সংবাদ

চাপ সামলানোর মন্ত্র শোনালেন মেসি

​ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ শুরু হতে বাকি আর মাত্র কয়েক প্রহর। পুরো ফুটবল বিশ্বের নজর এখন নিউইয়র্ক-নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের দিকে, যেখানে শিরোপা নির্ধারণী মহারণে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। হাইভোল্টেজ এই ফাইনালের আগে স্বাভাবিকভাবেই আকাশচুম্বী চাপ থাকবে।তবে এই চাপ সামলানোর মন্ত্র জানালেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জাভিটস সেন্টারে আয়োজিত ‘ফ্যানাটিকস ফেস্ট’ অনুষ্ঠানে এনএফএল তারকা টম ব্রেডি এবং সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার রিও ফার্ডিনান্ডের মুখোমুখি হয়ে মেসি এই অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন। এসময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।​শৈশবের ফুটবল জীবনের স্মৃতিচারণ করে মেসি বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই অনেক আবেগ নিয়ে ফুটবল খেলেছি। যেখানে সুযোগ পেয়েছি, স্কুলে, রাস্তায় কিংবা ক্লাবে; সেখানেই খেলেছি, আনন্দ করেছি। কারণ আমরা সবাই পাড়ার দল থেকেই ফুটবল শুরু করেছি।’বিশ্বকাপের মতো বড় ম্যাচের চাপ নিয়ে মেসি বলেন, ‘আমরা কখনো চাপ নিয়ে আলাদা করে ভাবি না। খেলাটাকে স্বাভাবিকভাবেই নিই এবং উপভোগ করার চেষ্টা করি। আমরা প্রতিযোগিতাপ্রিয়, জিততে ভালোবাসি। তবে ফুটবল দলীয় খেলা, প্রতিপক্ষও খেলে। তাই সব সময় জেতা সম্ভব নয়।’তিনি আরও যোগ করেন, ‘ছোটবেলায় আমি শিখেছি, জয়ের চেয়ে হারই বেশি আসে। সেই হারগুলোই আমাকে মানুষ হিসেবে এবং ফুটবলার হিসেবে আরও পরিণত করেছে।’​ফাইনালের প্রতিপক্ষ স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালকেও প্রশংসায় ভাসিয়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। মেসি বলেন, ‘ইয়ামাল অসাধারণ একজন ফুটবলার। আমি তাকে অনেক দিন ধরেই অনুসরণ করছি, কারণ সে এমন একটি ক্লাবে খেলে, যেটিকে আমি ভালোবাসি। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই সে বিশ্ব ফুটবলের আইকনে পরিণত হয়েছে। সামনে তার পুরো ক্যারিয়ার পড়ে আছে এবং ইতিহাস গড়ার দারুণ সুযোগও রয়েছে। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যেন সেটা এবার না হয়।’ইয়ামালকে কোলে নেওয়ার সেই বিখ্যাত ছবি নিয়ে মেসি বলেন, ‘আমি যখন ওর সঙ্গে ছবি তুলেছিলাম, তখন সে ছিল ছোট্ট একটি শিশু। আর এখন বিশ্বকাপের ফাইনালে তার বিপক্ষে খেলতে নামব—এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। জীবনে এমন ঘটনাও ঘটে! এখন সে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়।’​প্রশংসার পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে থামানোর প্রত্যয় জানিয়ে মেসি বলেন, ‘আমি চাই ওর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হোক, কারণ ওর ভালো মানে বার্সেলোনারও ভালো। কিন্তু ফাইনালে আমরা চেষ্টা করব যেন ও নিজের সেরাটা খেলতে না পারে। যদিও সেটা সহজ হবে না। স্পেনের অনেক ভালো খেলোয়াড় আছে এবং তাদের খেলার ধরনও দুর্দান্ত। তবে আমাদেরও নিজেদের শক্তি রয়েছে।’​উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে স্পেন এবং বুধবার ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ফাইনালে জায়গা করে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের এই ফাইনাল ম্যাচটি শুরু হবে আগামী র‌বিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায়।

চাপ সামলানোর মন্ত্র শোনালেন মেসি
ফ্রান্স ফ্রান্স
-
১৯ জুলাই - ০৩ এএম
ইংল্যান্ড ইংল্যান্ড
স্পেন স্পেন
-
২০ জুলাই - ০১ এএম
আর্জেন্টিনা আর্জেন্টিনা
প্রবাসী কার্ডের সুবাদে মিলবে ১০ সুবিধা, আগস্টে পরীক্ষামূলক যাত্রা

প্রবাসী কার্ডের সুবাদে মিলবে ১০ সুবিধা, আগস্টে পরীক্ষামূলক যাত্রা

​প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, আর্থিক সুরক্ষা এবং উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শনিবার (১৮ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চামেলী হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই কার্ডের বিস্তারিত কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে এই কার্ড চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা প্রবাসীদের জন্য নতুন এক মাইলফলক হতে যাচ্ছে। ​বৈঠকে জানানো হয়, আগামী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্ডের কার্যক্রম শুরু হবে। প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে এই ডেবিট কার্ড ইস্যু করা হবে। ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে ৫০ হাজার এবং আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে ২ লাখ প্রবাসী কার্ড বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে সব কার্যক্রম প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। ​প্রবাসী কার্ডের সুবিধাগুলো তুলে ধরে সভায় জানানো হয়, কার্ডধারীরা ১০টি বিশেষ সেবা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে বিমানবন্দরগুলোতে দ্রুত ইমিগ্রেশন ও লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধা, টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ে বিশেষ ছাড় এবং এয়ারপোর্ট পিক-অ্যান্ড-ড্রপ সেবা। এ ছাড়া সরকারি হাসপাতালে বিশেষ বুথ ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবায় ছাড় পাবেন তারা। প্রবাসীদের মৃত্যু হলে মরদেহ বিনা খরচে দেশে পরিবহন, রেমিট্যান্স রিওয়ার্ড পয়েন্ট, ক্রেডিট স্কোরিং ও ঋণ সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে এতে। পাশাপাশি জমি রেজিস্ট্রেশন, ইউটিলিটি সংযোগ, পাসপোর্ট, এনআইডি এবং কনস্যুলার সেবায় কার্ডধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং প্রবাসফেরতদের পুনর্বাসন ও বীমা সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। ​সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে আরও আধুনিক করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বিশ্বের সব প্রান্তে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেন এই কার্ডের সুবিধা পেতে পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ​বৈঠকে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ ও মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ক্রীড়া কার্ডের সফল কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় এবার প্রবাসী কার্ড বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রবাসীদের জীবনযাত্রাকে আরও সহজ ও সুসংহত করার লক্ষ্য নিয়েছে বর্তমান সরকার।
৩ ঘন্টা আগে

১৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম
পিউ রিসার্চের জরিপ বলছে, জনপ্রিয়তায় আমেরিকাকে টপকে শীর্ষে এখন চীন। বিশ্বে কি তবে আমেরিকার প্রভাব কমছে?

পিউ রিসার্চের জরিপ বলছে, জনপ্রিয়তায় আমেরিকাকে টপকে শীর্ষে এখন চীন। বিশ্বে কি তবে আমেরিকার প্রভাব কমছে?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৫৩ জন

