সংবাদ
এইচএসসি ফেলদের সুযোগ দিতে পেছাতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা

এইচএসসি ফেলদের সুযোগ দিতে পেছাতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা

এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের পুনঃপরীক্ষা বা সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার সুযোগ তৈরি করতে মেডিকেল কলেজ ও বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা পিছিয়ে যেতে পারে। ভর্তি প্রক্রিয়ায় এই শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের পথ সুগম করতেই এ চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভর্তি পরীক্ষা পেছানোর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করেছেন। তবে নীতিগতভাবে আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ এর উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন পরীক্ষা গ্রহণ সংক্রান্ত’ এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এছাড়াও সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা যেন আবারও পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারে এবং পরবর্তীতে মেডিকেল ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়, সে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।তিনি ভর্তি পরীক্ষা পেছানোর বিষয়ে উপাচার্যদের কাছে অনুরোধ জানান। সভার শুরুতে দু-একজন উপাচার্য ও কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা দ্বিমত ও আপত্তি জানালেও পরবর্তীতে শিক্ষামন্ত্রীর মানবিক ও যৌক্তিক অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিষযটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার আশ্বাস দেন।শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, মেডিকেলসহ দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা পেছানোর প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বিশ্ববিদ্যািলয়ের প্রতিনিধিরা সম্মতি প্রদান করলেও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ফোরামে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মত দেন।এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, “এটা শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নয়; বরং বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই বিবেচ্য বিষয়। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দেশনা আমরা পাইনি। তাদের কথা বিবেচনায় নিয়ে এতদিন পরীক্ষা আটকে রাখাও সম্ভব নয়। মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান জানান, বুধবার (৪ নভেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত আরেকটি সভা রয়েছে। সেখানে ভর্তি পরীক্ষা পেছানোর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন ও আলোচনা করা হবে।অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নূরুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের কল্যাণের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবার আগে ভর্তি পরীক্ষা নিতে যাচ্ছে। ফলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে এইচএসসিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা পুনঃপরীক্ষায় ভালো ফল করলে তাদেরও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।”তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীদের সার্বিক স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে বিষয়টিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন্ন সিন্ডিকেট সভায় তোলা হবে এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পর্যালোচনা করা হবে।
১৭ মিনিট আগে

মতামতমতামত

খাপড়া ওয়ার্ড থেকে জেলহত্যা

ইতিহাসের দুই সময়, দুটি কারাগার, দুটি রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৫০ সালে রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে সাত বিপ্লবী বন্দির মৃত্যু, আর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড। সময় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও দুটি ঘটনাই আমাদের ইতিহাসে কারাগারের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় হেফাজত এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের এক নির্মম প্রশ্ন রেখে গেছে।৩ নভেম্বর। জাতীয় জেলহত্যা দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক শোকাবহ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো একটি সুরক্ষিত স্থানে হত্যা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের চার জাতীয় নেতাকে। তারা হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান। যে কারাগার বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হেফাজতে থাকা মানুষের জীবন রক্ষা করা, সেই কারাগারের অভ্যন্তরেই সংঘটিত হয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক হত্যাকাণ্ড।কিন্তু কারাগারের দেয়ালের ভেতরে রাজনৈতিক বন্দিদের রক্ত ঝরার ইতিহাস কি কেবল ১৯৭৫ সালেই সীমাবদ্ধ? ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমাদের ফিরে যেতে হয় আরও ২৫ বছর আগে। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল। স্থান রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ড।জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের আগে এই খাপড়া ওয়ার্ডেই গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সাত কমিউনিস্ট রাজনৈতিক বন্দিকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যা খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। একে উপমহাদেশের প্রথম জেলহত্যার ঘটনাগুলোর অন্যতম হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।দুটি ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান ২৫ বছর। রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা, শাসনব্যবস্থা আলাদা, হত্যাকাণ্ডের পটভূমিও আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় ভয়াবহ মিল, সেটি হল কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দিদের জীবনও নিরাপদ ছিল না।খাপড়া ওয়ার্ড: প্রতিবাদ থেকে রক্তাক্ত পরিণতি১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় নানা পরিবর্তন আসে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মী, কৃষক আন্দোলনের সংগঠক, শ্রমিক নেতা ও বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে অনেকে কারাবন্দি হন। কিন্তু কারাগারের ভেতরেও তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল অমানবিক পরিবেশ।কারাবন্দিদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, তামাক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, তেলের ঘানি টানা, গম মাড়াই ও পেষাইয়ের মতো কঠোর শ্রমে বাধ্য করা-এসব ছিল বন্দিদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। সামান্য বিশ্রাম কিংবা কাজে দেরি হলেই নেমে আসত শারীরিক নির্যাতন।প্রথমে রাজশাহী কারাগারের কমিউনিস্ট বন্দিরা এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন। অনশন ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য কারাগারেও। ১৯৪৯ সালে ঢাকা ও রাজশাহী কারাগারে কয়েক দফায় দীর্ঘ অনশন চলে। খুলনা কারাগারে বিষ্ণু বৈরাগী এবং ঢাকা কারাগারে শিবেন রায়ের মৃত্যুর ঘটনাও বন্দিদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাদের মৃত্যুকে ঘিরে আত্মহত্যার প্রচার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে সেসময়। রাজবন্দিরা শুধু নিজেদের অধিকারের জন্যই লড়ছিলেন না, সাধারণ বন্দিদের ওপর চলা নির্যাতনের বিরুদ্ধেও তাঁরা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিলেন। তাদের দাবি ছিল-কারাগারে নির্যাতন বন্ধ করতে হবে, বন্দিদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে এবং কারাবিধি অনুযায়ী প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।এই আন্দোলনকে দমাতে কারা কর্তৃপক্ষ বন্দিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে। হিন্দু, মুসলমান ও আদিবাসী বন্দিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয় বলেও ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে। কিন্তু বন্দিরা সেই বিভাজনের চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেন।১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বন্দিদের দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কার্যকর কোনো সমাধান না আসায় ৫ এপ্রিল শুরু হয় অনশন। ক্রমেই অনশনকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দিরা তাদের দাবি আদায়ে অনড় থাকেন। এরপর আসে ২৪ এপ্রিল। যে দিনটি ইতিহাসে রক্তাক্ত হয়ে আছে।২৪ এপ্রিল ১৯৫০: খাপড়া ওয়ার্ডে গুলির শব্দসেদিন সকাল। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে বন্দিরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ তাদের অন্য একটি সেলে স্থানান্তর করতে চেয়েছিল। কিন্তু বন্দিরা সেই নির্দেশ মানতে রাজি হননি। তাদের আশঙ্কা ছিল, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও সংক্রামক রোগে আক্রান্ত বন্দিদের জন্য নির্ধারিত ১৪ নম্বর সেলে তাদের পাঠানো হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।জেল সুপার ডব্লিউ এফ বিলের সঙ্গে বন্দিদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে তিনি ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে বাইরে চলে যান। এরপর কারারক্ষীরা ওয়ার্ড ঘিরে ফেলে। বন্দিরা ভেতর থেকে দরজা আটকে দেন। চৌকি, তোশক, বালিশ ও শরীরের শক্তি দিয়ে তাঁরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।কিন্তু সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি। কারারক্ষীরা জানালার কাচ ভেঙে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে। মুহূর্তেই গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে কারাগারের পরিবেশ। বন্দিদের আর্তচিৎকার, রক্তাক্ত শরীর আর মৃত্যুর বিভীষিকায় খাপড়া ওয়ার্ড পরিণত হয় এক ভয়াবহ হত্যাক্ষেত্রে। সেদিন পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সাতজন কমিউনিস্ট রাজনৈতিক বন্দি। তারা হলেন-সুধীন ধর, বিজন সেন, হানিফ শেখ, সুখেন্দু ভট্টাচার্য, দেলোয়ার হোসেন, কম্পরাম সিং ও আনোয়ার হোসেন। আহত হন আরও ৩২ জন। এই সাতজনের মধ্যে কেউ ছিলেন শ্রমিক নেতা, কেউ ছাত্রনেতা, কেউ কৃষক আন্দোলনের সংগঠক, কেউবা রাজনৈতিক কর্মী। তাদের সবার পরিচয়ের মধ্যে একটি বিষয় ছিল অভিন্ন-তারা রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে কারাগারে ছিলেন।খাপড়া ওয়ার্ডের হত্যাকাণ্ড শুধু সাতটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, অসংখ্য বন্দির জীবনকেও বিপর্যস্ত করেছিল। আহতদের অনেকেই দীর্ঘদিন শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করেন। কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেন। হত্যাকাণ্ডের পর শহীদদের মরদেহ ও ঘটনার বিবরণ গোপন রাখার অভিযোগও ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের কাছে আড়ালেই থেকে যায় এই রক্তাক্ত অধ্যায়। পরে প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণ, লেখালেখি এবং ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের বিবরণ মানুষের সামনে আসতে শুরু করে। এই ইতিহাস সংরক্ষণে প্রথম আলো সম্পাদক ও লেখক মতিউর রহমানের ‘খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড ১৯৫০’ বইটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।২৫ বছর পর আবারও কারাগারে রক্তপাতখাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের ২৫ বছর পর, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, বাংলাদেশের আরেকটি কারাগার হয়ে ওঠে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী। এবার স্থান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকাকালে যে চার নেতা মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর তাদেরই একজনের পর একজনকে বন্দি করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে।এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ভোররাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে সশস্ত্র ঘাতকেরা। হত্যা করা হয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া চার জাতীয় নেতাকে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা অবস্থায় এভাবে হত্যা করা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত। খাপড়া ওয়ার্ডে বন্দিদের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল কারা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। আর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল সশস্ত্র ঘাতকদের অভিযানে। হত্যাকাণ্ড দুটির চরিত্র ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয়। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।ইতিহাসের দায়, স্মৃতির প্রশ্নএকটি বিষয় লক্ষণীয়, খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড এবং জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ড-দুটিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু জাতীয় স্মৃতি ও আলোচনায় দুই ঘটনার অবস্থান সমান নয়। ৩ নভেম্বর জাতীয় পর্যায়ে জেলহত্যা দিবস হিসেবে পরিচিত হলেও ২৪ এপ্রিলের খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড আজও তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।অথচ খাপড়া ওয়ার্ডের সাত শহীদের আত্মত্যাগকে বাদ দিয়ে এ ভূখণ্ডের রাজনৈতিক আন্দোলন, শ্রমিক অধিকার, কৃষক সংগ্রাম ও বামপন্থি রাজনীতির ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে লেখা সম্ভব নয়। তাদের রাজনৈতিক আদর্শ বা মতাদর্শের সঙ্গে কারও দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু বন্দি অবস্থায় তাদের ওপর গুলিবর্ষণ এবং প্রাণহানির ঘটনাকে ইতিহাস থেকে আড়াল করার সুযোগ নেই।একইভাবে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডও কেবল চারটি প্রাণহানির ঘটনা নয়। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, স্বাধীনতার রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার ওপর ভয়াবহ আঘাত।প্রশ্ন হচ্ছে, যে কারাগার বন্দিদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেই কারাগার কীভাবে হত্যাকাণ্ডের স্থানে পরিণত হয়? রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা মানুষের জীবন রক্ষার দায় কার? কারাগারের দেয়ালের ভেতরে সংঘটিত অপরাধের বিচার ও ইতিহাস সংরক্ষণের দায়িত্বই বা কার? ইতিহাসের এই দুটি অধ্যায় আমাদের সেই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করায়। ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে স্মরণ করার পাশাপাশি ২৪ এপ্রিলের খাপড়া ওয়ার্ডের সাত শহীদের কথাও আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন। কারণ, ইতিহাসের কোনো আত্মত্যাগই ছোট নয়। রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের ঊর্ধ্বে মানুষের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্নটি সব সময় গুরুত্বপূর্ণ।কারাগারের দেয়াল হয়তো অনেক ঘটনা আড়াল করতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের রক্তের দাগ মুছে দিতে পারে না। খাপড়া ওয়ার্ড থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার-দুটি সময়, দুটি হত্যাকাণ্ড। ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কারাগারের দরজা বন্ধ থাকলেই বন্দির জীবন নিরাপদ হয়ে যায় না।লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

পুষ্টিকর, নিরাপদ ও টেকসই খাদ্যের পথে বাংলাদেশ

একসময় বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—দেশের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করা যাবে কি না। স্বাধীনতার পর খাদ্যঘাটতি, দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সীমিত কৃষি উৎপাদনের কঠিন বাস্তবতার কারণে দীর্ঘদিন আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো। সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশ আজ অনেক দূর এগিয়েছে। ধান, সবজি, মাছ, ডিম, দুধ, মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যের উৎপাদন বেড়েছে। কৃষিতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত সম্প্রসারিত হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট-বড় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠেছে। মানুষের আয়, নগরায়ণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে খাদ্যের বাজারও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।এখন তাই নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। আমরা কত খাদ্য উৎপাদন করছি, শুধু সেই হিসাবই কি যথেষ্ট? নাকি আমাদের জানতে হবে—যে খাদ্য উৎপাদন করছি তা কতটা পুষ্টিকর, কতটা নিরাপদ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে কি না, উৎপাদনের সময় পরিবেশের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং আজকের খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাটি, পানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ আমরা কতটা সুরক্ষিত রাখতে পারছি? বাংলাদেশের আগামী দিনের খাদ্যব্যবস্থার মূল লক্ষ্য তাই হওয়া উচিত চারটি বিষয়—পুষ্টিকর, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই খাদ্য।বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প এখন দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দশক আগে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বলতে প্রধানত চাল, আটা, তেল, চিনি, বিস্কুট, রুটি, কেক কিংবা কয়েক ধরনের পানীয় বোঝানো হতো। এখন বাজারে দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য, ফলের রস, নানা ধরনের পানীয়, নুডলস, হালকা খাবার, সস, মসলা, হিমায়িত খাদ্য, রান্নার জন্য প্রস্তুত খাবার, সরাসরি খাওয়ার উপযোগী খাবার এবং নানা ধরনের স্বাস্থ্যসহায়ক খাদ্য পাওয়া যাচ্ছে। নগরায়ণ, কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, ছোট পরিবার এবং ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে সহজে ও দ্রুত প্রস্তুত করা যায় এমন খাবারের চাহিদা আগামী দিনে আরও বাড়বে। এটি খাদ্যশিল্পের জন্য বড় সুযোগ, তবে এর সঙ্গে বড় দায়িত্বও রয়েছে।কারণ মানুষের পেট ভরানো আর মানুষের শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেওয়া এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের প্রচলিত খাদ্যতালিকায় এখনও ভাত ও অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাদ্যের আধিক্য রয়েছে। ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য এবং শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু একটি সুস্থ শরীরের জন্য শুধু শর্করা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পর্যাপ্ত আমিষ, খাদ্যআঁশ, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান। তাই মাছ, ডিম, দুধ ও মাংসের পাশাপাশি ডাল, ছোলা, সয়াবিন, বাদাম, শাকসবজি ও ফলের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী এবং প্রবীণ মানুষের পুষ্টির প্রয়োজনকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা জরুরি।একটি পরিবারের ঘরে পর্যাপ্ত চাল থাকলেই সেই পরিবারের পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে বলা যায় না। তাদের খাদ্যে প্রয়োজনীয় আমিষ, ভিটামিন, খনিজ, খাদ্যআঁশ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও থাকতে হবে। তাই খাদ্যের পর্যাপ্ততা থেকে আমাদের চিন্তাকে পুষ্টিনিরাপত্তার দিকে নিয়ে যেতে হবে। আমরা কত ক্যালরি খাদ্য উৎপাদন করছি তার পাশাপাশি কতটা পুষ্টি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হওয়া উচিত।এই পরিবর্তনে দেশের খাদ্যশিল্প বড় ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন খাদ্য তৈরির সময় শুধু স্বাদ, রং, দাম এবং কত দিন ভালো থাকবে—এসব বিষয় বিবেচনা করলে চলবে না। পণ্য তৈরির শুরুতেই প্রশ্ন করা প্রয়োজন, এই খাবার মানুষের পুষ্টিতে কী যোগ করছে? বিস্কুট, রুটি, কেক কিংবা হালকা খাবারে সম্পূর্ণ শস্য ও খাদ্যআঁশ বাড়ানো যেতে পারে। পানীয়তে অতিরিক্ত যোগ করা চিনি কমানো যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রন, জিংক, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি–১২ এবং ফলিক অ্যাসিডের মতো অণুপুষ্টি উপাদান যোগ করে খাদ্যের পুষ্টিমান বাড়ানো সম্ভব। শিশুদের খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানোর দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।তবে খাদ্য পুষ্টিকর হলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেটিকে নিরাপদও হতে হবে। খাদ্যের নিরাপত্তার যাত্রা কারখানায় নয়, শুরু হয় কৃষকের মাঠে। কৃষিজমিতে কী ধরনের পানি ব্যবহার হচ্ছে, কী পরিমাণ সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে, পশু ও মাছ পালনে কী ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কাঁচামাল কীভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে—এসবই শেষ পর্যন্ত খাদ্যের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। এরপর রয়েছে পরিবহন, গুদামজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মোড়কজাতকরণ, বাজারজাতকরণ এবং দোকানে সংরক্ষণ। এই দীর্ঘ পথের যেকোনো পর্যায়ে খাদ্য দূষিত হতে পারে।রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু, ছত্রাকজাত বিষাক্ত পদার্থ, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু কিংবা অনুপযুক্ত রাসায়নিক পদার্থ খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। শুধু বাজারে পৌঁছানোর পর খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করে এসব ঝুঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই আধুনিক খাদ্যবিজ্ঞানের মূল শিক্ষা হলো—শেষে পরীক্ষা করে নিরাপত্তা খোঁজার চেয়ে শুরু থেকেই নিরাপদভাবে খাদ্য উৎপাদন করা ভালো। কৃষকের মাঠে উত্তম কৃষিচর্চা, কারখানায় উত্তম উৎপাদনচর্চা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি এবং উৎপাদনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।বাংলাদেশের বড় খাদ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই আধুনিক মাননিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ করছে। কিন্তু দেশের খাদ্যব্যবস্থা শুধু বড় কারখানার ওপর নির্ভর করে না। স্থানীয় বেকারি, মিষ্টির দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ, কাঁচাবাজার, পথের পাশের খাবারের দোকান এবং হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্য ব্যবসা এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এসব উৎস থেকে খাবার গ্রহণ করেন। তাই খাদ্যনিরাপত্তা শুধু বড় প্রতিষ্ঠানের সনদ কিংবা রপ্তানি পণ্যের শর্ত হয়ে থাকলে চলবে না। গ্রামের বাজার থেকে রাজধানীর বড় বিপণিবিতান পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্যের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য আইন ও তদারকির পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, সহজলভ্য খাদ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং খাদ্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করা প্রয়োজন।ভোক্তাকেও জানতে হবে তিনি কী খাচ্ছেন। খাদ্যের মোড়কে শুধু সুন্দর ছবি বা প্রতিষ্ঠানের নাম নয়; উপাদান, পুষ্টিমান, অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে এমন উপাদান, উৎপাদনের তারিখ এবং মেয়াদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। একজন সাধারণ মানুষ যেন সহজেই বুঝতে পারেন একটি খাবারে কত চিনি, লবণ, চর্বি, আমিষ ও খাদ্যআঁশ রয়েছে। সচেতন ভোক্তা শুধু নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করেন না, তিনি খাদ্যশিল্পকেও উন্নত ও স্বাস্থ্যকর পণ্য তৈরিতে উৎসাহিত করেন।পুষ্টি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা কৃষি উৎপাদনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে বাড়ছে জনসংখ্যা, নগরায়ণ এবং কৃষিজমির ওপর চাপ। ফলে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হবে—কম জমি, কম পানি, কম জ্বালানি এবং কম অপচয়ে কীভাবে বেশি পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন করা যায়? এজন্য জলবায়ু সহনশীল ফসল, পানি-সাশ্রয়ী কৃষি, সঠিক সেচব্যবস্থা এবং অঞ্চলভেদে উপযোগী কৃষিপণ্য উৎপাদনের দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।শুধু উৎপাদন বাড়ালেই অবশ্য সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদিত খাদ্যের কতটা মানুষের খাবারের থালায় পৌঁছাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, টমেটো কিংবা বিভিন্ন সবজির মৌসুমে অনেক সময় অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না। আবার সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সীমাবদ্ধতায় উৎপাদিত খাদ্যের একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়। একটি আম যদি ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়, তাহলে শুধু আমটিই নষ্ট হয় না; এর সঙ্গে নষ্ট হয় সেই আম উৎপাদনে ব্যবহৃত জমি, পানি, সার, কৃষকের শ্রম, পরিবহনের জ্বালানি এবং অর্থ।এখানে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বড় পরিবর্তন আনতে পারে। মৌসুমের অতিরিক্ত আমকে মণ্ড, রস, শুকনা খাদ্য বা গুঁড়ায় রূপান্তর করা যায়। টমেটো থেকে সস ও ঘন মণ্ড, আনারস থেকে রস ও শুকনা খাদ্য এবং কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তৈরি করা সম্ভব। এতে দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে এমন কৃষিপণ্য দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায়, কৃষক ভালো মূল্য পান এবং নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। দেশের প্রধান কৃষি উৎপাদন অঞ্চলে ছোট ও মাঝারি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তুললে কৃষকের কাছাকাছি পর্যায়েই বাছাই, পরিষ্কার, শীতলীকরণ, শুকানো, হিমায়ন এবং প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ করা সম্ভব হবে।এর সঙ্গে প্রয়োজন শক্তিশালী শীতল সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থা। মাছ, মাংস, দুধ, ফল ও সবজির গুণমান তাপমাত্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাই শুধু শহরে কয়েকটি হিমাগার তৈরি করলেই হবে না। উৎপাদন এলাকা থেকে সংগ্রহকেন্দ্র, সেখান থেকে শীতল পরিবহন, বিতরণকেন্দ্র এবং শেষ পর্যন্ত দোকান—পুরো পথেই প্রয়োজন অনুযায়ী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এতে খাদ্যের গুণমান ও পুষ্টিমান রক্ষা হবে, জীবাণুর বৃদ্ধি কমবে এবং খাদ্য অপচয়ও হ্রাস পাবে।খাদ্য সংরক্ষণের সঙ্গে মোড়কেরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। পরিবেশ রক্ষার কথা উঠলেই অনেক সময় প্লাস্টিক বা মোড়ক পুরোপুরি বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু উপযুক্ত মোড়ক খাদ্যকে আলো, অক্সিজেন, আর্দ্রতা, জীবাণু ও বাইরের দূষণ থেকে রক্ষা করে এবং সংরক্ষণকাল বাড়ায়। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত মোড়ক বাদ দেওয়া নয়; বরং যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু, সহজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং পরিবেশের ওপর কম চাপ সৃষ্টি করে এমন মোড়ক ব্যবহার করা। অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত মোড়ক কমানোর পাশাপাশি উপযুক্ত ক্ষেত্রে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত ও প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয়যোগ্য উপাদানের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের আরেকটি বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এমন উপাদানে, যেগুলোকে আমরা সাধারণত বর্জ্য মনে করি। ধান ভাঙানোর পর চালের কুঁড়া, ফল প্রক্রিয়াজাত করার পর খোসা ও বীজ, মাছ কাটার পর চামড়া ও আঁশ—এসবের অনেকটাই মূল্যবান কাঁচামাল। চালের কুঁড়া থেকে তেল ও আমিষ, ফলের খোসা থেকে খাদ্যআঁশ ও পেকটিন, মাছের চামড়া ও আঁশ থেকে কোলাজেন ও জিলাটিন, ফলের বীজ থেকে তেল এবং কৃষিজ উপজাত থেকে পশুখাদ্য, জৈব সার কিংবা জৈবশক্তি তৈরি করা সম্ভব। অর্থাৎ আজকের বর্জ্য আগামী দিনের কাঁচামাল হতে পারে। এক শিল্পের উপজাতকে অন্য শিল্পের সম্পদে পরিণত করার এই ধারণা বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে নতুন শিল্পের বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।পানি ও জ্বালানির ব্যবহারেও পরিবর্তন প্রয়োজন। খাদ্য কারখানায় কাঁচামাল ধোয়া, উত্তপ্ত করা, শীতল করা এবং যন্ত্রপাতি পরিষ্কারে প্রচুর পানি ও শক্তি লাগে। পানি-সাশ্রয়ী পরিষ্কারব্যবস্থা, নিরাপদ ক্ষেত্রে পরিশোধিত পানির পুনর্ব্যবহার, উৎপাদনের অতিরিক্ত তাপ পুনরুদ্ধার করে অন্য কাজে ব্যবহার, শক্তি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি এবং উন্নত শীতলীকরণ ব্যবস্থা উৎপাদন ব্যয় ও পরিবেশগত চাপ—দুটিই কমাতে পারে। বাংলাদেশের খাদ্য কারখানায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং কৃষিপণ্য শুকানোর কাজে সৌরশক্তির প্রয়োগও আরও বাড়ানো যেতে পারে।আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি খাদ্যশিল্পকে আরও নিরাপদ ও দক্ষ করতে পারে। একটি খাদ্যের কাঁচামাল কোথা থেকে এসেছে, কখন কারখানায় প্রবেশ করেছে, কোন উৎপাদনদলে তৈরি হয়েছে এবং কোথায় বিক্রি হয়েছে—এই তথ্য দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তুললে কোনো সমস্যা দেখা দিলে নির্দিষ্ট পণ্য দ্রুত বাজার থেকে প্রত্যাহার করা সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণের সাহায্যে বাজারের চাহিদা অনুমান, কাঁচামালের অপচয় শনাক্ত, উৎপাদন পরিকল্পনা এবং যন্ত্রপাতির সম্ভাব্য ত্রুটি আগাম নির্ণয় করাও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।তবে আধুনিক যন্ত্রপাতি কিনলেই আধুনিক খাদ্যশিল্প তৈরি হয় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো দক্ষ মানুষ। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খাদ্যবিজ্ঞান, খাদ্য প্রকৌশল, পুষ্টিবিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, অণুজীববিজ্ঞান ও জীবপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বহু তরুণ পড়াশোনা করছেন। এই জ্ঞানকে শিল্পের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা যদি শুধু গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং শিল্পের বাস্তব সমস্যা গবেষকের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে উদ্ভাবনের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং খাদ্যশিল্পের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন।সরকারের নীতিতেও একই ধরনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। কৃষিকে শুধু কৃষির বিষয়, খাদ্যশিল্পকে শুধু শিল্পের বিষয়, পুষ্টিকে শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় এবং পরিবেশকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখলে একটি টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন। কৃষকের মাঠ থেকে মানুষের খাবারের থালা পর্যন্ত পুরো পথকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে। ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিরাপদ উৎপাদন ও স্বাস্থ্যবিধির প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি, শীতল সরবরাহব্যবস্থায় বিনিয়োগ, কৃষিভিত্তিক নতুন শিল্পে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ—সবকিছুকে একই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার অভাব নেই। আমাদের কৃষি আছে, বৈচিত্র্যময় কৃষিপণ্য আছে, বড় ভোক্তাবাজার আছে, দ্রুত বিকাশমান খাদ্যশিল্প আছে এবং রয়েছে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী। এখন প্রয়োজন এসব শক্তিকে একই সুতোয় গাঁথা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ খাদ্যশিল্পকে তাই শুধু ‘খামার থেকে খাবারের থালা’ পর্যন্ত ভাবলে চলবে না; আমাদের লক্ষ্য হতে হবে ‘খামার থেকে পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও টেকসই ভবিষ্যৎ।’একুশ শতকে খাদ্যশিল্পের সাফল্য শুধু কত লাখ টন খাদ্য উৎপাদিত হলো তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। দেখতে হবে—কত কম জমি, পানি ও জ্বালানি ব্যবহার করে কত বেশি পুষ্টি মানুষের কাছে পৌঁছানো গেল, কতটা খাদ্য অপচয় থেকে রক্ষা করা গেল, কৃষক কতটা ন্যায্যমূল্য পেলেন এবং পুরো প্রক্রিয়ায় প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কতটা সুরক্ষিত রাখা গেল। যে খাদ্য মানুষের পেট ভরাবে, শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেবে, নিরাপদ থাকবে, কৃষককে ন্যায্যমূল্য দেবে এবং একই সঙ্গে মাটি, পানি ও পরিবেশ রক্ষা করবে—সেই খাদ্যই হওয়া উচিত আগামী বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের লক্ষ্য।[লেখক: খাদ্যবিজ্ঞানী, উদ্ভাবন ব্যবস্থাপক, সালুটিভিয়া, যুক্তরাজ্য] 

সচিবালয়ের স্থান নির্বাচন ও কৃষি গবেষণা

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কেন্দ্র সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ত স্থান নির্বাচন ও অবকাঠামোগত বিন্যাস সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। তবে যেকোনো বড় প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সেখানে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব, প্রায়োগিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা ইতিমধ্যে তীব্র সংকটে রূপ নিয়েছে।বর্তমান পরিস্থিতিকে নিছক কোনো জমি নিয়ে সাধারণ প্রশাসনিক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার ভবিষ্যৎ, একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশ, রাজধানীর পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।সাম্প্রতিক উত্তেজনা: মাটি পরীক্ষা প্রতিহত, সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুরচলমান এই বিরোধ কেবল দাপ্তরিক চিঠি চালাচালি বা প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি তা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। গত ২৭ অক্টোবর আলোচিত মাঠে মাটি পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানান। এ সময় তাঁরা সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও গাড়ি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৮ অক্টোবর শেকৃবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা ‘গবেষণার মাঠ ফেরত চাই, সচিবালয় নয়’ স্লোগান ও ব্যানার নিয়ে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে প্রবেশ করেন। এ সময় সেখানে এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার নির্মাণাধীন ফটক ও অবকাঠামোতেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সচিবালয় নির্মাণের প্রতিবাদে টানা তৃতীয় দিনের মতো চীন-মৈত্রী সিগন্যালে সড়ক অবরোধ করেন শেকৃবির শিক্ষার্থীরা।অর্থাৎ, আলোচ্য মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকূলে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছেন। এতে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীদের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও আস্থার সংকট। তাঁরা বারবার সময় বেঁধে দিলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সমাধান বা ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। একটি অপরিকল্পিত ও একতরফা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কীভাবে একটি সম্ভাবনাময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের মুখে ঠেলে দিতে পারে, এই ঘটনা তারই প্রমাণ। সংঘাতের পথ প্রশস্ত না করে নীতিগত ভুল সংশোধনের মাধ্যমে সংকট সমাধানে এখনই দূরদর্শী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।ঐতিহাসিক শিকড় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির সংকোচনশেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন ‘বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ কৃষিবিদ তৈরি করা। প্রতিষ্ঠার সময় এর জন্য প্রায় ২৯৮ একর জমি বরাদ্দ বা অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় ও সরকারি প্রয়োজনে এই ক্যাম্পাসের বড় একটি অংশ অন্যান্য সংস্থাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবহারযোগ্য জমির পরিমাণ ৮৭ একরেরও নিচে নেমে এসেছে।আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন গবেষণাপ্লট ও খামারের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের প্রয়োজনে অধিগ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেটি ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মূল ক্যাম্পাস থেকে এই উর্বর জমি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকেরা তীব্র স্থানসংকটে ভুগছেন। সরকারের সিদ্ধান্তে ২০২২ সালে বাণিজ্য মেলা পূর্বাচলে স্থানান্তরিত হলে শেকৃবি পরিবারের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। সবাই ভেবেছিলেন, ঐতিহাসিক মাঠটি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সেখানে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা সামনে আসায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।কৃষি গবেষণায় জমি ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রের গুরুত্বআধুনিক কৃষিশিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ হলো মাঠ, খামার ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণ। ফসলের নতুন জাতের কার্যকারিতা যাচাই, মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ, সেচ ব্যবস্থাপনা, সার প্রয়োগের মাত্রা নির্ধারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলক গবেষণার বিকল্প নেই।‘ওয়ান হেলথ’ বা এক স্বাস্থ্য ধারণা অনুযায়ী মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রাণিসম্পদ উৎপাদন, দুগ্ধবিজ্ঞান, গবাদিপশুর রোগ ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় খামার ও গবেষণার সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। শেকৃবির গবেষণা অবকাঠামো আরও সংকুচিত হলে তার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার ওপর।উন্নয়ন মানে কেবল কংক্রিটের স্থাপনা নয়সচিবালয় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। তবে বড় প্রকল্পের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু দাপ্তরিক সুবিধা বিবেচনা করলে চলে না। এর পরিবেশগত, যানজট ও সামাজিক প্রভাবও গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। ঢাকার মতো জনবহুল ও অপরিকল্পিত নগরে নতুন করে এ ধরনের বড় প্রশাসনিক স্থাপনা তৈরি হলে শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। এতে যানজট, শব্দ ও বায়ুদূষণ বাড়বে। আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণাকেন্দ্রের স্বাভাবিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশও ব্যাহত হতে পারে।প্রকৃত উন্নয়ন মানে কেবল কংক্রিটের স্থাপনা ও বড় বড় ভবন নির্মাণ নয়। বিদ্যমান প্রাকৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অংশ। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ এবং জ্ঞানচর্চার উপযোগী পরিসর রক্ষা করতে হবে।সমাধানের পথ: সংলাপ, স্বচ্ছতা ও বিচক্ষণতাবর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও কর্তৃপক্ষকে কালক্ষেপণ না করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। এই সংকটের স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।প্রথমত, জমির মালিকানা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নথি প্রকাশ করতে হবে। ঐতিহাসিক এই ভূখণ্ডের আইনি মালিকানা, অতীতের জমি বরাদ্দ এবং সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্তসংক্রান্ত সব প্রামাণ্য দলিল প্রকাশ করা উচিত। এতে দীর্ঘদিনের ধোঁয়াশা, ভুল বোঝাবুঝি ও আস্থার সংকট অনেকটাই দূর হবে।দ্বিতীয়ত, সচিবালয়ের জন্য বিকল্প জায়গা খুঁজতে হবে। একটি ঐতিহ্যবাহী ও গবেষণানির্ভর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উর্বর জমি সংকুচিত না করে ঢাকার আশপাশের খাসজমি কিংবা পূর্বাচলের মতো সম্ভাব্য বিকল্প জায়গাগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব জায়গার সুবিধা-অসুবিধা বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করে তা জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে।তৃতীয়ত, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। সংঘাত, উত্তেজনা বা বলপ্রয়োগের পথ পরিহার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ভিত্তিতে এই আলোচনা হতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগই সংকটের সম্মানজনক ও স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।শেকৃবির জমি নিয়ে বর্তমান বিতর্ক আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে: আমরা কি উন্নয়ন বলতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণকেই বুঝি, নাকি জ্ঞান, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সক্ষমতাকেও উন্নয়নের অংশ মনে করি? প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেই প্রয়োজনে কৃষি গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নষ্ট করা উচিত নয়। উন্নয়ন ও গবেষণার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ডিন ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়]

