সংবাদ
হয় আমি থাকব, না হয় হাসপাতালের দুর্নীতি থাকবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

হয় আমি থাকব, না হয় হাসপাতালের দুর্নীতি থাকবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শন শেষে চিকিৎসাসেবায় অনিয়ম ও অবহেলার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার বার্তা দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন ‘হয় আমি থাকব, না হয় হাসপাতালে অনিয়ম-দুর্নীতি থাকবে’। হাসপাতালগুলোতে অনিয়ম দূর করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি জানান, চিকিৎসাসেবা নিয়ে কোনো ধরনের অবহেলা বা স্বেচ্ছাচারিতা বরদাশত করা হবে না।শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের ডেঙ্গু ইউনিটসহ বিভিন্ন বিভাগ সরেজমিনে ঘুরে দেখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরিদর্শনকালে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন তিনি। চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনেরা অভিযোগ করেন, প্রয়োজনের সময় চিকিৎসকদের পাওয়া যায় না এবং নার্সদের কাছ থেকেও কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা মেলে না। অভিযোগ শুনে মন্ত্রী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, হাম প্রতিরোধে ইতোমধ্যে চার কোটি ডোজ টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশজুড়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালু হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি সারা দেশে পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে তিন মাসব্যাপী অভিযান। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
১ ঘন্টা আগে

ভারতের সঙ্গে হওয়া ১০১ চুক্তি নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের আভাস

ভারতের সঙ্গে হওয়া ১০১ চুক্তি নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের আভাস

হাসপাতালে স্ত্রীর মরদেহ ফেলে পালানোর সময় স্বামী আটক

হাসপাতালে স্ত্রীর মরদেহ ফেলে পালানোর সময় স্বামী আটক

হয় আমি থাকব, না হয় হাসপাতালের দুর্নীতি থাকবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

হয় আমি থাকব, না হয় হাসপাতালের দুর্নীতি থাকবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

মাইজিপি অ্যাপে ছয়টি প্রধান এআই মডেল নিয়ে জিপির ‘ওয়ান এআই’ চালু

মাইজিপি অ্যাপে ছয়টি প্রধান এআই মডেল নিয়ে জিপির ‘ওয়ান এআই’ চালু

দিল্লিতে BRICS সম্মেলন ঘিরে বিশ্বজুড়ে নজর, বদলাতে পারে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

দিল্লিতে BRICS সম্মেলন ঘিরে বিশ্বজুড়ে নজর, বদলাতে পারে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

চালুর এক বছর পার না হতেই বন্ধ লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টার

চালুর এক বছর পার না হতেই বন্ধ লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টার

শিশুদের গোপন যৌন নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরছে নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘আওয়াজ উঠাও’

শিশুদের গোপন যৌন নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরছে নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘আওয়াজ উঠাও’

 শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার আমীরুল ইসলাম আর নেই

শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার আমীরুল ইসলাম আর নেই

কক্সবাজারের বনে মিলল মহাবিপন্ন মেঘলা চিতা

কক্সবাজারের বনে মিলল মহাবিপন্ন মেঘলা চিতা

ময়মনসিংহ মেডিকেলে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ১ জনের মৃত্যু

ময়মনসিংহ মেডিকেলে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ১ জনের মৃত্যু

মতামতমতামত

মক্কাচুক্তি: ঢাকার সিদ্ধান্তে কি বদলাবে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণ?

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রথম অধ্যায়ে মূল সমীকরণ ছিল সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ঘিরে। কিন্তু এখন এই ত্রিপাক্ষিক নিরাপত্তা কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য সম্প্রসারণের প্রশ্নটি এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের সামনে। বাংলাদেশ এখনও চুক্তির সদস্য নয়, কিন্তু ঢাকার পক্ষ থেকে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার ইঙ্গিত এসেছে এবং সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে যুক্ত করার আগ্রহের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।বাংলাদেশের অবস্থান এখনও চূড়ান্ত নয়। তবে সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলিতে ঢাকার মনোভাব যে সম্পূর্ণ নেতিবাচক নয়, তা স্পষ্ট। ৩০ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ কোনও ঝুঁকির মুখে পড়বে না এবং এর ফলে অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সীমিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ঢাকা সম্ভাব্য সদস্যপদকে কোনও একটি দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে নয়, বরং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখাতে চাইছে।কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। বাংলাদেশ যদি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে একই নিরাপত্তা কাঠামোয় তার অবস্থান তৈরি হবে। আর পাকিস্তান ভারতের প্রধান নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটি। ফলে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে নয়াদিল্লি নিছক আরেকটি দেশের আন্তর্জাতিক জোটে যোগদানের ঘটনা হিসেবে দেখবে না। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান সংবেদনশীল পরিবেশে এর কৌশলগত তাৎপর্য অনেক বেশি।তবে এখানেও সরলীকরণ বিপজ্জনক। বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলেই যে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বিরুদ্ধে কোনও যৌথ সামরিক অবস্থান গ্রহণ করবে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনীতি, ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক সম্পর্ক, সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নদীর জল এবং বঙ্গোপসাগর–সবকিছুই ঢাকার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের অংশ। ফলে কোনও নতুন নিরাপত্তা কাঠামোয় যোগ দিলেও ভারতকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত হবে না।বরং বাংলাদেশের সম্ভাব্য আগ্রহের পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার। তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কও বাড়ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কেও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে ঢাকা যদি মক্কা কাঠামোয় প্রবেশ করে, তাহলে একদিকে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ বাড়াতে পারবে, অন্যদিকে নতুন অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দরজাও খুলতে পারে।কিন্তু এই সম্ভাব্য লাভের পাশাপাশি বড় ঝুঁকিও রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বহির্মুখী এবং রপ্তানি, প্রবাসী শ্রমিক ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে কোনও নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে পড়লে অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। Reuters-এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের non-alignment বা ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির পরীক্ষা হতে পারে এবং ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতো শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে।ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে–বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে নয়াদিল্লি কীভাবে মোকাবিলা করবে। যদি ভারত এটিকে সরাসরি পাকিস্তান-সমর্থিত বা ভারতবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখে কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। বিপরীতে, যদি ভারত বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে তার বহুমুখী কূটনীতির অংশ হিসেবে গ্রহণ করে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বাস্তব ক্ষেত্রগুলিকে আরও শক্তিশালী করে, তাহলে মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।এখানেই শশী থারুরের প্রথম পর্বের যুক্তি দ্বিতীয় পর্বে এসে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, ভারতের উত্তর হওয়া উচিত Gulf-কে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং Gulf-এর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রযোজ্য হতে পারে। ভারত যদি বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় নিজের গুরুত্ব আরও বাড়াতে পারে, তাহলে কোনও নতুন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোয় বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে ভারতবিরোধী অক্ষ হিসেবে রূপ নেওয়া কঠিন হবে।অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিঃসন্দেহে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হতে পারে। কারণ এতে মক্কা চুক্তির ভৌগোলিক পরিসর পশ্চিম এশিয়া থেকে সরাসরি বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। পাকিস্তান তখন শুধু সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সঙ্গেও একই নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে থাকবে। এর ফলে ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক ও মুসলিম বিশ্বের ফোরামগুলিতে আরও বেশি কূটনৈতিক leverage পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।তবে বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও গভীর–চুক্তিতে যোগ দিয়ে ঢাকা কি নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়াবে, নাকি নতুন নির্ভরতা তৈরি করবে? একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু সহযোগিতার সুযোগ দেয় না; প্রয়োজনে অংশীদারের নিরাপত্তা সংকটের ক্ষেত্রেও অবস্থান নেওয়ার রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রে সেই বাধ্যবাধকতা বাস্তবে কতটা হবে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। চুক্তির বিস্তারিত operational framework-ও প্রকাশ্যে সম্পূর্ণভাবে জানা যায়নি।এই কারণে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমান পথ হতে পারে কোনও তাড়াহুড়ো না করে চুক্তির বাস্তব শর্ত, সদস্যদের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির সীমা পরিষ্কারভাবে যাচাই করা। কারণ “collective defence” কথাটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও বাস্তবে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, threat perception এবং সামরিক সক্ষমতা আলাদা।ভারতের জন্যও একই শিক্ষা। বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক বা চাপ নয়, প্রয়োজন কৌশলগত সংলাপ। ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের যে ক্ষেত্রগুলি সরাসরি দুই দেশের জনগণের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত–বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদী ও বঙ্গোপসাগর–সেগুলিকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। কারণ একটি দেশকে কোনও জোট থেকে দূরে রাখার চেয়ে তার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক এতটাই গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা বেশি কার্যকর, যাতে সেই দেশ বহুমুখী অংশীদারিত্ব বজায় রেখেও ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ককে অপরিহার্য মনে করে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মক্কা চুক্তিকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করলে এর আসল ভূরাজনৈতিক চরিত্র আড়ালে চলে যাবে। এটি একইসঙ্গে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় কৌশলগত autonomy-র প্রশ্ন। বাংলাদেশ যদি এতে যোগ দেয়, তার সিদ্ধান্তও ধর্মীয় আবেগের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং কৌশলগত স্বাধীনতার ভিত্তিতেই বিচার করতে হবে।শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান মক্কা চুক্তিকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করবে–এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটিকে অবধারিতভাবে ভারতবিরোধী সামরিক অক্ষে পরিণত করবে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না। বরং এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক কূটনৈতিক পরীক্ষার সূচনা। পাকিস্তান চাইবে এর মাধ্যমে নিজের প্রভাব বাড়াতে, সৌদি আরব চাইবে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব সম্প্রসারিত করতে, তুরস্ক চাইবে নিজের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে, আর বাংলাদেশ চাইবে নতুন অংশীদারিত্বের সুবিধা নিতে গিয়ে নিজের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে।ভারতের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে ঠেকানো নয়; বরং এমন একটি কৌশল তৈরি করা, যাতে বাংলাদেশের নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ভারতের সঙ্গে তার মৌলিক সম্পর্ককে দুর্বল না করে। আর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা–মক্কা চুক্তিতে প্রবেশ করে কতটা নতুন কৌশলগত সুযোগ পাওয়া যাবে, আর সেই সুযোগের বিনিময়ে কতটা কূটনৈতিক স্বাধীনতা ধরে রাখা সম্ভব হবে।মক্কা চুক্তির পরবর্তী অধ্যায় তাই শুধু রিয়াদ, আঙ্কারা বা ইসলামাবাদে লেখা হবে না। তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ লেখা হবে ঢাকাতেও। আর সেই সিদ্ধান্তের দিকে এখন নজর শুধু ভারত বা পাকিস্তানের নয়–পুরো দক্ষিণ এশিয়ার।আরো পড়ুন...মক্কা চুক্তি: ভারতের সামনে নতুন সমীকরণ/ 

