সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
সুনামগঞ্জের হক সুপার মার্কেটে অ‌গ্নিকাণ্ড

সুনামগঞ্জের হক সুপার মার্কেটে অ‌গ্নিকাণ্ড

সুনামগঞ্জ শহরের ব্যস্ততম প্রাণকেন্দ্র ট্রাফিক পয়েন্ট সংলগ্ন হক সুপার মার্কেটে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে। শহ‌রের পুরাতন শহীদ মিনা‌রের উল্টো পা‌শে জুতার মা‌র্কেটেও আগুন লে‌গে‌ছে। পা‌শে থাকা এক‌টি ম‌্যাচলাইটের গোডাউন থে‌কে আগু‌নের সূত্রপাত হ‌য়ে‌ছে ব‌লে ধারণা করা হ‌চ্ছে। আকস্মিক এই অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তের মধ্যেই আগুনের লেলিহান শিখা মার্কেটের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বেশ কয়েকটি দোকান ভস্মীভূত হয়েছে। আগুনের তীব্রতা এতই বেশি যে দূর-দূরান্ত থেকেও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছে। জনবহুল এই এলাকায় আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মাঝে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ে‌ছে। ​ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করলেও আগুনের ভয়াবহতা ও সরু গলির কারণে তারা বেশ বেগ পোহাচ্ছেন। বাজারের দাহ্য পদার্থ ও ঘনবসতিপূর্ণ কাঠামোর কারণে আগুনের তীব্রতা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। প্রাথমিক অবস্থায় কয়েকটি দোকান সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। ​ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানানো হয়েছে, পানির স্বল্পতা এবং বাতাসের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগছে, তবে তারা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। স্থানীয় জনসাধারণও অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের সাথে আগুন নেভানোর লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন। সোমবার (৩০ মার্চ) মধ্যরাতের এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়‌নি।
২৭ মিনিট আগে

মতামতমতামত

’৬৯ আর ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি-ঘর কোথায়

অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ নামে তড়িঘড়ি করে একটি অধ্যাদেশ জারি করে গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করার কার্যক্রম শুরু করে। ঐ গণভবনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থাকতেন এবং জুলাই আন্দোলনের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সব কার্যক্রম গণভবন থেকেই পরিচালিত হচ্ছিল। জুলাই আন্দোলনে অগণিত মৃত্যু, চোখ হারানো, পংগু হয়ে পড়া আহতের আর্তনাদ, স্বজনহারা পরিবারের মানুষগুলোর আহাজারি মানুষের বিবেককে স্পর্ষ করেছিল। সেই আবেগকে ব্যবহার করে মুহাম্মদ ইউনূস ‘প্রতিহিংসার বশে’ গণভবনকে জুলাই স্মৃতি যাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিনা। সেটা একটা বড় প্রশ্ন। কিন্তু গণভবন তো শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাড়ি না, এটা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সরকার প্রধানের আবাসিক ভবন। এটা ইউনূস সাহেবের পৈতৃক সম্পত্তি নয় যে, তিনি ইচ্ছা করলেন আর সরকারি সম্পত্তিকে তার ‘স্মৃতির যাদুঘর’ বানিয়ে ফেললেন।জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ঘর থাকতেই পারে। তবে সেটা সরকার প্রধানের বাসভবনের জন্য নির্মিত স্থাপনায় কেনো করতে হবে? বিশেষত সরকার প্রধানের বাসভবনের মত স্পর্শকাতর স্থাপনার জন্য স্থান, জায়গার পরিসর, নিরাপত্তা ইস্যু ইত্যাদি নানা বিষয় বিবেচনা করে তা নির্ধারণ করতে হয়। জুলাই স্মৃতি ঘরের জন্য সেগুলো অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অন্য যেকোনো স্থানেই তা হতে পারে। আর এ দেশটাই তো গণঅভ্যুত্থানের দেশ। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পথ বেয়েই তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের এবং দীর্ঘ সময়ের নামে বেনামে সামরিক শাসনের পতন। ’৬৯ বা ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের জন্য তো পৃথক কোনো স্মৃতি ঘর নাই। তাহলে শুধু ’২৪-এর জন্য আলাদা স্মৃতি ঘর লাগবে কেনো? বরং স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের স্মৃতি যাদুঘর নির্মাণ করে ’৬৯, ’৯০, ’২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। যা থেকে পরবর্তী প্রজন্মসহ সবাই একপেশে বা খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির বদলে দেশ এবং দেশের গণআন্দোলনের বৈচিত্র্যময় নানা পর্ব ও উপাদান সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা পেতে পারেন।কিন্তু না, মুহাম্মদ ইউনূস ‘ইতিহাসের একক নায়ক’ হতে চান। আর তা হতে হলে মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের সব গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের ক্ষেত্রে তো রিসেট বাটন চাপ দিতে লাগবে। আবার ’২৪-এর জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে উগ্রবাদী ধর্মান্ধ শক্তির উত্থান ঘটেছে, তারাও এদেশের মানুষের গণসংগ্রামের ইতিহাসকে এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী নিজেদের কলঙ্কিত অধ্যায়কে যে কোনো প্রকারে ঢেকে ফেলার গভীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। সে ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই তারা জুলাই ’২৪ দিয়ে ’৭১ কে ঢেকে ফেলার প্রয়াস চালিয়ে আসছে। সে লক্ষ্যেই জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে তারা আঘাত হানে মুক্তিযুদ্ধের সব স্মারক, স্মৃতি, স্তম্ভ ও ভাস্কর্যের ওপর। ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশ্রয়ে একাধিকবার আঘাত হেনে ও অগ্নিসংযোগ করে ধানমন্ডি বত্রিশের ঐতিহাসিক বাড়িটি গুড়িয়ে দেয়া হয়।আজকের প্রজন্ম ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সম্পর্কে, শহীদদের সম্পর্কে কতটুকু জানেন? জানেন কি ঐ অভ্যুত্থানে কতজন শহীদ হয়েছিলেন? কি ভাবে জানবেন? সারা দেশে ’৬৯-এর অসংখ্য শহীদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা পর্যন্ত করা হয়নি। শহীদদের মধ্যে তরুণ আসাদ, কিশোর মতিউর, রুস্তম, গৃহবধূ আনোয়ারা কিংবা শহীদ ড. শামসুজ্জোহা এরকম কয়েকটি নাম আমরা গণঅভ্যুত্থান দিবসের দিনে শুনতে পাই। অথচ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক, কর্মচারী শহীদী মৃত্যুবরণ করেন। নরসিংদীর হাতিরদিয়া ও রায়পুরায় কৃষক এবং ঢাকার আদমজী, ডেমরা, টঙ্গী এবং খুলনার দৌলতপুর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ও আত্মদান আন্দোলনে বিশেষ মাত্রা সৃষ্টি করে।তৎকালীন ডাকসু, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের উভয় অংশ এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সমন্বয়েছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ’৬৯-এর জানুয়ারি থেকেই শুরু হয় আন্দোলনের নানা কর্মসূচি। এক পর্যায়ে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের একাংশও এসে মিলিত হয় এ আন্দোলনে। এই আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থী বা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নয়, বরং কৃষকদের মধ্যে, শ্রমিকদের মধ্যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৬৬ সনে সূচিত ছয়দফা দাবিতে যে স্বাধীকার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল তা পূর্ণতা পায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচিতে।জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী রাজনীতির ঐক্যের ফলে ছাত্র সমাজ ও মেহনতি জনতার মাঝে এক ধরনের একতার বাতাবরণ সৃষ্টি হয়। আন্দোলন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আইউব শাহীর পতনের মধ্য দিয়ে গনঅভ্যুত্থান সফলতা লাভ করে। কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন শেখ মুজিব, মনি সিংহ সহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সেল বলা যেতে পারে। তাই এই ঐতিহাসিক ও গৌরবের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের বিরোধীরা পাশ কাটাতে চায়- যেমনটা তারা বলে বাংলা ভাষা আন্দোলন করা ভুল হয়েছিল। তাদের নেতা গোলাম আজমের স্পষ্ট বয়ান ছিলো, ’মুসলমানদের তমুদ্দীন ও ধর্মীয় জ্ঞানের ভাণ্ডার উর্দু ভাষায় সংরক্ষিত রয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ হইতে ভাষা আন্দোলন করা সঠিক হয় নাই।’আবার এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে গোলাম আজমের দল কখনও সরবে ও কখনও নীরবে যুক্ত থাকলেও ১৯৯০-এর গনঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বীরত্ব গাঁথা ও আত্মত্যাগকে তারা খুব একটা সামনে আনতে চায় না। কারণ ’৯০ এর গণঅভ্যুত্থান সামনে আসা মানেই অভ্যুত্থানের মশাল জ্বালানো ডা. মিলন, কমরেড তাজুল, পুলিশ কতৃক ট্রাকের চাকায় পিষ্ট ছাত্র নেতা সেলিম, দেলোয়ার, রাউফুন বসুনিয়া, শাহজাহান সিরাজ, এক জটিল পর্বে আসলাম কিংবা ছাত্র কর্মী জয়নাল, জাফর, কান্চন, মোজাম্মেল, জেহাদ, খেতমজুর নেতা টিটো, বা রাজনৈতিক নেতা ময়েজউদ্দীনের আত্মদানের কাহিনী সামনে আসা। ’৯০ কে সামনে আনা মানেই অতি সাধারণ মানুষের হাতে লেখা ও বুকে পিঠে আঁকা ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ হয়ে যায় সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা। শহীদ নূর হোসেন যেন গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতীক।এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের আয়োজন পর্ব তথা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী গণসংগ্রাম এবং তার সমাপ্তি পর্বের মূল শক্তি ছিলো দেশের গনতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তি। এ অভ্যুত্থানের পথ বেয়েই বিএনপি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও অভ্যুত্থানে শহীদের তালিকা প্রণয়ন ও স্মৃতি সংরক্ষণে বিশেষ কিছু করা হয় নি। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে নতুন সরকারকে এ দায়িত্ব নিতে হবে।’৬৯ আর ’৯০কে, ’৫২ আর ’৭১ কে উগ্রবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ২০২৪ দিয়ে ঢেকে ফেলার প্রচেষ্টায় উন্মত্ত। ইউনূসও ‘রিসেট বাটন’ টিপে দেশের সব গৌরব গাঁথাকে বিশেষত দেশের মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলার প্রয়াসকে ১৮ মাস যাবত মদত দিয়ে গেলেন। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন সম্পন্ন না হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দেশে এখন একটি নির্বাচিত সরকার। বিজয়ী দল বিএনপি দাবি করে তাদের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ঘোষক’। নিশ্চয়ই ২৫ মার্চের কাল রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নিরস্ত্র জনতার উপর সশস্ত্র আক্রমণ এবং নির্বিচার গনহত্যার পরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার ঘোষণার ঐতিহাসিক মূল্য আছে। বেংগল রেজিমেন্ট তথা বাঙালি সশস্ত্র বাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনতা যুদ্ধে শামিল হওয়ায় গোটা জাতি উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। এই ভূমিকাকে অস্বীকার করা মানে ইতিহাসকে এককেন্দ্রীক করে ফেলা। তবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘ ২৫ বছরের গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম ও আত্মদানের ইতিহাস এবং সেই সব সংগ্রামের নেতৃত্বকে যদি অস্বীকার করা হয় বা ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গণরায়কে গুরুত্ব দেয়া না হয় তাহলেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ফলে জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ে। যার সুযোগ নিয়ে দেশের জন্ম যুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এবারে যদি এসব প্রশ্নে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে পারে, তবে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।তবে গত বছরের ৫ আগস্ট ইউনূসের ‘জুলাই ঘোষণা’ তে কিন্তু ইতিহাসের চরম বিকৃতি করা হয়েছে। এবং তার পরে ঘোষণা করলেন ‘জুলাই সনদ’। সেখানেও রয়েছে ইতিহাসের বিকৃতি। ইউনূসকে ইতিহাসের বয়ান রচনা করার দায়িত্ব তো দেয়া হয়নি। তবু তিনি তা করলেন এবং দেশের ইতিহাসকে জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেললেন কোন ক্ষমতা বলে? বাংলাদেশের সংগ্রাম মুখর ইতিহাসে তার ভূমিকা কি? অসংখ্য ইতিহাস বিকৃতির এক বয়ান নোবেল লরিয়েট পঠিত ঘোষণাপত্রে উঠে এসেছে- যা নতুন করে বিভাজন সৃষ্টির ঘোষণা হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে। জুলাই সনদ ঘোষণার পরে বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতিহাস বিকৃতির বিষয়ে আপত্তি না জানালেও ভিন্ন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘এটা জনগণের সঙ্গে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের একটা প্রতারণা’। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেয়ার অধিকার প্রধান উপদেষ্টা বা অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। বিশ্বাসভংগ ও প্রতারণা করে আমাদের অগোচরে জুলাই সনদের স্বাক্ষরিত কপি বদলে ফেলা হয়েছে। যা আলোচনা হয়েছে তা সুপারিশে নাই।’সুতরাং খুব স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী দলের উপর বিতর্কিত জুলাই সনদকে বা জুলাই গণুঅভ্যুত্থান অধ্যাদেশকে আইনি ভিত্তি দেয়ার দায়িত্ব পড়ে না। জুলাই গনঅভ্যুত্থানের জন্য দায়মুক্তি লাগবে কেনো? ’৬৯ ও ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে তো দায়মুক্তি লাগে নাই। তাহলে কি অভ্যুত্থানের আড়ালে এমন কিছু করা হয়েছে যার জন্য দায়মুক্তি লাগবে? দেশি-বিদেশি পত্র-পত্রিকায় ও মিডিয়ায় ‘স্নাইপার শুট’ এবং পুলিশ হত্যা ও অস্ত্র লুট ( যা এখনও জমা পড়েনি বা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি) নিয়ে নানা কথা আসছে। জীবনকে সম্মান জানাতে হবে। সে জীবন আন্দোলনকারীর হোক আর পুলিশেরই হোক। সুতরাং এ বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া দায় মুক্তি কার্যকর করা হলে আইনের প্রতি অবিচার করা হবে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মদানকারীদের পরিবাররা এবং অভ্যুত্থানের পরে মব হামলায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে সহায়তা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগ জারী রাখতে হবে।জুলাই আন্দোলনে আত্মদানের আবেগকে পুজি করে ‘প্রতিহিংসা মূলক’ জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশকেও আইনি স্বীকৃতি দেয়ার দায় নির্বাচিত সংসদের নেই। জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি রক্ষায় নির্বাচিত সরকার একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে ভারসাম্যপূর্ন একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের স্মৃতি যাদুঘর নির্মাণ করে ’৬৯, ’৯০, ’২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। একটি অনির্বাচিত সরকার যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একপেশে অধ্যাদেশগুলো জারি করেছে, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে পরিবর্তন এনে নির্বাচিত সরকারকেই ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।গত কয়েকদিনে ১/১১-এর অন্যতম কুশিলব লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (অব.) ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মামুন খালেদের গ্রেপ্তারের খবর দেখে মনে পড়লো পশ্চিমা শক্তির উপর নির্ভরশীল ইউনূসও তো ধোয়া তুলসী পাতা নন। তিনি কিন্তু ১/১১-এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ তত্ত্বে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনোভাব পরিবর্তন করায় ঐ ফর্মুলা কার্যকর হবে না বুঝতে পেরে দ্রুত তিনি দল গঠনের প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসেন। ড. ইউনূসকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও ১/১১-এর অনেক রহস্য উদ্ঘাটিত হতে পারে।ইউনূস পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তার দোস্তির দায় বিএনপির উপর চাপিয়ে দিয়ে গেলেন। নির্বাচনের তিনদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অপ্রকাশযোগ্য যে দেশ বিরোধী চুক্তি তিনি তাড়াহুড়ো করে করলেন তা সামাল দিতে পশ্চিমা পছন্দের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাদের মন্ত্রীসভায় জায়গা করে দিতে হলো। ড. ইউনূস দিল্লির জেন জির থেকে বের হওয়ার ভান করে কৌশলে বাংলাদেশকে আষ্টে পৃষ্ঠে বেধে দিয়ে গেলেন মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে। জামাত ও এনসিপিও আপাতত মার্কিনী স্বার্থের বিরোধী অবস্থানে যাবে না। বরং নানাভাবেই তারা মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ক্ষমতার বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার মোহে।কিন্তু বিএনপিকে এটা মনে রাখতে হবে ভোটারদের একটা বড় অংশ যারা বিএনপিকে পছন্দ না করলেও ধানের শীষে ভোট দিয়েছে এই আশা নিয়ে যে, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপোষ করবে না। উগ্র ধর্মান্ধ শক্তির কাছে নত হবে না। দেশে আর মব সংস্কৃতির চাষাবাদ করতে দেবে না এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সব রাজনৈতিক দলের স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার পরিবেশকে নিশ্চিত করবে। শুধু ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করে বিএনপি বেশি দিন জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারবে না। এ রকম বহু কার্ড পূর্বের সরকারও বিতরণ করেছে। সরকারকে নজর দিতে হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আর ব্যবসা বানিজ্যে কর্মচঞ্চলতা ফিরিয়ে আনতে। সরকারকে নজরে রাখতে হবে, দীর্ঘ কাল যাবত চলে আসা দখলদারী আর চাঁদাবাজির যে সংস্কৃতি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আস্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে তা থেকে বেরিয়ে এসে কিভাবে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা যায়। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে খণ্ডিতভাবে নয় বরং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ক্যানভাসে ধারণ করতে হবে ’৫২-এর ভাষা সংগ্রাম, ’৬৯, ’৯০, আর ২০২৪-এর স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামকে।দেশে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনে বিচার বিভাগ সহ-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ অবস্থা থেকে মুক্ত করে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা, সাংবিধানিক পদাধিকারীগণের জন্য স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কমানো ও রাষ্ট্রপতির পদকে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর আজ্ঞাবহ অবস্থা থেকে বের করে আনা এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও পরিবারতন্ত্রের অবসানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা কিন্তু বিমূর্তভাবে হলেও মানুষের মাঝে রয়েছে। নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি তো দীর্ঘদিনের।সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে এ সব সংস্কারে বিএনপিকে উদ্যোগী হতে হবে। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সংবিধানে এমন কোনো সংযোজন বিয়োজন করে সমাজে বিভাজন ও অস্থিরতা সৃষ্টি করা যাবে না। আদিবাসীসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ নানাবিধ সংস্কার কাজ সামনের দিনগুলোতে রয়েছে।[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা](লেখকের নিজস্ব মত)

