদ্ধ করা বা হাত-পা কাটার কথা আছে। কিন্তু সেখানে তওবার সুযোগ, বিচারকের রায়, সাক্ষ্য-প্রমাণের বাধ্যবাধকতাও আছে। সৌদি রাষ্ট্র যখন সেই প্রক্রিয়া না মেনে তাজিরের নামে শিরোচ্ছেদ করে, তখন তা যেমন বর্বরতা, তেমনি বাংলাদেশে রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া তৌহিদী জনতা যখন পিটিয়ে, ঝুলিয়ে, পুড়িয়ে মারে, তখন তা আরও বড় বর্বরতা। সৌদিতে রাষ্ট্র কল্লা কাটে, বাংলাদেশে মব কল্লা কাটে—পার্থক্য শুধু তলোয়ার কার হাতে। দুটোই দেখিয়ে দেয়, ধর্মকে যখন বিচারের বদলে প্রতিশোধের হাতিয়ার বানানো হয়, তখন অপরাধ কমে না, শুধু লাশের সংখ্যা বাড়ে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

কৃষির ভবিষ্যৎ: উৎপাদন বাড়ুক, বৈচিত্র‍্যও থাকুক

ক্রমবর্ধমান খাদ্যচাহিদা ও সীমিত কৃষিজমির বাস্তবতায় প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ জরুরি। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য মূল্যবান স্থানীয় জাতের জিনগত সম্পদ সংরক্ষণ করাও প্রয়োজন। এ জন্য দরকার বুদ্ধিমান ও ভারসাম্যপূর্ণ জাতনীতি।বাংলাদেশের কৃষি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রশ্নটি আর শুধু ‘কী চাষ করব’—এতে সীমাবদ্ধ নেই। বড় প্রশ্ন হলো, ক্রমশ কমতে থাকা কৃষিজমি থেকে ক্রমবর্ধমান মানুষের জন্য কীভাবে আরও বেশি খাদ্য উৎপাদন করা যাবে? একদিকে বাড়ছে জনসংখ্যা, খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা। অন্যদিকে কৃষিজমি সীমিত, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন কৃষিকে নতুন নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এই বাস্তবতায় কৃষিজমির পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ যতটা সীমিত, প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজন ততটাই অনিবার্য।এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ কোনো সাময়িক প্রবণতা নয়। এটি খাদ্যনিরাপত্তার বৃহত্তর প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত একটি কৃষিগত বাস্তবতা। একই জমিতে বেশি ফলন, স্বল্প জীবনকাল, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং অঞ্চলভেদে উপযোগী বৈশিষ্ট্যের কারণে উচ্চফলনশীল জাত কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে এই পরিবর্তনের অর্থ স্থানীয় জাতকে অস্বীকার করা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কোন জাত কোথায় কৃষকের জন্য বেশি লাভজনক, জাতীয় খাদ্যচাহিদা পূরণে বেশি কার্যকর এবং ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য বেশি মূল্যবান?সুতরাং উচ্চফলনশীল জাত ও স্থানীয় জাতের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করার চেয়ে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক একটি বুদ্ধিমান জাতনীতি। যেখানে অধিক উৎপাদন জরুরি, সেখানে উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ করতে হবে। আর যেসব স্থানীয় জাতের মধ্যে ভবিষ্যতে নতুন জাত উদ্ভাবন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া কিংবা পুষ্টি ও খাদ্যসংস্কৃতির জন্য মূল্যবান বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু বেশি উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য উৎপাদনশীলতা, লাভজনকতা, অভিযোজনক্ষমতা ও জিনগত বৈচিত্র‍্যরে মধ্যে সঠিক ভারসাম্যও জরুরি।বাংলাদেশের কৃষিতে স্থানীয় জাতের অবদান ঐতিহাসিক। কৃষকের বাছাই ও সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে অঞ্চলভেদে নানা বৈশিষ্ট্যের জাত গড়ে উঠেছে। কোনোটি খরা সহনশীল, কোনোটি জলাবদ্ধতা বা লবণাক্ততা সহনশীল। কোনোটি আবার স্বাদ, পুষ্টিমান কিংবা স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। এসব জাত আমাদের কৃষির ঐতিহ্য এবং মূল্যবান জিনগত সম্পদ। কিন্তু কৃষির প্রয়োজনও স্থির নয়। যে জাত একসময় একটি অঞ্চলের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট ছিল, বৃহত্তর খাদ্যচাহিদার বাস্তবতায় তা সব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। বেশি ফলন, স্বল্প জীবনকাল, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও বাজারের চাহিদা পূরণের সুবিধার কারণে উচ্চফলনশীল জাত কৃষির স্বাভাবিক বিবর্তনের অংশ হয়ে উঠেছে।উচ্চফলনশীল জাতের সঙ্গে সেচ, সুষম সার, যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত বালাই ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক চাষপদ্ধতির সমন্বয় কৃষির উৎপাদনক্ষমতায় বড় পরিবর্তন এনেছে। একই জমি থেকে বেশি ফলন এবং স্বল্প জীবনকালের জাতের মাধ্যমে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সীমিত কৃষিজমির দেশে এই পরিবর্তনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অধিক ফলনের তাগিদে জমির উল্লম্ব উৎপাদন বৃদ্ধির এটিই একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।