রম্যগদ্য: “পিটাও অ্যারিস্টোটল, মারেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”

এইডা আবার কী শুরু করলেন, হিডান অ্যারিস্টোটল, হিডান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? আপনে মিয়া পারেনও, এই দুই বিশ্বনন্দিত পাবলিকরেনি আন্নে হিডাইবেন! এগোরে হিডাইলে, পাবলিক আন্নেরে হিডি মারি হালাইবো। পাবলিক আমাকে পিটাক বা মব করে মেরে ফেলুক, এনিয়ে আমার চিন্তা নেই, কিন্তু এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যাক্তিত্ব যে বাংলাদেশের বারটা বাজাচ্ছে তার কী হবে?এ্যাঁ, যীষু খৃষ্টের জন্মেরও ৩৮৪ বছর আগে এ্যাথেনসের, জারা শহরে জন্ম লোইলো, অ্যারিস্টোটল, তখনতো বাংলাদেশের বাপেরও জন্ম হয় নাই! আর আন্নেনি কন বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক অ্যারিস্টোটল আন্নের বাংলাদেশের ... মারের! আন্নের মিয়া লজ্জা শরম নাই, অ্যারিস্টোটল আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথরে উপর এইসব অলীক মন গড়া অভিযোগ করতে!আরে উড়ঝুড়ে বাঙাল, তুইতো কিছু না বুঝেই কাটা টিকটিকির লেজের মতো লাফালাফি করিস। তড়প তড়প করে তড়পাস। তুই জানিস, তোর কথার এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের শুধু... মারেনি, ইঁনারা বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের ...জেন-জিরও... মেরে বসে আছেন।হ, কোইলেই হোইলো। এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের, বাংলার পরবর্তী প্রজন্মেরও... মারের! মনে রাইখেন মিয়া এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব অ্যারিস্টোটল পৃথিবীর ইতিহাসে, আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে যে অবদান রেখেছেন, আন্নের হাজার গুষ্টি আইলেও হ্যাগো বাম-পায়ের কানি আঙুলের ধারে কাছেও যাইতে পারবেন না!  আরে ভাই আমার আর আমার চৌদ্দগুষ্টির কারো এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্বের কাছেও যেতে হবে না। কিন্তু ইঁনারা দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশের শুধু ... মারেনি, তারা পুরো বাঙালি জাতির ... মেরেছেন। তুই বলতে পারিস আমরা কি এমন পাপ করলাম যে তোর ভাষায় এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্বের প্রচেষ্টায় আজ আমরা বাঙালি নাকি মধ্যপ্রাচ্যে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া ওঁচা মিসকিন হিসেবে পৃথিবীতে বিচরণ করবো! ভাবতে পারিস তোর এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্বের ঠেলায় আমাদের জাতিসত্তা নিয়ে টানাটানি শুরু হোয়েছে। আমরা কি বাঙালি নাকি আমরা ভিনগ্রহের প্রাণী উট সাবক!এইটা আপনি কি বলচেন যে, কবি শামসুর রাহমান বলেচেন, “অদ্ভুত এক উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ” কিন্তু কবি শামসুর রাহমান কখোনোই বলেননি যে বাঙালি আর বাঙালি নাই হ্যারা ব্যেবাগতে উষ্ট্র সাবক!কিন্তু ভাবেতো তাই দেখা যাচ্ছে, তোরা মরুভুমির কঠিন আবহাওয়ায় বসবাসরত পাবলিকের আচার অনুষ্ঠান লালন পালন করলে তোকে কে বলবে যে তুই বাঙালি নাকি পবিত্র উষ্ট্র দেশের বাসিন্দা?আপনে মিয়া কথা ঘুরায়েন না, এ্যাতক্ষণ কোইছেন, দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব অ্যারিস্টোটল আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশের জী-মারের অহন আবার বাঙালিরে পবিত্র উটের দেশে নিয়া ফালাইতে চান! সোজাসাপটা কন মিয়া আপনে ক্যান কোইছেন দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব অ্যারিস্টোটল আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশের তথা বাঙালির বারটা বাজাইছে?দ্যাখ, বিশ্বখ্যাত, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, তর্কশাস্ত্রবিদ, গাণিতিক জনাব অ্যারিস্টোটল তার পোয়েটিকসসে বলেছেন, একটি দেশ সব সময় পরিচালিত হয় ওই দেশের জনপ্রিয় নেতা দ্বারা, জনপ্রিয় নেতা জনগণের ভোটে সব সময় দেশ পরিচালনার ভার লাভ করে। কিন্তু দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠি কখোনোই জনতার ভোটে দেশ পরিচালনার সুযোগ পান না।  এই অ্যারিস্টোটলের কথা শুনে তোর বাংলাদেশের লোকেরা ১৯৭১-এ যেমন জনপ্রিয় নেতাকে ভোট দিলেন, তারপর তার দেশ পরিচালনার বহর দেখে তাকে ফুটো করলো। দেশ পড়লো অথৈ আঁধারে। বাঙালি জাতির বারোটা। তার পরবর্তীতে “টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সবাই বলে জিয়া জিয়া”। এমনি অপর এক জনপ্রিয় নেতাকে তোরা আবার গুলি কোরে হত্যা করলি। আবার বাঙালি অথৈ পাথারে। এ্যাখোন বাঙালি যদি  বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব অ্যারিস্টোটলের কথা না শুনতো তাহলে আজ বাঙলার ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লেখা হতো। তোরা অ্যারিস্টোটলের কথা শুনলি আর মরলি।এইডা আবার কী কথা! বিদেশে কি পাবলিক জনপ্রিয় নেতারে ভোট দ্যায় না?জ্বী, বিদেশে পাবলিক জনপ্রিয় নেতাকে ভোট দ্যায়, কিন্তু ওই নেতারা সিনেট মিনেট, কংগ্রেস, আপার বেঞ্চ লোয়ার বেঞ্চ করে সব শিক্ষিতদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দ্যায়, ফলে তোর ওই জনপ্রিয় নেতাকে কখোনোই স্বৈরাচার হবার চান্স দেয়া হয় না। কিন্তু তোর দেশের শিক্ষিতরা তো কোণঠাসা, কারণ তোর জনপ্রিয় নেতাটি তার জনপ্রিয়তায় এ্যাতোই অন্ধ যে, কখন জেন-জি তার ...’ মারছে তাও টের পেলেন না। আচ্ছা বুঝলাম হালার অ্যারিস্টোটলের কথা হুনি বাঙালি পাবলিক শিক্ষিতরে বাদদি জনপ্রিয় নেতারে ভুট প্রদান করি, নিজের...নিজেই ধ্বংস করছে। কিন্তু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররে এর মইধ্যে হান্দাইলেন ক্যামনে? হ্যায় ক্যেমনে বাঙালি জাতির...মারের?আরে অশিক্ষিত বর্বর বাঙাল, মবগোষ্টির সক্রিয় কাঙাল, তুই কেন জানিস না যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার শ্যামা নৃত্যনাট্যে, রাজকোষে চুরি হবার পর লিখলেন, “চুরি হয়ে গেছে রাজকোষে, চোর চাই, চোর চাই, যে কোরেই হোক, হোক সে অন্য কোনো লোক...”তো হ্যায়তো ঠিকই কোইছে, চোর চাই, চোর চাই, যে কোরেই হোক...ব্যাস পুলিশ তো চুর ধোরবোই।“আরে জঙ্গল পুলিশ তো চোর ধরবেই, এটাই ওদের ডিউটি। কিন্তু পুলিশ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কথা শুনে করলো কি, ছিনতাই করলো নীল মোটর সাইকেল, পুলিশ ধরলো লাল মোটর সাইকেল, কারণ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “চোর চাই, চোর চাই, যে কোরেই হোক, হোক সে অন্য কোনো লোক...” ব্যাস বিশ্ব কবির কথামতো পুলিশ অন্যলোককে ধরে আনলো। এখন তুইই বল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এইসব নোংরা বুদ্ধি না দিলে, পুলিশ কি এই বাঁকা পথে যেতো?তুই বল?গুরু আপনে ঠিকই কোইছেন, এই দুই বিশ্ব নন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব শুধু বাংলাদেশের  ...মারেনি, ইঁনারা বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের ...জেন-জিরও... মেরে বসে আছেন। ইঁনাদের বাংলাদেশে ব্যান্ড করা উচিৎ। আন্নের কথাই ঠিক হালাগোরে হিডান।তাহলে তুইও আমার সাথে বল “পিটাও অ্যরিস্টোটল, মারেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর...”আরে শুধু আমি কমু ক্যান পুরা বাংলাদেশের পাবলিকে কোইবো, “পিটাও অ্যরিস্টোটল, মারেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর...” [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

