সংবাদ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে যেসব অভিযোগ তুললেন হাসনাত আব্দুল্লাহ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে যেসব অভিযোগ তুললেন হাসনাত আব্দুল্লাহ

বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে নিয়ে বিস্তর অভিযোগ তুলেছেন কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক মো. আবুল হাসনাত (হাসনাত আব্দুল্লাহ)। শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে তিনি এসব অভিযোগ তুলেন।একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা থেকে মন্ত্রী হওয়ার দীর্ঘ যাত্রায় তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামে থাকা কোটি টাকার দুর্নীতি মামলা থেকে শুরু করে গুলশানের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট এবং বিপুল পরিমাণ বেনামি সম্পদের উৎস নিয়ে নানা অভিযোগ তুলে ধরেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ।দুর্নীতির বিরুদ্ধে বর্তমান প্রশাসনের দ্বিমুখী নীতি ও ভিন্নমতের ওপর ব্যাংক হিসাব তলবের সংস্কৃতির সমালোচনা করে হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—রাষ্ট্রের প্রকৃত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে মন্ত্রী-এমপিদের পাশাপাশি তাদের নিকটাত্মীয়দের সম্পদের হিসাবও বছরওয়ারি প্রকাশ করা হোক। আর যার শুরুটা হতে পারে তার নিজের হিসাব তলব দিয়েই।ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আব্দুল্লাহ লেখেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে ১ কোটি টাকা ঘুস নেওয়ার অভিযোগে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতি মামলায় ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মীর আকতার হোসেন লিমিটেড’-এর মালিক মীর জহির হোসেনের কাছ থেকে ১ কোটি টাকা ঘুস নেওয়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০০৭ সালের মে মাসে ধানমন্ডি থানায় এই মামলাটি দায়ের করেছিল।”এনসিপি নেতা আরও লেখেন, “৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১ কোটি টাকা জরিমানাও করা হয়েছিল। জরিমানার টাকা অনাদায়ে আরও ১ বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ঘুসের ১ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করার আদেশও দেওয়া হয়েছিল।”২০০৮ সালে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আরেকটি দুর্নীতি মামলায় ১৩ বছরের সাজা হয়েছিল- উল্লেখ করে হাসনাত আব্দুল্লাহ লেখেন, “অবৈধভাবে ৪ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ১০ বছরের ও ৩ বছরের সাজা মিলিয়ে ১৩ বছর হয়েছিল। এ ছাড়া চকরিয়ায় মাছের ঘের দখলের দুটি মামলাও ছিল সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে। এই দুই মামলা থেকেও তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খালাস পান।”হাসনাত আব্দুল্লাহ বিএনপির দিকে আঙ্গুল তুলে আরও লেখেন, “এখন বিএনপির সময়ে দুদকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হচ্ছে। সেটির অংশ হিসেবে বিএফইউআইয়ের মাধ্যমে সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব চাওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র যে কারো ব্যাংক হিসাব চাইতেই পারে। কিন্তু বিষয়টি তখন উদ্বেগজনক হয়, যখন সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললে ব্যাংক হিসাব তলব করা হচ্ছে। যদি রাষ্ট্রীয় কল্যাণের জন্যই ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়, তাহলে প্রত্যেক এমপি-মন্ত্রীর ব্যাংক হিসাবও তলব করা হোক।”প্রায় ২০ বছর আগে সালাহউদ্দিন আহমদ গুলশানের অন্যতম দামি ও বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স ‘প্লাটিনাম রেসিডেন্স’-এ একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের মালিক হয়েছেন বলে উল্লেখ করে এনসিপি নেতা হাসনাত লেখেন, “গুলশানে তার একাধিক বাড়ি ও সম্পদ রয়েছে বলেও আলোচনা রয়েছে। সাজার কারণে সালাহউদ্দিন আহমদ ২০০৮ সালে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ অংশ নেন। নির্বাচনী হলফনামা অনুসারে, ২০০৮ সালে সালাহউদ্দিন-হাসিনা দম্পতির মোট সম্পদ ছিল ৬.৩ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে তা ১২.৭ কোটি এবং ২০২৫ সালে ৩০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।”হাসনাত আব্দুল্লাহ বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পদের উৎস সম্পর্কে কৌতুহল প্রকাশ করে লেখেন, “এত সম্পদের উৎস কী? সালাহউদ্দিন আহমদ ‘৮৫ বিসিএস ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় ১৯৯৬ সালে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে ব্যবসা করার সুযোগ তার ছিল না। ১৯৯৬ সালে সিনিয়র সহকারী সচিব পদ থেকে যখন তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন, তখন মাসে বেতন-ভাতা মিলিয়ে বড়জোর ৬ হাজার টাকা পেতেন। মূল্যস্ফীতি হিসাবে যা বর্তমান বাজারের ৪০ হাজার টাকার চেয়েও কম সমান। আজ থেকে ২০ বছর আগেও গুলশানে ফ্ল্যাটের দাম ছিল কমপক্ষে সাড়ে ৩ হাজার টাকা বর্গফুট। ৩ হাজার বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম ছিল ওই সময়েই কোটি টাকা। ৬ হাজার টাকা বেতনের সরকারি কর্মকর্তা কি কোটি টাকার ফ্ল্যাট কিনতে পারেন?”কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আরও লেখেন, “২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রী পদে থাকায় ব্যবসা করার অধিকার সালাহউদ্দিন আহমদের ছিল না। পরের দুই বছর কারাগারে ছিলেন। এরপর বিএনপি ছিল বিরোধী দলে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিএনপি ছিল বিরোধী দলে। চাকরি থেকে রাজনীতিতে এসে সেই সময়ে সংসদ সদস্য হওয়া সালাহউদ্দিন, এই সময়ে কী ব্যবসা করলেন যে প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পরের কয়েক বছরে গুলশানে সম্পদের মালিক হয়ে গেলেন!”বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়ে এনসিপি নেতা আরও লেখেন, “শুধু দেশেই নয়, তার সন্তানদেরও পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোতে পড়াশোনা করিয়েছেন বলে জানা যায়। দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশে উচ্চশিক্ষার পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, সেই অর্থের উৎস কী ছিল? এই সম্পদের কতটা আয়, কতটা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া, কতটা বিনিয়োগ বা অন্য কোনো উৎস থেকে এসেছে—তার কি স্বচ্ছ ব্যাখ্যা রয়েছে? আর সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনার জন্য এত বিপুল অর্থ কীভাবে বৈধভাবে বিদেশে পাঠানো হয়েছে?”প্রশ্ন তুলে হাসনাত আব্দুল্লাহ আরও লেখেন, “একজন সরকারি কর্মকর্তা থেকে এমপি ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তার ঘোষিত আয়, সম্পদ বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য আছে কি না—সেটিও জনস্বার্থে খতিয়ে দেখা জরুরি।”সবশেষে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ লেখেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এই বিপুল সম্পদের প্রকৃত উৎস কী এবং তার পক্ষে কি স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য হিসাব রয়েছে? সুতরাং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত এমপি-মন্ত্রীদের নিকটাত্মীয় ও আত্মীয়স্বজনদের ব্যাংক হিসাবও প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় স্বার্থে তলব করা হোক। আমাকে দিয়েই তা শুরু হোক। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দায়িত্ব গ্রহণের আগে ও পরের সম্পদের হিসাব তারা নিজেরাই প্রকাশ করে গেছেন। দেখি, সরকারি এসব প্রতিষ্ঠান সেই সৎ সাহস দেখাতে পারে কি না!”
৯ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

রম্যগদ্য: “কুলি কলঙ্কিনির কোলাকুলি...”