আমি দেশপ্রেমিক, কিন্তু জাতীয়তাবাদী নই

সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হতে পারে যে ‘দেশপ্রেম’ (patriotism)  ও ‘জাতীয়তাবাদ’(nationalism)  এ দু’টো শব্দের অর্থ একই এবং তার দ্বারা একই কথা বোঝানো হয়। কিন্তু সেটি মোটেও সত্য নয়। আমি মার্কসবাদে দীক্ষিত একজন কমিউনিস্ট। আমি নিজেকে একজন ‘দেশপ্রেমিক’ বলে ভাবি, কিন্তু নিজেকে কখনোই একজন ‘জাতীয়তাবাদী’ বলে মনে করি না। কেন? এর কারণটি আমি এখানে সংক্ষেপে ব্যক্ত  করব।তার আগে, এ বিষয়ে যে ক্ষেত্রে গুরুতর ভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয় সেটি প্রথমে পরিস্কার করে নেয়া প্রয়োজন। আগেই বলেছি যে আমি ‘জাতীয়তাবাদী’ নই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ‘জাতীয়তাবাদ’ অথবা ‘জাতীয়তাবাদীদের’ প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি হলো শত্রুমূলক ও বৈরী। বরঞ্চ একথা আমি দৃঢ় প্রত্যয়ে বলবো যে—অনেক ক্ষেত্রেই, বিশেষতঃ একটি নিপীড়িত জাতির ক্ষেত্রে, জাতীয়তাবাদ প্রায়সই রাজনীতিতে ইতিবাচক এবং এমনকি কখনো কখনো প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করে। সুতরাং, এমন ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতি কমিউনিস্টদের মনোভাব যে বন্ধুসুলভ হবে সেটিই স্বাভাবিক। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে যেই সম্পর্ক গড়ে উঠতে পেরেছিল।কিন্তু এ তো গেলো জাতীয়তাবাদের প্রতি কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি কি হবে, সে বিষয়ে কথা। তার মানে কি তবে এই যে ‘কমিউনিস্ট’ আদর্শ ও ‘জাতীয়তাবাদের’ আদর্শ একই চরিত্রের? না! কারণ একটি হলো ভিন্ন আদর্শের প্রতি ‘দৃষ্টিভঙ্গির’ বিষয় এবং অপরটি হলো আদর্শগত ‘আত্মপরিচয়ের বিষয়। এই দু’টি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলার কারণে অনেক বিভ্রান্তির জন্ম হয়। ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রতি কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে যতো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই থাকুক না কেন, আদর্শগত আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে একজন কমিউনিস্ট কখনই ‘জাতীয়তাবাদী’ হতে পারে না। কেউ কেউ আবার বলছেন যে আমরা ‘জাতীয়তাবাদী’ নই ঠিকই, কিন্তু ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের মতো রণধ্বনি করে আমাদেরকে এখন লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পরতে হবে। কমিউনিস্টরা যেমন তাদের আত্মপরিচয়কে ‘জাতীয়তাবাদের’ দ্বারা চিহ্নিত করতে পারে না, তেমনি তারা তাদের সংগ্রামের মূল রণধ্বনিকে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দ্বারা নির্ধারণ করতে পারে না। কারণ তা হবে তার কমিউনিস্ট আত্মপরিচয় বিসর্জন দিয়ে ‘জাতীয়তাবাদী’ আদর্শ গ্রহণ করার মতো বিষয়।এবার তবে মূল কথায় ফেরা যাক। যেকোনো মানুষের জন্য দেশপ্রেম হলো একটি মহৎ গুণ। এটি হলো তার পরম গর্ব ও অহঙ্কারের বিষয়। নিজের জাতি ও নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসাই হলো দেশপ্রেম। দেশপ্রেমিক মানুষের স্বার্থবোধ ও চিন্তার পরিমণ্ডল ক্ষুদ্র ব্যক্তিসত্তার গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। ব্যক্তি ও পরিবারের সংকীর্ণ জগতকে অতিক্রম করে সে দেশ ও জাতির স্বার্থ ও সত্তার সাথে নিজেকে একাকার করে ফেলে। বিশ্ব জগতে সে তখন আর একক একটি ব্যক্তি মাত্র হয়ে থাকে না, সে হয়ে ওঠে সমষ্টির অঙ্গীভূত। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকের ক্ষেত্রে এই উত্তরণের প্রক্রিয়া ও সমষ্টি-বোধ তার স্বাভাবিক ধারায় তাকে পৌঁছে দেয় বিশ্ব মানবতার চেতনায়। এ কারণে তার নিজের দেশপ্রেম কখনোই অন্য আরেক ভিন্ন দেশ ও জাতির মানুষের দেশপ্রেমের বৈরী বা প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে না। সব জাতির মানুষের নিজ নিজ দেশপ্রেম হয়ে ওঠে একে অপরের পরিপূরক। একজন ‘প্রকৃত’ দেশপ্রেমিকের কাছে তার স্বদেশ ও স্বজাতি হয়ে ওঠে বিশ্বলোকের মহামানবের একটি অংশ, তারই সৌরভিত পুষ্পকাননের অন্যতম অলঙ্কার। দেশপ্রেমিকের স্বদেশ-প্রেমের স্বরূপ ঠিক এমনটাই।কবিগুরু তাই আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন—‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।’কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘জাতীয়তাবাদের’ তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি ছিলেন বিশ্ব-মানবের কবি। তিনি একইসাথে ছিলেন প্রবলভাবে দেশপ্রেমিক। কবিগুরু বলে গেছেন যে, ‘বিশ্ব-মানবের প্রতি ভালোবাসা-বোধের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যেমন কিনা প্রকৃত দেশপ্রেমের নিখুঁত স্ফুরণ ঘটতে পারে না, ঠিক তেমনি প্রগাঢ় দেশপ্রেমকে উপেক্ষা করে সত্যিকার মানবপ্রেম জাগরিত হতে পারে না।’স্বজাতি ও স্বদেশের প্রতি ভালোবাসাই হলো দেশপ্রেম। এখন প্রশ্ন হলো, এই স্বজাতি ও স্বদেশ ব্যাপারটি আসলে কী? এটা কি মানব জন্মের আদিলগ্ন থেকে মানবসত্তার অন্তর্গত একটি অন্তর্নিহিত উপাদান? নাকি তা ইতিহাসের ধারায় সুনির্দিষ্ট বাস্তবতায় আবির্ভূত একটি সামাজিক উপাদান? পরের কথাটি যদি সত্য হয় তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—কীভাবে ঘটেছে তার এই উদ্ভব?জাতিসত্তা-বোধ হলো ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা একটি উপলব্ধি, একটি চেতনা। বিস্তৃত ভূমণ্ডলে মানুষের উপস্থিতি বহুকালের। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষরা ক্রমে পরস্পরের সংস্পর্শে এসেছে, জীবন ধারণের প্রয়োজনে গোষ্ঠীবদ্ধ ও সমাজবদ্ধ হয়েছে। ইতিহাসের প্রত্যক্ষ প্রমাণ হলো এই যে, নানা উত্থান-পতন, বাঁধা-বিঘ্ন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত সত্ত্বেও মানুষ ক্রমাগতই একে অপরের নিকটবর্তী হয়েছে ও হচ্ছে। এই ক্রম-ধারাবাহিকতাতেই স্বজাতি-বোধের উদ্ভব। ইতিহাসের ধারাতেই নৃতত্ত্ব, ভূগোল ও প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলবায়ু ও আবহাওয়া, ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনাচার, অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থা— প্রভৃতি নানা উপাদানের যুগ যুগ ব্যাপী ধারাবাহিক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানব সমাজের পৃথক পৃথক গোষ্ঠীর মধ্যে নিজ নিজ স্বজাতি-বোধ গড়ে ওঠেছে। প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে এই নিবিড় বন্ধন সূত্রটি নাড়ির বন্ধনের মতোই তার জন্মলগ্ন থেকেই স্থাপিত হয়। এই স্বজাতি-বোধটা যেন তার মায়ের কোল, তার স্বাভাবিক শারীরিক-মানসিক আশ্রয়স্থল। নানা সূত্রের এক অদৃশ্য, কিন্তু বস্তুগত গাঁথুনি দ্বারা, স্বজাত্যবোধের এই অনুভূতি সৃষ্টি হয়।এই স্বজাতি-বোধের উৎপত্তি মানুষের ইচ্ছা নিরপেক্ষ। কিন্তু এই বোধের সৃজন অথবা তার পচন অনেকটাই নির্ভর করে একদিকে যেমন মানুষের নিজের উপর, তেমনি তা নির্ধারিত হয় স্বদেশ ও সমাজের চরিত্রের দ্বারা। চেতনায় এই স্বজাতি-বোধের গড়ে ওঠার ব্যাটারটি অগণন বাস্তব উপাদানের ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত এবং তা সময়ের পরিক্রমায় গভীরতর ভিত্তি পেয়েছে।এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় হলো— বিকাশের বৈচিত্রময়তার কারণেই একেকটি ভৌগলিক গণ্ডির মধ্যে বসবাসরত মানুষদেরকে নিয়েই পৃথক পৃথক স্বজাত্যবোধ বিকশিত হয়েছে। এভাবে জাতি-পরিচয় সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে নির্দিষ্ট ভৌগলিক এলাকার সাথে। রাজ্য-সাম্রাজ্যের ভাঙা-গড়া সত্ত্বেও জাতীয় আত্মপরিচয় নিয়ে পৃথিবীর একেকটি এলাকায় একেকটি জাতিসত্তার মানুষ যুগ যুগ ধরে বসবাস করেছে ও নিজ নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উদ্ভবের পর বিকাশ ঘটেছে জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। এভাবে স্বদেশ অনেকটা পরিমাণে একটি স্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক রূপ অর্জন করেছে। স্বজাতির চেতনার সাথে এভাবেই সংযুক্ত হয়েছে স্বদেশের অনুভূতি। “স্বজাতির” প্রতি নিবিড় আকর্ষণ ও ভালোবাসার আবেগ ক্রমেই রূপ পেয়েছে “স্বদেশের” প্রতি ভালোবাসায়। সেই ভালোবাসার নামই হলো দেশপ্রেম।কিন্তু এই স্বদেশ শুধু চিহ্নিত একটি ভূখণ্ড, তার গাছ-পালা, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, জলবায়ু-মৃত্তিকা প্রভৃতির সমাহারই কেবলমাত্র নয়। স্বদেশের শ্রেষ্ঠতম ও অমূল্য উপাদান হলো স্বদেশের মানুষ। স্বদেশের মানুষ নিয়েই স্বজাতির গঠন। তাই, দেশপ্রেমের প্রধান উপাদান, তার মর্মকথা হলো দেশের আপামর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশকে ভালোবাসতে হলে সর্বাগ্রে দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হয়।একটি দেশের সব মানুষ কিন্তু কোনো একক ও অখণ্ড সত্তা নয়। আদিম সাম্যবাদী সমাজের সময়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত মানবজাতির ইতিহাস হলো শ্রেণী বিভাজন ও শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। এক সময় সমাজ বিভক্ত ছিল মুষ্টিমেয় দাস মালিক ও অগণিত ক্রীতদাস— এই দুই শ্রেণীতে। তারপরে সমাজ বিভক্ত হয়েছে সামন্তপ্রভু ও ভূমিদাস অথবা প্রজাকুল হিসেবে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতেও সমাজে রয়েছে প্রধানত দুটি পরস্পর স্বার্থবিরোধী শ্রেণী— পুঁজিপতি ও শ্রমজীবী। রয়েছে শোষক শ্রেণী ও শোষিত শ্রেণী। শোষকরা মুষ্টিমেয়, হাতেগোনা গুটিকয়েক। শোষিতরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শোষক আর শোষিত— দু’পক্ষকেই একই সাথে ভালোবাসা যায় না। শোষিত মানুষকে ভালোবাসতে হলে যারা তাদেরকে শোষণ করে, সেই শোষকদের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। শোষক শ্রেণীর শোষণকে ঘৃণা করতে হয়।দেশপ্রেমের অভিপ্রকাশ যদি হয় স্বদেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা, তাহলে তার মূর্ত রূপ হতে হবে এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত দেশবাসীর প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু, সেই ভালোবাসা নিরর্থক ও নিষ্ফল—বন্ধ্যা হয়ে থাকবে যদি সেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী চিরদিন পুঁজিবাদের শোষণ জালে অর্থাৎ মজুরি-দাসত্বের শিকলে বাঁধা পড়ে থাকে। দেশৈর অগণিত মানুষের ওপর চলতে থাকা অমানবিক শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্যের জিঞ্জির মেনে নিয়ে দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। চলমান শোষণমূলক সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু থাকতে দিয়ে, সেই ব্যবস্থার গায়ে শুধু উপরভাসা সংস্কারের মলম লাগিয়ে মানুষের জীবন-জীবিকার যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা দিয়েও নির্ভেজাল দেশপ্রেম প্রদর্শিত হতে পারে না। প্রকৃত দেশপ্রেম দাবি করে শোষিত দেশবাসীর প্রতি ভালোবাসা এবং সেই ভালোবাসা দাবি করে শোষণমুক্তির সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা। তাই, প্রকৃত দেশপ্রেম স্বজাতি ও স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার তাড়নাতেই আমাদেরকে একই সাথে বিশ্ব মানবতার প্রতি উদার ভক্তি-শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় জাগরিত করে এবং সাথে সাথে শোষণমুক্তির সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে এবং এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। এসবই হলো প্রকৃত দেশপ্রেমের অন্যতম মর্মবাণী ও উপাদান। তদ্রুপ বিচারে আমি নিজেকে একজন দেশপ্রেমিক বলে বিবেচনা করি।এখন দেখা যাক, ‘জাতীয়তাবাদ’ কী? জাতীয়তাবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ যেখানে জাতীয় পরিচয়কে সামাজিক ঐক্যের সর্বোচ্চ ও শীর্ষরূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মতাদর্শে একথা ধরে নেয়া হয় যে, ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে এমন কিছু রয়েছে যার কাছে শ্রেণীস্বার্থ, শোষণ ব্যবস্থা থাকা-নাথাকা, সামাজিক বিভাজন জনিত স্বার্থবোধ—ইত্যাদি সবকিছু অধীনস্ত থাকে। তাছাড়া জাতীয়তাবাদী মতাদর্শকে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পটভূমি নির্বিশেষ স্থান-কালের বিবেচনার ঊর্ধ্বে, একটি অনাদিকালের জন্য স্থায়ী ভাবাদর্শ ও ব্যবস্থারূপে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।বস্তুত, জাতীয়তাবাদ ও জাতি-রাষ্ট্রের বিষয়গুলো মানব সভ্যতার ইতিহাসে তুলনামূলকভাবে নতুন সংযোজন। কালক্রমে, যখন মানব সমাজের পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটেছিল, তখন আর্থ-সামাজিক প্রয়োজনে স্বতন্ত্র স্বজাতি-বোধের উপাদানকে নতুন মাত্রিকতা ও গুরুত্ব দেয়াটা বিশেষভাবে প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল। এভাবে, ‘স্বজাতি-বোধের’ স্বাভাবিক উপলব্ধি উত্তরণ ঘটেছিল ‘জাতীয়তাবাদের’ মতাদর্শে। এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন জাতিকে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো।চার-পাঁচশ’ বছর আগেও রাজনীতি ও সমাজে জাতি-রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ভাবাদর্শ বলে তেমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। মানুষের স্বজাতি-বোধের। সাথে ভূ-রাজনীতির অথবা রাজনৈতিক আদর্শের কোনো শক্তিশালি ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না। রাজা-মহারাজারা যে ভূখণ্ড দখল করতে সক্ষম হতো, সেটাই হতো রাজ্যের (অর্থাৎ রাষ্ট্রের) ভূ-সীমানা ও ভৌগলিক গণ্ডি। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা দাস সমাজের ও সামন্তবাদী সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলার রাখার ক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় সৃষ্টি করত না। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা উদ্ভবের সাথে সাথে পুঁজির নিজস্ব স্বার্থেই বাজার দখল করা নিজ নিজ বাজার সংরক্ষণ এবং তা নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পুঁজিবাদের ‘বাজার-কর্তৃত্বের’ জন্য এই অন্তর্নিহিত তাগিদই জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের উন্মেষ ও জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব অনিবার্য করে তুলেছিল।  প্রথমাবস্থায় ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রগতিবাদী ভূমিকা ছিল সাধালণভাবে মুখ্য। কিন্তু স্থান-কাল-ভেদে এই ভূমিকা ক্রমেই ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিতে শুরু করেছিল। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতে উত্তরণের ক্ষেত্রে যেসব জাতি ও জাতি-রাষ্ট্র অগ্রবর্তী থাকতে সক্ষম হয়েছিল, তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়া জাতিগুলোকে পদানত করে সেখানে তাদের উপনিবেশ বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিল। এসব প্রভু-দেশ তাদের ঔপনিবেশিক শোষণ বিস্তারের জন্য জাতীয়তাবাদের মতাদর্শকে কাজে লাগিয়েছিল। এটি ছিল বৃহৎ শক্তির জাতীয়তাবাদ। আবার অন্যদিকে, পদানত ও ঔপনিবেশিক শাসনে আবদ্ধ জাতিগুলোর ক্ষেত্রে এই জাতীয়তাবাদী মতাদর্শই সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী বন্ধন মোচন করে স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ইতিবাচক আদর্শগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিল। তাই, এভাবে এবং আরো অন্য নানাভাবে “জাতীয়তাবাদের” দ্বিমুখী ভূমিকা ছিল বলে দেখা যায়।নির্দিষ্ট স্থান, কাল ও ঐতিহাসিক পটভূমিতে জাতীয়তাবাদের ইতিবাচক এবং এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে একটা প্রগতিশীল ভূমিকা ভাবাদর্শ হিসেবে জাতীয়তাবাদের নেতিবাচক ও এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল অভিঘাতের বিপদের আশঙ্কার কথাটিও ভালোভাবে হিসেবে রাখাটাও একান্তভাবে বাঞ্ছনীয়। জাতীয়তাবাদের কতগুলো নেতিবাচক দিক ও সম্ভাব্য বিপদের কথা আমি আবার এখানে উল্লেখ করছি।জাতীয়তাবাদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো জাত্যাভিমান। জাতি পরিচয়ই যে সহজাত কেন্দ্রিক বিষয়, এই তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠার জন্য এবং তার পক্ষে আরও শক্তকরণ তুলে ধরার জন্য অপর আরেকটি তত্ত্বও তার সাথে সাথে হাজির করা হয়। সেই তত্ত্ব হলো-‘জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্ব’। এ ক্ষেত্রে বলা হতে থাকলো যে, যেহেতু ‘আমাদের জাতিই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি’ তাই অন্যান্য ‘অনগ্রসর, অসভ্য জাতিগুলোকে মানুষ করার’ ইতিহাস প্রদত্ত দায়িত্ব এই শ্রেষ্ঠতর বা শ্রেষ্ঠতম জাতির দাবিদারদেরকে নিজেদের হাতে নিতে হবে। এই তত্ত্বের আলোকে একসময় বৃটিশরা ভারতীয়দেরকে ÒWhite mens burdenÓ  বলে আখ্যায়িত করতো। জাতীয়তাবাদের এহেন প্রয়োগ ঔপনিবেশিক মতবাদ ও ব্যবস্থাকে লালন করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছিল। জাত্যাভিমানের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রকাশ হলো ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ, জিয়নবাদ এবং অতি সম্প্রতি সৃষ্ট নয়া-ফ্যাসিবাদ, ‘সাদা মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব’ (White supremacy), America First  (সর্বাগ্রে আমেরিকা)  ইত্যাদি। এসবের অনুকরণে আমাদের দেশের বাঙালিদের মাঝেও জাত্যাভিমানের প্রকাশ দেখা যায়। তা দেখা যায় পার্বত্য এলাকার জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি, এবং এমনকি ভিন্ন কোনো তরিকার অনুসারী আউল-বাউল, মুরশিদ অনুগত সমতলের মুসলিম সম্প্রদায়, সংখ্যাালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি অনুসৃত দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে। জাত্যাভিমানে আচ্ছন্ন জাতি নিজের দোষ-ত্রুটি-দুর্বলতা-ঘাটতি-অপরাধগুলোকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে অন্ধ হয়ে থাকে, আর নিজের শক্তি-সামর্থ্য-ক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করে দেখে। ফলে, জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ও প্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে গিয়ে এরূপ জাত্যাভিমানে আচ্ছন্ন জাতি নানা সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং শেষমেষ অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়ে। জাত্যাভিমান থেকেই উৎসারিত হয় ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’। নিজ জাতির তথাকথিত স্বার্থরক্ষায় কোনো অন্যায় কাজকেই তখন আর অন্যায্য মনে করা হয় না। অন্য জাতির ওপর নিজ জাতির আধিপত্য চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে এই তত্ত্ব ও মতবাদের আশ্রয় নেয়া হয়। পৃথিবীতে জাতিতে জাতিতে সহ-অবস্থান ও শান্তি-ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ নষ্ট হয়।জাতীয়তাবাদের অন্যতম বড় বিপদ হলো তার অন্তর্নিহিত রক্ষণশীলতা। জাতীয় ঐতিহ্য ও জাতীয় ভাবধারা রক্ষার নামে নানা ধরনের বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও কূপমণ্ডূকতাকে সে লালন করে এবং উস্কে দেয়। জাতীয়তাবাদ এক ধরনের আত্মমুখীনতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার প্রবণতা ধারণ করে, যা কিনা বিশ্ব সভ্যতার অর্জন থেকে জাতির দূরত্বকে বাড়িয়ে দেয়। জাতীয়তাবাদ বিশ্ব সভ্যতার সাধারণ সর্বমানবিক ঐশ্বর্যময় সম্পদ থেকে আধার গ্রহণ করে স্বজাতিকে সমৃদ্ধ করার বদলে, ‘শ্রেষ্ঠ জাতির শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের’ নামে নিজের অতীত ও স্ব-গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখার প্রবণতা ধারণ করে। একটি জাতির মধ্যে তা ‘অতীতে ফিরে যাওয়ার’ (revivalism)  প্রবণতার জন্ম দেয়। এর ফলে, জাতি প্রগতিমুখীন না হয়ে রক্ষণশীল ও এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়ে।জাতীয়তাবাদ অন্ধ একমুখীনতা ও সংকীর্ণতাবাদী প্রবণতাও লালন করে। জাতীয়তাবাদ দাবি করতে চায় যে— সমাজের মধ্যে শ্রেণী বিভাজন, শ্রেণী সচেতনতা, ইতিহাস ও সমাজ রূপান্তরে শ্রেণীর ভূমিকা, শোষক ও শোষিতের মধ্যে মৌলিক অমোচনীয় দ্বন্দ্ব, শোষিত মানুষের ঐক্য, মানবিক ও শোষণমুক্ত নতুন সভ্যতা নির্মাণে বিশ্বের শ্রমিক সংহতি ও আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদি বিষয়গুলোর অন্যান্য সব বিষয়ের ঊর্ধ্বে এবং যা হলো সকলের কাছে সুপ্রিম গুরুত্ব সম্পন্ন বিষয়, তা হলো জাতির সার্বজনীন স্বকীয়তা।একট পর্যায়ে জাতীয়তাবাদ শ্রমিক শ্রেণীর শোষণমুক্তির সংগ্রামের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। এদেশেও আমরা বহু দিন ধরে দেখে এসেছি জাতীয়তাবাদী শক্তি কীভাবে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ সেøাগানের বিপরীতে ‘বাংলার মজদুর এক হও’ সেøাগান উত্থাপনের জন্য চেষ্টা করেছে। কিংবা তাদের মুখে অতীতে শুনেছি এবং বর্তমানে আবার খুব বেশি করে উচ্চারিত হতে শুনছি ‘শ্রমিক-মালিক ভাই-ভাই, বাঙালির একতার বিনাশ নাই’ ইত্যাদি ধরনের নসিহত। অন্যদিকে, বৃহৎ ও শক্তিমান জাতির ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ যে আগ্রাসী, আধিপত্যবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, উপনিবেশবাদী ও নয়া-উপনিবেশবাদী এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ফ্যাসিবাদী, নাৎসিবাদী, জিয়নবাদী, তালেবানি জঙ্গিবাদী, প্যান-ইসলামবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের চরম প্রতিক্রিয়াশীলতায় পর্যবসিত হতে পারে তা সমসাময়িক ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায়।এত তাত্ত্বিক কথায় না গিয়েও বাংলাদেশে ‘জাতীয়তাবাদের’ যে বাস্তব চেহারা আমরা দেখে চলেছি তা থেকেও এই আদর্শের স্বরূপ অনেকটাই স্পষ্ট হয়। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’— সেটা তো পাকিস্তানি ভাবাদর্শের একটি নরম সংস্করণ বৈ অন্য কিছু নয়। সে বিষয়ে বেশি আলোচনা না করলেও চলে। আর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ অনেক রকম ভূমিকাই আমরা দেখেছি, দেখে চলেছি। নিঃসন্দেহে একথা সত্য যে, বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় ও মুক্তিযুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আদর্শ ও জাতীয়তাবাদী শক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তার শীর্ষ পর্বে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এই জাতীয়তাবাদী শক্তির কোনো কোনো অংশ ’৭০-’৭১ সালেও হিটলারের মতো করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে বলে প্রচার চালিয়েছে, হিটলার রচিত ‘মেইন ক্যাম্ফ’ (আমার নেতা) বইটির আলোকে মতাদর্শ গ্রহণের ছবক দিয়েছে, আমেরিকা আমাদের স্বাধীনতার পাশে থাকবে বলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মোহগ্রস্ত থেকে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার সহায়তায় ‘স্বাধীনতা’ আনা যায় কিনা সেজন্য চেষ্টা করেছে। ইতিহাস এসব ঘটনার এবং এ ধরনের বহু ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে। সাম্রাজ্যবাদের মন যুগিয়ে চলার জন্য জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী বলে দাবিদার বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী, ব্যীক্ত পরস্পরের মধ্যে তাবেদারির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। আর মাঠে-ময়দানে বিভিন্ন ঘরানার জাতীয়তাবাদী নেতা-কর্মী-ক্যাডারদের বাস্তব কার্যকলাপ হিসেবে হালুয়া-রুটির ভাগবাটোয়ারা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, তদবিরবাজি, দখলবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে অসৎ পথে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদ-বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ-ইসলামী জাতীয়তাবাদ প্রভৃতির মধ্যে এবং তার প্রতিটির অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সমঝোতার খেলা চলছে। জাতীয়তাবাদীদের অব্যাহত খাই-খাই তৎপরতায় সাধারণ মানুষের জীবনে আজ নাভিঃশ্বাস উঠছে।ইতিহাসকে বিকৃত বা মুছে ফেলা যায় না। একথা ঠিক যে ‘জয় বাংলা’ মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ছিল। সাথে সাথে একথাও সত্য যে তা আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শের গর্ভ থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। এই রণধ্বনি দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং দেশবাসী তা গ্রহণ করেছিল। ১৯৭০ ও ১৯৭১ সাল ছিল মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত সম্পন্ন পর্ব ও তার তাৎক্ষণিক পূর্বের অধ্যায়। এই দুই বছর ‘জয় বাংলা’ যে আবেগের উৎস ছিল, একাত্তরের পর, স্বাধীন দেশের সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এই শ্লোগানকে ব্যবহার করে অনেক দুষ্কর্ম করেছে। ‘জয় বাংলা’-র সাথে ‘জয় বঙ্গবন্ধু’-কে যুক্ত করে এই রণধ্বনিতে পরিণত করেছে। তাছাড়া সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী অপশক্তির সাথে আপস করে তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে মদত দিয়ছে।দেশে আজ সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান একটি বড় রকম বিপদ। কিন্তু জনগণের ইহলৌকিক জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধান করার কাজে বাস্তব সাফল্য আনতে না পারলে এই উত্থান রোধ করা যাবে না। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ৈই তা সম্ভব এবং তা প্রতিষ্ঠা করাটা আওয়ামী লীগের বা বিএনপি, জাতীয় পার্পি, জামাতে ইসলামের দ্বারা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তির উত্থান। দেশের সামনে নতুন এজেন্ডা উপস্থিত হয়েছে। সেটিকে এগিয়ে নেয়ার মধ্য দিয়েই উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপদ দেউলিয়া হয়ে পরা শোষণ-লুটপাটের বুর্জোয়া শাসনের আশপাশ থেকে মুক্তি অর্জন করতে হবে। তাই, নিজের সম্পর্কে আমার বিনীত উচ্চারণ, আমি দেশপ্রেমিক বেট, কিন্তু জাতীয়তাবাদী নই। আমি ‘জয় বাংলা’-কে রণধ্বনি করে পথ চলার ‘জয় বাংলা’ পন্থী তো নয়ই। এ হলো আমার আদর্শগত আত্মপরিচয়ের প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য। কিন্তু যারা ‘জাতীয়তাবাদী’ অথবা ‘জয় বাংলা’ পন্থী-তাদের মতো করে কাজ করার অধিকার খর্ব করার যেকোনো প্রচেষ্টার আমি বিরোধী। শুধু বিরোধীই নই, তা রুখতে আমরা কমিউনিস্টরা রাজপথে আছি ও থাকবো।লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