তবে বেশি ফলনই শেষ কথা নয়। কোনো জাতের ফলন বেশি হলেও উৎপাদন ব্যয় বেশি হলে, ঝুঁকি বাড়লে কিংবা বাজারমূল্য কমে গেলে কৃষকের প্রকৃত লাভ নাও বাড়তে পারে। তাই জাতের সাফল্য মাপতে হবে ফলনের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, বাজারমূল্য, ঝুঁকি ও নিট আয়ের ভিত্তিতে। ভবিষ্যতের জাতনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতি হেক্টরে সর্বোচ্চ ফলনের পাশাপাশি টেকসই সর্বোচ্চ নিট আয় নিশ্চিত করা।জাত উন্নয়ন কর্মসূচির প্রত্যক্ষ ফল হলো নতুন জাত উদ্ভাবন, বীজ উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও সম্প্রসারণ। কিন্তু এর প্রকৃত সুফল আরও বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, জাতীয় উৎপাদন বাড়ানো, খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, উৎপাদনের ঝুঁকি কমানো এবং খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী করা। তাই শুধু কতটি নতুন জাত উদ্ভাবিত হলো, সেটিই বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, কৃষকের মাঠে এসব জাত কী পরিবর্তন আনতে পারল।এখানে স্থানীয় জাত ও উচ্চফলনশীল জাতকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। উচ্চফলনশীল জাত যেখানে উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বেশি উপযোগী, সেখানে তার সম্প্রসারণ অগ্রাধিকার পাবে। অন্যদিকে স্থানীয় জাতের যেসব বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতের কৃষির জন্য মূল্যবান, সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ প্রতিস্থাপন মানে বিলুপ্তি নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন।স্থানীয় জাতের গুরুত্ব এখানেই নতুনভাবে সামনে আসে। খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা কিংবা নির্দিষ্ট রোগ সহনশীলতার মতো বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতে নতুন জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সব স্থানীয় জাতকে বাণিজ্যিক চাষে ধরে রাখার প্রয়োজন না থাকলেও মূল্যবান জিনগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলা যাবে না। জিনব্যাংক, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে সংরক্ষণের মাধ্যমে এই সম্পদ নিরাপদ রাখতে হবে।জাত পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষকের বীজ ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় কৃষক নিজের উৎপাদিত ফসল থেকে বীজ সংরক্ষণ করতেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে বিনিময় করতেন। এখন প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক বীজব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এর সুফল হলো মানসম্মত বীজ ও উন্নত প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার। তবে একই সঙ্গে বীজের মান, দাম, প্রাপ্যতা এবং কৃষকের পছন্দের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও জরুরি। ভবিষ্যতের উচ্চফলনশীল জাতকে তাই শুধু বেশি ফলন দিলেই চলবে না। সেগুলোকে হতে হবে জলবায়ু সহনশীল, রোগ প্রতিরোধী, পানি ও অন্যান্য উপকরণ সাশ্রয়ী এবং কৃষকের জন্য লাভজনক।খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও নতুন রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বিবেচনায় জাত উন্নয়নের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত করতে হবে। এ জন্য প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির পাশাপাশি দ্রুত প্রজননপ্রযুক্তি (স্পিড ব্রিডিং) ও চিহ্নকনির্ভর নির্বাচন পদ্ধতির (মার্কার অ্যাসিস্টেড সিলেকশন) ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জাতের মূল্যবান বৈশিষ্ট্য আধুনিক প্রজননপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। উৎপাদনশীলতা ও অভিযোজনক্ষমতার এই সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতের জাত উন্নয়নের মূল শক্তি।এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলভেদে জাতের ফলন, উৎপাদন ব্যয়, নিট আয়, ঝুঁকি ও পরিবেশের উপযোগিতা মূল্যায়ন করতে হবে। নতুন জাত অবমুক্তির ক্ষেত্রে কৃষকের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানসম্মত বীজের উৎপাদন ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বীজ খাতের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যবান স্থানীয় জাত শনাক্ত করে সংরক্ষণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাতের সাফল্য মূল্যায়নের পদ্ধতিও বদলাতে হবে। শুধু ফলন নয়, কৃষকের নিট আয়, খাদ্যনিরাপত্তা, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, পরিবেশের ওপর প্রভাব ও জলবায়ু সহনশীলতাকেও মূল্যায়নের অংশ করতে হবে।