এইটা আবার কি বলচেন যে, কলঙ্কিনি তো কুলিকেও কলঙ্কিত করবে, তায়লে ওরা আবার কোলাকুলি করে কি প্রকারে! এমুন তাজ্জাবের কতাতো আমার বাপ দাদার চৌদ্দগুষ্টিও শোনেনি যে!তোর বাপ দাদা চৌদ্দ্গুষ্টি কী শুনেছেন তা আমি জানি না। তবে এইটুকু জানি যে বর্তমানে কুলি আর কলঙ্কিনি মহানন্দে কোলাকুলি করে সারা বিশ্বে সাড়া ফেলেছে।ভাই কলঙ্কিনি যদি কুলিরে ব্যাড়ায় ধরি কুলাকুলি করে, তায়লে কুলিওতো সারা দুনিয়ায় কলঙ্কিনির দোসর বইলা পরিচিত হোইবো! তায়লে কেউ ইচ্ছা করিনি কলঙ্কিনির বোঝা মাথায় লোইবো?ভাইরে তোর যত আদিখ্যেতা! এই যে দেখিসনি ১৯৭১ সালের পরে, পাকিস্তান আমলের ট্রেনের হকার, মাইয়া গ্রুপের চা আনতো যে ছ্যারা মানে টি’বয়, তারপর “ডোরিনা” দর্জির দোকান দখলকারী, পর্দার দোকানের ফ্লোর মোছুনিরসন্তান, সব রাতারাতি ধনী হয়ে উঠলো...যুদ্ধের পরে কিছু পাবলিক হক্কল টাইমেই কিছু সুবিধা পাইছে। এই লোই আন্নের মাতনের কিছু নাই। আন্নে দেখেন ন’, আন্নের ২০২৪-এর, অগাস্টের পর পাবলিকে ৬০০ কুটি ট্যাকার সুদ মাপ করি লোইছে! কতগুলার একটা সাইকেল আছিলো না, হ্যারা প্রাডো লোই ঘুরের! আর ১৯৭১ আছিলো যুদ্ধ। কিছু ওলট-পালট তো হোইবোই। আরে উড়ঝুড়ে বাঙাল, যেখানে দারিদ্রে তোর দেশের প্রায় ৫০ লক্ষ জনসাধারণ মারা পড়লো, আর একজন পৃথিবীর হ্যানো কোনো দুস্ককর্ম নেই যে করেনি, চুরি, ডাকাতি, গুম, খুন-জখম, রাহাজানি, ধর্ষণ-সমকামিতা, কোনো কিছুই বাদ দিসনি, সেই তোরা যখন ধনী হয়ে টাকার গরমে একে অপরের সাথে কোলাকুলি করে, দু’জনে লোক দ্যাখানো বন্ধুত্বের আড়ালে, শুভবুদ্ধির মানুষের উপর চোখ রাঙাস তখন ক্যামনটা লাগে!আন্নে মিয়া জীবনে মানুষ হোইতেন ন’! এই যে, নেপালে বরফের বন্যা আসি ব্যাবাগতেরে পানির মইধ্যে চুবাইলো, হেই বন্যা কি, সৎ-অসৎ, কুবুদ্ধি-সুবুদ্ধি দেখিনি চুবনি দিছে! রাস্তার মইধ্যে যারে পাইছে হ্যাতেরে ধরি কোপাইছে, সিম্পেল। আন্নে ১৯৭১-এর যুদ্ধের পরে, পাকিস্তান আমলের ট্রেনের হকার, মাইয়া গ্রুপের, টি’বয়, তারপর, দোকান দখলকারী, পর্দার দোকানের ফ্লোর মোছুনির পোলা সব রাতারাতি বড়লোক। তো, এইসব বড়লোকরা যদি এক হোই, কুলাকুলি করি আন্নের তথাকথিত শুভোবুদ্ধি সম্পন্ন..., তো এইডার মইধ্যে আঁই তো কুনো দোষ দেখি না!বাহ্ তাই বলে নৈতিকতা, পাড়া প্রতিবেশি, আত্মীয় স্বজন, জাতিভাই দেশবাসী কাউকেউ তুই ছাড় দিবি না, তোর নিজের স্বার্থে শত শত, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি মানুষের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা কোরবি! ওম্মারে মা, এই কোইলেন, পাকিস্তান আমলের ট্রেনের হকার, মাইয়া গ্রুপের, টি’বয়, দোকান দখলকারী, পর্দার দোকানের ফ্লোর মোছুনির পোলা...সত্যিকথা বলবো না? বাস্তবে তো তাই ঘটেছে...“সত্যি কথা বলবো না? বাস্তবে তো তাই ঘটেছে...” আরে মিয়া আন্নেই কন ট্রেনের হকার, টি’বয়, দোকান দখলকারী, পর্দার দোকানের ফ্লোর মোছুনির পোলা, পাকিস্তান আমলে তো এইসব পোলাপানের কোনো শিক্ষাদীক্ষা আছিলোনা, এক এক লুকের সাত আটটা পোলা, হ্যেরা কুত্তার মতুন রাস্তা ঘাটে জন্মাইছে, হ্যেগো আবার নৈতিকতা, শুভবুদ্ধি, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা! ফালতু কথা কোইতে লজ্জা করে না মিয়া! এইসব বগামিয়া, কালুমিয়া, লালুমিয়ার পোলারা ট্যাকা কামায়া ধনী হোইলে হ্যেরা তো কেবল, ডবল ডব্লিউ লয়া মৌজ ফুর্তি করবো, হ্যেগো টাইম কোই, পাড়া প্রতিবেশি, আত্মীয় স্বজন, জাতিভাই দেশবাসীর কথা চিন্তা করনের। যাগো সত্যিকার অর্থে দেশের চিন্তা করনের কথা, হ্যেরা তো মাল পায়াই খাল কাটতে ছুটলো, হ্যারাইতো আজ দেশের, দশের, জাতির বারটা বাজাইছে! হ্যাগোরে কিছু কয়া পারেন না, দোষ খালি ট্রেনের হকার, টি’বয়, দোকান দখলকারীর, পর্দার দোকানের ফ্লোর মোছুনির পোলার! বুঝিস না ক্যানো, সব জমিদারের ছেলেরা বামা পার্টি বানিয়ে গরীবের উপকারের নাম করে নিজেদের হারানো জমিদারি ফেরতেরে সুযোগ খুঁজছিলো, তাই যেই মন্ত্রিত্বের লোভ পেলো ব্যাস সাথে সাথে বিড়ালের নরম থাবার আড়ালের তীক্ষœ নখর বের করার মতো পুরো দলটার অস্তিত্ব বিলীন করে সুড়সুড়িয়ে ক্ষমতার ভোগ দখলে মত্ত। কিসের বামা পার্টি, কিসের উই শ্যাল ওভারকাম সাম ডে...মাল কামামু টু’ডে, বলে স্বৈরাচারের বাপ হয়ে জনগনকে দংশন শুরু।কিন্তু গুরু আপনের বামা পার্টি হুনছি কোন মন্দিরের জমি দুই’দলে ভাগকরি হিন্দু-মুসলমানে মিলিমিশি খাইছে?আরে মন্দিরের জমি দুই’দলে মিলিমিশি খাইছে, বলেইতো পাবলিক আজ সমাজ থেকে ওদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করে, আস্তাকুঁড়ে মানে ডাষ্টবিনে ফেলেছে!মাইনে বুজছেননি, বামা পার্টি কন আর বুর্জুয়া ক্যাপিটালিস্ট কন, মাল দেখলেই সব বেটায় টাল। হ্যাইডা, ট্রনের হকার, টি’বয়, দোকান দখলকারী, পর্দার দোকানের ফ্লোর মোছুনির পোলা যেই হোক, বিশ্বের ব্যেবাগতে মালের কাছে ধরা। মাল পাইলে শত শত পাবলিক পগারপার, আর মাল না পাইলে কেরানিগঞ্জের ঝাড়ুদার। মাল মাল করি আরে হ্যাতারা পুরা জাতিটারে, যাঁতাকলের তলে ফেলি ময়দা ডলন ডলের! শরম শরম...শরম বল আর লজ্জা বল, কুন্ঠা বা হায়া, শরমভরম, ব্রীড়াবনত, মাথাহেঁট যে নামেই ডাকিস এই তথাকথিত নেতাগুলো, আমাদের দেশের, সহজ-সরল জনগনের অশিক্ষার কুশিক্ষার সুযোগে কেবলই নিজের আখের গুছিয়েছে আর আমাদের বংশ পরম্পরায়ে গুহার আঁধারে ঠেলে দিয়েছে, ধিক ধিক...আমি আপনেরে কোইলাম, বাঙালরি মনে ধিকি ধিকি আগুন জ্বলের, বাঙালি আর একবার এক হোইলে আর কুনোদিনও মালের গন্ধে মাতাল হোইতো ন’। এইবার বাঙালি চান্স পাইলে এই স্বার্থপর নেতাগো লাত্থিমারি, ভাষানের দিন, মা-দূর্গার লগে বঙ্গপোসাগরে ভাসায় দিবো। সেই আশায় বসে থাকি, দেখি আবার কবে তোর সকল বাঙালি, ঘুষ, চুরি, ডাকাতি,গুম, খুন-জখম, রাহাজানি, ধর্ষণ-সমকামিতা, অ্যাসিড নিক্ষেপ, সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক হয় পঁচিশে মার্চের রাত্রির মতো...     [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