সংবাদ ডিজিটালে জেলা, উপজেলায় কাজ করতে আগ্রহীরা সিভি পাঠান

বিস্তারিত

মতামতমতামত

বৃষ্টিধোয়া বাতাসের অদৃশ্য হুমকি ব্ল্যাক কার্বন

বর্ষার বৃষ্টিতে ঢাকার আকাশ অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ধুলোমলিন শহরটিকে তখন তুলনামূলকভাবে নির্মল মনে হয়। মুষলধারে বৃষ্টি বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ধুয়ে ফেলে, বায়ুমণ্ডলকে শীতল করে।দৃশ্যমান বায়ুদূষণ কমিয়ে আনে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, বর্ষাকালে শ্বাস নেওয়ার জন্য বাতাস অনেক বেশি নিরাপদ হয়ে উঠেছে।কিন্তু চোখে দেখা এই স্বচ্ছতার আড়ালেও থেকে যেতে পারে এক অদৃশ্য ও ক্ষতিকর দূষক ব্ল্যাক কার্বন বা কালো কার্বন।বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, ঢাকার রসায়ন বিভাগ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বায়ুদূষণবিষয়ক গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বিভাগটি বায়ুর গুণমান পর্যবেক্ষণের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা কার্যক্রম গড়ে তুলেছে। নিউক্লিয়ার বিশ্লেষণ পদ্ধতি, অ্যারোসলের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় এবং বিভিন্ন উন্নত বিশ্লেষণধর্মী কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের বায়ুদূষণের প্রকৃতি ও উৎস অনুসন্ধান করা হচ্ছে।পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের গবেষণালব্ধ ফলাফল দূষণের প্রধান উৎস শনাক্তকরণ, বাংলাদেশে অ্যারোসলের ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং জাতীয় পর্যায়ে বায়ুর গুণমান ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত উদ্যোগ গ্রহণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, ঢাকার দীর্ঘমেয়াদি তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, বর্ষাকালে ঢাকার বাতাসে সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম-পিএম-টু পয়েন্ট ফাইভ) সামগ্রিক ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এলেও ব্ল্যাক কার্বনের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি থেকে যেতে পারে।বর্ষাকালে বাতাসে সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘ওয়েট ডিপোজিশন’ বা বৃষ্টিজনিত অপসারণ। বৃষ্টির ফোঁটা বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ও অন্যান্য বস্তুকণাকে সঙ্গে নিয়ে ভূমিতে নামিয়ে আনে। ফলে বাতাসে কণার মোট পরিমাণ কমে যায় এবং আকাশ দৃশ্যত পরিষ্কার হয়ে ওঠে।বাতাসে ভাসমান বস্তুর কণার উপস্থিতিতবে বাতাসে ভাসমান কণার মোট পরিমাণ কমে গেলেই সব ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সমানভাবে কমে যায় না। অবশিষ্ট কণাগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি দহনজনিত উৎস থেকে আসে, তবে বাতাস দেখতে পরিষ্কার হলেও তার বিষাক্ততা উদ্বেগজনক পর্যায়ে থাকতে পারে।খনিজ ধূলিকণা সাধারণত বাতাসে সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট ভরের একটি বড় অংশের জন্য দায়ী। অন্যদিকে ব্ল্যাক কার্বন প্রায় সম্পূর্ণভাবে জ্বালানির অসম্পূর্ণ দহন থেকে উৎপন্ন হয়। যানবাহনের ডিজেল ইঞ্জিন, ইটভাটা, শিল্পকারখানা, কয়লা ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানি, কাঠ ও বায়োমাস পোড়ানো, অপরিষ্কার রান্নার চুলা এবং উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানো ব্ল্যাক কার্বনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ব্ল্যাক কার্বনের সঙ্গে প্রায়ই পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন, ট্রানজিশন মেটাল এবং অতি সূক্ষ্ম কণার মতো বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এ কারণে দহনজনিত বায়ুদূষণ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ব্ল্যাক কার্বনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।ব্ল্যাক কার্বনের বিশেষত্ব হলো, এটি একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও জলবায়ুকে প্রভাবিত করে।বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ক্রমেই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট ভরের চেয়ে ব্ল্যাক কার্বনের মাত্রা অধিক কার্যকর নির্দেশক হতে পারে। কারণ ব্ল্যাক কার্বন দহন থেকে নির্গত বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শকে তুলনামূলকভাবে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।ব্ল্যাক কার্বনের অতি সূক্ষ্ম কণা শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসের গভীর অ্যালভিওলার অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে। কিছু কণা বায়ু, রক্ত প্রতিবন্ধক অতিক্রম করে রক্তসঞ্চালনেও পৌঁছাতে সক্ষম। এর ফলে শরীরে সিস্টেমিক প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, রক্তনালির অভ্যন্তরীণ আবরণের কার্যকারিতায় ব্যাঘাত এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। এসব প্রতিক্রিয়া শরীরের একাধিক অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে। বিভিন্ন স্বাস্থ্য গবেষণায় ব্ল্যাক কার্বনের সংস্পর্শের সঙ্গে হৃদ্‌রোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগ, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস, শিশুদের হাঁপানি, ফুসফুসে প্রদাহ, শিশুদের স্নায়ু-বিকাশগত সমস্যা এবং বয়স্কদের জ্ঞানীয় ক্ষমতা হ্রাসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন যানজটপূর্ণ সড়কে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। ট্রাফিক পুলিশ, রিকশাচালক, গণপরিবহনের চালক ও শ্রমিক, পথচারী, সড়কের পাশের দোকানি, নির্মাণশ্রমিক এবং স্কুলগামী শিশুরা নিয়মিত যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও দহনজনিত দূষণের সংস্পর্শে আসে।এ কারণে ব্ল্যাক কার্বন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ, যা আরও বেশি বৈজ্ঞানিক, প্রশাসনিক ও নীতিগত মনোযোগ দাবি করে।ব্ল্যাক কার্বন শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়; এটি জলবায়ুর ওপরও শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবস্থান করতে পারে। অন্যদিকে ব্ল্যাক কার্বনের বায়ুমণ্ডলীয় স্থায়িত্বকাল তুলনামূলকভাবে খুবই কম-সাধারণত কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ। তবে স্বল্পস্থায়ী হলেও এটি অত্যন্ত কার্যকর আলো শোষণকারী কণা এবং জলবায়ু উষ্ণায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।বায়ুমণ্ডলের অধিকাংশ অ্যারোসল সূর্যালোককে চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে শীতলীকরণ প্রভাব সৃষ্টি করে। কিন্তু ব্ল্যাক কার্বন সূর্যের আগত বিকিরণ শোষণ করে তা তাপে রূপান্তরিত করে। এর ফলে পারিপার্শ্বিক বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়, পৃথিবীর বিকিরণ ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে এবং বায়ুমণ্ডলের স্থিতিশীলতা, মেঘের গঠন ও আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহের ওপর প্রভাব পড়ে। বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে ব্ল্যাক কার্বনের কারণে সৃষ্ট উষ্ণতা মেঘ গঠনের প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এটি বৃষ্টিপাতের সময়, তীব্রতা ও ভৌগোলিক বণ্টনেও প্রভাব ফেলতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার মতো মৌসুমি বৃষ্টিনির্ভর অঞ্চলের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।ব্ল্যাক কার্বন বিভিন্ন পরোক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। এর কণা মেঘ ঘনীভবন কেন্দ্রক হিসেবে কাজ করতে পারে অথবা বিদ্যমান মেঘকণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে মেঘের প্রতিফলনক্ষমতা, স্থায়িত্ব এবং বৃষ্টিপাতের কার্যকারিতায় পরিবর্তন আনতে পারে।অ্যারোসল ও মেঘের এই মিথস্ক্রিয়া জলবায়ুবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল ও অনিশ্চিত বিষয়। তবে এটি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্ল্যাক কার্বন আঞ্চলিক আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।এ ছাড়া ব্ল্যাক কার্বনের কারণে সৃষ্ট বায়ুমণ্ডলীয় উষ্ণতা উল্লম্ব তাপমাত্রা বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো কোনো অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, অনাবৃষ্টি ও খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ব্ল্যাক কার্বনের বায়ুমণ্ডলীয় স্থায়িত্বকাল কম হওয়ায় এর নির্গমন হ্রাস করলে তুলনামূলকভাবে দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব। ব্ল্যাক কার্বন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একই সঙ্গে বায়ুর গুণমান উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে অগ্রগতি অর্জন করা যায়।জাতীয় বায়ুর গুণমান মানদণ্ড ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে সাধারণত সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) ভরঘনত্বের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। এই বস্তুকণার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু এর মোট ভরঘনত্ব পরিমাপ করে নির্ণয় করা যায় না যে, কণাগুলো তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর ভূত্বকীয় ধূলিকণা থেকে এসেছে, নাকি অধিক বিষাক্ত দহনজনিত উৎস থেকে উৎপন্ন হয়েছে।একই পরিমাণ সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মধ্যে ধূলিকণা, ব্ল্যাক কার্বন, জৈব কার্বন, মৌলিক কার্বন, ভারী ধাতু এবং অন্যান্য বিষাক্ত যৌগের অনুপাত ভিন্ন হতে পারে। ফলে শুধু সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট পরিমাণ জানলেই বাতাসের প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।বাতাসে ভাসমান বস্তুর কণার উপস্থিতিভবিষ্যতের বায়ুর গুণমান ব্যবস্থাপনায় সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) পাশাপাশি ব্ল্যাক কার্বন, জৈব কার্বন, মৌলিক কার্বন, ট্রেস মেটাল এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপাদানের নিয়মিত পরিমাপ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রিসেপ্টর মডেলিংয়ের মাধ্যমে দূষণের উৎস বিভাজন এবং অবিচ্ছিন্ন বায়ুমণ্ডলীয় পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।এ ধরনের সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে জানা যাবে, বায়ুদূষণের কতটুকু যানবাহন, ইটভাটা, শিল্পকারখানা, বায়োমাস দহন, নির্মাণকাজ, বর্জ্য পোড়ানো কিংবা আঞ্চলিক দূষণ পরিবহন থেকে আসছে। দূষণের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেলে প্রমাণভিত্তিক, লক্ষ্যনির্ভর ও কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে। বাংলাদেশে ব্ল্যাক কার্বনের নির্গমন কমাতে যানবাহনের নির্গমন পরীক্ষা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। পুরোনো ও অদক্ষ ডিজেল ইঞ্জিনের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। গণপরিবহনের মান উন্নয়ন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিনির্ভর যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে হবে। ইটভাটায় পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা, শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করা এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি।একই সঙ্গে ব্ল্যাক কার্বন পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক গবেষণাগার ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সম্প্রসারণ, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা প্রয়োজন।শহরের যেসব এলাকায় যানবাহন ও দহনজনিত দূষণের মাত্রা বেশি, সেসব স্থানে নিয়মিত ব্ল্যাক কার্বন পর্যবেক্ষণ চালু করা যেতে পারে। স্কুল, হাসপাতাল, আবাসিক এলাকা, বাস টার্মিনাল, প্রধান সড়ক এবং শিল্পাঞ্চলের বাতাসে ব্ল্যাক কার্বনের মাত্রা আলাদাভাবে নির্ণয় করা দরকার।বায়ুদূষণ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। আবর্জনা পোড়ানো, নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধোঁয়া সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, নির্মল আকাশ মানেই সব সময় নিরাপদ বাতাস নয়। বর্ষার বৃষ্টি বাতাসে থাকা বহু কণা ধুয়ে ফেললেও দহনজনিত বিষাক্ত কণার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করে না। দৃশ্যমান ধুলা কমে যাওয়ার আড়ালে ব্ল্যাক কার্বনের মতো ক্ষতিকর দূষক থেকে যেতে পারে।তাই বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনাকে শুধু সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট ভর পরিমাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দূষণের প্রকৃত ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়ালেই থেকে যাবে।ব্ল্যাক কার্বন কমানো গেলে একই সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে, নগরের বাতাস পরিচ্ছন্ন হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ কারণেই বাংলাদেশের বায়ুর গুণমান ব্যবস্থাপনায় ব্ল্যাক কার্বনকে এখন আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, ঢাকা

কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীরা?

