সংবাদ
এলপি গ্যাস: ১২ কেজি সিলিন্ডার ‘২০০০ টাকা’ ছাড়িয়েছে

এলপি গ্যাস: ১২ কেজি সিলিন্ডার ‘২০০০ টাকা’ ছাড়িয়েছে

‘সংকট নেই’, দাবি অপারেটরদের‘কৃত্রিম সংকট যেন তৈরী না হয়’, মন্ত্রীর সতর্কতা৯৯ শতাংশের বেশী সরবরাহ করে বেসরকারি খাতসরকারি সরবরাহ ১ শতাংশেরও কমরান্নায় বহুল ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট দেখা দিয়েছে। কয়েকদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন ভোক্তা ও বিক্রেতারা। বিশেষ করে বিক্রেতারা কয়েকটি ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার সরবরাহ না পাওয়ার কথা বলছেন।এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার। বিইআরসি সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছিল১ হাজার ৫৮৫ টাকা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গত দুই দিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোক্তাদের ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায়। এতে বাড়তি খরচের চাপে পড়েছেন তারা।এলপিজির বর্তমান আমদানি, মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি এবং বাজারদর পর্যালোচনার জন্য সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এক সভা আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।বাজারে এলপি গ্যাসের কোনো সংকট নেই বলে সভায় মন্ত্রীকে অবহিত করেন আমদানিকারক ও অপারেটররা। পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও গ্রাহক পর্যায়ে যেন সরবরাহ ঘাটতি না হয় এবং কেউ যেন মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে বলেন মন্ত্রী।মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, অগাস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন।এই তথ্যের ভিত্তিতে দেশের এলপিজির জোগান ও মজুদ পরিস্থিতি ‘ভালো’ বলে সভায় তথ্য দেওয়া হয়। আমদানিকারক ও অপারেটরদের ভাষ্য, বর্তমানে দেশে এলপি গ্যাসের কোনো সংকট নেই। তবে বিজ্ঞপ্তিতে দেশে বর্তমানে মোট কত এলপিজি মজুদ রয়েছে, সেই পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।এক যুগ আগেএক যুগ আগে সরকার পাইপলাইনের গ্যাসের নতুন সংযোগ বন্ধ করে দিলে নতুন বাসাবাড়ির পাশপাশি রেস্তোরাঁগুলোও রান্না করতে এলপি গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহার শুরু করে। দেশে বর্তমানে বছরে এলপি গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৬ থেকে ১৭ লাখ মেট্রিক টন, যা পুরোপুরি আমদানি নির্ভর। এলপিজি সরবরাহের ৯৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে বেসরকারি খাত। সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড সরবরাহ করছে এক শতাংশের মতো।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিইআরসি নির্ধারিত দামে কখনই এলপিজি সিলিন্ডারের গ্যাস কিনতে পাওয়া যায় না। খুচরায় অন্তন দুইশ টাকা বেশি গুনতে হয় ক্রেতাদের।বসুন্ধরা, যমুনা, বেক্সিমকো, ওমেরা, নাভানা, জেএমআই, টোটালগ্যাস, পেট্রোম্যাক্সসহ বড় বড় অনেক প্রতিষ্ঠান বাজারে এলপি গ্যাস সরবরাহ করছে। বিইআরসি বলছে, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স নিয়েছে ৫২টি কোম্পানি। এর মধ্যে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরতে ৩২টি কোম্পানির নিজস্ব প্ল্যান্ট আছে। আমদানি করার সক্ষমতা আছে ২৩টি কোম্পানির।‘নিয়ন্ত্রণহীন’ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেওমুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ভোক্তা পর্যায়ে এলপি গ্যাসের ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজারের কম হওয়া উচিত।তিনি আরও বলেন, দাম কমানোর ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মুনাফা বাড়িয়ে অর্থ পাচারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। অতিরিক্ত দামের জন্য তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পাশপাশি এ খাতের ব্যবসায়ীদেরও দায়ী করেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারও বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।এলপি গ্যাস আমদানি ও ব্যবসা বেসরকারি খাতে তুলে দেওয়ার কারণে সংকট দিন দিন বাড়ছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশ্লেষকরা। একই অভিমত এলপিজি ব্যবহারকারীদেরও।বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বিগত (আওয়ামী লীগ) সরকারের আমলে কৃত্রিমভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট দেখিয়ে রেস্তোঁরা খাতে পাইপলাইন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা হয়। তবে এ খাতে মাত্র ৫ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হতো। সেটা কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও আমলাদের যোগসাজশে আমদানি করা এলপিজি গ্যাসের ব্যবসা বেসরকারি সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে পাইপলাইনের গ্যাস বন্ধ করার মাধ্যমে। যারা বর্তমানে পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে একচেটিয়া ব্যবসা চালাচ্ছে।’নজর রাখার নির্দেশ মন্ত্রীরসোমবারের সভায় জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও গ্রাহক পর্যায়ে যেন সরবরাহের ঘাটতি না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।’এলপিজি অপারেটররা এ বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। অপারেটরদের ব্যবসা পরিচালনায় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথাও সভায় শোনেন মন্ত্রী।এ সব সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে নির্দেশ দেন তিনি।এলপি গ্যাস আমদানিতে বাধা দূর করতে মন্ত্রণালয় সহযোগিতা করবে বলেও আশ্বাস দেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা চান তিনি।
১ ঘন্টা আগে

এলপি গ্যাস: ১২ কেজি সিলিন্ডার ‘২০০০ টাকা’ ছাড়িয়েছে

এলপি গ্যাস: ১২ কেজি সিলিন্ডার ‘২০০০ টাকা’ ছাড়িয়েছে

শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ‘সঠিক তালিকা’ তৈরির সুপারিশ সংসদীয় কমিটির

শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ‘সঠিক তালিকা’ তৈরির সুপারিশ সংসদীয় কমিটির

প্রধানমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন, ভ্যাট আইনে পরিবর্তনের অনুমোদন

প্রধানমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন, ভ্যাট আইনে পরিবর্তনের অনুমোদন

প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিনের অপসারণসহ চার দফা দাবি পার্বত্যবাসীর

প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিনের অপসারণসহ চার দফা দাবি পার্বত্যবাসীর

বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট কাটার সুযোগ দিলো বাংলাদেশ ব্যাংক

বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট কাটার সুযোগ দিলো বাংলাদেশ ব্যাংক

কিশোর গ্যাং নির্মূলে মূলহোতাদের মূলোৎপাটন করা হবে

কিশোর গ্যাং নির্মূলে মূলহোতাদের মূলোৎপাটন করা হবে

বিয়ের ফাঁদে বাংলাদেশি তরুণীদের চীনে পাচার, নতুন রুট নেপাল

বিয়ের ফাঁদে বাংলাদেশি তরুণীদের চীনে পাচার, নতুন রুট নেপাল

চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক মারধর, কনটেইনার ডেলিভারি বন্ধ

চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক মারধর, কনটেইনার ডেলিভারি বন্ধ

কূটনীতির দরজা খোলা রাখলেও মহাপ্রলয়ের যুদ্ধের হুঁশিয়ারি ইরানের

কূটনীতির দরজা খোলা রাখলেও মহাপ্রলয়ের যুদ্ধের হুঁশিয়ারি ইরানের

দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে চাই : পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে চাই : পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

মতামতমতামত

রোহিঙ্গা সংকট: প্রতিশ্রুতির বৃত্তে আটকে আছে প্রত্যাবাসন

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে দাঁড়িয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা শুনতে শুনতে বারবার মনে হচ্ছিল- কতবার একই প্রশ্ন উঠবে, আর কতবার তার উত্তর খুঁজতে হবে? বছরের পর বছর ধরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বনেতারা উদ্বেগ জানাচ্ছেন, মানবিক সহায়তার কথা বলছেন, মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু কক্সবাজারের ক্যাম্পে থাকা মানুষগুলোর জীবনে সেই আলোচনার প্রতিফলন কতটা পড়ছে?জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনেও রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পেয়েছে। এবারও সংকটটিকে গুরুতর মানবিক সংকট হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং এর স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। কিন্তু এবারের আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত নতুন করে সেই পুরোনো প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে আসা- সেটা হলো রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বাস্তব পথটি কোথায়? বাংলাদেশের অবস্থান এ ক্ষেত্রে পরিষ্কার। রোহিঙ্গা সংকটের জন্ম মিয়ানমারে, তাই এর স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারকেই ঘিরে হতে হবে।বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। একটি মানবিক বিপর্যয়ের সময় সীমান্ত খুলে দেওয়া থেকে শুরু করে এত বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা-এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় মানবিক দায়িত্ব। কিন্তু এই দায়িত্বের কোনো শেষসীমা না থাকলে সেটি একসময় বাংলাদেশের জন্য গুরুতর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি করে এবং করছে।সেই বাস্তবতা থেকেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এবার পাঁচ দফা প্রস্তাব সামনে এসেছে। প্রথমত, প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সীমা। দ্বিতীয়ত, রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, প্রত্যাবাসনের আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।চতুর্থত, আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা।  আর পঞ্চমত, মানব পাচার, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান বন্ধে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা।প্রস্তাবগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট - বাংলাদেশ শুধু রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কথা বলছে না, বরং তারা যেন নিরাপদ পরিবেশে, অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে নিজেদের দেশে ফিরতে পারে, সেই নিশ্চয়তার কথাও বলছে।এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু সীমান্ত পার করিয়ে মানুষকে ফেরত পাঠানো আর টেকসই প্রত্যাবাসন এক বিষয় নয়। রোহিঙ্গারা যদি ফিরে গিয়ে আবারও নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য ও অধিকারহীনতার মুখোমুখি হয়, তাহলে সেই প্রত্যাবাসন কতটা টেকসই হবে - সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এ কারণেই ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান মামলার বিষয়টি সামনে এসেছে। গাম্বিয়া আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহ-পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত এই আয়োজন দেখিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকটের বিচারিক ও রাজনৈতিক দুই দিকই আন্তর্জাতিক আলোচনায় রয়েছে।কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমর্থন থাকা আর সংকটের বাস্তব পরিবর্তন- দুটি ভিন্ন বিষয়। এই পার্থক্যটিই সবচেয়ে বেশি অনুভব করা যায় কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোর বাস্তবতায়।সেখানে শিশুরা বড় হচ্ছে। তরুণেরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছে। পরিবারগুলো বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে। তাদের কাছে জাতিসংঘের প্রতিটি অধিবেশন, প্রতিটি প্রস্তাব এবং প্রতিটি আন্তর্জাতিক বিবৃতির শেষ প্রশ্ন একটাই,সেটা হল ফেরার পথ কবে খুলবে?অন্যদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাতের বাস্তবতা আরও জটিল হয়েছে। ফলে প্রত্যাবাসনের জন্য শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে ফিরে যাওয়া মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বাস্তব নিশ্চয়তা থাকবে।সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্য - সংঘাত বা সহিংসতা দিয়ে কোনো সংকটের সমাধান সম্ভব নয়, কূটনৈতিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমেই সমাধানের পথে যেতে হবে - এই বাস্তবতাকেই সামনে আনে। তবে কূটনীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন তার সঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক চাপের কার্যকর সমন্বয় থাকে। রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় বিপদ সম্ভবত এখানেই - সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে, নতুন ইস্যু সামনে আসছে, আন্তর্জাতিক মনোযোগও বিভক্ত হচ্ছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ থেমে নেই।বাংলাদেশের জন্যও এটি এখন শুধু মানবিকতার প্রশ্ন নয়। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী পরিস্থিতি একটি দেশের ওপর কতটা চাপ তৈরি করতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ বাংলাদেশ। তাই রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু ত্রাণ ও শরণার্থী ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়ালে থেকে যাবে। ত্রাণ প্রয়োজন, মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, কিন্তু এগুলো সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়।স্থায়ী সমাধানের অর্থ- নিরাপদ প্রত্যাবাসন, অধিকার নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার এবং মিয়ানমারে এমন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে রোহিঙ্গারা আবারও বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা ছাড়াই নিজেদের দেশে বসবাস করতে পারে।জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আবারও বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই আলোচনার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।কারণ রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আরেকটি বছর পার হওয়া মানে শুধু একটি সংকটের সময়কাল বাড়া নয়, এর অর্থ আরও একটি প্রজন্মের শিকড়হীন হয়ে বেড়ে ওঠা। জাতিসংঘের আলোচনার টেবিল থেকে কক্সবাজারের ক্যাম্প- দুই জায়গার দূরত্ব অনেক। কিন্তু এই দুই প্রান্তকে যুক্ত করার একমাত্র পথ হলো কার্যকর কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বাস্তব প্রত্যাবাসন। এবার সেই পথ কতটা এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

