সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
ঝড়-ঢলের শঙ্কায় হাওরের বোরো চাষিরা

ঝড়-ঢলের শঙ্কায় হাওরের বোরো চাষিরা

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকদের চোখ এখন আকাশে। একদিকে বৈরী আবহাওয়া, অন্যদিকে পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা। দ্রুত পাকা ধান ঘরে তুলতে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। স্বপ্নের ফসল শেষমেষ ঘরে উঠবে কি না, সেই দুশ্চিন্তাও যেন কাটছে না।উপজেলার বিভিন্ন হাওরে আগাম জাতের বোরো ধান পেকে গেছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় কাটছে কৃষকদের। তবে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।কৃষকেরা জানান, প্রতিবছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগে একমাত্র বোরো ফসল হুমকির মুখে পড়ে। সময়মতো বাঁধ নির্মাণ না হওয়া ও কাজে অনিয়মের কারণে অনেক সময় বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে অকাল বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।এদিকে, ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল হাওরের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দেখা দিয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, এই ঢল এলে দুর্বল বাঁধ ভেঙে মুহূর্তেই পানিতে ডুবে যেতে পারে পাকা ধান। ইতিমধ্যেই জেলার বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে অনেক কৃষকের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে।কৃষক মহরম আলী বলেন, ‘জমিতে ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধান ঘরে তুলতে পারা নিয়েই দুশ্চিন্তা।’ আরেক কৃষক জমির মিয়া জানান, ‘ফসল ভালো হলেও বাঁধের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। বাঁধের কাজে অনিয়ম আছে বলেই এত দুশ্চিন্তা।’জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলায় প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, কিছু হাওরে ইতিমধ্যে ধান কাটা শুরু হয়েছে। ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের।তিনি বলেন, ‘এতে অকাল বন্যায় বা পাহাড়ি ঢলে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কমবে। আমরা কৃষকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, বিলম্ব না করে দ্রুত ধান ঘরে তুলতে।’উপজেলা প্রশাসন জানায়, বাঁধগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং কৃষকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত পাকা ধান ঘরে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।হাওরের কৃষকেরা জানেন, প্রকৃতির রোষ থেকে রেহাই পাওয়া সহজ নয়। তবুও আশা ছাড়েন না তারা। স্বপ্ন দেখেন- ভালো ফলন হয়েছে, ধান ঘরে উঠুক, যেন সারা বছরের সংসারের চাকা সচল থাকে।
৪ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

দুই বাংলার প্রাণের এক চিরন্তন গল্প

বাংলা নববর্ষ, এই দুটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত টান, এক গভীর আবেগ, এক অমলিন পরিচয়।বছরের প্রথম দিন, কিন্তু শুধুই ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়, এ যেন বাঙালির হৃদয়ের নতুন করে স্পন্দিত হওয়া। পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন সূর্য, নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা, আর সেই সঙ্গে পুরনো কষ্ট, গ্লানি, ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলার এক প্রতিজ্ঞা।কিন্তু এই আবেগের শিকড় আজকের নয় এর ইতিহাস বহু পুরনো, প্রাচীন বাংলার মাটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।একসময় বাংলার মানুষ প্রকৃতির ছন্দে জীবন কাটাত। বৈশাখ মাসের শুরু মানেই ছিল নতুন কৃষি বছরের সূচনা। মাঠে নামার প্রস্তুতি, ফসলের নতুন চক্র; এই সবকিছু ঘিরেই নববর্ষের সূচনা হতো।গ্রামবাংলায় বসত মেলা, শোনা যেত লোকগান, মানুষ একত্র হয়ে ভাগ করে নিত আনন্দ। কোনো জাঁকজমক ছিল না, কিন্তু ছিল এক গভীর আন্তরিকতা, মাটির গন্ধে ভরা এক উৎসব।পরে সম্রাট আকবর এর সময় বাংলা সনের আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য চালু হওয়া এই বর্ষপঞ্জি ধীরে ধীরে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। শুরু হয় ‘হালখাতা’, পুরনো হিসাব মিটিয়ে নতুন খাতা খোলার প্রথা, যা আজও নববর্ষের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎসব গ্রাম থেকে শহরে, সরলতা থেকে আড়ম্বরের পথে এগিয়েছে; কিন্তু আবেগ একই রয়ে গেছে।ভোর না হতেই দুই বাংলার আকাশে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের রঙ। ঢাকার রমনা বটমূল থেকে শুরু করে কলকাতার রবীন্দ্রসদন; সব জায়গাতেই যেন এক সুর, এক আহ্বান। বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা রঙে-রূপে-প্রতীকে হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা, অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক। বিশাল মুখোশ, বর্ণিল শোভাযাত্রা; সব মিলিয়ে এক অনন্য দৃশ্য, যা আজ বিশ্বমঞ্চেও স্বীকৃত।অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে সকাল শুরু হয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে। বিশেষ করে এসো হে বৈশাখ যেন প্রতিটি ঘরে ঘরে নতুন বছরের আহ্বান নিয়ে আসে “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...”। এই সুর যেন গরম হাওয়ার সঙ্গে মিশে পুরনো ক্লান্তি উড়িয়ে নিয়ে যায় দূরে।খাবারের কথা বললে পান্তা-ইলিশ ছাড়া কি আর নববর্ষ সম্পূর্ণ হয়? বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পান্তা ভাত, ইলিশ ভাজা, কাঁচা ম‌রিচ, পেঁয়াজ; এক সরল অথচ ঐতিহ্যবাহী স্বাদ। পশ্চিমবঙ্গে যদিও ইলিশের পাশাপাশি মিষ্টি, লুচি, আলুর দম বা রেস্তোরাঁর ‘বৈশাখী থালি’ এখন বেশ জনপ্রিয়। নতুন জামাকাপড় পরে, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ যেন চারদিকে।আজকের দিনে নববর্ষ শুধু ঐতিহ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি আধুনিকতার সঙ্গেও তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার শুভেচ্ছা, ইউটিউব লাইভ, কর্পোরেট কনসার্ট, সব মিলিয়ে এটি এখন গ্লোবাল বাঙালির উৎসব।তবে দুই বাংলার উদযাপনে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্যও রয়েছে। বাংলাদেশে এটি একটি জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়, যেখানে বাঙালি পরিচয়ের জোরালো প্রকাশ ঘটে। পশ্চিমবঙ্গে এটি মূলত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উৎসব। তবুও আবেগের দিক থেকে কোনো অংশে কম নয়।সবচেয়ে বড় কথা, এই উৎসব বাঙালিকে এক করে দেয়। সীমান্তের বিভাজন, রাজনৈতিক মতভেদ, সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে এই একদিনে দুই বাংলার মানুষ একই অনুভূতিতে ভেসে যায়।তাই বলতে হয়, প্রাচীন বাংলার মাটির গন্ধ, কৃষকের ঘাম, লোকসংস্কৃতির সুর, সব মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের এই রঙিন, আধুনিক পহেলা বৈশাখ।সময়ের সঙ্গে রূপ বদলেছে, কিন্তু আত্মা বদলায়নি। আর তাই পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্ব, আবেগ আর চিরন্তন পরিচয়ের এক অমলিন প্রতীক।

