সংবাদ
সৌদিতে দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ, যা জানালেন প্রতিমন্ত্রী

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ, যা জানালেন প্রতিমন্ত্রী

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড (শিরশ্ছেদ) কার্যকর করার বিষয়ে সৌদি সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। ঘটনার বিস্তারিত জানতে দেশটির কাছে রায়ের কপি চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ কথা জানান। এর আগে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত বাংলাদেশি প্রবাসী মো. শাহেদ আহম্মদের মরদেহ দেশে পৌঁছালে বিমানবন্দরে তা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন তিনি।সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সৌদি আরবে যে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তাদের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনো দেওয়া হয়নি। আমরা এরই মধ্যে ঢাকার সৌদি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কথা বলেছি। সেই সঙ্গে ঘটনার মূল রহস্য জানতে ও মৃত্যুদণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ বুঝতে সৌদি সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। রায়ের কপি পেলেই পুরো বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।’প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্রত্যেকটি স্বাধীন দেশের নিজস্ব আইনি কাঠামো রয়েছে। তবে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে গিয়ে চরম দণ্ডে দণ্ডিত হলে সে বিষয়ে জানা সরকারের দায়িত্ব। এর আগে যেকোনো প্রবাসীর সাজার খবর পেলে আমরা কূটনৈতিক চ্যানেলে তা মওকুফের চেষ্টা করি। কিন্তু না জানতে পারলে তা সম্ভব হয় না। এত টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়ে প্রবাসীরা এভাবে লাশ হয়ে ফিরবেন, তা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং নিজ দেশের নাগরিকদের সুরক্ষায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব ধরনের তৎপরতা অব্যাহত রাখবে।’/ 
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

চলনবিলের অস্তিত্বের সংকট: প্রকৃতি বাঁচলেই বাঁচবে জীবিকা

একটি জলাভূমি হারিয়ে গেলে শুধু পানির পরিমাণ কমে যায় না; হারিয়ে যায় মাছের আবাস, কৃষির সম্ভাবনা, মানুষের জীবিকা এবং একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিচয়। চলনবিল আজ সেই বাস্তবতার মুখোমুখি। দখল, দূষণ, পানিপ্রবাহের সংকট ও নির্বিচার সম্পদ আহরণে বিপর্যস্ত এ জলাভূমির ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু পরিবেশের প্রশ্ন নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন।একসময় বর্ষায় দিগন্তজোড়া জলরাশি, দেশি মাছের প্রাচুর্য আর প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ছিল চলনবিল। বিস্তীর্ণ জলাভূমিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল কৃষি, মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদনের অর্থনীতি। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশিতে নৌকা চলত, আর শুষ্ক মৌসুমে বিলের পানি ও পলিকে কাজে লাগিয়ে চলত কৃষিকাজ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই পরিচিত দৃশ্যপট। নদী-খাল ভরাট, জলাভূমি দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো, পানির স্বল্পতা ও অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ চলনবিলের স্বাভাবিক পরিবেশকে চাপে ফেলেছে। এর মূল্য দিচ্ছে প্রকৃতি ও মানুষ—উভয়ই।আয়তনের হিসাব নয়, গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির ভবিষ্যৎচলনবিল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি। সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীবনযাত্রার সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বর্ষায় বিলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে যায়; শুষ্ক মৌসুমে অনেক স্থান কৃষিজমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই মৌসুমি পরিবর্তনই চলনবিলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও নথিতে চলনবিলের আয়তন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে এর আয়তন ৫৫০ বর্গমাইল বা প্রায় ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার উল্লেখ করা হয়েছিল। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘বাংলার ভ্রমণ’ গ্রন্থে আয়তন বলা হয় ৪৪১ বর্গমাইল বা প্রায় ১ হাজার ১৪২ বর্গকিলোমিটার। পরবর্তী বিভিন্ন প্রতিবেদনেও আয়তন কমে আসার কথা উঠে এসেছে। তবে বিভিন্ন সময়ের পরিমাপপদ্ধতি এক না হওয়ায় এসব সংখ্যা সরাসরি তুলনা করে আয়তন হ্রাসের নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করা যায় না। এ জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত জরিপ।আয়তনের হিসাব নিয়ে মতভেদ থাকলেও জলাভূমির ওপর চাপ অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কোথাও পলি জমে নদী-খালের গভীরতা কমেছে, কোথাও দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে পানিপ্রবাহ। কচুরিপানার বিস্তার এবং প্লাস্টিক, পলিথিনসহ নানা বর্জ্য পানিদূষণ বাড়াচ্ছে। কৃষিজমি সম্প্রসারণ ও অপরিকল্পিত সড়ক-অবকাঠামোও জলপ্রবাহে প্রভাব ফেলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।জলাভূমি সংকুচিত হওয়ার অর্থ শুধু পানির বিস্তার কমে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাছের বিচরণক্ষেত্র ও প্রজনন, জলজ উদ্ভিদ, পাখি এবং মানুষের জীবিকা। পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বাড়ে। একই সঙ্গে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হতে পারে। তাই চলনবিলকে শুধু মৌসুমি জলরাশি হিসেবে দেখলে চলবে না। এর নদী, খাল, জলাশয় ও সংযোগপথকে একই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।মাছ কমলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতিচলনবিলের সংকটের বড় দিক হলো মৎস্যসম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোথাও কোথাও নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে। প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ও পোনা আহরণের অভিযোগও রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা জলজ প্রাণীর আবাস সংকুচিত করতে পারে। নদী-খালের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, পানির গভীরতা কমে যাওয়া এবং দূষণও মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণে বাধা সৃষ্টি করে।মাছের উৎপাদন কমে গেলে ক্ষতি শুধু জেলেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মাছ ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, শুঁটকি উৎপাদক এবং মৌসুমি শ্রমিকেরাও এর প্রভাবের মুখে পড়েন। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল বহু মানুষের আয় কমে গেলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।এ কারণে মাছ রক্ষায় শুধু অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়। প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ, নদী-খালের পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং মৎস্যসম্পদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাছ আহরণে বিধিনিষেধের সময় জেলেদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে। মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা না করে কেবল নিষেধাজ্ঞা দিলে তা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর করা কঠিন হতে পারে।শামুক-ঝিনুক আহরণে জীবিকা ও পরিবেশের ভারসাম্যচলনবিলে শামুক-ঝিনুক আহরণ দরিদ্র মানুষের মৌসুমি আয়ের অন্যতম উৎস। সংগৃহীত শামুক-ঝিনুকের মাংস মাছের খাদ্য হিসেবে বিভিন্ন এলাকার ঘেরে সরবরাহ করা হয়। খোলস থেকে তৈরি হয় খাওয়ার চুন। এভাবে আহরণ, পরিবহন ও বেচাকেনাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতির একটি ক্ষুদ্র জীবিকাচক্র।স্থানীয়দের দাবি, তাড়াশের ২০ থেকে ২৫টি জলাভূমিতে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক নৌকায় শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়। স্থান ও সময়ভেদে প্রতি বস্তা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়; পাইকারি পর্যায়ে দাম ওঠে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। স্থানীয় সংগ্রহকারীদের হিসাবে, এ কাজে একজন মানুষ দিনে কয়েক শ টাকা আয় করতে পারেন। ফলে অনেক দরিদ্র পরিবারের কাছে শামুক-ঝিনুক আহরণ শুধু মৌসুমি পেশা নয়, সংসার চালানোরও একটি অবলম্বন।কিন্তু এই জীবিকার আড়ালে রয়েছে পরিবেশগত উদ্বেগ। শামুক-ঝিনুক জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ। নির্বিচারে আহরণে এদের প্রাকৃতিক মজুত কমে গেলে জলজ প্রাণীর খাদ্যপ্রাপ্তি ও পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আহরণের প্রকৃত মাত্রা এবং জলজ পরিবেশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া সমস্যার ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা কঠিন।তাই শামুক-ঝিনুক আহরণ পুরোপুরি বন্ধ করে দরিদ্র মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত করা যেমন সমাধান নয়, তেমনি পরিবেশগত প্রভাব উপেক্ষা করে নির্বিচারে আহরণের সুযোগ দেওয়াও যুক্তিসংগত নয়। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক জরিপের ভিত্তিতে আহরণের সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ, নিয়মিত নজরদারি এবং জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন। পাশাপাশি এ পেশার ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রকৃতি রক্ষা ও মানুষের জীবিকা—দুটিকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে টেকসই সমাধান।শুঁটকি শিল্পে উৎপাদন কমছে, চাপে হাজারো মানুষের জীবিকাচলনবিলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছে শুঁটকি উৎপাদন ও বাণিজ্য। বিলের মাছ শুকিয়ে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করার এ শিল্পে মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু কাঁচা মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্পটি এখন সংকটে।মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উল্লাপাড়া ও তাড়াশের ৬০টি শুঁটকি বাজারে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ৩০২ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১৮৫ দশমিক ১৭ মেট্রিক টনে। এক বছরে উৎপাদন কমেছে ১১৬ দশমিক ৮৩ মেট্রিক টন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ কম।তাড়াশের মহিষলুটিতে একসময় প্রায় ২৫টি শুঁটকি চাতাল চালু ছিল। এখন সেগুলোর প্রায় অর্ধেক বন্ধ হয়ে গেছে; সচল রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এ শিল্পে প্রায় ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই হাজারের বেশি পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ মৌসুমি আয়ের ওপর নির্ভরশীল। একজন শ্রমিকের দৈনিক আয় প্রায় ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা।চলনবিলের শুঁটকি দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এর বাজার রয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও দুবাইয়ের বাজারেও এ পণ্য যায়।মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর অঞ্চলে ২৭৫টি শুঁটকি চাতাল রয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪৫০ মেট্রিক টন এবং সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এ পরিমাণ শুঁটকি উৎপাদনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন কাঁচা মাছ প্রয়োজন।উৎপাদন কমে যাওয়ার এই চিত্র দেখিয়ে দেয়, প্রাকৃতিক সম্পদের সংকট কীভাবে একটি শিল্পকে দুর্বল করে দিতে পারে। কাঁচা মাছের জোগান কমলে চাতাল বন্ধ হয়, শ্রমিক কাজ হারান, ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন এবং পরিবারগুলোর আয় কমে যায়। ফলে শুঁটকি শিল্পকে বাঁচাতে শুধু উৎপাদনস্থলের উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; যে জলাভূমি থেকে মাছ আসে, সেটিকেও রক্ষা করতে হবে।শুঁটকি শিল্পের আধুনিকায়ন, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মাছ শুকানোর ব্যবস্থা, সংরক্ষণাগার, বাজারজাতকরণে সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া প্রয়োজন। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি মাছের প্রাকৃতিক উৎস রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে শিল্পটির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব হবে না।পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে প্রকৃতি রক্ষা করেবর্ষায় চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি, নৌভ্রমণ ও গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। পরিকল্পিত প্রচার ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা গেলে চলনবিলকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।সরকারি উদ্যোগে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। নিরাপদ নৌভ্রমণ, পরিচ্ছন্ন ঘাট, বিশ্রামাগার, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পণ্য বিক্রির বাজার গড়ে উঠলে নৌকার মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৎস্যজীবী ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কর্মসংস্থান বাড়তে পারে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব আয়ও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।তবে পর্যটনের নামে জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ কিংবা বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণের সুযোগ দেওয়া যাবে না। পর্যটনকেন্দ্র গড়তে হবে জলপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে। নৌযানের নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে পর্যটন গড়ার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সেই পর্যটনের আকর্ষণকেই নষ্ট করবে।চলনবিল রক্ষায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজনচলনবিলের সংকট বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। জলাভূমি ভরাট ও পানিপ্রবাহে বাধা মাছের আবাস ও প্রজননকে প্রভাবিত করে। মাছের উৎপাদন কমলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুঁটকি শিল্প ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিকেরা। অন্যদিকে, শামুক-ঝিনুকের নির্বিচার আহরণ জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এসব সমস্যা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিরাজগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক দীপক কুমার করের মতে, চলনবিলের মাছের মজুত, উৎপাদন, শুঁটকি শিল্প ও কর্মসংস্থানের প্রকৃত অবস্থা জানতে সমন্বিত জরিপ প্রয়োজন। মা মাছ ও পোনা রক্ষা, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ, নদী-খালের পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং দখল উচ্ছেদে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি শুঁটকি শিল্পের উন্নয়ন, সহজ শর্তে ঋণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও জরুরি।চলনবিল রক্ষায় প্রথমেই প্রয়োজন জলাভূমির সীমানা ও বর্তমান অবস্থা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য জরিপ। এরপর দখল ও দূষণ বন্ধ, নদী-খাল পুনরুদ্ধার, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; নিয়মিত তদারকি ও ফলাফল মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।একই সঙ্গে জলজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখতে হবে। জেলে, শামুক-ঝিনুক সংগ্রহকারী ও শুঁটকি শ্রমিকদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি না করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কার্যক্রম সফল করা কঠিন। স্থানীয় মানুষকে সমস্যার অংশ হিসেবে নয়, সমাধানের অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে হবে।চলনবিলকে ঘিরে কৃষি, মৎস্য, শুঁটকি শিল্প ও পর্যটনের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হলে আগে এর প্রাকৃতিক ভিত্তি রক্ষা করতে হবে। উন্নয়ন মানে জলাভূমি ভরাট কিংবা নির্বিচারে সম্পদ আহরণ নয়; উন্নয়ন হলো প্রকৃতিকে টিকিয়ে রেখে মানুষের জীবনমান উন্নত করা।চলনবিলের সংকট তাই এখনই গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। দখল-দূষণ বন্ধ, নদী-খালের প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, মা মাছ ও পোনা রক্ষা, শামুক-ঝিনুক আহরণ নিয়ন্ত্রণ এবং শুঁটকি শিল্পের আধুনিকায়নে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে। চলনবিল বাঁচানো মানে শুধু একটি জলাভূমি রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতি, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ।[লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)]

দুর্যোগসহনশীল কৃষিতে চাই বিজ্ঞানভিত্তিক ফসল পরিকল্পনা

শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধি, স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন জাতের সম্প্রসারণ এবং অঞ্চলভিত্তিক ফসল বিন্যাস পুনর্গঠনের মাধ্যমে কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল ও দুর্যোগসহনশীল করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষিতে এখন শুধু বেশি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ যথেষ্ট নয়। কখন, কোথায়, কোন ফসল এবং কোন জাত চাষ করলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমিয়ে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন নিশ্চিত করা যাবে, সেই সিদ্ধান্তই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বন্যা, আকস্মিক বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগ কৃষির প্রচলিত উৎপাদন ক্যালেন্ডারকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে। কখনো অনিয়মিত বৃষ্টিতে বীজতলা তৈরি ও ধান রোপণ ব্যাহত হচ্ছে, কখনো আগাম বন্যায় পাকা ধান তলিয়ে যাচ্ছে। আবার অতিবৃষ্টির কারণে একটি ফসল কাটার পর সময়মতো পরবর্তী ফসল আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কৃষির ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় উৎপাদন বাড়ানোর প্রচলিত ধারণার পাশাপাশি সময়ের সঠিক ব্যবহার, ফসলের জীবনকাল হ্রাস এবং দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।বাংলাদেশের সীমিত আবাদযোগ্য জমিতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণে শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধি দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। কিন্তু বছরে জমিতে কতটি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে, শুধু সেই হিসাব দিয়ে কৃষির সাফল্য বিচার করা যায় না। ফসলের সংখ্যা বাড়াতে গিয়ে মাটির উর্বরতা কমে গেলে, সেচের পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে কিংবা একটি ফসলের সঙ্গে অন্য ফসলের সময়গত সংঘাত তৈরি হলে সেই নিবিড়তা দীর্ঘ মেয়াদে সুফল বয়ে আনবে না। তাই প্রয়োজন পরিকল্পিত শস্যনিবিড়তা, যেখানে জমির উৎপাদনক্ষমতা, মাটির স্বাস্থ্য, পানির প্রাপ্যতা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজারের চাহিদা এবং দুর্যোগের সম্ভাব্য সময় একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ফসল ও জাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো অঞ্চলে দীর্ঘ জীবনকালসম্পন্ন ফসলের পরিবর্তে উপযোগী স্বল্পমেয়াদি জাত আবাদ করা গেলে ফসল সংগ্রহের সময় এগিয়ে আনা সম্ভব। এতে একদিকে আগাম বন্যা, খরা কিংবা মৌসুমি বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকির সঙ্গে ফসলের সংবেদনশীল পর্যায়ের সংঘাত কমানো যায়, অন্যদিকে একই জমিতে পরবর্তী ফসল আবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া যায়। তবে স্বল্প জীবনকাল মানেই সব পরিস্থিতিতে বেশি ফলন নয়। জাতের ফলনক্ষমতা, রোগবালাই প্রতিরোধ, স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজন এবং বাজারমূল্য যাচাই করেই জাত নির্বাচন করতে হবে।হাওরাঞ্চলের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সেখানে বোরো ধান কাটার আগেই আকস্মিক বন্যা দেখা দিলে কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রম মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই অঞ্চলভেদে উপযোগী স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ও আগাম পরিপক্ব ধানের জাত নির্বাচন, সময়মতো বপন বা রোপণ এবং দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বন্যাপ্রবণ এলাকায় পানিতে ডুবে থাকার সহনশীলতাসম্পন্ন জাত এবং খরাপ্রবণ এলাকায় খরাসহিষ্ণু জাতকে উৎপাদন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় স্বল্পমেয়াদি ও প্রতিকূলতা-সহনশীল জাতের ব্যবহার নিয়ে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যেমন, উপযুক্ত বন্যাপ্রবণ এলাকায় ব্রি ধান ৫১, ব্রি ধান ৫২ ও বিনা ধান ১১-এর মতো জাত এবং খরাপ্রবণ এলাকায় সংশ্লিষ্ট পরিবেশের উপযোগী খরাসহিষ্ণু জাত বিবেচনা করা যায়। তবে কোনো জাতের সুপারিশের ক্ষেত্রে স্থানীয় মাটি, পানি, মৌসুম ও কৃষি গবেষণার সর্বশেষ নির্দেশনা বিবেচনায় নিতে হবে।শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধির আরেকটি কার্যকর পথ হলো ফসলের জীবনকাল ও জমি খালি থাকার সময়ের মধ্যে সমন্বয় করা। ধান কাটার পর দীর্ঘ সময় জমি অনাবাদি থাকলে সেখানে উপযোগী স্বল্পমেয়াদি ডাল, তেলবীজ বা সবজি আবাদ করা যেতে পারে। ধানভিত্তিক ফসল বিন্যাসে সরিষা, মুগডাল, অন্যান্য ডাল ও উপযোগী সবজি অন্তর্ভুক্ত করা গেলে খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পুষ্টি, কৃষকের আয় এবং মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষত ডালজাতীয় ফসল মাটিতে জৈবিকভাবে নাইট্রোজেন সংযোজনে ভূমিকা রাখে। তবে এ ক্ষেত্রে নাইট্রোজেন সংযোজনের পরিমাণ নির্ভর করে ফসলের ধরন, অণুজীব, মাটির বৈশিষ্ট্য ও ব্যবস্থাপনার ওপর। ফলে একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষের পরিবর্তে পরিকল্পিত ফসল বৈচিত্র‍্য কৃষির ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।তবে সব অঞ্চলের জন্য একই ফসল বিন্যাস কার্যকর হবে না। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ জমি, দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এবং মধ্যাঞ্চলের বন্যাপ্রবণ নিম্নভূমির সমস্যা এক নয়। কোথাও পানি দ্রুত নেমে যায়, কোথাও দীর্ঘদিন জলাবদ্ধতা থাকে, আবার কোথাও সেচের পানির সংকটই প্রধান বাধা। তাই দেশের কৃষিকে অভিন্ন ক্যালেন্ডারে পরিচালনা না করে কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভিত্তিক ফসল পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিটি এলাকার জন্য প্রধান ফসল, বিকল্প ফসল, উপযুক্ত জাত, বপন ও রোপণের সময়, সম্ভাব্য সংগ্রহকাল এবং দুর্যোগের ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কৃষি আবহাওয়ার তথ্য, স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ ফলাফলের সমন্বয়ে এ পরিকল্পনা নিয়মিত হালনাগাদ করা গেলে কৃষক আগাম সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন।এ জন্য শুধু জাত নির্বাচন নয়, পুরো উৎপাদনব্যবস্থাকে সময়-সংবেদনশীল করে তুলতে হবে। সময়মতো বীজ সরবরাহ, উন্নতমানের বীজের প্রাপ্যতা, সেচ ও পানি নিষ্কাশন, কৃষিযন্ত্রের সহজলভ্যতা এবং ফসল কাটার পর দ্রুত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষত দুর্যোগের আশঙ্কাপূর্ণ এলাকায় অল্প সময়ে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য কম্বাইন হারভেস্টারসহ উপযোগী কৃষিযন্ত্রের প্রাপ্যতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, খরাপ্রবণ এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেচের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কেবল স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না; সেই জাতের বীজ সময়মতো কৃষকের হাতে পৌঁছানো এবং নির্ধারিত সময়ে ফসল সংগ্রহের সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।এ ক্ষেত্রে গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমকে অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় ঝুঁকি মোকাবিলায় উপযোগী, স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও মূল্যায়নে গুরুত্ব দিতে পারে। বীজ উৎপাদন ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য চাহিদা অনুযায়ী আগাম বীজ প্রস্তুত ও সরবরাহের পরিকল্পনা করতে পারে। অন্যদিকে সম্প্রসারণকর্মীরা কৃষককে সঠিক জাত নির্বাচন, ফসলের সময় নির্ধারণ এবং আবহাওয়ার সতর্কবার্তা অনুসরণে সহায়তা করতে পারেন। গবেষণাগারের প্রযুক্তি, মাঠের অভিজ্ঞতা এবং কৃষকের বাস্তব চাহিদার মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করতে পারলেই পরিকল্পনার সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছাবে।জাত উন্নয়নেও সময়ের গুরুত্ব বাড়াতে হবে। প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির পাশাপাশি যেখানে বৈজ্ঞানিকভাবে উপযোগী, সেখানে দ্রুত প্রজন্ম উন্নয়ন, জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্তকারী চিহ্নের সহায়তায় নির্বাচন এবং আধুনিক জিনগত বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প সময়ে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জাত উন্নয়নের গবেষণা জোরদার করা যেতে পারে। তবে দ্রুত জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি একাধিক স্থানে পরীক্ষা, ফলন যাচাই, রোগবালাই প্রতিরোধ এবং কৃষকের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। কারণ, দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর জাত বলতে শুধু দ্রুত পরিপক্ব জাতকে বোঝায় না; বরং যে জাত নির্দিষ্ট পরিবেশে নির্ভরযোগ্য ফলন দিতে পারে, সেটিই প্রকৃত অর্থে কৃষকের ঝুঁকি কমাতে সক্ষম।এই পরিকল্পনার সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য ও উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়টিও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। শস্যনিবিড়তা বাড়ানোর নামে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ, নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহার কিংবা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে কৃষিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। তাই মাটি পরীক্ষা করে সুষম সার প্রয়োগ, ফসলের অবশিষ্টাংশের যথাযথ ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং পানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ডালজাতীয় ফসলের অন্তর্ভুক্তি, জৈব পদার্থের সংযোজন ও প্রয়োজনভিত্তিক সেচের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে এখন প্রয়োজন একটি বাস্তবায়নযোগ্য জাতীয় দুর্যোগসহনশীল শস্যনিবিড়তা কর্মপরিকল্পনা। এর আওতায় কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভিত্তিক ফসল ক্যালেন্ডার প্রণয়ন, স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ও প্রতিকূলতা-সহনশীল জাতের তালিকা হালনাগাদ, বীজের চাহিদা নিরূপণ, কৃষিযন্ত্রের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এবং কৃষি আবহাওয়ার তথ্যের ব্যবহার সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। প্রথম পর্যায়ে হাওর, খরাপ্রবণ অঞ্চল, উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকা ও বন্যাপ্রবণ নিম্নভূমিতে পরীক্ষামূলকভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ফলন, উৎপাদন ব্যয়, কৃষকের নিট আয়, পানির ব্যবহার এবং দুর্যোগজনিত ক্ষতির পরিবর্তন মূল্যায়ন করা উচিত। সফল মডেলগুলো স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী অন্য এলাকায় সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।সবশেষে মনে রাখতে হবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি বন্ধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়; কিন্তু বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এর ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কৃষকের হাতে সঠিক জাত, সঠিক সময়ে বীজ, নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার তথ্য এবং উপযুক্ত উৎপাদন কৌশল পৌঁছে দেওয়া গেলে একই জমিতে উৎপাদনের সুযোগ বাড়বে, অনাবাদি সময় কমবে এবং ফসলহানির ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি হবে। শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধির প্রকৃত সাফল্য তাই শুধু বছরে অধিকসংখ্যক ফসল উৎপাদনে নয়, বরং সীমিত জমি ও সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে নিরাপদ, লাভজনক ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করার মধ্যে নিহিত। বাংলাদেশের কৃষিকে এখন উৎপাদননির্ভরতা থেকে পরিকল্পনানির্ভরতার দিকে এগিয়ে নিতে হবে।দুর্যোগের পর ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় না থেকে দুর্যোগের আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে ফসল নির্বাচন, জীবনকাল নির্ধারণ ও উৎপাদন ক্যালেন্ডার সাজানোই হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ। প্রকৃতির অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে নয়, বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিক ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই হোক আগামী দিনের কৃষির মূল দর্শন।[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন]

রম্যগদ্য: “আঁই কি কইচ্চি যে...?”

আঁই কি কইচ্চি যে, অর্থাৎ সাধূ ভাষায় বলিতে গেলে বলিতে হয় আমি কী করিয়াছি যে...?হ, আন্নে কী করচেন হেইডা আন্নে বুঝেন ন’?  হ’ বুইড়া খুকার পোলা, কচি খুকা, আঁই কি কইচ্চি যে? পুরা জাতির ইজ্জত মারি অহন বলচেন, আঁই কি কইচ্চি যে, লজ্জা শরম নাই মিয়া...ছুট্টু বেলায়, লজ্জা-শরম, হায়া- বেহায়া, সকলের মুন্ডু কেটে তা, বঙ্গপোসাগরে মা দূর্গার সাথে বিসর্জন দিয়েছি। তাই খামাখা লজ্জা শরম নাই মিয়া...কথাটি বলিয়া অযথা সময় নষ্ট করিয়া কি লাভ! এখন বর্তমানের কথা চিন্তা করেন। জাতির বারটা যা বাজার, তাতো আপনারা ফায়ার ব্রিগেডের ঘন্টার ন্যায় ঢং ঢং করিয়া বিগত প্রায় চুয়ান্ন বছরে বাজাইয়াছেন। এখন জাতি কি করবে সেই চিন্তা করবেন নাকি আজীবন, সরি, আমরণ ড্রইং রুমে, হা-হুতাশ করেই সময় কাটাবেন?হেঁ হেঁ যেই যায় লংকায় সেই হয় রাবণ। আমার দ্যেশের সুনার পোলারা যখনই দায়িত্ব পাইছে তখনই মাইনে লগে লগে, মাল কামানোর জন্য এ্যতোই ব্যাস্ত যে, নিজের আর পরিবারের কথা ভাবি, ফুলি ফাঁপি, চাকরের চারশ’ কোটি টাকা, জাতির কপালে তপ্তবালির টিকা পরাই দিছেন! আবার আপনারাই স্ত্রীর ছুটো ভাই, আপনেরা কন, “আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে / আসেনি কেহ অবনী পরে / সকলে আমরা সকলের তরে / প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।” এইনি আপনেগো সকলে আমরা সকলের তরে/ প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।” বাঙালী হোই বাঙ্গালিরে হিডি মারি হ্যালার! মায়ে মারে পোলারে, পোলায় মারে বাপেরে, কব্বর থুন লাশ তুলি পুড়ি হ্যেলার, এ্যান্নে আঁই হারিন’ পরীক্ষায় মাল্লেকাই ফেইল করচে, আবার হুনি শ্যাপারে হিডি মারি হ্যেলার, অখন বলেন আমি কি করবো যে?শোন এতো আর আজকের কথা নয়, এ তো সেই পনেরশ’ শতাব্দীর বৃটিশ আমলের কথা, “এ-দেশ আমার / এ-দেশ তোমার / করলো কারা রচনা / ভায়ে ভায়ে বিবাদ / কেনগেল না...” ভায়ে ভায়ে বিবাদ সেই বৃটিশ আমলের অভিশাপ আমরা আজও বয়ে ব্যেড়াচ্ছি!আরে মিয়া ভাই আপনে বৃটিশ আমলের পাপ লোই ঘুরেন আঁর কিচুই বলার নাই। দুনিয়ার সকল দেশে পাবলিকে মদ পান করের, এমোন কি আন্নের ঈলন মাস্ক, যেই ব্যাটা উড়ন্ত গাড়ি বানই দুনিয়া কাঁপার, হেই, ইলন মাস্কও মদ খায়। কিন্তু আন্নের দেশে মদ খাওন হারাম, তাই আমি গেলাম একটু মদখোর হারামী গুলারে শায়েস্তা করতে। আর আপনেরা  মদখোর হারামী গুলারে শায়েস্তা না করি আমারেই শায়েস্তা করলেন!! আমার বাপে আপনের দলের লাই মুরগীর রক্তমাখি রক্তাত পুষ্টার ছাড়ছে, আর সেই আমারেই বিলাতি মেম সাহেবের কথা হুনি, পাবলিকের সামনে বেইজ্জতি করলেন?আরে সোনা, এ’নিয়ে এ্যাতো মন খারাপ করিস না। মনে রাখবি এই যে চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজী, জামিন বাণিজ্য, মেডিকেলের চল্লিশ পার্সেন্ট কমিশন, আজ মন্ত্রী, কাল প্রতিমন্ত্রী, পরশু আম পাবলিক, এই সকলের মাঝেই তোমাদের মঙ্গল নিহিত রহিয়াছে।হ, মঙ্গল নিহিত রহিয়াছে, মুখ খারাপ করায়েন না মিয়া, সারা দেশের পাবলিকে অহন আমারে লোই টিটকারি মারের। আমারে কয়, চল্লিশ দিন তালামারি পাবলিকের ভাইগ্য মারছিলেন, অহন বিলাইতি মেমেরা, হেঁ হেঁ আপনের দক্ষিণ দুয়ারে তালামারি আপনের বাপ-দাদার, নানা দাদার না, বাপ-চাচার ভাইগ্য হিডি মারি হালার। এই দুঃখ আমি কারে কমু কন?আচ্ছা ভালো কথা তোরা সব, মানে যারা বিলাতি মেমে সাহেবের, চাপে পড়ে ত্রাহি মধুসূদন, ত্রাহি মধুসূদন, ত্রাহি কৃষ্ণ, ত্রাহি কৃষ্ণ, করছিস তারা আবার সবাই মিলে নতুন কোনো পার্টি খোলার কথা ভাছিস? নাকি অন্য কিছু বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মতো নিজের আখের গোছাবার জন্য বিরোধী দলে যোগ দিবি?আরে না, আন্নে আঁরে ভুল বুইঝেন না। ব্যেবাগ বীর মুক্তিযোদ্ধারা অহন সিনিয়র সিটিজেন। যারা দুই বছর বয়েসে যুদ্ধে গেছিলো তাগো বয়সও পঞ্চাশ পার। এইসব বুইড়া, কিডনি ফেইল ডাইলাইিসিস রুগী দিয়া আর যাই হোক, পলিটিক্যাল পার্টি চইলত’ন। মিছিলে দশ কদম হাঁটলেই হ্যাতাগো জিবলা বাইর হই যায়। অহন লাগবো জেন-জি, নিউ জেনারেশন।বুঝলাম তোরা জেন-জী, নিউ জেনারেশন, কিন্তু যেই জন্য, তোদের ভাষায় ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটলো, বাস্তবে তার তো কোনো পরিবর্তন দেখছিনা!হুনেন, আমাগোরেরও একটা প্ল্যান আছে, এই সমাজ বদলাবার জইন্নে আঁরা বাছি বাছি পোলা লোই সুইসাইড স্কোয়াড বানাই ব্যেবাগ মদখোর হারামী গো, মারি-হিডি দ্যেশের তন খ্যেদামু, লগে লগে বিলাইতে মেমেরে আলকাতরা মাখি নিগরু বানাই লন্ডনে পাঠামু। তাহলে দেশের উন্নয়ন, তৌবা তৌবা, উন্নয়ন না, উন্নয়ন না, দেশের ভালো করার জন্য তোরাও নিজেরা নিজেরা, মানে বাঙালী হয়ে বাঙালীকে হিডি মারবি!!হ্যেইডাতো আমাগো মানে জেন-জী’র, দোষনা। আপনেই তো বলেচেন, “এ-দেশ আমার / এ-দেশ তোমার / করলো কারা রচনা / ভায়ে ভায়ে বিবাদ কেন / গেল না...” ভায়ে ভায়ে বিবাদ সেই বৃটিশ আমলের অভিশাপ আমরা আজও বয়ে ব্যেড়াচ্ছি!!তাহলে তোরা জেন-জী, নিউ জেনারেশন, তোদের হাতেও বাঙালী হোয়ে বাঙ্গালি মার খাবে, মা মারছে ছেলেকে, ছেলে মারছে বাবাকে, কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলা, চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজী, জামিন বাণিজ্য, মেডিকেলের চল্লিশ পার্সেন্ট কমিশন, আজ মন্ত্রী, কাল প্রতিমন্ত্রী, পরশু আম পাবলিক, এই অবস্থার শেষ হবে না!জ্বী না, কেয়ামত থেকে কেয়ামত পর্যন্ত এই সিসটেম চলবো। আর শুনেন, অহন ভায়ে ভায়ের, সাথে বিলাইতি মেম আর দেশী বেগমও যুক্ত হোইবো। ছিঃ ছিঃ ছিঃ লজ্জা লজ্জা, শরম শরম...[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চাই ওয়ান হেলথভিত্তিক জাতীয় কৌশল

বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর কোনো সাময়িক বা নির্দিষ্ট ঋতুভিত্তিক স্বাস্থ্য সমস্যা নয়। এটি ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডের ২০ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষ (১,১৫,৬১৭ জন) এবং মোট মারা গেছেন ৩৫৭ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়ও ১,৩৬৬ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৫ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া চলতি সপ্তাহের (সপ্তাহ ৪২) হিসাব অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যা ৫,৩০৫ জন এবং সাপ্তাহিক মৃত্যু ১৫ জন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) তীব্র সংকট, প্লাটিলেটের জন্য স্বজনদের হাহাকার এবং প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় হাজারের বেশি নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট করে যে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা কিংবা মশা নিধনের সাময়িক অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন বছরব্যাপী প্রতিরোধ, বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারি এবং সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।ডেঙ্গুর এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত ও দ্রুত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা এবং দুর্বল নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সরাসরি ও গভীর ভূমিকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং অনিয়মিত পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অসময়ে অতিবৃষ্টি এবং বাতাসে উচ্চ আর্দ্রতা এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ও ভাইরাসের বিস্তারকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করছে। উপযুক্ত তাপমাত্রায় মশার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের বহিঃস্থ ‘ইনকিউবেশন পিরিয়ড’ বা ভাইরাস সংক্রমণক্ষম হয়ে ওঠার সুপ্তিকাল বহুলাংশে কমে আসে। ফলে একটি সংক্রমিত এডিস মশা তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যেই নতুন নতুন মানবদেহে দ্রুত সংক্রমণ ঘটানোর সক্ষমতা অর্জন করে। অন্যদিকে, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ভবন নির্মাণ এলাকা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পাত্র এবং বাসাবাড়ির ছাদবাগানে জমে থাকা পানি মশার আদর্শ প্রজননস্থলে পরিণত হচ্ছে। ফলে কেবল হাসপাতালমুখী চিকিৎসা দিয়ে এই জটিল পরিবেশগত ও বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট সামলানো একেবারেই অসম্ভব।আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতিগুলো মূলত ‘সংকট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ানিર્ભর’। মহামারি বা প্রাদুর্ভাব বাড়লে কেবল হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো কিংবা মশা নিধনে রাসায়নিক ওষুধ ছিটানোর সাময়িক তৎপরতা চোখে পড়ে। অথচ কোথায় মশার বংশবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে, কোন কোন এলাকায় প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে এবং সিটি করপোরেশন কর্তৃক ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা কতখানি বজায় রয়েছে, তা প্রতিনিয়ত বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা জরুরি। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া নির্বিচারে কীটনাশক ছিটানো কেবল বিপুল অর্থেরই অপচয় ঘটায় না, বরং পরিবেশগত ভারসাম্য ও অন্যান্য উপকারী পতঙ্গের চরম ক্ষতি সাধন করে। তাই লার্ভার উৎস নির্মূল, নিয়মিত পতঙ্গতাত্ত্বিক জরিপ, নগর বর্জ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিজ্ঞানসম্মত পরিবেশবান্ধব নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।এ ক্ষেত্রে ‘ওয়ান হেলথ’ বা এক স্বাস্থ্য পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই পদ্ধতি মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। ডেঙ্গু প্রাণী থেকে সরাসরি মানুষের মধ্যে ছড়ানো রোগ নয়; সংক্রমিত এডিস মশার মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়ায়। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ওয়ান হেলথের প্রয়োগ বলতে মানুষ, বাহক মশা, পরিবেশ ও জলবায়ুর সম্পর্ককে একসঙ্গে বিবেচনা করা বোঝায়। এর মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, কীটতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী, জলবায়ু গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘বিশেষ টাস্কফোর্স’ গঠন করেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। তবে কেবল কাগজ-কলমে বা প্রশাসনিক সমন্বয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে এই টাস্কফোর্সে কীটতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী ও ওয়ান হেলথ বিশেষজ্ঞদের সরাসরি যুক্ত করে ওয়ান হেলথ ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার তথ্য, মশার ঘনত্ব, প্রজননস্থলের অবস্থান এবং হাসপাতালের রোগীসংক্রান্ত তথ্য সমন্বয় করে একটি জাতীয় নজরদারি ও আগাম সতর্কীকরণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা এবং সংক্রমণ বৃদ্ধির আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি পরীক্ষা ও মূল্যায়নের ব্যবস্থাও করতে হবে, যেন মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়।পাশাপাশি নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, নিয়মিত বর্জ্য পরিষ্কার এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জনগণকে সচেতন হতে হবে। তবে নাগরিকদের ওপর দায় চাপিয়ে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নালা পরিষ্কার ও কার্যকর পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব।ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক উদ্যোগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণানির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক জাতীয় কৌশল প্রয়োজন। চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত নজরদারি ও আন্তমন্ত্রণালয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সাফল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত শুধু কতজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হলো, তার ভিত্তিতে নয়; বরং কতটি সংক্রমণ প্রতিরোধ করা গেল এবং কতটি জীবন রক্ষা করা গেল, তার ভিত্তিতে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতিবছর প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।[লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; ওয়ান হেলথ বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয় কমিটির সাবেক সদস্য]

নিরাপদ সড়ক: আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার

সড়ক যোগাযোগ একটি দেশের অর্থনীতি, উন্নয়ন ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই সড়কই যখন মানুষের অকালমৃত্যু, পঙ্গুত্ব ও পরিবারে স্থায়ী শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন উন্নয়নের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একটি দেশের সড়ক কত প্রশস্ত, কতটি সেতু নির্মিত হয়েছে কিংবা যানবাহনের গতি কত বেড়েছে, শুধু তা দিয়ে উন্নয়ন পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের অন্যতম মানদণ্ড হলো, মানুষ কতটা নিরাপদে চলাচল করতে পারছে এবং তার জীবন কতটা সুরক্ষিত। ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ আমাদের সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এখন প্রয়োজন প্রতিপাদ্যের বক্তব্যকে বাস্তব জীবনের নিরাপত্তায় রূপান্তর করা। এ জন্য চাই কার্যকর আইন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জবাবদিহি।জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বেদনাবিধুর ইতিহাস। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন নিহত হন। ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে ইলিয়াস কাঞ্চন নিরাপদ সড়কের দাবিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) আন্দোলন দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা, জনসম্পৃক্ততা ও গণমাধ্যমের সহযোগিতার মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তার দাবি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৭ সালে ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে দিবসটি দশমবারের মতো পালিত হচ্ছে। এই দিবস আমাদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করার পাশাপাশি অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় মূল্যায়নের সুযোগ করে দিয়েছে।জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালন, আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা, ব্যানার ও স্লোগানের পরও সড়কে মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কেন যথেষ্ট কমছে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সড়ক দুর্ঘটনাকে কেবল চালকের ভুল কিংবা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, আইন অমান্য, দুর্বল যান চলাচল ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক নকশা, অনিরাপদভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম, চালকের ক্লান্তি, পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ার মতো একাধিক কারণ কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকি একসঙ্গে উপস্থিত থাকে। ফলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শুধু একজন চালককে দায়ী করা, জরিমানা বাড়ানো কিংবা বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক প্রচার চালানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত, ধারাবাহিক ও প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশবিষয়ক একই বছরের প্রতিবেদনে দেশে সরকারি হিসাবে ৫ হাজার ৮৪ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মডেলভিত্তিক অনুমান ছিল প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক অনুমানের এই বড় ব্যবধান দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সংজ্ঞা, মৃত্যুর হিসাব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। তবে এসব সংখ্যা ২০২১ সালের তথ্য, ২০২৬ সালের বর্তমান মৃত্যুসংখ্যা নয়। এই পার্থক্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: সড়ক নিরাপত্তার কার্যকর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য, সমন্বিত ও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যব্যবস্থা অপরিহার্য। প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছাড়া দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং গৃহীত পদক্ষেপের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা কঠিন।সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিরাপদ সড়ক শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নাগরিক অধিকার, পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রীয় সুশাসনের অংশ। সরকার সড়ক নির্মাণ করবে, যানবাহন চলাচলের নিয়ম নির্ধারণ করবে, চালকের যোগ্যতা যাচাই করবে, পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণ করবে এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে যাত্রী, পথচারী, সাইকেলচালক ও মোটরসাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সড়ক নির্মাণের পর সেটি কতটা নিরাপদ থাকছে, পরিবহন আইন কতটা মানা হচ্ছে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো কত দ্রুত সংশোধন করা হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিরা সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, এসব বিষয়ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কাজের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে এবং তাদের কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেবে না।সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর কার্যকর ও ধারাবাহিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনকভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম, অতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য বহন এবং যান চলাচলের সংকেত অমান্যের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু আইন থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। আইন প্রয়োগে শিথিলতা, অনিয়ম, পক্ষপাত কিংবা দায়িত্বহীনতা থাকলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। কোনো বিশেষ দুর্ঘটনার পর কয়েক দিন অভিযান জোরদার করে পরে তৎপরতা কমিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। আইন প্রয়োগ হতে হবে নিয়মিত, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সব শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর। পরিবহন মালিক, চালক, শ্রমিক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি—কেউই যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ না পান। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা, অযৌক্তিক জরিমানা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগও বন্ধ করতে হবে।শুধু বিদ্যমান আইন প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বর্তমান বাস্তবতার আলোকে একটি সমন্বিত ও কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এমন আইনে সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের নিরাপত্তামান, যানবাহনের কারিগরি নিরাপত্তা, চালকের প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা, গতিসীমা, পথচারীর অধিকার, জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা, দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ, তদন্ত, নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। আইন প্রণয়নের আগে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞদের মতামত, গবেষণালব্ধ ফলাফল এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক, নাগরিক সমাজ ও সড়ক নিরাপত্তা সংগঠনগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আইনটি যেন শুধু অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের দলিল না হয়, বরং দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা গঠন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্ব নিশ্চিত করার কার্যকর কাঠামো হয়ে ওঠে।নতুন আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ পরস্পরের বিকল্প নয়। নতুন আইন তৈরি করতে সময় লাগলেও বর্তমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ থেমে থাকতে পারে না। আবার বিদ্যমান আইনে কোনো ঘাটতি থাকলে সেটি চিহ্নিত করে সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগও পিছিয়ে দেওয়া উচিত নয়। আইন প্রণয়নের পর বিধিমালা, দায়িত্ব বণ্টন, প্রয়োজনীয় জনবল, প্রযুক্তি, বাজেট এবং বাস্তবায়ন নির্দেশনা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভালো আইনও কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে। আইনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান বাস্তবায়নের জন্য কে দায়িত্ব পালন করবে, কীভাবে তা পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট থাকতে হবে। আইন প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি এবং স্থায়ী জবাবদিহি। আমাদের দেশে অনেক সময় কোনো বড় দুর্ঘটনা বা জনদাবির পর তৎপরতা বাড়ে, অভিযান চলে, সভা হয়, নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পর সেই তৎপরতা কমে গেলে আগের অনিয়ম আবার ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়। এভাবে চলতে থাকলে কোনো আইন, নির্দেশনা কিংবা কর্মসূচিই স্থায়ী ফল দিতে পারবে না। তাই সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে সাময়িক অভিযাননির্ভর না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে প্রতিটি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাজ, সময়সীমা, লক্ষ্যমাত্রা ও অগ্রগতি মূল্যায়নের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। নিয়মিত পর্যালোচনা সভা, মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন, ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রকাশ্য অগ্রগতি প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের অবস্থা যাচাই করা যেতে পারে।বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বিত দায়িত্ব বণ্টন থাকা প্রয়োজন। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিত হওয়ার পর সেটি নিরাপদ করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কোনো যানবাহন বারবার আইন লঙ্ঘন করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসাসেবা পৌঁছাতে কত সময় লাগছে এবং গৃহীত পদক্ষেপে দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ঝুঁকি কমেছে কি না, এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু কতটি অভিযান পরিচালিত হলো কিংবা কত টাকা জরিমানা আদায় হলো, সেটিই সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। প্রকৃত সাফল্য হলো দুর্ঘটনা ও গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি কমানো এবং মানুষের জীবন রক্ষা করা।সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নজরদারি ব্যবস্থা যেন ব্যক্তিনির্ভর না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো কর্মকর্তা বদলি হলে, প্রশাসনিক অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হলে কিংবা কোনো বড় দুর্ঘটনা গণমাধ্যমের আলোচনার বাইরে চলে গেলে সড়ক নিরাপত্তার কার্যক্রম যেন থেমে না যায়। এ জন্য আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে স্থায়ী দায়িত্ব নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা থাকতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কোথাও নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন না হলে তার কারণ জানতে হবে এবং সংশোধনী পদক্ষেপ নিতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে সড়ক নিরাপত্তা দিবসের কর্মসূচি শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সারা বছর ধরে বাস্তবায়িত হবে।চালকদের দক্ষতা ও কর্মপরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। পেশাদার চালকের হাতে বহু মানুষের জীবন নির্ভর করে। তাই লাইসেন্স দেওয়ার আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা যাচাই করা জরুরি। চালকের কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, ঘুমের সুযোগ এবং দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানো, ক্লান্ত অবস্থায় স্টিয়ারিং ধরা কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর অযৌক্তিক চাপ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শুধু চালকের ওপর সব দায় চাপিয়ে পরিবহন মালিক ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। চালক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত দক্ষতা যাচাই, পেশাগত আচরণ উন্নয়ন এবং পরিবহন পরিচালনায় নিরাপত্তানীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। চালকের ভুলের জন্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনায় ভূমিকা রাখা অন্যান্য কারণও তদন্ত করতে হবে।সড়কের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সড়কে পর্যাপ্ত ফুটপাত নেই, কোথাও ফুটপাত দখল হয়ে আছে, কোথাও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, শিল্পাঞ্চল এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পথচারীর ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সড়ক পরিকল্পনা করতে হবে। বিপজ্জনক বাঁক, দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হওয়া স্থান, অপর্যাপ্ত সড়কবাতি, ত্রুটিপূর্ণ নির্দেশক চিহ্ন ও সড়কচিহ্ন, অরক্ষিত সড়ক বিভাজক এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রবেশপথ চিহ্নিত করে সংশোধন করতে হবে। মহাসড়কে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে নিরাপদ পারাপার, সংযোগ সড়ক, সঠিক বাসস্টপ, গতিনিয়ন্ত্রণ এবং পথচারীবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান সড়কের নিরাপত্তা নিরীক্ষা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থান দ্রুত সংশোধনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার জন্য ‘নিরাপদ সড়কব্যবস্থা পদ্ধতি’ অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ধারণার মূল কথা হলো, মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই ভুল যেন অনিবার্যভাবে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের কারণ না হয়, সে অনুযায়ী পুরো পরিবহনব্যবস্থাকে সাজাতে হবে। নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা—এই উপাদানগুলোকে সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সচেতনতার প্রচার কিংবা শুধু শাস্তি দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। অবকাঠামো, আইন, যানবাহন, চালকের প্রশিক্ষণ, জরুরি চিকিৎসা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমানোর জাতিসংঘের বৈশ্বিক লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশকেও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ এবং অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে।দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক মিনিট অনেক আহত মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানো, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী পাওয়া, আহত ব্যক্তিকে সঠিকভাবে হাসপাতালে স্থানান্তর এবং উপযুক্ত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। তাই জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্যকর জরুরি সাড়াদানব্যবস্থা, সমন্বিত অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক, হাসপাতালগুলোর মধ্যে রোগী স্থানান্তরের ব্যবস্থা, গুরুতর আঘাতের চিকিৎসাসক্ষমতা এবং প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা জরুরি। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও হাসপাতালের মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনাস্থলে আহত ব্যক্তিকে অদক্ষভাবে টানাহেঁচড়া না করে প্রশিক্ষিত সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সাধারণ মানুষকেও সচেতন করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনায় দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর জীবন রক্ষার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আরেকটি বড় সমস্যা হলো দুর্ঘটনার তথ্যের বিচ্ছিন্নতা। পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তথ্য এক জায়গায় সমন্বিত না হলে দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, মৃত্যুর কারণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ণয় কঠিন হয়। তাই একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনা তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দুর্ঘটনার স্থান, সময়, যানবাহনের ধরন, সড়কের অবস্থা, হতাহত, চিকিৎসা এবং তদন্তের ফলাফল নিয়মিত নথিভুক্ত করতে হবে। তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এবং অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে পদ্ধতি ও সংজ্ঞার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান তুলনা ও বিশ্লেষণ করা যায়।সড়ক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় জনগণের দায়িত্বও অনস্বীকার্য। চালককে গতিসীমা মানতে হবে, বৈধ লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করতে হবে, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার করতে হবে এবং গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। মোটরসাইকেলে চালক ও যাত্রী উভয়ের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার জরুরি। পথচারীদের নির্ধারিত স্থানে রাস্তা পারাপার, ফুটপাত ব্যবহার এবং যান চলাচলের সংকেত মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে দায়িত্বশীল আচরণ, চালকের প্রশিক্ষণ এবং যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে জনসচেতনতার নামে রাষ্ট্র ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আড়াল করা যাবে না। নিরাপদ আচরণের সুযোগ তৈরি করতে হবে নিরাপদ অবকাঠামো, কার্যকর আইন এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যক্রমে বয়সোপযোগী সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা এবং জনসচেতনতামূলক প্রচার বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর প্রকাশের পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ, প্রতিরোধের উপায়, আইনের প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন থাকা প্রয়োজন। কোনো বড় দুর্ঘটনার পর সাময়িক আলোচনা করে থেমে না গিয়ে সড়ক নিরাপত্তার অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে। জনমত ও গণমাধ্যমের নজরদারি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক জনসচেতনতা সৃষ্টি ও নীতিগত পরিবর্তনের দাবিতে কাজ করে আসছে। সংগঠনটির প্রায় ১২০টি শাখার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকার চাইলে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, চালক প্রশিক্ষণ এবং সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় গড়ে তোলা গেলে উদ্যোগগুলো আরও কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও নজরদারির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ নাগরিক সংগঠনগুলোর মতামত গ্রহণ করা উচিত। সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হলে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের জনসম্পৃক্ততা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা কোনো একক সংস্থার কাজ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের তাৎপর্য তাই শুধু শোক স্মরণ বা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এই দিন হতে হবে সড়ক নিরাপত্তার অগ্রগতি পর্যালোচনা, ব্যর্থতার কারণ শনাক্ত এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের অঙ্গীকারের দিন। সরকারকে বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সমন্বিত আইন প্রণয়ন করতে হবে, নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, দক্ষ চালক তৈরি করতে হবে, জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি কর্মসূচির বাস্তব অগ্রগতি নিয়মিত যাচাই এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো দুর্ঘটনা বা দিবসকেন্দ্রিক তৎপরতা যেন কিছুদিন পর থেমে না যায়, সে জন্য সড়ক নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থের অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবেন, একজন শিক্ষার্থী নিশ্চিন্তে বিদ্যালয়ে যেতে পারবে এবং একজন শ্রমজীবী মানুষ জীবিকার সন্ধানে বের হয়ে সুস্থভাবে পরিবারের কাছে ফিরতে পারবেন। সড়কে মৃত্যু যেন স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া না হয়, প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হয় এবং একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। উন্নয়নের প্রকৃত সার্থকতা মানুষের জীবন রক্ষায়। তাই জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির বাইরে এসে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা, কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন, আইনের নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং স্থায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রণয়ন করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না, আবার আইন প্রয়োগের নামে সাময়িক তৎপরতা দেখিয়েও থেমে থাকা যাবে না। ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয়কে শুধু স্লোগানে নয়, বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ, সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন, নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)]

আলবার্টার গণরায় ও কানাডার ঐক্য

২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর কানাডার আলবার্টা প্রদেশে অনুষ্ঠিত গণভোট দেশটির কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক রাজনীতি, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং জাতীয় ঐক্য নিয়ে বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত করেছে। গণভোটের দশম প্রশ্নে ভোটারদের সামনে দুটি বিকল্প ছিল—আলবার্টা কানাডার প্রদেশ হিসেবে থাকবে, নাকি কানাডার সংবিধান অনুযায়ী প্রদেশটির বিচ্ছিন্নতা নিয়ে একটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। প্রকাশিত অনানুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী, প্রায় ৭৬.৫ শতাংশ ভোটার কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে এবং ২৩.৪ শতাংশ পরবর্তী বিচ্ছিন্নতা-প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে মত দিয়েছেন। ইলেকশন কানাডা সূত্রে জানা যায়, সরকারি ফল প্রকাশের নির্ধারিত তারিখ ২৯ অক্টোবর ২০২৬।এই ফলাফলকে শুধু একটি প্রাদেশিক ভোটের পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করলে এর পূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এটি একদিকে কানাডার জাতীয় ঐক্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংকেত, অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলীয় অসন্তোষ, প্রাদেশিক ক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে চলমান বিতর্কের সুস্পষ্ট প্রতিফলন। তবে এই গণভোটকে আলবার্টার বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। ভোটাররা সরাসরি স্বাধীনতার প্রশ্নে নয়, বরং ভবিষ্যতে সে বিষয়ে বাধ্যতামূলক গণভোটের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে কি না, সে বিষয়ে মত দিয়েছেন।গণভোটের সাংবিধানিক তাৎপর্যকানাডার সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী, কোনো প্রদেশ একতরফাভাবে গণভোটের ফল বা স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে আইনগতভাবে কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। ১৯৯৮ সালের ‘কুইবেকের বিচ্ছিন্নতা বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মতামত’ মামলায় কানাডার সুপ্রিম কোর্ট ব্যাখ্যা করেন, বিচ্ছিন্নতার পক্ষে স্পষ্ট প্রশ্নে সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়া গেলে তা সাংবিধানিক আলোচনার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এমন ফলাফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না।২০০০ সালের ‘স্পষ্টতা আইন’ও এই নীতির ওপর গুরুত্ব দেয়। গণভোটের প্রশ্নের স্পষ্টতা, বিচ্ছিন্নতার পক্ষে সমর্থনের ব্যাপকতা এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনার পাশাপাশি সাংবিধানিক আলোচনা, সম্পদ ও দায়ের বণ্টন, সীমান্ত, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।২০২৬ সালের গণভোটে ভোটাররা সরাসরি স্বাধীনতার পক্ষে বা বিপক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। তারা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, স্বাধীনতার প্রশ্নে পরবর্তী বাধ্যতামূলক গণভোটের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে কি না। তাই ফলাফলটির তাৎপর্য মূলত পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের সঙ্গে সম্পর্কিত। কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন দেয়নি। তবে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে ভবিষ্যৎ বিতর্কের অবসানও ঘটায়নি।অর্থনীতি ও বিচ্ছিন্নতার সম্ভাব্য প্রভাবআলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক বিষয়গুলো অপরিহার্য। প্রদেশটির তেল, গ্যাস, পেট্রোরসায়ন, কৃষি ও অন্যান্য শিল্প কানাডার অভ্যন্তরীণ বাজার, পরিবহনব্যবস্থা এবং আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। বিচ্ছিন্নতা বাস্তবায়িত হলে আন্তপ্রাদেশিক পাইপলাইন, বাণিজ্য, মুদ্রা, ব্যাংকিং, সরকারি ঋণ, পেনশন, কর এবং বিদ্যমান আর্থিক দায়বদ্ধতার বণ্টন নিয়ে জটিল আলোচনা প্রয়োজন হতো।একইভাবে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি শিল্পপ্রকল্পকে প্রভাবিত করতে পারত। তবে এগুলো সম্ভাব্য প্রভাব, নিশ্চিত ফল নয়। প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিণতি নির্ভর করত বিচ্ছিন্নতার শর্ত, নতুন আইনি কাঠামো, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং কানাডা ও আলবার্টার মধ্যকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপর।এখানে মৌলিক প্রশ্ন হলো, আলবার্টার অর্থনৈতিক স্বার্থ কানাডার যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে থেকে অধিক কার্যকরভাবে রক্ষা করা সম্ভব, নাকি রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন প্রয়োজন? গণভোটের ফলাফল বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তাবকে সমর্থন করেনি। ফলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় অর্থনৈতিক ক্ষমতা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বাস্তবসম্মত সমাধান বিশেষ গুরুত্ব পাবে।আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাআলবার্টার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় ফার্স্ট নেশনস বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার উপেক্ষা করা যায় না। কানাডার ক্রাউনের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক চুক্তি রয়েছে, যা ভূমি, সম্পদ, শাসনব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো নতুন রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন উঠলে এসব চুক্তির ধারাবাহিকতা ও অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।আলবার্টার বিচ্ছিন্নতার উদ্যোগ নিয়ে আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর উদ্বেগের একটি প্রধান দিক হলো, কানাডার সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তিগত অধিকার ভবিষ্যৎ ব্যবস্থায় কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে। তাদের অধিকার কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ওপর নির্ভরশীল কোনো বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত।অতএব, আলবার্টার স্বাধীনতার প্রশ্নকে শুধু প্রাদেশিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয় হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। ভূমির অধিকার, চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থান যেকোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকা উচিত।জাতীয় ঐক্য ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভবিষ্যৎআলবার্টার গণভোটের ফলাফল কানাডার জাতীয় ঐক্যের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত। তবে এই ফলাফলকে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। জাতীয় ঐক্য টেকসই করতে হলে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, নীতিগত সংলাপ এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের ন্যায্য সমন্বয় প্রয়োজন।প্রথমত, আঞ্চলিক অসন্তোষকে শুধু বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করলে এর অন্তর্নিহিত কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে। জ্বালানি নীতি, রাজস্ব বণ্টন ও প্রাদেশিক ক্ষমতা নিয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান প্রয়োজন।দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রাজনৈতিক দাবির প্রতি জনসমর্থনের পরিসর নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আলবার্টার ভোটাররা বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই সিদ্ধান্তকে সম্মান করার পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতার পক্ষে মত দেওয়া নাগরিকদের উদ্বেগও গণতান্ত্রিক আলোচনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।তৃতীয়ত, জাতীয় ঐক্য কেবল ঐতিহাসিক পরিচয় বা আবেগের ওপর নির্ভর করে না। নাগরিকদের বিশ্বাস করতে হবে যে তাদের অঞ্চল, অর্থনীতি ও অধিকার নীতিনির্ধারণে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই ঐক্য রক্ষার জন্য শুধু বিচ্ছিন্নতার বিরোধিতা নয়, কার্যকর যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থাও জরুরি।কুইবেক ও আলবার্টার অভিজ্ঞতার তুলনা এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। কুইবেকের আন্দোলনে ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় প্রধান ভূমিকা পালন করেছে; আলবার্টার আন্দোলনে অর্থনৈতিক স্বার্থ, জ্বালানি নীতি এবং প্রাদেশিক ক্ষমতার প্রশ্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই পার্থক্য দেখায়, কানাডার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলোকে একই রাজনৈতিক ছাঁচে বিচার করা যায় না।গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট, আঞ্চলিক স্বার্থ ও জাতীয় ঐক্যের ভারসাম্যআলবার্টার ১৯ অক্টোবর ২০২৬-এর গণভোট কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্রকাশিত অনানুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী, অধিকাংশ ভোটার কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন এবং বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে পরবর্তী বাধ্যতামূলক গণভোটের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই ফলাফলকে কানাডার জাতীয় ঐক্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংকেত হিসেবে দেখা যায়। তবে এটি আলবার্টার আঞ্চলিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি বিলুপ্ত করে না।কানাডার অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়: কোনো যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়িত্ব শুধু বিচ্ছিন্নতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে আঞ্চলিক ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তার ওপর। আলবার্টার অর্থনৈতিক গুরুত্ব, কুইবেকের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।এই গণরায় বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে জনম্যান্ডেট দেয়নি। এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার ও আলবার্টার প্রাদেশিক সরকার এই ফলাফলকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা, ন্যায্য ক্ষমতা বণ্টন এবং পারস্পরিক আস্থায় রূপান্তর করবে। আঞ্চলিক অসন্তোষকে উপেক্ষা না করে সাংবিধানিক সংলাপ ও গণতান্ত্রিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করাই হবে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রকৃত পরীক্ষা।আলবার্টার গণরায় কানাডার ঐক্যের পক্ষে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার বার্তা দিয়েছে। কিন্তু সেই ঐক্যের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, দায়বদ্ধ ও কার্যকর যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তোলার ওপর—যেখানে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং জাতীয় সংহতি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সাংবিধানিক সমঝোতার মাধ্যমে সহাবস্থান করতে পারে।[লেখক: কানাডাপ্রবাসী]

রাষ্ট্রের শক্তি: এলিয়েদা থেকে সৌদিতে দুই বাংলাদেশি

মার্কিন তরুণী এলিয়েদা ম্যাকর্ড। জন্ম টেক্সাসের হিউস্টনে ১৯৭৩ সালে। ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৮ বছর বয়সে আসেন বাংলাদেশে। তৎকালীন ঢাকার জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে যাত্রার আগে আটক হন। তার পোশাকের নিচে লুকানো চার প্যাকেটে প্রায় সাড়ে তিন কেজি হেরোইন পাওয়া যায়।পরে তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে হেরোইন পাচারের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মাদক মামলা হয়। বিচারে তাকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়। অবশ্য পরে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা ও মার্কিন কংগ্রেসম্যানের তদবিরে মুক্তি পান। ম্যাকর্ড স্বীকার করেছিলেন, প্রায় ১০ হাজার ডলারের প্রলোভনে তিনি হেরোইন বহনে রাজি হয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল পড়াশোনার খরচ ও পরিবারকে সাহায্য করা। চাঞ্চল্যকর সেই মামলাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় এনেছেন সিনিয়র সাংবাদিক জায়েদুল আহসান পিন্টু। ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি লেখেন, ‘র্কিন নাগরিক আটক হওয়ার পর থেকেই ঢাকায় তাদের দূতাবাস সব রকমের সহায়তা করে যায়। প্রচলিত আইন, মাদক বহন আর আসামির স্বীকারোক্তি থাকায় তেমন কিছু করতে পারছিল না। তবে কারাগারে বিশেষ মর্যাদা আদায় করতে পেরেছিল।’ জায়েদুল আহসান আরও লেখেন, ‘এলিয়েদার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যখন চূড়ান্ত রায় দেয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে মুক্ত করার নতুন উদ্যোগ নেয়। তারা এলিয়েদাকে দিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করায়। তৎকালিন রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত এলিয়েদার দণ্ড মওকুফ করে দেন।’পিন্টুর লেখায় আর এসেছে, ‘৩০ জুলাই, ১৯৯৬। দিনের প্রথমভাগে মার্কিন কংগ্রেসম্যান বিল রিচার্ডসন বিশেষ বিমানে বাংলাদেশে আসেন। (এই মার্কিন জনপ্রতিনিধি তার দেশের মেয়েকে বাঁচানোর জন্য শুরু থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।) ওইদিন সকালে জেল কর্তৃপক্ষ এলিয়েদাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেন। সেখানে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারাও ছিলেন। তারা এলিয়েদাকে রিচার্ডসনের ক্ষণিকের আবাসস্থল রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন মেঘনায় নিয়ে যান। সন্ধ্যায় বিল রিচার্ডসন এলিয়েদাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। যাবার আগে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে তারা সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।‘তার পোস্টে আরও লেখেন, ‘ওই যে, গুডি ওচিন্ডো। যিনি একই মামলায় খালাস পেয়েছিলেন। পাসপোর্ট সংক্রান্ত মামলায় দুই মাসের জেল হয়েছিল। তার খবর আর কেউ রাখেনি। দুই মাস পার হয়, দুই বছর পার হয় কিন্তু গরীব নাইজেরিয়ানের মুক্তি মেলে না। এই তরুণ তার বাংলাদেশি আইনজীবীর কাছে ১৪২১ ডলার জমা রেখেছিলেন। সেই আইনজীবী ওই ডলার আর ফেরত দেন না।’আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন দশক আগের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়, এলিয়েদা ম্যাকর্ডের মুক্তিতে মার্কিন কূটনীতি ও জনপ্রতিনিধির তৎপরতা, গুডি ওচিন্ডোর মুক্তিতে সাংবাদিকতা ও আদালতের ভূমিকা। ঠিক যেভাবে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর বাংলাদেশ জানতে পেরেছে ঘটনার অনেক পরে। ঘটনা তিনটি দেখায়, বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকের পাশে রাষ্ট্র কতটা দাঁড়ায়, তার ওপরও নির্ভর করে ন্যায়বিচারের বাস্তবতা। বিদেশের কারাগারে বন্দী একজন মার্কিন তরুণীর মুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসম্যান ছুটে এসেছিলেন। দূতাবাস সক্রিয় ছিল, রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন পৌঁছেছিল, শেষ পর্যন্ত বিশেষ বিমানে দেশে ফিরেছিলেন সেই তরুণী। অথচ, একই মামলায় দণ্ডিত আরেক বিদেশি তরুণের মুক্তির জন্য কাউকে পাওয়া যায়নি। পাঁচ বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটানোর পর তার কথা সামনে এনেছিল সাংবাদিকতা; হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত ফিরতে পেরেছিলেন নিজ দেশে।ঘটনা দুটি বাংলাদেশের। সময় ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০০১ সাল। আর ২০২৬ সালের অক্টোবরে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সামনে আসার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে: বিদেশে কোনো নাগরিকের জীবন যখন রাষ্ট্রের হাতে নয়, তখন তার পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্বটি কে পালন করে?প্রতীকী ছবিসৌদির মক্কায় গত ১৪ অক্টোবর নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশন জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের এ বিষয়ে জানানো হয়নি। পরে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিচারপ্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ। এই তথ্যই প্রশ্ন তুলেছে—বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের মুখে থাকা নাগরিকদের বিষয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক নজরদারি কতটা কার্যকর?এলিয়েদার মুক্তিতে রাষ্ট্রের সক্রিয়তামাদক পাচারের মামলায় ১৯৯৩ সালের জুলাইয়ে এলিয়েদা আর নাইজেরীয় নাগরিক রবার্ট ব্ল্যাংকসনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল আদালত। এলিয়েদার ঘটনা তখন বাংলাদেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত হয়। প্রথম দিকে তিনি দাবি করেছিলেন, মাদকের বিষয়ে না জেনেই বহন করেছিলেন। পরে ১৯৯৬ সালে মুক্তির পর স্বীকার করেন, অর্থের বিনিময়ে হেরোইন বহনে রাজি হয়েছিলেন। অর্থাৎ, তার মুক্তির প্রশ্নটি কেবল নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার বিষয় ছিল না; দণ্ডিত একজন নাগরিকের জন্য রাষ্ট্র কীভাবে মানবিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়, সেটিই ছিল বড় বিষয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১৯৯৬ সালের জুলাইয়ের শুরুতে তার দণ্ড বহাল রাখে। এরপর ক্ষমার আবেদনকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্যোগ শুরু হয়। নিউ মেক্সিকোর ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান বিল রিচার্ডসন এসে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেন। রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় ১৯৯৬ সালে মুক্তি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। এলিয়েদার মুক্তি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বাইরে গোপন পথে হয়নি। আদালতের রায় বহাল ছিল; মুক্তি এসেছিল রাষ্ট্রপতির ক্ষমার সাংবিধানিক পথ ধরে। কিন্তু সেই পথ সক্রিয় করতে পেরেছিল একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের ধারাবাহিক যোগাযোগ, দূতাবাসের তৎপরতা আর একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত উদ্যোগ।ব্ল্যাংকসনের পাশে কেউ নেইএলিয়েদার সঙ্গে একই মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ড পেয়েছিলেন নাইজেরীয় নাগরিক রবার্ট ব্ল্যাংকসন। তার ভাগ্যে একই ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ জোটেনি। তার পরবর্তী পরিণতি নিয়েও জনপরিসরে তথ্য খুব কম। একই মামলায় অভিযুক্ত আরেক নাইজেরীয় তরুণ গুডি ওচিন্ডোর অভিজ্ঞতা আরও নির্মম বৈপরীত্য সামনে আনে।গুডি ছিলেন ১৯ বছরের তরুণ। মূল মাদক মামলায় তিনি খালাস পেয়েছিলেন বলে তৎকালীন প্রতিবেদকের বিবরণে উঠে আসে। কিন্তু মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট ব্যবহারের একটি মামলায় দুই মাসের কারাদণ্ড ভোগ করার পরও তিনি মুক্তি পাননি। তার দেশে ফেরার ব্যবস্থা ছিল না, টিকিট কেনার টাকাও ছিল না। বাংলাদেশি আইনজীবীর কাছে রাখা ১ হাজার ৪২১ ডলার ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে নতুন মামলা হওয়ায় তার দুর্দশা আরও বাড়ে। মামলার শুনানি না হওয়ায় মুক্তির পথও বন্ধ হয়ে যায়। কারাগারে পাঁচ বছরের বেশি সময় কাটানোর পর কারা কর্মকর্তা ফরমান আলী বিষয়টি প্রতিবেদকের নজরে আনেন। ২০০১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টার-এ গুডিকে নিয়ে প্রতিবেদন লেখেন সাংবাদিক জায়েদুল আহসান। ওই দিনই হাইকোর্ট বিভাগ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করে। আদালতের হস্তক্ষেপের পর নাইজেরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা হয়।এখানে বৈপরীত্যটি স্পষ্ট। ম্যাকর্ডের জন্য দূতাবাস ও কংগ্রেসম্যান সক্রিয় হয়েছিলেন; গুডির ক্ষেত্রে তার দুর্দশা জনসমক্ষে আনতে হয়েছিল সাংবাদিককে, আর মুক্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়েছিল আদালতকে। একজনের পেছনে ছিল শক্তিশালী রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সক্ষমতা, অন্যজনের পেছনে ছিল না কার্যকর কোনো রাষ্ট্রীয় সহায়তা।সৌদি আরবের ঘটনায় বাংলাদেশের প্রশ্নসৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এই পুরোনো অভিজ্ঞতাগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার ও সৌদি আরবে বাংলাদেশ মিশন আগে থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানত না। মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা ও বিচারসংক্রান্ত তথ্য চেয়েছে।এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বিচারপ্রক্রিয়া, আইনজীবী পাওয়ার সুযোগ, আপিলের অবস্থা এবং কনস্যুলার সহায়তা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো সব নথি প্রকাশ্যে নেই। তাই এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত তথ্য জরুরি। বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়া নাগরিকের বিচার থামিয়ে দেওয়া বা অন্য দেশের আদালতের রায় বাতিল করানো কোনো দূতাবাসের ক্ষমতা নয়। তবে নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী, তিনি আইনজীবী পেয়েছেন কি না, তার আত্মপক্ষ সমর্থন ও আপিলের সুযোগ আছে কি না, মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির আগে পরিবার ও নিজ দেশের কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, আইনি সহায়তা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।কনস্যুলার সুরক্ষার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইনও প্রাসঙ্গিক। ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিক আটক হলে তিনি অনুরোধ করলে তাকে নিজের দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সে যোগাযোগে সহায়তা করতে হয়। তবে এই বিধান কীভাবে প্রয়োগ হয়েছে, দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে তারা কনস্যুলার যোগাযোগ চেয়েছিলেন কি না—তা নির্ধারণে মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।দুই বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীর মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা পরে জেনেছে কনস্যুলেটবাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ; সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। ফলে বিষয়টি শুধু দুই ব্যক্তির ভাগ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে কর্মরত নাগরিকের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা, মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রস্তুতি ও নজরদারির প্রশ্ন এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।রাষ্ট্র কি ভাগ্য নির্ধারণ করেএখানে ‘শক্তিশালী রাষ্ট্র’ বলতে শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি বোঝালে চলবে না। রাষ্ট্রের শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকের জন্য কত দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, আইনগত সহায়তা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রয়োজন হলে উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ম্যাকর্ডের ক্ষেত্রে সেই সক্ষমতা দেখিয়েছিল। গুডি ওচিন্ডোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সহায়তার ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও আদালতকে এগিয়ে আসতে হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি শুধু সৌদি আরবকে ব্যাখ্যা দিতে বলার মধ্যে সীমিত থাকলে চলবে না। মৃত্যুদণ্ডের মুখে থাকা বাংলাদেশিদের বিষয়ে দূতাবাস কীভাবে আগেভাগে তথ্য পাবে, কারাগার ও আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, পরিবারকে জানাবে এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করবে—তার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। কোনো নাগরিক অপরাধে দণ্ডিত হলেও তার ন্যায্য বিচার ও আইনি অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।এলিয়েদার ঘটনা দেখিয়েছে, দণ্ডিত নাগরিকের ভাগ্য বদলাতে কূটনীতি ও জনপ্রতিনিধির উদ্যোগ কতটা কার্যকর হতে পারে। গুডি ওচিন্ডোর ঘটনা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রীয় সহায়তা না থাকলে একজন মানুষ কীভাবে আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার মধ্যে হারিয়ে যেতে পারেন। আর সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে—নিজের নাগরিকের জীবন-মৃত্যুর মতো বিষয়ে বাংলাদেশ কতটা আগে জানতে পারে, কতটা পাশে দাঁড়াতে পারে?রাষ্ট্রের মর্যাদা কেবল বিদেশি সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতায় মাপা যায় না। সেই সম্পর্কের ভেতর নিজের নাগরিকের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা কতটা রক্ষা করা গেল, সেটিও তার বড় পরীক্ষা।

দুর্গোৎসবের ক্রম-বিবর্তন এবং অন্তর্নিহিত বার্তা

শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুদের এক বৃহৎ উৎসব। বাঙালি হিন্দুদের প্রাণের সঙ্গে, আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আনন্দোৎসবের নাম দুর্গাপূজা। মহালয়ায় আগমনবার্তা জানিয়ে, ষষ্ঠীতে আরম্ভ হয়ে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী শেষে দশমীতে সিঁদুরখেলা ও বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয় পাঁচ দিনের দুর্গোৎসব। হিন্দুদের এক বহুল আরাধ্যা ও জনপ্রিয় দেবী হলেন দুর্গা। সনাতন হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মা দুর্গার বাস হিমালয়ের কৈলাসে। দুর্গতি নাশের জন্য তিনি পৃথিবীতে নেমে আসেন পাঁচ দিনের জন্য।হিন্দু পুরাণ অনুসারে, অসুরদের রাজা মহিষাসুর তপস্যা করে ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে দেবতাদের কাছ থেকে স্বর্গ কেড়ে নেয়। অসুর হলো অশুভ শক্তির প্রকাশ। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালে মহাত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূতা হয়ে দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তাই হিন্দুধর্মাবলম্বীরা অশুভ শক্তির বিনাশ ও দুর্গতি নাশের আশায় শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিবছর দুর্গাপূজা করে থাকেন।‘দুর্গা’ শব্দটি দুর্গ থেকে আগত। পুরাণমতে, দুর্গ নামক অসুরকে বধ করার জন্য তিনি দুর্গা। দুর্গা শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো ‘অপরাজেয়’, ‘দুর্গম’। আবার দুর্গতিনাশিনী অর্থেও দুর্গা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। শশীভূষণ দাশগুপ্ত ভারতীয় শক্তিসাধনা নিয়ে গবেষণায় দুর্গা শব্দের উৎপত্তির স্তরগুলো পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন। তার মতে, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো, দুর্গা হলেন ‘দুর্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী’, অর্থাৎ দুর্গের রক্ষাকর্ত্রী। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, দুর্গা দশভুজা, দশপ্রহরণধারিণী, সিংহবাহিনী, মহিষাসুরমর্দিনী। দুর্গাপ্রতিমায় তাকে সেভাবেই দেখতে পাই। তিনি অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে বধ করছেন। আবার তিনি মাতৃস্বরূপা, শক্তির প্রতীক, সমগ্র জগতের মা। হিন্দুধর্মমতে, তিনি সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের শক্তি, মাতৃরূপ, পরম ব্রহ্মময়ী। তিনি সমস্ত সৃষ্টিসংসারকে মায়ের মতো আগলে রাখেন। হিন্দুধর্মের শাক্ত উপাসনা ও তন্ত্র শাখার প্রধান দেবী হলেন দুর্গা। দুর্গাপূজা মূলত শক্তির উপাসনা; মাতৃশক্তি ও নারীশক্তির উপাসনার উৎসব।আবার এই বাংলাতেই কেবল তিনি সপরিবারে পূজিতা। ‘দুর্গা’ শব্দের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্‌বেদ ও অথর্ববেদে। তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দেবীরূপে দুর্গাকে প্রথম দেখা যায়। এ ছাড়া রামায়ণ ও মহাভারতেও দেবী দুর্গার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে বেদে দুর্গা দেবী হিসেবে এত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না। দুর্গাপূজা ও মহিষাসুরবধের কাহিনি—এসব কিছুই হিন্দুদের মূল ধর্মগ্রন্থ বেদে পাওয়া যায় না। গুরুত্বপূর্ণ দেবী হিসেবে দুর্গার আবির্ভাব হয় বৌদ্ধধর্ম-পরবর্তী যুগে; প্রথম মার্কণ্ডেয় পুরাণের ‘দেবীমাহাত্ম্যে’ (৪০০ু৬০০ খ্রিস্টাব্দ), যা ৭০০ শ্লোকবিশিষ্ট ‘দুর্গাসপ্তশতী’ বা ‘চণ্ডী’ নামে পরিচিত। এখানেই রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের দুর্গাপূজার কাহিনি, মহিষাসুরবধ, শুম্ভ-নিশুম্ভ ও চণ্ড-মুণ্ডবধের কাহিনি পাওয়া যায়।দুর্গাপূজার প্রচলন সম্পর্কে একাধিক কিংবদন্তি প্রচলিত থাকলেও ‘পৌরাণিক কাহিনি’ অনুযায়ী, ‘সত্যযুগে’ রাজা সুরথ প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। ‘ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে’ আছে, দুর্গাপূজার ‘প্রথম প্রবর্তক’ ছিলেন ‘শ্রীকৃষ্ণ’; দ্বিতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন স্বয়ং ‘ব্রহ্মা’। তৃতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন ‘মহাদেব’। ‘দেবীভাগবত পুরাণ’ অনুসারে, ‘ব্রহ্মার মানসপুত্র’ ‘মনু’ ‘ক্ষীরোদসাগরের তীরে’ দুর্গার আরাধনা করে বর লাভ করেছিলেন। এসব কাহিনি পুরাণের।শাস্ত্র ও পুরাণ থেকে বেরিয়ে এসে মর্ত্যে, অর্থাৎ অবিভক্ত বাংলায়, দুর্গাপূজার আয়োজন প্রথম কে করেছিলেন, এ নিয়ে গবেষকদের কাছ থেকে বেশ কিছু তথ্য জানা যায়। সবকিছুর প্রথম নিয়ে মানুষের মনে একটি কৌতূহল কাজ করে, অর্থাৎ ‘কে প্রথম প্রবর্তক’। দুর্গাপূজার ক্ষেত্রেও ‘কে প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন’, তা নিয়ে আপামর জনগণের মধ্যে একটি কৌতূহল আছে। ‘পৌরাণিক মতে’ ‘সত্যযুগে’ ‘রাজা সুরথ’ এই পূজার প্রবর্তক। তেমনি ‘কলিযুগে’, অর্থাৎ আধুনিক যুগে, এই পূজার প্রবর্তক কে? তা নিয়েও কৌতূহলের শেষ নেই।আনন্দের বিষয়, বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত বিশ্বাস এবং বিভিন্ন তথ্যের ওপর নির্ভর করে আধুনিক যুগে বাংলার মানচিত্রে প্রথম দুর্গাপূজাটি করেছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর শেষে ‘রাজশাহীর তাহেরপুরের ভুঁইঞা রাজা’ ‘কংসনারায়ণ’। সেটা ‘তৃতীয় মোগল সম্রাট আকবরের আমলে’—এটি হলো প্রচলিত বিশ্বাস। ‘কংসনারায়ণের’ পরে ‘ভাদুড়িয়ার রাজা’ ‘জগৎনারায়ণ’ দুর্গাপূজা শুরু করেছিলেন। অন্য একটি সূত্রে জানা যায়, ‘কংসনারায়ণের’ পূজার ৩৮ বছর আগে ‘শেরশাহের’ কাছ থেকে ‘জায়গির’ পেয়ে ‘দামোদর নদে’র কোনো এক ধারে পূজা করেছিলেন ‘যশোচন্দ্র’ (১৫৪৫)।‘খান চৌধুরী আমানতুল্লা’ সাহেব তার ‘কোচবিহারের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন—‘অহোমরাজের প্রতিভূগণ আসামে প্রত্যাবৃত হইয়া কামতারাজ্যের বিবিধ আচার-ব্যবহারের সংবাদ অহোমরাজের সমক্ষে প্রকাশ করিয়াছিলেন, কামতাপুরে দশভুজা দুর্গার মূর্তির আড়ম্বরযুক্ত পূজাপদ্ধতির বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অহোমরাজ নিজ রাজ্যে উক্ত পূজার প্রবর্তন করিয়াছিলেন।’বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি ও ঐতিহাসিক তথ্যনির্ভর হয়ে বলা যায়, সন-তারিখের বিচারে ‘রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের’ ‘মনুসংহিতার টীকাকার’, তথা ‘কুল্লুক ভট্ট’র পৌত্র ‘কংসনারায়ণ’ প্রবর্তিত দুর্গাপূজার (১৫৮০) ১৮ বছর আগে ‘মহারাজা নরনারায়ণ’ ‘কোচরাজ্যে’ দুর্গাপূজা করেছিলেন। যা বাংলার মানচিত্রের বাইরে প্রথম দুর্গাপূজা। (৬২৮)দুর্গাপূজা আদিকালে ছিল রাজা-রাজড়াদের পূজা। সচ্ছল জমিদার কিংবা রাজাদের ছাড়া এ পূজা সাধারণের জন্য আয়োজন করা দুরূহ ছিল। দুর্গাপূজা কীভাবে উচ্চবিত্তদের মণ্ডপ থেকে সাধারণের কাছে এসেছিল, সেই গল্পটি বড় মধুর। দুর্গাপূজার সর্বজনীনতার সূচনা হয়েছিল ‘বারোয়ারি’ পূজার মাধ্যমে।বারোয়ারি দুর্গাপূজা প্রথম শুরু হয় ১৭৯০ সালে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায়। বারোজন যুবক মিলে চাঁদা তুলে এ পূজা শুরু করেন। তারা দেখেন, দুর্গাপূজায় প্রচুর খরচ, যা সর্বসাধারণের সাধ্যের বাইরে। তাই তারা সর্বসাধারণের জন্য এ ‘একচালা’ প্রতিমা নির্মাণ করে পূজার আয়োজন করেন।বারোজন বন্ধু বা ‘ইয়ার’ (ফারসিতে ‘ইয়ার’ মানে বন্ধু) মিলে এ পূজা আরম্ভ করায় একে বলা হয় বারোয়ারি দুর্গাপূজা। এরপর কালের বিবর্তনে দুর্গাপূজা বর্তমান সর্বজনীন রূপ নেয়। কালে কালে পূজার জৌলুশ বৃদ্ধিতে নিত্যনতুন অনুষঙ্গ যোগ হয়। আজকাল ঐতিহ্যবাহী একচালা ভেঙে বহুচালাবিশিষ্ট দুর্গাপূজা হয়। বাংলাদেশের কুমারটুলিগুলোতেও বিভিন্ন আঙ্গিকে নানা ঢঙের, নানা রূপের বৈচিত্র‍্যময় প্রতিমা নির্মাণ হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশাল আকৃতির দৃষ্টিনন্দন পূজামণ্ডপে আলোকোজ্জ্বল দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের পূজাগুলো থিমের ভিত্তিতে না হলেও এর বর্ণিল ও আন্তরিক আয়োজন ভক্তদের হৃদয় হরণ করে। বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছেন। এই ভূগ্রামের প্রধান শহরগুলো, বিশেষ করে লন্ডন, প্যারিস, টরন্টো, মন্ট্রিয়েল, নিউইয়র্ক, মিশিগানসহ পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট বাংলাদেশ। এসব বনলতাময় প্রবাসে প্রাণের উচ্ছ্বাসে বাঙালি হিন্দুরা দুর্গাপূজার আয়োজন করে থাকেন। রাজাদের পরিবার থেকে বারোয়ারি দুর্গাপূজা এখন বিশ্বজনীন রূপ পেয়েছে।মা দুর্গা হলেন দুর্গতিনাশিনী, অর্থাৎ সব দুঃখ-দুর্দশার বিনাশকারী। তিনি অন্যায় ও অসত্যের প্রতীক মহিষাসুরকে নিধন করার জন্যই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বিশ্বজুড়ে অন্যায়, অসত্য, যুদ্ধবিগ্রহের এই ক্রান্তিকালে মা দুর্গার আদর্শ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। মাতৃ-আরাধনার উদ্দেশ্যকে সফল করার লক্ষ্যে প্রতিটি পূজার আয়োজন যদি নিবেদিত হয়, তাহলে দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য সারা বিশ্বের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার সঙ্গে গৃহীত হবে এবং বিশ্ববাসী মাতৃ-আরাধনার তাৎপর্য সহজেই অনুধাবন করতে সমর্থ হবে। দুর্গাপূজা তাই পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, এমনকি বৈশ্বিক সংহতি রক্ষায় এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী একটি পূজা। পৃথিবীর সকল রাবণরূপী অসুরের বিনাশের জন্য দেবী দুর্গার আরাধনার গুরুত্ব অসীম। ‘রাবণস্য বিনাশায় রামসানুগ্রহায় চ অকালে বোধিতা দেবী।’ অর্থাৎ, রাবণকে বিনাশের জন্য রামের প্রতি অনুগ্রহবশত অকালে দেবী দুর্গা বোধিত হয়েছিলেন। দুষ্ট শক্তি রাবণকে বধ করার জন্য রাম নিদ্রিত অবস্থায় দেবীর পূজা করেছিলেন অকালবোধনের মাধ্যমে। আমাদের অন্তরের রাবণকে বিনাশ এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য তাই দুর্গাপূজার আয়োজন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ভক্তিসহকারে করা উচিত।[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

শব্দদূষণ: অসহনীয় শব্দ থেকে মুক্তি চাই

আমাদের দেশে পানি, মাটি, বায়ু ও শব্দদূষণ—এই চার ধরনের দূষণ ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এর বাইরে রয়েছে আলোকদূষণ, যা এখনো তেমন আলোচনায় আসেনি। মোবাইলফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও টেলিভিশনের পর্দা থেকে নির্গত নীল আলো ঘুম ও শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বর্তমানে দেশের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় শব্দদূষণ। অতিরিক্ত শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তি, ঘুম, মনোযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রতিনিয়ত শব্দের মধ্যে বসবাস করতে করতে মানুষ যেন এই দূষণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছে। অথচ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।শব্দের সহনীয় মাত্রা স্থান ও সময়ভেদে ভিন্ন হয়। শব্দদূষণ বিধিমালা অনুযায়ী, নীরব এলাকায় দিনের বেলায় শব্দের মাত্রা ৫০ ডেসিবল এবং রাতে ৪০ ডেসিবলের মধ্যে থাকা উচিত। আবাসিক এলাকায় দিনের বেলায় ৫৫ ডেসিবল ও রাতে ৪৫ ডেসিবল নির্ধারিত। বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকাতেও নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব মাত্রা কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ঘর থেকে কর্মস্থলে যাওয়া, যানবাহনে ভ্রমণ কিংবা বাসায় অবস্থান—কোথাও যেন শব্দের হাত থেকে রেহাই নেই। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালতের মতো নীরব এলাকায়ও প্রায়ই উচ্চ শব্দ শোনা যায়। ফলে রোগীর বিশ্রাম, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়।দেশে শব্দদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস যানবাহনের হর্ন। বিশেষ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলাচলের সময় অনেক গাড়ির হর্নের বিকট শব্দে মনে হয়, মাথার ভেতর হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে। আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করা হয়। দ্রুত পথ পরিষ্কার করা, অন্য যানবাহনকে ভয় দেখানো কিংবা যাত্রী আকৃষ্ট করার জন্য এসব হর্ন বাজানো হয়। বাসস্ট্যান্ডে অবৈধ দখল ও যানজটের কারণে একসঙ্গে অনেক গাড়ি হর্ন বাজায়। ফলে পরিস্থিতি আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। কিছু কিশোর ও তরুণ মোটরসাইকেলের শব্দনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র খুলে চালানোর সময় বিকট শব্দ সৃষ্টি করে। এতে পথচারী ও আশপাশের বাসিন্দারা ভোগান্তিতে পড়েন। অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানোর এই প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে সড়কে শব্দদূষণ কমানো কঠিন হবে।শিল্পকারখানার জেনারেটরও শব্দদূষণের বড় উৎস। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় কারখানা স্থাপন করা হলে এর শব্দে বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে বাড়ি পরিবর্তন করতেও বাধ্য হতে হয়। অন্যদিকে, শপিং মল, বিপণিবিতান, কাপড় ও জুতার দোকান, রোগনির্ণয়কেন্দ্র এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার করা হয়। ঈদ ও অন্যান্য উৎসবের সময় এ প্রবণতা আরও বাড়ে। হকার ও ভাসমান দোকানিরা বৈদ্যুতিক বাঁশি, ঘণ্টা কিংবা রেকর্ড করা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। উচ্চ স্বরে গানবাজনা ও ধর্মীয় বক্তৃতাও অনেক সময় আশপাশের মানুষের জন্য শব্দদূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিনোদন কিংবা ব্যবসার উদ্দেশ্য থাকলেও অন্যের শান্তি ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এমন উচ্চ শব্দ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।মোবাইলফোনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শব্দদূষণের নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। অনেকে জনসমাগমপূর্ণ স্থানে উচ্চ স্বরে কথা বলেন কিংবা লাউডস্পিকার চালিয়ে অন্যদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করেন না। ব্যক্তিগত ফোনালাপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও উচ্চ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। এ ছাড়া সড়ক ও মহাসড়কের পাশ থেকে নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সবুজের পরিমাণ কমছে। গাছপালা শব্দ শোষণে কিছুটা ভূমিকা রাখে। তাই বৃক্ষহীন পরিবেশে শব্দের প্রভাব আরও তীব্রভাবে অনুভূত হতে পারে। পরিকল্পিত নগরায়ণ, পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা এবং আবাসিক এলাকার পাশে শিল্পকারখানা স্থাপনে নিয়ন্ত্রণ শব্দদূষণ কমাতে সহায়ক হতে পারে।শব্দদূষণের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর। অতিরিক্ত শব্দে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন শব্দের মধ্যে থাকলে ঘুমের ব্যাঘাত, মাথাব্যথা, মানসিক চাপ ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, রোগী ও শব্দসংবেদনশীল মানুষের জন্য এর প্রভাব বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। তাই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। যানবাহনে অবৈধ হর্ন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো, উচ্চ শব্দে মাইক চালানো এবং মোটরসাইকেলের শব্দনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র খুলে চালানোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিল্পকারখানার জেনারেটর ও যন্ত্রপাতিতে শব্দ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। হকারদেরও বিকল্প উপায়ে পণ্য বিক্রির অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি বেশি করে গাছ লাগাতে হবে এবং বিদ্যমান গাছ রক্ষা করতে হবে।শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; আইনের যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত শব্দের মাত্রা পরিমাপ, বিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নীরব এলাকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। অপ্রয়োজনে হর্ন না বাজানো, নির্ধারিত মাত্রার মধ্যে মাইক ব্যবহার করা এবং জনসমাগমস্থলে সংযতভাবে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যই সম্পদ। নিজের সুবিধার জন্য অন্যের শান্তি ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।[লেখক: শিক্ষক]

ভিডিও আরও দেখুন

বিশ্বরেকর্ড গড়ে নতুন ইতিহাস গড়লেন অভিষেক

ক্রিজে ব্যাট হাতে এলেই যেন নতুন কোনো কীর্তি হাতছানি দেয় অভিষেক শর্মাকে। এবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম ম্যাচে ইনিংসের প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকিয়ে ইতিহাস গড়েছেন ভারতের এই বাঁহাতি ওপেনার। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ইনিংসের প্রথম বলে সর্বাধিক সাতটি ছক্কা মারার বিশ্বরেকর্ড এখন এককভাবে তার দখলে।বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ক্রাইস্টচার্চে নিউজিল্যান্ডের দেওয়া ২২৬ রানের বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইনিংসের শুরুতেই নিজের আগ্রাসী মেজাজের জানান দেন অভিষেক। কিউই পেসার ম্যাট হেনরির করা ইনিংসের প্রথম বলটিই কভার অঞ্চলের ওপর দিয়ে গ্যালারিতে পাঠিয়ে দেন তিনি। আর তাতেই জন্ম নেন এই নতুন রেকর্ডের।এর আগে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ইনিংসের প্রথম বলে ছক্কা হাঁকানোর রেকর্ডে অভিষেকের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন আফগানিস্তানের শফিকুল্লাহ শিনওয়ারি। দুজনেরই নামের পাশে ছিল ছয়টি করে ছক্কা। তবে সপ্তম ছক্কা হাঁকিয়ে শফিকুল্লাহকে পেছনে ফেলে এখন এককভাবে তালিকার শীর্ষে উঠে এলেন অভিষেক। ভারতের আরেক ব্যাটার সূর্যকুমার যাদব পাঁচটি ছক্কা নিয়ে এই তালিকার পরের অবস্থানে রয়েছেন।রেকর্ড গড়লেও ক্রাইস্টচার্চের এই ম্যাচে অবশ্য বড় ইনিংস খেলতে পারেননি অভিষেক। ম্যাট হেনরির বলের পর আগ্রাসন বজায় রাখলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ১২ বলে ২৯ রান করে মাইকেল ব্রেসওয়েলের শিকার হয়ে সাজঘরে ফেরেন তিনি। তার সংক্ষিপ্ত অথচ ঝড়ো এই ইনিংসে ছিল দুটি চার ও তিনটি ছক্কার মার। ব্যক্তিগতভাবে দ্রুত আউট হলেও তার এই ঝড়ো সূচনা ভারতের ইনিংসের ভিত গড়ে দেয়।অভিষেকের বিদায়ের পরও অবশ্য জয়ের পথ থেকে ছিটকে যায়নি ভারত। সঞ্জু স্যামসনের দুর্দান্ত ৬৭ রানের পাশাপাশি শ্রেয়াস আইয়ার ও নামান ধীরের দায়িত্বশীল অবদানে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যে পৌঁছে যায় সফরকারীরা। ২২৬ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়ায় দুই বল বাকি থাকতেই জয় নিশ্চিত করে ভারত।/ 

বিশ্বরেকর্ড গড়ে নতুন ইতিহাস গড়লেন অভিষেক