সংবাদ
অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুঁজি করে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে

অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুঁজি করে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে

আগে নিজের ঘর সামলান, তারপর অন্যকে নসিহত করতে আসবেনএকটি রাজনৈতিক দলকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, "স্বৈরাচার' আর 'গুপ্ত' এক হয়েছে।এখন তারা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে পুঁজি করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি বলেছেন, যারা দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে, একাত্তর সালে তাদের ভূমিকা কি ছিল তা এ দেশের মানুষের জানা আছে। স্বৈরাচার ও তাদের সহযোগী গুপ্তশক্তি এখন এক হয়ে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথ রুদ্ধ করতে চায় বলে অভিযোগ করেন তিনি। অহেতুক নানা বিষয় নিয়ে বিশৃঙ্খলা না ছড়িয়ে তাদের আগে নিজেদের ঘর সামলানোর পরামর্শ দেন সরকারপ্রধান।​বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ফেনীর পরশুরাম উপজেলার খেয়াঘাট মুহুরী ব্রিজ এলাকায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পের ফলক উন্মোচন ও মুহুরী নদী খননকাজের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।​প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত ১৬ বছরে কিভাবে আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছিল, তা দেশবাসী দেখেছে। আমরা সেই অচলাবস্থা কাটিয়ে দেশে আইনের শাসন ধীরে ধীরে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাই। কিন্তু আমরা লক্ষ করছি, কিছু দল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে ইস্যু করে অরাজকতা তৈরির পাঁয়তারা করছে। স্বৈরাচার ও এই গুপ্তশক্তি এক হয়ে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে।’নাম উল্লেখ না করে ​জামায়াতকে ইঙ্গিত দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণকে বিভ্রান্ত করে তারা কিছু আসনে জয় পেয়ে ধরাকে সরাজ্ঞান করছে। ১৯৭১ সালে যেভাবে মা-বোনদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল, ঠিক একইভাবে তারা আবারও নারী নির্যাতন শুরু করেছে। তাদের এক সদস্যের হাতে নারী নির্যাতনের ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। শুধু নির্যাতনই নয়, মানুষ বলছে একটি জীবনের অবসানও ঘটানো হয়েছে।’​তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে দেখলাম, সেই গুপ্ত দলের নেতারা এখন সরকারকে নীতিশিক্ষা দিতে খুব ব্যস্ত। বলছেন, আপনারা এই করেন, সেই করেন, আপনাদের এই ভুল, সেই ভুল। আমি তাদের উদ্দেশে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, দয়া করে আগে নিজের ঘরের দিকে তাকান। আপনাদের ঘরের লোকেরা কিভাবে নারী নির্যাতন করছে, তা আগে সামাল দিন। তারপর অন্যকে নসিহত করতে আসবেন।’​গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকেই একটি পক্ষ সব সময় দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮৬ সালেও তারা গণতন্ত্রের বিপক্ষে ভূমিকা রেখেছিল। এখন সময় এসেছে সতর্ক হওয়ার। কাদের কথা বিশ্বাস করবেন, আর কাদের প্রত্যাখ্যান করবেন, সে সিদ্ধান্ত জনগণের। যেকোনো মূল্যে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা হবে।’​নিজের রাজনৈতিক অঙ্গীকার তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘এটা আমার নানাবাড়ির এলাকা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এখানে আমি শুধু বেড়াতে আসিনি, এ অঞ্চলের মানুষের সার্বিক উন্নয়ন করা আমার সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। বিএনপির রাজনীতিই হলো উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি।’​তিনি আরও বলেন, ‘কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন কিংবা বন্ধ কলকারখানা চালুর মতো যুগান্তকারী উদ্যোগগুলো সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্যই নেওয়া। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে দেশের মানুষের ভাগ্য বদলাবে। অথচ একটি পক্ষ এই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে চায়। জনগণের কর্মসূচিতে যারা বাধা দেবে, তাদের কঠোর জবাব দেওয়া হবে।’​স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পরশুরামে ৩০ শয্যার হাসপাতাল করেছিলেন, পরে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তা ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন। স্থানীয় মানুষের দাবি এটি ১০০ শয্যা করার। আমরা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এটিকে ১৫০ শয্যায় রূপান্তর করব। শুধু পরশুরাম নয়, সারা দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ থেকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য জেলা শহর বা ঢাকায় ছুটতে না হয়।’​পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন (ভিপি জয়নাল) এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু।​এর আগে সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে ঢাকার গুলশানের বাসভবন থেকে সড়কপথে ফেনীর উদ্দেশে যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর ২টা ১০ মিনিটে তিনি প্রকল্পের ফলক উন্মোচন করেন। পরে নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে ও ড্রেজিং মেশিন চালু করে নদী খননকাজের সূচনা করেন এবং নদীর তীরে একটি নিমের চারা রোপণ করেন।​সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী ফুলগাজী বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণ করেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণ করেন। পরে তিনি ফুলগাজী জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে স্থাপিত রুফটপ সোলার থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
১০ ঘন্টা আগে

অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুঁজি করে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে

অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুঁজি করে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে

প্রকৃত গরীবরা ফ্যামিলি-কৃষক কার্ডের সহায়তা পাবে : এমপি মাধবী মারমা

প্রকৃত গরীবরা ফ্যামিলি-কৃষক কার্ডের সহায়তা পাবে : এমপি মাধবী মারমা

 শ্রেণিকক্ষে ঢুকে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রকে আছাড়, অভিভাবক আটক

শ্রেণিকক্ষে ঢুকে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রকে আছাড়, অভিভাবক আটক

চট্টগ্রাম বন্দরে নভেম্বর থেকে শতভাগ বিল পরিশোধ অনলাইন

চট্টগ্রাম বন্দরে নভেম্বর থেকে শতভাগ বিল পরিশোধ অনলাইন

পদত্যাগপ‌ত্রে যে ব‌্যাখ‌্যা সংরক্ষিত আসনের এমপির

পদত্যাগপ‌ত্রে যে ব‌্যাখ‌্যা সংরক্ষিত আসনের এমপির

ইয়াবা সেবনের ভিডিও ভাইরালের পর এনসিপি নেতা বহিষ্কার

ইয়াবা সেবনের ভিডিও ভাইরালের পর এনসিপি নেতা বহিষ্কার

শুধু কথায় নয়, বাস্তবে কাজ করে মানুষকে দেখাতে হবে : আরিফুল হক চৌধুরী

শুধু কথায় নয়, বাস্তবে কাজ করে মানুষকে দেখাতে হবে : আরিফুল হক চৌধুরী

তুরাগ নদে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ, ২৩ ঘণ্টা পর দুই শিশুর লাশ উদ্ধার

তুরাগ নদে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ, ২৩ ঘণ্টা পর দুই শিশুর লাশ উদ্ধার

রামগতি ও কমলনগরে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ-উচ্ছেদে হাইকোর্টের নির্দেশ

রামগতি ও কমলনগরে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ-উচ্ছেদে হাইকোর্টের নির্দেশ

বাংলাদেশে ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখছে 'প্লাগ অ্যান্ড প্লে'

বাংলাদেশে ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখছে 'প্লাগ অ্যান্ড প্লে'

সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ

সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ

গ্রাহকদের ৫ কোটি টাকা নিয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট উধাও

গ্রাহকদের ৫ কোটি টাকা নিয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট উধাও

রামগতি ও কমলনগরে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ-উচ্ছেদে হাইকোর্টের নির্দেশ

রামগতি ও কমলনগরে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ-উচ্ছেদে হাইকোর্টের নির্দেশ

৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ও প্রবীণ সুরক্ষায় নতুন ভাবনা

৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ও প্রবীণ সুরক্ষায় নতুন ভাবনা

জামায়াত যা পারেনি, বিএনপি তা করে দেখিয়েছে: অ্যাটর্নি জেনারেল

জামায়াত যা পারেনি, বিএনপি তা করে দেখিয়েছে: অ্যাটর্নি জেনারেল

স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য: দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে চাই সুস্থ জীবন

স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য: দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে চাই সুস্থ জীবন

সাপ্লিমেন্ট ছাড়াও ত্বকের যত্নে কাজে আসতে পারে যেসব খাবার

সাপ্লিমেন্ট ছাড়াও ত্বকের যত্নে কাজে আসতে পারে যেসব খাবার

বাংলাদেশে ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখছে 'প্লাগ অ্যান্ড প্লে'

বাংলাদেশে ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখছে 'প্লাগ অ্যান্ড প্লে'

দেশে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে : প্রধানমন্ত্রী

দেশে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে : প্রধানমন্ত্রী

টাঙ্গাইল মেডিকেলে ১২টির ৫টি লিফটই নষ্ট, ভোগান্তিতে রোগীরা

টাঙ্গাইল মেডিকেলে ১২টির ৫টি লিফটই নষ্ট, ভোগান্তিতে রোগীরা

মতামতমতামত

স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য: দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে চাই সুস্থ জীবন

মানুষ এখন আগের তুলনায় বেশি দিন বাঁচছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, টিকাদান, উন্নত পুষ্টি, নিরাপদ পানি, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের ফলে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। বাংলাদেশেও গত কয়েক দশকে মানুষের আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এর সঙ্গে একটি নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে—শুধু বেশি বছর বেঁচে থাকাই কি যথেষ্ট?একজন মানুষ যদি ৮০ বছর বাঁচেন, কিন্তু জীবনের শেষ ১০–১৫ বছর চলাফেরার সীমাবদ্ধতা, অনিয়ন্ত্রিত দীর্ঘমেয়াদি রোগ, একাকিত্ব এবং অন্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল অবস্থায় কাটান, তাহলে শুধু দীর্ঘায়ু দিয়ে তাঁর জীবনের মান বোঝা যায় না। আধুনিক জনস্বাস্থ্য তাই এখন শুধু জীবনকাল নয়, বরং সুস্থ জীবনকাল বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এখান থেকেই এসেছে ‘স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য’ বা ‘হেলদি এজিং’-এর ধারণা।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে, যার মাধ্যমে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সুস্থ ও অর্থবহ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর সক্ষমতা তৈরি এবং বজায় রাখা যায়। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য মানে শরীরে কোনো রোগ না থাকা নয়। একজন মানুষের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বাত বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকতে পারে; কিন্তু রোগগুলো যদি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং তিনি নিজের দৈনন্দিন কাজ করতে, চলাফেরা করতে, সিদ্ধান্ত নিতে, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং পরিবার ও সমাজে ভূমিকা রাখতে পারেন, তাহলে তিনিও স্বাস্থ্যকরভাবে বয়স বাড়াতে পারেন।দুইজন মানুষের বয়স ৭০ বছর হলেও তাঁদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা এক নাও হতে পারে। একজন হয়তো নিয়মিত হাঁটছেন, বাজার করছেন, ভ্রমণ করছেন, বই পড়ছেন এবং পরিবারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছেন। অন্যজন একই বয়সে দৈনন্দিন কাজের জন্য অন্যের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হতে পারেন। তাই শুধু বয়সের সংখ্যা দিয়ে একজন মানুষের সামগ্রিক অবস্থা বিচার করা যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি কী করতে পারছেন। তিনি কি নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজন সামলাতে পারছেন? নিজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন? স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছেন? পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারছেন? সমাজ বা পরিবারের জন্য কোনোভাবে অবদান রাখতে পারছেন? এসব সক্ষমতা যতদিন ধরে রাখা যায়, ততদিন স্বাধীনতা এবং জীবনের মান বজায় রাখার সম্ভাবনাও তত বেশি।যুক্তরাজ্যে স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যকে এখন শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসাব্যবস্থার বিষয় হিসেবে দেখা হয় না। সেখানে রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক যোগাযোগ, নিরাপদ বাসস্থান, আর্থিক নিরাপত্তা এবং বয়সবান্ধব পরিবেশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একজন মানুষ কত বছর বেঁচে আছেন, তার পাশাপাশি সেই বছরগুলোর কতটা সময় তিনি সুস্থ ও স্বাধীনভাবে কাটাতে পারছেন—এই প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।যুক্তরাষ্ট্রেও স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের ক্ষেত্রে নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, তামাক পরিহার, দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ, মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পশ্চিমা বিশ্বের স্বাস্থ্যনীতিতে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে—স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের প্রস্তুতি ৬০ বা ৬৫ বছর বয়সে শুরু হয় না। এর ভিত্তি তৈরি হয় তার অনেক আগে। ৪০, ৫০ বা ৬০ বছর বয়সে আমরা কী খাচ্ছি, কতটা চলাফেরা করছি, পেশিশক্তি কেমন, শরীরের ওজন কেমন, রক্তচাপ ও রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তামাক ব্যবহার করছি কি না এবং সামাজিকভাবে কতটা সক্রিয়—এসবই পরবর্তী জীবনের স্বাস্থ্য ও সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।বাংলাদেশের বাস্তবতা পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। আমাদের দেশে পরিবার এখনো প্রবীণ মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক প্রবীণ সন্তান ও পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন। নাতি-নাতনির সঙ্গে সময় কাটানো, পারিবারিক সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়া এবং সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য বলতে শুধু রোগমুক্ত থাকা বোঝালে চলবে না। একজন মানুষ যেন যতদিন সম্ভব নিজের কাজ নিজে করতে পারেন, চলাফেরা করতে পারেন, পরিবারে সম্মান পান, নিজের সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান এবং নিজেকে পরিবারের বোঝা নয় বরং সক্রিয় সদস্য মনে করেন—এসবও স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।বাংলাদেশে মানুষের আয়ু বাড়ার সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীও বাড়ছে। এর অর্থ ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, কিডনি সমস্যা, বাত, চোখের সমস্যা, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক দুর্বলতার মতো বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই এখন থেকেই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সব পর্যায়ে প্রস্তুতি প্রয়োজন।বয়স বাড়ার সঙ্গে যে বিষয়টি আমরা অনেক সময় যথেষ্ট গুরুত্ব দিই না, সেটি হলো পেশির শক্তি। বয়সের সঙ্গে পেশির ভর ও শক্তি ধীরে ধীরে কমতে পারে। এর সঙ্গে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অপর্যাপ্ত পুষ্টি যুক্ত হলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। পেশিশক্তি কমে গেলে চেয়ার থেকে ওঠা, সিঁড়ি ভাঙা, বাজারের ব্যাগ বহন করা কিংবা পড়ে গেলে উঠে দাঁড়ানোর মতো সাধারণ কাজও কঠিন হয়ে যেতে পারে। পড়ে গিয়ে হাড় ভেঙে যাওয়া অনেক প্রবীণ মানুষের স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।এ কারণে শুধু হাঁটা নয়, ব্যক্তির বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং চিকিৎসাগত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ। দেয়ালে হাত রেখে পুশ-আপ, চেয়ার থেকে ধীরে ধীরে ওঠা-বসা, হালকা ওজন ব্যবহার কিংবা প্রশিক্ষকের পরামর্শে উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যায়াম করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার অনুশীলন বয়স বাড়ার সঙ্গে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোর জন্য উপকারী হতে পারে।স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের জন্য বিদেশি বা অত্যন্ত ব্যয়বহুল খাবার প্রয়োজন—এমন ধারণারও ভিত্তি নেই। বাংলাদেশের প্রচলিত খাদ্যের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টিকর খাবার রয়েছে। মাছ, ডিম, দুধ, দই, ডাল, ছোলা ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার প্রোটিনের ভালো উৎস হতে পারে। ছোট মাছ, বিশেষ করে কাঁটাসহ খাওয়া হলে, প্রোটিনের পাশাপাশি ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি দিতে পারে। বিভিন্ন শাক, লাউ, পেঁপে, মিষ্টিকুমড়া, বেগুন, ঢেঁড়স, করলা, টমেটোসহ মৌসুমি সবজি খাদ্যে বৈচিত্র্য আনে। পেয়ারা, আমড়া, পেঁপে, কলা, কমলা ও অন্যান্য মৌসুমি ফলও খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।বয়স বাড়লে অনেক মানুষ খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেন। কিন্তু কম খাওয়ার সঙ্গে যদি প্রোটিন এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণও কমে যায়, তাহলে পেশিশক্তি ও শারীরিক সক্ষমতা আরও দ্রুত কমতে পারে। তাই বার্ধক্যে শুধু পেট ভরানো নয়, খাবারের পুষ্টিমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাবারে ভাত বা রুটির পাশাপাশি ডাল, মাছ বা ডিম, পর্যাপ্ত সবজি এবং সামর্থ্য অনুযায়ী ফল ও দুধজাত খাবার রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত তেল-চর্বি এবং ঘন ঘন ভাজাপোড়া খাবার সীমিত রাখা প্রয়োজন।অনেকেই মনে করেন ৬৫ বছর হলেই বার্ধক্য শুরু হয় এবং তখন থেকেই স্বাস্থ্য নিয়ে আলাদাভাবে ভাবতে হবে। বাস্তবে স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের প্রস্তুতি তার অনেক আগেই শুরু করা ভালো। বিশেষ করে ৪০ বা ৫০ বছরের পর থেকেই নিজের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ও সক্ষমতার দিকে পরিকল্পিতভাবে নজর দেওয়া যেতে পারে। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা দরকার। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তের শর্করা ও রক্তের চর্বি পরীক্ষা করা যেতে পারে। চোখ, দাঁত এবং শ্রবণশক্তির সমস্যাকেও অবহেলা করা উচিত নয়। বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ক্যানসার স্ক্রিনিং এবং টিকাদানের বিষয়েও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। যাঁদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ বা অন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে, তাঁদের নিয়মিত চিকিৎসা এবং নির্ধারিত ওষুধ সঠিকভাবে গ্রহণ করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য শুধু শরীরের বিষয় নয়; মস্তিষ্কের সুস্থতা এবং মানসিক সক্রিয়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু মানুষের স্মৃতিশক্তি বা তথ্য মনে করার গতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু নতুন কিছু শেখা, মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা এবং সামাজিকভাবে যুক্ত থাকা দৈনন্দিন কার্যকর সক্ষমতা বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বই বা পত্রিকা পড়া, লেখালেখি করা, বাগান করা, দাবা বা অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা, নতুন প্রযুক্তি শেখা, নতুন রান্না শেখা কিংবা নাতি-নাতনিকে পড়ানো—এসব কাজ বয়স বাড়ার পরও জীবনকে সক্রিয় ও অর্থবহ রাখতে পারে।একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এলাকার শিশুদের পড়াতে পারেন। একজন কৃষক তরুণ কৃষকদের নিজের অভিজ্ঞতা শেখাতে পারেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা বা অন্য পেশাজীবী তরুণদের পরামর্শ দিতে পারেন। একজন দাদা বা দাদি পরিবারের শিশুদের গল্প বলতে পারেন, পারিবারিক ইতিহাস জানাতে পারেন কিংবা তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন। এতে শুধু মানসিক সক্রিয়তা বজায় থাকে না, বরং প্রবীণ মানুষটির মধ্যে নিজের প্রয়োজনীয়তা ও জীবনের উদ্দেশ্যের অনুভূতিও বজায় থাকতে পারে।বাংলাদেশে যৌথ পরিবারের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। কাজ ও শিক্ষার কারণে অনেক সন্তান অন্য শহর বা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ফলে অনেক প্রবীণ দম্পতি বা ব্যক্তি একা বসবাস করছেন। তাই একাকিত্বকে শুধু আবেগের বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। দীর্ঘদিন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবারের তরুণ সদস্যদের দায়িত্ব তাই শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়। নিয়মিত কথা বলা, সময় দেওয়া, পারিবারিক সিদ্ধান্তে বাবা-মাকে যুক্ত করা এবং তাঁদের সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখতে সহায়তা করাও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে প্রবীণদেরও বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশী, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করা প্রয়োজন।ঘুমও স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বয়স বাড়ার সঙ্গে ঘুমের ধরনে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যাকে শুধু ‘বয়স হয়েছে’ বলে অবহেলা করা ঠিক নয়। প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমানো ও ওঠা, দিনের বেলা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং সন্ধ্যা বা রাতে অতিরিক্ত চা-কফি এড়িয়ে চলা সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘদিন ঘুম না হওয়া, অতিরিক্ত নাক ডাকা অথবা দিনের বেলা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বিষয় হলো তামাক। ধূমপানের পাশাপাশি জর্দা, গুল এবং অন্যান্য ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহারও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। কেউ ৩০ বা ৪০ বছর তামাক ব্যবহার করেছেন বলে এখন বন্ধ করে আর লাভ নেই—এ ধারণা সঠিক নয়। বয়স যাই হোক, তামাক ছেড়ে দেওয়ার স্বাস্থ্যগত উপকার থাকতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো তামাকমুক্ত জীবন।৫০ থেকে ৫৯ বছর বয়সকে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের ভিত্তি আরও শক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখা যেতে পারে। এ সময় শরীরের ওজন, রক্তচাপ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত হাঁটা, পেশিশক্তির ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পুষ্টি, ভালো ঘুম এবং তামাক পরিহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ৬০ থেকে ৬৯ বছরে শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাঁটার পাশাপাশি পেশিশক্তি ও ভারসাম্যের অনুশীলন, দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তির দিকে নজর, দীর্ঘমেয়াদি রোগের ভালো নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা দরকার। ৭০ বছরের পর লক্ষ্য হওয়া উচিত যতদিন সম্ভব স্বাধীনতা ও দৈনন্দিন কার্যকর সক্ষমতা ধরে রাখা। পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো, পর্যাপ্ত পুষ্টি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান এবং পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ তখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে এগুলো কঠোর বয়সভিত্তিক নিয়ম নয়; মানুষের শারীরিক অবস্থা ও সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে।স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের সব দায়িত্ব অবশ্য ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। একজন মানুষ নিয়মিত হাঁটতে চাইলে তাঁর এলাকায় নিরাপদ রাস্তা বা হাঁটার জায়গা প্রয়োজন। হাসপাতালে যেতে হলে সহজ ও নিরাপদ পরিবহন প্রয়োজন। বাড়িতে চলাফেরার জন্য পর্যাপ্ত আলো, নিরাপদ সিঁড়ি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক ব্যবস্থা দরকার। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবীণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি রোগের সমন্বিত চিকিৎসা এবং প্রয়োজন হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নগর ও সামাজিক পরিকল্পনায় তাই বয়সবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। নিরাপদ ফুটপাত, পার্ক ও হাঁটার জায়গা, প্রবীণবান্ধব গণপরিবহন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়মিত অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়িভিত্তিক পরিচর্যার সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বয়স সম্পর্কে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। ৬০ বা ৬৫ বছর বয়স হলেই একজন মানুষ সমাজের জন্য অপ্রয়োজনীয় হয়ে যান না। বরং কয়েক দশকের কর্মজীবন ও জীবনযাপনের মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতা সমাজের মূল্যবান সম্পদ হতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।পরিবারেরও এখানে বড় ভূমিকা রয়েছে। প্রবীণ বাবা-মাকে শুধু যত্নের প্রয়োজন আছে এমন মানুষ হিসেবে না দেখে পরিবারের সক্রিয় সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তাঁদের মতামত নেওয়া, পারিবারিক সিদ্ধান্তে যুক্ত রাখা, নাতি-নাতনির সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ দেওয়া এবং তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো—এসবও স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের অংশ। আর্থিক নিরাপত্তাও উপেক্ষা করা যায় না। চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার, বাসস্থান ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য ন্যূনতম আর্থিক নিশ্চয়তা একজন প্রবীণ মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।বার্ধক্য কোনো রোগ নয়। এটি জীবনের স্বাভাবিক একটি পর্যায়। স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের লক্ষ্য বয়স থামিয়ে দেওয়া বা মানুষকে চিরতরুণ রাখা নয়। বরং বয়স বাড়ার স্বাভাবিক পরিবর্তনের মধ্যেও যতদিন সম্ভব শারীরিক শক্তি, মানসিক সক্ষমতা, স্বাধীনতা, সামাজিক সম্পর্ক, আত্মমর্যাদা এবং জীবনের উদ্দেশ্য ধরে রাখাই এর মূল লক্ষ্য।বাংলাদেশের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। মানুষের আয়ু বৃদ্ধির অর্জনকে এখন সুস্থায়ু বৃদ্ধির অর্জনে রূপান্তর করতে হবে। আর এর প্রস্তুতি বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছানোর পর নয়, অনেক আগে থেকেই শুরু করা প্রয়োজন। পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পেশিশক্তি ধরে রাখা, তামাক পরিহার, পর্যাপ্ত ঘুম, দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ, মানসিক সক্রিয়তা এবং পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক—এসব ছোট ছোট বিষয়ই ভবিষ্যতের বার্ধক্যের ভিত্তি তৈরি করে।একজন ৭৫ বছরের মানুষ যদি সকালে হাঁটতে পারেন, নিজের দৈনন্দিন কাজের বেশির ভাগ নিজে করতে পারেন, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান এবং অনুভব করেন যে পরিবার ও সমাজে তাঁর এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে—তাহলে সেটিই স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের একটি সুন্দর উদাহরণ।তাই আমাদের প্রশ্ন শুধু ‘আমি কত বছর বাঁচব?’ হওয়া উচিত নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—‘আমি যে বছরগুলো বাঁচব, সেগুলো কতটা সুস্থ, সচল, স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ এবং অর্থবহভাবে বাঁচতে পারব?’ স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের প্রকৃত অর্থ সম্ভবত সেখানেই।[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

