সংবাদ
মানবদেহের ১২ ধরনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি বন্ধে হার্ডলাইনে সরকার

মানবদেহের ১২ ধরনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি বন্ধে হার্ডলাইনে সরকার

মাঠে ৭ সদস্যের জাতীয় কমিটি নিয়ম ভাঙলেই আবেদন বাতিল দালাল চক্রের খপ্পর থেকে রক্ষায় সরকারের বিশেষ উদ্যোগকিডনিসহ মানবদেহের ১২ ধরনের মূল্যবান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবৈধ উপায়ে বেচাকেনা বন্ধ করতে এবার অত্যন্ত কঠোর বা হার্ডলাইনে চলে গেছে সরকার। টাকার লোভে পড়ে দেশের বহু দরিদ্র ও অসহায় মানুষ গোপনে নিজেদের কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গ বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।অনেক ক্ষেত্রে দালাল চক্রের ফাঁদে পড়ে দরিদ্র দাতা কিডনি দানের পর প্রতিশ্রুত টাকা না পেয়ে মারাত্মক প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে কিডনি বিক্রির পর দালালরা দাতাকে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে মর্মে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে সেই হতভাগ্য ব্যক্তি দেশে ফিরে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় নিজের কষ্টের করুণ কাহিনী তুলে ধরেন।বিষয়টি সরকারের নজরে আসার পর নড়েচড়ে বসে নীতিনির্ধারণী মহল। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিবিড় আলোচনার মাধ্যমে সরকার গত বছরের নভেম্বর মাসে এই অমানবিক বাণিজ্য বন্ধে যুগান্তকারী আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তীতে চলতি বছরেই জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর এই সংক্রান্ত যুগান্তকারী আইনটি সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।আইন প্রণয়নের সঙ্গে সঙ্গেই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে নিঃস্বার্থবাদী দাতা হিসেবে সঠিক ও স্বচ্ছ উপায়ে অনুমতি দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপ-উপাচার্য প্রফেসর ডা. মুজিবুর রহমান হাওলাদারকে সভাপতি করে একটি শক্তিশালী ৭ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে।এই গুরুত্বপূর্ণ কমিটির অন্যান্য সম্মানিত সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিনিধি, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব এবং সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ সদর দপ্তরের একজন অতিরিক্ত আইজিপি।নবগঠিত এই জাতীয় কমিটির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো সম্পূর্ণ সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত নিঃস্বার্থবাদী দাতা নির্ধারণ করা, যাতে কোনো ধরনের অবৈধ লেনদেন বা জালিয়াতি হতে না পারে। অঙ্গদান কার্যক্রমে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য এই কমিটি কাজ করে যাচ্ছে। যদি কোনো আবেদনকারীর কাগজপত্র বা জবাব সন্তোষজনক না হয়, তবে বিশেষজ্ঞ কমিটি সেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের আবেদন তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে।এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অবৈধ সুপারিশ, তদবির কিংবা অনিয়ম করার ছিটেফোঁটাও সুযোগ রাখা হয়নি। আগ্রহী দাতাদের নির্দিষ্ট আবেদন ফরম সংগ্রহ করে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রুম নম্বর ১২৩ (ব্লক-বি) বরাবর পাঠাতে বলা হয়েছে। এছাড়া এই সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আবেদন ফরম স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক ওয়েবসাইটেও সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।কমিটির সম্মানিত সভাপতি প্রফেসর ডা. মুজিবুর রহমান হাওলাদার তার কার্যালয়ে একান্ত আলাপকালে জানান যে, মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন অনুযায়ী তারা বর্তমানে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। এই আইনের আওতায় কিডনি, হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, অন্ত্র, লিভার বা যকৃত, অগ্ন্যাশয়, অস্থি, অস্থিমজ্জা, চক্ষু, চর্ম, টিস্যু এবং জরায়ুসহ মোট ১২ ধরনেরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আইন বাস্তবায়নের পর ইতিমধ্যে কমিটি বেশ কয়েকটি সফল বৈঠক সম্পন্ন করেছে।নিয়ম অনুযায়ী, কিডনিসহ যেকোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দানে সরকার নির্ধারিত নির্দিষ্ট আবেদন ফরম যথাযথভাবে পূরণ করে জমা দিতে হয়। এরপর প্রাথমিক পর্যায়ে আবেদনপত্রগুলোর কাগজপত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়। প্রাথমিক যাচাই শেষে আবেদন ফরম কমিটির সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং নিঃস্বার্থ দাতা ও গ্রহীতা উভয়কেই সশরীরে কমিটির সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেখানে তাদের উভয়ের কাছ থেকে বিস্তারিত সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া সন্তোষজনক প্রমাণিত হলেই কেবল আবেদনটি গ্রহণ করে পরবর্তী আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আর যদি সাক্ষ্য সন্তোষজনক না হয়, তবে আবেদনটি সরাসরি বাতিল করা হয় কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে সংশোধনের জন্য লিখিতভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়।আবেদনের সত্যতা এবং দাতা-গ্রহীতার দেওয়া তথ্য কতটা নির্ভুল তা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত কঠোর তদন্তের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও পুলিশের দেওয়া গোপন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংগৃহীত আবেদনপত্রগুলো নিয়ে পরবর্তীতে পুনরায় বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গ্রামপর্যায়ে পুলিশের বিশেষ তদন্ত টিমের চৌকস কর্মকর্তারা সরাসরি সরজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানকারী দাতা ও গ্রহীতার পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত অনুসন্ধান ও খোঁজখবর নেন।কিডনি দানে গোপনে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা কড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হয়। ঠিক কী কারণে দাতা নিজের অমূল্য অঙ্গটি অন্য কাউকে দিতে চাচ্ছেন, তার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে তদন্তকারী দলকে দ্রুত কমিটির বরাবর প্রতিবেদন পাঠাতে হয়। শুধু তাই নয়, দাতা কিংবা গ্রহীতা কোনো ধরনের মাদকাসক্ত কি না, সেটিও ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। দীর্ঘ ও জটিল এই পরীক্ষার প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হওয়ার পরই কেবল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানে চূড়ান্ত অনুমতি দেওয়া হয়।চূড়ান্ত অনুমোদনের পর তারা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সরকারের তরফ থেকে অনুমোদিত যেকোনো ভালো হাসপাতালে গিয়ে নিরাপদভাবে অঙ্গ দান করতে পারেন। বর্তমানে এই ৭ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটির কাছে পাঠানো বিভিন্ন আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করে শতাধিক ব্যক্তির কিডনি দানের আইনগত অনুমতি প্রদান করা হয়েছে এবং আরও বহু আবেদন বর্তমানে অনুমোদনের প্রক্রিয়ধীন রয়েছে। এর বাইরেও একাডেমি ও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে ছয় শতাধিক সফল কিডনি দান কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।জাতীয় সংসদের পাসকৃত আইন এবং গত ১০ এপ্রিল প্রকাশিত গেজেটে দাতা হওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী নিকটাত্মীয় যেমন পিতা, মাতা, পুত্র, কন্যা, ভাই, বোন, স্বামী, স্ত্রী এবং রক্তের সম্পর্কের আপন চাচা, ফুফু, মামা, খালা, নানা, নানি, দাদা, দাদি, নাতি, নাতনি, আপন চাচাতো, মামাতো, ফুফুতো, খালাতো ভাই বা বোন, ভাতিজা, ভাতিজি, ভাগ্নে, ভাগ্নী এবং সৎ ভাই বা বোন অঙ্গ দান করতে পারবেন।পাশাপাশি আইনের বিধান অনুযায়ী 'নিঃস্বার্থবাদী দাতা' হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি রক্ত বা জন্মসূত্রে কোনো নিকটাত্মীয় না হওয়া সত্ত্বেও গ্রহীতার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক বা পরিচয়ের জেরে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে নিজের শরীরের কোনো অঙ্গ গ্রহীতাকে দান করার মহান সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তবে চাইলেই যেকোনো হাসপাতাল যত্রতত্র অঙ্গ সংযোজন করতে পারবে না। সরকার কর্তৃক সুনির্দিষ্ট অনুমতি গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন করা সম্ভব।কোনো হাসপাতাল মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন করতে ইচ্ছুক হলে তাদেরকে যথাযথ বিধিমালা ও শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সরকারের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করতে হয়। সরকারের তরফ থেকে সেই আবেদন বাধ্যতামূলকভাবে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার আইনি বিধান রয়েছে।অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দাতা হিসেবে উপযুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট বয়স ও স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ব্রেইন ডেথ বা মৃত ঘোষিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ক্যাডাভেরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহের বয়সসীমা ২ বছর থেকে ৭০ বছরের মধ্যে হতে হবে। আর জীবিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে দাতার বয়স ১৮ বছর থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে হওয়া আবশ্যক। তবে বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজনে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পরামর্শে দাতার বয়সসীমা কিছুটা শিথিলযোগ্য করা যেতে পারে।ব্যক্তির মৃত্যুর আগে যদি তার পক্ষ থেকে অঙ্গ দানে কোনো ধরনের লিখিত আপত্তি না থাকে এবং সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা কোনো কারণে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা না থাকে, তবেই তা বিবেচনা করা হয়। দাতার চক্ষু, অস্থিমজ্জা ও লিভার বা যকৃত প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্র ব্যতিরেকে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে অবশ্যই এইচবিএসএজি, অ্যান্টি এইচসিভি কিংবা এইচআইভি পজিটিভ থাকা চলবে না।এছাড়াও কোনো মেডিকেল বোর্ড কর্তৃক যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানে সম্পূর্ণ অযোগ্য বলে ঘোষণা করা না হয়ে থাকে, তবেই তিনি দাতা হিসেবে বিবেচিত হবেন। পক্ষান্তরে, কোনো ব্যক্তি যদি মাদকাসক্ত হন, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য বা আর্থিক প্রলোভনে পড়ে অঙ্গ দানে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, কিংবা এমন কোনো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত থাকেন যা তাকে সাধারণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দাতা হিসেবে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত করে তোলে, তবে তাকে দাতা হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে।নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শুধুমাত্র জাতীয় কমিটিই নয়, বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিটি হাসপাতালেও একটি করে বিশেষ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ওই মেডিকেল বোর্ডে অধ্যাপক পদমর্যাদার একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও একজন সার্জারি বিশেষজ্ঞসহ অন্তত দুজন এবং ন্যূনতম সহযোগী অধ্যাপক পদমর্যাদার একজন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ও একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ বাধ্যতামূলকভাবে থাকবেন। প্রয়োজনে এই বোর্ড আরও তিনজন সহযোগী অধ্যাপক পদমর্যাদার চিকিৎসককে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।এই মেডিকেল বোর্ডের মূল কার্যকারিতা হলো রোগীর শরীরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করা। এছাড়া ব্রেইন ডেথ ঘোষিত ব্যক্তির দেহ থেকে নিরাপদে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহ এবং তা জীবিত দেহে সফলভাবে সংযোজনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই বোর্ডই গ্রহণ করবে। চিকিৎসকদের অত্যন্ত কঠোর এই নিয়মগুলো মেনেই এখন থেকে দেশের যেকোনো প্রান্তে মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান ও সংযোজন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।এই সংক্রান্ত সমস্ত নির্দেশনা দেশের সকল হাসপাতালে কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণায়ের সেবা বিভাগ থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে; যার অনুলিপি সকল হাসপাতাল, জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনদের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
৪ ঘন্টা আগে