কোনো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার তরুণ প্রজন্মের জ্ঞান, দক্ষতা ও স্বপ্নের ওপর। যে জাতি তার শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধরে রাখতে পারে, সেই জাতিই আগামী দিনের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সভ্যতার নেতৃত্ব দেয়। আর যে রাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা মাঝপথেই শিক্ষার মূলধারা থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে, সেখানে উন্নয়নের সুউচ্চ অট্টালিকাও একসময় নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সামনে এমনই এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটের দরজা খুলে দিয়েছে। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। সংখ্যার ভাষায় এটি প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ তরুণ-তরুণী; কিন্তু বাস্তবে এটি সাড়ে পাঁচ লাখ অসমাপ্ত স্বপ্ন, সাড়ে পাঁচ লাখ সম্ভাবনার অপচয় এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবিক ট্র্যাজেডি : পরিসংখ্যান কখনো কখনো খুব নির্মম হয়। সেখানে চোখের জল, অপূর্ণ স্বপ্ন কিংবা একটি পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প ধরা পড়ে না। দুই বছর আগে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিল। অথচ এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে মাত্র সাড়ে ৯ লাখ। অর্থাৎ পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগেই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে গেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী। এরপর যারা ফরম পূরণ করেছে, তাদের মধ্যেও প্রতিদিন হাজার হাজার পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত থেকেছে। প্রতিটি অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর পেছনে রয়েছে একটি আলাদা গল্প কোথাও দারিদ্র্য, কোথাও বাল্যবিবাহ, কোথাও পরিবারের উপার্জনের দায়, কোথাও আবার হতাশা, মানসিক চাপ কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা। তাই এই সংকটকে কেবল পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বিচার করলে চলবে না; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় অগ্রগতির প্রশ্ন।কেন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীরা? কোনো শিক্ষার্থী একদিনে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। তার ঝরে পড়ার পেছনে দীর্ঘদিনের আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংকট কাজ করে। মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে সন্তানের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক পরিবারে কলেজে পাঠানোর চেয়ে সন্তানকে কাজে পাঠানোকে বেশি প্রয়োজনীয় মনে করা হচ্ছে। কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে, কেউ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আবার কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যে পরিণত হচ্ছে। এভাবেই ধীরে ধীরে বইয়ের ব্যাগের জায়গা দখল করে নিচ্ছে শ্রমের বোঝা। সবচেয়ে বড় কথা, বহু তরুণের কাছে শিক্ষা আর নিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের সংকট : শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার দায় শুধু পরিবার বা অর্থনৈতিক বাস্তবতার নয়; শিক্ষাব্যবস্থারও রয়েছে বড় দায়। আমাদের শিক্ষা এখনও অতিমাত্রায় পরীক্ষাকেন্দ্রিক, মুখস্থনির্ভর এবং নম্বরপ্রধান। শেখার আনন্দ, সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশের চেয়ে পরীক্ষার ফলকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টেস্ট পরীক্ষাকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যে দুর্বল শিক্ষার্থীরা মূল পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগই হারিয়ে ফেলে। অথচ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শিক্ষার্থীকে বাদ দেয়া নয়; তাকে শেখার উপযোগী করে গড়ে তোলা। শিক্ষা যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়, তবে ঝরে পড়ার এই মিছিল আরও দীর্ঘ হবে।এটি শুধু শিক্ষা নয়, অর্থনীতিরও সংকট : উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা উচ্চশিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের অন্যতম প্রধান সোপান। এখান থেকেই একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা কিংবা পেশাগত জীবনের পথে এগিয়ে যায়। ফলে এই স্তরে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া মানে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি তৈরি হওয়া। একটি দেশ তখনই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে পারে, যখন তার তরুণ জনগোষ্ঠী শিক্ষিত, দক্ষ ও উৎপাদনশীল হয়। কিন্তু যদি প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী মূলধারার শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে জনসংখ্যাগত সুবিধা   একসময় জনসংখ্যাগত চাপেই পরিণত হবে। উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন তখন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।পরবর্তী পর্বে ৬-১০ নম্বর অংশে বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য, মানসিক স্বাস্থ্য, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষানীতির দুর্বলতা সাহিত্যসমৃদ্ধ ও গবেষণাভিত্তিকভাবে তুলে ধরব।বাল্যবিয়ে, দারিদ্র্য ও অসমাপ্ত শিক্ষাযাত্রা : বাংলাদেশে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম বড় কারণ এখনও দারিদ্র্য ও বাল্যবিবাহ। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে বহু কিশোরীর শিক্ষাজীবন থেমে যায় বিয়ের পিঁড়িতে বসার মধ্য দিয়ে। গত বছর অনুপস্থিত এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য অংশের পরীক্ষার্থী বাল্যবিবাহের কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। একটি মেয়ে যখন অল্প বয়সে বিদ্যালয় ছেড়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হয়, তখন হারিয়ে যায় শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়; হারিয়ে যায় একজন সম্ভাব্য শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী কিংবা দক্ষ উদ্যোক্তা। একইভাবে অর্থনৈতিক সংকটে বহু ছেলে শিক্ষার্থীও বই ছেড়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কেউ গ্যারেজে, কেউ দোকানে, কেউ নির্মাণশ্রমিক, আবার কেউ বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নে শিক্ষার পথ থেকে সরে যাচ্ছে। এভাবে দারিদ্র্য ও সামাজিক বাস্তবতা মিলেই শিক্ষার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে হাজারো স্বপ্নের।শিক্ষা যখন হারায় বিশ্বাসের জায়গা : একসময় উচ্চশিক্ষা ছিল সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সাফল্যের সবচেয়ে বড় সোপান। কিন্তু আজ বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেও দীর্ঘদিন চাকরি না পাওয়ার অসংখ্য উদাহরণ তরুণদের মনে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। অনেকের কাছে প্রশ্ন জাগছে—দীর্ঘ ১৬ বা ১৮ বছর লেখাপড়া করেও যদি কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হয়, তবে এত দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রার মূল্য কোথায়? শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে এই বিচ্ছিন্নতাই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থীকে নিরুৎসাহিত করছে। ফলে তারা উচ্চশিক্ষার পরিবর্তে দ্রুত আয়ের পথকেই বেশি বাস্তবসম্মত মনে করছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসের সংকটও।মানসিক স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল বিভ্রান্তির নতুন বাস্তবতা : বর্তমান প্রজন্ম এমন এক সময়ে বেড়ে উঠছে, যেখানে প্রতিযোগিতা, সামাজিক প্রত্যাশা এবং ডিজিটাল বিভ্রান্তি একসঙ্গে তাদের মানসিক জগতে প্রভাব ফেলছে। পরীক্ষার চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং সামাজিক তুলনার সংস্কৃতি বহু শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম এবং দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের কারণে মনোযোগ ও পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। অথচ দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয় ও কলেজে এখনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং কিংবা মনোসামাজিক সহায়তার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নীরবে ভেঙে পড়ছে, আর সেই ভাঙনের শেষ পরিণতি হচ্ছে শিক্ষার মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।বিশ্বের অভিজ্ঞতা আমাদের কী শেখায় : শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়; বিশ্বের অনেক দেশই এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। তবে তারা সমস্যাটিকে কেবল শিক্ষা খাতের বিষয় হিসেবে দেখেনি। ভারত দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও ডিজিটাল শিক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছে; নেপাল ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের আগেভাগে শনাক্ত করার ব্যবস্থা চালু করেছে; শ্রীলঙ্কা তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষা সংস্কারে জোর দিয়েছে; পাকিস্তান কারিগরি শিক্ষা ও শিক্ষা ভাউচার কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেছে। এসব অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা হলো—শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ করতে হলে শিক্ষা, অর্থনীতি, সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানসিক স্বাস্থ্য—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থী মানেই হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ : একজন শিক্ষার্থী যখন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না, তখন শুধু একটি পরীক্ষার খাতা ফাঁকা থাকে না; ফাঁকা হয়ে যায় একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্র হারায় একজন দক্ষ নাগরিক, পরিবার হারায় উন্নত জীবনের আশা, আর সমাজ হারায় একটি উৎপাদনশীল শক্তি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই সম্পদকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে উন্নত, জ্ঞানভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন পূরণ হবে না। তাই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রতিটি ঘটনা কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্বেগের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, সমাজনীতি এবং জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। কারণ, আজ যে শিক্ষার্থী হারিয়ে যাচ্ছে, আগামীকাল তার অভাবই দেশের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।সময়োপযোগী শিক্ষা সংস্কারের আর কোনো বিকল্প নেই : এই সংকট মোকাবিলায় প্রথম প্রয়োজন প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান। জাতীয় পর্যায়ে একটি তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের আগেভাগেই শনাক্ত করতে হবে। উপবৃত্তি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। পাশাপাশি মাধ্যমিক স্তর থেকেই কারিগরি, প্রযুক্তিনির্ভর, উদ্যোক্তামুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি। কারণ সব শিক্ষার্থীর গন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় হতে হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। শিক্ষা এমন হতে হবে, যা একজন তরুণকে শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নয়, কর্মজীবনের জন্যও প্রস্তুত করবে।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক স্বপ্ন রক্ষার নিরাপদ আশ্রয় : একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য কেবল জিপিএ-৫ কিংবা শতভাগ পাসের হারে নির্ধারিত হয় না; প্রকৃত সাফল্য হলো একজন দুর্বল শিক্ষার্থীকে মূলধারায় ধরে রাখা। টেস্ট পরীক্ষাকে বাদ দেওয়ার উপকরণ নয়, শেখার ঘাটতি পূরণের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। প্রতিটি কলেজ ও বিদ্যালয়ে ধীরে ধীরে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং অভিভাবক-শিক্ষক সমন্বিত পরামর্শব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী যেন কোনো সংকটে একা অনুভব না করে-এমন মানবিক শিক্ষাব্যবস্থাই হতে পারে ঝরে পড়া রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।এইচএসসি পরীক্ষায় ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। প্রতিটি ঝরে পড়া শিক্ষার্থী একটি পরিবারের ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, একটি জাতির হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা এবং উন্নয়নের পথে একটি অপূরণীয় ক্ষতি। শিক্ষা কেবল একটি সনদ নয়; এটি একটি জাতির সভ্যতা, মানবিকতা ও সমৃদ্ধির ভিত্তি। তাই  এর প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি, কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সমাধান গ্রহণ করা। কারণ যে রাষ্ট্র তার শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে পারে, সেই রাষ্ট্রই আগামী দিনের জ্ঞান, উদ্ভাবন ও উন্নয়নের নেতৃত্ব দেয়। আর যে রাষ্ট্র তার তরুণদের হারিয়ে ফেলে, সে ধীরে ধীরে নিজের ভবিষ্যৎকেই হারিয়ে ফেলে।    বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রাকে সত্যিকার অর্থে টেকসই করতে হলে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলোয় ধরে রাখাই হতে হবে জাতীয় অঙ্গীকার।[লেখক: প্রশিক্ষক, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বরিশাল]

দুর্যোগ মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতিকে ত্বরান্বিত করছে

