সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
সেনা-সংকটে পতনের মুখে ইসরায়েল

সেনা-সংকটে পতনের মুখে ইসরায়েল

ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান বহুমুখী যুদ্ধের চাপে ইসরায়েল সামরিক বাহিনী ‘ভেতর থেকে পতনের’ কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির সেনাপ্রধান ইয়াল জামির। নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে তিনি এ সতর্কতা তুলে ধরেন। ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ অহরোনথের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাপ্রধান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে সংরক্ষিত বাহিনী ‘টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না’।জামির তাঁর বক্তব্যে ১০টি ‘লাল সংকেত’ উল্লেখ করে পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, চরমপন্থী ইহুদিদের (হারেদি) সেনাবাহিনীতে নিয়োগ, রিজার্ভ আইনে সংশোধন এবং বাধ্যতামূলক সেবার মেয়াদ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যা সমাধানে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে সামরিক বাহিনীতে তীব্র জনবল সংকট তৈরি হয়েছে।বর্তমানে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী গাজা উপত্যকা, লেবানন, সিরিয়া এবং পশ্চিম তীর- একাধিক ফ্রন্টে একযোগে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। জামির সতর্ক করে বলেন, পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সেখানে অতিরিক্ত ইউনিট মোতায়েন করতে বাধ্য করেছে। এতে ইতিমধ্যে চাপে থাকা সেনা সদস্যদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।তিনি আরও জানান, সরকার এখনো সঙ্কট নিরসনে প্রয়োজনীয় আইন পাস করতে পারেনি, যা বিদ্যমান বাহিনীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তাঁর মূল্যায়নে, শিগগিরই স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও সামরিক বাহিনী তাদের কার্যভার পালনে অক্ষম হয়ে পড়তে পারে। বর্তমান চাপ অব্যাহত থাকলে ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তুতিতে গুরুতর পতন ঘটবে বলে সতর্ক করেছেন সেনাপ্রধান। সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর
২ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

ইরান যুদ্ধ: বাংলাদেশের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রভাব আর শুধু আঞ্চলিক সীমায় আটকে নেই। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং বৈশ্বিক বাজারব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার ঢেউ এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। জ্বালানি তেলের দাম থেকে শুরু করে রান্নাঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার— সবকিছুতেই ব্যয়ের চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে।বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানির একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। সেখানে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জ্বালানি ও পণ্যের পরিবহন ব্যয়ে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্যমতে, শিপিং খরচ বাড়ার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে খুচরা বাজারে না পড়লেও কিছু সময় পর তা মুদ্রাস্ফীতিকে দীর্ঘমেয়াদে উসকে দেয়। ইতোমধ্যে সুপারট্যাংকারের ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া এই সংকটের গভীরতাকে স্পষ্ট করে।বাংলাদেশ যেহেতু বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল, গ্যাস এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য আমদানি করে, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশে দ্রুত অনুভূত হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, যা সরাসরি পণ্য পরিবহন ব্যয়ে প্রতিফলিত হয়। এর ফলে পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দাম বাড়তে থাকে। বাস ভাড়া, ট্রাক ভাড়া, এমনকি নৌপথের খরচও বেড়ে গিয়ে সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায়।এই সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতে। বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন অনেকাংশে নির্ভর করে রাসায়নিক সার, সেচব্যবস্থা এবং জ্বালানির ওপর। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল সারের কাঁচামাল এবং ইউরিয়া উৎপাদনের একটি প্রধান উৎস। সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হলে বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে। ইতোমধ্যে ইউরিয়া সারের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে, যা বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে।বর্তমানে বোরো ধান উৎপাদনের মৌসুম চলছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মৌসুমে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও সঠিক মূল্য নিশ্চিত না হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে সারের দাম কেজিপ্রতি কয়েক টাকা থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না, যা উৎপাদন পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।সারের পাশাপাশি সেচব্যবস্থার খরচও বাড়ছে। দেশের অধিকাংশ সেচপাম্প ডিজেলচালিত হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সেচ খরচও বেড়ে যায়। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে কৃষকের লাভের পরিমাণ কমে যায়। ফলে কৃষকের ওপর দ্বৈত চাপ সৃষ্টি হয়— একদিকে বাড়তি বিনিয়োগ, অন্যদিকে অনিশ্চিত বাজারমূল্য।এই বাড়তি উৎপাদন খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপিয়ে দেয়া হয়। ফসল বাজারে এলে কৃষকরা সেই বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হন। একই সময়ে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি ধাপে দাম আরও বাড়ে। ফলে শহর ও গ্রামের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠী, খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপে পড়ে।বাংলাদেশের জ্বালানি খাতও এই সংকটে ঝুঁকির মুখে। এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা থাকায় বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বাড়লে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে প্রভাব পড়ে। এতে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়ে এবং উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পায়। শিল্প খাতে এই চাপ অর্থনীতির সামগ্রিক গতিকে মন্থর করতে পারে।একই সময়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনও চলমান, যা জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন ধরে অস্থির করে রেখেছে। এর সঙ্গে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যুক্ত হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয় যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো আঞ্চলিক সংঘাতও দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমদানিনির্ভরতার কারণে বহির্বিশ্বের অস্থিরতা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। তাই দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতা কমানোর বিকল্প নেই। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সারের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি নাগরিক পর্যায়েও সচেতনতা জরুরি। বাড়ির আঙিনা, ছাদ বা পতিত জমিতে চাষাবাদ বাড়ানো একটি সহায়ক উদ্যোগ হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে পারলে বাজারের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য সহায়তা, বাজার তদারকি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।সব মিলিয়ে, দূরের যুদ্ধ এখন আর দূরের বিষয় নয়। এর প্রভাব আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় সরাসরি অনুভূত হচ্ছে। তাই এই সংকটকে সাময়িক হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নেয়াই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়। বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশে প্রতিটি ইঞ্চি জমির সঠিক ব্যবহার এবং সুসংগঠিত নীতি বাস্তবায়নই হতে পারে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কার্যকর পথ।[লেখক: সাবেক ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা] 

