সংবাদ
মজুরি আন্দোলন: ঢালাও ব্যাংক হিসাব জব্দে বিতর্ক, উদ্বেগ

মজুরি আন্দোলন: ঢালাও ব্যাংক হিসাব জব্দে বিতর্ক, উদ্বেগ

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা ও শ্রমিক অসন্তোষে ‘ইন্ধন’ এবং ‘অর্থায়নের’ অভিযোগে দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তথ্য তলবের ঘটনায় ব্যবসায়ী মহলে বিতর্ক ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।তারা বলছেন এমন অনেকের হিসাব জব্দ করা হয়েছে যাদের ব্যবসায়ী হিসেবে ‘সুনাম’ আছে এবং কোনো ‘রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা’ নেই।জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের তথ্য দেয়ার জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দের (ফ্রিজ) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পোশাক ও বস্ত্র খাতের ১২৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণ তলব করা হয়েছে।এনবিআরের তালিকায় দেশের তৈরি পোশাক, বস্ত্র, প্যাকেজিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের শীর্ষস্থানীয় অন্তত সাতটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর নাম এসেছে।‘সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়া’ এভাবে ঢালাও ব্যাংক হিসাব জব্দের পদক্ষেপে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ‘নেতিবাচক প্রভাব’ ও রপ্তানি খাতে ‘আস্থার সংকটের’ আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। কার পরামর্শ বা বুদ্ধিতে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সে প্রশ্নও উঠেছে ব্যবসায়ী মহলে।এনবিআরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার ‘তথ্যের ভিত্তিতে’ এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারা বলছেন অভিযোগ রয়েছে, পোশাক খাতের অস্থিরতাকে উসকে দিতে ‘বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অর্থের জোগান’ দেওয়া হচ্ছিল।অভিযোগ খতিয়ে দেখতে এনবিআরের করসংক্রান্ত দুটি বিশেষায়িত গোয়েন্দা শাখা, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট (আইটিআইআইইউ) তদন্ত শুরু করেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব চিঠি পাঠিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জমা দিতে বলা হয়েছে।এর আগে সচিবালয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেছিলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের মধ্যে যারা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের কেউ কেউ শ্রমিকদের আন্দোলনে বাইরে থেকে ‘ইন্ধন ও অর্থ’ দিচ্ছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পরপরই এনবিআরের এই তৎপরতার খবর পাওয়া যায়।তালিকায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি আছেন। আর দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নাম রয়েছে। তালিকায় এমন কয়েকজন উদ্যোক্তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যাদের প্রত্যক্ষ কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই এবং ব্যবসায়ী মহলে পরিচ্ছন্ন ও পেশাদার হিসেবে তাদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে।শেল্টেক্ গ্রুপ ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর আহমেদ ও তার মা রাশিদা আহমেদের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করেছে এনবিআর। এই দুজনের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে এমন তথ্য কারো কাছে নেই। তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত শেলটেক গ্রুপের দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণ ব্যবসায়ী তানভীর আহমেদের ভাবমূর্তি ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক বলেই জানা গেছে। তার বাবা দেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা এনভয় টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এক সময়ে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুশের্দীর মালিকানাধীন এনভয় গ্রুপের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও তার ছেলে। তবে সাড়ে চার বছর আগে তারা আলাদা হয়ে গেছেন।জব্দের তালিকায় রয়েছে তুসুকা গ্রুপ। গ্রুপটির ১০টি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলবের পাশাপাশি নয়জন ব্যক্তির হিসাব জব্দ করা হয়েছে। গ্রুপের উদ্যোক্তাদের একজন ফয়জুর রহমান বাদল ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব এবং পরিচালক ফয়জুর রহমান, আরশাদ জামিল, রেফায়েত উল্লাহ (তোতা), ফিরোজ আলমসহ নয়জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।তুসুকা গ্রুপের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকের মাধ্যমে কর্মীদের বেতন স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে একটা অংশ বেতন পাননি। কারণ, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। আমাদের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের আজকের সুনামে পৌঁছাতে বহু বছর সময় লেগেছে। শ্রমিক অসন্তোষের সময়ে অন্য কারখানার মতো আমাদের শ্রমিকদেরও কিছু দাবিদাওয়া থাকতে পারে, তার মানে এই নয় যে আমরাই শ্রমিকদের রাস্তায় নামিয়েছি। এমন পদক্ষেপ অন্যায্য।’তুসুকা গ্রুপের ওই কর্মকর্তা জানান, তাদের কারখানায় ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এক দিন কাজ বন্ধ থাকলে কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাহীন অংশীদারদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করায় কর্মীদের বেতন স্থানান্তর ব্যাহত হচ্ছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে অত্যন্ত ভুল বার্তা যাচ্ছে।এনবিআরের তদন্ত তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের একটি বড় অংশই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নীতি-নির্ধারক ও রাজনীতিক। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। এ ছাড়া তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান (কচি) এবং তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবও তলব ও জব্দের আওতায় এসেছে।তালিকায় আরও রয়েছে মিরপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও তার পরিবারের সদস্যদের নাম। ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বোনের স্বামী আলিফ মোল্লার নামও হিসাব জব্দের তালিকায় রয়েছে। এদের অনেকেই হয় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, নয়তো পলাতক।তালিকায় সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে সিরাজগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মমিন মণ্ডলের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান মণ্ডল গ্রুপের। গ্রুপটির চেয়ারম্যান আবদুল মমিন মণ্ডল, এমডি আবদুল আলিম মণ্ডলসহ পরিবারের ১৯ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং কটন ক্লাব, কটন ক্লোদিং, অ্যাপোলো ফ্যাশন, ট্রপিক্যাল নিটেক্সসহ গ্রুপটির মোট ২৮টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করা হয়েছে। গ্রুপটি বছরে অর্ধশত কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে।আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ। এই শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের তিনটি কোম্পানির হিসাব তলব করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতা এ কে এম মোশাররফ হোসেন, প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান ও এমডি হাসনাত মোশাররফসহ পরিবারের ৮ জনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে।ক্ষমতাচ্যুত সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদীর মালিকানাধীন এনভয় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সালাম মুর্শেদী, তার স্ত্রী ও মেয়ের হিসাব জব্দ করা হয়েছে।সাবেক সংসদ সদস্য খসরু চৌধুরী ও তার পরিবারের চারজনের হিসাব জব্দ এবং নিপা নিটওয়্যারসহ গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের লেনদেন তথ্য তলব করা হয়েছে। খসরু চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়ে পাননি। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে আছেন।গিভেন্সি গ্রুপের পাঁচটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের তথ্য চাওয়ার পাশাপাশি চেয়ারম্যান খতিব আবদুল জাহিদসহ চারজনের ব্যক্তিগত হিসাব জব্দ করা হয়েছে।চট্টগ্রামের ওয়েল গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলবের পাশাপাশি গ্রুপটির চেয়ারম্যান আবদুস সালাম, পরিচালক সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ শহীদুল ইসলাম, সৈয়দ তারিকুল ইসলামসহ ১১ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এই গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার ভাই সৈয়দ নুরুল ইসলাম আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপদেষ্টা ছিলেন, বর্তমানে কারাবন্দী। ওয়েল গ্রুপের তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যবসা রয়েছে।বিজিএমইএ এর একজন উপদেষ্টা সংবাদকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটা সেনসেটিভ বিষয়। বিষয়টা রাষ্ট্রীয়। রাষ্ট্র জনগনের জন্য যা ভালো মনে করবে তাই করবে। এই বিষয়ে আমার মন্তব্য করা উচিত হবে না।’ বিজিএমইএ এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, তাই এই বিষয়ে এখনই বিজিএমইএ কে জাড়ানো ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।ঢালাওভাবে রাজনৈতিক যোগসূত্রের সন্দেহ তৈরি করে ‘পরিচ্ছন্ন ও পেশাদার’ ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাব জব্দের ঘটনায় শিল্প খাতে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও তদন্ত ছাড়া ঢালাও পদক্ষেপে সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক সংবাদকে বলেন, ‘শ্রমিক আন্দোলনে কারও অসৎ উদ্দেশ্য বা তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন থাকলে সুনির্দিষ্ট তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের অবশ্যই চিহ্নিত করা উচিত। কিন্তু তথ্যপ্রমাণ ছাড়া ঢালাওভাবে ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হলে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হবে এবং স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে।’এনবিআর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন সংস্থার পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য ক্রস-চেক করা হচ্ছে। তবে নিরীহ ও প্রকৃত উৎপাদনশীল ব্যবসায়ীরা যাতে কোনো প্রশাসনিক জটিলত’ বা অহেতুক ভোগান্তির মুখে না পড়েন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও শিল্পমালিকরা।
২ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি সাম্প্রদায়িক ছিলেন?