বাংলাদেশের কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাতের গুরুত্ব ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। খাদ্যচাহিদা বাড়ছে, অথচ কৃষিজমি বাড়ছে না। ফলে প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে এই পরিবর্তন যেন একমুখী না হয়। সব অঞ্চলের মাটি, পানি, জলবায়ু ও বাজারের অবস্থা এক নয়। কোথাও সর্বোচ্চ ফলন গুরুত্বপূর্ণ, কোথাও খরা বা লবণাক্ততা সহনশীলতা। আবার কোথাও পুষ্টিমান কিংবা বাজারমূল্য বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। তাই ভবিষ্যতের কৃষিনীতির মূল কথা হওয়া উচিত—‘এক জাত সবার জন্য’ নয়, বরং ‘উপযোগী অঞ্চলে উপযোগী জাত’।কৃষির এই পরিবর্তনকে শুধু স্থানীয় জাতের জায়গায় উচ্চফলনশীল জাত বসানোর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আসলে সীমিত সম্পদে অধিক উৎপাদন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। একটি ভালো জাত এক মৌসুমের ফলন বাড়াতে পারে। কিন্তু একটি দূরদর্শী জাতনীতি বদলে দিতে পারে একটি দেশের খাদ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদনে উচ্চফলন, কৃষকের জন্য বেশি নিট লাভ, জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের জন্য জিনগত বৈচিত্র‍্য সংরক্ষণ। স্থানীয় জাত আমাদের কৃষির শিকড়, আর উচ্চফলনশীল জাত তার নতুন ডানা। শিকড়কে অস্বীকার করে নয়, বরং তার শক্তিকে কাজে লাগিয়েই কৃষিকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে হবে।[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)]

খাদ্যে ভেজাল: নীরব বিপর্যয়

ভেজাল খাদ্য মানুষের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে এটি মানুষের নৈতিকতারও অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। আধুনিক সভ্যতায় ‘ভেজাল’ শব্দটি আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এটি এখন কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং মানবতার জন্য এক নীরব বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। অতিমুনাফালোভী কিছু মানুষের কারণে আজ আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মিশছে বিষ।বর্তমানে চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি থেকে শুরু করে ফলমূল ও দুগ্ধজাত পণ্য—সব ধরনের খাদ্যেই রাসায়নিক ও ক্ষতিকর উপাদান মেশানোর অভিযোগ রয়েছে। ফরমালিন, কার্বাইড, বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত রং, ইউরিয়া এবং ক্ষতিকর সংরক্ষণকারী উপাদানের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে যকৃত ও কিডনির ক্ষতি, ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল পূর্ণ হওয়ার আগেই অনেকে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ, ভেজাল খাদ্যের এই আগ্রাসন মানুষের পার্থিব জীবনকে সংকুচিত করছে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।আজকের দিনে বাজার থেকে নির্ভেজাল খাদ্যপণ্য কেনা যেন ভাগ্যের ব্যাপার। চাল পালিশ করে চকচকে করা থেকে শুরু করে ফলমূল, শাকসবজি ও মাছে ফরমালিন ও কার্বাইডের যথেচ্ছ ব্যবহার এখন বহুল আলোচিত বিষয়। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ডিটারজেন্ট ও ইউরিয়া, গুঁড়া মসলায় ইটের গুঁড়া ও বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত রং, এমনকি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও শিশুখাদ্যেও ভেজালের অভিযোগ পাওয়া যায়। ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতুযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে যকৃতের রোগ, কিডনি বিকল, হৃদ্‌রোগ এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। আমরা পুষ্টির বদলে প্রতিনিয়ত শরীরে প্রবেশ করাচ্ছি দীর্ঘমেয়াদি বিষ।ভেজাল খাদ্যের এই রমরমা ব্যবসার পেছনে রয়েছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর চরম অনৈতিকতা এবং রাতারাতি ধনী হওয়ার অন্ধ লোভ। একশ্রেণির মানুষ অধিক মুনাফার জন্য অবলীলায় কোটি কোটি মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এই চক্র শুধু মানুষের পকেট কাটছে না, তাদের স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনও কেড়ে নিচ্ছে। যে সমাজ খাদ্যের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত জাঁকজমক অনেকটাই অর্থহীন।বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে খাদ্যে ভেজালের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর্তৃপক্ষ ১ হাজার ৭১৩টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ৫৭১টি নমুনায়, অর্থাৎ ৩৩ দশমিক ৩০ শতাংশে, ভেজাল, দূষণ কিংবা মানহীন উপাদান পাওয়া গেছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ৩০ শতাংশে পৌঁছায়। আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের রস ও পানীয়, সরিষার তেল, মাখন, সয়াবিন তেল, ডালডা এবং মধুতে সবচেয়ে বেশি ভেজাল বা দূষণ পাওয়া গেছে বলে কর্তৃপক্ষের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও আইসিডিডিআরবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিরাপদ খাদ্যের অভাবে দেশে প্রতিবছর বহু মানুষ ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।খাদ্যে ভেজাল দেওয়া বা খাদ্য নিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করাকে প্রায় সব বড় ধর্মেই গুরুতর অন্যায়, পাপ ও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। প্রধান ধর্মগুলোতে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও সততা ও মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়ে তাদের মধ্যে মিল রয়েছে।খাদ্যে ভেজাল ও বিষক্রিয়া রোধে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আইন প্রণয়ন, নিয়মিত তদারকি এবং উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের মাধ্যমে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এবং ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫ গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যে ভেজাল রোধ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকর করতে উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। ভেজাল খাদ্য উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রির বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাজার তদারকি ও পরিদর্শন কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হয়। মাঝেমধ্যে জরিমানা বা কারখানা সিলগালা করার খবর আমরা গণমাধ্যমে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব শাস্তি অপরাধের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত এবং সাময়িক। নিয়মিত ও কঠোর তদারকির অভাব, দুর্নীতির সুযোগ এবং আইনের ফাঁকফোকর গলে পার পেয়ে যাওয়ার কারণে অপরাধীরা বারবার একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। শুধু নামমাত্র জরিমানা করে এই সুসংগঠিত অপরাধচক্রকে দমন করা সম্ভব নয়। খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে এ ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে।তবে শুধু সরকারের সদিচ্ছা বা আইনের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। নাগরিক সমাজকেও এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। ভোক্তা হিসেবে আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। কৃত্রিম উপায়ে চকচকে করা কিংবা অসময়ে বাজারে আসা ফলমূল কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে অসাধু ব্যবসায়ীদের বর্জন করতে হবে। রাসায়নিকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করে পরিবেশবান্ধব কৃষিকাজকে উৎসাহিত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্যের উৎস তৈরি এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদে তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করা এখন সময়ের দাবি।খাদ্য মানুষের জীবনধারণের জন্য, জীবন কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। অথচ ভেজাল খাদ্যের এই নীরব আক্রমণ আমাদের প্রতিনিয়ত অসুস্থতার দিকে এবং পরিণামে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একটি সুস্থ ও সবল জাতি ছাড়া কোনো দেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে পারে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অসুস্থতা ও অকালমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাজার থেকে বিষের আধিপত্য দূর করতে হবে। অন্যথায় খাদ্যের মোড়কে মোড়ানো এই বিষ আমাদের সবাইকে অসময়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে।ভেজাল খাদ্য শুধু আমাদের সংক্ষিপ্ত জীবনের আয়ু কেড়ে নিচ্ছে না, মানুষের নৈতিকতাও নষ্ট করছে। যিনি খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছেন, তিনি মানবজীবনের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছেন। আর যিনি জেনেশুনে তা মুখ বুজে সহ্য করছেন, তিনিও এই সামাজিক অপরাধের বিস্তার রোধে নিজের দায়িত্ব পালন করছেন না।[লেখক: উপপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন]

১৩ সাংসদ হারানোর দাবি ঘিরে তুঙ্গে রাজনৈতিক জল্পনা!