কৃষির রূপান্তর শুরু হোক মানসম্পন্ন বীজ থেকে

কৃষির সাফল্যের শুরু কোথায়? উত্তরটি খুব সহজ—বীজে। কৃষক যত ভালো সার, সেচ, শ্রম ও আধুনিক প্রযুক্তিই ব্যবহার করুন না কেন, শুরুতেই যদি বীজের মান ভালো না হয়, তাহলে পরবর্তী বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন। একটি ভালো বীজ শুধু একটি বীজ নয়। এর মধ্যে থাকে উন্নত জাতের জেনেটিক সম্ভাবনা, ভালো অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা, প্রাণশক্তি, জাতের বিশুদ্ধতা ও রোগমুক্ততার নিশ্চয়তা। তাই বীজকে কৃষি উৎপাদনের প্রথম বিনিয়োগ এবং খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি বলা যায়।বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু আবাদি জমি কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদার কারণে ভবিষ্যতে একই জমি থেকে আরও বেশি উৎপাদন করতে হবে। এই বাস্তবতায় মানসম্পন্ন ও পরীক্ষিত বীজের ব্যবহার বাড়ানো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম কার্যকর পথ হতে পারে।১০০ শতাংশ নয়, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হোক বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। দেশের প্রতিটি জমিতে স্বল্প সময়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরবরাহ করা মানসম্পন্ন বীজ নিশ্চিত করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই বাস্তবতার আলোকে একটি মধ্যমেয়াদি জাতীয় লক্ষ্য হতে পারে—অন্তত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ আবাদি জমিতে পরীক্ষিত, মানসম্পন্ন ও অঞ্চল-উপযোগী বীজের ব্যবহার নিশ্চিত করা। এটি কেবল বীজ সরবরাহের লক্ষ্য নয়; এটি হতে পারে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির একটি জাতীয় কর্মসূচি। তবে তার আগে জানতে হবে—দেশে আসলে কত বীজ প্রয়োজন?২০২২-২০২৩ সালের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন ফসলের তাত্ত্বিক বীজ চাহিদা ছিল প্রায় ১২ লাখ ১০ হাজার ৩৫১ মেট্রিক টন। এর ৮০ শতাংশের পরিমাণ প্রায় ৯ লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন। একই সময়ে বিভিন্ন উৎস থেকে বীজ উৎপাদন ও আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৬১ হাজার ২৬৪ মেট্রিক টন।তবে এই দুই সংখ্যার পার্থক্যকে সরাসরি ‘মানসম্পন্ন বীজের ঘাটতি’ বলা যাবে না। কারণ কৃষকের নিজস্ব সংরক্ষিত বীজসহ বিভিন্ন উৎসের বীজ মোট সরবরাহের হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এবং সব বীজ একই মানের নয়। তাছাড়া ২০২২-২০২৩ সালের হিসাবকে ২০২৬ সালের বর্তমান চাহিদা হিসেবে ব্যবহার করাও যুক্তিসংগত নয়। অতএব প্রয়োজন সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে ফসলভিত্তিক জাতীয় বীজ চাহিদা ও সরবরাহের নতুন হিসাব।বীজের চাহিদা ফসলভেদে ভিন্ন। ধান, গম, ভুট্টা, পাট, ডাল, তেলবীজ, আলু, সবজি ও মসলার বীজহার এক নয়। অঞ্চলভেদেও চাহিদার পার্থক্য রয়েছে। তাই ‘দেশে মোট কত বীজ প্রয়োজন’—এ প্রশ্নের উত্তর একটি মাত্র সংখ্যায় দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি জাতীয় ফসলভিত্তিক বীজ চাহিদার ছক। সেখানে থাকবে আবাদি এলাকা, ফসলভিত্তিক বীজহার, মোট চাহিদা, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা, সরকারি ও বেসরকারি সরবরাহ, আমদানি, কৃষকের নিজস্ব বীজ এবং প্রকৃত ঘাটতির হিসাব। এই হিসাব ছাড়া জাতীয় বীজ উৎপাদন পরিকল্পনা অনেকটাই অনুমাননির্ভর থেকে যাবে।ভালো বীজে ফলন কতটা বাড়তে পারে?মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারে ফলন বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বিএডিসির বিভিন্ন নথিতে মানসম্পন্ন বীজ ও সুষম উপকরণ ব্যবহারে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই হার সব ফসল ও সব অঞ্চলের জন্য একই নয়। জাত, বীজের মান, মাটি, আবহাওয়া, সার, সেচ, রোগ-পোকা ব্যবস্থাপনা ও চাষপদ্ধতির ওপর ফলন বৃদ্ধির মাত্রা নির্ভর করে। তাই ৮০ শতাংশ জমিতে ভালো বীজ ব্যবহার করলেই জাতীয় উৎপাদন ২০ শতাংশ বেড়ে যাবে—এমন দাবি বৈজ্ঞানিক হবে না।তবে সম্ভাব্য প্রভাব বোঝাতে একটি সরল হিসাব করা যায়। যদি ৮০ শতাংশ জমিতে ভালো বীজ ব্যবহারের ফলে ওই জমির ফলন গড়ে ৫ শতাংশ বাড়ে, তাহলে মোট উৎপাদনে তাত্ত্বিক প্রভাব হতে পারে প্রায় ৪ শতাংশ। ফলন ১০ শতাংশ বাড়লে প্রভাব হতে পারে প্রায় ৮ শতাংশ। ১৫ শতাংশ বাড়লে প্রায় ১২ শতাংশ এবং ২০ শতাংশ বাড়লে প্রায় ১৬ শতাংশ।অর্থাৎ অন্য সবকিছু অপরিবর্তিত থাকলে ৮০ শতাংশ জমিতে মানসম্পন্ন বীজের কারণে সংশ্লিষ্ট জমির ফলন ৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ার ক্ষেত্রে জাতীয় মোট উৎপাদনে তাত্ত্বিকভাবে প্রায় ৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব তৈরি হতে পারে। এটি জাতীয় উৎপাদনের কোনো পূর্বাভাস নয়; সম্ভাব্য প্রভাব বোঝানোর একটি সরল হিসাবমাত্র।কৃষকের মাঠেই ভালো বীজের প্রমাণভালো বীজ ও উপযোগী জাতের সুফল কেবল গবেষণাগারে নয়, কৃষকের মাঠেও দেখা যায়। খাগড়াছড়ির কৃষক উচিমং মারমার জমিতে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইআরআরআই) সমর্থনে পরিচালিত মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় বিভিন্ন উন্নত ধানের জাত স্থানীয় চাষপদ্ধতির তুলনায় উল্লেখযোগ্য ফলন দিয়েছে। পরে তিনি উন্নত জাতের ধান চাষে আগ্রহী হন এবং আশপাশের কৃষকদেরও উৎসাহিত করেন।হাওর এলাকার কৃষক কামরুল ইসলামের অভিজ্ঞতাও তাৎপর্যপূর্ণ। আগাম পরিপক্ব জাতের ধান তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ হাওরে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি নিজে বীজ সংরক্ষণ করার পাশাপাশি অন্য কৃষকদেরও বীজ সরবরাহ করেছেন।আবার সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষক মো. আরাফাত লবণাক্ততা সহনশীল ব্রি ধান৯৯ চাষ করে আগের জাতগুলোর তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি ফলনের কথা জানিয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু ‘ভালো বীজ’ নয়, সঠিক অঞ্চল ও পরিবেশের জন্য সঠিক জাত নির্বাচনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে পরিচালিত পুরোনো একাধিক মাঠপর্যায়ের পরীক্ষাতেও পরিচ্ছন্ন বীজ ব্যবহারে কৃষকের প্রচলিত বীজের তুলনায় ধানের ফলন বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বীজের স্বাস্থ্য ও মানের উন্নয়ন সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত।বীজ খারাপ হলে অন্য বিনিয়োগও ঝুঁকিতেকৃষক উন্নত সার কিনলেন, সেচ দিলেন, রোগ-পোকা দমনে অর্থ ব্যয় করলেন। কিন্তু জমিতে যদি নিম্নমানের, মিশ্রিত বা দুর্বল বীজ ব্যবহার করা হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত গাছের সংখ্যা ও সমতা নাও পাওয়া যেতে পারে। ফলে সার, সেচ, শ্রম ও অন্যান্য উপকরণে কৃষকের বিনিয়োগের একটি অংশ কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনে রূপান্তরিত হয় না। ভালো বীজ তাই শুধু ফলন বাড়ায় না; কৃষকের অন্যান্য বিনিয়োগের দক্ষতাও বাড়াতে সাহায্য করে।শুধু কত টন নয়, কত টন মানসম্পন্ন বীজজাতীয় বীজ ব্যবস্থাপনায় এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন—‘কত টন বীজ উৎপাদন হয়েছে?’ এর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘কত টন মানসম্পন্ন বীজ সঠিক সময়ে কৃষকের হাতে পৌঁছেছে?’এক টন বীজ উৎপাদন এবং এক টন মানসম্পন্ন বীজ কৃষকের হাতে পৌঁছানো এক বিষয় নয়। অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা, জাতের বিশুদ্ধতা, আর্দ্রতা, রোগমুক্ততা, প্রাণশক্তি, সংরক্ষণক্ষমতা এবং সঠিক পরিচিতি—সবকিছুর নিশ্চয়তা থাকতে হবে। নিম্নমানের বা ভেজাল বীজ কৃষকের ক্ষতির পাশাপাশি জাতীয় কৃষি উৎপাদনেরও অপচয় ঘটায়।কৃষকের নিজস্ব বীজ ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে কৃষকের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভবও নয়। বরং এই ব্যবস্থাকে আরও বৈজ্ঞানিক করতে হবে। কৃষককে জানতে হবে—কোন গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন, কীভাবে বীজ শুকাবেন, কীভাবে রোগমুক্ত বীজ নির্বাচন করবেন, কীভাবে সংরক্ষণ করবেন এবং কখন বীজ পরিবর্তন করবেন। অর্থাৎ জাতীয় বীজ ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক মানসম্পন্ন বীজ এবং কৃষকের নিজস্ব ভালো বীজ—দুই ব্যবস্থাকেই সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।দরকার জাতীয় ৮০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ কর্মসূচিবাংলাদেশের বাস্তবতায় ‘জাতীয় ৮০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার কর্মসূচি’ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমে সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে ফসলভিত্তিক বীজের চাহিদা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সরকারি-বেসরকারি উৎপাদন সক্ষমতা, আমদানি, কৃষকের নিজস্ব বীজ এবং প্রকৃত ঘাটতি চিহ্নিত করতে হবে।তারপর বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান পরীক্ষা, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও কৃষকের ব্যবহার—এই পুরো শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করতে হবে। এ কাজে বিএডিসি, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বীজ প্রত্যয়ন সংস্থা, বেসরকারি বীজ কোম্পানি ও কৃষক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।কৃষির রূপান্তর শুরু হোক বীজ থেকেবাংলাদেশের কৃষি অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন—কম জমিতে বেশি উৎপাদন, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, নিরাপদ খাদ্য, পুষ্টি, কৃষকের আয় এবং খাদ্যনিরাপত্তা। এই প্রতিটি লক্ষ্যেই বীজের ভূমিকা রয়েছে।১০০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের লক্ষ্য হয়তো এখনই বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ একটি পরিমাপযোগ্য ও ধাপে ধাপে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন স্লোগান নয়, সঠিক হিসাব। জানতে হবে—দেশে কত বীজ প্রয়োজন, কোন ফসলে কত প্রয়োজন, কত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদিত হচ্ছে, কত আমদানি হচ্ছে, কৃষকের নিজস্ব বীজের কত অংশ মানসম্মত এবং প্রকৃত ঘাটতি কত।এই হিসাবের ভিত্তিতে যদি ৮০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে। কারণ কৃষির রূপান্তর শুরু হয় একটি বীজ থেকে। মানসম্পন্ন কোটি কোটি বীজই পারে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভিতকে আরও শক্তিশালী করতে। বীজ নিরাপদ হলে কৃষি নিরাপদ; কৃষি শক্তিশালী হলে শক্তিশালী হয় খাদ্যনিরাপত্তা।[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বিএডিসি]

