সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
বাজারে সয়লাব ‘নকল বিদেশি ইনজেকশন’

বাজারে সয়লাব ‘নকল বিদেশি ইনজেকশন’

জীবনরক্ষাকারি ৫ হাজার টাকার বিদেশি ইনজেকশন হচ্ছে নকলগর্ভবর্তী মহিলাদের জন্য এ রোফাইল্যাক খুবই কার্যকর: গাইনি বিশেষজ্ঞআমদানী নেই, তবুও ওষুধ দোকানে ৪ হাজার টাকা মূল্যে বিক্রি: আমদানীকারকনকলবাজদের ধরতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা চেয়েছে ঔষধ প্রশাসনআমদানিনিষিদ্ধ রোফাইল্যাক ওষুধের মোড়কে বিক্রি হচ্ছে বিষদেশের বাজারে গর্ভবতী নারীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী বিদেশি ইনজেকশন 'রোফাইল্যাক' (হিউম্যান অ্যান্টি-ডি ইমিউনোগ্লোবুলিন) গত দুই বছর ধরে বড় আকারে নকল হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।গর্ভাবস্থায় জটিলতা এড়াতে এবং প্রসবের পরবর্তী ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকরা এই ইনজেকশনটি ব্যবহারের পরামর্শ দেন। অথচ বর্তমানে এই জীবনরক্ষাকারী ওষুধের বৈধ আমদানি বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে একটি চক্র সারাদেশে নকল ওষুধের জাল বিছিয়েছে। আসল ওষুধের সংকটকে পুঁজি করে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকায় এ সব নকল ইনজেকশন বিক্রি করা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।কেন এই ইনজেকশন এত জরুরি?বিশেষজ্ঞদের মতে, হিউম্যান অ্যান্টি-ডি ইমিউনোগ্লোবুলিন ৩০০ মাইক্রোগ্রাম ইনজেকশনটি মূলত নেগেটিভ ব্ল্যাড গ্রুপের মায়েদের জন্য অপরিহার্য। যদি মায়ের রক্ত নেগেটিভ হয় এবং গর্ভস্থ শিশুর রক্ত পজেটিভ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে মায়ের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি রোধ করতে এটি ব্যবহার করা হয়। সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৮ সপ্তাহে এবং প্রসবের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই ইনজেকশন মায়েদের পুশ করতে হয়। এটি ব্যবহার না করলে পরবর্তী সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা, এমনকি গর্ভপাত বা নবজাতকের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গাইনি চিকিৎসক জানান, "ইনজেকশনটি খুবই জরুরি ও ব্যয়বহুল। যে সব গর্ভবতী নারীর ব্লাড গ্রুপ নেগেটিভ ও স্বামীর ব্লাড গ্রুপ পজিটিভ, তাদের নবজাতক শিশুর সুরক্ষায় এই ইনজেকশন অত্যন্ত কার্যকরী।তবে নকলের বিষয়ে তিনি বলেন, ইনজেকশনটি যারা নকল করছে তারা কী উপাদান ব্যবহার করছে তার ওপর নির্ভর করে রোগীর ক্ষতির মাত্রা কতটুকু হবে। এটি পরীক্ষা ছাড়া বলা সম্ভব নয়।আমদানি বন্ধের সুযোগে সক্রিয় জালিয়াত চক্রওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রোফাইল্যাক ইনজেকশনটির পূর্ববর্তী আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নানা কারণে এটি বর্তমানে আনছে না। ফলে ২০২৪ সাল থেকে বাজারে আসল ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।একজন ওষুধ আমদানিকারক জানান, "এই ওষুধটি মূলত সুইজারল্যান্ড থেকে আমদানি করা হয়। বর্তমানে বাজারে আসল ওষুধ নেই বললেই চলে। অথচ একটি চক্র গোপনে নকল ইনজেকশন তৈরি করে সারা দেশে সরবরাহ করছে। এতে উপকারের চেয়ে গর্ভবতী মায়েরা উল্টো চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন।"বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও পরিচালক আখতার হোসেন বলেন, "বর্তমানে এই ওষুধের কোনো আমদানি নেই। একটি চক্র সুযোগ বুঝে নকল ওষুধ বিক্রি করছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থাকে জানিয়েছি। আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সারাদেশে নকলবাজদের চিহ্নিত করে ড্রাগ আইনে ব্যবস্থা নিতে নিরলসভাবে কাজ করছেন।"বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও হুঁশিয়ারিনকল ওষুধের ভয়াবহতা নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেন, "নকল ওষুধ সেবন বা ব্যবহারের ফলে রোগীর কিডনি, লিভার, মস্তিষ্ক ও ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এমনকি খারাপ কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি হলে এটি মৃত্যুর কারণও হতে পারে।"তবে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির ফার্মাকোলজি বিভাগের একজন সিনিয়র শিক্ষক। তিনি বলেন, "ওষুধ কি নকল হয়? এটা আমার জানা নেই।"অন্যদিকে, মাঠ পর্যায়ের ওষুধ ব্যবসায়ীরা এই অপরাধের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন। ওষুধ দোকানের মালিক জিয়াউর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যারা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নকল করে তাদের আইনী প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ড হওয়া দরকার। নকলের ভিড়ে আসল চেনা দায় হয়ে পড়েছে। মানুষ ওষুধের নামে বিষ নিচ্ছে, যার পরিণাম হতে পারে মৃত্যু।"বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির নেতা আল আমিন হোসেন খানও একই দাবি জানিয়ে বলেন, "নকলবাজ যেই হোক তার সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। কোনো বিক্রেতা যদি জেনেবুঝে নকল ওষুধ বিক্রি করে, তবে আমরা প্রশাসনের সহায়তায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবো।"অভিযান চললেও থামছে না চক্রটিসম্প্রতি কেরানীগঞ্জের আর্টিবাজার এলাকায় এক বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ট্রাকভর্তি নকল ও অরেজিস্ট্রিকৃত ওষুধ ও সরঞ্জাম জব্দ করেছে র‌্যাব ও ওষুধ প্রশাসন। অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুর রশিদ এই অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এর আগেও মিটফোর্ডসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে যৌথ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধ জব্দ করা হয়।তবে ড্রাগ কোর্টে মামলা ও ধরপাকড় চললেও চক্রটি তাদের কৌশল পাল্টাচ্ছে। শহর থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এই 'বিষ' পৌঁছে যাচ্ছে গ্রামের ক্ষুদ্র ফার্মেসিতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভয়ে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী এ সব নকল ওষুধ ড্রয়ারে বা গোপন গুদামে লুকিয়ে রেখে টার্গেট ক্রেতাদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করছেন। বর্তমানে 'জনতা ট্রেডার্স' নামে একটি প্রতিষ্ঠান এই ইনজেকশনটি আমদানির অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে বলে জানা গেছে। অনুমোদন পেলে সুইজারল্যান্ড থেকে আসল ওষুধ এলে হয়তো এই সংকট কিছুটা দূর হবে।
৩ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

রম্যগদ্য: বই মেলায় কার বই?

‘‘বই মেলায় কার বই? মানে কী? বই মেলায় লেখকের বই! বই মেলায় লেখকের বই থাকবে না তো কী থাকবে? ডাক্তারের লেখা প্রেস্ক্রিপশন! যত্তসব আদিখ্যেতা।’’‘‘আরে জঙ্গল বই মেলায় থাকবে লেখকের বই, এ নিয়ে তোর সঙ্গে আমার কোনো বিবাদ নেই, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে কেউ একজন দিস্তা দিস্তা কাগজ নিয়ে তার জীবনের কিছু কথা লিখলো, প্রেসে যেয়ে বই ছাপালো, ব্যাস ওইটা বই হয়ে গেল?’’‘‘নিশ্চই, প্রেসে ছাপা বই, শক্ত দেড় ইঞ্চি পিসবোর্ড দিয়া বান্ধায়া মলাট দিলাম, ধ্রুবএষ প্রচ্ছদ, আর্কাইভ থ্যেইক্কা আই.এস.বি.এন. নাম্বার লাগাইলাম ব্যাস হয়াগেলো বই। এর মইধ্যে প্রবলেম কিতা!’’‘না’ বলছিলাম সাহিত্য পদবাচ্য বলে কিছু থাকবে না! প্রেসে ছাপা বই, শক্ত দেড় ইঞ্চি পিসবোর্ড দিয়ে মলাট, ধ্রুবএষ প্রচ্ছদ, আর্কাইভ থ্যেইক্কা আই.এস. বি.এন. নাম্বার, ব্যাস হয়ে গেলো বই!”“ওই মিয়াভাই, সাহিত্যতো বিচার করবো পাঠকে, হ্যারা যেইটা পইড়া মজা পাইবো, হেইটা সাহিত্য, যেই বই বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাইবো, হ্যেইডাই বই।”“তাহলে যে বই পুরস্কার পাবেনা সেগুলো কি বই না?”“পাগোলের মতুন কিতা মাতেনরে বা, একটা ক্লাসে সব ছাত্র কি ফার্স্ট হয়? আর যারা ফার্স্ট হয়না তারাকি ছাত্র না?”“বুঝলাম সেরা সাহিত্য পদবাচ্য বইটি পুরস্কার পেলো, আর অন্য বইগুলোও সাহিত্যের বিভিন্নরস সম্বলিত। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে আজকাল যে সব বইগুলো সাহিত্যের ধারে কাছে নেই, সে সব বইতো বইমেলায় ভরে যাচ্ছে, তাহলে এগুলোর কি হবে!”“আপনে কি বলতে চাচ্ছেন যে, এইযে মনে করেন কথাশিল্পী শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দিন, আহসান হাবিব, আলাউদ্দিন আল আজাদ...”“বুঝলাম বুঝলাম, এইসব মাদ্রাসাছাত্ররা পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের এক একজন দিকপাল হয়ে ওঠেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এসব, কথাশিল্পী শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দিন, আহসান হাবিব, আলাউদ্দিন আল আজাদ, ইনারা তাদের পাঠ্য পরিক্রমায় পাঠ করেছেন, মহাকবি শেক্সপিয়ার, কবি মিল্টন, হোমারের দি ইলিয়াড, ওয়ার্ডস ওয়ার্থ, আলেক্সজান্ডার ডুমা, সোফোক্লিস, ইউরিপিডিস, বায়রন...”“বুঝছি বুঝছি কথাশিল্পী শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দিন, আহসান হাবিব, আলাউদ্দিন আল আজাদ...ইনারা সব বিশ্বসাহিত্যের ধারক বাহকদের লেখার সঙ্গে পরিচিত হোই, নিজেগো বেইস শক্ত করছে আর বর্তমান বাংলা সাহিত্যরে উন্নতি করছেন।”“এইসব বাংলা সাহিত্যের দিকপালদের জীবনের শুরু থেকেই পরিচিত হচ্ছেন বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে আর তোদের বর্তমান লেখকরা পরিচিত হচ্ছেন কথাশিল্পী শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দিন, আহসান হাবিব, আলাউদ্দিন আল আজাদ এদের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে অতএব বুঝতেই পারিস তোদের লেখকদের সাহিত্যমান কি হবে!”“হেঁ হেঁ, এ কথা বললেতো হবে না, আমরা অখন যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম করছি যে, রবীন্দ্রনাথ, যতীন্দ্রনাথ, প্রমথনাথ, যদুনাথ সব বিধর্মী সাহিত্য স্কুল কলেজ থেইকে বাদ দিয়েছি যে, ফলে আমার বর্তমান বাংলা সাহিত্যসেবীরা দ্বীনের আলোয় উদ্ভাসিত হোই বাংলা সাহিত্যরে পবিত্রতম স্থানে পৌঁছে দেবে যে।”“ঠিক আছে তোর বাংলা সাহিত্য পুত-পবিত্র এক অনন্য মর্যাদায় পৌঁছে যাবে। যারা এইসব বিধর্মী বিবর্জিত সাহিত্য সাধনা করবেন তাদের সাহিত্য যে সব ঘরে পঠিত হবে সে সব ঘরে কখোনোই কোনো অপদেবতার আসর হবে না।”“হেঁ হেঁ বুইচেন না, এই সব বিধর্মী বিবর্জিত সাহিত্য ঘরে ঘরে পাঠ করলে, ভূত, পেত্নি, দৈত্যি-দানো কখনোই আপনের বাড়ির ত্রিসীমানায় আইবার পারবেনা যে।”“বুঝলাম ভাই তোর বিধর্মী বিবর্জিত সাহিত্য পাঠে জীবনের সব বালামসিবত দূর হবে। কিন্তু এগুলোকি মানে এইসব লেখাগুলোকি সাহিত্য পদ মর্যাদা পাবে?”“আরে মিয়া আপনেতো বীষম প্যাচাইল্লা মানুষ সাহিত্য হোইবোনা মানে এই যে দেখেন আমাদের অবসার প্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব স্যার প্রথম যে হিন্দু ভদ্রলোক আমাদের বিশ্বের পবিত্রতম গ্রন্থ কোরান শরীফ বাংলায় অনুবাদ করছিলেন, সেই ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের জীবন ও কর্ম লিখে এবং প্রকাশকরে নিজের আখেরাতের জন্য সোয়াব কামাইছেন। পিলাস উনি উপন্যাস, গল্প, কবিতা, নিবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, শ্রমকল্যাণ, ভূগোল, গবেষণা, জীবনী, বিবিধ প্রায় ৮০টি বই লিখেছেন। চিন্তা করতে পারেন স্যারদের বাংলা সাহিত্যের প্রতি কিরুপ ডেডিকেশন!”“বলিস কি? অতিরিক্ত সচিব যদি ৮০টি বই লিখেন, তাহলে সচিব স্যার কয়টা বই লিখবেন? ১৬০টি!”“না না এভাবে ডিডাকটিভ লজিকের মতো কথা বললে যে, ফ্যালাসি অব মিডেল টার্ম হবে।”“ফ্যালাসি অব মিডেল টার্ম, মানে কিরে?”“এই যেমন ধরেন, আমি টেবিল ছুঁয়েছি, টেবিল ফ্লোর ছুঁয়েছে অতএব আমি ফ্লোর ছুঁয়েছি। এই রকম ফ্যালাসি অব মিডেল টার্ম আর কি? তাই চট-যলদি বললে হবেনা, অতিরিক্ত সচিব স্যার যা লিখছেন সচিব স্যার তার ডবল লিখবেন।”“থাক ভাই আমার বলার কিছুই ছিলনা, তুই তোর স্যারদের, বিধর্মী বিবর্জিত সাহিত্য পাঠে জীবনের সব বালামসিবত দূর কর, আমার বই মেলায় সব অবসরপ্রাপ্তদের স্যারদের বালামসিবত দূর করা বই সাপ্লাই করে ভরিয়ে তোল, তাতে বাংলা সাহিত্যের উন্নতি হোক না হোক আমাদের আখেরাতের জীবন সহজ হোক এই কামনা করি। তোদের আরও উন্নতি হোক, সরকারি কর্মচারীরা দরকার হলে ছন্দনামে বালামসিবত দূর করার পুস্তক রচনা করুন। বাংলা সাহিত্যের করুণ অবস্থার উন্নতি করুন, পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার দরবারে এই আমার প্রার্থনা।”“কওন যায়না, এই পবিত্রতম মাসে আপনের ইচ্ছা কবুলও হতে পারে। শোনেন পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার দরবারে সফেদ দীলে কিছু চাইলে, তাতে শুধু বাংলা সাহিত্য না, জীবনের সব কিছুর উন্নতি হবে বুজেছেন!” “তোর মুখে ঘী’শক্কর, তুই বই মেলায় বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে মানব কল্যাণে নিজেরে নিবেদিত কর, আর বাংলা একাডেমিকে শুধু বাংলা সাহিত্যের উন্নতিনয় আখেরাতের রাস্তা উন্নয়নেও কাজে লাগা।”“দেখি এই পবিত্র মাসে, আপনের খায়েস কবুল হয় কিনা, আর বাংলা একাডেমিকে আখেরাতের রাস্তা উন্নয়নের কাজে লাগান যায় কিনা?”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

দেশের হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা: বাস্তবতা ও করণীয়

সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী বিভাগে হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হাম ও এর জটিলতায় প্রাণ হারিয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রে শিশুদের জন্য আইসিইউ বেডের দীর্ঘদিনের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনই গুরুতর অসুস্থ শিশু আইসিইউ সেবার অপেক্ষায় থাকে; কিন্তু বেডের অপ্রতুলতার কারণে অনেককেই বাধ্য হয়ে সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা নিতে হয়।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিলে নিবিড় পরিচর্যা বা আইসিইউ সাপোর্ট জীবনরক্ষাকারী হয়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— এই গুরুত্বপূর্ণ সেবা এখনও সর্বজনীন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে জনমনে উদ্বেগের পাশাপাশি নীতিনির্ধারক মহলেও আলোচনা-সমালোচনা ক্রমেই জোরদার হচ্ছে।ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, পেডিয়াট্রিক আইসিইউ এবং নিউনেটাল আইসিইউ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বাংলাদেশে এসব সেবার সম্প্রসারণ ঘটলেও জনসংখ্যার তুলনায় তা এখনও অত্যন্ত অপ্রতুল এবং মূলত শহরকেন্দ্রিক। দেশে প্রথম আইসিইউ চালু হয় ১৯৮০ সালে। বর্তমানে আনুমানিক ১০০টির মতো হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা রয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। সরকারি হাসপাতালে কার্যকরী আইসিইউ বেডের সংখ্যা মাত্র ২২০-২৫০টির মতো, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। আদর্শভাবে যেখানে আইসিইউ ও সাধারণ বেডের অনুপাত হওয়া উচিত ১:১০, সেখানে বাস্তবে তা প্রায় ১:২১৯। প্রতি এক লাখ জনগোষ্ঠীর জন্য আইসিইউ বেডের সংখ্যা মাত্র ০.৭, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় নিতান্ত কম।কোভিড-১৯ মহামারির পর দেশে আইসিইউ বেডের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় হাজারের ওপর পৌঁছালেও জনবল সংকটের কারণে এর একটি বড় অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে পেডিয়াট্রিক ও নিয়োনেটাল আইসিইউ সেবা এখনও মূলত বড় বেসরকারি ও বিশেষায়িত হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ জেলা হাসপাতালে এই ধরনের সেবা নেই, বা থাকলেও অত্যন্ত সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে।আইসিইউ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো দক্ষ জনবলের অভাব। দেশে প্রশিক্ষিত ইনটেনসিভিস্ট, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট এবং বিশেষায়িত আইসিইউ নার্সের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। প্রতি পাঁচ বছরে মাত্র ১৫০-২০০ জন বিশেষজ্ঞ তৈরি হতে পারে, যা এই খাতের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। বর্তমানে দেশে নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র ৪৩ জন। অথচ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, আইসিইউ পরিচালনায় এ ধরনের বিশেষজ্ঞদেরই নেতৃত্ব দেয়ার কথা। বাস্তবে প্রায় ৬০ শতাংশ আইসিইউ অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এবং মাত্র ১০ শতাংশ আইসিইউ নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।নার্সিং সেবার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। আইসিইউতে ২৪ ঘণ্টা রোগীর সেবায় নিয়োজিত নার্সদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাব রয়েছে। অধিকাংশ নার্সের নিবিড় পরিচর্যায় একাডেমিক প্রশিক্ষণ নেই এবং মাত্র ৪০ শতাংশ নার্স বেসিক লাইফ সাপোর্ট ও সিপিআর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ফলে আইসিইউ সেবার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।আইসিইউ স্থাপন ও পরিচালনা একটি ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। একটি ১০ শয্যার আইসিইউ স্থাপনে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা পেতে ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি কিংবা উন্নত ল্যাব সুবিধাও অনুপস্থিত।গবেষণায় দেখা গেছে, মোট রোগীর প্রায় ৫ শতাংশ আইসিইউ সেবার প্রয়োজন হয় এবং কার্যকর আইসিইউ ব্যবস্থাপনা প্রায় ৫০ শতাংশ মৃত্যুহার কমাতে সক্ষম। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে আইসিইউ ব্যবস্থাপনার মান নিয়ন্ত্রণ, নীতিমালা এবং তদারকির ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। মাত্র ২০ শতাংশ হাসপাতালে কার্যকর ইনফেকশন কন্ট্রোল কমিটি রয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য তা হাতের নাগালের বাইরে।এই প্রেক্ষাপটে দেশের আইসিইউ সেবা উন্নয়নে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি জেলা হাসপাতালে পর্যায়ক্রমে আইসিইউ স্থাপন করতে হবে এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে আবশ্যকভাবে পিআইসিইউ ও এনআইসিইউ চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালের মোট বেডের অন্তত ৫-১০ শতাংশ আইসিইউ বেড হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ইনটেনসিভ কেয়ার, ক্রিটিক্যাল কেয়ার নার্সিং এবং রেসপিরেটরি থেরাপির প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করতে হবে এবং এ খাতে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে।এছাড়া আইসিইউ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনা চালু করা, অচল আইসিইউ পুনরায় চালু করা, বিদ্যমান সরঞ্জামের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত আইসিইউ গাইডলাইন প্রণয়ন, ইনফেকশন কন্ট্রোল বাধ্যতামূলক করা এবং অ্যাক্রেডিটেশন সিস্টেম চালু করাও সময়ের দাবি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে টেলি-আইসিইউ এবং ডিজিটাল পেশেন্ট মনিটরিং ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।বাংলাদেশে আইসিইউ, পিআইসিইউ ও এনআইসিইউ সেবার অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য হলেও তা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং জনবল সংকটে সীমাবদ্ধ। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সেবা খাতকে শক্তিশালী করা সম্ভব হলে দেশের সামগ্রিক মৃত্যুহার হ্রাস এবং সংশ্লিষ্ট রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বি আর বি হাসপাতাল, ঢাকা]

দুর্নীতি: মানবসৃষ্ট এক নীরব দুর্যোগ

বাংলাদেশের ইতিহাসে দুর্যোগ কোনো নতুন শব্দ নয়। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই এই দেশের মানুষ টিকে আছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এমন এক দুর্যোগ ধীরে ধীরে রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে বিস্তার লাভ করছে, যার উৎস প্রকৃতিতে নয়, মানুষের আচরণে। সেই দুর্যোগ হলো দুর্নীতি। এটি এমন এক মানবসৃষ্ট বিপর্যয়, যার কোনো শব্দ নেই, কোনো দৃশ্যমান ধ্বংসস্তূপ নেই— তবুও এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, প্রশাসন এবং নৈতিক কাঠামোকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। দুর্নীতির প্রকৃতি বোঝার জন্য এটিকে কেবল আইনি অপরাধ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। যখন ক্ষমতা, দায়িত্ব ও সম্পদের ব্যবস্থাপনার মধ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থ অগ্রাধিকার পায়, তখন দুর্নীতি জন্ম নেয়। আর এই জন্ম কোনো একক স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং নিম্নস্তর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। দুর্নীতির প্রথম অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষ লাভ করে রাষ্ট্রের নিম্নস্তরের প্রশাসনিক কাঠামোতে। একটি জন্মসনদ, জমির খতিয়ান, নামজারি, ট্রেড লাইসেন্স কিংবা কোনো সরকারি সেবা পেতে অনেক সময় নাগরিকদের অঘোষিত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই ধরনের দুর্নীতি অনেক সময় এতটাই প্রাত্যহিক হয়ে উঠেছে যে তা যেন এক ধরনের অলিখিত প্রথায় পরিণত হয়েছে।এই দুর্নীতি পরিমাণে ছোট হলেও এর প্রভাব গভীর। কারণ এটি নাগরিকদের মনে রাষ্ট্র সম্পর্কে এক ধরনের হতাশা সৃষ্টি করে। যখন মানুষ দেখে যে আইন বা নিয়মের চেয়ে অর্থের বিনিময়ই দ্রুত ফল দেয়, তখন তার মধ্যে ন্যায়বোধের প্রতি আস্থা কমে যায়। ধীরে ধীরে নাগরিকের মধ্যে এমন ধারণা জন্ম নেয় যে, সিস্টেমের ভেতরে সততা দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। এই মানসিকতার পরিবর্তন সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। কারণ এটি নাগরিকদের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে এবং দুর্নীতিকে একটি সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত করে।বাংলাদেশ গত দুই দশকে অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নের ভেতরেই অনেক সময় দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে। অনেক প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কিংবা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প অনুমোদনের অভিযোগ দেখা যায়। এই পরিস্থিতি উন্নয়নের উদ্দেশ্যকে দুর্বল করে দেয়। একটি প্রকল্পের অর্থ যদি যথাযথভাবে ব্যবহৃত না হয়, তবে সেই প্রকল্প জনকল্যাণে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারে না। এই ধরনের দুর্নীতি উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়। কারণ রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ অপচয়ের মাধ্যমে হারিয়ে যায়। যে অর্থ দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা দারিদ্র্য বিমোচনে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া সম্ভব ছিল, তা অনেক সময় অদক্ষতা ও অনিয়মের কারণে অকার্যকর হয়ে পড়ে।বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংক খাতে বিভিন্ন অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করা, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে অযোগ্য ঋণ অনুমোদন কিংবা তদারকির দুর্বলতা— এসব বিষয় ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করে তোলে। ব্যাংক খাতের এই দুর্বলতা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। কারণ ব্যাংকগুলো জনগণের আমানত এবং বিনিয়োগের একটি প্রধান মাধ্যম। যদি এই ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়, তবে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও ধীর হয়ে পড়তে পারে। ফলে দুর্নীতির এই রূপটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকিতে পরিণত হয়।দুর্নীতির সবচেয়ে জটিল ও বিপজ্জনক রূপটি দেখা যায় তখন, যখন এটি উচ্চপর্যায়ের ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দুর্বল হয়, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সম্পদ বণ্টন, উন্নয়ন পরিকল্পনা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোতে জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য পেতে পারে। এর ফলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি সমাজে একটি নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেয়— যেন ক্ষমতা থাকলে জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই। এই ধারণা সমাজের ভেতরে গভীর হতাশা তৈরি করে এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করে।দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না; এটি সমাজের নৈতিক কাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। যখন মানুষ দেখে যে অসৎ উপায়ে দ্রুত সম্পদ অর্জন করা সম্ভব, তখন সততা ও নৈতিকতার মূল্য কমে যায়। এই পরিস্থিতি নতুন প্রজন্মের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তরুণেরা যদি মনে করে যে মেধা ও পরিশ্রমের চেয়ে প্রভাব ও অনিয়মই সফলতার পথ খুলে দেয়, তবে তাদের মধ্যে আদর্শের সংকট সৃষ্টি হয়। ফলে সমাজে একটি নৈতিক বিভ্রান্তি জন্ম নেয়, যেখানে সৎ মানুষ নিজেকে অসহায় মনে করে এবং অসৎ ব্যক্তি সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে। দুর্নীতিকে অনেক সময় একটি প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এর প্রভাব বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে এটি একটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। কারণ এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি দুর্বল করে, উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয় এবং সামাজিক আস্থাকে ধ্বংস করে।প্রাকৃতিক দুর্যোগ হঠাৎ আঘাত হানে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ক্ষত মুছে যায়। কিন্তু দুর্নীতি দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ক্ষয় করে, যার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করতে হয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রধান শর্ত। একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার ও ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুযোগ কমাতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক সচেতনতা। একটি সমাজ যদি দুর্নীতিকে ঘৃণা করতে শেখে এবং সততাকে সম্মান দেয়, তবে দুর্নীতির বিস্তার স্বাভাবিকভাবেই কমে আসতে পারে।বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সামাজিক সূচকে অগ্রগতি দেশের সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার পথে দুর্নীতি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি এমন এক মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, যা চোখে দেখা যায় না কিন্তু রাষ্ট্রের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। যদি এই দুর্যোগকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে উন্নয়নের অর্জনগুলোও একসময় প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।অতএব, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অর্থনৈতিক সম্পদে নয়, বরং তার সততা, ন্যায়বোধ এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতিতে নিহিত। আর সেই সংস্কৃতিই পারে বাংলাদেশকে এই নীরব মানবসৃষ্ট দুর্যোগ থেকে মুক্তির পথে এগিয়ে নিতে।[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

প্রতিরোধের রাজনীতি ও ভাষার বিবর্তন

পরিশীলিত কিংবা অশ্রাব্য ‘শব্দ’ ও ‘শব্দগুচ্ছ’ আসলে মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রগুলোর একটি। মানবসভ্যতার ইতিহাস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নিষ্পেষিত মানুষের ইতিহাস মূলত প্রতিরোধেরই ইতিহাস। আর সেই প্রতিরোধের জন্য প্রতিবাদের প্রথম ও মৌলিক মাধ্যমটি হচ্ছে ভাষা। দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চনা, নির্যাতন, নিপীড়ন ও অবিচারের ভারে মানুষের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তার সামনে তখন বিকল্পের পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে। তার অস্তিত্ব যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে, তার নীরবতা তখন আর নিরপেক্ষতার প্রতীক থাকে না; বরং তা আত্মসমর্পণের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। এই চরম বাস্তবতায় মানুষ যে অস্ত্রটি শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরে বা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, তা অনেক সময়ই দৃশ্যমান বা শারীরিক নয়, বরং ভাষাগত প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। শব্দ, মুখের বুলি, উচ্চারণ, এমনকি গালাগাল বা ‘গাইল’, সবকিছু মিলিয়ে ভাষা তখন হয়ে ওঠে প্রতিবাদের এক তীব্র ও তাৎপর্যপূর্ণ মাধ্যম। অন্তর্গত বেদনা-বিক্ষোভের ধ্বনি ও প্রতিধ্বনির মাধ্যমেই জালেমের সঙ্গে মজলুমের এই সংঘর্ষে গড়ে ওঠে এক প্রতিরোধী চেতনা, যেখানে ভাষাই হয়ে দাঁড়ায় মজলুমের শেষ আশ্রয়, শেষ প্রতিরোধ, শেষ আর্তনাদ।বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা এই তাত্ত্বিক সত্যের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। দীর্ঘ সতেরো বছরের বিদ্রুপ-অপবাদ-অপমান, দমন-পীড়ন, গুম, খুন ও অব্যাহত নির্যাতন-নিপীড়নের অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষকে কেবল শারীরিক কিংবা অর্থনৈতিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, গভীর মানসিক যন্ত্রণার ভারেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। স্বৈরাচারী রাষ্ট্রযন্ত্র ও সরকার তথা শাসকশ্রেণী এবং তার সেবাদাসশ্রেণী জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল জাতির বুকের ওপর। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি দমন-শোষণ-শাসন একটি ‘সামষ্টিক আতঙ্ক বা ভীতি‘ (কলেক্টিভ ট্রমা) তথা সমষ্টিগত মানসিক অভিঘাতের জন্ম দেয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মানুষের আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা ও ভাবনা-প্রকাশভঙ্গি কিংবা ভাষায়। ফলে এই পরিস্থিতিতে বিক্ষুব্ধ মানুষের ভাষা আর পরিশীলিত, ভদ্র বা শিষ্ট থাকার সামাজিক দায় বহন করে না। বরং তা ভেঙে ফেলে প্রচলিত শালীনতার শ্রেণীগত কিংবা ভাষাগত প্রকাশভঙ্গির কাঠামো। সাধারণ মানুষ আশ্রয় নেয় এমন এক ভাষার, যাকে আমরা সহজেই ‘অশ্রাব্য’ বা ‘অশালীন’ বলে চিহ্নিত করি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই অশ্রাব্যতাই কি প্রকৃতপক্ষে অশালীন কিংবা তিরস্কারযোগ্য? নাকি এটি নিপীড়িত মানুষের জমাটবাঁধা ক্ষোভ, দুঃখ ও বেদনার এক অনিবার্য এবং অকৃত্রিম ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ কিংবা হতাশা আশ্রিত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের বহিঃপ্রকাশ, যা সামাজিক অভিধানে ‘অশালীন’ হলেও ন্যায়বোধের বিচারে এক গভীর বেদনাহত ব্যক্তিসত্তার মানবিক আর্তনাদ?ভাষার মৌলিক উপাদান হলো ‘শব্দ’ বা ‘শব্দগুচ্ছ’ যা প্রথমত ব্যক্তির মুখ থেকেই উৎসারিত হয়; সেই অর্থে তা ব্যক্তিগত। কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনায় আমরা জানি, যখন কোনো শব্দ জনতার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা আর ব্যক্তিগত সীমানায় আবদ্ধ থাকে না; বরং তা রূপান্তরিত হয় একটি সামষ্টিক, সামাজিক, এমনকি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক চিহ্নে। এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে সমাজ-ভাষাবিজ্ঞানের (সোসিও-লিঙ্গুইস্টিক) পরিভাষায় বলা যেতে পারে ‘সামষ্টিক অধিগ্রহণ’ (কলেক্টিভ এপ্রোপ্রিয়েশান) যেখানে জনতা কোনো শব্দকে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের তথা সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা কিংবা বিশ্বাস ও চেতনার বাহক হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে যে শব্দ একসময় ছিল প্রান্তিক, উপেক্ষিত বা তথাকথিত ‘অচল’ কিংবা ‘অশালীন’, সেটিই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে সচল, গ্রহণযোগ্য এবং কেন্দ্রীয়। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই ভাষা নতুন অর্থ, নতুন শক্তি, নতুন মাত্রা এবং নতুন দিকনির্দেশনা অর্জন করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এভাবেই ভাষা যুগের ধর্ম, বর্তমানের প্রয়োজন ও সময়ের চরিত্রকে ধারণ করে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কোনো কোনো শব্দ বা বাক্যবন্ধ ধীরে ধীরে রূপ নেয় তীব্র রাজনৈতিক রূপকে; যেমন ‘মীর জাফর’ বিশেষ্যটি বিশেষণ হয়ে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশব্দে রূপান্তরিত হয়, কিংবা ‘মগের মুলুক’ বাগধারাটি হয়ে ওঠে বিশৃঙ্খলা ও অন্যায়ের প্রতীক। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে ভাষা তখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে স্মৃতি, প্রতিরোধ ও বিচারবোধের ধারক।প্রবাদ-প্রবচন, রূপক, উপমা- এসবকিছুর মধ্য দিয়েই ভাষা নিজেকে সমৃদ্ধ করে, প্রসারিত করে, এমনকি কখনো কখনও শোধিত ও পরিশীলিত করে। এই সমগ্র প্রক্রিয়াটি প্রায়ই সমাজের অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে এক ধরনের ‘উপজাত’ (বাই-প্রডাক্ট) হিসেবে জন্ম নেয় যা প্রথম দৃষ্টিতে ‘অশালীন’ বা ‘অগ্রহণযোগ্য’ মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা ভাষা ও সমাজ উভয়ের জন্যই এক ধরনের ‘শাপে বর’ হয়ে দাঁড়ায়। গ্রামীণ জীবনে বাংলায় এমন ‘অমার্জিত’ (স্ল্যাং) শব্দ, শব্দগুচ্ছ, প্রবাদ-প্রবচন, বাগধারা ভুরিভুরি ব্যবহৃত হয়। অতএব, যারা আজ বিদ্বেষপ্রসূত উদ্বেগে উৎকণ্ঠিত হয়ে এ প্রজন্মের প্রতিবাদী তরুণদের ব্যবহৃত ভাষাকে কেন্দ্র করে সমালোচনার ঝড় তুলছে, এমনকি তাদেরকে ‘ন্যাংটা’ করে নিরস্ত্র ও নিবৃত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের জন্য ইতিহাসে অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, জালেমের পক্ষে কিংবা ইনসাফের বিপক্ষে কৌশলী বয়ান নির্মাণ কখনোই জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ভাষাকে দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখতে পারে না। বরং প্রতিবারই দেখা গেছে, ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত ভাষা শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে জনতার অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান আশ্রিত দৈনন্দিন জীবনচর্যানির্ভর মনের গভীর থেকে উঠে আসা ভাষার সামনে। এই প্রেক্ষাপটে ওসমান হাদীর অবস্থান ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের রাজনীতিতে ‘গাইল’-এর ব্যবহারে তার ভাষ্য আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য দৃষ্টান্ত: কৌশলী দুর্বৃত্তায়ণ ও বয়ান-নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে কীভাবে প্রজ্ঞা, সৃজনশীলতা ও ভাষার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় তিনি স্বল্প সময়েই তার একটি দিকনির্দেশনা ও দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, ব্যক্তিমানুষের ক্ষোভ যখন দীর্ঘ সময় ধরে পুঞ্জীভূত হতে থাকে, তখন তা আর ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় জনরোষে। মনোবিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্ব উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষোভের এই রূপান্তর একটি সুপরিচিত প্রক্রিয়া। ব্যক্তির অভিজ্ঞতা যখন সমষ্টির অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়, তখন তা একটি ‘সামষ্টিক চেতনা’-র (কলেক্টিভ কন্সাসনেস) জন্ম দেয়। আর এই জনরোষই একসময় বিস্ফোরিত হয় গণআন্দোলনে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে রূপ নিতে পারে গণবিপ্লবে। ফলে ভাষা, যা প্রথমে ছিল ব্যক্তির ক্ষোভের বাহন, তা ক্রমে হয়ে ওঠে জনতার ঐক্যবদ্ধ চেতনার প্রতীক, দ্রোহের বহিঃপ্রকাশের মূর্ত রূপ। বাংলামুলুকে ভাষার বিবর্তন ও রূপান্তরের এই ধারাটি ইতিহাসে মোটেই নতুন নয়। আঠারো শতকের উপনিবেশিক কলকাতায় উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থানের প্রেক্ষাপটে কবিয়ালদের ভাষার ব্যবহার তার একটি উজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সেই কবিয়ালদের ‘খিস্তি খেউর’-এর মাঝে তথা পালাগান, তর্ক ও প্রতিযোগিতামূলক কাব্যের ভাষায় আমরা দেখি ব্যঙ্গ, কটাক্ষ, তীব্র বাক্যবাণ, এমনকি তথাকথিত অশ্রাব্যতারও এক সৃজনশীল ও কৌশলগত ব্যবহার। ভাষা সেখানে নিছক বিনোদনের উপকরণ ছিল না; বরং তা হয়ে উঠেছিল সামাজিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের মাধ্যম। আক্রমণ ও প্রতিআক্রমণের এই ভাষিক পরিসর আসলে ছিল একটি চলমান শ্রেণিসংগ্রামের প্রতিফলন, যেখানে ভাষাই ছিল প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, প্রতিশোধ এবং নিয়ন্ত্রণের এক সূক্ষ্ম কিন্তু কার্যকর হাতিয়ার। অর্থাৎ ভাষা তখন সমাজের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব, আন্তসম্পর্ক, বিবর্তন ও পরিবর্তনের জীবন্ত দলিল হিসেবে কাজ করছিল।মূলত ভাষা স্থির কোনো সত্তা নয়; বরং তা প্রবাহমান নদীর মতো। ভাষা সময়, সমাজ ও ইতিহাসের গতির সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত বিবর্তিত ও রূপান্তরিত হয়। ভাষাতত্ত্বের আলোচনায় এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, ভাষা একটি জীবন্ত অর্গানিজমের মতো যা জন্ম নেয়, বিকশিত হয়, কখনও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, আবার কখনও বা নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করে। সমাজে যখন অবক্ষয়, নৈরাজ্য, বৈষম্য বা সংকট দেখা দেয়, তখন তার প্রতিফলন অনিবার্যভাবে ভাষাতেও প্রতিফলিত হয়। যে ভাষা আর বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারে না, তা ক্রমে ভেঙে পড়ে। তার জায়গা দখল করে নেয় এমন এক নতুন ভাষা, যা সময়ের সত্য, মানুষের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান কিংবা সামষ্টিক স্মৃতি ও সামাজিক টানাপোড়েনকে ধারণ করতে সক্ষম। এই ভাঙন ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়েই ভাষা নিজেকে নতুন করে বিনির্মাণ করে। একে আমরা ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখতে পারি যেখানে পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন অর্থ ও প্রকাশভঙ্গির জন্ম হয়। আর এই পরিবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং সমাজের গভীরে চলমান রূপান্তরেরই ধারাবাহিকতা। ফলে ভাষার এই ভাঙা-গড়া, গঠন-পুনর্গঠন ও নবায়নকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভাষা যেহেতু কখনোই বস্তু নিরপেক্ষ নয়, তাই এটিকে বুঝে ওঠা, বিশ্লেষণ করা এবং সময়োপযোগীভাবে গ্রহণ করাই আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব এবং অগ্রগতি স্মারক।গণঅভ্যুত্থান বা তীব্র সামাজিক অস্থিরতার সময় ভাষার এই রূপান্তর আরও দ্রুত, ঘনীভূত এবং তীক্ষ্মè হয়ে ওঠে। তখন ভাষা আর কেবল যোগাযোগের নিরপেক্ষ মাধ্যম থাকে না; এটি রূপ নেয় প্রতিরোধের অস্ত্রে, প্রতিবাদের স্লোগানে, আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিশোধের প্রতীকে। ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনেই আমরা এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখি যেখানে ভাষা জনতার আবেগ, ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষাকে সংগঠিত করে এক ধরনের শক্তিতে রূপান্তরিত করে। ফলে এই রূপান্তরকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই; বরং চলমান পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে ধারণ করে ভাষার এই বিবর্তন সামাজিক রূপান্তরের এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান। স্বাভাবিকভাবেই, যারা পুরোতন বন্দোবস্তে অভ্যস্ত এবং সেটিকে টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর, বর্তমানের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের কাছে নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদী ভাষা অসহনীয় মনে হয়। কারণ এই ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও আক্রমণের ভাষা কেবল শব্দের পরিবর্তন নয়; এটি ক্ষমতার কাঠামোর প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। তাই স্বৈরাচারী বন্দোবস্তের কিংবা বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সুবিধাভোগী তথাকথিত সুশীলেরা শালীনতা, শিষ্টাচার বা নৈতিকতার প্রশ্নকে সামনে এনে কৌশলে ভাষার এই ব্যবহারকে অগ্রহণযোগ্য প্রমাণ করার চেষ্টা করে যেন ভাষার তথাকথিত ‘অশালীনতা’কে কেন্দ্র করে মূল অন্যায় ও অবিচারের প্রশ্নটি আড়াল করা যায়। এটি আসলে একটি সুপরিচিত কৌশল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান তৈরির রাজনীতি, যেখানে প্রতিপক্ষের ভাষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ভাষাগত ও কালচারাল হেজিমনির বিস্তারে মাধ্যমে বাস্তবতাকেই নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস চালানো হয়। তা সত্ত্বেও লক্ষণীয় যে, নতুন প্রজন্ম অভিনব ও সৃজনশীল কলাকৌশলের মাধ্যমে এই বয়ান তৈরির দুর্ভিসন্ধি ও অপপ্রয়াসগুলোকে প্রতিনিয়তই চ্যালেঞ্জ করছে।যদিও ভাষার ব্যবহারের মাধ্যমে কালচারাল হেজিমনি বজায় রাখার বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধ এখনও পুরোপুরি সুচিন্তিত বা সুসংগঠিত কোনো কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ নয়, তবুও এর ভেতরে একটি স্বতঃস্ফূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি কাজ করছে যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও সুসংহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিরোধের রাজনীতিতে ভাষা হয়ে ওঠে ন্যায্যতার তথা ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের পথে একটি কার্যকর নৈতিক উপকরণ। তবে তথাকথিত ‘কদর্য’ ভাষার কার্যকারিতা নির্ভর করে এর সঠিক ও সংযত ব্যবহারের ওপর। কারণ যে অস্ত্র যত শক্তিশালী, তার অপব্যবহারের ঝুঁকিও তত বেশি। তাই প্রয়োজন প্রজ্ঞা, প্রেক্ষিতবোধ এবং নৈতিক সংযম যাতে ভাষা ধ্বংস বা বিশৃঙ্খলা নয়, বরং ন্যায় ও মুক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। প্রাসঙ্গিকভাবেই এখানে বহুলপ্রচলিত একটি আপ্তবাক্য নতুন অর্থ ও তাৎপর্য লাভ করে, বাস্তবে আমরা দেখতে পাই, ‘মানুষ দুঃখ পেলে খোদাকেও গালাগালি করে’। প্রথম দৃষ্টিতে এটি নিছক হতাশা বা বেদনার প্রকাশ মনে হলেও, গভীরভাবে দেখলে এটি মানুষের সীমাহীন যন্ত্রণার এক তীব্র ভাষ্য ও কঠিন জীবনবাস্তবতা, যা একই সঙ্গে প্রতিবাদী কণ্ঠের বৈধতাকেও প্রতিষ্ঠা করে। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যখন মানুষ চরম অসহায়তার মুখোমুখি হয় এবং তার চারপাশের সব প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়, বিশেষ করে রাষ্ট্র, সমাজ, ন্যায়বিচার প্রভৃতি ব্যর্থ হয়ে পড়ে, তখন সে ভাষার মধ্য দিয়েই তার অস্তিত্বের শেষ দাবি উত্থাপন করে। এই ভাষা তখন আর কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের অস্তিত্ববাদী ঘোষণা, ‘যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি, ততক্ষণ আমি আর অন্যায়কে মেনে নিচ্ছি না’। ফলে সেই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধ অভীপ্সা শালীন না অশালীন এই প্রশ্নটি গৌণ হয়ে পড়ে; মুখ্য হয়ে ওঠে ন্যায়ের পক্ষে ন্যায্যতার দাবি ও অন্যায়ের প্রতিরোধ।এই কারণেই গণঅভ্যুত্থানকালীন সময়ে ব্যবহৃত অনেক শব্দ বা শব্দগুচ্ছ অর্থাৎ নানা ‘গাইল’-কে কেবল অশ্রাব্যতার খোপে ফেলে খারিজ করে দিলে আমরা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের ভাষার গভীরতর সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্যকে অস্বীকার করি। এই ভাষা নিছক আবেগের উচ্ছ্বাস নয়; এটি আমাদের সময়ের এক জীবন্ত ও ঐতিহাসিক দলিল। এখানে জমা থাকে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ক্ষোভ ও প্রতিরোধের কিংবা প্রতিহত করার সঞ্চিত অভিজ্ঞতা; একই সঙ্গে এতে প্রতিফলিত হয় মানুষের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও প্রয়াস। অর্থাৎ এই ‘গালাগালি’-র ভাষা শুধু প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের নয়, প্রতিহত করা ও অর্জনেরও সহায়ক অস্ত্র। কারণ এটি নীরবতা ভাঙার ভাষা, আত্মপ্রকাশের ভাষা, আত্মশক্তিতে বলিয়ান হয়ে রুখে দাঁড়ানোর ভাষা। ভাষার এই বিবর্তনকে বুঝতে হলে কেবল শব্দের শুদ্ধতা বা অশুদ্ধতার বিচারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ভাষার পেছনে যে ইতিহাস, যে সামাজিক বাস্তবতা, যে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক কষ্ট-যন্ত্রণা-ভয়ের তীব্রতা এবং দ্রোহের আগুন কাজ করে তা অনুধাবন করাই এখানে মুখ্য। সমাজতাত্ত্বিক পরিভাষায় যাকে ‘সামষ্টিক স্মৃতি’ (কালেক্টিভ মেমোরি) বলা হয়, এখানে এই ভাষা তারই অন্যতম বাহক। এই স্মৃতির ভেতর দিয়ে একটি সমাজ তার অতীতের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান, বর্তমানের সংগ্রাম ও অর্জন এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। ফলে ভাষার এই রূপান্তরকে অস্বীকার করা মানে কেবল শব্দ বা শব্দগুচ্ছকে অস্বীকার করা নয়; বরং একটি জাতির মানুষের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা-অভিজ্ঞান, আনন্দ-বেদনা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার ধারাবাহিকতায় প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের ইতিহাসকেই অস্বীকার করা।সামাজিক মানদণ্ডে ভাষা কেবল ভদ্রতার আবরণ বা ভাবপ্রকাশের নিরপেক্ষ বাহন নয়; এটি সমাজের অন্তর্গত সত্যের এক জীবন্ত প্রতিফলন এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নির্মাণ ও বিনির্মাণের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। যখন সমাজে অবিচার স্ফীত হয়, দ্বন্দ্ব তীব্রতর হয় এবং অভিঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন ভাষাও তার স্বর, ভঙ্গি ও রূপ পরিবর্তন করে যা ভাষার স্বাভাবিক, অবশ্যম্ভাবী চলমান গতিপথের নির্দেশক। ভাষার এই পরিবর্তন, বিবর্তন ও রূপান্তরকে দমন বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা আসলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করারই নামান্তর। জাতীয় উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির স্বার্থে প্রয়োজন তা গভীরভাবে বোঝা, বিচার-বিশ্লেষণ করা এবং পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী মূল্যায়ন করা। প্রয়োজন গণবিতর্কের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জ্ঞানীয় উৎকর্ষের আলোকায়ন ও বয়ান তৈরির রাজনৈতিক অপকৌশলের মূল উৎপাটন। কারণ ভাষার এই রূপান্তরের ভেতরেই নিহিত থাকে জাতির অনাগত সময়ের পূর্বাভাস এবং ভবিষ্যতে অগ্রগতির রাজপথ নির্ধারণের দিকনির্দেশনা। আর ভাষার এই বিবর্তন ধারণ করে রাষ্ট্র কিংবা সমাজের দ্বান্দ্বিক অবস্থা, যা হয়তো চলমান সময়ে ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে তাকে পুনর্গঠনের সম্ভাবনার দিকেও বয়ে নিয়ে চলেছে। তাই এই পরিবর্তনকে ভয় নয়, বরং আমাদের বোধ, বুদ্ধি ও উপলব্ধি দিয়ে তাকে গ্রহণ করতে হবে; হৃদয়ের উষ্ণতায় তাকে অনুধাবন করতে হবে; এবং ভবিষ্যতের প্রতি আস্থাশীল থেকে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণমুখী এক মানবিক সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে তাকে আলিঙ্গন করতে হবে।[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

নাফ নদীতে জেলেদের কান্না থামবে কবে?

কোনো এক শনিবার। সকাল ৭টা। টেকনাফের নাফ নদীতে তখনো কুয়াশা কাটেনি। তিনটি নৌকায় জেলেরা জাল ফেলছিলেন। হঠাৎ কয়েকটি স্পিডবোট এসে তাদের ঘিরে ফেলে। একদল সশস্ত্র লোক অস্ত্রের মুখে ১৩ জন জেলেকে ধরে নিয়ে যায় মায়ানমারের ভেতরে। এই ঘটনার পেছনে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি জড়িত।এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা না। এই বাস্তবতা দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ফল। স্থানীয় ও গণমাধ্যমের সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০০ জন বাংলাদেশি জেলেকে আটক করেছে আরাকান আর্মি। তাদের মধ্যে ১৭১ জন এখনও মিয়ানমারের কারাগারে বন্দী। একই সঙ্গে ৩২টি ট্রলার সেখানে পড়ে আছে। এটি এখন গভীর অনিশ্চয়তার খবর। নাফ নদীর শান্ত জল আজ অশান্ত হয়ে উঠেছে। ওই পানিতে লুকিয়ে আছে এক গভীর আতঙ্ক।কেন নাফ নদী এখন এতটা অশান্ত? উত্তর লুকিয়ে আছে মায়ানমারের গত কয়েক বছরের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসে। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মায়ানমারের সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে জান্তা বাহিনী শুরু করে চরম দমন-পীড়ন। কিন্তু সাধারণ মানুষ দমে যায়নি। শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ। এই প্রতিরোধই জন্ম দেয় এক দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের।চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত জান্তা বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৮ হাজার মানুষ। গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি। ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন ৩৬ লাখ মানুষ। এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে আরাকান আর্মি। ২০০৯ সালে ছোট আকারে যাত্রা শুরু করলেও এখন তারা রাখাইন রাজ্যের অঘোষিত শাসক। তারা এখন আর কেবল একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী নয়। তারা একটি আধা-রাষ্ট্রীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।২০২৩ সালের শেষে ‘অপারেশন ১০২৭’ শুরু হওয়ার পর জান্তা বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের ২৭১ কিলোমিটার এলাকার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আরাকান আর্মির হাতে। মংডু ও বুথিডংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলকাগুলো এখন তাদের দখলে। বর্তমানে মিয়ানমারের মাত্র ২১ শতাংশ এলাকা জান্তা সরকারের অধীনে। বাকিটা বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। এই পরিবর্তন আমাদের সীমান্তের নিরাপত্তা সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।আরাকান আর্মি কেন সাধারণ জেলেদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে? এর পেছনে আছে গভীর রাজনৈতিক কৌশল। প্রথমত তারা দেখাতে চায় এই এলাকার আসল মালিক তারা। নাফ নদীতে তাদের দাপট বজায় রাখার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশকে একটি বার্তা দিচ্ছে। তারা বোঝাতে চায় জান্তা সরকারের দিন শেষ। এখন থেকে এপারে কথা বলতে হলে তাদের সঙ্গেই বলতে হবে।দ্বিতীয়ত জিম্মি সংকট তৈরি করে তারা দর কষাকষির সুযোগ খোঁজে। অনেক সময় মুক্তিপণ আদায় বা নৌকাগুলো নিজেদের যুদ্ধের কাজে ব্যবহারে এসব করে। নাফ নদীর ওই নৌকাগুলো তাদের মূল্যবান সম্পদ। ইঞ্জিনের নৌকাগুলো তারা রসদ সরবরাহের কাজে ব্যবহার করে।সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমীকরণ। গত ফেব্রুয়ারিতে আরাকান আর্মি ৭৩ জন বাংলাদেশি জেলেকে মুক্তি দিয়েছিল। এটি ছিল তাদের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা। কিন্তু মাস ঘুরতেই আবার ১৩ জনকে অপহরণ করা হলো। এটি কি তাদের অভ্যন্তরীণ কোনো বিশৃঙ্খলা নাকি দ্বিমুখী নীতি, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।রাখাইন রাজ্য এখন কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নেই। এখানে চীন ও আমেরিকার স্বার্থ জড়িয়ে আছে। চীনের কাছে রাখাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের আওতায় কিয়াউকপিউ বন্দর দিয়ে তারা সরাসরি ভারত মহাসাগরে পৌঁছাতে চায়। তাই চীন একদিকে জান্তা সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে আরাকান আর্মির সঙ্গেও গোপন যোগাযোগ রাখছে। তাদের মূল লক্ষ্য যেভাবেই হোক নিজেদের ব্যবসায়িক করিডোর নিরাপদ রাখা।অন্যদিকে আমেরিকা চাচ্ছে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে। তারা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে নানাভাবে সহায়তা দিচ্ছে। এই দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় মাঝখান থেকে পিষ্ট হচ্ছে আমাদের সীমান্ত ও সাধারণ জেলেরা। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার চেয়ে এখানে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বড় দেশগুলোর আধিপত্যের লড়াই। এই লড়াইয়ে রক্ত ঝরছে আমাদের সাধারণ মানুষের।বাংলাদেশ এখন এক কঠিন কূটনীতির সামনে দাঁড়িয়ে। একদিকে জান্তা সরকার, অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের ক্ষমতাধর আরাকান আর্মি। গত কয়েক বছরে আমাদের কৌশল ছিল দুপক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখা। কিন্তু ১৩ জেলের অপহরণ প্রমাণ করে ওই কৌশলে বড় ধরনের ফাঁক আছে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। নাফ নদীতে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের টহল কেবল বাড়ালেই হবে না। প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। ড্রোন নজরদারি বাড়িয়ে প্রতিটি নৌকার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। আমাদের জেলেরা কোনো এলাকায় জাল ফেলছেন, তা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকা দরকার।জেলেদের সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে হবে। যেহেতু আরাকান আর্মি এখন সীমান্তের ওপারে প্রকৃত নিয়ন্ত্রক, তাই তাদের সঙ্গে কার্যকরী ও কঠোর আলোচনার বিকল্প নেই। আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ছাড় দেয়া যাবে না। জান্তা সরকারকে জানিয়েও লাভ নেই, কারণ ওই এলাকায় তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।শাহপরীর দ্বীপের জেলেরা ঝুঁকি জেনেও পেটের দায়ে নদীতে নামেন। সরকারি উদ্যোগে তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান বা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার নিরাপদ ব্যবস্থা করা দরকার। তাদের জীবন ও জীবিকার মধ্যে যে যুদ্ধ চলছে, তার অবসান ঘটাতে হবে। না হলে অভাবের তাড়নায় তারা বার বার এই মরণফাঁদে পা দেবেন।মিয়ানমারের এই অস্থিরতা আমাদের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকেও অনিশ্চিত করে তুলছে। রাখাইন রাজ্যে যদি শান্তি না ফেরে। তবে রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরতে চাইবে না। আবার আরাকান আর্মি যদি সেখানে স্থায়ী শাসক হয়, তবে তাদের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করতে হবে। তারা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বা অধিকারের বিষয়ে কতটা আন্তরিক হবে, তা এখনও বড় প্রশ্ন।আসিয়ান বা জাতিসংঘের মাধ্যমে মিয়ানমারের সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে। চীন ও আমেরিকার মতো প্রভাবশালী দেশগুলোকে এই সংকটে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে বাধ্য করতে হবে। আঞ্চলিক শান্তি বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব সবার ওপর পড়বে। এই বার্তাটি দরবারে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।নাফ নদীর পাড়ের মানুষগুলোর জীবন আজ সুতোর ওপর ঝুলছে। প্রতিদিন ভোরে তারা যখন নদীতে নামেন, জানেন না সন্ধ্যায় ঘরে ফিরবেন কি না। ওই ১৩ জন জেলে পরিবার এখন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের মধ্যে ১৭ বছরের কিশোর থেকে ৫৫ বছরের বৃদ্ধ আছেন। তাদের অপরাধ কি? নিজের জলসীমায় মাছ ধরতে চেয়েছিলেন।প্রতিবেশী দেশের সংঘাত আমাদের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আরাকান আর্মির উত্থান বা জান্তার পতন আমাদের হাতে নেই। কিন্তু আমাদের নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। সীমান্তের বেড়া যতই উঁচু হোক, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা না থাকলে তার কোনো মূল্য নেই। প্রতিটি নাগরিকের জীবনের দাম সমান হওয়া উচিত।শাহপরীর দ্বীপের ওই হাহাকার থামানো এখন সময়ের দাবি। নাফ নদীর ওপারে কারা শাসক, সেটা বড় কথা নয়। এপারে যারা আছেন, তারা বাংলাদেশি। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের নীতিনির্ধারকদের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে নাফ নদীর এই করুণ সুর একদিন বড় কোনো বিপদের সংকেত হয়ে দেখা দেবে। আমাদের জেলেরা মুক্তি পাক। সীমান্ত নিরাপদ হোক। নাফ নদীর জল আবার শান্তির বার্তাবাহক হোক।[লেখক: গণমাধ্যমকর্মী]

আইন জানার বিকল্প নেই

‘আইন না জানলে তার ক্ষমা নেই’—আইনের এ কথাটি বহুল প্রচলিত। এর অর্থ হলো, আইনের অজ্ঞতা ক্ষমার অযোগ্য; অর্থাৎ আইন না জানা কোনোভাবেই দায়মুক্তির কারণ হতে পারে না। রাষ্ট্র ধরে নেয়, তার দেশে বসবাসকারী সব নাগরিকই প্রচলিত আইন সম্পর্কে অবগত। তাই বাস্তবে কেউ কোনো আইন না জেনে তা লঙ্ঘন করলেও, পরে অনুতপ্ত হয়ে ‘আমি জানতাম না’—এমন অজুহাত দিলে তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। ফলে প্রচলিত আইন ভঙ্গের দায়ে শাস্তি পেতেই হয়। আইন না জানলে, আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নেয়া উচিত।বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়। একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তি সুধীর তির্কী এবং একজন মুসলিম ব্যক্তি মো. আব্দুর রহিম। সুধীর তির্কী গুরুতর অসুস্থ; তার চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করা প্রয়োজন। তিনি এক বিঘা (৩৩ শতক) জমি বিক্রি করতে ইচ্ছুক। এ খবর পেয়ে আব্দুর রহিম উপযুক্ত মূল্যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিলের মাধ্যমে সুধীর তির্কীর কাছ থেকে এক বিঘা জমি ক্রয় করেন। দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পর থেকে তিনি ওই জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন।কিছুদিন পর সুধীর তির্কী মৃত্যুবরণ করলে তার পুত্র নয়ন তির্কী ও নারায়ণ তির্কী আদালতে মামলা করেন। তাদের দাবি, আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জমি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারার বিধান অনুযায়ী সরকারের অনুমতি ছাড়া জমি বিক্রি করা যায় না। কিন্তু উক্ত দলিলে সরকারের অনুমতি নেয়া হয়নি। ওই ধারায় বলা আছে, আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জমি সরকারের অনুমতি ছাড়া হস্তান্তর করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে এবং এ ধরনের বাতিল দলিলের ক্ষেত্রে তামাদি প্রযোজ্য হয় না। অর্থাৎ, এ দলিলের কোনো আইনগত মূল্য নেই।এ অবস্থায় আব্দুর রহিম আদালতে জবাবে বলেন, এ ধরনের জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমতি লাগে—এ তথ্য তার জানা ছিল না। কিন্তু এমন যুক্তিতে তার দলিল বৈধ হবে না। কারণ, আইনের অজ্ঞতা কোনো অজুহাত নয়— তাই এ ধরনের যুক্তি আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় না।এ কারণেই জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অনেক দালাল ও প্রতারক সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। ফলে মামলা-মোকদ্দমায় পড়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হন। তাই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন।দৈনন্দিন জীবনের অনেক কাজেই আইনের বিধান জড়িত। সেগুলো সম্পর্কে সাধারণ ধারণা থাকলে নানা ঝামেলা ও ক্ষতি এড়ানো যায়। একটি প্রবাদ আছে—‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।’অনেকে মনে করেন, অজ্ঞতা ঝামেলা থেকে মুক্তির পথ। তারা বলেন, কিছু না জানলে দুশ্চিন্তাও থাকে না। এতে সাময়িকভাবে জীবন সহজ ও আনন্দময় মনে হতে পারে। কিন্তু অজ্ঞতার কোনো ভবিষ্যৎ নেই; বরং তা পরিণামে ক্ষতির কারণ হয়। সমাজে এমন অনেক উদাহরণ দেখা যায়—কেউ জমি-জমা অর্জন করেছেন ঠিকই, কিন্তু তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা সব হারিয়ে পথে বসেছেন।বাস্তবে অধিকাংশ ফৌজদারি মামলার বড় একটি অংশ জমি-সংক্রান্ত বিরোধ থেকে সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ইরি ও আমন ধান কাটার মৌসুমে জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জমি-জমার ক্ষেত্রে বৈধ কাগজপত্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে ভূমির প্রাণই হলো বৈধ দলিল। বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কোনো মামলায় জয়লাভ করা প্রায় অসম্ভব।জমি-সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা একবার শুরু হলে এর নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগে— কখনও কখনও প্রজন্ম পার হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মামলার খরচ জমির মূল্যের চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়ায়। জেদের বশে অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। এ প্রসঙ্গে শেক্সপিয়ারের একটি উক্তি স্মরণ করা যায়— ‘আইন মাকড়সার জালের মতো; এতে ছোটরা ধরা পড়ে, বড়রা বেরিয়ে যায়।’তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। আইনের অজ্ঞতা ক্ষমার অযোগ্য হলেও, তথ্যের অজ্ঞতা কখনও কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যেমন—গ্রামের অনেক মানুষ শহরের খবরাখবর রাখেন না। হঠাৎ কোনো এলাকায় অস্থিরতা দেখা দিলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু মাইকিংয়ের খবর না পেয়ে কেউ যদি সেখানে উপস্থিত হন, তাহলে তিনি তথ্যের অজ্ঞতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমা পেতে পারেন। সুতরাং, আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ৯৭ ধারার বিধান অনুযায়ী অনুমতি না নিলে, ওই হস্তান্তর ৯৭ (৭) ধারা অনুযায়ী বাতিল বলে গণ্য হবে এবং তা তামাদি দ্বারা বাধাগ্রস্ত হবে না।আইন জানা তাই কেবল প্রয়োজন নয়, অপরিহার্য।[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

ইউরোপ নামের স্বর্গ, সাগরের ভাসমান কবরখানা

সুনামগঞ্জে আকাশে আজ মেঘ নেই, তবু আলো কম। কারণ আলো সবসময় সূর্য থেকে আসে না—কখনও আসে মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা আশার আগুন থেকে। আর সেই আগুন যখন একে একে নিভে যায়, তখন পুরো জনপদ অন্ধকার হয়ে ওঠে। গত শুক্রবার, অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার পথে আফ্রিকার লিবিয়া উপকূলে ১৮টি বাংলাদেশি তরুণপ্রাণ সাগরে ভেসে গেছে—এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়; এটি এক জাতির দীর্ঘদিনের আত্মপ্রবন্ধনার নির্মম পুনরাবৃত্তি।আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করি, যেখানে বিদেশ শব্দটি একটি মন্ত্রের মতো কাজ করে। এ মন্ত্র উচ্চারণ করলেই যেন দারিদ্র্য পালিয়ে যায়, বেকারত্ব লজ্জা পায়, আর ভবিষ্যৎ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। গ্রামের কোনো তরুণ যদি ঘোষণা দেয়— সে ইউরোপ যাবে, তখন সে আর সাধারণ মানুষ থাকে না; সে হয়ে ওঠে পরিবারের গর্ব, পাড়ার স্বপ্ন, ভবিষ্যতের প্রতীক। অথচ সেই যাত্রার মানচিত্রে কোথাও লেখা থাকে না— শেষ ঠিকানা হতে পারে এমন এক সাগর, যেখানে কবরেরও নামফলক থাকে না।এই স্বপ্নের স্থপতিরা কবি নন, দার্শনিকও নন। তারা দালাল—সময়ের সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ী, যারা হতাশাকে পুঁজি করে স্বপ্নের প্যাকেজ বিক্রি করে। ১০-১২ লাখ টাকার বিনিময়ে তারা এমন এক ইউরোপ দেখায়, যেখানে রাস্তা সোনার, কাজ নিশ্চিত, আর জীবন অনন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের। কিন্তু সেই গল্পের শেষ পাতাটি তারা ছিঁড়ে ফেলে— যেখানে লেখা থাকে, এই যাত্রায় মৃত্যু খুবই সম্ভাব্য।দালালরা জানে, এই দেশের মানুষ বাস্তবতার চেয়ে স্বপ্নকে বেশি ভালোবাসে। তাই তারা বাস্তবতাকে আড়াল করে, স্বপ্নকে বাড়িয়ে তোলে। তারা জানে, একজন কৃষকের শেষ জমিটুকুও বিক্রি করানো যায়, যদি তাকে বিশ্বাস করানো যায়—তার ছেলে একদিন ইউরোপ থেকে টাকা পাঠাবে। সেই টাকায় ঘর উঠবে, সম্মান ফিরবে, জীবনের মান পাল্টাবে। কিন্তু তারা বলে না—কখনও কখনও সেই টাকার বদলে আসে একটি নির্লিপ্ত খবর: আপনার ছেলে আর নেই।সাগর এই কাহিনির সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে নির্মম সাক্ষী। সে কোনো ভাষণ দেয় না, কোনো প্রতিবাদও করে না। কিন্তু তার বুকে জমা থাকে হাজারো নামহীন কবর। ছোট ছোট নৌকা, মানুষের অতিরিক্ত বোঝা নিয়ে যখন তার বুক চিরে এগোয়, তখন সাগর বুঝে যায়—এটি ভ্রমণ নয়, এটি এক দীর্ঘ মৃত্যু-যাত্রা। অনাহারে, তৃষ্ণায়, আতঙ্কে মানুষগুলো একে একে নিভে যায়। তারপর তাদের দেহগুলো সাগরে নিক্ষেপ করা হয়— যেন তারা কখনও পৃথিবীর অংশই ছিল না।এই দৃশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালে ভূমধ্যসাগর এক বিশাল কবরস্থানে পরিণত হয়েছিল। হাজার হাজার অভিবাসী ইউরোপে যাওয়ার পথে প্রাণ হারিয়েছিল—বাংলাদেশিরাও ছিল সেই তালিকায়। ২০১৯ সালে লিবিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে বহু বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটে। এরপরও এই মৃত্যুর মিছিল থামেনি। ২০২৩, ২০২৪ সর্বশেষ ২০২৬ প্রতিটি বছরই যেন একই ট্র্যাজেডির নতুন সংস্করণ। চরিত্র বদলায়, কিন্তু কাহিনি একই থাকে—স্বপ্ন, প্রতারণা, মৃত্যু। প্রশ্ন জাগে—এই গল্প থামে না কেন?কারণ, এই গল্পের লেখক কেবল দালাল নয়— আমরা সবাই। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার—প্রত্যেকেই এই ট্র্যাজেডির সহ-লেখক। রাষ্ট্র আইন করে, কিন্তু আইনের ফাঁক দিয়ে দালালরা নতুন রাস্তা বানিয়ে ফেলে। সমাজ সফলতার গল্পকে এত বড় করে তোলে যে, ব্যর্থতার লাশগুলো সেখানে স্থান পায় না। পরিবার সন্তানের ভবিষ্যতের আশায় ঝুঁকি নেয়, কিন্তু সেই ঝুঁকির গভীরতা বুঝতে পারে না।আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত মানদণ্ড গড়ে উঠেছে—বিদেশে গেলে মানুষ সফল, দেশে থাকলে অযোগ্য। এই মানদণ্ডই তরুণদের ঠেলে দেয় অজানার দিকে। তারা বিশ্বাস করে—যেকোনো মূল্যে বিদেশ যেতে হবে। সেই মূল্য কখনও টাকা, কখনও জীবন।রাষ্ট্র এখানে প্রায়ই এক নীরব দর্শকের মতো আচরণ করে। তদন্ত হয়, মামলা হয়, গ্রেপ্তারও হয়—কিন্তু সময়ের সঙ্গে সবকিছু আবার থিতিয়ে যায়। যেন এই মৃত্যুগুলো আমাদের অভ্যাসের অংশ হয়ে গেছে। আমরা শোক জানাই, কিন্তু বদল চাই না; আমরা কান্না দেখি, কিন্তু কারণ অনুসন্ধান করি না।এই পুরো প্রক্রিয়াটি আসলে এক ধরনের মৃত্যুর অর্থনীতি—যেখানে বিনিয়োগ করে পরিবার, মুনাফা লুটে দালাল, আর ক্ষতির বোঝা বহন করে সমাজ। এখানে মানুষের জীবন একটি পণ্যে পরিণত হয়েছে, যার মূল্য নির্ধারিত হয় চাহিদা ও সরবরাহের সূত্রে।সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো—আমরা এই বাস্তবতার সঙ্গে আপস করে ফেলেছি। একটি নৌকাডুবির খবর এখন আর আমাদের নাড়া দেয় না; আমরা এটিকে একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিয়েছি। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, যখন মৃত্যু স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন জীবনের মর্যাদা হারিয়ে যায়।তবু পথ আছে—যদি আমরা সত্য বলার সাহস করি। আমাদের স্বীকার করতে হবে—ইউরোপ কোনো স্বর্গ নয়; এটি সংগ্রামের আরেক নাম। আমাদের দেখাতে হবে—এই যাত্রায় কতজন হারিয়ে গেছে। আমাদের বুঝতে হবে—দেশের ভেতরে সুযোগের অভাবই মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।দালালচক্র ভাঙতে হলে শুধু আইন নয়, সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি। পরিবারকে সচেতন করতে হবে, যাতে তারা অন্ধ বিশ্বাসে জীবন বাজি না রাখে। একই সঙ্গে বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের পথ প্রসারিত করতে হবে, যাতে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেতে বাধ্য না হয়।সবশেষে, আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। উন্নয়ন কি শুধুই পরিসংখ্যানের খেলা, যদি সেই উন্নয়ন তরুণদের দেশে রাখার মতো শক্তি না রাখে? সাফল্য কি সত্যিই সাফল্য, যদি তার মূল্য হয় একটি প্রাণ?সুনামগঞ্জের সেই ১৮ জন আর ফিরে আসবে না। তাদের নামে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে উঠবে না, ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম লেখা নাও থাকতে পারে। কিন্তু তাদের মৃত্যু একটি প্রশ্ন হয়ে বেঁচে থাকবে।সাগরের ঢেউ প্রতিদিন তীরে এসে আছড়ে পড়ে, আবার ফিরে যায়। কিন্তু কিছু ঢেউ আছে, যা ফিরে যায় না— সেগুলো হয়ে থাকে সতর্কবার্তা। এই ১৮টি প্রাণও তেমনই এক ঢেউ, যা বারবার আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। প্রশ্ন এখনও একটাই— আমরা কি জাগবো, নাকি আবারও নতুন কোনো নৌকার জন্য অপেক্ষা করবো, যেখানে স্বপ্ন আর মৃত্যু পাশাপাশি যাত্রা করবে? [লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

সিপাহী বিদ্রোহের ১৬৯ বছর

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য সিপাহী বিদ্রোহের ১৬৯ বছর পূর্ণ হয়েছে এবার। ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্রিটিশ ভারতের ব্যারাকপুরে সিপাহী বিপ্লব খ্যাত এ বিদ্রোহের শুরু। ফরাসী, পর্তুগিজদের সঙ্গে ইংরেজরাও ভারতবর্ষে চলে আসে ব্যবসা করার উদ্দেশে। প্রথমে ব্যবসা উদ্দেশ্য থাকলেও সময় পরিক্রমায় নানা চক্রান্ত ও কূটকৌশলের মাধ্যমে তারা ভারতের নিয়ন্ত্রণ হাতে সচেষ্ট হয়।১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজদ্দৌলাকে পরাজিত করার মাধ্যমে এ দেশে তাদের ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে মির কাসিমের পরাজয়ের পরে সমগ্র ভারতবর্ষ চলে যায় তাদের নিয়ন্ত্রণে। পলাশী যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হাতে পায়, তা কাজে লাগিয়ে সারা ভারতবর্ষে শোষণ ও নির্যাতন চালাতে থাকে।বাংলার স্বাধীনচেতা জনগণ কখনো পরাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। এ কারণে ১৯ শতকের মাঝ পর্যন্ত ছোট বড় বহু আন্দোলন, আক্রমণ, যুদ্ধ, বিদ্রোহ বা অভ্যূত্থানের মধ্যে দিয়ে বিদ্রোহের ধারা অব্যাহত থেকেছে। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার যুদ্ধ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। ১৮৩১ সালে ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থায় তিতুমীর শহীদ যান।ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ ওঠে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সর্বাগ্রে চলে আসে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের কথা। অনেকেই এটাকে বলেছেন ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ, মহাবিদ্রোহ, আবার কারো কাছে এটি ছিল গণঅভ্যুত্থান। ইংরেজ শাসনামলে ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো সিপাহী বিদ্রোহ। ১৮৫৭ সালে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ ছিল এটি। এই বিদ্রোহের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করা।সিপাহী বিদ্রোহের শুরু১৮৫৭ সালের ১০ মে মিরাট শহরে শুরু হওয়া ইংরেজ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সিপাহীদের সঙ্গে যে যুদ্ধে সংঘটিত হয় তাই সিপাহী বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ১৮৫৭ সালে উত্তর ও মধ্য ভারতে যে বিরাট গণবিদ্রোহ সংঘটিত হয় তা ব্রিটিশ শাসনকে প্রায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কোম্পানির সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়ে তা ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।বাংলায় শুরু হয়ে ইংরেজ অধিকৃত ভারতের অন্য এলাকার সিপাহীদের মধ্যেও এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিম বাংলার ব্যারাকপুরে সিপাহী ‘মঙ্গল পাণ্ডের’ নেতৃত্বে প্রথম বিদ্রোহ শুরু হয়। প্রায় এক বছর ধরে অগণিত কৃষক, শিল্পী, সৈন্য ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী বীরত্বের সঙ্গে সংগ্রাম চালিয়ে যায়। তাদের সাহসিকতা ও আত্মবিসর্জন ভারতবাসীর ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।ইংরেজরা এই বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করে। নিরপরাধ বহুজনকে এ সময় নির্বিচারে ফাঁসি দেয়া হয়। ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে সে সময় বাংলার বিদ্রোহী সিপাহীদের ফাঁসি দেয়া হয়। বিদ্রোহীরা পরাজিত হলেও এই বিদ্রোহের ফলেই কোম্পানির শাসনের অবসান হয়। শুরু হয় ব্রিটিশরাজ তথা রানী ভিক্টোরিয়ার শাসন।ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন২৯ মার্চ, ১৮৫৭ রোববার বিকেল বেলা। ব্রিটিশদের জন্যে দিনটি ছিল ছুটির দিন। তারা বিশ্রাম নিচ্ছিল যার যার গৃহে। ব্যারাকপুরের প্যারেড ময়দানে অসময়ে মানুষদের ভিড় বাড়ছিল। ধীরে ধীরে প্যারেড গ্রাউন্ডে জড়ো হতে থাকে বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। পঞ্চম ব্যাটালিয়ন বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য মঙ্গল পাণ্ডে ঘুরছিলেন ব্যারাকপুর প্যারেড গ্রাউন্ডের আশপাশেই। চাপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল চারদিকে, কী হচ্ছে তা তখনো কেউ জানে না, তবে এটুকু জানে যে কিছু একটা ঘটছে। সিপাহীদের মধ্যে কেউ আসছে খালি হাতে, কেউ বন্দুক নিয়ে। সৈনিকদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছিল। কেউ জানেনা কি ঘটতে চলেছে তবে এটুকু জানে যে রচিত হবে এক মহান ইতিহাস।কেউ একজন এগিয়ে এসে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিবে, সবাই এই অপেক্ষা করছে। ফলাফল যদি আশানুরূপ না হয় তাহলে পরিনাম ভয়াবহ হবে, এ কারণে কেউ এগিয়ে আসার সাহস করতে পারছে না!সিপাহী বিদ্রোহ কেন হয়েছিল?খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রকাশ্যে ধর্মপ্রচার, হিন্দু-মুসলিমদের জোড় করে খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা, মসজিদ ও মন্দিরের জমির ওপর কর আরোপ এসব মিলিয়ে জনগণ বিক্ষুদ্ধ হতে থাকে। এরূপ নানা কারণে ১৮৫৭ সালের বহু আগে থেকেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সামরিক কারণে সিপাহীদের ক্ষোভ জমা হচ্ছিল।সামরিক বৈষম্য সিপাহী বিপ্লবের উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল। ইংরেজ সামরিক অফিসার ও সিপাহীদের তুলনায় দেশীয় সিপাহী ও অফিসারদের বেতন ছিল কম। তাছাড়া ইংরেজ সামরিক অফিসাররা দেশীয় সামরিক অফিসারও সিপাহীদের খুব বিশ্রি ভাষায় গালিগালাজ করত। বৃটিশ সরকার ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫০০ জন ভারতীয় সৈন্যের জন্য বার্ষিক ৯৮ লাখ পাউন্ড ব্যয় করতো এবং অন্যদিকে ৫১ হাজার ৩১৬ ইংরেজ সৈনিকের জন্য ৫৬ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড ব্যয় করতো। যা ছিল ভারতীয় সিপাহীদের জন্য চরম বৈষম্য।সেনাবিভাগে ব্রিটিশ ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে বেতন, পদোন্নতি, বদলি ইত্যাদির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণ ভারতের সৈন্যদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। সিন্ধু ও আফগানিস্তানে নিযুক্ত সেনাদলকে বিশেষ ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও ভারতীয় সেনাদের তা থেকে বঞ্চিত করা হয়। তাদের ধর্ম বিশ্বাসকে মর্যাদা না দিয়ে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের যত্রতত্র বদলির ব্যবস্থা করেন। জাত ও ধর্ম হারাবার ভয়ে সিপাহীগণ কালাপানি পার হয়ে ব্রহ্মদেশ বা অন্যত্র যেতে অনাগ্রহী হয়।সিপাহিদের ক্ষোভ যখন ক্রমশ পূঞ্জীভূত হচ্ছিল ঠিক সেই সময়ে এনফিল্ড রাইফেল নামে এক নতুন ধরনের রাইফেলের প্রবর্তন তাদের ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়। এনফিল্ড রাইফেলে যে কার্তুজ ব্যবহার করা হত, তার খোলসটি দাঁতে কেটে রাইফেলে ভরতে হতো। গুজব রটে যায় যে, এই কার্তুজে গরু ও শুয়োরের চর্বি মেশানো আছে। ধর্মচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় কোম্পানির সেনাবাহিনীর হিন্দু ও মুসলমান সিপাহীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং এই টোটা ব্যবহার করতে অস্বীকার করে ।এনফিল্ড রাইফেলকে প্রত্যক্ষ ধরা হলে, এটি কিন্ত মূল কারণ নয়। কারণ সরকার সিপাহীদের সামনে এই টোটা নষ্ট করা হলেও তাদের অসন্তোষ স্থিমিত হয় নি। কারণ এই বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণ তথা সিপাহীদের তীব্র অসন্তোষ। পরবর্তীকালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিপাহীরা চর্বি মাখানো এই টোটাই ব্যবহার করেছিল। সিপাহী বিদ্রোহ একদিনে জন্ম নেয়নি বরং এটি ছিল বহুদিনের তিলে তিলে সঞ্চিত প্রস্তুতির ফল।১৮৫৭ সালে কলকাতার ব্যারাকপুরে মঙ্গল পান্ডের বিদ্রোহের দ্বারা শুরু হওয়া সিপাহী বিদ্রোহ পরবর্তিতে মহাবিদ্রোহে রূপ নেয়। ইংরেজ সরকার এই বিদ্রোহকে কঠোর হস্তে দমন করলেও এর মাধ্যমে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হয়। দীর্ঘ ১০০ বছর অত্যাচার, লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের পরে এ মহাবিদ্রোহ ছিল একটি জলোচ্ছ্বাসের মতো। এটাকে অনেকে আবেগের সঙ্গে পলাশীর প্রতিশোধও বলে থাকেন।প্রথমদিকে অনেকটা বিজয়ী হয়েও, শেষে পরাজয় বরণ করেছিলেন। পরাজয় সত্ত্বেও ভারতবর্ষের সিপাহী ও জনগণের এই যে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ তা পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রেরণা যুগিয়েছে। পাশাপাশি বৃটিশ শাসকদের নৃশংস বর্বরতার চিত্রও তুলে ধরেছে। [লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]

জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে প্রযুক্তির গুরুত্ব ও চ্যালেঞ্জ

মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে প্রযুক্তি অপরিহার্য। প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার পাশাপাশি বিশ্বকে একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত করেছে। এরই ফলশ্রুতিতে এখন যেখানে তথ্য ও সেবা বিশ্ববাসীর হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। যা দৈনন্দিন কাজ সহজ, দ্রুত ও আরামদায়ক করে তুলেছে। এর পাশাপাশি ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, উন্নত চিকিৎসা, অনলাইন ব্যাংকিং, এবং শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার যোগাযোগ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করেছে। প্রতিনিয়ত এই প্রযুক্তির ব্যবহার স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত ও বিনোদনের মতো খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে জীবনকে নিরাপদ ও আরও উন্নত করতে বড় ভূমিকা রাখছে। বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি খাতে বিপ্লব চলছে। মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তির ছোঁয়া পৌঁছে গেছে। তাই একবিংশ শতাব্দীতে জাতীয় জীবনের উন্নয়নের জন্য পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আমাদের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন। এদিকে ইন্টারনেট অব থিংস, রোবোটিকস, ক্লাউড কম্পিউটিং, মেশিন লার্নিং, ব্লকচেইন প্রযুক্তি, সেন্সর, অটোমেশন, থ্রিডি প্রিন্টিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, জিন ও প্রকৌশল প্রযুক্তির সমন্বয়ে আজকের বিশ্বে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। তবে একই সাথে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, কর্মসংস্থান হ্রাস, গোপনীয়তা লঙ্ঘন, এবং ডিজিটাল বিভাজন বা বৈষম্যের মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলোও তৈরি হয়েছে, যা মোকাবিলা করাই বর্তমানের প্রধান লক্ষ্য। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় দক্ষ কর্মী তৈরি, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা নীতি, এবং উদ্ভাবনের সাথে সাথে নৈতিক ব্যবহারের নিশ্চিতকরণ অপরিহার্য। ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে এনে সাধারণ মানুষের তথ্য ও সেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রযুক্তি ব্যবহার এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক উন্নয়নে পিছিয়ে পরা দেশগুলোকে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে এগিয়ে নেয়া সম্ভব। এদিকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হলে দারিদ্র্য দূরীকরণের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। তাই বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আজকের তথ্য শক্তিই আগামীর পৃথিবীর চালিকাশক্তি। বর্তমান আধুনিক যুগে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার স্বার্থে তথ্যের প্রয়োজন। এই কথাটি এখন স্পষ্ট যে যার নিকট যত বেশি তথ্য রয়েছে সে তত বেশি শক্তিশালী। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পৃথিবীর দরিদ্র জনগোষ্টির জন্য খুলে দিয়েছে অপার সম্ভাবনার দুয়ার। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কৃষি বিপ্লব, শিল্প বিপ্লবের পর বর্তমান পৃথিবী নতুনতর এক বিপ্লবের মুখোমুখি হতে চলেছে যার নাম তথ্য বিপ্লব। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের জীবন হয়েছে এখন অনেক সহজ, সরল এবং স্বাচ্ছন্দ্যময়। ঘরে বসে বিশ্ব ভ্রমণ, মার্কেটিং, ব্যাংকিং বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস কিংবা ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে ঘোরাঘুরি করা এখন একেবারে সহজ। তাইতো এখন মানুষের এমন কোন কাজ নেই যেখানে প্রযুক্তির ছোয়া লাগেনি। বিশ্বের দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিহার্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগই একটি দেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে। তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যদি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা যায়, তবে দারিদ্র্য ও বেকারত্বকে বিদায় দেয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে। এজন্য আমাদের লক্ষ্য হতে হবে প্রযুক্তিবান্ধব একটি সমাজ গঠন করা, যেখানে মেধা ও সুযোগের সঠিক সমন্বয় ঘটবে। প্রযুক্তির উন্নয়ন মানে একটি দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন। এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। প্রযুক্তি মানুষকে যোগায় জীবন সহায়ক ব্যবস্থা বা লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, যে কারণে মানুষ পৃথিবীতে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়ার শক্তি অর্জন করে। আর এভাবেই প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি হয়ে উঠছে মানুষের প্রতিদিনের সঙ্গী।[লেখক: নেটওয়ার্ক টেকনিশিয়ান (আইসিটি সেল), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

ভিডিও

নানান জটিলতা পেরিয়ে বিশ্বকাপে ইরাক

বেশ জটিল সময় পার করছে ইরাক। একদিকে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অন্যদিকে ভঙ্গুর অর্থনীতি। তবে সকল বাধা পেরিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছর পর ফিফা বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে দেশটি।মেক্সিকোর মন্টেরেতে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফের ফাইনালে ইরাক ২-১ গোলে হারায় লাতিন দেশ বলিভিয়াকে। এর আগে গত কয়েক দশক ধরে যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় নাজুক পরিস্থিতি ছিল দেশটিতে।এদিকে, চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে শেষ পর্যন্ত  গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলতে দলটি আদৌ ভেন্যুতে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়েও ছিল সংশয়। দলীয় কর্মকর্তারা ফিফার কাছে ম্যাচটি পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, তবে তা প্রত্যাখ্যাত হয়।তবে, সব সংশয় কাটিয়ে অবশেষে খেলছে ইরাক।জানা যায়, জর্ডান থেকে পর্তুগালের লিসবন হয়ে মেক্সিকোর মন্টেরেতে পৌঁছায় ইরাক ফুটবল দল। এ ছাড়া তাদের অস্ট্রেলিয়ান কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড নিজেও ভোগান্তিতে পড়েন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ শহরে তিনি আটকে পড়ার কয়েকদিন পরে দুবাই হয়ে যোগ দেন মেক্সিকোয় থাকা দলের সঙ্গে। কোচের বিলম্বের কারণে হিউস্টনে নির্ধারিত অনুশীলন ক্যাম্পও বাতিল করতে হয়।এর বাইরে ইরাকে মেক্সিকোর দূতাবাস না থাকায় ফুটবলারদের ভিসা পাওয়াও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে সৌদি আরব ও কাতারে অবস্থিত মেক্সিকান দূতাবাসের মাধ্যমে তাদের ভ্রমণ নথি সংগ্রহ করতে হয়। এসব ভোগান্তি অবশ্য স্মরণ করতে চাইলেন না ইরাকের কোচ আর্নল্ড, ‘পরিস্থিতি খুবই কঠিন ছিল। আমি চাই না এসব নিয়ে বেশি কথা বলতে। আমি চেষ্টা করেছি খেলোয়াড়দের মন থেকে এসব চাপ দূর রাখতে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যে অনেক কিছুই ঘটছে।’ তবে চেক ক্লাব ভিক্টোরিয়া প্লজেনের হয়ে খেলা ইরাকের ডিফেন্ডার মেরচাস দোস্কি জানান, ‘আমি ইউরোপ থেকে সরাসরি মন্টেরেতে এসেছি, কিন্তু স্থানীয় লিগে খেলা অন্যদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।’এশিয়ান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাই থেকে সরাসরি বিশ্বকাপে ওঠার সুযোগ হাতছাড়া করেছিল ইরাক। তবে প্লে-অফ নিশ্চিত করেই উৎসবে মাতে দেশটি। সেই সময় বাগদাদে মানুষের উদযাপন দেখে অবাক হয়েছিলেন কোচ আর্নল্ড, কারণ তিনি জানতেই তাদের সামনে প্লে-অফ ফাইনালের মতো বড় ম্যাচ বাকি। বিশ্বকাপ নিশ্চিতের পর ইরাকের খেলোয়াড়রা কোচ আর্নল্ডকে কাঁধে তুলে নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন, তার গায়ে জড়ানো ছিল ইরাকের পতাকা। পুরো কৃতিত্ব শিষ্যদের দিয়েছেন আর্নল্ড, ‘এই জয়ের কৃতিত্ব খেলোয়াড়দের। তাদের পরিশ্রম, লড়াইয়ের মানসিকতা এবং আত্মত্যাগই আমাদের জিতিয়েছে। আমি খুবই আনন্দিত যে আমরা ৪ কোটি ৬০ লাখ মানুষকে খুশি করতে পেরেছি, বিশেষ করে এই কঠিন সময়ে।’বিশ্বকাপের খেলার স্বপ্ন সত্যি করার পথে মাঠের লড়াইয়েও ইরাককে দীর্ঘ ও কঠিন বাছাইপর্ব অতিক্রম করতে হয়েছে। চারটি ধাপে মোট ২১টি ম্যাচ খেলে তারা প্লে-অফে পৌঁছায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুই লেগের এশিয়ান প্লে-অফ খেলতে হয় ইরাককে। প্রথম লেগে আবুধাবিতে ১-১ ড্র করার পর বসরায় দ্বিতীয় লেগে অতিরিক্ত সময়ের ১৭তম মিনিটে আমির আল-আম্মারির পেনাল্টিতে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় তারা। এদিকে, ইরাকের একমাত্র পূর্ববর্তী বিশ্বকাপ অংশগ্রহণও ছিল ১৯৮৬ সালে, সেটিও হয়েছিল মেক্সিকোতে। এবারও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার পাশাপাশি ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক মেক্সিকো।আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বিশ্বকাপ চলবে উত্তর আমেরিকায়। ইরাক টুর্নামেন্টের মূলপর্বে উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের গ্রুপিং ও খেলার সূচিও নিশ্চিত হয়ে গেছে। ‘আই’ গ্রুপে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স ছাড়াও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নরওয়ে ও সেনেগাল। ১৬ জুন ফক্সবোরোতে ইরাক প্রথম ম্যাচ খেলবে নরওয়ের সঙ্গে।নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪০৫টি উৎপাদনকারী, ৯৮টি সেবাদানকারী, ৬৫টি খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা এবং ৩২টি আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।এনবিআর আশা করছে, স্বয়ংক্রিয় এ পদ্ধতি চালুর ফলে ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা বাড়বে। একই সঙ্গে করদাতাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধও জোরদার হবে।সূত্র-বাসস

নানান জটিলতা পেরিয়ে বিশ্বকাপে ইরাক
২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৮ এএম
স্কুল-কলেজে সপ্তাহের তিন দিন অনলাইনে ক্লাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সরকারের এ উদ্যোগে কি জ্বালানি সশ্রয় হবে? আপনি কী মনে করছেন?

স্কুল-কলেজে সপ্তাহের তিন দিন অনলাইনে ক্লাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সরকারের এ উদ্যোগে কি জ্বালানি সশ্রয় হবে? আপনি কী মনে করছেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ জন