সংবাদ
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে দুই দিনের ট্রেনের টিকিট বিক্রি করবে রেলওয়ে

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে দুই দিনের ট্রেনের টিকিট বিক্রি করবে রেলওয়ে

পবিত্র ঈদুল আজহা আগামী ২৮ মে সম্ভাব্য দিন ধরে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে ঈদের দিন দেশে সাধারণত কোনো আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে না। এই কারণে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা এবং ঈদ ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী তিন দিনের টিকিট বিক্রি করার বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।​রেলওয়ের ঈদ কর্মপরিকল্পনা থেকে জানা গেছে, আগামী ২৮, ২৯ ও ৩০ মে’র ট্রেনের টিকিট চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে বিক্রি করা হবে। যদি ২৮ মে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়, তবে ২৯ ও ৩০ মে’র টিকিট চাঁদ দেখা কমিটি ঈদের দিন ঘোষণার পরপরই অনলাইনের মাধ্যমে যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।ইতোমধ্যে ঈদের আগের যাত্রার টিকিট বিক্রি সম্পন্ন হয়েছে। গত ১৩ মে দেওয়া হয়েছে ২৩ মে’র যাত্রার টিকিট। একইভাবে পর্যায়ক্রমে ১৪, ১৫, ১৬ ও ১৭ মে বিক্রি করা হয়েছে যথাক্রমে ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ মে’র অগ্রিম টিকিট।ঈদ উদযাপন শেষে কর্মস্থলে ফেরার সুবিধার্থে আগামী ২১ মে থেকে ফিরতি ট্রেনের টিকিট বিক্রি শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে ২১, ২২, ২৩, ২৪ ও ২৫ মে বিক্রি করা হবে যথাক্রমে ৩১ মে এবং ১, ২, ৩ ও ৪ জুনের ফিরতি যাত্রার টিকিট।​টিকিট ক্রয়ের নিয়মাবলী ও শর্তসমূহ:​টিকিটের সীমা: রেলওয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একজন যাত্রী ঈদ অগ্রিম যাত্রার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ একবার এবং একবারে সর্বাধিক চারটি টিকিট কিনতে পারবেন।​রিফান্ড নীতি: ঈদের অগ্রিম যাত্রার টিকিট কোনোভাবেই রিফান্ড বা ফেরতযোগ্য নয়।​স্ট্যান্ডিং টিকিট: আসন না পাওয়া যাত্রীদের অনুরোধে যাত্রার দিন ট্রেনের মোট আসনের (উচ্চ শ্রেণি ব্যতীত) ২৫ শতাংশ ‘স্ট্যান্ডিং’ বা আসনবিহীন টিকিট স্টেশন কাউন্টার থেকে বিক্রি করা হবে।​ঈদ যাত্রাকে নির্বিঘ্ন ও কালোবাজারিমুক্ত রাখতে এবারও শতভাগ টিকিট অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
৪৯ মিনিট আগে

মতামতমতামত

কৃত্রিম জনমত তৈরির ধারা ও বট বাহিনী

আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক গতিপথ নির্ধারণে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে বট বাহিনী। কথাটি শুনে অনেকেই চমকে যেতে পারেন। বিমান বাহিনী, সেনা বাহিনী, নৌবাহিনীর থেকেও কখনো কখনো শক্তিশালী মনে হয় বট বাহিনীকে’! উন্নত পেশাদার বাহিনীগুলো সমাজের মতামত তৈরিতে ভূমিকা রাখে না। তবে বট বাহিনী সামাজিক মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট মতামতের পক্ষে মুহুর্তে লক্ষাধিক মানুষের কৃত্রিম মতামত সৃষ্টি করতে সক্ষম। সকলেই ‘এক-মত’ তাহলে বিষয়টি ‘সত্য’, এরকম ভেবে যারা নিজেদের মতামত পরিবর্তন করে থাকেন তাদের উপর বট বাহিনীর প্রভাব অসীম। সমাজে আজকাল প্রতিনিয়ত কিছুটা হলেও এই ধারাতে কৃত্রিম জনমত তৈরি হচ্ছে। কৃত্রিম ভাবে সৃষ্ট এসব মতামত ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত করছে ব্যক্তি, সমাজ এবং সরকারের মতামত এবং নীতি নির্ধারণে। মতামত তৈরির এই প্রক্রিয়া আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিকে গভীর সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জগতের অভিভাবকেরা কী এই অশুভ মতামত তৈরির প্রক্রিয়ার বিষয়ে সচেতন আছেন নাগরিক সমাজের সদস্য হিসেবে আমরা ঠিক বুঝতে পারিনা। ‘রোবট’ থেকে ‘বট’ শব্দটি এসেছে। এটি এমন একটি প্রযুক্তি নির্ভর সফটওয়্যার, যা মানুষের মতো আচরণ করতে সক্ষম। এর কর্মক্ষেত্র হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বট বাহিনী কিংবা বটকে ব্যবহার করা হয় একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রচারনা চালিয়ে নিজেদের পক্ষে একটি কৃত্রিম মতামত তৈরি করা হলো বটবাহিনীর লক্ষ্য। রাজনীতির স্বাভাবিক গতিকে একটি নির্দিষ্ট দল বা মতাদর্শের দিকে টেনে নিতে বট বাহিনীর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। রাজনৈতিক প্রচারণা চালাতে, কখনো প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে, আবার কখনো কৃত্রিম জনপ্রিয়তা তৈরির জন্য বট বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়। বটবাহিনী হলো ছদ্ম বা গুপ্ত বাহিনী। মেঘনাদের মতো মেঘের আড়ালে এখানে প্রযুক্তির পর্দা টানিয়ে যুদ্ধ করে থাকে বটবাহিনী, যেহেতু বাহিনীটি ছদ্মবেশ ধারণ করে মতামত প্রচার করে থাকে তাই বটবাহিনী কোন ভাবেই ˆনতিক কোন শক্তি নয়। অনৈতিক ছদ্মবেশ ধারণকারীরা কখনোই সমাজে শুভ শক্তি হিসেবে গণ্য হতে পারেনা। ভার্চুয়াল সমাজে এই যে বিরামহীন যুদ্ধ চলছে এই যুদ্ধের সব চেয়ে বড় শক্তি হলো বট বাহিনী। কারা এই বট বাহিনী? বট কিন্তু শ্যামল ছায়া দিয়ে সবাইকে আগলে রাখা বটবৃক্ষ নয়। কৃত্রিম উত্তাপ ছড়িয়ে সমাজ ও রাজনীতির অলি-গলিতে প্রবেশ করে তথ্য বিকৃতি করে একটি ছদ্ম শক্তির পক্ষে মতামত তৈরি করে থাকে। এমন ভাবে মতামত তৈরি হয় সাধারণের কাছে মনে হয় এটিই প্রকৃত মতামত। আমরা গণতন্ত্র নিয়ে অষ্ট প্রহর কথা বলে থাকি। গণতন্ত্র কিন্তু নির্মিত হয় ‘গণের’ মতামতের ওপর। এই গণ বা জনগণ যে মতামত দিতে চান সে মতামত কী স্বাভাবিক ভাবে প্রকাশিত হতে পারছে নাকি পৃষ্ট হচ্ছে বট বাহিণীর মতামতের নিচে। সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতিতে ব্যাপক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। ভারসাম্য-হীনতা তৈরির জন্য বটবাহিনীর ভূমিকা কতোটুকু এসব বিষয়ে আমাদের গবেষণা যে খুব বেশি হচ্ছেনা, তা আমরা আঁচ করতে পারি। মনে রাখতে হবে গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি দাঁড়িয়ে থাকে মুক্ত মতপ্রকাশ, সত্য তথ্য এবং সচেতন নাগরিকের ওপর। সহিংসতা বা প্রতিপক্ষের কণ্ঠরোধ যেমন গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি কৃত্রিম জনমত তৈরির এই ডিজিটাল সংস্কৃতিও সমান বিপজ্জনক। সমাজ, রাজনীতির স্বাভাবিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করে এটি একটি কৃত্রিম, অবাস্তব, অযৌক্তিক পথে একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। মানুষের স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করে এবং বিভ্রান্তিকে সত্যের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বহুমুখী উন্নতির ফলে বটবাহিনী দিনেদিনে মানুষের মতো করে ভাষা ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। এ কারণেই মানুষ আর বটের মধ্যে পার্থক্য করা খুব কঠিন কাজ হয়ে পড়ছে। বট বাহিনী মূলত দু’ভাবে কাজ করে থাকে। বট বাহিনীকে মোতা দাগে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো প্রযুক্তি নির্ভর অর্থাৎ সফটওয়্যার নির্ভর বট আর অন্যটি হলো মানব নিয়ন্ত্রিত বট। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বট, নির্দিষ্ট শব্দ বা পোস্ট শনাক্ত করার ক্ষমতা রাখে। তাদের এতোই ক্ষমতা যে মুহূর্তের মধ্যে মন্তব্য, শেয়ার বা প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে মানবিক সুরে মানুষের মতো কথা বলতে সক্ষম হচ্ছে বট বাহিনী। মানবসদৃশ ভাষা ব্যবহারে তারা এতোই সক্ষম যে তাদের মতামতকে সমাজের কণ্ঠ হিসেবে বিবেচনা না করে পারা যায়না। স্বল্পশিক্ষিত অতিসাধারণ, কিংবা শিক্ষিত মানুষের পক্ষে প্রকৃত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী আর কৃত্রিম বটের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা দুরুহ হয়ে পড়ে।  মানব নিয়ন্ত্রিত বট কোন কোন ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নির্ভর বটের থেকে বিপদজনক। বাস্তব ক্ষেত্রে এরা মানুষ হলেও ছদ্ম পরিচয়ে এরা অগণন অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে থাকে। রাজনৈতিক দল, করপোরেট গোষ্ঠী কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের নির্দেশে তারা সংঘবদ্ধভাবে অপপ্রচার, গালাগালি, চরিত্রহনন ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালায়। একজন অপারেটর কখনো কখনো ত্রিশ, চল্লিশটি পর্যন্ত অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ করে। নির্দিষ্ট ভাবে ইশারা পেলেই তারা যে কোনো পোস্টে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমন্বিত আক্রমণ শুরু করে। বাস্তব সেনা সদস্যরাও এতো নিষ্ঠুর আক্রমণ করতে পারেনা। ছদ্ম প্রভুর ছদ্ম সেনারা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিরতিহীন ভাবে আক্রমন শানিয়ে যায়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তাপ যত বেড়েছে, বট বাহিনীর সক্রিয়তাও তত দৃশ্যমান হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক ঘটনা, আন্দোলন কিংবা সংবেদনশীল সংবাদ প্রকাশের পর মুহূর্তেই হাজার হাজার অভিন্ন মন্তব্য, একই ধরনের ভাষা ও একই সুরের প্রচারণা চোখে পড়ে। এতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের অনেকেই মনে করেন, যেন পুরো সমাজ একটি নির্দিষ্ট মতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অথচ বাস্তবে এই জনমতের ঢেউয়ের বড় অংশই কৃত্রিম। একটি বিষয় অত্যন্ত আশা জাগানিয়া। সেটি হলো কৃত্রিম মতামত সর্বস্তরের মানুষকে স্পর্শ করতে পারেনি। কৃত্রিম মতামত কিছুটা প্রভাবিত করতে পারে সামাজিক, রাজনৈতিক গতি প্রবাহ তবে প্রকৃত বা বাস্তব মতামতকে যথেষ্ট ভাবে প্রভাবিত করতে পারেনা। ফেসবুকের জনমত আর মাঠের বাস্তবতা যে এক নয়, তা প্রমাণিত হয়েছে ভোটের ফলাফলে। অনলাইনে যে পক্ষকে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দেখানো হয়েছে, বাস্তবে নির্বাচনী ফলাফল ছিল তার ঠিক বিপরীত। এতে প্রমাণ হয়েছে, বটের তৈরি করা কৃত্রিম জনপ্রিয়তা সব সময় বাস্তব রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে পারে না। মাঝে মধ্যে মীমাংসিত বিষয়কে মিথ্যা বানানোর চেষ্টা কিংবা টাইমিংয়ের হেরফেরে বট নিজেই হাসির পাত্রে পরিণত হয় এবং মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়। তবু ক্ষতি কম হচ্ছে না। কারণ, এই বট সংস্কৃতি সমাজে বিষাক্ততা বাড়াচ্ছে, মতপ্রকাশের পরিবেশ সংকুচিত করছে এবং তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ধ্বংস করছে। কৃত্রিম মতামত তৈরির এই প্রবাহকে রুখতে হলে প্রয়োজন ডিজিটাল লিটারেসি জ্ঞান। নাগরিক সমাজের এই দক্ষতার অভাবে কৃত্রিম মতামত তৈরির প্রক্রিয়া সবল হচ্ছে ক্রমাগত। আমাদের সমাজে ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি বা তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এখনও দুর্বল হওয়ায় বট নির্ভর প্রচারণা খুব সহজেই মানুষের আবেগ, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সামাজিক বিভাজনকে প্রভাবিত করতে পারে। সামজিক রাজনৈতিক গতিধারার স্বাভাবিক প্রবাহকে বহমান রাখাটা খুব জরুরি। কৃত্রিম মতামত আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের নিয়ন্ত্রক হতে পারেনা। ঘুণপোকা যেমন ভেতর থেকে একটি কাঠামোকে অকার্যকর করে ফেলে কৃত্রিম মতামতও এক সময় আমাদের জাতীয় পথ চলাকে অর্থহীন করে তুলতে পারে। সময় হয়েছে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধন এবং সামজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল লিটারেসির জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির। এ বিষয়ে নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তিবিদ এবং রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠন গুলোকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। [লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

