সংবাদ
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিপিডিবির, বিরোধিতা বিভিন্ন সংগঠনের

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিপিডিবির, বিরোধিতা বিভিন্ন সংগঠনের

বিপিডিবির দাবি, পাইকারি বিদ্যুতে প্রতি ইউনিটে ঘাটতি ‘প্রায় ৬ টাকা’। ইউনিটে দাম ১.২০ থেকে ১.৫০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাবসঞ্চালন চার্জ ইউনিটে ১৯ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব সরকারি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানিরবসিয়ে রেখে চার্জ দিতে হচ্ছে, তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ‘খরচ বাড়ছে’ক্যাপটিভের গ্যাস বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে দিলে লাভ হবেবিপিডিবির ইঞ্জিনিয়ারদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবেসৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর ওপর জোরবিইআরসি ‘অবৈধ প্রস্তাবের পক্ষ নিয়েছে’: অভিযোগ ক্যাবেরউৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের পাইকারি দাম প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি)। প্রস্তাবের ওপর বুধবার (২০ মে) গণশুনানি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এতে অংশ নিয়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা।এদিকে শুনানিতে অংশ নিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিটে ১৯ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি। এ দুই প্রস্তাব কার্যকর হলে শেষ পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।গণশুনানির প্রথম অধিবেশন শেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, প্রয়োজনের চেয়ে ‘বেশী’ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রেখেও টাকা দিতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ‘বেড়ে যাচ্ছে’।তিনি বলেন, বিপিডিবির ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের (তড়িৎ প্রকৌশলী) দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। সৌরবিদ্যুতের জোর দেয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এতে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপদনে নির্ভরশীলতা কমবে। ক্যাপটিভ পাওয়ারে যে গ্যাস দিতে হচ্ছে তা বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে দিতে পারলে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ কমে আসবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। বুধবার ঢাকার ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে প্রথম দিনের গণশুনানি হয়।বিইআরসি চেয়ারম্যনের সভাপতিত্বে সদস্য (অর্থ, প্রশাসন ও আইন) মো. আব্দুর রাজ্জাক, সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগে. জেনারেল মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার (অব.), সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান, সদস্য (পেট্রোলিয়াম) ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া শুনানি গ্রহণ করেন।  এসময় বিইআরসি সচিব (যুগ্মসচিব) মো. নজরুল ইসলাম সরকার ও কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।একই (কেআইবি) স্থানে বৃহস্পতিবারও (২১ মে) গণশুনানি হবে। দুই দিনের গণশুনানিতে বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাব পর্যায়ক্রমে শুনবে বিইআরসি।বিপিডিবির প্রস্তাবে যা আছেবিপিডিবির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট/ঘন্টা) ৭ টাকা ৪ পয়সা, যা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর রয়েছে।ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির যুক্তিতে বিপিডিবি বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয় বাবদ মোট ব্যয় দাঁড়াবে ১৪ লাখ ৩১ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। বিদ্যমান বাল্ক ট্যারিফে বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয় হবে ৭ লাখ ৭৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। রাজস্ব চাহিদা অনুযায়ী প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় সরবরাহ ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১২ টাকা ৯১ পয়সা। এই হারে পাইকারি দাম নির্ধারণ করা হলে কোনো ঘাটতি থাকবে না।তবে বিপিডিবি প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা অথবা ১ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।রাষ্ট্রায়াত্ত্ব এই প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ঘাটতি কমবে ১৩ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। আর ১ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ালে ঘাটতি কমবে ১৬ হাজার ৬২৩ কোটি টাকার বেশি।অর্থাৎ বিপিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ি দাম বাড়ালেও সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হবে।গণশুনানিতে জানানো হয়, গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে আরও ২০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৬০ হাজার কোটি টাকায়।শুনানিতে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, “এমন না এই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে পুরো ঘাটতি পূরণ হবে তা নয়। এই দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারের ভতুর্কি এক পশ্চমাংশ থেকে এক চতুর্থাংশে নামতে পারে।কমিশনের কারিগরি কমিটি কী বলছেবিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি কতটুকু করা উচিৎ তা সরকারের ভর্তুকির পরিমাণের ওপর ছেড়ে দিয়েছে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। গণশুনানিতে কমিটি এ কথা জানিয়েছে।বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ভর্তুকি বাদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিপিডিবির নিট রাজস্ব চাহিদা ১৩ লাখ ৭২ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা বা প্রতি ইউনিটে ১২ টাকা ৫১ পয়সা।বিদ্যমান পাইকারি দরে ওই অর্থবছরে প্রতি ইউনিটে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ৫ টাকা ৪৭ পয়সা। ভর্তুকি ছাড়া এই ঘাটতি পূরণ করতে পাইকারি মূল্যহার প্রায় ৭৭ দশমিক ৭০ শতাংশ বাড়ানোর প্রয়োজন হবে।সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাববিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী রাষ্ট্রায়াত্ত্ব প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ৩০ পয়সা সঞ্চালন চার্জ নেয়। প্রতিষ্ঠানটি তা বাড়িয়ে ৪৯ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে।সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রশিদ খান সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়ে শুনানিতে বলেন, “বিদ্যুৎ সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগ করা হলেও প্রত্যাশিত হারে বিদ্যুৎ সঞ্চালন হচ্ছে না। একইসঙ্গে ডলারের দাম বৃদ্ধি ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপের কারণে প্রতিষ্ঠানটি গত তিন বছর ধরে লোকসানে রয়েছে। বর্তমানে তাদের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা।”বিইআরসির কারিগরি কমিটি বলছে, প্রস্তাবিত হারের তুলনায় কিছুটা কমিয়ে ইউনিটপ্রতি সঞ্চালন ব্যয় ৪৪ পয়সার কাছাকাছি নির্ধারণ করা যেতে পারে।ইনস্টল ক্যাপাসিটি ‘বেশী’বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, দেশে বিদ্যুতের স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় আনুপাতিক হারে ‘অনেক বেশি’।তিনি বলেন, “এই ইনস্টল ক্যাপাসিটি বেশি হওয়ার কারণে ওই যে বসিয়ে খাওয়ানো যেটা যেহেতু বসা আছে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে বসিয়ে বসিয়ে।”তার মতে, স্থাপিত সক্ষমতা আদর্শ মাত্রায় থাকলে ক্যাপাসিটি চার্জের চাপ কম হত। তিনি বলেন, “যদি আমার ইন্স্টল ক্যাপাসিটি এর চেয়ে কম থাকত। আইডিয়ালি যেটা হওয়া উচিত ২০-২৫ শতাংশ যদি থাকত, ক্যাপাসিটি চার্জ হয়ত কম খরচ করতে হইত। এটা সহনীয় হইত তখন।”ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ (সরকারি গ্যাস ব্যবহার করে শিল্প প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র) প্রসঙ্গে বিইআরসি চেয়ারম্যান আরো বলেন, “নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেলে ক্যাপটিভ বিদ্যুতের প্রয়োজন হত না। আপনি পাওয়ারের কথা বলছেন যদি আনইন্টারাপটেড পাওয়ার আপনি দিতে পারতেন, তাহলে কিন্তু ক্যাপটিভ পাওয়ারগুলো হয়ত থাকত না।” তার মতে, ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ব্যবহৃত গ্যাস বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা গেলে তা আরও দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানো যেত।বিপিডিবির ইঞ্জিনিয়ারদের প্রতি পরামর্শসৌরবিদ্যুতে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সম্পর্কে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। তিনি বলেন, “পিডিবির (বিপিডিবি) দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন লাগবে একটু। পিডিবিতে যারা কাজ করেন, যারা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন লাগবে। আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বলতে যেটা বুঝি, এটা চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে।”জালাল আহমেদ বলেন, “সৌরবিদ্যুৎ বাড়লে ব্যয়বহুল বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং ভোক্তার ওপর চাপও কমে আসবে। আমরা সোলারকে যদি উৎসাহিত করি, ভবিষ্যতে সোলারের উৎপাদন যদি বৃদ্ধি পায়, নিঃসন্দেহে আপনার অধিকতর খরচ যেখানে হচ্ছে এই খরচটা কমে আসবে এবং নিঃসন্দেহে এটার উপরে যে বোঝা, এটা কমবে।”গণশুনানিতে ভোক্তাদের বিরোধিতাগণশুনানিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, “মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে একটা কথা বারবার বলা হচ্ছে যে, দাম না বাড়ালে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। সরকার ভর্তুকি কোথা থেকে দেয়? ভোক্তার টাকা দিয়েই কিন্তু ভর্তুকি দেওয়া হয়।” তিনি বলেন, “সবাই শুধু সরকারের মুনাফা নিয়েই ভাবছে, অথচ মানুষ যে মরে যাবে, তার কোনো খেয়াল নেই।”কমিশনকে সতর্ক করে ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, “৫ আগস্টের পর দেশে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। অথচ বিইআরসি কোনও পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেলো না। আপনারা বলেন, আইন অনুযায়ী ক্ষমতা নেই। যেখানে সংবিধান পরিবর্তনের মতো কথা উঠতে পারে, সেখানে বিইআরসি আইন পরিবর্তন কেন সম্ভব হবে না? আপনারা মানুষের পক্ষ না নিয়ে যারা অবৈধভাবে এসব প্রস্তাব দিচ্ছে, তাদের পক্ষ নিচ্ছেন। আপনাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, এখান থেকে সরে আসুন। সরে না এলে আপনারা এক সময় গণশত্রুতে পরিণত হবেন।”সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “বিইআরসির এই গণশুনানি বন্ধ করা উচিত। এই শুনানির এখন আর গ্রহণযোগ্যতা নেই। বিইআরসির উচিত এখন নিজেদের আইন সংশোধন করে এরপর আবার শুনানি করা। এখন যে শুনানি হচ্ছে সেটা আসলে লোক দেখানো। প্রতিবারই শুনানি হয়, এরপর দাম বাড়ানো হয়।”বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নেতা জালালুদ্দিন বলেন, “আমাদের রফতানি এমনিতেই নিম্নমুখী এই সময় বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্পের ওপরে চরম আঘাত নেমে আসবে।”লিখিত বক্তব্য চাইলো কমিশনবিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “সবার মতামত পাওয়া গেছে। সবার মতামত বিবেচনা করে কমিটির মূল্যায়নের মাধ্যমে আমরা বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত জানাবো।”শুনানিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের লিখিত বক্তব্য ২৩ মে জমা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত বক্তব্য পাওয়া গেলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কমিশনের জন্য সুবিধা হবে।
৭ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