বিনিয়োগে খরা, আস্থার সংকটে স্থবির অর্থনীতি

উদ্বৃত্ত তারল্য মানেই অলস অর্থ নয়। আমানত থেকে কোনো ব্যাংকের বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) সংরক্ষণের পর বাকি অর্থ উদ্বৃত্ত তারল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংককে মোট আমানতের ১৩ শতাংশ এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে ৪ শতাংশ এসএলআর রাখতে হয়। বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের বিপরীতে এই অর্থ রাখার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দুই ধরনের ব্যাংককেই নগদ জমা অনুপাত (সিআরআর) হিসেবে আরও ৪ শতাংশ অর্থ রাখতে হয়।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। আগের মাস জুলাই শেষে এর পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ২৩ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। গত জুনে ছিল ৪ লাখ ১৪ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, বিনিয়োগের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিকল্প হিসেবে এই অর্থের বড় অংশ দিয়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে ঋণ দেওয়ার চেষ্টা করছে ব্যাংকগুলো।পরিসংখ্যান বলছে, কম সুদের ঋণ দিতেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ব্যাংকাররা। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে কম সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক গত মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এই তহবিল থেকে গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। এই প্যাকেজের আওতায় বন্ধ শিল্প ও সেবাখাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে এ পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, সবুজ কারখানায় রূপান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানি এবং হিমায়িত চিংড়িসহ বিভিন্ন খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে এক টাকাও বিতরণ হয়নি।এবার কৃষি ও পল্লিঋণের চিত্রের দিকে তাকানো যাক। দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানে কৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ। প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। স্বাধীনতার পর থেকে কৃষি উৎপাদন তিন গুণের বেশি বেড়েছে। ধান, স্বাদুপানির মাছ, পাট ও আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব কৃষি খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।চলতি অর্থবছরের শুরুতে কৃষিঋণ বিতরণের গতি কিছুটা বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে ব্যাংকগুলো। এ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা পুরো অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১২ শতাংশ। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কৃষিঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে শস্য উপখাতে, যদিও তা আগের বছরের তুলনায় কম (সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন)।এবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য কৃষি ও পল্লিঋণ খাতে ৩৯ হাজার কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর নিজস্ব শাখা ও অন্যান্য ব্যবস্থার মাধ্যমে বরাদ্দের ৫০ শতাংশ ঋণ বিতরণ করতে হবে। এই ৫০ শতাংশের মধ্যে শস্য ও ফসল উপখাতে ৫৫ শতাংশ, প্রাণিসম্পদ উপখাতে ২০ শতাংশ এবং মৎস্য উপখাতে ১৫ শতাংশ বিতরণের কথা বলা হয়েছে। আগের নীতিমালায় শস্য ও ফসল উপখাতে ৬০ শতাংশ, প্রাণিসম্পদ উপখাতে ১৫ শতাংশ এবং মৎস্য উপখাতে ১৫ শতাংশ ঋণ বিতরণের কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ এবার প্রাণিসম্পদ উপখাতে ঋণের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে কমানো হয়েছে শস্য ও ফসল উপখাতে।বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—ব্যাংক খাতে তারল্য থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ বাড়ছে না। এর কারণ অর্থের অভাব নয়, বরং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের ঘাটতি। একজন উদ্যোক্তা নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে শুধু ঋণের সুদহার বিবেচনা করেন না। তিনি দেখেন, বাজারে চাহিদা কেমন, উৎপাদন ব্যয় কত, গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়মিত পাওয়া যাবে কি না, কর ও নিয়ন্ত্রক নীতি কতটা স্থিতিশীল এবং ভবিষ্যতে ব্যবসার পরিবেশ কেমন থাকবে। এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে ব্যাংকে অর্থ পড়ে থাকলেও উদ্যোক্তা ঋণ নিতে আগ্রহী হন না।উচ্চ সুদহার অবশ্যই বিনিয়োগের পথে একটি বড় বাধা। তবে শুধু সুদহার কমিয়ে সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ ঋণের ব্যয় কমলেও যদি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিশ্চয়তা না থাকে, বাজার দুর্বল থাকে, করব্যবস্থা জটিল হয় এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে সংশয় থাকে, তাহলে উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে যাবেন না। তাই বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা জরুরি।বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কর ও অন্যান্য প্রণোদনার ঘোষণা দিলেই হবে না। এসব সুবিধা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। কোন খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে, কোথায় বাধা রয়ে গেছে এবং কোন সরকারি সংস্থার কারণে প্রকল্প আটকে আছে—এসব বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যেসব অবকাঠামো সরাসরি উৎপাদন, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং অপচয় কমানোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সীমিত রাজস্ব দিয়ে বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো তৈরি করতে হলে ব্যয়ের প্রতিটি টাকার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক হিসাবের পাশাপাশি আস্থার ওপরও নির্ভর করে। উদ্যোক্তা যদি মনে করেন, তাঁর বিনিয়োগের পরিবেশ স্থিতিশীল থাকবে, জ্বালানি পাওয়া যাবে, ঋণ পাওয়া সহজ হবে, করনীতি পূর্বানুমানযোগ্য থাকবে এবং নীতি হঠাৎ বদলাবে না, তাহলে তিনি ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হবেন। একই নিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও দিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আবার গতিশীল করতে হলে শুধু বিনিয়োগের জন্য প্রণোদনা দিলেই চলবে না, বিনিয়োগের অনুকূল আস্থার পরিবেশ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলেই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের গতি বাড়বে এবং বাংলাদেশও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারবে।বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসালটিংয়ের অর্থায়ন ও সহায়তায় পরিচালিত ‘অনুমোদন বিষয়ে জনমত জরিপ ২০২৬’-এর ফলাফল গত ১৯ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্কদের একটি দলের ওপর পরিচালিত এই জরিপে ১০ হাজার ৪১৩টি ফোনকল করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে জনমতকে ‘সতর্ক আশাবাদ’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো থাকলেও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। উত্তরদাতাদের বড় একটি অংশ মনে করেন, আগের তুলনায় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কিছুটা খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে সাধারণ মানুষ তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সামগ্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের কার্যক্রমে সন্তুষ্টি থাকলেও দৈনন্দিন জীবনে প্রকৃত উন্নতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষ এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।ব্যাংক খাতের সংস্কার বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের আরেকটি পূর্বশর্ত। দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক। প্রকৃত খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি নির্ধারণ, সম্পদের গুণগত মান যাচাই, দুর্বল ব্যাংকের সময়বদ্ধ পুনর্গঠন এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভালো ঋণগ্রহীতা ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের একভাবে বিবেচনা করা যাবে না। উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংক খাতে আস্থা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে।এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। এসব প্রতিষ্ঠান কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়ে। জামানতের সীমাবদ্ধতা, ঋণের উচ্চ ব্যয়, জটিল কাগজপত্র এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি নিতে অনীহা তাদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে। তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রপ্তানিমুখী খাত, কৃষিভিত্তিক পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন বাড়াতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সিটি ইউনিভার্সিটি]

আয় নেই, রিটার্ন নেই, তবু টিআইএনধারীর জরিমানা কেন?

টিআইএন নিয়েছিলেন কয়েক বছর আগে। তখন প্রয়োজন ছিল। জমি কিনবেন, ব্যাংক হিসাব খুলবেন, ব্যবসা করবেন কিংবা অনলাইনে আয় করবেন, যে কারণেই হোক টিআইএন নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে আর আয় হলো না। কাজও হলো না। রিটার্নও দেওয়া হলো না। এভাবে বছর কেটে গেল। হঠাৎ একদিন কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ। তখনই প্রশ্ন, আয় যখন নেই, করই যখন দিতে হবে না, তাহলে জরিমানা কেন? এখানেই রয়েছে অনেক করদাতার বড় ভুল বোঝাবুঝি।কারণ রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আর কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এক বিষয় নয়। একজন ব্যক্তির করযোগ্য আয় শূন্য হতে পারে, কিন্তু আইন অনুযায়ী তার রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। আর নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে, কর না থাকলেও জরিমানার মুখে পড়ার সুযোগ রয়েছে।বাংলাদেশে টিআইএন নেওয়ার ঘটনা এখন খুবই সাধারণ। চাকরি, ব্যবসা, জমি কেনাবেচা, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা কিংবা বিভিন্ন আর্থিক কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনে মানুষ টিআইএন নিচ্ছেন। কেউ আবার ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আয় করবেন ভেবে আগেই টিআইএন নিয়েছেন। কিন্তু প্রয়োজন শেষ হওয়ার পর অনেকেই ধরে নেন, টিআইএন তো শুধু নিয়েছিলাম, আয়ই তো হয়নি, রিটার্ন দেওয়ারও দরকার নেই। এই একটি ধারণাই পরে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৬-এ নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তির রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর রিটার্ন দাখিলে বাধ্য হলে ধারা ১৭০ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করতে হয়। অর্থাৎ আয় নেই, এই কথাটিই সবসময় রিটার্ন না দেওয়ার বৈধ কারণ নয়। প্রথমে দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে বাধ্য কি না। যদি বাধ্য হন, তাহলে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।এখানেই আসে জরিমানার বিষয়টি। অনেকেই মনে করেন, করযোগ্য আয় নেই এবং কর পরিশোধযোগ্যও নেই, তাই রিটার্ন দিতে দেরি হলেও কোনো জরিমানা হবে না। কিন্তু রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে কর পরিশোধযোগ্য না থাকলেও জরিমানা প্রযোজ্য হতে পারে।ধরা যাক, একজন করদাতার করযোগ্য আয় নেই। হিসাব করে তার পরিশোধযোগ্য কর দাঁড়াল শূন্য টাকা। তিনি ভাবলেন, করই যখন নেই, রিটার্ন না দিলেও কিছু হবে না। কিন্তু যদি তিনি আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে বাধ্য হন এবং নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন না দেন, তাহলে শুধু কর শূন্য হওয়ার কারণে জরিমানা থেকে মুক্তি নিশ্চিত নয়।কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ পাওয়ার আগে বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করা হলে এবং কর পরিশোধযোগ্য না থাকলে ন্যূনতম জরিমানা ৫ হাজার টাকা হতে পারে। অন্যদিকে, নোটিশ পাওয়ার পর রিটার্ন দাখিল করলে প্রযোজ্য ন্যূনতম জরিমানা ১০ হাজার টাকা হতে পারে। অর্থাৎ নোটিশ আসার আগেই বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করলে জরিমানার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে আরও পরিষ্কার করা যায়। ধরা যাক, একজন করদাতার পরিশোধযোগ্য কর ৫০ হাজার টাকা। তিনি যদি কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ পাওয়ার আগে নিজ উদ্যোগে বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করেন, তাহলে ধারা ১৭৪(২) অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকার ১০ শতাংশ হয় ৫ হাজার টাকা। প্রযোজ্য ন্যূনতম জরিমানার বিধান বিবেচনায় তার জরিমানা হবে ৫ হাজার টাকা।অন্যদিকে একই করদাতা যদি কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ পাওয়ার পর রিটার্ন দাখিল করেন, তাহলে ধারা ১৭৪(৩) অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকার ১৫ শতাংশ হয় ৭ হাজার ৫০০ টাকা। তবে প্রযোজ্য ন্যূনতম জরিমানার কারণে তার জরিমানা হবে ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ একই করদাতা, একই করের পরিমাণ, কিন্তু সময়ের ব্যবধানেই জরিমানার অঙ্ক বদলে যেতে পারে।এখন প্রশ্ন, টিআইএন নেওয়ার যে প্রয়োজন ছিল, সেটি যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে কি রিটার্নের দায়িত্বও শেষ হয়ে যাবে? ধরা যাক, একজন ব্যক্তি জমি কেনার জন্য টিআইএন নিয়েছিলেন। পরে জমি কেনা হয়নি। আবার কেউ ব্যাংকিংয়ের প্রয়োজনে টিআইএন নিয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রয়োজন আর নেই। কেউ অনলাইন ব্যবসা বা ইউটিউব থেকে আয় করার পরিকল্পনায় টিআইএন নিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো আয় হয়নি। এ অবস্থায় টিআইএন নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য শেষ হয়ে গেলেই রিটার্ন দাখিলের আইনগত দায়িত্বও শেষ হয়ে যাবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।প্রথমে দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আয়কর আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে বাধ্য কি না। বাধ্য হলে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। অর্থাৎ টিআইএন কেন নেওয়া হয়েছিল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও রিটার্নের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণের একমাত্র বিষয় নয়।অনেক করদাতার প্রশ্ন, আমার তো কোনো করই নেই, তাহলে রিটার্ন দেব কেন? রিটার্নকে শুধু কর পরিশোধের কাগজ হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যায় না। একজন করদাতার আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় এবং অর্থের উৎসসহ বিভিন্ন আর্থিক তথ্য রিটার্নের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়।একজন ব্যক্তির নিজের উপার্জন না থাকলেও তার সম্পদ থাকতে পারে, পরিবারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন কিংবা নিজের নামে বিভিন্ন ব্যয় হতে পারে। তাই আমার আয় নেই এবং আমার রিটার্ন দেওয়ার প্রয়োজন নেই, এই দুটি বক্তব্য সবসময় একই অর্থ বহন করে না। করযোগ্য আয় না থাকলে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী করের পরিমাণ শূন্য হতে পারে। কিন্তু আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।এখন আসা যাক তাদের কথায়, যাদের টিআইএন কয়েক বছর আগে নেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত কোনো রিটার্ন দাখিল করা হয়নি। একসঙ্গে কী করতে হবে, এর উত্তর সবার ক্ষেত্রে একই নয়। টিআইএন গ্রহণের তারিখ, কোন করবর্ষ থেকে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়েছে, আগে কোনো রিটার্ন দাখিল করা হয়েছিল কি না এবং বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কর অবস্থা, এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।বিশেষ করে ১ জুলাই ২০২৫-এর পর টিআইএন নিয়েছেন কিন্তু এখনো রিটার্ন দেননি, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বর্তমান করবর্ষ থেকে নিয়মিত রিটার্ন দাখিল শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে আগের কোনো করবর্ষের রিটার্ন দিতে হবে কি না বা জরিমানা হবে কি না, তা ব্যক্তির পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইন দেখে নিশ্চিত হতে হবে। আর আগে থেকেই টিআইএন থাকলে কিন্তু কয়েক বছর রিটার্ন না দিয়ে থাকলে, কোন কোন বছরের রিটার্ন দেওয়া প্রয়োজন এবং কোনো জরিমানা প্রযোজ্য হবে কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করা উচিত।বিলম্বে রিটার্ন দাখিলের কারণে জরিমানা আরোপ হলে অনেকে ব্যক্তিগত অনুরোধের মাধ্যমে জরিমানা কমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত অনুরোধের ভিত্তিতে আইন নির্ধারিত জরিমানা কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই জরিমানা আরোপের আগে বা পরে প্রথমেই দেখতে হবে, কোন করবর্ষের জন্য জরিমানা হয়েছে, কেন হয়েছে এবং কোন আইনি বিধানের অধীনে হয়েছে।তবে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো জরিমানা হওয়ার অপেক্ষা না করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করা। টিআইএন নেওয়ার পর সেটিকে অপ্রয়োজনীয় ভেবে ফেলে রাখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি শুধু আয় নেই বলেও রিটার্নের বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়।প্রথমে নিজের কর অবস্থা যাচাই করতে হবে। আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, তা দেখতে হবে। থাকলে সময়মতো রিটার্ন দাখিল করতে হবে। আর দীর্ঘদিন রিটার্ন দাখিল না করে থাকলে পূর্ববর্তী করবর্ষগুলোর অবস্থাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।কর ব্যবস্থায় দায়িত্ব শুধু কর পরিশোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সঠিক তথ্য দিয়ে সময়মতো রিটার্ন দাখিল করাও একজন করদাতার গুরুত্বপূর্ণ আইনগত দায়িত্ব। তাই টিআইএন আছে অথচ রিটার্ন দাখিল করছেন না, এমন হলে বিষয়টি অবহেলা না করে নিজের কর অবস্থা যাচাই করা জরুরি। কারণ আজকের ছোট্ট অবহেলাই ভবিষ্যতে জরিমানা, নোটিশ এবং বাড়তি জটিলতার কারণ হতে পারে।মনে রাখতে হবে, করযোগ্য আয় নেই মানেই সব ক্ষেত্রে রিটার্নের প্রয়োজন নেই, এমন নয়। আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। আর সময়মতো রিটার্ন দাখিল করাই জরিমানা ও অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়ানোর সবচেয়ে নিরাপদ পথ।[লেখক: আয়কর আইনজীবী]