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাস্কর্য কিংবা ম্যুরাল পাকিস্তান ছাড়া পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রেই রয়েছে। পাকিস্তানে নেই, কারণ পাকিস্তান ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গানসহ সমস্ত সৃষ্টিকর্ম আইন করে নিষিদ্ধ করেছিল। আজ বহু বছর পর বাংলাদেশে পাকিস্তান-প্রেমীরা নানা প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের গায়ে সাম্প্রদায়িকতার কালি লেপন করে দেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইছে।ঢাকার পর এবার খুলনায় রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি লেপন করা হয়েছে। পাশে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা’ শিরোনামে দুটি লিফলেট লাগিয়ে দিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। যেখানে লেখা ছিল, ‘তিতুমীরের বাংলায়, মুসলিম ও পূর্ব বাংলা বিদ্বেষী রঠার ঠাঁই নাই/ভারত বন্দনার ঠাঁই নাই’। প্রশ্ন হলো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে না জানা, না বোঝা কিছু মানুষ কবির প্রতিকৃতিতে কালি লেপন করে সারা বিশ্বের কাছে আমাদের ছোট করছে কি না? আমাদের জানা উচিত, রাশিয়া, ফ্রান্স, চেক প্রজাতন্ত্র, লন্ডন, আয়ারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, হাঙ্গেরি, আর্জেন্টিনা, চীন, মেক্সিকো, চিলি, কলম্বিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, ইসরায়েল, লেবানন, মিশর, বেলজিয়াম, স্পেন, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, রোমানিয়া, স্লোভেনিয়া ও ভারতসহ বিভিন্ন ভাস্কর্য রয়েছে। এসব ভাস্কর্য তাদের বিশুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার অংশ আর বিশ্বকবির প্রতি সম্মান। এমনকি অনেক রাষ্ট্রের ডাকটিকিটেও রবীন্দ্রনাথের ছবি রয়েছে। তারা ভুল করে রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য স্থাপন করেনি।আমরা যদি হাজার বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ না করি, তাহলে রবীন্দ্রনাথের কিছুই আসবে-যাবে না। বরং স্মরণ না করলে আমাদেরই ক্ষতি হবে। কারণ তিনি বিশ্বনন্দিত। আর বিশ্বনন্দিত হওয়ার অন্তরালে যে বিষয়গুলো কাজ করেছে, তার প্রধান দিকটি ছিল তার অসাম্প্রদায়িকতা। কবিগুরু তার রাজনৈতিক উপন্যাস ‘গোরা’-তে বলেছেন, ‘দেখুন পরেশবাবু, কাল রাত্রে আমি বিধাতার কাছে প্রার্থনা করেছিলুম যে, আজ প্রাতঃকালে আমি যেন নূতন জীবন লাভ করি। আজ আমি এমন শুচি হয়ে উঠেছি যে, চণ্ডালের ঘরেও আমার আর অপবিত্রতার ভয় রইল না। পরেশবাবু, আজ প্রাতঃকালে সম্পূর্ণ অনাবৃত চিত্তখানি নিয়ে একেবারে আমি ভারতবর্ষের কোলের উপরে ভূমিষ্ঠ হয়েছি—মাতৃক্রোড় যে কাকে বলে এতদিন পরে তা আমি পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি।’উপন্যাসের শেষাংশে তিনি লিখেছেন, ‘আমি হিন্দু নই। আজ আমি মুক্ত পরেশবাবু। আমি যে পতিত হব, ব্রত হব, সে ভয় আর আমার নেই, আমাকে আর পদে পদে মাটির দিকে চেয়ে শুচিতা বাঁচিয়ে চলতে হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরেশবাবু আপনি আজ আমাকে সেই দেবতার মন্ত্রে দীক্ষা দিন যিনি হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান, ব্রাহ্ম সকলেরই। যার মন্দিরের দ্বার কোন জাতীর কাছে, কোন ব্যক্তির কাছে কোন দিন অবরুদ্ধ হয় না, যিনি কেবলই হিন্দুর দেবতা নয়, গোটা ভারতবর্ষের দেবতা।’ কবি এ বিষয়ে আরও বলেছেন, ‘আমার ধর্ম কী, তা সে আজও আমি সম্পূর্ণ এবং সুস্পষ্ট করে জানি, এমন কথা আমি বলতে পারি না। অনুশাসন আকারে তত্ত্ব আকারে কোন পুঁথিতে লেখা ধর্ম সে তা নয়।’আসলে কবি কোনো ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী ছিলেন না, তা কবি জসীম উদদীনের আলোচনা থেকে একটু অনুমান করা যায়। পল্লী কবি লিখেছেন, ‘আমি তখন এমএ পড়তে কলিকাতা এমসি এ হোস্টেলে ছিলাম। সেই সময়ে আমি প্রায়ই কবির সঙ্গে দেখা করতে যেতাম; আমাকে দেখলেই কবি সাম্প্রদায়িক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতেন। তিনি বলতেন, “কেন যে মানুষ একের অপরাধের জন্য অপরকে মারে! ও দেশের মুসলমানেরা হিন্দুদের মারল, তাই এ দেশের হিন্দুরা মুসলমানদের মেরে তার প্রতিবাদ করবে, এই বর্বর মনোবৃত্তির হাত থেকে দেশ কীভাবে উদ্ধার পাবে বলতে পার? দেখ, কী সামান্য ব্যাপার নিয়ে কলহ হয়। গরু কোরবানি নিয়ে মসজিদের সামনে বাজনা নিয়ে, একটা পশুকে রক্ষা করতে কত মানুষকে মানুষ হত্যা করছে।”’আজ থেকে শত বছর পূর্বে এমন এক পরিস্থিতিভেদে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাবা, আমার ধর্ম নেই, আমি যাকে ভালোবাসি সেই ভাগ্যবানই আমার ধর্ম। … তোমার মেজো ছেলে করিম, তাকে আমি মনের মধ্যে গ্রহণ করেছি—আমার ধর্মকর্ম ওরই সঙ্গে বাঁধা পড়েছে। তুমি মুসলমান করে নাও আমাকে, তাতে আমার আপত্তি হবে না—আমার না হয় দুই ধর্মই থাকল।’ এখানে ধর্ম ও সম্প্রদায়কে বিবেচনা না করে মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ। সারা বিশ্বের মানুষের জন্য কবির আহ্বান ছিল, ‘কোন দেশ থেকে যে কোন সমাজ থেকে যেই আসুক না কেন, তাঁর পুণ্যজীবনের জ্যোতিতে পরিবৃত হয়ে আমরা সকলকেই এই মুক্তির ক্ষেত্রে আহ্বান করব। দেশ দেশান্তর দূর দূরান্তর থেকে যে কোন ধর্মবিশ্বাসকে অবলম্বন করে যিনিই এখানে আশ্রয় চাইবেন, আমরা যেন কাউকে গ্রহণ করতে কোন সংস্কারের বাধা বোধ না করি। কোন সম্প্রদায়ের লিপিবদ্ধ বিশ্বাসের দ্বারা আমাদের মন যেন সংকুচিত না হয়।’সকল মানুষের জন্য রবীন্দ্রনাথ ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেছেন, ‘তোমরা কেউবা পূর্বাচলের যাত্রী সূর্যোদয়ের দিকেই তোমাদের মুখ, সেই দিকে যিনি তোমাদের অভ্যুদয়ের পথে আহবান করছেন তাকে তোমরা পূর্বমুখ করেই প্রণাম করো। আমরা পশ্চিম অস্তাচলের দিকে জোড়হাত করে উপাসনা করি, সেই দিক থেকে আমাদের আহবান আসছে, সেই আহবান ও সুন্দর গুরুগম্ভীর এবং শান্তিময় আনন্দরসে পরিপূর্ণ। কাউকে পরিত্যাগ করে থাকতে পারেন না।’ বিধায় তিনি অসাম্প্রদায়িক।আর কবিগুরু আমাদের শিক্ষাবিরোধী ছিলেন, এমন ধারণা মোটেও সঠিক নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনেক আগে ১৯০৫ সালে পতিসরে এমনই স্কুল স্থাপন করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছেন। ‘বিদ্যালয় স্থাপন করাই শেষ নয়, বরং হাতে-কলমে শিক্ষায় প্রবৃত্ত হন।’ পাশাপাশি তার কালীগ্রাম পরগণার গ্রামে গ্রামে অবৈতনিক পাঠশালা চালু করেন। ১৯০৫ সালে কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে গরিব প্রজাদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়েছিলেন, তা বিরল ঘটনা। তাই একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, কবিগুরু গ্রামাঞ্চলের মানুষের প্রাথমিক শিক্ষার কাজ হাতে নিয়েছিলেন।লেখক: রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষকঢাকার পর খুলনাতেও রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি

জলবায়ু সংকট: ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর চাই ন্যায্য অধিকার