সড়ক দুর্ঘটনা: জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি, কারণ ও করণীয়

সম্প্রতি রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার ঝুঁকিপূর্ণ চিত্রকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সার্বিক অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। বর্তমান বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনা একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে, আর বাংলাদেশে এটি এখন এক ভয়াবহ সামাজিক সংকট। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক বা নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটছে, যার ফলে ঝরে যাচ্ছে অমূল্য প্রাণ, ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার।বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার উন্নত বিশ্বের তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। বিআরটিএর জরিপ মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ২৩ হাজার ১৬৬ জন মানুষ নিহত হয়। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক যুগে দেশে ৬৭ হাজার ৮৯০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৭২৬ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২১ জন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশ। রাজধানী ঢাকা এবং মহাসড়কগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনার চিত্রও কম ভয়াবহ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় এবং প্রতিদিন এক হাজারের বেশি শিশু ও তরুণ প্রাণ হারায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর প্রায় ৯৬ শতাংশই ঘটে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে। অর্থাৎ বাংলাদেশসহ এ ধরনের দেশগুলোয়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৬,৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯,১১১ জন নিহত এবং ১৪,৮১২ জন আহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় সারা দেশে ৮ হাজার ৫৪৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছে ১২ হাজার ৬০৮ জন। এর মধ্যে ২ হাজার ৩২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ৩ হাজার ১৫১ জন। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ১.৫৪ শতাংশ, নিহতের সংখ্যা ৭.৫০ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ১৭.৭৩ শতাংশ বেড়েছে। নৌ ও রেলপথেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটে। তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে রেলপথে ৪৯৭টি দুর্ঘটনায় ৫১২ জন নিহত এবং ৩১৫ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ১১৮টি দুর্ঘটনায় ১৮২ জন নিহত, ২৬৭ জন আহত এবং ১৫৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ২ হাজার ৩২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত এবং ৩ হাজার ১৫১ জন আহত হয়েছেন। গত ১০ বছরে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে বেড়ে ৬০ লাখ হয়েছে। নতুন করে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তায় চলাচলের পাশাপাশি ছোট যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং এসব যানবাহনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে ১৬৮ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১ হাজার ৯৫২ চালক, ১ হাজার ৮৭৯ পথচারী, ৬২২ পরিবহন শ্রমিক, ৭৫৫ শিক্ষার্থী, ১২৬ শিক্ষক, ১ হাজার ২০৬ নারী, ৬৫৮ শিশু, ৪৮ সাংবাদিক, ১৭ চিকিৎসক, ১৬ বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১ চিত্রনায়ক, ৬ আইনজীবী, ১২ প্রকৌশলী এবং ২১৫ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় পাওয়া গেছে।তথ্যানুযায়ী, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৫০.৮৪ শতাংশ পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়া, ২৪.৩৯ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৮.৯২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া, ৪.৯৯ শতাংশ বিবিধ কারণে এবং ০.৭৩ শতাংশ ট্রেনের সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষের কারণে হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার ৩৫.৬৭ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে, ২১.৬৬ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ৩৫.৮১ শতাংশ ফিডার রোডে এবং ৪.৯৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঢাকা মহানগরীতে এবং ১.২০ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে ঘটেছে। শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬২১টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬০৮ এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১ হাজার ১০০ জন মানুষ। এর মধ্যে ২৭১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৬৪ জন, ৪টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৬ জন ও দুজন আহত হয়েছেন। ২২টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন।বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো চালকদের অদক্ষতা, অসচেতনতা এবং বেপরোয়া মনোভাব। অনেক চালকই যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই গাড়ি চালান, আবার অনেকেই লাইসেন্সবিহীন। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলফোন ব্যবহার— এসব আচরণ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। অনেক পুরনো ও অচল যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে, যা যে কোনো সময় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতাও একটি বড় সমস্যা। ভাঙাচোরা রাস্তা, ডিভাইডারের অভাব, অপর্যাপ্ত ট্রাফিক সিগন্যাল ও ফুটওভারব্রিজের স্বল্পতা দুর্ঘটনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং দুর্নীতিও একটি বড় কারণ। ট্রাফিক আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ ও অনিয়মের কারণে অযোগ্য চালক লাইসেন্স পেয়ে যায় এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল অব্যাহত থাকে। একই সঙ্গে পথচারীদের অসচেতনতা যেমন যেখানে-সেখানে রাস্তা পারাপার-দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু প্রাণহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে পুরো পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। এ ছাড়া প্রতি বছর দেশের অর্থনীতিতে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়, যা জাতীয় উন্নয়নকে ব্যাহত করে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যে ক্ষতি হয় তার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির দুই ভাগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, আন্তর্জাতিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ডলার। উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে এর পরিমাণ ৬৫ বিলিয়ন ডলার।এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং আইন ভঙ্গকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও কঠোর করতে হবে, যাতে অযোগ্য কেউ গাড়ি চালাতে না পারে। তৃতীয়ত, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি-প্রশস্ত রাস্তা, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।এ ছাড়া যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা নিয়মিত করা এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষকে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। চালক, যাত্রী ও পথচারী-সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল আচরণই পারে দুর্ঘটনা কমাতে।সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; বরং এটি প্রতিরোধযোগ্য। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং কার্যকর পদক্ষেপ। আমরা যদি সবাই নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি এবং আইন মেনে চলি, তাহলে সড়ককে মৃত্যুকূপ থেকে নিরাপদ যাত্রাপথে রূপান্তর করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, জীবনের মূল্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

