সংবাদ
সংবিধানে ফিরছে গণভোট-তত্ত্বাবধায়ক, স্বীকৃতি পাবে জুলাই অভ্যুত্থান

সংবিধানে ফিরছে গণভোট-তত্ত্বাবধায়ক, স্বীকৃতি পাবে জুলাই অভ্যুত্থান

সংবিধান সংশোধনের পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোটের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হবে এবং ভবিষ্যতে এই পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গণভোটের বাধ্যবাধকতা রাখা হবে। এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংবিধান সংশোধন সংশ্লিষ্ট বিশেষ কমিটি।মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির ষষ্ঠ বৈঠক শেষে সংসদ মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠকে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়।সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সংবিধানের যেসব মৌলিক অনুচ্ছেদে পরিবর্তন বা সংযোজন আসবে, তা কার্যকর করার আগে সাংবিধানিক গণভোটের আয়োজন করতে হবে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান তুলে দেওয়াকে হাইকোর্ট আগেই অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগে যা ছিল, সেটিই সঠিক। আইনের ভাষায় একে বলা হয় ‘ডকট্রিন অব ইক্লিপস’ বা গ্রহণের তত্ত্ব। গ্রহণ সরে গেলে যেমন চাঁদ আবার দেখা যায়, তেমনি অসাংবিধানিক ঘোষণা হওয়ায় গণভোটের বিধানটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসবে।’গণভোটের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে যেসব অনুচ্ছেদে পরিবর্তন বা সংযোজন আসবে, সেগুলো কার্যকর করার আগে গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। এটি হবে সাংবিধানিক গণভোট। এর আগে যে গণভোট হয়েছে, সেটি ছিল আইনি গণভোট।সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এমনভাবে ফিরিয়ে আনা হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ সহজে এটি বাতিল করতে না পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হলেও ভবিষ্যতে জনগণের কাছে যেতে হবে; এমন কঠোর বিধান রাখা হবে।’তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন বা এর কাঠামো কেমন হবে, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিএনপি প্রস্তাব করেছে, বিতর্ক এড়াতে রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার অপশনটি না রাখাই ভালো। বিষয়টি সংসদে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্য ও আহতসহ মোট ৬৩ জনের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। যদিও মতবিনিময়ে মোট ৬৫ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাদের সবাই অংশ নেননি। তবে আমন্ত্রণ না পেয়েও ১৪ জন মতবিনিময়ে অংশ নেন। তারা এই অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষার দাবি জানান। বৈঠকে বক্তাদের বেশির ভাগই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাংবিধানিক সুরক্ষা, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দায়মুক্তি ও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার ত্বরান্বিত করার দাবি জানান। এ ছাড়া কেউ কেউ জুলাই যোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানো, আহতদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, জুলাই যোদ্ধারা যাতে আইনি হেনস্তার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার মতো দাবিও তুলে ধরেন।সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি সংবিধানে থাকবে। কেউ কেউ এটি প্রস্তাবনায় রাখার কথা বললেও কমিটি মনে করছে এটি সংবিধানের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত।’তিনি আরও জানান, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ স্বাক্ষরিত হয়েছে, সরকার সেটি সেভাবেই বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার ত্বরান্বিত করার দাবি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার দ্রুত শেষ করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে কমিটি আরও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করবে। পরবর্তী ধাপে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সাবেক বিচারপতি ও শিক্ষাবিদদের মতামত নেওয়া হবে। বিরোধী দলের কর্মসূচি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘লং মার্চ বা আন্দোলন করা গণতান্ত্রিক অধিকার, তবে সংবিধান সংশোধনের মূল কাজটি সংসদেই সম্পন্ন হবে।’বৈঠকে জুলাই অভ্যুত্থানের আহতদের চিকিৎসা ও শহীদ পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়। কমিটি জানিয়েছে, সমাজের সকল স্তরের মানুষের মতামত নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বিল পাসের জন্য সংসদে রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে।
৯ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