ডেঙ্গু: সংখ্যার আড়ালে ব্যর্থতা

সংখ্যাগুলো একসাথে সাজালে চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জুনে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন প্রায় তিন হাজার মানুষ। জুলাইয়ে তা তিনগুণ বেড়ে নয় হাজারের বেশিতে পৌঁছায়। আগস্টে সেই সংখ্যা আরও লাফিয়ে বেড়ে বিশ হাজার পার হয়ে যায়। আর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই একদিনে দেড় হাজারের বেশি রোগী ভর্তির নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে—চলতি বছরের সর্বোচ্চ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ, প্রাণ গেছে ১২১ জনের। এই ঊর্ধ্বমুখী রেখা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়—এটি একটি প্যাটার্ন, যা প্রতিবছর প্রায় একই সময়ে ফিরে আসে।ইতিহাস ঘাঁটলে এই প্যাটার্ন আরও স্পষ্ট হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর তথ্য সংরক্ষণ করছে। এই দুই দশকের মধ্যে ২০২৩ সাল সবচেয়ে ভয়াবহ বছর হিসেবে রেকর্ড হয়ে আছে—সে বছর তিন লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং মৃত্যু হয়েছিল ১ হাজার ৭০৫ জনের, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এরপর ২০২৫ সালেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি—চার শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান এবং হাসপাতালে ভর্তি হন প্রায় এক লাখ দুই হাজার রোগী। এই তিন বছরের তুলনামূলক চিত্র একটি জিনিস স্পষ্ট করে দেয়—আগস্ট থেকে অক্টোবর সময়টা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, আর এবারও ঠিক সেই ধারাবাহিকতাই দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরজুড়ে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।ভৌগোলিক বিস্তারের তথ্যও উদ্বেগজনক। ঢাকা বিভাগে সংক্রমণ সর্বোচ্চ হলেও এককভাবে আর রাজধানীর সমস্যা এটি নয়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ পুরো ঢাকা বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। বরিশালে প্রায় ৬ হাজার, চট্টগ্রামে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জেও আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। ময়মনসিংহ, কক্সবাজার, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরেও সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি। গত কয়েক বছর ধরে দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও। ২০১৯ সালের আগে যে রোগ মূলত বড় শহরকেন্দ্রিক ছিল, তা এখন গ্রামীণ জনপদেও পৌঁছে গেছে—অর্থাৎ এডিস মশার বিস্তারও আর শহরের সীমানায় আটকে নেই।এই বিস্তারের পেছনে কারণ হিসেবে কীটতত্ত্ববিদরা দেখাচ্ছেন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। আগে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরকে এডিস মশার প্রধান প্রজননকাল ধরা হতো। কিন্তু এখন সারাদেশে প্রায় সারা বছরই এই মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। শহরে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম কিছুটা দৃশ্যমান হলেও গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের উদ্যোগ তুলনামূলক দুর্বল, ফলে এডিস মশার প্রজননস্থল অনেকাংশে অনিয়ন্ত্রিত থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় জেলাগুলোতেও ডেঙ্গুর বিস্তার নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে, যা আগে তেমন লক্ষ্য করা যায়নি।পরিসংখ্যানের আরেকটি স্তরে গেলে দেখা যায় একটি লিঙ্গভিত্তিক অসামঞ্জস্য। এ বছর হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের প্রায় ৬২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ শতাংশ নারী। কিন্তু মৃত্যুর চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত—এখন পর্যন্ত মৃতদের প্রায় ৫৬ শতাংশ নারী। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পুরুষরা কর্মসূত্রে শহরে থাকার সুবাদে সহজে পরীক্ষা করানোর সুযোগ পান, নারীদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ তুলনামূলক কম। ফলে আক্রান্ত নারীর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানে হয়তো কম প্রতিফলিত হচ্ছে, আর রোগ নির্ণয়ে বিলম্বের কারণে জটিলতা বেড়ে মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ছে। এই তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যানগত খুঁত নয়—এটি স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে থাকা বাস্তব বৈষম্যের একটি প্রতিফলন, যা নীতিনির্ধারণে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।সরকারি পর্যায়ে সাড়া দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। প্রধানমন্ত্রী দেশজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন, যেখানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা স্বেচ্ছাসেবক, বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্ট কর্মীদের সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও গতিশীল ও সমন্বিত করার নির্দেশনা জারি করেছে। এসব পদক্ষেপ ইতিবাচক, তবে বাস্তবতা হলো—এই সক্রিয়তা প্রতিবারই আসে সংক্রমণ শীর্ষে পৌঁছানোর পর, প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি হিসেবে নয়।সংখ্যাগুলো একত্র করলে একটি স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়—আগামী দুই মাস, বিশেষত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর, বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য নির্ধারক সময়। এই সময়ে পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা কেবল হাসপাতালের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে মশার প্রজননস্থল কতটা ধ্বংস করা যাচ্ছে, শহর ও গ্রামজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে কতটা কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা যাচ্ছে তার ওপর। বাড়ির আঙিনা, ছাদের টব, নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা করানো এবং বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের মতো সাধারণ সতর্কতাগুলোই এখন সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা।গত তিন বছরের তথ্য-উপাত্ত একটি বার্তাই বারবার দিচ্ছে—ডেঙ্গু আর কোনো এককালীন মহামারি নয়, এটি বাংলাদেশের বার্ষিক স্বাস্থ্যচিত্রের স্থায়ী অংশ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে যদি আমরা মৌসুমভিত্তিক প্রতিক্রিয়ার বদলে বছরজুড়ে প্রতিরোধমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে প্রতিবছরই সংখ্যাগুলো নতুন রেকর্ড ছুঁয়ে যাবে—আর তার মূল্য দিতে হবে মানুষের প্রাণ দিয়েই। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]

সমস্যা কি ব্যাটারিচালিত রিকশায় নাকি পরিকল্পনায়?

ঢাকার রাস্তায় যানজট নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু যানজটের চরিত্র বদলেছে। আগে যেখানে বাস, প্রাইভেট কার, সিএনজি, রিকশা ও মোটরসাইকেল নিয়ে মূলত প্রতিযোগিতা ছিল, এখন সেখানে যোগ হয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের বিশাল বহর। তারা কখনো প্রধান সড়কে উঠে আসছে, কখনো হঠাৎ থেমে যাত্রী তুলছে, কখনো ইউটার্ন নিচ্ছে, আবার কখনো ফুটপাতের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে। ফলে রাস্তার শৃঙ্খলা আরও দুর্বল হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।এখন তাই ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু পরিবহনের বিষয় নয়। এটি হয়ে উঠেছে নগর পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান, সড়ক নিরাপত্তা, রাজস্ব এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।দেশে গণপরিবহন পর্যাপ্ত নয়। শহরের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে অনেক সময় বাস পাওয়া যায় না। বড় বাস অলিগলিতে ঢুকতে পারে না। গ্রাম, উপজেলা কিংবা ছোট শহরে তো আধুনিক গণপরিবহনের সুযোগ আরও সীমিত। ফলে মানুষের প্রয়োজন থেকেই ছোট যানবাহনের বাজার তৈরি হয়েছে। যেখানে বাস যায় না, সেখানে রিকশা যায়। যেখানে রিকশায় দূরত্ব বেশি, সেখানে ইজিবাইক যায়। যেখানে যাত্রী কম, সেখানে বড় বাস চালানো লাভজনক নয়, কিন্তু ছোট যানবাহন চলতে পারে।অর্থাৎ ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু যানজট তৈরি করেনি। আমাদের দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থার শূণ্যতাও পূরণ করেছে।সমস্যা অন্য জায়গায়। প্রয়োজনের কারণে একটি পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার পরও আমরা সেটিকে পরিকল্পনার মধ্যে আনিনি। যানবাহন বাড়তে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়নি। চালকরা গাড়ি চালাচ্ছেন, কিন্তু প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। গাড়ি তৈরি হচ্ছে, কিন্তু উৎপাদনের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে, কিন্তু চার্জিং স্টেশন কোথায় এবং কীভাবে পরিচালিত হবে, তারও পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ নেই।সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, দেশে ঠিক কতগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে, সেটিও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ। অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাবে দেশে ই-থ্রি-হুইলারের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। শুধু ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ২০ লাখ। সংখ্যার এই পার্থক্যকে ছোট বিষয় মনে করার কারণ নেই। যে খাতে কয়েক মিলিয়ন যানবাহন চলছে, সেই খাতের সঠিক পরিসংখ্যানই যদি রাষ্ট্রের কাছে না থাকে, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করবে কীভাবে?আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অনেক সময় কোনো একটি বিষয়কে অবজ্ঞা করতে করতে সেটিকে বড় হতে দেয়। যখন সেটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেটিকে সমস্যা হিসেবে আবিষ্কার করে। এরপর শুরু হয় অভিযান, উচ্ছেদ, নিষেধাজ্ঞা এবং নতুন নীতিমালা। কিন্তু যে জায়গা থেকে সমস্যাটি তৈরি হয়েছে, সেই উৎসে খুব কমই যাওয়া হয়।ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রেও যদি শুধু চালকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়, তাহলে সমস্যার খুব সামান্য অংশই ধরা পড়বে।একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার পেছনে আছে চালক, মালিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, স্থানীয় কারখানা, বডি নির্মাতা, ব্যাটারি বিক্রেতা, চার্জিং স্টেশন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি পুরো ইনফরমাল অর্থনীতি। এই পুরো ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে শুধু রাস্তা থেকে রিকশা সরানো অনেকটা নদীর ওপরের পানি সরিয়ে নদীর উৎস বন্ধ করার চেষ্টা করার মতো।ঢাকার যানজটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তার যে কোনো স্থানে হঠাৎ থামলেই হয়তো বড় কোনো সমস্যা মনে হয় না। কিন্তু এমন শত শত যানবাহন যখন একই সময়ে নিজেদের মতো করে যাত্রী ওঠানামা করায়, ইউটার্ন নেয় এবং প্রধান সড়কে ঢোকে, তখন পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ে। একটি ছোট অনিয়ম তখন বড় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।আরেকটি সমস্যা হলো, ঢাকার সড়কগুলোতে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। বাসের নিজস্ব রুট, রিকশার নিজস্ব চলাচল, মোটরসাইকেলের আলাদা গতি এবং প্রাইভেট কারের আলাদা বন্দোবস্ত প্রয়োজন। এর সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু শহরকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা তৈরি হয়নি।ফলে একই রাস্তা সবাই ব্যবহার করছে, কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে সমন্বয় করে চলছে না।এটি শুধু যানজটের কারণ নয়, সড়ক নিরাপত্তারও বড় সমস্যা। বেশিরভাগ চালকের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। অনেক যানবাহনের ফিটনেস সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই। অনেক গাড়ি স্থানীয়ভাবে তৈরি বা পরিবর্তন করা হচ্ছে। যাত্রী বহনের ক্ষমতা, ব্রেক, আলো, ব্যাটারি এবং অন্যান্য নিরাপত্তা উপকরণের মানও সব ক্ষেত্রে এক নয়।এই অবস্থায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে, সেটিই স্বাভাবিক।তবে ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় সমস্যা সম্ভবত রাস্তা নয়, বিদ্যুৎ।সাধারণত মধ্যরাতের পর বিদ্যুতের চাহিদা কমে আসার কথা। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা দেখছেন, প্রত্যাশিত হারে চাহিদা কমছে না। তাদের ধারণা, বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক রাতের বেলায় চার্জ দেওয়ার কারণে এই চাহিদা থেকে যাচ্ছে।সিপিডির হিসাবে, ই-থ্রি-হুইলার খাত দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করছে। এর পরিমাণ প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট। একটি পরিবহন খাতের জন্য এটি ছোট কোনো সংখ্যা নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এখন এমন একটি বড় ব্যবহারকারী তৈরি হয়েছে, যাকে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ পরিকল্পনার মূল আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।আরও বড় সমস্যা হলো চার্জিং ব্যবস্থা।সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। এর বিপরীতে অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬। এই পরিসংখ্যান সত্য হলে বিষয়টি শুধু বিদ্যুৎ চুরির নয়। এটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রমাণ।এই অবৈধ চার্জিং ব্যবস্থার কারণে সরকার প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে সিপিডি জানিয়েছে। অর্থাৎ একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ছে, বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে এবং সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।এত বড় একটি ব্যবস্থা এতদিন কীভাবে অদৃশ্য থাকল?কয়েকটি অবৈধ দোকান বা চার্জিং পয়েন্ট একদিনে ৪৮ হাজারে পৌঁছায় না। ধীরে ধীরে তারা তৈরি হয়। মানুষ ব্যবহার করে। স্থানীয়ভাবে অনুমতি বা সমঝোতা তৈরি হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ আসে। ব্যবসা চলে। তারপর একসময় সংখ্যাটি এত বড় হয় যে রাষ্ট্রের নজরে পড়ে।এ কারণেই শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না।সরকার এখন ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন, লাইসেন্স, নির্দিষ্ট রুট, জিপিএস, জিও-ফেন্সিং এবং উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করছে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। ঢাকাকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে নির্দিষ্ট রঙ ও নম্বরের মাধ্যমে যানবাহন পরিচালনার পরিকল্পনাও কার্যকর হতে পারে। প্রধান সড়ক থেকে এসব যানবাহন সরিয়ে ফিডার রুটে চালানোর উদ্যোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ।কিন্তু পরিকল্পনা কাগজে থাকলে কোনো লাভ নেই।বাংলাদেশে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগের অভাব নেই। অভাব রয়েছে নিয়মিত ও সমানভাবে তা বাস্তবায়নের। একজন রিকশাচালককে আটক করা বা তার গাড়ি জব্দ করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু অনুমোদনহীন কারখানা বন্ধ করা, অবৈধ যন্ত্রাংশের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা, অবৈধ চার্জিং স্টেশন বন্ধ করা এবং এসবের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা অনেক কঠিন।রাষ্ট্র যদি শুধু রাস্তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির ওপর আইন প্রয়োগ করে, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ নয়, সেটি লোক দেখানো আইনের প্রয়োগ মাত্র।ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোন মডেলের গাড়ি তৈরি হবে, কতজন যাত্রী বহন করতে পারবে, ব্যাটারির মান কী হবে, ব্রেক ও আলো কেমন হবে, এসব নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি গাড়ির নিবন্ধন থাকতে হবে। চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ফিটনেস পরীক্ষা ছাড়া কোনো যানবাহন রাস্তায় চলতে দেওয়া উচিত নয়।চার্জিং ব্যবস্থাকেও বৈধ করতে হবে। প্রতিটি চার্জিং স্টেশনকে নিবন্ধনের আওতায় এনে বিদ্যুতের আলাদা হিসাব রাখা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট সময়ে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে বিদ্যুৎ চুরি কমবে এবং সরকার জানতে পারবে এই খাতে আসলে কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে।ব্যাটারিচালিত রিকশাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার বদলে এটিকে গণপরিবহনের অংশ করা যেতে পারে। বড় বাস প্রধান সড়কে চলবে, আর ব্যাটারিচালিত ছোট যানবাহন আবাসিক এলাকা ও অলিগলি থেকে যাত্রী এনে বাস, মেট্রোরেল বা অন্যান্য বড় পরিবহনের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে। এতে এগুলো মূল গণপরিবহনের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহায়ক হতে পারে।এ ধরনের ব্যবস্থা হলে একজন যাত্রীকে পুরো যাত্রার জন্য রিকশার ওপর নির্ভর করতে হবে না। বাস বা মেট্রোরেল হবে মূল পরিবহন, আর ছোট বৈদ্যুতিক যানবাহন হবে ছোট দূরত্বের বাহন। তখন একটি বিশৃঙ্খল পরিবহন খাত ধীরে ধীরে একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে।ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ও আমাদের ভাবতে হবে। ব্যাটারি শেষ হয়ে হলে সেটি কোথায় যায়? নিম্নমানের ব্যাটারি, ব্যবহৃত ব্যাটারি এবং সেগুলোর বর্জ্য ভবিষ্যতে পরিবেশের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই শুধু গাড়ি নিবন্ধন করলেই হবে না। ব্যাটারি উৎপাদন, ব্যবহার, পরিবর্তন এবং পুনর্ব্যবহারের জন্যও নীতিমালা প্রয়োজন।শেষ পর্যন্ত লড়াইটা ব্যাটারিচালিত রিকশার সঙ্গে নয়। লড়াইটা আমাদের পরিকল্পনাহীনতার সঙ্গে। কয়েক মিলিয়ন ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে বোঝা হিসেবে না দেখে একটি নিয়ন্ত্রিত, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। তবে তার জন্য প্রয়োজন শুধু অভিযান নয়, তথ্য; শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, নীতি; শুধু নীতি নয়, বাস্তবায়ন।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রভাষক, ডিপার্টমেন্ট অব ইংলিশ অ্যান্ড মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ, আইইউবিএটি]

