সংবাদ
গ্যাস সংকট আগের সরকারের ‘পাপের ফল’

গ্যাস সংকট আগের সরকারের ‘পাপের ফল’

দেশে চলমান গ্যাস সংকটকে আগের সরকারের ‘পাপের ফল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।তিনি জানিয়েছেন, এই সংকট পুরোপুরি নিরসন করতে সরকারের আরও অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন মিলনায়তনে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। নজরুল বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বিভাগীয় পর্যায়ের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই সভার আয়োজন করা হয়।গ্যাস সংকট নিয়ে বিরোধী দলের আন্দোলনের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘মানুষ আসলে যথেষ্ট কষ্ট পাচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রী নিজে এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আমাদের বক্তব্য খুব সহজ, মানুষের কষ্টটা সত্য। কিন্তু এই সংকটের জন্য বর্তমান সরকারকে দোষ দেওয়া সঠিক নয়। বাংলাদেশ এখন একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজের দিকে পৌঁছেছে। অহেতুক কাউকে দায় দেওয়া হলে মানুষ তা গ্রহণ করবে না।’জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমানে যে সংকটের মুখোমুখি আমরা হয়েছি, তা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা এবং একটি আকস্মিক দুর্ঘটনার ফল। সেই দুর্ঘটনা কাটিয়ে ওঠার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে সরবরাহ লাইনের সক্ষমতা বাড়লেও চাহিদার তুলনায় এখনো দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল।সংকট সমাধানে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি। ভোলার গ্যাস মূল লাইনে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। তবে প্রতিটি প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ।’স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, জরিপ অনুযায়ী দেশের স্থলভাগে ৪০ থেকে ৫০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে দেশে বছরে ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে।সেই অনুযায়ী কাজ চলছে এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ূন কবিরের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু ওয়াহাব আকন্দ এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। অনুষ্ঠানে চার জেলার জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন।
৪১ মিনিট আগে

মতামতমতামত

চেনা কথা, জানা ইতিহাস

মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত ‘জুলাই মাস্টার মাইন্ড’ মাহফুজ আলমের একটি সাক্ষাৎকার ইউটিউবে শুনছিলাম। সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দীন সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন। সেখানে মাহফুজ আলম বললেন, ‘শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন তৎকালীন পূর্ব বাংলার ‘আনকন্ট্রোভারশিয়াল’ নেতা এবং তার নেতৃত্বেই স্বাধীনতা। স্বাধীনতার পরেও তিনি ‘আনকন্ট্রোভারশিয়াল’ ছিলেন। ’৭২-এর সংবিধান রচনা ও কার্যকর করার পরে মুজিব বিতর্কিত হন। ‘তর্কের খাতিরে মাহফুজ আলমের বক্তব্য যদি মেনেও নেই, তারপরও তারই ভাষায় ‘সংবিধান নিয়ে বিতর্কিত’ কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত এবং অবিতর্কিত নেতাকে স্বপরিবারে পাশবিক নৃশংসতায় নিহত করার দিনটিকে তারা ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় শোক দিবস হিসাবে পালনের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে পাল্টে দিয়ে মুজিব হত্যাকারীদের পক্ষেই প্রকারান্তরে অবস্থান নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের মনোনীত রাষ্ট্রপতিকে বঙ্গভবনে রেখে, বঙ্গভবন থেকে মুজিবের ছবি মাহফুজ আলম যেভাবে নিজ উদ্যোগে খুলে ফেলে দিলেন তখনই বুঝা গেলো যত আক্রোশ তা স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতার প্রতি।এতদিন মুজিব স্মৃতি বিরোধী তৎপরতা চালিয়ে এখন আবার সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে অন্তত ১৯৭১ সালে আমাদের দেশ স্বাধীন হতো না। তিনি আমাদের স্বাধীনতার স্থপতি’। অথচ স্থপতির সকল স্মৃতি চিহ্ন তারা গুড়িয়ে দিলেন! তাদের সরকারের ছত্রছায়ায় দুই দিন ধরে মব বাহিনী ৩২নং এর বাড়িটি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিলো । তারা চেয়ে চেয়ে দেখলেন। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মব বাহিনীকে পুরাটা সময় নিরাপত্তা দিয়ে রাখলেন। সে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে বলেও মনে হয় না। এখনো যে কেউ ব‍্যক্তিগতভাবেও মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ৩২নং এর ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িটির সামনে গেলে প্রথমে হেনস্থা এবং তারপরে গ্রেপ্তার হচ্ছেন।ইউনূস, মাহফুজ আলম, আসিফ নজরুলরা কি বললেন বা কি করলেন বা বর্তমান সরকারও কি ভূমিকা নিল, তাতে তো বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস নতুন করে রচিত হবে না। ‘ভায়েরা আমার’ বলে সেই যে সম্বোধন; আর সেই ডাক ‘এ বারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এ বারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বাংলাদেশের কেউ কি কোনদিন ভুলতে পারবে? ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, তোমাদের যা কিছু আছে, তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা কিছু আছে আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে।’ এতো সহজ ভাষায় স্বাধীনতার ডাক, সংগ্রামের বার্তা এর আগে বাংলাদেশ কি কখনো শুনেছে ?এই ডাকেই তো বিরাট ওলট পালট। কৃত্রিম এক দেশ ভেঙে বেরিয়ে আসলো নতুন দেশ, নতুন জাতি, নতুন নাম, নতুন নাগরিক। বদলে গেলো এশিয়ার মানচিত্র। তবে তার সমালোচনার জায়গাও ছিল। স্বাধীনতার পর একদলীয় শাসন প্রবর্তন মুজিবের বিরাট ভুল ছিলো। তারই ছায়াসংগী, তার বন্দীদশা অবস্থায় যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামকে অগ্রসর করে নিয়েছিলেন সেই তাজউদ্দিনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে তিনি মারাত্মক ভুল করেছেন। রক্ষী বাহিনীর দৌরাত্ম্য, লাল বাহিনীর স্বেচ্ছাচার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। দলের নেতাদের ‘ফুটানি’ বন্ধ করতে পারেননি। ফুটানি মারতে যেয়ে একদল ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, আরেকদল সেটা না করতে পেরে ‘ক্যাপস্টেনের প্যাকেটেই স্টার সিগারেট ঢুকিয়ে’ জনসমক্ষে ঠিকই ফুটানি মেরেছেন।আর এসবের সুযোগ নিয়ে, নতুন দেশ ও নতুন জাতি গঠনের বিরোধী শক্তি দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ১৫ আগস্টের কালরাতে সংঘটিত করে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাকে স্বপরিবারে হত্যা করে তারা বদলা নিলো। বিদেশে থাকায় বেঁচে গিয়েছিলেন মুজিবের দুই কন্যা, হাসিনা এবং রেহানা। এ হত্যাকাণ্ডের অর্ধ শতাব্দী পরেও তাদের জিঘাংসা মেটেনি। এই তো গত বছর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ বললেন, ‘যিনি খারাপ কাজ করবেন তা ফের তার ওপরই আসবে। শেখ মুজিবুর রহমান এই অবিভক্ত পাকিস্তানকে দুই ভাগ করেছিলেন। যিনি পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি অবশেষে তার করুণ পরিণতি ভোগ করেছেন।’ এমনকি পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম ‘দা ক্যাচ লাইন’ পত্রিকা ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পরে এক নিবন্ধে লিখেছে ‘৫৪ বছর পর হিসাব নিকাশের সময় এসেছে। পূর্ব পাকিস্তানকে ফিরে আসতে হবে’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিরোধী পাকিস্তানের এ সব বক্তব্যের প্রতিবাদ না করে আমরা একতরফা মহব্বতের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি।তবে পাকিস্তানের বা তাদের এদেশীয় দোসরদের এসব উসকানিমূলক বক্তব্য এবং ৩২নং এর ঐতিহাসিক বাড়িটিসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থাপনা ও ভাস্কর্য ভাঙার মানে হচ্ছে, শেখ মুজিব আজও আমাদের সঙ্গে এই বাংলাদেশেই আছেন। বাংলাদেশের মানুষের মাঝে তিনিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কেননা তিনিই আমাদের স্বাধীনতার নেতা। স্বাধীনতা সংগ্রামে আরো অনেকের অবদান আছে। সৈয়দ নজরুল-তাজউদ্দীন, ভাসানী-মোজাফফর, মনি সিংহ-ফরহাদ, ওসমানী-জিয়া-খালেদ মোশারফ এমনি আরো অনেক চরিত্র আছে। আন্তর্জাতিক ভাবেও অনেক চরিত্র আছে। যেমন ইন্দিরা গান্ধী, পোদগর্নি যাদের সহায়তা ছাড়া স্বাধীনতা অর্জন আরো কঠিন হত। কিন্তু এ সবই পার্শ্ব চরিত্র। প্রধান ও কেন্দ্রীয় চরিত্র শেখ মুজিবর রহমান। তাঁর গগনচুম্বি ও সর্বপ্লাবী ভূমিকাই গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল স্বাধীনতার মরনপন লড়াইয়ে। ১৯৭১–এর মুক্তিযুদ্ধ কিংবা বঙ্গবন্ধুকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে চাওয়া যেমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত তেমনি ‘বঙ্গবন্ধু’ বিষয়টি শুধু নির্দিষ্ট একটি দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহার করা, পারিবারিক সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুযোগে গোটা দেশকে মুজিবময় করে তোলার প্রয়াসের মাধ্যমেও মুজিবের বিশালতাকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।শেখ মুজিবর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে কোনো দলের প্রতি আনুগত্য নয় বরং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ। শেষ বিচারে বাংলাদেশের জনগণের লড়াই-ই মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মূল শক্তি। জনগণই ইতিহাসের স্রষ্টা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেই জনগণের মাঝেই চিরঞ্জীব থাকবেন। সেই জনগনকে ‘কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না’! শোকের ১৫ আগস্টে তার স্মৃতির প্রতি রইলো শ্রদ্ধাঞ্জলি।(লেখকের নিজস্ব মত )[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

অভিযাত্রামূলক নির্বান ও প্রত্ন নাটক

‘কাব্যেষু নাটকং রম্যম’সংস্কৃত আলঙ্কারিকগন নাট্য সাহিত্যে কাব্য সাহিত্যের স্থান দিয়েছেন। তাদের মতে নাটক মূলত দু’প্রকার। দৃশ্য কাব্য ও শ্রব্য কাব্য। নাটক মূলত শ্রব্য কাব্য। এটি দৃশ্য ও শ্রব্য কাব্যের সমন্বয়ে রঙমঞ্চে গতিমানব জীবনের প্রতিচ্ছবি আমাদের সম্মুখে মুর্ত্ত করে তোলে। ঔপনিবেশীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিস্তারে বাংলার অধিকাংশ মানুষের মনে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে বাংলা নাটকের জন্ম অষ্টাদশ শতক। কিন্ত খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ খ্রিস্টাব্দে রচিত চর্যাপদের একটি চর্য্যায় বুদ্ধ নাটকের উল্লেখ পাই। ‘নাচন্তি বাজিল গায়ন্তি দেবী/বুদ্ধ নাটক বিসমা হোহৗ’ তাহলে বুদ্ধ নাটক সম্পর্কে আমরা ধারনা পাই বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নির্দশন চ্যারা থেকে। এই পদটি বাংলা নাটকের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার ইতিহাস হাজার বছরের ইতিহাস। পুরনো এই ইতিহাস ও সভ্যতার অনেক কিচু হারিয়ে গেছে কালের প্রবাহে। মাটি চাপা পড়েছে সভ্যতা। এই সভ্যতাই আমাদের শেকড়। এই শেকড় রক্ষাই নতুন ধারায় উপস্থাপন করা শুরু হয়েছে। এই ঐহিত্য সম্পদ রক্ষায় জনসচেতনা সৃষ্টিতে এই প্রথম বাঙ্গালীর সংস্কৃতির পথে বানানো হচ্ছে প্রত্ননাটক। বাংলাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্যের যে প্রাচুর্যময় ভাণ্ডার রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হল আমাদের প্রত্ন প্রত্নতান্ত্রিক নির্দশন। এসব নির্দশন সংরক্ষনের জন্য বিভিন্ন প্রত্ন নাটক রচিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ও উয়ারী বটেশ্বর স্থাপনা নিয়ে দুটি প্রত্ন নাটক রচিত ও প্রদর্শিত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সকল প্রত্ন এলাকার ইতিহাস নিয়ে এমন প্রত্ন নাটক তৈরী হবে। এই নাটকের বৈশিষ্ট্যহল প্রত্ন সম্পদ এলাকার মানুষের অভিনয়েই তা প্রদর্শিত হবে। এ জন্য কোন মঞ্চ নয়, প্রত্ন সাইটই মঞ্চ। এভাবেই দেশের প্রথম প্রত্ন নাটক ‘সোমপুর কথন’ প্রদর্শিত হয় উত্তরাঞ্চলের পাহাড়পুরে। এই নাটকের মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে, বিশ্বের কত বড় সম্পদ ধারণ করে আছে এই মাটি। এই সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব বর্তায় ঐ এলাকার মানুষেরই ওপর। এমনি আরেকটি প্রত্ন নাটক ‘পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়’। এটি মূলত চট্টগ্রামের আনোয়ারাই হতে যাওয়া আর্ন্তজাতিক পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় ও অত্র এলাকার ইতিহাসকে কেন্দ্র করে। উল্লেখ্য যে, বাংলার পাল রাজাদের চারশত বছরের রাজত্বকালে ভারত-বাংলায় জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সাহিত্য-দর্শন ও শিল্প-ভাস্কর্যের অভাবনীয় উন্নতি সাধিত হয়। পাল বংশের স্বর্ণযুগ স্রষ্টা দ্বিতীয় ধর্মপাল (৭৭০-৮১০) খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে তাঁর সমগ্র সাম্রাজ্যে যে ৫০টি সংঘরাম প্রতিষ্ঠা করেন। তন্মধ্যে অন্যতম এই পন্ডিত বিহার। এটা ছিল নালন্দা, সোমপুর, তক্ষশীলা প্রভৃতি মহাবিহার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমপর্যায়ের। তিব্বতের বিশ্ব বিশ্রুত ঐতিহাসিক লামা তারানাথের (১৬০৮ খ্রি.) ‘হিস্ট্রি অব বুড্ডিজম’ গ্রন্থে এই বিহার চট্টগ্রামে অবস্থিত ও সম্রাট ধর্মপালের অন্যতম মহৎর্কীতি বলে উল্লেখ করেন। তিব্বতী সূত্র থেকে জানা যায় প্রাচীনকালে বৌদ্ধ শাস্ত্র অধ্যয়ন, রচনা, অনুবাদ ও চর্চা করা হতো এসব বিহারে। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং সপ্তক শতকে পুন্ড্রবর্ধনে বিশটি বিহার, সমতটে ত্রিশটি, তাম্রলিপিতে দশটি, কজঙ্গলে ছয়-সাতটি এবং কর্ণসুবর্ণে দশটি বিহার দেখতে পান। প্রখ্যাত বৌদ্ধ বিহারের মধ্যে ছিলো মগধ বা দক্ষিণ বিহারস্থিত নালন্দা, বিক্রমশীলা এবং তদন্তপুরা। সেই সময় পূর্ববঙ্গের আরো কয়েকটি বিহার বর্তমান ছিল। তাদের মধ্যে ঢাকার অদূরে বিক্রমপুরী বিহার, কুমিল্লার সন্নিকটে পট্টিকের কনকস্তুপ বিহার ও চট্টগ্রামের পন্ডিত বিহার উল্লেখযোগ্য (কর্ণফুলী বহমান- সম্পাদক, সরোজ রঞ্জন চৌং, কলি- ২০০৪, পৃ-৩১)। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত পাল, চন্দ্র, দেব, আরাকানি প্রভৃতি বৌদ্ধ রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় এই পন্ডিত বিহার সগৌরবে তার অস্তিত বজায় রেখেছিল। বর্তমান পটিয়া থানার অন্তর্গত বড় উঠান ছিল এককালে বৌদ্ধ রাজা কান্তিদেবের রাজধানী। বড় উঠান এলাকায় দেয়াং পাহাড়ের একটি অংশের নাম বিশ্বমুড়া। এখানে আরকান রাজ বিক্রম রাজার বাড়ি ছিল। তার নামানুসারে দেয়াং পাহাড়ের একটি অংশের নামকরণ করা হয় বিশ্বমুড়া। এখানে খনন কাজ করলে এখনো পাকা ইটের দেয়াল ও ছোট আকারের বুদ্ধমূর্তি পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ডিসটিক গেজেটিয়া ১৯৭৫ অনুসারে দেয়াং পাহাড়েই ছিল সেই বিশ্ব বিখ্যাত পন্ডিত বিহার। এই বিহারের প্রথম উপাচার্য ছিলেন চট্টগ্রামের চক্রশালা গ্রামের কৃতি সন্তান মহাপন্ডিত প্রজ্ঞাভদ্র। যার শিষ্য ছিলেন আরেক মহাপন্ডিত অতীশ দীপংকর। যাকে গৌতমবুদ্ধের পর সম্মান করে চীনের মানুষ। দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন জ্ঞানী-গুণি, চুরাশি সিদ্দাচার্যগণ এই বিদ্যাপীঠে বসে চর্যাগীতি বা চর্যাপদ রচান করেন। এ চর্যাপদ বা চর্যাগীতি থেকে পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার গোড়াপত্তন হয়। কাল প্রবাহে হারিয়ে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টি পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারি ভাবে নেয়া এই উদ্যোগটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ার অন্যতম কারণ বরাদ্দকৃত ভূমিতে সরকারের আরেকটি মন্ত্রনালয় কর্তৃক গুচ্ছ গ্রাম প্রতিষ্ঠা এবং সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নদী গর্ভে নির্মিতব্য প্রস্তাবিত টানেল নদীর ঐ পাড়ে বরাদ্দকৃত স্থানে দিয়ে উঠতে পারে বলে শুনা যাচ্ছে। অর্থাৎ সরকারের আন্তঃমন্ত্রনালয় সমূহের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে একটি মহতী কাজটি এখনো ফাইল বন্দী হয়ে আছে।  [লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়]

