সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
রোববার থেকে নতুন সময়ে অফিস-ব্যাংক

রোববার থেকে নতুন সময়ে অফিস-ব্যাংক

বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের কারণে সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনে এক ঘণ্টা কমানো হয়েছে। রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে অফিস চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ব্যাংকের লেনদেন চলবে সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত। আর দোকানপাট বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সন্ধ্যা ৬টায়।শনিবার (৪ এপ্রিল) জনপ্রশাসন ও বাংলাদেশ ব্যাংক আলাদা প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নতুন এই সময়সূচি কার্যকর থাকবে।জরুরি পরিষেবা যেমন বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, হাসপাতাল, গণমাধ্যম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ- এসব প্রতিষ্ঠান এ সময়সীমার বাইরে থাকবে। আদালতের সময় সুপ্রিম কোর্ট নির্ধারণ করবে। আর শিল্পকারখানার জন্য শ্রম আইন অনুযায়ী নির্দেশনা দেবে শ্রম মন্ত্রণালয়।সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, জরুরি সেবা ব্যতীত সব বিপণিবিতান, অফিস ভবন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ করতে হবে।শনিবার বিদ্যুৎ ভবনে দোকান ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সেখানে ব্যবসায়ীরা রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলার দাবি জানান। তবে সরকার জানিয়েছে, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আপাতত সন্ধ্যা ৬টার সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে- তা নিয়ে রোববার থেকে নির্দেশনা দেওয়া শুরু করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস রাখার কথা ভাবছে মন্ত্রণালয়। জোড়-বিজোড়ের ভিত্তিতে তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন সশরীর ক্লাস নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, সেখানে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া কঠিন। করোনাকালেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে অনলাইনে আনা যায়নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন।২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে অফিসের সময় এক ঘণ্টা কমানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুনে তা আবার স্বাভাবিক করা হয়। এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটে পুনরায় সময় কমাতে বাধ্য হচ্ছে সরকার।প্রসঙ্গত, ২৯ মার্চ দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কয়েক দিনের মাথায় জ্বালানিসংকটে পড়ে দেশ। এ অবস্থায় বিদ্যুতের চাপ কমাতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাসের বিষয়টি সামনে এসেছে।
৪ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

জ্বালানি সংকটের চেয়ে বড় সংকট আস্থাহীনতা

অতি সম্প্রতি নড়াইলে জ্বালানি তেল না পেয়ে তানভীর ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক নাহিদ সরকারকে হত্যার অভিযোগে এক ট্রাক চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তেল না পেয়ে ট্রাক ড্রাইভার সুজাত আলী পাম্পের ম্যানেজারের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হন, এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ম্যানেজারকে হত্যা করার হুমকি দেন। অভিযোগ ওঠেছে যে, রাত ২টার দিকে পেট্রল পাম্প বন্ধ করে ম্যানেজার নাহিদ সরদার ও তার সহকর্মী জিহাদ ইসলাম তাদের মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা দিলে পেছন দিক থেকে সুজাত আলী তার ট্রাক দিয়ে মোটরসাইকেলে সজোরে ধাক্কা দেন, ঘটনাস্থলেই নাহিদ সরদার নিহত হন, তার সহকর্মী জিহাদ ইসলামের অবস্থাও গুরুতর। জ্বালানি তেলের জন্য সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত দীর্ঘ আট ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাননি ট্রাকচালক সুজাত আলী। বেশ কিছুদিন যাবত দেশের বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে যানবাহনের বিরাট বিরাট লাইন পরিলক্ষিত হচ্ছে, কয়েক কিলোমিটার লম্বা। চাহিদা মোতাবেক তেল না থাকায় মবের ভয়ে বহু পেট্রল পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে। যানবাহনের চালকদের মধ্যে লাইনের আগেপরের অবস্থান নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ও মারামারি হচ্ছে। সারা দেশের পেট্রল পাম্পগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার, সরকারি মনিটরিং বৃদ্ধি ও বিশৃঙ্খলা রোধে উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছে পেট্রাল পাম্পের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। তেল সরবরাহ করতে গিয়ে পাম্প কর্তৃপক্ষও হিমশিম খাচ্ছে। পুলিশ ও পাম্পের কর্মীরা ক্রেতাদের শান্ত রাখতে হ্যাণ্ডমাইক ব্যবহার করছেন। মোটরসাইকেলের চাপে পাম্পে অ্যাম্বুলেন্সও ঢুকতে পারছে না। ক্রেতারা লাইনে অপেক্ষা করতে করতে শুধু অতীষ্ট হয়ে ওঠে না, উদ্বিগ্নও থাকে; কারণ যে কোনো মুহুর্তে পাম্প কর্তৃপক্ষ হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দিতে পারে ‘তেল নাই’। বিভিন্ন পাম্পে প্রতিদিন হঠাৎ ‘নাই’ ঘোষণা শুনতে শুনতে ক্রেতারা আর ধৈর্য রাখতে পারছে না। ‘নাই’ ঘোষণার আগেই তেল পাওয়া নিশ্চিত করতে কেউ কেউ লাইন ভাঙছেন, কেউ কেউ ক্ষমতা জাহির করে বিশেষ ব্যবস্থায় লাইন ছাড়াই তেল পেয়ে যাচ্ছেন। মোটরসাইকেল এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছুটাছুটি করছে, কিন্তু তেল পাচ্ছে না, কারণ ফিলিং স্টেশনগুলোকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। কসকরের ট্রাকের মতো তেলের গাড়ি কোন একটি ফিলিং স্টেশনে পৌঁছার সংবাদ পেলেই সব ক্রেতারা সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। অফিসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একাধিক আদেশ জারি করেছে সরকার। শুধু প্রয়োজনীয় সংখ্যক বাতি, পাখা চালু করে অফিস ছাড়ার সময় তা বন্ধ করা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকারের আরেকটি ইন্টারেস্টিং নির্দেশনা হচ্ছে, এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি রাখতে হবে। শুধু তাই নয়, জ্বালানি খরচ কমাতে বেশিরভাগ সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জ্বালানি সঙ্কট মোকাবিলায় বহুপাক্ষিক দাতাদের কাছ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋত চাওয়া হয়েছে। এত পদক্ষেপ নিয়েও সরকার সামাল দিতে পারছে না, বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে হানা দিয়ে বোতলে রাখা তেলও জব্দ করা হচ্ছে। এতে হিতে বিপরীত হচ্ছে। বিএনপি সরকার কেন এই দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবস্থা আগে থেকে গ্রহণ করেনি তা স্পষ্ট নয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে কত ধূর্ত তা প্রতিপন্ন হয় ১৯৭১ সনে অবলম্বিত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের আরেকটি ধূর্তামি থেকে। ১৯৭০ সনের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হওয়ার পরও আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন চরম পর্যায়ে উপনীত হয়। আন্দোলনকে দমন করতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও অস্ত্র আনার সুবিধার্থে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েই ঢাকায় চলে আসেন। আলোচনা একই প্রক্রিয়া ট্রাম্প যখন ইরানের ক্ষেত্রে অবলম্বন করে যাচ্ছিলেন তখনই প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহে আমাদের যত্নবান হওয়া উচিত ছিল। তারপরও দৃশ্যমান তেল সঙ্কট কৃত্রিম, সরকারের অতিরিক্ত সতর্কতার কারণে ভোক্তার মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তাদের মধ্যে এই মর্মে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে যে, শীঘ্র আর তেল পাওয়া যাবে না, পাওয়া গেলেও দাম বেশি হবে। পেট্রল পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেলের ভিড় বেশি, কারণ অনেকেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের মোটরসাইকেল দিয়ে। তাই তারা শুধু দৈনন্দিনের প্রয়োজনীয় তেল নয়, ছোট ছোট পানির বোতলেও তেল ভরে মজুত করছেন। তাদের যদি প্রথমেই এই মর্মে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়া হতো যে, পেট্রল এবং অকটেন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় না, বাংলাদেশে ব্যবহৃত পেট্রলের প্রায় পুরোটাই এবং অকটেনের সিংহভাগ আমাদের গ্যাস খনির উপজাত বা কনডেনসেট থেকে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কনডেনসেট অনেক সময় পুড়িয়ে ফেলতে হয়, কারণ পেট্রল এবং অকটেনের চাহিদা মোট জ্বালানি তেলের মাত্র ৬ শতাংশ। এছাড়াও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে শোধন করেও ডিজেল, পেট্রল, ফার্নেস তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি পাওয়া যায়। সমস্যা এখন কিছুটা এলপিজি এবং ডিজেল নিয়ে, বছরে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার ৬৩ শতাংশই ডিজেল। ডিজেল নিয়েও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন দিয়ে ইতোমধ্যে ডিজেল আনা হয়েছে। তবে এলপিজির পুরোটাই বেসরকারি খাতে আনা হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিক্রি মূল্য নির্ধারণ নিয়ে ইতস্তত থাকায় বেসরকারি খাত এলপিজি আমদানিতে উৎসাহী নাও হতে পারে। যুদ্ধের মধ্যেও পরিশোধিত ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস তেল ও জেট ফুয়েলও ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে কেনার চেষ্টা হচ্ছে। তারপরও পেট্রল, অকটেন এবং ডিজেল নিয়ে দেশব্যাপী এত হাহাকার কেন ?দেশে জ্বালানি সংকট নেই মর্মে সংসদে বিবৃতি দিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তার মতে পেট্রল পাম্পে যে দীর্ঘ লাইন দেখা যায় তা প্রকৃত চিত্র নয়। ৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে ট্রাক ড্রাইভার পেট্রল পাম্পের ম্যানেজারকে হত্যা করলো, আর মন্ত্রী বলছেন তা প্রকৃত চিত্র নয়। মন্ত্রীর কথা হচ্ছে গত বছর এই সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছিল, এ বছর তার চেয়ে বেশি সরবরাহ করা হয়েছে। কথা মিথ্যা নয়, কিন্তু যুদ্ধের শুরুতে রেশনিং বা সাশ্রয়ের কথা বলে ভোক্তাদের আস্থা নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। একই কাজ করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। গভর্নর হয়েই তিনি তারল্য সঙ্কটের সম্মুখীন কোন ব্যাংককে একটি টাকাও দেবেন না বলে ঘোষণা দেন; কিন্তু তিনি যখন তার ভুল বুঝতে পারলেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়েও ব্যাংকগুলোকে আর রক্ষা করতে পারলেন না। তেলের মজুত রোধ করতে অবৈধ মজুতদারির তথ্যদাতাকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তেলের দাম বাড়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকায় মজুত করার প্রবনতা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাসের অপশাসনে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, এই অবস্থায় জ্বালানি তেলের সঙ্কট আরও গভীর হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে, লোডশেডিং হবে যখন তখন, শিল্পকারখানায় নেমে আসবে বিপর্যয়। তবে দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পারঙ্গম, ২০২২ সনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট জ্বালানি সঙ্কট তৎকালীন সরকার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। শুধু তাই নয়, সারা বিশ্ব দেখেছে, করোনা এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিশ্ব মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি, উন্নত দেশগুলোর নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি মধ্যেও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৮ শতাংশ। বিএনপি সরকারকে মনে রাখতে হবে যে, যুদ্ধের শুরুতে বাংলাদেশের বিবৃতি ইরানের পক্ষে যায়নি, গেছে বিপক্ষে। এছাড়াও আমেরিকার ওপর বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ইরানকে রুষ্ট করে তুলতে পারে, তাই হরমুজ প্রণালী বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে কি না তা অনিশ্চিত। ইরানের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করার পর অর্থনৈতিক স্থাপনায় ব্যাপক আঘাত হানা হলে ইরানও শেষ মরণকামড় দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর তেলক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করবে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো আক্রান্ত হলে প্রাবাসীদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। এভাবে ইরানকে ধ্বংস করতে গিয়ে বাংলাদেশের মতো গরীব দেশগুলোকে ধ্বংস করে দেবে মি. ডনাল্ড ট্রাম্প। সন্ধ্যা ৬টার পর ঢাকা শহর এখন প্রায় অন্ধকার; যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু অন্ধকার নয়, উৎপাদন প্রায় রুদ্ধ হয়ে যাবে, মূল্যস্ফীতি ঘটবে, দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাতীয় এই দুর্যোগেও সংসদে যা নিয়ে আলোচনা চলছে তা গতানুগতিক, কারোর মধ্যে শোনার আগ্রহ নেই; তেল নিয়ে উদ্ভুত সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে আলোচনা হলে সংসদের ওপর জনগণের আস্থা বাড়ত।[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