সম্পর্কের ভাঙন ও আত্মহনন: উত্তরণের পথ

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী কিংবা নববিবাহিত শিক্ষিত নারীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো আমাদের সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; বরং এগুলো আমাদের সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক মূল্যবোধ, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। প্রেমে ব্যর্থতা বা দাম্পত্য জীবনের সংকটকে কেন্দ্র করে যে মানসিক বিপর্যয় তৈরি হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে এমন এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়, যা সমাজে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে, অথচ প্রতিরোধযোগ্য ছিল। তাই এই বিষয়গুলোকে আবেগ দিয়ে নয়, বরং যুক্তি, সহমর্মিতা এবং সামাজিক বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করা জরুরি। আত্মহত্যার এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়; অতীতেও আমরা বারবার একই চিত্র দেখেছি। প্রেমঘটিত ব্যর্থতা, দাম্পত্য কলহ, মানসিক আঘাত— এইসব কারণকে সামনে রেখে অনেকেই জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। প্রথম দৃষ্টিতে বিষয়টি ব্যক্তিগত আবেগের বিস্ফোরণ বা দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ মনে হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে এর পেছনে রয়েছে জটিল সামাজিক কাঠামো, মানসিক চাপ, সাংস্কৃতিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সংকটের সমন্বিত প্রভাব।বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোতে পরিবার, বিবাহ এবং সামাজিক মর্যাদা একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বিবাহকে জীবনের এক অনিবার্য ও চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষিত নারীরাও এই প্রচলিত ধারণা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নন। ফলে যখন কোনো প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যায় কিংবা দাম্পত্য জীবনে অশান্তি দেখা দেয়, তখন তা শুধু একটি সম্পর্কের সমাপ্তি নয়; বরং ব্যক্তির আত্মপরিচয়, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে অনুভূত হয়। এই আঘাত অনেক সময় এতটাই গভীর হয় যে ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, অপ্রয়োজনীয় কিংবা অসহায় মনে করতে শুরু করে।পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে। এখানে নারীর পরিচয় প্রায়ই নির্ধারিত হয় তার পারিবারিক সম্পর্কের মাধ্যমে— সে কার মেয়ে, কার স্ত্রী, কিংবা কার মা। এই নির্ভরশীল পরিচয় কাঠামো নারীদের আত্মমর্যাদাকে ভঙ্গুর করে তোলে। যখন সম্পর্ক ভেঙে যায়, তখন সেই ভাঙন কেবল আবেগগত নয়, অস্তিত্বগত সংকটে রূপ নেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ, গুজব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারও সহানুভূতির জায়গা থেকে পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়; বরং ‘মানসম্মান’ রক্ষার মানসিকতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে ভুক্তভোগী নারী নিজেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন, একা এবং অসহায় মনে করতে থাকে।মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত সাধারণত হঠাৎ করে নেয়া হলেও এর পেছনে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও দমিয়ে রাখা কষ্ট কাজ করে। প্রেমের ব্যর্থতা বা দাম্পত্য দ্বন্দ্ব অনেক সময় একটি ট্রিগার হিসেবে কাজ করে, যা আগে থেকে জমে থাকা হতাশা, একাকিত্ব, আত্মসম্মানহীনতা এবং অবমূল্যায়নের অনুভূতিকে বিস্ফোরিত করে। এই অবস্থায় ব্যক্তি একটি সংকীর্ণ মানসিক ফ্রেমে আটকে পড়ে, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কগনিটিভ টানেলিং’ বলা হয়। এই অবস্থায় মানুষ তার বর্তমান কষ্ট ছাড়া আর কিছু দেখতে পায় না; ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, আশেপাশের মানুষের ভালোবাসা কিংবা জীবনের অন্য অর্থপূর্ণ দিকগুলো তার দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। মা-বাবার স্নেহ, ভাই-বোনের ভালোবাসা, বন্ধুদের আন্তরিকতা— সবকিছু যেন মুহূর্তের জন্য গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। এটি কোনো ইচ্ছাকৃত অবহেলা নয়; বরং গভীর মানসিক বিপর্যয়ের একটি লক্ষণ।নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা জীবনকে অমূল্য বলে মনে করি এবং আত্মহত্যাকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও বেদনাদায়ক পরিণতি হিসেবে দেখি। প্রায় সব ধর্ম ও সংস্কৃতিতেই জীবন রক্ষার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তবে কেবল ‘আত্মহত্যা ভুল’ এই বক্তব্য দিয়ে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন সহমর্মিতা, বোঝাপড়া এবং কার্যকর সহায়তা ব্যবস্থা। নৈতিকতার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে মানবিকতায়— মানুষের কষ্টকে উপলব্ধি করা এবং সেই কষ্ট লাঘবে পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নৈতিক দায়িত্বের বাস্তব প্রয়োগ ঘটে। এই প্রেক্ষাপটে সমাজ, পরিবার এবং রাষ্ট্র— সবারই একটি সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। আমাদের সমাজে এখনও মানসিক সমস্যাকে দুর্বলতা বা লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়, যা মানুষকে সাহায্য নিতে নিরুৎসাহিত করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদার কাউন্সেলিং সেবা চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক উন্মুক্ত আলোচনা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত, পরিবারকে হতে হবে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল, যেখানে সন্তানরা নির্ভয়ে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। বিচার নয়, প্রয়োজন সহানুভূতি এবং মনোযোগ দিয়ে শোনা। তৃতীয়ত, নারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর না হলে অনেক নারী অস্বাস্থ্যকর বা নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকেও বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে তারা এক ধরনের মানসিক বন্দীত্বের মধ্যে বসবাস করে, যা দীর্ঘমেয়াদে হতাশা ও আত্মঘাতী প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে নারীদের আত্মনির্ভর করে তোলা এই সমস্যার একটি মৌলিক সমাধান হতে পারে। চতুর্থত, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অপরিহার্য। প্রেমে ব্যর্থতা, সম্পর্ক ভাঙন কিংবা বিবাহবিচ্ছেদকে এখনও আমাদের সমাজে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে মানুষ তার ব্যক্তিগত সংকটকে লজ্জার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করবে এবং সাহায্য চাইতে দ্বিধা বোধ করবে। সম্পর্কের ভাঙনকে জীবনের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ব্যর্থতা মানেই জীবনের সমাপ্তি নয়— বরং নতুনভাবে শুরু করার একটি সুযোগ। পঞ্চমত, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে জাতীয় নীতি প্রণয়ন, জরুরি হেল্পলাইন চালু, সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম যেন সংবেদনশীলভাবে এই ঘটনাগুলো উপস্থাপন করে এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নববিবাহিত শিক্ষিত নারীদের জন্য কিছু বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে না দেখে, এটিকে জীবনের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। নিজের স্বপ্ন, লক্ষ্য এবং ব্যক্তিগত পরিচয় বজায় রাখা জরুরি। দাম্পত্য সম্পর্কে খোলামেলা যোগাযোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়; সমস্যা হলে তা চেপে না রেখে আলোচনা করা উচিত। পাশাপাশি, বিবাহের পরেও বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য সহায়ক। প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলিং নেয়াও একটি ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গেলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। এখনও অনেক মানুষ মানসিক সমস্যাকে দুর্বলতা বা লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখে, ফলে তারা সাহায্য নিতে সংকোচ বোধ করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কাউন্সেলিং সেবা চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন।দ্বিতীয়ত, পারিবারিক যোগাযোগের উন্নতি অপরিহার্য। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তানরা তাদের সমস্যাগুলো পরিবারকে বলতে পারে না, কারণ তারা ভয় পায়— তাদের বিচার করা হবে বা বোঝা হবে না। পরিবারকে এমন একটি নিরাপদ স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সন্তানরা নির্ভয়ে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে।তৃতীয়ত, নারীদের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখায় উল্লেখিত বিষয়, পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা ছাড়া বিয়ে না করা— এটি একটি বাস্তবসম্মত পরামর্শ। অনেক নারী অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হওয়ার কারণে একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক থেকেও বেরিয়ে আসতে পারে না। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের স্বনির্ভর করে তোলা হলে তারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আরও স্বাধীনভাবে নিতে পারবে।চতুর্থত, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের সমাজে এখনও প্রেম, সম্পর্ক ভাঙন কিংবা বিবাহবিচ্ছেদকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে মানুষ সম্পর্কের সংকটে পড়ে নিজেকে একা ও অসহায় মনে করবে। সম্পর্ক ভাঙনকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।পঞ্চমত, রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধ নীতি, হেল্পলাইন সেবা এবং সহজলভ্য কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এ ছাড়া গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ— তারা যেন দায়িত্বশীলভাবে এই বিষয়গুলো উপস্থাপন করে এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।নববিবাহিত নারীদের জন্য বিশেষভাবে কিছু দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বিবাহকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে না দেখে, এটি একটি অংশ হিসেবে দেখা উচিত। নিজের ব্যক্তিগত স্বপ্ন, লক্ষ্য এবং পরিচয় বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত, দাম্পত্য সম্পর্কে খোলামেলা যোগাযোগ অপরিহার্য। সমস্যা হলে তা চেপে না রেখে আলোচনা করা উচিত।তৃতীয়ত, সামাজিক সহায়তা নেটওয়ার্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহের পর অনেক নারী তাদের বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়, যা তাদের একাকীত্ব বাড়ায়। এই সম্পর্কগুলো বজায় রাখা মানসিকভাবে শক্তিশালী থাকতে সাহায্য করে।চতুর্থত, প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নেয়া উচিত। কাউন্সেলিং বা থেরাপি কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়; বরং এটি নিজের যত্ন নেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সবশেষে বলা যায়, আত্মহত্যা একটি জটিল সামাজিক ও মানসিক সমস্যা, যার সমাধান একক কোনো পদক্ষেপে সম্ভব নয়। এটি মোকাবিলার জন্য ব্যক্তিগত সচেতনতা, পারিবারিক সহমর্মিতা, সামাজিক পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ— সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। জীবন সত্যিই অমূল্য, কিন্তু এই সত্যটি উপলব্ধি করার জন্য মানুষের প্রয়োজন সহানুভূতি, সমর্থন এবং একটি নিরাপদ পরিবেশ, যেখানে তারা তাদের কষ্ট ভাগ করে নিতে পারে এবং নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়।সবকিছু বিবেচনায় স্পষ্ট হয় যে আত্মহত্যা কোনো একক কারণের ফল নয়; এটি ব্যক্তিগত কষ্ট, সামাজিক চাপ এবং মানসিক অস্থিরতার জটিল সমন্বয়। এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ— পরিবারের সহানুভূতিশীল ভূমিকা, সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর নীতি গ্রহণ। একই সঙ্গে ব্যক্তিকেও বুঝতে হবে যে জীবনের সংকট সাময়িক, কিন্তু জীবনের সম্ভাবনা অসীম। সহায়তা চাইতে পারা দুর্বলতা নয়, বরং তা বেঁচে থাকার শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ। একটি সহমর্মী, সচেতন এবং সমর্থনশীল সমাজই পারে এই নীরব সংকটকে প্রতিরোধ করতে এবং মানুষকে নতুন করে বাঁচার সাহস দিতে। [লেখক: অধ্যাপক; সদস্য, শিক্ষাক্রম, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড]

এবার যাচ্ছি মঙ্গলে

স্টিফেন হকিংয়ের সোজা ভবিষ্যৎ বাণী ছিল, শতাব্দী ব্যবধানে মানব জাতিকে ভিনগ্রহে বসতি গড়তেই হবে। স্পেস এক্সের মালিক ইলন মাস্ক বলছেন এই শতাব্দীর প্রথমার্ধে মঙ্গলে মানুষ পাঠাবেন। ব্লু অরিজিনের মালিক মার্ক বেজোস শান্ত অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন ২০৪০ সালের মধ্যে মানুষ অবশ্যই মঙ্গলে পদার্পণ করবেই। সোজা কথা হলো সৌরজগতে পৃথিবীর কাছের গ্রহ বুধ বা শুক্রে বা উপগ্রহ চাঁদে পানি না থাকায় মনুষ্য বসতি সম্ভব নয়। তবে একটু দূরের মঙ্গল গ্রহে সম্ভব, কারণ মঙ্গলে একসময় পানি ছিল, জলাশয় ছিল, খাল, নদী ছিল। এখনও মাটির নিচে পানির ভান্ডার আছে। যেমন পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠের নিচে পানি আছে। সোজা কথায় মঙ্গলে বেঁচে থাকার জন্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে মনুষ্য বসতি সম্ভব। মঙ্গলে বাতাস আছে, তবে তা পৃথিবীর চেয়ে হালকা। মেরু অঞ্চলে জমাট বরফও আছে।বৈরী হলো গ্রহটি প্রচণ্ড ঠান্ডা। মাইনাস ২০০ (বিশ ডিগ্রির) নিচে তাপমাত্রা। পৃষ্ঠে আয়রন অক্সাইড বেশি থাকায় পৃথিবীর অর্ধেক আয়তনের গ্রহটি পুরোপুরি লালচে। ২৪ ঘণ্টা ৩৭ মিনিটে ১ দিন ও ৬৮৭ দিনে ১ বছর। মানুষের বাস উপযোগী করতে হলে বাতাসের পরিমাণ ও বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতেই হবে। তার ওপর নিশ্চিত করতে হবে বৃষ্টিপাত। ইলন মাক্সের বক্তব্য, নিউক্লিয়ার চার্জ করে কয়েক বছরের জন্য ধুলায় ঢেকে দেয়া হবে মঙ্গলের আকাশ। ধুলার আবরণে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়বে। তাপমাত্রা বাড়লে মরুর বরফ গলে মেঘ সৃষ্টি হবে। কয়েক দশকের ব্যবধানে ধীরে ধীরে বৃষ্টিপাত বাড়বে। একাধিক ঋতুর আবির্ভাব হতে বাধ্য।মঙ্গলে বসতি স্থাপনের প্রধানতম প্রতিবন্ধকতা হলো চুম্বক ক্ষেত্রের অভাব। কোটি কোটি বছর আগে থেকে গ্রহটির ভূ-অভ্যন্তরে মিথস্ক্রিয়া ধীরে ধীরে স্থিমিত হয়ে পড়ায় ও পৃষ্ঠদেশ থেকে মেঘ-বৃষ্টির ঋতুচক্র হারিয়ে যাওয়ায়, গ্রহটি চুম্বকত্বহীন হয়ে পড়েছে। সৌর তাপ ও আলোর ক্ষতিকর বিকিরণ ঊর্ধ্বাকাশে আটকানোর একমাত্র প্রাকৃতিক ব্যবস্থা হলো বায়ুমণ্ডলের চুম্বকক্ষেত্র। সৌর ও মহাকাশের বহু ক্ষতিকর পদার্থ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঊর্ধ্বাকাশে ঠেকিয়ে দেয় বলে আমরা ভূ-পৃষ্ঠে বেঁচে আছি। মঙ্গলে পৃথিবীর মতো বায়ুমণ্ডল, একাধিক ঋতু ও চৌম্বক ক্ষেত্র ন্যূনতম ভারসাম্যে এলে মনুষ্য বসতি গড়ে তোলা সম্ভব। শত শত বছরের ব্যবধানে গ্রিন হাউস প্রযুক্তি ব্যবহার করে রবিশষ্য উৎপাদন হবে। কৃত্রিম জলপ্রবাহে চাষ হবে। প্রথম দিকে অক্সিজেন আটকে রেখে হয়তো ঘরে থাকতে হবে। বাড়ি থেকে বের হলেই হয়তো পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে বের হতে হবে- এই যা। আরও কত প্রতিবন্ধকতা দেখা দেবে। আবার এসব অতিক্রমও করা যাবে। লাগুক না এর জন্য দশকের পর দশক বা শত শত বছর। ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে নাসা মিউজিয়ামে মোটামুটি ১ বেলা ঘুরেছিলুম। তৃতীয় তলায় মঙ্গলে পাঠানো ল্যান্ডার পারসিভিয়ারেন্সের প্রাথমিক টেস্টিং মেশিনটি ডিসপ্লেতে দেখে পুলকিত হলাম। পৃথিবীতে পরীক্ষা চালানো হয়েছে এটি দিয়ে। অতঃপর হুবহু আরেকটি এখন মঙ্গলে। দিন-রাত ব্যস্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণায়।ষাটের দশক থেকে মঙ্গলের প্রতি মানুষের অব্যাহত অভিযান মনুষ্য ল্যান্ডিং করার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে চলেছে। দীর্ঘ অর্ধশতক ধরে মঙ্গলে ৩ ধরনের যন্ত্রদানব পাঠানো হয়েছে। দীর্ঘ এক দশকের ব্যর্থতার পর ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর সোভিয়েত মঙ্গলযান ‘মার্স-৩’ মঙ্গলে ল্যান্ড করে। এরপর থেকে চাঁদে ল্যান্ড করেছে রুশ (রসকসমস) আমেরিকান (NASA), ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA), চীনের মহাকাশ সংস্থা (CNSA), ভারতীয় মহাকাশ সংস্থার (ISRO) একাধিক ল্যান্ডার। প্রথম অভিযানেই ল্যান্ডিং করে চমক দেখিয়েছে ভারতের ইসরো। ল্যান্ডারের পেটের ভেতর থেকে যে যন্ত্রটি বেরিয়ে এসে আশে পাশে রাজার হালে হেলে দুলে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালায়, সেটির নাম রোভার। ইসরোর রোভার, রসকসমসের রোভার, চীনের রোভার ‘তিয়ানওয়েন- ১’ এটি ল্যান্ড ‘ঝুরুং’-এর পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে মে ২০২১ থেকে চালিয়ে যাচ্ছে বৈজ্ঞানিক গবেষণা। ইউরোপীয় অর্থাৎ ESA-এর রোভার বর্তমানে রীতিমতো প্রতিযোগিতা দিয়ে মঙ্গলে মনুষ্য বসতি গড়ে তোলার করণীয় নিয়ে গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যস্ত। বিশ্ববাসীর জন্য সুখবর আছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘অ্যানাবেনা’ ও ‘নস্টক’ নামক অনুজীব বা ব্যাকটেরিয়াকে মঙ্গলে ছেড়ে দেয়া গেলে সময়ের ব্যবধানে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর মতো ভারসাম্যপূর্ণ অক্সিজেনে ভরপুর হবে। নাসা আরও এককাঠি সরস হাওয়াই দ্বীপে এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের একটি ভূখণ্ডে ১টি বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। চতুর্দিকে মনুষ্যহীন এই বাড়িতে একাকী থাকবেন ৬ নভোচারী। মূলত ৬ জন মানুষ একসঙ্গে একটি ঘরে বহির্জগতের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন থাকলে কিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় তার পরীক্ষা চলছে। নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী শ্রীঘ্রই একাধিক মনুষ্যবিহীন অরবিটার পাঠানো হবে। মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসবে ‘স্পেস এক্সের’ হ্যাংগারে। আবার ওই রকেটে করে মনুষ্যবাহী অরবিটার পাঠানো হবে মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করার জন্য। এরপর শুরু হবে নভোচারীদের মঙ্গলে ল্যান্ডিং করানোর চূড়ান্ত পর্ব। দীর্ঘ ৭ মাসের মঙ্গল যাত্রার জন্য নাসা পথিমধ্যে অর্থাৎ কক্ষপথে ‘ল্যাগরেঞ্চ-২’ পয়েন্টে যাত্রাবিরতি দিতে চায়। যদি যাত্রাপথ ৪ মাসে নামিয়ে আনার উদ্যোগ সফল হয় তবে বিশ্রাম না দিয়েও সরাসরি মঙ্গলে ল্যান্ডিংয়ের চিন্তা প্রাধান্য পাবে। কারণ এ ক্ষেত্রে আসা যাওয়ায় লাগবে মাত্র ৮ মাস। অবশ্য রাশিয়ার প্লাজমা জ্বালানির রকেট পাঠানোর ঘোষণা যদি সত্যি সফল হয় তবে মঙ্গলে মানুষ হাঁটবে, খেলবে, চাষ করবে, বাজার করবে, হোক না তা দুই প্রজন্ম পর। ‘রসকসমসের’ বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লাজমা প্রযুক্তির রকেটের গতি এতদিনকার জ্বালানির সমস্ত সক্ষমতা অতিক্রম করবে। প্লাজমা জ্বালানি দিয়ে রকেট স্টার্ট দেয়ার ১ মাসের মধ্যে পৌঁছে যাবে মঙ্গলে। বিশ্ববাসী রইল সেই শুভদিনের প্রত্যাশায়। [লেখক: আইনজীবী, আপিল বিভাগ]

