সংবাদ
মজুত ফুরিয়ে আসছে, গ্যাস সংকটে এলএনজিতে ঝুঁকছে সরকার

মজুত ফুরিয়ে আসছে, গ্যাস সংকটে এলএনজিতে ঝুঁকছে সরকার

সাগরে ও স্থলে কয়েকটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাপরিত্যাক্ত টেংরাটিলা থেকে আবার গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগভোলার গ্যাস দিয়ে সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কারখানানতুন ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনাসাগরের ২৬ ব্লকে অনুসন্ধানে বিডিংদেশে প্রতিনিয়ত গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। তবে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে; মজুতও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। স্থলে ও সাগরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কার এবং সেখান থেকে সরবরাহ বাড়ানোর মতো পরিস্থিতি আপাতত নেই। তাই সামনের বছরগুলোতে বিদ্যুৎ ও শিল্পখাতে গ্যাসের চাহিদা সামাল দিতে সরকার বেশ কয়েকটি ভাসমান ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে।পাশপাশি ১৫০টি নতুন কূপ খনন, সাগরের ২৬ ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিডিং রাউন্ড আহ্বান এবং ভোলার গ্যাসের ‘সর্বোত্তম’ ব্যবহারের বিষয়েও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এদিকে দীর্ঘদিন পরিত্যাক্ত অবস্থায় থাকা সুনামগঞ্জের ছাতকে অবস্থিত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে নতুন করে জরিপ ও কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন এন্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব সম্প্রতি এ বিষয়ে সংবাদকে বলেন, “টেংরাটিলায় দুটি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”পেট্রোবাংলার আওতাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এন্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) এই গ্যাসক্ষেত্রে পুনরায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ইতিমধ্যে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছে বলে জানান তিনি।প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, “ডিপিপির আওতায় এখানে প্রাথমিকভাবে ২টি অনুসন্ধান ও মূল্যায়ন কূপ খনন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার সংবাদকে বলেন, “টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি ছাতক পূর্ব ও ছাতক পশ্চিম নামে দুটি অংশে বিভক্ত। নাইকোর সময় বিস্ফোরণে ছাতক পশ্চিম অংশের একটি স্তরের গ্যাস পুড়ে গেছে। অন্যান্য স্তর এবং ছাতক পূর্ব অংশের গ্যাসের মজুত অক্ষত আছে বলে আমরা মনে করছে। পেট্রোবাংলার বিবেচনায়, এই গ্যাসক্ষেত্রে সম্ভাব্য মজুত ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।চাহিদার বিপরীতে ঘাটতিদেশে গ্যাস সংকট দীর্ঘদিনের। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দিয়ে চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ মেটানো সম্ভব হচ্ছে। এক-তৃতীয়াংশ ঘাটতির কারণে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশপাশি শিল্পোৎপাদনেও ভাটা পড়েছে।পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ি, দেশে দৈনিক মোট গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দৈনিক গড়ে সরবরাহ করা হয় ২৬০ কোটি ঘনফুটের মত। এরমধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে আসে দৈনিক ১৫৫ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুটের মতো।কক্সবাজারের মহেশখালিতে স্থাপিত মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট ও বেসরকারি কোম্পানি সামিটের পৃথক দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে আসে দৈনিক মোট ৯৫ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট। দৈনিক ঘাটতি থাকে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটের মতো।সম্প্রতি একটি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড এবং যথাসময়ে এলএনজি কার্গো না আসার কারণে বেশ কিছুদিন ঘাটতি আরো বেড়ে যায়। এতে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশপাশি শিল্পোৎপাদনে ধ্বস নামে। গ্যাসের অভাবে অনেক সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং অনেক এলাকায় আবাসিকে রান্নার চুলা বন্ধ হয়ে যায়।নতুন এলএনজি টার্মিনালপ্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ি, দেশে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ২০৩৫ সালের মধ্যে পাঁচটি নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মধ্যে তিনটি হবে ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) এবং দুটি হবে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল।পরিকল্পিত তিনটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনালের (এফএসআরইউ) মধ্যে একটি কক্সবাজারের মহেশখালীর গভীর সমুদ্রের কুতুবজোম এলাকায় স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিএনইই) প্রস্তাব জিটুজি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ে গত ২৮ জুলাই নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।জ্বালানি ও খনিজ বিভাগ বলছে, চীনের নির্মীয়মাণ এই এফএসআরইউটি ২০২৮ সালের মাঝামাঝি গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারে। এতে দেশের রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)  বা ৬০ কোটি ঘনফুট বাড়বে। বড় আকারের এই এফএসআরইউতে বড় জাহাজ থেকেও এলএনজি গ্রহণ করা যাবে। এতে এলএনজি আমদানির খরচ কমতে পারে। একই আকারের আরেকটি এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ছাড়া জরুরি ভিত্তিতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অথবা পায়রা কিংবা মোংলা বন্দরের কাছে আরো একটি এফএসআরইউ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।জানা গেছে, দুটি স্থলভিত্তিক টার্মিনালের মধ্যে একটি কক্সবাজারের নির্মীয়মাণ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছে স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর সক্ষমতা হবে বছরে ৭.৫ মিলিয়ন টন (এমটিপিএ)। পেট্রোবাংলা দেশের প্রথম স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করতে কাজ করা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে মাতারবাড়ীতেই একই সক্ষমতার আরো একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে।সংসদে প্রধানমন্ত্রীশিল্পে গ্যাস-সংকট ঠেকাতে সরকার নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনসহ ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ৯ সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংসদ নেতা বলেছেন, আকস্মিক বা সাময়িক গ্যাস-সংকটের কারণে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে সরকার।সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ি, দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে কমবেশি দৈনিক গড়ে ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে আকস্মিক গ্যাস-সংকটে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।সরকারপ্রধান সংসদে আশা প্রকাশ করেছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।প্রধানমন্ত্রী সংসদে আরো জানান, এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের সুবিধাজনক কোনো স্থানে জরুরি ভিত্তিতে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আকস্মিক গ্যাস-সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত সরবরাহসক্ষমতা তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার।সাগরে অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাসসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের পাশপাশি ভোলার গ্যাস কীভাবে ব্যবহার করা হবে সেসব কথাও সেদিন প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন। তারেক রহমান বলেন, সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বিড দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রমও গ্রহণ করা হয়েছে।ভোলার গ্যাসের ব্যবহার প্রসঙ্গে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের মূল গ্যাস নেটওয়ার্কে নিয়ে আসতে চাইলে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছর সময় লাগবে। তাই ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করে শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। ইতিমধ্যে সেখানে গ্যাসনির্ভর কিছু শিল্প স্থাপনের চেষ্টা চলছে। এর ফলে ভোলা অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতির আকারও বাড়বে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের মানুষের স্বার্থে ভোলার গ্যাস যথাযথভাবে ব্যবহারের জন্য সেখানে একটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও করছে সরকার।ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে এনে আগ্রহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের বিষয়েও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্যাসপ্রাপ্তি সাপেক্ষে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।সরকারের এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা মোকাবিলা এবং শিল্প ও রপ্তানি খাতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান, উৎপাদন ও অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।উৎপাদন হ্রাসহাইড্রোকার্বন ইউনিটের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই বছরে দেশে গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ৬৯৬ দশমিক ১০ বিলিয়ন ঘনফুট। দৈনিক গড় উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৯০৭ দশমিক ১২ মিলিয়ন বা প্রায় ১৯০ কোটি  ঘনফুট। আগের অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৭৪৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট এবং দৈনিক গড় ২ হাজার ৪৮ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন বা প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ এক বছরে দৈনিক গড় উৎপাদন কমেছে ১৪১ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ঘনফুট।নতুন ১৫০ কূপসরকারের তথ্য অনুযায়ি, ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে ২৯টির কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ২৭ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে বলে সাম্প্রতি সংসদে জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে এতে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে বাড়তি প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস। সরকারে প্রত্যাশা, কর্মসূচির বাকি অংশ বাস্তবায়িত হলে দেশীয় উৎপাদন বাড়বে। তবে যে হারে উৎপাদন কমছে, নতুন কূপ থেকে বাড়তি উৎপাদন সে ঘাটতি পোষাতে পারবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন করেছে।ভবিষ্যৎ ঘাটতি মোকাবিলায় এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পথেই হাঁটছে সরকার। তবে এ পথেও ঝুঁকি রয়েছে। ২০২৫ সালে ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে প্রায় ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যা আগের বছরের ৮৬টি কার্গোর জন্য ব্যয় করা ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ৮৫৫ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার বেশি।গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান (মধ্যপ্রাচ্য) যুদ্ধ শুরুর পর কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কার্গো না আসায় মার্চ থেকে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে ৩৫ কার্গো এলএনজি কিনতে হয়েছে। মার্চে কেনা দুটি কার্গোর দাম ছিল প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ২৮ দশমিক ২৮ ডলার ও ২৩ দশমিক ০৮ ডলার। জানুয়ারিতে একই বাজারে এলএনজির দাম ছিল প্রায় ১০ ডলার।মজুত গ্যাসে চলবে কতদিন?বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গত ১৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে জানান, বর্তমানে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত অবশিষ্ট মজুত গ্যাসের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে এবং বর্তমানে কম-বেশি দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ করা হলে ওই অবশিষ্ট ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আনুমানিক ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব হবে।প্রকৃতপক্ষে ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট বা ৭৬৩০০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের মজুদ দেশের দৈনিক মোট চাহিদার কতদিন পূরণে সক্ষম তার হিসাব একেক রকম।পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ি, দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট ধরে যদি পুরোটাই দেশীয় ক্ষেত্রগুলো থেকে সরবরাহ করা সম্ভব হয় এবং নতুন কোন কূপ বা গ্যাসক্ষেত্র যদি যুক্ত না হয়, তাহলে মজুত গ্যাসে চলবে আর সাড়ে পাঁচ বছর।যদি এলএনজিসহ বর্তমান সরবরাহ সক্ষমতা দৈনিক ২৬০ কোটি ঘনফুট ধরে হিসেব করা হয়, তাহলে মজুত গ্যাসে চলবে আর আট বছর।আর যদি শুধু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর বতর্মান সরবরাহ সক্ষমতা দৈনিক ১৬০ কোটি ঘনফুট ধরে হিসেব করা হয়, তাহলে মজুত গ্যাসে চলবে আরো ১৩ বছর।তবে শিল্প ও বিদ্যুতে গ্যাসের চাহিদা যেহেতু প্রতিদিনই বাড়ছে, তাই বছর ভিত্তিক চাহিদা নিরূপণ করা হলে, মজুত গ্যাস আরো দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। আবার উত্তোলনযোগ্য মজুত শেষের দিকে এসে পুরোপুরি উত্তোলন করা যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
৫ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

