জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রাম: পরস্পরবিরোধী, নাকি পরিপূরক?
জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, শ্রেণিসংগ্রাম ইত্যাদি নিয়ে পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা চলছে। বামপন্থী এক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন, “কমিউনিস্টরা যখন সারা দেশে কলকারখানায়, ক্ষেতখামারে, চা-বাগানে শ্রেণিসংগ্রাম গড়ে তুলতে ব্যাপৃত, তখন একদল পুরোনো সেই খেলায় মেতে উঠেছে। পুরো আন্দোলনকে জাতীয়তাবাদের চোরাবালিতে ডুবিয়ে মারতে চাইছে।” উদ্ধৃত বক্তব্যটি জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের আন্তঃসম্পর্ক বিষয়ে কিছু মৌলিক তাত্ত্বিক প্রশ্ন সামনে এনেছে।জাতীয়তাবাদের বুর্জোয়া সীমাবদ্ধতা এবং শ্রেণিসংগ্রামের ওপর তার সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক রূপ ও রাজনৈতিক চরিত্রের মধ্যে পার্থক্য না করে তাকে সামগ্রিকভাবে শ্রেণিসংগ্রামের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করা কতটা যথার্থ? বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশের ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলন এবং বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি আরও গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।শ্রেণিসংগ্রাম কি জাতীয় প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন?মার্ক্সবাদে শ্রেণিসংগ্রাম কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। উৎপাদনসম্পর্ক ও তার অন্তর্নিহিত শ্রেণিগত দ্বন্দ্বের ভিত্তিতে, সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র, জাতীয় ও জাতিগত নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক আধিপত্যের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শ্রেণিসংগ্রাম বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানা রূপে বিকশিত হয়।শ্রেণিশোষণ ও জাতীয় নিপীড়ন অভিন্ন বিষয় নয়। কিন্তু ইতিহাসের নির্দিষ্ট পর্যায়ে এ দুটি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। বিশেষত ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের অধীনে জাতীয় নিপীড়ন প্রায়ই অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক অধিকারহীনতার সঙ্গে যুক্ত থেকেছে। ফলে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম অনেক ক্ষেত্রেই শ্রেণিসংগ্রামের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।তবে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে বিভিন্ন শ্রেণির অংশগ্রহণের অর্থ তাদের শ্রেণিস্বার্থের বিলুপ্তি নয়। জাতীয় ঐক্যের মধ্যেও শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত ও বুর্জোয়ার স্বার্থগত দ্বন্দ্ব বহাল থাকে। মার্ক্সবাদী রাজনীতির দায়িত্ব এই দ্বন্দ্বকে উপলব্ধি করে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের ভেতর শ্রমজীবী মানুষের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন ও মাও: জাতীয় প্রশ্নের ঐতিহাসিক উপলব্ধিমার্ক্স ও এঙ্গেলস জাতীয়তাবাদকে নির্বিচারে প্রত্যাখ্যান করেননি। তারা পোল্যান্ডের জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রামকে সমর্থন করেছিলেন। আয়ারল্যান্ডের প্রশ্নে মার্ক্স দেখিয়েছিলেন, আইরিশ জনগণের ওপর ব্রিটিশ আধিপত্য ইংরেজ শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক চেতনাকেও বিভক্ত ও দুর্বল করে। অর্থাৎ, নিপীড়ক জাতির শ্রমিকশ্রেণির মুক্তিও নিপীড়িত জাতির স্বাধীনতার প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।লেনিন এই উপলব্ধিকে আরও বিকশিত করেন। তিনি নিপীড়ক জাতির আধিপত্যবাদী জাতীয়তাবাদ এবং নিপীড়িত জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য করেছিলেন। তার কাছে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করা ছিল শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতি প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত।মার্ক্স ও এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ইশতেহার-এর ঐতিহাসিক আহ্বান ছিল—‘দুনিয়ার মজদুর, এক হও!’ পরবর্তী সময়ে লেনিনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ঔপনিবেশিক ও নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তিসংগ্রামকে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই রাজনৈতিক উপলব্ধি থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় সেই বিখ্যাত আহ্বান—‘দুনিয়ার শ্রমিক ও নিপীড়িত জাতিসমূহ, ঐক্যবদ্ধ হও!’১৯২০ সালের ডিসেম্বরে এক বক্তৃতায় লেনিন নিজেই এই সম্প্রসারিত স্লোগান উদ্ধৃত করে তার রাজনৈতিক যথার্থতা সমর্থন করেছিলেন। এটি মার্ক্সবাদের শ্রেণিগত অবস্থান পরিত্যাগের ঘোষণা ছিল না; বরং সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংগ্রামের সঙ্গে নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তিসংগ্রামকে যুক্ত করার রাজনৈতিক উপলব্ধি।মাও সেতুংয়ের চিন্তায় জাতীয় মুক্তি ও আন্তর্জাতিকতাবাদের এই সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। জাপানি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চীনের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রেক্ষাপটে ১৯৩৮ সালে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, একজন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদী হয়েও কি দেশপ্রেমিক হতে পারেন? মাওয়ের উত্তর ছিল দ্ব্যর্থহীন—একজন কমিউনিস্টের জন্য এটি কেবল সম্ভাবনার বিষয় নয়, তাকে অপরিহার্যভাবে তা হতে হবে।মাওয়ের কাছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেম সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিপন্থী ছিল না। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির স্বাধীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন ও মাওয়ের জাতীয় প্রশ্নসংক্রান্ত অবস্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাত্ত্বিক পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক শিক্ষা তাদের চিন্তায় পাওয়া যায়—জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণিমুক্তির সম্পর্ককে কোনো যান্ত্রিক সূত্রে নির্ধারণ করা যায় না; তার বিচার করতে হয় সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভিত্তিতে।ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ এবং উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদ কি এক?ইউরোপে আধুনিক জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছিল সামন্ততান্ত্রিক সমাজের রূপান্তর, পুঁজিবাদী বাজারের সম্প্রসারণ, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ এবং নাগরিক পরিচয়ের উত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায়। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন ধারা প্রধানত ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ, সাম্রাজ্যবাদ এবং জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। আবার কিছু ব্যতিক্রমও ছিল। যেমন, আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে নিপীড়িত জাতির মুক্তিকামী জাতীয়তাবাদও বিকশিত হয়েছিল।অন্যদিকে, ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক জাতীয়তাবাদের একটি প্রধান উৎস ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এখানে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে কৃষকের জমির অধিকার, শ্রমিকের শোষণমুক্তি, ঔপনিবেশিক সম্পদ লুণ্ঠনের অবসান এবং জনগণের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও যুক্ত হয়েছিল।তবে উপমহাদেশীয় জাতীয়তাবাদও কোনো একক রাজনৈতিক ধারা ছিল না। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদ, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মুসলিম জাতীয়তাবাদ, দক্ষিণপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং পরবর্তী সময়ে ভাষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে বিকশিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ—এসব ধারার সামাজিক ভিত্তি, রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ঐতিহাসিক পরিণতি এক ছিল না।আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তায় জাতীয়তাবাদকে তার ঐতিহাসিক উৎস, সামাজিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক চরিত্র অনুযায়ী বিভিন্ন ধারায় বিশ্লেষণ করা হয়—নাগরিক জাতীয়তাবাদ, জাতিগত জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ, ঔপনিবেশিকতাবিরোধী জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ এবং বামপন্থী বা সমাজতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি। একই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্যেও একাধিক প্রবণতা সহাবস্থান করতে পারে। এমনকি ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ও শ্রেণিশক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের সঙ্গে একই জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক চরিত্রও বদলে যেতে পারে।এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো কোনো বামপন্থী নেতা আসলে কোন জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন? বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে, আধিপত্যবাদী ও সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে, নাকি পাকিস্তানি রাষ্ট্রের জাতীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বাঙালির ঐতিহাসিক মুক্তিকামী জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধেও?উপমহাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম ও শ্রেণিসংগ্রামের ঐতিহাসিক সম্পর্কভারতীয় উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সমান্তরালেই এখানে শ্রমিক-কৃষকের শ্রেণিভিত্তিক সংগ্রাম বিকশিত হয়েছিল। ১৯২০-এর দশক থেকে শ্রমিক সংগঠন, কৃষক আন্দোলন এবং কমিউনিস্ট রাজনীতির বিস্তার ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী সংগ্রামকে নতুন সামাজিক ভিত্তি দিয়েছিল।বাংলার তেভাগা আন্দোলনে ভাগচাষিরা জোতদারি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিলেন। তেলেঙ্গানার কৃষক সংগ্রাম সামন্ততান্ত্রিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এসব আন্দোলন জাতীয় স্বাধীনতার বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না; আবার জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া নেতৃত্বের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজেদের আবদ্ধ রাখেনি।তবে উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে জাতীয় প্রশ্নে গুরুতর তাত্ত্বিক ও কৌশলগত বিভ্রান্তিও দেখা গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট পার্টির ‘জনযুদ্ধ’ নীতি এবং ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত জাতীয়তাবাদী গণআন্দোলনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে জটিল করে তোলে।একইভাবে, দেশভাগের প্রাক্কালে গঙ্গাধর অধিকারীর প্রতিবেদনে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে গৃহীত অবস্থান এবং মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দেয়। জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক জাতিসত্তা এবং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার পার্থক্য নির্ধারণে এই অভিজ্ঞতা আজও আলোচনার দাবি রাখে।এই ইতিহাসের শিক্ষা হলো, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক অন্ধ অনুসরণ কিংবা নির্বিচার বিরোধিতার নয়। জাতীয় মুক্তির প্রগতিশীল উপাদানগুলোকে ধারণ করেও শ্রমিক-কৃষকের স্বতন্ত্র শ্রেণিস্বার্থ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অক্ষুণ্ন থাকে।বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা: ভৌগোলিক স্বাধীনতা থেকে শ্রেণিমুক্তির অসমাপ্ত সংগ্রামপাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এখানে জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণিসংগ্রামের আন্তঃসম্পর্ক অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয় মুক্তির যে আকাঙ্ক্ষা বিকশিত হয়েছিল, তার পেছনে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নের পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকারহীনতা, আঞ্চলিক শোষণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সম্পদ বণ্টনের অন্যায্যতা মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল। অর্থাৎ, বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ভেতরেই শ্রেণিগত অসন্তোষের একটি শক্তিশালী উপাদান শুরু থেকেই উপস্থিত ছিল। তৎকালীন বামপন্থী ও কমিউনিস্টদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব ছিল এই জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে শ্রমিক-কৃষকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা।১৯৭১ সালে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জিত হলেও উৎপাদনসম্পর্ক ও সম্পদের ওপর শ্রেণিগত নিয়ন্ত্রণের কোনো মৌলিক রূপান্তর ঘটেনি। ফলে জাতীয় মুক্তির পরবর্তী ঐতিহাসিক দায়িত্ব ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির দিকে এগিয়ে নেওয়া। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সীমাবদ্ধতা এখানেই। স্বাধীনতার পর শ্রমিক-কৃষকের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা, জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা এবং মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বামপন্থীরা কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এই ব্যর্থতার দায় কেবল বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের ওপর চাপিয়ে দিলে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দুর্বলতার আত্মসমালোচনা আড়ালে পড়ে যায়।শ্রেণিসংগ্রামের কথা উচ্চারণ করা আর বাস্তবে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করা এক বিষয় নয়। শ্রেণিসংগ্রামকে কেবল কারখানার মালিক ও শ্রমিকের অর্থনৈতিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র, গণতান্ত্রিক অধিকার, ধর্মীয় আধিপত্য, সাম্রাজ্যবাদী নির্ভরতা এবং জাতীয় নিপীড়নের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো আড়ালে পড়ে যায়। অথচ এসব বিষয় শ্রেণিশক্তির ভারসাম্য ও রাজনৈতিক সংগ্রামের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। জাতীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্ন থেকে শ্রেণিসংগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করা মার্ক্সবাদী রাজনীতিকে সংকীর্ণ ‘অর্থনীতিবাদে’ নামিয়ে আনার ঝুঁকিও তৈরি করে।বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় জাতীয় প্রশ্নটি একটি নতুন তাৎপর্য নিয়ে সামনে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক ধারা এবং ধর্মান্ধ ও উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো যখন রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার করছে, এমন প্রেক্ষাপটে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক প্রগতিশীল উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন নতুন গুরুত্ব পায়।এখানে জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন নিছক কোনো আবেগ নয়; এটি রাষ্ট্রের আদর্শিক চরিত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অর্জন রক্ষার প্রশ্ন। গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হলে শ্রমিকশ্রেণির সংগঠন, প্রতিবাদ এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিসরও সংকুচিত হয়। তদুপরি, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা শ্রমজীবী মানুষকে বিভক্ত করে এবং তাদের অভিন্ন শ্রেণিস্বার্থের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।সে দিক থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ স্বাধীনতা-পরবর্তী যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ এটি এখন কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; বরং ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা রক্ষার রাজনৈতিক ঢাল।জাতীয় প্রশ্ন ও শ্রেণিপ্রশ্নের এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক সিপিবির বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেও দৃশ্যমান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর চুক্তি, দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ কিংবা জাতীয় সম্পদের ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সিপিবির যে প্রতিবাদ, তার মূল রাজনৈতিক ভিত্তি কী?এসব আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। এগুলো সরাসরি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ক্ষেত্র, যার সঙ্গে জাতীয় মুক্তির চেতনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সংগ্রাম এবং দেশের অভ্যন্তরে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পরস্পরের পরিপূরক।বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রগতিশীল উত্তরাধিকার ধারণ করার অর্থ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের আনুগত্য স্বীকার করা নয়; আবার পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর স্বতন্ত্র পরিচয় ও অধিকারকে অস্বীকার করাও নয়। জাতীয় চেতনার প্রকৃত গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য সব নাগরিকের সমান মর্যাদা এবং সব জাতিসত্তার অধিকার নিশ্চিত করতে পারাটাই মূল কথা। জাতীয় পরিচয়ের বৃত্তের বাইরে গিয়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ যদি স্বতন্ত্র আদিবাসী পরিচয়ে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি করেন, তবে তা প্রদানে বাধা কোথায়?জাতীয় মুক্তির অর্জন রক্ষা এবং শ্রেণিশোষণের অবসান—এই দুটি সংগ্রামকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করানো নয়, বরং দ্বান্দ্বিক ঐক্যে বিকশিত করাই আজকের দিনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ওপর প্রধান ঐতিহাসিক দায়িত্ব হিসেবে বর্তায়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক কর্মী; কানাডা প্রবাসী]