আলোকিত জাতি গঠনে শিক্ষা

নৈতিক রাষ্ট্র নির্মাণের মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। একটি রাষ্ট্রের আইন, সংবিধান কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো যতই উন্নত ও সুসংগঠিত হোক, যদি তার নাগরিকদের নৈতিক বোধ, দায়িত্বশীলতা ও ন্যায়-অন্যায়ের বিচারক্ষমতা দুর্বল থাকে, তবে সেই রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও কার্যকর রাখা কঠিন। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্রটি শেষ পর্যন্ত পরিচালিত হয় মানুষ দিয়ে, আর সেই মানুষের মূল্যবোধ, বিবেক ও আচরণ গড়ে ওঠে শিক্ষার নানামুখি দীর্ঘ পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আইন মানুষকে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারে, কিন্তু নৈতিক শিক্ষা মানুষকে অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে উপলব্ধি ও বিশ্বাস করতে শেখায়। প্রশাসনিক ব্যবস্থা কর্তব্য পালনে বাধ্য করতে পারে, কিন্তু নাগরিক দায়িত্ববোধ মানুষকে দায়িত্বকে নিজের নৈতিক দায় হিসেবে গ্রহণ করতে শেখায়। এই অর্থে সামগ্রিক শিক্ষা প্রক্রিয়া তথা অনানুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবকাঠামো নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শিক্ষার মাধ্যমেই নাগরিকের মধ্যে দায়িত্ববোধ, ন্যায়বিচারের চেতনা, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মানবিকতার বিকাশ ঘটানো সম্ভব। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের দায়িত্ব শুধু নিজের অধিকার দাবি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, ভিন্নমত সহ্য করা, শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষের প্রতি সংবেদনশীল থাকা এবং বৃহত্তর জনকল্যাণের কথা বিবেচনা করাও তার দায়িত্ব। এই মূল্যবোধগুলো কেবল আইন বা পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞা মুখস্থ করিয়ে অর্জন করানো যায় না। এগুলো গড়ে ওঠে এমন শিক্ষার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেখানে শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনের নৈতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে ভাবতে শেখে, অন্যের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে এবং নিজের সিদ্ধান্তের সামাজিক পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হয়। ফলে নৈতিক শিক্ষা কোনো আলাদা বিষয় বা পরীক্ষার অংশমাত্র নয়; এটি জীবনব্যাপী শিক্ষার সমগ্র প্রক্রিয়ায় এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কৃতির মধ্যে নিহিত থাকা প্রয়োজন।দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা উন্নয়নকে প্রায়ই ভৌত অবকাঠামো তথা ভবন,  সড়ক, সেতু, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা কিংবা মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করি। এসব অবশ্যই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক; কিন্তু এগুলো উন্নয়নের সম্পূর্ণ চিত্র নয়। একটি দেশের ভবন যত উঁচু কিংবা দৃষ্টিনন্দনই হোক না কেন, যদি তার নাগরিকেরা অসহিষ্ণু হন; প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, যদি মানুষ মিথ্যা ও অপতথ্যের কাছে সহজেই আত্মসমর্পণ করে; অর্থনীতি যত বড়ই হোক, যদি সমাজে ন্যায়বোধ ও মানবিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে সেই উন্নয়নকে পূর্ণাঙ্গ মানবিক উন্নয়ন বলা যায় না। উন্নয়নের বস্তুগত সূচকের পাশাপাশি তাই একটি জাতির বৌদ্ধিক, নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সক্ষমতাকেও উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়নের গভীরতর চিত্র পাওয়া যায় তার পারিবারিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিবেশে। সেখানে পারিবারিক পরিমন্ডলে সম্পর্ক কত মানবিক, সুনিবিড় ও সুদৃঢ়,এবং নবীন, প্রবীণ ও দুর্বলের মর্যাদা কতটুকু সুসংহত; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কতটা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারে, শিক্ষক কতটা নির্ভয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন, গবেষক কতটা স্বাধীনভাবে প্রচলিত ধারণাকে পরীক্ষা করতে পারেন এবং একটি প্রতিষ্ঠান কতটা সত্যের অনুসন্ধানকে উৎসাহিত করে; সামাজিক পরিবেশে পরমতসহিষ্ণুতা, সহানুভূতি-সহমর্মিতা এবং সামাজিক ন্যায্যতা; রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে আইনের শাসন, জান-মাল-সম্মানের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার এসবই একটি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির দৃশ্যমান পরিপক্বতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। যে দেশে প্রশ্ন করা অপরাধ, ভিন্নমত প্রকাশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্ষমতাসীন মতের সমালোচনা অনাকাঙ্ক্ষিত, সেখানে বাহ্যিক অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটলেও প্রকৃত অর্থে মানবিক, নৈতিক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে না।বিশেষ করে সত্য অনুসন্ধানের স্বাধীনতা একটি সুস্থ সামাজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণশক্তি। সত্য কখনো কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক নিয়মই হলো প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা, প্রমাণ পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন হলে পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত সংশোধন করা। তাই যে রাষ্ট্র তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই অনুসন্ধানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, সে কেবল ভালো শিক্ষার্থী তৈরি করে না; সে এমন নাগরিক তৈরি করে যারা গুজবের পরিবর্তে প্রমাণ, আবেগের পরিবর্তে যুক্তি এবং অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে বিবেকের ওপর নির্ভর করতে শেখে। আর এই নাগরিকরাই শেষ পর্যন্ত একটি নৈতিক, দায়িত্বশীল ও টেকসই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষার উন্নয়নে আমাদের করণীয় কী? বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু অবকাঠামোগতভাবে সম্প্রসারণ করলেই হবে না; এর দর্শন, পরিচালন কাঠামো, নেতৃত্ব, শিক্ষকতা, গবেষণা-সংস্কৃতি এবং শিক্ষার্থী-অভিজ্ঞতার মৌলিক ভিত্তিকেও পুনর্বিবেচনা করতে হবে। জাতীয় শিক্ষাদর্শনের আলোকে রাষ্ট্র শিক্ষার স্তরভিত্তিক যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ করবে, শিক্ষাপরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নকে প্রতিটি স্তরে সেই লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে এবং পরিববর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার সাথে মিল রেখে জনশক্তি উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে উচ্চশিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শিক্ষা কোনো সরকারের সাময়িক রাজনৈতিক কর্মসূচি বা ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যম হতে পারে না; এটি হতে হবে রাষ্ট্রের নাগরিকদের দীর্ঘমেয়াদি মানবিক, নৈতিক ও আইনী সুরক্ষার সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তার অগ্রগতি নিশ্চিত করার কৌশলগত ভিত্তি।রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কারের প্রাথমিক পদক্ষেপে অপরিহার্য অংশ হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থার এই পুনর্গঠনের প্রথম শর্তই হলো শিক্ষাঙ্গনের বৌদ্ধিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষককে যেন কোনো রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা গোষ্ঠীগত চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নিজের জ্ঞান, যুক্তি ও গবেষণার ভিত্তিতে মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়। কারণ যেখানে চিন্তার স্বাধীনতা নেই, সেখানে সৃজনশীলতার সুযোগ থাকে না; আর সৃজনশীলতা ছাড়া জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি কিংবা স্বনির্ভর জাতি গঠন সম্ভব নয়। এই বৌদ্ধিক স্বাধীনতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রশ্নটি। শিক্ষার মনোন্নয়নে শিক্ষক নিয়োগ, তাঁদের পদোন্নতি ও একাডেমিক নেতৃত্ব নির্ধারণে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত আনুগত্য কিংবা গোষ্ঠীগত সম্পর্কের পরিবর্তে মেধা, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও কর্ম-অভিজ্ঞতা, গবেষণা, শিক্ষাদানের দক্ষতা, পেশাগত সততা ও নিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের দক্ষতা ও সক্ষমতাকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমাদেরকে একজন শিক্ষক, শিক্ষাবিশেজ্ঞ কিংবা শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষানুরাগীর পরিচয়গত পার্থক্য; তাঁদের পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতার যে পার্থক্য সেগুলো সুচারুভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। কেবল ক্ষমতাসীন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা মতের সমর্থক হিসেবে নয়, বরং শিক্ষাক্ষেত্রে সঠিক নেতৃত্বের জন্য কাউকে নিয়োগ প্রদানের পূর্বে জ্ঞানসৃষ্টিকারী ও জ্ঞানবিনিময়কারী পেশাজীবী হিসেবে তার যথার্থ মূল্যায়ন করতে হবে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব এমন ব্যক্তিদের হাতে দিতে হবে, যারা একাডেমিক উৎকর্ষে অগ্রগণ্য, ন্যায়সংগত প্রশাসন পরিচালনার সক্ষমতার রেখেছেন, এবং কাজকর্মে স্বচ্ছতা প্রদর্শন ও মতের বৈচিত্র‍্যকে সম্মান করেন। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো শিক্ষানীতি বা সংস্কারই কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে না।রাষ্ট্রকে সামাজিক চুক্তির শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে একই সঙ্গে আগামী প্রজন্ম তথা শিক্ষার্থীদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, তবে কোনোভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার সংঘাতের ক্ষেত্র হতে দেওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিমন্ডলে দলীয় রাজনীতি নয়; তাদের অধিকার, শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উন্নয়নে এবং রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে রাজনীতিতে অংশ নেবে। শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্র, সংবিধান, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনীতি, পরিবেশ, জননীতি ও সমসাময়িক জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিষয়ে জানবে, বিতর্ক করবে এবং নিজস্ব মত গড়ে তুলবে এটাই কেবল কাম্যই নয়, অপরিহার্য। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যেন দলীয় রাজনীতির লেজুড়ভিত্তিতে কিংবা একাডেমিক মূল্যায়ন, সুযোগ, নেতৃত্ব বা সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণের মানদণ্ডে পরিণত না হয়। শিক্ষার্থীদের রাজনীতি যদি নাগরিক সচেতনতা, নেতৃত্বের বিকাশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অনুশীলন হয়, তবে তা হবে ইতিবাচক এবং জাতীয় অগ্রগতির সহায়ক; কিন্তু তা যদি দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, সহিংসতা, ভয়ভীতি, দলীয় নির্দেশ পালন কিংবা ক্ষমতার আনুগত্যের প্রশিক্ষণে পরিণত হয়, তাহলে তা হবে শিক্ষার উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং জাতির জন্য আত্মঘাতী।ছাত্ররাজনীতিকে দলীয় রাজনীতির নাগপাশ থেকে মুক্ত করার পাশাপাশি গবেষণা, বিতর্ক ও মুক্তচিন্তার পরিবেশকে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত করতে হবে। বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে, প্রমাণ খুঁজতে, তথ্য যাচাই করতে এবং ভিন্ন ব্যাখ্যার তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে শেখানো প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষায় যৌক্তিক চিন্তার এই সংস্কৃতিকে আরও গবেষণাভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, নৈতিক ও একাডেমিক স্বাধীনতা, আন্তঃবিষয়ক (ইন্টারডিসিপ্লিনারি) সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক জ্ঞানসম্প্রদায় (ইন্টালেক্চুয়াল কমিউনিটি) ও পেশাগত সম্প্রদায়ের (কমিউনিটি অব প্রেক্টিস) সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কোন একটি বিষয়ে বিতর্ককে বিরোধিতা হিসেবে নয়, নিজেকে সমৃদ্ধ করার এবং জ্ঞান সৃষ্টির একটি স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের শিক্ষকের বক্তব্যকে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রশ্ন করতে পারে, কিংবা একজন গবেষক যদি প্রচলিত কোনো তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা নিয়ে নির্ভয়ে আলোচনা করতে পারেন, তখনই প্রকৃত অর্থে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সহিংসতা, ভয়ভীতি এবং গোষ্ঠীগত আধিপত্যের সংস্কৃতিও সম্পূর্ণভাবে দূর করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী যেন রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ, ধর্ম, সামাজিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত মতের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে; কোনো শিক্ষক যেন প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কায় নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত না হন। শিক্ষাঙ্গনে প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োগ হবে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও জবাবদিহির মাধ্যমে; ভয় প্রদর্শন, দখল কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাবের মাধ্যমে নয়। এ ক্ষেত্রে কার্যকর অভিযোগ-নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, স্বচ্ছ শৃঙ্খলাবিধি এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন ছাড়া একদিকে যেমন মুক্তচিন্তা কিংবা সৃজনশীলতা কোনোটিই বিকশিত হতে পারে না; অপরদিকে ব্যক্তিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির পথ সংকোচিত হয়ে পড়ে।মানবিকতা, নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধকে শিক্ষার প্রান্তিক কোনো বিষয় হিসেবে না রেখে এর কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু কীভাবে ভালো চাকরি পেতে হয় তা শেখালে চলবে না; তাকে শেখাতে হবে কেন একজন ভালো মানুষ, দায়িত্বশীল নাগরিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের সক্রিয় অংশীদার হতে হবে এবং কীভাবে হতে হয়। সততা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সহনশীলতা, ন্যায়বোধ, পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব, দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান এমূল্যবোধগুলো শিক্ষার প্রতিটি স্তরে চর্চার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে। কারণ মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা কোনো আলাদা পরীক্ষার বিষয় নয়; এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন সংস্কৃতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের মধ্য দিয়ে শেখানো হয়। এই সবকিছুর সমন্বিত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা একই সঙ্গে জ্ঞানী, দক্ষ, নৈতিক, মানবিক ও মুক্তচিন্তার ব্যক্তি-মানুষ তৈরির পাশাপাশি দেশের জন্য সুনাগরিক তৈরি করবে। জাতীয় শিক্ষাদর্শনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপন্থার সমন্বয়ে একটি ধারাবাহিক শিক্ষাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। জাতীয় অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিকে নিশ্চিত করতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার মৌলিক দর্শন ও প্রতিষ্ঠানগত অগ্রাধিকার যেন বারবার পরিবর্তিত না হয়, সে দিকে আমাদের বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। তাতে একদিকে যেমন জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ হবে, অপরদিকে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যাবে। তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাপরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায় করা। শিক্ষা কোনো দলের সম্পত্তি কিংবা নিয়ন্ত্রণ ও মতাদর্শ প্রচারের কৌশল নয়; এটি সমগ্র জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আমরা হয়তো শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে পারব, কিন্তু নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে সক্ষম ও আলোকিত জাতি গড়ে তুলতে পারব না।আমাদের শিক্ষাঙ্গন হোক সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে আলোর প্রতিষ্ঠান যেখানে জ্ঞান হবে মুক্ত, চিন্তা হবে স্বাধীন, মতের বৈচিত্র‍্য হবে স্বীকৃত ও সমৃদ্ধির উপায় এবং মানুষের মর্যাদাকে দেওয়া হবে সর্বোচ্চ মূল্য। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়, যখন তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার অনুগত প্রতিষ্ঠান না হয়ে সত্যের অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। যে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সাহস নেই, সেখানে জ্ঞানের বিকাশ থেমে যায়; যে শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি মেধার বিকল্প হয়ে ওঠে, সেখানে সৃজনশীলতা ও নৈতিক নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষাকে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার না বানিয়ে জাতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, মানবিক উৎকর্ষ এবং নাগরিক কল্যাণের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংসদ ভবনে যতটা না নির্ধারিত হবে, তার চেয়েও বেশি নির্ধারিত হবে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, পাঠাগার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত চিন্তার পরিসরে এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে গণসচেতনা বৃ্দ্িধতে সামাজিক পরিমন্ডলে। সংসদ রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন করতে পারে, সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে, প্রশাসন তা বাস্তবায়ন করতে পারে; কিন্তু সেই রাষ্ট্র ও সমাজকে কেমন মানুষ পরিচালনা করবে, তারা কতটা ন্যায়নিষ্ঠ, যুক্তিবাদী, মানবিক ও দায়িত্বশীল হবে তার ভিত্তি নির্মিত হয় শিক্ষার মধ্য দিয়েই। একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তার বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে, কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে তার ভবিষ্যৎ।একটি স্বৈরাচারী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হয়তো খুব বেশি সময় লাগে না; ভয়, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, মতপ্রকাশের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আনুগত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই তা দ্রুত করা সম্ভব। কিন্তু একটি মুক্ত, মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি, নৈতিক নাগরিকত্ব এবং সুপরিকল্পিত জনকল্যাণমুখী নীতিমালার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। আমাদের বুঝতে হবে যে, সেই কাজের কেন্দ্রবিন্দুটিই হলো শিক্ষা। কারণ মুক্ত সমাজ কেবল আইন দিয়ে তৈরি হয় না; তাকে ধারণ করার মতো মুক্তমনা মানুষও তৈরি করতে হয়। গণতন্ত্র কেবল একটি সংবিধানিক ব্যবস্থা নয়; এটি পারস্পারিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার একটি বাস্তবমুখী জীবনচর্চা, আর সেই জীবনচর্চার ভিত্তি নির্মাণ করে শিক্ষাই। এই কারণে রাজনীতির শিক্ষা আমাদের শিক্ষার একটা অনুষঙ্গ হলেও রাজনীতিকীকরণ থেকে শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনকে মুক্ত রাখা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষার রাজনীতি মানে শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রক্রিয়ার রাজনীতিকীকরণ নয়। অপরদিকে শিক্ষার বিরাজনীতিকীকরণ রাজনীতিকে অস্বীকার করাও নয়; বরং শিক্ষাকে তার প্রকৃত জাতীয় দায়িত্ব পালনের উপযোগী করে তোলা। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে রাজনৈতিক সচেতনতা থাকবে কিন্তু দলীয় আনুগত্য থাকবে না; মতাদর্শ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকবে কিন্তু যৌক্তিক চিন্তার বিকাশ, গবেষণা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে না; নেতৃত্ব থাকবে কিন্তু তা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে; সমালোচনা থাকবে কিন্তু তা হবে যুক্তি ও প্রমাণনির্ভর; এবং সবচেয়ে বড় কথা, যেখানে কোনো ক্ষমতার চেয়ে সত্যের মূল্য বেশি হবে। জাতীয় শিক্ষাদর্শনের ভিত্তিতে শিক্ষার রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে এমন শিক্ষাপরিকল্পনাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে, যা ক্ষমতাসীন সরকার বা দলের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করবে।আলোকিত মানুষ তৈরির সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো হলো দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, আর শিক্ষাব্যবস্থা সেই আলোর বাতিঘরগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তিসরবরাহকারী ব্যবস্থা। বাতিঘরের কাজ পথিককে কোনো নির্দিষ্ট পথে টেনে নেওয়া নয়; বরং অন্ধকারের মধ্যে পথ চিনে নেওয়ার মতো আলো দেওয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাজও তাই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আনুগত্য তৈরি করা নয়; বরং মানুষকে এমন জ্ঞান, বিচারবোধ ও নৈতিক সাহস দেওয়া, যার মাধ্যমে সে নিজের পথ নিজেই চিনে নিতে পারে। ‘শিক্ষাব্যবস্থা’ নামক পাওয়ারহাউস বা শক্তিকেন্দ্র থেকে শক্তির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে জাতি শুধু জ্ঞানের অন্ধকারেই হারিয়ে যায় না, হারিয়ে ফেলে তার বিবেক, দিকনির্দেশনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্ষমতাও। অতএব, আমাদের সামনে আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কেবল কতজনকে শিক্ষার আওতায় আনতে পেরেছি, তা নয়; বরং আমরা কেমন মানুষ তৈরি করছি। আমরা কি এমন প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে দ্বিধা করবে না, ভিন্নমতকে সম্মান করবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেকের কণ্ঠ শুনবে এবং নিজের জ্ঞান ও দক্ষতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করবে? যদি উত্তরটি ‘হ্যাঁ’ করতে হয়, তবে শিক্ষাকে মুক্ত করতে হবে দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি এবং দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির করালগ্রাস থেকে। শিক্ষাঙ্গনে যোগ্য ও নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চার সব পথ অবারিত রাখতে হবে। তখনই শিক্ষার আলো কেবল শ্রেণিকক্ষকে আলোকিত করবে না; তা ছড়িয়ে পড়বে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আর সেই আলো জ্বলে উঠলে বাংলাদেশ তার ইতিহাসকে নতুন করে বুঝতে, বর্তমানকে বিবেক ও যুক্তির আলোকে মূল্যায়ন করতে এবং ভবিষ্যৎকে আরও মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক করে নির্মাণ করতে সক্ষম হবে। ইতিহাস হবে আমাদের শিক্ষা, বাস্তবতা হবে আমাদের পরিকল্পনা ও এগিয়ে চলার ভিত্তি, আর মুক্ত ও আলোকিত ভবিষ্যৎ হবে আমাদের লক্ষ্য। সেই ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়ার চাবিকাঠি আমাদেরই হাতের মুঠোয়। আর তার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো সুপরিকল্পিত ও মানসম্মত শিক্ষা; যে শিক্ষা মানবিক, নৈতিক ও ভবিষ্যতমুখী সুনাগরিক তৈরি করে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন

মানুষের জীবনে জন্মের পর প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো জন্মনিবন্ধন সনদ। এটি শুধু একটি কাগজ নয়; একজন মানুষের নাম, জন্মতারিখ ও পরিচয়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আইনি ভিত্তি। একইভাবে একজন নাগরিকের মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধন করাও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর ৬ অক্টোবর বাংলাদেশে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস পালন করা হয়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সঠিক তথ্য ছাড়া কোনো দেশের জনসংখ্যা, নাগরিক সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার কার্যকর পরিকল্পনা করা কঠিন। তাই জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবসের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সময়মতো এবং নির্ভুল নিবন্ধনের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা।একটি শিশুর জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব তার নিবন্ধন সম্পন্ন করা জরুরি। জন্মনিবন্ধন না থাকলে বিদ্যালয়ে ভর্তি, বয়সের প্রমাণ, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়াতেও জন্মনিবন্ধনের তথ্য প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে জন্মতারিখ, নাম ও মা-বাবার পরিচয়ের মতো তথ্য ভুল হলে একজন নাগরিককে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে। তাই জন্মনিবন্ধনকে নাগরিক জীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিল হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।মৃত্যু নিবন্ধনের গুরুত্বও কোনো অংশে কম নয়। একজন নাগরিকের মৃত্যুর তথ্য যথাসময়ে রাষ্ট্রীয় নথিতে যুক্ত হলে জনসংখ্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়। সরকারি ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য সুবিধায় ভুয়া বা মৃত ব্যক্তির নামে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ কমে। একই সঙ্গে জনসংখ্যা পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যনীতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নেও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যায়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের নির্ভরযোগ্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশে নিবন্ধন ব্যবস্থায় অগ্রগতি হয়েছে। অনলাইনে আবেদন, তথ্য সংরক্ষণ ও সংশোধনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সেবা গ্রহণের পথ আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এখনো নানা সমস্যা রয়েছে। সার্ভারের ধীরগতি, কারিগরি ত্রুটি, তথ্য যাচাইয়ের জটিলতা এবং নাম বা জন্মতারিখ সংশোধনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া নাগরিকদের ভোগান্তিতে ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এসব কারণে অনেকে সময়মতো নিবন্ধন না করে পরে আবেদন করেন। এতে তথ্য যাচাই আরও জটিল হয়।নিবন্ধন ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দালালচক্রের তৎপরতার অভিযোগও রয়েছে। দ্রুত কাজ করে দেওয়ার কথা বলে তারা মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেয়। সরকারি সেবার ক্ষেত্রে এমন মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ সমস্যা দূর করতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, সহজ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। আবেদন থেকে সনদ দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল ব্যবস্থা কার্যকর করা, অনলাইন পেমেন্টের সুযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।শতভাগ ও নির্ভুল নিবন্ধন নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও টিকাদান কেন্দ্রের সঙ্গে জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ স্থাপন করা গেলে শিশুর জন্মের তথ্য দ্রুত নথিভুক্ত করা সম্ভব। একইভাবে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধনের ব্যবস্থা জোরদার করা যেতে পারে। পাশাপাশি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও এ কাজে যুক্ত করা দরকার।জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালনের দিন নয়। এটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার একটি সুযোগ। প্রতিটি জন্মের সঠিক তথ্য যেমন একজন মানুষকে রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও আইনি সুরক্ষা দেয়, তেমনি প্রতিটি মৃত্যুর সঠিক নিবন্ধন রাষ্ট্রকে নির্ভুল তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়তা করে। তাই জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনকে সহজ, দ্রুত, নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত করা জরুরি। প্রতিটি জীবন রাষ্ট্রীয় নথিতে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হলেই গড়ে উঠবে নির্ভুল তথ্যভিত্তিক ও নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্র।[লেখক: প্রাবন্ধিক]

কৃষিভিত্তিক সমবায় : গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক—তিন দিক থেকেই গভীর। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের প্রধান উৎস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত শিল্প, পরিবহন ও বাজারব্যবস্থা। কিন্তু কৃষির এত বড় অবদান থাকা সত্ত্বেও কৃষককে উৎপাদন ব্যয়, বাজারদর, মধ্যস্বত্বভোগী, সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, ঋণের উচ্চ ব্যয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কৃষিভিত্তিক সমবায় একটি কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো হতে পারে। কৃষকের বিচ্ছিন্ন শক্তিকে সংগঠিত শক্তিতে রূপান্তর করে উৎপাদন, বিপণন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিনিয়োগে যৌথ সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব সমবায়ের মাধ্যমে।আমাদের দেশে সমবায় আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনেক। কিন্তু অশিক্ষা, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও অসাধুতার কারণে সমবায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। কৃষক সমাজে সমবায়ের চেতনার ঘাটতি এবং যৌথ উদ্যোগ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাও রয়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক বাধা, আর্থিক সংকট, অনীহা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে কৃষিকাজ করা কঠিন হয়। তাই কৃষকদের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। কৃষিভিত্তিক মৌলিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সমবায়ের সুফল ও সুযোগ সম্পর্কে কৃষকদের বাস্তব ধারণা দিতে হবে।বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সমবায় সমিতি রয়েছে। এসব সমবায়ের একটি বড় অংশ কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। সমবায়ের মাধ্যমে কৃষক উন্নত বীজ, সার, সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে পারেন। তাঁরা যৌথভাবে ফসল সংগ্রহ, মাড়াই, ঝাড়াই ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারেন। সংগঠিতভাবে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কৃষকের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। বন্যা, খরা, শৈত্যপ্রবাহসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও সমবায়ী উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। কৃষিব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়নে তাই সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।কৃষিভিত্তিক সমবায় কৃষকদের জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে পারে। একজন কৃষকের পক্ষে নতুন জাতের বীজ, আধুনিক চাষপদ্ধতি, মাটির স্বাস্থ্য, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও বাজারের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা কঠিন। কিন্তু সমবায় সংগঠিতভাবে কৃষিবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ সংস্থা ও বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ, মাঠদিবস, প্রদর্শনী প্লট ও প্রযুক্তি ব্যবহারের কর্মসূচি আয়োজন করা সম্ভব। এতে কৃষি উৎপাদনে বৈজ্ঞানিক ও তথ্যনির্ভর পদ্ধতির ব্যবহার বাড়বে।বাজারব্যবস্থায়ও কৃষিভিত্তিক সমবায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সমবায় একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সদস্যদের পণ্য তালিকাভুক্ত করে অনলাইন অর্ডার গ্রহণ ও সংগঠিতভাবে সরবরাহ করতে পারে। সুপারশপ, রেস্টুরেন্ট, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তিভিত্তিক বাজার তৈরি করা গেলে কৃষকের আয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের বাজারও স্থিতিশীল হতে পারে। উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্র‍্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন করা গেলে কৃষকের আয় আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।কৃষিভিত্তিক সমবায়ের বিভিন্ন ধরন হতে পারে। শস্য উৎপাদন ও বিপণন সমবায়, দুগ্ধ সমবায়, মৎস্য চাষি সমবায়, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সমবায় এবং সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সমবায় কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশেও এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সঙ্গে সমবায়কে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।কৃষিভিত্তিক সমবায় নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রামীণ নারীরা কৃষিকাজ, পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, বীজ সংরক্ষণ ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। কিন্তু তাঁদের শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য অনেক সময় যথাযথভাবে স্বীকৃত হয় না। নারী-কেন্দ্রিক কৃষি সমবায় বা বিদ্যমান সমবায়ে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন, বিপণন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের ভূমিকা বাড়বে। এর ফলে পরিবারের আয় বৃদ্ধি এবং নারীর আর্থিক স্বাধীনতা—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলাতেও কৃষি সমবায় কার্যকর হতে পারে। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি ও তাপমাত্রার পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষিকে ক্রমাগত ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। একক কৃষকের পক্ষে এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন। সমবায়ের মাধ্যমে জলবায়ু-সহনশীল জাত, উন্নত সেচব্যবস্থা, ফসল বৈচিত্র‍্যকরণ, পানি সংরক্ষণ, কৃষিবীমা ও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম যৌথভাবে গ্রহণ করা সম্ভব। এতে কৃষকের ঝুঁকি কমবে এবং উৎপাদনের স্থিতিশীলতা বাড়বে।তবে সমবায় আন্দোলনের বড় সমস্যা এর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। সমবায় গঠন, নিবন্ধন, পরিচালনা, অডিট ও নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা সমবায়ের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিভিন্ন সমবায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করতে সমবায়ীদের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। সমবায়ের নিবন্ধন ও পরিচালনা প্রক্রিয়াকে সহজ করতে হবে। সমবায় কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সদস্যদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে হবে।কৃষিভিত্তিক সমবায়কে জাতীয় অর্থনীতির বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে। কৃষকের উৎপাদিত কাঁচামাল স্থানীয় শিল্পে ব্যবহার করা গেলে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সংযোগ তৈরি হবে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত হয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে গেলে মূল্যশৃঙ্খলে কৃষকের অংশও বাড়ানো সম্ভব। এতে আমদানি নির্ভরতা কমানো, কৃষিভিত্তিক রপ্তানি বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে তরুণদের কৃষিতে আকৃষ্ট করতে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বাজারব্যবস্থার সংস্কারও জরুরি।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃষিভিত্তিক সমবায়কে শুধু কৃষকদের একটি সংগঠন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বাজার গবেষণা, হিসাব ব্যবস্থাপনা, দক্ষ নেতৃত্ব, প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। সমবায় সফল হবে তখনই, যখন সদস্যরা এটিকে অনুদাননির্ভর প্রকল্প নয়, নিজেদের মালিকানাধীন ও পরিচালিত অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করবেন। সদস্যদের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতাই হবে এর মূল পুঁজি।কৃষিভিত্তিক সমবায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে, বাজারে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে, কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজন করতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষির আধুনিকায়ন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলাতেও এর ভূমিকা থাকতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা।কৃষককে শুধু উৎপাদক নয়, উদ্যোক্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কার্যকর পথ হতে পারে কৃষিভিত্তিক সমবায়। সঠিক নীতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে সমবায়কে শক্তিশালী করা গেলে এটি শুধু কৃষকের আয় বৃদ্ধির মাধ্যম হবে না; বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক, উৎপাদনশীল ও বিকেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

সবার জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন

প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্ব বসতি দিবস পালন করা হয়। সে অনুযায়ী ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হচ্ছে। শহর ও নগরের বর্তমান অবস্থা, সবার জন্য উপযুক্ত বাসস্থানের মৌলিক অধিকার এবং ভবিষ্যৎ নগর গড়ে তোলায় মানুষের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। মানব বসতির বর্তমান অবস্থা, পর্যাপ্ত আবাসন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও টেকসই বাসস্থান নিশ্চিত করার বিষয়টিও দিবসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৮৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ১১৯তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ৪০/২০২ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রতিবছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার বিশ্ব বসতি দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৮৬ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘ দ্রুত নগরায়ণ এবং বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর নগরমুখী হওয়ার বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করবে। ফলে অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন এবং সবার জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা আরও জরুরি হয়ে উঠবে।এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত বাসস্থান’। পর্যাপ্ত আবাসন নিশ্চিত করতে নিম্ন আয়ের পরিবার, গৃহহীন মানুষ, দুর্যোগ ও সংকটকবলিত জনগোষ্ঠী এবং বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে থাকা মানুষের চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এর পাশাপাশি প্রয়োজন ভূমির মালিকানা ও দখলের নিরাপত্তা, সুপরিকল্পিত ও নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন আবাসিক এলাকা এবং সামাজিক, সরকারি, ভাড়াভিত্তিক, সমবায় ও বাজারভিত্তিক আবাসনের সুযোগ। আবাসনব্যবস্থা হতে হবে পরিবেশবান্ধব, জলবায়ু-সহনশীল, নিরাপদ ও মানসম্মত।জাতিসংঘের ‘আরবান অক্টোবর’ কর্মসূচির সূচনাও বিশ্ব বসতি দিবসের মধ্য দিয়ে। অক্টোবর মাসজুড়ে নগরায়ণ, আবাসন ও টেকসই নগর উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এর লক্ষ্য হলো সরকার, স্থানীয় সম্প্রদায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে নগর উন্নয়নে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। সমন্বিত আবাসন কৌশল, বহুস্তরীয় শাসনব্যবস্থা, সহায়ক আইন ও নীতি, নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।জাতিসংঘের আবাসনবিষয়ক ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি ১২ লাখ মানুষ বস্তির পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসেছে। একই সময়ে ৫ কোটি ৩০ লাখ মানুষ উন্নত পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা পেয়েছে এবং ৪ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি পরিবার ভূমির মালিকানা বা দখলের আইনি অধিকার পেয়েছে। তবে বৈশ্বিক আবাসন সংকট এখনো তীব্র। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ২৮০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের আবাসন-সংক্রান্ত অপর্যাপ্ততার মধ্যে ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১১০ কোটি মানুষ বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক আবাসনে বসবাস করছে। বিশ্বে প্রায় ৩১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ গৃহহীন। অন্যদিকে প্রতি পাঁচটি পরিবারের একটি তাদের ব্যয়যোগ্য আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি আবাসনের পেছনে ব্যয় করছে। এতে পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতা কমছে এবং ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে।বাংলাদেশেও আবাসন ও মানব বসতি নিয়ে নানা নীতি ও আইন রয়েছে। জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা-২০১৬-এর লক্ষ্য হলো সব শ্রেণির মানুষের জন্য উপযুক্ত আবাসন সহজলভ্য করা এবং টেকসই মানব বসতি গড়ে তোলা। নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করাও এ নীতির অন্যতম লক্ষ্য। এ ছাড়া ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ১৯৯৬; মহানগরী ও সব পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উদ্যান ও জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০; রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এবং বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালাসহ বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা রয়েছে।বাংলাদেশের মানব বসতি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় আবাসস্থল ধ্বংসের বিভিন্ন কারণ হিসেবে অতিরিক্ত জনসংখ্যা, ত্রুটিপূর্ণ ভূমি ব্যবস্থাপনা, অবৈধ বৃক্ষনিধন, জ্বালানি কাঠের সংকট, বনসম্পদ আহরণ, অবকাঠামো ও পরিবহন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, ইটভাটা স্থাপন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, গবাদি পশুর অতিচারণসহ বিভিন্ন বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে জীববৈচিত্র‍্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।বাংলাদেশে আবাসন-সংক্রান্ত নীতি ও আইন থাকলেও সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ বড় চ্যালেঞ্জ। কোথাও জনবলের অভাব, কোথাও দুর্বল তদারকি, আবার কোথাও আইন প্রয়োগের ঘাটতির কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু নতুন আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সরকার, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সবার জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে পারলেই বিশ্ব বসতি দিবসের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক ও লাইন ডাইরেক্টর (এমআইএস), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর]

শিক্ষকের মর্যাদা ও শিক্ষার মান

৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। দিবসটি শিক্ষক সমাজের দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার নিয়ে কথা বলার দিন। প্রতিবছরের মতো এবারও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে চতুর্থবারের মতো সরকারিভাবে দিবসটি পালিত হচ্ছে।ইউনেস্কো প্রতিবছরের মতো এবারও দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে। এবারের প্রতিপাদ্যের মূল বক্তব্য হলো—শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ এবং ৬০ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা ও অবস্থান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ সভায় ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দ্বিতীয় জন্মদাতা অথবা জাতি গড়ার কারিগর হিসেবে বিবেচিত শিক্ষক সমাজের মান-সম্মান, মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যেই দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।শিক্ষার অধিকার একটি মানবিক ও মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘের ঘোষণা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তঃসরকার সম্মেলনে শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়। সম্মেলনে শিক্ষকদের মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করা, মাধ্যমিক স্তরে সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে বৈষম্যহীন শিক্ষা নীতি, শিক্ষার উদ্দেশ্য ও গুণগত মান উন্নয়ন, পদোন্নতি, পেশাগত আচরণবিধি, নারী শিক্ষকদের জন্য কর্মবান্ধব পরিবেশ, শিক্ষকদের অধিকার ও নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সরকারপ্রধান বা তাঁদের প্রতিনিধিরা এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন।শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৪ নম্বর লক্ষ্যে মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও জীবনব্যাপী শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং তাঁদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের দক্ষতা, আন্তরিকতা, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে এখনও নানা ঘাটতি রয়েছে। অবসর ও কল্যাণ তহবিলে কর্তন করা অর্থ অবসরে যাওয়ার তিন-চার বছর পরও অনেক শিক্ষক-কর্মচারী পাচ্ছেন না। কাগজপত্র জমা দেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে পাওনা পরিশোধের বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি।বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষকদের ওপর হামলা, মারধর, হত্যা এবং গলায় জুতার মালা পরানোর মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে। জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মী ও গভর্নিং বডির সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার বিচার না হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও মর্যাদাহানির বোধ তৈরি হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের ওপর নির্যাতন এবং আইনবহির্ভূতভাবে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে তৈরি হওয়া মানসিক দূরত্বও পাঠদান কার্যক্রমের জন্য নতুন সংকট হিসেবে সামনে এসেছে।বিশ্ব শিক্ষক দিবসের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতার পাশাপাশি পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। ইউনেস্কো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতে জাতীয় আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বাংলাদেশেও ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ করে তা পর্যায়ক্রমে ৭ শতাংশে উন্নীত করার এবং ১০ বছরের মধ্যে শিক্ষাকে সরকারিকরণের তাগিদ দিয়েছিল।কিন্তু এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। শিক্ষাখাতে বরাদ্দের হার কিছুটা বাড়লেও মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এর সুফল যথেষ্ট পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সরকারের পক্ষ থেকে জিডিপির ৫, ৬ বা ৭ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তা ৫৫ বছরে কখনও ২ দশমিক ৪ শতাংশের ওপরে ওঠেনি। এসডিজির আলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে মানসম্মত, সমতাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জীবনব্যাপী শিক্ষা নিশ্চিত করতে এবং মাধ্যমিক স্তরে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালনার জন্য পরিকল্পনা কমিশন জিডিপির ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করেছিল। এর বিপরীতে শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বর্তমানে তা প্রায় ২ শতাংশ। তবে ইতিবাচক দিক হলো, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা ২৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে এবং ১ হাজার টাকা বাড়িভাড়ার পরিবর্তে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষা এখনো বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশ তুলনামূলকভাবে কম। বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরিজীবনে পদোন্নতির সুযোগও সীমিত। প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার পর অনেকের পদোন্নতির সুযোগ থাকে না। কর্মদক্ষতাভিত্তিক পদোন্নতির ব্যবস্থাও নেই। সময়ভিত্তিক পদোন্নতি এবং চাকরিজীবনে সীমিত পদোন্নতির কারণে এই পেশায় মেধাবীদের অংশগ্রহণ কমছে। একই সঙ্গে পেশাগত মান বৃদ্ধির চেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বেতন-ভাতার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা কঠিন হচ্ছে। যারা আসছেন, তাঁদেরও ধরে রাখা যাচ্ছে না।শিক্ষক সংগঠনের অবস্থানবিশ্ব শিক্ষক দিবসের ঐতিহাসিক ঘোষণা এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে বাংলাদেশের শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করেছেন। তবে দলীয় রাজনীতির প্রভাবের বাইরে স্বাধীন ও পেশাদার অবস্থান থেকে বৃহৎ আন্দোলন তেমন গড়ে ওঠেনি। গভর্নিং বডির দলীয়করণের কারণে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণ, পৃথক নিয়োগ কমিশন এবং বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষকদের আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতার আওতায় কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়ন এবং পাঠদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা দিতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে অন্য কাজে শিক্ষকদের যুক্ত না করা, পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা, নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং আর্থিক নিরাপত্তার জন্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।ইউনেস্কোর ঘোষণার পাশাপাশি সংবিধানে শিক্ষার বিষয়ে রাষ্ট্রের যে অঙ্গীকার রয়েছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশের শিক্ষার মান উন্নত করা সম্ভব। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ঘোষণায় স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করছে কি না, সে বিষয়ে ইউনেস্কোর কার্যকর তদারকি থাকা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী শিক্ষক সমাজের মর্যাদা বৃদ্ধি পাক। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের পাঠদান কার্যক্রমের পাশাপাশি বস্তুনিষ্ঠভাবে দেশ, জাতি ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুন—এটাই প্রত্যাশা। শিক্ষক যেমন তাঁর অধিকার ভোগ করবেন, তেমনি দায়িত্বও পালন করবেন। এ জন্য প্রয়োজন মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষক, ভালো শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষকদের আন্তসম্পর্কের উন্নয়ন।[লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি]