চামড়াশিল্পের সংকট

চামড়াশিল্পের সংকট কাটাতে সরকার আসন্ন  ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। পশুর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে শৃঙ্খলা আনতেও নতুন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রতিবছর চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়া, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং সংরক্ষণ সংকট নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা কাটাতেই এবার আগাম প্রস্তুতি ও কঠোর ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়ার নতুন দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। এবারের সিদ্ধান্তে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা এবং খাসির চামড়ায় ৩ টাকা করে দাম বাড়ানো হয়েছে। এ বছর ঢাকা মহানগরে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২-৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে এ দাম ৫৭-৬২ টাকা। গত বছর ঢাকায় গরুর চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৬০-৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫-৬০ টাকা। সেই হিসাবে এ বছর প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২২-২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।এছাড়া এ খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণনীতিতে বড় ধরনের শিথিলতা এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি জারি করা এক বিশেষ সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এখন থেকে চামড়া ব্যবসায়ীরা আগের ঋণের বকেয়া কিস্তি পরিশোধ ছাড়াই নতুন ঋণ নেয়ার সুযোগ পাবেন। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম সচল রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, যেসব ব্যবসায়ীর ঋণ পুনঃতফসিল বা রিশিডিউল করা রয়েছে, তাদের নতুন ঋণ পেতে আগের বকেয়ার নির্দিষ্ট অংশ পরিশোধের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এ বিশেষ সুবিধা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, চামড়াশিল্প দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী খাত। যেহেতু এ খাতের প্রধান কাঁচামাল কোরবানির ঈদকে ঘিরেই সংগ্রহ করা হয়, তাই এ সময়ে ব্যবসায়ীদের হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের জোগান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংককে চামড়া খাতের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চলতি মূলধন ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এবারের নির্দেশনায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র সংগ্রাহকদের ওপর। যাতে ঋণসুবিধা শুধু বড় শিল্পপতি বা ট্যানারি মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য হাটবাজার ও গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এ সুবিধার আওতায় আসবেন বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোকে ২০২৬ সালের জন্য চামড়া খাতে ঋণ বিতরণের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যা কোনোভাবেই গত বছরের তুলনায় কম রাখা যাবে না। ঋণের লক্ষ্যমাত্রা এবং তার বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেয়ার সময়সীমাও বেঁধে দেয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের ফলে কোরবানির পশুর চামড়া নষ্ট হওয়া রোধ হবে এবং মাঠপর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার ন্যায্য দাম পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চামড়া শিল্প রক্ষায় কিছু উদ্যোগ নিলেও তাতে কাঙ্ক্ষিত সুফল আসেনি। গত বছর কওমি মাদরাসাগুলোকে চামড়া সংরক্ষণের জন্য কাঁচা লবণ দেয়া হয়েছিল, কিন্তু সেটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। সরকারের উচিত ছিল চামড়া শিল্পের দেশীয় বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবান এই কাঁচামালকে দেশীয় বাজারে মূল্যহীনতার অবস্থা থেকে মুক্ত করতে আগের সরকার ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের প্রকল্পে চামড়া শিল্প নিয়ে দৃশ্যমান কোনো পরিকল্পনা নেই, অথচ এটি রাষ্ট্রের বড় আয়ের একটি খাত। আগের সেই সিন্ডিকেটও এখনো পুরোপুরি ভাঙা যায়নি।  কোরবানির সময় দেশের মোট চামড়ার প্রায় ৭১ শতাংশ কওমি মাদরাসার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। দ্রুত সিন্ডিকেট ভেঙে কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে গত বছর প্রথমবারের মতো দেশের মসজিদ-মাদরাসায় লবণ বরাদ্দ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সে ধারাবাহিকতায় এবারও বিভিন্ন মাদরাসায় বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে ২০ কোটি টাকার লবণ। তবে এবার প্রথমবারের মতো চামড়া সংরক্ষণে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সঠিকভাবে চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর কোরবানির পশুর ১৫-৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়। এর মধ্যে ২০ শতাংশেরও বেশি চামড়ায় কাটা-ছেঁড়া বা পক্সের মতো ক্ষত থাকে। এতে এসব চামড়ার গুণগত মান ও বাজারমূল্য কমে যায়।কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে প্রস্তুতিমূলক নানা কার্যক্রম চলছে। সংস্কারকাজ চলছে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি)। অকেজো ও পুরনো যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে মোটর ও পাম্পগুলোর মেরামত ও প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। কঠিন বর্জ্য রাখার ডাম্পিং স্টেশনও সংস্কার করা হচ্ছে। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল মজুত করা হচ্ছে। তবে যুদ্ধের কারণে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া ও জ্বালানি সংকটে প্রায় ১৫ দিন ট্যানারিতে উৎপাদন বন্ধ ছিল। এতে প্রস্তুতিতে কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছে।কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চামড়া শিল্পনগরীর প্রস্তুতি ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এখনও শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বৈঠক বাকি রয়েছে। এসব বৈঠকের পরই সামগ্রিক প্রস্তুতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।গত বছরের মতো এবারও প্রায় ২০ কোটি টাকার লবণ মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানায় বিনা মূল্যে বিতরণ করা হবে। এর লক্ষ্য হলো, এসব প্রতিষ্ঠান যেন কোরবানির চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারে এবং ন্যায্য মূল্য পায়। গত বছর প্রথমবার এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এবার সেটিকে আরও কার্যকর করতে লবণ বিতরণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যুক্ত করা হয়েছে।গত বছর প্রথমবারের মতো চামড়া সংগ্রহে বিভিন্ন মাদ্রাসায় লবণ দেয়া হলেও উদ্যোগটির পুরো সুফল পাওয়া যায়নি। এমন কিছু মাদ্রাসায় লবণ দেয়া হয়েছিল, যেসব মাদ্রাসা চামড়া সংগ্রহ করে না। পরে সেসব মাদরাসা বরাদ্দকৃত লবণ বিক্রি করে দেয়। এসব বিবেচনায় এ বছর মাদ্রাসা, মসজিদ ও লিল্লাহ বোর্ডিং নির্ধারণে আরও সতর্কতা অবল¤^ন করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সে জন্য এবার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যুক্ত করা হয়েছে।সরকার লবণ বিতরণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীরা চামড়া সংগ্রহ করলেও লবণ প্রয়োগে তাদের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। ফলে সময়মতো ও সঠিকভাবে লবণ দেয়া হয় না। এতে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। [লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

একটি গাছ, কিছু জমি এবং ধর্ষণের অভিযোগ

আদালতের এজলাস কক্ষটি তখন পিনপতন নীরব। আদালতে বিচারপ্রার্থী চল্লিশোর্ধ রানু কবীর। সঙ্গে তার ষোড়শী মেয়ে হ্যাপী। আসামীদ্বয় লিয়াকত ও মান্নান কম্পমান অবস্থায় দুই হাত জোড়া করে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১) ধারা। ধর্ষণের এ অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদ্বয়ের মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এ ধারার বলা হয়েছে যে, যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বছরের অধিক বয়সের কোন নারীর সঙ্গে তার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শণ বা প্রতারণামূলকভাবে তার সন্মতি আদায় করে অথবা ষোল বছরের কম বয়সের কোন নারীর সঙ্গে তার সন্মতিসহ বা সন্মকি ব্যতিরেকে যৌনসঙ্গম করেন, তাহলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবেন।নালিশী আরজি থেকে জানা যায়, রানু কবির তার মেয়ে হ্যাপীকে নিয়ে বসবাস করেন শ্বশুরের ভিটায়। স্বামী একজন প্রবাসী। বছরে একবার বাড়ি এসে পরিবার-পরিজনদের দেখে যান। তিনি ও তার মেয়ে ঘটনার দিন নিজ বসতঘরে অবস্থান করছিলেন। তখন বিকেল প্রায় তিনটা। আকস্মিকভাবেই তার ঘরে আগমন করলো আসামিরা। কিছু বোঝার আগেই রানু কবীরকে আসামি লিয়াকত ধর্ষণ করতে শুরু করল। একইভাবে মেয়ে হ্যাপীকে পাশের ঘরে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে মান্নান। ধর্ষণ শেষে আসামিরা বীরদর্পে বেরিয়ে যায়। চিৎকার দিয়ে ডাকাডাকি করলেও পাড়া-প্রতিবেশীরা কেউ এগিয়ে আসেনি। কারণ আসামিরা অত্যন্ত দাঙ্গাবাজ লোক।অভিযোগের বর্ণনা দিতে গিয়ে রানু কবীর তার আঁচল দিয়ে ও মেয়ে হ্যাপী তার ওড়নায় মুখ ঢেকে অঝোর ধারায় কাঁদছিলেন। এজলাস কক্ষে এক অভাবনীয় পরিবেশের সৃষ্টি হলো। উপস্থিত জনগণ পারলে আসামিদের পিটুনি শুরু করে দেয়। কিন্তু এজলাস কক্ষে নিজের হাতে আইন তুলে নেয়ার সুযোগ কারও নেই। তাই রক্ষে আর কী! আসামিরা করজোরে বিচারকের কাছে নিবেদন করল তারা দুই ভাই নির্দোষ, তারা বিচারপ্রার্থী। অভিযোগ গঠনের পর বিজ্ঞ বিচারক বিচারের দিন ধার্য করলেন। নির্ধারিত দিনে বিচার কাজ শুরু হলো।পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোকদ্দমা বিচারের জন্য উপস্থাপন করলেন। রাষ্ট্রপক্ষের ১ ন¤^র সাক্ষী হিসেবে ডাক পড়লো ফরিয়াদী (বাদী) রানু কবীরের। সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রানু কবীর হলফ পড়লেন ‘আমি প্রতিজ্ঞাপূর্বক বলিতেছি যে, এই মোকদ্দমায় আমি যে সাক্ষ্য দিব তা সত্য হইবে, ইহার কোনো অংশ মিথ্যা হইবে না এবং আমি কোনো কিছু গোপন করিব না।’ বিচারক লক্ষ্য করলেন রানু কবীর হলফ পড়তে গিয়ে ইতস্তত বোধ করছিলেন এবং তার গলা অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছিল। সবাই উদগ্রীব নির্যাতিতা রানু কবীরের ফরিয়াদ শোনার জন্য। কিন্তু রানু কবীরের মুখে কোনো কথা নেই। প্রশ্ন জাগে, কেন এই নীরবতা। বিচারক অত্যন্ত সহানুভূতিমাখা কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেন রানু কবীরকে, তাকে কেউ ভয় দেখিয়েছে কি না? তারপরও রানু কবীর নীরব। বিচারকের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা, বার বার তিনি রানু কবীরকে অভয় দিতে থাকেন, আশ্বাস দিতে থাকেন তার সর্বাঙ্গীন নিরাপত্তা বিধানের।সব শেষে রানু কবীর অস্ফুট কণ্ঠে বলেন, ‘ আসামীরা সব দিয়ে দিয়েছে’। বিস্মিত বিচারক জিজ্ঞাসা করেন, কী দিয়ে দিয়েছে? এ সময় এগিয়ে আসেন আইনজীবী, তিনি জানান যে, ˆপত্রিক সম্পত্তিতে ফরিয়াদির স্বামীর প্রাপ্য অংশ দিয়ে দিয়েছে আসামিদ্বয়। এবার বিচারের কাঠগড়ায় দ-ায়মান ফরিয়াদি রানু কবীরকে জিজ্ঞেস করেন আসামি তাকে ধর্ষণ করেছে কি-না? প্রশ্ন শুনে লজ্জাবনত হয়ে পড়েন রানু কবীর, তিনি জবাব দেন ‘না, আমার ভাসুর লিয়াকত সজ্জন ব্যক্তি। তিনি আমার সঙ্গে কখনোই কোনো খারাপ বা অশালীন আচরণ করেননি। সম্পত্তির ভাগাভাগি ত্বরান্বিত করার জন্যই মামলা করেছিলাম। নালিশ দরখাস্তের বক্তব্য আমার নয়, ভাশুরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে নালিশ দায়ের করতে আমি কাউকে কোনো নির্দেশনা দিইনি।’এরপর ডাক পড়ে সাক্ষী হ্যাপীর। যথারীতি হলফ পড়ানোর পর তাকেও বিচারক জিজ্ঞাসা করেন, আসামি মান্নান তাকে ধর্ষণ করেছে কি না? তিনিও তার মায়ের মতোই জবাব দেন। তার সঙ্গে শ্রদ্ধেয় চাচাকে জড়িয়ে ধর্ষণের যে কথা বলা হয়েছে তা জেনে তিনি যারপরনাই লজ্জিত হন। ঘটনা এরপর পরিষ্কার হয়ে যায় বিচারকের সামনে। লিয়াকত, মান্নান ও রহিম এরা তিন ভাই। তাদের এজমালি সম্পত্তিতে রয়েছে একটি বিশাল আমগাছ। ওই গাছের আম পাড়তে গিয়েছিলেন হ্যাপী। আমগাছের ডাল ভেঙে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এই আশঙ্কায় তাকে ওই সময় আম পাড়তে নিষেধ করেন তার চাচা। এই নিয়েই বিরোধের সূত্রপাত। তখন রানু কবীর সিদ্ধান্ত নেন তার স্বামীর ˆপর্তৃক সম্পত্তি ভাগাভাগি করে নেবে। তার স্বামী এতে রাজি হননি।স্বামীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে, তাকে না জানিয়ে রানু কবীর এক পরিচিত ‘টাউট’ শ্রেণীর লোকের শরণাপন্ন হন। সেই ব্যক্তিই জমি দ্রুত আদায় করার ‘সহজ বুদ্ধি’ হিসেবে এই ধর্ষণের নোংরা গল্প ফাঁদেন। সামান্য জমির লোভ আর ক্ষোভের বশে একটি পরিবারকে ধ্বংস করতে, নিজের ও নিজের ১৬ বছরের মেয়ের সম্ভ্রমকে বন্ধক রেখে আদালতে মিথ্যা মামলা ঠুকে দিয়েছিলেন রানু কবীর।মামলা থেকে লিয়াকত ও মান্নান সসম্মানে খালাস পেলেন বটে, কিন্তু যে মানসিক যন্ত্রণা, সামাজিক অবমাননা আর আদালতের বারান্দায় ঘোরার ক্লান্তি তারা সয়েছেন, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? আইনের এমন অপব্যবহার আমাদের সমাজের এক অন্ধকার দিককে চোখের সামনে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।অথচ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৭ ধারায় মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে ৭ বছরের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ‘রক্ষাকবচ’ থাকা সত্ত্বেও মিথ্যা মামলার হিড়িক কেন থামছে না? কারণ, এই ১৭ ধারার বাস্তব প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ধারাটি রীতিরকম কাগজে বাঘ, বাস্তবে ঠুঁটো জগন্নাথ। একটি মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পর আদালত খুব কম ক্ষেত্রেই নিজ উদ্যোগে বাদী বা তার পেছনে থাকা কুশীলবদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেন। শাস্তির এই ভয়হীনতাই অপরাধপ্রবণ মানুষকে আরও সাহসী করে তুলছে।প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রামের সাধারণ একজন নারী আইনের মারপ্যাঁচ বা আদালতের ভাষা বোঝেন না। তাহলে এই রোমহর্ষক ও কুৎসিত ধর্ষণের গল্পগুলো লেখে কারা? বাস্তবতা হলো, আদালতের আনাচে-কানাচে ও বারান্দায় ওত পেতে থাকা এক শ্রেণীর অসাধু ‘টাউট’, দালাল এবং নীতিহীন মোহরা (আইনজীবী সহকারী) এমনকি কিছু আইনজীবীরাও এই নোংরা ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে তারা তৈরি করে দেন একেকটিড় বানোয়াট ও লোমহর্ষক ‘স্ক্রিপ্ট’। জমিজমা, টাকা-পয়সা বা ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানোর জন্য তারা ধর্ষণের মামলাকে ‘সবচেয়ে মোক্ষম ও সহজ হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দেয়।সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো, এই নালিশি দরখাস্ত বা আরজিগুলো অত্যন্ত অশালীন, কুরুচিপূর্ণ এবং চটকদার ভাষায় লেখা হয়, যা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে পড়া অসম্ভব। অনেক সময় বাদী নিজে সম্পূর্ণ না বুঝেই শুধু অপর পক্ষকে দ্রুত জেলে ঢোকানো বা ঘায়েল করার জন্য সেই নোংরা কাগজে টিপসই বা স্বাক্ষর দিয়ে দেন।[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

বিভক্ত বিশ্বের মেলবন্ধনে জাদুঘর

১৮ মে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। ‘বিভক্ত বিশ্বের মেলবন্ধনে জাদুঘর’ আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য। জাদুঘর সংগ্রহশালা। এ ইতিহাস, ঐতিহ্য সাংস্কৃতিক উপাদান সংগ্রহ, প্রদর্শন ও সংরক্ষণ করা হয়। ‘বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর’ বিশেষায়িত সংগ্রহশালা। বিশেষ, স্থায়ী, অস্থায়ী প্রদর্শনীতে শিল্পকলা, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, জাতিতাত্ত্বিক, প্রাকৃতিক  নিদর্শনাদিতে পরিপূর্ণ তার ভাণ্ডার।  ভৌগোলিক রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামাজিক বিভাজন এবং সাংস্কৃতিক মেরুকরণের এই যুগে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অতীতের নিছক সংগ্রহশালা থেকে বর্তমানের সক্রিয় মধ্যস্থতাকারীতে বিবর্তিত হয়েছে। জাদুঘর এখানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে। আমরা যখন ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস পালন করছি, তখন বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করতে শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করছে। জাদুঘর প্রত্নবস্তুর কোনো সংগ্রহশালা শুধু নয়। সংগ্রহ শালার অট্টালিকা হিসেবে জাদুঘরকে বিবেচনা করার অবকাশ নেই। বহুমাত্রিক ভাবনার যথেষ্ট অবাধ পথ খোলা রয়েছে। জাদুঘর ‘যোগাযোগের ক্ষেত্র’ উপস্থাপন করে— জাদুঘর এমন এক নিরপেক্ষ ভূমি যেখানে ভিন্ন ভিন্ন আখ্যানের মিলন ঘটে, ঐতিহাসিক ক্ষতগুলো স্বীকৃত হয় এবং একটি অভিন্ন মানবিক পরিচয় গড়ে ওঠে।  সংলাপের জন্য নিরপেক্ষ ভূমি হিসেবে জাদুঘর বিশ্ব আজ বিভক্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো কঠিন আলোচনার জন্য অভাব। আধুনিক জাদুঘরগুলো এই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে এসেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ডিজিটাল ইকো- চেম্বারের মতো না হয়ে, জাদুঘরগুলো এমন এক শারীরিক ও বৌদ্ধিক পরিবেশ প্রদান করে যেখানে তথ্যভিত্তিক ইতিহাসেরসঙ্গে যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার মিলন ঘটে। রাজনৈতিক বিভাজন দূর করতে পারে জাদুঘর। অনেক দেশেই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ দুটি ভিন্ন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। জাদুঘরগুলো দীর্ঘমেয়াদী ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের মাধ্যমে ঐক্য বজায় রাখতে অবদান রাখে। অতীত সমাজগুলো কীভাবে সংঘাত মোকাবিলা করেছে তা দেখানোর মাধ্যমে জাদুঘর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের বর্তমান বিভাজনগুলো তাৎপর্যপূর্ণ হলেও তা একটি বৃহত্তর মানবিক চক্রের অংশ। এটি দর্শনার্থীদের তাদের পরিচয়ের বাইরে এসে শেয়ার্ড সিভিক রেসপন্সিবিলিটি বা অংশীদারিত্বমূলক নাগরিক দায়িত্বের দৃষ্টিতে বিশ্বকে দেখতে উৎসাহিত করে। একটি বিভক্ত বিশ্ব প্রায়ই  বিষয়ের ওপর মনোযোগ দেয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যটি অংশীদারিত্বমূলক ঐতিহ্য-এর ওপর জোর দেয়। উদাহরণস্বরূপ, যখন একটি জাদুঘর সিল্ক সামগ্রী প্রদর্শন করে, তখন এটি প্রমাণ করে যে ইউরোপীয়, মধ্যপ্রাচ্যীয় এবং এশীয় সংস্কৃতিগুলো হাজার বছর ধরে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত ছিল। এই উপলব্ধি আমাদের বিচ্ছিন্নতাবাদ থেকে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার দিকে ধাবিত করে। বি-উপনিবেশায়ন এবং ঐতিহাসিক ক্ষত নিরাময় বিশ্বেও জনসংখ্যার একটি বড় অংশ যদি মনে করে যে তাদের ইতিহাস চুরি করা হয়েছে বা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তবে বিশ্বকেঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব নয়। ২০২৬ সালের এই ম্যান্ডেট বা আদেশটি বিশ্বব্যাপী পুনর্মিলনের হাতিয়ার হিসেবে বি-উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। শান্তির নিদর্শন হিসেবে প্রত্নবস্তু প্রত্যাবর্তন জাদুঘর করে। সাংস্কৃতিক নিদর্শনগুলো তাদের আদি দেশে ফেরত পাঠানোকে এখন আর কেবল আইনি বাধ্য বাধকতা হিসেবে নয়, বরং ঐক্যের জন্য একটি ˆনতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে। যখন প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্ব পুরুষদের অবশিষ্টাংশ বা পবিত্র বস্তু ফেরত দেয়, তখন তারা অতীতের ভুলগুলো স্বীকার করে। এই জাতিগুলোর মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন করে, যা শোষণের ইতিহাসকে একটি কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অংশীদারিত্বের ভবিষ্যতে রূপান্তরিত করে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে জোরালো করে জাদুঘর। ঐক্য মানেই একরূপতা নয়। একটি ঐক্যবদ্ধ বিশ্ব হলো সেটিই যেখানে প্রত্যেকের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। আধুনিক জাদুঘরগুলো সক্রিয়ভাবে তাদের গ্যালারিগুলো পুনর্গঠন করছে যাতে আদিবাসী, জাতিগত সংখ্যালঘু এবং শ্রমজীবী মানুষের আখ্যান অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এই জাতীয় ইতিহাসের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে জাদুঘরগুলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তাদের দেশের ঐতিহ্যের ওপর মালিকানাবোধ তৈরি করতে সাহায্য করে, যার ফলে সামাজিক ঘর্ষণ হ্রাস পায়। সীমান্তের ওপারে ডিজিটাল সেতু নির্মাণ করে জাদুঘর। ২০২৬ সালে-এর সংজ্ঞা তার শারীরিক দেয়ালের বাইরে অনেক দূর প্রসারিত হয়েছে। ভৌগোলিকভাবে একটি বিভক্ত বিশ্বকে এক করার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ডিজিটাল রূপান্তর। ভার্চুয়াল সীমান্ত-অতিক্রম হয় জাদুঘরের মাধ্যমে। যারা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে বা দরিদ্র এলাকায় বাস করেন, তাদের জন্য বিশ্বমানের জাদুঘর ভ্রমণ করা অসম্ভব। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং হাই-ডেফিনিশন ডিজিটাল আর্কাইভগুলো জাদুঘরকে তাদের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। সংস্কৃতির এই নিশ্চিত করে যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলো সবার—তাদের পাসপোর্ট যা-ই হোক না কেন। সহযোগিতামূলক বিশ্ব প্রদর্শনীতে জাদুঘর যুক্ত থাকে। প্রযুক্তি বিভিন্ন মহাদেশের কিউরেটরদের যৌথভাবে প্রদর্শনী তৈরির সুযোগ করে দেয়। গ্লোবাল রেজিলিয়েন্স বা বিশ্বব্যাপী স্থিতিস্থাপকতার ওপর একটি ডিজিটাল প্রদর্শনীতে ঢাকা, লন্ডন এবং নাইরোবির নিদর্শনগুলো একই সঙ্গে প্রদর্শিত হতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে দর্শকদের দেখায় যে আমাদের সংগ্রাম এবং সাফল্যগুলো সর্বজনীন। [লেখক: প্রাবন্ধিক]

