সংবাদ
তুরাগে সাত লাশ ভাসার খবর ভিত্তিহীন: পুলিশ

তুরাগে সাত লাশ ভাসার খবর ভিত্তিহীন: পুলিশ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তুরাগ নদীতে ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর লাশ ভাসছে’ শিরোনামে প্রচারিত তথ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।শনিবার (২৭ জুন) এক বিবৃতিতে পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, এ ধরনের কোনো ঘটনার তথ্য বা অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আসেনি। জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্যে একটি মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে।বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ক্ষুণ্ণ করার অপচেষ্টা চলছে। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানায় পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে বা গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো তৎপর রয়েছে।এ ধরনের অপপ্রচারে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বিবৃতি উল্লেখ করা হয়েছে।
১ ঘন্টা আগে

বিশ্বকাপ সময়সূচি: দেখতে ক্লিক করুন

মতামতমতামত

বার্ধক্যের নতুন বাস্তবতা

সত্তরোর্ধ্ব নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের পর সবাই হতবাক। ঘরভর্তি আবর্জনা, স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে ছত্রাক, ছোট খাটে পড়ে ছিল অর্ধগলিত দেহ। কবে মারা গেছেন কেউ জানে না, সন্তানরাও না। রান্নাঘর দেখে বোঝা যায় বছর ধরে চুলা জ্বলেনি। এই নোংরা পরিবেশই বলে দেয় কতটা অবহেলায় ছিলেন তিনি। বৃদ্ধার এক ছেলে যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক। মেয়ে স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক। মায়ের সঙ্গে মেয়েই থাকতেন। সাড়া না পেয়ে মেয়ে ক্লিনিক থেকে নার্স ডাকেন, নার্সই পুলিশে খবর দেয়। সুস্থ মানুষ এমন পরিবেশে থাকতে পারেন না। মেয়ের মানসিক অসুস্থতা না থাকলে মায়ের লাশের গন্ধও তিনি টের পেতেন।বাংলাদেশে সাধারণত সন্তানই মা-বাবাকে দেখে। তবুও ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন হয়েছে। সেখানে সামর্থ্যবান সন্তানকে বাবা-মায়ের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, সঙ্গ ও সেবা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। আইন ভাঙলে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মুম্বাইয়ে আমেরিকা প্রবাসী ছেলেকে মা অনুরোধ করেছিলেন আমেরিকায় নিতে অথবা বৃদ্ধাশ্রমে রাখতে। ছেলে সময় পায়নি। কোটি টাকার ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় কঙ্কাল। আজ মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের সন্তানেরা উচ্চশিক্ষা ও অভিবাসনের জন্য বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। দেশের ভেতরেও স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চাকরি করেন। ফলে মা-বাবা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। গৃহকর্মীর কাছে বৃদ্ধ মা-বাবাকে রেখে যাওয়া সবসময় নিরাপদ নয়। সামাজিক মাধ্যমে দেখা গেছে, বিছানায় প্রসাব করার অপরাধে গৃহকর্মী বৃদ্ধাকে চড় মারছে। তবু সমাজের ভয়ে আমরা ঘরেই রাখি, কারণ ধর্মীয় মূল্যবোধে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো পাপ মনে করি।অথচ বহু সন্তান চাইলেও দায়িত্ব নিতে পারে না। নিজের খাবার জোগাড় করতে না পেরে কেউ ছিনতাই করে, কেউ চুরি করে, কেউ দেহ বিক্রি করে। কখন জেলে যায় বা হাসপাতালে পড়ে থাকে মা-বাবাও জানেন না। দিনরাত খেটেও স্ত্রী-সন্তানের মুখে ভাত তুলে দিতে না পারলে বৃদ্ধ মা-বাবার গুরুত্ব কমে যায়। অনেক পরিবারে প্রতিবন্ধী বা দুরারোগ্য সন্তান আছে, যারা আজীবন অন্যের ওপর নির্ভরশীল। যেসব পরিবারে শুধু মেয়ে, সেখানে বিবাহিত মেয়ের পক্ষে মা-বাবাকে সেবা দেয়া কঠিন। আবার অসংখ্য প্রবীণের সন্তান নেই, আত্মীয় নেই। সম্পদ না থাকলে ভাড়া করা লোক রাখাও সম্ভব নয়। এরাই রাস্তায় ভিক্ষা করে, স্টেশন বা ফুটপাতে ঘুমায়, পুলিশের লাঠি খায়। তাই সব মা-বাবা সন্তানের নির্যাতনে ঘর ছাড়েন, এই কথা সত্য নয়।দেশে এখনো দশ শতাংশ মানুষ চরম দরিদ্র। বসতি নেই, বস্ত্র নেই, চিকিৎসা নেই, খাবারের নিশ্চয়তা নেই। ত্রিশ শতাংশ মানুষের তিন বেলা ভাত জোটে না। অর্থনীতি যতই বাড়ক, সবাইকে কাজ দেয়া কোনো সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কোটি মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনিতে এনে সহায়তা দেয়াও সম্ভব নয়। ফলে রোজগারের আশায় সন্তানেরা বৃদ্ধ মা-বাবাকে ফেলে বিদেশে যাচ্ছে। যাদের সে সামর্থ্য নেই তারা শহরে এসে ফুটপাতে কচু, লতি, পিঠা বিক্রি করছে। স্বল্প আয়ের এই মানুষগুলোর কাছ থেকেও পুলিশ আর মাস্তান চাঁদা নেয়। রাস্তায় প্রায়ই দেখা যায়, রোগে কাতর বা স্মৃতিভ্রষ্ট বৃদ্ধ নারী-পুরুষ ফুটপাতে পড়ে আছে। ফেইসবুকে পোস্ট দেয়া পথিকেরা তাদের ডিঙিয়ে চলে যায়। জীবিত না মৃত, খোঁজ নেয়ার তাগিদও থাকে না। ধর্মের দোহাই দিয়ে লাভ নেই। পুলিশ আর দারোয়ানের গুঁতা খাওয়া এই মানুষগুলোর কাছে ফুটপাতের চেয়ে বৃদ্ধাশ্রম স্বর্গ।নিঃস্ব বিধবা, নিঃসন্তান, বিপত্নীক বা অকৃতদার প্রবীণদের জন্য বৃদ্ধাশ্রমই উত্তম জায়গা। দেশের অধিকাংশ বৃদ্ধাশ্রম দুস্থ ও অসহায় প্রবীণের বিনা পয়সায় থাকা-খাওয়ার স্থান। সহায়-সম্বলহীন বয়োবৃদ্ধদের নিশ্চিত জীবনযাপনের একমাত্র আশ্রয় এটিই। মূল্যবোধ বদলাচ্ছে। বৃদ্ধাশ্রমে রাখা মানেই মা-বাবাকে ফেলে দেয়া নয়। প্রয়োজনের কাছে ধর্মের বাণীও অশ্রুত থাকছে। অভাবের তাড়নায় প্রবীণদের শ্রদ্ধা করার তাগিদও কাজে আসছে না।এখন ভালো বৃদ্ধাশ্রমকে কমিউনিটি লিভিং প্লেস বলা যায়। এখানে সমবয়সীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, ভাব বিনিময় হয়, যা অনেক সময় পরিবারেও মেলে না। চার হাজার বছর আগে চীনে অসহায় প্রবীণদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। সেই প্রয়োজন আজও ফুরায়নি, বরং বেড়েছে। পাশ্চাত্যে সাবালক সন্তানেরা আলাদা থাকে, মা-বাবাও তাদের জীবনে বাধা হতে চান না। অনেকে বৃদ্ধাশ্রমে নিজের জগৎ গড়ে নেন। সব বৃদ্ধাশ্রম বিনা খরচে নয়, কোথাও প্রচুর অর্থ লাগে। তবু মানুষ সঙ্গ পায়, গল্প করে, টেলিভিশন দেখে সময় কাটায়। প্রতি বছর দল বেঁধে দেশ-বিদেশে ঘুরতে যায়। নিজেরাই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। সেলিব্রিটিরা উপহার নিয়ে আসেন। সন্তানেরাও দেখতে যায়। তাই উন্নত বিশ্বে প্রবীণ নিবাস আরামদায়ক। বৃদ্ধাশ্রম মানেই এতিমখানা নয়, এটি নিঃসঙ্গতা কাটানোর উত্তম স্থান।আমাদের দেশেও বৃদ্ধাশ্রমের প্রতি আতঙ্ক কমছে। অনেক বৃদ্ধাশ্রমে এখন নিরাপত্তা, চিকিৎসা, বইপড়া, বিনোদন, ভ্রমণের সুবিধা আছে। ঘরে সন্তান বা আত্মীয়ের সান্নিধ্য না পেলে সমবয়সীদের সঙ্গে বৃদ্ধাশ্রমে থাকাই শ্রেয়। পাশ্চাত্যে যারা বৃদ্ধাশ্রমে যান না তারা নিঃসঙ্গতা কাটাতে কুকুর-বিড়াল পোষেন। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ ও দরিদ্র দেশ হওয়ায় প্রবীণদের সমস্যা ব্যাপক। সরকার বয়স্ক ভাতা চালু করলেও তা পর্যাপ্ত নয়। সরকারি-বেসরকারি বৃদ্ধাশ্রমও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। যে পরিবারে সন্তানের সামর্থ্য নেই, সেসব মা-বাবার ভরণপোষণ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেয়া উচিত। নচিকেতার গান শুনে যারা কেঁদেছেন, সামর্থ্যবানদেরও বৃদ্ধাশ্রম গড়ার শপথ নেয়া দরকার।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

তরুণ সমাজের চিন্তার মাধ্যমে দেশ গঠন সম্ভব

একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি সামাজিক পরিবর্তনের একটি প্রধান চালিকাশক্তি। মানুষ তাদের ˆদনন্দিন জীবনে সেই অগ্রগতির প্রভাব অনুভব করে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পারস্পরিক সম্পর্ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি দরিদ্র দেশ, তার পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেনো, সাধারণত যুদ্ধ বা সংঘাতের দ্বারা ব্যাহত না হলে এগিয়ে চলতে থাকে। নেতৃত্বের গুণমান এবং জনগণের সৃজনশীলতা ও পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে সেই অগ্রগতি ধীর বা দ্রুত হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিশ্বায়নের শক্তি। বাংলাদেশের ১৬০ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে সবসময় এমন স্বপ্নদ্রষ্টারা রয়েছেন, যারা নিজেদের জীবন এবং অন্যদের জীবন উন্নত করতে চান। এই সম্মিলিত শক্তিই ব্যাপক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির মধ্যেও দেশ ও অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। মানুষ গ্রাম, শহর এবং পল্লীসমাজ সবখানেই অগ্রগতির আদর্শ অনুসন্ধান করে। কিন্তু মৌলিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মানুষ প্রায়ই এক ধরনের উদাসীনতা প্রদর্শন করে। তবে আমি মনে করি, বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রে রূপান্তরমূলক পরিবর্তন নিয়ে বিদ্যমান নীরবতার পেছনে দু’টি কারণ রয়েছে। আমি মনে করি, একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে মৌলিক পরিবর্তন দুইভাবে ঘটতে পারে। প্রথমত, মানুষকে এই বিষয়ে আশ্বস্ত হতে হবে যে প্রতিশ্রুত পরিবর্তন বাস্তবেই ঘটবে এবং যারা সেই পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলছেন তারা বিশ্বাসযোগ্য। বিশ্বাস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এটি শুধু শিক্ষা ও দক্ষতার বিষয় নয়; বরং সততা, নৈতিকতা এবং সক্রিয় সম্পৃক্ততার সঙ্গেও সম্পর্কিত। মানুষ সাধারণত দেখতে চায় যে যারা পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছেন, তারা বৃহত্তর স্বার্থে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করেছেন, ঝুঁকি নিয়েছেন এবং অবিচল অঙ্গীকার প্রদর্শন করেছেন। দ্বিতীয়ত, পরিবর্তন ঘটতে পারে যদি দুঃশাসন নিজস্ব ভারেই ভেঙে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে একটি বড় সংকট সৃষ্টি হয় এবং লাখো সাধারণ মানুষ হঠাৎ করেই তাদের জীবিকা নিয়ে গুরুতর হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং অত্যন্ত অস্থির একটি দেশ শাসন করা সহজ নয়। এই কারণেই দীর্ঘমেয়াদি কর্তৃত্ববাদী শাসন শেষ পর্যন্ত টেকসই হয় না। কেউ কেউ এমন একটি পতনের অপেক্ষায় থাকতে পারেন। কিন্তু তার পরিণতি হতে পারে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য, যা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন সৃষ্টি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত, এমন একটি পরিবর্তনের সুফলও আবার ভিন্ন একটি অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে।স্বাধীনতার জন্য জনগণের নিজস্ব সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই। এমন সংগ্রাম দীর্ঘ, কঠিন এবং নানাবিধ বাধায় পরিপূর্ণ। দুর্ভাগ্যবশত, খুব কম মানুষই সেই পথে হাঁটতে ইচ্ছুক। যারা হাঁটেন, তারাই শ্রদ্ধার যোগ্য হয়ে ওঠেন। তারাই প্রকৃত নেতা হয়ে ওঠেন। তবে নেতৃত্ব নিজেই সামাজিক রূপান্তরের সমগ্র প্রক্রিয়ার কেবল একটি অংশ। একজন নেতার আবির্ভাব দীর্ঘ সময়ের পরীক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং ভুল-শুদ্ধির মধ্য দিয়ে ঘটে। বাংলাদেশে যারা বছরের পর বছর গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছেন যদিও অনেক সময় আপসও করেছেন তারা মূলত পূর্ববর্তী প্রজন্মের মানুষ। বর্তমান রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলো অনেক দিক থেকেই সেই আগের সংগ্রামের সুফলভোগী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সমকালীন নির্বাচনী গণতন্ত্রের ব্যবস্থা সেইসব সংগ্রামেরই ফল। দেশকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে বিকল্প নেতৃত্ব এবং একটি নতুন বয়ান নির্মাণ প্রয়োজন, যার কোনোটিই রাতারাতি সৃষ্টি হতে পারে না। একজন ব্যক্তি নিজের জীবনমান উন্নত করার জন্য জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় ব্যয় করতে পারেন। কিন্তু একটি সমাজের মূল্যবোধ পরিবর্তন করতে হলে শত শত, হাজার হাজার মানুষের শিক্ষা, অভ্যাস এবং আচরণ পরিবর্তন করতে হয়। এ কারণেই একটি সামাজিক ব্যবস্থা এক, দুই কিংবা দশ বছরের মধ্যে পরিবর্তিত হয় না। প্রজন্ম পেরিয়ে যায়। একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক রূপান্তর হলো শত শত ও হাজার হাজার সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘটিত অসংখ্য ক্ষুদ্র পরিবর্তনের সমষ্টি।এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের কেন্দ্রীয় বয়ানে পরিণত হয়েছিল, যা পরে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ নামে পুনঃব্র্যান্ডিং করা হয়। এটিকে উন্নয়নের প্রতীক, জনসেবা সম্প্রসারণের একটি পদ্ধতি এবং নাগরিক ক্ষমতায়নের একটি মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। আমাদের বলা হয়েছিল যে ডিজিটাল সংযোগ মানেই অগ্রগতি, মোবাইল ব্যাংকিং মানেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সিসিটিভি ক্যামেরা মানেই নিরাপত্তা এবং জাতীয় ডাটাবেস মানেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা। কিন্তু বাস্তবে এই কাঠামো ধীরে ধীরে এমন একটি নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার যন্ত্রে পরিণত হয়, যেখানে প্রযুক্তি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নয়, বরং নীরব আনুগত্য গড়ে তোলার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নয়, বরং প্রশ্নহীন আনুগত্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা জোরদার করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের রাষ্ট্র নির্মাণ কৌশলের একটি অংশ। এর মাধ্যমে প্রযুক্তিকে আধুনিকতার বাহ্যিক চিত্র তুলে ধরার জন্য ব্যবহার করা হলেও মানুষকে আরও গভীর অন্ধকারে রাখা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, যার মাধ্যমে সামান্য ভিন্নমতও কঠোরভাবে দমন করা হতো; বহু ক্ষেত্রে মানুষ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কারাবরণ, গুম এবং এমনকি মৃত্যুর শিকার হয়েছে।এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্প কার্যত এমন একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করেছে যারা তথ্য গ্রহণ করে, কিন্তু সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করে না। এই নাগরিকরা স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে, ফরম পূরণ করে এবং ক্যামেরার সামনে দাঁড়ায়, কিন্তু খুব কমই রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে। তারা সার্ভারের আপডেট নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে, কিন্তু গণতন্ত্রের ধারণা সম্পর্কেই উদাসীন থাকে। এই একমাত্রিক নীরবতার বিপরীতে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব একটি মোড় ঘোরানোর মুহূর্তের ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল রাজপথের একটি আন্দোলন ছিল না; বরং ডিজিটাল পরিসরেও একটি বিকল্প বয়ানের সূচনা করেছিল। ভিডিও, ইনফোগ্রাফিক, প্রামাণ্যচিত্র, অনুবাদ এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ চিন্তাশীল ডিজিটাল প্রতিরোধের নতুন রূপ নির্মাণ শুরু করে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে তথ্যপ্রযুক্তি কেবল রাষ্ট্রের নজরদারির বাহন হওয়ার প্রয়োজন নেই; এটি বিকল্প সংগঠন এবং সম্মিলিত কর্মকাণ্ডেরও একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। আন্তোনিও গ্রামশির ভাষায়, তারা ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’-এ পরিণত হয়েছে—এমন ব্যক্তি, যারা বিদ্যমান ব্যবস্থার ভাষা পুনরাবৃত্তি না করে, প্রতিরোধের নতুন বয়ান সৃষ্টি করতে সক্ষম।তরুণরা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে একটি স্মার্টফোন শুধু টিকটকের জন্য ব্যবহৃত একটি যন্ত্র নয়; এটি রাষ্ট্র সম্পর্কে চিন্তা করার একটি মোবাইল প্ল্যাটফর্মও হতে পারে। একটি ফেইসবুক পোস্ট একটি ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হতে পারে। একটি টেলিগ্রাম চ্যানেল বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। তাদের অনেকেই শুধু প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ নয়; নৈতিকভাবে দৃঢ় এবং রাজনৈতিকভাবেও সচেতন। এই অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে রাষ্ট্র সম্পর্কে একটি বিকল্প কল্পনার পথ উন্মুক্ত করে—যাকে আমরা বলি ক্রিটিক্যাল বাংলাদেশ: এমন একটি চিন্তাশীল, নৈতিক এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের কল্পনা, যা প্রচলিত উন্নয়নের মিথের বাইরে বিকল্প বাস্তবতা নির্মাণ করতে চায়। এটি কোনো সরকারি প্রকল্প নয়। এটি এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন, যা চিন্তাশীল, জবাবদিহিমূলক, নৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে মুক্ত। এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনার স্থান নয়, বরং বিতর্ক ও মতভেদের ক্ষেত্র। যেখানে গণমাধ্যম প্রচারণার যন্ত্র নয়, সত্য অনুসন্ধানের প্ল্যাটফর্ম। যেখানে তরুণরা কেবল ভোটার নয়, বরং ধারণা সৃষ্টির সহ-নির্মাতা।প্রযুক্তি নাগরিকদের সহযোগী হতে পারে, কিন্তু যখন এটি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা গণতন্ত্রের শত্রু হয়ে ওঠে। প্রশ্নহীন উন্নয়ন আধুনিক দাসত্বের এক ধরনের রূপ। মৌলিক প্রশ্ন হলো: আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই? এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে এক ক্লিকেই নাগরিকদের নীরব করে দেয়া যায়, নাকি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে একটি মাত্র প্রশ্নই পুরো ব্যবস্থাকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে পারে? বাংলাদেশের বহু তরুণ এখনও রাজনীতি থেকে দূরে রয়েছে, কারণ তাদের ˆশশব গড়ে উঠেছে ভয়, নজরদারি এবং প্রোপাগান্ডার মধ্যে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম তাদের সামনে এমন একটি আদর্শ উপস্থাপন করেছিল, যেখানে বিরোধিতা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহ, প্রশ্ন তোলা মানেই ষড়যন্ত্র, আর সমালোচনা মানেই বিদেশি স্বার্থের সেবা করা। সুতরাং, সমালোচনামূলক চিন্তা বনাম ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’—এটি এমন একটি নিয়ন্ত্রিত তথ্যব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল, যা বাহ্যিক আলোকচ্ছটায় উজ্জ্বল হলেও জ্ঞান ও সমালোচনামূলক চিন্তার অনুপস্থিতিতে অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। তবুও এখনও এমন তরুণ রয়েছে, যারা শুধু ডিজিটাল দক্ষতাই নয়, সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতাও অর্জন করছে। তারা জানে কীভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে হয়, সত্যতা যাচাই করতে হয় এবং নিজেদের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হয়। এই তরুণদের মাধ্যমেই একটি নতুন নাগরিক সমাজ গড়ে উঠতে পারে—যা শুধু কাগজে-কলমে নয়, বরং নৈতিক সাহস, বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে প্রযুক্তি বিচ্ছিন্নতার নয়, সংযোগের হাতিয়ার। যেখানে প্রতিটি মোবাইল ফোন শুধু সেলফি তোলার যন্ত্র নয়, বরং সত্যের সাক্ষী। এই অর্থে, ক্রিটিক্যাল বাংলাদেশ কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়; এটি সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পুনর্গঠনের একটি প্রকল্প। এটি মানুষকে রাষ্ট্রের বয়ানকে প্রশ্ন করতে, গণমাধ্যমের বার্তা যাচাই করতে এবং নিজেদের অবস্থান থেকে নতুন বয়ান নির্মাণ করতে আহ্বান জানায়—এমন বয়ান, যা প্রতিক্রিয়াশীল নয়; বরং মুক্তিকামী, ভবিষ্যতমুখী এবং সৃজনশীল।আমাদের যুব সমাজ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে একটি নতুন বাংলাদেশের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, এবং সেই আশার কেন্দ্রে রয়েছে এই বিপ্লবী চিন্তার প্রজন্ম। যদি রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব এই প্রজন্মের হাতে ন্যস্ত হয়, তবে উন্নয়ন হবে অংশগ্রহণমূলক, গণতন্ত্র প্রশ্ন করার সংস্কৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে এবং প্রযুক্তি স্বাধীনতার পথে পরিণত হবে। নতুন প্রজন্মের প্রতি একটাই আহ্বান: নীরব থেকো না। নীরবতা অন্যায়ের সঙ্গে এক ধরনের সহযোগিতা। প্রশ্ন করো—কারণ প্রশ্নহীন উন্নয়ন এক ধরনের নীরব মৃত্যু। আর সেই মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতা একমাত্র প্রশ্নেরই রয়েছে। কোনো পেশার প্রক...ত মর্যাদা তার সামাজিক ক্ষমতা বা প্রভাব দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় তার দায়বদ্ধতা, আত্মশুদ্ধির সক্ষমতা এবং জনগণের আস্থা অর্জনের ক্ষমতা দিয়ে। অপমানের ভাষা সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা কখনও সমস্যার সমাধান দেয় না। সমাধান আসে সংলাপ, আত্মসমালোচনা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকে। এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে কথায়, আচরণে এবং আত্মসমালোচনায়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

ব্ল্যাঙ্ক চেক বা সিকিউরিটি চেক কি গলার ফাঁস?

ব্যবসায়িক লেনদেন, ব্যাংক লোন কিংবা ব্যক্তিগত ধারদেনার ক্ষেত্রে ‘সিকিউরিটি চেক’ বা ব্ল্যাঙ্ক চেক’ দেয়ার প্রচলন আমাদের সমাজে বেশ পুরোনো। অনেকেই বিশ্বাসের খাতিরে শুধু একটা স্বাক্ষর করে ফাঁকা চেক অন্য পক্ষের হাতে তুলে দেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখন, যখন সেই বিশ্বাসের অপব্যবহার করে চেকে ইচ্ছামতো মোটা অঙ্কের টাকা ও তারিখ বসিয়ে আদালতে এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা ঠুকে দেয়া হয়।হঠাৎ এমন আইনি মারপ্যাঁচে পড়ে অনেকেই দিশেহারা হয়ে যান। কিন্তু আইন কাউকে অন্ধভাবে শাস্তি দেয় না। আপনার দেয়া চেকটি যদি সত্যিই কেবল ‘সিকিউরিটি’ বা ‘নিরাপত্তা স্মারক’ হিসেবে দেয়া হয়ে থাকে এবং সেখানে যদি জালিয়াতি করা হয়, তবে আদালতে মুখের কথায় নয়, আইনি ও ˆবজ্ঞানিক যুক্তিতে লড়াই করতে হবে।আদালতে আসামিপক্ষে লড়াই করার এবং খালাস পাওয়ার প্রধান ৫টি আইনি অস্ত্র নিচে আলোচনা করা হলো:১. চেকের ভিন্ন হাতের লেখা ও ভিন্ন কালি (ধারা ৮৭)একটি চেকের মূল চরিত্র হচ্ছে এর সত্যতা। হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ৮৭ ধারা অনুযায়ী, চেকে যদি ড্রয়ারের (চেক দাতা) সম্মতি ছাড়া কোনো মৌলিক পরিবর্তন করা হয়, তবে সেই চেকটি বাতিল বলে গণ্য হবে। আপনার স্বাক্ষর যদি সঠিকও হয়, কিন্তু চেকের ভেতরের তারিখ, টাকার অঙ্ক এবং নাম যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন হাতের লেখায় এবং ভিন্ন কালিতে লেখা হয়, তবে তা আদালতে বড় একটি ডিফেন্স। বাদীকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, এই ভিন্ন লেখার পেছনে চেক দাতার সম্মতি ছিল।২. স্বাক্ষর থাকলেই কি তা ‘ইস্যু করা চেক’?আমাদের দেশের উচ্চ আদালতের একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত রয়েছে এম.এ মজিদ বনাম মো. আব্দুল মোতালেব (৫৬ ডিএলআর, ৬৩৬) মামলায়। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট বলেছেন:‘আসামির স্বাক্ষর, টাকার অঙ্ক এবং পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখায় থাকলে এর ধারা ৩ (ন) অনুসারে উহাকে ‘ইস্যুয়েন্স অব চেক’ বলা যাইবে না।’ অর্থাৎ, আপনি শুধু স্বাক্ষর দিয়েছেন মানেই এই নয় যে আপনি পুরো চেকটি ওই টাকা বসিয়ে আইনসম্মতভাবে ইস্যু করেছেন।৩. প্রমাণের দায় কার? (৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭):সাম্প্রতিক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির হলো এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র (৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭) মামলা। এই সিদ্ধান্তে মহামান্য হাইকোর্ট আরও কঠোরভাবে বলেছেন যদি ড্রয়ার নিজে চেক সম্পূর্ণ পূরণ না করেন এবং হস্তাক্ষরে স্পষ্ট অসঙ্গতি থাকে, তবে বাদীকে (যিনি মামলা করেছেন) অবশ্যই আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে, অন্যের দ্বারা চেকটি পূরণের ক্ষেত্রে চেক দাতার স্পষ্ট অনুমতি বা সম্মতি ছিল। বাদী এই ব্যাখ্যার সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারলে মামলার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়।৪. ফরেনসিক পরীক্ষা: আসামির মৌলিক অধিকারঅনেকেই ভাবেন, চেকে স্বাক্ষর যখন মিলে গেছে, তখন আর বাঁচার উপায় নেই। এটি ভুল ধারণা। সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী, চেকের লেখার বয়স এবং কালির ভিন্নতা পরীক্ষার জন্য সরকারি ফরেনসিক ল্যাবে (যেমন সিআইডি বা পিবিআই-এর হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞ) চেকটি পাঠানোর আবেদন করা আসামির আইনগত অধিকার।ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের দু’টি বিখ্যাত সিদ্ধান্তত্ম কল্যাণী ভাস্কর বনাম এম.এস. সম্পূর্ণম (২০০৭) এবং টি. নাগাপ্পা (২০০৮) মামলায় বলা হয়েছে, আইনে বাদীর পক্ষে প্রাথমিক অনুমানের সুযোগ থাকলেও, আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ বা ন্যায়বিচারের অধিকার কেড়ে নেয়া যাবে না। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যদি প্রমাণ হয় যে স্বাক্ষরটি ৫ বছর আগের আর ভেতরের লেখাগুলো ২ মাস আগের তবে জালিয়াতি সহজেই ধরা পড়বে।৫. সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার অপরাধ নয়মহামান্য আপিল বিভাগের একটি লিডিং জাজমেন্ট হলো হুমায়ুন রশিদ বনাম শাহিন আকন্দ (৭১ ডিএলআর (এডি))। এই মামলার মূল নীতি হলো কোনো ব্ল্যাঙ্ক চেক যদি শুধুমাত্র সিকিউরিটি বা জামানত হিসেবে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে পাওনাদার যদি নিজের ইচ্ছামতো বড় অঙ্ক বসিয়ে তার অপব্যবহার করে মামলা করে, তবে এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার অধীনে কোনো অপরাধ গঠিত হয় না।শেষ কথাআইন সচেতনতাই আইনি ফাঁদ থেকে বাঁচার প্রধান উপায়। কারো বিরুদ্ধে সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার করে মিথ্যা মামলা হলে, ভয় না পেয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে শুরুতেই চেকটি ফরেনসিক পরীক্ষার আবেদন করা উচিত এবং উচ্চ আদালতের এই চমৎকার নজিরগুলো যুক্তিতর্কের সময় উপস্থাপন করা উচিত। আইন যেমন অপরাধীকে সাজা দেয়, তেমনি কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যাতে জালিয়াতির শিকার না হন, তার সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।সতর্কতা: যেকোনো আইনি লেনদেনে ব্ল্যাঙ্ক চেক দেয়া থেকে বিরত থাকুন। যদি দিতেই হয়, তবে চেকে ‘সিকিউরিটি চেক’ লিখে দিন এবং কোনো চুক্তির অধীনে দিচ্ছেন তা লিখিত আকারে রাখুন।[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

রম্যগদ্য: ফ্যাসিস্ট খ্যাদাইলাম, ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম

“হি হি হি, আনন্দের আর সীমা নাই, দারুণ কোইছেন, “ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যাদাইলাম, ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম”। “ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যেদাইলাম, হেইডা তো, সিম্পেল, বুইজাইলচ্চি, কিন্তু ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম, এইডার মাজেজাটাতো ঠিক বুজা পারতাছিনা?”“ওম্মা, কচি খোকা! এই সামান্য জিনিসটা তুমি বুঝতে পারছো না! কথাটাতো একদম জলবৎ তরলং, ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যাদাইলাম, ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম। একজনকে তাড়ালাম আর একজনের ভয়ে পালালাম।”“একজনরে খ্যাদাইলেন, বুঝলাম, আর একজনের ভয়ে পলাইলেন? কিন্তু কখন পলাইলেন কার ভয়ে পলাইলেন, তার নাম কিতা? কিছুইতো বুজা পারতাছিনা?”“ওই জঙ্গল, ভাশুরের নাম কি মুখে নেয়া যায়?”“না, কহোনই না। ভাশুর তো শশুরেরই রিডিউস ফুটোকপি, হ্যার নাম মুখে ক্যান, স্বপ্নেও দ্যেহন যাইবো না। বুজছোইন!”“জ্বী, আমি ঠিকই বুঝেছি, তাই যার ভয়ে পালালাম তার নাম মুখে নিচ্ছিনা, আর প্রিন্ট মাধ্যমেও প্রকাশ করছি না।”“তয় আপনে যে এ্যতো ফুটানি মারতাছেন, ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যাদাইলাম, জনগনের সার্পুট না পাইলে, ফ্যাসিস্ট সরকাররে খ্যেদাইতে পারতেন?”“তুই কি, আজকাল ইউটিউব দ্যেখা ছেড়ে দিয়েছিস, ইউটিউবে দেখিসনি সবাই ক্যেমন গাল ফুলিয়ে বলছেন, যে আমরা জুলাইয়ের পুরো আন্দোলন পরিচালনা করেছি। আমাদের নাম প্রকাশ পেলে, জনগনের সাপোর্ট পাবনা বলেই আমাদের নাম প্রকাশ করিনি। আর জনগনও আমাদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে সংগ্রামকে বেগবান করে সহজেই সাম্রাজ্যবাদ কায়েম করলাম।”“কিন্তু আপনে তো, দেড় হাজার জীবন বলি দিয়া, এক ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যেদাইয়া আর এক ইউনুস ফ্যাসিস্ট সরকার আইন্না বসাইলেন। লাভটা কি হোইলো!’“অ্যাঁএ, ড. ইউনূস, ফ্যাসিস্ট! তুই ফ্যাসিস্টের মানে বোজো? ফ্যাসিস্ট হোইলো গোঁড়া জাতীয়তাবাদ, এক ব্যাক্তির ইচ্ছার ওপর দেশ চলবে। বিরোধী দলকে দমন, পীড়ন, মারণ, গুম-হত্যা, সেভেন মার্ডার, ব্যাক্তির কোনোই ইচ্ছা থাকবে না, গোষ্টির মতো চলতে হবে। যেটা বিগত কালে তোরা বাংলার বুকে দেখেছিস।”“ক্যা ইউনূসের সময় আপনে গুম-খুন করেন নাই?”“আরে ভাই ওই সময় গুমের কোনোই ইতিহাস নেই। আরে ব্যাটা বিশ্ব ইতিহাসে ফ্যাসিস্ট হচ্ছেন মাত্র দুইজন, বেনিতো মুসোলিনি (১৯২২-১৯৪৩) আর আমাদের জামার্নির এ্যাডলফ হিটলার (১৯৩৩-১৯৪৫) আর তোদেরটা সেই তুলনায় চুনোপুঁটি, নস্যিরে নস্যি। তোদের সময় এক সেনাসদস্য ভাষ্যানুসারে এক সেনা কর্মকর্তার গুম খুনের সংখ্যা আর কটা হবে, তিনশ’চারশ’ এক হাজার, দুহাজার, তিন হাজার-পাঁচ হাজার, কিন্তু এক হিটালেরর সময় সারা বিশ্বে মানুষ মারা গেছে ছয় (৬) কোটি। বুঝতে পারিস কোথায় চার-পাঁচ হাজার আর কোথায় ছয় কোটি! আর ড.ইউনুসের সময় কয়টা হাতে গোনা যায়।”“বুলডোজার দিয়া বাড়ির চৌকাঠ পর্যন্ত গুড়ায়া দিলেন, মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরাইলেন, চিফের গালে জুতার বাড়ি মারলেন, এইগুলা ফ্যাসিস্টের কাম না?”“শোন ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রতীক মাঝে একটি কুঠার, এই হচ্ছে ততকালীন ফ্যাসিস্টের প্রতীক। ড. ইউনূসের সময় এই প্রতীক দেখা যায়নাই। তিনি কখনোই তার ইচ্ছা মতো কাজ করেন নাই। জনগন যা চেয়েছে তিনি তাতে সাপোর্ট দিয়েছেন।”“হ’ নন ডিসক্লোজার এ্যাগ্রিমেন্ট তো জনগন চাইছিল?”“আরে এটাতো ততকালীন সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন, ড. ইউনূস কি করবেন। সবাই জনগণের ইচ্ছা।”“হ, জনগন শুয়োর খাওনের এ্যাগ্রিমেন্টে সই করবো! আন্নে হাগলনি কোনো!”“আমাকে এ’কথা বলে লাভ নেই, তোরা তখন ড.ইউনুসকে ক্যাপ্টেন বানিয়েছিস, ক্যাপ্টেন যা করবার তার লাইসেন্স তাকে তোরাই দিয়েছিস!”“আচ্ছা বুজছি বুজছি ড. ইউনূস ফ্যাসিস্ট হোইলে তারেও আপনেরা খ্যেদাইতেন, কিন্তু অহন কন আপনেরা ভাইগ্যা আইলেন কার ডরে?”“দ্যেখ একে ঠিক ভাইগ্যা আইলাম বা পালিয়ে এলাম বললে হবে না। এটা হচ্ছে মহান বাম পন্থীনেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেলিনের কথা, “ওয়ান স্টেপ ফরওর্য়াড, টু’স্টেপস ব্যাক” মানে যদিও তুমি সংগ্রামে একপা এগিয়েছো, তাহলে আরোও আগানোর জন্য প্রয়োজনে দু’পা পিছিয়ে আসতে পারো।”“ও! তার মানে আপনেরা এখন পলান নাই? ভ্লাদিমির ইলিচ লেলিনের কথা মত, “ওয়ান স্টেপ ফরওর্য়াড, টু’স্টেপস ব্যাক গিয়ার মারছেন। তারপর আবার ঝোপ বুইজ্ঝা কোপ দিবেন!”“ব্যাপারটা অনেকটা তাই। যেমন দ্যেখ বর্তমানে বাংলার জনগন প্রায় ৫৪ বছর ধরে লাঞ্ছনার গঞ্জনার বঞ্চনার শিকার হতে হতে তোরা আজ সরকারের প্রতি, নেতাদের প্রতি, মন্ত্রীদের প্রতি আস্থা হারিয়ে, আজ জীবন ছেড়ে মরণের পরে শুখে থাকার জন্য লালায়িত। আর এই লালসা তোদের জীবন বিমুখ করে, চুরি-ডাকাতি, খুন-জখম রাহাজানী, অবলা নারীর প্রতি অত্যাচার সব কিছুই সহজ ভাবে গ্রহণ করছিস, মেনে নিচ্ছিস। কিন্তু ক্যেন ক্যেন, ক্যেন সমাজে এই বিশৃঙ্খলা, কোনো সুস্থ্য মস্তিষ্ক কি অনাচার মেনে নিতে পারে!”“না না না, এইডা, এই অতিআচার মাইনষ্যে ক্যেমনে মাইন্না নিবো কন, কন, কন?”“কিন্তু তোরা তো সকাল-সন্ধ্যা সব মেনে নিচ্ছিস। বিগত ৫৪ বছর খালি এ’দল আর ও’দল করে মরলি। কাজের কাজ কিছুই হলোনা, তোরা যেই তিমিরে সেই তিমিরেই পড়ে রইলি।”“আমরা সাধারণ মাইনষ্যে কি করমু কন?”“খামাখা ফালতু কথা বলিস না, “আমরা সাধারণ মাইনষ্যে কি করমু কন!” আরে তোরা সাধারণ মানুষ এক হলে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনিস, তোরা সাধারণ মানুষ এক হলে ˆস্বরাচার হোমোকে ফেলতে পারিস, তোরা সাধারণ মানুষ এক হলে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়, আর তুই কিনা বলিস “আমরা সাধারণ মাইনষ্যে কি করমু কন!”“ক্যান এইবার তো ভুটে আমরা আমাগো মার্কায় ভুট দিছিলাম কিন্তু ফলতো পাইলাম না!”“কোন মার্কায় ভোট দিয়েছিলি গ্রীক গডেস মানে গ্রীসের দেবী থেমিসের বাঁ-হাতে ধরে রাখা প্রতীককে তুই আপামর জনসাধারণের মুক্তির প্রতীক ভেবেছিস?”“গ্রীসের দেবী কন আর যাই কন, হ্যেই যেইডা বাম হাতে ধইরালচ্চে, হেই মার্কাই আমাগো গরীবের মুক্তির মার্কা।”“আরে ভাই তুই একজন নারী, গ্রীসের দেবী থেমিসের মুর্তি হাইকোর্টের সামনে থেকে নিয়ে চিপায় ফেলে দিলি। কারণ তোর মতে নারী নেতৃত্ব হারাম! আবার সেই দেবী থেমিসেরই বাঁ-হাতে ধরে থাকা বস্তুটি, প্রতীকটি, মার্কাটি গরীবের মুক্তির মার্কা হয়ে উঠল! আশ্চর্য্য তুই যেই দেবীটাকেই ঘৃণা করিস আবার সেই দেবীর বাম’হাতে ধরে থাকা মার্কাকে মাথায় তুলে নাচিস! লজ্জা হয়না তোর!”“ভাই লাজ লজ্জা বুঝিনা, আমাগো দেশে নারী নেতৃত্ব চলবো না আমাগো লাগলে একটা হিটলার আইন্নাদেন হ্যেয়ই দেশ চালাক, গরীবরে বাঁচাক। কিন্তুক কুনো বেডি আইন্না দিয়েন না।”“দেবী থেমিসকে অপমান করে, তার বাঁ’হাতে ধরে থাকা প্রতীক নিয়ে নাচা নাচি করলে মহান সৃষ্টিকর্তা ব্যেজার হন। যার জন্য আমরা মানে মানে, চুপি সারে সরে এলাম। যদি কোনোদিন সত্যিকারে মানুষ হোই, মানুষকে মানুষ মনে করে শ্রদ্ধা করতে পারি, সেইদিন আবার আসবো মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে, ততদিন জনগণের চোখের আড়ালে বা লোক চক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে থাকি।”“দেখি আমরা যদি ব্যেবাগ গরীবরা এক হোইতে পারি, তায়লে দেবী থেমিসরে থুয়া কেবল হ্যের বাম হাতের মার্কা লয় নাচুমনা। নাচলে দেবীরে লয়া দেবীর মার্কালয়া নাচুম। কিন্তুক আপনি যে কোইলেন, “ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যেদাইলাম, ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম। তয় এই ভাশুরটা ক্যেডা?”“আরে বুঝিসনা ক্যেন, ভাশুরের নাম মুখে আনা নিষেধ।”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

সততার বিড়ম্বনা সর্বকালে

সরকারি চাকরিতে সৎ, সাহসী ও বিবেকবান হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। সঙ্গে দেশপ্রেম থাকলে সেটা আরও বিপজ্জনক। অবস্থাদৃষ্ঠে মনে হয়, সততা, নিরপেক্ষতা বা দেশপ্রেমিক হওয়ার দায় সরকারি কর্মচারীর মধ্যে না থাকাই ভালো। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা হবে শতভাগ আজ্ঞাবহ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সদা তৎপর, কর্মচঞ্চল। দেশের ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনায় নিমগ্ন হওয়া তার জন্যে নয়। দেশ ও জনগণের ভালো মন্দের দায় পুরোটা জনপ্রতিনিধির হাতে থাকবে। কারণ জনগণ জেনেশুনেই তাদেরকে সেই ম্যান্ডেট দিয়েছে। সেখানে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় জীবিকা করা বেতনভুক্ত কর্মচারী কেন নাক গলাবে? তার কাজ হবে ওপরের আদেশ মোতাবেক সঠিক দায়িত্ব পালন করা। কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ, কল্যাণ-অকল্যাণ এটা সরকার বুঝবে। সম্প্রতি সিলেটের ডেপুটি কমিশনারের (ডিসি) ক্ষেত্রে যা হল, তাতে জনগণের জন্যে মেসেজটা এমনই মনে হয়। ডেপুটি কমিশনারের (ডিসি) কাজের অন্ত নেই। বস্তুত তার অধিক্ষেত্রের সকল সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারির একটা সাধারণ এখতিয়ার তার কর্মপরিধির মধ্যে পড়ে। জেলা প্রশাসনের সুদূর অতীতের ইতিহাসে এমন একটা ঐতিহ্যগত অনুশাসন রয়েছে। জনসাধারণের স্বার্থ ও কল্যাণ নিহিত আছে এমন ইস্যুতে জেলা প্রশাসক স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসকই তৎক্ষনাৎ জনগণের পাশে দাঁড়ান। তখনই এটা তার দাপ্তরিক কাজের অন্তর্ভুক্ত বিষয় হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, রুটিন কাজের বাইরে না গিয়ে একদম গতানুগতিক ধারায় গা ভাসিয়ে দিয়েও চাকরি করা যায়। অধিকাংশ ডিসি এটাই অনুসরণ করেন এবং সময় কাটিয়ে নির্বিঘ্নে, নিরাপদে ফিরে আসেন। এদের কোনো নাম গন্ধও থাকে না, বিপদগ্রস্ত হন না, বিতর্ক হয় না, এরা সব সময়ই সুসময়ে বাস করেন। সমস্যা কেবল তাদের, যারা বক্সের বাইরে গিয়ে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে জনস্বার্থকে রক্ষা করার নিমিত্ত খানিকটা ঝুঁকি গ্রহণ করেন। ২.জেলা প্রশাসনের আড়াই শো বছরের অধিক কালের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এমন অসংখ্য নজির স্থাপিত হয়ে আছে। নিম্ন-গাঙেয় বদ্বীপের এ দেশে স্মরণাতীত কাল থেকে বন্যা, খরা, প্লাবন, জলোচ্ছ্বাস আর মহামারী লেগেই ছিল। আজও এর রেশ চলমান আছে। আর এর সঙ্গে জেলা প্রশাসনের দাপ্তরিক দায়িত্ব ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ফলে মাঠ প্রশাসনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার নানা কিংবদন্তিও প্রচলিত আছে। অতীতের সিভিল সার্ভেন্টদের আত্মজীবনীমূলক লেখায় এমন ঘটনার অবতারণা রয়েছে। দেশের জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিকার হিসেবে জনগণের পাশে সবার আগে ডেপুটি কমিশনারই (ডিসি) দাঁড়ান। তিনিই দায়িত্ব নিয়ে ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেন। সরকারের সঙ্গে পত্র যোগাযোগও করে থাকে জেলা প্রশাসন। ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহ, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখাসহ সব দায়িত্ব নেন। যেমন— খাদ্য গুদামের গেইট খোলার কাজ, বাঁধ নির্মাণের কাজ, রিলিফ পৌঁছানোর কাজ, প্রাথমিক চিকিৎসার কাজ, সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে মত বিনিময়ের কাজ ইত্যাদি। বৃটিশ ভারতে এবং পরবর্তীকালের পূর্ব পাকিস্তানে এমন সিদ্ধান্ত নিতে কারও অনুমতির প্রয়োজন হত না। জনশ্রুতি আছে, গুদামের মজুতকৃত খাদ্য বিতরণ করে পূর্ববঙ্গের কোনো এক মহকুমায় সাময়িক দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করেছিলেন বিখ্যাত আইসিএস অফিসার এবং কুমিল্লা মডেল তথা বার্ডের প্রতিষ্ঠাতা জনাব আখতার হামিদ খান। এবং এর সূত্র ধরেই পরবর্তীতে তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। অবশ্য তিনি চাকরিকে ত্যাগ না করলে এতো বিপুল খ্যাতিমান হতেন না। এ সবই নিয়তি। ৩.মনে হয়, এ কারণেই ট্রেনিং প্রতিষ্ঠানসমূহে পড়ানো হত, সরকারি দায়িত্ব পালনে অতি উৎসাহী হওয়ার প্রয়োজন নেই। দায়িত্ব আমন্ত্রণ করা মানে একই সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত শত্রু ও ঝুঁকিকে আমন্ত্রণ করা। এরচেয়ে সব সময়ই নির্বিকার, অনুৎসাহী, লিপ-সার্ভিস সর্বস্ব, মধ্যম মানের গোবেচারা ধরনের ডিসি’র কোনো প্রতিপক্ষ থাকে না। তারা অজাতশত্রু ও জনপ্রিয় আমলা নামে পরিচিতি লাভ করেন। এবং বিনা বাধায়, বিনা প্রশ্নে চাকরির উচ্চতর শিখরে আসীন হয়ে যান। তারা ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং সরকার কাছেও সর্বদা প্রথম পছন্দের তালিকায় থাকেন। সময় বদলে গেছে, যুগের পরিবর্তন হয়েছে। সিভিল সার্ভিসে এখন আর হিরোইজম প্রদর্শনের অবকাশ নেই। এক সময়ে এসব ছিল, এর পক্ষে জনমতও ছিল। মানুষের মধ্যে নীতি নৈতিকতা, আদর্শিক প্রেরণা ছিল। অন্যায়কে সমর্থন জোগানোর মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। যা এখন সম্পূর্ণ বিপরীত। ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে কেউ বিপদগ্রস্ত হতে চায় না। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চায় না। তাই কেউ কারও রক্ষক হয়ে এগিয়ে আসছে না। কাজেই সময়ের সঙ্গে গা ভাসিয়ে, গা বাঁচানো চাকরির কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া সততা, নিরপেক্ষতা, দেশপ্রেমবোধ এসব পড়াশোনা করাই ভালো, প্রয়োগে, চর্চায়, অনুশীলনে খুব বেশি দরকার নেই। ৪.বিগত কয়েক বছরে দেশের কয়েকজন আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট/ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কথা বলা যায়। বিশেষ করে জনাব রোকন-উদ দৌলা, মুনীর চৌধুরী এবং সারোয়ার আলমের দিকে তাকানো যায়। প্রথমোক্ত দু’জন অতিরিক্ত সচিব থেকে অবসরে চলে যান। এদের প্রত্যাশিত সচিব পদে পদোন্নতি পাননি। কেন পাননি সে বিষয়ে আলোকপাত করছি না তবে জনগণের প্রত্যাশা ছিল তারা তাদের সততার পুরস্কার পাবেন। শেষোক্ত সারোয়ার আলমের নাম কেবল দেশের মিডিয়ায় নয়, সর্বত্র সর্বজনের কাছে পরিচিত ছিল। কিন্তু যথাসময়ে তারও পদোন্নতি হয়নি। পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে মানসিক ভাবে প্রায় ভেঙে পড়েছিলেন। এতে গণপ্রত্যাশাও হোঁচট খেয়ে পড়েছিল। একজন সৎ মানুষের চাকরি এবং ক্যারিয়ার বিবেচনায় এটা মারাত্মক এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে থাকছে। এ-সব নিয়ে সুশীল সমাজের ভাবনার বিস্তর অবকাশ রয়েছে। সময় এসেছে ব্যক্তির সততাকে উর্ধ্বে তুলে ধরার। ছোট্ট একটা কথা দিয়ে শেষ করা যায়, ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারির বিকেলে ভারতের স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধীকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। পরদিন ইংল্যান্ড থেকে প্রেরিত এক শোকবার্তায় জর্জ বার্নার্ড শ’ লিখেছিলেন, ‘যদি এমনই হবে এত ভালো হওয়ার দরকার কি ছিল’?[লেখকের নিজস্ব মত][লেখক: গল্পকার, সাবেক সচিব]

মাদকের আগ্রাসন প্রতিরোধে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি

মাদকদ্রব্য, ধূমপান ও তামাক সেবন মানুষের অকাল মৃত্যু এবং স্বাস্থ্যহানীর অন্যতম প্রধান কারণ। মাদকাসক্তি একটি রোগ। মাদকাসক্ত ব্যক্তির আসক্তি তাকে মানসিক ও শারীরিক রোগসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম মাদকের নেশায় বুদ হয়ে বিপথগামী হয়ে পড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বড় অংশের জনগোষ্ঠী কিশোর-তরুণ, যে কারণে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে বলা হয় ইয়ুথ ডিভিডেন্ট। বেসরকারি হিসেব মতে, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। মাদকসেবীদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। ভয়ঙ্কর তথ্য হচ্ছে, ইয়াবা সেবনকারী শতকরা ৮৫ ভাগই তরুণ যুবসমাজ! আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন রোগের মতো এইচআইভি এইডসের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা মাদক গ্রহণকালীন সময়ে অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ। গবেষণায় দেখা যায়, মাদকাসক্তদের মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগই ধূমপায়ী এবং তাদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, যা গবেষণায় প্রমাণিত। ধূমপানে অভ্যস্ততার মধ্য দিয়ে তরুণরা মাদকদ্রব্য সেবন শুরু করে থাকে। পরবর্তীতে ইয়াবা, ফেনসিডিল, সিসা, হেরোইন, কোকেন, আফিম, কোডিন, মরফিন, এলএসডিসহ বিভিন্ন মরণ নেশায় আসক্ত হয়। ক্রমাš^য়ে মাদকাসক্তরা কিডনি, লিভার, মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। এটা অনস্বীকার্য যে, তরুণদের মাদকের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে হলে মাদক নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নাই। সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে ও স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য তরুণদের ধূমপান, মাদকসহ সব নেশা থেকে দূরে থাকা জরুরি। কিন্তু, বিভিন্ন পদক্ষেপ স্বত্ত্বেও থেমে নেই সর্বণাশা মাদকের বিস্তার। মাদকের সঙ্গে জড়িত অসাধু চক্র আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংসের দারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।মাদক নির্মূল কার্যক্রম বাস্তবায়নে সমন্বিত প্রতিরোধ কার্যক্রম বাস্তবায়ন জরুরি। যেখানে মনোসামাজিক, নৈতিক ও সামাজিকরণ শিক্ষা প্রদান এর বিষয়সমূহ সর্বস্তরে পরিচালনার উদ্যেগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। মাদকাসক্তির চিকিৎসা: মাদক শব্দটি শুনলে বেশিরভাগ মানুষই বিচলিত হয় বা ভয় পায়, আর মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের ঘৃণা ও নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদেরকে শাষণ, ঘৃণা বা অবহেলা না করে তাকে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে নিরাময় কেন্দ্রে পরিপূর্ণ চিকিৎসা দেয়া জরুরি। যাতে তারা সমাজের বোঝা না হয়ে সুস্থ হয়ে আবার পরিবারে ফিরে আসতে পারে। তাই পিতা-মাতার প্রতি অনুরোধ আপনার সন্তানকে মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে লুকিয়ে রাখবেন না, ঘৃণা করবেন না বরং তাকে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যান। তাকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিন। সঠিক চিকিৎসা সহায়তা পাওয়ার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে একদিন তারাই সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্তি প্রতিরোধে চাহিদা, সরবরাহ কমানোর সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা ও পূণর্বাসনকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি: বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যসমূহে মাদকদ্রব্য বিক্রি, কৌশলী প্রচার ও ক্রেতা আকর্ষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই মাদকের বিস্তার রোধে সামাজিক মাধ্যমে কঠোর নজরদারি জোরদার করা জরুরি। এ লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাদকসংক্রান্ত পোস্ট, পেজ, গ্রুপ ও অ্যাকাউন্ট দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট সামাজিক মাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের (যেমন: বিটিআরসি, আইসিটি বিভাগ, সাইবার নিরাপত্তা) সঙ্গে সমš^য় জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইনে মাদক বিক্রির কলা- কৌশল ও ডার্কয়েব ইত্যাদি শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ সক্রিয় করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচারণা বৃদ্ধি, বেআইনি অনলাইন কার্যক্রম রিপোর্ট করার ব্যবস্থা চালু এবং সাইবার অপরাধ দমনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। করণীয়: কিশোর-তরুণ প্রজন্মকে মাদকমুক্ত রাখতে শক্তিশালী প্রতিরোধ কার্যক্রম জরুরি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ অর্থাৎ- চিকিৎসার চাইতে প্রতিরোধ ভালো। এটা যদিও স্বাস্থ্যগত অসুখ ও তার চিকিৎসা এবং রোগ প্রতিরোধকে বুঝায় ও একই পদ্ধতি ব্যবহার করে মাদকাসক্তি সমস্যা মোকাবিলা ও তার সুষ্ঠু সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়াই ভালো। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা, মাদকের বিস্তার, সামাজিক অবক্ষয় এবং শিক্ষার মানের অবনতিসহ বিভিন্ন কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাদকের উৎপাদন, পাচার ও অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তরুণদের জন্য সুস্থ সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ, মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং অনেককে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তেও প্ররোচিত করে। তাই মাদকের বিস্তার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সামাজিক অপরাধ হ্রাস এবং নিরাপদ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব আমাদের সন্তান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে সঠিকভাবে পথ- নির্দেশনা দিয়ে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। সমাজে অনেক প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি আছে যারা স্ব উদ্যোগে এ বিষয়ে কাজ করছে। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় এবং সুনির্দিষ্ট দপ্তর আছে যারা তরুণদের উন্নয়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। কাজ হচ্ছে তবে ভয় জেঁকে বসছে। মাদক জোঁকের মতো জেকে বসেছে তরুণদের দেহে। যদি এই জোঁকের পাল থেকে তরুণদের রক্ষা করা না যায় তাহলেই সর্বণাশ। যে বৈষম্যহীন সমাজ ও নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেরাব কথা আমারে তরুণদের, তারাই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। আগামীর বাংলাদেশ পগড়ে ঘোরতর অমানিশায়, অনিশ্চয়তায়! দেশ থেকে মাদকের বিস্তার রোধে শক্তিশালী সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশের পাশাপাশি সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে মাদক পাচার ও সরবরাহ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা। মাদক পাচার ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক কারবারের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি ভেঙে দিয়ে এর নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে হবে। মাদকাসক্তির চিকিৎসায় সরকারকে আরও বিনিয়োগ করতে হবে। বর্তমানে সারা দেশে সরকারিভাবে ৬টি বেসরকারিভাবে ৩৮০টি মাদকনিরাময় কেন্দ্র রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্যমান সেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এসব কেন্দ্রে শুধু মাদক থেকে বিরত রাখাই নয়, বরং পরিকল্পিত পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা, মানসিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর জন্য নিজ নিজ ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে কাউন্সেলিং ও নৈতিক দিকনির্দেশনার সুযোগ নিশ্চিত করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে পুনর্বাসিত ব্যক্তিরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে সমাজ ও রাষ্ট্রে দায়িত্বশীল ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।[লেখক: সদস্য, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স কমিটি (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়)] 

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য

দেশের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্য যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের কোন বিকল্প নেই। আধুনিক অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদকে অধিক মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীই একটি দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। এ কারণেই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো শিক্ষাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। ইউনেস্কোসহ বেশ কিছু উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শিক্ষায় বিনিয়োগ দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মানুষের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কেবল নিজেদের জীবনমান উন্নত করে না; তারা জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। অর্থনীতিবিদদের প্রদত্ত ‘মানবসম্পদ তত্ত্ব’ (হিউম্যান ক্যাপিটাল থিওরি) অনুসারে শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও কর্মক্ষমতাকে উন্নত করে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের অর্থনৈতিক লাভে পরিণত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি অতিরিক্ত বছর একজন ব্যক্তির আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। শিক্ষিত মানুষ সাধারণত উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করে, নতুন প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করতে পারে এবং পরিবর্তিত শ্রমবাজারের সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জাতীয় উৎপাদন, কর রাজস্ব, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির (টেকনোলজি-বেইস&ড নলেজ ইকোনোমি) দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, অটোমেশন, বিগ ডেটা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ অর্থনীতি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশ্ব শ্রমবাজারের কাঠামোকে আমূল পরিবর্তন করছে। ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ক্রমশ এমন দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, যা প্রচলিত শিক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান, ডিজিটাল সাক্ষরতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আজীবন শেখার সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের নিশ্চয়তার পাশাপাশি গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি এবং দক্ষ শিক্ষক প্রস্তুতির উদ্যোগ। বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী যথাযথ শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেলে দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। কিন্তু যদি তাদের আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ অর্থনীতি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী জ্ঞান ও দক্ষতায় শিক্ষিত করা না যায়, তাহলে এই সম্ভাবনাময় জনশক্তি বেকারত্ব, অর্ধবেকারত্ব এবং দক্ষতার ঘাটতির কারণে জাতীয় অর্থনীতির জন্য বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। অর্থনীতিতে যাকে ‘জনসংখ্যাগত সুবিধা’ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) বলা হয়, তা তখন ‘জনসংখ্যাগত বোঝা’ (ডেমোগ্রাফিক বার্ডেন)-য় রূপ নিতে পারে। বার্ষিক জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি কেবল শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রশ্ন নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রশ্ন। যে রাষ্ট্র তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে যুগোপযোগী শিক্ষা ও দক্ষতায় সজ্জিত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই আগামী দিনের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। অন্যদিকে শিক্ষায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে ব্যর্থতা একটি জাতির উন্নয়ন সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত করে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ভিত্তিও শিক্ষা। রাষ্ট্রের নাগরিকদের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, তেমনি সেই নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজন সচেতন, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিকসমাজ। শিক্ষা সেই নাগরিকসমাজ গঠনের প্রধান মাধ্যম। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব, অপরাধপ্রবণতা, মাদকাসক্তি, চরমপন্থা, শিশুবিবাহ, লিঙ্গবৈষম্য এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। কারণ শিক্ষা মানুষকে কেবল তথ্য ও দক্ষতা প্রদান করে না; এটি তার বিচারবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। ফলে শিক্ষিত ব্যক্তি নিজের জীবন ও পরিবারের কল্যাণে যেমন ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাজবিজ্ঞানীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সামাজিক সংহতি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইমের (১৮৫৮-১৯১৭) মতে, শিক্ষা সমাজের অভিন্ন মূল্যবোধ, নৈতিক আদর্শ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ নতুন প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করে। অন্যদিকে অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও সামাজিক বঞ্চনা প্রায়শই অপরাধ, সহিংসতা, উগ্রবাদ এবং সামাজিক অস্থিরতার উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। যে সমাজে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তৃত হয়, সেখানে নাগরিকরা অধিকতর আইনমান্যকারী, সহনশীল এবং গণতান্ত্রিক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগকে কেবল একটি উন্নয়নমূলক উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিকনিরাপত্তা ও জাতীয় স্থিতিশীলতার কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত। এ কারণেই শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল কখনোই শিক্ষা খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ইতিবাচক প্রভাব স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবার পরিকল্পনা, নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক সম্প্রীতি, উৎপাদনশীলতা, আইনশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় সেবার গুণগত মান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। একজন শিক্ষিত মা তার সন্তানের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষার বিষয়ে অধিক সচেতন হন; একজন শিক্ষিত নাগরিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন; একজন দক্ষ শিক্ষিত কর্মী অর্থনীতিতে অধিক অবদান রাখেন; আর একজন সচেতন ভোটার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেন। ফলে শিক্ষায় ব্যয়িত প্রতিটি অর্থ রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রতিফলন সৃষ্টি করে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কেবল শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করাই চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং সেই বরাদ্দের কার্যকর, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হলো পরিকল্পনার ধারাবাহিকতার অভাব, প্রকল্পভিত্তিক চিন্তার আধিক্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং গুণগত মানের প্রশ্নে দীর্ঘস্থায়ী উদাসীনতা। ফলে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও যদি তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হয়, কিংবা মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে রাষ্ট্রীয় অর্থের নয়ছয়ে শুভঙ্করের ফাঁকিটাই প্রধান হয়ে ওঠে, তবে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করা সম্ভব হবে না। এজন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, নৈতিক ও নাগরিক শিক্ষা শক্তিশালীকরণ এবং প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সমতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বিকাশের পরিবর্তে পরীক্ষাকেন্দ্রিক সনদ অর্জনের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়লেও দক্ষ ও উদ্ভাবনী মানবসম্পদের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে তা কেবল চাকরিপ্রার্থী তৈরি না করে; বরং সমস্যা সমাধানে সক্ষম, প্রযুক্তি-সচেতন, উদ্ভাবনী, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করে। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে কতজন মানুষ চাকরি খুঁজছে তার ওপর নয়; বরং কতজন মানুষ নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে, নেতৃত্ব দিতে এবং সমাজের কল্যাণে ইতিবাচক অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে তার ওপর। অতএব শিক্ষায় অধিক বরাদ্দ এবং সেই বরাদ্দের কার্যকর ব্যবস্থাপনা- এই দুটি বিষয়কে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষা যদি মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রসংস্কারের ভিত্তি হয়, তবে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে আর কোনো টেকসই বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্বে যেসব দেশ মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা এবং সুশাসনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, তাদের উন্নয়নের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তারা প্রায় সবাই শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক জনশক্তির চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত, সম্পদস্বল্প কিংবা ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ অনেক দেশও শিক্ষায় ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে যেসব রাষ্ট্র শিক্ষাকে অবহেলা করেছে, সেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং জাতীয় ঐক্য দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইতিহাস তাই বারবার প্রমাণ করেছে যে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান দ্বারা। টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো শিক্ষা। কারণ শিক্ষাই মানুষকে অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে, নির্ভরশীলতা থেকে আত্মনির্ভরতার দিকে, সংকীর্ণতা থেকে মানবিকতার দিকে এবং বিভক্তি থেকে জাতীয় ঐক্যের দিকে নিয়ে যায়। একটি রাষ্ট্র যত বেশি শিক্ষিত, দক্ষ এবং সচেতন নাগরিক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি তত বেশি শক্তিশালী হয়। সুতরাং রাষ্ট্রীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি কোনো নির্দিষ্ট খাতকে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছি, যেখানে রাষ্ট্রসংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের ব্যাপক জনআকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কেবল আইন, নীতি বা প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে এই আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী করে তুলতে হলে প্রয়োজন এমন এক নাগরিকসমাজ, যারা জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ। আর সেই নাগরিকসমাজ গড়ে তোলার প্রধান ভিত্তি হলো একটি মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা। জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে, তাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষাসংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষার আত্মঘাতী রাজনীতিকরণ, জাতীয় দর্শনের আলোকে শিক্ষানীতির ধারাবাহিক উৎকর্ষ ও প্রয়োগের অভাব, শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি, গবেষণায় অনাগ্রহ এবং দক্ষতা উন্নয়নের সীমাবদ্ধতার মতো বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করে শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ (ন্যূনতম জিডিপির ৫%) নিশ্চিত করতে হবে এবং সেই বরাদ্দের স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে কেবল বিদ্যালয়, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ নয়; এটি মানুষের সম্ভাবনায় বিনিয়োগ, জাতীয় ঐক্যে বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। বর্তমান বিশ্বে একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, বরং তার মানবসম্পদে নিহিত। একটি দেশের সড়ক, সেতু বা অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার নাগরিকদের জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের ওপর। যে জাতি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেই জাতিই টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সুশাসনের পথে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রসংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন জ্ঞানসমৃদ্ধ, দক্ষ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিকসমাজ। আর সেই নাগরিকসমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি হলো একটি মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা। তাই শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং জনশক্তির চাহিদাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। শিক্ষাকে ব্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষাখাতে ন্যূনতম জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেই অর্থের স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষিত, দক্ষ, সৃজনশীল ও নৈতিক নাগরিকরাই একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে আজ আমরা শিক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি তার ওপর। [লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

ডিজিটাল যুগে মানুষের অস্থিরতা ও মনোজগতের পরিবর্তন

আজকের পৃথিবীকে অনেকে ‘hyper-connected world’ বা ‘অতি-সংযুক্ত বিশ্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তথ্য, প্রযুক্তি ও যোগাযোগের অভূতপূর্ব বিস্তার মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি তার ভেতরে তৈরি করেছে এক নতুন ধরনের মানসিক চাপ ও অস্থিরতা। ইতিহাসে পরিবর্তন সবসময় ছিল, কিন্তু বর্তমান সময়ের মতো এত দ্রুত, এত ধারাবাহিক এবং এত সর্বব্যাপী পরিবর্তন আগে কখনো দেখা যায়নি। এই পরিবর্তনের ভেতরেই মানুষ ক্রমশ নিজের মনোজগতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, এটাই আজকের সবচেয়ে বড় সামাজিক বাস্তবতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার গত দুই দশকে প্রায় ২৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে ১৮-৩৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে মানসিক চাপ ও অনিদ্রাজনিত সমস্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির যুগে এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে, উন্নয়ন কি সত্যিই মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাচ্ছে, নাকি তা নতুন ধরনের সংকট তৈরি করছে? প্রযুক্তি বিপ্লব ও মনোযোগের সংকট: স্মার্টফোন, সামাজিক মাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আজ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গড়ে একজন মানুষ দিনে ৪-৬ ঘণ্টা মোবাইল বা ডিজিটাল স্ক্রিনে ব্যয় করছে, এমন তথ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। এই ধারাবাহিক তথ্য প্রবাহ, নোটিফিকেশন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল কনটেন্ট মানুষের মনোযোগের স্বাভাবিক গঠনকে বদলে দিচ্ছে। স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, মস্তিষ্ক স্বল্পমেয়াদি ‘ডোপামিন রিওয়ার্ড’ অর্থাৎ দ্রুত আনন্দের প্রতি ক্রমশ বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখা, গভীরভাবে চিন্তা করা বা ধৈর্য ধরে কোনো কাজ সম্পন্ন করার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। একে অনেক গবেষক ‘attention fragmentation’ বা খণ্ডিত মনোযোগ সংকট হিসেবে উল্লেখ করছেন। ফলে আমরা একদিকে তথ্য বেশি জানছি, কিন্তু গভীরভাবে বোঝার ক্ষমতা হারাচ্ছি। এই দ্বন্দ্বই আধুনিক মানুষের মানসিক অস্থিরতার একটি মৌলিক উৎস। সামাজিক মাধ্যম ও তুলনার অদৃশ্য চাপ: সামাজিক মাধ্যম আজ কেবল যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম নয়, এটি এক ধরনের ‘সামাজিক প্রদর্শন মঞ্চ’। এখানে মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সফল বা আকর্ষণীয় অংশটিই উপস্থাপন করে। কিন্তু দর্শক সেই সাজানো বাস্তবতার সঙ্গে নিজের অসম্পূর্ণ বাস্তবতাকে তুলনা করতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার আত্মসম্মানবোধ কমিয়ে দিতে পারে এবং FOMO (Fear of Missing Out) বা পিছিয়ে পড়ার ভয় তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। এক ধরনের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যেখানে মানুষ নিজের জীবনকে ‘কম সফল’ মনে করতে শুরু করে। এই তুলনার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হতাশার জন্ম দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চাপ অনেক সময় ব্যবহারকারী নিজেও সরাসরি বুঝতে পারেন না, কিন্তু তার আচরণ ও মানসিক অবস্থায় এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিক্ষা, প্রতিযোগিতা ও শৈশবের চাপ: বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ফলাফলনির্ভরতা। পরীক্ষার নম্বর, গ্রেড এবং র‌্যাংকিংকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। ইউনেস্কো ও বিভিন্ন শিক্ষা গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা শিশুদের সৃজনশীলতা ও মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শৈশব থেকেই যখন সাফল্যের মানদণ্ড কেবল ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন শেখার আনন্দ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। শিশু শেখে ‘চাপের মধ্যে সাফল্য অর্জন’ করতে, কিন্তু ‘অন্বেষণের মাধ্যমে শেখা’ কমে যায়। এই মানসিক কাঠামো পরবর্তীতে কর্মজীবনেও অস্থিরতা ও অতিরিক্ত চাপ গ্রহণের প্রবণতা তৈরি করে। ফলে শিক্ষা আর কেবল জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র থাকে না, এটি এক ধরনের মানসিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়। তথ্যের অতিভার ও সিদ্ধান্তহীনতা: বর্তমান যুগকে তথ্যের যুগ বলা হলেও এর একটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের অতিভার (information overload)। প্রতিদিন মানুষ অসংখ্য সংবাদ, মতামত, ভিডিও ও বিশ্লেষণের মুখোমুখি হচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, অতিরিক্ত তথ্য মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং ‘decision fatigue’ তৈরি করতে পারে। ফলে ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত হয়, মানসিক ক্লান্তি অনুভব করে এবং এক ধরনের স্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে থাকে। তথ্য যত বাড়ছে, ততই মানুষ মানসিকভাবে স্থির হতে পারছে না, এটি আধুনিক জীবনের একটি মৌলিক বৈপরীত্য। তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির সংস্কৃতি ও মস্তিষ্কের পরিবর্তন: অনলাইন গেম, শর্ট ভিডিও এবং দ্রুত বিনোদনের সংস্কৃতি মানুষের মস্তিষ্ককে তাৎক্ষণিক পুরস্কারের প্রতি অভ্যস্ত করে তুলছে। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অভ্যাস মস্তিষ্কের ‘reward System’-কে পুনর্গঠন করছে, যার ফলে ধৈর্য এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। বাস্তব জীবনের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ধীর, ফলে সেটি অনেক সময় বিরক্তিকর মনে হয়। এই মানসিক পরিবর্তনের কারণে ভার্চুয়াল জগৎ যত বেশি আকর্ষণীয় হচ্ছে, বাস্তব জীবন তত বেশি জটিল ও অসহনীয় মনে হচ্ছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা মানুষের ভেতরে এক ধরনের স্থায়ী অসন্তোষ তৈরি করছে, যা আধুনিক অস্থিরতার আরেকটি বড় কারণ। অস্থিরতা একক নয়, জটিল বাস্তবতা: মানুষের এই অস্থিরতা কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি। এটি প্রযুক্তি, শিক্ষা, সামাজিক কাঠামো, তথ্যপ্রবাহ এবং জীবনযাত্রার সমন্বিত ফলাফল। আধুনিক সভ্যতা যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি মানসিক ভারসাম্যের ওপর নতুন চাপও সৃষ্টি করেছে। তবে এই বাস্তবতা অপরিবর্তনীয় নয়। গবেষণায় দেখা যায়, ডিজিটাল ডিটক্স, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো, মনোযোগ প্রশিক্ষণ (mindfulness practice) এবং সচেতন প্রযুক্তি ব্যবহার মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা। প্রযুক্তি বা আধুনিকতা নয়, বরং আমরা কীভাবে এর সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছি, সেটিই নির্ধারণ করবে আমাদের মানসিক ভবিষ্যৎ। আজকের মানুষ তাই কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং নিজের মানসিক স্থিতিরও রক্ষক। এই দায়িত্ব যত দ্রুত আমরা বুঝতে পারব, ততই অস্থির সময়ের ভেতরেও কিছুটা স্থিরতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে করণীয় ও নীতিগত সুপারিশ: সাম্প্রতিক স্নায়ুবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য এবং ডিজিটাল আচরণবিষয়ক গবেষণায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় জীবনযাত্রাভিত্তিক আচরণগত পরিবর্তন সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, ˆদনন্দিন স্ক্রিন ব্যবহার ২০-৩০ শতাংশ কমাতে পারলে মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই উদ্বেগজনিত চাপ এবং ঘুমের মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়। মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যা আমাদের চিন্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণা বলছে, নিয়মিত মনোযোগ অনুশীলন বা ধ্যানজাতীয় অভ্যাস এই অংশের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। প্রতিদিন অল্প সময়, প্রায় ১০-১৫ মিনিট, নিঃশব্দে শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি মনোযোগ দিলে মস্তিষ্কের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়। এছাড়া প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে অন্তত দুই ঘণ্টা প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটালে শরীরের কর্টিসল নামক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোনের মাত্রা কমে যায়। এর ফলে মানসিক চাপ হ্রাস পায় এবং আবেগীয় স্থিতিশীলতা বাড়ে। ঘুমের নিয়মিততা বা নির্দিষ্ট সময়সূচি মানসিক সুস্থতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। যাদের ঘুম-জাগরণের একটি স্থির রুটিন থাকে, তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রেও এখন বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং মনোযোগ স্বাস্থ্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে ‘ডিজিটাল বিরতি’ বা নির্দিষ্ট সময় পর পর পর্দা থেকে দূরে থাকা মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। সব মিলিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে, মানসিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের উপায় আমাদের ˆদনন্দিন অভ্যাসের মধ্যেই নিহিত। সচেতন জীবনযাপন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ, এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। [লেখক: রিসার্চ কোঅর্ডিনেটর, ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি; সহকারী অধ্যাপক, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি]

সুশাসনের নৈতিক অর্থনীতি

অর্থনৈতিক উন্নয়নের আলোচনায় সাধারণত মূলধন গঠন, শিল্পায়ন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মতো কারিগরি পরিভাষাগুলো প্রাধান্য পায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা আবার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহিতার ওপর জোর দেন। তবে এই সমস্ত কাঠামোগত ধারণার গভীরে একটি মৌলিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা নিহিত থাকে—তা হলো ‘আস্থা’। নাগরিকরা যখন বিশ্বাস করেন যে তাদের করের টাকা জনকল্যাণে ব্যয় হবে, বিনিয়োগকারীরা যখন চুক্তির সুরক্ষার নিশ্চয়তা পান, আর শ্রমিকরা যখন বিশেষাধিকারের বদলে যোগ্যতার মূল্যায়ন দেখেন, তখনই উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি তৈরি হয়। আস্থার এই মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ভিত্তিকেই বলা যায় ‘সুশাসনের নৈতিক অর্থনীতি’। শাসনব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে ‘নৈতিক অর্থনীতি’ হলো রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তির অধীনেই সরকার কর আদায় করে এবং জনসম্পদ পরিচালনার বৈধতা পায়, যার মূল শর্ত হলো এই ক্ষমতার ব্যবহার হবে জনকল্যাণে। যখন এই সামাজিক চুক্তি লঙ্ঘিত হয়, তখন প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা সংকটে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অগ্রগতি থমকে দাঁড়ায়। বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্যায়নে দেখা যায়, সুশাসন কেবল কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এটি একটি দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক সম্পদ। শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোসম্পন্ন দেশগুলো ভৌত অবকাঠামোসর্বস্ব দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্নেন্স ইন্ডিকেটরস’ ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ করেছে যে, সরকারি কার্যকারিতা, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতার মতো সূচকগুলোর সঙ্গে একটি দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক লেনদেন ব্যয় হ্রাস এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অর্জন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। দেশটি একটি ভঙ্গুর দশা থেকে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি জিডিপিসহ নিম্ন-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্য হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, নারী শিক্ষা এবং তৈরি পোশাক খাতের বিশ্বব্যাপী সাফল্য এর অন্যতম উদাহরণ। তবে এই অর্জনকে ধরে রেখে উচ্চ-মধ্যম আয়ের স্তরে পৌঁছানোর পথে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সুশাসনের ঘাটতি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ‘দুর্নীতি ধারণা সূচক ২০২৫’ (যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত)-এ বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৪, যা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে অনেক নিচে। এই সূচককে কেবল একটি ‘ধারণা’ বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই, কারণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী এবং ঋণদাতারা পুঁজি বিনিয়োগের আগে এই সুশাসনের ঝুঁকিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করেন। ফলে, দুর্নীতির এই নেতিবাচক ধারণা সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুর্নীতিকে কেবল নৈতিক স্খলন হিসেবে দেখলে এর পূর্ণাঙ্গ রূপ বোঝা যাবে না; এটি মূলত একটি বড় অর্থনৈতিক বিকৃতি। দুর্নীতি উৎপাদনশীল খাত থেকে সম্পদ সরিয়ে নেয় এবং সরকারি প্রকল্পের ব্যয় অন্যায়ভাবে বাড়িয়ে দেয়। দুর্নীতির কারণে অপচয় হওয়া প্রতিটি টাকা আসলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু অভিযোজনের মতো অতি জরুরি খাতগুলোর বরাদ্দে টান ফেলে। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হলো, এটি বাজারে এমন একটি অনিশ্চয়তা তৈরি করে যা দীর্ঘমেয়াদী দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা, যাদের রাজনৈতিক প্রভাব বা বাড়তি পুঁজি নেই, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যখন মেধার চেয়ে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বা প্রভাব খাটিয়ে বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হয়, তখন উদ্ভাবনী শক্তি নষ্ট হয় এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা স্থবির হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবৈধ আর্থিক প্রবাহ বা অর্থ পাচার। ভুল চালান, কর ফাঁকি এবং মুনাফা স্থানান্তরের মাধ্যমে প্রতি বছর দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ বাইরে চলে যাচ্ছে। এই বহিঃপ্রবাহ রাষ্ট্রকে তার অপরিহার্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে, যা অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে দুর্বল করে এবং সরকারকে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ক্ষতিকর বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা হলো জিডিপির তুলনায় করের অত্যন্ত নিম্ন অনুপাত, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও কর আদায়ের হার আশানুরূপ বাড়েনি। এর মূল কারণও সুশাসনের সংকট। কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের অভাব এবং করদাতাদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি কর পরিপালনকে ব্যাহত করে। নাগরিকরা যখন দেখেন যে তাদের করের টাকা স্বচ্ছতার সঙ্গে জনকল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে না, তখন কর ফাঁকির প্রবণতা বা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বৃদ্ধি পায়। একইভাবে, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সুশাসনের চরম ঘাটতি দৃশ্যমান। প্রকল্পের ভুল নির্বাচন, কেনাকাটায় অনিয়ম, বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্বল তদারকি সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে। অবকাঠামো খাতে (যেমন পরিবহন ও জ্বালানি প্রকল্প) ব্যাপক বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন হলেও, তা যদি অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীস্বার্থের ভিত্তিতে হয়, তবে তা উৎপাদনশীল সম্পদ না হয়ে উল্টো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিশাল ঋণের বোঝা বা দায়ে পরিণত হয়। বাংলাদেশের আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত দীর্ঘকাল ধরে সুশাসনের অভাবে ভুগছে। একটি সুস্থ অর্থনীতিতে ব্যাংকগুলো সঞ্চয় সংগ্রহ করে তা উৎপাদনশীল খাতে বরাদ্দ করে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন এবং তদারকির অভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। খেলাপি ঋণের এই সংস্কৃতি আর্থিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করছে এবং প্রকৃত উৎপাদনশীল উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা সংকুচিত করছে। আর্থিক খাতের এই দুর্বলতা বিনিয়োগ ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। এই শাসনতান্ত্রিক কাঠামোকে কার্যকর করতে আরেকটি অপরিহার্য উপাদান হলো দক্ষ জনপ্রশাসন ও স্বাধীন বিচার বিভাগ। জনপ্রশাসনে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও চুক্তি কার্যকরের জন্য আইনের শাসন এবং একটি পূর্বাভাসযোগ্য আইনি পরিবেশ অপরিহার্য। বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিশ্চয়তা ব্যবসার লেনদেন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আধুনিক প্রযুক্তি বা ডিজিটাল শাসন একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা, অনলাইন কর প্রশাসন এবং ডিজিটাল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমিয়ে দুর্নীতির সুযোগ অনেকাংশে হ্রাস করে। বাংলাদেশ ডিজিটালাইজেশনে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সব সংকট সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা। এখানেই গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্বাধীন সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সচেতন নাগরিকদের ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে বাধ্য করে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে না, একে নাগরিক সক্রিয়তার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। উন্নয়নের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি ও সম্ভাবনা উভয়ই সমান। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক বাজারে একীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য আমাদের এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন যা জটিলতা সামলাতে এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ইতিহাস দেখায় যে, সুশাসন সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতা। সুশাসনের নৈতিক অর্থনীতি কোনো বিমূর্ত দর্শন নয়; এটি সমাজ ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার এক বাস্তবসম্মত পথরেখা। টেকসই উন্নয়নের পথ শুধু উচ্চতর প্রবৃদ্ধির হার বা বড় বাজেটের চটকদার সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত ভিত্তি নিহিত রয়েছে স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং জনস্বার্থের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের মধ্যে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

ভিডিও আরও দেখুন

ফুটবলের উৎস ২৩০০ বছর আগে চীনে

আমাদের অনেকের ধারণা, ফুটবলের জন্ম কেবল ইংল্যান্ডে। কিন্তু ফিফা স্বীকৃতি দিয়েছে, ফুটবলের সবচেয়ে প্রাচীন প্রাতিষ্ঠানিক রূপটির উৎপত্তি হয়েছিল প্রায় ২৩০০ বছর আগে প্রাচীন চীনে।তখন এই খেলার নাম ছিল ‘কুজু’। সামরিক প্রশিক্ষণ থেকে রাজকীয় বিনোদন- কীভাবে ‘কুজু’ আধুনিক ফুটবলে রূপান্তরিত হলো, সেই ইতিহাস ভীষণ রোমাঞ্চকর।‘কুজু’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে- ‘কু’ মানে পায়ে লাথি মারা। আর 'জু' মানে চামড়ার তৈরি বল। অর্থাৎ, পায়ে বল লাথি মেরে খেলা। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় ও দ্বিতীয় শতকে চীনের যুদ্ধরত রাজ্যসমূহের যুগে এবং পরবর্তীতে হান রাজবংশের আমলে এই খেলার ব্যাপক প্রচলন ঘটে।কুজুর জন্ম হয়েছিল মূলত যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে। হান রাজবংশের সামরিক জেনারেলরা লক্ষ্য করলেন, যুদ্ধ না থাকলে সৈন্যরা দীর্ঘ সময় অলস হয়ে পড়ে। তাদের পায়ের পেশি দুর্বল হয়ে যায়। সৈন্যদের শারীরিক ফিটনেস, ক্ষিপ্রতা আর দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কুজু বাধ্যতামূলক করা হয়।বলটি ছিল পশুর শক্ত চামড়ার ভেতরে চুল বা পালক ঠাসা। আজকের ফুটবলের মতো বাউন্স করত না, বরং বেশ ভারী ছিল। পরবর্তীতে হান সম্রাট লিউ বাং নিজে কুজুর ভক্ত হয়ে ওঠেন। তিনি রাজপ্রাসাদের ভেতরেই ‘কুজু মাঠ’ তৈরি করেছিলেন। যেখানে পেশাদার দলগুলো রাজার সামনে প্রতিযোগিতায় নামত।ট্যাংক যুগে (৬১৮-৯০৭ খ্রি.) চীনারা পালক বা চুলের পরিবর্তে পশুর মূত্রথলি ব্যবহার করে বাতাসভর্তি বল তৈরি করতে শেখে। বলটি হালকা হয়। বাতাসে ভেসে থাকার ক্ষমতা পায়।প্রাচীন কুজু মূলত দুই পদ্ধতিতে খেলা হতো। ‘ঝু কিউ’ পদ্ধতিতে মাঠের মাঝখানে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু বাঁশের জাল থাকত। দুই দলের খেলোয়াড়রা কেবল পা, বুক বা মাথা দিয়ে বল পাস করে সেই উঁচু নেটের ভেতর বল ঢোকানোর চেষ্টা করত।পেশাদার ক্লাবসং রাজবংশের আমলে (৯৬০-১২৭৯ খ্রি.) কুজু সম্পূর্ণ পেশাদার রূপ নেয়। ‘কিশি শে’ নামে বিশ্বের প্রথম পেশাদার ফুটবল ক্লাবের জন্ম হয়। খেলোয়াড়রা টাকা বা রাজকীয় উপাধির বিনিময়ে খেলতেন। নির্দিষ্ট নিয়ম অমান্য করলে রেফারি বা বিচারক দ্বারা শাস্তির বিধান ছিল।কুজু খেলার পেছনে প্রাচীন চীনাদের গভীর সামাজিক ও যুদ্ধকালীন মনস্তত্ত্ব কাজ করত। প্রথমত, এই খেলার এক ধরনের অহিংস যুদ্ধ। কনফুসীয় দর্শনে বিশ্বাসী চীনারা সরাসরি সহিংসতা পছন্দ করত না। কুজু ছিল রক্তপাতহীন এক কৃত্রিম যুদ্ধ- তরবারি বা বল্লম দিয়ে মানুষ হত্যা না করে, একটি বলকে জয় করার মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মনস্তাত্ত্বিক বিকল্প।চীনের রাজনৈতিক কাঠামো সবসময় ‘সমষ্টিগত শৃঙ্খলাকে’ প্রাধান্য দিয়েছে। কুজুতে একা কেউ গোল দিতে পারত না- নিখুঁত পাসের মাধ্যমে পুরো দলকে বল জালের কাছে নিয়ে যেতে হতো। এই খেলাটি শেখাত কীভাবে ব্যক্তিগত অহংকার ভুলে দলের স্বার্থে একসাথে কাজ করতে হয়।আধুনিক ফুটবলের জন্ম১৪শ শতকে মিং রাজবংশের শাসনে কুজু তার গৌরব হারায়। অতিরিক্ত জুয়া, মদ্যপান এবং বিনোদনের নামে রাজনৈতিক অবক্ষয়ের কারণে মিং শাসকরা নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তবে সিল্ক রোড এবং সমুদ্রযাত্রার মাধ্যমে পায়ে বল খেলার ধারণা এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপে পৌঁছায়।১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ড এই আদি ধারণাকে পুঁজি করে, হাত দিয়ে বল ছোঁয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে এবং মাঠের দুই প্রান্তে গোলপোস্ট বসিয়ে আধুনিক ফুটবলের নিয়মকানুন চূড়ান্ত করে।আজকের মেসি বা রোনালদোর নিখুঁত ড্রিবলিং বা বাইসাইকেল কিকের পেছনের অদৃশ্য সুতোটি বাঁধা রয়েছে হাজার বছর আগের প্রাচীন চীনা সৈন্যদের কুজু খেলার মাঠে। চীন ফুটবলকে দিয়েছিল প্রাণ আর পা। ইংল্যান্ড দিয়েছে আধুনিক পোশাক ও বৈশ্বিক নিয়ম।

ফুটবলের উৎস ২৩০০ বছর আগে চীনে
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৯৯ জন