বিশ্বমঞ্চে ভাষণ: রাজনীতি, অর্থনীতি ও বাস্তবতা

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকেই সবচেয়ে আলোচিত খবরটি এল মঞ্চের বাইরে থেকে। নিউইয়র্কের গ্র‍্যান্ড হায়াত হোটেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সম্পূরক চুক্তি করল। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখলেন, বাংলাদেশ ও তুরস্ক মিলে ১১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা বোয়িংয়ের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক দিন’। এই বোয়িং কেনার ঘটনাই বলে দেয়, জাতিসংঘে ভাষণের চেয়ে করিডরে বাণিজ্যিক দর-কষাকষি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। তবে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়ে ভাষাটিকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ, লুটপাট ও অর্থ পাচারে দেশ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে এবং ২০২৪ সালে দেশ মুক্ত হয়েছে। দেশ মেরামতে তার সরকার তিন ‘আর’ কৌশল নিয়েছে—রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন। তার বাবা জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং মা খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে একই মঞ্চে ভাষণ দিয়েছিলেন। তাই এটি তার পরিবারের তৃতীয় ভাষণ। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন, যা প্রাসঙ্গিক। বক্তব্যের আবেগ ও প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে।আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার নিয়ে ভাষণে উত্থাপিত অভিযোগ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানেরা কতটা গুরুত্ব দিয়ে শুনেছেন, তা জানা যায়নি। ফখরুদ্দীন সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও কথিত আয়নাঘরে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন। তাই আয়নাঘরের সংস্কৃতি যে বহু পুরোনো, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি থানাই যেন একেকটি আয়নাঘর। রিমান্ডের নামে নির্যাতন করে কথা আদায়ের যে প্রক্রিয়া চলে, তা নিয়ে উচ্চ আদালতও একাধিকবার অভিমত প্রকাশ করেছেন এবং সরকারকে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন—স্বচ্ছ কাচে ঘেরা কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চিকিৎসক ও আইনজীবীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা। কিন্তু কোনো সরকারই এসব পরামর্শ বাস্তবায়ন করেনি। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান যদি রাজনৈতিক কারণে গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা চিরতরে বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা নেন এবং হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করেন, তাহলে তা হবে ঐতিহাসিক। জনগণ সেটাই প্রত্যাশা করে।প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ক্ষতবিক্ষত হওয়ার বক্তব্যটি তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে মেলে না। বিএনপি সরকারের সর্বশেষ ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাজেট ছিল মাত্র ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮-০৯ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিএনপি সরকারই সেই বাজেট করেছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। দেশের অর্থনীতি ক্ষতবিক্ষত হলে ১ লাখ কোটি টাকার বাজেট ১৭ বছর পর ৯ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাল কীভাবে? এই শক্ত ভিত কি  ইউনূসের ১৮ মাস এবং বিএনপির সাত মাসে তৈরি হয়েছে? হয়নি। বিএনপির ২০০৬-০৭ অর্থবছরে জিডিপি ছিল ৭০ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের শেষ প্রান্তে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। মাথাপিছু আয় ৬১০ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৩৮ ডলারে। বাংলাদেশের এই অগ্রগতিকে জাতিসংঘ, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম উন্নয়নের মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই উন্নয়ন হয়নি, শুধু অর্থনীতি ক্ষতবিক্ষত হয়েছে—এমন বক্তব্য বাস্তবসম্মত নয়। এমনকি  ইউনূসের সরকারের শ্বেতপত্রেও স্বীকার করা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত সব মানদণ্ড পূরণ করেছে।ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিষয়ও প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের প্রশ্নে সরকারের দ্বিচারিতা পরিহার করা জরুরি। বাংলাদেশে দুর্নীতি না কমার একটি কারণ হলো, দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে কোনো সরকারই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেনি। বিএনপির আমলেই দেশ টানা পাঁচবার দুর্নীতিতে শীর্ষে ছিল, যা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন,  ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিচারের পাশাপাশি  ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপির আমলের দুর্নীতিরও বিচার হওয়া জরুরি। এমন নিরপেক্ষ ও নির্মোহ পদক্ষেপ নেওয়া হলে ভবিষ্যতে কেউ দুর্নীতি ও অর্থ পাচার করতে দ্বিতীয়বার ভাববে। তাছাড়া জনগণ দল ও দলের প্রতীকে ভোট দেয়, আর রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতিবাজদের মনোনয়ন দেয়। এ কারণেও দুর্নীতি কমে না, বরং বাড়ে।জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কম ভাষণ দেওয়া হয়নি। কিন্তু এসব ভাষণে বাংলাদেশের দৃশ্যমান কোনো উপকার হয়েছে বলে মনে হয় না। অধিবেশনের অধিকাংশ আসনই ফাঁকা থাকে। গতানুগতিক বক্তব্য শোনার চেয়ে অধিবেশনের ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের গুরুত্ব অনেক বেশি। সাধারণ পরিষদে গৃহীত সব সিদ্ধান্ত সদস্যদেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলকও নয়। তাই অনেক সমালোচক এই অধিবেশনকে জাতিসংঘ নামের বিনোদন ক্লাবে সরকারপ্রধানদের বনভোজন কিংবা বিশ্বনেতাদের বার্ষিক মহামিলন ও কূটনৈতিক মহোৎসব হিসেবে অভিহিত করেন। এবারও সেই বাস্তবতা দেখা গেছে।পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ৫ সেপ্টেম্বর সিলেটে বলেছিলেন, জাতিসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। পরে ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে তিনিই জানান, এবার আলাদা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগ নেই। দুই হাত দূরে থেকেও ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক না হওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। তবে বৈঠক একেবারেই হয়নি, তা নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী কুয়েতের যুবরাজ, ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘের মহাসচিব এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিরাট বহর সঙ্গে না নেওয়ার জন্য তাকে প্রশংসা করতে হয়। তারপরও এতজনকে সঙ্গে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল কি না, সে প্রশ্ন থেকে যায়।শেষ বিচারে ভাষণটি ছিল রাজনৈতিক ঘোষণা, অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র নয়। ফ্যাসিবাদের আখ্যান এক অংশকে উদ্বুদ্ধ করবে, কিন্তু অর্থনীতির অগ্রগতির ভিত অস্বীকার করলে বিনিয়োগকারীদের কাছে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে। তাই প্রতিহিংসা নয়, ভারসাম্য দরকার। সব আমলের গুম-খুন ও দুর্নীতির বিচার হোক, আয়নাঘর ও রিমান্ডে নির্যাতন বন্ধ হোক, অর্থ পাচার কমুক, দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করুক। তা না হলে ভাষণ কাগজেই থেকে যাবে, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটবে না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

কৃষকের লাভ নিশ্চিত করতে বদলাতে হবে বিপণনব্যবস্থা

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে যখন আমরা কথা বলি, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেশার মানুষ হিসেবে কৃষক ও প্রান্তিক খামারিদের কথা সবার আগে বলা উচিত। খাদ্য উৎপাদনের মূল কারিগর সেই কৃষক ও খামারিরাই আজ নানা কারণে কৃষিপেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। পেশা ছেড়ে তারা চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। কেন তারা দীর্ঘদিনের পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন, নাকি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন—এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। তাদের জমি আছে, শ্রম আছে, প্রযুক্তি আছে, উৎপাদনের সক্ষমতাও আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উৎপাদন করে কৃষক শেষ পর্যন্ত কতটা লাভ করছেন? এই প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক না হলে শুধু কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।আমাদের দেশের কৃষির বড় সংকট উৎপাদনে নয়, বরং কৃষি উৎপাদনের সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। একজন কৃষক যখন ধান, সবজি, ফল, মাছ, দুধ, ডিম, মাংস কিংবা অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন করেন, তখন তাকে বীজ, সার, সেচ, বিদ্যুৎ, শ্রম, ওষুধ, গবাদিপশুর খাদ্য, জমির ভাড়া, যন্ত্রপাতি ও পরিবহনে অর্থ ব্যয় করতে হয়। অথচ উৎপাদন শেষে বাজারে তার পণ্যের মূল্য নির্ধারণে নিয়ন্ত্রণ থাকে খুবই সীমিত। বিশেষ করে পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে কৃষককে দ্রুত বিক্রি করতে হয়। তাদের কাছে পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা নেই। অনেক সময় মহাজনি ঋণ বা ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি পরিশোধের তাড়া কিংবা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন মেটাতে নগদ অর্থের দরকার হয়। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র কৃষক ও খামারিরা একই সময়ে নতুন ফলন বাজারে নিয়ে আসেন। ফলে সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচের কাছাকাছি, কখনো তারও কম দামে পণ্য বিক্রি করতে তারা বাধ্য হন।যুগ যুগ ধরে এখানেই বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির বড় বৈপরীত্য। কৃষক কম দামে পণ্য বিক্রি করছেন, অথচ একই পণ্য শহরের ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অবশ্যই পুরো ব্যবধানকে মধ্যস্বত্বভোগী বা মৌসুমি ফড়িয়ার মুনাফা হিসেবে দেখলে বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। পরিবহন, বাছাই, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, টোলের খরচ, পথে পথে অনৈতিক চাঁদা আদায় এবং খুচরা বিক্রিরও ব্যয় রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের এই মূল্যশৃঙ্খল কতটা দক্ষ, স্বচ্ছ এবং কৃষক ও ভোক্তা—উভয়ের জন্য ন্যায্য? এখানেই দেশের কৃষি উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থার সংস্কারের বড় সুযোগ রয়েছে।সাম্প্রতিক সময়ে কৃষকের কৃষিপেশা ত্যাগের প্রবণতার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং তাদের কৃষিতে ফেরানোর বিষয়টি নতুনভাবে ভাবতে হচ্ছে। কৃষিকে শুধু একটি পেশা হিসেবে নয়, লাভজনক ব্যবসা ও বিনিয়োগের খাত হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ জাতীয় উন্নয়ননীতিতে অগ্রাধিকার পাওয়া জরুরি। একজন কৃষক যেন উৎপাদনের আগেই জানতে পারেন—কী ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদন করবেন, কতটা উৎপাদন করবেন, বাজারে তার সম্ভাব্য চাহিদা কত এবং সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য কত হতে পারে। অর্থাৎ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষক, খামারি ও উৎপাদনকারীদের ‘আগে উৎপাদন, পরে বাজার খোঁজা’ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পিত উৎপাদনব্যবস্থায় যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংগঠিত কৃষক ও উৎপাদক গোষ্ঠী, সমবায় এবং চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একক কৃষকের পক্ষে বড় ক্রেতার সঙ্গে দর-কষাকষি করা কঠিন। কিন্তু কয়েক শ কৃষক যদি সমবায় বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে একই মান বজায় রেখে নির্ধারিত পরিমাণে ও নির্দিষ্ট সময়ে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারেন, তাহলে তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। অন্যদিকে বড় ক্রেতারাও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ পাবেন। কৃষক ও বাজারের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি হলে উৎপাদনের ঝুঁকি কমবে এবং দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বিপণনে দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠবে।বাংলাদেশের কৃষকের আয় বাড়ানোর আরেকটি বড় পথ হলো উৎপাদিত পণ্যে মূল্য সংযোজন। কৃষক শুধু কাঁচা পণ্য বিক্রি করবেন—এই ধারণা বদলাতে হবে। ফল, সবজি, আলু, মসলা, মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমসহ প্রায় প্রতিটি কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেই গ্রেডিং, বাছাই, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত মূল্য সৃষ্টি করা সম্ভব। কৃষক বা কৃষক সংগঠন—সমবায় কিংবা উৎপাদক গোষ্ঠী—যদি এই মূল্যশৃঙ্খলের অংশীদার হতে পারেন, তাহলে উৎপাদনের পাশাপাশি মূল্য সংযোজন থেকেও আয় করতে পারবেন। এতে প্রান্তিক কৃষক ও খামারিদের আয় বাড়বে।সমবায় বা গোষ্ঠীভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণনের জন্য হিমাগারসহ শীতল সরবরাহব্যবস্থা, আধুনিক গুদাম, সাইলো, প্যাকহাউস, গ্রেডিং সেন্টার, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, ফসল তোলার আগে ও পরে মান নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক পরিবহনকে কৃষি অবকাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের একটি অংশ বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয় বা মান হারায়। এই অপচয় কৃষকের আয় কমায় এবং ভোক্তার জন্য দাম বাড়ায়। তাই ফসল তোলার পরবর্তী ব্যবস্থাপনা উন্নত করলে একই সঙ্গে কৃষকের আয় বাড়ানো এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব।কৃষকের জন্য একটি কার্যকর কৃষিপণ্যের মূল্য সুরক্ষা কাঠামোও প্রয়োজন। এর অর্থ এই নয় যে সরকার প্রতিটি পণ্যের বাজারদর নির্ধারণ করে দেবে। বরং উৎপাদন ব্যয়, যুক্তিসংগত মুনাফা, বাজারের চাহিদা, সরবরাহ পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি ও মৌসুমি পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে নির্ভরযোগ্য ও তাৎক্ষণিক মূল্যতথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। কৃষককে নিয়মিত বাজারদর, সম্ভাব্য চাহিদা এবং উৎপাদন পরিকল্পনার তথ্য দিতে হবে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বাজারদর তথ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় কৃষিপণ্যের রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় কৃষিনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। বাংলাদেশের কৃষিকে শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভরশীল রাখলে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো কোনো পণ্যের অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়ে দাম পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই শাকসবজি, ফল, আলু, মসলা, মাছ, চিংড়ি, মাংস, ডিম, দুগ্ধজাত পণ্য এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের জন্য নতুন আন্তর্জাতিক বাজার খুঁজে বের করতে হবে। শুধু কাঁচা পণ্য নয়, মূল্য সংযোজিত ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এতে একই পরিমাণ কৃষি উৎপাদন থেকে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।রপ্তানি বাজারের সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনাকেও যুক্ত করতে হবে। কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা রয়েছে, কী মানের পণ্য প্রয়োজন, কী ধরনের প্যাকেজিং ও সনদ দরকার—এসব তথ্য কৃষকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। রপ্তানিকারক, কৃষক সংগঠন বা সমবায়, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে রপ্তানিমুখী চুক্তিভিত্তিক কৃষি উৎপাদন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বিশ্ববাজারে প্রবেশের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক নির্ধারিত মান ও পরিমাণ অনুযায়ী উৎপাদন করবেন, রপ্তানিকারক বাজার নিশ্চিত করবেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মান নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের উৎস অনুসরণযোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। এতে কৃষক উৎপাদনের আগেই বাজার সম্পর্কে ধারণা পাবেন।বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর বাজারও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় খাদ্যপণ্যের চাহিদা রয়েছে। এমন সম্ভাবনাময় বাজারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য নিরাপদ, পণ্যের উৎস অনুসরণযোগ্য, মানসম্মত ও সনদপ্রাপ্ত পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।এ ক্ষেত্রে কৃষি ও শিল্পনীতির মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ জরুরি। কৃষক মাঠে উৎপাদন করবেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পৌঁছাতে প্রয়োজন হবে আধুনিক প্যাকহাউস, শীতল সরবরাহব্যবস্থা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরীক্ষাগার, আন্তর্জাতিক মানের সনদ, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা এবং রপ্তানি অর্থায়ন। অর্থাৎ কৃষিকে শুধু মাঠের অর্থনীতি হিসেবে নয়, খামার থেকে রপ্তানি পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সমন্বিত মূল্যশৃঙ্খল হিসেবে দেখতে হবে।কৃষকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, রোগবালাই, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাজারমূল্যের আকস্মিক পতন—এসব ঝুঁকি কৃষকের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। কৃষিবিমা, আবহাওয়ার তথ্য, আগাম বাজারসংকেত, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং দুর্যোগের পর দ্রুত অর্থায়নের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। কৃষককে শুধু উৎপাদনের প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না; ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ, বাজার বিশ্লেষণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও চুক্তি ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণও দিতে হবে।কৃষিতে তরুণদের ফিরিয়ে আনতেও এই পরিবর্তন জরুরি। আধুনিক কৃষি মানে শুধু জমিতে চাষ করা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষিপ্রযুক্তি, যান্ত্রিকীকরণ, তথ্য-উপাত্ত, অনলাইন বাণিজ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সরবরাহব্যবস্থা, ব্র্যান্ডিং, রপ্তানি ও কৃষিভিত্তিক পর্যটন। একজন তরুণ নিজে কৃষক না হয়েও কৃষকের পণ্য সংগ্রহ, গ্রেডিং, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও বিপণনের উদ্যোক্তা হতে পারেন। এভাবেই বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রামীণ ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে।কৃষকের আয় বাড়ানো শুধু তার ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতিরও স্বার্থ। কৃষকের হাতে আয় বাড়লে গ্রামীণ বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটবে, পরিবহন ও সেবাখাতের চাহিদা বাড়বে এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটবে। অর্থাৎ কৃষকের মুনাফা গ্রামীণ অর্থনীতিতে পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ জনপদে কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে কৃষককে করুণা নয়, অর্থনৈতিক মর্যাদা দিতে হবে। কৃষকের সক্ষমতা ও ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে হবে। তাকে শুধু ভর্তুকি বা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল করে রাখলে চলবে না; এমন একটি বাজার তৈরি করতে হবে, যেখানে তিনি উৎপাদন খরচ জানবেন, বাজারের চাহিদা বুঝবেন এবং যুক্তিসংগত মুনাফায় পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। সরকার গড়ে তুলবে অবকাঠামো, তথ্য, গবেষণা ও প্রযুক্তির সুবিধা এবং দেবে নীতিগত সহায়তা। বেসরকারি খাত তৈরি করবে বাজার ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ। আর কৃষক সংগঠিত হয়ে উৎপাদন, পণ্যের গুণগত মান ও সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াবেন।বাংলাদেশকে তাই এখন শুধু কৃষককে কৃষিতে ফেরানোর কর্মসূচি নয়, বরং লাভজনক কৃষিতে তার প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার জাতীয় কর্মসূচি নিয়ে ভাবতে হবে। কৃষককে শুধু জমিতে ফিরিয়ে দিলেই হবে না, তাকে লাভজনক বাজারে ফিরিয়ে আনতে হবে। তার বাজার যেন গ্রামের হাটে সীমাবদ্ধ না থাকে; তার বাজার হবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক। উৎপাদনের ঝুঁকি যদি কৃষকের হয়, তবে বাজারে মূল্য সংযোজনের সুযোগও তার হাতে থাকতে হবে।কৃষকের শ্রম ও পুঁজি খাদ্য উৎপাদন করে। কিন্তু সেই উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য যেন তার হাতেই ফিরে আসে। এই ভারসাম্যই হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতির শক্ত ভিত এবং কৃষিভিত্তিক জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।[লেখক: গ্রিন সার্কুলার ইকোনমি বিশেষজ্ঞ]