কৃত্রিম জনমত তৈরির ধারা ও বট বাহিনী

আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক গতিপথ নির্ধারণে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে বট বাহিনী। কথাটি শুনে অনেকেই চমকে যেতে পারেন। বিমান বাহিনী, সেনা বাহিনী, নৌবাহিনীর থেকেও কখনো কখনো শক্তিশালী মনে হয় বট বাহিনীকে’! উন্নত পেশাদার বাহিনীগুলো সমাজের মতামত তৈরিতে ভূমিকা রাখে না। তবে বট বাহিনী সামাজিক মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট মতামতের পক্ষে মুহুর্তে লক্ষাধিক মানুষের কৃত্রিম মতামত সৃষ্টি করতে সক্ষম। সকলেই ‘এক-মত’ তাহলে বিষয়টি ‘সত্য’, এরকম ভেবে যারা নিজেদের মতামত পরিবর্তন করে থাকেন তাদের উপর বট বাহিনীর প্রভাব অসীম। সমাজে আজকাল প্রতিনিয়ত কিছুটা হলেও এই ধারাতে কৃত্রিম জনমত তৈরি হচ্ছে। কৃত্রিম ভাবে সৃষ্ট এসব মতামত ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত করছে ব্যক্তি, সমাজ এবং সরকারের মতামত এবং নীতি নির্ধারণে। মতামত তৈরির এই প্রক্রিয়া আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিকে গভীর সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জগতের অভিভাবকেরা কী এই অশুভ মতামত তৈরির প্রক্রিয়ার বিষয়ে সচেতন আছেন নাগরিক সমাজের সদস্য হিসেবে আমরা ঠিক বুঝতে পারিনা। ‘রোবট’ থেকে ‘বট’ শব্দটি এসেছে। এটি এমন একটি প্রযুক্তি নির্ভর সফটওয়্যার, যা মানুষের মতো আচরণ করতে সক্ষম। এর কর্মক্ষেত্র হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বট বাহিনী কিংবা বটকে ব্যবহার করা হয় একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রচারনা চালিয়ে নিজেদের পক্ষে একটি কৃত্রিম মতামত তৈরি করা হলো বটবাহিনীর লক্ষ্য। রাজনীতির স্বাভাবিক গতিকে একটি নির্দিষ্ট দল বা মতাদর্শের দিকে টেনে নিতে বট বাহিনীর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। রাজনৈতিক প্রচারণা চালাতে, কখনো প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে, আবার কখনো কৃত্রিম জনপ্রিয়তা তৈরির জন্য বট বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়। বটবাহিনী হলো ছদ্ম বা গুপ্ত বাহিনী। মেঘনাদের মতো মেঘের আড়ালে এখানে প্রযুক্তির পর্দা টানিয়ে যুদ্ধ করে থাকে বটবাহিনী, যেহেতু বাহিনীটি ছদ্মবেশ ধারণ করে মতামত প্রচার করে থাকে তাই বটবাহিনী কোন ভাবেই ˆনতিক কোন শক্তি নয়। অনৈতিক ছদ্মবেশ ধারণকারীরা কখনোই সমাজে শুভ শক্তি হিসেবে গণ্য হতে পারেনা। ভার্চুয়াল সমাজে এই যে বিরামহীন যুদ্ধ চলছে এই যুদ্ধের সব চেয়ে বড় শক্তি হলো বট বাহিনী। কারা এই বট বাহিনী? বট কিন্তু শ্যামল ছায়া দিয়ে সবাইকে আগলে রাখা বটবৃক্ষ নয়। কৃত্রিম উত্তাপ ছড়িয়ে সমাজ ও রাজনীতির অলি-গলিতে প্রবেশ করে তথ্য বিকৃতি করে একটি ছদ্ম শক্তির পক্ষে মতামত তৈরি করে থাকে। এমন ভাবে মতামত তৈরি হয় সাধারণের কাছে মনে হয় এটিই প্রকৃত মতামত। আমরা গণতন্ত্র নিয়ে অষ্ট প্রহর কথা বলে থাকি। গণতন্ত্র কিন্তু নির্মিত হয় ‘গণের’ মতামতের ওপর। এই গণ বা জনগণ যে মতামত দিতে চান সে মতামত কী স্বাভাবিক ভাবে প্রকাশিত হতে পারছে নাকি পৃষ্ট হচ্ছে বট বাহিণীর মতামতের নিচে। সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতিতে ব্যাপক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। ভারসাম্য-হীনতা তৈরির জন্য বটবাহিনীর ভূমিকা কতোটুকু এসব বিষয়ে আমাদের গবেষণা যে খুব বেশি হচ্ছেনা, তা আমরা আঁচ করতে পারি। মনে রাখতে হবে গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি দাঁড়িয়ে থাকে মুক্ত মতপ্রকাশ, সত্য তথ্য এবং সচেতন নাগরিকের ওপর। সহিংসতা বা প্রতিপক্ষের কণ্ঠরোধ যেমন গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি কৃত্রিম জনমত তৈরির এই ডিজিটাল সংস্কৃতিও সমান বিপজ্জনক। সমাজ, রাজনীতির স্বাভাবিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করে এটি একটি কৃত্রিম, অবাস্তব, অযৌক্তিক পথে একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। মানুষের স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করে এবং বিভ্রান্তিকে সত্যের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বহুমুখী উন্নতির ফলে বটবাহিনী দিনেদিনে মানুষের মতো করে ভাষা ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। এ কারণেই মানুষ আর বটের মধ্যে পার্থক্য করা খুব কঠিন কাজ হয়ে পড়ছে। বট বাহিনী মূলত দু’ভাবে কাজ করে থাকে। বট বাহিনীকে মোতা দাগে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো প্রযুক্তি নির্ভর অর্থাৎ সফটওয়্যার নির্ভর বট আর অন্যটি হলো মানব নিয়ন্ত্রিত বট। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বট, নির্দিষ্ট শব্দ বা পোস্ট শনাক্ত করার ক্ষমতা রাখে। তাদের এতোই ক্ষমতা যে মুহূর্তের মধ্যে মন্তব্য, শেয়ার বা প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে মানবিক সুরে মানুষের মতো কথা বলতে সক্ষম হচ্ছে বট বাহিনী। মানবসদৃশ ভাষা ব্যবহারে তারা এতোই সক্ষম যে তাদের মতামতকে সমাজের কণ্ঠ হিসেবে বিবেচনা না করে পারা যায়না। স্বল্পশিক্ষিত অতিসাধারণ, কিংবা শিক্ষিত মানুষের পক্ষে প্রকৃত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী আর কৃত্রিম বটের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা দুরুহ হয়ে পড়ে।  মানব নিয়ন্ত্রিত বট কোন কোন ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নির্ভর বটের থেকে বিপদজনক। বাস্তব ক্ষেত্রে এরা মানুষ হলেও ছদ্ম পরিচয়ে এরা অগণন অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে থাকে। রাজনৈতিক দল, করপোরেট গোষ্ঠী কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের নির্দেশে তারা সংঘবদ্ধভাবে অপপ্রচার, গালাগালি, চরিত্রহনন ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালায়। একজন অপারেটর কখনো কখনো ত্রিশ, চল্লিশটি পর্যন্ত অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ করে। নির্দিষ্ট ভাবে ইশারা পেলেই তারা যে কোনো পোস্টে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমন্বিত আক্রমণ শুরু করে। বাস্তব সেনা সদস্যরাও এতো নিষ্ঠুর আক্রমণ করতে পারেনা। ছদ্ম প্রভুর ছদ্ম সেনারা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিরতিহীন ভাবে আক্রমন শানিয়ে যায়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তাপ যত বেড়েছে, বট বাহিনীর সক্রিয়তাও তত দৃশ্যমান হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক ঘটনা, আন্দোলন কিংবা সংবেদনশীল সংবাদ প্রকাশের পর মুহূর্তেই হাজার হাজার অভিন্ন মন্তব্য, একই ধরনের ভাষা ও একই সুরের প্রচারণা চোখে পড়ে। এতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের অনেকেই মনে করেন, যেন পুরো সমাজ একটি নির্দিষ্ট মতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অথচ বাস্তবে এই জনমতের ঢেউয়ের বড় অংশই কৃত্রিম। একটি বিষয় অত্যন্ত আশা জাগানিয়া। সেটি হলো কৃত্রিম মতামত সর্বস্তরের মানুষকে স্পর্শ করতে পারেনি। কৃত্রিম মতামত কিছুটা প্রভাবিত করতে পারে সামাজিক, রাজনৈতিক গতি প্রবাহ তবে প্রকৃত বা বাস্তব মতামতকে যথেষ্ট ভাবে প্রভাবিত করতে পারেনা। ফেসবুকের জনমত আর মাঠের বাস্তবতা যে এক নয়, তা প্রমাণিত হয়েছে ভোটের ফলাফলে। অনলাইনে যে পক্ষকে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দেখানো হয়েছে, বাস্তবে নির্বাচনী ফলাফল ছিল তার ঠিক বিপরীত। এতে প্রমাণ হয়েছে, বটের তৈরি করা কৃত্রিম জনপ্রিয়তা সব সময় বাস্তব রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে পারে না। মাঝে মধ্যে মীমাংসিত বিষয়কে মিথ্যা বানানোর চেষ্টা কিংবা টাইমিংয়ের হেরফেরে বট নিজেই হাসির পাত্রে পরিণত হয় এবং মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়। তবু ক্ষতি কম হচ্ছে না। কারণ, এই বট সংস্কৃতি সমাজে বিষাক্ততা বাড়াচ্ছে, মতপ্রকাশের পরিবেশ সংকুচিত করছে এবং তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ধ্বংস করছে। কৃত্রিম মতামত তৈরির এই প্রবাহকে রুখতে হলে প্রয়োজন ডিজিটাল লিটারেসি জ্ঞান। নাগরিক সমাজের এই দক্ষতার অভাবে কৃত্রিম মতামত তৈরির প্রক্রিয়া সবল হচ্ছে ক্রমাগত। আমাদের সমাজে ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি বা তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এখনও দুর্বল হওয়ায় বট নির্ভর প্রচারণা খুব সহজেই মানুষের আবেগ, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সামাজিক বিভাজনকে প্রভাবিত করতে পারে। সামজিক রাজনৈতিক গতিধারার স্বাভাবিক প্রবাহকে বহমান রাখাটা খুব জরুরি। কৃত্রিম মতামত আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের নিয়ন্ত্রক হতে পারেনা। ঘুণপোকা যেমন ভেতর থেকে একটি কাঠামোকে অকার্যকর করে ফেলে কৃত্রিম মতামতও এক সময় আমাদের জাতীয় পথ চলাকে অর্থহীন করে তুলতে পারে। সময় হয়েছে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধন এবং সামজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল লিটারেসির জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির। এ বিষয়ে নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তিবিদ এবং রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠন গুলোকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। [লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

পদ্মা ব্যারাজ: বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ভবিষ্যৎ রক্ষার মহাপরিকল্পনা