অদক্ষ হাতে আয়কর রিটার্ন প্রস্তুত: বাড়ছে অডিটের ঝুঁকি

আয়কর রিটার্ন দাখিল একজন করদাতার জন্য শুধু একটি নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ নয়, বরং এটি তার আর্থিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়,ব্যয়, সম্পদ, দায়, বিনিয়োগ, ব্যাংক লেনদেন ও কর পরিশোধের তথ্য রিটার্নে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক করদাতা নিজের আয়কর রিটার্ন প্রস্তুত না করে কম্পিউটার, ফটোকপি কিংবা অনলাইন সেবার দোকানে গিয়ে অল্প খরচে রিটার্ন তৈরি ও দাখিল করছেন। এতে তাৎক্ষণিকভাবে সময় ও অর্থ সাশ্রয় হলেও ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে ভবিষ্যতে করদাতাকে করসংক্রান্ত জটিলতা এবং যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে হতে পারে।অনেক ক্ষেত্রে কম্পিউটার দোকানে রিটার্ন প্রস্তুতের প্রক্রিয়াটি হয়ে ওঠে শুধু করদাতার কাছ থেকে কিছু তথ্য নিয়ে নির্দিষ্ট সফটওয়্যার বা অনলাইন ব্যবস্থায় তা বসিয়ে দেওয়া। করদাতার প্রকৃত আয় কী, আয়ের উৎস কী, সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে, আগের বছরের সঙ্গে বর্তমান বছরের তথ্যের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, ব্যাংক লেনদেনের প্রকৃতি কী এবং বিনিয়োগের উৎস কোথায়, এসব বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ অনেক সময় হয় না। ফলে রিটার্ন দাখিল হয়ে গেলেও সেটি করদাতার প্রকৃত আর্থিক অবস্থার যথাযথ প্রতিফলন ঘটাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।আয়কর রিটার্নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো তথ্যের ধারাবাহিকতা। একজন করদাতার আগের বছরের সম্পদ, ব্যাংক ব্যালান্স, বিনিয়োগ, নগদ অর্থ ও দায়ের সঙ্গে চলতি বছরের তথ্যের একটি যৌক্তিক সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিবছর নতুন করে রিটার্ন তৈরি করতে গিয়ে আগের বছরের তথ্য বিবেচনায় না নিলে সম্পদের পরিমাণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে কোনো করদাতার ঘোষিত আয় তুলনামূলক কম হলেও সম্পদের পরিমাণ যদি হঠাৎ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, তাহলে সেই সম্পদ বৃদ্ধির উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে।তবে সম্পদ বৃদ্ধি পেলেই সেটিকে করযোগ্য আয় হিসেবে বিবেচনা করা যাবে এমন নয়। উত্তরাধিকার, উপহার, ঋণ, পূর্বের সঞ্চয়, সম্পদ বিক্রয় কিংবা অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকেও একজন করদাতার সম্পদ বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু এসব উৎসের যথাযথ তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ না করলে পরবর্তীতে সেই সম্পদ বৃদ্ধির ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে। ফলে রিটার্ন প্রস্তুতের সময় শুধু সম্পদের পরিমাণ নয়, সম্পদ অর্জনের উৎসও যথাযথভাবে বিবেচনা করা জরুরি।ব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন। অনেক করদাতার ব্যাংক হিসাবে ব্যবসায়িক লেনদেন, ঋণের অর্থ, পরিবারের সদস্যের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ, সম্পদ বিক্রির অর্থ কিংবা অন্যান্য উৎসের টাকা জমা হয়। ব্যাংকে জমা হওয়া প্রতিটি অর্থ করযোগ্য আয় নয়। আবার প্রকৃত আয়কে অন্য কোনো উৎস হিসেবে দেখানোও সঠিক নয়। তাই ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের প্রকৃতি বুঝে প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ এবং রিটার্নে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসার বিক্রয়, মূলধন, ব্যবসায়িক ব্যয়, ব্যাংক লেনদেন, ব্যক্তিগত উত্তোলন, ব্যবসায়িক সম্পদ এবং দায়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। একজন ব্যবসায়ী রিটার্নে যে তথ্য দিচ্ছেন, তার সঙ্গে ব্যাংক লেনদেন বা অন্যান্য আর্থিক নথির বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে ভবিষ্যতে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে। শুধু কম্পিউটারে সংখ্যা বসিয়ে রিটার্ন তৈরি করলে এসব বিষয় যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয় না।চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রেও একইভাবে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। অনেক চাকরিজীবীর প্রধান আয় বেতন হলেও এর পাশাপাশি ব্যাংক আমানতের সুদ, সঞ্চয়পত্র, বাড়িভাড়া, বিনিয়োগ কিংবা অন্যান্য বৈধ উৎস থেকে আয় থাকতে পারে। একই সঙ্গে তার সম্পদ, দায় ও বিনিয়োগের তথ্যও রিটার্নে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। কোনো একটি তথ্য বাদ পড়ে গেলে বা ভুলভাবে উপস্থাপিত হলে পরবর্তীতে সেটি সংশোধন কিংবা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে।রিটার্ন প্রস্তুতের ক্ষেত্রে আগের বছরের রিটার্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল। কিন্তু অনেক করদাতা প্রতিবছর নতুন করে রিটার্ন তৈরি করানোর সময় আগের বছরের রিটার্ন সামনে রাখেন না। ফলে এক বছরের সঙ্গে আরেক বছরের সম্পদ, দায়, ব্যাংক ব্যালান্স বা বিনিয়োগের তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। একজন করদাতার আর্থিক অবস্থার স্বাভাবিক পরিবর্তন অবশ্যই হতে পারে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের পেছনে যৌক্তিক কারণ থাকা এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।এখানে অডিট প্রসঙ্গটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কোনো রিটার্ন অদক্ষভাবে প্রস্তুত হয়েছে বলেই সেটি অডিটের আওতায় যাবে এমন নয়। কর কর্তৃপক্ষের যাচাই বা অডিটের জন্য নির্ধারিত আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে। তবে রিটার্নে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে অমিল, অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি, ব্যাংক লেনদেনের সঙ্গে ঘোষিত তথ্যের পার্থক্য কিংবা অন্যান্য অসংগতি থাকলে করদাতার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই রিটার্ন প্রস্তুতের সময় সতর্ক না হলে ভবিষ্যতে করদাতার জন্য অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রিটার্নে তথ্যের দায়। অনেক করদাতা মনে করেন, কম্পিউটার দোকানের কর্মী রিটার্ন তৈরি করেছেন, তাই কোনো ভুল হলে তার দায়ও ওই ব্যক্তির। বাস্তবে রিটার্নে প্রদত্ত তথ্যের সত্যতা ও যথার্থতার বিষয়টি করদাতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রিটার্ন প্রস্তুতকারী ব্যক্তি তথ্য টাইপ করা বা অনলাইন দাখিলের কাজে সহায়তা করতে পারেন, কিন্তু করদাতার প্রকৃত আয়, সম্পদ, দায় ও অন্যান্য আর্থিক তথ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়া এবং তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে রিটার্ন দাখিলের আগে করদাতার নিজের আর্থিক তথ্য গুছিয়ে নেওয়া উচিত। আগের বছরের রিটার্ন, বেতন বা ব্যবসার আয়, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বিনিয়োগের তথ্য, সঞ্চয়পত্র, সম্পত্তি ক্রয় বা বিক্রয়ের দলিল, ঋণের তথ্য এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথি একসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে তার উৎসের তথ্য ও প্রমাণও সংরক্ষণ করা উচিত। জটিলতা থাকলে অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবী বা কর পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।করদাতাদের মনে রাখা দরকার, একটি আয়কর রিটার্ন শুধু একটি নির্দিষ্ট করবর্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভবিষ্যতে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ, সম্পত্তি ক্রয়, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, সম্পদ হস্তান্তর কিংবা অন্যান্য আর্থিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তী রিটার্নের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে। ফলে আজ রিটার্নে দেওয়া কোনো ভুল তথ্য ভবিষ্যতে নতুন প্রশ্নের কারণ হতে পারে।প্রযুক্তির ব্যবহার আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়াকে নিঃসন্দেহে সহজ করেছে। অনলাইন ব্যবস্থার কারণে একজন করদাতা নিজেও অনেক কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। কিন্তু প্রযুক্তি শুধু তথ্য প্রবেশ ও দাখিলের প্রক্রিয়াকে সহজ করে। তথ্যটি সত্য, সঠিক এবং আইনসম্মত কি না, তা নিশ্চিত করে না। একটি সফটওয়্যার জানে না কোনো অর্থ উত্তরাধিকার থেকে এসেছে, কোনটি ঋণ, কোনটি ব্যবসার আয় এবং কোনটি সম্পদ বিক্রির অর্থ। এসব বিষয় নির্ধারণ করতে প্রয়োজন সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় নথি এবং কর আইন সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান।তাই আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতের ক্ষেত্রে শুধু কত কম খরচে রিটার্ন তৈরি করা গেল, সেটিকে গুরুত্ব না দিয়ে রিটার্নের তথ্য কতটা সঠিক, পূর্ণাঙ্গ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেদিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কম্পিউটার দোকান থেকে রিটার্ন তৈরি করানো নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তৈরি হতে পারে যখন কর আইন ও আর্থিক তথ্য যথাযথভাবে না বুঝে শুধু দ্রুত রিটার্ন দাখিল করা হয়।[লেখক: আয়কর আইনজীবী]

স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য: দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে চাই সুস্থ জীবন