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে প্রতিশ্রুতির কমতি নেই। প্রায় প্রতিটি জলবায়ু সম্মেলনেই নতুন লক্ষ্য, অর্থায়নের ঘোষণা এবং নানা কর্মপরিকল্পনা সামনে আসে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ ও জনগোষ্ঠীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এখনো একই—প্রতিশ্রুত অর্থ কোথায়? ঘোষিত অর্থের কতটুকু বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছেছে? আর এসব প্রতিশ্রুতির ফলে মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন এসেছে? তাই আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে নতুন নতুন প্রতিশ্রুতির চেয়ে আগে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, অথযে জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী নয়, স্বল্পোন্নত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর তার দায় চাপানো যাবে না। জলবায়ু অর্থায়নে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।কপ-২৯ সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ২০৩৫ সাল নাগাদ বছরে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন বা ৩০ হাজার কোটি ডলার জলবায়ু অর্থায়নের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উৎস থেকে এই অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে বছরে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অন্যদিকে কপ-৩০ সম্মেলনে বেলেম অভিযোজন সূচক গ্রহণ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে অভিযোজন অর্থায়ন তিন গুণ করার আহ্বান জানানো হয়। কাগজে-কলমে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও প্রতিশ্রুতি, প্রকৃত প্রয়োজন এবং বাস্তবে অর্থ ছাড়ের মধ্যে ব্যবধান এখনো অনেক বেশি।অভিযোজন অর্থায়নের ক্ষেত্রে এই সংকট সবচেয়ে স্পষ্ট। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ২০২৫ সালের অ্যাডাপটেশন গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমে বছরে প্রায় ৩১০ থেকে ৩৬৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। অথচ ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক সরকারি অভিযোজন অর্থায়নের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় অর্থায়নের ঘাটতি প্রায় ১২ থেকে ১৪ গুণ। এটি শুধু অর্থের ঘাটতি নয়; বরং জলবায়ু ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বৈষম্য।অর্থায়নের পরিমাণের পাশাপাশি এর ধরন নিয়েও রয়েছে গুরুতর উদ্বেগ। উন্নত দেশগুলোর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য মোট ১৩৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন করা হয়েছে বা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ছিল সরকারি অর্থায়ন। কিন্তু এই অর্থের ৬৭ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছে ঋণ হিসেবে। বিপরীতে অনুদানের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।প্রশ্ন হলো, জলবায়ু সংকটের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী দেশগুলোকে কেন সেই সংকট মোকাবিলায় নতুন করে ঋণের বোঝা নিতে হবে? যেসব দেশ ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বিপর্যয়ের মুখোমুখি, তাদের ওপর ঋণের চাপ বাড়ানো কোনোভাবেই ন্যায়সংগত হতে পারে না।বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু অর্থায়নের ঘাটতি মানে উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়া, কৃষকের অভিযোজন সক্ষমতা দুর্বল থাকা, দুর্যোগের পর পুনরুদ্ধার বিলম্বিত হওয়া এবং খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়া। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতিতে। ফলে জলবায়ু অর্থায়ন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়; এটি উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।এখানেই জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি সামনে আসে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (ইউএনএফসিসিসি) এবং প্যারিস চুক্তিতে অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও সক্ষমতার নীতি (সিবিডিআর-আরসি) এবং দূষণকারীকে দায় বহনের নীতির স্বীকৃতি রয়েছে। প্যারিস চুক্তির ৯ নম্বর অনুচ্ছেদেও উন্নত দেশগুলোর অর্থায়নের দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। এসব নীতির মূল কথা হলো, যেসব দেশের ঐতিহাসিক দায় বেশি এবং আর্থিক সক্ষমতা বেশি, তাদের দায়িত্বও বেশি হতে হবে। অথচ কম নিঃসরণকারী দেশগুলোকে অভিযোজনের জন্য ঋণ নিতে বাধ্য করা হলে জলবায়ু ন্যায়বিচারের মূল ধারণাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।উন্নয়নশীল দেশগুলো এমনিতেই ঋণের চাপে রয়েছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের হিসাবে, ২০২৫ সালে এসব দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে। একই বছরে ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য নতুন ঋণ গ্রহণ অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করতে পারে।তাই কপ-৩১ সম্মেলনে আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত স্পষ্ট—নতুন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বিদ্যমান অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন জরুরি। কপ-২৯-এ নির্ধারিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য এবং জলবায়ু অর্থায়ন ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উদ্যোগের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা, বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা, স্বচ্ছ প্রতিবেদন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে অভিযোজন ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন হতে হবে নতুন ও অতিরিক্ত, পর্যাপ্ত, পূর্বানুমানযোগ্য এবং অনুদানভিত্তিক।শুধু অর্থের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। জটিল আবেদনপ্রক্রিয়া, দীর্ঘ অনুমোদন এবং কঠিন শর্তের বেড়াজালে জলবায়ু অর্থায়ন আটকে থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কোনো উপকার হবে না। অর্থ পৌঁছাতে হবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও জলবায়ু আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর কাছে সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। যাদের জীবন জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।একই কথা প্রযোজ্য লস অ্যান্ড ড্যামেজ বা ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার অর্থায়নের ক্ষেত্রেও। শুধু একটি তহবিল গঠন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন তাৎক্ষণিক। অথচ অর্থ পেতে যদি দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাহলে সেই অর্থের কার্যকারিতা কতটুকু থাকবে? ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার অর্থায়ন হতে হবে পর্যাপ্ত, নতুন ও অতিরিক্ত, দ্রুতপ্রাপ্তিযোগ্য, সরাসরি ব্যবহারযোগ্য এবং প্রধানত অনুদানভিত্তিক।জলবায়ু অর্থায়নের পাশাপাশি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সীমা বজায় রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। কপ-২৮-এর দুবাই ঐকমত্যে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ন্যায়সংগত, সুশৃঙ্খল ও সমতাভিত্তিক উত্তরণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের অগ্রগতি এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। নতুন জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্প সম্প্রসারণ সীমিত করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো, জ্বালানি দক্ষতা উন্নত করা এবং দেশভিত্তিক সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ জরুরি।তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার পরামর্শ দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি এবং বিকল্প জ্বালানি অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। উত্তরণ হতে হবে দ্রুত, ন্যায়সংগত এবং অর্থায়নসমর্থিত।কপ-৩০ সম্মেলনে গৃহীত ৫৯টি বেলেম অভিযোজন সূচক অভিযোজন কার্যক্রমের অগ্রগতি পরিমাপের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে জাতীয় পর্যায়ের গড় পরিসংখ্যান দিয়ে অভিযোজনের প্রকৃত সাফল্য বোঝা সম্ভব নয়। উপকূলের কোনো চর, লবণাক্ততাপ্রবণ গ্রাম কিংবা ক্ষুদ্র কৃষকের পরিবারের জীবন কতটা বদলেছে, তা জানতে স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য ও মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষের আয়, জীবিকা, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতার পরিবর্তন পরিমাপ করতে হবে। অভিযোজন কার্যক্রমের সাফল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ থাকতে হবে।শেষ পর্যন্ত কপ-৩১-এর সামনে প্রশ্ন একটাই—বিশ্ব আবারও কি বড় অঙ্কের অর্থ ও উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করবে, নাকি এবার বাস্তবায়নের পথে এগোবে? যে সংকটের জন্য দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো দায়ী নয়, সেই সংকটের মূল্য তাদের ঋণের বোঝা বাড়িয়ে পরিশোধ করতে বলা কোনোভাবেই ন্যায়বিচার হতে পারে না। আমরা করুণা চাই না; চাই দায়িত্বের স্বীকৃতি, বিদ্যমান অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন এবং ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়ন।কপ-৩১ থেকে তাই বার্তা হতে হবে দ্ব্যর্থহীন—স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর (এমভিসি) ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করা যাবে না। যে সংকট তারা সৃষ্টি করেনি, তার দায়ও তাদের কাঁধে চাপানো যাবে না। জলবায়ু অর্থায়নকে প্রতিশ্রুতির হিসাব থেকে বের করে মানুষের জীবনে পরিমাপযোগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ারে পরিণত করতে হবে। কারণ জলবায়ু ন্যায়বিচার কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি ঐতিহাসিক দায় ও দায়িত্বের স্বীকৃতি।[লেখক: এম রেজাউল করিম চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ফাউন্ডেশন; এম এ হাসান, প্রধান, জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগ, কোস্ট ফাউন্ডেশন]