মৈত্রী-সম্প্রীতির বার্তাবহ উৎসব বাংলা নববর্ষ

পৃথিবীর নানা দেশে মার্চের শেষে এপ্রিলের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে নববর্ষ উদযাপিত হয়| এথনিক কালচারের প্রকাশই এখানে মুখ্য| তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্যে ‘নওরোজ’ বা নতুন বছর হিসেবে পালিত হয়| অঞ্চলভেদে নাম ‘নয়রোজ’ ‘নিউরোজ’ উপলক্ষে তিনদিন/সাতদিনব্যাপী বিশাল মেলা, উৎসব| আমাদের জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ| এ দিনটি প্রত্যেক বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে উৎসবের আমেজ আর ফুরফুরে বাতাসের এক অনিন্দ্য সুন্দর মিলনের বার্তা| আলপনা আঁকা শাড়ি আর পাঞ্জাবি ছাড়া যেন এ দিনটিকে আর পালন করাই যায় না| সঙ্গে লাল সবুজ আর সাদার মিশেলে হাতে, গালে ফুলকি আঁকা নগর বাঙালির হালফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে| লেখাটির ভুমিকা অংশেই বাংলাপঞ্জিকা সূচনার গল্প সংক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থাপনা না করলে সামগ্রিক আলোচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে| কী ভাবে শুরু হলো বাংলা ও বাঙালির বর্ষ গণনা| ভারতবর্ষে মুঘল সামাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন| কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না| এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো| খাজনা পরিশোধে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন| সম্রাটের আদেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের প্রবর্তন করেন| ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়| তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে| প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন পরে বাংলা বর্ষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে| ধর্মজাতপাত নিয়ে সম্রাট আকবরের কোনও গোঁড়ামি ছিল না, বরং খাঁটি অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন তিনি| ইতিহাস তা-ই বলে| বাংলাদেশে ক্রমশ বাড়ছে বর্ষবরণের আমেজ| বাংলা নববর্ষ নিছক উৎসব নয়, বরং এটি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির এক শক্তিশালী প্রতীক| মোগল সম্রাট আকবরের আমলে কর আদায়ের সুবিধার্থে প্রবর্তিত এই ঐতিহ্য বর্তমানে বাঙালির ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, যা একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও ঐক্যের বার্তা বহন করে| বর্ষবরণ মিলনের এমন এক উৎসব যা ঐক্যের বার্তা বহন করে আসে প্রতি বছর| ওই যে ঐক্যের বার্তা, এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এক অসাধারণ বার্তা দিয়েছেন তার উৎসব নামক প্রবন্ধে| কী বলেছেন রবি ঠাকুর:“...উৎসব একলার নহে| মিলনের মধ্যেই সত্যের প্রকাশ— সেই মিলনের মধ্যেই সত্যকে অনুভব করা উৎসবের সম্পূর্ণতা| একলার মধ্যে যাহা ধ্যানযোগে বুঝিবার চেষ্টা করি, নিখিলের মধ্যে তাহাই প্রত্যক্ষ করিলে তবেই আমাদের উপলব্ধি সম্পূর্ণ হয়| মিলনের মধ্যে যে সত্য, তাহা কেবল বিজ্ঞান নহে তাহা আনন্দ, তাহা রসস্বরূপ, তাহা প্রেম| তাহা আংশিক নহে, তাহা সমগ্র; কারণ, তাহা কেবল বুদ্ধিকে নহে, তাহা হৃদয়কেও পূর্ণ করে|  আজ আমাদের কিসের উৎসব? শক্তির উৎসব| মানুষের মধ্যে কী আশ্চর্য শক্তি আশ্চর্য রূপে প্রকাশ পাইতেছে! আপনার সমস্ত ক্ষুদ্র প্রয়োজনকে অতিক্রম করিয়া মানুষ কোন‌ ঊর্ধ্বে গিয়া দাঁড়াইয়াছে| “বাঙালির নববর্ষ তাই আংশিক নহে, এটি সমগ্র| রবীন্দ্রনাথের চিরায়ত ঐক্য ও মিলনের দর্শন যুক্ত ও মূর্ত্ত হচ্ছে বাঙালির নববর্ষ উদযাপনে| নববর্ষ উদযাপনে আরও যুক্ত হচ্ছে বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, বিপ্লব-বেঁচে থাকা, লোকজ সংস্কৃতি, কুটির শিল্প ও সংগ্রামের শেকড়| আমাদের ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধের ওপর বহুবার আঘাত এসেছে পাকিস্তান আমলে| আঘাত এসেছে বাংলাদেশ আমলেও| ষড়যন্ত্র করা হয়েছে ধর্মের নামে ভিনদেশি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার| বাঙালি বীরের জাতি, সেটা মেনে নেয়নি| বাংলা নববর্ষে আনন্দের বাঁধভাঙা জোয়ারে সেই ঘৃণ্য অপচেষ্টা ভেসে গেছে কচুরিপানার মতো| ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বাংলা নববর্ষ অনুঘটকের মতো কাজ করেছে| জুগিয়েছে সামনে চলার অনন্ত প্রেরণা| তাই প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ প্রবল শক্তি, সাহস ও সংগ্রামের সংকল্প নিয়ে হাজির হয় বাংলাদেশে| বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতা চেতনার চিরন্তন শিখা বাংলা নববর্ষ| পহেলা বৈশাখের উৎসব শুরুর দিকে ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক| গ্রামীণ-মেলা, লোকজ খেলাধুলা ও নৃত্য-সংগীত ছিল প্রধান আকর্ষণ| দিনে-দিনে তা শহরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে| বাঙালির আদি সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনকারী এই অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আমাদের বিশেষ প্রেরণা জুগিয়েছে| এ ভূখণ্ডের বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেছে বাংলা নববর্ষের সাংস্কৃতিক-উৎসব ও চেতনা| ষাটের দশকে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির সশস্ত্র-মুক্তিসংগ্রামসহ বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামকে বেগবান করে| বৈশাখের সংস্কৃতি আমাদের জীবন-সাহিত্য ও বাঙালি জীবনে জড়িয়ে পড়ে ওতপ্রোতভাবে| নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক অনন্য বৈশিষ্ট্য মিলে নববর্ষ উৎসব এখন বাঙালির এক প্রাণের উৎসব-প্রাণবন্ত এক মিলনমেলা| নববর্ষ আদিম মানব গোষ্ঠীর কাছে ছিল সিজনাল ফেস্টিভ্যাল| নববর্ষ হিসেবে ‘পহেলা বৈশাখ’ সভ্য মানুষের ‘এগ্রিকালচারাল ফেস্টিভ্যাল’| বাংলা নববর্ষ এ দেশের একটা প্রাচীনতম ঐতিহ্য| পহেলা বৈশাখের উৎসবের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে| বৈশাখী মেলায় সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের আনাগোনা| মৈত্রী-সম্প্রীতির এক উদার মিলনক্ষেত্র| নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই আসে মেলায়| এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিকিকিনির আশা আর বিনোদনের টান| বাংলা নববর্ষ, বাংলা পঞ্জিকা প্রণয়ের ইতিহাস অনন্য| পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নাই বললেই চলে| মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে এর প্রচলন, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো| বিশ্বের বড় বড় উৎসব ধর্মকেন্দ্রিক বা জাতিকেন্দ্রিক| এদিক থেকে ব্যতিক্রম বাঙালির পহেলা বৈশাখের নানা আয়োজন| বাঙালির নববর্ষে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অনুষঙ্গ প্রবল| মূলত এ কারণেই, বাংলা নববর্ষ উদযাপনে জাতীয় ঐক্য এতো দৃঢ় হয় যেখানে আর কোন দীনতা, পশ্চাতপদতা কাজ করতে পারেনা| বাঙালির জাতীয় জীবুনের বিভেদ, সংকীর্ণতা, অনৈক্য দূর করে জাতীয় শক্তিকে বলিয়ান করতে নববর্ষের মতো উৎসব নিয়ত প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে| আমাদের অন্তর্মূলের শক্তি হলো, শেকড়ে ফিরে যাওয়া| শেকড় থেকে আমরা ঐক্যতান বা কাছে আসার শক্তি সঞ্চয় করি| বাংলা নববর্ষ আমাদের সেই শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছে| লোকজ উৎসব বাঁচিয়ে রাখার জন্য কোন বিশেষ প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হয়না| প্রান্তিক বাঙালিদের জীবন প্রবাহের শক্তিই বাংলা নববর্ষকে আরও রঙিন আরও উৎসবমুখর করে তুলবে| শুভ নববর্ষ![লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