পদ্মা ব্যারাজ: বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ভবিষ্যৎ রক্ষার মহাপরিকল্পনা

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু প্রকল্প কেবল অবকাঠামো নয়, সময়ের দাবি হয়ে আসে। পদ্মা সেতু যেমন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ, অর্থনীতি ও আত্মবিশ্বাসে নতুন যুগের সূচনা করেছে, তেমনি আজ ‘পদ্মা ব্যারাজ’ হতে পারে বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির নতুন ভিত্তি। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো— দেশের বহু নদী আজ মৃতপ্রায়। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে পড়ে। খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, বাগেরহাট, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এখন নদী আছে, কিন্তু প্রবাহ নেই; খাল আছে, কিন্তু পানি নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার বিস্তার। এই সংকট শুধু পরিবেশগত নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সংকট। তাই পদ্মা ব্যারাজ এখন আর শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়—এটি দক্ষিণাঞ্চলকে টিকিয়ে রাখার দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কৌশল। কেন এখন পদ্মা ব্যারাজ অপরিহার্য?বিশেষজ্ঞদের মতে, Farakka Barrage চালুর পর থেকেই শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানিপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ’৩৪-’৭৪ সময়কালের তুলনায় ’৭৫-২০০৫ সময়ে ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত গঙ্গা-পদ্মা নদীর প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। গড়াই নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সুপেয় পানির সংকট তৈরি হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে, মাছের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, নদীর নাব্যতা কমছে এবং সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ঝুঁকির মুখে পড়ছে। একসময় দক্ষিণাঞ্চল ছিল নদী, মাছ ও উর্বরতার প্রতীক। নদীর বুকজুড়ে চলতো নৌকা, খাল-বিল ভরা থাকতো মাছের প্রাচুর্যে। অথচ আজ অনেক নদী শুধু চর আর পলিতে ভরাট। এই বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।কৃষিতে আসতে পারে নতুন বিপ্লব:বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার বড় শক্তি কৃষি। কিন্তু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল কৃষিজমি এখনও পুরোপুরি ব্যবহৃত হচ্ছে না। লবণাক্ততা ও পানির অভাবে অনেক জমি এক ফসলি হয়ে পড়েছে, কোথাও আবার জমি অনাবাদি থাকে। একসময় Ganges-Kobadak Irrigation Project দেশের অন্যতম বৃহৎ সেচপ্রকল্প ছিল। প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার হেক্টরের বেশি জমি এই প্রকল্পের আওতায় সেচ সুবিধা পেত। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর কমে যাওয়ায় অনেক পাম্প অকার্যকর হয়ে পড়ে। পদ্মা ব্যারাজ কার্যকর হলে দক্ষিণাঞ্চলে সেচব্যবস্থা সম্প্রসারিত হবে। বছরে একাধিক ফসল উৎপাদন সম্ভবহবে। ধান ছাড়াও গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, সবজি ও ফল উৎপাদনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, খাদ্যচাহিদাও বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিকে পুনর্জীবিত করা অত্যন্ত জরুরি। মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধারে বড় সম্ভাবনা:বাংলাদেশের সংস্কৃতি, পুষ্টি ও অর্থনীতির সঙ্গে মাছ গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশীয় মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গঙ্গা অববাহিকার স্বাভাবিক স্রোত, ঘোলাভাব, পুষ্টিগুণ ও লবণাক্ততার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একসময় এই নদীব্যবস্থায় ২০০টির বেশি স্বাদুপানির মাছ এবং অন্তত ১৮ প্রজাতির চিংড়ির আবাস ছিল। বর্তমানে অনেক দেশীয় মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে যদি নদীতে সারা বছর ন্যূনতম প্রবাহ বজায় রাখা যায়, তাহলে দেশীয় মাছের প্রজনন বৃদ্ধি পাবে, জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং নদীনির্ভর মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। এটি শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়; এর সঙ্গে লাখো জেলের জীবন-জীবিকা জড়িত।লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সমাধান:দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো লবণাক্ততা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। গবেষণায় খুলনা অঞ্চলের রূপসা নদীতে ক্লোরাইডের মাত্রা ৫৬৩.৭৫ মিলিগ্রাম/লিটার পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে Total Dissolved Solids (TDS) ১,২০০ মিলিগ্রাম/লিটার ছাড়িয়েছে, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্রহণযোগ্য সীমা ৫০০ মিলিগ্রাম/লিটার। ফলে কৃষিজমি অনাবাদি হচ্ছে, সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে নারীরা দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহে সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ করেন। যদি পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত মিঠাপানি সরবরাহ করা যায়, তাহলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে। সুন্দরবন রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ:বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলকে রক্ষা করতে সুন্দরবনের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এই বনও আজ সংকটে। নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বাড়ছে, যা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। পরিবেশবিদদের মতে, সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখতে হলে নিয়মিত মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। পদ্মা ব্যারাজ সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ এই প্রকল্প শুধু মানুষের জন্য নয়; বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার সঙ্গেও সম্পর্কিত। নদী বাঁচলে অর্থনীতিও বাঁচবেবাংলাদেশের অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে নদীকেন্দ্রিক। নদী শুধু পানির উৎস নয়; এটি পরিবহন, কৃষি, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু নদীতে পানি কমে যাওয়ায় নাব্যতা নষ্ট হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৩২০ কিলোমিটারের বেশি নৌপথ অকার্যকর হয়ে পড়ে। এতে নদীনির্ভর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হাজার হাজার মাঝি ও নৌযানশ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। যদি নদীতে স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে, তাহলে নৌপরিবহন সহজ হবে, পলি ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে এবং নদীর প্রাণ ফিরে আসবে। এতে পরিবহন ব্যয় কমবে, আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়বে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ:বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। আগামী কয়েক দশকে পানি ব্যবস্থাপনা হবে জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাপী এখন পানি নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ ভবিষ্যতের খাদ্যসংকট, অভিবাসন ও সামাজিক অস্থিরতার সঙ্গে পানির সম্পর্ক গভীর। বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পানি অবকাঠামো গড়ে তুলতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতে সংকট আরও তীব্র হবে। পদ্মা ব্যারাজ সেই দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা:তবে একটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে—ব্যারাজ নির্মাণ মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। বিশ্বের অনেক দেশে অপরিকল্পিত বাঁধ ও ব্যারাজ পরিবেশগত বিপর্যয়ও তৈরি করেছে। তাই পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে নদী, জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও স্থানীয় জনজীবনের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায়। একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং কার্যকর পলি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন নিশ্চিত করতে আধুনিক ফিশ প্যাসেজ নির্মাণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া স্থানীয় জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, কারণ এই প্রকল্পের সুফল ও প্রভাব সবচেয়ে বেশি বহন করবে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও পরিবেশবিদদের সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ আন্তঃসীমান্ত পানি কূটনীতির দক্ষ ব্যবস্থাপনাও এ প্রকল্পের সফলতার জন্য অপরিহার্য। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পদ্মা ব্যারাজ যেন কেবল রাজনৈতিক আবেগ বা প্রতীকী উন্নয়ন প্রকল্প না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার ভিত্তিতে বাস্তবায়িত একটি টেকসই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পরিণত হয়। এখন সময় জাতীয় ঐকমত্যের:বাংলাদেশ একসময় ভাবত, পদ্মা সেতু হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু আজ সেই সেতুই দেশের উন্নয়নের প্রতীক। পদ্মা ব্যারাজও তেমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা হতে পারে, যা আগামী ৫০ বছরের পানি, কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, নদী শুকিয়ে গেলে শুধু পানি হারায় না; হারায় কৃষি, মাছ, সংস্কৃতি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এখনই বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ পানি নিয়ে যে বৈশ্বিক সংকট শুরু হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও তীব্র হবে। পদ্মা ব্যারাজ সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি হতে পারে—যদি এটি হয় বিজ্ঞানসম্মত, পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থনির্ভর।(লেখকের নিজস্ব মত) [লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ঢাকা]