অর্থনীতির লাশের ওপর রাজনীতির উৎসব

পাশের দেশ শ্রীলঙ্কা ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে যে দেশ সার্বভৌম ঋণ পরিশোধে খেলাপি হয়েছিল, জ্বালানি তেল কেনার টাকা ছিল না, রাতে শহর অন্ধকার হয়ে যেত, সেই শ্রীলঙ্কাকেই ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাংক নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের ভিত্তিতে দেশগুলোকে চার ভাগে ভাগ করে। সেই মানদণ্ডে উত্তরণ শ্রীলঙ্কার জন্য বড় প্রাপ্তি। ২০২৫ সনে শ্রীলঙ্কার জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ শতাংশ। শিল্প খাতের পুনরুদ্ধার, পর্যটন এবং আর্থিক সেবা খাতের সম্প্রসারণই এর মূল চালিকা শক্তি। মাত্র তিন বছরে এমন ঘুরে দাঁড়ানো সত্যিই বিস্ময়কর।শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক অধপতন ছিল অভাবনীয়। ২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল ইস্টার সানডেতে কলম্বোসহ কয়েকটি শহরের তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে বোমা হামলায় ১৮৯ জন নিহত এবং ৪৫৯ জন আহত হয়। এরপরই এলো করোনার আঘাত। পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য সব থমকে যায়। সরকারের অব্যবস্থাপনা যোগ হয়ে ২০২২ সালে দেশটি দেউলিয়া ঘোষণা করে। বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার নেমে আসে মাত্র ১.৯ বিলিয়ন ডলারে। মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশ ছাড়ায়। সেই সময় শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের কাছেও ২০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছিল। কিন্তু আগের ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় বাংলাদেশ সাড়া দেয়নি। পৃথিবীর কেউই তখন পাশে দাঁড়ায়নি। করোনায় পর্যটন আয় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ২০২২ সালে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়।এই গর্ত থেকেই শ্রীলঙ্কা উঠে আসছে। কিন্তু কীভাবে ? রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে পাশে রেখে অর্থনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে। আইএমএফের সঙ্গে ২.৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি, ঋণ পুনর্গঠন, পর্যটনে কর ছাড়, প্রবাসী আয়ে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা। ফলাফল হাতে নাতে। ২০২৩ সালে যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল মাইনাস ২.৩ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা ৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কায় পর্যটক এসেছে ২০ লাখের বেশি। রপ্তানি আয় বেড়েছে, রেমিট্যান্স বেড়েছে। রিজার্ভও ১.৯ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সংকট যত গভীরই হোক, সঠিক নীতি থাকলে ঘুরে দাঁড়ানো যায়, শ্রীলঙ্কা সেটাই দেখিয়েছে।করোনা ও বিশ্বমন্দার মধ্যেও ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭ শতাংশের ঘরে ছিল। করোনার কারণে ২০২২-২৩ অর্থবছরে কিছুটা কমে ৩.৮ শতাংশ হলেও পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো বিপর্যয় ছিল না। জাতিসংঘ তখনই বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের চূড়ান্ত সনদ দেয়। রপ্তানি আয় ৫০ বিলিয়ন ডলার, রিজার্ভ ২১ বিলিয়ন ডলার, রেমিট্যান্স ২৩ বিলিয়ন ডলার। শ্রীলঙ্কাকে ঋণ দেয়ার সক্ষমতাও তখন আমাদের ছিল।কিন্তু এরপরই ছবিটা পাল্টে যায়। মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে অর্থনীতিকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক প্রতিশোধের মঞ্চ বানিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার একপেশে এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেশজুড়ে মব সৃষ্টি, ভাঙচুর আর আইনের শাসনের কবর রচনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রের মেশিনারি ব্যবহার হয়েছে প্রতিপক্ষ দমনে, উৎপাদন বাড়াতে নয়। ফল কী হলো? ১৮ মাসে বেসরকারি বিনিয়োগে ধস, নতুন শিল্পের অনুমোদন প্রায় শূন্য, ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট। রেমিট্যান্স ২০২৫ সালে ২৭ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু সেটা গেছে আমদানি ব্যয়, ঋণের কিস্তি আর জ্বালানি বিল পরিশোধে। তাই রেমিট্যান্স বাড়লেও নিট রিজার্ভে টান পড়েছে। রপ্তানি আয়, এফডিআই, রাজস্ব আদায়, সব সূচকেই নিম্নগতি। রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির আর কোনো খাতেই স্বস্তি নেই।এই ধ্বংসের দায় কেউ নেবে না। অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের রাজত্বে অর্থনীতি একেবারে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা, প্রকল্প ব্যয়ে অনিয়ম, সুশাসনের ঘাটতি, এগুলো অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু এটাও সত্য, আওয়ামী লীগ আমলের মেগা প্রকল্পগুলো আজ দেশের মেরুদণ্ড। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুতের বড় বড় প্রকল্প না হলে ঢাকা যানজটে অচল হয়ে যেত, দেশ অন্ধকারে ডুবে যেত। সমস্যা ছিল বাস্তবায়ন আর ঋণের ব্যবস্থাপনায়, প্রকল্পে নয়। ১৫ বছরের সমস্যা থাকার পরও ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। আসল ধাক্কাটা লেগেছে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে, যখন নীতি-সিদ্ধান্তের অভাবে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে। বিএনপি সরকারও সেই ১৮ মাসের কথা উচ্চারণ করছে না। তারা আরামে সব দায় চাপাচ্ছে ফখরুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের ওপর।আজকের নগ্ন সত্য এটাই। শ্রীলঙ্কা ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে উৎপাদনে ফিরেছে। আর বাংলাদেশ উৎপাদন ফেলে ধ্বংসস্তূপ বানাচ্ছে। একটি দেশ রাজনীতির চেয়ে পেটকে বড় করেছে। আরেকটি দেশ পেটের চেয়ে প্রতিহিংসাকে বড় করেছে। যতদিন রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য মানুষের জীবনমান আর বিনিয়োগের পরিবেশ না হয়ে প্রতিপক্ষ নিধন থাকে, ততদিন এই রক্তক্ষরণ থামবে না। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার আমলের অপরাধ থেকে শিক্ষা না নিলে এবং দায় স্বীকার না করলে এই পতন ঠেকানোর আর কোনো পথ থাকবে না।বিএনপিও ইউনূসের মতো প্রতিহিংসার রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এই প্রশ্রয় অব্যাহত থাকলে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। নতুন বাজেট কার্যকর হলে বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে, আর তাতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবন রক্ষার স্বার্থে বিএনপি সরকারকে ইউনূসের সময়কার নমনীয় নীতি থেকে সরে এসে বাস্তবমুখী ও জনকল্যাণমুখী পথে ফিরতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা: নীরব মহামারি

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা যেন তারুণ্যের প্রাণ কেড়ে নেয়ার এক নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, দেশে গত সাড়ে ছয় বছরে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৪ হাজার ১৪৩ জন। ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এই পরিসংখ্যান শুধু কিছু সংখ্যা নয়; এর পেছনে রয়েছে হাজার হাজার পরিবারের কান্না, স্বপ্নভঙ্গ এবং সারাজীবনের ক্ষত।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়Ñএই নিহত ও আহতদের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণ। অর্থাৎ যে বয়সে একজন মানুষের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, চাকরিতে প্রবেশ করার কথা, পরিবারকে এগিয়ে নেয়ার কথা, উদ্যোক্তা হওয়ার কথা কিংবা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার কথা, সেই বয়সেই অনেকের জীবন থেমে যাচ্ছে সড়কে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি এই মৃত্যগুলোকে কেবল ‘দুর্ঘটনা’ বলে পাশ কাটিয়ে যাব?মোটরসাইকেল তরুণদের কাছে স্বাধীনতা ও দ্রুত চলাচলের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যানজটের শহরে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো, স্বল্প খরচে যাতায়াত এবং সহজলভ্যতার কারণে মোটরসাইকেলের জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ চালনা।রাস্তায় একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়Ñ একদল তরুণ মোটরসাইকেল নিয়ে ছুটছেন অস্বাভাবিক গতিতে। কেউ ওভারটেক করছেন, কেউ দুই গাড়ির মাঝ দিয়ে চলে যাচ্ছেন, কেউ হেলমেট ছাড়া, কেউ আবার হেলমেট ব্যবহার করলেও তা ঠিকমতো বাঁধছেন না। রাতের সড়কে চলছে গতির প্রতিযোগিতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবার কখনো কখনো এই ঝুঁকিপূর্ণ চালনাই ‘স্টাইল’ কিংবা ‘রোমাঞ্চ’ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। সমস্যাটা এখানেই। যে গতি কয়েক সেকেন্ড সময় বাঁচায়, সেই গতিই কখনো কখনো একটি পুরো জীবন কেড়ে নেয়।মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে চালকের চারপাশে কোনো ধাতব সুরক্ষা কাঠামো নেই। ফলে দুর্ঘটনার সময় শরীর সরাসরি আঘাতের মুখে পড়ে। গতি যত বেশি হয়, দুর্ঘটনার পরিণতিও তত ভয়াবহ হয়। তাই মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে গতি নিয়ন্ত্রণ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জীবন রক্ষার মৌলিক শর্ত।মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কথা উঠলেই আমরা প্রায়ই চালকের দিকে আঙুল তুলি। ‘বেপরোয়া চালায়’, ‘আইন মানে না’, ‘হেলমেট পরে না’Ñএসব অভিযোগের অনেকটাই সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু চালককে দায়ী করেই কি সমস্যার সমাধান সম্ভব?একজন তরুণ যদি আইন ভাঙে, তাকে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন করতে হবেÑআইন প্রয়োগ কতটা কার্যকর? সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী? ঝুঁকিপূর্ণ মোড়, মহাসড়ক কিংবা শহরের ব্যস্ত সড়কে নজরদারি কতটা কার্যকর? মানসম্পন্ন হেলমেট নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কী? মোটরসাইকেল বিক্রির আগে নিরাপত্তা সম্পর্কে ক্রেতাকে কতটা সচেতন করা হচ্ছে?অর্থাৎ সড়ক নিরাপত্তার দায় শুধু চালকের নয়; সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারক ও আমদানিকারক, পরিবার এবং সমাজÑসবার।মোটরসাইকেলের গতি নিয়ন্ত্রণে এখন আর শুধু পুলিশের বাঁশি কিংবা মামলা নির্ভর করে থাকার সুযোগ নেই। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার, স্পিড গভর্নর বা অন্য কার্যকর প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রয়োগ, ডিজিটাল ট্রাফিক ইনফোর্সমেন্ট এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্বয়ংক্রিয় গতি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। একজন চালক ইচ্ছা করলেই যেন তার মোটরসাইকেলকে বিপজ্জনক গতিতে নিয়ে যেতে না পারেনÑএমন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মানুষের ভুলকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে একটি ভুলের পরিণতি মৃত্যু না হয়। বাংলাদেশকেও সেই সেইফ সিস্টেম এপ্রোচ-এর দিকে যেতে হবে।হেলমেট ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনও অনেক চালক ও আরোহী মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার করেন না। অনেকে শুধু পুলিশের চোখ এড়াতে নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহার করেন। কেউ আবার হেলমেট মাথায় রাখলেও স্ট্র্যাপ বাঁধেন না। ফলে ‘হেলমেট পরা’ এবং ‘নিরাপদ হেলমেট ব্যবহার’Ñদুটিকে এক করে দেখা যাবে না।মানসম্পন্ন হেলমেটের মান নির্ধারণ, বাজারে নিম্নমানের হেলমেট নিয়ন্ত্রণ এবং আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চালক ও আরোহীÑউভয়ের জন্য হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি নিয়মিত এনফোর্সমেন্ট নিশ্চিত করতে হবে।শুধু ‘সাবধানে গাড়ি চালান’ কিংবা ‘দ্রুত গাড়ি চালাবেন না’Ñএই ধরনের প্রচলিত বার্তা দিয়ে তরুণদের আচরণ পরিবর্তন করা কঠিন। তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে তাদের ভাষায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, যুব সংগঠন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তার নতুন ধরনের প্রচার চালাতে হবে। বাস্তব দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মানুষের গল্প, দুর্ঘটনায় আহত পরিবারের সংগ্রাম এবং একটি ভুলের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি তরুণদের সামনে তুলে ধরতে হবে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপত্তামূলক প্রচারণার ক্ষেত্রেও আরও সৃজনশীল হতে হবে। তরুণদের জন্য তরুণদের দিয়েই কনটেন্ট তৈরি করা যেতে পারে। কারণ যে বার্তা একজন তরুণ নিজের বয়সী আরেকজন তরুণের কাছ থেকে শুনবে, সেটি হয়তো সরকারি বিজ্ঞপ্তির চেয়ে বেশি কার্যকর হবে। মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বিজ্ঞাপনে গতি, রোমাঞ্চ, ঝুঁকি ও প্রতিযোগিতাকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা হলে তা তরুণদের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। মোটরসাইকেলকে ‘আরও দ্রুত’, ‘আরও শক্তিশালী’ বা ‘চ্যালেঞ্জ নেয়ার বাহন’ হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি নিরাপদ চালনা, দায়িত্বশীলতা ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বিজ্ঞাপন শুধু পণ্য বিক্রি করে না; এটি আচরণও তৈরি করে।মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ হলো নিরাপদ, সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের ঘাটতি। একজন তরুণ যদি সময়মতো, নিরাপদে ও যুক্তিসংগত ভাড়ায় গণপরিবহনে যাতায়াত করতে পারেন, তাহলে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলের ওপর তার নির্ভরতা কমতে পারে। তাই মোটরসাইকেলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সহজ, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মোটরসাইকেল কমানোর কথা বললে হবে না; মানুষকে নিরাপদ বিকল্পও দিতে হবে।১৫ হাজার মৃত্যু কি আমাদের জন্য যথেষ্ট সতর্কবার্তা নয়? গত সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা একটি দেশের জন্য ভয়াবহ সতর্কবার্তা। আরও ভয়াবহ হলো, এই মৃত্যুর বড় অংশ তরুণদের। একজন তরুণের মৃত্যু মানে শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়। তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি পরিবারের আয়, বাবা-মায়ের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং দেশের সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু, কিশোর ও তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। তাহলে আন্তর্জাতিক যুব দিবসে আমরা যদি তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলি, সড়কে তাদের নিরাপত্তার কথা না বললে সেই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মানসম্পন্ন হেলমেট নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যকর প্রচারণা চালাতে হবে। মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা পরিবর্তন করতে হবে। নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে উন্নত করতে হবে গণপরিবহন।আমাদের অঙ্গীকার হোকÑতরুণদের গতি থামানো নয়, তাদের গতি নিরাপদ করা।যে তরুণ আজ মোটরসাইকেলে ছুটছে, সে-ই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, কৃষিবিদ কিংবা রাষ্ট্রনায়ক। তার জীবন কোনোভাবেই কয়েক মিনিটের গতি, সামান্য অসচেতনতা কিংবা একটি ভুল সিদ্ধান্তের কাছে হার মানতে পারে না। তারুণ্যের হাতে গতি থাকুক, কিন্তু সেই গতি যেন মৃত্যুর দিকে না যায়।আজ যদি আমরা ব্যবস্থা না নিই, আগামী দিনে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান আরও বড় হবে। আর তখন হয়তো আমরা আবারও সংখ্যা গুনবÑকতজন মারা গেল, কতজন আহত হলো।কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর তখনও পাওয়া যাবে না। আর কত তরুণ প্রাণ হারালে আমরা সত্যিই বুঝব যে, এটি আর নিছক দুর্ঘটনা নয়Ñএটি প্রতিরোধযোগ্য একটি জাতীয় সংকট?[লেখক: অ্যাডভোকেসি অফিসার (কমিউনিকেশন), স্বাস্থ্য সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন]

থিয়েটার চর্চায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন পিছিয়ে যাচ্ছে?

অভিনয়ের অভিনয় করে অভিনয় করা যায় না, অভিনয় তারাই করতে পারে যারা অভিনয়কে ধারন করে। থিয়েটারে পড়াশোনা করেই অভিনয় শেখা যায় না বরং অভিনেতারা থিয়েটারে পড়ে অভিনয় কে জীবিত রাখে। থিয়েটার বা নাট্যকলা এটি শুধু একটি বিষয় নয় বরং হাজারো শিল্পীর প্রান। সাধারণ মানুষের কাছে যেখানে থিয়েটারের কোনো মূল্য নেই বা তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গন্য করা হয় না, তারই উল্টোদিকে শিপ্লীদের কাছে থিয়েটার একটি উচ্ছ্বাসের নাম। কারন শিপ্লীরা থিয়েটার ধারন করে, তারপর অভিনয় করে। তারা ভালোবেসে অভিনয় করে, বর্তমান সিনেমার ফ্রেমের জন্য নয় বরং তারা থিয়েটার কে নিজের সন্তানের মতো ধারন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য সব বিষয়ে সবাই ইঁদুর দৌড় প্রতিযোগিতার মতো মুখস্থ করতে পারলেও, থিয়েটার এসবের ব্যতিক্রম। কারনে থিয়েটারে অভিনয় করতে হয় মন থেকে। থিয়েটার চর্চা করতে হয়।আমাদের দেশে প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটার বিভাগ রয়েছে। এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা, অন্য সব বিভাগ থেকে কম হলেও, এর গুরুত্ব কমে যায় না। যেকোনো জাতীয় দিবস বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক আয়োজনের বেশিরভাগ দায়িত্ব এই বিভাগের উপরই বর্তায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটাই সত্য যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে অবহেলিত বিভাগ হলো থিয়েটার। আমাদের দেশে থিয়েটার অবস্থা শুধু খারাপ নয় বরং খুবই খারাপ ও শোচনীয়।বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটার বিষয়টাকে শুধুমাত্র নামের জন্যই রেখেছে। নয়তো এই বিষয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের কোনো সুযোগ-সুবিধা তারা দিতে পরছে না।দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটারের সমস্যা সমূহ:শিল্প হিসেবে অবমূল্যায়ন: বাংলাদেশের মতো একটি স্বপ্ল আয়ের দেশে যেখানে উচ্চশিক্ষিত এর হার খুবই কম। সেই দেশে থিয়েটারের মতো বিষয়কে অবহেলার চোখেই দেখা হয়। থিয়েটার যে চর্চা বা পড়াশোনা করার একটি বিষয় হতে পারে একথা কেউ মানতেই চায় না। তারা মনে করে নাটক মানেই অভিনয় আর অভিনয় করতে কোনো কষ্ট আছে নাকি তাই এটা নিয়ে পড়াশোনা করার কোনো দরকার নেই। কিন্তু অভিনয় করতে হলেও যে অনেক কিছু জানতে হয়, ভাব ভঙ্গি মন থেকে আনতে, চর্চা করতে হয়, ইতিহাস জানতে হয়, একথা কেউ মানতেই চায় না ফলে থিয়েটার থেকে যায় পিছনে।পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই: দেশের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই থিয়েটারের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, কখনো পর্যাপ্ত জায়গাও পাওয়া যায় না। থিয়েটার এমন একটি বিষয় যা চর্চা ছাড়া করা অসম্ভব। কিন্তু শিক্ষক, জায়গা ও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারনে চর্চার অভাবে এই ছোট বিষয় ছোট্টই থেকে যায়। শিক্ষার্থীদের বড় কিছু করে দেখানোর সুযোগই দেয়া হয় না। আবার সেশনজট তো রয়েছেই।শিপ্লী ও দর্শক দুজনেই হচ্ছে থিয়েটার বিমুখ: বর্তমান ডিজিটাল যুগে এসে মানুষ থিয়েটারের বিকল্প হিসেবে ফোনেই বিভিন্ন সিনেমা বা ছবি দেখে ফলে তারা আর থিয়েটারে যায় না। এখন দর্শক যদি থিয়েটারেই না যায় তাহলে শিপ্লীরা অভিনয় দেখাবে কাকে? আপনি মানেন আর নাই মানেন, বাংলাদেশে অন্যান্য বিষয়ে পড়াশোনা করার পাশাপাশি সবাই যেমন কিছু না কিছু কাজ করে আয় করে। থিয়েটার শিক্ষার্থীদেরও এই আয়টা প্রয়োজন। কিন্তু দিনশেষে যখন তারা অনেক কষ্ট করে একটা নাটক প্রস্তুত করে দেখে আসনে দর্শক খুবই কম তখন তাদের মনোবল ভেঙে যায় আর আয় তো হয়ই না। হয়তো তারা থিয়েটার বিষয়টাকে নিজের ভালোবাসার জায়গা থেকে বেঁছে নিয়েছে কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে পেট চলে না, দিনশেষে তাদেরও একটা অল্প অংশ আয় প্রয়োজন কিন্তু ওটা না পেয়ে ধীরে ধীরে তারাও থিয়েটার বিমুখ হয়ে যায়।থিয়েটারের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি: বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ থিয়েটার এবং মিডিয়াকে এক মনে করে। কিন্তু থিয়েটার ও মিডিয়া এক নয়। দুটোকে এক মনে করার কারনে তারা ভাবে মিডিয়ার যেই খারাপ দিকগুলো রয়েছে তা হয়তো থিয়েটারেও রয়েছে ফলে অনেক পরিবার থেকে সন্তানদের থিয়েটার পড়তে দেওয়া হয় না। মানুষ থিয়েটারের নাম শুনলে বাঁকা চোখে দেখে। যা থিয়েটারকে দুর্বল করে দেয়।উপরের এই কারন গুলোর জন্য আমাদের দেশে থিয়েটার পিছয়ে রয়েছে। অথচ বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে খুবই জাঁকজমক ভাবে এখনো থিয়েটার পড়ানো হয়। বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটারের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে থিয়েটার চর্চার সুযোগ, পাশাপাশি বিভিন্ন প্রোডাকশনে কাজ করার সুযোগ ফলে তাদের আমাদের দেশের মতো কোনো সংকটে পড়তে হয় না।থিয়েটার শুধু একটি বিনোদন মাধ্যম নয় বরং এটি গ্রামীন সংস্কৃতি, ভাষা ও ইতিহাসের এক বাহক। থিয়েটার সমাজের বিভিন্ন অসংগতি, বৈষম্য সরাসরি তুলে ধরে। মঞ্চনাটকের মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি, শ্রেণীর মানুষের গল্প উঠে আসে। ফলে দর্শকদের মধ্যে এটি সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বাড়ায়। থিয়েটারের ‘মুখোশ নাটক’, ‘গাননাট্য’, ‘পালাগান’ এর মতো প্রোগ্রাম গুলো আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে ধরে রাখে। আর শিকড় ছাড়া কী কোনো জাতি বাঁচতে পারে? থিয়েটার শুধু শিকড় ধরে রাখে না বরং এটি মানুষ কে চিন্তা করতে শিখায়, প্রশ্ন করতে শিখায়। থিয়েটারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা: কথা বলার প্রকাশভঙ্গি, আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব, দলগত কাজ ও সৃজনশীলতার মতো দক্ষতাগুলো অর্জন করে। যা যেকোনো কাজে লাগে। তাই থিয়েটারকে অবহেলার চোখে না দেখে, বরং সরকার ও আমাদের উচিত কীভাবে আরো উন্নত করা যায় তার দিকে নজর দেওয়া।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

হিজবুল্লাহর পুনরুত্থান: যুদ্ধ, পরাজয় তারপর কী কৌশল

যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তেসাল ২০২৪। সেপ্টেম্বর শেষ হয় হয়। ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধে হিজবুল্লাহর টিকে থাকা দায়। সংগঠনটি এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। ইসরায়েলের ৮০টি বোমা লেবাননের এই সংগঠনের সদর দপ্তর ধ্বংস করে দিয়েছিল। নিহত হয়েছিলেন সংগঠনটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। তাদের মধ্যে ছিলেন হাসান নাসরাল্লাহও। মনে হচ্ছিল, ইসরায়েলিরা তাকে খুঁজে বের করে ফেলেছিল; এমনকি মাটির ৬০ ফুট নিচেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না।হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের সন্দেহ হচ্ছিল যে, ইসরায়েল তাদের ফোনে আড়ি পেতেছে। এমনকি তারা কী বলছে বা করছে তার সবই জানতে পারছে শত্রুপক্ষ। ইসরায়েল হাজার হাজার পেজার ও ওয়াকিটকিতেও বিস্ফোরক বসিয়ে দিয়েছিল, যার ফল হয়েছিল ভয়াবহ। তাই বেঁচে থাকা কমান্ডাররা ফোন ফেলে মোটরসাইকেল ও স্কুটারে চড়ে হারেত হরেইক, চিয়াহ এবং বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের অন্য এলাকায় ছুটতে শুরু করেন। এসব এলাকা স্থানীয়ভাবে দাহিয়েহ নামে পরিচিত। সবকিছুই যেন হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। নাসরাল্লাহ যেখানে নিরাপদ ছিলেন না, সেখানে আর কারও নিরাপদ থাকবার কথা নয়। এবার হিজবুল্লাহকে শেষ ভরসার পরিকল্পনায় যেতে হলো যে পরিকল্পনা কখনো বাস্তবায়ন করতে হবে বলে কমান্ডাররা ভাবেননি। দাহিয়েহর বিভিন্ন জায়গায়, যেমন বেকারি, ব্যাংকের শাখা কিংবা ফোনের দোকানের মতো পরিচিত স্থানে একে অন্যের সঙ্গে দেখা করতে হবে।যোগাযোগ করতে হবে চোখে চোখ রেখে। শুধু সামনাসামনি।একত্র হওয়ার পর তারা সংগঠনকে আবার সংগঠিত করা এবং দক্ষিণ লেবাননে আসন্ন ইসরায়েলি স্থল অভিযানের মুখোমুখি হওয়ার পরিকল্পনা করেন। সেখান থেকেই হিজবুল্লাহর ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু যে ঘুরে দাঁড়ানো একসময় সংগঠনটিকে পতনের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনে এবং এর সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।মিডল ইস্ট আই হিজবুল্লাহ সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ জ্ঞান থাকা সাতজন ব্যক্তি, সংগঠনটির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি, লেবাননের রাজনীতিক ও কর্মকর্তা এবং কয়েকজন আরব কূটনীতিকের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের প্রায় সবাই পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।তারা জানিয়েছেন, তীব্র আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে হিজবুল্লাহ একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল এবং পরাজয়ের পর কীভাবে সংগঠনটি তার সামরিক শাখাকে আবার দাঁড় করাতে সক্ষম হয়।সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনায় কী উঠে এসেছে, ২০২৩ সালের পর লেবাননে ইসরায়েলের দুটি যুদ্ধে ইরানের ভূমিকা কী ছিল, হিজবুল্লাহর অর্থনৈতিক সংকট কতটা গভীর এবং সংগঠনটি যে শিয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ও সুরক্ষার দাবি করে, সেই জনগোষ্ঠীর মধ্যে কতটা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে ওয়াকিটকি বিস্ফোরণের ঘটনা কীভাবে প্রায় গণহত্যায় রূপ নিতে পারত হিজবুল্লাহ কীভাবে পুরনো রকেট প্রযুক্তিকে নতুন কাজে ব্যবহার করেছে কীভাবে ভিডিও গেমে অভ্যস্ত তরুণেরা যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিয়েছে হতাশ ডনাল্ড ট্রাম্প কেন হিজবুল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার দাবি করেছিলেন এটি ২০২৪ সালে ইসরায়েলের কাছে হিজবুল্লাহর পরাজয়, ১৫ মাস পর নতুন এক যুদ্ধে সংগঠনটির বিস্ময়কর পুনরুত্থান এবং বর্তমানে হিজবুল্লাহর অবস্থার গল্প যখন দেশের ভেতরে ও বাইরে তার শত্রুরা সংগঠনটির সামরিক শক্তি চিরতরে ভোঁতা করে দিতে চাইছে।যুদ্ধের আগে বন্ধ দরজার ভেতরে হিজবুল্লাহর সদস্যদের মধ্যে মোটামুটি একটি বিষয়ে ঐকমত্য আছে—২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামলা চালানো ছিল গভীর ও ঐতিহাসিক ভুল। অন্তত যেভাবে হামলাটি করা হয়েছিল, তা ভুল ছিল।তিনটি সূত্র বলছে, সিদ্ধান্তটি একান্তই নাসরাল্লাহর ছিল এবং হিজবুল্লাহর নির্বাহী সংস্থা শুরা কাউন্সিলের ভেতরে এর বিরোধিতা করেছিলেন কেউ কেউ।চলতি মাসের শুরুতে ইসরায়েলের আর্মি রেডিও প্যালেস্টাইনি সংগঠন হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার আগের কয়েক মাস ও বছরজুড়ে হামাস ও হিজবুল্লাহর মধ্যে আলোচনার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী উদ্ধার করেছে বলে দাবি করা অভ্যন্তরীণ নথির বরাত দিয়ে আর্মি রেডিও জানায়, গাজায় হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার নাসরাল্লাহকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমন্বিত আকস্মিক হামলায় যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, সাবেক সংসদ সদস্য এবং সীমান্ত ও সম্পদ বিভাগের প্রধান নাওয়াফ মুসাভি এসব প্রতিবেদনকে ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ বলে উড়িয়ে দেন।তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘এটা নিছক প্রচারণা, মাটির বাস্তবতা নয়।’তবে হিজবুল্লাহর অন্য কয়েকজন সদস্য পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ইসরায়েলি প্রতিবেদনে কিছুটা সত্যতা থাকতে পারে।বছরের পর বছর ধরে ইরান এবং তার মিত্র রাষ্ট্র ও সশস্ত্র সংগঠনগুলোর জোট ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধের অক্ষ একটি কৌশল গড়ে তুলেছে ‘ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট’। এর লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলকে চারদিক থেকে শত্রু দিয়ে ঘিরে রাখা, যাতে সব দিক থেকেই হামলার আশঙ্কা থাকে।এই কৌশলের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন প্রয়াত ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানি এবং নাসরাল্লাহ। তার ক্যারিশমা, সামরিক সাফল্য ও রাজনৈতিক দক্ষতা তাকে আঞ্চলিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী করে তুলেছিল।আরবি ভাষায় দক্ষ এবং অসংখ্য যুদ্ধে অভিজ্ঞ সোলেইমানি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিদেশে পরিচালিত এলিট ইউনিট কুদস ফোর্সের প্রধান হিসেবে ইরানের মিত্রদের তদারক ও কখনো কখনো নির্দেশ দিতেন। এসব মিত্রের মধ্যে ছিল ইরাকের আধাসামরিক বাহিনী এবং ইয়েমেনের আনসার আল্লাহ যা হুতিদের নামে বেশি পরিচিত।ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যেও তার ছিল গভীর প্রভাব। তার ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা তেহরানকে এমন সক্রিয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে প্রভাবিত করতে পারত, যেসব ক্ষেত্রে ইরান সাধারণত ‘কৌশলগত ধৈর্য’ অবলম্বন করে অপেক্ষাকৃত সতর্ক নীতি অনুসরণ করতে আগ্রহী ছিল।দু’জনের এই একই ধরনের গতিশীলতার উদাহরণ হিসেবে একটি সূত্র ২০১২ সালের একটি কথোপকথনের কথা বলেন। সে সময় সোলেইমানি নাসরাল্লাহকে বাশার আল-আসাদের সমর্থনে সিরিয়ার যুদ্ধে হিজবুল্লাহর হস্তক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছিলেন।সূত্রটি বলেন, ‘নাসরাল্লাহ বলেছিলেন, ‘আপনি ঠিক বলেছেন, আমাদের যেতে হবে। তবে আমাদের তো গতকালই সিরিয়ায় থাকা উচিত ছিল।’২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় সোলেইমানির হত্যাকাণ্ড ছিল একটি বড় মোড়। প্রতিরোধের ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট কৌশলের প্রধান চালিকাশক্তিকে হারায় জোটটি। কৌশলটি ধীরে ধীরে গতি হারাতে থাকে। হিজবুল্লাহর তিনটি সূত্রের মতে, শেষ পর্যন্ত এ কারণেই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়ার পথে যায়।দুটি সূত্র জানায়, হামলার পর তৎকালীন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আবদুল্লাহিয়ান বৈরুত সফর করে নাসরাল্লাহকে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে তেহরান শুধু নৈতিকভাবে যুদ্ধকে সমর্থন করতে প্রস্তুত।নাসরাল্লাহও ইরানিদের মতোই ভয় পেতেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। তাই তিনি আগেই সীমিতভাবে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ৮ অক্টোবর তিনি ইসরায়েলের দিকে এক দফা রকেট ছোড়ার নির্দেশ দেন। গাজায় যখন বোমা পড়ছিল, তখনই তিনি একটি ‘সমর্থন ফ্রন্ট’ খুলে দেন।তবে তার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা, বিশেষ করে রাদওয়ান ফোর্সের বিশেষ অভিযান ইউনিটের প্রধান ইব্রাহিম আকিল এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের মত ছিল, হিজবুল্লাহকে হয় পুরোপুরি যুদ্ধে যেতে হবে, নয়তো একেবারেই যাওয়া যাবে না।অল্পের জন্য এড়ানো বড় বিপর্যয় এক বছর ধরে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা চলেছে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সংঘাত এড়ানোর যে সীমারেখাটি কার্যত সীমান্ত হিসেবে কাজ করে, সেই ব্লু লাইনের দুই পাশে প্রায় ৭ হাজার রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং বিমান ও কামানের হামলা হয়েছে।লেবাননের ক্ষয়ক্ষতি ইসরায়েলের তুলনায় ছিল বহুগুণ বেশি। সীমান্তের দক্ষিণে ইসরায়েলের ৭০ জনের বিপরীতে লেবাননে নিহত হন প্রায় ২ হাজার মানুষ।তবু হিজবুল্লাহ বিপুলসংখ্যক ইসরায়েলি সেনাকে ব্যস্ত রাখতে পেরেছিল। এর ফলে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ থেকে কিছু সম্পদ ও সেনা অন্যদিকে সরাতে হয়েছে এবং উত্তরাঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার ইসরায়েলিকে সরিয়ে নিতে হয়েছে।দুই পক্ষই কিছু অলিখিত সীমার মধ্যে কাজ করছিল। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো হামলা বা লক্ষ্যবস্তুর জবাবে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানানো হবে এমন একটি বোঝাপড়া ছিল। নাসরাল্লাহ সতর্ক করে দিয়েছিলেন, দাহিয়েহতে হামলা হলে তার জবাব দেয়া হবে তেল আবিবে।কিন্তু ইসরায়েল ধীরে ধীরে সেই সীমা ঠেলে দিতে থাকে এবং হিজবুল্লাহর সংকল্প পরীক্ষা করতে থাকে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দাহিয়েহতে ইসরায়েলি হামলায় হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা সালেহ আল-আরুরি নিহত হন।এর জবাবে হিজবুল্লাহ মেরন পর্বতে ইসরায়েলি একটি সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের রকেট হামলা চালায়। দলটির সূত্রগুলো বলছে, হামলার লক্ষ্য তেল আবিব করা হয়নি, কারণ আরুরি ছিলেন প্যালেস্টাইনি, লেবাননি নন। তাই জবাবের মাত্রাও সে অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছিল।ছয় মাস পর হিজবুল্লাহর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ফুয়াদ শুকর নিহত হলে সংগঠনটি প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলের দিকে এক হাজার রকেট ছোড়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ইসরায়েল আগেই হামলা চালিয়ে অধিকাংশ রকেট উৎক্ষেপণস্থল ধ্বংস করে দেয়।হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র বলছে, ইসরায়েলিরা পুরো সময়ই সংগঠনটির নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়ার পরিকল্পনা শুনছিল।সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এসে হিজবুল্লাহর নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় কতটা বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।২০২৪ সালের ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল হাজার হাজার পেজার এবং শত শত ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত করে। ইসরায়েলের সমর্থকেরা এই অভিযানকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন, যেন কোনো জেমস বন্ডের সিনেমার ঘটনা।ভুয়া কোম্পানি ব্যবহার করে হিজবুল্লাহর সরবরাহব্যবস্থায় ঢুকে মোসাদ যোগাযোগের এসব যন্ত্রে বিস্ফোরক ঢুকিয়ে দেয়। এতে প্রায় ৪০ জন নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন।তৎকালীন মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়া বলেছিলেন, এটি ছিল ‘আমাদের মিশন বাস্তবায়নের স্পষ্ট উদাহরণ’। হামলাটির স্মারক হিসেবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ডনাল্ড ট্রাম্পকে একটি সোনার পেজার উপহারও দিয়েছিলেন।হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো অস্বীকার করে না যে এটি ছিল ভয়াবহ আঘাত। তবে তাদের দাবি, অভিযানটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।১৭ সেপ্টেম্বর বিস্ফোরিত পেজারগুলোই সংবাদ শিরোনাম কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ওয়াকিটকি যেগুলো আকারে বড়, বেশি বিস্ফোরক বহন করত এবং মাঠপর্যায়ের যোদ্ধারা ব্যবহার করতেন।হিজবুল্লাহর পেজারগুলো মূলত লোকজনকে ডাকার কাজে ব্যবহৃত হতো এবং সেগুলোর ব্যবহারকারী ছিলেন বেশির ভাগই বেসামরিক সদস্য। ২০২২ সাল থেকেই ইসরায়েল সংগঠনটিকে এসব নষ্ট করা যন্ত্র সরবরাহ করতে শুরু করেছিল। হামলার সময় প্রায় ২ হাজার ৫০০ পেজার ব্যবহারে ছিল।কিন্তু ওয়াকিটকি অভিযানের প্রস্তুতি নাকি চলছিল এক দশক ধরে। দুটি সূত্রের মতে, ১৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল ওই অভিযান শুরু করার সময় ১৫ হাজার ওয়াকিটকি গুদামে রাখা ছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেগুলো তখন বন্ধ ছিল।এই সংখ্যা আগে মোসাদের এক এজেন্টের দেয়া তথ্যের সঙ্গেও মেলে। ওই এজেন্ট দাবি করেছিলেন, একটি গোপন ইসরায়েলি ভুয়া কোম্পানি হিজবুল্লাহকে ১৬ হাজার ওয়াকিটকি সরবরাহ করেছিল।পেজার হামলার পরদিন মাত্র কয়েকশ’ ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত হয়, যেখানে হাজার হাজার পেজার বিস্ফোরিত হয়েছিল। কিন্তু ওয়াকিটকির হামলার ভয়াবহতা ছিল বেশি। দ্বিতীয় হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হন, আগের দিন নিহত হয়েছিলেন ১২ জন।হিজবুল্লাহর দুটি সূত্রের মতে, ইসরায়েল কেন আগেভাগে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার কারণ হলো মোসাদ হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ আলোচনা শুনছিল এবং তারা জানত, হাতে আর সময় নেই।সেপ্টেম্বরের শুরুতেই হিজবুল্লাহ ও ইরান বুঝতে পারে, যুদ্ধ আর সীমিত রাখা সম্ভব নয়। লেবাননের সংগঠনটি তখন সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।১৯ সেপ্টেম্বর একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেখানে হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিকল্পনায় আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেবে। ওই পরিকল্পনায় স্থল অভিযানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।কিন্তু হিজবুল্লাহর একটি পরিদর্শক দল সংগঠনটিকে সরবরাহ করা পেজারগুলো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকে।যন্ত্রগুলো এরই মধ্যে দুবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তারপরও সন্দেহ কাটেনি। তাই কয়েকটি নমুনা আরও পরীক্ষা করার জন্য ইরানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।সূত্রগুলোর মতে, এই সিদ্ধান্তই ইসরায়েলকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।একটি সূত্র বলেন, ‘পেজারগুলো যদি বিস্ফোরিত না হতো, তাহলে ওয়াকিটকিগুলো চালু করে হাজার হাজার যোদ্ধার মধ্যে বিতরণ করা হতো। এরপর সেগুলো বিস্ফোরিত করা হতো।’হিজবুল্লাহর পরাজয় ৬৬ দিন ধরে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ভয়াবহ বিমান ও স্থল অভিযান চালায়। একের পর এক আঘাতে সংগঠনটিকে বিপর্যস্ত করে ফেলে তারা।ইসরায়েল শুধু নাসরাল্লাহকেই হত্যা করেনি; তার চাচাতো ভাই ও উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হাশেম সাফিয়েদ্দিনকেও হত্যা করে।হিজবুল্লাহর সামরিক নেতৃত্বের অধিকাংশই নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন আকিল এবং তার রাদওয়ান ফোর্সের কমান্ডাররা। তাঁরা এমন একটি কমান্ড সেন্টারে বৈঠক করছিলেন, যেটি ২০০৬ সালের ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের সময় নাসরাল্লাহ ব্যবহার করেছিলেন।হিজবুল্লাহর পুরো ইউনিট, গোলাবারুদের গুদাম এবং সংগঠনটির সম্ভাব্য হামলায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখা অন্য লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়।এর আগে মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যে কমান্ডাররা এই হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের বেশির ভাগই বেঁচে যান কারণ তারা ফোন ধরেননি।দক্ষিণে হিজবুল্লাহর ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ইউনিট সংগঠনটিকে সময় কিনে দেয়। উত্তরে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের ওপর যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা ছাড়াই তারা আক্রমণকারী ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে লড়াই করতে থাকে। দক্ষিণে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা ইসরায়েলি সেনাদের আটকে রাখার সময় ইরান তার মিত্রকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে।দুটি সূত্রের মতে, হিজবুল্লাহর সামরিক কাঠামো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের মতো। প্রতিটি কমান্ডারের একজন করে ইরানি পড়ঁহঃবৎঢ়ধৎঃ বা সমপর্যায়ের প্রতিনিধি থাকে।হিজবুল্লাহর বিভিন্ন ইউনিট ও বিভাগের প্রধান এবং তাদের ডেপুটিদের হত্যা করা হলে সেই শূন্যতা পূরণে ইরানি প্রতিনিধিরা লেবাননে আসেন। একটি সূত্র জানায়, তাদের মধ্যে ছিলেন সোলেইমানির উত্তরসূরি এবং কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কায়ানি। কুদস ফোর্সের লেবানন শাখার প্রধান আব্বাস নিলফোরুশান নাসরাল্লাহর সঙ্গে হিজবুল্লাহর সদর দপ্তরে হামলায় নিহত হন।হিজবুল্লাহ মনে করে, তাদের প্রতিরোধক্ষমতা ইসরায়েলকে বিস্মিত করেছিল। শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।সংগঠনটির সূত্রগুলো বলছে, নেতানিয়াহু মনে করেছিলেন, আর কোনো ইসরায়েলি সেনার জীবন ঝুঁকিতে না ফেলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে হিজবুল্লাহকে শেষ করে দেয়া সম্ভব।লেবানন ও আন্তর্জাতিক মহলে তখন প্রায় বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয় যে হিজবুল্লাহ ‘ছিন্নভিন্ন’ হয়ে গেছে এবং তার সামরিক শক্তি আগের মাত্রার ২০ শতাংশে নেমে এসেছে যদি আদৌ এতটা থেকেও থাকে।হিজবুল্লাহকে শেষ করা না গেলে লেবাননকে পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো যাবে না এমন ধারণার পক্ষে জনমত তৈরি হতে থাকে।একজন আরব কূটনীতিকের মতে, হিজবুল্লাহ এতটা দুর্বল হয়ে পড়ায় সৌদিরা উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। ওই কূটনীতিক বলেন, মিসরীয়রা ফরাসিদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে হিজবুল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র অরাষ্ট্রীয় সংগঠন হিসেবে তাদের সময় শেষ। এখন নেতাদের উচিত সম্মানজনকভাবে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া।হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর মতে, সংগঠনটি তখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ছিল এবং বড় ধরনের ছাড় দেয়ার বিষয়েও আগ্রহী ছিল।সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন হিজবুল্লাহর অবস্থানকে আরও দুর্বল করে।এক দশক ধরে ঘৃণিত স্বৈরশাসককে ক্ষমতায় রাখতে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে হিজবুল্লাহ বহু যোদ্ধা, অর্থ এবং আরব জনগণের বড় অংশের সহানুভূতি হারিয়েছিল। লেবাননে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার দিনই যখন সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের আকস্মিক অভিযান শুরু হয়, তখন আবার আসাদকে বাঁচানোর মতো অবস্থায় ছিল না হিজবুল্লাহ।আসাদের পতনে হিজবুল্লাহর শত্রুরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে হিজবুল্লাহকে লিতানি নদীর দক্ষিণ থেকে সব বাহিনী সরিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এরপর বিভিন্ন দেশ ও লেবাননের রাজনৈতিক দলগুলো আরও উত্তর দিকে সরে যাওয়ার দাবি জানাতে শুরু করে।এক আরব কূটনীতিক মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আসাদ পতনের পর বক্তব্যের ধরন বদলে যায়। লিতানি নদীর উত্তরে সরে যাওয়ার দাবিও ওঠে, যদিও আমরা সবাই জানতাম, মূল চুক্তিতে এমন কিছু ছিল না।’হিজবুল্লাহর প্রতি এই সর্বোচ্চ চাপের নীতি সংগঠনটির অবস্থানও আরও কঠোর ও আগ্রাসী করে তোলে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি বারবার লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের প্রায় প্রতিদিনের হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে।হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘লেবানন রাষ্ট্র এবং যুক্তরাষ্ট্র হিজবুল্লাহকে রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে টেনে নেয়ার একটি সুযোগ হারিয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর হিজবুল্লাহ জানিয়েছিল, তারা আলোচনার জন্য উন্মুক্ত। এমনকি ইরানের সঙ্গে জুনের যুদ্ধেও তারা অংশ নেয়নি।’‘কিন্তু ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকা এবং রাষ্ট্রের কোনো বিকল্প পথ দেখাতে অনিচ্ছার কারণে তাদের আর নমনীয় থাকার সুযোগ ছিল না।’প্রতিরক্ষা থেকে আক্রমণে বাইরে থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল, ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতিতে হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা রক্তক্ষরণে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।ইসরায়েলের অবিরাম হামলায় যেন ‘হাজার ক্ষত’ দিয়ে মৃত্যু নয়, বরং ৩ হাজার বিমান, ড্রোন ও কামানের হামলা নেমে এসেছিল।হিজবুল্লাহর অধিকাংশ কমান্ডার এবং তাদের উত্তরসূরিদের হত্যা করার পর এবার তাদের উত্তরসূরিদের উত্তরসূরিদেরও একে একে হত্যা করা হচ্ছিল।এদিকে ইসরায়েলি সেনা ও ঠিকাদারেরা পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করে। সীমান্তের পাশে শিয়া-অধ্যুষিত প্রতিটি শহর ও গ্রাম প্রায় মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়।হিজবুল্লাহর এক সূত্র বলেন, ‘সীমান্ত এলাকা এখন ফুটবল মাঠের মতো পুরোপুরি সমতল। একটি ভবনও দাঁড়িয়ে নেই; নেই বাড়ি, নেই মসজিদ।’সংগঠনটির পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো প্রতিক্রিয়া না আসায় মনে হচ্ছিল, তারা হয় এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে আর দাঁড়াতে পারছে না, অথবা নিজেদের রক্ষার সাহস হারিয়েছে।বাস্তবে হিজবুল্লাহ তখন বড় ধরনের সামরিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। লক্ষ্য ছিল এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যাতে আবারও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিজেদের সামলে লড়াই করা যায়।দুই জ্যেষ্ঠ সূত্র মিডল ইস্ট আইকে বলেন, সামরিক শাখাটি অতিরিক্ত বড় ও জটিল হয়ে উঠেছিল। কার্যকরভাবে কাজ করার জন্য এটি ছিল অতিরিক্ত ভারী ও ধীরগতির। যুদ্ধ সেই কাঠামোকে আরও পঙ্গু করে দিয়েছিল।সমাধান ছিল কাঠামোটিকে একেকটি অংশে ভেঙে ফেলা।সূত্রগুলোর মতে, ইউনিট ও বিভাগগুলোকে একে অন্যের কাছ থেকে পুরোপুরি স্বাধীন করে দেয়া হয়। এর ভিত্তি ছিল প্রয়াত হিজবুল্লাহ কমান্ডার ইমাদ মুগনিয়েহর নেতৃত্বে কার্যকর হওয়া গেরিলা যুদ্ধের মডেল। প্রতিটি ইউনিটকে কিছু নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। এগুলো ছিল আগে থেকেই নির্ধারিত বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য এক ধরনের যুদ্ধ-নির্দেশিকা। ফলে যুদ্ধের উত্তপ্ত সময়ে কেন্দ্রীয় কমান্ডের নির্দেশের অপেক্ষা না করেও ইউনিটগুলো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারতো।নতুন নির্দেশনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যোদ্ধাদের শেষ গুলি পর্যন্ত লড়াই করতেই হবে, এমন নয়। প্রয়োজন হলে কোনো ইউনিটকে এলাকা ছেড়ে দেওয়ার অনুমতিও দেয়া হয়।চলতি বছরের মার্চে এই নতুন কাঠামোর প্রথম বড় পরীক্ষা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে।খামেনি ছিলেন হিজবুল্লাহ এবং বহু শিয়া লেবাননির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা। হিজবুল্লাহ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ‘ভিলায়াত আল-ফকিহ’ মতবাদ অনুসরণ করে। খামেনি হত্যার জবাবে সীমান্তের ওপারে ছয়টি রকেট ছোড়া হয়।তবে হিজবুল্লাহর বর্ণনা অনুযায়ী, সংগঠনটি একই সঙ্গে নিশ্চিত হয়েছিল যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল লেবাননে নতুন হামলা চালাতে যাচ্ছে। তাই তারা আগেভাগেই হামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনেও এই মূল্যায়নের সমর্থন পাওয়া যায়।এক সূত্র বলেন, ‘মার্চে ওই রকেট ছোড়ার সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ নাঈম কাসেমের সিদ্ধান্ত।’ তিনি নাসরাল্লাহর উত্তরসূরি হিসেবে সংগঠনটির মহাসচিব হয়েছেন। ‘তবে ইরানও এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিল।’অন্য এক সূত্র বলেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে খামেনি হত্যার অনেক আগেই হিজবুল্লাহর ইসরায়েলে হামলা করা উচিত ছিল—ইরানের পরামর্শ ছিল এমনই। ‘কিন্তু হিজবুল্লাহ ভিন্ন হিসাব করেছিল।’আকাশ থেকে মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যে এখন গেমিং ক্যাফের অভাব নেই।জেরুজালেম থেকে তেহরান, কায়রো পর্যন্ত ধোঁয়ায় ভারী অন্ধকার ঘরে তরুণদের দেখা যায় পর্দার সামনে বসে ফিফা কিংবা সর্বশেষ ফার্স্ট-পারসন-ভিউ (এফপিভি) শুটিং গেমে একে অপরকে চ্যালেঞ্জ করতে।দাহিয়েহতে হিজবুল্লাহর অভিজ্ঞ সদস্যরা জেন-জি তরুণদের দেখে হতাশ হতেন। আমেরিকান প্রোগ্রামারদের বানানো কাল্পনিক যুদ্ধে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করছে এটাই তাদের চোখে পড়তো। ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা প্রবীণদের মনে হতো, তরুণেরা বুঝি নরম হয়ে যাচ্ছে।তারা জানতেন না, এই তরুণেরাই পরের যুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেবে।২০২৬ সালের মার্চে আবার যুদ্ধ শুরু হলে ইসরায়েলি সেনারা লিতানি নদীর দক্ষিণে এবং তারও বাইরে লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত বাড়ি, পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটি, এমনকি একটি ক্রুসেডার দুর্গেও তারা প্রায় ৩০০টি অবস্থান গড়ে তোলে।আগের যুদ্ধে তীব্র লড়াই হওয়া বিন্ত জবেইলের মতো শহরগুলো হিজবুল্লাহ নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ছেড়ে দেয়। কিন্তু কোথাও ইসরায়েল নিরাপদ ছিল না। ইসরায়েলি সেনাদের সারাক্ষণ বিরক্ত করা, হয়রানি করা এবং লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। ২ মার্চের পর থেকে দক্ষিণ লেবাননে প্রায় ২০ ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে।লক্ষ্য ছিল, ইসরায়েলি সেনারা যাতে কোনো অবস্থানকে স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত করার সুযোগ না পায়। ২০২৪ সালে সীমান্তে পাঁচটি ঘাঁটি তৈরির মতো ঘটনা যেন আর না ঘটে। এ কাজে হিজবুল্লাহ ড্রোন ব্যবহার করছে।ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিটি নতুন দফার লড়াইয়ে নতুন কোনো অস্ত্র হাজির করার প্রবণতা রয়েছে হিজবুল্লাহর। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের সামরিক উদ্ভাবনক্ষমতার জানান দেয়।২০০৬ সালে ছিল করনেট অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র। এটি ইসরায়েলি সাঁজোয়া যান ভেদ করে বড় ধরনের কৌশলগত বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। এবার ব্যবহার করা হচ্ছে এফপিভি ড্রোন। এগুলো ফাইবার-অপটিক কেবলের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় বৈদ্যুতিন বাধা দিয়ে এগুলো ঠেকানো কঠিন।নেতানিয়াহু সস্তা কিন্তু প্রাণঘাতী এই উড়ন্ত যন্ত্রগুলোকে ‘কেন্দ্রীয় হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ড্রোনগুলো শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং পুরো হামলার ভিডিও ধারণ করে।ইউক্রেনের মতোই এসব আক্রমণাত্মক ড্রোন পরিচালনার দক্ষতা এসেছে ভিডিও গেমের সংস্কৃতি থেকে। দুটি সূত্রের মতে, এখন হিজবুল্লাহর ড্রোনচালকদের বড় অংশই লেবাননের গেমার।প্রযুক্তিটি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০২৪ সালের যুদ্ধেও হিজবুল্লাহ ড্রোন ব্যবহার করেছিল। তবে এরপর উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে। ড্রোনগুলোও উন্নত করা হয়েছে। এখন এগুলো বেশি বিস্ফোরক বহন করতে পারে এবং ফলে মারকাভা ট্যাংকের জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।হিজবুল্লাহর জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হলো, ড্রোন তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলোর অনেকটাই তাদের আগে থেকেই ছিল।২০২৪ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ আলমাস-১ নামে উন্নত ফাইবার-অপটিক অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করে। এতে টেলিভিশন ও তাপীয় চিত্রনির্ভর যৌথ নির্দেশনা ব্যবস্থা ছিল। এটি একটি ইসরায়েলি স্পাইক ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা উল্টোভাবে বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছিল, যা আগে হিজবুল্লাহর হাতে এসেছিল।সমস্যা ছিল, ফাইবার-অপটিক কেবলটির দৈর্ঘ্য মাত্র ৮-১০ কিলোমিটার। ফলে সীমান্তপারের সংঘর্ষে ক্ষেপণাস্ত্রটি খুব বেশি কার্যকর ছিল না।২০২৬ সালে সংঘাত যখন মূলত লেবাননের মাটিতে সীমাবদ্ধ, তখন এই সীমা আর সমস্যা ছিল না। আলমাস ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য মজুত করে রাখা বিপুল পরিমাণ কেবল বরং অপেক্ষাকৃত ছোট ও গোপন এফপিভি ড্রোনে ব্যবহারের জন্য কাজে লাগানো হয়।হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গুণগত সুবিধা পাওয়ার জন্য হিজবুল্লাহ তার সামরিক শাখাকে বড় করেছিল। এখন তারা কৌশল বদলেছে এবং প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে। ড্রোন তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ।’প্রযুক্তিগতভাবে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ বর্তমানে যুদ্ধবিরতি পালন করছে। ১৬ এপ্রিল থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর। তবে দুই পক্ষের হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে লেবানন রাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যুদ্ধ থেকে লেবাননকে আলাদা রাখার চেষ্টা করছে।ওয়াশিংটনে আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটি লেবাননে ব্যাপক সমালোচিত। এখন পর্যন্ত এর ফলে ‘পরীক্ষামূলক প্রকল্পের’ আওতায় লেবাননের সেনাবাহিনীকে দক্ষিণের মাত্র একটি শহরে মোতায়েনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে—যদিও ইসরায়েল ওই শহর দখল করেই রাখেনি।এদিকে লেবানন রাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও যুদ্ধবিরতির মূল ভরসা এখনো কার্যত ইরান। ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে।দক্ষিণ লেবাননে শিগগিরই স্বাভাবিক জীবন ফিরবে এমন কোনো লক্ষণ নেই। হিজবুল্লাহর সূত্র ও লেবাননের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি যুদ্ধের বিরতি; যুদ্ধের সমাপ্তি নয়। লেবাননের শিয়াদের মধ্যে প্রশ্ন লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তের ভূখণ্ডের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। লেবাননের দিকে বিস্তৃত সাইট্রাস ও তামাকের খেত, বিদেশে সফল হয়ে ওঠা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে নির্মিত টেরাকোটার ছাদওয়ালা বাড়ি। সরু আঁকাবাঁকা সড়কের দিকে কলাগাছের পাতা এমনভাবে ঝুঁকে আছে, যেন পথ চলতি গাড়িতে ওঠার জন্য হাত তুলেছে।দক্ষিণে ইসরায়েলি বাড়ি ও কৃষিজমি সমুদ্রের পাশে সুশৃঙ্খল সারিতে সাজানো। কিরিয়াত শিমোনার নিচের সমভূমিতে ছড়িয়ে আছে জিগস পাজলের মতো ভূমিরেখা।দুই পাশের উঁচু জায়গাগুলো থেকে বাসিন্দারা কৌতূহল নিয়ে বেড়া ও জাতিসংঘের টহল দেয়া কাঁচা রাস্তার ওপারে তাকিয়ে একে অন্যের জীবন ও পৃথিবী দেখতে পারেন।ভূমিটি যেন অভিন্ন যমজ। কিন্তু নাকবার বিপর্যয়ে তারা আলাদা হয়ে গেছে এবং এখন তাদের চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।এখান থেকেই হিজবুল্লাহর প্রথম সদস্য এবং মূল সমর্থকদের উঠে আসা। ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে ইসরায়েলি আগ্রাসনে বাস্তুচ্যুত শিয়া লেবাননিরা আমাল আন্দোলন থেকে সরে এসে হিজবুল্লাহর দিকে ঝুঁকেছিল। তাদের আকৃষ্ট করেছিল প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাবিরোধী বক্তব্য এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের অঙ্গীকার।আজ এই জনগোষ্ঠীগুলোই হিজবুল্লাহর গত দুই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংগঠনটির সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক চুক্তিও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে।দক্ষিণ লেবাননে প্রায় ৬ লাখ মানুষ এখনও নিজ বাড়ি থেকে বাস্তুচ্যুত। তাদের অনেকের বাড়িঘর আর নেই। গাজায় শহর ও গ্রাম নিশ্চিহ্ন করার যে নীতি ইসরায়েল অনুসরণ করেছে, লেবাননেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘শিয়া সমাজের ভেতরে প্রশ্ন বাড়ছে, এটা নিশ্চিত।’দাহিয়েহতে নিহত যোদ্ধাদের একটি কবরস্থানেও অসন্তোষের চাপা গুঞ্জন শোনা যায়। এখানে নিহত সন্তান, ভাইবোন ও স্বামীদের জন্য নীরবে প্রার্থনা করা হয়। কবরগুলোর মাঝখানে ছোট শিশুরা ছুটে বেড়ায়; কোনো কোনো কবরে একসঙ্গে চারজন যোদ্ধার মরদেহ শায়িত।একজন দর্শনার্থী বলেন, ‘শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে নিহত আমার বন্ধুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। কিন্তু যা কিছু ঘটেছে, তা নিয়ে আমার গুরুতর আপত্তি আছে।’গত দুই যুদ্ধ ছিল ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধের পর শিয়া জনগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত।গাজা যুদ্ধে হিজবুল্লাহর হস্তক্ষেপের বিষয়ে লেবানন ও অঞ্চলের এমনকি ঐতিহ্যগতভাবে হিজবুল্লাহবিরোধী কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সহানুভূতি ছিল। কিন্তু মার্চে ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে আবারও ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া ডেকে আনার সিদ্ধান্ত ক্ষোভ ও বিস্ময় সৃষ্টি করেছে।লেবাননের উপপ্রধানমন্ত্রী তারেক মিত্র যেমন মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, এটি ছিল ‘এমন এক যুদ্ধ, যা লেবানন চায়নি, শুরু করেনি।’তবে জ্যেষ্ঠ হিজবুল্লাহ কর্মকর্তা নাওয়াফ মুসাভির যুক্তি, শুধু আলোচনার মাধ্যমে ইসরায়েল কখনো লেবানন ছাড়বে না। তার মতে, যুদ্ধের জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করা হচ্ছে ‘তথ্যকে উল্টো করে দেখানোর একটি গণমাধ্যম প্রচারণার’ অংশ হিসেবে।তিনি বলেন, ‘দখলদারিত্বকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত না করে এই প্রচারণা প্রতিরোধকেই সমস্যা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।’‘ধরুন, হিজবুল্লাহ নেই। তাহলেও লেবাননের জনগণের ভূমি মুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশকারী একটি সংগঠন থাকত। তখন সেই সংগঠনই সমস্যা হয়ে দাঁড়াত এমনকি তার নাম যদি আমেরিকার ডেমোক্রেটিক পার্টিও হতো।’যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক, প্রায় ৫ লাখ শিয়া মানুষ গৃহহীন। রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা করে কিংবা হিজবুল্লাহ শক্তি প্রয়োগ করে—কেউই তাদের ঘরে ফিরিয়ে নিতে পারেনি।এদিকে হিজবুল্লাহও আগের মতো সামাজিক কল্যাণসেবা দিতে পারছে না। সূত্রগুলোর মতে, এর একটি কারণ ভয়াবহ আর্থিক সংকট। তবে সংগঠনটির হাতে থাকা অর্থের বড় অংশও এখন সামরিক কাজে অগ্রাধিকার পাচ্ছে।এক সূত্র বলেন, ‘আগে সংগঠনটি বাড়িভাড়া, বাড়ি সংস্কার ও কল্যাণসেবার খরচ দিত। এখন তা বন্ধ। কারণ সিরিয়ার মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে স্থলপথ আর খোলা নেই। ইরান ও লেবাননের মধ্যে বিমান চলাচলও সীমিত। কিছুটা হলেও এই শূন্যতা শিয়া সমাজের ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দাতব্য উদ্যোগ পূরণ করছে।’এই অসন্তোষ হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আরও আনুষ্ঠানিক, শক্তিশালী ও সংগঠিত শিয়া বিরোধিতায় রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।ইসরায়েলের প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের নীতি—যেখানে দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের ‘শিয়া শত্রু জনগোষ্ঠী’ বলা হয়েছে—বরং শিয়া সমাজকে হিজবুল্লাহর আরও কাছে ঠেলে দিয়েছে।লেবাননের অন্য ধর্মাবলম্বীদের একটি অংশের বৈরিতাও একই কাজ করেছে। তাদের কেউ কেউ শিয়া স্বদেশবাসীর দুর্দশার প্রতি খুব কম সহানুভূতি দেখিয়েছে; বরং আমাল ও হিজবুল্লাহর উত্থানের আগে ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক থাকা এই সম্প্রদায়ের পতন দেখে যেন আনন্দই পেয়েছে।হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘শিয়াদের মধ্যে অস্তিত্বের ওপর হুমকি তৈরি হয়েছে এমন অনুভূতি রয়েছে।’ চাপের মুখে সম্প্রদায় কীভাবে একত্র হচ্ছে, তার উদাহরণ হিসেবে তিনি আমাল আন্দোলন ও এর নেতা নাবিহ বেরির সাম্প্রতিক ভূমিকার কথা বলেন।‘আমাল আদর্শগতভাবে ইরানের ঘনিষ্ঠ নয়। কিন্তু খামেনির জন্য শোকসভায় বেরি বলেছিলেন, আমালের সঙ্গে ইরানের কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে। এটি নিছক কথার কথা ছিল না।’সূত্রটি আরও বলেন, ‘ব্যক্তিগত আলাপে হতাশা থেকে জন্ম নেয়া অসন্তোষের কথা শোনা যায়। কিন্তু সীমিত বিরোধিতার বেশি কিছু আমরা দেখিনি। নতুন কোনো গতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়ার মতো উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি।’‘আগের সেই হিজবুল্লাহ আর নেই’ ২০২৬ সালের আগস্টে এসে হিজবুল্লাহর অবস্থান কোথায়?সামরিকভাবে সংগঠনটি ভয়াবহভাবে দুর্বল হয়েছে। যদিও দ্রুতগতি ও গেরিলাধাঁচের বাহিনীতে রূপান্তরের নতুন কৌশল কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।গত দুই যুদ্ধে কতজন হিজবুল্লাহ সদস্য নিহত হয়েছেন, তার কোনো সরকারি সংখ্যা নেই। তবে সংগঠনটির সূত্রগুলোর ধারণা, নিহতের সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে হতে পারে। তাদের অধিকাংশই নিহত হয়েছেন ২০২৪ সালে। হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৃত্তের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘২০২৩ সালের হিজবুল্লাহ আর আজকের হিজবুল্লাহ এক নয়।’‘হিজবুল্লাহর বিশাল রকেট শক্তি ছিল, সীমান্তে উপস্থিতি ছিল এবং ইসরায়েলের জন্য বাস্তব ও গুরুতর হুমকি ছিল। তাদের পেছনে সমর্থন ও সরবরাহের যে ব্যবস্থা ছিল, তা গোটা অঞ্চল পেরিয়ে আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।’ হিজবুল্লাহর গ্যালিলি অঞ্চলে হামলার যে কোনো পরিকল্পনা থাকলেও তা এখন বিলীন। সংগঠনটির এক সূত্র বলেন, আজকের স্লোগান জেরুজালেমের বদলে লেবাননকে রক্ষার কথা বলে।তীব্র চাপের মধ্যেও সংগঠনটির নেতৃত্ব টিকে থাকার সক্ষমতা ও কৌশলগত দক্ষতা দেখিয়েছে। নাঈম কাসেম মহাসচিব হওয়ার পর শুরুতে তাকে নিয়ে কিছুটা ঠাট্টা-বিদ্রুপ হয়েছিল।নাসরাল্লাহর মতো তার আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব নেই। সাফিয়েদ্দিনের মতো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বও নেই নাসরাল্লাহর মতো তিনিও ছিলেন সাইয়্যেদ, অর্থাৎ নবীর বংশধর। তবু কাসেম অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে হিজবুল্লাহকে পরিচালনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজেও ইসরায়েলি হত্যাচেষ্টার লক্ষ্য।চলতি বছরের শুরুতে তার বড় একটি পুনর্গঠন ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এর মাধ্যমে তিনি নিজের ভাবনা অনুযায়ী সংগঠনটিকে নতুন করে সাজান এবং প্রভাবশালী কয়েকজন নেতাকে প্রান্তিক করে দেন। কাজটি বড় ধরনের বাধা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে বলে মনে হয়।রাজনৈতিক বৃত্তের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি বলেন, ‘কাসেমের ক্যারিশমা নেই—এমন অনেক কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি এখন একটি রূপান্তরকালীন সময়ে সংগঠনটিকে আবার গড়ে তুলছেন।’‘তিনি প্রমাণ করেছেন যে তিনি সংগঠনটির অবস্থান ধরে রাখতে পারেন, পুরো সংগঠন পুনর্গঠন করতে পারেন এবং এর মধ্যে ঐক্য সুসংহত করতে পারেন।’হিজবুল্লাহর সব জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতা নিহত হলেও প্রতিষ্ঠাতা প্রজন্মের কাসেম ও হিজবুল্লাহর সংসদীয় ব্লকের প্রধান মোহাম্মদ রাদ এখনও নিজ নিজ অবস্থানে আছেন।দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রভাবশালী নেতারাও আছেন। তাদের মধ্যে হাসান ফাদলাল্লাহ সামনে এসেছেন এবং আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। মুসাভি বলেন, ‘আমরা একটি প্রতিরোধ আন্দোলন। আমাদের নেতাদের হত্যার ঝুঁকি আছে। তাই প্রতিটি পদে এমন একজন বিকল্প থাকতে হবে, যিনি কোনো কর্মকর্তা নিহত বা শহীদ হলে তার জায়গা নিতে পারবেন।’তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, বলা যায় প্রথম প্রজন্ম নিহত হয়েছে, দ্বিতীয় প্রজন্মও নিহত হয়েছে এবং তৃতীয় প্রজন্মের অনেকেও নিহত হয়েছেন। তবু প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।’‘ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম সম্পর্কে শক্তিশালী তথ্য ছিল। কিন্তু এখন তারা এমন একটি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে লড়ছে, যাদের তারা চেনে না।’এই দুর্বলতার সময়ে মনে হতে পারে, নাসরাল্লাহর আমলের তুলনায় ইরান এখন হিজবুল্লাহকে আরও বেশি সরাসরি পরিচালনা করছে। কিন্তু সূত্রগুলোর বক্তব্য, বাস্তবে মাটিতে ইরানি উপদেষ্টার সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কম।রাজনৈতিক বৃত্তের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি বলেন, ‘আমার মনে হয়, বর্তমান সময়ে ইরানের উপস্থিতি সবচেয়ে কম। এর কারণ লজিস্টিক সমস্যা। সিরিয়া এখন আর ইরানিদের জন্য আগের মতো উন্মুক্ত নয়। বিমান চলাচলও কঠিন।’‘তবে রাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যায়ে সমন্বয় অবশ্যই আছে। এই সমন্বয় হয়তো এখন সবচেয়ে শক্তিশালী।’তিনি বলেন, অঞ্চলের পাশাপাশি হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার আলোচনা ও সংঘাতের ওপর।ইরানের যুদ্ধ তেহরান ও হিজবুল্লাহর সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করেছে। ইরান এমন কোনো যুদ্ধ-সমাপ্তির আলোচনায় যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যাতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণলেবানন রাষ্ট্রের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সম্পর্ক এখন সবচেয়ে তলানিতে।২ মার্চ ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর হামলা, এরপর প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামের হিজবুল্লাহর সামরিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা এবং প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগ সব মিলিয়ে সংগঠনটি ও রাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছে।সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪ সালের ইসরায়েলি আগ্রাসনের পর হিজবুল্লাহর ভেতরে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর আলোচনা হয়েছিল। সশস্ত্র আন্দোলন থেকে শুধু রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তরিত হওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।হিজবুল্লাহ এখন সংসদের সবচেয়ে বড় দল এবং বহু বছর ধরে লেবানন রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।লেবাননের সাম্প্রদায়িক ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থার মাধ্যমে তৈরি রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া একটি রাষ্ট্রবিরোধী সংগঠন হিসেবে হিজবুল্লাহর জন্ম হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে টিকে থাকা ও শক্তিশালী হওয়ার জন্য সংগঠনটি সেই দল ও ব্যক্তিত্বগুলোরই অনেক বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করেছে, যাদের একসময় তারা ঘৃণা করত।২০১৯ সালের রাষ্ট্রবিরোধী গণবিক্ষোভের সময়ও তারা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষা দিয়েছিল। বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরে সমর্থকদের পাঠিয়ে তারা বিক্ষোভকারীদের শিবির ভেঙে দেয়।রাজনৈতিক বৃত্তের ঘনিষ্ঠ সূত্রটির মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বালু যখন তাদের পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে, তখন হিজবুল্লাহ আবারও নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে। তিনি বলেন, ‘অস্ত্র ত্যাগ এবং সেটি কীভাবে বা কোন রূপে হতে পারে—এসব নিয়ে দলের ভেতরে পেছনে আলোচনা চলছে। কিন্তু যুদ্ধের সময়ে কোনো প্রস্তাব সামনে আনা সম্ভব নয়।’‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাঈম কাসেমের কোনো অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা নেই।’ স্বাভাবিকভাবেই, এমন কিছু নেতা আছেন যারা অস্ত্র ত্যাগ এবং রাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্বের কাছে ছাড় দেয়ার ধারণায় ক্ষুব্ধ।একজন সূত্র বলেন, ‘এটা শুধু আমার ব্যক্তিগত মত, অবশ্যই দলের মত নয়। আমার মনে হয়, হিজবুল্লাহর উচিত বোমা হামলা ও হত্যার মাধ্যমে আবার উন্মত্ত অবস্থায় ফিরে যাওয়া। আশির দশকের হিজবুল্লাহতে ফিরে যাওয়া।’‘কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। আমরা এখন সমাজের গভীরে প্রোথিত।’আরেকটি জটিলতা হলো, ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক মহল ও লেবাননের কিছু পক্ষ লেবাননের সেনাবাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার চাপ দিচ্ছে। দেশটির অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। এমনকি ইকোনমিস্টও লেবাননের সেনাবাহিনীকে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।গত মাসে তারা লিখেছে, ‘ভয় বোঝা যায়, কিন্তু তা নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’মিত্রি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ইসরায়েল হয়তো এমন পরিস্থিতি দেখতে চাইবে। ‘কিন্তু আমার মনে হয়, সেনাবাহিনী কিংবা হিজবুল্লাহ কেউই একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ফাঁদে পা দিতে চায় না।’অন্যদিকে মুসাভি বলেন, ‘লেবাননে এমন কেউ অস্ত্র হাতে প্রতিরোধের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে আমি তা মনে করি না। কারণ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার অর্থ হবে লেবানন ধ্বংস হওয়ার আগেই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনা।’একটার পর একটা ভয়াবহ আঘাত এবং আগাম মৃত্যুঘোষণা সত্ত্বেও হিজবুল্লাহ এবং ইরান নেতৃত্বাধীন প্রতিরোধের অক্ষ এখনও জীবিত। তারা সশস্ত্র, প্রভাবশালী এবং বর্তমানে প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে নতুন করে সক্রিয়। একই সময়ে ইসরায়েলি সেনারা লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকায় অবস্থান করছে।যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটিকে ব্যাপকভাবে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই তা নিয়ে ঠাট্টা করেছেন। কিন্তু এই কাঠামো হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা সময়ও দিয়েছে।এক সূত্র বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে, কারণ সংগঠনটির অনেক শত্রুও ওই কাঠামোর সমালোচনা করেছে।’সূত্রটির মতে, অঞ্চলটির প্রতিটি আলোচনা ও দর-কষাকষির কেন্দ্রে এখনো হিজবুল্লাহ রয়েছে। এমনকি ওভাল অফিসেও।দুটি হিজবুল্লাহ সূত্র এবং একজন লেবাননি কূটনৈতিক সূত্রের মতে, সাম্প্রতিক কয়েকটি যুদ্ধবিরতি আলোচনা নিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্প এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি ওয়াশিংটনে লেবাননের রাষ্ট্রদূতকে ফোন করে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে বলেন।এক সূত্রের ভাষ্য, ‘এরপর কর্মকর্তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং হিজবুল্লাহর যে কারও ফোন নম্বর খুঁজতে শুরু করেন। তারা যেসব শিয়াকে চিনতেন, এমনকি অপরিচিত শায়খদেরও ফোন করছিলেন যাতে কথা বলার জন্য সঠিক ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়।’তিনটি সূত্রই জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।(মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত)

হাওরের বুকে জীবন ও জলকাব্য

হাওরের নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে বিস্তৃত জলধারা, দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে দূর-দূরান্তে পানি আর পানি- যেন সম্পূর্ণ পৃথিবীটাই জলরাশিতে আবৃত। বর্ষার ঝুম বৃষ্টির সময় হাতে ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ফোন স্ক্রল করার সময় হাওরের ছবি বা ভিডিও সামনে আসলেই সেখানে যাওয়ার ইচ্ছে জাগে না—এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর আর কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওরের মনমাতানো দৃশ্যগুলো দেখলেই ভ্রমণপিপাসুদের পক্ষে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।কিন্তু কেমন কাটে হাওড় অঞ্চলে বেড়ে ওঠা মানুষদের দৈনন্দিন জীবন? কীভাবে শুরু হয় তাদের প্রতিদিনের সকাল আর কীভাবে কাটে তাদের সারাটা দিন? বাস্তবে তারাও কি উপভোগ করতে পারে হাওরের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নাকি এই সৌন্দর্যই তাদের জন্য বিষাদের কারণ হয়ে ওঠে?সংস্কৃত শব্দ ‘সাগর’ এর বিকৃত আঞ্চলিক নাম হচ্ছে ‘হাওর’। বর্ষার অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে জমে থাকা দিগন্তজোড়া বিশাল জলরাশিকে দেখতে সাগরের মতো মনে হওয়ায় স্থানীয়রা একে ‘সাগর’ নামে ডাকত, যা কালের পরিক্রমায় ‘হাওর’ নামে পরিচিতি লাভ করে। বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত ও জনপ্রিয় হাওরসমূহের মধ্যে রয়েছে সিলেটের হাকালুকি হাওর, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর ও শনির হাওর, কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম হাওর, মৌলভীবাজারের হাইল হাওর ইত্যাদি। প্রতিবছর বর্ষা এলেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে যায় এই সব হাওরে প্রকৃতির সঙ্গে একটুখানি নিবিড় সময় কাটানোর আশায়।হাওর অঞ্চলের মানুষের বৈচিত্র্যে ভরা বছরের প্রায় অর্ধেক সময় পানিতে আবদ্ধ থাকে, বাকি অর্ধেক সময় থাকে শুকনো। সাধারণত এপ্রিল থেকে নভেম্বর এই ছয় মাস হাওরে পানি থাকে এবং ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই শীতকালীন সময়ে পানি সম্পূর্ণ রূপে শুকিয়ে যায়। এই সময়টা কৃষকদের ধান চাষের উপযুক্ত সময়। উর্বর পলিমাটি সমৃদ্ধ হওয়ায় এখানে কৃষিকাজ তুলনামূলক কম কষ্টসাধ্য। সাধারণত বীজতলা থেকে চারা তুলে নরম কাদামাটিতে রোপণ করেন স্থানীয় কৃষকরা। মে মাসেই শুরু হয় ধান ঘরে তোলার সমারোহ। পাহাড়ি ঢল ও অকাল বন্যার হাত থেকে নিজেদের ফসল বাঁচাতে এই সময়ে হাওরের কৃষকরা তাদের সবচেয়ে ব্যস্ততম সময় কাটান। ধান কাটা, মাড়াই করা, শুকানো, সিদ্ধ করা ও সংরক্ষণ করার কাজে ব্যস্ত থাকেন নারী-পুরুষ উভয়ই। এরপর মে ও জুন মাসের দিকে হাওরে আবার বর্ষার পানি আসতে শুরু করে, যা অক্টোবর বা নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী থাকে।অন্যদিকে, মে মাসের দিকে ধান কাটার ব্যস্ততা ফুরোলে হাওরবাসীর জীবনে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ছোট ছোট নৌকায় ১ থেকে ২ জন মিলে জাল আর বড়শি নিয়ে সকাল সকাল তারা বের হন মাছ ধরার উদ্দেশে। সারাদিন মাছ ধরা শেষে বাড়ি ফিরে শুরু হয় রান্নার প্রস্তুতি। তরতাজা মাছের সঙ্গে গরম ভাত—এটাই হাওরের মানুষের নিত্যদিনের স্বস্তির খাবার। ধান চাষ আর মাছ ধরা ছাড়াও এখানকার মানুষ গরু, ছাগল, মুরগি ও হাঁস পালন করে থাকে। এছাড়া অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে পর্যটন এলাকার হাওরগুলোতে নৌকা ও হাউসবোট চালক, অটোরিকশা ও মোটরবাইক চালক এবং ট্যুর গাইড হিসেবে অনেকে কাজ করছেন। অনেকে ভ্রাম্যমাণ রেস্তোরাঁ বা দোকানপাট পরিচালনা করেও জীবিকা নির্বাহ করছেন।হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখ জুড়ানো হলেও এখানকার মানুষের জীবনসংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। ঋতুভিত্তিক চরম আবহাওয়ার কারণে তাদের প্রতিনিয়ত নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে প্রায় সময় হাওরবাসীর একমাত্র আয়ের উৎস পানিতে তলিয়ে যায়। পানিতে রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ার ফলে নৌকা ছাড়া যাতায়াত অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং বাচ্চাদের স্কুল-কলেজে যাওয়াও বন্ধ থাকে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সঠিক সময়ে হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছানো যায় না, ফলে অনেকে বিনা চিকিৎসায় মারা যান; বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত মারাত্মক। এছাড়া হাওরের বাতাসে সৃষ্ট ঢেউ বা ‘আফালের’ ধাক্কায় ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা মেরামত করতে প্রতিবছর হাওরবাসীকে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়।হাওরের মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা দূর করতে এবং তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য বর্ষার পানিতে না ডোবা উঁচু ‘অল-ওয়েদার’ সড়ক নির্মাণ করতে হবে এবং বর্ষাকালে দ্রুত ও নিরাপদে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত নৌকার ব্যবস্থা রাখতে হবে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকদের বৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড়ি ঢল সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা দিতে হবে। সরকারি পর্যায়ে বন্যাসহনশীল ধানের চারা বিতরণ এবং ‘আফালের’ ক্ষতিকর আঘাত থেকে বাঁচতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি উঁচু স্থানে আশ্রয় প্রকল্প, চিকিৎসা কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকার, এনজিও এবং সাধারণ মানুষের মিলিত প্রচেষ্টাতেই কেবল হাওরের মানুষের জীবনমান স্থায়ীভাবে উন্নত করা সম্ভব।[লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও বাড়ছে খেলাপি ঋণ

বাংলা সাহিত্যের অন্নদামঙ্গল কাব্যের বিখ্যাত একটি লাইন হলো, ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়’ অর্থাৎ, কোনো শহরে বড় বিপদ এলে সেখান থেকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানই ক্ষতির হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না; সবাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তেমনি ১ আগস্ট ২০২৬ তারিখের পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন চোখে পড়লো, যেখানে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে গত এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হাওে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে। সুতরাং ভাববার বিষয় হলোÑ কেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার বিভিন্নভাবে নানা উপায়ে চেষ্টা করছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে কীভাবে সহযোগিতা করে দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো যায়। দেশে কখনো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে খেলাপি ঋণ আতঙ্কজনক পর্যায়ে ছিল না। এই খাতটি বরাবরই ভালো অবস্থানে ছিল, যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণও ছিল কাক্সিক্ষত পর্যায়ে। তাই এই খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত আরও আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে। এর অন্যতম কারণ হতে পারে অর্থনৈতিক মন্দা অথবা ব্যাংকিং খাতে দক্ষ জনবলের অভাব। আবার, ব্যাংকিং খাতে ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ না করার যে অপসংস্কৃতি বিদ্যমান রয়েছে, তারও ধারাবাহিকতায় এমনটি হতে পারে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটি কেন আতঙ্কজনক পর্যায়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত মার্চ শেষে এক কোটি টাকার চেয়ে কম ঋণ রয়েছে এমন খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার। অথচ গত বছরের মার্চে এই সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের মোট ঋণের ৩৪ শতাংশের বেশি এখন খেলাপি ঋণ। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ১৫ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। টাকার অঙ্কে খেলাপির হার কম হলেও, গ্রাহক বিবেচনায় খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ হারে। গত বছরের মার্চে এই শ্রেণীর খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার ৩২৩। গত মার্চ শেষে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮৫। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২৪ লাখ ঋণগ্রহীতা নতুন করে খেলাপি হয়েছে। অর্থাৎ টাকার পরিমাণের চেয়ে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা অনেক বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অনেকটা দেশের অর্থনীতির অবস্থারই প্রতিফলন বলে মনে হয়। দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো থাকলে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা এতটা বাড়ত না। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই উল্লেখ করেছে, ছোট ছোট ঋণের খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া খুচরা পর্যায়ে ঋণের গুণগত মানের ব্যাপক অবনতির ইঙ্গিত বহন করে। এসব ঋণে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবারের ঋণের বোঝা বৃদ্ধি, এসএমই কার্যক্রমের মন্থর গতি এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাওয়া যাকে মূল কারণ মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়াও রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির উচ্চচাপ। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও মনে করে, বড় বড় ঋণ খেলাপি হলে আর্থিক খাতে ক্ষতি বেশি হয়। তবে ছোট ছোট ঋণ হিসাবের খেলাপি দ্রুত বেড়ে যাওয়া সামগ্রিক খাতের জন্য একটি অশনি সংকেত বহন করে। এবার দেখা যাক, এই খাতে কেন বাড়ছে খেলাপি ঋণ। বিষয়টি গত এক বছরে যে পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তার ফলাফল এক বছরের নয়। অর্থাৎ এর যাত্রা শুরু হয়েছিল কোভিড মহামারির সময় থেকে, যার ফলশ্রুতিতে আজকের এই অবস্থা। এর পাশাপাশি রয়েছে বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা এর অন্যতম  কারণ বলে মনে করা হয়। বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাবের বড় একটি উদাহরণ হলো, প্রথম আলোর ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখের এক প্রতিবেদন, যার শিরোনাম ছিল ‘কৃষক থেকে খুচরা বাজারে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ’। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, ‘কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হয়। ওই চাল ব্যাপারী, মিলার, আড়তদার ঘুরে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সায়। তার মানে, কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ হচ্ছে। একইভাবে কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের কাছে আসতে মসুর ডালের দাম বাড়ছে ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, আলুতে ৫০ শতাংশ, কাঁচা মরিচে ১১৬ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ, ডিমে ২৫ শতাংশ, গরুর মাংসে ১৩ শতাংশ, মাছে ১০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগিতে ২২ শতাংশ।’ এ থেকে বোঝা যায়, উৎপাদক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হলেও ভোক্তাকে উচ্চমূল্যই পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই উদাহরণ থেকে একটি বিষয় প্রতীয়মান যে, একজন কৃষক কৃষিঋণ নিয়ে যে ফসল ফলান, তার উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় তিনি কাঙিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন না। ফলে ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণ যথাসময়ে পরিশোধ করতে পারেন না।এ কারণে ঋণটি খেলাপি হয়। আবার উচ্চমূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের আয় কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে। কারণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের ক্রেতা কম থাকলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হয় না। ফলে ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণখেলাপি হয়। আবার একজন চাকরিজীবী বছর শেষে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট পান। অথচ ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতির কারণে তার মোট খরচ ১০ শতাংশই বৃদ্ধি পায়। এর বিপরীতে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট হলে বাকি ৫ শতাংশ ঘাটতি থেকে যায়, যা একসময় ব্যাংকঋণের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বাধাগ্রস্ত হয়। বর্তমান পরিস্থিতিই তার বাস্তব উদাহরণ। আবার অর্থনীতির উপাদানগুলোকে গিটারের তারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। যেখানে গিটারের যেকোনো একটি তার ছিঁড়ে গেলে বা নষ্ট হলে গিটারটি আর বাজে না। অর্থাৎ বাকিগুলোও বিকল হয়ে যায়। অর্থনীতির উপাদানগুলোও ঠিক তেমনই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে দীর্ঘদিন মুদ্রা সংকোচন নীতির মাধ্যমে সুদের হার বৃদ্ধি করা হলো। ফলে দেশে বেকারত্ব বেড়ে গেল, যার প্রভাব পড়লো ব্যাংকিং খাতে। আর ঠিক এ কারণেই দেশে ব্যাংকিং খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেশি। এ থেকে উত্তরণের একটিই উপায়, তা হলো কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। একমাত্র এটিই পারে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটাতে। সেই অপেক্ষায় দেশ ও জাতি।[লেখক: ব্যাংকার]  

প্রান্তিকের স্বপ্ন ভঙ্গের পরের রাজনীতি

বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ। সমতা, সমদৃষ্টির সমাজ। পঞ্চাশ, ষাটের দশকে যাদের জন্ম তাদের স্বপ্নের সমাজে এসব উপাদান টগবগ করতো। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সংবিধানে কী অযাচিত ভাবে মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র এসেছিল। জন আকাক্সক্ষায় কী অন্তর্ভূক্তিমূলক মানবিক সমাজের এজেন্ডা ছিল না। এখন যেমন ধর্ম এসেছে রাজনীতিতে তখন উদ্যাম  আকাক্সক্ষা স্রোতে সমতা, সাম্য, মানবিকতা এসেছিল তরুণদের হৃদয়ে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগ খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। তরুণদের আকাক্সক্ষার মানবিক সমাজ গড়ার জন্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ছাত্ররা আস্থা রেখেছিল সমাজতন্ত্রকে ধারণ করা ছাত্র সংগঠনগুলোতে। সে কারণে ‘ছাত্র ইউনিয়ন’ এর উপর আস্থা ছিল তরুণ শিক্ষার্থীদের। এরপর জাসদ ছাত্রলীগ, সারাদেশে  তারুণদের বুকে ঝড় তোলে। সে ঝড় কতটুকু ছাত্ররাজনীতির ময়দানকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করতে পেরেছিল  সে মূল্যায়ন না হয় ভিন্ন ভাবে করা যেতে পারে। তবে গবেষণা গ্রন্থে প্রবেশ না করেই এটা বলা যায় যে স্বাধীন বাংলাদেশে তরুণ সমাজ সাম্য, মৈত্রী, নায্যতাভিত্তিক  একটি দেশ গড়তে চেয়েছিলো। ইতিহাসের পাতায় নয় পঞ্চাশের শেষ  অথবা ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যাদের জন্ম তাদের জীবন অভিজ্ঞতা পাঠ করলেই সেই সত্য উন্মোচন করা সহজ।চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার আকাক্সক্ষার কথা শুনে পঞ্চাশ ষাটের দশকের অনেকেই অগ্রহ সহকারে আন্দোলনটিকে  অনুসরণ এবং সমর্থন করতে থাকেন। আন্দোলনের শুরুতেই আমরা শুনতে পাই, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাই নাই’, ‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাই নাই’ এসব স্লোগান বদ্ধ সমাজকে অনেকটা চমকে দেয়। নড়ে চড়ে ওঠে সাধারণ মানুষ, শিক্ষত মধ্যবিত্ত স্বাপ্নিক মানুষের দল। এবার কী তাহলে প্রকৃত অর্থে বৈষম্য নিরসন হতে যাচ্ছে। আশায় বুক বাঁধে অনেক আবেগী, সহজ সরল নাগরিক। যৌবনে যারা বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা অনেকেই ভেবেছিলেন সাম্যবাদী নজরুলের স্বপ্নের কাল বোশেখী বোধ হয় এলো।  ‘অনেকেই জয়ধ্বণি’ দেয়া শুরু করলেন। কেউ উচ্চস্বরে কেউ নিম্ন স্বরে। দূর থেকে তারা ‘নৃত্য পাগল’ তরুণদের আকাক্সক্ষা  আন্তরিক কৌতুহলে  পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন রাজপথের দিকে তাকিয়ে। রাজপথেও নজরুলের গান চলছে। ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐনূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ আসল এবার অনাগত প্রলয়-নেশায় নৃত্যুপাগল/সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল?’  আগল তাহলে ভাঙতে যাচ্ছে। সাতচল্লিশ পূর্ব বিপ্লবীদের অনেকেই আগল ভাঙতে চেয়েছিলেন। সত্তর আশির দশকের দ্বিমেরু বিশিষ্ট পৃথিবীতে দেশে দেশে আগল ভাঙার রাজনীতি দেখেছি আমরা। আগল শেষ পর্যন্ত ভাঙেনি। আগল ভাঙার রাজনীতিতে যারা নিবেদিত ছিলেন, তারা অনেকেই হতাশ হয়ে  নিজের আদর্শের বিপরীত পথে হেঁটে হেঁটে হারিয়ে গেছেন আগল ভাঙার রাজনীতির প্রান্তর থেকে।চব্বিশের আন্দোলনের যারা পরিকল্পনা করেছিলেন তারা জানতেন মধ্যবিত্ত বাঙালি পাগল হয় আগল ভাঙার গানে। পরিকল্পনা যে ভাবে করা উচিত ছিল ঠিক সে ভাবেই করা হয়েছিল।  হৃদয় হরণ করা গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল দেয়ালে দেয়ালে।  মনে আছে এখনও, একটি ছোট গাছের ডালে কয়েকটি পাতা।  পাতাগুলোতে লেখা ছিল ‘হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ , খ্রিস্টান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি’। ডালের নিচে লেখা, ‘পাতা ছেড়াঁ নিষেধ’  এই যে মহামিলনের, মহা   সৌহার্দ্যরে বার্তা দেয়ালে দেয়ালে একে দেয়া হয়েছিলো সে বার্তা হৃদয় ছুয়ে গেছে। এই আন্দোলনের গানগুলোর দিকে খেয়াল করুন, মোহিনী চৌধুরীর সেই অমর গান, মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান। গানটি শুনলে হৃদয়ের কোনের নিস্প্রভ আগুন জ্বলে ওঠে। ‘কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা/বন্দীশালার ওই শিকল ভাঙা/তারা কি ফিরিবে আজ সু-প্রভাতে/যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে/যারা স্বর্গগত তারা এখনও জানেন/স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি।’  আহা, স্বর্গের চেয়েও প্রিয় জন্মভূমি। এরকম সঙ্গীতের বাণী যখন দেশ প্রেমিক বাঙালির কর্ণ কূহরে প্রবেশ করে তখন তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে না হয় তারা মিছিলে যায়। আন্দোলনের শুরুতে মধ্যবিত্ত প্রগতিকামী বাঙালি ভেবেছিল, চণ্ডিদাসের সেই অমর বাণী, আব্দুল হাকিমের অকৃত্রিম দেশ প্রেমের ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের  মানব ধর্মের উত্থান হিসেবে হলো বুঝি আবার।  নায্যতা ভিত্তিক, মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় বুকে ধারণ করে ঢাকার দেয়ালে ম্লান  হয়ে গেলেও এখনও গ্রাফিতেতে  লেখা আছে, ‘বিপ্লব শেষে তুমিও যদি স্বৈরাচারী হয়ে যাও, বিপ্লব তোমার পিছু ছাড়বে না।’  কথাটি মিথ্যে মনে হয়নি। তখনো, এখনও এবং ভবিষ্যতেও মনে হবে না।নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে, শুধু সঙ্গে নয় সামনে নিয়ে ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’ কিংবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবোরে’  গান গেয়ে আকাশ বাতাস বিদীর্ন করে দিয়েছিল মিছিলে মিছিলে। এর পর বিস্ময় নিয়ে দেখা গেলো তীরে নৌকা ভেড়ার পর পরই  নারীদেরকে কারা যেনো পেছনে নিয়ে গেলো। ধীরে ধীরে নারী আবার অবরোধ বাসিনী হয়ে গেলো প্রায় এবং তাদের স্বর নিচে নেমে এলো। আর গান! বাউলদের আখড়ায়, বাউল গানের আসরে আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো। ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগরের’ মতো গান আর মিছিলে শুনা গেলোনা। গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য যেদেশে সাতচল্লিশের পর থেকে আনন্দ শুরু হয়েছিল সে দেশে গণতন্ত্রের মুক্তি আন্দোলনের লড়াইকে আইসিইউ তে পাঠিয়ে দেয়া হলো গণমাধ্যমগুলোতে আঘাত করা শুরু করা হলো। প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ যারা ভিন্নমত পরিবেশন করতেন তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো। বাঙালির অহংঙ্কারের প্রতিষ্ঠান ছায়ানট, উদীচিতে আগুন জ্বললো দাউ দাউ করে। বিপ্লবের মূল বার্তার সাথে অরাজনৈতিক , শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত  বাঙালিরা বিপ্লবত্তোর কর্মকান্ডের কোন সাদৃশ্য খুজে  না পেয়ে হতাশ হলেন।আন্দোলনের শুরুতে আমরা কোন ধর্মীয় বার্তা খুজে পাইনি। পাঁচ আগস্টের পর দেখা গেলো একদল লোক ধর্মের নামে কবর থেকে লাশ উঠিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। গাছে ঝুলিয়ে মৃত লাশকে  আগুন দিয়ে পুড়িয়ে উল্লাস করতে দেখা গেলো। প্রান্তিক মানুষেরা সরে গেলো আন্দোলন থেকে। আমরা এক বিস্ময়কর নির্লিপ্ততা, উদাসীনতার শাসন দেখতে পেলাম অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাস। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার অফিসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছুতে, পোঁছুতে সাংবাদিক নূরুল কবির পৌঁছে গেলেন। কতো আর্তি জানালেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমরা দেখতে পেলাম সেই ট্র্যানশলেশনের সে বিখ্যাত বাক্য ব্যবহার করতে। রোগি মারা যাওয়ার অপেক্ষায় ডাক্তার।  ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগি মারা গেলো।’ অর্থাৎ অগ্নি সংযোগ শেষে তার উপস্থিত হলেন।  রোগির মৃত্যুর পর আমরা শুনতে পেলাম, ‘যোগাযোগের অনেক চেষতা করা হয়েছে’। তবে কার্যকর যোগাযোগের চিহ্ন নাগরিক সমাজ খুঁজে পেলোনা।পাঁচ আগস্টের পর আমরা বৈষম্য নিরসনের স্লোগান আর শুনতে পেলাম না। বৈষম্য নিরসনের উপায় নিয়ে কোন সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের আয়োজন দেখতে পেলাম না। পথে প্রান্তরে কোনো মিছিল নেই। অগ্নি ঝরা কোনো বক্তব্যও নেই। বৈষম্য  নিরসন দারিদ্রের মতো যাদু ঘরে চলে গেলো । আমাদের বয়সী মানুষ যারা ষাটের দশকে জন্ম নিয়েছেন তারা জীবন ভর ঠকতে, ঠকতে, অধিক শোকে পাথর হয়ে গেলেন। যারা অষ্টপ্রহর সমতার সমাজের স্বপ্ন দেখে দেখে প্রান্তিকের সাথে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন তার বিস্ময়ে  বিমূঢ় প্রায়।আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি যদিও নেতৃত্ব দানকারীরা  বিস্মৃত হয়েছেন, প্রান্তিক মানুষেরা কিন্তু মোটেই বিস্মৃত হননি। আন্দোলনের মধ্যমনি যারা ছিলেন তাদেরকে ফিরে তাকাতে হবে। জন আকাক্সক্ষাকে মূর্ত করার জন্য তারা কী  প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আর বাস্তবে এখন কী ঘটছে। নিছক সরকার পরিবর্তনের জন্য এ’দেশে অনেক আন্দোলন অভুত্থ্যান হয়েছে। আন্দোলন শেষে প্রতারিত হয়েছে মানুষ। বারবার  প্রত্যাখ্যাত, প্রতারিত হলে আর একটি বিপ্লব অপেক্ষা করে প্রত্যাখাকারীদের  সামনে।হাছন, লালন, রাধারমণ, শাহ করিমের দেশের মানুষ আমরা। বড়ই কোমল আমাদের হৃদয়, যুগপৎ কঠিনও বটে। আমরা আর অস্থিরতা চাইনা। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, শোষণ বঞ্চনাহীন সমাজ আমাদের আকাক্সক্ষা। এই আকাক্সক্ষা প্রত্যাশার কথা  প্রান্তিকেরা দেয়ালে লিখতে পারিনা, তবে মনের গহীনে পুষে রাখে।  এবার উদ্ভট উটের পিঠ থেকে নেমে, সমাজকে, রাষ্ট্রকে বুঝিয়ে দিতে হবে মালিকানা। প্রান্তিকের মালিকানা। শত  শত  বছরের আকাক্সক্ষার শোষন হীন, বৈষম্য মুক্ত রাষ্ট্র গড়ে তুলতে না পারলে সামনে মহা বিপদের সাইরেন শুনা যেতে পারে। আন্দোলনের সময় লেখা সেই গ্রাফিতিরা বাণী, বিপ্লব শেষে তুমি যদি স্বৈরাচার হয়ে যাও বিপ্লপব তোমার পিছু ছাড়বে না। ‘কথাটি মনে রাখার, দায়িত্ব শুধু সরকারের নয় সব নাগরিকের।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

ভিডিও আরও দেখুন

টাইগারদের অসি জয়ে দেশি কোচদের বন্দনা মাশরাফির

ডারউইনে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের নির্বাচক এবং কোচিং প্যানেলকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন সাবেক সফল ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা।জিম্বাবুয়ের মাটিতে হারের ধাক্কা সামলে ক্যাঙ্গারুদের ডেরায় এমন দাপুটে জয়কে অভাবনীয় উল্লেখ করে এই সাফল্যের পেছনে দলের আড়ালে থাকা দেশি মাস্টারমাইন্ডদের অবদানের কথা সামনে এনেছেন তিনি।ক্রিকেট অঙ্গনে যখন জয়ের সব আলো শুধুই ক্রিকেটাররা পান, তখন নেপথ্যের কারিগরদের মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন মাশরাফি।দেশি কোচদের প্রতি বরাবরই আস্থাশীল এই মাশরাফি লিখেছেন, "দল হারলে আমরা খুব সহজেই সিলেক্টর বা কোচিং প্যানেলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেই, কিন্তু দল জিতলে তাদের কৃতিত্বটা আড়ালে পড়ে যায়।"অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এই অবিস্মরণীয় জয়ে বিশেষ করে স্বদেশি কোচিং স্টাফদের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, "অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর কয়েকজনকে ধন্যবাদ না দিলেই নয়, বিশেষ করে আমাদের দেশি কোচ যারা আছেন। ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল, বোলিং কোচ তালহা জুবায়ের, ফিল্ডিং কোচ আশিকুর রহমান এবং কম্পিউটার অ্যানালিস্ট শাওনসহ আরো যারা আছেন দলের সঙ্গে, সবাই এই কৃতিত্বের অংশীদার।"খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই দেশি কোচদের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়া জাতীয় দলের সাবেক এই দলপতি পুনরায় নিজের দৃঢ় বিশ্বাসের কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন, "আমাদের দেশি কোচদের যদি আরো সুযোগ এবং দায়িত্ব দেওয়া হয়, আমি বিশ্বাস করি তারা নিজেদের সামর্থ্য আরও ভালোভাবে প্রমাণ করতে পারবেন এবং দেশের ক্রিকেটকে আরও অনেক কিছু দিতে পারবেন।"ক্রিকেটের প্রতি গভীর আবেগ প্রকাশ করে মাশরাফি লেখেন, "ক্রিকেট তুমি প্রথম স্পর্শ, প্রথম চাওয়া, প্রথম বিরহ, প্রথম পাওয়া, প্রথম কলহ, প্রথম রাত্রী, প্রথম দিন, প্রথম মিলনের অন্তহীন ভালোবাসা, আবার কখনও কখনও চরম যাতনা।" ডারউইনের এই গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য উদ্‌যাপনের পাশাপাশি সামনে থাকা ম্যাকাই টেস্টের জন্যও বাংলাদেশ দলকে শুভকামনা জানিয়েছেন নড়াইল এক্সপ্রেস।

টাইগারদের অসি জয়ে দেশি কোচদের বন্দনা মাশরাফির