পান্তার সাতকাহন

পান্তা- গ্রামীণ বাংলার সকালের খাবার যা পুষ্টি সমৃদ্ধ এবং ঐতিহ্যের স্মারক| এটি বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির অংশ| ‘পান্তা’ প্রত্যয় সাধিত শব্দ; পানি+তা (ভাত) = পান্তা অর্থাৎ পানিতে ভেজানো ভাত বা পানি ভাত| সাধারণত রাতের খাবার শেষে যে অতিরিক্ত ভাত থেকে যায় সেটাতে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখলে বিভিন্ন ধরনের গাজনকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক ভাতের শর্করা ভেঙে ইথানলওল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে| ফলে ভাতের অম্লত্ব বেড়ে যায় এবং তখন পচনকারী ব্যাকটেরিয়া আর ভাত নষ্ট করতে পারে না- এজন্যই এটি স্বীকৃত ভাত সংরক্ষণ পদ্ধতি| সকালে সেই ভাত সাধারণত পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা ও লবণসহ খাওয়া হয়| তাছাড়া, বিভিন্ন ধরনের ভর্তা, যেমন: আলুভর্তা, বেগুনভর্তা, শুটকিভর্তা, ডালভর্তা, মরিচপোড়া, সরিষার তেল, শাক ভাজা, ডালের বড়া, মাছ ভাজা ও তরকারি দিয়ে পান্তা খাওয়া হয়| আবার, পান্তা আর নারকেল, সে এক চমৎকার সমন্বয়! একবার কেউ খেলে বার বার খেতে ইচ্ছা করবে| কখনো আলাদা করে পান্তা ভাতের শুধু জলীয় অংশটুকু যা আমানি নামে পরিচিত - খাওয়া হয়| যেকোনো ধরনের ভাতেই পানি মিশিয়ে পান্তা ভাত তৈরি করা যায়| তবে, সাধারণত তলাল বা আতপ চালের ভাতের পান্তা স্বাদে এবং পুষ্টিগুণে এগিয়ে| আর ভাত যদি হয় সুগন্ধি চালের, যেমন: বাসমতি, রানী স্যালুট, কাঁচড়া, চিনিগুঁড়া, বাংলামতি বা কালোজিরার, তাহলে তা স্বাদে হয় অনন্য| বাংলাদেশে অঞ্চল ভেদে পান্তা খাওয়ার প্রবণতার ভিন্নতা দেখা যায়, যেমন: বরিশাল অঞ্চলের মানুষ পান্তা বেশি খেয়ে থাকেন| দেশে গরমকালে অর্থাৎ মার্চ থেকে জুলাই-আগস্ট মাস পর্যন্ত পান্তাভাত খাওয়ার প্রচলন বেশি| মূলত ভাত যাদের প্রধান খাদ্য, পান্তা তাদের কাছে পরিচিত| বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পান্তা খাওয়ার সংস্কৃতি চালু আছে| গ্রীষ্মে এসব অঞ্চলে তাপমাত্রাও আর্দ্রতা অত্যন্ত বেশি হওয়ায় ভাত খুব সহজেই নষ্ট হয়ে যায়| কিন্তু, ভাত যদি পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় তাহলে তা আর নষ্ট হয় না| এভাবেই ভাত সংরক্ষণের পদ্ধতি হিসেবেই পান্তা ভাতের প্রচলন| পান্তা বাংলাদেশের বাইরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার, উড়িষ্যা, তামিলনাড়ু, অন্ধপ্রদেশ ও কেরালায় খাওয়া হয়| তবে, অঞ্চল ভেদে পান্তাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়| যেমন: আসামে পান্তা ভাতকে পঁইতা ভাত বা পন্তা ভাত বলে; উড়িষ্যায় বলে পোখালো, আর তামিলনাড়ুতে বলে প্যাযায়সাদাম| তবে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চীন, ইন্দোনেশিয়াতে ও পান্তার মতো খাবারের প্রচলন আছে, যা তৈরির প্রক্রিয়া যেমন ভিন্ন, স্বাদও তেমন ভিন্ন| পান্তা ভাতের ইতিহাস আনুমানিক দুই হাজার বছরের পুরনো হলেও কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে মুঘল আমলে এ খাবারের প্রচলন বাড়ে| সেসময় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আগতদর্শক শ্রোতাদেরকে পান্তা খেতে দেয়া হতো| আর বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে শহুরে বাঙালি সমাজ বাংলা নববর্ষকে ঘটা করে পালন শুরু করে| এসব অনুষ্ঠানে পান্তা ভাতই আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু| আর এখন শহুরে সমাজে পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়াতো হালের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে| উল্লেখ্য, পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশে ফুটপাত থেকে শুরু করে পাঁচ তারকা হোটেলে পান্তা খাওয়ার ধুমপড়ে যায়| আমাদের মনে আছে, বছর পাঁচেক আগে পান্তা ভাতের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ আলো হয়েছিল| এর বড় কারণ ছিল ‘মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া’ প্রতিযোগিতা ২০২১| উক্ত প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিশোয়ার চৌধুরী পান্তা ভাতের মতো একটি অত্যন্ত সাদামাটাও আটপৌরে খাবার পরিবেশন করে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন| কিশোয়ার ওই প্রতিযোগিতায় পান্তা ভাতের সঙ্গে আলুভর্তা ও সার্ডিন মাছ ভাজা উপস্থাপন করে এ পুরস্কার জিতে নেন| পান্তা ভাত এতই জনপ্রিয় যে যুগে যুগে একে নিয়ে অনেক প্রবাদ-প্রবচন রচিত হয়েছে| এসব প্রবাদ-প্রবচনের কোন কোনটি শক্তি ও সক্ষমতার পরিচায়ক, যেমন: পান্তা ভাতের জল, তিন পুরুষের বল; শাশুড়ি নাই, ননদ নাই, কার বা করি ডর, আগে খাই পান্তা, শেষে লেপি ঘর| অথবা, বাঁদির কামে জোসনাই, পান্তা ভাত খাস নাই| আবার, কোন কোনটি আর্থিক সামর্থ্যের ইঙ্গিতবহ| যেমন:পান্তা ভাতে নুন জোটে না, বেগুন পোড়ায় ঘি; নুন আনতে পান্তা ফুরায়| মোটে মা রাঁধে না, তপ্ত আর পান্তা| অথবা, মাগা ভাত তার আবার বাসি আর পান্ত| আবার, কোন কোনটি স্বতন্ত্র অর্থ প্রকাশক| যেমন:কী কথা বলবো সই, পান্তা ভাতে টক দই| অথবা, কিসের মধ্যে কী, পান্তা ভাতে ঘি| পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ সাধারণ ভাতের তুলনায় অনেক বেশি| বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এবং আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক পৃথক গবেষণায় বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে| গবেষণা লব্ধ ফলাফল বলছে, পান্তা ভাতে (প্রতি ১০০ গ্রাম) আয়রনের পরিমাণ ৩.৪ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে ৭৩.৯১ মিলিগ্রাম (২২ গুণ), ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ২১ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে ৮৫০মিলিগ্রাম (৪০ গুণ), আর পটাশিয়ামের পরিমাণ ৭৭ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে ৮৩৯ মিলিগ্রাম (১১ গুণ) হয়| অন্যদিকে, সোডিয়াম এর পরিমাণ ৪৭৫ মিলিগ্রাম থেকে কমে ৩০৩ মিলি গ্রাম হয়| আর সেজন্যই পান্তা ভাতের স্বাদ কিছুটা পানসে এবং আমরা লবণ মিশিয়ে খেয়ে থাকি| অন্য একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, পান্তা ভাতে জিংক এবং ভিটামিন-বি (বি২- রাইবোফ্লাভিন, বি৬- পাইরিডক্সিন, বি১২-সায়ানোকোবালামিন) এর পরিমাণও অনেক বেড়ে যায়| তাহলে প্রশ্ন জাগে, পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ কীভাবে বাড়ে? চাল তথা শস্য জাতীয় সকল খাবারে ফাইটেট নামক অ্যান্টিনিউট্রিয়েন্ট থাকে যা খনিজ লবণসমূহ, যেমন: আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক শক্ত বন্ধনের মাধ্যমে আবদ্ধ করে রাখে| ফলে, আমাদের শরীর এই সমস্ত খনিজ লবণ শোষণ করতে পারে না| কিন্তু ভাতকে যখন কয়েক ঘণ্টা (৮-১২ঘণ্টা) ভিজিয়ে রাখা হয়, তখন ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি হয় যার ফলে ভাতের অম্লত্ব বেড়ে যায়| ফলাফল, ফাইটেটে আবদ্ধ খনিজ লবণসমূহ মুক্ত হয় এবং আমাদের দেহ সহজেই সেগুলো শোষণ করতে পারে| ফলশ্রুতিতে, পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ সাধারণ ভাতের তুলনায় অনেকগুণ বেড়ে যায়| তাছাড়া, পান্তা ভাত শরীর ঠান্ডা রাখে, রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণ করে, কোলেস্টেরল কমায়, অধিকশক্তিযোগায়, হজমের সহায়তা করে, ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ত্বকের শ্রীবৃদ্ধি করে, পেটের আলসার নিরাময় করে এবং এলার্জি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে| পান্তা ভাত আমাদের জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া (সাধারণত দই এ যে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়) এর উৎস হিসেবে ও কাজ করে| তবে, এত সব উপকারিতার সঙ্গে কিছু ক্ষতি কর দিকও বিদ্যমান, যেমন: অনেক সময় তৈরির প্রক্রিয়ার ক্রুটি বা অসাবধানতার কারণে পান্তা ভাতে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে এবং তার ফলে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগ-ব্যাধি হতে পারে| আবার, দীর্ঘক্ষণ (১৮ ঘণ্টার অধিক) ভাত ভিজিয়ে রাখলে অ্যালকোহল তৈরি হয় যা খেলে শরীর ম্যাজম্যাজ করে এবং ঘুম ঘুম হতে পারে| আর ও মনে রাখা দরকার যে পান্তা ভাত আর বাসি ভাত এক নয়| রাতের অতিরিক্ত ভাত কক্ষ তাপমাত্রায় রেখে দিলে সকালে তাকে বাসি ভাত বলে| পান্তা ভাত যেখানে উপাদেয়, স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিগুণে অনন্য, বাসি ভাত সেখানে জীবাণুযুক্ত, অস্বাস্থ্যকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ| তাই, পান্তা ভাত আদরনীয় হলে ও বাসি ভাত বর্জনীয়!পান্তা- বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি, আপন ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক| গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে শরীর সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে পান্তা টনিক হিসেবে কাজ করে| যদিও পান্তা হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির অংশ, শুধুমাত্র নিকট অতীতে পান্তার এতসব গুণের কথা জানতে পেরেছি আমরা| জয় হোক পান্তার, জয় হোক বাঙালি সংস্কৃতির![লেখক: অধ্যাপক, অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়]

শোভাযাত্রা এগোয়, আমরা কি এগোই?

পহেলা বৈশাখ আমাদের ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন, কিন্তু বাস্তবে এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক নীরব প্রশ্নপত্র| প্রতি বছর যখন বৈশাখ আসে, আমরা রঙে রঙিন হই, শোভাযাত্রায় হাঁটি, শুভেচ্ছা বিনিময় করি| শহরের রাজপথ মুখোশ, পুতুল, ঢাকের শব্দ আর উৎসবের উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে| মনে হয়, আমরা এক নতুন পৃথিবীতে প্রবেশ করেছি| কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— এই বাহ্যিক অগ্রগতির ভেতরে আমাদের মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক অগ্রগতি কতটা সত্যি?বাংলা নববর্ষের ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে| কৃষিভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাকে সহজ করার জন্য হিজরি চান্দ্র সনের সঙ্গে সৌর সনের সমন্বয়ে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়| শুরুতে এটি ছিল প্রশাসনিক প্রয়োজন, কিন্তু সময়ের প্রবাহে তা রূপ নেয় এক সাংস্কৃতিক উৎসবে| ইতিহাসের এই রূপান্তরই প্রমাণ করে— যে কোনো প্রথা মানুষের জীবন ও অনুভূতির সঙ্গে মিশে গেলে তা কেবল হিসাবের বিষয় থাকে না, হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের অংশ| আজ পহেলা বৈশাখ শুধু ক্যালেন্ডারের প্রথম পাতা নয়; এটি এক সামাজিক মিলনমেলা| ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম, শিক্ষিত-অশিক্ষিত—সবাই এক কাতারে এসে দাঁড়ায়| শুভ নববর্ষ শব্দটি তখন আর কেবল শুভেচ্ছা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের সমতার ভাষা| কিন্তু বাস্তব জীবনে এই সমতা কতটা স্থায়ী? উৎসব শেষে কি আমরা আবার পুরনো বিভাজনের দেয়াল তুলে দিই না?হালখাতা এই দিনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক| ব্যবসায়ীরা পুরনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খোলেন| গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করানো হয়, সম্পর্ক নবায়ন করা হয়| এই প্রথা কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি বিশ্বাসের পুনর্গঠন| কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিশ্বাস কি কেবল উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা, নাকি বাস্তব জীবনে তা টিকে থাকে? নাকি বছরের বাকি সময় আমরা আবার সন্দেহ, অবিশ্বাস আর স্বার্থের জালে জড়িয়ে পড়ি?রমনার বটমূলে ভোরের সূর্যের সঙ্গে যখন - এসো হে বৈশাখ - ধ্বনিত হয়, তখন মনে হয় প্রকৃতি নিজেই নতুন জীবনের আহ্বান জানাচ্ছে| এই গান শুধু সংগীত নয়, এটি এক দার্শনিক আহ্বান—পুরনো জীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে নতুন করে বাঁচার| কিন্তু আমরা কি সত্যিই সেই আহ্বান শুনি, নাকি এটি কেবল উৎসবের পটভূমির সুর হয়ে থাকে?সবার অংশগ্রহণে শোভাযাত্রা এই দিনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক| রঙিন মুখোশ, বিশাল প্রতীকী কাঠামো, লোকজ শিল্পের সমাহার—সব মিলিয়ে এটি এক চলমান শিল্পকর্ম| এর ভেতরে আছে অশুভের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ| কিন্তু সেই প্রতিবাদ কি কেবল কাগজে-রঙে সীমাবদ্ধ, নাকি বাস্তব জীবনের অন্যায়, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধেও আমাদের অবস্থান দৃঢ়? শোভাযাত্রা যখন এগোয়, আমরা কি সত্যিই এগোই?খাবারের দিক থেকেও পহেলা বৈশাখ এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা| পান্তা-ইলিশ, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ কিংবা হরেক রকমের ভর্তা —এই খাবারগুলো বাঙালির মাটির সঙ্গে সম্পর্কের প্রতীক| কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটি যখন শহুরে অভিজাত সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে, তখন এক ধরনের সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটে| ঐতিহ্য কি তখন তার সহজতা হারায়? নাকি সেটিই তার বিবর্তন?গ্রামবাংলায় পহেলা বৈশাখের চিত্র আরও প্রাণবন্ত| সেখানে মেলা বসে, লোকজ গান গাওয়া হয়, খেলাধুলা ও নানান আয়োজন চলে| এই মেলা শুধু আনন্দের কেন্দ্র নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি চালিকাশক্তি| ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিল্পীরা এখানে তাদের জীবিকার সুযোগ পান| সংস্কৃতি ও অর্থনীতি এখানে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় স্বাভাবিকভাবে| বিশ্বায়নের এই যুগে পহেলা বৈশাখ আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার ডাক দেয়| প্রযুক্তি, নগরায়ণ ও আধুনিকতার প্রবাহে আমরা যতই এগোই, ততই আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধরে রাখার প্রয়োজন বেড়ে যায়| কারণ পরিচয়হীন অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত কূন্যতায় পরিণত হতে পারে| তাই বৈশাখ কেবল উৎসব নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধও| এই দিনে আমরা নতুন পোশাক পরি, ছবি তুলি, সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানাই| কিন্তু প্রশ্ন হলো— আমাদের চিন্তা, মনন ও আচরণ কি সত্যিই নতুন হয়? নাকি এটি কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন, ভেতরের স্থবিরতা অক্ষণ্ন রেখে?পহেলা বৈশাখ আসলে এক আয়নার মতো| এটি আমাদের দেখায় আমরা কেমন হতে পারতাম, আর বাস্তবে আমরা কেমন হয়ে আছি| এই আয়নায় যদি আমরা শুধু সাজসজ্জা দেখি, তবে তা অপূর্ণ দর্শন| কিন্তু যদি আমরা নিজেদের ভেতরের সমাজ, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধকে দেখি, তবে সেটিই হবে প্রকৃত উপলব্ধি| শহরের আলো, ঢাকের শব্দ, শোভাযাত্রার রং—সব মিলিয়ে এক দিনের জন্য আমরা যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করি| কিন্তু সেই জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এসে আমরা কতটা বদলাই? এই প্রশ্নই পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন| এক কথায় পহেলা বৈশাখ আমাদের কেবল আনন্দ দেয় না; এটি আমাদের প্রশ্ন করে| আমাদের জাগিয়ে তোলে| আমাদের নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়| শোভাযাত্রা হয়তো এগোয়, কিন্তু আমরা যদি না এগোই, তবে সেই রঙিন যাত্রা কেবল একটি প্রদর্শনী হয়েই থেকে যাবে| তাই নতুন বছরের এই দিনে প্রত্যাশা একটাই—আমরা যেন কেবল উৎসব উদযাপন না করি, বরং নিজেদের ভেতরেও এক নতুন সূচনা ঘটাই| চিন্তায়, চেতনায়, দায়িত্ববোধে ও মানবিকতায়| সবাইকে শুভ নববর্ষ| [লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

পহেলা বৈশাখ: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সন্ধিক্ষণ

পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব| তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎসবের ধরণ, উদযাপন পদ্ধতি এবং সামাজিক তাৎপর্যেও এসেছে নানা পরিবর্তন| একসময় গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত এই দিনটি এখন শহুরে আয়োজনে আরও জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে উঠেছে| তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—এই আধুনিকতার ভিড়ে আমরা কি আমাদের মূল ঐতিহ্যকে ঠিকভাবে ধরে রাখতে পারছি?প্রাচীনকালে পহেলা বৈশাখ ছিল কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ| কৃষকরা নতুন বছরের শুরুতে নতুন ফসলের পরিকল্পনা করতেন, ব্যবসায়ীরা হালখাতার মাধ্যমে নতুন হিসাব শুরু করতেন| কিন্তু বর্তমান সময়ে কৃষির গুরুত্ব কমে যাওয়া এবং নগরায়ণের ফলে এই দিকটি অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে| শহরের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এই ঐতিহ্যের গভীরতা সম্পর্কে তেমন অবগত নয়| ফলে পহেলা বৈশাখ অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র একটি উৎসব বা ছুটির দিনে পরিণত হচ্ছে| আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে| এখন মানুষ ঘরে বসেই অনলাইনে শুভেচ্ছা বিনিময় করছে, ভার্চুয়াল আয়োজনে অংশ নিচ্ছে| এটি একদিকে যেমন সহজ করেছে যোগাযোগ, অন্যদিকে সরাসরি মিলনমেলার যে উষ্ণতা, তা কিছুটা হলেও কমিয়ে দিয়েছে| উৎসবের প্রাণবন্ততা অনেকাংশে নির্ভর করে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণের ওপর, যা প্রযুক্তির কারণে কিছুটা সীমিত হয়ে পড়ছে| আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাণিজ্যিকীকরণ| পহেলা বৈশাখ এখন অনেক ক্ষেত্রেই একটি বড় ব্যবসায়িক সুযোগে পরিণত হয়েছে| পোশাক, খাবার, সাজসজ্জা—সবকিছুতেই উৎসবকে ঘিরে বাড়তি বাণিজ্যিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়| যদিও এটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক, তবে অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ উৎসবের মূল চেতনাকে আড়াল করে ফেলতে পারে| ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিবর্তে যদি কেবল বাহ্যিক আড়ম্বরই প্রাধান্য পায়, তাহলে তা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে| তবে সবকিছুর মধ্যেও আশার দিক রয়েছে| মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো উদ্যোগগুলো আমাদের সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরছে| মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বদলে এবার করা হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’| তরুণ প্রজন্মের অনেকেই আবার নতুনভাবে লোকসংগীত, গ্রামীণ মেলা এবং ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে| বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পহেলা বৈশাখকে ঘিরে নানা আয়োজন করছে, যা নতুন প্রজন্মকে এই উৎসবের সঙ্গে পরিচিত করে তুলছে| এই প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় কী? প্রথমত, পহেলা বৈশাখের ইতিহাস ও তাৎপর্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করতে হবে| পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে| দ্বিতীয়ত, উৎসব উদযাপনে সরলতা ও আন্তরিকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে মূল চেতনা অক্ষণ্ন থাকে| তৃতীয়ত, গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতিকে আরও বেশি প্রাধান্য দিতে হবে, যাতে শহর-গ্রামের সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ় হয়| পহেলা বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতির একটি জীবন্ত প্রতীক| সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আসবে, সেটাই স্বাভাবিক| তবে সেই পরিবর্তনের মাঝেও আমাদের শিকড়কে ভুলে গেলে চলবে না| ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয় ঘটিয়ে যদি আমরা এই উৎসবকে উদযাপন করতে পারি, তবেই পহেলা বৈশাখ তার প্রকৃত সৌন্দর্য ও তাৎপর্য বজায় রাখতে সক্ষম হবে| [লেখক: সাংবাদিক]

পহেলা বৈশাখ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক আত্মা

পহেলা বৈশাখ এলে আমরা লাল-সাদা পোশাকে রঙিন হয়ে উঠি। “শুভ নববর্ষ” বলে একে অপরকে আলিঙ্গন করি। মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিই। বাইরে থেকে দেখলে এটি নিছক একটি আনন্দের দিন। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, এই দিনটি শুধু উৎসব নয় এটি আমাদের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ পথচলার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।বাংলা নববর্ষের সূচনা মূলত মুঘল আমলে, সম্রাট আকবরের সময়। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে রাজস্ব আদায় সহজ করার জন্যই বাংলা সনের প্রবর্তন। সেই সময় থেকেই পহেলা বৈশাখ ছিল নতুন হিসাব, নতুন ফসল, নতুন আশার দিন। “হালখাতা” সেই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা, যেখানে ব্যবসায়ীরা পুরনো দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন বছরের সূচনা করেন। অর্থাৎ, শুরু থেকেই এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি, উৎপাদন ও জীবিকার সম্পর্ক।আজকের বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ কেবল সাংস্কৃতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বৈশাখকে কেন্দ্র করে দেশের পোশাক, হস্তশিল্প, মাটির পণ্য, খাদ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন হয়। হাজার হাজার মানুষ এই সময় অস্থায়ীভাবে কাজের সুযোগ পান। ঢাকার রমনা বটমূল থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার মেলা সবখানেই এক ধরনের ক্ষুদ্র অর্থনীতি সক্রিয় হয়ে ওঠে।তবে পহেলা বৈশাখের গুরুত্ব শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তান আমলে এই উৎসব ধীরে ধীরে বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। ধর্মীয় বিভাজনের বিপরীতে একটি অসাম্প্রদায়িক, বাঙালি পরিচয়ের ঘোষণা হিসেবে এটি শক্তিশালী হয়ে দাঁড়ায়। স্বাধীনতার পর এই উৎসব হয়ে ওঠে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক- যেখানে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে মানুষ একসঙ্গে উদযাপন করে।এই প্রেক্ষাপটে “মঙ্গল শোভাযাত্রা” একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রা আজ শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, শুভ শক্তির আহ্বান এবং সামাজিক সংহতির প্রতীক। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। যা প্রমাণ করে, পহেলা বৈশাখ কেবল বাংলাদেশের নয়, বিশ্বমানবতারও একটি সম্পদ।কিন্তু এই উজ্জ্বল ছবির ভেতরেও কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পহেলা বৈশাখ ক্রমেই বাণিজ্যিকীকরণের দিকে এগোচ্ছে। ফ্যাশন ব্র্যান্ড, করপোরেট প্রচারণা, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রদর্শনী- সব মিলিয়ে উৎসবের একটি বড় অংশ এখন বাজারকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। এতে অর্থনীতি চাঙা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এর মূল সাংস্কৃতিক আত্মা আড়ালে চলে যাচ্ছে।আরেকটি বাস্তবতা হলো শহর ও গ্রামের বৈশাখ উদযাপনের পার্থক্য। শহরের বৈশাখ অনেকটাই আয়োজননির্ভর, কখনো কখনো কৃত্রিম; আর গ্রামের বৈশাখ এখনও অনেকটাই সহজ, প্রাণবন্ত, প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত। এই ব্যবধান আমাদের ভাবতে বাধ্য করে আমরা কি আমাদের শিকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছি?নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। বড় আয়োজনের সঙ্গে বাড়ছে নিরাপত্তা শঙ্কা, ফলে উৎসবের স্বাভাবিকতা অনেক সময় সীমিত হয়ে যায়। অথচ এই দিনটি তো ছিল মুক্তির, উন্মুক্ততার, একসঙ্গে থাকার দিন।তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায় পহেলা বৈশাখ কি শুধু একটি দিন, নাকি একটি দীর্ঘ ইতিহাসের বহমান ধারা?সম্ভবত এর উত্তর আমাদেরই ঠিক করতে হবে। যদি আমরা এটিকে শুধু পোশাক, ছবি আর খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তাহলে এটি একদিনের উৎসব হয়েই থাকবে। কিন্তু যদি আমরা এর ভেতরের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করি, তাহলে এটি হয়ে উঠবে আমাদের জাতীয় পরিচয়ের শক্তিশালী ভিত্তি।সমাধান খুব জটিল নয়, কিন্তু সচেতনতা দরকার। নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে বৈশাখের ইতিহাস, এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় সংস্কৃতি, গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকজ উপাদানগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে উৎসবটি কেবল শহরকেন্দ্রিক না হয়ে ওঠে। আর বাণিজ্যিক দিক থাকলেও সেটি যেন সংস্কৃতিকে ছাপিয়ে না যায় এই ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।আমরা উন্নয়নের গল্প বলি, আধুনিকতার কথা বলি। কিন্তু একটি জাতির শক্তি তার শিকড়ে, তার ইতিহাসে, তার সংস্কৃতিতে। পহেলা বৈশাখ সেই শিকড়েরই স্মারক। তাই পহেলা বৈশাখ শুধু একটি নতুন বছর নয়, এটি একটি জাতির দীর্ঘ ইতিহাস, সংগ্রাম, অর্থনীতি ও আত্মপরিচয়ের ধারাবাহিকতা। এই উৎসব বেঁচে থাকুক শুধু ক্যালেন্ডারে নয়, আমাদের চেতনায়।আজ যখন আমরা বৈশাখ উদযাপন করি, তখন মনে রাখতে হবে এই উৎসব কোনো এক দিনের সাজ নয়, এটি একটি ধারাবাহিক চেতনা। যে চেতনায় আছে কৃষকের ঘামের গন্ধ, আছে লোকজ সুর, আছে প্রতিবাদের ইতিহাস, আছে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক আত্মা।আমরা যদি এই বৈশাখকে শুধু ছবির ফ্রেমে বন্দি করি, তাহলে হয়তো আনন্দ থাকবে, কিন্তু আত্মা থাকবে না। আর যদি আমরা এর ভেতরের ইতিহাস, মানুষের জীবনসংগ্রাম আর সংস্কৃতিকে ধারণ করি তাহলেই বৈশাখ সত্যিকারের বেঁচে থাকবে।পহেলা বৈশাখ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আমরা শুধু নতুন বছরকে নয় নিজেদেরও নতুন করে খুঁজে পাই।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গবেষক

এআই যুগে ওয়ার্ডপ্রেস ও শপিফাই: পরিবর্তনের ঢেউ ও টিকে থাকার লড়াই

ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, বরং একটি মৌলিক রূপান্তরের শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে| গত কয়েক বছরে এআই এমনভাবে এগিয়েছে যে এটি এখন ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, ই-কমার্স এবং সফটওয়্যার ব্যবসার প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলছে| বিশেষ করে ওয়ার্ডপ্রেস প্লাগইন এবং শপিফাই অ্যাপ ব্যবসার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান|বিশ্বব্যাপী বর্তমানে প্রায় ৪৩% ওয়েবসাইট ওয়ার্ডপ্রেস দিয়ে তৈরি, যা এটিকে সবচেয়ে বড় কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে| অন্যদিকে শপিফাই বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, যেখানে লক্ষাধিক ব্যবসা প্রতিদিন লেনদেন করছে| কিন্তু এআই-এর আগমনের ফলে এই দুই ইকোসিস্টেমের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে- এই ব্যবসাগুলো কি আগের মতো থাকবে, নাকি পুরোপুরি বদলে যাবে?ওয়ার্ডপ্রেস: সংকুচিত হচ্ছে কি বাজার?ওয়ার্ডপ্রেস প্লাগইন ব্যবসার একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে নির্ভর করেছে টাইম সেভিং টুলস এর ওপর| যেমন- বেসিক এসইও অপ্টিমাইজেশন, সিম্পল ফরম বিল্ডার্স, কনটেন্ট জেনারেটরস বা ইমেজ অপটিমাইজেশন টুলস| কিন্তু এআই এখন এই কাজগুলো মুহূর্তেই করে ফেলতে পারছে| একটি এআই টুল এখন কয়েক সেকেন্ডে এমন কনটেন্ট তৈরি করতে পারে, যা আগে একজন মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ধরে করতে হতো|এর ফলে সহজ ও একমাত্রিক প্লাগইনগুলো বাজারে তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারাতে শুরু করেছে| পাশাপাশি এআই-পাওয়ার্ড ওয়েবসাইট বিল্ডার্স (যেমন Wix AI বা অন্যান্য অটোমেটেড বিল্ডার) নতুন ব্যবহারকারীদের ওয়ার্ডপ্রেস-এর বাইরে নিয়ে যাচ্ছে| একজন নতুন উদ্যোক্তা এখন আর ওয়ার্ডপ্রেস শিখতে আগ্রহী নাও হতে পারেন; বরং তিনি এআই-কে নির্দেশ দিয়ে কয়েক মিনিটেই একটি সম্পূর্ণ ওয়েবসাইট তৈরি করে ফেলতে পারেন|তবে এর মানে এই নয় যে ওয়ার্ডপ্রেস প্লাগইন ব্যবসা শেষ হয়ে যাচ্ছে| বরং এটি একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে| যেসব প্লাগইন জটিল ওয়ার্কপ্লো, সিস্টেম ইন্ট্রিগেশন বা এন্টারপ্রাইজ লেভেল সমস্যার সমাধান করে- সেগুলোর চাহিদা এখনো শক্তিশালী| উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মেম্বারশীপ সিস্টেম, লর্নিং মেনেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস), WooCommerce-এর অ্যাডভান্সড এক্সটেনশন, বুকিং সিস্টেম বা মাল্টি প্ল্যাটফর্ম পাবলিশিং টুলস| এই ধরনের সিস্টেমগুলো শুধু এআই দিয়ে সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়, কারণ এখানে দরকার নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনা|শপিফাই: কেন এগিয়ে?শপিফাই তুলনামূলকভাবে একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, কারণ এটি মূলত লেনদেনভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত| একটি ই-কমার্স সিস্টেম শুধু ওয়েবসাইট ˆতরি নয়; এখানে ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট, পেমেন্ট গেটওয়ে, শিপিং, ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স এবং কাস্টমার ডাটা- সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে| এই জটিল কাঠামো এআই দ্বারা পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা কঠিন|শপিফাই ইতোমধ্যেই তাদের প্ল্যাটফর্মে এআই অন্তর্ভুক্ত করেছে- প্রোডাক্ট ডেসক্রিপশন জেনারেশন, অটোমেটেড মার্কেটিং টুলস, এআই-পাওয়ার্ড সার্চ ইত্যাদির মাধ্যমে| ফলে ব্যবহারকারীরা আলাদা করে এআই টুল খোঁজার প্রয়োজন অনুভব করেন না| এছাড়া শপিফাই-এর একটি বড় সুবিধা হলো এর ব্যবহারকারীরা ব্যবসায়িক মানসিকতার এবং তারা প্রয়োজন হলে মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি দিতে প্রস্তুত| অনেক শপিফাই অ্যাপ মাসে ২৯ থেকে ২৯৯ ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে, যা ওয়ার্ডপ্রেস প্লাগইন ব্যবসার তুলনায় বেশি লাভজনক|নতুন হুমকি: এআই শপিং এজেন্টতবে শপিফাই-এর জন্যও একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে| ভবিষ্যতে যদি ক্রেতারা সরাসরি এআই এসিসটেন্টকে ব্যবহার করে পণ্য কেনা শুরু করে- যেমন ‘আমাকে ১০০ ডলারের মধ্যে সেরা জুতা খুঁজে কিনে দাও’ তাহলে ট্রেডিশনাল অনলাইন স্টোর ব্রাউজিং কমে যেতে পারে| এতে করে ব্র্যান্ডিং, ইউআই/ ইউএক্স এবং স্টোরফ্রন্ট-এর গুরুত্ব কিছুটা কমে যেতে পারে|ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাএই পরিবর্তনের মাঝে একটি বিষয় স্পষ্ট- এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং একটি শক্তিশালী টুল হিসেবে গ্রহণ করতে হবে| ভবিষ্যতের সফল ওয়ার্ডপ্রেস প্লাগইন বা শপিফাই অ্যাপ হবে সেগুলো, যেগুলো এআইকে নিজেদের সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করবে|উদাহরণ হিসেবে বলা যায়:*এআই-ড্রিভেন কনটেন্ট রিপারপোসিং* প্রেডিক্টিভ এনালাইটিকস (বেস্ট টাইম টু পোস্ট বা সেল)* এআই-বেসড কাস্টমার সাপোর্ট* পারসোনালাইজড ইউজার এক্সপেরিয়েন্সএই ধরনের ফিচারগুলো ব্যবসাকে শুধু সহজ করে না, বরং আরও কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে|বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটবাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন একটি বড় সুযোগ| দেশের অনেক ডেভেলপার ইতোমধ্যেই ওয়ার্ডপ্রেস প্লাগইন এবং শপিফাই অ্যাপ তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করছেন| যদি তারা সময়মতো এআই ইন্টিগ্রেশন করতে পারে, তাহলে তারা বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে|কিন্তু যদি তারা পুরনো মডেলে আটকে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে| কারণ বৈশ্বিক বাজারে এখন গতি, দক্ষতা এবং ইনোভেশন- এই তিনটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ|এআই কোনো প্ল্যাটফর্মকে ধ্বংস করছে না; বরং এটি একটি নতুন মানদন্ড তৈরি করছে| ওয়ার্ডপ্রেস এবং শপিফাই- উভয় ক্ষেত্রেই যারা পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে, তারাই টিকে থাকবে|ডিজিটাল ব্যবসার ভবিষ্যৎ এখন আর কেবল কোড বা টুলের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে কত দ্রুত এবং কত দক্ষভাবে একটি ব্যবসা নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে পারে তার ওপর|সবশেষে বলা যায় এআই আর কোনো বিকল্প নয়, এটি এখন একটি অপরিহার্য বাস্তবতা| যারা এটি বুঝবে এবং কাজে লাগাবে, ভবিষ্যৎ তাদেরই|[লেখক: পরিচালক (লোকাল অপারেশনস অ্যান্ড অ্যাডমিন), স্টারটাইজ লিমিটেড]