পুলিশের ৬ হাজার ৫৩৯ পরিদর্শকের বিষয়ে গোপন তদন্ত শুরু

পুলিশের ৬ হাজার ৫৩৯ পরিদর্শকের বিষয়ে গোপন তদন্ত শুরু

ভৈরব থেকে মাটি পাচারের সময় জাহাজ জব্দ

ভৈরব থেকে মাটি পাচারের সময় জাহাজ জব্দ

চার দপ্তরের দায়িত্বে এক ইউএনও, সেবা প্রার্থীদের ভোগান্তি

চার দপ্তরের দায়িত্বে এক ইউএনও, সেবা প্রার্থীদের ভোগান্তি

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩০ প্যাকেট দুধ চুরি, দুই যুবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩০ প্যাকেট দুধ চুরি, দুই যুবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ

উত্তরবঙ্গের ভাগ্য বদলে শুরু হলো তিস্তা মহাপরিকল্পনার কার্যক্রম

উত্তরবঙ্গের ভাগ্য বদলে শুরু হলো তিস্তা মহাপরিকল্পনার কার্যক্রম

মাগুরায় ৫০৬ কোটি টাকার অবাস্তব বিদ্যুৎ বিল

মাগুরায় ৫০৬ কোটি টাকার অবাস্তব বিদ্যুৎ বিল

সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব তলব বিএফআইইউর

সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব তলব বিএফআইইউর

‘বিএনপিকে হেয় করতে সারের কৃত্রিম সংকট বানিয়ে আন্দোলন’- প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম

‘বিএনপিকে হেয় করতে সারের কৃত্রিম সংকট বানিয়ে আন্দোলন’- প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম

মাঝ আকাশে পাইলটদের মারামারি, গন্তব্য বদলাল বিমান

মাঝ আকাশে পাইলটদের মারামারি, গন্তব্য বদলাল বিমান

ময়মনসিংহে নাগরিকদের মুখোমুখি সিটি প্রশাসক : আধুনিক নগর গড়ার প্রতিশ্রুতি

ময়মনসিংহে নাগরিকদের মুখোমুখি সিটি প্রশাসক : আধুনিক নগর গড়ার প্রতিশ্রুতি

মতামতমতামত

আইনশৃঙ্খলার লাগাম কার হাতে?

ক্ষোভ সামলে রাখা কঠিন। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়, “দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি।” দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখলে সত্যিই প্রশ্ন জাগে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার মন্ত্রণালয় কি যথাযথভাবে কাজ করছে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কোথায়? অন্যায় যখন প্রকাশ্যেই ঘটে, তখন পুলিশ কেন অনেক সময় দর্শকের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে থাকে?মিরপুরে সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিয়ে লুটপাট চালিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এর নেপথ্যে ছিল রাজনৈতিক প্রভাব ও জমি দখলের স্বার্থ। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি জানত, তারপরও কেন কার্যকর প্রতিরোধ দেখা গেল না, সেটি তদন্ত করে জনগণের সামনে পরিষ্কার করা জরুরি।ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে একই ধরনের আরেকটি ঘটনা সামনে এসেছে। এবার লক্ষ্য একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অভিযোগের কেন্দ্রে আবারও জমি দখলের স্বার্থ। প্রশ্ন তাই সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছেই; আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাদের হাত-পা বাঁধা?দেশের মানুষ এমন বাংলাদেশ চায় না, যেখানে জমি দখল, হামলা, লুটপাট কিংবা ভয় দেখানো একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ক্ষমতার প্রদর্শনী হয়ে উঠবে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অতীতের দলীয় পদ-পদবির প্রভাব থাকার অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। কেউ বর্তমানে পদে নেই, কিন্তু ‘সাবেক’ পরিচয়টুকুই যদি এলাকায় প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সেটিও রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য অস্বস্তিকর প্রশ্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার কাছে তাই প্রথম প্রশ্নটি আইনশৃঙ্খলা নিয়ে, দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক শৃঙ্খলা নিয়ে।যেসব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যকর কমিটি নেই, সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই কিংবা একই এলাকায় একাধিক গোষ্ঠী নিজেদের আলাদা নেতৃত্ব দাবি করে, সেখানেই তৈরি হয় নিয়ন্ত্রণের সংকট। একই এলাকায় কেউ নিজেকে মূল নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করছে, অন্য কেউ পুরোনো পদ-পদবির পরিচয়ে প্রভাব দেখাচ্ছে, আবার আরেকটি পক্ষ নিজেদের আলাদা বলয় তৈরি করছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কে কার কথা শুনবে, সেটিই অনেক সময় পরিষ্কার থাকে না।এই সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার দায় শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও এর দায় নিতে হবে। সংগঠনগুলোকে নিয়মিত কমিটির আওতায় আনতে হবে, সাংগঠনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে, রাজনীতির পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধে জড়ালে তার বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনগত ব্যবস্থা হবে। পদ কোনো অপরাধের লাইসেন্স নয়।একই সঙ্গে পদ-পদবি ঘিরে আর্থিক লেনদেন, প্রভাব বিস্তার কিংবা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করার উদ্যোগও জরুরি। রাজনৈতিক সংগঠনে পদ মানে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ নয়; বরং দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি।এর পরের এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি পুলিশের। একটি থানার আওতায় যদি একাধিক রাজনৈতিক বলয় সক্রিয় থাকে, তাহলে পুলিশ সদস্যদের ওপরও নানা দিক থেকে চাপ তৈরি হয়। এক পক্ষের সঙ্গে কথা বললে অন্য পক্ষ অসন্তুষ্ট হয়; একজনের অভিযোগ আমলে নিলে আরেকজন রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত একজন পুলিশ সদস্য যদি মনে করেন, আইন প্রয়োগের আগে তাকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবতে হবে, তাহলে আইনের শাসন দুর্বল হওয়াই স্বাভাবিক।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এখানেই আপনার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।পুলিশকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে; অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয়, পদ-পদবি কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধির অনুমোদন নিয়ে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি চলতে পারে না। পুলিশের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একটি স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামো থাকা দরকার, যাতে থানার কার্যক্রমে অযাচিত চাপ তৈরি না হয়।পুলিশকে আইনের অধীনে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে, আবার সেই স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ অন্যায় করলে তারও ব্যবস্থা হবে; কিন্তু রাজনৈতিক চাপে পুলিশ যেন আইন প্রয়োগ থেকে পিছিয়ে না যায়; এই নিশ্চয়তাও রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শুধু থানার সমস্যা নয়। এটি মানুষের নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার, ব্যবসার পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। রাতের আঁধারে জমি দখল, দিনের আলোয় লুটপাট কিংবা প্রকাশ্যে ত্রাস; এসব কোনো স্বাভাবিক সমাজের চিত্র হতে পারে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে; এ কথা বলার সময় হয়তো আসেনি। কিন্তু পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেই দায়িত্ব এখনই নিতে হবে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার হাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ; রাজনৈতিক পেশিশক্তির লাগাম টানা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের পেশাগত ভূমিকা পালনের যথাযথ পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া। দেশের মানুষ কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়। যারা অন্যায় করছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়; অপরাধটাই যেন তাদের পরিচয় হয়। আর যারা আইন রক্ষা করবে, তারা যেন রাজনৈতিক অসন্তোষের ভয়ে আইন প্রয়োগ থেকে পিছিয়ে না যায়।এখন প্রশ্ন একটাই; সরকার কি সত্যিই পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে চায়? তা হলে সময় এখনও আছে। দরকার শুধু দৃঢ় সিদ্ধান্ত, স্পষ্ট নির্দেশনা এবং তার বাস্তব প্রয়োগ।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক সভাপতি, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব]

সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থান: বিশ্বকে বাংলাদেশের সতর্কবার্তা

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এখন আর ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়। এটি ইতোমধ্যে উপকূলীয় জনপদ, দ্বীপরাষ্ট্র ও নিম্নভূমির মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলছে। জাতিসংঘও বিষয়টিকে বৈশ্বিক উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করে ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করে।জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৪-এ অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বাস্তবতা তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-যে সংকটের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর দায় তুলনামূলকভাবে কম, সেই সংকট মোকাবিলার ব্যয় ও দায়িত্বও কি তাদের একার হবে?বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। নদী, বদ্বীপ ও সমুদ্রঘেরা এই দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে শুধু কিছু জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই তৈরি হয় না, এর সঙ্গে যুক্ত হয় লবণাক্ততার বিস্তার, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতি, সুপেয় পানির সংকট, ঘরবাড়ি হারানো এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির মতো নানা সমস্যা। জাতিসংঘের ভাষ্যেও উঠে এসেছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আবাসন, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং জীবিকার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে চারটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন-বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমানো, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। এসব প্রস্তাবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অভিযোজনের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্নটি। এখানেই বাংলাদেশের অবস্থানটি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।  বাংলাদেশ একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রস্তুতি, উপকূল সুরক্ষা এবং বন ও জলাভূমি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে তুলে ধরেছেন।অন্যদিকে দেশটি মনে করিয়ে দিয়েছে, জাতীয় উদ্যোগের পাশাপাশি বৈশ্বিক সহযোগিতার বিকল্প নেই। জাতিসংঘের এই বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে না দেখে উন্নয়ন, অর্থনীতি, মানবিক নিরাপত্তা ও বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত একটি বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের উদ্দেশ্যও ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সক্রিয় করা এবং সমন্বিত ও অর্থায়নসমৃদ্ধ পদক্ষেপের দিকে এগিয়ে যাওয়া। বৈঠকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক ঘোষণাও গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তাই নিউইয়র্কের এই বক্তব্য কেবল একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেওয়া আরেকটি জলবায়ু বক্তৃতা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের উপকূল, নদী, কৃষি, মানুষের বসতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাবি উত্থাপনের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও অভিযোজন, দুর্যোগ প্রস্তুতি, পরিকল্পিত নগরায়ণ, উপকূলীয় অবকাঠামো এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের মতো বিষয়গুলোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করা জরুরি।সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ছে-এ বাস্তবতা কোনো একটি দেশের সীমান্তে থেমে থাকে না। জাতিসংঘের আলোচনাতেও উঠে এসেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব বন্দর, সরবরাহব্যবস্থা, খাদ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির ওপরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক আলোচনায় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই আলোচনার সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াই শেষ পর্যন্ত শুধু সমুদ্রকে ঠেকানোর লড়াই নয়-এটি মানুষের বসতি, জীবিকা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই।লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন।

রাজবন্দী: একসময়ের সহযোদ্ধারা কি চেয়ে চেয়ে দেখবে?

রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সাথে যোগাযোগ বা সংযোগ না থাকায় রাজনৈতিক নেতাদের সাথে স্বল্প সময়ের জন্য সামাজিক অনুষ্ঠানাদি ছাড়া খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় পর বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের সাথে একান্তে গল্প করার সুযোগ হয়েছিল। সাইফুল হকের কলেজ জীবন খুলনায়, দৌলতপুর বি.এল. কলেজে। আমারও তাই। উপরন্তু তিনি আমার ছোট ভাইয়ের বন্ধু ও সহপাঠী ছিলেন। আর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি প্রথমে ছাত্র ঐক্য ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক ও পরে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্র ঐক্য ফোরাম এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে ছিল। সাইফুল হক তখন ছাত্র আন্দোলন থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিলেও সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সেই কর্মযজ্ঞে তার অনানুষ্ঠানিক উপস্থিতি থাকতো। ছোট ভাইয়ের বন্ধু হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তার সাথে ঘনিষ্ঠতা ছিল।যাহোক, সাইফুল হককে একান্তে পেয়ে নানা বিষয় আলোচনার মাঝে আমার মনে যে প্রশ্ন অনেকদিন যাবৎ ঘুরপাক খাচ্ছে, তাকে সে প্রশ্নটা করলাম। বললাম, আপনারা বামপন্থীরা, বিশেষত আপনাদের দল, কেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, যার সাথে দীর্ঘকাল একসাথে দল করেছেন, পথ হেঁটেছেন, সেই মেনন ভাইয়ের মুক্তি দাবি করছেন না? অন্তত জামিনের অধিকার তো তার রয়েছে? তিনি তো রাজনৈতিক বন্দী। সাইফুল হক আমার প্রশ্নে বিব্রত বোধ করলেন। তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বললেন, ‘আপনার প্রস্তাব আমাদের পার্টি ফোরামের পরবর্তী সভায় উত্থাপন করবো’। বিএনপি নেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সময়ে মেনন ভাইদের সাথে ছিলেন। ছাত্র মৈত্রীর নেতা ও আমাদের সহযোদ্ধা ছিলেন। তার এবং আমার স্কুল ও কলেজ জীবন খুলনা সেন্ট যোসেফ’স স্কুল এবং বিএল কলেজ। তিনি বিএল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার সাথেও সাম্প্রতিক সময়ে স্বল্প সময়ের জন‍্য একদিন দেখা হয়েছিলো। তাকেও অনুরোধ করলাম মেনন ভাইয়ের জামিনের জন‍্য কিছু করেন। যদি তাও না পারেন এই বয়সের প্রবীণ ও অসুস্থ রাজনীতিককে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসার সুযোগ নেওয়ার ব‍্যবস্থাটা করে দিন। দু’মাসেরও বেশী সময় পার হয়েছে। কিছুই তো হলো না।ইউনূসের শিশু-কিশোর-তরুণ বাহিনী প্রবীণ রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেননের রাজনৈতিক জীবনের ইতিকথা নাও জানতে পারে। কিন্তু এদেশের রাজনৈতিক দলসমূহ, নাগরিক সমাজ, এমনকি শাসক দল বিএনপির নীতি নির্ধারকদের কারোরই তো অজানা থাকার কথা নয়। রাশেদ খান মেনন ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। তিনি ১৯৬৩-৬৪ বর্ষে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন এবং ৬৪-৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কুখ্যাত মোনেম খানের আগমনের বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন ও পরে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ঐ বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হলে জেল থেকে এম.এ. পরীক্ষা দেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সংগঠনেও তিনি জেল অভ‍্যন্তরে থেকে এবং মুক্তি লাভের পরেও ভূমিকা রাখেন। তিনি প্রথাগত চীনপন্থী রাজনীতি পরিত্যাগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।রাজনৈতিক জীবনে মেনন অসংখ্যবার কারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৬২ সালে নিরাপত্তা আইনে প্রথম কারাবন্দি হওয়ার পর ’৬৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন মেয়াদে নিরাপত্তা আইন, দেশরক্ষা আইন ও বিভিন্ন মামলায় কারাবরণ করেন। ৭০ সালের এক রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার আমলে তার অনুপস্থিতিতে তাকে সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও সম্পত্তির ষাট ভাগ বাজেয়াপ্তের দণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছিল। স্বাধীন দেশে সামরিক শাসনবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং এ সময়েও কারারুদ্ধ হয়েছিলেন।রাশেদ খান মেনন দেশের বাম আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ও তার দলের বিভক্তির ঝুঁকি নিয়ে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে শরিক হন। ভুল হোক, শুদ্ধ হোক, এটা তার ও দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্তকে ভুল, সুবিধাবাদী, পদস্খলন নানা ভাষায় আক্রমণ করা যেতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই এটা ফৌজদারি অপরাধ নয়। আর ২০২৪ সালের মন্ত্রিসভায়ও তিনি ছিলেন না, সরকারের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল না। তবে সংসদীয় রাজনীতির মোহ তাকে পেয়ে বসেছিল। শেখ হাসিনা তাকে ২০২৪-এর নির্বাচনে জোট প্রার্থী করতে চাচ্ছিলেন না। তার সামনে সহজ সুযোগ এসেছিল, বিতর্কিত নির্বাচন থেকে দূরে থাকার। তার বয়স, শরীর, স্বাস্থ্যও কিন্তু একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অনুকূল ছিল না। জোট রাজনীতিতে অনেক সময় অপছন্দের বিষয়ও মেনে নিতে হয়। কিন্তু অপছন্দ থেকে দূরে থাকার নিশ্চিত সুযোগ তিনি হেলায় হারালেন। বরং অনেক অনুনয়-বিনয় করে নিজের ও দলের মর্যাদা খাটো করে নির্বাচনের টিকেট নিলেন। এসবই রাজনৈতিক বিচ্যুতি হতে পারে, ফৌজদারি অপরাধ নয়।জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন করা মানে যেমন বেহেশতের টিকেট নিশ্চিত করা নয়, তেমনি এ আন্দোলন নিয়ে বা আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে দ্বিমত বা রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত থাকলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। মেনন ভাই টকশোগুলোতে ছাত্রদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি, চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিরোধিতা করেছেন। এটাও তো কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামাত ও জঙ্গিবাদের কঠোর সমালোচনা করতেন — এটাও তো ফৌজদারি অপরাধ নয়। আর ইউনূস থেকে শুরু করে জামাত, এনসিপি এবং আমরা সাধারণ নাগরিক সবাই জানি ও বুঝি যে তার নামে যে খুনের মামলাগুলি দেয়া হয়েছে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং হাস্যকরও বটে।আওয়ামী শাসনামলে তাদের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটকে নিষ্ক্রিয় রেখে বিতর্কিত নির্বাচনের সময়গুলোতে এবং বিরোধী আন্দোলনের সময়ে সক্রিয় করা হতো। জুলাই আন্দোলনের সময়েও কিছুটা সক্রিয় করা হয়। তবে মিডিয়াতে বিরোধী দল ও জামায়াত-শিবিরকে সমালোচনা করা ছাড়া জোট নেতাদের বিশেষ করণীয় ছিল না। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই বিকেলে গণভবনে ১৪ দলের বৈঠক ডাকেন। প্রবীণ রাজনীতিক মেনন ভাই ততদিনে পরিণতি বুঝে গেছেন। আমার জানামতে তিনি ঐ সভায় যেতে আগ্রহী ছিলেন না। শরীর ভালো নেই, বাইরে রাস্তার অবস্থাও ভালো নয় — এ যুক্তি দিয়ে এড়িয়ে যেতে চাইছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনী পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। আর যেতে মন না চাইলেও এত দীর্ঘ সময় শাসক দলের সঙ্গে থেকে সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পরে ঐ বিপদের সময়ে না যাওয়াটাও মানায় না।সভার পরে টেলিভিশনের সংবাদে আমরা শুনলাম, ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াত ও শিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একপাশে মেনন ভাই ও অন্য পাশে ইনু ভাইকে রেখে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ ঘোষণা দিলেন। সবার মনে প্রশ্ন জাগলো, ১৪ দল জামাত-শিবিরকে কিভাবে নিষিদ্ধ করে? তারা প্রস্তাব করতে পারে বা সরকারকে সুপারিশ করতে পারে। আর এত বছর পর এখন কেন এই সিদ্ধান্ত! যাহোক, দুই দিন ১৪ দলের নামে প্রচার করে ১ আগস্ট জামাত-শিবির নিষিদ্ধের সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হয়, যা কার্যত বুমেরাং হয়। কারণ ইতোমধ্যে পর্দার অন্তরালের খেলায় শেখ হাসিনা বা সরকার ব্যাকফুটে চলে যায়। ফলে নিষিদ্ধের ঘোষণায় জামাত-শিবির আরও শক্তিশালী ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।সরকার পতনের পরে ইউনূস আমলের শুরুতেই রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দুজনকেই একাধিক খুনের মামলার আসামি করা হয়। পরবর্তীতে জুলাই হত্যাকাণ্ডের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলছে। ইনু ভাইকে তো ইতিমধ্যে সাজাও দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে তারা আজ বন্দী।মেনন ভাই, ইনু ভাইয়ের কথা আলাদাভাবে লিখলাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে, বিশেষত সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের ছাত্র কর্মী হিসেবে তাদের সাথে সখ্য গড়ে উঠেছিল বলে। অবশ্য মেনন ভাইয়ের সাথে আরও আগে থেকে। আমার স্কুল-কলেজ জীবনের কিছু বন্ধু বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলেন। খুলনায় তৎকালীন ‘মেনন গ্রুপের’ যোগাযোগ ও আড্ডার জায়গা ছিলো ‘তৃপ্তি নিলয়’। আর পাশেই ‘ইস্টার্ন প্রেস’ ছিলো ‘মতিয়া গ্রুপের’ যোগাযোগ কেন্দ্র। আমি প্রায়ই তৃপ্তি নিলয়ে যেতাম ‘দেশব্রতী’ পত্রিকার খোঁজে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আমার ছোট চাচা লিয়াকত হোসেন ভাসানী ন‍্যাপের খুলনার নেতা হওয়ায় তৃপ্তি নিলয়ের আড্ডার সবাই আমাকে বিশেষ স্নেহের সঙ্গে দেখতেন। ১৯৭২ সালে ঢাকা আসার পর আমি মাঝেমধ্যে বন্ধুদের সাথে ওদের পার্টি অফিসে যেতাম। সেখানেই মেনন ভাইয়ের সাথে পরিচয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর হল ছাড়তে বাধ্য হলে আমি বেশকিছু দিন শহীদুল্লাহ হলে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃস্থানীয় ও গণসংগীত শিল্পী প্রয়াত ফকির আলমগীর এবং আমার বন্ধু আব্দুল্লাহ হিল বাকির রুমে থাকতাম। তখনও ওদের সাথে মেনন ভাইয়ের কাছে যেতাম। বিউটি ভাবী, মেনন ভাইয়ের আজিমপুরের আবাস স্থলেও আমি কয়েকবার গিয়েছি। মস্কোতেও বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি অনুষ্ঠানে এবং প‍্যাট্রিস লুবুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমাবেশে মেনন ভাইয়ের সাথে একই মঞ্চে অংশ নেয়ার সুযোগ হয়েছে। এরপর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময়ে তো অসংখ্যবার মেনন ভাইয়ের সাথে কথা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে।রাজনীতিক হাসানুল হক ইনু নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রলীগের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি ১৯৬৯ এর গনঅভ‍্যুত্থানে অংশ নেন। রাজনীতির ঝড়ো হাওয়ায় নিজের খেলোয়াড়ি জীবন এবং পেশাদার প্রকৌশলী হওয়ার পারিবারিক আকাঙ্ক্ষা ত‍্যাগ করে রাজনীতিতেই বাঁধা পড়েন। আর ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের এই রক্ষণভাগের খেলোয়াড় (গোলরক্ষক ) রাজনীতির মাঠে সবসময় আক্রমণভাগে খেলতে পছন্দ করতেন। ইনু ভাইয়ের সাথেও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু সেরকম ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি। ইনু ভাইরা আমাকে নরমপন্থী ছাত্র নেতা মনে করতেন। ওনাদের ছাত্র সংগঠনের সাথে আমাদের আন্দোলনের গতিপথ, কৌশল ও কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক লেগেই থাকতো এবং এক পর্যায়ে হলে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ধরনের সংঘাতও হয়েছিল। সে সংঘাতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ-বহির্ভূত ২/১টি সংগঠনও তাদের পক্ষ নিয়ে মিলিতভাবে আমাদের শান্তিপূর্ণ এক মিছিলে আক্রমণ করলে, গুলি বর্ষণ করলে আমাদের এক কর্মী নিহত হয়। সে কারণে ইনু ভাইরা কোনো দিন দুঃখ প্রকাশও করেনি। এর প্রতিক্রিয়ায় আমাদের কিছু উত্তেজিত কর্মী শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে ইনু ভাইকে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় আমরা ও রাজনৈতিক নেতারা দ্রুত জাসদ অফিসে যেয়ে দুঃখ প্রকাশ করি। যা হোক, এরপরে তো আমি ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নেই।তারও ছয় বছর পরে আমি চাকরিতে যোগদান করার ৫/৬ মাসের মধ্যেই ইনু ভাইয়ের সাথে দেখা আমার কর্মস্থলে। উনি ঐ একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ওনাদের এক প্রাক্তন সহকর্মী ও প্রাক্তন সংসদ সদস্যের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। আমাকে দেখে হাসিমুখে বললেন, আপনি এখানে কী করেন? আমি বললাম, আমি তো এই প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগ দিয়েছি। ইনু ভাইয়ের মুখটা মলিন হয়ে গেলো এবং এক দৃষ্টিতে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে হতাশার সুরে বললেন, ‘আপনারা এভাবে রাজনীতি থেকে সরে গেলে আমরা আর কিভাবে এগোবো! সমস্যা থাকলে তো আমাদের সাথেও আলাপ করতে পারতেন। আমরাও তো পর নই।’ এর পরে এ পর্যন্ত আর কখনো ইনু ভাইয়ের সাথে দেখা হয়নি। কিন্তু সেদিনের তার চাহনির মাঝে যে আকুতি — যাতে রাজনীতি ছেড়ে না যাই, আমার রাজনৈতিক জীবনের প্রতি তার যে সম্মানবোধ —তা আজও ভুলি নি। আমি সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে আসায় আমার এক সহোদর আর বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান দুদু ছাড়া আর কেউ এরকম প্রতিক্রিয়া অন্তত আমার সামনে প্রকাশ করেন নি। ইতিপূর্বে জিয়া আমলে হাসানুল হক ইনু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা পেলেও সাড়ে চার বছরের মধ্যেই মুক্তি পান। কারাবন্দী কিংবা আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হওয়া আরো অনেকের সাথেই তো রয়েছে রাজনৈতিক সংগ্রামের নানা স্মৃতি যা স্বল্প পরিসরের এ লেখায় উল্লেখ করা সম্ভব হলো না।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে উল্লেখ করেছে, ‘হাসানুল হক ইনু নিজে কাউকে হত্যা করেছেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব বা অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করেননি।’ রায়ে বলা হয়েছে, ‘ইনুর উপস্থিতিতে কোনো ফৌজদারি অপরাধ (ক্রিমিনাল অফেন্স) ঘটেনি’। তাহলে আশি ছুঁইছুঁই বছরের মুক্তিযোদ্ধা ইনুকে কেনো সাজা? তিনি রাজনৈতিকভাবে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচির বিরোধী ছিলেন এবং কঠোরভাবে তার সমালোচনা করতেন। আর জামায়াত ইসলামকে নিষিদ্ধ করার দাবি তো দেশের সংবিধানই তাকে দিয়ে রেখেছে। কী আছে আমাদের সংবিধানে? এটাই আছে যে, মুক্তিযুদ্ধ হলো ‘একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, রাজাকার, আলবদর এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ’। তাই মুক্তিযোদ্ধা হাসানুল হক ইনু হানাদার বাহিনীর সহযোগীদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবি করতেই পারেন। তবে কোটা-বিরোধী ন্যায্য আন্দোলনের সময়ে এ দাবি উত্থাপন কতটা যুক্তিযুক্ত ছিলো, সে আলোচনা ভিন্ন। পূর্ণাঙ্গ রায় পড়ে এটাই মনে হয়েছে, রাজনৈতিক কারণেই তাকে দণ্ড দেয়া হয়েছে।বাংলাদেশে তো দীর্ঘকাল যাবত ‘রাজবন্দী’ কথাটার কোনো অস্তিত্ব নেই। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের শাসনকালে রাজনৈতিক কারণে যাদের আটক করা হতো, তাদেরকে কারাগারে রাজবন্দী হিসেবে পৃথক কার্ড ও মর্যাদা দেয়া হত। কিন্তু বাংলাদেশে প্রায় সব সরকারের আমলেই কম আর বেশি রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলক, গায়েবি ও মিথ্যা মামলা দেওয়ার অপসংস্কৃতি চলে আসছে। জুলাইয়ের গল্পে তো বলা হয়েছিলো এ ধারার অবসান হবে। কিন্তু হলো কই? একই ধারা চলছে ভিন্ন রূপে, ভিন্ন ঢঙে। কাউকে ‘দোসর’ আখ্যায়িত করার কোনো রকম সুযোগ থাকলেই, তার বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছে খুনের মামলা।‘রাজবন্দীর চিঠি’ গল্পের এক জায়গায় কবি নজরুল বন্দী জীবনের পরিস্থিতি কবিতা আকারে ব্যাখ্যা করে লিখেছেন: ‘অপমান কেনা শুধু! প্রাণ দিলে পায়ে দলে যাবে তোর প্রাণ! / শুধু অনাদর শুধু অবহেলা শুধু অপমান! / ভালোবাসা? সে শুধু কথার কথা রে!’ আমার মনে প্রায়শই প্রশ্ন জাগে, শুধু সাইফুল হকের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি নয়, সিপিবি, বাসদ, বাংলাদেশ জাসদ, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন কেন রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু সহ রাজবন্দীদের মুক্তির দাবি করছে না। তারা কি মেনন ভাই ও ইনু ভাইকে খুনী মনে করেন? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে কেনো ‘শুধু অনাদর শুধু অবহেলা শুধু অপমান!’। কেনো দীর্ঘ সময়ের রাজপথের সাথীদের কাছে ‘ ভালোবাসা? — সে শুধু কথার কথা রে!’রাজনৈতিক ভুলের শাস্তি তো রাজনৈতিকভাবে হয়। ব্যক্তিগত বা দলগত নৈতিক দায়ের শাস্তিও নিশ্চয়ই পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা খুনের মামলার আসামি সাজিয়ে দেয়া যায় না। এক সময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতাদের, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের বছরের পর বছর মিথ্যা মামলায় আটক রাখা হবে আর শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকায় একসময়ের সহযোদ্ধারা চেয়ে চেয়ে দেখবে? অনেক সময় পার হয়েছে, বাম গণতান্ত্রিক শক্তি আওয়াজ তুলুক — রাজবন্দীদের মুক্তি চাই। মুক্তি চাই।জানতে পারলাম, জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিনিধি সভায় উপস্থিত প্রতিনিধিদের উপর প্রথমে যুবদল মব হামলা করেছে এবং পরে পুলিশ এসে হামলাকারীদের সাথে মিলিতভাবে একে একে প্রতিনিধিদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের অপরাধ তারা ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়েছেন। শাসকদলের প্ল্যানে তো জয়বাংলা শ্লোগান নিষিদ্ধের কথা শোনা যায়নি। নাকি ‘জয় বাংলা’ শুধুমাত্র ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের’ জন‍্য বরাদ্দ! আর কেউ উচ্চারণ করতে পারবে না। কি জানি কি প্ল্যান!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

সময়ের অনন্ত ঋণ

মানুষের জীবনে কিছু বাক্য থাকে, যেগুলো উচ্চারিত হওয়ার মুহূর্তে সাধারণ মনে হলেও সময়ের দীর্ঘ পরিক্রমায় সেগুলোই একদিন আত্মজিজ্ঞাসার আয়না হয়ে দাঁড়ায়। জীবনের এক পর্যায়ে উপলব্ধি হয়—আমরা আসলে সময়কে ব্যয় করি না; সময়ই আমাদের জীবনকে ধীরে ধীরে ব্যয় করে। প্রতিটি সূর্যোদয় আমাদের আয়ু থেকে একটি দিন সরিয়ে নেয়, প্রতিটি সূর্যাস্ত আমাদের অস্তিত্বের ভাণ্ডার থেকে একটি সম্ভাবনা মুছে দেয়। অথচ আমরা নির্বিকারভাবে ভাবি—সময় তো এখনো অনেক বাকি।ঘুম মানুষের জৈবিক অস্তিত্বের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নিদ্রা শরীরকে পুনর্গঠিত করে, মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়, ক্লান্ত সত্তাকে পুনরায় কর্মক্ষম করে। কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিদ্রা যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন বিশ্রাম আর পুনর্গঠনের মাধ্যম থাকে না; তা হয়ে ওঠে সময়ের নীরব অপহরণ। সমস্যা ঘুমে নয়, সমস্যাটি অতিরিক্ততায়; বিশ্রামে নয়, অচেতন অভ্যাসে।ধরা যাক, একজন মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় প্রতিদিন মাত্র দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুমিয়ে কাটালেন। দুই ঘণ্টা শুনতে সামান্য; কিন্তু জীবন কখনো একক মুহূর্তের হিসাব নেয় না, সে সমষ্টির নির্মম অঙ্কে আমাদের সামনে আয়না ধরেছে। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুম মানে বছরে ৭৩০ ঘণ্টা। অর্থাৎ প্রায় ৩০ দিন ১০ ঘণ্টা। দশ বছরে ৭,৩০০ ঘণ্টা—প্রায় ৩০৪ দিন। আর ষাট বছরে এই অতিরিক্ত সময় দাঁড়ায় ৪৩,৮০০ ঘণ্টা, অর্থাৎ প্রায় ১,৮২৫ দিন—পূর্ণ পাঁচ বছর।ভাবুন, জীবনের পাঁচটি বছর যদি কেবল অতিরিক্ত নিদ্রার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে থাকে, তবে সেই পাঁচ বছর আসলে কত অদৃশ্য সম্ভাবনার সমাধি! পাঁচ বছরে একজন মানুষ অসংখ্য গ্রন্থ পাঠ করতে পারেন, নতুন কোনো ভাষা আয়ত্ত করতে পারেন, গবেষণা করতে পারেন, শিল্পচর্চা করতে পারেন, অসংখ্য মানুষের জীবন স্পর্শ করতে পারেন, অথবা নিজের ভেতরে এমন এক জ্ঞানলোক নির্মাণ করতে পারেন, যার আলো মৃত্যুর পরও অন্যের পথকে আলোকিত করবে।সময়ের অপচয় তাই নিছক কয়েকটি ঘণ্টার অপচয় নয়; এটি সম্ভাবনার অপমৃত্যু। যে মুহূর্তটি আমরা অবহেলায় বিসর্জন দিই, তার সঙ্গে কেবল বর্তমানটিই হারায় না—হারিয়ে যায় সেই মুহূর্ত থেকে জন্ম নিতে পারত এমন অসংখ্য ভবিষ্যৎ।মানুষের সবচেয়ে বিস্ময়কর আত্মপ্রবঞ্চনা হলো—সে নিজের মৃত্যুকে জানে, কিন্তু নিজের সময়ের সীমাবদ্ধতাকে অনুভব করে না। আমরা জানি জীবন অনিত্য, তবু আচরণ করি যেন আমাদের হাতে অনন্তকাল জমা আছে। আগামীকালকে আমরা এমন এক সম্পদ মনে করি, যার ওপর আমাদের অবিচ্ছেদ্য মালিকানা রয়েছে। অথচ আগামীকাল কখনো প্রতিশ্রুত নয়; প্রতিশ্রুত কেবল এই মুহূর্ত।সময়ের প্রকৃতি বড় নির্মম। সে কারও দুঃখে থামে না, কারও সাফল্যে দ্রুততর হয় না, কারও অনুতাপে ফিরে তাকায় না। রাজা ও ভিখারি, জ্ঞানী ও অজ্ঞ, সফল ও ব্যর্থ—সবার জন্য সময়ের প্রবাহ অভিন্ন। পার্থক্য শুধু এই যে, কেউ সময়ের স্রোতে নিজের অস্তিত্বের অর্থ নির্মাণ করে, আর কেউ সেই স্রোতের ভাসমান আবর্জনার মতো অচিহ্নিতভাবে বিলীন হয়ে যায়।আমরা প্রায়ই বলি, “সময় পাচ্ছি না।” প্রকৃত সত্য অনেক সময় আরও নির্মম—সময় নেই তা নয়, সময়ের যথার্থ বিন্যাস নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনন্ত বিচরণ, উদ্দেশ্যহীন আলাপ, অকারণ বিলম্ব, অতিরিক্ত নিদ্রা, অনিয়ন্ত্রিত বিনোদন—এসব আমাদের জীবন থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ কেটে নেয়। আশ্চর্য হলো, একটি দিন থেকে দশ মিনিট হারালে আমরা উদ্বিগ্ন হই না; কিন্তু সেই দশ মিনিটের পুনরাবৃত্তিই একদিন কয়েক মাস, কয়েক বছর হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়ায়।জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ অর্থের হিসাবের চেয়ে সময়ের হিসাব নিয়েই বেশি অনুতপ্ত হয়। তখন বোঝা যায়—যে অর্থ হারিয়েছিলাম, তা হয়তো আবার অর্জন করা সম্ভব ছিল; যে সুযোগ হারিয়েছিলাম, তা হয়তো আর ফিরে আসেনি; কিন্তু যে সময় চলে গেছে, তার কোনো পুনর্মুদ্রণ নেই।অতএব সময়কে মূল্য দেওয়া মানে সারাক্ষণ কর্মব্যস্ত থাকা নয়। সময়ের প্রতি শ্রদ্ধা মানে জীবনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। কখন বিশ্রাম প্রয়োজন, কখন অধ্যয়ন, কখন সৃজন, কখন নীরব আত্মসমীক্ষা এবং কখন মানুষের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে হবে—এই বোধই সময়জ্ঞান।মানুষের হাতে সময়কে বন্দী করার কোনো যন্ত্র নেই, অতীতকে পুনরুদ্ধারের কোনো মন্ত্র নেই। আছে কেবল বর্তমান। এই বর্তমানই ভবিষ্যতের অতীত হয়ে যাবে—মাত্র একটি মুহূর্তের ব্যবধানে।তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—“আমার হাতে কত সময় আছে?” বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—“যে সময়টুকু আমার হাতে আছে, তার কতটা আমি অর্থবহ করে তুলছি?”কারণ শেষ বিচারে জীবন দীর্ঘতার কাছে নয়, গভীরতার কাছে ঋণী। সময় একদিন আমাদের ছেড়ে যাবে—এটাই অনিবার্য। কিন্তু সময় চলে যাওয়ার আগে আমরা সময়ের মধ্যে কী রেখে যেতে পারলাম, সেটিই হয়ে থাকবে আমাদের অস্তিত্বের প্রকৃত স্বাক্ষর।সময়কে যে মানুষ কেবল অতিবাহিত হতে দেয়, সে বয়স পায়; আর যে মানুষ সময়কে অর্থ দেয়, সে উত্তরাধিকার রেখে যায়।[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

