সংবাদ
বায়ুদূষণে শীর্ষে দিল্লি, ঢাকার অবস্থান দেখুন

বায়ুদূষণে শীর্ষে দিল্লি, ঢাকার অবস্থান দেখুন

বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণ পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। আজ শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের (IQAir) হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, দূষণের তালিকায় ১৮১ স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ১০২ স্কোর নিয়ে ১১তম অবস্থানে রয়েছে।আইকিউএয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী, ১৮১ স্কোর ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে ঢাকার ১০২ স্কোরকে ধরা হয় ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’। অর্থাৎ শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীদের জন্য এই বাতাস ঝুঁকিপূর্ণ।তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মালয়েশিয়ার কুচিং শহর, যার স্কোর ১৬৯। তৃতীয় স্থানে রয়েছে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর (স্কোর ১৬৮)। এছাড়া শীর্ষ ১০ দূষিত শহরের তালিকায় আরও রয়েছে বাহরাইনের মানামা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, কাতারের দোহা এবং পাকিস্তানের লাহোর।সংস্থাটির মানদণ্ড অনুযায়ী, বায়ুমান স্কোর ০ থেকে ৫০ হলে বাতাস ‘ভালো’। ৫১ থেকে ১০০ হলে ‘সহনীয়’। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’। এছাড়া ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১ থেকে ৩০০ হলে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০১-এর বেশি হলে বাতাসকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বা বিপজ্জনক হিসেবে ধরা হয়।\ 
২৯ মিনিট আগে

মতামতমতামত

হিমালয়ের বরফ ভাঙার শব্দ আমাদের দুয়ারেও

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের দৃশ্যগুলো আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো সবকিছু বরফ, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। গত ২৮ আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে অন্তত ৫৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় এক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় এই সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।কিন্তু একজন কৃষিবিদ এবং পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা মানুষ হিসেবে এই ঘটনাকে আমি শুধু একটি দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখতে পারছি না। আমার কাছে এটি হিমালয় অঞ্চলসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।প্রাথমিকভাবে অঞ্চলটিতে ভূকম্পন শনাক্ত হওয়ায় অনেকে ভূমিকম্পের কথা ভেবেছিলেন। পরে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আরও উদ্বেগজনক। হিমালয়ের ৫ হাজার ১২৭ মিটার উচ্চতার একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে পড়ে এবং বিপুল পরিমাণ বরফ ও শিলা উপত্যকার দিকে ধেয়ে আসে। সেই ধস পানি, কাদা ও পাথরের সঙ্গে মিশে এক ভয়ংকর ডেব্রিস ফ্লো বা ধ্বংসস্রোত তৈরি করে। কোনো কোনো পর্যায়ে এর গতি ছিল সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার। এই গতির একটি স্রোতের সামনে মানুষের আত্মরক্ষার সময় যে কতটা কম, তা সহজেই অনুমান করা যায়। তবে এখানে একটি বৈজ্ঞানিক সতর্কতা জরুরি। একটি নির্দিষ্ট হিমবাহ ধসের একমাত্র কারণ জলবায়ু পরিবর্তন- এ কথা পর্যাপ্ত গবেষণা ছাড়া বলা উচিত নয়। ভূতাত্ত্বিক গঠন, বরফের ভেতরে পানির চাপ, পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা, তাপমাত্রার পরিবর্তন অনেক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।কিন্তু বৃহত্তর বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহের জায়গা ক্রমেই কমছে। হিমালয় বদলে যাচ্ছে। সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি)-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহে বরফ হারানোর হার ২০০০ সালের পর প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের হিমবাহ তাদের মোট আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ এবং আনুমানিক বরফভাণ্ডারের প্রায় ৯ শতাংশ হারিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে ১৯৭৫ সালের পর কোথাও কোথাও বরফের পুরুত্ব ২৭ মিটার পর্যন্ত কমে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অঞ্চলের পানি ব্যবস্থার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ডব্লিউএমও-এর তথ্যও আমাদের আশ্বস্ত করে না। সংস্থাটির এশিয়ার জলবায়ুর অবস্থা ২০২৪ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া বর্তমানে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে। মধ্য হিমালয়ে কম শীতকালীন তুষারপাত এবং তীব্র গ্রীষ্মকালীন তাপ হিমবাহ ক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করছে।এসব সংখ্যা শুধু বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনের সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী। জড়িয়ে আছে কৃষি। জড়িয়ে আছে খাদ্য এবং শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন। হিমালয়কে আমরা অনেক সময় দূরের কোনো বরফে ঢাকা পর্বতমালা হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে হিমালয় শুধু নেপাল, ভারত, ভুটান বা চীনের পাহাড় নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল নদীব্যবস্থার প্রাণ এই হিমালয়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রসহ এ অঞ্চলের অসংখ্য নদীর পানিপ্রবাহ হিমালয়ের তুষার, হিমবাহ ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। কোটি কোটি মানুষের কৃষি, পানীয় জল, খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতি এই নদীগুলোর ওপর নির্ভর করে।তাই হিমালয়ের পরিবর্তন মানে শুধু পাহাড়ের পরিবর্তন নয়। তার অভিঘাত একদিন সমতলেও এসে পৌঁছায়।আর বাংলাদেশ সেই সমতলেরই একটি দেশ।আমরা এমন একটি বদ্বীপে বাস করি, যেখানে অধিকাংশ বড় নদীর উৎস দেশের সীমানার বাইরে। উজানে অতিবৃষ্টি, হিমবাহ গলন, পাহাড়ি ঢল কিংবা নদীর প্রবাহে আকস্মিক পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের ওপর এসে পড়তে পারে। অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকিও আমাদের ঘিরে রয়েছে।অর্থাৎ একদিকে হিমালয়ের পরিবর্তন, অন্যদিকে সমুদ্রের পরিবর্তন এই দুই প্রান্তের জলবায়ু ঝুঁকির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। কৃষি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, “জলবায়ু পরিবর্তন” কথাটি অনেক সময় আমাদের কাছে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, গবেষণাপত্র কিংবা নীতিনির্ধারণী আলোচনার বিষয় বলে মনে হয়।একজন কৃষকের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন এত জটিল কোনো শব্দ নয়। তার কাছে জলবায়ু পরিবর্তন হলো বীজ বোনার সময় বৃষ্টি না হওয়া; ধান পাকার ঠিক আগে অতিবৃষ্টি; কয়েক মাসের খরায় জমি ফেটে যাওয়া; তীব্র গরমে ফুল ও ফল ঝরে পড়া; অথবা এক রাতের বন্যায় কয়েক মাসের শ্রম হারিয়ে যাওয়া।অর্থাৎ জলবায়ু সংকট শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনের সংকট। নেপালের এই বিপর্যয় আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে। শুধু দুর্যোগের পরে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দুর্যোগ আসার আগেই তার সংকেত শনাক্ত করা এবং মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া।প্রথমত, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ, পাহাড়ি ঢাল এবং নদীর প্রবাহের জন্য শক্তিশালী আঞ্চলিক ‘আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা’ গড়ে তুলতে হবে। স্যাটেলাইট, রিমোট সেন্সিং, স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র, নদী সেন্সর এবং আধুনিক পূর্বাভাস প্রযুক্তি আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। কয়েক মিনিট কিংবা কয়েক ঘণ্টার আগাম সতর্কতাও অনেক ক্ষেত্রে হাজারো মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু ও নদীসংক্রান্ত তথ্য বিনিময় আরও শক্তিশালী করতে হবে। নেপাল, ভুটান, ভারত, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বৃষ্টিপাত, নদীর পানি, হিমবাহের অবস্থা এবং হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের তথ্য প্রায় বাস্তব সময়ে বিনিময়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ নদী রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না। দুর্যোগও পাসপোর্ট নিয়ে আসে না। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের নিজস্ব হিমালয়-নদী-জলবায়ু গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে। উজানের কোন পরিবর্তন কত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে এ বিষয়ে আরও উন্নত মডেল, তথ্যভান্ডার ও গবেষণা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আবহাওয়া অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন।চতুর্থত, আমাদের কৃষিকে আরও জলবায়ু সহনশীল করতে হবে। খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও তাপসহনশীল জাতের সম্প্রসারণ, অঞ্চলভিত্তিক ফসল ক্যালেন্ডার, পানি সংরক্ষণ এবং কৃষকের কাছে দ্রুত আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।পঞ্চমত, অবকাঠামো নির্মাণে শুধু অতীতের আবহাওয়ার রেকর্ড নয়, ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকিকেও বিবেচনা করতে হবে। আজকের একটি সেতু, বাঁধ বা সড়ক হয়তো আগামী ৫০ বছর ব্যবহার করা হবে। তাই গতকালের জলবায়ু দিয়ে আগামী দিনের অবকাঠামো পরিকল্পনা করলে চলবে না।আরেকটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই যেটি হলো জলবায়ু ন্যায়বিচার। যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠী বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে। হিমালয়ের দুর্গম গ্রামের একজন মানুষ কিংবা বাংলাদেশের উপকূলের একজন কৃষক বৈশ্বিক শিল্পায়নের সুবিধা সবচেয়ে বেশি পাননি। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের মূল্য তাদেরই ঘর, ফসল, জীবিকা এবং কখনো জীবন দিয়ে দিতে হচ্ছে। আজ নেপালে যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাদের শোক কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যারা এখনো নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় আছেন, তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কতটা কঠিন, তা শুধু অনুভব করার চেষ্টা করা যায়। নিহত প্রত্যেক মানুষের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও শোক। আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা।নিহতদের শান্তি দেওয়া, নিখোঁজ মানুষগুলোকে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া আর নেপাল ও তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে এই ভয়াবহ বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য পাশে দাড়াতে হবে বিশ্বকে। আবার শোকের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষা নিতেও হবে। বিজ্ঞান আমাদের বিপদের সংকেত দেখাতে পারে।প্রযুক্তি আমাদের আগাম সতর্ক করতে পারে।গবেষণা আমাদের পথ দেখাতে পারে।প্রয়োজন সেই জ্ঞানকে মানুষের জীবন রক্ষার সিদ্ধান্তে রূপান্তর করা। হিমালয় বাংলাদেশের সীমানার বাইরে কিন্তু হিমালয়ের পানি আমাদের নদীতে আসে। সেই নদীর পানি আমাদের কৃষিজমিকে উর্বর করে, আমাদের খাদ্য উৎপাদন ও জীবনকে টিকিয়ে রাখে। তাই দূরের কোনো পাহাড়ে বরফ ভাঙার ঘটনাকে শুধু দূরের ঘটনা মনে করার সুযোগ আমাদের নেই। হিমালয়ের বরফ যখন ভাঙে, তার শব্দ শুধু পাহাড়েই থেমে থাকে না; সেই সতর্কধ্বনি নদীপথ বেয়ে একদিন আমাদের দুয়ারেও এসে পৌঁছায়।লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও শিক্ষক

