সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
ইন্টারনেট বন্ধ ছিল সুপরিকল্পিত

ইন্টারনেট বন্ধ ছিল সুপরিকল্পিত

সরকারি নির্দেষেই ইন্টারনেট শাটডাউন করা হয়েছিল জয়-পলকের বিরুদ্ধে তৃতীয় সাক্ষীর সাক্ষ্য প্রদানজুলাই আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা আকস্মিক বন্ধের পেছনের আসল রহস্য এবার উন্মোচিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ইমদাদুল হক মোল্লা ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন, কোনো কারিগরি ত্রুটি নয় বরং সরকারের সরাসরি সিদ্ধান্তেই সেদিন ইন্টারনেট সেবা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিলো।রবিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি দেন তিনি।জুলাই আন্দোলনে ইন্টারনেট বন্ধ করে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানোর দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই সাক্ষ্য নেওয়া হয়।ইমদাদুল হক তার জবানবন্দিতে ইন্টারনেট সংযোগের কারিগরি স্তর ব্যাখ্যা করে বলেন, ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা প্রান্তিক স্তরে থাকলেও তাদের উপরে সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি ও ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্টরিয়াল কোম্পানির মতো সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়েছে। আন্দোলনের সময় যখন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন আইআইজির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিলো যে ওপরের স্তর থেকে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতেই তারা নিশ্চিত হন যে এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ।সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ইমদাদুল হক তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের মিথ্যাচারের বিষয়টিও আদালতের সামনে স্পষ্ট করেন।তিনি জানান, ২৩ জুলাই মহাখালী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবন পরিদর্শনের সময় পলক ডাটা সেন্টারে আগুনের অজুহাত দিয়েছিলেন, যা ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য।তার ভাষ্যমতে, আগুন লেগেছিলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে, ডাটা সেন্টারে নয়। এমনকি আগুনের কারণে কিছু ফাইবার ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ ছিলো না, কারণ দেশে তখন আরও ১৫ থেকে ১৬টি সক্রিয় ডাটা সেন্টার ছিলো। জবানবন্দি শেষে পলকের আইনজীবী লিটন আহমেদ তাকে জেরা করেন। অন্যদিকে সজীব ওয়াজেদ জয় পলাতক থাকায় তার পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আইনি কার্যক্রমে অংশ নেন।
২ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

বৈশাখ, কৃষি ও বাংলার পরিবর্তিত সময়চিত্র

বাংলা নববর্ষ উদযাপন বাঙালির জীবনে শুধু একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়; এর গভীরে নিহিত রয়েছে কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থা, প্রকৃতির চক্র এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস| বৈশাখের আগমন মানেই নতুন বছরের সূচনা, কিন্তু এই সূচনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফসল, পরিশ্রম, প্রাপ্তি ও অনিশ্চয়তার বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা| সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার রূপান্তর ঘটেছে, আর তার প্রভাব পড়েছে বৈশাখের অর্থ ও তাৎপর্যের ওপরও| তাই বৈশাখকে সত্যিকারভাবে বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান বাস্তবতাকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি|আগেকার দিনে বাংলা নতুন বছরের সূচনা বৈশাখ মাসে ছিল না| অগ্রহায়ণ মাসে নতুন বছর শুরু হতো| আর সে সময়ই আমন ধান ঘরে তোলা হতো এবং সেটিই ছিল সে সময়ের প্রধান ফসল| বর্তমানেও আমন ধান তার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে—উৎপাদনের বিচারে বোরো ধানের পরেই এর অবস্থান| সে সময় নতুন ধান ঘরে ওঠার আনন্দে কৃষকরা ‘নবান্ন’ উৎসব পালন করতেন, যা ছিল কৃষিনির্ভর জীবনের প্রাচুর্যের প্রতীক| তবে এই উৎসব নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ ছিল না; ধান ওঠার পর সুবিধাজনক সময়ে তা উদযাপিত হতো| অনেক ক্ষেত্রে এই আয়োজন পৌষ মাস পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় একে ‘পৌষ পার্বণ’ও বলা হতো|বর্তমানেও নবান্ন পালিত হয় তবে সরকারি উদ্যোগে এবং সেটা পয়লা অগ্রহায়ণে| আধুনিক কৃষিপদ্ধতির কারণে আমন ধান আগেই কাটা সম্ভব হওয়ায় এখন আর পৌষ মাস পর্যন্ত অপেক্ষার প্রয়োজন পড়ে না|নতুন বছর অগ্রহায়ণ থেকে পিছিয়ে বৈশাখে প্রবর্তনের একটি প্রেক্ষাপট আছে| মুঘল সম্রাট আকবর তার খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ফসলি-সন প্রবর্তন করেন এবং বৈশাখ মাসকে বছরের সূচনা হিসেবে নির্ধারণ করেন| ফসলি-সন বলা হলেও সুবে বাংলায় উৎপাদিত ফসলের সঙ্গে এর তেমন সম্পর্ক ছিল না| কারণ ঐ সময় ছিল চৈতালী ফসল তোলার শেষ সময়| কিন্তু সে ফসলগুলো তেমন অর্থকরী ফসল ছিল বলে মনে হয় না| তাই অতীতের বৈশাখ ছিল অনেকাংশে কষ্ট ও দায়বদ্ধতার সময়| চৈত্রের তীব্র দাবদাহের পর বৈশাখে বৃষ্টিপাত কম থাকত এবং কৃষকের ঘরে খাদ্যসংকট দেখা দিত| সে সময় বোরো ধান সারা দেশে বিস্তৃত না থাকায় অধিকাংশ কৃষকের প্রধান ভরসা ছিল আউশ, আমন ও অন্যান্য মৌসুমি ফসল| কিন্তু এসব ফসলও পর্যাপ্ত না হলে খাজনা পরিশোধ একটি বড় চাপ হয়ে দাঁড়াত| ফলে ˆবশাখের আনন্দ তখন অনেকাংশেই সীমিত হয়ে পড়তো| যাই হোক এবং যেভাবেই হোক সময়ের সঙ্গে এটিই এক সময় বাংলা সন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং বছরের প্রথম দিন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও প্রশাসনিক দিনে পরিণত হয়| এর সঙ্গে খাজনা আদায় ও হালখাতার প্রথার সূচনা ঘটে|একসময় পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে কৃষি বর্ষপঞ্জির একটি নতুন চক্রের সূচনা হতো, যখন আউশ ধান, জলি আমন ও পাট চাষের প্রস্তুতি নেয়া ছিল কৃষকের নিয়মিত কর্মপরিকল্পনার অংশ| কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই চিত্রে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে| বর্তমানে বৃষ্টিনির্ভর আউশ ও জলি আমনের চাষ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে সেচনির্ভর বোরো ধানই প্রধান ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে; অনেক ক্ষেত্রেই আগের আউশের জমি এখন বোরো চাষের আওতায় এসেছে|তবুও কৃষিনির্ভর এই ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি; বরং পরিবর্তিত রূপে তা এখনও সংস্কৃতির ভেতরে বিদ্যমান| এখন বৈশাখ মাসই হয়ে উঠেছে নতুন ধান ঘরে তোলার প্রধান সময়| ফলে আগের মতোই এই সময়টি ফসল ঘরে ওঠার আনন্দ বহন করে, যদিও তার প্রেক্ষাপট ভিন্ন| এই কৃষিভিত্তিক আবহের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন একটি মাত্রা—ডিজিটাল ‘কৃষিকার্ড’ চালুর উদ্যোগ| এর মাধ্যমে কৃষকের একটি স্বীকৃত পরিচয় নিশ্চিত হবে, যা ব্যবহার করে তারা সহজেই সরকারি ভর্তুকি, প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারবেন| এর ফলে কৃষি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে| এভাবে নববর্ষ আবারও কৃষিকেন্দ্রিক বাস্তবতার সঙ্গে নতুনভাবে সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে|আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে দেশের কৃষিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে| উন্নত সেচব্যবস্থা, উচ্চফলনশীল বীজ এবং গবেষণালব্ধ জ্ঞানের প্রয়োগে এখন চৈত্র-বৈশাখেই সারা দেশে বোরো ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে| এতে কৃষকের ঘরে সময়মতো নতুন ফসল পৌঁছায় এবং বৈশাখ অনেক ক্ষেত্রেই প্রাপ্তি ও স্বস্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে| ফলে সামগ্রিকভাবে কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থারও উন্নতি লক্ষ করা যায়|তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যেও হাওর অঞ্চলের বাস্তবতা ভিন্ন মাত্রা যোগ করে| দেশের কৃষিতে হাওরের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও এখানকার কৃষিজীবন এখনও প্রকৃতিনির্ভর এবং ঝুঁকিপূর্ণ| বছরের অধিকাংশ সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকার কারণে বোরো ধানই এখানে প্রধান ফসল| কৃষকরা দীর্ঘ সময় পরিশ্রমের পর চৈত্রের শেষে ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি নেন, কিন্তু একই সময়ে পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা দেখা দেয়, যা মুহূর্তেই পাকা ধান তলিয়ে দিতে পারে| এই কারণে হাওরের কৃষকদের জন্য বৈশাখ সবসময় স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে না; বরং তা অনেক সময় অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের প্রতীক হয়ে ওঠে| ফলে তাদের জীবনে এই সময়টি এক দ্বৈত অভিজ্ঞতা বহন করে—একদিকে নতুন ফসলের আশা, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা| এই দ্বন্দ্বই বৈশাখকে হাওর অঞ্চলের কৃষকের কাছে এক অনন্য, বহুমাত্রিক বাস্তবতায় পরিণত করেছে|সারা দেশে বোরো ধানের বিস্তারের ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে এর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে| বিশেষ করে ফসলের বৈচিত্র্য আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষির জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে| তদুপরি, বোরো ধানের জমি দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ থাকায় মিথেন গ্যাসের নির্গমন বাড়ছে, যা পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে| তাই কৃষি উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে|তবে এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা আজ অনেকাংশে বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল| উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবনের ফলে উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি খাদ্যাভ্যাসেও কিছু বৈচিত্র্য এসেছে| এর পাশাপাশি শহরাঞ্চলে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে পান্তাভাত খাওয়ার যে নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা এখন এক ধরনের প্রতীকী ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে| যদিও গ্রামীণ জীবনে এটি বরাবরই সাধারণ খাবার ছিল, তবুও শহুরে উদযাপনের মাধ্যমে এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে|বর্তমান বাস্তবতায় বৈশাখ মাসেই যখন নতুন ধান ঘরে ওঠে, তখন নবান্ন উৎসবের মতো একটি কৃষিভিত্তিক উদযাপন এই সময়েও চালু করা যেতে পারে| এর মাধ্যমে কৃষকের পরিশ্রমের স্বীকৃতি দেয়া সম্ভব হবে এবং নববর্ষের সঙ্গে কৃষিজীবনের সম্পর্ক আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে|বৈশাখ আজ বহুমাত্রিক অর্থে সমৃদ্ধ একটি সময়| এটি যেমন নতুন বছরের সূচনা, তেমনি কৃষির অর্জন, সম্ভাবনা এবং অনিশ্চয়তার এক সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি| ঐতিহ্যগত প্রথা, কৃষির পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং কৃষিকার্ডের মতো আধুনিক উদ্যোগ—সবকিছু মিলিয়ে ˆবশাখ এখন বাংলাদেশের কৃষি ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক| এই সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই নববর্ষ তার প্রকৃত তাৎপর্য লাভ করুক এবং বাঙালির জীবনযাত্রার সঙ্গে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠুক|[লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট]

পথশিশু: সংখ্যার আড়ালে হারানো জীবন

২০২৬ সালেও পৃথিবীর কোটি কোটি শিশু নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা ও মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রাস্তায় জীবনযাপন করছে| তাদের কাছে ˆশশব মানে খেলাধুলা বা ¯^প্ন নয়—বরং বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম| প্রতি বছর ১২ এপ্রিল পালিত হয় আন্তর্জাতিক পথশিশু দিবস আমাদের সামনে এমন এক বাস্তবতা তুলে ধরে, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই| দিবসটি কেবল একটি প্রতীকী আয়োজন নয়; এটি মানবিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার আহ্বান, নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা এবং সমাজের জন্য আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত| পথশিশু বলতে সাধারণত সেইসব শিশুদের বোঝায়, যারা জীবিকার প্রয়োজনে বা পারিবারিক ভাঙনের কারণে রাস্তায় বসবাস করে কিংবা দিনের অধিকাংশ সময় রাস্তায় কাটায়| কেউ সম্পূর্ণ পরিবারহীন, আবার কেউ পরিবার থাকা সত্ত্বেও দারিদ্র্য, সহিংসতা, অবহেলা বা সামাজিক ˆবষম্যের কারণে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে| এদের জীবন অনিশ্চয়তা, শোষণ, নিরাপত্তাহীনতা ও বঞ্চনায় পরিপূর্ণ| আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বে আনুমানিক ১৫-২০ কোটি শিশু কোনো না কোনোভাবে রাস্তায় বসবাস বা কাজ করতে বাধ্য| দক্ষিণ এশিয়া, সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি প্রকট| প্রায় ৪০% পথশিশু কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় নেই| প্রায় ৩০% শিশু নিয়মিত শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার| ২০% এর বেশি শিশু অপরাধচক্র, মাদক বা বিপজ্জনক কাজে জড়িয়ে পড়ে| উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু মানবপাচার ও শোষণের ঝুঁকিতে থাকে| এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; এগুলো প্রতিটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া নিরাপত্তা, শিক্ষা ও সম্ভাবনার করুণ প্রতিচ্ছবি| বাংলাদেশেও পথশিশু সমস্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চ্যালেঞ্জ| বিভিন্ন গবেষণা ও বেসরকারি সংস্থার তথ্যমতে— দেশে আনুমানিক ১০-১৫ লাখ পথশিশু রয়েছে| রাজধানী ঢাকায় রয়েছে প্রায় ৫-৬ লাখ পথশিশু| প্রায় ৬৫% শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত| প্রায় ৫০% শিশু কোনো না কোনো শিশুশ্রমে নিয়োজিত| দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুতি, নদীভাঙন, বন্যা, নগরায়ণ এবং গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন—এসব কারণ পথশিশু বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে| এছাড়া নগর জীবনের ব্যয়বৃদ্ধি ও সামাজিক ˆবষম্যও এ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে| পথশিশুদের প্রতিদিনের জীবন এক অনিশ্চিত ও কঠোর বাস্তবতার মধ্যে সীমাবদ্ধ| তারা খাবার, আশ্রয়, নিরাপত্তা—প্রতিটি মৌলিক চাহিদার জন্য সংগ্রাম করে| অনেক শিশু হকারি, ভিক্ষাবৃত্তি, আবর্জনা সংগ্রহ বা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত| তারা ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড বা উন্মুক্ত স্থানে রাত কাটায়| সহজেই তারা মাদকাসক্তি, অপরাধচক্র, যৌন নির্যাতন ও পাচারের শিকার হয়| ¯^াস্থ্যঝুঁকি তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ| অপুষ্টি, ত্বকের রোগ, শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, ডায়রিয়া, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা তাদের ¯^াভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে| অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবার বাইরে থাকে| শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার হলেও পথশিশুরা এই অধিকার থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত| জীবিকার তাগিদে তারা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না| তাদের দক্ষতা ও জ্ঞান বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়| ভবিষ্যতে স্থায়ী ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে| দারিদ্র্যের চক্র প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে থাকে| অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম কিছুটা সহায়তা করলেও তা পর্যাপ্ত নয়| অনেক ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে না| বাংলাদেশ সরকার পথশিশুদের পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে| সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে আশ্রয়কেন্দ্র, শিক্ষা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে| তবে বাস্তবতায় কিছু সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট— পর্যাপ্ত বাজেট ও অবকাঠামোর অভাব| প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা ও সমš^য়ের ঘাটতি| দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার অভাব| উপকারভোগীদের সঠিকভাবে চিহ্নিতকরণে সমস্যা| ফলে এসব উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে পুরোপুরি সফল হতে পারছে না| পথশিশু সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সমšি^ত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য| পথশিশুদের জন্য পৃথক জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে| ফ্রি ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার আওতায় পথশিশুদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে| ভ্রাম্যমাণ স্কুল, রাতের স্কুল এবং নমনীয় শিক্ষা পদ্ধতি চালু করতে হবে| সম্ভব হলে শিশুদের পরিবারে ফিরিয়ে এনে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে| ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে| নিয়মিত ¯^াস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টি কর্মসূচি এবং মানসিক সহায়তা প্রদান জরুরি| গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে সমাজ পথশিশুদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়| নির্ভুল পরিসংখ্যান সংগ্রহ ও গবেষণার ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করতে হবে| পথশিশুরা সমাজের বোঝা নয়; তারা একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ| তাদের প্রতি অবহেলা মানে একটি সম্ভাবনাকে ধ্বংস করা| একজন পথশিশুর পাশে দাঁড়ানো মানে একটি জীবনকে নতুন পথে এগিয়ে নেয়া| সমাজের প্রতিটি মানুষের ছোট ছোট উদ্যোগ—যেমন শিক্ষা সহায়তা, মানবিক আচরণ, সচেতনতা সৃষ্টি—এই শিশুদের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে| তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি| [লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]

কেন মঙ্গল শোভাযাত্রা নয়?