রোহিঙ্গা সংকট: প্রতিশ্রুতির বৃত্তে আটকে আছে প্রত্যাবাসন

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে দাঁড়িয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা শুনতে শুনতে বারবার মনে হচ্ছিল- কতবার একই প্রশ্ন উঠবে, আর কতবার তার উত্তর খুঁজতে হবে? বছরের পর বছর ধরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বনেতারা উদ্বেগ জানাচ্ছেন, মানবিক সহায়তার কথা বলছেন, মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু কক্সবাজারের ক্যাম্পে থাকা মানুষগুলোর জীবনে সেই আলোচনার প্রতিফলন কতটা পড়ছে?জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনেও রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পেয়েছে। এবারও সংকটটিকে গুরুতর মানবিক সংকট হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং এর স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। কিন্তু এবারের আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত নতুন করে সেই পুরোনো প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে আসা- সেটা হলো রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বাস্তব পথটি কোথায়? বাংলাদেশের অবস্থান এ ক্ষেত্রে পরিষ্কার। রোহিঙ্গা সংকটের জন্ম মিয়ানমারে, তাই এর স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারকেই ঘিরে হতে হবে।বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। একটি মানবিক বিপর্যয়ের সময় সীমান্ত খুলে দেওয়া থেকে শুরু করে এত বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা-এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় মানবিক দায়িত্ব। কিন্তু এই দায়িত্বের কোনো শেষসীমা না থাকলে সেটি একসময় বাংলাদেশের জন্য গুরুতর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি করে এবং করছে।সেই বাস্তবতা থেকেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এবার পাঁচ দফা প্রস্তাব সামনে এসেছে। প্রথমত, প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সীমা। দ্বিতীয়ত, রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, প্রত্যাবাসনের আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।চতুর্থত, আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা।  আর পঞ্চমত, মানব পাচার, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান বন্ধে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা।প্রস্তাবগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট - বাংলাদেশ শুধু রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কথা বলছে না, বরং তারা যেন নিরাপদ পরিবেশে, অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে নিজেদের দেশে ফিরতে পারে, সেই নিশ্চয়তার কথাও বলছে।এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু সীমান্ত পার করিয়ে মানুষকে ফেরত পাঠানো আর টেকসই প্রত্যাবাসন এক বিষয় নয়। রোহিঙ্গারা যদি ফিরে গিয়ে আবারও নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য ও অধিকারহীনতার মুখোমুখি হয়, তাহলে সেই প্রত্যাবাসন কতটা টেকসই হবে - সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এ কারণেই ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান মামলার বিষয়টি সামনে এসেছে। গাম্বিয়া আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহ-পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত এই আয়োজন দেখিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকটের বিচারিক ও রাজনৈতিক দুই দিকই আন্তর্জাতিক আলোচনায় রয়েছে।কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমর্থন থাকা আর সংকটের বাস্তব পরিবর্তন- দুটি ভিন্ন বিষয়। এই পার্থক্যটিই সবচেয়ে বেশি অনুভব করা যায় কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোর বাস্তবতায়।সেখানে শিশুরা বড় হচ্ছে। তরুণেরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছে। পরিবারগুলো বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে। তাদের কাছে জাতিসংঘের প্রতিটি অধিবেশন, প্রতিটি প্রস্তাব এবং প্রতিটি আন্তর্জাতিক বিবৃতির শেষ প্রশ্ন একটাই,সেটা হল ফেরার পথ কবে খুলবে?অন্যদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাতের বাস্তবতা আরও জটিল হয়েছে। ফলে প্রত্যাবাসনের জন্য শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে ফিরে যাওয়া মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বাস্তব নিশ্চয়তা থাকবে।সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্য - সংঘাত বা সহিংসতা দিয়ে কোনো সংকটের সমাধান সম্ভব নয়, কূটনৈতিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমেই সমাধানের পথে যেতে হবে - এই বাস্তবতাকেই সামনে আনে। তবে কূটনীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন তার সঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক চাপের কার্যকর সমন্বয় থাকে। রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় বিপদ সম্ভবত এখানেই - সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে, নতুন ইস্যু সামনে আসছে, আন্তর্জাতিক মনোযোগও বিভক্ত হচ্ছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ থেমে নেই।বাংলাদেশের জন্যও এটি এখন শুধু মানবিকতার প্রশ্ন নয়। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী পরিস্থিতি একটি দেশের ওপর কতটা চাপ তৈরি করতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ বাংলাদেশ। তাই রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু ত্রাণ ও শরণার্থী ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়ালে থেকে যাবে। ত্রাণ প্রয়োজন, মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, কিন্তু এগুলো সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়।স্থায়ী সমাধানের অর্থ- নিরাপদ প্রত্যাবাসন, অধিকার নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার এবং মিয়ানমারে এমন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে রোহিঙ্গারা আবারও বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা ছাড়াই নিজেদের দেশে বসবাস করতে পারে।জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আবারও বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই আলোচনার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।কারণ রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আরেকটি বছর পার হওয়া মানে শুধু একটি সংকটের সময়কাল বাড়া নয়, এর অর্থ আরও একটি প্রজন্মের শিকড়হীন হয়ে বেড়ে ওঠা। জাতিসংঘের আলোচনার টেবিল থেকে কক্সবাজারের ক্যাম্প- দুই জায়গার দূরত্ব অনেক। কিন্তু এই দুই প্রান্তকে যুক্ত করার একমাত্র পথ হলো কার্যকর কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বাস্তব প্রত্যাবাসন। এবার সেই পথ কতটা এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

অ্যালগরিদমিক শাসন ও ডিজিটাল পুঁজিবাদ

ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর কোনো দূরবর্তী রাজনৈতিক রূপকল্প বা কেবল নথিপত্রের ঘোষণা নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের প্রত্যক্ষ বাস্তবতা। ২০২৫ সালের শুরুর পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই এই রূপান্তরের বিশালতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা পৌনে আট কোটিতে পৌঁছেছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৪.৫ শতাংশ। অন্যদিকে সক্রিয় মোবাইল সংযোগের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১৮ কোটিতে, যা জনসংখ্যার প্রায় ১০৬ শতাংশ। দৈনন্দিন অর্থপ্রবাহ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতেও ঘটেছে অভূতপূর্ব বিপ্লব। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বা এমএফএসের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিনের কেনাকাটা থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন সারছেন। নিবন্ধিত এমএফএস অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় ২৫ কোটি এবং সারাদেশে সক্রিয় এজেন্ট ছড়িয়ে রয়েছেন প্রায় ২০ লাখ। এই এমএফএস ব্যবস্থার দৌলতে এতদিন অর্থনীতির বাইরে থাকা অনানুষ্ঠানিক খাত দ্রুতগতিতে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।তবে প্রযুক্তিগত এই উল্লম্ফন ও আপাত-সুবিধার চমকপ্রদ অন্তরালে একটি মৌলিক ও জটিল প্রশ্ন ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। যে ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর আমরা চোখ বন্ধ করে নির্ভরশীল হয়ে উঠছি, মূলত তার আসল মালিক কে? প্রতিদিনের কেনাকাটা, সামাজিক যোগাযোগ বা নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নাগরিকেরা যে বিপুল পরিমাণ ডেটা তৈরি করছেন, তার নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে? অদৃশ্য সফটওয়্যার অ্যালগরিদম কীভাবে শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ ভোক্তার দৈনন্দিন জীবন, আয় ও ভাগ্য নির্ধারণ করছে? প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর এই একচ্ছত্র আধিপত্য থেকে জন্ম নেওয়া বিপুল মুনাফা কার পকেটে জমা হচ্ছে, আর এর পরিবেশগত ও সামাজিক চড়া মূল্যই বা কারা পরিশোধ করছে?এই কঠিন ও অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে গবেষক আইটর জিমেনেজের বই ‘দ্য ক্রাইমস অফ ডিজিটাল ক্যাপিটালিজম: করপোরেট ক্রাইম ইন এন এজ অফ এক্সপ্লয়টেশন’। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত এবং আমেরিকান সোসাইটি অফ ক্রিমিনোলজির সম্মানজনক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বইটির মূল বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো। জিমেনেজ দেখিয়েছেন, ডিজিটাল পুঁজিবাদে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতিগুলো ঘটছে, সেগুলোকে নিছক প্রযুক্তির অনিচ্ছাকৃত বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি কিংবা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এসব ক্ষতি মূলত এমন এক কাঠামোগত ব্যবসায়িক ব্যবস্থার সরাসরি ফল, যেখানে করপোরেট মুনাফা অর্জন, নাগরিকদের ওপর প্রতিনিয়ত নজরদারি, অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে ডেটা আহরণ এবং অ্যালগরিদমের মাধ্যমে শ্রমশক্তির ওপর আধিপত্য বিস্তার একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে, যেখানে দ্রুত ডিজিটালাইজেশন ঘটছে অথচ প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, ডেটা সুরক্ষা ও জনস্বার্থ রক্ষা নিয়ে গভীর ও নীতিগত বিতর্কের চরম অভাব রয়েছে, সেখানে জিমেনেজের এই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি।আইটর জিমেনেজের অন্যতম প্রধান অবদান হলো, তিনি প্রচলিত আইনি বৈধতা এবং প্রকৃত সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম পার্থক্যটিকে উন্মোচিত করেছেন। প্রচলিত ফৌজদারি আইন সাধারণত কেবল সরাসরি নিষিদ্ধ আইনভঙ্গ বা দৃশ্যমান অপরাধকেই অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। কিন্তু বহুজাতিক বা বৃহৎ করপোরেট ব্যবস্থার বেলায় দেখা যায়, একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় আইন অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেও কোটি কোটি মানুষের বিপুল সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধন করতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে আইন নিজেই পুরোনো অথবা শক্তিশালী বহুজাতিক অর্থনৈতিক গোষ্ঠী বা টেক-জায়ান্টদের স্বার্থে প্রভাবিত বা তৈরি হতে পারে। ডিজিটাল অর্থনীতিতে সাধারণ নাগরিকের ডেটা সংগ্রহ করা সেবার শর্তাবলীতে সম্মতির আড়ালে আইনসম্মত মনে হলেও তা গোপনীয়তার অপমৃত্যু ঘটায়। গিগ-শ্রমিককে ‘স্বাধীন ঠিকাদার’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা আপাতদৃষ্টিতে আইনি হলেও তা শ্রমিককে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করে। আবার অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্তের কারণে শ্রমিক কাজ হারালে মেধা-সম্পদের অজুহাতে কোনো আপিলের সুযোগ থাকে না, এবং এই সার্বিক অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। জিমেনেজ এখানে প্রযুক্তির অন্ধ বিরোধিতা করছেন না; বরং তিনি প্রশ্ন তুলছেন—নতুন প্রযুক্তিনির্ভর এই করপোরেট ও নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতাকে সামাজিক জবাবদিহিতার আওতায় আনার মতো পর্যাপ্ত আইনি ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ইচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য আমাদের মতো রাষ্ট্রগুলোর আদৌ আছে কি না।সাধারণ মানুষের মনে ধারণা দেওয়া হয় যে ডিজিটাল বা ক্লাউড প্রযুক্তি হলো ভার্চয়াল, বস্তুহীন এবং পরিবেশবান্ধব। কিন্তু এই কাল্পনিক জগতের পেছনে রয়েছে এক বিশালাকার বাস্তব ও বস্তুগত অবকাঠামো। বিপুল ডেটা সেন্টার, কোটি কোটি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ, ভারী যন্ত্রাংশ, বিরল খনিজ সম্পদ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে লুকিয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ প্রচ্ছন্ন শ্রমিকের কায়িক শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে আজকের ডিজিটাল বিশ্ব। প্রযুক্তির প্রয়োজনীয় খনিজ ও কাঁচামাল আহরণ করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী স্থানচ্যুত হচ্ছে। বাংলাদেশেও ডিজিটালাইজেশনের এই অবকাঠামো টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন কী পরিমাণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় বা মেয়াদোত্তীর্ণ ইলেকট্রনিক বর্জ্য কোথায় ও কীভাবে ফেলার মাধ্যমে মাটি ও পানি দূষিত করছে, আর সরঞ্জাম সরবরাহ-শৃঙ্খলে যুক্ত শ্রমিকদের অবস্থান কী—এসব বিষয়ে আমাদের নীতি-নির্ধারণী মহলে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক আলোচনার পরিধি এখনও অত্যন্ত সীমিত।ডিজিটাল প্রযুক্তি শ্রমবাজারের ঐতিহ্যবাহী রূপ ও ধারণাকে আমূল বদলে দিয়ে শ্রমিকের মৌলিক অধিকারকে নতুন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বৈশ্বিক গিগ-শ্রমশক্তির দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। দেশে লক্ষাধিক নিয়মিত ও অনিয়মিত ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন, পাশাপাশি রাইড-শেয়ারিং, ফুড-ডেলিভারি কিংবা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রতিদিন লাখো তরুণ যুক্ত হচ্ছেন। তবে এই তথাকথিত স্বাধীন কাজের আড়ালে থাকা অন্ধকার দিকটি উপেক্ষা করার মতো নয়। রাইড-শেয়ারিং বা ফুড-ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মের কর্মীরা প্রথাগত শ্রমিকের মতো কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, চিকিৎসা সুবিধা, পেনশন, বা দুর্ঘটনায় আইনি সুরক্ষা পান না। এসব প্ল্যাটফর্মে একজন শ্রমিক কখন কাজ পাবেন, কোন ট্রিপে তাঁর কত আয় হবে, কিংবা তাঁর কাজের রেটিং কেমন হবে—তা নির্ধারণ করে একজন অদৃশ্য মানুষ নয়, বরং কোম্পানির জটিল সফটওয়্যার অ্যালগরিদম। বিশ্বখ্যাত ফেয়ারওয়ার্কের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, বাংলাদেশে পরিচালিত একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, উপযুক্ত মজুরি ও সুরক্ষার চরম অভাব রয়েছে। কোনো অ্যালগরিদম যদি ভুল বা অন্যায্য সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো শ্রমিকের অ্যাকাউন্ট হঠাৎ ব্লক করে দেয় বা আয় কমিয়ে দেয়, তবে রাষ্ট্রীয় শ্রম আইনে তার বিরুদ্ধে আপিল করা বা আইনি দায়ভার চাপানোর জন্য স্পষ্ট কোনো ধারা নেই।ডিজিটাল পুঁজিবাদে তথ্যের চেয়ে মূল্যবান ও লাভজনক সম্পদ আর কিছু হতে পারে না। কোনো নাগরিক যখন প্রয়োজনীয় সেবা নিতে গিয়ে অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে ঢোকেন, তখন দীর্ঘ আইনি ভাষা না বুঝেই তিনি সম্মতির মাধ্যমে নিজের অতি ব্যক্তিগত ডেটা কোম্পানির হাতে তুলে দেন। এই ডেটা সংকট ও তথ্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অর্ডিনেন্স এবং ন্যাশনাল ডেটা গভর্ন্যান্স অর্ডিনেন্সের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু মূল পরীক্ষাটি রয়ে গেছে বাস্তবায়নের জায়গায়—এই আইনগুলো কি প্রকৃতপক্ষে সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ডেটা অধিকার রক্ষা করবে, নাকি রাষ্ট্র ও বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে নজরদারির বাড়তি ক্ষমতা এনে দেবে? এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে প্রযুক্তিগত বৈষম্যের বিষয়টি। ২০২৫ সালের শুরুতে দেশে পৌনে আট কোটি মানুষ কোনোভাবে অনলাইনে এলেও, সাড়ে নয় কোটির বেশি মানুষ অর্থাৎ প্রায় ৫৫.৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখনও নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধার বাইরে। ফলে, প্রযুক্তিগত সুবিধা ও ডিজিটাল অর্থনীতি যদি কেবল শহরের সচ্ছল ও সুবিধাভোগী শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এই ডিজিটালাইজেশন বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে কমানোর বদলে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে।আইটর জিমেনেজের বইটির মূল বার্তা প্রযুক্তির বিকাশকে রুদ্ধ করা নয়, বরং প্রযুক্তির সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে সেই ক্ষমতার ভারসাম্যকে পুনর্নির্ধারণ করা। বাংলাদেশের সামনে এখন প্রযুক্তিগত বিকাশ বজায় রাখা এবং সেই ব্যবস্থার ওপর গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করার জোড়া দায়িত্ব রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে অবিলম্বে নাগরিকের ব্যক্তিগত ডেটাকে নিছক বাণিজ্যিকভাবে বিক্রিযোগ্য পণ্য হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে এবং গিগ ও প্ল্যাটফর্ম-শ্রমিকদের প্রচলিত শ্রম আইনের স্পষ্ট সংজ্ঞায় এনে ন্যূনতম মজুরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে অ্যালগরিদম কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বা রেটিং দিচ্ছে তা জানার অধিকার ও অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রাখতে হবে এবং প্রযুক্তি সংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন ও অবকাঠামো পরিচালনায় কয়েকটি সীমিত বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর রাষ্ট্রের অতি-নির্ভরশীলতা রোধ করতে হবে।বাংলাদেশ আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করবে কি করবে না, সেই বিতর্ক বা প্রাতিষ্ঠানিক সংশয় আজকের দিনে পুরোপুরি অচল ও নিরর্থক। ডিজিটাল ব্যবস্থা আমাদের জীবনের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে। কিন্তু মূল ও ঐতিহাসিক প্রশ্নটি হলো, আমরা কেমন ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে চাই? আমরা কি এমন এক সমাজ বানাব যেখানে কোটি কোটি মানুষের অক্লান্ত শ্রম, ব্যক্তিগত ডেটা ও দৈনন্দিন গতিবিধি কয়েকটি বৈশ্বিক করপোরেট জায়ান্টের জমাটবদ্ধ সম্পদে পরিণত হবে? নাকি আমরা এমন একটি সচেতন ডিজিটাল সমাজ গড়ব, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার, শ্রমিকের মানবিক মর্যাদা, সর্বজনীন ন্যায়বিচার এবং সামগ্রিক জনস্বার্থকে শক্তিশালী করার হাতিয়ার হিসেবে? পছন্দটি সম্পূর্ণ আমাদের এবং আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণের ওপর নির্ভর করছে।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।]

একসঙ্গে থেকেও আমরা একা

সময় এখন তথ্য ও প্রযুক্তির। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্বজুড়ে বিস্তার ঘটছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আর মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রায় সবার হাতেই মোবাইল ফোন। যোগাযোগ, বিনোদন, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজ এখন মোবাইলনির্ভর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গেম ও জুয়ার মতো নানা ঝুঁকিও।আবালবৃদ্ধবনিতা থেকে শুরু করে ধনী-গরিব—সব শ্রেণির মানুষের হাতেই এখন মোবাইল ফোন। কাজেও মোবাইল, অবসরেও মোবাইল, বিনোদনেও মোবাইল। ফলে মানুষে মানুষে সরাসরি মতবিনিময় ও আড্ডার আগ্রহ কমছে। একা থাকা এবং নিজের জগতে ডুবে থাকাকেই অনেকে স্বাচ্ছন্দ্য মনে করছেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে, মোবাইল ফোন কি ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?আমাদের চারপাশে মানুষের ভিড় বাড়ছে, অথচ কমে যাচ্ছে আপন মানুষ। প্রযুক্তি দূরের মানুষকে কাছে এনেছে ঠিকই, কিন্তু কাছের মানুষগুলোকে যেন আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। একসময় অবসর পেলেই মানুষ পরিবারের সঙ্গে বসত, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত, প্রতিবেশীর খোঁজ নিত। এখন অবসর পেলেই অনেকের চোখ চলে যায় মোবাইলের পর্দায়। একই ঘরে বসে থাকা মানুষগুলোর মধ্যেও তৈরি হচ্ছে অদৃশ্য দূরত্ব। কথা বলার মানুষ আছে, কিন্তু মনের কথা বলার মানুষ যেন কমে যাচ্ছে।হাজারো পরিচিত মুখের ভিড়েও অনেক মানুষ ভীষণ একা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রতিদিন নিজেদের হাসিমুখের ছবি প্রকাশ করি। অথচ সেই হাসির আড়ালে কতটা শূন্যতা লুকিয়ে থাকে, তা অনেক সময় কেউ জানে না। মানুষ অন্যের জীবনের খবর রাখে, কিন্তু পাশের মানুষটির মন খারাপের খবর রাখে না।সম্পর্কগুলোও ধীরে ধীরে প্রয়োজননির্ভর হয়ে পড়ছে। যতক্ষণ প্রয়োজন আছে, ততক্ষণ যোগাযোগ থাকে। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সম্পর্কের উষ্ণতাও কমে যায়। অভিমান জমে থাকে, কিন্তু তা ভাঙার মতো মানুষ থাকে না। কষ্ট হয়, কিন্তু কষ্টের কথা শোনার মতো ধৈর্যশীল মানুষ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই নিজের সমস্যার কথা বলতে চান, কিন্তু অন্যকে বিরক্ত করার ভয়ে চুপ করে থাকেন। এই নীরবতা একসময় মানুষকে নিজের ভেতরেই বন্দি করে ফেলে।ব্যস্ত জীবনের অজুহাতে আমরা প্রিয় মানুষদের সময় দিতে ভুলে যাচ্ছি। বাবা-মায়ের পাশে বসার সময় নেই, বন্ধুর সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সময় নেই। প্রিয় মানুষটি কেমন আছে—এই ছোট্ট প্রশ্নটিও অনেক সময় করা হয় না। ফলে সম্পর্কগুলো টিকে থাকে, কিন্তু সম্পর্কের উষ্ণতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মানুষ নিজের একাকিত্বকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করেছে।একসময় পরিবারে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প-আড্ডা ও মতবিনিময় হতো। পরিবারের সদস্যরা সারাদিন ব্যস্ত থাকলেও রাতে একসঙ্গে খাবার খেতে বসতেন। খাবারের টেবিলে পরিবার, সমাজ ও চারপাশের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার বড় একটি অংশ সেখান থেকেই অর্জিত হতো। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। প্রয়োজন ছাড়া কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে চায় না। মোবাইলের রঙিন পর্দার ভেতরেই অনেকে নিজের আলাদা জগৎ তৈরি করে নিয়েছেন।রাস্তা, ঘাট, চায়ের দোকান, বাস কিংবা ট্রেন—সব জায়গাতেই একই চিত্র। সবাই যেন মোবাইলের পর্দায় নিমগ্ন। কেউ গান শুনছেন, কেউ খবর পড়ছেন, কেউ ভিডিও দেখছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত। পাশে কে বসে আছেন, চারপাশে কী ঘটছে—সেদিকে নজর দেওয়ার সময় যেন কারও নেই।শিশুরাও এর বাইরে নয়। অনেক শিশু মোবাইল ফোনে গেম খেলে, মোবাইল দেখতে দেখতে খাবার খায়। বড়রাও পারিবারিক, সামাজিক, দাপ্তরিক ও আর্থিক নানা কাজ মোবাইলেই সারেন। এরপর দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটিয়ে দেন। ফলে পরিবারের সদস্যরা একই জায়গায় থেকেও নিজ নিজ পর্দার জগতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।কর্মক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। একসঙ্গে অনেক সহকর্মী বসে থাকলেও প্রত্যেকে নিজের মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। কেউ গান শুনছেন, কেউ খবর পড়ছেন, কেউ ভিডিও দেখছেন, কেউ কারও সঙ্গে অনলাইনে কথা বলছেন। কথাবার্তা হলেও অনেক সময় তা সংক্ষিপ্ত ও প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। একে অন্যের চোখের দিকে তাকিয়ে আন্তরিকভাবে কথা বলার অভ্যাস কমে যাচ্ছে।বন্ধুদের আড্ডাতেও একই অবস্থা। দশজন বন্ধু একসঙ্গে বসে আছেন, অথচ সবার মনোযোগ মোবাইলের পর্দায়। কেউ গেম খেলছেন, কেউ ভিডিও দেখছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত। ফলে একসঙ্গে থেকেও তারা যেন প্রত্যেকে আলাদা জগতে অবস্থান করছেন। বাস্তব আড্ডার জায়গা দখল করে নিচ্ছে ভার্চুয়াল ব্যস্ততা।মোবাইল ফোন মানুষের যোগাযোগের পরিসর বাড়িয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে পারিবারিক, সামাজিক ও মানবিক বন্ধনে দূরত্ব তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি মানুষের কাজকে দ্রুত ও সহজ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির অতিরিক্ত নির্ভরতা যদি মানুষের আবেগ, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সম্পর্ককে দুর্বল করে, তাহলে সেই অগ্রগতি নিয়ে ভাবারও প্রয়োজন আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দরভাবে নিজেকে উপস্থাপন করার প্রবণতা বাড়ছে, অথচ বাস্তব জীবনের সম্পর্কের সেতু দুর্বল হয়ে পড়ছে।মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক হৃদ্যতা ও মানবিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং এর ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। প্রয়োজনের সময় প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু প্রযুক্তিকে যেন আমাদের জীবনের সম্পর্কগুলোর নিয়ন্ত্রক হতে না দেওয়া হয়।মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ তুলে চারপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকানো দরকার। প্রিয় মানুষের পাশে বসা দরকার। একটি ফোন, একটু খোঁজ নেওয়া কিংবা কয়েক মিনিটের আন্তরিক কথাও কারও একাকিত্ব অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে। মনে রাখতে হবে, মানুষ যতই আধুনিক হোক, ভালোবাসা, সঙ্গ ও আন্তরিকতার প্রয়োজন কখনো কমে না।জীবনে কতজন মানুষকে আমরা চিনি, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো, কতজন মানুষ আমাদের আপন। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে একা। কিন্তু সেই একাকিত্ব যেন প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়িয়ে না দেয়। প্রযুক্তি আমাদের আশীর্বাদ। সেই আশীর্বাদ যেন আমাদের সম্পর্কের জন্য অভিশাপ হয়ে না ওঠে।[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

রেশম শিল্পে জাগুক নতুন প্রাণ

বাংলায় প্রাচীনকাল থেকেই রেশম চাষ বা পলু পোকা পালন এবং রেশম সুতা তৈরির প্রচলন ছিল। মুঘল আমলে বাংলায় রেশম উৎপাদন ও কারিগরি উৎকর্ষ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সে সময় মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও ঢাকা রেশম বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সপ্তদশ শতকে বিদেশি বণিক ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রেশমের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তারা কাসিমবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে কুঠি স্থাপন করে রেশম ব্যবসা সম্প্রসারণ করে।সুলতানি ও মুঘল আমলে অবিভক্ত বাংলা, বিশেষ করে কাসিমবাজার ও রাজশাহী অঞ্চল, রেশম উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। বাংলার রেশমের মান ভালো হওয়ায় তা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হতো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রেশম বাণিজ্য থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করে। তবে ব্রিটিশদের নীতির পরিবর্তন, ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়ে।১৮৩৫ সালের মধ্যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ অঞ্চলের প্রায় ১০০টি রেশম নিষ্কাশনকেন্দ্র নিষ্ক্রিয় করে দেয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। যদিও পরবর্তী সময়ে বেসরকারি উদ্যোগে রেশম শিল্পের কিছুটা সম্প্রসারণ ঘটে এবং রপ্তানি বাণিজ্যও জমজমাট হয়ে ওঠে। কিন্তু ১৮৭০-এর দশকে রেশমকীটের রোগের ব্যাপক বিস্তার এবং কারিগরি ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার কারণে বাংলার রেশম শিল্প বিদেশের বাজার হারাতে শুরু করে।দেশভাগের পর ১৯৫২ সাল থেকে রাজশাহীতে নতুন করে রেশম উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৬১ সালে রাজশাহীতে একটি সরকারি রেশম কারখানা স্থাপিত হয়। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেশম চাষ ও উৎপাদনের অবকাঠামো রয়েছে। রেশম উন্নয়ন বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয় রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, যশোর ও রাঙামাটিতে রয়েছে। ভোলাহাট, ঠাকুরগাঁও, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ, বগুড়া, কুমিল্লা ও রাজবাড়ীতে রেশম সম্প্রসারণ কার্যালয় রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ভোলাহাট, মীরগঞ্জ, ঈশ্বরদী, ঝিনাইদহ, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, কোনাবাড়ী, ময়নামতি, চন্দ্রঘোনা ও সাঁকোয়ায় রেশম বীজাগার ও খামার এলাকা রয়েছে।সরকারি ব্যবস্থাপনায় রেশম বোর্ডের অধীনে আদর্শ নার্সারি, মিনি ফার্ম এবং চাউকি রিসার্চ সেন্টারও রয়েছে। এসব কেন্দ্রে উন্নত জাতের তুঁত গাছ ও রেশম গুটি উৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রেশম চাষ সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমি তুঁত চাষের আওতায় আনা হয়েছিল। রাঙামাটির চন্দ্রঘোনা ও পঞ্চগড়ের সাঁকোয়ায় জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ ও রেশম বীজাগার রয়েছে।তুঁত চাষের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জমি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট রেশম বীজাগারের জমির পরিমাণই প্রায় ৩৬ দশমিক ৭৯ একর। রাজশাহী রেশম কারখানা প্রায় সাড়ে ১৫ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত। রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটও রাজশাহীতে রয়েছে। বোর্ডের অধীনে থাকা বিভিন্ন মিনি ফার্ম, বীজাগার, নার্সারি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জমি বিবেচনায় নিলে রেশম খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অবকাঠামোগত ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু এই সম্পদ ও অবকাঠামো থাকার পরও শিল্পটি আজ রুগ্ণ অবস্থায় রয়েছে।১৯৯১ সালে আমদানি শুল্ক কমানোর পর চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কম দামে রেশম সুতা দেশের বাজারে প্রবেশ করে। বিদেশি সুতা তুলনামূলক সস্তা ও চকচকে হওয়ায় দেশীয় রেশম সুতা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। ২০০২ সালে লোকসানের কারণ দেখিয়ে ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সরকারি রেশম কারখানা ও অন্যান্য সরকারি মিল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে রেশম শিল্পের মূল চালিকাশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সুতার সংকটে বেসরকারি মিলগুলোও একে একে বন্ধ হতে থাকে।রেশম শিল্প পুনরুজ্জীবিত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র‍্য বিমোচনে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। দেশে বছরে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ মেট্রিক টন রেশমের চাহিদা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। তুঁত চাষ, রেশম পোকা পালন, সুতা তৈরি এবং কাপড় বোনার মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রামীণ অর্থনৈতিক চক্র গড়ে তোলা সম্ভব। এ শিল্পে বিভিন্ন স্তরে দক্ষ ও অদক্ষ—উভয় ধরনের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।দারিদ্র‍্য বিমোচনের অন্যতম প্রধান শর্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বাংলাদেশের দরিদ্র ও গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে রেশম শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্পটি পুনরুজ্জীবিত করা গেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ শিল্পের প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি ও অনেক কাঁচামাল দেশেই রয়েছে। তাই আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে।রেশম চাষের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও সম্ভব। গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি নারীরা ছোট পরিসরে তুঁত চাষ ও রেশম পোকা পালনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। এতে পরিবারের বাড়তি আয় সৃষ্টি হতে পারে। বাড়ির আঙিনা কিংবা গ্রামীণ রাস্তার পাশের জমিতেও ছোট পরিসরে তুঁত চাষ করা সম্ভব। রেশম চাষ তুলনামূলকভাবে শ্রমঘন এবং গ্রামীণ মানুষের জন্য আয় সৃষ্টির একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।তাই ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে শুধু অতীতের গৌরব হিসেবে দেখলে চলবে না। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত জাতের তুঁত ও রেশমকীট, ন্যায্যমূল্য, মানসম্মত সুতা উৎপাদন, সরকারি কারখানার আধুনিকায়ন এবং বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে রেশম শিল্পকে নতুন করে দাঁড় করাতে হবে। উৎপাদক, গবেষক, উদ্যোক্তা ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগই পারে বাংলাদেশের রেশম শিল্পকে আবারও সম্ভাবনাময় করে তুলতে।[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

