সংবাদ
হাম ও উপসর্গে একদিনে ১২ শিশুর মৃত্যু

হাম ও উপসর্গে একদিনে ১২ শিশুর মৃত্যু

সারাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (৬ মে সকাল ৮টা থেকে ৭ মে সকাল ৮টা) হাম ও হামের মতো উপসর্গে ১২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর মোট মৃত্যু দাঁড়ালো ২৮৮ জনে।অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত একদিনে নিশ্চিতভাবে ১ জন এবং হামের উপসর্গ বা সন্দেহভাজন হিসেবে আরও ১১ জন শিশু মারা গেছে। সেইসঙ্গে নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২৩৩ জন শিশু, যাদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম রোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ২৮৬ জন।চলতি বছরের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মোট সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৪৯৮ জনে। ল্যাব পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত ৮ হাজার ২০৮ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ২৮ হাজার ২৩৪ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন।মোট মৃত্যুর হিসাবে নিশ্চিত হামে ৫৭ জন এবং সন্দেহভাজন হিসেবে ২৩১ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। শিশুর শরীরে জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া শিশুদের দ্রুত টিকা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের আহ্বান জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
৮ মিনিট আগে

মতামতমতামত

গ্রামের ধানকাটা ও প্রাসঙ্গিক কথা

এখন বৈশাখ মাস। গ্রামে আছি। কিশোরগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হিসেবে হাওরাঞ্চলেই বেড়ে উঠেছি। শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামের মাঠে-ঘাটে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ঝুলিটা বেশ বড়োই বলা যায়। এখন বোরোধান কাটার ভরা মৌসুম চলছে। ভাটি বাংলার মানুষের মূল ফসল এই বোরোধান। এটা বছরে একবার হয়। এর ওপরই চলে কৃষকের বারো মাসের ভালো-মন্দ জীবন। স্মরণাতীত কাল থেকেই ভাটির মানুষের সুখ-দুঃখ আয়-ব্যয়, আর আটপৌরে জীবন যাত্রার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে বিল-ঝিল আর হাওরের বোরো ধানের সোঁদাগন্ধ। বোরো ধানের ফলন বরাবরই ভালো হয়, বেশির ভাগ সময়েই বাম্পার ফলন হয়ে থাকে। যদিও এর সঙ্গে আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতন দুর্ভাগ্য লেগে থাকে। এতদস্বত্বেও হাওরের মানুষ অভ্যস্ত এবং অভিজ্ঞ। দুর্যোগ বলতে অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, হঠাৎ বাঁধ ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি হয়ে থাকে। কিন্তু এসবের ভেতরেও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কৃষকরা তাদের জীবিকার মতন ধান সংগ্রহ করে নিতে পারে। ২.দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এবারের দুর্যোগ সম্পূর্ণ অন্যরকম, মাত্র ৫-৬ দিনের অতিবৃষ্টি এসে তলিয়ে দেয় হাজার হাজার হেক্টর প্রায় পেকে ওঠা ধানের জমি। পানি সরে যাচ্ছে না কিছুতেই, কারণ নানা স্থানে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, ব্রিজ কালভার্টের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে, খাল, নালা, সংকোচিত হয়েছে যত্রতত্র। এবার স্বচোখে ধান লওয়া আর কৃষকের অবর্ণনীয় বিড়ম্বনা দেখে অশ্রুপাত করা ছাড়া যেন উপায় নেই। এমনিতেই বোরো ব্যয়বহুল ফসল। এর উৎপাদন অধিক হওয়ার পেছনে প্রয়োজন পড়ে পর্যাপ্ত পানি, সার, কীটনাশক প্রভৃতির। কৃষকরা লোন করে, এনজিওর কিস্তি পরিশোধের দায় নেয়, গ্রামীণ সুদের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান দিয়ে শোধ করার শর্তে টাকা এনে বোরো ধান চাষ করে থাকে। তাদের ভরসা ধান তুলে সব ঋণের বোঝা নামিয়ে স্বস্তির হাসি হাসবে। না, এবার তা হচ্ছে না, কৃষক ধান ওঠাতে পারছে না মূলত বিরূপ আবহাওয়া আর হাতে নগত টাকার অভাবে। ৩.আরেকটা অনির্বচনীয় দৃশ্য যা বিবেককে নাড়া দিয়ে যায়, তা হলো ধানের বাজার মূল্য। এর কোনো দাম নেই। মনে হয়, মানুষ শুধু চাল খায়, ধানের দরকার নেই। মাঠে মাঠে ভেজা ধান পড়ে আছে, কেনার কেউ নেই। আপাতদৃষ্টিতে সবচেয়ে ফেলনা বস্তুর নামই ধান। দেখা যায়, এক মণ ধানের দাম সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা। আর একজন দিনমজুর বা রোজ কামলার মজুরি ১৫০০-১৬০০ টাকা। বৃষ্টির কারণে জমিতে তারা বেশি সময় থাকতে পারছেনা। অথচ এদের জন্যে দু’বেলা খাবারও সরবরাহ করতে হচ্ছে কৃষককেই। যেখানে একজন মজুর দিনে ২০০০ টাকার ধান কাটতে পারছে না, তাকে দু’বেলা খাবার এবং ১৬শ’ টাকা দিতে হচ্ছে। কোন দিকে যাবে কৃষক আর জমির মালিকরা? তারা জমির তলিয়ে যাওয়া ধান আনবে নাকি জমিতেই বিলীন হতে দিবে তা স্থির করে ওঠতে পারছে না। সহানীয় একজন প্রবীণ কৃষক জানালেন, ‘গত ৫০ বছরে তিনি এমন আবহাওয়ার বিপর্যয় দেখেননি। গত এক সপ্তাহের মধ্যে দু’চার ঘণ্টার জন্যও সূর্যের আলোর দেখে নাই। কাটা ধানে চারা গজিয়ে উঠেছে, খর পচে গলে যাচ্ছে। এতে গরু-বাছুরের খাবারের সংকট দেখা দিবে। এবার ভাটি অঞ্চলের কৃষক ধান হারানোর পাশাপাশি গরু-মহিষও হারাবে’। সামনে অল্প ক’দিনের মধ্যেই গ্রামে গ্রামে কোরবানির হাট বসবে। ভাটি বাংলায় এবার যারা গরু লালন-পালন করছে বেশি দামের আশায় তারাও আশাহত হয়ে পড়েছে। কারণ গোখাদ্য সংকট দেখা দিবে। ৪.গ্রামে ক্রমেই কমে যাচ্ছে শ্রমজীবী দিনমজুরের সংখ্যা। নানাবিধ পেশায় তারা জড়িয়ে পড়েছে। যারা গ্রামে থাকছে তাদের একটা অংশ নিকটতম হাট-বাজারে ছোটখাটো ব্যবসা করছে, রিকশা বাইসাইকেল, চাস্টলসহ বিভিন্ন গ্যারেজে কাজ করছে। সামান্য কিছু অংশ বিদেশে, আরেকটা অংশ শহরে চলে গেছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামে জুতার কাজ বা রিকশা অটোরিকশা ইত্যাদিতে জড়িয়ে গেছে। বর্তমানে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, জমিওয়ালা কৃষকের তুলনায় দিনমজুরের সংখ্যা কম। ফলশ্রুতিতে তারা নিজেরাই নিজের মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে কৃষকদের জিম্মি করে ফেলেছে। কৃষকের অবস্থা এমন যে, হয় সে জমির ধান কেটে আনবে অথবা ফেলে দিবে। আবার কেউ কেউ বিঘা প্রতি চুক্তিতে দিয়ে দিচ্ছে। এক বিঘা জমির ধান কেটে দিতে তারা চাচ্ছে ১০ হাজার টাকা। এতে ধান হবে সর্বোচ্চ ১৮-২০ মণ। আর মধ্যস্বত্ব ভোগীরা সুযোগ বুঝে ভেজা ধানই ক্রয় করছে মণপ্রতি ৭০০ টাকা দামে। এ যেন গ্রামীণ কৃষকদের জন্যে এক করুণ ও হতাশার চিত্র। গ্রামের কৃষিতে দিনমজুরের এমন ভয়াবহ সংকট নিরসন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই ধরনের ˆনরাজ্যকর পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় চলতে পারে না। সরকারকে কৃষি কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এদিকে নজর দিতে হবে। দেশের শহরকেন্দ্রিক লাখ লাখ শ্রমিককে গ্রামে ফেরাতে হবে। বিশেষ করে রাজধানীতে যে কয়েক লক্ষাধিক অবৈধ রিকশা ও অটোরিকশা চালক রয়েছে এদের ফেরানোর একটা উদ্যাগ নিতে হবে। প্রয়োজনে আইন করে ফেরাতে হবে। কেননা, বলা হয়, ঢাকা শহরের বহুমাত্রিক অপরাধের সঙ্গে এরা জড়িত। মূলত মাদকাসক্ত, স্থানীয় মস্তান ও বখাটেদের সঙ্গে এদের ওঠাবসা। এরা অনেকে একাধিক ঘর সংসার করেছে। নারী নির্যাতন ও পাচারের মতন অপরাধেও তারা জড়িত এমন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হরহামেশাই বের হচ্ছে। আরেকটি অপরাধ হলো, শহরজুড়ে মোটর চালিত অটোরিকশার রাজত্ব কায়েম করেছে তারা। অবৈধ লাইনের বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে প্রতিদিন। তারা রাজনৈতিক মিছিল মিটিংয়ে ভাড়ায় যাচ্ছে, ভাঙচুরে অংশ নিচ্ছে। শহরের ভিভিআইপি রোডে রাত-বিরাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, প্রশ্রাব- পায়খানার দুর্গন্ধে ঢাকার রাস্তার ফুটপাত ধরে পথচারীদের চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এদিকে নজর দেয়া সরকার/সিটি করপোরেশনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, পৃথিবীর আর কোনো দেশের রাজধানী শহরের চিত্র এমনট নয়। নাগরিক সেবার প্রধান শর্ত হলো শহরবাসীর জন্য একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করা। এটা যেকোনো সরকারের জন্যে সুশাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করা হয়। কাজেই এ একটা মূল জায়গায় হাত দিলে হয়তো গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক ধারা ফিরে আসতে পারে। আজকাল কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে এতে সন্দেহ নাই তথাপি শ্রমিকের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তা কমেনি। বরং শ্রমিকের প্রাচুর্য থাকলে কৃষকরা বছরে তিনবার ফসল তুলতে পারতো। শ্রমিকেরও কর্মসংস্থান হতো। দেশে খাদ্যের আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পেত। এগুলো একটি অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত বিষয়। কাজেই নতুন সরকারকে গ্রাম, শহর, মহানগর, রাজধানী সবকিছু নিয়ে সামষ্টিক ভাবে ভাবতে হবে। আবহমান গ্রাম ও আদি কৃষককে বাঁচানোর জন্যে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। [লেখক: গল্পকার]