বাংলা নববর্ষ ১ বৈশাখ| এটি একটি উৎসব| এই উৎসবটি বাংলা জনপদের বসবাসরত সব মানুষের| কারণ এই উৎসবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ-গোত্র বা সম্প্রদায়গত কোনো বিভাজন থাকে না| তাই বাংলা নববর্ষ একটি সার্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসব| বাংলা জনপদে বসবাসরত সব জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের মানুষের মেল বন্ধন হলো পহেলা ˆবশাখ| হাজার হাজার বছরে ধরে এই জনপদের মানুষ পহেলা বৈশাখকে সাড়াম্বরে পালন করে আসছে| বাংলা জনপদে মুসলিম শাসন শুরুর পর মোগলরা খাজনা আদায়ের এর ব্যবহার ঘটায়| সর্বোপরি, বাংলা জনপদের মানুষের প্রাণের উৎসব হলো বাংলা নববর্ষ| বাংলাদেশের রাজধানীসহ সারাদেশে জাতির মঙ্গল কামনায় এই উৎসবটি পালিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে| তবে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে, এই উৎসবকে কেন্দ্র করে চলছে এক প্রকার অপরাজনীতি| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বাংলা নববর্ষের দিনে প্রতি বছর যে শোভাযাত্রা হয়, ফের সেটির নতুন নাম নির্ধারণ করা হয়েছে| এতদিন এটি ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত থাকলেও এবার থেকে এর নাম ‘ˆবশাখী শোভাযাত্রা’ করার কথা জানিয়েছে সরকার| অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন কওে সুখ-শান্তি আর সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় বর্তমানে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়| তবে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতায় নানা পরিবর্তন এসেছে| অনেকেই মনে করেন যে, মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে বাংলা সন গণনা শুরু হওয়ার পর খাজনা আদায়ের পর যে উৎসব হত, তা থেকে এর উৎপত্তি| আর তখন থেকে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে| প্রশ্ন হচ্ছে এই শোভা যাত্রাটাত বছরের শুরুতে হচ্ছে তার নামটা কি ˆবশাখী শোভা যাত্রা দেয়া খুবই প্রয়োজন? যেহেতু বছরটা শুরু হয় এই দিনের এই উৎসব দিয়ে, তাই জনপদের মঙ্গল কামনা করে শোভা যাত্রাটি বের করলে কার কি ক্ষতি? কেন এই শোভা যাত্রাটাকে মঙ্গল শোভা যাত্রা বলা যাবে না? মঙ্গল নামটি কি কোন গোষ্ঠি, ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি? এটি একটি সার্বজনীন শব্দ| এই উৎপত্তি বাংলা জনপদ থেকে| বাংলা নববর্ষ উৎযাপনের ধারাবাহিকতায় কখনও আগের বিভিন্ন নিয়ম বাদ দেয়া হয়েছে, আবার কখনও নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে এই উৎসবের সঙ্গে| ধীরে ধীরে বাঙালি সংস্কৃতি আর রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে এই উৎসব| ‘মঙ্গল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো— কল্যাণ, শুভ, ভালো বা হিত| এটি একটি সংস্কৃত থেকে আসা শব্দ, যার অর্থ উপযুক্ত বা শুভপ্রদ| সাধারণ অর্থ: কল্যাণ, শুভ, মঙ্গলময়| হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা সাহিত্য অকাদেমী থেকে প্রকাশিত বঙ্গীয় শব্দকোষ (প্রথম খণ্ড)| ২০০১ থেকে জানা যায় যে মঙ্গল অর্থ কল্যাণপ্রদায়ক| এর সমার্থক শব্দাবলি হলোকল্যাণ, মঙ্গল, ভালো, শুভ| তবে শোনা যায় যে, মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে আপত্তির মূল কারণ ধর্মীয় বিশ্বাস| কেউ কেউ বলছেন যে, বিভিন্ন ইসলামপন্থী সংগঠনের মতে এটি হিন্দু সংস্কৃতি ও ইসলামী আকিদার পরিপন্থী|| শোভাযাত্রায় বিভিন্ন জীব-জন্তুর প্রতিকৃতি বা মোটিফ ব্যবহার, শব্দটির ব্যবহার এবং নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণকে তারা অনৈসলামিক ও বিজাতীয়সংস্কৃতি বলে মনে করেন| তবে ধর্মের নামে এই মঙ্গল শব্দের অপব্যাখাগুলো ঠিক না| তারপর দেখা যাচ্ছে যে, ১. অনেক ইসলামপন্থী দল মনে করে, মঙ্গল শোভাযাত্রার বিভিন্ন মোটিফ ও জীব-জন্তুর প্রতিকৃতি হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যামুসলিম সংস্কৃতির বিরোধী| ‘মঙ্গল’ শব্দটি দিয়ে অশুভ দূর করে মঙ্গল কামনা করা হয়, যা ইসলামী দৃষ্টিতে সৃষ্টিকর্তার (আল্লাহ) ওপর ভরসা বা তওহীদের ধারণার পরিপন্থী বলে তারা মনে করেন| ৩. পহেলা ˆবশাখে বিভিন্ন জীব-জন্তুর মূর্তি, মুখে উল্কি আঁকা এবং নারী-পুরুষের একসঙ্গে চলার বিষয়টিকে তারা ‘বিজাতীয়’ ও ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী বলে গণ্য করেন| ৪. অতীতে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী বা সংগঠন এই আয়োজনের বিরোধিতা করে একে ‘হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি’ বলে আখ্যায়িত করেছে (বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে)| ৫. আপত্তির মুখে অনেক সময় এর নাম পরিবর্তন করে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘ˆবশাখী শোভাযাত্রা’ করা হয়| এই সমস্ত আপত্তি কেন? এটা তো কোন বিশেষ ধর্মের অনুষ্ঠান না| এর এর প্রচলনটা কোন ধর্মানুসারে হয় নাই| তবে বাংলাদেশের মানুষের ধর্মঅনুভুতিকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করার জন্য উল্লেখিত অপব্যাখ্যাগুলো দেয়া হচ্ছে| সারা বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশের পহেলা ˆবশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মনে করে একটি অসাম্প্রদায়িক সার্বজনীন অনুষ্ঠান| তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই উৎসবটি ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর মাধ্যমে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে| ১৯৬০-এর দশক থেকে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষকে বরণ করে আসছে ছায়ানট| ঢাকার রমনা পার্কে ছায়ানট আয়োজন করে প্রাত্যোষিক সঙ্গীতানুষ্ঠান| এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হতো অন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা| এর ফলে সাধারণ মানুষ নিবিড়ভাবে আকৃষ্ট হয় এই উৎসবে| নাগরিক আবহে সার্বজনীনপহেলা বৈ শাখ উদযাপনে নতুন মাত্রা যোগ করে ছায়ানট| ১৯৮০-র দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরূদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একইসঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ প্রবর্তিত হয়| পরের বছরও চারুকলার সামনে থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়| তবে ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে চারুপীঠ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যশোরে প্রথমবারের মতো নববর্ষ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে| যশোরের সেই শোভাযাত্রায় ছিল- পাপেট, বাঘের প্রতিকৃতি, পুরানো বাদ্যযন্ত্রসহ আরও অনেক শিল্পকর্ম| শুরুর বছরেই যশোরে শোভাযাত্রা আলোড়ন ˆতরি করে| পরবর্তীতে যশোরের সেই শোভাযাত্রার আদলেই ঢাকার চারুকলা থেকে শুরু হয় বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা| শুরু থেকেই চারুকলার শোভাযাত্রাটির নাম মঙ্গল শোভাযাত্রা ছিল না| ১৯৯৬ সাল আনন্দ শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামকরণ করাহয়| ১৯৮৯ সালে প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রায় ছিল বিশালকায় চারুকর্ম পুতুল, হাতি, কুমির, লক্ষ্মীপেঁচা, ঘোড়াসহ বিচিত্র মুখোশএবং সাজসজ্জা, বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য| ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের মঙ্গল শোভাযাত্রায়ও নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি স্থান পায়| ১৯৯১ সালে চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিল্পীদের উদ্যোগে হওয়া সেই শোভাযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর, বিশিষ্ট লেখক, শিল্পীরাসহ সাধারণ নাগরিকরা অংশ নেয়| শোভাযাত্রায় স্থান পায় বিশালআকার হাতি, বাঘের প্রতিকৃতির কারুকর্ম| কৃত্রিম ঢাক আর অসংখ্য মুখোশখচিত প্ল্যাকার্ড| মিছিলটি নাচে গানে উৎফুল্ল পরিবেশ সৃষ্টি করে| এর প্রাচীন ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পহেলা উৎসব পালন করা হত বছরের প্রথম দিনে তার কারণটি ছিল আগত বছরটি যেন প্রতিটি মানুষের জন্য কল্যান বয়ে আনে| প্রাচীন বাংলার মানুষ একটি কথা বিশ্বাস করতেন, শুরুটা যদি মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে করা যায় তাহলে সারাটা বছরই মঙ্গলময় হবে| সুতরাং এই ধারণা থেকে শোভা যত্রাটার নাম মঙ্গল শোভা যত্রা করা হয়েছে| মঙ্গল শোভাযাত্রাটাকে কেউ বিশেষ মহলের দিকে ঠেলে দেন তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক| মঙ্গল শোভা যাত্রাটা উৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে কোন রাজনৈতিক ধর্মীয় বা কোন সম্প্রদায়ের উপাদান বা সংশ্রবতা খুজে পাওয়া যায় না| এটা বাংলার একটি প্রাচীন উৎসব থেকে আগত| তাই এর রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অপব্যাখা দেয়া ঠিক না|[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