নরেন্দ্র মোদীর সরকার কি এবার সত্যিই জোটের চাপে পড়তে চলেছে? একদিকে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতে সমাজবাদী পার্টির সাফল্য, অন্যদিকে এনডিএ-র গুরুত্বপূর্ণ শরিকদের নিয়ে নতুন রাজনৈতিক জল্পনা। সব মিলিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।তবে  টিডিপি এবং জেডিইউ এনডিএ ছেড়ে দিয়েছে, আভাস ভাসলেও  ভেতরের নিশ্চিত খবর এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে দুই শরিক দল জোট ছেড়েছে এবং মোদী সরকার এক ধাক্কায় ১৩ জন সাংসদ হারিয়েছে—এমন দাবি এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠিত নয়!২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলুগু দেশম পার্টি এবং নীতীশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড। দুই দলের সম্মিলিত সাংসদ সংখ্যা ২৮। এর বাইরে চিরাগ পাসোয়ানের লোক জনশক্তি পার্টি (রামবিলাস)-এর পাঁচ সাংসদও এনডিএ-র শক্তির অন্যতম স্তম্ভ।অর্থাৎ, জোটের কোনও গুরুত্বপূর্ণ শরিক সমর্থন প্রত্যাহার করলে তার রাজনৈতিক প্রভাব যথেষ্ট বড় হতে পারে। তবে রাজনৈতিক অসন্তোষ, সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি এবং আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছেড়ে দেওয়া—এই তিনটি বিষয় এক নয়।নাইডুর অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ?চন্দ্রবাবু নাইডুর রাজনৈতিক গুরুত্ব শুধু তাঁর দলের সাংসদ সংখ্যার জন্য নয়। অন্ধ্রপ্রদেশের উন্নয়ন, রাজ্যের আর্থিক সহায়তা এবং কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সম্পর্ক—এই বিষয়গুলিতে তাঁর অবস্থান এনডিএ-র সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ।অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশে সাম্প্রতিক বিধান পরিষদ নির্বাচনে বিজেপি ছয়টি এবং সমাজবাদী পার্টি পাঁচটি আসন পেয়েছে। বারাণসী ও লখনউয়ের মতো এলাকায় বিজেপির ধাক্কা রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই ফলাফলের পর উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য বলেছেন, সমাজবাদী পার্টি এমন জায়গায় জিতেছে যেখানে তাদের জেতার কথা ছিল না। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাহলে মোদী সরকারের সামনে আসল সংকট কোথায়?আসল প্রশ্ন, এনডিএ-র শরিকরা কি কেবল নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য কেন্দ্রের উপর চাপ বাড়াচ্ছে, নাকি জোটের ভিতরেই বড় কোনও পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে?বিরোধীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্ক এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অসন্তোষের প্রভাব এবার এনডিএ-র শরিকদের উপরেও পড়ছে। তবে শরিকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেই সরকার পড়ে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি।মোদী সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা—শরিকদের আস্থা ধরে রাখা এবং বিরোধীদের ক্রমবর্ধমান চাপ সামলানো।আর চন্দ্রবাবু নাইডু যদি ভবিষ্যতে কোনও বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেন, তার প্রভাব শুধু অন্ধ্রপ্রদেশে নয়, দিল্লির ক্ষমতার সমীকরণেও পড়তে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে এখনই জোট ভাঙনের নিশ্চিত খবর account করা যায়না।

‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ জয় বাংলা’ স্লোগান!