বৈসাবি উৎসবে মাতোয়ারা তিন পার্বত্যজেলা

‘কাট্টোল পাযোগ বিজু এজোক্র--অর্থাৎ কাঁঠাল পাঁকবে বিজু বা চৈত্র সংক্রান্তি আসবে| এ বচন দিয়ে লেখা শুরু করছি| যখন বউ কথা কউ পাখিটি ডাকতে শুরু করে, কোকিল যখন কুহু কুহু ডাকবে, তখনি বিজু বা চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবের আগমনের বার্তা নিয়ে আসে| বিজুর আগমনের প্রতীক্ষায় আবেগ নিবিড় হয়ে অতিবাহিত করতে হয়| কখন যে বিজু আসবে? এভাবে দিনের পর যেতে এমনি মুহূর্তে হঠাৎ চলে আসে বিজু বা ‘বৈসাবি নামক উৎসবটি’| গতকাল চৈত্র মাসের ৩০ তারিখ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শেষ দিন| আগামীকাল থেকে শুরু হবে নতুন বঙ্গাব্দ| অর্থাৎ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১ বৈশাখ| পাহাড়িরা চৈত্র মাসের শেষ দিনকে ‘বৈসাবি উৎসব হিসেবে পালন করে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে| পাহাড়ের তিন সম্প্রদায় আজকের দিনের জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে| পাহাড়ে বসবাসরত সকল মানুষের মাঝে প্রতি বছর এক আনন্দের বন্যা আসে, যা জাতিগত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে একে অন্যের স্নেহ ভালোবাসার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলে| তাই বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, ‘বৈসাবি অহিংসার প্রতীক, বন্ধুত্বের প্রতীক, মৈত্রীর প্রতীক| বৈসাবি অর্থ- ‘বৈ’ এই প্রথম অক্ষর দিয়ে বৈশাখীও বলতে পারি| বৈ+সা+বি= বৈসাবি, অর্থাৎ ‘বৈ’ মানে ‘বৈষু’- এটি চাকমা সম্প্রদায়ের ভাষা| ‘সা’ মানে ‘সাংগ্রাই’- এটি মার্মা সম্প্রদায়ের ভাষা| ‘বি’ মানে ‘বিঝ’-এটি চাকমা সম্প্রদায়ের ভাষা| সুতরাং বছরের প্রথম দিনকে ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈষ’, মার্মা সম্প্রদায় ‘সাংগ্রাই’, চাকমা সম্প্রদায় ‘বিষু’ নামে অভিহিত করে থাকে| তিন সম্প্রদায়ের আদি অক্ষর দিয়ে গঠিত হয়েছে ‘বৈসাবি’| এখন এ বিষয়ে আলোকপাতে যাচ্ছি কোন সম্প্রদায় কীভাবে বৈসাবি উদযাপন করে| বষু: পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী ত্রিপুরা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনকে ‘বৈষ’ বলে| এরা মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী| এ দিনে এরা অনাগত দিনগুলোতে সুখে শান্তিতে বসবাস করার জন্যে মন্দিরে গিয়ে পরম করুণাময়ের নিকট প্রার্থনা করে| কিশোর-কিশোরীরা এ দিনে প্রতি বাড়িতে গিয়ে ফুল বিতরণ করে এবং যুবক-যুবতীরা তার প্রিয়জনকেও ফুল দিয়ে ভালোবাসার শুভেচ্ছা জানায়| ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈষু’ তিনটি পর্বে উদযাপন করে| হারি বৈষু, বিষুমা বৈষু ও বিসিকাতাল বৈষু| এ উৎসবে তারা জাতি ভেদাভেদ, হিংসাবিদ্বেষ, শত্রুতা সবকিছু ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়| বৈষু দিনে এরা পাচন, সেমাই, পিঠা ইত্যাদি খাবারের আয়োজন করে থাকে| গরু-মহিষের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ তিতিক্ষার ফলে তাদের দ্বারা বছরের অন্ন সংস্থান হয় বলে এ দিনে গরু, মহিষকে স্নান করিয়ে দেয়া হয় এবং গলায় ফুলের মালা পড়িয়ে দেয়া হয়| ধূপ, প্রদীপ জেলে শ্রদ্ধা নিবেদন করার মধ্য দিয়ে তারা বৈষু পালন করে| সাংগ্রাই: সাংগ্রাই, এটি মার্মা ভাষা| মার্মা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনকে সাংগ্রাই নামে অভিহিত করে থাকে| বৈশাখের প্রথমদিন তারা সাংগ্রাই উৎসব পালন করে| পিঠা, পাচন, সেমাইয়ের আয়োজন থাকে| সব বয়সী লোকেরা বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়ায় ও আনন্দ উৎসব করে| তবে দিনের প্রধান আকর্ষণ জলোৎসব| মার্মা ভাষায় এটিকে বলে ‘রিলংপোয়ে’| জলখেলার জন্যে আগে থেকে প্যান্ডেল তৈরি করে| এখানে যুবক-যুবতীরা একে অন্যকে লক্ষ্য করে জলছিটিয়ে কাবু করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়| বয়োবৃদ্ধরা এ দিনে ধর্মীয় প্রথা অনুসারে বিহারে বা মন্দিরে গিয়ে ধর্মীয় কাজে লিপ্ত হয়| ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা অতর্কিত জল ছিটিয়ে দিয়ে আনন্দ উল্লাস করে সাংগ্রাই উৎসবকে বিদায় জানায়| বিজু: বিজু, এটি চাকমা ভাষা| চাকমারা বিজু উৎসবকে তিন পর্বে ভাগ করে উপভোগ করেন| বছরের শেষ অর্থাৎ ˆচত্র মাসের ২৯ তারিখ ফুল বিজু, ৩০ চৈত্রকে মূল বিজু ও নববর্ষের প্রথমদিন অর্থাৎ ১ বৈশাখ ‘গজ্যাপজ্যা’ বিজু হিসেবে উৎসব পালন করে| ফুল বিজু: ফুল বিজুর দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে নানা রকমের ফুল সংগ্রহে নেমে পড়ে কিশোর-কিশোরীরা| ফুল সংগ্রহ করার পর চারভাগে ভাগ করে একভাগ দিয়ে নিজের মনের মতো করে বাড়ি সাজায়, অন্য একভাগ দিয়ে বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে সমবেতভাবে বুদ্ধের উপাসনা করে এবং ভিক্ষুদের নিকট থেকে পঞ্চশীল গ্রহণপূর্বক ধর্মদেশনা শোনেন| অন্য একভাগ দিয়ে ছড়া বা নদীতে বা পুকুরপাড়ে পূজামণ্ডপ তৈরি করে প্রার্থনা করে যেনো সারা বছর পানির ন্যায় অর্থাৎ পানি যেমন শান্তশিষ্ট সেরূপ নিজেও শান্তশিষ্ট বা ভালোভাবে জীবনযাপন অতিবাহিত করতে পারে| আর একভাগ ফুল নিয়ে প্রিয়জনকে ভালোবাসার উপহার দেয়| কেউ কেউ ফুল দিয়ে বন্ধুকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়| মূল বিজু: মূল বিজু হচ্ছে বিজুর প্রথমদিন| ফুল বিজুদিনে মূল বিজুর প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়| এ দিনে ঘরের মহিলারা খুবই ব্যস্ত থাকে| তারা ৩০-৪০ প্রকার তরিতরকারি মিশ্রণে ঘন্ড বা পাচন তৈরি করা হয়| প্রচলিত আছে-এ দিন যে যতো বাড়িতে গিয়ে যতোবেশি পাচন খাবে ততোবেশি মঙ্গল হবে| পাচন ছাড়াও নানা ধরনের পিঠা, বিনিধানের খই, লাড়ু, সেমাই, মদ ইত্যাদির আয়োজন করে| এ দিনে সবার বাড়ির দরজা খোলা থাকে, যখন যার ইচ্ছে আসতে কোনো বাঁধা নেই| যারা বেড়াতে আসে তাদের বাড়ির মালিক যথাযথ আপ্যায়নের কোনো কমতি রাখে না| উপরে উল্লিখিত আইটেম পরিবেশন করা হয়| সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে বাড়ির দরজা, উঠানে, গো-শালায়, বৌদ্ধ বিহারে প্রদীপ জ্বালিয়ে মঙ্গল কামনা করা হয়| গজ্যাপজ্যা বিজু: নববর্ষের প্রথমদিনটিকে চাকমারা গজ্যাপাজ্যা বিজু হিসেবে উদযাপন করে| এই দিন বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে বিশ্রামের সঙ্গে দিনটিকে অতিবাহিত করা হয়| ছোটরা বড়দের নমস্কার করে এবং স্নান করিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে| সন্ধ্যায় স্থানীয় বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে পঞ্চশীল গ্রহণ করে অনাগত দিনগুলো যাতে সকলের জন্যে মঙ্গলময় হয় এই প্রার্থনা শেষের পর গজ্যাপজ্যা বিজুর পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়| ‘বৈসাবি হিংসা বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের উৎসব| এই উৎসবের মধ্যদিয়ে অতীতের সব দুঃখ, গ্লানি, বেদনা, ক্ষোভ, উঁচু- নিচু, ধনী-গরিব বৈষম্য পরিহার করে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়| একদিকে যেমন ধর্মীয় বিধান, অন্যদিকে সামাজিকতার বহিঃপ্রকাশও ‘বৈসাবি বহন করে| এটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উৎসব হলেও সবার অংশগ্রহণে পুরো আয়োজন সফলতা লাভ করে|  [লেখক: প্রাবন্ধিক]