জৈব নিরাপত্তা কি শুধু খামারের জন্যই প্রয়োজন?

বাংলাদেশে ‘জৈব নিরাপত্তা’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে পোলট্রি বা গবাদিপশুর খামারের গেট, জীবাণুনাশকের স্প্রে, ফুটবাথ কিংবা কর্মীদের সুরক্ষাপোশাক। সামগ্রিক ধারণায় এটি যেন কেবল পশুপাখিকে রোগ থেকে বাঁচানোর একটি খামারভিত্তিক ব্যবস্থা। কিন্তু জনস্বাস্থ্য ও অণুজীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধারণা অত্যন্ত সংকীর্ণ। খামারের জৈব নিরাপত্তা ব্যর্থ হলে এর প্রভাব পশুপাখির শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জাতীয় জনস্বাস্থ্যে। এই মৌলিক সত্যটি এখনো আমাদের নীতি ও জনআলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ—এই তিনটি স্তম্ভের সঙ্গে খামারের জৈব নিরাপত্তা গভীরভাবে যুক্ত। প্রতিদিন লাখো মানুষ যে মাংস, ডিম বা দুধ গ্রহণ করে, তার উৎস এই খামারগুলো। খামারের ভেতরে রোগ ছড়ালে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় থাকলে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকলে কিংবা অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার চললে তার মাশুল শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। খামারের ব্যর্থতা প্রথমে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারব্যবস্থায় আঘাত হানে। সেখান থেকে তা পৌঁছায় মানুষের রান্নাঘরে এবং শেষ পর্যন্ত মানবদেহে। তাই জৈব নিরাপত্তাকে শুধু পশুপাখির স্বাস্থ্য সুরক্ষার গণ্ডিতে আটকে রাখলে ঝুঁকির প্রকৃত মাত্রা বোঝা যাবে না।দেশের পোলট্রি ও গবাদিপশুর খামারগুলোতে সংক্রামক রোগের বিস্তার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সালমোনেলা, ক্যাম্পিলোব্যাক্টার, ক্ষতিকর ই-কোলাই কিংবা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো জীবাণুর বিস্তারের অন্যতম কারণ খামারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, দূষিত পানি ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। প্রান্তিক খামারি ও কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতাও রোগের বিস্তার বাড়ায়। সুরক্ষাপোশাক ব্যবহার না করা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখা এবং খামারের পোশাক পরে বাইরে চলাফেরা করা এর উদাহরণ। এসব জীবাণুর অনেকগুলোই জুনোটিক, অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। ফলে খামার পর্যায়ের একটি ছোট অবহেলা সহজেই বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।বর্তমানে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকিগুলোর একটি হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। খামারে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়। পরে এসব জীবাণু দুধ-মাংসের মাধ্যমে, খামারের কর্মীদের মাধ্যমে কিংবা বর্জ্য দ্বারা দূষিত পানি ও মাটির মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে। এর পরিণতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। সাধারণ সংক্রমণের ক্ষেত্রেও জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। এতে হাসপাতালের চিকিৎসা জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। তাই খামারে সঠিক জৈব নিরাপত্তা বজায় রাখা শুধু পশু সুরক্ষার বিষয় নয়। এটি ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকর রাখারও একটি মৌলিক ভিত্তি।খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের একটি বড় দুর্বলতা। মৃত পশুপাখি, মলমূত্র ও দূষিত তরল বর্জ্য প্রায়ই খোলা জায়গায় ফেলা হয়। এতে আশপাশের নদী, খাল, মাটি ও বাতাসে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিবেশের এই দূষণ শেষ পর্যন্ত কৃষিপণ্য, মাছ, শাকসবজি ও পানীয় জলের মাধ্যমে মানুষের খাদ্যচক্রে ফিরে আসে। ফলে জৈব নিরাপত্তার অভাব পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে এবং মানুষের নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।জীবন্ত পাখির বাজার বা কাঁচাবাজারও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। খামারের রোগ বাজারে পৌঁছালে তা হাজারো মানুষের সংস্পর্শে আসে। বাজারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, খোলা মাংস, রক্ত ও মলমূত্রের মিশ্রণ এবং গরমে পচন—সব মিলিয়ে রোগ ছড়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। একটি খামারে জৈব নিরাপত্তা মানা হলেও বাজারব্যবস্থায় যদি তা ভেঙে পড়ে, পুরো প্রক্রিয়াই অকার্যকর হয়ে যায়। তাই জৈব নিরাপত্তাকে শুধু খামারের গণ্ডিতে আটকে রাখলে চলবে না। এটি বাজারব্যবস্থার সঙ্গেও সমানভাবে যুক্ত।মূলত, জৈব নিরাপত্তা একটি অখণ্ড শৃঙ্খল। খামার, পরিবহন, বাজার, রান্নাঘর ও হাসপাতাল—এই পাঁচটি ধাপের যেকোনো একটিতে ব্যর্থতা পুরো খাদ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। খামারের ব্যর্থতা বাজারে পৌঁছায়, সেখান থেকে মানুষের ঘরে যায় এবং শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে গিয়ে দাঁড়ায়। তাই জৈব নিরাপত্তাকে কেবল পশুপাখির রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে পুরো ব্যবস্থাই অরক্ষিত থেকে যায়।বাংলাদেশে জৈব নিরাপত্তাকে এখনো মূলত খামারের রোগ প্রতিরোধের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। নীতিনির্ধারক, খামারি ও সংশ্লিষ্ট খাতের অনেকেই এটিকে মানুষের স্বাস্থ্য বা পরিবেশের স্বাস্থ্যের সঙ্গে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ওয়ান হেলথ’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ দৃষ্টিভঙ্গিও আমাদের নীতিমালায় আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দরকার আচরণগত পরিবর্তন, সচেতনতা, সঠিক চর্চা ও নিয়মিত বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ।জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে জাতীয় জনস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ে। খাদ্যবাহিত রোগ বাড়ে, মহামারির ঝুঁকি তৈরি হয়, অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে যেতে পারে এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই জৈব নিরাপত্তাকে খামারের গণ্ডি থেকে বের করে ‘এক স্বাস্থ্য’ ভাবনার আলোকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটি শুধু পশুপাখির রোগ প্রতিরোধের উপায় নয়; মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশের স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার জন্যও এটি একটি অপরিহার্য নিরাপত্তাব্যবস্থা।বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থা—এসবই নির্ভর করছে আমরা জৈব নিরাপত্তাকে কতটা বিস্তৃতভাবে দেখি তার ওপর। খামারের ব্যর্থতা মানুষের ঘরে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগে না। তাই জৈব নিরাপত্তাকে শুধু পশুপাখির জন্য নয়, মানুষের জীবন, পরিবেশ ও জাতীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি মৌলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।[লেখক: সাবেক ডিন, ফ্যাকাল্টি অব অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন; সাবেক চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়]