“জয় বাংলা বলতে মনরে আমার এখনো কেন ভাবো/আমার হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাবো/অন্ধকারে পুবাকাশে উঠবে আবার দিনমণি”। —মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এ গান শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের নয়, গোটা দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করত স্বাধীনতার মরণপণ লড়াইয়ে। মুক্তিযুদ্ধ তো শুধু স্বাধীনতার যুদ্ধ নয়, আমাদের কাছে এক আবেগময় অনুভূতিও বটে। মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি জয় বাংলা স্লোগানও আমাদের ভালোবাসার ও অতি আপন স্লোগান।১৯৭০ সালে ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আবুল খায়ের ছয় দফার আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে প্রখ্যাত অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, সৈয়দ হাসান ইমাম ও কবরী অভিনীত ‘জয় বাংলা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। গীতিকার ছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। চলচ্চিত্রটি সে বছর সেন্সরে জমা পড়লেও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার চলচ্চিত্রটির মুক্তি আটকে দিলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে তা মুক্তি পায়। কিন্তু ‘৭০ সালেই এ সিনেমার জন্য রেকর্ড করা শাহনাজ রহমতুল্লাহ এবং মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের কণ্ঠে কালজয়ী গান “জয় বাংলা বাংলার জয়/হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়/কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে/নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়...” প্রকাশ পেলে তা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনাসংগীত হিসেবে প্রচারিত হতো।জয় বাংলা, বাংলার জয়—মিশে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। জয় বাংলা স্লোগানের প্রতীকী শক্তিকে তুলে ধরতে একটি কৌতুকের প্রচলন হয়েছিল। গল্পটি এমন—১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী চুল কাটাচ্ছেন। হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে এল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান! ভয়ে তাঁর চুল খাড়া হয়ে গেল। নাপিত তখন মুচকি হেসে বললেন, ‘স্যার, আমি যখনই জয় বাংলা বলি, আপনার চুল খাড়া হয়ে যায়, আর আমার চুল কাটতে সুবিধা হয়!’ এটি নিছক একটি রম্য গল্প বা কাল্পনিক কৌতুক হলেও এর মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের প্রতীকী শক্তি এবং একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য।এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয় যে, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বা দেশের সংবিধানে ঘোষিত মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ বা বিরোধী গোষ্ঠী তথা জামায়াতে ইসলামী ও রাজাকার-আলবদর বাহিনীর বর্তমান সংস্করণ যারা আছেন, তাদের এ স্লোগানে গাত্রদাহ হয়। কিন্তু বিএনপির কেন গাত্রদাহ হতে যাবে? জয় বাংলা তো বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বা বাংলাদেশ চিরজীবী হোক স্লোগানকে নাকচ করে না। বা এর সঙ্গে বিরোধাত্মকও নয়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত কোনো এক মিছিল থেকে নাকি জয় বাংলা ধ্বনি শোনা গেছে। এ অভিযোগে বিএনপির নাম ব্যবহার করে সিপিবি অফিসের সামনে গভীর রাতে মব করা হলো। কয়েকজনকে মারধর করা হলো। সিপিবি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া দল। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় সিপিবির কোনো কর্মী এ স্লোগান উচ্চারণ করতেই পারে। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংযোগ বা সংশ্লিষ্টতা নেই, সংশ্লিষ্টতা আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের। মুক্তিযোদ্ধার দাফনে জামায়াত-শিবির বাধা প্রদান করলে বা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির ওপর হামলা হলে এবং তার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হতে হলে ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি উচ্চারিত হতেই পারে। যদিও সিপিবির মূল রণধ্বনি এটা নয়, আবার এ স্লোগান পরিত্যক্তও নয়। যতটুকু জানি, স্বাধীন দেশে সিপিবির মূল স্লোগান—ভাত, কাপড়, জমি, কাজ। তবে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাই যদি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, স্লোগানও তো পরিবর্তিত হতে পারে।এটাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে বাংলার মানুষ জয় বাংলাকে কিন্তু শুধু স্লোগান হিসেবেই দেখেনি। জয় বাংলার মাঝে খুঁজে পেতে চেয়েছে শোষণমুক্তি, গণতন্ত্র, সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা। ভালোবাসার রত্নকে মানুষ যত্রতত্র ব্যবহার করে না। তাতে রত্ন তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলে। ঠিক তেমনি আমাদের ভালোবাসার মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনিও সারাক্ষণ জপ করার বিষয় নয়। বিশেষত, যদি কোনো শাসকদল তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, কর্তৃত্ববাদী শাসন, জবরদস্তি ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা, আর্থিক খাতে লুণ্ঠন ও বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন ইত্যাদি গণবিরোধী কর্মকাণ্ডকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ও চেতনাকে হরহামেশা জপ করে থাকেন, তখন আর মুক্তিযুদ্ধ ও তার রণধ্বনি মানুষের মাঝে, বিশেষত বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মাঝে গভীর আবেদন সৃষ্টি করে না।বাংলাদেশের গৌরবময় জন্ম-ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘ সময় যাবৎ যে একঘেয়ে রেকর্ড বাজানো হয়েছে এবং ইতিহাসকে অনেকটা পারিবারিক সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, তা তরুণ প্রজন্মের মাঝে বিরক্তি সৃষ্টি করেছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক ইতিহাসও ঠিক ষাটোর্ধ্ব প্রজন্মের ন্যায় আজকের তরুণদের মনে একই ধরনের আবেগ সৃষ্টি করে না। অথচ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নির্মাণে মোট কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৮০ শতাংশ হচ্ছে তরুণ সমাজ। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গণতন্ত্রের চশমা পরে মুক্তিযুদ্ধকে দেখতে চায়। এসব চাহিদা পূরণ না হলে মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুও তাদের কাছে অপ্রধান হয়ে দাঁড়ায়। সেই তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষায় যদি রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপন করা না যায়, কথায় কথায় জয় বাংলা বলে মনের ঝাল মেটানো হয়তো যাবে, কিন্তু রাজনীতিটা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই আজ যারা দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথাসহ দেশের ইতিহাসকেই মুছে ফেলতে চায়, তাদের পরাভূত করতে হলে রাজনীতিটাকে পাথরের মতো স্থির হিসেবে না দেখে সৃজনশীলতার সঙ্গে তা নতুন ভাষায়, নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে হবে।আবার অপব্যবহার হয়েছে বলেই কি মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি পরিত্যাগ করতে হবে? নিশ্চয়ই নয়। তবে ফাঁপা বুলি হিসেবে না জপে অসমাপ্ত জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আর বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তার যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে। সেটাই সৃজনশীলতা। এ ক্ষেত্রে লেজুড়বৃত্তির জুজু দেখলে বিচ্ছিন্নতার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।এটা তো স্পষ্ট যে ২০২৪-এর রক্তাক্ত ঘটনাবলির পরে এমন এক উগ্রবাদী ধর্মান্ধ শক্তির উত্থান হয়েছে, তারা মুখে যা-ই বলুক, তাদের আক্রোশ কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা রেজিমের চেয়ে ’৭১-এর ওপরই বেশি। শুধু মুখ ফুটে বলতে পারছে না, ’৭১-এর আগেই ভালো ছিলাম। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিএনপি কর্মীরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সিপিবি অফিসে মব হামলা করবে, এটা বিশ্বাস হতে চায় না। ধারণা করি, দেশকে আরও অস্থিতিশীল করতে চায়, এমন শক্তি এ ঘটনার পেছনে থাকতে পারে।অস্থিতিশীলতার বিপদকে মোকাবিলা করতে হলে বিএনপিকে এটা বিবেচনায় রাখতে হবে, তাদের দলকে সমর্থন করেন না, এমন বিপুলসংখ্যক ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন এই আশা নিয়ে যে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এবার দেশ পরিচালনা করবেন। দেশের জন্মযুদ্ধবিরোধী শক্তির কাছে এবার অন্তত নত হবেন না। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আগের মতো একতরফা বয়ান না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেই সামরিক নেতৃত্বকে মর্যাদা দেওয়ার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বিএনপিকে নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়া, যা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেটা বিএনপি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হলে বিভাজনের শক্তি ও উগ্রপন্থা পরাজিত হবে। কিন্তু বিএনপি ইতিমধ্যে ‘আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের’ ইউনূসীয় ভূতে আচ্ছন্ন। এখন ‘জয় বাংলা স্লোগানের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করে’ কি বিএনপি অস্থিতিশীলতার শক্তির পাতা ফাঁদে পা দেবে?(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