আগুনের বাজারে সভ্যতার মুখোশ

পৃথিবী যেন এখন এক বিশাল হাট—নামের আগে সভ্যতা, ভেতরে নিখাদ ব্যবসা। এই হাটে সবকিছুই বিক্রি হয়: নীতি, নৈতিকতা, মানবতা—এমনকি মানুষের জীবনও। শুধু দরকার নিখুঁত প্যাকেজিং আর কিছু মেকি ভাষা। আগুনের গন্ধকে বলা হয় স্থিতিশীলতা, ধ্বংসকে নিরাপত্তা, আর রক্তকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। শব্দের এই কারসাজিতে সত্য এতটাই ঢেকে যায় যে মানুষ একসময় মিথ্যাকেই বাস্তব মনে করতে শুরু করে।এই হাটের মাঝখানে জ্বলছে এক অনির্বাণ চুলা। সেখানে কাঠ নয়, জ্বলে মানুষের ঘর; কয়লা নয়, পুড়ে শিশুর স্বপ্ন। তবু বিস্ময়কর—চুলার পাশে দাঁড়ানো লোকগুলো সাদা পোশাকে সজ্জিত। তাদের মুখে শান্তির বুলি, হাতে আগুনের দাহ। তারা বলে, আগুন নেভাতে এসেছে—কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখে, সেই নেভানোর নামেই তারা আরও তেল ঢালছে। আগুন এখানে শুধু ধ্বংসের প্রতীক নয়, এটি ক্ষমতার এক দৃশ্যমান রূপ— যেখানে জ্বলতে থাকা প্রতিটি শিখা একেকটি স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।এরা এক অদ্ভুত জাতের কারিগর। তাদের কারখানায় তৈরি হয় ন্যায়ের বুলেট, শান্তির বোমা আর মানবিকতার মিসাইল। প্রতিটি অস্ত্রের গায়ে লেখা থাকে কোনো মহৎ শব্দ, যেন শব্দের ঝলকে রক্তের দাগ মুছে যায়। তারা জানে—মানুষ শব্দে বেশি বিশ্বাস করে, সত্যে নয়। তাই তারা শব্দকে অস্ত্র বানায়, আর অস্ত্রকে ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে। একসময় মানুষ এতটাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে যে, ধ্বংসকেও সে উন্নয়নের অংশ মনে করতে শুরু করে।এই হাটে আছে একদল হিসাবরক্ষকও। তারা ঠাণ্ডা মাথায় হিসাব কষে—আজ কত ঘর পুড়লো, কাল কত মানুষ মরবে, আর তাতে কত মুনাফা আসবে। তাদের খাতায় মানুষের নাম নেই, আছে শুধু সংখ্যা। শূন্যের পাশে যত সংখ্যা বাড়ে, তাদের চোখে তত উজ্জ্বল হয় আনন্দের আলো। এই সংখ্যার খেলায় মানবিকতা হারিয়ে যায়, আর লাভ-ক্ষতির অঙ্কই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত সত্য। তারা কখনও দেখে না একটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে থাকা একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি জীবনের গল্প।সবচেয়ে বড় কৌতুক—এই আগুনের বাজারেই বসে শান্তির মেলা। সেখানে হয় বড় বড় বক্তৃতা, ছুটে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, আর কাগজে কাগজে লেখা হয় চুক্তি। ক্যামেরার সামনে করমর্দন, হাসি আর কূটনৈতিক ভাষার চাতুর্য দেখে মনে হয়—এই বুঝি পৃথিবী বদলে যাবে। কিন্তু মেলা শেষ হলেই সেই কাগজ উড়ে যায় আগুনে—আর আগুন আরও উঁচু হয়ে জ্বলে ওঠে। তখন বোঝা যায়, শান্তির মেলা আসলে আগুন টিকিয়ে রাখারই এক অভিনব কৌশল।নীরব দর্শকদের ভূমিকাও এখানে কম নয়। তারা আগুন দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তারপর নিজ নিজ ঘরে ফিরে যায়। কেউ কেউ আবার আগুনের ছবি তুলে রাখে—স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, যেন একদিন বলতে পারে, আমরা সেই সময় বেঁচে ছিলাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা শোক প্রকাশ করে, ক্ষোভ জানায়, কিন্তু বাস্তবতায় তারা নিস্তব্ধ। তারা ভুলে যায়—দর্শকও এক ধরনের অংশগ্রহণকারী; শুধু তাদের হাত রক্তে ভেজে না। নীরবতা অনেক সময় শব্দের চেয়েও বেশি শক্তিশালী সমর্থন হয়ে ওঠে।এই আগুনের শহরে শিশুরা বড় হয় ধোঁয়ার গন্ধে। তারা জানে না ফুলের সুবাস কেমন; তারা চেনে শুধু বারুদের গন্ধ। তাদের খেলনা ট্যাংকের মতো, তাদের স্বপ্ন বাঙ্কারের মতো। তারা শিখে যায়—বাঁচতে হলে লুকাতে হয়, হাসতে হলে চুপ থাকতে হয়। তাদের শৈশব কেড়ে নেয়া হয় খুব ধীরে, খুব নিঃশব্দে। একদিন তারা বড় হয়, আর সেই একই আগুনের অংশ হয়ে যায়—কারও হাতে অস্ত্র, কারও হাতে পতাকা, কারও হাতে প্রতিশোধের শপথ।আর যারা এই আগুন জ্বালায়, তারা থাকে অনেক দূরে—শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে, কাঁচের দেয়ালের আড়ালে। তাদের কাছে আগুন মানে একটি গ্রাফ, একটি রিপোর্ট, একটি কৌশল। তারা আগুনের তাপ অনুভব করে না, শুধু তার আলো ব্যবহার করে নিজেদের ছায়া বড় করে। তাদের সিদ্ধান্তে জ্বলে ওঠে শহর, ভেঙে পড়ে সভ্যতা, কিন্তু তাদের জীবনে সেই আগুনের কোনো ছোঁয়া লাগে না। এই দূরত্বই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি—এবং সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা।সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সত্যটি হলো—এই পৃথিবীতে আগুন কখনো নিজে নিজে জ্বলে না। কেউ তা জ্বালায়, কেউ তাতে হাওয়া দেয়, আর কেউ সেই আগুন দেখে মুনাফার হাসি হাসে। এই ত্রিমুখী সম্পর্কের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আধুনিক সভ্যতার এক নির্মম বাস্তবতা—যেখানে ধ্বংস একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া, আর শান্তি একটি কৌশলগত শব্দমাত্র।তাই এই আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে যদি কেউ প্রশ্ন করে—দোষ কার? উত্তরটি সহজ নয়। দোষ শুধু তাদের নয়, যারা আগুন জ্বালায়; দোষ তাদেরও, যারা আগুনকে মেনে নেয়, যারা আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে উষ্ণতা উপভোগ করে, আর যারা আগুনের গল্প শুনে হাততালি দেয়। এই সম্মিলিত নীরবতা আর স্বার্থপরতা আগুনকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।শেষ পর্যন্ত, হয়তো একদিন এই আগুন নিভে যাবে। কিন্তু তার ছাইয়ে থেকে যাবে এক নির্মম সাক্ষ্য—সভ্যতার মুখোশ যতই চকচকে হোক, তার ভেতরের মুখ সবসময় ততটা সুন্দর নয়। সেই ছাই একদিন ইতিহাস হয়ে বলবে—এই পৃথিবী আগুন নেভাতে জানতো, কিন্তু আগুন জ্বালাতে ছিল আরও বেশি দক্ষ। [লেখক : সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

লটারি না ভর্তি পরীক্ষা?

কেজিতে তো নয়ই, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত কোন ভর্তি পরীক্ষা থাকা উচিত নয়! যে সমাজে সে জন্মগ্রহন করেছে সেই সমাজ তাকে কোনো ধরনের মানসিক চাপে না ফেলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ করে দিবে, এটি সমাজের কাছে তার বৈধ পাওনা। এখানে পরীক্ষা নামক বিষয় যোগ করার প্রশ্নই আসেনা। তবে, চতুর্থ শ্রেণী থেকে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া একেবারে অযৌক্তিক নয়, সেখানে প্রশ্ন হতে হবে শ্রেণী উপযোগী ও যৌক্তিক। ভর্তি পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীরা কিছুটা পড়াশোনা করে এবং অভিভাবকরাও পড়াশোনার বিষয়ে কিছুট সচেতন হন। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত সকল অভিভাবকদের তাদের নিকটস্থ বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য চিন্তা করতে হবে। তারা যদি তথাকথিত নামকরা বিদ্যালয়ে ভর্তির পেছনে ছোটেন তাহলে সরকার কিংবা অন্য কারুরই কিছু করার নেই। কোন সমস্যা হলেই আমরা সরকারকে দায়ী করি, সরকারের উপর সব চাপিয়ে দিই কিংবা সরকারকে মূহুর্তের মধ্যেই সব পরিবর্তন করতে বলি যা যুগ যুগ ধরে হয়নি। সবাই সুপারিশের ফিরিস্তি তুলে ধরি, সরকারকে এটা করতে হবে, সেটা করতে হবে কিন্তু কি দিয়ে , কিভাবে এবং এত অল্প সময়ে করা যে সম্ভব নয় সেগুলো আমরা কখনও চিন্তা করিনা। শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে বড় বড় শহরগুলোতে কারণ নামকরা (?) দু’চারটি প্রতিষ্ঠানে সব অভিভাবক তাদের সন্তানদের ভর্তি করাতে চান। তারা ভর্তির জন্য সব ধরনের পদ্ধতিই অবলম্বন করেন (অর্থ, প্রতিপত্তি, রাজনৈতিক প্রভাব, কোচিং)। অথচ সরকারি ও বেসরকারি বহু বিদ্যালয় আছে সেগুলোতে শিক্ষার্থী পাওয়া য়ায়না। সরকারিগুলোতে সমস্যা নেই কিন্তু বেসরকারিগুলোতে শিক্ষার্থীর অভাবে কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের ঠিকমতো বেতন নিতে পারেন না। তাই, আওয়ামী সরকারের আমলে এই লটারি পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয় কারন নিজের পার্টির লোজকজনকেও ম্যানজে করা যেতনা সবাই তথাকথিত ভাল স্কুলে ভর্তি করাবেন। আমাদের ছোট-বড় প্রতিটি শহর জ্যামের শহর! সেই জ্যাম ঠেলে সকালবেলা সবাই ছোটেন বাচ্চাদের নিয়ে । এই বয়সে বাচ্চাদের বাসার কাছে ফুলবাগানের মতো কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, আমোদ ফুর্তি করা আর বয়স উপযোগী সহজ কিছু বিষয় শেখার কথা এবং এর মাধ্যমে সামাজিকতা ও বন্ধুত্ব ইত্যাদি শেখার প্রথম ধাপ। অথচ অভিভাবকগন তাদেরকে মহা প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে তাদের শারীরিক মানসিক কষ্টের বিনিময়ে, সমাজের উচুঁ শ্রেণী, নিচু শ্রেণী, অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য ব্যস্ত, মহাব্যস্ত, আর যখন সমস্যা হয় তখন সব সরকারের ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। নামকরা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতেই হবে। সরকার আইন করতে পারে কিন্তু সেটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিকদের নিজস্ব গতিপথ রয়েছে, সরকার প্রয়োগ করতে গেলে সেটি অনেক সময়ই ব্যক্তি স্বাধীনতার বিপক্ষে এমনকি বলপ্রয়োগের পর্যায়ে চলে যায়।কাজেই সব সমস্যা সরকারকে দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতে গেলে সমস্যা হবেই। অনেক অভিভাবক আছেন, তাদের শিশু সন্তানকে তথাকথিত ভাল স্কুলে পড়ানোর জন্য সাত-সমুদ্র পাড়ি দিয়ে শিশুদের সেখানে নিয়ে যান শুধুমাত্র ভালো পড়ালেখার জন্যই নয়, নিজেদের মান-সম্মানের কথা চিন্তা করে, প্রেস্টিজের কথা চিন্তা করে। এখানে সরকারের কিছু করার নেই। সিদ্ধান্ত অভিভাবকদের নিতে হবে, সরকার শুধু কাজটি করতে উৎসাহ প্রদান করতে পারে। স্থানীয় স্কুলগুলো সবই হয়তো সেই মানের নেই, কিন্তু যখন অভিভাবকগন তাদের শিশু-সন্তানদের ভর্তি করবেন তখন নিকটস্থ বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না থাকলেও তারা ভালো করার চেষ্টা করবে। বিদ্যালয়গুলো সামাজিক প্রতিষ্ঠান, এগুলো ভালো করার দায়িত্ব অভিভাবকদের এবং সমাজেরও। এটি করা হলে লটারি আর ভর্তি পরীক্ষার কোন প্রশ্ন থাকবেনা, শিশুরা তাদের ওপর মানসিক অত্যাচার থেকে বেঁচে যাবে। আমাদের সরকারি বেসরকারি কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠানই জনসংখ্যা অনুপাতে নেই, এগুলো সুষমভাবে এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠেনি। এটিও একটি বাস্তবতা। যেগুলো আছে সেগুলোকে মানে তোলার দায়িত্ব নাগরিকদেরও, কারণ সরকারের একার পক্ষে এতসব ম্যানেজ করা সম্ভব নয়। অভিভাবকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার ফলে, তথাকথিত নামী দামী স্কুলে দ্বিতীয় তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হতে যেসব অবাক করা প্রশ্ন আসে সেগুলো অযৌক্তিক এবং কোন মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষা হয়না। যেমন ঢাকার একটি বিখ্যাত স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছিল’ বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার পথচলা কবে থেকে শুরু হয় এবং উপকারিতা কি? ’ এ প্রশ্ন বিসিএসকেও ছাড়িয়ে যায়। অভিভাবক যখন এসব স্কুলে সন্তান ভর্তির জন্য পাগলপ্রায় তখন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এ ধরনের আজে বাজে প্রশ্ন ভর্তি পরীক্ষায় দিয়ে থাকে আর মাঝখানে শিশুদের কোচিং করানোর জন্য আরেকটি শ্রেণী গড়ে উঠে। এটিই স্বাভাবিক। আমার স্পষ্ট মনে আছে আমার কন্যা (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যায়ে মাস্টার্সে পড়ে) শিশু শ্রেণীতে ভর্তির সময় তার মা অন্য অভিভাবকদের কাছ থেকে ভিকারুন্নেছা স্কুলে ভর্তি করানোর কয়েকটি কোচিংয়ের ঠিকানা নিয়ে এসেছিলেন। আমি খোঁজ-খবর নিয়ে দেখলমা কোচিং-এ পড়ানো হচ্ছে আফ্রিকার কিছু দেশের মুদ্রার নাম, রাজধানীর নাম, ঐসব দেশের সরকার ব্যবস্থা, কঠিন ব্যাকরণ ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, ঐসব কোচিংয়ে ভর্তি হওয়া আরেক কসরত। যেন বুয়েটে ভর্তির কোচিং! আর অর্থদণ্ড তো আছেই। আমি এসব বাদ দিতে বললাম। বাদ দিযে মেয়েকে একটি ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করলাম কারণ সেখানে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেই, অতএব ভর্তির কোচিংও নেই। আমাদের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন ‘শিক্ষায় লটরি, এটা তো জুয়া খেলা, এটা কীভাবে সিস্টেম হতে পারে? কাজেই আমরা লটারি পদ্ধতি প্রত্যাহার করলাম। দ্যাটস ইট। লটারি কোনো শিক্ষা ব্যবস্থায় থাকতে পারেনা। সেটি শিক্ষার কোনো মানদন্ড হতে পারেনা। লটারি ইস নট সলিউশন। ক্লাস ওয়ানে মেধা যাচাইয়ের প্রশ্ন আসেনা। খুবই সিম্পল ওয়েতে পরীক্ষা নিবো। ক্লাস ওয়ানে আমরা নিউরোসার্জন বানানোর চেষ্টা করবোনা। কেউ কোচিং বাণিজ্য করতে চাইলে সরকার বসে থাকবেনা। সরকার ইনহাউজ কোচিংযের ব্যবস্থা করবে।’ মন্ত্রী মহোদয়ের কথাগুলোর সঙ্গে আমি একমত তবে খুব সিম্পল ওয়েতে পরীক্ষা নিবো এবং কোচিং বাণিজ্য করতে চাইলে সরকার বসে থাকবেনা। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবক্ষেত্র পর্যন্ত যেতে যেতে মূল মেসেজের সামান্য অবিকল অবস্থায় থাকে। এটি যারা বাস্তবায়ন করেন বা করবেন তারা দুর্নীতির আশ্রয় নেন যা সরকারের পক্ষে এত মাইক্রো লেভেলে পৌঁছে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। প্রাথমিকে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের বয়স ৪-৬ বছরের মধ্যে যখন শিশুরা কেবল তাদের মতো করে কথাবার্তা ও যোগাযোগ করতে শেখে। শিশুরা তখন প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ, পরিবার ও সমাজের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকে। তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি এমন পর্যায়ে থাকেনা যে, তাদের মেধা ও জানা-শোনা পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই যোগ্য। সেটা করা মানে শিশুদের প্রতি অবিচার ও অভিভাবকদের জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করা। লটারি পদ্ধতির সুবিধা ছিল এর স্বচছতা ও জবাবদিহিতা। লটারি পদ্ধতিতে সরকারের একজন প্রতিনিধি সশরীরে উপস্থিত থাকতেন। কেন্দ্রীয়ভাবে লটারি হওয়ার কারণে এখানো স্বজনপ্রীতি বা অর্থিক লেনদেনের সুযোগ ছিলনা বললেই চলে। ফলে অভিভাবকরা একটি আস্থার জায়গায় ছিলেন এবং মেধাবী ও সাধারণ-সব শিক্ষার্থীই ভর্তির সমান সুযোগ পেত। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বাছাই করে সেরাদেরই ভর্তি করে তাহলে তাদের কৃতিত্ব কোথায় ? সব ধরনের মেধার শিক্ষার্থীদের ভর্তি করে তাদের বিকশিত করার সুযোগ দেয়াই একটি প্রকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ। শুধুমাত্র সেরাদের নিয়ে শ্রেণী তৈরি করলে সমাজের শিক্ষার্থী ও অভিভাকদের মধ্যে এক ধরনের অহংবোধ ও বিভাজন তৈরি হয় যার কারণে বর্তমানে শিশু ভর্তি প্রক্রিয়ায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে আরেকটি বিষয় আমরা বেমালুম এড়িযে যাচ্ছি আর সেটি হচেছ, ভর্তি প্রক্রিয়ায় সমস্যা হচেছ শহর এলাকায় আর শহর শুধু বাংলাদেশ নয়। শহর এলকার সব বিদ্যালয়েও ভর্তির তীব্র প্রতিযোগিতা নেই। বাংলাদেশের হাজার হাজার গ্রাম, গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোর করুণ অবস্থা, শিক্ষার মানের দিক দিয়ে, শিক্ষার্থী সংখ্যার দিকে দিয়ে এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়েও। শহরের মাত্র কয়েকটি বিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা যখন এত এত আলোচনা করি তখন মনে হয়, গ্রামের স্কুল স্কুল নয়, গ্রামের শিক্ষর্থীরা শিক্ষার্থী নয়! [লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজ]

যুদ্ধের তিন নিয়ামক

মানুষ প্রায়ই মনে করে যে যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় যুদ্ধক্ষেত্রেই। সেনাবাহিনী অগ্রসর হয়, শত্রুপক্ষ পিছু হটে এবং শেষ পর্যন্ত এক পক্ষ বিজয় অর্জন করে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধ খুব কমই এইভাবে শেষ হয়। এগুলো শেষ হয় তখনই, যখন একসঙ্গে তিনটি বিষয় ভেঙে পড়ে— অস্ত্রভান্ডার, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা। এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করে যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হবে এবং কীভাবে তা শেষ হবে।ইরানকে ঘিরে উদীয়মান সংঘাতও এই একই পথ অনুসরণ করবে। এটি কোনো নাটকীয় আত্মসমর্পণ বা যুদ্ধক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পতনের মাধ্যমে শেষ হবে না। বরং এটি শেষ হবে তখন, যখন তিনটি আলাদা চাপ একত্রিত হতে শুরু করবে— যখন অস্ত্রভান্ডার ফুরিয়ে আসবে, বাজার অস্থির হয়ে উঠবে এবং রাজনৈতিক ধৈর্য শেষ হয়ে যাবে। হয়তো একসঙ্গে নয়, কিন্তু এতটাই কাছাকাছি যে নেতারা বাধ্য হবেন নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে, যা পরে তারা কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন, যদিও বাস্তবে তা হবে প্রয়োজনের তাগিদে নেয়া পদক্ষেপ।প্রথমেই আসা যাক অস্ত্রের প্রসঙ্গে। আধুনিক যুদ্ধ প্রায়ই এমন একটি ধারণা তৈরি করে যেন সামরিক সক্ষমতা অসীম। নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, স্যাটেলাইট নজরদারি, বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা— সবকিছুই যেন এমন এক প্রযুক্তিগত স্থায়িত্বের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে উন্নত সামরিক শক্তি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। বাস্তবে তা সম্ভব নয়, কখনই ছিল না।সমস্যা উদ্ভাবনে নয়, উৎপাদনে। একটি আধুনিক প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র কেবল একটি অস্ত্র নয়; এটি একটি জটিল, বিশেষায়িত ব্যবস্থা, যা সীমিত সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরশীল। মাইক্রোইলেকট্রনিক্স, দুর্লভ উপাদান, নিখুঁত প্রকৌশল— এসব কোনো কিছুই রাতারাতি বাড়ানো যায় না, এমনকি এক বছরের মধ্যেও নয়। এগুলোর জন্য প্রয়োজন চুক্তি, দক্ষ শ্রমিক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। আর যুদ্ধ যে জিনিসটি সবচেয়ে দ্রুত গ্রাস করে, তা হলো এই সময়।সংঘাতের শুরুতে মজুত অস্ত্র এই বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখে। কমান্ডাররা তখন উদারভাবে অস্ত্র ব্যবহার করেন, কারণ তারা তা করতে পারেন। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করে, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং যুদ্ধের গতি টেকসই বলে মনে হয়। কিন্তু এটি একটি বিভ্রম। মাত্র একটি তীব্র রাতের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই কয়েক মাসের উৎপাদনকে শেষ করে দিতে পারে। আর যখন মজুত একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে যায়, তখন কৌশল পরিবর্তন শুরু হয়— নীতির কারণে নয়, বরং গাণিতিক বাস্তবতার কারণে।এই সীমাবদ্ধতা উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যদিও ভিন্নভাবে। যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর করে অত্যাধুনিক, ব্যয়বহুল এবং সীমিত সংখ্যক অস্ত্র ব্যবস্থার ওপর, যা প্রতিস্থাপন করা ধীরগতির। অন্যদিকে ইরান নির্ভর করে পরিমাণ ও অসম কৌশলের ওপর— সস্তা ড্রোন, সহজ ক্ষেপণাস্ত্র যেগুলো সরাসরি জয়ের জন্য নয়, বরং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তুলতে, চাপ সৃষ্টি করতে এবং ব্যয় বাড়াতে ব্যবহৃত হয়।এটি এক ধরনের প্রতিযোগিতা— যা হলো নির্ভুলতা বনাম স্থায়িত্ব, গুণমান বনাম পরিমাণ। ইতিহাস দেখায়, এমন প্রতিযোগিতায় কোনো পক্ষই একচেটিয়া সাফল্য পায় না। ১৯৪৪ সালে জার্মানি তা উপলব্ধি করেছিল, যখন মিত্রশক্তির শিল্প উৎপাদন তাদের কৌশলগত দক্ষতাকে ছাপিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রও ভিয়েতনাম এবং পরে ইরাকে একই ধরনের বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিল, যেখানে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে।এখানে সময়ই হলো গোপন নিয়ামক। যে পক্ষ সময়কে ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারে, সাধারণত তারাই টিকে থাকে— অথবা অন্তত বিজয়ের সংজ্ঞা পরিবর্তন করার মতো সময় পায়।এরপর আসে বাজার। বাজার সেনাবাহিনীর চেয়েও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং কৌশলগত গল্পে খুব কমই আগ্রহী। বিনিয়োগকারীরা কোনো অঞ্চল কার নিয়ন্ত্রণে তা নিয়ে মাথা ঘামায় না; তারা চায় স্থিতিশীলতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং ঝুঁকি কম থাকা। এগুলো যখন নষ্ট হতে শুরু করে, তখন পুঁজি সরে যেতে শুরু করে— প্রথমে ধীরে, তারপর হঠাৎ করে।জ্বালানি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। পারস্য উপসাগরে যেকোনো বিঘ্ন পরিস্থিতি দ্রুত বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলে। তেলের দাম বাড়ে, জাহাজ চলাচলের পথ পরিবর্তিত হয়, বীমার খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু এর দ্বিতীয় প্রভাব আরও গভীর— সারের দাম বাড়ে, কয়েক মাস পরে খাদ্যের দামও বাড়ে। নিয়ন্ত্রিত মুদ্রাস্ফীতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।আধুনিক অর্থনীতি একে অন্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। জ্বালানির মতো একটি খাতে টান পড়লে পুরো ব্যবস্থাই নড়বড়ে হয়ে যায়। বিমান চলাচল বদলে যায়, সরবরাহ শৃঙ্খল দীর্ঘ হয়, উৎপাদন ধীর হয়ে যায় এবং পৃথিবীর কোনো এক কোণে একজন ভোক্তা হঠাৎ করে রুটি বা বিদ্যুতের জন্য বেশি মূল্য দিতে শুরু করে, কারণটি না জেনেই।আরও একটি নতুন মাত্রা রয়েছে ডিজিটাল অবকাঠামো। ডেটা সেন্টার, ক্লাউড নেটওয়ার্ক— এগুলো এখন আর প্রান্তিক নয়, বরং অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এগুলো লক্ষ্যবস্তু হলে প্রভাব পড়ে আর্থিক খাত, যোগাযোগ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায়।আমার মতে, ইরান এই বিষয়টি বেশ ভালো করে বুঝতে পেরেছে। তাই, ইরান শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বরং সেই অর্থনৈতিক স্নায়ুতন্ত্রকে লক্ষ্য করছে, যা সামরিক শক্তিকে টিকিয়ে রাখে। যুক্তি সহজ— যদি একটি পরাশক্তির অর্থনৈতিক পরিবেশকে জটিল করে তোলা যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানো তার জন্য অনাকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।এই অর্থে বাজার এক ধরনের অদৃশ্য বিচারকের মতো কাজ করে। তারা যুদ্ধ থামাতে পারে না, কিন্তু এর খরচ এত বাড়িয়ে দিতে পারে যে রাজনৈতিক নেতারা বিজয়ের নয়, বরং বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে শুরু করেন।এবার আসা যাক রাজনীতির কথায়— যা সবচেয়ে অবমূল্যায়িত, অথচ প্রায়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।যুদ্ধ সাধারণত ঐক্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। জনগণ পতাকার চারপাশে একত্রিত হয়, বিরোধিতা সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়, এবং নেতারা সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ পান। কিন্তু এই ঐক্য স্থায়ী নয়। খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং লক্ষ্য অস্পষ্ট হয়ে পড়লে এটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।গণতান্ত্রিক দেশে সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হবেই, যুদ্ধ শেষ হোক বা না হোক। আর এই নির্বাচনই পররাষ্ট্রনীতিকে অভ্যন্তরীণ সমস্যায় পরিণত করে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি তখন আর একটি বিমূর্ত বিষয় থাকে না; এটি হয়ে ওঠে নির্বাচনী ইস্যু। সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। আর যদি হতাহতের সংখ্যা বাড়ে, তবে তা প্রতীক হয়ে ওঠে।যুক্তরাষ্ট্রও এমন একটি সময়সীমার মুখোমুখি। মধ্যবর্তী নির্বাচন একটি অনিবার্য বাস্তবতা, যা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে বদলে দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের আইনপ্রণেতারা তখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন— এই যুদ্ধ কতদিন চলবে? কত খরচ হবে? এর উদ্দেশ্য কী?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনারেলরা দিতে পারেন না। এগুলো এমন প্রশ্ন, যা রাজনীতিবিদদের এড়ানোর উপায় নেই।ইতিহাস এখানে আবারও পথ দেখায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ সামরিক বিকল্পের অভাবে শেষ হয়নি; এটি শেষ হয়েছিল কারণ অভ্যন্তরীণ সমর্থন ভেঙে পড়েছিল। ইরাক যুদ্ধও একই ধরনের পথ অনুসরণ করেছিল, যদিও কম নাটকীয়ভাবে। উভয় ক্ষেত্রেই যুদ্ধক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক সহনশীলতা ছিল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।ইরানের কৌশলও মনে হয় এই বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। দ্রুত জয়লাভ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করা— সামরিক, অর্থনৈতিক এবং মানসিক যতক্ষণ না প্রতিপক্ষের জোট নিজের ভেতরেই দুর্বল হয়ে পড়ে।এটাই হলো ‘অস্ত্র, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা’র সারকথা। এটি কোনো স্লোগান নয়; এটি একটি কাঠামো, যেখানে প্রতিটি উপাদান অন্যটিকে শক্তিশালী করে। অস্ত্রের ঘাটতি সামরিক বিকল্পকে সীমিত করে, বাজারের অস্থিরতা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাড়ায়, আর রাজনৈতিক চাপ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর ইচ্ছাকে দুর্বল করে।এই চক্রের ভেতরেই যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে যায়। পূর্ণ বিজয় পরিণত হয় আংশিক সাফল্যে। লক্ষ্যগুলো নীরবে সংশোধিত হয়। আলোচনা, যা একসময় প্রত্যাখ্যাত ছিল, তা বাস্তবসম্মত বিকল্পে পরিণত হয়। নেতারা তখন স্থিতিশীলতা, প্রতিরোধ, ভারসাম্যের মতো শব্দ ব্যবহার করেন— যা আসলে সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়, বিজয়ের নয়।সম্ভবত এইভাবেই এই যুদ্ধ শেষ হবে— কোনো একক সিদ্ধান্তমূলক আঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং বিভিন্ন চাপের একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে। স্পষ্টতার মাধ্যমে নয়, বরং এমন এক অস্পষ্টতার মাধ্যমে, যাকে দক্ষতার সঙ্গে সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।এখানে একটি বিদ্রূপ রয়েছে। যুদ্ধ প্রায়ই শুরু হয় সর্বোচ্চ লক্ষ্য নিয়ে— শত্রুকে পরাজিত করা, অঞ্চল পুনর্গঠন, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। কিন্তু শেষ হয় অনেক বেশি সীমিত ফলাফলে— নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ এবং প্রায় আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া, যদিও অনেক বেশি খরচ ও কম ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে।ইরান এই ধারণাটি বোঝে এবং এর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও তা বোঝে, যদিও তা স্বীকার করতে সময় নেয়। পার্থক্য জ্ঞানে নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তাকে সহ্য করার রাজনৈতিক সক্ষমতায়।শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলো সেইগুলো হবে না, যা মানুষ টেলিভিশনে দেখে। এগুলো ঘটবে উৎপাদন প্রতিবেদন, বাজার সূচক এবং জনমত জরিপে। কম নাটকীয়, কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর যখন এই তিনটি ফাটলরেখা— অস্ত্র, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা একত্রিত হবে, তখন ফলাফল ঘোষণার প্রয়োজন হবে না। তা ইতোমধ্যেই নির্ধারিত হয়ে যাবে।[লেখক: প্রাবন্ধিক]

মালাকারটোলা গণহত্যা

পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ ঢাকায় গণহত্যা শুরু করার পর প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজারবাগ ও পিলখানায় হামলা চালায়। এ তিন স্থানে গণহত্যার পর ২৭ মার্চ সবচেয়ে বড় গণহত্যা চালায় পুরান ঢাকার লোহারপুল এলাকার মালাকারটোলায়। তাদের লক্ষ্য ছিল ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত মহল্লাগুলো। এ গণহত্যায় আমিও আমার দুভাইকে হারাই। মালাকারটোলায় আমাদের বাড়িটি ছিল বাম রাজনীতির একটি কেন্দ্র। আমরা তিন ভাই ও পাঁচ বোন মা-বাবার সঙ্গে সে বাড়িতে থাকতাম। আমার বাবা ও ভাইরা সবাই ছিলেন বাম আদর্শের কর্মী। আমাদের বাড়িতে প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার আবহ ছিল। আমি তখন গেন্ডারিয়া হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি।২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হওয়ার পর ২৬ মার্চ সারাদিন পুরান ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও থানায় হামলা চালিয়ে যাকে যে অবস্থায় পেয়েছে পাকিস্তানিরা, মেশিনগানের ব্রাশফায়ারে হত্যা করেছে। আমরা আতঙ্ক আর কারফিউর কারণে বাড়ি থেকে বের হইনি। ২৭ মার্চ সকালে কারফিউ শিথিল হলে আশপাশের এলাকা দেখতে বের হই। বিধ্বস্ত চেহারা বিভিন্ন এলাকার। শাঁখারিপট্টিতে অনেক লাশ পড়ে থাকতে দেখি। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি সূত্রাপুর থানা, সেখানে গিয়ে দেখি পাকিস্তানিদের মর্টার আর মেশিনগানের গুলিতে পুরো ভবনটি প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে আছে। থানার ভেতরে দেখি এক পুলিশের লাশ পড়ে আছে। পাকিস্তানি সৈন্যবোঝাই গাড়ি লোহারপুলের ওপর দিয়ে যাওয়া-আসা করছে। এরই মধ্যে দেখলাম একদল লোক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে লুটপাট করছে। অন্যদিকে অসংখ্য মানুষ ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাচ্ছে শহর ছেড়ে। এসব দেখে চরম ভয় পেয়ে আবার বাড়ি ফিরে ঢাকা ছেড়ে পালানোর পরিকল্পনা করি। ঠিক করি পরদিনই আমরা বুড়িগঙ্গা নদী পেরিয়ে বিক্রমপুরের দিকে চলে যাব। এসব ভাবনাচিন্তার মধ্যেই ২৭ মার্চ রাত নেমে আসে। রাতে পাকিস্তানি বাহিনী হামলা করতে পারে ভেবে আমি পাশের মুসলমানদের বাড়িতে চলে যাই রাত কাটাতে। আমার বোনরাও অন্য এক বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। বাড়িতে থেকে যায় বাবা, ভাই দুলাল ও বিপ্লব।সন্ধ্যা থেকে আবার কারফিউ শুরু হয়। রাত ১১টার দিকে একদল আর্মি এসে আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে। দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে আমার বাবা কালিপদ দে, ভাই দুলাল দে ও বিপ্লবকে ধরে নিয়ে যায়। ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে পাকিস্তান আর্মি সবাইকে জেরা করে এবং কাপড় খুলে দেখে নিশ্চিত হয় যে তারা সবাই হিন্দু। আমাদের বাড়িতে হামলা করার আগে-পরে আর্মি আরও কয়েকটি বাড়িতে হামলা করে অনেক লোককে ধরে নিয়ে যায়। সবাইকে নিয়ে যাওয়া হয় লোহারপুলে। সেখানে সবাইকে লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে একসঙ্গে সবার দিকে মেশিনগান উঁচিয়ে গুলি করা হয়। গুলি খেয়ে সবাই লুটিয়ে পড়ে। তবে সৌভাগ্যক্রমে আমার বাবাসহ আরও দু-তিনজন বেঁচে যান। বাবার গালে ও কানে গুলি লাগে, দু’একজনের গায়ে একেবারেই গুলি লাগেনি। তারা দোলাই খালের ময়লা পানিতে মড়ার মতো পড়ে থাকেন। আহত শরীর নিয়ে আমার বাবাও মাটিতে শুয়ে থাকেন। কয়েক ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পর খুব ভোরে ফজরের নামাজের আজানের শব্দ শুনে বাবা উঠতে চেষ্টা করেন। উঠেই তিনি দেখেন আমার ভাই দুলাল দে শুয়ে আছে পাশেই। তিনি খুব মিহি কণ্ঠে দুলালকে ডাকেন। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারেন দুলাল বেঁচে নেই। এরপর তিনি রক্তাক্ত শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে দোলাই খালের পাড় দিয়ে হেঁটে কাছেই আমাদের পরিচিত ডা. আজিজুন্নেসার বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। ডা. আজিজুন্নেসা তাড়াতাড়ি একজন লোক দিয়ে বাবাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে পাঠান। সেখানে বাবা প্রায় এক সপ্তাহ চিকিৎসা নিয়ে প্রথমে বিক্রমপুর গিয়ে আমাদের সঙ্গে মিলিত হন। পরে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আমরা সবাই আগরতলায় চলে যাই।[লেখক: প্রাবন্ধিক]

স্বাধীনতা দিবস: সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি ও গণমানুষের বঞ্চনা

২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং জাতীয় জীবনে একটি গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্যবাহী মুহূর্ত। দিনটি আমাদের জন্য একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং একটি চলমান, কিন্তু এখনো অসমাপ্ত জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রগঠনের প্রকল্পের মূর্তপ্রতীক। ১৯৭১ সালের এ দিনে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে রক্তাক্ত সংগ্রামের পথ ধরে আমরা অর্জন করি বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয়ের মাধ্যমে আমাদেরকে দু’বার স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছিল। আমাদের এ অর্জন ছিল উপনিবেশিক এবং উপনিবেশ-উত্তর শাসনব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক মুক্তির ঘোষণা। সেই ঘোষণার মধ্যে নিহিত ছিল একটি ন্যায্য, সমতাভিত্তিক এবং মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে প্রশ্নটি আজ আরও তীক্ষ্ণ, আরও অনিবার্য হয়ে ওঠে, সেটি হলো, এই রাষ্ট্র কি সত্যিই জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, নাকি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কেবল শাসকের হাতবদল ঘটেছে, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র অপরিবর্তিত থেকেছে, আর প্রান্তিক মানুষ রয়ে গেছে একই বাস্তবতায় আবদ্ধ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের ধারণাকে কেবল আবেগের আলোকে নয়, বরং তাত্ত্বিক ও দার্শনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা জরুরি।ইংরেজ চিন্তক টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) তার ‘লেভিয়াথান’-এ রাষ্ট্রকে একটি সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যার প্রধান দায়িত্ব হলো বিশৃঙ্খলা রোধ করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। তার দৃষ্টিতে, মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা ছিল সংঘাতপূর্ণ; তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব অপরিহার্য। কিন্তু এই ধারণা পরবর্তীকালে অপর ইংরেজ চিন্তক জন লক (১৬৩২-১৭০৪) সংশোধন করেন। লক যুক্তি দেন যে রাষ্ট্রের বৈধতা কোনো পরম ক্ষমতায় নয়, বরং জনগণের সম্মতি ও তাদের প্রাকৃতিক অধিকার তথা জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র যদি এই মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের সেই রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, সুইস চিন্তক জাঁ-জাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮) ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল)-র ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, প্রকৃত সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে নয়; এটি নিহিত থাকে জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা ও অভিন্ন স্বার্থে। রাষ্ট্র তখনই বৈধ ও কার্যকর হয়ে ওঠে, যখন তা এই সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে স্পষ্ট হয় যে, যদি রাষ্ট্র জনগণের প্রত্যাশা, প্রয়োজন ও অধিকারকে প্রতিফলিত না করে, তবে তা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে, অর্থাৎ নামমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান থাকে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সার্বভৌম হয় না।বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে এক গভীর ও স্পষ্ট বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মালিকানা গণমানুষের হাতে ন্যস্ত হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের ভিন্ন এক চিত্র দেখায় যেখানে ক্ষমতা ধীরে ধীরে একটি সীমিত, কেন্দ্রাভিমুখী গোষ্ঠীর ভেতরে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া এবং সম্পদ বণ্টনের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণ প্রায়ই প্রতীকী স্তরে সীমাবদ্ধ থেকেছে। কার্যত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রটি থেকে তারা বহুলাংশে বিচ্ছিন্ন। এই প্রেক্ষাপটে ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘হেজিমনি’ (আধিপত্য)-র ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি দেখিয়েছেন, শাসকশ্রেণী কেবল বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রীয় দমননীতির মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে না; বরং তারা সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এমন এক সম্মতিনির্ভর বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে তাদের আধিপত্য স্বাভাবিক, এমনকি অপরিহার্য বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আধিপত্য কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষা, গণমাধ্যম, প্রশাসন এবং সামাজিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়েও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ফলে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে যে, তা অনেকের কাছেই প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়।এখানে ফরাসী ঐতিহাসিক ও চিন্তক মিশেল ফুকোর (১৯২৬-১৯৮৪) ‘ক্ষমতা তত্ত্ব’ (পাওয়ার থিওরি) এই আলোচনাকে আরও গভীরতা প্রদান করে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ক্ষমতা কোনো একক কেন্দ্র বা শীর্ষস্তরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহুমাত্রিক, বিস্তৃত এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে থাকে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনব্যবস্থা, এমনকি ভাষা ও দৈনন্দিন চর্চার মধ্য দিয়েও ক্ষমতা নিজেকে ক্রমাগত পুনরুৎপাদন করে। ফলে ক্ষমতার দৃশ্যমান রূপ, যেমন সরকার বা নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও, অদৃশ্য কাঠামোগত সম্পর্কগুলো অপরিবর্তিত থেকে যেতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতিতে একটি লক্ষণীয় ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এই ধারাবাহিকতা আমাদের সামনে একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের ব্যর্থতা নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক জটিলতা, যেখানে ক্ষমতার বিন্যাস এমনভাবে স্থায়ী রূপ পেয়েছে যে, তা সহজে পরিবর্তিত হয় না। ফলে স্বাধীনতার পর যে রাষ্ট্র জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন হওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে এক সীমাবদ্ধ ক্ষমতার পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে জনগণের মাঝে পরিবর্তনের প্রত্যাশা বারবার জাগ্রত হলেও, কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে তা পূর্ণতা পায় না।ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলার শাসকগোষ্ঠীর গণবিচ্ছিন্নতা কেবল সাম্প্রতিক কোনো বাস্তবতা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ার ফল, যা বর্তমান সংকটকে আরও গভীর ও জটিল করে তুলেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে যে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা মূলত একটি ‘শোষণমূলক রাষ্ট্র’ যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশ থেকে সম্পদ আহরণ এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতার স্বার্থ সংরক্ষণ। এই কাঠামোয় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য, আর প্রশাসন ছিল জনগণের সেবক নয়, বরং শাসকের হাতিয়ার। পাকিস্তান আমলেও এই একই ধারা বহুলাংশে অব্যাহত থাকে, যেখানে পূর্ব বাংলার জনগণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় থেকে যায়। স্বাধীনতার মাধ্যমে সেই শোষণমূলক কাঠামো ভেঙে দিয়ে জনগণের মনে একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল এক গভীর ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই প্রত্যাশার কেন্দ্রে ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হবে এবং উন্নয়ন ও সম্পদের সুফল দেশের সব মানুষের মাঝে সমভাবে বণ্টিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের দেখিয়েছে ভিন্ন এক চিত্র। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বহু ক্ষেত্রে সেই পুরনো শোষণমূলক প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদ একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত থেকে গেছে, আর সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত অধিকার ও সুযোগ থেকে সবসময়ই বঞ্চিতই রয়ে গেছে।বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক দুর্বলতা হলো দলীয় ও পরিবারতান্ত্রিক বৃত্তবদ্ধতা, যা সর্বস্তরের মানুষের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে প্রকৃত অর্থে সীমিত করে ফেলে। এ প্রসঙ্গে জার্মান বংশোদ্ভুত সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট মিখেলসের (১৮৭৬-১৯৩৬) ‘অলিগার্কের লৌহ আইন’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, যে কোনো সংগঠন, তা যতই গণতান্ত্রিক আদর্শে প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ক্ষমতাবান এই গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান সংরক্ষণে এমন সব কলাকৌশল অবলম্বন করে, যা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ক্রমশ সংকুচিত করে ফেলে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এই তত্ত্বের এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এখানে দলীয় কাঠামোর ভেতরেই এমন এক অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ গড়ে উঠেছে, যেখানে নেতৃত্বের পরিবর্তন বা বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ অত্যন্ত সীমিত, এমনকি প্রায় অসম্ভব। পরিবারতান্ত্রিক প্রভাব, আনুগত্যভিত্তিক রাজনীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন- এসব উপাদান মিলিয়ে একটি সংকীর্ণ বৃত্ত তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রবাহকে সাধারণ জনগণের দিকে না নিয়ে সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই আবদ্ধ রাখে। ফলে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও, তার কার্যকারিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট কেবল সাময়িক বা ব্যক্তিনির্ভর নয়; এটি গভীরভাবে প্রোথিত একটি ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা, যেখানে শোষণমূলক কাঠামো এবং অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ একে অন্যকে শক্তিশালী করে চলেছে। এর ফলে স্বাধীনতার মৌলিক প্রতিশ্রুতি তথা জনগণের ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্রের সর্বত্র সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা আজও পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি।সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে এই দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে তা কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘটনারূপে নয়, বরং গণমানুষের সঞ্চিত বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং প্রত্যাশার এক প্রতীকী বিস্ফোরণ হিসেবে প্রতিভাত হয়। এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপেক্ষিত মানুষরা নিজেদের অস্তিত্ব, অধিকার এবং অংশগ্রহণের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এই অর্থে, ঘটনাটিকে জাঁ-জাক রুশোর ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল) অর্থাৎ জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য দাবির এক ধরনের পুনরুত্থান হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার পুনরায় উচ্চারিত হয়েছে। তবে এই জাগরণ, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তা রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রত্যাশিত প্রতিফলন পায়নি। অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে অনীহা, বিলম্ব এবং নানা কৌশলগত তালবাহানার আশ্রয় নেয়া ইঙ্গিত দেয় যে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকে ভেঙে তা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অনিচ্ছুক, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধী। রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও পারস্পরিক প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে যে পরিবর্তনের দাবি যতই জোরালো হোক না কেন, ক্ষমতার বর্তমান বিন্যাস তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত নয়।এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ‘পথের উপর নির্ভরতা’ (পাথ ডিপেন্ডেন্সি) তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, অতীতের প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার বিন্যাস এমন এক ধারাবাহিকতা তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথগুলোকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। ফলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলেও তা সহজে বাস্তবায়িত হয় না, কারণ বিদ্যমান কাঠামো নিজেকে টিকিয়ে রাখতে নানা কলাকৌশলের প্রয়োগ ও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোতেই নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণ, নীতিনির্ধারণের ধরণ এবং ক্ষমতার চর্চার মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি হয় অর্থাৎ ব্যক্তি, পরিবার বা দল পরিবর্তিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের শাসনের ধরন অপরিবর্তিত থেকে যায়। গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক রূপ বিদ্যমান থাকলেও, তার ভেতরকার চর্চা ও কার্যকারিতা ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে অনেকাংশে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা যায়, যেখানে গণতন্ত্রের ভাষ্য বজায় রেখেই এক ধরনের কাঠামোগত স্বৈরতন্ত্র পুনরুৎপাদিত হয় যা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেয় মুক্তির, কিন্তু বাস্তবে তাদের আবদ্ধ করে রাখে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক, পরিত্রাণহীন নিয়তির মধ্যে।এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন একটি মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন যা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর আংশিক পরিবর্তনের প্রয়াসে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, রাজনৈতিক দর্শন এবং ক্ষমতার বিন্যাসের একটি সামগ্রিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করবে। এখানে প্রশ্নটি কেবল কে শাসন করবে, তা নয়; বরং কিভাবে শাসন পরিচালিত হবে এবং সেই শাসনের উদ্দেশ্য কী হবে- এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর পুনর্বিবেচনা অপরিহার্য। মার্কিন চিন্তক জন রলস (১৯২১-২০০২) তার ‘ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায় বিচার’ (জাস্টিস এজ ফেয়ারনেস) তত্ত্বে যে ধারণা তুলে ধরেছেন, তা এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তার মতে, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গঠিত হওয়া উচিত, যাতে তা সর্বপ্রথম এবং সর্বাধিকভাবে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে। অর্থাৎ উন্নয়ন, নীতি এবং সম্পদ বণ্টনের মানদণ্ড নির্ধারিত হবে ক্ষমতাবানদের সুবিধা নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে। এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অপরিহার্য হয়ে ওঠে। একটি সক্রিয়, সচেতন এবং সংগঠিত নাগরিক সমাজই পারে রাষ্ট্রের ওপর কার্যকর জবাবদিহিতা আরোপ করতে, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে জনমত গড়ে তুলতে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলন- এই সবগুলো ক্ষেত্র সম্মিলিতভাবে একটি সমালোচনামূলক নাগরিক চেতনা নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে, যা রাষ্ট্রকে তার প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধ রাখতে সক্ষম হবে।এই প্রেক্ষাপটে আমাদের স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য নতুন করে অনুধাবন করা প্রয়োজন। এটি কেবল জাতির জন্য অতীতের গৌরবময় অর্জন স্মরণের দিন নয়; বরং একটি অসমাপ্ত সংগ্রামের পুনঃঘোষণা, একটি নৈতিক দায়বদ্ধতার নবায়ণ। স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধানের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হবে যেখানে মানুষ নিজেকে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হিসেবে অনুভব করবে, এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাইরের প্রভাব ও আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকবে। অতএব, স্বাধীনতা দিবসে গণমানুষের ভাগ্যের প্রকৃত পরিবর্তনই হোক আমাদের স্বাধীনতার মূল অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সর্বোপরি একটি জাগ্রত, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক নাগরিক সমাজ। অন্যথায় স্বাধীনতা একটি প্রতীকী অর্জন হিসেবেই থেকে যাবে, কিন্তু তার বাস্তব রূপ চিরকালই আমাদের নাগালের বাইরে রয়ে যাবে। তাই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক- স্বাধীনতাকে কেবল অতীতের একটি সাফল্য হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান, ক্রমবিকাশমান প্রকল্প হিসেবে দেখা; এবং সেই প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে গণমানুষের মুক্তি, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ

স্বাধীনতা যেকোনো জাতির জীবনে শ্রেষ্ঠ অর্জন। ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই স্বাধীনতা লাভ করতে বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছে। সব জাতির স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ প্রয়োজন হয়নি। বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ করেছে— নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম, যেখানে ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে। দুই লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছে এবং কোটি কোটি মানুষ অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছে। তারপর এই স্বাধীনতা লাভ করেছে।সুতরাং, বাঙালির এই স্বাধীনতা বিষয়টি অন্য দেশের স্বাধীনতা লাভের চাইতে অবশ্যই একটু আলাদা। পৃথিবীর অনেক জাতি সংগ্রাম করে স্বাধীনতা লাভ করেছে। আবার অনেক দেশ শুধু অধ্যাদেশের বা ঘোষণার মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে। কোনো কোনো দেশ ঔপনিবেশিক বা অন্যান্য রাজকীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে— রাজতান্ত্রিক বা শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে।ভারত বিভাগ, অর্থাৎ ব্রিটিশদের কাছ থেকে যে ভারত বিভাজিত হয়, সেটিও ঠিক আক্ষরিক অর্থে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে হয়নি। বাঙালি জাতিকে ৪৭-এর বিভাজনের পরে খুব সঙ্গতভাবেই এদেশের মানুষ উপলব্ধি করেছে যে তারা প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করেনি। এই স্বাধীনতা লাভ না করার পেছনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য তো ছিলই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জাতিগত সংকট বা জাতীয়তাবাদের চেতনার সংকট।বাঙালি জাতির এই ভূমি থেকে উৎসারিত যে চেতনা, যে মনন, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, জীবনাচার দিয়ে তৈরি হয়েছে— সেটি দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বিভাজিত পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিকভাবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে মানুষ অনুশীলন করতে পারেনি, চর্চা করতে পারেনি। স্বাভাবিকভাবে বাঙালির যে জাতীয়তাবাদী পরিচয়, সেই পরিচয় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেনি পাকিস্তানে।এই অনানুষ্ঠানিক বাঙালিয়ানার শক্তিকে পাকিস্তানিরা ভয় পেত এবং হিংসা করত। তারা বাঙালিকে শুধু চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার করেনি, শুধু অর্থনৈতিকভাবে বৈষম্যের শিকার করেনি, শিক্ষার ক্ষেত্রেও বৈষম্য করেছে। তার সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে— তার গান, নৃত্য বা ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে শত শত বছর ধরে চলে আসা বাঙালির উৎসব ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড— সেগুলোকেও তারা অপছন্দ করত। এমনকি তারা এর চর্চাকে ভয় পেত।কারণ তারা মনে করত, বাঙালি যদি তার নিজস্ব পরিচয়ে সমৃদ্ধ হয়, তাহলে একদিন তারা যে বৈষম্যমূলক শাসন, শোষণ ও নিপীড়ন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানবাসীর ওপর পরিচালনা করছিল, সেটি বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তারা বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে সবসময় ভয় করত, হিংসা করত এবং এ ধরনের সামাজিক ও জাতীয় কর্মকাণ্ডকে শুধু নিরুৎসাহিতই নয়, কখনও কখনও বাধাগ্রস্তও করত।রবীন্দ্রসংগীত চর্চার ক্ষেত্রে তারা অনেক বিধিনিষেধ তৈরি করেছিল। ঠিক তেমনই নাট্যকলা চর্চার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ ছিল। নজরুলের অনেক কবিতা, প্রবন্ধ ভজন, কীর্তনসহ অনেক কালজয়ী সংগীতকেও এদেশে অলিখিতভাবে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হতো। বাংলা ভাষাকেও তারা ভয় পেত। সে কারণেই ভাষার দাবিতে বাঙালিকে আন্দোলন করতে হয়। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের কথা এই জাতি সবসময় শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ রাখে।তাই বাঙালি যে মুক্তিযুদ্ধ করেছে— সেটি শুধু মানচিত্র পরিবর্তন বা শুধু একটি পতাকা পরিবর্তনের জন্য নয়। শুধু কোনো বিশেষ উর্দুভাষী ব্যক্তির পরিবর্তে বাঙালি নামের কোনো মানুষের দ্বারা শাসিত হওয়ার জন্যও নয়। আসলে আকাঙ্ক্ষা ছিল আমাদের নিজস্ব মাটির ওপর দাঁড়িয়ে, নিজস্ব সংস্কৃতির চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বাঙালির সম্ভাবনাকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করা।বাঙালির অনেক সমৃদ্ধ শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য ছিল এবং তার বিচ্ছিন্ন অবয়ব এখনও বিরজমান। সেগুলোকে ধারণ করে, চর্চা করে এবং আমাদের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও মানবসম্পদ ব্যবহার করে এবং দীর্ঘদিন বিজাতীয়দের দ্বারা শাসিত ও শোষিত বাঙালির ব্যর্থতা ও সম্ভাবনার দ্বান্দ্বিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা তুলে দাঁড়ানোর যে আকাঙ্ক্ষা, যা কোনো একক ব্যক্তির ছিল না, কোনো একক দলেরও ছিল না। এটি ছিল গোটা বাংলার ভূখণ্ডের সব মানুষের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সেই চেতনার সমৃদ্ধ জাতি নির্মাণের।এখানে বাংলা ভাষাভাষী তো বটেই, যারা অন্য ভাষাভাষী নৃগোষ্ঠী , তারাও একটি উদার রাষ্ট্রনীতি চাইতেন— যেখানে সব ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমান সুযোগ ভোগ করে রাষ্ট্রীয় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করবে। সেটি ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা।এটি কোনো লিখিত দলিলের প্রয়োজন ছিল না। এটি ছিল গোটা বাংলাদেশের এই ভূখণ্ডের মানুষের একটি অলিখিত ঐকমত্য (কনসেনসাস)— সমস্ত বাঙালির একটি স্বাভাবিক জনমত। সেই আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে বাঙালি নয় মাসের মরণপণ যে যুদ্ধ করেছিল, সেটিই হলো মুক্তিযুদ্ধ।সেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা লাভ করা— এটি আসলে শুধু কোনো অধ্যাদেশের মাধ্যমে কোনো নতুন রাষ্ট্রের স্বাধীন পরিচয় লাভ করা নয়। এটি বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের হৃদয়ে লালিত স্বপ্নে ভরা এক বিশাল শক্তিমত্তায় ঋদ্ধ আকাঙ্ক্ষা।সে আকাঙ্ক্ষা হলো— বাঙালি পৃথিবীর কোনো জাতির চাইতে ছোট নয়। সুতরাং আমাদের স্বাধীনতা শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তনের স্বাধীনতা নয়। এ স্বাধীনতা বাঙালির হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা, এটি বাঙালির চিরায়ত জাতীয়তাবাদী চেতনার আকাঙ্ক্ষা, মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে পরিচিত লাভের আকাঙ্ক্ষা।এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা, কোনো গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতা বা কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক সংকীর্ণতা এই আকাঙ্ক্ষাকে দমন করতে পারে না, খণ্ডিত করতে পারে না। বরং এটি হলো তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি মানুষের এই ভূখণ্ডের মানুষের আকাঙ্ক্ষা, আজকের দিনের আঠারো কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা।কাজেই আজকে যে স্বাধীনতা দিবস— এই স্বাধীনতা দিবস বাঙালির ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের যে আকাঙ্ক্ষা, সে আকাঙ্ক্ষার ফসল। প্রকৃত স্বাধীন, মুক্ত, উদার বাঙালি জাতীয়তাবাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা— সে আকাঙ্ক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় আজকের স্বাধীনতা দিবস।এই স্বাধীনতা দিবসকে কোনো সংকীর্ণ দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। এটি আঠারো কোটি বাঙালির সম্পদ। এই স্বাধীনতার আস্বাদন প্রতিটি বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে— এটি হলো আজকের দিনের অঙ্গীকার।বাঙালি অতীতে কখনই কোনো সংকীর্ণ স্বার্থের কাছে বা কোনো দাম্ভিক শক্তির কাছে হার মানেনি এবং ভবিষ্যতেও কখনও হার মানবে না। বাঙালি উদার বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ করবে— সেটিই আজকের দিনের স্বাধীনতা দিবসের আমাদের সবার আকাঙ্ক্ষা।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক : সাবেক প্রোভাইস চ্যান্সেলর, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়]

ভিডিও

সিঙ্গাপুরে পৌঁছেছেন হামজা-শামিতরা

এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের শেষ ম্যাচে অংশ নিতে ভিয়েতনাম থেকে সিঙ্গাপুর পৌঁছেছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল।আগামী ৩১ মার্চ স্বাগতিক সিঙ্গাপুরের মুখোমুখি হবে লাল-সবুজ প্রতিনিধিরা। দুই দলের জন্য এই ম্যাচের সমীকরণ ভিন্ন ভিন্ন।সিঙ্গাপুর এরই মধ্যে টুর্নামেন্টের মূল পর্বে খেলা নিশ্চিত করে ফেললেও বাংলাদেশের বিদায় আগেভাগেই নিশ্চিত হয়ে গেছে। এখন কেবল সম্মান বাঁচানোর লড়াইয়ে মাঠে নামবে জামাল ভূঁইয়া ও হামজা চৌধুরীরা।বাছাইপর্বের আগের ৫ ম্যাচে বাংলাদেশের অর্জন ৫ পয়েন্ট। ঘরের মাঠে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে প্রথম সাক্ষাতে ২-১ গোলে হেরেছিল লাল-সবুজের দল। ফিরতি লেগের এই ম্যাচে জয় পেলে বাংলাদেশের পয়েন্ট হবে ৮, যা এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের মিশনে একটি সম্মানজনক সমাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।এবারের বাছাইপর্বে অ্যাওয়ে ম্যাচে বাংলাদেশের রেকর্ড বেশ আশাব্যঞ্জক। ভারতের বিপক্ষে গোলশূন্য এবং হংকংয়ের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে অপরাজিত থাকার আত্মবিশ্বাস নিয়েই সিঙ্গাপুরের মাঠে নামছে দল।তবে মূল ম্যাচের আগের প্রস্তুতিটা মোটেও ভালো হয়নি বাংলাদেশের। সিঙ্গাপুর সফরের আগে ভিয়েতনামের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিলো হামজা-শামিতরা। হ্যানয়ে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছে ক্যাবরেরার শিষ্যদের। এই হার দলের মানসিকতায় কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।সব ছাপিয়ে এখন মূল আলোচনায় স্প্যানিশ কোচ হ্যাভিয়ের ক্যাবরেরার ভবিষ্যৎ। আগামী এপ্রিলে বাফুফের সঙ্গে তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।গুঞ্জন রয়েছে, সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচের ফলের ওপরই নির্ভর করছে তার চুক্তি নবায়ন। ক্যাবরেরা নিজে বাংলাদেশে কাজ চালিয়ে যেতে আগ্রহী হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গ্যালারিতে ফুটবল ভক্তদের ক্ষোভের মুখে আছেন তিনি। সমর্থকদের বড় একটি অংশ তাকে আর কোচের পদে দেখতে রাজি নয়। ফলে সিঙ্গাপুর মিশন কেবল দলের সম্মান রক্ষার নয়, বরং কোচের গদি টিকিয়ে রাখারও কঠিন এক পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে।

সিঙ্গাপুরে পৌঁছেছেন হামজা-শামিতরা
১৭ মার্চ ২০২৬, ০৩:১৬ পিএম
এবার বাংলাদেশে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর কবে হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

এবার বাংলাদেশে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর কবে হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

  ২০ মার্চ ২০২৬
  ২১ মার্চ ২০২৬
  নিশ্চিত নই
মোট ভোটদাতাঃ ১২ জন