কৃষিজমি ও বন রক্ষায় কৃষিবনায়নের সম্ভাবনা

প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। অথচ এই বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ভূখণ্ডে। ফলে দেশের জমির ওপর চাপও অসীম। একই জমিতে বারবার ফসল ফলিয়ে মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। দেশের প্রায় ৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন হেক্টর নিট আবাদি জমিতে গড়ে ফসল নিবিড়তা এখন প্রায় ১৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ অধিকাংশ জমিতে বছরে দুইবার, কোথাও কোথাও তিনবার পর্যন্ত ফসল ফলানো হচ্ছে।কিন্তু যে জমি আমাদের খাদ্যের জোগান দেয়, সেই জমিই ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। ১৯৬০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশের আবাদযোগ্য ও কৃষিজমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে বনভূমিও। শুধু ২০০২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় ৮ দশমিক ৮৫ হাজার হেক্টর আর্দ্র প্রাথমিক বন হারিয়েছে। ২০০০ সালের তুলনায় দেশের মোট বৃক্ষ আচ্ছাদনও কমেছে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার হেক্টর বা ১৩ শতাংশ। একদিকে কৃষিজমি কমছে, অন্যদিকে বনভূমি হারাচ্ছে দেশ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং প্রকৃতির ওপর বাড়তে থাকা চাপের এই সময়ে পুরোনো একটি কৃষিপদ্ধতি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। সেটি হলো কৃষিবনায়ন বা এগ্রোফরেস্ট্রি।কৃষিবনায়নের মূল ধারণাটি সহজ। একই জমিতে পরিকল্পিতভাবে গাছের সঙ্গে ফসল চাষ করা এবং প্রয়োজনে এর সঙ্গে গবাদিপশু পালন যুক্ত করা। এতে কৃষককে গাছ ও ফসলের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হয় না। একই জমি থেকে পাওয়া যায় খাদ্য, কাঠ, ফল, পশুখাদ্য ও আয়। একই সঙ্গে বাড়ে পরিবেশের সহনশীলতাও।বাংলাদেশে কৃষিবনায়ন নতুন কোনো ধারণা নয়। এ দেশে পরিকল্পিতভাবে গাছ ও ফসলের সমন্বিত চাষের ইতিহাস প্রায় দেড় শতাব্দীর। ১৮৭১ সালে মিয়ানমার থেকে আসা টাউংইয়া পদ্ধতি কাপ্তাই পাহাড়ে প্রথম প্রয়োগ করা হয়। এই পদ্ধতিতে সেগুনের তরুণ গাছের সারির মাঝখানে কৃষকেরা ধান ও শাকসবজি চাষ করতেন। এতে একদিকে বন পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতো, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের খাদ্যের চাহিদাও পূরণ হতো। স্বল্প মেয়াদে খাদ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদে কাঠ—একই জমি থেকে এই দুই ধরনের সুফল পাওয়ার ধারণাটিই আজকের কৃষিবনায়নের অন্যতম ভিত্তি। এরপর দেশে কৃষিবনায়ন নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের বেতাগী-পোমরা এলাকায় ১৯৭৯-৮০ সালে পরিচালিত সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিকে দেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক জনসম্পৃক্ত বন ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সহায়তায় উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, গ্রাম ও খামার বনায়ন এবং বসতবাড়িকেন্দ্রিক বনায়ন কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়।পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক নার্সারি গড়ে তোলা এবং মানসম্মত চারা উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে চরাঞ্চলভিত্তিক কৃষিবনায়ন এবং পুষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও সহনশীলতাভিত্তিক কৃষি ও গ্রামীণ রূপান্তর কর্মসূচির আওতায় কৃষিবনায়ন প্রকল্পের মতো উদ্যোগ বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় জলবায়ু সহনশীল কৃষিবনায়ন পদ্ধতি সম্প্রসারণে কাজ করছে।বাংলাদেশের কৃষিবনায়নের সবচেয়ে পরিচিত রূপ হলো বসতবাড়িকেন্দ্রিক কৃষিবনায়ন। গ্রামীণ বাংলাদেশের অধিকাংশ বসতবাড়িই এক অর্থে ছোট্ট একটি কৃষিবন। বাড়ির আঙিনায় ফলের গাছ, কাঠের গাছ, বাঁশ, শাকসবজি ও বিভিন্ন ফসল একসঙ্গে বেড়ে ওঠে। ধারণা করা হয়, দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার কোনো না কোনোভাবে এ ধরনের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। দেশের জ্বালানি কাঠের ৮০ শতাংশের বেশি এবং বাঁশের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে এই ব্যবস্থা থেকে।সিলেটের কমলগঞ্জ উপজেলায় পরিচালিত একটি গবেষণায় বসতবাড়িকেন্দ্রিক কৃষিবনায়নের ২৯টি ভিন্ন বিন্যাস পাওয়া গেছে। কোথাও আম, কলা, মিষ্টিকুমড়া ও ফুলকপি একই জায়গায় চাষ হচ্ছে। আবার কোথাও সুপারি, আম, কলা ও ফরাসি শিমের মতো ফসল বিভিন্ন উচ্চতায় স্তর তৈরি করে বেড়ে উঠছে। একই জমিতে গাছের ছায়া, ঝোপঝাড় ও ভূমিস্তরের ফসল মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে একটি ছোট্ট বহুতল উৎপাদনব্যবস্থা।বসতবাড়ির বাইরেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিবনায়নের বৈচিত্র‍্য রয়েছে। ধান, পাট বা হলুদের সঙ্গে আম চাষ, বনভূমিতে টাউংইয়া পদ্ধতি, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জুমচাষ, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, রাবারভিত্তিক কৃষিবনায়ন এবং চরাঞ্চলে গাছ ও ফসলের সমন্বিত চাষ এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। মধুপুরের শালবন এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় লিচু, আনারস, আদা, পেঁপে ও কলার সমন্বিত কৃষিবনায়ন পদ্ধতি লাভজনক হওয়ার পাশাপাশি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতেও ভালো ফল দিয়েছে। অর্থাৎ কৃষিবনায়ন শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, জমির স্বাস্থ্য রক্ষাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।দেশের উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বহুতল কৃষিবনায়ন ব্যবস্থায় একই জমির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হয়। দিনাজপুরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বসতবাড়ি ও কৃষিজমিভিত্তিক কৃষিবনায়ন থেকে তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও কম খরচে আয় করা সম্ভব। অন্যদিকে, বাগানভিত্তিক কৃষিবনায়ন দীর্ঘ মেয়াদে বেশি আয় নিশ্চিত করতে পারে।বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণও উদ্বেগজনকভাবে কম। বর্তমানে দেশের মোট আয়তনের মাত্র ১৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ বনভূমি। মাথাপিছু বনভূমির পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ১৫ হেক্টর, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। তাই শুধু বন সংরক্ষণ করলেই হবে না, কৃষিজমি ও মানুষের বসতভিটাসহ অন্যান্য ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গাছের উপস্থিতি বাড়াতে হবে।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও কৃষিবনায়নের গুরুত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশের হালনাগাদ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটি গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কৃষিবনায়ন ও বন খাত কার্বন শোষণ এবং নিঃসরণ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষিবনায়নের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই। এটি শুধু গাছ লাগানোর কর্মসূচি নয়। এর মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের আয়, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে একই ব্যবস্থার মধ্যে আনা সম্ভব। অন্য অনেক পরিবেশগত উদ্যোগ কৃষকের কাছে বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু কৃষিবনায়ন কৃষকের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে পরিবেশের প্রয়োজনকে যুক্ত করে।তবে সম্ভাবনা থাকলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না। কৃষিবনায়নের বিস্তারে এখনো বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। বিশেষ করে চর ও পার্বত্য অঞ্চলে জমি ও গাছের মালিকানা নিয়ে অস্পষ্টতা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করে। কাঠ ও অন্যান্য বনজ পণ্যের বাজারব্যবস্থাও দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত চারা পাওয়া যায় না। নারী কৃষকদের জমি, ঋণ ও প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত। সবচেয়ে বড় কথা, কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমে কৃষিবনায়ন এখনো প্রান্তিক একটি বিষয় হিসেবেই রয়ে গেছে।বাংলাদেশের হাতে অবশ্য নীতিগত কিছু ভিত্তি রয়েছে। জাতীয় বন নীতিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের বৃক্ষ আচ্ছাদন ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। জাতীয় কৃষিনীতি আন্তঃফসল চাষকে উৎসাহিত করেছে। বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-তেও দীর্ঘমেয়াদি ভূমি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনা রয়েছে। তবে এসব নীতি ও উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। কৃষিবনায়নের জন্য ভূমি ও বৃক্ষের মালিকানা, মানসম্মত চারা উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং জলবায়ু অর্থায়নকে একই কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন। এ জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় কৃষিবনায়ন নীতি প্রণয়ন সময়ের দাবি।বাংলাদেশ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে কৃষিজমি কমছে, বনভূমি সংকুচিত হচ্ছে, মানুষের খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও দিন দিন তীব্র হচ্ছে। এই বাস্তবতায় কৃষিবনায়ন হয়তো সব সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। তবে একই সঙ্গে একাধিক সমস্যা মোকাবিলায় এটি একটি কার্যকর পথ হতে পারে। একটি জমিতে যদি একই সঙ্গে খাদ্য, ফল, কাঠ, আয় ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তবে সেই সম্ভাবনাকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি কৃষিবনায়নকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে, নাকি এটিকে দেশের ভবিষ্যৎ ভূমি ও কৃষি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কৌশল হিসেবে গ্রহণ করবে?[লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার, সার্ক কৃষি কেন্দ্র]

কালীপূজা: শক্তির আরাধনা

কালীপূজা সনাতন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। দুর্গাপূজা যেমন দুর্গোৎসব হিসেবে উদ্‌যাপিত হয়, কালীপূজা তেমনভাবে উৎসব নয়। তবে কালীপূজার সঙ্গে উৎসবের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সেটি দীপাবলির উৎসব। বাঙালির কাছে যা দীপান্বিতা নামে পরিচিত। দীপান্বিতা অমাবস্যার গভীর রাতে কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ রাতে হিন্দুদের ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠে অসংখ্য প্রদীপ। আলোর বন্যায় আলোকিত হয়ে ওঠে চারদিক। প্রদীপের শিখা যেন প্রাণের অস্তিত্ব ঘোষণা করে। সেই প্রাণ অন্ধকার থেকে আলোয় যাওয়ার জন্য ব্যাকুল। এ কারণে এ রাত দীপাবলি, দীপাবলী বা দীপান্বিতার রাত হিসেবে পরিচিত।কালীপূজা মূলত শক্তির আরাধনা। এটি তান্ত্রিক ধারার অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। শক্তিসাধক ও তন্ত্রানুসারীরা বিশ্বাস করেন, সৃষ্টির মূলে রয়েছেন আদ্যাশক্তি মহামায়া। নির্গুণ পরমব্রহ্ম যখন সৃষ্টির আনন্দে মেতে ওঠেন, তখন তার মধ্যে গুণের প্রকাশ ঘটে। এই গুণই মহাশক্তি। সৃষ্টির শুরু আছে, শেষও আছে। সৃষ্টির শেষ হচ্ছে ধ্বংস, আর মাঝখানে রয়েছে স্থিতিকাল। মহাশক্তি এই সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের অধিশ্বরী। তিনি মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতী নামেও পূজিতা।আদিকাল থেকেই সনাতন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের আধ্যাত্মিক চেতনার দুটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে বেদ ও তন্ত্র স্বীকৃত। বৈদিক ধারায় যাগযজ্ঞের পাশাপাশি যোগসাধনার বিকাশ ঘটে। এর মূলসূত্র ‘সো-অহং’। অর্থাৎ, স্রষ্টাকে পরম সত্য হিসেবে উপলব্ধি করে ‘আমি কে’—তা জানার চেষ্টাই যোগসাধনা। অন্যদিকে, তন্ত্রসাধনার মূলসূত্র ‘অহং-স’। এখানে ‘আমি’কে উপলব্ধির মধ্য দিয়ে ‘তিনি’ সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভের চেষ্টা করা হয়। বৈদিক ধারার নির্যাস শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা এবং তান্ত্রিক ধারার অন্যতম নির্যাস শ্রীশ্রীচণ্ডী। চণ্ডীতে বিভিন্ন কাহিনির মধ্য দিয়ে আদ্যাশক্তির পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।মহাশক্তিকে কালীরূপে আরাধনার বিষয়ে বিভিন্ন কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। একটি কাহিনি অনুসারে, হিমালয়দুহিতা পার্বতী জন্মসূত্রে কৃষ্ণবর্ণা ছিলেন। শিব একবার তাকে ‘কালী’ বলে বিদ্রূপ করেছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পার্বতী দীর্ঘদিন সাধনা করে গৌরবর্ণ লাভ করেন। পরে তিনি গৌরী নামে পরিচিত হন।শাস্ত্রমতে, দুর্গার দশমহাবিদ্যার মধ্যে কালী অন্যতম প্রধান রূপ। বিবসনা, নৃমুণ্ডমালিনী কালী ভীষণ সৌন্দর্যের প্রতীক। তিনি একদিকে ভক্তকে বর ও অভয় দান করেন, অন্যদিকে অসুর নিধনের মধ্য দিয়ে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করেন। এই মাতৃকাশক্তির আরাধনার মধ্য দিয়ে সাধক নিজেও শক্তিমান হয়ে ওঠেন। তার শুভশক্তি নিয়োজিত হয় জগতের কল্যাণে।সৃষ্টির আদি কারণ হিসেবে মাতৃকাশক্তিকে গ্রহণ করা আধ্যাত্মিক ভাবনার এক অনন্য দিক। মা ও সন্তানের নৈকট্য সৃষ্টির সবচেয়ে নিবিড় বন্ধন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির এই বন্ধনের অনুভূতি মানুষের মনে যথার্থভাবে জাগ্রত হলে অন্যায় পথে পা বাড়ানোর সুযোগ থাকে না।শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব আধ্যাত্মিক সাধনার বিভিন্ন পথের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি মূলত কালীসাধক ছিলেন। বহুবার তিনি নিজেকে ‘ন্যাংটা মায়ের ন্যাংটা ছেলে’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। এই উক্তির মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, তার পাওয়ার কিছু নেই, হারানোরও কিছু নেই।প্রতিবছর দুর্গাপূজার পর আসে কালীপূজা। বিজয়া দশমীর পরবর্তী পূর্ণিমা তিথিতে হয় লক্ষ্মীপূজা। লক্ষ্মীপূর্ণিমার পরের অমাবস্যা কালীপূজার তিথি হিসেবে নির্ধারিত। দুর্গাপূজা মূলত বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেই তুলনায় কালীপূজার প্রচলন অনেক ব্যাপক। অঞ্চলভেদে কালীপূজার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা লোকজ উপাদান।গ্রামবাংলায় কালীপূজার আগে পক্ষকালব্যাপী আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর রীতি রয়েছে। লম্বা বাঁশের মাথায় একটি প্রদীপ বা লণ্ঠন লাগিয়ে উঁচুতে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এ সময় আমাদের দেশে পোকার উপদ্রব বাড়ে। মনে হতে পারে, পোকামাকড় ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর প্রচলন হয়েছে। তবে এর সঙ্গে ধর্মীয় ও লোকজ বিশ্বাসও জড়িয়ে রয়েছে।কালী তান্ত্রিক ধারার প্রধান আরাধ্যা দেবী। সাধক অজ্ঞানের অন্ধকার ভেদ করে জ্ঞানের আলো লাভের জন্য ব্যাকুল থাকেন। অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার প্রতীক হিসেবেই কালীপূজার নির্ধারিত সময় অমাবস্যার গভীর অন্ধকার রাত। একই কারণে কালীর গাত্রবর্ণও কালো। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন—“সকল জ্ঞানের অতীত যে মা তাইতো কালো আমার শ্যামা,জ্ঞানরূপী শিব চরণে তাঁর লুটিয়ে পড়ে রয়,আমার নাই আঁধারের ভয়।”কালীর পদে লুটিয়ে থেকে যিনি জ্ঞানের সন্ধান পেয়েছেন, তার অবস্থান সব ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে।লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ।

পোশাক খাতে অস্থিরতা: প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সমাধান

ঢাকা-গাজীপুর-সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের অসন্তোষ ক্রমশ সহিংস রূপ নিয়েছে। ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি, কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ ও ছাঁটাই বাতিল—এই তিন দফা দাবিতে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করছেন। কোথাও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশ ও বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ইতোমধ্যে সাভারে তিন প্লাটুন এবং গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সরকার ১ নভেম্বর মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ৪ নভেম্বর বোর্ড ডিসেম্বর থেকে নতুন কাঠামো কার্যকর এবং জানুয়ারি থেকে বর্ধিত বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে, কিন্তু কত টাকা বাড়বে, তা এখনো ঘোষণা করেনি। এ কারণে মাঠের উত্তাপ কমেনি। এই শিল্প ৮০ শতাংশ রপ্তানি আয়ের উৎস। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের জীবিকা এর ওপর নির্ভরশীল। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৫২৯টি কারখানার ১০ লাখ শ্রমিকের কাজ ব্যাহত হয়েছে। তাই এই অস্থিরতার দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান জাতীয় স্বার্থেই জরুরি।এই আন্দোলনে বহিরাগত অনুপ্রবেশের প্রমাণ মিলছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া ৪০ জনের কেউই শ্রমিক নন, তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী। আবার মাঠে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদেরও লাঠি হাতে রাস্তায় দেখা গেছে—এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্ন হলো, ক্ষমতাসীন দলের লোকজন লাঠি হাতে নামলে তা যদি পুলিশকে সহায়তা হয়, তবে অন্য দলের ক্ষেত্রে তা অপরাধ কেন হবে? শ্রমিকের ন্যায্য দাবির আড়ালে কোনো রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক পক্ষের লাঠি হাতে রাস্তায় নামার আইনগত ভিত্তি নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব একমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। অতীতে পাকিস্তান আমলের এনএসএফ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারের আমলেই দলীয় লোকজন দিয়ে আন্দোলন দমনের সংস্কৃতি ছিল, যার পরিণতি ভালো হয়নি। মোনায়েম খানের পেটোয়া বাহিনীর সদস্য পাঁচপাত্তু ছুরিকাঘাতে মারা গেছেন, খোকার লাশ পড়ে ছিল তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি—সবাই একই ভুল করেছে। এবারও সেই পথে হাঁটা ঠিক হচ্ছে না। কারণ, এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।এই অস্থিরতার মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিকের মৃত্যু। তার বড় ভাই জানিয়েছেন, সোমবার আন্দোলনে হামলার ঘটনা মুঠোফোনে ভিডিও করার চেষ্টা করায় হামলাকারীরা তার ওপর চড়াও হয়। তাকে বেধড়ক মারধর করে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে আন্দোলনরত শ্রমিকরা তাকে উদ্ধার করে শিন-শিন জাপান হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়। বাবা-হারা এই তরুণ পাঁচ বছর ধরে গাজীপুরে থেকে পরিবারের হাল ধরেছিলেন। একজন শ্রমিক যখন অন্যায়ের প্রমাণ রাখতে গিয়ে প্রাণ হারান, তখন বুঝতে হবে আন্দোলন আর সাধারণ শ্রমিকদের হাতে নেই; এর মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ ঘটেছে।সরকারের দুই উপদেষ্টার দুই রকম বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ বাড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ৩ নভেম্বর সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে বলেছেন, পুলিশের আইনি অধিকারের মধ্যে কাউকে হত্যা করার অধিকার আছে, যদি সে ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। জুলাই আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বর্তমান বিএনপি সরকার কি এ ধরনের আইনের প্রয়োগ মেনে নিয়েছে? মেনে নেয়নি। তাহলে এখন পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের সময় এ কথা কেন আসছে? এই বক্তব্য রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তা ছাড়া, এই বক্তব্য মাঠপর্যায়ের পুলিশকে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগে উৎসাহিত করতে পারে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান ফেসবুকে দাবি করেছেন, শ্রমিক পরিচয়ধারী নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুর্বৃত্তরাই তৌফিকের হত্যাকারী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের অনেকে যখন বলেন, আওয়ামী লীগ মৃত এবং ভারতে কবর হয়েছে, তখন এই ‘দুর্বৃত্তরা’ আসে কোথা থেকে?আন্দোলন হলেই ষড়যন্ত্রের গল্প হাজির করা আমাদের পুরোনো ও সুবিধাজনক অভ্যাস। বলা হয়, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ধ্বংস করে এই ব্যবসা ভারত নিয়ে যেতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমানদের মধ্যে সংঘাত হলেও আমরা বলি, ইহুদি ষড়যন্ত্র। কিন্তু আমাদের জ্ঞানের এত বড় দুর্ভিক্ষ যে ষড়যন্ত্র ধরার ক্ষমতাও নেই, অক্ষমতার লজ্জাও নেই। সত্য হলো, এই ব্যবসা বাংলাদেশ থেকে চলে গেলে শুধু ভারতে যাবে না, চীন, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও পাকিস্তানের কাছেও যাবে। প্রতিযোগীরা কাউকে ছাড় দেয় না। ভিডিওচিত্রের যুগে, যেখানে প্রতিটি হামলার দৃশ্য ধারণ করা হচ্ছে, সেখানে কল্পিত ষড়যন্ত্রের অবতারণা করে সাময়িক নিষ্কৃতি পাওয়া গেলেও সমস্যা ছাইচাপা আগুনের মতো থেকে যাবে এবং পরে আরও বড় হয়ে ফিরে আসবে। তাই আসল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।আমি ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা-জয়দেবপুর যাতায়াতের পথে পোশাকশ্রমিকদের ভোরবেলা ছোট পুঁটলি হাতে কারখানার দিকে ছুটে যেতে দেখেছি। দেখেছি, বৃষ্টিতে ভিজে কাজে যোগ দিয়ে গায়ের কাপড় পাখার বাতাসে শুকাতে। দেখেছি, সন্ধ্যায় ছুটির পর ক্লান্ত শরীরেও হাসি-ঠাট্টা করতে। একবার তাদের আন্দোলনের আক্রোশ থেকে বাঁচতে সহকর্মীদের নিয়ে গ্রামের মেঠোপথে দৌড়াতে হয়েছে। আবার পুলিশের তাড়াও খেয়েছি। তাদের বেতন কম, কিন্তু তারা অল্পতেই তুষ্ট থাকেন। আজ দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও চিকিৎসা ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে ১২ হাজার ৫০০ টাকায় সংসার চালানো যে অসম্ভব, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাদের কষ্টটা বাস্তব।এই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রী জুনায়েদ সাকিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে বিদ্রূপ হচ্ছে, তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ আমলে বিরোধী দলে থাকাকালে তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন, ২৫ হাজার টাকার মজুরির সংগ্রামকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।’ আজ তিনি নিজেই মন্ত্রী, কিন্তু শ্রমিকদের পক্ষে তার একটি কথাও শোনা যাচ্ছে না। রাজনীতি এমনই—বিরোধী দলে থাকলে এক রকম কথা, সরকারে গেলে সুর বদলে যায়। এই দ্বিচারিতাই মানুষের আস্থা নষ্ট করে। সরকার জাতীয় বেতন স্কেলে কর্মচারীদের মূল বেতন গ্রেডভেদে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু মূল্যস্ফীতির চাপ শুধু সরকারি চাকরিজীবীরা নন, পোশাকশ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষই মোকাবিলা করছেন। তাই তাদেরও আয় বৃদ্ধি করা দরকার।ষড়যন্ত্র বা আওয়ামী লীগের ইন্ধন খুঁজে সময় নষ্ট না করে ডিসেম্বরের আশ্বাসকে স্পষ্ট অঙ্কে পরিণত করতে হবে। আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানই দেশের স্বার্থ, শ্রমিকদের স্বার্থ এবং সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা করবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শ্রমিকের মজুরি ও শিল্পের প্রতিযোগিতা: সমাধান কোন পথে?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করে শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কীভাবে বজায় রাখা যায়? অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে শ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। ১ নভেম্বর নতুন মজুরি বোর্ড গঠন, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, কারখানা বন্ধ, সড়ক অবরোধ এবং শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম বৈঠকের পরও শ্রমিকদের অসন্তোষ পুরোপুরি কাটেনি। এই আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন শ্রমিক অসন্তোষ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি শ্রমিকের জীবনযাত্রা, শিল্পের ভবিষ্যৎ এবং দেশের রপ্তানি অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।সংকটের সমাধান শ্রমিকের দাবি উপেক্ষা করা কিংবা মালিকের ব্যয়সংকট অস্বীকার করার মধ্যে নেই। প্রয়োজন এমন একটি ন্যায্য সমঝোতা, যেখানে শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয়, কারখানার আর্থিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায়িত্ব বিবেচনায় নেওয়া হবে। মূল বিষয়টি হলো, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি শিল্পের প্রতিযোগিতার বাধা নয়; বরং কম মজুরির ওপর নির্ভরশীল উৎপাদনব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের স্থিতিশীলতাকেই দুর্বল করে।বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবি এই ব্যবধানের কারণে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে বাসাভাড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম শ্রমিকদের আয়ের বড় অংশ গ্রাস করে। অনেক শ্রমিককে প্রয়োজনীয় খাবার কমিয়ে, চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়ে কিংবা ঋণ করে মাস পার করতে হয়। পরিবারের একাধিক সদস্যের আয় না থাকলে একজন শ্রমিকের পক্ষে এই ব্যয়ে সংসার চালানো আরও কঠিন। মাসিক মজুরি দিয়ে ন্যূনতম জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে না পারলে কর্মক্ষেত্রে অসন্তোষ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই মজুরি বৃদ্ধির দাবি কেবল বেশি অর্থ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়; এটি শ্রমিকের মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।অন্যদিকে, মালিকদের সমস্যাও বাস্তব। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো বড় প্রতিষ্ঠানের মতো আর্থিক সামর্থ্য রাখে না। জ্বালানি ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, ঋণের উচ্চ সুদ, পরিবহন ব্যয় এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদনকে ব্যয়বহুল করেছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকেও সব সময় পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। অনেক ক্রেতা কম দামে পণ্য সরবরাহের জন্য চাপ দেন, অথচ শ্রমিকের অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পরিবেশগত মান বজায় রাখার প্রত্যাশা করেন। এই দ্বৈত অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির পুরো ব্যয় শুধু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দিলে সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। তবে আর্থিক সমস্যার অজুহাতে শ্রমিকের ন্যূনতম অধিকারও খর্ব করা যায় না। কারখানার প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ এবং ব্যয় কমানোর উদ্যোগে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।সাম্প্রতিক আন্দোলনে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কারখানা বন্ধ, উৎপাদন ব্যাহত এবং শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিজিএমইএর হিসাবে, ১ নভেম্বর ৫২৯টি কারখানা বন্ধ ছিল এবং প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি। বিক্ষোভের কারণে সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে; কোথাও ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। শ্রমিকের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সহিংসতা, ভাঙচুর ও জনদুর্ভোগও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বলপ্রয়োগ করে অসন্তোষ দমন করলে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং অবিশ্বাস বাড়বে। শ্রমিকের অভিযোগ শুনতে হবে, সংঘর্ষের ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে এবং আইনসম্মতভাবে দাবি জানানোর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি এবং কোনো ধরনের উসকানি বা সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা আলাদাভাবে বিবেচনা করাও জরুরি।তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানও এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক অসন্তোষ শুধু কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করে না; রপ্তানি আদেশ, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, বিনিয়োগ এবং লাখ লাখ পরিবারের জীবিকাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক শক্তি। উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে নতুন রপ্তানি আদেশ পাওয়া কঠিন হবে এবং দেশের দীর্ঘদিনের বাজার-সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এই বাস্তবতা শ্রমিকের দাবি দমনের যুক্তি হতে পারে না। বরং শিল্পের স্থিতিশীলতার স্বার্থেই শ্রমিকদের অসন্তোষের কারণ দূর করা জরুরি।প্রতিযোগিতার অর্থ শুধু কম মজুরিতে পণ্য উৎপাদন নয়। শ্রমিকের আয় অপর্যাপ্ত হলে পুষ্টি, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ বাধাগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব পড়ে কর্মক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও কর্মক্ষেত্রে স্থিতিশীলতার ওপর। দক্ষ, সুস্থ ও নিরাপদ শ্রমশক্তি ছাড়া উন্নত মানের পণ্য উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য সম্ভব নয়। শ্রমিকের আয় বাড়লে তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নতির পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে চাহিদাও বাড়তে পারে। তাই মজুরি বৃদ্ধিকে শুধু উৎপাদন ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে কম মজুরির সুবিধার বদলে দক্ষতা, পণ্যের মান, দ্রুত সরবরাহ ও উন্নত কর্মপরিবেশের ওপর প্রতিযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে।এ ক্ষেত্রে নতুন মজুরি বোর্ডের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোর্ডকে শ্রমিক ও মালিক—উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, যাতায়াত, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনের প্রকৃত ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা দরকার। শুধু সর্বনিম্ন মজুরির অঙ্ক নয়, বিভিন্ন গ্রেডের মজুরির ব্যবধান, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক এবং অন্যান্য সুবিধাও পর্যালোচনা করতে হবে। শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব যেন কার্যকর হয় এবং তাঁদের মতামত গুরুত্ব পায়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। কয়েক বছর পরপর আন্দোলন ও সংঘর্ষের মাধ্যমে মজুরি নির্ধারণের পরিবর্তে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মজুরি ঘোষণার পর তা বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, সেটিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।শিল্পের প্রতিযোগিতা বাড়াতে উৎপাদন ব্যবস্থার দুর্বলতাও দূর করতে হবে। অনেক কারখানায় পুরোনো যন্ত্রপাতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দক্ষতার ঘাটতি, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার অপচয় ব্যয় বাড়ায়। আধুনিক প্রযুক্তি, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হবে। শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়লে পণ্যের মান ও উৎপাদনের গতি উন্নত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার ও শিল্প সংগঠনগুলো যৌথভাবে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সহায়তা এবং ক্ষুদ্র কারখানার আধুনিকায়নে উদ্যোগ নিতে পারে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের নামে শ্রমিক ছাঁটাই কিংবা তাঁদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। দক্ষতার উন্নতির সঙ্গে আয় ও কর্মপরিবেশের উন্নতিও যুক্ত করতে হবে।আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যেসব ব্র‍্যান্ড শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের কথা বলে, তাদের ক্রয়মূল্য নির্ধারণেও এসব বিষয় প্রতিফলিত হওয়া উচিত। উৎপাদন ব্যয় ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার উপযোগী দাম না দিয়ে শুধু কম মূল্যে পণ্য কেনার প্রতিযোগিতা তৈরি করলে শ্রমিকের অধিকার রক্ষা কঠিন হবে। সরকার, মালিক সংগঠন ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ন্যায্য মূল্য, সময়মতো অর্থ পরিশোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তির বিষয়ে সমঝোতা গড়ে তুলতে হবে। ক্রেতাদের কাছ থেকে শেষ মুহূর্তে অর্ডার পরিবর্তন, অযৌক্তিক মূল্যছাড় কিংবা বিল পরিশোধে বিলম্বের মতো চর্চাও বন্ধ হওয়া দরকার।সরকারের উচিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে স্বল্পসুদে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তা দেওয়া। তবে এই সহায়তার সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি, নিরাপত্তা ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার শর্ত যুক্ত থাকতে হবে। কারখানাভিত্তিক শ্রমিক-মালিক আলোচনা, কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং নিয়মিত শ্রম পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিক সংগঠনগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে দাবি আদায়ের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকে এবং শ্রমিকের প্রকৃত স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। শ্রমিকের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকলে অসন্তোষ বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার আগেই সমাধান করা সম্ভব।বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ শ্রমিক ও মালিকের এক পক্ষের জয় কিংবা অন্য পক্ষের পরাজয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া নয়; এটি উৎপাদনব্যবস্থার অপরিহার্য ভিত্তি। আবার শিল্পের টিকে থাকা, রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানও জাতীয় স্বার্থের অংশ। নতুন মজুরি বোর্ডকে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত দিতে হবে, মালিকদের তা বাস্তবায়নের সদিচ্ছা দেখাতে হবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে কম মজুরির প্রতিযোগিতা থেকে দক্ষতা, মান ও ন্যায্য শ্রমসম্পর্কের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে হবে। শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন ও শিল্পের বিকাশকে একই নীতির অংশ করতে পারলেই বর্তমান সংকট থেকে টেকসই সমাধান বেরিয়ে আসবে।(মতামত লেখকের নিজস্ব)[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।]

ডিগ্রির বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট ও মানবসম্পদের অপচয়

দেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটছে, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানাধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন। কিন্তু তাদের অনেকেই যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। কেউ বেকার থাকছেন, কেউ স্বল্প আয়ের অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন, আবার কেউ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় নিজের কর্মক্ষম সময় হারাচ্ছেন। অর্থাৎ দেশ শিক্ষিত জনশক্তি তৈরি করছে, কিন্তু সেই জনশক্তিকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করতে পারছে না। বিশ্বব্যাংকের ডেমোগ্রাফিক চেইঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্নাতক বা তার বেশি শিক্ষিত মানুষের ৬০ শতাংশের বেশি অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত। দেশের মোট কর্মীর প্রায় ৮৪ শতাংশ, অর্থাৎ ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার মাত্র ২.৭ শতাংশ, যেখানে ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির গড় ৫.৪ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান শুধু বেকারত্বের চিত্র নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার গভীর দুর্বলতার প্রতিফলন।বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটলেও শিক্ষিত মানুষের জন্য মানসম্মত চাকরির বাজার সমানতালে বড় হয়নি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উচ্চ শিক্ষিতদের অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত থাকার তথ্য এই বাস্তবতাই তুলে ধরে। একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি যে অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত থাকা মানেই বেকার থাকা নয়। বরং অনেক শিক্ষিত মানুষ কাজ করছেন, কিন্তু তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। এটি মানবসম্পদের অপচয় বলেই বিবেচ্য। একজন শিক্ষার্থী ১৬ থেকে ১৮ বছর শিক্ষা অর্জনে ব্যয় করেন। পরিবার অর্থ বিনিয়োগ করে, রাষ্ট্র শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যয় করে। অথচ শেষ পর্যন্ত সেই শিক্ষার্থী যদি তার যোগ্যতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে যুক্ত হন, তাহলে ব্যক্তিগত ও জাতীয় উভয় পর্যায়েই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল কমে যায়। সমস্যার পেছনে শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের অসামঞ্জস্য, ব্যবহারিক দক্ষতার ঘাটতি এবং উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি না হওয়া গুরুত্বপূর্ণ কারণ।বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আধিক্য। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ কর্মী এই খাতে নিয়োজিত। তাদের বড় অংশ ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, গৃহকর্ম ও বিভিন্ন সেবামূলক পেশায় কাজ করেন। কিন্তু এসব কাজের ক্ষেত্রে নিয়োগপত্র, নির্ধারিত বেতন, স্বাস্থ্যবিমা, পেনশন এবং চাকরির নিরাপত্তা অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে।  অর্থাৎ বাংলাদেশে কাজের সুযোগ থাকলেও মানসম্মত কাজের সংকট রয়েছে। একজন মানুষ সারাদিন কাজ করেও যদি ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে না পারেন, অসুস্থ হলে চিকিৎসার নিশ্চয়তা না পান কিংবা যেকোনো সময় কাজ হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে সেই কর্মসংস্থানকে টেকসই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলা যায় না।আমাদের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তরুণ জনগোষ্ঠী। কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত বেশি থাকলে একটি দেশ উৎপাদন, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ পায়। অর্থনীতিতে একে জনসংখ্যাগত সুবিধা বলা হয়। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়তে থাকবে। ২০৫১ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আরও উদ্বেগজনক হলো, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে শ্রমের জোগান কর্মসংস্থানের চাহিদার তুলনায় ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি হতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেই অর্থনীতি শক্তিশালী হবে না। তাদের জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কাজ তৈরি করতে হবে। তা না হলে আজকের তরুণ জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার বছরে মাত্র ২.৭ শতাংশ। অথচ ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় ৫.৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরির গতি তুলনামূলকভাবে অর্ধেক। এর পেছনে বিনিয়োগের দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, জ্বালানি সংকট, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং শিল্পের সীমিত বহুমুখীকরণ কাজ করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে কর্মী কমাচ্ছে। ফলে প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করা তরুণদের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বিশ্ব ব্যাংকের আরেকটি অর্থনৈতিক পূর্বাভাসও উদ্বেগজনক। সংস্থাটির অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ উন্নয়ন পর্যালোচনায় ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে দুর্বল বিনিয়োগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের সমস্যাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অতএব, শুধু শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতা বাড়ালেই হবে না; তাদের নিয়োগ করার মতো প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানও তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সংকটের সঙ্গে নারীর সীমিত শ্রমবাজার অংশগ্রহণ গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৩৮ শতাংশ। সামাজিক বাধা, নিরাপদ কর্ম পরিবেশের অভাব, শিশুযত্নের সীমিত ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং পারিবারিক দায়িত্ব নারীদের কর্মজীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। অথচ নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ানো গেলে পরিবারের আয়, জাতীয় উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সবই বাড়তে পারে। এ জন্য নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ, সমান মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, নিরাপদ যাতায়াত এবং কর্মস্থলে শিশুযত্নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।কর্মসংস্থানের জন্য শুধু শিক্ষাগত সনদ যথেষ্ট নয়; সুস্বাস্থ্য, দক্ষতা এবং সামাজিক নিরাপত্তাও প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা উঠে এসেছে। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ২০ শতাংশ সেখানে কর্মরত। শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি। আবার প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশের ভর্তির হার ৩৬ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৬২ শতাংশ। পরিসংখ্যান দেখায়, মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি এখনো সমানভাবে শক্তিশালী হয়নি। সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পেনশন ও অবসরকালীন নিরাপত্তা নেই। ফলে ভবিষ্যতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।এই সংকট সমাধানে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা। শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে ব্যবহারিক শিক্ষা, ইন্টার্নশিপ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তৈরি পোশাকশিল্পের বাইরে ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, পর্যটন এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রযুক্তি এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। কারণ এই খাতের বিকাশ নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। ন্যায্য মজুরি, নিয়োগপত্র, স্বাস্থ্যবিমা এবং পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে অদক্ষ জনশক্তির পরিবর্তে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বব্যাংকও ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন সহজ করা, দক্ষতা উন্নয়ন, নারীর কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে।বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে আমরা কি আমাদের জনশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি? একদিকে শিক্ষিত তরুণেরা যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না, অন্যদিকে দেশের ৮৪ শতাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরির গতি কম, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ সীমিত এবং ভবিষ্যতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে অর্থনৈতিক সাফল্য বিচার করা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মানসম্মত চাকরি, মানুষের আয় ও উৎপাদনশীলতা, এবং শিক্ষিত তরুণেরা তাদের মেধা কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছেন কি না। বাংলাদেশের সামনে এখনো জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ২০৪৫ সালের সময়সীমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই সুযোগ অনন্তকাল থাকবে না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ, আর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ব্যর্থতা হবে সেই মানুষকে কাজে লাগাতে না পারা। তাই উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে শুধু অবকাঠামো নয়, মানবসম্পদ, মানসম্মত কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতাকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ধারিত হয় তার মানুষের কাজের সুযোগ, আয়ের নিরাপত্তা এবং উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ব্যাংকার; সহযোগী অধ্যাপক (খন্ডকালীন), অর্থনীতি বিভাগ, সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়]

সমবায়: উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার অন্যতম হাতিয়ার

‘করব সমবায়, গড়ব দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ৭ নভেম্বর পালিত হচ্ছে ৫৫তম জাতীয় সমবায় দিবস। একটি দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে হলে শুধু সরকারের উদ্যোগ বা ব্যক্তির একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব। সমবায়ের মূল দর্শনই হলো এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা। ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’—এই চেতনা ধারণ করেই গড়ে উঠতে পারে একটি স্বনির্ভর ও বৈষম্যহীন সমাজ।মানুষের সভ্যতার বিকাশে সমবায়ের ভূমিকা বহু পুরোনো। প্রকৃতির প্রতিকূলতা মোকাবিলা ও জীবনধারণের প্রয়োজনে মানুষ একসময় সংঘবদ্ধ হতে শিখেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, একক প্রচেষ্টার চেয়ে সম্মিলিত উদ্যোগে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি। আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সমবায় সেই যৌথ প্রচেষ্টারই একটি পরীক্ষিত রূপ। বিশেষ করে বিত্তহীন ও স্বল্পবিত্ত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়নে সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও সমবায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, দুগ্ধ উৎপাদন, ক্ষুদ্র শিল্প, আবাসন, সঞ্চয় ও ঋণ কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমবায় সমিতি কাজ করছে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পুঁজি সংগ্রহ, উৎপাদন ও পণ্য বিপণনের সুযোগ পাচ্ছেন। কৃষক সম্মিলিতভাবে উৎপাদন ও বিপণন করতে পারলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও সহজ হবে। একইভাবে নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাবলম্বিতা অর্জনেও সমবায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে সমবায় অর্থনীতির সফল দৃষ্টান্ত রয়েছে। জার্মানি, ডেনমার্ক, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন, বিপণন ও পণ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আন্তর্জাতিক সমবায় জোটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ সমবায় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে সমবায় একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলনকে আরও গতিশীল করতে যুবসমাজকে যুক্ত করা জরুরি। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণকে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় পুঁজি সরবরাহ করা গেলে তারা সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারবে। এ জন্য উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্ষুদ্র শিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতে পণ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে দাদন ও উচ্চ সুদের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।তবে সমবায় আন্দোলনের বড় বাধা হলো অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা। অনেক ক্ষেত্রে সমবায়ের নামে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো সদস্যদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে ব্যক্তিগত লাভের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কোথাও সদস্যদের সঞ্চয় আত্মসাৎ করা হচ্ছে, কোথাও আবার কার্যক্রম চলছে নামমাত্র। এসব অনিয়ম বন্ধ করতে সমবায় সমিতির নিবন্ধন, নিরীক্ষা ও তদারকি জোরদার করতে হবে। সদস্যদের অংশগ্রহণ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সমবায়ের প্রকৃত সুফল পেতে হলে এর পরিচালনায় গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ৬৯২টি সমবায় সমিতি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঞ্চয়, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সমবায়কে কেবল আনুষ্ঠানিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন যুগোপযোগী নীতি, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা।দারিদ্র‍্য ও বৈষম্য কমিয়ে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সমবায় হতে পারে কার্যকর হাতিয়ার। এ জন্য রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিপর্যায়ে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সম্মিলিত কল্যাণকে গুরুত্ব দিতে হবে। সমবায়ের চর্চা যত বিস্তৃত হবে, মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক সংহতি তত বাড়বে। [লেখক: শিক্ষক, কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম]

রম্যগদ্য: “কিয়ের লেখা, কিয়ের পড়া, বিদেশ যামু লাইনে খাড়া”

হেঁঃ হেঁঃ হাগলনি কোনো, লেহাপড়া ছাড়া বিদেশ গেলে তো, পানি চায়াও খাবা পারবেন না?তুই বললেতো চলবে না! তুই দেখিসনি তোদের সব জেন-জির ছাত্ররা, ধরে ধরে সব শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করালো!হ, দেখছিতো। মাস্টার মানুষ মাস্টারি করবেন, পোলাপানরে মানুষ করবেন, আপনে ক্যান সরকারের পা-চাঁটবেন!ওম্মা কচি খোকা, সরকারের কথা না শুনলে এমপিওভুক্ত হবে না, পেনশন পাবে না, নিয়মিত বেতন পাবে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ পাবে না।শিক্ষকরা যদি বেতনই না পায় তাহলে তোর কথা মতো পোলাপানরে মানুষ করবে কীভাবে?এইসব ফালতু কথা কোয়েন না, পোলাপানরে মানুষ করবে কীভাবে! আপনেরা মিয়া শিক্ষক, আপনেরা ব্যাবাগতে এক লগে, এক হয়া যুদি কন, আমাগো পরবর্তী প্রজন্ম হ্যারাই ভবিষ্যতে আমাগো দেশ চালাইবো, হ্যাগোরে যুদি মানুষ না বানাই তায়লে জন্তু জানোয়ার দিয়া কি দেশ চলবো? কন কন, জন্তু জানোয়ার দিয়া কি দেশ চলবো?বাহ্! তোর কথায় যুক্তি আছে, বুঝলাম। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ওরাই ভবিষ্যতে আমাদের দেশ চালাবে। কিন্তু তোমার শিক্ষদের মাঝেইতো লাল, নীল,সবুজ, হলুদ, ভায়োলেট,অরেঞ্জ কত রকমের রঙের বাহার। তাহলে সব শিক্ষক এক হয়ে একত্রে কাজ করবে কীভাবে!ক্যান মিয়া ভাই রংধনু দ্যাখেন নাই! রংধনুর মইধ্যে সাতটা রং কিন্তু ব্যেবাগতে মিল্লা একটাই রংধনু তো, আপনেগো যত রঙই থাকুক নীতির প্রশ্নে আপোস না করলেইতো আপনেরা পরবর্তী প্রজন্মরে মানুষ করতে পারতেন।বাহ্ আমদের নিজ্স্ব রাজনৈতিক চিন্তাধারা থাকতে পারে না?আপনেরা মিয়া জিন্দেগীতে আর মানুষ হোইবে না! খেলার মইধ্যে রাজনীতি, পড়ার মইধ্যে রাজনীতি, বাথরুমের মইধ্যে রাজনীতি, বাজারের মইধ্যে রাজনীতি, ছেরিগো হলে রাজনীতি, ছ্যারাগো চান্দির মইধ্যে রাজনীতি, এই রাজনীতি করতে করতে বাঙালি জাতিটারে ছ্যারাভ্যারা কোইরালচ্চেন...বুঝলাম বুঝলাম সব ব্যাক্তিস্বার্থে রাজনীতিকে ব্যাবহার করে জাতিটার অবস্থা এমন করেছিস যে এখন কেউ আর তার নিজ মাতৃভূমিতে বসবাস করতে চায় না। সব বিদেশে পালাতে চায়।তো, আগে না আমাগো স্কুলের বাইল্য শিক্ষায় কোইতেন “জননীর জন্মভূমিশ্চঃ স্বর্গাদপী গরিয়সীঃ” মাত্তিভূমি বলে স্বর্গের চায়াও গরিমায় বড়, তো অহন পাবলিকে নিজ মাত্তিভূমি ছাইড়া ভাগবার চায় ক্যালা?“মাত্তিভূমি ছাইড়া ভাগবার চায়...কারণ তোমরা দেশ স্বাধীন করার পর এমন ভাবে দেশ পরিচালনা করছো যে পাবলিক বাপ বাপ বলে মাতৃভূমি ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে।হুনেন আপনেরাই শিক্ষিতরা বৃটিশ আমলে কোইতেন,“স্বদেশের কুকুর পুজা করো বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।” আর বর্তমানে আপনেগো দেশ পরিচালনার বাহার দেইখ্যা বাংলার ঠাকুররা বিদেশে যায়া সাবেগো কুকুর পাইল্লা জীবন চালাইতেছে।দ্যেখ পৃথিবীতে কেউ তার মাতৃভূমি ছেড়ে কোথাও থেকে শান্তি পায় না। ওই যে সারমেয়রা পর্যন্ত তুই বাড়ি থেকে যত দূরেই ছেড়ে দিয়ে আসিস ওরা ঠিকই আবার নিজ বাড়িতে ফিরে আসে। নাড়ীর টান তুই বুঝবি না।হ হ বুঝুম না ক্যালা, ভারত পাকিস্তান ভাগ হওনের সময় কত্ত লুকের কান্দন, তাগো চুক্ষের পানি শুকাইতে না শুকাইতে আপনেরা আবার ইস্ট-পাকিস্তান ওয়েস্ট-পাকিস্তান ভাগ হয়া গেলেন! আবার কত্ত পাবলিকের কান্দন, তাগো চুক্ষের পানি শুকাইতে না শুকাইতে আপনেরা আবার দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দল বানায়া আবার মাইরপিট, মারামারি, ফাটাফাটি লাগায়া রাখছেন! কী করবি বল, তোরা কিছু ব্যাক্তি কেবল মাত্র নিজেদের জাগতিক সুখের জন্য, টাকা টাকা করে পুরো বাঙালি জাতিটার বারটা বাজাচ্ছিস।এই যে কন ট্যাকা ট্যাকা, অহন তো দেখলেন, ট্যাকা ট্যাকা কোইরা যা করলেন, পাবলিকে আপনেগো ঘরের চৌকাঠভি খুইল্লা লয়া গেছে, ট্যাকা কি কব্বরে লোইবেন!এখন ওই টাকায় ওদের বিদেশে আরামে রাখছে আর নিজের দেশের আম পাবলিকের জীবন ত্রাহি মধূসুদন ত্রাহি মধূসুদন করছে।ভাইনা ভালা, আপনেরা এবার নতুন প্রজন্ম জেন-জি’রে কন ভাই তুরা যেন ট্যাকার কাছে নিজেরে না বেইচ্চা দেশটারে একটু মানুষের মতো মানুষ কর। আমি কি বলবো বল, কে যেন লিখেছিলো,“ টাকা কড়ির টানটা প্রবল/ গতিটা তার রকেট/ ভুলেই বসেন সব মহাজন/ কাফনের নাই পকেট।”বুঝলেন চুরে শুনে না ধর্মের কাহিনি, এইসব ছড়া মড়া দিয়া কাম হোইবো না। আপনেরা যুদি আইণ কড়া করার না পারেন, ব্যাংক লুটেরাগো ধইরা বাইন্দা না পিটান, তায়লে কুনো দিনও বাঙালি আর তার মাত্তিভূমিতে থাকতে চাইবো না! আমাগো পোলাপান ব্যেবাকতে আবার বৃটিশ আমলের মতুন বিদেশিগো চাকর হয়া জীবন পার করবো। এই ভারত বর্ষের স্বাধীনতা, স্বাধীন ভারত, স্বাধীন পাকিস্তান, স্বাধীন বাংলাদেশ ব্যেবাগ স্বাধীন পাবলিক আবার বিদেশি গো পাচাঁটবো। কোন কবি না কোইছিলো, “এই জীবন চেয়েছিলে বুঝি...!!কবির কথায় যখন তুললি, তাহলে কবি কিশোর সুকান্তের কবিতা শোন“ছাড়পত্র”...কন হুনি কবি কিশোর সুকান্তের“ছাড়পত্ত”...খালি কথার মাঝে কথা!ঠিক আছে ঠিক আছে কন হুনি, “ছাড়পত্ত”“ছাড়পত্র” কবি কিশোর সুকান্তের কবিতা“ছাড়পত্র” ...এসেছে নতুন শিশু/ তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান/ চলে যাবো/ তবু যতক্ষণ/ দেহে আছে প্রাণ/ প্রণপনে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল/ এ’বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার...ভাইডি বিশ্ব লাগবো না, আপনে খালি বাংলাদেশকে এই শিশুর বাসযোগ্য কোইরা দ্যান তায়লে কেউ আর বিদেশ যায়া মরবো না...ঠিক আছে,বাংলাদেশকে এই শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি, এই হোক আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার...   [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

ভিডিও আরও দেখুন

ভারত সফরের পুরো পারিশ্রমিক বুঝে পায়নি ব্রাজিল ও উরুগুয়ে

​গত বছরের অক্টোবর মাসে ভারত সফরে গিয়ে প্রীতি ম্যাচ খেলে আসা পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবং দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে এখনও তাদের প্রতিশ্রুত পুরো ম্যাচ ফি বা পারিশ্রমিক হাতে পায়নি।ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই আলোচিত ম্যাচগুলোর পারিশ্রমিক পরিশোধে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)।​গত বছরের ৩ ও ৬ অক্টোবর ঘরের মাঠে ব্রাজিল ও উরুগুয়ের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল ভারতীয় ফুটবল দল। ম্যাচগুলোতে দুই ম্যাচের একটিতেও জয়লাভ করতে পারেনি স্বাগতিকরা; ব্রাজিলের বিপক্ষে ৩-০ এবং উরুগুয়ের বিপক্ষে ৬-১ ব্যবধানে বড় ব্যবধানে হেরেছিল তারা।এছাড়া পানামার বিপক্ষে অপর ম্যাচটি ১-১ ড্রয়ে শেষ হয়েছিল। দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী দুই দলের বিপক্ষে কলকাতার মাঠে এই ম্যাচগুলোকে ঘিরে দেশটির ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে উন্মাদনার কমতি ছিল না। তবে পানামা তাদের পুরো ম্যাচ ফি ঠিকঠাক বুঝে পেলেও ব্রাজিল ও উরুগুয়ে এখনও তাদের পাওনা অর্থের মাত্র অর্ধেক পেয়েছে বলে জানা গেছে।​টাইমস অব ইন্ডিয়ার সাংবাদিক মার্কাস মারগুলহাওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বকেয়া অর্থ পরিশোধের উপায় হিসেবে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই ২০ কোটি রুপির একটি নির্দিষ্ট মেয়াদি আমানত বা এফডিআর ভাঙানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন এআইএফএফ সভাপতি কল্যাণ চৌবে। তবে ফেডারেশনের সাধারণ পরিষদের সদস্যদের তীব্র বিরোধিতার মুখে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।প্রতিবাদী সদস্যরা সাফ জানিয়ে দেন, এই সংরক্ষিত তহবিল কেবল জরুরি সংকটের জন্যই ব্যবহার করা যাবে। এমনকি এআইএফএফের সহসভাপতি এনএ হারিসও সভায় পুনরায় মনে করিয়ে দেন যে, এর আগে নির্বাহী কমিটি পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে এফডিআর থেকে কোনোভাবেই অর্থ তোলা যাবে না। বর্তমানে ব্রাজিলের প্রায় ১৯ কোটি রুপি এবং উরুগুয়ের প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ রুপি বকেয়া পরিশোধের জন্য ভারতীয় ফুটবল কর্তৃপক্ষ সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে বলে জানা গেছে।​মূলত প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম টিকিট বিক্রি হওয়ায় ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ আর্থিক অবস্থা আরও বেশি জটিল আকার ধারণ করেছে। ম্যাচের টিকিট বিক্রি থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কোটি রুপি আয়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল এআইএফএফ। কিন্তু টিকিটের অতিরিক্ত দামের কারণে সাধারণ দর্শকদের মধ্যে মারাত্মক অনীহা তৈরি হয়।পরবর্তী সময়ে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী তিন ক্লাব: মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট, ইস্টবেঙ্গল ও মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের সমর্থকদের জন্য বিশেষ ছাড়ে টিকিট বিক্রি করা হয় এবং ব্রাজিলের ম্যাচের ক্ষেত্রে ‘একটি কিনলে একটি বিনামূল্যে’ শীর্ষক বিশেষ অফারও চালু করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। শুধু তা-ই নয়, টিকিট বিক্রির অংশীদারের কাছ থেকে অগ্রিম বাবদ নেওয়া ২৫ কোটি রুপির একটি অংশও এখন এআইএফএফকে ফেরত দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।​রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ফুটবলার ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, আর্সেনালের ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস, পিএসজির অধিনায়ক মারকিনিয়োস ও চেলসির উদীয়মান সেনসেশন এস্তেভাওয়ের মতো বিশ্বসেরা ও তারকাসমৃদ্ধ স্কোয়াড নিয়ে ভারত সফর করেও পুরো পারিশ্রমিক না পাওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন দারুণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ভারত সফরের পুরো পারিশ্রমিক বুঝে পায়নি ব্রাজিল ও উরুগুয়ে