সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
সংবিধান সংস্কার আদেশকে ‘প্রতারণার দলিল’ আখ্যা দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সংবিধান সংস্কার আদেশকে ‘প্রতারণার দলিল’ আখ্যা দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে এক উত্তপ্ত আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই উদ্যোগকে তীব্র সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন। তিনি এই আদেশকে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ বা শুরু থেকেই অবৈধ হিসেবে অভিহিত করে একে ‘জাতীয় প্রতারণার দলিল’ বলে বর্ণনা করেন।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, যে আদেশের কোনো আইনি ভিত্তি নেই, সেটি আইনত অবৈধ। এটি না কোনো অধ্যাদেশ, না কোনো আইন; বরং এটি একটি ‘নিউট্রাল জেন্ডার’ বা অন্তহীন প্রতারণার নামান্তর।তিনি আরও যোগ করেন, ১৯৭৩ সালের পর রাষ্ট্রপতির এমন কোনো আদেশ জারির সাংবিধানিক ক্ষমতা আর অবশিষ্ট নেই।মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার উত্থাপিত একটি মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন। তিনি সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ও তফসিল উদ্ধৃত করে বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই আদেশকে বৈধ আইন বলা হলেও এর জন্মই হয়েছে অবৈধভাবে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং ১৯৭২ সালের আদেশ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা থাকলেও ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদীয় বৈঠকের পর সেই ক্ষমতা রহিত হয়ে গেছে। ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারলেও সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তন বা রহিত করার এখতিয়ার তার নেই। এই আদেশের মাধ্যমে বর্তমান সংসদের সার্বভৌম ক্ষমতা খর্ব করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে, যা নজিরবিহীন।গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জনগণ জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে কি না তা জানতে আমরাই প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যালটে যেভাবে প্রশ্ন সাজানো হয়েছে, তা অনেকটা ‘কুইনাইন ট্যাবলেট’ কলার ভেতরে ঢুকিয়ে খাওয়ানোর মতো। তিনটি ভালো প্রশ্নের সাথে একটি বিতর্কিত আদেশ চাপিয়ে দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে।একইসাথে তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, সংসদ সদস্যরা সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শপথ নিয়েছেন, কোনো সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নয়। সিইসি এই ফরম সংসদে পাঠিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন ও শপথ ভঙ্গ করেছেন।বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সংস্কারের বিরোধী নয় বরং আমরা ২০২৫ সালের জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর ধারণ করি। তবে আমরা সেই সংস্কার চাই যা সংবিধানসম্মত এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখে। জুলাই জাতীয় সনদের ৪৭টি বিষয়ে যে ঐকমত্য হয়েছে, তা আগামীতে সংসদে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে জনগণের ম্যানডেট অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
২ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

ইউরোপ নামের স্বর্গ, সাগরের ভাসমান কবরখানা

সুনামগঞ্জে আকাশে আজ মেঘ নেই, তবু আলো কম। কারণ আলো সবসময় সূর্য থেকে আসে না—কখনও আসে মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা আশার আগুন থেকে। আর সেই আগুন যখন একে একে নিভে যায়, তখন পুরো জনপদ অন্ধকার হয়ে ওঠে। গত শুক্রবার, অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার পথে আফ্রিকার লিবিয়া উপকূলে ১৮টি বাংলাদেশি তরুণপ্রাণ সাগরে ভেসে গেছে—এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়; এটি এক জাতির দীর্ঘদিনের আত্মপ্রবন্ধনার নির্মম পুনরাবৃত্তি।আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করি, যেখানে বিদেশ শব্দটি একটি মন্ত্রের মতো কাজ করে। এ মন্ত্র উচ্চারণ করলেই যেন দারিদ্র্য পালিয়ে যায়, বেকারত্ব লজ্জা পায়, আর ভবিষ্যৎ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। গ্রামের কোনো তরুণ যদি ঘোষণা দেয়— সে ইউরোপ যাবে, তখন সে আর সাধারণ মানুষ থাকে না; সে হয়ে ওঠে পরিবারের গর্ব, পাড়ার স্বপ্ন, ভবিষ্যতের প্রতীক। অথচ সেই যাত্রার মানচিত্রে কোথাও লেখা থাকে না— শেষ ঠিকানা হতে পারে এমন এক সাগর, যেখানে কবরেরও নামফলক থাকে না।এই স্বপ্নের স্থপতিরা কবি নন, দার্শনিকও নন। তারা দালাল—সময়ের সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ী, যারা হতাশাকে পুঁজি করে স্বপ্নের প্যাকেজ বিক্রি করে। ১০-১২ লাখ টাকার বিনিময়ে তারা এমন এক ইউরোপ দেখায়, যেখানে রাস্তা সোনার, কাজ নিশ্চিত, আর জীবন অনন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের। কিন্তু সেই গল্পের শেষ পাতাটি তারা ছিঁড়ে ফেলে— যেখানে লেখা থাকে, এই যাত্রায় মৃত্যু খুবই সম্ভাব্য।দালালরা জানে, এই দেশের মানুষ বাস্তবতার চেয়ে স্বপ্নকে বেশি ভালোবাসে। তাই তারা বাস্তবতাকে আড়াল করে, স্বপ্নকে বাড়িয়ে তোলে। তারা জানে, একজন কৃষকের শেষ জমিটুকুও বিক্রি করানো যায়, যদি তাকে বিশ্বাস করানো যায়—তার ছেলে একদিন ইউরোপ থেকে টাকা পাঠাবে। সেই টাকায় ঘর উঠবে, সম্মান ফিরবে, জীবনের মান পাল্টাবে। কিন্তু তারা বলে না—কখনও কখনও সেই টাকার বদলে আসে একটি নির্লিপ্ত খবর: আপনার ছেলে আর নেই।সাগর এই কাহিনির সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে নির্মম সাক্ষী। সে কোনো ভাষণ দেয় না, কোনো প্রতিবাদও করে না। কিন্তু তার বুকে জমা থাকে হাজারো নামহীন কবর। ছোট ছোট নৌকা, মানুষের অতিরিক্ত বোঝা নিয়ে যখন তার বুক চিরে এগোয়, তখন সাগর বুঝে যায়—এটি ভ্রমণ নয়, এটি এক দীর্ঘ মৃত্যু-যাত্রা। অনাহারে, তৃষ্ণায়, আতঙ্কে মানুষগুলো একে একে নিভে যায়। তারপর তাদের দেহগুলো সাগরে নিক্ষেপ করা হয়— যেন তারা কখনও পৃথিবীর অংশই ছিল না।এই দৃশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালে ভূমধ্যসাগর এক বিশাল কবরস্থানে পরিণত হয়েছিল। হাজার হাজার অভিবাসী ইউরোপে যাওয়ার পথে প্রাণ হারিয়েছিল—বাংলাদেশিরাও ছিল সেই তালিকায়। ২০১৯ সালে লিবিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে বহু বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটে। এরপরও এই মৃত্যুর মিছিল থামেনি। ২০২৩, ২০২৪ সর্বশেষ ২০২৬ প্রতিটি বছরই যেন একই ট্র্যাজেডির নতুন সংস্করণ। চরিত্র বদলায়, কিন্তু কাহিনি একই থাকে—স্বপ্ন, প্রতারণা, মৃত্যু। প্রশ্ন জাগে—এই গল্প থামে না কেন?কারণ, এই গল্পের লেখক কেবল দালাল নয়— আমরা সবাই। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার—প্রত্যেকেই এই ট্র্যাজেডির সহ-লেখক। রাষ্ট্র আইন করে, কিন্তু আইনের ফাঁক দিয়ে দালালরা নতুন রাস্তা বানিয়ে ফেলে। সমাজ সফলতার গল্পকে এত বড় করে তোলে যে, ব্যর্থতার লাশগুলো সেখানে স্থান পায় না। পরিবার সন্তানের ভবিষ্যতের আশায় ঝুঁকি নেয়, কিন্তু সেই ঝুঁকির গভীরতা বুঝতে পারে না।আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত মানদণ্ড গড়ে উঠেছে—বিদেশে গেলে মানুষ সফল, দেশে থাকলে অযোগ্য। এই মানদণ্ডই তরুণদের ঠেলে দেয় অজানার দিকে। তারা বিশ্বাস করে—যেকোনো মূল্যে বিদেশ যেতে হবে। সেই মূল্য কখনও টাকা, কখনও জীবন।রাষ্ট্র এখানে প্রায়ই এক নীরব দর্শকের মতো আচরণ করে। তদন্ত হয়, মামলা হয়, গ্রেপ্তারও হয়—কিন্তু সময়ের সঙ্গে সবকিছু আবার থিতিয়ে যায়। যেন এই মৃত্যুগুলো আমাদের অভ্যাসের অংশ হয়ে গেছে। আমরা শোক জানাই, কিন্তু বদল চাই না; আমরা কান্না দেখি, কিন্তু কারণ অনুসন্ধান করি না।এই পুরো প্রক্রিয়াটি আসলে এক ধরনের মৃত্যুর অর্থনীতি—যেখানে বিনিয়োগ করে পরিবার, মুনাফা লুটে দালাল, আর ক্ষতির বোঝা বহন করে সমাজ। এখানে মানুষের জীবন একটি পণ্যে পরিণত হয়েছে, যার মূল্য নির্ধারিত হয় চাহিদা ও সরবরাহের সূত্রে।সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো—আমরা এই বাস্তবতার সঙ্গে আপস করে ফেলেছি। একটি নৌকাডুবির খবর এখন আর আমাদের নাড়া দেয় না; আমরা এটিকে একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিয়েছি। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, যখন মৃত্যু স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন জীবনের মর্যাদা হারিয়ে যায়।তবু পথ আছে—যদি আমরা সত্য বলার সাহস করি। আমাদের স্বীকার করতে হবে—ইউরোপ কোনো স্বর্গ নয়; এটি সংগ্রামের আরেক নাম। আমাদের দেখাতে হবে—এই যাত্রায় কতজন হারিয়ে গেছে। আমাদের বুঝতে হবে—দেশের ভেতরে সুযোগের অভাবই মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।দালালচক্র ভাঙতে হলে শুধু আইন নয়, সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি। পরিবারকে সচেতন করতে হবে, যাতে তারা অন্ধ বিশ্বাসে জীবন বাজি না রাখে। একই সঙ্গে বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের পথ প্রসারিত করতে হবে, যাতে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেতে বাধ্য না হয়।সবশেষে, আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। উন্নয়ন কি শুধুই পরিসংখ্যানের খেলা, যদি সেই উন্নয়ন তরুণদের দেশে রাখার মতো শক্তি না রাখে? সাফল্য কি সত্যিই সাফল্য, যদি তার মূল্য হয় একটি প্রাণ?সুনামগঞ্জের সেই ১৮ জন আর ফিরে আসবে না। তাদের নামে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে উঠবে না, ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম লেখা নাও থাকতে পারে। কিন্তু তাদের মৃত্যু একটি প্রশ্ন হয়ে বেঁচে থাকবে।সাগরের ঢেউ প্রতিদিন তীরে এসে আছড়ে পড়ে, আবার ফিরে যায়। কিন্তু কিছু ঢেউ আছে, যা ফিরে যায় না— সেগুলো হয়ে থাকে সতর্কবার্তা। এই ১৮টি প্রাণও তেমনই এক ঢেউ, যা বারবার আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। প্রশ্ন এখনও একটাই— আমরা কি জাগবো, নাকি আবারও নতুন কোনো নৌকার জন্য অপেক্ষা করবো, যেখানে স্বপ্ন আর মৃত্যু পাশাপাশি যাত্রা করবে? [লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

সিপাহী বিদ্রোহের ১৬৯ বছর

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য সিপাহী বিদ্রোহের ১৬৯ বছর পূর্ণ হয়েছে এবার। ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্রিটিশ ভারতের ব্যারাকপুরে সিপাহী বিপ্লব খ্যাত এ বিদ্রোহের শুরু। ফরাসী, পর্তুগিজদের সঙ্গে ইংরেজরাও ভারতবর্ষে চলে আসে ব্যবসা করার উদ্দেশে। প্রথমে ব্যবসা উদ্দেশ্য থাকলেও সময় পরিক্রমায় নানা চক্রান্ত ও কূটকৌশলের মাধ্যমে তারা ভারতের নিয়ন্ত্রণ হাতে সচেষ্ট হয়।১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজদ্দৌলাকে পরাজিত করার মাধ্যমে এ দেশে তাদের ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে মির কাসিমের পরাজয়ের পরে সমগ্র ভারতবর্ষ চলে যায় তাদের নিয়ন্ত্রণে। পলাশী যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হাতে পায়, তা কাজে লাগিয়ে সারা ভারতবর্ষে শোষণ ও নির্যাতন চালাতে থাকে।বাংলার স্বাধীনচেতা জনগণ কখনো পরাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। এ কারণে ১৯ শতকের মাঝ পর্যন্ত ছোট বড় বহু আন্দোলন, আক্রমণ, যুদ্ধ, বিদ্রোহ বা অভ্যূত্থানের মধ্যে দিয়ে বিদ্রোহের ধারা অব্যাহত থেকেছে। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার যুদ্ধ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। ১৮৩১ সালে ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থায় তিতুমীর শহীদ যান।ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ ওঠে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সর্বাগ্রে চলে আসে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের কথা। অনেকেই এটাকে বলেছেন ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ, মহাবিদ্রোহ, আবার কারো কাছে এটি ছিল গণঅভ্যুত্থান। ইংরেজ শাসনামলে ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো সিপাহী বিদ্রোহ। ১৮৫৭ সালে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ ছিল এটি। এই বিদ্রোহের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করা।সিপাহী বিদ্রোহের শুরু১৮৫৭ সালের ১০ মে মিরাট শহরে শুরু হওয়া ইংরেজ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সিপাহীদের সঙ্গে যে যুদ্ধে সংঘটিত হয় তাই সিপাহী বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ১৮৫৭ সালে উত্তর ও মধ্য ভারতে যে বিরাট গণবিদ্রোহ সংঘটিত হয় তা ব্রিটিশ শাসনকে প্রায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কোম্পানির সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়ে তা ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।বাংলায় শুরু হয়ে ইংরেজ অধিকৃত ভারতের অন্য এলাকার সিপাহীদের মধ্যেও এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিম বাংলার ব্যারাকপুরে সিপাহী ‘মঙ্গল পাণ্ডের’ নেতৃত্বে প্রথম বিদ্রোহ শুরু হয়। প্রায় এক বছর ধরে অগণিত কৃষক, শিল্পী, সৈন্য ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী বীরত্বের সঙ্গে সংগ্রাম চালিয়ে যায়। তাদের সাহসিকতা ও আত্মবিসর্জন ভারতবাসীর ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।ইংরেজরা এই বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করে। নিরপরাধ বহুজনকে এ সময় নির্বিচারে ফাঁসি দেয়া হয়। ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে সে সময় বাংলার বিদ্রোহী সিপাহীদের ফাঁসি দেয়া হয়। বিদ্রোহীরা পরাজিত হলেও এই বিদ্রোহের ফলেই কোম্পানির শাসনের অবসান হয়। শুরু হয় ব্রিটিশরাজ তথা রানী ভিক্টোরিয়ার শাসন।ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন২৯ মার্চ, ১৮৫৭ রোববার বিকেল বেলা। ব্রিটিশদের জন্যে দিনটি ছিল ছুটির দিন। তারা বিশ্রাম নিচ্ছিল যার যার গৃহে। ব্যারাকপুরের প্যারেড ময়দানে অসময়ে মানুষদের ভিড় বাড়ছিল। ধীরে ধীরে প্যারেড গ্রাউন্ডে জড়ো হতে থাকে বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। পঞ্চম ব্যাটালিয়ন বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য মঙ্গল পাণ্ডে ঘুরছিলেন ব্যারাকপুর প্যারেড গ্রাউন্ডের আশপাশেই। চাপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল চারদিকে, কী হচ্ছে তা তখনো কেউ জানে না, তবে এটুকু জানে যে কিছু একটা ঘটছে। সিপাহীদের মধ্যে কেউ আসছে খালি হাতে, কেউ বন্দুক নিয়ে। সৈনিকদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছিল। কেউ জানেনা কি ঘটতে চলেছে তবে এটুকু জানে যে রচিত হবে এক মহান ইতিহাস।কেউ একজন এগিয়ে এসে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিবে, সবাই এই অপেক্ষা করছে। ফলাফল যদি আশানুরূপ না হয় তাহলে পরিনাম ভয়াবহ হবে, এ কারণে কেউ এগিয়ে আসার সাহস করতে পারছে না!সিপাহী বিদ্রোহ কেন হয়েছিল?খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রকাশ্যে ধর্মপ্রচার, হিন্দু-মুসলিমদের জোড় করে খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা, মসজিদ ও মন্দিরের জমির ওপর কর আরোপ এসব মিলিয়ে জনগণ বিক্ষুদ্ধ হতে থাকে। এরূপ নানা কারণে ১৮৫৭ সালের বহু আগে থেকেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সামরিক কারণে সিপাহীদের ক্ষোভ জমা হচ্ছিল।সামরিক বৈষম্য সিপাহী বিপ্লবের উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল। ইংরেজ সামরিক অফিসার ও সিপাহীদের তুলনায় দেশীয় সিপাহী ও অফিসারদের বেতন ছিল কম। তাছাড়া ইংরেজ সামরিক অফিসাররা দেশীয় সামরিক অফিসারও সিপাহীদের খুব বিশ্রি ভাষায় গালিগালাজ করত। বৃটিশ সরকার ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫০০ জন ভারতীয় সৈন্যের জন্য বার্ষিক ৯৮ লাখ পাউন্ড ব্যয় করতো এবং অন্যদিকে ৫১ হাজার ৩১৬ ইংরেজ সৈনিকের জন্য ৫৬ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড ব্যয় করতো। যা ছিল ভারতীয় সিপাহীদের জন্য চরম বৈষম্য।সেনাবিভাগে ব্রিটিশ ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে বেতন, পদোন্নতি, বদলি ইত্যাদির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণ ভারতের সৈন্যদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। সিন্ধু ও আফগানিস্তানে নিযুক্ত সেনাদলকে বিশেষ ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও ভারতীয় সেনাদের তা থেকে বঞ্চিত করা হয়। তাদের ধর্ম বিশ্বাসকে মর্যাদা না দিয়ে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের যত্রতত্র বদলির ব্যবস্থা করেন। জাত ও ধর্ম হারাবার ভয়ে সিপাহীগণ কালাপানি পার হয়ে ব্রহ্মদেশ বা অন্যত্র যেতে অনাগ্রহী হয়।সিপাহিদের ক্ষোভ যখন ক্রমশ পূঞ্জীভূত হচ্ছিল ঠিক সেই সময়ে এনফিল্ড রাইফেল নামে এক নতুন ধরনের রাইফেলের প্রবর্তন তাদের ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়। এনফিল্ড রাইফেলে যে কার্তুজ ব্যবহার করা হত, তার খোলসটি দাঁতে কেটে রাইফেলে ভরতে হতো। গুজব রটে যায় যে, এই কার্তুজে গরু ও শুয়োরের চর্বি মেশানো আছে। ধর্মচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় কোম্পানির সেনাবাহিনীর হিন্দু ও মুসলমান সিপাহীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং এই টোটা ব্যবহার করতে অস্বীকার করে ।এনফিল্ড রাইফেলকে প্রত্যক্ষ ধরা হলে, এটি কিন্ত মূল কারণ নয়। কারণ সরকার সিপাহীদের সামনে এই টোটা নষ্ট করা হলেও তাদের অসন্তোষ স্থিমিত হয় নি। কারণ এই বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণ তথা সিপাহীদের তীব্র অসন্তোষ। পরবর্তীকালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিপাহীরা চর্বি মাখানো এই টোটাই ব্যবহার করেছিল। সিপাহী বিদ্রোহ একদিনে জন্ম নেয়নি বরং এটি ছিল বহুদিনের তিলে তিলে সঞ্চিত প্রস্তুতির ফল।১৮৫৭ সালে কলকাতার ব্যারাকপুরে মঙ্গল পান্ডের বিদ্রোহের দ্বারা শুরু হওয়া সিপাহী বিদ্রোহ পরবর্তিতে মহাবিদ্রোহে রূপ নেয়। ইংরেজ সরকার এই বিদ্রোহকে কঠোর হস্তে দমন করলেও এর মাধ্যমে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হয়। দীর্ঘ ১০০ বছর অত্যাচার, লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের পরে এ মহাবিদ্রোহ ছিল একটি জলোচ্ছ্বাসের মতো। এটাকে অনেকে আবেগের সঙ্গে পলাশীর প্রতিশোধও বলে থাকেন।প্রথমদিকে অনেকটা বিজয়ী হয়েও, শেষে পরাজয় বরণ করেছিলেন। পরাজয় সত্ত্বেও ভারতবর্ষের সিপাহী ও জনগণের এই যে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ তা পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রেরণা যুগিয়েছে। পাশাপাশি বৃটিশ শাসকদের নৃশংস বর্বরতার চিত্রও তুলে ধরেছে। [লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]

জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে প্রযুক্তির গুরুত্ব ও চ্যালেঞ্জ

মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে প্রযুক্তি অপরিহার্য। প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার পাশাপাশি বিশ্বকে একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত করেছে। এরই ফলশ্রুতিতে এখন যেখানে তথ্য ও সেবা বিশ্ববাসীর হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। যা দৈনন্দিন কাজ সহজ, দ্রুত ও আরামদায়ক করে তুলেছে। এর পাশাপাশি ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, উন্নত চিকিৎসা, অনলাইন ব্যাংকিং, এবং শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার যোগাযোগ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করেছে। প্রতিনিয়ত এই প্রযুক্তির ব্যবহার স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত ও বিনোদনের মতো খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে জীবনকে নিরাপদ ও আরও উন্নত করতে বড় ভূমিকা রাখছে। বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি খাতে বিপ্লব চলছে। মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তির ছোঁয়া পৌঁছে গেছে। তাই একবিংশ শতাব্দীতে জাতীয় জীবনের উন্নয়নের জন্য পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আমাদের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন। এদিকে ইন্টারনেট অব থিংস, রোবোটিকস, ক্লাউড কম্পিউটিং, মেশিন লার্নিং, ব্লকচেইন প্রযুক্তি, সেন্সর, অটোমেশন, থ্রিডি প্রিন্টিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, জিন ও প্রকৌশল প্রযুক্তির সমন্বয়ে আজকের বিশ্বে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। তবে একই সাথে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, কর্মসংস্থান হ্রাস, গোপনীয়তা লঙ্ঘন, এবং ডিজিটাল বিভাজন বা বৈষম্যের মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলোও তৈরি হয়েছে, যা মোকাবিলা করাই বর্তমানের প্রধান লক্ষ্য। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় দক্ষ কর্মী তৈরি, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা নীতি, এবং উদ্ভাবনের সাথে সাথে নৈতিক ব্যবহারের নিশ্চিতকরণ অপরিহার্য। ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে এনে সাধারণ মানুষের তথ্য ও সেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রযুক্তি ব্যবহার এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক উন্নয়নে পিছিয়ে পরা দেশগুলোকে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে এগিয়ে নেয়া সম্ভব। এদিকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হলে দারিদ্র্য দূরীকরণের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। তাই বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আজকের তথ্য শক্তিই আগামীর পৃথিবীর চালিকাশক্তি। বর্তমান আধুনিক যুগে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার স্বার্থে তথ্যের প্রয়োজন। এই কথাটি এখন স্পষ্ট যে যার নিকট যত বেশি তথ্য রয়েছে সে তত বেশি শক্তিশালী। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পৃথিবীর দরিদ্র জনগোষ্টির জন্য খুলে দিয়েছে অপার সম্ভাবনার দুয়ার। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কৃষি বিপ্লব, শিল্প বিপ্লবের পর বর্তমান পৃথিবী নতুনতর এক বিপ্লবের মুখোমুখি হতে চলেছে যার নাম তথ্য বিপ্লব। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের জীবন হয়েছে এখন অনেক সহজ, সরল এবং স্বাচ্ছন্দ্যময়। ঘরে বসে বিশ্ব ভ্রমণ, মার্কেটিং, ব্যাংকিং বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস কিংবা ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে ঘোরাঘুরি করা এখন একেবারে সহজ। তাইতো এখন মানুষের এমন কোন কাজ নেই যেখানে প্রযুক্তির ছোয়া লাগেনি। বিশ্বের দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিহার্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগই একটি দেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে। তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যদি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা যায়, তবে দারিদ্র্য ও বেকারত্বকে বিদায় দেয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে। এজন্য আমাদের লক্ষ্য হতে হবে প্রযুক্তিবান্ধব একটি সমাজ গঠন করা, যেখানে মেধা ও সুযোগের সঠিক সমন্বয় ঘটবে। প্রযুক্তির উন্নয়ন মানে একটি দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন। এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। প্রযুক্তি মানুষকে যোগায় জীবন সহায়ক ব্যবস্থা বা লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, যে কারণে মানুষ পৃথিবীতে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়ার শক্তি অর্জন করে। আর এভাবেই প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি হয়ে উঠছে মানুষের প্রতিদিনের সঙ্গী।[লেখক: নেটওয়ার্ক টেকনিশিয়ান (আইসিটি সেল), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

রামেকে শিশুদের নিঃশ্বাস হারানোর গল্প

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এখন যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা কেবল একটি হাসপাতালের সংকট নয়, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর অসাম্য ও অক্ষমতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য।মাত্র কয়েকদিনে ডজন ডজন শিশু মারা গেছে। আর অনেকে আইসিইউতে যাওয়ার আগেই হারিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা বহু শিশু আইসিইউ বেড না পেয়ে মারা যাওয়ার পরই তাদের “সিরিয়াল” আসে। “মৃত্যুর পর মেলে কাঙ্ক্ষিত সিরিয়াল”...এই একটি বাক্যই যেন পুরো বাস্তবতার নির্যাস।প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুদের জন্য নির্ধারিত আইসিইউ বেডের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। প্রতিদিন গড়ে ৩০টির বেশি শিশু আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন নিয়ে আসে। অথচ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে হাতে গোনা কয়েকজনকে। বাকিরা অপেক্ষা করছে একটি বেডের জন্য। একটি সুযোগের জন্য। এই অপেক্ষাই অনেকের জন্য মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়ার সময় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ২-৩ দিন ধরে অপেক্ষা করেও বেড মিলছে না। আবার কেউ কেউ সিরিয়ালের নিচে থাকায় সুযোগ পাননি।এই সংকটের ভেতরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠে আসে ন্যায়বিচারের।আইসিইউতে সিরিয়াল কি সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর? বাস্তবতা বলছে, সবসময় তা হচ্ছে না। ক্ষমতার প্রভাব, পরিচয় বা সুপারিশের কারণে সিরিয়াল ভেঙে যাওয়ার অভিযোগ বহুদিনের। অথচ চিকিৎসার ক্ষেত্রে একমাত্র অগ্রাধিকার হওয়া উচিত রোগীর অবস্থা। সিরিয়াল ভাঙা যাবে, কিন্তু সেটি কেবল তখনই, যখন কোনো রোগীর অবস্থা ভয়াবহ।এটি হতে হবে সম্পূর্ণ চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত, কোনোভাবেই ব্যক্তিগত প্রভাব নয়। অন্যথায় এটি হয়ে ওঠে অন্য এক শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়ার নীরব কারণ।সমস্যা শুধু বেডের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। হাসপাতালের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এই সংকটকে আরও তীব্র করছে। লিফটগুলোর শোচনীয় অবস্থা এমন যে, আইসিইউতে ভর্তি রোগীর অ্যাটেনডেন্টরা জরুরি ওষুধ বা ইনজেকশন আনতে গিয়ে মূল্যবান সময় হারাচ্ছেন। সেই সময়টুকুই অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জীবনের শেষ সময় হয়ে উঠছে। একজন বাবা দৌড়াচ্ছেন, একজন মা প্রার্থনা করছেন কিন্তু সিস্টেম তখন অচল। এই দৃশ্য কোনোভাবেই একটি আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার হতে পারে না।আইসিইউ কেবল যন্ত্রপাতির সমষ্টি নয়। এটি একটি সমন্বিত সিস্টেম। দক্ষ নার্স, প্রশিক্ষিত ডাক্তার, সার্বক্ষণিক মনিটরিং- এই তিনটি ছাড়া আইসিইউ কার্যকর হতে পারে না। প্রতিবেদনে স্পষ্ট যে, জনবল সংকট, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব আর সমন্বয়ের ঘাটতি চিকিৎসার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাইরে থেকে আধুনিক দেখালেও ভেতরে যদি এই কাঠামো না থাকে, তাহলে সেটি কেবল একটি আড়ম্বরপূর্ণ খোলস।রাজশাহী মেডিকেল কলেজ উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। এই প্রতিষ্ঠানকে আমরা এমন অবস্থায় দেখতে চাই না। কারণ এটি কেবল একটি হাসপাতাল নয় বরং এটি মানুষের আস্থা, নিরাপত্তা আর বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। আর সেই ভরসা যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে সমাজের ভিতও নড়ে যায়।সমাধানের পথ স্পষ্ট। প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগ। প্রথমত, আইসিইউতে একটি কঠোর, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। যেখানে কোনো প্রভাব বা সুপারিশ কাজ করবে না। জরুরি রোগীদের জন্য বৈজ্ঞানিক ট্রায়াজ ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে সবচেয়ে সংকটাপন্ন রোগী অগ্রাধিকার পায়। তবে সেটি হতে হবে কেবল চিকিৎসাগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে।দ্বিতীয়ত, আইসিইউতে নজরদারি ও জনবল বাড়াতে হবে। দক্ষ নার্স ও অভিজ্ঞ ডাক্তার নিয়োগের মাধ্যমে একটি কার্যকর টিম গড়ে তুলতে হবে। এই ক্ষেত্রে বারডেম হাসপাতালের আইসিইউ একটি অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হতে পারে, যেখানে শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও মানবিকতা একসঙ্গে কাজ করে।তৃতীয়ত, অবিলম্বে অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। লিফটগুলো সচল ও আধুনিক করা, জরুরি ওষুধ সরবরাহের দ্রুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এই বিষয়গুলো আর অবহেলার সুযোগ নেই। আইসিইউতে প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই পরিকল্পনা করতে হবে।সবশেষে, এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রতিটি জেলায় উন্নত সুবিধাসম্পন্ন আইসিইউ স্থাপন অপরিহার্য। একটি শিশুকে যদি কয়েক ঘণ্টা দূরে চিকিৎসার জন্য পাঠাতে হয়, তাহলে সেই সময়টুকুই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই জেলা পর্যায়ে শক্তিশালী আইসিইউ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।আমরা উন্নয়নের গল্প লিখছি। অগ্রগতির হিসাব করছি। কিন্তু একটি শিশু যদি একটি বেড না পেয়ে মারা যায়, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা অর্থবহ? এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দিতে হবে। কারণ এই শিশুদের নিঃশ্বাস শুধু তাদের নিজের নয়, এটি আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গবেষক।

ব্যতিক্রম অবস্থার সড়ক: মৃত্যু, প্রান্তিকতা এবং শাসন-ব্যর্থতার স্থাপত্য

বাংলাদেশে প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়— এটি একটি গভীর কাঠামোগত অভিযোগের শক্তিশালী তথ্যবিন্দু। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এই রক্তপাত এখন আর কেবল চালকের অসতর্কতা বা যান্ত্রিক ত্রুটির সরল অঙ্কে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। প্রশ্নটি এখন আর এটি নয় যে মানুষ কেন রাস্তায় মরে; বরং সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতির নিরিখে প্রশ্ন হলো— কারা এই মৃত্যুর ধারাবাহিকতা থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পায়। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতর পরবর্তী দিনগুলোতে আমরা যখন লাশের মিছিল দেখি, তখন তা আমাদের পরিবহন শাসনের কদর্য রূপটিকেই উন্মোচিত করে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭,৫৮৪ জন এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫,৫৫০ কোটি টাকায়। অথচ ২০২৬ সালের কেবল ঈদের ১০ দিনেই মৃত্যুর সংখ্যা ২৭৪ জন ছাড়িয়ে গেছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। এই মৃত্যুগুলো অব্যাহত থাকা অদক্ষতা বা দুর্ভাগ্যের ভাষায় ব্যাখ্যার দাবি রাখে না; এর জন্য প্রয়োজন সমাজবিজ্ঞানের নিবিড় ভাষা।এই সংকটের মূলে রয়েছে ইউহান গালটুংয়ের ‘কাঠামোগত সহিংসতা’ তত্ত্ব। গালটুং প্রত্যক্ষ সহিংসতা এবং কাঠামোগত সহিংসতার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্যরেখা টেনেছিলেন। তার মতে, যখন কোনো ব্যক্তি সরাসরি কাউকে আঘাত না করেও একটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যবস্থার বিন্যাসের মাধ্যমে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তখনই তা কাঠামোগত সহিংসতা। বাংলাদেশে যখন বিআরটিএ চলাচলের অযোগ্য যানবাহনকে ফিটনেস সনদ দেয়, কিংবা যখন হাইওয়ে পুলিশের জনবল সংকটের কারণে দুই লাখ কিলোমিটার রাস্তায় আইন প্রয়োগ অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন কোনো একক আমলা বা পুলিশ কর্মকর্তা খুনি হিসেবে চিহ্নিত হন না। অথচ এই ব্যবস্থার প্রতিটি রন্ধ্রে থাকা গাফিলতিগুলো সম্মিলিতভাবে হাজার হাজার মানুষকে হত্যার দিকে ঠেলে দেয়। ২০২৬ সালের ২৫ মার্চ দৌলতদিয়ায় একটি বাস পদ্মা নদীতে ডুবে ২৬ জন মানুষের মৃত্যু কোনো নিয়তির লিখন ছিল না। এটি ছিল দশকের পর দশক ধরে ফেরি পারাপার আধুনিক না করার এবং চালকদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ না করার কাঠামোগত সিদ্ধান্তের সঞ্চিত পরিণতি। গালটুং সরাসরি সহিংসতা— মুষ্টি বা বুলেট এবং কাঠামোগত সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন, যেখানে ক্ষতটি মানুষের জীবন কেমন হতে পারত এবং কাঠামো তাদের কেমন হতে দেয়— এই ব্যবধান থেকে জন্ম নেয়। বাংলাদেশের রাস্তায় সেই ব্যবধান মারাত্মক এবং পরিমাপযোগ্য।বাংলাদেশের যাতায়াত ব্যবস্থায় অসাম্য বোঝার জন্য গাই স্ট্যান্ডিংয়ের ‘প্রিকারিয়েট’ বা প্রান্তিক শ্রমজীবী শ্রেণি তত্ত্বটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। স্ট্যান্ডিং এই শ্রেণিকে কেবল দারিদ্র্য দিয়ে নয়, বরং কাজ, পরিচয় এবং সময়ে নিরাপত্তার কাঠামোগত অনুপস্থিতি দিয়ে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের তথ্যানুসারে, রাস্তায় নিহতদের প্রায় ৭৮ শতাংশই ছিলেন ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ, যারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তাদের মৃত্যু এলোমেলো ছিল না; এটি মূলত তাদের ওপরই কেন্দ্রীভূত ছিল যাদের কাছে নিরাপদ যাতায়াতের কোনো বিকল্প নেই। ঘিঞ্জি বাস, অলাইসেন্সপ্রাপ্ত মোটরসাইকেল কিংবা পণ্য ও যাত্রী একসঙ্গে বহন করা ট্রাকই তাদের ভাগ্যের লিখন হয়ে দাঁড়ায়।মোটরসাইকেল, যা এখন মোট সড়ক মৃত্যুর ৩৬ শতাংশের জন্য দায়ী, তা হয়ে উঠেছে আমাদের প্রিকারিয়েট শ্রেণীর প্রধান বাহন। এটি সাশ্রয়ী এবং ঢাকা মহানগর ও তার উপশহরগুলোর বিশৃঙ্খল রাস্তায় দ্রুত চলাচলের একমাত্র উপায়। এটি ডেলিভারি রাইডার, ছোট ব্যবসায়ী কিংবা গ্রাম থেকে আসা সেই তরুণের বাহন যার কর্মস্থলে সিএনজি ভাড়া দেয়ার সামর্থ্য নেই। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন যখন পর্যবেক্ষণ করে যে অধিকাংশ মোটরসাইকেল শিকার ১৪ থেকে ৪৫ বছর বয়সী তরুণ পুরুষ— তখন এটি পরিসংখ্যানের ভাষায় বাংলাদেশের প্রান্তিক শ্রমশক্তির স্থানিক পদচিহ্ন বর্ণনা করছে। রাস্তা এখানে এলোমেলোভাবে কাউকে মারে না; এটি শ্রেণির সীমারেখা ধরে আঘাত করে। যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে বা সুরক্ষিত সরকারি কনভয়ে চলেন, তারা এই মরণফাঁদগুলো অনায়াসেই এড়িয়ে যেতে পারেন।এই শাসনব্যবস্থার স্থায়ী অচলবস্থাকে ব্যাখ্যা করা যায় জর্জিও আগামবেনের ‘ব্যতিক্রমের রাষ্ট্র’ বা ‘ব্যতিক্রমী অবস্থা’ ধারণা দিয়ে। আগামবেন দেখিয়েছেন কীভাবে জরুরি অবস্থা বা ব্যতিক্রমী অবস্থাই একসময় স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলাকে স্থগিত করে স্থায়ী রূপ নেয়। এটি মূলত কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি বর্ণনায় তৈরি হয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশের সড়ক শাসনে এটি গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়— পদ্মার বাস ডুবি বা কুমিল্লার লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কা, কিন্তু সেই প্রতিবেদনগুলো প্রায় কখনই প্রকাশিত হয় না, বাস্তবায়িত হয় না কিংবা কোনো কার্যকর জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয় না। এখানে জরুরি অবস্থাই হলো স্থায়ী অবস্থা এবং ব্যতিক্রমই হলো নিয়ম।এটি কেবল আমলাতান্ত্রিক সক্ষমতার ব্যর্থতা নয়। বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা আইনের অভাব নেই; সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ একটি সারগর্ভ সংস্কার ছিল। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল বিদ্যমান রয়েছে এবং বিআরটিএ, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের আলাদা ম্যান্ডেট আছে— যা নেই তা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ব্যতিক্রমের এই রাষ্ট্র বিশৃঙ্খলা থেকে জন্ম নেয় না, বরং এটি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যখন আইন প্রয়োগের চেয়ে আইনের তোয়াক্কা না করা বেশি লাভজনক হয়, তখন রাস্তাই হয়ে ওঠে অরাজকতার চারণভূমি।পরিবহন খাতের এই ক্ষমতা কাঠামোটি মূলত পিয়ের বুর্দিয়ের ‘ক্ষেত্র তত্ত্ব’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বুর্দিয়ের মতে, সামাজিক জীবন ক্ষমতার পরস্পরাচ্ছন্ন ক্ষেত্রগুলোর চারপাশে সংগঠিত হয়, যেখানে অভিনেতারা বিভিন্ন ধরনের পুঁজি ব্যবহার করে প্রতিযোগিতা করে। বাংলাদেশের পরিবহন খাত কেবল একটি যাতায়াত ব্যবস্থা বা বাজার নয়; এটি রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। পরিবহন শ্রমিক ও মালিক ফেডারেশনগুলো ঐতিহাসিকভাবে সর্বাধিক সংগঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত। একাধিক সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রেখে তারা একটি ‘ছায়া-রাষ্ট্র’ গড়ে তুলেছে।এই ক্ষেত্রে সড়ক নিরাপত্তা সংগঠনগুলো প্রতীকী পুঁজিতে সমৃদ্ধ হলেও রাজনৈতিক পুঁজিতে অত্যন্ত অক্ষম। তারা তথ্য উৎপাদন করে, সংবাদ সম্মেলন করে এবং মোটরসাইকেল পর্যবেক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তির সুপারিশ করে। তাদের সুপারিশগুলো প্রযুক্তিগতভাবে সুচিন্তিত কিন্তু রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়। বছরে সাত হাজার মৃত্যু হলো সেই বীভৎস মূল্য যা এই ক্ষেত্রটি তাদের কাছ থেকে আদায় করে যারা এই রাজনৈতিক খেলায় অংশ নেয় না। সিন্ডিকেটের প্রভাবে ফিটনেসবিহীন গাড়ি যেমন রাস্তায় টিকে থাকে, তেমনই অদক্ষ চালকের হাতে লাইসেন্স পৌঁছে যায় অবলীলায়।কেন সমাজ এই বৃহৎ মাত্রার ট্র্যাজেডি দেখেও নীরব থাকে বা দ্রুত ভুলে যায়, তা ব্যাখ্যা করে স্ট্যানলি কোহেনের ‘অস্বীকারের রাষ্ট্র’ বিশ্লেষণ। কোহেন দেখিয়েছেন কীভাবে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজগুলো বৃহৎ মাত্রার ক্ষতি সম্পর্কে তাদের কাছে থাকা তথ্যে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশ তার সড়ক দুর্ঘটনার সংকট সম্পর্কে অজ্ঞ নয়। প্রতিদিন পরিসংখ্যান প্রকাশিত হচ্ছে, সংবাদপত্র লাশের ছবি দিচ্ছে, নাগরিক সমাজ কারণগুলো স্পষ্টভাবে বলছে। তবুও নির্বাচনের পর নির্বাচনে বা বাজেটের পর বাজেটে এই সমস্যাটি পুনরাবৃত্তি হয়।বিশেষ করে ঈদের সময় সড়ক মৃত্যুর ঢেউ এই অস্বীকারের সর্বাধিক দৃশ্যমান প্রকাশ। প্রতি বছর ঈদের আগে নিরাপত্তা সংগঠনগুলো সতর্কতা জারি করে, কিন্তু প্রতি বছরই উৎসবমুখর ঘরে ফেরার স্রোত অব্যবস্থাপিত ও অতিরিক্ত বোঝাই সড়কে গণমৃত্যু ঘটায়। ২০২৬ সালের ঈদের মৃত্যুর সংখ্যা ১০ দিনে ২৭৪ জন নিহত হওয়া গত বছরের তুলনায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন আসেনি। তথ্য এখানে কাঠামোকে পরিবর্তন করতে পারে না কারণ কাঠামোই এমনভাবে তৈরি যা তথ্যকে কেবল একটি সংখ্যায় পরিণত করে এবং মানুষের স্মৃতি থেকে দ্রুত মুছে দেয়।এই সংকটের গভীরে যেতে কিম্বার্লে ক্রেনশর ‘ইন্টারসেকশনালিটি’ বা ‘পরস্পরচ্ছেদী দুর্বলতা’ তত্ত্বটি আবশ্যক। এটি দাবি করে যে আমরা যেন সমষ্টিগত পরিসংখ্যান ভেঙে দেখি। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের তথ্যানুসারে, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ১৫ শতাংশ ছিল শিশু এবং ১২ শতাংশ ছিল নারী। শিশুরা মারা যায় লেভেল ক্রসিংয়ে, স্কুলের বাসে কিংবা মহাসড়ক পার হওয়ার সময়— যেখানে কোনো নিরাপদ অবকাঠামো নেই। নারীরা মারা যান তাদের গতিশীলতার সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে— যাত্রী হিসেবে যানবাহনের অবস্থা বা চালকের আচরণের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।জুডিথ বাটলারের ‘প্রিকারিয়াস লাইফ’ বা ‘ভঙ্গুর জীবন’ ধারণাটি এখানে আলোকপাত করে কেন এই মৃত্যুগুলো টেকসই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। বাটলারের মতে, কিছু জীবন অন্যদের তুলনায় বেশি ‘শোকযোগ্য’ এবং দৃশ্যমান। ফরিদপুরের মহাসড়কে নিহত একজন অজ্ঞাত পথচারী সংসদকে নাড়া দেয় না। অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে পিষ্ট শিশুকে কেবল একটি গ্রাম শোক করে, কিন্তু একটি মন্ত্রণালয় তা দ্রুত ভুলে যায়। সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের প্রধান শ্রম হলো এই মৃত্যুগুলোকে কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং শোকযোগ্য ও গণনাযোগ্য জীবনে পরিণত করা।কলিন ক্রাউচের ‘পোস্ট-ডেমোক্রেসি’ বা ‘উত্তর-গণতন্ত্র’ তত্ত্ব বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা রাজনীতির সংস্কার চক্রকে চিহ্নিত করে। এই তত্ত্বে গণতান্ত্রিক শাসনের রূপগুলো— যেমন আইন প্রণয়ন বা কাউন্সিল গঠন অব্যাহত থাকে যখন প্রকৃত জবাবদিহিতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ ছিল ঠিক এমন একটি মুহূর্ত: ব্যাপক ও প্রগতিশীল একটি আইন যা মূলত অপ্রয়োগকৃত রয়ে গেছে। আন্তোনিও গ্রামশির ‘আধিপত্য’ বা ‘হেজেমনি’ ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শাসক শ্রেণী কেবল বলপ্রয়োগ নয়, বরং সম্মতির আড়ালে নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখে। সড়ক নিরাপত্তা সপ্তাহ পালন বা মন্ত্রীদের প্রতিশ্রুতি আসলে আধিপত্য রক্ষারই একটি অংশ, যা মূল সমস্যা সমাধানের চেয়ে মানুষকে আশ্বস্ত রাখতেই বেশি ব্যবহৃত হয়।বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তার সংকট যা দাবি করে তা আরেকটি তদন্ত কমিটি নয়, আরেকটি ট্রাফিক সচেতনতা সপ্তাহ নয়, কিংবা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে আরেকটি মন্ত্রিসভার বিবৃতি নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক-পরিবহন সংযোগের সেই অশুভ আঁতাত ভাঙা যা আইন প্রয়োগকে অসম্ভব করে তোলে। প্রয়োজন একটি স্বাধীন সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ, যানবাহন ফিটনেস জালিয়াতির অপরাধীকরণ এবং অবকাঠামো নির্মাণের দর্শনে মৌলিক পরিবর্তন। এগুলো কারিগরি সুপারিশ নয়, এগুলো রাজনৈতিক দাবি।বাংলাদেশে আসলে সড়ক নিরাপত্তার কোনো যান্ত্রিক সমস্যা নেই; এখানে একটি গভীর শাসন-সমস্যা আছে— যা সড়ক মৃত্যুর মাধ্যমে বীভৎসভাবে প্রকাশিত হয়। শেষ পর্যন্ত, রাস্তা একটি সামাজিক আয়না। এটি একটি সমাজের শ্রেণিবিন্যাস প্রতিফলিত করে— কে সুরক্ষিত, কে উন্মুক্ত, কার মৃত্যু জবাবদিহিতা তৈরি করে আর কার মৃত্যু কেবল একটি সংখ্যা হয়ে ডাটাবেজে জমা হয়।২০২৬ সালের এই ঈদ-পরবর্তী ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা এক ধরনের ‘মৃত্যুর স্থাপত্যে’ বসবাস করছি। বাংলাদেশ যতদিন না সেই আয়নায় নিজের কদর্য রূপটি দেখবে, ততদিন ঈদের লাশের মিছিল কমবে না। তদন্ত কমিটিগুলো তাদের অপঠিত প্রতিবেদন দাখিল করতে থাকবে এবং প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষ তাদের রক্ত ও ঘাম দিয়ে সেই রাষ্ট্রের মূল্য বহন করতে থাকবে, যে রাষ্ট্র রূপান্তরের কঠিন পথের চেয়ে অস্বীকারের স্বস্তিকে বেছে নিয়েছে। রাস্তা থেকে রক্ত মুছলেই দায় মুক্তি ঘটে না, বরং সেই রক্তের প্রতিটি বিন্দু ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি জানায়।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

গ্রাম থেকে বিশ্ববাজার: গড়ে উঠুক বাংলাদেশ ব্র্যান্ড

বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকশিল্পনির্ভর রপ্তানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এই খাত কয়েক যুগ ধরে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অসাধারণ সাফল্য এনে দিয়েছে, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে একটি বাস্তবতা স্পষ্ট- রপ্তানিতে একক প্রধান খাতনির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে, বৈশ্বিক বাজারে সামান্য মন্দা, বাণিজ্যনীতি পরিবর্তন, বৈদেশিক মুদ্রার দামের ওঠা নামা বা রাজনৈতিক অস্থিরতা, অঞ্চলিক যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলেই তার প্রভাব পড়ে আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় সময়ের দাবি হলো রপ্তানি পণ্যের বহুমাত্রিকীকরণ; বর্তমান সরকারের ভিশনারি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে- কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প, গ্রামীণ জনপদের এস এম ই উদ্যোগ, পরিবেশবান্ধব পণ্য এবং অপ্রচলিত পন্যের রপ্তানি খাতে; যাকে আমরা এলাকা ভিত্তিক সার্কুলার শিল্প অঞ্চল যা আধুনিক গ্রীন সার্কুলার ইকোনমি বলব।বর্তমানে বিশ্ববাজারে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল খাতগুলোর একটি হলো পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ পণ্যের বাজার। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ, পাট বা অন্যান্য গাছের তন্তু-ফাইবার কম্পোজিট, নারিকেল আঁশের পণ্য, সুপারি গাছের খোল, কলাপাতার প্লেট, কচুরিপানাজাত পন্য, এলজি ও খুদিপানা থেকে প্রস্তুত উন্নত মানের পশু খাদ্য, বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিং, কাঠের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী, বায়োমস, অটোরাইস মিলের ছাই ও ছাই থেকে উৎপন্য পন্য, চারকোল, সুপারি থেকে উৎপন্ন নানান রকমের পরিবেশ বান্ধব পন্য, বায়ো সার- এসব পণ্যের চাহিদা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়, মিডেলইস্টে দ্রুত বাড়ছে। এই প্রবণতা সার্কুলার ইকোনমির ধারণার সঙ্গে যুক্ত, যেখানে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা হয় এবং উৎপাদন-ব্যবহার-পুনর্ব্যবহার একটি টেকসই চক্রে আবর্তিত হয়। বাংলাদেশের কৃষিজ পন্যের অবশিষ্টাংশ- ধানের তুষ, পাটের আঁশ, নারিকেলের ছোবড়া, আখের ও ভুট্টাগাছের বর্জ্য- এসবই হতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পরিবেশ বান্ধব সবুজ শিল্পের মূল্যবান কাঁচামাল। সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এগুলোকে রপ্তানিযোগ্য পরিবেশবান্ধব পণ্যে রূপ দেয়া সম্ভব।বাংলাদেশের বীজ উৎপাদনও একটি সম্ভাবনাময় খাত; দেশে উন্নতমানের ধান, সবজি ও ফলের বহু হাইব্রিড (উচ্চ ফলনশীল) জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে এসব বীজের চাহিদা রয়েছে। সরকারের অপ্রচলিত পন্য রপ্তানির ওয়ানস্টপ সাপোর্ট সার্ভিস, কৃষক,গবেষক ও উদ্যোক্তার সমন্বিত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বীজ শিল্প গড়ে তোলা গেলে তা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি কৃষকের আয় বহুগুণ বাড়াতে পারে, এর জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, চাষাবাদ, সংরক্ষণ, সার্টিফিকেশন ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল ব্যবস্থা।অপ্রচলিত পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকবে গ্রামীণ স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কিন্তু বাস্তবতা হলো- গ্রামে ব্যবসা শুরু করতে সবচেয়ে বড় বাধা মূলধনের সহজ প্রাপ্যতা ও বাজারসংযোগের অভাব। ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের জায়গা থেকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারকে গ্রামীণ স্টার্টআপের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। স্বল্পসুদে ঋণ, স্টার্টআপ ফান্ড, বিশেষ ভর্তুকি এবং রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা দিলে নতুন উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত হবেন।কৃষি ও গ্রামীণ শিল্পভিত্তিক উদ্যোগের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক প্যাকেজ প্রয়োজন, যেখানে জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বিপণন সহায়তা একসঙ্গে থাকবে। সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একক কৃষক বা কারিগরের পক্ষে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা কঠিন কিন্তু একটি সমবায় বা উৎপাদক সংগঠন সহজেই মাননিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং এবং বড় অর্ডার সরবরাহ করতে সক্ষম। গ্রামে প্রডিউসার কোম্পানি বা প্রোডাকশন কো-অপারেটিভ গড়ে উঠলে কৃষক, নারী ও যুবকদের আয় স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা গেলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন একসঙ্গে সম্ভব হবে।রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি, অনেক সময় গ্রামীণ উৎপাদক জানেন না যে তার তৈরি পণ্য উচ্চমূল্যে বিদেশে বিক্রি হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মশালা, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ব্যবহারের শিক্ষা, কনটেন্ট তৈরি, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, ক্রয়াদেশ গ্রহণ, সময়মতো সরবরাহ, সার্টিফিকেশন, কাস্টমস প্রক্রিয়া, ট্যাক্স-ভ্যাট ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রামীণ উদ্যোক্তাকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগী কমবে এবং লাভ বাড়বে।গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা মান, হারবাল পণ্যের কার্যকারিতা, পরিবেশবান্ধব উপকরণ উন্নয়ন- এসব বিষয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন ছাড়া রপ্তানিযোগ্য শিল্প গড়ে উঠবে না। গবেষণা-উদ্যোক্তা-শিল্প সংযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে উদ্ভাবন সরাসরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে রূপ নেয়। প্রযুক্তি স্থানান্তর ও ইনোভেশন হাব গড়ে তোলা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।সরকারি নীতিতেও প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পের জন্য আলাদা রপ্তানি অঞ্চল, সহজ রেজিস্ট্রেশন, দ্রুত মানসনদ প্রদান, কম খরচে পরীক্ষাগার সুবিধা এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনে কর-ছাড় ও বিশেষ প্রণোদনা দিলে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ ও ব্র্যান্ডিং সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বহুমুখীকরণ উদ্যোগের সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্রামীণ জনপদের কর্মসংস্থানে। গ্রামেই যদি শিল্প ও ব্যবসা গড়ে ওঠে, তবে শহরমুখী অভিবাসন কমবে। নারী, যুবক ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য নতুন আয়-উৎস সৃষ্টি হবে। পরিবারের আর্থিক স্থিতি বাড়বে, স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং জাতীয় জিডিপিতে অবদান বৃদ্ধি পাবে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠবে, যেখানে উন্নয়নের সুফল তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাবে।অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি কেবল একটি বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নয়; এটি একটি সামগ্রিকভাবে আগামীর উন্নয়ন কৌশল। গ্রাম, কৃষি, পরিবেশ, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তোলা সম্ভব— যেখানে উৎপাদন হবে স্থানীয় কিন্তু বাজার হবে বৈশ্বিক। এই পথেই বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ‘বাংলাদেশ ব্র্যান্ড’ গড়ে তুলে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে।[লেখক: কনসালট্যান্ট, বাংলাদেশ অরগানিক হাব]

পশ্চিমবঙ্গের ভোট এবং এসআইআর

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন ঘোষিত হয়েছে। এখানকার শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস, এই নির্বাচনে জিতে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য মরিয়া। বামপন্থীরা এই নির্বাচনকে নিছক ক্ষমতায় ফিরে আসবার একটা লড়াই হিসেবে দেখছেন না। এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপি এবং তাদের সহযোগী প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক শক্তি তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে, বাংলার বুকে মানুষের সব থেকে বড় বিপদকে গুরুত্ব দিয়ে বিভাজনের রাজনীতিকে প্রতিহত করতে, তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিরন্তন বাংলাকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পরিচালিত করছেন। ভোটের প্রচার পর্বকেও সেই ভাবে পরিচালিত করছেন।অন্যপক্ষে আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি, তারাও এই রাজ্যে ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে তাদের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। পশ্চিমবঙ্গবাসীর আর্থ- সামাজিক উন্নয়নের জন্য তাদের কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে, উগ্র রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রকাশই তাদের লক্ষ্য। গোটা ভারতজুড়ে তারা যে নিজেদের মস্তিষ্ক আরএসএসের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তারই একটি অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে সংযুক্ত করবার জন্য, বিজেপি এখন সবথেকে বেশি সচেষ্ট।ভোট প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার অব্যবহিত আগেই পশ্চিমবঙ্গের বুকে এসআইআর করতে শুরু করে নির্বাচন কমিশন। এসআইআর প্রক্রিয়াটি কোনো নতুন প্রক্রিয়া নয়। বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া হয়েছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া ঘিরে এখন যে ধরনের রাজনৈতিক উত্তাপ, বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকার বা তাদের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ, তার বিন্দু বিসর্গ অতীতে ২০০২ সালের এসআইআরের সময় আমরা দেখতে পাইনি। সেদিনের সেই এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কোনো ভীতির সঞ্চার হয়নি। যেটা এখন তৈরি হয়েছে, প্রশাসনিক উদ্যোগের প্রশ্নে কেন্দ্র-রাজ্যের সমন্বয়ে। ভোটার তালিকার সংশোধন, এটা ভারতের সংবিধান প্রদত্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্ষেত্রে একটি অতি স্বাস্থ্যকর বিষয়। সেই স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও কোনো অন্যথা সেদিন ঘটেনি। সেদিন পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্ট সরকার, কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার, যে সরকারের মন্ত্রী ছিলেন মমতা স্বয়ং, বা নির্বাচন কমিশন, সর্বোপরি সাধারণ মানুষ-- কোনো জায়গা থেকে কোনো রকম সাম্প্রদায়িক বিভাজনের লক্ষ্যে, প্রশাসনকে ব্যবহার করবার দৃষ্টিভঙ্গি-- এই এসআইআরকে ঘিরে ওঠেনি।ভারতের নাগরিক মুসলমানদের, বেনাগরিক করবার পরিকল্পনাটা আরএসএসের স্বাধীনতার (১৯৪৭) পরবর্তী কাল থেকেই একটি গৃহীত নীতি। এই পরিকল্পনার কথা তাদের তাত্ত্বিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান নির্মাতা এমএস গোলওয়ালকার, তার, ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ নামক তত্ত্বের মধ্যে অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলে গিয়েছেন। সেদিন একক ক্ষমতায় বিজেপি কেন্দ্রে সরকার পরিচালনা করছিল না। আর সেই কারণেই হয়তো বিজেপির পক্ষে এসআইআর ঘিরে সেদিন, আজকের মতো ভয়াবহ হিন্দু সম্প্রদায়িক অবস্থান নেয়া, জোট রাজনীতির নিরিখে, অর্থাৎ কেন্দ্রে সরকার পরিচালনা করবার বিষয়টিকে মাথায় রেখে বাস্তবায়নের দিকে এগোনো সম্ভবপর ছিল না।পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই আরও চারটি রাজ্যের নির্বাচন হচ্ছে। যার মধ্যে কেরালাম অন্যতম। এই রাজ্যে বামপন্থীরা ক্ষমতায় রয়েছে। তারা রাজ্য বিধানসভায় প্রস্তাব নিয়ে খুব স্পষ্টভাবেই বলেছেন; কোনো অবস্থাতেই তারা কেরলমে এসআইআর প্রক্রিয়া লাগু হতে দেবেন না। সেটা তারা দেনওনি। সেই রাজ্যে ভোট প্রক্রিয়া চলছে। ভোটার তালিকা নিয়ম মাফিক সংশোধিত হয়েছে। কিন্তু কোথাও কোনো অবস্থাতেই এসআইআর প্রক্রিয়া সেখানকার মানুষের ওপরে, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কমিশন যা ইতোমধ্যে ভারতবাসীর কাছে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে নির্যাতন কমিশন নামে অভিহিত হতে শুরু করেছে, তারা লাগু করতে পারেনি।এরকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গবাসী কে ফেলে দেয়ার সার্বিক দায়টি একই সঙ্গে কেন্দ্রের শাসক বিজেপি এবং রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর বর্তায়। রাজ্যের ভোটার তালিকায় বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে আসা মানুষদের দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে বামফ্রন্ট সরকার। আর তাদের ভোটেই তারা দীর্ঘদিন রাজ্যে ক্ষমতাশীল আছেন-- অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারের আমলে এটাই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি। এই দাবি ঘিরে খোদ লোকসভার মধ্যেও তিনি নানা ধরনের অসংসদীয় কাজ করেছিলেন। আরএসএসের যে মুসলিমমুক্ত ভারতের পরিকল্পনা, যেটি তারা তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির মাধ্যমে ভারতের লাগু করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে আসছে, সেই কাজটি তারা বিজেপি সরকারের মন্ত্রী মমতাকে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রথম শুরু করেছিল।ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এসআইআর ঘিরে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান্যতায় পশ্চিমবঙ্গে এখনও ৬০ লাখের বেশি মানুষ ভোটার তালিকার বাইরে রয়েছেন। এই বিপুলসংখ্যক মানুষদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছেন মুসলমানরা। এটা বিজেপির মুসলমান মুক্ত ভারতের রাজনৈতিক কর্মসূচির একটি অঙ্গ। বিজেপির এই ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক বিভাজনমূলক প্রক্রিয়াকে ফলো প্রশ্ন করবার লক্ষ্যে সব থেকে বেশি সহায়ক ছিলেন মমতা।গত ১৫ বছর ধরে যে সীমাহীন দুর্নীতি, ব্যর্থতা অপদার্থতার ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা শূন্যগর্ভ জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন। তার থেকে পুনরুদ্ধার জীবনে একটা প্রত্যাশা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। সিপিআই (এম) সিপিআইএম লিবারেশন, সিপিআই, অন্যান্য বামপন্থী দলগুলো এবং আইএসএফ, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে যে ধরনের রাজনৈতিক ইস্যুগুলোকে তুলে ধরেছেন, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির প্রশ্নে, যেভাবে রাজনীতির প্রধান বিষয় হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন, তা থেকে মানুষের মনকে ঘুরিয়ে দিতে বিজেপি এবং তৃণমূল উভয় সাম্প্রদায়িক শক্তি চেষ্টার বিরাম করছে না। কংগ্রেস দল এই ভোটে অতীতের মতো বামপন্থীদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেনি এ ঘিরে ওই দলের রাজ্য নেতৃত্বের মধ্যেই একাধিক মতবিরোধের কথা শুনতে পাওয়া যায়। যদিও সাম্প্রদায়িকতাকে প্রতিহত করবার প্রশ্নে ওই দলের হাতেগোনা দুয়েকজন নেতা ছাড়া আর কারো মধ্যে এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অবস্থান দেখতে পাওয়া যায়নি। [লেখক: ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

’৬৯ আর ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি-ঘর কোথায়

অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ নামে তড়িঘড়ি করে একটি অধ্যাদেশ জারি করে গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করার কার্যক্রম শুরু করে। ঐ গণভবনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থাকতেন এবং জুলাই আন্দোলনের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সব কার্যক্রম গণভবন থেকেই পরিচালিত হচ্ছিল। জুলাই আন্দোলনে অগণিত মৃত্যু, চোখ হারানো, পংগু হয়ে পড়া আহতের আর্তনাদ, স্বজনহারা পরিবারের মানুষগুলোর আহাজারি মানুষের বিবেককে স্পর্ষ করেছিল। সেই আবেগকে ব্যবহার করে মুহাম্মদ ইউনূস ‘প্রতিহিংসার বশে’ গণভবনকে জুলাই স্মৃতি যাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিনা। সেটা একটা বড় প্রশ্ন। কিন্তু গণভবন তো শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাড়ি না, এটা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সরকার প্রধানের আবাসিক ভবন। এটা ইউনূস সাহেবের পৈতৃক সম্পত্তি নয় যে, তিনি ইচ্ছা করলেন আর সরকারি সম্পত্তিকে তার ‘স্মৃতির যাদুঘর’ বানিয়ে ফেললেন।জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ঘর থাকতেই পারে। তবে সেটা সরকার প্রধানের বাসভবনের জন্য নির্মিত স্থাপনায় কেনো করতে হবে? বিশেষত সরকার প্রধানের বাসভবনের মত স্পর্শকাতর স্থাপনার জন্য স্থান, জায়গার পরিসর, নিরাপত্তা ইস্যু ইত্যাদি নানা বিষয় বিবেচনা করে তা নির্ধারণ করতে হয়। জুলাই স্মৃতি ঘরের জন্য সেগুলো অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অন্য যেকোনো স্থানেই তা হতে পারে। আর এ দেশটাই তো গণঅভ্যুত্থানের দেশ। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পথ বেয়েই তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের এবং দীর্ঘ সময়ের নামে বেনামে সামরিক শাসনের পতন। ’৬৯ বা ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের জন্য তো পৃথক কোনো স্মৃতি ঘর নাই। তাহলে শুধু ’২৪-এর জন্য আলাদা স্মৃতি ঘর লাগবে কেনো? বরং স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের স্মৃতি যাদুঘর নির্মাণ করে ’৬৯, ’৯০, ’২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। যা থেকে পরবর্তী প্রজন্মসহ সবাই একপেশে বা খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির বদলে দেশ এবং দেশের গণআন্দোলনের বৈচিত্র্যময় নানা পর্ব ও উপাদান সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা পেতে পারেন।কিন্তু না, মুহাম্মদ ইউনূস ‘ইতিহাসের একক নায়ক’ হতে চান। আর তা হতে হলে মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের সব গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের ক্ষেত্রে তো রিসেট বাটন চাপ দিতে লাগবে। আবার ’২৪-এর জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে উগ্রবাদী ধর্মান্ধ শক্তির উত্থান ঘটেছে, তারাও এদেশের মানুষের গণসংগ্রামের ইতিহাসকে এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী নিজেদের কলঙ্কিত অধ্যায়কে যে কোনো প্রকারে ঢেকে ফেলার গভীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। সে ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই তারা জুলাই ’২৪ দিয়ে ’৭১ কে ঢেকে ফেলার প্রয়াস চালিয়ে আসছে। সে লক্ষ্যেই জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে তারা আঘাত হানে মুক্তিযুদ্ধের সব স্মারক, স্মৃতি, স্তম্ভ ও ভাস্কর্যের ওপর। ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশ্রয়ে একাধিকবার আঘাত হেনে ও অগ্নিসংযোগ করে ধানমন্ডি বত্রিশের ঐতিহাসিক বাড়িটি গুড়িয়ে দেয়া হয়।আজকের প্রজন্ম ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সম্পর্কে, শহীদদের সম্পর্কে কতটুকু জানেন? জানেন কি ঐ অভ্যুত্থানে কতজন শহীদ হয়েছিলেন? কি ভাবে জানবেন? সারা দেশে ’৬৯-এর অসংখ্য শহীদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা পর্যন্ত করা হয়নি। শহীদদের মধ্যে তরুণ আসাদ, কিশোর মতিউর, রুস্তম, গৃহবধূ আনোয়ারা কিংবা শহীদ ড. শামসুজ্জোহা এরকম কয়েকটি নাম আমরা গণঅভ্যুত্থান দিবসের দিনে শুনতে পাই। অথচ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক, কর্মচারী শহীদী মৃত্যুবরণ করেন। নরসিংদীর হাতিরদিয়া ও রায়পুরায় কৃষক এবং ঢাকার আদমজী, ডেমরা, টঙ্গী এবং খুলনার দৌলতপুর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ও আত্মদান আন্দোলনে বিশেষ মাত্রা সৃষ্টি করে।তৎকালীন ডাকসু, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের উভয় অংশ এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সমন্বয়েছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ’৬৯-এর জানুয়ারি থেকেই শুরু হয় আন্দোলনের নানা কর্মসূচি। এক পর্যায়ে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের একাংশও এসে মিলিত হয় এ আন্দোলনে। এই আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থী বা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নয়, বরং কৃষকদের মধ্যে, শ্রমিকদের মধ্যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৬৬ সনে সূচিত ছয়দফা দাবিতে যে স্বাধীকার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল তা পূর্ণতা পায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচিতে।জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী রাজনীতির ঐক্যের ফলে ছাত্র সমাজ ও মেহনতি জনতার মাঝে এক ধরনের একতার বাতাবরণ সৃষ্টি হয়। আন্দোলন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আইউব শাহীর পতনের মধ্য দিয়ে গনঅভ্যুত্থান সফলতা লাভ করে। কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন শেখ মুজিব, মনি সিংহ সহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সেল বলা যেতে পারে। তাই এই ঐতিহাসিক ও গৌরবের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের বিরোধীরা পাশ কাটাতে চায়- যেমনটা তারা বলে বাংলা ভাষা আন্দোলন করা ভুল হয়েছিল। তাদের নেতা গোলাম আজমের স্পষ্ট বয়ান ছিলো, ’মুসলমানদের তমুদ্দীন ও ধর্মীয় জ্ঞানের ভাণ্ডার উর্দু ভাষায় সংরক্ষিত রয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ হইতে ভাষা আন্দোলন করা সঠিক হয় নাই।’আবার এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে গোলাম আজমের দল কখনও সরবে ও কখনও নীরবে যুক্ত থাকলেও ১৯৯০-এর গনঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বীরত্ব গাঁথা ও আত্মত্যাগকে তারা খুব একটা সামনে আনতে চায় না। কারণ ’৯০ এর গণঅভ্যুত্থান সামনে আসা মানেই অভ্যুত্থানের মশাল জ্বালানো ডা. মিলন, কমরেড তাজুল, পুলিশ কতৃক ট্রাকের চাকায় পিষ্ট ছাত্র নেতা সেলিম, দেলোয়ার, রাউফুন বসুনিয়া, শাহজাহান সিরাজ, এক জটিল পর্বে আসলাম কিংবা ছাত্র কর্মী জয়নাল, জাফর, কান্চন, মোজাম্মেল, জেহাদ, খেতমজুর নেতা টিটো, বা রাজনৈতিক নেতা ময়েজউদ্দীনের আত্মদানের কাহিনী সামনে আসা। ’৯০ কে সামনে আনা মানেই অতি সাধারণ মানুষের হাতে লেখা ও বুকে পিঠে আঁকা ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ হয়ে যায় সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা। শহীদ নূর হোসেন যেন গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতীক।এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের আয়োজন পর্ব তথা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী গণসংগ্রাম এবং তার সমাপ্তি পর্বের মূল শক্তি ছিলো দেশের গনতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তি। এ অভ্যুত্থানের পথ বেয়েই বিএনপি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও অভ্যুত্থানে শহীদের তালিকা প্রণয়ন ও স্মৃতি সংরক্ষণে বিশেষ কিছু করা হয় নি। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে নতুন সরকারকে এ দায়িত্ব নিতে হবে।’৬৯ আর ’৯০কে, ’৫২ আর ’৭১ কে উগ্রবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ২০২৪ দিয়ে ঢেকে ফেলার প্রচেষ্টায় উন্মত্ত। ইউনূসও ‘রিসেট বাটন’ টিপে দেশের সব গৌরব গাঁথাকে বিশেষত দেশের মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলার প্রয়াসকে ১৮ মাস যাবত মদত দিয়ে গেলেন। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন সম্পন্ন না হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দেশে এখন একটি নির্বাচিত সরকার। বিজয়ী দল বিএনপি দাবি করে তাদের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ঘোষক’। নিশ্চয়ই ২৫ মার্চের কাল রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নিরস্ত্র জনতার উপর সশস্ত্র আক্রমণ এবং নির্বিচার গনহত্যার পরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার ঘোষণার ঐতিহাসিক মূল্য আছে। বেংগল রেজিমেন্ট তথা বাঙালি সশস্ত্র বাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনতা যুদ্ধে শামিল হওয়ায় গোটা জাতি উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। এই ভূমিকাকে অস্বীকার করা মানে ইতিহাসকে এককেন্দ্রীক করে ফেলা। তবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘ ২৫ বছরের গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম ও আত্মদানের ইতিহাস এবং সেই সব সংগ্রামের নেতৃত্বকে যদি অস্বীকার করা হয় বা ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গণরায়কে গুরুত্ব দেয়া না হয় তাহলেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ফলে জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ে। যার সুযোগ নিয়ে দেশের জন্ম যুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এবারে যদি এসব প্রশ্নে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে পারে, তবে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।তবে গত বছরের ৫ আগস্ট ইউনূসের ‘জুলাই ঘোষণা’ তে কিন্তু ইতিহাসের চরম বিকৃতি করা হয়েছে। এবং তার পরে ঘোষণা করলেন ‘জুলাই সনদ’। সেখানেও রয়েছে ইতিহাসের বিকৃতি। ইউনূসকে ইতিহাসের বয়ান রচনা করার দায়িত্ব তো দেয়া হয়নি। তবু তিনি তা করলেন এবং দেশের ইতিহাসকে জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেললেন কোন ক্ষমতা বলে? বাংলাদেশের সংগ্রাম মুখর ইতিহাসে তার ভূমিকা কি? অসংখ্য ইতিহাস বিকৃতির এক বয়ান নোবেল লরিয়েট পঠিত ঘোষণাপত্রে উঠে এসেছে- যা নতুন করে বিভাজন সৃষ্টির ঘোষণা হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে। জুলাই সনদ ঘোষণার পরে বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতিহাস বিকৃতির বিষয়ে আপত্তি না জানালেও ভিন্ন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘এটা জনগণের সঙ্গে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের একটা প্রতারণা’। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেয়ার অধিকার প্রধান উপদেষ্টা বা অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। বিশ্বাসভংগ ও প্রতারণা করে আমাদের অগোচরে জুলাই সনদের স্বাক্ষরিত কপি বদলে ফেলা হয়েছে। যা আলোচনা হয়েছে তা সুপারিশে নাই।’সুতরাং খুব স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী দলের উপর বিতর্কিত জুলাই সনদকে বা জুলাই গণুঅভ্যুত্থান অধ্যাদেশকে আইনি ভিত্তি দেয়ার দায়িত্ব পড়ে না। জুলাই গনঅভ্যুত্থানের জন্য দায়মুক্তি লাগবে কেনো? ’৬৯ ও ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে তো দায়মুক্তি লাগে নাই। তাহলে কি অভ্যুত্থানের আড়ালে এমন কিছু করা হয়েছে যার জন্য দায়মুক্তি লাগবে? দেশি-বিদেশি পত্র-পত্রিকায় ও মিডিয়ায় ‘স্নাইপার শুট’ এবং পুলিশ হত্যা ও অস্ত্র লুট ( যা এখনও জমা পড়েনি বা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি) নিয়ে নানা কথা আসছে। জীবনকে সম্মান জানাতে হবে। সে জীবন আন্দোলনকারীর হোক আর পুলিশেরই হোক। সুতরাং এ বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া দায় মুক্তি কার্যকর করা হলে আইনের প্রতি অবিচার করা হবে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মদানকারীদের পরিবাররা এবং অভ্যুত্থানের পরে মব হামলায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে সহায়তা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগ জারী রাখতে হবে।জুলাই আন্দোলনে আত্মদানের আবেগকে পুজি করে ‘প্রতিহিংসা মূলক’ জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশকেও আইনি স্বীকৃতি দেয়ার দায় নির্বাচিত সংসদের নেই। জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি রক্ষায় নির্বাচিত সরকার একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে ভারসাম্যপূর্ন একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের স্মৃতি যাদুঘর নির্মাণ করে ’৬৯, ’৯০, ’২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। একটি অনির্বাচিত সরকার যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একপেশে অধ্যাদেশগুলো জারি করেছে, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে পরিবর্তন এনে নির্বাচিত সরকারকেই ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।গত কয়েকদিনে ১/১১-এর অন্যতম কুশিলব লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (অব.) ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মামুন খালেদের গ্রেপ্তারের খবর দেখে মনে পড়লো পশ্চিমা শক্তির উপর নির্ভরশীল ইউনূসও তো ধোয়া তুলসী পাতা নন। তিনি কিন্তু ১/১১-এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ তত্ত্বে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনোভাব পরিবর্তন করায় ঐ ফর্মুলা কার্যকর হবে না বুঝতে পেরে দ্রুত তিনি দল গঠনের প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসেন। ড. ইউনূসকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও ১/১১-এর অনেক রহস্য উদ্ঘাটিত হতে পারে।ইউনূস পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তার দোস্তির দায় বিএনপির উপর চাপিয়ে দিয়ে গেলেন। নির্বাচনের তিনদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অপ্রকাশযোগ্য যে দেশ বিরোধী চুক্তি তিনি তাড়াহুড়ো করে করলেন তা সামাল দিতে পশ্চিমা পছন্দের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাদের মন্ত্রীসভায় জায়গা করে দিতে হলো। ড. ইউনূস দিল্লির জেন জির থেকে বের হওয়ার ভান করে কৌশলে বাংলাদেশকে আষ্টে পৃষ্ঠে বেধে দিয়ে গেলেন মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে। জামাত ও এনসিপিও আপাতত মার্কিনী স্বার্থের বিরোধী অবস্থানে যাবে না। বরং নানাভাবেই তারা মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ক্ষমতার বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার মোহে।কিন্তু বিএনপিকে এটা মনে রাখতে হবে ভোটারদের একটা বড় অংশ যারা বিএনপিকে পছন্দ না করলেও ধানের শীষে ভোট দিয়েছে এই আশা নিয়ে যে, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপোষ করবে না। উগ্র ধর্মান্ধ শক্তির কাছে নত হবে না। দেশে আর মব সংস্কৃতির চাষাবাদ করতে দেবে না এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সব রাজনৈতিক দলের স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার পরিবেশকে নিশ্চিত করবে। শুধু ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করে বিএনপি বেশি দিন জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারবে না। এ রকম বহু কার্ড পূর্বের সরকারও বিতরণ করেছে। সরকারকে নজর দিতে হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আর ব্যবসা বানিজ্যে কর্মচঞ্চলতা ফিরিয়ে আনতে। সরকারকে নজরে রাখতে হবে, দীর্ঘ কাল যাবত চলে আসা দখলদারী আর চাঁদাবাজির যে সংস্কৃতি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আস্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে তা থেকে বেরিয়ে এসে কিভাবে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা যায়। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে খণ্ডিতভাবে নয় বরং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ক্যানভাসে ধারণ করতে হবে ’৫২-এর ভাষা সংগ্রাম, ’৬৯, ’৯০, আর ২০২৪-এর স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামকে।দেশে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনে বিচার বিভাগ সহ-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ অবস্থা থেকে মুক্ত করে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা, সাংবিধানিক পদাধিকারীগণের জন্য স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কমানো ও রাষ্ট্রপতির পদকে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর আজ্ঞাবহ অবস্থা থেকে বের করে আনা এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও পরিবারতন্ত্রের অবসানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা কিন্তু বিমূর্তভাবে হলেও মানুষের মাঝে রয়েছে। নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি তো দীর্ঘদিনের।সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে এ সব সংস্কারে বিএনপিকে উদ্যোগী হতে হবে। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সংবিধানে এমন কোনো সংযোজন বিয়োজন করে সমাজে বিভাজন ও অস্থিরতা সৃষ্টি করা যাবে না। আদিবাসীসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ নানাবিধ সংস্কার কাজ সামনের দিনগুলোতে রয়েছে।[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা](লেখকের নিজস্ব মত)

সড়ক দুর্ঘটনা: জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি, কারণ ও করণীয়

সম্প্রতি রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার ঝুঁকিপূর্ণ চিত্রকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সার্বিক অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। বর্তমান বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনা একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে, আর বাংলাদেশে এটি এখন এক ভয়াবহ সামাজিক সংকট। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক বা নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটছে, যার ফলে ঝরে যাচ্ছে অমূল্য প্রাণ, ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার।বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার উন্নত বিশ্বের তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। বিআরটিএর জরিপ মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ২৩ হাজার ১৬৬ জন মানুষ নিহত হয়। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক যুগে দেশে ৬৭ হাজার ৮৯০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৭২৬ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২১ জন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশ। রাজধানী ঢাকা এবং মহাসড়কগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনার চিত্রও কম ভয়াবহ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় এবং প্রতিদিন এক হাজারের বেশি শিশু ও তরুণ প্রাণ হারায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর প্রায় ৯৬ শতাংশই ঘটে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে। অর্থাৎ বাংলাদেশসহ এ ধরনের দেশগুলোয়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৬,৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯,১১১ জন নিহত এবং ১৪,৮১২ জন আহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় সারা দেশে ৮ হাজার ৫৪৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছে ১২ হাজার ৬০৮ জন। এর মধ্যে ২ হাজার ৩২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ৩ হাজার ১৫১ জন। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ১.৫৪ শতাংশ, নিহতের সংখ্যা ৭.৫০ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ১৭.৭৩ শতাংশ বেড়েছে। নৌ ও রেলপথেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটে। তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে রেলপথে ৪৯৭টি দুর্ঘটনায় ৫১২ জন নিহত এবং ৩১৫ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ১১৮টি দুর্ঘটনায় ১৮২ জন নিহত, ২৬৭ জন আহত এবং ১৫৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ২ হাজার ৩২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত এবং ৩ হাজার ১৫১ জন আহত হয়েছেন। গত ১০ বছরে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে বেড়ে ৬০ লাখ হয়েছে। নতুন করে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তায় চলাচলের পাশাপাশি ছোট যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং এসব যানবাহনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে ১৬৮ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১ হাজার ৯৫২ চালক, ১ হাজার ৮৭৯ পথচারী, ৬২২ পরিবহন শ্রমিক, ৭৫৫ শিক্ষার্থী, ১২৬ শিক্ষক, ১ হাজার ২০৬ নারী, ৬৫৮ শিশু, ৪৮ সাংবাদিক, ১৭ চিকিৎসক, ১৬ বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১ চিত্রনায়ক, ৬ আইনজীবী, ১২ প্রকৌশলী এবং ২১৫ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় পাওয়া গেছে।তথ্যানুযায়ী, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৫০.৮৪ শতাংশ পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়া, ২৪.৩৯ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৮.৯২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া, ৪.৯৯ শতাংশ বিবিধ কারণে এবং ০.৭৩ শতাংশ ট্রেনের সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষের কারণে হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার ৩৫.৬৭ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে, ২১.৬৬ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ৩৫.৮১ শতাংশ ফিডার রোডে এবং ৪.৯৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঢাকা মহানগরীতে এবং ১.২০ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে ঘটেছে। শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬২১টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬০৮ এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১ হাজার ১০০ জন মানুষ। এর মধ্যে ২৭১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৬৪ জন, ৪টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৬ জন ও দুজন আহত হয়েছেন। ২২টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন।বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো চালকদের অদক্ষতা, অসচেতনতা এবং বেপরোয়া মনোভাব। অনেক চালকই যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই গাড়ি চালান, আবার অনেকেই লাইসেন্সবিহীন। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলফোন ব্যবহার— এসব আচরণ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। অনেক পুরনো ও অচল যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে, যা যে কোনো সময় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতাও একটি বড় সমস্যা। ভাঙাচোরা রাস্তা, ডিভাইডারের অভাব, অপর্যাপ্ত ট্রাফিক সিগন্যাল ও ফুটওভারব্রিজের স্বল্পতা দুর্ঘটনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং দুর্নীতিও একটি বড় কারণ। ট্রাফিক আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ ও অনিয়মের কারণে অযোগ্য চালক লাইসেন্স পেয়ে যায় এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল অব্যাহত থাকে। একই সঙ্গে পথচারীদের অসচেতনতা যেমন যেখানে-সেখানে রাস্তা পারাপার-দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু প্রাণহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে পুরো পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। এ ছাড়া প্রতি বছর দেশের অর্থনীতিতে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়, যা জাতীয় উন্নয়নকে ব্যাহত করে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যে ক্ষতি হয় তার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির দুই ভাগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, আন্তর্জাতিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ডলার। উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে এর পরিমাণ ৬৫ বিলিয়ন ডলার।এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং আইন ভঙ্গকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও কঠোর করতে হবে, যাতে অযোগ্য কেউ গাড়ি চালাতে না পারে। তৃতীয়ত, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি-প্রশস্ত রাস্তা, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।এ ছাড়া যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা নিয়মিত করা এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষকে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। চালক, যাত্রী ও পথচারী-সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল আচরণই পারে দুর্ঘটনা কমাতে।সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; বরং এটি প্রতিরোধযোগ্য। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং কার্যকর পদক্ষেপ। আমরা যদি সবাই নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি এবং আইন মেনে চলি, তাহলে সড়ককে মৃত্যুকূপ থেকে নিরাপদ যাত্রাপথে রূপান্তর করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, জীবনের মূল্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

ভিডিও

ক্রীড়া ভাতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য ক্রীড়া ভাতা প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ সোমবার (৩০ মার্চ) সকাল সোয়া ১০টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘শাপলা হলে’ এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তিনি।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী খেলোয়াড়দের মাঝে ‘ক্রীড়া কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমেরও সূচনা করেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জনকারী ক্রীড়াবিদদের সম্মাননা প্রদান করা হয়।এবারের ক্রীড়া ভাতা কর্মসূচি বেতন কাঠামোর আওতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কর্মসূচির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’।অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

ক্রীড়া ভাতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
৩০ মার্চ ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
২০১৮ সালের পর জন্ম নেওয়া শিশুরা হামের টিকার আওতায় আসেনি। সে জন্যই মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে? আপনি কি মনে করেন?

২০১৮ সালের পর জন্ম নেওয়া শিশুরা হামের টিকার আওতায় আসেনি। সে জন্যই মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে? আপনি কি মনে করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ জন