সভ্যতার উন্নয়নের থাবায় বিপন্ন হিমালয়

২৬ আগস্ট, ২০২৬। হিমালয়ের নেপাল–তিব্বত সীমান্তে হঠাৎ নেমে এল বরফ, পাথর, কাদা ও পানির এক ভয়ংকর স্রোত। নদী তার স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হলো ধ্বংসের স্রোতে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে বিশাল বরফ–শিলা ধসের পর নদীর গতিপথে আকস্মিক জলপ্রবাহ তৈরির কথা বলা হচ্ছে। ঘটনাটিকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখছেন না বিজ্ঞানীরা; উষ্ণায়ন, হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন, পাহাড়ের অস্থিতিশীলতা এবং মানুষের বাড়তে থাকা অবকাঠামোগত চাপ- সব মিলিয়ে হিমালয়ের ঝুঁকির নতুন বাস্তবতার দিকে তাকাতে হচ্ছে। কিন্তু এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নটি হলো—হিমালয়ে যা ঘটছে, তা কি শুধু পাহাড়ের বিপদ? উত্তরটি হচ্ছে, না। কারণ হিমালয় কোনো বিচ্ছিন্ন পর্বতমালা নয়। এর বরফে জমে আছে এশিয়ার পানির ভবিষ্যৎ। এর ঢাল বেয়ে নেমে আসা নদীর পলিতে তৈরি হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ কৃষিভূমি। এর বৃষ্টিব্যবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। এর বন ও তৃণভূমি অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়। আর এর নদী ও ভূপ্রকৃতির ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে ভারতীয় উপমহাদেশের বহু প্রাচীন সভ্যতা।অর্থাৎ, হিমালয়ের সংকট আসলে সভ্যতার সংকট।  আজ যে হিমালয়কে আমরা পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিসেবে দেখি, তার শুরু হয়েছিল প্রায় ৪–৫ কোটি বছর আগে। তখন ভারত কোনো মহাদেশীয় উপদ্বীপ ছিল না বর্তমান অর্থে; ভারতীয় ভূখণ্ডের উত্তর দিকে ছিল টেথিস মহাসাগর। ভারতীয় প্লেট ক্রমাগত উত্তরে এগিয়ে গিয়ে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। দুই মহাদেশীয় প্লেটের ঘনত্ব কাছাকাছি হওয়ায় কোনো একটি সহজে অন্যটির নিচে ঢুকে যেতে পারেনি। ফলে ভূত্বক ভাঁজ হয়ে ওপরে উঠে তৈরি হয়েছে হিমালয় ও তিব্বতি মালভূমি।উন্নয়নের তাণ্ডব দেবতাত্মাতেও এই সংঘর্ষ আজও শেষ হয়নি। ভারতীয় প্লেট উত্তর দিকে ইউরেশিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে হিমালয় এখনো একটি সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল। এই চলমান চাপই একদিকে পাহাড়কে গড়ে তুলছে, অন্যদিকে ভূমিকম্প ও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি করছে। হিমালয় অঞ্চলের ভূমিকম্পের প্রধান কারণও ভারত ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষ। অর্থাৎ হিমালয় একই সঙ্গে সৃষ্টির এবং বিপর্যয়ের ভূগোল।কোটি কোটি বছর ধরে যে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া পাহাড় বানিয়েছে, সেই একই প্রক্রিয়া আজও তার ভেতরে শক্তি জমা করছে। তাই হিমালয়ের গল্প শুধু পাহাড়ের গল্প নয়। এটি সমতলেরও গল্প। পর্বতের শিলা ক্ষয় হয়ে নদীর সঙ্গে নেমে এসেছে মাটি, বালি ও পলি। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, যমুনা, শতদ্রু, তিস্তা কিংবা আরও অসংখ্য নদী সেই পলি বহন করে তৈরি করেছে বিশাল ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি। এই সমভূমি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও পুরু পললভূমি।এই প্রক্রিয়াটি শুধু ভূতাত্ত্বিক ছিল না—এটি ছিল সভ্যতা নির্মাণের প্রক্রিয়াও। পাহাড় থেকে নদী, নদী থেকে পলি, পলি থেকে উর্বর মাটি, মাটি থেকে কৃষি। এরপর খাদ্য উদ্বৃত্ত। তারপর বসতি, নগর, রাষ্ট্র, সভ্যতা।বয়ে যাওয়া জলপথপ্রাচীন মানুষের জন্য নদী ছিল পানির উৎস, মাছের উৎস, যোগাযোগের পথ এবং কৃষির প্রাণ। হিমালয়ের নদীগুলো যে বিপুল পলি সমতলে এনেছে, তা কৃষির জন্য তৈরি করেছে উর্বর ভূমি। সিন্ধু সভ্যতার ক্ষেত্রেও নদী ও সমভূমির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভূবৈজ্ঞানিক গবেষণা দেখিয়েছে, হিমালয়-উৎসারিত নদীর গতিপথ ও পরিবর্তন প্রাচীন বসতির বিস্তার এবং নগরায়ণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।অর্থাৎ কয়েক হাজার বছর আগে মানুষ হয়তো জানত না প্লেট টেকটনিকস কী, হিমবাহ কীভাবে তৈরি হয় কিংবা নদী কীভাবে পলি বহন করে। কিন্তু তাদের জীবন ছিল এসব প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। হিমালয়ের আরেকটি অসাধারণ ভূমিকা রয়েছে—দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি জলবায়ুতে। ভারত মহাসাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ু উত্তরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় হিমালয়ের বিশাল প্রাচীরের মুখোমুখি হয়। পর্বতের ভূপ্রকৃতি এই আর্দ্র বায়ুর গতিপথ ও বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করে।বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, হিমালয় দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ ভৌত বাধা হিসেবে কাজ করে এবং উপমহাদেশের জলবায়ু কাঠামোকে প্রভাবিত করে। তিব্বতি মালভূমির উত্থানও এশিয়ার জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। ভূতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, তিব্বতি মালভূমি ও হিমালয়ের উত্থানের সঙ্গে এশীয় মৌসুমি জলবায়ুর বিকাশের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। তাই হিমালয়কে শুধু ‘বরফের পাহাড়’ বলা ভুল। এটি এশিয়ার একটি বিশাল জলবায়ু-নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা।বরফের নিচে লুকানো এশিয়ার ভবিষ্যৎহিন্দুকুশ–হিমালয় অঞ্চলকে বলা হয় ‘থার্ড পোল’ বা তৃতীয় মেরু। মেরু অঞ্চলের বাইরে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বরফ ও তুষারভাণ্ডার এখানে। এই অঞ্চল থেকে উৎপত্তি হয়েছে এশিয়ার ১০টি বড় নদী ব্যবস্থার। এসব নদীর অববাহিকায় বসবাস করে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ। হিমালয় অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবন-জীবিকা যেমন এর ওপর নির্ভরশীল, তেমনি বহু দূরের সমভূমির কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ ও নগরজীবনও এই পানির সঙ্গে যুক্ত।এখানে একটি ভয়ংকর বৈপরীত্য আছে। যে বরফ হাজার হাজার বছর ধরে পানির সঞ্চয় হিসেবে কাজ করেছে, মানুষ এখন সেই বরফকে খুব দ্রুত হারাচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি)-এর নতুন মূল্যায়ন বলছে, হিন্দুকুশ–হিমালয়ের হিমবাহে বরফ হারানোর হার ২০০০ সালের পর দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিমবাহগুলোর মোট আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ এবং অনুমিত বরফভাণ্ডার প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। ১৯৭৫ সালের তুলনায় কিছু অঞ্চলে বরফের পুরুত্বের ক্ষতি ২৭ মিটার পর্যন্ত হয়েছে।প্রাণীদেরও আবাসআরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৩ সালের আইসিআইএমওডি মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০১১–২০২০ দশকে হিমবাহের বরফ হারানোর হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি ছিল। বর্তমান উচ্চ নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষে হিমবাহের বর্তমান আয়তনের বিপুল অংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিপদটা শুধু এখন ‘বরফ গলে বন্যা’ নয়। বরং হিমালয়ের জলবায়ু সংকটকে আমরা অনেক সময় খুব সরলভাবে দেখি—তাপমাত্রা বাড়বে, বরফ গলবে, নদীতে পানি বাড়বে। অথচ, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। হিমবাহ দ্রুত গললে প্রথম পর্যায়ে কোথাও কোথাও পানির প্রবাহ বাড়তে পারে। তৈরি হতে পারে নতুন হিমবাহ-হ্রদ। এসব হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে সৃষ্টি হতে পারে আকস্মিক বন্যা বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্ল্যাড বা জিএলওএফ।ভূমিধস নদী আটকে দিতে পারে। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে নেমে আসতে পারে আকস্মিক বন্যা। বরফ ও পাথরের ধস নদীতে পড়ে তৈরি করতে পারে ভয়াবহ ডেব্রিস ফ্লো বা ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ।অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহ ছোট হয়ে গেলে বরফ থেকে পাওয়া পানির মজুত কমে যায়। অর্থাৎ আজকের অতিরিক্ত পানি ভবিষ্যতের পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না; বরং একসময় উল্টো পানির ঘাটতি তৈরি করতে পারে। আইসিআইএমওডি-এর গবেষণাও বলছে, হিমবাহ ও তুষারের পরিবর্তনের ফলে মধ্য শতাব্দীর দিকে পানির প্রাপ্যতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে পরে কমতে পারে।নীরব প্রান্তরে নিশ্চিন্ত প্রাণীতাই হিমালয়ের সামনে একই সঙ্গে দুটি বিপদ—অতিরিক্ত পানি এবং পানির অভাব। প্রকৃতি হিমালয়কে ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। কিন্তু মানুষ বদলাচ্ছে আরও দ্রুত। পাহাড় কেটে রাস্তা হচ্ছে। নদীতে বাঁধ হচ্ছে। হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্প হচ্ছে। টানেল তৈরি হচ্ছে। পর্যটননগরী গড়ে উঠছে। হোটেল, বাজার, আবাসন বাড়ছে। খনিজ উত্তোলন হচ্ছে। বন কাটা হচ্ছে। উন্নয়ন প্রয়োজন। হিমালয়ের মানুষও বিদ্যুৎ, রাস্তা, হাসপাতাল, শিক্ষা, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থান চান। প্রশ্ন উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয়। প্রশ্ন হলো— হিমালয়ের ভূপ্রকৃতির সহনক্ষমতা না বুঝে উন্নয়ন করলে সেই উন্নয়ন কত দিন টিকবে?হিমালয় এমনিতেই ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল। তার ওপর বরফ গলছে, মাটির ভেতরের স্থায়ী বরফ বা পারমাফ্রস্ট বদলাচ্ছে, বৃষ্টির ধরন পাল্টাচ্ছে। এই অবস্থায় পাহাড় কেটে ভারী অবকাঠামো বসালে ঝুঁকি এক জায়গায় এসে জমা হয়।আইসিআইএমওডি বলছে, হিমালয়ের ক্রায়োস্ফিয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হড়পা বান বা আকস্মিক বন্যা, ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ, ভূমিধসসহ বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে বসতি, অবকাঠামো, পানি, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তায়।জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির প্রবাহ যখন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তখন এই অবকাঠামোকেও নতুন ঝুঁকির হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।যে পাহাড়কে দেবতা ভাবত মানুষএখানে আধুনিক উন্নয়নের সঙ্গে প্রাচীন সভ্যতার একটি গভীর বৈপরীত্য দেখা যায়।হিমালয় মানুষের কাছে শুধু সম্পদ ছিল না। এটি ছিল পবিত্রতা। কৈলাস হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং তিব্বতি বন ঐতিহ্যে পবিত্র। গঙ্গা শুধু নদী নয়—দেবী। অসংখ্য ঝরনা, বন, পাহাড়, পাথর, হ্রদ ও গুহা স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। হিমালয়ের বহু অঞ্চলে এমন বনভূমি রয়েছে, যেগুলো স্থানীয় দেবতা, পূর্বপুরুষ বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে শত শত বছর ধরে রক্ষা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তরাখণ্ডসহ হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘পবিত্র বনভূমি’ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে।হিমালয়কে দেবতাই মনে করতো আদি পুরুষরাঅর্থাৎ প্রাচীন সমাজ হয়তো ‘বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন’ বা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ শব্দটি জানত না। কিন্তু তাদের বিশ্বাস বলত—এই বন কাটা যাবে না। এই জলাশয় নষ্ট করা যাবে না। এই পাহাড়ে কিছু করা যাবে না। ধর্মীয় বিশ্বাস অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃতির জন্য একটি সামাজিক সুরক্ষা-কবচ তৈরি করেছিল।আধুনিক মানুষ সেই জায়গায় বসিয়েছে অন্য একটি ধারণা—সম্পদ।পাহাড় মানে জলবিদ্যুৎ।নদী মানে বিদ্যুৎ।বন মানে কাঠ।জমি মানে রিয়েল এস্টেট।পাহাড় মানে পর্যটন।খনিজ মানে অর্থনীতি। এখানেই সভ্যতার সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব।পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডারহিমালয়ের উচ্চতা কয়েক শ’ মিটারের সমভূমি থেকে আট হাজার মিটারেরও বেশি শৃঙ্গে পৌঁছেছে। এই বিপুল উচ্চতার পার্থক্য সৃষ্টি করেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র জলবায়ু অঞ্চল।ফলে একই অঞ্চলের মধ্যে পাওয়া যায় উষ্ণ অরণ্য, নাতিশীতোষ্ণ বন, শঙ্কুযুক্ত বন, তৃণভূমি, আলপাইন অঞ্চল এবং তুষারভূমি।হিন্দুকুশ–হিমালয় চারটি বৈশ্বিক ‘বায়োডাইভারসিটি হটস্পট’-এর সঙ্গে যুক্ত এবং এখানে ৩৫ হাজারের বেশি উদ্ভিদ, প্রায় ২০০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখির উপস্থিতির কথা আইসিআইএমওডি উল্লেখ করেছে।কিন্তু এই বৈচিত্র্য এখন চাপে। বন উজাড়, অতিচারণ, কৃষিজমির বিস্তার, নগরায়ণ, অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তন মিলিয়ে আবাসস্থল খণ্ডিত হচ্ছে। উচ্চ পাহাড়ের এমন অনেক প্রাণী আছে, যারা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও উচ্চতার মধ্যে বেঁচে থাকে। উষ্ণতা বাড়লে তারা সহজে আরও ওপরে সরে যেতে পারে না—কারণ ওপরে গিয়ে একসময় পাহাড় শেষ হয়ে যায়।এটি এক ধরনের ‘উচ্চতার ফাঁদ’।হিমালয়ের একটি প্রাণীর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থ তাই শুধু গরম হয়ে যাওয়া নয়; কখনো কখনো এর অর্থ হলো—তার বাসযোগ্য পৃথিবী ছোট হয়ে যাওয়া।সভ্যতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে নদীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। অথচ হিমালয়ের নদীগুলোকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছি। বাঁধ দিয়ে। ব্যারাজ দিয়ে। বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে। তীররক্ষা দিয়ে। নদীর গতিপথ বদলে। কিন্তু নদী কেবল পানির প্রবাহ নয়। নদী বহন করে পলি, শক্তি, জৈবপদার্থ, বীজ এবং জীবনের অসংখ্য উপাদান।বহমান জলধারানদীকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে তার স্বাভাবিক গতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। আর হিমালয়ের মতো তরুণ, সক্রিয় ও দ্রুত পরিবর্তনশীল পর্বতব্যবস্থায় সেই হস্তক্ষেপের ফল কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত হতে পারে। প্রাচীন সভ্যতাগুলো নদীর সঙ্গে বসবাস করতে শিখেছিল। অথচ এ যুগে এসে আধুনিক সভ্যতা নদীকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বদলাতে চায়। এই দুই দর্শনের মধ্যে পার্থক্যটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।উপমহাদেশের তিনটি ভবিষ্যৎহিমালয়ের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তিনটি বড় প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমত, পানি। সিন্ধু অববাহিকা ভারত ও পাকিস্তানের কোটি মানুষের কৃষির ভিত্তি। গঙ্গা ভারত ও বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবনধারার অংশ। ব্রহ্মপুত্র চীন, ভারত ও বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বহমান। হিমালয়ের বরফ ও তুষারের পরিবর্তন তাই সীমান্ত মানবে না।দ্বিতীয়ত, খাদ্য। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীর পানি এবং পলি দক্ষিণ এশিয়ার কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পানি প্রবাহের সময় বদলে গেলে সেচব্যবস্থা, ফসলের ক্যালেন্ডার এবং কৃষি উৎপাদনও বদলাতে পারে। আর তৃতীয়ত, ভূরাজনীতি। পানি যখন কমবে, তখন নদীর পানি শুধু পরিবেশের বিষয় থাকবে না—তা হয়ে উঠবে কূটনীতি ও নিরাপত্তার বিষয়। ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—সব দেশের ভবিষ্যৎ কোনো না কোনোভাবে এই জলভূগোলের সঙ্গে যুক্ত। তাই হিমালয়ের ভবিষ্যৎ একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রশ্নও।বাংলাদেশের জন্য বিপদটা কোথায়?বাংলাদেশ হিমালয়ের পাদদেশে নয়। কিন্তু হিমালয়ের নদীর শেষ প্রান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। এই কারণে পাহাড়ে যা ঘটে, তার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থায় পৌঁছাতে পারে। অতিরিক্ত বৃষ্টির সঙ্গে হিমবাহজাত পানির প্রবাহ মিললে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে বরফ ও তুষারের মজুত কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদি পানির প্রাপ্যতায় চাপ তৈরি হতে পারে।ধূসর পাহাড়এর সঙ্গে যুক্ত হবে— নদীভাঙন, পলি পরিবহন, কৃষি, মৎস্য, নদীর নাব্যতা, ভূগর্ভস্থ পানি, উপকূলীয় লবণাক্ততা এবং আন্তঃসীমান্ত পানি-রাজনীতি। বাংলাদেশ তাই হিমালয়ের দর্শক নয়। বরং বাংলাদেশ হিমালয়ের ডাউনস্ট্রিম স্টেকহোল্ডার বা পরবর্তী ধাপের অংশীজন। এই বাস্তবতাটি আমাদের জাতীয় জলবায়ু ও পানি নীতিতে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার সময় এসেছে। তাহলে হিমালয় কি ধ্বংস হয়ে যাবে? না। অন্তত বিজ্ঞান এমন কথা বলে না। হিমালয় থাকবে। কোটি বছর ধরে থাকা এই পর্বতমালা হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাবে না। কিন্তু আমরা যে হিমালয়কে চিনি, সেটি বদলে যেতে পারে। বরফ কমবে। হিমবাহ সরে যাবে। নতুন হ্রদ তৈরি হবে। কিছু হ্রদ ভেঙে যাবে। ভূমিধসের চরিত্র বদলাবে। নদীর প্রবাহের মৌসুমি ছন্দ পাল্টাবে। জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল সরে যাবে। কৃষির পানি-নিরাপত্তা বদলাবে। পাহাড়ি মানুষের বসতি ও জীবিকা বদলাবে।২০২৩ সালের আইসিআইএমওডি মূল্যায়ন এই পরিবর্তনকে মানবসময়ের বিচারে ‘অভূতপূর্ব এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয়’ বলে বর্ণনা করেছিল। ২০২৬ সালের নতুন তথ্য বলছে, বরফ হারানোর গতি আরও তীব্র হয়েছে। আর ২৬ আগস্টের নেপাল–তিব্বত বিপর্যয় আমাদের চোখের সামনে দেখিয়ে দিল—উচ্চ পাহাড়ে একটি পরিবর্তন কীভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে নদী, রাস্তা, বসতি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মানুষের জীবনকে একসঙ্গে বিপন্ন করতে পারে।সভ্যতার ঋণ কি শোধ করতে পারব?হাজার হাজার বছর আগে মানুষ হিমালয়ের কাছ থেকে নিয়েছিল পানি। নদী দিয়েছিল কৃষি। পলি দিয়েছিল উর্বর মাটি। বন দিয়েছিল খাদ্য ও জ্বালানি। পর্বত দিয়েছিল বৃষ্টি ও জলবায়ুর আশ্রয়। মানুষ সেই সম্পদের ওপর বসতি গড়েছে। নগর বানিয়েছে। সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। ধর্ম ও সংস্কৃতি নির্মাণ করেছে। কোটি কোটি মানুষের জীবন দাঁড়িয়ে গেছে হিমালয় থেকে নেমে আসা পানির ওপর।আজ সেই মানুষই পাহাড়ে আরও রাস্তা বানাচ্ছে, নদী আটকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, বন কাটছে, পর্যটননগরী বানাচ্ছে, কার্বন নিঃসরণ বাড়াচ্ছে। সভ্যতার সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হয়তো এটাই—যে প্রকৃতি তাকে জন্ম দিয়েছে, উন্নয়নের নামে সেই প্রকৃতিকেই সে দুর্বল করে তুলছে। হিমালয় কোনো দেবতার অভিশাপে বিপন্ন হচ্ছে না। কোনো একক দুর্যোগও এর জন্য দায়ী নয়। এখানে কাজ করছে ভূতত্ত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা, উন্নয়ন, অবকাঠামো, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং মানুষের প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা। তাই সমাধানও একক নয়।কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অপরিকল্পিত নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। হিমবাহ ও তুষারভাণ্ডার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। হিমবাহের হ্রদ ফেটে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের আগাম সতর্কতা বাড়াতে হবে। নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। ভারত, চীন, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়াতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের আগে পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু ঝুঁকিকে বাধ্যতামূলকভাবে বিবেচনায় আনতে হবে।পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে নদীসবচেয়ে বড় কথা, হিমালয়কে সম্পদ হিসেবে দেখার পাশাপাশি একটি জীবন্ত ইকোসিস্টেম হিসেবে দেখতে হবে। কারণ পাহাড়ের ওপর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তার ফল অনেক সময় পাহাড়ে থাকে না। তা নেমে আসে নদীতে। নদী থেকে সমতলে। সমতল থেকে কৃষিক্ষেতে। আর শেষ পর্যন্ত মানুষের ঘরে। গত ২৬ আগস্টের সেই ভয়ংকর ঢল তাই কেবল নেপাল–তিব্বতের একটি দুর্যোগের ছবি নয়। এটি হয়তো ভবিষ্যতের একটি সতর্ক সংকেত—হিমালয়কে আমরা যতটা বদলাব, একদিন সেই বদল ততটাই ফিরে আসবে আমাদের সভ্যতার দরজায়।হিমালয় হয়তো টিকে থাকবে। প্রশ্ন হলো—হিমালয় বদলে যাওয়ার পরও আমরা কি একই সভ্যতা হিসেবে টিকে থাকতে পারব?লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ইতিহাস আজ ধ্বংসের মুখে, চোখে পড়ছে না কারো?

‎সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি‎পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে আছে শত বছরের পুরনো অসংখ্য স্থাপনা। যা বিভিন্ন সময়ের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু এসব স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। ‎এর মধ্যে অন্যতম সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি। এই জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা প্রতাপশালী হিন্দু জমিদার রেবতী মোহন দাস। ২০ শতকের গোড়ার দিকে তিনি এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। ‎পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে এই বাড়ির মালিক হন তার ছেলে জমিদার রায় বাহাদুর সত্যেন্দ্রনাথ কুমার দাস। তিনি ওয়াল্টার রোড়ে অনেক গুলো বিজলী বাতি স্থাপনের জন্য অর্থ প্রদান করেন। এজন্য ওয়াল্টার রোড়ের একটি বিরাট অংশের নাম তার পিতা রেবতী মোহন দাস এর নামানুসারে রেবতী মোহন দাস বা সংক্ষেপে আর এম রোড় রাখা হয়। ‎কিন্তু দেশভাগের সময় জমিদার বাড়ির বংশধর গণবাড়িটি ছেড়ে চলে যায়। পরে বাড়িটি সরকারের তত্ত্বাবধায়নে চলে আসে। ‎পৃথক দু’টি ৩তলা বিশিষ্ট ভবনের সমম্বয়ে তৈরি ভবনটিতে অসাধারণ ফুলপাতার কারুকার্য রয়েছে যা ঐ সময়ের স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন বহন করে। দক্ষিণের অংশটি বেশি প্রাচীন এবং এর প্রায় ৫০ ফুট উঁচু প্রবেশ মুখ রয়েছে। আর ছাদ তিনটি করিন্থিয়ান স্তম্ভ দ্বারা স্থাপিত। পুরো দালানের ভিতরে বিভিন্ন আয়তনের প্রায় ৩৫টি কক্ষ রয়েছে। অন্য দিকে উত্তর পার্শ্বের তিনতলা ভবনটি রেবতী মোহন দাসের কোন এক আত্মীয় নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। এখানেও ৫০ ফুটের প্রবেশমুখ ও প্রায় সমান সংখ্যক কক্ষ রয়েছে। ‎কিন্তু বর্তমানে ভবনটি মলিন ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যা এখন ব্যবহৃত হয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কোয়ার্টার হিসেবে। এতে করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে এবং বসতি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় যথাযথ ভাবে সংরক্ষন সম্ভব হচ্ছে না।  ‎রূপলাল হাউজ‎রূপলাল হাউস বাংলাদেশের ঢাকার ফরাসগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত ঊনবিংশ শতাব্দীর এক বিশাল অট্টালিকা। ১৮২৫ সালে স্টিফেন আরাটুন নামের একজন আর্মেনীয় ব্যবসায়ী এটি নির্মাণ করেন। কিন্তু ১৮৪০ সালের দিকে ব্যবসায়ী রূপলাল দাশ ও তার ভাই রঘুনাথ দাশ এই বাড়িটি কিনে নেন। পরবর্তীতে, এই বাড়িটির নামকরণ হয় ‘রূপলাল হাউজ’। ছোট ব্যবসা দিয়ে শুরু করে রূপলাল হয়ে ওঠেন শহরের ধনীদের মধ্যে অন্যতম একজন। ‎রূপলাল হাউজের সৌন্দর্য ছিল নৈস্বর্গিক। বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে প্রতিষ্ঠিত এই অট্টালিকার মধ্যে প্রায় ৫০টি ঘর, জলশা ঘর ও বিভিন্ন আলোচনা কক্ষ ছিল। যা তিনটি ব্লকে বিভক্ত ছিল যথা- রূপলাল ব্লক, রঘুনাথ ব্লক ও কেন্দ্রীয় ব্লক। এর জানালা, দরজা, বারান্দা ও ভিতের কারুকার্য অত্যন্ত শৈল্পিক। এছাড়া বুড়িগঙ্গার স্নিগ্ধ বাতাস এক অন্যরকম আবহ তৈরি করতো। ‎রূপলাল হাউজ প্রথম আলোচনায় আসে ১৮৮৬ সালে যখন রূপলাল দাশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সম্মানে একটি বল ডান্স পার্টির আয়োজন করেন। এছাড়া ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগীতজ্ঞ ও শিল্পরা আসতেন যার মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের কথা ও উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটি ছিল তখনকার সময়ে ঢাকা বিলাসবহুল ২টি বাড়ির মধ্যে একটি। ‎১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পরে রূপলাল দাশের পরিবার কলকাতায় চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে একটি আনুষ্ঠানিক বিনিময় দলিলের মাধ্যমে সিদ্দিক জামাল বাড়িটি কিনে নেয়। ‎ইতিহাসের চিহ্ন বহনকারী এই অট্টালিকা এখনও দাঁড়িয়ে আছে পরম অযত্ন আর অবহেলায়। যা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে কয়েক দশকের খন্ডিত মালিকানা আর সীমিত রক্ষণাবেক্ষণের ফলে ধসে পড়া দেয়াল, ভেঙে পড়া সিলিং, দেয়ালের চিরে জন্মানো আগাছা, জমধরা লোহার নকশা আর দেয়ালের বের হওয়া যাওয়া ইটে। ‎সম্প্রতি, প্রত্মতত্ত্ব বিভাগ কিছু অংশের রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার পেলেও সম্পুর্ণ এর আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। রূপলাল হাউজের ধ্বংস শুধু একটি ভবনের ধ্বংস নয় বরং ঊনিশ শতকের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধ্বংস। [লেখক: শিক্ষার্থী, ‎ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]   

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইপিআর কতটা কার্যকর হবে

বাংলাদেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের শুরু হয়েছে। গত ১৩ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা নির্দেশিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ১৩ ধারার অধীনে জারি করা এই নির্দেশিকা প্রকাশের দিন থেকেই কার্যকর হয়েছে।ইপিআর মানে হলো, কোনো প্রতিষ্ঠান বাজারে যে পণ্য বা প্যাকেজিং ছাড়ছে, সেটি ব্যবহারের পর বর্জ্য হিসেবে কী হবে, তার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ও ব্যয়ের একটি অংশও সেই প্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে। এত দিন বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার বড় দায়িত্ব ছিল স্থানীয় সরকার ও অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহকারীদের ওপর। নতুন ব্যবস্থা উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদেরও সেই দায়িত্বের আওতায় আনছে।এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ, প্লাস্টিক ব্যবহারের সুবিধা যারা নিচ্ছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয়ের একটি অংশও তাদের বহন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে উৎপাদকদের কম প্লাস্টিক ব্যবহার, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং তৈরি এবং পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ ব্যবহারে উৎসাহিত করা সম্ভব।তবে গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে কাজ শেষ হয়নি। বরং এখনই শুরু হচ্ছে আসল পরীক্ষা। বাংলাদেশে ইপিআর দরকার কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন পরিষ্কার। পরবর্তী প্রশ্ন হলো, এটি কীভাবে কার্যকর করা হবে।ইপিআর ব্যবস্থার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে এর অর্থায়নের ওপর। প্লাস্টিক সংগ্রহ, পরিবহন, বাছাই ও পুনর্ব্যবহারে বাস্তব খরচ আছে। সেই খরচ মেটানোর মতো অর্থ যদি ব্যবস্থায় না আসে, তাহলে নিবন্ধন ও প্রতিবেদন বাড়লেও পরিবেশগত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।গেজেটের নির্দেশিকায় ইপিআর প্রকল্পের ফি নির্ধারণের একটি কাঠামো রাখা হয়েছে। তবে ফি কতটা হবে, তা নিয়ে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ন্যূনতম ফি নির্ধারণ না থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে কম খরচে আনুষ্ঠানিকভাবে দায় মেটানো সম্ভব হবে, কিন্তু বাস্তবে পর্যাপ্ত প্লাস্টিক সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহার হবে না।তাই ইপিআর ফিকে শুধু একটি নিয়ম মানার খরচ হিসেবে দেখলে চলবে না। ফি এমন হতে হবে, যাতে প্লাস্টিক সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের প্রকৃত ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়।সব প্লাস্টিকের জন্য একই হারে ফি নির্ধারণও যুক্তিসংগত নয়। যে প্লাস্টিক সহজে পুনর্ব্যবহার করা যায়, তার সঙ্গে যে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা কঠিন, তার খরচ এক হওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে পরিবেশগত ক্ষতি ও পুনর্ব্যবহারের সক্ষমতা বিবেচনায় ফি নির্ধারণ করা গেলে উৎপাদকদের প্যাকেজিংয়ের ধরন বদলানোরও প্রণোদনা তৈরি হবে।ইপিআর নির্দেশিকায় প্রথম দুই বছরের জন্য ১৫ শতাংশ প্লাস্টিক সংগ্রহ ও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃতীয় বছর থেকে এই হার বেড়ে যথাক্রমে ৩০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ হবে।শুরু হিসেবে এসব লক্ষ্য বাস্তবসম্মত হতে পারে। কিন্তু একটি সমস্যা হলো, সব ধরনের প্লাস্টিকের জন্য একই ধরনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।বাস্তবে সব প্লাস্টিক সমান নয়। পিইটি বা এইচডিপিইর মতো কিছু প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহারের বাজার ও অবকাঠামো রয়েছে। অন্যদিকে মাল্টিলেয়ার প্যাকেজিং, কিছু ফ্লেক্সিবল প্লাস্টিক ও ইপিএস পুনর্ব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে কঠিন ও ব্যয়বহুল।ফলে একই লক্ষ্য থাকলে সহজে পুনর্ব্যবহার করা যায় এমন প্লাস্টিকের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে মোট সংগ্রহের লক্ষ্য পূরণ হলেও পরিবেশের জন্য বেশি ক্ষতিকর বা কঠিনে-পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকগুলো অবহেলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।তাই পরবর্তী পর্যায়ে প্লাস্টিকের ধরনভেদে আলাদা সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ফিতেও পার্থক্য আনা যেতে পারে। যে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা কঠিন, তার ক্ষেত্রে উৎপাদককে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।বাংলাদেশের প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের বাস্তব চিত্র বুঝতে হলে অনানুষ্ঠানিক খাতকে সামনে আনতেই হবে। বর্জ্য সংগ্রহকারী, ফেরিওয়ালা, ভাঙারি দোকান, ছোট সংগ্রাহক ও পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সংগ্রহ করছে।এই ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে ইপিআরের নতুন সংগ্রহব্যবস্থা তৈরি করলে বাস্তবে একই কাজের জন্য দুটি ব্যবস্থা দাঁড়াবে। এতে খরচ বাড়বে, আবার বিদ্যমান কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।বরং তাদের ইপিআর ব্যবস্থার অংশীদার করা উচিত। পেশাগত প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং স্বচ্ছ পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করে তাদের আনুষ্ঠানিক মূল্যশৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।এতে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি হবে। প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন ও পুনর্ব্যবহার ঘিরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়তে পারে।অর্থাৎ, ইপিআর শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নয়; এটি সবুজ কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগও হতে পারে।একটি পণ্য বাজারে আসার পর তার ইপিআর দায় কার ওপর পড়বে, সেটি পরিষ্কার না হলে পুরো ব্যবস্থাই জটিল হয়ে উঠতে পারে।একটি পণ্যের সঙ্গে উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিক একাধিক পক্ষ জড়িত থাকতে পারেন। একই পণ্যের জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের ওপর একই ধরনের দায় পড়লে ব্যবসায়িক বিরোধ তৈরি হতে পারে। আবার দায় কার, তা অস্পষ্ট থাকলে কেউ দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগও পেতে পারে।তাই উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকের মধ্যে কার প্রধান দায়, তা স্পষ্ট করে দেওয়া দরকার।ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান কখন ইপিআরের আওতায় আসবে, সেটিও দ্রুত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। শুধু প্রতিষ্ঠানের আকার দিয়ে পরিবেশগত দায় নির্ধারণ সব সময় যুক্তিসংগত নয়। ছোট কোনো প্রতিষ্ঠানও বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক প্যাকেজিং বাজারে ছাড়তে পারে।তাই ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের আকারের পাশাপাশি দেশের বাজারে কত পরিমাণ প্লাস্টিক ছাড়া হচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বচ্ছতা প্রয়োজন। যে প্লাস্টিক সত্যিই রপ্তানি হয়েছে এবং দেশের বাজারে আসেনি, তার ক্ষেত্রে অব্যাহতি দেওয়ার যুক্তি রয়েছে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান রপ্তানিমুখী হলেই তার সব পণ্য ইপিআরের বাইরে থাকবে, এমন সুযোগ থাকা উচিত নয়। রপ্তানি নথির মাধ্যমে প্রকৃত পরিমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।প্লাস্টিক সংগ্রহ করলেই কাজ শেষ নয়। সেই প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে তৈরি পণ্যের বাজারও থাকতে হবে।এ ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যেসব পণ্যে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক ব্যবহার করা নিরাপদ ও প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে পুনর্ব্যবহৃত উপাদান ব্যবহারের দিকে যেতে পারে।সরকারি ক্রয়ে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের চাহিদা তৈরি হলে পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। এতে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যশৃঙ্খল গড়ে উঠতে পারে যেমন, সংগ্রহ থেকে বাছাই, পুনর্ব্যবহার, নতুন পণ্য উৎপাদন এবং শেষ পর্যন্ত বাজারজাতকরণ পর্যন্ত।এই সংযোগ তৈরি না হলে ইপিআর মূলত বর্জ্য সংগ্রহের একটি ব্যবস্থা হয়ে থাকবে। আর এই সংযোগ তৈরি করতে পারলে এটি বাংলাদেশের সার্কুলার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।ইপিআর কার্যকর করতে হলে প্রথমেই জানতে হবে, দেশে কত প্লাস্টিক বাজারে আসছে এবং তার কতটুকু বর্জ্য হিসেবে তৈরি হচ্ছে।কোন প্রতিষ্ঠান কত প্লাস্টিক বাজারে ছাড়ছে, কতটুকু সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কতটুকু সত্যিই পুনর্ব্যবহার হচ্ছে, এসব তথ্যের নির্ভরযোগ্য হিসাব দরকার। শুধু কোনো প্লাস্টিক সংগ্রহ করা হয়েছে বললেই সেটি পুনর্ব্যবহার হয়েছে বলে ধরে নেয়া যাবে না।তাই একটি ডিজিটাল নিবন্ধন ও তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তথ্য যাচাই ও অডিটের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি হলে ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের ধরনভেদে লক্ষ্য নির্ধারণ, ফি ঠিক করা এবং কোথায় বিনিয়োগ দরকার, সে সিদ্ধান্ত নেয়াও সহজ হবে।ইপিআরের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো এটি শুধু প্লাস্টিক বর্জ্য কমানোর নীতি নয়; এটি উৎপাদন ও ব্যবসার ধরনেও পরিবর্তন আনতে পারে।সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদকরা অপ্রয়োজনীয় প্যাকেজিং কমাতে, সহজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার করতে এবং পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামালের ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই, পুনর্ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহৃত পণ্য উৎপাদনে নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে।এ কারণে ইপিআরকে বাংলাদেশের শিল্পনীতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং সার্কুলার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা দরকার।বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু বেশি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি অর্থনীতি তৈরি করা, যেখানে ব্যবহারের পর ফেলে দেয়া প্লাস্টিক আবার উৎপাদন ব্যবস্থায় ফিরে আসে।ইপিআর নির্দেশিকা গেজেট হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন প্রয়োজন বাস্তবায়নের প্রস্তুতি।পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত দ্রুত ইপিআর ফি নির্ধারণের স্বচ্ছ কাঠামো, উৎপাদক-আমদানিকারক-ব্র্যান্ড মালিকের দায়, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তির মানদণ্ড এবং রপ্তানি অব্যাহতির যাচাই পদ্ধতি স্পষ্ট করা।একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের ধরনভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, অনানুষ্ঠানিক খাতকে ইপিআরের সঙ্গে যুক্ত করা, তথ্য যাচাইয়ের ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সরকারি ক্রয়ের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহৃত পণ্যের বাজার তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইপিআরের প্রথম কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। কোথায় লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে, কোথায় ঘাটতি থাকছে এবং কোন প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে, সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী নীতি পরিবর্তন করা উচিত।বাংলাদেশে এখন ইপিআর দরকার কি না, সেই বিতর্কের সময় শেষ। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কেমন ইপিআর ব্যবস্থা তৈরি করতে চাই।শুধু নিবন্ধন, ফি ও প্রতিবেদননির্ভর ব্যবস্থা তৈরি করলে ইপিআর আরেকটি নিয়মকানুনের কাঠামোতে পরিণত হতে পারে। কিন্তু উৎপাদকের দায়বদ্ধতার সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রণোদনা, অনানুষ্ঠানিক খাত, নির্ভরযোগ্য তথ্য, পুনর্ব্যবহারের বাজার এবং সরকারি ক্রয়কে যুক্ত করতে পারলে ইপিআর বাংলাদেশের প্লাস্টিক অর্থনীতিকে আরও পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।গেজেট আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন সেই ভিত্তির ওপর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বাংলাদেশের পরবর্তী বড় কাজ। [লেখক: সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)]

রম্যগদ্য: ‘মিউচিয়াল ছিনতাই ও রিপ্রিন্ট’

হেঁ হেঁ হেঁ, ছিনতাই নি মিউচিয়ালি, মাইনে বলি কোই কেউ কাউরে নি ছিনতাই করের! আন্নে মিয়া বাহাত্তোইরা বুইড়া যা মনে আসে তাই কন! হেঁ হেঁ হেঁ, মিউচিয়ালি ছিনতাই!ওই ব্যাটা বুড়বক, পানিওয়ালির পোলা, পৃথিবীতে মিউচিয়ালি ছিনতাই যে কত প্রকার ও কি কি তা তুই জানিস?এইডা কী কন, মিউচিয়ালি ছিনতাই! মিলিমিশি বোই বোই ছিনতাই! ধ্যাৎ তা হয় নাকি?হয় নাকি? মানে কিরে আজকাল তো ঘরে ঘরে মিলেমিশে ছিনতাই চলছে, চলবে।হ হ বুঝছি, বুজঝি, এই যেমুন মনে করেন কনট্রাকটার আর ইক্সিএন টিটিএনওও হ্যাতারা ব্যাবাগতে মিলিমিশি প্রজেক্টের ট্যাকা ছিনতাই করের! হ এইটারে আপনে মিউচিয়ালি ছিনতাই কোইলেও কোইতে পারেন। যেমন বালিশ পাঁচ হাজার টাক! ছাগল বার লক্ষ টাকা... “এইটারে আপনে মিউচিয়ালি ছিনতাই কোইলেও কোইতে পারেন?তুই দেখিস না বীমা কোম্পানিগুলোতে বড় বড় ব্যবসায়ীরা মিউচুয়ালি দুই নাম্বার পণ্য বোঝাই জাহাজ ডুবিয়ে কোটি কোটি টাকার বিমার প্রিয়াম ভাগবাঁটোয়ারা করে!হ হ হুনছি হুনছি বিমা কোম্পানিগুলা বিমার প্রিয়ামের ট্যাকা ভাগ-বাঁটোয়ারার লাই হ্যাতারা বেওয়ারিশ লাশ মেডিকেলের ডোম থ্যেইক্কা কিন্না কোটি কোটি ট্যাকার মাল কামায়!আরে ব্যাটা এগুলোতো সরাসরি ডাকাতি, আমি বলছিলাম মিউচিয়ালি ছিনতাই’এর কথা। মানে ছোট খাটো চামে চামে যারা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে।চামে চামে অনৈতিক কাজ, হেইডা আবার কিরে বাপ।এই যেমন মনে কর তুই স্কুলে বাচ্চা আনতে গেলি, বাচ্চার স্কুল ছুটি হতে এ্যাখনো তিন ঘণ্টা বাকি, তখন মাটি বা খালাটি কি করবেন, তখন স্কুলের কাছের স্বামী বা দুলাভায়ের বাসায় যেয়ে টিভি ইন্টারনেট এইসব দেখে সময়টা পার করে বাচ্চা বা বইনপুতকে নিয়ে বাড়ি ফিরলো।তো ইয়ার মইধ্যে আপনে ছিনতাই দেখলেন কুতায়?যেই লোক জেগে ঘুমায় তাকেতো আর জাগানো যায় না, যেমন মনে কর এইযে প্রতিদিন তোদের সমাজে চাঁদাবাজী চলছে, কোই তোর লক্ষ লক্ষ হকার ভাই কি এর প্রতিবাদ করে! এইযে প্রতিদিনের লাইনের চাঁদাবাজী চলছে এটা ছিনতাইয়ের চেয়ে কম কি, বল? যে চাঁদা দিচ্ছে আর যে চাঁদা নিচ্ছে দু’জনেই তো মিউচুয়ালি মানে আপোসে ছিনতাই চালাচ্ছে!তো আপনের পোরশাষণ কি করবো কন? হ্যেরা হোইলো জনগনের, মানে দেশের মালিকের কর্মকর্তা, মালিক যদি নিজেই মিউচিয়ালি ছিনতাই মাইন্না নেয় তয় আমার আপনের কি করনের আছে কন?কিন্তু তোর কি মনে হয় কোনো মালিক চাইবে তার কর্মচারী তার কাছ থেকে বেতনও নিবে আবার মালিকের কাছ থেকে চান্দাও নিবে, এটা হয় কখনোও!না না নান না, পীরথীবির কুনো দ্যেশে কর্মচারী বেতনও নিবে আবার মালিকের কাছ থেকে চান্দাও নিবে,এইডা হয় না!তাহলে সব সম্ভবের দেশ তোর বাংলাদেশে সবই সম্ভব। এই যে রংপুরের একই পরিবারের চার জনকে হত্যা ইয়াবা সেবন দেখে ফ্যেলায় মার্ডার, মার্ডার করছে কে দু’জন কিশোর বা পনের ষোল বছরের ছেলে। এটা কি সম্ভব!! বাড়ীর কর্তা ও গৃহ বধুকে হত্যা করতে গেলে উনারা তো ওই দু’জন কিশোর বা পনের ষোল বছরের ছেলে কি পারবে ওদের সঙ্গে? ধস্তাধস্তি হবে না? দু’জন কিশোর বা পনের ষোল বছরের ছেলের গায়ে কি আঁচড় বা খামচির দাগ থাকবে না? তোর প্রশাষণ বলছে নিহতের চোয়াল ভাঙা আর পোস্টমর্টেম বলছে, চোয়াল-টোয়াল ভাঙেনি, সব ঠিক আছে। আরো মজার ব্যাপার হলো ওই বাড়ীর বিদ্যুতের লাইন রাস্তার মুল খুঁটি থেকে বিছিন্ন করা হয়েছে, যেটা তোর এই দু’জন কিশোর বা পনের ষোল বছরের ছেলের পক্ষে সম্ভব নয়। তাহলে এবার তুই বল এইসব কাজ মিউচুয়ালি মানে সবাই মিলেমিশে না করলে কি সম্ভব?হেঁ হেঁ কি যে কন, মিউচুয়ালি মার্ডার, মানে যারে মার্ডার করবেন হ্যের লগে আলাপ আলোচানার মাধ্যমে মার্ডার! হি হি পিরথীবির কুনো রম্য লেখকও এইরাম ঘটনা চিন্তা করা পারবো না!কিন্তু বাস্তবেতো ঘটছে ভাই!স্যার একটা কথা কনতো, এইযে লিখছেন মিউচুয়ালি ছিনতাই ও রিপ্রিন্ট, মিউচুয়ালি ছিনতাই তো বুঝলাম কিন্তু এই রিপ্রিন্ট এইডা কী?আরে এতো একদম সিম্পেল, রিপ্রিন্টের, আদীবার মা, আকবর স্যারের লেখা উপন্যাসের মতো শাহ্জাদীর কালো নেকাব তুলে বললেন,“ হেঁ হেঁ পাবেন তো মাত্র নয়’শ টাকা, আর এর জন্য কাগজপত্র যোগাড় করতে উকিলের, ফোন বিল, যাতায়াত সবমিলে খরচ হবে মিনিমাম পাঁচ হাজার টাকা। তাহলে ন’শ টাকার জন্য আপনি কি পাঁচ হাজার টাকা খরচ করবেন? এই কথা শুনে রাসেইল্লা আর চামচ নুরু কয় কী, হি হি বারো হাত কাঁকুড়ের তের হাত বিচি। হি হি হি। ভাই রে ভাই, এ্যাতো প্যাচাইল্লা কারবারে আমারে জড়াইয়েন না স্যার, মিউচিয়াল ছিনতাই, চার মার্ডার, রিপ্রিন্ট, ভাই আপনেগোরে সব বাই বাই, আমি অখন যাই দেশের মালিকের কাছে যাই, দেখি হ্যেরা কি নয়’শ টাকার জইন্য পাঁচ হাজার টাকা খরচ করবো, নাকি চার মার্ডারের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করবো! পারলে প্রতিদিনের লাইনের চন্দাবাজী বন্ধ করবো, হ্যেরা যেইডা করবো হেইডাই আইন...তাহলে যা তুই তোর দেশের মালিকের কাছে, দ্যাখ জনগণ মানে দেশের মালিক কি চায়... [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

শব্দের রাজনীতি, রাজনীতির শব্দ

গণতন্ত্র বলতে আমরা সাধারণত নির্বাচন, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা কিংবা ভোটাধিকারের কথা বুঝি। এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয় অহরহ। কিন্তু গণতন্ত্রের এমন একটি উপাদান আছে, যা নিয়ে কথা কম হয়, অথচ এটিই গণতন্ত্রকে অন্য সব শাসনব্যবস্থা থেকে আলাদা করে দেয়—সেটি হলো গঠনমূলক সমালোচনা। ব্যক্তি আক্রমণ, অশ্রাব্য গালাগালি বা কটূক্তি গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য নয়; বরং এগুলো স্বৈরাচারী মানসিকতার প্রাথমিক লক্ষণ। যে রাজনীতি যুক্তি দিয়ে না জিতে গলাবাজি দিয়ে জিততে চায়, সে রাজনীতি গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলে।শব্দের শক্তি নিয়ে আমরা প্রায়ই উদাসীন থাকি। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, একটি শব্দ যেমন সংলাপের দরজা খুলে দিতে পারে, তেমনি একটি ভুল শব্দ গোটা জাতিকে যুদ্ধ ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মিত্রশক্তি জাপানের কাছে আত্মসমর্পণের শর্ত দিয়ে পটসডাম ঘোষণা জারি করেছিল। জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কানতারো সুজুকি এর জবাবে “মোকুসাতসু” শব্দটি ব্যবহার করেন। এই একটি শব্দের অস্পষ্ট অনুবাদ—নীরব থাকা বোঝানো হলেও তা “উপেক্ষা করা” অর্থে প্রচারিত হয়- বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয় বলে অনেকে মনে করেন। এর পরিণতিতে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নেমে আসে মানব ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ধ্বংসযজ্ঞ। একটি শব্দের অসতর্ক ব্যবহার কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এর চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।আমাদের নিজের ইতিহাসেও এমন উদাহরণ আছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার একটি মন্তব্য আন্দোলনকে নতুন গতি দিয়েছিল, যার পরিণতিতে তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। প্রতিবেশী ভারতেও সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, বেকার যুবসমাজ নিয়ে দেশটির প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের জের ধরে পদত্যাগ করতে হয়েছে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, রাজনীতিতে শব্দচয়ন কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়—এটি জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি আক্রমণ আর গালিগালাজ যেন একরকম স্বাভাবিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। প্রজন্মের ভেদাভেদ নেই বললেই চলে—পুরনো ধারার নেতা থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরাও কমবেশি এই সংস্কৃতির শরিক। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, রাজনীতিতে মিথ্যা প্রচার আর ব্যক্তি আক্রমণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বরং নতুন মোড়কে তা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেও অশোভন স্লোগান আর কটূ ভাষার ব্যবহার এখন যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই প্রবণতা শুধু ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ নেই, জাতীয় রাজনীতির মঞ্চেও তার প্রতিফলন স্পষ্ট। এমনকি যারা নিজেদের জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন, রাজনীতিতে নতুনত্ব ও শালীনতার প্রতিশ্রুতি দেন, তাদের অনেকের আচরণেও পুরনো সেই অসহিষ্ণুতারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এনসিপির জুলাই পদযাত্রার সময় দলটির এক নেতা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে প্রতিপক্ষ দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ও রূঢ় ভাষা ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে, যার জেরে একাধিক স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এমনই এক সংঘর্ষে দলটির এক কর্মী চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারান। রাজনৈতিক বিতর্কে জেতার আগ্রহে উচ্চারিত কয়েকটি শব্দের মূল্য একজন তরুণকে সারাজীবনের জন্য চোখের আলো থেকে বঞ্চিত করেছে—এই মূল্য কি আদৌ পরিশোধযোগ্য? শুধু এই একটি ঘটনা নয়, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের নেতাদের মধ্যেও একে অপরের বিরুদ্ধে লাগামহীন ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। এটি কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির লক্ষণ হতে পারে না। গণতান্ত্রিক রাজনীতি মানে ধৈর্য, সহনশীলতা এবং যুক্তিনির্ভর গঠনমূলক সমালোচনা—প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রতিযোগিতা নয়।এখানেই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও সতর্ক হতে হবে। প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের আগে ভাবতে হবে, এই একটি বাক্য কতজনের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিহাস বারবার শিখিয়েছে, নেতার মুখের একটি অসতর্ক বাক্য শুধু ব্যক্তি সম্মানহানির প্রশ্ন নয়, তা রূপ নিতে পারে সহিংসতায়, এমনকি প্রাণহানিতেও। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে একটি বক্তব্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে লাখো মানুষের কাছে, তাই দায়িত্বও বেড়েছে বহুগুণ।সমালোচনা গণতন্ত্রের প্রাণ, কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে যুক্তিনির্ভর, শালীন ও গঠনমূলক। প্রতিপক্ষকে ভুল প্রমাণ করার অধিকার সবার আছে, কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের নামে ব্যক্তিগত অবমাননা বা মিথ্যাচার গণতন্ত্রকেই দুর্বল করে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিকার অর্থে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করতে চায়, তাহলে সবার আগে দরকার শব্দচর্চায় শালীনতা ফিরিয়ে আনা। নইলে ইতিহাস আবারও প্রমাণ করবে—একটি ভুল শব্দই যথেষ্ট, একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ করে দেওয়ার জন্য।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়]

স্বপ্নের অনুবর্তী কালচক্র: পিঙ্ক বাস ও নাগরিক মর্যাদার নব্য অভিসন্ধি

কিছু স্বপ্ন ব্যক্তিমানসের একান্ত গোপন সম্পদ নয়; তারা সময়ের অন্তঃসলিলায় জন্ম নেয়, সমাজের নীরব আকাক্সক্ষায় পুষ্ট হয় এবং ইতিহাসের অনুকূল ক্ষণ প্রতীক্ষা করে। এমনই এক স্বপ্ন আমি বহু আগে দেখেছিলাম—একটি নগর, যেখানে একজন নারী পথের দিকে তাকিয়ে আশঙ্কার সম্ভাব্য অভিঘাত গণনা করবেন না; বরং তার দৃষ্টি থাকবে গন্তব্যের দিকে, তার চেতনা থাকবে সম্ভাবনার দিকে, আর তার পদক্ষেপ হবে নাগরিক আত্মমর্যাদার স্বাভাবিক অভিব্যক্তি।তখন সে স্বপ্ন ছিল কেবল অন্তর্মুখী কল্পলোকের একটি নৈঃশব্দ্যপূর্ণ নির্মাণ। আজ ‘পিংক বাস’-এর রাজপথে চলমান রথচক্র দেখে মনে হয়, সময় কখনো কখনো মানুষের সুদূরতম প্রত্যাশাকেও বাস্তবতার ভাষায় অনুবাদ করে। যে স্বপ্ন একদিন ব্যক্তিগত অনুভবের অন্তরালে নিভৃতে জ্বলে ছিল, আজ তা সামাজিক অঙ্গীকারের দৃশ্যমান প্রতিমূর্তি হয়ে নগরের পথ অতিক্রম করছে।এই কারণেই পিংক বাস আমার কাছে নিছক একটি গণপরিবহন নয়। এটি এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সামাজিক দর্শনের বহমান প্রতীক; এটি রাষ্ট্রের মানবিক সংবেদনশীলতার একটি ইতিবাচক স্বাক্ষর; এটি এমন এক ভবিষ্যৎ-চিন্তার সূচনা, যেখানে উন্নয়ন কেবল কংক্রিটের উচ্চতায় নয়, নাগরিকের নিরাপত্তাবোধের গভীরতায় পরিমাপিত হয়।সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড কখনো তার অট্টালিকার উচ্চতায় নির্ধারিত হয় না। একটি সমাজ কত দ্রুতগামী, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—সে কতটা মর্যাদার সঙ্গে তার নাগরিকদের চলার অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। বিশেষত নারী যদি জনপরিসরে অবাধ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নিরাপদে বিচরণ করতে পারেন, তবে সেই সমাজের নৈতিক স্থাপত্য যে ক্রমশ পরিণত হচ্ছে, তাতে সন্দেহের অবকাশ থাকে না।আমার বহুদিনের সেই স্বপ্নের কেন্দ্রেও ছিল এই সহজ অথচ গভীর সত্য নিরাপত্তা কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিক অস্তিত্বের মৌলিক পূর্বশর্ত।একজন নারী যখন কর্মস্থলে যান, তিনি কেবল চাকরিতে যোগ দিতে যান না; তিনি নিজের অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের দিকে অগ্রসর হন। একজন শিক্ষার্থী যখন নিরাপদে শিক্ষাঙ্গনে পৌঁছান, তিনি কেবল শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করেন না; তিনি ভবিষ্যতের জ্ঞানভূমিতে পদার্পণ করেন। একজন মা যখন নিশ্চিন্তে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করেন, তখন তার সঙ্গে যাত্রা করে একটি পরিবারের স্থিতি ও আস্থা।অতএব, নিরাপদ চলাচল কেবল ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়; এটি সম্ভাবনার সামাজিক গতিশীলতা।পিংক বাসের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই এটি নারীর চলাচলকে কেবল সহজতর করে না; বরং তার উপস্থিতিকে জনপরিসরের স্বাভাবিক সত্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যেন নগর নিজেই ঘোষণা করছে এই পথ তোমারও, এই শহর তোমারও, এই ভবিষ্যৎ নির্মাণে তোমার অংশীদারিত্বও সমানভাবে অনিবার্য। এই উচ্চারণের সামাজিক মূল্য অপরিসীম।কারণ বহুদিন ধরে নারীর পথচলা ছিল অদৃশ্য সতর্কতার সঙ্গে আপসের ইতিহাস। সময়, দূরত্ব, ভিড় কিংবা পরিবেশ সবকিছুর সঙ্গে তাকে এক ধরনের নীরব সমঝোতায় যেতে হতো। আজকের এই উদ্যোগ সেই দীর্ঘ সামাজিক অভিজ্ঞতার বিপরীতে একটি ইতিবাচক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত বহন করে। এটি যেন বলে নারীর চলার পথকে সংকুচিত করা নয়, বরং পথকেই আরও মানবিক করে তোলাই সভ্যতার দায়িত্ব। আমার একসময় দেখা স্বপ্নটিও ছিল এমনই।আমি কল্পনা করতাম, এমন এক সময় আসবে যখন নারীর নিরাপদ যাতায়াত নিয়ে আলোচনা কোনো বিলাসী প্রত্যাশা হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং এটি হবে উন্নত রাষ্ট্রচিন্তার স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। আজ পিংক বাসের বাস্তব উপস্থিতি দেখে মনে হয়, সেই কল্পনার অন্তত একটি অংশ সময়ের কাছে তার স্বীকৃতি পেয়েছে।স্বপ্নেরও নিজস্ব কালচক্র আছে। কিছু স্বপ্ন তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তব হয় না। তারা মানুষের চেতনায় বীজের মতো সুপ্ত থাকে। নীতি, সদিচ্ছা, সামাজিক সচেতনতা ও সময়ের সম্মিলিত অনুকম্পায় একদিন সেই বীজ অঙ্কুরিত হয়। পিংক বাসকে আমি সেই অঙ্কুরোদ্গমের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে দেখি। এটি প্রমাণ করে, মানবিক প্রয়োজন যখন সামাজিক অগ্রাধিকারে পরিণত হয়, তখন কল্পনাও নীতিতে রূপ নেয়, আর নীতি একসময় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।তবে এই অর্জনের সর্বোচ্চ সৌন্দর্য এর সূচনাতেই।কারণ মহৎ উদ্যোগের প্রকৃত শক্তি তার বর্তমান সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সে ভবিষ্যতের আরও বৃহত্তর রূপান্তরের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। আজ পিংক বাস নারীর নিরাপদ যাত্রার একটি আশাব্যঞ্জক পরিসর নির্মাণ করেছে। আগামী দিনে এই অভিজ্ঞতা সমগ্র গণপরিবহনব্যবস্থাকে আরও শৃঙ্খলিত, প্রযুক্তিনির্ভর, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক করে তুলতে অনুপ্রাণিত করবে টাই প্রত্যাশিত।একদিন হয়তো এমন সময় আসবে, যখন আলাদা কোনো রঙের বাসের প্রয়োজন হবে না; কারণ প্রতিটি বাসই হবে নিরাপদ, প্রতিটি স্টপেজ হবে মর্যাদাপূর্ণ, প্রতিটি রাস্তা হবে সমঅধিকারের, এবং প্রতিটি জনপরিসর হবে নারীর অবাধ নাগরিক উপস্থিতির স্বাভাবিক ভূখণ্ড। কিন্তু সেই সুদূর মানবিক ভবিষ্যতের দিকে যাত্রাপথে আজকের পিংক বাস নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।আমি যখন এর দিকে তাকাই, তখন কেবল একটি বাস দেখি না। দেখি সময়ের সঙ্গে স্বপ্নের সংলাপ। দেখি ব্যক্তিগত প্রত্যাশার সামাজিক রূপান্তর। দেখি রাষ্ট্রের ইতিবাচক দায়বোধের এক চলমান প্রতীক। এবং গভীরভাবে অনুভব করি—মানুষের দেখা কিছু স্বপ্ন কখনো বিলীন হয় না; তারা ইতিহাসের উপযুক্ত প্রহরের অপেক্ষায় থাকে।আজ সেই অপেক্ষার একটি অধ্যায় পূর্ণতা পেয়েছে।হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই উদ্যোগকে শুধু একটি পরিবহনসেবা হিসেবে স্মরণ করবে না। তারা এটিকে দেখবে এমন এক সময়ের স্মারক হিসেবে, যখন সমাজ নারীর নিরাপদ চলাচলকে উন্নয়নের প্রান্তিক বিষয় নয়, বরং সভ্যতার নৈতিক অনিবার্যতা হিসেবে স্বীকার করতে শুরু করেছিল।কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত যানবাহনের সংখ্যা মনে রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে মানুষের জীবনকে কোন সিদ্ধান্ত কতটা মর্যাদাপূর্ণ করে তুলেছিল।পিংক বাস তাই আমার কাছে একসময় দেখা একটি স্বপ্নের অনুবর্তী কালচক্র- যেখানে কল্পনা বাস্তবতার সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রমাণ করেছে, সুদূরপ্রসারী মানবিক স্বপ্ন কখনো নৈঃসঙ্গ্যের অন্ধকারে হারিয়ে যায় না; তারা একদিন সময়ের মহাসড়কে নিজেদের রথচক্র ঘুরিয়েই ইতিহাসে প্রবেশ করে।[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

ছোট শহরগুলোও কি পরিকল্পিত নগরায়ণের অধিকার রাখে না?

বাংলাদেশে নগরায়ণ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। বড় শহরগুলোর পাশাপাশি দেশের ছোট শহর ও পৌর এলাকাগুলোও ক্রমেই জনবসতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই পরিবর্তন কতটা পরিকল্পিত?একটি শহর গড়ে ওঠার পর সেখানে সমস্যা সৃষ্টি হলে সমাধানের চেষ্টা করার চেয়ে শুরুতেই সঠিক পরিকল্পনা করা অনেক বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী। অথচ আমাদের অনেক ছোট পৌরসভায় এখনো ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, ভূমির ব্যবহার, পরিবেশ, জলাবদ্ধতা, যানবাহন, বাণিজ্যিক এলাকা, উন্মুক্ত স্থান ও নাগরিক নিরাপত্তাকে সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয় না।পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ পৌরসভা এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে।করতোয়া নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত দেবীগঞ্জ পৌরসভা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নির্মল পরিবেশের জন্য বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, গাছপালায় ঘেরা সবুজ এলাকা, করতোয়া নদী, ময়নামতির চর এবং তুলনামূলক কম যানজটÑসব মিলিয়ে এখানে একটি স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য পৌর পরিবেশ গড়ে তোলার অনন্য সুযোগ রয়েছে।দেবীগঞ্জ পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত কর্মকাণ্ড যেমন বেড়েছে, তেমনি মানুষের বসতি ও অভ্যন্তরীণ সড়ক ব্যবস্থাও সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণের সঙ্গে যদি ভূমি ব্যবহার ও পানি নিষ্কাশনের সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা, যানজট, অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং পরিবেশগত নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে বর্ষাকালে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দেয়ার বিষয়টি ভাবনার কারণ। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তা নির্মিত হলেও রাস্তার দুই পাশে পর্যাপ্ত ও পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। ফলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতে না পেরে নাগরিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। প্রশ্ন হলোÑসমস্যা আরও প্রকট হওয়ার পর আমরা সমাধানের উদ্যোগ নেব, নাকি এখনই ভবিষ্যৎ বিবেচনায় পরিকল্পনা করবো?আমার বিশ্বাস, এখনই সময় একটি সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের। শুধু দেবীগঞ্জের জন্য নয়, দেশের প্রতিটি ছোট ও মাঝারি পৌরসভার ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা অপরিহার্য।কী হতে পারে সেই পরিকল্পনা?প্রথমত, পৌর এলাকার ভূমি ব্যবহার নির্ধারণ করতে হবে। কোথায় আবাসিক এলাকা, কোথায় বাণিজ্যিক এলাকা, কোথায় সরকারি প্রতিষ্ঠান, কোথায় উন্মুক্ত স্থান, কোথায় সবুজ এলাকা- এসব সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। দেবীগঞ্জের ক্ষেত্রে বাজার ও নির্ধারিত কয়েকটি এলাকাকে বাণিজ্যিক অঞ্চল হিসেবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যেতে পারে। আবাসিক এলাকার ভেতরে যত্রতত্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে একদিকে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ে, অন্যদিকে যানজট ও নাগরিক দুর্ভোগও সৃষ্টি হয়।দ্বিতীয়ত, পৌরসভার বর্তমান খোলা মাঠগুলো সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি শহরের সৌন্দর্য শুধু দালানকোঠায় নয়; তার উন্মুক্ত স্থান, গাছপালা ও সবুজ পরিবেশেও নিহিত। আজ যে মাঠটি অব্যবহৃত মনে হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই হতে পারে শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ, নাগরিকদের হাঁটার স্থান কিংবা একটি উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্র।তৃতীয়ত, ময়নামতির চরসহ প্রাকৃতিক সবুজ অঞ্চল এবং করতোয়া নদীর তীরকে ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। নদীকে দখল বা দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে এর তীরে পরিকল্পিত হাঁটার পথ, বৃক্ষশোভিত উন্মুক্ত স্থান ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এতে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটনেরও সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।চতুর্থত, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু বিচ্ছিন্নভাবে ড্রেন নির্মাণ করলেই হবে না। পুরো পৌর এলাকার জন্য একটি সমন্বিত পানি নিষ্কাশন ও বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোথা থেকে পানি আসবে, কোন পথে যাবে, কোথায় জমা হবে এবং কীভাবে দ্রুত নিষ্কাশিত হবেÑএসব বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।পঞ্চমত, ছোট শহরকে বড় শহরের অনুকরণে গড়ে তোলার পরিবর্তে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করা উচিত। দেবীগঞ্জে ভারী শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে উৎসাহিত করা যেতে পারে।ষষ্ঠত, ভবিষ্যতের যানজট বিবেচনায় নিয়ে এখন থেকেই রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশার চলাচল ও পার্কিংয়ের জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা করতে হবে। শহর বড় হয়ে যাওয়ার পর যানজট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন; কিন্তু ছোট অবস্থায় সঠিক পরিকল্পনা করলে তা অনেক সহজ।সপ্তমত, বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। ভবনের উচ্চতা, রাস্তার প্রশস্ততা, অগ্নিনিরাপত্তা, পার্কিং, আলো-বাতাস এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয়া হলে ভবিষ্যতে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। নাগরিক নিরাপত্তাও আধুনিক পৌর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও জনসমাগমস্থলে পর্যাপ্ত সড়কবাতি এবং সিসিটিভি স্থাপন করা হলে নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি রাতের শহরও আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে।উন্নয়ন বনাম পরিবেশÑএই দ্বন্দ্ব কেন?অনেক সময় মনে করা হয়, পরিবেশ সংরক্ষণ করলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। বাস্তবে বিষয়টি উল্টো। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পাশাপাশি চলতে পারে। একটি পৌরসভায় আজ রাস্তা তৈরি করা হলো, কাল রাস্তার জন্য ড্রেন ভাঙতে হলো, পরদিন নতুন ভবনের জন্য রাস্তা প্রশস্ত করতে হলোÑএ ধরনের বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে অর্থের অপচয় এবং নাগরিক ভোগান্তি দু’টোই বাড়ায়। অন্যদিকে, আগে থেকে একটি মাস্টার প্ল্যান থাকলে একই পরিকল্পনার আওতায় সড়ক, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা এবং সবুজ স্থানÑসবকিছু সমন্বিতভাবে উন্নয়ন করা সম্ভব।এখনই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়দেবীগঞ্জ এখনো এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যখন পরিকল্পিতভাবে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার সুযোগ রয়েছে। শহরটি অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে যাওয়ার আগেই যদি ভূমি ব্যবহার, পরিবেশ, সড়ক, ড্রেনেজ, বাণিজ্যিক এলাকা ও উন্মুক্ত স্থান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ নাগরিকরা এর সুফল পাবেন।দেবীগঞ্জ শুধু একটি উদাহরণ। দেশের অসংখ্য ছোট পৌরসভা একই ধরনের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই ছোট শহরগুলোর উন্নয়নকে শুধু স্থানীয় বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি দেশের সামগ্রিক নগরায়ণ নীতির অংশ হওয়া উচিত।আমরা এমন শহর চাই না, যেখানে উন্নয়নের নামে একের পর এক ভবন উঠবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে মাঠ, গাছ, জলাশয় ও নদীর তীর। আমরা এমন শহর চাই, যেখানে উন্নয়ন হবে- কিন্তু পরিকল্পিতভাবে; ভবন হবে- কিন্তু পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে; রাস্তা হবেÑকিন্তু জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না করে; বাণিজ্য বাড়বে- কিন্তু আবাসিক এলাকার স্বাভাবিক জীবন নষ্ট না করে। দেবীগঞ্জের মতো ছোট শহরগুলোকে এখনই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া গেলে ভবিষ্যতে এগুলোই হতে পারে বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৌর নগরীর মডেল।প্রশ্নটি তাই শুধু দেবীগঞ্জকে নিয়ে নয়- আমরা কি আমাদের ছোট শহরগুলোর ভবিষ্যৎও আজ থেকেই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে চাই?[লেখক: প্রকৌশলী; সাধারণ সম্পাদক, দেবীগঞ্জ উপজেলা কল্যাণ সমিতি, ঢাকা]