‘এআই’ উত্তর জানে, কিন্তু শিক্ষার্থীকে কে জানবে?

এখন আর কোনো শিক্ষার্থীকে একটি সংজ্ঞা জানার জন্য পরদিনের ক্লাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। কয়েকটি শব্দ লিখলেই কয়েক সেকেন্ডে উত্তর এসে যায়। অঙ্কের সমাধান, প্রবন্ধের খসড়া, ইতিহাসের সারাংশ, এমনকি পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নও প্রযুক্তি সাজিয়ে দিতে পারে।তাহলে কি এমন এক সময় আসছে, যখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক আর অপরিহার্য থাকবেন না? প্রশ্নটি প্রযুক্তির। কিন্তু উত্তরটি সম্ভবত মানুষের।কারণ শিক্ষা কি শুধু উত্তর জানার নাম? নিশ্চিতভাবেই না। শিক্ষা হলো কোন প্রশ্নটি করা উচিত তা বুঝতে শেখা, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে শেখা, ভুল থেকে উঠে দাঁড়াতে শেখা, অন্য মানুষের কথা শুনতে শেখা এবং জ্ঞানকে দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করতে শেখা। এই জায়গাগুলোতে একজন শিক্ষক এখনও অনন্য। আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাব্যবস্থাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। ইউনেস্কোর ২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আলোচনাতেও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে শিক্ষকতার নতুন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি স্পষ্টভাবে বলছে ভবিষ্যতের শিক্ষায় শিক্ষককে কেন্দ্রেই রাখতে হবে। তাদের সাম্প্রতিক প্রচারণার কথাটিও খুব অর্থবহ: “Teachers cannot be coded.” অর্থাৎ শিক্ষকের মানবিক ভূমিকাকে কোনো কোডে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা যায় না।একজন শিক্ষক হিসেবে বিষয়টি আমার কাছেও গভীরভাবে ভাববার।একটি শ্রেণিকক্ষে সব শিক্ষার্থী কখনো একরকম থাকে না। কেউ প্রশ্ন করতে ভালোবাসে, কেউ চুপচাপ শোনে। কেউ একটি বিষয় একবার বললেই বুঝে ফেলে, আর কারও কাছে একই বিষয় তিনবার অন্যভাবে বলতে হয়। আবার এমনও শিক্ষার্থী থাকে, যে পড়াটি না বোঝার কারণে নয়, হয়তো বাড়ির কোনো দুশ্চিন্তার কারণে সেদিন মনোযোগ দিতে পারছে না।একটি ‘এআই’ তার ভুল উত্তর ধরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীর মুখ দেখে সবসময় বুঝতে পারবে না আজ তার চোখ দুটি এত নিস্তেজ কেন। এইখানেই শিক্ষক। শিক্ষকের কাজ আসলে কখনোই শুধু তথ্য সরবরাহ করা ছিল না। কিন্তু দীর্ঘদিন আমরা শিক্ষকের ভূমিকাকে অনেকটাই তথ্য দেওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি। শিক্ষক বলবেন, শিক্ষার্থী লিখবে। শিক্ষক প্রশ্ন করবেন, শিক্ষার্থী উত্তর দেবে। এখন সেই ব্যবস্থাই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে।কারণ তথ্যের ওপর শিক্ষকের একচেটিয়া অধিকার আর নেই। আজকের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ক্লাস নেওয়ার আগেই একটি বিষয় সম্পর্কে পড়ে আসতে পারে। সে ভিডিও দেখতে পারে, ডিজিটাল বই পড়তে পারে, এআই-কে প্রশ্ন করতে পারে। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষক যদি শুধু বইয়ের কথাই পুনরাবৃত্তি করেন, শিক্ষার্থীর কাছে তার প্রয়োজন স্বাভাবিকভাবেই কমবে। কিন্তু এখানেই শিক্ষকের ভূমিকা যে শেষ, তা মনে করলে ভুল হবে বরং শিক্ষকের ভুমিকা নতুনভাবে শুরু।ভবিষ্যতের শিক্ষক সম্ভবত আর শুধুই “জ্ঞানদাতা” নন। তিনি হবেন জ্ঞানের পথপ্রদর্শক। তিনি বলবেন না শুধু “উত্তরটি এই”; বরং জিজ্ঞেস করবেন “তুমি এই উত্তরকে সত্য মনে করলে কেন?”এই একটি পরিবর্তনই শিক্ষাকে বদলে দিতে পারে।কারণ ‘এআই’ খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্যও দিতে পারে। একটি সুন্দর ভাষায় লেখা উত্তর সবসময় সঠিক উত্তর নয়। একটি সূত্র উল্লেখ করা মানেই সূত্রটি নির্ভরযোগ্য নয়। ফলে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগত দক্ষতাগুলোর একটি হবে যাচাই করার ক্ষমতা।কোন উৎস বিশ্বাসযোগ্য? কোন তথ্যের পেছনে প্রমাণ আছে? কোথায় পক্ষপাত কাজ করছে? কোথায় যুক্তির ফাঁক?এই বিচারবোধ তৈরি না হলে প্রযুক্তির যুগে একজন শিক্ষার্থী তথ্যসমৃদ্ধ হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানী নাও হতে পারে।আর এখানেই একজন শিক্ষকের দায়িত্ব আরও বড়। ইউনেস্কোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দক্ষতা কাঠামোতেও শিক্ষককে শুধু ‘এআই’ ব্যবহারকারী হিসেবে দেখা হয়নি বরং প্রযুক্তিকে কীভাবে মানবকেন্দ্রিক, নৈতিক ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে, সেই দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ‘এআই’ জানা যথেষ্ট নয় কিন্তু ‘এআই’ কোথায় ব্যবহার করতে হবে এবং কোথায় থামতে হবে, সেটিও জানতে হবে।বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই প্রশ্নটি খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।আমাদের শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই ‘এআই’ ব্যবহার করছে। কেউ অ্যাসাইনমেন্ট লিখছে, কেউ অনুবাদ করছে, কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আমরা কি তাদের শেখাচ্ছি কীভাবে এটি ব্যবহার করতে হবে?একজন শিক্ষার্থী যদি পুরো অ্যাসাইনমেন্ট ‘এআই’ দিয়ে লিখিয়ে জমা দেয়, তাহলে হয়তো সে সুন্দর একটি লেখা জমা দিল। কিন্তু সে কী শিখল?আবার বিপরীতভাবে ‘এআই’ নিষিদ্ধ করে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?সম্ভবত না।ক্যালকুলেটর আসার পরে গণিত বন্ধ হয়নি। ইন্টারনেট আসার পরে বই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি। একইভাবে ‘এআই’-কেও শিক্ষকের শত্রু  হওয়ার প্রয়োজন নেই। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি শিক্ষকের সহকারী হতে পারে। একজন শিক্ষক ‘এআই’ ব্যবহার করে একই বিষয়ের বিভিন্ন স্তরের পাঠ তৈরি করতে পারেন। দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য সহজ ব্যাখ্যা, অগ্রসর শিক্ষার্থীর জন্য কঠিন সমস্যা, ক্লাসের জন্য প্রশ্ন, উদাহরণ বা শেখানোর নতুন কৌশল বের করতে পারেন। ইউনেস্কোর শিক্ষক ও ‘এআই’-সংক্রান্ত আলোচনাতেও বলা হয়েছে, ‘এআই’ শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে তবে মানবিক বিচারবোধ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের জায়গা নিতে পারে না।তাই আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয় “এআই কি শিক্ষককে সরিয়ে দেবে?”বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত “এআই ব্যবহার করে একজন শিক্ষক কীভাবে আরও ভালো শিক্ষক হতে পারেন?”এ জন্য প্রথম প্রয়োজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ।আমরা শিক্ষার্থীদের নতুন প্রযুক্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারি না এমন শিক্ষকদের হাতে, যারা সেই প্রযুক্তির সুযোগ ও ঝুঁকি সম্পর্কে জানার সুযোগই পাননি। শিক্ষককে শুধু একটি সফটওয়্যার চালানো শেখালেই হবে না। তাকে বুঝতে হবে তথ্যের গোপনীয়তা, কপিরাইট, পক্ষপাত, ভুল তথ্য, একাডেমিক সততা এবং শিক্ষার্থীর অতিনির্ভরতার ঝুঁকি।আরেকটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। ‘এআই’-এর কারণে শিক্ষকের মানবিক দায়িত্ব কমবে না, বাড়বে। কারণ প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, শিশুর সামনে পৃথিবী তত দ্রুত খুলে যাবে। সে এমন বিষয় দেখবে, পড়বে, জানবে যা আগের প্রজন্ম অনেক পরে জানত। কিন্তু সে কি মানসিকভাবে সেই তথ্যের জন্য প্রস্তুত?তার সঙ্গে কে কথা বলবে? একজন ছাত্র পরীক্ষায় খারাপ করলে ‘এআই’ তাকে “কীভাবে ভালো ফল করতে হবে” তার দশটি পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু সে যখন মনে করে, “আমি আর পারব না” তখন তার পাশে একজন মানুষ দরকার।একজন শিক্ষক কখনও শুধু তো একটি বিষয়ের শিক্ষক নন। শিক্ষার্থীর জীবনের একটি সময়ে তিনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যাকে সে বিশ্বাস করতে শেখে।সেই সম্পর্কের মূল্য কোনো প্রযুক্তির মাপে ধরা কঠিন।আজ পৃথিবীতে শিক্ষকের প্রয়োজনও কমছে না। ইউনেস্কোর হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বে আরও প্রায় ৪৪ মিলিয়ন শিক্ষক প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষককে প্রশিক্ষিত, সমর্থিত এবং মর্যাদাবান রাখাকেও মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম শর্ত বলা হচ্ছে। এ তথ্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়।প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, পৃথিবী এখনো শিক্ষক খুঁজছে।তবে সেই শিক্ষককে বদলাতে হবে। আগামী দিনের শিক্ষককে সব উত্তর জানা মানুষ হতে হবে না। এমন দাবি এখন অবাস্তবও। তার চেয়ে বরং তাকে এমন একজন মানুষ হতে হবে, যিনি জানেন কোথায় উত্তর খুঁজতে হয়, কীভাবে তা যাচাই করতে হয় এবং কীভাবে শিক্ষার্থীকে নিজের উত্তর খুঁজে নিতে শেখাতে হয়।তাকে বলতে হবে “আমি জানি না, চল আমরা খুঁজে দেখি।”আর এই বাক্যটি হয়তো ভবিষ্যতের শিক্ষকতার অন্যতম সুন্দর বাক্য।কারণ একজন শিক্ষক যখন স্বীকার করেন যে শেখা কখনো শেষ হয় না, তখন তিনি শিক্ষার্থীকেও শেখান জ্ঞান মানে সব জানা নয়।জ্ঞান মানে শেখার সাহস রাখা। ‘এআই’ হয়তো একদিন আরও দ্রুত হবে। আরও নিখুঁত হবে। আমাদের ভাষা, অভ্যাস ও প্রয়োজন আরও ভালোভাবে বুঝবে।তবু একটি প্রশ্ন থেকে যাবে। কে একজন শিক্ষার্থীকে শেখাবে সততা? কে তাকে বলবে জ্ঞানকে অন্যের ক্ষতির জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়? কে বুঝিয়ে দেবে সফলতা শুধু নম্বর নয়? কে তার ব্যর্থতার দিনে তাকে মনে করিয়ে দেবে তার মূল্য একটি পরীক্ষার ফলের চেয়ে অনেক বড়?এসব প্রশ্নের উত্তর কোনো অ্যালগরিদমের মধ্যে পুরোপুরি ধরা যায় না। কারণ শিক্ষা শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। তাই ‘এআই’-এর যুগে শিক্ষককে বাঁচাতে প্রযুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে না। বরং শিক্ষককে প্রযুক্তির ওপরে তার সবচেয়ে বড় শক্তিটি ফিরে পেতে হবে মানুষকে বোঝার শক্তি।এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শুধু শিক্ষককে শুভেচ্ছা জানানোই যথেষ্ট নয়। আমাদের ভাবতে হবে, দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তির যুগে শিক্ষককে কীভাবে আরও দক্ষ, আরও স্বাধীন এবং আরও মানবিক ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করা যায়।কারণ ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘এআই’ থাকবে, প্রযুক্তি থাকবে, অসংখ্য ডিজিটাল সহায়তা থাকবে তবু শিক্ষার্থীর পাশে এমন একজন মানুষ প্রয়োজন হবে, যিনি শুধু তার উত্তর নয়, তার মানুষ হয়ে ওঠার পথটিও দেখবেন। ‘এআই’ উত্তর জানবে। কিন্তু শিক্ষার্থীর ভয়, স্বপ্ন, দ্বিধা, সম্ভাবনা আর নীরবতার ভাষা বুঝতে পাশে একজন মানুষই লাগবে। সেই মানুষটির নাম শিক্ষক।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, বরেন্দ্র কলেজ, রাজশাহী

মেধাতালিকায় প্রথম, নিয়োগে অনুপস্থিত

একজন শিক্ষার্থী যখন শৈশব থেকে পড়াশোনা শুরু করে, তখন তার সামনে থাকে একটি স্বপ্ন একদিন নিজের যোগ্যতায় নিজের একটি জায়গা তৈরি করবে। বছরের পর বছর বই পড়া, পরীক্ষা দেওয়া, ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করা এবং পরিবারের প্রত্যাশার সঙ্গে লড়াই করে যখন সে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেয়, তখন সেই পরীক্ষা তার কাছে শুধু একটি পরীক্ষা থাকে না; হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের মূল্যায়ন।প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-কে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই নতুন করে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে একজন প্রার্থীর মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন আসলে কোথায়?গত ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়েছিল। এর আগে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ৬৯ হাজার ২৬৫ জন মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে নির্বাচিতদের নিয়োগপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু ২৪ সেপ্টেম্বরের পর বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার তালিকা প্রকাশের সময় দেখা যায়, সুপারিশপ্রাপ্ত অনেক প্রার্থীর নামে নিয়োগপত্র ইস্যু করা হয়নি। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিভিন্নভাবে প্রায় দেড় হাজার প্রার্থীর বাদ পড়ার অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। তাদের বাদ দেওয়ার নির্দিষ্ট কারণও প্রকাশ্যে স্পষ্ট করা হয়নি; প্রার্থীদের অনেকে পুলিশ বা গোয়েন্দা যাচাইয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদনের কথা জানতে পেরেছেন।এই ঘটনাগুলোর মধ্যেই সামনে এসেছে তামান্না আক্তারের ঘটনা। তিনি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। নিজ উপজেলা চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণের মেধাতালিকায় তিনি প্রথম এবং পুরো চাঁদপুর জেলায় ১১তম হয়েছিলেন। তার দাবি, তিনি বা তার পরিবারের কেউ কোনো সময় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু ২৪ সেপ্টেম্বর তার নামে নিয়োগপত্র ইস্যু হয়নি। প্রতিবেদনে তার বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ ও এনএসআইয়ের ভেরিফিকেশনে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং তিনি এটিকে ‘পলিটিক্যাল ট্যাগ’-এর ফল হিসেবে দেখছেন।তামান্নার ঘটনা তাই শুধু একজন চাকরিপ্রার্থীর ব্যক্তিগত হতাশার গল্প নয়; এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে একজন মানুষ যদি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নিজের উপজেলায় প্রথম হন, তাহলে তার নিয়োগ আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কারণটি কি তার কাছে স্পষ্ট হওয়া উচিত নয়?সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই থাকা স্বাভাবিক। রাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠানে কাদের নিয়োগ দিচ্ছে, সে বিষয়ে আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করতেই পারে। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জনের পূর্বকার্যকলাপ, কাগজপত্র ও নথি যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছিল।কিন্তু যাচাইয়ের প্রশ্নের পাশাপাশি স্বচ্ছতার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে সেই আপত্তির ভিত্তি কী? কোন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? তথ্যটি কতটা নির্ভুল? সংশ্লিষ্ট প্রার্থী কি নিজের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন? ভুল তথ্য থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ আছে কি?বিশেষ করে যদি কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক মতাদর্শ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পুরোনো কোনো পোস্ট কিংবা পরিবারের কোনো সদস্যের রাজনৈতিক পরিচয়কে তার নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই ব্যক্তির নিজের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অন্যের রাজনৈতিক অবস্থানকে কীভাবে যুক্ত করা হলো?একজন মানুষের পরিবারে ভিন্নমতের মানুষ থাকতে পারেন। আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক মত তার নিজের মতের সঙ্গে এক নাও হতে পারে। তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজের কর্মকাণ্ড, নির্দিষ্ট প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনকে আলাদা করে দেখা জরুরি।এখানে ‘মেধা’ এবং ‘ভেরিফিকেশন’কে একে অপরের বিপরীতে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। একজন প্রার্থী পরীক্ষায় ভালো করেছেন এটি তার যোগ্যতার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। আবার রাষ্ট্রের আইনগত যাচাইয়ের প্রয়োজন থাকলে সেটিও হতে পারে। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই প্রশ্ন হলো—মানদণ্ডটি কী এবং সেটি কি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?একজন প্রার্থীর জন্য একটি সরকারি চাকরি শুধু একটি চাকরি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের বহু বছরের আশা, আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ। তাই বছরের পর বছর পড়াশোনা করে পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনের পর শেষ মুহূর্তে নিয়োগ আটকে গেলে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা তৈরি হয় শুধু সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার মাধ্যমেও। একজন নাগরিক যদি জানেন যে তার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তিনি কারণ জানতে পারবেন, নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন এবং ভুল হলে প্রতিকার চাইতে পারবেন, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তার আস্থা বাড়বে।তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কে চাকরি পেলেন, কে পেলেন না’ এখানে থেমে থাকা উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত কেন পেলেন না?যে প্রার্থী পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে সেই আপত্তির ভিত্তি কী? কোন প্রমাণের ভিত্তিতে তার নিয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছে? তাকে কি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে? একই মানদণ্ড কি প্রত্যেক প্রার্থীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে?(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

মৃত্যু নিয়ে উল্লাসের অমানবিক সংস্কৃতি

শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা। বাগেরহাটের মোল্লাহাটে কোদালিয়া ইউনিয়নের কচুড়িয়া মধ্যপাড়ায় একটি পানের বরজের পাশ থেকে পলিথিনে মোড়ানো বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হলো ৬ বছরের শিশু মুসলিমার গলাকাটা মরদেহ। বিকেলে বাড়ির আশপাশে সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে খেলছিল মেয়েটি। একপর্যায়ে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিহত মুসলিমা কচুড়িয়া গ্রামের ইসলাম শেখের মেয়ে। এই খবরটি কোনো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পারেনি। কেন পারেনি? কারণ আমরা এখন প্রতিদিনই এমন বস্তাবন্দি লাশ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে ভয়ংকর।ঠিক একই রকম অভ্যস্ততার শিকার হতে যাচ্ছিল ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাও। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিকেল ৩টা ১২ মিনিটে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা জঙ্গলে তাকে ডেকে নিয়ে যায় পরিচিত চারজন—তুহিন (১৯), ফাহাদ (১৫), কামরুল (১৬) ও সিয়াম (১৯)। পুলিশের ভাষ্য, একটি আইফোন ছিনতাইয়ের জন্য তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়। ছেলেটি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের সন্তান। ছবিতে যে মুখটি দেখা যায়—ফর্সা, ফুটফুটে, হাসিমাখা—তা দেখলে হৃদয় গলে যায়। এই বয়সে তো তার খেলার মাঠে থাকার কথা, মায়ের হাত ধরে স্কুল থেকে ফেরার কথা।এখানেই কঠিন প্রশ্নটি আসে। আসল ঘটনা কি শুধু মোবাইল? ১৩ বছরের শিশুর হাতে দামি আইফোন কেন? সে নির্জন পাহাড়ে ছবি তুলতে যাবে কেন? তার চেয়ে ৬ বছরের বড় তরুণদের সঙ্গে ঘুরবে কেন? তার লেখাপড়ার খোঁজ কতটা রাখা হচ্ছিল? সে কি মেধাবী ছাত্র ছিল, নাকি মা-বাবার অমনোযোগে বখাটে ছেলেদের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছিল? এটা মা-বাবাকে দোষারোপ নয়, আত্মসমালোচনা। আমরা সন্তানের হাতে ফোন তুলে দিয়ে দায়িত্ব শেষ ভাবি। কিন্তু ফোন তাকে কোন অন্ধকার জগতে টানছে, তার খোঁজ রাখি না। অপ্রতিমের ক্ষেত্রে সেই অবহেলার ছাপ আছে বলেই পুলিশ বলছে, বখাটে তরুণদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠেছিল। শিশুর হাতে আইফোন এখন বিলাসিতা নয়, বিপদ। মুসলিমার ক্ষেত্রেও একই—৬ বছরের শিশুকে বিকেলে খোলা মাঠে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো নিরাপত্তাবলয় নেই।এই হত্যা নিয়ে বিতর্ক আরেক দিকে মোড় নিয়েছে তার মায়ের রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে। ড. নাহিদা বেগম জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি আন্দোলনে অংশ নিতেই পারেন। কিন্তু অভিযোগ আছে, সেই সময় ও ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মৃত্যু নিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত অশালীন ভাষায় উপহাস করেছেন। এখন তার সন্তানের মৃত্যুতে আওয়ামী লীগের পক্ষের কিছু মানুষ প্রতিশোধমূলক ও অমানবিক মন্তব্য করছে। এই প্রতিশোধমূলক কথাবার্তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি শিশুর মৃত্যু নিয়ে উল্লাস সভ্য সমাজে চলতে পারে না। কিন্তু যাদের পরিবারের সদস্যরা জুলাই আন্দোলনে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বা এখন খুন হয়েছেন, তাদের কান্না যখন উপহাসের শিকার হয়, তখন তাদের ক্ষোভ থামানো কঠিন। আপনি যদি অন্যের সন্তানের লাশ নিয়ে উল্লাস করেন, তাহলে নিজের সন্তানের লাশের সামনে সংযম আশা করার নৈতিক জোর থাকে না।এই প্রতিহিংসার চক্র আজ হঠাৎ তৈরি হয়নি। জুলাই আন্দোলনের সময় থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যা, পিটিয়ে মারা, আগুন দিয়ে পোড়ানোর যে সংস্কৃতি শুরু হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা মব হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তখন প্রকাশ্যে বলা হয়েছে, মব করুন, আওয়ামী লীগের লোকদের ধরে নির্যাতন করুন। আর একদল মানুষ আলহামদুলিল্লাহ বলেছে। সেই মব নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলেও থামেনি, বরং আরও বেপরোয়া হয়েছে। আজ আওয়ামী লীগের লোক মরলে কাল সাধারণ শিশু মরছে। মুসলিমার মরদেহ উদ্ধারের পর বিক্ষুব্ধ জনতা যেমন পানের বরজের মালিকের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে, তেমনি প্রতিটি মৃত্যুর পর আমরা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছি। হত্যার লাইসেন্স একবার দিলে তা আর দল দেখে না। ঘুরে ঘুরে সবার ঘরে ঢোকে। অপ্রতিম ও মুসলিমা তারই শিকার।অপ্রতিম বা মুসলিমা একা নয়। এই সময়ে শিশুর মৃত্যু সর্বত্র। হামে এ বছর হাজারের বেশি শিশু মারা গেছে। এটা টিকার অবহেলায় এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা। এই দায় ড. মোহাম্মদ ইউনূস এবং তার অন্তর্বর্তী সরকারের। পুলিশের তথ্য বলছে, এ বছর ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে। যদিও বেশির ভাগ ফিরে এসেছে, তবু ২ হাজারের বেশি এখনও নিখোঁজ। এটা কি কোনো সুস্থ সমাজের পরিচায়ক? রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে তালাবদ্ধ ঘরে শ্বাসরোধ করে হত্যার মতো বীভৎস ঘটনা, যেখানে ১২ বছরের শিশু আয়ুষও ছিল, তা আমাদের সমাজের অধঃপতনই দেখায়। মাদারীপুরে এক কলেজছাত্রকে মোবাইলের জন্য প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, গাজীপুরে এক গার্মেন্টসকর্মীকে বাড়ি ফেরার পথে মেরে ফেলা, রাজশাহীতে এক বৃদ্ধ রিকশাচালককে ২০০ টাকার জন্য হত্যা করে ড্রেনে ফেলে রাখা—এমন শত শত খুন প্রতিনিয়ত হচ্ছে।এই অধঃপতন চলতে থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে বর্তমান বিএনপি সরকারেরই। একদিকে তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের চরম সংকট, দফায় দফায় দাম বাড়ছে, অন্যদিকে ছিনতাই, রাহাজানি, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না, জিডিপি প্রবৃদ্ধি খুব কম, প্রতিদিন মানুষ কর্মহীন হচ্ছে। ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ফেরার নিশ্চয়তা নেই। খুন আওয়ামী লীগ আমলেও হয়েছে, কিন্তু এত ব্যাপক ও বীভৎস ছিল না। সরকার চলছে ঋণের ওপর। দেশে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা থাকলে কোনো উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করতে আসবে না। মবই যখন আইন, তখন বিনিয়োগ আসে না। রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।এত হত্যার পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলে চলেছেন, আগের যেকোনো আমলের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা ভালো। সমস্যা স্বীকার না করলে সমাধান হবে কীভাবে? অপ্রতিমের হত্যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমরা একটি প্রতিশোধপরায়ণ সমাজ বানিয়েছি, যেখানে অন্যের মৃত্যুতে উল্লাস করা যায়, আর নিজের সন্তানের মৃত্যুতে আমরা ন্যায়বিচার চাই। এই দ্বিচারিতা থেকে বের হতে হবে। মুসলিমার জন্য, অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু তুহিন-ফাহাদ বা জাহাঙ্গীরদের শাস্তি নয়। ন্যায়বিচার মানে সেই মব সংস্কৃতির বিচার, যা তাদের খুন করতে শিখিয়েছে। ন্যায়বিচার মানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মৃত্যু নিয়ে উপহাস বন্ধ করা। না হলে আজ অপ্রতিম, কাল মুসলিমা, পরশু আপনার সন্তান। লাশের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো উন্নয়ন হয় না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

নারীর কর্মসংস্থানে বাধা কোথায়

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত নারীদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী। সংখ্যাটি শুধু শ্রমবাজারের পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার, কর্মসংস্কৃতি এবং উন্নয়নের ধারণার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রতিফলন। গত কয়েক দশক ধরে আমাদের বলা হচ্ছে, নারী শিক্ষা বেড়েছে, মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, পরীক্ষার ফল ভালো করছে, পেশাগত দক্ষতা অর্জন করছে। কিন্তু শিক্ষার দরজা পেরিয়ে কর্মক্ষেত্রের দরজায় এসে যদি অধিকাংশ নারী থেমে যান, তাহলে আমরা তাদের কীসের জন্য শিক্ষিত করছি?আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘দ্য জেন্ডার পে গ্যাপ ইন বাংলাদেশ: ট্রেন্ডস, কজেস অ্যান্ড পলিসি অপশনস’ প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের এই বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী হলেও তাদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী। একই সময়ে ২০২৩ সালে পুরুষের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ, নারীর ৪০ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেই ব্যবধান ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ।এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ৫ শতাংশ নয়, বরং বাকি ৯৫ শতাংশ। তারা কি কাজ করতে চান না? নাকি তাদের কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়নি? দুটো প্রশ্ন এক নয়। একটি সমাজ যদি শিক্ষিত নারীর বড় অংশকে শ্রমবাজারের বাইরে রাখে, তবে সেই অনুপস্থিতিকে ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ বলে ব্যাখ্যা করা সহজ। কিন্তু তাতে সমস্যার কাঠামোগত চরিত্রটি আড়াল হয়ে যায়।শিক্ষা যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং পেশাগত পরিচয়ে রূপান্তরিত না হয়, তাহলে শিক্ষার সামাজিক সুফল অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একজন শিক্ষিত নারী চাকরি করতে চাইলেন, কিন্তু শিশুর যত্ন, নিরাপদ যাতায়াত, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ কিংবা পরিবারের প্রত্যাশা তাকে নিরুৎসাহিত করল। আরেকজন নারী হয়তো চাকরি পেলেন, কিন্তু এমন পেশায় যেখানে তার শ্রমের মূল্য কম। এই ঘটনাগুলো আলাদা মনে হলেও বাস্তবে একই কাঠামোর ভিন্ন প্রকাশ।শ্রমের মজুরি ব্যবধান এই সমস্যাকে আরও গভীর করে। আইএলওর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যবেক্ষণযোগ্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও নারী ও পুরুষের উপার্জনে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান থাকে। সামগ্রিকভাবে নারীরা পুরুষের তুলনায় গড়ে ২২ থেকে ২৫ শতাংশ কম আয় করেন। সহজভাবে বলতে গেলে, পুরুষ যদি এক হাজার টাকা আয় করেন, নারীর আয় দাঁড়ায় প্রায় ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকা। তবে এই ব্যবধান সব ক্ষেত্রে একই থাকে না। পেশা, খাত, কর্মঘণ্টা, কাজের ধরন ও কর্মসংস্থানের বৈশিষ্ট্যও মজুরি নির্ধারণ করে।আইএলওর তথ্যমতে, মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানে থাকা নারীদের ৪১ শতাংশ উৎপাদন খাতে কাজ করেন, পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২৩ শতাংশ। নারীদের আরও ১৯ শতাংশ গৃহস্থালি কাজে এবং ১২ শতাংশ শিক্ষা খাতে নিয়োজিত। অর্থাৎ শ্রমবাজারে নারীর প্রবেশ ঘটলেও তাদের অবস্থান সমান ক্ষমতা বা সমান আয়ের জায়গায় হচ্ছে না। পোশাকশিল্পে নারীর বিপুল উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু উৎপাদন লাইনে নারীর সংখ্যা বেশি হওয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নারীর উপস্থিতি বেশি হওয়া এক বিষয় নয়।ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের পরিসংখ্যানটি তাই বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। দেশে ব্যবস্থাপনা পদে থাকা ব্যক্তিদের মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশ নারী। দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার ১০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বৈশ্বিক গড় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ নারী শুধু শ্রমবাজারে কম প্রবেশ করছেন না, প্রবেশ করলেও নেতৃত্বের সিঁড়িতে ওপরে ওঠার পথ সংকীর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মী অনেক থাকতে পারেন, কিন্তু যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পদে তাদের উপস্থিতি সামান্য হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার কাঠামো কতটা বদলেছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।নারীর কর্মসংস্থান বাড়াতে আমরা প্রায়ই দক্ষতা উন্নয়নের কথা বলি। দক্ষতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সব সমস্যার সমাধান প্রশিক্ষণ নয়। একজন নারীকে আরও একটি প্রশিক্ষণ দিয়ে যদি তাকে একই অনিরাপদ, কম মজুরির এবং সীমিত উন্নতির চাকরিতে পাঠানো হয়, তবে তার দক্ষতা বাড়বে, কিন্তু শ্রমের মূল্য বাড়বে না। দক্ষতার পাশাপাশি দরকার কাজের মান, মজুরি কাঠামো, নিরাপত্তা, পদোন্নতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রবেশাধিকার।আরও বড় অদৃশ্য বাধা রয়েছে ঘরের ভেতরে। বেতনভোগী নারীরা সপ্তাহে গড়ে ২৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন, পুরুষেরা করেন ৭ দশমিক ৬ ঘণ্টা। বেতনভোগী ও গৃহস্থালি কাজ মিলিয়ে নারীদের সাপ্তাহিক কাজের সময় দাঁড়ায় ৭৩ দশমিক ৭ ঘণ্টা, পুরুষদের ৫৯ ঘণ্টা। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার পরও নারীর দ্বিতীয় কর্মদিবস শেষ হয় না। অফিস থেকে ফিরে তার আরেকটি কর্মক্ষেত্র অপেক্ষা করে। সেই কাজের কোনো বেতন নেই, ছুটি নেই, পদোন্নতি নেই, বার্ষিক মূল্যায়ন নেই।একজন পুরুষের কর্মজীবনকে স্বাভাবিক পেশাগত যাত্রা এবং একজন নারীর কর্মজীবনকে পারিবারিক সমঝোতার ফল হিসেবে দেখা হয়। এর প্রভাব নিয়োগ থেকে পদোন্নতি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। সন্তান হবে, মাতৃত্বকালীন ছুটি লাগবে, পরিবারে যত্নের দায়িত্ব থাকবে, তাই নারী হয়তো কম সময়ের কাজ বেছে নেবেন বা ক্যারিয়ারের মাঝপথে বিরতি নেবেন। এরপর সেই বিরতিই আবার তার কম আয় বা পদোন্নতি না পাওয়ার যুক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে।এটি এক ধরনের চক্র। সমাজ নারীর ওপর পারিবারিক যত্নের দায়িত্ব যত বেশি দেয়, শ্রমবাজারে তার অংশগ্রহণ তত সীমিত হয়। অংশগ্রহণ সীমিত হলে অভিজ্ঞতা ও আয় কমে। আয় কম হলে পারিবারিক সিদ্ধান্তে তার অংশগ্রহণের ক্ষমতাও কমে যায়। তারপর বলা হয়, নারীর চাকরি না করাই হয়তো পরিবারের জন্য সুবিধাজনক। অর্থাৎ যে বাধা আমরা তৈরি করেছি, পরে সেটিকেই নারীর পছন্দ হিসেবে ব্যাখ্যা করি।বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেয় এবং শ্রম আইনেও সমান মজুরি ও কর্মপরিবেশের বিধান রয়েছে। কিন্তু কাগজে অধিকার থাকা এবং কর্মক্ষেত্রে তার বাস্তব মূল্য পাওয়া এক বিষয় নয়। আইএলও বলছে, সমান মজুরির বিধানের বাস্তব প্রয়োগ সীমিত। ন্যূনতম মজুরি কাঠামো সব খাতকে সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করে না। নারীর অংশগ্রহণ বেশি এমন কাজের মূল্যায়নে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত যথেষ্টভাবে বিবেচিত হয় না।এখানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নিয়োগকর্তারও দায় আছে। বেতন নির্ধারণ যদি অস্বচ্ছ হয়, পদোন্নতির মানদণ্ড যদি অস্পষ্ট হয়, একই ধরনের কাজের মূল্যায়ন যদি ভিন্নভাবে করা হয়, তাহলে আইন থাকা সত্ত্বেও বৈষম্য শনাক্ত করা কঠিন। তাই শুধু সমান মজুরির ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বেতন কাঠামোয় স্বচ্ছতা, কাজের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, শক্তিশালী শ্রম পরিদর্শন এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। আইএলওর সাম্প্রতিক নীতিগত আলোচনাতেও বেতন কাঠামোর স্বচ্ছতা, বস্তুনিষ্ঠ কাজের মূল্যায়ন, সামাজিক সুরক্ষা, পরিচর্যা নীতি এবং শ্রম পরিদর্শনের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।তবে এই সমস্যাকে কেবল নারীর সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একজন শিক্ষিত নারী যখন শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন না, তখন শুধু তার ব্যক্তিগত আয় হারায় না; দেশ হারায় তার দক্ষতা, করদাতা হিসেবে সম্ভাব্য অবদান, উৎপাদনশীলতা এবং উদ্ভাবনের সুযোগ। একজন মেধাবী নারী যদি বছরের পর বছর ঘরের অবৈতনিক কাজে আটকে থাকেন, তার শিক্ষা ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে জাতীয় সম্পদে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে নারী কর্মসংস্থান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্নও বটে।আমাদের উন্নয়নের ভাষাতেও তাই পরিবর্তন দরকার। শুধু কতজন মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো, কতজন পাস করল, কিংবা কতজন নারী শ্রমবাজারে ঢুকলেন, তা দিয়ে অগ্রগতি মাপা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে তারা কোন পেশায় ঢুকছেন, কত আয় করছেন, কত ঘণ্টা কাজ করছেন, নিরাপত্তা কেমন, পদোন্নতির সুযোগ কতটা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় কতজন পৌঁছাচ্ছেন। সংখ্যায় অংশগ্রহণ বাড়লেও যদি নারীরা নিচের সারিতে আটকে থাকেন, তাহলে সেটি পূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নয়।একটি দেশ যদি তার উচ্চশিক্ষিত নারীদের ৯৫ শতাংশের বড় অংশকে শ্রমবাজারের বাইরে রেখে দেয়, তবে সেটি শুধু অসমতাই নয়, এটি অর্থনৈতিক অপচয়ও। যে সমাজ মেয়েদের দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে বিনিয়োগ করে, কিন্তু কর্মজীবনে তাদের জায়গা দিতে পারে না, সে সমাজ নিজের তৈরি মানবসম্পদের একটি বড় অংশ ব্যবহার না করেই এগিয়ে যেতে চায়। আর যে নারী একই সঙ্গে চাকরি ও ঘরের কাজ করেন, কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই তার শ্রমের মূল্য কম, তার কাছে সমতা শব্দটি কোনো অর্থ বহন করে না।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নারীরা কাজ করবেন কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, তারা কেন কাজের বাইরে থাকবেন, কেন কম মজুরির কাজে বেশি থাকবেন, কেন নেতৃত্বে এত কম থাকবেন এবং কেন ঘরের কাজের ভার তাদের কাঁধেই বেশি থাকবে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বদলাতে পারলেই ৫ শতাংশের পরিসংখ্যানটি কেবল একটি হতাশাজনক সংখ্যা হয়ে থাকবে না; এটি একটি পুরোনো শ্রমবাজারকে নতুন করে ভাবার সূচনা হতে পারে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রভাষক, ইংরেজি ও আধুনিক ভাষা বিভাগ, আইইউবিএটি]

ভিডিও আরও দেখুন

অবৈধ দখলে থাকা সব খেলার মাঠ উদ্ধারের নির্দেশ ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর

দেশের বিদ্যমান জেলা স্টেডিয়ামগুলোকে আধুনিকায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া অবকাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। তিনি বলেছেন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগে দেশের বিদ্যমান মাঠ ও স্টেডিয়ামগুলোকে যথাযথ ব্যবহারোপযোগী করার ওপর সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকাল ১১টায় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একটি ক্রিকেট একাডেমির উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।আমিনুল হক বলেন, ‘তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত খেলাধুলার একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে শ্রীমঙ্গল ক্রিকেট একাডেমির পাশাপাশি মাঠে ড্রেসিং রুমসহ প্রয়োজনীয় ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’জেলা স্টেডিয়ামগুলোর আধুনিকায়নে ইতিমধ্যেই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে। এসব অবকাঠামো উন্নত করা গেলে ক্রিকেট ও ফুটবলের পাশাপাশি সাঁতার, ভলিবল, টেবিল টেনিস, দাবা, আর্চারি, শুটিং ও হকিসহ অন্যান্য খেলায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে।তরুণ প্রজন্মকে মাদকমুক্ত ও সুস্থ রাখতে খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শহরের ওয়ার্ড পর্যায়ে ফুটসাল বা ছোট মাঠ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।’শিক্ষার সঙ্গে খেলাধুলাকে যুক্ত করার অংশ হিসেবে আগামী শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকেই খেলাধুলাবিষয়ক পাঠ্যপুস্তক সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।মৌলভীবাজারের বিভিন্ন খেলার মাঠ দখল হয়ে থাকার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আমিনুল হক বলেন, অবৈধভাবে দখলে থাকা সব খেলার মাঠ উদ্ধার করে খেলাধুলার উপযোগী করার জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শিশু-কিশোর ও তরুণদের মাঠমুখী করতে হলে আগে তাদের খেলার জায়গা নিশ্চিত করতে হবে।আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণেই সন্তুষ্ট থাকতে চায় না, বরং সম্ভাবনাময় খেলাগুলোতে পদক জয়ের লক্ষ্যে লড়াই করতে চায়। এ জন্য অলিম্পিক, এশিয়ান গেমস ও কমনওয়েলথ গেমসের মতো আসরকে সামনে রেখে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মামুনুর রশীদ, শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান, সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) মো. ওয়াহিদুজ্জামান রাজু, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক সরফুদ্দীন আহমদ সরফুসহ স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠক ও সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রতিমন্ত্রী শ্রীমঙ্গল উপজেলায় প্রস্তাবিত মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।

অবৈধ দখলে থাকা সব খেলার মাঠ উদ্ধারের নির্দেশ ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর