তোফায়েল আহমেদ: হারিয়ে যাবেন না
একজন অসাধারণ বাগ্মী, মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে উঠে আসা বিরলপ্রজ রাজনীতিক, জাতীয় নেতা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তোফায়েল আহমেদ বেঁচে থাকবেন। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, ইতিহাসের উত্থান-পতন ও নানা বাঁক বদলে একজন নেতা হিসেবে তিনি কখনো বিস্মৃতির অতল অন্ধকারে হারিয়ে যাবেন না।সরকারি চাকরির সুবাদে তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখেছিলাম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বকালীন তাঁর সঙ্গে মোট সাড়ে তিনবছর কাজ করেছি। তখনই তাঁর সান্নিধ্যে যাবার এক অপার সুযোগ আসে। স্মার্ট, পরিপাটি এবং অসামান্য স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি। দাপ্তরিক নথি, নোটাংশ, সারসংক্ষেপ, ক্ষণ, তারিখ ইত্যাদি বিস্ময়করভাবে মনে রাখতে পারতেন। নথিতে সিদ্ধান্ত দিতেন ব্যক্তিগত দায় নিয়ে। কোনো জটিল বিষয়ে কর্মকর্তাগণ সিদ্ধান্তে দোদুল্যমান হয়ে গেলে বা মৌনতা অবলম্বন করলে তিনি বলতেন, -নথিটা দাও আমি নিজেই লিখে দিচ্ছি। ভবিষ্যতে সমস্যা হলে সেটা আমি দেখবো।তিনি সবসময় হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করতেন। তাঁর মুখের ওপর বিষণ্ণতার কালোছায়া কখনো দেখি নি। হঠাৎ মেজাজ দেখেছি, তবে তা একেবারে হারাতে দেখি নি। হয়তো তাঁরও অনেক দুঃখবোধ ছিল যা প্রকাশিত নয় এবং অফিসারদের কাছে কখনো ভাগ করার ছিল না। তাঁর মধ্যে চাপা, প্রচ্ছন্ন এবং দৃঢ়চেতা মানুষের নানাবিধ গুণাবলী ছিল।বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য-শৌর্য ও বিদ্যায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়। আলাদা একজন। তখনকার বাণিজ্য সচিব আপাদমস্তক বিনয়ী মানুষ হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন এবং আমি মাঝেমধ্যে তাঁর সামনে উপবিষ্ট হয়ে বলতাম, -স্যার, আমরা কিন্তু বাইরে গিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করি তা কখনো বলি না, বরঞ্চ বলে থাকি, আমরা তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে আছি। এমন কথায় তিনি মনে মনে আনন্দিতবোধ করতেন। আবার সস্নেহে বলতেন,-নিশ্চয় তোমরা কোনো একটা মতলব নিয়ে এসেছো।পোশাক-আশাকে এত রুচিবান, পরিচ্ছন্ন, শৌখিন ও অভিজাত এদেশের মন্ত্রীদের মধ্যে সচরাচর দেখা যেত না। পাজামা, পাঞ্জাবি, মুজিবকোট, স্যুট, ব্লেজার, জুতো পরতেন নামি দামি ব্র্যান্ডের। ব্যতিক্রম মানের হিসেবে সহজেই বুঝা যেত। এ বিষয়ে তিনি ছিলেন উদার এবং দরাজ স্বভাবের মানুষ।মনে পড়ে, তখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস হবে। দুপুরের পরপর অফিসে ঢুকে তিনি বললেন,-দ্যাখো, বাইরে কেমন প্রচন্ড দাবদাহ চলছে। গাড়ি থেকে নামাই যায় না। বাইরে তাকানো মুশকিল। গুমোট পরিবেশ। বৃষ্টি-বাদল হওয়া জরুরি। ঢাকার আবহাওয়াটা কেমন যেন বদলে গেছে। তাছাড়া আমি তো আবার সানগ্লাস পরি না। তাৎক্ষণিক জিজ্ঞেস করলাম,-কেন স্যার? তিনি বললেন,-সিরাজ ভাই একবার (সিরাজুল আলম খান) মানা করেছিলেন। তিনি বলতেন, 'সানগ্লাস নাকি এদেশের গণমানুষের রাজনীতির সঙ্গে মানানসই নয়'। সেই থেকে সানগ্লাস বাদ দিয়েছিলাম, আর কোনোদিন পরি নি।২.একদিন অপরাহ্নে অফিসে এসেই আমাকে ইন্টার-কমে কল করলেন। 'এখুনি উপরে আস'। এভাবে তিনি আমাকে প্রায়ই ডেকে পাঠাতেন। কিন্তু সেদিনের কণ্ঠস্বরটা কেমন যেন ছিল! আমি বের হয়ে লিফটের দরজায় দাঁড়ালাম। চারতলার দক্ষিণ প্রান্তে মন্ত্রীর কক্ষ, আমি দোতলায়। কাজেই লিফটেই যেতে চাই। ভাবছিলাম, কোন বিষয়ে জানতে চাচ্ছেন, বুঝতে পারছি না। তাঁর কক্ষে প্রবেশের মুখে পৌঁছাতেই ব্যক্তিগত স্টাফরা বললো, -শিগগিরই ঢুকেন স্যার, এরমধ্যেই কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছেন আপনি কোথায়?দরজার ভেতরে পা রেখেই সালাম জানালাম, দেখি মন্ত্রীর নির্ধারিত চেয়ারে বসে আছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু।আমি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে। কী, আশ্চর্য! পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, তোফায়েল আহমেদ সোফায় সহাস্যে বসে আছেন। আমি খানিকটা অপ্রস্তুত হলাম। তিনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন,-আমু ভাই, ওর কথাই বলেছিলাম, সে চট্টগ্রামের ডিসি ছিল। আমু সাহেব বললেন, -হ্যাঁ আপনাকে দেখেছি বলে মনে হয়, সবাই তো চিনে-জানেও ।এবার কাজের কথা। মন্ত্রী বললেন, -দেখো, আমু ভাই আমার নেতা। সেই বরিশালের বি,এম কলেজ থেকেই আমি আমু ভাইয়ের সাথে আছি। তোমার কাছে আমু ভাইয়ের একটা কাজ আছে। এটা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাড়াতাড়ি করে দিতে হবে।সেদিন এক সঙ্গে চা খেয়ে আমি নিচে নেমে আসি। পরদিন আবার মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা। তিনি নিজে থেকেই হাসিমুখে বললেন, -শোন মান্নান, গতকাল আমু ভাইকে একটু বেশি সম্মান দেখালাম আর কি! তিনি আমার নেতা, ঠিকই আছে। তবে '৭০ এ তিনি প্রাদেশিক পরিষদের নেতা ছিলেন। একই সময়ে আমি কিন্তু ছিলাম পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে।আমি বললাম, -জ্বি স্যার, আপনি নাকি তখন বয়সের দিক থেকে সর্ব কনিষ্ঠ এমএনএ ছিলেন?৩.আরও একদিনের ঘটনা। মুন্সিগঞ্জের জনৈক হিন্দু এমপি একটা ওষুধ প্রস্তুতকারী সংগঠনের আসন্ন নির্বাচনে তাঁর লোককে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য আমাকে একটি অনৈতিক ও গর্হিত প্রস্তাব করে বসেন। আমার রুমে বসেই তিনি এমন লোভনীয় প্রস্তাব দেন। তখন মহামান্য হাইকোর্ট থেকে আমাকে ঐ সংগঠনের ‘প্রশাসক’ নিয়োগ করা হয়েছিল। আমি তাঁর কথা শুনতে চাই নি। এমনকি আমার রুম থেকে তাঁকে দয়া করে চলে যেতে বলেছিলাম। সেদিন তিনি বেশ রাগান্বিত বদনে আমার কক্ষ ত্যাগ করেছিলেন। পরে জানতে পারি, সেদিনই তিনি সরাসরি মন্ত্রীর কক্ষে ঢুকে আমার সম্পর্কে আজেবাজে মন্তব্য করেন। এবং বলেছিলেন, - তোফায়েল ভাই, কোত্থেকে যে এসব জামায়াতি অফিসার খুঁজে পান জানি না। সেদিন মন্ত্রী তাঁর কথা শুনেছেন বটে। যদিও তেমন কিছু মন্তব্য করেন নি। তবে দুয়েকদিন পরে, হঠাৎ করে অনেকের উপস্থিতিতে বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলে ওঠলেন, -সেদিন তো মান্নানকে একজন এমপি জামায়াতের লোক বলে গেল। তখন কেউ কথা বলছেন না। সবাই চুপ,বিব্রত। নীরবতা ভেঙে আমি নিজেই বললাম, -স্যার, আমি এই প্রথম এমনটা শুনলাম। অবশ্য আগে আমাকে জাসদ, বাসদ, ছাত্রদল, নাস্তিক অনেক কিছু বলা হয়েছে। এবারই একেবারে চুড়ান্ত অভিধায় অভিষিক্ত হলাম স্যার! মন্ত্রী বললেন, -যাক এসব। আমি বুঝতে পেরেছি। তুমি তাকে কোনো পাত্তাই দাওনি মনে হয়। ৪.তিনি অসুস্থ। একদিন সন্ধ্যা বেলায় তাঁর বনানীর বাসায় দেখতে যাই। জানলাম তিনি উপরে রেস্ট নিচ্ছেন। ইদানিং তিনি বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে থাকেন। আমি ঘুরে ঘুরে বাসার নিচ তলায় সাজানো তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের দুর্লভ আলোকচিত্র ও সাদাকালো ফটোগ্রাফগুলি দেখছিলাম। যার সঙ্গে '৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়-স্মৃতির অমূল্য ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এমন সময় বাসায় প্রবেশ করলেন আরেক কিংবদন্তী ও জাতীয় ব্যক্তিত্ব তোফায়েল আহমেদের ঘনিষ্ঠ রাজনীতি-সহচর প্রয়াত নেতা আবদুর রাজ্জাকের পুত্র নাহিন রাজ্জাক। কথা বলছিলাম রাজ্জাক তনয়ের সঙ্গে। খানিক পরে তিনি শারীরিক অসুবিধা নিয়েই স্টিক হাতে ড্রয়িং রুমে নেমে আসলেন। নাহিনকে দেখে,- আরে তুই কখন আসলি?আমি লক্ষ করলাম, একজন বাবা ছেলেকে যেমন আদরের সুরে বলেন, তেমনি করে নাহিনকে বললেন এবং তাদের পারিবারিক খোঁজ-খবর নিলেন। তাঁর আম্মার কথা জিজ্ঞেস করলেন। সেদিন আমি এবং নাহিন এক সাথেই তাঁর সামনে বসেছিলাম। কী আশ্চর্য, সেদিনও তিনি আমার মেয়ের নতুন সংসার এবং জামাতার কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলেন নি।৫.মন্ত্রীর সামনে বসে দাপ্তরিক নানা বিষয়ে কথা বলার সময় প্রায়ই একটি বিষয় লক্ষ করতাম, তাঁর চেয়ার বরাবর পেছনের দেয়ালে ঝুলছে সাদা কাগজের ওপর কাঁচা হাতে আঁকা ফুল, পাখি, নীল আকাশ, নদী, বৃক্ষ ইত্যাদির নানান দৃশ্য। এগুলো তাঁর ছোট্ট নাতনির হাতের আঁকা। কাগজগুলি বাতাসে নড়ে গেলে তিনি নিজের হাতে সযত্নে দেয়ালে সেঁটে দিতেন। সেই ক্ষুদে অংকন শিল্পী তাঁর একমাত্র কন্যার মেয়ে। চেয়ার ঘুরিয়ে দেখতেন এবং নাতনির সঙ্গে হাসিমুখে আলাপ করতেন। মনে হয়, একজন সংবেদনশীল, কোমলপ্রাণ, শিশুবান্ধব মানুষ হিসেবেও তিনি অতুলনীয় ছিলেন। ৬.২০১৭ সালের শেষের দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হতে বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম হিসেবে বদলি হয়ে যাই। যাওয়ার আগে তিনি বললেন,-মান্নান তুমি তো চলে যাচ্ছ। তোমার স্থলাভিষিক্ত করে সেখানে কাকে দিব? আমি বললাম,- স্যার, এটা আপনার একান্ত পছন্দ। অনেকেই তো আছেন। - আচ্ছা, দেখি, কী করা যায়।চট্টগ্রামে চলে আসার মাস-দুই পরে একদিন রাত ১০টার দিকে হঠাৎ তাঁর ফোন। আমি কমিশনার বাংলোর ভেতরের ওয়াকওয়ে ধরে হাঁটছিলাম। রাতে হাঁটাহাঁটির অভ্যাস আমার বহু বছরের। হাঁটার অভ্যাসটা বোধকরি জীবিত কর্মক্ষম মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তোফায়েল আহমেদ বললেন,- মান্নান 'আই মিস ইউ'। তোমার মেয়েটা কোথায়? ও কি এখন ভালো আছে?আমি বিস্মিত হয়ে যাই। কথা বলতে পারছিলাম না। সঙ্গে সঙ্গে চোখে জল আসার মতন অবস্থা হলো।-স্যার আপনি ভালো আছেন?-খুব ভালো নেই। তোমার কাজটা এখন আগের মতো ওরা করতে পারছে না। তুমি করে দিতে পারতে।- স্যার, ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো কিছু দিন সময় লাগবে।ফোন শেষ করে মনে মনে বলছিলাম, ‘আই মিস ইউ’ এমন একটা বাক্য সারা জীবনে আমাকে আর কেউ কোনোদিন বলেনি। এটাই প্রথম এবং শেষ। ৭.আরেক দিনের কথা। তখন ২০২০ সাল। আমি করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। শারীরিক অবস্থা ভালো নেই। কয়েক মাস আগেই আমার স্ত্রী করোনায় মৃত্যুবরণ করেন। হাসপাতালে থাকাবস্থায় আমাকে বদলি করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হলো। বিষয়টি খুব অমানবিক ছিল। তবু কর্তৃপক্ষের ইচ্ছায় তা হয়েছিল। আমার কোনো কিছু বলার ছিল না। দু’দিন পরে হঠাৎ তোফায়েল আহমেদের ফোন।-মান্নান তোমাকে ওরা বদলি করে দিয়েছে? যাক্ কষ্ট নিও না। ওরা তোমাকে চিনতে পারে নি। থাকো কিছু দিন। দেখা যাবে।পরে শুনেছিলাম, সংসদেও তিনি আমার বদলির বিষয়টি তুলেছিলেন।৮.পৃথিবীর প্রতিটি কিংবদন্তির বাহ্যিক আচরণ ও অবয়বের আড়ালে একান্ত নিভৃতে, হৃদয়ের গহীন ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক মানবীয় কোমলপ্রাণ সত্তা। যা সহজে চোখে পড়ে না। সচরাচর বাইরে অদৃশ্য হয়ে থাকে তাঁর ভেতরের ভিন্নতর এমন রূপ। আর এসব গুণই কালক্রমে তাঁকে সাধারণ থেকে বিশেষ করে তোলে। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন সমগ্র দেশ, জাতি ও গণমানুষের বিবেক তথা মুখপাত্র। তখন তাঁর পরিচয় হয়ে যায় তিনি একজন জাতীয় নেতা বা জাতীয় ব্যক্তিত্ব। রাজনীতিবিদ এর ব্যক্তিক চরিত্রের ভালো মন্দ ছাপিয়ে গিয়ে, একজন ধ্রুবতারা নেতা, প্রাণবন্ত মানুষ তোফায়েল আহমেদের আত্মার চিরশান্তির জন্যে প্রার্থনা করছি। লেখক: সাবেক সচিব ও গল্পকার