মক্কা চুক্তি: ভারতের সামনে নতুন সমীকরণ

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ৭ আগস্ট ২০২৬-এ স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো—তিন দেশের যেকোনও একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি। এই একটি ধারাই আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন তুলেছে, তবে কি একটি নতুন মুসলিম নিরাপত্তা জোটের জন্ম হলো? ভারতে প্রশ্নটি আরও সরাসরি—পাকিস্তান কি এবার সৌদি আরব ও তুরস্কের নিরাপত্তা ছাতার নিচে গিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে আরও বেশি কৌশলগত সুবিধা পাবে?কংগ্রেস নেতা, প্রাক্তন বিদেশ মন্ত্রী ও লোকসভা সাংসদ শশী থারুর Indian Express-এ প্রকাশিত তাঁর বিশ্লেষণে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে প্রথমেই অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা থেকে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, এই পর্যায়ে মক্কা চুক্তিকে “Islamic NATO” বলা premature। কারণ NATO-র মতো কার্যকর সামরিক জোটের জন্য যে ঐক্যবদ্ধ কমান্ড, নির্দিষ্ট বাহিনী, সামরিক আন্তঃসংযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন, মক্কা চুক্তিতে এখনও সেই পরিকাঠামো দেখা যাচ্ছে না। ফলে এটি আপাতত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিচালনাকারী সামরিক জোটের চেয়ে একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত deterrence framework হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।তবে এখানেই চুক্তিটির গুরুত্ব শেষ হয়ে যাচ্ছে না। বরং তিন দেশের আলাদা আলাদা শক্তিকে একই কাঠামোয় নিয়ে আসাটিই এর প্রকৃত তাৎপর্য। সৌদি আরব নিয়ে আসছে বিপুল আর্থিক ক্ষমতা, জ্বালানি সম্পদ ও ইসলামী বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব; তুরস্ক নিয়ে আসছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প, সামরিক প্রযুক্তি এবং NATO-অভিজ্ঞতা; আর পাকিস্তান নিয়ে আসছে বড় সামরিক বাহিনী, পারমাণবিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা। থারুরের ভাষ্যেও এই তিন শক্তির সমন্বয়কে চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়েছে।কিন্তু তিন দেশের লক্ষ্য এক নয়। সৌদি আরবের প্রধান উদ্বেগ পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা, ইয়েমেনের হুথি হামলা এবং দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিরাপত্তা-নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা। তুরস্ক একইসঙ্গে NATO-র সদস্য এবং স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের প্রভাব বাড়াতে চায়। আর পাকিস্তানের জন্য এই চুক্তি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি সামরিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ। ফলে একই চুক্তির ভেতরে তিন দেশের তিন ধরনের হিসাব কাজ করছে।এই জায়গাতেই ভারতের জন্য আসল প্রশ্নটি তৈরি হয়। পাকিস্তান কি এই চুক্তিকে ভারতের বিরুদ্ধে কোনও ভবিষ্যৎ সংঘাতে কৌশলগত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে? থারুরের বিশ্লেষণ বলছে, বিষয়টিকে এত সরলভাবে দেখা ঠিক হবে না। পাকিস্তানের মাটিতে উৎপন্ন কোনও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জবাবে ভারত যদি নির্দিষ্ট সন্ত্রাসী অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে “unprovoked aggression” হিসেবে সৌদি আরব বা তুরস্ক গ্রহণ করবে—এমন নিশ্চয়তা চুক্তি দেয় না। বরং এ ধরনের ঘটনায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই হবে মূল বিষয়।তারপরও ভারতের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ চুক্তিটির সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য প্রভাব সরাসরি Article 1 বা collective defence ধারায় নয়, বরং তিন দেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতায়। তুরস্কের ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি, নৌ-প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক ইসলামাবাদের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতাকে আরও বাড়াতে পারে। একইসঙ্গে গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে সমন্বিত কূটনৈতিক অবস্থানও ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।এখানে আমাদের নিজস্ব বিশ্লেষণ হলো—মক্কা চুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এর সামরিক ধারা নয়, বরং তিন দেশের পারস্পরিক leverage। সৌদি আরব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব দিতে পারে, তুরস্ক দিতে পারে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, আর পাকিস্তান দিতে পারে সামরিক manpower ও একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের deterrence value। ফলে ভবিষ্যতে চুক্তিটি যদি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তাহলে এর রাজনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব আজকের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।তবে একই সঙ্গে চুক্তির দুর্বলতাও স্পষ্ট। তিন দেশের threat perception এক নয়। সৌদি আরবের নিরাপত্তা হিসাব মূলত পশ্চিম এশিয়াকে ঘিরে, তুরস্কের নিজস্ব আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে এবং পাকিস্তানের প্রধান নিরাপত্তা হিসাব ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি অভিন্ন চুক্তির অধীনে এই তিন ভিন্ন অগ্রাধিকার কতটা দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিত থাকবে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। Indian Express-এর আরেক বিশ্লেষণেও এই প্রশ্নটি উঠেছে—যৌথ প্রতিরক্ষার চুক্তি থাকলেই কার্যকর জোট তৈরি হয় না; প্রয়োজন অভিন্ন threat perception ও বাস্তব operational commitment।তাই ভারতের সামনে থারুর যে পথটি রেখেছেন, সেটি মূলত আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতি। তাঁর প্রস্তাবের তিনটি স্তম্ভ—credible deterrence, defence innovation এবং Gulf diplomacy। অর্থাৎ পাকিস্তানের সম্ভাব্য ভুল হিসাবের সুযোগ না দেওয়া, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানো এবং সৌদি আরবসহ Gulf দেশগুলির সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করা।বিশেষ করে Saudi-India সম্পর্ক এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও সৌদি আরবের সম্পর্ক এখন শুধু তেল বা প্রবাসী ভারতীয়দের ওপর নির্ভরশীল নয়; বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতাতেও এর বিস্তার ঘটেছে। ফলে রিয়াদ পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ হলেই যে দিল্লির সঙ্গে তার সম্পর্ককে বিসর্জন দেবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং ভারতের কৌশল হওয়া উচিত সৌদি আরবকে এমনভাবে নিজের সঙ্গে যুক্ত রাখা, যাতে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি নিরাপত্তা সহযোগিতা ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিকল্প হয়ে উঠতে না পারে।অতএব মক্কা চুক্তিকে ভারতের জন্য তাৎক্ষণিক সামরিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা যেমন ভুল, তেমনই একে নিছক প্রতীকী ঘোষণা বলে উড়িয়ে দেওয়াও ভুল। এটি একটি পরিবর্তনশীল পশ্চিম এশীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিফলন, যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নতুন অংশীদার খুঁজছে। পাকিস্তান এই পরিবর্তন থেকে কৌশলগত সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।কিন্তু এই নতুন সমীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনও সামনে। কারণ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের বাইরে আরও একটি দেশের নাম এই আলোচনায় ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে—বাংলাদেশ। ঢাকা যদি শেষ পর্যন্ত এই নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে মক্কা চুক্তির প্রভাব আর শুধু পশ্চিম এশিয়া বা ভারত-পাকিস্তান সমীকরণে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে। সেই সম্ভাবনা, বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি এবং ভারতের জন্য তার অর্থ—পরবর্তী পর্বের মূল প্রশ্ন।

