সংবাদ
৯ মাসের কম বয়সীদের ৯৭ শতাংশে হাম শনাক্ত, বাড়ছে মৃত্যু

৯ মাসের কম বয়সীদের ৯৭ শতাংশে হাম শনাক্ত, বাড়ছে মৃত্যু

ঢাকায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের ৯৭.৩ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে। টিকার বয়স হয়নি বা টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুরাই এ প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে ভাইরাসের এমন কোনো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা বর্তমানে ব্যবহৃত টিকার সুরক্ষাকে এড়িয়ে যেতে পারে। আইসিডিডিআরবির গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে যেসব শিশুর টিকা দেওয়ার বয়স হয়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলে ওই গবেষণায় বলা হয়েছে।গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি ‘বি৩ জিনোটাইপ’-এর, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রাদুর্ভাবেও শনাক্ত হয়েছে।আইসিডিডিআরবি ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত শিশু হাসপাতালে সন্দেহভাজন হাম নিয়ে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৪১ শিশুকে নিয়ে অনুসন্ধান চালান। পরীক্ষাগারে ৩২৪ শিশুর হাম নিশ্চিত হয়।বয়স ও টিকা নেওয়ার ভিত্তিতে শিশুদের চারটি দলএর অর্থ এই নয় যে দুই ডোজ টিকা পাওয়া সকল শিশুর ৭৬ শতাংশ হামে আক্রান্ত হচ্ছে। অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া সব শিশুই সন্দেহভাজন হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। তাই এই হিসাব শুধু হাসপাতালভিত্তিক ওই অনুসন্ধানের জন্য প্রযোজ্য।আইসিডিডিআরবির সংক্রমণ রোগ বিভাগের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, ‘টিকা এখনো কার্যকর কিনা, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরী হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের অনুসন্ধানে ভাইরাসটি টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার হার কম ছিল।’বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হাম-রুবেলার টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাস ও দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে। প্রথম ডোজের আগে শিশুরা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি এবং সমষ্টিগত সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল থাকে।আইসিডিডিআরবির আগের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া হামের অ্যান্টিবডি দ্রুত কমে যায়। তিন থেকে আট মাস বয়সে কোনো সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি শনাক্ত হয়নি। তবে সেই বিশ্লেষণে মাত্র ১৬ জন শিশু অন্তর্ভুক্ত ছিল, তাই আরও বিস্তৃত গবেষণার পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।আইসিডিডিআরবির ফাইলোজেনেটিক বিশ্লেষণে ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স অন্তর্ভুক্ত ছিল। সব ভাইরাসই ‘বি৩’ ধরনের সঙ্গে মিল রয়েছে। ভাইরাসের ‘এইচ’ প্রোটিনের অ্যান্টিবডি শনাক্ত করতে পারে- এমন অংশে চারটি পরিবর্তন বা মিউটেশন শনাক্ত হয়েছে।‘এইচ’ প্রোটিন ভাইরাসকে মানুষের কোষে প্রবেশ করতে সহায়তা করে এবং টিকার মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডির প্রধান লক্ষ্য এটি। তবে মিউটেশন থাকার অর্থ এই নয় যে টিকা আর কাজ করছে না। হাম ভাইরাস এখনো একটি একক সেরোটাইপ এবং টিকার অ্যান্টিবডি ভাইরাসের একাধিক স্থান শনাক্ত করতে পারে।আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘এই প্রাথমিক ফলাফল কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, আবার দেখিয়েছে আমাদের আরও অনেক কিছু জানা দরকার। টিকা নেওয়া কিছু শিশু কেন আক্রান্ত হয়েছে, গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর পেছনে কোন বিষয়গুলো কাজ করছে, অপুষ্টি কীভাবে সুরক্ষাকে প্রভাবিত করে—সেসব অনুসন্ধানে আমরা আরও বিস্তৃত গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করছি।’স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত ১৫ হাজার ২৭২ জন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে হামজনিত সন্দেহজনক ৭২১ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ৪ শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৮৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে সন্দেহভাজনসহ আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৩৭ জন।এ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭৮ জন। এর মধ্যে সন্দেহজনক হামে ১ লাখ ৩০ হাজার ৮৩ জন এবং নিশ্চিত হামে ১৬ হাজার ২৯৫ জন শিশু আক্রান্ত হয়েছে।হামে আক্রান্ত শিশুদের ‍নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছেগবেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, অভিভাবকদের টিকা দিতে দেরি করা বা টিকা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। শিশুর বয়স অনুযায়ী হাম-রুবেলার সব ডোজ নিশ্চিত করতে হবে। প্রাদুর্ভাবকালে টিকাদান বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।আইসিডিডিআরবির ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহকারী বিজ্ঞানী ডা. কামরুন নাহার বলেন, ‘শিশুরা কেন টিকা নিতে পারছে না এবং জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের যে হার জানানো হচ্ছে, তার আড়ালে কোনো কোনো এলাকায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়েছে কিনা- তা আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। এই গবেষণা টিকাদান কৌশল আরও কার্যকর করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাবে শিশুদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করবে।’ডা. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘হাম প্রতিরোধ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে টিকা দেওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি জানানো হলেও এই প্রাদুর্ভাব এত বড় হলো কেন- সেটিও আমাদের বুঝতে হবে।’
৪ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও প্রবাসীদের ঘুমহীন রাত: স্বদেশচেতনা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ

ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে রাজনৈতিক গতিধারা নতুন মোড় নেয়। সেই মুহূর্তগুলো কেবল একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ হয়ে থাকে না। বরং সেটা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সকল মানুষের সমগ্র জাতিসত্তার চেতনাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। ইতিহাসের প্রতিটি বড় গণআন্দোলন, গণজাগরণ কিংবা রাষ্ট্ররূপান্তরের প্রক্রিয়ায় দেখা গিয়েছে যে, দেশের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে অবস্থান করেও প্রবাসীরা নানাভাবে সেই পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান তেমনই একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ, যা দেশের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনোজগতে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও তাঁরা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রশ্নে প্রত্যক্ষ অংশীদারের মতোই উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত ও সক্রিয় ছিলেন।আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবাসীদের জীবনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, জীবন-বাস্তবতায় তাঁরা দেশান্তরিত হলেও স্বদেশ তাঁদের চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে দেশ ছাড়তে পারে, কিন্তু মনোজগতে দেশ কখনোই প্রবাসীদেরকে ছেড়ে যায় না। জন্মভূমির মাটি ও মানুষ, শৈশবের স্মৃতি, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ও ইতিহাসের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের যে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা স্বদেশ থেকে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। সমাজবিজ্ঞানীরা একে ‘প্রবাসী পরিচয়’ (ডায়াসপোরিক আইডেন্টিটি)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শারীরিকভাবে প্রবাসীরা হয়তো স্বদেশের বাইরে অন্য কোন দেশে অবস্থান করে, কিন্তু তাঁদের যাপীত-জীবনের স্মৃতি, আবেগ-অনুভূতি ও আত্মপরিচয়ের একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে সংযুক্ত থাকে প্রিয় জন্মভূমির সঙ্গে।প্রবাসীদের কাছে বাংলাদেশ কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি তাদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের চিন্তাচেতনা, আবেগ-অনুভূতি, ইচ্ছে-আকাক্সক্ষা-স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বড় একটি অংশ জুড়েই থাকে প্রিয় স্বদেশ। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন তারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন, সন্তানের কাছে বাংলাদেশের গল্প বলেন, জাতীয় দিবসগুলো পালন করেন কিংবা দেশের খবর অনুসরণ করেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তাঁরা তাঁদের অস্তিত্বের একটি অংশকে দৈনন্দিন জীবন-চর্যায় বাঁচিয়ে রাখেন। নাড়ির এই অদৃশ্য সংযোগই প্রবাসীদের স্বদেশচেতনাকে জীবন্ত রাখে। তাই দেশের সংকট তাঁদের হৃদয়কে নাড়া দেয়, আর জাতীয় অর্জন তাঁদের গর্বিত করে। দেশের মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখন প্রবাসীরাও মানসিকভাবে সেই সংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠেন। ঐতিহাসিক সত্যের অংশ হিসেবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।স্বদেশচেতনার পাশাপাশি প্রবাসীদের উদ্বেগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো দেশে রেখে আসা আপনজনদের কল্যাণ-চিন্তা ও স্বদেশের প্রতি গভীর টান। পৃথিবীর যেখানেই তারা থাকুন না কেন, তাঁদের ধ্যানজ্ঞান জুড়ে থাকে বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং ফেলে আসা জীবনের অসংখ্য দূর-অতীত ও নিকট-অতীতের স্মৃতি। দূরদেশে অবস্থান করলেও প্রতিদিন তাঁদের মন পড়ে থাকে দেশের খোঁজখবরে। কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা সামাজিক সংকট দেখা দিলে প্রথমেই তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমার আপনজনেরা কেমন আছে’? চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় এই উদ্বেগ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত, সহিংসতা, দমন-পীড়ন এবং অনিশ্চয়তার খবর তাদের উৎকণ্ঠিত করে তুলেছিল। উদ্বেগ ও উৎকন্ঠায় অনেকেই রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করেছেন, ফোনে পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং তাদের নিরাপত্তার সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রেখেছেন। কেউ বারবার একই নম্বরে ফোন করেছেন, কেউ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচিতজনদের খুঁজেছেন, কেউ আবার সামান্য একটি বার্তার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন। প্রবাসীদের এই মানসিক অবস্থাকে কেবল রাজনৈতিক উদ্বেগ বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে; এটি ছিল স্বজন, স্বজাতি এবং স্বদেশের প্রতি গভীর আবেগ, দায়িত্ববোধ ও মানবিক সংযোগের বহিঃপ্রকাশ।চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে বিভীষিকাময় মুহূর্ত ছিল যখন স্বৈরাচারী সরকার বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। আধুনিক বিশ্বে ইন্টারনেট কেবল একটি প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা কিংবা উপযোগিতা নয়; এটি প্রবাসী মানুষের জন্য স্বদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সেতুবন্ধন। প্রতিদিনের ফোনকল, ভিডিও আলাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা কিংবা সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণ প্রভৃতি সবকিছু মিলিয়েই নানা মাধ্যমে প্রবাসীরা তাঁদের দেশকে কাছে অনুভব করেন। সেই সেতুবন্ধন যখন হঠাৎ ভেঙে পড়ে, তখন দূরত্বের বাস্তবতা নির্মমভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়, নিজেদেরকে ভাবতে হয় ভিন গ্রহের বাসিন্দা। ১৯ জুলাই ২০১৪-এর সেই যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতার মুহূর্তে অসংখ্য প্রবাসীর কাছে মনে হয়েছিল যেন বাংলাদেশ হঠাৎ করেই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে আড়াল হয়ে গেছে। আমার মতো অনেকের চেতনায় বাংলাদেশ যেন এ দুনিয়া হতে হারিয়ে গিয়েছিল। সময় কাটাতে হয়েছিল দুর্যোগকালীন উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা নিয়ে। দেশে কী ঘটছে, কারা নিরাপদ আছে, কারা বিপদের মধ্যে আছে, কিভাবে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা যেতে পারে এসব কোনো কিছুই আর নিশ্চিতভাবে জানার উপায় ছিল না।রাষ্ট্র যখন তথ্যপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দেয়, তখন মানুষের কল্পনা ও আশঙ্কা বাস্তবতার চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, তথ্যের অভাব প্রায়ই মানুষের উদ্বেগ ও উৎকন্ঠাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সেই অজানাকে, যার সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য ও ধারণা পাওয়া যায় না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত অসংখ্য বাংলাদেশির কাছে সেই দিনগুলো ছিল অসহায়ত্ব, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং মানসিক যন্ত্রণার এক দীর্ঘ অধ্যায়। অনেক প্রবাসী রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন। কর্মস্থলে থেকেও কাজে মনোযোগ দিতে পারেননি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বসেও মন পড়ে ছিল বাংলাদেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে। দেশে বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্তুতি, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো সুযোগ না থাকায় তাঁদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছিল অনিশ্চয়তার মধ্যে। কোনো অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে মনে হতো হয়তো দেশের কারও খবর পাওয়া যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য কোনো তথ্যের সন্ধানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছেন অনেকে। কিন্তু তথ্যের চেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, ভয়তাড়িত অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তার ভারই তখন ছিল বেশি।আমি নিজেও সত্যিকার অর্থে সেই জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে কোনো কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারিনি। প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা, পেশাগত দায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত কাজ সবকিছুই যেন অর্থহীন মনে হচ্ছিল। সারাক্ষণ মনে হতো, দেশে কী হচ্ছে? আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা কেমন আছে? পরিচিতজনদের কেউ বিপদে পড়েছে কি না? নানাভাবে মানুষের সাথে যুক্ত থাকার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বহু প্রবাসী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বাংলাদেশের সর্বশেষ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্য। কেউ তাঁদের পরিবারের খোঁজ জানতে চেয়েছেন, কেউ বন্ধুদের খবর জানতে চেয়েছেন, আবার কেউ কেবল নিশ্চিত হতে চেয়েছেন যে তাঁদের প্রিয় মানুষগুলো এখনো নিরাপদ আছেন। সেই ফোনকল, বার্তা এবং উদ্বেগভরা প্রশ্নগুলো আজও স্মৃতিতে স্পষ্ট হয়ে আছে। সেই সময় প্রবাসীদের অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁদের সম্মিলিত মানসিক যন্ত্রণা। একজনের উৎকণ্ঠা আরেকজনের উদ্বেগকে স্পর্শ করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্রবাসী গ্রুপ, কমিউনিটি ফোরাম এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের নেটওয়ার্কগুলো তখন পরিণত হয়েছিল উদ্বিগ্ন মানুষের অনানুষ্ঠানিক সহায়তা ব্যবস্থায়। কেউ সামান্য কোনো তথ্য পেলেই অন্যদের জানাতেন, কেউ সম্ভাব্য যোগাযোগের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন, কেউ আবার শুধু মানসিক সমর্থন দেওয়ার জন্য অন্যদের পাশে দাঁড়াতেন। এই সম্মিলিত উদ্বেগ ও পারস্পরিক সংযোগই প্রমাণ করে যে, প্রবাসী সম্প্রদায় কেবল বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের সমষ্টি নয়; বরং একটি বিস্তৃত মানবিক ও আবেগিক নেটওয়ার্ক, যার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে স্বদেশচেতনা।প্রবাসীদের জীবনে হয়তো অনেক স্মৃতি আসে-যায়, কিন্তু দেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার জুলাইয়ের সেই মুহূর্তগুলো তারা কোনোদিন ভুলতে পারবেন না। তখন ভৌগোলিক দূরত্ব যেন হঠাৎ করেই বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। প্রবাসীরা নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন যে, দূরে থাকলেও তাঁদের হৃদয়, চিন্তা এবং অস্তিত্বের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের সঙ্গেই বাঁধা। স্বদেশের সংকট তখন তাঁদের ব্যক্তিগত সংকটে পরিণত হয়েছিল। সেই ঘুমহীন রাতগুলো, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটানো দীর্ঘ প্রহরগুলো এবং একটি ফোনকলের অপেক্ষায় থাকা অসংখ্য মানুষের মুখ আজ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের এক নীরব কিন্তু গভীর মানবিক দলিল হয়ে আছে।প্রবাসীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা। দেশের লাখো পরিবার প্রবাসীদের উপার্জনের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। পরিবার-পরিজনের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, ব্যবসা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় নির্বাহে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। তাঁরা কেবল অর্থ পাঠান না; দেশের সুখ-দুঃখ, উন্নয়ন ও সংকটের অর্থনৈতিক দায়ভারও বহন করেন। ফলে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাঁদের জন্য কেবল একটি সংবাদ নয়; বরং তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু পরিবারের জীবনমান উন্নত করে না; জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ফলে প্রবাসীরা যখন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, তখন সেই উদ্বেগের সঙ্গে অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে। তাঁরা জানেন, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন কেবল দেশের মানুষের জন্যই নয়; তাঁদের নিজেদের পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।উপরে তুলে ধরা এই তিনটি বাস্তবতা তথা স্বদেশচেতনা, আপনজনের প্রতি আবেগগত বন্ধন এবং অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা- চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রবাসীদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ফলে তাঁরা কেবল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাননি; বরং নানাপন্থায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেছেন এই নাগরিক অধিকার আদায়ের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সংগ্রামে। ভৌগোলিক দূরত্ব তাঁদের শারীরিক উপস্থিতিকে সীমিত করতে পেরেছিল, কিন্তু তাঁদের চিন্তাভাবনা, গণদাবীর পক্ষে অবস্থান এবং স্বৈরাচারী সরকার বিরোধী কর্মতৎপরতাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে দূর থেকে পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ তাঁদেরকে আন্দোলনের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর বিশেষ সক্ষমতা দিয়েছে। ফলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নাগরিকদের আন্দোলন ছিল না; এটি ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক বাংলাদেশি চেতনারও বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়েছিল, যার সক্রিয় অংশীদার ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা।গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের সবচেয়ে দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল তথ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় তথ্য কেবল সংবাদ নয়; এটি ক্ষমতা, প্রতিরোধ এবং জনমত গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যখন কোনো রাষ্ট্র তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তখন বিকল্প তথ্যব্যবস্থা সামাজিক প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যখন তথ্যপ্রবাহ নানা সীমাবদ্ধতা, বিভ্রান্তি এবং নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়ছিল, তখন প্রবাসীরা বিকল্প তথ্যপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবিনার, লাইভ আলোচনা, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাঁরা দেশের পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া খণ্ডিত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, ভিডিওচিত্র, আলোকচিত্র এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগসমূহ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচারে অনেক প্রবাসী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই সঙ্গে দেশের ভেতরের আন্দোলনকারী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মধ্যে একটি কার্যকর যোগাযোগ-সেতু তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, অনুবাদ, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দেশের অভ্যন্তরে যে কণ্ঠস্বর কখনো কখনো সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল, তা প্রবাসীদের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিসরে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। প্রবাসীরা কেবল তথ্যের গ্রহীতা ছিলেন না; বরং তাঁরা তথ্য-নিয়ন্ত্রণ ও তথ্য-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তথ্যসংগ্রাম তথা ‘ইনফরমেশন অ্যাক্টিভিজম’-এর সক্রিয় অংশে পরিণত হয়েছিলেন। একবিংশ শতাব্দীর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আন্দোলন-সংগ্রামে তথ্যপ্রবাহের গুরুত্ব বিবেচনা করলে এই ভূমিকার তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।প্রবাসীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, আহত ব্যক্তি, নিহতদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে বহু প্রবাসী ব্যক্তি ও সংগঠন আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন। বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা নিজ নিজ উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহ করেছেন, সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এবং সংকটাপন্ন পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানবিক সহায়তার এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং এটি ছিল জাতীয় সংহতি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের একটি শক্তিশালী প্রকাশ। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ সাময়িকভাবে স্থগিত বা সীমিত করার আহ্বানও দেখা যায়, যা সরকারের প্রতি এক ধরনের প্রতীকী এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। প্রবাসীদের একটি অংশ মনে করেছিল যে, রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাঁদের অবস্থান প্রকাশের অধিকার রয়েছে। এই উদ্যোগের ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও এটি ঐক্য ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে প্রবাসীরা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের প্রভাব প্রয়োগের সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং প্রয়োজনে অর্থনৈতিক শক্তিকেও নাগরিক অবস্থানের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত ছিলেন।চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের ভূমিকার একটি বিশেষ দিক ছিল তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় ‘নাগরিক কূটনীতি’ (সিটিজেন ডিপ্লোমেসি) বলা হয়, যেখানে সাধারণ নাগরিকরাই আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করেছিলেন। তারা স্থানীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফিং দেন, বিবৃতি প্রদান করেন, তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। অনেক দেশে স্মারকলিপি প্রদান, চিঠি প্রেরণ, গোলটেবিল আলোচনা আয়োজন, সংবাদ সম্মেলন এবং প্রতিনিধি বৈঠকের মাধ্যমে তাঁরা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন। বৈশ্বিক যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক ব্যবহারের এই সক্ষমতা আধুনিক প্রবাসী সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বাইরে থেকেও তাঁরা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছেন।রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, আলোচনা সভা এবং সংহতি কর্মসূচির আয়োজন করেন। লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি, বার্লিন, প্যারিস, রোম, স্টকহোমসহ বিশ্বের নানা শহরে অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও জনমতের দৃষ্টি আকর্ষণে সহায়ক হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে এসব কর্মসূচিতে শুধু বাংলাদেশিরাই নয়, বরং স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফলে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ একটি জাতীয় ইস্যুর গণ্ডি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। বিদেশের মাটিতে এই সংহতি প্রকাশ দেশের আন্দোলনকারীদের জন্য নৈতিক শক্তির উৎস হয়ে ওঠে। এটি তাদের এই বার্তা দেয় যে, তাঁরা একা নন; বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি বাংলাদেশি তাদের সংগ্রামের পাশে রয়েছে। সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে নৈতিক সমর্থনের গুরুত্ব কখনোই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আন্দোলনের কঠিন সময়ে মানুষ কেবল সাংগঠনিক বা আর্থিক সহায়তাই খোঁজে না; তারা জানতে চায়, তাদের কণ্ঠস্বর অন্যরাও শুনছে এবং তাদের সংগ্রাম বৃহত্তর মানবিক ও নৈতিক সমর্থন লাভ করছে। প্রবাসীদের সংহতির এই কর্মসূচিগুলো সেই সময় আন্দোলনকারীদেরকে শক্তি যুগিয়েছিল।প্রবাসীদের এই ভূমিকা অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও প্রবাসীরা আন্তর্জাতিক জনমত গঠন, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। লন্ডন, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে তখনকার প্রবাসী বাংলাদেশিরা যে জনমত-সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন, তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি স্বীকৃত অধ্যায়। ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতারই আধুনিক রূপ আমরা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষ করেছি। পার্থক্য শুধু এই যে, আজকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রবাসীদের প্রভাব বিস্তারের পরিধি, গতি এবং কার্যকারিতা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। চব্বিশের অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে যে প্রবাসীদের ভূমিকা কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন-আলোচনায় প্রবাসীদের অবদানকে প্রায়শই অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, তারা দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাঁরা রাষ্ট্রকে কেবল একটি সরকার বা রাজনৈতিক দলের সমার্থক হিসেবে দেখেন না; বরং একটি বৃহত্তর জাতীয় চুক্তি, নাগরিক অধিকার এবং সম্মিলিত ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন। তাই রাষ্ট্র যখন সংকটে পড়ে, তখন তাদের উদ্বেগও নাগরিক দায়িত্ববোধের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে।চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এই পরিবর্তনের সময়ে দেশের মানুষের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, প্রত্যাশা এবং আশার এক অনন্য অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। তারা দূরে থেকেও দেশের জন্য ভেবেছেন, কথা বলেছেন, সংগঠিত হয়েছেন এবং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাদের অনেকেই হয়তো আন্দোলনের ময়দানে উপস্থিত ছিলেন না, কিন্তু তাদের কণ্ঠ, তাদের শ্রম, তাঁদের যোগাযোগ, তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা এবং তাদের অবিচল স্বদেশপ্রেম এই গণঅভ্যুত্থানের বিস্তৃত সামাজিক শক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। সেই অর্থে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান শুধু বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরের মানুষের গল্প নয়; এটি বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির হৃদস্পন্দনেরও ইতিহাস।গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সময়ে প্রবাসীদের এই সম্পৃক্ততাকে কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল মূলত স্বদেশপ্রেম, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ। মানুষ সাধারণত সেই বিষয় নিয়েই উদ্বিগ্ন হয়, যার সঙ্গে তার আবেগ, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রবাসীদের অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখনও তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা ভৌগোলিকভাবে দূরে অবস্থান করলেও নিজেদেরকে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নৈতিক ভবিষ্যৎ থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন মনে করেননি। সমাজবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, আধুনিক বিশ্বে জাতিসত্তার ধারণা কেবল একটি ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা বিস্তৃত হয় সীমান্ত অতিক্রম করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মানুষের চেতনা, অভিজ্ঞতা এবং সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে সত্য। আজকের বাংলাদেশ শুধু বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসরত মানুষের নয়; এটি একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত পেশাজীবীদের, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি প্রবাসী বাংলাদেশিরও। তাদের প্রত্যেকের জীবন, স্বপ্ন এবং পরিচয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ফলে দেশের সংকট, সংগ্রাম কিংবা অর্জন তাদের ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশে পরিণত হওয়াই স্বাভাবিক।প্রবাসীরা কেবল অর্থনৈতিক অবদানের উৎস নন; তারা একই সঙ্গে জাতীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক শক্তি। দেশ ও দশের কল্যাণে তাদের ভূমিকা বহুমাত্রিক। তারা আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে পারেন, মানবাধিকার প্রশ্নে বৈশ্বিক সংহতি সৃষ্টি করতে পারেন, তথ্যপ্রবাহের বিকল্প পথ নির্মাণ করতে পারেন, কূটনৈতিক যোগাযোগকে প্রভাবিত করতে পারেন এবং সংকটকালে দেশের মানুষের পাশে মানবিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়াতে পারেন। অর্থাৎ তারা শুধু অর্থনীতির অংশ নন; তারা জাতীয় জীবনেরও সক্রিয় অংশীদার। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের এই সক্রিয় অংগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী নাগরিক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আরও শক্তিশালী, প্রাতিষ্ঠানিক এবং টেকসই সেতুবন্ধন গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ একটি জাতির শক্তি কেবল তার ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তার মানুষের জ্ঞান, শ্রম, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা, ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতার মধ্যেও নিহিত থাকে। যে রাষ্ট্র তার প্রবাসীদের কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস হিসেবে দেখে, সে রাষ্ট্র তাদের প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে না। তাই আমাদের প্রয়োজন এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা যেখানে প্রবাসীদেরকে দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, নীতিনির্ধারণ এবং রাষ্ট্রগঠনের বৃহত্তর অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা কখনো কেবল ভৌগোলিক উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। দেশের জন্য উদ্বিগ্ন হতে, দেশের জন্য কাঁদতে, দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে কিংবা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে দেশের মাটিতে উপস্থিত থাকা সবসময় প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় হাজার হাজার মাইল দূরে বসে থাকা একজন মানুষও স্বদেশের প্রতি এমন দায়বদ্ধতা অনুভব করতে পারেন, যা তাকে নীরব দর্শক হয়ে থাকতে দেয় না। বর্তমানে নানা জনের হাতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস লেখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও লেখা হবে ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ-প্রতিরোধে উত্তাল রাজপথের বীরত্বগাথা, তরুণদের আত্মত্যাগ, মানুষের সাহস, প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের ইতিহাস দিয়ে; কিন্তু সেই ইতিহাসের আরেকটি অনুচ্চারিত অধ্যায় হিসেবেও রয়ে যাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের অশ্রুসিক্ত উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার বেদনাবিদ্ধ সময়ের গল্প, ঘুমহীন রাতের অভিজ্ঞতা এবং স্বদেশের জন্য নিরন্তর প্রার্থনার স্মৃতি। ইতিহাসের আনুষ্ঠানিক দলিলে হয়তো তাদের নাম খুব বেশি লেখা থাকবে না, কিন্তু তাদের উদ্বেগ, অপেক্ষা এবং সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল এই বৃহত্তর গণজাগরণের নীরব শক্তিগুলোর একটি। রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রবাসীদের এই অভিজ্ঞতাগুলো হয়তো পরিসংখ্যান হয়ে ওঠবে না, কিন্তু জাতির সমষ্টিগত স্মৃতিতে এগুলো গভীর মানবিক সাক্ষ্য হিসেবে বেঁচে থাকবে।একদিন যখন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস পাঠ করবে, তখন তারা রাজপথের সংগ্রামের পাশাপাশি হয়তো এই নীরব অধ্যায়ের কথাও জানবে। শুনবে সেইসব প্রবাসী মানুষের কথা, যারা দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্তে বাংলাদেশের সঙ্গেই ছিলেন। তারা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন, তথ্যের জন্য অপেক্ষা করেছেন, আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে কাজ করেছেন, মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছেন, প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন করেছেন এবং নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কারণ তারা দেশ থেকে বহুদূরে ছিলেন, কিন্তু বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তাদের ঠিকানা ছিল ভিন্ন দেশে, কিন্তু তাদের হৃদয়ের ঠিকানা ছিল বাংলাদেশ। তাদের শরীর অবস্থান করছিল পৃথিবীর অন্য দেশের বিভিন্ন নগরে, কিন্তু তাদের চিন্তা, উদ্বেগ, প্রার্থনা এবং স্বপ্নের একটি বড় অংশ তখনও বাংলাদেশের রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয়, শহর, গ্রাম এবং সংগ্রামী মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। তাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে প্রবাসীদের অবদান কেবল একটি পরিশিষ্ট নয়; বরং এটি সেই বৃহত্তর জাতীয় সংগ্রামের কাহিনিরই অংশ, যেখানে দেশের ভেতর ও বাইরের বাংলাদেশিরা মিলিতভাবে অন্যায়, বৈষম্য ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল। আর সেই কারণেই বলা যায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশের মাটিতে সংঘটিত একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; বরং এটি ছিল সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের হৃদয়ে একযোগে ধ্বনিত হওয়া স্বদেশচেতনার এক ঐতিহাসিক জাগরণ।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