বাঙালির লোকসংস্কৃতি

বাঙালি উৎসব ও আনন্দপ্রিয় জাতি| পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা উপলক্ষে তারা আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে| সেসবের মধ্যে ব্যতিক্রমী হয়ে আবির্ভূত হয় বাংলা নববর্ষ, যার ¯^াদ, গন্ধ ও আবেদন অন্যান্য উৎসব থেকে একেবারেই আলাদা| জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ, সব বাঙালি সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একই হৃদয়াবেগে একটি মোহনায় মিলিত হয়ে পালন করে এই সর্বজনীন উৎসব| চিরায়ত বাঙালিত্বের অহঙ্কার আর সংস্কৃতির উদার আহ্বানে জাগরুক হয়ে নাচে-গানে, গল্পে-আড্ডায়, আহারে-বিহারে চলে নতুন বছরকে বরণ করার পালা| বাংলা নববর্ষ তাই বাঙালির জীবনে সবচেয়ে বড় সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব| এর মাধ্যমে জাতি তার ¯^কীয়তা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার শক্তি সঞ্চয় করে; সচেষ্ট হয় আত্মপরিচয় ও শিকড়ের সন্ধানে|বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য হলো বাংলা বর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ| আর বাঙালির কাছে বাংলা নববর্ষ বরণ একটি প্রাণের উৎসব| বাংলা নববর্ষের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা| এমন নববর্ষই বাঙালি জাতিকে ইস্পাত-কঠিন ঐক্যে আবদ্ধ করেছিল, শক্তি ও সাহস জুগিয়েছিল স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে| চট্টগ্রাম অঞ্চলে শত বছর ধরে গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক হয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘জব্বারের বলী খেলা’| চট্টগ্রাম শহরের লালদীঘির মাঠে বিভিন্ন কুস্তিগীর বা বলীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই স্বতঃস্ফূর্ত আয়োজন আজও দর্শকদের কাছে দারুণ আকর্ষণের বিষয়| প্রতিবছর ১২ বৈশাখ উৎসবমুখর পরিবেশে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়|বাঙালি নারীর প্রধান পোশাক শাড়ি| যেকোনো উৎসবে-পার্বণে নারীর প্রথম পছন্দ এটি| শাড়ির নানা ধরন রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম জামদানি| এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ| জামদানি শাড়ি তুলা দিয়ে প্রস্তুতকৃত এক ধরনের শাড়ি, যা মসলিনের উত্তরাধিকার বহন করে| বাংলার মধ্যযুগে মসলিন ছিল অত্যন্ত মূল্যবান কাপড়| পরবর্তীতে মসলিন বিলুপ্ত হলেও জামদানির বিকাশ ঘটে| জনশ্রুতি আছে, ব্রিটিশরা মসলিন শিল্প ধ্বংস করতে কারিগরদের আঙুল কেটে দিয়েছিল| যদিও এ নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, তবু বাস্তবতা হলো— মসলিনের অবসানের পর জামদানি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে| নকশিকাঁথা আমাদের লোকশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ| সাধারণ কাঁথার ওপর নানান নকশা করে এটি ˆতরি করা হয়| পুরনো কাপড়ের সুতা খুলে কিংবা নতুন সুতা কিনে কাঁথা সেলাই করা হয়| ফুল, লতা, পাতা ইত্যাদি নকশা এতে ফুটে ওঠে| ময়মনসিংহ, রাজশাহী, ফরিদপুর ও যশোর অঞ্চলে নকশিকাঁথা বিশেষভাবে বিখ্যাত| তবে এই শিল্পও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে|একসময় গ্রামীণ জীবনে শিকা, চাঁদোয়া, শীতলপাটি ছিল অপরিহার্য| এখন এগুলো বিলুপ্তির পথে| মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শীতলপাটির কারিগর কমে গেছে| প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্যের চাপে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প টিকে থাকতে পারছে না| একইভাবে বিয়ের গীত, বৃষ্টি ডাকার গান, ছাদ পেটানোর গান—এসব লোকজ সংস্কৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে| আধুনিক প্রযুক্তি ও ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে নতুন প্রজন্ম এসবের সঙ্গে সংযোগ হারাচ্ছে|লোকজ সংস্কৃতির পরিবর্তন স্বাভাবিক, কিন্তু সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা উদ্বেগজনক| বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমরা নিজের শিকড় ভুলে যাচ্ছি| কাঁসা-পিতলের বাসন, ঢেঁকি, জাঁতা—এসব হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট শব্দ, ভাষা ও জীবনধারা| চট্টগ্রামের মেজবান সংস্কৃতি এখনও শক্তভাবে টিকে আছে| এটি শুধু খাবার নয়, সামাজিক বন্ধনেরও প্রতীক| ধারণা করা হয়, ১৬০০-১৮০০ সালের মধ্যে এই সংস্কৃতির প্রচলন শুরু হয়| ‘মেজবান’ শব্দটি ফারসি উৎসের| এই আয়োজন চট্টগ্রামের স্বতন্ত্র্যকে তুলে ধরে| সংস্কৃতি হলো মানুষের আত্মার প্রকাশ| নৃবিজ্ঞানী Edward Burnett Tylor-এর মতে, সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত আচরণ, বিশ্বাস, শিল্প, আইন, নীতি—সবকিছুর সম্মিলিত রূপই সংস্কৃতি| সংস্কৃতি প্রবহমান; এর স্থবিরতা মানেই ক্ষয়| তাই বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে আমাদের সচেতন হতে হবে|বাংলাদেশ ও বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ঐতিহ্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি|[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

অনিয়ন্ত্রিত অটো: সমন্বিত নীতি জরুরি

রাজধানী ঢাকা একসময় প্রাণচঞ্চল নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল| আজ তা ধীরে ধীরে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের জটে আটকে পড়া শহরে পরিণত হচ্ছে| বিশেষ করে রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অপ্রতিরোধ্য বিস্তার নগরের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করছে| এটি শুধু যানজটের সমস্যা নয়; এর প্রভাব অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামোর গভীরে ছড়িয়ে পড়ছে| এই বাস্তবতায় অটো নিয়ন্ত্রণ এখন আর বিলাসিতা নয়, অপরিহার্য জাতীয় দাবি| ঢাকার সড়কগুলো মূলত পরিকল্পিত হয়েছে মোটরযান চলাচলের জন্য| নির্দিষ্ট গতিতে যানবাহন চলবে—এমন ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এই কাঠামো গড়ে উঠেছে| কিন্তু বাস্তবে রিকশা ও অটোর দখলদারিত্ব সেই কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে| ধীরগতির যানবাহন প্রধান সড়কে চলাচল করায় বাস, কার ও অ্যাম্বুলেন্স আটকে যাচ্ছে| জরুরি সেবাও ব্যাহত হচ্ছে| এর ফলে মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে| অফিসগামী মানুষ সময়মতো পৌঁছাতে পারছে না, শিক্ষার্থীরা ক্লাস মিস করছে, ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছে| দীর্ঘস্থায়ী যানজট দেশের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে| ব্যাটারিচালিত অটোর বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের ওপর চাপও বাড়ছে| প্রতিটি অটো প্রতিদিন চার্জ নিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, যা সম্মিলিতভাবে জাতীয় গ্রিডে বড় চাপ ˆতরি করছে| এই অতিরিক্ত চাহিদা পরিকল্পিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে| গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে এর প্রভাব আরও তীব্র| অর্থাৎ, একটি অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থা পুরো দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে| যানজট সময়ের অপচয় ঘটানোর পাশাপাশি জ্বালানির অপচয়ও বাড়ায়| ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন ধীরগতিতে চলায় পেট্রল ও ডিজেল অকারণে পুড়ে| এতে ˆবদেশিক মুদ্রা ব্যয় বাড়ে, কারণ জ্বালানির বড় অংশ আমদানিনির্ভর| একই সঙ্গে বায়ুদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করছে| ক্ষতিকর গ্যাসের নিঃসরণ নগরের বায়ুকে বিষাক্ত করে তুলছে, বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও অন্যান্য রোগ| ফলে এটি অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশগত সংকটও ˆতরি করছে| একসময় ঢাকার মানুষ ¯^ল্প দূরত্ব হাঁটতে অভ্যস্ত ছিল| এখন অটোর সহজলভ্যতা সেই অভ্যাস কমিয়ে দিয়েছে| এক কিলোমিটার পথও অনেকের কাছে হাঁটার অযোগ্য মনে হয়| এতে মানুষ শারীরিক পরিশ্রম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে| শিশু-কিশোরদের মধ্যেও এই প্রবণতা বাড়ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক| এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যে| ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের মতো রোগ বাড়ছে| এই প্রবণতা জাতীয় স্বাস্থ্যখাতেও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে| অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের সংখ্যা বাড়াও একটি বড় ঝুঁকি| পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্সিং ব্যবস্থা না থাকায় অনেক অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তি এই পেশায় যুক্ত হচ্ছে| এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্কদেরও অটো চালাতে দেখা যায়| ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সীমিত জ্ঞানের কারণে তারা নিয়ম ভাঙে| হঠাৎ দিক পরিবর্তন, সিগন্যাল অমান্য করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা| এতে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে এবং মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে| নিয়ন্ত্রণহীন অটো এখন সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ| হঠাৎ মোড় নেয়া বা উল্টো পথে চলার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে| এতে প্রাণহানি যেমন হচ্ছে, তেমনি অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হচ্ছেন| এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও গভীর| তবুও এই খাতের সঠিক পরিসংখ্যান নেই| কতসংখ্যক অটো চলাচল করছে—তার নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব নীতিনির্ধারণকে দুর্বল করছে| অটো সহজ আয়ের উৎস হওয়ায় গ্রাম থেকে শহরে মানুষের আগমন বাড়ছে| কৃষিতে অনিশ্চয়তা ও কর্মসংস্থানের সংকট মানুষকে শহরমুখী করছে| ফলে নগরে চাপ বাড়ছে—আবাসন সংকট, বস্তির বিস্তার, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যা তীব্র হচ্ছে| একই সঙ্গে গ্রাম হারাচ্ছে কর্মক্ষম জনশক্তি| কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে বা কম উৎপাদন হচ্ছে| শহরের বিস্তারে উর্বর জমিও কমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে| ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনা ছিল সমšি^ত ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে| কিন্তু অটোর অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার সেই পরিকল্পনাকে ব্যাহত করেছে| বড় যানবাহনের চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় গণপরিবহন কার্যকারিতা হারাচ্ছে| ফলে মানুষ ছোট যানবাহনের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা একটি দুষ্টচক্র ˆতরি করছে| এতে মেট্রোরেল বা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের মতো প্রকল্পের সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে পড়ছে| এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত জাতীয় নীতি প্রয়োজন| অটোর নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং বাধ্যতামূলক করতে হবে| একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ ˆতরি করে যানবাহনের সংখ্যা ও চলাচলের তথ্য সংরক্ষণ জরুরি| নির্দিষ্ট রুট ও জোন নির্ধারণ করে প্রধান সড়কে অটোর প্রবেশ সীমিত করতে হবে| পাশাপাশি গণপরিবহনকে আধুনিক ও সহজলভ্য করতে হবে, যাতে মানুষ বিকল্প পায়| অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি| একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে| ঢাকার সড়কে অটোর অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার এখন বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে| এটি শুধু যানজট নয়, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে| সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সমস্যা আরও জটিল হবে| একটি পরিকল্পিত, টেকসই ও কার্যকর নগর গড়তে হলে অটো নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই| এখন প্রয়োজন সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত ও তার বাস্তবায়ন| [লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, নারায়ণগঞ্জ জেলা সমিতি]