ইরান যুদ্ধ: বাংলাদেশের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রভাব আর শুধু আঞ্চলিক সীমায় আটকে নেই। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং বৈশ্বিক বাজারব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার ঢেউ এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। জ্বালানি তেলের দাম থেকে শুরু করে রান্নাঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার— সবকিছুতেই ব্যয়ের চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে।বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানির একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। সেখানে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জ্বালানি ও পণ্যের পরিবহন ব্যয়ে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্যমতে, শিপিং খরচ বাড়ার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে খুচরা বাজারে না পড়লেও কিছু সময় পর তা মুদ্রাস্ফীতিকে দীর্ঘমেয়াদে উসকে দেয়। ইতোমধ্যে সুপারট্যাংকারের ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া এই সংকটের গভীরতাকে স্পষ্ট করে।বাংলাদেশ যেহেতু বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল, গ্যাস এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য আমদানি করে, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশে দ্রুত অনুভূত হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, যা সরাসরি পণ্য পরিবহন ব্যয়ে প্রতিফলিত হয়। এর ফলে পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দাম বাড়তে থাকে। বাস ভাড়া, ট্রাক ভাড়া, এমনকি নৌপথের খরচও বেড়ে গিয়ে সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায়।এই সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতে। বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন অনেকাংশে নির্ভর করে রাসায়নিক সার, সেচব্যবস্থা এবং জ্বালানির ওপর। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল সারের কাঁচামাল এবং ইউরিয়া উৎপাদনের একটি প্রধান উৎস। সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হলে বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে। ইতোমধ্যে ইউরিয়া সারের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে, যা বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে।বর্তমানে বোরো ধান উৎপাদনের মৌসুম চলছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মৌসুমে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও সঠিক মূল্য নিশ্চিত না হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে সারের দাম কেজিপ্রতি কয়েক টাকা থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না, যা উৎপাদন পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।সারের পাশাপাশি সেচব্যবস্থার খরচও বাড়ছে। দেশের অধিকাংশ সেচপাম্প ডিজেলচালিত হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সেচ খরচও বেড়ে যায়। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে কৃষকের লাভের পরিমাণ কমে যায়। ফলে কৃষকের ওপর দ্বৈত চাপ সৃষ্টি হয়— একদিকে বাড়তি বিনিয়োগ, অন্যদিকে অনিশ্চিত বাজারমূল্য।এই বাড়তি উৎপাদন খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপিয়ে দেয়া হয়। ফসল বাজারে এলে কৃষকরা সেই বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হন। একই সময়ে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি ধাপে দাম আরও বাড়ে। ফলে শহর ও গ্রামের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠী, খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপে পড়ে।বাংলাদেশের জ্বালানি খাতও এই সংকটে ঝুঁকির মুখে। এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা থাকায় বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বাড়লে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে প্রভাব পড়ে। এতে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়ে এবং উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পায়। শিল্প খাতে এই চাপ অর্থনীতির সামগ্রিক গতিকে মন্থর করতে পারে।একই সময়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনও চলমান, যা জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন ধরে অস্থির করে রেখেছে। এর সঙ্গে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যুক্ত হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয় যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো আঞ্চলিক সংঘাতও দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমদানিনির্ভরতার কারণে বহির্বিশ্বের অস্থিরতা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। তাই দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতা কমানোর বিকল্প নেই। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সারের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি নাগরিক পর্যায়েও সচেতনতা জরুরি। বাড়ির আঙিনা, ছাদ বা পতিত জমিতে চাষাবাদ বাড়ানো একটি সহায়ক উদ্যোগ হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে পারলে বাজারের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য সহায়তা, বাজার তদারকি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।সব মিলিয়ে, দূরের যুদ্ধ এখন আর দূরের বিষয় নয়। এর প্রভাব আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় সরাসরি অনুভূত হচ্ছে। তাই এই সংকটকে সাময়িক হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নেয়াই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়। বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশে প্রতিটি ইঞ্চি জমির সঠিক ব্যবহার এবং সুসংগঠিত নীতি বাস্তবায়নই হতে পারে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কার্যকর পথ।[লেখক: সাবেক ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা] 