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু প্রকল্প কেবল অবকাঠামো নয়, সময়ের দাবি হয়ে আসে। পদ্মা সেতু যেমন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ, অর্থনীতি ও আত্মবিশ্বাসে নতুন যুগের সূচনা করেছে, তেমনি আজ ‘পদ্মা ব্যারাজ’ হতে পারে বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির নতুন ভিত্তি। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো— দেশের বহু নদী আজ মৃতপ্রায়। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে পড়ে। খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, বাগেরহাট, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এখন নদী আছে, কিন্তু প্রবাহ নেই; খাল আছে, কিন্তু পানি নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার বিস্তার। এই সংকট শুধু পরিবেশগত নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সংকট। তাই পদ্মা ব্যারাজ এখন আর শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়—এটি দক্ষিণাঞ্চলকে টিকিয়ে রাখার দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কৌশল। কেন এখন পদ্মা ব্যারাজ অপরিহার্য?বিশেষজ্ঞদের মতে, Farakka Barrage চালুর পর থেকেই শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানিপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ’৩৪-’৭৪ সময়কালের তুলনায় ’৭৫-২০০৫ সময়ে ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত গঙ্গা-পদ্মা নদীর প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। গড়াই নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সুপেয় পানির সংকট তৈরি হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে, মাছের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, নদীর নাব্যতা কমছে এবং সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ঝুঁকির মুখে পড়ছে। একসময় দক্ষিণাঞ্চল ছিল নদী, মাছ ও উর্বরতার প্রতীক। নদীর বুকজুড়ে চলতো নৌকা, খাল-বিল ভরা থাকতো মাছের প্রাচুর্যে। অথচ আজ অনেক নদী শুধু চর আর পলিতে ভরাট। এই বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।কৃষিতে আসতে পারে নতুন বিপ্লব:বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার বড় শক্তি কৃষি। কিন্তু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল কৃষিজমি এখনও পুরোপুরি ব্যবহৃত হচ্ছে না। লবণাক্ততা ও পানির অভাবে অনেক জমি এক ফসলি হয়ে পড়েছে, কোথাও আবার জমি অনাবাদি থাকে। একসময় Ganges-Kobadak Irrigation Project দেশের অন্যতম বৃহৎ সেচপ্রকল্প ছিল। প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার হেক্টরের বেশি জমি এই প্রকল্পের আওতায় সেচ সুবিধা পেত। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর কমে যাওয়ায় অনেক পাম্প অকার্যকর হয়ে পড়ে। পদ্মা ব্যারাজ কার্যকর হলে দক্ষিণাঞ্চলে সেচব্যবস্থা সম্প্রসারিত হবে। বছরে একাধিক ফসল উৎপাদন সম্ভবহবে। ধান ছাড়াও গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, সবজি ও ফল উৎপাদনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, খাদ্যচাহিদাও বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিকে পুনর্জীবিত করা অত্যন্ত জরুরি। মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধারে বড় সম্ভাবনা:বাংলাদেশের সংস্কৃতি, পুষ্টি ও অর্থনীতির সঙ্গে মাছ গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশীয় মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গঙ্গা অববাহিকার স্বাভাবিক স্রোত, ঘোলাভাব, পুষ্টিগুণ ও লবণাক্ততার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একসময় এই নদীব্যবস্থায় ২০০টির বেশি স্বাদুপানির মাছ এবং অন্তত ১৮ প্রজাতির চিংড়ির আবাস ছিল। বর্তমানে অনেক দেশীয় মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে যদি নদীতে সারা বছর ন্যূনতম প্রবাহ বজায় রাখা যায়, তাহলে দেশীয় মাছের প্রজনন বৃদ্ধি পাবে, জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং নদীনির্ভর মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। এটি শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়; এর সঙ্গে লাখো জেলের জীবন-জীবিকা জড়িত।লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সমাধান:দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো লবণাক্ততা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। গবেষণায় খুলনা অঞ্চলের রূপসা নদীতে ক্লোরাইডের মাত্রা ৫৬৩.৭৫ মিলিগ্রাম/লিটার পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে Total Dissolved Solids (TDS) ১,২০০ মিলিগ্রাম/লিটার ছাড়িয়েছে, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্রহণযোগ্য সীমা ৫০০ মিলিগ্রাম/লিটার। ফলে কৃষিজমি অনাবাদি হচ্ছে, সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে নারীরা দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহে সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ করেন। যদি পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত মিঠাপানি সরবরাহ করা যায়, তাহলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে। সুন্দরবন রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ:বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলকে রক্ষা করতে সুন্দরবনের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এই বনও আজ সংকটে। নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বাড়ছে, যা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। পরিবেশবিদদের মতে, সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখতে হলে নিয়মিত মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। পদ্মা ব্যারাজ সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ এই প্রকল্প শুধু মানুষের জন্য নয়; বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার সঙ্গেও সম্পর্কিত। নদী বাঁচলে অর্থনীতিও বাঁচবেবাংলাদেশের অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে নদীকেন্দ্রিক। নদী শুধু পানির উৎস নয়; এটি পরিবহন, কৃষি, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু নদীতে পানি কমে যাওয়ায় নাব্যতা নষ্ট হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৩২০ কিলোমিটারের বেশি নৌপথ অকার্যকর হয়ে পড়ে। এতে নদীনির্ভর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হাজার হাজার মাঝি ও নৌযানশ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। যদি নদীতে স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে, তাহলে নৌপরিবহন সহজ হবে, পলি ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে এবং নদীর প্রাণ ফিরে আসবে। এতে পরিবহন ব্যয় কমবে, আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়বে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ:বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। আগামী কয়েক দশকে পানি ব্যবস্থাপনা হবে জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাপী এখন পানি নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ ভবিষ্যতের খাদ্যসংকট, অভিবাসন ও সামাজিক অস্থিরতার সঙ্গে পানির সম্পর্ক গভীর। বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পানি অবকাঠামো গড়ে তুলতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতে সংকট আরও তীব্র হবে। পদ্মা ব্যারাজ সেই দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা:তবে একটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে—ব্যারাজ নির্মাণ মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। বিশ্বের অনেক দেশে অপরিকল্পিত বাঁধ ও ব্যারাজ পরিবেশগত বিপর্যয়ও তৈরি করেছে। তাই পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে নদী, জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও স্থানীয় জনজীবনের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায়। একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং কার্যকর পলি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন নিশ্চিত করতে আধুনিক ফিশ প্যাসেজ নির্মাণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া স্থানীয় জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, কারণ এই প্রকল্পের সুফল ও প্রভাব সবচেয়ে বেশি বহন করবে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও পরিবেশবিদদের সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ আন্তঃসীমান্ত পানি কূটনীতির দক্ষ ব্যবস্থাপনাও এ প্রকল্পের সফলতার জন্য অপরিহার্য। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পদ্মা ব্যারাজ যেন কেবল রাজনৈতিক আবেগ বা প্রতীকী উন্নয়ন প্রকল্প না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার ভিত্তিতে বাস্তবায়িত একটি টেকসই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পরিণত হয়। এখন সময় জাতীয় ঐকমত্যের:বাংলাদেশ একসময় ভাবত, পদ্মা সেতু হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু আজ সেই সেতুই দেশের উন্নয়নের প্রতীক। পদ্মা ব্যারাজও তেমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা হতে পারে, যা আগামী ৫০ বছরের পানি, কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, নদী শুকিয়ে গেলে শুধু পানি হারায় না; হারায় কৃষি, মাছ, সংস্কৃতি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এখনই বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ পানি নিয়ে যে বৈশ্বিক সংকট শুরু হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও তীব্র হবে। পদ্মা ব্যারাজ সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি হতে পারে—যদি এটি হয় বিজ্ঞানসম্মত, পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থনির্ভর।(লেখকের নিজস্ব মত) [লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ঢাকা]