বাউল ও সাম্যবাদ

বাংলাদেশে সাম্যবাদী সমাজ গড়ার আন্দোলন দীর্ঘদিনের। ইউরোপীয় ও রুশ নানা দর্শনের ভিত্তিতে বাংলা অঞ্চলে সাম্যবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত। তবে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার বহু আগে ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্যবাদী প্রথা চালু ছিল। প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকায়িত আছে সাম্যবাদের অনুশীলন। ইংরেজ শাসনের পূর্বে বাংলা জনপদের প্রতিটি গ্রাম ছিল স্বনির্ভর। এই অঞ্চলে ইংরেজ শাসনের আগে পণ্যবিনিময় প্রথা চালু ছিল। প্রতিটি গ্রাম ছিল বহুমাত্রিক উৎপাদনব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং এখানকার গ্রামগুলো গড়ে উঠেছিল বহুবিধ পেশার শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে। মানুষের চাহিদাভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থা ছিল প্রতিটি গ্রামে। যেমন— কৃষকরা খাদ্যের চাহিদা মেটাতেন, তাঁতিরা কাপড়ের, জেলেরা মাছের, গোয়ালারা দুধের যোগান দিতেন। এছাড়া ধোপা, নাপিত, কামার, স্বর্ণকার, কুমোর, চিকিৎসার জন্য কবিরাজসহ নানা পেশার মানুষ একই গ্রামে বাস করত। গ্রামের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে এসব পেশার মানুষ প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন বা সেবা প্রদান করত। এই সময়টায় প্রাচীন বাংলার গ্রামগুলো এক ধরনের সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার আওতাধীন ছিল। ইংরেজ শাসনের পর থেকে মুদ্রার ব্যাপক প্রচলন ঘটে এবং আদি সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। তবে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকারীরা প্রাচীন বাংলার এই সমাজব্যবস্থার ওপর অনুশীলন করে সমাজ পরিবর্তনের জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেননি। তারা সাম্যবাদ অনুশীলনের প্রক্রিয়া চালিয়েছেন রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক আদলে। তাই বর্তমানে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্যবাদী রাজনীতি অনেকটা তলানিতে পড়ে আছে। এর মূল কারণ হলো, সমাজতান্ত্রিক নেতারা এই দেশের সংস্কৃতির হাজার বছরের সাম্যবাদী ঐতিহ্যের কথা রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে আসেন না। সাম্যবাদী বিষয়গুলো অনুধাবন করা যায় বাউল সমাজের জীবনপ্রণালী পর্যবেক্ষণ করলে। বাউল হলো বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলের এক অনন্য সাধন-ভজন গোষ্ঠী ও লোকজ সংগীতধারা। বাউলরা মূলত সুফিবাদ ও বৈষ্ণব সহজিয়া মতের মিশ্রণে মানবপ্রেম ও আত্মার সন্ধানের গান গেয়ে বেড়ায়। অনেকেই বলেন, ‘বাউল’ শব্দের অর্থ সাধারণত উন্মাদ বা পাগল— যারা সামাজিক বিধিনিষেধ মানে না। প্রকৃতপক্ষে তারা আদি সাম্যবাদের কথা বলে বলেই কায়েমি স্বার্থবাদীরা তাদের পাগল বলে আখ্যা দেয়। বাউল গান মূলত মানুষের জীবন ও প্রকৃতির কথা বলে। ২০০৫ সালে ইউনেস্কো বাউল গানকে অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাউল গান কেন সাম্যবাদী ধারা বহন করে, তার কয়েকটি দিক উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, বাউল মতবাদ দেহের ভেতরেই ঈশ্বরের অবস্থান বা ‘আত্মা’র সন্ধানে বিশ্বাসী, যা ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয় বহন করে। দ্বিতীয়ত, বাউল গানে মানবতাবাদ প্রবল, যেখানে জাত-পাত বা ধর্মের কড়াকড়ি নেই। তৃতীয়ত, বাউলরা একতারা, দোতারা, ঢোল, খঞ্জনি, বাঁশিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে গান পরিবেশন করেন, যেখানে পুঁজিবাদী তথাকথিত আধুনিকতার প্রভাব নেই। চতুর্থত, বাউলদের সাধনা সংগীতের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়; এই সাধনায় জাত, কাল, পাত্র, ধনী-গরিবের ভেদাভেদ থাকে না। পঞ্চমত, বাউল গানে মাটি, মানুষ, সাম্য, মানবতাবাদ এবং আধ্যাত্মিক ভাবের গভীর প্রকাশ পাওয়া যায়। অন্যদিকে সাম্যবাদ বা কমিউনিজম (ল্যাটিন শব্দ থেকে উদ্ভূত, অর্থ ‘সাধারণ’ বা ‘সর্বজনীন’) একটি সামাজিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক এবং অর্থনৈতিক মতবাদ, যা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ। এর লক্ষ্য একটি কমিউনিস্ট সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে উৎপাদন, বিতরণ ও বিনিময়ের উপায়গুলো সাধারণ মালিকানাধীন হবে এবং পণ্য বণ্টন হবে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী। একটি কমিউনিস্ট সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, সামাজিক শ্রেণী এবং পরবর্তীকালে অর্থ ও রাষ্ট্র (বা জাতিররাষ্ট্র) বিলুপ্ত হবে। ‘দ্য অক্সফোর্ড হ্যান্ডবুক অব কার্ল মার্ক্স’-এর মতে, মার্ক্স পুঁজিবাদ-পরবর্তী সমাজ বোঝাতে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন— যেমন পজিটিভ হিউম্যানিজম, সোশালিজম, কমিউনিজম, মুক্ত ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্র, উৎপাদকদের মুক্ত সমিতি ইত্যাদি। তিনি এগুলোকে প্রায় সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ‘সোশালিজম’ ও ‘কমিউনিজম’কে পৃথক ঐতিহাসিক ধাপ হিসেবে দেখার ধারণা তাঁর মূল লেখায় ছিল না; এটি পরবর্তীতে মার্ক্সবাদী পরিভাষায় যুক্ত হয়। অন্যদিকে বাউল দর্শন ধর্মীয় চিন্তা থেকে উদ্ভূত আত্ম-অন্বেষণের এক বিশেষ রূপ, যা মূলত আত্মার আধ্যাত্মিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের লোকসাহিত্য ও লোকঐতিহ্য বিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, আরব অঞ্চলের রাজনৈতিক শক্তির প্রতিক্রিয়ায় সুফিবাদের জন্ম, যা পরে পারস্যে বিকশিত হয় এবং ইরান ও মধ্য এশিয়ায় বিস্তার লাভ করে। ক্রমে এটি পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় এসে চর্যাগীতির সঙ্গে মিশে নতুন রূপ লাভ করে। তুর্কি বিজয়ের পর সুফি দরবেশদের আগমনে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের মানবতাবাদ ও সুফিবাদ মিলিত হয়ে মরমি ভাবধারার জন্ম দেয়। গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল, ড. আশরাফ সিদ্দিকী প্রমুখের মতে, মধ্যযুগের শুরুতে বাংলায় অদ্বৈতবাদের প্রভাবে চৈতন্যবাদ বিকশিত হয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে। ভাগবতধর্ম, আদি রামধর্ম ও কৃষ্ণধর্মের মিলনে বৈষ্ণবধর্ম আত্মপ্রকাশ করে। এর সঙ্গে প্রাচীন মরমীবাদের সংমিশ্রণ ঘটে। বাউল ও বাউল মতবাদের উৎপত্তিকাল আনুমানিক ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ। ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’ গ্রন্থে প্রফেসর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য এ মত প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করেন, বৌদ্ধদের মহাযান পন্থা থেকে বাউলদের উদ্ভব। কমিউনিজমে স্বশাসিত সমাজ গঠনের লক্ষ্য থাকলেও তা অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে— কোথাও স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব ও শ্রমিকদের স্ব-পরিচালনার ওপর জোর দেয়া হয়, আবার কোথাও রাষ্ট্রনির্ভর পদ্ধতির কথা বলা হয়। রাজনৈতিক পরিসরে কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলোকে সাধারণত বাম বা দূর-বামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস উল্লেখ করেন, ১৮৪৮ সালে ‘দ্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশের সময় ইউরোপে সোশালিজম ছিল গ্রহণযোগ্য, কিন্তু কমিউনিজম ততটা নয়। প্রাচীন বাংলার সমাজব্যবস্থার পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই সময় ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্যবাদী প্রথার চর্চা ছিল। উত্তর ভারতের যোদ্ধেয় জাতির জীবনব্যবস্থায়ও সাম্যবাদী উপাদান লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতির ক্ষেত্রে অনেকেই দেশীয় সংস্কৃতির চেয়ে সোভিয়েত সংস্কৃতির প্রভাব বেশি গ্রহণ করেছেন। একটি প্রচলিত প্রবাদ ছিল— সোভিয়েত রাশিয়ায় বৃষ্টি হলে বাংলাদেশের বামপন্থীরা এখানে ছাতা মেলে ধরতেন। দেশীয় বাস্তবতায় রাজনীতি অনুশীলন করেছেন এমন বামপন্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার আগ পর্যন্ত এদেশে বামপন্থীরা কমিউনিস্ট আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। সোভিয়েত ভাঙনের পরও অনেকেই বিভিন্ন ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে বামপন্থী পরিচয় ব্যবহার করছেন— এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রকৃত সাম্যবাদী চেতনার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, এদেশের অনেক বামপন্থী বাস্তবিক অর্থে সাম্যবাদকে অন্তরে ধারণ করতে পারেননি। এক অর্থে বাউলরাই তাদের জীবনাচরণ ও দর্শনের মাধ্যমে সাম্যের বাণী বাংলার জনপদে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সুতরাং, প্রকৃত সাম্যবাদী চেতনার ধারক হিসেবে বাউলদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। [লেখক: উন্নয়নকর্মী]

সুয়েজ থেকে হরমুজ: ইতিহাসের স্রোতে শক্তির সাঁঝবেলা

ইতিহাসকে যদি একটি দীর্ঘ, অবিরাম নদীর মতো ধরা যায়, তবে তার স্রোত কখনও সরল নয়। নদী বাঁকে বাঁকে চলে, কখনও থমথমে হ্রদে থেমে যায়, আবার কখনও ঝরনার মতো উজ্জ্বল হয়ে ছুটে চলে। ইতিহাসও তেমনি—প্রতিটি অধ্যায় লেখা হয় মানুষের রক্ত, স্বপ্ন, ভুলভ্রান্তি এবং পুনর্জাগরণের মিশেলে। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল ছিল সেই নদীর এক প্রবল স্রোতের সংকেত—যেখানে বিশ্ব দেখেছিল এক প্রাচীন সাম্রাজ্যের ক্লান্তি। আজ, পারস্য উপসাগরের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা হরমুজ প্রণালী যেন নতুন করে প্রশ্ন তোলে ইতিহাস কি আবারও কোনো সন্ধিক্ষণের দিকে এগোচ্ছে?সুয়েজ খাল উনিশ ও বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে ছিল এক কৌশলগত সেতু। ইউরোপ ও এশিয়ার সংক্ষিপ্ত পথ হিসেবে এর নিয়ন্ত্রণ মানে ছিল বৈশ্বিক বাণিজ্য, সামরিক চলাচল এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব। যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স দীর্ঘ সময় ধরে এই নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের শক্তির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাস্তবতা পরিবর্তিত হতে থাকে; কাঠামোটিতে ফাটল ধরতে শুরু করে। মিশরের রাষ্ট্রনায়ক কামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণের ঘোষণা দিলে তা ছিল ঔপনিবেশিক প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি সাহসী রাজনৈতিক উচ্চারণ। প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইসরায়েল সামরিক পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু তারা যে আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল, তা তাদের প্রত্যাশার বাইরে। যুক্তরাষ্ট্র সেই অভিযানের বিরোধিতা করে এবং অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ব্রিটেনকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে। একই সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন -এর কূটনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলাফল—ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে অপমানজনকভাবে সরে আসতে হয়। এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয়, ঔপনিবেশিক যুগের অবসান আসন্ন এবং বিশ্বরাজনীতির নেতৃত্ব নতুন শক্তির হাতে স্থানান্তরিত হচ্ছে। সুয়েজ সংকটের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি একটি প্রতীকী ভাঙন। ব্রিটেনের সামরিক শক্তি তখনও ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে সীমাবদ্ধ করে। ক্ষমতা কেবল অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না; তা নির্ভর করে আন্তর্জাতিক সমীকরণ, অর্থনৈতিক শক্তি, কূটনৈতিক প্রভাব এবং সময়ের চলমান ধারা—সব কিছুর সমন্বয়ে। আজকের হরমুজ প্রণালী সেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি বহন করে। এটি শুধু ভৌগোলিক স্থান নয়; বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ, যার প্রতিটি নৌযান, প্রতিটি কূটনৈতিক বিবৃতি, এমনকি নীরবতাও বহন করে সম্ভাব্য সংঘর্ষের ছায়া। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী অবিশ্বাস, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এই প্রণালীকে জটিল ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে। সুয়েজের মতো নাটকীয় মুহূর্তের সঙ্গে হরমুজ পরিস্থিতির তুলনা করাটা সরল নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল দৃশ্যমান এবং উপনিবেশভিত্তিক, যার পতনও ছিল সহজে চিহ্নিত। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বহুমাত্রিক—সামরিক উপস্থিতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং জোটব্যবস্থা—সবই এতে অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক বিশ্ব আরও জটিল। সুয়েজ সংকটের সময় বিশ্ব ছিল দ্বিমেরু—যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন-এর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিভক্ত। বর্তমানে বিশ্ব বহু-মেরু, যেখানে চীন এবং রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই বাস্তবতায় কোনো একক ঘটনার মাধ্যমে একটি পরাশক্তির পতন তাড়াহুড়োর ফল নয়। তবুও, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বড় ধরনের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এটি তার বৈশ্বিক নেতৃত্বের ওপর প্রশ্ন তুলতে পারে, বিশেষত যদি সে তার মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। তবে এটিকে একটি ‘সুয়েজ মুহূর্ত’ হিসেবে দেখা যাবে না; কারণ আধুনিক বিশ্বে ক্ষমতার রূপ অনেক বেশি জটিল এবং বিস্তৃত। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, সাম্রাজ্যের পতন সাধারণত ধীরগতির এবং বহুমাত্রিক। অর্থনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে একটি শক্তি ধীরে ধীরে তার প্রভাব হারায়। সেই অর্থে হরমুজ কোনো চূড়ান্ত পরিণতি নয়; বরং একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। সুয়েজ থেকে হরমুজ—এই তুলনা আমাদের শেখায় যে, শক্তির স্রোত কখনও স্থির থাকে না। এটি ধীরে ধীরে, নিখুঁতভাবে রূপান্তরিত হয়। নাটকীয় পতনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো গভীর, সূক্ষ্ম পরিবর্তন। কারণ ইতিহাসের সাঁঝবেলা কখনও অন্ধকারের সূচনা নয়; বরং তা নতুন ভোরের প্রস্তুতি। [লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

ইংরেজি শেখানোর উদ্দেশ্য, পড়ানোর ধরন ও মূল্যায়ন

আমাদের দেশের ইংরেজি পরীক্ষায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশ্নপত্র, পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, বিসিএসের এবং যে কোন নিয়োগ পরীক্ষার (সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) প্রশ্নপত্র দেখলে কি মনে হয়? প্রশ্নের সঙ্গে ইংরেজি পড়ার বা ইংরেজি বিষয়টিকে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে পড়ানোর উদ্দেশের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়না। ইংরেজি প্রশ্ন দেখলে মনে হয়, শিক্ষার্থী কিংবা বিসিএস পরীক্ষার্থী অথবা কোন নিয়োগ কর্তৃপক্ষ জানতে চান যে শিক্ষার্থী বা কোন প্রার্থী ইংরেজি ভাষার গঠন প্রণালী বা ব্যাকরণ নিয়ে গভীর গবেষণা করছেন কিনা। আমাদের দরকার ছিল তারা ইংরেজিতে তার নিজ সম্পর্কে, তার চারপাশ সম্পর্কে কিছু বলতে পারে কিনা এবং সেই বিষয়গুলোই ইংরেজিতে লিখতে পারছে কিনা, অন্যের ইংরেজি বল বুঝতে পারে কিনা এবং সেই অনুযায়ী উত্তর দিতে পারে কিনা। সেটি নিশ্চিত করার জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা সেই ধরনের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা দেখছি তারা সবাই এমন সব বিষয় প্রশ্নে তুলে দেন বা জিজ্ঞেস করেন যার দ্বারা বুঝা যায় যে, শিক্ষার্থী বা প্রার্থী ইংরেজি গ্রামাওে এমফিল করছে কিনা কিংবা পিএইচডি করছে কিনা। এখানে আমি পাবলিক পরীক্ষার কয়েকটি প্রশ্ন এবং ক্যাডেট কলেজে প্রশ্ন দেখলাম। দেখলেই যে কেউ বুঝতে পারবেন এখানে কি টেস্ট করতে চাওয়া হয়েছে?এই অবস্থা শিক্ষার্থীদের ভাষা ব্যবহারকে, ব্যবহার করার অনুশীলনকে যে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে এবং যে উদ্দেশে এই বিষয়টি পড়ানো হচ্ছে সেই উদ্দেশের ধারে কাছেও নেই। প্রশ্নপত্র এমনভাবে করা হয় তাতে মনে হয়, একজন শিক্ষার্থী ইংরেজি ভাষার ব্যবহার ভালোভাবে আয়ত্ত্ব কওে ফেলেছে সেটি ইতোমধ্যে পরীক্ষিত এবং এখন ভাষায় তার কতটা গভীর দখল আছে সেটি পরীক্ষা করা হয়েছে। সে ভাষার ভেতরের কারণগুলো এবং সম্পর্কগুলো আরও একটু গভীরভাবে জানে কিনা সেগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে। এগুলো করতে গিয়ে শিক্ষার্থীর ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা মোটেই বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ভাষা নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা হয়তো এসব বিষয় কারণ ও সম্পর্ক বের করে লিপিবদ্ধ করে রাখেন যাতে আরও যারা এসব বিষয় গবেষণা করতে চান তারা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন যা সাধারণ ইংরেজি শিক্ষক বিশেষ করে যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয় তাদের জন্য নয় এবং তাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে তেমন কোনো কাজেও আসেনা, আর লক্ষ কোটি শিক্ষার্থীদের এ নিয়ে কোনো কাজও নেই, এতে তাদের কোন উপকারও হয়না। আর এজন্যই রাষ্ট্রীয় খরচে যে বার বছর ধরে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ইংরেজি পড়ানো হচ্ছে তাতে উদ্দেশ্য সফল হচ্ছেনা। যদিও কারিকুলামে লেখা আছে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি বিষয়ে নিজেকে স্বতস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করতে পারবে, ইংরেজি শুনে বুঝতে পারবে, ইংরেজি নিজে লিখতে পারবে এবং ইংরেজি বিষয় পড়ে বুঝতে পারবে এবং ভেতরকার মেসেজ গ্রহন করতে পারবে। জাতীয়ভাবে আমাদের শিক্ষার্থীদের যে ইংরেজি পড়ানোর উদ্দেশ্য এবং তারা কি অর্জন করবে তার সঙ্গে প্রচলিত মূল্যায়নব্যবস্থা কোনেওভাবেই যায়না। এসব প্রশ্নকেই আমাদের শিক্ষকরা, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অনেকেই (সবাই নয়) বলছেন এ তো চমৎকার প্রশ্ন। কেউ বলছেন, এ প্রশ্ন এত সহজ কেনো? এ গ্রামার তো যে কেউ পারব ইত্যাদি। প্রশ্ন এমনভাবে করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীদের আরও চিন্তা করতে হয়, শিক্ষকদের ভীষণভাবে বেগ পেতে হয়। যাতে তারা সহজে বুঝতে না পারে, এখানে দ্যাট কেনো আডজেকটিভ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ইত্যাদি। তার মানে উদ্দেশের সঙ্গে কোনো মিল নেই এবং ইংরেজি যারা পড়াচ্ছেন বা বিষয়টি যেভাবে ডিল করছেন তাদের কাছে ইংরেজি পড়ানোর উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়। আমদের বুঝতে হবে, ইংরেজি একটি বাধ্যতামূলক বিষয হিসেবে আমাদের দেশে পড়ানো হয় মূলত বাণিজ্যিক কারণে। কিন্তু প্রশ্নপত্র, পড়ানোর ধরন এবং সবার ভাব-ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে বাঙালিরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বাদ দিয়ে যেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ওপর সবার গবেষণা করতে বসেছেন এবং এর কঠিন থেকে কঠিনতর বিষয়গুলো আয়ত্ত্ব তাদের করতেই হবে তবেই না ইংরেজি শেখা হয়ে যাবে! আমাদের সব শিক্ষার্থীদের শেক্সপিয়ার আর ওয়ার্ডসওয়ার্থ ভালোভাবে জানতে হবে, বুঝতে হবে তাদের সাহিত্যের সব বিষয়গুলো গভীরভাবে আয়ত্ব করতে হবে এবং একইভাবে ইংরেজি ভাষার উৎপত্তি, ইতিহাস এর ক্রমবিকাশ, অর্থনীতির সঙ্গে এর সম্পর্ক, সমাজ পরিবর্তন, মানব ইতিহাসের অগ্রগতির সঙ্গে এর সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়গুলো যে সাধারণ সব শিক্ষার্থীদের জানতে হবে তা নয়। আমাদের শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ইংরেজি জানতে হবে যাতে তারা বিদেশে চাকরি কিংবা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে বিপদে না পড়েন। সুন্দরভাবে তাদের কাজগুলো ভিন্নভাষী দেশে চালিয়ে আসতে পারেন। আমাদের দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি করেন। তারা না জানেন ইংরেজি, না জানেন আরবী। মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে শুনে শুনে আরবী ভাষা তাদের মধ্যে অনেকেই আয়ত্ব করে ফেলেন এবং চমৎকার ভাবে আরবী ভাষায় কথা বলেন। তারা যদি ইংরেজি ভাষাটিও অনেকটা আয়ত্ব করে যেতে পারতেন তাহলে সেটি হয়তো সোনায় সোহাগা। কারণ তারা শুধুমাত্র শ্রমিক হিসেবে নয়, আরও বেশি বেতনের কাজ করতে পারতেন। আর তাদের কাজ করে অর্থ উপার্জন মানে শুধু তার নিজের উপার্জন নয়, দেশের উপার্জন। কিন্তু এই বিষয়টিকে আমরা বাস্তবে রূপ দিতে পারছিনা। কারণ শিক্ষাজীবনে তাদের শিখিয়েছি নউন কত প্রকার ও কি কি, কোনটি কোন ধরনের নাউন এবং কেনো ইত্যাদি যা মরুভূমির দেশে কিংবা শীতপ্রধান দেশ কোথাও তেমন কাজে লাগছে না। ফলে, তারা আবার অতিরিক্ত পয়সা ও সময় ব্যয় করে বিভিন্ন ধরনের কোচিংয়ে ভর্তি হন ইংরেজি শেখার জন্য। কিন্তু সেই কোচিংগুলোর অবস্থাও তো একই- তারা শেখাচ্ছেন কিছু অনুবাদ, স্বতস্ফূর্তভাবে ভাষা ব্যবহারের কোনো অনুশীলন নেই। দ্বিতীয় একটি কারণ হচ্ছে যারা উচ্চশিক্ষা কিংবা অন্যকোন কাজের জন্য বিদেশে যান তারা যাতে ভালোভাবে ইংরেজি ভাষাভাষী কিংবা অন্যভাষাভাষী দেশে সব কাজ মোটামুটি ভালোভাবে চালিয়ে যেতে পারেন। আমাদের ইংরেজি পড়ানো, ইংরেজির ক্লাস, ইংরেজির সিলেবাস ও মূল্যায়ন সে রকম হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তারা সবাই সারা জীবন ভারব কত প্রকার, কোন শব্দটি একটি বাক্যে কোন ধরনের নাউন এবং কেনো, এবং এগুলো আবার পড়েছেন সব বাংলায় ব্যাখ্যা অর্থাৎ ভাষা শেখার কোন পদ্ধতিতে নয়। জটিল বাক্য কাকে বলে, কেনো বলে, গঠনপ্রণালী কি কি ইত্যাদি। পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন দেখলেই তো বুঝা যাচেছ প্রায় সবকিছুই এগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ আর লিখিত একটি অংশ থাকে যা পুরোপুরি ট্রেডিশনাল। আর সেই সুযোগ কিছু শিক্ষক ও কোচিং সেন্টার একটি প্যারাগ্রাফ থেকে কিভাবে অন্য যে কোন প্যারাগ্রাফ লেখা যায় ইত্যাদি কসরত শেখায় শিক্ষার্থীদের। নিজের ভাষা উন্নত করার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। এখনে প্রশ্ন হলো তাদেরকে কি কেউ এসব কথা জিজ্ঞেস করবে কোন বিদেশি কোম্পানিতে কিংবা, বিদেশের মাটিতে কিংবা বিদেশের কোন অফিসে যে কোনটি অ্যাকটিভ ভয়েস, কোনটি নাউন ইন অ্যাপোজিশন ইত্যাদি? তারা বরং দেখবেন আমাদের শিক্ষার্থীরা বা গ্রাজুয়েটরা বিদেশিদের ইংরেজি বলা কতটা বুঝেন, সেইভাবে উত্তর দিতে পারেন কিনা, নিজেও বলে প্রকাশ করতে পারেন কিনা এবং নিজে লিখে প্রকাশ করতে পারেন কিনা।[লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজ] 

মরুর বালু ও অতল সমুদ্রে মৃত্যুফাঁদ

মরুর তপ্ত বালুকারাশি আর অতল সমুদ্রের নীল জল—একপাশে তৃষ্ণার হাহাকার, অন্যপাশে লোনা জলের গ্রাস। এর মাঝেই লুকিয়ে আছে এক নৃশংস মৃত্যুফাঁদ। গত কয়েকদিনে ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে বিলীন হওয়া ২২টি তাজা প্রাণ কেবল সংখ্যা নয়; বরং ২২টি স্বপ্ন, ২২টি পরিবার এবং ২২টি শোকাতুর দীর্ঘশ্বাসের গল্প। সবুজ শ্যামল এই বাংলার বুক চিরে দারিদ্র্যের কষাঘাত আর সোনালি ভবিষ্যতের মরিচিকা যখন কোনো তরুণকে গ্রাস করে, তখন শুরু হয় এক করুণ যাত্রার উপাখ্যান। মানব পাচার কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং আধুনিক সভ্যতার গায়ে এক কলঙ্কিত ক্ষত, যা হাজারো মা-বাবার বুক খালি করে চলেছে প্রতিনিয়ত। উন্নত জীবনের আশায় বুক বেঁধে যারা ঘর ছাড়ে, তাদের অজানাই থেকে যায় যে তারা আসলে এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পা দিচ্ছে, যেখানে বালুকাধূসর মরুভূমি কিংবা উত্তাল সমুদ্রের লোনা জল হয়ে ওঠে তাদের শেষ শয্যা।মানবসত্তা কেনাবেচার এই নিষ্ঠুর প্রথা বা মানব পাচার আধুনিক বিশ্বের এক ভয়াবহ অভিশাপ। আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে এই বিষয়ের একটি চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো: মানব পাচারের শিকড় মূলত প্রাচীন দাসপ্রথার গভীরে প্রোথিত। প্রাচীনকালে যুদ্ধবন্দী বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষকে জোরপূর্বক শ্রম কিংবা যৌন দাসত্বে বাধ্য করা হতো। ইতিহাসের সেই অন্ধকার অধ্যায়ই আধুনিককালে ‘মানব পাচার’ হিসেবে নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে।শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে যখন শ্রমের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়, তখন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে মানুষ সরিয়ে নেয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিশ্বায়নের ফলে সীমান্ত উন্মুক্ত হওয়া এবং যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় পাচারকারীরা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ পায়।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানব পাচারের ইতিহাস মূলত দারিদ্র্য এবং উন্নত জীবনের সন্ধানে দেশান্তরী হওয়ার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িত। সত্তর ও আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির আড়ালে অনেক ক্ষেত্রে অবৈধভাবে মানুষ পাঠানোর মাধ্যমে এ দেশে পাচারের বীজ বপন করা হয়।মানব পাচার মূলত তিনটি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়: উৎস দেশ, ট্রানজিট দেশ এবং গন্তব্য দেশ। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং ফিলিপাইন মূলত ‘উৎস দেশ’ হিসেবে পরিচিত, যেখান থেকে মানুষ পাচার করা হয়।দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া পাচারকারীদের জন্য ট্রানজিট ও গন্তব্য উভয় হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের জঙ্গলগুলোতে পাচারকৃতদের আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে।মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেমন— সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার মূলত শ্রম পাচারের প্রধান গন্তব্য। এখানে অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র বেতনে বা বিনা বেতনে শ্রমিকদের অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।লিবিয়া বর্তমানে মানব পাচারের একটি ভয়াবহ ‘হাব’ বা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা মানুষদের এখান থেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।ইউরোপের উন্নত দেশগুলো যেমন— ইতালি, গ্রিস এবং স্পেন অনেক পাচারকৃত মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য। তবে সেখানে পৌঁছাতে পারলেও তারা প্রায়ই অবৈধ অভিবাসীর তকমা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতেও পাচারকৃত মানুষদের দেখা মেলে। এখানে মূলত কৃষি খাত এবং সেবা শিল্পে সস্তায় শ্রম শোষণের জন্য পাচার করা হয়।প্রতিবেশী দেশ ভারত বাংলাদেশের নারী ও শিশু পাচারের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রলোভন দেখিয়ে তাদের নিয়ে গিয়ে যৌন পল্লী বা গৃহস্থালির কাজে শ্রম দাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়।পাচারকারী চক্রগুলোর জাল মাকড়সার মতো ছড়িয়ে আছে গ্রাম থেকে বিশ্ব দরবার পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত। তারা বিভিন্ন দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বা যোগসাজশ করতে দক্ষ। সমুদ্রপথে ছোট নৌকায় গাদাগাদি করে মানুষ তোলা থেকে শুরু করে বিদেশের মাটিতে বন্দীশালায় আটকে রেখে নির্যাতন—সবকিছুই এই চক্রগুলো অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিচালনা করে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চক্রগুলো সাধারণত গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করে। তারা ‘দালাল’ নামে পরিচিত স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ভুয়া ভিসার প্রলোভন দেখায়। এই স্থানীয় দালালরা আবার যুক্ত থাকে ঢাকাভিত্তিক বড় এজেন্সির সঙ্গে, যাদের আন্তর্জাতিক অপরাধী সিন্ডিকেটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।মানব পাচার একটি জঘন্য অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। এটি প্রতিরোধে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। নিচে করণীয় তুলে ধরা হলো: মানব পাচার রোধে সরকারের প্রধান কাজ হলো বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। পাচারকারীদের দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।পাচার প্রতিরোধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সভা, সেমিনার এবং গণমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে পাচারের ভয়াবহতা এবং পাচারকারীদের কৌশলের ব্যাপারে জনগণকে সজাগ করে তুলতে হবে।পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবকে পাচারপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকা এবং বিমানবন্দরগুলোতে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পাচারচক্রের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে হবে।সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধু-বান্ধবের ব্যাপারে অভিভাবকদের বিশেষ নজর রাখতে হবে। অতিরিক্ত লোভ বা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে কেউ যেন সন্তানকে ভুল পথে নিতে না পারে, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে এবং সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।যারা পাচারের শিকার হয়ে ফিরে এসেছেন, তাদের সামাজিকভাবে হেয় না করে সহমর্মিতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। ভুক্তভোগীদের উচিত পাচারকারীদের তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা, যাতে অন্য কেউ এই ফাঁদে না পড়ে।বিদেশে কর্মসংস্থান বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে অবশ্যই সরকারি অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে তথ্য যাচাই করতে হবে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের প্রলোভনে পড়ে পাসপোর্ট বা টাকা লেনদেন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।দারিদ্র্য ও বেকারত্বই পাচারের মূল কারণ। তাই দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং তরুণ সমাজকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে পাচারকারীরা তরুণদের ফাঁদে ফেলছে। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে এবং অপরিচিত কারো প্রলোভনে সাড়া দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে ‘মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটি’কে সক্রিয় করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পাচারবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।মানব পাচার একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পাচার হওয়া ব্যক্তিদের উদ্ধার ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজতর করতে হবে।[লেখক: প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল]

রম্যগদ্য: বই মেলায় কার বই?

