সংবাদ
ডিজিটাল ডাটাবেজে যুক্ত হচ্ছে নিকাহ রেজিস্ট্রি

ডিজিটাল ডাটাবেজে যুক্ত হচ্ছে নিকাহ রেজিস্ট্রি

অনলাইনে বিয়ে-তালাক নিবন্ধনে বন্ধ হবে তথ্য গোপনজানা যাবে এনআইডি সার্ভার থেকেইবহুবিয়ে ও বাল্যবিয়ে রোধে কঠোর অবস্থান সরকারেরঅনলাইনে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে তথ্য গোপন করে দেশের কোথাও আর বহুবিয়ে কিংবা বাল্যবিয়ের সুযোগ থাকবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।তিনি বলেছেন, বিয়ে নিবন্ধনের সকল তথ্য পর্যায়ক্রমে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্মনিবন্ধন এবং পাসপোর্টের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। ফলে একজন ব্যক্তি অতীতে বিবাহিত কি না, একাধিক বিয়ে থাকলে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এবং নতুন বিয়ের ক্ষেত্রে আইনগত পূর্বানুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা মুহূর্তেই খুব সহজেই যাচাই করা সম্ভব হবে।শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে ‘অনলাইনে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধনে সফটওয়্যারের ব্যবহারবিধি এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি’ শীর্ষক এক আবাসিক প্রশিক্ষণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো বলেন।আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান আরও বলেন, অনলাইনে এই নিবন্ধনের ফলে দেশের বৈবাহিক সম্পর্কের সম্পূর্ণ তথ্য একটি সমন্বিত ডাটাবেজে নিরাপদে সংরক্ষিত থাকবে। এতে দেশের কোথাও বাল্যবিয়ে হচ্ছে কি না, প্রতিবছর মোট কতটি বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে এবং বিয়ে-সংক্রান্ত প্রচলিত আইনগুলো যথাযথভাবে কার্যকর করা হচ্ছে কি না, এসব তথ্য নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করা সহজতর হবে।তিনি উল্লেখ করেন, কোনো ব্যক্তি পূর্বে বিবাহিত থাকলে অনলাইনে তা সহজেই যাচাই করে নতুন বিয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না তা পরিষ্কার দেখা যাবে। এতে গোপন বিয়ে, তথ্য গোপন রাখা এবং পরবর্তীতে বিয়ে অস্বীকার করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর আগের বৈবাহিক সম্পর্কের সঠিক তথ্য জানার সুযোগও তৈরি হবে।ভবিষ্যতের আইনি জটিলতা নিরসনের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, মৃত্যুর পর স্ত্রী বা সন্তান পরিচয়ে একাধিক ব্যক্তি সম্পত্তি বা অধিকার দাবি করলেও এই নিবন্ধিত ডিজিটাল তথ্যের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য সহজেই যাচাই করা যাবে। এমনকি বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনে অনলাইনেই বৈবাহিক তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব নিকাহ রেজিস্ট্রারকে এই আধুনিক অনলাইন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।‘সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স’ শীর্ষক পাইলট প্রকল্পের এই অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের সচিবসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
৫ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

শিশু-কিশোরের হাতে গাড়ি ও আইফোন: করুণ পরিণতির দায়

একজনের বয়স ১৭। আরেকজনের ১৩। একজন গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে দুর্ঘটনায় একজন শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনায় এখন শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে। অন্যজন মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়ে আর ঘরে ফেরেনি। পরে উদ্ধার হয়েছে তার মরদেহ।আলাদা দুটি ঘটনা। প্রেক্ষাপটও আলাদা। কিন্তু দুটিই আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়—শিশুদের হাতে আমরা কতটা ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও প্রযুক্তি তুলে দিচ্ছি, আর সেই সঙ্গে কতটা দায়িত্ব, সীমারেখা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি?বারিধারার ঘটনায় ১৭ বছরের কিশোরটির বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে। তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় ঘটনার পূর্ণ সত্য বেরিয়ে আসবে। একইভাবে অপ্রতিমের মৃত্যুর কারণ, কীভাবে তার মৃত্যু হলো এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত— সেটিও তদন্তেই নিশ্চিত হবে। তাই কোনো ঘটনার পুরো সত্য জানার আগে কাউকে দায়ী করে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এই ঘটনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে। বরং প্রশ্ন তোলাই জরুরি।গাড়ি, দামি ফোন— কিন্তু দায়িত্ববোধ?একটি গাড়ি শুধু একটি যানবাহন নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে চালকের দক্ষতা, বয়স, আইন মানার সক্ষমতা এবং অন্য মানুষের জীবনের প্রতি দায়িত্ববোধ। একইভাবে একটি স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়। এটি শিশুর সামনে খুলে দেয় বিশাল এক ভার্চুয়াল জগৎ— বন্ধুত্ব, বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগ, অজানা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, নানা ধরনের কনটেন্ট এবং কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কের দরজাও।সন্তানের হাতে গাড়ি বা আইফোন দেওয়া যাবে কি না— প্রশ্নটা শুধু এতটুকু নয়। প্রশ্ন উঠেছে- সন্তানের বয়স, মানসিক পরিপক্বতা, দায়িত্ববোধ এবং নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে অভিভাবকরা কীভাবে এসব সুবিধা দিচ্ছেন? সবচেয়ে কঠিন জায়গা এখানেই। সন্তানকে ভালোবাসা মানে তার প্রতিটি চাওয়া পূরণ করা নয়। কখনো ভালোবাসার অর্থ ‘হ্যাঁ’, আবার কখনো ভালোবাসার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শব্দটি ‘না’।অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের কী শেখায়?১৩ বছরের অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়েছিল। এরপর সে আর বাড়ি ফেরেনি। প্রায় ২০ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যুর পেছনে কী ঘটেছিল, কারা জড়িত ছিল— এসব তদন্তের বিষয়। কিন্তু একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের উৎকণ্ঠা এবং তাকে খুঁজে বের করার প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের ভাবায়।একটি শিশু যখন বাড়ি থেকে বের হয়, তার সঙ্গে কে আছে— আমরা কি জানি? সে কোথায় যাচ্ছে— আমরা কি সেটা জানি? তার বন্ধুরা কারা— সে খোঁজ কি নিয়েছি? এছাড়া সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে— সেসব বিষয়ে কোনো নজরদারি আমরা কি করছি? সে নিয়মিত কোথায় আড্ডা দেয়, কোন জায়গাগুলোতে যায়, তার চেয়ে বয়সে অনেক বড় কারও সঙ্গে মেলামেশা করছে কি না— এসব বিষয়ে আমরা কখনো তার সঙ্গে কথা বলি? এসব প্রশ্নের অর্থ এই নয় যে সন্তানকে সারাক্ষণ সন্দেহ করতে হবে। বরং এর অর্থ হলো— সন্তানের জীবনে অভিভাবকের উপস্থিতি থাকতে হবে।শুধু ‘পুলিশের দায়িত্ব’ বললেই কি শেষ?পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই— গত ৭ মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ জন শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। কিন্তু ২ হাজার ৩৮ জন শিশুর এখনো সন্ধান মেলেনি।এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার আছে। একজন মা আছেন, যিনি সন্তানের অপেক্ষায় দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন। একজন বাবা আছেন, যিনি হয়তো প্রতিদিন থানায় যোগাযোগ করছেন। ভাই-বোন আছে, যারা অপেক্ষা করছে— একদিন হয়তো দরজা খুলে তাদের আপনজন ফিরে আসবে।নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছবি, সর্বশেষ অবস্থান, মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য— যত দ্রুত এসব তথ্য কাজে লাগানো যায়, শিশুকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তত বাড়তে পারে। এ কারণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে দ্রুত, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক অনুসন্ধান নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে পরিবারকেও জানতে হবে, নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত কী পদক্ষেপ নিতে হবে।অভিভাবকের দায়িত্ব কোথায়?সন্তানকে ‘চোখে চোখে রাখা’ মানে তাকে বন্দি করে রাখা নয়। তার ব্যক্তিগত পরিসর ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মান রেখেই নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়। প্রথম কাজ সন্তানের বন্ধুদের চিনুন।সে কার সঙ্গে সময় কাটায়, তাদের বয়স কত, কোথায় যায় সেসব জানুন। সন্তানের বন্ধুদের সম্পর্কে জানতে চাওয়া মানেই তাদের ওপর অবিশ্বাস করা নয়। বরং সন্তানের নিরাপত্তার জন্য এটি স্বাভাবিক দায়িত্ব।দ্বিতীয়ত প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে জানুন। সন্তান কোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে, কী ধরনের ভিডিও দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে— এসব নিয়ে বন্ধুর মতো কথা বলতে হবে। শুধু ফোন কেড়ে নেওয়া বা বকাঝকা করলে অনেক সময় শিশু আরও গোপনীয় হয়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ম পরিবারেই স্পষ্ট হওয়া দরকার।তৃতীয় কাজ হলো তার বয়স অনুযায়ী সীমারেখা তৈরি করুন। যে বয়সে গাড়ি চালানোর অনুমতি নেই, সে বয়সে গাড়ির চাবি তুলে দেওয়া শুধু স্বাধীনতা নয়, অন্য মানুষের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। একইভাবে দামি ফোন দেওয়ার আগে ভাবতে হবে, শিশুটি সেটি ব্যবহারের দায়িত্ব ও ঝুঁকি বোঝে কি না।চতুর্থত তাকে সময় দিন। দামি স্কুল, পোশাক, ফোন, খেলনা কিংবা গাড়ি সন্তানের প্রয়োজনের একটি অংশ হতে পারে। কিন্তু সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তার কথা শোনা এবং তার পরিবর্তনগুলো বোঝার বিকল্প কোনো বস্তুগত সুবিধা হতে পারে না। প্রতিদিন কিছু সময় শুধু সন্তানের জন্য রাখা যেতে পারে। সেই সময়ে জিজ্ঞাসাবাদ নয়, কথা হোক। সে কী ভাবছে, কী নিয়ে আনন্দিত, কী নিয়ে ভয় পাচ্ছে, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে— এসব জানার চেষ্টা করা জরুরি।শুধু পরিবার নয়, সমাজেরও দায় আছেএকটি শিশুর নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু মা-বাবার নয়। স্কুল, শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী— সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।শিশুর আচরণে হঠাৎ বড় পরিবর্তন, অস্বাভাবিক বন্ধুত্ব, বাড়ির বাইরে দীর্ঘ সময় কাটানো, ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় যাতায়াত বা অনলাইনে অস্বাভাবিক যোগাযোগ— এসবকে শুধু ‘বয়সের দোষ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। আবার কোনো শিশুকে বিপথে যাওয়ার আশঙ্কা দেখলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও ঠিক নয়। শিশুর ক্ষেত্রে প্রয়োজন নজরদারির পাশাপাশি সহমর্মিতা, কাউন্সেলিং, শিক্ষা এবং নিরাপদ পরিবেশ।অপ্রতিমরা ফিরবে না, কিন্তু প্রশ্ন থাকবেঅপ্রতিম আর ফিরবে না। তার পরিবারের শোক কোনো ভাষায় পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা হয়ে থাকতে পারে— যদি আমরা শিক্ষা নিতে চাই।একইভাবে বারিধারার ঘটনায় ১৭ বছরের এক কিশোরের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং কীভাবে এলো, সেটিও তদন্তের পাশাপাশি অভিভাবক, সমাজ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।শিশুর হাতে গাড়ি তুলে দেওয়ার আগে আমরা কি তার দায়িত্ববোধ যাচাই করেছি? তার হাতে দামি স্মার্টফোন দেওয়ার আগে আমরা কি তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা শিখিয়েছি? সন্তান বাইরে গেলে সে কার সঙ্গে আছে, কোথায় আছে- সেসব বিষয়ে খোজ কী রাখছি? আর সবচেয়ে বড় কথা, সন্তানকে বাবা-মায়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কথা বলার মতো নিরাপদ পরিবেশ কি আমরা তৈরি করেছি?সন্তানকে ভালোবাসা মানে শুধু তার চাহিদা পূরণ করা নয়। ভালোবাসা মানে প্রয়োজনের সময় সীমা টেনে দেওয়া, ভুল থেকে ফিরিয়ে আনা, বিপদের আগে সতর্ক করা এবং এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যাতে বিপদে পড়লে সে সবার আগে মা-বাবার কাছেই ফিরে আসে।একটি আইফোন সন্তানের হাতে দেওয়া যায়, কিন্তু তার সঙ্গে দায়িত্ববোধ না দিলে সেটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। গাড়ির চাবি দেওয়া যায়, কিন্তু আইন ও জীবনের মূল্য না শেখালে সেটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে আমরা তাদের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু সেই পৃথিবীতে কীভাবে নিরাপদে চলতে হয়— সেটিও শেখাতে হবে। কারণ সন্তানকে চোখে চোখে রাখা মানে তাকে বন্দি করা নয়; তাকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব নেওয়া।অপ্রতিমের পরিবারের কান্না যেন শুধু একটি পরিবারের কান্না হয়ে না থাকে। বারিধারার ঘটনাও যেন কেবল একটি মামলার নথিতে আটকে না যায়। এই ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের প্রত্যেক মা-বাবার অন্তত একবার ভাবা উচিত— সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কী দেখে, কী করে? এছাড়া কোন কারণে বিপদে পড়লে, সে কি আমাকে সবকিছু সাহস করে বলতে পারবে?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে সচেতনভাবে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প অভিভাবকদের নেই।লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

বাংলাদেশের রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থার আয়না ফুটপাত

ঢাকার কোনো ব্যস্ত ফুটপাতে দাঁড়ালে একই সঙ্গে দুটি ছবি দেখা যায়। একদিকে পথচারীর ভিড়, যানজট, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার অসুবিধা। অন্যদিকে সারি সারি ছোট দোকান, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি, চা-নাশতার দোকান, কাপড়, জুতা, ফল, খেলনা কিংবা নানা রকম পণ্যের পসরা। একজনের কাছে এটি চলাচলের পথ, আরেকজনের কাছে সেটিই তার দোকান, সংসারের আয় এবং বেঁচে থাকার অবলম্বন।এই দুই বাস্তবতার মধ্যে দ্বন্দ্ব নতুন নয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ফুটপাতের সমস্যাটি শুধু নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, গ্রাম থেকে শহরে মানুষের আসা, রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো এবং চাঁদাবাজি। তাই ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। আবার হকারদের নামে ফুটপাত দখল করে পথচারীদের চলাচলের অধিকার কেড়ে নেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।আসল প্রশ্ন হলো, এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় হবে কীভাবে? এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশে রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল ও সমাজ—এই চারটির সম্পর্কও বুঝতে হয়।আইনের দৃষ্টিতে ফুটপাত সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা। সেখানে স্থায়ীভাবে দোকান বসানোর অধিকার কারও নেই। কিন্তু বাস্তব জীবনে ফুটপাত অনেক দিন ধরেই শহরের অর্থনীতির একটি অংশ।কারণ, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য ছোট ব্যবসা ও হকারি হচ্ছে জীবিকার পথ। দোকান ভাড়া নেওয়া, অগ্রিম টাকা দেওয়া, বিদ্যুৎ-পানি ও অন্যান্য খরচ বহন করা অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। ফুটপাত তাই তাদের কাছে সবচেয়ে সহজ প্রবেশের জায়গা। এই বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশের নয়। বিশ্বের অনেক শহরেই রাস্তার পাশে ছোট ব্যবসা আছে। ব্যাংককের রাতের বাজার, জাপানের বিভিন্ন শহরের ছোট রাস্তার দোকান কিংবা নিউইয়র্কের পথের খাবারের দোকান—সবই দেখায়, জনপরিসর ও ছোট ব্যবসার মধ্যে একটি সম্পর্ক আছে।পার্থক্য হলো, অনেক দেশে এই অর্থনীতিকে নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। কোথায় দোকান বসবে, কতক্ষণ বসবে, কতটুকু জায়গা ব্যবহার করা যাবে—এসব নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ব্যবস্থাটি এখনো দুর্বল। ফলে ফুটপাত একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পত্তি এবং সমাজের বাস্তব অর্থনৈতিক পরিসর হয়ে আছে।সমস্যাটা তখনই বড় হয়, যখন এর মধ্যে ঢুকে পড়ে রাজনীতি।হকারি নিজে অপরাধ নয়। ছোট ব্যবসা করাও অপরাধ নয়। কিন্তু যখন একজন হকারকে ফুটপাতে বসার জন্য স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নিয়মিত টাকা দিতে হয়, তখন বিষয়টি আর শুধু অর্থনীতির থাকে না। তখন তৈরি হয় একটি আলাদা ব্যবস্থা।কোথায় কে বসবে, কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হবে, কে কাকে ‘রক্ষা’ করবে—এসবের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের হাতে। এখানেই সমস্যার গভীরতা। রাষ্ট্রের আইন যেখানে বলে, ফুটপাত সবার, সেখানে স্থানীয় ক্ষমতার রাজনীতি বলে—এই জায়গা অমুকের, ওই জায়গা তমুকের। ফলে হকারের কাছে আইন নয়, অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কার সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে।‘পাতি নেতা’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?বাংলাদেশের স্থানীয় সমাজের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—অনেক বিরোধ বা প্রয়োজনের সমাধান আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে স্থানীয় মানুষ ও নেতাদের মাধ্যমে হয়। বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া বিরোধ, বাজারের ব্যবসায়ীদের ঝামেলা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে বিরোধ—অনেক ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো স্থানীয় নেতা বা মধ্যস্থতাকারী সেখানে উপস্থিত থাকেন।এই কারণে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা শুধু দলের কর্মী নন। অনেক সময় তিনি এলাকার ক্ষমতার মধ্যস্থতাকারীও। এই ব্যবস্থার ভালো ও খারাপ—দুই দিকই আছে। কোনো বিরোধ বড় সংঘাতে যাওয়ার আগে একজন স্থানীয় নেতা তা থামিয়ে দিতে পারেন। আবার সেই ক্ষমতাই ব্যবহার করে তিনি চাঁদা তুলতে পারেন, জায়গা দখল করতে পারেন বা নিজের অনুসারীদের সুবিধা দিতে পারেন।অর্থাৎ একই ব্যক্তি একদিকে বিরোধ ঠেকাতে পারেন, অন্যদিকে সেই ক্ষমতার ওপর নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থও তৈরি করতে পারেন। এটাই বাংলাদেশের স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য।সরকার আর দল এক নয়এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি হলো সরকার ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে। সরকারের দায়িত্ব নাগরিকদের জন্য নিয়ম তৈরি করা এবং তা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা। রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় সংগঠন সরকারি ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে ওঠে, তখন সমস্যা তৈরি হয়। হকার কোথায় বসবেন, কে তাকে রক্ষা করবে, কার কাছে অভিযোগ করবেন—এসবের উত্তর যদি প্রশাসনের বদলে স্থানীয় দলীয় নেতার কাছে পাওয়া যায়, তাহলে রাষ্ট্রের জায়গায় একটি অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামো তৈরি হয়। তখন হকারও সেই ব্যবস্থার অংশ হয়ে যান। তিনি টাকা দেন, বিনিময়ে জায়গা ও নিরাপত্তা পান। নেতা টাকা নেন, বিনিময়ে তার প্রভাব ধরে রাখেন।দুই পক্ষের এই সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। কারণ ফুটপাত তখন আর পুরোপুরি পথচারীর থাকে না। প্রশ্ন আসে, উচ্ছেদ করলেই কি সমস্যা মিটবে? এক কথায় উত্তর হচ্ছে, না। কারণ হকারকে সরিয়ে দিলে তার জীবিকার প্রশ্নটি থেকে যায়।উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কারওয়ানবাজারের রহিমা বেওয়ার মতো বয়স্ক নারী যদি ফুটপাতে ছোট দোকান করে সংসার চালান, তার দোকান ভেঙে দিলে শুধু একটি অবৈধ স্থাপনা সরানো হয় না; তার পরিবারের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।অন্যদিকে হকারের জন্য ফুটপাত ছেড়ে দিলে পথচারীর চলাচলের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাহলে সমাধান কোথায়? সমাধান হলো, দুটো সমস্যাকেই একই সঙ্গে স্বীকার করা। হকারের জীবিকা যেমন বাস্তব, পথচারীর চলাচলের অধিকারও তেমনই বাস্তব।বিশ্বের শহরগুলো কী করেছে?অনেক শহর এই সমস্যাকে উচ্ছেদ দিয়ে নয়, ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মোকাবিলা করেছে। ব্যাংককের উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে রাস্তার খাবার ও ছোট ব্যবসা শহরের জীবন ও পর্যটনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে সব জায়গায় সব সময় দোকান বসানোর অনুমতি নেই। কোথায় বসা যাবে, কখন বসা যাবে—এসব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নিয়ম করা হয়েছে। নিউইয়র্কেও রাস্তার ছোট ব্যবসার জন্য অনুমতি, নির্দিষ্ট স্থান ও ফুটপাত ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে। অর্থাৎ প্রশ্নটি ‘হকার থাকবে কি থাকবে না’—এমন নয়। প্রশ্ন হলো, হকার থাকবে কীভাবে। বাংলাদেশেও এই ভাবনাটিই দরকার।প্রথম কাজ হতে পারে ঢাকার সব গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাতের একটি পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি করা। কোথায় কতটুকু ফুটপাত আছে, কোথায় মানুষের চলাচল বেশি, কোথায় স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, মেট্রো স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ড—সব তথ্য এক জায়গায় থাকতে হবে। তারপর ঠিক করা যেতে পারে, কোন ফুটপাত পুরোপুরি পথচারীর জন্য থাকবে এবং কোথায় সীমিত পরিসরে হকার বসতে পারবেন। কিছু এলাকায় সময়ও ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে।ধরা যাক, দিনের কর্মঘণ্টায় ফুটপাত পুরোপুরি পথচারীর জন্য থাকবে। বিকেলের পর নির্দিষ্ট অংশে হকার বসতে পারবেন। রাত শেষে আবার সেই জায়গা খালি করতে হবে। এতে একই জায়গা দিনের এক সময়ে চলাচলের জন্য এবং অন্য সময়ে ছোট ব্যবসার জন্য ব্যবহার করা সম্ভব।স্থায়ী দোকান নয়, চলমান কার্টআরেকটি ব্যবস্থা হতে পারে স্থায়ী দোকানের বদলে চলমান ঠেলাগাড়ি বা ছোট কার্ট। হকারের নিবন্ধন থাকবে। পরিচয়পত্র থাকবে। কোন এলাকায় তিনি ব্যবসা করতে পারবেন, সেটিও নির্ধারিত থাকবে। দিন শেষে কার্ট রাখার জন্য এলাকায় সরকারি বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট জায়গা থাকতে পারে। তাহলে ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখল হয়ে থাকবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই নিবন্ধন যেন দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে না হয়। কে কোন দলের লোক, কার সঙ্গে কার সম্পর্ক—এসব যদি বিবেচনার বিষয় হয়, তাহলে নতুন ব্যবস্থাও পুরোনো চাঁদাবাজির ব্যবস্থায় পরিণত হবে। নিবন্ধনের ভিত্তি হতে হবে প্রয়োজন, জীবিকা ও স্বচ্ছ নিয়ম।আসল সংস্কার রাজনৈতিকতবে এখানেই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসে। হকারের জন্য পরিচয়পত্র দিলেই কি চাঁদাবাজি বন্ধ হবে? হবে না। কারণ চাঁদাবাজির যে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটি ভাঙা না গেলে হকারের ওপর পুরোনো চাপ ফিরে আসবে।একজন হকার তখন বলতে পারবেন—‘আমার সরকারি পরিচয়পত্র আছে।’ কিন্তু স্থানীয় নেতা যদি বলেন, ‘আমার টাকা না দিলে এখানে বসতে পারবে না’, তাহলে সেই পরিচয়পত্রের মূল্য খুব বেশি থাকবে না। তাই ফুটপাত ব্যবস্থাপনার সংস্কারকে শুধু সিটি করপোরেশনের কাজ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি রাজনৈতিক সংস্কারেরও প্রশ্ন।বাংলাদেশের জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রচিন্তাবাংলাদেশের রাষ্ট্রকে শুধু উচ্ছেদকারী রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে চলবে না। রাষ্ট্রের একটি কাজ হলো আইন প্রয়োগ করা। কিন্তু আরেকটি কাজ হলো সমাজের বাস্তবতাকে বুঝে সেই বাস্তবতার জন্য নিয়ম তৈরি করা। হকার আছে—এই বাস্তবতা অস্বীকার করে তাকে সরিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু তাতে হকারি বন্ধ হবে না। অন্য কোথাও গিয়ে আবার ফুটপাত দখল হবে। তাই রাষ্ট্রকে বলতে হবে—হকারি থাকবে, কিন্তু নিয়মের মধ্যে থাকবে। ফুটপাত থাকবে পথচারীর জন্য, কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গায় ও নির্দিষ্ট সময়ে ক্ষুদ্র ব্যবসাও থাকবে। রাজনৈতিক দল থাকবে, কিন্তু ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করবে না। স্থানীয় নেতা থাকবেন, কিন্তু প্রশাসনের বিকল্প হবেন না। হকারের সংগঠন থাকবে, কিন্তু চাঁদাবাজির হাতিয়ার হবে না। এই ভারসাম্য তৈরি করাই মূল কাজ।ফুটপাত বাংলাদেশের আয়না কীভাবেঢাকার ফুটপাতের দিকে তাকালে বাংলাদেশের সমাজের একটি বড় ছবি দেখা যায়। এখানে দরিদ্র মানুষের জীবিকার প্রয়োজন আছে। আছে নাগরিকের চলাচলের অধিকার। আছে অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি। আছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। আছে প্রশাসনের দুর্বলতা। আছে স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো।সবকিছু মিলেই ফুটপাত। তাই ফুটপাতের সমস্যার সমাধান শুধু ফুটপাত থেকে মানুষ সরিয়ে দেওয়া নয়। প্রশ্ন হলো, যে সমাজে কোটি মানুষের জীবিকা অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল, সেই সমাজকে আমরা কীভাবে নিয়মের মধ্যে আনব—তাদের জীবিকা নষ্ট না করে? এর উত্তর হয়তো উচ্ছেদে নয়, ব্যবস্থাপনায়।চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে, হকারি নয়ফুটপাত পথচারীর জন্য রাখতে হবে, কিন্তু হকারকে শত্রু  বানিয়ে নয়। রাজনৈতিক দলকে সংগঠিত হতে দিতে হবে, কিন্তু অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক হতে নয়। আর রাষ্ট্রকে শুধু আইন প্রয়োগকারী হিসেবে নয়, সমাজের বিভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে ন্যায়সংগত সমন্বয় তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে হবে। কারণ ফুটপাতের সংকট শেষ পর্যন্ত ফুটপাতের সংকট নয়। এটি প্রশ্ন তোলে—রাষ্ট্র কার জন্য, সরকার কার জন্য এবং শহরটি আসলে কার?

নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে!

আমরা আমাদের দু’চোখ দিয়ে গাছপালা, আকাশ, নদী, পাহাড়, পর্বত, মানুষজন—সবকিছুই দেখি। কিন্তু যে শক্তির কারণে আমরা দেখতে পাই, সেই পরম শক্তিকে আমরা দেখি না। কারণ সেই পরম শক্তি তো বাইরে নয়, রয়েছে আমাদের চোখের ভেতর—দৃষ্টি বা আলো হয়ে। রবীন্দ্রনাথ এ কথাই লিখেছিলেন কবিতার ভাষায়, আর গানের সুরে সুরে—‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।’ কিন্তু না, এবার আমরা ঠিকই দেখে ফেলেছি। চোখের সেই বিচ্ছুরিত আলোয় গোটা দেশবাসী এবার দেখতে পেল এক নয়নকে এবং তার পরম শক্তিমত্তাকে। হ্যাঁ, রবিউল ইসলাম নয়নকে আমরা নয়ন ভরে দেখতে পেয়েছি। দেখেছি, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ জাসদ কার্যালয় জয় করে বীরের বেশে কার্যালয়ের তিনতলার বারান্দা থেকে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় স্লোগান উচ্চারণ করছেন, আর নিচে দাঁড়ানো ভক্তকুল তার প্রতিধ্বনি করছেন।মাগুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্যসচিব নয়ন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মাত্র কয়েক দিনে তার ভাগ্য বদলে ফেলেন। সরকার বদলের পরপরই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। তার বিরুদ্ধে দখল ও চাঁদাবাজির নানা অভিযোগ পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে। তার দৃশ্যমান কোনো আয় নেই। তার ভাষায়, ‘এক মামা তার বাসা ভাড়ার টাকা দেন। আরেক ভাই তার যাতায়াতের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এবং বাকি খরচ তিনি শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় থেকে নির্বাহ করেন।’ তবে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তিনি ৫ আগস্ট-পরবর্তী মাত্র কয়েক দিনে দখল আর চাঁদাবাজির রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এ সময় তার নামে ইসলামী ব্যাংকে হামলা, একটি টেলিভিশন চ্যানেল দখলের প্রচেষ্টা ইত্যাদি অভিযোগ ওঠায় দলের মধ্যেও নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অবশ্য দলের চেয়ারপারসনের গাড়ির সামনে দৌড়ে দৌড়ে তিনি কিছুটা ড্যামেজ কন্ট্রোল করেন এবং কেন্দ্রীয় যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক পদেও অধিষ্ঠিত হন।হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সাংগঠনিক কর্মসূচি হিসেবে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গত ২৬ সেপ্টেম্বর একটি প্রতিনিধি সভা আহ্বান করে। ঘরোয়া হলেও সভাটি যেহেতু বড় আকারের ছিল, তাই তারা পুলিশকেও অবহিত করে সভাটির আয়োজন করে। জাসদ কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকায় নিশ্চয়ই পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা তৎপরতা আছে। তাই উক্ত সভাকে কেন্দ্র করে কোনো ষড়যন্ত্র বা নাশকতামূলক তৎপরতা সন্দেহ করলে পুলিশ নিশ্চয়ই সভা শুরুর আগেই তা বন্ধ করে দিত। কিন্তু সরকারের গোয়েন্দা তৎপরতা ব্যর্থ হতে পারে, নয়নের নয়ন তো ব্যর্থ হতে পারে না!নয়ন বলেছেন, তার নেটওয়ার্কে নাকি ধরা পড়েছে—জাসদের আড়ালে সেখানে আওয়ামী লীগের ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ জমায়েত হচ্ছিল। তিনি তার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ‘ষড়যন্ত্র’ রুখে দেওয়ার জন্য ঢাকা দক্ষিণের আওতাধীন এলাকা থেকে তার ভক্তকুলকে জাসদ অফিসের সামনে সমবেত করে প্রথমে এক দফা প্রতিনিধিদের ওপর হামলা ও হেনস্তার ব্যবস্থা করলেন। তারপর পুলিশ ডাকলেন। পুলিশ বাহিনীর কমান্ড নিজেই নিয়ে নিলেন। অতঃপর ২৮৯ জন প্রতিনিধিকে আটক করা হলো। আটক প্রতিনিধিরা পুলিশের গাড়িতে ওঠার সময় আরেক দফা তাদের হেনস্তার ব্যবস্থা করে তিনি উঠে গেলেন জাসদ কার্যালয়ের বারান্দায় এবং সেখান থেকে বিজয়ের স্লোগান দিয়ে ক্ষান্ত হলেন।জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার উচ্ছেদ করার পর এই হলো একেবারে ‘নির্ভেজাল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা’। সেই ‘গণতন্ত্রকে’ সমুন্নত রাখতে আবার রাতের মধ্যেই ২৭ জন বাদে অন্য সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ২৭ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, “জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে তারা জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন।”কিন্তু প্রশ্ন হলো, জাসদ অফিসের ভেতরে তারা যে ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিলেন’, এমন অভিযোগ কি জাসদ দিয়েছে? তাহলে কিসের ভিত্তিতে এ অভিযোগ? পুলিশ বা সরকার বলতে চায়, জয় বাংলা স্লোগান দেওয়াটাই বিশৃঙ্খলা বা গোলমাল সৃষ্টি। সরকারের বয়স তো সবে সাত মাস। জয় বাংলা স্লোগানকে তারা এত ভয় পেলে বাকি সময় দেশ চালাবেন কীভাবে?জয় বাংলা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ছিল। আমার মনে পড়ে, মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং সেন্টারে আমরা একটু নিজেদের স্বাতন্ত্র‍্য প্রকাশের জন্য স্লোগান দিতাম—‘জয় স্বাধীন বাংলা’। মর্মবস্তু তো একই। জয় বাংলা স্লোগানটা দলীয়করণ হয়ে যাওয়ায়, আবার যাতে করে স্বাধীন দেশে উগ্র জাত্যাভিমান সৃষ্টি না হয় এবং এর আড়ালে মানুষের রুটি-রুজির স্লোগান চাপা না পড়ে, সেজন্য হয়তো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দল এ স্লোগানকে আওয়ামী লীগের মতো দিবানিশি উচ্চারণ করে না। কিন্তু তারা কেউই জয় বাংলার বিরোধী নয়। তবে ন্যায়-অন্যায় সব ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মাহাত্ম্যকে মলিন করেছে। এখন সরকার, বিএনপি, এনসিপি, জামায়াত কি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে, যাতে মুক্তিযুদ্ধের এই রণধ্বনি আবার নতুন করে উচ্চারণ করতে সবাই বাধ্য হয়?শুধু একজন রবিউল ইসলাম নয়ন নন, শাসকদলের এলাকাভিত্তিক নেতাকর্মীদের একাংশ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন, যা কিন্তু প্রকৃতই দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। অতি সম্প্রতি মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। শত শত লোক এক্সকাভেটর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে এসব ভাঙচুরে অংশ নিলেন এবং এই দীর্ঘ সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখা মিলল না। সরকারি দল বিএনপির লোকজনের সম্পৃক্ততা থাকার কারণেই কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে তো বিএনপিরই একজন সংসদ সদস্য জড়িত থাকারও অভিযোগ উঠেছে। এটা প্রশংসনীয় যে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিএনপি হাইকমান্ড ওই সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি ইতোমধ্যে পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমাও দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম কোনো সংসদ সদস্যকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে পদত্যাগ করতে হলো।তবে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র আর মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই ‘দুই জন নয়ন’ বাংলাবাজারের ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্রে এসে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি বিক্রি করা নিয়ে আপত্তি তুলে বলেন, বইটি নিষিদ্ধ। একপর্যায়ে তারা আরও লোকজন জড়ো করে মব সৃষ্টি করলে পুলিশ এসে বিক্রয়কেন্দ্রের দুই কর্মীকে আটক করে। পরবর্তীতে এই বই আর বিক্রি করবে না—এই শর্তে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কেমন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি! বইটি নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু বিক্রি করা যাবে না। অনেকটা আওয়ামী লীগের মতো অবস্থা—অর্থাৎ ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ বই’!এনসিপি-জামায়াতের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে তো আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু ছিল না। ছিল মবের রাজত্ব। মাঝখানে সামান্য উন্নতির আভাস দেখা গেলেও আবার পূর্বাবস্থায় চলে গেছে। ইউনূস আমলে মবকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। ইউনূসের মুখপাত্র শফিকুল আলম বলেছিলেন, মব নয়, এদেরকে প্রেসার গ্রুপ বলা যেতে পারে। যেমনটা জাসদ অফিসে হামলাকে নয়ন এখন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন—‘তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন মানবিক সরকারের আমলে জাসদ অফিস থেকে আটক প্রতিনিধিদের ওপর বিক্ষুব্ধ জনগণ যাতে হামলা করতে না পারে, সেজন্য ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনি তার সমর্থকদের ডেকে এনেছেন এ পবিত্র দায়িত্ব পালনে।’জাসদ প্রতিনিধিদের জন্য তার এই দরদ দেখে জাসদ নেতৃবৃন্দও এখন ঠাওর করতে পারছেন না—তার ‘নয়ন ভরা জল আর দুহাত ভরা ফুল’ থেকে এখন ফুল নেবেন, না অশ্রু নেবেন! নয়নবাহিনী যে ব্যাখ্যাই দিক না কেন, দেশজুড়ে একটার পর একটা এ ধরনের ঘটনায় নাগরিক সমাজ, সাধারণ মানুষ—সবাই উদ্বিগ্ন। তাদের ‘দু নয়নে ভয় আছে, মনে সংশয় আছে’—এর শেষ কোথায়!(লেখকের নিজস্ব মত)লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা

যখন মধ্যবিত্তের আশা ফুরিয়ে যায়

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি একটি সহজ সামাজিক চুক্তির ওপর গভীর আস্থা রেখে এসেছে—মন দিয়ে পড়াশোনা করো, সততার সঙ্গে কাজ করো, তবেই জীবনে স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা আসবে। ধরে নেওয়া হতো, একটি নির্দিষ্ট ও নিয়মিত আয়ই নিশ্চিত করবে পরিবারের মা॥থা গোঁজার ভালো জায়গা, সন্তানের মানসম্মত শিক্ষা, সুচিকিৎসা, পরিমিত সঞ্চয় এবং জীবনের শেষভাগে এসে একটি শান্তিময় অবসর। কিন্তু আজ সেই চিরচেনা বিশ্বাসের ভিতটি যেন ধসে পড়ছে। জীবনযাত্রার অনিয়ন্ত্রিত ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ বেতনভোগী পরিবারগুলোকে আজ এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—তাদের দীর্ঘদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি ও অপরিসীম ত্যাগ আদৌ কি সেই উন্নত ভবিষ্যতের সন্ধান দেবে, যার প্রতিশ্রুতি তাদের দেওয়া হয়েছিল?এই ক্ষয়ক্ষতি কেবল পারিবারিক বাজেটের হিসাব-নিকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারগুলো যখন সর্বোচ্চ কঠোর পরিশ্রম করেও তাদের ন॥্যূনতম জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে হিমশিম খায়, তখন দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা দিন দিন ফিকে হতে শুরু করে। কষ্টের সঞ্চয় উবে যায়, জীবনের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা সংকুচিত হয়ে আসে এবং তরুণ প্রজন্ম নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার সাগরে তলিয়ে যায়। এভাবেই স্রেফ কেনাকাটা বা ক্রয়ক্ষমতার একটি অর্থনৈতিক সংকট ধীরে ধীরে সামাজিক বিশ্বাসের এক সুদূরপ্রসারী জাতীয় সংকটে রূপ নেয়।অবিরাম মুদ্রাস্ফীতি এই সমস্যার ব্যাপকতা তুলে ধরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৮.৩৬ শতাংশ, যা আগস্টের ৮.২৯ শতাংশ থেকে বেশি। যদিও আগের সর্বোচ্চ স্তর ॥েথকে দাম কিছুটা কমেছে, বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি ক্রয়ক্ষমতাকে ক্রমাগত ক্ষুণ্ন করেছে, অন্যদিকে মজুরি তার সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে, যার ফলে অনেক বেতনভোগী কর্মীর প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এটি সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করে, কারণ তারা উল্লেখযোগ্য সম্পদ বা আয়ের বিভিন্ন উৎসের পরিবর্তে নিয়মিত বেতনের ওপর নির্ভরশীল। যখন খাদ্য, পরিবহন, বিদ্যুৎ, বাড়ি ভাড়া এবং টিউশন ফি—সবকিছু একসা॥েথ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, তখন সামান্য বেতন বৃদ্ধিও খুব একটা স্বস্তি এনে দেয় না। যে পরিবারগুলো একসময় প্রতি মাসে সঞ্চয় করত, তারা এখন তাদের সমস্ত আয় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পেছনে খরচ করে ফেলে।সঞ্চয়ের বিলুপ্তিই হয়তো সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি। সঞ্চয় পরিবারগুলোকে চাকরি হারানো, অসুস্থতা এবং অপ্রত্যাশিত খরচের হাত থেকে রক্ষা করে এবং এর মাধ্যমেই বাড়ি কেনা, সন্তানদের উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানো এবং বার্ধক্যের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়। এই সঞ্চয় ফুরিয়ে গেলে পরিবারগুলো ঋণ নেয়, সম্পদ বিক্রি করে অথবা গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ স্থগিত করে। তখন নিরাপত্তাহীনতা একটি সাময়িক সমস্যা না থেকে স্থায়ী অবস্থায় পরিণত হয়।আবাসন সংকট দিন দিন গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ঢাকা সহ বড় শহরগুলোতে আকাশচুম্বী বাড়িভাড়া ও ক্রমবর্ধমান ফ্ল্যাট-জমির দাম সাধারণ বেতনভোগী পরিবারগুলোর নাগালের বাইরে চলে গেছে। আবাসন খরচ সামলাতে অনেক পরিবারই শহরের দ॥ূরবর্তী এলাকাগুলোতে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে; তবে এর ফলে তাদের যাতায়াত খরচ যেমন বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, তেমনই প্রতিদিন পোহাতে হচ্ছে মারাত্মক ক্লান্তিকর ও দীর্ঘ যাত্রার দুর্ভোগ। নিজের একটি স্বপ্নের মা॥থার ওপর ছাদ বা বাড়ির মালিকানা, যা একসময় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পেশাজীবীদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ছিল—তা আজ সাধারণ আয়ের তুলনায় সম্পত্তির দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় ক্রমেই অধরা স্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।শিক্ষা, যা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক উন্নতির সবচেয়ে নিশ্চিত পথ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে, তা নিজেই একটি বোঝায় পরিণত হচ্ছে। বাবা-মায়েরা স্কুলের বেতন, প্রাইভেট কোচিং, পরিবহন, বই এবং ডিজিটাল শিক্ষার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন, কারণ তারা আশা করেন যে শিক্ষা তাদের সন্তানদের জন্য আরও ভালো সুযোগ তৈরি করবে। কিন্তু ব্যয়বহুল শিক্ষা এবং অনিশ্চিত চাকরির সম্ভাবনা এই দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক প্রতিশ্রতির প্রতি বিশ্বাসকে ক্ষয় করে দিচ্ছে।তরুণ স্নাতকরা বিশেষভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে। ডিগ্রি এখন আর নিরাপদ চাকরি, ভালো বেতন বা একটি সুস্পষ্ট কর্মজীবনের নিশ্চয়তা দেয় না। তাই অনেকেই দেশান্তরের ক॥থা ভাবেন, বিয়ে পিছিয়ে দেন বা স্বাধীনভাবে সংসার শুরু করতে দেরি করেন, আবার অন্যরা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে তাদের বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। এই ধরনের পরিস্থিতি তরুণদের শিক্ষা এবং পেশাগত সাফল্যের ম॥ূল্যের ওপর বিশ্বাসকে ক্ষয় করে দিতে পারে।স্বাস্থ্যসেবার অতিরিক্ত ব্যয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে স্বাস্থ্য খাতের মোট খরচের ৭৯.৩ শতাংশই নাগরিকদের নিজস্ব পকেট থেকে বহন করতে হয়। ফলে বিপুল এই ব্যয়ের চাপ সামলাতে না পেরে ২০২৪ সালে প্রায় ৬৫ শতাংশ স্বাস্থ্য চাহিদা বা চিকিৎসাসেবা অপ॥ূর্ণই ॥েথকে গেছে। এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে কতটা কঠিন আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য, একটি গুরুতর অসুস্থতাই বছরের পর বছরের সঞ্চয় নিঃশেষ করে দিতে পারে। পর্যাপ্ত বীমা বা সাশ্রয়ী সরকারি চিকিৎসার অভাবে পরিবারগুলো ঋণ করে, চিকিৎসা বিলম্বিত করে অ॥থবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমিয়ে দেয়। একটিমাত্র জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি কয়েক মাসের মধ্যেই বছরের পর বছরের আর্থিক অগ্রগতিকে নষ্ট করে দিতে পারে।এই দীর্ঘস্থায়ী আ॥ির্থক চাপ মানুষের পারিবারিক সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সন্তানের স্কুলের বেতন, ক্রমবর্ধমান বাড়িভাড়া এবং অবসরকালীন ভবিষ্যৎ চিন্তায় প্রতিনিয়ত জর্জরিত ॥থাকেন বাবা-মায়েরা। অন্যদিকে, তরুণ পেশাজীবীরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন—তাদের অর্জিত যোগ্যতা ও কঠোর পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত আ॥ির্থক স্বাধীনতা এনে দিতে পারবে কি না। এই ক্রমাগত অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে থমকে দেয় এবং নিজের ব্যক্তিগত উন্নতির প্রতি আত্মবিশ্বাসকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে।এর পরিণতি শুধু ব্যক্তিগত পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভোগ, উদ্যোক্তা, পেশাগত পরিষেবা, কর এবং মানব সম্পদে বিনিয়োগের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত শ্রেণিই বাংলাদেশের অ॥র্থনীতিকে চালিত করে। পরিবারগুলো যখন খরচ কমিয়ে দেয়, তখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল চাহিদার সম্মুখীন হয়। যখন তরুণরা দেশের অভ্যন্তরীণ সুযোগের ওপর আস্থা হারায়, তখন দেশ দক্ষ কর্মী ও ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নিরাপত্তাহীনতা বিদ্যমান বৈষম্যকেও আরও বাড়িয়ে তোলে। ধনী পরিবারগুলো সম্পত্তি, বিনিয়োগ এবং বহুমুখী আয়ের মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষিত রাখে, অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারগুলো নির্দিষ্ট সহায়তার জন্য যোগ্য হতে পারে। অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে ॥থাকে। তাদের আয় সরকারি সহায়তার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে পারে, কিন্তু তাদের সঞ্চয় বেকারত্ব, অসুস্থতা বা দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির সংকট মোকাবিলা করতে পারে না।এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও সুদ॥ূরপ্রসারী অ॥র্থনৈতিক রূপরেখা। ম॥ূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অবশ্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে; তবে স্রেফ পণ্যের দাম স্থিতিশীল রেখেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রকৃত সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সা॥েথ সামঞ্জস্য রেখে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থা এবং সবার জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। এছাড়া, বাজারে কার্যকর তদারকি এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলে সাধারণ ভোক্তাদের সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির শোষণের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।শিক্ষাব্যবস্থাকেও শ্রমবাজারের চাহিদার সা॥েথ আরও ভালোভাবে সামঞ্জস্যপ॥ূর্ণ করে তুলতে হবে। কারিগরি প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা এবং শিল্প-সংশ্লিষ্ট শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিক বিনিয়োগ স্নাতকদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। একইভাবে, সাশ্রয়ী সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হলে স্বল্প আয়ের বেতনভুক্ত পরিবারগুলোর আর্থিক ঝুঁকি কমে আসবে।নিয়োগকর্তা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও এক্ষেত্রে দায়িত্ব রয়েছে। উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ পরিবারের আয় বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। দায়িত্বশীল সঞ্চয় ও ঋণ সুবিধা পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত ঋণের ভারে না জড়িয়েও আর্থিক ধাক্কা সামলে উঠতে সাহায্য করতে পারে।তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত মধ্যবিত্তের এই নিরাপত্তাহীনতাকে কেবল ব্যক্তিবিশেষের দুর্ভাগ্যের গল্প হিসেবে না দেখে, একে একটি বড় জাতীয় অ॥র্থনৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা। দেশের মানুষের প্রকৃত আয় ও মজুরি, আবাসন ব্যয় এবং পারিবারিক ঋণের মাত্রার ওপর নিয়মিত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে ঠিক কোন কোন খাতে চাপ সবচেয়ে বেশি—তা সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সামাজিক-অর্থনৈতিক নীতিমালার মাধ্যমেই কেবল সাধারণ পরিবারগুলোর মনে এই বিশ্বাস ও আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব যে, তাদের অমানুষিক শ্রম ও প্রচেষ্টা একেবারে বৃথা যাচ্ছে না।মধ্যবিত্ত শ্রেণি কখনোই অসাধারণ কোনো ধন-সম্পদ বা বিলাসী জীবনের স্বপ্ন দেখে না। তাদের প্রত্যাশাগুলো অত্যন্ত সাদামাটা ও স্পষ্ট: একটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, সন্তানের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, সহনীয় ও সহজলভ্য চিকিৎসা ব্যবস্থা, মাথার ওপর নিরাপদ একটি ছাদ এবং জীবনপ্রাহ্ণে মর্যাদাপ॥ূর্ণ অবসরের জন্য সামান্য কিছু সঞ্চয়। এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়; বরং সমাজে আত্মমর্যাদা ও ন্যূনতম মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত।যখন কঠোর পরিশ্রম ও সর্বোচ্চ ত্যাগের পরও এই মৌলিক নিশ্চয়তাগুলো অর্জিত হয় না, তখন তার ক্ষতিকর প্রভাব কেবল সাধারণ মানুষের কেনাকাটা বা ভোগব্যয় কমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ফলে সমাজ ও ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়, সুন্দর ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষাগুলো ম্লান হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের ম॥ূল প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশ্বাস টলে যেতে শুরু করে। তাই মধ্যবিত্তের সামাজিক ও আ॥ির্থক নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা কেবল একটি শুষ্ক অ॥র্থনৈতিক লক্ষ্য নয়; বরং সামাজিক গতিশীলতা রক্ষা, একটি উৎপাদনশীল নাগরিক সমাজ গঠন এবং বাংলাদেশের সুন্দর ভবিষ্যতের ওপর জনগণের আস্থা টিকিয়ে রাখার জন্যও এটি অত্যন্ত জরুরি।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।]

অপরাধ কমাতে সামাজিক উদ্যোগও জরুরি

দিন দিন অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সামনে আসছে এমন কিছু অপরাধ, যা আগে কখনো দেখা যায়নি বা কল্পনাও করা যায়নি। শিশু হত্যা থেকে শুরু করে নারী নির্যাতন পর্যন্ত নানা ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছে মানুষ। এর পেছনে সামাজিকীকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও কম দায়ী নয়।মানুষের অস্থিরতা ও অপরাধের প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রেই একই সরল রেখায় চলে। অস্থিরতা থেকে অপরাধ বাড়ার পেছনে বড় একটি কারণ হলো অসহিষ্ণু আচরণ। অনেকের মধ্যেই স্বস্তি বা ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। ভালো কথা বললেও সামাজিকভাবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।বিশেষ করে কিশোর বয়সে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এ সময়ে মস্তিষ্কের চাঞ্চল্য ও ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে কেউ কেউ খারাপ কাজকেও একসময় অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে দেখতে শুরু করে। কোনো বড় ধরনের ভুল বা দুর্ঘটনা ঘটানোর পরও তারা বিষয়টিকে গুরুতর বলে মনে নাও করতে পারে। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার পাশাপাশি আচরণগত ও নৈতিক ক্ষেত্রেও নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে।সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো অপরাধসংক্রান্ত সংবাদ ও তথ্য কীভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক না থাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো ঘটনা দ্রুত প্রকাশের পর নানা ধরনের মন্তব্য আসতে থাকে। এসব মন্তব্যের মধ্যে এমন কিছু প্রতিক্রিয়াও থাকে, যা অপরাধের প্রতি আগ্রহ বা উৎসাহ তৈরি করতে পারে। কোনো কোনো ব্যক্তি সেখান থেকে অপরাধের ধরন বা কৌশল সম্পর্কে ধারণা নিয়ে তা নিজের জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করতে পারে।অপরাধভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। ‘সিআইডি’র মতো অনুষ্ঠানে অনেক সময় অপরাধ সংঘটনের বিভিন্ন কৌশল এবং অপরাধের পর নিজেকে আড়াল করার বিষয় দেখানো হয়। বিভিন্ন ধরনের গেমের মাধ্যমেও সহিংসতা বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের প্রতি কিশোরদের আগ্রহ তৈরি হতে পারে। তাই এসব বিষয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে নির্মাতা ও গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।কিশোর বয়সের অপরাধ বন্ধে শুধু আইন কি যথেষ্ট? প্রশ্নটি গভীরভাবে ভাবার বিষয়। কারণ একজন কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর কোথায় আশ্রয় পায়, কারা তাকে প্রশ্রয় দেয়—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি তাকে আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেয় এবং যে পরিবার সন্তানের প্রতি যথেষ্ট নজর রাখে না, উভয়েরই সামাজিক দায় রয়েছে। কিন্তু এই দায় অনেক সময় সমাজে দৃশ্যমান হয় না। এর ফলাফল ঠিকই সমাজকে ভোগ করতে হয়। নতুন নতুন অপরাধের ভারে সমাজে তৈরি হয় মানবিক সংকট। কখনো রাজনৈতিক পরিচয়ে, আবার কখনো গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই অপরাধ কমানো যাবে কীভাবে? এর জন্য সামাজিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন। যেসব বাবা-মা সন্তানের খোঁজখবর রাখেন না, তাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক কাউন্সেলিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা বা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একসময় গণশিক্ষার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছিল। তেমনি গণসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া সামাজিক অপরাধের প্রবণতা কমানো কঠিন।ধরা যাক, একটি পরিবারের একজন সন্তান মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। বাবা-মা বিষয়টি সম্পর্কে কোনো খোঁজ রাখছেন না। এমনকি সন্তান যে ধীরে ধীরে বিপথে যাচ্ছে, তার লক্ষণও তারা বুঝতে পারছেন না। এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন করতে সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। একটি এলাকার অভিভাবকেরা নিয়মিত একসঙ্গে বসতে পারেন। সেখানে সন্তানদের প্রতি তাদের দায়িত্ব, কিশোরদের আচরণগত পরিবর্তনের লক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হতে পারে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি এ ধরনের সামাজিক জাগরণ তৈরি করা গেলে মাদক ও কিশোর অপরাধ কমানোর পথ তৈরি হতে পারে। তবে এটি অবশ্যই একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তারপরও উদ্যোগটি নেওয়া জরুরি।যে বয়সে কিশোরদের জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মননশীলতা দিয়ে সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করার কথা, সেই বয়সে তাদের একটি অংশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এটি আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অপরাধের ধরন ও কারণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, অপরাধবিষয়ক সংবাদ দায়িত্বশীলভাবে উপস্থাপন করা এবং সামাজিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।এসব উদ্যোগ এখন রাষ্ট্রীয়ভাবেও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। ভালো চিন্তা, মূল্যবোধ ও শিক্ষা কীভাবে মানুষের মধ্যে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সমাজ—সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন—এটাই প্রত্যাশা।(লেখকের নিজস্ব মত)লেখক: রসায়নবিদ

আদিবাসী জরিপ: অধিকার নিশ্চিত করতে চাই সঠিক তথ্য

১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে দেশব্যাপী মাঠপর্যায়ে সমতল ও পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের আর্থসামাজিক ও জনমিতিক অবস্থা নিরূপণের এক গুরুত্বপূর্ণ জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলমান এই উদ্যোগ কেবল কিছু সংখ্যা বা পরিসংখ্যান সংগ্রহের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি এ দেশের মাটিতে কয়েক হাজার বছর ধরে বসবাসকারী প্রান্তিক আদিবাসী মানুষের অস্তিত্ব, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও আইনি সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম।একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীর সুষম উন্নয়ন কিংবা প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে জাতীয় আদমশুমারি ও গৃহগণনা হলেও ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা, প্রচারণার অভাব এবং অসচেতনতার কারণে বহু আদিবাসী পরিবার মূল তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বিশেষ করে সমতলের সাঁওতাল, তুরি, ওরাওঁ, মুন্ডা, মালো, মাহালি, কোল ও কোডা সম্প্রদায়ের মতো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা এবং ভৌগোলিক অবস্থান রাষ্ট্রীয় নথিতে সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে শিক্ষা, সরকারি কোটা সুবিধা, বিশেষ অর্থনৈতিক বরাদ্দ এবং সর্বোপরি ভূমির অধিকারের মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ‘আদিবাসী জরিপ ২০২৬’ অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে।তবে মাঠপর্যায়ে এই জরিপ সফল করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, প্রান্তিক আদিবাসী মানুষের মধ্যে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তাদের তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের ঐতিহাসিক ভয় বা দ্বিধাবোধ কাজ করে। অতীতে ভুল তথ্য বা অসচেতনতার কারণে অনেক পরিবারকে পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হতে হয়েছে কিংবা আইনি জটিলতায় পড়তে হয়েছে। তাই এই জরিপকে ঘিরে সাধারণ মানুষের ভয় ও দ্বিধা দূর করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, রয়েছে ভাষার প্রতিবন্ধকতা। অনেক আদিবাসী প্রবীণ ও নারী বাংলা ভাষা সঠিকভাবে বুঝতে বা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। ফলে জরিপকারীরা প্রশ্ন করার সময় জাতিগত পরিচয় বা মাতৃভাষার নাম নথিতে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ নাও করতে পারেন। এ কারণে এবারের ‘আদিবাসী জরিপ ২০২৬’-এ তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে আদিবাসীদের যুক্ত করা হয়েছে।তাই এবারের জরিপে মাঠপর্যায়ের গণনাকারী এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাধারণ নাগরিকদের কয়েকটি বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।নিখুঁত জাতিগত পরিচয় লিপিবদ্ধকরণ: নিজ নিজ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের নাম—যেমন সাঁওতাল, কোল, কোডা, তুরি, ওরাওঁ, মাহালি ইত্যাদি—জরিপের ফরমে স্পষ্ট ও সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। কোনো সমগোত্রীয় বা ভুল নামে যেন প্রকৃত পরিচয় ঢাকা পড়ে না যায়, সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে।মাতৃভাষার সঠিক স্বীকৃতি: বাড়িতে বা নিজেদের মধ্যে যে মাতৃভাষায় কথা বলা হয়, যেমন সাঁওতালি বা সাদরি, তা ফরমে নির্ভুলভাবে উল্লেখ করতে হবে। ভবিষ্যতে শিশুদের বহুভাষিক শিক্ষা প্রসারেও এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।অনুপস্থিত সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি: জীবিকার তাগিদে বা পড়াশোনার কারণে পরিবারের কোনো সদস্য বর্তমানে ঢাকা বা অন্য কোনো শিল্পাঞ্চলে অবস্থান করলে তাকেও পরিবারের সদস্য হিসেবে গণনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দরিদ্র ও সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে শহরের প্রান্তিক শ্রমিকেরা যেন গণনার বাইরে না থাকেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।আর্থসামাজিক ও পেশাগত সঠিক তথ্য: পরিবারের প্রকৃত আয়, জমির মালিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশার তথ্য গোপন না করে সঠিকভাবে দিতে হবে। এসব তথ্য ভবিষ্যতের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার: বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্য প্রচার ও সচেতনতা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই ‘আদিবাসী জরিপ ২০২৬’ নিয়ে কোনো ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য চোখে পড়লে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে না দিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জেলা ও উপজেলা কার্যালয়ে জানাতে হবে। একই সঙ্গে সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে।এই সময়ে ন্যাশনাল এজেন্সি ফর গ্রিন রেভল্যুশন, উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম, জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ দেশের সব আদিবাসী সংগঠন, তরুণ সমাজ ও স্থানীয় উন্নয়নকর্মীদের প্রতি আহ্বান থাকবে—আগামী দিনগুলোতে পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে উঠান বৈঠক ও সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এই জরিপে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।আমাদের মনে রাখতে হবে, বৈচিত্র‍্যরে মধ্যেই বাংলাদেশের সৌন্দর্য নিহিত। একজন প্রান্তিক আদিবাসী নাগরিকের জীবন ও সামাজিক পরিচয়ের মূল্য কোনো অংশেই কম নয়। তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং সঠিক তথ্য দিয়ে ‘আদিবাসী জরিপ ২০২৬’ সফল করতে সহযোগিতা করতে হবে। সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্যই পারে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর যথাযথ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে এবং তাদের সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার পথ আরও সুগম করতে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

রম্যগদ্য: “কুলি কলঙ্কিনির কোলাকুলি...”

এইটা আবার কি বলচেন যে, কলঙ্কিনি তো কুলিকেও কলঙ্কিত করবে, তায়লে ওরা আবার কোলাকুলি করে কি প্রকারে! এমুন তাজ্জাবের কতাতো আমার বাপ দাদার চৌদ্দগুষ্টিও শোনেনি যে!তোর বাপ দাদা চৌদ্দ্গুষ্টি কী শুনেছেন তা আমি জানি না। তবে এইটুকু জানি যে বর্তমানে কুলি আর কলঙ্কিনি মহানন্দে কোলাকুলি করে সারা বিশ্বে সাড়া ফেলেছে।ভাই কলঙ্কিনি যদি কুলিরে ব্যাড়ায় ধরি কুলাকুলি করে, তায়লে কুলিওতো সারা দুনিয়ায় কলঙ্কিনির দোসর বইলা পরিচিত হোইবো! তায়লে কেউ ইচ্ছা করিনি কলঙ্কিনির বোঝা মাথায় লোইবো?ভাইরে তোর যত আদিখ্যেতা! এই যে দেখিসনি ১৯৭১ সালের পরে, পাকিস্তান আমলের ট্রেনের হকার, মাইয়া গ্রুপের চা আনতো যে ছ্যারা মানে টি’বয়, তারপর “ডোরিনা” দর্জির দোকান দখলকারী, পর্দার দোকানের ফ্লোর মোছুনিরসন্তান, সব রাতারাতি ধনী হয়ে উঠলো...যুদ্ধের পরে কিছু পাবলিক হক্কল টাইমেই কিছু সুবিধা পাইছে। এই লোই আন্নের মাতনের কিছু নাই। আন্নে দেখেন ন’, আন্নের ২০২৪-এর, অগাস্টের পর পাবলিকে ৬০০ কুটি ট্যাকার সুদ মাপ করি লোইছে! কতগুলার একটা সাইকেল আছিলো না, হ্যারা প্রাডো লোই ঘুরের! আর ১৯৭১ আছিলো যুদ্ধ। কিছু ওলট-পালট তো হোইবোই। আরে উড়ঝুড়ে বাঙাল, যেখানে দারিদ্রে তোর দেশের প্রায় ৫০ লক্ষ জনসাধারণ মারা পড়লো, আর একজন পৃথিবীর হ্যানো কোনো দুস্ককর্ম নেই যে করেনি, চুরি, ডাকাতি, গুম, খুন-জখম, রাহাজানি, ধর্ষণ-সমকামিতা, কোনো কিছুই বাদ দিসনি, সেই তোরা যখন ধনী হয়ে টাকার গরমে একে অপরের সাথে কোলাকুলি করে, দু’জনে লোক দ্যাখানো বন্ধুত্বের আড়ালে, শুভবুদ্ধির মানুষের উপর চোখ রাঙাস তখন ক্যামনটা লাগে!আন্নে মিয়া জীবনে মানুষ হোইতেন ন’! এই যে, নেপালে বরফের বন্যা আসি ব্যাবাগতেরে পানির মইধ্যে চুবাইলো, হেই বন্যা কি, সৎ-অসৎ, কুবুদ্ধি-সুবুদ্ধি দেখিনি চুবনি দিছে! রাস্তার মইধ্যে যারে পাইছে হ্যাতেরে ধরি কোপাইছে, সিম্পেল। আন্নে ১৯৭১-এর যুদ্ধের পরে, পাকিস্তান আমলের ট্রেনের হকার, মাইয়া গ্রুপের, টি’বয়, তারপর, দোকান দখলকারী, পর্দার দোকানের ফ্লোর মোছুনির পোলা সব রাতারাতি বড়লোক। তো, এইসব বড়লোকরা যদি এক হোই, কুলাকুলি করি আন্নের তথাকথিত শুভোবুদ্ধি সম্পন্ন..., তো এইডার মইধ্যে আঁই তো কুনো দোষ দেখি না!বাহ্ তাই বলে নৈতিকতা, পাড়া প্রতিবেশি, আত্মীয় স্বজন, জাতিভাই দেশবাসী কাউকেউ তুই ছাড় দিবি না, তোর নিজের স্বার্থে শত শত, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি মানুষের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা কোরবি! ওম্মারে মা, এই কোইলেন, পাকিস্তান আমলের ট্রেনের হকার, মাইয়া গ্রুপের, টি’বয়, দোকান দখলকারী, পর্দার দোকানের ফ্লোর মোছুনির পোলা...সত্যিকথা বলবো না? বাস্তবে তো তাই ঘটেছে...“সত্যি কথা বলবো না? বাস্তবে তো তাই ঘটেছে...” আরে মিয়া আন্নেই কন ট্রেনের হকার, টি’বয়, দোকান দখলকারী, পর্দার দোকানের ফ্লোর মোছুনির পোলা, পাকিস্তান আমলে তো এইসব পোলাপানের কোনো শিক্ষাদীক্ষা আছিলোনা, এক এক লুকের সাত আটটা পোলা, হ্যেরা কুত্তার মতুন রাস্তা ঘাটে জন্মাইছে, হ্যেগো আবার নৈতিকতা, শুভবুদ্ধি, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা! ফালতু কথা কোইতে লজ্জা করে না মিয়া! এইসব বগামিয়া, কালুমিয়া, লালুমিয়ার পোলারা ট্যাকা কামায়া ধনী হোইলে হ্যেরা তো কেবল, ডবল ডব্লিউ লয়া মৌজ ফুর্তি করবো, হ্যেগো টাইম কোই, পাড়া প্রতিবেশি, আত্মীয় স্বজন, জাতিভাই দেশবাসীর কথা চিন্তা করনের। যাগো সত্যিকার অর্থে দেশের চিন্তা করনের কথা, হ্যেরা তো মাল পায়াই খাল কাটতে ছুটলো, হ্যারাইতো আজ দেশের, দশের, জাতির বারটা বাজাইছে! হ্যাগোরে কিছু কয়া পারেন না, দোষ খালি ট্রেনের হকার, টি’বয়, দোকান দখলকারীর, পর্দার দোকানের ফ্লোর মোছুনির পোলার! বুঝিস না ক্যানো, সব জমিদারের ছেলেরা বামা পার্টি বানিয়ে গরীবের উপকারের নাম করে নিজেদের হারানো জমিদারি ফেরতেরে সুযোগ খুঁজছিলো, তাই যেই মন্ত্রিত্বের লোভ পেলো ব্যাস সাথে সাথে বিড়ালের নরম থাবার আড়ালের তীক্ষœ নখর বের করার মতো পুরো দলটার অস্তিত্ব বিলীন করে সুড়সুড়িয়ে ক্ষমতার ভোগ দখলে মত্ত। কিসের বামা পার্টি, কিসের উই শ্যাল ওভারকাম সাম ডে...মাল কামামু টু’ডে, বলে স্বৈরাচারের বাপ হয়ে জনগনকে দংশন শুরু।কিন্তু গুরু আপনের বামা পার্টি হুনছি কোন মন্দিরের জমি দুই’দলে ভাগকরি হিন্দু-মুসলমানে মিলিমিশি খাইছে?আরে মন্দিরের জমি দুই’দলে মিলিমিশি খাইছে, বলেইতো পাবলিক আজ সমাজ থেকে ওদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করে, আস্তাকুঁড়ে মানে ডাষ্টবিনে ফেলেছে!মাইনে বুজছেননি, বামা পার্টি কন আর বুর্জুয়া ক্যাপিটালিস্ট কন, মাল দেখলেই সব বেটায় টাল। হ্যাইডা, ট্রনের হকার, টি’বয়, দোকান দখলকারী, পর্দার দোকানের ফ্লোর মোছুনির পোলা যেই হোক, বিশ্বের ব্যেবাগতে মালের কাছে ধরা। মাল পাইলে শত শত পাবলিক পগারপার, আর মাল না পাইলে কেরানিগঞ্জের ঝাড়ুদার। মাল মাল করি আরে হ্যাতারা পুরা জাতিটারে, যাঁতাকলের তলে ফেলি ময়দা ডলন ডলের! শরম শরম...শরম বল আর লজ্জা বল, কুন্ঠা বা হায়া, শরমভরম, ব্রীড়াবনত, মাথাহেঁট যে নামেই ডাকিস এই তথাকথিত নেতাগুলো, আমাদের দেশের, সহজ-সরল জনগনের অশিক্ষার কুশিক্ষার সুযোগে কেবলই নিজের আখের গুছিয়েছে আর আমাদের বংশ পরম্পরায়ে গুহার আঁধারে ঠেলে দিয়েছে, ধিক ধিক...আমি আপনেরে কোইলাম, বাঙালরি মনে ধিকি ধিকি আগুন জ্বলের, বাঙালি আর একবার এক হোইলে আর কুনোদিনও মালের গন্ধে মাতাল হোইতো ন’। এইবার বাঙালি চান্স পাইলে এই স্বার্থপর নেতাগো লাত্থিমারি, ভাষানের দিন, মা-দূর্গার লগে বঙ্গপোসাগরে ভাসায় দিবো। সেই আশায় বসে থাকি, দেখি আবার কবে তোর সকল বাঙালি, ঘুষ, চুরি, ডাকাতি,গুম, খুন-জখম, রাহাজানি, ধর্ষণ-সমকামিতা, অ্যাসিড নিক্ষেপ, সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক হয় পঁচিশে মার্চের রাত্রির মতো...     [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

কৃষির রূপান্তর শুরু হোক মানসম্পন্ন বীজ থেকে

কৃষির সাফল্যের শুরু কোথায়? উত্তরটি খুব সহজ—বীজে। কৃষক যত ভালো সার, সেচ, শ্রম ও আধুনিক প্রযুক্তিই ব্যবহার করুন না কেন, শুরুতেই যদি বীজের মান ভালো না হয়, তাহলে পরবর্তী বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন। একটি ভালো বীজ শুধু একটি বীজ নয়। এর মধ্যে থাকে উন্নত জাতের জেনেটিক সম্ভাবনা, ভালো অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা, প্রাণশক্তি, জাতের বিশুদ্ধতা ও রোগমুক্ততার নিশ্চয়তা। তাই বীজকে কৃষি উৎপাদনের প্রথম বিনিয়োগ এবং খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি বলা যায়।বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু আবাদি জমি কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদার কারণে ভবিষ্যতে একই জমি থেকে আরও বেশি উৎপাদন করতে হবে। এই বাস্তবতায় মানসম্পন্ন ও পরীক্ষিত বীজের ব্যবহার বাড়ানো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম কার্যকর পথ হতে পারে।১০০ শতাংশ নয়, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হোক বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। দেশের প্রতিটি জমিতে স্বল্প সময়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরবরাহ করা মানসম্পন্ন বীজ নিশ্চিত করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই বাস্তবতার আলোকে একটি মধ্যমেয়াদি জাতীয় লক্ষ্য হতে পারে—অন্তত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ আবাদি জমিতে পরীক্ষিত, মানসম্পন্ন ও অঞ্চল-উপযোগী বীজের ব্যবহার নিশ্চিত করা। এটি কেবল বীজ সরবরাহের লক্ষ্য নয়; এটি হতে পারে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির একটি জাতীয় কর্মসূচি। তবে তার আগে জানতে হবে—দেশে আসলে কত বীজ প্রয়োজন?২০২২-২০২৩ সালের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন ফসলের তাত্ত্বিক বীজ চাহিদা ছিল প্রায় ১২ লাখ ১০ হাজার ৩৫১ মেট্রিক টন। এর ৮০ শতাংশের পরিমাণ প্রায় ৯ লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন। একই সময়ে বিভিন্ন উৎস থেকে বীজ উৎপাদন ও আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৬১ হাজার ২৬৪ মেট্রিক টন।তবে এই দুই সংখ্যার পার্থক্যকে সরাসরি ‘মানসম্পন্ন বীজের ঘাটতি’ বলা যাবে না। কারণ কৃষকের নিজস্ব সংরক্ষিত বীজসহ বিভিন্ন উৎসের বীজ মোট সরবরাহের হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এবং সব বীজ একই মানের নয়। তাছাড়া ২০২২-২০২৩ সালের হিসাবকে ২০২৬ সালের বর্তমান চাহিদা হিসেবে ব্যবহার করাও যুক্তিসংগত নয়। অতএব প্রয়োজন সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে ফসলভিত্তিক জাতীয় বীজ চাহিদা ও সরবরাহের নতুন হিসাব।বীজের চাহিদা ফসলভেদে ভিন্ন। ধান, গম, ভুট্টা, পাট, ডাল, তেলবীজ, আলু, সবজি ও মসলার বীজহার এক নয়। অঞ্চলভেদেও চাহিদার পার্থক্য রয়েছে। তাই ‘দেশে মোট কত বীজ প্রয়োজন’—এ প্রশ্নের উত্তর একটি মাত্র সংখ্যায় দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি জাতীয় ফসলভিত্তিক বীজ চাহিদার ছক। সেখানে থাকবে আবাদি এলাকা, ফসলভিত্তিক বীজহার, মোট চাহিদা, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা, সরকারি ও বেসরকারি সরবরাহ, আমদানি, কৃষকের নিজস্ব বীজ এবং প্রকৃত ঘাটতির হিসাব। এই হিসাব ছাড়া জাতীয় বীজ উৎপাদন পরিকল্পনা অনেকটাই অনুমাননির্ভর থেকে যাবে।ভালো বীজে ফলন কতটা বাড়তে পারে?মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারে ফলন বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বিএডিসির বিভিন্ন নথিতে মানসম্পন্ন বীজ ও সুষম উপকরণ ব্যবহারে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই হার সব ফসল ও সব অঞ্চলের জন্য একই নয়। জাত, বীজের মান, মাটি, আবহাওয়া, সার, সেচ, রোগ-পোকা ব্যবস্থাপনা ও চাষপদ্ধতির ওপর ফলন বৃদ্ধির মাত্রা নির্ভর করে। তাই ৮০ শতাংশ জমিতে ভালো বীজ ব্যবহার করলেই জাতীয় উৎপাদন ২০ শতাংশ বেড়ে যাবে—এমন দাবি বৈজ্ঞানিক হবে না।তবে সম্ভাব্য প্রভাব বোঝাতে একটি সরল হিসাব করা যায়। যদি ৮০ শতাংশ জমিতে ভালো বীজ ব্যবহারের ফলে ওই জমির ফলন গড়ে ৫ শতাংশ বাড়ে, তাহলে মোট উৎপাদনে তাত্ত্বিক প্রভাব হতে পারে প্রায় ৪ শতাংশ। ফলন ১০ শতাংশ বাড়লে প্রভাব হতে পারে প্রায় ৮ শতাংশ। ১৫ শতাংশ বাড়লে প্রায় ১২ শতাংশ এবং ২০ শতাংশ বাড়লে প্রায় ১৬ শতাংশ।অর্থাৎ অন্য সবকিছু অপরিবর্তিত থাকলে ৮০ শতাংশ জমিতে মানসম্পন্ন বীজের কারণে সংশ্লিষ্ট জমির ফলন ৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ার ক্ষেত্রে জাতীয় মোট উৎপাদনে তাত্ত্বিকভাবে প্রায় ৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব তৈরি হতে পারে। এটি জাতীয় উৎপাদনের কোনো পূর্বাভাস নয়; সম্ভাব্য প্রভাব বোঝানোর একটি সরল হিসাবমাত্র।কৃষকের মাঠেই ভালো বীজের প্রমাণভালো বীজ ও উপযোগী জাতের সুফল কেবল গবেষণাগারে নয়, কৃষকের মাঠেও দেখা যায়। খাগড়াছড়ির কৃষক উচিমং মারমার জমিতে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইআরআরআই) সমর্থনে পরিচালিত মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় বিভিন্ন উন্নত ধানের জাত স্থানীয় চাষপদ্ধতির তুলনায় উল্লেখযোগ্য ফলন দিয়েছে। পরে তিনি উন্নত জাতের ধান চাষে আগ্রহী হন এবং আশপাশের কৃষকদেরও উৎসাহিত করেন।হাওর এলাকার কৃষক কামরুল ইসলামের অভিজ্ঞতাও তাৎপর্যপূর্ণ। আগাম পরিপক্ব জাতের ধান তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ হাওরে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি নিজে বীজ সংরক্ষণ করার পাশাপাশি অন্য কৃষকদেরও বীজ সরবরাহ করেছেন।আবার সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষক মো. আরাফাত লবণাক্ততা সহনশীল ব্রি ধান৯৯ চাষ করে আগের জাতগুলোর তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি ফলনের কথা জানিয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু ‘ভালো বীজ’ নয়, সঠিক অঞ্চল ও পরিবেশের জন্য সঠিক জাত নির্বাচনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে পরিচালিত পুরোনো একাধিক মাঠপর্যায়ের পরীক্ষাতেও পরিচ্ছন্ন বীজ ব্যবহারে কৃষকের প্রচলিত বীজের তুলনায় ধানের ফলন বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বীজের স্বাস্থ্য ও মানের উন্নয়ন সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত।বীজ খারাপ হলে অন্য বিনিয়োগও ঝুঁকিতেকৃষক উন্নত সার কিনলেন, সেচ দিলেন, রোগ-পোকা দমনে অর্থ ব্যয় করলেন। কিন্তু জমিতে যদি নিম্নমানের, মিশ্রিত বা দুর্বল বীজ ব্যবহার করা হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত গাছের সংখ্যা ও সমতা নাও পাওয়া যেতে পারে। ফলে সার, সেচ, শ্রম ও অন্যান্য উপকরণে কৃষকের বিনিয়োগের একটি অংশ কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনে রূপান্তরিত হয় না। ভালো বীজ তাই শুধু ফলন বাড়ায় না; কৃষকের অন্যান্য বিনিয়োগের দক্ষতাও বাড়াতে সাহায্য করে।শুধু কত টন নয়, কত টন মানসম্পন্ন বীজজাতীয় বীজ ব্যবস্থাপনায় এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন—‘কত টন বীজ উৎপাদন হয়েছে?’ এর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘কত টন মানসম্পন্ন বীজ সঠিক সময়ে কৃষকের হাতে পৌঁছেছে?’এক টন বীজ উৎপাদন এবং এক টন মানসম্পন্ন বীজ কৃষকের হাতে পৌঁছানো এক বিষয় নয়। অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা, জাতের বিশুদ্ধতা, আর্দ্রতা, রোগমুক্ততা, প্রাণশক্তি, সংরক্ষণক্ষমতা এবং সঠিক পরিচিতি—সবকিছুর নিশ্চয়তা থাকতে হবে। নিম্নমানের বা ভেজাল বীজ কৃষকের ক্ষতির পাশাপাশি জাতীয় কৃষি উৎপাদনেরও অপচয় ঘটায়।কৃষকের নিজস্ব বীজ ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে কৃষকের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভবও নয়। বরং এই ব্যবস্থাকে আরও বৈজ্ঞানিক করতে হবে। কৃষককে জানতে হবে—কোন গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন, কীভাবে বীজ শুকাবেন, কীভাবে রোগমুক্ত বীজ নির্বাচন করবেন, কীভাবে সংরক্ষণ করবেন এবং কখন বীজ পরিবর্তন করবেন। অর্থাৎ জাতীয় বীজ ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক মানসম্পন্ন বীজ এবং কৃষকের নিজস্ব ভালো বীজ—দুই ব্যবস্থাকেই সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।দরকার জাতীয় ৮০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ কর্মসূচিবাংলাদেশের বাস্তবতায় ‘জাতীয় ৮০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার কর্মসূচি’ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমে সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে ফসলভিত্তিক বীজের চাহিদা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সরকারি-বেসরকারি উৎপাদন সক্ষমতা, আমদানি, কৃষকের নিজস্ব বীজ এবং প্রকৃত ঘাটতি চিহ্নিত করতে হবে।তারপর বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান পরীক্ষা, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও কৃষকের ব্যবহার—এই পুরো শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করতে হবে। এ কাজে বিএডিসি, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বীজ প্রত্যয়ন সংস্থা, বেসরকারি বীজ কোম্পানি ও কৃষক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।কৃষির রূপান্তর শুরু হোক বীজ থেকেবাংলাদেশের কৃষি অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন—কম জমিতে বেশি উৎপাদন, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, নিরাপদ খাদ্য, পুষ্টি, কৃষকের আয় এবং খাদ্যনিরাপত্তা। এই প্রতিটি লক্ষ্যেই বীজের ভূমিকা রয়েছে।১০০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের লক্ষ্য হয়তো এখনই বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ একটি পরিমাপযোগ্য ও ধাপে ধাপে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন স্লোগান নয়, সঠিক হিসাব। জানতে হবে—দেশে কত বীজ প্রয়োজন, কোন ফসলে কত প্রয়োজন, কত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদিত হচ্ছে, কত আমদানি হচ্ছে, কৃষকের নিজস্ব বীজের কত অংশ মানসম্মত এবং প্রকৃত ঘাটতি কত।এই হিসাবের ভিত্তিতে যদি ৮০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে। কারণ কৃষির রূপান্তর শুরু হয় একটি বীজ থেকে। মানসম্পন্ন কোটি কোটি বীজই পারে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভিতকে আরও শক্তিশালী করতে। বীজ নিরাপদ হলে কৃষি নিরাপদ; কৃষি শক্তিশালী হলে শক্তিশালী হয় খাদ্যনিরাপত্তা।[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বিএডিসি]

অদক্ষ হাতে আয়কর রিটার্ন প্রস্তুত: বাড়ছে অডিটের ঝুঁকি

আয়কর রিটার্ন দাখিল একজন করদাতার জন্য শুধু একটি নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ নয়, বরং এটি তার আর্থিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়,ব্যয়, সম্পদ, দায়, বিনিয়োগ, ব্যাংক লেনদেন ও কর পরিশোধের তথ্য রিটার্নে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক করদাতা নিজের আয়কর রিটার্ন প্রস্তুত না করে কম্পিউটার, ফটোকপি কিংবা অনলাইন সেবার দোকানে গিয়ে অল্প খরচে রিটার্ন তৈরি ও দাখিল করছেন। এতে তাৎক্ষণিকভাবে সময় ও অর্থ সাশ্রয় হলেও ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে ভবিষ্যতে করদাতাকে করসংক্রান্ত জটিলতা এবং যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে হতে পারে।অনেক ক্ষেত্রে কম্পিউটার দোকানে রিটার্ন প্রস্তুতের প্রক্রিয়াটি হয়ে ওঠে শুধু করদাতার কাছ থেকে কিছু তথ্য নিয়ে নির্দিষ্ট সফটওয়্যার বা অনলাইন ব্যবস্থায় তা বসিয়ে দেওয়া। করদাতার প্রকৃত আয় কী, আয়ের উৎস কী, সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে, আগের বছরের সঙ্গে বর্তমান বছরের তথ্যের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, ব্যাংক লেনদেনের প্রকৃতি কী এবং বিনিয়োগের উৎস কোথায়, এসব বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ অনেক সময় হয় না। ফলে রিটার্ন দাখিল হয়ে গেলেও সেটি করদাতার প্রকৃত আর্থিক অবস্থার যথাযথ প্রতিফলন ঘটাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।আয়কর রিটার্নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো তথ্যের ধারাবাহিকতা। একজন করদাতার আগের বছরের সম্পদ, ব্যাংক ব্যালান্স, বিনিয়োগ, নগদ অর্থ ও দায়ের সঙ্গে চলতি বছরের তথ্যের একটি যৌক্তিক সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিবছর নতুন করে রিটার্ন তৈরি করতে গিয়ে আগের বছরের তথ্য বিবেচনায় না নিলে সম্পদের পরিমাণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে কোনো করদাতার ঘোষিত আয় তুলনামূলক কম হলেও সম্পদের পরিমাণ যদি হঠাৎ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, তাহলে সেই সম্পদ বৃদ্ধির উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে।তবে সম্পদ বৃদ্ধি পেলেই সেটিকে করযোগ্য আয় হিসেবে বিবেচনা করা যাবে এমন নয়। উত্তরাধিকার, উপহার, ঋণ, পূর্বের সঞ্চয়, সম্পদ বিক্রয় কিংবা অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকেও একজন করদাতার সম্পদ বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু এসব উৎসের যথাযথ তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ না করলে পরবর্তীতে সেই সম্পদ বৃদ্ধির ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে। ফলে রিটার্ন প্রস্তুতের সময় শুধু সম্পদের পরিমাণ নয়, সম্পদ অর্জনের উৎসও যথাযথভাবে বিবেচনা করা জরুরি।ব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন। অনেক করদাতার ব্যাংক হিসাবে ব্যবসায়িক লেনদেন, ঋণের অর্থ, পরিবারের সদস্যের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ, সম্পদ বিক্রির অর্থ কিংবা অন্যান্য উৎসের টাকা জমা হয়। ব্যাংকে জমা হওয়া প্রতিটি অর্থ করযোগ্য আয় নয়। আবার প্রকৃত আয়কে অন্য কোনো উৎস হিসেবে দেখানোও সঠিক নয়। তাই ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের প্রকৃতি বুঝে প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ এবং রিটার্নে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসার বিক্রয়, মূলধন, ব্যবসায়িক ব্যয়, ব্যাংক লেনদেন, ব্যক্তিগত উত্তোলন, ব্যবসায়িক সম্পদ এবং দায়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। একজন ব্যবসায়ী রিটার্নে যে তথ্য দিচ্ছেন, তার সঙ্গে ব্যাংক লেনদেন বা অন্যান্য আর্থিক নথির বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে ভবিষ্যতে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে। শুধু কম্পিউটারে সংখ্যা বসিয়ে রিটার্ন তৈরি করলে এসব বিষয় যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয় না।চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রেও একইভাবে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। অনেক চাকরিজীবীর প্রধান আয় বেতন হলেও এর পাশাপাশি ব্যাংক আমানতের সুদ, সঞ্চয়পত্র, বাড়িভাড়া, বিনিয়োগ কিংবা অন্যান্য বৈধ উৎস থেকে আয় থাকতে পারে। একই সঙ্গে তার সম্পদ, দায় ও বিনিয়োগের তথ্যও রিটার্নে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। কোনো একটি তথ্য বাদ পড়ে গেলে বা ভুলভাবে উপস্থাপিত হলে পরবর্তীতে সেটি সংশোধন কিংবা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে।রিটার্ন প্রস্তুতের ক্ষেত্রে আগের বছরের রিটার্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল। কিন্তু অনেক করদাতা প্রতিবছর নতুন করে রিটার্ন তৈরি করানোর সময় আগের বছরের রিটার্ন সামনে রাখেন না। ফলে এক বছরের সঙ্গে আরেক বছরের সম্পদ, দায়, ব্যাংক ব্যালান্স বা বিনিয়োগের তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। একজন করদাতার আর্থিক অবস্থার স্বাভাবিক পরিবর্তন অবশ্যই হতে পারে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের পেছনে যৌক্তিক কারণ থাকা এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।এখানে অডিট প্রসঙ্গটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কোনো রিটার্ন অদক্ষভাবে প্রস্তুত হয়েছে বলেই সেটি অডিটের আওতায় যাবে এমন নয়। কর কর্তৃপক্ষের যাচাই বা অডিটের জন্য নির্ধারিত আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে। তবে রিটার্নে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে অমিল, অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি, ব্যাংক লেনদেনের সঙ্গে ঘোষিত তথ্যের পার্থক্য কিংবা অন্যান্য অসংগতি থাকলে করদাতার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই রিটার্ন প্রস্তুতের সময় সতর্ক না হলে ভবিষ্যতে করদাতার জন্য অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রিটার্নে তথ্যের দায়। অনেক করদাতা মনে করেন, কম্পিউটার দোকানের কর্মী রিটার্ন তৈরি করেছেন, তাই কোনো ভুল হলে তার দায়ও ওই ব্যক্তির। বাস্তবে রিটার্নে প্রদত্ত তথ্যের সত্যতা ও যথার্থতার বিষয়টি করদাতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রিটার্ন প্রস্তুতকারী ব্যক্তি তথ্য টাইপ করা বা অনলাইন দাখিলের কাজে সহায়তা করতে পারেন, কিন্তু করদাতার প্রকৃত আয়, সম্পদ, দায় ও অন্যান্য আর্থিক তথ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়া এবং তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে রিটার্ন দাখিলের আগে করদাতার নিজের আর্থিক তথ্য গুছিয়ে নেওয়া উচিত। আগের বছরের রিটার্ন, বেতন বা ব্যবসার আয়, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বিনিয়োগের তথ্য, সঞ্চয়পত্র, সম্পত্তি ক্রয় বা বিক্রয়ের দলিল, ঋণের তথ্য এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথি একসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে তার উৎসের তথ্য ও প্রমাণও সংরক্ষণ করা উচিত। জটিলতা থাকলে অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবী বা কর পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।করদাতাদের মনে রাখা দরকার, একটি আয়কর রিটার্ন শুধু একটি নির্দিষ্ট করবর্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভবিষ্যতে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ, সম্পত্তি ক্রয়, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, সম্পদ হস্তান্তর কিংবা অন্যান্য আর্থিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তী রিটার্নের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে। ফলে আজ রিটার্নে দেওয়া কোনো ভুল তথ্য ভবিষ্যতে নতুন প্রশ্নের কারণ হতে পারে।প্রযুক্তির ব্যবহার আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়াকে নিঃসন্দেহে সহজ করেছে। অনলাইন ব্যবস্থার কারণে একজন করদাতা নিজেও অনেক কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। কিন্তু প্রযুক্তি শুধু তথ্য প্রবেশ ও দাখিলের প্রক্রিয়াকে সহজ করে। তথ্যটি সত্য, সঠিক এবং আইনসম্মত কি না, তা নিশ্চিত করে না। একটি সফটওয়্যার জানে না কোনো অর্থ উত্তরাধিকার থেকে এসেছে, কোনটি ঋণ, কোনটি ব্যবসার আয় এবং কোনটি সম্পদ বিক্রির অর্থ। এসব বিষয় নির্ধারণ করতে প্রয়োজন সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় নথি এবং কর আইন সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান।তাই আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতের ক্ষেত্রে শুধু কত কম খরচে রিটার্ন তৈরি করা গেল, সেটিকে গুরুত্ব না দিয়ে রিটার্নের তথ্য কতটা সঠিক, পূর্ণাঙ্গ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেদিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কম্পিউটার দোকান থেকে রিটার্ন তৈরি করানো নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তৈরি হতে পারে যখন কর আইন ও আর্থিক তথ্য যথাযথভাবে না বুঝে শুধু দ্রুত রিটার্ন দাখিল করা হয়।[লেখক: আয়কর আইনজীবী]

ভিডিও আরও দেখুন

আবাহনীর গোল বন্যায় উড়ে গেল ঢাকা ওয়ান্ডারার্স

বাংলাদেশ ফুটবল লিগের চাঁদপুর ভেন্যুতে ঐতিহ্যবাহী আবাহনী লিমিটেডের গতি ও আক্রমণের তোপে পড়েছিল ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব। পুরো ম্যাচজুড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে ওয়ান্ডারার্সকে ৫-১ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে আকাশী-নীল শিবিরের দলটি।শনিবার (৩ অক্টোবর) চাঁদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহযোগিতায় এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ব্যবস্থাপনায় চাঁদপুর স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয় দুই ঐতিহ্যবাহী দল। ম্যাচের শুরু থেকেই তীব্র আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয় আবাহনী।ম্যাচের ৩ মিনিটের মাথায় নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড অকাচির হেডে এগিয়ে যায় আবাহনী (১-০)। শুরুর সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ৬ মিনিটের মাথায় দূরপাল্লার জোরালো শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন দলটির পাকিস্তানি তারকা মঈন আহমেদ (২-০)। পিছিয়ে পড়ে খেলায় ফিরতে মরিয়া ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ১৪ মিনিটে জাহিদ হোসেনের দর্শনীয় গোলে ব্যবধান কমিয়ে ২-১ করে।তবে ওয়ান্ডারার্সের ঘুরে দাঁড়ানোর আশা স্থায়ী হয়নি। ৩৪ মিনিটে আবাহনীর খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। স্পট কিক থেকে ঠাণ্ডা মাথার নিখুঁত শটে আবাহনীকে ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন তাঁদের আক্রমণভাগের তারকা। ৩-১ গোলের এগিয়ে থেকেই প্রথমার্ধের খেলা শেষ করে আবাহনী।দ্বিতীয় পর্বেও আবাহনীর ধারালো আক্রমণের সামনে ওয়ান্ডারার্সের রক্ষণভাগ দিশেহারা হয়ে পড়ে। ৭৫ মিনিটে একক প্রচেষ্টায় নিজের দ্বিতীয় ও দলের চার নম্বর গোলটি করেন অকাচি (৪-১)। এরপর নির্ধারিত সময় শেষে অতিরিক্ত সময়ে (ইঞ্জুরি টাইম) আবাহনীর তরুণ ফরোয়ার্ড মুনাফ দারুণ এক ফিনিশিংয়ে পঞ্চম গোলটি করে ওয়ান্ডারার্সের বড় পরাজয় নিশ্চিত করেন (৫-১)। শেষ পর্যন্ত বিশাল জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ঢাকা আবাহনী।চাঁদপুর স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ফুটবলপ্রেমীদের উপস্থিতি ছিল দেখার মতো। স্থানীয় দর্শকদের করতালিতে মুখর ছিল পুরো প্রাঙ্গণ।ম্যাচ চলাকালে আবাহনীর কর্মকর্তাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শাহিন, ফুটবল সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন মেজু, জেলা বিএনপির সহসভাপতি জসিম উদ্দিন খান বাবুল, দেওয়ান মো. সফিকুজ্জামান, খলিলুর রহমান গাজী, পৌর বিএনপির সভাপতি আক্তার হোসেন মাঝি, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহজালাল মিশন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন জনুসহ অন্যান্য অতিথিরা।

আবাহনীর গোল বন্যায় উড়ে গেল ঢাকা ওয়ান্ডারার্স