সম্পর্কের ভাঙন ও আত্মহনন: উত্তরণের পথ

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী কিংবা নববিবাহিত শিক্ষিত নারীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো আমাদের সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; বরং এগুলো আমাদের সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক মূল্যবোধ, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। প্রেমে ব্যর্থতা বা দাম্পত্য জীবনের সংকটকে কেন্দ্র করে যে মানসিক বিপর্যয় তৈরি হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে এমন এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়, যা সমাজে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে, অথচ প্রতিরোধযোগ্য ছিল। তাই এই বিষয়গুলোকে আবেগ দিয়ে নয়, বরং যুক্তি, সহমর্মিতা এবং সামাজিক বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করা জরুরি। আত্মহত্যার এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়; অতীতেও আমরা বারবার একই চিত্র দেখেছি। প্রেমঘটিত ব্যর্থতা, দাম্পত্য কলহ, মানসিক আঘাত— এইসব কারণকে সামনে রেখে অনেকেই জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। প্রথম দৃষ্টিতে বিষয়টি ব্যক্তিগত আবেগের বিস্ফোরণ বা দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ মনে হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে এর পেছনে রয়েছে জটিল সামাজিক কাঠামো, মানসিক চাপ, সাংস্কৃতিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সংকটের সমন্বিত প্রভাব।বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোতে পরিবার, বিবাহ এবং সামাজিক মর্যাদা একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বিবাহকে জীবনের এক অনিবার্য ও চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষিত নারীরাও এই প্রচলিত ধারণা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নন। ফলে যখন কোনো প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যায় কিংবা দাম্পত্য জীবনে অশান্তি দেখা দেয়, তখন তা শুধু একটি সম্পর্কের সমাপ্তি নয়; বরং ব্যক্তির আত্মপরিচয়, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে অনুভূত হয়। এই আঘাত অনেক সময় এতটাই গভীর হয় যে ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, অপ্রয়োজনীয় কিংবা অসহায় মনে করতে শুরু করে।পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে। এখানে নারীর পরিচয় প্রায়ই নির্ধারিত হয় তার পারিবারিক সম্পর্কের মাধ্যমে— সে কার মেয়ে, কার স্ত্রী, কিংবা কার মা। এই নির্ভরশীল পরিচয় কাঠামো নারীদের আত্মমর্যাদাকে ভঙ্গুর করে তোলে। যখন সম্পর্ক ভেঙে যায়, তখন সেই ভাঙন কেবল আবেগগত নয়, অস্তিত্বগত সংকটে রূপ নেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ, গুজব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারও সহানুভূতির জায়গা থেকে পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়; বরং ‘মানসম্মান’ রক্ষার মানসিকতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে ভুক্তভোগী নারী নিজেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন, একা এবং অসহায় মনে করতে থাকে।মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত সাধারণত হঠাৎ করে নেয়া হলেও এর পেছনে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও দমিয়ে রাখা কষ্ট কাজ করে। প্রেমের ব্যর্থতা বা দাম্পত্য দ্বন্দ্ব অনেক সময় একটি ট্রিগার হিসেবে কাজ করে, যা আগে থেকে জমে থাকা হতাশা, একাকিত্ব, আত্মসম্মানহীনতা এবং অবমূল্যায়নের অনুভূতিকে বিস্ফোরিত করে। এই অবস্থায় ব্যক্তি একটি সংকীর্ণ মানসিক ফ্রেমে আটকে পড়ে, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কগনিটিভ টানেলিং’ বলা হয়। এই অবস্থায় মানুষ তার বর্তমান কষ্ট ছাড়া আর কিছু দেখতে পায় না; ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, আশেপাশের মানুষের ভালোবাসা কিংবা জীবনের অন্য অর্থপূর্ণ দিকগুলো তার দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। মা-বাবার স্নেহ, ভাই-বোনের ভালোবাসা, বন্ধুদের আন্তরিকতা— সবকিছু যেন মুহূর্তের জন্য গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। এটি কোনো ইচ্ছাকৃত অবহেলা নয়; বরং গভীর মানসিক বিপর্যয়ের একটি লক্ষণ।নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা জীবনকে অমূল্য বলে মনে করি এবং আত্মহত্যাকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও বেদনাদায়ক পরিণতি হিসেবে দেখি। প্রায় সব ধর্ম ও সংস্কৃতিতেই জীবন রক্ষার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তবে কেবল ‘আত্মহত্যা ভুল’ এই বক্তব্য দিয়ে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন সহমর্মিতা, বোঝাপড়া এবং কার্যকর সহায়তা ব্যবস্থা। নৈতিকতার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে মানবিকতায়— মানুষের কষ্টকে উপলব্ধি করা এবং সেই কষ্ট লাঘবে পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নৈতিক দায়িত্বের বাস্তব প্রয়োগ ঘটে। এই প্রেক্ষাপটে সমাজ, পরিবার এবং রাষ্ট্র— সবারই একটি সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। আমাদের সমাজে এখনও মানসিক সমস্যাকে দুর্বলতা বা লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়, যা মানুষকে সাহায্য নিতে নিরুৎসাহিত করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদার কাউন্সেলিং সেবা চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক উন্মুক্ত আলোচনা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত, পরিবারকে হতে হবে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল, যেখানে সন্তানরা নির্ভয়ে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। বিচার নয়, প্রয়োজন সহানুভূতি এবং মনোযোগ দিয়ে শোনা। তৃতীয়ত, নারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর না হলে অনেক নারী অস্বাস্থ্যকর বা নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকেও বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে তারা এক ধরনের মানসিক বন্দীত্বের মধ্যে বসবাস করে, যা দীর্ঘমেয়াদে হতাশা ও আত্মঘাতী প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে নারীদের আত্মনির্ভর করে তোলা এই সমস্যার একটি মৌলিক সমাধান হতে পারে। চতুর্থত, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অপরিহার্য। প্রেমে ব্যর্থতা, সম্পর্ক ভাঙন কিংবা বিবাহবিচ্ছেদকে এখনও আমাদের সমাজে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে মানুষ তার ব্যক্তিগত সংকটকে লজ্জার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করবে এবং সাহায্য চাইতে দ্বিধা বোধ করবে। সম্পর্কের ভাঙনকে জীবনের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ব্যর্থতা মানেই জীবনের সমাপ্তি নয়— বরং নতুনভাবে শুরু করার একটি সুযোগ। পঞ্চমত, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে জাতীয় নীতি প্রণয়ন, জরুরি হেল্পলাইন চালু, সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম যেন সংবেদনশীলভাবে এই ঘটনাগুলো উপস্থাপন করে এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নববিবাহিত শিক্ষিত নারীদের জন্য কিছু বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে না দেখে, এটিকে জীবনের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। নিজের স্বপ্ন, লক্ষ্য এবং ব্যক্তিগত পরিচয় বজায় রাখা জরুরি। দাম্পত্য সম্পর্কে খোলামেলা যোগাযোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়; সমস্যা হলে তা চেপে না রেখে আলোচনা করা উচিত। পাশাপাশি, বিবাহের পরেও বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য সহায়ক। প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলিং নেয়াও একটি ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গেলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। এখনও অনেক মানুষ মানসিক সমস্যাকে দুর্বলতা বা লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখে, ফলে তারা সাহায্য নিতে সংকোচ বোধ করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কাউন্সেলিং সেবা চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন।দ্বিতীয়ত, পারিবারিক যোগাযোগের উন্নতি অপরিহার্য। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তানরা তাদের সমস্যাগুলো পরিবারকে বলতে পারে না, কারণ তারা ভয় পায়— তাদের বিচার করা হবে বা বোঝা হবে না। পরিবারকে এমন একটি নিরাপদ স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সন্তানরা নির্ভয়ে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে।তৃতীয়ত, নারীদের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখায় উল্লেখিত বিষয়, পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা ছাড়া বিয়ে না করা— এটি একটি বাস্তবসম্মত পরামর্শ। অনেক নারী অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হওয়ার কারণে একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক থেকেও বেরিয়ে আসতে পারে না। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের স্বনির্ভর করে তোলা হলে তারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আরও স্বাধীনভাবে নিতে পারবে।চতুর্থত, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের সমাজে এখনও প্রেম, সম্পর্ক ভাঙন কিংবা বিবাহবিচ্ছেদকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে মানুষ সম্পর্কের সংকটে পড়ে নিজেকে একা ও অসহায় মনে করবে। সম্পর্ক ভাঙনকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।পঞ্চমত, রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধ নীতি, হেল্পলাইন সেবা এবং সহজলভ্য কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এ ছাড়া গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ— তারা যেন দায়িত্বশীলভাবে এই বিষয়গুলো উপস্থাপন করে এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।নববিবাহিত নারীদের জন্য বিশেষভাবে কিছু দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বিবাহকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে না দেখে, এটি একটি অংশ হিসেবে দেখা উচিত। নিজের ব্যক্তিগত স্বপ্ন, লক্ষ্য এবং পরিচয় বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত, দাম্পত্য সম্পর্কে খোলামেলা যোগাযোগ অপরিহার্য। সমস্যা হলে তা চেপে না রেখে আলোচনা করা উচিত।তৃতীয়ত, সামাজিক সহায়তা নেটওয়ার্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহের পর অনেক নারী তাদের বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়, যা তাদের একাকীত্ব বাড়ায়। এই সম্পর্কগুলো বজায় রাখা মানসিকভাবে শক্তিশালী থাকতে সাহায্য করে।চতুর্থত, প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নেয়া উচিত। কাউন্সেলিং বা থেরাপি কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়; বরং এটি নিজের যত্ন নেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সবশেষে বলা যায়, আত্মহত্যা একটি জটিল সামাজিক ও মানসিক সমস্যা, যার সমাধান একক কোনো পদক্ষেপে সম্ভব নয়। এটি মোকাবিলার জন্য ব্যক্তিগত সচেতনতা, পারিবারিক সহমর্মিতা, সামাজিক পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ— সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। জীবন সত্যিই অমূল্য, কিন্তু এই সত্যটি উপলব্ধি করার জন্য মানুষের প্রয়োজন সহানুভূতি, সমর্থন এবং একটি নিরাপদ পরিবেশ, যেখানে তারা তাদের কষ্ট ভাগ করে নিতে পারে এবং নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়।সবকিছু বিবেচনায় স্পষ্ট হয় যে আত্মহত্যা কোনো একক কারণের ফল নয়; এটি ব্যক্তিগত কষ্ট, সামাজিক চাপ এবং মানসিক অস্থিরতার জটিল সমন্বয়। এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ— পরিবারের সহানুভূতিশীল ভূমিকা, সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর নীতি গ্রহণ। একই সঙ্গে ব্যক্তিকেও বুঝতে হবে যে জীবনের সংকট সাময়িক, কিন্তু জীবনের সম্ভাবনা অসীম। সহায়তা চাইতে পারা দুর্বলতা নয়, বরং তা বেঁচে থাকার শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ। একটি সহমর্মী, সচেতন এবং সমর্থনশীল সমাজই পারে এই নীরব সংকটকে প্রতিরোধ করতে এবং মানুষকে নতুন করে বাঁচার সাহস দিতে। [লেখক: অধ্যাপক; সদস্য, শিক্ষাক্রম, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড]