মানুষ এখন আগের তুলনায় বেশি দিন বাঁচছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, টিকাদান, উন্নত পুষ্টি, নিরাপদ পানি, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের ফলে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। বাংলাদেশেও গত কয়েক দশকে মানুষের আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এর সঙ্গে একটি নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে—শুধু বেশি বছর বেঁচে থাকাই কি যথেষ্ট?একজন মানুষ যদি ৮০ বছর বাঁচেন, কিন্তু জীবনের শেষ ১০–১৫ বছর চলাফেরার সীমাবদ্ধতা, অনিয়ন্ত্রিত দীর্ঘমেয়াদি রোগ, একাকিত্ব এবং অন্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল অবস্থায় কাটান, তাহলে শুধু দীর্ঘায়ু দিয়ে তাঁর জীবনের মান বোঝা যায় না। আধুনিক জনস্বাস্থ্য তাই এখন শুধু জীবনকাল নয়, বরং সুস্থ জীবনকাল বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এখান থেকেই এসেছে ‘স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য’ বা ‘হেলদি এজিং’-এর ধারণা।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে, যার মাধ্যমে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সুস্থ ও অর্থবহ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর সক্ষমতা তৈরি এবং বজায় রাখা যায়। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য মানে শরীরে কোনো রোগ না থাকা নয়। একজন মানুষের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বাত বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকতে পারে; কিন্তু রোগগুলো যদি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং তিনি নিজের দৈনন্দিন কাজ করতে, চলাফেরা করতে, সিদ্ধান্ত নিতে, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং পরিবার ও সমাজে ভূমিকা রাখতে পারেন, তাহলে তিনিও স্বাস্থ্যকরভাবে বয়স বাড়াতে পারেন।দুইজন মানুষের বয়স ৭০ বছর হলেও তাঁদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা এক নাও হতে পারে। একজন হয়তো নিয়মিত হাঁটছেন, বাজার করছেন, ভ্রমণ করছেন, বই পড়ছেন এবং পরিবারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছেন। অন্যজন একই বয়সে দৈনন্দিন কাজের জন্য অন্যের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হতে পারেন। তাই শুধু বয়সের সংখ্যা দিয়ে একজন মানুষের সামগ্রিক অবস্থা বিচার করা যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি কী করতে পারছেন। তিনি কি নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজন সামলাতে পারছেন? নিজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন? স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছেন? পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারছেন? সমাজ বা পরিবারের জন্য কোনোভাবে অবদান রাখতে পারছেন? এসব সক্ষমতা যতদিন ধরে রাখা যায়, ততদিন স্বাধীনতা এবং জীবনের মান বজায় রাখার সম্ভাবনাও তত বেশি।যুক্তরাজ্যে স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যকে এখন শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসাব্যবস্থার বিষয় হিসেবে দেখা হয় না। সেখানে রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক যোগাযোগ, নিরাপদ বাসস্থান, আর্থিক নিরাপত্তা এবং বয়সবান্ধব পরিবেশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একজন মানুষ কত বছর বেঁচে আছেন, তার পাশাপাশি সেই বছরগুলোর কতটা সময় তিনি সুস্থ ও স্বাধীনভাবে কাটাতে পারছেন—এই প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।যুক্তরাষ্ট্রেও স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের ক্ষেত্রে নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, তামাক পরিহার, দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ, মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পশ্চিমা বিশ্বের স্বাস্থ্যনীতিতে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে—স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের প্রস্তুতি ৬০ বা ৬৫ বছর বয়সে শুরু হয় না। এর ভিত্তি তৈরি হয় তার অনেক আগে। ৪০, ৫০ বা ৬০ বছর বয়সে আমরা কী খাচ্ছি, কতটা চলাফেরা করছি, পেশিশক্তি কেমন, শরীরের ওজন কেমন, রক্তচাপ ও রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তামাক ব্যবহার করছি কি না এবং সামাজিকভাবে কতটা সক্রিয়—এসবই পরবর্তী জীবনের স্বাস্থ্য ও সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।বাংলাদেশের বাস্তবতা পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। আমাদের দেশে পরিবার এখনো প্রবীণ মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক প্রবীণ সন্তান ও পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন। নাতি-নাতনির সঙ্গে সময় কাটানো, পারিবারিক সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়া এবং সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য বলতে শুধু রোগমুক্ত থাকা বোঝালে চলবে না। একজন মানুষ যেন যতদিন সম্ভব নিজের কাজ নিজে করতে পারেন, চলাফেরা করতে পারেন, পরিবারে সম্মান পান, নিজের সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান এবং নিজেকে পরিবারের বোঝা নয় বরং সক্রিয় সদস্য মনে করেন—এসবও স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।বাংলাদেশে মানুষের আয়ু বাড়ার সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীও বাড়ছে। এর অর্থ ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, কিডনি সমস্যা, বাত, চোখের সমস্যা, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক দুর্বলতার মতো বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই এখন থেকেই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সব পর্যায়ে প্রস্তুতি প্রয়োজন।বয়স বাড়ার সঙ্গে যে বিষয়টি আমরা অনেক সময় যথেষ্ট গুরুত্ব দিই না, সেটি হলো পেশির শক্তি। বয়সের সঙ্গে পেশির ভর ও শক্তি ধীরে ধীরে কমতে পারে। এর সঙ্গে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অপর্যাপ্ত পুষ্টি যুক্ত হলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। পেশিশক্তি কমে গেলে চেয়ার থেকে ওঠা, সিঁড়ি ভাঙা, বাজারের ব্যাগ বহন করা কিংবা পড়ে গেলে উঠে দাঁড়ানোর মতো সাধারণ কাজও কঠিন হয়ে যেতে পারে। পড়ে গিয়ে হাড় ভেঙে যাওয়া অনেক প্রবীণ মানুষের স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।এ কারণে শুধু হাঁটা নয়, ব্যক্তির বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং চিকিৎসাগত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ। দেয়ালে হাত রেখে পুশ-আপ, চেয়ার থেকে ধীরে ধীরে ওঠা-বসা, হালকা ওজন ব্যবহার কিংবা প্রশিক্ষকের পরামর্শে উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যায়াম করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার অনুশীলন বয়স বাড়ার সঙ্গে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোর জন্য উপকারী হতে পারে।স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের জন্য বিদেশি বা অত্যন্ত ব্যয়বহুল খাবার প্রয়োজন—এমন ধারণারও ভিত্তি নেই। বাংলাদেশের প্রচলিত খাদ্যের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টিকর খাবার রয়েছে। মাছ, ডিম, দুধ, দই, ডাল, ছোলা ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার প্রোটিনের ভালো উৎস হতে পারে। ছোট মাছ, বিশেষ করে কাঁটাসহ খাওয়া হলে, প্রোটিনের পাশাপাশি ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি দিতে পারে। বিভিন্ন শাক, লাউ, পেঁপে, মিষ্টিকুমড়া, বেগুন, ঢেঁড়স, করলা, টমেটোসহ মৌসুমি সবজি খাদ্যে বৈচিত্র্য আনে। পেয়ারা, আমড়া, পেঁপে, কলা, কমলা ও অন্যান্য মৌসুমি ফলও খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।বয়স বাড়লে অনেক মানুষ খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেন। কিন্তু কম খাওয়ার সঙ্গে যদি প্রোটিন এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণও কমে যায়, তাহলে পেশিশক্তি ও শারীরিক সক্ষমতা আরও দ্রুত কমতে পারে। তাই বার্ধক্যে শুধু পেট ভরানো নয়, খাবারের পুষ্টিমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাবারে ভাত বা রুটির পাশাপাশি ডাল, মাছ বা ডিম, পর্যাপ্ত সবজি এবং সামর্থ্য অনুযায়ী ফল ও দুধজাত খাবার রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত তেল-চর্বি এবং ঘন ঘন ভাজাপোড়া খাবার সীমিত রাখা প্রয়োজন।অনেকেই মনে করেন ৬৫ বছর হলেই বার্ধক্য শুরু হয় এবং তখন থেকেই স্বাস্থ্য নিয়ে আলাদাভাবে ভাবতে হবে। বাস্তবে স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের প্রস্তুতি তার অনেক আগেই শুরু করা ভালো। বিশেষ করে ৪০ বা ৫০ বছরের পর থেকেই নিজের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ও সক্ষমতার দিকে পরিকল্পিতভাবে নজর দেওয়া যেতে পারে। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা দরকার। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তের শর্করা ও রক্তের চর্বি পরীক্ষা করা যেতে পারে। চোখ, দাঁত এবং শ্রবণশক্তির সমস্যাকেও অবহেলা করা উচিত নয়। বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ক্যানসার স্ক্রিনিং এবং টিকাদানের বিষয়েও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। যাঁদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ বা অন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে, তাঁদের নিয়মিত চিকিৎসা এবং নির্ধারিত ওষুধ সঠিকভাবে গ্রহণ করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য শুধু শরীরের বিষয় নয়; মস্তিষ্কের সুস্থতা এবং মানসিক সক্রিয়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু মানুষের স্মৃতিশক্তি বা তথ্য মনে করার গতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু নতুন কিছু শেখা, মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা এবং সামাজিকভাবে যুক্ত থাকা দৈনন্দিন কার্যকর সক্ষমতা বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বই বা পত্রিকা পড়া, লেখালেখি করা, বাগান করা, দাবা বা অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা, নতুন প্রযুক্তি শেখা, নতুন রান্না শেখা কিংবা নাতি-নাতনিকে পড়ানো—এসব কাজ বয়স বাড়ার পরও জীবনকে সক্রিয় ও অর্থবহ রাখতে পারে।একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এলাকার শিশুদের পড়াতে পারেন। একজন কৃষক তরুণ কৃষকদের নিজের অভিজ্ঞতা শেখাতে পারেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা বা অন্য পেশাজীবী তরুণদের পরামর্শ দিতে পারেন। একজন দাদা বা দাদি পরিবারের শিশুদের গল্প বলতে পারেন, পারিবারিক ইতিহাস জানাতে পারেন কিংবা তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন। এতে শুধু মানসিক সক্রিয়তা বজায় থাকে না, বরং প্রবীণ মানুষটির মধ্যে নিজের প্রয়োজনীয়তা ও জীবনের উদ্দেশ্যের অনুভূতিও বজায় থাকতে পারে।বাংলাদেশে যৌথ পরিবারের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। কাজ ও শিক্ষার কারণে অনেক সন্তান অন্য শহর বা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ফলে অনেক প্রবীণ দম্পতি বা ব্যক্তি একা বসবাস করছেন। তাই একাকিত্বকে শুধু আবেগের বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। দীর্ঘদিন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবারের তরুণ সদস্যদের দায়িত্ব তাই শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়। নিয়মিত কথা বলা, সময় দেওয়া, পারিবারিক সিদ্ধান্তে বাবা-মাকে যুক্ত করা এবং তাঁদের সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখতে সহায়তা করাও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে প্রবীণদেরও বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশী, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করা প্রয়োজন।ঘুমও স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বয়স বাড়ার সঙ্গে ঘুমের ধরনে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যাকে শুধু ‘বয়স হয়েছে’ বলে অবহেলা করা ঠিক নয়। প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমানো ও ওঠা, দিনের বেলা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং সন্ধ্যা বা রাতে অতিরিক্ত চা-কফি এড়িয়ে চলা সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘদিন ঘুম না হওয়া, অতিরিক্ত নাক ডাকা অথবা দিনের বেলা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বিষয় হলো তামাক। ধূমপানের পাশাপাশি জর্দা, গুল এবং অন্যান্য ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহারও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। কেউ ৩০ বা ৪০ বছর তামাক ব্যবহার করেছেন বলে এখন বন্ধ করে আর লাভ নেই—এ ধারণা সঠিক নয়। বয়স যাই হোক, তামাক ছেড়ে দেওয়ার স্বাস্থ্যগত উপকার থাকতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো তামাকমুক্ত জীবন।৫০ থেকে ৫৯ বছর বয়সকে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের ভিত্তি আরও শক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখা যেতে পারে। এ সময় শরীরের ওজন, রক্তচাপ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত হাঁটা, পেশিশক্তির ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পুষ্টি, ভালো ঘুম এবং তামাক পরিহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ৬০ থেকে ৬৯ বছরে শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাঁটার পাশাপাশি পেশিশক্তি ও ভারসাম্যের অনুশীলন, দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তির দিকে নজর, দীর্ঘমেয়াদি রোগের ভালো নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা দরকার। ৭০ বছরের পর লক্ষ্য হওয়া উচিত যতদিন সম্ভব স্বাধীনতা ও দৈনন্দিন কার্যকর সক্ষমতা ধরে রাখা। পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো, পর্যাপ্ত পুষ্টি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান এবং পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ তখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে এগুলো কঠোর বয়সভিত্তিক নিয়ম নয়; মানুষের শারীরিক অবস্থা ও সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে।স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের সব দায়িত্ব অবশ্য ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। একজন মানুষ নিয়মিত হাঁটতে চাইলে তাঁর এলাকায় নিরাপদ রাস্তা বা হাঁটার জায়গা প্রয়োজন। হাসপাতালে যেতে হলে সহজ ও নিরাপদ পরিবহন প্রয়োজন। বাড়িতে চলাফেরার জন্য পর্যাপ্ত আলো, নিরাপদ সিঁড়ি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক ব্যবস্থা দরকার। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবীণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি রোগের সমন্বিত চিকিৎসা এবং প্রয়োজন হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নগর ও সামাজিক পরিকল্পনায় তাই বয়সবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। নিরাপদ ফুটপাত, পার্ক ও হাঁটার জায়গা, প্রবীণবান্ধব গণপরিবহন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়মিত অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়িভিত্তিক পরিচর্যার সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বয়স সম্পর্কে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। ৬০ বা ৬৫ বছর বয়স হলেই একজন মানুষ সমাজের জন্য অপ্রয়োজনীয় হয়ে যান না। বরং কয়েক দশকের কর্মজীবন ও জীবনযাপনের মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতা সমাজের মূল্যবান সম্পদ হতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।পরিবারেরও এখানে বড় ভূমিকা রয়েছে। প্রবীণ বাবা-মাকে শুধু যত্নের প্রয়োজন আছে এমন মানুষ হিসেবে না দেখে পরিবারের সক্রিয় সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তাঁদের মতামত নেওয়া, পারিবারিক সিদ্ধান্তে যুক্ত রাখা, নাতি-নাতনির সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ দেওয়া এবং তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো—এসবও স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের অংশ। আর্থিক নিরাপত্তাও উপেক্ষা করা যায় না। চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার, বাসস্থান ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য ন্যূনতম আর্থিক নিশ্চয়তা একজন প্রবীণ মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।বার্ধক্য কোনো রোগ নয়। এটি জীবনের স্বাভাবিক একটি পর্যায়। স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের লক্ষ্য বয়স থামিয়ে দেওয়া বা মানুষকে চিরতরুণ রাখা নয়। বরং বয়স বাড়ার স্বাভাবিক পরিবর্তনের মধ্যেও যতদিন সম্ভব শারীরিক শক্তি, মানসিক সক্ষমতা, স্বাধীনতা, সামাজিক সম্পর্ক, আত্মমর্যাদা এবং জীবনের উদ্দেশ্য ধরে রাখাই এর মূল লক্ষ্য।বাংলাদেশের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। মানুষের আয়ু বৃদ্ধির অর্জনকে এখন সুস্থায়ু বৃদ্ধির অর্জনে রূপান্তর করতে হবে। আর এর প্রস্তুতি বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছানোর পর নয়, অনেক আগে থেকেই শুরু করা প্রয়োজন। পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পেশিশক্তি ধরে রাখা, তামাক পরিহার, পর্যাপ্ত ঘুম, দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ, মানসিক সক্রিয়তা এবং পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক—এসব ছোট ছোট বিষয়ই ভবিষ্যতের বার্ধক্যের ভিত্তি তৈরি করে।একজন ৭৫ বছরের মানুষ যদি সকালে হাঁটতে পারেন, নিজের দৈনন্দিন কাজের বেশির ভাগ নিজে করতে পারেন, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান এবং অনুভব করেন যে পরিবার ও সমাজে তাঁর এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে—তাহলে সেটিই স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের একটি সুন্দর উদাহরণ।তাই আমাদের প্রশ্ন শুধু ‘আমি কত বছর বাঁচব?’ হওয়া উচিত নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—‘আমি যে বছরগুলো বাঁচব, সেগুলো কতটা সুস্থ, সচল, স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ এবং অর্থবহভাবে বাঁচতে পারব?’ স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের প্রকৃত অর্থ সম্ভবত সেখানেই।[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