বৈশাখ, কৃষি ও বাংলার পরিবর্তিত সময়চিত্র

বাংলা নববর্ষ উদযাপন বাঙালির জীবনে শুধু একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়; এর গভীরে নিহিত রয়েছে কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থা, প্রকৃতির চক্র এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস| বৈশাখের আগমন মানেই নতুন বছরের সূচনা, কিন্তু এই সূচনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফসল, পরিশ্রম, প্রাপ্তি ও অনিশ্চয়তার বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা| সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার রূপান্তর ঘটেছে, আর তার প্রভাব পড়েছে বৈশাখের অর্থ ও তাৎপর্যের ওপরও| তাই বৈশাখকে সত্যিকারভাবে বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান বাস্তবতাকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি|আগেকার দিনে বাংলা নতুন বছরের সূচনা বৈশাখ মাসে ছিল না| অগ্রহায়ণ মাসে নতুন বছর শুরু হতো| আর সে সময়ই আমন ধান ঘরে তোলা হতো এবং সেটিই ছিল সে সময়ের প্রধান ফসল| বর্তমানেও আমন ধান তার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে—উৎপাদনের বিচারে বোরো ধানের পরেই এর অবস্থান| সে সময় নতুন ধান ঘরে ওঠার আনন্দে কৃষকরা ‘নবান্ন’ উৎসব পালন করতেন, যা ছিল কৃষিনির্ভর জীবনের প্রাচুর্যের প্রতীক| তবে এই উৎসব নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ ছিল না; ধান ওঠার পর সুবিধাজনক সময়ে তা উদযাপিত হতো| অনেক ক্ষেত্রে এই আয়োজন পৌষ মাস পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় একে ‘পৌষ পার্বণ’ও বলা হতো|বর্তমানেও নবান্ন পালিত হয় তবে সরকারি উদ্যোগে এবং সেটা পয়লা অগ্রহায়ণে| আধুনিক কৃষিপদ্ধতির কারণে আমন ধান আগেই কাটা সম্ভব হওয়ায় এখন আর পৌষ মাস পর্যন্ত অপেক্ষার প্রয়োজন পড়ে না|নতুন বছর অগ্রহায়ণ থেকে পিছিয়ে বৈশাখে প্রবর্তনের একটি প্রেক্ষাপট আছে| মুঘল সম্রাট আকবর তার খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ফসলি-সন প্রবর্তন করেন এবং বৈশাখ মাসকে বছরের সূচনা হিসেবে নির্ধারণ করেন| ফসলি-সন বলা হলেও সুবে বাংলায় উৎপাদিত ফসলের সঙ্গে এর তেমন সম্পর্ক ছিল না| কারণ ঐ সময় ছিল চৈতালী ফসল তোলার শেষ সময়| কিন্তু সে ফসলগুলো তেমন অর্থকরী ফসল ছিল বলে মনে হয় না| তাই অতীতের বৈশাখ ছিল অনেকাংশে কষ্ট ও দায়বদ্ধতার সময়| চৈত্রের তীব্র দাবদাহের পর বৈশাখে বৃষ্টিপাত কম থাকত এবং কৃষকের ঘরে খাদ্যসংকট দেখা দিত| সে সময় বোরো ধান সারা দেশে বিস্তৃত না থাকায় অধিকাংশ কৃষকের প্রধান ভরসা ছিল আউশ, আমন ও অন্যান্য মৌসুমি ফসল| কিন্তু এসব ফসলও পর্যাপ্ত না হলে খাজনা পরিশোধ একটি বড় চাপ হয়ে দাঁড়াত| ফলে ˆবশাখের আনন্দ তখন অনেকাংশেই সীমিত হয়ে পড়তো| যাই হোক এবং যেভাবেই হোক সময়ের সঙ্গে এটিই এক সময় বাংলা সন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং বছরের প্রথম দিন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও প্রশাসনিক দিনে পরিণত হয়| এর সঙ্গে খাজনা আদায় ও হালখাতার প্রথার সূচনা ঘটে|একসময় পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে কৃষি বর্ষপঞ্জির একটি নতুন চক্রের সূচনা হতো, যখন আউশ ধান, জলি আমন ও পাট চাষের প্রস্তুতি নেয়া ছিল কৃষকের নিয়মিত কর্মপরিকল্পনার অংশ| কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই চিত্রে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে| বর্তমানে বৃষ্টিনির্ভর আউশ ও জলি আমনের চাষ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে সেচনির্ভর বোরো ধানই প্রধান ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে; অনেক ক্ষেত্রেই আগের আউশের জমি এখন বোরো চাষের আওতায় এসেছে|তবুও কৃষিনির্ভর এই ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি; বরং পরিবর্তিত রূপে তা এখনও সংস্কৃতির ভেতরে বিদ্যমান| এখন বৈশাখ মাসই হয়ে উঠেছে নতুন ধান ঘরে তোলার প্রধান সময়| ফলে আগের মতোই এই সময়টি ফসল ঘরে ওঠার আনন্দ বহন করে, যদিও তার প্রেক্ষাপট ভিন্ন| এই কৃষিভিত্তিক আবহের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন একটি মাত্রা—ডিজিটাল ‘কৃষিকার্ড’ চালুর উদ্যোগ| এর মাধ্যমে কৃষকের একটি স্বীকৃত পরিচয় নিশ্চিত হবে, যা ব্যবহার করে তারা সহজেই সরকারি ভর্তুকি, প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারবেন| এর ফলে কৃষি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে| এভাবে নববর্ষ আবারও কৃষিকেন্দ্রিক বাস্তবতার সঙ্গে নতুনভাবে সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে|আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে দেশের কৃষিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে| উন্নত সেচব্যবস্থা, উচ্চফলনশীল বীজ এবং গবেষণালব্ধ জ্ঞানের প্রয়োগে এখন চৈত্র-বৈশাখেই সারা দেশে বোরো ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে| এতে কৃষকের ঘরে সময়মতো নতুন ফসল পৌঁছায় এবং বৈশাখ অনেক ক্ষেত্রেই প্রাপ্তি ও স্বস্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে| ফলে সামগ্রিকভাবে কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থারও উন্নতি লক্ষ করা যায়|তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যেও হাওর অঞ্চলের বাস্তবতা ভিন্ন মাত্রা যোগ করে| দেশের কৃষিতে হাওরের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও এখানকার কৃষিজীবন এখনও প্রকৃতিনির্ভর এবং ঝুঁকিপূর্ণ| বছরের অধিকাংশ সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকার কারণে বোরো ধানই এখানে প্রধান ফসল| কৃষকরা দীর্ঘ সময় পরিশ্রমের পর চৈত্রের শেষে ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি নেন, কিন্তু একই সময়ে পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা দেখা দেয়, যা মুহূর্তেই পাকা ধান তলিয়ে দিতে পারে| এই কারণে হাওরের কৃষকদের জন্য বৈশাখ সবসময় স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে না; বরং তা অনেক সময় অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের প্রতীক হয়ে ওঠে| ফলে তাদের জীবনে এই সময়টি এক দ্বৈত অভিজ্ঞতা বহন করে—একদিকে নতুন ফসলের আশা, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা| এই দ্বন্দ্বই বৈশাখকে হাওর অঞ্চলের কৃষকের কাছে এক অনন্য, বহুমাত্রিক বাস্তবতায় পরিণত করেছে|সারা দেশে বোরো ধানের বিস্তারের ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে এর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে| বিশেষ করে ফসলের বৈচিত্র্য আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষির জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে| তদুপরি, বোরো ধানের জমি দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ থাকায় মিথেন গ্যাসের নির্গমন বাড়ছে, যা পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে| তাই কৃষি উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে|তবে এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা আজ অনেকাংশে বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল| উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবনের ফলে উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি খাদ্যাভ্যাসেও কিছু বৈচিত্র্য এসেছে| এর পাশাপাশি শহরাঞ্চলে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে পান্তাভাত খাওয়ার যে নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা এখন এক ধরনের প্রতীকী ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে| যদিও গ্রামীণ জীবনে এটি বরাবরই সাধারণ খাবার ছিল, তবুও শহুরে উদযাপনের মাধ্যমে এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে|বর্তমান বাস্তবতায় বৈশাখ মাসেই যখন নতুন ধান ঘরে ওঠে, তখন নবান্ন উৎসবের মতো একটি কৃষিভিত্তিক উদযাপন এই সময়েও চালু করা যেতে পারে| এর মাধ্যমে কৃষকের পরিশ্রমের স্বীকৃতি দেয়া সম্ভব হবে এবং নববর্ষের সঙ্গে কৃষিজীবনের সম্পর্ক আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে|বৈশাখ আজ বহুমাত্রিক অর্থে সমৃদ্ধ একটি সময়| এটি যেমন নতুন বছরের সূচনা, তেমনি কৃষির অর্জন, সম্ভাবনা এবং অনিশ্চয়তার এক সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি| ঐতিহ্যগত প্রথা, কৃষির পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং কৃষিকার্ডের মতো আধুনিক উদ্যোগ—সবকিছু মিলিয়ে ˆবশাখ এখন বাংলাদেশের কৃষি ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক| এই সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই নববর্ষ তার প্রকৃত তাৎপর্য লাভ করুক এবং বাঙালির জীবনযাত্রার সঙ্গে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠুক|[লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট]

ভিডিও

ম্যানসিটিতে ভাঙনের ইঙ্গিত

ক্যারাবাও কাপ জয়ের আনন্দ এখনো ভোলেননি ম্যানচেস্টার সিটি সমর্থকেরা। কিন্তু ট্রফি হাতে পেপ গার্দিওলা ও বের্নাদো সিলভার উজ্জ্বল হাসির পেছনে যেন লুকিয়ে আছে অশনি সংকেত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, সিলভার ভবিষ্যৎ নিয়ে গার্দিওলার ‘গ্রাম্পি’ (খিটখিটে) মনোভাব দলের ভেতরে অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।দীর্ঘদিন ধরে সিটির মিডফিল্ডের অপরিহার্য অংশ বের্নাদো সিলভা। প্রতিটি ম্যাচে তার অদম্য দৌড়, টেকনিক ও ফুটবল বুদ্ধি দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সম্প্রতি পর্তুগিজ এই তারকার ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা বেড়েছে। গার্দিওলার সাম্প্রতিক আচরণ বিশ্লেষকদের চোখে পড়েছে, যা ভাঙনের ইঙ্গিত বহন করছে।গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিলভা প্রসঙ্গে গার্দিওলার মনোভঙ্গি ‘বিরক্তিকর। যদিও সরাসরি কোনো মুখোমুখি সংঘাতের খবর নেই, কিন্তু পর্দার আড়ালে নাকি পরিস্থিতি খুব একটা স্বাভাবিক নয়। সিলভা বহুবারই ইউরোপের অন্য ক্লাবে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। বার্সেলোনা ও পিএসজির মতো ক্লাবগুলোতে তার নাম জড়িয়েছে বারবার। এই নিয়েই নাকি গার্দিওলার সঙ্গে মতপার্থক্য দেখা দিচ্ছে।প্রিমিয়ার লিগের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসেছে এই অস্থিরতার খবর। সিটি এখনও শিরোপা দৌঁড়ে আছে। কিন্তু দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়দের একজনকে নিয়ে এই অনিশ্চয়তা পছন্দ করবেন না গার্দিওলা। অন্যদিকে, সিলভা হয়তো চান ক্যারিয়ারের শেষভাগে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে।ম্যানসিটি ভক্তদের জন্য বড় প্রশ্ন হলো- সিলভা কি থাকছেন, না কি যাচ্ছেন? যদি তিনি চলে যান, তাহলে তার জায়গা কে নেবে? আর পেপ কি সত্যিই ‘গ্রাম্পি’ নাকি এটা কেবলই গুঞ্জন? উত্তর মিলবে হয়তো আগামী কয়েক সপ্তাহের ট্রান্সফার বাজারে। 

ম্যানসিটিতে ভাঙনের ইঙ্গিত
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ২২ জন