সিধু-কানুর ভাস্কর্য পুনঃস্থাপনে দেরি কেন

সাম্প্রতিক সময়ে দিনাজপুর যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। গিয়েছিলাম ঐতিহাসিক সিধু-কানুর ভাস্কর্যটি স্মরণ করতে। কিন্তু রড, ইট, পাথর, বালি ও কংক্রিটে নির্মিত সেই ভাস্কর্যটি এখন আর নেই। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মুখে সিধু-কানুর ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয়। উপমহাদেশের বীরযোদ্ধা সিধু-কানুর স্মৃতিবিজড়িত এই ভাস্কর্যের ধ্বংসাবশেষও যেন আমাদের ইতিহাসের প্রতি এক ধরনের অবহেলার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।মূলত ভাস্কর্যটি তিনটি স্তরে সাজানো হয়েছিল। প্রথম অংশে ছিল সাঁওতাল বিদ্রোহ ও তেভাগা আন্দোলনের বিপ্লবীদের স্মরণে মুর‌্যাল। দ্বিতীয় স্তরে ছিল কমরেড ইলা মিত্র, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, কমরেড গুরুদাস তালুকদার ও খোকা বাইশের মুর‌্যালের প্রতিকৃতি। তৃতীয় অংশে ছিল ব্রিটিশবিরোধী মহান সাঁওতাল বিদ্রোহের অমর নায়ক সিধু-কানু ভ্রাতৃদ্বয়ের ভাস্কর্য। তাদের হাতে ছিল সাঁওতাল বিদ্রোহের চিরন্তন স্মারক তীর-ধনুক। বীরত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে তাদের উপস্থাপন করা হয়েছিল। নিচের দুটি অংশ অক্ষত থাকলেও সিধু-কানুর ভাস্কর্যটি উপড়ে ফেলা হয়েছে।ভাস্কর্যটি ভাঙার ঘটনা নিয়ে আদিবাসী নেতৃবৃন্দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ রয়েছে। তাদের বক্তব্য, প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের মুর‌্যালের কোনো ক্ষতি না করে শুধু সিধু-কানুর ভাস্কর্যটি কেন ভেঙে ফেলা হলো? তাদের আশঙ্কা, এর পেছনে আদিবাসীদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবদানকে অস্বীকার করার মানসিকতা কাজ করতে পারে। বিষয়টি সত্য হলে তা অবশ্যই উদ্বেগের। কারণ কোনো জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সংগ্রামের স্মারক ধ্বংস করা শুধু একটি স্থাপনা নষ্ট করা নয়; এর সঙ্গে সেই জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় ও ইতিহাসের প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে।ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের স্মারক হিসেবে সিধু-কানুর ভাস্কর্যটি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে দিনাজপুর-পঞ্চগড় মহাসড়কের পাশে কান্তনগর মোড়ে স্থাপন করা হয়। দিনাজপুরের কান্তনগর মোড় বা ১০ মাইলের ঐতিহাসিক তেভাগা চত্বরে নির্মিত স্মারকটি ছিল এই অঞ্চলের কৃষক ও আদিবাসী মানুষের সংগ্রামের একটি দৃশ্যমান প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ভাস্কর্যটির সঙ্গে নিজেদের ইতিহাস ও অধিকার আদায়ের চেতনার সম্পর্ক তৈরি করেছিল। সেখানে বারবার গিয়ে তারা অতীতের সংগ্রামকে স্মরণ করতেন।সিধু-কানুর ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলার পর ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরের রাজপথে আদিবাসী ছাত্র-জনতা, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, আদিবাসী মুক্তি মোর্চাসহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অংশ নেন। সেদিন প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে একটি স্মারকলিপি দিনাজপুরের ডিসি‘র কাছে হস্তান্তর করা হয়। নয় দফা দাবির মধ্যে সিধু-কানুর ভাস্কর্য পুনর্নির্মাণ এবং ভাঙচুরকারীদের শাস্তির দাবিও ছিল।জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, দিনাজপুরের ডিসি তখন বলেছিলেন, সিধু-কানুর ভাস্কর্য পুনঃস্থাপনের জন্য এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং তা বিবেচনাধীন রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এত দিন পরও সেই ‘বিবেচনাধীন’ অবস্থার অবসান হলো কি?১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর বাংলার কৃষকদের ওপর জমিদার ও জোতদারদের শোষণ আরও তীব্র হয়। কৃষকেরা নিজেদের শ্রম ও উৎপাদন খরচ বহন করেও উৎপাদিত ফসলের বড় অংশ জোতদারদের দিতে বাধ্য হতেন। এরই প্রেক্ষাপটে তেভাগা আন্দোলনের দাবি ছিল, উৎপাদিত ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ কৃষক এবং এক-তৃতীয়াংশ জমির মালিক পাবেন। ১৯৪৬-৪৮ সালের ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনে উত্তরবঙ্গের আদিবাসী সাঁওতালদের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ছিল। হাজী মোহাম্মদ দানেশ এ অঞ্চলের কৃষক ও সাঁওতালদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।সাঁওতালদের সংগ্রামের ইতিহাস আরও পুরোনো। ১৮৫৫ সালে সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব, ফুলো ও ঝানোসহ সাঁওতাল নেতারা জমিদার, মহাজন ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। তাদের আন্দোলনে সাঁওতালদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার খেটে খাওয়া মানুষও যুক্ত হয়েছিল। শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে এই সংগ্রাম উপমহাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে।সিধু-কানুর স্মৃতি ধরে রাখতে ভারতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পার্ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাদের নামে স্থাপনা ও ভাস্কর্য রয়েছে। তাদের নামে স্মারক ডাকটিকিটও প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে সিধু-কানুর স্মৃতি শুধু সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর নয়, উপমহাদেশের শোষণবিরোধী সংগ্রামেরও অংশ।দিনাজপুরের কান্তনগর মোড়ে স্থাপিত ভাস্কর্যটি চিত্রশিল্পী প্রদ্যোত কুমার দাসের নকশায় নির্মিত হয়েছিল। বহু মিটিং, আন্দোলন ও দাবির পর এই স্মারক নির্মিত হয়। তাই এটি শুধু একটি ভাস্কর্য নয়; এর সঙ্গে এ অঞ্চলের কৃষক, শ্রমজীবী ও আদিবাসী মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস জড়িয়ে আছে।একটি ঐতিহাসিক ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার পর তা পুনর্নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ভাস্কর্যটির ধ্বংসাবশেষ যদি সংরক্ষিত হয়ে থাকে, তবে তার ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ইতিহাসের কোনো স্মারক ধ্বংসের ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্যও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।সাঁওতাল বিদ্রোহের মহানায়ক সিধু-কানু শুধু একটি জনগোষ্ঠীর বীর নন। শোষণ, বঞ্চনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রামের ইতিহাসে তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। তাই তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো এবং কান্তনগর মোড়ে তাদের ভাস্কর্য দ্রুত স্বস্থানে পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের সব ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্মারকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ইতিহাসের স্মারক রক্ষা মানে শুধু অতীতকে রক্ষা করা নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসকে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়াও।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

দীর্ঘায়ুর যুগে প্রবীণদের জন্য নতুন প্রস্তুতি

আজ ১ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস’ পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থার পুনর্ভাবনা’। প্রবীণ ব্যক্তিরা শুধু সামাজিক সুরক্ষার সুবিধাভোগী নন; তাঁদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও আজীবন শিক্ষার ব্যবস্থা নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘায়ুকে স্বাস্থ্যকর, উৎপাদনশীল ও মর্যাদাপূর্ণ করার পাশাপাশি সমাজের সব ক্ষেত্রে প্রবীণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর ৪৫/১০৬ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ঘোষণা করে। ১৯৯১ সালের ১ অক্টোবর প্রথমবার দিবসটি পালিত হয়। বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যার বয়স কাঠামো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ফলে সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।জাতিসংঘের ‘বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২৪’ অনুযায়ী, ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বে ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২৬ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাতে পারে। ২০৭০-এর দশকের শেষ দিকে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২২০ কোটিতে পৌঁছানোর প্রাক্কলন রয়েছে। ২০৮০ সালের মধ্যে এই বয়সী মানুষের সংখ্যা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ বিশ্ব প্রবীণ সমাজের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।বাংলাদেশেও একই ধরনের জনমিতিক পরিবর্তন ঘটছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের প্রবীণ ধরা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৫’ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ মানুষ ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী। জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ থেকে ৪ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছাতে পারে।প্রবীণদের কল্যাণ ও আর্থসামাজিক সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৮ সাল থেকে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ২০১৩ সালে ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা’ প্রণয়ন করা হয়। এর লক্ষ্য প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ, দারিদ্র‍্যমুক্ত, কর্মময়, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ সামাজিক জীবন নিশ্চিত করা। নীতিমালায় স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রাধিকার, প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো, সামাজিক অংশগ্রহণ, দুর্যোগকালে বিশেষ সুরক্ষা, গবেষণা এবং আন্তঃপ্রজন্ম যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।এ ছাড়া ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’, ‘বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০১৩’ এবং ‘সুস্থ বার্ধক্য বিষয়ক জাতীয় কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (২০২৪-২০৩০)’সহ বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২২ সালে বয়স্কদের সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক জাতীয় নির্দেশিকাও প্রণয়ন করেছে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া, কর্মসংস্থানের অভাব, সঞ্চয়হীনতা, রোগব্যাধি, একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পারিবারিক সহায়তার ঘাটতির কারণে অনেক প্রবীণ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।জাতীয় প্রবীণ নীতিমালায় প্রবীণদের জন্য পরিচয়পত্র, গণপরিবহনে পৃথক টিকিট কাউন্টার, হাসপাতাল ও জনসেবা প্রতিষ্ঠানে র‌্যাম্প, প্রবীণ নিবাস ও দিবা-যত্ন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সুবিধার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের অনেকগুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। নীতিমালা প্রণয়নের এক দশকের বেশি সময় পরও এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় হালনাগাদ জরুরি হয়ে পড়েছে।প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি শুধু সমাজকল্যাণের নয়; এটি স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। তাই প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, নিরাপদ চলাচল, আর্থিক সুরক্ষা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে সমাজের কাজে লাগানোর পথও তৈরি করতে হবে।প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, সুশীল সমাজ, পরিবার এবং সমাজের সব বয়সী মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দীর্ঘায়ু যখন মানবসভ্যতার বড় অর্জন, তখন দীর্ঘ জীবন যেন একাকিত্ব, অসহায়ত্ব ও অবহেলার কারণ না হয়—এটাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক ও লাইন ডাইরেক্টর (এমআইএস), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর]

আইনশৃঙ্খলার লাগাম কার হাতে?

ক্ষোভ সামলে রাখা কঠিন। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়, “দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি।” দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখলে সত্যিই প্রশ্ন জাগে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার মন্ত্রণালয় কি যথাযথভাবে কাজ করছে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কোথায়? অন্যায় যখন প্রকাশ্যেই ঘটে, তখন পুলিশ কেন অনেক সময় দর্শকের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে থাকে?মিরপুরে সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিয়ে লুটপাট চালিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এর নেপথ্যে ছিল রাজনৈতিক প্রভাব ও জমি দখলের স্বার্থ। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি জানত, তারপরও কেন কার্যকর প্রতিরোধ দেখা গেল না, সেটি তদন্ত করে জনগণের সামনে পরিষ্কার করা জরুরি।ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে একই ধরনের আরেকটি ঘটনা সামনে এসেছে। এবার লক্ষ্য একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অভিযোগের কেন্দ্রে আবারও জমি দখলের স্বার্থ। প্রশ্ন তাই সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছেই; আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাদের হাত-পা বাঁধা?দেশের মানুষ এমন বাংলাদেশ চায় না, যেখানে জমি দখল, হামলা, লুটপাট কিংবা ভয় দেখানো একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ক্ষমতার প্রদর্শনী হয়ে উঠবে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অতীতের দলীয় পদ-পদবির প্রভাব থাকার অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। কেউ বর্তমানে পদে নেই, কিন্তু ‘সাবেক’ পরিচয়টুকুই যদি এলাকায় প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সেটিও রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য অস্বস্তিকর প্রশ্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার কাছে তাই প্রথম প্রশ্নটি আইনশৃঙ্খলা নিয়ে, দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক শৃঙ্খলা নিয়ে।যেসব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যকর কমিটি নেই, সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই কিংবা একই এলাকায় একাধিক গোষ্ঠী নিজেদের আলাদা নেতৃত্ব দাবি করে, সেখানেই তৈরি হয় নিয়ন্ত্রণের সংকট। একই এলাকায় কেউ নিজেকে মূল নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করছে, অন্য কেউ পুরোনো পদ-পদবির পরিচয়ে প্রভাব দেখাচ্ছে, আবার আরেকটি পক্ষ নিজেদের আলাদা বলয় তৈরি করছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কে কার কথা শুনবে, সেটিই অনেক সময় পরিষ্কার থাকে না।এই সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার দায় শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও এর দায় নিতে হবে। সংগঠনগুলোকে নিয়মিত কমিটির আওতায় আনতে হবে, সাংগঠনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে, রাজনীতির পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধে জড়ালে তার বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনগত ব্যবস্থা হবে। পদ কোনো অপরাধের লাইসেন্স নয়।একই সঙ্গে পদ-পদবি ঘিরে আর্থিক লেনদেন, প্রভাব বিস্তার কিংবা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করার উদ্যোগও জরুরি। রাজনৈতিক সংগঠনে পদ মানে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ নয়; বরং দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি।এর পরের এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি পুলিশের। একটি থানার আওতায় যদি একাধিক রাজনৈতিক বলয় সক্রিয় থাকে, তাহলে পুলিশ সদস্যদের ওপরও নানা দিক থেকে চাপ তৈরি হয়। এক পক্ষের সঙ্গে কথা বললে অন্য পক্ষ অসন্তুষ্ট হয়; একজনের অভিযোগ আমলে নিলে আরেকজন রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত একজন পুলিশ সদস্য যদি মনে করেন, আইন প্রয়োগের আগে তাকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবতে হবে, তাহলে আইনের শাসন দুর্বল হওয়াই স্বাভাবিক।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এখানেই আপনার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।পুলিশকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে; অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয়, পদ-পদবি কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধির অনুমোদন নিয়ে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি চলতে পারে না। পুলিশের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একটি স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামো থাকা দরকার, যাতে থানার কার্যক্রমে অযাচিত চাপ তৈরি না হয়।পুলিশকে আইনের অধীনে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে, আবার সেই স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ অন্যায় করলে তারও ব্যবস্থা হবে; কিন্তু রাজনৈতিক চাপে পুলিশ যেন আইন প্রয়োগ থেকে পিছিয়ে না যায়; এই নিশ্চয়তাও রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শুধু থানার সমস্যা নয়। এটি মানুষের নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার, ব্যবসার পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। রাতের আঁধারে জমি দখল, দিনের আলোয় লুটপাট কিংবা প্রকাশ্যে ত্রাস; এসব কোনো স্বাভাবিক সমাজের চিত্র হতে পারে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে; এ কথা বলার সময় হয়তো আসেনি। কিন্তু পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেই দায়িত্ব এখনই নিতে হবে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার হাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ; রাজনৈতিক পেশিশক্তির লাগাম টানা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের পেশাগত ভূমিকা পালনের যথাযথ পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া। দেশের মানুষ কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়। যারা অন্যায় করছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়; অপরাধটাই যেন তাদের পরিচয় হয়। আর যারা আইন রক্ষা করবে, তারা যেন রাজনৈতিক অসন্তোষের ভয়ে আইন প্রয়োগ থেকে পিছিয়ে না যায়।এখন প্রশ্ন একটাই; সরকার কি সত্যিই পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে চায়? তা হলে সময় এখনও আছে। দরকার শুধু দৃঢ় সিদ্ধান্ত, স্পষ্ট নির্দেশনা এবং তার বাস্তব প্রয়োগ।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক সভাপতি, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব]

সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থান: বিশ্বকে বাংলাদেশের সতর্কবার্তা

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এখন আর ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়। এটি ইতোমধ্যে উপকূলীয় জনপদ, দ্বীপরাষ্ট্র ও নিম্নভূমির মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলছে। জাতিসংঘও বিষয়টিকে বৈশ্বিক উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করে ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করে।জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৪-এ অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বাস্তবতা তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-যে সংকটের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর দায় তুলনামূলকভাবে কম, সেই সংকট মোকাবিলার ব্যয় ও দায়িত্বও কি তাদের একার হবে?বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। নদী, বদ্বীপ ও সমুদ্রঘেরা এই দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে শুধু কিছু জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই তৈরি হয় না, এর সঙ্গে যুক্ত হয় লবণাক্ততার বিস্তার, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতি, সুপেয় পানির সংকট, ঘরবাড়ি হারানো এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির মতো নানা সমস্যা। জাতিসংঘের ভাষ্যেও উঠে এসেছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আবাসন, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং জীবিকার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে চারটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন-বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমানো, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। এসব প্রস্তাবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অভিযোজনের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্নটি। এখানেই বাংলাদেশের অবস্থানটি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।  বাংলাদেশ একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রস্তুতি, উপকূল সুরক্ষা এবং বন ও জলাভূমি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে তুলে ধরেছেন।অন্যদিকে দেশটি মনে করিয়ে দিয়েছে, জাতীয় উদ্যোগের পাশাপাশি বৈশ্বিক সহযোগিতার বিকল্প নেই। জাতিসংঘের এই বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে না দেখে উন্নয়ন, অর্থনীতি, মানবিক নিরাপত্তা ও বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত একটি বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের উদ্দেশ্যও ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সক্রিয় করা এবং সমন্বিত ও অর্থায়নসমৃদ্ধ পদক্ষেপের দিকে এগিয়ে যাওয়া। বৈঠকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক ঘোষণাও গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তাই নিউইয়র্কের এই বক্তব্য কেবল একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেওয়া আরেকটি জলবায়ু বক্তৃতা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের উপকূল, নদী, কৃষি, মানুষের বসতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাবি উত্থাপনের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও অভিযোজন, দুর্যোগ প্রস্তুতি, পরিকল্পিত নগরায়ণ, উপকূলীয় অবকাঠামো এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের মতো বিষয়গুলোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করা জরুরি।সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ছে-এ বাস্তবতা কোনো একটি দেশের সীমান্তে থেমে থাকে না। জাতিসংঘের আলোচনাতেও উঠে এসেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব বন্দর, সরবরাহব্যবস্থা, খাদ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির ওপরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক আলোচনায় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই আলোচনার সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াই শেষ পর্যন্ত শুধু সমুদ্রকে ঠেকানোর লড়াই নয়-এটি মানুষের বসতি, জীবিকা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই।লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন।

রাজবন্দী: একসময়ের সহযোদ্ধারা কি চেয়ে চেয়ে দেখবে?

রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সাথে যোগাযোগ বা সংযোগ না থাকায় রাজনৈতিক নেতাদের সাথে স্বল্প সময়ের জন্য সামাজিক অনুষ্ঠানাদি ছাড়া খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় পর বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের সাথে একান্তে গল্প করার সুযোগ হয়েছিল। সাইফুল হকের কলেজ জীবন খুলনায়, দৌলতপুর বি.এল. কলেজে। আমারও তাই। উপরন্তু তিনি আমার ছোট ভাইয়ের বন্ধু ও সহপাঠী ছিলেন। আর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি প্রথমে ছাত্র ঐক্য ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক ও পরে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্র ঐক্য ফোরাম এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে ছিল। সাইফুল হক তখন ছাত্র আন্দোলন থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিলেও সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সেই কর্মযজ্ঞে তার অনানুষ্ঠানিক উপস্থিতি থাকতো। ছোট ভাইয়ের বন্ধু হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তার সাথে ঘনিষ্ঠতা ছিল।যাহোক, সাইফুল হককে একান্তে পেয়ে নানা বিষয় আলোচনার মাঝে আমার মনে যে প্রশ্ন অনেকদিন যাবৎ ঘুরপাক খাচ্ছে, তাকে সে প্রশ্নটা করলাম। বললাম, আপনারা বামপন্থীরা, বিশেষত আপনাদের দল, কেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, যার সাথে দীর্ঘকাল একসাথে দল করেছেন, পথ হেঁটেছেন, সেই মেনন ভাইয়ের মুক্তি দাবি করছেন না? অন্তত জামিনের অধিকার তো তার রয়েছে? তিনি তো রাজনৈতিক বন্দী। সাইফুল হক আমার প্রশ্নে বিব্রত বোধ করলেন। তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বললেন, ‘আপনার প্রস্তাব আমাদের পার্টি ফোরামের পরবর্তী সভায় উত্থাপন করবো’। বিএনপি নেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সময়ে মেনন ভাইদের সাথে ছিলেন। ছাত্র মৈত্রীর নেতা ও আমাদের সহযোদ্ধা ছিলেন। তার এবং আমার স্কুল ও কলেজ জীবন খুলনা সেন্ট যোসেফ’স স্কুল এবং বিএল কলেজ। তিনি বিএল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার সাথেও সাম্প্রতিক সময়ে স্বল্প সময়ের জন‍্য একদিন দেখা হয়েছিলো। তাকেও অনুরোধ করলাম মেনন ভাইয়ের জামিনের জন‍্য কিছু করেন। যদি তাও না পারেন এই বয়সের প্রবীণ ও অসুস্থ রাজনীতিককে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসার সুযোগ নেওয়ার ব‍্যবস্থাটা করে দিন। দু’মাসেরও বেশী সময় পার হয়েছে। কিছুই তো হলো না।ইউনূসের শিশু-কিশোর-তরুণ বাহিনী প্রবীণ রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেননের রাজনৈতিক জীবনের ইতিকথা নাও জানতে পারে। কিন্তু এদেশের রাজনৈতিক দলসমূহ, নাগরিক সমাজ, এমনকি শাসক দল বিএনপির নীতি নির্ধারকদের কারোরই তো অজানা থাকার কথা নয়। রাশেদ খান মেনন ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। তিনি ১৯৬৩-৬৪ বর্ষে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন এবং ৬৪-৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কুখ্যাত মোনেম খানের আগমনের বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন ও পরে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ঐ বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হলে জেল থেকে এম.এ. পরীক্ষা দেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সংগঠনেও তিনি জেল অভ‍্যন্তরে থেকে এবং মুক্তি লাভের পরেও ভূমিকা রাখেন। তিনি প্রথাগত চীনপন্থী রাজনীতি পরিত্যাগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।রাজনৈতিক জীবনে মেনন অসংখ্যবার কারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৬২ সালে নিরাপত্তা আইনে প্রথম কারাবন্দি হওয়ার পর ’৬৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন মেয়াদে নিরাপত্তা আইন, দেশরক্ষা আইন ও বিভিন্ন মামলায় কারাবরণ করেন। ৭০ সালের এক রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার আমলে তার অনুপস্থিতিতে তাকে সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও সম্পত্তির ষাট ভাগ বাজেয়াপ্তের দণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছিল। স্বাধীন দেশে সামরিক শাসনবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং এ সময়েও কারারুদ্ধ হয়েছিলেন।রাশেদ খান মেনন দেশের বাম আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ও তার দলের বিভক্তির ঝুঁকি নিয়ে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে শরিক হন। ভুল হোক, শুদ্ধ হোক, এটা তার ও দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্তকে ভুল, সুবিধাবাদী, পদস্খলন নানা ভাষায় আক্রমণ করা যেতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই এটা ফৌজদারি অপরাধ নয়। আর ২০২৪ সালের মন্ত্রিসভায়ও তিনি ছিলেন না, সরকারের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল না। তবে সংসদীয় রাজনীতির মোহ তাকে পেয়ে বসেছিল। শেখ হাসিনা তাকে ২০২৪-এর নির্বাচনে জোট প্রার্থী করতে চাচ্ছিলেন না। তার সামনে সহজ সুযোগ এসেছিল, বিতর্কিত নির্বাচন থেকে দূরে থাকার। তার বয়স, শরীর, স্বাস্থ্যও কিন্তু একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অনুকূল ছিল না। জোট রাজনীতিতে অনেক সময় অপছন্দের বিষয়ও মেনে নিতে হয়। কিন্তু অপছন্দ থেকে দূরে থাকার নিশ্চিত সুযোগ তিনি হেলায় হারালেন। বরং অনেক অনুনয়-বিনয় করে নিজের ও দলের মর্যাদা খাটো করে নির্বাচনের টিকেট নিলেন। এসবই রাজনৈতিক বিচ্যুতি হতে পারে, ফৌজদারি অপরাধ নয়।জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন করা মানে যেমন বেহেশতের টিকেট নিশ্চিত করা নয়, তেমনি এ আন্দোলন নিয়ে বা আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে দ্বিমত বা রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত থাকলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। মেনন ভাই টকশোগুলোতে ছাত্রদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি, চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিরোধিতা করেছেন। এটাও তো কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামাত ও জঙ্গিবাদের কঠোর সমালোচনা করতেন — এটাও তো ফৌজদারি অপরাধ নয়। আর ইউনূস থেকে শুরু করে জামাত, এনসিপি এবং আমরা সাধারণ নাগরিক সবাই জানি ও বুঝি যে তার নামে যে খুনের মামলাগুলি দেয়া হয়েছে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং হাস্যকরও বটে।আওয়ামী শাসনামলে তাদের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটকে নিষ্ক্রিয় রেখে বিতর্কিত নির্বাচনের সময়গুলোতে এবং বিরোধী আন্দোলনের সময়ে সক্রিয় করা হতো। জুলাই আন্দোলনের সময়েও কিছুটা সক্রিয় করা হয়। তবে মিডিয়াতে বিরোধী দল ও জামায়াত-শিবিরকে সমালোচনা করা ছাড়া জোট নেতাদের বিশেষ করণীয় ছিল না। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই বিকেলে গণভবনে ১৪ দলের বৈঠক ডাকেন। প্রবীণ রাজনীতিক মেনন ভাই ততদিনে পরিণতি বুঝে গেছেন। আমার জানামতে তিনি ঐ সভায় যেতে আগ্রহী ছিলেন না। শরীর ভালো নেই, বাইরে রাস্তার অবস্থাও ভালো নয় — এ যুক্তি দিয়ে এড়িয়ে যেতে চাইছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনী পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। আর যেতে মন না চাইলেও এত দীর্ঘ সময় শাসক দলের সঙ্গে থেকে সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পরে ঐ বিপদের সময়ে না যাওয়াটাও মানায় না।সভার পরে টেলিভিশনের সংবাদে আমরা শুনলাম, ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াত ও শিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একপাশে মেনন ভাই ও অন্য পাশে ইনু ভাইকে রেখে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ ঘোষণা দিলেন। সবার মনে প্রশ্ন জাগলো, ১৪ দল জামাত-শিবিরকে কিভাবে নিষিদ্ধ করে? তারা প্রস্তাব করতে পারে বা সরকারকে সুপারিশ করতে পারে। আর এত বছর পর এখন কেন এই সিদ্ধান্ত! যাহোক, দুই দিন ১৪ দলের নামে প্রচার করে ১ আগস্ট জামাত-শিবির নিষিদ্ধের সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হয়, যা কার্যত বুমেরাং হয়। কারণ ইতোমধ্যে পর্দার অন্তরালের খেলায় শেখ হাসিনা বা সরকার ব্যাকফুটে চলে যায়। ফলে নিষিদ্ধের ঘোষণায় জামাত-শিবির আরও শক্তিশালী ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।সরকার পতনের পরে ইউনূস আমলের শুরুতেই রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দুজনকেই একাধিক খুনের মামলার আসামি করা হয়। পরবর্তীতে জুলাই হত্যাকাণ্ডের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলছে। ইনু ভাইকে তো ইতিমধ্যে সাজাও দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে তারা আজ বন্দী।মেনন ভাই, ইনু ভাইয়ের কথা আলাদাভাবে লিখলাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে, বিশেষত সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের ছাত্র কর্মী হিসেবে তাদের সাথে সখ্য গড়ে উঠেছিল বলে। অবশ্য মেনন ভাইয়ের সাথে আরও আগে থেকে। আমার স্কুল-কলেজ জীবনের কিছু বন্ধু বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলেন। খুলনায় তৎকালীন ‘মেনন গ্রুপের’ যোগাযোগ ও আড্ডার জায়গা ছিলো ‘তৃপ্তি নিলয়’। আর পাশেই ‘ইস্টার্ন প্রেস’ ছিলো ‘মতিয়া গ্রুপের’ যোগাযোগ কেন্দ্র। আমি প্রায়ই তৃপ্তি নিলয়ে যেতাম ‘দেশব্রতী’ পত্রিকার খোঁজে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আমার ছোট চাচা লিয়াকত হোসেন ভাসানী ন‍্যাপের খুলনার নেতা হওয়ায় তৃপ্তি নিলয়ের আড্ডার সবাই আমাকে বিশেষ স্নেহের সঙ্গে দেখতেন। ১৯৭২ সালে ঢাকা আসার পর আমি মাঝেমধ্যে বন্ধুদের সাথে ওদের পার্টি অফিসে যেতাম। সেখানেই মেনন ভাইয়ের সাথে পরিচয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর হল ছাড়তে বাধ্য হলে আমি বেশকিছু দিন শহীদুল্লাহ হলে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃস্থানীয় ও গণসংগীত শিল্পী প্রয়াত ফকির আলমগীর এবং আমার বন্ধু আব্দুল্লাহ হিল বাকির রুমে থাকতাম। তখনও ওদের সাথে মেনন ভাইয়ের কাছে যেতাম। বিউটি ভাবী, মেনন ভাইয়ের আজিমপুরের আবাস স্থলেও আমি কয়েকবার গিয়েছি। মস্কোতেও বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি অনুষ্ঠানে এবং প‍্যাট্রিস লুবুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমাবেশে মেনন ভাইয়ের সাথে একই মঞ্চে অংশ নেয়ার সুযোগ হয়েছে। এরপর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময়ে তো অসংখ্যবার মেনন ভাইয়ের সাথে কথা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে।রাজনীতিক হাসানুল হক ইনু নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রলীগের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি ১৯৬৯ এর গনঅভ‍্যুত্থানে অংশ নেন। রাজনীতির ঝড়ো হাওয়ায় নিজের খেলোয়াড়ি জীবন এবং পেশাদার প্রকৌশলী হওয়ার পারিবারিক আকাঙ্ক্ষা ত‍্যাগ করে রাজনীতিতেই বাঁধা পড়েন। আর ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের এই রক্ষণভাগের খেলোয়াড় (গোলরক্ষক ) রাজনীতির মাঠে সবসময় আক্রমণভাগে খেলতে পছন্দ করতেন। ইনু ভাইয়ের সাথেও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু সেরকম ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি। ইনু ভাইরা আমাকে নরমপন্থী ছাত্র নেতা মনে করতেন। ওনাদের ছাত্র সংগঠনের সাথে আমাদের আন্দোলনের গতিপথ, কৌশল ও কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক লেগেই থাকতো এবং এক পর্যায়ে হলে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ধরনের সংঘাতও হয়েছিল। সে সংঘাতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ-বহির্ভূত ২/১টি সংগঠনও তাদের পক্ষ নিয়ে মিলিতভাবে আমাদের শান্তিপূর্ণ এক মিছিলে আক্রমণ করলে, গুলি বর্ষণ করলে আমাদের এক কর্মী নিহত হয়। সে কারণে ইনু ভাইরা কোনো দিন দুঃখ প্রকাশও করেনি। এর প্রতিক্রিয়ায় আমাদের কিছু উত্তেজিত কর্মী শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে ইনু ভাইকে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় আমরা ও রাজনৈতিক নেতারা দ্রুত জাসদ অফিসে যেয়ে দুঃখ প্রকাশ করি। যা হোক, এরপরে তো আমি ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নেই।তারও ছয় বছর পরে আমি চাকরিতে যোগদান করার ৫/৬ মাসের মধ্যেই ইনু ভাইয়ের সাথে দেখা আমার কর্মস্থলে। উনি ঐ একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ওনাদের এক প্রাক্তন সহকর্মী ও প্রাক্তন সংসদ সদস্যের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। আমাকে দেখে হাসিমুখে বললেন, আপনি এখানে কী করেন? আমি বললাম, আমি তো এই প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগ দিয়েছি। ইনু ভাইয়ের মুখটা মলিন হয়ে গেলো এবং এক দৃষ্টিতে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে হতাশার সুরে বললেন, ‘আপনারা এভাবে রাজনীতি থেকে সরে গেলে আমরা আর কিভাবে এগোবো! সমস্যা থাকলে তো আমাদের সাথেও আলাপ করতে পারতেন। আমরাও তো পর নই।’ এর পরে এ পর্যন্ত আর কখনো ইনু ভাইয়ের সাথে দেখা হয়নি। কিন্তু সেদিনের তার চাহনির মাঝে যে আকুতি — যাতে রাজনীতি ছেড়ে না যাই, আমার রাজনৈতিক জীবনের প্রতি তার যে সম্মানবোধ —তা আজও ভুলি নি। আমি সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে আসায় আমার এক সহোদর আর বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান দুদু ছাড়া আর কেউ এরকম প্রতিক্রিয়া অন্তত আমার সামনে প্রকাশ করেন নি। ইতিপূর্বে জিয়া আমলে হাসানুল হক ইনু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা পেলেও সাড়ে চার বছরের মধ্যেই মুক্তি পান। কারাবন্দী কিংবা আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হওয়া আরো অনেকের সাথেই তো রয়েছে রাজনৈতিক সংগ্রামের নানা স্মৃতি যা স্বল্প পরিসরের এ লেখায় উল্লেখ করা সম্ভব হলো না।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে উল্লেখ করেছে, ‘হাসানুল হক ইনু নিজে কাউকে হত্যা করেছেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব বা অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করেননি।’ রায়ে বলা হয়েছে, ‘ইনুর উপস্থিতিতে কোনো ফৌজদারি অপরাধ (ক্রিমিনাল অফেন্স) ঘটেনি’। তাহলে আশি ছুঁইছুঁই বছরের মুক্তিযোদ্ধা ইনুকে কেনো সাজা? তিনি রাজনৈতিকভাবে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচির বিরোধী ছিলেন এবং কঠোরভাবে তার সমালোচনা করতেন। আর জামায়াত ইসলামকে নিষিদ্ধ করার দাবি তো দেশের সংবিধানই তাকে দিয়ে রেখেছে। কী আছে আমাদের সংবিধানে? এটাই আছে যে, মুক্তিযুদ্ধ হলো ‘একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, রাজাকার, আলবদর এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ’। তাই মুক্তিযোদ্ধা হাসানুল হক ইনু হানাদার বাহিনীর সহযোগীদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবি করতেই পারেন। তবে কোটা-বিরোধী ন্যায্য আন্দোলনের সময়ে এ দাবি উত্থাপন কতটা যুক্তিযুক্ত ছিলো, সে আলোচনা ভিন্ন। পূর্ণাঙ্গ রায় পড়ে এটাই মনে হয়েছে, রাজনৈতিক কারণেই তাকে দণ্ড দেয়া হয়েছে।বাংলাদেশে তো দীর্ঘকাল যাবত ‘রাজবন্দী’ কথাটার কোনো অস্তিত্ব নেই। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের শাসনকালে রাজনৈতিক কারণে যাদের আটক করা হতো, তাদেরকে কারাগারে রাজবন্দী হিসেবে পৃথক কার্ড ও মর্যাদা দেয়া হত। কিন্তু বাংলাদেশে প্রায় সব সরকারের আমলেই কম আর বেশি রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলক, গায়েবি ও মিথ্যা মামলা দেওয়ার অপসংস্কৃতি চলে আসছে। জুলাইয়ের গল্পে তো বলা হয়েছিলো এ ধারার অবসান হবে। কিন্তু হলো কই? একই ধারা চলছে ভিন্ন রূপে, ভিন্ন ঢঙে। কাউকে ‘দোসর’ আখ্যায়িত করার কোনো রকম সুযোগ থাকলেই, তার বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছে খুনের মামলা।‘রাজবন্দীর চিঠি’ গল্পের এক জায়গায় কবি নজরুল বন্দী জীবনের পরিস্থিতি কবিতা আকারে ব্যাখ্যা করে লিখেছেন: ‘অপমান কেনা শুধু! প্রাণ দিলে পায়ে দলে যাবে তোর প্রাণ! / শুধু অনাদর শুধু অবহেলা শুধু অপমান! / ভালোবাসা? সে শুধু কথার কথা রে!’ আমার মনে প্রায়শই প্রশ্ন জাগে, শুধু সাইফুল হকের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি নয়, সিপিবি, বাসদ, বাংলাদেশ জাসদ, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন কেন রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু সহ রাজবন্দীদের মুক্তির দাবি করছে না। তারা কি মেনন ভাই ও ইনু ভাইকে খুনী মনে করেন? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে কেনো ‘শুধু অনাদর শুধু অবহেলা শুধু অপমান!’। কেনো দীর্ঘ সময়ের রাজপথের সাথীদের কাছে ‘ ভালোবাসা? — সে শুধু কথার কথা রে!’রাজনৈতিক ভুলের শাস্তি তো রাজনৈতিকভাবে হয়। ব্যক্তিগত বা দলগত নৈতিক দায়ের শাস্তিও নিশ্চয়ই পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা খুনের মামলার আসামি সাজিয়ে দেয়া যায় না। এক সময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতাদের, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের বছরের পর বছর মিথ্যা মামলায় আটক রাখা হবে আর শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকায় একসময়ের সহযোদ্ধারা চেয়ে চেয়ে দেখবে? অনেক সময় পার হয়েছে, বাম গণতান্ত্রিক শক্তি আওয়াজ তুলুক — রাজবন্দীদের মুক্তি চাই। মুক্তি চাই।জানতে পারলাম, জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিনিধি সভায় উপস্থিত প্রতিনিধিদের উপর প্রথমে যুবদল মব হামলা করেছে এবং পরে পুলিশ এসে হামলাকারীদের সাথে মিলিতভাবে একে একে প্রতিনিধিদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের অপরাধ তারা ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়েছেন। শাসকদলের প্ল্যানে তো জয়বাংলা শ্লোগান নিষিদ্ধের কথা শোনা যায়নি। নাকি ‘জয় বাংলা’ শুধুমাত্র ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের’ জন‍্য বরাদ্দ! আর কেউ উচ্চারণ করতে পারবে না। কি জানি কি প্ল্যান!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

সময়ের অনন্ত ঋণ

মানুষের জীবনে কিছু বাক্য থাকে, যেগুলো উচ্চারিত হওয়ার মুহূর্তে সাধারণ মনে হলেও সময়ের দীর্ঘ পরিক্রমায় সেগুলোই একদিন আত্মজিজ্ঞাসার আয়না হয়ে দাঁড়ায়। জীবনের এক পর্যায়ে উপলব্ধি হয়—আমরা আসলে সময়কে ব্যয় করি না; সময়ই আমাদের জীবনকে ধীরে ধীরে ব্যয় করে। প্রতিটি সূর্যোদয় আমাদের আয়ু থেকে একটি দিন সরিয়ে নেয়, প্রতিটি সূর্যাস্ত আমাদের অস্তিত্বের ভাণ্ডার থেকে একটি সম্ভাবনা মুছে দেয়। অথচ আমরা নির্বিকারভাবে ভাবি—সময় তো এখনো অনেক বাকি।ঘুম মানুষের জৈবিক অস্তিত্বের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নিদ্রা শরীরকে পুনর্গঠিত করে, মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়, ক্লান্ত সত্তাকে পুনরায় কর্মক্ষম করে। কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিদ্রা যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন বিশ্রাম আর পুনর্গঠনের মাধ্যম থাকে না; তা হয়ে ওঠে সময়ের নীরব অপহরণ। সমস্যা ঘুমে নয়, সমস্যাটি অতিরিক্ততায়; বিশ্রামে নয়, অচেতন অভ্যাসে।ধরা যাক, একজন মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় প্রতিদিন মাত্র দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুমিয়ে কাটালেন। দুই ঘণ্টা শুনতে সামান্য; কিন্তু জীবন কখনো একক মুহূর্তের হিসাব নেয় না, সে সমষ্টির নির্মম অঙ্কে আমাদের সামনে আয়না ধরেছে। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুম মানে বছরে ৭৩০ ঘণ্টা। অর্থাৎ প্রায় ৩০ দিন ১০ ঘণ্টা। দশ বছরে ৭,৩০০ ঘণ্টা—প্রায় ৩০৪ দিন। আর ষাট বছরে এই অতিরিক্ত সময় দাঁড়ায় ৪৩,৮০০ ঘণ্টা, অর্থাৎ প্রায় ১,৮২৫ দিন—পূর্ণ পাঁচ বছর।ভাবুন, জীবনের পাঁচটি বছর যদি কেবল অতিরিক্ত নিদ্রার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে থাকে, তবে সেই পাঁচ বছর আসলে কত অদৃশ্য সম্ভাবনার সমাধি! পাঁচ বছরে একজন মানুষ অসংখ্য গ্রন্থ পাঠ করতে পারেন, নতুন কোনো ভাষা আয়ত্ত করতে পারেন, গবেষণা করতে পারেন, শিল্পচর্চা করতে পারেন, অসংখ্য মানুষের জীবন স্পর্শ করতে পারেন, অথবা নিজের ভেতরে এমন এক জ্ঞানলোক নির্মাণ করতে পারেন, যার আলো মৃত্যুর পরও অন্যের পথকে আলোকিত করবে।সময়ের অপচয় তাই নিছক কয়েকটি ঘণ্টার অপচয় নয়; এটি সম্ভাবনার অপমৃত্যু। যে মুহূর্তটি আমরা অবহেলায় বিসর্জন দিই, তার সঙ্গে কেবল বর্তমানটিই হারায় না—হারিয়ে যায় সেই মুহূর্ত থেকে জন্ম নিতে পারত এমন অসংখ্য ভবিষ্যৎ।মানুষের সবচেয়ে বিস্ময়কর আত্মপ্রবঞ্চনা হলো—সে নিজের মৃত্যুকে জানে, কিন্তু নিজের সময়ের সীমাবদ্ধতাকে অনুভব করে না। আমরা জানি জীবন অনিত্য, তবু আচরণ করি যেন আমাদের হাতে অনন্তকাল জমা আছে। আগামীকালকে আমরা এমন এক সম্পদ মনে করি, যার ওপর আমাদের অবিচ্ছেদ্য মালিকানা রয়েছে। অথচ আগামীকাল কখনো প্রতিশ্রুত নয়; প্রতিশ্রুত কেবল এই মুহূর্ত।সময়ের প্রকৃতি বড় নির্মম। সে কারও দুঃখে থামে না, কারও সাফল্যে দ্রুততর হয় না, কারও অনুতাপে ফিরে তাকায় না। রাজা ও ভিখারি, জ্ঞানী ও অজ্ঞ, সফল ও ব্যর্থ—সবার জন্য সময়ের প্রবাহ অভিন্ন। পার্থক্য শুধু এই যে, কেউ সময়ের স্রোতে নিজের অস্তিত্বের অর্থ নির্মাণ করে, আর কেউ সেই স্রোতের ভাসমান আবর্জনার মতো অচিহ্নিতভাবে বিলীন হয়ে যায়।আমরা প্রায়ই বলি, “সময় পাচ্ছি না।” প্রকৃত সত্য অনেক সময় আরও নির্মম—সময় নেই তা নয়, সময়ের যথার্থ বিন্যাস নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনন্ত বিচরণ, উদ্দেশ্যহীন আলাপ, অকারণ বিলম্ব, অতিরিক্ত নিদ্রা, অনিয়ন্ত্রিত বিনোদন—এসব আমাদের জীবন থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ কেটে নেয়। আশ্চর্য হলো, একটি দিন থেকে দশ মিনিট হারালে আমরা উদ্বিগ্ন হই না; কিন্তু সেই দশ মিনিটের পুনরাবৃত্তিই একদিন কয়েক মাস, কয়েক বছর হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়ায়।জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ অর্থের হিসাবের চেয়ে সময়ের হিসাব নিয়েই বেশি অনুতপ্ত হয়। তখন বোঝা যায়—যে অর্থ হারিয়েছিলাম, তা হয়তো আবার অর্জন করা সম্ভব ছিল; যে সুযোগ হারিয়েছিলাম, তা হয়তো আর ফিরে আসেনি; কিন্তু যে সময় চলে গেছে, তার কোনো পুনর্মুদ্রণ নেই।অতএব সময়কে মূল্য দেওয়া মানে সারাক্ষণ কর্মব্যস্ত থাকা নয়। সময়ের প্রতি শ্রদ্ধা মানে জীবনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। কখন বিশ্রাম প্রয়োজন, কখন অধ্যয়ন, কখন সৃজন, কখন নীরব আত্মসমীক্ষা এবং কখন মানুষের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে হবে—এই বোধই সময়জ্ঞান।মানুষের হাতে সময়কে বন্দী করার কোনো যন্ত্র নেই, অতীতকে পুনরুদ্ধারের কোনো মন্ত্র নেই। আছে কেবল বর্তমান। এই বর্তমানই ভবিষ্যতের অতীত হয়ে যাবে—মাত্র একটি মুহূর্তের ব্যবধানে।তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—“আমার হাতে কত সময় আছে?” বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—“যে সময়টুকু আমার হাতে আছে, তার কতটা আমি অর্থবহ করে তুলছি?”কারণ শেষ বিচারে জীবন দীর্ঘতার কাছে নয়, গভীরতার কাছে ঋণী। সময় একদিন আমাদের ছেড়ে যাবে—এটাই অনিবার্য। কিন্তু সময় চলে যাওয়ার আগে আমরা সময়ের মধ্যে কী রেখে যেতে পারলাম, সেটিই হয়ে থাকবে আমাদের অস্তিত্বের প্রকৃত স্বাক্ষর।সময়কে যে মানুষ কেবল অতিবাহিত হতে দেয়, সে বয়স পায়; আর যে মানুষ সময়কে অর্থ দেয়, সে উত্তরাধিকার রেখে যায়।[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

রোহিঙ্গা সংকট: প্রতিশ্রুতির বৃত্তে আটকে আছে প্রত্যাবাসন

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে দাঁড়িয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা শুনতে শুনতে বারবার মনে হচ্ছিল- কতবার একই প্রশ্ন উঠবে, আর কতবার তার উত্তর খুঁজতে হবে? বছরের পর বছর ধরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বনেতারা উদ্বেগ জানাচ্ছেন, মানবিক সহায়তার কথা বলছেন, মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু কক্সবাজারের ক্যাম্পে থাকা মানুষগুলোর জীবনে সেই আলোচনার প্রতিফলন কতটা পড়ছে?জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনেও রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পেয়েছে। এবারও সংকটটিকে গুরুতর মানবিক সংকট হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং এর স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। কিন্তু এবারের আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত নতুন করে সেই পুরোনো প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে আসা- সেটা হলো রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বাস্তব পথটি কোথায়? বাংলাদেশের অবস্থান এ ক্ষেত্রে পরিষ্কার। রোহিঙ্গা সংকটের জন্ম মিয়ানমারে, তাই এর স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারকেই ঘিরে হতে হবে।বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। একটি মানবিক বিপর্যয়ের সময় সীমান্ত খুলে দেওয়া থেকে শুরু করে এত বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা-এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় মানবিক দায়িত্ব। কিন্তু এই দায়িত্বের কোনো শেষসীমা না থাকলে সেটি একসময় বাংলাদেশের জন্য গুরুতর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি করে এবং করছে।সেই বাস্তবতা থেকেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এবার পাঁচ দফা প্রস্তাব সামনে এসেছে। প্রথমত, প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সীমা। দ্বিতীয়ত, রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, প্রত্যাবাসনের আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।চতুর্থত, আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা।  আর পঞ্চমত, মানব পাচার, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান বন্ধে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা।প্রস্তাবগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট - বাংলাদেশ শুধু রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কথা বলছে না, বরং তারা যেন নিরাপদ পরিবেশে, অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে নিজেদের দেশে ফিরতে পারে, সেই নিশ্চয়তার কথাও বলছে।এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু সীমান্ত পার করিয়ে মানুষকে ফেরত পাঠানো আর টেকসই প্রত্যাবাসন এক বিষয় নয়। রোহিঙ্গারা যদি ফিরে গিয়ে আবারও নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য ও অধিকারহীনতার মুখোমুখি হয়, তাহলে সেই প্রত্যাবাসন কতটা টেকসই হবে - সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এ কারণেই ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান মামলার বিষয়টি সামনে এসেছে। গাম্বিয়া আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহ-পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত এই আয়োজন দেখিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকটের বিচারিক ও রাজনৈতিক দুই দিকই আন্তর্জাতিক আলোচনায় রয়েছে।কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমর্থন থাকা আর সংকটের বাস্তব পরিবর্তন- দুটি ভিন্ন বিষয়। এই পার্থক্যটিই সবচেয়ে বেশি অনুভব করা যায় কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোর বাস্তবতায়।সেখানে শিশুরা বড় হচ্ছে। তরুণেরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছে। পরিবারগুলো বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে। তাদের কাছে জাতিসংঘের প্রতিটি অধিবেশন, প্রতিটি প্রস্তাব এবং প্রতিটি আন্তর্জাতিক বিবৃতির শেষ প্রশ্ন একটাই,সেটা হল ফেরার পথ কবে খুলবে?অন্যদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাতের বাস্তবতা আরও জটিল হয়েছে। ফলে প্রত্যাবাসনের জন্য শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে ফিরে যাওয়া মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বাস্তব নিশ্চয়তা থাকবে।সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্য - সংঘাত বা সহিংসতা দিয়ে কোনো সংকটের সমাধান সম্ভব নয়, কূটনৈতিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমেই সমাধানের পথে যেতে হবে - এই বাস্তবতাকেই সামনে আনে। তবে কূটনীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন তার সঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক চাপের কার্যকর সমন্বয় থাকে। রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় বিপদ সম্ভবত এখানেই - সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে, নতুন ইস্যু সামনে আসছে, আন্তর্জাতিক মনোযোগও বিভক্ত হচ্ছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ থেমে নেই।বাংলাদেশের জন্যও এটি এখন শুধু মানবিকতার প্রশ্ন নয়। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী পরিস্থিতি একটি দেশের ওপর কতটা চাপ তৈরি করতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ বাংলাদেশ। তাই রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু ত্রাণ ও শরণার্থী ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়ালে থেকে যাবে। ত্রাণ প্রয়োজন, মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, কিন্তু এগুলো সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়।স্থায়ী সমাধানের অর্থ- নিরাপদ প্রত্যাবাসন, অধিকার নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার এবং মিয়ানমারে এমন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে রোহিঙ্গারা আবারও বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা ছাড়াই নিজেদের দেশে বসবাস করতে পারে।জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আবারও বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই আলোচনার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।কারণ রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আরেকটি বছর পার হওয়া মানে শুধু একটি সংকটের সময়কাল বাড়া নয়, এর অর্থ আরও একটি প্রজন্মের শিকড়হীন হয়ে বেড়ে ওঠা। জাতিসংঘের আলোচনার টেবিল থেকে কক্সবাজারের ক্যাম্প- দুই জায়গার দূরত্ব অনেক। কিন্তু এই দুই প্রান্তকে যুক্ত করার একমাত্র পথ হলো কার্যকর কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বাস্তব প্রত্যাবাসন। এবার সেই পথ কতটা এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

ভিডিও আরও দেখুন

মেসির ১০ নম্বর জার্সির উত্তরসূরি হবেন কে

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে লিওনেল মেসির সম্ভাব্য বিদায়ের পর আর্জেন্টিনার স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সিটি কে পাবেন, তা নিয়ে এখনই কোনো তাড়াহুড়ো করতে রাজি নন দলটির কোচ লিওনেল স্কালোনি। অধিনায়কের শেষ ম্যাচ পর্যন্ত আইকনিক এই নম্বরটি আপাতত খালি রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। মেসির বিদায় নেওয়ার পরই ঠিক করা হবে তার উত্তরসূরি।আগামী ৭ অক্টোবর বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে সম্ভাব্য বিদায়ী ম্যাচ খেলতে নামবেন মেসি। তার আগে বলিভিয়া ও বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে আরও দুটি প্রীতি ম্যাচে মাঠে নামবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এই ম্যাচগুলোতে কোনো ফুটবলারের গায়ে ১০ নম্বর জার্সি দেখা যাবে না।বলিভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি স্পষ্ট করে স্কালোনি বলেন, ‘এই ম্যাচগুলোতে কাউকে ১০ নম্বর দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তাই লিওর বিদায়ী ম্যাচের আগে আমরা এটি অন্য কাউকে দেব না। তার বিদায়ের পরেই দেখব, কাকে এই জার্সি দেওয়া যায়।’তবে মেসি-পরবর্তী যুগে স্থায়ীভাবেই অন্য কোনো আলবিসেলেস্তে ফুটবলারকে এই ঐতিহাসিক ১০ নম্বর পরতে হবে বলে নিশ্চিত করেছেন আর্জেন্টাইন কোচ। তিনি জানান, ‘বাছাইপর্বের সব ম্যাচে একই ফুটবলারকে এই নম্বর পরতে হবে, এমন নয়। তবে আমাদের ভাবনা হচ্ছে একজনই এটি স্থায়ীভাবে ধারণ করবে। কারণ, এই জার্সি পরার সঙ্গে অনেক সুন্দর আবেগ জড়িয়ে আছে। তবে কাকে দেওয়া হবে, তা এখনো আমরা ঠিক করিনি।’মেসির অনুপস্থিতিতে এর আগেও একাধিক ফুটবলার আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইকুয়েডরের বিপক্ষে ১০ নম্বর পরা ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে অ্যাঞ্জেল কোরেয়া ও পাওলো দিবালাকেও এই নম্বরে দেখা গেছে।সংবাদ সম্মেলনে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন এই মাস্টারমাইন্ড। ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলায় আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সভাপতি ক্লদিও তাপিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে জানিয়ে স্কালোনি ইঙ্গিত দেন, পরিকল্পনা ঠিক থাকলে ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দলটির প্রধান কোচের দায়িত্বে থেকে যেতে পারেন তিনি।মেসির বিদায়ের পরও আর্জেন্টিনা ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী স্কালোনি বলেন, ‘নতুন প্রতিভাদের আগমন এবং খেলোয়াড়দের জেতার ক্ষুধা প্রমাণ করে–মেসির বিদায়ের পরও আর্জেন্টিনা বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে দাপটের সঙ্গেই রাজত্ব করবে।’

মেসির ১০ নম্বর জার্সির উত্তরসূরি হবেন কে