সংবাদ
‘জামায়াতে হারিয়ে যাচ্ছে’ এনসিপি, পদত্যাগ সামান্তার

‘জামায়াতে হারিয়ে যাচ্ছে’ এনসিপি, পদত্যাগ সামান্তার

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের অন্যতম সামান্তা শারমিন। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণেরা দুই বছর যখন দলটি গঠন করেন, সে সময় দলের জ্যেষ্ঠ আহ্বায়ক হয়েছিলেন তিনি। তার আগে যে প্ল্যাটফর্ম থেকে এনসিপি গঠন করা হয়, সেই জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সামান্তা শারমিন।এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিান সামান্তা শারমিন। এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটিতে ‘পদাবনতির’ দুই সপ্তাহ পর দলটি ছেড়ে দিলেন তিনি।দল ছাড়ার কারণ হিসেবে চারুকলার শিক্ষার্থী সামান্তা শারমিন বলেছেন, নিজস্ব রাজনৈতিক ‘লাইন’ স্পষ্ট না থাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হারিয়ে যেতে হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের এই দলটিকে এখন জামায়াতে ইসলামীর জন্য নানা ইস্যুতে প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহায়ক ভূমিকা নিতে হচ্ছে। তা ছাড়া এনসিপির ‘বড়’ রাজনৈতিক দলের ‘লেজুড়’ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়াটা দলটির নিজস্ব নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করেছে বলেও মনে করছেন সামান্তা শারমিন। এ ছাড়া এনসিপির ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি। কাউন্সিল এড়িয়ে এনসিপির কমিটি পুনর্গঠন নিয়েও নিজের অসন্তোষের কথা উল্লেখ করেছেন সামান্তা শারমিন।এক ফেইসবুক পোস্টে সামান্তা শারমিন বলেছেন, এসব বিষয়ে বারবার পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানোর পরেও এনসিপি তার গতিপথ পরিবর্তন করতে আগ্রহী হয়নি। সে জন্য তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ডিসেম্বরে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পর থেকে দলীয় কার্যক্রমে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন সামান্তা শারমিন। সর্বশেষ গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটিতে তাকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়।পদত্যাগের বিষয়ে সামান্তা শারমিন জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে তিনি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে হোয়াটসঅ্যাপে পদত্যাগপত্র পাঠান। এনসিপির গ্রুপেও সবাইকে পদত্যাগের বিষয়টি তিনি জানিয়েছেন। পদত্যাগ নিয়ে ফেইসবুকে দেওয়া পোস্টে সামান্তা লিখেছেন, মানুষ তরুণদের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাশা নিয়ে, যারা পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর পুনরাবৃত্তি করবে না; বরং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনীতির পথ তৈরি করবে। গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নগুলো এখনো নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের অপেক্ষায় আছে।সামান্তা লিখেছেন, “বাংলাদেশের তরুণদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন একটি দল গঠন করা নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক ঐক্য নির্মাণ করা, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিভাজনই রাজনীতির চালিকা শক্তি হবে না; মতাদর্শের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন লক্ষ্যকে তা গ্রাস করবে না; আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের ঊর্ধ্বে কোনো বিদেশি শক্তির অবস্থান থাকবে না। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তরুণসমাজ যদি আবার সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ নেয়, তবে তা হতে হবে অতীতের কোনো দলের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের নতুন প্রচেষ্টা।” এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কাজ করতে যারা অঙ্গীকারাবদ্ধ, তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে চান, সবাইকে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন সামান্তা শারমিন।
৩ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

রাষ্ট্র কি তার ইতিহাস ধারণে অক্ষম?

বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, “আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।”এই একটি বাক্যেই বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস, রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং জনগণের আত্মপরিচয়ের মূল কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র কি আজ সেই ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদায় ধারণ করছে?গত ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পূর্বনির্ধারিত একটি বিশেষ প্রদর্শনী উদ্বোধনের আগমুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় চার নেতা’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি ৩ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত চলার কথা ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুরোধে প্রদর্শনীটি স্থগিত করা হয়েছে। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, এটি কেবল একটি প্রদর্শনীর আয়োজন ছিল না, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় চার নেতার অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি উদ্যোগও ছিল। যে চার নেতা-সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান-১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভূমিকা স্মরণ করা কি রাষ্ট্রের জন্য কোনো অস্বস্তির বিষয় হওয়ার কথা? ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে তুলে এনে আরও পূর্ণাঙ্গ, সত্যনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাসকে একটি রাজনৈতিক দল নিজেদের একক সম্পত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। পরিবর্তনের পর বলা হয়েছিল, ইতিহাসের সব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ও অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখেছি? অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৭ মার্চ ও ৪ নভেম্বরসহ আটটি জাতীয় দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অথচ ৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ তারিখে গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়েছিল। একটি রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস, তার সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস এবং স্বাধীনতার জন্য নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের অবদান-এসব কি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্ব হারাতে পারে?ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করলে বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ-এসব আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত হয় বাংলাদেশের সংবিধান। আর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারের অভ্যন্তরে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। ঘটনাগুলো ভিন্ন সময়ের হলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, স্বাধীনতার সংগ্রাম ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কোনো একটি অধ্যায়কে আড়াল করে বা কোনো ব্যক্তির অবদানকে খাটো করে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা যায় না।এখানেই বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমান সরকার বিএনপির নেতৃত্বাধীন। দলটি নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে দাবী করে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁরই সন্তান। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি দলটির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। সেই প্রত্যাশা থেকেই প্রশ্ন উঠছে-অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি হওয়া ইতিহাসের মূল্যায়নসংক্রান্ত বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে বর্তমান সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে? জাতীয় চার নেতার স্মরণে একটি প্রদর্শনী নিরাপত্তাজনিত কারণে স্থগিত হওয়ার ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। স্বাধীনতার পক্ষে যাঁরা লড়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, সংগঠিত করেছেন, জীবন দিয়েছেন-তাঁদের অবদান বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসের অংশ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্কও হতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের সমাধান হওয়া উচিত গবেষণা, তথ্য-প্রমাণ ও মুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে- কোনো অধ্যায় বাদ দিয়ে, কোনো স্মরণানুষ্ঠান সংকুচিত করে কিংবা কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে আড়াল করে নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল বর্তমান পরিচালনা করা নয়, অতীতের সত্য ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতাও সংরক্ষণ করা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তার ইতিহাসের সুবিধাজনক অংশটুকু গ্রহণ করবে আর অস্বস্তিকর অংশটুকু এড়িয়ে যাবে-এমন হতে পারে না। জাতীয় চার নেতার অবদান, সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস কিংবা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্ব-সবকিছুর যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নিরাপত্তার বাস্তব উদ্বেগ থাকলে তা মোকাবিলা করে আয়োজনের বিকল্প ব্যবস্থা করা যায়, কিন্তু বারবার স্থগিত হওয়া বা বাদ পড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ইতিহাসচর্চার পরিসর সংকুচিত হলে তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।বাংলাদেশের জনগণ কোনো দলের মনোনীত ইতিহাস চায় না। তারা চায় সত্যনিষ্ঠ, পূর্ণাঙ্গ ও পক্ষপাতহীন ইতিহাস। কারণ ইতিহাসের মালিক কোনো সরকার নয়, কোনো রাজনৈতিক দলও নয়-ইতিহাসের উত্তরাধিকারী বাংলাদেশের জনগণ। লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

স্পিকারের বক্তব্যের আয়নায় সমাজের চিত্র

‘এখানে সমাজের নিকৃষ্ট যে লোকটা, সে-ই এমপি, মন্ত্রী হয়। সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজেরা সমাজের নেতা হয়ে গেছেন। সমাজব্যবস্থাটাই এমন হয়েছে, এখানে ভালো মানুষের নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই’—জাতীয় সংসদের স্পিকার।তিনি কঠিন সত্য কথা বলেছেন। তার কথায় প্রবল ক্ষোভ ও আত্মবিশ্বাস ছিল। দুটি বাক্যের মধ্যেই যেন গোটা দেশের চিত্র ফুটে উঠেছে। যদিও এমন কথা অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন। তবে জাতীয় সংসদের স্পিকার যখন এ কথা বলেন, তখন এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য ভিন্নতর হয়ে ওঠে।মনে পড়ে, আশির দশকের গোড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় এমনই একটি বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়েছিল। তখনকার দিনের একজন বিখ্যাত বিচারপতি তার প্রধান অতিথির ভাষণে একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। সেই বিচারপতির ছাত্ররাজনীতির পটভূমি ছিল খুবই প্রণিধানযোগ্য। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের ভিপি হিসেবে মাতৃভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ডাকসুর এক অভিষেক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘দেশে বর্তমানে ভালো মানুষের কোনো মূল্য নেই, সমাজে তারা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।’ একই সঙ্গে তরুণদের অবক্ষয়ের কথা তুলে ধরে বলেছিলেন, ‘যেখানে তরুণেরা বিপথগামী হবে, সেখান থেকে মুক্তি আশা করা যায় না।’এখন ভাবলে মনে হয়, বিগত চার দশকের বেশি সময়ে দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হওয়া ছাড়া মানুষের শ্রেণিচরিত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। আজও সেই বক্তব্য শতভাগ সত্য ও প্রাসঙ্গিক।২.বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সমাজের সৎ, বিবেকবান, দেশপ্রেমিক, ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষগুলো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা অসৎ, অসাধু, লুটেরা ও প্রতারকদের কালোটাকার আড়ালে ক্রমাগত ঢাকা পড়ে গেছেন। সমাজে তারা এতটাই অসহায় যে মুখ খুলে বলতেও পারছেন না, তারা ভালো নেই। একদিকে তারা পারছেন না নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে, অন্যদিকে অবৈধ অর্থের মালিক এবং নব্য চাঁদাবাজ ও দখলদার শ্রেণির কবলে পড়ে রক্ষা করতে পারছেন না নিজেদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। দেশের অরাজনৈতিক, দেশপ্রেমিক ভালো মানুষগুলোর মুখে যেন কোনো শব্দ নেই। তারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।গত কয়েক বছরে গ্রামে-গঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায় সর্বত্র একশ্রেণির উঠতি বয়সী তরুণের উত্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে এ জাগরণ সমাজহিতৈষী নয়, বরং সমাজবিরোধী। তারা লেখাপড়ায় নেই, থাকলেও যৎসামান্য। তারা ব্যবহৃত হচ্ছে নানা অপকর্মের হাতিয়ার হিসেবে। তাদের ব্যবহার করছেন তথাকথিত দলবাজ, পল্টিবাজ ও ক্ষমতালোভী নেতারা।নেতাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ আলোকিত। তারা বিদেশে পড়াশোনা করছে কিংবা অন্য উদ্দেশ্যে সেখানে বসবাস করছে। তাদের অর্থবিত্তের জোগান আসে এ দেশ থেকে। বিদেশে তারা আরাম-আয়েশের জীবন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে অন্যের সন্তানদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মাদক, নেশার উপকরণ, মোটরসাইকেলের চাবি। তাদের দেওয়া হচ্ছে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির দায়িত্ব। সারা দেশে তারাই এখন জাতীয় সমস্যার আরেক নাম।এদের কোনো দলমত নেই, আদর্শ নেই। তারা সব সময় ক্ষমতাসীন দলের কাছাকাছি থাকা পাতিনেতাদের পদলেহন করে, ভোল পাল্টে সুযোগ নেয়। নেতাদের দেওয়া আদেশ-নির্দেশ পালন করাই তাদের প্রধান কাজ।স্পিকার খেদের সঙ্গে আরও একটি মূল্যবান কথা বলেছেন, ‘নেতারা মাদক খায়, কর্মীরাও মাদক খায়। সব বাটপারের কারখানা হয়ে গেছে এসব জায়গা। ধীরে ধীরে চোখের সামনে সমাজটা নষ্ট হয়ে গেল।’ এ যেন চারদিকে এক অদ্ভুত আঁধার নেমে আসছে।৩.আশির দশকের আরও একটি সংবাদ শিরোনামের কথা মনে পড়ে। মাসিক গণস্বাস্থ্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এক ভয়াবহ প্রচ্ছদ কাহিনি—‘নেশার কবলে বাংলাদেশ’। তখন এমন শিরোনাম ছিল অবিশ্বাস্য। প্রয়াত আলোচিত সাংবাদিক মিনার মাহমুদ এ প্রচ্ছদ কাহিনি রচনা করেছিলেন। তৎকালীন ঢাকার চানখাঁরপুল, সদরঘাট, মিরপুরসহ নানা স্থানের মাদকের আখড়ার কথা উল্লেখ ছিল এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। এতে দেশে নেশা ও মাদকের সর্বগ্রাসী ছোবলের ইঙ্গিত ছিল। যদিও তখন পর্যন্ত এ বিষয়ে দেশের সাধারণ মানুষের তেমন কোনো ধারণাই ছিল না।অথচ আজকের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতায় পণ্য হিসেবে মাদকের অবাধ বিচরণ অনেক বেশি সহজলভ্য হয়েছে। দেশের গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায়, ঘরে ঘরে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। এদের পেছনে রয়েছে নেতারা, যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করছেন অন্য সবকিছু। চিহ্নিত মাদকসেবী ও মাদক কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনে দিনরাত নিরাপদে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। হাটবাজারে সবার জ্ঞাতসারে কেনাবেচা হচ্ছে মাদকদ্রব্য। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ছে। একশ্রেণির তরুণ রাতে মাদক সেবন করে, দিনে চাঁদাবাজি করে এলাকা চষে বেড়াচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এদের রোখার ক্ষমতা যেন কারও হাতে নেই। সত্যিকার অর্থেই এখন সমগ্র বাংলাদেশ নেশার কবলে।৪.এবার স্পিকারের কথায় ফিরে আসা যাক। কেন এ দেশে নিকৃষ্ট দুর্নীতিবাজেরা এমপি-মন্ত্রী হন? অতীতে এ বিষয়ে অনেক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। হালের টক শো তো আছেই। কিন্তু কোনো সমাধান কি এসেছে? আসেনি। কারণ, যাঁরা সভায় সভাপতির আসনে বসে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, কালোটাকা ও মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলেন, দিনের শেষে তারাই আবার মনোনয়ন-বাণিজ্যেরও হোতা হয়ে ওঠেন।যে দেশে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরাও এমপি পদে মনোনয়নের জন্য আদাজল খেয়ে তদবিরে নেমে যান, সেখানে শিক্ষিত, সৎ, দেশপ্রেমিক ও ভালো মানুষের নির্বাচিত হওয়া সম্ভব কি? দেশের গত কয়েক বছরের চিত্র তো তা-ই বলে।এমনও দেখা গেছে, একাধিক উচ্চশিক্ষিত ও যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় অশিক্ষিত একজন বিত্তবান পাদুকা ব্যবসায়ীর পক্ষে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দেনদরবার হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারই মনোনয়নপ্রাপ্তি ঘটেছে। তিনি এমপি হয়েছেন। বছরের পর বছর এলাকার হাজার হাজার দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষিত মানুষের ওপর খবরদারি চালিয়েছেন।এখানে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি বিবেচ্য নয় বলে তারা নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে বাহিনী নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন। সংসদের পাঁচ বছরে এরা মোটামুটি নীরবতা পালন করেন। কারণ, এটাই তাদের নিরাপদে ও শত্রুমুক্ত থাকার কৌশল। কেবল নিভৃতে নিজেদের ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যে আলাদিনের প্রদীপের মতো জ্বলে ওঠেন। নির্বাচনের আগে করা বিপুল ব্যয় পুষিয়ে নিয়ে রাতারাতি ফুলেফেঁপে ওঠেন।এ দেশে এমপির গাড়ি ও জাতীয় সংসদের মূল্যবান প্রতীক যেন বাণিজ্যে লক্ষ্মীর মতো কাজ করে। এটি এখন ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পপতি হওয়ার এক অসাধারণ সোপানের নাম।বলাবাহুল্য, দেশে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা মাঠপর্যায়ে কাজ করে থাকে। নির্বাচন এলে তারা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তৎপর হয়। গত এক দশক ধরে লক্ষণীয় যে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এসব সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। তাদের লিখিত মতামত ও জনপ্রিয়তা যাচাইবিষয়ক গোপন প্রতিবেদন পাওয়ার জন্য প্রায় সবাই ছোটাছুটি করেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সাধ্যাতীত চেষ্টা করে সরকারকে অবহিত করে। কিন্তু বাস্তবে এসব তথ্য খুব বেশি আমলে নেওয়া হয় না। দলগুলোর সর্বোচ্চ নেতৃত্বের তালিকাই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়।মনে হয়, এটিও এক অদ্ভুত রাষ্ট্রীয় আচার ও প্রথায় পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে না। ফলে জাতীয় সংসদ যেন এক দুর্বোধ্য প্রাচীরের ভেতরে আটকে পড়েছে। এ প্রাচীর ভেদ করে বেরিয়ে আসা সহজ হবে না। কেননা, সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় অর্থের শক্তিতে।৫.অথচ জাতীয় সংসদের সদস্য, উচ্চ আদালতের বিচারক, সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণের দায়িত্ব জাতীয় সংসদের হাতেই রয়েছে। কিন্তু কোনো আমলেই বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সর্বোচ্চ অবস্থানে থেকেও এ বিষয়ে কখনো আইন পাস হয় না। এতেই বোঝা যায়, আইন প্রণয়নের পথে বাধা বা অন্তরায় কোথায়।এমনকি কখনো কখনো উচ্চ আদালতের সম্মতি তথা নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এসব বাস্তবায়িত হয়নি। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর পথ পেরিয়ে এসেও জাতি আজ একই তিমিরে ঘুরপাক খাচ্ছে।বর্তমান স্পিকার একজন আইনপ্রণেতা, বহুবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি অশীতিপর একজন ঝানু পার্লামেন্টারিয়ানও বটে। তার মুখ থেকে এমন হতাশার মন্তব্য সমগ্র জাতির সামনে প্রশ্নের জন্ম দেবে, এটাই স্বাভাবিক।আশির দশকের আরও একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। জেনারেল হোসেন মুহাম্মদ এরশাদ তখন ক্ষমতায়। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী ছিলেন এর প্রতিবেদক। তিনি গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস, নাকি আফগান মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন, তা ঠিক মনে নেই। বাণীটি ছিল, ‘এমন এক সময় আসবে, যখন জ্ঞানীরা জ্ঞানী হওয়ার কারণে অনুশোচনা করবেন, মূর্খরা তাদের মূর্খতার জন্য গর্ব করবেন, আর দুর্নীতিবাজেরা তাদের দুর্নীতির জন্য উল্লাস করবেন।’যত দূর মনে পড়ে, ওই প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে সেই সাংবাদিককে তখন অনেক খেসারত দিতে হয়েছিল। এখন দেশের যেদিকেই তাকানো যায়, এমন উল্লাসের নৃত্যই চোখে পড়ে। আর সমাজের উৎকৃষ্ট ও ভালো মানুষগুলো যেন অনুশোচনার আগুনে তিলে তিলে দগ্ধ হচ্ছেন।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার]

স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োজন সমন্বিত জনবল পরিকল্পনা

একটি উপজেলা হাসপাতালের কথা ভাবুন। সেখানে একজন চিকিৎসক আছেন, কিন্তু রোগীকে ইনজেকশন দেওয়া, স্যালাইন চালানো, রক্তচাপ মাপা, পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা কিংবা এক্স-রে করার মতো পর্যাপ্ত কর্মী নেই। ফলে চিকিৎসককে নিজের কাজের বাইরেও অনেক দায়িত্ব সামলাতে হয়। আর রোগীকে দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। এটি কোনো একটি হাসপাতালের চিত্র নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিচিত বাস্তবতা। সমস্যার মূলে শুধু জনবলের ঘাটতি নয়, জনবলের অসম কাঠামোও রয়েছে।১:৩:৭ অনুপাত কেন গুরুত্বপূর্ণস্বাস্থ্যসেবা কখনোই একক কোনো পেশার কাজ নয়। চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন। নার্স ও ধাত্রী রোগীর শয্যাপাশে সরাসরি সেবার বড় অংশ নিশ্চিত করেন। আর প্যারামেডিক ও সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীরা পরীক্ষাগার, রোগের চিত্রায়ণ, ওষুধ সরবরাহ, ফিজিওথেরাপি, জরুরি সেবা ও স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখেন।বৈশ্বিক আলোচনায় সাধারণত প্রতি একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স ও পাঁচজন সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীর কথা বলা হয়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবানির্ভর দেশে আমার প্রস্তাব, কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে চিকিৎসক:নার্স:প্যারামেডিক অনুপাত ১:৩:৭ নির্ধারণ করা। এতে চিকিৎসকের সময় বাঁচবে, সেবার মান বাড়বে এবং ব্যয়ও তুলনামূলক কমবে।বাস্তব চিত্র: সংখ্যায় এগিয়েছি, কাঠামোয় পিছিয়েস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মানবসম্পদবিষয়ক তথ্যপত্র ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত এমবিবিএস চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার। এর মধ্যে সেবায় নিয়োজিত আছেন প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার। নিবন্ধিত নার্সের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার। ২০১৯ সালের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রীর সম্মিলিত ঘনত্ব ২০১৯ সালে প্রতি ১০ হাজারে ৮ দশমিক ৩ জন থেকে বেড়ে ১৫ দশমিক ১৬ জনে পৌঁছেছে।কিন্তু এই অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাবিত মানদণ্ড প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে ৪৪ দশমিক ৫ জন। অর্থাৎ আমরা এখনো এই মানদণ্ডের অর্ধেকেরও অনেক নিচে রয়েছি।আরও উদ্বেগের বিষয় হলো জনবলের অনুপাতের ভারসাম্যহীনতা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স আছেন একেরও কম, প্রায় ০ দশমিক ৭৫ থেকে ১ দশমিক ১ জন। অথচ কাঙ্ক্ষিত অনুপাত তিনজন। সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাও কাঙ্ক্ষিত পাঁচজনের তুলনায় দুইয়ের কম। ২০১৯ সালে পরিস্থিতি ছিল আরও করুণ। তখন অনুপাত ছিল ১:০.৬:০.৩। অর্থাৎ আমরা উন্নতি করেছি, কিন্তু গন্তব্য এখনো অনেক দূরে।নিয়োগে ভারসাম্যহীনতাসমস্যার একটি বড় কারণ জনবল নিয়োগ ও পদ সৃষ্টির প্রচলিত ধারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ প্রায় ৩৮ হাজার ২৫৫টি। অন্যদিকে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে নার্স ও ধাত্রীর পদ প্রায় ৫০ হাজার ৮২৫টি। অর্থাৎ পদ কাঠামোতেই ১:৩ অনুপাতের ধারেকাছেও যাওয়া সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেছেন, অতীতে জনবল সংকট দেখা দিলে নিয়োগের ক্ষেত্রে মূলত চিকিৎসকদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজনীয় ভারসাম্য উপেক্ষিত থাকত।এর সঙ্গে রয়েছে শূন্য পদের সমস্যা। ২০২৫ সালের মানবসম্পদবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের প্রায় ৪ হাজার ৩০৮টি এবং নার্সের প্রায় ১ হাজার ৬৫৩টি পদ শূন্য ছিল। পরবর্তী সময়ের তথ্যে অনুমোদিত পদ ও শূন্য পদের সংখ্যা দুটোই বেড়েছে। চিকিৎসকের প্রায় ৯ হাজার ৯৯০টি এবং নার্সের ৪ হাজার ৮৭০টি পদ খালি রয়েছে। একদিকে পদ শূন্য, অন্যদিকে কয়েক হাজার প্রশিক্ষিত নার্স বেকার। এটি পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রমাণ।চাহিদার হিসাব২০২৫ সালে প্রকাশিত স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার জন্য সরকারি খাতে প্রয়োজন প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার চিকিৎসক, ৩ লাখ ৫০ হাজার নার্স এবং ৫ লাখ ১৭ হাজার অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী।সহজ হিসাবেই বিষয়টি বোঝা যায়। বর্তমানে সেবায় নিয়োজিত প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার চিকিৎসকের জন্য ১:৩ অনুপাতে প্রয়োজন প্রায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার নার্স। অথচ আছেন প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার। অর্থাৎ ঘাটতি ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। একই চিকিৎসকসংখ্যার বিপরীতে ১:৭ অনুপাতে প্রয়োজন প্রায় ৮ লাখ ১০ হাজার প্যারামেডিক ও সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মী। এই বিশাল ঘাটতি রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একটি কৌশলগত পরিকল্পনা।করণীয় কীপ্রথমত, জাতীয় স্বাস্থ্য জনবল পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতাল—প্রতিটি পর্যায়ের জন্য ১:৩:৭ অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে জনবলের কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। চিকিৎসক নিয়োগের সময়ই প্রয়োজনীয় নার্স ও প্যারামেডিকের পদ অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা উচিত।দ্বিতীয়ত, নার্সিং ও প্যারামেডিক শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কলেজে আসনসংখ্যা বাড়ানো, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পরীক্ষাগার ও আবাসনসুবিধা নিশ্চিত করা এবং মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউটগুলোকে শক্তিশালী করা জরুরি। শিক্ষার মানের সঙ্গে আপস না করে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ কর্মী তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।তৃতীয়ত, এসব পেশায় কর্মজীবনের আকর্ষণ বাড়াতে হবে। নার্স ও প্যারামেডিকদের জন্য স্পষ্ট পদোন্নতির কাঠামো, ন্যায্য বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং দুর্গম এলাকায় কাজের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। তা না হলে প্রশিক্ষিত জনবল দেশের বাইরে চলে যাবে অথবা পেশা ছেড়ে দেবে।চতুর্থত, অপরিকল্পিত নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার জনবলসংক্রান্ত তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল তথ্যভান্ডারে আনতে হবে। কোথায় কত পদ শূন্য, কোথায় কতজন প্রশিক্ষিত কর্মী বেকার—এসব তথ্য এক জায়গায় পাওয়া গেলে নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর ও তথ্যভিত্তিক হবে।পঞ্চমত, বেসরকারি খাতকেও এই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। দেশের স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই লাইসেন্স প্রদান ও মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সেখানেও ন্যূনতম নার্স ও কারিগরি স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপাত নিশ্চিত করা উচিত।ষষ্ঠত, দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। প্রশিক্ষিত নার্স বা প্যারামেডিক যেসব কাজ নিরাপদে করতে পারেন, সেসব দায়িত্ব তাঁদের হাতে দিতে হবে। এতে চিকিৎসকেরা জটিল রোগীর চিকিৎসায় বেশি সময় দিতে পারবেন।স্বাস্থ্যসেবা একটি দলগত কাজ। চিকিৎসক সেখানে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, কিন্তু একা তিনি সাফল্য নিশ্চিত করতে পারেন না। শুধু চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ালে হাসপাতালের ভবন ও শয্যা পূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেবা পূর্ণতা পাবে না। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে জনবল পরিকল্পনায় সংখ্যার চেয়ে ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।১:৩:৭ অনুপাতকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তা হলে আগামী এক দশকে আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব, যেখানে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—সবখানেই মানুষ সময়মতো মানসম্মত সেবা পাবেন।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন]