হোয়াইট কালার ক্রাইম: অর্থনীতির নীরব ঘাতক

আমরা যখন অপরাধের কথা ভাবি, তখন সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে চোর, ডাকাত বা ছিনতাইকারীর চিত্র। এ ধরনের অপরাধ দৃশ্যমান, তাৎক্ষণিক এবং অনেক সময় সহিংসতার সঙ্গে জড়িত। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ‘ব্লু-কলার ক্রাইম’। কিন্তু আধুনিক সমাজে এমন এক ধরনের অপরাধ রয়েছে, যার কোনো রক্তাক্ত দৃশ্য নেই, অথচ এর ক্ষতি একটি দেশের অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের জীবনযাত্রাকে দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত করে দেয়। এই অপরাধই হলো ‘হোয়াইট কালার ক্রাইম’।সাদারল্যান্ডের তত্ত্বের আলোকে১৯৩৯ সালে আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানী এডউইন সাদারল্যান্ড প্রথম ‘হোয়াইট কালার ক্রাইম’ ধারণাটি উপস্থাপন করেন। তার মতে, সমাজে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো ব্যক্তি দায়িত্ব পালনের সময় নিজের অবস্থানের অপব্যবহার করে যে অপরাধ করেন, সেটিই হোয়াইট কালার ক্রাইম।এই সংজ্ঞার সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, অসাধু ব্যবসায়ী, ব্যাংকার কিংবা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা যখন ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তখন তার ক্ষতি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবন এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।বাংলাদেশে হোয়াইট কালার ক্রাইমবাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াইট কালার ক্রাইমের সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেত্র হলো ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি, ভুয়া বা শেল কোম্পানির নামে ঋণ গ্রহণ, শেয়ারবাজারে কারসাজি, কর ফাঁকি, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো ঘটনাগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।এসব অপরাধের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো অপরাধীরা অনেক সময় সমাজে সম্মানিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত থাকেন। বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে তাদের আর্থিক অনিয়মের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে। মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থাহীনতা এসবই এমন অপরাধের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব।অন্যদিকে, সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও হোয়াইট কালার অপরাধে বিচারপ্রক্রিয়া প্রায়ই দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আইনি জটিলতার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে আরও অপরাধ সংঘটনের পথ সহজ করে দেয়।অর্থনীতির জন্য নীরব হুমকিহোয়াইট কালার ক্রাইমের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর অদৃশ্য প্রভাব। একটি ব্যাংক থেকে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ কিংবা বিদেশে অর্থ পাচার শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে না; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যাহত করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করে, বিনিয়োগ পরিবেশ দুর্বল করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, এই অপরাধের শিকার শেষ পর্যন্ত গোটা সমাজ।উত্তরণের পথহোয়াইট কালার ক্রাইমকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার সংকটও বটে। তাই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজন শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।একই সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জনগণের মধ্যে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। আইনের চোখে সবাই সমান এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলেই হোয়াইট কালার ক্রাইমের বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দৃশ্যমান অপরাধের পাশাপাশি এই অদৃশ্য অর্থনৈতিক মহামারীর বিরুদ্ধেও সমান গুরুত্ব দিয়ে লড়াই করতে হবে। কারণ, একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য সব সময় অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো একটি কলমের স্বাক্ষর, একটি জালিয়াতিপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারই যথেষ্ট।লেখক: শিক্ষার্থী, অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

তেলাপোকা ফিরেছে, কারণ ক্ষত শুকায়নি

ভারতের রাজনীতিতে আবার উচ্চারিত হচ্ছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। ককরোচ মানে তেলাপোকা। যে পতঙ্গটিকে দেখলে মানুষ জুতা খোঁজে, বিষ ছেটায়, অথচ কোটি বছরেও যাকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলা যায়নি, সেই তেলাপোকাকেই এবার নিজেদের প্রতীক বানিয়েছে ভারতের বেকার তরুণেরা। ২০২৪ সালের জুনে নিট প্রশ্নফাঁস এবং সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতির ‘তেলাপোকা’ মন্তব্যের জেরে যে ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্মের জন্ম হয়েছিল, তা দুই বছর পর ২০২৬ এর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে এসে আবার দিল্লির যন্তর মন্তর কাঁপাচ্ছে। প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে, পুরনো ঘটনা নিয়ে এখন আন্দোলন কেন? উত্তর একটাই, পুরনো ক্ষতের ওপর নতুন ঘা পড়েছে। সরকার ২০২৪ এ যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন ধীরগতির। উল্টো ২০২৬ এর মে-জুনে এসএসি, রেলওয়ে এবং রাজ্য পুলিশের নিয়োগ পরীক্ষায় আবারও বড় আকারের প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছে, সিবিআই-এর তদন্তে একাধিক রাজ্যের যোগসূত্রের কথা এসেছে। তাই হতাশা কেবল মেডিকেল প্রত্যাশীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা এখন সরকারি চাকরিপ্রার্থী কোটি তরুণের ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। পুরনো অপমান আর নতুন হতাশা মিলে আবার বিস্ফোরণ ঘটেছে।২০২৪ এর ঘটনাপ্রবাহ এখন ইতিহাস। সেবার নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের পর সারা দেশে বিক্ষোভ হয়। কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর আসে। ঠিক সেই সময় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিতে বেকার যুবকদের প্রসঙ্গে বলেন, কাজ নেই বলেই তারা তেলাপোকার মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বোস্টনের শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকের ‘সব তেলাপোকা এক হলে কী হবে’ পোস্টটি তখন ভাইরাল হয়। চাপের মুখে সরকার নিট পুনঃপরীক্ষা, তদন্ত কমিটি এবং কঠোর আইনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আন্দোলন থামায়। কিন্তু সেই আইন সংসদে পাস হলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। দুর্নীতির চক্র পুরোপুরি ভাঙা যায়নি। ফলে তেলাপোকা প্ল্যাটফর্মটি সুপ্ত অবস্থায় ছিল, মরেনি।বিস্ফোরণের দ্বিতীয় কারণ হলো ডিজিটাল মেমোরি। ২০২৬ এর জুনে হঠাৎ করে বিচারপতির সেই পুরনো বক্তব্যের ১৫ সেকেন্ডের ক্লিপটি ইনস্টাগ্রাম রিল এবং ইউটিউব শর্টসে ভাইরাল হয়ে যায়। কোটি ভিউ। যারা ২০২৪ এ স্কুলে ছিল, তারা এবার প্রথমবার এই অবজ্ঞা দেখেছে। পুরনো অপমান নতুন করে রক্তাক্ত করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন প্রশ্নফাঁসের খবর। চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, কিন্তু সুযোগ বাড়েনি। তাই ২০২৪ এ যে আগুন নেভানো হয়েছিল, ২০২৬ এ এসে তা আবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। এই সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আরেকটি তত্ত্বও ছড়ায়। সরকার এফসিআরএ বিল পাস করতে যাচ্ছে, আর সেই বিল আটকাতেই কিছু এনজিও নাকি যুবকদের উসকাচ্ছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি। তাই ২০২৪ এর ক্ষোভ আর ২০২৬ এর বাস্তবতা মিলে এক ভয়ঙ্কর মিশ্রণ তৈরি হয়েছে। অভিজিৎ দীপক আবার সামনে এসে যন্তর মন্তরে জমায়েতের ডাক দেন।যন্তর মন্তরের চিত্র এবারও একই, কিন্তু মাত্রা বড়। দেশের ১৮টি রাজ্য থেকে তরুণেরা ট্রেনে-বাসে এসে হাজির হয়েছে। সরকার আগের মতোই মেট্রো বন্ধ করেছে, ইন্টারনেট স্লো করেছে। কিন্তু লাভ হয়নি। হিন্দু-মুসলিম-দলিত সবাই এক প্ল্যাকার্ডে লিখেছে ‘চাকরি চাই, সম্মান চাই’। পুলিশ লাঠি চালিয়েছে, মঞ্চ ভেঙেছে। রাতের মধ্যে আবার মঞ্চ তৈরি হয়েছে। তেলাপোকার প্রতীকী শক্তি এখানেই। তাকে মারলে সে মরে না, বরং অন্ধকারে আরও ছড়িয়ে পড়ে। এবারের আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক দলের পতাকা ছিল না। ছিল কেবল মোবাইল, মিম আর অভিমান। তেলাপোকার মতোই তারা প্রমাণ করে, চাপ দিলে এরা মরে না, বরং আরও ছড়ায়।সরকার এবারও পুরনো কৌশলেই ফিরেছে। প্রথমে কঠোরতা, পরে সংলাপ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাতির উদ্দেশে বলেন, ৯০ দিনের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল হবে এবং প্রশ্নফাঁস রোধে নতুন টাস্কফোর্স গঠন হবে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি ২০২৪ এর আইনে প্রথমবারের মতো বড় গ্রেপ্তারও হয়েছে। কেন্দ্রীয় দুই মন্ত্রী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আন্দোলনকারীরা ১৫ দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করেছে, ফলাফল দেখার শর্তে। রক্তপাত হয়নি, এটি স্বস্তির। একটি বড় সংকট সংলাপের মাধ্যমে আপাতত নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এখানেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র রাজনৈতিক তাৎপর্য। তারা রাষ্ট্র ভাঙতে চায়নি, তারা চেয়েছে রাষ্ট্র তাদের শুনুক।ভারতের গণতন্ত্রের বিশেষত্ব এখানেই। ২৮টি রাজ্যের এই দেশে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও আন্দোলন হয়। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়ে না। কারণ এখানে সেনাবাহিনী ব্যারাকে থাকে, আদালত সরকারের বিরুদ্ধে রায় দেয়, গণমাধ্যম প্রশ্ন করে। তাই ক্ষোভ রাস্তায় আটকে থাকে না, ক্ষোভ জমে বিস্ফোরণ হয় না, প্রতিষ্ঠানের দরজা পর্যন্ত যায়। তেলাপোকা আন্দোলনও সেই দরজা পর্যন্ত গেছে। এটি বিপ্লবের ডাক দেয়নি, এটি দাবি করেছে জবাবদিহিতার।শেষ কথা হলো, তেলাপোকা টিকে থাকে কারণ সে অভিযোজিত হতে জানে। ভারতের গণতন্ত্রও টিকে আছে কারণ সে চাপকে অস্বীকার করে না, আত্মস্থ করে। যারা একদিন তেলাপোকা বলে ব্যঙ্গ করেছিল, তারা আজ টেবিলে বসে কথা বলতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এই জয় ততক্ষণই জয়, যতক্ষণ প্রতিশ্রুতি কাগজে না থেকে মাঠে নামে। না হলে ২০২৮ এ আবার নতুন কোনো ক্লিপ ভাইরাল হবে, আবার নতুন তেলাপোকা জন্ম নেবে। রাষ্ট্রের কাজ হলো মানুষকে এতটা কোণঠাসা না করা, যাতে তাকে তেলাপোকা হয়ে বাঁচতে হয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে

ছন্দে ছন্দে অঝোর ধারায় বর্ষায় যখন বৃষ্টি ঝরতে থাকে, মাসটি শ্রাবণ না হলেও কর্ণ কূহরে সেই অমর গানটি বাজতে থাকে। অফিসের কাজ, খাওয়া দাওয়া, আড্ডা আলাপে মশগুল থাকলেও অনবরত কানে অনুরণন হতে থাকে ‘শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে / তোমারি সুরটি আমার মুখের ’পরে, বুকের’ পরে/পুরবের আলোর সঙ্গে পড়ুক পাতে দুই নয়ানে/–নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে।/” আহা কী অসাধারণ গান। এবারের শ্রাবণে সেই অমর গানকে ছাপিয়ে আর একটি গান বাঙালির হৃদয় মন দখল করে ফেলেছে ইতোমধ্যে। সে গানটি হঠাত করে প্রতিটি বাঙালির অন্তর আবার জয় করলো কী ভাবে, সেই গল্পটি পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। সিলেট জেলা শহরের খুব কাছেই ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা। সিলেট শহর থেকে মাত্র ত্রিশ, চল্লিশ মিনিটের দুরত্ব। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পাল। বিউটি রাণী পাল সিলেটের শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেছেন। প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল। চোখের ভেতরে অপার স্বপ্ন। শিশু শিক্ষার জন্য উপযুক্ত একজন শিক্ষক। সাধারণত প্রধান শিক্ষকেরা খুব বেশি ক্লাস নিতে দেখা যায়না। বিউটি রানী পাল ব্যতিক্রম। তার ফেসবুকে প্রবেশ করে দেখা গেলো তিনি শিশুদের অঙ্ক শেখান নানা সৃজনশীল, আনন্দময় ভঙ্গীতে । একই ভাবে দেখতে পেলাম তিনি সাত বারের নাম ছড়ার ছন্দে শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছেন। কী আনন্দময় শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ। তার ফেইসবুক আইডিতে বিদ্যালয়ে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা করানো, নাচ-গানের মাধ্যমে গণিতের বিভিন্ন চিহ্ন ও পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু শেখানো, শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ এবং গাছের চারা বিতরণের বিভিন্ন ভিডিও দেখা যায়। তার আইডি সকলের জন্য উন্মুক্ত। এরকম আইডিতে প্রবেশ করলে মন ভালো হয়ে যায়। প্রধাণ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতি তার নিবেদন দেখলে এই অন্ধকার সময়ে কিছুটা হলেও আলোর রেখার অস্তিত্ব উপলব্ধি করা যায়। সম্প্রতি ২৩ জুলাই তারিখে এই নিবেদিত প্রাণ প্রধান শিক্ষিকার একটি ভিডিও সামজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। খুব সাধারণ একটি ভিডিও। তাকে দেখা যায় নব্বইয়ের দশকের সাড়া জাগানো ‘ডিফারেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের একটি শ্রুতি মধুর গানের সঙ্গে হেটে যেতে। গানটির কথা ছন্দময়। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে/অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবনে ঝরায়ে/আজ কেন মন উদাসী হয়ে/দূর অজানায় চায় হারাতে’, কাব্যময় গীতিকবিতা। ডিফারেন্ট টাচের শিল্পী মেজবাহ্ রহমান গানটি গেয়েছিলেন নব্বই সালে। তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিলো গানটি। বিউটি রাণী পাল স্কুল সময়ের বাইরে গানটির সঙ্গে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তালে তালেও নয় শুধুমাত্র হেঁটে। নৃত্যের ভঙ্গিতে হাঁটা নয়। অত্যন্ত সহজ সরল হাঁটা তবে নান্দনিক। এই ভিডিওটি ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেইসবুক পেজ থেকে নেতিবাচক ক্যাপশন দিয়ে আসিফ ইকবাল ইরন নামে এক প্রবাসী তরুণ ভিডিওটি ছড়িয়ে দেন। ‘ছড়িয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোক প্রানবন্ত এই শিক্ষককে সাইবার বুলিং শুরু করেন। অশ্লীলতা, শিষ্টাচার বহির্ভুত ভিডিও হিসেবে অনেকেই চিহ্নিত করে অশালীন ভাবে গালি গালাজ শুরু করেন। তবে দেশের অধিকাংশ শুভ চিন্তার মানুষ এর মধ্যে কোন অভব্যতার চিহ্ন খোঁজে পাননি। বিউটি রানীর সহকর্মীরা তাকে অকুন্ঠ সুমর্থন জানিয়ে এ’গান দিয়ে নিজেরা এক ভিন্ন ধর্মী প্রতিবাদের সূচনা করেন। গত কয়েকদিন ফেইসবুকের নিউজফিড ছেয়ে গেছে অগণন শিক্ষক এবং সুশীল নাগরিকদের অভিনব সঙ্গীত ময় প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। সকলের একি কথা,একজন নারী শিক্ষক কি তার প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের বাইরে একটি ব্যক্তিগত জীবন যাপন করতে পারেন না? শিশুবান্ধব আধুনিক শিক্ষাদান ও শিক্ষকের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে কেন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে? ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো গুণী শিক্ষকের চরিত্রহনন কি সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়? শিশু মনস্তত্ব এবং শিশু শিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করে থাকেন তারা জানেন আনন্দঘন পরিবেশে শিশুদের শিক্ষা দানের বিকল্প কিছু নেই। খেলার মাধ্যমে শিখন, গানের মাধ্যমে শিখন সর্বোপরি আনন্দের মাধ্যমে শিখন হলো শিশুদের নির্ভয়ে শিক্ষাজীবনে প্রবেশের উপযুক্ত উপাদান। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকতা কেবল ব্লাকবোর্ড, খড়ি কিংবা একমুখী বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে কোমলমতি শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ, মনোযোগ আকর্ষণ এবং ভীতিহীন পরিবেশ তৈরির জন্য 'আনন্দদায়ক শিখন' বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও বাধ্যতামূলক একটি মাধ্যম। বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিক্ষক কর্তৃক শ্রেণীকক্ষে বা সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রমে নাচের তালে ছড়া ও গান শেখানো এবং তা শিক্ষামূলক ভিডিও বা রিলস আকারে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়টি আইনি, প্রশাসনিক, শিক্ষাতাত্ত্বিক ও সাংবিধানিক- প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও সমর্থনযোগ্য। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তাই শিক্ষা দানের জন্য নৃত্য, গীত, চারুকলা, ক্রীড়ার মাধ্যমে শিক্ষক প্রশিক্ষন দেয়া হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তাই নিজেদেরকে প্রশিক্ষিত করে রাখতে হয় শিশু মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী পাঠদানের জন্য। এই প্রস্তুতি সরকারি প্রশিক্ষানালয় ‘প্রাথিমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট’ থেকে প্রদান করা হয়। দক্ষ, নিবেদিত শিক্ষকেরা স্বতঃপ্রণদিত হয়ে নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে নিজেদেরকে প্রস্তুত রাখতে চেষ্টা করেন। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল এরকম স্বঃউদয়োগী শিক্ষক। তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সৃজনশীলতার জন্য তিনি চলমান বছরে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে জেলা শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হন। এরকম সম্ভাবনাময় শিক্ষকের উদ্যমকে পেছন থেকে টেনে ধরার কী এখন আমাদের জাতীয় জীবনে অগ্রাধিকার। বিষয়টি গভীর ভাবে ভেবে দেখতে হবে। সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক বিউটি পালের পক্ষে এগিয়ে এসেছে সরকার, সুশীল সমাজের লোক, মূল ধারার সংবাদ মাধ্যম। নেতি বাচক অসংখ্য ঘটনা ও পরিবেশ পরিস্থিতির মধ্যে বড়ই আশাপ্রদ বিষয় এটি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, ঘটনাটিকে তিনি কোনো অন্যায় বা অপরাধ হিসেবে দেখছেন না। গান গাওয়া অন্যায় কোন বিষয় নয়।’ এরকম বিষয় নিয়ে সরকার এবং নাগরিক সমাজের যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে আগামীর যে কোন সময়ে। বিশ্ব জুড়ে শিশু শিক্ষাকে সব চেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। কেনো দেখা হয় এর ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন য়াছে বলে মনে করিনা। নাগরিক সমাজকে সচেতন থাকতে হবে। শিশুর নিজস্ব ধারায় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়ে বেড়ে উঠতে সাহায্য করতে হবে। শিক্ষকের আচরণ হবে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সহযোগিতামূলক। শিশুর অবুঝ মন বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে। পাঠদান পদ্ধতি হবে আনন্দপূর্ণ। যা শিশুরা শিক্ষকের সঙ্গে হাসতে-খেলতে শিখবে। এ’ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ রাখতে হবে। তিনি বলেছেন: ‘আনন্দহীন শিক্ষা, শিক্ষা নয়, যে শিক্ষায় আনন্দ নেই সে শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না’। লেখাটি শেষ করি বিউটি রাণী পালের মুখের কথা দিয়ে। সম্প্রতি তিনি বিডি নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা মুখে বলব কারিকুলাম উন্নত, আর আমাদের মন-মানসিকতা থাকবে সংকীর্ণ-তাহলে আমরা কীভাবে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নেব?’। সংকীর্নতা ছেড়ে আকাশের মতো উদার না হলে শিশু শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমরা আধুনিক বিশ্বের উপযোগি করে গড়ে তুলতে পারবো না। বিষয়টি যে কতো গুরুত্বপূর্ণ জাতি হিসেবে আমাদের অষ্ট প্রহর মনে রাখতে হবে।[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

রুনা লায়লার ক্ষোভ ও পদত্যাগপত্রে বানান ভুল

গতকালের পত্রিকাজুড়ে দেশ-বিদেশের বিচিত্র খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে দুটো খবরের ওপর বিশেষ নজর পড়লো। একটা দেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব রুনা লায়লার প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ প্রকাশ এবং অপরটি মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দীন চুপ্পুর পদত্যাগ পত্রের লেখায় অসংখ্য বানান ভুল। দুটো সংবাদই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হলো। তবে বানানের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই বেশি স্থান করে নিয়েছে।রুনা লায়লা উপমহাদেশের সংগীতের এক জীবন্ত কিংবদন্তির নাম। বাংলাদেশ এবং বাঙালির অহংকার বললেও অত্যুক্তি হবে না। এদেশে জন্মগ্রহণ করলেও তার শৈশব কেটেছে পাকিস্তানে। স্বাধীনতার পরে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। জন্মভূমির প্রতি তার রয়েছে প্রগাঢ় অনুভূতি এবং ভালোবাসা। যা তার বিভিন্ন সময়ের দেয়া সাক্ষাৎকারে অকপটে প্রকাশিত। তাকে বিশেষ কোনো  বিশেষণ দিয়ে বর্ণনা করা যাবে বলে মনে হয় না। ছয় দশকের বেশি তার সংগীত জীবনের সময়কাল। নানা ধরনের গান, নানা ভাষায় গেয়ে দুনিয়াজুড়ে বিপুল খ্যাতি পেয়েছেন। বলা হয়, ১৮টি ভাষায় ১৩ হাজারের বেশি গান তার কণ্ঠে গীত হয়েছে। তাকে নিয়ে গর্ব করার মতন অগণিত গল্প আছে। সুরের রানী হিসেবে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে তার সমান জনপ্রিয়তা রয়েছে।২.জানা যায়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি গতকালই তাঁকে প্রথমবারের মতন আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা প্রদান করে। একইসাথে শ্রাবণের বৃষ্টিস্নাত সায়াহ্নে তার একক সংগীতানুষ্টানের আয়োজন করে শিল্পকলা একাডেমি। এতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকতারা উপস্থিত ছিলেন। পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছে ‘রুনার গানে ভিজল শ্রাবণসন্ধ্যা’। একপর্যায়ে মিডিয়ার সামনে তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ‘নিজের দেশের শিল্পকলা একাডেমিতে একক সংগীত আয়োজন করতে আমাকে ৬২ বছর অপেক্ষা করতে হলো'। এটা এমন একজন প্রতিভাবান, গুণী সংগীত শিল্পীর জন্যে মোটেও কাঙ্খিত নয়। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুরনো শিল্পকলায় তিনি ইতোপূর্বে সংগীত পরিবেশন করলেও তার একক আয়োজন এ-ই প্রথম। আরও জানা যায়, তার এই একক সংগীতানুষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত অর্থ সম্প্রতিকালের বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় ব্যয় করা হবে।এমন আয়োজনকে তিনি তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শামিল বলেও বিবেচনা করেছেন। রুনা লায়লা বরাবরই খুব রসাত্মক ও উইটি ভাষায় কথা বলেন। যা দর্শক শ্রোতাকে দ্রুত সংযোগ করে করতে পারে। শিল্পকলায়ও এর ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। তবে প্রশ্ন হলো, তাকে নিয়ে একক সংগীতানুষ্ঠান না হওয়ার পেছনে কী কোনো রহস্য আছে? যেখানে শিল্প কলায় বিদেশি শিল্পীদেরও একক অনুষ্ঠান হয়েছে। ভক্তরা মনে করেন এটা সরকারের পক্ষ থেকে অবহেলা বা অবজ্ঞা নয় বরং অতীতে সুবিধাজনক সময় না হওয়ায় আসল কারণ। শিল্পী নিজেও সারাবছর ধরে বিদেশে নানাবিধ সংগঠনের আমন্ত্রণে থাকায় হয়তো হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া শিল্পী রুনা লায়লার শিডিউল, সম্মতি এবং সংস্থার সিদ্ধান্ত সবমিলিয়ে হয়তো সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য যে, ইচ্ছে  করলেই শিল্পী রুনা লায়লাকে যেকোনো সময়ে এমনকি জাতীয় প্রোগ্রামেও আনা সম্ভব হয় না।৩.এ প্রসঙ্গে বলা যায়, ২০১০ সালে প্রথম দিকে অফিসার্স ক্লাব ঢাকার এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে শিল্পী রুনা লায়লাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের মিলনমেলা হয়েছিল। ক্লাবের নবনির্বাচিত কমিটির অভিষেকের আয়োজন ছিল।এতে আরও কয়েকজন শিল্পীর মধ্যে সাবিনা ইয়াসমিনও ছিলেন। অনেক ধরনের গান হয়েছে। রাতের প্রহরও ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে। সবশেষে মাইক্রোফোনে ঘোষণা হল এবারের শিল্পী দেশের সেরা লিজেন্ড রুনা লায়লা। তার গান শুরুর শুভ মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। সবাই নড়েচড়ে বসেছেন। শিল্পীর কণ্ঠসুধায় সিক্ত হবেন। মনে আছে, গান শুরুর আগে দুয়েকটা কথা বলার সময় তিনি লক্ষ করলেন, শ্রোতাদের পেছনের সারিগুলোতে টুংটাং শব্দ হচ্ছে। তখন কেউ কেউ খাবারে হাত লাগাচ্ছেন। তাদের দাবি, তারা ডায়াবেটিসের রোগী। কিছু খেতে হবে, বেশি অপেক্ষা করতে পারছিলেন না। কাজেই খেতে খেতেই গান শুনবেন।শিল্পী রুনা লায়লা এটাকে তার প্রতি এক ধরনের অসম্মান প্রদর্শন বলে মনে করেছেন এবং কালবিলম্ব না করে মঞ্চ থেকে নেমে সোজা বাসায়। সেদিন তার পেছনে বেশ ক'জন সিনিয়র কর্মকর্তা ক্লাবের সিংহ দুয়ার পর্যন্ত দৌড়ালেন। না, কাজ হল না। তাকে ফেরানো গেল না। ফেরানো যায়নি। এর নাম রুনা লায়লা।৪.দ্বিতীয় বিষয় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ পত্রে ১৬টি বানান ভুল। সব কাজ ফেলে যারা এটা আবিষ্কার করেছেন, একে স্রেফ বাড়াবাড়ি হয়েছে বলতে হবে। নতুন শুদ্ধ বানান রীতিতে তিনটা বানান ভিন্নতর হয়েছে। তাছাড়া ইংরেজি শব্দকে বাংলায় লিখতে গেলে যেটাকে ভুল ধরা হয়েছে সেটা গর্হিত কিছু নয়।মনে হয়, সবকিছুতে ভুল ধরা, সন্দেহ করা, অধৈর্য হওয়ার একটা মারাত্মক প্রবণতার ভেতর দিয়ে চলেছে দেশ। সবাইকে আরও সহনশীল সংবেদনশীল হওয়ার ওপর জোর দিতে হবে। সাধারণ  মানুষকেও বিদ্যমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে অধিকতর মহৎ ও জনকল্যাণমুখী কাজে ব্যবহার করতে হবে। এবিষয়ে গ্রামে-গঞ্জে সামাজিক শিক্ষা ও গণসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করার সময় এসেছে। যা শিক্ষণীয় হবে, মাদক বিরোধী হবে বা যুবসমাজকে স্বাবলম্বী করে তোলার প্ল্যাটফর্ম হবে। অন্যথায় অন্তত ফেইসবুক মাধ্যমটি বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্যে সুফল নয় বরং একদিন অসহনীয় কুফল নিয়ে আসবে।[লেখক: গল্পকার]

শিক্ষককে মানুষ থাকতে দিন, তবেই মানুষ গড়া সম্ভব

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং দ্রুত পরিবর্তিত বৈশ্বিক কর্মবাজার; অন্যদিকে এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ, যারা হবে দক্ষ, সৃজনশীল, মানবিক এবং মূল্যবোধসম্পন্ন। এই বাস্তবতায় শিক্ষা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু নতুন কারিকুলাম বা প্রযুক্তি নয়; বরং সেই মানুষটি, যিনি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। রাষ্ট্র আজ স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ গড়ছে, ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী তৈরি করছে, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে থেকেই যায়। একজন আধুনিক শিক্ষক ছাড়া কি আধুনিক শিক্ষা সম্ভব? আমার বিশ্বাস, এর উত্তর ‘না’।কারণ একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ কখনো প্রযুক্তি নয়; একজন শিক্ষক। একটি স্মার্ট বোর্ড, একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কিংবা একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার শিক্ষার্থীর শেখাকে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু শেখার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে পারে না। সেই অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেন একজন চিন্তাশীল, সৃজনশীল, মানবিক এবং দায়িত্বশীল শিক্ষক। প্রযুক্তি শিক্ষকের বিকল্প নয়; বরং একজন দক্ষ শিক্ষকের হাতেই প্রযুক্তি শিক্ষাকে আরও কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক এবং আনন্দময় করে তোলে।এ কারণেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনেস্কোর ‘রেকমেন্ডেইশন কনসার্নিং দ্য স্টেটাস অফ টিচার্স’ -এ শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত স্বাধীনতাকে মানসম্মত শিক্ষার মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষকের মানোন্নয়ন ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।বাংলাদেশও শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণার প্রসার এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। যে মানুষটি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলেন, তার পেশাগত বিকাশ, সৃজনশীলতা, গবেষণার সুযোগ এবং মানসিক স্বাধীনতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনো অনেক সময় শিক্ষকের জ্ঞান, গবেষণা, পাঠদানের দক্ষতা কিংবা মানুষ গড়ার অবদানের চেয়ে তাঁর ব্যক্তিজীবনের শালীন প্রকাশ বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। আমরা চাই তিনি শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তা শেখান, অথচ তার নিজের মুক্ত ও মানবিক প্রকাশকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি না। আমরা চাই তিনি সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তুলুন, অথচ তার নিজের সৃজনশীলতাকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখি। এই বৈপরীত্য দূর না করলে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্যও পূর্ণতা পাবে না। একজন শিক্ষক সর্বাগ্রে একজন মানুষ। তারও অনুভূতি আছে, পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ থাকতে পারে। তিনি যদি পেশাগত নৈতিকতা, শালীনতা এবং দায়িত্ববোধ অক্ষুণ্ন রাখেন, তাহলে তার মানবিক সত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো শিক্ষাগত বা নৈতিক ভিত্তি নেই।আজকের পৃথিবীতে একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদবি বা বয়স নয়; তার শেখার ক্ষমতা। যে শিক্ষক প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান অর্জন করেন, প্রযুক্তিকে কাজে লাগান, গবেষণায় যুক্ত থাকেন, সংস্কৃতিচর্চা করেন এবং শিক্ষার্থীদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলেন, তিনিই প্রকৃত আধুনিক শিক্ষক। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু বই থেকে শেখে না; তারা শেখে শিক্ষকের চিন্তা, আচরণ, মূল্যবোধ এবং জীবনদর্শন থেকেও।এই কারণেই শিক্ষকের মানবিক সত্তা, সৃজনশীলতা এবং পেশাগত বিকাশকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একজন শিক্ষক যত বেশি জ্ঞানচর্চা করবেন, সংস্কৃতিমনা হবেন, সময়ের সঙ্গে নিজেকে আপডেট রাখবেন এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হবেন, তার শ্রেণিকক্ষও তত বেশি প্রাণবন্ত, চিন্তাশীল ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক হয়ে উঠবে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু নীতিমালায় লেখা হয় না; প্রতিদিন নীরবে লেখা হয় শ্রেণিকক্ষে। আর সেই ভবিষ্যতের প্রধান নির্মাতা একজন শিক্ষক। তাই শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা কোনো একটি পেশার স্বার্থ রক্ষা নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতারই অংশ।শিক্ষা কখনো কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়; এটি মানুষ গড়ার একটি অবিরাম প্রক্রিয়া। আর মানুষ গড়ার এই কাজটি যিনি করেন, তিনি নিজেও একজন পূর্ণ মানুষ। তাই শিক্ষককে এমন একটি সত্তায় পরিণত করা উচিত নয়, যেখানে তার ব্যক্তিত্ব, অনুভূতি এবং সৃজনশীলতার কোনো স্থান থাকবে না।আমাদের সমাজে এখনো একটি ভুল ধারণা রয়ে গেছে শিক্ষক মানেই তিনি সব সময় গম্ভীর থাকবেন, ব্যক্তিজীবনকে আড়ালে রাখবেন এবং কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবেন। কিন্তু একজন শিক্ষক যদি শালীনতা ও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রেখে নিজের স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন, সংস্কৃতিচর্চা করেন, বই পড়েন, গবেষণা করেন কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন, তাহলে তা তার শিক্ষকতার পরিপন্থী নয়; বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ করে। আজকের পৃথিবীতে একজন শিক্ষকের পরিচয় তার বয়স নয়; তার মনের বয়স। একজন শিক্ষক ষাট বছর বয়সেও আধুনিক হতে পারেন, যদি তিনি নতুন কিছু শেখার আগ্রহ না হারান। আবার কম বয়সেও কেউ যদি পরিবর্তনের প্রতি অনাগ্রহী হন, তবে তিনি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবেন না। তাই আধুনিক শিক্ষক বলতে আমরা এমন একজন মানুষকে বুঝি, যিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন জ্ঞান, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত করেন।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষা, ভার্চুয়াল ল্যাব, ওপেন এডুকেশনাল রিসোর্স এবং বৈশ্বিক জ্ঞানভাণ্ডার আজ শিক্ষকের হাতের নাগালে। এগুলোকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই; বরং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য এগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। যে শিক্ষক প্রযুক্তিকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযাত্রী হিসেবে গ্রহণ করবেন, তিনিই ভবিষ্যতের শ্রেণিকক্ষের নেতৃত্ব দেবেন।একইভাবে, যে শিক্ষক বই পড়েন, গবেষণা করেন, নতুন ধারণা নিয়ে ভাবেন, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেন এবং সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন, তিনি কখনো পুরোনো হয়ে যান না। কারণ একজন শিক্ষক আজীবন শিক্ষার্থী; শেখা থেমে গেলে শিক্ষকতাও থেমে যায়।এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন শিক্ষককে আমরা কেমন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই? এমন একজন মানুষ, যিনি কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবেন, নাকি এমন একজন, যিনি জীবনকে জানবেন, সমাজকে বুঝবেন এবং সংস্কৃতির আলোয় নিজেকে সমৃদ্ধ করবেন? একজন শিক্ষক যদি শালীনতা ও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রেখে গান শোনেন, কবিতা আবৃত্তি করেন, সাহিত্যচর্চা করেন, গবেষণা করেন কিংবা শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন, তাহলে তা তার শিক্ষকতার পরিপন্থী নয়; বরং শিক্ষকতাকে আরও সমৃদ্ধ করে। কারণ শিক্ষা কেবল তথ্যের নয়; রুচি, মানবিকতা, সৌন্দর্যবোধ ও মূল্যবোধেরও চর্চা। একজন সংস্কৃতিমনা শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব গুণ বিকাশে অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষকের বয়স নয় শিক্ষকের মনের বয়সই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যিনি প্রতিদিন নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করেন, নতুন বই পড়েন, নতুন ধারণা নিয়ে ভাবেন এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেন, তিনিই প্রকৃত আধুনিক শিক্ষক। আর এমন শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের শেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেন। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষকের পাঠ নয়; তার কৌতূহল, উদ্যম ও জীবনবোধ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে।প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব? কীভাবে এমন একটি শিক্ষা-পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, যেখানে শিক্ষক একই সঙ্গে আধুনিক, দক্ষ, সৃজনশীল এবং মর্যাদাসম্পন্ন পেশাজীবী হিসেবে বিকশিত হতে পারেন? কেবল সমস্যা চিহ্নিত করলেই চলবে না; এর কার্যকর সমাধানের পথও নির্ধারণ করতে হবে। কারণ একজন শিক্ষকের বিকাশ মানেই একটি প্রজন্মের বিকাশ। তাই এই পরিবর্তনের দায় শুধু শিক্ষকের নয়; রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ.. সবার। এ লক্ষ্য অর্জনে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।প্রথমত, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষণ-পদ্ধতি, গবেষণা, যোগাযোগ দক্ষতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সৃজনশীল শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।দ্বিতীয়ত, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা, মেন্টরশিপ এবং পারস্পরিক শেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একজন শিক্ষকের ভালো উদ্যোগ যেন অন্য শিক্ষকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়; নিরুৎসাহ বা ঈর্ষার কারণ নয়। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। শালীন ব্যক্তিজীবনকে বিতর্কের বিষয় না বানিয়ে, তার শ্রেণিকক্ষের কাজ, গবেষণা, সততা এবং মানুষ গড়ার অবদানকে মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড করতে হবে।চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অযাচিত ট্রল, অপপ্রচার এবং সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত অপমান বা চরিত্রহনন কখনোই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।পঞ্চমত, শিক্ষা নীতির বাস্তবায়নে শিক্ষককে অংশীদার করতে হবে। নতুন কারিকুলাম, প্রযুক্তি ব্যবহার, মূল্যায়ন পদ্ধতি বা শিক্ষা সংস্কারের সিদ্ধান্তে মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিলে বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।সবশেষে, শিক্ষকদের প্রতিও একটি প্রত্যাশা রয়েছে। সমাজ যখন তাদের সম্মান দেয়, তখন সেই সম্মানের প্রতিদানও তাদের দিতে হবে নিষ্ঠা, সততা, আজীবন শেখার মানসিকতা এবং পেশাগত নৈতিকতার মাধ্যমে। একজন শিক্ষককে প্রতিদিনই নিজেকে নতুন করে গড়তে হবে। কারণ তিনি শুধু পাঠদান করেন না; তিনি আগামী দিনের নাগরিক তৈরি করেন। আমরা যদি সত্যিই একটি স্মার্ট, মানবিক ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে শিক্ষকের হাতে শুধু প্রযুক্তি তুলে দিলেই হবে না; তার চিন্তার স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।কারণ একজন শিক্ষককে মানুষ থাকতে দিলে তবেই তিনি মানুষ গড়তে পারবেন। একজন শিক্ষকের হাসি, তার সংস্কৃতিচর্চা, তার গবেষণা এবং তার মানবিক সত্তা তার শিক্ষকতাকে ছোট করে না; বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ, আরও অনুপ্রেরণাদায়ী করে তোলে। আর এমন শিক্ষকই একটি আলোকিত জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষকআরও পড়ুন-বাবা হওয়া সহজ, পিতা হওয়া কঠিনলাল স্রোতের নীরব বীর‘দূষণ’ হয়ে উঠছে সম্পদরক্তের দামে কেনা বিষণ্ণ জীবনজলবায়ু পরিবর্তনের নীরব শিকার বাংলাদেশের শ্রমিকরা

শ্রাবণের গানই হয়ে উঠলো প্রতিবাদের প্রতীক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা আমাদের সমাজ সম্পর্কে বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। প্রশ্নটি খুব সরল- একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষ থাকতে পারবেন না?সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়েছিল। ভিডিওতে তাকে হালকা বাতাসে আঁচল উড়িয়ে, ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’–এর সঙ্গে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডের সেই ভিডিওই হয়ে ওঠে সমালোচনা, কটাক্ষ ও সামাজিক বিচারের বিষয়।কিন্তু সেই সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় যা ঘটেছে, তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা একই গান ব্যবহার করে রিলস তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কেউ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, কেউ কর্মস্থলে, কেউ ব্যক্তিগত পরিবেশে ভিডিও করেছেন।  তাদের বক্তব্য একটাই- একজন শিক্ষক বা একজন নারীকে তার ব্যক্তিগত আনন্দ, পোশাক, হাসি, গান কিংবা স্বাভাবিক অভিব্যক্তির জন্য হেনস্তা করা হলে তার প্রতিবাদ হওয়া দরকার।একটি রোমান্টিক গান এভাবে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠবে- সম্ভবত গানটির গীতিকার ও সুরকার আশরাফ বাবুও ১৯৮৭ সালের এক শ্রাবণে খুলনায় বসে গানটি লেখার সময় তা ভাবেননি। কিন্তু সময় কখনো কখনো শিল্পকে নতুন অর্থ দেয়। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি এই শ্রাবণে হয়ে উঠেছে সামাজিক বিচারপ্রবণতার বিরুদ্ধে এক ধরনের সম্মিলিত প্রতিবাদের প্রতীক।শিক্ষিকা সামিয়া শিকদার লিখেছেন, ‘বিউটি রানী পাল ম্যাডামকে হেনস্তার চেষ্টা সফল হয়নি। আজ প্রতিটি সাহসী শিক্ষকই একেকজন বিউটি রানী পাল। আমরা মাথা নত করব না, সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাব।’কুমিল্লার শিক্ষিকা লায়লা নূর পিংকি লিখেছেন, ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গানের ভিডিও নিয়ে কটাক্ষের প্রসঙ্গ টেনে, শিক্ষকদের এই প্রতিবাদের ফলে মানুষ অন্তত কিছু সময়ের জন্য অন্য কিছু নিয়ে কথা বলছে। তার ভাষায়, ডিজিটাল এই প্রতিবাদ দেখিয়ে দিয়েছে, অন্যায় হলে শিক্ষকেরাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারেন।পঞ্চগড়ের শিক্ষিকা ফেরদৌস লিখেছেন, ‘এরপর শাড়ি পরেই দিব শিক্ষকের সেই ভাইরাল নাচ!’ আর চট্টগ্রামের মতলব বাজারের শিক্ষিকা জয়ন্তী ভৌমিকের প্রশ্নটি আরও সরাসরি: ‘শিক্ষক যদি হাসেন, সমস্যা! সাজেন, সমস্যা! পরিপাটি থাকেন, সমস্যা! ভ্রমণে যান, সমস্যা! ছবি পোস্ট করেন, সমস্যা! তাহলে কি শিক্ষক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হওয়ার অধিকারটাও জমা দিতে হবে?’এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে।একজন শিক্ষক অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তার কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা, শালীনতা, পেশাগত সততা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। কোনো শিক্ষক আইন ভঙ্গ করলে, শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করলে, প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা লঙ্ঘন করলে বা দায়িত্বে অবহেলা করলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। শিক্ষকও আইনের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু একটি ব্যক্তিগত ভিডিওতে কাউকে গান করতে, হাঁটতে, হাসতে বা আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা গেলেই তার চরিত্র, সততা কিংবা পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি ন্যায়সংগত?এখানেই মূল সমস্যাটি।আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে এমন এক ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করি, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছেও প্রত্যাশা করি না। শিক্ষক যেন সব সময় গম্ভীর থাকবেন, সব সময় সংযত থাকবেন, ব্যক্তিগত আনন্দ প্রকাশ করবেন না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করবেন না- এমন একটি অলিখিত সামাজিক বিধি যেন তৈরি হয়ে গেছে।কিন্তু শিক্ষক কি কেবল শ্রেণিকক্ষের মানুষ? বিদ্যালয়ের দরজা দিয়ে ঢোকার পর তিনি শিক্ষক- এটি সত্য। কিন্তু বিদ্যালয়ের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসার পর তিনি কি মানুষ নন?একজন শিক্ষকেরও পরিবার আছে, বন্ধুত্ব আছে, পছন্দ-অপছন্দ আছে, সংস্কৃতিচর্চা আছে, আনন্দ আছে, ক্লান্তি আছে। তিনি গান শুনতে পারেন, ভ্রমণে যেতে পারেন, ছবি তুলতে পারেন, সাজতে পারেন, হাসতে পারেন। এসবের কোনোটিই তাকে কম দায়িত্বশীল শিক্ষক বানায় না।বরং বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শেখাতে হলে শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য জানলেই হয় না। গান, অভিনয়, গল্প, আবৃত্তি, নৃত্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড শিশুর কল্পনাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক বোধ গড়ে তোলে। আমরা যখন একজন শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গান গাইতে বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখি, তখন সেটিকে শিক্ষার অংশ হিসেবে স্বাগত জানাই। কিন্তু একই শিক্ষক বিদ্যালয়ের বাইরে নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে একটি গান বা নাচের ভিডিও প্রকাশ করলে তার চরিত্র বা পেশাগত মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করি।এই দ্বৈত মানসিকতা কেন?একজন শিক্ষক যদি সংস্কৃতির মূল্য বোঝেন, সৃজনশীলতার চর্চা করেন এবং জীবনে আনন্দের জায়গা রাখেন, তাহলে তিনি শিক্ষার্থীদেরও আরও মানবিক, আত্মবিশ্বাসী ও মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। একজন আনন্দহীন মানুষই যে ভালো শিক্ষক হবেন- এমন কোনো প্রমাণ নেই।এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সামাজিক বিচার অনেক সময় আরও কঠোর হয়ে ওঠে।একজন পুরুষ শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান করলে বা আনন্দের ভিডিও প্রকাশ করলে সেটিকে অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারী শিক্ষক একই কাজ করলে তার পোশাক, চুল, হাঁটা, হাসি কিংবা শরীরী ভাষা নিয়ে শুরু হয় নৈতিকতার আলোচনা। নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমাজের এই অতিরিক্ত আগ্রহ নতুন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু সেই প্রবণতাকে আরও দ্রুত, আরও প্রকাশ্য এবং আরও নিষ্ঠুর করে তুলেছে।একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় মন্তব্য, কটাক্ষ, চরিত্রহনন, এমনকি চাকরি হারানোর দাবি। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি পোস্ট কখনোই পুরো সমাজের মতামতকে প্রতিনিধিত্ব করে না।কোনো সংবাদে যদি বলা হয়, ‘অভিভাবকদের ক্ষোভ’, ‘জনগণের দাবি’ বা ‘সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ’, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- সত্যিই কি সংশ্লিষ্ট অভিভাবকেরা অভিযোগ করেছেন? লিখিত কোনো অভিযোগ আছে কি? অভিযোগের প্রকৃতি কী? নাকি কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট ধীরে ধীরে ‘জনমত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে? সমালোচনার অধিকার সবার আছে। কেউ মনে করতেই পারেন, কোনো নির্দিষ্ট আচরণ একজন শিক্ষকের পেশাগত ভূমিকার সঙ্গে মানানসই নয়। সেই মত প্রকাশের অধিকারও তার আছে। কিন্তু মতের সঙ্গে ব্যক্তিগত অপমান, চরিত্রহনন বা ধর্মীয় বিদ্বেষ যুক্ত হলে তা আর সুস্থ সমালোচনা থাকে না।বিউটি রাণী পাল হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন নারী। তার ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে কোনো বৈষম্য বা বিদ্বেষ হয়েছে কি না, সেটি প্রমাণ ও তদন্তের বিষয়। প্রমাণ ছাড়া কাউকে ধর্মীয় বিদ্বেষের জন্য অভিযুক্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি কারও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তিনি সামাজিক বা পেশাগত চাপের মুখে পড়ছেন কি না, সেটিও উপেক্ষা করা যায় না।একই সঙ্গে প্রতিবাদের ভাষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যারা একজন নারী শিক্ষককে অপমান করেছেন, তাদের সমালোচনা করতে গিয়ে যদি পাল্টা কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীকে একইভাবে অপমান করা হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান হয় না। এক ধরনের অসহিষ্ণুতার জবাব আরেক ধরনের অসহিষ্ণুতা দিয়ে দেওয়া যায় না।প্রতিবাদ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবাদ যেন আরেকটি নিপীড়নের ভাষা না হয়ে ওঠে। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানে শিক্ষিকাদের এই সম্মিলিত ভিডিও প্রকাশের ঘটনা তাই শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রবণতা নয়। এর মধ্যে এক ধরনের সামাজিক বার্তাও আছে। একজনকে হেনস্তা করার চেষ্টা যখন হাজারো মানুষকে একই প্রতীকের অধীনে দাঁড় করিয়ে দেয়, তখন সেটি নিছক বিনোদন থাকে না; তা প্রতিবাদের রূপ নেয়।তবে এই প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই যে, বহু শিক্ষক ও শিক্ষিকা নিজেদের স্বাভাবিক প্রকাশের জায়গাটি নতুন করে দাবি করেছেন।লায়লা নূর পিংকির কথায়, ‘যেসব শিক্ষক কোনো দিন লজ্জায় ভিডিও দিতেন না, তাদের প্রতিভাও বিকশিত করে দিলেন।’ কথাটির মধ্যে রসিকতা আছে, কিন্তু সামাজিক বাস্তবতাও আছে। আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে অনেক মানুষ স্বাভাবিকভাবে আনন্দ প্রকাশ করার আগেও ভাবেন- কেউ কি তাকে বিচার করবে?এটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।একজন শিক্ষককে তার পেশাগত কাজের জন্য মূল্যায়ন করা উচিত। তিনি শ্রেণিকক্ষে কেমন পড়ান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, দায়িত্ব কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন, বিদ্যালয়ে তাঁর অবদান কী- এসব হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড। একটি ভিডিও দিয়ে একজন মানুষের সমগ্র পরিচয় নির্ধারণ করা ন্যায়সংগত নয়।আরও বড় কথা, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মুহূর্তকে সামাজিক নজরদারির বস্তুতে পরিণত করা হলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যায়। শিক্ষক সংকট, শিক্ষার মান, অবকাঠামোর ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, নিরাপদ শিক্ষাপরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা করার বদলে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি- কে কী পোশাক পরলেন, কীভাবে হাঁটলেন, কোন গানের সঙ্গে ভিডিও করলেন।এটি কেবল একজন শিক্ষক বা একটি ভিডিওর সমস্যা নয়। এটি আমাদের সামাজিক অগ্রাধিকারেরও প্রশ্ন।আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রকাশ করতে ভয় পাবেন? আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে নারীর হাসি, পোশাক, চুল, সাজসজ্জা কিংবা আনন্দের মুহূর্তও জনসমক্ষে নৈতিক বিচারের বিষয় হয়ে উঠবে?যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।একজন শিক্ষককে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। কিন্তু দায়িত্বশীলতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা পরস্পরের বিরোধী নয়। পেশাগত দায়িত্বের জন্য একজন শিক্ষককে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য তাকে সমাজের অনুমতি নিতে হবে- এমন কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারণা থাকতে পারে না।মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন সবার আছে, তেমনি অন্যের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্বও সবার।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই ভারসাম্য: স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু দায়িত্বও থাকবে; সমালোচনা থাকবে, কিন্তু অপমান নয়; মতভেদ থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়। বিউটি রাণী পালকে ঘিরে বিতর্কের শেষ কথা তাই কোনো পক্ষের জয় বা পরাজয় নয়। মূল প্রশ্নটি আরও বড়।একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষও থাকতে পারবেন?উত্তরটি হওয়া উচিত- অবশ্যই।শিক্ষকেরও হাসার অধিকার আছে। আনন্দ করার অধিকার আছে। গান শোনার অধিকার আছে। সংস্কৃতিচর্চার অধিকার আছে। নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে বাঁচার অধিকার আছে।একজন শিক্ষককে তার কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও দিয়ে নয়, তার দীর্ঘদিনের কাজ দিয়ে মূল্যায়ন করা হোক। একজন নারীকে তার পোশাক, হাসি, চুল বা আনন্দের মুহূর্তের জন্য সামাজিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে আমরা অন্তত একবার নিজেদের দিকে তাকাই।কারণ শিক্ষকরা রোবট নন।নারীরাও নন।তারা মানুষ।আর একটি মানবিক সমাজের প্রথম শর্তই হলো- মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা।লেখক: সাংবাদিক। সংবাদ প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

আবারও কি ভাঙছে পাকিস্তান

বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে বেলুচ নেতা। ‘বেলুচিস্তান প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করে এই প্রদেশটির জন্য আলাদা জাতীয় সঙ্গীত, আলাদা পতাকা, পৃথক মুদ্রা ও স্বাধীন প্রশাসনিক পদ্ধতি চালুর দাবি তুলেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী। তাদের দাবি, তারা বেলুচিস্তানের ৮৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, বাকি ১৫ শতাংশ পাকিস্তান সরকারের দখলে। এই ১৫ শতাংশের দখলদারিত্ব থেকে পাকিস্তানকে বিতাড়ন করতে বেলুচ যোদ্ধারা সশস্ত্র লড়াই চালাচ্ছে। চারটি প্রদেশের সমন্বয়ে পাকিস্তান গঠিত, তার মধ্যে বেলুচিস্তান আয়তনে সবচেয়ে বড়। প্রদেশটির আয়তন ৩,৪৭,১৯০ বর্গকিলোমিটার, বাংলাদেশের প্রায় আড়াই গুণ বড়। এটি পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের ৪৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক এলাকা। লোকসংখ্যা দেড় কোটিরও কম। প্রদেশটির উত্তরে আফগানিস্তান, পশ্চিমে ইরান এবং দক্ষিণে আরব সাগর। বৃষ্টিপাত খুব কম, তাই বনজঙ্গল নেই, চাষাবাদও সীমিত। মরুভূমি ও পর্বতময় এই প্রদেশে হাতে গোনা কয়েকটি উর্বর উপত্যকায় চাষ হয়। তবে খনিজ সম্পদে ভরপুর। প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, স্বর্ণ ও তামার বিরাট মজুত রয়েছে এখানে।ইতিহাস বহু পুরনো। ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বে এই অঞ্চল আলেকজাণ্ডার দখল করেছিলেন। এরপর দখল করে শাসন করেছে ভারতীয় কিছু শাসক, পারস্য, আরব, গজনভি, ঘোরি এবং মঙ্গোলেরা। তারপর ব্রিটিশরা অঞ্চলটি দখলে নেয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর বেলুচিস্তান এককভাবে পাকিস্তানে যোগ দেয়নি। তখন বেলুচিস্তান ছিল ব্রিটিশ শাসিত প্রদেশ ও চারটি রাজ্যের সমষ্টি। ব্রিটিশ বেলুচিস্তান, মাকরান, লাসবেলা ও খারান পাকিস্তানে যোগ দেয় ১৯৪৭ সালেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় রাজ্য কালাতের খান মীর আহমদ ইয়ার খান প্রথমে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের পর ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে বাধ্য হন। বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা একে জোরপূর্বক সংযুক্তি হিসেবে দেখেন। এই বিতর্ক ও স্বাধীনতা হারানোর ক্ষোভ থেকেই পরবর্তী সংঘাতের বীজ বোনা হয়।যোগদানের এক বছরের মাথায় ১৯৪৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় প্রথম বেলুচ বিদ্রোহ। খানের ভাই প্রিন্স আব্দুল করিম খানের নেতৃত্বে একদল যোদ্ধা স্বাধীন কালাতের দাবিতে অস্ত্র ধরেন। এই সংঘাত ১৯৫০ সাল পর্যন্ত চলে এবং পাকিস্তানি বাহিনী তা দমন করে। এরপর ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭৩ এবং ২০০০ এর দশকে পর্যায়ক্রমে আরও বড় বিদ্রোহ হয়েছে। বেলুচদের মূল অভিযোগ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা। অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার দিক থেকে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের বাকি প্রদেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। প্রথমদিকে তারা স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিল। সেই দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় এবং আন্দোলন দমনের মুখে বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন বেলুচিস্তান প্রতিষ্ঠার পথে যায়। এই লক্ষ্যে গঠিত হয় বেলুচ লিবারেশন আর্মি। সমস্যা হলো বেলুচদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী নেতৃত্বের অভাব। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে বাংলাদেশ মাত্র নয় মাসে মুক্ত হলেও বেলুচিস্তান তা পারছে না। তারা লড়ে যাচ্ছে যুগের পর যুগ ধরে। আর কয়েক বছর বাদেই তাদের লড়াইয়ের শতবর্ষ পূর্ণ হয়ে যাবে।সম্প্রতি পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বেলুচ লিবারেশন আর্মি গোয়াদারের উপকূলরক্ষী বাহিনীর ক্যাম্পে বড় হামলার দাবি করেছে এবং বলেছে চীন পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের কাজ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হামলা চলবে। এর জবাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রদেশজুড়ে নতুন অভিযান শুরু করেছে। একই সময়ে জেনেভায় মানবাধিকার কাউন্সিলের পাশে বেলুচ নেতা মীর সুলেমান দাউদ জান খান অফ কালাত বলেছেন, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোট হলে বেশিরভাগ বেলুচ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেবে। বেলুচিস্তানের সশস্ত্র বিদ্রোহীদের জঙ্গি ও সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে পাকিস্তান তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালাচ্ছে। সম্প্রতি স্বাধীনতা ঘোষণার পর শুধু সশস্ত্র বিদ্রোহীরা নয়, বেলুচিস্তানের সাধারণ জনগণও সব জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, নারীরা রয়েছে অগ্রণী ভূমিকায়।এই বাহিনী শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আক্রমণ চালাচ্ছে না, পাকিস্তানে বাস্তবায়নাধীন চীনা প্রকল্প এবং প্রকল্পে নিয়োজিত চীনা শ্রমিকদের ওপরও হামলা করছে। ৬,০০০ কোটি ডলার ব্যয়ের চীন পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্পে কর্মরত চীনা শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য কয়েক হাজার সামরিক কর্মী নিয়োগ করতে হয়েছে। তবু হামলা থামছে না। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে তেহরিক ই তালেবানের হামলাও অব্যাহত আছে। ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানে তালেবানেরা ক্ষমতায় আসার পর এক বছরে পাকিস্তানে ২৫০ বারের বেশি সশস্ত্র আক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। পাকিস্তান তালেবান ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তান বারবার আফগানিস্তানকে তেহরিক ই তালেবান এবং বেলুচ লিবারেশন আর্মির ঘাঁটি বন্ধ করতে বলেছে, কিন্তু আফগান তালেবান সরকার সেই অনুরোধ মানছে না। ফলে আফগানিস্তান পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে।পাকিস্তান আগে থেকেই বেলুচদের সহযোগিতা করার জন্য ভারতকে দায়ী করছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই পাকিস্তান ভারত পরস্পরকে দায়ী করার পুরনো রীতি চলছে। দুই দেশের পারস্পরিক শত্রুতার কারণে তারা অস্ত্র উৎপাদন ও সংগ্রহে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে, দুটি দেশই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী। জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছিলেন, ঘাস খেয়ে হলেও পারমাণবিক বোমা বানাবেন। ভারতের সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় গিয়ে পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়েছে। এখন বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী জনতাকে সেই অস্ত্র দিয়ে দমন করার চেষ্টা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বেলুচ আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ‘শেখ মুজিবের পথ ধর, বেলুচিস্তান স্বাধীন কর’ এই স্লোগান এখন শোনা যাচ্ছে। এই স্লোগানের অন্যতম উদ্যোক্তা মানবাধিকার কর্মী মাহরাং বালোচ। সম্ভবত ১৯৭১ সালে তার জন্মও হয়নি, কিন্তু তিনি শেখ মুজিবকে চেনেন, জানেন শেখ মুজিব কীভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন। বাংলাদেশের একজন ঐতিহাসিক নেতার পথ ধরে তারা বেলুচিস্তান স্বাধীন করতে চায়। বঙ্গবন্ধু এখন পাকিস্তানের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, তিনি এখন বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুপ্রেরণাদাতা।শেখ মুজিবকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার এক প্রান্তে তার ভাস্কর্য ভাঙা হচ্ছে, বাড়ির ইট খুলে নেয়া হচ্ছে, আর অন্য প্রান্তে মুজিব স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে জেগে উঠছেন। অর্থনৈতিকভাবে বেলুচিস্তান এখনও পাকিস্তানের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল। সম্পদ থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় মানুষ চাকরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই বঞ্চনা, সঙ্গে রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন, মিলেই বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের সবচেয়ে অস্থির প্রদেশে পরিণত করেছে। পাকিস্তান ভাঙবে কি না সেই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে, তবে বেলুচিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি বলছে সংকট গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।(লেখকের নিজস্ব মত) [লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন: কী পেলেন, কী হারালেন!

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদত্যাগের গুঞ্জন, বঙ্গভবনের নীরবতা, সরকারের অস্পষ্ট অবস্থান, স্পিকারের বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরা এবং রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যগত অবস্থা- সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের অপেক্ষার আবহ তৈরি হয়েছে। যদিও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটি কেবল তিনি পদত্যাগ করবেন কি না, সেটি নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো— বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন শেষ পর্যন্ত কী পেলেন, আর কী হারালেন?বিতর্কের মাঝেই দায়িত্ব গ্রহণ২০২৩ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন রাজনীতিক, সাবেক জেলা জজ, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়ার সময় ধারণা করা হয়েছিল, তিনি রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে এগিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল সময়গুলোর একটির মুখোমুখি হন তিনি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাকে এমন সব সিদ্ধান্তের অংশ হতে হয়েছে, যেগুলো নিয়ে এখনো রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক শেষ হয়নি।বড় অর্জন—সাংবিধানিক ধারাবাহিকতারাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের সমর্থকেরা বলবেন, তার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। একদিকে ক্ষমতার পালাবদল, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ, পরে জাতীয় নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল ছিলেন।২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নতুন মন্ত্রিসভাকে তিনিই শপথবাক্য পাঠ করান। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তার এই ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।বড় ক্ষতি—বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তবে রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে তার বিভিন্ন সময়ে দেওয়া পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন।কয়েক মাস পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের কোনো লিখিত বা দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই। একজন রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে এমন অসামঞ্জস্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই তৈরি করেনি; বরং রাষ্ট্রীয় নথি, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রপতির দপ্তরের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এই একটি ঘটনাই তার পুরো মেয়াদের মূল্যায়নে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।নিজের ইচ্ছায় নাকি পরিস্থিতির চাপে?রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা নতুন নয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নির্বাচনের পর দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। পরে দেশীয় গণমাধ্যমকেও বলেছিলেন, 'আমার ভালো লাগে না।'অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বঙ্গভবনের কার্যক্রম সীমিত হওয়া, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা এবং রাষ্ট্রপতির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার অনুভূতির কথাও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। এবার পদত্যাগের গুঞ্জনের পেছনে স্বাস্থ্যগত কারণকে সামনে আনা হলেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশের প্রশ্ন— এটি কি শুধুই স্বাস্থ্যগত সিদ্ধান্ত, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সম্মানজনক প্রস্থান?স্বাস্থ্যও একটি বাস্তবতারাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যগত বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৩ সালে তার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়। চলতি বছর যুক্তরাজ্যে গিয়ে এনজিওগ্রামের সময় আবারও একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক ধরা পড়ে এবং স্টেন্ট বসাতে হয়।  বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রায়ই ব্যক্তিগত আলোচনায় শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন এবং দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথাও বলেছেন। অতএব, যদি তিনি সত্যিই পদত্যাগ করেন, তবে স্বাস্থ্যগত কারণকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগও নেই।গুঞ্জন, নীরবতা ও রাজনৈতিক বার্তারাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে জাতীয় সংসদের স্পিকারের বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও সরকারিভাবে সফর সংক্ষিপ্ত করার কারণ জানানো হয়নি, তবু সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছেই জমা দিতে হয় এবং পদ শূন্য হলে তিনিই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে সরকারের মন্ত্রীদের সংযত প্রতিক্রিয়া, বঙ্গভবনের আনুষ্ঠানিক নীরবতা এবং রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিবের মন্তব্য, ‘আপনার মতো আমিও খবরটি দেখছি। পুরো পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নিজেই একটি গণমাধ্যমকে পাঠানো বার্তায় তার বিরুদ্ধে প্রচারিত একটি ফোনালাপের খবরকে “কল্পনার বাইরে” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অর্থাৎ গুঞ্জনের সব উপাদানই এখনো নিশ্চিত তথ্য নয়।’রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও দলটিকে প্রধান নিয়ামক করে তুলেছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। ফলে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সেটি শুধু একজন ব্যক্তির বিদায় নয়; বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির পুনর্গঠনেরও সূচনা হবে।ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে?একজন রাষ্ট্রপতির সাফল্য শুধু তিনি কতগুলো ফাইলে সই করেছেন, কতজন রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র গ্রহণ করেছেন কিংবা কতটি বিদেশ সফর করেছেন— এসব দিয়ে মূল্যায়িত হয় না। তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সংকটের মুহূর্তে তার ভূমিকার মাধ্যমে। মো. সাহাবুদ্দিন এমন এক সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, যখন বাংলাদেশ ধারাবাহিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, সাংবিধানিক বিতর্ক এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে গেছে। তিনি রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন— এটি তার পক্ষে যাবে। আবার তার কিছু বক্তব্য, সিদ্ধান্ত এবং নীরবতা বিতর্ক তৈরি করেছে—এটিও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করুন বা মেয়াদ পূর্ণ করুন- তার রাষ্ট্রপতিত্বের মূল্যায়ন এখনই শুরু হয়ে গেছে। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সম্মান অর্জন করেছেন, কিন্তু সেই সম্মানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিতর্ক, প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক চাপের দীর্ঘ ছায়া। সম্ভবত এ কারণেই তার রাষ্ট্রপতিত্বের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন হতে পারে- তিনি পদ পেয়েছিলেন অনেক, কিন্তু সেই পদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার পথ ছিল অনেক বেশি কঠিন।ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তার উত্তর নির্ভর করবে কেবল তার বিদায়ের ওপর নয়; বরং সংকটের সময় রাষ্ট্র, সংবিধান এবং গণতন্ত্রের প্রতি তার ভূমিকাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে বিচার করে, তার ওপর।লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

ভিডিও আরও দেখুন

বিশ্বকাপের কান্না ভুলে আবার মাঠে মেসি

বিশ্বকাপ ফাইনালের বিষাদ কাটিয়ে আবারও চিরচেনা আঙিনায় ফিরলেন লিওনেল মেসি। তবে ফুটবল জাদুকরের প্রত্যাবর্তনের দিনটি জয়ে স্মরণীয় করে রাখতে পারল না ইন্টার মায়ামি। ঘরের মাঠে কলম্বাস ক্রুর সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে পয়েন্ট ভাগাভাগি করতে হয়েছে ফ্লোরিডার ক্লাবটিকে।স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালের হারের ১৩ দিন পর আজই প্রথম কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে মাঠে নামেন মেসি। ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা ম্যাচের ৫৩ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামলে পুরো গ্যালারি তাকে করতালিতে অভিবাদন জানায়। মেসির সঙ্গে এদিন মায়ামির একাদশে ফিরেছিলেন আরেক আর্জেন্টাইন তারকা রদ্রিগো দে পল। মাঠে নেমে গোল করার দুটি সুবর্ণ সুযোগ পেলেও জালের দেখা পাননি মেসি।ম্যাচের শুরু থেকেই দাপট ছিল লুইস সুয়ারেজের। ১৬ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে বল পেয়ে প্রতিপক্ষ গোলরক্ষককে এগিয়ে আসতে দেখে দারুণ এক ‘লুপ’ শটে লক্ষ্যভেদ করেন এই উরুগুয়ান স্ট্রাইকার। চলতি মৌসুমে এটি তার দশম গোল। তবে মায়ামির লিড বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৩৪ মিনিটে কলম্বাস ক্রুর হুগো পিকার্ডের ক্রস ঠেকাতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল পাঠিয়ে দেন মায়ামির ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার কাসেমিরো।বিরতির ঠিক আগে আবারও এগিয়ে যায় মায়ামি। সুয়ারেজের নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে গোল করেন নোয়াহ অ্যালেন। শুরুতে অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হলেও ভিএআরের (VAR) সাহায্যে শেষ পর্যন্ত গোলের সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু করা মায়ামি ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেলেও কাজে লাগাতে পারেনি। উল্টো ৮৪ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে গোল করে সমতায় ফেরে কলম্বাস ক্রু।বর্তমানে এমএলএসের পয়েন্ট টেবিলে শীর্ষে থাকা নাশভিলে এসসির চেয়ে ২ পয়েন্টে পিছিয়ে আছে ইন্টার মায়ামি। বুধবার লিগস কাপে ঘরের মাঠে অ্যাতলেটিকো দে সান লুইসকে আতিথ্য দেবে মেসির দল।

বিশ্বকাপের কান্না ভুলে আবার মাঠে মেসি