নিরাপদ খাদ্য, সুস্থ ভবিষ্যৎ

খাদ্য নিরাপত্তা একটি দেশের জন্য স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভোক্তার আস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি| খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবেশনের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে খাদ্যদূষণ ও খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়| আধুনিক বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ‘খামার থেকে খাবার টেবিল’ পদ্ধতিতে বিবেচনা করা হয়, যেখানে পুরো খাদ্য শৃঙ্খলকে একসঙ্গে নজরদারির আওতায় আনা হয়| খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি (হাইজিন) এবং জন্য স্বাস্থ্যের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে— স্বাস্থ্যবিধির অভাব খাদ্যদূষণ ঘটায় এবং রোগের বিস্তার ঘটায়, আর সঠিক স্বাস্থ্যবিধি জন¯^াস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখে|ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিশ্বে সবচেয়ে উন্নত ও ˆবজ্ঞানিকভাবে শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত| সেখানে জেনারেল ফুড ল’ এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে যে বাজারে আসা প্রতিটি খাদ্য মানুষের জন্য নিরাপদ হতে হবে| ইউরোপিয়ান ফুড সেফটি অথরিটি ¯^াধীনভাবে ˆবজ্ঞানিক গবেষণা ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে, যার ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ করা হয়| পাশাপাশি র‌্যাপিড অ্যালার্ট সিস্টেম ফর ফুড অ্যান্ড ফিড দ্রুত খাদ্যঝুঁকি শনাক্ত করে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করে এবং ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য বাজার থেকে সরিয়ে নেয়| ফলে ইউরোপে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় সমšি^ত, ¯^চ্ছ এবং ˆবজ্ঞানিক উপায়ে, যা জনগণের মধ্যে উচ্চ আস্থা ˆতরি করেছে|যুক্তরাজ্যের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সুসংগঠিত| ফুড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সি এই ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়| যুক্তরাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ˆবশিষ্ট্য হলো ফুড হাইজিন রেটিং সিস্টেম (এফএইচআরএস), যা সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য প্রতিষ্ঠানের ¯^াস্থ্যবিধির মান সহজভাবে তুলে ধরে| এই ব্যবস্থায় রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, হোটেল ও অন্যান্য খাদ্য ব্যবসাকে ০ থেকে ৫ পর্যন্ত স্কোর দেয়া হয়—৫ মানে অত্যন্ত ভালো এবং ০ মানে গুরুতর ঝুঁকিপূর্ণ| এই রেটিং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশপথে প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক (বিশেষত ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে) এবং অনলাইনে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে| ফলে ভোক্তারা সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে কোথায় নিরাপদ খাবার পাওয়া যাবে, এবং ব্যবসায়ীরাও ভালো রেটিং পেতে ¯^াস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য হয়|খাদ্য নিরাপত্তা যুক্তরাজ্যে খাতভিত্তিকভাবে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়| উৎপাদন শিল্পে এইচএসিসি পদ্ধতি বাধ্যতামূলক, যা খাদ্যের ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে| ক্যাটারিং খাতে—যেমন রেস্টুরেন্ট ও হোটেলে—কর্মীদের প্রশিক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সঠিক রান্না ও সংরক্ষণ তাপমাত্রা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| খুচরা বিক্রয় খাতে খাদ্যের লেবেলিং, অ্যালার্জেন তথ্য প্রদান এবং কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়| এই সমšি^ত ব্যবস্থার ফলে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি কম এবং জনগণের মধ্যে খাদ্যের প্রতি আস্থা বেশি|অন্যদিকে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো উন্নয়নশীল পর্যায়ে রয়েছে| ২০১৩ সালের খাদ্য নিরাপত্তা আইন এবং বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি প্রতিষ্ঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও বাস্তবায়নে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে| পরিদর্শন ও আইন প্রয়োগের সক্ষমতা এখনও দুর্বল, আধুনিক পরীক্ষাগারের সংখ্যা কম, এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমš^য়ের অভাব রয়েছে| দেশের বড় একটি অংশে অনানুষ্ঠানিক খাদ্য ব্যবসা পরিচালিত হওয়ায় নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে| খাদ্যে ভেজাল—যেমন ক্ষতিকর রাসায়নিক, কৃত্রিম রং ও সংরক্ষণকারী পদার্থের ব্যবহার—একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে|এই পার্থক্যের প্রভাব সরাসরি জন¯^াস্থ্যে প্রতিফলিত হয়| ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে খাদ্যবাহিত রোগের হার তুলনামূলক কম এবং জনগণের মধ্যে খাদ্যের প্রতি আস্থা বেশি| কিন্তু বাংলাদেশে খাদ্যদূষণের কারণে ডায়রিয়া, খাদ্যবিষক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি ¯^াস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ¯^াস্থ্যখাত ও অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে|বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা উন্নয়নের জন্য একটি সমšি^ত উদ্যোগ প্রয়োজন| প্রথমত, বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমš^য় বাড়াতে হবে| দ্বিতীয়ত, আইন প্রয়োগ জোরদার করতে হবে—নিয়মিত পরিদর্শন, কঠোর শাস্তি এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে| তৃতীয়ত, আধুনিক পরীক্ষাগার ও কোল্ড চেইন অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি| আন্তর্জাতিক মান যেমন এইচএসিসিপি ও কোডেক্স অ্যালিমেনটেরিয়াস অনুসরণ করলে খাদ্যের মান বৃদ্ধি পাবে এবং রপ্তানির সুযোগও বাড়বে|খাতভিত্তিক উন্নয়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| খাদ্য উৎপাদন শিল্পে মাননিয়ন্ত্রণ ও ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে| রেস্টুরেন্ট ও ক্যাটারিং খাতে যুক্তরাজ্যের মতো ফুড হাইজিন রেটিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে, যেখানে প্রতিটি খাদ্য প্রতিষ্ঠানের মান জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে| এতে ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়বে এবং ব্যবসায়ীরা নিয়ম মেনে চলতে উৎসাহিত হবে| খুচরা বাজারে সঠিক লেবেলিং, সংরক্ষণ এবং বিশেষ করে স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের নিয়মের আওতায় আনতে হবে| একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও শিক্ষার মাধ্যমে ভোক্তাদের সচেতন করা জরুরি|সবশেষে বলা যায়, খাদ্য নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার| যুক্তরাজ্যের ফুড হাইজিন রেটিং সিস্টেমের মতো ¯^চ্ছ ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ দেখিয়ে দেয় যে সঠিক নীতি ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব| বাংলাদেশ ইতোমধ্যে যাত্রা শুরু করেছে, এখন প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, সচেতনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা| নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি সুস্থ ও নিরাপদ জাতি গড়ে তুলতে|[লেখক: যুক্তরাজ্যের স্যালুটিভিয়া নামক একটি খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিতে ইনোভেশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন]