শরতের উৎসব, বাংলার সর্বজনীন পরিচয়

বাংলার ঋতুচক্রে শরৎ কেবল একটি ঋতু নয়; এটি একটি মনস্তত্ত্ব, একটি সামগ্রিক অনুভূতি। দীর্ঘ তিন মাসের বর্ষার কর্দমাক্ত, রুদ্ধ ও অনেকটা স্থবির জীবন পেরিয়ে যখন আকাশে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ ভাসতে শুরু করে, নদীর ধূসর চরে সাদা কাশফুল মাথা দোলায়, ভোরের বাতাস শিউলির মিষ্টি গন্ধে ভরে ওঠে এবং দূর্বাঘাসের ডগায় শিশির জমে, তখন বাঙালি মাত্রই বুঝতে পারে, মা আসছেন। শারদীয় দুর্গোৎসব তাই কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাংলার প্রকৃতি, কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের এক সামগ্রিক উদযাপন। এই উৎসবের সর্বজনীনতা বুঝতে হলে তাকে শুধু আলোকসজ্জায় সজ্জিত মণ্ডপের ভেতরে খুঁজলে চলবে না; খুঁজতে হবে ধানখেতে, কুমোরের উঠোনে, তাঁতির মাকুতে, বাজারের ভিড়ে এবং মানুষের আনন্দে।এই উৎসবের সবচেয়ে বড় শক্তি এর সর্বজনীন দর্শন। দুর্গাপূজার সঙ্গে ‘সর্বজনীন’ শব্দটি এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে তা আলাদা করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলায় বারোয়ারি পূজার সূচনা হয়েছিল জাতিভেদপ্রথা ও জমিদারদের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙার একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারোজন বন্ধু চাঁদা তুলে যে পূজার আয়োজন করেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল—পূজা কোনো জমিদারের ব্যক্তিগত বৈভব প্রদর্শনের ক্ষেত্র নয়; এটি সবার, সবার জন্য। সেই চেতনা আজ ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। দুর্গোৎসব ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে সাংস্কৃতিক মহামিলনে পরিণত হয়েছে। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে কলকাতার কুমোরটুলি, রাজশাহীর প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে চট্টগ্রামের শহরাঞ্চল—বিভিন্ন স্থানে মণ্ডপ তৈরিতে বাঁশের কাজ করেন মুসলমান কারিগর, প্রতিমার খড়ের কাঠামো বাঁধেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কারিগর, আর মণ্ডপের আলোকসজ্জা ও সাজসজ্জার কাজে যুক্ত হন নানা ধর্মের মানুষ। পূজার ভোগ রান্না থেকে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায় পারস্পরিক সহযোগিতা। দর্শনার্থীদের সারিতে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আরতি দেখেন। এই দৃশ্য বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক হলো নারীশক্তির আরাধনা। দুর্গা এখানে কেবল দশভুজা অসুরদলনী দেবী নন; তিনি কন্যা, তিনি মা, যিনি বছরে একবার বাপের বাড়িতে আসেন। বাংলার পারিবারিক পরিসরে কন্যাসন্তানকে যে স্নেহ ও সম্মানের সঙ্গে দেখা হয়, দেবী দুর্গার মধ্যেও সেই আবেগের প্রতিফলন ঘটে। তাই এই উৎসব নারীর প্রতি সম্মান, শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং মাতৃত্বের প্রতি ভালোবাসারও এক সামাজিক প্রকাশ।শরতের প্রকৃতি এই উৎসবের একটি অপরিহার্য প্রেক্ষাপট তৈরি করে। শরৎকে এমনি এমনি ঋতুরানি বলা হয় না; এর পেছনে রয়েছে জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য ও নান্দনিকতার সম্মিলন। বর্ষার পর অনেক সময় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমে আসে, আকাশ হয়ে ওঠে নির্মল ও গভীর নীল। নদীর চরে কাশফুল ফোটে, বিলে শাপলা ও পদ্ম দেখা যায়, ভোরে ঘাসের ওপর জমে শিশির। এসব প্রাকৃতিক উপাদান দুর্গাপূজার আয়োজনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। বর্ষাকালে কাদামাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি ও শুকানো কঠিন হলেও শরতের রোদে তা তুলনামূলক সহজ হয়। নদীর পানি কমে এলে কোথাও কোথাও পলিমাটি সংগ্রহ করাও সহজ হয়। গ্রামীণ বাংলায় খাল-বিলের পদ্ম ও শাপলা ফুল পূজার সাজসজ্জায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্রকৃতি যেন নিজেই উৎসবের আয়োজন সাজিয়ে দেয়। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শরৎকালেও অসময়ে ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক ঝড়ের ঘটনা ঘটছে। অনেক এলাকায় কাশবন কমে যাচ্ছে, নদী ভরাট হচ্ছে। আকস্মিক বৃষ্টিতে মণ্ডপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং প্রতিমা তৈরিতে বিলম্বের ঘটনাও ঘটে। তাই শারদীয় উৎসবের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে শরতের প্রকৃতি রক্ষা করা জরুরি। নদী ও বিল রক্ষা, কাশবন সংরক্ষণ এবং পদ্মবিলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এখন শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের উৎসব ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা।বাংলার কৃষকের কাছে শরৎ আশা ও শঙ্কার যুগপৎ সময়। মাঠে তখন আমন ধান। ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে আমন ধানের বৃদ্ধি, ফুল ফোটা ও শিষ গঠনের বিভিন্ন পর্যায় চলে। এ সময় কৃষক সারা বছরের শ্রম ও স্বপ্ন নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। একটি ভারী বৃষ্টি, ঝড় কিংবা বন্যা তাঁর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। কৃষির এই বাস্তবতার সঙ্গে দুর্গাপূজার সময়ের সম্পর্ক রয়েছে, যদিও উৎসবটিকে সরাসরি ফসল তোলার উৎসব হিসেবে চিহ্নিত করা পুরোপুরি যথাযথ নয়। বাংলার কৃষিজীবনের সঙ্গে শারদীয় উৎসবের সম্পর্ক বহুদিনের। নবান্নের আগমুহূর্তে নতুন ফসলের প্রত্যাশা, ভালো ফলনের প্রার্থনা এবং উৎসবের আয়োজন গ্রামীণ জীবনে এক বিশেষ আবহ তৈরি করে। ভালো ফসল হলে কৃষকের হাতে অর্থ আসে, আর্থিক স্বস্তি বাড়ে এবং উৎসবের খরচ বহন করাও তুলনামূলক সহজ হয়। আজও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব দেখা যায়। আমন ধান কাটার মৌসুমের আগে-পরে কৃষকের আয়, ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের জন্য নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য কৃষি উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। একই সময়ে বাজারে নানা ধরনের মৌসুমি সবজির সরবরাহ বাড়ে। এই কৃষিকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড স্থানীয় বাজারকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখে। শরৎ তাই শুধু দেবীর আগমনের বার্তা নয়; কৃষকের ঘরেও সম্ভাব্য সমৃদ্ধির প্রত্যাশা নিয়ে আসে। ধানের শিষে যখন দোলা লাগে, তখন ঢাকের বাদ্যিও যেন সেই দোলায় তাল মেলায়।অর্থনীতির দৃষ্টিতে দুর্গাপূজা একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড। একে অনেক সময় ‘উৎসব অর্থনীতি’ বলা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজাকে ঘিরে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন গবেষণায় এই অর্থনীতির বড় আকারের কথা উঠে এসেছে। বাংলাদেশেও দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। এই অর্থনীতির বিস্তার ও গভীরতা বোঝা যায় এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পেশার মানুষের দিকে তাকালে। একজন মৃৎশিল্পী সারা বছর অপেক্ষা করেন পূজার মৌসুমের জন্য। তাঁর সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকেন খড়, বাঁশ ও মাটি সরবরাহকারী, মাটি কাটার শ্রমিক এবং রং বিক্রেতারা। ঢাকার ধামরাই, রাজশাহীর বানেশ্বর, যশোর ও চট্টগ্রামের পটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এই শিল্প বহু পরিবারের জীবিকার উৎস। বস্ত্র ও ফ্যাশন খাতেও পূজার প্রভাব রয়েছে। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদীর তাঁতপল্লিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ সময় পোশাক তৈরির কাজ বাড়ে। পূজাকে সামনে রেখে অনেকে নতুন পোশাক কেনেন। ঢাক, আলোকসজ্জা, মণ্ডপ নির্মাণ ও শব্দব্যবস্থাপনার কাজেও বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়। পূজার দিনগুলোতে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ফুল, মিষ্টি ও প্রসাধনসামগ্রীর ব্যবসায়ও লেনদেন বাড়ে। মানুষ ঘর থেকে বের হন, কেনাকাটা করেন, খাওয়াদাওয়া করেন এবং বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যান। এই বাড়তি চাহিদা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করে। এই অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এর সুফল বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও। গ্রামের কুমোর, শহরের দর্জি, ফুটপাতের চা বিক্রেতা ও রিকশাচালক—অনেকেই এই উৎসবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে উপকৃত হন। তাই দুর্গাপূজা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের পাশাপাশি বহু মানুষের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিতেও শরৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বর্ষার পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হতে পারে। ফলে এ সময় ডেঙ্গুর ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া ও বিভিন্ন চর্মরোগের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় দুর্গাপূজার আয়োজনের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম যুক্ত করা যেতে পারে। মণ্ডপের আশপাশে জমে থাকা পানি, ফেলে দেওয়া খাবারের পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল ও ডাবের খোসায় পানি জমলে তা মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে। তাই নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা জরুরি। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যের একটি ইতিবাচক দিক হলো মানসিক সুস্থতা। বর্ষার একঘেয়েমি ও দীর্ঘ সময় ঘরবন্দী থাকার পর শরতের উৎসব মানুষকে ঘরের বাইরে আসার, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার এবং সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ দেয়। সামাজিক মেলামেশা, সম্মিলিত আনন্দ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের মানসিক প্রশান্তিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের মিলন, পরিবারের সদস্যদের পুনর্মিলন এবং বন্ধুদের আড্ডা মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক হতে পারে। এ কারণে দুর্গাপূজাকে শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে নয়, সামাজিক সুস্থতা ও পারস্পরিক সংযোগের উপলক্ষ হিসেবেও দেখা যায়। এ সময় স্বাস্থ্য বিভাগের করণীয় হলো বড় মণ্ডপগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ নিশ্চিত করা, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো এবং জনসমাগমস্থলে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখতে আয়োজকদের সহায়তা করা।শেষ পর্যন্ত শারদীয় দুর্গোৎসব এমন এক আয়না, যেখানে বাংলার প্রকৃত মুখ প্রতিফলিত হয়। সেই আয়নায় আছে শরতের নীল আকাশ, আমন ধানের সবুজ মাঠ, কুমোরের হাতে গড়া প্রতিমা, নতুন পোশাকের আনন্দ এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আরতি দেখার অপূর্ব দৃশ্য। এই উৎসবকে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে দেখলে এর সঙ্গে যুক্ত বাংলার কৃষি, অর্থনীতি, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির বিস্তৃত সম্পর্ক উপেক্ষিত থেকে যায়। রাষ্ট্রের উচিত এই উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এর সঙ্গে যুক্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিল্প ও জীবিকাকে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া। মনে রাখতে হবে, নদী বাঁচলে কাশফুল বাঁচবে, কাশফুল বাঁচলে শরতের সৌন্দর্য টিকে থাকবে, আর প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান বজায় থাকলেই বাঙালির এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব তার সব রং নিয়ে বিকশিত হবে।[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]

রাতে পুলিশের একা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, কী বার্তা দিচ্ছে?

খুলনায় ছিনতাইকারীদের হামলায় এক পুলিশ পরিদর্শক গুরুতর আহত হওয়ার পর রাতে একা চলাচল না করতে সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছে জেলা পুলিশ। পুলিশের নিজেদের নিরাপত্তায় নেওয়া এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।প্রশ্ন উঠছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই যদি রাতে একা চলাচলে নিরাপত্তাঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?খুলনা জেলা পুলিশের নির্দেশনাটি মূলত সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু এর প্রভাব পুলিশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জননিরাপত্তা, পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা, রাতে চলাচল এবং অপরাধ দমনে পুলিশের সক্ষমতা—সবকিছুর সঙ্গেই বিষয়টি সম্পর্কিত।সাধারণের নিরাপত্তাহীনতা বাড়বেপুলিশের কাজ অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া। সেই পুলিশের সদস্যদেরই রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশ দেওয়া হলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে—রাস্তাঘাটে নিরাপত্তার পরিস্থিতি কি এতটাই খারাপ?বিশেষ করে রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরা শ্রমজীবী মানুষ, দোকানকর্মী, পরিবহনশ্রমিক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশার মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে পারে। যাদের জীবিকার প্রয়োজনে রাতেও বাইরে থাকতে হয়, তাদের জন্য এই বার্তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ।তবে পুলিশের অভ্যন্তরীণ একটি নির্দেশনাই পুরো এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চূড়ান্ত চিত্র নয়। বাস্তবে অপরাধের হার, ছিনতাইয়ের স্থান ও সময়, পুলিশের টহল এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারের তথ্য বিশ্লেষণ করেই পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হবে।রাতের জীবিকায় প্রভাব পড়বেশহরের অর্থনীতি শুধু দিনের বেলায় চলে না। রাতের দোকান, খাবারের ব্যবসা, পরিবহন, হাসপাতাল, নিরাপত্তাসেবা এবং বিভিন্ন জরুরি পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাজের সময়ও অনেক ক্ষেত্রে রাত পর্যন্ত বিস্তৃত।রাতে ছিনতাই ও হামলার আশঙ্কা বাড়লে মানুষ অপ্রয়োজনে বাইরে যাওয়া কমাতে পারেন। এতে রাতের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার জন্য অতিরিক্ত পরিবহন খরচ, বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা কিংবা পরিচিত কারও সঙ্গে ফেরার প্রয়োজন তৈরি হতে পারে।বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে এসব বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া সব সময় সম্ভব নয়। তাই রাতে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে তার প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। যাদের হাতে অর্থ ও যাতায়াতের বিকল্প কম, তারাই বেশি বিপাকে পড়তে পারেন।পুলিশের নিরাপত্তা জননিরাপত্তার অংশখুলনায় পুলিশ পরিদর্শকের ওপর হামলার পর জেলা পুলিশের সতর্কতা অযৌক্তিক নয়। দায়িত্ব পালন শেষে একজন পুলিশ সদস্য যেন অপরাধীর হামলার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্ব।কিন্তু এই ব্যবস্থা যদি শুধু পুলিশ সদস্যদের চলাচল সীমিত করার মধ্যে আটকে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটির সমাধান হবে না। বরং ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে কোথায়, কখন এবং কীভাবে ছিনতাই হচ্ছে, তা শনাক্ত করা জরুরি।রাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল বাড়ানো, ছিনতাইপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা, সড়কের আলো নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা, সন্দেহভাজন অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং দ্রুত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তায় একা চলাচল এড়িয়ে চলার পাশাপাশি এসব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও বাড়তে পারে।পুলিশের প্রতি আস্থার প্রশ্নজননিরাপত্তার ক্ষেত্রে শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, মানুষ নিজেকে কতটা নিরাপদ মনে করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা বা তাদের চলাচলে সতর্কতা জারি করা প্রশাসনের দায়িত্বশীলতার পরিচয় হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এ ধরনের নির্দেশনার পেছনের পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকলে মানুষের মধ্যে আতঙ্কও তৈরি হতে পারে।খুলনা জেলা পুলিশ বলেছে, এটি মূলত সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দেওয়া অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা। ফলে নির্দেশনাটিকে পুলিশ প্রশাসনের অসহায়ত্বের স্বীকারোক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে পুলিশের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া সতর্কতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। মানুষ যদি দেখেন, ছিনতাইয়ের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত হচ্ছে, অপরাধীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুলিশের কার্যকর উপস্থিতি রয়েছে, তাহলে তাদের আস্থা বাড়বে।অপরাধ দমনে প্রয়োজন ধারাবাহিক ব্যবস্থাখুলনা জেলা পুলিশ গত ৬ অক্টোবর থেকে অপরাধী গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। এর আগে রূপসায় জয় ঢালী হত্যার দেড় মাস পর তার বাবা আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দিঘলিয়ার ফরমাইশখানা এলাকায় চায়ের দোকানে গুলি করে একজনকে হত্যার ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।এসব ঘটনার সঙ্গে ছিনতাইয়ের ঘটনাকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। প্রতিটি অপরাধের কারণ, ধরন ও অপরাধীদের পরিচয় আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে একের পর এক গুরুতর অপরাধের ঘটনায় এলাকাবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।বিশেষ অভিযান সাময়িকভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ দমনে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, দ্রুত তদন্ত, অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের বিচার এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি।খুলনা জেলা পুলিশের রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশনাকে শুধু পুলিশের অভ্যন্তরীণ সতর্কতা হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর তাৎপর্য উপেক্ষিত হতে পারে। আবার এই নির্দেশনা থেকেই পুরো খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।তবে একজন পুলিশ পরিদর্শক যদি দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের হামলায় গুরুতর আহত হন, তাহলে ঘটনাটি অবশ্যই জননিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। পুলিশের নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একই জননিরাপত্তা ব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।পুলিশের সদস্যদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ যেন রাতে নিরাপদে চলাচল করতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা দেওয়াও প্রশাসনের দায়িত্ব। শেষ পর্যন্ত নির্দেশনা নয়, অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং মানুষের নিরাপদ চলাচলই পুলিশের সক্ষমতা ও জনআস্থার প্রকৃত পরীক্ষা।

তরুণ শ্রমিকের শোভন কাজ ও শ্রমবাজার

সভ্যতার ইতিহাস মূলত মানুষের শ্রমের ইতিহাস। কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন, শ্রমিক কারখানা সচল রাখেন, নির্মাণশ্রমিক শহর গড়ে তোলেন, পরিবহনশ্রমিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। গৃহশ্রমিক পরিবার ও নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেন। পোশাকশ্রমিক বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখেন। রিকশাচালক, হকার, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, মৎস্যজীবী ও ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করা তরুণেরাও অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ। অথচ তাদের অনেকেই নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। এই বাস্তবতায় বিশ্ব শোভন কর্ম দিবসের গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।প্রতিবছর ৭ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শোভন কর্ম দিবস। শ্রমিকের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। শোভন কাজ বলতে শুধু কর্মসংস্থান বোঝায় না। এমন কাজকে শোভন বলা যায়, যেখানে ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপত্তা, বৈষম্যহীন পরিবেশ, অধিকার চর্চার স্বাধীনতা এবং অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, বার্ধক্য কিংবা কর্মহীনতার সময়ে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত থাকে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ১৯৯৯ সালে শোভন কাজের ধারণাকে বৈশ্বিক শ্রমনীতির গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে সামনে আনে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অষ্টম লক্ষ্যেও শোভন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।তরুণ শ্রমিকের ভবিষ্যৎতরুণেরা শ্রমবাজারের বড় সম্ভাবনা। কিন্তু তাদের অনেকেই কর্মজীবনের শুরুতেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। স্থায়ী চাকরির বদলে অস্থায়ী কাজ, কম মজুরি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং সামাজিক সুরক্ষাহীন কর্মসংস্থান তাদের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত তরুণদের অনেকে দীর্ঘদিন চাকরি খুঁজেও কাজ পাচ্ছেন না। আবার কাজ পেলেও অনেকে যোগ্যতা অনুযায়ী মজুরি বা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না।তাই শুধু কতজনের কর্মসংস্থান হয়েছে, তা দিয়ে শ্রমবাজারের প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। কাজের মানও বিবেচনায় নিতে হবে। দীর্ঘ সময় কাজ করেও যদি একজন তরুণের আয় দিয়ে খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব না হয়, তবে সেই কর্মসংস্থানকে শোভন বলা যায় না। চাকরি হারালে আর্থিক সহায়তা না পাওয়া কিংবা কর্মক্ষেত্রে অন্যায়ের প্রতিকার করতে না পারাও অনিশ্চয়তার লক্ষণ। এসব সমস্যা সমাধানকে শ্রমনীতির অগ্রাধিকার দিতে হবে।বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সংকটবাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন, পোশাক ও সেবা খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করেন। কিন্তু শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। তাদের অনেকের লিখিত নিয়োগপত্র নেই, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত নয়, নিয়মিত মজুরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই এবং সামাজিক সুরক্ষাও সীমিত। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে অনেকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ পান না। অসুস্থতা বা কর্মক্ষমতা হারালে পুরো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে।এই পরিস্থিতি শ্রমিকের ব্যক্তিগত দুর্ভোগের পাশাপাশি অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর। শ্রমজীবী মানুষের আয় অনিশ্চিত হলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে। এতে বাজারে চাহিদা ও উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তাই শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা একটি শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি।জীবনযাপনের উপযোগী মজুরিন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করলেই শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হয় না। মজুরি এমন হতে হবে, যাতে শ্রমিক নিজের ও পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারেন। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত ও পোশাকের ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা নিয়মিত পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।শহরাঞ্চলে বাসাভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে শ্রমিকের প্রকৃত আয় কমে যায়। কাগজে মজুরি বাড়লেও মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে জীবনমানের উন্নতি ঘটে না। তাই মজুরি নির্ধারণে শিল্পের সক্ষমতার পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়ও বিবেচনা করতে হবে।শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকারশ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার শোভন কাজের অন্যতম শর্ত। একজন শ্রমিকের পক্ষে একা মালিকের সঙ্গে দরকষাকষি করা কঠিন। সংগঠিত শ্রমিকেরা সম্মিলিতভাবে তাদের দাবি তুলতে পারেন এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করতে পারেন।শ্রমিক সংগঠন শুধু মজুরি বৃদ্ধির জন্য নয়; কর্মঘণ্টা, ছুটি, নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও বৈষম্য প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সংগঠন গঠনে বাধা, চাকরি হারানোর ভয়, মালিকপক্ষের বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকের স্বাধীনতা সীমিত করে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হবে। স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল শ্রমিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হলে শ্রমিক-মালিক বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ বাড়বে।শোভন কাজের সঙ্গে গণতন্ত্রেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শ্রমিকের মতপ্রকাশ ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত না হলে কর্মক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে ওঠে না। মজুরি নির্ধারণ, শ্রম আইন সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে শ্রমিক প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে। সরকার, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে নিয়মিত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।নারী ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের সুরক্ষাবাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারী শ্রমিকের অবদান অপরিসীম। বিশেষ করে পোশাকশিল্প ও সেবা খাতে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মজুরি ও পদোন্নতিতে বৈষম্য, যৌন হয়রানি, নিরাপদ যাতায়াতের অভাব এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধার সীমাবদ্ধতা এখনো তাদের জন্য বড় বাধা। এসব দূর করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।একইভাবে হকার, রিকশাচালক, গৃহশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, বর্জ্য সংগ্রহকারী ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করা মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের জন্য সহজ নিবন্ধন, পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্ঘটনা বিমা, পেনশন ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। অনানুষ্ঠানিক খাতকে এক দিনে আনুষ্ঠানিক করা সম্ভব নয়। তবে ধাপে ধাপে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব।প্রযুক্তির পরিবর্তন ও নতুন কর্মসংস্থানকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও ডিজিটাল প্রযুক্তি শ্রমবাজারের ধরন বদলে দিচ্ছে। কিছু প্রচলিত কাজ কমে যেতে পারে, আবার নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। পোশাকশিল্প, ব্যাংকিং, হিসাবরক্ষণ, পরিবহন ও প্রশাসনিক কাজে প্রযুক্তির প্রভাব বাড়ছে। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল বিপণন ও অনলাইন শিক্ষায় নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।এই পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের সক্ষম করে তোলা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তরুণদের কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রচলিত কাজ হারানোর ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকদের নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করা তরুণদের ক্ষেত্রেও সুরক্ষা জরুরি। যাঁরা যাত্রী পরিবহন, খাবার সরবরাহ কিংবা অনলাইনভিত্তিক সেবা দেন, তাদের অনেকেই অসুস্থতা, দুর্ঘটনা ও কর্মহীনতার সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা পান না। নতুন কর্মসংস্থানের ধরন যেন শ্রমিকের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।শিশুশ্রম ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাদারিদ্র‍্য, পারিবারিক আয়সংকট ও সামাজিক সুরক্ষার অভাবে অনেক শিশু অল্প বয়সে শ্রমে যুক্ত হয়। শিশুশ্রম বন্ধ করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের সহায়তা, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের সরিয়ে আনা প্রয়োজন। বিদ্যালয়ে থাকার বয়সে শিশু শ্রমে যুক্ত হলে তার শৈশব নষ্ট হয় এবং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা প্রতিরোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারখানা, নির্মাণক্ষেত্র, পরিবহন ও কৃষিতে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ শ্রমিকের জীবন রক্ষা করে, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের করণীয়শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার ও যৌথ দরকষাকষির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা, নারী শ্রমিকের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা কোনো দয়া বা অনুদান নয়; এটি অধিকার। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, কর্মহীনতা ও বার্ধক্যের সময়ে শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, দুর্ঘটনা বিমা ও বার্ধক্যকালীন নিরাপত্তা ধাপে ধাপে বিস্তৃত করতে হবে।শোভন কাজ নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। মালিকদেরও ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন, আইনসম্মত ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকের মতামতের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিককে উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে নয়, প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। এতে শ্রমিকের আস্থা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে।গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও নাগরিক সমাজকেও শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে। শ্রমিকের অবদান ও অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরার পাশাপাশি ভালো কর্মপরিবেশের উদাহরণও সামনে আনতে হবে।অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যএকটি দেশের উন্নয়ন শুধু মাথাপিছু আয়, মোট দেশজ উৎপাদন কিংবা রপ্তানি দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে, উন্নয়নের সুফল শ্রমজীবী মানুষ কতটা পাচ্ছেন। তরুণেরা কতটা নিশ্চয়তার সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারছেন, নারী শ্রমিকের মর্যাদা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং অসুস্থ ও প্রবীণ শ্রমিকের জন্য কী সুরক্ষা রয়েছে—এসবও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।আমরা এমন উন্নয়ন চাই, যেখানে রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনমানও উন্নত হবে; প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে। এ জন্য তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, নীতিনির্ধারণ, শ্রমিক নেতৃত্ব ও সংগঠনের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাদের শ্রম অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া জরুরি।মানুষের শ্রমের মর্যাদা ছাড়া কোনো উন্নয়নই পূর্ণাঙ্গ নয়। একজন শ্রমিক শুধু উৎপাদনের সংখ্যা নন; তিনি একজন মানুষ, নাগরিক ও পরিবারের সদস্য। তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুল তরুণ শ্রমশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মীদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর শ্রম আইন, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, স্বাধীন শ্রমিক সংগঠন ও কার্যকর সামাজিক সংলাপ।তরুণ শ্রমিকদের সংগঠিত করার অর্থ শুধু মজুরি বা কর্মপরিবেশের উন্নয়ন নয়; নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তাদের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। আজকের তরুণ শ্রমিকেরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্মাণ করবেন। তাদের জন্য নিরাপদ, ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মজগৎ গড়ে তুলতে পারলেই শোভন কাজের অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হবে।শ্রমের মর্যাদা, বৈষম্য হ্রাস ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় শ্রমিক, মালিক ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অংশীদারত্ব গড়ে উঠুক। কাজ হোক শুধু জীবিকা অর্জনের উপায় নয়, মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। শোভন কাজ হোক সবার অধিকার, তরুণ শ্রমিকের কণ্ঠ হোক ভবিষ্যতের শক্তি।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]

আয়কর রিটার্নে ভুল ও অসংগতি এড়ানোর উপায়

বাংলাদেশে আয়কর রিটার্ন দাখিল করলেই অনেক করদাতা মনে করেন, দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রিটার্নে দেওয়া তথ্য, আয়, ব্যয়, সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেনের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে ভবিষ্যতে কর কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে পারেন। প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য যাচাইয়ের এই সময়ে তাই শুধু রিটার্ন দাখিল নয়, সঠিক তথ্য দেওয়া এবং আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখাই করদাতার সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্যের মাধ্যমে করদাতাদের আর্থিক কর্মকাণ্ড যাচাই করতে পারে। ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র, জমি বা ফ্ল্যাটের ক্রয়-বিক্রয়, গাড়ি নিবন্ধন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, বিদেশ ভ্রমণসহ বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে রিটার্নের তথ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে তা যাচাইয়ের কারণ হতে পারে।আমাদের সমাজে আয়কর অডিটকে অনেকেই কর ফাঁকির অভিযোগ হিসেবে দেখেন। বাস্তবে অডিট কর প্রশাসনের একটি আইনসম্মত যাচাইপ্রক্রিয়া। কোনো ফাইল অডিটের জন্য নির্বাচিত হলেই করদাতা অপরাধী, এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে আয়, ব্যয়, সম্পদ ও লেনদেনে অসামঞ্জস্য থাকলে করদাতাকে তাঁর দেওয়া তথ্যের যথার্থতা ব্যাখ্যা করতে হতে পারে।অডিটের ঝুঁকির অন্যতম কারণ হলো আয় ও জীবনযাত্রার মধ্যে অসামঞ্জস্য। একজন ব্যক্তি যদি কম আয় দেখান, অথচ উচ্চমূল্যের ফ্ল্যাট, গাড়ি বা বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেন, তাহলে এসব সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন উঠতে পারে। এখানে সম্পদ থাকা সমস্যা নয়; বরং সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস যথাযথভাবে ব্যাখ্যা ও প্রমাণ করতে না পারাই ঝুঁকির বিষয়।ব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ব্যাংক হিসাবে নিয়মিত বড় অঙ্কের অর্থ জমা বা উত্তোলন হলেও রিটার্নে তার যৌক্তিক প্রতিফলন না থাকলে বিষয়টি যাচাই করা হতে পারে। বিশেষ করে ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত লেনদেন একই হিসাবে পরিচালনা করলে হিসাবের স্বচ্ছতা নষ্ট হয়। তাই ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য পৃথক হিসাব এবং সঠিক হিসাবরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।সম্পদ বিবরণীতেও অনেক সময় অসামঞ্জস্য দেখা যায়। জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি বা অন্যান্য মূল্যবান সম্পদের তথ্য অসম্পূর্ণভাবে দেওয়া, প্রকৃত মূল্য গোপন করা কিংবা সম্পদ কেনার অর্থের উৎস ব্যাখ্যা করতে না পারা করদাতার জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে। এসব ক্ষেত্রে ক্রয়দলিল, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, ঋণের কাগজপত্রসহ প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ করা জরুরি।বিদেশ ভ্রমণ বা বৈদেশিক লেনদেন নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবে প্রদর্শিত আয় ও এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্য থাকলে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। একইভাবে বিদেশ থেকে অর্থ গ্রহণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বা আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস ও লেনদেনের প্রকৃতি স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।অনেক সময় ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকি নয়, অসাবধানতাও কর জটিলতার কারণ হয়। উৎসে কর কর্তনের তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ না করা, ব্যাংক সুদ বা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দেখাতে ভুলে যাওয়া, বিনিয়োগের তথ্য অসম্পূর্ণ রাখা কিংবা প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ না করা এর উদাহরণ। তথ্য যাচাইয়ের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ার ফলে এসব অসামঞ্জস্য শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়েছে।কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দৈবচয়নভিত্তিক পদ্ধতিতেও কর ফাইল যাচাইয়ের জন্য নির্বাচন করা হতে পারে। তাই অডিটের জন্য নির্বাচিত হওয়া মানেই অপরাধী—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।করদাতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তথ্যের স্বচ্ছতা, সঠিক হিসাবরক্ষণ এবং নথিপত্র সংরক্ষণ। আয়, ব্যয়, বিনিয়োগ, ব্যাংক লেনদেন ও সম্পদের তথ্য যেন পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং প্রয়োজন হলে প্রতিটি তথ্যের পক্ষে যথাযথ নথি দেখানো যায়, তা নিশ্চিত করা উচিত।একই সঙ্গে কর পরিকল্পনা ও কর ফাঁকির পার্থক্য বোঝা জরুরি। আইনসম্মতভাবে কর সাশ্রয়ের পরিকল্পনা করা বৈধ। কিন্তু প্রকৃত আয় গোপন করা, ভুয়া তথ্য দেওয়া বা সম্পদের তথ্য আড়াল করা আইনগত জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী অভিজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া করদাতার জন্য সহায়ক হতে পারে।বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও সরকারি সেবার অর্থায়নে করের ভূমিকা অপরিসীম। তাই কর প্রদান করার পাশাপাশি সঠিক তথ্য দেওয়া এবং আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখাও একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।আয়কর অডিটকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে অবহেলা করারও সুযোগ নেই। সঠিক তথ্য, আয় ও ব্যয়ের যৌক্তিক সামঞ্জস্য এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রই একজন করদাতার সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।[লেখক: আয়কর আইনজীবী]