অ্যালগরিদমিক শাসন ও ডিজিটাল পুঁজিবাদ

ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর কোনো দূরবর্তী রাজনৈতিক রূপকল্প বা কেবল নথিপত্রের ঘোষণা নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের প্রত্যক্ষ বাস্তবতা। ২০২৫ সালের শুরুর পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই এই রূপান্তরের বিশালতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা পৌনে আট কোটিতে পৌঁছেছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৪.৫ শতাংশ। অন্যদিকে সক্রিয় মোবাইল সংযোগের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১৮ কোটিতে, যা জনসংখ্যার প্রায় ১০৬ শতাংশ। দৈনন্দিন অর্থপ্রবাহ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতেও ঘটেছে অভূতপূর্ব বিপ্লব। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বা এমএফএসের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিনের কেনাকাটা থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন সারছেন। নিবন্ধিত এমএফএস অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় ২৫ কোটি এবং সারাদেশে সক্রিয় এজেন্ট ছড়িয়ে রয়েছেন প্রায় ২০ লাখ। এই এমএফএস ব্যবস্থার দৌলতে এতদিন অর্থনীতির বাইরে থাকা অনানুষ্ঠানিক খাত দ্রুতগতিতে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।তবে প্রযুক্তিগত এই উল্লম্ফন ও আপাত-সুবিধার চমকপ্রদ অন্তরালে একটি মৌলিক ও জটিল প্রশ্ন ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। যে ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর আমরা চোখ বন্ধ করে নির্ভরশীল হয়ে উঠছি, মূলত তার আসল মালিক কে? প্রতিদিনের কেনাকাটা, সামাজিক যোগাযোগ বা নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নাগরিকেরা যে বিপুল পরিমাণ ডেটা তৈরি করছেন, তার নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে? অদৃশ্য সফটওয়্যার অ্যালগরিদম কীভাবে শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ ভোক্তার দৈনন্দিন জীবন, আয় ও ভাগ্য নির্ধারণ করছে? প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর এই একচ্ছত্র আধিপত্য থেকে জন্ম নেওয়া বিপুল মুনাফা কার পকেটে জমা হচ্ছে, আর এর পরিবেশগত ও সামাজিক চড়া মূল্যই বা কারা পরিশোধ করছে?এই কঠিন ও অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে গবেষক আইটর জিমেনেজের বই ‘দ্য ক্রাইমস অফ ডিজিটাল ক্যাপিটালিজম: করপোরেট ক্রাইম ইন এন এজ অফ এক্সপ্লয়টেশন’। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত এবং আমেরিকান সোসাইটি অফ ক্রিমিনোলজির সম্মানজনক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বইটির মূল বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো। জিমেনেজ দেখিয়েছেন, ডিজিটাল পুঁজিবাদে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতিগুলো ঘটছে, সেগুলোকে নিছক প্রযুক্তির অনিচ্ছাকৃত বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি কিংবা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এসব ক্ষতি মূলত এমন এক কাঠামোগত ব্যবসায়িক ব্যবস্থার সরাসরি ফল, যেখানে করপোরেট মুনাফা অর্জন, নাগরিকদের ওপর প্রতিনিয়ত নজরদারি, অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে ডেটা আহরণ এবং অ্যালগরিদমের মাধ্যমে শ্রমশক্তির ওপর আধিপত্য বিস্তার একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে, যেখানে দ্রুত ডিজিটালাইজেশন ঘটছে অথচ প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, ডেটা সুরক্ষা ও জনস্বার্থ রক্ষা নিয়ে গভীর ও নীতিগত বিতর্কের চরম অভাব রয়েছে, সেখানে জিমেনেজের এই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি।আইটর জিমেনেজের অন্যতম প্রধান অবদান হলো, তিনি প্রচলিত আইনি বৈধতা এবং প্রকৃত সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম পার্থক্যটিকে উন্মোচিত করেছেন। প্রচলিত ফৌজদারি আইন সাধারণত কেবল সরাসরি নিষিদ্ধ আইনভঙ্গ বা দৃশ্যমান অপরাধকেই অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। কিন্তু বহুজাতিক বা বৃহৎ করপোরেট ব্যবস্থার বেলায় দেখা যায়, একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় আইন অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেও কোটি কোটি মানুষের বিপুল সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধন করতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে আইন নিজেই পুরোনো অথবা শক্তিশালী বহুজাতিক অর্থনৈতিক গোষ্ঠী বা টেক-জায়ান্টদের স্বার্থে প্রভাবিত বা তৈরি হতে পারে। ডিজিটাল অর্থনীতিতে সাধারণ নাগরিকের ডেটা সংগ্রহ করা সেবার শর্তাবলীতে সম্মতির আড়ালে আইনসম্মত মনে হলেও তা গোপনীয়তার অপমৃত্যু ঘটায়। গিগ-শ্রমিককে ‘স্বাধীন ঠিকাদার’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা আপাতদৃষ্টিতে আইনি হলেও তা শ্রমিককে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করে। আবার অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্তের কারণে শ্রমিক কাজ হারালে মেধা-সম্পদের অজুহাতে কোনো আপিলের সুযোগ থাকে না, এবং এই সার্বিক অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। জিমেনেজ এখানে প্রযুক্তির অন্ধ বিরোধিতা করছেন না; বরং তিনি প্রশ্ন তুলছেন—নতুন প্রযুক্তিনির্ভর এই করপোরেট ও নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতাকে সামাজিক জবাবদিহিতার আওতায় আনার মতো পর্যাপ্ত আইনি ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ইচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য আমাদের মতো রাষ্ট্রগুলোর আদৌ আছে কি না।সাধারণ মানুষের মনে ধারণা দেওয়া হয় যে ডিজিটাল বা ক্লাউড প্রযুক্তি হলো ভার্চয়াল, বস্তুহীন এবং পরিবেশবান্ধব। কিন্তু এই কাল্পনিক জগতের পেছনে রয়েছে এক বিশালাকার বাস্তব ও বস্তুগত অবকাঠামো। বিপুল ডেটা সেন্টার, কোটি কোটি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ, ভারী যন্ত্রাংশ, বিরল খনিজ সম্পদ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে লুকিয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ প্রচ্ছন্ন শ্রমিকের কায়িক শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে আজকের ডিজিটাল বিশ্ব। প্রযুক্তির প্রয়োজনীয় খনিজ ও কাঁচামাল আহরণ করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী স্থানচ্যুত হচ্ছে। বাংলাদেশেও ডিজিটালাইজেশনের এই অবকাঠামো টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন কী পরিমাণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় বা মেয়াদোত্তীর্ণ ইলেকট্রনিক বর্জ্য কোথায় ও কীভাবে ফেলার মাধ্যমে মাটি ও পানি দূষিত করছে, আর সরঞ্জাম সরবরাহ-শৃঙ্খলে যুক্ত শ্রমিকদের অবস্থান কী—এসব বিষয়ে আমাদের নীতি-নির্ধারণী মহলে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক আলোচনার পরিধি এখনও অত্যন্ত সীমিত।ডিজিটাল প্রযুক্তি শ্রমবাজারের ঐতিহ্যবাহী রূপ ও ধারণাকে আমূল বদলে দিয়ে শ্রমিকের মৌলিক অধিকারকে নতুন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বৈশ্বিক গিগ-শ্রমশক্তির দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। দেশে লক্ষাধিক নিয়মিত ও অনিয়মিত ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন, পাশাপাশি রাইড-শেয়ারিং, ফুড-ডেলিভারি কিংবা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রতিদিন লাখো তরুণ যুক্ত হচ্ছেন। তবে এই তথাকথিত স্বাধীন কাজের আড়ালে থাকা অন্ধকার দিকটি উপেক্ষা করার মতো নয়। রাইড-শেয়ারিং বা ফুড-ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মের কর্মীরা প্রথাগত শ্রমিকের মতো কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, চিকিৎসা সুবিধা, পেনশন, বা দুর্ঘটনায় আইনি সুরক্ষা পান না। এসব প্ল্যাটফর্মে একজন শ্রমিক কখন কাজ পাবেন, কোন ট্রিপে তাঁর কত আয় হবে, কিংবা তাঁর কাজের রেটিং কেমন হবে—তা নির্ধারণ করে একজন অদৃশ্য মানুষ নয়, বরং কোম্পানির জটিল সফটওয়্যার অ্যালগরিদম। বিশ্বখ্যাত ফেয়ারওয়ার্কের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, বাংলাদেশে পরিচালিত একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, উপযুক্ত মজুরি ও সুরক্ষার চরম অভাব রয়েছে। কোনো অ্যালগরিদম যদি ভুল বা অন্যায্য সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো শ্রমিকের অ্যাকাউন্ট হঠাৎ ব্লক করে দেয় বা আয় কমিয়ে দেয়, তবে রাষ্ট্রীয় শ্রম আইনে তার বিরুদ্ধে আপিল করা বা আইনি দায়ভার চাপানোর জন্য স্পষ্ট কোনো ধারা নেই।ডিজিটাল পুঁজিবাদে তথ্যের চেয়ে মূল্যবান ও লাভজনক সম্পদ আর কিছু হতে পারে না। কোনো নাগরিক যখন প্রয়োজনীয় সেবা নিতে গিয়ে অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে ঢোকেন, তখন দীর্ঘ আইনি ভাষা না বুঝেই তিনি সম্মতির মাধ্যমে নিজের অতি ব্যক্তিগত ডেটা কোম্পানির হাতে তুলে দেন। এই ডেটা সংকট ও তথ্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অর্ডিনেন্স এবং ন্যাশনাল ডেটা গভর্ন্যান্স অর্ডিনেন্সের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু মূল পরীক্ষাটি রয়ে গেছে বাস্তবায়নের জায়গায়—এই আইনগুলো কি প্রকৃতপক্ষে সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ডেটা অধিকার রক্ষা করবে, নাকি রাষ্ট্র ও বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে নজরদারির বাড়তি ক্ষমতা এনে দেবে? এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে প্রযুক্তিগত বৈষম্যের বিষয়টি। ২০২৫ সালের শুরুতে দেশে পৌনে আট কোটি মানুষ কোনোভাবে অনলাইনে এলেও, সাড়ে নয় কোটির বেশি মানুষ অর্থাৎ প্রায় ৫৫.৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখনও নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধার বাইরে। ফলে, প্রযুক্তিগত সুবিধা ও ডিজিটাল অর্থনীতি যদি কেবল শহরের সচ্ছল ও সুবিধাভোগী শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এই ডিজিটালাইজেশন বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে কমানোর বদলে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে।আইটর জিমেনেজের বইটির মূল বার্তা প্রযুক্তির বিকাশকে রুদ্ধ করা নয়, বরং প্রযুক্তির সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে সেই ক্ষমতার ভারসাম্যকে পুনর্নির্ধারণ করা। বাংলাদেশের সামনে এখন প্রযুক্তিগত বিকাশ বজায় রাখা এবং সেই ব্যবস্থার ওপর গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করার জোড়া দায়িত্ব রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে অবিলম্বে নাগরিকের ব্যক্তিগত ডেটাকে নিছক বাণিজ্যিকভাবে বিক্রিযোগ্য পণ্য হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে এবং গিগ ও প্ল্যাটফর্ম-শ্রমিকদের প্রচলিত শ্রম আইনের স্পষ্ট সংজ্ঞায় এনে ন্যূনতম মজুরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে অ্যালগরিদম কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বা রেটিং দিচ্ছে তা জানার অধিকার ও অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রাখতে হবে এবং প্রযুক্তি সংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন ও অবকাঠামো পরিচালনায় কয়েকটি সীমিত বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর রাষ্ট্রের অতি-নির্ভরশীলতা রোধ করতে হবে।বাংলাদেশ আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করবে কি করবে না, সেই বিতর্ক বা প্রাতিষ্ঠানিক সংশয় আজকের দিনে পুরোপুরি অচল ও নিরর্থক। ডিজিটাল ব্যবস্থা আমাদের জীবনের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে। কিন্তু মূল ও ঐতিহাসিক প্রশ্নটি হলো, আমরা কেমন ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে চাই? আমরা কি এমন এক সমাজ বানাব যেখানে কোটি কোটি মানুষের অক্লান্ত শ্রম, ব্যক্তিগত ডেটা ও দৈনন্দিন গতিবিধি কয়েকটি বৈশ্বিক করপোরেট জায়ান্টের জমাটবদ্ধ সম্পদে পরিণত হবে? নাকি আমরা এমন একটি সচেতন ডিজিটাল সমাজ গড়ব, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার, শ্রমিকের মানবিক মর্যাদা, সর্বজনীন ন্যায়বিচার এবং সামগ্রিক জনস্বার্থকে শক্তিশালী করার হাতিয়ার হিসেবে? পছন্দটি সম্পূর্ণ আমাদের এবং আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণের ওপর নির্ভর করছে।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।]