বিরতির বোতাম টিপে ট্রিগারে আঙুল

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আজকাল যেন এক অদ্ভুত যন্ত্র—যেখানে বিরতি মানে থেমে যাওয়া নয়, বরং আরও নিখুঁতভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি| বাইরে থেকে বোতাম চাপা হয়েছে, যুদ্ধ থেমেছে—এমন একটি দৃশ্য ˆতরি করা হয়| কিন্তু ভেতরে ভেতরে আঙুল তখনও ট্রিগারে, চোখ লক্ষ্যবস্তুতে স্থির| এই ˆদ্বত বাস্তবতাই আজকের তথাকথিত যুদ্ধবিরতির প্রকৃত পরিচয়|যুদ্ধবিরতি শব্দটি শুনলেই সাধারণ মানুষ ¯^স্তির নিশ্বাস ফেলে| মনে হয়, অন্তত কিছু সময়ের জন্য গোলাগুলি থামবে, আকাশে আর আগুন ঝরবে না, শিশুরা হয়তো ভয়ের মধ্যে নয়, ঘুমের মধ্যে ডুবে যাবে| কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়| এখানে যুদ্ধবিরতি মানে অনেক সময়ই যুদ্ধের ভাষা বদলানো—শব্দ কমে, কিন্তু সংকেত বাড়ে; বিস্ফোরণ কমে, কিন্তু প্রস্তুতি তীব্র হয়|মূলত এই যুদ্ধবিরতি হলো এক ধরনের নীরব বিস্ফোরণ| বাইরে থেকে শান্ত, ভেতরে চাপা উত্তেজনা| এটি অনেকটা সেই নদীর মতো, যার ওপরের পানি স্থির, কিন্তু নিচে স্রোত তীব্রভাবে বইছে| আর সেই স্রোত কখন ভাঙন ডেকে আনবে, তা বোঝার আগেই তীর ভেঙে পড়ে|এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক সেই নদীর মতোই—উপর থেকে কূটনৈতিক সৌজন্য, ভেতরে জমে থাকা সন্দেহ| প্রত্যেকে নিজেদের অবস্থানকে শক্ত করতে চায়, কিন্তু কেউই পুরোপুরি বিশ্বাস করতে রাজি নয়| ফলে যুদ্ধবিরতি এখানে একটি সমাধান নয়; এটি একটি হিসাবি বিরতি, যেখানে সবাই নিজেদের পরবর্তী চালের হিসাব কষছে|ইসরায়েল এই খেলায় যেন এক সতর্ক প্রহরী—যার কাছে নিরাপত্তা মানে সর্বোচ্চ সতর্কতা| তার দৃষ্টিতে হুমকি কখনোই সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয় না; বরং প্রতিটি বিরতির মধ্যেই নতুন হুমকির সম্ভাবনা জন্ম নেয়| তাই যুদ্ধবিরতি তার কাছে কখনোই নিশ্চিন্ততার প্রতীক নয়; এটি বরং আরও বড় প্রস্তুতির সময়|অন্যদিকে ইরান এই সমীকরণে এক ˆধর্যশীল খেলোয়াড়| সে সরাসরি সংঘর্ষের চেয়েও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে বিশ্বাসী| তার লক্ষ্য শুধু একটি যুদ্ধ জেতা নয়, বরং পুরো অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করা| ফলে যুদ্ধবিরতির সময়টাকে সে ব্যবহার করে নিজের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে, মিত্রদের সংগঠিত করতে এবং প্রতিপক্ষের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে|আর যুক্তরাষ্ট্র—সে যেন এই জটিল নাটকের অদৃশ্য পরিচালক| কখনও সামনে আসে, কখনো আড়ালে থাকে, কিন্তু দৃশ্যের গতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যায়| তার কাছে এই অঞ্চল কেবল একটি সংঘাতের ক্ষেত্র নয়; এটি একটি বৃহত্তর কৌশলগত মানচিত্রের অংশ, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে বিশ্ব রাজনীতির ওপর|এই তিন শক্তির মধ্যে যুদ্ধবিরতি তাই অনেকটা তিনটি আলাদা ঘড়ির সময় মেলানোর চেষ্টা| প্রত্যেকের সময় আলাদা, গতি আলাদা, উদ্দেশ্যও আলাদা| ফলে সাময়িকভাবে সময় মিললেও, কিছুক্ষণ পরেই আবার অসামঞ্জস্য দেখা দেয়|এই অসামঞ্জস্যের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যায় প্রক্সি যুদ্ধের মধ্যে| লেবানন, সিরিয়া, ইরাক—এই অঞ্চলগুলো যেন মূল সংঘাতের প্রতিধ্বনি বহন করে| এখানে সরাসরি বড় শক্তিগুলো না লড়লেও, তাদের ছায়া লড়াই চালিয়ে যায়| ফলে একটি জায়গায় যুদ্ধবিরতি হলেও অন্য জায়গায় সংঘাত থামে না; বরং নতুন রূপে জেগে ওঠে|হয়তো এই জন্যই বিশ্লেষকরা মনে করেন এটি যেন একটি বিশাল অর্কেস্ট্রা—যেখানে একজন সঙ্গীত থামালেও অন্যরা বাজিয়ে যায়| ফলে পুরো সঙ্গীত কখনোই থামে না, শুধু সুর বদলায়| যুদ্ধবিরতি এখানে সেই সুরের সাময়িক পরিবর্তন মাত্র|অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই যুদ্ধবিরতির গুরুত্ব অনেক| তেলের বাজার, বাণিজ্যিক রুট, ˆবশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা—সবকিছুই এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল| ফলে যুদ্ধবিরতি অনেক সময় মানবিক প্রয়োজনের চেয়ে অর্থনৈতিক চাপ থেকেই আসে| কিন্তু যখন অর্থনীতি ও রাজনীতি একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে যায় |অন্যভাবে বলা যায়, এই যুদ্ধবিরতি হলো এক ধরনের কৌশলগত ঘুম| চোখ বন্ধ, কিন্তু মস্তিষ্ক জেগে আছে| সবাই বিশ্রামের ভান করছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পরবর্তী আঘাতের পরিকল্পনা চলছে| এই ঘুম ভাঙতে খুব বেশি শব্দের প্রয়োজন হয় না—একটি ছোট উত্তেজনাই যথেষ্ট|এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ| তারা এই খেলায় অংশগ্রহণ করে না, কিন্তু ফলাফল ভোগ করে| তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়, তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাদের জীবনের নিরাপত্তা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে| যুদ্ধবিরতি তাদের জন্য সাময়িক ¯^স্তি নিয়ে আসে, কিন্তু সেই ¯^স্তি কখনোই স্থায়ী হয় না|প্রশ্ন হলো—এই যুদ্ধবিরতি কতটুকু সত্যিকার অর্থে কার্যকর পারে? ¯^ল্পমেয়াদে হয়তো কিছুটা উত্তেজনা কমাতে পারে, আলোচনার সুযোগ ˆতরি করতে পারে| কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর সফলতা নির্ভর করে আস্থার ওপর| আর সেই আস্থা যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে কোনো চুক্তিই দীর্ঘস্থায়ী হয় না| আসলে এই যুদ্ধবিরতি অনেকটা সেই পরীক্ষার মতো, যেখানে সবাই পাস করতে চায়, কিন্তু কেউই নিয়ম মানতে চায় না| ফলে ফলাফল আগেই অনুমান করা যায়—সংঘাতের পুনরাবৃত্তি|শেষ পর্যন্ত, এই যুদ্ধবিরতি কোনো শেষ কথা নয়; এটি একটি চলমান গল্পের একটি অধ্যায় মাত্র| এখানে প্রতিটি বিরতি নতুন সূচনার ইঙ্গিত দেয়, প্রতিটি শান্তির ঘোষণা নতুন উত্তেজনার সম্ভাবনা ˆতরি করে| এটি এক ধরনের সেতু, যার এক প্রান্তে যুদ্ধ, অন্য প্রান্তে অনিশ্চিত শান্তি—আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববাসী, অপেক্ষায়| মধ্যপ্রাচ্যের এই অন্তহীন বাস্তবতায় তাই বিরতির বোতাম কখনোই পুরোপুরি কার্যকর হয় না| কারণ বোতাম চাপার হাতটি যতক্ষণ ট্রিগার থেকে সরছে না, ততক্ষণ শান্তি কেবল একটি শব্দ—বাস্তবতা নয়|শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই থেকে যায়—এই বিরতি কি সত্যিই থামার জন্য, নাকি আরও নিখুঁতভাবে আঘাত করার জন্য? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে এই যুদ্ধবিরতি আসলে শান্তির নয়, বরং সংঘাতের আরও পরিশীলিত প্রস্তুতির জন্য | আর তখনই বোঝা যাবে , এখানে যুদ্ধ থামে না—শুধু মাঝে মাঝে বিরতির অভিনয় করে|[লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