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে প্রকৃতির রোষানলের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বাঁচতে হয়। প্রতি বছর বন্যা, জলোচ্ছ্বাস কিংবা প্রবল ঘূর্ণিঝড় আমাদের বিস্তীর্ণ উপকূল এবং নিম্নাঞ্চলের মানুষের জীবন তছনছ করে দিয়ে যায়। যখনই কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের ওপর আঘাত হানে, তখন গণমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রশাসন পর্যন্ত সকলের সম্পূর্ণ মনোযোগ থাকে কেবল দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির দিকে। কয়টি কাঁচা ঘরবাড়ি ভাঙলো, কত হাজার একর ফসলের জমি তলিয়ে গেল কিংবা ঠিক কতগুলো গবাদিপশু ভেসে গেল, আমরা মূলত সেই হিসাব মেলাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সরকারি ও বেসরকারি নানাবিধ উদ্যোগে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ হিসেবে খুব দ্রুত পৌঁছে যায় চাল, ডাল, বিশুদ্ধ পানি, ত্রিপল এবং নগদ অর্থ। কিন্তু এই বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের পর বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর মনের ভেতর যে ভয়াবহ এক নীরব ঝড় শুরু হয়, তার খবর আমরা কয়জন রাখি? BJPsych International জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ৪৮ শতাংশেরও বেশি শিশু ও কিশোর বিচ্ছেদ উদ্বেগ, পিটিএসডি, প্যানিক অ্যাটাক ও বিষণ্নতাসহ নানা গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিল  । দুর্যোগ এবং বাস্তুচ্যুতির কারণে সৃষ্ট মানসিক স্বাস্থ্যের গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংকট আমাদের দেশে আজও প্রায় সম্পূর্ণ আলোচনার বাইরে রয়ে গেছে।একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন সেই মানুষটির কথা, যার সারা জীবনের তিল তিল করে জমানো পয়সায় বোনা স্বপ্নের ঘরটি মুহূর্তের মধ্যে রাক্ষুসে নদীর পেটে বিলীন হয়ে গেছে। অথবা সেই প্রান্তিক কৃষকের কথা ভাবুন, চোখের সামনে যার সোনালি ধানের মাঠ সাগরের লোনা জলে ডুবে গিয়ে চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে। এই মানুষগুলো দুর্যোগে শুধু তাদের বৈষয়িক সম্পদই হারায় না, তারা হারায় বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বোনা তাদের সমস্ত স্বপ্ন। রাতে যখন জোয়ারের পানি বাড়ে কিংবা আকাশে কালো মেঘ জমে, তখন তাদের বুকে যে অজানা আতঙ্ক দানা বাঁধে, তা কোনো সাধারণ ভয় নয়। এটি এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত বা ট্রমা। বারবার সবকিছু হারিয়ে তারা একসময় তীব্র অস্তিত্ব সংকটে ভুগতে শুরু করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন নতুন এক ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ক্লাইমেট অ্যাংজাইটি।নদীভাঙন এবং বন্যায় বাস্তুচ্যুত হওয়া পরিবারের নারী এবং শিশুদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি সবচেয়ে বেশি ঘটে। আশ্রয়কেন্দ্রে বা নতুন জায়গায় নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার অভাব তাদের মনে গভীর দাগ কাটে। Journal of Affective Disorders Reports -এ ২০২৪ সালে প্রকাশিত গবেষণায় খুলনার দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের ৩৫০ জন নারীর মধ্যে ৬৩ শতাংশ মাঝারি থেকে গুরুতর মাত্রার বিষণ্নতায় ভুগছেন বলে পাওয়া গেছে, যেখানে বাড়িঘর ক্ষতি, জীবিকা হারানো এবং পারিবারিক সংঘাতকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।বাস্তুচ্যুতির ফলে সৃষ্ট এই মানসিক সংকট কেবল দুর্যোগকালীন নির্দিষ্ট সময়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। যখন একজন মানুষ নদীভাঙন বা বন্যার কারণে নিজের পৈতৃক ভিটে চিরতরে ছাড়তে বাধ্য হন, তখন তিনি আসলে তার আজন্ম চেনা সামাজিক পরিচয় এবং আত্মীয়তার বন্ধন থেকেও ছিটকে পড়েন। নিজের পরিচিত শ্যামল গ্রাম ছেড়ে শহরের কোনো ঘিঞ্জি ও অস্বাস্থ্যকর বস্তিতে আশ্রয় নেয়া মানুষটি প্রতিনিয়ত এক ধরনের শেকড়হীন অনুভূতিতে ভোগেন। PLOS ONE -এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে উদ্বেগের হার ৭৬ শতাংশেরও বেশি পাওয়া গেছে, যা ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া মানুষদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। শহরের সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশ, জীবিকার চরম অনিশ্চয়তা এবং অমানবিক জীবনযাপন তাদের মাঝে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই পুঞ্জীভূত হতাশা অনেক সময় পারিবারিক কলহ, মাদকাসক্তি এবং আত্মহত্যার মতো ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে মানুষকে ঠেলে দেয়।অথচ এই রূঢ় ও ভয়াবহ বাস্তবতার পরও আমাদের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার বিষয়টি একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে উপেক্ষিত রয়ে গেছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের বদ্ধমূল কুসংস্কার এবং সচেতনতার অভাব। আমরা সাধারণত মনে করি, যার পেটে ভাত নেই বা মাথার ওপর ছাদ নেই, তার আবার মনের অসুখ নিয়ে ভাবার বিলাসিতা কেন! আমাদের এই ধারণাটি একেবারেই ভুল। মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসী বিষয় নয়, এটি মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা এবং টিকে থাকার সক্ষমতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। চরম বিপদের সময় একজন মানুষের যদি মানসিক জোরই পুরোপুরি ভেঙে যায়, তবে তাকে শুধু কয়েক বস্তা ত্রাণ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা কখনোই সম্ভব নয়।এখন সময় এসেছে আমাদের এই সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলানোর। দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যুক্ত করতে হবে। সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড বা মানসিক প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে প্রতিটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকার স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া অত্যন্ত জরুরি। দুর্যোগের পরপরই ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে গিয়ে তাদের কথা শোনার, তাদের সান্ত্বনা দেয়ার এবং ভয় কাটানোর জন্য একটি দক্ষ ও মানবিক কর্মীবাহিনী তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি, যারা দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা বা বিষণ্নতায় ভুগছেন, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কাউন্সিলিং বা চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই হয়তো বারবার ঝড় আসবে, নদীর জল কূল ছাপিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করবে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোকে পুরোপুরি ঠেকানোর ক্ষমতা হয়তো আমাদের মানুষের হাতে নেই। কিন্তু দুর্যোগের পর সর্বস্বান্ত হওয়া মানুষগুলোর পাশে পরম মমতায় দাঁড়িয়ে তাদের মনের সাহসটুকু জুগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য আমাদের অবশ্যই আছে। আসুন, আগামী দিনগুলোতে ত্রাণের বস্তার পাশাপাশি আমরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর প্রতি একটু মানসিক সমর্থন ও গভীর সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিই। মনের ভেতরের অদৃশ্য ক্ষতগুলো দূর করতে পারলে তবেই তারা নতুন করে জীবনযুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর আসল শক্তিটুকু খুঁজে পাবে।[লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

হাড্ডি আমার, মাংস আপনার

কওমি মাদ্রাসা স্থাপনের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন এবং হাফেজিয়া মাদ্রাসার জন্য পৃথক কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনে বিএনপি সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল। এজন্য ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ ও অন্য ৬টি বোর্ডের প্রধানদের ৯ জুলাই আহুত বৈঠকে যোগ দিতে আহ্বান জানানো হয় ; কিন্তু তারা অংশগ্রহণে অসম্মতি জানিয়েছে। কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারি অনুদান বা আর্থিক সহায়তার ধার ধারে না। তাই শিক্ষানীতি বা পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের সামান্যতম হস্তক্ষেপও তারা সহ্য করবে না-  এ কথা তারা বহুবার বলেছে। দারুল উলুম দেওবন্দের অনুসৃত নীতিমালার আলোকে তারা মক্তব থেকে দাওরা হাদিস পর্যন্ত ১৪টি শ্রেণী চালায়, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হেফজ বিভাগ। এই অবস্থানই আমাকে আজকের কলামটি লিখতে বাধ্য করেছে।গত কয়েক মাসেই দেশের কয়েকটি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতনের যে খবর বেরিয়েছে তা পড়লে গা শিউরে ওঠে। চট্টগ্রামের একটি মাদ্রাসায় ১০ বছরের এক ছাত্রকে চুরির অপবাদে হাত-পা বেঁধে সিলিং ফ্যানের হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেটানো হয়। মাথা নিচের দিকে, রক্ত জমে চোখ-মুখ ফুলে যায়, তবুও থামেনি শিক্ষক। গত বছরের শেষ দিকে কুমিল্লার এক কওমি মাদ্রাসায় ‘পড়া না পারার’ অপরাধে আরেক শিশুকে রাতভর শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার পর সকালে পা বেঁধে সিলিং-এর সাথে ঝুলিয়ে বেত, লাঠি আর প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে পেটানো হয়। শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রাজশাহীর একটি মাদ্রাসায় কুরআন মুখস্থ না পারার অপরাধে শিশুকে শিকল দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল তিন দিন। খাবার দেয়া হয়নি, বাথরুমে যেতে দেয়া হয়নি। সিলেটেও ভাত চুরির অপবাদে এক শিশুর দুই হাত পেছনে বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এমন অসংখ্য ঘটনা নেট দুনিয়ায় গেলেই নজরে পড়বে।এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন না। প্রতি বছর শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর কাছে যে অভিযোগগুলো জমা হয়, তার বড় অংশই আসে মাদ্রাসা-মক্তব-হেফজখানা থেকে। যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি শারীরিক পিটুনি, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা, উপুড় করে লাঠি দিয়ে আঘাত করা এখনও ‘আদব শেখানো’ আর ‘দ্বীনি তালিমের’ নামে চলে আসছে। প্রশ্ন হলো, যে প্রতিষ্ঠানে নবীর রহমতের কথা শেখানো হয়, নৈতিকতার সবক দেয়া হয়, সেখানেই কেন শিশুর শরীরে পড়ে সবচেয়ে নির্মম আঘাত ? এটা কেমন নৈতিকতা ? কুরআন শিক্ষায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে তারা পাশ্চাত্যের ‘কুরআন শূন্য করার পুরানা কৌশল’ বলে আখ্যা দেয়। ফলে তারা নিজেদের এক ধরনের রাষ্ট্রের বাইরের শক্তি মনে করে, বিএনপি সরকারকে তা বুঝতে হবে।অনেকেই তখনই পাল্টা যুক্তি তোলেন  ‘শুধু মাদ্রাসা কেন ? স্কুলের শিক্ষকরাও তো পেটায়। মা-বাবাও পেটায়। আপনারা মাদ্রাসা নিয়ে পড়ে আছেন কেন’? যুক্তিটা আংশিক সত্য। আমাদের প্রজন্মের প্রায় সবাই স্কুলে বেতের বাড়ি খেয়েছি। বাসায় এসে বাবাকে বললে উল্টো আরও দুইটা বেতের বাড়ি জুটত। ‘হাড্ডি আমার, মাংস আপনার’- এই বাক্য দ্বারা বাবারা গর্ব করে শিক্ষকের হাতে নিজ সন্তানকে তুলে দিতেও দেখেছি। কিন্তু পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল। শহরের বেশিরভাগ স্কুলে এখন বেত্রাঘাত নিষিদ্ধ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আছে, অভিভাবকরা সচেতন। কোনো শিক্ষক সীমা ছাড়ালে মামলা হয়, মিডিয়া আসে, শিক্ষক বরখাস্ত হয়। কিন্তু মাদ্রাসা-মক্তবের বড় অংশ এখনো রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার বাইরে। সেখানে অভিযোগ করলে বলা হয় ‘এটা তালিমের অংশ’, ‘গুনাহ হবে’, ‘হুজুরের বদনাম করো না’। সেখানে শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ থাকে না। তাই স্কুলে দুইটা বেতের বাড়ি আর মাদ্রাসায় শিকল দিয়ে বেঁধে ফ্যানে ঝুলিয়ে পেটানো-  দুটোকে এক পাল্লায় মাপা যায় না।তাহলে প্রশ্ন আসে, সরকারি স্কুল-কলেজ থাকতে মানুষ কেন গরীবের সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠায় ? উত্তরটা খুব সোজা এবং খুব নির্মম। কারণ সরকারি স্কুলে থাকা-খাওয়া নেই, কিন্তু মাদ্রাসায় আছে। গরীব বাবা-মা দুই বেলা পেটের চিন্তায় সন্তানকে মাদ্রাসায় দিয়ে দেন। সেখানে অন্তত ছেলেটা না খেয়ে থাকবে না, থাকার জায়গা পাবে। রাষ্ট্র যখন শিক্ষার পাশাপাশি খাবারের দায়িত্ব নেয় না, তখন মাদ্রাসা সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। কিন্তু এই ‘ফ্রি’ থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে শিশুকে দিতে হয় তার শরীরের উপর দিয়ে যাওয়া নির্যাতন। এটা দান না, এটা একটা অলিখিত চুক্তি-   তোমার পেট ভরাব, বদলে তোমার শরীরের উপর আমাদের অধিকার থাকবে।আর এই মাদ্রাসাগুলো চলে কার টাকায় ? মানুষের দানে। মানুষ মাদ্রাসায় মুক্তহস্তে টাকা দেয়। কারণ অনেকে মনে করে মাদ্রাসায় দান করলে সওয়াব হয়, বেহেশতের রাস্তা সহজ হয়। ফলে যারা সারাজীবন ঘুষ খায়, চাঁদাবাজি করে, দুর্নীতি করে তারাও শেষ বয়সে মাদ্রাসায় মোটা অঙ্কের টাকা দেয়। টাকা দিয়ে তারা পাপ ধোয়, আর মাদ্রাসা সেই টাকায় চলে। স্কুলের জন্য মানুষ এভাবে দান করে না। কারণ স্কুলে ‘সওয়াব’ নেই। ফলে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল থেকে যায়, আর বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠা মাদ্রাসাগুলোতে কোনো তদারকি থাকে না। দেশে এরা এত শক্তিশালী প্রেসার গ্রুপ যে, প্রতিটি সরকার এদের সমীহ করতে বাধ্য হয়। দীনি শিক্ষার নামে শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর দৈহিক নির্যাতন হলেও সরকার তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না।শেষ কথা একটাই। কওমি কর্তৃপক্ষ সরকারের তত্ত্বাবধান প্রত্যাখ্যান করছে কি শুধুই ‘দীনি শিক্ষার স্বাধীনতা’ রক্ষার জন্য, নাকি তাদের প্রতিষ্ঠানে চলা শিশু নিপীড়নকে অবাধ রাখার জন্যও? উত্তরটা সময়ই দেবে। নৈতিকতা শুধু কিতাব মুখস্থ করলে আসে না। আসে জবাবদিহিতা, আইনের শাসন আর শিশুকে মানুষ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে। যে শিক্ষক নিজেই শিশুকে পশুর মতো পেটায়, সে সারাদিন হাদিস পড়ালেও তার ছাত্র শিখবে-  ক্ষমতা থাকলে দুর্বলকে পেটানো যায়। ধর্মের নাম ব্যবহার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা গেলে, ধর্মই তখন অপরাধের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। মাদ্রাসা হোক বা স্কুল, বাড়ি হোক বা মসজিদের মক্তব-  যেখানেই শিশুর শরীরে আঘাতের দাগ পড়বে, সেখানেই রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে। প্রথম কাজ শিশুর গা থেকে বেত আর শিকল সরিয়ে নেয়া। তারপর বই, ভালোবাসা আর জবাবদিহির ক্লাসরুম। নইলে ‘হাড্ডি আমার, মাংস আপনার’- এই নিষ্ঠুর প্রবাদ দিয়েই আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম শেষ হয়ে যাবে। যে জাতি তার শিশুদের রক্ষা করতে পারে না, সে জাতি কোনো মূল্যবোধ দিয়েই বাঁচতে পারে না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