শিশুদের নিরাপত্তা কোথায়

অতি সম্প্রতিকালের কিছু ধর্ষণ ঘটনা। টাঙ্গাইল পৌরসভা এনায়েতপুর বইল্যা বাজারের পূর্ব পাশের একটি মহিলা মাদ্রাসার ৪০ জনের বেশি কন্যা শিশুকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। যৌন নির্যাতন করা হতো ছাত্রীদের চোখ বেঁধে। ছাত্রীদের বাথরুম গোপনে ভিডিও করে তা প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন চালানো হতো। নেত্রকোণার মদন উপজেলায় একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকের ধর্ষণে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা। গর্ভবতী হওয়া নিয়ে শিশুটির কোনো জ্ঞান নেই, পেটের ভেতর নড়াচড়া সে অনুভব করেছে, কিন্তু কী নড়াচড়া করে তা সে জানে না। তার শারীরে পরিবর্তন আসার পর তার পরিবার তাকে প্রশ্ন করে ধর্ষণের বিষয়টি জানতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের ‘আল হিদায়াত হিফজুল কুরআন মডেল মাদ্রাসায়’ ৯ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে শিক্ষক সাকির আলী প্রথমে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছেন, পরে গলা চেপে শূন্যে তুলে মাটিতে আছাড় দিয়েছেন, শিশুটি যন্ত্রণায় যতবেশি কান্নাকাটি করেছে, শিক্ষকের নির্যাতন ততবেশি বেড়েছে। সহপাঠিরা আতঙ্কিত অবস্থায় এই দৃশ্য দেখেছে। এই নির্যাতন হচ্ছে যৌনকর্মের পূর্ব প্রস্তুতি।এমন ঘটনা শত শত।ধর্ষণ শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতে কমবেশি আছে, কিন্তু বাংলাদেশে মহামারি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্ষণ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জিম্মি করে ধর্ষণ করা হয়, যৌনকর্মে রাজি না হলে ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। কিন্তু মাদ্রাসায় ধর্ষণের চিত্র ভিন্ন, সেখানে ধর্ষিত প্রায় সবাই শিশু। মাদ্রাসায় ছেলে শিশুদের বলাৎকারের নানা কাহিনী রূপকথার গল্পের মতো অবিশ্বাস্য মনে হয়। মাদ্রাসার শিক্ষকদের ধর্ষণ ও বলাৎকারে বহু শিশু মারাও গেছে। শুধু কী মাদ্রাসার শিক্ষক ? না, মসজিদের অনেক ইমাম ও মুয়াজ্জিনও ধর্ষণ এবং বলাৎকারের অপকর্মে লিপ্ত। এরা বহু ঘটনায় ধরা পড়েছে, সাধারণ জনগণের হাতে নিগৃতও হয়েছে, তারপরও ধর্ষণ আর বলাৎকার থামছে না। ধর্ম এবং রাষ্ট্রও এদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখেছে, কিন্তু এরা ভয় পায় না। লুত জাতির ধ্বংস বা দোজখের আগুনে দগ্ধ হওয়ার ভীতিজনক শাস্তির ভয়ও তাদের কুৎসিত প্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখতে পারে না। এরা ধর্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল বলেই সম্ভবত ধর্মের নিষেধাজ্ঞা এদের ভীত করে না।একশ্রেণীর মাওলানা, ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বলাৎকার ও ধর্ষণের ধরন শুধু বিকৃত নয়, অভিনবও। শিশুর মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে, হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ ও বলাৎকার করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চকোলেট দিয়ে, কোন কোন ক্ষেত্রে গোসল বা গায়ে তেল মাখানোর ফজিলত বর্ণনা করতে করতে, কখনো কখনো সওয়াব কামানোর বানী দিয়ে, আবার কখনো কখনো বেহেস্ত পাওয়ার আশ্বাসবানী শুনিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এমনও দেখা গেছে, নির্যাতিত শিশুর যন্ত্রণার চিৎকার শুনে ধর্ষক মাওলানারা বেশি বেশি যৌন উত্তেজনা অনুভব করেছে। শয়তান আছর করে বলেই তাদের ধর্ষণশক্তি বেড়ে যায়, সব দোষ শয়তানের ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা। ধর্ষণের আরও একটি অভিনব কৌশল তারা অনুসরণ করে থাকে, তারা শিশুদের মনে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাদের যৌনকর্মকে সহজ করে তোলে। শিক্ষকের কথা না শুনলে অন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়, হাতের আঙুলে পচন ধরার ভয়, কবরে বিষধর সাপের দংশনের ভয়, আর দোজখের ভয়। এইসব ভয় কাজ না করলে বেত আর লাঠির ভয়। মাদ্রাসার এমন অমানুষিক নির্যাতনের কথা সবাই জানে। শিশুর হাত-পা রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয়, তারপর শুরু হয় পিটানো। শিশুর বাবাগো, মাগো চিৎকারে চারিদিক প্রকম্পিত হলেও শিক্ষকের মন গলে না, যতক্ষণ দেহে শক্তি থাকে ততক্ষণ পিটায়। মাঝে মাঝে হাত-পা বেঁধে টাঙ্গিয়ে পিটানো হয়। বাকি ছাত্র-ছাত্রীরা এই রোমহর্ষক নির্যাতনের মধ্যেও জোরে জোরে কোরআন পড়তে থাকে। এমন আতঙ্ক ও ভীতিজনক অবস্থা দেখার পর কোন শিক্ষার্থীর পক্ষে শিক্ষকের আহবানে যৌনকর্মে সাড়া না দেয়ার সাহস থাকে না। তাদের নালিশ করারও কোনো স্থান নেই, মা-বাবা ধর্মীয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগকে গুরুত্ব দেন না। অবশ্য মা-বাবার সীমাবদ্ধতাও আছে, মাদ্রাসা থেকে এনে সন্তানদের স্কুলে দেয়ার সামর্থ তাদের নেই। গরীব ঘরের শিশুরা মাদ্রাসায় শুধু পড়তে যায় না, খাবারও পায়। তাই কোন মা-বাবা চায় না তাদের সন্তান মাদ্রাসা থেকে বিতাড়িত হোক, বিতাড়িত হলে শুধু লেখাপড়া বন্ধ হবে না, হস্টেলে অবস্থান করে বিনে পয়সায় খাবারটাও হারাবে।দেশে কতগুলো মাদ্রাসা আছে তার সঠিক হিসাব বের করাও কঠিন, কারণ কওমী মাদ্রাসা করতে সরকারের অনুমতি লাগে না। দেশের যেখানেই চোখ পড়বে সেখানেই মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা, কওমী মাদ্রাসা, মহিলা মাদ্রাসা, মহিলা ক্যাডেট মাদ্রাসা। ধর্মীয় রক্ষণশীল অংশের সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্য আওয়ামী লীগ সরকার দেশের আনাচেকানাচে কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর সরকারগুলোর চরম ব্যর্থতায় দরিদ্র ও হত দরিদ্র পরিবারগুলো সাধারণ শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, হচ্ছে। সমাজে যারা এককালে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন তাদেরই নাতিপুতি সন্তানেরা এখন মাদ্রাসা তৈরি করছেন। গণতন্ত্রের নামে আমাদের দেশে যে নির্বাচন হয় তাও মাদ্রাসার সম্প্রসারণে বিরাট ভূমিকা পালন করছে, আস্তিক-নাস্তিক-ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজ সব প্রার্থীই নির্বাচনের সময় অকাতরে মাদ্রাসায় দান করে যাচ্ছেন। আর যারা মাদ্রাসা থেকে পাস করছেন তাদের ইহকালে টিকে থাকার কোন কর্মজ্ঞান নেই, তাই কর্মসংস্থানের জন্য আরেকটি মাদ্রাসা খুলতে হয়।গরীবের ইহকাল কষ্টের, তাই পরকালে বেহেশতের প্রত্যাশা অত্যধিক। শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সব মুসলমানের একটি ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে, কোরআনে হাফেজ হলে তার মা-বাবা বেহেশতে যাবে। শুধু তাই নয়, একজন হাফেজ যে তার চৌদ্দ গোষ্ঠীকে বেহেশতে নিতে পারবেন সেই ধারণা আমাদের দেয়া হয়েছে মক্তবে। কিন্তু এ সম্পর্কে কোরআনে কোনো বক্তব্য নেই, এমন কী এ সম্পর্কে কোনো সহিহ হাদিসও নেই। একটি দুর্বল হাদিসে বলা হয়েছে যে, একজন কোরআনে হাফেজ তার গোষ্ঠীর ১০ জন জাহান্নামী ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। কিন্তু দুর্বল হওয়ায় অধিকাংশ আলেম এই হাদিসটি অগ্রহণযোগ্য বলে মতামত দিয়েছেন। তবুও পরিবারের একজন সদস্যকে হাফেজ বানানোর তীব্র আগ্রহ রয়েছে। এই আগ্রহ থেকেই গরীব পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের মাদ্রায় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায়। হাফেজ মাওলানা দ্বারা হাফেজ শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ আর বলাৎকার নিয়ে আলেম সমাজে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া নেই, ওয়াজে মাদ্রাসার কোন ধর্ষক শিক্ষককে ভর্ৎসনা করার নজিরও খুব বেশি নেই।শুধু দেশে নয়, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতেও অহরহ ধর্ষণ হচ্ছে। সউদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো প্রভৃতি দেশে বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলো থেকে নারী গৃহকর্মী নিয়ে গৃহকর্তা ও গৃহকর্তার ছেলে মিলে শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গৃহকর্মী গর্ভবতী হয়ে দেশে ফেরত আসে, দেশে আসার পর শিশু জন্ম নিলে তাদের বলা হয় ‘জারজ’। এমন নিষ্পাপ ‘জারজ’ সন্তানের জন্ম হয়েছে একাত্তরেও। গণিমতের মাল গণ্য করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার মিলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দুই থেকে চার লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছে। সেনাদের এই ধর্ষণ শুধু যৌনক্ষুধা মেটানোর তাগিদে হয়নি, হয়েছে একটি জাতি, সম্প্রদায়কে কলুষিত ও অপমানিত করার জিঘাংসাজাত আক্রোশ থেকে। তাদের গর্ভে জন্ম নেয়া শিশুদের অধিকাংশ বাংলাদেশে ঠাঁই পায়নি, তাদের স্থান হয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বাকি যারা ছিল তাদের স্কুলে ভর্তির সময় বাবার নাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ লিখতে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর গৃকর্মীরাও একাত্তরের মতো অসহায়, তাদের নালিশ শোনার মতো কোন আপনজন ওখানে নেই; তাছাড়া সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ক্ষমতা এবং সাহস কোনটাই বাংলাদেশের নেই। বিদেশে গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন ও তাদের ধর্ষণ করার কারণে অদ্যাবধি কোনো ব্যক্তির শাস্তি হয়নি। ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, নেপাল, ফিলিপিন্স মাঝে মাঝে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ রাখে। কিন্তু অভাব তাদের আবার পাঠাতে বাধ্য করে।সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই খারাপ, ৫ আগস্টের পর দেশের সর্বত্র এমন একটি প্রতীতির জন্ম হয়েছে যে, সংঘবদ্ধ হয়ে যাই করুক না কেন তা আমলে নেয়া হবে না। চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী এবং মব সন্ত্রাসের মতো ধর্ষকেরাও নিজেদের ‘বিপ্লবী’ ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায়, নিশ্চয়ই এই সরকার মোহাম্মদ ইউনূসের মতো ইনডেমনিটির চর্চা করবে না, জিরো টলারেন্সের একটি কঠোর বার্তা দিয়ে ধর্ষকদের মনে ভয় ধরিয়ে দেবে। এছাড়াও মাদ্রাসার ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আলেম সমাজ সোচ্চার হলে ধর্ষণ ও বলাৎকার থামানো হয়তো সম্ভব হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