শিশিরের শব্দের মতো ফিরে ফিরে আসে শরৎ

যারা প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, প্রকৃতির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকান, তাদের প্রতি আমার অন্যরকম ভালোবাসা। প্রকৃতিকে ভালোবাসে যে মানুষ, সে মানুষের হৃদয় সংকীর্ণ হতে পারে না। প্রকৃতিপ্রেমী মানুষেরা জাগতিক হলেও স্বচ্ছ জলাশয়ে শুভ্র মেঘের ছায়া দেখে তাদের মন অপার্থিব আনন্দে ভরে ওঠে। বর্ষা শেষে প্রকৃতি যখন স্নিগ্ধ উজ্জ্বল রূপে নিজেকে সাজায়, তখন মানুষের হৃদয়-আকাশেও রুপালি রোদ্দুরের উঁকিঝুঁকি! বর্ষাবসানে প্রখর উজ্জ্বলতা নয়, মায়াময় স্নিগ্ধতা মাখা অনির্বচনীয় সৌন্দর্য নিয়ে শরৎ উপস্থিত হয়। শরতের একধরনের স্তব্ধতা আছে। স্তব্ধতার ছন্দ আছে, গান আছে, ধ্বনি আছে, শব্দ আছে। কে শুনতে পায় সে শব্দ, ধ্বনি। বাংলার কবিরা তা শুনতে পান। তারা কান পেতে রাখেন সে শব্দ শোনার জন্য। জীবনানন্দ তাই বলেন, “সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে।” শিশিরের শব্দ শুনতে হলে কান পেতে থাকতে হয়। শরৎ, বসন্তের মতো উজ্জ্বল নয়। শরৎ নববধূর মতো লজ্জায় অবনত। লজ্জাবতী গাছের পাতার মতো। সামান্য স্পর্শে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। শরৎ অনেকটা বাঙালি জীবনের মতো। কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি। কখনো কাশের মতো সাদার ঢেউ খেলে যায় জীবনে, আবার নীল আকাশের মতো অনিন্দ্য সুন্দর রঙে জীবন ভরে ওঠে।শরতের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রোমান্টিক রবীন্দ্রনাথ শরতের শান্ত, সৌম্য রূপে বিভোর হয়ে প্রকৃতিতে ভেসে বেড়াতেন। শরতের নৈঃশব্দ্যের সৌন্দর্য তাকে নিয়ে যেত অন্য লোকে। বর্ষাবসানে ঝকঝকে প্রকৃতির আহ্বান তিনি শুনতে পেতেন। প্রকৃতির অনুষঙ্গগুলোর আগমনে তিনি পুলক বোধ করতেন। শরতের প্রতি অপার ভালোবাসা তিনি তার সঙ্গীতে, কবিতায় উন্মোচন করেছেন। তিনি যখন গীতিকবিতায় লেখেন—“শরতে আজ কোন্‌ অতিথি/ এল প্রাণের দ্বারে। / আনন্দগান গা রে হৃদয়, / আনন্দগান গা রে। / নীল আকাশের নীরব কথা / শিশির-ভেজা ব্যাকুলতা / বেজে উঠুক আজি তোমার / বীণার তারে তারে।”  আহা, কী অদ্ভুত শরৎবন্দনা। শরতের অনিন্দ্য সুন্দর কোমল সূর্যালোকে মুগ্ধ হয়ে তিনি লিখেছেন ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি।’ কী অপূর্ব বর্ণনা, মনে হয় যেন শরতের ছবি দৃশ্যমান করে তুললেন কলমের তুলি দিয়ে। এরকম বর্ণনা বাঙালি মনকে শরতের অপূর্ব রূপমাধুর্যকে অনুভব করার জন্য প্রস্তুত করেছে।বাংলাদেশের মানুষের জীবন বসন্তের উজ্জ্বল বাহারি রঙের মতো নয়, আবার শীতের প্রকৃতির মতো রুক্ষও বলা যাবে না। তবে বাঙালি জীবনে খরতপ্ত গ্রীষ্মের পর শান্তির বারি নিয়ে আসে বর্ষা। গ্রীষ্মের তপ্ত রোদ থেকে নিষ্কৃতি পেতে পাখিরাও আশ্রয় খোঁজে গাছের ডালে। রৌদ্রের তীব্রতা এড়াতে পথেঘাটে মানুষ খোঁজে একটুখানি ছায়া। প্রচণ্ড গরমে যখন প্রশান্তির ছায়ার আশ্রয় খোঁজে সকল শ্রেণির মানুষ, তখনও গ্রীষ্মের রৌদ্রতাপ থেকে বাঁচতে ছায়ায় আশ্রয় নেওয়ার মতো সময় পায় না শ্রমজীবী মানুষ। অসহ্য গরমকে উপেক্ষা করে অবিচলভাবে চলতে থাকে তাদের জীবন ও জীবিকা। প্রান্তিক বাঙালির কঠিন জীবনে রূপ, রসের ধারা বইয়ে দিয়ে বর্ষা আসে, বর্ষার অপরূপ ছন্দময় বৃষ্টি অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। বর্ষাবসানে স্নিগ্ধ, সুন্দর, মার্জিত বাঙালি বধুর মতো শরৎ ঘোমটা খোলে। প্রকৃতির ঘোমটা কিন্তু ঝলমলে উজ্জ্বল বেনারসি শাড়ির মতো নয়, বাংলার কারিগরদের শিল্পিত হাতে তৈরি মার্জিত জামদানি শাড়ি। এই শিল্পিত সুন্দর ঋতুকে ভালো না বেসে থাকতে পারেননি বাংলার কবি, চিত্রশিল্পী থেকে শুরু করে সকল সৃষ্টিশীল মানুষ। শরতের স্নিগ্ধতায় মোহগ্রস্ত হয়েছিলেন মহাকবি কালিদাস। কালিদাসই প্রথম বলেছিলেন শরৎ নববধূর মতো। কী অসাধারণ উপস্থাপনা। কালিদাস বলেছিলেন, “প্রিয়তম আমার ঐ চেয়ে দেখ/ নব বধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎকাল সমাগত”।আমরা কী দেখেছি নববধূর মতো সমাগত শরৎকালকে। যারা আমার মতো নগরে বসবাস করেন, তাদের বর্ষা ছাড়া আর কোনো ঋতুকে দেখার সুযোগ হয় না। অন্য ঋতুগুলোকে অনুভব করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক বদ্ধ ঘরের ভেতর নৃত্য, গীত সহকারে বসন্তবরণ, বর্ষা উদযাপন কিংবা হেমন্তকালে নবান্ন উৎসবে উপস্থিত হয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলার বকুলতলায় উদযাপন করা হয় প্রতি বছর শরৎ উৎসব। নাচ, গান আর আবৃত্তির মধ্য দিয়ে শরৎবন্দনায় অংশ নেন শিল্পীরা। চারুকলায় নবান্ন উদযাপিত হয়, বর্ষবরণ হয়, প্রতিটি ঋতুর আবাহন করে চারুকলার শিক্ষার্থীরা। একইভাবে সারা দেশে বিভিন্ন বদ্ধ ঘরে অথবা কৃষ্ণচূড়া, শিরীষ প্রাঙ্গণে ঋতু আবাহন ও বন্দনা করা হয়। প্রতিটি ঋতুর অপার্থিব সৌন্দর্যে স্নাত হওয়া আর বদ্ধ ঘরে কিংবা ছাদের নিচের কৃষ্ণচূড়া তলায় ঋতুকে আবাহন করার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। এভাবে অংশ নিয়ে ঋতুকে কী অনুভব করা যায় না। শুধু মাত্র ঋতুর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা যায়।আমরা যদি প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যকে পান করতে চাই, জীবনে সুন্দরকে আবাহন করতে চাই, তাহলে বৈচিত্র‍্যময় ঋতুর স্পর্শ পেতে হবে। শরৎ সন্ধ্যায় আল-ধরা পথ ধরে, ডানে-বামে সামান্য সোনালি রঙের ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে একা একা হেঁটে গেলে মানুষ উদাসী হয়ে যায়। এই যে মনের ঔদাসীন্য, তা হলো শরতের সঙ্গে মনের যোগসূত্র ঘটানো। খালি পায়ে শিশিরের স্পর্শের অনুভূতি, মনের ভেতরের বাউল মানুষকে জাগিয়ে তুলে। মানুষের ভেতরের দার্শনিক মানুষ যখন জেগে ওঠে, তখন মানুষ আর অমানুষ হতে পারে না। থোকা থোকা শিউলির সৌন্দর্য পিপাসু হয়ে পড়ে। সত্য, সুন্দর তার সহযাত্রী হয়।শরৎ মানেই শিউলি ফোটার দিন। শিউলির মধুগন্ধ ভেসে বেড়ানোর দিন। শিউলির আরেক নাম শেফালি। আগের দিনে কবিরা শেফালি নামটাই বেশি ব্যবহার করেছেন। শিউলি বা শেফালি যা-ই বলি না কেন, ফুলটি হলো বাংলার শরতের প্রতীক। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আরণ্যক' উপন্যাসে শিউলির বিশাল বন ও তার তীব্র ঘ্রাণের কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ সবাই বারবার শিউলির প্রশস্তি গেয়েছেন।প্রেমের কবি, প্রেমিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম সবার অলক্ষ্যে শিউলির সৌন্দর্য বিসর্জনকে দেখেছেন বিরহ জড়ানো গভীর দুঃখবোধ হিসেবে। তিনি গেয়েছেন “'তোমারি অশ্রু জলে শিউলি তলে সিক্ত শরতে/হিমানীর পরশ বুলাও ঘুম ভেঙে দাও...'। প্রেমের কবিকে শিউলির অপরূপ সৌন্দর্য অন্যরকম প্রেমাতুর করে তুলত। শারদ রাতে তিনি আকুল হয়ে উঠতেন। তার সেই অমর সঙ্গীতে শিউলির প্রতি তার ভালোবাসার মূর্তিমান হয়ে ওঠে। “শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ/এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথি কই।” শারদ রাতে শিউলি ফুলের প্রতি তার এই আকুলতা চিরদিন প্রেমিক হৃদয়ে ঢেউ তুলে যাবে।শরতে নদীর রূপে একধরনের স্নিগ্ধ মুগ্ধতা খুঁজে পাওয়া যায়। মনে হয় শান্ত মেয়ের আঁচল ওড়ে যায় শরতের নদীর ঢেউয়ের ছন্দের তালে। নদীর দু-কূল ছাপিয়ে বানের জলকে সরিয়ে দিয়ে আন্দোলিত হয় কাশবন। কাশের পেলব পাপড়িগুলো দিনমান হাওয়ায় দোলে, বাতাসে উড়ে যেতে চায়। কাশের বনের শ্বেত সমুদ্রের ঢেউ, ধ্যানমগ্ন হয়ে না দেখলে শরতের অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্যকে প্রায় দেখা হয়ে ওঠে না বললেই চলে। কাশের বন, নদীর ঢেউ, সুনীল আকাশের দূরগামী মেঘ যখন দিগন্ত ছাপিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে খেলা করে, তখন বাংলার শরৎ দৃশ্যমান হয় প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষের সম্মুখে।ফিরে আসি প্রথম কথায়, প্রকৃতিকে ভালোবাসার মানুষেরা মানুষকে ভালো না বেসে পারেন না, মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। মানুষ যদি প্রকৃতির অংশ হয়ে নিজ হাতে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, তাহলে প্রকৃতির অংশ হিসাবে মানুষ কোনোভাবেই তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হবে না। প্রকৃতিকে ভালোবাসা, হৃদয় থেকে যেমন উৎসারিত হয়, একইভাবে প্রকৃতিকে ভালোবাসার গুরুত্বও বুঝিয়ে দিতে হয়।শরতের দিনগুলোকে যেন স্বপ্নের মতোই মনে হয়। চারপাশে ছড়িয়ে থাকে অনেক স্বপ্ন। আমরা সেসব স্বপ্ন কুড়িয়ে নিয়ে ভাবতে বসি কত কিছু! শরতের এই শুভ্র রূপ পবিত্রতার প্রতীক। এই পবিত্রতা দিয়ে আমরা অমানবিক মনকে পরিবার, সমাজ, দেশ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাই আমাদের সুবর্ণ ভূমির অনেক বাইরে।[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় চাই খামারভিত্তিক কৌশল

দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ক্ষতিকর ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বা অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা ও প্রতিবেদন আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্লাস্টিক দূষণ যে এখন আর কেবল নদী, সমুদ্র কিংবা শহরের ডাস্টবিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা অত্যন্ত নীরবে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ঢুকে পড়েছে, দুধের এই চিত্র তারই অকাট্য প্রমাণ। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে এ নিয়ে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ফলে বাজারগুলোতে দুধ পরীক্ষার কড়াকড়ি এবং ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চারদিকে আলোচনা চলছে।ভোক্তাদের এই উদ্বেগ মোটেও অমূলক নয়। তবে এই চলমান জনআলোচনার আড়ালে সংকটের আসল গোড়াটি অধরাই থেকে যাচ্ছে। দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিক ধরা পড়া মানে সমস্যার শুরু নয়; বরং এটি আমাদের অসচেতন ও অপরিকল্পিত কৃষি-পরিবেশগত অব্যবস্থাপনার একটি অনিবার্য শেষ পরিণতি।নিশ্চিতভাবেই দুধ পরীক্ষা করা জরুরি।  এটি ভোক্তাকে সাময়িক সচেতনতা দেয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সতর্ক করে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ একটি ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ ব্যবস্থা। পরীক্ষা কেবল আমাদের বলে দেয় যে দুধ দূষিত হয়েছে, কিন্তু তা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়,সেই স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না।  মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে সত্যিকার অর্থে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের নজর দিতে হবে খামারের দিকে, যেখানে এই বিষাক্ত কণাগুলো প্রথম খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে।লক্ষণীয় বিষয় হলো, মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি দুধে তৈরি হয় না। এগুলো অনেক আগেই জমা হয় আমাদের কৃষিজমি, পশুখাদ্য এবং খামারের পানিতে।  দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পবর্জ্য মিশ্রিত পানি দিয়ে সেচ দেওয়া, স্লাজ সার হিসেবে ব্যবহার এবং কৃষিতে প্লাস্টিক মালচিং- এর অবাধ ব্যবহারের কারণে কৃষিজমিতে প্লাস্টিক কণা জমছে।  এ ছাড়া ফসলের মাঠের পাশে যেখানে-সেখানে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে তা ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে যায়।  এই মাটিতে যে ঘাস, ভুষি বা খড় উৎপাদিত হয়, তা গবাদিপশু খাওয়ার মাধ্যমে সরাসরি তাদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক বহন করে নিয়ে যায়।পশুখাদ্যের বাণিজ্যিক সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় ঝুঁকি আরও বেশি। বাণিজ্যিক পোলট্রি ফিড, গরুর দানাদার খাদ্য কিংবা মাছের খাবার সাধারণত প্লাস্টিকের বস্তায় সংরক্ষণ ও পরিবহন করা হয়।  পরিবহনকালীন ঘর্ষণ, অতিরিক্ত তাপ বা প্লাস্টিকের বস্তার ক্ষয় থেকে অতিক্ষুদ্র কণা খাদ্যের সঙ্গে মিশে যায়। আবার শহরতলির ডেইরি খামারগুলোতে দেখা যায়, গরু প্রায়ই রাস্তার পাশে বা আবর্জনার স্তূপ থেকে খাবার খুঁজতে গিয়ে পলিথিন গিলে ফেলে। এই প্লাস্টিক কণাগুলো প্রাণীর শরীরে ঢুকলে তা কেবল বর্জ্য হিসেবে মলমূত্রের সাথে বেরিয়ে যায় না, বরং প্রাণীর শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া করে।খামারের পানিও এই দূষণের আরেকটি বড় উৎস।  গবাদিপশু যে পুকুর, খাল বা ভূগর্ভস্থ পানি পান করে, তাতে সিন্থেটিক ফাইবার, গাড়ির টায়ারের ক্ষয় থেকে তৈরি অতিক্ষুদ্র কণা এবং প্লাস্টিকের ভাঙা অংশ মিশে থাকে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় এই উৎসগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত, এবং বাংলাদেশের কৃষি-পরিবেশও এখন হুবহু একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।প্রাণীর শরীরে এই প্লাস্টিক কণার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা খুবই সীমিত। মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রাণীর শরীরে ঢুকলে তা ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্রের দেয়ালে ক্রমাগত ঘর্ষণ ও প্রদাহ সৃষ্টি করে। এতে অন্ত্রের প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হজম ও রোগপ্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ‘মাইক্রোবায়োম’ -এর ভারসাম্য নষ্ট হয়। দুগ্ধবতী গাভী ও পোলট্রির ক্ষেত্রে এই অস্বাভাবিকতা খাদ্য হজমের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে এবং নানাবিধ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।মাইক্রোপ্লাস্টিকের আরেকটি ভয়ঙ্কর বৈশিষ্ট্য হলো ‘প্লাস্টিস্ফিয়ার’ তৈরি করা। এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলোর ওপর ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জমে একধরনের জৈব আস্তরণ বা ‘বায়োফিল্ম’ তৈরি করে, যেখানে বিভিন্ন রোগজীবাণু এবং অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া খুব সহজেই বংশবৃদ্ধি করতে পারে। যখন এই প্লাস্টিস্ফিয়ার প্রাণীর অন্ত্রে প্রবেশ করে, তখন তা ক্ষতিকর জীবাণুর বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।  এর ফলে প্রাণী ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ে, চিকিৎসায় জটিলতা দেখা দেয় এবং খামারিদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।  এটি মূলত বৈশ্বিক উদ্বেগের অন্যতম কারণ,অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধির একটি অন্যতম অনালোচিত পথ।এই পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তীব্র তাদপ্রবাহ। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে গবাদিপশু মারাত্মক ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপজনিত চাপের মধ্যে থাকে।  উচ্চ তাপমাত্রা এমনিতেই পশুর খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দেয় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে। এই তাপজনিত চাপের কারণে যখন অন্ত্রের সুরক্ষা ভেঙে পড়ে, তখন মাইক্রোপ্লাস্টিক আরও সহজে অন্ত্র ভেদ করে প্রাণীর রক্তপ্রবাহে ঢুকে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত দুধের মাধ্যমে মানবদেহে পৌঁছায়। সুতরাং, ল্যাবরেটরিতে দুধে যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে, তা আসলে খামারের সামগ্রিক পরিবেশগত সংকটের শেষ ধাপ মাত্র।দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের বর্তমান নীতিনির্ধারণী দৃষ্টিভঙ্গি এখনো সমস্যার ভুল জায়গায় আলো ফেলছে। প্লাস্টিক দূষণকে আমরা এখনো কেবল সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখি।  আর খাদ্য নিরাপত্তা তদারকি করা হয় কেবল শহরের বাজারে তৈরি পণ্য বা দুধ পরীক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু কৃষি জমি, পশুখাদ্য এবং খামারের পানি,যেখান থেকে মূল দূষণ ছড়াচ্ছে, তা পুরোপুরি নজরদারির বাইরে।  বাংলাদেশে পশুখাদ্যে বা কৃষিজমির পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো সর্বোচ্চ সহনশীলতার মানদণ্ড নেই। পাশাপাশি, ভেটেরিনারি জনস্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ও অত্যন্ত সীমিত।দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে আমাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও খামার ব্যবস্থা প্লাস্টিক দূষণের আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। যদি আমরা সত্যি সত্যি নিরাপদ দুধ ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চাই, তবে আমাদের কৌশল বদলাতে হবে।  বাজার থেকে নমুনা পরীক্ষা করার চিরাচরিত প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে খামার পর্যায় থেকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।কৃষিজমির পানি ও মাটিতে প্লাস্টিক কণার অনুপ্রবেশের ওপর নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে পশুখাদ্যের উৎপাদন, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণে প্লাস্টিকের বিকল্প নিরাপদ উপাদানের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। সর্বোপরি, ভেটেরিনারি জনস্বাস্থ্য গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব ও এএমআর ঝুঁকিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্ষতিকর উপাদানকে খাদ্যচক্রে ঢোকার আগেই যদি আমরা খামার পর্যায়ে রুখে দিতে না পারি, তবে কেবল শেষ মুহূর্তের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।[লেখক: সাবেক ডিন, ফ্যাকাল্টি অব অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন; সাবেক চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথশেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়]

পাহাড়ের উৎসবের দিন পাবলিক পরীক্ষা?