ভিডিও আরও দেখুন

ফিফপ্রো বর্ষসেরা একাদশে যারা

ফুটবল বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত স্বীকৃতি হিসেবে পরিচিত ফিফপ্রো বর্ষসেরা একাদশের ২৬ জনের প্রাথমিক সংক্ষিপ্ত তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এবারের এই তালিকাটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পেশাদার ফুটবলারদের সরাসরি গোপন ভোটের মাধ্যমে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্বাচিত হয়েছে। বিশ্ব ফুটবলের তারকা খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই তালিকায় বরাবরের মতো এবারও বেশ কিছু চমকপ্রদ নাম জায়গা করে নিয়েছে।খেলোয়াড়দের এই স্বনামধন্য ভোটিং প্রক্রিয়ায় বিশ্বজুড়ে সবমিলিয়ে ১৯ হাজার ৮০৬ জন পেশাদার ফুটবলার অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মাঠের পারফরম্যান্স এবং ধারাবাহিক নৈপুণ্য বিবেচনা করেই খেলোয়াড়েরা তাদের সেরা পছন্দগুলো বেছে নিয়েছেন। এই বিশাল তালিকা থেকে দীর্ঘ বাছাই ও মূল্যায়নের পর চূড়ান্ত একাদশে জায়গা পাবেন কেবল বর্তমান বিশ্বের সেরা ফুটবল তারকারারা।প্রকাশিত এই সংক্ষিপ্ত তালিকায় বিশ্ব ফুটবলের বেশ কিছু মহাতারকার নাম স্পষ্টভাবে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আধুনিক ফুটবলের জীবন্ত দুই কিংবদন্তি লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো যথারীতি এই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছেন। তাদের সঙ্গে গোল করার মেশিন হিসেবে পরিচিত ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইনও এই লড়াইয়ে সামিল হয়েছেন।এছাড়া বর্তমান প্রজন্মের সেরা তারকাদের মধ্যে কিলিয়ান এমবাপে, গোলমেশিন আরলিং হালান্ড, রিয়াল মাদ্রিদের মিডফিল্ডের প্রাণভোমরা জুড বেলিংহাম এবং বার্সেলোনার বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামালের মতো বিশ্বখ্যাত তারকারাও এই সংক্ষিপ্ত তালিকায় বুক উঁচু করে জায়গা করে নিয়েছেন।মাঠের পজিশন অনুযায়ী অন্যান্য তারকাদের মধ্যে রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠের লড়াইয়েও রয়েছে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা। বার্সেলোনার তারকা মিডফিল্ডার রদ্রি, রিয়াল মাদ্রিদের বিশ্বস্ত গোলকিপার থিবো কুর্তোয়া এবং লিভারপুলের পরীক্ষিত রক্ষণভাগের দেয়াল ভার্জিল ফন ডাইক এই মনোনয়ন পেয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত।ডিফেন্ডারদের এই লম্বা তালিকায় আরও রয়েছেন আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল ও উইলিয়াম সালিবা, বার্সেলোনার তরুণ ও উদীয়মান ডিফেন্ডার পাউ কুবারসি এবং প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের দুই ক্ষিপ্র ফুলব্যাক আশরাফ হাকিমি ও নুনো মেন্দেস।মাঝমাঠের সৃজনশীলতা ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে তালিকার জায়গা পেয়েছেন বার্সেলোনার পেদ্রি, আর্সেনালের ডেকলান রাইস, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মিডফিল্ডের কান্ডারি ব্রুনো ফার্নান্দেজ এবং পিএসজির ভিতিনিহা।এছাড়া গোলরক্ষক পজিশনে বিশ্ব মঞ্চে নিজেদের প্রমাণের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এবং স্পেনের নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক ডেভিড রায়া।বিশ্ব ফুটবলের অন্যান্য বড় বড় ব্যক্তিগত পুরস্কারের ভিড়ে ফিফপ্রো বর্ষসেরা একাদশের বিশেষ এবং অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কোনো সাংবাদিক বা সাধারণ দর্শকের ভোটে নির্বাচিত হয় না। এই মর্যাদাপূর্ণ একাদশটি পুরোপুরিভাবে নির্বাচিত হয় কেবল খোদ পেশাদার ফুটবলারদের নিজেদের গোপন ভোটে।মাঠে যারা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়েন কিংবা একসঙ্গে সতীর্থ হিসেবে ঘাম ঝরান, সেই সতীর্থ ও প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়েরাই নিখুঁতভাবে মাঠের পারফরম্যান্স বিচার করে বিশ্ব ফুটবলের এই সেরা একাদশটি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে বেছে নেন।

ফিফপ্রো বর্ষসেরা একাদশে যারা