‘প্যাক্স আমেরিকানা’র পতন

ইতিহাস খুব কম সময়েই নিজেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করে। বেশিরভাগ বড় পরিবর্তন শুরু হয় নিরবে—কোনো বৈঠকের টেবিলে, কোনো করমর্দনের আড়ালে, কিংবা এমন এক রাজনৈতিক মুহূর্তে যার প্রকৃত তাৎপর্য তখনই ধরা পড়ে না। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বেইজিং সফর ছিল তেমনই এক ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র তখন এমন এক চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে এগিয়ে গিয়েছিল, যাকে সে দীর্ঘদিন বৈশ্বিক ব্যবস্থার বাইরে রাখতে চেয়েছিল। কয়েক বছর পর দেং জিয়াও পিংয়ের আমেরিকা সফর বিশ্বকে আরেকটি বার্তা দিয়েছিল—চীন বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে নয়, বরং তার ভেতরে প্রবেশ করে তাকে নতুনভাবে প্রভাবিত করতে চায়। ডনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিন পিংয়ের বেইজিং বৈঠক হয়তো সেই ঐতিহাসিক নাটকীয়তার পুনরাবৃত্তি করবে না। গ্রেট হল অব দ্য পিপলের কোনো ছবি সম্ভবত নিক্সন-মাওয়ের ছবির মতো ইতিহাসের প্রতীকে পরিণত হবে না। তবু এই সম্মেলনকে নিছক আরেকটি কূটনৈতিক রুটিন বলে দেখার সুযোগ নেই। এর গুরুত্ব লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়—বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনশীল ভারসাম্যে এবং কোন রাষ্ট্রটি ক্রমশ বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ, ˆধর্যশীল ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে এগোচ্ছে, সেই বাস্তবতায়। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী তিন দশক যুক্তরাষ্ট্র এমন এক আত্মবিশ্বাসে কাটিয়েছে, যেন তার সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রাধান্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। ওয়াশিংটনের বড় অংশ বিশ্বাস করত, অর্থনৈতিক একীভূতের মধ্য দিয়ে চীন ধীরে ধীরে পশ্চিমা রাজনৈতিক কাঠামোর দিকেই ঝুঁকবে। চীনকে দেখা হতো বিশাল উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে, সভ্যতাগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়। আজ সেই ধারণা শুধু ভুলই নয়, অনেকাংশে বোকামি বলেও মনে হয়। আজকের চীন অতীতের ন্যায় সত্তরের দশকের বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল রাষ্ট্র নয়। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি; এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার; এবং এমন এক প্রযুক্তিগত শক্তি, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে সেমিকন্ডাক্টর পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে আমেরিকার দীর্ঘদিনের একচেটিয়া প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—চীন এই উত্থান ঘটিয়েছে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে জড়িয়ে নয়, বরং বাণিজ্য, অবকাঠামো ও কৌশলগত ˆধর্যের মাধ্যমে। এই পার্থক্যটি ছোট নয়। বেইজিংয়ের দিকে যাত্রা করছে এমন এক আমেরিকা, যার কাঁধে কৌশলগত ক্লান্তির ভার স্পষ্ট। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া কিংবা সাম্প্রতিক ইরান-সংকট—সব ক্ষেত্রেই একটি প্রবণতা চোখে পড়ে: যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরু করতে পারদর্শী, কিন্তু তা রাজনৈতিকভাবে টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে প্রায়ই ব্যর্থ। সামরিক শক্তির প্রাচুর্য সবসময় কৌশলগত সাফল্য নিশ্চিত করে না; বরং অনেক সময় তা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। চীন ঠিক সেই সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ নিয়েছে। তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও বেইজিং সরাসরি সংঘাতে জড়ানো এড়িয়ে গেছে। ইরান থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে, আঞ্চলিক মধ্যস্থতার পক্ষে থেকেছে এবং নিজেকে যোদ্ধার চেয়ে সম্ভাব্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে তুলে ধরেছে। এটি আদর্শবাদ নয়; বরং বাস্তববাদ। কারণ হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাস্তববাদকে দুর্বলতা বলা যায় না—প্রায়শই সেটিই পরিপক্বতার পরিচয়। পশ্চিমা বিশ্বে চীনকে প্রায়ই এমন এক আগ্রাসী শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়, যে বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থাকে উল্টে দিতে চায়। বাস্তবতা অবশ্য আরও জটিল। দক্ষিণ চীন সাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক বা তাইওয়ান প্রশ্নে বেইজিং নিঃসন্দেহে তার প্রভাব বাড়াতে চায়। কিন্তু তার পদ্ধতি অধিকাংশ সময়ই সামরিক আঘাতের চেয়ে অর্থনৈতিক নির্ভরতা, অবকাঠামোগত সংযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ওপর নির্ভরশীল। তাইওয়ান ইস্যুতেও চীনের আচরণে একটি হিসাবি সতর্কতা দেখা যায়। শি জিনপিং একাধিকবার পুনরেকত্রীকরণকে ঐতিহাসিক লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু বেইজিং এখনও ইউক্রেনে রাশিয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানে যায়নি। কারণ চীনা কৌশলবিদরা বোঝেন— বড় শক্তির যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু তার পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তি যুদ্ধেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও চিপ নিষেধাজ্ঞা চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারবে। তথাকথিত ‘স্মল ইয়ার্ড, হাই ফেন্স’ নীতির লক্ষ্য ছিল উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও এআই অবকাঠামো থেকে বেইজিংকে বিচ্ছিন্ন রাখা। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টোও। চীন দেশীয় উদ্ভাবনে গতি বাড়িয়েছে, নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং পশ্চিমা জোটের বাইরে নতুন অংশীদার খুঁজে নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেও কিছু ক্ষেত্রে নীতিগত শিথিলতায় যেতে হয়েছে, কারণ বাজার হারানোর চাপ আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্যও অস্বস্তিকর হয়ে উঠছিল। এখানেই একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট হয়: গভীরভাবে আন্তঃসংযুক্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনকে বিচ্ছিন্ন করা সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিচ্ছিন্ন করার মতো সহজ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন নতুন প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয়ই জানে, আগামী দশকের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব অনেকাংশে নির্ধারিত হবে এআই, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও উন্নত অটোমেশনের মাধ্যমে। কিন্তু এখানে একটি বড় বৈপরীত্য আছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই এই প্রতিযোগিতাকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বনাম কর্তৃত্ববাদের লড়াই হিসেবে তুলে ধরে। অথচ বিশ্বের বহু দেশ এখন মতাদর্শের চেয়ে সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আর সেই সক্ষমতার প্রদর্শনে চীন অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে গেছে। যখন আমেরিকান রাজনীতি অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ, সংস্কৃতিযুদ্ধ ও প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থায় জর্জরিত, তখন বেইজিং নিজেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, এটি এমন এক কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচয় দেয় যা পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো অনেক দিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে দেখাতে পারছে না। চীন বন্দর, রেলপথ, শিল্পাঞ্চল ও জ্বালানি করিডোর নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে; আর যুক্তরাষ্ট্র ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এমন যুদ্ধে, যেগুলো দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। অবশ্য এর মানে এই নয় যে চীনের সামনে কোনো সংকট নেই। জনসংখ্যাগত পতন, যুব বেকারত্ব, ঋণের চাপ ও রিয়েল এস্টেট খাতের অস্থিরতা— এসবই বাস্তব সমস্যা। চীনের উত্থান যেমন অনিবার্য নয়, তেমনি তার পতনও অবধারিত নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায়ই বাস্তবতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে মানুষের ধারণা। আর সেখানেই ডনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে বেইজিংয়ের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সংঘাত, অস্থির শুল্কনীতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসা এবং হঠাৎ সামরিক সিদ্ধান্ত— এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এমনকি ইউরোপের অনেক দেশ এখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল নিচ্ছে। তারা আর এককভাবে আমেরিকার ধারাবাহিকতার ওপর ভরসা করতে পারছে না। চীন এই সুযোগটি দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে। নিজেকে স্থিতিশীল বাণিজ্য, অবকাঠামোগত সংযোগ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরছে— যা অনেক দেশের কাছে আমেরিকার অস্থিরতার বিপরীত প্রতিচ্ছবি। এই বর্ণনা পুরোপুরি সত্য কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু ভূরাজনীতিতে ধারণারও নিজস্ব শক্তি আছে। বেইজিং সম্মেলনের প্রকৃত গুরুত্ব তাই কোনো যৌথ বিবৃতির ভাষায় নয়, বরং তার প্রতীকে। বিশ বছর আগে আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা চীনা নেতাদের সঙ্গে কথা বলতেন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির অবস্থান থেকে। আজ পরিস্থিতি বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও সামরিক, আর্থিক ও প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। চীনও নানা সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। তবু একটি বিষয় স্পষ্ট— এক পক্ষ ক্রমশ বেশি প্রতিক্রিয়াশীল দেখাচ্ছে, অন্য পক্ষ বেশি ˆধর্যশীল। সম্ভবত আগামী ইতিহাস এই বৈঠককে কোনো নাটকীয় সন্ধিক্ষণ হিসেবে নয়, বরং ধীর এক ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের প্রতীক হিসেবেই মনে রাখবে। বিশ্ব হয়তো ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছে, আমেরিকান আধিপত্য আর একছত্র নয়; আর চীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজের জায়গা তৈরি করছে অতি আওয়াজের নাটক দিয়ে নয়, বরং শৃঙ্খলা, স্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের মাধ্যমে। [লেখক: প্রাবন্ধিক]

সাঁওতালি ভাষায় শপথ: আদিবাসী ভাষার মর্যাদার নতুন দিগন্ত

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বাঁকুড়ার রানিবাঁধ কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষুদিরাম টুডু। বিজেপির টিকেটে নির্বাচিত এই নেতা ইতোমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। ৯ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। দিনটির বিশেষত্ব ছিল— এ দিন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী পালিত হচ্ছিল। বঙ্গের নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে নিজ মাতৃভাষা সাঁওতালিতে শপথ গ্রহণ করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন টুডু। শপথ বাক্যের পুরো অংশ তিনি সাঁওতালি ভাষায় সাবলীলভাবে উচ্চারণ করেন। তার এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজ্যের আদিবাসী সংস্কৃতি ও ভাষাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সাঁওতালি ভাষায় শপথ নেয়ার সময় ময়দানে উপস্থিত জনতার মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা থেকে উঠে আসা এই নেতার হাত ধরে আদিবাসী উন্নয়নের পথে নতুন দিশা মিলবে। এবারের নির্বাচনে ক্ষুদিরাম টুডু ছাড়াও ভারতীয় জনতা পার্টি থেকে রেকর্ডসংখ্যক সাঁওতাল বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন— লাবসেন বাস্কে, প্রণত টুডু, ছেত্রমোহন হাঁসদা, লক্ষ্মীকান্ত সাউর, দুর্গা মুরমু, অমিয় কিস্কু, যোয়েল মুরমু, বুধরায় টুডু, মিস মায়ন মুরমু, কমলাকান্ত হাঁসদা এবং ভদ্রা হেমব্রম। আমরা বিশ্বাস করি, আগামীতে সাঁওতালি বিধায়করা সাঁওতালি ভাষাতেই শপথ গ্রহণ করবেন। আমরা দেখেছি, আদিবাসী অধ্যুষিত ঝাড়খণ্ড রাজ্যে ২০২০ খ্রিস্টাব্দে ৮১ জন বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর ৭ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন বিধানসভার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি বিধায়ক আঞ্চলিক ভাষায় শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেনসহ ৫৫ জন হিন্দিতে শপথ গ্রহণ করেন। বাকি ২২ জন ১০টি আঞ্চলিক ভাষায় শপথ নেন। এদের মধ্যে ৫ জন হো ভাষায়, ৪ জন খোরঠা ভাষায়, ৩ জন সাঁওতালি ভাষায় এবং ২ জন আংগিকা ভাষায় শপথ গ্রহণ করেন। এছাড়া আরও কয়েকজন ˆমথিলী, বাংলা, মুণ্ডারী ও কুড়ুখ ভাষায় শপথপত্র পাঠ করেন। সংস্কৃত ভাষায় ৩ জন এবং উর্দু ভাষায় ১ জন শপথ নেন। ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে ২২টি ভাষার সরকারি স্বীকৃতি রয়েছে। ভাষাগুলো হলো— অসমীয়া, বাংলা, বোড়ো, ডোগরি, গুজরাটি, হিন্দি, কন্নড়, কাশ্মীরি, কোঙ্কণি, ˆমথিলী, মালয়ালম, মণিপুরি, মারাঠি, নেপালি, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি, সংস্কৃত, সাঁওতালি, সিন্ধি, তামিল, তেলুগু ও উর্দু। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ভারতে ১৯ হাজার ৫০০-এর বেশি মাতৃভাষা বা উপভাষা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২১টি প্রধান ভাষা রয়েছে, যেগুলোতে ১০ হাজারের বেশি মানুষ কথা বলে। লোকসভায়ও সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণের নজির রয়েছে। ২০১৪ সালের ৬ জুন ময়ুরভঞ্জ থেকে নির্বাচিত রামচরণ হাঁসদা সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম থেকে উমা সরেনও সাঁওতালি ভাষাকেই বেছে নিয়েছিলেন। লাবসেন বাস্কে ২০১১ সালে মন্ত্রী হিসেবে সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ করেন। তৎকালীন সময়ে রামচরণ হাঁসদা বলেছিলেন, বোড়ো ভাষার পাশাপাশি সাঁওতালি ভাষাকেও সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আদিবাসী সাঁওতালদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। সাঁওতালি ভাষার উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে ৭ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে শিলিগুড়িতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি দ্রৌপদী মুর্মু। বিধাননগরের একটি মাঠে আন্তর্জাতিক সাঁওতালি সম্মেলনের অনুমতি না দেয়ায় তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘মমতা দিদি আমার ছোট বোনের মতো। তিনি হয়তো কোনো কারণে আমার ওপর রাগ করেছেন। এখানে এত বড় মাঠ রয়েছে, সভা করতে অসুবিধা হওয়ার কথা ছিল না। আসলে ইচ্ছা করেই আমাদের এই মাঠে সভা করতে দেয়া হয়নি।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এ ঘটনায় তৃণমূল প্রশাসনের সমালোচনা করেছিলেন। কেউ কেউ মনে করছেন, সাম্প্রতিক সেই উপেক্ষার প্রতিক্রিয়াও হয়তো প্রতিফলিত হয়েছে সদ্য গঠিত মন্ত্রিসভার সদস্য ক্ষুদিরাম টুডুর শপথ গ্রহণে। সাঁওতালি ভাষা অত্যন্ত প্রাচীন। এটি অস্ট্রোএশীয় ভাষাপরিবারের মুণ্ডা শাখার অন্তর্ভুক্ত। ভাষাবিদদের মতে, হাজার হাজার বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল থেকে অস্ট্রোএশীয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পূর্ব ও মধ্য ভারতে এসে বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকেই মুণ্ডা ভাষাগুলোর বিকাশ ঘটে। পরে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ভাষা আলাদা পরিচিতি লাভ করে এবং ক্রমে সাঁওতালি নামে পরিচিত হয়। লোকগাঁথা ও গানের ভাষায় সাঁওতালদের বর্ণমালার উল্লেখ পাওয়া গেলেও তার নির্দিষ্ট প্রমাণ দীর্ঘদিন পাওয়া যায়নি। আধুনিক যুগে ১৮৪৬ সালে রেভারেন্ড জে. ফিলিপস সাঁওতালি ভাষা নিয়মিতভাবে লিখে সংরক্ষণ, অনুবাদ ও ব্যাকরণ রচনার কাজ শুরু করেন। ১৮৫২ সালে তার বই ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্যা সাঁওতালি ল্যাঙ্গুয়েজ’ প্রকাশিত হয়। প্রথমদিকে বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করা হলেও পরে উচ্চারণের শুদ্ধতা রক্ষায় রোমান লিপির ব্যবহার বাড়ে। উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে সাঁওতালি ভাষার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি বর্ণমালা উদ্ভাবনের চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলা, দেবনাগরী, ওড়িয়া, অলচিকি ও রোমান লিপি বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ২০০৩ সালে ভারতের সংসদে পাস হওয়া ৯২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সাঁওতালি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে সাঁওতালি ভারতের স্বীকৃত সরকারি ভাষাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। তবে সরকার ভাষাটিকে স্বীকৃতি দিলেও সরকারি লিপি কোনটি হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ১৯২৫ সালে রঘুনাথ মুরমু উদ্ভাবিত অলচিকি বর্ণমালার প্রসার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হয়। আমাদের প্রত্যাশা, লেখ্য ভাষার ভিন্নতা থাকলেও কথ্য ভাষার ঐক্য অটুট থাকবে। সাঁওতালি কথ্য ভাষায় শপথ গ্রহণ সেই ঐক্যের শক্তিকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে। ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সাঁওতালি ভাষাভাষীদের মধ্যে এই ভাষা সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। আমরা সাঁওতালি ভাষার অগ্রযাত্রা কামনা করি। [লেখক: কলামিস্ট]