জৈব নিরাপত্তা কি শুধু খামারের জন্যই প্রয়োজন?

বাংলাদেশে ‘জৈব নিরাপত্তা’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে পোলট্রি বা গবাদিপশুর খামারের গেট, জীবাণুনাশকের স্প্রে, ফুটবাথ কিংবা কর্মীদের সুরক্ষাপোশাক। সামগ্রিক ধারণায় এটি যেন কেবল পশুপাখিকে রোগ থেকে বাঁচানোর একটি খামারভিত্তিক ব্যবস্থা। কিন্তু জনস্বাস্থ্য ও অণুজীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধারণা অত্যন্ত সংকীর্ণ। খামারের জৈব নিরাপত্তা ব্যর্থ হলে এর প্রভাব পশুপাখির শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জাতীয় জনস্বাস্থ্যে। এই মৌলিক সত্যটি এখনো আমাদের নীতি ও জনআলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ—এই তিনটি স্তম্ভের সঙ্গে খামারের জৈব নিরাপত্তা গভীরভাবে যুক্ত। প্রতিদিন লাখো মানুষ যে মাংস, ডিম বা দুধ গ্রহণ করে, তার উৎস এই খামারগুলো। খামারের ভেতরে রোগ ছড়ালে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় থাকলে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকলে কিংবা অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার চললে তার মাশুল শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। খামারের ব্যর্থতা প্রথমে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারব্যবস্থায় আঘাত হানে। সেখান থেকে তা পৌঁছায় মানুষের রান্নাঘরে এবং শেষ পর্যন্ত মানবদেহে। তাই জৈব নিরাপত্তাকে শুধু পশুপাখির স্বাস্থ্য সুরক্ষার গণ্ডিতে আটকে রাখলে ঝুঁকির প্রকৃত মাত্রা বোঝা যাবে না।দেশের পোলট্রি ও গবাদিপশুর খামারগুলোতে সংক্রামক রোগের বিস্তার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সালমোনেলা, ক্যাম্পিলোব্যাক্টার, ক্ষতিকর ই-কোলাই কিংবা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো জীবাণুর বিস্তারের অন্যতম কারণ খামারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, দূষিত পানি ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। প্রান্তিক খামারি ও কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতাও রোগের বিস্তার বাড়ায়। সুরক্ষাপোশাক ব্যবহার না করা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখা এবং খামারের পোশাক পরে বাইরে চলাফেরা করা এর উদাহরণ। এসব জীবাণুর অনেকগুলোই জুনোটিক, অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। ফলে খামার পর্যায়ের একটি ছোট অবহেলা সহজেই বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।বর্তমানে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকিগুলোর একটি হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। খামারে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়। পরে এসব জীবাণু দুধ-মাংসের মাধ্যমে, খামারের কর্মীদের মাধ্যমে কিংবা বর্জ্য দ্বারা দূষিত পানি ও মাটির মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে। এর পরিণতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। সাধারণ সংক্রমণের ক্ষেত্রেও জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। এতে হাসপাতালের চিকিৎসা জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। তাই খামারে সঠিক জৈব নিরাপত্তা বজায় রাখা শুধু পশু সুরক্ষার বিষয় নয়। এটি ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকর রাখারও একটি মৌলিক ভিত্তি।খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের একটি বড় দুর্বলতা। মৃত পশুপাখি, মলমূত্র ও দূষিত তরল বর্জ্য প্রায়ই খোলা জায়গায় ফেলা হয়। এতে আশপাশের নদী, খাল, মাটি ও বাতাসে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিবেশের এই দূষণ শেষ পর্যন্ত কৃষিপণ্য, মাছ, শাকসবজি ও পানীয় জলের মাধ্যমে মানুষের খাদ্যচক্রে ফিরে আসে। ফলে জৈব নিরাপত্তার অভাব পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে এবং মানুষের নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।জীবন্ত পাখির বাজার বা কাঁচাবাজারও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। খামারের রোগ বাজারে পৌঁছালে তা হাজারো মানুষের সংস্পর্শে আসে। বাজারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, খোলা মাংস, রক্ত ও মলমূত্রের মিশ্রণ এবং গরমে পচন—সব মিলিয়ে রোগ ছড়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। একটি খামারে জৈব নিরাপত্তা মানা হলেও বাজারব্যবস্থায় যদি তা ভেঙে পড়ে, পুরো প্রক্রিয়াই অকার্যকর হয়ে যায়। তাই জৈব নিরাপত্তাকে শুধু খামারের গণ্ডিতে আটকে রাখলে চলবে না। এটি বাজারব্যবস্থার সঙ্গেও সমানভাবে যুক্ত।মূলত, জৈব নিরাপত্তা একটি অখণ্ড শৃঙ্খল। খামার, পরিবহন, বাজার, রান্নাঘর ও হাসপাতাল—এই পাঁচটি ধাপের যেকোনো একটিতে ব্যর্থতা পুরো খাদ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। খামারের ব্যর্থতা বাজারে পৌঁছায়, সেখান থেকে মানুষের ঘরে যায় এবং শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে গিয়ে দাঁড়ায়। তাই জৈব নিরাপত্তাকে কেবল পশুপাখির রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে পুরো ব্যবস্থাই অরক্ষিত থেকে যায়।বাংলাদেশে জৈব নিরাপত্তাকে এখনো মূলত খামারের রোগ প্রতিরোধের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। নীতিনির্ধারক, খামারি ও সংশ্লিষ্ট খাতের অনেকেই এটিকে মানুষের স্বাস্থ্য বা পরিবেশের স্বাস্থ্যের সঙ্গে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ওয়ান হেলথ’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ দৃষ্টিভঙ্গিও আমাদের নীতিমালায় আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দরকার আচরণগত পরিবর্তন, সচেতনতা, সঠিক চর্চা ও নিয়মিত বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ।জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে জাতীয় জনস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ে। খাদ্যবাহিত রোগ বাড়ে, মহামারির ঝুঁকি তৈরি হয়, অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে যেতে পারে এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই জৈব নিরাপত্তাকে খামারের গণ্ডি থেকে বের করে ‘এক স্বাস্থ্য’ ভাবনার আলোকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটি শুধু পশুপাখির রোগ প্রতিরোধের উপায় নয়; মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশের স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার জন্যও এটি একটি অপরিহার্য নিরাপত্তাব্যবস্থা।বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থা—এসবই নির্ভর করছে আমরা জৈব নিরাপত্তাকে কতটা বিস্তৃতভাবে দেখি তার ওপর। খামারের ব্যর্থতা মানুষের ঘরে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগে না। তাই জৈব নিরাপত্তাকে শুধু পশুপাখির জন্য নয়, মানুষের জীবন, পরিবেশ ও জাতীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি মৌলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।[লেখক: সাবেক ডিন, ফ্যাকাল্টি অব অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন; সাবেক চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়]