এবার যাচ্ছি মঙ্গলে

স্টিফেন হকিংয়ের সোজা ভবিষ্যৎ বাণী ছিল, শতাব্দী ব্যবধানে মানব জাতিকে ভিনগ্রহে বসতি গড়তেই হবে। স্পেস এক্সের মালিক ইলন মাস্ক বলছেন এই শতাব্দীর প্রথমার্ধে মঙ্গলে মানুষ পাঠাবেন। ব্লু অরিজিনের মালিক মার্ক বেজোস শান্ত অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন ২০৪০ সালের মধ্যে মানুষ অবশ্যই মঙ্গলে পদার্পণ করবেই। সোজা কথা হলো সৌরজগতে পৃথিবীর কাছের গ্রহ বুধ বা শুক্রে বা উপগ্রহ চাঁদে পানি না থাকায় মনুষ্য বসতি সম্ভব নয়। তবে একটু দূরের মঙ্গল গ্রহে সম্ভব, কারণ মঙ্গলে একসময় পানি ছিল, জলাশয় ছিল, খাল, নদী ছিল। এখনও মাটির নিচে পানির ভান্ডার আছে। যেমন পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠের নিচে পানি আছে। সোজা কথায় মঙ্গলে বেঁচে থাকার জন্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে মনুষ্য বসতি সম্ভব। মঙ্গলে বাতাস আছে, তবে তা পৃথিবীর চেয়ে হালকা। মেরু অঞ্চলে জমাট বরফও আছে।বৈরী হলো গ্রহটি প্রচণ্ড ঠান্ডা। মাইনাস ২০০ (বিশ ডিগ্রির) নিচে তাপমাত্রা। পৃষ্ঠে আয়রন অক্সাইড বেশি থাকায় পৃথিবীর অর্ধেক আয়তনের গ্রহটি পুরোপুরি লালচে। ২৪ ঘণ্টা ৩৭ মিনিটে ১ দিন ও ৬৮৭ দিনে ১ বছর। মানুষের বাস উপযোগী করতে হলে বাতাসের পরিমাণ ও বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতেই হবে। তার ওপর নিশ্চিত করতে হবে বৃষ্টিপাত। ইলন মাক্সের বক্তব্য, নিউক্লিয়ার চার্জ করে কয়েক বছরের জন্য ধুলায় ঢেকে দেয়া হবে মঙ্গলের আকাশ। ধুলার আবরণে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়বে। তাপমাত্রা বাড়লে মরুর বরফ গলে মেঘ সৃষ্টি হবে। কয়েক দশকের ব্যবধানে ধীরে ধীরে বৃষ্টিপাত বাড়বে। একাধিক ঋতুর আবির্ভাব হতে বাধ্য।মঙ্গলে বসতি স্থাপনের প্রধানতম প্রতিবন্ধকতা হলো চুম্বক ক্ষেত্রের অভাব। কোটি কোটি বছর আগে থেকে গ্রহটির ভূ-অভ্যন্তরে মিথস্ক্রিয়া ধীরে ধীরে স্থিমিত হয়ে পড়ায় ও পৃষ্ঠদেশ থেকে মেঘ-বৃষ্টির ঋতুচক্র হারিয়ে যাওয়ায়, গ্রহটি চুম্বকত্বহীন হয়ে পড়েছে। সৌর তাপ ও আলোর ক্ষতিকর বিকিরণ ঊর্ধ্বাকাশে আটকানোর একমাত্র প্রাকৃতিক ব্যবস্থা হলো বায়ুমণ্ডলের চুম্বকক্ষেত্র। সৌর ও মহাকাশের বহু ক্ষতিকর পদার্থ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঊর্ধ্বাকাশে ঠেকিয়ে দেয় বলে আমরা ভূ-পৃষ্ঠে বেঁচে আছি। মঙ্গলে পৃথিবীর মতো বায়ুমণ্ডল, একাধিক ঋতু ও চৌম্বক ক্ষেত্র ন্যূনতম ভারসাম্যে এলে মনুষ্য বসতি গড়ে তোলা সম্ভব। শত শত বছরের ব্যবধানে গ্রিন হাউস প্রযুক্তি ব্যবহার করে রবিশষ্য উৎপাদন হবে। কৃত্রিম জলপ্রবাহে চাষ হবে। প্রথম দিকে অক্সিজেন আটকে রেখে হয়তো ঘরে থাকতে হবে। বাড়ি থেকে বের হলেই হয়তো পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে বের হতে হবে- এই যা। আরও কত প্রতিবন্ধকতা দেখা দেবে। আবার এসব অতিক্রমও করা যাবে। লাগুক না এর জন্য দশকের পর দশক বা শত শত বছর। ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে নাসা মিউজিয়ামে মোটামুটি ১ বেলা ঘুরেছিলুম। তৃতীয় তলায় মঙ্গলে পাঠানো ল্যান্ডার পারসিভিয়ারেন্সের প্রাথমিক টেস্টিং মেশিনটি ডিসপ্লেতে দেখে পুলকিত হলাম। পৃথিবীতে পরীক্ষা চালানো হয়েছে এটি দিয়ে। অতঃপর হুবহু আরেকটি এখন মঙ্গলে। দিন-রাত ব্যস্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণায়।ষাটের দশক থেকে মঙ্গলের প্রতি মানুষের অব্যাহত অভিযান মনুষ্য ল্যান্ডিং করার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে চলেছে। দীর্ঘ অর্ধশতক ধরে মঙ্গলে ৩ ধরনের যন্ত্রদানব পাঠানো হয়েছে। দীর্ঘ এক দশকের ব্যর্থতার পর ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর সোভিয়েত মঙ্গলযান ‘মার্স-৩’ মঙ্গলে ল্যান্ড করে। এরপর থেকে চাঁদে ল্যান্ড করেছে রুশ (রসকসমস) আমেরিকান (NASA), ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA), চীনের মহাকাশ সংস্থা (CNSA), ভারতীয় মহাকাশ সংস্থার (ISRO) একাধিক ল্যান্ডার। প্রথম অভিযানেই ল্যান্ডিং করে চমক দেখিয়েছে ভারতের ইসরো। ল্যান্ডারের পেটের ভেতর থেকে যে যন্ত্রটি বেরিয়ে এসে আশে পাশে রাজার হালে হেলে দুলে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালায়, সেটির নাম রোভার। ইসরোর রোভার, রসকসমসের রোভার, চীনের রোভার ‘তিয়ানওয়েন- ১’ এটি ল্যান্ড ‘ঝুরুং’-এর পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে মে ২০২১ থেকে চালিয়ে যাচ্ছে বৈজ্ঞানিক গবেষণা। ইউরোপীয় অর্থাৎ ESA-এর রোভার বর্তমানে রীতিমতো প্রতিযোগিতা দিয়ে মঙ্গলে মনুষ্য বসতি গড়ে তোলার করণীয় নিয়ে গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যস্ত। বিশ্ববাসীর জন্য সুখবর আছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘অ্যানাবেনা’ ও ‘নস্টক’ নামক অনুজীব বা ব্যাকটেরিয়াকে মঙ্গলে ছেড়ে দেয়া গেলে সময়ের ব্যবধানে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর মতো ভারসাম্যপূর্ণ অক্সিজেনে ভরপুর হবে। নাসা আরও এককাঠি সরস হাওয়াই দ্বীপে এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের একটি ভূখণ্ডে ১টি বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। চতুর্দিকে মনুষ্যহীন এই বাড়িতে একাকী থাকবেন ৬ নভোচারী। মূলত ৬ জন মানুষ একসঙ্গে একটি ঘরে বহির্জগতের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন থাকলে কিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় তার পরীক্ষা চলছে। নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী শ্রীঘ্রই একাধিক মনুষ্যবিহীন অরবিটার পাঠানো হবে। মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসবে ‘স্পেস এক্সের’ হ্যাংগারে। আবার ওই রকেটে করে মনুষ্যবাহী অরবিটার পাঠানো হবে মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করার জন্য। এরপর শুরু হবে নভোচারীদের মঙ্গলে ল্যান্ডিং করানোর চূড়ান্ত পর্ব। দীর্ঘ ৭ মাসের মঙ্গল যাত্রার জন্য নাসা পথিমধ্যে অর্থাৎ কক্ষপথে ‘ল্যাগরেঞ্চ-২’ পয়েন্টে যাত্রাবিরতি দিতে চায়। যদি যাত্রাপথ ৪ মাসে নামিয়ে আনার উদ্যোগ সফল হয় তবে বিশ্রাম না দিয়েও সরাসরি মঙ্গলে ল্যান্ডিংয়ের চিন্তা প্রাধান্য পাবে। কারণ এ ক্ষেত্রে আসা যাওয়ায় লাগবে মাত্র ৮ মাস। অবশ্য রাশিয়ার প্লাজমা জ্বালানির রকেট পাঠানোর ঘোষণা যদি সত্যি সফল হয় তবে মঙ্গলে মানুষ হাঁটবে, খেলবে, চাষ করবে, বাজার করবে, হোক না তা দুই প্রজন্ম পর। ‘রসকসমসের’ বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লাজমা প্রযুক্তির রকেটের গতি এতদিনকার জ্বালানির সমস্ত সক্ষমতা অতিক্রম করবে। প্লাজমা জ্বালানি দিয়ে রকেট স্টার্ট দেয়ার ১ মাসের মধ্যে পৌঁছে যাবে মঙ্গলে। বিশ্ববাসী রইল সেই শুভদিনের প্রত্যাশায়। [লেখক: আইনজীবী, আপিল বিভাগ]

আগুনের বাজারে সভ্যতার মুখোশ

পৃথিবী যেন এখন এক বিশাল হাট—নামের আগে সভ্যতা, ভেতরে নিখাদ ব্যবসা। এই হাটে সবকিছুই বিক্রি হয়: নীতি, নৈতিকতা, মানবতা—এমনকি মানুষের জীবনও। শুধু দরকার নিখুঁত প্যাকেজিং আর কিছু মেকি ভাষা। আগুনের গন্ধকে বলা হয় স্থিতিশীলতা, ধ্বংসকে নিরাপত্তা, আর রক্তকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। শব্দের এই কারসাজিতে সত্য এতটাই ঢেকে যায় যে মানুষ একসময় মিথ্যাকেই বাস্তব মনে করতে শুরু করে।এই হাটের মাঝখানে জ্বলছে এক অনির্বাণ চুলা। সেখানে কাঠ নয়, জ্বলে মানুষের ঘর; কয়লা নয়, পুড়ে শিশুর স্বপ্ন। তবু বিস্ময়কর—চুলার পাশে দাঁড়ানো লোকগুলো সাদা পোশাকে সজ্জিত। তাদের মুখে শান্তির বুলি, হাতে আগুনের দাহ। তারা বলে, আগুন নেভাতে এসেছে—কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখে, সেই নেভানোর নামেই তারা আরও তেল ঢালছে। আগুন এখানে শুধু ধ্বংসের প্রতীক নয়, এটি ক্ষমতার এক দৃশ্যমান রূপ— যেখানে জ্বলতে থাকা প্রতিটি শিখা একেকটি স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।এরা এক অদ্ভুত জাতের কারিগর। তাদের কারখানায় তৈরি হয় ন্যায়ের বুলেট, শান্তির বোমা আর মানবিকতার মিসাইল। প্রতিটি অস্ত্রের গায়ে লেখা থাকে কোনো মহৎ শব্দ, যেন শব্দের ঝলকে রক্তের দাগ মুছে যায়। তারা জানে—মানুষ শব্দে বেশি বিশ্বাস করে, সত্যে নয়। তাই তারা শব্দকে অস্ত্র বানায়, আর অস্ত্রকে ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে। একসময় মানুষ এতটাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে যে, ধ্বংসকেও সে উন্নয়নের অংশ মনে করতে শুরু করে।এই হাটে আছে একদল হিসাবরক্ষকও। তারা ঠাণ্ডা মাথায় হিসাব কষে—আজ কত ঘর পুড়লো, কাল কত মানুষ মরবে, আর তাতে কত মুনাফা আসবে। তাদের খাতায় মানুষের নাম নেই, আছে শুধু সংখ্যা। শূন্যের পাশে যত সংখ্যা বাড়ে, তাদের চোখে তত উজ্জ্বল হয় আনন্দের আলো। এই সংখ্যার খেলায় মানবিকতা হারিয়ে যায়, আর লাভ-ক্ষতির অঙ্কই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত সত্য। তারা কখনও দেখে না একটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে থাকা একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি জীবনের গল্প।সবচেয়ে বড় কৌতুক—এই আগুনের বাজারেই বসে শান্তির মেলা। সেখানে হয় বড় বড় বক্তৃতা, ছুটে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, আর কাগজে কাগজে লেখা হয় চুক্তি। ক্যামেরার সামনে করমর্দন, হাসি আর কূটনৈতিক ভাষার চাতুর্য দেখে মনে হয়—এই বুঝি পৃথিবী বদলে যাবে। কিন্তু মেলা শেষ হলেই সেই কাগজ উড়ে যায় আগুনে—আর আগুন আরও উঁচু হয়ে জ্বলে ওঠে। তখন বোঝা যায়, শান্তির মেলা আসলে আগুন টিকিয়ে রাখারই এক অভিনব কৌশল।নীরব দর্শকদের ভূমিকাও এখানে কম নয়। তারা আগুন দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তারপর নিজ নিজ ঘরে ফিরে যায়। কেউ কেউ আবার আগুনের ছবি তুলে রাখে—স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, যেন একদিন বলতে পারে, আমরা সেই সময় বেঁচে ছিলাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা শোক প্রকাশ করে, ক্ষোভ জানায়, কিন্তু বাস্তবতায় তারা নিস্তব্ধ। তারা ভুলে যায়—দর্শকও এক ধরনের অংশগ্রহণকারী; শুধু তাদের হাত রক্তে ভেজে না। নীরবতা অনেক সময় শব্দের চেয়েও বেশি শক্তিশালী সমর্থন হয়ে ওঠে।এই আগুনের শহরে শিশুরা বড় হয় ধোঁয়ার গন্ধে। তারা জানে না ফুলের সুবাস কেমন; তারা চেনে শুধু বারুদের গন্ধ। তাদের খেলনা ট্যাংকের মতো, তাদের স্বপ্ন বাঙ্কারের মতো। তারা শিখে যায়—বাঁচতে হলে লুকাতে হয়, হাসতে হলে চুপ থাকতে হয়। তাদের শৈশব কেড়ে নেয়া হয় খুব ধীরে, খুব নিঃশব্দে। একদিন তারা বড় হয়, আর সেই একই আগুনের অংশ হয়ে যায়—কারও হাতে অস্ত্র, কারও হাতে পতাকা, কারও হাতে প্রতিশোধের শপথ।আর যারা এই আগুন জ্বালায়, তারা থাকে অনেক দূরে—শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে, কাঁচের দেয়ালের আড়ালে। তাদের কাছে আগুন মানে একটি গ্রাফ, একটি রিপোর্ট, একটি কৌশল। তারা আগুনের তাপ অনুভব করে না, শুধু তার আলো ব্যবহার করে নিজেদের ছায়া বড় করে। তাদের সিদ্ধান্তে জ্বলে ওঠে শহর, ভেঙে পড়ে সভ্যতা, কিন্তু তাদের জীবনে সেই আগুনের কোনো ছোঁয়া লাগে না। এই দূরত্বই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি—এবং সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা।সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সত্যটি হলো—এই পৃথিবীতে আগুন কখনো নিজে নিজে জ্বলে না। কেউ তা জ্বালায়, কেউ তাতে হাওয়া দেয়, আর কেউ সেই আগুন দেখে মুনাফার হাসি হাসে। এই ত্রিমুখী সম্পর্কের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আধুনিক সভ্যতার এক নির্মম বাস্তবতা—যেখানে ধ্বংস একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া, আর শান্তি একটি কৌশলগত শব্দমাত্র।তাই এই আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে যদি কেউ প্রশ্ন করে—দোষ কার? উত্তরটি সহজ নয়। দোষ শুধু তাদের নয়, যারা আগুন জ্বালায়; দোষ তাদেরও, যারা আগুনকে মেনে নেয়, যারা আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে উষ্ণতা উপভোগ করে, আর যারা আগুনের গল্প শুনে হাততালি দেয়। এই সম্মিলিত নীরবতা আর স্বার্থপরতা আগুনকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।শেষ পর্যন্ত, হয়তো একদিন এই আগুন নিভে যাবে। কিন্তু তার ছাইয়ে থেকে যাবে এক নির্মম সাক্ষ্য—সভ্যতার মুখোশ যতই চকচকে হোক, তার ভেতরের মুখ সবসময় ততটা সুন্দর নয়। সেই ছাই একদিন ইতিহাস হয়ে বলবে—এই পৃথিবী আগুন নেভাতে জানতো, কিন্তু আগুন জ্বালাতে ছিল আরও বেশি দক্ষ। [লেখক : সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

লটারি না ভর্তি পরীক্ষা?

কেজিতে তো নয়ই, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত কোন ভর্তি পরীক্ষা থাকা উচিত নয়! যে সমাজে সে জন্মগ্রহন করেছে সেই সমাজ তাকে কোনো ধরনের মানসিক চাপে না ফেলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ করে দিবে, এটি সমাজের কাছে তার বৈধ পাওনা। এখানে পরীক্ষা নামক বিষয় যোগ করার প্রশ্নই আসেনা। তবে, চতুর্থ শ্রেণী থেকে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া একেবারে অযৌক্তিক নয়, সেখানে প্রশ্ন হতে হবে শ্রেণী উপযোগী ও যৌক্তিক। ভর্তি পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীরা কিছুটা পড়াশোনা করে এবং অভিভাবকরাও পড়াশোনার বিষয়ে কিছুট সচেতন হন। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত সকল অভিভাবকদের তাদের নিকটস্থ বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য চিন্তা করতে হবে। তারা যদি তথাকথিত নামকরা বিদ্যালয়ে ভর্তির পেছনে ছোটেন তাহলে সরকার কিংবা অন্য কারুরই কিছু করার নেই। কোন সমস্যা হলেই আমরা সরকারকে দায়ী করি, সরকারের উপর সব চাপিয়ে দিই কিংবা সরকারকে মূহুর্তের মধ্যেই সব পরিবর্তন করতে বলি যা যুগ যুগ ধরে হয়নি। সবাই সুপারিশের ফিরিস্তি তুলে ধরি, সরকারকে এটা করতে হবে, সেটা করতে হবে কিন্তু কি দিয়ে , কিভাবে এবং এত অল্প সময়ে করা যে সম্ভব নয় সেগুলো আমরা কখনও চিন্তা করিনা। শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে বড় বড় শহরগুলোতে কারণ নামকরা (?) দু’চারটি প্রতিষ্ঠানে সব অভিভাবক তাদের সন্তানদের ভর্তি করাতে চান। তারা ভর্তির জন্য সব ধরনের পদ্ধতিই অবলম্বন করেন (অর্থ, প্রতিপত্তি, রাজনৈতিক প্রভাব, কোচিং)। অথচ সরকারি ও বেসরকারি বহু বিদ্যালয় আছে সেগুলোতে শিক্ষার্থী পাওয়া য়ায়না। সরকারিগুলোতে সমস্যা নেই কিন্তু বেসরকারিগুলোতে শিক্ষার্থীর অভাবে কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের ঠিকমতো বেতন নিতে পারেন না। তাই, আওয়ামী সরকারের আমলে এই লটারি পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয় কারন নিজের পার্টির লোজকজনকেও ম্যানজে করা যেতনা সবাই তথাকথিত ভাল স্কুলে ভর্তি করাবেন। আমাদের ছোট-বড় প্রতিটি শহর জ্যামের শহর! সেই জ্যাম ঠেলে সকালবেলা সবাই ছোটেন বাচ্চাদের নিয়ে । এই বয়সে বাচ্চাদের বাসার কাছে ফুলবাগানের মতো কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, আমোদ ফুর্তি করা আর বয়স উপযোগী সহজ কিছু বিষয় শেখার কথা এবং এর মাধ্যমে সামাজিকতা ও বন্ধুত্ব ইত্যাদি শেখার প্রথম ধাপ। অথচ অভিভাবকগন তাদেরকে মহা প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে তাদের শারীরিক মানসিক কষ্টের বিনিময়ে, সমাজের উচুঁ শ্রেণী, নিচু শ্রেণী, অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য ব্যস্ত, মহাব্যস্ত, আর যখন সমস্যা হয় তখন সব সরকারের ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। নামকরা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতেই হবে। সরকার আইন করতে পারে কিন্তু সেটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিকদের নিজস্ব গতিপথ রয়েছে, সরকার প্রয়োগ করতে গেলে সেটি অনেক সময়ই ব্যক্তি স্বাধীনতার বিপক্ষে এমনকি বলপ্রয়োগের পর্যায়ে চলে যায়।কাজেই সব সমস্যা সরকারকে দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতে গেলে সমস্যা হবেই। অনেক অভিভাবক আছেন, তাদের শিশু সন্তানকে তথাকথিত ভাল স্কুলে পড়ানোর জন্য সাত-সমুদ্র পাড়ি দিয়ে শিশুদের সেখানে নিয়ে যান শুধুমাত্র ভালো পড়ালেখার জন্যই নয়, নিজেদের মান-সম্মানের কথা চিন্তা করে, প্রেস্টিজের কথা চিন্তা করে। এখানে সরকারের কিছু করার নেই। সিদ্ধান্ত অভিভাবকদের নিতে হবে, সরকার শুধু কাজটি করতে উৎসাহ প্রদান করতে পারে। স্থানীয় স্কুলগুলো সবই হয়তো সেই মানের নেই, কিন্তু যখন অভিভাবকগন তাদের শিশু-সন্তানদের ভর্তি করবেন তখন নিকটস্থ বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না থাকলেও তারা ভালো করার চেষ্টা করবে। বিদ্যালয়গুলো সামাজিক প্রতিষ্ঠান, এগুলো ভালো করার দায়িত্ব অভিভাবকদের এবং সমাজেরও। এটি করা হলে লটারি আর ভর্তি পরীক্ষার কোন প্রশ্ন থাকবেনা, শিশুরা তাদের ওপর মানসিক অত্যাচার থেকে বেঁচে যাবে। আমাদের সরকারি বেসরকারি কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠানই জনসংখ্যা অনুপাতে নেই, এগুলো সুষমভাবে এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠেনি। এটিও একটি বাস্তবতা। যেগুলো আছে সেগুলোকে মানে তোলার দায়িত্ব নাগরিকদেরও, কারণ সরকারের একার পক্ষে এতসব ম্যানেজ করা সম্ভব নয়। অভিভাবকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার ফলে, তথাকথিত নামী দামী স্কুলে দ্বিতীয় তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হতে যেসব অবাক করা প্রশ্ন আসে সেগুলো অযৌক্তিক এবং কোন মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষা হয়না। যেমন ঢাকার একটি বিখ্যাত স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছিল’ বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার পথচলা কবে থেকে শুরু হয় এবং উপকারিতা কি? ’ এ প্রশ্ন বিসিএসকেও ছাড়িয়ে যায়। অভিভাবক যখন এসব স্কুলে সন্তান ভর্তির জন্য পাগলপ্রায় তখন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এ ধরনের আজে বাজে প্রশ্ন ভর্তি পরীক্ষায় দিয়ে থাকে আর মাঝখানে শিশুদের কোচিং করানোর জন্য আরেকটি শ্রেণী গড়ে উঠে। এটিই স্বাভাবিক। আমার স্পষ্ট মনে আছে আমার কন্যা (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যায়ে মাস্টার্সে পড়ে) শিশু শ্রেণীতে ভর্তির সময় তার মা অন্য অভিভাবকদের কাছ থেকে ভিকারুন্নেছা স্কুলে ভর্তি করানোর কয়েকটি কোচিংয়ের ঠিকানা নিয়ে এসেছিলেন। আমি খোঁজ-খবর নিয়ে দেখলমা কোচিং-এ পড়ানো হচ্ছে আফ্রিকার কিছু দেশের মুদ্রার নাম, রাজধানীর নাম, ঐসব দেশের সরকার ব্যবস্থা, কঠিন ব্যাকরণ ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, ঐসব কোচিংয়ে ভর্তি হওয়া আরেক কসরত। যেন বুয়েটে ভর্তির কোচিং! আর অর্থদণ্ড তো আছেই। আমি এসব বাদ দিতে বললাম। বাদ দিযে মেয়েকে একটি ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করলাম কারণ সেখানে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেই, অতএব ভর্তির কোচিংও নেই। আমাদের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন ‘শিক্ষায় লটরি, এটা তো জুয়া খেলা, এটা কীভাবে সিস্টেম হতে পারে? কাজেই আমরা লটারি পদ্ধতি প্রত্যাহার করলাম। দ্যাটস ইট। লটারি কোনো শিক্ষা ব্যবস্থায় থাকতে পারেনা। সেটি শিক্ষার কোনো মানদন্ড হতে পারেনা। লটারি ইস নট সলিউশন। ক্লাস ওয়ানে মেধা যাচাইয়ের প্রশ্ন আসেনা। খুবই সিম্পল ওয়েতে পরীক্ষা নিবো। ক্লাস ওয়ানে আমরা নিউরোসার্জন বানানোর চেষ্টা করবোনা। কেউ কোচিং বাণিজ্য করতে চাইলে সরকার বসে থাকবেনা। সরকার ইনহাউজ কোচিংযের ব্যবস্থা করবে।’ মন্ত্রী মহোদয়ের কথাগুলোর সঙ্গে আমি একমত তবে খুব সিম্পল ওয়েতে পরীক্ষা নিবো এবং কোচিং বাণিজ্য করতে চাইলে সরকার বসে থাকবেনা। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবক্ষেত্র পর্যন্ত যেতে যেতে মূল মেসেজের সামান্য অবিকল অবস্থায় থাকে। এটি যারা বাস্তবায়ন করেন বা করবেন তারা দুর্নীতির আশ্রয় নেন যা সরকারের পক্ষে এত মাইক্রো লেভেলে পৌঁছে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। প্রাথমিকে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের বয়স ৪-৬ বছরের মধ্যে যখন শিশুরা কেবল তাদের মতো করে কথাবার্তা ও যোগাযোগ করতে শেখে। শিশুরা তখন প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ, পরিবার ও সমাজের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকে। তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি এমন পর্যায়ে থাকেনা যে, তাদের মেধা ও জানা-শোনা পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই যোগ্য। সেটা করা মানে শিশুদের প্রতি অবিচার ও অভিভাবকদের জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করা। লটারি পদ্ধতির সুবিধা ছিল এর স্বচছতা ও জবাবদিহিতা। লটারি পদ্ধতিতে সরকারের একজন প্রতিনিধি সশরীরে উপস্থিত থাকতেন। কেন্দ্রীয়ভাবে লটারি হওয়ার কারণে এখানো স্বজনপ্রীতি বা অর্থিক লেনদেনের সুযোগ ছিলনা বললেই চলে। ফলে অভিভাবকরা একটি আস্থার জায়গায় ছিলেন এবং মেধাবী ও সাধারণ-সব শিক্ষার্থীই ভর্তির সমান সুযোগ পেত। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বাছাই করে সেরাদেরই ভর্তি করে তাহলে তাদের কৃতিত্ব কোথায় ? সব ধরনের মেধার শিক্ষার্থীদের ভর্তি করে তাদের বিকশিত করার সুযোগ দেয়াই একটি প্রকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ। শুধুমাত্র সেরাদের নিয়ে শ্রেণী তৈরি করলে সমাজের শিক্ষার্থী ও অভিভাকদের মধ্যে এক ধরনের অহংবোধ ও বিভাজন তৈরি হয় যার কারণে বর্তমানে শিশু ভর্তি প্রক্রিয়ায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে আরেকটি বিষয় আমরা বেমালুম এড়িযে যাচ্ছি আর সেটি হচেছ, ভর্তি প্রক্রিয়ায় সমস্যা হচেছ শহর এলাকায় আর শহর শুধু বাংলাদেশ নয়। শহর এলকার সব বিদ্যালয়েও ভর্তির তীব্র প্রতিযোগিতা নেই। বাংলাদেশের হাজার হাজার গ্রাম, গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোর করুণ অবস্থা, শিক্ষার মানের দিক দিয়ে, শিক্ষার্থী সংখ্যার দিকে দিয়ে এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়েও। শহরের মাত্র কয়েকটি বিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা যখন এত এত আলোচনা করি তখন মনে হয়, গ্রামের স্কুল স্কুল নয়, গ্রামের শিক্ষর্থীরা শিক্ষার্থী নয়! [লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজ]

যুদ্ধের তিন নিয়ামক

মানুষ প্রায়ই মনে করে যে যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় যুদ্ধক্ষেত্রেই। সেনাবাহিনী অগ্রসর হয়, শত্রুপক্ষ পিছু হটে এবং শেষ পর্যন্ত এক পক্ষ বিজয় অর্জন করে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধ খুব কমই এইভাবে শেষ হয়। এগুলো শেষ হয় তখনই, যখন একসঙ্গে তিনটি বিষয় ভেঙে পড়ে— অস্ত্রভান্ডার, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা। এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করে যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হবে এবং কীভাবে তা শেষ হবে।ইরানকে ঘিরে উদীয়মান সংঘাতও এই একই পথ অনুসরণ করবে। এটি কোনো নাটকীয় আত্মসমর্পণ বা যুদ্ধক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পতনের মাধ্যমে শেষ হবে না। বরং এটি শেষ হবে তখন, যখন তিনটি আলাদা চাপ একত্রিত হতে শুরু করবে— যখন অস্ত্রভান্ডার ফুরিয়ে আসবে, বাজার অস্থির হয়ে উঠবে এবং রাজনৈতিক ধৈর্য শেষ হয়ে যাবে। হয়তো একসঙ্গে নয়, কিন্তু এতটাই কাছাকাছি যে নেতারা বাধ্য হবেন নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে, যা পরে তারা কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন, যদিও বাস্তবে তা হবে প্রয়োজনের তাগিদে নেয়া পদক্ষেপ।প্রথমেই আসা যাক অস্ত্রের প্রসঙ্গে। আধুনিক যুদ্ধ প্রায়ই এমন একটি ধারণা তৈরি করে যেন সামরিক সক্ষমতা অসীম। নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, স্যাটেলাইট নজরদারি, বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা— সবকিছুই যেন এমন এক প্রযুক্তিগত স্থায়িত্বের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে উন্নত সামরিক শক্তি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। বাস্তবে তা সম্ভব নয়, কখনই ছিল না।সমস্যা উদ্ভাবনে নয়, উৎপাদনে। একটি আধুনিক প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র কেবল একটি অস্ত্র নয়; এটি একটি জটিল, বিশেষায়িত ব্যবস্থা, যা সীমিত সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরশীল। মাইক্রোইলেকট্রনিক্স, দুর্লভ উপাদান, নিখুঁত প্রকৌশল— এসব কোনো কিছুই রাতারাতি বাড়ানো যায় না, এমনকি এক বছরের মধ্যেও নয়। এগুলোর জন্য প্রয়োজন চুক্তি, দক্ষ শ্রমিক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। আর যুদ্ধ যে জিনিসটি সবচেয়ে দ্রুত গ্রাস করে, তা হলো এই সময়।সংঘাতের শুরুতে মজুত অস্ত্র এই বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখে। কমান্ডাররা তখন উদারভাবে অস্ত্র ব্যবহার করেন, কারণ তারা তা করতে পারেন। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করে, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং যুদ্ধের গতি টেকসই বলে মনে হয়। কিন্তু এটি একটি বিভ্রম। মাত্র একটি তীব্র রাতের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই কয়েক মাসের উৎপাদনকে শেষ করে দিতে পারে। আর যখন মজুত একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে যায়, তখন কৌশল পরিবর্তন শুরু হয়— নীতির কারণে নয়, বরং গাণিতিক বাস্তবতার কারণে।এই সীমাবদ্ধতা উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যদিও ভিন্নভাবে। যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর করে অত্যাধুনিক, ব্যয়বহুল এবং সীমিত সংখ্যক অস্ত্র ব্যবস্থার ওপর, যা প্রতিস্থাপন করা ধীরগতির। অন্যদিকে ইরান নির্ভর করে পরিমাণ ও অসম কৌশলের ওপর— সস্তা ড্রোন, সহজ ক্ষেপণাস্ত্র যেগুলো সরাসরি জয়ের জন্য নয়, বরং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তুলতে, চাপ সৃষ্টি করতে এবং ব্যয় বাড়াতে ব্যবহৃত হয়।এটি এক ধরনের প্রতিযোগিতা— যা হলো নির্ভুলতা বনাম স্থায়িত্ব, গুণমান বনাম পরিমাণ। ইতিহাস দেখায়, এমন প্রতিযোগিতায় কোনো পক্ষই একচেটিয়া সাফল্য পায় না। ১৯৪৪ সালে জার্মানি তা উপলব্ধি করেছিল, যখন মিত্রশক্তির শিল্প উৎপাদন তাদের কৌশলগত দক্ষতাকে ছাপিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রও ভিয়েতনাম এবং পরে ইরাকে একই ধরনের বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিল, যেখানে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে।এখানে সময়ই হলো গোপন নিয়ামক। যে পক্ষ সময়কে ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারে, সাধারণত তারাই টিকে থাকে— অথবা অন্তত বিজয়ের সংজ্ঞা পরিবর্তন করার মতো সময় পায়।এরপর আসে বাজার। বাজার সেনাবাহিনীর চেয়েও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং কৌশলগত গল্পে খুব কমই আগ্রহী। বিনিয়োগকারীরা কোনো অঞ্চল কার নিয়ন্ত্রণে তা নিয়ে মাথা ঘামায় না; তারা চায় স্থিতিশীলতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং ঝুঁকি কম থাকা। এগুলো যখন নষ্ট হতে শুরু করে, তখন পুঁজি সরে যেতে শুরু করে— প্রথমে ধীরে, তারপর হঠাৎ করে।জ্বালানি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। পারস্য উপসাগরে যেকোনো বিঘ্ন পরিস্থিতি দ্রুত বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলে। তেলের দাম বাড়ে, জাহাজ চলাচলের পথ পরিবর্তিত হয়, বীমার খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু এর দ্বিতীয় প্রভাব আরও গভীর— সারের দাম বাড়ে, কয়েক মাস পরে খাদ্যের দামও বাড়ে। নিয়ন্ত্রিত মুদ্রাস্ফীতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।আধুনিক অর্থনীতি একে অন্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। জ্বালানির মতো একটি খাতে টান পড়লে পুরো ব্যবস্থাই নড়বড়ে হয়ে যায়। বিমান চলাচল বদলে যায়, সরবরাহ শৃঙ্খল দীর্ঘ হয়, উৎপাদন ধীর হয়ে যায় এবং পৃথিবীর কোনো এক কোণে একজন ভোক্তা হঠাৎ করে রুটি বা বিদ্যুতের জন্য বেশি মূল্য দিতে শুরু করে, কারণটি না জেনেই।আরও একটি নতুন মাত্রা রয়েছে ডিজিটাল অবকাঠামো। ডেটা সেন্টার, ক্লাউড নেটওয়ার্ক— এগুলো এখন আর প্রান্তিক নয়, বরং অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এগুলো লক্ষ্যবস্তু হলে প্রভাব পড়ে আর্থিক খাত, যোগাযোগ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায়।আমার মতে, ইরান এই বিষয়টি বেশ ভালো করে বুঝতে পেরেছে। তাই, ইরান শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বরং সেই অর্থনৈতিক স্নায়ুতন্ত্রকে লক্ষ্য করছে, যা সামরিক শক্তিকে টিকিয়ে রাখে। যুক্তি সহজ— যদি একটি পরাশক্তির অর্থনৈতিক পরিবেশকে জটিল করে তোলা যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানো তার জন্য অনাকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।এই অর্থে বাজার এক ধরনের অদৃশ্য বিচারকের মতো কাজ করে। তারা যুদ্ধ থামাতে পারে না, কিন্তু এর খরচ এত বাড়িয়ে দিতে পারে যে রাজনৈতিক নেতারা বিজয়ের নয়, বরং বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে শুরু করেন।এবার আসা যাক রাজনীতির কথায়— যা সবচেয়ে অবমূল্যায়িত, অথচ প্রায়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।যুদ্ধ সাধারণত ঐক্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। জনগণ পতাকার চারপাশে একত্রিত হয়, বিরোধিতা সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়, এবং নেতারা সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ পান। কিন্তু এই ঐক্য স্থায়ী নয়। খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং লক্ষ্য অস্পষ্ট হয়ে পড়লে এটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।গণতান্ত্রিক দেশে সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হবেই, যুদ্ধ শেষ হোক বা না হোক। আর এই নির্বাচনই পররাষ্ট্রনীতিকে অভ্যন্তরীণ সমস্যায় পরিণত করে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি তখন আর একটি বিমূর্ত বিষয় থাকে না; এটি হয়ে ওঠে নির্বাচনী ইস্যু। সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। আর যদি হতাহতের সংখ্যা বাড়ে, তবে তা প্রতীক হয়ে ওঠে।যুক্তরাষ্ট্রও এমন একটি সময়সীমার মুখোমুখি। মধ্যবর্তী নির্বাচন একটি অনিবার্য বাস্তবতা, যা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে বদলে দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের আইনপ্রণেতারা তখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন— এই যুদ্ধ কতদিন চলবে? কত খরচ হবে? এর উদ্দেশ্য কী?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনারেলরা দিতে পারেন না। এগুলো এমন প্রশ্ন, যা রাজনীতিবিদদের এড়ানোর উপায় নেই।ইতিহাস এখানে আবারও পথ দেখায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ সামরিক বিকল্পের অভাবে শেষ হয়নি; এটি শেষ হয়েছিল কারণ অভ্যন্তরীণ সমর্থন ভেঙে পড়েছিল। ইরাক যুদ্ধও একই ধরনের পথ অনুসরণ করেছিল, যদিও কম নাটকীয়ভাবে। উভয় ক্ষেত্রেই যুদ্ধক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক সহনশীলতা ছিল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।ইরানের কৌশলও মনে হয় এই বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। দ্রুত জয়লাভ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করা— সামরিক, অর্থনৈতিক এবং মানসিক যতক্ষণ না প্রতিপক্ষের জোট নিজের ভেতরেই দুর্বল হয়ে পড়ে।এটাই হলো ‘অস্ত্র, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা’র সারকথা। এটি কোনো স্লোগান নয়; এটি একটি কাঠামো, যেখানে প্রতিটি উপাদান অন্যটিকে শক্তিশালী করে। অস্ত্রের ঘাটতি সামরিক বিকল্পকে সীমিত করে, বাজারের অস্থিরতা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাড়ায়, আর রাজনৈতিক চাপ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর ইচ্ছাকে দুর্বল করে।এই চক্রের ভেতরেই যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে যায়। পূর্ণ বিজয় পরিণত হয় আংশিক সাফল্যে। লক্ষ্যগুলো নীরবে সংশোধিত হয়। আলোচনা, যা একসময় প্রত্যাখ্যাত ছিল, তা বাস্তবসম্মত বিকল্পে পরিণত হয়। নেতারা তখন স্থিতিশীলতা, প্রতিরোধ, ভারসাম্যের মতো শব্দ ব্যবহার করেন— যা আসলে সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়, বিজয়ের নয়।সম্ভবত এইভাবেই এই যুদ্ধ শেষ হবে— কোনো একক সিদ্ধান্তমূলক আঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং বিভিন্ন চাপের একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে। স্পষ্টতার মাধ্যমে নয়, বরং এমন এক অস্পষ্টতার মাধ্যমে, যাকে দক্ষতার সঙ্গে সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।এখানে একটি বিদ্রূপ রয়েছে। যুদ্ধ প্রায়ই শুরু হয় সর্বোচ্চ লক্ষ্য নিয়ে— শত্রুকে পরাজিত করা, অঞ্চল পুনর্গঠন, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। কিন্তু শেষ হয় অনেক বেশি সীমিত ফলাফলে— নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ এবং প্রায় আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া, যদিও অনেক বেশি খরচ ও কম ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে।ইরান এই ধারণাটি বোঝে এবং এর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও তা বোঝে, যদিও তা স্বীকার করতে সময় নেয়। পার্থক্য জ্ঞানে নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তাকে সহ্য করার রাজনৈতিক সক্ষমতায়।শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলো সেইগুলো হবে না, যা মানুষ টেলিভিশনে দেখে। এগুলো ঘটবে উৎপাদন প্রতিবেদন, বাজার সূচক এবং জনমত জরিপে। কম নাটকীয়, কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর যখন এই তিনটি ফাটলরেখা— অস্ত্র, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা একত্রিত হবে, তখন ফলাফল ঘোষণার প্রয়োজন হবে না। তা ইতোমধ্যেই নির্ধারিত হয়ে যাবে।[লেখক: প্রাবন্ধিক]

মালাকারটোলা গণহত্যা

পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ ঢাকায় গণহত্যা শুরু করার পর প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজারবাগ ও পিলখানায় হামলা চালায়। এ তিন স্থানে গণহত্যার পর ২৭ মার্চ সবচেয়ে বড় গণহত্যা চালায় পুরান ঢাকার লোহারপুল এলাকার মালাকারটোলায়। তাদের লক্ষ্য ছিল ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত মহল্লাগুলো। এ গণহত্যায় আমিও আমার দুভাইকে হারাই। মালাকারটোলায় আমাদের বাড়িটি ছিল বাম রাজনীতির একটি কেন্দ্র। আমরা তিন ভাই ও পাঁচ বোন মা-বাবার সঙ্গে সে বাড়িতে থাকতাম। আমার বাবা ও ভাইরা সবাই ছিলেন বাম আদর্শের কর্মী। আমাদের বাড়িতে প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার আবহ ছিল। আমি তখন গেন্ডারিয়া হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি।২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হওয়ার পর ২৬ মার্চ সারাদিন পুরান ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও থানায় হামলা চালিয়ে যাকে যে অবস্থায় পেয়েছে পাকিস্তানিরা, মেশিনগানের ব্রাশফায়ারে হত্যা করেছে। আমরা আতঙ্ক আর কারফিউর কারণে বাড়ি থেকে বের হইনি। ২৭ মার্চ সকালে কারফিউ শিথিল হলে আশপাশের এলাকা দেখতে বের হই। বিধ্বস্ত চেহারা বিভিন্ন এলাকার। শাঁখারিপট্টিতে অনেক লাশ পড়ে থাকতে দেখি। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি সূত্রাপুর থানা, সেখানে গিয়ে দেখি পাকিস্তানিদের মর্টার আর মেশিনগানের গুলিতে পুরো ভবনটি প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে আছে। থানার ভেতরে দেখি এক পুলিশের লাশ পড়ে আছে। পাকিস্তানি সৈন্যবোঝাই গাড়ি লোহারপুলের ওপর দিয়ে যাওয়া-আসা করছে। এরই মধ্যে দেখলাম একদল লোক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে লুটপাট করছে। অন্যদিকে অসংখ্য মানুষ ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাচ্ছে শহর ছেড়ে। এসব দেখে চরম ভয় পেয়ে আবার বাড়ি ফিরে ঢাকা ছেড়ে পালানোর পরিকল্পনা করি। ঠিক করি পরদিনই আমরা বুড়িগঙ্গা নদী পেরিয়ে বিক্রমপুরের দিকে চলে যাব। এসব ভাবনাচিন্তার মধ্যেই ২৭ মার্চ রাত নেমে আসে। রাতে পাকিস্তানি বাহিনী হামলা করতে পারে ভেবে আমি পাশের মুসলমানদের বাড়িতে চলে যাই রাত কাটাতে। আমার বোনরাও অন্য এক বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। বাড়িতে থেকে যায় বাবা, ভাই দুলাল ও বিপ্লব।সন্ধ্যা থেকে আবার কারফিউ শুরু হয়। রাত ১১টার দিকে একদল আর্মি এসে আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে। দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে আমার বাবা কালিপদ দে, ভাই দুলাল দে ও বিপ্লবকে ধরে নিয়ে যায়। ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে পাকিস্তান আর্মি সবাইকে জেরা করে এবং কাপড় খুলে দেখে নিশ্চিত হয় যে তারা সবাই হিন্দু। আমাদের বাড়িতে হামলা করার আগে-পরে আর্মি আরও কয়েকটি বাড়িতে হামলা করে অনেক লোককে ধরে নিয়ে যায়। সবাইকে নিয়ে যাওয়া হয় লোহারপুলে। সেখানে সবাইকে লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে একসঙ্গে সবার দিকে মেশিনগান উঁচিয়ে গুলি করা হয়। গুলি খেয়ে সবাই লুটিয়ে পড়ে। তবে সৌভাগ্যক্রমে আমার বাবাসহ আরও দু-তিনজন বেঁচে যান। বাবার গালে ও কানে গুলি লাগে, দু’একজনের গায়ে একেবারেই গুলি লাগেনি। তারা দোলাই খালের ময়লা পানিতে মড়ার মতো পড়ে থাকেন। আহত শরীর নিয়ে আমার বাবাও মাটিতে শুয়ে থাকেন। কয়েক ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পর খুব ভোরে ফজরের নামাজের আজানের শব্দ শুনে বাবা উঠতে চেষ্টা করেন। উঠেই তিনি দেখেন আমার ভাই দুলাল দে শুয়ে আছে পাশেই। তিনি খুব মিহি কণ্ঠে দুলালকে ডাকেন। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারেন দুলাল বেঁচে নেই। এরপর তিনি রক্তাক্ত শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে দোলাই খালের পাড় দিয়ে হেঁটে কাছেই আমাদের পরিচিত ডা. আজিজুন্নেসার বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। ডা. আজিজুন্নেসা তাড়াতাড়ি একজন লোক দিয়ে বাবাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে পাঠান। সেখানে বাবা প্রায় এক সপ্তাহ চিকিৎসা নিয়ে প্রথমে বিক্রমপুর গিয়ে আমাদের সঙ্গে মিলিত হন। পরে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আমরা সবাই আগরতলায় চলে যাই।[লেখক: প্রাবন্ধিক]

ভিডিও

চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক

আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক হচ্ছে। বাংলা ও ইংরেজির মতো এ বিষয়টিও মূল বিষয়ের মর্যাদা পাবে। শিশুদের ডিজিটাল আসক্তি থেকে মাঠে ফিরিয়ে আনতে এবং মাদকমুক্ত সমাজ গঠনেই এই সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।মঙ্গলবার (২৯ মার্চ) জাতীয় সংসদে চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এ ঘোষণা দেন।প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই এই উদ্যোগ কার্যকর হবে। শুরুতে সাতটি খেলা বা ডিসিপ্লিন দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। পরে পর্যায়ক্রমে আরও খেলা যুক্ত করা হবে।প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাসায় ফেরার পর অনেক শিশু ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো তাদের মাঠে ফিরিয়ে আনা এবং একটি সক্রিয় জীবনধারায় উৎসাহিত করা।’শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক- উভয় পদ্ধতিতে হবে। তবে মাঠে সক্রিয় অংশগ্রহণই হবে মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, তরুণদের খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখার মাধ্যমে একটি মাদকমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব হবে। পরিকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় খেলার মাঠ উন্নয়ন করবে সরকার। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।

চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক
১৭ মার্চ ২০২৬, ০৩:১৬ পিএম
এবার বাংলাদেশে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর কবে হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

এবার বাংলাদেশে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর কবে হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

  ২০ মার্চ ২০২৬
  ২১ মার্চ ২০২৬
  নিশ্চিত নই
মোট ভোটদাতাঃ ১৩ জন