প্রতিবছর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পাবলিক পরীক্ষার রুটিনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সামাজিক উৎসব—বৈসুক, সাংগ্রাই, বিঝু, বিহু, চাংক্রান ও চৈত্রসংক্রান্তির দিনগুলোতে পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার রুটিনও এর ব্যতিক্রম নয়। গত ২৪ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রুটিনে দেখা যায়, ১৩ এপ্রিল জীববিজ্ঞান ও অর্থনীতি এবং ১৫ এপ্রিল সব ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের পরীক্ষা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ ১৩ এপ্রিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রধান উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ দিন। ফলে পরীক্ষার্থীদের একদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি, অন্যদিকে পারিবারিক ও সামাজিক উৎসবে অংশ নেওয়ার মধ্যে বেছে নিতে হবে—যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বর্ষবিদায় ও নববর্ষবরণ উপলক্ষে প্রতিবছর ১১ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত নানা সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উৎসব পালন করে। সম্প্রদায়ভেদে উৎসবের নাম ভিন্ন হলেও এর উদ্দেশ্য ও চেতনা অভিন্ন। পরিবারের সদস্যরা একত্র হন, সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করেন এবং নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনাচারের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করেন। বিঝু এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক উৎসব। নাচ-গানসহ নানা আয়োজনে পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে অনেক মানুষ এতে অংশ নেন। ফলে এসব উৎসব এখন শুধু কোনো একটি জনগোষ্ঠীর বিষয় নয়; পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরই অংশ।ঐতিহাসিকভাবেও এসব উৎসবের সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে বিঝু উৎসব উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয়, আদালত ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরে ছুটি থাকত। তাই এ সময়ের ছুটিকে বিঝু ছুটি বা বিঝু উৎসবের ছুটি বলা হতো। পরবর্তী সময়ে রমজান উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটি চালু হওয়ায় সেই প্রথা আর থাকেনি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সামাজিক উৎসবগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। অন্তত পাঁচ দিন—১১ থেকে ১৫ এপ্রিল—সাধারণ ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি বৈচিত্র‍্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে। সেই অন্তর্ভুক্তির বাস্তব প্রতিফলন শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাতেও থাকা প্রয়োজন। কোনো জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসবের দিন পাবলিক পরীক্ষা নির্ধারণ করা হলে সেই অন্তর্ভুক্তির চেতনা প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষ করে এসএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ পরীক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার্থী নয়; তারাও কোনো পরিবার, সম্প্রদায় ও সংস্কৃতির অংশ।এখনও ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার আগে যথেষ্ট সময় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষার রুটিনটি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। অন্তত ১১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে কোনো পাবলিক পরীক্ষা না রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের দিনগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এটি কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দাবি নয়; বরং একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মানের প্রকাশ।বৈসুক, সাংগ্রাই, বিঝু, বিহু, চাংক্রান, বিষু ও চৈত্রসংক্রান্তি আবহমান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। এসব উৎসব পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই প্রধান উৎসবের দিনগুলোতে পাবলিক পরীক্ষা না নেওয়া এবং উৎসব উপলক্ষে অন্তত পাঁচ দিনের সাধারণ ছুটি বিবেচনা করা সময়ের দাবি। রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে, যখন সংখ্যাগরিষ্ঠের পাশাপাশি প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উৎসবকে সমান মর্যাদা দেবে। ধর্ম যার যার, উৎসব হোক সবার—এই চেতনাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সভাপতি, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাজদ্বীপ, রাঙ্গামাটি]