সিধু-কানুর ভাস্কর্য পুনঃস্থাপনে দেরি কেন

সাম্প্রতিক সময়ে দিনাজপুর যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। গিয়েছিলাম ঐতিহাসিক সিধু-কানুর ভাস্কর্যটি স্মরণ করতে। কিন্তু রড, ইট, পাথর, বালি ও কংক্রিটে নির্মিত সেই ভাস্কর্যটি এখন আর নেই। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মুখে সিধু-কানুর ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয়। উপমহাদেশের বীরযোদ্ধা সিধু-কানুর স্মৃতিবিজড়িত এই ভাস্কর্যের ধ্বংসাবশেষও যেন আমাদের ইতিহাসের প্রতি এক ধরনের অবহেলার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।মূলত ভাস্কর্যটি তিনটি স্তরে সাজানো হয়েছিল। প্রথম অংশে ছিল সাঁওতাল বিদ্রোহ ও তেভাগা আন্দোলনের বিপ্লবীদের স্মরণে মুর‌্যাল। দ্বিতীয় স্তরে ছিল কমরেড ইলা মিত্র, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, কমরেড গুরুদাস তালুকদার ও খোকা বাইশের মুর‌্যালের প্রতিকৃতি। তৃতীয় অংশে ছিল ব্রিটিশবিরোধী মহান সাঁওতাল বিদ্রোহের অমর নায়ক সিধু-কানু ভ্রাতৃদ্বয়ের ভাস্কর্য। তাদের হাতে ছিল সাঁওতাল বিদ্রোহের চিরন্তন স্মারক তীর-ধনুক। বীরত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে তাদের উপস্থাপন করা হয়েছিল। নিচের দুটি অংশ অক্ষত থাকলেও সিধু-কানুর ভাস্কর্যটি উপড়ে ফেলা হয়েছে।ভাস্কর্যটি ভাঙার ঘটনা নিয়ে আদিবাসী নেতৃবৃন্দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ রয়েছে। তাদের বক্তব্য, প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের মুর‌্যালের কোনো ক্ষতি না করে শুধু সিধু-কানুর ভাস্কর্যটি কেন ভেঙে ফেলা হলো? তাদের আশঙ্কা, এর পেছনে আদিবাসীদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবদানকে অস্বীকার করার মানসিকতা কাজ করতে পারে। বিষয়টি সত্য হলে তা অবশ্যই উদ্বেগের। কারণ কোনো জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সংগ্রামের স্মারক ধ্বংস করা শুধু একটি স্থাপনা নষ্ট করা নয়; এর সঙ্গে সেই জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় ও ইতিহাসের প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে।ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের স্মারক হিসেবে সিধু-কানুর ভাস্কর্যটি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে দিনাজপুর-পঞ্চগড় মহাসড়কের পাশে কান্তনগর মোড়ে স্থাপন করা হয়। দিনাজপুরের কান্তনগর মোড় বা ১০ মাইলের ঐতিহাসিক তেভাগা চত্বরে নির্মিত স্মারকটি ছিল এই অঞ্চলের কৃষক ও আদিবাসী মানুষের সংগ্রামের একটি দৃশ্যমান প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ভাস্কর্যটির সঙ্গে নিজেদের ইতিহাস ও অধিকার আদায়ের চেতনার সম্পর্ক তৈরি করেছিল। সেখানে বারবার গিয়ে তারা অতীতের সংগ্রামকে স্মরণ করতেন।সিধু-কানুর ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলার পর ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরের রাজপথে আদিবাসী ছাত্র-জনতা, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, আদিবাসী মুক্তি মোর্চাসহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অংশ নেন। সেদিন প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে একটি স্মারকলিপি দিনাজপুরের ডিসি‘র কাছে হস্তান্তর করা হয়। নয় দফা দাবির মধ্যে সিধু-কানুর ভাস্কর্য পুনর্নির্মাণ এবং ভাঙচুরকারীদের শাস্তির দাবিও ছিল।জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, দিনাজপুরের ডিসি তখন বলেছিলেন, সিধু-কানুর ভাস্কর্য পুনঃস্থাপনের জন্য এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং তা বিবেচনাধীন রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এত দিন পরও সেই ‘বিবেচনাধীন’ অবস্থার অবসান হলো কি?১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর বাংলার কৃষকদের ওপর জমিদার ও জোতদারদের শোষণ আরও তীব্র হয়। কৃষকেরা নিজেদের শ্রম ও উৎপাদন খরচ বহন করেও উৎপাদিত ফসলের বড় অংশ জোতদারদের দিতে বাধ্য হতেন। এরই প্রেক্ষাপটে তেভাগা আন্দোলনের দাবি ছিল, উৎপাদিত ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ কৃষক এবং এক-তৃতীয়াংশ জমির মালিক পাবেন। ১৯৪৬-৪৮ সালের ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনে উত্তরবঙ্গের আদিবাসী সাঁওতালদের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ছিল। হাজী মোহাম্মদ দানেশ এ অঞ্চলের কৃষক ও সাঁওতালদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।সাঁওতালদের সংগ্রামের ইতিহাস আরও পুরোনো। ১৮৫৫ সালে সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব, ফুলো ও ঝানোসহ সাঁওতাল নেতারা জমিদার, মহাজন ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। তাদের আন্দোলনে সাঁওতালদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার খেটে খাওয়া মানুষও যুক্ত হয়েছিল। শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে এই সংগ্রাম উপমহাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে।সিধু-কানুর স্মৃতি ধরে রাখতে ভারতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পার্ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাদের নামে স্থাপনা ও ভাস্কর্য রয়েছে। তাদের নামে স্মারক ডাকটিকিটও প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে সিধু-কানুর স্মৃতি শুধু সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর নয়, উপমহাদেশের শোষণবিরোধী সংগ্রামেরও অংশ।দিনাজপুরের কান্তনগর মোড়ে স্থাপিত ভাস্কর্যটি চিত্রশিল্পী প্রদ্যোত কুমার দাসের নকশায় নির্মিত হয়েছিল। বহু মিটিং, আন্দোলন ও দাবির পর এই স্মারক নির্মিত হয়। তাই এটি শুধু একটি ভাস্কর্য নয়; এর সঙ্গে এ অঞ্চলের কৃষক, শ্রমজীবী ও আদিবাসী মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস জড়িয়ে আছে।একটি ঐতিহাসিক ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার পর তা পুনর্নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ভাস্কর্যটির ধ্বংসাবশেষ যদি সংরক্ষিত হয়ে থাকে, তবে তার ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ইতিহাসের কোনো স্মারক ধ্বংসের ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্যও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।সাঁওতাল বিদ্রোহের মহানায়ক সিধু-কানু শুধু একটি জনগোষ্ঠীর বীর নন। শোষণ, বঞ্চনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রামের ইতিহাসে তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। তাই তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো এবং কান্তনগর মোড়ে তাদের ভাস্কর্য দ্রুত স্বস্থানে পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের সব ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্মারকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ইতিহাসের স্মারক রক্ষা মানে শুধু অতীতকে রক্ষা করা নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসকে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়াও।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

দীর্ঘায়ুর যুগে প্রবীণদের জন্য নতুন প্রস্তুতি

আজ ১ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস’ পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থার পুনর্ভাবনা’। প্রবীণ ব্যক্তিরা শুধু সামাজিক সুরক্ষার সুবিধাভোগী নন; তাঁদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও আজীবন শিক্ষার ব্যবস্থা নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘায়ুকে স্বাস্থ্যকর, উৎপাদনশীল ও মর্যাদাপূর্ণ করার পাশাপাশি সমাজের সব ক্ষেত্রে প্রবীণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর ৪৫/১০৬ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ঘোষণা করে। ১৯৯১ সালের ১ অক্টোবর প্রথমবার দিবসটি পালিত হয়। বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যার বয়স কাঠামো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ফলে সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।জাতিসংঘের ‘বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২৪’ অনুযায়ী, ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বে ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২৬ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাতে পারে। ২০৭০-এর দশকের শেষ দিকে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২২০ কোটিতে পৌঁছানোর প্রাক্কলন রয়েছে। ২০৮০ সালের মধ্যে এই বয়সী মানুষের সংখ্যা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ বিশ্ব প্রবীণ সমাজের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।বাংলাদেশেও একই ধরনের জনমিতিক পরিবর্তন ঘটছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের প্রবীণ ধরা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৫’ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ মানুষ ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী। জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ থেকে ৪ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছাতে পারে।প্রবীণদের কল্যাণ ও আর্থসামাজিক সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৮ সাল থেকে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ২০১৩ সালে ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা’ প্রণয়ন করা হয়। এর লক্ষ্য প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ, দারিদ্র‍্যমুক্ত, কর্মময়, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ সামাজিক জীবন নিশ্চিত করা। নীতিমালায় স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রাধিকার, প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো, সামাজিক অংশগ্রহণ, দুর্যোগকালে বিশেষ সুরক্ষা, গবেষণা এবং আন্তঃপ্রজন্ম যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।এ ছাড়া ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’, ‘বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০১৩’ এবং ‘সুস্থ বার্ধক্য বিষয়ক জাতীয় কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (২০২৪-২০৩০)’সহ বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২২ সালে বয়স্কদের সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক জাতীয় নির্দেশিকাও প্রণয়ন করেছে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া, কর্মসংস্থানের অভাব, সঞ্চয়হীনতা, রোগব্যাধি, একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পারিবারিক সহায়তার ঘাটতির কারণে অনেক প্রবীণ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।জাতীয় প্রবীণ নীতিমালায় প্রবীণদের জন্য পরিচয়পত্র, গণপরিবহনে পৃথক টিকিট কাউন্টার, হাসপাতাল ও জনসেবা প্রতিষ্ঠানে র‌্যাম্প, প্রবীণ নিবাস ও দিবা-যত্ন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সুবিধার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের অনেকগুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। নীতিমালা প্রণয়নের এক দশকের বেশি সময় পরও এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় হালনাগাদ জরুরি হয়ে পড়েছে।প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি শুধু সমাজকল্যাণের নয়; এটি স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। তাই প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, নিরাপদ চলাচল, আর্থিক সুরক্ষা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে সমাজের কাজে লাগানোর পথও তৈরি করতে হবে।প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, সুশীল সমাজ, পরিবার এবং সমাজের সব বয়সী মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দীর্ঘায়ু যখন মানবসভ্যতার বড় অর্জন, তখন দীর্ঘ জীবন যেন একাকিত্ব, অসহায়ত্ব ও অবহেলার কারণ না হয়—এটাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক ও লাইন ডাইরেক্টর (এমআইএস), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর]

আইনশৃঙ্খলার লাগাম কার হাতে?