মহালয়া: পূর্বপুরুষের স্মরণ, দেবীপক্ষের সূচনা

কাশফুলে দোলা লাগিয়ে এবার মর্ত্যে আবির্ভূতা হবেন চিন্ময়ী দেবী দুর্গা। স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে ভক্তদের দর্শন দিতে আসেন দশভূজা দুর্গতিনাশিনী। শারদীয় দুর্গাপূজার প্রাক্কালে মহালয়া তিথিতে চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে আবাহন করা হয়। মহালয়া এলেই বাংলার প্রকৃতি যেন মাতৃপূজার শুভক্ষণকে বরণ করার জন্য প্রস্তুত হয়। দেবী বন্দনার সুর ধ্বনিত হয় মানুষের হৃদয়ে। দূর থেকে ভেসে আসে ঢাকের আওয়াজ। বুকে জাগে আনন্দ ও প্রতীক্ষা—মা আসছেন আমাদের মাঝে। কাশফুল ফুটলে শরৎ আসে, নাকি শরৎ এলে কাশফুল ফোটে—এ নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু মহালয়া এলেই যে দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা মানুষের মনে ছড়িয়ে পড়ে, তা নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই।মহালয়া মানে পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনা। চাঁদের হিসাব অনুসারে, আশ্বিনের অমাবস্যায় পিতৃপক্ষ শেষ হয় এবং দেবীপক্ষের সূচনা ঘটে। দেবীপক্ষের শেষ তিথি পূর্ণিমা, যা কোজাগরী পূর্ণিমা নামে পরিচিত। এ দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা লক্ষ্মীপূজার আয়োজন করেন। দুর্গাপূজা মূলত পাঁচ দিনের উৎসব হলেও মহালয়া থেকেই বাঙালির মনে শারদীয় উৎসবের আনন্দ শুরু হয়। দেবীর আগমনী সুরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ। বাংলার মাঠ-ঘাট, নদী-আকাশ আর কাশবন যেন সেই আনন্দেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পিতৃপক্ষ পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাদের উদ্দেশে তর্পণের জন্য বিশেষ সময়। তর্পণ শব্দের অর্থ তৃপ্ত করা বা সন্তুষ্ট করা। সনাতন ধর্মে কোনো শুভ কাজের আগে প্রয়াত পিতা-মাতা ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তাদের উদ্দেশে তর্পণ করার রীতি রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং তাদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়। অনেকে মহালয়ার দিন গঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীর জলে অঞ্জলি দিয়ে তর্পণ করেন। এই আচার শুধু পূর্বপুরুষদের স্মরণেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্য দিয়ে সমগ্র জীবজগতের মঙ্গলও কামনা করা হয়। যাঁরা নির্দিষ্ট দিনে শ্রাদ্ধ করতে পারেননি, তারাও এ দিন তা করতে পারেন বলে ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে।মহালয়া ও তর্পণ নিয়ে মহাভারতে কর্ণের একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। কথিত আছে, মৃত্যুর পর কর্ণ স্বর্গে গেলে তাকে খাদ্য হিসেবে সোনা ও রত্ন দেওয়া হয়। কারণ, জীবদ্দশায় তিনি প্রচুর স্বর্ণ দান করলেও পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে অন্ন দান করেননি। কর্ণ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তাকে জানানো হয়, তিনি পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে খাদ্য নিবেদন করেননি। কর্ণ জানান, তিনি তার পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। পরে তাকে ষোলো দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে এসে তাদের উদ্দেশে অন্ন ও জল দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এই কাহিনির মধ্য দিয়ে পূর্বপুরুষদের স্মরণ এবং তাদের উদ্দেশে অন্ন-জল নিবেদনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।শাস্ত্রমতে, মহালয়া একটি অমাবস্যা তিথি। এ দিন পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, তর্পণের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের তৃপ্তি সাধিত হয় এবং তারা উত্তরসূরিদের আশীর্বাদ করেন। একই সঙ্গে মহালয়া দেবী দুর্গার আগমনের প্রস্তুতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ‘বোধন’ অর্থ জাগরণ। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে দেবীর বোধন করা হয়। শ্রীশ্রী চণ্ডীর কাহিনিতে দেবী মহামায়ার যোগনিদ্রা থেকে বিষ্ণুর জেগে ওঠা এবং মধু-কৈটভ নামের দুই অসুরের সঙ্গে তার যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে। দুর্গার আবির্ভাব ও মহিষাসুরবধের কাহিনিও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক।মহালয়ার আগে ‘শুভ মহালয়া’ বলা যাবে কি না, তা নিয়েও কারও কারও প্রশ্ন রয়েছে। তবে অনেক শাস্ত্রজ্ঞের মতে, পূর্বপুরুষদের স্মরণ, তাদের আত্মার শান্তি কামনা এবং দেবী দুর্গার আবাহনের এই তিথিকে অশুভ বলার কারণ নেই। পণ্ডিত সতীনাথ পঞ্চতীর্থের ব্যাখ্যায়, মহালয়ার তর্পণ শুধু পিতৃপুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দেবতা, ঋষি এবং পরিচিত-অপরিচিত প্রয়াতদের উদ্দেশেও তর্পণের বিধান রয়েছে। এই দৃষ্টিতে মহালয়া স্মরণ, শ্রদ্ধা ও কল্যাণকামনার তিথি। তাই অনেকে বিশ্বাস করেন, এই পুণ্য তিথিকে ‘শুভ মহালয়া’ বলে অভিহিত করায় কোনো অসংগতি নেই।সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, মহিষাসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ দেবতাদের রক্ষায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শক্তির সমন্বয়ে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। দেবতাদের দেওয়া অস্ত্র ধারণ করে তিনি মহিষাসুরকে বধ করেন। এই কাহিনি অন্যায়, অত্যাচার ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের বার্তা বহন করে। মহালয়া তাই একদিকে পূর্বপুরুষদের স্মরণের দিন, অন্যদিকে দেবীপক্ষের সূচনা ও দুর্গার আগমনী বার্তা। এই তিথি মানুষের মনে শুভবোধ, আশা ও নতুন উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে।ছোটবেলায় মহালয়া দিয়েই আমাদের দুর্গাপূজার আনন্দপর্ব শুরু হতো। সেই আনন্দের সমাপ্তি ঘটত দেবী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। মহালয়া থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রতিটি দিন সুন্দর ও আনন্দময় হোক। শুভ মহালয়া সবার মনে জাগিয়ে তুলুক শুভবোধ, সম্প্রীতি ও কল্যাণের প্রত্যাশা।[লেখক: প্রাবন্ধিক]

রম্যগদ্য: নিজের জালে নিজে বন্দী

হেঁ হেঁ হেঁঁ, ক্যামন, খুব তো তখন নাচছিলেন, মোসাদের ডিভাইস আনি হ্যাতাগো ব্যাবাক খবরাখবর ফানির মতুন জাইন্না যামু। যেহানে যা ঘটবো, আন্নে ব্যাবাগ কিছু, আগেই জানি যাইবেন যে। তো ভালো কথা, তুই কাঁচা মানে “র” খবরাখবর সংগ্রহ করে, দেশের কোথায় কী ঘটছে, সব জেনে বুঝেসুঝে, তারপর দেশের ও দেশবাসীর উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নিবি সেটাতো খুব ভালো কথা। এই জন্য তুই শুধু মোসাদ ক্যান, দরকার হলে কেজিবি, এফবিআই, সিআইএ, জানিসারিস, হামাস সবের থেকে টেকনোলজি আহ্বান কর। দেশ ও দেশের নাগরিকের জন্য উন্নয়নমুখী যে কোনো কাজে তুই শতভাগ জনগণের সহযোগিতা পাবি।হেঁ হেঁ হেঁঁ, দেশ ও দেশের নাগরিকের জন্য উন্নয়ন! আরে মিয়া মোসাদের ডিভাইস আনি বিরোধী পার্টির ব্যাবাক খবরাখবর শুনোনের লাই যন্ত্র ব্যাবহার করের! আর আন্নেনি কন, দেশ ও দেশের নাগরিকের জন্য উন্নয়নমুখী যে কোনো কাজে মানে পাবলিকের শান্তি মারার কাজে এই সব আধুনিক আড়িপাতার মেশিন আনি দেশের উন্নয়নের কাজে লাগাইবো?আরে না না না, মানুষের ক্ষতি করার জন্য মোসাদের অত্যাধুনিক ডিভাইস ব্যাবহার করলে তা কখোনোই কোনো ভদ্র শিক্ষিত সামজ মেনে নিবে না। আমেরিকার মতো জায়গায়, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, নিক্সন আড়ি পাততে যেয়ে “ওয়াটার গেট” কেলেঙ্কারিতে ধরা খেয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলো, আর সেখানে তোর দেশে মোসাদের অত্যাধুনিক আড়িপাতার ডিভাইস ব্যাবহার...আরে মিয়াভাই খালি ব্যাবহার? হ্যাতারা তো, ব্যাবাগ কথা হুনের, এর পর হ্যেইডারে আবার, ফোনালাপ ফাঁস করি পাবলিকরে সব কথা হুনাই, বিরোধীরে পচাইতেছে।না না, এসব নোংরা ফাউল কাজ কোনো মানুষের বাচ্চার কাজ না।মানুষের বাচ্চার কাজ না হোইলে এইগুলা কাগো কাজ! সারা পিরথিবীতে “মাফিয়া”গো ধরনের লাই গোয়েন্দা সংস্থ্যারা এক ব্যাটার গাড়ির ড্যাশ বোর্ডে গোপন, ট্রান্সমিটার লাগাই, প্রায় ছয়মাস হ্যের পিছে ঘুরি ঘুরি তারপর হ্যেতারে কট কোরছে। আর ব্যাটা গোয়েন্দা সংস্থ্যার ক্যাপ্টেন কি রকম বাহবা পাইছে আপনে জানেন? আজকাল সারা বিশ্বে গোয়েন্দা সংস্থ্যার নিত্য নতুন অত্যাধুনিক আড়িপাতার যন্ত্র ব্যাবহার এবং আবিষ্কার পুরাপুরি জায়েজ।বলিস কী! সারা বিশ্বে শিক্ষিত অশিক্ষিত, জালিম আর মজলুম, জননগণের সরকার সবাই গোয়েন্দা সংস্থ্যার নিত্য নতুন অত্যাধুনিক আড়িপাতার নাজায়েজ যন্ত্র ব্যাবহার এবং আবিষ্কার পুরাপুরি জায়েজ বলে স্বীকার করেছে?কী বলচেন স্বীকার কোরেছে, ওরা অহন কম্পিউটার দী, হান্দাই হ্যাকিং করি ব্যেবাগ সরকারের গোপন নথিপত্র, পাবলিকের সামনে তুলি ধরের...ছী ছী ছী তৌবা তৌবা, মানুষের ভালোর জন্য তুই যদি মোসাদের অত্যাধুনিক ডিভাইস ব্যাবহার করিস তাহোলে পাবলিক তোকে বাহবা দিবে। কিন্তু খালি নিজের গদী রক্ষার জন্য, নিজের স্বৈরাচারি কর্মকান্ড চালানোর জন্য, জনগনের ক্ষতির জন্য জনগনের ট্যাক্সের টাকায় মোসাদের অত্যাধুনিক ডিভাইস কিনলে তা কখোনোই, মানুষের বাচ্চার কাজ বলে মনে হবেনা।মানুষের বাচ্চা কন বা দেবদূতের বাচ্চা কন, ব্যেবাগ দুনিয়ায় অহন যে কোনো সরকার তার গদি টিকিইবার লাই মোসাদের অত্যাধুনিক ডিভাইস কামে লাগার।লজ্জা লজ্জা, শরম শরম, কুন্ঠা বা হায়া কিংবা মাথাহেঁট, তুই যাই বলিস সুস্থ্য মানসিকতার সরকার কখোনোই জনগনের ক্ষতির জন্য, কেবল নিজের গদি রক্ষার জন্য এসব আড়িপাতার মেশিন ব্যাবহার করবে,না।বুঝলাম যেই দিন রামে রাজত্ব করবো হেই দিন, মোসাদের অত্যাধুনিক আড়িপাতা ডিভাইস ব্যাবহার বন্ধ হোইবো। কিন্তু আমি কোইকি মজা একটা ঘইট্টা গ্যেছেগা...এর মাঝে তুই আবার মজা মানে পাবলিকের এন্টারটেইনমেন্টের কী পেলি?ক্যান আপনে কি ইউটিউব দ্যেখেন না?ইউটিউবের সাথে এর আবার কি সম্পর্ক?আরে মিয়া আপনে হুনেন নাই, “এ্যাই শোনো, তুমি কি আমার লগে কক্সবাজার যাইবা? / না বাবা না, আপনার হাত অনেক লম্বা, আমার ভয় লাগে/ যাহ্ দুষ্টু তুমি মিথ্যা ভয় পাও, জাননা আমার হাতে ব্যাথা কাউকে মারি না/...  এসব আবার কি বলছিস, “এ্যাই শোনো, তুমি কি আমার লগে কক্সবাজার যাইবা? ক্যা বোঝেন না, আরো মজার এন্টারটেইনমেন্ট হুনেন, “এ্যাই শোনো তোমার জমির চায়ের, সৌরভ কিন্তু বীষম কড়া, তাই তোমার জমির চায়ের সৌরভ পানিতে ধুয়া হালকা কোইরা আইনো, নাইলে খাইলে জীবলা আর গলা জ্বলে/ যাহ দুষ্ট্ ুকি যে কও...আচ্ছা রাখ তোর এই সব ফালতু হেঁয়ালি পুর্ণ সংলাপ, বল তুই কি বলতে চাস...ক্যা মিয়া বোজেন না, ফোনালাপ ফাঁস। হ্যেতারা যেই মোসাদের আড়িপাতা ডিভাইস আনি পাবলিকের গোপন কথা ফাঁস করতো, অহন অন্য ব্যাটারা ওই মোসাদের আড়িপাতা ডিভাইস দী, হ্যেতাগো ফোনালাপ ইউটিউবে ফাঁস করের...এম্মা একিরে যেই লংকায় যাচ্ছে সেই রাবণ। এইসব আড়িপাতা ডিভাইস কেবল মানুষের ক্ষতির জন্য ব্যাবহৃত হবে!আরে রাখেন আপনের নীতিকথা! আমি কোই কী স্বৈরাচার এখন নিজের জালে নিজে বন্দী। আগে যেই মোসাদের ডিভাইস আনি পাবলিকরে হয়রানি করছে, অহন সেইম মেশিন দী, পাবলিকের সামনে হ্যাগোর হয়রানি শুরু হোইছে!আচ্ছা বলতো বাঙালীর এই পরস্পরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুড়ি থামবে কবে রে...?আই তো কোই “কেয়ামত সে কেয়ামত তক চলেগা...”    [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