জলবায়ু পরিবর্তন কি ডেঙ্গুকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে?

ডেঙ্গু এখন আর কোনোভাবেই কেবল ‘বর্ষার রোগ’ নেই। ডেঙ্গু এখন বছরজুড়ে থাকা এক সমস্যা। সমস্যার স্বরূপ এখন অনেকটাই বদলে গেছে। ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তার এখন আর শুধু রাজধানী ঢাকা বা বড় শহরগুলোর অভিজাত এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের মডেল অনুযায়ী বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট এবং খুলনা জেলা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বাস্তবেও তাই ঘটছে। ঢাকায় সংক্রমণের সুযোগ কমে এলেও উপকূলীয় ও প্রান্তিক জেলাগুলোয় রোগী বাড়ছে। শেষ কয়েক বছরের প্রতি মৌসুমে ডেঙ্গু ছড়িয়েছে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায়। ২০২৬ সালের জুনের একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বর্ষা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই ৫৮টি জেলায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে তা ৬৪ জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে। এর অর্থ হলো, ডেঙ্গু এখন একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে এবং প্রত্যন্ত গ্রামেগঞ্জে পর্যন্ত ভয়াবহভাবে বিস্তার লাভ করেছে।এই বদলে যাওয়া চিত্রের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মশা এক্টোথার্ম বা শীতল রক্তের প্রাণী। তার দেহের তাপমাত্রা সরাসরি পরিবেশের তাপমাত্রার সাথে বাঁধা। তাই তাপমাত্রা বাড়লে তার শরীরের ভেতরের সব রাসায়নিক প্রক্রিয়াই দ্রুত চলতে শুরু করে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্পর্ক খুব নিবিড়। গবেষণা বলছে, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে মশার কামড়ের মধ্যবর্তী সময় প্রায় অর্ধেক হয়ে আসে, সংক্রমণ বেড়ে যায় অন্তত ২.৪ গুণ। ২৮ ডিগ্রির কাছাকাছি তাপমাত্রায় কামড়ানো ও সংক্রমণ দুটোই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। বিপাকক্রিয়া দ্রুত হওয়ায় ডিম পাকার চক্রও ছোট হয়ে আসে, ফলে স্ত্রী মশাকে বেশি ঘন ঘন রক্ত খুঁজতে হয়। একই সঙ্গে মশার দেহে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির গতিও বহুগুণ বেড়ে যায়। ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রিতে উঠলেই ভাইরাসের ইনকিউবেশন সময় ১৫ দিন থেকে নেমে আসে ৬-৭ দিনে।জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির ধরনও বদলেছে। আগের মতো টানা কয়েক দিনের হালকা বর্ষণের বদলে এখন হুট করে তীব্র বৃষ্টি হচ্ছে, তারপর দীর্ঘ বিরতি। এই অনিয়মিত কিন্তু তীব্র বৃষ্টিপাত শহর-গ্রাম দুই জায়গাতেই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি করছে, আর এডিস মশা পাচ্ছে অগণিত নতুন প্রজননক্ষেত্র। জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উঠলে আমাদের চোখে সাধারণত ভাসে উপকূলে বাঁধ ভাঙার দৃশ্য বা কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বাড়ার চিত্র। ডেঙ্গুর এই বিস্তারও যে একই সংকটের অংশ, সেটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই।মশার আচরণেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে জানা ছিল, এডিস শুধু পরিষ্কার জমা পানিতে ডিম পাড়ে। এখন দেখা যাচ্ছে, নোংরা-ড্রেনের পানিতেও দিব্যি বংশবিস্তার করছে। জুলাইয়ে ঢাকায় মাঠপর্যায়ে কাজ করা এক জাপানি গবেষক দল নাকি এই দৃশ্য দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিলেন, এমন অভিজ্ঞতা তাঁদের কারও কখনো হয়নি। ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল, প্রায় সাড়ে তিন লাখ আক্রান্ত। এরপর ভাবা হয়েছিল পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু ২০২৫ সালেও লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ৪১৩ জন। প্রবণতাটা নিম্নমুখী নয়, বরং জটিল হচ্ছে ক্রমশ।এখানেই আসল সমস্যা। আমাদের নীতি এই বদলে যাওয়া বাস্তবতার সাথে তাল মেলাতে পারছে না। প্রতি বছর একই চক্র দেখা যায়। বর্ষা এলে ফগার মেশিনের ধোঁয়া, সংবাদ সম্মেলন, আশ্বাসবাণী আর তারপর বর্ষা শেষে বিস্মৃতি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরও একটা নির্দিষ্ট সমস্যা। সিটি করপোরেশনের মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম মূলত লক্ষ্য করে কিউলেক্স মশাকে, যেটা ড্রেন-নর্দমার পচা পানিতে জন্মায়। অথচ ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস মশা, যার প্রজনন হয় বাড়ির ভেতরে-আশপাশে জমা পরিষ্কার পানিতে। বছরের পর বছর যে ফগিং চলছে, সেটা আসলে ভুল মশাকে টার্গেট করছে। যোগ হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতাও। রোগ নজরদারির দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের, কিন্তু মশার উৎস নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থানীয় সরকারের অধীনে। দুইয়ের মাঝে সমন্বয় প্রায়ই দুর্বল থাকে। স্বাস্থ্য খাতের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৬-৩১ চালু হয়েছে বটে, কিন্তু কাগুজে পরিকল্পনা আর মাঠের বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাক থেকেই যাচ্ছে। তবে আশার জায়গাও আছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তৈরি “ডেন-এক্স ট্র্যাপ” বিদ্যুৎ ছাড়াই চলা, দেশীয় উদ্ভিদ-উপাদান দিয়ে তৈরি একটা মশার ফাঁদ, যা স্ত্রী এডিসকে ডিম পাড়তে প্রলুব্ধ করে কিন্তু সেই ডিম নষ্ট করে দেয়। এখন এটি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় তিন হাজার স্থাপন করা হয়েছে। এমন কম খরচের, স্থানীয় সমাধান বাড়ানোর সুযোগ আছে সারা দেশে।সমাধানের রাস্তাটা তাই স্পষ্ট। মশা নিয়ন্ত্রণকে ঋতুভিত্তিক না রেখে সারা বছরের কর্মসূচি করতে হবে, শুষ্ক মৌসুম থেকেই প্রজননস্থল ধ্বংসের কাজ জোরদার করে। আবহাওয়া ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য একত্র করে পূর্বাভাসভিত্তিক সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আর ঢাকার বাইরে, বিশেষত উপকূলীয় জেলাগুলোতে পৌরসভা-ইউনিয়ন পর্যায়ে হাসপাতাল ও রোগ-নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, কারণ ঝুঁকিটা এখন সেখানেই বেশি।লেখার শুরুতে যে সংখ্যাগুলোর কথা বলেছিলাম, সেখানেই ফিরি। ৬৫ জনের মৃত্যুর আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্রমবর্ধমান প্যাটার্নটাই আসল সংকেত। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে ডেঙ্গু তার রূপ বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত, আমরা এখনো পড়ে আছি পুরোনো ধাঁচের প্রস্তুতি নিয়ে। এই ফারাকটা যত দ্রুত ঘোচানো যাবে, ততই মঙ্গল।[লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

ভিডিও আরও দেখুন

ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি, ফিফার নথি চাইল উয়েফা

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে সুইজারল্যান্ডে ফৌজদারি মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার একটি ফেডারেল আদালতের কাছে ফিফার বেশ কিছু গোপন নথিপত্র চেয়ে আবেদন করেছে সংস্থাটি।ফ্লোরিডার আদালতে করা উয়েফার আবেদনে বলা হয়েছে, ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) নামের নতুন একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে পুরুষ, নারী ও ক্লাব বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব হস্তান্তরের গোপন পরিকল্পনা করেছিলেন ইনফান্তিনো। উয়েফার অভিযোগ, ফিফা কাউন্সিল বা সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই তিনি কয়েকজন উপদেষ্টা ও বিনিয়োগকারীর সঙ্গে মিলে এই ছক কষেছিলেন।সুইস দণ্ডবিধির ১৫৮ ধারা অনুযায়ী, ইনফান্তিনো ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ‘ফৌজদারি অব্যবস্থাপনা’-এর অভিযোগে মামলা করার কথা ভাবছে উয়েফা। নথিতে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জশুয়া কুশনারের নেতৃত্বাধীন বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর কাছে ৪২০ কোটি ডলারে ফিফার এই স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা ছিল। এতে ফিফার পুরো বাণিজ্যিক স্বত্বের বাজারমূল্য ধরা হয়েছিল ২ হাজার কোটি ডলার, যা উয়েফার মতে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম। কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই এই চুক্তি করার চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি উয়েফার।তবে এর মধ্যে ফিফার জন্য কিছুটা স্বস্তির খবরও আছে। ফিফার টুর্নামেন্টগুলো বয়কট করার যে কড়া হুমকি উয়েফা দিয়েছিল, বৃহস্পতিবার তা ‘সাময়িকভাবে’ স্থগিত করার কথা জানিয়েছে তারা। ফলে আগামী মাসে পোল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ নিয়ে তৈরি হওয়া শঙ্কা আপাতত কাটল। উয়েফার এই বয়কটের হুমকির মুখেই মূলত স্বত্ব বিক্রির ওই গোপন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন ইনফান্তিনো।আরো পড়ূন...ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে উয়েফার বড় অ্যাকশন ইনফান্তিনোকে পদত্যাগের আলটিমেটাম উয়েফা প্রধানের/

ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি, ফিফার নথি চাইল উয়েফা