একসঙ্গে থেকেও আমরা একা

সময় এখন তথ্য ও প্রযুক্তির। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্বজুড়ে বিস্তার ঘটছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আর মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রায় সবার হাতেই মোবাইল ফোন। যোগাযোগ, বিনোদন, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজ এখন মোবাইলনির্ভর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গেম ও জুয়ার মতো নানা ঝুঁকিও।আবালবৃদ্ধবনিতা থেকে শুরু করে ধনী-গরিব—সব শ্রেণির মানুষের হাতেই এখন মোবাইল ফোন। কাজেও মোবাইল, অবসরেও মোবাইল, বিনোদনেও মোবাইল। ফলে মানুষে মানুষে সরাসরি মতবিনিময় ও আড্ডার আগ্রহ কমছে। একা থাকা এবং নিজের জগতে ডুবে থাকাকেই অনেকে স্বাচ্ছন্দ্য মনে করছেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে, মোবাইল ফোন কি ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?আমাদের চারপাশে মানুষের ভিড় বাড়ছে, অথচ কমে যাচ্ছে আপন মানুষ। প্রযুক্তি দূরের মানুষকে কাছে এনেছে ঠিকই, কিন্তু কাছের মানুষগুলোকে যেন আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। একসময় অবসর পেলেই মানুষ পরিবারের সঙ্গে বসত, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত, প্রতিবেশীর খোঁজ নিত। এখন অবসর পেলেই অনেকের চোখ চলে যায় মোবাইলের পর্দায়। একই ঘরে বসে থাকা মানুষগুলোর মধ্যেও তৈরি হচ্ছে অদৃশ্য দূরত্ব। কথা বলার মানুষ আছে, কিন্তু মনের কথা বলার মানুষ যেন কমে যাচ্ছে।হাজারো পরিচিত মুখের ভিড়েও অনেক মানুষ ভীষণ একা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রতিদিন নিজেদের হাসিমুখের ছবি প্রকাশ করি। অথচ সেই হাসির আড়ালে কতটা শূন্যতা লুকিয়ে থাকে, তা অনেক সময় কেউ জানে না। মানুষ অন্যের জীবনের খবর রাখে, কিন্তু পাশের মানুষটির মন খারাপের খবর রাখে না।সম্পর্কগুলোও ধীরে ধীরে প্রয়োজননির্ভর হয়ে পড়ছে। যতক্ষণ প্রয়োজন আছে, ততক্ষণ যোগাযোগ থাকে। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সম্পর্কের উষ্ণতাও কমে যায়। অভিমান জমে থাকে, কিন্তু তা ভাঙার মতো মানুষ থাকে না। কষ্ট হয়, কিন্তু কষ্টের কথা শোনার মতো ধৈর্যশীল মানুষ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই নিজের সমস্যার কথা বলতে চান, কিন্তু অন্যকে বিরক্ত করার ভয়ে চুপ করে থাকেন। এই নীরবতা একসময় মানুষকে নিজের ভেতরেই বন্দি করে ফেলে।ব্যস্ত জীবনের অজুহাতে আমরা প্রিয় মানুষদের সময় দিতে ভুলে যাচ্ছি। বাবা-মায়ের পাশে বসার সময় নেই, বন্ধুর সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সময় নেই। প্রিয় মানুষটি কেমন আছে—এই ছোট্ট প্রশ্নটিও অনেক সময় করা হয় না। ফলে সম্পর্কগুলো টিকে থাকে, কিন্তু সম্পর্কের উষ্ণতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মানুষ নিজের একাকিত্বকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করেছে।একসময় পরিবারে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প-আড্ডা ও মতবিনিময় হতো। পরিবারের সদস্যরা সারাদিন ব্যস্ত থাকলেও রাতে একসঙ্গে খাবার খেতে বসতেন। খাবারের টেবিলে পরিবার, সমাজ ও চারপাশের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার বড় একটি অংশ সেখান থেকেই অর্জিত হতো। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। প্রয়োজন ছাড়া কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে চায় না। মোবাইলের রঙিন পর্দার ভেতরেই অনেকে নিজের আলাদা জগৎ তৈরি করে নিয়েছেন।রাস্তা, ঘাট, চায়ের দোকান, বাস কিংবা ট্রেন—সব জায়গাতেই একই চিত্র। সবাই যেন মোবাইলের পর্দায় নিমগ্ন। কেউ গান শুনছেন, কেউ খবর পড়ছেন, কেউ ভিডিও দেখছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত। পাশে কে বসে আছেন, চারপাশে কী ঘটছে—সেদিকে নজর দেওয়ার সময় যেন কারও নেই।শিশুরাও এর বাইরে নয়। অনেক শিশু মোবাইল ফোনে গেম খেলে, মোবাইল দেখতে দেখতে খাবার খায়। বড়রাও পারিবারিক, সামাজিক, দাপ্তরিক ও আর্থিক নানা কাজ মোবাইলেই সারেন। এরপর দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটিয়ে দেন। ফলে পরিবারের সদস্যরা একই জায়গায় থেকেও নিজ নিজ পর্দার জগতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।কর্মক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। একসঙ্গে অনেক সহকর্মী বসে থাকলেও প্রত্যেকে নিজের মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। কেউ গান শুনছেন, কেউ খবর পড়ছেন, কেউ ভিডিও দেখছেন, কেউ কারও সঙ্গে অনলাইনে কথা বলছেন। কথাবার্তা হলেও অনেক সময় তা সংক্ষিপ্ত ও প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। একে অন্যের চোখের দিকে তাকিয়ে আন্তরিকভাবে কথা বলার অভ্যাস কমে যাচ্ছে।বন্ধুদের আড্ডাতেও একই অবস্থা। দশজন বন্ধু একসঙ্গে বসে আছেন, অথচ সবার মনোযোগ মোবাইলের পর্দায়। কেউ গেম খেলছেন, কেউ ভিডিও দেখছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত। ফলে একসঙ্গে থেকেও তারা যেন প্রত্যেকে আলাদা জগতে অবস্থান করছেন। বাস্তব আড্ডার জায়গা দখল করে নিচ্ছে ভার্চুয়াল ব্যস্ততা।মোবাইল ফোন মানুষের যোগাযোগের পরিসর বাড়িয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে পারিবারিক, সামাজিক ও মানবিক বন্ধনে দূরত্ব তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি মানুষের কাজকে দ্রুত ও সহজ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির অতিরিক্ত নির্ভরতা যদি মানুষের আবেগ, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সম্পর্ককে দুর্বল করে, তাহলে সেই অগ্রগতি নিয়ে ভাবারও প্রয়োজন আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দরভাবে নিজেকে উপস্থাপন করার প্রবণতা বাড়ছে, অথচ বাস্তব জীবনের সম্পর্কের সেতু দুর্বল হয়ে পড়ছে।মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক হৃদ্যতা ও মানবিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং এর ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। প্রয়োজনের সময় প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু প্রযুক্তিকে যেন আমাদের জীবনের সম্পর্কগুলোর নিয়ন্ত্রক হতে না দেওয়া হয়।মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ তুলে চারপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকানো দরকার। প্রিয় মানুষের পাশে বসা দরকার। একটি ফোন, একটু খোঁজ নেওয়া কিংবা কয়েক মিনিটের আন্তরিক কথাও কারও একাকিত্ব অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে। মনে রাখতে হবে, মানুষ যতই আধুনিক হোক, ভালোবাসা, সঙ্গ ও আন্তরিকতার প্রয়োজন কখনো কমে না।জীবনে কতজন মানুষকে আমরা চিনি, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো, কতজন মানুষ আমাদের আপন। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে একা। কিন্তু সেই একাকিত্ব যেন প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়িয়ে না দেয়। প্রযুক্তি আমাদের আশীর্বাদ। সেই আশীর্বাদ যেন আমাদের সম্পর্কের জন্য অভিশাপ হয়ে না ওঠে।[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

রেশম শিল্পে জাগুক নতুন প্রাণ

বাংলায় প্রাচীনকাল থেকেই রেশম চাষ বা পলু পোকা পালন এবং রেশম সুতা তৈরির প্রচলন ছিল। মুঘল আমলে বাংলায় রেশম উৎপাদন ও কারিগরি উৎকর্ষ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সে সময় মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও ঢাকা রেশম বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সপ্তদশ শতকে বিদেশি বণিক ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রেশমের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তারা কাসিমবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে কুঠি স্থাপন করে রেশম ব্যবসা সম্প্রসারণ করে।সুলতানি ও মুঘল আমলে অবিভক্ত বাংলা, বিশেষ করে কাসিমবাজার ও রাজশাহী অঞ্চল, রেশম উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। বাংলার রেশমের মান ভালো হওয়ায় তা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হতো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রেশম বাণিজ্য থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করে। তবে ব্রিটিশদের নীতির পরিবর্তন, ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়ে।১৮৩৫ সালের মধ্যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ অঞ্চলের প্রায় ১০০টি রেশম নিষ্কাশনকেন্দ্র নিষ্ক্রিয় করে দেয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। যদিও পরবর্তী সময়ে বেসরকারি উদ্যোগে রেশম শিল্পের কিছুটা সম্প্রসারণ ঘটে এবং রপ্তানি বাণিজ্যও জমজমাট হয়ে ওঠে। কিন্তু ১৮৭০-এর দশকে রেশমকীটের রোগের ব্যাপক বিস্তার এবং কারিগরি ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার কারণে বাংলার রেশম শিল্প বিদেশের বাজার হারাতে শুরু করে।দেশভাগের পর ১৯৫২ সাল থেকে রাজশাহীতে নতুন করে রেশম উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৬১ সালে রাজশাহীতে একটি সরকারি রেশম কারখানা স্থাপিত হয়। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেশম চাষ ও উৎপাদনের অবকাঠামো রয়েছে। রেশম উন্নয়ন বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয় রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, যশোর ও রাঙামাটিতে রয়েছে। ভোলাহাট, ঠাকুরগাঁও, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ, বগুড়া, কুমিল্লা ও রাজবাড়ীতে রেশম সম্প্রসারণ কার্যালয় রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ভোলাহাট, মীরগঞ্জ, ঈশ্বরদী, ঝিনাইদহ, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, কোনাবাড়ী, ময়নামতি, চন্দ্রঘোনা ও সাঁকোয়ায় রেশম বীজাগার ও খামার এলাকা রয়েছে।সরকারি ব্যবস্থাপনায় রেশম বোর্ডের অধীনে আদর্শ নার্সারি, মিনি ফার্ম এবং চাউকি রিসার্চ সেন্টারও রয়েছে। এসব কেন্দ্রে উন্নত জাতের তুঁত গাছ ও রেশম গুটি উৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রেশম চাষ সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমি তুঁত চাষের আওতায় আনা হয়েছিল। রাঙামাটির চন্দ্রঘোনা ও পঞ্চগড়ের সাঁকোয়ায় জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ ও রেশম বীজাগার রয়েছে।তুঁত চাষের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জমি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট রেশম বীজাগারের জমির পরিমাণই প্রায় ৩৬ দশমিক ৭৯ একর। রাজশাহী রেশম কারখানা প্রায় সাড়ে ১৫ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত। রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটও রাজশাহীতে রয়েছে। বোর্ডের অধীনে থাকা বিভিন্ন মিনি ফার্ম, বীজাগার, নার্সারি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জমি বিবেচনায় নিলে রেশম খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অবকাঠামোগত ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু এই সম্পদ ও অবকাঠামো থাকার পরও শিল্পটি আজ রুগ্ণ অবস্থায় রয়েছে।১৯৯১ সালে আমদানি শুল্ক কমানোর পর চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কম দামে রেশম সুতা দেশের বাজারে প্রবেশ করে। বিদেশি সুতা তুলনামূলক সস্তা ও চকচকে হওয়ায় দেশীয় রেশম সুতা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। ২০০২ সালে লোকসানের কারণ দেখিয়ে ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সরকারি রেশম কারখানা ও অন্যান্য সরকারি মিল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে রেশম শিল্পের মূল চালিকাশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সুতার সংকটে বেসরকারি মিলগুলোও একে একে বন্ধ হতে থাকে।রেশম শিল্প পুনরুজ্জীবিত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র‍্য বিমোচনে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। দেশে বছরে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ মেট্রিক টন রেশমের চাহিদা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। তুঁত চাষ, রেশম পোকা পালন, সুতা তৈরি এবং কাপড় বোনার মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রামীণ অর্থনৈতিক চক্র গড়ে তোলা সম্ভব। এ শিল্পে বিভিন্ন স্তরে দক্ষ ও অদক্ষ—উভয় ধরনের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।দারিদ্র‍্য বিমোচনের অন্যতম প্রধান শর্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বাংলাদেশের দরিদ্র ও গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে রেশম শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্পটি পুনরুজ্জীবিত করা গেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ শিল্পের প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি ও অনেক কাঁচামাল দেশেই রয়েছে। তাই আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে।রেশম চাষের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও সম্ভব। গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি নারীরা ছোট পরিসরে তুঁত চাষ ও রেশম পোকা পালনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। এতে পরিবারের বাড়তি আয় সৃষ্টি হতে পারে। বাড়ির আঙিনা কিংবা গ্রামীণ রাস্তার পাশের জমিতেও ছোট পরিসরে তুঁত চাষ করা সম্ভব। রেশম চাষ তুলনামূলকভাবে শ্রমঘন এবং গ্রামীণ মানুষের জন্য আয় সৃষ্টির একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।তাই ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে শুধু অতীতের গৌরব হিসেবে দেখলে চলবে না। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত জাতের তুঁত ও রেশমকীট, ন্যায্যমূল্য, মানসম্মত সুতা উৎপাদন, সরকারি কারখানার আধুনিকায়ন এবং বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে রেশম শিল্পকে নতুন করে দাঁড় করাতে হবে। উৎপাদক, গবেষক, উদ্যোক্তা ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগই পারে বাংলাদেশের রেশম শিল্পকে আবারও সম্ভাবনাময় করে তুলতে।[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

বাগাড়ম্বরের আড়ালে জবাবদিহিহীনতার প্রশ্ন

অতি সম্প্রতি জাতিসংঘে মুহাম্মদ ইউনূস একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অস্তিত্বের ঘোষণা দিয়েছেন। ২১ সেপ্টেম্বর সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে ভাড়া করা হলে ‘সোশ্যাল বিজনেস, ইয়ুথ অ্যান্ড টেকনোলজি’ নামে সাইড ইভেন্ট হয়, যেখানে অল্প কিছু অতিথি ছিলেন। কৃতজ্ঞতাবশত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তাকে হাইলাইট করতে চেয়েছেন। কিন্তু এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণের গুরুত্ব জনগণের কাছে কমে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ইউনূসের পক্ষে-বিপক্ষে সরগরম আলোচনা, অথচ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ তত গুরুত্ব পায়নি। এর দায় বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। ইউনূসের প্রভাব নিয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি যে অপকর্ম করেছেন, তা জনগণ ভুলবে না।মোহাম্মদ ইউনূসের একটি বড় ভাঁওতাবাজি ছিল পাসপোর্ট নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, পাসপোর্টের জন্য জনগণ অফিসে যাবে কেন, ঘরে বসে অনলাইনে পেয়ে যাবে। তিনি নিজেই বলেছেন, সরকার ঘরে পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ঘরে বসে পাসপোর্ট পাচ্ছে না, ভোগান্তি একই আছে।মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত সময়কাল প্রায় ১৮ মাস। এই সময়ে বড় প্রতিশ্রুতি ছিল সংস্কার, দুর্নীতি দমন ও বিনিয়োগ। কিন্তু মিলল বক্তৃতার জৌলুস আর কাজের ঘাটতি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জবাবদিহিতা। ইউনূস সরকার এখন ক্ষমতায় নেই, কিন্তু তার অপকর্মের কোনো বিচার হচ্ছে না। কারণ ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তাকে রাজনৈতিক ছাড় দিয়েছে। আদালতও অভিযোগগুলো আমলে নিচ্ছে না। ফলে ১৮ মাসে রাষ্ট্রের যে ক্ষতির পাহাড় জমেছে, তার দায়ও আওয়ামী লীগের ওপর বর্তানো হচ্ছে।২০২৪ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ মহাসচিবকে কক্সবাজারে আনা হয়। ইউনূস চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝাতে চাইলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের লোক। বলা হলো, ‘আগামী ঈদ তারা নিজ ভূখণ্ডে করবে।’ কিন্তু ১৮ মাস শেষেও একজন রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন হয়নি। ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভরণপোষণ, পাসপোর্ট জালিয়াতি করে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের বদনাম—আগের মতোই আছে। ইউনূস শোডাউনের ভাঁওতাবাজি করলেন, কিন্তু কূটনৈতিক অগ্রগতি শূন্য।বিনিয়োগের নামেও একই প্রতারণা। একজন তরুণকে ‘বিনিয়োগের জাদুকর’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। প্রচার হলো, ইংরেজি জানা এই প্যারাসুট তরুণ বিদেশ থেকে বিনিয়োগ এনে দেশকে সিঙ্গাপুর বানিয়ে দেবে। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ কমেছে। উল্টো চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একই সময়ে বলা হলো, পৃথিবীর সব দেশ বাংলাদেশ থেকে লোক নেওয়ার জন্য তার কাছে আবেদনের পর আবেদন করে যাচ্ছে, অথচ ২০২৫ সালে বৈধ অভিবাসন আগের বছরের চেয়ে কমেছে।জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী। আওয়ামী লীগ সরকার সামিটের সঙ্গে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি করেছিল। ইউনূস সরকার ২০২৫-এর শুরুতে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে চুক্তি বাতিল করে, কিন্তু বিকল্প টার্মিনাল করল না। জুলাই ২০২৫-এ এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুনের পর দৈনিক প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে তীব্র সংকট শুরু হয়। একইভাবে আগের সরকারের অনুমোদিত ৩৭টি সৌর প্রকল্পের এলওআই বা লেটার অব ইনটেন্ট বাতিল করা হয়। বলা হলো, স্বচ্ছ দরপত্র হবে। ওই ৩৭টি প্রকল্প থেকে ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন করে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ যোগ করার উদ্যোগ আর নেওয়া হয়নি।স্বাস্থ্য খাতে অবহেলার খেসারত দিল শিশুরা। অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে হামের টিকা কেনার আগের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। যুক্তি ছিল, উন্মুক্ত দরপত্র হবে। কিন্তু সময়মতো টিকা আসেনি। ফলে ২০২৫ সাল থেকে হামে এক হাজারের বেশি শিশু মারা গেছে।একইভাবে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ইউনূসের আমলে কয়েক মাস কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়। স্টোরের ওষুধ তালাবদ্ধ থাকায় কোটি টাকার ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক প্রতিশোধের কারণে আগের সরকারের ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সব বাতিল করার পরিণতি জনগণ এখন ভুগছে।অর্থনীতিতে ধস নামে ব্যাংক ও বাণিজ্যনীতির কারণে। আইন লঙ্ঘন করে সত্তরোর্ধ্ব একজন অর্থনীতিবিদকে গভর্নর করা হয়। তিনি প্রকাশ্যে কয়েকটি ব্যাংককে ‘দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে ‘লাল তালিকাভুক্ত’ করেন। এরপরই আমানতকারীরা আতঙ্কে টাকা তুলতে শুরু করে, কয়েকটি ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়ে। আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং সহায়তা বন্ধ করায় অল্প দিনেই খেলাপি ঋণ দ্বিগুণ হয়, অনেক কারখানা বন্ধ হয়। নিজের গদি রক্ষায় ইউনূস সরকার প্রথমে স্টারলিংক নিয়ে হৈচৈ করল, ট্রাম্প প্রশাসনের পালাবদলের পর সেই প্রসঙ্গও চাপা পড়ে গেল। সবচেয়ে বড় বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, যা বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা খর্ব করবে।সবশেষে দুর্নীতির শ্বেতপত্র। ‘সেরা অর্থনীতিবিদ’ দিয়ে আগের সরকারের পাচারের হিসাব বের করে ভাষণ দেওয়া হলো, বিদেশে দল বেঁধে সফর হলো, কোটি টাকা খরচ হলো। কিন্তু একটি টাকাও ফেরত আসেনি। উল্টো আলোচনা হচ্ছে, ইউনূস আমলেই বিভিন্ন খাতে বড় দুর্নীতি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন ও অন্যান্য মামলা প্রশাসনিক নির্দেশে প্রত্যাহার হয়েছে, তার প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে কর সুবিধা ও নতুন লাইসেন্স। নোবেল লরিয়েটের আমলে আরও দুটি বস্তুর উদয় হয়েছে—অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি আর মব সন্ত্রাস।বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথা দিয়ে রাষ্ট্র চলে না। রোহিঙ্গা যায়নি, বিনিয়োগ আসেনি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট বেড়েছে, শিশু মরছে, ক্লিনিক অচল হয়েছে, ব্যাংক খাত ধুকছে, বাণিজ্য চুক্তি গলার ফাঁস হয়েছে। ক্ষমতা ছেড়েও তিনি জবাবদিহির বাইরে। কিন্তু আরোপিত দেবত্বের মহিমা আর বাস্তবতার হোঁচট একসঙ্গে হাঁটে না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

রোবোটিক সার্জারি: শল্যচিকিৎসার নতুন অধ্যায়

সার্জারি চিকিৎসার ইতিহাস প্রায় ১০ হাজার বছরের হলেও একসময় ইউরোপের অন্ধকার যুগে নাপিতেরা কাঁটাছেঁড়া বা সার্জারির কাজ করতেন। আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় সার্জারি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে প্রযুক্তির প্রতিটি নতুন সংযোজন রোগীর জন্য আরও নিরাপদ, কম আঘাতপ্রবণ ও অধিক নিখুঁত চিকিৎসার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ওপেন সার্জারি থেকে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি, ল্যাপারোস্কোপি থেকে রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড সার্জারি—এই বিবর্তনের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো রোবোটিক সার্জারি।রোবোটিক সার্জারির ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। ১৯৮৫ সালে ‘পুমা-৫৬০’ নামের একটি রোবোটিক সিস্টেম ব্যবহার করে মস্তিষ্কের টিস্যু পরীক্ষা করা হয়। এটিকে রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড সার্জারির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ‘প্রোবট’, ‘রোবোডক’, ‘এইসপ’ ও ‘জিউস’-এর মতো বিভিন্ন সিস্টেমের উন্নয়ন ঘটে।১৯৯০-এর দশকে নাসার প্রতিরক্ষা গবেষণা ও টেলিসার্জারির ধারণা রোবোটিক সার্জারি প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে দুর্গম স্থান, যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা মহাকাশে অবস্থানরত রোগীর কাছে দূরবর্তী সার্জনের দক্ষতা পৌঁছে দেওয়ার ধারণা থেকে টেলিরোবোটিক সার্জারির গবেষণা এগিয়ে যায়। এরপর আসে ‘দা ভিঞ্চি সার্জিক্যাল সিস্টেম’-এর যুগ। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ ‘দা ভিঞ্চি’ সিস্টেমকে সাধারণ ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির জন্য অনুমোদন দেয়। এরপর ইউরোলজি, গাইনোকোলজি, জেনারেল সার্জারি, থোরাসিক সার্জারি এবং বিভিন্ন ক্যান্সার সার্জারিতে রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হয়।বাংলাদেশও এখন এই প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। গত আগস্ট মাসে ‘মেডবট টুমাই’ এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবটের সহায়তায় দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়—একটি রোবোটিক কোলেসিস্টেকটমি এবং অন্যটি রোবোটিক হিস্টেরেকটমি। অনেকে এটিকে বাংলাদেশে নিয়মিত রোবোটিক সার্জারি সেবার সূচনা হিসেবে ঘোষণা করেছেন।রোবোটিক সার্জারি এমন একটি উন্নত মিনিমালি ইনভেসিভ বা স্বল্প-আঘাতের অস্ত্রোপচার পদ্ধতি, যেখানে সার্জন একটি কনসোলে বসে বিশেষায়িত যন্ত্র ও ক্যামেরা-সমৃদ্ধ রোবোটিক বাহু নিয়ন্ত্রণ করে জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রোবট নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে রোগীর অস্ত্রোপচার করে না। রোবোটিক সিস্টেম সার্জনের হাতের নড়াচড়াকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিতভাবে রোগীর শরীরের ভেতরের যন্ত্রে রূপান্তর করে। সাধারণত একটি রোবোটিক সার্জিক্যাল প্ল্যাটফর্মে থাকে সার্জনের কনসোল, রোগীর পাশে থাকা একাধিক রোবোটিক আর্ম, উচ্চ-রেজল্যুশনের থ্রি-ডি ক্যামেরা, সূক্ষ্ম ও বিভিন্ন ধরনের সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট এবং সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিত মুভমেন্ট ও মুভমেন্ট স্কেলিং ব্যবস্থা। ফলে সার্জন শরীরের গভীর ও সংকীর্ণ স্থানে ত্রিমাত্রিক ও বড় করে দেখা অপারেটিভ ফিল্ডে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে পারেন।প্রথমে রোগীর শরীরে কয়েকটি ছোট ছিদ্র করা হয়। এসব ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষ সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট প্রবেশ করানো হয়। রোবোটিক বাহুগুলো রোগীর শরীরের বাইরে অবস্থান করে এবং ভেতরের যন্ত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। যন্ত্রের মাথা মানুষের কব্জির মতো বিভিন্ন দিকে নড়াচড়া করতে সক্ষম। কিছু সিস্টেমে ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত মুভমেন্টের সুবিধা থাকে। একই সঙ্গে হাতের স্বাভাবিক বা সূক্ষ্ম কাঁপুনি সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিতভাবে কমিয়ে আনা যায়।এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সূক্ষ্মতা। মানুষের হাত যতই দক্ষ হোক, তার স্বাভাবিক নড়াচড়া ও কাঁপুনির কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। রোবোটিক প্রযুক্তি সেই নড়াচড়াকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে আরও নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। যন্ত্রের মাথা মানুষের কব্জির মতো বিভিন্ন দিকে নড়াচড়া করতে পারে এবং শরীরের গভীর ও সংকীর্ণ স্থানে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চক্ষমতার ত্রিমাত্রিক ভিশন। শরীরের গভীরে কোনো অতি সূক্ষ্ম অ্যানাটমিক কাঠামো, রক্তনালি বা টিস্যুর স্তর শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এই উন্নত দৃষ্টিশক্তি সার্জনকে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে জটিল ও সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারে এর গুরুত্ব রয়েছে।রোবোটিক সার্জারির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো, এটি সাধারণত মিনিমালি ইনভেসিভ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। বড় করে কেটে অস্ত্রোপচার করার পরিবর্তে ছোট ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষ যন্ত্র প্রবেশ করানো হয়। এর ফলে নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে অপারেশনের পর ব্যথা কম হতে পারে, ক্ষত দ্রুত শুকাতে পারে, সংক্রমণের ঝুঁকি কমতে পারে এবং রোগী তুলনামূলক দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। কিছু নির্বাচিত অস্ত্রোপচারে রক্তক্ষরণও কম হতে পারে। ইউরোলজি, গাইনোকোলজি, জেনারেল সার্জারি, থোরাসিক সার্জারি এবং বিভিন্ন ক্যান্সার সার্জারিতে রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহার ইতোমধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। পেলভিস, প্রোস্টেট, জরায়ু, কোলন-রেকটামসহ শরীরের জটিল অঞ্চলে সার্জনের জন্য উন্নত ভিশন ও সূক্ষ্ম মুভমেন্টের সুবিধা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।রোবোটিক সার্জারি অত্যাধুনিক হলেও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। ফলে অন্য অস্ত্রোপচারের মতোই রক্তপাত, সংক্রমণ, অ্যানেস্থেসিয়া-সংক্রান্ত জটিলতা এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জখমের সম্ভাবনা থাকে। নিরাপদভাবে রোবোটিক সার্জারি করা সম্ভব না হলে ওপেন সার্জারিতে রূপান্তর করতে হতে পারে। রোবোটিক সার্জারিতে যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বিকল্প সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত টিম প্রস্তুত রাখা অপরিহার্য। রোবোটিক সার্জারি পরিচালনার জন্য দক্ষ সার্জন, সহকারী, অবেদন বিশেষজ্ঞ, নার্সিং ও বায়োমেডিক্যাল টিম তৈরি রাখা প্রয়োজন। শুধু রোবট স্থাপন করলেই নিরাপদ সার্জারি পরিচালনা সম্ভব নয়; এর জন্য দীর্ঘ ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। রোবোটিক প্ল্যাটফর্ম, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি এখনো ব্যয়বহুল। তাই অপারেশনের খরচও বেশি। রোবোটিক সার্জারির খরচ প্রচলিত সার্জারি বা ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির তুলনায় প্রায় দুই থেকে তিন গুণ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ১ লাখ ২০ হাজার টাকার একটি প্রচলিত অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে রোবোটিক সার্জারিতে প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হতে পারে।রোবোটিক সার্জারি নিয়ে সাধারণের একটি ভুল ধারণা হলো—এতে হয়তো ভবিষ্যতে সার্জনের প্রয়োজন থাকবে না। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা হলো, এটি সার্জন প্রতিস্থাপন নয়, সার্জন-সহায়ক প্রযুক্তি। সিদ্ধান্ত নেন সার্জন; রোগীর সমস্যা বোঝেন সার্জন; কখন, কোথায়, কীভাবে অপারেশন করতে হবে এবং কোনো জটিলতা দেখা দিলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে—এসবের জন্য সার্জনের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। রোবট সার্জনের চোখকে আরও স্পষ্টভাবে দেখতে, হাতকে আরও সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে এবং জটিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে আরও সঠিকভাবে পৌঁছাতে সহায়তা করে।বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারির সূচনা নিঃসন্দেহে চিকিৎসা প্রযুক্তির বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর মাধ্যমে দেশের সার্জনদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি রোবট কেনা কোনো হাসপাতালের চিকিৎসার মানের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। রোবট কতটি আছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কতজন দক্ষ সার্জন এটি পরিচালনা করছেন; কতটা নিরাপদভাবে ব্যবহার হচ্ছে; রোগী নির্বাচন কতটা বৈজ্ঞানিক; জটিলতার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত; এবং সর্বোপরি রোগী কতটা উপকৃত হচ্ছেন।শল্যচিকিৎসার ভবিষ্যৎ নিঃসন্দেহে আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত ইমেজিং, রোবোটিক্স ও ডেটা-নির্ভর চিকিৎসা একদিন সার্জারির চেহারা আরও বদলে দিতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, চিকিৎসার মূল দর্শন অপরিবর্তিত থাকবে—রোগীর নিরাপত্তা, মানবিকতা ও সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করা। অতএব, বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারির অগ্রযাত্রাকে স্বাগত জানাতে হবে, তবে অন্ধ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে নয়; বিজ্ঞান, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, নিরাপত্তা ও রোগীর সামর্থ্যের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে। কারণ শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মাপকাঠি হবে না কতটি রোবট দেশে এসেছে—সাফল্যের মাপকাঠি হবে, এই প্রযুক্তি দিয়ে আমরা কতটা নিরাপদ, কার্যকর ও মানবিক শল্যচিকিৎসা দিতে পারছি।[লেখক: পরিচালক, মেডিক্যাল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

পোল্ট্রি ফার্মিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প দেশের প্রাণিজ আমিষ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উৎস । মহামারী, খাদ্যের ক্রমবর্ধমান উচ্চ মূল্য, পরিবেশের ব্যপক তারতম্য, শ্রম সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রতিনিয়ত এই শিল্প নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী  এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে স্মার্ট পোল্ট্রি ফার্মিং বা প্রিসিশন পোল্ট্রি ফার্মিং। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ আই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), কম্পিউটার ভিশন ,সেন্সর, রোবোটিক্স এবং ক্লাউড প্রযুক্তির সমন্বয়ে খামারের প্রতিটি তথ্য উপাথ্য সংগ্রহ করে  রিয়েল-টাইমের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। ফলে উৎপাদন বাড়ে, মৃত্যুহার কমে এবং খামার পরিচালনা আরও লাভজনক ও টেকসই হয়।খামারের পরিবেশ পর্যবেক্ষণএকটি আদর্শ ফার্ম বিশেষ করে মুরগির স্বাস্থ্য ও উৎপাদন অনেকাংশেই নির্ভর করে খামারের পরিবেশের ওপর। আধুনিক খামারে আইওটি -ভিত্তিক সেন্সরের মাধ্যমে তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা, অ্যামোনিয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড, বাতাসের গতি এবং আলোর তীব্রতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হয়। এসব তথ্য ইএসপি-৩২, আর্ডুইনো বা প্রোগ্রামেবল লজিক কন্ট্রোলার -এর মাধ্যমে ক্লাউডে সংরক্ষিত হয় এবং নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে মোবাইলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। ফলে খামারের পরিবেশ সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, হিট স্ট্রেস ও গ্যাসজনিত ঝুঁকি কমে এবং মুরগির স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা উন্নত হয়।এ আই-ভিত্তিক রোগ শনাক্তকরণকম্পিউটার ভিশন: ক্যামেরা দিয়ে মুরগির চলাফেরা, ডানা ঝুলে যাওয়া, ল্যাংড়া হাঁটা, চোখ-মুখের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করা।থার্মাল ক্যামেরা: শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে জ্বর বা সংক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা।শব্দভিত্তিক এআই প্রযুক্তি: কাশি, হাঁচি বা শ্বাসকষ্টের শব্দ বিশ্লেষণ করে শ্বাসতন্ত্রের রোগের সম্ভাবনা নির্ণয় করা।এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রোগের লক্ষণ সহজে বুঝা যায় এবং যা খামারীকে ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করতে পারে।খাদ্য ও পানি গ্রহণ পর্যবেক্ষণখাদ্য খামারের মোট উৎপাদন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ। স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে— লোড সেল“ দিয়ে ফিডের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়।স্বয়ংক্রিয় স্মার্ট ফিডার নির্ধারিত সময়ে খাদ্য সরবরাহ করে। ওয়াটার ফ্লো মিটার পানির ব্যবহার রেকর্ড করে। এ আই খাদ্য ও পানির গ্রহণের ধরণ বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করে। এর ফলে খাদ্যের অপচয় কমে, এফ সি আর উন্নত হয় এবং শ্রম ব্যয় হ্রাস পায়।মুরগির আচরণ পর্যবেক্ষণআধুনিক পোল্ট্রি খামারে এআই ও কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তি মুরগির আচরণ পর্যবেক্ষণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। উচ্চ-রেজোলিউশন ক্যামেরা সার্বক্ষণিক মুরগির চলাফেরা, খাদ্য-পানি গ্রহণ, ও ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ করে, আর এআই অ্যালগরিদম এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক আচরণ শনাক্ত করে। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে মুরগির শব্দ বিশ্লেষণ (অ্যাকোস্টিক মনিটরিং) করা যায়। মুরগি যদি ঠান্ডা লাগার কারণে গড়গড় শব্দ করে, তবে এআই অ্যালগরিদম সেই শব্দ শুনেই রোগ বা মানসিক চাপের পূর্বাভাস দিতে পারে। চলাফেরা কমে যাওয়া, একত্রে জড়ো হওয়া বা খাদ্যে অনীহার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সিস্টেম তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থাপককে মোবাইল অ্যাপ বা এসএমএসে সতর্ক করে। এর ফলে রোগ, হিট স্ট্রেস বা ভেন্টিলেশন সমস্যা দ্রুত ধরা পড়ে, সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া যায়, মৃত্যুহার কমে এবং খামার ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ ও বৈজ্ঞানিক হয়।ওজন, ইউনিফর্মিটি ও বৃদ্ধির হার নির্ণয়মুরগির ওজন ও বৃদ্ধির হার নির্ণয়ে এখন আর প্রতিটি মুরগিকে হাতে ধরে ওজন করার প্রয়োজন হয় না। আধুনিক খামারে থ্রি ডি ক্যামেরা, স্টেরিও ভিশন ক্যামেরা, কম্পিউটার ভিশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ আই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্পর্শ ছাড়াই গড় ওজন, ইউনিফর্মিটি, বৃদ্ধির হার, সিভি % নির্ণয় করা যায়।স্মার্ট ভেন্টিলেশন ও ক্লাইমেট কন্ট্রোল ;আধুনিক পোল্ট্রি খামারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ আই) ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এক্সজস্ট ফ্যান, কুলিং প্যাড, হিটার, ফগার, এয়ার ইনলেট, পর্দা/সাইড ওয়াল কার্টেইন পরিচালিত হয়। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন অনুযায়ী সিস্টেম নিজেই প্রয়োজনীয় সমন্বয় করে খামারের জন্য সর্বোত্তম পরিবেশ নিশ্চিত করে। ফলে হিট স্ট্রেস কমে, মুরগির মৃত্যুহার কমে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ে।ডিম উৎপাদন পর্যবেক্ষণ ও এআই-ভিত্তিক উৎপাদন বিশ্লেষণলেয়ার ও ব্রিডার খামারে এ আই -ভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিম উৎপাদন, ফাটা ও নোংরা ডিমের সংখ্যা, ডিমের ওজন এবং এগ বেল্ট-এর কার্যক্রম রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যায়। পাশাপাশি এ আই- মৃত্যুহার, খাদ্য ও পানি গ্রহণ,হ্যাচাবিলিটি,ফার্র্টিলিটি, এফ সি আর (ফিড কনভার্সন রেশিও), ও লাইভাবিলিটি (মুরগির বেঁচে থাকার হার) বিশ্লেষণ করে উৎপাদনের প্রবণতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করে। কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সিস্টেম তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা দেয়, ফলে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।বায়োসিকিউরিটি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাআধুনিক পোল্ট্রি খামারে রোগ প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বায়োসিকিউরিটিতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। আরএফআইডি কার্ড (রেডিও তরঙ্গভিত্তিক পরিচয়পত্র), ফেস রিকগনিশন (মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি), স্মার্ট সিসিটিভি, মোশন সেন্সর (গতিবিধি নির্ণায়ক সেন্সর), ভিজিটর ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (দর্শনার্থী পরিচালনা বা ট্র‍্যাকিং ব্যবস্থা), যানবাহন ট্র‍্যাকিং বা অবস্থান নজরদারি ব্যবস্থা প্রযুক্তির মাধ্যমে খামারে ব্যক্তি ও যানবাহনের প্রবেশ-নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এর ফলে অননুমোদিত প্রবেশ কমে, রোগজীবাণু বহিরাগত উৎস থেকে খামারে প্রবেশের ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং সামগ্রিক বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা আরও কার্যকর ও শক্তিশালী হয়।স্মার্ট রোবোটিক্সউন্নত পোল্ট্রি খামারে বর্তমানে ডিম সংগ্রহ, খামার পরিষ্কার, ফিড সরবরাহ, মৃত মুরগি শনাক্তকরণ এবং লিটার পর্যবেক্ষণের মতো কাজে ডিম সংগ্রহকারী রোবট, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নকারী রোবট, ফিড পুশিং রোবট (খাবার ঠেলে দেওয়ার রোবট), মৃত মুরগি শনাক্তকারী রোবট, লিটার মনিটরিং রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি শ্রমের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি খামার ব্যবস্থাপনাকে আরও দ্রুত, নির্ভুল ও দক্ষ করে তুলছে।সমন্বিত আইওটি ড্যাশবোর্ডস্মার্ট পোল্ট্রি খামারের সব সেন্সর ও ডিভাইস একটি সমন্বিত আইওটি ড্যাশবোর্ডের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এই ড্যাশবোর্ডে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, অ্যামোনিয়া , কার্বন ডাই-অক্সাইড , খাদ্য ও পানি গ্রহণ, দেহের ওজন, ডিম উৎপাদন, মৃত্যুহার, এফ সি আর , টিকাদান সূচি এবং ওষুধ ব্যবহারের তথ্য রিয়েল-টাইমে দেখা যায়। ফলে মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার থেকেই খামারের সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়।স্মার্ট পোল্ট্রি ফার্মিং কেবল একটি ট্রেন্ড বা ফ্যাশন নয়, এটি টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার একটি অন্যতম হাতিয়ার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ আই), আইওটি, কম্পিউটার ভিশন  ও স্মার্ট সেন্সর সমন্বয়ে পোলট্রি শিল্প দ্রুত একটি ডেটা-নির্ভর (তথ্য-ভিত্তিক / উপাত্ত-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ) শিল্পে রূপান্তরিত হচ্ছে।পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ, রোগ শনাক্তকরণ, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, ওজন নির্ণয়, ডিম উৎপাদন পর্যবেক্ষণ এবং উৎপাদন বিশ্লেষণ—সবকিছু এখন আরও নির্ভুল, দ্রুত ও বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে এই প্রযুক্তির ধীরে ধীরে বিস্তার উৎপাদন বৃদ্ধি, খরচ হ্রাস এবং টেকসই খামার ব্যবস্থাপনার নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। সরকারি অনুদান, সহজ শর্তে ঋণ এবং খামারিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে খুব দ্রুতই বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পোল্ট্রি শিল্পে এক অভূতপূর্ব রূপান্তর ঘটবে।[লেখক: সিনিয়র ম্যানেজার, প্যারাগন গ্রুপ]

জ্ঞানেশ বিতর্কে মমতা–সিপিএম সখ্য, বদলাচ্ছে কি রাজনীতির অঙ্ক?

নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্কে উত্তাল জাতীয় রাজনীতি। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধীরা যখন একজোট হওয়ার চেষ্টা করছে, তখন বাংলার রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে এক নতুন আলোচনার বিষয়। যে সিপিএমের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন গড়ে তুলে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই দলের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির সঙ্গে এবার সরাসরি টেলিফোনে কথা বললেন তৃণমূল নেত্রী।শুধু তাই নয়, আগামী সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তাঁকে জানিয়েছেন বলে সূত্রের খবর। ফলে প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিরোধীদের আন্দোলন কি বাংলার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিকে জাতীয় স্তরে আরও কাছাকাছি আনছে?তবে এই যোগাযোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে গেলে বাংলার ইতিহাসের দিকে তাকানো জরুরি। ১৯৭৭ সাল থেকে টানা ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। সেই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল সিপিএম-বিরোধী আন্দোলন।দীর্ঘদিনের সেই রাজনৈতিক সংঘাত বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূল ও সিপিএমকে দুই বিপরীত মেরুতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বাংলায় তৃণমূল ও সিপিএমের রাজনৈতিক সংঘাতের উপর এর কোনও প্রভাব পড়বে কি না। আপাতত তেমন কোনও সমঝোতার ইঙ্গিত নেই। রাজ্যে দুই দলই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছে। সিপিএমের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগাযোগকে তাই এখনই নতুন রাজনৈতিক জোটের সূচনা বলা যায় না।তবে জাতীয় রাজনীতির সমীকরণে এই যোগাযোগ একটি নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। যে নেত্রী একসময় বাংলায় বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটানোর আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনিই এখন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সিপিএমের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয়ের পথে হাঁটছেন।রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রয়োজনে বিরোধী দলগুলির মধ্যে যোগাযোগ কতটা বাড়তে পারে, এই ঘটনা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন এই সান্নিধ্য কি কেবল নির্বাচন কমিশন বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধী ঐক্যের বৃহত্তর সমীকরণ তৈরির পথ খুলে দেবে।

শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও মুক্তচিন্তার শিক্ষাঙ্গন

শিক্ষককে হতে হয় জ্ঞানের বাহক, বিবেক জাগ্রত করার সহযাত্রী এবং মানুষ গড়ার কারিগর; কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচারক নয়। প্রকৃতপক্ষে একজন শিক্ষক কেবল একজন পেশাজীবী নন; তিনি একটি সভ্যতার ধারক ও বাহক। একটি প্রজন্ম তার শিক্ষকদের কাছ থেকে শুধু পাঠ্যবিষয়ের জ্ঞানই অর্জন করে না; তাদের কাছ থেকেই শেখে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে ভিন্নমতকে সম্মান করতে হয়, কীভাবে যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয় এবং কীভাবে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়াতে হয়। তাই একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত আচার-আচরণ, মূল্যবোধ, বৌদ্ধিক সততা ও পেশাগত নৈতিকতা শিক্ষার্থীদের ওপর পাঠ্যপুস্তকের চেয়েও অনেক গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষকের কাজ শিক্ষার্থীদের নিজের মতো করে গড়ে তোলা নয়; বরং তাদের নিজেদের মতো করে ভাবতে, বিচার করতে এবং নিজেদের বোধ ও বিবেকের আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে শেখানো।এই কারণেই শিক্ষকতার সঙ্গে সরাসরি রাজনীতি ও ক্ষমতার সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। শিক্ষক যখন নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানকে শিক্ষার্থীর স্বাধীন চিন্তার বিকাশে ব্যবহার করেন, তখন তিনি প্রকৃত অর্থে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু যখন সেই অবস্থান কোনো নির্দিষ্ট দল, মতাদর্শ বা গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত হয়, তখন শিক্ষকতার নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। শ্রেণিকক্ষ তখন আর মুক্ত সংলাপ ও অনুসন্ধানের জায়গা থাকে না; তা হয়ে উঠতে পারে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব ও প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র। অথচ শিক্ষার্থীর মনে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়। বরং তাকে এমন বৌদ্ধিক সক্ষমতা দেওয়া শিক্ষার উদ্দেশ্য, যার মাধ্যমে সে বিভিন্ন মত ও তথ্য-উপাত্ত বিচার-বিশ্লেষণ করে নিজের অবস্থান নিজেই নির্ধারণ করতে পারে।মার্কিন দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ জন ডিউই (১৮৫৯ু১৯৫২) শিক্ষা ও গণতন্ত্রের সম্পর্ককে অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর চিন্তায় শিক্ষা ছিল গণতান্ত্রিক জীবনচর্চার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কারণ গণতন্ত্র কেবল ভোট দেওয়ার একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়। এটি এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে মানুষ ভিন্নমত প্রকাশ করে, অন্যের মত শোনে, যুক্তি ও অভিজ্ঞতার আলোকে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে এবং সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়। এই সংস্কৃতি গড়ে ওঠার প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য প্রয়োজন এমন শিক্ষক, যিনি চিন্তার স্বাধীনতাকে উৎসাহিত করবেন, মতের বৈচিত্র‍্যকে সম্মান করবেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তিবোধ, অনুসন্ধিৎসা ও সমালোচনামূলক চিন্তার সক্ষমতা বিকশিত করতে সহায়তা করবেন। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে সব বিষয়ে একমত হবেন এমন কোনো প্রয়োজন নেই। বরং শিক্ষার্থীর সঙ্গে মতভেদ থাকার মধ্য দিয়েও কীভাবে সম্মানজনক ও যুক্তিনির্ভর সংলাপ করা যায়, সেটিই তিনি শেখাবেন। তিনি শিক্ষার্থীকে বলবেন না কোন মতটি গ্রহণ করতে হবে; বরং শেখাবেন কীভাবে কোনো মতের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ খুঁজতে হয়, কীভাবে যুক্তির শক্তি ও দুর্বলতা শনাক্ত করতে হয় এবং কীভাবে নিজের পূর্বধারণাকেও প্রশ্ন করতে হয়। এই বৌদ্ধিক স্বাধীনতাই একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতে কেবল দক্ষ পেশাজীবী নয়, একজন বিবেকবান ও দায়িত্বশীল নাগরিকে পরিণত করে।কিন্তু শিক্ষক যখন নিজেই দলীয় বিভাজনের সক্রিয় অংশ হয়ে ওঠেন এবং নিজের রাজনৈতিক পরিচয়কে পেশাগত পরিচয়ের ওপর প্রাধান্য দেন, তখন তিনি সচেতন বা অচেতনভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সেই বিভাজনের বীজ বপন করেন। বিশেষত শিক্ষক যদি মূল্যায়ন, আচরণ, সুযোগ প্রদান কিংবা দৈনন্দিন একাডেমিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত পরিচয়কে বিবেচনার মধ্যে আনেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের কাছে একটি বিপজ্জনক বার্তা পৌঁছে যায়। আর সেটা হলো যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, যুক্তির চেয়ে আনুগত্য শক্তিশালী এবং সত্যের চেয়ে ক্ষমতার নৈকট্য অধিক মূল্যবান। এমন অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক বিকাশকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফল হলো শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে পরিচয়ভিত্তিক অবস্থান গ্রহণে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। কোনো বিষয়ে তথ্য ও যুক্তি যাচাই করার আগে তারা জানতে চায় কে বলেছে, কোন পক্ষ বলেছে বা কোন পরিচয়ের মানুষ বলেছে। অথচ জ্ঞানের জগতে কোনো বক্তব্যের সত্যতা বক্তার রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে নির্ধারিত হয় না; তা নির্ধারিত হয় তার প্রমাণ, যুক্তি, পদ্ধতি ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে। এই মৌলিক বোধটি হারিয়ে গেলে শিক্ষার্থী স্বাধীন চিন্তার অধিকারী না হয়ে গোষ্ঠীগত পরিচয়ের বাহকে পরিণত হয়। সুতরাং শিক্ষককে রাজনীতিবিমুখ হতে হবে এ কথা বলা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি প্রয়োজনীয়ও নয়। কারণ একজন শিক্ষকও সমাজের একজন সচেতন নাগরিক এবং তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মত থাকতেই পারে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষ, একাডেমিক মূল্যায়ন ও শিক্ষাদানকে দলীয় আনুগত্যের প্রভাবমুক্ত রাখা তাঁর পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্ব। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাসের স্বাধীনতা যেমন একজন শিক্ষকের অধিকার, তেমনি শিক্ষার্থীর স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষক যদি এই সীমারেখাটি সচেতনভাবে রক্ষা করতে পারেন, তাহলেই শিক্ষাঙ্গন রাজনৈতিক বিভাজনের ক্ষেত্র না হয়ে গণতান্ত্রিক নাগরিকত্ব, মুক্তবুদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চার প্রকৃত বিদ্যালয়ে পরিণত হতে পারে।গণতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা অপরিহার্য। কারণ তারাই ভবিষ্যতের নাগরিক, পেশাজীবী, নীতিনির্ধারক এবং নেতৃত্বের সম্ভাব্য ধারক। একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে কতটা সচেতন, যুক্তিনির্ভর, বাস্তববাদী এবং দায়িত্বশীল হয়ে উঠছে তার ওপর। তাই শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রের কাঠামো, সংবিধান, নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশ, অর্থনীতি, বৈষম্য, জননীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে জানার ও মতামত গঠনের সুযোগ থাকা জরুরি। শিক্ষার্থীরা যদি সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো নিয়ে চিন্তা না করে, তাহলে ভবিষ্যতের নাগরিক সমাজও দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে রাজনৈতিক সচেতনতা আর দলীয় সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক সচেতনতা মানুষকে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে জানতে, বিভিন্ন মত ও অবস্থানকে বুঝতে এবং নিজের বিবেক ও যুক্তির আলোকে মতামত গঠন করতে সাহায্য করে। পক্ষান্তরে দলীয় আনুগত্য অনেক সময় ব্যক্তির স্বাধীন বিচারবোধকে একটি নির্দিষ্ট সাংগঠনিক অবস্থানের অধীন করে ফেলে। একজন সচেতন শিক্ষার্থী একই সঙ্গে সরকারের কোনো নীতিকে সমর্থন করতে পারেন, আবার অন্য কোনো নীতির সমালোচনা করতে পারেন; কোনো রাজনৈতিক দলের একটি অবস্থানের সঙ্গে একমত হতে পারেন, আবার একই দলের অন্য কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও করতে পারেন। এই স্বাধীনতাই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সচেতনতার লক্ষণ। কারণ গণতন্ত্রে নাগরিকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর প্রতি নয়; মূল আনুগত্য হওয়া উচিত সংবিধান, আইন, ন্যায়, মানবিক মর্যাদা এবং জনকল্যাণের প্রতি।বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই পার্থক্যটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রচলিত ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করা, নতুন ধারণা পরীক্ষা করা এবং বিকল্প ভবিষ্যৎ কল্পনা করার সুযোগ থাকার কথা। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান কিংবা ইতিহাসের শিক্ষার্থী যদি বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন করতে না পারে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্য কেবল কতজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করল তার মধ্যে নিহিত নয়। বরং কতজন শিক্ষার্থী সেখানে এসে নিজের চিন্তার সীমা অতিক্রম করতে শিখল, প্রচলিত ধারণাকে যুক্তির আলোকে পরীক্ষা করল এবং নতুন প্রশ্ন উত্থাপনের সাহস অর্জিত করল তার মধ্যেই এর প্রকৃত সাফল্য নিহিত। কিন্তু যখন শিক্ষাজীবনের প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে দলীয় আনুগত্য, তখন শিক্ষার মূল লক্ষ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন শিক্ষার্থীর মেধা, কৌতূহল, গবেষণার আগ্রহ কিংবা একাডেমিক পরিচয়ের চেয়ে তার রাজনৈতিক পরিচয় অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিবেশে মতভিন্নতা আর স্বাভাবিক বৌদ্ধিক বৈচিত্র‍্য হিসেবে বিবেচিত হয় না; বরং তা অনেক সময় শত্রুতা বা বিশ্বাসঘাতকতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজের প্রকৃত মত প্রকাশের পরিবর্তে নিরাপদ অবস্থান গ্রহণ করতে শেখে; আচরণে সততা প্রদর্শণের পরিবর্তে দ্বিচারিতার আশ্রয় নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে তারা যুক্তির চেয়ে গোষ্ঠীর অবস্থান অনুসরণ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সংস্কৃতি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ক্ষতি করে না; সামাজিক জীবনসহ ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ও নাগরিক জীবনেও এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে।বিশ্ববিদ্যালয় তাই কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় হবে প্রশ্ন করার জায়গা, বিতর্ক করার জায়গা, গবেষণা করার জায়গা এবং ভিন্নমতের সঙ্গে যুক্তিনির্ভর সংলাপে মেতে ওঠার জায়গা। সেখানে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নেই; বরং সব মতকে জ্ঞানতাত্ত্বিক ও নৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি করার মতো পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী চাইলে রাজনীতি করবেন, রাজনৈতিক সংগঠনে যুক্ত হবেন, কোনো দলের সমর্থক হবেন এটি তাঁর নাগরিক স্বাধীনতার অংশ। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী যেন দলীয় পরিচয়ের কারণে একাডেমিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, আবার দলীয় পরিচয়ের কারণে অন্যায্য সুবিধাও না পান এই নীতিগত ভারসাম্য নিশ্চিত করাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, ছাত্রসংগঠন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং একাডেমিক প্রশাসনের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব যখন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিকল্প কাঠামো তৈরি করে, তখন শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষার্থী তখন স্বাধীন নাগরিক হওয়ার পরিবর্তে কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রের অনুসারী হয়ে ওঠার প্রলোভনে পড়ে। এর বিপরীতে আমাদের প্রয়োজন এমন এক উচ্চশিক্ষার সংস্কৃতি, যেখানে রাজনৈতিক মত থাকবে, কিন্তু দলীয় দাসত্ব থাকবে না; বিতর্ক থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না; মতাদর্শ থাকবে, কিন্তু মতের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে না; এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থাকবে, কিন্তু একাডেমিক উৎকর্ষ ও নাগরিক মর্যাদার বিনিময়ে নয়। অতএব, শিক্ষার্থীদের রাজনীতিমুক্ত করা নয়, বরং তাদের দলীয় আনুগত্যের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত রেখে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। কারণ গণতন্ত্রের জন্য আমাদের প্রয়োজন শুধু ভোটার নয়, বিবেকবান নাগরিক; শুধু কর্মী নয়, স্বাধীনচিন্তার মানুষ; শুধু অনুসারী নয়, প্রশ্ন করতে সক্ষম নেতৃত্ব। আর সেই নাগরিক ও নেতৃত্ব গড়ে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো আমাদের শিক্ষাঙ্গন।ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষ কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান অর্জন করবে না; বরং প্রকৃতির সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে এবং সর্বোপরি মানবতার সঙ্গে তার একটি গভীর ও সৃজনশীল সম্পর্ক গড়ে উঠবে। তাঁর শিক্ষাভাবনার কেন্দ্রে ছিল মানুষের সামগ্রিক বিকাশ তথা শরীর, মন, বুদ্ধি, নন্দনবোধ, সৃজনশীলতা ও নৈতিক চেতনার সমন্বিত বিকাশ। এই আদর্শকে বাস্তবে পরীক্ষা ও প্রয়োগ করার উদ্দেশ্যেই তিনি শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে তিনি এমন একটি শিক্ষাপরিবেশ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যেখানে প্রকৃতি হবে শিক্ষার সহচর, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হবে মানবিক ও সংলাপভিত্তিক এবং জ্ঞান হবে জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কোনো যান্ত্রিক কারখানায় পরিণত করতে চাননি, যেখানে একই ছাঁচে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে তৈরি করা হবে। তাঁর কাছে প্রত্যেক মানুষ ছিল স্বতন্ত্র সম্ভাবনার অধিকারী। তাই শিক্ষার কাজ হলো সেই সম্ভাবনাকে আবিষ্কার ও বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টি করা; একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে মানুষকে ঢেলে দেওয়া নয়। তিনি শিক্ষার মধ্যে আনন্দ, সৌন্দর্য, কৌতূহল, সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতার অবকাশ রাখতে চেয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষাদর্শের এই মানবিক দিকটি আজও আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক; বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন পরীক্ষার ফল, সনদ, চাকরির প্রতিযোগিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের চাপ শিক্ষার বৃহত্তর মানবিক উদ্দেশ্যকে অনেক সময় আড়াল করে ফেলে।রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষা মানে ছিল মুক্তি। সেই মুক্তি শুধু অজ্ঞতা থেকে মুক্তি নয়, সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি; শুধু অশিক্ষা থেকে মুক্তি নয়, ভয় থেকে মুক্তি; শুধু কুসংস্কার থেকে মুক্তি নয়, অন্ধ আনুগত্য থেকেও মুক্তি। তাঁর শিক্ষাভাবনার গভীরে ছিল মানুষের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন সত্তার বিকাশ। তিনি এমন মানুষ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যে নিজের চোখে পৃথিবীকে দেখতে পারে, নিজের বুদ্ধিতে বিচার করতে পারে এবং নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে পারে। তাই তাঁর শিক্ষাদর্শের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল একটি বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাঠামোয় নয়; বরং মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার প্রতি তাঁর গভীর আস্থায় নিহিত। আজকের বাংলাদেশের শিক্ষা-আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের এই মুক্তির দর্শনকে নতুন করে স্মরণ করা প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমন হতে হবে, যা শিক্ষার্থীকে কেবল পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য প্রস্তুত করবে না; বরং তাকে জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বোঝার এবং প্রয়োজন হলে প্রচলিত বাস্তবতাকে প্রশ্ন করার সক্ষমতা দেবে। তাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে ভিন্নমতকে ভয় না পায়, যুক্তিকে অবজ্ঞা না করে, ক্ষমতার সামনে অন্ধভাবে নত না হয় এবং নিজের বিবেককে কোনো দলীয় বা গোষ্ঠীগত আনুগত্যের কাছে সমর্পণ না করে। একই সঙ্গে তাকে নিজের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করবে, আবার সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা গোষ্ঠীগত বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর মানবিকতার বোধও জাগ্রত করবে।কাজী নজরুল ইসলামও (১৮৯৯ু১৯৭৬) শিক্ষাকে কেবল জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেননি।  তিনি শিক্ষাকে মানুষের মুক্তি, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর সাহিত্য, প্রবন্ধ, বক্তৃতা ও সামগ্রিক জীবনদর্শনের গভীরে ছিল মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তিনি এমন এক শিক্ষার পক্ষে ছিলেন, যা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখাবে, বৈষম্যের শৃঙ্খল ভাঙতে সাহস দেবে এবং নিজস্ব চিন্তা ও বিবেকের আলোয় সত্যকে অনুসন্ধান করার শক্তি জোগাবে। নজরুলের কাছে মানুষই ছিল সর্বোচ্চ মূল্যবোধ। ধর্ম, বর্ণ, জাতি কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভাজন তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই তাঁর শিক্ষাভাবনার কেন্দ্রে ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুক্তচিন্তার বিকাশ। তিনি এমন শিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ নয়, সহমর্মিতা সৃষ্টি করবে; বিভাজন নয়, সংহতি গড়ে তুলবে; অন্ধ আনুগত্য নয়, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করবে। নজরুল বারবার মানুষকে শৃঙ্খলমুক্ত হওয়ার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বিদ্রোহ ছিল কেবল রাজনৈতিক শাসনের বিরুদ্ধে নয়; অজ্ঞতা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, সামাজিক অবিচার এবং চিন্তার দাসত্বের বিরুদ্ধেও। এই অর্থে তাঁর শিক্ষাদর্শ ছিল গভীরভাবে মুক্তিকামী। তিনি এমন মানুষ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যে অন্যায়ের সামনে নীরব থাকবে না, ক্ষমতার ভয়কে সত্যের উপরে স্থান দেবে না এবং মানুষের মর্যাদাকে সব ধরনের সংকীর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মূল্যায়ন করবে।আজকের বাংলাদেশে, যেখানে কখনো কখনো মতভেদকে বিরোধিতা হিসেবে এবং প্রশ্ন করাকে অবাধ্যতা হিসেবে দেখা হয়, সেখানে নজরুলের এই মুক্তচেতা মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষা যদি সত্যিই মানুষের ভেতরে সাহস, সহনশীলতা, ন্যায়বোধ ও মানবিক সংবেদনশীলতা জাগিয়ে তুলতে না পারে, তবে তা কেবল তথ্য ও দক্ষতা অর্জনের একটি সীমিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়; মানুষের প্রকৃত বিকাশের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে না। এই কারণেই আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য কেবল ‘শিক্ষিত’ মানুষ তৈরি করা নয়; বরং আলোকিত, মানবিক, যুক্তিবাদী, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। জাতীয় উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য দক্ষ জনশক্তি অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে যদি নৈতিকতা, মানবিকতা, মুক্তবুদ্ধি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় না ঘটে, তাহলে সেই দক্ষতা কখনোই একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। শিক্ষা তখন কেবল কর্মসংস্থানের উপকরণ হয়ে ওঠে; মানুষ গড়ার শক্তি হয়ে উঠতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের অন্তর্গত সম্ভাবনার বিকাশের কথা; নজরুল আমাদের শিখিয়েছেন সেই মানুষকে অন্যায় ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে দাঁড়াতে হবে। একজন শিক্ষা দিয়েছেন স্বাধীন চিন্তার সৌন্দর্য, অন্যজন শিখিয়েছেন স্বাধীন চিন্তার সাহস। একজন দেখিয়েছেন মানবিক বিকাশের পথ, অন্যজন দেখিয়েছেন মানবিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা যদি এই দুই মহান মনীষীর মানবিক ও মুক্তিকামী দর্শন থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তাহলে শিক্ষা সত্যিকার অর্থেই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক রূপান্তরের শক্তিতে পরিণত হতে পারে।আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা হয়ে উঠুক মানুষের মানবিক উৎকর্ষ, মুক্তবুদ্ধির বিকাশ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সেই জীয়নকাঠি, যে শিক্ষা মানুষকে কেবল জীবিকা অর্জনের যোগ্য করে তুলবে না; তাকে নিজের বিবেকের কাছে স্বাধীন, সত্যের কাছে সৎ, সমাজের কাছে দায়িত্বশীল এবং মানবতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলবে। যে শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাবে, আবার শুনতেও শেখাবে; নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবে, আবার অন্যের অধিকারকে সম্মান করতেও উদ্বুদ্ধ করবে; নিজের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি গর্ববোধ জাগাবে, আবার বিশ্বমানবতার বৃহত্তর পরিসরের সঙ্গেও তাকে যুক্ত করবে। এমন শিক্ষাই পারে মুক্তচিন্তার শিক্ষাঙ্গন নির্মাণ করতে; এমন শিক্ষাই পারে একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করতে। আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য তাই কেবল ‘শিক্ষিত’ মানুষ তৈরি করা নয়; বরং আলোকিত, মানবিক, যুক্তিবাদী, সৃজনশীল, প্রতিবাদী ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য দক্ষ জনশক্তি অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে যদি নৈতিকতা, মানবিকতা, মুক্তবুদ্ধি, সৎসাহস ও নাগরিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় না ঘটে, তাহলে সেই দক্ষতা কখনোই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তাই আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা হয়ে উঠুক মানুষের মানবিক উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে মুক্তির সেই জীয়নকাঠি যে শিক্ষা মানুষকে কেবল জীবিকা অর্জনের যোগ্য করে তুলবে না, তাকে নিজের বিবেকের কাছে স্বাধীন, সমাজের কাছে দায়িত্বশীল এবং সত্যের কাছে সৎ মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

ভিডিও আরও দেখুন

লড়াই ছাড়াই সেমিফাইনালের টিকিট ভারতের

এশিয়ান গেমস ক্রিকেটে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠেই নামতে হয়নি ভারতকে। টানা বর্ষণ ও অনুপযুক্ত আউটফিল্ডের কারণে নির্ধারিত সময়ের ১৬ মিনিট আগেই ম্যাচটি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান আম্পায়ারেরা। ফলে কোনো বল মাঠে না গড়িয়েই সেমিফাইনালে পৌঁছে গেল ভারত। পক্ষান্তরে কোয়ার্টার ফাইনালেই স্বপ্নভঙ্গ হলো আফগানিস্তানের।জাপানের নিশিনেতে সোমবার ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার সূচি ছিল। তবে আবহাওয়ার কোনো উন্নতি না হওয়ায় টস করাও সম্ভব হয়নি।এশিয়ান গেমসের নিয়ম অনুযায়ী, ম্যাচ পরিত্যক্ত হলে আইসিসি টি-টোয়েন্টি র‍্যাঙ্কিংয়ে সিডিংয়ের ভিত্তিতে এগিয়ে থাকা দল পরবর্তী রাউন্ডে উন্নীত হয়। সেই সুবিধায় সেরা চারে জায়গা নিশ্চিত করে ভারত। উল্লেখ্য, টুর্নামেন্টের র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী শীর্ষ চার দল–ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার সুযোগ পায়।সেমিফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হবে নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার চতুর্থ কোয়ার্টার ফাইনালের বিজয়ী দল। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সেই ম্যাচটিও যদি বৃষ্টির পেটে যায়, তবে র‍্যাঙ্কিংয়ের মারপ্যাঁচে সেমিফাইনালে চলে যাবে শ্রীলঙ্কা।এর আগে টুর্নামেন্টের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে পাকিস্তান ও হংকংয়ের ম্যাচটিও একই কারণে টস ছাড়া পরিত্যক্ত হয়। ফলে র‍্যাঙ্কিংয়ের সুবিধায় সেমিফাইনালে পৌঁছে যায় পাকিস্তান।আফগানদের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে বৃষ্টিতে কপাল পোড়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। টানা দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়ান গেমসে এই দুই দলের লড়াই বৃষ্টির কারণে ভেস্তে গেল। এর আগে ২০২৩ সালের হাংঝৌ এশিয়ান গেমসের ফাইনালেও একই পরিণতি দেখেছিল দল দুটি।সেবার ফাইনালে আফগানিস্তানের ইনিংসের ১৮.২ ওভারের মাথায় বৃষ্টি নামলে আর খেলা শুরু করা যায়নি। ফলে উচ্চতর সিডিংয়ের সুবিধায় ভারতকে স্বর্ণপদক বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল এবং আফগানিস্তানকে রৌপ্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়।দুই বছর পর পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের বার ফাইনাল হলেও এবার কোয়ার্টার ফাইনালেই বৃষ্টির বাঁধায় বিদায় নিতে হলো আফগানদের। আর কোনো লড়াই ছাড়াই সেমিফাইনালের টিকিট পেয়ে গেল ভারত।\ 

লড়াই ছাড়াই সেমিফাইনালের টিকিট ভারতের