চায়ের রাজধানীর সবুজ গৌরব

ভোরের আলো ফোটার আগেই শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ঘেরা চা–বাগান জেগে ওঠে। শিশিরভেজা সবুজ পাতার ওপর প্রথম সূর্যের আলো পড়তেই মাথায় বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে কাজে নেমে পড়েন চা–শ্রমিকেরা। তাদের হাতে সংগ্রহ হয় দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি। সেই কচি পাতার সুবাস ছড়িয়ে পড়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে। প্রকৃতি, মানুষের শ্রম, শতবর্ষের ইতিহাস আর শিল্পের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই জনপদের নাম শ্রীমঙ্গল- বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী।এই সবুজ জনপদ এবার যুক্ত করেছে নতুন এক গৌরব। জাতীয় চা দিবস–২০২৬ উপলক্ষে দেশের চা শিল্পে গুণগত মান, উৎপাদন, রপ্তানি, উদ্ভাবনী বিপণন ও শ্রমিক কল্যাণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দিয়েছে বাংলাদেশ চা বোর্ড। এর মধ্যে সর্বোচ্চ গুণগতমানসম্পন্ন চা উৎপাদনকারী বাগান হিসেবে সম্মাননা অর্জন করেছে কেদারপুর টি কোম্পানি লিমিটেডের ঐতিহ্যবাহী মধুপুর চা বাগান। গত ২০ জুন শ্রীমঙ্গলে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় চা দিবসের অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে সম্মাননা ও সনদ তুলে দেওয়া হয়। চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উন্নতমানের চা উৎপাদন এবং গুণগত উৎকর্ষ ধরে রাখার কারণেই মধুপুর চা বাগান এ স্বীকৃতি অর্জন করেছে।দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কেদারপুর টি কোম্পানি লিমিটেডের মালিকানায় রয়েছে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ঝিমাই, হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার মধুপুর এবং শ্রীমঙ্গলের দিনারপুর ও সাতগাঁও- এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ চা বাগান। উৎপাদনের মান, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি দেশের চা–শিল্পে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নাম হিসেবে পরিচিত। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লায়লা রহমান কবীর ১৯৭৫ সাল থেকে সফলতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নিহাদ কবির। বাংলাদেশের করপোরেট অঙ্গনে লায়লা রহমান কবীর একজন অগ্রগণ্য নারী উদ্যোক্তা। বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম নারী চেয়ারম্যান, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ)-এর প্রথম নারী সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি দেশের ব্যবসা ও শিল্প খাতে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ব্যবসা ও জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০১৪ সালে ডেইলি স্টার–ডিএইচএল বাংলাদেশ বিজনেস অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।লায়লা রহমান কবীরের স্বামী ছিলেন দেশের স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ, খ্যাতিমান সাংবাদিক, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এবং সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য আহমদুল কবির। তিনি একসময় সাতগাঁও চা বাগানের স্বত্বাধিকারী ছিলেন এবং দেশের ঐতিহ্যবাহী দৈনিক সংবাদ–এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৪৫–৪৬ সালে ডাকসুর প্রথম সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ব্যাংকিং, শিল্প, সাংবাদিকতা ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকদের একজন হিসেবে দেশের আর্থিক খাতেও তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে তার উত্তরসূরি আলতামাশ কবির (মিশু) দেশের ঐতিহ্যবাহী দৈনিক সংবাদ–এর সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে চা চাষ শুরু হয় ১৮৪০ সালে চট্টগ্রামে। পরে ১৮৫৭ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগানে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদনের মধ্য দিয়ে এ শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আজ শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যতম বৃহৎ চা উৎপাদন অঞ্চল। প্রায় ৫০টি চা বাগান, পাহাড়, টিলা, বনাঞ্চল, হাওর ও জীববৈচিত্র্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই জনপদকে অনেকেই ভালোবেসে বলেন- চায়ের স্বর্গরাজ্য।ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক ধরে শ্রীমঙ্গলে প্রবেশের মুখে মুছাই এলাকায় সাতগাঁও চা বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ২৪ ফুট উঁচু ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্য। মাথায় ঝুড়ি, হাতে চা–পাতা তোলার ভঙ্গিতে নির্মিত এই ভাস্কর্য যেন চা–শ্রমিকের শ্রম, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার এক স্থির প্রতিচ্ছবি। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং সাতগাঁও চা বাগানের অর্থায়নে ২০০৯ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১০ সালে এটি সম্পন্ন হয়। ভাস্কর সঞ্জিত রায়ের নির্মিত এই শিল্পকর্ম আজ শ্রীমঙ্গলের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকগুলোর একটি। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা এখানে ভিড় করেন। সবুজ চা–বাগান, পাহাড় আর ‘চা কন্যা’কে ঘিরে তৈরি হয় অসংখ্য স্মৃতি আর আলোকচিত্র।জাতীয় চা দিবসে একরপ্রতি সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী চা বাগান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে শ্রী গোবিন্দপুর চা বাগান। শ্রেষ্ঠ চা রপ্তানিকারকের পুরস্কার পেয়েছে দি কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড। শ্রমিক কল্যাণে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা পেয়েছে মির্জাপুর চা বাগান। উদ্ভাবনী বাজারজাতকরণে পুরস্কার অর্জন করেছে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেড।পাশাপাশি বাংলাদেশ চা বোর্ড ‘বাংলাদেশ টি ইন্ডাস্ট্রি’ ও ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ নামে দুটি মোবাইল অ্যাপ চালু করেছে। চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ক্লোন এবং জেসমিন টি, রোজ টি, লেমন টি, মাসালা টি ও চকোলেট টি–সহ মূল্যসংযোজিত চা উৎপাদনের উদ্যোগ দেশের চা–শিল্পকে আরও বহুমুখী ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে।এক কাপ চায়ের স্বাদের পেছনে লুকিয়ে থাকে পাহাড়ের মাটি, ভোরের কুয়াশা, চা–শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রম, উদ্যোক্তার দূরদর্শিতা এবং দেড় শতাব্দীর ইতিহাস। জাতীয় চা দিবস–২০২৬–এ মধুপুর চা বাগানের অর্জিত স্বীকৃতি সেই দীর্ঘ যাত্রারই নতুন মাইলফলক। আর শ্রীমঙ্গলের প্রবেশমুখে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা ‘চা কন্যা’ যেন প্রতিদিন আগত দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয়- বাংলাদেশের চায়ের গল্প কেবল একটি পানীয়ের গল্প নয়; এটি মানুষের শ্রম, ঐতিহ্য, প্রকৃতি এবং উৎকর্ষের এক অনবদ্য ইতিহাস।লেখক: দৈনিক সংবাদ-এর শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভেরার রাজনৈতিক দর্শন এবং আমাদের গন্তব্য

