সংবাদ
চীন থেকে শক্তিশালী জে-১০ যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ

চীন থেকে শক্তিশালী জে-১০ যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে চীন থেকে আধুনিক ৪.৫ প্রজন্মের ‘জে-১০সিই’ (J-10CE) যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে সরকার। সম্প্রতি পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার লড়াইয়ে এই যুদ্ধবিমানের সাফল্যের খবর আসার পরই ঢাকা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ (এসসিএমপি)-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহিদুর রহমানের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব যুদ্ধবিমান কেনার একটি খসড়া প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে পাঠানো হয়েছে। বাজেটে বরাদ্দ সাপেক্ষে চলতি অর্থবছরেই এই ক্রয়প্রক্রিয়া কার্যকর করা হতে পারে। অন্যথায় এটি আগামী অর্থবছরের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হবে।জে-১০সিই মূলত একটি ইঞ্জিনচালিত মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান, যা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১.৮ মেক গতিতে উড়তে পারে। এটি আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য বিভিন্ন উন্নত অস্ত্র বহনে সক্ষম। গত মে মাসে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার সংক্ষিপ্ত সামরিক উত্তজনা চলাকালীন এই বিমানটি ফরাসি প্রযুক্তির রাফাল যুদ্ধবিমানের বিপরীতে কার্যকর পারফরম্যান্স দেখিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে।জানা গেছে, এই ক্রয় প্রস্তাবের আওতায় কেবল যুদ্ধবিমানই নয়, এর সঙ্গে চীন থেকে অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার এবং ড্রোন কেনার পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমানবাহিনী প্রধানদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির আলোচনার পর এই নতুন সমর সরঞ্জাম কেনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। গত জানুয়ারি মাসে ইসলামাবাদে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধানদের বৈঠকে অ্যারোস্পেস প্রযুক্তি এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল।মায়ানমারের সাম্প্রতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিমানবাহিনীকে আধুনিকায়ন করার এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।সূত্র: ডন আরো পড়ুন...চীনের জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা চলছে/
২ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

বৈশ্বিক কার্বন ট্রেডিং ও বিশ্বব্যবস্থার গতিধারা

একবিংশ শতাব্দীতে জলবায়ু পরিবর্তন আর কেবল পরিবেশবিষয়ক সংকট নয়; এটি অর্থনীতি, বাণিজ্য, কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, চরম আবহাওয়া, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি সবকিছু মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এই বাস্তবতায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য অর্থনৈতিক ও বাজারভিত্তিক যে পদ্ধতিগুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে কার্বন ট্রেডিং বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কার্বন ট্রেডিংকে অনেকে কেবল পরিবেশ রক্ষার একটি অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেন। কিন্তু এর প্রভাব অনেক বিস্তৃত। কোন দেশ কতটা নিঃসরণ করতে পারবে, কে কার্বন কমানোর প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করবে, কোন দেশ কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করবে, কোন দেশ তা কিনবে এবং ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কার্বনের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে এসব প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতি। ফলে কার্বন বাজার এখন একই সঙ্গে পরিবেশনীতি, অর্থনীতি এবং কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কার্বন ট্রেডিং আসলে কী?সহজভাবে বললে, কার্বন ট্রেডিং হলো এমন একটি বাজারব্যবস্থা যেখানে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা হয় এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেই নিঃসরণ-অধিকার বা নিঃসরণ কমানোর প্রমাণপত্র কেনাবেচা করা যায়। এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন। কার্বন ট্রেডিংকে সরাসরি অর্থনীতিবিদ রোনাল্ড কোসের ‘Polluter Pays Principle’-এর তত্ত্ব বলা পুরোপুরি নির্ভুল নয়। কোসের কাজ মূলত সম্পত্তির অধিকার ও বাহ্যিকতার অর্থনৈতিক সমস্যাকে বাজারভিত্তিক সমাধানের আলোচনায় নিয়ে আসে; আর ‘polluter pays’ নীতিটি পরবর্তীতে পরিবেশনীতি ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে আলাদাভাবে বিকশিত হয়।  কিয়োটো থেকে প্যারিস: কার্বন বাজারের আন্তর্জাতিকীকরণআন্তর্জাতিক কার্বন বাজারের ইতিহাসে ১৯৯৭ সালের কিয়োটো প্রোটোকল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিয়োটো প্রোটোকলের অধীনে Clean Development Mechanism প্রতিষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশে নির্দিষ্ট ধরনের নিঃসরণ কমানোর প্রকল্পে বিনিয়োগ করে নির্গমন হ্রাসের ক্রেডিট অর্জন করতে পারত। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি জলবায়ু কূটনীতিকে আরও বিস্তৃত কাঠামো দেয়। প্যারিস চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬ এ-আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিঃসরণ কমানোর বিভিন্ন পদ্ধতির আইনি ভিত্তি তৈরি করে। বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ৬.২এ- আন্তর্জাতিকভাবে স্থানান্তরযোগ্য নিঃসরণ হ্রাসের হিসাব ও বাণিজ্যের সুযোগ দেয় এবং অনুচ্ছেদ ৬.৪এ-একটি জাতিসংঘ-তত্ত্বাবধানে নতুন কার্বন ক্রেডিটিং ব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করে। এর অর্থ হলো— কার্বন এখন শুধু পরিবেশগত সূচক নয়; এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির একটি ক্রমবর্ধমান সম্পদে পরিণত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে কার্বনের মূল্য, হিসাব ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যার হাতে থাকবে, জলবায়ু অর্থনীতিতেও তার প্রভাব বাড়বে। জলবায়ু কূটনীতিতে উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনকার্বন বাজার নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্কগুলোর একটি হলো Global North বনাম Global South। উন্নত দেশগুলোর যুক্তি হলো, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহার করলে তুলনামূলক কম খরচে নিঃসরণ কমানো সম্ভব। যেখানে কম খরচে কার্বন কমানো যায়, সেখানে বিনিয়োগ করলে বৈশ্বিকভাবে একই অর্থে বেশি পরিবেশগত ফল পাওয়া সম্ভব। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রশ্ন ভিন্ন। তাদের যুক্তি হলো, শিল্পবিপ্লবের পর দীর্ঘ সময় ধরে উন্নত দেশগুলো বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একই মাত্রার উন্নয়ন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হলে তা ন্যায্য হবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অবস্থান আরও স্পষ্ট। বাংলাদেশের বৈশ্বিক নিঃসরণে অবদান তুলনামূলকভাবে খুব কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই শুধু কার্বনের বাজার তৈরি করলেই জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না। প্রয়োজন ঐতিহাসিক দায়, সক্ষমতা, উন্নয়নের অধিকার এবং ক্ষয়ক্ষতির বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়া। কার্বন বাজারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: গ্রিনওয়াশিংকার্বন ট্রেডিংয়ের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো greenwashing। কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান বাস্তব নিঃসরণ কমানোর পরিবর্তে কার্বন ক্রেডিট কিনে নিজেকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। কিন্তু সেই ক্রেডিট যদি প্রকৃত অতিরিক্ত নিঃসরণ হ্রাসের প্রতিনিধিত্ব না করে, তাহলে পরিবেশগত লাভ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। এখানেই কার্বন বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন আসে। একটি প্রকল্প বাস্তবে কত টন কার্বন কমিয়েছে তার সঠিক হিসাব না থাকলে বাজার কাগজে বড় হলেও বাস্তবে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর নাও হতে পারে। তাই কার্বন ক্রেডিটের ক্ষেত্রে additionality, permanence, leakage, measurement, reporting and verification অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ প্রকল্পটি সত্যিই অতিরিক্ত নিঃসরণ কমিয়েছে কি না, কার্বন হ্রাস দীর্ঘস্থায়ী কি না, এক জায়গায় নিঃসরণ কমিয়ে অন্য জায়গায় বেড়ে যাচ্ছে কি না এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না এসব নিশ্চিত করতে হবে। কার্বন এখন বাণিজ্যনীতিরও অংশকার্বন বাজারের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের Carbon Border Adjustment Mechanism এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এর লক্ষ্য হলো কার্বন-নিবিড় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কার্বন ব্যয়ের প্রতিফলন ঘটানো এবং ইউরোপীয় শিল্পকে এমন প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া, যেখানে অন্য দেশে তুলনামূলক কম কঠোর জলবায়ু নীতির কারণে উৎপাদন ব্যয় কম হতে পারে। CBAM-এর মাধ্যমে কার্বন ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খরচের অংশ হয়ে উঠছে। ফলে কোনো দেশের পরিবেশনীতি এখন শুধু সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; তার রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গেও যুক্ত। বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক হলেও CBAM-এর প্রাথমিক আওতায় পোশাক খাত নেই। তাই সরাসরি পোশাক রপ্তানিতে CBAM-জনিত শুল্ক এখনই আরোপ হচ্ছে এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে ভবিষ্যতে কার্বন হিসাব, জ্বালানি দক্ষতা, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবেশগত মান ক্রমেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিটি শুধু সম্ভাব্য ‘কার্বন শুল্ক’ নয়; বরং বৈশ্বিক বাজারে কম-কার্বন উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা। বাংলাদেশের সামনে সুযোগ কোথায়?কার্বন বাজার বাংলাদেশের জন্য শুধু ঝুঁকি নয়, সুযোগও তৈরি করতে পারে। সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বন, পুনঃবনায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট কৃষি প্রকল্প থেকে যাচাইযোগ্য নিঃসরণ হ্রাস তৈরি করা সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক কার্বন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এখানে সতর্কতা জরুরি। বাংলাদেশের বন, জমি বা প্রাকৃতিক সম্পদকে শুধু কার্বন ক্রেডিট তৈরির সম্পদ হিসেবে দেখলে চলবে না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, জীববৈচিত্র্য, ভূমির মালিকানা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো কার্বন প্রকল্প গ্রহণ করলে তা নতুন ধরনের শোষণের জন্ম দিতে পারে। কার্বন বাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে দরকষাকষির ক্ষমতার অসমতা। উন্নত দেশের বড় কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি উন্নয়নশীল দেশের প্রকল্প থেকে কম দামে ক্রেডিট কিনে নেয় এবং পরবর্তীতে উচ্চমূল্যে তা বিক্রি করে, তাহলে প্রকল্পের স্থানীয় জনগোষ্ঠী বা সংশ্লিষ্ট দেশ ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করা নয়; বরং কার্বনের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ, প্রকল্পের মালিকানা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির শর্তে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো।  [লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

প্রসঙ্গ: রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও এসএসসি’র ফল

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়ে গেল। এত ফরমাল এবং রাষ্ট্রাচার আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে এর আগের রাষ্ট্রপতিরা নির্বাচিত হয়েছিলেন কিনা তা নিয়েও জনমনে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে বেশ উৎসবমুখর ও জাঁকজমক আয়োজনের ভেতর দিয়ে এ নির্বাচনী অনুষ্ঠান হয়ে গেল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে, প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নিজে এবং প্রধানমন্ত্রী গোপন ব্যালটে ভোট দেন। এখানে বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও একজন প্রার্থী দেয়া হয়েছিল। তবে সে প্রার্থী নিজে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত ছিলেন না। তিনি তার নিজ নির্বাচনী এলাকা থেকে পরাজিত হয়েছিলেন। বলা যায় তিনি একজন সংসদের বাইরের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ছিলেন। তবে তর্কে-বিতর্কে, বাক-বিতন্ডা আর নানা সময়ে নতুন নতুন রাজনৈতিক ইস্যুভিত্তিক মন্তব্যে তার জুড়ি মেলা ভার। বিশেষ করে একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ইত্যাদি বিষয়ে তিনি একজন একক দার্শনিক। এমনকি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পরাজিত হয়েও তিনি বঙ্গভবন এবং রাষ্ট্রপতির কর্ম নিয়ে একটা আজগুবি শব্দবোমা ফাটিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতির কাজ হল বঙ্গভবনের ভেতরের মাজার জিয়ারত করা ইত্যাদি। ২.বিএনপি’র মহাসচিব পদে দীর্ঘদিন যাবত দায়িত্ব পালনকারী একজন পরীক্ষিত আস্থাভাজন নেতা, সুশীল, উচ্চশিক্ষিত ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে সর্বমহলে পরিচিতজন মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটা ইতিবাচক সাড়া পড়ে যায়। বিনয়ী মানুষ, নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিক, আদর্শিক ভাব-ভাবনার অধিকারী ব্যক্তি হিসেবেও রয়েছে তার বিপুল জনসমর্থন ও জনপ্রিয়তা। আমার একেবারে ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে বলছি, বঙ্গবন্ধুর পরে বাংলাদেশের আর কোনো রাষ্ট্রপতিকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতাগুলো থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ও অনর্গল আবৃত্তি করতে শোনা যায়নি। এদিক থেকে নবনির্বাচিত বর্তমান রাষ্ট্রপতি ব্যতিক্রমী তথা বাংলাভাষা ও শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির একজন সমঝদার ব্যক্তিত্ব। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো, ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ, পরমতসহিষ্ণু ‘রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর ভূমিকা এবং আচরণও হবে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। ৩.একইসঙ্গে মনে হচ্ছে, দেশের সাধারণ মানুষ দীর্ঘ একটা হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন, গুজব তথা ‘মব সম্রাট’ খ্যাত মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়ায়। জনমনে ঘোরলাগা সংশয় ছিল, ট্রেনে, বাসে, স্টেশনে, সড়কে, জনপদে মানুষের মাঝে চাপা আশঙ্কা ছিল তিনিই হবেন দেশের পরবর্তী অর্থাৎ ২৩তম রাষ্ট্রপতি। বিগত অন্তর্বর্তী সময়ের সরকার প্রধান হিসেবে তিনি জাতিকে যতটা হতাশ করেছেন, সম্ভবত অতীতে আর কেউ করেন নি। ভবিষ্যতেও এমনটা করার সম্ভাবনা কম। তার সময় নিয়ে এখন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে যে, তিনি তার বাক- যাদুবিদ্যা দিয়ে কেবল দেশবাসীকে বোকা বানানোর অসাধারণ পারদর্শিতা ও ছলাকলার কৌশলই রপ্ত করেছেন। আর কিছু নয়। তার দ্বারা যে অন্যকিছু হবে না এটাও আজ দিবালোকের মতন প্রকাশিত। ৪.এ বছরের (২০২৬ খ্রি.) এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে একধরনের বিপর্যয় ঘটে যায়। পাসের হার আশঙ্কাজনক ভাবে হ্রাস পায়। দেশের মোট ১১টি শিক্ষা বাের্ডে পাসের গড় হার দাঁড়ায় ৬২.২৫ শতাংশ। যা বিগত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। শিক্ষামন্ত্রী ফল প্রকাশ কালে বললেন, ফলাফল নিয়ে কারও যদি আপত্তি থাকে, তাহলে তিনি খাতা রিভিউ করার সুযোগ দিবেন। এমন ঘোষণা দেওয়ার কারনে অবস্হা কোন দিকে যাচ্ছে সেটাও জানা দরকার। এবছর দেশে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ৩০ হাজারের মতন। পাস করেছে ১১ লাখ ৩৯ হাজারের কাছাকাছি। কিন্তু জানা যায়, পাস এবং ফেইল করা মিলিয়ে প্রায় ১৩ লাখ ছাত্র ছাত্রী তাদের খাতা পুনঃমূল্যায়নের আবেদন করেছে। এটাও দেশে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। সেদিন একজন প্রধান পরীক্ষক জানালেন, তার অধীনে সাধারণ পরীক্ষক থাকেন ৫ থেকে ৮ জন। প্রথমে তারা খাতা পুনঃপরীক্ষা করে প্রধান পরীক্ষকের কাছে জমা দেন। প্রধান পরীক্ষক পুনঃনিরীক্ষন শেষে তা সংশ্লিষ্ট বোর্ডে নিজ দায়িত্বে পৌঁছে দেন। তবে খাতা পুনঃমূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, আবেদনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ কূণ্য বা ১ থেকে ৫ নম্বর পেয়েছে এমন আছে। সেখানে নম্বর যোগ করার কি কোনো সুযোগ আছে? আবার দেখা গেছে ৯০ নম্বর পাওয়া ছাত্রও আবেদন করেছে, কারণ তার ধারণা সে ১০০ নম্বরে ৯৮ বা ৯৯ পাবে। এটা এক অদ্ভূত বিষয় এবং অভিজ্ঞতা বলে সেই প্রধান পরীক্ষক জানালেন। তিনি বলেন, ‘সরকার কর্তৃক ঢালাও ভাবে এমন সুযোগ দেয়া যথাযথ হয়নি। বরং বিশেষ ক্ষেত্রে তা করা যেত’। তাদের অভিজ্ঞতা বলে, এর মধ্যে লক্ষাধিক ছাত্র ছাত্রী আবেদন করেছে সম্পুর্ন বিনা কারণে। তাদের ধারণা সরকার হয়তো কোনো পদ্ধতি প্রয়োগ করে এদের পাস নিশ্চিত করে দিবে। ৫.এদিকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে কলেজে ভর্তি নিয়ে চলছে আরেক নজিরবিহীন কাণ্ড। এবছর এসএসসিতে কম পাস করায় গ্রামের কলেজগুলো প্রয়োজনীয় ছাত্র-ছাত্রী পাচ্ছে না। এমপিও, ননএমপিও সব কলেজই নানা প্রকার ছাড় দিয়ে বা আর্থিক সুযোগ সুবিধার কথা ঘোষণা দিয়েও ছাত্রদের নাগাল পাচ্ছে না। বিনা বেতনে পড়ানোর অঙ্গীকার করেও হালে পানি পাচ্ছে না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কলেজ শিক্ষকগণ ছাত্র-ছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হানা দিচ্ছেন, মা-বাবা, অভিভাবককে সম্মত করেও ছাত্রের মন পাচ্ছে না। তারা শহরের বড় বড় কলেজের স্বপ্ন দেখছে। গ্রামের প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করবে না। এক্ষেত্রে অভিভাবকরা যেন রীতিমতো অসহায়বোধ করছেন। তারা সন্তানদের সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে গ্রামবাংলার শত শত স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও সাধারণ ইন্টারমিডিয়েট কলেজগুলো প্রত্যাশিত ছাত্র-ছাত্রী পাচ্ছে না। জানা যায়, কোনো নতুন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও ছাত্রের অনুপাত প্রায় সমান সমান। গ্রামীণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন করুণ চিত্র কখনো কাম্য হতে পারে না।  (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার]

মিউ মিউ অর্থনীতি: বিড়াল যখন বদলে দেয় শহুরে জীবনের গল্প

মাত্র এক দশক আগেও ঢাকার ফ্ল্যাটবাড়িতে বিড়াল পোষা ছিল অনেকটাই ব্যতিক্রমী বিষয়। রাস্তা থেকে আহত কোনো বিড়ালকে আশ্রয় দেয়া কিংবা শিশুর আবদারে ঘরে একটি বিড়াল রাখার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল। এখন দৃশ্যটি বদলে গেছে। হাজার হাজার টাকা খরচ করে পার্সিয়ান, সাইবেরিয়ান, স্কটিশ ফোল্ড কিংবা যার্গডলের মতো বিদেশি জাতের বিড়াল কেনা হচ্ছে। তাদের জন্য আসছে আমদানি করা খাবার, বিশেষ লিটার, খেলনা ও নানা ধরনের পরিচর্যার সামগ্রী। তৈরি হয়েছে পোষ্য ক্লিনিক, গ্রুমিং সেন্টার, ডে-কেয়ার, বোর্ডিং এমনকি ক্যাট হোটেলও। দৃষ্টিতে এটি নিছক পোষ্যপ্রেমের পরিবর্তন মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, বিড়ালকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই নতুন বাজার আসলে বাংলাদেশের দ্রুত বদলে যাওয়া নগরজীবনের একটি গুরুত্বপূূর্ণ প্রতিচ্ছবি। এখানে অর্থনীতি যেমন আছে, তেমনি আছে নগরায়ন, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, ভোগসংস্কৃতি, সামাজিক মর্যাদা এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান একাকীত্বের গল্প। শিল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে শুধু বিড়ালের খাবারের বাজারই প্রায় ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় ৩২ হাজার মেট্রিক টন বিড়ালের খাবার আমদানি হয়েছে। চীন, থাইল্যান্ড, ভারত ও তুরস্ক এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। খাবারের পাশাপাশি লিটার, খেলনা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সামগ্রী মিলিয়ে পোষ্যপণ্যের বাজারে বছরে শত শত কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট শিল্পের হিসাবে এ বাজারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০-২০ শতাংশ। এই পরিবর্তনের পেছনে প্রথমেই চোখে পড়ে নগরজীবনের রূপান্তর। দ্রুত নগরায়নের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবার দুর্বল হয়েছে, বেড়েছে একক পরিবার ও একা বসবাসের প্রবণতা। উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কারণে বহু তরুণ-তরুণী পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের পরিচিত পরিমণ্ডল থেকে দূরে শহরে বসবাস করছেন। ছোট ফ্ল্যাট, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং সীমিত সামাজিক যোগাযোগ অনেকের জীবনে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা তৈরি করছে। সেই শূন্যতায় বিড়াল হয়ে উঠছে নীরব, সঙ্গীসুলভ একটি উপস্থিতি। বিড়াল পোষার প্রবণতা তাই শুধু অর্থনৈতিক সামর্থ্যের বিষয় নয়; এটি মানুষের আবেগ ও মানসিক প্রয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত। একটি বিড়ালকে খাওয়ানো, তার যত্ন নেয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসা করানো কিংবা তার সঙ্গে সময় কাটানো অনেক শহুরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সম্পর্কের একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিড়ালের ছবি ও ভিডিও প্রকাশও এই সম্পর্ককে ব্যক্তিগত পরিসর থেকে প্রকাশ্য সামাজিক পরিসরে নিয়ে যাচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্থনি গিডেন্সের ‘আধুনিকতা ও আত্মপরিচয়’ ধারণার আলোকে এই পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা যায়। আধুনিক সমাজে ব্যক্তির পরিচয় শুধু পরিবার, ঐতিহ্য কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হয় না; ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও পছন্দের মাধ্যমেও পরিচয় নির্মিত হয়। কোন ধরনের বিড়াল পোষা হবে, তার খাবার কী হবে, কীভাবে পরিচর্যা করা হবে—এসবও তাই ব্যক্তির জীবনযাপন ও আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে পারে। জঁ বোদ্রিয়ারের ভোগবাদী সমাজের ধারণাও এখানে প্রাসঙ্গিক। আধুনিক ভোগের জগতে মানুষ কোনো পণ্য শুধু তার ব্যবহারিক প্রয়োজনের জন্য কেনে না; পণ্যের প্রতীকী অর্থও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঢাকার কোনো উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের দামী বিদেশি জাতের বিড়াল, আমদানি করা খাবার কিংবা বিশেষায়িত পরিচর্যার সামগ্রী তাই শুধু পোষ্য পালনের উপকরণ নয়; এগুলো রুচি, সামর্থ্য ও জীবনযাপনেরও সংকেত বহন করতে পারে। সামাজিক মাধ্যম সেই সংকেতকে আরও দৃশ্যমান করে। পিয়ের বুর্দিয়োর ‘পার্থক্যকরণ’ ধারণার দিক থেকেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। কোন জাতের বিড়াল জনপ্রিয়, কোন খাবার উন্নত, কোন ক্লিনিকে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায় কিংবা কোথায় আধুনিক গ্রুমিং করা হয়—এসব বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান একটি নতুন ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দক্ষতা তৈরি করছে। ফলে পোষ্যপালন শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, একটি স্বতন্ত্র শহুরে উপসংস্কৃতির অংশও হয়ে উঠছে। এর অর্থনৈতিক প্রভাবও উপেক্ষা করার মতো নয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বড় শহরে পোষ্য চিকিৎসাকেন্দ্র বাড়ছে। টিকাদান, অস্ত্রোপচার, রোগনির্ণয়, গ্রুমিং ও পরামর্শসেবা এখন একটি বিস্তৃত বাজার তৈরি করেছে। অনলাইন ও সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক ব্যবসায় বিক্রি হচ্ছে লিটার, ক্যারিয়ার, খেলনা, স্ক্র্যাচিং পোস্টসহ নানা সামগ্রী। ডে-কেয়ার, বোর্ডিং, গ্রুমিং এবং পোষ্যকেন্দ্রিক কনটেন্ট তৈরিও নতুন অ॥র্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অর্থাৎ ‘বিড়াল অর্থনীতি’ ছোট হলেও এটি নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। তবে এই বাজারের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। ক্যাট ব্রিডিং ও পোষ্য ব্যবসার বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক ও পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অবৈজ্ঞানিক আন্তঃপ্রজনন, জিনগত সমস্যা এবং প্রাণীর প্রতি অমানবিক আচরণ উদ্বেগের বিষয়। একই সঙ্গে খাবার, ওষুধ ও টিকার ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা এই খাতকে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। বাজার বড় হওয়ার আগেই এসব বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। আরেকটি বিষয় আরও গভীরভাবে ভাবা দরকার। বিদেশি জাতের বিড়ালের জন্য ব্যয়বহুল খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার বাজার বাড়ছে, অথচ একই শহরের রাস্তায় অসংখ্য দেশি বিড়াল ক্ষুধা, রোগ ও অবহেলায় দিন কাটাচ্ছে। একদিকে বিলাসী পোষ্য অর্থনীতি, অন্যদিকে অবহেলিত প্রাণী—এই বৈপরীত্য আমাদের নগর সমাজের আয় ও ভোগের অসমতাকেও প্রতিফলিত করে। তবে এ কারণে পোষ্যপালনের প্রবণতাকে নিছক বিলাসিতা বলে উড়িয়ে দেয়া ঠিক হবে না। বরং এর মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজের পরিবর্তনগুলো পড়তে হবে। নগরায়ন মানুষের বসবাসের ধরন বদলাচ্ছে, পরিবার বদলাচ্ছে, সম্পর্কের ধরন বদলাচ্ছে, অবসর ও বিনোদনের ধরন বদলাচ্ছে। সেই সঙ্গে বদলাচ্ছে ভালোবাসা ও সঙ্গী নির্বাচনের ধরনও। বিড়াল সেই পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান প্রতীক। বিশেষ করে তরুণ শহুরে মানুষের একটি অংশ তাদের ইচ্ছাধীন আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ পোষ্য প্রাণীর পেছনে ব্যয় করছেন। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের প্রকাশ যেমন আছে, তেমনি আছে স্বাধীনতা, আবেগ, সঙ্গ এবং ব্যক্তিগত জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও। ফলে বিড়াল এখানে একই সঙ্গে প্রাণী, সঙ্গী, ভোগের বস্তু এবং আত্মপরিচয়ের অংশ। এই উদীয়মান খাতকে তাই দায়িত্বশীলভাবে বিকশিত করার প্রয়োজন রয়েছে। পোষ্য প্রাণীর প্রজনন ও কল্যাণে ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ, আমদানিকৃত খাবার ও ওষুধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রাণী চিকিৎসার মান নিয়ন্ত্রণ এবং অমানবিক ব্যবসায়িক চর্চা বন্ধে নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে দেশীয়ভাবে নিরাপদ পোষ্যখাদ্য ও আনুষঙ্গিক পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেয়া যেতে পারে। এতে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, ‘বিড়াল অর্থনীতি’কে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ এটি কোনো দিন তৈরি পোশাক বা প্রবাসী আয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে বলে নয়। এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এটি আমাদের সমাজের এমন কিছু পরিবর্তন দৃশ্যমান করে, যা প্রচলিত অর্থনৈতিক সূচকে ধরা পড়ে না। একটি বিড়ালের খাবার, লিটার, চিকিৎসা কিংবা গ্রুমিংয়ের ব্যয়ের ভেতর দিয়ে আমরা নগর মধ্যবিত্তের নতুন ভোগচাহিদা দেখতে পাই। একটি ফ্ল্যাটে বিড়ালের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে দেখতে পাই একাকীত্ব, স্বাধীনতা ও পরিবর্তিত পারিবারিক সম্পর্কের গল্প। অর্থনীতির ভাষায় এটি হয়তো ছোট একটি বাজার। কিন্তু সমাজের ভাষায় এটি বড় একটি সংকেত। বাংলাদেশের শহরগুলো যত বদলাবে, মানুষের চাহিদা ও সম্পর্কের ধরনও তত বদলাবে। সেই পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী হয়ে উঠেছে বিড়াল। তাই ‘মিউ মিউ অর্থনীতি’ আসলে শুধু বিড়ালের খাবার, চিকিৎসা বা খেলনার বাজার নয়; এটি বদলে যাওয়া শহুরে বাংলাদেশের জীবন, মনস্তত্ত্ব ও ভোগসংস্কৃতির একটি ছোট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ দর্পণ। [লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী। ]

জঙ্গিবাদ নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ

সম্প্রতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম-এর ৩৮তম প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল কায়েদার তৎপরতা নিয়ে স্পষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইণ্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ বা একিউআইএস একটি খণ্ডিত গোষ্ঠী থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কে রূপান্তরিত হচ্ছে। বড় ইউনিটের বদলে তারা এখন ছোট ছোট, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেলের মাধ্যমে কাজ করছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লাল কেল্লায় হামলার দায়ও আনুষ্ঠানিকভাবে একিউআইএস-এর ওপর চাপানো হয়েছে। রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, এই গোষ্ঠীটি বাংলাদেশকে ব্যবহার করে স্থায়ী ঘাঁটি ও গোপন সেল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। সরকারের অবস্থান ঠিক এর বিপরীত। বর্তমান বিএনপি সরকার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেছেন, বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই। শঙ্কা না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অযথা আতঙ্কিত না হতে বলেছে। এমনকি জাতিসংঘের রিপোর্টকে ‘অনুমান নির্ভর’ আখ্যা দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা অন্য কথা বলছে। ঢাকা ও এর আশপাশে গত কয়েক মাসে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। গত ১২ আগস্ট সাভারের একটি বাড়িতে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট অভিযান চালিয়ে ৯টি বিস্ফোরক, বিপুল পরিমাণ গানপাউডার ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। এর আগে আশুলিয়া এবং মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকেও বোমা উদ্ধার হয়েছে। এসব ঘটনার পর পুলিশ সদর দপ্তর সারা দেশে সতর্কতা জারি করতে বাধ্য হয়েছে। জঙ্গি তৎপরতা বাংলাদেশে নতুন নয়, বরং সুযোগ পেলেই মাথাচাড়া দেয়। ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে উগ্রপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো আবার উজ্জীবিত হচ্ছে। কারাগার ভেঙে কিংবা জামিনে সেসময় এমন কিছু ব্যক্তি বেরিয়ে এসেছেন যাদের বিরুদ্ধে উগ্র সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। কারা অধিদপ্তরের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানিয়েছেন, কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বা জামিনে থাকা বিপুল সংখ্যক জঙ্গির নথি নেই। অর্থাৎ নথিগুলো নষ্ট বা গায়েব করে দেয়া হয়েছে। এদের বেশিরভাগকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ৫ আগস্টের পর তারা বেরিয়ে গেছে, বের করে দেয়া হয়েছে, জামিনে মুক্তি পেয়েছে। বিএনপি, জামায়াত এবং তাদের ঘরানার একটি অংশের বক্তব্য হলো, দেশে জঙ্গি নেই, এসব আওয়ামী লীগের অপপ্রচার। অথচ ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। বিএনপির শাসনামলে ‘বাংলাভাই’ রাজশাহী অঞ্চলে পুলিশের ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে মানুষ ধরে এনে গাছে ঝুলিয়ে পিটিয়েছে, মেরেছে। তখন জামায়াতের নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, বাংলাভাই বলে কেউ নেই, এটা মিডিয়ার সৃষ্টি। অথচ সেই সরকারই বহুদিন পর তাকে গ্রেপ্তার করে এবং বিচারে তার ফাঁসি হয়। জঙ্গি না থাকলে ২০০৫ সালে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা ফুটাল কারা? কারা আদালতে বোমা মেরে ‘তাগুত’ আইনের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করল? প্রশ্নগুলো আজও অমীমাংসিত। এই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে নারকীয় অধ্যায় ছিল ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা। ওই রাতে জেএমবির কথিত নব্য শাখার উগ্রপন্থীরা ১৭ জন বিদেশিসহ ২০ জনকে নির্মমভাবে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনার পর বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিকভাবে বড় ধাক্কা খায়। বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। হলি আর্টিজান প্রমাণ করেছিল, দেশীয় জঙ্গিরা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বড় হামলার সক্ষমতা রাখে। সেই ক্ষত এখনও শুকায়নি। যখন দেশের ভেতরে একের পর এক বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে, তখন তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এড়ায় না। নজরে না এলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ তাদের রিপোর্টে এত সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করত না। নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক। তাই ‘অনুমান নির্ভর’ বলে রিপোর্ট উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ কম। অথচ একই জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার ভলকার তুর্কের জুলাই গণআন্দোলন বিষয়ক প্রতিবেদনকে অক্ষরে অক্ষরে সত্য মেনে নেয়া হয়েছে। টিআইবি-র দুর্নীতি বিষয়ক রিপোর্টও বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার প্রথমে অস্বীকার করেছে, হুমকি দিয়েছে, পরে সেই রিপোর্ট উপেক্ষার খেসারত দেশকে দুর্নীতির আখড়া হিসেবে দিতে হয়েছে। শেষ কথা হলো, অস্বীকার দিয়ে বিপদ দূর হয় না। যদি সরকার এখনই জাতিসংঘের সতর্কতাকে গুরুত্ব না দেয়, সময়মতো সেলগুলো ভেঙে না দেয়, তাহলে বাংলাদেশ পাকিস্তানের পথেই হাঁটবে। একসময় পাসপোর্টে পাকিস্তানের ভিসা থাকলে ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলো সেই পাসপোর্টে ভিসা দিতে চাইতো না। বাংলাদেশকে যদি সেই তালিকায় যেতে হয়, তার দায় সরকারকেই নিতে হবে। জাতিসংঘের রিপোর্ট কোনো রাজনৈতিক অস্ত্র নয়, এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি আয়না। আয়নায় মুখ দেখে যদি আমরা বলি মুখ নেই, তাহলে বাস্তবতা বদলাবে না। বরং সেল বাড়বে, বিস্ফোরক বাড়বে, আর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি অস্থির ও বিচ্ছিন্ন বাংলাদেশ পাবে। এখন সময় রাজনীতির হিসাব ভুলে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার। নইলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

হিমালয়ের বরফ ভাঙার শব্দ আমাদের দুয়ারেও

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের দৃশ্যগুলো আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো সবকিছু বরফ, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। গত ২৮ আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে অন্তত ৫৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় এক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় এই সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।কিন্তু একজন কৃষিবিদ এবং পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা মানুষ হিসেবে এই ঘটনাকে আমি শুধু একটি দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখতে পারছি না। আমার কাছে এটি হিমালয় অঞ্চলসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।প্রাথমিকভাবে অঞ্চলটিতে ভূকম্পন শনাক্ত হওয়ায় অনেকে ভূমিকম্পের কথা ভেবেছিলেন। পরে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আরও উদ্বেগজনক। হিমালয়ের ৫ হাজার ১২৭ মিটার উচ্চতার একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে পড়ে এবং বিপুল পরিমাণ বরফ ও শিলা উপত্যকার দিকে ধেয়ে আসে। সেই ধস পানি, কাদা ও পাথরের সঙ্গে মিশে এক ভয়ংকর ডেব্রিস ফ্লো বা ধ্বংসস্রোত তৈরি করে। কোনো কোনো পর্যায়ে এর গতি ছিল সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার। এই গতির একটি স্রোতের সামনে মানুষের আত্মরক্ষার সময় যে কতটা কম, তা সহজেই অনুমান করা যায়। তবে এখানে একটি বৈজ্ঞানিক সতর্কতা জরুরি। একটি নির্দিষ্ট হিমবাহ ধসের একমাত্র কারণ জলবায়ু পরিবর্তন- এ কথা পর্যাপ্ত গবেষণা ছাড়া বলা উচিত নয়। ভূতাত্ত্বিক গঠন, বরফের ভেতরে পানির চাপ, পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা, তাপমাত্রার পরিবর্তন অনেক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।কিন্তু বৃহত্তর বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহের জায়গা ক্রমেই কমছে। হিমালয় বদলে যাচ্ছে। সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি)-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহে বরফ হারানোর হার ২০০০ সালের পর প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের হিমবাহ তাদের মোট আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ এবং আনুমানিক বরফভাণ্ডারের প্রায় ৯ শতাংশ হারিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে ১৯৭৫ সালের পর কোথাও কোথাও বরফের পুরুত্ব ২৭ মিটার পর্যন্ত কমে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অঞ্চলের পানি ব্যবস্থার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ডব্লিউএমও-এর তথ্যও আমাদের আশ্বস্ত করে না। সংস্থাটির এশিয়ার জলবায়ুর অবস্থা ২০২৪ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া বর্তমানে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে। মধ্য হিমালয়ে কম শীতকালীন তুষারপাত এবং তীব্র গ্রীষ্মকালীন তাপ হিমবাহ ক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করছে।এসব সংখ্যা শুধু বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনের সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী। জড়িয়ে আছে কৃষি। জড়িয়ে আছে খাদ্য এবং শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন। হিমালয়কে আমরা অনেক সময় দূরের কোনো বরফে ঢাকা পর্বতমালা হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে হিমালয় শুধু নেপাল, ভারত, ভুটান বা চীনের পাহাড় নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল নদীব্যবস্থার প্রাণ এই হিমালয়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রসহ এ অঞ্চলের অসংখ্য নদীর পানিপ্রবাহ হিমালয়ের তুষার, হিমবাহ ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। কোটি কোটি মানুষের কৃষি, পানীয় জল, খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতি এই নদীগুলোর ওপর নির্ভর করে।তাই হিমালয়ের পরিবর্তন মানে শুধু পাহাড়ের পরিবর্তন নয়। তার অভিঘাত একদিন সমতলেও এসে পৌঁছায়।আর বাংলাদেশ সেই সমতলেরই একটি দেশ।আমরা এমন একটি বদ্বীপে বাস করি, যেখানে অধিকাংশ বড় নদীর উৎস দেশের সীমানার বাইরে। উজানে অতিবৃষ্টি, হিমবাহ গলন, পাহাড়ি ঢল কিংবা নদীর প্রবাহে আকস্মিক পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের ওপর এসে পড়তে পারে। অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকিও আমাদের ঘিরে রয়েছে।অর্থাৎ একদিকে হিমালয়ের পরিবর্তন, অন্যদিকে সমুদ্রের পরিবর্তন এই দুই প্রান্তের জলবায়ু ঝুঁকির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। কৃষি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, “জলবায়ু পরিবর্তন” কথাটি অনেক সময় আমাদের কাছে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, গবেষণাপত্র কিংবা নীতিনির্ধারণী আলোচনার বিষয় বলে মনে হয়।একজন কৃষকের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন এত জটিল কোনো শব্দ নয়। তার কাছে জলবায়ু পরিবর্তন হলো বীজ বোনার সময় বৃষ্টি না হওয়া; ধান পাকার ঠিক আগে অতিবৃষ্টি; কয়েক মাসের খরায় জমি ফেটে যাওয়া; তীব্র গরমে ফুল ও ফল ঝরে পড়া; অথবা এক রাতের বন্যায় কয়েক মাসের শ্রম হারিয়ে যাওয়া।অর্থাৎ জলবায়ু সংকট শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনের সংকট। নেপালের এই বিপর্যয় আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে। শুধু দুর্যোগের পরে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দুর্যোগ আসার আগেই তার সংকেত শনাক্ত করা এবং মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া।প্রথমত, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ, পাহাড়ি ঢাল এবং নদীর প্রবাহের জন্য শক্তিশালী আঞ্চলিক ‘আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা’ গড়ে তুলতে হবে। স্যাটেলাইট, রিমোট সেন্সিং, স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র, নদী সেন্সর এবং আধুনিক পূর্বাভাস প্রযুক্তি আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। কয়েক মিনিট কিংবা কয়েক ঘণ্টার আগাম সতর্কতাও অনেক ক্ষেত্রে হাজারো মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু ও নদীসংক্রান্ত তথ্য বিনিময় আরও শক্তিশালী করতে হবে। নেপাল, ভুটান, ভারত, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বৃষ্টিপাত, নদীর পানি, হিমবাহের অবস্থা এবং হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের তথ্য প্রায় বাস্তব সময়ে বিনিময়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ নদী রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না। দুর্যোগও পাসপোর্ট নিয়ে আসে না। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের নিজস্ব হিমালয়-নদী-জলবায়ু গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে। উজানের কোন পরিবর্তন কত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে এ বিষয়ে আরও উন্নত মডেল, তথ্যভান্ডার ও গবেষণা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আবহাওয়া অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন।চতুর্থত, আমাদের কৃষিকে আরও জলবায়ু সহনশীল করতে হবে। খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও তাপসহনশীল জাতের সম্প্রসারণ, অঞ্চলভিত্তিক ফসল ক্যালেন্ডার, পানি সংরক্ষণ এবং কৃষকের কাছে দ্রুত আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।পঞ্চমত, অবকাঠামো নির্মাণে শুধু অতীতের আবহাওয়ার রেকর্ড নয়, ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকিকেও বিবেচনা করতে হবে। আজকের একটি সেতু, বাঁধ বা সড়ক হয়তো আগামী ৫০ বছর ব্যবহার করা হবে। তাই গতকালের জলবায়ু দিয়ে আগামী দিনের অবকাঠামো পরিকল্পনা করলে চলবে না।আরেকটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই যেটি হলো জলবায়ু ন্যায়বিচার। যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠী বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে। হিমালয়ের দুর্গম গ্রামের একজন মানুষ কিংবা বাংলাদেশের উপকূলের একজন কৃষক বৈশ্বিক শিল্পায়নের সুবিধা সবচেয়ে বেশি পাননি। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের মূল্য তাদেরই ঘর, ফসল, জীবিকা এবং কখনো জীবন দিয়ে দিতে হচ্ছে। আজ নেপালে যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাদের শোক কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যারা এখনো নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় আছেন, তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কতটা কঠিন, তা শুধু অনুভব করার চেষ্টা করা যায়। নিহত প্রত্যেক মানুষের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও শোক। আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা।নিহতদের শান্তি দেওয়া, নিখোঁজ মানুষগুলোকে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া আর নেপাল ও তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে এই ভয়াবহ বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য পাশে দাড়াতে হবে বিশ্বকে। আবার শোকের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষা নিতেও হবে। বিজ্ঞান আমাদের বিপদের সংকেত দেখাতে পারে।প্রযুক্তি আমাদের আগাম সতর্ক করতে পারে।গবেষণা আমাদের পথ দেখাতে পারে।প্রয়োজন সেই জ্ঞানকে মানুষের জীবন রক্ষার সিদ্ধান্তে রূপান্তর করা। হিমালয় বাংলাদেশের সীমানার বাইরে কিন্তু হিমালয়ের পানি আমাদের নদীতে আসে। সেই নদীর পানি আমাদের কৃষিজমিকে উর্বর করে, আমাদের খাদ্য উৎপাদন ও জীবনকে টিকিয়ে রাখে। তাই দূরের কোনো পাহাড়ে বরফ ভাঙার ঘটনাকে শুধু দূরের ঘটনা মনে করার সুযোগ আমাদের নেই। হিমালয়ের বরফ যখন ভাঙে, তার শব্দ শুধু পাহাড়েই থেমে থাকে না; সেই সতর্কধ্বনি নদীপথ বেয়ে একদিন আমাদের দুয়ারেও এসে পৌঁছায়।লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও শিক্ষক

সভ্যতার উন্নয়নের থাবায় বিপন্ন হিমালয়

২৬ আগস্ট, ২০২৬। হিমালয়ের নেপাল–তিব্বত সীমান্তে হঠাৎ নেমে এল বরফ, পাথর, কাদা ও পানির এক ভয়ংকর স্রোত। নদী তার স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হলো ধ্বংসের স্রোতে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে বিশাল বরফ–শিলা ধসের পর নদীর গতিপথে আকস্মিক জলপ্রবাহ তৈরির কথা বলা হচ্ছে। ঘটনাটিকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখছেন না বিজ্ঞানীরা; উষ্ণায়ন, হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন, পাহাড়ের অস্থিতিশীলতা এবং মানুষের বাড়তে থাকা অবকাঠামোগত চাপ- সব মিলিয়ে হিমালয়ের ঝুঁকির নতুন বাস্তবতার দিকে তাকাতে হচ্ছে। কিন্তু এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নটি হলো—হিমালয়ে যা ঘটছে, তা কি শুধু পাহাড়ের বিপদ? উত্তরটি হচ্ছে, না। কারণ হিমালয় কোনো বিচ্ছিন্ন পর্বতমালা নয়। এর বরফে জমে আছে এশিয়ার পানির ভবিষ্যৎ। এর ঢাল বেয়ে নেমে আসা নদীর পলিতে তৈরি হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ কৃষিভূমি। এর বৃষ্টিব্যবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। এর বন ও তৃণভূমি অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়। আর এর নদী ও ভূপ্রকৃতির ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে ভারতীয় উপমহাদেশের বহু প্রাচীন সভ্যতা।অর্থাৎ, হিমালয়ের সংকট আসলে সভ্যতার সংকট।  আজ যে হিমালয়কে আমরা পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিসেবে দেখি, তার শুরু হয়েছিল প্রায় ৪–৫ কোটি বছর আগে। তখন ভারত কোনো মহাদেশীয় উপদ্বীপ ছিল না বর্তমান অর্থে; ভারতীয় ভূখণ্ডের উত্তর দিকে ছিল টেথিস মহাসাগর। ভারতীয় প্লেট ক্রমাগত উত্তরে এগিয়ে গিয়ে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। দুই মহাদেশীয় প্লেটের ঘনত্ব কাছাকাছি হওয়ায় কোনো একটি সহজে অন্যটির নিচে ঢুকে যেতে পারেনি। ফলে ভূত্বক ভাঁজ হয়ে ওপরে উঠে তৈরি হয়েছে হিমালয় ও তিব্বতি মালভূমি।উন্নয়নের তাণ্ডব দেবতাত্মাতেও এই সংঘর্ষ আজও শেষ হয়নি। ভারতীয় প্লেট উত্তর দিকে ইউরেশিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে হিমালয় এখনো একটি সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল। এই চলমান চাপই একদিকে পাহাড়কে গড়ে তুলছে, অন্যদিকে ভূমিকম্প ও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি করছে। হিমালয় অঞ্চলের ভূমিকম্পের প্রধান কারণও ভারত ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষ। অর্থাৎ হিমালয় একই সঙ্গে সৃষ্টির এবং বিপর্যয়ের ভূগোল।কোটি কোটি বছর ধরে যে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া পাহাড় বানিয়েছে, সেই একই প্রক্রিয়া আজও তার ভেতরে শক্তি জমা করছে। তাই হিমালয়ের গল্প শুধু পাহাড়ের গল্প নয়। এটি সমতলেরও গল্প। পর্বতের শিলা ক্ষয় হয়ে নদীর সঙ্গে নেমে এসেছে মাটি, বালি ও পলি। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, যমুনা, শতদ্রু, তিস্তা কিংবা আরও অসংখ্য নদী সেই পলি বহন করে তৈরি করেছে বিশাল ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি। এই সমভূমি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও পুরু পললভূমি।এই প্রক্রিয়াটি শুধু ভূতাত্ত্বিক ছিল না—এটি ছিল সভ্যতা নির্মাণের প্রক্রিয়াও। পাহাড় থেকে নদী, নদী থেকে পলি, পলি থেকে উর্বর মাটি, মাটি থেকে কৃষি। এরপর খাদ্য উদ্বৃত্ত। তারপর বসতি, নগর, রাষ্ট্র, সভ্যতা।বয়ে যাওয়া জলপথপ্রাচীন মানুষের জন্য নদী ছিল পানির উৎস, মাছের উৎস, যোগাযোগের পথ এবং কৃষির প্রাণ। হিমালয়ের নদীগুলো যে বিপুল পলি সমতলে এনেছে, তা কৃষির জন্য তৈরি করেছে উর্বর ভূমি। সিন্ধু সভ্যতার ক্ষেত্রেও নদী ও সমভূমির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভূবৈজ্ঞানিক গবেষণা দেখিয়েছে, হিমালয়-উৎসারিত নদীর গতিপথ ও পরিবর্তন প্রাচীন বসতির বিস্তার এবং নগরায়ণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।অর্থাৎ কয়েক হাজার বছর আগে মানুষ হয়তো জানত না প্লেট টেকটনিকস কী, হিমবাহ কীভাবে তৈরি হয় কিংবা নদী কীভাবে পলি বহন করে। কিন্তু তাদের জীবন ছিল এসব প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। হিমালয়ের আরেকটি অসাধারণ ভূমিকা রয়েছে—দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি জলবায়ুতে। ভারত মহাসাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ু উত্তরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় হিমালয়ের বিশাল প্রাচীরের মুখোমুখি হয়। পর্বতের ভূপ্রকৃতি এই আর্দ্র বায়ুর গতিপথ ও বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করে।বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, হিমালয় দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ ভৌত বাধা হিসেবে কাজ করে এবং উপমহাদেশের জলবায়ু কাঠামোকে প্রভাবিত করে। তিব্বতি মালভূমির উত্থানও এশিয়ার জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। ভূতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, তিব্বতি মালভূমি ও হিমালয়ের উত্থানের সঙ্গে এশীয় মৌসুমি জলবায়ুর বিকাশের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। তাই হিমালয়কে শুধু ‘বরফের পাহাড়’ বলা ভুল। এটি এশিয়ার একটি বিশাল জলবায়ু-নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা।বরফের নিচে লুকানো এশিয়ার ভবিষ্যৎহিন্দুকুশ–হিমালয় অঞ্চলকে বলা হয় ‘থার্ড পোল’ বা তৃতীয় মেরু। মেরু অঞ্চলের বাইরে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বরফ ও তুষারভাণ্ডার এখানে। এই অঞ্চল থেকে উৎপত্তি হয়েছে এশিয়ার ১০টি বড় নদী ব্যবস্থার। এসব নদীর অববাহিকায় বসবাস করে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ। হিমালয় অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবন-জীবিকা যেমন এর ওপর নির্ভরশীল, তেমনি বহু দূরের সমভূমির কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ ও নগরজীবনও এই পানির সঙ্গে যুক্ত।এখানে একটি ভয়ংকর বৈপরীত্য আছে। যে বরফ হাজার হাজার বছর ধরে পানির সঞ্চয় হিসেবে কাজ করেছে, মানুষ এখন সেই বরফকে খুব দ্রুত হারাচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি)-এর নতুন মূল্যায়ন বলছে, হিন্দুকুশ–হিমালয়ের হিমবাহে বরফ হারানোর হার ২০০০ সালের পর দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিমবাহগুলোর মোট আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ এবং অনুমিত বরফভাণ্ডার প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। ১৯৭৫ সালের তুলনায় কিছু অঞ্চলে বরফের পুরুত্বের ক্ষতি ২৭ মিটার পর্যন্ত হয়েছে।প্রাণীদেরও আবাসআরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৩ সালের আইসিআইএমওডি মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০১১–২০২০ দশকে হিমবাহের বরফ হারানোর হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি ছিল। বর্তমান উচ্চ নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষে হিমবাহের বর্তমান আয়তনের বিপুল অংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিপদটা শুধু এখন ‘বরফ গলে বন্যা’ নয়। বরং হিমালয়ের জলবায়ু সংকটকে আমরা অনেক সময় খুব সরলভাবে দেখি—তাপমাত্রা বাড়বে, বরফ গলবে, নদীতে পানি বাড়বে। অথচ, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। হিমবাহ দ্রুত গললে প্রথম পর্যায়ে কোথাও কোথাও পানির প্রবাহ বাড়তে পারে। তৈরি হতে পারে নতুন হিমবাহ-হ্রদ। এসব হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে সৃষ্টি হতে পারে আকস্মিক বন্যা বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্ল্যাড বা জিএলওএফ।ভূমিধস নদী আটকে দিতে পারে। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে নেমে আসতে পারে আকস্মিক বন্যা। বরফ ও পাথরের ধস নদীতে পড়ে তৈরি করতে পারে ভয়াবহ ডেব্রিস ফ্লো বা ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ।অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহ ছোট হয়ে গেলে বরফ থেকে পাওয়া পানির মজুত কমে যায়। অর্থাৎ আজকের অতিরিক্ত পানি ভবিষ্যতের পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না; বরং একসময় উল্টো পানির ঘাটতি তৈরি করতে পারে। আইসিআইএমওডি-এর গবেষণাও বলছে, হিমবাহ ও তুষারের পরিবর্তনের ফলে মধ্য শতাব্দীর দিকে পানির প্রাপ্যতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে পরে কমতে পারে।নীরব প্রান্তরে নিশ্চিন্ত প্রাণীতাই হিমালয়ের সামনে একই সঙ্গে দুটি বিপদ—অতিরিক্ত পানি এবং পানির অভাব। প্রকৃতি হিমালয়কে ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। কিন্তু মানুষ বদলাচ্ছে আরও দ্রুত। পাহাড় কেটে রাস্তা হচ্ছে। নদীতে বাঁধ হচ্ছে। হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্প হচ্ছে। টানেল তৈরি হচ্ছে। পর্যটননগরী গড়ে উঠছে। হোটেল, বাজার, আবাসন বাড়ছে। খনিজ উত্তোলন হচ্ছে। বন কাটা হচ্ছে। উন্নয়ন প্রয়োজন। হিমালয়ের মানুষও বিদ্যুৎ, রাস্তা, হাসপাতাল, শিক্ষা, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থান চান। প্রশ্ন উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয়। প্রশ্ন হলো— হিমালয়ের ভূপ্রকৃতির সহনক্ষমতা না বুঝে উন্নয়ন করলে সেই উন্নয়ন কত দিন টিকবে?হিমালয় এমনিতেই ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল। তার ওপর বরফ গলছে, মাটির ভেতরের স্থায়ী বরফ বা পারমাফ্রস্ট বদলাচ্ছে, বৃষ্টির ধরন পাল্টাচ্ছে। এই অবস্থায় পাহাড় কেটে ভারী অবকাঠামো বসালে ঝুঁকি এক জায়গায় এসে জমা হয়।আইসিআইএমওডি বলছে, হিমালয়ের ক্রায়োস্ফিয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হড়পা বান বা আকস্মিক বন্যা, ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ, ভূমিধসসহ বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে বসতি, অবকাঠামো, পানি, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তায়।জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির প্রবাহ যখন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তখন এই অবকাঠামোকেও নতুন ঝুঁকির হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।যে পাহাড়কে দেবতা ভাবত মানুষএখানে আধুনিক উন্নয়নের সঙ্গে প্রাচীন সভ্যতার একটি গভীর বৈপরীত্য দেখা যায়।হিমালয় মানুষের কাছে শুধু সম্পদ ছিল না। এটি ছিল পবিত্রতা। কৈলাস হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং তিব্বতি বন ঐতিহ্যে পবিত্র। গঙ্গা শুধু নদী নয়—দেবী। অসংখ্য ঝরনা, বন, পাহাড়, পাথর, হ্রদ ও গুহা স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। হিমালয়ের বহু অঞ্চলে এমন বনভূমি রয়েছে, যেগুলো স্থানীয় দেবতা, পূর্বপুরুষ বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে শত শত বছর ধরে রক্ষা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তরাখণ্ডসহ হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘পবিত্র বনভূমি’ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে।হিমালয়কে দেবতাই মনে করতো আদি পুরুষরাঅর্থাৎ প্রাচীন সমাজ হয়তো ‘বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন’ বা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ শব্দটি জানত না। কিন্তু তাদের বিশ্বাস বলত—এই বন কাটা যাবে না। এই জলাশয় নষ্ট করা যাবে না। এই পাহাড়ে কিছু করা যাবে না। ধর্মীয় বিশ্বাস অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃতির জন্য একটি সামাজিক সুরক্ষা-কবচ তৈরি করেছিল।আধুনিক মানুষ সেই জায়গায় বসিয়েছে অন্য একটি ধারণা—সম্পদ।পাহাড় মানে জলবিদ্যুৎ।নদী মানে বিদ্যুৎ।বন মানে কাঠ।জমি মানে রিয়েল এস্টেট।পাহাড় মানে পর্যটন।খনিজ মানে অর্থনীতি। এখানেই সভ্যতার সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব।পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডারহিমালয়ের উচ্চতা কয়েক শ’ মিটারের সমভূমি থেকে আট হাজার মিটারেরও বেশি শৃঙ্গে পৌঁছেছে। এই বিপুল উচ্চতার পার্থক্য সৃষ্টি করেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র জলবায়ু অঞ্চল।ফলে একই অঞ্চলের মধ্যে পাওয়া যায় উষ্ণ অরণ্য, নাতিশীতোষ্ণ বন, শঙ্কুযুক্ত বন, তৃণভূমি, আলপাইন অঞ্চল এবং তুষারভূমি।হিন্দুকুশ–হিমালয় চারটি বৈশ্বিক ‘বায়োডাইভারসিটি হটস্পট’-এর সঙ্গে যুক্ত এবং এখানে ৩৫ হাজারের বেশি উদ্ভিদ, প্রায় ২০০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখির উপস্থিতির কথা আইসিআইএমওডি উল্লেখ করেছে।কিন্তু এই বৈচিত্র্য এখন চাপে। বন উজাড়, অতিচারণ, কৃষিজমির বিস্তার, নগরায়ণ, অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তন মিলিয়ে আবাসস্থল খণ্ডিত হচ্ছে। উচ্চ পাহাড়ের এমন অনেক প্রাণী আছে, যারা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও উচ্চতার মধ্যে বেঁচে থাকে। উষ্ণতা বাড়লে তারা সহজে আরও ওপরে সরে যেতে পারে না—কারণ ওপরে গিয়ে একসময় পাহাড় শেষ হয়ে যায়।এটি এক ধরনের ‘উচ্চতার ফাঁদ’।হিমালয়ের একটি প্রাণীর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থ তাই শুধু গরম হয়ে যাওয়া নয়; কখনো কখনো এর অর্থ হলো—তার বাসযোগ্য পৃথিবী ছোট হয়ে যাওয়া।সভ্যতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে নদীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। অথচ হিমালয়ের নদীগুলোকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছি। বাঁধ দিয়ে। ব্যারাজ দিয়ে। বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে। তীররক্ষা দিয়ে। নদীর গতিপথ বদলে। কিন্তু নদী কেবল পানির প্রবাহ নয়। নদী বহন করে পলি, শক্তি, জৈবপদার্থ, বীজ এবং জীবনের অসংখ্য উপাদান।বহমান জলধারানদীকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে তার স্বাভাবিক গতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। আর হিমালয়ের মতো তরুণ, সক্রিয় ও দ্রুত পরিবর্তনশীল পর্বতব্যবস্থায় সেই হস্তক্ষেপের ফল কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত হতে পারে। প্রাচীন সভ্যতাগুলো নদীর সঙ্গে বসবাস করতে শিখেছিল। অথচ এ যুগে এসে আধুনিক সভ্যতা নদীকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বদলাতে চায়। এই দুই দর্শনের মধ্যে পার্থক্যটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।উপমহাদেশের তিনটি ভবিষ্যৎহিমালয়ের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তিনটি বড় প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমত, পানি। সিন্ধু অববাহিকা ভারত ও পাকিস্তানের কোটি মানুষের কৃষির ভিত্তি। গঙ্গা ভারত ও বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবনধারার অংশ। ব্রহ্মপুত্র চীন, ভারত ও বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বহমান। হিমালয়ের বরফ ও তুষারের পরিবর্তন তাই সীমান্ত মানবে না।দ্বিতীয়ত, খাদ্য। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীর পানি এবং পলি দক্ষিণ এশিয়ার কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পানি প্রবাহের সময় বদলে গেলে সেচব্যবস্থা, ফসলের ক্যালেন্ডার এবং কৃষি উৎপাদনও বদলাতে পারে। আর তৃতীয়ত, ভূরাজনীতি। পানি যখন কমবে, তখন নদীর পানি শুধু পরিবেশের বিষয় থাকবে না—তা হয়ে উঠবে কূটনীতি ও নিরাপত্তার বিষয়। ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—সব দেশের ভবিষ্যৎ কোনো না কোনোভাবে এই জলভূগোলের সঙ্গে যুক্ত। তাই হিমালয়ের ভবিষ্যৎ একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রশ্নও।বাংলাদেশের জন্য বিপদটা কোথায়?বাংলাদেশ হিমালয়ের পাদদেশে নয়। কিন্তু হিমালয়ের নদীর শেষ প্রান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। এই কারণে পাহাড়ে যা ঘটে, তার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থায় পৌঁছাতে পারে। অতিরিক্ত বৃষ্টির সঙ্গে হিমবাহজাত পানির প্রবাহ মিললে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে বরফ ও তুষারের মজুত কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদি পানির প্রাপ্যতায় চাপ তৈরি হতে পারে।ধূসর পাহাড়এর সঙ্গে যুক্ত হবে— নদীভাঙন, পলি পরিবহন, কৃষি, মৎস্য, নদীর নাব্যতা, ভূগর্ভস্থ পানি, উপকূলীয় লবণাক্ততা এবং আন্তঃসীমান্ত পানি-রাজনীতি। বাংলাদেশ তাই হিমালয়ের দর্শক নয়। বরং বাংলাদেশ হিমালয়ের ডাউনস্ট্রিম স্টেকহোল্ডার বা পরবর্তী ধাপের অংশীজন। এই বাস্তবতাটি আমাদের জাতীয় জলবায়ু ও পানি নীতিতে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার সময় এসেছে। তাহলে হিমালয় কি ধ্বংস হয়ে যাবে? না। অন্তত বিজ্ঞান এমন কথা বলে না। হিমালয় থাকবে। কোটি বছর ধরে থাকা এই পর্বতমালা হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাবে না। কিন্তু আমরা যে হিমালয়কে চিনি, সেটি বদলে যেতে পারে। বরফ কমবে। হিমবাহ সরে যাবে। নতুন হ্রদ তৈরি হবে। কিছু হ্রদ ভেঙে যাবে। ভূমিধসের চরিত্র বদলাবে। নদীর প্রবাহের মৌসুমি ছন্দ পাল্টাবে। জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল সরে যাবে। কৃষির পানি-নিরাপত্তা বদলাবে। পাহাড়ি মানুষের বসতি ও জীবিকা বদলাবে।২০২৩ সালের আইসিআইএমওডি মূল্যায়ন এই পরিবর্তনকে মানবসময়ের বিচারে ‘অভূতপূর্ব এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয়’ বলে বর্ণনা করেছিল। ২০২৬ সালের নতুন তথ্য বলছে, বরফ হারানোর গতি আরও তীব্র হয়েছে। আর ২৬ আগস্টের নেপাল–তিব্বত বিপর্যয় আমাদের চোখের সামনে দেখিয়ে দিল—উচ্চ পাহাড়ে একটি পরিবর্তন কীভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে নদী, রাস্তা, বসতি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মানুষের জীবনকে একসঙ্গে বিপন্ন করতে পারে।সভ্যতার ঋণ কি শোধ করতে পারব?হাজার হাজার বছর আগে মানুষ হিমালয়ের কাছ থেকে নিয়েছিল পানি। নদী দিয়েছিল কৃষি। পলি দিয়েছিল উর্বর মাটি। বন দিয়েছিল খাদ্য ও জ্বালানি। পর্বত দিয়েছিল বৃষ্টি ও জলবায়ুর আশ্রয়। মানুষ সেই সম্পদের ওপর বসতি গড়েছে। নগর বানিয়েছে। সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। ধর্ম ও সংস্কৃতি নির্মাণ করেছে। কোটি কোটি মানুষের জীবন দাঁড়িয়ে গেছে হিমালয় থেকে নেমে আসা পানির ওপর।আজ সেই মানুষই পাহাড়ে আরও রাস্তা বানাচ্ছে, নদী আটকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, বন কাটছে, পর্যটননগরী বানাচ্ছে, কার্বন নিঃসরণ বাড়াচ্ছে। সভ্যতার সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হয়তো এটাই—যে প্রকৃতি তাকে জন্ম দিয়েছে, উন্নয়নের নামে সেই প্রকৃতিকেই সে দুর্বল করে তুলছে। হিমালয় কোনো দেবতার অভিশাপে বিপন্ন হচ্ছে না। কোনো একক দুর্যোগও এর জন্য দায়ী নয়। এখানে কাজ করছে ভূতত্ত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা, উন্নয়ন, অবকাঠামো, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং মানুষের প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা। তাই সমাধানও একক নয়।কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অপরিকল্পিত নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। হিমবাহ ও তুষারভাণ্ডার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। হিমবাহের হ্রদ ফেটে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের আগাম সতর্কতা বাড়াতে হবে। নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। ভারত, চীন, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়াতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের আগে পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু ঝুঁকিকে বাধ্যতামূলকভাবে বিবেচনায় আনতে হবে।পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে নদীসবচেয়ে বড় কথা, হিমালয়কে সম্পদ হিসেবে দেখার পাশাপাশি একটি জীবন্ত ইকোসিস্টেম হিসেবে দেখতে হবে। কারণ পাহাড়ের ওপর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তার ফল অনেক সময় পাহাড়ে থাকে না। তা নেমে আসে নদীতে। নদী থেকে সমতলে। সমতল থেকে কৃষিক্ষেতে। আর শেষ পর্যন্ত মানুষের ঘরে। গত ২৬ আগস্টের সেই ভয়ংকর ঢল তাই কেবল নেপাল–তিব্বতের একটি দুর্যোগের ছবি নয়। এটি হয়তো ভবিষ্যতের একটি সতর্ক সংকেত—হিমালয়কে আমরা যতটা বদলাব, একদিন সেই বদল ততটাই ফিরে আসবে আমাদের সভ্যতার দরজায়।হিমালয় হয়তো টিকে থাকবে। প্রশ্ন হলো—হিমালয় বদলে যাওয়ার পরও আমরা কি একই সভ্যতা হিসেবে টিকে থাকতে পারব?লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ইতিহাস আজ ধ্বংসের মুখে, চোখে পড়ছে না কারো?

‎সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি‎পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে আছে শত বছরের পুরনো অসংখ্য স্থাপনা। যা বিভিন্ন সময়ের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু এসব স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। ‎এর মধ্যে অন্যতম সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি। এই জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা প্রতাপশালী হিন্দু জমিদার রেবতী মোহন দাস। ২০ শতকের গোড়ার দিকে তিনি এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। ‎পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে এই বাড়ির মালিক হন তার ছেলে জমিদার রায় বাহাদুর সত্যেন্দ্রনাথ কুমার দাস। তিনি ওয়াল্টার রোড়ে অনেক গুলো বিজলী বাতি স্থাপনের জন্য অর্থ প্রদান করেন। এজন্য ওয়াল্টার রোড়ের একটি বিরাট অংশের নাম তার পিতা রেবতী মোহন দাস এর নামানুসারে রেবতী মোহন দাস বা সংক্ষেপে আর এম রোড় রাখা হয়। ‎কিন্তু দেশভাগের সময় জমিদার বাড়ির বংশধর গণবাড়িটি ছেড়ে চলে যায়। পরে বাড়িটি সরকারের তত্ত্বাবধায়নে চলে আসে। ‎পৃথক দু’টি ৩তলা বিশিষ্ট ভবনের সমম্বয়ে তৈরি ভবনটিতে অসাধারণ ফুলপাতার কারুকার্য রয়েছে যা ঐ সময়ের স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন বহন করে। দক্ষিণের অংশটি বেশি প্রাচীন এবং এর প্রায় ৫০ ফুট উঁচু প্রবেশ মুখ রয়েছে। আর ছাদ তিনটি করিন্থিয়ান স্তম্ভ দ্বারা স্থাপিত। পুরো দালানের ভিতরে বিভিন্ন আয়তনের প্রায় ৩৫টি কক্ষ রয়েছে। অন্য দিকে উত্তর পার্শ্বের তিনতলা ভবনটি রেবতী মোহন দাসের কোন এক আত্মীয় নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। এখানেও ৫০ ফুটের প্রবেশমুখ ও প্রায় সমান সংখ্যক কক্ষ রয়েছে। ‎কিন্তু বর্তমানে ভবনটি মলিন ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যা এখন ব্যবহৃত হয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কোয়ার্টার হিসেবে। এতে করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে এবং বসতি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় যথাযথ ভাবে সংরক্ষন সম্ভব হচ্ছে না।  ‎রূপলাল হাউজ‎রূপলাল হাউস বাংলাদেশের ঢাকার ফরাসগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত ঊনবিংশ শতাব্দীর এক বিশাল অট্টালিকা। ১৮২৫ সালে স্টিফেন আরাটুন নামের একজন আর্মেনীয় ব্যবসায়ী এটি নির্মাণ করেন। কিন্তু ১৮৪০ সালের দিকে ব্যবসায়ী রূপলাল দাশ ও তার ভাই রঘুনাথ দাশ এই বাড়িটি কিনে নেন। পরবর্তীতে, এই বাড়িটির নামকরণ হয় ‘রূপলাল হাউজ’। ছোট ব্যবসা দিয়ে শুরু করে রূপলাল হয়ে ওঠেন শহরের ধনীদের মধ্যে অন্যতম একজন। ‎রূপলাল হাউজের সৌন্দর্য ছিল নৈস্বর্গিক। বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে প্রতিষ্ঠিত এই অট্টালিকার মধ্যে প্রায় ৫০টি ঘর, জলশা ঘর ও বিভিন্ন আলোচনা কক্ষ ছিল। যা তিনটি ব্লকে বিভক্ত ছিল যথা- রূপলাল ব্লক, রঘুনাথ ব্লক ও কেন্দ্রীয় ব্লক। এর জানালা, দরজা, বারান্দা ও ভিতের কারুকার্য অত্যন্ত শৈল্পিক। এছাড়া বুড়িগঙ্গার স্নিগ্ধ বাতাস এক অন্যরকম আবহ তৈরি করতো। ‎রূপলাল হাউজ প্রথম আলোচনায় আসে ১৮৮৬ সালে যখন রূপলাল দাশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সম্মানে একটি বল ডান্স পার্টির আয়োজন করেন। এছাড়া ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগীতজ্ঞ ও শিল্পরা আসতেন যার মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের কথা ও উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটি ছিল তখনকার সময়ে ঢাকা বিলাসবহুল ২টি বাড়ির মধ্যে একটি। ‎১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পরে রূপলাল দাশের পরিবার কলকাতায় চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে একটি আনুষ্ঠানিক বিনিময় দলিলের মাধ্যমে সিদ্দিক জামাল বাড়িটি কিনে নেয়। ‎ইতিহাসের চিহ্ন বহনকারী এই অট্টালিকা এখনও দাঁড়িয়ে আছে পরম অযত্ন আর অবহেলায়। যা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে কয়েক দশকের খন্ডিত মালিকানা আর সীমিত রক্ষণাবেক্ষণের ফলে ধসে পড়া দেয়াল, ভেঙে পড়া সিলিং, দেয়ালের চিরে জন্মানো আগাছা, জমধরা লোহার নকশা আর দেয়ালের বের হওয়া যাওয়া ইটে। ‎সম্প্রতি, প্রত্মতত্ত্ব বিভাগ কিছু অংশের রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার পেলেও সম্পুর্ণ এর আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। রূপলাল হাউজের ধ্বংস শুধু একটি ভবনের ধ্বংস নয় বরং ঊনিশ শতকের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধ্বংস। [লেখক: শিক্ষার্থী, ‎ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]   

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইপিআর কতটা কার্যকর হবে

বাংলাদেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের শুরু হয়েছে। গত ১৩ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা নির্দেশিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ১৩ ধারার অধীনে জারি করা এই নির্দেশিকা প্রকাশের দিন থেকেই কার্যকর হয়েছে।ইপিআর মানে হলো, কোনো প্রতিষ্ঠান বাজারে যে পণ্য বা প্যাকেজিং ছাড়ছে, সেটি ব্যবহারের পর বর্জ্য হিসেবে কী হবে, তার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ও ব্যয়ের একটি অংশও সেই প্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে। এত দিন বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার বড় দায়িত্ব ছিল স্থানীয় সরকার ও অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহকারীদের ওপর। নতুন ব্যবস্থা উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদেরও সেই দায়িত্বের আওতায় আনছে।এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ, প্লাস্টিক ব্যবহারের সুবিধা যারা নিচ্ছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয়ের একটি অংশও তাদের বহন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে উৎপাদকদের কম প্লাস্টিক ব্যবহার, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং তৈরি এবং পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ ব্যবহারে উৎসাহিত করা সম্ভব।তবে গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে কাজ শেষ হয়নি। বরং এখনই শুরু হচ্ছে আসল পরীক্ষা। বাংলাদেশে ইপিআর দরকার কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন পরিষ্কার। পরবর্তী প্রশ্ন হলো, এটি কীভাবে কার্যকর করা হবে।ইপিআর ব্যবস্থার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে এর অর্থায়নের ওপর। প্লাস্টিক সংগ্রহ, পরিবহন, বাছাই ও পুনর্ব্যবহারে বাস্তব খরচ আছে। সেই খরচ মেটানোর মতো অর্থ যদি ব্যবস্থায় না আসে, তাহলে নিবন্ধন ও প্রতিবেদন বাড়লেও পরিবেশগত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।গেজেটের নির্দেশিকায় ইপিআর প্রকল্পের ফি নির্ধারণের একটি কাঠামো রাখা হয়েছে। তবে ফি কতটা হবে, তা নিয়ে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ন্যূনতম ফি নির্ধারণ না থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে কম খরচে আনুষ্ঠানিকভাবে দায় মেটানো সম্ভব হবে, কিন্তু বাস্তবে পর্যাপ্ত প্লাস্টিক সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহার হবে না।তাই ইপিআর ফিকে শুধু একটি নিয়ম মানার খরচ হিসেবে দেখলে চলবে না। ফি এমন হতে হবে, যাতে প্লাস্টিক সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের প্রকৃত ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়।সব প্লাস্টিকের জন্য একই হারে ফি নির্ধারণও যুক্তিসংগত নয়। যে প্লাস্টিক সহজে পুনর্ব্যবহার করা যায়, তার সঙ্গে যে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা কঠিন, তার খরচ এক হওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে পরিবেশগত ক্ষতি ও পুনর্ব্যবহারের সক্ষমতা বিবেচনায় ফি নির্ধারণ করা গেলে উৎপাদকদের প্যাকেজিংয়ের ধরন বদলানোরও প্রণোদনা তৈরি হবে।ইপিআর নির্দেশিকায় প্রথম দুই বছরের জন্য ১৫ শতাংশ প্লাস্টিক সংগ্রহ ও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃতীয় বছর থেকে এই হার বেড়ে যথাক্রমে ৩০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ হবে।শুরু হিসেবে এসব লক্ষ্য বাস্তবসম্মত হতে পারে। কিন্তু একটি সমস্যা হলো, সব ধরনের প্লাস্টিকের জন্য একই ধরনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।বাস্তবে সব প্লাস্টিক সমান নয়। পিইটি বা এইচডিপিইর মতো কিছু প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহারের বাজার ও অবকাঠামো রয়েছে। অন্যদিকে মাল্টিলেয়ার প্যাকেজিং, কিছু ফ্লেক্সিবল প্লাস্টিক ও ইপিএস পুনর্ব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে কঠিন ও ব্যয়বহুল।ফলে একই লক্ষ্য থাকলে সহজে পুনর্ব্যবহার করা যায় এমন প্লাস্টিকের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে মোট সংগ্রহের লক্ষ্য পূরণ হলেও পরিবেশের জন্য বেশি ক্ষতিকর বা কঠিনে-পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকগুলো অবহেলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।তাই পরবর্তী পর্যায়ে প্লাস্টিকের ধরনভেদে আলাদা সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ফিতেও পার্থক্য আনা যেতে পারে। যে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা কঠিন, তার ক্ষেত্রে উৎপাদককে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।বাংলাদেশের প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের বাস্তব চিত্র বুঝতে হলে অনানুষ্ঠানিক খাতকে সামনে আনতেই হবে। বর্জ্য সংগ্রহকারী, ফেরিওয়ালা, ভাঙারি দোকান, ছোট সংগ্রাহক ও পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সংগ্রহ করছে।এই ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে ইপিআরের নতুন সংগ্রহব্যবস্থা তৈরি করলে বাস্তবে একই কাজের জন্য দুটি ব্যবস্থা দাঁড়াবে। এতে খরচ বাড়বে, আবার বিদ্যমান কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।বরং তাদের ইপিআর ব্যবস্থার অংশীদার করা উচিত। পেশাগত প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং স্বচ্ছ পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করে তাদের আনুষ্ঠানিক মূল্যশৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।এতে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি হবে। প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন ও পুনর্ব্যবহার ঘিরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়তে পারে।অর্থাৎ, ইপিআর শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নয়; এটি সবুজ কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগও হতে পারে।একটি পণ্য বাজারে আসার পর তার ইপিআর দায় কার ওপর পড়বে, সেটি পরিষ্কার না হলে পুরো ব্যবস্থাই জটিল হয়ে উঠতে পারে।একটি পণ্যের সঙ্গে উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিক একাধিক পক্ষ জড়িত থাকতে পারেন। একই পণ্যের জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের ওপর একই ধরনের দায় পড়লে ব্যবসায়িক বিরোধ তৈরি হতে পারে। আবার দায় কার, তা অস্পষ্ট থাকলে কেউ দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগও পেতে পারে।তাই উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকের মধ্যে কার প্রধান দায়, তা স্পষ্ট করে দেওয়া দরকার।ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান কখন ইপিআরের আওতায় আসবে, সেটিও দ্রুত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। শুধু প্রতিষ্ঠানের আকার দিয়ে পরিবেশগত দায় নির্ধারণ সব সময় যুক্তিসংগত নয়। ছোট কোনো প্রতিষ্ঠানও বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক প্যাকেজিং বাজারে ছাড়তে পারে।তাই ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের আকারের পাশাপাশি দেশের বাজারে কত পরিমাণ প্লাস্টিক ছাড়া হচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বচ্ছতা প্রয়োজন। যে প্লাস্টিক সত্যিই রপ্তানি হয়েছে এবং দেশের বাজারে আসেনি, তার ক্ষেত্রে অব্যাহতি দেওয়ার যুক্তি রয়েছে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান রপ্তানিমুখী হলেই তার সব পণ্য ইপিআরের বাইরে থাকবে, এমন সুযোগ থাকা উচিত নয়। রপ্তানি নথির মাধ্যমে প্রকৃত পরিমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।প্লাস্টিক সংগ্রহ করলেই কাজ শেষ নয়। সেই প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে তৈরি পণ্যের বাজারও থাকতে হবে।এ ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যেসব পণ্যে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক ব্যবহার করা নিরাপদ ও প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে পুনর্ব্যবহৃত উপাদান ব্যবহারের দিকে যেতে পারে।সরকারি ক্রয়ে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের চাহিদা তৈরি হলে পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। এতে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যশৃঙ্খল গড়ে উঠতে পারে যেমন, সংগ্রহ থেকে বাছাই, পুনর্ব্যবহার, নতুন পণ্য উৎপাদন এবং শেষ পর্যন্ত বাজারজাতকরণ পর্যন্ত।এই সংযোগ তৈরি না হলে ইপিআর মূলত বর্জ্য সংগ্রহের একটি ব্যবস্থা হয়ে থাকবে। আর এই সংযোগ তৈরি করতে পারলে এটি বাংলাদেশের সার্কুলার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।ইপিআর কার্যকর করতে হলে প্রথমেই জানতে হবে, দেশে কত প্লাস্টিক বাজারে আসছে এবং তার কতটুকু বর্জ্য হিসেবে তৈরি হচ্ছে।কোন প্রতিষ্ঠান কত প্লাস্টিক বাজারে ছাড়ছে, কতটুকু সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কতটুকু সত্যিই পুনর্ব্যবহার হচ্ছে, এসব তথ্যের নির্ভরযোগ্য হিসাব দরকার। শুধু কোনো প্লাস্টিক সংগ্রহ করা হয়েছে বললেই সেটি পুনর্ব্যবহার হয়েছে বলে ধরে নেয়া যাবে না।তাই একটি ডিজিটাল নিবন্ধন ও তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তথ্য যাচাই ও অডিটের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি হলে ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের ধরনভেদে লক্ষ্য নির্ধারণ, ফি ঠিক করা এবং কোথায় বিনিয়োগ দরকার, সে সিদ্ধান্ত নেয়াও সহজ হবে।ইপিআরের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো এটি শুধু প্লাস্টিক বর্জ্য কমানোর নীতি নয়; এটি উৎপাদন ও ব্যবসার ধরনেও পরিবর্তন আনতে পারে।সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদকরা অপ্রয়োজনীয় প্যাকেজিং কমাতে, সহজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার করতে এবং পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামালের ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই, পুনর্ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহৃত পণ্য উৎপাদনে নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে।এ কারণে ইপিআরকে বাংলাদেশের শিল্পনীতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং সার্কুলার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা দরকার।বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু বেশি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি অর্থনীতি তৈরি করা, যেখানে ব্যবহারের পর ফেলে দেয়া প্লাস্টিক আবার উৎপাদন ব্যবস্থায় ফিরে আসে।ইপিআর নির্দেশিকা গেজেট হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন প্রয়োজন বাস্তবায়নের প্রস্তুতি।পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত দ্রুত ইপিআর ফি নির্ধারণের স্বচ্ছ কাঠামো, উৎপাদক-আমদানিকারক-ব্র্যান্ড মালিকের দায়, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তির মানদণ্ড এবং রপ্তানি অব্যাহতির যাচাই পদ্ধতি স্পষ্ট করা।একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের ধরনভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, অনানুষ্ঠানিক খাতকে ইপিআরের সঙ্গে যুক্ত করা, তথ্য যাচাইয়ের ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সরকারি ক্রয়ের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহৃত পণ্যের বাজার তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইপিআরের প্রথম কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। কোথায় লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে, কোথায় ঘাটতি থাকছে এবং কোন প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে, সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী নীতি পরিবর্তন করা উচিত।বাংলাদেশে এখন ইপিআর দরকার কি না, সেই বিতর্কের সময় শেষ। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কেমন ইপিআর ব্যবস্থা তৈরি করতে চাই।শুধু নিবন্ধন, ফি ও প্রতিবেদননির্ভর ব্যবস্থা তৈরি করলে ইপিআর আরেকটি নিয়মকানুনের কাঠামোতে পরিণত হতে পারে। কিন্তু উৎপাদকের দায়বদ্ধতার সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রণোদনা, অনানুষ্ঠানিক খাত, নির্ভরযোগ্য তথ্য, পুনর্ব্যবহারের বাজার এবং সরকারি ক্রয়কে যুক্ত করতে পারলে ইপিআর বাংলাদেশের প্লাস্টিক অর্থনীতিকে আরও পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।গেজেট আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন সেই ভিত্তির ওপর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বাংলাদেশের পরবর্তী বড় কাজ। [লেখক: সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)]

রম্যগদ্য: ‘মিউচিয়াল ছিনতাই ও রিপ্রিন্ট’

হেঁ হেঁ হেঁ, ছিনতাই নি মিউচিয়ালি, মাইনে বলি কোই কেউ কাউরে নি ছিনতাই করের! আন্নে মিয়া বাহাত্তোইরা বুইড়া যা মনে আসে তাই কন! হেঁ হেঁ হেঁ, মিউচিয়ালি ছিনতাই!ওই ব্যাটা বুড়বক, পানিওয়ালির পোলা, পৃথিবীতে মিউচিয়ালি ছিনতাই যে কত প্রকার ও কি কি তা তুই জানিস?এইডা কী কন, মিউচিয়ালি ছিনতাই! মিলিমিশি বোই বোই ছিনতাই! ধ্যাৎ তা হয় নাকি?হয় নাকি? মানে কিরে আজকাল তো ঘরে ঘরে মিলেমিশে ছিনতাই চলছে, চলবে।হ হ বুঝছি, বুজঝি, এই যেমুন মনে করেন কনট্রাকটার আর ইক্সিএন টিটিএনওও হ্যাতারা ব্যাবাগতে মিলিমিশি প্রজেক্টের ট্যাকা ছিনতাই করের! হ এইটারে আপনে মিউচিয়ালি ছিনতাই কোইলেও কোইতে পারেন। যেমন বালিশ পাঁচ হাজার টাক! ছাগল বার লক্ষ টাকা... “এইটারে আপনে মিউচিয়ালি ছিনতাই কোইলেও কোইতে পারেন?তুই দেখিস না বীমা কোম্পানিগুলোতে বড় বড় ব্যবসায়ীরা মিউচুয়ালি দুই নাম্বার পণ্য বোঝাই জাহাজ ডুবিয়ে কোটি কোটি টাকার বিমার প্রিয়াম ভাগবাঁটোয়ারা করে!হ হ হুনছি হুনছি বিমা কোম্পানিগুলা বিমার প্রিয়ামের ট্যাকা ভাগ-বাঁটোয়ারার লাই হ্যাতারা বেওয়ারিশ লাশ মেডিকেলের ডোম থ্যেইক্কা কিন্না কোটি কোটি ট্যাকার মাল কামায়!আরে ব্যাটা এগুলোতো সরাসরি ডাকাতি, আমি বলছিলাম মিউচিয়ালি ছিনতাই’এর কথা। মানে ছোট খাটো চামে চামে যারা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে।চামে চামে অনৈতিক কাজ, হেইডা আবার কিরে বাপ।এই যেমন মনে কর তুই স্কুলে বাচ্চা আনতে গেলি, বাচ্চার স্কুল ছুটি হতে এ্যাখনো তিন ঘণ্টা বাকি, তখন মাটি বা খালাটি কি করবেন, তখন স্কুলের কাছের স্বামী বা দুলাভায়ের বাসায় যেয়ে টিভি ইন্টারনেট এইসব দেখে সময়টা পার করে বাচ্চা বা বইনপুতকে নিয়ে বাড়ি ফিরলো।তো ইয়ার মইধ্যে আপনে ছিনতাই দেখলেন কুতায়?যেই লোক জেগে ঘুমায় তাকেতো আর জাগানো যায় না, যেমন মনে কর এইযে প্রতিদিন তোদের সমাজে চাঁদাবাজী চলছে, কোই তোর লক্ষ লক্ষ হকার ভাই কি এর প্রতিবাদ করে! এইযে প্রতিদিনের লাইনের চাঁদাবাজী চলছে এটা ছিনতাইয়ের চেয়ে কম কি, বল? যে চাঁদা দিচ্ছে আর যে চাঁদা নিচ্ছে দু’জনেই তো মিউচুয়ালি মানে আপোসে ছিনতাই চালাচ্ছে!তো আপনের পোরশাষণ কি করবো কন? হ্যেরা হোইলো জনগনের, মানে দেশের মালিকের কর্মকর্তা, মালিক যদি নিজেই মিউচিয়ালি ছিনতাই মাইন্না নেয় তয় আমার আপনের কি করনের আছে কন?কিন্তু তোর কি মনে হয় কোনো মালিক চাইবে তার কর্মচারী তার কাছ থেকে বেতনও নিবে আবার মালিকের কাছ থেকে চান্দাও নিবে, এটা হয় কখনোও!না না নান না, পীরথীবির কুনো দ্যেশে কর্মচারী বেতনও নিবে আবার মালিকের কাছ থেকে চান্দাও নিবে,এইডা হয় না!তাহলে সব সম্ভবের দেশ তোর বাংলাদেশে সবই সম্ভব। এই যে রংপুরের একই পরিবারের চার জনকে হত্যা ইয়াবা সেবন দেখে ফ্যেলায় মার্ডার, মার্ডার করছে কে দু’জন কিশোর বা পনের ষোল বছরের ছেলে। এটা কি সম্ভব!! বাড়ীর কর্তা ও গৃহ বধুকে হত্যা করতে গেলে উনারা তো ওই দু’জন কিশোর বা পনের ষোল বছরের ছেলে কি পারবে ওদের সঙ্গে? ধস্তাধস্তি হবে না? দু’জন কিশোর বা পনের ষোল বছরের ছেলের গায়ে কি আঁচড় বা খামচির দাগ থাকবে না? তোর প্রশাষণ বলছে নিহতের চোয়াল ভাঙা আর পোস্টমর্টেম বলছে, চোয়াল-টোয়াল ভাঙেনি, সব ঠিক আছে। আরো মজার ব্যাপার হলো ওই বাড়ীর বিদ্যুতের লাইন রাস্তার মুল খুঁটি থেকে বিছিন্ন করা হয়েছে, যেটা তোর এই দু’জন কিশোর বা পনের ষোল বছরের ছেলের পক্ষে সম্ভব নয়। তাহলে এবার তুই বল এইসব কাজ মিউচুয়ালি মানে সবাই মিলেমিশে না করলে কি সম্ভব?হেঁ হেঁ কি যে কন, মিউচুয়ালি মার্ডার, মানে যারে মার্ডার করবেন হ্যের লগে আলাপ আলোচানার মাধ্যমে মার্ডার! হি হি পিরথীবির কুনো রম্য লেখকও এইরাম ঘটনা চিন্তা করা পারবো না!কিন্তু বাস্তবেতো ঘটছে ভাই!স্যার একটা কথা কনতো, এইযে লিখছেন মিউচুয়ালি ছিনতাই ও রিপ্রিন্ট, মিউচুয়ালি ছিনতাই তো বুঝলাম কিন্তু এই রিপ্রিন্ট এইডা কী?আরে এতো একদম সিম্পেল, রিপ্রিন্টের, আদীবার মা, আকবর স্যারের লেখা উপন্যাসের মতো শাহ্জাদীর কালো নেকাব তুলে বললেন,“ হেঁ হেঁ পাবেন তো মাত্র নয়’শ টাকা, আর এর জন্য কাগজপত্র যোগাড় করতে উকিলের, ফোন বিল, যাতায়াত সবমিলে খরচ হবে মিনিমাম পাঁচ হাজার টাকা। তাহলে ন’শ টাকার জন্য আপনি কি পাঁচ হাজার টাকা খরচ করবেন? এই কথা শুনে রাসেইল্লা আর চামচ নুরু কয় কী, হি হি বারো হাত কাঁকুড়ের তের হাত বিচি। হি হি হি। ভাই রে ভাই, এ্যাতো প্যাচাইল্লা কারবারে আমারে জড়াইয়েন না স্যার, মিউচিয়াল ছিনতাই, চার মার্ডার, রিপ্রিন্ট, ভাই আপনেগোরে সব বাই বাই, আমি অখন যাই দেশের মালিকের কাছে যাই, দেখি হ্যেরা কি নয়’শ টাকার জইন্য পাঁচ হাজার টাকা খরচ করবো, নাকি চার মার্ডারের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করবো! পারলে প্রতিদিনের লাইনের চন্দাবাজী বন্ধ করবো, হ্যেরা যেইডা করবো হেইডাই আইন...তাহলে যা তুই তোর দেশের মালিকের কাছে, দ্যাখ জনগণ মানে দেশের মালিক কি চায়... [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

ভিডিও আরও দেখুন

দক্ষিণ সুরমায় পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়াম করার পরিকল্পনা সরকারের

সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় একটি পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। দেশের প্রতিটি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের ধারাবাহিকতায় এখানে বড় পরিসরে এই ক্রীড়া স্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শনিবার (২৯ আগস্ট) দক্ষিণ সুরমায় স্টেডিয়ামের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন শেষে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এ তথ্য জানান।প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, ‘সরকার দেশের প্রতিটি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে ২০১টি উপজেলায় এই কাজ চলমান রয়েছে। তবে দক্ষিণ সুরমার গুরুত্ব বিবেচনা করে এখানে মিনি স্টেডিয়ামের পরিবর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়াম করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।’পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী জানান, স্টেডিয়ামের জন্য ইতোমধ্যে তিনটি সম্ভাব্য স্থান দেখা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও খেলোয়াড়দের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থানটিই চূড়ান্ত করা হবে। বিশেষ করে দর্শকরা যেন সহজে গ্যালারিতে বসে খেলা উপভোগ করতে পারেন এবং খেলোয়াড়দের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, সেদিকেই নজর দেওয়া হচ্ছে।পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্য প্রায় পাঁচ থেকে ছয় একর জায়গার প্রয়োজন হবে উল্লেখ করে আমিনুল হক বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি যেখানে সরকারি খাস জমি পাওয়া যাবে, সেখানেই স্টেডিয়ামটি নির্মাণ করতে। এতে সরকারের ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ অতিরিক্ত ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।’তিনি আরও জানান, দেশের অনেক উপজেলায় স্টেডিয়ামের কাজ শেষ হয়েছে, কিছু চলমান রয়েছে এবং বাকিগুলো ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পরই শুরু হবে।\ 

দক্ষিণ সুরমায় পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়াম করার পরিকল্পনা সরকারের