শিশুদের নিরাপত্তা কোথায়

অতি সম্প্রতিকালের কিছু ধর্ষণ ঘটনা। টাঙ্গাইল পৌরসভা এনায়েতপুর বইল্যা বাজারের পূর্ব পাশের একটি মহিলা মাদ্রাসার ৪০ জনের বেশি কন্যা শিশুকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। যৌন নির্যাতন করা হতো ছাত্রীদের চোখ বেঁধে। ছাত্রীদের বাথরুম গোপনে ভিডিও করে তা প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন চালানো হতো। নেত্রকোণার মদন উপজেলায় একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকের ধর্ষণে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা। গর্ভবতী হওয়া নিয়ে শিশুটির কোনো জ্ঞান নেই, পেটের ভেতর নড়াচড়া সে অনুভব করেছে, কিন্তু কী নড়াচড়া করে তা সে জানে না। তার শারীরে পরিবর্তন আসার পর তার পরিবার তাকে প্রশ্ন করে ধর্ষণের বিষয়টি জানতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের ‘আল হিদায়াত হিফজুল কুরআন মডেল মাদ্রাসায়’ ৯ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে শিক্ষক সাকির আলী প্রথমে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছেন, পরে গলা চেপে শূন্যে তুলে মাটিতে আছাড় দিয়েছেন, শিশুটি যন্ত্রণায় যতবেশি কান্নাকাটি করেছে, শিক্ষকের নির্যাতন ততবেশি বেড়েছে। সহপাঠিরা আতঙ্কিত অবস্থায় এই দৃশ্য দেখেছে। এই নির্যাতন হচ্ছে যৌনকর্মের পূর্ব প্রস্তুতি।এমন ঘটনা শত শত।ধর্ষণ শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতে কমবেশি আছে, কিন্তু বাংলাদেশে মহামারি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্ষণ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জিম্মি করে ধর্ষণ করা হয়, যৌনকর্মে রাজি না হলে ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। কিন্তু মাদ্রাসায় ধর্ষণের চিত্র ভিন্ন, সেখানে ধর্ষিত প্রায় সবাই শিশু। মাদ্রাসায় ছেলে শিশুদের বলাৎকারের নানা কাহিনী রূপকথার গল্পের মতো অবিশ্বাস্য মনে হয়। মাদ্রাসার শিক্ষকদের ধর্ষণ ও বলাৎকারে বহু শিশু মারাও গেছে। শুধু কী মাদ্রাসার শিক্ষক ? না, মসজিদের অনেক ইমাম ও মুয়াজ্জিনও ধর্ষণ এবং বলাৎকারের অপকর্মে লিপ্ত। এরা বহু ঘটনায় ধরা পড়েছে, সাধারণ জনগণের হাতে নিগৃতও হয়েছে, তারপরও ধর্ষণ আর বলাৎকার থামছে না। ধর্ম এবং রাষ্ট্রও এদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখেছে, কিন্তু এরা ভয় পায় না। লুত জাতির ধ্বংস বা দোজখের আগুনে দগ্ধ হওয়ার ভীতিজনক শাস্তির ভয়ও তাদের কুৎসিত প্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখতে পারে না। এরা ধর্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল বলেই সম্ভবত ধর্মের নিষেধাজ্ঞা এদের ভীত করে না।একশ্রেণীর মাওলানা, ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বলাৎকার ও ধর্ষণের ধরন শুধু বিকৃত নয়, অভিনবও। শিশুর মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে, হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ ও বলাৎকার করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চকোলেট দিয়ে, কোন কোন ক্ষেত্রে গোসল বা গায়ে তেল মাখানোর ফজিলত বর্ণনা করতে করতে, কখনো কখনো সওয়াব কামানোর বানী দিয়ে, আবার কখনো কখনো বেহেস্ত পাওয়ার আশ্বাসবানী শুনিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এমনও দেখা গেছে, নির্যাতিত শিশুর যন্ত্রণার চিৎকার শুনে ধর্ষক মাওলানারা বেশি বেশি যৌন উত্তেজনা অনুভব করেছে। শয়তান আছর করে বলেই তাদের ধর্ষণশক্তি বেড়ে যায়, সব দোষ শয়তানের ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা। ধর্ষণের আরও একটি অভিনব কৌশল তারা অনুসরণ করে থাকে, তারা শিশুদের মনে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাদের যৌনকর্মকে সহজ করে তোলে। শিক্ষকের কথা না শুনলে অন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়, হাতের আঙুলে পচন ধরার ভয়, কবরে বিষধর সাপের দংশনের ভয়, আর দোজখের ভয়। এইসব ভয় কাজ না করলে বেত আর লাঠির ভয়। মাদ্রাসার এমন অমানুষিক নির্যাতনের কথা সবাই জানে। শিশুর হাত-পা রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয়, তারপর শুরু হয় পিটানো। শিশুর বাবাগো, মাগো চিৎকারে চারিদিক প্রকম্পিত হলেও শিক্ষকের মন গলে না, যতক্ষণ দেহে শক্তি থাকে ততক্ষণ পিটায়। মাঝে মাঝে হাত-পা বেঁধে টাঙ্গিয়ে পিটানো হয়। বাকি ছাত্র-ছাত্রীরা এই রোমহর্ষক নির্যাতনের মধ্যেও জোরে জোরে কোরআন পড়তে থাকে। এমন আতঙ্ক ও ভীতিজনক অবস্থা দেখার পর কোন শিক্ষার্থীর পক্ষে শিক্ষকের আহবানে যৌনকর্মে সাড়া না দেয়ার সাহস থাকে না। তাদের নালিশ করারও কোনো স্থান নেই, মা-বাবা ধর্মীয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগকে গুরুত্ব দেন না। অবশ্য মা-বাবার সীমাবদ্ধতাও আছে, মাদ্রাসা থেকে এনে সন্তানদের স্কুলে দেয়ার সামর্থ তাদের নেই। গরীব ঘরের শিশুরা মাদ্রাসায় শুধু পড়তে যায় না, খাবারও পায়। তাই কোন মা-বাবা চায় না তাদের সন্তান মাদ্রাসা থেকে বিতাড়িত হোক, বিতাড়িত হলে শুধু লেখাপড়া বন্ধ হবে না, হস্টেলে অবস্থান করে বিনে পয়সায় খাবারটাও হারাবে।দেশে কতগুলো মাদ্রাসা আছে তার সঠিক হিসাব বের করাও কঠিন, কারণ কওমী মাদ্রাসা করতে সরকারের অনুমতি লাগে না। দেশের যেখানেই চোখ পড়বে সেখানেই মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা, কওমী মাদ্রাসা, মহিলা মাদ্রাসা, মহিলা ক্যাডেট মাদ্রাসা। ধর্মীয় রক্ষণশীল অংশের সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্য আওয়ামী লীগ সরকার দেশের আনাচেকানাচে কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর সরকারগুলোর চরম ব্যর্থতায় দরিদ্র ও হত দরিদ্র পরিবারগুলো সাধারণ শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, হচ্ছে। সমাজে যারা এককালে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন তাদেরই নাতিপুতি সন্তানেরা এখন মাদ্রাসা তৈরি করছেন। গণতন্ত্রের নামে আমাদের দেশে যে নির্বাচন হয় তাও মাদ্রাসার সম্প্রসারণে বিরাট ভূমিকা পালন করছে, আস্তিক-নাস্তিক-ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজ সব প্রার্থীই নির্বাচনের সময় অকাতরে মাদ্রাসায় দান করে যাচ্ছেন। আর যারা মাদ্রাসা থেকে পাস করছেন তাদের ইহকালে টিকে থাকার কোন কর্মজ্ঞান নেই, তাই কর্মসংস্থানের জন্য আরেকটি মাদ্রাসা খুলতে হয়।গরীবের ইহকাল কষ্টের, তাই পরকালে বেহেশতের প্রত্যাশা অত্যধিক। শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সব মুসলমানের একটি ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে, কোরআনে হাফেজ হলে তার মা-বাবা বেহেশতে যাবে। শুধু তাই নয়, একজন হাফেজ যে তার চৌদ্দ গোষ্ঠীকে বেহেশতে নিতে পারবেন সেই ধারণা আমাদের দেয়া হয়েছে মক্তবে। কিন্তু এ সম্পর্কে কোরআনে কোনো বক্তব্য নেই, এমন কী এ সম্পর্কে কোনো সহিহ হাদিসও নেই। একটি দুর্বল হাদিসে বলা হয়েছে যে, একজন কোরআনে হাফেজ তার গোষ্ঠীর ১০ জন জাহান্নামী ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। কিন্তু দুর্বল হওয়ায় অধিকাংশ আলেম এই হাদিসটি অগ্রহণযোগ্য বলে মতামত দিয়েছেন। তবুও পরিবারের একজন সদস্যকে হাফেজ বানানোর তীব্র আগ্রহ রয়েছে। এই আগ্রহ থেকেই গরীব পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের মাদ্রায় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায়। হাফেজ মাওলানা দ্বারা হাফেজ শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ আর বলাৎকার নিয়ে আলেম সমাজে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া নেই, ওয়াজে মাদ্রাসার কোন ধর্ষক শিক্ষককে ভর্ৎসনা করার নজিরও খুব বেশি নেই।শুধু দেশে নয়, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতেও অহরহ ধর্ষণ হচ্ছে। সউদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো প্রভৃতি দেশে বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলো থেকে নারী গৃহকর্মী নিয়ে গৃহকর্তা ও গৃহকর্তার ছেলে মিলে শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গৃহকর্মী গর্ভবতী হয়ে দেশে ফেরত আসে, দেশে আসার পর শিশু জন্ম নিলে তাদের বলা হয় ‘জারজ’। এমন নিষ্পাপ ‘জারজ’ সন্তানের জন্ম হয়েছে একাত্তরেও। গণিমতের মাল গণ্য করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার মিলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দুই থেকে চার লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছে। সেনাদের এই ধর্ষণ শুধু যৌনক্ষুধা মেটানোর তাগিদে হয়নি, হয়েছে একটি জাতি, সম্প্রদায়কে কলুষিত ও অপমানিত করার জিঘাংসাজাত আক্রোশ থেকে। তাদের গর্ভে জন্ম নেয়া শিশুদের অধিকাংশ বাংলাদেশে ঠাঁই পায়নি, তাদের স্থান হয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বাকি যারা ছিল তাদের স্কুলে ভর্তির সময় বাবার নাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ লিখতে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর গৃকর্মীরাও একাত্তরের মতো অসহায়, তাদের নালিশ শোনার মতো কোন আপনজন ওখানে নেই; তাছাড়া সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ক্ষমতা এবং সাহস কোনটাই বাংলাদেশের নেই। বিদেশে গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন ও তাদের ধর্ষণ করার কারণে অদ্যাবধি কোনো ব্যক্তির শাস্তি হয়নি। ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, নেপাল, ফিলিপিন্স মাঝে মাঝে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ রাখে। কিন্তু অভাব তাদের আবার পাঠাতে বাধ্য করে।সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই খারাপ, ৫ আগস্টের পর দেশের সর্বত্র এমন একটি প্রতীতির জন্ম হয়েছে যে, সংঘবদ্ধ হয়ে যাই করুক না কেন তা আমলে নেয়া হবে না। চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী এবং মব সন্ত্রাসের মতো ধর্ষকেরাও নিজেদের ‘বিপ্লবী’ ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায়, নিশ্চয়ই এই সরকার মোহাম্মদ ইউনূসের মতো ইনডেমনিটির চর্চা করবে না, জিরো টলারেন্সের একটি কঠোর বার্তা দিয়ে ধর্ষকদের মনে ভয় ধরিয়ে দেবে। এছাড়াও মাদ্রাসার ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আলেম সমাজ সোচ্চার হলে ধর্ষণ ও বলাৎকার থামানো হয়তো সম্ভব হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

‘প্যাক্স আমেরিকানা’র পতন

ইতিহাস খুব কম সময়েই নিজেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করে। বেশিরভাগ বড় পরিবর্তন শুরু হয় নিরবে—কোনো বৈঠকের টেবিলে, কোনো করমর্দনের আড়ালে, কিংবা এমন এক রাজনৈতিক মুহূর্তে যার প্রকৃত তাৎপর্য তখনই ধরা পড়ে না। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বেইজিং সফর ছিল তেমনই এক ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র তখন এমন এক চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে এগিয়ে গিয়েছিল, যাকে সে দীর্ঘদিন বৈশ্বিক ব্যবস্থার বাইরে রাখতে চেয়েছিল। কয়েক বছর পর দেং জিয়াও পিংয়ের আমেরিকা সফর বিশ্বকে আরেকটি বার্তা দিয়েছিল—চীন বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে নয়, বরং তার ভেতরে প্রবেশ করে তাকে নতুনভাবে প্রভাবিত করতে চায়। ডনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিন পিংয়ের বেইজিং বৈঠক হয়তো সেই ঐতিহাসিক নাটকীয়তার পুনরাবৃত্তি করবে না। গ্রেট হল অব দ্য পিপলের কোনো ছবি সম্ভবত নিক্সন-মাওয়ের ছবির মতো ইতিহাসের প্রতীকে পরিণত হবে না। তবু এই সম্মেলনকে নিছক আরেকটি কূটনৈতিক রুটিন বলে দেখার সুযোগ নেই। এর গুরুত্ব লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়—বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনশীল ভারসাম্যে এবং কোন রাষ্ট্রটি ক্রমশ বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ, ˆধর্যশীল ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে এগোচ্ছে, সেই বাস্তবতায়। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী তিন দশক যুক্তরাষ্ট্র এমন এক আত্মবিশ্বাসে কাটিয়েছে, যেন তার সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রাধান্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। ওয়াশিংটনের বড় অংশ বিশ্বাস করত, অর্থনৈতিক একীভূতের মধ্য দিয়ে চীন ধীরে ধীরে পশ্চিমা রাজনৈতিক কাঠামোর দিকেই ঝুঁকবে। চীনকে দেখা হতো বিশাল উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে, সভ্যতাগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়। আজ সেই ধারণা শুধু ভুলই নয়, অনেকাংশে বোকামি বলেও মনে হয়। আজকের চীন অতীতের ন্যায় সত্তরের দশকের বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল রাষ্ট্র নয়। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি; এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার; এবং এমন এক প্রযুক্তিগত শক্তি, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে সেমিকন্ডাক্টর পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে আমেরিকার দীর্ঘদিনের একচেটিয়া প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—চীন এই উত্থান ঘটিয়েছে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে জড়িয়ে নয়, বরং বাণিজ্য, অবকাঠামো ও কৌশলগত ˆধর্যের মাধ্যমে। এই পার্থক্যটি ছোট নয়। বেইজিংয়ের দিকে যাত্রা করছে এমন এক আমেরিকা, যার কাঁধে কৌশলগত ক্লান্তির ভার স্পষ্ট। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া কিংবা সাম্প্রতিক ইরান-সংকট—সব ক্ষেত্রেই একটি প্রবণতা চোখে পড়ে: যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরু করতে পারদর্শী, কিন্তু তা রাজনৈতিকভাবে টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে প্রায়ই ব্যর্থ। সামরিক শক্তির প্রাচুর্য সবসময় কৌশলগত সাফল্য নিশ্চিত করে না; বরং অনেক সময় তা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। চীন ঠিক সেই সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ নিয়েছে। তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও বেইজিং সরাসরি সংঘাতে জড়ানো এড়িয়ে গেছে। ইরান থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে, আঞ্চলিক মধ্যস্থতার পক্ষে থেকেছে এবং নিজেকে যোদ্ধার চেয়ে সম্ভাব্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে তুলে ধরেছে। এটি আদর্শবাদ নয়; বরং বাস্তববাদ। কারণ হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাস্তববাদকে দুর্বলতা বলা যায় না—প্রায়শই সেটিই পরিপক্বতার পরিচয়। পশ্চিমা বিশ্বে চীনকে প্রায়ই এমন এক আগ্রাসী শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়, যে বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থাকে উল্টে দিতে চায়। বাস্তবতা অবশ্য আরও জটিল। দক্ষিণ চীন সাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক বা তাইওয়ান প্রশ্নে বেইজিং নিঃসন্দেহে তার প্রভাব বাড়াতে চায়। কিন্তু তার পদ্ধতি অধিকাংশ সময়ই সামরিক আঘাতের চেয়ে অর্থনৈতিক নির্ভরতা, অবকাঠামোগত সংযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ওপর নির্ভরশীল। তাইওয়ান ইস্যুতেও চীনের আচরণে একটি হিসাবি সতর্কতা দেখা যায়। শি জিনপিং একাধিকবার পুনরেকত্রীকরণকে ঐতিহাসিক লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু বেইজিং এখনও ইউক্রেনে রাশিয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানে যায়নি। কারণ চীনা কৌশলবিদরা বোঝেন— বড় শক্তির যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু তার পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তি যুদ্ধেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও চিপ নিষেধাজ্ঞা চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারবে। তথাকথিত ‘স্মল ইয়ার্ড, হাই ফেন্স’ নীতির লক্ষ্য ছিল উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও এআই অবকাঠামো থেকে বেইজিংকে বিচ্ছিন্ন রাখা। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টোও। চীন দেশীয় উদ্ভাবনে গতি বাড়িয়েছে, নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং পশ্চিমা জোটের বাইরে নতুন অংশীদার খুঁজে নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেও কিছু ক্ষেত্রে নীতিগত শিথিলতায় যেতে হয়েছে, কারণ বাজার হারানোর চাপ আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্যও অস্বস্তিকর হয়ে উঠছিল। এখানেই একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট হয়: গভীরভাবে আন্তঃসংযুক্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনকে বিচ্ছিন্ন করা সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিচ্ছিন্ন করার মতো সহজ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন নতুন প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয়ই জানে, আগামী দশকের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব অনেকাংশে নির্ধারিত হবে এআই, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও উন্নত অটোমেশনের মাধ্যমে। কিন্তু এখানে একটি বড় বৈপরীত্য আছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই এই প্রতিযোগিতাকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বনাম কর্তৃত্ববাদের লড়াই হিসেবে তুলে ধরে। অথচ বিশ্বের বহু দেশ এখন মতাদর্শের চেয়ে সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আর সেই সক্ষমতার প্রদর্শনে চীন অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে গেছে। যখন আমেরিকান রাজনীতি অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ, সংস্কৃতিযুদ্ধ ও প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থায় জর্জরিত, তখন বেইজিং নিজেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, এটি এমন এক কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচয় দেয় যা পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো অনেক দিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে দেখাতে পারছে না। চীন বন্দর, রেলপথ, শিল্পাঞ্চল ও জ্বালানি করিডোর নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে; আর যুক্তরাষ্ট্র ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এমন যুদ্ধে, যেগুলো দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। অবশ্য এর মানে এই নয় যে চীনের সামনে কোনো সংকট নেই। জনসংখ্যাগত পতন, যুব বেকারত্ব, ঋণের চাপ ও রিয়েল এস্টেট খাতের অস্থিরতা— এসবই বাস্তব সমস্যা। চীনের উত্থান যেমন অনিবার্য নয়, তেমনি তার পতনও অবধারিত নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায়ই বাস্তবতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে মানুষের ধারণা। আর সেখানেই ডনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে বেইজিংয়ের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সংঘাত, অস্থির শুল্কনীতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসা এবং হঠাৎ সামরিক সিদ্ধান্ত— এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এমনকি ইউরোপের অনেক দেশ এখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল নিচ্ছে। তারা আর এককভাবে আমেরিকার ধারাবাহিকতার ওপর ভরসা করতে পারছে না। চীন এই সুযোগটি দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে। নিজেকে স্থিতিশীল বাণিজ্য, অবকাঠামোগত সংযোগ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরছে— যা অনেক দেশের কাছে আমেরিকার অস্থিরতার বিপরীত প্রতিচ্ছবি। এই বর্ণনা পুরোপুরি সত্য কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু ভূরাজনীতিতে ধারণারও নিজস্ব শক্তি আছে। বেইজিং সম্মেলনের প্রকৃত গুরুত্ব তাই কোনো যৌথ বিবৃতির ভাষায় নয়, বরং তার প্রতীকে। বিশ বছর আগে আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা চীনা নেতাদের সঙ্গে কথা বলতেন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির অবস্থান থেকে। আজ পরিস্থিতি বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও সামরিক, আর্থিক ও প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। চীনও নানা সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। তবু একটি বিষয় স্পষ্ট— এক পক্ষ ক্রমশ বেশি প্রতিক্রিয়াশীল দেখাচ্ছে, অন্য পক্ষ বেশি ˆধর্যশীল। সম্ভবত আগামী ইতিহাস এই বৈঠককে কোনো নাটকীয় সন্ধিক্ষণ হিসেবে নয়, বরং ধীর এক ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের প্রতীক হিসেবেই মনে রাখবে। বিশ্ব হয়তো ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছে, আমেরিকান আধিপত্য আর একছত্র নয়; আর চীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজের জায়গা তৈরি করছে অতি আওয়াজের নাটক দিয়ে নয়, বরং শৃঙ্খলা, স্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের মাধ্যমে। [লেখক: প্রাবন্ধিক]

সাঁওতালি ভাষায় শপথ: আদিবাসী ভাষার মর্যাদার নতুন দিগন্ত

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বাঁকুড়ার রানিবাঁধ কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষুদিরাম টুডু। বিজেপির টিকেটে নির্বাচিত এই নেতা ইতোমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। ৯ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। দিনটির বিশেষত্ব ছিল— এ দিন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী পালিত হচ্ছিল। বঙ্গের নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে নিজ মাতৃভাষা সাঁওতালিতে শপথ গ্রহণ করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন টুডু। শপথ বাক্যের পুরো অংশ তিনি সাঁওতালি ভাষায় সাবলীলভাবে উচ্চারণ করেন। তার এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজ্যের আদিবাসী সংস্কৃতি ও ভাষাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সাঁওতালি ভাষায় শপথ নেয়ার সময় ময়দানে উপস্থিত জনতার মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা থেকে উঠে আসা এই নেতার হাত ধরে আদিবাসী উন্নয়নের পথে নতুন দিশা মিলবে। এবারের নির্বাচনে ক্ষুদিরাম টুডু ছাড়াও ভারতীয় জনতা পার্টি থেকে রেকর্ডসংখ্যক সাঁওতাল বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন— লাবসেন বাস্কে, প্রণত টুডু, ছেত্রমোহন হাঁসদা, লক্ষ্মীকান্ত সাউর, দুর্গা মুরমু, অমিয় কিস্কু, যোয়েল মুরমু, বুধরায় টুডু, মিস মায়ন মুরমু, কমলাকান্ত হাঁসদা এবং ভদ্রা হেমব্রম। আমরা বিশ্বাস করি, আগামীতে সাঁওতালি বিধায়করা সাঁওতালি ভাষাতেই শপথ গ্রহণ করবেন। আমরা দেখেছি, আদিবাসী অধ্যুষিত ঝাড়খণ্ড রাজ্যে ২০২০ খ্রিস্টাব্দে ৮১ জন বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর ৭ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন বিধানসভার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি বিধায়ক আঞ্চলিক ভাষায় শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেনসহ ৫৫ জন হিন্দিতে শপথ গ্রহণ করেন। বাকি ২২ জন ১০টি আঞ্চলিক ভাষায় শপথ নেন। এদের মধ্যে ৫ জন হো ভাষায়, ৪ জন খোরঠা ভাষায়, ৩ জন সাঁওতালি ভাষায় এবং ২ জন আংগিকা ভাষায় শপথ গ্রহণ করেন। এছাড়া আরও কয়েকজন ˆমথিলী, বাংলা, মুণ্ডারী ও কুড়ুখ ভাষায় শপথপত্র পাঠ করেন। সংস্কৃত ভাষায় ৩ জন এবং উর্দু ভাষায় ১ জন শপথ নেন। ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে ২২টি ভাষার সরকারি স্বীকৃতি রয়েছে। ভাষাগুলো হলো— অসমীয়া, বাংলা, বোড়ো, ডোগরি, গুজরাটি, হিন্দি, কন্নড়, কাশ্মীরি, কোঙ্কণি, ˆমথিলী, মালয়ালম, মণিপুরি, মারাঠি, নেপালি, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি, সংস্কৃত, সাঁওতালি, সিন্ধি, তামিল, তেলুগু ও উর্দু। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ভারতে ১৯ হাজার ৫০০-এর বেশি মাতৃভাষা বা উপভাষা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২১টি প্রধান ভাষা রয়েছে, যেগুলোতে ১০ হাজারের বেশি মানুষ কথা বলে। লোকসভায়ও সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণের নজির রয়েছে। ২০১৪ সালের ৬ জুন ময়ুরভঞ্জ থেকে নির্বাচিত রামচরণ হাঁসদা সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম থেকে উমা সরেনও সাঁওতালি ভাষাকেই বেছে নিয়েছিলেন। লাবসেন বাস্কে ২০১১ সালে মন্ত্রী হিসেবে সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ করেন। তৎকালীন সময়ে রামচরণ হাঁসদা বলেছিলেন, বোড়ো ভাষার পাশাপাশি সাঁওতালি ভাষাকেও সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আদিবাসী সাঁওতালদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। সাঁওতালি ভাষার উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে ৭ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে শিলিগুড়িতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি দ্রৌপদী মুর্মু। বিধাননগরের একটি মাঠে আন্তর্জাতিক সাঁওতালি সম্মেলনের অনুমতি না দেয়ায় তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘মমতা দিদি আমার ছোট বোনের মতো। তিনি হয়তো কোনো কারণে আমার ওপর রাগ করেছেন। এখানে এত বড় মাঠ রয়েছে, সভা করতে অসুবিধা হওয়ার কথা ছিল না। আসলে ইচ্ছা করেই আমাদের এই মাঠে সভা করতে দেয়া হয়নি।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এ ঘটনায় তৃণমূল প্রশাসনের সমালোচনা করেছিলেন। কেউ কেউ মনে করছেন, সাম্প্রতিক সেই উপেক্ষার প্রতিক্রিয়াও হয়তো প্রতিফলিত হয়েছে সদ্য গঠিত মন্ত্রিসভার সদস্য ক্ষুদিরাম টুডুর শপথ গ্রহণে। সাঁওতালি ভাষা অত্যন্ত প্রাচীন। এটি অস্ট্রোএশীয় ভাষাপরিবারের মুণ্ডা শাখার অন্তর্ভুক্ত। ভাষাবিদদের মতে, হাজার হাজার বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল থেকে অস্ট্রোএশীয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পূর্ব ও মধ্য ভারতে এসে বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকেই মুণ্ডা ভাষাগুলোর বিকাশ ঘটে। পরে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ভাষা আলাদা পরিচিতি লাভ করে এবং ক্রমে সাঁওতালি নামে পরিচিত হয়। লোকগাঁথা ও গানের ভাষায় সাঁওতালদের বর্ণমালার উল্লেখ পাওয়া গেলেও তার নির্দিষ্ট প্রমাণ দীর্ঘদিন পাওয়া যায়নি। আধুনিক যুগে ১৮৪৬ সালে রেভারেন্ড জে. ফিলিপস সাঁওতালি ভাষা নিয়মিতভাবে লিখে সংরক্ষণ, অনুবাদ ও ব্যাকরণ রচনার কাজ শুরু করেন। ১৮৫২ সালে তার বই ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্যা সাঁওতালি ল্যাঙ্গুয়েজ’ প্রকাশিত হয়। প্রথমদিকে বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করা হলেও পরে উচ্চারণের শুদ্ধতা রক্ষায় রোমান লিপির ব্যবহার বাড়ে। উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে সাঁওতালি ভাষার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি বর্ণমালা উদ্ভাবনের চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলা, দেবনাগরী, ওড়িয়া, অলচিকি ও রোমান লিপি বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ২০০৩ সালে ভারতের সংসদে পাস হওয়া ৯২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সাঁওতালি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে সাঁওতালি ভারতের স্বীকৃত সরকারি ভাষাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। তবে সরকার ভাষাটিকে স্বীকৃতি দিলেও সরকারি লিপি কোনটি হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ১৯২৫ সালে রঘুনাথ মুরমু উদ্ভাবিত অলচিকি বর্ণমালার প্রসার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হয়। আমাদের প্রত্যাশা, লেখ্য ভাষার ভিন্নতা থাকলেও কথ্য ভাষার ঐক্য অটুট থাকবে। সাঁওতালি কথ্য ভাষায় শপথ গ্রহণ সেই ঐক্যের শক্তিকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে। ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সাঁওতালি ভাষাভাষীদের মধ্যে এই ভাষা সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। আমরা সাঁওতালি ভাষার অগ্রযাত্রা কামনা করি। [লেখক: কলামিস্ট]

ফল ও সবজি রপ্তানিতে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে লাউ, কুমড়া, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, পেঁপে, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, বরবটি, শিম ও টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি রপ্তানি হয়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত শুরু হওয়ায় ওই অঞ্চলের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপের কয়েকটি দেশে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছিল। এতে সবজি রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি শুরু হয়েছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যের সবজির বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা প্রতিযোগী দেশের ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। শীত মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে দিনে ৩৫-৪০ টন সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের গন্তব্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান। এর বাইরে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি হয়। বর্তমানে ১৮০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সবজি রপ্তানি করছে। সবজির পাশাপাশি মৌসুমি ফলমূলও রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ৫ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৪ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের সবজি। বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৮ কোটি ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবে ১ কোটি ১৬ লাখ ডলার, ইউএইতে ৯৯ লাখ ডলার, কাতারে ৪১ লাখ ডলার ও কুয়েতে ৩১ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর বাইরে যুক্তরাজ্যে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, ইতালিতে ৩৬ লাখ ও কানাডায় ২৩ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে। শীত মৌসুমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কিছু শাকসবজি উৎপাদন হয়। তবে গ্রীষ্মকালে তাদের উৎপাদন থাকে না বলে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানির চাহিদা চার-পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। সবজি রপ্তানিতে বাংলাদেশের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত। আকাশপথ বন্ধ থাকলেও তাদের জন্য তেমন সমস্যা হয় না। কারণ মুম্বাই থেকে তিন দিনেই মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পৌঁছে যায়। আর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পাঠালে ২৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। বাংলাদেশ ১৯৭৩ সাল থেকে শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি শুরু করে। প্রথম বাজার ছিল যুক্তরাজ্য। তখন ১ হাজার ৭০০ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। কৃষিপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যকরণের উদ্দেশে ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। তাজা শাকসবজি, ফলমূল, পান ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের একমাত্র সংগঠন। বর্তমানে এ সংস্থার ৫শ’ সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন নিয়মিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাজা ফল ও সবজি রপ্তানি করছেন। বাংলাদেশ থেকে নানা ধরনের ফলমূল ও সবজি রপ্তানি হয়ে থাকে। এশিয়ান ফল, সবজি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ। করলা, বেগুন, লাউ, ঢ্যাঁড়শ, বরবটি, কাঁচামরিচ, কাঁচা পেঁপে, পালংশাক, পটল, কাঁচকলা, মুলা, ঝিঙা, কচু, চিচিঙ্গা, কচুর লতি, মিষ্টি আলু, চালকুমড়া, তেজপাতা, কলার ফুল ও ফুলকপিসহ আরও অনেক সবজি এবং কাঁঠাল, আনারস, লিচু, আম, কামরাঙা, ড্রাগন ফল, আমড়া, খেজুর, আমলকি, জলপাই ও বিভিন্ন জাতের লেবু রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। পানপাতা, ধনেপাতা ও অনুরূপ পণ্যও বিদেশে যাচ্ছে। যদিও ২০১২ সালের দিকে ইউরোপ ছিল সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় মধ্যপ্রাচ্যে। ইইউভিত্তিক অঞ্চলগুলো বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক অঞ্চল। অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন ও কুয়েতে সর্বাধিক পরিমাণে তাজা শাকসবজি ও ফল রপ্তানি করা হয়। তবে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ এখনও অল্প পরিমাণে তাজা সবজি ও ফল রপ্তানি করছে। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে মূলত কানাডায় বাংলাদেশের শাকসবজি রপ্তানি হয়। আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী উন্নতমানের শাকসবজি, ফলমূল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করতে এবং রপ্তানি বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, কৃষক ও উদ্যানচাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে। এতে গ্রামীণ আয় বাড়ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। সম্প্রতি পার্বত্য বান্দরবানের লামা উপজেলায় পাহাড়ি কৃষিপণ্য রপ্তানিতে উদ্যোক্তা ও চাষিদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত আম, আনারস, কমলা, কলা, কফি, কাঁঠাল, কাজুবাদাম, ড্রাগন ফল ও পেঁপেসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। তাজা ফলমূলের পাশাপাশি শুকনো ফল, ফলের চিপস ও জুস প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমেও নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে। তবে ফল ও সবজি রপ্তানিতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। ভরা মৌসুমে রপ্তানির জন্য পর্যাপ্ত কার্গো সুবিধা নেই। প্রতিযোগী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের তুলনায় বিদেশি উড়োজাহাজের ভাড়া বেশি। উৎপাদন পর্যায় থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত কার্যকর শীতল চেইন ব্যবস্থা না থাকায় পণ্যের সতেজতা কমে যায়। পচনশীল পণ্য পরিবহনের জন্য বিশেষ এয়ার কার্গো উড়োজাহাজও নেই। স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং উপকরণের শিল্প এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। বর্তমানে আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রয়োজন ৬০০-৭০০ টন পণ্য। কিন্তু দৈনিক গড় রপ্তানি হচ্ছে মাত্র ২০০-২৫০ টন। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও মূলত জাতিগত বা এথনিক বাজারকেন্দ্রিক। বিশ্বের উচ্চমূল্যের বাজারে এখনও শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফাইটোস্যানিটারি ও মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধান আরোপ করেছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রেও বড় সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় ইরাডিকেশন ব্যবস্থা না থাকায় সেখানে পূর্ণাঙ্গ রপ্তানি শুরু করা যায়নি। তবে এ বিষয়ে কাজ চলছে। বাংলাদেশের কৃষিখাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হর্টিকালচার। ফল, সবজি, ফুল, মসলা ও ওষুধি গাছের চাষ এ খাতের অন্তর্ভুক্ত। উর্বর মাটি, অনুকূল জলবায়ু ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে দেশে হর্টিকালচার ফসলের উৎপাদন বাড়ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের ফল ও সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে বছরে প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টনের বেশি ফল উৎপাদিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ১০০-১৫০ কোটি টাকার ফল ও সবজি রপ্তানি করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ফল ও সবজি রপ্তানি বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে হলে গুণগত মান উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা জরুরি। গ্লোবাল গ্যাপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানদণ্ড মেনে উৎপাদন বাড়াতে হবে। ˆজব ও নিরাপদ ফল উৎপাদনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে এ খাতকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু দেশীয় চাহিদাই পূরণ করবে না, আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। [লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

ভিডিও আরও দেখুন

পাকিস্তানকে বাংলাদেশের হোয়াইটওয়াশ

এবার পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করে ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশ।  সিলেট টেস্টের চতুর্থ দিন শেষেই বলতে গেলে জয়ের দ্বারপ্রান্তে ছিল বাংলাদেশ। অলৌকিক কিছু না ঘটলে এই টেস্টে বাংলাদেশের জয় আটকানো কঠিন ছিল পাকিস্তানের জন্য। তবে পঞ্চম দিন সকালে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন সফরকারী ব্যাটাররা।অভিজ্ঞ রিজওয়ানের সঙ্গে বেশ সাবলীল ব্যাটিং করছিলেন সাজিদ খান। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আরও একবার বাংলাদেশের ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হলেন যেন তাইজুল ইসলাম। টেলএন্ডার সাজিদকে আউট করে স্বস্তি ফেরান।এরপর সেঞ্চুরির দ্বারপ্রান্তে থাকা রিজওয়ানও আর বেশিক্ষণ টিকতে পারলেন না। মুহূর্তেই ম্যাচের চিত্র বদলে যায়। খুররাম শেহজাদকে আউট করে পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেকটাও মারেন তাইজুল।মিরপুর টেস্ট জেতার পর সিলেটও দাপুটে পারফরম্যান্স ধরে রাখল বাংলাদেশ দল। দুই ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে পাকিস্তানকে ৭৮ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়ে হোয়াইটওয়াশ করল টাইগাররা। তাতেই হয়েছে ইতিহাস। ঘরের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে এবারই প্রথমবার পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ।৪৩৭ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে চতুর্থ দিন শেষে ৭ উইকেটে ৩১৬ রান করেছিল পাকিস্তান। শেষ দিনে জয়ের জন্য বাংলাদেশের দরকার ছিল মাত্র তিন উইকেট। অন্যদিকে জয়ের জন্য পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ১২১ রান।পঞ্চম দিনের শুরুতে ব্যাট করতে নামেন আগের দিনের দুই অপরাজিত ব্যাটার মোহাম্মিদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান। দিনের শুরুতেই এই জুটি ভাঙার সুযোগ এসেছিল। নাহিদ রানার করা বলে স্লিপে ক্যাচও তুলে দিয়েছিলেন রিজওয়ান। কিন্তু হাতের ক্যাচ মিস করেন মেহেদী হাসান মিরাজ।এই সুযোগ মিস করার পর বাংলাদেশিদের ভোগাতে থাকেন রিজওয়ান ও সাজিদ খান। এই দুই ব্যাটারের কল্যাণে জয়ের স্বপ্নও দেখতে থাকে পাকিস্তানিরা। কিন্তু সেই জুটি ভাঙেন তাইজুল ইসলাম। সাজিদ খানকে আউট করার মাধ্যমে নিজের ফাইফার পূর্ণ করেন এই বাঁহাতি স্পিনার। আউট হওয়ার আগে ৩৬ বলে ২৮ রান করেন সাজিদ।এদিকে সেঞ্চুরির পথেই ছিলেন পাকিস্তানি উইরেটকিপার ব্যাটার রিজওয়ান। কিন্তু তাকে শতক পূর্ণ করতে দেননি শরিফুল ইসলাম। মিরাজের হাতে ক্যাচ তুলে দেওয়ার আগে ৯৪ রান করেন রিজওয়ান। ১৬৬ বলে খেলা তার এই ইনিংসটি ১০টি চারে সাজানো। এছাড়া শূন্য রানে আউট হন খুররাম শেহজাদ। আর শূন্য রানে অপরাজিত থাকেন মোহাম্মদ আব্বাস।বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ছয়টি নেন বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। ৩৪.২ ওভার বল করে ১২০ রানের খরচায় ছয়টি উইকেট পেয়েছেন তিনি। এছাড়া দুটি উইকেট নেন নাহিদ রানা। আর একটি করে উইকেটের দেখা পেয়েছেন শরিফুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ।সিলেট টেস্টের শুরুতে ব্যাট করতে নেমে লিটন দাসের সেঞ্চুরি নিজেদের প্রথম ইনিংসে ২৭৮ রান করেছিল বাংলাদেশ। জবাবে ২৩২ রানে থামে পাকিস্তান। ফলে ৪৬ রানে লিড পায় স্বাগতিকরা। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ ৩৯০ রান করলে টার্গেট দাঁড়ায় ৪৩৭ রানে। কিন্তু পাকিস্তান অলআউট হয়েছে ৩৫৮ রানেই।

পাকিস্তানকে বাংলাদেশের হোয়াইটওয়াশ
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৬৮ জন