বাগাড়ম্বরের আড়ালে জবাবদিহিহীনতার প্রশ্ন

অতি সম্প্রতি জাতিসংঘে মুহাম্মদ ইউনূস একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অস্তিত্বের ঘোষণা দিয়েছেন। ২১ সেপ্টেম্বর সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে ভাড়া করা হলে ‘সোশ্যাল বিজনেস, ইয়ুথ অ্যান্ড টেকনোলজি’ নামে সাইড ইভেন্ট হয়, যেখানে অল্প কিছু অতিথি ছিলেন। কৃতজ্ঞতাবশত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তাকে হাইলাইট করতে চেয়েছেন। কিন্তু এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণের গুরুত্ব জনগণের কাছে কমে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ইউনূসের পক্ষে-বিপক্ষে সরগরম আলোচনা, অথচ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ তত গুরুত্ব পায়নি। এর দায় বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। ইউনূসের প্রভাব নিয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি যে অপকর্ম করেছেন, তা জনগণ ভুলবে না।মোহাম্মদ ইউনূসের একটি বড় ভাঁওতাবাজি ছিল পাসপোর্ট নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, পাসপোর্টের জন্য জনগণ অফিসে যাবে কেন, ঘরে বসে অনলাইনে পেয়ে যাবে। তিনি নিজেই বলেছেন, সরকার ঘরে পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ঘরে বসে পাসপোর্ট পাচ্ছে না, ভোগান্তি একই আছে।মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত সময়কাল প্রায় ১৮ মাস। এই সময়ে বড় প্রতিশ্রুতি ছিল সংস্কার, দুর্নীতি দমন ও বিনিয়োগ। কিন্তু মিলল বক্তৃতার জৌলুস আর কাজের ঘাটতি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জবাবদিহিতা। ইউনূস সরকার এখন ক্ষমতায় নেই, কিন্তু তার অপকর্মের কোনো বিচার হচ্ছে না। কারণ ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তাকে রাজনৈতিক ছাড় দিয়েছে। আদালতও অভিযোগগুলো আমলে নিচ্ছে না। ফলে ১৮ মাসে রাষ্ট্রের যে ক্ষতির পাহাড় জমেছে, তার দায়ও আওয়ামী লীগের ওপর বর্তানো হচ্ছে।২০২৪ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ মহাসচিবকে কক্সবাজারে আনা হয়। ইউনূস চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝাতে চাইলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের লোক। বলা হলো, ‘আগামী ঈদ তারা নিজ ভূখণ্ডে করবে।’ কিন্তু ১৮ মাস শেষেও একজন রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন হয়নি। ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভরণপোষণ, পাসপোর্ট জালিয়াতি করে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের বদনাম—আগের মতোই আছে। ইউনূস শোডাউনের ভাঁওতাবাজি করলেন, কিন্তু কূটনৈতিক অগ্রগতি শূন্য।বিনিয়োগের নামেও একই প্রতারণা। একজন তরুণকে ‘বিনিয়োগের জাদুকর’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। প্রচার হলো, ইংরেজি জানা এই প্যারাসুট তরুণ বিদেশ থেকে বিনিয়োগ এনে দেশকে সিঙ্গাপুর বানিয়ে দেবে। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ কমেছে। উল্টো চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একই সময়ে বলা হলো, পৃথিবীর সব দেশ বাংলাদেশ থেকে লোক নেওয়ার জন্য তার কাছে আবেদনের পর আবেদন করে যাচ্ছে, অথচ ২০২৫ সালে বৈধ অভিবাসন আগের বছরের চেয়ে কমেছে।জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী। আওয়ামী লীগ সরকার সামিটের সঙ্গে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি করেছিল। ইউনূস সরকার ২০২৫-এর শুরুতে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে চুক্তি বাতিল করে, কিন্তু বিকল্প টার্মিনাল করল না। জুলাই ২০২৫-এ এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুনের পর দৈনিক প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে তীব্র সংকট শুরু হয়। একইভাবে আগের সরকারের অনুমোদিত ৩৭টি সৌর প্রকল্পের এলওআই বা লেটার অব ইনটেন্ট বাতিল করা হয়। বলা হলো, স্বচ্ছ দরপত্র হবে। ওই ৩৭টি প্রকল্প থেকে ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন করে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ যোগ করার উদ্যোগ আর নেওয়া হয়নি।স্বাস্থ্য খাতে অবহেলার খেসারত দিল শিশুরা। অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে হামের টিকা কেনার আগের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। যুক্তি ছিল, উন্মুক্ত দরপত্র হবে। কিন্তু সময়মতো টিকা আসেনি। ফলে ২০২৫ সাল থেকে হামে এক হাজারের বেশি শিশু মারা গেছে।একইভাবে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ইউনূসের আমলে কয়েক মাস কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়। স্টোরের ওষুধ তালাবদ্ধ থাকায় কোটি টাকার ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক প্রতিশোধের কারণে আগের সরকারের ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সব বাতিল করার পরিণতি জনগণ এখন ভুগছে।অর্থনীতিতে ধস নামে ব্যাংক ও বাণিজ্যনীতির কারণে। আইন লঙ্ঘন করে সত্তরোর্ধ্ব একজন অর্থনীতিবিদকে গভর্নর করা হয়। তিনি প্রকাশ্যে কয়েকটি ব্যাংককে ‘দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে ‘লাল তালিকাভুক্ত’ করেন। এরপরই আমানতকারীরা আতঙ্কে টাকা তুলতে শুরু করে, কয়েকটি ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়ে। আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং সহায়তা বন্ধ করায় অল্প দিনেই খেলাপি ঋণ দ্বিগুণ হয়, অনেক কারখানা বন্ধ হয়। নিজের গদি রক্ষায় ইউনূস সরকার প্রথমে স্টারলিংক নিয়ে হৈচৈ করল, ট্রাম্প প্রশাসনের পালাবদলের পর সেই প্রসঙ্গও চাপা পড়ে গেল। সবচেয়ে বড় বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, যা বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা খর্ব করবে।সবশেষে দুর্নীতির শ্বেতপত্র। ‘সেরা অর্থনীতিবিদ’ দিয়ে আগের সরকারের পাচারের হিসাব বের করে ভাষণ দেওয়া হলো, বিদেশে দল বেঁধে সফর হলো, কোটি টাকা খরচ হলো। কিন্তু একটি টাকাও ফেরত আসেনি। উল্টো আলোচনা হচ্ছে, ইউনূস আমলেই বিভিন্ন খাতে বড় দুর্নীতি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন ও অন্যান্য মামলা প্রশাসনিক নির্দেশে প্রত্যাহার হয়েছে, তার প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে কর সুবিধা ও নতুন লাইসেন্স। নোবেল লরিয়েটের আমলে আরও দুটি বস্তুর উদয় হয়েছে—অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি আর মব সন্ত্রাস।বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথা দিয়ে রাষ্ট্র চলে না। রোহিঙ্গা যায়নি, বিনিয়োগ আসেনি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট বেড়েছে, শিশু মরছে, ক্লিনিক অচল হয়েছে, ব্যাংক খাত ধুকছে, বাণিজ্য চুক্তি গলার ফাঁস হয়েছে। ক্ষমতা ছেড়েও তিনি জবাবদিহির বাইরে। কিন্তু আরোপিত দেবত্বের মহিমা আর বাস্তবতার হোঁচট একসঙ্গে হাঁটে না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

ভিডিও আরও দেখুন

মেসির ১০ নম্বর জার্সির উত্তরসূরি হবেন কে

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে লিওনেল মেসির সম্ভাব্য বিদায়ের পর আর্জেন্টিনার স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সিটি কে পাবেন, তা নিয়ে এখনই কোনো তাড়াহুড়ো করতে রাজি নন দলটির কোচ লিওনেল স্কালোনি। অধিনায়কের শেষ ম্যাচ পর্যন্ত আইকনিক এই নম্বরটি আপাতত খালি রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। মেসির বিদায় নেওয়ার পরই ঠিক করা হবে তার উত্তরসূরি।আগামী ৭ অক্টোবর বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে সম্ভাব্য বিদায়ী ম্যাচ খেলতে নামবেন মেসি। তার আগে বলিভিয়া ও বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে আরও দুটি প্রীতি ম্যাচে মাঠে নামবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এই ম্যাচগুলোতে কোনো ফুটবলারের গায়ে ১০ নম্বর জার্সি দেখা যাবে না।বলিভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি স্পষ্ট করে স্কালোনি বলেন, ‘এই ম্যাচগুলোতে কাউকে ১০ নম্বর দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তাই লিওর বিদায়ী ম্যাচের আগে আমরা এটি অন্য কাউকে দেব না। তার বিদায়ের পরেই দেখব, কাকে এই জার্সি দেওয়া যায়।’তবে মেসি-পরবর্তী যুগে স্থায়ীভাবেই অন্য কোনো আলবিসেলেস্তে ফুটবলারকে এই ঐতিহাসিক ১০ নম্বর পরতে হবে বলে নিশ্চিত করেছেন আর্জেন্টাইন কোচ। তিনি জানান, ‘বাছাইপর্বের সব ম্যাচে একই ফুটবলারকে এই নম্বর পরতে হবে, এমন নয়। তবে আমাদের ভাবনা হচ্ছে একজনই এটি স্থায়ীভাবে ধারণ করবে। কারণ, এই জার্সি পরার সঙ্গে অনেক সুন্দর আবেগ জড়িয়ে আছে। তবে কাকে দেওয়া হবে, তা এখনো আমরা ঠিক করিনি।’মেসির অনুপস্থিতিতে এর আগেও একাধিক ফুটবলার আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইকুয়েডরের বিপক্ষে ১০ নম্বর পরা ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে অ্যাঞ্জেল কোরেয়া ও পাওলো দিবালাকেও এই নম্বরে দেখা গেছে।সংবাদ সম্মেলনে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন এই মাস্টারমাইন্ড। ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলায় আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সভাপতি ক্লদিও তাপিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে জানিয়ে স্কালোনি ইঙ্গিত দেন, পরিকল্পনা ঠিক থাকলে ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দলটির প্রধান কোচের দায়িত্বে থেকে যেতে পারেন তিনি।মেসির বিদায়ের পরও আর্জেন্টিনা ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী স্কালোনি বলেন, ‘নতুন প্রতিভাদের আগমন এবং খেলোয়াড়দের জেতার ক্ষুধা প্রমাণ করে–মেসির বিদায়ের পরও আর্জেন্টিনা বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে দাপটের সঙ্গেই রাজত্ব করবে।’

মেসির ১০ নম্বর জার্সির উত্তরসূরি হবেন কে