যারা মানুষের আচরণের সংস্কৃতি বিষয়ে কৌতূহলী এবং মনোযোগী তারা নিশ্চয় লক্ষ্য করে থাকবেন, স্বভাবিক কথা মালায় আমাদের স্বর অনেকটা উঁচু হয়ে গেছে। সমাজে বিভেদ, বিভক্তি যতো বেড়ে যায় প্রতিহিংসা ও সমতালে বৃদ্ধি পায়। মানুষের স্বাভাবিক স্বর অস্বাভাবিক ভাবে উঁচুতে উঠতে থাকে। আক্রমনাত্মক হয়ে যায় কণ্ঠস্বর।  বাঙালি স্বভাবজাত ভাবে কিছুটা উচ্চস্বরে যোগাযোগে অভ্যস্থ।সমসাময়িক কালে রাজনৈতিক সভা সমাবেশে মার্জিত, চিন্তা উদ্রেককারী বক্তব্য খুব কম শুনা যায়।সকলেই ভাবেন স্বর যতো উচ্চ হবে শ্রোতাদের কাছ বক্তব্য ততো গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।আলোচনার বিষয় বস্তু নিয়ে খুব বেশি চিন্তা না করলেও চলে, বক্তব্যের শালীনতাও চিন্তা যোগ্য নয়। অশালীন শব্দের অধিকতর ব্যবহার বক্তব্যকে ক্ষমতায়িত  করে বলে  অনেকেই বিশ্বাস করেন।অশ্লীল শব্দ ব্যবহারের  পেছনে যুক্তির কোন অভাব নেই। ফরাসী বিপ্লব থেকে শুরু কর বিশ্বখ্যাত বিপ্লবীদের কথাও শুনে থাকি। অনেকেই প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বা সূত্র ছাড়াই বলে থাকেন ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভেরা অশ্লীল শব্দাবলীর চর্চা করে যেতেন নিয়মিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাই আমরা মহাজ্ঞানী চে কিংবা কাস্ত্রোর মতো গড়ে তুলছি। তাই মনে হয় সংস্কৃতি বিনির্মানের পথের পথিকদের আমাদের ‘চরৈবেতি’ বলা মহৎ কর্ম। রাজনৈতিক সংস্কৃতির উর্বর  ক্ষেত্রে আমরা মহানন্দে মুক্তভাবে অশ্লীলতার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি বাক স্বাধীনতার নামে।ষাটের দশকে জন্ম। লেখা পড়ার দৌড় খুব সীমিত। চে গুয়েভেরার অশ্লীলতা শব্দ চর্চার দর্শনের কথা জানা নেই। তবে মানুষ হিসেবে এতোটুকু বুঝি, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যতই অশ্লীলতা প্রবেশ করবে, সামাজিক সংস্কৃতি ততই অগ্রণযোগ্য এবং পশ্চাদপদ হতে থাকবে দ্রুত। যেহেতু ষাটের দশকে জন্ম আন্দোলন, অভূত্থান, যুদ্ধ দেখেই  বড় হয়েছি। ঊনসত্তরের গণআন্দোলন কী ভাবে সংগঠিত হয়েছে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের শিক্ষা স্বয়ংক্রিয় ভাবে হয়ে গেছে। বড় বড় জাতীয় নেতাকে সামনে থেকে দেখার  এবং বক্তব্য শুনার সৌভাগ্য হয়েছে। রসসিক্ত, ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। এসব মহান নেতাদের মেঠো বক্তৃতাতেও কখনো সুক্ষ কিংবা স্থুল অশ্লীলতার ইঙ্গিত পাইনি। মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান,  অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, মনি সিংহের বক্তব্যে সৌজন্য, শিষ্টাচারের সীমা লঙ্ঘিত হতে দেখিনি। ভিন্ন আদর্শের নেতাদের মতাদর্শের বিরোধিতা করেতে দেখেছি কিন্তু এ’কারণে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কোন বক্তব্য শুনতে পাইনি। সাম্প্রতিক কালের রাজনীতির মাঠের মেঠো বক্তৃতা, দেয়াল লিখন, স্লোগানে যখন উচ্চারণ অযোগ্য খিস্তি খেঁউড়ের দৌরাত্ম দেখি তখন মনে হয় সময়ের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছি বোধ হয় আমরা বহু মানুষ।আশার কথা এখনও অগণন রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজের সদস্য  বিশ্বাস করেন এসব খিস্তি খেঁউড় বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির অংশ নয়। মানুষের মুখের ভাষাই মূলত রাজনীতি এবং সমাজের ভাষা। নির্লিপ্ত ভাবে উচ্চারিত এসব অশ্লীল শব্দাবলী ক্ষণিকের জন্য চমক সৃষ্টির উপাদান মাত্র, এসব বক্তব্য দীর্ঘ মেয়াদী আবেদন সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হবে।ভাষা, শ্রেণী, সমাজের একটি সভ্য কাঠামো রয়েছে। এই কাঠামো ভেঙে যাওয়ার জন্য দুঃখবোধ, ভাঙন রোধের জন্য সামজিক অভিভাবকদের নির্লিপ্ততা, উদাসীন,আচরণ মোটেই কাম্য নয়। ভয়ের দিক হলো সমাজের বাতিঘর হিসেবে যাদেরকে আমরা চিহ্নিত করে রেখেছিলাম তারা কেউ এর প্রতিবাদ করছেন না। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের ক্ষুদ্র একটি অংশ বলার চেষ্টা করছেন এটি ভাষার রূপান্তর বা বদলে যাওয়া। এটি নতুন প্রজন্মের নতুন অভিব্যক্তি। যদিও তারা গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না। বাংলা ভাষার হাজার বছরের ইতিহাসে এরকম অস্বাবিক বাঁক বদলের নজির কখনো দেখা যায়নি।অশ্লীলতার বৈধকরন যারা করছেন তারা অনেকেই সমাজের জ্ঞানী মানুষ হিসেবে পরিচিত। তারা সমাজের নৈতিকতার দেয়ালকে ভাঙ্গার জন্য উৎসাহ প্রদান করছেন। নেতৃত্বের আসন থেকে ‘অশ্লীলতা বৈধ’ এই বার্তা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, যা পরবর্তী প্রজন্ম এবং সমাজকে নিশ্চিত ভাবে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে, গবেষণা না করেই এ’কথাটি বলা যায়।আশ্চর্যের বিষয় অশ্লীল শব্দ এবং বাক্য গুলো ব্যবহৃত হচ্ছে সরাসরি নারীদের উদ্দেশে। আমাদের দেশের নৈতিকতায় মাতৃজাতির প্রতি অভাবনীয় শ্রদ্ধার জায়গা নির্দিষ্ট করা ছিলো এবং এ’বিষয়ে সমাজের সকলেই একই সুরে কথা বলতেন। সংবেদনশীল কোন মানুষ যখন উন্মুক্ত আকাশের নিচে অশ্রাব্য শব্দে মাতৃজাতির প্রতি অপমান সূচক স্লোগান তোলেন তখন আমাদের সামগ্রিক সংস্কৃতির মানের অবস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে পারা যায়না। অসভ্যতাকে পরোক্ষ ভাবে সমর্থন দেয়া কিংবা নীরবতার সংস্কৃতি পালন করাকে দায়িত্বশীল, দেশ প্রেমিক নাগরিকের লক্ষন হিসেবে মেনে নেয়া যায়না। দায় না থাকলে সামাজিক, রাষ্ট্রনৈতিক অভিভাবকত্বের যোগ্যতা অর্জন করা যায়না। নির্লিপ্ততা, এড়িয়ে যাওয়া, উদাসীনতার দায় কিংবা জবাবদিহিতা সামজিক অভিভাবকদের একসময় বহন করতে হবে এ’কথাটি মনে রাখা উচিত।  রাজনৈতিক সংস্কৃতির দ্রুত অধঃপতনের এই সময়ে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা নিয়ত শুনে থাকি। তবে যারা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাজনীতির জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলে থাকেন তারা  নিশ্চয় জানেন যে আক্রমনাত্মক যোগাযোগ সমাজে প্রতিহিংসাকে বাড়িয়ে দেয় এবং রাজনীতিতে সকল শ্রেণীপেশার মানুষের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। এরকম অস্থির এক সময়ে নানা ভাবে বিভক্ত সমাজে অন্তর্ভুক্তি মূলক রাজনীতি চর্চার কথা অনেক ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক বয়ান বলে মনে হয়।অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার জন্য অন্তর্ভুক্তি মূলক রাজনৈতিক চর্চার প্রয়োজন।সব কিছুর পূর্বশর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিশুদ্ধকরন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের সদস্য, সাংস্কৃতিক সংগঠণের কর্মীরা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ১২  ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পূর্বে আমাদের সামনে হাজির হয়ে ছিলেন। সাধারণ নাগরিকদের কর্ণকূহরে বহু মধুর শব্দ এবং বাক্য এখনও অনুকরণ করে বেড়াচ্ছে। নির্বাচনের পর সব পথ সব মত বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টি হবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে সবচেয়ে সাহসী উচ্চারণ আমরা শুনেছি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কণ্ঠে।গণতন্ত্রের মৌলবাণী হচ্ছে শত ফুল বিকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা। নির্বাচনী জনসভায় আমরা ডানপন্থী দলগুলোর কাছ থেকেও অন্তর্ভুক্তি মূলক সমাজ এবং রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। নির্বাচনের কিছুদিন পূর্বে ৫ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বাম প্রগতিশীল দলগুলোর নবগঠিত জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’-এর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান বলেছিলেন  একটি আধুনিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে আস্তিক-নাস্তিক, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী সব শ্রেণীর মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে। যারা রাজনীতিতে সক্রিয় নন, উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন তারা অনেকেই এরকম সাহসী উচ্চারণ শুনে নড়েচড়ে উঠেন।সাত চল্লিশের পর থেকে আমরা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকিকরণের অঙ্গীকারের কথা শুনে আসছি। পাকিস্তানের তেইশ’ বছর, স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চান্ন বছর অতিক্রম করার  সময়ও আমরা একই অঙ্গীকারের কথা শুনছি। প্রশ্ন হলো আমরা কী অনেক দূর অতিক্রম করেও যাত্রা শুরুর বিন্দুতেই অবস্থা করছি। মনে রাখতে হবে ভৌতিক কাঠামোর উন্নয়নের থেকে সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান উন্নয়ন হলো গুরুত্বপূর্ণ। ভৌতিক কাঠামো উন্নয়নের সাথে যদি আমাদের সংস্কৃতির উন্নয়ন না ঘটে তাহলে উন্নয়ন কখনো টেকসই হবেনা। ভৌতিক কাঠামো বালির বাঁধের মতো ভেঙে যাবে।ফিরে আসি রাজনৈতিক সংস্কৃতির আলোচনায়। অশ্লীলতার নহর বয়ে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর থেকে ঐক্যবদ্ধ , সভ্য, গণতান্ত্রিক জাতি গঠণ কী সম্ভব। এ’জন্য রাজনীতিবিজ্ঞান, প্ল্যাটো, এরিস্টোটল, মার্ক্স পড়ার কোন প্রয়োজন নেই। জাতিকে কদর্য পথ থেকে ফেরানোর জন্য সামাজিক অভিভাবক বিশেষ করে শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, বিবেকসম্পন্ন সাংবাদিকসহ সব শ্রেণীর মানুষের সচেতন প্রয়াস খুব জরুরি। রাজনৈতিক ভাষার বিবর্তন, রুপান্তর ঘটবে এ’কথা মনে রেখেই  এগোতে হবে। বিবর্তন মানে বিপথে গমণ নয়। বিবর্তন হলো কাক্সিক্ষত, জাতীয় স্বপ্নের গন্তব্যে পৌঁছনোর প্রচেষ্টা। মনে রাখতে হবে আমরা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনাকাক্সিক্ষত লক্ষ্যহীন বিবর্তন চাইনা। আমরা চাই এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে আলোচনার গভীরতা থাকবে, সব শ্রেণীপেশার মানুষের অংশ গ্রহণ থাকবে। মার্জিত, রুচিসম্পন্ন স্লোগান, দেয়াল লিখন, মেঠো বক্তৃতায় জাতি নতুন পথের সন্ধান পাবে। এরকম লক্ষ্যে যদি জাতীয় ঐক্য গড়ে না ওঠে, তাহলে আমাদের সার্বিক উন্নয়নের সব চেষ্টা যে দূর আকাশে উবে যাবে এরকম উপসংহারে পৌঁছায় অন্যায় কোনো কাজ হবে বলে মনে হয়না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক] 

ক্ষমতায় বসেই বিধানসভায় গুন্ডাদমন আইন পাস

রাজ্যে কার্যকর হতেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘গুন্ডাদমন আইন’। আর সেই বিতর্ক এবার পৌঁছে গেল আদালতের দরজায়।বহু বিতর্কিত ‘গুন্ডাদমন বিল’ বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে দ্রুত পাশ করানো হয়, কার্যত কোনও বিস্তৃত পর্যালোচনা ছাড়াই। এর পরেই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৩ জুলাই (সোমবার) থেকেই সারা রাজ্যে এই আইন কার্যকর করার ঘোষণা করা হয়, যা ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক। এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্ট-এ দায়ের করা হয় একটি জনস্বার্থ মামলা।সোমবার থেকে চালু হয়েছে বহুচর্চিত ‘পশ্চিমবঙ্গ  পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ অ্যাক্ট, ২০২৬’।   কিন্তু এই  আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হল জনস্বার্থ মামলা।কলকাতা হাইকোর্ট-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী-র ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন জানিয়েছেন আইনজীবী তথা সিপিএম নেতা সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়। আদালত সূত্রে খবর, আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা গ্রহণ করা হয়েছে এবং খুব শিগগিরই শুনানির দিন নির্ধারণ হতে পারে।উল্লেখ্য, ২৯ জুন রাজ্য বিধানসভায় দীর্ঘ আলোচনার পর ধ্বনিভোটে পাশ হয় এই বিল। পরে রাজ্যপালের সম্মতিও মেলে। এর পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন,  ১৩ জুলাই থেকে আইন কার্যকর হয়ে গেল।নতুন আইনে পুলিশের হাতে দেওয়া হয়েছে বিস্তৃত ক্ষমতা। অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে এক বছর পর্যন্ত আটক রাখার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, দুষ্কৃতীমূলক কাজ বা সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি নষ্টের অভিযোগেও এই আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এমনকি ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে ‘দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ’ ধার্য করার ক্ষমতাও রাখা হয়েছে, যা প্রকৃত ক্ষতির দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে।রাজ্য সরকারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলা অপরাধচক্র, তোলাবাজি এবং সংঘবদ্ধ দুষ্কৃতী দমনে এই আইন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, রাজ্যকে ‘গুন্ডামুক্ত’ করতে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।তবে বিরোধীরা একেবারেই ভিন্ন সুরে। তাদের অভিযোগ, এই আইনের একাধিক ধারা নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও সাংবিধানিক সুরক্ষার পরিপন্থী। মামলাকারীর বক্তব্য, শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার বা দীর্ঘ সময় আটক রাখা ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিপন্থী এবং এই আইন ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।এই পরিস্থিতিতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়ে আইনের উপর অবিলম্বে স্থগিতাদেশের আর্জি জানানো হয়েছে। আদালত মামলাটি গ্রহণ করায় এখন নজর আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।আইনশৃঙ্খলা রক্ষার হাতিয়ার, না কি নাগরিক স্বাধীনতার উপর চাপ—গুন্ডাদমন আইন নিয়ে এই বিতর্কের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে আদালতের রায়ের উপর।

নেপালে ফের পালাবদলের ইঙ্গিত?

নেপালে কি ফের বড় রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত? নজর এখন সেদিকেই।যে Gen Z তরুণ প্রজন্মের সমর্থনে ক্ষমতায় এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী বালিন্দ্র শাহ, এবার তাঁর সরকারের বিরুদ্ধেই রাস্তায় নেমেছে সেই তরুণরাই।রাজধানী কাঠমান্দু-এর রাস্তায় গত কয়েকদিন ধরে দেখা যাচ্ছে বিক্ষোভের ছবি। তবে এই প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু দুর্নীতি বা সোশ্যাল মিডিয়া নয়—বরং একটি উচ্ছেদ অভিযান।এপ্রিল মাস থেকে Bagmati River-এর তীরবর্তী এলাকায় বেআইনি বসতি সরানোর অভিযান শুরু করে নেপাল সরকার। প্রশাসনের দাবি, বন্যার ঝুঁকি কমানো এবং সরকারি জমি পুনরুদ্ধারই এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য।কিন্তু বাস্তবায়ন নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।আড়াই হাজারের বেশি পরিবার—প্রায় পনেরো হাজার মানুষ—হঠাৎই গৃহহীন হয়ে পড়েন। অভিযোগ, পুনর্বাসনের কোনও স্থায়ী ব্যবস্থা না করেই উচ্ছেদ চালানো হয়েছে।যাদের অস্থায়ী শিবিরে রাখা হয়েছিল, বর্ষার জলে সেই শিবিরও প্লাবিত হয়ে পড়ে, বিশেষ করে কীর্তিপুর এলাকায়।পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন গণেশ নেপালি নামে এক গাড়িচালক আত্মাহুতির চেষ্টা করেন। এরপর আরও কয়েকটি আত্মহননের চেষ্টার খবর সামনে আসে—যা প্রতিবাদীদের কাছে সরকারের উদাসীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে।শনিবার জয়েন্ট ন্যাশনাল স্কোয়াটার্স ফ্রন্ট-এর ডাকে মাইতিঘার মণ্ডলা-এ জড়ো হন শয়ে শয়ে তরুণ-তরুণী। তাঁদের একটাই দাবি—উচ্ছেদ নয়, আগে পুনর্বাসন।এদিকে বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই হস্তক্ষেপ করেছে সুপ্রিম কোর্ট অফ নেপাল। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ—বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করা যাবে না। পাশাপাশি, গৃহহীন পরিবারগুলির জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্যের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।ন্যাশনাল হিউমান রাইটস কমিশন নেপাল-ও একই আর্জি জানিয়েছে।যদিও প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ তাঁর সরকারের পদক্ষেপকে আইনসম্মত বলেই দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, একটি বিশেষ মহল ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করছে। তবে আন্দোলনকারীদের আটক ও হেনস্থার কারণে বিতর্ক আরও বেড়েছে।এই পরিস্থিতির শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ঘটনায়। সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই সরকার-বিরোধী গণআন্দোলনে পরিণত হয়। সেই আন্দোলনে প্রাণ হারান প্রায় ৭৫ জন, এবং পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি,পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি।এরপর ২০২৬ সালের মার্চে নির্বাচনে বিপুল জয় পায় রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে দেশের কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী হন বালেন শাহ—যিনি তরুণদের কাছে ছিলেন পরিবর্তনের প্রতীক।কিন্তু ক্ষমতায় আসার ১০০ দিনের মধ্যেই সেই সমর্থনের ভিতেই ফাটল ধরার ইঙ্গিত মিলছে।নেপালের এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে পারে ভারতেও, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে। পানিট্যাংকি সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও পণ্য যাতায়াত করে। অতীতে বড় আন্দোলনের সময় এই রুট কার্যত স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দার্জিলিং-কালিম্পঙের সামাজিক যোগসূত্র এবং শিলিগুড়ি করিডর হয়ে বাণিজ্যিক নির্ভরতার কারণে এই অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

উন্নয়নের চাকা নাকি পানিবন্দী নগরী

এক রাতের বৃষ্টিতেই রাজধানীর পরিচিত সড়কগুলো যেন নদীতে পরিণত হলো। ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকার অলিগলি, প্রধান সড়ক ও বিপণিবিতানের সামনে জমেছে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। কোথাও গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে আছে, কোথাও মানুষ জুতা হাতে নোংরা পানি মাড়িয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। নিচতলার বাসাবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকেছে। শিশু, বৃদ্ধ, রোগী ও কর্মজীবী মানুষের দুর্ভোগের যেন কোনো সীমা নেই।বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১২ জুলাই ভোর ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ছয় ঘণ্টায় বৃষ্টি হয় ৭৬ মিলিমিটার।ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে গিয়ে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। এমনকি পানিবন্দী সড়কে মাত্র ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে কোথাও প্রায় ৯০ মিনিট সময় লেগেছে।  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দৃশ্যগুলো দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে আমরা কোন দেশের রাজধানীতে বাস করছি? উন্নয়নের এত গল্প, এত বড় বড় প্রকল্প, এত ব্যয় তারপরও কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কেন অচল হয়ে পড়ে প্রায় দুই কোটি মানুষের এই নগরী?প্রশ্নটি শুধু ক্ষোভের নয়, এটি নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন।বৃষ্টি প্রাকৃতিক, কিন্তু জলাবদ্ধতা কি পুরোপুরি প্রাকৃতিক?বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। অল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিও হতে পারে। কিন্তু একটি আধুনিক রাজধানীর রাস্তা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে থাকবে, গণপরিবহন বন্ধ হয়ে যাবে, মানুষ হাসপাতালে বা কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবে না এটি স্বাভাবিক নয়।বৃষ্টিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না; কিন্তু বৃষ্টির পানি কোন পথে, কত দ্রুত শহর থেকে বেরিয়ে যাবে সেটি নিশ্চিত করা নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মৌলিক দায়িত্ব।ঢাকার জলাবদ্ধতা তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এর পেছনে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাশয় দখল, অপর্যাপ্ত ও বিচ্ছিন্ন ড্রেনেজব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। গবেষণায়ও ঢাকার দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ধ্বংসকে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।  ড্রেন আছে, কিন্তু পানি যাবে কোথায়?ঢাকায় ড্রেন একেবারেই নেই এ কথা ঠিক নয়। শহরের বিভিন্ন স্থানে ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু ড্রেন থাকলেই তো হবে না; সেই ড্রেনের পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে, সেটিই বড় প্রশ্ন।একটি এলাকার ড্রেন পরিষ্কার থাকলেও সেটি যদি কোনো বন্ধ খাল, ভরাট জলাশয় অথবা সংকুচিত নালার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে পানি বের হবে কীভাবে?একসময় ঢাকার বৃষ্টির পানি অসংখ্য খাল, পুকুর, নিম্নভূমি ও জলাভূমির মাধ্যমে আশপাশের নদীতে গিয়ে পড়ত। এসব প্রাকৃতিক জলাধার কিছু পানি ধারণ করত, কিছু পানি মাটির নিচে প্রবেশ করাত এবং বাকি পানি ধীরে ধীরে নদীতে নিয়ে যেত।কিন্তু উন্নয়নের নামে আমরা সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাই ধ্বংস করেছি। খাল ভরাট করে রাস্তা, ভবন ও আবাসন প্রকল্প হয়েছে; পুকুর ও নিচু জমি ভরাট হয়েছে; জলপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়েছে। ফলে পানি নামার পথ না পেয়ে রাস্তায় জমছে।খালের ওপর শুধু দৃষ্টিনন্দন সেতু বা হাঁটার পথ বানিয়ে তাকে জীবন্ত করা যায় না। খালের শুরু ও শেষ প্রান্ত, ড্রেনের সংযোগ এবং নদীতে পানি পড়ার পথ সচল রাখতে হবে। একটি খালের মাঝের অংশ উদ্ধার করে দুই প্রান্ত বন্ধ রেখে দিলে সেটি পানি নিষ্কাশনের পথ নয়, বরং একটি স্থির জলাধারে পরিণত হবে।কংক্রিটে ঢাকা শহরঢাকার বড় অংশ এখন কংক্রিট, পিচ, টাইলস ও ভবনে ঢাকা। বাড়ির উঠান, মাটির পথ, বাগান, খোলা মাঠ ও নিচু জমি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।আগে বৃষ্টির একটি অংশ মাটিতে শোষিত হতো। এখন অধিকাংশ পানি একসঙ্গে সড়ক ও ড্রেনে এসে পড়ছে। ফলে স্বল্প সময়ে ড্রেনের ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি পানি তৈরি হচ্ছে।নতুন ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার সময় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ছাদের পানি ধরে রাখা, ভবনের নির্দিষ্ট অংশ খোলা রাখা এবং পানি মাটিতে প্রবেশ করানোর ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক হওয়ার কথা। বাস্তবে এসব শর্ত কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে, তার নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।শুধু ভবন নির্মাণের অনুমতি দিলেই হবে না; সেই ভবনের কারণে এলাকার জনসংখ্যা, যানবাহন, বর্জ্য ও বৃষ্টির পানির চাপ কতটা বাড়বে, সেটিও হিসাব করতে হবে।পলিথিন ও বর্জ্যে বন্ধ ড্রেনঢাকার জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। রাস্তায় ফেলে দেওয়া পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট, কাপ, কাগজ, গৃহস্থালি আবর্জনা ও নির্মাণবর্জ্য বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনে গিয়ে জমে।ফলে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক জায়গায় ড্রেন পরিষ্কারের পর তোলা ময়লা রাস্তার পাশেই রেখে দেওয়া হয়। বৃষ্টি হলে সেই ময়লা আবার ড্রেনে ফিরে যায়।এখানে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। যে মানুষটি রাস্তায় পলিথিন বা ময়লা ফেলছেন, তিনিই পরদিন জলাবদ্ধতার জন্য কর্তৃপক্ষকে দায়ী করছেন। তবে শুধু নাগরিককে দোষারোপ করে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নির্মাণবর্জ্য অপসারণ এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও নগর কর্তৃপক্ষের কাজ।পয়োনিষ্কাশন আর বৃষ্টির পানি একই পথে কেন?ঢাকার বহু এলাকায় বৃষ্টির পানি, গৃহস্থালি বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের সংযোগ একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেছে। ড্রেন বন্ধ হলে নোংরা ও দূষিত পানি রাস্তায় উঠে আসে।এই পানির মধ্যে হেঁটে চলতে গিয়ে মানুষ চর্মরোগ, ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নর্দমার পানি বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।একটি আধুনিক নগরে পয়োবর্জ্য বহনের লাইন এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আলাদা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকার বহু জায়গায় এখনো এই মৌলিক বিভাজন কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি।দায়িত্ব অনেকের, জবাবদিহি কার?ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের সঙ্গে সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।একটি সংস্থা রাস্তা নির্মাণ করে, আরেকটি ড্রেন করে, অন্য একটি সংস্থা খাল দেখাশোনা করে। আবার রাস্তা নির্মাণের কিছুদিন পর পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বা অন্য কোনো সেবা সংস্থা সেটি খুঁড়ে ফেলে। সমন্বিত নকশা ও কার্যকর তদারকি না থাকায় একটি কাজ করতে গিয়ে আরেকটি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে প্রায় প্রতি বছরই নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়, অর্থ বরাদ্দ হয়, খাল পরিষ্কার ও ড্রেন সংস্কারের ঘোষণা আসে। কিন্তু প্রথম বড় বৃষ্টিতেই শহরের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পায়।নাগরিকেরা তাই জানতে চান কোথায় কত টাকা ব্যয় হয়েছে? কোন এলাকার ড্রেন কতটুকু বৃষ্টি সামলাতে সক্ষম? কাজের মান পরীক্ষা করেছে কে? ব্যর্থতার জন্য কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়েছে কি?দায়িত্ব যখন অনেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে, তখন ব্যর্থতার দায় যেন শেষ পর্যন্ত কারও ওপরই পড়ে না।জলবায়ু পরিবর্তন অজুহাত নয়জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে ভারী ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়ছে এটি বাস্তবতা। চলতি বর্ষাতেও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে ঢাকা বিভাগসহ বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।  কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনকে সব ব্যর্থতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বরং বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে জেনেই আমাদের নগর পরিকল্পনা, ড্রেনের ধারণক্ষমতা ও জরুরি ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে হবে।বিশ কিংবা ত্রিশ বছর আগের বৃষ্টিপাত ও জনসংখ্যার হিসাব ধরে বর্তমান ঢাকার ড্রেনেজব্যবস্থা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এখনকার নগর পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলাভূমি সংকোচন এবং জনসংখ্যার চাপ বিবেচনায় নিতে হবে।সমাধানের পথ কোথায়?প্রথমেই ঢাকার সব খাল, পুকুর, জলাধার, নিম্নভূমি এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করে একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন দেখতে পারেন, কোন খালের সীমানা কতটুকু এবং কোথায় দখল হয়েছে।দখলমুক্ত করার পর খালগুলোর সঙ্গে ড্রেন ও নদীর সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে হবে। শুধু খনন বা সৌন্দর্যবর্ধন নয়, পানি প্রবাহের পুরো পথ সচল রাখা জরুরি।দ্বিতীয়ত, পুরো ঢাকার জন্য একটি সমন্বিত স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে আলাদাভাবে নয়, পুরো রাজধানী ও আশপাশের নদী-খালকে একটি অভিন্ন জলপ্রবাহ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।তৃতীয়ত, বর্ষার আগে লোকদেখানো পরিচ্ছন্নতার পরিবর্তে সারা বছর ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। কোন ড্রেন কখন পরিষ্কার হলো, কত বর্জ্য তোলা হলো এবং কত টাকা ব্যয় হলো তা নাগরিকদের জন্য প্রকাশ করতে হবে।চতুর্থত, জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর, ক্যামেরা ও তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে ড্রেনের পানির উচ্চতা, প্রবাহ এবং কোথায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে তা আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। ঢাকার জন্য এমন প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা গবেষণায়ও উঠে এসেছে।  পঞ্চমত, নতুন ভবন ও আবাসন প্রকল্পে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং, ছাদবাগান, পানি শোষণযোগ্য খোলা জায়গা এবং নিজস্ব পানি ধারণব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিধিমালা না মানলে ভবনের অনুমোদন বাতিল বা জরিমানার ব্যবস্থা থাকতে হবে।ষষ্ঠত, পলিথিন ও নির্মাণবর্জ্য ড্রেনে ফেলার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের জন্য সহজ ও নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।সবশেষে, ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য একটি প্রধান সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ বা কমান্ড কাঠামো প্রয়োজন। জলাবদ্ধতা হলে কে দায় নেবে, কে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে এবং কার কাছে নাগরিক অভিযোগ জানাবে এটি সুস্পষ্ট হতে হবে।বৃষ্টি অপরাধী নয়প্রতি বর্ষায় আমরা একই দৃশ্য দেখি। মানুষ দুর্ভোগে পড়ে, সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করেন, জরুরি বৈঠক হয় এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। কয়েক দিন পর পানি নেমে গেলে আলোচনা থেমে যায়। পরের বৃষ্টিতে আবার একই দুর্ভোগ ফিরে আসে।এভাবে একটি রাজধানী চলতে পারে না। বৃষ্টির কারণে মানুষ কর্মস্থলে যেতে পারবে না, রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে পারবে না, পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে যেতে পারবে না এবং নিচতলার বাসিন্দারা ঘর রক্ষায় রাত কাটাবেন এটি কোনো আধুনিক শহরের স্বাভাবিক চিত্র নয়।আমাদের মনে রাখতে হবে বৃষ্টি অপরাধী নয়। অপরাধী সেই নগর পরিকল্পনা, যেখানে পানির বেরিয়ে যাওয়ার পথ রাখা হয়নি সেই উন্নয়ন, যা খাল, জলাধার ও নিম্নভূমি ধ্বংস করেছে; এবং সেই ব্যবস্থাপনা, যা প্রতি বর্ষায় মানুষের দুর্ভোগ দেখেও বদলায় না।ঢাকাকে বাঁচাতে আর নতুন কোনো স্লোগানের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন খাল উদ্ধার, কার্যকর ড্রেনেজ, জলাধার সংরক্ষণ, সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।তা না হলে কোটি মানুষের এই রাজধানী ক্রমেই এমন এক নগরীতে পরিণত হবে, যেখানে আকাশে মেঘ জমলেই নাগরিকের মনে একটি আতঙ্ক ঘনীভূত হবে আজ আবার কতটা ডুববে ঢাকা?লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

ভিডিও আরও দেখুন

যেভাবে রেফারিকে সতর্ক করলেন স্প্যানিশ কোচ

২০২৬ বিশ্বকাপের মাঠের লড়াই ছাপিয়ে এখন আলোচনায় রেফারিং। একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও ভিএআরের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর এবার ফাইনালের রেফারিকে নিয়ে মুখ খুললেন স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শিরোপা নির্ধারণী মহারণের আগে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ম্যাচ পরিচালনায় রেফারির কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই।আগামী রোববার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বজয়ের লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় শুরু হতে যাওয়া এই ম্যাচের দায়িত্ব পেয়েছেন স্লোভেনিয়ান রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ। এই রেফারিই কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সৌদি আরবের সেই ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচটি পরিচালনা করেছিলেন।স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘স্পোর্ত’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘রেফারি মাঠে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখাতে পারেন না এবং নিয়ম ভাঙার সুযোগ দিতে পারেন না। ফুটবলের বৈধতার যে সীমারেখা আছে, তা কোনোভাবেই অতিক্রম করতে দেওয়া যাবে না। তার দায়িত্ব হবে নিয়মের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।’টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার ম্যাচগুলোতে রেফারিদের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে অভিযোগ তুলেছিল কয়েকটি দেশ। বিশেষ করে শেষ ষোলোতে মিসরের কোচ ও খেলোয়াড়রা ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন। সম্ভবত সেই প্রেক্ষাপট থেকেই স্পেন কোচ আগেভাগেই সতর্কবার্তা দিয়ে রাখলেন।তবে রেফারিদের ওপর আস্থার কথা জানিয়ে দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘রেফারিদের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। তবে তার চেয়েও বেশি আস্থা আছে আমার দলের ওপর। আমরা জানি এমন বড় ম্যাচে কীভাবে নিজেদের ফুটবল দর্শন ধরে রাখতে হয়। উসকানিতে পা না দিয়ে আমরা আমাদের সহজাত ফুটবল খেলতে চাই।’আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির একসময়ের শিক্ষক ছিলেন দে লা ফুয়েন্তে। প্রিয় শিষ্যের দলের বিপক্ষে নামার আগে তিনি আরও যোগ করেন, ‘আর্জেন্টিনা তাদের মতো করেই খেলবে। কিন্তু আমাদের মনোযোগ থাকতে হবে শুধু নিজেদের পরিকল্পনায়। নিজেদের ভাবনায় অটল থাকতে চাই।’দে লা ফুয়েন্তে আরও বলেন, ‘এটি অসাধারণ একটি ফুটবল প্রদর্শনী হতে যাচ্ছে। দুটি দলই নিজেদের সেরাটা তুলে ধরার চেষ্টা করবে। আমরা আশা করি, রেফারি ম্যাচের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দক্ষতার সঙ্গে সামলাবেন, যাতে বিশ্বকাপ ফাইনালের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ম্যাচ উপভোগ করতে পারে ফুটবল বিশ্ব।’/ 

যেভাবে রেফারিকে সতর্ক করলেন স্প্যানিশ কোচ