ক্ষোভ সামলে রাখা কঠিন। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়, “দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি।” দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখলে সত্যিই প্রশ্ন জাগে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার মন্ত্রণালয় কি যথাযথভাবে কাজ করছে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কোথায়? অন্যায় যখন প্রকাশ্যেই ঘটে, তখন পুলিশ কেন অনেক সময় দর্শকের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে থাকে?মিরপুরে সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিয়ে লুটপাট চালিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এর নেপথ্যে ছিল রাজনৈতিক প্রভাব ও জমি দখলের স্বার্থ। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি জানত, তারপরও কেন কার্যকর প্রতিরোধ দেখা গেল না, সেটি তদন্ত করে জনগণের সামনে পরিষ্কার করা জরুরি।ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে একই ধরনের আরেকটি ঘটনা সামনে এসেছে। এবার লক্ষ্য একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অভিযোগের কেন্দ্রে আবারও জমি দখলের স্বার্থ। প্রশ্ন তাই সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছেই; আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাদের হাত-পা বাঁধা?দেশের মানুষ এমন বাংলাদেশ চায় না, যেখানে জমি দখল, হামলা, লুটপাট কিংবা ভয় দেখানো একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ক্ষমতার প্রদর্শনী হয়ে উঠবে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অতীতের দলীয় পদ-পদবির প্রভাব থাকার অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। কেউ বর্তমানে পদে নেই, কিন্তু ‘সাবেক’ পরিচয়টুকুই যদি এলাকায় প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সেটিও রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য অস্বস্তিকর প্রশ্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার কাছে তাই প্রথম প্রশ্নটি আইনশৃঙ্খলা নিয়ে, দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক শৃঙ্খলা নিয়ে।যেসব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যকর কমিটি নেই, সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই কিংবা একই এলাকায় একাধিক গোষ্ঠী নিজেদের আলাদা নেতৃত্ব দাবি করে, সেখানেই তৈরি হয় নিয়ন্ত্রণের সংকট। একই এলাকায় কেউ নিজেকে মূল নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করছে, অন্য কেউ পুরোনো পদ-পদবির পরিচয়ে প্রভাব দেখাচ্ছে, আবার আরেকটি পক্ষ নিজেদের আলাদা বলয় তৈরি করছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কে কার কথা শুনবে, সেটিই অনেক সময় পরিষ্কার থাকে না।এই সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার দায় শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও এর দায় নিতে হবে। সংগঠনগুলোকে নিয়মিত কমিটির আওতায় আনতে হবে, সাংগঠনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে, রাজনীতির পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধে জড়ালে তার বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনগত ব্যবস্থা হবে। পদ কোনো অপরাধের লাইসেন্স নয়।একই সঙ্গে পদ-পদবি ঘিরে আর্থিক লেনদেন, প্রভাব বিস্তার কিংবা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করার উদ্যোগও জরুরি। রাজনৈতিক সংগঠনে পদ মানে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ নয়; বরং দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি।এর পরের এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি পুলিশের। একটি থানার আওতায় যদি একাধিক রাজনৈতিক বলয় সক্রিয় থাকে, তাহলে পুলিশ সদস্যদের ওপরও নানা দিক থেকে চাপ তৈরি হয়। এক পক্ষের সঙ্গে কথা বললে অন্য পক্ষ অসন্তুষ্ট হয়; একজনের অভিযোগ আমলে নিলে আরেকজন রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত একজন পুলিশ সদস্য যদি মনে করেন, আইন প্রয়োগের আগে তাকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবতে হবে, তাহলে আইনের শাসন দুর্বল হওয়াই স্বাভাবিক।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এখানেই আপনার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।পুলিশকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে; অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয়, পদ-পদবি কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধির অনুমোদন নিয়ে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি চলতে পারে না। পুলিশের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একটি স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামো থাকা দরকার, যাতে থানার কার্যক্রমে অযাচিত চাপ তৈরি না হয়।পুলিশকে আইনের অধীনে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে, আবার সেই স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ অন্যায় করলে তারও ব্যবস্থা হবে; কিন্তু রাজনৈতিক চাপে পুলিশ যেন আইন প্রয়োগ থেকে পিছিয়ে না যায়; এই নিশ্চয়তাও রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শুধু থানার সমস্যা নয়। এটি মানুষের নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার, ব্যবসার পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। রাতের আঁধারে জমি দখল, দিনের আলোয় লুটপাট কিংবা প্রকাশ্যে ত্রাস; এসব কোনো স্বাভাবিক সমাজের চিত্র হতে পারে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে; এ কথা বলার সময় হয়তো আসেনি। কিন্তু পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেই দায়িত্ব এখনই নিতে হবে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার হাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ; রাজনৈতিক পেশিশক্তির লাগাম টানা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের পেশাগত ভূমিকা পালনের যথাযথ পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া। দেশের মানুষ কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়। যারা অন্যায় করছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়; অপরাধটাই যেন তাদের পরিচয় হয়। আর যারা আইন রক্ষা করবে, তারা যেন রাজনৈতিক অসন্তোষের ভয়ে আইন প্রয়োগ থেকে পিছিয়ে না যায়।এখন প্রশ্ন একটাই; সরকার কি সত্যিই পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে চায়? তা হলে সময় এখনও আছে। দরকার শুধু দৃঢ় সিদ্ধান্ত, স্পষ্ট নির্দেশনা এবং তার বাস্তব প্রয়োগ।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক সভাপতি, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব]

সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থান: বিশ্বকে বাংলাদেশের সতর্কবার্তা

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এখন আর ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়। এটি ইতোমধ্যে উপকূলীয় জনপদ, দ্বীপরাষ্ট্র ও নিম্নভূমির মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলছে। জাতিসংঘও বিষয়টিকে বৈশ্বিক উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করে ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করে।জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৪-এ অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বাস্তবতা তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-যে সংকটের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর দায় তুলনামূলকভাবে কম, সেই সংকট মোকাবিলার ব্যয় ও দায়িত্বও কি তাদের একার হবে?বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। নদী, বদ্বীপ ও সমুদ্রঘেরা এই দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে শুধু কিছু জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই তৈরি হয় না, এর সঙ্গে যুক্ত হয় লবণাক্ততার বিস্তার, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতি, সুপেয় পানির সংকট, ঘরবাড়ি হারানো এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির মতো নানা সমস্যা। জাতিসংঘের ভাষ্যেও উঠে এসেছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আবাসন, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং জীবিকার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে চারটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন-বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমানো, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। এসব প্রস্তাবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অভিযোজনের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্নটি। এখানেই বাংলাদেশের অবস্থানটি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।  বাংলাদেশ একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রস্তুতি, উপকূল সুরক্ষা এবং বন ও জলাভূমি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে তুলে ধরেছেন।অন্যদিকে দেশটি মনে করিয়ে দিয়েছে, জাতীয় উদ্যোগের পাশাপাশি বৈশ্বিক সহযোগিতার বিকল্প নেই। জাতিসংঘের এই বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে না দেখে উন্নয়ন, অর্থনীতি, মানবিক নিরাপত্তা ও বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত একটি বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের উদ্দেশ্যও ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সক্রিয় করা এবং সমন্বিত ও অর্থায়নসমৃদ্ধ পদক্ষেপের দিকে এগিয়ে যাওয়া। বৈঠকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক ঘোষণাও গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তাই নিউইয়র্কের এই বক্তব্য কেবল একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেওয়া আরেকটি জলবায়ু বক্তৃতা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের উপকূল, নদী, কৃষি, মানুষের বসতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাবি উত্থাপনের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও অভিযোজন, দুর্যোগ প্রস্তুতি, পরিকল্পিত নগরায়ণ, উপকূলীয় অবকাঠামো এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের মতো বিষয়গুলোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করা জরুরি।সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ছে-এ বাস্তবতা কোনো একটি দেশের সীমান্তে থেমে থাকে না। জাতিসংঘের আলোচনাতেও উঠে এসেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব বন্দর, সরবরাহব্যবস্থা, খাদ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির ওপরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক আলোচনায় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই আলোচনার সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াই শেষ পর্যন্ত শুধু সমুদ্রকে ঠেকানোর লড়াই নয়-এটি মানুষের বসতি, জীবিকা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই।লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন।

ভিডিও আরও দেখুন

শুটআউটের রোমাঞ্চে সিঙ্গাপুরকে হারাল বাংলাদেশ

পেনাল্টি শুটআউটে সিঙ্গাপুরকে হারিয়ে রোমাঞ্চকর এক জয়ে এশিয়ান গেমসে নিজেদের অভিযান শেষ করল বাংলাদেশের নারী হকি দল। শুক্রবার (২ অক্টোবর) জাপানের গিফু প্রিফেকচারাল গ্রিন স্টেডিয়ামে নির্ধারিত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর, শুটআউটে ২-১ ব্যবধানের জয়ে টুর্নামেন্টে নবম স্থান নিশ্চিত করেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।   ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দেশের মধ্যে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই দেখা যায়। প্রথমার্ধেই দারুণ এক আক্রমণ থেকে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেন আইরিন আক্তার রিয়া। ম্যাচের ১০ মিনিটে তার পাওয়া চোখধাঁধানো ফিল্ড গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় বাংলাদেশ।   তবে দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের দৃশ্যপট। ৪২ মিনিটে হলুদ কার্ড দেখে লিমা আক্তার মাঠ ছাড়লে সাময়িকভাবে ১০ জনের দলে পরিণত হয় বাংলাদেশ। একজন খেলোয়াড় কম থাকার সেই সুযোগ পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগায় সিঙ্গাপুর। দুই মিনিট পরই (৪৪ মিনিট) পেনাল্টি কর্নার থেকে নেওয়া নিখুঁত শটে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান তৌ লি মিন।   এরপর আর কোনো দলই গোল করতে না পারায় নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ অমীমাংসিত থেকে শেষ হয়। পরবর্তীতে জয়-পরাজয় নির্ধারণে পেনাল্টি শুটআউটের আশ্রয় নেওয়া হয়। শুটআউটে স্নায়ুচাপ ধরে রেখে সিঙ্গাপুরকে ২-১ ব্যবধানে পরাস্ত করে স্মরণীয় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশের মেয়েরা।  / 

শুটআউটের রোমাঞ্চে সিঙ্গাপুরকে হারাল বাংলাদেশ