উচ্চশিক্ষা, আত্মপ্রবঞ্চনার এক মহাকাব্য

আমরা যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আমাদের কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন করা উচিত—আমাদের শিক্ষার মূল্য কে পরিশোধ করেছে, আর আমরা তার বিনিময়ে দেশকে কী ফিরিয়ে দিয়েছি? আমাদের মেধার পেছনে ব্যয় হওয়া অর্থ কোনো রাজকীয় কোষাগারের উত্তরাধিকার নয়। এর প্রতিটি টাকার সঙ্গে মিশে আছে একজন রিকশাচালকের ঘাম, একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের ওভারটাইম, একজন প্রবাসীর নির্বাসিত যৌবন এবং কোটি মানুষের না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পেছনে রাষ্ট্রের যে বিনিয়োগ, তার অর্থ এসেছে এই খেটে খাওয়া মানুষের কাছ থেকেই। যে রিকশাচালক নিজের সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে হিমশিম খান, তার উপার্জনের অংশ দিয়ে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বসেছি। যে প্রবাসী বছরের পর বছর পরিবারের মুখ দেখতে পান না, তার পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রায় আমাদের শিক্ষার অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। অথচ প্রশ্ন হলো, আমরা তাদের কতটুকু প্রতিদান দিতে পেরেছি? নাকি জনগণের অর্থে উচ্চশিক্ষিত হয়ে জনগণের কাছ থেকেই দূরে সরে যাওয়ার সামাজিক লাইসেন্স অর্জন করেছি?একটি স্বনামধন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর—উভয় পরীক্ষায় ৩.৮৬ সিজিপিএ অর্জন করেছেন একজন শিক্ষার্থী। ৪৪তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে। অথচ বিষয়সংশ্লিষ্ট চাকরির সাক্ষাৎকার দিতে লন্ডনে গিয়ে নিয়োগকর্তার কাছ থেকে যা শুনতে হয়েছে তা অপ্রত্যাশিত । এটি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কোনো আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক শিক্ষাগত সমতুল্যতার সিদ্ধান্ত নয়। তবু অভিজ্ঞতাটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়—পরীক্ষার ফলাফল আর বাস্তব দক্ষতার মধ্যে এত দূরত্ব কেন?এই সংকট যে নিছক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, পরিসংখ্যানও তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার এবং উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ১৩.৫৪ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক হলো, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের (১৫ু২৯ বছর) বেকারত্বের হার প্রায় ২৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আমরা একদিকে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়াচ্ছি, অন্যদিকে সেই ডিগ্রিকে কর্মক্ষেত্রের কার্যকর দক্ষতায় রূপান্তর করতে হিমশিম খাচ্ছি। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি মানবসম্পদ তৈরি করছি, নাকি শিক্ষিত বেকারত্বের এক বিশাল প্রদর্শনী সাজাচ্ছি?কেউ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তুলনা করেন, তখন অপমান লাগে, ক্ষোভ হয়। কিন্তু শুধু ক্ষোভের উত্তাপে আয়নাটি ভেঙে ফেললে নিজের মুখ দেখা যায় না। বরং প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমরা কি আমাদের প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যের সমান যোগ্যতা অর্জন করছি? নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটিকে ব্যক্তিগত দক্ষতার বিকল্প পরিচয়পত্র বানিয়ে ফেলেছি?আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি চিন্তাশীল মানুষ, গবেষক, উদ্ভাবক ও সমস্যা সমাধানকারী তৈরি করছে, নাকি জিপিএর কারিগরি দক্ষতায় পারদর্শী কিছু সনদধারী নাগরিক তৈরি করছে? পরীক্ষার খাতায় নির্ভুল উত্তর লিখতে পারলেই যদি মেধার চূড়ান্ত স্বীকৃতি মেলে, তবে বাস্তব পৃথিবীর অজানা সমস্যার সমাধান করবে কে?অবশ্য দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়। দায় সেই শিক্ষকেরও, যিনি পাঠ্যবইয়ের বাইরে জ্ঞানের জানালা খুলতে ভুলে গেছেন; সেই প্রশাসকেরও, যিনি গবেষণার চেয়ে আনুষ্ঠানিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেন; সেই নীতিনির্ধারকেরও, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ান, কিন্তু শিক্ষার মান ও কর্মমুখী দক্ষতার প্রশ্নে নীরব থাকেন। দায় আমাদেরও—আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় নিয়ে গর্ব করি, অথচ নিজেদের দুর্বলতা নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পাই।সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হলো, যে শ্রমিকের ঘামে আমাদের শিক্ষার প্রদীপ জ্বলে, তাকেই আমরা অশিক্ষিত বলে অবজ্ঞা করি। অথচ তার জীবনবোধ, শ্রমের শৃঙ্খলা, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই এবং দায়িত্ববোধের কাছে আমাদের অনেক তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের শেখার আছে। তিনি হয়তো ইংরেজিতে জীবনবৃত্তান্ত লিখতে পারেন না, কিন্তু জীবনের যে কঠিন পরীক্ষায় প্রতিদিন উত্তীর্ণ হন, তার কোনো জিপিএ আমাদের সনদে লেখা নেই।পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু সমাবর্তনের ছবি, পদকের ঝলক কিংবা বিসিএসের সুপারিশের সংখ্যায় মাপা যায় না। মাপতে হবে গবেষণার মানে, উদ্ভাবনে, কর্মক্ষেত্রে দক্ষতায়, নাগরিক দায়িত্ববোধে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে এর অবদানে।আমাদের আত্মসমালোচনা আত্মঅপমান নয়; এটি দায়বদ্ধতার প্রথম পাঠ। ডিগ্রি অর্জন ব্যক্তিগত সাফল্য, কিন্তু সেই ডিগ্রির পেছনে জনগণের বিনিয়োগ একটি সামাজিক আমানত। সেই আমানতের প্রতিদান দিতে না পারলে আমাদের অহংকারের মুকুট আসলে দায়মুক্তির মুখোশ ছাড়া কিছুই নয়।রাষ্ট্র আমাদের শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল, আমরা কি মানুষ হওয়ার দায়িত্ব পালন করেছি? জনগণ আমাদের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করেছিল মানুষ তৈরির আশায়; আমরা যদি কেবল সার্টিফিকেট তৈরি করি, তবে সমাবর্তনের আলোকসজ্জা যতই ঝলমলে হোক, তার আড়ালে যোগ্যতার জানাজাই অনুষ্ঠিত হবে।রাষ্ট্র মানুষ চেয়েছিল, আমরা সার্টিফিকেট হয়ে ফিরেছি—এই আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পাওয়ার দিনই হবে আমাদের প্রকৃত সমাবর্তন।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গণমাধ্যমকর্মী]

ধর্মের নামে মব, বিচারের নামে বর্বরতা

সৌদি আরবে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার সিতির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বাংলাদেশে অনেকেই মর্মাহত। কিন্তু এ তো শরিয়া আইনেরই প্রয়োগ। যারা এই যুক্তিতে দেশে তৌহিদী জনতার নামে পিটিয়ে মারা জায়েজ মনে করেন, তাদের এই কান্না ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়। শরিয়া আইনের বীভৎস রূপ দেখে হাহুতাশ করলে তো আর পুরো শরিয়া মানা হলো না। এমন মৃত্যুদণ্ড সৌদিতে অহর্নিশ হচ্ছে। সেখানে গড়ে বছরে ৩০০ জনের বেশি মানুষের শিরোচ্ছেদ হয়। তারপরও অপরাধ কমে না। এতে প্রমাণিত, প্রকাশ্য বীভৎস শাস্তি অপরাধ কমায় না।আমরা সৌদির শিরোচ্ছেদে মৃত্যুদণ্ডে কাঁদছি, কিন্তু বাংলাদেশের ভেতরে আমরা কী করছি? তৌহিদী জনতার নামে মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে, বস্তাবন্দি করে হত্যা করছি। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর এই জোশ আরও বেড়েছে। সর্বশেষ বলি সাতক্ষীরার দেবহাটার ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। ধর্ম অবমাননার একটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে প্রথম দফায় মারধর করা হয়। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করলে রাত সাড়ে আটটায় সেখানেও ঢুকে দ্বিতীয় দফায় পিটুনি দেওয়া হয়। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেলে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। পরিবারের ভাষ্য, এটি পরিকল্পিত হত্যা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে অনার্স-মাস্টার্স করা, দুই শিশু সন্তানের জনক শামীম মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। স্ত্রীর সঙ্গে কলহের কথোপকথন রেকর্ড করে ছড়ানো হয়। স্থানীয় জামায়াত অফিসে সংগঠিত হয়ে হামলা করা হয়। আর নিজেকে মুফতি পরিচয় দেওয়া ফজলুল হক আমিনী ফেসবুক লাইভে ডেকে মব তৈরি করেন।আমরা এখন প্রতিদিনই এমন বস্তাবন্দি লাশ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে ভয়ংকর। টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে, ঢাকায় এক সমাবেশে চরমপন্থীরা সরকারকে হুমকি দিয়েছে—ধর্ম অবমাননাকারীকে সরকার মৃত্যুদণ্ড না দিলে তারা নিজেরাই তা দেবে। এটি আইএস-আল-কায়েদার ভাষা। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনেক মিছিলে আইএসের পতাকা দেখা গেছে। রংপুরের তারাগঞ্জে মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ হয়েছে এক হুজুরের হুমকিতে। ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের সব সরকারই প্রশ্রয় দিয়েছে। টাইমের মতে, আওয়ামী লীগ একই সঙ্গে দমন ও তুষ্ট করেছে, ভোটের জন্য কওমি মাদ্রাসা ছড়িয়ে দিয়েছে, ব্লগার হত্যায় প্রথমে উদাসীন ছিল। আবার এই কঠোর অবস্থানের বিরোধিতা করেছে বিএনপি, এমনকি হলি আর্টিজানকেও নাটক বলেছে। ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত আমলে বাংলা ভাইয়ের উত্থান আমরা দেখেছি। প্রকাশ্যে হাত-পা বেঁধে উল্টো ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। ৩২টি লাশের পরিচয় মিলেছিল। সহায়তা করেছিল পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত নেতারা। তখন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন বাবর।আমাদের ধর্মীয় শিক্ষায় গলদ আছে কি না, ভাবতে হবে। অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ উঠলেই মানুষ এত হিংস্র হয় কেন? বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ অন্যায় করে, ঘুষ খায়, মানুষ ঠকায়। কিন্তু ধর্ম নিয়ে কটূক্তির কথা শুনলেই রাস্তায় নেমে পড়ে। অথচ ব্যক্তিজীবনে ধর্মকর্মে একনিষ্ঠ নয়। আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের শাস্তি আছে, কিন্তু ‘অনুভূতি’র কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই, দেওয়াও সম্ভব নয়। এই অস্পষ্টতার সুযোগেই চলছে হত্যার উৎসব। তালিকাটি দীর্ঘ। বাগেরহাটে ছয় বছরের শিশু মুসলিমার বস্তাবন্দি গলাকাটা লাশ, কুষ্টিয়ায় সুফি পীর শামীম রেজাকে পিটিয়ে হত্যা, ভালুকায় হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ মহাসড়কে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়া, গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পোড়ানো, পটিয়ায় পার্থ বিশ্বাস, পাটগ্রামে মানসিক ভারসাম্যহীন জুয়েলকে ৪২০ মিটার টেনে পুড়িয়ে হত্যা—যেখানে ৬৫ শতাংশ ছিল কিশোর।এই মবের চেহারা দেখুন। দরবার ভাঙচুর ও হত্যায় অংশ নেওয়াদের মধ্যে শিশু, কিশোর, যুবক—দু-একজন ছাড়া কারও মুখে দাড়ি-টুপি নেই। বেশির ভাগ হাফপ্যান্ট আর লুঙ্গি পরা। তবে এদের যারা উত্তেজিত করে, তারা ভিন্ন জগতের মানুষ। তাদের বলা হয় ‘তৌহিদী জনতা’। এই বিক্ষুব্ধ জনসমষ্টি প্রচলিত আইন মানে না, প্রশাসন মানে না। ধর্ম নিয়ে বিতর্ককারীদের হত্যায় তারা স্বর্গীয় সুখ পায়। জিহাদের উত্তেজনায় জীবিত মানুষকে পুড়িয়ে মারে, কবর থেকে লাশ তুলে উল্লাস করে। মানুষ পোড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও এটাকে তারা ধর্ম অবমাননা মনে করে না। এমন জনগোষ্ঠী বেশি দেখা যায় পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে। বাংলাদেশে ভোট হারানোর ভয়ে বাম-ডান সব দল এই উগ্রতাকে সমীহ করে। তাই গণতান্ত্রিক নির্বাচন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তুলছে।এখানেই গাজীপুরের আউচপাড়ার ঘটনাটি প্রাসঙ্গিক। সাত বছরের ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসাশিক্ষক মোসলেহ উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ‘চুমু’র কথা স্বীকার করতেই স্বজনরা চড় মেরে গণপিটুনি দেন। এরপর আলেম সমাজ বলতে শুরু করেছে, ‘আইন নিজের হাতে নেবেন কেন, শিক্ষক অপরাধ করলে আইন আছে।’ অথচ এই আলেম সমাজই এত দিন ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল। ন্যায্য ক্ষোভ থেকে যখন মানুষ আইন হাতে তুলে নেয়, তখন বিচার থাকে না, থাকে শুধু মব। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর—এই নয় মাসে মব সহিংসতায় ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান সাইদুর রহমান ২০২৫ সালের মূল্যায়নে বলেছিলেন, ‘সমাজে অভূতপূর্ব নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। সরকার মব সহিংসতা বন্ধে কোনো উদ্যোগই নেয়নি।’ উত্তরায় ছিনতাইকারীকে পিটিয়ে ঝুলিয়ে রাখা, টঙ্গীতে তরুণকে পিটিয়ে হত্যা তারই ধারাবাহিকতা।ইসলামে মুরতাদের শাস্তি নিয়ে হাদিস আছে—‘যে দ্বীন পরিবর্তন করবে, তাকে হত্যা করো’ (বুখারি ৬৯২২)। সূরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতে অশান্তি সৃষ্টিকারীর জন্য মৃত্যুদণ্ড, শূলবিদ্ধ করা বা হাত-পা কাটার কথা আছে। কিন্তু সেখানে তওবার সুযোগ, বিচারকের রায়, সাক্ষ্য-প্রমাণের বাধ্যবাধকতাও আছে। সৌদি রাষ্ট্র যখন সেই প্রক্রিয়া না মেনে তাজিরের নামে শিরোচ্ছেদ করে, তখন তা যেমন বর্বরতা, তেমনি বাংলাদেশে রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া তৌহিদী জনতা যখন পিটিয়ে, ঝুলিয়ে, পুড়িয়ে মারে, তখন তা আরও বড় বর্বরতা। সৌদিতে রাষ্ট্র কল্লা কাটে, বাংলাদেশে মব কল্লা কাটে—পার্থক্য শুধু তলোয়ার কার হাতে। দুটোই দেখিয়ে দেয়, ধর্মকে যখন বিচারের বদলে প্রতিশোধের হাতিয়ার বানানো হয়, তখন অপরাধ কমে না, শুধু লাশের সংখ্যা বাড়ে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

কৃষির ভবিষ্যৎ: উৎপাদন বাড়ুক, বৈচিত্র‍্যও থাকুক

ক্রমবর্ধমান খাদ্যচাহিদা ও সীমিত কৃষিজমির বাস্তবতায় প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ জরুরি। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য মূল্যবান স্থানীয় জাতের জিনগত সম্পদ সংরক্ষণ করাও প্রয়োজন। এ জন্য দরকার বুদ্ধিমান ও ভারসাম্যপূর্ণ জাতনীতি।বাংলাদেশের কৃষি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রশ্নটি আর শুধু ‘কী চাষ করব’—এতে সীমাবদ্ধ নেই। বড় প্রশ্ন হলো, ক্রমশ কমতে থাকা কৃষিজমি থেকে ক্রমবর্ধমান মানুষের জন্য কীভাবে আরও বেশি খাদ্য উৎপাদন করা যাবে? একদিকে বাড়ছে জনসংখ্যা, খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা। অন্যদিকে কৃষিজমি সীমিত, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন কৃষিকে নতুন নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এই বাস্তবতায় কৃষিজমির পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ যতটা সীমিত, প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজন ততটাই অনিবার্য।এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ কোনো সাময়িক প্রবণতা নয়। এটি খাদ্যনিরাপত্তার বৃহত্তর প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত একটি কৃষিগত বাস্তবতা। একই জমিতে বেশি ফলন, স্বল্প জীবনকাল, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং অঞ্চলভেদে উপযোগী বৈশিষ্ট্যের কারণে উচ্চফলনশীল জাত কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে এই পরিবর্তনের অর্থ স্থানীয় জাতকে অস্বীকার করা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কোন জাত কোথায় কৃষকের জন্য বেশি লাভজনক, জাতীয় খাদ্যচাহিদা পূরণে বেশি কার্যকর এবং ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য বেশি মূল্যবান?সুতরাং উচ্চফলনশীল জাত ও স্থানীয় জাতের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করার চেয়ে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক একটি বুদ্ধিমান জাতনীতি। যেখানে অধিক উৎপাদন জরুরি, সেখানে উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ করতে হবে। আর যেসব স্থানীয় জাতের মধ্যে ভবিষ্যতে নতুন জাত উদ্ভাবন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া কিংবা পুষ্টি ও খাদ্যসংস্কৃতির জন্য মূল্যবান বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু বেশি উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য উৎপাদনশীলতা, লাভজনকতা, অভিযোজনক্ষমতা ও জিনগত বৈচিত্র‍্যরে মধ্যে সঠিক ভারসাম্যও জরুরি।বাংলাদেশের কৃষিতে স্থানীয় জাতের অবদান ঐতিহাসিক। কৃষকের বাছাই ও সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে অঞ্চলভেদে নানা বৈশিষ্ট্যের জাত গড়ে উঠেছে। কোনোটি খরা সহনশীল, কোনোটি জলাবদ্ধতা বা লবণাক্ততা সহনশীল। কোনোটি আবার স্বাদ, পুষ্টিমান কিংবা স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। এসব জাত আমাদের কৃষির ঐতিহ্য এবং মূল্যবান জিনগত সম্পদ। কিন্তু কৃষির প্রয়োজনও স্থির নয়। যে জাত একসময় একটি অঞ্চলের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট ছিল, বৃহত্তর খাদ্যচাহিদার বাস্তবতায় তা সব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। বেশি ফলন, স্বল্প জীবনকাল, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও বাজারের চাহিদা পূরণের সুবিধার কারণে উচ্চফলনশীল জাত কৃষির স্বাভাবিক বিবর্তনের অংশ হয়ে উঠেছে।উচ্চফলনশীল জাতের সঙ্গে সেচ, সুষম সার, যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত বালাই ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক চাষপদ্ধতির সমন্বয় কৃষির উৎপাদনক্ষমতায় বড় পরিবর্তন এনেছে। একই জমি থেকে বেশি ফলন এবং স্বল্প জীবনকালের জাতের মাধ্যমে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সীমিত কৃষিজমির দেশে এই পরিবর্তনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অধিক ফলনের তাগিদে জমির উল্লম্ব উৎপাদন বৃদ্ধির এটিই একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।তবে বেশি ফলনই শেষ কথা নয়। কোনো জাতের ফলন বেশি হলেও উৎপাদন ব্যয় বেশি হলে, ঝুঁকি বাড়লে কিংবা বাজারমূল্য কমে গেলে কৃষকের প্রকৃত লাভ নাও বাড়তে পারে। তাই জাতের সাফল্য মাপতে হবে ফলনের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, বাজারমূল্য, ঝুঁকি ও নিট আয়ের ভিত্তিতে। ভবিষ্যতের জাতনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতি হেক্টরে সর্বোচ্চ ফলনের পাশাপাশি টেকসই সর্বোচ্চ নিট আয় নিশ্চিত করা।জাত উন্নয়ন কর্মসূচির প্রত্যক্ষ ফল হলো নতুন জাত উদ্ভাবন, বীজ উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও সম্প্রসারণ। কিন্তু এর প্রকৃত সুফল আরও বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, জাতীয় উৎপাদন বাড়ানো, খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, উৎপাদনের ঝুঁকি কমানো এবং খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী করা। তাই শুধু কতটি নতুন জাত উদ্ভাবিত হলো, সেটিই বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, কৃষকের মাঠে এসব জাত কী পরিবর্তন আনতে পারল।এখানে স্থানীয় জাত ও উচ্চফলনশীল জাতকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। উচ্চফলনশীল জাত যেখানে উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বেশি উপযোগী, সেখানে তার সম্প্রসারণ অগ্রাধিকার পাবে। অন্যদিকে স্থানীয় জাতের যেসব বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতের কৃষির জন্য মূল্যবান, সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ প্রতিস্থাপন মানে বিলুপ্তি নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন।স্থানীয় জাতের গুরুত্ব এখানেই নতুনভাবে সামনে আসে। খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা কিংবা নির্দিষ্ট রোগ সহনশীলতার মতো বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতে নতুন জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সব স্থানীয় জাতকে বাণিজ্যিক চাষে ধরে রাখার প্রয়োজন না থাকলেও মূল্যবান জিনগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলা যাবে না। জিনব্যাংক, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে সংরক্ষণের মাধ্যমে এই সম্পদ নিরাপদ রাখতে হবে।জাত পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষকের বীজ ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় কৃষক নিজের উৎপাদিত ফসল থেকে বীজ সংরক্ষণ করতেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে বিনিময় করতেন। এখন প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক বীজব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এর সুফল হলো মানসম্মত বীজ ও উন্নত প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার। তবে একই সঙ্গে বীজের মান, দাম, প্রাপ্যতা এবং কৃষকের পছন্দের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও জরুরি। ভবিষ্যতের উচ্চফলনশীল জাতকে তাই শুধু বেশি ফলন দিলেই চলবে না। সেগুলোকে হতে হবে জলবায়ু সহনশীল, রোগ প্রতিরোধী, পানি ও অন্যান্য উপকরণ সাশ্রয়ী এবং কৃষকের জন্য লাভজনক।খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও নতুন রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বিবেচনায় জাত উন্নয়নের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত করতে হবে। এ জন্য প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির পাশাপাশি দ্রুত প্রজননপ্রযুক্তি (স্পিড ব্রিডিং) ও চিহ্নকনির্ভর নির্বাচন পদ্ধতির (মার্কার অ্যাসিস্টেড সিলেকশন) ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জাতের মূল্যবান বৈশিষ্ট্য আধুনিক প্রজননপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। উৎপাদনশীলতা ও অভিযোজনক্ষমতার এই সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতের জাত উন্নয়নের মূল শক্তি।এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলভেদে জাতের ফলন, উৎপাদন ব্যয়, নিট আয়, ঝুঁকি ও পরিবেশের উপযোগিতা মূল্যায়ন করতে হবে। নতুন জাত অবমুক্তির ক্ষেত্রে কৃষকের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানসম্মত বীজের উৎপাদন ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বীজ খাতের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যবান স্থানীয় জাত শনাক্ত করে সংরক্ষণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাতের সাফল্য মূল্যায়নের পদ্ধতিও বদলাতে হবে। শুধু ফলন নয়, কৃষকের নিট আয়, খাদ্যনিরাপত্তা, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, পরিবেশের ওপর প্রভাব ও জলবায়ু সহনশীলতাকেও মূল্যায়নের অংশ করতে হবে।বাংলাদেশের কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাতের গুরুত্ব ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। খাদ্যচাহিদা বাড়ছে, অথচ কৃষিজমি বাড়ছে না। ফলে প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে এই পরিবর্তন যেন একমুখী না হয়। সব অঞ্চলের মাটি, পানি, জলবায়ু ও বাজারের অবস্থা এক নয়। কোথাও সর্বোচ্চ ফলন গুরুত্বপূর্ণ, কোথাও খরা বা লবণাক্ততা সহনশীলতা। আবার কোথাও পুষ্টিমান কিংবা বাজারমূল্য বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। তাই ভবিষ্যতের কৃষিনীতির মূল কথা হওয়া উচিত—‘এক জাত সবার জন্য’ নয়, বরং ‘উপযোগী অঞ্চলে উপযোগী জাত’।কৃষির এই পরিবর্তনকে শুধু স্থানীয় জাতের জায়গায় উচ্চফলনশীল জাত বসানোর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আসলে সীমিত সম্পদে অধিক উৎপাদন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। একটি ভালো জাত এক মৌসুমের ফলন বাড়াতে পারে। কিন্তু একটি দূরদর্শী জাতনীতি বদলে দিতে পারে একটি দেশের খাদ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদনে উচ্চফলন, কৃষকের জন্য বেশি নিট লাভ, জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের জন্য জিনগত বৈচিত্র‍্য সংরক্ষণ। স্থানীয় জাত আমাদের কৃষির শিকড়, আর উচ্চফলনশীল জাত তার নতুন ডানা। শিকড়কে অস্বীকার করে নয়, বরং তার শক্তিকে কাজে লাগিয়েই কৃষিকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে হবে।[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)]

ভিডিও আরও দেখুন

জমে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী হা-ডু-ডু টুর্নামেন্ট

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে শুরু হয়েছে ‘উত্তর-পূর্ব দর্জিপাড়া সমাজ উন্নয়ন ক্লাব হা-ডু-ডু টুর্নামেন্ট-২০২৬’। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেলে উত্তর-পূর্ব দর্জিপাড়া সমাজ উন্নয়ন ক্লাব মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে এই টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করা হয়। ঐতিহ্যবাহী এই গ্রামীণ খেলা দেখতে মাঠে সাধারণ দর্শকদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে খেলাটি ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দ দেখা যায়।​টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে খেলার শুভ উদ্বোধন করেন তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার হোসেন।অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উত্তর-পূর্ব দর্জিপাড়া সমাজ উন্নয়ন ক্লাবের সভাপতি মো. শাহজাহান মিয়া এবং পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন শাহিনুর ইসলাম।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন তেঁতুলিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহাদৎ হোসেন রঞ্জু, তেঁতুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. লাইছুর রহমান, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু সাঈদ মিয়া, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক খন্দকার আবু নোমান (এনাম), সাবেক তেঁতুলিয়া ছাত্রদল সভাপতি মো. সাইদুর রহমান বাবুল, উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব মো. জাকির হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আবু সালেহ ইব্রাহিম ইমরান, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন তেঁতুলিয়া উপজেলা শাখার সেক্রেটারি মো. জাহাঙ্গীর আলম, ৩ নম্বর তেঁতুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মনছুর আলম, উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মো. আবু বক্কর সিদ্দিক সবুজ এবং ৩ নম্বর তেঁতুলিয়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মো. এরশাদুল হকসহ অন্যান্যরা। ​টুর্নামেন্ট আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী হা-ডু-ডু খেলাটিকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন করে পরিচিত করা, সমাজে পারস্পরিক সম্প্রীতি জোরদার করা এবং তরুণ সমাজকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যেই মূলত এই টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছে।স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীরা মনে করছেন, এ ধরনের টুর্নামেন্ট বা আয়োজন আমাদের গ্রামীণ খেলাধুলার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে সুস্থ বিনোদনের সুযোগ করে দিতে দারুণভাবে সাহায্য করবে।

জমে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী হা-ডু-ডু টুর্নামেন্ট