সারের দেশে ক্ষুধার্ত মাটি

জৈব পদার্থের ঘাটতি, পুষ্টির ভারসাম্যহীনতা ও নিবিড় চাষের চাপে নীরবে দুর্বল হচ্ছে বাংলাদেশের মাটি। যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত এসে পড়বে খাদ্যনিরাপত্তায়।বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার গল্প আমরা সাধারণত ধানের ফলন, সারের দাম, সেচের খরচ কিংবা বাজারে চালের দামের মধ্যেই খুঁজি। অথচ এই পুরো ব্যবস্থার নিচে যে ভিত্তিটি নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছে সেই মাটির স্বাস্থ্যের দিকে আমাদের নজর তুলনামূলকভাবে কম।একটি জমি বছরের পর বছর ফসল দিতে থাকলেই যে সেই জমি সুস্থ আছে, বিষয়টি তেমন নয়। বরং অধিক ফসল উৎপাদনের চাপেই মাটি ধীরে ধীরে তার জৈব পদার্থ, পুষ্টির ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য এবং পানি ধারণক্ষমতা হারাতে পারে। এই কারণেই বাংলাদেশের কৃষিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হওয়া উচিত। আমরা কি শুধু ফসল উৎপাদন করছি, নাকি একই সঙ্গে মাটিকেও পুনর্গঠন করছি?জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশের নিচে। আর আরও প্রায় ২৮ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে তা ১ থেকে ১.৭ শতাংশের মধ্যে। এই চিত্র নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের কৃষিজমির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তা। জৈব পদার্থ কেবল গাছের খাদ্য নয়। এটি মাটির দানাদার গঠন উন্নত করে, পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে, পুষ্টি সংরক্ষণ করে এবং অণুজীবের কার্যক্রমকে সক্রিয় রাখে। ফলে মাটির জৈব পদার্থ কমে গেলে শুধু উর্বরতা নয়, মাটির সামগ্রিক কার্যক্ষমতাও দুর্বল হয়।সার বাড়ছে, কিন্তু মাটির স্বাস্থ্য কি বাড়ছে? এখানেই বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। বিশ্বব্যাংক-এর খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর আবাদি জমিতে প্রায় ৩৯১.৯ কেজি সার-পুষ্টি উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।কিন্তু বেশি সার ব্যবহার মানেই বেশি উর্বর মাটি নয়।সমস্যাটি সারের পরিমাণের পাশাপাশি পুষ্টির ভারসাম্য, মাটির প্রকৃত চাহিদা এবং প্রয়োগ পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি ফসল যখন জমি থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিংক, বোরনসহ বিভিন্ন পুষ্টি গ্রহণ করে, সেই পুষ্টির একটি অংশ শস্য ও খড়ের সঙ্গে মাঠের বাইরে চলে যায়। এই ঘাটতি যদি যথাযথভাবে পূরণ না হয়, তাহলে মাটি ধীরে ধীরে নিজের সঞ্চিত পুষ্টি হারাতে থাকে।কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মাটির পুষ্টি উপাদান নিঃশেষকরণ’। মাটি থেকে পুষ্টি আহরণ চলতে থাকে। কিন্তু পুনঃস্থাপন হয় তার চেয়ে কম।বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি নতুন নয়। বিশেষ করে নিবিড় চাষ, একাধিক ফসলের চাপ এবং গৌণ ও অণুপুষ্টির অসম ব্যবহারের কারণে অনেক এলাকায় মাটির পুষ্টিগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষিতে আরেকটি নীরব পরিবর্তন ঘটেছে। ফসলের অবশিষ্টাংশের বড় অংশ পশুখাদ্য, জ্বালানি বা অন্য কাজে মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। গোবরও আগের মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে জমিতে ফেরে না।ফলে যে জৈব পদার্থ স্বাভাবিকভাবে মাটিতে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, সেটিও কমে যাচ্ছে।  এফএও-এর মূল্যায়নেও নিবিড় চাষ, উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় জৈব পদার্থের দ্রুত পচন, কম জৈব সার ব্যবহার এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে না ফেরানোকে মাটির জৈব পদার্থ কমে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ আমরা জমি থেকে শুধু শস্য তুলে নিচ্ছি না, অনেক ক্ষেত্রে মাটির নিজস্ব পুনরুদ্ধারের উপাদানটুকুও সরিয়ে নিচ্ছি। ফলে একই ফলন ধরে রাখতে ক্রমে বাইরের ইনপুট-এর ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, অথচ মাটির নিজস্ব উৎপাদনক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য সতর্কবার্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির বাস্তবতা দেশের অনেক অংশের চেয়ে আলাদা। দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম, উচ্চ তাপমাত্রা, সীমিত মাটির আর্দ্রতা এবং সেচের ওপর নির্ভরতা সবকিছু একসঙ্গে এ অঞ্চলের কৃষিকে চাপের মধ্যে রাখে। এ অঞ্চলে একই জমিতে নিবিড়ভাবে ধান, গম, ভুট্টা, আলু কিংবা অন্যান্য ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে শুধু নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাসিয়ামনির্ভর চিন্তা যথেষ্ট নয়। সালফার, জিংক, বোরনসহ গৌণ ও অণুপুষ্টির ভারসাম্য যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি মাটিতে জৈব পদার্থ ফিরিয়ে দেওয়া।বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো পানি-সংকটাপন্ন এলাকায় মাটির স্বাস্থ্যকে শুধু মাটি উর্বরকরণ ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীলতার প্রশ্ন। কারণ সুস্থ, জৈব পদার্থসমৃদ্ধ মাটি তুলনামূলকভাবে বেশি পানি ধরে রাখতে পারে। খরার সময় এই বৈশিষ্ট্য ফসলকে টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। মাটির অসুখের চিকিৎসা শুধু কিন্তু ইউরিয়া নয়। যে কারণে আধুনিক কৃষিতে এখন শুধু “কত কেজি সার দেব”এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত কোন জমিতে, কোন ফসলে, কোন পুষ্টি, কতটুকু এবং কখন প্রয়োজন?বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)-এর সার সুপারিশমালা হাতবই ২০২৪-এও মাটির অবস্থা, স্থানভেদ এবং পরীক্ষাভিত্তিক সুপারিশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনা, জৈব অনুজীব সার, জৈব অঙ্গার, চুন প্রয়োগ, পুষ্টি উপাদান ব্যবহারের দক্ষতা এবং কৃষিতে উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদান ব্যবহারের কার্যকারিতা-এর মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।  এটাই ভবিষ্যতের পথ। প্রথমত, মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সার প্রয়োগ-কে নিয়মিত কৃষিচর্চার অংশ করতে হবে। মানুষের শরীর পরীক্ষা না করে যেমন ওষুধ দেওয়া যুক্তিসংগত নয়, তেমনি জমির অম্লত্ব, জৈব পদার্থ ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের অবস্থা না জেনে বছরের পর বছর একই মাত্রায় সার প্রয়োগ করাও বৈজ্ঞানিক নয়।দ্বিতীয়ত, সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা মাঠপর্যায়ে আরও শক্তভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এর অর্থ রাসায়নিক সার বাদ দেওয়া নয়; বরং রাসায়নিক সার, গোবর, কম্পোস্ট, সবুজ সার, ফসলের অবশিষ্টাংশ, ডালজাতীয় ফসল এবং প্রয়োজনমতো জৈবসার—সবকিছুর সমন্বিত ব্যবহার।তৃতীয়ত, কৃষকের কাছে শুধু সার পৌঁছানো নয়, মাটিতে জৈব পদার্থ ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় ও প্রণোদনাও পৌঁছাতে হবে।চতুর্থত, শস্যবিন্যাসে ডালজাতীয় ও মাটির স্বাস্থ্য পুনর্গঠনকারী ফসল বাড়াতে হবে।পঞ্চমত, ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনা-কে কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশের সব মাটির জন্য একই প্রেসক্রিপশন দেওয়া যাবে না। অঞ্চল, মাটির ধরন, ফসল এবং মাটি পরীক্ষার গুরুত্ব অনুযায়ী সুপারিশ আলাদা হওয়াই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। বলা ভালো, সমস্যা চিহ্নিত করলেই কাজ শেষ হয় না। এখন দরকার এমন কিছু পদক্ষেপ, যা একই সঙ্গে কৃষক, সম্প্রসারণব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারণ তিন স্তরেই কাজ করবে।এক. ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সহজলভ্য মাটি পরীক্ষার সেবা বাড়াতে হবে। মাটি পরীক্ষা যেন প্রকল্পনির্ভর বা কাগুজে কাজ না হয়ে নিয়মিত কৃষিচর্চার অংশ হয়।দুই. শুধু রাসায়নিক সারে ভর্তুকি নয়, জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনা-এও প্রণোদনা দিতে হবে। কম্পোস্ট, সবুজ সার, গোবরের কার্যকর ব্যবহার এবং স্থানীয়ভাবে জৈব উপাদান তৈরির উদ্যোগ বাড়ানো দরকার।তিন. ঢালাও মাত্রা-এর বদলে জমি-নির্দিষ্ট সার সুপারিশ চালু করতে হবে। একই ফসল হলেও ভিন্ন মাটি, ভিন্ন কৃষি-পরিবেশগত অঞ্চল ও ভিন্ন পুষ্টি অবস্থায় একই মাত্রার সার বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়।চার. শস্যবিন্যাসে ডালজাতীয় ও মাটি পুনরূদ্ধারকারী ফসল বাড়াতে হবে। শুধু উচ্চ পুষ্টি-গ্রাহী ফসলের পুনরাবৃত্তি না করে এমন ফসল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা মাটির ভারসাম্য পুনর্গঠনে সহায়তা করে।পাঁচ. শস্যের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো এবং সম্পূর্ণ অপসারণ কমিয়ে অবশিষ্টাংশ বা বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বাড়াতে হবে। যতটা সম্ভব ফসলের অবশিষ্টাংশকে মাটির সম্পদ হিসেবে ফিরিয়ে দিতে হবে।ছয়. বরেন্দ্রসহ পানি-সংকটাপন্ন অঞ্চলে জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনা, মাটি ঢাকা পদ্ধতি এবং পানি সাশ্রয়ী সেচ-কে একসঙ্গে নিতে হবে। এখানে মাটির স্বাস্থ্য ও পানির দক্ষ ব্যবহারকে আলাদা করে দেখা যাবে না।সাত. কৃষি সম্প্রসারণে ফলনের পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য নির্দেশক পর্যবেক্ষণ শুরু করতে হবে। শুধু কত টন ফসল হলো, তা নয় মাটির জৈব পদার্থ, অম্লত্ব, পুষ্টির ভারসাম্য ও পানি ধারণক্ষমতার পরিবর্তনও নীতিগতভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার।জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে সুস্থ মাটিই প্রথম প্রতিরক্ষা। তাই মাটির উর্বরতা এখন আর শুধু কৃষিবিজ্ঞানের বিষয় নয়। এটি সরাসরি জলবায়ু অভিযোজনের সঙ্গেও যুক্ত। বাংলাদেশে কখনো খরা, কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো বন্যা, আবার উপকূলে লবণাক্ততা কৃষিকে আঘাত করছে। এমন অবস্থায় শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন করলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।যে মাটিতে সেই জাতটি জন্মাবে, সেই মাটিকেও সহনশীল হতে হবে। সুস্থ মাটি পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে, পুষ্টি সংরক্ষণ করে এবং প্রতিকূল পরিবেশে ফসলকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেয়। তাই জলবায়ু-সপ্রতিভ কৃষি-এর আলোচনায় মাটির স্বাস্থ্য-কে কেন্দ্রীয় জায়গায় আনতে হবে।বাংলাদেশ বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও খাদ্য উৎপাদনে অসাধারণ অগ্রগতি করেছে। এখন আমাদের সামনে দ্বিতীয় প্রজন্মের চ্যালেঞ্জ এই উৎপাদনকে টেকসই করা। কোনো জমি আজ ৬ টন ধান দিল কি না, সেটিই তার স্বাস্থ্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। সেই জমি আরও ২০ বছর একই উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে কি না, সেটিও খাদ্যনিরাপত্তার হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। মাটিকে একটি ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে তুলনা করা যায়। প্রতিটি ফসলের সঙ্গে আমরা সেই ব্যাংক থেকে পুষ্টির একটি অংশ তুলে নিচ্ছি। কিন্তু জমা না দিয়ে শুধু উত্তোলন চলতে থাকলে একসময় মূলধন কমে যায়। আমাদের কৃষিতেও তেমনি ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে এক বিশাল মাটির ঋণ।আর সেই ঋণের মূল্য শুধু কৃষক দেবেন না। দেবে ভোক্তা উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও খাদ্যমূল্যের মাধ্যমে। দেবে জাতীয় অর্থনীতি বাড়তি কৃষি-ইনপুট ও সহায়তার মাধ্যমে। আর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কম উৎপাদনক্ষম কৃষিজমির মাধ্যমে। তাই বাংলাদেশের আগামী কৃষিনীতি শুধু “কত খাদ্য উৎপাদন হলো” এই প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না। পাশাপাশি জানতে হবে মাটির জৈব পদার্থ বাড়ছে না কমছে, পুষ্টির ভারসাম্য কোন দিকে যাচ্ছে, এবং দীর্ঘমেয়াদে আমাদের কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা কতটা টেকসই থাকছে।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সাধারণ। যে মাটি আমাদের প্রতিদিনের ভাতের থালা ভরে দিচ্ছে, সেই মাটিকে আমরা কতটুকু ফিরিয়ে দিচ্ছি? কারণ খাদ্যনিরাপত্তার শেষ লড়াইটি শুধু বাজারে নয়, সারের গুদামেও নয়। শেষ লড়াইটি হবে মাটির ভেতরে।মাটি ক্ষুধার্ত রেখে কোনো দেশ দীর্ঘদিন খাদ্যে নিরাপদ থাকতে পারে না।লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও শিক্ষক

ভিডিও আরও দেখুন

বার্মিংহামে লজ্জার মুখে পাকিস্তান, হোয়াইটওয়াশের আশঙ্কা

বার্মিংহামের এজবাস্টনে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্টে রানের পাহাড়ের নিচে চাপা পড়েছে পাকিস্তান। ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে সংগৃহীত বড় লিডের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ৫২ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে দ্বিতীয় দিন শেষ করেছে সফরকারীরা। ইনিংস হার এড়াতেই বাবর আজমের দলকে এখনো করতে হবে আরও ২৬৮ রান, হাতে রয়েছে ৮টি উইকেট।লিডস ও লর্ডসে হেরে আগেই সিরিজ হাতছাড়া করা পাকিস্তান এই ম্যাচে প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৩৩ রানেই গুটিয়ে যায়। জশ টাংয়ের ৪টি এবং ওলি রবিনসন ও জফরা আর্চারের ৩টি করে উইকেটে চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে তারা। সৌদ শাকিল সর্বোচ্চ ৪৩ রান করেন।জবাবে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে ৪৫৩ রানের বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করায় ইংল্যান্ড, তুলে নেয় ৩২০ রানের পর্বতসম লিড। স্বাগতিকদের পক্ষে পাঁচজন ব্যাটার হাফ-সেঞ্চুরি হাঁকান–অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক ৭৫, ড্যান লরেন্স ৬৫, জেমি স্মিথ ৬৯, এমিলিও গে ৬০ এবং আট নম্বরে নেমে ওলি রবিনসন করেন ৫০ রান।দ্বিতীয় ইনিংসে ৩২০ রানে পিছিয়ে থেকে ব্যাট করতে নেমে আবারও ধাক্কা খায় পাকিস্তান। ওলি রবিনসনের আগুনে বোলিংয়ে শূন্য রানে সাজঘরে ফেরেন দুই ওপেনার সাইম আইয়ুব ও আবদুল্লাহ শফিক। বিশেষ করে সাইম আইয়ুব চলতি টেস্টের দুই ইনিংসে পেতেন কোনো রানের মুখ না দেখেই বিদায় নেন।দিন শেষে আজান আওয়াইস ও অধিনায়ক শান মাসুদ অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। তিন টেস্টের সিরিজে ইতোমধ্যে ২–০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা ইংল্যান্ডের সামনে এখন পাকিস্তানকে ৩–০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করার বড় সুযোগ।\ 

বার্মিংহামে লজ্জার মুখে পাকিস্তান, হোয়াইটওয়াশের আশঙ্কা