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ জয়

ভারতের পশ্চিম বঙ্গের নির্বাচন কে ‘রাজনৈতিক অলৌকিক ঘটনা’ বলার যথেষ্ট কারণ আছে। পনেরো বছর পর পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের পতন এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অভূতপূর্ব উত্থান প্রথম দেখায় যেন এক আকস্মিক বিপর্যয়ের মতো। কিন্তু রাজনীতি সচরাচর আকস্মিক বিপর্যয়ে কাজ করে না। বরং তা ধীরে ধীরে জমা হয়, জেগে উঠে, আর তারপর প্রায় নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গ এর আগেও এমন গল্প দেখেছে। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার চাপে কংগ্রেসের পতন ঘটে। ২০১১ সালে বামফ্রন্ট (একসময় যাকে অজেয় বলে মনে করা হতো) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে উদীয়মান জনপ্রিয়তার ঢেউয়ে তলিয়ে যায়। প্রতিটি পরিবর্তনকে তখন যুগান্তকারী মোড় হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি পরির্বতনই ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা ক্ষয়প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি। ২০২৬ সালে বিজেপির জয় সম্পূর্ণভাবে সেই ধারার মধ্যেই পড়ে। এখানে কোনো জাদু নেই—শুধু সময়ের সঞ্চিত গতিবেগই অবশেষে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছেছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে কাছের ব্যাখ্যাটি হলো ‘বিদ্বেষমূলক ভোট’। যেকোনো জায়গায় পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকা অনেক দীর্ঘ সময়; বাংলায় তা যেন চিরন্তন। প্রশাসন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে কুখ্যাত ‘কাটমানি’ সংস্কৃতি—দুর্নীতির অভিযোগ সাধারণ মানুষের আলোচনায় প্রাধান্য পেতে থাকে। একসময় যে কল্যাণ প্রকল্পগুলি দারুণ জনপ্রিয় ছিল, সেগুলো এখন আর রূপান্তরকর বলে মনে হয় না, বরং নিয়মিত কিছু বিষয়ে পরিণত হয়। ভোটাররা, বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও তরুণ সমাজ, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পুনরায় যাচাই করতে শুরু করে। একসময়ের কৃতজ্ঞতা বদলে গিয়ে প্রথমে ‘পাওনা’ মনে হয়, পরে সেটাই হয়ে ওঠে হতাশা। কিন্তু শুধু বিদ্বেষমূলক ভোটই ২০০-এর বেশি আসনে জয় এনে দিতে পারে না। আরও গভীর কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। বিজেপি নির্বাচনী অঙ্ক নিজেই নতুন করে সাজাতে সক্ষম হয়। অমিত শাহের কৌশলগত নির্দেশনায় এবং নরেন্দ্র মোদির বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে দলটি একটি পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর খেলার কৌশল প্রয়োগ করে: একটি ভোটব্যাংককে সংহত করা এবং অন্যটিকে ভেঙে দেওয়া। হিন্দু ভোটের সংহতকরণ (প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ৬৫%) এবং মুসলিম ভোটের আংশিক বিভাজনের ফলে গ্রামীণ ও আধা-শহুরে কেন্দ্রগুলোতে একটি সিদ্ধান্তমূলক সুবিধা তৈরি হয়। এটি ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়, কিন্তু বাংলায় এটি একটি গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দশকের পর দশক ধরে এই রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিজেকে গর্বিত করত প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ প্রতিরোধ করার জন্যে। সেই প্রতিরোধ এখন দুর্বল হয়েছে। বিজেপি শুধু একটি জাতীয় বয়ান আমদানি করেনি; বরং এটিকে স্থানীয় রূপ দিয়েছে। এটি পরিচয়ের রাজনীতির সঙ্গে কল্যাণের প্রতিশ্রুতি যুক্ত করেছে, তৃণমূলের সামাজিক কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করে বড় আকারের নগদ স্থানান্তর ও উন্নয়নের অঙ্গীকার দিয়েছে। এর মাধ্যমে এটি আদর্শিক সংহতি এবং বাস্তব প্রণোদনার মধ্যে রেখা অস্পষ্ট করে দিয়েছে। দলটির কৌশলগত শৃঙ্খলাও ছিল ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালের প্রচারণার তুলনায় (যেটি কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর অতিনির্ভরতা ও ব্যক্তিগত আক্রমণে ভরপুর ছিল) বিজেপি এবার কৌশল বদলায়। ব্যক্তিত্বের সংঘর্ষের বদলে তারা প্রশাসনের ব্যর্থতার দিকে নজর দেয়। স্থানীয় নেতৃত্বকে সামনে আনে, বুথ-স্তরের সংগঠনে ব্যাপক বিনিয়োগ করে এবং ১৭৭টি জয়-উপযোগী কেন্দ্রকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করে। এমনকি তাদের সাংস্কৃতিক বার্তাটিকেও পরিমার্জিত করা হয়: দল সচেতনভাবেই ‘বাঙালিয়ানা’কে গ্রহণ করে, ‘বাইরের লোক’ সেই তকমা ঝেড়ে ফেলে যা আগে তাদের জনপ্রিয়তাকে সীমিত করে রেখেছিল। ফলাফলটি নিছক রাজ্য-স্তরের জয় নয়; এটি ভারতের রাজনৈতিক ভূগোলে এক কাঠামোগত পরিবর্তন। পশ্চিমবঙ্গ ছিল বিজেপির প্রসারের বিরোধিতা করা শেষ বড় ঘাঁটিগুলোর একটি। এর পতন আসাম, ত্রিপুরা ও ওড়িশায় অর্জিত সাফল্যের সঙ্গে মিলে পূর্ব ভারতে দলটির একীকরণ সম্পূর্ণ করে। এর প্রভাব কলকাতার বাইরেও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। ভূরাজনৈতিক দিক থেকে, এর প্রভাব তাৎক্ষণিক এবং তা আর কোথাও বাংলাদেশের মতো প্রকট নয়। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের আর একটি রাজ্য মাত্র নয়; এটি ভারতের বাংলাদেশ-প্রবেশদ্বার। দেশটির সঙ্গে এর দীর্ঘ, উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে, এটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের একটি বড় অংশ সম্ভব করে এবং দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সেতু হিসেবে কাজ করে। তৃণমূল শাসনের অধীনে, অভিবাসন, নাগরিকত্ব আইন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে রাজ্য সরকার ও নয়া দিল্লির মধ্যে প্রায়ই এক সূক্ষ্ম টানাপড়েন ছিল। সেই টানাপড়েন কোনো না কোনোভাবে এক ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে কাজ করতো। কেন্দ্রের সঙ্গে সারিবদ্ধ একটি বিজেপি সরকার অবশ্যই সেই প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলে দিবে। প্রথম ও সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়টি হলো অভিবাসন। বাংলাদেশ থেকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ্র-এর বয়ানটি বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই জোর দিয়ে বলে আসছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং প্রস্তাবিত নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি)-র মতো নীতিগুলো এই বয়ানের সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িত। পশ্চিমবঙ্গে একটি রাজ্য সরকার যদি কেন্দ্রের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে একমত হয়, তাহলে তা কঠোর আইন প্রয়োগের পথ সুগম করতে পারে, কথায় বলা বিষয়গুলোকে প্রশাসনিক বাস্তবতায় রূপ দিতে পারে। ঢাকার জন্য এটি কূটনৈতিক ও মানবিক উভয় ধরনের উদ্বেগই বাড়ায়। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চোরাচালান, পাচার এবং সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়তে পারে—এই সব ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ মিলে যায়। তবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রায়শই সামাজিক মূল্য নিয়ে আসে। সীমান্তের জনপদগুলো, যারা ইতোমধ্যেই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বাস করে, নিরাপত্তা জোরদার করার এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সীমান্তের ছোটখাটো ঘটনাও দ্রুত রাজনৈতিক অগ্নিকাণ্ডের রূপ নিতে পারে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সম্পর্কটি এক বিপরীতমুখী পরিস্থিতি তৈরি করে। এক দিকে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার যোগাযোগের প্রকল্পগুলো (রেল সংযোগ, অভ্যন্তরীণ জলপথ, বন্দর উন্নয়ন) দ্রুত করতে পারে, যা দুই অর্থনীতির জন্যই লাভজনক। বিশেষ করে কলকাতা-ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডর অপরিসীম সম্ভাবনা ধারণ করে। অন্যদিকে, অভিবাসন বা পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে গেলে এই অর্থনৈতিক লাভগুলো হুমকির মুখে পড়তে পারে। বাণিজ্য চলে স্থিতিশীলতার ওপরে ভর করে; রাজনীতি প্রায়ই তাকে বিঘ্নিত করে। চতুর্থত, আছে উপলব্ধির প্রশ্নটি। বাংলাদেশে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নজর রাখা হয় ঘনিষ্ঠভাবে, প্রায়শই সন্দেহের চোখে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী সুরে বিজেপির জোর ইতোমধ্যেই অস্বস্তি তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আরও শক্তিশালী উপস্থিতি এই উদ্বেগগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, বিশেষ করে যদি নীতিগত পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশ বা তার নাগরিকদের প্রতি বিদ্বেষের ধারণাকেই শক্তিশালী করে। তা আবার বাংলাদেশের নিজস্ব ঘরোয়া রাজনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে, সেখানে ভারত-বিরোধী মনোভাব এখনও এক শক্তিশালী সংগঠনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তবে এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা ভুল হবে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, গত এক দশক ধরে, নিরাপত্তা সমন্বয়, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও আঞ্চলিক সংযোগের বাস্তবসম্মত সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই কাঠামোগত উপাদানগুলো একদিনে উধাও হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং, আরও সমন্বিত ভারতীয় রাজনৈতিক কাঠামো যা পরিকাঠামো ও বাণিজ্য সংক্রান্ত উদ্যোগে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজ করে দিতে পারে। আসল চ্যালেঞ্জ হলো এই বিপরীতমুখী পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। একটি সম্পর্ক যা অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল কিন্তু রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর, তার যত্নসহকারে পরিচালনা জরুরি। বাংলাদেশের জন্য এর মানে হলো, এমন একটি কৌশল নেয়া যা না অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াশীল, না উদাসীন। বাংলাদেশকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে, পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ফলাফল গঠনে রাজ্য-স্তরের রাজনীতির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকেও স্বীকার করে নিতে হবে। বিজেপির জন্যও চ্যালেঞ্জটি সমান তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনী সাফল্য বাড়তি প্রত্যাশা বয়ে আনে। পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা যেখানে রাজ্যের নিজস্ব শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয় এবং প্রতিরোধের ইতিহাস রয়েছে, অবশ্যই দলটির সক্ষমতার পরীক্ষা নেবে; তারা প্রচারণার প্রতিশ্রুতিগুলোকে টেকসই শাসনে রূপ দিতে পারে কিনা। যেসব শক্তি তাদের ক্ষমতায় এনেছে—বিদ্বেষমূলক ভোট, মেরুকরণ এবং উচ্চ প্রত্যাশা—সময়ের ব্যবধানে সেগুলোই তাদের বিরুদ্ধেও যেতে পারে। গণতন্ত্রের নিজস্ব একটি ধারা আছে যা বিজয়ীদের বিনীত করে দেয়। শেষ পর্যন্ত, পশ্চিমবঙ্গে যা ঘটেছে তা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটি একটি বড় রাজনৈতিক সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়: কোনো আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়, কোনো জোট অটল নয়। ভোটারদের মন বদলায়, বয়ান বদলায়, আর ক্ষমতা হাতবদল হয়। বিজেপির এই জয় একইসঙ্গে একটি চূড়ান্ত পরিণতি ও একটি সূচনা—এক দশকব্যাপী রাজনৈতিক প্রকল্পের চূড়ান্ত পরিণতি, এবং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা যার ফলাফল এখনও অনিশ্চিত। বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি পরিষ্কার কিন্তু জটিল। ভূগোল দূরত্বের সুযোগ দেয় না; রাজনীতি সতর্কতা দাবি করে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান আগামী দিনগুলোতে সম্পৃক্ততার পরিসীমা নির্ধারণ করবে। এটি সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যায় নাকি সহযোগিতার—অথবা আরও সম্ভাবনাময়, উভয়ের এক অস্বস্তিকর মিশ্রণ ঘটাবে—তা নির্ভর করবে নির্বাচনের উপর না, বরং তার ফলাফলগুলো কীভাবে সামলানো হয় তার ওপর। ইতিহাস, সর্বোপরি, কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে শেষ হয় না। বরং তা কেবল পাতা উল্টায়। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রাবন্ধিক]

