সংবাদ
দুর্গাপূজায় টানা ছুটির বিনিময়ে শনিবার যে সকল প্রতিষ্ঠান খোলা

দুর্গাপূজায় টানা ছুটির বিনিময়ে শনিবার যে সকল প্রতিষ্ঠান খোলা

​সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা পাঁচ দিনের সরকারি ছুটির সুযোগ করে দিতে শনিবার (১৭ অক্টোবর) সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি অফিসসহ ব্যাংক, শেয়ারবাজার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আদালত খোলা থাকবে।পূর্বঘোষিত সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চাকরিজীবীদের এই শনিবারের নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটিটি বাতিল করা হয়েছে।​জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়েছে, আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২ অক্টোবরের অতিরিক্ত ছুটি সমন্বয়ের স্বার্থেই আগামী ১৭ অক্টোবর শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে সেদিন অফিস করার নির্দেশ দেওয়া হয়।এতে জানানো হয়, ১৭ অক্টোবর শনিবার সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সমস্ত বেসরকারি অফিস স্বাভাবিক নিয়মে খোলা থাকবে।​এর আগে গত ৫ অক্টোবর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সাধারণ ছুটি ও নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটি পুনর্নির্ধারণের এই বিশেষ প্রস্তাবটি অনুমোদন পায়। এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী ১৭ অক্টোবর শনিবার যথারীতি স্বাভাবিক কর্মদিবসের মতোই সব অফিস কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সচিবালয়সহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্ধারিত সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অফিস করবেন এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমসহ আদালত ও শেয়ারবাজারের লেনদেনও পুরো সময় চালু থাকবে। ​বছরের নির্ধারিত সরকারি ছুটির পরিক্রমা অনুযায়ী, আগামী ২০ অক্টোবর (মঙ্গলবার) মহানবমী উপলক্ষে নির্বাহী আদেশে এবং ২১ অক্টোবর (বুধবার) বিজয়া দশমী উপলক্ষে আগে থেকেই সাধারণ ছুটি নির্ধারিত ছিল। তবে ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার কর্মদিবস থাকায় সরকার সেখানেও নির্বাহী আদেশে ছুটি ঘোষণা করে।এর ফলে ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার থেকে ২৪ অক্টোবর শনিবার (শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটিসহ) টানা পাঁচ দিন ছুটির আমেজ বজায় থাকবে।
৪ ঘন্টা আগে

দুর্গাপূজায় টানা ছুটির বিনিময়ে শনিবার যে সকল প্রতিষ্ঠান খোলা

দুর্গাপূজায় টানা ছুটির বিনিময়ে শনিবার যে সকল প্রতিষ্ঠান খোলা

এডিস মশা শনাক্তে আসছে এআই চালিত স্মার্ট ফাঁদ

এডিস মশা শনাক্তে আসছে এআই চালিত স্মার্ট ফাঁদ

বিলুপ্তির মুখে ১০ লাখ প্রজাতি: জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান গুতেরেসের

বিলুপ্তির মুখে ১০ লাখ প্রজাতি: জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান গুতেরেসের

ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক চক্রান্তে থমকে গেছে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন

ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক চক্রান্তে থমকে গেছে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন

বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশ বেকার

বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশ বেকার

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

সম্প্রীতি বজায় রেখে দুর্গোৎসব উদযাপনে দেশবাসীর প্রতি আইজিপির আহ্বান

সম্প্রীতি বজায় রেখে দুর্গোৎসব উদযাপনে দেশবাসীর প্রতি আইজিপির আহ্বান

মহাষষ্ঠীতে উৎসবের মহাসূচনা: থিমের চমক ও ঐতিহ্যের টান

মহাষষ্ঠীতে উৎসবের মহাসূচনা: থিমের চমক ও ঐতিহ্যের টান

তিরঙ্গা সমাবেশের আগেই দিল্লি পুলিশ আটক করলো অভিজিৎ-নেহাকে

তিরঙ্গা সমাবেশের আগেই দিল্লি পুলিশ আটক করলো অভিজিৎ-নেহাকে

সংকটে বাংলাদেশের পাশে থাকার জোরালো বার্তা বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ'র

সংকটে বাংলাদেশের পাশে থাকার জোরালো বার্তা বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ'র

মতামতমতামত

রম্যগদ্য: “দেশের বডিতে অন্য মাথা”

হ হ, বুঝছি। আপনে বর্তমান প্রজন্ম জেন-জি’র, কথা বলচেন যে, বর্তমান জেন-জি,  কোনো কিছু, উড়িয়েও দিতে চায় না পুড়িয়েও দিতে চায় না...”হ ভাই দুনিয়া অখন এআই’এর যুগ, অহন পাবলিক আর উড়ায়া-পুড়ায়া দেয় না, অহন স্রেফ সুদখোরের আবিষ্কৃত পথে জেন-জি, কেবল বুলডোজারদি গুড়ায়া দ্যায়।আরে পাগলা আমি এই বুলডোজার কালচারের কথা বলছি না। আমি বলছি মাননীয় বেতাল পঞ্চবিংশতি বেতালের কথা। যার কথার কোনো তাল নাই, বেতাল!আরে না, আমি বলছিলাম, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতি থেকে বাংলায় অনুবাদ বেতাল পঞ্চবিংশতি ভূতের গল্প।ভূত মাইনে তো অতীত, অহন আর অতীতের প্যাচাল শুনি কী লাভ হোইবো। বিগত চুয়ান্ন বছর ধরি ট্যাকা ট্যাকা করি বাঙালি জাতির ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান ব্যাবাগ পচাই অহননি আপনে আবার ভূতের কতা কন!শোননা, বেতাল পঞ্চবিংশতির গল্প হোচ্ছে, রাজা বিক্রমাদিত্য শমী বৃক্ষ হতে, বেতাল ভূতের কঙ্কাল পেড়ে আনবে, আর পথিমধ্যে বেতাল একটা করে গল্প বলবে...ভূতেনি, মাইনে অতীতনি, বর্তমানের গল্প কোইবো?ধুর বাঙাল কেবল কথার মাঝে কথা বলিস...ঠিক আছে ঠিক আছে, আর কমু না ভূতেও বর্তমানের গল্প কোইবো। নেন আন্নে আপনের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতির ভাষায় ল্যাখা বাংলায় অনুবাদ বেতাল পঞ্চবিংশতি ভূতের গল্প কন।রাজা বিক্রমাদিত্য শমী বৃক্ষ হতে, বেতাল ভূতের কঙ্কাল পেড়ে আনবে, আর পথিমধ্যে বেতাল একটা করে গল্প বলবে...  কিন্তু প্রতিটি গল্পের শেষে বেতাল ভূত ওই গল্পের উপর বেইজ করে একটা প্রশ্ন করবে? রাজা যদি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দ্যায় তায়লে বেতাল আবার শমী বৃক্ষের উপর চলে যাবে রাজা বিক্রমাদিত্যকে আবার গাছে উঠে বেতাল ভূতের কঙ্কাল পেড়ে আনবেন, আর যদি রাজা ইচ্ছা করে ভুল উত্তর দ্যান তাহলে বেতাল ভূত রাজার ঘাড় মটকে মেরে ফেলবে। ওম্মারে মা, সত্যি কোইলে আবার গাছে চড়ন, আর মিথ্যা কোইলে মরণ। বেতাল ভূতে তো রাজার ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান ব্যাবাগ মারি হ্যালার! তো আন্নের এই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতির ভাষায় ল্যাখা বাংলায় অনুবাদ পঞ্চবিংশতি বেতাল ভূতের গল্পের মইধ্যে বাংলাদেশের কুনো সর্ম্পক আছেনি?সর্ম্পক আছেনি মানে কিরে, এখনতো পুরো দেশ এমনি এক বেতালের মতো চলছে।আন্নে মিয়া চোখ থাকিতে অন্ধ! আন্নে দেখছেন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা কী সুন্দর বিশ্বমানে পৌঁছাইছে...কী কী বললি! আইনশৃঙ্খলা বিশ্বমানে পৌঁছেছে...ক্যান আন্নের কুনো সন্দ আছেনি?কী ব্যাপার তুই কি গঞ্জিকা মানে গাঁজাটাঁজা টানছিস নাকি?কিয়ের গঞ্জিকা মানে গাঁজাটাঁজা টানছিস নাকি! আপনে দ্যাখেন নাই জার্মানি পর্যটকের ল্যাপটপ মাত্র চাইর দিনে উদ্ধার।আর ওই যে, ধানমন্ডির সামনে এক মানসিক ভারসাম্যহীন, ব্যাডারে হিডি, লাত্থিমারি হোতাই ফ্যালার, হেই বিচারের রায় দ্রুত সময়ে কার্যকর! বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থান অহন পিরথীবির যে কুনো সভ্য দেশের চেয়েও সভ্য। আর আন্নে মিয়া কন, আপনের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতির ভাষায় ল্যাখা বাংলায় অনুবাদ বেতাল পঞ্চবিংশতি ভূতের মতুন দেশ চলের। আসলেই বাঙ্গালী নিজের ভালো নিজে দ্যাখা পারে না!আচ্ছা তুই বল মানসিক ভারসাম্যহীন লোকের বিচার কি স্বভাবিক অপরাধীদের মতো বিচার হবে?হাগলনি কোনো! হাগলের বিচার মাইনে, মানসিক অপরাধীদের প্রথমে আপনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞর পরামর্শ লোই, হ্যাতারে ভালো করি তারপর না বিচার। কিন্তু স্যার আপনে যে তখন থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতি থেকে বাংলায় অনুবাদ বেতাল পঞ্চবিংশতি ভূতের গল্পের মতো বাংলাদেশ চলের বোলচেন, সেটার মাজেজা কী?আচ্ছা তোকে একটা বেতালের গল্প বলি...বলেন বলেন ভূতের গল্প আমার খুবই মজা লাগে। এসব ভূতের গল্প মজার না, বোধের।আরে প্যাচাল কম পাড়েন, গল্পটা কন।শোন বলি বেতালের গল্প। সে বহু বহু দিন আগের কথা, মা’দূর্গার এক তরুণী ভক্ত বাসর রাতের পর স্বামী ও স্বামীর বন্ধুর সাথে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে। এমন সময় পথিমধ্যে ডাকাতের তলোয়ারের আঘাতে স্বামী ও স্বামীর বন্ধুর মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে পড়ে থাকে। জিনিসপত্র লুঠ করে ডাকাতরা পালিয়ে যায়। নববধূ তখন স্বামীর শোকে আত্মহত্যা করতে যাবে এমন সময় মা দূর্গা এসে বলেন “ওহে তরুণী ভক্ত তোমার আত্মহত্যার প্রয়োজন নেই আমি এঁদের জীবিত করে দিচ্ছি, তুমি জলদি দেহের সাথে মাথা জুড়ে দাও।নতুন বৌ কি স্বামীরে ফিরি পাইবো?আরে শোন তো... কন কন বেতালের গল্প কন।নতুন বৌ মরা স্বামী ফিরে পাবে, এই খুশিতে তাড়াতাড়ি দুই ধড়ের সাথে মাথা জুড়ে দিলো। সাথে সাথে দুই যুবা পুরুষ যেন ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন, এই ভাবে জেগে উঠলো। সবাই খুব খুশী। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করে দেখে যে, তাড়াহুড়ায় নতুন বৌ স্বামীর দেহে জুড়েছে বন্ধুর মাথা আর বন্ধুর দেহে জুড়েছে স্বামীর মাথা। এখন কে এই তরুণীর সাথে ঘর করবে?আপনে কি বলচেন যে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বেতাল পঞ্চবিংশতি ভূতের গল্পের মতো বাংলাদেশের মাথা পাল্টে গেচে! বাংলাদেশের বডিতে অন্য মাথা লেগেচে যে...আমারতো তাই মনে হয়, না হলে নিজের দেশের লোকের হাজার সেল ফোন, ল্যাপটপ চুরি হলে বছর কা বছর পাওয়া যায় না আর বিদেশির ল্যাপটপ চারদিনে উদ্ধার! বিষয়টা ভাববার বিষয়।কিন্তু যুদি বাংলাদেশের সব চুরি চাইর দিনে ধরা পড়ে, সব বিচার যুদি লগে লগে সমাধা হয় তায়লে বাংলাদেশের বডিতে অন্য মাথা লাগলেও আমি হেই মাথারে স্বাগতম জানামু...সেই ভালো, চল দেশের ভালোর জন্য আমরা সবের মাথা পাল্টাই...  [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

মব কালচার, মব অ্যাটাক

‘মব’ শব্দটির সঙ্গে বাংলাদেশের গণমানুষের পরিচয় বেশি দিনের নয়। শব্দটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায় মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। এটা একটা ইংরেজি শব্দ, যার বাংলা অর্থ উচ্ছৃঙ্খল জনতা। এরা দৃশ্যপটে আসে মূলত চব্বিশের গণআন্দোলনের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে। আর যারা ঘটনার আকস্মিকতায় ক্ষমতার মসনদ পেয়ে যায়, তারাই মবের স্রষ্টা, মব সংস্কৃতি ও মবের লালন-পালনের দায়িত্ব মাথায় তুলে নেয়। একই সঙ্গে তারা মবের ধারক-বাহক, তোষণ-পোষণের দায়িত্বও কাঁধে নিয়ে নেয়।এই মবরা একই শ্রেণির, একই বয়সের, প্রায় একই পোশাক-পরিচ্ছদে চলাফেরা করে। এদের চেহারায়ও অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। তখন এরা রাষ্ট্রীয় অর্থে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বেষ্টনীতে বাস করত। অবস্থা এমন ছিল যে, এরা দেশের রিজার্ভ আর্ম ব্যাটালিয়নের ন্যায় রাজধানীর উত্তর-পশ্চিমাংশের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস করত। প্রয়োজন পড়লেই ডাক পেত, আর এক ঘণ্টার ব্যবধানে শাহবাগ চত্বরে, রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বা শহীদ মিনারে দুর্বার গতিতে এসে হাজির হতো।এদের চলাফেরার গতি ও নিশানা এক। কঠোরভাবে চেইন অব কমান্ড বা নেতৃত্ব অনুসরণকারী। কোথায় যাবে, কী কাজে যাবে, তা এদের সবার জানার বিষয় নয়। দু-চারজন নেতার কমান্ডে তারা কমান্ডো ফোর্সের মতো যেকোনো অপারেশনে ঝাঁপিয়ে পড়তে কুণ্ঠিত হয় না, কোনো দ্বিধায় ভোগে না। এদের কাজ হলো কমান্ড মানা, ন্যায়-অন্যায় দেখবেন নেপথ্যের কারিগরগণ। এভাবেই বছর দেড়েকের একটা উদ্ভট, ভৌতিক ও অনভিজ্ঞ ইউটোপিয়ান সরকারের অস্তিত্ব গোটা জাতি দেখেছিল।২.সেকালে মবদের হাইকমান্ডের সঙ্গে নিয়মিত সভা, নীতিনির্ধারণী আলোচনা, গ্রামে-গঞ্জে অ্যাটাকের কলাকৌশল, আর্থিক সহায়তা, নিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয়ে নিয়মিত ব্রিফিং দেওয়ারও ব্যবস্থা ছিল। সে সময় শাহবাগের মোড়ে মব বাহিনী অবস্থান করলে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে অসংখ্য জনহিতৈষী ব্যক্তি এসে খাবার, পানীয়—সবই সরবরাহ করতেন। তাদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে সরকারি নীতিমালা বাস্তবায়নের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেন। একসময় মবরা খণ্ড খণ্ড দলে বিভক্ত হয়ে একক পর্যায়ে রাজপথ ত্যাগ করত এবং অদৃশ্য হয়ে মিলিয়ে যেত।দেখা গেছে, দ্রুততম সময়ে যোগ দিতে মেট্রোরেল ব্যবহার করে শাহবাগ চত্বরে নেমে পড়ত। প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় মবদের সার্বক্ষণিক খবরাখবর নিতেন, এদের নিরাপত্তার যথাযথ তদারকি করতেন। তা ছাড়া, মব আন্দোলনের নির্ধারিত স্থানগুলো থেকে প্রধান উপদেষ্টা মহোদয়ের সরকারি বাসভবন ছিল খুবই কাছাকাছি দূরত্বের মধ্যে। এদের দেখভালের জন্য তিনি একাধিক ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকেও দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন। এমনকি প্রধান উপদেষ্টা স্বয়ং মবের সেক্টর কমান্ডারদের সঙ্গে পৃথক পৃথক সভা করে এদের রণনীতি, রণকৌশল সম্পর্কে খুব ধীরস্থির, ঠান্ডা মাথায় তার অশীতিপর অভিজ্ঞতার নির্যাস ঢেলে দিতেন। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ করে ভেসে আসত।মানুষের স্মৃতি দুর্বল না হলে বা স্মৃতি বেইমানি না করলে ২০২৫ সালের কথা এত তাড়াতাড়ি ভোলার নয়। মজার বিষয় ছিল, তিনি রাস্তায় মব নামিয়ে গণদাবির মহড়া প্রদর্শন করাতেন। বলতেন, এটা আজই গেজেটে প্রকাশ করুন, জনগণ রাস্তায় অনশন করছে, পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন হচ্ছে। আরও অনেক বিচিত্র নাটকীয়তা একটা জাতি দেখেছিল।৩.সেকালের মবরা এখনো ঢাকা শহরে বসবাস করছে। তারা বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, হল, কলেজের হোস্টেল, মাদ্রাসা, লাইব্রেরি, বইবিতানসহ নানা স্থানে বিচরণ করছে। সংকেত পেলেই নাশকতার মতো কাজে নেমে আসবে। তারা দেশের জেলা শহরগুলোতে থেকেও হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে, কখনো সরবে, কখনো নিভৃতে দায়িত্ব পালন করে চলেছে। ওপরের নির্দেশ পেলেই এরা কাজে নামে। রাজধানীকে তারা কেন্দ্রস্থল ধরে এবং জেলা শহরকে প্রান্ত বিবেচনা করছে। কেন্দ্রের নির্দেশনা পালন করেই তারা চলে। এতে কেন্দ্র-প্রান্ত সম্পর্কে কোনো ভাটা পড়ছে না।কিছুদিন পূর্বে হবিগঞ্জ জেলার একজন মব স্টারের বক্তব্য সারা দেশবাসী দেখেছে। সে কত অকুতোভয় এবং আত্মবিশ্বাসী, তা তো ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চোখের সামনেই। একজন পুলিশ অফিসারকে পুড়িয়ে মারার অকপট স্বীকারোক্তির কথা কেউ ভুলতে পারবে না। মনে হয়, মবরা এ মুহূর্তে অলস সময় কাটাচ্ছে, তারা মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় আছে। সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি লাগানো মেয়েটার কথা বলা যায়। তাকে পুলিশে ধরার পরে সে বলেছে, ‘আমি এত কিছু জানতাম না, আমাকে ওরা বলেছে, আমি করেছি।’ মবদের সাধারণ চরিত্র এমনই, এরা জানে না এরা কী করে, কার জন্য করে।৪.অথচ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরীণ কর্মে নেহাত অনভিজ্ঞ ব্যক্তিটি মনে করতেন, এ দেশে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেনাবাহিনী/সুপ্রিম আর্মড ফোর্স—এসবের ভরসায় থাকলে ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না। এগুলো থাকবে আইনি কাঠামোর বিধিবদ্ধ নিয়মের বেড়াজালে। প্রকৃত জুলাইযোদ্ধার সঙ্গে আজগুবিভাবে জন্ম নেওয়া ও তাৎক্ষণিক গজিয়ে ওঠা স্কুল-কলেজের বারান্দায় থাকা বা বিপথগামী তরুণেরাই মূল নিয়ামক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি এদের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা না ভেবে, প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার অপকর্মে এদের জড়িত করেন। যার তুল্যমূল্য খেসারত এ জাতিকে হয়তো আরও কয়েক বছর দিয়ে যেতে হবে।মবরা এখন সারা দেশে রাজনৈতিক দলের অচেনা, একেবারে পাতি নেতাদেরও ডান হাত হিসেবে কাজ করে চলেছে। তারা এদের বিশেষ কোনো অ্যাসাইনমেন্ট যেমন- বাড়ি, জমি, দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের কাজ দিলে হোন্ডার বহর নিয়ে পৌঁছে যায় এবং নিমিষে একটা সফল রিপোর্ট জমা দিতে পারে। তাদের দরকার টাকা, মোটরবাইক, জ্বালানি ও নেশার অর্থের জোগান ইত্যাদি। একটা বিরাট অংশ হয়তো জানেই না সে কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে। সমাজে এদের মা-বাবাও চরম হতাশ, নিয়ন্ত্রণহীন, উচ্ছন্নে যাওয়া সন্তান। এসব নিয়ে ভাবনার সময় চলে যাচ্ছে, দেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রায় হারিয়ে গেছে।কিশোর গ্যাং এবং মব অপরাধীরা হাটে, মাঠে-ঘাটে, স্টেশনে সর্বত্র বিরাজমান। শাসন করার কোথাও কেউ নেই, উল্টো তারা থানা-পুলিশের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে জড়াচ্ছে, দালালি করার কলাকৌশল শিখে গেছে, জনপ্রতিনিধিদের কাছে অযাচিত গুরুত্ব পাচ্ছে। কেউ জানতে চাইছে না তারা পড়াশোনা করছে কি না, কোথায় পড়ে, কোথাকার ছাত্র। সবাই এদের বাহবা দিচ্ছে, ‘ওয়েল ডান’ বলে পিঠে হাত রাখছে। তারাও দ্বিগুণ উৎসাহ-উদ্দীপনায় পরবর্তী মিশনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এভাবেই জাতির ভবিষ্যৎ তরুণেরা আজ সর্বনাশের কিনারে দাঁড়িয়ে। আর এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় মুহাম্মদ ইউনূসের হাত ধরে, তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে।৫.সম্প্রতি ইউরোপ ও আমেরিকায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টার ওপর মব অ্যাটাকের মতো ঘটনা ঘটেছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে একদল বাংলাদেশি তাকে খুনি, গণতন্ত্র হত্যাকারী, পুলিশ হত্যাকারী, শিশু হত্যাকারী, প্রতারক ইত্যাদি বলে অশোভন ভাষায় চিৎকার করে গালমন্দ করেছে। তাদের মারমুখী আচরণ করতেও দেখা গেছে। এখন মনে হয়, এগুলো তার স্রেফ নিয়তি নয়, বরং প্রাপ্য। এ পৃথিবীতে কে কার ক্ষতি করবে, কেউ জানে না। সম্মান দেওয়া-নেওয়ার মালিকও অদৃশ্য। বিশ্বব্যাপী অনবরত ঘুরে বেড়ানো এই মহান নোবেলজয়ী ও মাইক্রোক্রেডিট বিশেষজ্ঞের আগামী দিনগুলো কীভাবে কাটবে, তা কেবল সময়ই বলে দিতে পারে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার ও প্রাবন্ধিক]

ব্যাংক খাতের সংস্কারে চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা

বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সংস্কারের বিকল্প নেই। ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় সরকারের সংস্কার কর্মসূচির বিভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। আর্থিক খাতের সংস্কার, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, বন্ধ কলকারখানা চালু এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো দেশের মানুষেরও প্রত্যাশা। তবে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব সরকারের। আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্ত পূরণের জন্য নয়, জাতীয় স্বার্থেই আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।আগের ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করে। পরে কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। সাত কিস্তিতে অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও পাঁচ কিস্তিতে এসেছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা, করছাড় যৌক্তিক করা, রাজস্বনীতি ও রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম আলাদা করা এবং ভর্তুকি কমানোর মতো শর্তগুলো যথাসময়ে পূরণ হয়নি। পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও কঠিন শর্তের কারণে বর্তমান সরকার পুরোনো কর্মসূচি এগিয়ে নিতে আগ্রহী হয়নি। এখন তিন বছর মেয়াদি নতুন কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ নিয়ে আলোচনা চলছে। শর্ত নিয়ে দর-কষাকষির পাশাপাশি সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।পুরোনো কর্মসূচির যেসব সংস্কার অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাজস্ব আদায় বাড়ানো, করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, অযৌক্তিক করছাড় কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। একইভাবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করতে কার্যকর আইন ও তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতীতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার, করছাড় যৌক্তিক করা এবং বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার মতো উদ্যোগ প্রত্যাশিত অগ্রগতি পায়নি। ফলে রাজস্ব আয়ের ঘাটতি ও সরকারি ব্যয়ের চাপ সামলাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এসব সংস্কার আবারও পিছিয়ে দিলে নতুন ঋণ কর্মসূচিও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংকট আরও গভীর। অতীতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্বল তদারকি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা দেওয়ার কারণে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বেরিয়ে গেছে। এর ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। খেলাপি ঋণের বড় অংশ মাত্র কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। এই পরিস্থিতির দায় এড়াতে পারে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো। ব্যাংকের মালিকানা ও ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করা, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং আর্থিক অপরাধের তদন্ত নিশ্চিত করা এখন অপরিহার্য।ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটিয়ে তুলতে সাধারণ মানুষের করের টাকা ব্যবহারের প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বিপর্যস্ত ব্যাংক খাতের ক্ষতি সামাল দিতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর প্রতিবছর প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ ব্যাংকের অনিয়ম ও লুটপাটের বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু জনগণের অর্থ ব্যয় করার আগে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—এই ক্ষতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? ব্যাংক লুটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পদ উদ্ধার, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা এবং অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত না করে সাধারণ মানুষের করের টাকা দিয়ে ক্ষতি পূরণ করা ন্যায়সংগত হতে পারে না।বিশ্বব্যাংকের ৪৫ কোটি ডলারের একটি কর্মসূচিতে আমানত সুরক্ষা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ব্যাংক পুনর্গঠনের প্রস্তুতির মতো বিষয় রয়েছে। তবে ব্যাংক খাতের সব ক্ষতি মেটানোর জন্য এ অর্থ দেওয়া হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংস্কার ও জবাবদিহির শর্ত আরোপ করে। জনগণের অর্থ ব্যাংক পুনরুদ্ধারে ব্যয় করলেও একই ধরনের শর্ত থাকা উচিত। কোন ব্যাংককে কেন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, অর্থ কীভাবে ব্যবহার হবে, কী সংস্কার করা হবে এবং প্রত্যাশিত ফল না এলে কারা দায় নেবে—এসব বিষয় স্পষ্ট করতে হবে।সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশের পরিবর্তে বর্তমান সরকার যে আইন করেছে, তাতে পুরোনো মালিকদের আবার মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টিকারী একটি ধারা যুক্ত হয়েছিল। সমালোচনার মুখে পরে তা বাতিল করা হয়। এ ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ব্যাংক খাতের সংস্কারে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বেসরকারি ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সেই ব্যবস্থা ফিরে এলে সংস্কারের সুফল মিলবে না।নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আর্থিক খাত সংস্কার কমিশন গঠন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার বিষয়েও সরকারের অগ্রগতি দেখানো প্রয়োজন। ব্যাংক খাতের নীতিনির্ধারণ ও তদারকিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ঋণখেলাপি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু দুর্বল ব্যাংক একীভূত করলেই সংকটের সমাধান হবে না; ব্যাংকের সম্পদের মান, ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। সরকারি হিসাবে, দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ, ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেশের সম্পদের পরিমাণ ৫৭ হাজার ৩২৫ কোটি টাকার বেশি। এসব সম্পদ আইনগত প্রক্রিয়ায় উদ্ধার করা গেলে ব্যাংক খাতের ক্ষতি সামাল দিতে সহায়তা পাওয়া সম্ভব। তবে শুধু টাস্কফোর্স গঠন বা সম্পদ জব্দের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। অর্থ ফেরত আনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং উদ্ধার করা অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত তথ্য দিতে হবে।মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ ১৯৯৭ সালের আর্থিক সংকটের পর ব্যাংক খাতে সংস্কার করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। ব্যাংক পুনরুদ্ধারে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা দরকার। ব্যাংক বাঁচাতে জনগণের অর্থ ব্যবহার করা হলে সেই অর্থের বিনিময়ে কী সংস্কার হবে, কত দিনে ফল পাওয়া যাবে এবং ব্যর্থতার দায় কার—তা আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে।ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নতুন ঋণ নিয়ে সাময়িক চাপ সামাল দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করলে সংকট আবারও ফিরে আসবে। তাই ঋণচুক্তির পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের অর্থে ব্যাংক খাতের ক্ষতি পূরণ করতে হলে তার আগে দায়ীদের জবাবদিহি ও সংস্কারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। জাতীয় স্বার্থেই ব্যাংক ও আর্থিক খাতে কার্যকর সংস্কার এখন সময়ের দাবি।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

রবীন্দ্রনাথের অবয়বে কালিমা লেপন

১০ অক্টোবর ২০২৬ সালের সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মুছে দেওয়ার প্রতিবাদে ‘শতকণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ’ কর্মসূচি চলছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনে। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে / তবে একলা চলো রে...’। ব্যক্তিগত মতামত হলো, রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি মুছে ফেলার জন্য প্রতিবাদের কোনো প্রয়োজন নেই। রবীন্দ্রনাথ স্বপ্রকাশিত তার সৃষ্টিকর্মের মাঝে। তার ঔজ্জ্বল্য রবি বা সূর্যের মতো বাঁধভাঙা। এতই প্রখর তার কিরণ যে তাকে ঢেকে দেওয়ার প্রচেষ্টা আকাশের দিকে তাকিয়ে থুতু ফেলার মতো। যা ফিরে এসে নিজের গা কুৎসিত করে এবং নিজেকে অপমানিত করে। থুতু আকাশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না, সূর্যের কাছাকাছি যাওয়া তো অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথের মুখে কালিমা লেপন করে জাতির মুখে কালিমা লেপন করা হলো, এ বোধ জন্মাতে পারেনি কালিমা লেপনকারীদের অন্তরে। কী করে বোধ জন্মাবে? আমাদের শিক্ষায় তো বোধ জন্মানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। যে মেয়েটি রবীন্দ্রনাথের মুখাবয়ব কালো রং দিয়ে ঢেকে দিতে গিয়েছিল, তার মুখাবয়ব, দেহভঙ্গি দেখে বড় মায়া লেগেছে। তাকে যখন সাংবাদিকেরা ঘিরে ধরেছেন, মেয়েটি মোবাইল দেখে দেখে উত্তর পড়ে শোনাচ্ছিল।সে একটি ঘুড়ি। ঘুড়ির নাটাই ‘হেথা নয়, হোথা নয়, অন্য কোনো খানে।’ দেখে দেখে পড়তে পারছিল না। নাটাই যারা ধরে রেখেছিল, তারা কালিমা লেপনের ব্যাখ্যা লিখে দিয়েছে। মেয়েটি বলছিল, ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রতিবাদের কর্মসূচিতে এসেছে সে। ভারতীয় আধিপত্যবাদকে রুখতে হলে রবীন্দ্রনাথের মুখে কালিমা লেপন প্রয়োজন। মোবাইল ফোনে যে বার্তা সে পেয়েছে, তার বাইরে যখন তাকে প্রশ্ন করা হলো, ভারতীয় আধিপত্যবাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক কী? তোতাপাখির শেখানো বুলিতে এই প্রশ্নের উত্তর ছিল না। মেয়েটি কাতর হয়ে বলেছে, ‘আপনারা আমাকে আর প্রশ্ন করবেন না। এরকম ঝামেলা হবে জানলে তো আমি আজ কালিমা-লেপন কর্মসূচিতে আসতামই না।’ আহারে, এসব তরুণ-তরুণীকে কী করে রাজনীতির নোংরা খেলার ঘুঁটি বানানো হচ্ছে, সে কথা ভাবলে হৃদয় বিদীর্ণ হয়।রবীন্দ্রনাথ যে অর্থে ভারতীয়, একই অর্থে আমাদের জাতীয় কবি, প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলামও ভারতীয়। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান তাকে অনেকটা জোর করে নিয়ে না এলে তিনি ভারতেই থাকতেন। তরুণ-তরুণীদের দোষ দেওয়ার কিছুই নেই। তাদের শৈশব থেকে যেভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তারা সেই শিক্ষাই আত্মস্থ করেছে। শিক্ষা দিয়েছে পরিবার, রাষ্ট্র, সমাজ, বুদ্ধিজীবী মহল। যে বুদ্ধিজীবী কোনো প্রমাণ ছাড়া, সূত্র ছাড়া ছড়িয়ে দিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন, তিনি বা তারা কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। এসব দেখে ‘মনে হয়’, ‘ধরে নেওয়া যায়’ রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ছিলেন।যিনি এই নোংরা খেলার তত্ত্ব মাঠে ছেড়েছেন, তিনি কিন্তু নীরব। আমাদের নিষ্পাপ সন্তানেরা তার তত্ত্ব বিশ্বাস করে ওই বুদ্ধিজীবী অ্যান্ড কোংয়ের প্রেরণায়, তাদের পরিকল্পনায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। নৈতিকতাহীন গুজব মাঠে ছাড়া হয়েছে। এই গুজবের পালে হাওয়া দেওয়া হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার মসলা দিয়ে। সেই মেয়েটিকে একজন কন্যার পিতা হিসেবে কী করে কাঠগড়ায় তুলি? পুতুল হয়ে সুতোর টানে সে দর্শকের সামনে নেচেছে। সুতো কাদের হাতে, কারা এসব তরুণকে মাঠে ছেড়ে দিয়েছে, তাদের কি আমরা চিনি? আমরা খুব ভালো করে চিনি এবং জানি। তাদের টিকিটির ছোঁয়ার সাহস আমাদের নেই। তাই আকাশের ঘুড়ি কিংবা পুতুলনাচের পুতুলকে ধরে আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই।রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগর—এদের কোনো দেশ নেই। এরা বিশ্বের সম্পদ। বাংলা শিশু শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা ছিল যুগান্তকারী। উনিশ শতকের বাংলায় শিশুদের জন্য পড়ালেখা সহজ, আনন্দময় ও উপযোগী করে তুলতে তিনি বিভিন্নমুখী সংস্কার ও অবদান রাখেন। শিশুদের বাংলা ভাষা শেখার জন্য তিনি রচনা করেন ঐতিহাসিক ও বহুল প্রচলিত গ্রন্থ ‘বর্ণপরিচয়’ (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ)। এর মাধ্যমে বাংলা বর্ণমালাকে সহজ ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে সাজানো হয়। এই যে তরুণ-তরুণীদের পিতা-মাতা, এমনকি তারা নিজেরাও বিদ্যাসাগরের কাছে ঋণী। তাদের কি সেসব কথা জানানো হয়েছে? জানানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে জানানো হয়নি। আমরা নীরবতার সংস্কৃতিকে পছন্দ করি। বড় নিরাপদ রাখে নীরবতা।রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম কি তার নিজের? তার সৃষ্টিকর্ম বিশ্বের সকল মানুষের সম্পদ। কী আশ্চর্য! কালিমা লেপন করল বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী, আর পরম মমতায় সেই কালিমাকে উঠিয়ে নিয়ে পরিশুদ্ধ করার কাজ করলেন একজন রিকশাচালক। তাকে অভিনন্দন, কুর্নিশ। তিনি না করলেও রাতের আঁধারে কোনো একজন প্রান্তিক মানুষ ভয়কে জয় করে এ কাজটি করতেন। আমাদের আশপাশে যারা চোখে দেখেন বলে দাবি করেন, তারা কিন্তু চক্ষুষ্মান নন। এই যে রিকশাচালক, তিনি হয়তো রবীন্দ্রনাথ পড়েননি, তোতাপাখির মতো সত্য-মিথ্যা ইতিহাস পাঠ করে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলার যোগ্যতাও তার নেই। তিনি হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করতে পারেন সত্য, সুন্দরের সত্তা। তিনি চক্ষুষ্মান, হৃদয়ভরা আলো। হৃদয়ে আলোর প্লাবন এত নির্মল যে, বোধের গভীরতা বই পড়া কিংবা একচক্ষুসম্পন্ন মানুষের চেয়ে অনেক বেশি।রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য, ম্যুরাল বা স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার, গুঁড়িয়ে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা কি এই প্রথম ঘটল বাংলাদেশে? বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেল, এই ঘটনাটি প্রথম নয়। যারা সাহিত্য, শিল্পকলায় মানবিকতা পছন্দ করেন না, তারা এই চেষ্টা একাধিকবার করেছেন। একটি ঘটনা আমার স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ম্যুরালে কালো রঙের কালি লেপে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সেই কালি মুছে ফেলে।কালি মুছে যায়, তবে যারা কালিমা লেপন করে, তাদের অন্তরে কালি সঞ্চিত থাকে। এ কারণে বারবার এসব ঘটনা ঘটতে থাকে। যে দেশে কালিমা লেপনের ঘটনা ঘটে, সেই দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে একটি দ্বীপ তৈরি করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য দিয়ে। সেই দ্বীপের ভেতরে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলসহ অনেককেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ যেন শত্রুসৈন্য খতম করা। ভঙ্গুর মনীষীরা আজ দুবছরের অধিক সময় ধরে আহত হয়ে শুয়ে আছেন সেই দ্বীপে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বুদ্ধিজীবীরা নীরবতার সংস্কৃতিকে ধারণ করেছেন। নীরবতা হলো হীরন্ময়।রবীন্দ্রনাথ দীন-দরিদ্র, প্রাণপ্রাচুর্যহীন, করুণাকাতর কোনো লেখক নন। তিনি বিশ্বকবি। তাই তাকে রক্ষা করার প্রয়োজন নেই। একজন মানুষ এক জন্মে ঋষির মতো ধ্যানমগ্ন হয়ে অজস্র রত্নভান্ডার তার ভাষায় সৃষ্টি করতে সক্ষম—রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম না দেখলে আমাদের বিশ্বাস করা কঠিন হতো। সৃষ্টিকর্মের মান ও পরিমাণ দিয়ে বিবেচনা করলে তিনি ছিলেন রাজা।রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে, বিশ্বের সকল মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন একাধারে বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক হিসেবে। তাকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তার সৃষ্টিসম্ভারের ভেতর কী আছে? রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিসম্ভারে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন রয়েছে। জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয় তার সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১,৯১৫টি গান, যা যথাক্রমে ‘গল্পগুচ্ছ’ ও ‘গীতবিতান’ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে ‘চিঠিপত্র’ ও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত। এ ছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন। কোনো শুভচিন্তার মানুষ তার সৃষ্টিসম্ভারের দিকে তাকিয়ে কি তাকে প্রণতি না জানিয়ে পারবেন? জানি না, তবে আমরা পারি।রবীন্দ্রনাথকে পূজা করার প্রয়োজন নেই। তাকে শ্রদ্ধা করারও প্রয়োজন নেই। তাকে রক্ষা করারও দরকার আছে বলে মনে করি না। তবে তাকে অপমান করার অধিকার আমাদের কারও নেই। তাকে অপমান করলে সত্য, সুন্দর, মহৎ পৃথিবীকে নোংরা করা হয়। আমরা অনেক জঞ্জাল সঞ্চয় করেছি আমাদের ভাগাড়ে। আরও অসুন্দর জঞ্জালের প্রয়োজন আছে?(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

প্রবৃদ্ধি নয়, মানুষের জীবনমানই অর্থনীতির লক্ষ্য

এ বছর বিশ্ব অর্থনীতির উত্থান-পতন নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক সংকটের ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক ভিত্তি উন্নয়নের জন্যতাদের যৌথভাবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। সুইডেনের রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস ১২ অক্টোবর এই পুরস্কার ঘোষণা করে।তাদের গবেষণার স্বীকৃতিতে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি—অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে শুধু সামগ্রিক পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলেই চলে না, বরং পরিবার, ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের প্রত্যাশাও বুঝতে হয়।অর্থনীতি বলতে আমরা সাধারণত প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয় বুঝি। কিন্তু এসব সামগ্রিক সূচকের পেছনে কাজ করে কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কোনো পরিবার কতটা ব্যয় করবে, কতটা সঞ্চয় করবে, কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন কারখানা স্থাপন করবে কি না কিংবা পণ্যের দাম কখন পরিবর্তন করবে—এসব সিদ্ধান্তের সম্মিলিত প্রভাবেই অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারিত হয়। রবার্ট ই. হলের গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে পরিবারের ভোগব্যয় এবং ভবিষ্যৎ আয় সম্পর্কে প্রত্যাশার সম্পর্ক।তার ১৯৭৮ সালের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা দেখায়, মানুষের ব্যয়ের সিদ্ধান্ত শুধু বর্তমান আয়ের ওপর নির্ভর করে না; ভবিষ্যৎ সম্পদ ও আয় সম্পর্কে নতুন তথ্যও ভোগব্যয়কে প্রভাবিত করতে পারে। অন্যদিকে, মাইকেল উডফোর্ড আধুনিক মুদ্রানীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।তার গবেষণায় সুদের হার, মূল্য নির্ধারণ, মানুষের প্রত্যাশা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্তের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০০৩ সালে প্রকাশিততার ‘ইন্টারেস্ট অ্যান্ড প্রাইসেস: ফাউন্ডেশন অব এ থিওরি অব মনিটারি পলিসি’ গ্রন্থটি আধুনিক মুদ্রানীতির আলোচনায় বিশেষভাবে পরিচিত ও সমাদৃত।দুই অর্থনীতিবিদের গবেষণার তাৎপর্য হলো, অর্থনীতির সামগ্রিক ওঠানামাকে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আচরণের সঙ্গে যুক্ত করে আরও কার্যকর নীতিনির্ধারণের ভিত্তি তৈরি করা। বিশ্ব অর্থনীতি সব সময় একই গতিতে চলে না। কখনো উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং মানুষের আয় বৃদ্ধি পায়। আবার কখনো অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কিংবা আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে উৎপাদন কমে যায় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে। ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা প্রচলিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেলের সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছিল। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণ এবং সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের কার্যকারিতা আরও ভালোভাবে বোঝার প্রয়োজন দেখা দেয়। হল ও উডফোর্ডের গবেষণা এমন মডেল বিকাশে অবদান রাখে, যেগুলোতে মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, প্রত্যাশা এবং বাজারের আচরণকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধারার গবেষণা থেকে বিকশিত আধুনিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেলগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকে অর্থনৈতিক ধাক্কার সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ এবং উপযুক্ত নীতিগত প্রতিক্রিয়া নির্ধারণে সহায়তা করে। তবে কোনো মডেলই সব পরিস্থিতিতে নিশ্চিত সমাধান দিতে পারে না; নীতির কার্যকারিতা নির্ভর করে সংকটের ধরন, সময় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর।অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার ও আর্থিক পরিস্থিতি পরিচালনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে, সরকার কর, সরকারি ব্যয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থনীতির চাহিদা এবং উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ানোর কথা বিবেচনা করতে পারে। এতে ঋণ নেওয়ার ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং ভোগ ও বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি কমতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত কঠোর নীতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থরতা এবং কর্মসংস্থানের ওপর চাপও সৃষ্টি করতে পারে। আবার মন্দার সময় উপযুক্ত নীতিগত সহায়তা অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে। এখানেই নীতিনির্ধারণের সূক্ষ্মতা। অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা না বুঝে শুধু সুদের হার পরিবর্তন কিংবা সরকারি ব্যয় বাড়ানো-কমানো যথেষ্ট নয়। মানুষের প্রত্যাশা, বাজারের প্রতিক্রিয়া এবং নীতির বিশ্বাসযোগ্যতাও বিবেচনায় নিতে হয়।বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রাধিকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে। একই সঙ্গে ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ এবং বাজারের অনিশ্চয়তা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এ বাস্তবতায় হল ও উডফোর্ডের গবেষণা থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া যায়। প্রথমত, অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মূল্যস্ফীতির কারণ চিহ্নিত না করে শুধু সামগ্রিক চাহিদা কমানোর চেষ্টা করলে প্রত্যাশিত ফল নাও আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার পাশাপাশি সরকারের ব্যয়, করনীতি ও উন্নয়ন কর্মসূচির কার্যকারিতাও বিবেচনা করতে হবে। তৃতীয়ত, নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা দরকার। মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আস্থাশীল হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে। চতুর্থত, প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি তার সুফল কারা পাচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করা জরুরি। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষ্য শুধু মূল্যস্ফীতির হার বা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি নয়; মানুষের জীবনযাত্রার মান, কর্মসংস্থান এবং বাস্তব আয়ের উন্নতিও এর অংশ। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এসব নীতি প্রয়োগের সময় স্থানীয় বাস্তবতা, সরবরাহব্যবস্থা, বৈদেশিক বাণিজ্য, উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিতে হবে। উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা সরাসরি অনুকরণ করাই যথেষ্ট নয়।অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আলোচনা শুধু মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কিংবা সুদের হার নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আয়ের বৈষম্য, সম্পদের সুষম বণ্টন, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন। একটি দেশের অর্থনীতি তখনই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যখন তার উন্নয়নের সুফল সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের কাছে পৌঁছায়। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা কঠিন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের জন্য সহজ অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।অর্থনৈতিক নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা। সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার, আর্থিক খাতে সুশাসন এবং নীতিনির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োগ অর্থনীতির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে পারে। এই আস্থা বিনিয়োগ, উৎপাদন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণার আলোচনায় যে বৃহত্তর শিক্ষা উঠে আসে, তা হলো অর্থনীতির বিভিন্ন উপাদানকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার না করে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে হবে। তবে অর্থনৈতিক মডেলকে বাস্তব জীবনের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না; বরং তথ্য, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে তার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নয়, বরং এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার গুরুত্ব পায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সার্থকতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে, তার ভিত্তিতে।অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত এই গবেষণা মনে করিয়ে দেয় যে অর্থনৈতিক সংকটের মোকাবিলা কেবল তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন গভীর বিশ্লেষণ, বাস্তবসম্মত মডেল এবং নীতির সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক মডেলকে বাস্তব তথ্য দিয়ে যাচাই করা এবং সময়ের সঙ্গে তার সীমাবদ্ধতা সংশোধন করাও জরুরি। অর্থনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনমানের উন্নতি। প্রবৃদ্ধি যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে, মূল্যস্ফীতি মানুষের আয়কে ক্ষয় করে কিংবা উন্নয়নের সুফল সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির সামাজিক তাৎপর্য সীমিত হয়ে পড়ে। রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণা অর্থনৈতিক নীতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।তাদের কাজ থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যদি তথ্যনির্ভর, সমন্বিত ও জনকল্যাণমুখী নীতি গ্রহণ করতে পারে, তাহলে অর্থনৈতিক অস্থিরতার ক্ষতিকর প্রভাব কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথ সুগম করা সম্ভব। অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড তাই শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধি কতটা স্থিতিশীল, কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারছে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সহযোগী অধ্যাপক (খণ্ডকালীন), সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়]

জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির একচল্লিশ বছর

অক্টোবর এলেই জগন্নাথ হলের পরিচিত ভবন, প্রাঙ্গণ ও পথগুলো আমার কাছে অন্য অর্থ নিয়ে ফিরে আসে। যেখানে একদিন ছাত্রজীবনের স্বাভাবিক আনন্দ ছিল, সেখানে দেখি হারিয়ে যাওয়া সতীর্থদের মুখ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শোক দিবসের আয়োজন, স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন কিংবা রবীন্দ্রনাথের পঙ্‌ক্তিসংবলিত ব্যানার আমাকে তাদের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু আমার স্মৃতিতে তাদের শুধু মৃত্যু নেই; আছে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন রক্ষায় প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা সম্পর্কে কিছু অনিষ্পন্ন প্রশ্ন।১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর রাতে জগন্নাথ হলের পুরোনো অ্যাসেম্বলি ভবনের টেলিভিশন কক্ষে শিক্ষার্থী, কর্মচারী ও অতিথিরা বিটিভির জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘শুকতারা’ দেখছিলেন। দিনভর বৃষ্টির পর রাত নয়টার দিকে ছাদ ধসে পড়ে। প্রাণ হারান ৩৯ জন; আহত হন প্রায় ৩০০ জন। একটি সাধারণ সন্ধ্যা মুহূর্তে অসহনীয় শোকের রাতে পরিণত হয়। সেই ঘটনাকে আমরা অক্টোবর ট্রাজেডি বলে স্মরণ করি। কিন্তু ‘ট্রাজেডি’ শব্দের গভীর বিষণ্নতার মধ্যেও দায়িত্বের প্রশ্ন যেন অস্পষ্ট হয়ে না যায়।প্রাণহানির সংখ্যা ঘটনাটির ভয়াবহতা বোঝায়, কিন্তু ক্ষতির সমগ্র পরিসর বোঝায় না। প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে একটি পরিবারের জীবন বদলে যায়। আহতদের চিকিৎসা, সুস্থ হয়ে ওঠা এবং শিক্ষাজীবনে ফিরে আসার অভিজ্ঞতাও এই ইতিহাসের অংশ। তাদের পরবর্তী জীবনের নির্দিষ্ট দুর্ভোগ সম্পর্কে তথ্য ছাড়া দাবি করা উচিত নয়। তবে নিহতদের তালিকার পাশাপাশি আহতদের অভিজ্ঞতা ও পরিবারের বক্তব্য সংরক্ষণের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। তাদের কথা ছাড়া এই বিপর্যয়ের মানবিক ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।আমি তখন জগন্নাথ হলের ছাত্র। এই বিপর্যয়ের প্রত্যক্ষদর্শী। তৎকালীন ছাত্রসংগঠনের কর্মী হিসেবে অবহেলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি, সাধারণ ছাত্রদের সংগঠিত করেছি, দাবি তুলতে উৎসাহ দিয়েছি। সতীর্থের লাশ বহনের যে অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছিল, তা কোনো বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ স্মৃতি নয়। তার ভার আজও বহন করি। একচল্লিশ বছর পর আমার প্রশ্ন তাই ব্যক্তিগত বেদনা থেকে জন্ম নিলেও তার তাৎপর্য প্রাতিষ্ঠানিক: যে অবহেলার অভিযোগ আমরা তুলেছিলাম, তার পূর্ণাঙ্গ উত্তর কোথায়? আমাদের প্রতিবাদের পেছনে ছিল শিক্ষার্থীর জীবনের প্রতি দায়িত্ব পালনের দাবি। আমরা চাইতাম, কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা করুক কীভাবে বিপজ্জনক অবস্থার একটি ভবন ব্যবহৃত হতে থাকল এবং সতর্কতা বা মেরামতের আবেদন কী পরিণতি পেল। ছাত্রদের সেই প্রতিবাদকে শুধু দুর্ঘটনা-পরবর্তী আবেগ হিসেবে দেখলে তার মূল বক্তব্য হারিয়ে যায়। শোক আমাদের প্রতিবাদের তীব্রতা বাড়িয়েছিল; কিন্তু দাবিটির ভিত্তি ছিল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। এই প্রশ্নের সঙ্গে স্মরণের কোনো বিরোধ নেই। নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন প্রয়োজনীয়। তাদের নাম, মুখ ও জীবনের পরিচয় নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও কর্তব্য। সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন স্মরণকে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সম্পন্ন হওয়ার নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ফুল দেওয়া এবং অতীতের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করা পৃথক কাজ। প্রথমটি আন্তরিক হলেও দ্বিতীয়টির প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না।জগন্নাথ হলের সামনে রবীন্দ্রনাথের “মরণসাগরপারে তোমরা অমর, তোমাদের স্মরি” পঙ্‌ক্তিটি দেখলে আমি সেই পার্থক্য নিয়েই ভাবি। আমাদের প্রিয়জনেরা স্মৃতিতে বেঁচে থাকেন—এই অনুভূতি মানবিক। কিন্তু যাঁদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি, তাদের মৃত্যুর পরে ‘অমর’ ঘোষণার ভাষা প্রতিষ্ঠানকে কী দায়িত্ব দেয়? তাদের মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে তাদের মৃত্যুর সত্য জানার অধিকারও কি স্বীকার করতে হয় না?একই গানে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—“বন্দীরে দিয়ে গেছ মুক্তির সুধা,তোমাদের স্মরি।সত্যের বরমালে সাজালে বসুধা,তোমাদের স্মরি।”এখানে স্মরণের সঙ্গে মুক্তি ও সত্যের সম্পর্ক আছে। জগন্নাথ হলের নিহতদের মৃত্যু নিজে থেকে অন্যদের মুক্ত করেছে কিংবা সত্য প্রতিষ্ঠা করেছে—এমন দাবি করার ভিত্তি নেই। সেই মৃত্যুর অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করতে পারে, অবহেলার বাস্তবতা উন্মোচনের তাগিদ দিতে পারে। কিন্তু তথ্যপ্রকাশ, দায় নির্ণয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ জীবিতদেরই সম্পন্ন করতে হবে। কবিতার প্রতি আস্থা থাকলে তার নৈতিক তাৎপর্য নিয়েও ভাবতে হবে। ‘সত্যের বরমালে সাজালে বসুধা’ পঙ্‌ক্তিতে একটি সম্পন্ন কাজের স্বীকৃতি রয়েছে। অথচ এই মৃত্যুগুলোকে ঘিরে সত্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন যদি অনিষ্পন্ন থাকে, তাহলে পঙ্‌ক্তিটিকে ঘটনার নিষ্পন্ন বিবরণ হিসেবে গ্রহণ করতে আমার সংশয় হয়। সাহিত্যিক উচ্চারণ আমাদের অনুভূতিকে মর্যাদা দেয়। প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেই উচ্চারণের সঙ্গে বাস্তব কাজের সম্পর্কও পরীক্ষা করতে হয়। আমার আপত্তি তাই কোনো ব্যানারের বিরুদ্ধে নয়। প্রশ্নটি প্রতিষ্ঠানের আচরণ সম্পর্কে। স্মরণে ব্যবহৃত ভাষা এবং বাস্তবে পালিত দায়িত্বের মধ্যে কতখানি সংযোগ রয়েছে? ‘তোমাদের স্মরি’ বলার সঙ্গে যদি সংশ্লিষ্ট নথি সহজলভ্য করা, অভিযোগের উত্তর দেওয়া এবং নিরাপত্তার অগ্রগতি জানানো যুক্ত হয়, তাহলে সেই উচ্চারণ আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে। অবহেলার প্রশ্নটি কেবল আমাদের ব্যক্তিগত স্মৃতিতে নেই। জগন্নাথ হলের প্রাক্তন প্রাধ্যক্ষ, প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ড. রংগলাল সেন তার ‘জগন্নাথ হলের অক্টোবর দুর্ঘটনা ও তার প্রতিক্রিয়া’ প্রবন্ধে ভবন সংস্কারের প্রয়োজন এবং বারবার চিঠি দেওয়ার কথা লিখেছেন। তিনি ১৯৭৩-১৯৮৩ সময়ে বিভিন্ন প্রাধ্যক্ষের মেরামতের আবেদন এবং তার পরবর্তী প্রাধ্যক্ষের ১৯৮০ সালের এপ্রিলের চিঠির উল্লেখ করেছেন। তার বিবরণ অনুযায়ী, কাজ শুরুর আগেই বিপর্যয় ঘটে।অধ্যাপক জগদীশ চন্দ্র শুক্লদাসের স্মৃতিবয়ানেও মেরামতের আবেদন, বিপজ্জনক অবস্থার সতর্কতা এবং মেরামতের সঙ্গে ভবন ব্যবহারের উদ্বেগজনক সম্পর্ক উঠে এসেছে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রকাশিত বিবরণে যখন পূর্বসতর্কতার প্রসঙ্গ ফিরে আসে, তখন ঘটনার ব্যাখ্যা শুধু বৃষ্টির ওপর ছেড়ে দেওয়া যথেষ্ট হয় না। আবহাওয়া মানুষের নিয়ন্ত্রণে ছিল না; কিন্তু ভবন পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত মানুষের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে এসব স্মৃতিবয়ানকে মূল প্রশাসনিক নথির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করাও যথার্থ হবে না। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। সংশ্লিষ্ট চিঠি, প্রকৌশল মতামত, বরাদ্দ, কার্যাদেশ এবং ব্যবহার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত একত্রে পরীক্ষা করলে দায়িত্বের ধারাবাহিকতা বোঝা সহজ হবে। কোন আবেদন কখন পৌঁছেছিল, কী সুপারিশ এসেছিল, সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোথায় বিলম্ব হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর চাই। অভিযোগের যথার্থতা প্রতিষ্ঠা কিংবা সংশোধন, উভয়ের জন্যই নথি প্রয়োজন।এই অনুসন্ধানে দায়িত্বের বিভিন্ন স্তরও আলাদা করে দেখতে হবে। হল প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং সিদ্ধান্ত অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এক নয়। কেউ সতর্কতা জানিয়ে থাকলে তার স্বীকৃতি প্রয়োজন; কোথাও দায়িত্ব পালিত না হলে সেটিও নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। অস্পষ্টভাবে সবাইকে দায়ী করা যেমন যথার্থ নয়, তেমনি দায়িত্ব বিভিন্ন দপ্তরে বিভক্ত ছিল বলে প্রতিষ্ঠান সামগ্রিক ব্যাখ্যার কর্তব্য এড়াতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় একটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সন্তানকে সেখানে পাঠিয়ে পরিবার শিক্ষা ও নিরাপত্তার ওপর আস্থা রাখে। শিক্ষার্থীর পক্ষে ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা বিচার করা কিংবা মেরামতের বরাদ্দ অনুমোদন করা সম্ভব নয়। সে প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। এই নির্ভরতার কারণেই প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে বিশেষ দায়িত্ব যুক্ত হয়। প্রাণহানির ইতিহাস লিখতে গিয়ে সেই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল, তা বাদ দেওয়া চলে না।ঘটনার পরে উদ্ধার, চিকিৎসা ও রক্তদানে যে অসাধারণ মানবিক সংহতি সৃষ্টি হয়েছিল, আমি তা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল হকের ‘স্মৃতিচারণ’ লেখায় হাসপাতালের পরিস্থিতি ও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সহযোগিতার বিবরণ রয়েছে। বিপর্যয়ের মধ্যে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই ইতিহাস আমাদের মূল্যবান সম্পদ। তার স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। কিন্তু উদ্ধারকাজের সাফল্য দিয়ে বিপর্যয়ের আগের সিদ্ধান্তগুলো মূল্যায়ন করা যায় না। কোনো প্রতিষ্ঠান জরুরি পরিস্থিতিতে আন্তরিকভাবে কাজ করতে পারে, আবার তার পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতাও থাকতে পারে। একটি দিকের স্বীকৃতি অন্য দিক সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার অধিকার কেড়ে নেয় না। পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসে দুটিই থাকতে হবে।পরবর্তী সময়ে নিহতদের পরিবারকে সহায়তা, আহতদের চিকিৎসা এবং কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ড. সৌমিত্র শেখরের ‘অক্টোবর দুর্ঘটনা এবং তারপর’ প্রবন্ধে সহায়তা, ভর্তি-সুবিধা ও ট্রাস্টের বিবরণের পাশাপাশি কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত না হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সহায়তার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা অন্যায্য। কিন্তু সহায়তা প্রদান এবং অবহেলার দায় ব্যাখ্যা করা পৃথক দায়িত্ব। নতুন ভবন নির্মাণ আবাসনের প্রয়োজন মেটাতে পারে; পুরোনো ভবন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল, তার উত্তর দেয় না। পরিবার ও আহতদের প্রতি দায়িত্ব মূল্যায়নেও তাদের নিজেদের বক্তব্য শোনা প্রয়োজন। কোন সহায়তা পাওয়া গিয়েছিল, তা কতটা কাজে এসেছিল এবং কোনো প্রতিশ্রুতি অসম্পূর্ণ ছিল কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মানুষের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সম্মান ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করেই তা সংরক্ষণ করা যায়। সহায়তা গ্রহণের কারণে প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রশ্ন তোলার অধিকার সীমিত হয় না।একইভাবে তদন্ত হওয়া, প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া এবং সুপারিশ কার্যকর হওয়াও এক বিষয় নয়। প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. এ. ফায়েজের ২০০৬-২০০৭ সালের শোকদিবসের বাণীতে আগে প্রকাশিত দুটি তদন্ত প্রতিবেদনের উল্লেখ আছে। তাই তদন্ত বা প্রতিবেদন একেবারেই ছিল না—এমন দাবি যথার্থ নয়। প্রয়োজন হলো প্রতিবেদনগুলোর সিদ্ধান্ত, গৃহীত ব্যবস্থা এবং অবশিষ্ট প্রশ্ন একসঙ্গে জানা। কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছিল, কোনটি বাস্তবায়িত হয়েছিল এবং কোনোটি বাস্তবায়িত না হলে তার কারণ কী—এই বিবরণও প্রকাশ করা দরকার। প্রতিবেদন প্রকাশের পর দায়িত্ব শেষ হয়েছে ধরে নেওয়া যায় না। সুপারিশের অনুসরণ সম্পর্কে নথি থাকলে তা সামনে আসুক। নথি অনুপস্থিত থাকলে সেই সীমাবদ্ধতাও স্পষ্টভাবে বলা হোক। অনিশ্চয়তা স্বীকার করা ইতিহাসকে দুর্বল করে না; বরং অযাচাইকৃত দাবি থেকে তাকে রক্ষা করে।বর্তমান প্রশাসনকে ১৯৮৫ সালের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায়ের সঙ্গে এক করে দেখা সমীচীন নয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ধারাবাহিক প্রতিষ্ঠান। নেতৃত্ব বদলালেও নথি সংরক্ষণ, ইতিহাস ব্যাখ্যা এবং শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বহাল থাকে। আজকের কর্তৃপক্ষ অতীতের সিদ্ধান্ত নেয়নি; তবু সেই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তথ্যপ্রকাশের উদ্যোগ নিতে পারে। দীর্ঘদিনের সংশয় দূর করার এই সুযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা বাড়াতে পারে।আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ‘জগন্নাথ হলের ট্রাজেডি’ প্রবন্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাহীনতা ও শিক্ষার প্রতি সামাজিক উপেক্ষার বৃহত্তর প্রশ্ন তুলেছেন। তার বিশ্লেষণ মনে করিয়ে দেয়, ভবনের ব্যর্থতার পেছনে অগ্রাধিকার নির্ধারণের ব্যর্থতাও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। নতুন নির্মাণ দৃশ্যমান; পুরোনো ভবনের নিয়মিত মেরামত কম আলোচিত। অথচ জীবনরক্ষার জরুরি ব্যয় প্রচারযোগ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে না। নিরাপত্তাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার নিয়মিত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ভবন নির্মাণের সঙ্গে তার পরিদর্শন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। কোনো সমস্যা শনাক্ত হওয়ার পর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ভবনটি ব্যবহৃত হতে থাকলে অন্তর্বর্তী নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠবে। বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা থাকলেও সেই সময়ে মানুষের জীবন কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।তাই আমার প্রস্তাব, বিশ্ববিদ্যালয় অক্টোবর ট্রাজেডি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ নথিসংগ্রহ প্রকাশ করুক। মেরামতের আবেদন, তদন্ত প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী ব্যবস্থার বিবরণ সেখানে থাকুক। পরিবার ও আহতদের সম্মতিতে তাদের সংরক্ষিত নথি যুক্ত করা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য আলাদাভাবে চিহ্নিত থাকুক। কোথায় তথ্যের ঘাটতি আছে, তাও স্পষ্ট বলা হোক। উদ্দেশ্য পূর্বনির্ধারিত রায় ঘোষণা করা নয়; যাচাইযোগ্য ইতিহাসের ভিত্তি তৈরি করা। এই সংগ্রহ শুধু বিশেষজ্ঞদের জন্য নয়, সাধারণ পাঠকের জন্যও ব্যবহারযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। ঘটনার সময়ক্রম, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সিদ্ধান্ত এবং নথির পরিচয় সহজভাবে উপস্থাপন করা যায়। মূল নথি ও পরবর্তী স্মৃতিচারণ আলাদা রাখা হলে পাঠক বুঝতে পারবেন কোন বক্তব্য প্রত্যক্ষ রেকর্ডে রয়েছে, আর কোনটি ব্যক্তিগত স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল। নতুন প্রজন্ম তখন শোক দিবসের পেছনের ইতিহাসও জানতে পারবে। অতীতের এই অনুসন্ধানের সঙ্গে বর্তমান নিরাপত্তার ব্যবস্থাপনাও যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। দাবি শুধু জগন্নাথ হলের জন্য নয়; সব আবাসিক হল এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য প্রযোজ্য। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ক্ষেত্রে নিরাপদ বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ভবন খালি করার নির্দেশ দিয়ে সংশ্লিষ্ট মানুষকে অনিশ্চয়তায় রেখে দেওয়া দায়িত্বের পূর্ণাঙ্গ পালন নয়।শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ জানানোর সুযোগ এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো ছাত্র বিপজ্জনক অবস্থা সম্পর্কে অভিযোগ করলে তার বক্তব্য যথাযথ দপ্তরে পৌঁছানো, পরীক্ষা করা এবং সিদ্ধান্ত জানানো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। অভিযোগ জানানোর কারণে কাউকে অসুবিধায় পড়তে হলে পূর্বসতর্কতার পথই বাধাগ্রস্ত হবে। ছাত্রদের প্রতিবাদ ও প্রশ্নকে তাই নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।একচল্লিশ বছর পরে আমার অবস্থান প্রতিহিংসার নয়। সতীর্থ-স্বজনদের স্মৃতির প্রতি দায়িত্ব পালনের তাগিদ থেকেই কথা বলি। যাদের আমরা হারিয়েছি, তাদের জীবন কোনো প্রশাসনিক বিবরণের সংখ্যা হয়ে থাকুক, তা চাই না। তাদের স্বপ্ন ছিল, পরিবার ছিল, ভবিষ্যৎ ছিল। সেই ভবিষ্যৎ কেন থেমে গেল এবং তা রক্ষায় প্রতিষ্ঠানের কোথায় ব্যর্থতা ছিল—এই প্রশ্নের উত্তর চাওয়া তাদের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধারই প্রকাশ। সময়ের ব্যবধান সেই দাবির ন্যায্যতা কমায় না। আমি চাই, বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রকাশিত স্মৃতিবয়ানে থাকা অবহেলার অভিযোগগুলোর নথিভিত্তিক উত্তর দিক। তদন্তের সিদ্ধান্ত, গৃহীত ব্যবস্থা এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের বিবরণ প্রকাশ করুক। যেখানে দায়িত্ব পালিত হয়েছে, তার স্বীকৃতি থাকুক; যেখানে ব্যর্থতা প্রতিষ্ঠিত হবে, তা স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হোক। কোনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়া না গেলে সেই সীমাবদ্ধতাও জানানো হোক। সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এই সাহস বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাকে সমুন্নত করবে। বর্তমান নেতৃত্বের জন্য এটি অতীতের অনিষ্পন্ন প্রশ্ন মোকাবিলা করে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ। সেই আস্থা পুনর্গঠনের কাজ বর্তমান শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায়ও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। ১৫ অক্টোবর শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তার হিসাব দেওয়ার দিন হয়ে উঠুক। কোন ভবন পরীক্ষা হয়েছে, কোন মেরামত সম্পন্ন হয়েছে, কোন ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে এবং তা দূর করার দায়িত্ব কার—এসব তথ্য প্রকাশিত হোক। শিক্ষার্থীর সতর্কবার্তা যেন নিরুত্তর পড়ে না থাকে। আমাদের প্রজন্মের প্রতিবাদ তখনই স্থায়ী অর্থ পাবে, যখন পরবর্তী প্রজন্মের উদ্বেগ সময়মতো শোনা হবে এবং কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে।রবীন্দ্রনাথের “তোমাদের স্মরি” উচ্চারণ তাই আমাদের সান্ত্বনার সঙ্গে বিবেকের দায়ও জাগিয়ে তুলুক। “সত্যের বরমালে সাজালে বসুধা”—এই পঙ্‌ক্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের একটি বাস্তব পথ হলো মৃত্যুগুলোকে ঘিরে সত্য উন্মোচনের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করা। নিহতদের মৃত্যু নিজে সেই কাজ করে দেয়নি; দায়িত্বটি আমাদের ওপর রয়ে গেছে। আমরা তাদের স্মৃতিকে যত গভীরভাবে ধারণ করি, তাদের মৃত্যুর কারণ ও দায় সম্পর্কে তত স্পষ্ট উত্তর চাওয়ার কর্তব্যও অনুভব করি। আমার আকাঙ্ক্ষা, জগন্নাথ হলের প্রাঙ্গণে ফিরে আসা শোক একদিন সত্যপ্রকাশ ও দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তাও বহন করুক। নিহতদের পরিবার জানুক, তাদের প্রশ্ন প্রতিষ্ঠান শুনেছে; আহতরা জানুন, তাদের অভিজ্ঞতা এই ইতিহাসে মর্যাদা পেয়েছে; বর্তমান শিক্ষার্থীরা দেখুক, অতীতের শিক্ষা তাদের জীবন রক্ষার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের ‘অমর’ ঘোষণার আগে ও পরে তাই প্রশ্নটি দৃশ্যমান থাকুক: তাদের বেঁচে থাকার অধিকার কেন রক্ষা পেল না? সেই প্রশ্নের সৎ উত্তর এবং আজকের জীবন রক্ষায় তার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যেই আমাদের স্মরণ পূর্ণতা পেতে পারে।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব; জগন্নাথ হলের ১৯৮১-৮২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী]

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুল

শহরের আলো যখন রাতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তখন ফুটপাতের এক কোণে কুঁকড়ে থাকে একটি ছোট্ট শরীর। গায়ে ছেঁড়া জামা, পেটে ক্ষুধার জ্বালা, চোখে ঘুমের বদলে সতর্ক দৃষ্টি। অন্য শিশুরা যখন মায়ের কোলে রূপকথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে, তখন সে শিখে যায় কীভাবে রাতের অন্ধকারে নিজেকে আড়াল করে রাখতে হয়। তার নামের পাশে কোনো ঠিকানা নেই। জন্মদিনে কেক কাটার আনন্দ নেই। ‘সাবধানে যেয়ো’ বলে বিদায় জানানোর কেউ নেই। আমরা প্রতিদিন তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই। সিগন্যালে গাড়ির কাচে তাদের হাত বাড়াতে দেখে চোখ ফিরিয়ে নিই। অথচ প্রশ্নটি থেকেই যায়—যাদের কোনো অভিভাবক নেই, তাদের অভিভাবক হবে কে?বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে অসংখ্য শিশু রাস্তাকেই ঘর বানিয়েছে। কেউ দারিদ্র‍্যরে চাপে, কেউ নদীভাঙনে সব হারিয়ে, কেউ বাবা-মায়ের মৃত্যুতে, আবার কেউ নির্যাতনের ভয়ে ঘর ছেড়েছে। ঢাকার রেলস্টেশন, চট্টগ্রামের বাসস্ট্যান্ড কিংবা শহরের ফুটপাত—এসব জায়গাই তাদের ঠিকানা। এই শিশুরা কেবল কোনো পরিসংখ্যানের অংশ নয়। প্রতিটি শিশুর পেছনে রয়েছে একটি মুখ, একটি জীবন এবং অপূর্ণ থেকে যাওয়া শৈশব।রাস্তা তাদের কাছে একই সঙ্গে ঘর, বিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্র। অথচ সেই ঘরের কোনো দরজা নেই, কোনো নিরাপত্তাও নেই। রাত নামলে ঘুমন্ত শিশুরা হয়ে ওঠে সহজ শিকার। চুরি, মারধর ও যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি তাদের নিত্যসঙ্গী। মেয়েশিশুদের বিপদ আরও বেশি। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ কাগজ কুড়ায়, কেউ ভিক্ষা করে। আবার কেউ অপরাধচক্রের ফাঁদে পড়ে মাদক বহনের মতো কাজে জড়িয়ে যায়। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দূষিত পানি ও অপুষ্টির কারণে তারা নানা রোগে ভোগে। চিকিৎসার সুযোগও সীমিত। ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কেউ কেউ নেশার দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিদ্যালয়ের দরজাও তাদের অনেকের জন্য বন্ধ। জন্মনিবন্ধন না থাকাসহ নানা বাধায় তারা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এভাবে দারিদ্র‍্য ও শিক্ষাবঞ্চনার চক্র এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।শারীরিক ক্ষতের চেয়েও গভীর হতে পারে মনের ক্ষত। অবহেলা, ঘৃণা ও সহিংসতার মধ্যে বড় হতে হতে শিশুদের মনে জন্ম নেয় অবিশ্বাস, ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব। সমাজ তাদের ‘টোকাই’ বলে অবজ্ঞা করে। অথচ এই শিশুরাই আমাদের সামাজিক ব্যর্থতার নীরব সাক্ষী। নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার তাদেরও আছে। জন্মপরিচয়, পারিবারিক অবস্থা কিংবা আর্থিক সামর্থ্য কোনো শিশুর মর্যাদা নির্ধারণ করতে পারে না। অথচ বাস্তবে এই শিশুরাই সবচেয়ে বেশি বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার।শিশুদের সুরক্ষায় আইনি অঙ্গীকারের অভাব নেই। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করেছে। দেশের শিশু আইনেও শিশুর সুরক্ষা ও বিকাশের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু কাগজের অঙ্গীকার ও ফুটপাতের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান রয়ে গেছে। সরকারি সংস্থা, বেসরকারি সংগঠন ও স্থানীয় প্রশাসন নানা উদ্যোগ নিলেও সমন্বয়ের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই তা শিশুদের কাছে পৌঁছায় না। এই দায় কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়; রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক—সবারই দায়িত্ব রয়েছে। তাই শুধু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা।এই পরিস্থিতি বদলানোর পথ রয়েছে। রাষ্ট্রকে শহরগুলোতে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। পথশিশুদের জন্য বিনা মূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা ও জন্মনিবন্ধনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমে তদারকি ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। পুলিশকে পথশিশুদের সঙ্গে সংবেদনশীল ও মানবিক আচরণের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যারা শিশুদের শোষণ করে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বেসরকারি সংগঠন ও ব্যবসায়ী সমাজ বিকল্প শিক্ষা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনে ভূমিকা রাখতে পারে। গণমাধ্যমের কাজ হবে করুণা জাগানোর পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিষয়টি সামনে আনা। নাগরিক হিসেবেও আমরা ‘টোকাই’ বলে কোনো শিশুকে অবজ্ঞা না করে তার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতে পারি। কোনো শিশুকে বিপদে দেখলে সহায়তা করতে পারি কিংবা শিশু সহায়তা নম্বর ১০৯৮-এ জানাতে পারি। তবে বিচ্ছিন্ন সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যাতে কোনো শিশুকে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন রাস্তায় লড়াই করতে না হয়।শিশুরা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুল—কবিরা যুগে যুগে এ কথাই বলে এসেছেন। কিন্তু সব ফুল বাগানে ফোটে না। কিছু ফুল ফোটে ফুটপাতের ধুলোয়, অবহেলার উত্তাপে পুড়ে, বিনা যত্নে। একটি সমাজকে চেনা যায় তার সবচেয়ে অসহায় সন্তানদের সঙ্গে আচরণের মধ্য দিয়ে। আমরা যতই আকাশছোঁয়া ভবন গড়ি, উন্নয়নের যত ফিরিস্তিই দিই, কোনো শিশু যদি রাতে অনাহারে ও নিরাপত্তাহীনতায় ঘুমাতে যায়, তবে সেই উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না।তাই দায় চাপানোর খেলা বন্ধ করে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ প্রতিটি পথশিশুর চোখে জমে থাকা প্রশ্নটির উত্তর আমাদেরই দিতে হবে—‘আমারও কি একটা ঘর হতে পারে না?’লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা সাহিত্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সৌরবিদ্যুতের বড় লক্ষ্য, বাস্তবায়নে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎ এখন আর কেবল বিকল্প কোনো উৎস নয়, ভবিষ্যতের বিদ্যুৎব্যবস্থায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।বাড়ির ছাদ থেকে শিল্পকারখানা, সরকারি ভবন থেকে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র - বিভিন্ন ক্ষেত্রে সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সরকারও ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।কিন্তু বড় লক্ষ্য নির্ধারণ আর তা বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। সৌর প্যানেল স্থাপনের খরচ কে বহন করবে, উৎপাদিত বিদ্যুতের ন্যায্য দাম পাওয়া যাবে কি না, ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ মিলবে কি না - এসব প্রশ্নের সমাধান ছাড়া পরিকল্পনাটি কতটা এগোবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সাধারণ গ্রাহক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে, উৎপাদিত বিদ্যুৎ কার্যকরভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে এবং বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার বাস্তবসম্মত সুযোগ থাকবে।লক্ষ্যমাত্রা বড়, বাস্তবায়নের পথ কতটা মসৃণ?২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা থেকে এবং ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ভূমিভিত্তিক প্রকল্প থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বায়ুবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকেও অতিরিক্ত সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়বে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতেও সৌরবিদ্যুৎ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিল্পকারখানায় দিনের বেলায় বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি, সেখানে নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।তবে লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বর্তমান সক্ষমতা ও বাস্তব অগ্রগতির ব্যবধান বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। নতুন প্রকল্প ঘোষণা, সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ এবং বাস্তবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া বিদ্যুতের পরিমাণ এক নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রতিবছর কতটা নতুন সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে, বিনিয়োগ কোথা থেকে আসবে এবং কোন বাধাগুলো দূর করতে হবে, তার সুস্পষ্ট হিসাব প্রয়োজন।শুধু পরিকল্পনায় সক্ষমতার পরিমাণ উল্লেখ করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা, কার্যকর তদারকি এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা। পাশাপাশি বর্তমানে কত মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চালু রয়েছে, কতটি প্রকল্প নির্মাণাধীন এবং নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে কী ধরনের অগ্রগতি হচ্ছে - এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।ছাদে সৌর প্যানেল, কিন্তু বিনিয়োগের আগ্রহ কতটা?ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। শহরের আবাসিক ভবন, সরকারি স্থাপনা, বিপণিবিতান ও শিল্পকারখানার ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমে এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ সরাসরি ব্যবহার করা যায়।তবে সব ছাদ সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য সমান উপযোগী নয়। ছাদের আয়তন, নকশা, ছায়া, ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা, স্থাপনের নিরাপত্তা এবং বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিতে হয়। এসব বিষয় যাচাই না করে বিনিয়োগ করলে প্রত্যাশিত উৎপাদন ও আর্থিক সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে।ঢাকার বহুতল আবাসিক ভবনগুলোতে বিষয়টি আরও জটিল। একটি ভবনে একাধিক ফ্ল্যাটমালিক থাকেন। ছাদ যৌথ ব্যবহারের জায়গা হলেও সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপন, বিনিয়োগের অর্থ ভাগাভাগি এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের সুবিধা বণ্টন নিয়ে মতভেদ তৈরি হতে পারে। একজন বিনিয়োগ করলেন, অথচ অন্যরাও সুবিধা পেলেন - এমন পরিস্থিতিতে ন্যায্য হিসাবের ব্যবস্থা না থাকলে উদ্যোগটি টেকসই হবে না।এ কারণে আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে শুধু প্যানেল স্থাপনে প্রণোদনা দিলেই চলবে না। যৌথ বিনিয়োগের নিয়ম, বিদ্যুতের ব্যবহার ও ব্যয়ের হিসাব ভাগাভাগি এবং জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে ভবনমালিক ও ফ্ল্যাটমালিকদের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্ট করা প্রয়োজন।সাড়ে ১০ টাকায় বিদ্যুৎ বিক্রি: লাভের হিসাব কী বলছে?ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। নির্ধারিত শর্তে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপন করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করলে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ সুবিধা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। তবে এ প্রণোদনা পেতে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও কারিগরি শর্ত পূরণ করতে হবে।উদ্যোগটি গ্রাহকদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে। তবে বিদ্যুৎ বিক্রির মূল্য ও সুবিধার শর্তের পাশাপাশি উৎপাদনের মোট খরচ এবং বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হবে।সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, বৈদ্যুতিক সংযোগ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ - সবকিছুর পেছনে বিনিয়োগ প্রয়োজন। ব্যাটারি যুক্ত করলে ব্যয় আরও বাড়ে। ঋণ নিয়ে প্রকল্প স্থাপন করলে সুদের খরচও যুক্ত হয়। ফলে শুধু বিদ্যুৎ বিক্রির মূল্য বিবেচনা করে প্রকল্পের লাভজনকতা নির্ধারণ করা যায় না।প্রচলিত বাজারদরের একটি আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, তিন কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপনে দেড় লাখ থেকে এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে। ব্যাটারি যুক্ত করলে মোট বিনিয়োগ প্রায় পৌনে তিন লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে সরঞ্জামের মান, ব্যাটারির ধরন ও সক্ষমতা, স্থাপনের শর্ত এবং প্রকল্পের কাঠামোর ওপর প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে। এ হিসাবকে তাই নির্দিষ্ট বাজারদর নয়, আনুমানিক ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।এখন প্রশ্ন হলো, এই বিনিয়োগ থেকে কত দিনে অর্থ ফেরত আসবে? উৎপাদিত বিদ্যুতের কতটা নিজে ব্যবহার করা যাবে, কতটা গ্রিডে বিক্রি করা সম্ভব হবে এবং বিক্রির অর্থ কতটা নিয়মিত পাওয়া যাবে - এসব হিসাবের ওপর বিনিয়োগের লাভজনকতা নির্ভর করে।বিশেষ করে ছোট গ্রাহকদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট ব্যয় বেশি হলে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের বিক্রির পরিমাণ কম হলে প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট ক্রয়মূল্য ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের ব্যয়, ঋণের সুদ, নিজস্ব ব্যবহারের মাধ্যমে সাশ্রয় এবং প্রকল্পের আয়ুষ্কাল বিবেচনায় নিয়ে এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে গ্রাহক নিজের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করেও যুক্তিসংগত আর্থিক সুবিধা পান।শিল্পকারখানায় সম্ভাবনা বেশি, অর্থায়ন বড় বাধাবাংলাদেশের পোশাকশিল্পে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একদিকে বিদ্যুতের ব্যয় কমানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের শর্ত - দুই কারণে কারখানার মালিকদের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের আগ্রহ বাড়ছে।অনেক কারখানার বিশাল ছাদ রয়েছে। সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপন করে দিনের বেলায় বিদ্যুতের একটি অংশ নিজস্বভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। এতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন কমতে পারে এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি কারখানার কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য পূরণেও এটি সহায়ক হতে পারে।সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ২০ আগস্ট ২০২৬-এ প্রকাশিত এক সমীক্ষায় বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ছাদে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট-পিক (MWp) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। এ হিসাব কারখানাগুলোর ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নির্দেশ করে। বাস্তবে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ সূর্যালোক, আবহাওয়া ও ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে।এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু কারখানার মালিকদের আগ্রহ থাকলেও সব ক্ষেত্রে অর্থায়নের নিশ্চয়তা নেই। বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে এককালীন বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। ব্যাংকঋণের সুদ বেশি হলে বা ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে বিনিয়োগের পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে।এ ক্ষেত্রে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, প্রকল্পের শুরুতেই অর্থায়নের নিশ্চয়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোর জন্য সহজলভ্য সবুজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যেসব প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহী, তাদের জন্য ঋণ ও বিনিয়োগের ব্যবস্থা সহজ করা গেলে শিল্প খাতের সম্ভাবনাকে বাস্তব উৎপাদনে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।একই সঙ্গে সরকারি ভবন ও বড় বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোতেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এসব ভবনে পরিকল্পিতভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সম্ভব। সরকারি স্থাপনাগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন ও ছাদের উপযোগিতা যাচাই করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জমি কোথায়?ছাদভিত্তিক উৎপাদনের পাশাপাশি বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনও জরুরি। তবে এসব প্রকল্পের জন্য পর্যাপ্ত জমি পাওয়া বাংলাদেশের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাসন ও শিল্পায়নের চাপে কৃষিজমির ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য কৃষিজমি ব্যবহার করলে খাদ্য উৎপাদন ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।তাই জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। পতিত বা অনুপযোগী জমি, উপযুক্ত সরকারি জমি এবং অন্যান্য বিকল্প স্থান চিহ্নিত করে সেগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। জমির মালিকানা, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় না নিলে প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে।এ ছাড়া বড় প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া গেলেও বিদ্যুৎ সঞ্চালনের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। উৎপাদনকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন ও উপকেন্দ্র না থাকলে উৎপাদন বাড়িয়েও পুরো সুবিধা পাওয়া যাবে না। ফলে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনার সঙ্গে সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়নও সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।গ্রিডের সক্ষমতা না বাড়লে উৎপাদনের সুফল মিলবে কীভাবে?সৌরবিদ্যুতের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এর উৎপাদন সূর্যের আলো ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। দিনের বেলায় উৎপাদন বেশি হলেও সন্ধ্যার পর তা কমে যায়। ফলে জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থার সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের সমন্বয় করতে উন্নত গ্রিড ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।একই সময়ে অনেক এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে গেলে গ্রিডকে সেই বিদ্যুৎ গ্রহণ, সঞ্চালন ও বিতরণ করতে সক্ষম হতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও সঞ্চালন অবকাঠামো দুর্বল হলে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।এ ক্ষেত্রে স্মার্ট গ্রিড, উন্নত উৎপাদন পূর্বাভাস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ সংরক্ষণের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও এর জন্য বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাই সব প্রকল্পে একই ধরনের প্রযুক্তি প্রয়োগ না করে প্রকল্পের আকার, অবস্থান, উৎপাদনের ধরন ও বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী সমাধান নির্ধারণ করতে হবে।সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা ও নমনীয়তা বাড়ানো জরুরি। উৎপাদিত বিদ্যুৎ কীভাবে গ্রহণ, ব্যবস্থাপনা ও বিতরণ করা হবে, তার বাস্তব পরিকল্পনা ছাড়া শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আস্থা ফেরানো জরুরিপ্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। দেশীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো প্রকল্পে অর্থ দেওয়ার আগে নীতিমালার স্থিতিশীলতা, অনুমোদন প্রক্রিয়া, বিদ্যুৎ কেনার নিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করেন। এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যেতে পারে।বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে অতীতে অনুমোদিত কিছু প্রকল্প বাতিলের অভিজ্ঞতা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রশ্ন সামনে এসেছে। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ আইনের আওতায় অনুমোদিত একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের উদ্যোগ নেয়। তবে এ সিদ্ধান্তের ফলে নতুন বিনিয়োগ কতটা প্রভাবিত হয়েছে, তা নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।সাধারণভাবে বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রকল্প অনুমোদনের নিয়ম স্পষ্ট থাকবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অযথা বিলম্ব হবে না এবং বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারবেন।বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। সৌর প্যানেল স্থাপন, বৈদ্যুতিক প্রকৌশল, রক্ষণাবেক্ষণ ও গ্রিড ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল তৈরি করা না গেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও স্থানীয় সক্ষমতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।লক্ষ্যে পৌঁছাতে এখন কী করা দরকার?২০৩০ সালের সৌরবিদ্যুৎ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।প্রথমত, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আবাসিক গ্রাহক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য স্বল্প সুদের ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণের পরিমাণ, পরিশোধের সময়সীমা ও অন্যান্য শর্ত এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রকল্পের আর্থিক সাশ্রয় ও আয় দিয়ে বিনিয়োগের ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়।দ্বিতীয়ত, সৌর সরঞ্জামের ব্যয় কমাতে হবে। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের আমদানি এবং স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে হবে। শুল্ক ও করের কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে প্রকল্পের ব্যয় অযথা না বাড়ে। একই সঙ্গে সরঞ্জামের মান নিশ্চিত করা এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।তৃতীয়ত, উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য ও শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রকৃত ব্যয়, প্রকল্পের আকার এবং গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ, মিটারিং ও বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী করতে হবে।চতুর্থত, জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সঞ্চালন লাইন, উপকেন্দ্র, স্মার্ট গ্রিড এবং প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।পঞ্চমত, জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিজমি রক্ষা করে উপযুক্ত স্থানে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং ভবনের ছাদকে উৎপাদনের কাজে লাগানোর জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।ষষ্ঠত, বিনিয়োগ ও নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প অনুমোদন, বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নের নিয়ম স্পষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য হওয়া জরুরি। এতে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা সহজ হবে।সবশেষে, লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। কত মেগাওয়াট সক্ষমতা বাস্তবে যুক্ত হয়েছে, কতটি প্রকল্প নির্মাণাধীন এবং কোন বাধায় কাজ আটকে আছে - এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্ধারিত লক্ষ্যের বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতির তুলনামূলক হিসাব প্রকাশ করতে হবে। এতে পরিকল্পনার দুর্বলতা চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের দায়িত্বও স্পষ্ট করা যাবে।সৌরবিদ্যুতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বাস্তব পদক্ষেপের ওপরবাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্পকারখানা, সরকারি স্থাপনা ও আবাসিক ভবনের ছাদ ব্যবহার এবং উপযুক্ত জমিতে বড় প্রকল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিনিয়োগের সুযোগ, ন্যায্য বিদ্যুৎ মূল্য, উন্নত গ্রিডব্যবস্থা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা তাই শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের জ্বালানি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতারও পরীক্ষা। নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্য অর্জিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে ঘোষিত পরিকল্পনার কতটা বাস্তবে রূপ নেয় তার ওপর।বাংলাদেশের হাতে সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তরের প্রযুক্তি রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বাস্তবসম্মত উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। সম্ভাবনাকে অর্জনে রূপ দিতে পারলে সৌরবিদ্যুৎ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর অর্থায়ন, অবকাঠামো ও নীতিগত বাধা অমীমাংসিত থাকলে বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

কৃষকের ঘামে, কৃষিবিদের জ্ঞানে বদলে যাক কৃষি

“ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো”—কবি রফিক আজাদের এই পঙ্‌ক্তি বাংলা সাহিত্যের এক তীব্র আর্তনাদ। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি এক নির্মম প্রশ্ন। ভাতের অভাব যখন মানুষের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে, তখন স্বাধীনতার মানচিত্রও ক্ষুধার কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে উচ্চারিত এই পঙ্‌ক্তি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কেবল ভূখণ্ডের মুক্তি নয়; মানুষের মুখে অন্ন, জীবনে মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যেই স্বাধীনতার পূর্ণতা।একটি মানচিত্রের ভেতরে থাকে নদী, মাঠ, জনপদ, ইতিহাস ও মানুষের স্বপ্ন। কিন্তু সেই মানচিত্রের প্রতিটি ঘরে যদি অন্নের নিশ্চয়তা না থাকে, তবে স্বাধীনতার অর্জনও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই বাংলাদেশের কৃষির ইতিহাস শুধু ফসল উৎপাদনের ইতিহাস নয়; এটি ক্ষুধার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। এই ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছেন কৃষক, যার ঘামে মাটি উর্বর হয়। তাঁর পাশে রয়েছেন কৃষিবিদ, যার জ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি মাটির সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করে।বাংলাদেশের কৃষি আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তা কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রযুক্তির অর্জন নয়। এর পেছনে রয়েছে কৃষকের প্রজন্মান্তরের অভিজ্ঞতা, কৃষিবিদের গবেষণা ও উদ্ভাবন, কৃষি সম্প্রসারণকর্মীদের মাঠপর্যায়ের প্রচেষ্টা, কৃষিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অবদান এবং রাষ্ট্রের নীতি ও সহায়তা। কৃষক ও কৃষিবিদ—দুই ভিন্ন পরিচয়, কিন্তু লক্ষ্য এক: মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করা, কৃষিকে টেকসই করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উৎপাদনের ভিত্তি সুরক্ষিত রাখা। একজন অভিজ্ঞতার আলোকে মাটির ভাষা বোঝেন, অন্যজন গবেষণার মাধ্যমে সেই ভাষার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খোঁজেন। এই দুই জ্ঞানের সমন্বয়েই কৃষি হয়ে ওঠে শক্তিশালী, আধুনিক ও সম্ভাবনাময়।স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য জোগানো। সীমিত জমি, ঘনবসতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কৃষক উৎপাদনের লড়াই চালিয়ে গেছেন। কৃষিবিদ ও গবেষকেরা উন্নত জাত উদ্ভাবন, মানসম্মত বীজ উৎপাদন, সেচের সম্প্রসারণ, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির বিকাশে কাজ করেছেন। কৃষকের হাতে প্রযুক্তি পৌঁছেছে; কৃষক সেই প্রযুক্তিকে নিজের জমি, পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়োগ করেছেন। গবেষণাগারের জ্ঞান মাঠে প্রাণ পেয়েছে, আর মাঠের বাস্তবতা গবেষণাকে দিয়েছে নতুন দিকনির্দেশনা।এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। একসময় যে দেশকে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তাড়া করত, সেই দেশ আজ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তবে এই অর্জনকে আত্মতুষ্টির কারণ ভাবার সুযোগ নেই। কারণ, খাদ্যনিরাপত্তা শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। খাদ্য মানুষের নাগালে আছে কি না, ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে কি না, পুষ্টির চাহিদা পূরণ করছে কি না এবং দুর্যোগ কিংবা বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও সরবরাহ অব্যাহত থাকছে কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে ফসল ফললেই কৃষকের দায়িত্ব শেষ হয় না; সেই ফসলের ন্যায্য মূল্য, নিরাপদ সংরক্ষণ, কার্যকর বিপণন এবং ভোক্তার সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করাও খাদ্যব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।আজ কৃষির সামনে চ্যালেঞ্জের ধরন বদলেছে। জনসংখ্যা বাড়ছে, আবাদযোগ্য জমি কমছে, উৎপাদন উপকরণের ব্যয় বাড়ছে। কৃষিশ্রমিকের সংকট, বাজারের অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষকের ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলছে। কোথাও বন্যা, কোথাও খরা, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও লবণাক্ততা কৃষির প্রচলিত হিসাব পাল্টে দিচ্ছে। একদিকে উৎপাদন বাড়াতে হচ্ছে, অন্যদিকে মাটি, পানি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। অর্থাৎ আগামীর কৃষিকে একই সঙ্গে হতে হবে উৎপাদনশীল, লাভজনক, পুষ্টিসমৃদ্ধ, পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল।এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় কৃষকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে কৃষিবিদের বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানের সমন্বয় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। জলবায়ু-সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ফসলের জাত, মানসম্মত বীজ, পানি সাশ্রয়ী সেচ, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, সুষম সার প্রয়োগ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিযান্ত্রিকীকরণ কৃষিকে নতুন সক্ষমতা দিতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি উদ্ভাবনই শেষ কথা নয়; প্রযুক্তি কৃষকের কাছে কতটা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও ব্যবহারযোগ্য হয়েছে, সেটিই তার সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি। কৃষকের বাস্তব সমস্যা না বুঝে প্রযুক্তি চাপিয়ে দিলে তা মাঠে স্থায়ী হয় না। আবার বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও গবেষণাকে উপেক্ষা করলে কৃষি প্রকৃতির অনিশ্চয়তার কাছে আরও অসহায় হয়ে পড়বে।কৃষককে শুধু উৎপাদনের শ্রমিক হিসেবে দেখলে চলবে না; তিনি কৃষির জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনেরও অংশীদার। কোন জমিতে কোন ফসল ভালো হয়, কখন বীজ বপন করলে ফলন বাড়ে, কোন রোগের লক্ষণ কীভাবে প্রকাশ পায় কিংবা স্থানীয় আবহাওয়ার পরিবর্তনে ফসলের আচরণ কেমন হয়—এসব বিষয়ে কৃষকের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ অমূল্য। কৃষিবিদের দায়িত্ব সেই অভিজ্ঞতাকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা এবং কৃষকের সঙ্গে জ্ঞান বিনিময়ের পথ তৈরি করা। কৃষকের মাঠ ও গবেষণাগারের মধ্যে দূরত্ব যত কমবে, কৃষি গবেষণা তত বেশি বাস্তবমুখী হবে। কৃষককে বাদ দিয়ে কৃষির উন্নয়ন সম্ভব নয়; আবার কৃষিবিজ্ঞানকে সঙ্গে না নিয়ে ভবিষ্যতের খাদ্যচাহিদা পূরণ করাও কঠিন।কৃষকের মুখে হাসি না থাকলে খাদ্যনিরাপত্তার অর্জন পূর্ণতা পায় না। ফসল উৎপাদনের পর ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, সংরক্ষণের অভাবে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া কিংবা বাজারতথ্যের অসমতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া—এসব বাস্তবতা কৃষকের উৎপাদনে আগ্রহ দুর্বল করে। অথচ কৃষকই খাদ্যব্যবস্থার প্রথম ও অপরিহার্য স্তম্ভ। তাই কৃষকের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করতে সংরক্ষণাগার, হিমাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা, কৃষক সমবায়, সরাসরি বাজারসংযোগ এবং নির্ভরযোগ্য বাজারতথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সহজ শর্তে কৃষিঋণ, ফসলবিমা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও কৃষকের ঝুঁকি কমাতে পারে। কৃষক লাভবান হলে কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়বে; বিনিয়োগ বাড়লে খাদ্যব্যবস্থার ভিত্তিও হবে দৃঢ়।খাদ্যনিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো পুষ্টি। পেট ভরানো আর পুষ্টি নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। মানুষের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল ও তেলবীজসহ বৈচিত্র‍্যময় খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন ও জৈব-সমৃদ্ধকরণ পুষ্টির ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় জাত, দেশীয় ফল, শাকসবজি ও অন্যান্য জিনগত সম্পদ সংরক্ষণ করতে হবে। প্রকৃতির প্রতিটি বীজে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। কোনো কোনো স্থানীয় জাত হয়তো বর্তমানে কম উৎপাদন দেয়, কিন্তু তার মধ্যে থাকতে পারে খরা, লবণাক্ততা কিংবা রোগ প্রতিরোধের মূল্যবান বৈশিষ্ট্য। তাই জিনগত সম্পদ ও জীববৈচিত্র‍্য রক্ষা শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়; এটি আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তারও পূর্বশর্ত।আগামী দিনের কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপগ্রহের তথ্য, চালকবিহীন আকাশযান, সংবেদক ও নির্ভুল কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। এসব প্রযুক্তি ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, রোগবালাই শনাক্তকরণ, পানি ও সার ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন পরিকল্পনায় সহায়তা করতে পারে। তবে প্রযুক্তির সুফল যেন কেবল বড় কৃষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছানো, তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ডিজিটাল সেবা সহজলভ্য করা জরুরি। কৃষিতে নারীর অবদানও যথাযথ স্বীকৃতি ও সহায়তা দাবি করে। বীজ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে ফসল উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পারিবারিক পুষ্টি নিশ্চিত করা—বিভিন্ন পর্যায়ে নারীর শ্রম ও জ্ঞান কৃষির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁদের দক্ষতা, অধিকার ও অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে কৃষির অগ্রযাত্রা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বেসরকারি খাত এবং কৃষক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। মানসম্মত বীজ ও উপকরণের সময়মতো সরবরাহ, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, সেচ ও পানি সংরক্ষণ, গবেষণার ফল মাঠে পৌঁছানো, কৃষকের ন্যায্য মূল্য এবং বাজারব্যবস্থার উন্নয়ন—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কৃষি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে সাময়িক সাফল্য আসতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা।সবচেয়ে বড় কথা, কৃষির উন্নয়নকে কেবল উৎপাদন বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা যাবে না। কৃষি একটি জীবন্ত ব্যবস্থা, যেখানে মাটি, পানি, বীজ, জীববৈচিত্র‍্য, কৃষক, বিজ্ঞান ও বাজার পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই ব্যবস্থার কোনো একটি অংশ দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থাই ঝুঁকিতে পড়ে। তাই আজকের সিদ্ধান্তে আগামী দিনের মাটির উর্বরতা, পানির প্রাপ্যতা, বীজের বৈচিত্র‍্য এবং কৃষকের জীবিকার কথা বিবেচনায় নিতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের খাদ্য নিশ্চিত করতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই হতে হবে কৃষি উন্নয়নের মূল দর্শন।কবির সেই পঙ্‌ক্তি আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। কারণ, ক্ষুধার প্রশ্ন কখনো পুরোনো হয় না; শুধু তার রূপ বদলায়। একসময় প্রশ্ন ছিল, মানুষের মুখে ভাত জুটবে কি না। আজ প্রশ্ন—সেই ভাত কতটা নিরাপদ, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী; কৃষক কতটা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন; আর আগামী দিনের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আমাদের কৃষি কতটা প্রস্তুত। স্বাধীনতার মানচিত্রকে মর্যাদাবান রাখতে হলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে কৃষকের মাঠে, কৃষিবিদের গবেষণায় এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পরিকল্পনায়।মানচিত্র আমাদের স্বাধীনতার পরিচয়, আর অন্ন সেই স্বাধীনতার প্রাণ। মানচিত্রের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে মানুষের খাদ্য ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের ঘামকে দিতে হবে যথাযথ মূল্য, কৃষিবিদের জ্ঞানকে দিতে হবে গবেষণা ও প্রয়োগের সুযোগ, আর কৃষিকে দেখতে হবে জাতির দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে। কৃষক ও কৃষিবিদের এই পরিপূরক শক্তিই পারে ক্ষুধার আর্তনাদকে সম্ভাবনার উচ্চারণে রূপ দিতে। অতীতের সংগ্রাম আমাদের পথ দেখাক, বর্তমানের বিজ্ঞান আমাদের শক্তি জোগাক, আর ভবিষ্যতের কৃষি হোক জ্ঞান, শ্রম, প্রযুক্তি ও প্রকৃতির সমন্বিত সৃজন।কৃষকের ঘামে, কৃষিবিদের জ্ঞানে বদলে যাক বাংলাদেশের কৃষি—নিরাপদ হোক মানুষের অন্ন, সুরক্ষিত থাকুক প্রকৃতি, সমুন্নত হোক স্বাধীনতার মানচিত্র।[লেখক: ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)]

ভিডিও আরও দেখুন

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ব্যাটিং ধসে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় বাংলাদেশের

সেমিফাইনালে খেলার অলৌকিক সমীকরণ মেলানো তো দূরের কথা, দক্ষিণ আফ্রিকা লিজেন্ডসের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে টুর্নামেন্ট থেকেই বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স। ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অব লিজেন্ডসের শেষ চারে যাওয়ার লক্ষ্যে ১১.৫ ওভারে ২১০ রানের অসম্ভব এক পাহাড়সম টার্গেট তাড়া করতে নেমে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয় মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের দল।বুধবার (১৪ অক্টোবর) শারজায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে টস জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন দক্ষিণ আফ্রিকা লিজেন্ডসের অধিনায়ক ফাফ দু প্লেসি। ইনিংসের শুরুতে ফাফকে দ্রুত ফিরিয়ে দিয়ে টাইগারদের মনে স্বস্তি এনে দেন কামরুল ইসলাম রাব্বি। এর কিছু সময় পর ১৮ রান করা এবি ডি ভিলিয়ার্সকেও সাজঘরে ফেরান বোলাররা।তবে শুরুর সেই সাফল্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। ওয়ান ডাউনে নেমে বাংলাদেশি বোলারদের ওপর চওড়া হন জেপি ডুমিনি। ওয়েন পারনেলের ২২ রান এবং মর্ন ভন উইকের ৩০ রানের পর কলিন ইনগ্রামের সঙ্গে মিলে স্কোরবোর্ড সমৃদ্ধ করতে থাকেন ডুমিনি। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৪৯ বলে ৭টি চার ও ৫টি ছক্কার সাহায্যে ৮৯ রানের অপরাজিত এক ঝোড়ো ইনিংস খেলে দলের সংগ্রহ ৩ উইকেটে ২১০ রানে পৌঁছে দেন তিনি। বাংলাদেশের পক্ষে রুবেল হোসেন, আবু জায়েদ চৌধুরী ও কামরুল ইসলাম রাব্বি একটি করে উইকেট শিকার করেন।জবাবে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে হলে ১১.৫ ওভারের মধ্যে ২১০ রান টপকাতে হতো বাংলাদেশকে। অবিশ্বাস্য এই লক্ষ্য তাড়ায় নামার পর শুরু থেকেই ধসে পড়ে লাল-হুরাদের ব্যাটিং লাইনআপ। দলীয় মাত্র ৪ রানের মাথায় প্রথম দুই উইকেট হারিয়ে চরম বিপদে পড়ে দল। দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছানোর আগেই সাজঘরে ফেরেন শীর্ষ সারির তিন ব্যাটার।দলের চরম বিপর্যয়ের মুখে অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও ২৬ বলে ৩৭ রান করে তিনিও বিদায় নেন। শেষ দিকে আরাফাত সানির ৩০ বলের ৩১ রানের ইনিংসটি কেবল পরাজয়ের ব্যবধানটাই কিছুটা কমিয়েছে। নির্ধারিত ওভার শেষে বড় ব্যবধানের হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় বাংলাদেশকে। এই পরাজয়ের ফলে সেমিফাইনালের আশা তো বটেই, টুর্নামেন্ট থেকেও হতাশাজনক বিদায় নিশ্চিত হলো মাহমুদউল্লাহদের।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ব্যাটিং ধসে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় বাংলাদেশের