ফল ও সবজি রপ্তানিতে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে লাউ, কুমড়া, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, পেঁপে, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, বরবটি, শিম ও টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি রপ্তানি হয়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত শুরু হওয়ায় ওই অঞ্চলের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপের কয়েকটি দেশে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছিল। এতে সবজি রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি শুরু হয়েছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যের সবজির বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা প্রতিযোগী দেশের ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। শীত মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে দিনে ৩৫-৪০ টন সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের গন্তব্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান। এর বাইরে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি হয়। বর্তমানে ১৮০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সবজি রপ্তানি করছে। সবজির পাশাপাশি মৌসুমি ফলমূলও রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ৫ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৪ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের সবজি। বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৮ কোটি ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবে ১ কোটি ১৬ লাখ ডলার, ইউএইতে ৯৯ লাখ ডলার, কাতারে ৪১ লাখ ডলার ও কুয়েতে ৩১ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর বাইরে যুক্তরাজ্যে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, ইতালিতে ৩৬ লাখ ও কানাডায় ২৩ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে। শীত মৌসুমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কিছু শাকসবজি উৎপাদন হয়। তবে গ্রীষ্মকালে তাদের উৎপাদন থাকে না বলে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানির চাহিদা চার-পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। সবজি রপ্তানিতে বাংলাদেশের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত। আকাশপথ বন্ধ থাকলেও তাদের জন্য তেমন সমস্যা হয় না। কারণ মুম্বাই থেকে তিন দিনেই মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পৌঁছে যায়। আর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পাঠালে ২৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। বাংলাদেশ ১৯৭৩ সাল থেকে শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি শুরু করে। প্রথম বাজার ছিল যুক্তরাজ্য। তখন ১ হাজার ৭০০ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। কৃষিপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যকরণের উদ্দেশে ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। তাজা শাকসবজি, ফলমূল, পান ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের একমাত্র সংগঠন। বর্তমানে এ সংস্থার ৫শ’ সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন নিয়মিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাজা ফল ও সবজি রপ্তানি করছেন। বাংলাদেশ থেকে নানা ধরনের ফলমূল ও সবজি রপ্তানি হয়ে থাকে। এশিয়ান ফল, সবজি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ। করলা, বেগুন, লাউ, ঢ্যাঁড়শ, বরবটি, কাঁচামরিচ, কাঁচা পেঁপে, পালংশাক, পটল, কাঁচকলা, মুলা, ঝিঙা, কচু, চিচিঙ্গা, কচুর লতি, মিষ্টি আলু, চালকুমড়া, তেজপাতা, কলার ফুল ও ফুলকপিসহ আরও অনেক সবজি এবং কাঁঠাল, আনারস, লিচু, আম, কামরাঙা, ড্রাগন ফল, আমড়া, খেজুর, আমলকি, জলপাই ও বিভিন্ন জাতের লেবু রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। পানপাতা, ধনেপাতা ও অনুরূপ পণ্যও বিদেশে যাচ্ছে। যদিও ২০১২ সালের দিকে ইউরোপ ছিল সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় মধ্যপ্রাচ্যে। ইইউভিত্তিক অঞ্চলগুলো বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক অঞ্চল। অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন ও কুয়েতে সর্বাধিক পরিমাণে তাজা শাকসবজি ও ফল রপ্তানি করা হয়। তবে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ এখনও অল্প পরিমাণে তাজা সবজি ও ফল রপ্তানি করছে। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে মূলত কানাডায় বাংলাদেশের শাকসবজি রপ্তানি হয়। আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী উন্নতমানের শাকসবজি, ফলমূল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করতে এবং রপ্তানি বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, কৃষক ও উদ্যানচাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে। এতে গ্রামীণ আয় বাড়ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। সম্প্রতি পার্বত্য বান্দরবানের লামা উপজেলায় পাহাড়ি কৃষিপণ্য রপ্তানিতে উদ্যোক্তা ও চাষিদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত আম, আনারস, কমলা, কলা, কফি, কাঁঠাল, কাজুবাদাম, ড্রাগন ফল ও পেঁপেসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। তাজা ফলমূলের পাশাপাশি শুকনো ফল, ফলের চিপস ও জুস প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমেও নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে। তবে ফল ও সবজি রপ্তানিতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। ভরা মৌসুমে রপ্তানির জন্য পর্যাপ্ত কার্গো সুবিধা নেই। প্রতিযোগী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের তুলনায় বিদেশি উড়োজাহাজের ভাড়া বেশি। উৎপাদন পর্যায় থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত কার্যকর শীতল চেইন ব্যবস্থা না থাকায় পণ্যের সতেজতা কমে যায়। পচনশীল পণ্য পরিবহনের জন্য বিশেষ এয়ার কার্গো উড়োজাহাজও নেই। স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং উপকরণের শিল্প এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। বর্তমানে আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রয়োজন ৬০০-৭০০ টন পণ্য। কিন্তু দৈনিক গড় রপ্তানি হচ্ছে মাত্র ২০০-২৫০ টন। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও মূলত জাতিগত বা এথনিক বাজারকেন্দ্রিক। বিশ্বের উচ্চমূল্যের বাজারে এখনও শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফাইটোস্যানিটারি ও মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধান আরোপ করেছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রেও বড় সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় ইরাডিকেশন ব্যবস্থা না থাকায় সেখানে পূর্ণাঙ্গ রপ্তানি শুরু করা যায়নি। তবে এ বিষয়ে কাজ চলছে। বাংলাদেশের কৃষিখাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হর্টিকালচার। ফল, সবজি, ফুল, মসলা ও ওষুধি গাছের চাষ এ খাতের অন্তর্ভুক্ত। উর্বর মাটি, অনুকূল জলবায়ু ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে দেশে হর্টিকালচার ফসলের উৎপাদন বাড়ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের ফল ও সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে বছরে প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টনের বেশি ফল উৎপাদিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ১০০-১৫০ কোটি টাকার ফল ও সবজি রপ্তানি করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ফল ও সবজি রপ্তানি বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে হলে গুণগত মান উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা জরুরি। গ্লোবাল গ্যাপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানদণ্ড মেনে উৎপাদন বাড়াতে হবে। ˆজব ও নিরাপদ ফল উৎপাদনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে এ খাতকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু দেশীয় চাহিদাই পূরণ করবে না, আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। [লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

নীরব মহামারি হাইপারটেনশন

১৭ মে বিশ্ব হাইপারটেনশন দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘Controlling Hypertension Together ’। বিশ্ব হাইপারটেনশন লীগ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই আহ্বান স্পষ্ট করে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটি রাষ্ট্র, সমাজ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও পরিবারের সমন্বিত দায়। নীরব ঘাতক: পরিসংখ্যান যা বলছেউচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় ‘সাইলেন্ট কিলার’। কারণ উপসর্গ ছাড়াই এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল ও অন্ধত্বের প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে ১৪০ কোটি মানুষ হাইপারটেনশনে আক্রান্ত। এর মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে। বাকি ৭৫ শতাংশ হয় শনাক্তের বাইরে, নয়তো চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনার বাইরে। বৈশ্বিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। মোট আক্রান্তের তিন-চতুর্থাংশ বাস করেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে। এসব দেশে রোগ শনাক্তকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার সুযোগ সীমিত। তথ্য বলছে, বিশ্বে মোট মৃত্যুর ১৩ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। ইস্কেমিক হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ৪৫ শতাংশ এবং স্ট্রোকজনিত মৃত্যুর ৫২ শতাংশের নেপথ্যে এই একটিই কারণ। বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: সংকটের বহুমাত্রিকতাবাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ এখন অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সংকট। মেটা-অ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ হাইপারটেনশনে ভুগছেন। শহরাঞ্চলে এই হার ২৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনে একজন আক্রান্ত। সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্যে। ৩৫ বছরের বেশি বয়সী আক্রান্তদের ৫৪ শতাংশ জানেন না যে তাদের রক্তচাপ বেশি। যারা জানেন এবং ওষুধ নিচ্ছেন, তাদের ৬৭ শতাংশের রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর ৬৭-৬৮ শতাংশ ঘটছে অসংক্রামক রোগে। এর মধ্যে ১৫-২০ শতাংশ মৃত্যুর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কারণ হাইপারটেনশন-জনিত জটিলতা। দ্রুত নগরায়ন, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, কায়িক পরিশ্রমের অভাব এবং মানসিক চাপ এই সংকটকে তীব্র করছে। ঝুঁকির কাঠামো ও আমাদের দুর্বলতাহাইপারটেনশনের ঝুঁকি দুই ধরনের। বয়স ও বংশগতি অপরিবর্তনীয়। কিন্তু আচরণগত ঝুঁকি পরিবর্তনযোগ্য। বাংলাদেশে দৈনিক লবণ গ্রহণের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ৫ গ্রামের প্রায় দ্বিগুণ। ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত খাবার ও রেস্তরাঁর খাবারে লুকানো সোডিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তামাক ব্যবহার, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনও সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় যতটা প্রস্তুত, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ততটা নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে নিয়মিত স্ক্রিনিং, রোগী ফলোআপ ও সাশ্রয়ী ওষুধের সরবরাহে ঘাটতি স্পষ্ট। সমাধানের পথ: বহুখাতভিত্তিক সমন্বয়‘Controlling Hypertension Together’ প্রতিপাদ্যের বাস্তবায়নে চারটি স্তরে কাজ জরুরি। ১. রাষ্ট্রীয় নীতি: প্রক্রিয়াজাত খাবারে সোডিয়ামের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ করে আইন প্রণয়ন করতে হবে। তামাক নিয়ন্ত্রণের মতো খাদ্যপণ্যের মোড়কে ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। জাতীয় অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে হাইপারটেনশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ২. স্বাস্থ্যব্যবস্থা: কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩০ বছর বয়সের পর সবার জন্য বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। PEN প্রোটোকল অনুযায়ী চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধের সরবরাহ বাড়াতে হবে। ৩. সামাজিক সচেতনতা: শিক্ষা কার্যক্রমে খাদ্য ও জীবনাচার বিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করতে হবে। কর্মস্থলে, মসজিদে, মন্দিরে নিয়মিত স্বাস্থ্য ক্যাম্প আয়োজন করে স্ক্রিনিংয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ৪. ব্যক্তি ও পরিবার: প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা, খাবারে অতিরিক্ত লবণ পরিহার, ধূমপান বর্জন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ সেবনই আপাতত সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। উপসংহার: উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করা সহজ, চিকিৎসা সাশ্রয়ী। প্রধান বাধা সচেতনতার অভাব ও অবহেলা। ‘আমার কিছু হবে না’ এই আত্মঘাতী মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। বিশ্ব হাইপারটেনশন দিবসে নাগরিক হিসেবে অঙ্গীকার হোক, আজই নিজের ও পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের রক্তচাপ মাপব। রাষ্ট্র হিসেবে অঙ্গীকার হোক, আমরা নীতি ও বাজেটে হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেবো। কারণ নীরব ঘাতককে রুখতে হলে সোচ্চার হতে হবে এখনই। [লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]