‘‘বই মেলায় কার বই? মানে কী? বই মেলায় লেখকের বই! বই মেলায় লেখকের বই থাকবে না তো কী থাকবে? ডাক্তারের লেখা প্রেস্ক্রিপশন! যত্তসব আদিখ্যেতা।’’‘‘আরে জঙ্গল বই মেলায় থাকবে লেখকের বই, এ নিয়ে তোর সঙ্গে আমার কোনো বিবাদ নেই, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে কেউ একজন দিস্তা দিস্তা কাগজ নিয়ে তার জীবনের কিছু কথা লিখলো, প্রেসে যেয়ে বই ছাপালো, ব্যাস ওইটা বই হয়ে গেল?’’‘‘নিশ্চই, প্রেসে ছাপা বই, শক্ত দেড় ইঞ্চি পিসবোর্ড দিয়া বান্ধায়া মলাট দিলাম, ধ্রুবএষ প্রচ্ছদ, আর্কাইভ থ্যেইক্কা আই.এস.বি.এন. নাম্বার লাগাইলাম ব্যাস হয়াগেলো বই। এর মইধ্যে প্রবলেম কিতা!’’‘না’ বলছিলাম সাহিত্য পদবাচ্য বলে কিছু থাকবে না! প্রেসে ছাপা বই, শক্ত দেড় ইঞ্চি পিসবোর্ড দিয়ে মলাট, ধ্রুবএষ প্রচ্ছদ, আর্কাইভ থ্যেইক্কা আই.এস. বি.এন. নাম্বার, ব্যাস হয়ে গেলো বই!”“ওই মিয়াভাই, সাহিত্যতো বিচার করবো পাঠকে, হ্যারা যেইটা পইড়া মজা পাইবো, হেইটা সাহিত্য, যেই বই বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাইবো, হ্যেইডাই বই।”“তাহলে যে বই পুরস্কার পাবেনা সেগুলো কি বই না?”“পাগোলের মতুন কিতা মাতেনরে বা, একটা ক্লাসে সব ছাত্র কি ফার্স্ট হয়? আর যারা ফার্স্ট হয়না তারাকি ছাত্র না?”“বুঝলাম সেরা সাহিত্য পদবাচ্য বইটি পুরস্কার পেলো, আর অন্য বইগুলোও সাহিত্যের বিভিন্নরস সম্বলিত। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে আজকাল যে সব বইগুলো সাহিত্যের ধারে কাছে নেই, সে সব বইতো বইমেলায় ভরে যাচ্ছে, তাহলে এগুলোর কি হবে!”“আপনে কি বলতে চাচ্ছেন যে, এইযে মনে করেন কথাশিল্পী শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দিন, আহসান হাবিব, আলাউদ্দিন আল আজাদ...”“বুঝলাম বুঝলাম, এইসব মাদ্রাসাছাত্ররা পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের এক একজন দিকপাল হয়ে ওঠেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এসব, কথাশিল্পী শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দিন, আহসান হাবিব, আলাউদ্দিন আল আজাদ, ইনারা তাদের পাঠ্য পরিক্রমায় পাঠ করেছেন, মহাকবি শেক্সপিয়ার, কবি মিল্টন, হোমারের দি ইলিয়াড, ওয়ার্ডস ওয়ার্থ, আলেক্সজান্ডার ডুমা, সোফোক্লিস, ইউরিপিডিস, বায়রন...”“বুঝছি বুঝছি কথাশিল্পী শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দিন, আহসান হাবিব, আলাউদ্দিন আল আজাদ...ইনারা সব বিশ্বসাহিত্যের ধারক বাহকদের লেখার সঙ্গে পরিচিত হোই, নিজেগো বেইস শক্ত করছে আর বর্তমান বাংলা সাহিত্যরে উন্নতি করছেন।”“এইসব বাংলা সাহিত্যের দিকপালদের জীবনের শুরু থেকেই পরিচিত হচ্ছেন বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে আর তোদের বর্তমান লেখকরা পরিচিত হচ্ছেন কথাশিল্পী শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দিন, আহসান হাবিব, আলাউদ্দিন আল আজাদ এদের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে অতএব বুঝতেই পারিস তোদের লেখকদের সাহিত্যমান কি হবে!”“হেঁ হেঁ, এ কথা বললেতো হবে না, আমরা অখন যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম করছি যে, রবীন্দ্রনাথ, যতীন্দ্রনাথ, প্রমথনাথ, যদুনাথ সব বিধর্মী সাহিত্য স্কুল কলেজ থেইকে বাদ দিয়েছি যে, ফলে আমার বর্তমান বাংলা সাহিত্যসেবীরা দ্বীনের আলোয় উদ্ভাসিত হোই বাংলা সাহিত্যরে পবিত্রতম স্থানে পৌঁছে দেবে যে।”“ঠিক আছে তোর বাংলা সাহিত্য পুত-পবিত্র এক অনন্য মর্যাদায় পৌঁছে যাবে। যারা এইসব বিধর্মী বিবর্জিত সাহিত্য সাধনা করবেন তাদের সাহিত্য যে সব ঘরে পঠিত হবে সে সব ঘরে কখোনোই কোনো অপদেবতার আসর হবে না।”“হেঁ হেঁ বুইচেন না, এই সব বিধর্মী বিবর্জিত সাহিত্য ঘরে ঘরে পাঠ করলে, ভূত, পেত্নি, দৈত্যি-দানো কখনোই আপনের বাড়ির ত্রিসীমানায় আইবার পারবেনা যে।”“বুঝলাম ভাই তোর বিধর্মী বিবর্জিত সাহিত্য পাঠে জীবনের সব বালামসিবত দূর হবে। কিন্তু এগুলোকি মানে এইসব লেখাগুলোকি সাহিত্য পদ মর্যাদা পাবে?”“আরে মিয়া আপনেতো বীষম প্যাচাইল্লা মানুষ সাহিত্য হোইবোনা মানে এই যে দেখেন আমাদের অবসার প্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব স্যার প্রথম যে হিন্দু ভদ্রলোক আমাদের বিশ্বের পবিত্রতম গ্রন্থ কোরান শরীফ বাংলায় অনুবাদ করছিলেন, সেই ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের জীবন ও কর্ম লিখে এবং প্রকাশকরে নিজের আখেরাতের জন্য সোয়াব কামাইছেন। পিলাস উনি উপন্যাস, গল্প, কবিতা, নিবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, শ্রমকল্যাণ, ভূগোল, গবেষণা, জীবনী, বিবিধ প্রায় ৮০টি বই লিখেছেন। চিন্তা করতে পারেন স্যারদের বাংলা সাহিত্যের প্রতি কিরুপ ডেডিকেশন!”“বলিস কি? অতিরিক্ত সচিব যদি ৮০টি বই লিখেন, তাহলে সচিব স্যার কয়টা বই লিখবেন? ১৬০টি!”“না না এভাবে ডিডাকটিভ লজিকের মতো কথা বললে যে, ফ্যালাসি অব মিডেল টার্ম হবে।”“ফ্যালাসি অব মিডেল টার্ম, মানে কিরে?”“এই যেমন ধরেন, আমি টেবিল ছুঁয়েছি, টেবিল ফ্লোর ছুঁয়েছে অতএব আমি ফ্লোর ছুঁয়েছি। এই রকম ফ্যালাসি অব মিডেল টার্ম আর কি? তাই চট-যলদি বললে হবেনা, অতিরিক্ত সচিব স্যার যা লিখছেন সচিব স্যার তার ডবল লিখবেন।”“থাক ভাই আমার বলার কিছুই ছিলনা, তুই তোর স্যারদের, বিধর্মী বিবর্জিত সাহিত্য পাঠে জীবনের সব বালামসিবত দূর কর, আমার বই মেলায় সব অবসরপ্রাপ্তদের স্যারদের বালামসিবত দূর করা বই সাপ্লাই করে ভরিয়ে তোল, তাতে বাংলা সাহিত্যের উন্নতি হোক না হোক আমাদের আখেরাতের জীবন সহজ হোক এই কামনা করি। তোদের আরও উন্নতি হোক, সরকারি কর্মচারীরা দরকার হলে ছন্দনামে বালামসিবত দূর করার পুস্তক রচনা করুন। বাংলা সাহিত্যের করুণ অবস্থার উন্নতি করুন, পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার দরবারে এই আমার প্রার্থনা।”“কওন যায়না, এই পবিত্রতম মাসে আপনের ইচ্ছা কবুলও হতে পারে। শোনেন পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার দরবারে সফেদ দীলে কিছু চাইলে, তাতে শুধু বাংলা সাহিত্য না, জীবনের সব কিছুর উন্নতি হবে বুজেছেন!” “তোর মুখে ঘী’শক্কর, তুই বই মেলায় বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে মানব কল্যাণে নিজেরে নিবেদিত কর, আর বাংলা একাডেমিকে শুধু বাংলা সাহিত্যের উন্নতিনয় আখেরাতের রাস্তা উন্নয়নেও কাজে লাগা।”“দেখি এই পবিত্র মাসে, আপনের খায়েস কবুল হয় কিনা, আর বাংলা একাডেমিকে আখেরাতের রাস্তা উন্নয়নের কাজে লাগান যায় কিনা?”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