আধুনিক কৃষি ও স্মার্ট প্রযুক্তির সমন্বয়েই টেকসই সমৃদ্ধির সম্ভাবনা

বাংলাদেশের কৃষি আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি কমে যাওয়া ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি; অন্যদিকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্রমবর্ধমান চাপ। এই বাস্তবতায় কৃষিকে টেকসই, লাভজনক ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে রূপান্তরের বিকল্প নেই। আধুনিক কৃষি ও স্মার্ট এগ্রিকালচারের সমন্বয়ই পারে বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে।বাংলাদেশের কৃষি কেবল ফসল উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যসম্পদও গভীরভাবে যুক্ত। এই তিনটি উপখাতের সমন্বিত উন্নয়ন ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, খরা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং শ্রম সংকট কৃষিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট কৃষি সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।স্মার্ট কৃষি শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, এটি কৃষিকে দক্ষ, টেকসই ও লাভজনক করার একটি আধুনিক দর্শন। এর মাধ্যমে কৃষক সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ফলে উৎপাদন বাড়ে, অপচয় কমে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষিকে আরও কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক করে তোলাই স্মার্ট এগ্রিকালচারের মূল লক্ষ্য। এখানে সেন্সর, ড্রোন, স্যাটেলাইট ইমেজিং, জিপিএস, ইন্টারনেট অব থিংস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালাইটিক্স ব্যবহার করা হয়। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, পুষ্টিগুণ কিংবা রোগবালাই সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া যায়। ফলে কৃষক প্রয়োজন অনুযায়ী সার, সেচ ও কীটনাশক ব্যবহার করতে পারেন। এতে খরচ যেমন কমে, তেমনি পরিবেশ দূষণও হ্রাস পায়।আধুনিক কৃষি মূলত উচ্চফলনশীল জাত, সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এটি উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। অন্যদিকে স্মার্ট কৃষি নির্ভুল ব্যবস্থাপনার সুযোগ দেয়। মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে যতটুকু সার প্রয়োজন ততটুকুই প্রয়োগ করা যায়। এতে অপচয় কমে এবং উৎপাদন বাড়ে। একইভাবে বায়োচার, ˆজব সার ও মাইক্রোবিয়াল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব। এই দুই ব্যবস্থার সমন্বয়ই ভবিষ্যতের টেকসই কৃষির ভিত্তি।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন পূর্বাভাস, আবহাওয়ার পরিবর্তন কিংবা কীটপতঙ্গের আক্রমণ আগাম শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষক সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন। কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনাতেও স্বচ্ছতা আসবে।অনেকের আশঙ্কা, স্মার্ট কৃষি চালু হলে কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। প্রযুক্তিনির্ভর বাণিজ্যিক কৃষি নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে অনেকেই কৃষি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন, ফলে অনাবাদি জমির পরিমাণ বাড়ছে। স্মার্ট কৃষি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষিকে লাভজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে তরুণরাও কৃষিতে আগ্রহী হবে এবং অনাবাদি জমিও উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।তবে বাংলাদেশে স্মার্ট কৃষি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। দেশের অনেক এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল। এছাড়া অধিকাংশ কৃষক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষিত নন। আরেকটি বড় বিষয় হলো খণ্ডিত জমি। ছোট ছোট জমিতে ড্রোন বা আধুনিক যন্ত্র কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন। তাই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সমবায়ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ‘বিসিসিটি-বাউ বায়োচার চুলা’ উদ্ভাবন করা হয়েছে। এই চুলার মাধ্যমে কৃষক রান্নার সময় বিনামূল্যে উন্নতমানের বায়োচার উৎপাদন করতে পারেন। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এতে প্রায় ৭৮ শতাংশ অজৈব কার্বন রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় উন্নত। বায়োচার ব্যবহারে মাটির উর্বরতা বাড়ে, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমে এবং উৎপাদন খরচ হ্রাস পায়। পাশাপাশি এটি কার্বন সংরক্ষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়ও ভূমিকা রাখে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বায়োচার থেকে ন্যানো-ফিড উৎপাদন করা সম্ভব, যা গবাদিপশুর মিথেন গ্যাস নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে।বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর, বাণিজ্যিক ও গবেষণাভিত্তিক করতে হবে। রিমোট সেন্সিং, ড্রোন, এআই, ন্যানোপ্রযুক্তি এবং প্রিসিশন কৃষির সমন্বিত প্রয়োগ কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক করতে পারে। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ে গবেষণার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ কৃষিতে বিশ্বমানের অবস্থানে উন্নীত হতে পারবে।কৃষির আধুনিকায়নই বাংলাদেশের টেকসই সমৃদ্ধির প্রধান সম্ভাবনা। আর স্মার্ট কৃষির সফল বাস্তবায়নই পারে দেশকে প্রকৃত স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিতে।[লেখক: অধ্যাপক, প্যারাসাইটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ]

পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা: কারণ, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ

পেঁয়াজ বাংলাদেশের রান্নাঘরের অপরিহার্য পণ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর বাজার বারবার অস্থির হয়ে উঠেছে। কখনো দাম হঠাৎ বেড়েছে, আবার কখনো বাম্পার ফলনের পর কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি। এ অস্থিরতা কেবল বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা নয়; এর পেছনে রয়েছে উৎপাদন, সংরক্ষণ, আমদানি, নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যনির্ভরতার জটিল সম্পর্ক। বাংলাদেশে পেঁয়াজ উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন ৩.৪২ মিলিয়ন টন থেকে ৪ মিলিয়ন টনের বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। কোনো কোনো হিসাবে উৎপাদন দেশের চাহিদার কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি বলে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে বাজারে প্রায়ই ঘাটতি, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট দেখা দেয়। এর প্রধান কারণ হলো ফসল-পরবর্তী ক্ষতি, দুর্বল সংরক্ষণব্যবস্থা এবং বাজারে সরবরাহের অসামঞ্জস্য। পেঁয়াজ বাজারের অস্থিরতার সবচেয়ে বড় কারণ সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা। পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য। সঠিকভাবে শুকানো, বাতাস চলাচল, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, রোগাক্রান্ত বাল্ব বাছাই এবং ˆবজ্ঞানিক সংরক্ষণ নিশ্চিত না হলে উৎপাদিত পেঁয়াজের বড় অংশ নষ্ট হয়। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত ফসল-পরবর্তী পর্যায়ে নষ্ট হতে পারে। ফলে উৎপাদন বেশি হলেও বাজারে কার্যকর সরবরাহ কমে যায়। মৌসুমি সরবরাহের চাপ ও অফ-সিজন ঘাটতিও বাজার অস্থিরতার বড় কারণ। পেঁয়াজের বড় অংশ নির্দিষ্ট মৌসুমে বাজারে আসে। তখন সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমে যায় এবং কৃষক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। কিন্তু কয়েক মাস পর সংরক্ষিত পেঁয়াজ কমে গেলে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়, দাম আবার বেড়ে যায়। অর্থাৎ একই পণ্যে কৃষক ও ভোক্তা দুই সময়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন— মৌসুমেকৃষক কম দাম পান, আর অফ-সিজনে ভোক্তা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের পেঁয়াজ বাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো ভারতনির্ভর আমদানি। দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ প্রধানত ভারতের ওপর নির্ভর করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বেড়ে গেলে বা উৎপাদন কমলে ভারত রপ্তানি সীমিত বা বন্ধ করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েবাংলাদেশের বাজারে। ২০১৯ সালে ভারতের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার পর দেশে পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ২০২০ এবং ২০২৩ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এসব ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, একক উৎসনির্ভর আমদানি একটি বড় ঝুঁকি। নীতিগত সিদ্ধান্তের সময় ও সমন্বয়ের ঘাটতিও পেঁয়াজ বাজারকে অস্থির করে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কখনো আমদানি সীমিত করা হয়, আবার ভোক্তার দাম নিয়ন্ত্রণে আমদানি খুলে দেয়া হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত যদি সময়মতো, তথ্যভিত্তিক এবং পূর্বপরিকল্পিত না হয়, তাহলে দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকের ফসল ওঠার সময় আমদানি খুলে দিলে দাম পড়ে যায়। আবার ঘাটতির সময় দেরিতে আমদানি করলে ভোক্তাকে বেশি দামে পেঁয়াজ কিনতে হয়। বাজার তথ্যের ঘাটতি ও মজুত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও অস্থিরতা বাড়ায়। দেশে কত পেঁয়াজ উৎপাদিত হলো, কতটা সংরক্ষিত আছে, কতটা নষ্ট হয়েছে, কতটা বাজারে আসবে এবং কতটা আমদানি প্রয়োজন—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও তাৎক্ষণিক তথ্য সবসময় পাওয়া যায় না। ফলে কৃষক, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও সরকার অনেক সময় অনুমানের ওপর সিদ্ধান্ত নেয়। এতে গুজব, আতঙ্ক, অতিরিক্ত মজুত, হঠাৎ আমদানি কিংবা হঠাৎ দামপতনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাজারে কারসাজি বা অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতাও তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সমস্যাটি নতুন নয়। ২০১৯, ২০২০ ও ২০২৩ সালে ভারতের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের পেঁয়াজ বাজারে বড় ধাক্কা লাগে। আবার উৎপাদন বেশি হলে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকলে কৃষক লোকসানে পড়েন। অর্থাৎ পেঁয়াজ খাতে একদিকে ভোক্তার জন্য মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি, অন্যদিকে কৃষকের জন্য দামপতনের ঝুঁকি— দুই-ই বিদ্যমান। এই পরিস্থিতিতে পেঁয়াজ খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন বৃদ্ধিকে কার্যকর সরবরাহে রূপান্তর করা। উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ দুর্বল থাকলে তা বাজার স্থিতিশীল করতে পারে না। আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাজারকে বাইরের সিদ্ধান্তের ঝুঁকিতে রাখে। কৃষক উৎপাদন খরচ, রোগবালাই, জলবায়ু ঝুঁকি ও দামের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। আবার ভোক্তার জন্য সহনীয় দাম নিশ্চিত করতে গিয়ে কৃষকের ন্যায্যমূল্য যেন নষ্ট না হয়— এই ভারসাম্য রক্ষা করাও কঠিন। বীজ, জাত, সংরক্ষণ প্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজার তথ্য—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিতব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। উত্তরণের জন্য সবার আগে পেঁয়াজের সংরক্ষণব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে। সাধারণ কোল্ডস্টোরেজ পেঁয়াজের জন্য সবসময় উপযুক্ত নয়। পেঁয়াজের জন্য দরকার বায়ু চলাচলযুক্ত, কম খরচের, গ্রামভিত্তিক ও কৃষকবান্ধব সংরক্ষণাগার। সংরক্ষণ ক্ষতি কমাতে ধরৎ-ভষড়ি সধপযরহব বা অনুরূপ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শুধু যন্ত্র স্থাপন করলেই হবে না; কৃষকদের সঠিকভাবে পেঁয়াজ শুকানো, পঁৎরহম, মৎধফরহম, রোগাক্রান্ত বাল্ব আলাদা করা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা শেখাতে হবে। অফ-সিজন পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানোও জরুরি। বর্তমানে সরবরাহ খুব বেশি মৌসুমনির্ভর। গ্রীষ্মকালীন বা অফ-সিজন জাত, জলবায়ু-সহনশীল জাত, উন্নত বীজ, সেচ সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে সারা বছরের সরবরাহ ভারসাম্যপূর্ণ করা সম্ভব। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবেএবং বাজারও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে। আমদানি নীতি হতে হবে আগাম, তথ্যভিত্তিক ও ক্যালেন্ডারভিত্তিক। আমদানি হঠাৎ বন্ধ বা হঠাৎ খুলে দিলে বাজারে অস্থিরতা বাড়ে। মৌসুম শুরুর আগেই উৎপাদন পূর্বাভাস, মজুত পরিস্থিতি, সম্ভাব্য ক্ষতি, চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারদর বিশ্লেষণ করে আমদানি পরিকল্পনা করা দরকার। কৃষকের ফসল ওঠার সময় আমদানি নিয়ন্ত্রিত রাখা এবং অফ-সিজনে ঘাটতির আগেই পরিকল্পিত আমদানি নিশ্চিত করা হলে কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষই উপকৃত হবে। আমদানির উৎস ˆবচিত্র্যময় করা দরকার। ভারত কাছের দেশ হওয়ায় পরিবহন সহজ ও খরচ কম, কিন্তু একক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই মায়ানমার, পাকিস্তান, চীন, তুরস্ক, মিসরসহ সম্ভাব্য বিকল্প উৎস আগেই চিহ্নিত করে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও সরবরাহ চুক্তি প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। বাজার তথ্য ও মজুত মনিটরিং শক্তিশালী করাও অপরিহার্য। ইউনিয়ন, উপজেলা, আড়ত, পাইকারি বাজার ও সংরক্ষণাগার থেকে নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। কোথায় কত পেঁয়াজ আছে, কতটা নষ্ট হচ্ছে, কতটা বাজারে আসতে পারে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে গুজব ও আতঙ্ক কমবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মজুত, কারসাজি ও অস্বাভাবিক মুনাফার বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি দরকার। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে পেঁয়াজ উৎপাদন টেকসই হবে না। পেঁয়াজ উৎপাদনে বীজ, সার, সেচ, শ্রম ও জমির খরচ বাড়ছে। বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেলে কৃষক পরের বছর আবাদ কমিয়ে দেন; তখন আবার ঘাটতি তৈরি হয়। এ জন্য মৌসুমভিত্তিক ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, কৃষক পর্যায়ে সরাসরি ক্রয়, সমবায়ভিত্তিক সংরক্ষণ এবং স্বল্পসুদে সংরক্ষণ ঋত চালু করা যেতে পারে। পেঁয়াজ প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ানো গেলে বাজারের চাপ কমবে। পেঁয়াজ থেকে ফ্লেক্স, পাউডার, পেস্ট ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরি করা গেলে উদ্বৃত্ত মৌসুমে কৃষক বিকল্প বাজার পাবেন। অফ-সিজনে এসব শিল্পজাত পণ্য বাজার স্থিতিশীল রাখতেও সহায়তা করতে পারে। এ জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ, মান নিয়ন্ত্রণ, সহজ ঋত এবং বাজার সংযোগ জরুরি। গবেষণা ও সম্প্রসারণকে আরও কার্যকর করতে হবে। উচ্চফলনশীল, রোগসহনশীল, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য এবং অফ-সিজন উপযোগী জাত উদ্ভাবন ও দ্রুত সম্প্রসারণ প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকদের সঠিক বীজ নির্বাচন, সময়মতো রোপণ, রোগ ব্যবস্থাপনা, ফসল তোলা, curing ও সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনাকে কৃষি সম্প্রসারণের মূল অংশ করতে হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, পেঁয়াজ বাজারের অস্থিরতার মূল কারণ উৎপাদনের ঘাটতি নয়; বরং উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি, মৌসুমি সরবরাহের চাপ, দুর্বল সংরক্ষণব্যবস্থা, আমদানি নীতির অনিশ্চয়তা, ভারতনির্ভরতা এবং বাজার তথ্যের ঘাটতি। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বাইরের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের বাজারকে ঝুঁকিতে ফেলে। আবার সাম্প্রতিক উৎপাদন বৃদ্ধিও প্রমাণ করেছে, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী না হলে বেশি উৎপাদন কৃষকের জন্য নিশ্চয়তা দেয় না। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত—বছরজুড়ে স্থিতিশীল সরবরাহ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, ভোক্তার সহনীয় দাম এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থা। [লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন]