অক্ষরের অলিন্দে আত্মজিজ্ঞাসার আয়না

লন্ডন এমন এক শহর, যেখানে বর্তমানের ব্যস্ততার পাশেই অতীত নীরবে বসবাস করে। রাজপথে হাঁটতে হাঁটতে কখনো মনে হয়, পুরোনো ভবনগুলো যেন সময়ের কাছে লেখা দীর্ঘ চিঠি—যার প্রতিটি জানালায় আটকে আছে কোনো এক যুগের গল্প। টেমসের জল বয়ে যায়, বদলায় নগরীর চেহারা, বদলায় মানুষের জীবনযাপন; তবু ইতিহাসের কিছু চিহ্ন থেকে যায় অবিচল। এমন এক শহরে আমার গন্তব্য ব্রিটিশ লাইব্রেরি। সেখানে যাচ্ছিলাম একটি বিখ্যাত গ্রন্থাগার দেখতে, কিন্তু ফিরে এলাম নিজের সমাজ, ইতিহাস ও জ্ঞানচর্চা নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন সঙ্গে নিয়ে।সেন্ট প্যানক্রাসের ব্যস্ত এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটির স্থাপত্যে প্রথমেই চোখে পড়ে লাল ইটের গাম্ভীর্য। বিশাল অথচ সংযত অবয়ব; যেন নিজের গুরুত্ব ঘোষণা না করেও তা জানান দিতে জানে। বাইরে মানুষের দ্রুত পদচারণা, যানবাহনের শব্দ, স্টেশনের ব্যস্ততা। ভেতরে প্রবেশ করতেই সেই কোলাহল যেন কয়েক ধাপ দূরে সরে যায়। এখানে নীরবতা শূন্য নয়; বরং অসংখ্য মানুষের চিন্তা, শ্রম ও আবিষ্কারের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ।ব্রিটিশ লাইব্রেরি ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই যুক্তরাজ্যের স্বতন্ত্র জাতীয় গ্রন্থাগার হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তবে এর শেকড় আরও পুরোনো। ১৭৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্রন্থসংগ্রহের মধ্যেই এর ইতিহাসের সূচনা। সেন্ট প্যানক্রাসে বর্তমান ভবনটি ১৯৯৮ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ উদ্বোধন করেন। সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্রন্থাগারে পরিণত হয়েছে। এর সংগ্রহে রয়েছে ১৭ কোটিরও বেশি উপাদান—বই, পাণ্ডুলিপি, সংবাদপত্র, মানচিত্র, চিঠি, আলোকচিত্র, শব্দরেকর্ডিং, সংগীতের স্বরলিপি ও অসংখ্য ঐতিহাসিক দলিল।সংখ্যাটি বিস্ময়কর, কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় বিস্ময় এর ভেতরে জমা মানুষের জীবন। কোনো বিবর্ণ চিঠিতে হয়তো অপেক্ষার কথা লেখা আছে, কোনো পুরোনো সংবাদপত্রে ধরা আছে একটি সময়ের রাজনৈতিক উত্তাপ, কোনো মানচিত্রে চিহ্নিত হয়েছে আজ আর নেই এমন জনপদ। কাগজের গায়ে কালি শুকিয়ে গেছে বহু আগে, কিন্তু তার ভেতরের সময় এখনো শুকায়নি। একটি দলিল খুললে কখনো রাষ্ট্রের ইতিহাস সামনে আসে, কখনো সাধারণ মানুষের অজানা জীবনের দরজা খুলে যায়। এখানে ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ কিংবা যুদ্ধজয়ের বিবরণ নয়; মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার চিহ্নও।ট্রেজারিজ গ্যালারিতে গিয়ে সেই অনুভূতি আরও তীব্র হলো। ম্যাগনা কার্টা, শেক্‌সপিয়রের প্রথম ফোলিও, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নোটবুকের মতো ঐতিহাসিক নিদর্শন মানুষের চিন্তার অসাধারণ ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কয়েক শতাব্দী আগে লেখা কোনো পঙ্‌ক্তি কিংবা আঁকা কোনো রেখার সামনে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, মানুষের সৃষ্টিশীলতা সময়ের সীমানা মানে না। একটি দলিল নাগরিক অধিকার সম্পর্কে রাষ্ট্রের ধারণা বদলে দিতে পারে, একটি সাহিত্যকর্ম ভাষার প্রকাশভঙ্গিকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে পারে। এসব নিদর্শন তাই কেবল অতীতের স্মারক নয়, মানুষের চিন্তার বিবর্তনেরও সাক্ষ্য।তবে এই সংগ্রহের সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধতার পাশাপাশি কিছু কঠিন প্রশ্নও মনে আসে। ইতিহাসের সম্পদ কার? কোন পথে, কার অনুমতিতে, কোন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক নিদর্শন অন্য ভূখণ্ডের সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে? ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক অতীত বিবেচনায় প্রশ্নগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উপনিবেশ থেকে সংগৃহীত বহু নিদর্শনের মালিকানা ও প্রত্যর্পণ নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। কোনো ঐতিহাসিক বস্তু যত্নে সংরক্ষণ করা জরুরি, কিন্তু তার উৎস, অধিকার ও সংগ্রহের ইতিহাসের প্রতিও দায়বদ্ধ থাকা প্রয়োজন। অতীতকে কেবল প্রদর্শন করাই যথেষ্ট নয়; অতীতের অন্যায় নিয়েও সৎ আলোচনা দরকার।এই বিশাল সংগ্রহে দক্ষিণ এশিয়ার ভাষা, সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতির বহু উপাদান রয়েছে। দূরদেশের একটি গ্রন্থাগারে উপমহাদেশের পরিচিত সাংস্কৃতিক চিহ্ন দেখে নিজের শেকড়ের কথা মনে পড়ল। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যও এই বৃহত্তর ইতিহাসের অংশ। আমাদের পুঁথি, পুরোনো সংবাদপত্র, সাহিত্যকর্ম ও সামাজিক দলিল শুধু আমাদের নিজস্ব সম্পদ নয়; মানবসভ্যতার ইতিহাস বোঝারও উপকরণ। অথচ দেশে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি ও ঐতিহাসিক দলিল এখনো যথাযথ সংরক্ষণের অপেক্ষায়। কোথাও পরিচর্যার অভাব, কোথাও অর্থের সংকট, কোথাও আবার প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ঘাটতি। অন্যের সংগ্রহশালায় নিজের ঐতিহ্যের চিহ্ন দেখে গর্বিত হওয়া সহজ; নিজের ঘরের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব নেওয়াই কঠিন।ব্রিটিশ লাইব্রেরির প্রকৃত শক্তি শুধু তার সংগ্রহের বিশালতায় নয়, জ্ঞানচর্চার ব্যবস্থাতেও। নির্ধারিত নিয়মে রিডার পাস নিয়ে গবেষক, শিক্ষার্থী ও পাঠকেরা পাঠকক্ষে কাজ করতে পারেন। কেউ পুরোনো দলিল ঘেঁটে ইতিহাসের অজানা অধ্যায় খুঁজছেন, কেউ ভাষার বিবর্তন অনুসন্ধান করছেন, কেউ সংবাদপত্রের পাতায় খুঁজছেন কোনো ঘটনার হারিয়ে যাওয়া সূত্র। তাঁদের নীরব শ্রমে বোঝা যায়, জ্ঞান কোনো সাজানো প্রদর্শনী নয়; এটি নিরন্তর অনুসন্ধানের বিষয়। সংরক্ষিত তথ্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠাভ্যাসের কথাও মনে হলো। বাংলাদেশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগার আছে, কিন্তু সবখানে তা শিক্ষার্থীদের জীবন্ত অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠতে পারেনি। কোথাও বইয়ের ঘাটতি, কোথাও পাঠকক্ষের অনুপযুক্ত পরিবেশ, কোথাও আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল সংরক্ষণের অভাব। আমরা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে যতটা সময় দিই, মুক্তভাবে পড়া ও জানার আনন্দে ততটা সময় দিই কি? যে শিক্ষার্থী শুধু নির্ধারিত পাঠের উত্তর মুখস্থ করে, তার সামনে পৃথিবীর বিস্তৃত প্রশ্নগুলো অনেক সময় অদেখাই থেকে যায়।গ্রন্থাগার তাই কোনো প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত আয়োজন নয়; এটি একটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি। সড়ক মানুষের চলার পথ তৈরি করে, গ্রন্থাগার তৈরি করে চিন্তার পথ। হাসপাতাল যেমন শরীরের সুরক্ষায় প্রয়োজন, তেমনি পাঠাগার প্রয়োজন সমাজের মননশীলতা ও বিচারবোধের বিকাশে। উন্নয়নের হিসাব শুধু সেতু, ভবন কিংবা বড় প্রকল্প দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না। সেই হিসাবের মধ্যে থাকতে হয় কত শিশু বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, কত তরুণ গবেষণার সুযোগ পাচ্ছে, কত পুরোনো দলিল নিরাপদে সংরক্ষিত হচ্ছে—এসব প্রশ্নও।ব্রিটিশ লাইব্রেরির সাধারণ প্রবেশ বিনা মূল্যে। স্থায়ী ট্রেজারিজ গ্যালারিও সাধারণত বিনা টিকিটে দেখা যায়; বিশেষ প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে আলাদা টিকিট লাগতে পারে। এই উন্মুক্ততা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জ্ঞানচর্চার দরজা যত বেশি মানুষের জন্য খোলা থাকবে, সমাজে কৌতূহল ও অনুসন্ধানের পরিসরও তত বাড়বে। কোনো শিশু প্রথমবার কয়েক শ বছরের পুরোনো পাণ্ডুলিপি দেখে হয়তো ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে। সেই ছোট্ট বিস্ময়ই একদিন বড় কোনো অনুসন্ধানের শুরু হতে পারে।গ্রন্থাগার থেকে বেরিয়ে আবার ইউস্টন রোডের ব্যস্ততায় ফিরে এলাম। শহর তার নিজস্ব গতিতে ছুটছে। অথচ মনে হচ্ছিল, ভেতরে দেখা প্রতিটি নিদর্শন যেন একটি করে প্রশ্ন রেখে গেছে। আমাদের ইতিহাস কতটা নিরাপদ, আমাদের পাঠাগার কতটা প্রাণবন্ত, জ্ঞান ও গবেষণা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে কতটা জায়গা পাচ্ছে? ব্রিটিশ লাইব্রেরি দেখে বুঝলাম, একটি জাতির পরিচয় শুধু তার অতীতের গৌরবে নয়; সেই অতীতকে সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ববোধেও। সেদিন তাই শুধু একটি গ্রন্থাগার দেখে ফিরিনি; নিজের সমাজের দিকে নতুন করে তাকানোর প্রয়োজন অনুভব করেছি।[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী]

সবাইকে কি পরীক্ষায় পাস করতেই হবে?

পাস কর, নইলে মর!প্রথম কথাটি উচ্চারিত হলেও পরের কথাটি অনুচ্চারিত। অথচ বাস্তবে তা যথেষ্ট সত্য। একজন পরীক্ষার্থী কত কারণে খারাপ ফল করতে পারে, তা সমাজের অনেকেই জানেন না। যেসব বাবা-মায়ের নিজের কোনো সনদ নেই, তাদেরও সন্তানকে নিয়ে আশা আকাশছোঁয়া! একটি পরীক্ষা যেকোনো কারণে খারাপ হতে পারে। এমনকি কোনো কারণে অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।আমার মেয়ে এবার জিপিএ-৫ পায়নি। আত্মীয়স্বজনের আড়চোখে তাকানো দেখেছি। অনেকে মুখে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে নেতিবাচক মন্তব্য করে ঢোক গিলে ফেলেছেন। আবার কেউ কেউ প্রচণ্ড সমালোচনাও করেছেন। বুঝেও চুপ থেকেছি। আরেকটু দেখে নিয়েছি মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।কিন্তু এরপরও আমি জানি, আমার সন্তান ভালো ফল করেছে। এটাই তার সত্যিকারের ফলাফল। শিক্ষামন্ত্রীও চেয়েছেন প্রকৃত ফলাফল বেরিয়ে আসুক। আমরা যেন অনেক বেশি নম্বর পাওয়া বা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো ফল দেখে আপ্লুত না হই!আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঠিক করতে হলে সত্যিকার অর্থেই মানসম্মত শিক্ষার দিকে যেতে হবে। আমার সন্তানের মা বলেছেন, তুমি অনেক কিছু করতে পারবে। কারণ, তুমি পরীক্ষা শেষ করে এখন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার উপযোগী করে নিজেকে গড়ে তুলেছ। আমাদের কাছে যোগ্যতা অর্জনই অনেক বড় বিষয়।তিনি আরও বলেছেন, তুমি যদি অকৃতকার্যও হতে, তবে মানুষকে কী বলব, সেটাও আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম। তোমাকে ছোট করে এমন কোনো কথা অন্তত পরিবার থেকে উচ্চারণ করব না।আত্মহত্যার ঘটনাগুলো বরাবরের মতোই কানে আসছে। গাজীপুরের শ্রীপুরে সিয়াম নামে এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর শুনলাম। চিরকুটে লিখেছে, ‘মা, আমি তোমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারলাম না।’ কথাটির ওজন অনেক। সন্তানেরও হয়তো স্বপ্ন অনেক বড় ছিল। ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে পানি ঝরেছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই অনেক কিছু মিথ্যা মনে হয়েছে। ভেবেছি, আমরা পেরে উঠছি না। আমরা শুধু শিক্ষিত বানানোর নামে একটি প্রতিযোগিতায় নেমেছি! এ খেলা অসম, এ খেলা নিজেদের শেষ করে দেওয়ার!সমাজে এমন সব রোগ ছড়িয়ে পড়েছে, যার কারণে আমাদের মনোজগতে একধরনের মৃত্যু ঘটছে। প্রতিযোগিতা চলছে নম্বরে নম্বরে। বাবা-মায়েরা ঘেমে যান সন্তানের প্লে-শ্রেণির ফল প্রকাশের দিন থেকেই। আধা নম্বর কম পেলেও শিক্ষকের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেন, কেন কম পেল!শিক্ষকেরাও আধা নম্বর বাড়িয়ে সন্তানকে পাস করিয়ে মায়েদের মুখে অমলিন হাসি দেখার অভ্যাস করে ফেলেছেন!আমরা যারা সামাজিক মানুষ, কোনো শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলে আগেই বলে দিই, ‘আগেই জানতাম, এমনই হবে!’যে শিক্ষার্থীর মা-বাবা তাকে খোঁটা দেন, তার ওপর সামাজিকভাবেও এমন আচরণ করা হলে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে বাধ্য। তার কাছে তখন এ কথাটিই সত্য হয়ে ওঠে—‘পাস কর, অথবা মর!’পাসের প্রতিযোগিতায় আমরা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছি যে গত বছরগুলোতে আমাদের পাসের ফল কিনতেও বাধ্য করা হয়েছে! এবার অন্তত ক্ষান্ত দিন। মানসম্মত শিক্ষার দিকে আসুন। সন্তান সবাই পাস করবে, পড়বে, সনদ নেবে, চাকরি করবে, টাকা আনবে—শুধু এটাই কি জীবনের লক্ষ্য?সেদিন কক্সবাজারে একটি ছেলের সঙ্গে দেখা হলো। দারুণ গান গায়। ছেলেটি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। পড়াশোনায় খুব ভালো ফল করে না। কিন্তু সে ভালো গান গায়। সে যদি শুধু গানই গায়, তবুও কি জীবিকা অর্জন করতে পারবে না? যদি শুধু জীবিকার জন্যই পড়াশোনা করতে হয়, তবে যেকোনো সৎ উপায়েই সে তা করতে পারে। যাই হোক, সবাই একই পথে হাঁটবে না।আমাদের বাচ্চাদের একটু শান্তিতে পড়াশোনা করার সুযোগ দিন। পাস-ফেল পাশাপাশি শব্দ। আবার ‘ব্যর্থতাই সাফল্যের স্তম্ভ’—কথাটিও পরীক্ষিত সত্য। তাদের প্রতিযোগিতা করার সুযোগ দিন।যে শিক্ষার্থী ফেল করেছে, তার বাবা-মা হিসেবে তার পাশে গিয়ে বলুন, জীবনটা এমনই। এবার তুমি খারাপ করেছ, তার মানে এই নয় যে তুমি আর ভালো করতে পারবে না। পরেরবার তুমি সবার চেয়ে ভালো করবে। আর পড়াশোনায় ভালো না করলেও জীবনে ভালো মানুষ হবে।কষ্টের সময় তাকে জাপটে ধরে ছোটবেলার মতো বলুন, ‘বাবা/মা, চলো ঘুরতে যাই। দূরে কোথাও ঘুরে আসি। শক্তি নিয়ে আসি, আবার পড়বে!’পড়াশোনা তো বাঁচার জন্যই, সুন্দরভাবে বাঁচার জন্যই। পড়তে গিয়ে মৃত্যুর শিক্ষা কে দিল এই জগতে! সন্তানকে মানসিক নিরাপত্তা দেওয়াও আপনার দায়িত্ব।শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও এ বিষয়ে কিছু নীতিমালা জারি করা প্রয়োজন। আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয় কারা, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রকাশ করা দরকার।অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষার জন্য কীভাবে সহায়তা দেওয়া যায়, সবাই মিলে তার একটি কাঠামো তৈরির সময় এসেছে।সন্তানেরা বাঁচার জন্য পড়ুক। মানুষের মতো মানুষ হওয়ার জন্য পড়ুক!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: রসায়নবিদ]

খাপড়া ওয়ার্ড থেকে জেলহত্যা

ইতিহাসের দুই সময়, দুটি কারাগার, দুটি রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৫০ সালে রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে সাত বিপ্লবী বন্দির মৃত্যু, আর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড। সময় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও দুটি ঘটনাই আমাদের ইতিহাসে কারাগারের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় হেফাজত এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের এক নির্মম প্রশ্ন রেখে গেছে।৩ নভেম্বর। জাতীয় জেলহত্যা দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক শোকাবহ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো একটি সুরক্ষিত স্থানে হত্যা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের চার জাতীয় নেতাকে। তারা হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান। যে কারাগার বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হেফাজতে থাকা মানুষের জীবন রক্ষা করা, সেই কারাগারের অভ্যন্তরেই সংঘটিত হয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক হত্যাকাণ্ড।কিন্তু কারাগারের দেয়ালের ভেতরে রাজনৈতিক বন্দিদের রক্ত ঝরার ইতিহাস কি কেবল ১৯৭৫ সালেই সীমাবদ্ধ? ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমাদের ফিরে যেতে হয় আরও ২৫ বছর আগে। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল। স্থান রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ড।জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের আগে এই খাপড়া ওয়ার্ডেই গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সাত কমিউনিস্ট রাজনৈতিক বন্দিকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যা খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। একে উপমহাদেশের প্রথম জেলহত্যার ঘটনাগুলোর অন্যতম হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।দুটি ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান ২৫ বছর। রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা, শাসনব্যবস্থা আলাদা, হত্যাকাণ্ডের পটভূমিও আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় ভয়াবহ মিল, সেটি হল কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দিদের জীবনও নিরাপদ ছিল না।খাপড়া ওয়ার্ড: প্রতিবাদ থেকে রক্তাক্ত পরিণতি১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় নানা পরিবর্তন আসে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মী, কৃষক আন্দোলনের সংগঠক, শ্রমিক নেতা ও বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে অনেকে কারাবন্দি হন। কিন্তু কারাগারের ভেতরেও তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল অমানবিক পরিবেশ।কারাবন্দিদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, তামাক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, তেলের ঘানি টানা, গম মাড়াই ও পেষাইয়ের মতো কঠোর শ্রমে বাধ্য করা-এসব ছিল বন্দিদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। সামান্য বিশ্রাম কিংবা কাজে দেরি হলেই নেমে আসত শারীরিক নির্যাতন।প্রথমে রাজশাহী কারাগারের কমিউনিস্ট বন্দিরা এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন। অনশন ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য কারাগারেও। ১৯৪৯ সালে ঢাকা ও রাজশাহী কারাগারে কয়েক দফায় দীর্ঘ অনশন চলে। খুলনা কারাগারে বিষ্ণু বৈরাগী এবং ঢাকা কারাগারে শিবেন রায়ের মৃত্যুর ঘটনাও বন্দিদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাদের মৃত্যুকে ঘিরে আত্মহত্যার প্রচার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে সেসময়। রাজবন্দিরা শুধু নিজেদের অধিকারের জন্যই লড়ছিলেন না, সাধারণ বন্দিদের ওপর চলা নির্যাতনের বিরুদ্ধেও তাঁরা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিলেন। তাদের দাবি ছিল-কারাগারে নির্যাতন বন্ধ করতে হবে, বন্দিদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে এবং কারাবিধি অনুযায়ী প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।এই আন্দোলনকে দমাতে কারা কর্তৃপক্ষ বন্দিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে। হিন্দু, মুসলমান ও আদিবাসী বন্দিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয় বলেও ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে। কিন্তু বন্দিরা সেই বিভাজনের চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেন।১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বন্দিদের দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কার্যকর কোনো সমাধান না আসায় ৫ এপ্রিল শুরু হয় অনশন। ক্রমেই অনশনকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দিরা তাদের দাবি আদায়ে অনড় থাকেন। এরপর আসে ২৪ এপ্রিল। যে দিনটি ইতিহাসে রক্তাক্ত হয়ে আছে।২৪ এপ্রিল ১৯৫০: খাপড়া ওয়ার্ডে গুলির শব্দসেদিন সকাল। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে বন্দিরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ তাদের অন্য একটি সেলে স্থানান্তর করতে চেয়েছিল। কিন্তু বন্দিরা সেই নির্দেশ মানতে রাজি হননি। তাদের আশঙ্কা ছিল, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও সংক্রামক রোগে আক্রান্ত বন্দিদের জন্য নির্ধারিত ১৪ নম্বর সেলে তাদের পাঠানো হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।জেল সুপার ডব্লিউ এফ বিলের সঙ্গে বন্দিদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে তিনি ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে বাইরে চলে যান। এরপর কারারক্ষীরা ওয়ার্ড ঘিরে ফেলে। বন্দিরা ভেতর থেকে দরজা আটকে দেন। চৌকি, তোশক, বালিশ ও শরীরের শক্তি দিয়ে তাঁরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।কিন্তু সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি। কারারক্ষীরা জানালার কাচ ভেঙে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে। মুহূর্তেই গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে কারাগারের পরিবেশ। বন্দিদের আর্তচিৎকার, রক্তাক্ত শরীর আর মৃত্যুর বিভীষিকায় খাপড়া ওয়ার্ড পরিণত হয় এক ভয়াবহ হত্যাক্ষেত্রে। সেদিন পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সাতজন কমিউনিস্ট রাজনৈতিক বন্দি। তারা হলেন-সুধীন ধর, বিজন সেন, হানিফ শেখ, সুখেন্দু ভট্টাচার্য, দেলোয়ার হোসেন, কম্পরাম সিং ও আনোয়ার হোসেন। আহত হন আরও ৩২ জন। এই সাতজনের মধ্যে কেউ ছিলেন শ্রমিক নেতা, কেউ ছাত্রনেতা, কেউ কৃষক আন্দোলনের সংগঠক, কেউবা রাজনৈতিক কর্মী। তাদের সবার পরিচয়ের মধ্যে একটি বিষয় ছিল অভিন্ন-তারা রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে কারাগারে ছিলেন।খাপড়া ওয়ার্ডের হত্যাকাণ্ড শুধু সাতটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, অসংখ্য বন্দির জীবনকেও বিপর্যস্ত করেছিল। আহতদের অনেকেই দীর্ঘদিন শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করেন। কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেন। হত্যাকাণ্ডের পর শহীদদের মরদেহ ও ঘটনার বিবরণ গোপন রাখার অভিযোগও ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের কাছে আড়ালেই থেকে যায় এই রক্তাক্ত অধ্যায়। পরে প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণ, লেখালেখি এবং ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের বিবরণ মানুষের সামনে আসতে শুরু করে। এই ইতিহাস সংরক্ষণে প্রথম আলো সম্পাদক ও লেখক মতিউর রহমানের ‘খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড ১৯৫০’ বইটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।২৫ বছর পর আবারও কারাগারে রক্তপাতখাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের ২৫ বছর পর, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, বাংলাদেশের আরেকটি কারাগার হয়ে ওঠে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী। এবার স্থান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকাকালে যে চার নেতা মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর তাদেরই একজনের পর একজনকে বন্দি করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে।এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ভোররাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে সশস্ত্র ঘাতকেরা। হত্যা করা হয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া চার জাতীয় নেতাকে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা অবস্থায় এভাবে হত্যা করা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত। খাপড়া ওয়ার্ডে বন্দিদের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল কারা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। আর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল সশস্ত্র ঘাতকদের অভিযানে। হত্যাকাণ্ড দুটির চরিত্র ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয়। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।ইতিহাসের দায়, স্মৃতির প্রশ্নএকটি বিষয় লক্ষণীয়, খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড এবং জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ড-দুটিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু জাতীয় স্মৃতি ও আলোচনায় দুই ঘটনার অবস্থান সমান নয়। ৩ নভেম্বর জাতীয় পর্যায়ে জেলহত্যা দিবস হিসেবে পরিচিত হলেও ২৪ এপ্রিলের খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড আজও তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।অথচ খাপড়া ওয়ার্ডের সাত শহীদের আত্মত্যাগকে বাদ দিয়ে এ ভূখণ্ডের রাজনৈতিক আন্দোলন, শ্রমিক অধিকার, কৃষক সংগ্রাম ও বামপন্থি রাজনীতির ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে লেখা সম্ভব নয়। তাদের রাজনৈতিক আদর্শ বা মতাদর্শের সঙ্গে কারও দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু বন্দি অবস্থায় তাদের ওপর গুলিবর্ষণ এবং প্রাণহানির ঘটনাকে ইতিহাস থেকে আড়াল করার সুযোগ নেই।একইভাবে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডও কেবল চারটি প্রাণহানির ঘটনা নয়। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, স্বাধীনতার রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার ওপর ভয়াবহ আঘাত।প্রশ্ন হচ্ছে, যে কারাগার বন্দিদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেই কারাগার কীভাবে হত্যাকাণ্ডের স্থানে পরিণত হয়? রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা মানুষের জীবন রক্ষার দায় কার? কারাগারের দেয়ালের ভেতরে সংঘটিত অপরাধের বিচার ও ইতিহাস সংরক্ষণের দায়িত্বই বা কার? ইতিহাসের এই দুটি অধ্যায় আমাদের সেই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করায়। ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে স্মরণ করার পাশাপাশি ২৪ এপ্রিলের খাপড়া ওয়ার্ডের সাত শহীদের কথাও আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন। কারণ, ইতিহাসের কোনো আত্মত্যাগই ছোট নয়। রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের ঊর্ধ্বে মানুষের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্নটি সব সময় গুরুত্বপূর্ণ।কারাগারের দেয়াল হয়তো অনেক ঘটনা আড়াল করতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের রক্তের দাগ মুছে দিতে পারে না। খাপড়া ওয়ার্ড থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার-দুটি সময়, দুটি হত্যাকাণ্ড। ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কারাগারের দরজা বন্ধ থাকলেই বন্দির জীবন নিরাপদ হয়ে যায় না।লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

পুষ্টিকর, নিরাপদ ও টেকসই খাদ্যের পথে বাংলাদেশ

একসময় বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—দেশের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করা যাবে কি না। স্বাধীনতার পর খাদ্যঘাটতি, দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সীমিত কৃষি উৎপাদনের কঠিন বাস্তবতার কারণে দীর্ঘদিন আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো। সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশ আজ অনেক দূর এগিয়েছে। ধান, সবজি, মাছ, ডিম, দুধ, মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যের উৎপাদন বেড়েছে। কৃষিতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত সম্প্রসারিত হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট-বড় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠেছে। মানুষের আয়, নগরায়ণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে খাদ্যের বাজারও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।এখন তাই নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। আমরা কত খাদ্য উৎপাদন করছি, শুধু সেই হিসাবই কি যথেষ্ট? নাকি আমাদের জানতে হবে—যে খাদ্য উৎপাদন করছি তা কতটা পুষ্টিকর, কতটা নিরাপদ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে কি না, উৎপাদনের সময় পরিবেশের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং আজকের খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাটি, পানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ আমরা কতটা সুরক্ষিত রাখতে পারছি? বাংলাদেশের আগামী দিনের খাদ্যব্যবস্থার মূল লক্ষ্য তাই হওয়া উচিত চারটি বিষয়—পুষ্টিকর, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই খাদ্য।বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প এখন দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দশক আগে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বলতে প্রধানত চাল, আটা, তেল, চিনি, বিস্কুট, রুটি, কেক কিংবা কয়েক ধরনের পানীয় বোঝানো হতো। এখন বাজারে দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য, ফলের রস, নানা ধরনের পানীয়, নুডলস, হালকা খাবার, সস, মসলা, হিমায়িত খাদ্য, রান্নার জন্য প্রস্তুত খাবার, সরাসরি খাওয়ার উপযোগী খাবার এবং নানা ধরনের স্বাস্থ্যসহায়ক খাদ্য পাওয়া যাচ্ছে। নগরায়ণ, কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, ছোট পরিবার এবং ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে সহজে ও দ্রুত প্রস্তুত করা যায় এমন খাবারের চাহিদা আগামী দিনে আরও বাড়বে। এটি খাদ্যশিল্পের জন্য বড় সুযোগ, তবে এর সঙ্গে বড় দায়িত্বও রয়েছে।কারণ মানুষের পেট ভরানো আর মানুষের শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেওয়া এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের প্রচলিত খাদ্যতালিকায় এখনও ভাত ও অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাদ্যের আধিক্য রয়েছে। ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য এবং শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু একটি সুস্থ শরীরের জন্য শুধু শর্করা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পর্যাপ্ত আমিষ, খাদ্যআঁশ, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান। তাই মাছ, ডিম, দুধ ও মাংসের পাশাপাশি ডাল, ছোলা, সয়াবিন, বাদাম, শাকসবজি ও ফলের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী এবং প্রবীণ মানুষের পুষ্টির প্রয়োজনকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা জরুরি।একটি পরিবারের ঘরে পর্যাপ্ত চাল থাকলেই সেই পরিবারের পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে বলা যায় না। তাদের খাদ্যে প্রয়োজনীয় আমিষ, ভিটামিন, খনিজ, খাদ্যআঁশ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও থাকতে হবে। তাই খাদ্যের পর্যাপ্ততা থেকে আমাদের চিন্তাকে পুষ্টিনিরাপত্তার দিকে নিয়ে যেতে হবে। আমরা কত ক্যালরি খাদ্য উৎপাদন করছি তার পাশাপাশি কতটা পুষ্টি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হওয়া উচিত।এই পরিবর্তনে দেশের খাদ্যশিল্প বড় ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন খাদ্য তৈরির সময় শুধু স্বাদ, রং, দাম এবং কত দিন ভালো থাকবে—এসব বিষয় বিবেচনা করলে চলবে না। পণ্য তৈরির শুরুতেই প্রশ্ন করা প্রয়োজন, এই খাবার মানুষের পুষ্টিতে কী যোগ করছে? বিস্কুট, রুটি, কেক কিংবা হালকা খাবারে সম্পূর্ণ শস্য ও খাদ্যআঁশ বাড়ানো যেতে পারে। পানীয়তে অতিরিক্ত যোগ করা চিনি কমানো যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রন, জিংক, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি–১২ এবং ফলিক অ্যাসিডের মতো অণুপুষ্টি উপাদান যোগ করে খাদ্যের পুষ্টিমান বাড়ানো সম্ভব। শিশুদের খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানোর দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।তবে খাদ্য পুষ্টিকর হলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেটিকে নিরাপদও হতে হবে। খাদ্যের নিরাপত্তার যাত্রা কারখানায় নয়, শুরু হয় কৃষকের মাঠে। কৃষিজমিতে কী ধরনের পানি ব্যবহার হচ্ছে, কী পরিমাণ সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে, পশু ও মাছ পালনে কী ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কাঁচামাল কীভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে—এসবই শেষ পর্যন্ত খাদ্যের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। এরপর রয়েছে পরিবহন, গুদামজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মোড়কজাতকরণ, বাজারজাতকরণ এবং দোকানে সংরক্ষণ। এই দীর্ঘ পথের যেকোনো পর্যায়ে খাদ্য দূষিত হতে পারে।রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু, ছত্রাকজাত বিষাক্ত পদার্থ, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু কিংবা অনুপযুক্ত রাসায়নিক পদার্থ খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। শুধু বাজারে পৌঁছানোর পর খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করে এসব ঝুঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই আধুনিক খাদ্যবিজ্ঞানের মূল শিক্ষা হলো—শেষে পরীক্ষা করে নিরাপত্তা খোঁজার চেয়ে শুরু থেকেই নিরাপদভাবে খাদ্য উৎপাদন করা ভালো। কৃষকের মাঠে উত্তম কৃষিচর্চা, কারখানায় উত্তম উৎপাদনচর্চা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি এবং উৎপাদনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।বাংলাদেশের বড় খাদ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই আধুনিক মাননিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ করছে। কিন্তু দেশের খাদ্যব্যবস্থা শুধু বড় কারখানার ওপর নির্ভর করে না। স্থানীয় বেকারি, মিষ্টির দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ, কাঁচাবাজার, পথের পাশের খাবারের দোকান এবং হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্য ব্যবসা এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এসব উৎস থেকে খাবার গ্রহণ করেন। তাই খাদ্যনিরাপত্তা শুধু বড় প্রতিষ্ঠানের সনদ কিংবা রপ্তানি পণ্যের শর্ত হয়ে থাকলে চলবে না। গ্রামের বাজার থেকে রাজধানীর বড় বিপণিবিতান পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্যের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য আইন ও তদারকির পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, সহজলভ্য খাদ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং খাদ্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করা প্রয়োজন।ভোক্তাকেও জানতে হবে তিনি কী খাচ্ছেন। খাদ্যের মোড়কে শুধু সুন্দর ছবি বা প্রতিষ্ঠানের নাম নয়; উপাদান, পুষ্টিমান, অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে এমন উপাদান, উৎপাদনের তারিখ এবং মেয়াদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। একজন সাধারণ মানুষ যেন সহজেই বুঝতে পারেন একটি খাবারে কত চিনি, লবণ, চর্বি, আমিষ ও খাদ্যআঁশ রয়েছে। সচেতন ভোক্তা শুধু নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করেন না, তিনি খাদ্যশিল্পকেও উন্নত ও স্বাস্থ্যকর পণ্য তৈরিতে উৎসাহিত করেন।পুষ্টি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা কৃষি উৎপাদনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে বাড়ছে জনসংখ্যা, নগরায়ণ এবং কৃষিজমির ওপর চাপ। ফলে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হবে—কম জমি, কম পানি, কম জ্বালানি এবং কম অপচয়ে কীভাবে বেশি পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন করা যায়? এজন্য জলবায়ু সহনশীল ফসল, পানি-সাশ্রয়ী কৃষি, সঠিক সেচব্যবস্থা এবং অঞ্চলভেদে উপযোগী কৃষিপণ্য উৎপাদনের দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।শুধু উৎপাদন বাড়ালেই অবশ্য সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদিত খাদ্যের কতটা মানুষের খাবারের থালায় পৌঁছাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, টমেটো কিংবা বিভিন্ন সবজির মৌসুমে অনেক সময় অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না। আবার সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সীমাবদ্ধতায় উৎপাদিত খাদ্যের একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়। একটি আম যদি ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়, তাহলে শুধু আমটিই নষ্ট হয় না; এর সঙ্গে নষ্ট হয় সেই আম উৎপাদনে ব্যবহৃত জমি, পানি, সার, কৃষকের শ্রম, পরিবহনের জ্বালানি এবং অর্থ।এখানে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বড় পরিবর্তন আনতে পারে। মৌসুমের অতিরিক্ত আমকে মণ্ড, রস, শুকনা খাদ্য বা গুঁড়ায় রূপান্তর করা যায়। টমেটো থেকে সস ও ঘন মণ্ড, আনারস থেকে রস ও শুকনা খাদ্য এবং কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তৈরি করা সম্ভব। এতে দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে এমন কৃষিপণ্য দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায়, কৃষক ভালো মূল্য পান এবং নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। দেশের প্রধান কৃষি উৎপাদন অঞ্চলে ছোট ও মাঝারি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তুললে কৃষকের কাছাকাছি পর্যায়েই বাছাই, পরিষ্কার, শীতলীকরণ, শুকানো, হিমায়ন এবং প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ করা সম্ভব হবে।এর সঙ্গে প্রয়োজন শক্তিশালী শীতল সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থা। মাছ, মাংস, দুধ, ফল ও সবজির গুণমান তাপমাত্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাই শুধু শহরে কয়েকটি হিমাগার তৈরি করলেই হবে না। উৎপাদন এলাকা থেকে সংগ্রহকেন্দ্র, সেখান থেকে শীতল পরিবহন, বিতরণকেন্দ্র এবং শেষ পর্যন্ত দোকান—পুরো পথেই প্রয়োজন অনুযায়ী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এতে খাদ্যের গুণমান ও পুষ্টিমান রক্ষা হবে, জীবাণুর বৃদ্ধি কমবে এবং খাদ্য অপচয়ও হ্রাস পাবে।খাদ্য সংরক্ষণের সঙ্গে মোড়কেরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। পরিবেশ রক্ষার কথা উঠলেই অনেক সময় প্লাস্টিক বা মোড়ক পুরোপুরি বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু উপযুক্ত মোড়ক খাদ্যকে আলো, অক্সিজেন, আর্দ্রতা, জীবাণু ও বাইরের দূষণ থেকে রক্ষা করে এবং সংরক্ষণকাল বাড়ায়। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত মোড়ক বাদ দেওয়া নয়; বরং যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু, সহজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং পরিবেশের ওপর কম চাপ সৃষ্টি করে এমন মোড়ক ব্যবহার করা। অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত মোড়ক কমানোর পাশাপাশি উপযুক্ত ক্ষেত্রে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত ও প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয়যোগ্য উপাদানের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের আরেকটি বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এমন উপাদানে, যেগুলোকে আমরা সাধারণত বর্জ্য মনে করি। ধান ভাঙানোর পর চালের কুঁড়া, ফল প্রক্রিয়াজাত করার পর খোসা ও বীজ, মাছ কাটার পর চামড়া ও আঁশ—এসবের অনেকটাই মূল্যবান কাঁচামাল। চালের কুঁড়া থেকে তেল ও আমিষ, ফলের খোসা থেকে খাদ্যআঁশ ও পেকটিন, মাছের চামড়া ও আঁশ থেকে কোলাজেন ও জিলাটিন, ফলের বীজ থেকে তেল এবং কৃষিজ উপজাত থেকে পশুখাদ্য, জৈব সার কিংবা জৈবশক্তি তৈরি করা সম্ভব। অর্থাৎ আজকের বর্জ্য আগামী দিনের কাঁচামাল হতে পারে। এক শিল্পের উপজাতকে অন্য শিল্পের সম্পদে পরিণত করার এই ধারণা বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে নতুন শিল্পের বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।পানি ও জ্বালানির ব্যবহারেও পরিবর্তন প্রয়োজন। খাদ্য কারখানায় কাঁচামাল ধোয়া, উত্তপ্ত করা, শীতল করা এবং যন্ত্রপাতি পরিষ্কারে প্রচুর পানি ও শক্তি লাগে। পানি-সাশ্রয়ী পরিষ্কারব্যবস্থা, নিরাপদ ক্ষেত্রে পরিশোধিত পানির পুনর্ব্যবহার, উৎপাদনের অতিরিক্ত তাপ পুনরুদ্ধার করে অন্য কাজে ব্যবহার, শক্তি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি এবং উন্নত শীতলীকরণ ব্যবস্থা উৎপাদন ব্যয় ও পরিবেশগত চাপ—দুটিই কমাতে পারে। বাংলাদেশের খাদ্য কারখানায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং কৃষিপণ্য শুকানোর কাজে সৌরশক্তির প্রয়োগও আরও বাড়ানো যেতে পারে।আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি খাদ্যশিল্পকে আরও নিরাপদ ও দক্ষ করতে পারে। একটি খাদ্যের কাঁচামাল কোথা থেকে এসেছে, কখন কারখানায় প্রবেশ করেছে, কোন উৎপাদনদলে তৈরি হয়েছে এবং কোথায় বিক্রি হয়েছে—এই তথ্য দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তুললে কোনো সমস্যা দেখা দিলে নির্দিষ্ট পণ্য দ্রুত বাজার থেকে প্রত্যাহার করা সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণের সাহায্যে বাজারের চাহিদা অনুমান, কাঁচামালের অপচয় শনাক্ত, উৎপাদন পরিকল্পনা এবং যন্ত্রপাতির সম্ভাব্য ত্রুটি আগাম নির্ণয় করাও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।তবে আধুনিক যন্ত্রপাতি কিনলেই আধুনিক খাদ্যশিল্প তৈরি হয় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো দক্ষ মানুষ। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খাদ্যবিজ্ঞান, খাদ্য প্রকৌশল, পুষ্টিবিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, অণুজীববিজ্ঞান ও জীবপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বহু তরুণ পড়াশোনা করছেন। এই জ্ঞানকে শিল্পের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা যদি শুধু গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং শিল্পের বাস্তব সমস্যা গবেষকের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে উদ্ভাবনের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং খাদ্যশিল্পের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন।সরকারের নীতিতেও একই ধরনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। কৃষিকে শুধু কৃষির বিষয়, খাদ্যশিল্পকে শুধু শিল্পের বিষয়, পুষ্টিকে শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় এবং পরিবেশকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখলে একটি টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন। কৃষকের মাঠ থেকে মানুষের খাবারের থালা পর্যন্ত পুরো পথকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে। ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিরাপদ উৎপাদন ও স্বাস্থ্যবিধির প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি, শীতল সরবরাহব্যবস্থায় বিনিয়োগ, কৃষিভিত্তিক নতুন শিল্পে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ—সবকিছুকে একই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার অভাব নেই। আমাদের কৃষি আছে, বৈচিত্র্যময় কৃষিপণ্য আছে, বড় ভোক্তাবাজার আছে, দ্রুত বিকাশমান খাদ্যশিল্প আছে এবং রয়েছে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী। এখন প্রয়োজন এসব শক্তিকে একই সুতোয় গাঁথা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ খাদ্যশিল্পকে তাই শুধু ‘খামার থেকে খাবারের থালা’ পর্যন্ত ভাবলে চলবে না; আমাদের লক্ষ্য হতে হবে ‘খামার থেকে পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও টেকসই ভবিষ্যৎ।’একুশ শতকে খাদ্যশিল্পের সাফল্য শুধু কত লাখ টন খাদ্য উৎপাদিত হলো তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। দেখতে হবে—কত কম জমি, পানি ও জ্বালানি ব্যবহার করে কত বেশি পুষ্টি মানুষের কাছে পৌঁছানো গেল, কতটা খাদ্য অপচয় থেকে রক্ষা করা গেল, কৃষক কতটা ন্যায্যমূল্য পেলেন এবং পুরো প্রক্রিয়ায় প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কতটা সুরক্ষিত রাখা গেল। যে খাদ্য মানুষের পেট ভরাবে, শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেবে, নিরাপদ থাকবে, কৃষককে ন্যায্যমূল্য দেবে এবং একই সঙ্গে মাটি, পানি ও পরিবেশ রক্ষা করবে—সেই খাদ্যই হওয়া উচিত আগামী বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের লক্ষ্য।[লেখক: খাদ্যবিজ্ঞানী, উদ্ভাবন ব্যবস্থাপক, সালুটিভিয়া, যুক্তরাজ্য] 

সচিবালয়ের স্থান নির্বাচন ও কৃষি গবেষণা

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কেন্দ্র সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ত স্থান নির্বাচন ও অবকাঠামোগত বিন্যাস সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। তবে যেকোনো বড় প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সেখানে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব, প্রায়োগিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা ইতিমধ্যে তীব্র সংকটে রূপ নিয়েছে।বর্তমান পরিস্থিতিকে নিছক কোনো জমি নিয়ে সাধারণ প্রশাসনিক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার ভবিষ্যৎ, একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশ, রাজধানীর পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।সাম্প্রতিক উত্তেজনা: মাটি পরীক্ষা প্রতিহত, সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুরচলমান এই বিরোধ কেবল দাপ্তরিক চিঠি চালাচালি বা প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি তা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। গত ২৭ অক্টোবর আলোচিত মাঠে মাটি পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানান। এ সময় তাঁরা সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও গাড়ি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৮ অক্টোবর শেকৃবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা ‘গবেষণার মাঠ ফেরত চাই, সচিবালয় নয়’ স্লোগান ও ব্যানার নিয়ে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে প্রবেশ করেন। এ সময় সেখানে এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার নির্মাণাধীন ফটক ও অবকাঠামোতেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সচিবালয় নির্মাণের প্রতিবাদে টানা তৃতীয় দিনের মতো চীন-মৈত্রী সিগন্যালে সড়ক অবরোধ করেন শেকৃবির শিক্ষার্থীরা।অর্থাৎ, আলোচ্য মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকূলে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছেন। এতে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীদের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও আস্থার সংকট। তাঁরা বারবার সময় বেঁধে দিলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সমাধান বা ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। একটি অপরিকল্পিত ও একতরফা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কীভাবে একটি সম্ভাবনাময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের মুখে ঠেলে দিতে পারে, এই ঘটনা তারই প্রমাণ। সংঘাতের পথ প্রশস্ত না করে নীতিগত ভুল সংশোধনের মাধ্যমে সংকট সমাধানে এখনই দূরদর্শী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।ঐতিহাসিক শিকড় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির সংকোচনশেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন ‘বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ কৃষিবিদ তৈরি করা। প্রতিষ্ঠার সময় এর জন্য প্রায় ২৯৮ একর জমি বরাদ্দ বা অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় ও সরকারি প্রয়োজনে এই ক্যাম্পাসের বড় একটি অংশ অন্যান্য সংস্থাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবহারযোগ্য জমির পরিমাণ ৮৭ একরেরও নিচে নেমে এসেছে।আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন গবেষণাপ্লট ও খামারের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের প্রয়োজনে অধিগ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেটি ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মূল ক্যাম্পাস থেকে এই উর্বর জমি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকেরা তীব্র স্থানসংকটে ভুগছেন। সরকারের সিদ্ধান্তে ২০২২ সালে বাণিজ্য মেলা পূর্বাচলে স্থানান্তরিত হলে শেকৃবি পরিবারের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। সবাই ভেবেছিলেন, ঐতিহাসিক মাঠটি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সেখানে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা সামনে আসায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।কৃষি গবেষণায় জমি ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রের গুরুত্বআধুনিক কৃষিশিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ হলো মাঠ, খামার ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণ। ফসলের নতুন জাতের কার্যকারিতা যাচাই, মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ, সেচ ব্যবস্থাপনা, সার প্রয়োগের মাত্রা নির্ধারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলক গবেষণার বিকল্প নেই।‘ওয়ান হেলথ’ বা এক স্বাস্থ্য ধারণা অনুযায়ী মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রাণিসম্পদ উৎপাদন, দুগ্ধবিজ্ঞান, গবাদিপশুর রোগ ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় খামার ও গবেষণার সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। শেকৃবির গবেষণা অবকাঠামো আরও সংকুচিত হলে তার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার ওপর।উন্নয়ন মানে কেবল কংক্রিটের স্থাপনা নয়সচিবালয় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। তবে বড় প্রকল্পের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু দাপ্তরিক সুবিধা বিবেচনা করলে চলে না। এর পরিবেশগত, যানজট ও সামাজিক প্রভাবও গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। ঢাকার মতো জনবহুল ও অপরিকল্পিত নগরে নতুন করে এ ধরনের বড় প্রশাসনিক স্থাপনা তৈরি হলে শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। এতে যানজট, শব্দ ও বায়ুদূষণ বাড়বে। আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণাকেন্দ্রের স্বাভাবিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশও ব্যাহত হতে পারে।প্রকৃত উন্নয়ন মানে কেবল কংক্রিটের স্থাপনা ও বড় বড় ভবন নির্মাণ নয়। বিদ্যমান প্রাকৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অংশ। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ এবং জ্ঞানচর্চার উপযোগী পরিসর রক্ষা করতে হবে।সমাধানের পথ: সংলাপ, স্বচ্ছতা ও বিচক্ষণতাবর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও কর্তৃপক্ষকে কালক্ষেপণ না করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। এই সংকটের স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।প্রথমত, জমির মালিকানা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নথি প্রকাশ করতে হবে। ঐতিহাসিক এই ভূখণ্ডের আইনি মালিকানা, অতীতের জমি বরাদ্দ এবং সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্তসংক্রান্ত সব প্রামাণ্য দলিল প্রকাশ করা উচিত। এতে দীর্ঘদিনের ধোঁয়াশা, ভুল বোঝাবুঝি ও আস্থার সংকট অনেকটাই দূর হবে।দ্বিতীয়ত, সচিবালয়ের জন্য বিকল্প জায়গা খুঁজতে হবে। একটি ঐতিহ্যবাহী ও গবেষণানির্ভর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উর্বর জমি সংকুচিত না করে ঢাকার আশপাশের খাসজমি কিংবা পূর্বাচলের মতো সম্ভাব্য বিকল্প জায়গাগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব জায়গার সুবিধা-অসুবিধা বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করে তা জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে।তৃতীয়ত, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। সংঘাত, উত্তেজনা বা বলপ্রয়োগের পথ পরিহার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ভিত্তিতে এই আলোচনা হতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগই সংকটের সম্মানজনক ও স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।শেকৃবির জমি নিয়ে বর্তমান বিতর্ক আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে: আমরা কি উন্নয়ন বলতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণকেই বুঝি, নাকি জ্ঞান, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সক্ষমতাকেও উন্নয়নের অংশ মনে করি? প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেই প্রয়োজনে কৃষি গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নষ্ট করা উচিত নয়। উন্নয়ন ও গবেষণার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ডিন ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়]

আমি দেশপ্রেমিক, কিন্তু জাতীয়তাবাদী নই

সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হতে পারে যে ‘দেশপ্রেম’ (patriotism)  ও ‘জাতীয়তাবাদ’(nationalism)  এ দু’টো শব্দের অর্থ একই এবং তার দ্বারা একই কথা বোঝানো হয়। কিন্তু সেটি মোটেও সত্য নয়। আমি মার্কসবাদে দীক্ষিত একজন কমিউনিস্ট। আমি নিজেকে একজন ‘দেশপ্রেমিক’ বলে ভাবি, কিন্তু নিজেকে কখনোই একজন ‘জাতীয়তাবাদী’ বলে মনে করি না। কেন? এর কারণটি আমি এখানে সংক্ষেপে ব্যক্ত  করব।তার আগে, এ বিষয়ে যে ক্ষেত্রে গুরুতর ভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয় সেটি প্রথমে পরিস্কার করে নেয়া প্রয়োজন। আগেই বলেছি যে আমি ‘জাতীয়তাবাদী’ নই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ‘জাতীয়তাবাদ’ অথবা ‘জাতীয়তাবাদীদের’ প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি হলো শত্রুমূলক ও বৈরী। বরঞ্চ একথা আমি দৃঢ় প্রত্যয়ে বলবো যে—অনেক ক্ষেত্রেই, বিশেষতঃ একটি নিপীড়িত জাতির ক্ষেত্রে, জাতীয়তাবাদ প্রায়সই রাজনীতিতে ইতিবাচক এবং এমনকি কখনো কখনো প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করে। সুতরাং, এমন ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতি কমিউনিস্টদের মনোভাব যে বন্ধুসুলভ হবে সেটিই স্বাভাবিক। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে যেই সম্পর্ক গড়ে উঠতে পেরেছিল।কিন্তু এ তো গেলো জাতীয়তাবাদের প্রতি কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি কি হবে, সে বিষয়ে কথা। তার মানে কি তবে এই যে ‘কমিউনিস্ট’ আদর্শ ও ‘জাতীয়তাবাদের’ আদর্শ একই চরিত্রের? না! কারণ একটি হলো ভিন্ন আদর্শের প্রতি ‘দৃষ্টিভঙ্গির’ বিষয় এবং অপরটি হলো আদর্শগত ‘আত্মপরিচয়ের বিষয়। এই দু’টি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলার কারণে অনেক বিভ্রান্তির জন্ম হয়। ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রতি কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে যতো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই থাকুক না কেন, আদর্শগত আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে একজন কমিউনিস্ট কখনই ‘জাতীয়তাবাদী’ হতে পারে না। কেউ কেউ আবার বলছেন যে আমরা ‘জাতীয়তাবাদী’ নই ঠিকই, কিন্তু ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের মতো রণধ্বনি করে আমাদেরকে এখন লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পরতে হবে। কমিউনিস্টরা যেমন তাদের আত্মপরিচয়কে ‘জাতীয়তাবাদের’ দ্বারা চিহ্নিত করতে পারে না, তেমনি তারা তাদের সংগ্রামের মূল রণধ্বনিকে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দ্বারা নির্ধারণ করতে পারে না। কারণ তা হবে তার কমিউনিস্ট আত্মপরিচয় বিসর্জন দিয়ে ‘জাতীয়তাবাদী’ আদর্শ গ্রহণ করার মতো বিষয়।এবার তবে মূল কথায় ফেরা যাক। যেকোনো মানুষের জন্য দেশপ্রেম হলো একটি মহৎ গুণ। এটি হলো তার পরম গর্ব ও অহঙ্কারের বিষয়। নিজের জাতি ও নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসাই হলো দেশপ্রেম। দেশপ্রেমিক মানুষের স্বার্থবোধ ও চিন্তার পরিমণ্ডল ক্ষুদ্র ব্যক্তিসত্তার গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। ব্যক্তি ও পরিবারের সংকীর্ণ জগতকে অতিক্রম করে সে দেশ ও জাতির স্বার্থ ও সত্তার সাথে নিজেকে একাকার করে ফেলে। বিশ্ব জগতে সে তখন আর একক একটি ব্যক্তি মাত্র হয়ে থাকে না, সে হয়ে ওঠে সমষ্টির অঙ্গীভূত। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকের ক্ষেত্রে এই উত্তরণের প্রক্রিয়া ও সমষ্টি-বোধ তার স্বাভাবিক ধারায় তাকে পৌঁছে দেয় বিশ্ব মানবতার চেতনায়। এ কারণে তার নিজের দেশপ্রেম কখনোই অন্য আরেক ভিন্ন দেশ ও জাতির মানুষের দেশপ্রেমের বৈরী বা প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে না। সব জাতির মানুষের নিজ নিজ দেশপ্রেম হয়ে ওঠে একে অপরের পরিপূরক। একজন ‘প্রকৃত’ দেশপ্রেমিকের কাছে তার স্বদেশ ও স্বজাতি হয়ে ওঠে বিশ্বলোকের মহামানবের একটি অংশ, তারই সৌরভিত পুষ্পকাননের অন্যতম অলঙ্কার। দেশপ্রেমিকের স্বদেশ-প্রেমের স্বরূপ ঠিক এমনটাই।কবিগুরু তাই আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন—‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।’কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘জাতীয়তাবাদের’ তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি ছিলেন বিশ্ব-মানবের কবি। তিনি একইসাথে ছিলেন প্রবলভাবে দেশপ্রেমিক। কবিগুরু বলে গেছেন যে, ‘বিশ্ব-মানবের প্রতি ভালোবাসা-বোধের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যেমন কিনা প্রকৃত দেশপ্রেমের নিখুঁত স্ফুরণ ঘটতে পারে না, ঠিক তেমনি প্রগাঢ় দেশপ্রেমকে উপেক্ষা করে সত্যিকার মানবপ্রেম জাগরিত হতে পারে না।’স্বজাতি ও স্বদেশের প্রতি ভালোবাসাই হলো দেশপ্রেম। এখন প্রশ্ন হলো, এই স্বজাতি ও স্বদেশ ব্যাপারটি আসলে কী? এটা কি মানব জন্মের আদিলগ্ন থেকে মানবসত্তার অন্তর্গত একটি অন্তর্নিহিত উপাদান? নাকি তা ইতিহাসের ধারায় সুনির্দিষ্ট বাস্তবতায় আবির্ভূত একটি সামাজিক উপাদান? পরের কথাটি যদি সত্য হয় তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—কীভাবে ঘটেছে তার এই উদ্ভব?জাতিসত্তা-বোধ হলো ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা একটি উপলব্ধি, একটি চেতনা। বিস্তৃত ভূমণ্ডলে মানুষের উপস্থিতি বহুকালের। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষরা ক্রমে পরস্পরের সংস্পর্শে এসেছে, জীবন ধারণের প্রয়োজনে গোষ্ঠীবদ্ধ ও সমাজবদ্ধ হয়েছে। ইতিহাসের প্রত্যক্ষ প্রমাণ হলো এই যে, নানা উত্থান-পতন, বাঁধা-বিঘ্ন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত সত্ত্বেও মানুষ ক্রমাগতই একে অপরের নিকটবর্তী হয়েছে ও হচ্ছে। এই ক্রম-ধারাবাহিকতাতেই স্বজাতি-বোধের উদ্ভব। ইতিহাসের ধারাতেই নৃতত্ত্ব, ভূগোল ও প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলবায়ু ও আবহাওয়া, ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনাচার, অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থা— প্রভৃতি নানা উপাদানের যুগ যুগ ব্যাপী ধারাবাহিক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানব সমাজের পৃথক পৃথক গোষ্ঠীর মধ্যে নিজ নিজ স্বজাতি-বোধ গড়ে ওঠেছে। প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে এই নিবিড় বন্ধন সূত্রটি নাড়ির বন্ধনের মতোই তার জন্মলগ্ন থেকেই স্থাপিত হয়। এই স্বজাতি-বোধটা যেন তার মায়ের কোল, তার স্বাভাবিক শারীরিক-মানসিক আশ্রয়স্থল। নানা সূত্রের এক অদৃশ্য, কিন্তু বস্তুগত গাঁথুনি দ্বারা, স্বজাত্যবোধের এই অনুভূতি সৃষ্টি হয়।এই স্বজাতি-বোধের উৎপত্তি মানুষের ইচ্ছা নিরপেক্ষ। কিন্তু এই বোধের সৃজন অথবা তার পচন অনেকটাই নির্ভর করে একদিকে যেমন মানুষের নিজের উপর, তেমনি তা নির্ধারিত হয় স্বদেশ ও সমাজের চরিত্রের দ্বারা। চেতনায় এই স্বজাতি-বোধের গড়ে ওঠার ব্যাটারটি অগণন বাস্তব উপাদানের ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত এবং তা সময়ের পরিক্রমায় গভীরতর ভিত্তি পেয়েছে।এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় হলো— বিকাশের বৈচিত্রময়তার কারণেই একেকটি ভৌগলিক গণ্ডির মধ্যে বসবাসরত মানুষদেরকে নিয়েই পৃথক পৃথক স্বজাত্যবোধ বিকশিত হয়েছে। এভাবে জাতি-পরিচয় সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে নির্দিষ্ট ভৌগলিক এলাকার সাথে। রাজ্য-সাম্রাজ্যের ভাঙা-গড়া সত্ত্বেও জাতীয় আত্মপরিচয় নিয়ে পৃথিবীর একেকটি এলাকায় একেকটি জাতিসত্তার মানুষ যুগ যুগ ধরে বসবাস করেছে ও নিজ নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উদ্ভবের পর বিকাশ ঘটেছে জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। এভাবে স্বদেশ অনেকটা পরিমাণে একটি স্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক রূপ অর্জন করেছে। স্বজাতির চেতনার সাথে এভাবেই সংযুক্ত হয়েছে স্বদেশের অনুভূতি। “স্বজাতির” প্রতি নিবিড় আকর্ষণ ও ভালোবাসার আবেগ ক্রমেই রূপ পেয়েছে “স্বদেশের” প্রতি ভালোবাসায়। সেই ভালোবাসার নামই হলো দেশপ্রেম।কিন্তু এই স্বদেশ শুধু চিহ্নিত একটি ভূখণ্ড, তার গাছ-পালা, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, জলবায়ু-মৃত্তিকা প্রভৃতির সমাহারই কেবলমাত্র নয়। স্বদেশের শ্রেষ্ঠতম ও অমূল্য উপাদান হলো স্বদেশের মানুষ। স্বদেশের মানুষ নিয়েই স্বজাতির গঠন। তাই, দেশপ্রেমের প্রধান উপাদান, তার মর্মকথা হলো দেশের আপামর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশকে ভালোবাসতে হলে সর্বাগ্রে দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হয়।একটি দেশের সব মানুষ কিন্তু কোনো একক ও অখণ্ড সত্তা নয়। আদিম সাম্যবাদী সমাজের সময়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত মানবজাতির ইতিহাস হলো শ্রেণী বিভাজন ও শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। এক সময় সমাজ বিভক্ত ছিল মুষ্টিমেয় দাস মালিক ও অগণিত ক্রীতদাস— এই দুই শ্রেণীতে। তারপরে সমাজ বিভক্ত হয়েছে সামন্তপ্রভু ও ভূমিদাস অথবা প্রজাকুল হিসেবে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতেও সমাজে রয়েছে প্রধানত দুটি পরস্পর স্বার্থবিরোধী শ্রেণী— পুঁজিপতি ও শ্রমজীবী। রয়েছে শোষক শ্রেণী ও শোষিত শ্রেণী। শোষকরা মুষ্টিমেয়, হাতেগোনা গুটিকয়েক। শোষিতরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শোষক আর শোষিত— দু’পক্ষকেই একই সাথে ভালোবাসা যায় না। শোষিত মানুষকে ভালোবাসতে হলে যারা তাদেরকে শোষণ করে, সেই শোষকদের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। শোষক শ্রেণীর শোষণকে ঘৃণা করতে হয়।দেশপ্রেমের অভিপ্রকাশ যদি হয় স্বদেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা, তাহলে তার মূর্ত রূপ হতে হবে এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত দেশবাসীর প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু, সেই ভালোবাসা নিরর্থক ও নিষ্ফল—বন্ধ্যা হয়ে থাকবে যদি সেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী চিরদিন পুঁজিবাদের শোষণ জালে অর্থাৎ মজুরি-দাসত্বের শিকলে বাঁধা পড়ে থাকে। দেশৈর অগণিত মানুষের ওপর চলতে থাকা অমানবিক শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্যের জিঞ্জির মেনে নিয়ে দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। চলমান শোষণমূলক সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু থাকতে দিয়ে, সেই ব্যবস্থার গায়ে শুধু উপরভাসা সংস্কারের মলম লাগিয়ে মানুষের জীবন-জীবিকার যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা দিয়েও নির্ভেজাল দেশপ্রেম প্রদর্শিত হতে পারে না। প্রকৃত দেশপ্রেম দাবি করে শোষিত দেশবাসীর প্রতি ভালোবাসা এবং সেই ভালোবাসা দাবি করে শোষণমুক্তির সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা। তাই, প্রকৃত দেশপ্রেম স্বজাতি ও স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার তাড়নাতেই আমাদেরকে একই সাথে বিশ্ব মানবতার প্রতি উদার ভক্তি-শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় জাগরিত করে এবং সাথে সাথে শোষণমুক্তির সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে এবং এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। এসবই হলো প্রকৃত দেশপ্রেমের অন্যতম মর্মবাণী ও উপাদান। তদ্রুপ বিচারে আমি নিজেকে একজন দেশপ্রেমিক বলে বিবেচনা করি।এখন দেখা যাক, ‘জাতীয়তাবাদ’ কী? জাতীয়তাবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ যেখানে জাতীয় পরিচয়কে সামাজিক ঐক্যের সর্বোচ্চ ও শীর্ষরূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মতাদর্শে একথা ধরে নেয়া হয় যে, ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে এমন কিছু রয়েছে যার কাছে শ্রেণীস্বার্থ, শোষণ ব্যবস্থা থাকা-নাথাকা, সামাজিক বিভাজন জনিত স্বার্থবোধ—ইত্যাদি সবকিছু অধীনস্ত থাকে। তাছাড়া জাতীয়তাবাদী মতাদর্শকে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পটভূমি নির্বিশেষ স্থান-কালের বিবেচনার ঊর্ধ্বে, একটি অনাদিকালের জন্য স্থায়ী ভাবাদর্শ ও ব্যবস্থারূপে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।বস্তুত, জাতীয়তাবাদ ও জাতি-রাষ্ট্রের বিষয়গুলো মানব সভ্যতার ইতিহাসে তুলনামূলকভাবে নতুন সংযোজন। কালক্রমে, যখন মানব সমাজের পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটেছিল, তখন আর্থ-সামাজিক প্রয়োজনে স্বতন্ত্র স্বজাতি-বোধের উপাদানকে নতুন মাত্রিকতা ও গুরুত্ব দেয়াটা বিশেষভাবে প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল। এভাবে, ‘স্বজাতি-বোধের’ স্বাভাবিক উপলব্ধি উত্তরণ ঘটেছিল ‘জাতীয়তাবাদের’ মতাদর্শে। এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন জাতিকে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো।চার-পাঁচশ’ বছর আগেও রাজনীতি ও সমাজে জাতি-রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ভাবাদর্শ বলে তেমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। মানুষের স্বজাতি-বোধের। সাথে ভূ-রাজনীতির অথবা রাজনৈতিক আদর্শের কোনো শক্তিশালি ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না। রাজা-মহারাজারা যে ভূখণ্ড দখল করতে সক্ষম হতো, সেটাই হতো রাজ্যের (অর্থাৎ রাষ্ট্রের) ভূ-সীমানা ও ভৌগলিক গণ্ডি। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা দাস সমাজের ও সামন্তবাদী সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলার রাখার ক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় সৃষ্টি করত না। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা উদ্ভবের সাথে সাথে পুঁজির নিজস্ব স্বার্থেই বাজার দখল করা নিজ নিজ বাজার সংরক্ষণ এবং তা নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পুঁজিবাদের ‘বাজার-কর্তৃত্বের’ জন্য এই অন্তর্নিহিত তাগিদই জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের উন্মেষ ও জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব অনিবার্য করে তুলেছিল।  প্রথমাবস্থায় ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রগতিবাদী ভূমিকা ছিল সাধালণভাবে মুখ্য। কিন্তু স্থান-কাল-ভেদে এই ভূমিকা ক্রমেই ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিতে শুরু করেছিল। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতে উত্তরণের ক্ষেত্রে যেসব জাতি ও জাতি-রাষ্ট্র অগ্রবর্তী থাকতে সক্ষম হয়েছিল, তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়া জাতিগুলোকে পদানত করে সেখানে তাদের উপনিবেশ বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিল। এসব প্রভু-দেশ তাদের ঔপনিবেশিক শোষণ বিস্তারের জন্য জাতীয়তাবাদের মতাদর্শকে কাজে লাগিয়েছিল। এটি ছিল বৃহৎ শক্তির জাতীয়তাবাদ। আবার অন্যদিকে, পদানত ও ঔপনিবেশিক শাসনে আবদ্ধ জাতিগুলোর ক্ষেত্রে এই জাতীয়তাবাদী মতাদর্শই সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী বন্ধন মোচন করে স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ইতিবাচক আদর্শগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিল। তাই, এভাবে এবং আরো অন্য নানাভাবে “জাতীয়তাবাদের” দ্বিমুখী ভূমিকা ছিল বলে দেখা যায়।নির্দিষ্ট স্থান, কাল ও ঐতিহাসিক পটভূমিতে জাতীয়তাবাদের ইতিবাচক এবং এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে একটা প্রগতিশীল ভূমিকা ভাবাদর্শ হিসেবে জাতীয়তাবাদের নেতিবাচক ও এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল অভিঘাতের বিপদের আশঙ্কার কথাটিও ভালোভাবে হিসেবে রাখাটাও একান্তভাবে বাঞ্ছনীয়। জাতীয়তাবাদের কতগুলো নেতিবাচক দিক ও সম্ভাব্য বিপদের কথা আমি আবার এখানে উল্লেখ করছি।জাতীয়তাবাদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো জাত্যাভিমান। জাতি পরিচয়ই যে সহজাত কেন্দ্রিক বিষয়, এই তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠার জন্য এবং তার পক্ষে আরও শক্তকরণ তুলে ধরার জন্য অপর আরেকটি তত্ত্বও তার সাথে সাথে হাজির করা হয়। সেই তত্ত্ব হলো-‘জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্ব’। এ ক্ষেত্রে বলা হতে থাকলো যে, যেহেতু ‘আমাদের জাতিই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি’ তাই অন্যান্য ‘অনগ্রসর, অসভ্য জাতিগুলোকে মানুষ করার’ ইতিহাস প্রদত্ত দায়িত্ব এই শ্রেষ্ঠতর বা শ্রেষ্ঠতম জাতির দাবিদারদেরকে নিজেদের হাতে নিতে হবে। এই তত্ত্বের আলোকে একসময় বৃটিশরা ভারতীয়দেরকে ÒWhite mens burdenÓ  বলে আখ্যায়িত করতো। জাতীয়তাবাদের এহেন প্রয়োগ ঔপনিবেশিক মতবাদ ও ব্যবস্থাকে লালন করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছিল। জাত্যাভিমানের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রকাশ হলো ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ, জিয়নবাদ এবং অতি সম্প্রতি সৃষ্ট নয়া-ফ্যাসিবাদ, ‘সাদা মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব’ (White supremacy), America First  (সর্বাগ্রে আমেরিকা)  ইত্যাদি। এসবের অনুকরণে আমাদের দেশের বাঙালিদের মাঝেও জাত্যাভিমানের প্রকাশ দেখা যায়। তা দেখা যায় পার্বত্য এলাকার জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি, এবং এমনকি ভিন্ন কোনো তরিকার অনুসারী আউল-বাউল, মুরশিদ অনুগত সমতলের মুসলিম সম্প্রদায়, সংখ্যাালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি অনুসৃত দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে। জাত্যাভিমানে আচ্ছন্ন জাতি নিজের দোষ-ত্রুটি-দুর্বলতা-ঘাটতি-অপরাধগুলোকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে অন্ধ হয়ে থাকে, আর নিজের শক্তি-সামর্থ্য-ক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করে দেখে। ফলে, জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ও প্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে গিয়ে এরূপ জাত্যাভিমানে আচ্ছন্ন জাতি নানা সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং শেষমেষ অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়ে। জাত্যাভিমান থেকেই উৎসারিত হয় ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’। নিজ জাতির তথাকথিত স্বার্থরক্ষায় কোনো অন্যায় কাজকেই তখন আর অন্যায্য মনে করা হয় না। অন্য জাতির ওপর নিজ জাতির আধিপত্য চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে এই তত্ত্ব ও মতবাদের আশ্রয় নেয়া হয়। পৃথিবীতে জাতিতে জাতিতে সহ-অবস্থান ও শান্তি-ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ নষ্ট হয়।জাতীয়তাবাদের অন্যতম বড় বিপদ হলো তার অন্তর্নিহিত রক্ষণশীলতা। জাতীয় ঐতিহ্য ও জাতীয় ভাবধারা রক্ষার নামে নানা ধরনের বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও কূপমণ্ডূকতাকে সে লালন করে এবং উস্কে দেয়। জাতীয়তাবাদ এক ধরনের আত্মমুখীনতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার প্রবণতা ধারণ করে, যা কিনা বিশ্ব সভ্যতার অর্জন থেকে জাতির দূরত্বকে বাড়িয়ে দেয়। জাতীয়তাবাদ বিশ্ব সভ্যতার সাধারণ সর্বমানবিক ঐশ্বর্যময় সম্পদ থেকে আধার গ্রহণ করে স্বজাতিকে সমৃদ্ধ করার বদলে, ‘শ্রেষ্ঠ জাতির শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের’ নামে নিজের অতীত ও স্ব-গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখার প্রবণতা ধারণ করে। একটি জাতির মধ্যে তা ‘অতীতে ফিরে যাওয়ার’ (revivalism)  প্রবণতার জন্ম দেয়। এর ফলে, জাতি প্রগতিমুখীন না হয়ে রক্ষণশীল ও এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়ে।জাতীয়তাবাদ অন্ধ একমুখীনতা ও সংকীর্ণতাবাদী প্রবণতাও লালন করে। জাতীয়তাবাদ দাবি করতে চায় যে— সমাজের মধ্যে শ্রেণী বিভাজন, শ্রেণী সচেতনতা, ইতিহাস ও সমাজ রূপান্তরে শ্রেণীর ভূমিকা, শোষক ও শোষিতের মধ্যে মৌলিক অমোচনীয় দ্বন্দ্ব, শোষিত মানুষের ঐক্য, মানবিক ও শোষণমুক্ত নতুন সভ্যতা নির্মাণে বিশ্বের শ্রমিক সংহতি ও আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদি বিষয়গুলোর অন্যান্য সব বিষয়ের ঊর্ধ্বে এবং যা হলো সকলের কাছে সুপ্রিম গুরুত্ব সম্পন্ন বিষয়, তা হলো জাতির সার্বজনীন স্বকীয়তা।একট পর্যায়ে জাতীয়তাবাদ শ্রমিক শ্রেণীর শোষণমুক্তির সংগ্রামের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। এদেশেও আমরা বহু দিন ধরে দেখে এসেছি জাতীয়তাবাদী শক্তি কীভাবে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ সেøাগানের বিপরীতে ‘বাংলার মজদুর এক হও’ সেøাগান উত্থাপনের জন্য চেষ্টা করেছে। কিংবা তাদের মুখে অতীতে শুনেছি এবং বর্তমানে আবার খুব বেশি করে উচ্চারিত হতে শুনছি ‘শ্রমিক-মালিক ভাই-ভাই, বাঙালির একতার বিনাশ নাই’ ইত্যাদি ধরনের নসিহত। অন্যদিকে, বৃহৎ ও শক্তিমান জাতির ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ যে আগ্রাসী, আধিপত্যবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, উপনিবেশবাদী ও নয়া-উপনিবেশবাদী এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ফ্যাসিবাদী, নাৎসিবাদী, জিয়নবাদী, তালেবানি জঙ্গিবাদী, প্যান-ইসলামবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের চরম প্রতিক্রিয়াশীলতায় পর্যবসিত হতে পারে তা সমসাময়িক ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায়।এত তাত্ত্বিক কথায় না গিয়েও বাংলাদেশে ‘জাতীয়তাবাদের’ যে বাস্তব চেহারা আমরা দেখে চলেছি তা থেকেও এই আদর্শের স্বরূপ অনেকটাই স্পষ্ট হয়। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’— সেটা তো পাকিস্তানি ভাবাদর্শের একটি নরম সংস্করণ বৈ অন্য কিছু নয়। সে বিষয়ে বেশি আলোচনা না করলেও চলে। আর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ অনেক রকম ভূমিকাই আমরা দেখেছি, দেখে চলেছি। নিঃসন্দেহে একথা সত্য যে, বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় ও মুক্তিযুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আদর্শ ও জাতীয়তাবাদী শক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তার শীর্ষ পর্বে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এই জাতীয়তাবাদী শক্তির কোনো কোনো অংশ ’৭০-’৭১ সালেও হিটলারের মতো করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে বলে প্রচার চালিয়েছে, হিটলার রচিত ‘মেইন ক্যাম্ফ’ (আমার নেতা) বইটির আলোকে মতাদর্শ গ্রহণের ছবক দিয়েছে, আমেরিকা আমাদের স্বাধীনতার পাশে থাকবে বলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মোহগ্রস্ত থেকে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার সহায়তায় ‘স্বাধীনতা’ আনা যায় কিনা সেজন্য চেষ্টা করেছে। ইতিহাস এসব ঘটনার এবং এ ধরনের বহু ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে। সাম্রাজ্যবাদের মন যুগিয়ে চলার জন্য জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী বলে দাবিদার বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী, ব্যীক্ত পরস্পরের মধ্যে তাবেদারির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। আর মাঠে-ময়দানে বিভিন্ন ঘরানার জাতীয়তাবাদী নেতা-কর্মী-ক্যাডারদের বাস্তব কার্যকলাপ হিসেবে হালুয়া-রুটির ভাগবাটোয়ারা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, তদবিরবাজি, দখলবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে অসৎ পথে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদ-বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ-ইসলামী জাতীয়তাবাদ প্রভৃতির মধ্যে এবং তার প্রতিটির অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সমঝোতার খেলা চলছে। জাতীয়তাবাদীদের অব্যাহত খাই-খাই তৎপরতায় সাধারণ মানুষের জীবনে আজ নাভিঃশ্বাস উঠছে।ইতিহাসকে বিকৃত বা মুছে ফেলা যায় না। একথা ঠিক যে ‘জয় বাংলা’ মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ছিল। সাথে সাথে একথাও সত্য যে তা আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শের গর্ভ থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। এই রণধ্বনি দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং দেশবাসী তা গ্রহণ করেছিল। ১৯৭০ ও ১৯৭১ সাল ছিল মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত সম্পন্ন পর্ব ও তার তাৎক্ষণিক পূর্বের অধ্যায়। এই দুই বছর ‘জয় বাংলা’ যে আবেগের উৎস ছিল, একাত্তরের পর, স্বাধীন দেশের সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এই শ্লোগানকে ব্যবহার করে অনেক দুষ্কর্ম করেছে। ‘জয় বাংলা’-র সাথে ‘জয় বঙ্গবন্ধু’-কে যুক্ত করে এই রণধ্বনিতে পরিণত করেছে। তাছাড়া সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী অপশক্তির সাথে আপস করে তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে মদত দিয়ছে।দেশে আজ সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান একটি বড় রকম বিপদ। কিন্তু জনগণের ইহলৌকিক জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধান করার কাজে বাস্তব সাফল্য আনতে না পারলে এই উত্থান রোধ করা যাবে না। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ৈই তা সম্ভব এবং তা প্রতিষ্ঠা করাটা আওয়ামী লীগের বা বিএনপি, জাতীয় পার্পি, জামাতে ইসলামের দ্বারা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তির উত্থান। দেশের সামনে নতুন এজেন্ডা উপস্থিত হয়েছে। সেটিকে এগিয়ে নেয়ার মধ্য দিয়েই উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপদ দেউলিয়া হয়ে পরা শোষণ-লুটপাটের বুর্জোয়া শাসনের আশপাশ থেকে মুক্তি অর্জন করতে হবে। তাই, নিজের সম্পর্কে আমার বিনীত উচ্চারণ, আমি দেশপ্রেমিক বেট, কিন্তু জাতীয়তাবাদী নই। আমি ‘জয় বাংলা’-কে রণধ্বনি করে পথ চলার ‘জয় বাংলা’ পন্থী তো নয়ই। এ হলো আমার আদর্শগত আত্মপরিচয়ের প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য। কিন্তু যারা ‘জাতীয়তাবাদী’ অথবা ‘জয় বাংলা’ পন্থী-তাদের মতো করে কাজ করার অধিকার খর্ব করার যেকোনো প্রচেষ্টার আমি বিরোধী। শুধু বিরোধীই নই, তা রুখতে আমরা কমিউনিস্টরা রাজপথে আছি ও থাকবো।লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

ভিডিও আরও দেখুন

বিশ্ব ফুটবলে ইতি টানলেন পর্তুগিজ মহাতারকা

আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি পর্দার আলাড়ে চলে গেলেন। দীর্ঘ ২৩ বছরের রেকর্ডভাঙা পথচলার ইতি টানলেন পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। অবশেষে থামল সেই পা, যা বিশ্ব ফুটবলের প্রতিটি বড় মঞ্চে প্রতিপক্ষের জাল কাঁপিয়েছে। শুধু গোলের হিসেব নয়, ফুটবলের প্রতি তার চরম নিবেদন আর একাগ্রতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে গেল এক অনন্য দৃষ্টান্ত।বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন ৪১ বছর বয়সী এই তারকা।বিবৃতিতে রোনালদো বলেন, ‘সময় এসেছে জাতীয় দলের সাত নম্বর জার্সিটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার। এই জার্সি কখনোই শুধু আমার ছিল না। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার, রক্ষা করার এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্টেডিয়ামে বয়ে নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব আমার ছিল।’সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না জানিয়ে রোনালদো আরও লেখেন, ‘কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নেওয়া যায় না, হৃদয়েরও ভূমিকা থাকে।’২০০৩ সালের আগস্টে কাজাখস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের মাধ্যমে পর্তুগালের জার্সিতে অভিষেক হয় রোনালদোর। এরপর দীর্ঘ ২৩ বছরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তিনি পরিণত হয়েছেন এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে।ম্যাচ ও গোল: পর্তুগালের হয়ে ২২০টির বেশি ম্যাচ খেলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের (১৪০+) রেকর্ড গড়েছেন তিনি।ট্রফি: ২০১৬ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০১৯ উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপা জিতেছেন।ব্যক্তিগত স্বীকৃতি: পাঁচবার ব্যালন ডি'অর জয়ের পাশাপাশি রয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে।আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিলেও, ক্লাব ফুটবলে রোনালদোর ধারাবাহিকতা এবং প্রভাব কোনোদিনই হারিয়ে যাবে না। স্পোর্টিং লিসবন থেকে শুরু করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস—প্রতিটি ক্লাবেই তিনি রেখেছেন নিজের অমোচনীয় ছাপ। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে জিতেছেন চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ।মাঠের বাইরেও তার ফিটনেস, ডিসিপ্লিন এবং খেলার প্রতি অদম্য ইচ্ছা তাকে পরিণত করেছে 'সিআর সেভেন' ব্র্যান্ডে।রোনালদো জানিয়েছেন, গত দুই দশকে দেশের জার্সি গায়ে যে সম্মান ও ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, তা কখনো ভুলবেন না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, আমার এই যাত্রা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।’সোশ্যাল মিডিয়ায় তার এই বিদায় বার্তার পর ভক্তদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকে বলছেন, আন্তর্জাতিক ফুটবল মানেই রোনালদো—এই চিন্তা থেকে বের হওয়া সহজ হবে না। তবে ফুটবলপ্রেমীরা আশাবাদী, ক্লাব ফুটবলে তিনি আরও কিছুদিন মাঠ মাতাবেন।

বিশ্ব ফুটবলে ইতি টানলেন পর্তুগিজ মহাতারকা