মাহালী আদিবাসীদের প্রাণের উৎসব ‘জিতিয়া পার্বন’

একটি জাতির পরিচয় শুধু তার নাম, বসতি কিংবা জীবনযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভাষা, গান, নাচ, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, লোককথা, উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েও একটি জনগোষ্ঠী তার স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। তাই কোনো সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি উৎসবের বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে ইতিহাস, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাহালী আদিবাসী সম্প্রদায়ের ‘জিতিয়া পার্বন’ তেমনই একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব, যা একসময় প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। নিজেদের শিকড় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার তাগিদে মাহালীরা আবারও এই উৎসবকে ফিরিয়ে এনেছেন।গত ৩ অক্টোবর ২০২৬ রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা মাহালী পাড়ায় দিনব্যাপী উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে জিতিয়া পার্বন। মাহালী আদিবাসী আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সংগঠন (মাসাউস) ও জিতিয়া পার্বন উদযাপন কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার প্রায় ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের সহস্রাধিক শিশু, নারী ও পুরুষ অংশ নেন। কয়েকদিনের প্রস্তুতির পর শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। নাচ, গান, মাদলের ছন্দ, প্রার্থনা, আলোচনা, পিঠা বিতরণ এবং বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবটি পরিণত হয় মাহালী সম্প্রদায়ের মিলনমেলায়।মাহালী সমাজে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, জিতিয়া পার্বণের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। জিত বহন ঠাকুর নামে একজন মাহালী নেতা ছিলেন, যিনি মানুষের কুসংস্কার, পরাধীনতা ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তার স্মরণে মাহালীরা এই পার্বণ পালন করে আসছেন বলে প্রবীণরা জানান। উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কঠোরভাবে নিরামিষ খাবার গ্রহণ। প্রার্থনার পাশাপাশি গান ও নৃত্য এ পার্বণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উৎসবের সময় যে লোকগানটি গাওয়া হয়, তার কথায়ও ফুটে ওঠে মাহালী জীবনের সরলতা ও সামষ্টিকতার ছবি।তবে জিতিয়া পার্বণের গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাহালী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নানা সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের কারণে মাহালী সমাজে এ উৎসবের চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে উৎসবটি নিয়মিতভাবে উদযাপিত না হওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই নিজেদের ঐতিহ্যের একটি অংশ অচেনা হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে মাহালী সম্প্রদায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুদ্ধারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে মাসাউসের নেতৃত্বে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় আবার জিতিয়া পার্বন উদযাপন শুরু হয়।মাসাউসের নির্বাহী পরিচালক মেরিনা হাঁসদার ভাষায়, প্রায় ৫০ বছর ধরে মাহালী সমাজের একটি অংশ ধর্মান্তরসহ নানা কারণে এই উৎসব থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। তাই জিতিয়া পার্বনকে তারা কেবল একটি পুরোনো উৎসব হিসেবে দেখছেন না; বরং মাহালী পরিচয়কে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। এই উদ্যোগে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাহালী তরুণদের মধ্যে নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্যবাহী দং ও ঝুমুর নাচ এবং মাদলের চর্চা বাড়ছে।জিতিয়া পার্বনের পুনর্জাগরণের এই ধারাটি এক দিনের নয়। ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বাগানপাড়া, ললিত নগরে উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়। পরে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পবা উপজেলার দামকুড়ায় এবং ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গোদাগাড়ীর কাকনহাটের শুরশুনিপাড়ায় আয়োজন করা হয়। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে তানোরের মুন্ডুমালা মাহালী পাড়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এ উৎসব। বিভিন্ন সময়ে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, অক্সফাম, এনএজিআর, সিসিবিভিও, কারিতাস, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমি, ইউসেপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সহযোগিতা করেছেন। ফলে উৎসবটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।প্রবীণ মাহালী সমাজের গুরুজন ও জিতিয়া পার্বণের ঠাকুর ষষ্ঠী টুডু তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের শিকড় ভুলে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের মূলকথা হলো—নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য প্রবীণদের কাছ থেকে শিখে নিতে হবে এবং গর্বের সঙ্গে তা ধরে রাখতে হবে। এই আহ্বানের গুরুত্ব আজকের সময়ে আরও বেশি। বিশ্বায়ন ও দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার কারণে ছোট জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি নানা চাপের মুখে পড়ছে। নতুন প্রজন্ম যদি নিজেদের ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই অনেক লোকজ জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক উপাদান হারিয়ে যেতে পারে।জিতিয়া পার্বন মাহালী সম্প্রদায়ের কাছে আনন্দ ও মিলনের উৎসব হওয়ার পাশাপাশি আত্মপরিচয় রক্ষারও একটি আয়োজন। এর মধ্য দিয়ে শিশুরা নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, তরুণেরা সাংস্কৃতিক চর্চায় যুক্ত হচ্ছে এবং প্রবীণদের কাছ থেকে হারিয়ে যেতে বসা রীতি ও স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। দং ও ঝুমুর নাচ, মাদলের ছন্দ, লোকগান, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং সম্মিলিত প্রার্থনা—সব মিলিয়ে এ উৎসব মাহালী জীবনের বহুমাত্রিক সংস্কৃতিকে ধারণ করছে।একটি দেশের বৈচিত্র‍্য তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেখানে বসবাসকারী সব জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মর্যাদা পায়। বাংলাদেশের আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর রয়েছে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণ শুধু সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর সমাজেরও দায় রয়েছে। কারণ একটি সংস্কৃতির বিলুপ্তি শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র‍্যকেই দরিদ্র করে।জিতিয়া পার্বনের মাদলের শব্দ তাই কেবল একটি উৎসবের আহ্বান নয়। এর মধ্যে রয়েছে শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার ডাক, নিজেদের ইতিহাস জানার আহ্বান এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়। মাহালীরা যেন নিজেদের ভাষা, গান, নাচ ও জীবনাচারকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন, সে জন্য এমন সাংস্কৃতিক উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। ঐতিহ্যকে শুধু স্মরণ করলেই হবে না, তাকে চর্চার মধ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। জিতিয়া পার্বনের প্রাণের উৎসব সেই চর্চারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

ভিডিও আরও দেখুন

৩৪৬ রানে শেষ বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস

মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে চলমান টেস্টের দ্বিতীয় দিনে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ২৯ রান যোগ করতেই গুটিয়ে গেছে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস।প্রথম দিনের ৮ উইকেটে ৩১৭ রান নিয়ে খেলা শুরু করে শেষ পর্যন্ত ৩৪৬ রানে অলআউট হয় স্বাগতিকরা। সফরকারী আফগান বোলারদের ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রিত বোলিং ও নিখুঁত লাইন-লেংথের সামনে টাইগারদের শেষদিকের ব্যাটাররা বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি।দিনের শুরুতেই উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন তাইজুল ইসলাম। মোহাম্মদ সেলিমের লেগ স্টাম্পের বাইরের বল পুল করতে গিয়ে টাইমিং মিস করেন তিনি। আম্পায়ার প্রথমে আউট না দিলেও আফগানিস্তানের নেওয়া রিভিউতে স্পষ্ট দেখা যায় বল তাইজুলের গ্লাভস স্পর্শ করেছিল। ফলে ৯ রান করে মাঠ ছাড়েন তিনি।এরপর শেষ ব্যাটার হিসেবে এবাদত হোসেন ৭ বল খেলেও রানের খাতা খুলতে ব্যর্থ হন। ইয়ামিন আহমাদজাইয়ের ধীরগতির ফুলার লেংথ বলে ব্যাটের বাইরের কানায় লেগে পয়েন্টে সহজ ক্যাচ তুলে দিয়ে সাজঘরে ফেরেন তিনি। অন্যপ্রান্তে অপরাজিত থেকে যান নাঈম হাসান। আফগানিস্তানের পক্ষে বিধ্বংসী বোলিং উপহার দিয়ে সর্বোচ্চ ৪টি উইকেট শিকার করেন মোহাম্মদ সেলিম, ৩টি উইকেট পান ইয়ামিন আহমাদজাই এবং ২টি উইকেট নেন ইসমত আলম।এর আগে ম্যাচের প্রথম দিনে বাংলাদেশের শুরুটা অবশ্য বেশ আশা ব্যাঞ্জকই ছিল। ওপেনিং জুটিতে তানজিদ হাসান তামিম ও সাদমান ইসলাম চমৎকারভিত্তি গড়ে তুলে যোগ করেন ১২৪ রান। দুর্দান্ত ছন্দে থাকা তানজিদ তামিম ৪১ বলে ঝোড়ো ফিফটি পূর্ণ করার পর ৮৩ রানের মাথায় ইসমত আলমের শিকার হয়ে সাজঘরে ফেরেন।এরপর সাদমান ইসলামও ৬৭ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে আউট হন। তবে উদ্বোধনী জুটি ভাঙার পর হঠাৎ করেই টাইগারদের ইনিংসে ভয়াবহ ধস নামেন। মাত্র ৫ রানের ব্যবধানে সাজঘরে ফেরেন নির্ভরযোগ্য ব্যাটার মুমিনুল হক, অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম এবং অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। এর মধ্যে মুশফিক ৭ বল খেলে শূন্য রানে ইয়ামিনের দুর্দান্ত ইনসুইং ইয়র্কারে বোল্ড হয়ে হতাশাজনকভাবে বিদায় নেন।মাঝপথে বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চালান লিটন কুমার দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ। দুজনে মিলে গড়ে তোলেন গুরুত্বপূর্ণ ৬২ রানের একটি জুটি। কিন্তু মিরাজ ২৪ রান করে আউট হওয়ার পর ক্যারিয়ারের ২১তম ফিফটি হাঁকানো লিটন দাসও ৫২ রান করে মোহাম্মদ সেলিমের শিকার হন।লিটনের বিদায়ের পরপরই হাসান মাহমুদ ২ রানে বোল্ড হলে বাংলাদেশের বড় সংগ্রহের স্বপ্ন ভেস্তে যায়। শেষ পর্যন্ত প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ৩৪৬ রানে থমকে দাঁড়ায়, যা ম্যাচের বাকী অংশের লড়াইকে আরও রোমাঞ্চকর মোড়ে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।

৩৪৬ রানে শেষ বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস