নদীভাঙনে বিলীন জনপদ: বিষখালী থেকে তিস্তা
বাংলাদেশের ইতিহাসের শুরু নদী দিয়ে, সভ্যতার উন্মেষ নদীকে ঘিরে, আর বাঙালির জীবনযাত্রার প্রতিটি অধ্যায়ে জড়িয়ে আছে নদীর অমলিন ছোঁয়া। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, বিষখালী, কীর্তনখোলা কিংবা পায়রা এই নদীগুলো শুধু জলধারা নয়; তারা আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, সাহিত্য ও জনপদের প্রাণস্পন্দন। শত শত বছর ধরে এই নদীগুলোর বুকে ভেসে এসেছে জীবনের গান, আবার তাদের উন্মত্ত স্রোতে হারিয়ে গেছে অসংখ্য বসতি, অগণিত মানুষের স্বপ্ন আর প্রজন্মের স্মৃতি। নদী যখন হাসে, তখন বাংলার মাঠে সোনালি ধান দোলে; নদী যখন রুদ্ররূপ ধারণ করে, তখন নিঃস্ব হয়ে যায় হাজারো পরিবার। বিষখালী থেকে তিস্তা, পদ্মা থেকে ব্রহ্মপুত্র দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত একই দীর্ঘশ্বাস, একই আর্তনাদ। নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যায় শত বছরের বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির, পূর্বপুরুষের কবর আর মানুষের শেকড়। ভাঙনের যন্ত্রণা কেবল মাটি হারানোর নয়, এটি অস্তিত্ব হারানোর বেদনা; এটি স্মৃতি, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ হারানোর নাম। বিষখালীর বুকে হারিয়ে যাওয়া ভবানীপুর বাজার: ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার নাচনমহল ইউনিয়নের ভবানীপুর বাজার একসময় ছিল শত বছরের প্রাণকেন্দ্র। দুই শতাধিক দোকানের কোলাহল আর মানুষের জীবিকার স্পন্দনে মুখর সেই বাজার আজ বিষখালীর গর্ভে বিলীন। পুরোনো বাজার হারিয়ে এক কিলোমিটার দূরে নতুন বাজার গড়ে উঠেছে। কিন্তু নতুন বাজারের অধিকাংশ মানুষই নদীভাঙনের শিকার। তাদের জীবনের গল্প যেন একই বাড়ি নেই, জমি নেই, আছে শুধু বেঁচে থাকার সংগ্রাম। চাঁদপুরা গ্রামের হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্ব: ভবানীপুরের পাশের চাঁদপুরা গ্রাম আজ শুধু স্মৃতির নাম। যেখানে ছিল ধান খেত, নারকেল-সুপারির বাগান, সেখানে আজ নদীর জল। ভাঙনের শিকার মানুষগুলো বাঁধের ওপর টিনের ঘরে জীবন কাটাচ্ছেন। মানুষ ও গবাদিপশু একই ছাদের নিচে রাত কাটাচ্ছে। এই চিত্র শুধু চাঁদপুরের নয়; বাংলাদেশের হাজারো গ্রামের। ভাঙনের সঙ্গে হারিয়ে যায় স্মৃতি ও শেকড়: নদীভাঙন শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস করে না, ধ্বংস করে মানুষের আবেগ ও সামাজিক বন্ধন। বহু মানুষ পূর্বপুরুষের কবর রক্ষার চেষ্টা করেন, কিন্তু নদীর কাছে সবকিছুই অসহায়। প্রতিবেশীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আত্মীয়রা ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। হারিয়ে যায় সামাজিক পরিচয় ও শেকড়। পদ্মা থেকে তিস্তা: একই বেদনার গল্প: শরীয়তপুর, মাদারীপুর, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট কিংবা নীলফামারী সবখানেই নদীভাঙনের একই চিত্র। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ৮,৭০০ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয় এবং প্রায় দুই লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাস্তুচ্যুত মানুষের নতুন জীবন: যাদের সামর্থ্য আছে, তারা নতুন জায়গায় ঘর তোলেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ আশ্রয় নেন বাঁধের ওপর কিংবা অন্যের জমিতে। কৃষক হয়ে যান দিনমজুর, ব্যবসায়ী হয়ে যান রিকশাচালক, শিক্ষিত মানুষ হয়ে পড়েন বেকার। নদীভাঙন শুধু ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরেরও নাম। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশুরা: নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলোতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় নারী ও শিশুরা। বিদ্যালয় হারিয়ে শিশুরা শিক্ষার বাইরে চলে যায়। অনেক মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। আশ্রয়হীন নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে একটি প্রজন্ম ঝুঁকির মুখে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তন সংকটকে আরও গভীর করছেবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীর প্রবাহ ও চরিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অতিবৃষ্টি, অনিয়মিত বন্যা ও পলি জমার কারণে ভাঙনের মাত্রা বাড়ছে। ফলে নদীভাঙন এখন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি জলবায়ুজনিত মানবিক সংকট। পুনর্বাসনের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা: বাংলাদেশে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নদীভাঙনের শিকার অনেক পরিবারও এই কর্মসূচির মাধ্যমে উপকৃত হয়েছে। যদিও এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবু এটি একটি ইতিবাচক ভিত্তি ˆতরি করেছে। নদীশাসনে চলমান উদ্যোগ: বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভিন্ন অঞ্চলে নদীতীর সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ ও ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। রাজশাহীতে পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও নদীতীর রক্ষা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে। জনমুখী নেতৃত্বের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা :দেশের মানুষের প্রত্যাশা, বর্তমান জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে নদীভাঙনকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখা হবে। উন্নয়ন শুধু সেতু, সড়ক ও ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থেকে নদীভাঙা মানুষের পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনর্গঠনের দিকেও সমান গুরুত্ব পাবে এমন প্রত্যাশা আজ সাধারণ মানুষের। শিক্ষাবিদের দৃষ্টিতে নদীভাঙন: মানবিক ও বৈজ্ঞানিক সমাধানের আহ্বান: পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান মনে করেন, নদীভাঙন কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটের সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। তার ভাষায়, ‘নদীভাঙনের ফলে মানুষ শুধু জমি বা ঘরবাড়ি হারায় না, হারিয়ে ফেলে তার শেকড়, স্মৃতি, সামাজিক পরিচয় ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক নদীশাসন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য মানবিক পুনর্বাসন ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে নদীর গতিপ্রকৃতি, পলি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণ নিয়ে সমন্বিত গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্র, স্থানীয় প্রশাসন, গবেষক সমাজ ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই নদীভাঙনের ক্ষতি কমিয়ে একটি নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, নদী আমাদের সভ্যতার উৎস; তাই নদীকে শত্রু নয়, বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পদ হিসেবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি নদীভাঙনের শিকার মানুষদের পুনর্বাসনকে মানবিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা : ভারতের আসাম ও বিহার, নেপাল কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নদীভাঙন ও বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি রয়েছে। বাংলাদেশেও স্থানীয় সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সমš^য়ে স্থায়ী সমাধান গড়ে তোলা সম্ভব। প্রয়োজন জাতীয় নদীভাঙন নীতি: নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তথ্যভান্ডার ˆতরি, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় নীতি প্রণয়ন জরুরি। নদীভাঙাকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় অংশে নিয়ে আসতে হবে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন মানুষ বাঁচে : হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প তখনই অর্থবহ হবে, যখন ভিটেমাটি হারানো মানুষের মুখে হাসি ফিরবে। নদীভাঙা মানুষের জন্য জমি, ঘর, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হতে পারে মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয়। বাংলার নদীগুলো আমাদের জীবন দিয়েছে, সভ্যতা দিয়েছে, দিয়েছে শস্য-শ্যামল এই ভূখণ্ডের অফুরন্ত প্রাচুর্য। অথচ আজ সেই নদীর বুকেই ভেসে বেড়ায় অসংখ্য মানুষের দীর্ঘশ্বাস। বিষখালীর পাড়ে হারিয়ে যাওয়া ভবানীপুর বাজার, চাঁদপুরার বিলীন স্মৃতি কিংবা তিস্তার তীরে আশ্রয়হীন মানুষের অশ্রু এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের নীরব বেদনার প্রতিচ্ছবি। নদীভাঙনের শিকার মানুষ কোনো পরিসংখ্যান নয়, তারা এ দেশের কৃষক, জেলে, শিক্ষক, শ্রমিক, মা-বাবা ও সন্তান তারা আমাদেরই মানুষ। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল পৌঁছে যায় নদীর পাড়ে বসবাসকারী সর্বস্ব হারানো মানুষটির কাছেও। তাই সময়ের দাবি, নদীভাঙনকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে বিজ্ঞানভিত্তিক নদীশাসন, টেকসই পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনর্গঠনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মুখে আবারও হাসি ফিরিয়ে আনা। দেশের মানুষের প্রত্যাশা, জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে মানবিক ও জনমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার অঙ্গীকারের ধারাবাহিকতায় নদীভাঙা মানুষের জীবন-সংগ্রাম নতুন গুরুত্ব পাবে এবং বিষখালী থেকে তিস্তা পর্যন্ত প্রতিটি জনপদ ফিরে পাবে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন। কারণ নদীর কান্না থামানো মানেই মানুষের কান্না থামানো, আর সেই দায়িত্ব পালনেই নির্মিত হবে আরও সমৃদ্ধ, মানবিক ও স্বপ্নময় বাংলাদেশ। [লেখক: প্রশিক্ষক, গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বরিশাল]