দেশের হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা: বাস্তবতা ও করণীয়

সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী বিভাগে হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হাম ও এর জটিলতায় প্রাণ হারিয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রে শিশুদের জন্য আইসিইউ বেডের দীর্ঘদিনের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনই গুরুতর অসুস্থ শিশু আইসিইউ সেবার অপেক্ষায় থাকে; কিন্তু বেডের অপ্রতুলতার কারণে অনেককেই বাধ্য হয়ে সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা নিতে হয়।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিলে নিবিড় পরিচর্যা বা আইসিইউ সাপোর্ট জীবনরক্ষাকারী হয়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— এই গুরুত্বপূর্ণ সেবা এখনও সর্বজনীন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে জনমনে উদ্বেগের পাশাপাশি নীতিনির্ধারক মহলেও আলোচনা-সমালোচনা ক্রমেই জোরদার হচ্ছে।ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, পেডিয়াট্রিক আইসিইউ এবং নিউনেটাল আইসিইউ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বাংলাদেশে এসব সেবার সম্প্রসারণ ঘটলেও জনসংখ্যার তুলনায় তা এখনও অত্যন্ত অপ্রতুল এবং মূলত শহরকেন্দ্রিক। দেশে প্রথম আইসিইউ চালু হয় ১৯৮০ সালে। বর্তমানে আনুমানিক ১০০টির মতো হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা রয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। সরকারি হাসপাতালে কার্যকরী আইসিইউ বেডের সংখ্যা মাত্র ২২০-২৫০টির মতো, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। আদর্শভাবে যেখানে আইসিইউ ও সাধারণ বেডের অনুপাত হওয়া উচিত ১:১০, সেখানে বাস্তবে তা প্রায় ১:২১৯। প্রতি এক লাখ জনগোষ্ঠীর জন্য আইসিইউ বেডের সংখ্যা মাত্র ০.৭, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় নিতান্ত কম।কোভিড-১৯ মহামারির পর দেশে আইসিইউ বেডের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় হাজারের ওপর পৌঁছালেও জনবল সংকটের কারণে এর একটি বড় অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে পেডিয়াট্রিক ও নিয়োনেটাল আইসিইউ সেবা এখনও মূলত বড় বেসরকারি ও বিশেষায়িত হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ জেলা হাসপাতালে এই ধরনের সেবা নেই, বা থাকলেও অত্যন্ত সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে।আইসিইউ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো দক্ষ জনবলের অভাব। দেশে প্রশিক্ষিত ইনটেনসিভিস্ট, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট এবং বিশেষায়িত আইসিইউ নার্সের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। প্রতি পাঁচ বছরে মাত্র ১৫০-২০০ জন বিশেষজ্ঞ তৈরি হতে পারে, যা এই খাতের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। বর্তমানে দেশে নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র ৪৩ জন। অথচ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, আইসিইউ পরিচালনায় এ ধরনের বিশেষজ্ঞদেরই নেতৃত্ব দেয়ার কথা। বাস্তবে প্রায় ৬০ শতাংশ আইসিইউ অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এবং মাত্র ১০ শতাংশ আইসিইউ নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।নার্সিং সেবার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। আইসিইউতে ২৪ ঘণ্টা রোগীর সেবায় নিয়োজিত নার্সদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাব রয়েছে। অধিকাংশ নার্সের নিবিড় পরিচর্যায় একাডেমিক প্রশিক্ষণ নেই এবং মাত্র ৪০ শতাংশ নার্স বেসিক লাইফ সাপোর্ট ও সিপিআর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ফলে আইসিইউ সেবার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।আইসিইউ স্থাপন ও পরিচালনা একটি ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। একটি ১০ শয্যার আইসিইউ স্থাপনে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা পেতে ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি কিংবা উন্নত ল্যাব সুবিধাও অনুপস্থিত।গবেষণায় দেখা গেছে, মোট রোগীর প্রায় ৫ শতাংশ আইসিইউ সেবার প্রয়োজন হয় এবং কার্যকর আইসিইউ ব্যবস্থাপনা প্রায় ৫০ শতাংশ মৃত্যুহার কমাতে সক্ষম। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে আইসিইউ ব্যবস্থাপনার মান নিয়ন্ত্রণ, নীতিমালা এবং তদারকির ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। মাত্র ২০ শতাংশ হাসপাতালে কার্যকর ইনফেকশন কন্ট্রোল কমিটি রয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য তা হাতের নাগালের বাইরে।এই প্রেক্ষাপটে দেশের আইসিইউ সেবা উন্নয়নে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি জেলা হাসপাতালে পর্যায়ক্রমে আইসিইউ স্থাপন করতে হবে এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে আবশ্যকভাবে পিআইসিইউ ও এনআইসিইউ চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালের মোট বেডের অন্তত ৫-১০ শতাংশ আইসিইউ বেড হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ইনটেনসিভ কেয়ার, ক্রিটিক্যাল কেয়ার নার্সিং এবং রেসপিরেটরি থেরাপির প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করতে হবে এবং এ খাতে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে।এছাড়া আইসিইউ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনা চালু করা, অচল আইসিইউ পুনরায় চালু করা, বিদ্যমান সরঞ্জামের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত আইসিইউ গাইডলাইন প্রণয়ন, ইনফেকশন কন্ট্রোল বাধ্যতামূলক করা এবং অ্যাক্রেডিটেশন সিস্টেম চালু করাও সময়ের দাবি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে টেলি-আইসিইউ এবং ডিজিটাল পেশেন্ট মনিটরিং ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।বাংলাদেশে আইসিইউ, পিআইসিইউ ও এনআইসিইউ সেবার অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য হলেও তা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং জনবল সংকটে সীমাবদ্ধ। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সেবা খাতকে শক্তিশালী করা সম্ভব হলে দেশের সামগ্রিক মৃত্যুহার হ্রাস এবং সংশ্লিষ্ট রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বি আর বি হাসপাতাল, ঢাকা]

দুর্নীতি: মানবসৃষ্ট এক নীরব দুর্যোগ

বাংলাদেশের ইতিহাসে দুর্যোগ কোনো নতুন শব্দ নয়। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই এই দেশের মানুষ টিকে আছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এমন এক দুর্যোগ ধীরে ধীরে রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে বিস্তার লাভ করছে, যার উৎস প্রকৃতিতে নয়, মানুষের আচরণে। সেই দুর্যোগ হলো দুর্নীতি। এটি এমন এক মানবসৃষ্ট বিপর্যয়, যার কোনো শব্দ নেই, কোনো দৃশ্যমান ধ্বংসস্তূপ নেই— তবুও এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, প্রশাসন এবং নৈতিক কাঠামোকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। দুর্নীতির প্রকৃতি বোঝার জন্য এটিকে কেবল আইনি অপরাধ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। যখন ক্ষমতা, দায়িত্ব ও সম্পদের ব্যবস্থাপনার মধ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থ অগ্রাধিকার পায়, তখন দুর্নীতি জন্ম নেয়। আর এই জন্ম কোনো একক স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং নিম্নস্তর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। দুর্নীতির প্রথম অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষ লাভ করে রাষ্ট্রের নিম্নস্তরের প্রশাসনিক কাঠামোতে। একটি জন্মসনদ, জমির খতিয়ান, নামজারি, ট্রেড লাইসেন্স কিংবা কোনো সরকারি সেবা পেতে অনেক সময় নাগরিকদের অঘোষিত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই ধরনের দুর্নীতি অনেক সময় এতটাই প্রাত্যহিক হয়ে উঠেছে যে তা যেন এক ধরনের অলিখিত প্রথায় পরিণত হয়েছে।এই দুর্নীতি পরিমাণে ছোট হলেও এর প্রভাব গভীর। কারণ এটি নাগরিকদের মনে রাষ্ট্র সম্পর্কে এক ধরনের হতাশা সৃষ্টি করে। যখন মানুষ দেখে যে আইন বা নিয়মের চেয়ে অর্থের বিনিময়ই দ্রুত ফল দেয়, তখন তার মধ্যে ন্যায়বোধের প্রতি আস্থা কমে যায়। ধীরে ধীরে নাগরিকের মধ্যে এমন ধারণা জন্ম নেয় যে, সিস্টেমের ভেতরে সততা দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। এই মানসিকতার পরিবর্তন সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। কারণ এটি নাগরিকদের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে এবং দুর্নীতিকে একটি সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত করে।বাংলাদেশ গত দুই দশকে অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নের ভেতরেই অনেক সময় দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে। অনেক প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কিংবা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প অনুমোদনের অভিযোগ দেখা যায়। এই পরিস্থিতি উন্নয়নের উদ্দেশ্যকে দুর্বল করে দেয়। একটি প্রকল্পের অর্থ যদি যথাযথভাবে ব্যবহৃত না হয়, তবে সেই প্রকল্প জনকল্যাণে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারে না। এই ধরনের দুর্নীতি উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়। কারণ রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ অপচয়ের মাধ্যমে হারিয়ে যায়। যে অর্থ দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা দারিদ্র্য বিমোচনে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া সম্ভব ছিল, তা অনেক সময় অদক্ষতা ও অনিয়মের কারণে অকার্যকর হয়ে পড়ে।বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংক খাতে বিভিন্ন অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করা, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে অযোগ্য ঋণ অনুমোদন কিংবা তদারকির দুর্বলতা— এসব বিষয় ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করে তোলে। ব্যাংক খাতের এই দুর্বলতা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। কারণ ব্যাংকগুলো জনগণের আমানত এবং বিনিয়োগের একটি প্রধান মাধ্যম। যদি এই ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়, তবে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও ধীর হয়ে পড়তে পারে। ফলে দুর্নীতির এই রূপটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকিতে পরিণত হয়।দুর্নীতির সবচেয়ে জটিল ও বিপজ্জনক রূপটি দেখা যায় তখন, যখন এটি উচ্চপর্যায়ের ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দুর্বল হয়, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সম্পদ বণ্টন, উন্নয়ন পরিকল্পনা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোতে জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য পেতে পারে। এর ফলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি সমাজে একটি নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেয়— যেন ক্ষমতা থাকলে জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই। এই ধারণা সমাজের ভেতরে গভীর হতাশা তৈরি করে এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করে।দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না; এটি সমাজের নৈতিক কাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। যখন মানুষ দেখে যে অসৎ উপায়ে দ্রুত সম্পদ অর্জন করা সম্ভব, তখন সততা ও নৈতিকতার মূল্য কমে যায়। এই পরিস্থিতি নতুন প্রজন্মের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তরুণেরা যদি মনে করে যে মেধা ও পরিশ্রমের চেয়ে প্রভাব ও অনিয়মই সফলতার পথ খুলে দেয়, তবে তাদের মধ্যে আদর্শের সংকট সৃষ্টি হয়। ফলে সমাজে একটি নৈতিক বিভ্রান্তি জন্ম নেয়, যেখানে সৎ মানুষ নিজেকে অসহায় মনে করে এবং অসৎ ব্যক্তি সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে। দুর্নীতিকে অনেক সময় একটি প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এর প্রভাব বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে এটি একটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। কারণ এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি দুর্বল করে, উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয় এবং সামাজিক আস্থাকে ধ্বংস করে।প্রাকৃতিক দুর্যোগ হঠাৎ আঘাত হানে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ক্ষত মুছে যায়। কিন্তু দুর্নীতি দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ক্ষয় করে, যার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করতে হয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রধান শর্ত। একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার ও ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুযোগ কমাতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক সচেতনতা। একটি সমাজ যদি দুর্নীতিকে ঘৃণা করতে শেখে এবং সততাকে সম্মান দেয়, তবে দুর্নীতির বিস্তার স্বাভাবিকভাবেই কমে আসতে পারে।বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সামাজিক সূচকে অগ্রগতি দেশের সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার পথে দুর্নীতি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি এমন এক মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, যা চোখে দেখা যায় না কিন্তু রাষ্ট্রের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। যদি এই দুর্যোগকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে উন্নয়নের অর্জনগুলোও একসময় প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।অতএব, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অর্থনৈতিক সম্পদে নয়, বরং তার সততা, ন্যায়বোধ এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতিতে নিহিত। আর সেই সংস্কৃতিই পারে বাংলাদেশকে এই নীরব মানবসৃষ্ট দুর্যোগ থেকে মুক্তির পথে এগিয়ে নিতে।[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

প্রতিরোধের রাজনীতি ও ভাষার বিবর্তন

পরিশীলিত কিংবা অশ্রাব্য ‘শব্দ’ ও ‘শব্দগুচ্ছ’ আসলে মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রগুলোর একটি। মানবসভ্যতার ইতিহাস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নিষ্পেষিত মানুষের ইতিহাস মূলত প্রতিরোধেরই ইতিহাস। আর সেই প্রতিরোধের জন্য প্রতিবাদের প্রথম ও মৌলিক মাধ্যমটি হচ্ছে ভাষা। দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চনা, নির্যাতন, নিপীড়ন ও অবিচারের ভারে মানুষের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তার সামনে তখন বিকল্পের পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে। তার অস্তিত্ব যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে, তার নীরবতা তখন আর নিরপেক্ষতার প্রতীক থাকে না; বরং তা আত্মসমর্পণের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। এই চরম বাস্তবতায় মানুষ যে অস্ত্রটি শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরে বা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, তা অনেক সময়ই দৃশ্যমান বা শারীরিক নয়, বরং ভাষাগত প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। শব্দ, মুখের বুলি, উচ্চারণ, এমনকি গালাগাল বা ‘গাইল’, সবকিছু মিলিয়ে ভাষা তখন হয়ে ওঠে প্রতিবাদের এক তীব্র ও তাৎপর্যপূর্ণ মাধ্যম। অন্তর্গত বেদনা-বিক্ষোভের ধ্বনি ও প্রতিধ্বনির মাধ্যমেই জালেমের সঙ্গে মজলুমের এই সংঘর্ষে গড়ে ওঠে এক প্রতিরোধী চেতনা, যেখানে ভাষাই হয়ে দাঁড়ায় মজলুমের শেষ আশ্রয়, শেষ প্রতিরোধ, শেষ আর্তনাদ।বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা এই তাত্ত্বিক সত্যের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। দীর্ঘ সতেরো বছরের বিদ্রুপ-অপবাদ-অপমান, দমন-পীড়ন, গুম, খুন ও অব্যাহত নির্যাতন-নিপীড়নের অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষকে কেবল শারীরিক কিংবা অর্থনৈতিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, গভীর মানসিক যন্ত্রণার ভারেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। স্বৈরাচারী রাষ্ট্রযন্ত্র ও সরকার তথা শাসকশ্রেণী এবং তার সেবাদাসশ্রেণী জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল জাতির বুকের ওপর। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি দমন-শোষণ-শাসন একটি ‘সামষ্টিক আতঙ্ক বা ভীতি‘ (কলেক্টিভ ট্রমা) তথা সমষ্টিগত মানসিক অভিঘাতের জন্ম দেয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মানুষের আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা ও ভাবনা-প্রকাশভঙ্গি কিংবা ভাষায়। ফলে এই পরিস্থিতিতে বিক্ষুব্ধ মানুষের ভাষা আর পরিশীলিত, ভদ্র বা শিষ্ট থাকার সামাজিক দায় বহন করে না। বরং তা ভেঙে ফেলে প্রচলিত শালীনতার শ্রেণীগত কিংবা ভাষাগত প্রকাশভঙ্গির কাঠামো। সাধারণ মানুষ আশ্রয় নেয় এমন এক ভাষার, যাকে আমরা সহজেই ‘অশ্রাব্য’ বা ‘অশালীন’ বলে চিহ্নিত করি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই অশ্রাব্যতাই কি প্রকৃতপক্ষে অশালীন কিংবা তিরস্কারযোগ্য? নাকি এটি নিপীড়িত মানুষের জমাটবাঁধা ক্ষোভ, দুঃখ ও বেদনার এক অনিবার্য এবং অকৃত্রিম ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ কিংবা হতাশা আশ্রিত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের বহিঃপ্রকাশ, যা সামাজিক অভিধানে ‘অশালীন’ হলেও ন্যায়বোধের বিচারে এক গভীর বেদনাহত ব্যক্তিসত্তার মানবিক আর্তনাদ?ভাষার মৌলিক উপাদান হলো ‘শব্দ’ বা ‘শব্দগুচ্ছ’ যা প্রথমত ব্যক্তির মুখ থেকেই উৎসারিত হয়; সেই অর্থে তা ব্যক্তিগত। কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনায় আমরা জানি, যখন কোনো শব্দ জনতার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা আর ব্যক্তিগত সীমানায় আবদ্ধ থাকে না; বরং তা রূপান্তরিত হয় একটি সামষ্টিক, সামাজিক, এমনকি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক চিহ্নে। এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে সমাজ-ভাষাবিজ্ঞানের (সোসিও-লিঙ্গুইস্টিক) পরিভাষায় বলা যেতে পারে ‘সামষ্টিক অধিগ্রহণ’ (কলেক্টিভ এপ্রোপ্রিয়েশান) যেখানে জনতা কোনো শব্দকে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের তথা সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা কিংবা বিশ্বাস ও চেতনার বাহক হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে যে শব্দ একসময় ছিল প্রান্তিক, উপেক্ষিত বা তথাকথিত ‘অচল’ কিংবা ‘অশালীন’, সেটিই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে সচল, গ্রহণযোগ্য এবং কেন্দ্রীয়। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই ভাষা নতুন অর্থ, নতুন শক্তি, নতুন মাত্রা এবং নতুন দিকনির্দেশনা অর্জন করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এভাবেই ভাষা যুগের ধর্ম, বর্তমানের প্রয়োজন ও সময়ের চরিত্রকে ধারণ করে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কোনো কোনো শব্দ বা বাক্যবন্ধ ধীরে ধীরে রূপ নেয় তীব্র রাজনৈতিক রূপকে; যেমন ‘মীর জাফর’ বিশেষ্যটি বিশেষণ হয়ে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশব্দে রূপান্তরিত হয়, কিংবা ‘মগের মুলুক’ বাগধারাটি হয়ে ওঠে বিশৃঙ্খলা ও অন্যায়ের প্রতীক। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে ভাষা তখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে স্মৃতি, প্রতিরোধ ও বিচারবোধের ধারক।প্রবাদ-প্রবচন, রূপক, উপমা- এসবকিছুর মধ্য দিয়েই ভাষা নিজেকে সমৃদ্ধ করে, প্রসারিত করে, এমনকি কখনো কখনও শোধিত ও পরিশীলিত করে। এই সমগ্র প্রক্রিয়াটি প্রায়ই সমাজের অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে এক ধরনের ‘উপজাত’ (বাই-প্রডাক্ট) হিসেবে জন্ম নেয় যা প্রথম দৃষ্টিতে ‘অশালীন’ বা ‘অগ্রহণযোগ্য’ মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা ভাষা ও সমাজ উভয়ের জন্যই এক ধরনের ‘শাপে বর’ হয়ে দাঁড়ায়। গ্রামীণ জীবনে বাংলায় এমন ‘অমার্জিত’ (স্ল্যাং) শব্দ, শব্দগুচ্ছ, প্রবাদ-প্রবচন, বাগধারা ভুরিভুরি ব্যবহৃত হয়। অতএব, যারা আজ বিদ্বেষপ্রসূত উদ্বেগে উৎকণ্ঠিত হয়ে এ প্রজন্মের প্রতিবাদী তরুণদের ব্যবহৃত ভাষাকে কেন্দ্র করে সমালোচনার ঝড় তুলছে, এমনকি তাদেরকে ‘ন্যাংটা’ করে নিরস্ত্র ও নিবৃত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের জন্য ইতিহাসে অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, জালেমের পক্ষে কিংবা ইনসাফের বিপক্ষে কৌশলী বয়ান নির্মাণ কখনোই জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ভাষাকে দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখতে পারে না। বরং প্রতিবারই দেখা গেছে, ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত ভাষা শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে জনতার অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান আশ্রিত দৈনন্দিন জীবনচর্যানির্ভর মনের গভীর থেকে উঠে আসা ভাষার সামনে। এই প্রেক্ষাপটে ওসমান হাদীর অবস্থান ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের রাজনীতিতে ‘গাইল’-এর ব্যবহারে তার ভাষ্য আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য দৃষ্টান্ত: কৌশলী দুর্বৃত্তায়ণ ও বয়ান-নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে কীভাবে প্রজ্ঞা, সৃজনশীলতা ও ভাষার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় তিনি স্বল্প সময়েই তার একটি দিকনির্দেশনা ও দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, ব্যক্তিমানুষের ক্ষোভ যখন দীর্ঘ সময় ধরে পুঞ্জীভূত হতে থাকে, তখন তা আর ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় জনরোষে। মনোবিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্ব উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষোভের এই রূপান্তর একটি সুপরিচিত প্রক্রিয়া। ব্যক্তির অভিজ্ঞতা যখন সমষ্টির অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়, তখন তা একটি ‘সামষ্টিক চেতনা’-র (কলেক্টিভ কন্সাসনেস) জন্ম দেয়। আর এই জনরোষই একসময় বিস্ফোরিত হয় গণআন্দোলনে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে রূপ নিতে পারে গণবিপ্লবে। ফলে ভাষা, যা প্রথমে ছিল ব্যক্তির ক্ষোভের বাহন, তা ক্রমে হয়ে ওঠে জনতার ঐক্যবদ্ধ চেতনার প্রতীক, দ্রোহের বহিঃপ্রকাশের মূর্ত রূপ। বাংলামুলুকে ভাষার বিবর্তন ও রূপান্তরের এই ধারাটি ইতিহাসে মোটেই নতুন নয়। আঠারো শতকের উপনিবেশিক কলকাতায় উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থানের প্রেক্ষাপটে কবিয়ালদের ভাষার ব্যবহার তার একটি উজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সেই কবিয়ালদের ‘খিস্তি খেউর’-এর মাঝে তথা পালাগান, তর্ক ও প্রতিযোগিতামূলক কাব্যের ভাষায় আমরা দেখি ব্যঙ্গ, কটাক্ষ, তীব্র বাক্যবাণ, এমনকি তথাকথিত অশ্রাব্যতারও এক সৃজনশীল ও কৌশলগত ব্যবহার। ভাষা সেখানে নিছক বিনোদনের উপকরণ ছিল না; বরং তা হয়ে উঠেছিল সামাজিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের মাধ্যম। আক্রমণ ও প্রতিআক্রমণের এই ভাষিক পরিসর আসলে ছিল একটি চলমান শ্রেণিসংগ্রামের প্রতিফলন, যেখানে ভাষাই ছিল প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, প্রতিশোধ এবং নিয়ন্ত্রণের এক সূক্ষ্ম কিন্তু কার্যকর হাতিয়ার। অর্থাৎ ভাষা তখন সমাজের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব, আন্তসম্পর্ক, বিবর্তন ও পরিবর্তনের জীবন্ত দলিল হিসেবে কাজ করছিল।মূলত ভাষা স্থির কোনো সত্তা নয়; বরং তা প্রবাহমান নদীর মতো। ভাষা সময়, সমাজ ও ইতিহাসের গতির সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত বিবর্তিত ও রূপান্তরিত হয়। ভাষাতত্ত্বের আলোচনায় এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, ভাষা একটি জীবন্ত অর্গানিজমের মতো যা জন্ম নেয়, বিকশিত হয়, কখনও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, আবার কখনও বা নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করে। সমাজে যখন অবক্ষয়, নৈরাজ্য, বৈষম্য বা সংকট দেখা দেয়, তখন তার প্রতিফলন অনিবার্যভাবে ভাষাতেও প্রতিফলিত হয়। যে ভাষা আর বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারে না, তা ক্রমে ভেঙে পড়ে। তার জায়গা দখল করে নেয় এমন এক নতুন ভাষা, যা সময়ের সত্য, মানুষের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান কিংবা সামষ্টিক স্মৃতি ও সামাজিক টানাপোড়েনকে ধারণ করতে সক্ষম। এই ভাঙন ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়েই ভাষা নিজেকে নতুন করে বিনির্মাণ করে। একে আমরা ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখতে পারি যেখানে পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন অর্থ ও প্রকাশভঙ্গির জন্ম হয়। আর এই পরিবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং সমাজের গভীরে চলমান রূপান্তরেরই ধারাবাহিকতা। ফলে ভাষার এই ভাঙা-গড়া, গঠন-পুনর্গঠন ও নবায়নকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভাষা যেহেতু কখনোই বস্তু নিরপেক্ষ নয়, তাই এটিকে বুঝে ওঠা, বিশ্লেষণ করা এবং সময়োপযোগীভাবে গ্রহণ করাই আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব এবং অগ্রগতি স্মারক।গণঅভ্যুত্থান বা তীব্র সামাজিক অস্থিরতার সময় ভাষার এই রূপান্তর আরও দ্রুত, ঘনীভূত এবং তীক্ষ্মè হয়ে ওঠে। তখন ভাষা আর কেবল যোগাযোগের নিরপেক্ষ মাধ্যম থাকে না; এটি রূপ নেয় প্রতিরোধের অস্ত্রে, প্রতিবাদের স্লোগানে, আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিশোধের প্রতীকে। ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনেই আমরা এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখি যেখানে ভাষা জনতার আবেগ, ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষাকে সংগঠিত করে এক ধরনের শক্তিতে রূপান্তরিত করে। ফলে এই রূপান্তরকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই; বরং চলমান পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে ধারণ করে ভাষার এই বিবর্তন সামাজিক রূপান্তরের এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান। স্বাভাবিকভাবেই, যারা পুরোতন বন্দোবস্তে অভ্যস্ত এবং সেটিকে টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর, বর্তমানের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের কাছে নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদী ভাষা অসহনীয় মনে হয়। কারণ এই ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও আক্রমণের ভাষা কেবল শব্দের পরিবর্তন নয়; এটি ক্ষমতার কাঠামোর প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। তাই স্বৈরাচারী বন্দোবস্তের কিংবা বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সুবিধাভোগী তথাকথিত সুশীলেরা শালীনতা, শিষ্টাচার বা নৈতিকতার প্রশ্নকে সামনে এনে কৌশলে ভাষার এই ব্যবহারকে অগ্রহণযোগ্য প্রমাণ করার চেষ্টা করে যেন ভাষার তথাকথিত ‘অশালীনতা’কে কেন্দ্র করে মূল অন্যায় ও অবিচারের প্রশ্নটি আড়াল করা যায়। এটি আসলে একটি সুপরিচিত কৌশল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান তৈরির রাজনীতি, যেখানে প্রতিপক্ষের ভাষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ভাষাগত ও কালচারাল হেজিমনির বিস্তারে মাধ্যমে বাস্তবতাকেই নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস চালানো হয়। তা সত্ত্বেও লক্ষণীয় যে, নতুন প্রজন্ম অভিনব ও সৃজনশীল কলাকৌশলের মাধ্যমে এই বয়ান তৈরির দুর্ভিসন্ধি ও অপপ্রয়াসগুলোকে প্রতিনিয়তই চ্যালেঞ্জ করছে।যদিও ভাষার ব্যবহারের মাধ্যমে কালচারাল হেজিমনি বজায় রাখার বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধ এখনও পুরোপুরি সুচিন্তিত বা সুসংগঠিত কোনো কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ নয়, তবুও এর ভেতরে একটি স্বতঃস্ফূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি কাজ করছে যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও সুসংহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিরোধের রাজনীতিতে ভাষা হয়ে ওঠে ন্যায্যতার তথা ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের পথে একটি কার্যকর নৈতিক উপকরণ। তবে তথাকথিত ‘কদর্য’ ভাষার কার্যকারিতা নির্ভর করে এর সঠিক ও সংযত ব্যবহারের ওপর। কারণ যে অস্ত্র যত শক্তিশালী, তার অপব্যবহারের ঝুঁকিও তত বেশি। তাই প্রয়োজন প্রজ্ঞা, প্রেক্ষিতবোধ এবং নৈতিক সংযম যাতে ভাষা ধ্বংস বা বিশৃঙ্খলা নয়, বরং ন্যায় ও মুক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। প্রাসঙ্গিকভাবেই এখানে বহুলপ্রচলিত একটি আপ্তবাক্য নতুন অর্থ ও তাৎপর্য লাভ করে, বাস্তবে আমরা দেখতে পাই, ‘মানুষ দুঃখ পেলে খোদাকেও গালাগালি করে’। প্রথম দৃষ্টিতে এটি নিছক হতাশা বা বেদনার প্রকাশ মনে হলেও, গভীরভাবে দেখলে এটি মানুষের সীমাহীন যন্ত্রণার এক তীব্র ভাষ্য ও কঠিন জীবনবাস্তবতা, যা একই সঙ্গে প্রতিবাদী কণ্ঠের বৈধতাকেও প্রতিষ্ঠা করে। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যখন মানুষ চরম অসহায়তার মুখোমুখি হয় এবং তার চারপাশের সব প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়, বিশেষ করে রাষ্ট্র, সমাজ, ন্যায়বিচার প্রভৃতি ব্যর্থ হয়ে পড়ে, তখন সে ভাষার মধ্য দিয়েই তার অস্তিত্বের শেষ দাবি উত্থাপন করে। এই ভাষা তখন আর কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের অস্তিত্ববাদী ঘোষণা, ‘যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি, ততক্ষণ আমি আর অন্যায়কে মেনে নিচ্ছি না’। ফলে সেই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধ অভীপ্সা শালীন না অশালীন এই প্রশ্নটি গৌণ হয়ে পড়ে; মুখ্য হয়ে ওঠে ন্যায়ের পক্ষে ন্যায্যতার দাবি ও অন্যায়ের প্রতিরোধ।এই কারণেই গণঅভ্যুত্থানকালীন সময়ে ব্যবহৃত অনেক শব্দ বা শব্দগুচ্ছ অর্থাৎ নানা ‘গাইল’-কে কেবল অশ্রাব্যতার খোপে ফেলে খারিজ করে দিলে আমরা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের ভাষার গভীরতর সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্যকে অস্বীকার করি। এই ভাষা নিছক আবেগের উচ্ছ্বাস নয়; এটি আমাদের সময়ের এক জীবন্ত ও ঐতিহাসিক দলিল। এখানে জমা থাকে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ক্ষোভ ও প্রতিরোধের কিংবা প্রতিহত করার সঞ্চিত অভিজ্ঞতা; একই সঙ্গে এতে প্রতিফলিত হয় মানুষের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও প্রয়াস। অর্থাৎ এই ‘গালাগালি’-র ভাষা শুধু প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের নয়, প্রতিহত করা ও অর্জনেরও সহায়ক অস্ত্র। কারণ এটি নীরবতা ভাঙার ভাষা, আত্মপ্রকাশের ভাষা, আত্মশক্তিতে বলিয়ান হয়ে রুখে দাঁড়ানোর ভাষা। ভাষার এই বিবর্তনকে বুঝতে হলে কেবল শব্দের শুদ্ধতা বা অশুদ্ধতার বিচারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ভাষার পেছনে যে ইতিহাস, যে সামাজিক বাস্তবতা, যে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক কষ্ট-যন্ত্রণা-ভয়ের তীব্রতা এবং দ্রোহের আগুন কাজ করে তা অনুধাবন করাই এখানে মুখ্য। সমাজতাত্ত্বিক পরিভাষায় যাকে ‘সামষ্টিক স্মৃতি’ (কালেক্টিভ মেমোরি) বলা হয়, এখানে এই ভাষা তারই অন্যতম বাহক। এই স্মৃতির ভেতর দিয়ে একটি সমাজ তার অতীতের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান, বর্তমানের সংগ্রাম ও অর্জন এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। ফলে ভাষার এই রূপান্তরকে অস্বীকার করা মানে কেবল শব্দ বা শব্দগুচ্ছকে অস্বীকার করা নয়; বরং একটি জাতির মানুষের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা-অভিজ্ঞান, আনন্দ-বেদনা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার ধারাবাহিকতায় প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের ইতিহাসকেই অস্বীকার করা।সামাজিক মানদণ্ডে ভাষা কেবল ভদ্রতার আবরণ বা ভাবপ্রকাশের নিরপেক্ষ বাহন নয়; এটি সমাজের অন্তর্গত সত্যের এক জীবন্ত প্রতিফলন এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নির্মাণ ও বিনির্মাণের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। যখন সমাজে অবিচার স্ফীত হয়, দ্বন্দ্ব তীব্রতর হয় এবং অভিঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন ভাষাও তার স্বর, ভঙ্গি ও রূপ পরিবর্তন করে যা ভাষার স্বাভাবিক, অবশ্যম্ভাবী চলমান গতিপথের নির্দেশক। ভাষার এই পরিবর্তন, বিবর্তন ও রূপান্তরকে দমন বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা আসলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করারই নামান্তর। জাতীয় উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির স্বার্থে প্রয়োজন তা গভীরভাবে বোঝা, বিচার-বিশ্লেষণ করা এবং পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী মূল্যায়ন করা। প্রয়োজন গণবিতর্কের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জ্ঞানীয় উৎকর্ষের আলোকায়ন ও বয়ান তৈরির রাজনৈতিক অপকৌশলের মূল উৎপাটন। কারণ ভাষার এই রূপান্তরের ভেতরেই নিহিত থাকে জাতির অনাগত সময়ের পূর্বাভাস এবং ভবিষ্যতে অগ্রগতির রাজপথ নির্ধারণের দিকনির্দেশনা। আর ভাষার এই বিবর্তন ধারণ করে রাষ্ট্র কিংবা সমাজের দ্বান্দ্বিক অবস্থা, যা হয়তো চলমান সময়ে ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে তাকে পুনর্গঠনের সম্ভাবনার দিকেও বয়ে নিয়ে চলেছে। তাই এই পরিবর্তনকে ভয় নয়, বরং আমাদের বোধ, বুদ্ধি ও উপলব্ধি দিয়ে তাকে গ্রহণ করতে হবে; হৃদয়ের উষ্ণতায় তাকে অনুধাবন করতে হবে; এবং ভবিষ্যতের প্রতি আস্থাশীল থেকে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণমুখী এক মানবিক সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে তাকে আলিঙ্গন করতে হবে।[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

ভিডিও

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে কোন পুরস্কার কার ঝুলিতে

সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে টাইব্রেকারে ভারতকে ৪-৩ গোলে হারিয়েছে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা ঘরে তুললো বাংলাদেশ। বয়সভিত্তিক এই টুর্নামেন্টে চতুর্থবারের চেষ্টায় ফাইনালে এসে প্রথমবার ভারতকে হারানোর স্বাদ পেল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।বাংলাদেশের গোলরক্ষক ইসমাইল মাহিনের পারফরম্যান্স পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ছিলো ধারাবাহিক। শেষ পর্যন্ত তিনি টুর্নামেন্ট সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কারও জিতেছেন।টাইব্রেকারে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম তিন শটে সফল ছিলেন মুর্শেদ আলি, চন্দ্রন রয় ও আব্দুল ফাহিম। তবে চতুর্থ শটে এসে ব্যর্থ হন স্যামুয়েল রাকশাম, তার শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ফলে তখন দুদলই সমানে সমান অবস্থানে ছিল।কিন্তু ভারতের শেষ শটে আর সফলতা আসেনি। টুর্নামেন্টের টপ স্কোরার ওমাং দোদুমও লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হন। তার শট মিস করার পরই সুযোগ কাজে লাগায় বাংলাদেশ, আর তাতেই নিশ্চিত হয় শিরোপা জয়।এদিকে, বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে আলোচনায় থাকেন রোনান সুলিভান, যিনি ভারতীয় গোলরক্ষক সুরাজ সিংকে বোকা বানিয়ে পানেনকা শটে জয়সূচক গোলটি করেন। তার এই সাহসী শটেই আবারও ইতিহাসের পাতায় নাম লেখায় বাংলাদেশ।জয়ের পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক দলকে অভিনন্দন জানান এবং আর্থিক পুরস্কারের ঘোষণা দেন। দেশে ফিরলেই খেলোয়াড়দের হাতে সেই পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।মাহিন ছাড়াও বাংলাদেশের ঝুলিতে আরও পুরস্কার স্থান পেয়েছে। সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন ইলান ইমরান ও ওমাং দোদুম (৩ গোল করে)। টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ভারতের ওমাং দোদুম। আর ফেয়ার প্লে ট্রফি জিতেছে মালদ্বীপ।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে কোন পুরস্কার কার ঝুলিতে
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ জন