চিনির ঝুঁকি: নীরব স্বাস্থ্য সংকট

চিনি মানব খাদ্যের একটি প্রাকৃতিক উপাদান এবং এটি শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংস্কৃতিতে চিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে— যেমন পিঠা, মিষ্টি, পায়েস এবং বিভিন্ন উৎসবভিত্তিক খাবারে। তবে আধুনিক সময়েখাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের সহজলভ্যতার কারণে চিনির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করেফ্রি সুগার—অর্থাৎ খাবারে যোগ করা চিনি, মধু, সিরাপ এবং ফলের রসে থাকা চিনি—বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদিও চিনি নিজে বিষ নয়, কিন্তু অতিরিক্ত এবং নিয়মিত গ্রহণ শরীরের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।বিশ্বব্যাপী গত কয়েক দশকে চিনির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী খাবারের পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত, উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত এবং কম পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবারের ব্যবহার বেড়েছে। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শহরাঞ্চলে ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস, বিস্কুট, চকলেট এবং অন্যান্য মিষ্টি খাবারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও ধীরে ধীরে এই ধরনের খাদ্যের প্রসার ঘটছে। ফলে খাদ্যাভ্যাসে একটি পরিবর্তন এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।বাংলাদেশের শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেশি থাকে এবং বাজারে সহজলভ্য সস্তা মিষ্টিজাত খাবার ও পানীয় এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে শিশুদের মধ্যেদাঁতের ক্ষয় (ডেন্টালক্যারিজ) একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। মুখের ব্যাকটেরিয়া চিনি ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত করে। এছাড়া বেশি ক্যালোরিযুক্ত কিন্তু পুষ্টিহীন খাবার গ্রহণের ফলে শিশুদের মধ্যে ওজন বৃদ্ধি এবং স্থুলতা বাড়তে পারে। এটি ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে, ছোটবেলা থেকে অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হলে তা পরবর্তীতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গঠনে বাধা দেয়।চিনি এবং মেটাবলিক রোগ যেমন টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং নন-অ্যালকোহলিকফ্যাটি লিভার ডিজিজের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ, বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয় থেকে, শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি যোগ করে। এই অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হয়, বিশেষ করে পেটের চারপাশে। এর ফলেইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, যেখানে শরীর ইনসুলিন হরমোনের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এটি ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে শত কোটি মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিস এবং প্রি-ডায়াবেটিসের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশেও এই সমস্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, যেখানে লাখ লাখ মানুষ ইতোমধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং আরও অনেক মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও জটিল, কারণ এখানে একই সঙ্গে অপুষ্টি এবং অতিপুষ্টি—দুটোই বিদ্যমান। একদিকে কিছু মানুষ পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে না, অন্যদিকে শহরাঞ্চলে অনেক মানুষ অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবার গ্রহণ করছে। এই ‘ডাবলবার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন’ জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয় এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক দেশসুগার ট্যাক্স বা চিনিযুক্ত পানিয়ের ওপর কর আরোপ করেছে। যেমন যুক্তরাজ্য, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স এবং আরও অনেক দেশ এই নীতি গ্রহণ করেছে। এই করের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে চিনিযুক্ত পানিয় কম খেতে উৎসাহিত করা, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কম চিনি ব্যবহার করতে বাধ্য করা এবং স্বাস্থ্যখাতে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করা। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের কর আরোপের ফলে অনেক দেশে চিনিযুক্তপানিয়ের ব্যবহার কমেছে এবং কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যে চিনির পরিমাণ কমিয়েছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে এই ধরনের নীতি গ্রহণ করা হলে তা জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশ করে যে, প্রতিদিনের মোট ক্যালোরির ১০% এর কম ফ্রি সুগার থেকে আসা উচিত এবং সম্ভব হলে তা ৫% এর নিচে রাখা উচিত। এটি প্রায় ২৫ গ্রাম বা ৬ চা চামচ চিনির সমান। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই অজান্তেই এই সীমার চেয়ে বেশি চিনি গ্রহণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, মাত্র ২৫০ মিলিলিটার কোমল পানিয় বা ফলের রসেই প্রায় ২৫-৩০ গ্রাম চিনি থাকতে পারে। এর সঙ্গে যদি বিস্কুট, কেক বা অন্যান্য মিষ্টি খাবার যুক্ত হয়, তবে ˆদনিক চিনি গ্রহণ সহজেই সুপারিশকৃত সীমা অতিক্রম করে যায়।চিনি কমানোর জন্য বিভিন্ন বিকল্প রয়েছে। সম্পূর্ণ ফল খাওয়া ফলের রসের তুলনায় বেশি উপকারী, কারণ এতে ফাইবার থাকে যা রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায়। এছাড়া কম বা শূন্য ক্যালোরিযুক্ত মিষ্টিকারক যেমন— স্টেভিয়া, সুক্রালোজ এবং অ্যাসপারটেম ব্যবহার করা যেতে পারে। খাদ্য শিল্পে বর্তমানে বিভিন্নফ্লেভার প্রযুক্তিব্যবহার করে কম চিনি দিয়ে একই স্বাদ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি মিষ্টতার অনুভূতি বাড়াতে সাহায্য করে, ফলে কম চিনি ব্যবহার করেও গ্রহণযোগ্য স্বাদ তৈরি করা সম্ভব হয়।এই সমস্যা সমাধানে সরকার, শিল্পখাত এবং জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকার খাদ্যের প্যাকেটে স্পষ্ট লেবেলিং বাধ্যতামূলক করতে পারে, শিশুদের লক্ষ্য করে মিষ্টিজাত খাবারের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং প্রয়োজনে সুগার ট্যাক্স চালু করতে পারে। খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কম চিনি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকর পণ্য তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে, শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে মানুষ নিজের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।সবশেষে বলা যায়, চিনি আমাদের খাদ্যের একটি অংশ হলেও এর অতিরিক্ত ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডায়াবেটিস ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান হার এই সমস্যার গুরুত্বকে তুলে ধরে। সঠিক নীতি, সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এই সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব। ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।[লেখক: যুক্তরাজ্যের স্যালুটিভিয়া নামক একটি খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিতে ইনোভেশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন]

ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি ও ডিজিটাল সেবার বাস্তবতা

ভূমি বলতে সাধারণত পৃথিবীর উপরিভাগের কঠিন স্থলভাগকে বোঝায়। ভূমি হলো প্রকৃতির অকাতরে দান করা মাটি, জল, খনিজ ও বনজ সম্পদ। এটি মানুষের বসবাস বা উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত স্থান। অর্থনৈতিক বা আইনি সংজ্ঞায় আবাদি-অনাবাদি জমি, নদ-নদী, খাল-বিল, ঘরবাড়ি এবং মাটির সঙ্গে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত সব কিছুকেই ভূমি হিসেবে গণ্য করা হয়। এভাবেও বলা যায়, মানুষ বা প্রকৃতি কর্তৃক সরাসরি ব্যবহৃত বা উৎপাদনে সহায়তা করে—এমন প্রাকৃতিক উপাদান (মাটি, পানি, আলো) হলো ভূমি। আইনের ভাষায় ভূমি হলো আবাদি, অনাবাদি, পানিতে নিমজ্জিত এলাকা, ঘরবাড়ি এবং মাটির সঙ্গে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত যে কোনো বস্তু (রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ২ (১৬) ধারা অনুযায়ী)। প্রকৃতার্থে ভূমি হলো উৎপাদনের আদি ও মৌলিক উপাদান। এর মধ্যে মাটি ছাড়াও খনিজ, বনজ সম্পদ, জলাশয় ও জলবায়ু অন্তর্ভুক্ত। এটা ঠিক যে, ভূমি প্রকৃতির দান, এর জোগান সীমিত। এটি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করা যায় না এবং এর উর্বরাশক্তিও ভিন্ন হয়। বর্তমান সভ্যতার উন্মেষের আগে আজকের মতো ভূমির মালিকানা নিয়ে এত দ্বন্দ্ব, ঝগড়া-বিবাদ বা যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল না। সভ্যতার উষালগ্নে মানুষের সমাজব্যবস্থাকে বলা হয় আদি সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা। এই সমাজব্যবস্থায় ভূমির মালিকানার বিষয়টি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল না। মানুষ সমাজবদ্ধভাবে ভূমি ব্যবহার করত এবং ভূমির মালিকানাও ছিল সামাজিক। সময়ের ক্রমবিবর্তনে সামন্তপ্রথা, রাজতন্ত্র এবং বর্তমানে কথিত গণতন্ত্রে এসে ভূমি হয়ে গেছে ব্যক্তিগত সম্পদ। সৃষ্টি হয়েছে ব্যক্তির ভূমির মালিকানা। আর এই ভূমিকে ব্যক্তিগতভাবে কুক্ষিগত করার জন্য চলে নানা চেষ্টা। এভাবেই শুরু হয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে ভূমি হস্তান্তর বা মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে ভূমি বিক্রি বা দানের কার্যক্রম শুরু হয়। এই কার্যক্রম পরিচালিত হয় রাষ্ট্রের নিযুক্ত ব্যক্তির অনুমোদনে। অর্থাৎ রাষ্ট্রকে জানিয়ে মালিকানা পরিবর্তন হয়। রাষ্ট্র সব ভূমির মালিক। তাই ব্যক্তিকে ভূমির জন্য রাষ্ট্রকে কর দিতে হয়। ব্যক্তি তার ভোগ বা দখলকৃত জমির ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রকে ভূমি কর দেয়। রাষ্ট্র এই অনুমোদন প্রক্রিয়া সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য বেশ কিছু দপ্তর সৃষ্টি করেছে। যেমন—ভূমি নিবন্ধন দপ্তর, ভূমি রাজস্ব আদায় দপ্তর, ভূমি জরিপ দপ্তরসহ নানা ধরনের বিভাগ। বর্তমানে সরকারের এই দপ্তরগুলো দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে ভূমি-সংক্রান্ত কার্যক্রমে দুর্নীতি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে সরকার ডিজিটাল ভূমি সেবা চালু করেছে। ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুর্নীতি কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তবে এই ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদৌ দুর্নীতি হ্রাস পাচ্ছে কি না, এর উত্তর খুবই জটিল। কারণ মার্চ ২০২৬-এর তথ্যমতে, ভূমি মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি ‘ওয়ান ডিজিটে’ (১০ শতাংশের নিচে) নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ভূমি-সংক্রান্ত দুর্নীতি কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। ভূমি-সংক্রান্ত কার্যক্রমে দুর্নীতির সাধারণ ক্ষেত্রগুলো হলো—১. ভূমি রেজিস্ট্রেশন ও নামজারি (মিউটেশন)। ভূমি অফিসে নামজারির ক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণ ও হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২. মৌজা ম্যাপ, খতিয়ান বা দলিলে কারচুপি। ৩. ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানে দুর্নীতি। ৪. প্রভাবশালীদের নামে সম্পত্তি বরাদ্দ ও অবৈধ দখল। ৫. ভূমি অফিসগুলোতে দালালদের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণ। এই ধরনের অনিয়ম দূর করতে সরকার ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করেছে। ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে অনলাইন ভূমি কর (ই-ট্যাক্স) পোর্টালে নিবন্ধন করে ঘরে বসেই ভূমি কর পরিশোধ করা যায়। অনলাইনে হওয়ায় সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই যোগাযোগ কতটা কমেছে? এখনও অনলাইনে আবেদন করে ভূমি অফিসে ঘুরতে হয় সাধারণ মানুষকে। ডিজিটাল হলেও অনেক ক্ষেত্রে কোনো বাস্তব সুফল পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ সাধারণ মানুষের ডিজিটাল বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। ভূমি অফিসের চারপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকান। অধিকাংশ সাধারণ মানুষ ডিজিটাল পদ্ধতি বোঝেন না। তাই তাদের ভূমি অফিসে যেতে হয় এবং অফিসের কর্মরত ব্যক্তিরা অনেক সময় সেবা গ্রহণকারীকে এসব দোকানে যেতে বলেন। অনেকটা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের মতো। ভূমি সেবাগ্রহীতারা ওই দোকানে গেলে দোকানিরা সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। গ্রামের নিরীহ মানুষ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়। ভূমি সেবা প্রদানের নামে গড়ে ওঠা এসব কম্পিউটার দোকান কার্যত দালালের কাজ করে। ভূমি সেবায় অনিয়মের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো—১. সরকারি ফির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ দাবি। এই বিষয়টির সঙ্গে ভূমি অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মীরা জড়িত। একটি ভূমি অফিসে যতজন কর্মচারী আছেন, তার চেয়ে বেশি রয়েছে দালাল। এই দালালরা ফাইল প্রসেসিং থেকে শুরু করে বাইরের কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকানের মাধ্যমে ভূমি সেবার কাজ করে দেয়, যা অনিরাপদ অনলাইন সেবার রূপ নিয়েছে। ২. ভুল রেকর্ড সংশোধন বা মাঠ পরচা পেতে দীর্ঘসূত্রিতা ও অবৈধ অর্থ লেনদেন। টাকা না দিলে মিউটেশনের আবেদন খারিজ হয়ে যায়। ৩. ডিজিটাল ভূমি উন্নয়ন কর দেয়ার ক্ষেত্রেও অবৈধভাবে অর্থ আদায় করা হয়। শ্রেণী পরিবর্তনের আবেদন দীর্ঘদিন ডিসি অফিসে ঝুলে থাকে। যোগাযোগ করা হলেও কোনো কাজ হয় না। শোনা যায়, রাজশাহী অঞ্চলে প্রতিটি শ্রেণী পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রতি কাঠায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এই টাকা দিলে ডিসি অফিস সহজেই কাজটি করে দেয়। ভূমি রেজিস্ট্রেশনে অনিয়মেরও শেষ নেই। সম্প্রতি ঢাকা জেলার সাভারে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনকে তার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ৩ মে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা-৬ থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে এ নির্দেশ দেয়া হয়। অফিস আদেশে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩ (খ) অনুযায়ী অসদাচরণ এবং বিধি ৩ (ঘ) অনুযায়ী দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে প্রত্যাহার করে মহাপরিদর্শক নিবন্ধন দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে দ্রুত বর্তমান দায়িত্বভার হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলো ছিল—১. দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ গ্রহণ। তাকে ‘ম্যানেজ মাস্টার’ হিসেবেও উল্লেখ করা হতো। ২. সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় অল্প সময়ে তিনি ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেন করেছেন। ৩. বিলাসবহুল গাড়ি, বহুতল ভবন নির্মাণ এবং বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন। ৪. ভূমি নিবন্ধনে অনিয়ম, জাল দলিল এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এটি তো সাভারের সাব-রেজিস্ট্রারের কর্মকাণ্ড, যেহেতু তিনি ধরা পড়েছেন তাই জনগণ জানতে পেরেছে। কিন্তু অজানা রয়ে গেছে আরও অনেক সাব-রেজিস্ট্রারের কুকীর্তি। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেও সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতি শতাংশ জমি কেনাবেচা বা যে কোনো ধরনের দলিল করার ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রারের একটি নির্দিষ্ট অবৈধ হার রয়েছে। রূপগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিল করলে সরকারি ও আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রারকে শতাংশপ্রতি দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। ভূমি-সংক্রান্ত অফিসগুলো আজ দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এখানে কর্মরতরা নিজেদের ইচ্ছামতো ঘুষের হার নির্ধারণ করেন। বিভিন্ন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে তারা বহাল তবিয়তে টিকে আছেন। ভূমি-সংক্রান্ত অনিয়ম দূর করতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। [লেখক: উন্নয়নকর্মী]

ভিডিও আরও দেখুন

দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশন বাংলাদেশের, কঠিন চাপে পাকিস্তান

সিলেট টেস্টের প্রথম দিন শেষ বিকেলে ৬ ওভার ব্যাটিং করে বিনা উইকেটে ২১ রান তুলেছিল পাকিস্তান। তবে রোববার (১৭ মে) দ্বিতীয় দিনের সকালে ব্যাটিংয়ে নেমেই বাংলাদেশি বোলারদের তোপের মুখে পড়ে কঠিন চাপের মধ্যে পড়েছে সফরকারীরা। তাসকিন আহমেদ ও মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণি ও গতিতে প্রথম সেশনটি পুরোপুরি নিজেদের করে নিয়েছে বাংলাদেশ।দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশনে মোট ২৪ ওভার ব্যাটিং করতে পেরেছে পাকিস্তান। তবে এই সময়ে মাত্র ৭৫ রান তুলতে গিয়ে তারা হারিয়ে ফেলেছে ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। সবমিলিয়ে প্রথম সেশন শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ ৪ উইকেটে ৯৬ রান। বাংলাদেশ থেকে তারা এখনো ১৮২ রানে পিছিয়ে রয়েছে। বর্তমানে বাবর আজম ৩৭ ও সালমান আঘা ৬ রান নিয়ে ক্রিজে লড়ছেন।দিনের প্রথম ওভারে শরিফুল ইসলাম বল হাতে নিয়ে মাত্র ১ রান দেন। এরপরের ওভারেই আক্রমণে এসে প্রথম আঘাত হানেন গতি তারকা তাসকিন আহমেদ। তাঁর ওভারের প্রথম দুই বলেই অস্বস্তিতে ছিলেন পাকিস্তানি ওপেনার আব্দুল্লাহ ফজল। তৃতীয় বলে লিটন দাসের গ্লাভসে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন তিনি (২১ বলে ৯ রান)।এক ওভার বিরতি দিয়ে নিজের পরের ওভারে আবারও জোড়া আঘাত হানেন তাসকিন। এবার তাঁর শিকার আজান আওয়াইজ। পা বাড়িয়ে ডিফেন্স করতে গিয়ে ব্যাটের কানা ছুঁয়ে বল শর্ট লেগে থাকা মুমিনুল হকের হাতে সহজ ক্যাচ হিসেবে জমা পড়ে। ৩৪ বলে ১৩ রান করে বিদায় নেন আজান। ফলে ২৩ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে শুরুতেই ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় পাকিস্তান।১০ ওভারে ২৩ রানে ২ উইকেট হারানোর পর অধিনায়ক শান মাসুদকে সাথে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন বাবর আজম। দুইজনে মিলে উইকেটে জমে গিয়ে ৩৮ রানের জুটি গড়েন। তবে দ্বিতীয় দিনে নিজের প্রথম ওভারে আক্রমণে এসেই এই বিপজ্জনক জুটিকে থামান অফ স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ। মিরাজের বলে শর্ট কাভারে দুর্দান্ত এক ক্যাচ নেন বদলি ফিল্ডার নাঈম হাসান। শান মাসুদ ২১ রানে আউট হতেই ভাঙে এই জুটি।শান মাসুদকে ফেরানোর পর থিতু হতে দেননি সৌদ শাকিলকেও। মাত্র ৮ রান করা শাকিলকে দ্রুতই সাজঘরে ফেরত পাঠান মিরাজ। প্রথম সেশন শেষে বাংলাদেশের পক্ষে তাসকিন আহমেদ ও মেহেদী হাসান মিরাজ ২টি করে উইকেট শিকার করেছেন।  

দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশন বাংলাদেশের, কঠিন চাপে পাকিস্তান
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৬৭ জন