হাওরের কান্না

হাওর হলো বাটি বা গামলা আকৃতির বিশাল, নিচু জলাভূমি। ধরে নেয়া যায় যে, সংস্কৃত শব্দ ‘সাগর’ থেকে স্থানীয় উচ্চারণে ‘হাওর’ শব্দের উৎপত্তি, কারণ বর্ষায় এটি সাগরে রূপ নেয়। সাধারণত ভূ-গাঠনিক কারণে সৃষ্ট এবং বর্ষাকালে পানিতে ডুবে সমুদ্রের মতো রূপ ধারণ করে। হাওর মূলত একটি মৌসুমি জলাভূমি, যেখানে বর্ষায় পানি জমে থাকে এবং শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে ফসলি জমি ও চারণভূমিতে পরিণত হয়। হাওরের মূল ˆবশিষ্ট্য হলো— ১. এটি পিরিচ আকৃতির ভূ-গাঠনিক অবনমন, ২. মূলত বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলায়) হাওরগুলোর অবস্থান, ৩. নদী ও খাল থেকে পানি এসে হাওর পূর্ণ হয়, ৪. হাওর অঞ্চল ধান চাষ, মাছ উৎপাদন এবং পরিযায়ী পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত, ৫. হাওর, বাঁওড়, বিল, ঝিল বা নদী থেকে ভিন্ন, কারণ এটি বর্ষায় নদী অববাহিকার অতিরিক্ত পানি ধারণ করে রাখে। বাংলাদেশে ছোট-বড়    ৪১৪টি থেকে ৪২৩টি হাওর রয়েছে। অর্থনীতির বিবেচনায় দেখা যায় যে, হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনপ্রণালী কৃষিনির্ভর। হাওরগুলোতে প্রধানত ৬ মাস পানি থাকে এবং ৬ মাস শুকনা ভূমিতে এক ফসলি বোরো ধান চাষ করা হয়। হাওরের জীবন অত্যন্ত ˆবচিত্র্যময় হলেও দারিদ্র্য, যাতায়াত সমস্যা ও বন্যায় ফসলহানির কারণে জীবনযাত্রার মান নিম্নতর। মূলত বোরো ধান চাষ ও মাছ ধরা এখানকার প্রধান জীবিকা। হাওর অঞ্চলের জীবনযাত্রার প্রধান দিকগুলো হলো— ১. বছরের অর্ধেক সময় এলাকা জলমগ্ন থাকে, তাই মাছ ধরা এবং বাকি সময়ে বোরো ধান চাষই প্রধান পেশা। আগাম বন্যা বা অকাল বন্যায় বোরো ধান তলিয়ে গেলে চরম খাদ্য সংকটে পড়েন হাওরবাসী। ২. দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী এবং দারিদ্র্যের হার বেশি। ৩. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ৪. বর্ষাকালে নৌকা এবং শুকনো মৌসুমে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে চলাচল করতে হয়। ৫. যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ৬. বসতঘরগুলো সাধারণত উঁচু ঢিবির ওপর তৈরি করা হয়। এখানকার বসতিগুলো ‘গুচ্ছগ্রাম’ বা ছোট ছোট দ্বীপের মতো দেখায়। ৭. অপরিকল্পিত পাকা রাস্তা ও বাঁধের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়, যা কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ৮. হাওর অঞ্চল মাছ ও নানা প্রজাতির জলজ প্রাণী (যেমন: কচ্ছপ, ভোঁদড়) এবং পাখির একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। কৃষি অর্থনীতিবিদদের তথ্যমতে, বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে (প্রধানত সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই ৭টি জেলা) দেশের মোট বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয়। হাওর অঞ্চলের বোরো ধান দেশের চালের চাহিদার একটি বড় অংশ যোগান দেয় এবং এই অঞ্চলের ধানের ওপর জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভরশীল। ২০২৬ সালের সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী মে ২০২৬-এর তথ্যমতে, হাওরের ৭টি জেলায় ৯.৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বন্যামুক্ত আছে ৪.৫৫ লাখ হেক্টর। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ২৮ হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এপ্রিলের শেষ নাগাদ পর্যন্ত হাওরের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমির ধান কাটা বাকি ছিল। প্রতি বছর এভাবে শস্যহানিতে হাওরের কৃষক সর্বস্বান্ত হন। দারিদ্র্যের নিচে এখানকার বহু মানুষ বসবাস করছে। হাওরাঞ্চলে প্রতি বছর অকাল বন্যা, পাহাড়ি ঢল এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়। হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বিভিন্ন বছরে ভিন্ন হলেও তা গড়ে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। হাওরের সম্পদের ক্ষতির প্রধান দিকগুলো হলো— ১. প্রধানত বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার কারণে প্রতি বছর ১০ লাখ টনের বেশি চাল নষ্ট হয়, যার আর্থিক মূল্য সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২. পানি দূষণ, অক্সিজেনের অভাব এবং অসময়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় হাজার হাজার মেট্রিক টন মাছ মারা যায়। ২০১৬-১৭ সালের মতো বড় বন্যায় শুধু মাছের ক্ষতির পরিমাণই ৪১ কোটি টাকার বেশি ছিল। ৩. ধান পচে যাওয়ায় এবং পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় প্রতি বছর ১১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি গোখাদ্য নষ্ট হয়। ৪. অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, অতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহার এবং বালু জমে হাওরের ইকোসিস্টেম বা প্রতিবেশ ব্যবস্থা নষ্ট হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক মাছের প্রজননস্থল ধ্বংস করছে। মূলত অকাল বন্যা বা পাহাড়ি ঢল হাওরের মানুষের স্বপ্ন ও জীবন-জীবিকা প্রতি বছরই বিপন্ন করে তোলে। হাওরাঞ্চলে প্রতি বছর বন্যা বা অকাল বন্যা হওয়ার পেছনে ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের সৃষ্ট বিভিন্ন কারণ দায়ী। এগুলোর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো— ১. হাওরগুলো ভারতের মেঘালয় ও আসামের সীমান্ত ঘেঁষা। ওইসব পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে পানি দ্রুত নেমে এসে হাওর এলাকা প্লাবিত করে। ২. ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হাওড়ে বন্যা হয়, কারণ হাওর মূল সমতল ভূমি থেকে বাটি আকৃতির নিচু এলাকা। তাই হাওর অঞ্চল বাটির মতো নিচু, চারপাশে নদী থেকে পানি গড়িয়ে এখানে জমা হয়। ৩. গত তিন দশকে হাওরে বহমান প্রায় ৮৬ শতাংশ নদী ভরাট হয়ে গেছে। নদ-নদী ও খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে পানির ধারণক্ষমতা কমে গেছে। ৪. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে (মার্চ-মে) অস্বাভাবিক ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যা অকাল বন্যা ডেকে আনে। ৫. হাওরের ভেতর দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা, বাঁধ ও কালভার্ট নির্মাণের ফলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়। ৬. সময়মতো বাঁধ মেরামত না করা বা দুর্বল বাঁধের কারণে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত জমিতে ঢুকে পড়ে। মূল বিষয়: হাওরের বন্যা মূলত পাহাড়ি ঢল এবং অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার একটি সম্মিলিত ফল। হাওর অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকার দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা (২০১২-২০৩২) বাস্তবায়ন করছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করে কৃষি, মৎস্য ও যোগাযোগের আধুনিকায়ন করা। হাওর নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা ও চলমান উদ্যোগগুলো হলো— ১. হাওড়ে বহমান ১৭টি নদী ভিন্ন খাতে (পানিসম্পদ, কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, যোগাযোগ ইত্যাদি) সংস্কারে ১৫৪টি প্রকল্প ১৬টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২. সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে হাওরের ফসল রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। ৩. কৃষকদের সহায়তা ও নতুন জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। ৪. বোরো ফসল রক্ষায় সরাসরি ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান কেনা, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তন এবং কম সময়ে ফলন দেওয়া (৯০-৯৫ দিনে) আমন ধানের নতুন জাত আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ৫. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ৬. হাওরের পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে এবং নদী-খাল খননের মাধ্যমে নাব্য রক্ষা করার উদ্যোগ চলমান রয়েছে। ৭. হাওর এলাকায় সাবমারসিবল (পানিতে ডুবে যায় এমন) রাস্তা ও উড়াল সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে, যা বর্ষায় নৌপথ এবং শুষ্ক মৌসুমে সড়কপথ হিসেবে কাজ করে। ৮. হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বজায় রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র তৈরি এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা শুধু ফাইলবন্দী থাকলে হবে না, এর বাস্তব রূপ দিতে হবে। কারণ অভাব এখন হাওরের মানুষের নিত্যসঙ্গী। হাওরের মানুষের এই অভাব দূর করতে হলে উপরোল্লিখিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি। [লেখক: উন্নয়নকর্মী]

ফেনীর ‘মেঘ বিস্ফোরণ’ কোন বিপদের বার্তা

ঊনিশে বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের উৎসবের রেশ পুরোপুরি মেলায়নি। অথচ বাড়ির আলমারি থেকে বের হয়ে এসেছে পুরনো কাঁথা। মে মাসে কাঁথা গায়ে দেওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশে আগে কল্পনাও করা যেত না। এই সময়টা হওয়ার কথা তীব্র দাবদাহের। ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় পোড়া রোদ, ঘামে ভেজা শরীর, লু হাওয়ায় ঘর থেকে বের না হওয়ার দিন। অথচ আকাশ মেঘলা, বাতাসে কনকনে ঠান্ডার পরশ। মাত্র দিন কয়েক আগেও কিন্তু ছিল উল্টো চিত্র। তীব্র তাপদাহে পুড়ছিল দেশ। মানুষ হাঁসফাঁস করছিল রাস্তায়, মাঠে, কলকারখানায়। আর এখন? হঠাৎ ঠান্ডা, ঝড়ো হাওয়া, ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস। এত দ্রুত, এত তীব্র এই পরিবর্তন এটি কি শুধু আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা? না। এটি একটি গভীর সংকটের বার্তা।গত ২৮ এপ্রিল ফেনী জেলায় ঘটে যাওয়া ঘটনা বাংলাদেশের আবহাওয়ার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি আছড়ে পড়ে। হঠাৎ ফ্ল্যাশ ফ্লাড দেখা দেয়। নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যায়। স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছে, এই বৃষ্টিপাত সময় ও তীব্রতার বিচারে ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক’।আবহাওয়াবিদরা এই ঘটনাকে চিহ্নিত করেছেন বিশেষ নামে ‘ক্লাউডবার্স্ট’ বা ‘মেঘ-বিস্ফোরণ’। এটি হলো অত্যন্ত স্বল্প সময়ে অত্যধিক বৃষ্টিপাত। প্রায় এক ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি একটি সীমিত এলাকায়, যা তাৎক্ষণিক ও তীব্র বন্যার সৃষ্টি করে। এই বিস্ফোরণ ঘটে যখন গরম জলীয়বাষ্প হঠাৎ ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে আসে। মুহূর্তের মধ্যে তা ঘনীভূত হয়ে প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। এটি কোনো সাধারণ বৃষ্টি নয়। এটি আক্ষরিক অর্থেই আকাশ ফেটে পড়া।বচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ক্লাউডবার্স্ট ঐতিহ্যগতভাবে পাহাড়ি অঞ্চলের ঘটনা। ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড- এসব জায়গায় এটি পরিচিত দুর্যোগ। কিন্তু বাংলাদেশের মতো সমতল বদ্বীপে এটি নতুন এবং ভয়ঙ্কর ঘটনা। আমাদের অনেকেই জানেন না এটা কী। আমাদের অবকাঠামো প্রস্তুত নয় এর মোকাবেলায়। এমনকি আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাঠ্যবইয়েও এটির কথা নেই।ক্লাউডবার্স্টের পাশাপাশি আরেকটি বিপজ্জনক ঘটনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। যা হচ্ছে ‘ক্লাউড স্টলিং’। দুর্বল বায়ুপ্রবাহ বা বায়ুমণ্ডলীয় চাপের ভারসাম্যহীনতার কারণে ঝড়ের মেঘ একটি নির্দিষ্ট এলাকার উপর থেমে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে একই স্থানে প্রবল বৃষ্টি ঢেলে দেয়। এমনকি পূর্ণাঙ্গ ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও। মেঘ যখন হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, তখন তার নিচের মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।তীব্র গরমের পর হঠাৎ এই কনকনে ঠান্ডার পেছনে রয়েছে একটি বৈশ্বিক সমুদ্রীয় ঘটনা লা নিনা। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয় তাকে বিজ্ঞানীরা বলেন লা নিনা। এর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরে সীমাবদ্ধ থাকে না। লা নিনা সক্রিয় থাকলে বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত, শক্তিশালী মৌসুমি বায়ু এবং বড় ধরনের বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু লা নিনা একা এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়। দায়ী হলো দশকের পর দশক ধরে জমে ওঠা কার্বন নিঃসরণ, উষ্ণ হয়ে ওঠা বঙ্গোপসাগর, আর বায়ুমণ্ডলের ভেতরে জমা হওয়া অতিরিক্ত তাপশক্তি যা এখন হঠাৎ হঠাৎ বিভিন্ন রূপে বিস্ফোরিত হচ্ছে। ফেনীর ক্লাউডবার্স্ট একটি সতর্কসংকেত। আগামী দিনে বাংলাদেশ এমন আরও কিছু অপরিচিত দুর্যোগের মুখোমুখি হতে পারে। যার সঙ্গে আমাদের এখনো পরিচয় নেই।তাপ গম্বুজ: উচ্চচাপের একটি বিশাল বায়ুস্তম্ভ যখন কোনো এলাকার উপর আটকে যায়, তখন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০-১৫ ডিগ্রি বেশি উঠে যেতে পারে। কানাডায় ২০২১ সালে এটি ঘটেছিল। মানুষ মরেছিল রাস্তায়। বাংলাদেশে এই ঘটনার আশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে।আকস্মিক খরা: একদিন প্রবল বৃষ্টি, তার তিনদিন পরেই মাঠ ফেটে চৌচির- এই দ্রুত ও অপ্রত্যাশিত খরার ধরনটি জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন উপহার। কৃষকের পক্ষে এর সঙ্গে খাপ খাওয়ানো প্রায় অসম্ভব।অফ-সিজন সাইক্লোন: ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম এখন আর নির্দিষ্ট নেই। বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ পানি এখন শীতকালেও ঘূর্ণিঝড় তৈরিতে সক্ষম। এমন ঘূর্ণিঝড় আসবে যখন আমরা আদৌ প্রস্তুত থাকব না।লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ: সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপকূলীয় নদী ও মাটিতে লবণ ঢুকছে। এটি ধীর গতির দুর্যোগ। হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়ের মতো দৃশ্যমান নয়। কিন্তু ধীরে ধীরে কৃষিজমি, পানীয় জল আর জনজীবনকে বিষিয়ে দিচ্ছে।এখনই যা করতে হবেশুধু বিপদের কথা বললে ভয় আর আতঙ্ক হয়, নীতি হয় না। তাই প্রশ্ন করতে হবে- এই অচেনা দুর্যোগগুলোর সামনে বাংলাদেশ আসলে কী করতে পারে? প্রথমত জানতে হবে, জানাতে হবে। ক্লাউডবার্স্ট, হিট ডোম, ফ্ল্যাশ ড্রট- এই শব্দগুলো এখনো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত। অথচ এই বিপদগুলো এখন দোরগোড়ায়। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের অধ্যায় নতুন করে লিখতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মোবাইলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস স্থানীয় ভাষায় আরও দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত খাল বাঁচাও, শহর বাঁচাও। ঢাকায় গত পঞ্চাশ বছরে যত খাল ভরাট হয়েছে, যত জলাভূমি দখল হয়েছে সেগুলো ছিল শহরের প্রাকৃতিক স্পঞ্জ। ক্লাউডবার্স্টের মতো আকস্মিক ভারী বৃষ্টিতে সেই স্পঞ্জ না থাকলে পানি যাবে কোথায়? রাস্তায়, ঘরে, মানুষের জীবনে। যেসব খাল এখনো আছে সেগুলো দখলমুক্ত করা রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন, প্রযুক্তির নয়।তৃতীয়ত, কৃষিকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে। লবণসহিষ্ণু ধানের জাত, খরা-প্রতিরোধী সবজি, ভাসমান কৃষি- এই প্রযুক্তিগুলো বাংলাদেশে আছে, কিন্তু সারাদেশে ছড়ায়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে শুধু ফলন বাড়ানোর দপ্তর না রেখে জলবায়ু অভিযোজনের দপ্তরে পরিণত করতে হবে।চতুর্থত বিশ্বের কাছে ক্ষতিপূরণ চাই। বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে যুক্ত করে মাত্র শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ। অথচ মূল্য চোকাচ্ছি সবচেয়ে বেশি। ধনী দেশগুলোর শতাব্দীর শিল্পায়নের পাপের ফল ভোগ করছে ফেনীর বন্যাকবলিত মানুষ, সুন্দরবনের লবণাক্ত মাটি, বৈশাখের কাঁথা-মোড়ানো কৃষক। ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিলের যে দাবি বাংলাদেশ করে আসছে, সেটি ভিক্ষা নয় এটি ন্যায্য ক্ষতিপূরণ।পঞ্চমত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আপডেট করতে হবে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিশ্বে প্রশংসিত। কিন্তু ক্লাউডবার্স্ট, হিট ডোম বা ফ্ল্যাশ ড্রটের জন্য কোনো প্রোটোকল নেই। নেই প্রশিক্ষিত জনবল, নেই আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম। এই শূন্যতা এখনই পূরণ করতে হবে পরে নয়। কারণ পরে আর সময় নাও থাকতে পারে। বৈশাখের এই কাঁথা-মোড়ানো রাত, ফেনীর মেঘ-বিস্ফোরণ, কয়েকদিন আগের দাহানো তাপ- এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটাই বার্তার ভিন্ন ভিন্ন ভাষা। প্রকৃতি বলছে ,‘আমি বদলে গেছি। তোমরাও বদলাও।’বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, এই জাতি বিপদে ভাঙে না। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, ফণী- প্রতিটিতে আমরা উঠে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু সেই বিপদগুলো আমরা চিনতাম। আগামীর বিপদগুলো অচেনা। তাই এবার শুধু সাহস যথেষ্ট নয় দরকার জ্ঞান, প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।প্রশ্ন একটাই- ঘুম ভাঙার আগে আর কতটা ক্ষতি হতে দিব আমরা?লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক।

পশ্চিমবঙ্গে কে? মোদী না দিদি, জানা যাবে সোমবার

রাত পোহালেই শুরু হবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত রাজনৈতিক মুহূর্ত — ভোট গণনা। তারপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে বাংলাদেশে লাগোয়া ভারতের এই রাজ্যের ক্ষমতার চাবিকাঠি কার হাতে উঠতে চলেছে — পরিবর্তনের ডাক নিয়ে এগিয়ে আসা নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপির, না কি আবারও নিজের শক্ত জমি ধরে রাখতে সক্ষম হবেন মমতা ব্যানার্জী। টান টান উত্তেজনার পর এখন গোটা রাজ্য দাঁড়িয়ে এক চূড়ান্ত মুহূর্তের সামনে, যেখানে প্রতিটি ভোট, প্রতিটি রাউন্ডের গণনা নির্ধারণ করতে পারে আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণ। সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে গণনার প্রক্রিয়া — প্রথমে পোস্টাল ব্যালট, যা অনেক সময়েই প্রাথমিক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। তারপর একে একে খুলবে ইভিএম। আর প্রতিটি রাউন্ডের ফলাফল বাড়াবে উত্তেজনার পারদ।কিন্তু এই লড়াই শুধুমাত্র সংখ্যার লড়াই নয়, এটি একেবারে স্নায়ুযুদ্ধ — গণনাকেন্দ্রের ভেতরে এজেন্টদের সতর্ক নজরদারি যেমন থাকবে, তেমনি বাইরে হাজার হাজার কর্মীর উপস্থিতিও তৈরি করবে এক চাপা উত্তেজনার পরিবেশ। দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনও ঝুঁকি নিতে নারাজ। তৃণমূল কংগ্রেস তাদের সংগঠন এবং নেতৃত্বের উপর ভরসা রেখে এগোচ্ছে, যেখানে মমতা ব্যানার্জীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বিশেষ করে মহিলা ও সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে এখনো একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। দলের ভিতরে স্পষ্ট বার্তা — শেষ পর্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে, একটি ভোটও যেন হাতছাড়া না হয়। আর বিজেপি সম্পূর্ণ আলাদা কৌশলে মাঠে নেমেছে। তাদের মূল ভরসা দীর্ঘদিনের শাসনের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া অসন্তোষ, অর্থাৎ অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি ফ্যাক্টর। আর সেই সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর জাতীয় স্তরের জনপ্রিয়তাকে সামনে রেখে তারা রাজ্যে পরিবর্তনের বার্তা ছড়িয়েছে। তারা নির্ভর এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরী করা কেন্দ্রীয় সরকার নির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর।এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হল এর অনিশ্চয়তা — শহরে পরিবর্তনের সুর যতটা স্পষ্ট, গ্রামাঞ্চলেও কি সেই একই হাওয়া বইছে, সংখ্যালঘু ভোট কতটা একপাক্ষিকভাবে পড়েছে, নারী ভোটাররা কি আবারও স্থিতিশীলতার পক্ষে রায় দিয়েছেন, নাকি পরিবর্তনের হাওয়ায় হেঁটেছেন — এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। এমনকি উচ্চ ভোটদানের হার নিয়েও চলছে জোরদার বিশ্লেষণ — এটা কি পরিবর্তনের ইঙ্গিত, না কি বিদ্যমান শক্তির আরও মজবুত হয়ে ওঠার লক্ষণ, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলেও মতভেদ রয়েছে।পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন শুধু রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় রাজনীতিতেও, তাই গোটা দেশের নজর এখন এই ফলাফলের দিকে। সব মিলিয়ে এখন সময় যেন থমকে আছে — কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা, তারপরই সামনে আসবে চূড়ান্ত সত্য।উত্তেজনা এখনো চরমে। এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে — শেষ হাসি কে হাসবে, নরেন্দ্র মোদী না মমতা ব্যানার্জী — উত্তর লুকিয়ে আছে আগামীকালের ভোট গণনা পর্বের মধ্যেই।

ব্র্যান্ডে গড়া সত্তা, ধার করা পরিচয়

সমসাময়িক বাংলাদেশে পরিচয় আর কেবল পরিবার, ভাষা, ধর্ম বা ভৌগোলিক অবস্থানের আদিম সূত্রে নির্ধারিত হয় না—এটি ক্রমশ এক জটিল ‘ভোক্তা আচরণ’ বা ‘কনজিউমার বিহেভিয়ার’-এর মাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে। বাজার এখন আর কেবল পণ্য ও সেবার আদান-প্রদানের একটি সাধারণ চত্বর নয়; এটি এখন এমন এক প্রতীকী ও রাজনৈতিক ক্ষেত্র, যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্ব, আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক অবস্থানকে প্রতিনিয়ত সংজ্ঞায়িত করছে। ঢাকার বিলাসবহুল শপিং মল থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর এবং অনলাইন ও ফেইসবুক মার্কেটপ্লেস—সবখানেই ‘ভোগ’ বা ‘কনজাম্পশন’ এখন একটি শক্তিশালী ভাষায় পরিণত হয়েছে। এই ভাষার মাধ্যমেই ব্যক্তি সমাজকে বলছে সে আসলে কে, এবং সে কোন অবস্থানে পৌঁছাতে চায়।পরিচয় রাজনীতির এই নতুন রূপান্তরটি নিছক অর্থনৈতিক নয়, বরং গভীরভাবে মনস্তাত্ত্বিক। বাংলাদেশে একসময় পরিচয় নির্ধারিত হতো আদর্শিক অবস্থান বা শ্রেণীসংগ্রামের ভিত্তিতে। কিন্তু বর্তমানের বিশ্বায়িত বাস্তবতায় সেই জায়গা দখল করেছে ব্র্যান্ডের লোগো, স্মার্টফোনের মডেল এবং জীবনযাত্রার আভিজাত্য। এই পরিবর্তনের ফলে আমাদের সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিগুলোও পণ্যমুখী হয়ে উঠেছে।ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বোর্দিউ তার বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মানুষের খাদ্যাভ্যাস, পোশাকের ধরন কিংবা বিচিত্র সব পছন্দ আসলে তার ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’-র বহিঃপ্রকাশ। বোর্দিউর মতে, উচ্চবিত্তরা কেবল সম্পদ দিয়ে নয়, বরং তাদের বিশেষ রুচি (টেস্ট) দিয়ে নিজেদের সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে। বাংলাদেশেও এই বাস্তবতার প্রতিফলন অত্যন্ত তীব্র।একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পোশাক পরা কিংবা দামি কফি শপে বসে আড্ডা দেয়া এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়; এটি একটি ‘সাংস্কৃতিক সংকেত’। এই সংকেতটি সমাজে এক ধরনের কৃত্রিম উঁচু-নিচু ভেদাভেদ বা ‘সোশ্যাল ডিস্টিংশন’ তৈরি করে। যখন একজন ব্যক্তি স্থানীয় পণ্যের চেয়ে বিদেশি ব্র্যান্ডকে প্রাধান্য দেন, তখন তিনি আসলে একটি বিশেষ বিশ্বজনীন পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে চান। এই প্রক্রিয়ায় পরিচয় আর জন্মগত থাকে না, তা হয়ে ওঠে অর্জিত এবং ক্রয়যোগ্য।আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী থরস্টেইন ভেবলেন এক শতাব্দী আগে ‘কনস্পিকুয়াস কনজাম্পশন’ বা ‘দৃষ্টিনন্দন ভোগ’-এর ধারণাটি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মানুষ পণ্য কেনে তার ব্যবহারিক মূল্যের জন্য নয়, বরং সমাজে নিজের মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্বটি এখনকার চেয়ে প্রাসঙ্গিক আর কখনোই ছিল না।বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের কাছে বিয়ে, ঈদ কিংবা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান এখন আর কেবল উৎসব নয়, বরং এটি নিজের সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি বৃহৎ মঞ্চ। দামি গাড়ি, দামি আসবাবপত্র এবং ব্র্যান্ডের ঘড়ি ব্যবহার করার মাধ্যমে ব্যক্তি এটি প্রমাণ করতে চায় যে সে ‘সাফল্যের’ চূড়ায় পৌঁছেছে। মজার বিষয় হলো, এই প্রদর্শনের প্রবণতা এখন আর কেবল উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে নিম্ন-মধ্যবিত্ত এমনকি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও এই ‘প্রদর্শনীমূলক ভোগ’ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মৌলিক চাহিদা অপূর্ণ রেখেও মানুষ কেবল সামাজিক মর্যাদা রক্ষার তাগিদে দামি গ্যাজেট বা ফ্যাশনেবল পণ্য ক্রয় করছে। এই ‘ধারের ওপর গড়া আধুনিকতা’ আমাদের সমাজের এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।বাংলাদেশে পরিচয় রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে ভাষা, ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে এই উপাদানগুলো বাজারের পণ্যে পরিণত হতে শুরু করেছে। সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক স্টুয়ার্ট হলো-এর মতে, পরিচয় কোনো স্থির বিষয় নয়; এটি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রতীকের মাধ্যমে নির্মিত হয়। বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে ‘হালাল’ প্রসাধনী, ‘মডেস্ট ফ্যাশন’ (শালীন পোশাক) কিংবা ‘দেশি অর্গানিক’ খাদ্যের যে জোয়ার, তা আসলে বাজারভিত্তিক পরিচয়েরই প্রতিফলন।একজন ব্যক্তি যখন ‘হালাল’ লেবেলযুক্ত সাবান বা শ্যাম্পু কেনেন, তখন তিনি কেবল একটি পণ্য কিনছেন না; তিনি নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের একটি স্বীকৃতিও কিনছেন। একইভাবে, ‘দেশি’ পণ্যের বিজ্ঞাপনে যখন জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করা হয়, তখন ক্রেতা সেই পণ্যটি কিনে নিজেকে একজন ‘দেশপ্রেমিক’ নাগরিক হিসেবে অনুভব করেন। অর্থাৎ, বাজার এখন আমাদের ধর্মবিশ্বাস এবং দেশপ্রেমকেও প্যাকেটজাত করে বিক্রি করছে। এখানে কার্ল মার্কস-এর ‘কমোডিটি ফেটিশজম’ বা পণ্যের মোহময়তার ধারণাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পণ্যের পেছনে থাকা শ্রমিকের ঘাম বা উৎপাদন কাঠামোর শোষণের কথা আমরা ভুলে যাই, যখন পণ্যটি আমাদের সামনে একটি বিশেষ আদর্শিক পরিচয় নিয়ে হাজির হয়।বাংলাদেশে ভোক্তা সংস্কৃতির এই উল্লম্ফনে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটক এখন পরিচয় নির্মাণের প্রধান কারখানা। ইনস্টাগ্রামের নান্দনিকতা বা ‘এস্থেটিকস’ এখন তরুণ প্রজন্মের কাছে জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের প্রকৃত জীবনের চেয়ে ‘ডিজিটাল উপস্থিতি’ এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।ইনফ্লুয়েন্সার বা ডিজিটাল প্রভাবশালীদের জীবনধারা দেখে সাধারণ তরুণরা নিজেদের জীবনকে মূল্যায়ন করছে। এই প্রক্রিয়ায় ‘নিজস্বতা’ বা ‘অথেন্টিসিটি’ একটি ব্যবসায়িক প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তি এখন আর তার নিজের জন্য বাঁচে না; সে বাঁচে তার ভার্চুয়াল অনুসারীদের লাইক এবং শেয়ারের জন্য। এই ‘ডিজিটাল প্রদর্শনী’ মানুষকে একটি মেকি সত্তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী জিগমুন্ট বাউম্যান একে বলেছিলেন ‘লিকুইড মডার্নিটি’ বা তরল আধুনিকতা। যেখানে সবকিছুই অস্থায়ী—আজকের পরিচয় কালকের নতুন কোনো ট্রেন্ডের কাছে ফিকে হয়ে যায়। এই অস্থিতিশীলতা মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগ এবং হীনমন্যতা তৈরি করছে।বিশ্বায়ন বা গ্লোবালাইজেশন বাংলাদেশে একটি ‘হাইব্রিড’ বা মিশ্র সাংস্কৃতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। সমাজবিজ্ঞানে একে ‘গ্লোকালাইজেশন’ বলা হয়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে বৈশ্বিক সংস্কৃতি স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে নতুন রূপ ধারণ করে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ফাস্ট ফুড চেইন যখন স্থানীয় মশলা ব্যবহার করে মেনু তৈরি করে, কিংবা যখন পাশ্চাত্য ঘরানার পোশাকে দেশি নকশা যোগ করা হয়, তখন সেটি এই গ্লোকালাইজেশনেরই উদাহরণ।তবে এই মিশ্রণ সবসময় ইতিবাচক নয়। এর ফলে আমাদের স্থানীয় ঐতিহ্যগুলো অনেক সময় তার গভীরতা হারিয়ে কেবল পর্যটন বা বিপণনের সামগ্রীতে পরিণত হয়। মেলা, পূজা বা ঈদের ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গগুলো এখন কর্পোরেট স্পন্সরশিপের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পরিচয় আর শেকড় থেকে আসে না, তা আসে কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং থেকে। এই ‘ব্র্যান্ডেড পরিচয়’ আমাদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।ভোক্তা সংস্কৃতির এই প্রসারের সমান্তরালে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের যে শ্রমিক ৫ ডলারের মজুরিতে একটি ব্র্যান্ডের শার্ট তৈরি করছেন, সেই একই শার্ট যখন ঢাকার কোনো অভিজাত শপিং মলে ৫০ ডলারে বিক্রি হয়, তখন সেটি এক চরম বৈপরীত্য তুলে ধরে। একদিকে ভোগের উৎসব, অন্যদিকে উৎপাদনের কঠোর শ্রম।এই ব্যবস্থার অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো ‘ভোগের আর্থিকীকরণ’। মোবাইল ব্যাংকিং এবং ক্রেডিট কার্ডের সহজলভ্যতা মানুষকে সঞ্চয়ের চেয়ে ব্যয়ের দিকে বেশি উৎসাহিত করছে। ‘এখনই ভোগ করুন, পরে পরিশোধ করুন’—এই নীতি মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ফাঁদে ফেলছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, যারা পরিচয় গঠনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তারা এই আর্থিক ঝুঁকির প্রধান শিকার। পরিচয় এখানে কেবল একটি সাংস্কৃতিক বিষয় নয়, এটি হয়ে উঠছে একটি বিশাল আর্থিক বোঝা।ভোক্তা সংস্কৃতির সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়েছে আমাদের রাজনৈতিক চেতনার ওপর। যখন পরিচয় ক্রমশ ভোগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একজন ব্যক্তি নিজেকে ‘নাগরিক’ হিসেবে ভাবার চেয়ে ‘ভোক্তা’ হিসেবে ভাবতে বেশি পছন্দ করেন। নাগরিকের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্র ও সমাজের প্রশ্নে সক্রিয় হওয়া, কিন্তু ভোক্তার দায়িত্ব হলো কেবল নিজের পছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা।রাজনীতিও এখন অনেকটা পণ্যের বিপণনের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো এখন জনগণের কাছে নাগরিক অধিকারের চেয়ে ‘উন্নয়নের সুফল’ এবং ‘সুযোগ-সুবিধা’ বেশি বিক্রি করতে চায়। ফলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখন জীবনধারার পছন্দে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি হ্যাসট্যাগ ব্যবহার করা কিংবা সচেতনতামূলক পোস্ট শেয়ার করাকেই অনেকে বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য করছেন। একে ‘স্ল্যাক্টিভিজম’ বা অলস সক্রিয়তা বলা হয়। এটি মানুষকে গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের লড়াই থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে একটি প্রতীকী তৃপ্তির মধ্যে আবদ্ধ রাখে।বাংলাদেশের ভোক্তা সংস্কৃতিতে নারীদের ভূমিকা দ্বিমুখী। একদিকে, অনলাইন ব্যবসা এবং এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনেক নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। এটি তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং ক্ষমতায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। তারা নিজেদের পছন্দমতো পোশাক বা পণ্য নির্বাচন করে প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন।অন্যদিকে, বাজার নারীর পরিচয়কে নতুনভাবে পণ্যায়িত করছে। সৌন্দর্য পণ্য, ডায়েট প্ল্যান এবং মডেস্ট ফ্যাশনের নামে নারীর ওপর নতুন নতুন সৌন্দর্যের মানদণ্ড চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। নারীকে এখন প্রতিনিয়ত ‘নিখুঁত’ হওয়ার চাপে থাকতে হয়, যা মূলত বাজারেরই একটি কৌশল। ফলে ক্ষমতায়নের আড়ালে অনেক সময় নতুন ধরনের পরনির্ভরশীলতা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি হচ্ছে।ভোক্তা সংস্কৃতি ও পরিচয় রাজনীতির এই মেলবন্ধন আমাদের সামনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। আমরা কি কেবল পণ্যের মাধ্যমেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করব? আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কি কেবল ব্র্যান্ডের লোগো দেখেই একে অপরকে মূল্যায়ন করবে? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি কেবল ভোগের উন্মাদনা তৈরি করে এবং সামাজিক সংহতি নষ্ট করে, তবে সেই প্রবৃদ্ধির সার্থকতা কোথায়?বাংলাদেশ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের একদিকে আছে উদীয়মান অর্থনীতির হাতছানি, অন্যদিকে আছে শেকড়হীন পরিচয়ের ঝুঁকি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ হলো ভোক্তা সংস্কৃতিকে পুরোপুরি অস্বীকার করা নয়, বরং একে সমালোচনামূলকভাবে দেখা। আমাদের বুঝতে হবে যে, মানুষের পরিচয় তার কেনা পণ্যে নয়, বরং তার মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে নিহিত।পরিচয় কোনো ব্র্যান্ড নয় যা বাজার থেকে কেনা যায়; এটি একটি চর্চা যা তিলে তিলে গড়ে তুলতে হয়। অন্তর্ভুক্তি কোনো শপিং মলের সদস্যপদে নেই, এটি আছে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতার মধ্যে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কতটা সচেতনভাবে এই ‘ব্র্যান্ডে গড়া সত্তা’ থেকে বেরিয়ে এসে একটি প্রকৃত মানবিক ও সামষ্টিক পরিচয় নির্মাণ করতে পারি তার ওপর।বাজার আমাদের পণ্য দিতে পারে, কিন্তু গরিমা দিতে পারে না। বাজার আমাদের সুবিধাবাদ দিতে পারে, কিন্তু মুক্তি দিতে পারে না। পরিচয় যখন ভোগের দাস হয়ে পড়ে, তখন মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যায়। তাই আমাদের প্রয়োজন এমন এক সাংস্কৃতিক জাগরণ, যা মানুষকে পুনরায় ‘ভোক্তা’ থেকে ‘নাগরিক’ হিসেবে রূপান্তরিত করবে এবং পণ্যের সম্পর্কের চেয়ে মানুষের সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেবে। বাংলাদেশের এই দীর্ঘ যাত্রা কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নয়, বরং এটি আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারেরও এক মহান লড়াই।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

বহুমুখী অর্থনৈতিক চাপে দেশ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে পরিবহন খরচ বাড়ছে। এর ঢেউ ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের দামে লাগতে শুরু করেছে। সামনে আরও দাম বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। তাই এখনই খরচ নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। জ্বালানি খরচ বাড়লে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। ফলে পণ্য ও সেবার খরচ বৃদ্ধি পায় এবং এর প্রভাব পড়ে বাজারদরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, মার্চ মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি।বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম। এমন অবস্থায় সামনের দিনগুলোয় খরচের চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই হিসাব করে চলাই সীমিত আয় ও মধ্যবিত্ত পরিবারের টিকে থাকার কার্যকর কৌশল হতে পারে। বর্তমানে দেশের মানুষ ক্রমেই একটি কঠিন পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, দেড় বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে প্রাণ ফিরবে, শিল্পকারখানা সচল হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতা এখন ভিন্ন।দেশের অর্থনীতি এখন একাধিক চাপে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, মানুষের আয় চাপে রয়েছে, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি দুর্বল। বিনিয়োগও প্রত্যাশামতো বাড়ছে না। এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানি ও বৈদেশিক খাতে চাপের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ অবস্থায় নতুন সরকারের সামনে মূল প্রশ্ন—কোন সমস্যাকে আগে অগ্রাধিকার দেয়া হবে: মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাত, নাকি জ্বালানি?বাংলাদেশের মতো ঘাটতি বাজেটের দেশে সরকারকে ধার করে চলতে হয়। দেশি বা বিদেশি—উভয় উৎস থেকেই ঋণ নেয়া হয়। সরকার আগে ব্যয় করে, পরে অর্থের সংস্থান করে। নতুন সরকারকে আগের প্রকল্পগুলোর ব্যয়ের চাপও বহন করতে হচ্ছে। সরকারের আয়ের প্রধান উৎস রাজস্ব খাত হলেও বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি দুর্বল। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে শুল্ক-কর আদায়ে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। ফলে রাজস্ব আয় দ্রুত বাড়বে, এমন আশা করা কঠিন।এ পরিস্থিতিতে সরকারি বেতন-ভাতা, সুদ ব্যয়, ভর্তুকি ও চলমান প্রকল্পের ব্যয় মেটাতে সরকারকে নিয়মিত ঋণ নিতে হচ্ছে। ঋণ ব্যবস্থাপনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কখনো কখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দিতে হচ্ছে। এতে রিজার্ভ মানি বৃদ্ধি পায়, যা বাজারে অর্থের জোগান বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে।এদিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও দ্রুত বদলাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বেশি পড়ছে। ফলে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলেছে, বৈশ্বিক সংঘাতের ফলে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়বে, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শ্রমবাজারে চাপ বাড়বে। বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে যেতে পারে, যা আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের ঝুঁকি বেশি।বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণে ধীরগতির কারণে ঋণের কিস্তি ছাড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজস্ব খাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং জ্বালানি ভর্তুকি সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রগতি প্রয়োজন। এসব সংস্কার কার্যক্রমে গতি না এলে কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পাওয়া কঠিন হবে।বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমšি^ত ও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ। স্বল্পমেয়াদি চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করা জরুরি। এজন্য অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব বাড়ানো এবং কাঠামোগত সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

ভিডিও আরও দেখুন

২০ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে আর্সেনাল

আক্ষেপ ঘুচিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে উঠেছে আর্সেনাল। মঙ্গলবার রাতে এমিরেটস স্টেডিয়ামে সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগের লড়াইয়ে আতলেতিকো মাদ্রিদকে ১-০ গোলে হারিয়েছে মিকেল আর্তেতার দল। দুই লেগ মিলিয়ে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বুদাপেস্টের টিকিট নিশ্চিত করল গানার্সরা।প্রথম লেগ ১-১ গোলে ড্র থাকায় ফিরতি লেগে শুরু থেকেই ছিল টানটান উত্তেজনা। প্রথমার্ধের ৪৪তম মিনিটে এমিরেটসের গ্যালারিকে উল্লাসে মাতান বুকায়ো সাকা। ভিক্টর ইয়োকেরেসের বিল্ড-আপ থেকে লিয়েন্দ্রো ট্রোসার্ডের নেওয়া শট আতলেতিকো গোলরক্ষক ইয়ান ওবলাক প্রতিহত করলেও, ফিরতি বলে আলতো টোকায় জাল খুঁজে নেন সাকা। এই এক গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়।গোলের খোঁজে মরিয়া আতলেতিকো বেশ কিছু ভালো আক্রমণ করলেও আর্সেনালের রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় তা ব্যর্থ হয়। প্রথমার্ধে জুলিয়ানো সিমিওনেকে গোল করা থেকে রুখতে ডেক্লান রাইসের সেই দুর্দান্ত ট্যাকল কিংবা বিরতির পর গ্যাব্রিয়েলের চমৎকার ডিফেন্ডিং ছিল চোখে পড়ার মতো। অন্যদিকে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন ইয়োকেরেসও, তবে তার শটটি বারের ওপর দিয়ে চলে যায়।গত মৌসুমে পিএসজির কাছে হেরে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল আর্সেনালকে। এবার সেই দুঃখ ভুলে ফাইনালে ওঠার পাশাপাশি গানার্সদের সামনে তৈরি হয়েছে এক ঐতিহাসিক সুযোগ। প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ একই মৌসুমে 'ডাবল' জেতার হাতছানি এখন আর্তেতার শিষ্যদের সামনে।এর আগে ২০০৬ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে উঠলেও বার্সেলোনার কাছে হেরে রানার্সআপ হতে হয়েছিল আর্সেনালকে। আগামী ৩০ মে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামবে তারা। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ হবে বায়ার্ন মিউনিখ অথবা পিএসজির মধ্যে যেকোনো এক দল।   

২০ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে আর্সেনাল
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৫৭ জন