রেলস্টেশনগুলো চালু হোক

অতিসম্প্রতি একটা জাতীয় ˆদনিকে প্রকাশিত খবরে দেখা গেল, বাংলাদেশ রেলওয়ের কেবল পূর্বাঞ্চলেরই অর্ধশতাধিক রেলস্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে| সংবাদটি তাৎক্ষণিকভাবে নজরে পড়ে এবং এর পেছনের যৌক্তিকতা কী তা জানার কৌতূহল জাগ্রত হয়| রেলপথ, রেলস্টেশন, ট্রেন ইত্যাদি নিয়ে প্রকাশিত যেকোনো সংবাদই দেশের জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে থাকে| কারণ গত দেড়শ বছরের অধিককালে এ জনপদের মানুষের চলাচলের প্রধান বাহন বলতে হয় নৌকা, না হয় ট্রেনই ছিল প্রধান| বলাবাহুল্য, এ অঞ্চলে ট্রেন এবং রেলস্টেশনের যাত্রা শুরু হয় ১৮৬২ সালের নভে¤^র মাসে| এর আগে জলপথই ছিল এই নিম্নগাঙেয় বদ্বীপের সাধারণ মানুষের নড়াচড়ার একমাত্র অবল¤^ন| বিশ্বব্যাপী গবেষকদের হাতে পরিসংখ্যানের যে ডায়েরি রয়েছে, এতে গণযোগাযোগের নিরাপত্তার প্রশ্নে রেলপথই প্রথম স্থানে আছে| তাকে অতিক্রম করে আর কোনো পরিবহন এখনও যায়নি| আর এ কারণেই বোধহয়, আজকের তথ্য-প্রযুক্তির উচ্চ শিখরে আরোহনকারী ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়ে আকাশ পথকে টপকে গিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে আধুনিক ট্রেন|পক্ষান্তরে এশিয়া, আফ্রিকার চিত্র কিছুটা ভিন্ন হলেও ব্যতিক্রম চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এমনকি ভারতও রেলপথে বিপ্লব ঘটিয়েছে| সাধারণ নিম্নআয়ের মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থলের আরেক নাম হয়েছে রেলপথ এবং রেলওয়ে স্টেশন|২.বিশ্বায়নের এমন রূপচিত্রে বাংলাদেশের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ আলাদা| এখানে রেলের বিস্তার বা সম্প্রসারণের পরিবর্তে দিনের পর দিন নানাভাবে সংকুচিত হয়েছে| গত কয়েক দশকে কিছু ভালো ট্রেন, ডাবল লাইন, দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সংযোগকারী ট্রেনলাইন হলেও প্রশাসনিক অবহেলায় বেহাত হয়ে গেছে রেলের বিপুল পরিমাণ সম্পদ এবং স্থাবর জমি| এখানে উল্লেখ করা যায়, ¯^াধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলাদেশ রেলওয়ে অধীনে রাস্তা ছিল ২৮৫৮.৪৩ কি.মি., স্টেশন ছিল ৪৪৬টি, জমি ছিল ৬০,৬৩৩ একর| বর্তমানে এবিসি গ্রেডে স্টেশনের সংখ্যা মোট ৪৫৫টি, রেললাইন ২৮৭৭ কি.মি.|অথচ ১৯৭২ সালে দেশের একই ভৌগোলিক সীমারেখার ভেতরে জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৫০ লাখ| আর আজকের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি| যোগাযোগের অন্যান্য মাধ্যমের সঙ্গে তুলনার বিচারে রেলের অগ্রগতি হয়েছে নিতান্তই সামান্য| বলা হয়, এদেশের রেলপথ সেবা আধুনিক সুযোগ সুবিধাসহ প্রযুক্তিনির্ভর না হওয়ার পেছনের রহস্যময়তাকে উন্মোচন করা হয়নি বা কখনও করা যায়নি|৩.রেলের পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যেই ৫১টি ছোট স্টেশন বন্ধ হয়ে যায়| এমন সংবাদ কখনও সুখকর হতে পারে না| কর্তৃপক্ষ বলছে লোকবল সংকট প্রয়োজনীয় স্টাফ না থাকায়, সেবার গুরুত্ব কমে যাওয়া ইত্যাদি| স্টেশন মাস্টার, পয়েন্টসম্যানের অভাবজনিত কারণ বলা হয়েছে— যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক| এসব অরক্ষিত, অনিরাপদ স্টেশনগুলোর কথা ভাবতে গেলে হৃদয়ের গহীনে বেদনার উদ্রেক হয়| চোখের কোণে জল আসে| এর স্থাপনাগুলো অন্তত একশতাব্দী ধরে ¯^ ¯^ এলাকার জনগণের সেবায় দাঁড়িয়ে ছিল| এদের গৌরবময় ও জৌলুস ভরা অতীত ছিল| প্রতিদিন শত শত ভ্রমণপিপাসু মানুষের পদচিহ্নে সরব জীবন্ত ছিল, ত্রস্ত-ব্যস্ত ছিল মাস্টার, কুলি-মজুর আর মাটিসংলগ্ন কোলাহল মুখর প্ল্যাটফর্মগুলো| আজ হয়তো জনশূন্য বিরানভূমি, যাত্রী মানুষের বদলে ভবনের চারপাশটা দখলে নিয়েছে মাদকাসক্ত তরুণের দল, স্থানীয় মস্তান, অসাধু ব্যবসায়ী, ভূমিখেকো সন্ত্রাসী এবং কিছু বেওয়ারিশ কুকুর| হয়তো এটাই বাস্তবতা| এটা কী ভাবা যায়!৪.খবরটা পড়ে ভীষণ শঙ্কিত হয়েছি নিজেও| রেলস্টেশনের কাছাকাছি এক পাড়াগাঁয়ে জন্মেছি বলে| সারাদিন ট্রেনের হুঁইসেল শুনে শুনে ˆশশব, ˆকশোর, যৌবন পেরিয়ে এখন বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছি| দেখলাম, বন্ধ হয়ে যাওয়া স্টেশনের তালিকায় ˆভরববাজার জং টু গৌরীপুর জং এর মধ্যবর্তী একাধিক স্টেশন রয়েছে| ˆভরবের সন্নিকটে কালিকাপ্রসাদসহ রয়েছে বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের অনন্য সৃষ্টি ও বহুল আলোচিত সেই নীলগঞ্জ ও সোহাগী| ভাবছিলাম, একই অজুহাতে নিজের আজন্ম লালিত নস্টালজিক রেলস্টেশন মানিকখালীও একদিন বন্ধ হয়ে যাবে কী? এমন দুঃ¯^প্নের কথা কে ভাবতে পারে? একই ভাবে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অবধি অসংখ্য পরিচিত স্টেশনের নাম রয়েছে| কুমিল্লা, লাকসাম, চাঁদপুর বরাবর লাইনে রয়েছে একাধিক ঐতিহ্যবাহী রেলস্টেশনের নাম| রেলস্টেশন বন্ধ হয়ে যাক এটা কারও কাম্য হতে পারে না| জনবল সংকট দ্রুত নিয়োগের মধ্য দিয়ে এর অবসান ঘটানো যেতে পারে| দেশে প্রায় অর্ধকোটি তরুণ-তরুণী বেকারত্বকে বরণ করে স্রেফ মোটরবাইকের ওপর বেঁচে আছে| প্রতি বছর হাজার হাজার মেধাবী যুবক, ছাত্রছাত্রী কেবল কর্মসংস্থান আর নিরাপত্তার নামে ¯^দেশ ও মাতৃভূমিকে ত্যাগ করে পাড়ি জমাচ্ছে পৃথিবীর দেশে দেশে| যারা যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, ফিরে আসছে খুবই কম| পত্রিকায় বা সামাজিক মাধ্যমে এমন দুঃখজনক প্রতিবেদন হরহামেশাই চোখে পড়ছে| সরকার যায় সরকার আসে| হঠাৎ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে উল্লসিত হয়ে ওঠে লক্ষকোটি মানুষের মনপ্রাণ| কিন্তু কেউ ঠেকাতে পারছে না মেধার পতন, ব্রেনড্রেন আর প্রজন্মের হতাশা| অথচ সরকারের খাতায় হিসাব আছে, শুধু রাজ¯^ খাতেই হাজার হাজার পদ শূন্য হয়ে পড়ে আছে বছরের পর বছর ধরে| কে রাখে কার খবর?৫.সরকারের কাছে চাওয়া, বন্ধ হয়ে যাওয়া সব রেলস্টেশন অনতিবিল¤ে^ চালু করার পদক্ষেপ নেওয়া হোক| ৫০টি স্টেশনের বিপরীতে ৩ জন করে মোট ১৫০ জন কর্মচারীর নিয়োগ দান করে দ্রুত প্রশিক্ষণসহ পদায়ন করা যায়| জন¯^ার্থে লোকাল ট্রেন বা কমিউটার ট্রেন চালু করে দেয়া যায়| এতে করে আপাতত রেলের স্থাবর সম্পত্তি ও স্টেশনগুলো বেঁচে যাবে| মৃতপ্রায় ফ্ল্যাটফর্মগুলো তাৎক্ষণিক প্রাণের স্পন্দনে জেগে উঠবে| সরকারের মনোযোগে এমন সমূহ ক্ষতি ও অপচয় থেকে রক্ষা পাবে রেলওয়ে বিভাগ এবং দেশ| বর্তমানে ফাঁকা মাঠে পড়ে থাকা কোটিকোটি টাকার সম্পদ সরাসরি সরকারের তত্ত্বাবধানে ফিরে আসবে| রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে একজন নাগরিকের এরচেয়ে জরুরি আর কী প্রত্যাশা থাকতে পারে?[লেখক: গল্পকার]

নারী সংরক্ষণ নাকি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ?

ভারতের রাজনীতিতে আবারও সামনে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। নারী সংরক্ষণ আইন কার্যকর করার প্রস্তুতির মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের আরেকটি বড় পরিকল্পনা; লোকসভা আসনসংখ্যা বৃদ্ধি। দুই বিষয় আলাদা হলেও বাস্তবে একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ, নতুন বিতর্ক।২০২৩ সালে পাশ হওয়া নারী শক্তি বন্দন আইনে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় ৩৩ শতাংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই আইন কার্যকর করার জন্য প্রয়োজন নতুন জনশুমারি এবং তার ভিত্তিতে ডিলিমিটেশন। অর্থাৎ, শুধু আইন পাশ হলেই হবে না, পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকে নতুন করে সাজাতে হবে।এখানেই কেন্দ্রের তাড়াহুড়োর ইঙ্গিত। তাই দীর্ঘ প্রক্রিয়া এড়িয়ে ২০১১ সালের জনশুমারির তথ্য ব্যবহার করে দ্রুত সংরক্ষণ কার্যকর করার চিন্তাভাবনা চলছে বলেই সূত্রের খবর। প্রশ্ন উঠছে, আইনের নির্ধারিত শর্ত পাশ কাটিয়ে এই পদক্ষেপ আদৌ কতটা টেকসই?এই প্রেক্ষাপটেই সামনে আসছে আরও বড় পরিকল্পনা, লোকসভা বিস্তার। বর্তমানে ৫৪৩টি আসন নিয়ে চলা লোকসভা, ভবিষ্যতে বেড়ে ৮১৬-তে পৌঁছতে পারে। আর এই নতুন কাঠামোয় প্রায় ২৭৩টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা। সংখ্যার এই পরিবর্তন শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি ভারতের প্রতিনিধিত্বের কাঠামোকেই বদলে দিতে পারে।কারণ, বাস্তবতা হলো দেশের জনসংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় লোকসভা আসন প্রায় স্থিরই রয়ে গেছে। ফলে একেকজন সাংসদের উপর চাপ বেড়েছে বহুগুণ। এই দিক থেকে আসনসংখ্যা বৃদ্ধি একটি বাস্তবসম্মত প্রয়োজন বলেই মনে করছেন অনেকে।কিন্তু সমস্যার শুরু এখানেই। আসনসংখ্যা বাড়ানো মানেই কি নতুন করে আসন বণ্টন? আর যদি জনসংখ্যার ভিত্তিতে তা করা হয়, তাহলে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির আশঙ্কা, তাদের রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যেতে পারে।কারণ, গত কয়েক দশকে দক্ষিণের রাজ্যগুলি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল। অন্যদিকে, উত্তর ভারতের অনেক রাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি অনেক বেশি। ফলে নতুন করে বণ্টন হলে স্বাভাবিকভাবেই উত্তর ভারতের আসন বাড়বে।এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন—জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল রাজ্যগুলি কি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে?প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন, রাজ্যগুলির বর্তমান আসন অনুপাত অক্ষুণ্ণ রেখেই মোট আসন বাড়ানো হবে। এই বার্তা আপাতত স্বস্তি দিলেও, এটিই চূড়ান্ত সমাধান কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।কারণ, ভবিষ্যতের ভারত শুধু আজকের জনসংখ্যার ওপর নির্ভর করবে না। অভিবাসন, নগরায়ন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন, সব মিলিয়ে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।আইনগত দিক থেকেও পথটা সহজ নয়। সংবিধানের ৩৬৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই ধরনের পরিবর্তনের জন্য সংসদের দুই কক্ষেই বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনও একক দলের পক্ষে তা সম্ভব নয়। ফলে বিরোধীদের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এদিকে বিরোধীরাও এই ইস্যুতে সরব। সর্বদলীয় বৈঠকের দাবি উঠেছে, রোডম্যাপ চাওয়া হয়েছে। ফলে স্পষ্ট এই লড়াই শুধু নীতির নয়, রাজনৈতিক অবস্থান এবং প্রভাবেরও।বিশ্লেষকদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিতও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নারী সংরক্ষণকে সামনে রেখে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা, পাশাপাশি বিরোধীদের কৌশলে চাপে রাখা এই দুই দিকই সমানভাবে কাজ করতে পারে।তবে সবশেষে বাস্তব প্রশ্ন একটাই, এই পরিবর্তন কি সত্যিই ভারতের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে, নাকি নতুন করে আঞ্চলিক ভারসাম্যের সংকট তৈরি করবে?নারী সংরক্ষণ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু তার বাস্তবায়নের পদ্ধতিই ঠিক করে দেবে, এটি ইতিহাস তৈরি করবে নাকি নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে।সিগ‌নেচার (Signature) লাইন বলছে, সংখ্যা বাড়ছে, আসন বাড়ছে, কিন্তু আসল লড়াইটা প্রতিনিধিত্বের। আর সেই লড়াইয়ের ফলই ঠিক করবে ভারতের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।

ভিডিও

ম্যানসিটিতে ভাঙনের ইঙ্গিত

ক্যারাবাও কাপ জয়ের আনন্দ এখনো ভোলেননি ম্যানচেস্টার সিটি সমর্থকেরা। কিন্তু ট্রফি হাতে পেপ গার্দিওলা ও বের্নাদো সিলভার উজ্জ্বল হাসির পেছনে যেন লুকিয়ে আছে অশনি সংকেত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, সিলভার ভবিষ্যৎ নিয়ে গার্দিওলার ‘গ্রাম্পি’ (খিটখিটে) মনোভাব দলের ভেতরে অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।দীর্ঘদিন ধরে সিটির মিডফিল্ডের অপরিহার্য অংশ বের্নাদো সিলভা। প্রতিটি ম্যাচে তার অদম্য দৌড়, টেকনিক ও ফুটবল বুদ্ধি দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সম্প্রতি পর্তুগিজ এই তারকার ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা বেড়েছে। গার্দিওলার সাম্প্রতিক আচরণ বিশ্লেষকদের চোখে পড়েছে, যা ভাঙনের ইঙ্গিত বহন করছে।গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিলভা প্রসঙ্গে গার্দিওলার মনোভঙ্গি ‘বিরক্তিকর। যদিও সরাসরি কোনো মুখোমুখি সংঘাতের খবর নেই, কিন্তু পর্দার আড়ালে নাকি পরিস্থিতি খুব একটা স্বাভাবিক নয়। সিলভা বহুবারই ইউরোপের অন্য ক্লাবে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। বার্সেলোনা ও পিএসজির মতো ক্লাবগুলোতে তার নাম জড়িয়েছে বারবার। এই নিয়েই নাকি গার্দিওলার সঙ্গে মতপার্থক্য দেখা দিচ্ছে।প্রিমিয়ার লিগের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসেছে এই অস্থিরতার খবর। সিটি এখনও শিরোপা দৌঁড়ে আছে। কিন্তু দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়দের একজনকে নিয়ে এই অনিশ্চয়তা পছন্দ করবেন না গার্দিওলা। অন্যদিকে, সিলভা হয়তো চান ক্যারিয়ারের শেষভাগে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে।ম্যানসিটি ভক্তদের জন্য বড় প্রশ্ন হলো- সিলভা কি থাকছেন, না কি যাচ্ছেন? যদি তিনি চলে যান, তাহলে তার জায়গা কে নেবে? আর পেপ কি সত্যিই ‘গ্রাম্পি’ নাকি এটা কেবলই গুঞ্জন? উত্তর মিলবে হয়তো আগামী কয়েক সপ্তাহের ট্রান্সফার বাজারে। 

ম্যানসিটিতে ভাঙনের ইঙ্গিত
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ১৬ জন