সংবাদ
জানুয়ারির প্রথম অধিবেশনে আসছে সংবিধান সংশোধন বিল

জানুয়ারির প্রথম অধিবেশনে আসছে সংবিধান সংশোধন বিল

জুলাই জাতীয় সনদই প্রধান অগ্রাধিকারসংবিধানে ফিরছে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা’পাস হওয়ার পর হবে গণভোটআমাদের মূল অগ্রাধিকার হলো জুলাই জাতীয় সনদ। তবে নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী ম্যান্ডেট পাওয়া বিষয়গুলোও আমরা ধারণ করবো। সংবিধানে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ আমরা ফিরিয়ে আনবো। যা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে অনুচ্ছেদ ৮ এ যুক্ত করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এটি আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি।রবিবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের গণমাধ্যম সেন্টারে সংবিধান সংশোধন কমিটির তৃতীয় সভা শেষে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ এসব কথা বলেন।সংবিধান সংশোধনের সময়সীমা সম্পর্কে কমিটির আহ্বায়ক জানান, ডিসেম্বরের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন কমিটির রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপনের জোর প্রচেষ্টা চলছে। ওই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আইন মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিল তৈরি করে পাঠাবে।আশা করা যাচ্ছে, আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই এই বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হবে। এরপর বিলের ওপর দীর্ঘ আলোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনী শেষে তা পাস হলে গণভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ লাভ করবে।গণভোট প্রসঙ্গে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির আহ্বায়ক সালাউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী বাতিল হওয়ায় ১৪২ অনুচ্ছেদটি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। সংবিধানে প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে পরিবর্তন আসতে পারে। এসব ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আনা হলে মহামান্য রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের সুনির্দিষ্ট আগেই দেশের জনগণকে অবশ্যই গণভোটের মাধ্যমে তাদের মতামত জানাতে হবে। মূলত সংসদ বিল পাসের পরই এই সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান রয়েছে।তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সুরক্ষায় গণভোটের প্রস্তাব নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার জন্য দলটি দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজপথে আপসহীন সংগ্রাম চালিয়েছে, ভবিষ্যতের কোনো সংসদ যেন দলীয় স্বার্থে তা সহজে বাতিল বা পরিবর্তন করতে না পারে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলোতে সংশোধনী আনতেও যেন আবশ্যিকভাবে গণভোটের প্রয়োজন হয়, সেই আইনি বিধান যুক্ত করার জোরালো প্রস্তাব করা হয়েছে।
৪ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

বাগাড়ম্বরের আড়ালে জবাবদিহিহীনতার প্রশ্ন

অতি সম্প্রতি জাতিসংঘে মুহাম্মদ ইউনূস একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অস্তিত্বের ঘোষণা দিয়েছেন। ২১ সেপ্টেম্বর সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে ভাড়া করা হলে ‘সোশ্যাল বিজনেস, ইয়ুথ অ্যান্ড টেকনোলজি’ নামে সাইড ইভেন্ট হয়, যেখানে অল্প কিছু অতিথি ছিলেন। কৃতজ্ঞতাবশত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তাকে হাইলাইট করতে চেয়েছেন। কিন্তু এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণের গুরুত্ব জনগণের কাছে কমে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ইউনূসের পক্ষে-বিপক্ষে সরগরম আলোচনা, অথচ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ তত গুরুত্ব পায়নি। এর দায় বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। ইউনূসের প্রভাব নিয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি যে অপকর্ম করেছেন, তা জনগণ ভুলবে না।মোহাম্মদ ইউনূসের একটি বড় ভাঁওতাবাজি ছিল পাসপোর্ট নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, পাসপোর্টের জন্য জনগণ অফিসে যাবে কেন, ঘরে বসে অনলাইনে পেয়ে যাবে। তিনি নিজেই বলেছেন, সরকার ঘরে পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ঘরে বসে পাসপোর্ট পাচ্ছে না, ভোগান্তি একই আছে।মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত সময়কাল প্রায় ১৮ মাস। এই সময়ে বড় প্রতিশ্রুতি ছিল সংস্কার, দুর্নীতি দমন ও বিনিয়োগ। কিন্তু মিলল বক্তৃতার জৌলুস আর কাজের ঘাটতি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জবাবদিহিতা। ইউনূস সরকার এখন ক্ষমতায় নেই, কিন্তু তার অপকর্মের কোনো বিচার হচ্ছে না। কারণ ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তাকে রাজনৈতিক ছাড় দিয়েছে। আদালতও অভিযোগগুলো আমলে নিচ্ছে না। ফলে ১৮ মাসে রাষ্ট্রের যে ক্ষতির পাহাড় জমেছে, তার দায়ও আওয়ামী লীগের ওপর বর্তানো হচ্ছে।২০২৪ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ মহাসচিবকে কক্সবাজারে আনা হয়। ইউনূস চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝাতে চাইলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের লোক। বলা হলো, ‘আগামী ঈদ তারা নিজ ভূখণ্ডে করবে।’ কিন্তু ১৮ মাস শেষেও একজন রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন হয়নি। ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভরণপোষণ, পাসপোর্ট জালিয়াতি করে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের বদনাম—আগের মতোই আছে। ইউনূস শোডাউনের ভাঁওতাবাজি করলেন, কিন্তু কূটনৈতিক অগ্রগতি শূন্য।বিনিয়োগের নামেও একই প্রতারণা। একজন তরুণকে ‘বিনিয়োগের জাদুকর’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। প্রচার হলো, ইংরেজি জানা এই প্যারাসুট তরুণ বিদেশ থেকে বিনিয়োগ এনে দেশকে সিঙ্গাপুর বানিয়ে দেবে। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ কমেছে। উল্টো চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একই সময়ে বলা হলো, পৃথিবীর সব দেশ বাংলাদেশ থেকে লোক নেওয়ার জন্য তার কাছে আবেদনের পর আবেদন করে যাচ্ছে, অথচ ২০২৫ সালে বৈধ অভিবাসন আগের বছরের চেয়ে কমেছে।জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী। আওয়ামী লীগ সরকার সামিটের সঙ্গে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি করেছিল। ইউনূস সরকার ২০২৫-এর শুরুতে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে চুক্তি বাতিল করে, কিন্তু বিকল্প টার্মিনাল করল না। জুলাই ২০২৫-এ এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুনের পর দৈনিক প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে তীব্র সংকট শুরু হয়। একইভাবে আগের সরকারের অনুমোদিত ৩৭টি সৌর প্রকল্পের এলওআই বা লেটার অব ইনটেন্ট বাতিল করা হয়। বলা হলো, স্বচ্ছ দরপত্র হবে। ওই ৩৭টি প্রকল্প থেকে ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন করে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ যোগ করার উদ্যোগ আর নেওয়া হয়নি।স্বাস্থ্য খাতে অবহেলার খেসারত দিল শিশুরা। অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে হামের টিকা কেনার আগের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। যুক্তি ছিল, উন্মুক্ত দরপত্র হবে। কিন্তু সময়মতো টিকা আসেনি। ফলে ২০২৫ সাল থেকে হামে এক হাজারের বেশি শিশু মারা গেছে।একইভাবে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ইউনূসের আমলে কয়েক মাস কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়। স্টোরের ওষুধ তালাবদ্ধ থাকায় কোটি টাকার ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক প্রতিশোধের কারণে আগের সরকারের ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সব বাতিল করার পরিণতি জনগণ এখন ভুগছে।অর্থনীতিতে ধস নামে ব্যাংক ও বাণিজ্যনীতির কারণে। আইন লঙ্ঘন করে সত্তরোর্ধ্ব একজন অর্থনীতিবিদকে গভর্নর করা হয়। তিনি প্রকাশ্যে কয়েকটি ব্যাংককে ‘দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে ‘লাল তালিকাভুক্ত’ করেন। এরপরই আমানতকারীরা আতঙ্কে টাকা তুলতে শুরু করে, কয়েকটি ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়ে। আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং সহায়তা বন্ধ করায় অল্প দিনেই খেলাপি ঋণ দ্বিগুণ হয়, অনেক কারখানা বন্ধ হয়। নিজের গদি রক্ষায় ইউনূস সরকার প্রথমে স্টারলিংক নিয়ে হৈচৈ করল, ট্রাম্প প্রশাসনের পালাবদলের পর সেই প্রসঙ্গও চাপা পড়ে গেল। সবচেয়ে বড় বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, যা বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা খর্ব করবে।সবশেষে দুর্নীতির শ্বেতপত্র। ‘সেরা অর্থনীতিবিদ’ দিয়ে আগের সরকারের পাচারের হিসাব বের করে ভাষণ দেওয়া হলো, বিদেশে দল বেঁধে সফর হলো, কোটি টাকা খরচ হলো। কিন্তু একটি টাকাও ফেরত আসেনি। উল্টো আলোচনা হচ্ছে, ইউনূস আমলেই বিভিন্ন খাতে বড় দুর্নীতি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন ও অন্যান্য মামলা প্রশাসনিক নির্দেশে প্রত্যাহার হয়েছে, তার প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে কর সুবিধা ও নতুন লাইসেন্স। নোবেল লরিয়েটের আমলে আরও দুটি বস্তুর উদয় হয়েছে—অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি আর মব সন্ত্রাস।বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথা দিয়ে রাষ্ট্র চলে না। রোহিঙ্গা যায়নি, বিনিয়োগ আসেনি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট বেড়েছে, শিশু মরছে, ক্লিনিক অচল হয়েছে, ব্যাংক খাত ধুকছে, বাণিজ্য চুক্তি গলার ফাঁস হয়েছে। ক্ষমতা ছেড়েও তিনি জবাবদিহির বাইরে। কিন্তু আরোপিত দেবত্বের মহিমা আর বাস্তবতার হোঁচট একসঙ্গে হাঁটে না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

রোবোটিক সার্জারি: শল্যচিকিৎসার নতুন অধ্যায়

সার্জারি চিকিৎসার ইতিহাস প্রায় ১০ হাজার বছরের হলেও একসময় ইউরোপের অন্ধকার যুগে নাপিতেরা কাঁটাছেঁড়া বা সার্জারির কাজ করতেন। আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় সার্জারি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে প্রযুক্তির প্রতিটি নতুন সংযোজন রোগীর জন্য আরও নিরাপদ, কম আঘাতপ্রবণ ও অধিক নিখুঁত চিকিৎসার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ওপেন সার্জারি থেকে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি, ল্যাপারোস্কোপি থেকে রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড সার্জারি—এই বিবর্তনের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো রোবোটিক সার্জারি।রোবোটিক সার্জারির ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। ১৯৮৫ সালে ‘পুমা-৫৬০’ নামের একটি রোবোটিক সিস্টেম ব্যবহার করে মস্তিষ্কের টিস্যু পরীক্ষা করা হয়। এটিকে রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড সার্জারির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ‘প্রোবট’, ‘রোবোডক’, ‘এইসপ’ ও ‘জিউস’-এর মতো বিভিন্ন সিস্টেমের উন্নয়ন ঘটে।১৯৯০-এর দশকে নাসার প্রতিরক্ষা গবেষণা ও টেলিসার্জারির ধারণা রোবোটিক সার্জারি প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে দুর্গম স্থান, যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা মহাকাশে অবস্থানরত রোগীর কাছে দূরবর্তী সার্জনের দক্ষতা পৌঁছে দেওয়ার ধারণা থেকে টেলিরোবোটিক সার্জারির গবেষণা এগিয়ে যায়। এরপর আসে ‘দা ভিঞ্চি সার্জিক্যাল সিস্টেম’-এর যুগ। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ ‘দা ভিঞ্চি’ সিস্টেমকে সাধারণ ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির জন্য অনুমোদন দেয়। এরপর ইউরোলজি, গাইনোকোলজি, জেনারেল সার্জারি, থোরাসিক সার্জারি এবং বিভিন্ন ক্যান্সার সার্জারিতে রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হয়।বাংলাদেশও এখন এই প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। গত আগস্ট মাসে ‘মেডবট টুমাই’ এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবটের সহায়তায় দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়—একটি রোবোটিক কোলেসিস্টেকটমি এবং অন্যটি রোবোটিক হিস্টেরেকটমি। অনেকে এটিকে বাংলাদেশে নিয়মিত রোবোটিক সার্জারি সেবার সূচনা হিসেবে ঘোষণা করেছেন।রোবোটিক সার্জারি এমন একটি উন্নত মিনিমালি ইনভেসিভ বা স্বল্প-আঘাতের অস্ত্রোপচার পদ্ধতি, যেখানে সার্জন একটি কনসোলে বসে বিশেষায়িত যন্ত্র ও ক্যামেরা-সমৃদ্ধ রোবোটিক বাহু নিয়ন্ত্রণ করে জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রোবট নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে রোগীর অস্ত্রোপচার করে না। রোবোটিক সিস্টেম সার্জনের হাতের নড়াচড়াকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিতভাবে রোগীর শরীরের ভেতরের যন্ত্রে রূপান্তর করে। সাধারণত একটি রোবোটিক সার্জিক্যাল প্ল্যাটফর্মে থাকে সার্জনের কনসোল, রোগীর পাশে থাকা একাধিক রোবোটিক আর্ম, উচ্চ-রেজল্যুশনের থ্রি-ডি ক্যামেরা, সূক্ষ্ম ও বিভিন্ন ধরনের সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট এবং সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিত মুভমেন্ট ও মুভমেন্ট স্কেলিং ব্যবস্থা। ফলে সার্জন শরীরের গভীর ও সংকীর্ণ স্থানে ত্রিমাত্রিক ও বড় করে দেখা অপারেটিভ ফিল্ডে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে পারেন।প্রথমে রোগীর শরীরে কয়েকটি ছোট ছিদ্র করা হয়। এসব ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষ সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট প্রবেশ করানো হয়। রোবোটিক বাহুগুলো রোগীর শরীরের বাইরে অবস্থান করে এবং ভেতরের যন্ত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। যন্ত্রের মাথা মানুষের কব্জির মতো বিভিন্ন দিকে নড়াচড়া করতে সক্ষম। কিছু সিস্টেমে ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত মুভমেন্টের সুবিধা থাকে। একই সঙ্গে হাতের স্বাভাবিক বা সূক্ষ্ম কাঁপুনি সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিতভাবে কমিয়ে আনা যায়।এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সূক্ষ্মতা। মানুষের হাত যতই দক্ষ হোক, তার স্বাভাবিক নড়াচড়া ও কাঁপুনির কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। রোবোটিক প্রযুক্তি সেই নড়াচড়াকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে আরও নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। যন্ত্রের মাথা মানুষের কব্জির মতো বিভিন্ন দিকে নড়াচড়া করতে পারে এবং শরীরের গভীর ও সংকীর্ণ স্থানে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চক্ষমতার ত্রিমাত্রিক ভিশন। শরীরের গভীরে কোনো অতি সূক্ষ্ম অ্যানাটমিক কাঠামো, রক্তনালি বা টিস্যুর স্তর শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এই উন্নত দৃষ্টিশক্তি সার্জনকে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে জটিল ও সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারে এর গুরুত্ব রয়েছে।রোবোটিক সার্জারির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো, এটি সাধারণত মিনিমালি ইনভেসিভ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। বড় করে কেটে অস্ত্রোপচার করার পরিবর্তে ছোট ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষ যন্ত্র প্রবেশ করানো হয়। এর ফলে নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে অপারেশনের পর ব্যথা কম হতে পারে, ক্ষত দ্রুত শুকাতে পারে, সংক্রমণের ঝুঁকি কমতে পারে এবং রোগী তুলনামূলক দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। কিছু নির্বাচিত অস্ত্রোপচারে রক্তক্ষরণও কম হতে পারে। ইউরোলজি, গাইনোকোলজি, জেনারেল সার্জারি, থোরাসিক সার্জারি এবং বিভিন্ন ক্যান্সার সার্জারিতে রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহার ইতোমধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। পেলভিস, প্রোস্টেট, জরায়ু, কোলন-রেকটামসহ শরীরের জটিল অঞ্চলে সার্জনের জন্য উন্নত ভিশন ও সূক্ষ্ম মুভমেন্টের সুবিধা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।রোবোটিক সার্জারি অত্যাধুনিক হলেও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। ফলে অন্য অস্ত্রোপচারের মতোই রক্তপাত, সংক্রমণ, অ্যানেস্থেসিয়া-সংক্রান্ত জটিলতা এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জখমের সম্ভাবনা থাকে। নিরাপদভাবে রোবোটিক সার্জারি করা সম্ভব না হলে ওপেন সার্জারিতে রূপান্তর করতে হতে পারে। রোবোটিক সার্জারিতে যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বিকল্প সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত টিম প্রস্তুত রাখা অপরিহার্য। রোবোটিক সার্জারি পরিচালনার জন্য দক্ষ সার্জন, সহকারী, অবেদন বিশেষজ্ঞ, নার্সিং ও বায়োমেডিক্যাল টিম তৈরি রাখা প্রয়োজন। শুধু রোবট স্থাপন করলেই নিরাপদ সার্জারি পরিচালনা সম্ভব নয়; এর জন্য দীর্ঘ ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। রোবোটিক প্ল্যাটফর্ম, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি এখনো ব্যয়বহুল। তাই অপারেশনের খরচও বেশি। রোবোটিক সার্জারির খরচ প্রচলিত সার্জারি বা ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির তুলনায় প্রায় দুই থেকে তিন গুণ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ১ লাখ ২০ হাজার টাকার একটি প্রচলিত অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে রোবোটিক সার্জারিতে প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হতে পারে।রোবোটিক সার্জারি নিয়ে সাধারণের একটি ভুল ধারণা হলো—এতে হয়তো ভবিষ্যতে সার্জনের প্রয়োজন থাকবে না। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা হলো, এটি সার্জন প্রতিস্থাপন নয়, সার্জন-সহায়ক প্রযুক্তি। সিদ্ধান্ত নেন সার্জন; রোগীর সমস্যা বোঝেন সার্জন; কখন, কোথায়, কীভাবে অপারেশন করতে হবে এবং কোনো জটিলতা দেখা দিলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে—এসবের জন্য সার্জনের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। রোবট সার্জনের চোখকে আরও স্পষ্টভাবে দেখতে, হাতকে আরও সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে এবং জটিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে আরও সঠিকভাবে পৌঁছাতে সহায়তা করে।বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারির সূচনা নিঃসন্দেহে চিকিৎসা প্রযুক্তির বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর মাধ্যমে দেশের সার্জনদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি রোবট কেনা কোনো হাসপাতালের চিকিৎসার মানের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। রোবট কতটি আছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কতজন দক্ষ সার্জন এটি পরিচালনা করছেন; কতটা নিরাপদভাবে ব্যবহার হচ্ছে; রোগী নির্বাচন কতটা বৈজ্ঞানিক; জটিলতার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত; এবং সর্বোপরি রোগী কতটা উপকৃত হচ্ছেন।শল্যচিকিৎসার ভবিষ্যৎ নিঃসন্দেহে আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত ইমেজিং, রোবোটিক্স ও ডেটা-নির্ভর চিকিৎসা একদিন সার্জারির চেহারা আরও বদলে দিতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, চিকিৎসার মূল দর্শন অপরিবর্তিত থাকবে—রোগীর নিরাপত্তা, মানবিকতা ও সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করা। অতএব, বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারির অগ্রযাত্রাকে স্বাগত জানাতে হবে, তবে অন্ধ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে নয়; বিজ্ঞান, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, নিরাপত্তা ও রোগীর সামর্থ্যের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে। কারণ শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মাপকাঠি হবে না কতটি রোবট দেশে এসেছে—সাফল্যের মাপকাঠি হবে, এই প্রযুক্তি দিয়ে আমরা কতটা নিরাপদ, কার্যকর ও মানবিক শল্যচিকিৎসা দিতে পারছি।[লেখক: পরিচালক, মেডিক্যাল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

পোল্ট্রি ফার্মিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প দেশের প্রাণিজ আমিষ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উৎস । মহামারী, খাদ্যের ক্রমবর্ধমান উচ্চ মূল্য, পরিবেশের ব্যপক তারতম্য, শ্রম সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রতিনিয়ত এই শিল্প নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী  এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে স্মার্ট পোল্ট্রি ফার্মিং বা প্রিসিশন পোল্ট্রি ফার্মিং। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ আই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), কম্পিউটার ভিশন ,সেন্সর, রোবোটিক্স এবং ক্লাউড প্রযুক্তির সমন্বয়ে খামারের প্রতিটি তথ্য উপাথ্য সংগ্রহ করে  রিয়েল-টাইমের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। ফলে উৎপাদন বাড়ে, মৃত্যুহার কমে এবং খামার পরিচালনা আরও লাভজনক ও টেকসই হয়।খামারের পরিবেশ পর্যবেক্ষণএকটি আদর্শ ফার্ম বিশেষ করে মুরগির স্বাস্থ্য ও উৎপাদন অনেকাংশেই নির্ভর করে খামারের পরিবেশের ওপর। আধুনিক খামারে আইওটি -ভিত্তিক সেন্সরের মাধ্যমে তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা, অ্যামোনিয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড, বাতাসের গতি এবং আলোর তীব্রতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হয়। এসব তথ্য ইএসপি-৩২, আর্ডুইনো বা প্রোগ্রামেবল লজিক কন্ট্রোলার -এর মাধ্যমে ক্লাউডে সংরক্ষিত হয় এবং নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে মোবাইলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। ফলে খামারের পরিবেশ সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, হিট স্ট্রেস ও গ্যাসজনিত ঝুঁকি কমে এবং মুরগির স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা উন্নত হয়।এ আই-ভিত্তিক রোগ শনাক্তকরণকম্পিউটার ভিশন: ক্যামেরা দিয়ে মুরগির চলাফেরা, ডানা ঝুলে যাওয়া, ল্যাংড়া হাঁটা, চোখ-মুখের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করা।থার্মাল ক্যামেরা: শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে জ্বর বা সংক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা।শব্দভিত্তিক এআই প্রযুক্তি: কাশি, হাঁচি বা শ্বাসকষ্টের শব্দ বিশ্লেষণ করে শ্বাসতন্ত্রের রোগের সম্ভাবনা নির্ণয় করা।এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রোগের লক্ষণ সহজে বুঝা যায় এবং যা খামারীকে ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করতে পারে।খাদ্য ও পানি গ্রহণ পর্যবেক্ষণখাদ্য খামারের মোট উৎপাদন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ। স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে— লোড সেল“ দিয়ে ফিডের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়।স্বয়ংক্রিয় স্মার্ট ফিডার নির্ধারিত সময়ে খাদ্য সরবরাহ করে। ওয়াটার ফ্লো মিটার পানির ব্যবহার রেকর্ড করে। এ আই খাদ্য ও পানির গ্রহণের ধরণ বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করে। এর ফলে খাদ্যের অপচয় কমে, এফ সি আর উন্নত হয় এবং শ্রম ব্যয় হ্রাস পায়।মুরগির আচরণ পর্যবেক্ষণআধুনিক পোল্ট্রি খামারে এআই ও কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তি মুরগির আচরণ পর্যবেক্ষণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। উচ্চ-রেজোলিউশন ক্যামেরা সার্বক্ষণিক মুরগির চলাফেরা, খাদ্য-পানি গ্রহণ, ও ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ করে, আর এআই অ্যালগরিদম এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক আচরণ শনাক্ত করে। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে মুরগির শব্দ বিশ্লেষণ (অ্যাকোস্টিক মনিটরিং) করা যায়। মুরগি যদি ঠান্ডা লাগার কারণে গড়গড় শব্দ করে, তবে এআই অ্যালগরিদম সেই শব্দ শুনেই রোগ বা মানসিক চাপের পূর্বাভাস দিতে পারে। চলাফেরা কমে যাওয়া, একত্রে জড়ো হওয়া বা খাদ্যে অনীহার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সিস্টেম তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থাপককে মোবাইল অ্যাপ বা এসএমএসে সতর্ক করে। এর ফলে রোগ, হিট স্ট্রেস বা ভেন্টিলেশন সমস্যা দ্রুত ধরা পড়ে, সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া যায়, মৃত্যুহার কমে এবং খামার ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ ও বৈজ্ঞানিক হয়।ওজন, ইউনিফর্মিটি ও বৃদ্ধির হার নির্ণয়মুরগির ওজন ও বৃদ্ধির হার নির্ণয়ে এখন আর প্রতিটি মুরগিকে হাতে ধরে ওজন করার প্রয়োজন হয় না। আধুনিক খামারে থ্রি ডি ক্যামেরা, স্টেরিও ভিশন ক্যামেরা, কম্পিউটার ভিশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ আই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্পর্শ ছাড়াই গড় ওজন, ইউনিফর্মিটি, বৃদ্ধির হার, সিভি % নির্ণয় করা যায়।স্মার্ট ভেন্টিলেশন ও ক্লাইমেট কন্ট্রোল ;আধুনিক পোল্ট্রি খামারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ আই) ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এক্সজস্ট ফ্যান, কুলিং প্যাড, হিটার, ফগার, এয়ার ইনলেট, পর্দা/সাইড ওয়াল কার্টেইন পরিচালিত হয়। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন অনুযায়ী সিস্টেম নিজেই প্রয়োজনীয় সমন্বয় করে খামারের জন্য সর্বোত্তম পরিবেশ নিশ্চিত করে। ফলে হিট স্ট্রেস কমে, মুরগির মৃত্যুহার কমে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ে।ডিম উৎপাদন পর্যবেক্ষণ ও এআই-ভিত্তিক উৎপাদন বিশ্লেষণলেয়ার ও ব্রিডার খামারে এ আই -ভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিম উৎপাদন, ফাটা ও নোংরা ডিমের সংখ্যা, ডিমের ওজন এবং এগ বেল্ট-এর কার্যক্রম রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যায়। পাশাপাশি এ আই- মৃত্যুহার, খাদ্য ও পানি গ্রহণ,হ্যাচাবিলিটি,ফার্র্টিলিটি, এফ সি আর (ফিড কনভার্সন রেশিও), ও লাইভাবিলিটি (মুরগির বেঁচে থাকার হার) বিশ্লেষণ করে উৎপাদনের প্রবণতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করে। কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সিস্টেম তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা দেয়, ফলে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।বায়োসিকিউরিটি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাআধুনিক পোল্ট্রি খামারে রোগ প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বায়োসিকিউরিটিতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। আরএফআইডি কার্ড (রেডিও তরঙ্গভিত্তিক পরিচয়পত্র), ফেস রিকগনিশন (মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি), স্মার্ট সিসিটিভি, মোশন সেন্সর (গতিবিধি নির্ণায়ক সেন্সর), ভিজিটর ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (দর্শনার্থী পরিচালনা বা ট্র‍্যাকিং ব্যবস্থা), যানবাহন ট্র‍্যাকিং বা অবস্থান নজরদারি ব্যবস্থা প্রযুক্তির মাধ্যমে খামারে ব্যক্তি ও যানবাহনের প্রবেশ-নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এর ফলে অননুমোদিত প্রবেশ কমে, রোগজীবাণু বহিরাগত উৎস থেকে খামারে প্রবেশের ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং সামগ্রিক বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা আরও কার্যকর ও শক্তিশালী হয়।স্মার্ট রোবোটিক্সউন্নত পোল্ট্রি খামারে বর্তমানে ডিম সংগ্রহ, খামার পরিষ্কার, ফিড সরবরাহ, মৃত মুরগি শনাক্তকরণ এবং লিটার পর্যবেক্ষণের মতো কাজে ডিম সংগ্রহকারী রোবট, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নকারী রোবট, ফিড পুশিং রোবট (খাবার ঠেলে দেওয়ার রোবট), মৃত মুরগি শনাক্তকারী রোবট, লিটার মনিটরিং রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি শ্রমের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি খামার ব্যবস্থাপনাকে আরও দ্রুত, নির্ভুল ও দক্ষ করে তুলছে।সমন্বিত আইওটি ড্যাশবোর্ডস্মার্ট পোল্ট্রি খামারের সব সেন্সর ও ডিভাইস একটি সমন্বিত আইওটি ড্যাশবোর্ডের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এই ড্যাশবোর্ডে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, অ্যামোনিয়া , কার্বন ডাই-অক্সাইড , খাদ্য ও পানি গ্রহণ, দেহের ওজন, ডিম উৎপাদন, মৃত্যুহার, এফ সি আর , টিকাদান সূচি এবং ওষুধ ব্যবহারের তথ্য রিয়েল-টাইমে দেখা যায়। ফলে মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার থেকেই খামারের সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়।স্মার্ট পোল্ট্রি ফার্মিং কেবল একটি ট্রেন্ড বা ফ্যাশন নয়, এটি টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার একটি অন্যতম হাতিয়ার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ আই), আইওটি, কম্পিউটার ভিশন  ও স্মার্ট সেন্সর সমন্বয়ে পোলট্রি শিল্প দ্রুত একটি ডেটা-নির্ভর (তথ্য-ভিত্তিক / উপাত্ত-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ) শিল্পে রূপান্তরিত হচ্ছে।পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ, রোগ শনাক্তকরণ, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, ওজন নির্ণয়, ডিম উৎপাদন পর্যবেক্ষণ এবং উৎপাদন বিশ্লেষণ—সবকিছু এখন আরও নির্ভুল, দ্রুত ও বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে এই প্রযুক্তির ধীরে ধীরে বিস্তার উৎপাদন বৃদ্ধি, খরচ হ্রাস এবং টেকসই খামার ব্যবস্থাপনার নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। সরকারি অনুদান, সহজ শর্তে ঋণ এবং খামারিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে খুব দ্রুতই বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পোল্ট্রি শিল্পে এক অভূতপূর্ব রূপান্তর ঘটবে।[লেখক: সিনিয়র ম্যানেজার, প্যারাগন গ্রুপ]

জ্ঞানেশ বিতর্কে মমতা–সিপিএম সখ্য, বদলাচ্ছে কি রাজনীতির অঙ্ক?

নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্কে উত্তাল জাতীয় রাজনীতি। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধীরা যখন একজোট হওয়ার চেষ্টা করছে, তখন বাংলার রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে এক নতুন আলোচনার বিষয়। যে সিপিএমের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন গড়ে তুলে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই দলের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির সঙ্গে এবার সরাসরি টেলিফোনে কথা বললেন তৃণমূল নেত্রী।শুধু তাই নয়, আগামী সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তাঁকে জানিয়েছেন বলে সূত্রের খবর। ফলে প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিরোধীদের আন্দোলন কি বাংলার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিকে জাতীয় স্তরে আরও কাছাকাছি আনছে?তবে এই যোগাযোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে গেলে বাংলার ইতিহাসের দিকে তাকানো জরুরি। ১৯৭৭ সাল থেকে টানা ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। সেই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল সিপিএম-বিরোধী আন্দোলন।দীর্ঘদিনের সেই রাজনৈতিক সংঘাত বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূল ও সিপিএমকে দুই বিপরীত মেরুতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বাংলায় তৃণমূল ও সিপিএমের রাজনৈতিক সংঘাতের উপর এর কোনও প্রভাব পড়বে কি না। আপাতত তেমন কোনও সমঝোতার ইঙ্গিত নেই। রাজ্যে দুই দলই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছে। সিপিএমের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগাযোগকে তাই এখনই নতুন রাজনৈতিক জোটের সূচনা বলা যায় না।তবে জাতীয় রাজনীতির সমীকরণে এই যোগাযোগ একটি নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। যে নেত্রী একসময় বাংলায় বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটানোর আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনিই এখন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সিপিএমের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয়ের পথে হাঁটছেন।রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রয়োজনে বিরোধী দলগুলির মধ্যে যোগাযোগ কতটা বাড়তে পারে, এই ঘটনা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন এই সান্নিধ্য কি কেবল নির্বাচন কমিশন বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধী ঐক্যের বৃহত্তর সমীকরণ তৈরির পথ খুলে দেবে।

শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও মুক্তচিন্তার শিক্ষাঙ্গন

শিক্ষককে হতে হয় জ্ঞানের বাহক, বিবেক জাগ্রত করার সহযাত্রী এবং মানুষ গড়ার কারিগর; কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচারক নয়। প্রকৃতপক্ষে একজন শিক্ষক কেবল একজন পেশাজীবী নন; তিনি একটি সভ্যতার ধারক ও বাহক। একটি প্রজন্ম তার শিক্ষকদের কাছ থেকে শুধু পাঠ্যবিষয়ের জ্ঞানই অর্জন করে না; তাদের কাছ থেকেই শেখে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে ভিন্নমতকে সম্মান করতে হয়, কীভাবে যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয় এবং কীভাবে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়াতে হয়। তাই একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত আচার-আচরণ, মূল্যবোধ, বৌদ্ধিক সততা ও পেশাগত নৈতিকতা শিক্ষার্থীদের ওপর পাঠ্যপুস্তকের চেয়েও অনেক গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষকের কাজ শিক্ষার্থীদের নিজের মতো করে গড়ে তোলা নয়; বরং তাদের নিজেদের মতো করে ভাবতে, বিচার করতে এবং নিজেদের বোধ ও বিবেকের আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে শেখানো।এই কারণেই শিক্ষকতার সঙ্গে সরাসরি রাজনীতি ও ক্ষমতার সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। শিক্ষক যখন নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানকে শিক্ষার্থীর স্বাধীন চিন্তার বিকাশে ব্যবহার করেন, তখন তিনি প্রকৃত অর্থে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু যখন সেই অবস্থান কোনো নির্দিষ্ট দল, মতাদর্শ বা গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত হয়, তখন শিক্ষকতার নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। শ্রেণিকক্ষ তখন আর মুক্ত সংলাপ ও অনুসন্ধানের জায়গা থাকে না; তা হয়ে উঠতে পারে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব ও প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র। অথচ শিক্ষার্থীর মনে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়। বরং তাকে এমন বৌদ্ধিক সক্ষমতা দেওয়া শিক্ষার উদ্দেশ্য, যার মাধ্যমে সে বিভিন্ন মত ও তথ্য-উপাত্ত বিচার-বিশ্লেষণ করে নিজের অবস্থান নিজেই নির্ধারণ করতে পারে।মার্কিন দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ জন ডিউই (১৮৫৯ু১৯৫২) শিক্ষা ও গণতন্ত্রের সম্পর্ককে অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর চিন্তায় শিক্ষা ছিল গণতান্ত্রিক জীবনচর্চার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কারণ গণতন্ত্র কেবল ভোট দেওয়ার একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়। এটি এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে মানুষ ভিন্নমত প্রকাশ করে, অন্যের মত শোনে, যুক্তি ও অভিজ্ঞতার আলোকে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে এবং সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়। এই সংস্কৃতি গড়ে ওঠার প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য প্রয়োজন এমন শিক্ষক, যিনি চিন্তার স্বাধীনতাকে উৎসাহিত করবেন, মতের বৈচিত্র‍্যকে সম্মান করবেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তিবোধ, অনুসন্ধিৎসা ও সমালোচনামূলক চিন্তার সক্ষমতা বিকশিত করতে সহায়তা করবেন। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে সব বিষয়ে একমত হবেন এমন কোনো প্রয়োজন নেই। বরং শিক্ষার্থীর সঙ্গে মতভেদ থাকার মধ্য দিয়েও কীভাবে সম্মানজনক ও যুক্তিনির্ভর সংলাপ করা যায়, সেটিই তিনি শেখাবেন। তিনি শিক্ষার্থীকে বলবেন না কোন মতটি গ্রহণ করতে হবে; বরং শেখাবেন কীভাবে কোনো মতের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ খুঁজতে হয়, কীভাবে যুক্তির শক্তি ও দুর্বলতা শনাক্ত করতে হয় এবং কীভাবে নিজের পূর্বধারণাকেও প্রশ্ন করতে হয়। এই বৌদ্ধিক স্বাধীনতাই একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতে কেবল দক্ষ পেশাজীবী নয়, একজন বিবেকবান ও দায়িত্বশীল নাগরিকে পরিণত করে।কিন্তু শিক্ষক যখন নিজেই দলীয় বিভাজনের সক্রিয় অংশ হয়ে ওঠেন এবং নিজের রাজনৈতিক পরিচয়কে পেশাগত পরিচয়ের ওপর প্রাধান্য দেন, তখন তিনি সচেতন বা অচেতনভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সেই বিভাজনের বীজ বপন করেন। বিশেষত শিক্ষক যদি মূল্যায়ন, আচরণ, সুযোগ প্রদান কিংবা দৈনন্দিন একাডেমিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত পরিচয়কে বিবেচনার মধ্যে আনেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের কাছে একটি বিপজ্জনক বার্তা পৌঁছে যায়। আর সেটা হলো যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, যুক্তির চেয়ে আনুগত্য শক্তিশালী এবং সত্যের চেয়ে ক্ষমতার নৈকট্য অধিক মূল্যবান। এমন অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক বিকাশকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফল হলো শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে পরিচয়ভিত্তিক অবস্থান গ্রহণে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। কোনো বিষয়ে তথ্য ও যুক্তি যাচাই করার আগে তারা জানতে চায় কে বলেছে, কোন পক্ষ বলেছে বা কোন পরিচয়ের মানুষ বলেছে। অথচ জ্ঞানের জগতে কোনো বক্তব্যের সত্যতা বক্তার রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে নির্ধারিত হয় না; তা নির্ধারিত হয় তার প্রমাণ, যুক্তি, পদ্ধতি ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে। এই মৌলিক বোধটি হারিয়ে গেলে শিক্ষার্থী স্বাধীন চিন্তার অধিকারী না হয়ে গোষ্ঠীগত পরিচয়ের বাহকে পরিণত হয়। সুতরাং শিক্ষককে রাজনীতিবিমুখ হতে হবে এ কথা বলা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি প্রয়োজনীয়ও নয়। কারণ একজন শিক্ষকও সমাজের একজন সচেতন নাগরিক এবং তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মত থাকতেই পারে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষ, একাডেমিক মূল্যায়ন ও শিক্ষাদানকে দলীয় আনুগত্যের প্রভাবমুক্ত রাখা তাঁর পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্ব। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাসের স্বাধীনতা যেমন একজন শিক্ষকের অধিকার, তেমনি শিক্ষার্থীর স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষক যদি এই সীমারেখাটি সচেতনভাবে রক্ষা করতে পারেন, তাহলেই শিক্ষাঙ্গন রাজনৈতিক বিভাজনের ক্ষেত্র না হয়ে গণতান্ত্রিক নাগরিকত্ব, মুক্তবুদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চার প্রকৃত বিদ্যালয়ে পরিণত হতে পারে।গণতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা অপরিহার্য। কারণ তারাই ভবিষ্যতের নাগরিক, পেশাজীবী, নীতিনির্ধারক এবং নেতৃত্বের সম্ভাব্য ধারক। একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে কতটা সচেতন, যুক্তিনির্ভর, বাস্তববাদী এবং দায়িত্বশীল হয়ে উঠছে তার ওপর। তাই শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রের কাঠামো, সংবিধান, নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশ, অর্থনীতি, বৈষম্য, জননীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে জানার ও মতামত গঠনের সুযোগ থাকা জরুরি। শিক্ষার্থীরা যদি সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো নিয়ে চিন্তা না করে, তাহলে ভবিষ্যতের নাগরিক সমাজও দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে রাজনৈতিক সচেতনতা আর দলীয় সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক সচেতনতা মানুষকে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে জানতে, বিভিন্ন মত ও অবস্থানকে বুঝতে এবং নিজের বিবেক ও যুক্তির আলোকে মতামত গঠন করতে সাহায্য করে। পক্ষান্তরে দলীয় আনুগত্য অনেক সময় ব্যক্তির স্বাধীন বিচারবোধকে একটি নির্দিষ্ট সাংগঠনিক অবস্থানের অধীন করে ফেলে। একজন সচেতন শিক্ষার্থী একই সঙ্গে সরকারের কোনো নীতিকে সমর্থন করতে পারেন, আবার অন্য কোনো নীতির সমালোচনা করতে পারেন; কোনো রাজনৈতিক দলের একটি অবস্থানের সঙ্গে একমত হতে পারেন, আবার একই দলের অন্য কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও করতে পারেন। এই স্বাধীনতাই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সচেতনতার লক্ষণ। কারণ গণতন্ত্রে নাগরিকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর প্রতি নয়; মূল আনুগত্য হওয়া উচিত সংবিধান, আইন, ন্যায়, মানবিক মর্যাদা এবং জনকল্যাণের প্রতি।বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই পার্থক্যটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রচলিত ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করা, নতুন ধারণা পরীক্ষা করা এবং বিকল্প ভবিষ্যৎ কল্পনা করার সুযোগ থাকার কথা। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান কিংবা ইতিহাসের শিক্ষার্থী যদি বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন করতে না পারে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্য কেবল কতজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করল তার মধ্যে নিহিত নয়। বরং কতজন শিক্ষার্থী সেখানে এসে নিজের চিন্তার সীমা অতিক্রম করতে শিখল, প্রচলিত ধারণাকে যুক্তির আলোকে পরীক্ষা করল এবং নতুন প্রশ্ন উত্থাপনের সাহস অর্জিত করল তার মধ্যেই এর প্রকৃত সাফল্য নিহিত। কিন্তু যখন শিক্ষাজীবনের প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে দলীয় আনুগত্য, তখন শিক্ষার মূল লক্ষ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন শিক্ষার্থীর মেধা, কৌতূহল, গবেষণার আগ্রহ কিংবা একাডেমিক পরিচয়ের চেয়ে তার রাজনৈতিক পরিচয় অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিবেশে মতভিন্নতা আর স্বাভাবিক বৌদ্ধিক বৈচিত্র‍্য হিসেবে বিবেচিত হয় না; বরং তা অনেক সময় শত্রুতা বা বিশ্বাসঘাতকতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজের প্রকৃত মত প্রকাশের পরিবর্তে নিরাপদ অবস্থান গ্রহণ করতে শেখে; আচরণে সততা প্রদর্শণের পরিবর্তে দ্বিচারিতার আশ্রয় নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে তারা যুক্তির চেয়ে গোষ্ঠীর অবস্থান অনুসরণ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সংস্কৃতি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ক্ষতি করে না; সামাজিক জীবনসহ ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ও নাগরিক জীবনেও এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে।বিশ্ববিদ্যালয় তাই কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় হবে প্রশ্ন করার জায়গা, বিতর্ক করার জায়গা, গবেষণা করার জায়গা এবং ভিন্নমতের সঙ্গে যুক্তিনির্ভর সংলাপে মেতে ওঠার জায়গা। সেখানে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নেই; বরং সব মতকে জ্ঞানতাত্ত্বিক ও নৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি করার মতো পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী চাইলে রাজনীতি করবেন, রাজনৈতিক সংগঠনে যুক্ত হবেন, কোনো দলের সমর্থক হবেন এটি তাঁর নাগরিক স্বাধীনতার অংশ। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী যেন দলীয় পরিচয়ের কারণে একাডেমিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, আবার দলীয় পরিচয়ের কারণে অন্যায্য সুবিধাও না পান এই নীতিগত ভারসাম্য নিশ্চিত করাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, ছাত্রসংগঠন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং একাডেমিক প্রশাসনের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব যখন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিকল্প কাঠামো তৈরি করে, তখন শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষার্থী তখন স্বাধীন নাগরিক হওয়ার পরিবর্তে কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রের অনুসারী হয়ে ওঠার প্রলোভনে পড়ে। এর বিপরীতে আমাদের প্রয়োজন এমন এক উচ্চশিক্ষার সংস্কৃতি, যেখানে রাজনৈতিক মত থাকবে, কিন্তু দলীয় দাসত্ব থাকবে না; বিতর্ক থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না; মতাদর্শ থাকবে, কিন্তু মতের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে না; এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থাকবে, কিন্তু একাডেমিক উৎকর্ষ ও নাগরিক মর্যাদার বিনিময়ে নয়। অতএব, শিক্ষার্থীদের রাজনীতিমুক্ত করা নয়, বরং তাদের দলীয় আনুগত্যের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত রেখে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। কারণ গণতন্ত্রের জন্য আমাদের প্রয়োজন শুধু ভোটার নয়, বিবেকবান নাগরিক; শুধু কর্মী নয়, স্বাধীনচিন্তার মানুষ; শুধু অনুসারী নয়, প্রশ্ন করতে সক্ষম নেতৃত্ব। আর সেই নাগরিক ও নেতৃত্ব গড়ে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো আমাদের শিক্ষাঙ্গন।ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষ কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান অর্জন করবে না; বরং প্রকৃতির সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে এবং সর্বোপরি মানবতার সঙ্গে তার একটি গভীর ও সৃজনশীল সম্পর্ক গড়ে উঠবে। তাঁর শিক্ষাভাবনার কেন্দ্রে ছিল মানুষের সামগ্রিক বিকাশ তথা শরীর, মন, বুদ্ধি, নন্দনবোধ, সৃজনশীলতা ও নৈতিক চেতনার সমন্বিত বিকাশ। এই আদর্শকে বাস্তবে পরীক্ষা ও প্রয়োগ করার উদ্দেশ্যেই তিনি শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে তিনি এমন একটি শিক্ষাপরিবেশ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যেখানে প্রকৃতি হবে শিক্ষার সহচর, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হবে মানবিক ও সংলাপভিত্তিক এবং জ্ঞান হবে জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কোনো যান্ত্রিক কারখানায় পরিণত করতে চাননি, যেখানে একই ছাঁচে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে তৈরি করা হবে। তাঁর কাছে প্রত্যেক মানুষ ছিল স্বতন্ত্র সম্ভাবনার অধিকারী। তাই শিক্ষার কাজ হলো সেই সম্ভাবনাকে আবিষ্কার ও বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টি করা; একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে মানুষকে ঢেলে দেওয়া নয়। তিনি শিক্ষার মধ্যে আনন্দ, সৌন্দর্য, কৌতূহল, সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতার অবকাশ রাখতে চেয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষাদর্শের এই মানবিক দিকটি আজও আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক; বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন পরীক্ষার ফল, সনদ, চাকরির প্রতিযোগিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের চাপ শিক্ষার বৃহত্তর মানবিক উদ্দেশ্যকে অনেক সময় আড়াল করে ফেলে।রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষা মানে ছিল মুক্তি। সেই মুক্তি শুধু অজ্ঞতা থেকে মুক্তি নয়, সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি; শুধু অশিক্ষা থেকে মুক্তি নয়, ভয় থেকে মুক্তি; শুধু কুসংস্কার থেকে মুক্তি নয়, অন্ধ আনুগত্য থেকেও মুক্তি। তাঁর শিক্ষাভাবনার গভীরে ছিল মানুষের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন সত্তার বিকাশ। তিনি এমন মানুষ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যে নিজের চোখে পৃথিবীকে দেখতে পারে, নিজের বুদ্ধিতে বিচার করতে পারে এবং নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে পারে। তাই তাঁর শিক্ষাদর্শের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল একটি বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাঠামোয় নয়; বরং মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার প্রতি তাঁর গভীর আস্থায় নিহিত। আজকের বাংলাদেশের শিক্ষা-আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের এই মুক্তির দর্শনকে নতুন করে স্মরণ করা প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমন হতে হবে, যা শিক্ষার্থীকে কেবল পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য প্রস্তুত করবে না; বরং তাকে জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বোঝার এবং প্রয়োজন হলে প্রচলিত বাস্তবতাকে প্রশ্ন করার সক্ষমতা দেবে। তাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে ভিন্নমতকে ভয় না পায়, যুক্তিকে অবজ্ঞা না করে, ক্ষমতার সামনে অন্ধভাবে নত না হয় এবং নিজের বিবেককে কোনো দলীয় বা গোষ্ঠীগত আনুগত্যের কাছে সমর্পণ না করে। একই সঙ্গে তাকে নিজের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করবে, আবার সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা গোষ্ঠীগত বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর মানবিকতার বোধও জাগ্রত করবে।কাজী নজরুল ইসলামও (১৮৯৯ু১৯৭৬) শিক্ষাকে কেবল জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেননি।  তিনি শিক্ষাকে মানুষের মুক্তি, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর সাহিত্য, প্রবন্ধ, বক্তৃতা ও সামগ্রিক জীবনদর্শনের গভীরে ছিল মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তিনি এমন এক শিক্ষার পক্ষে ছিলেন, যা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখাবে, বৈষম্যের শৃঙ্খল ভাঙতে সাহস দেবে এবং নিজস্ব চিন্তা ও বিবেকের আলোয় সত্যকে অনুসন্ধান করার শক্তি জোগাবে। নজরুলের কাছে মানুষই ছিল সর্বোচ্চ মূল্যবোধ। ধর্ম, বর্ণ, জাতি কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভাজন তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই তাঁর শিক্ষাভাবনার কেন্দ্রে ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুক্তচিন্তার বিকাশ। তিনি এমন শিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ নয়, সহমর্মিতা সৃষ্টি করবে; বিভাজন নয়, সংহতি গড়ে তুলবে; অন্ধ আনুগত্য নয়, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করবে। নজরুল বারবার মানুষকে শৃঙ্খলমুক্ত হওয়ার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বিদ্রোহ ছিল কেবল রাজনৈতিক শাসনের বিরুদ্ধে নয়; অজ্ঞতা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, সামাজিক অবিচার এবং চিন্তার দাসত্বের বিরুদ্ধেও। এই অর্থে তাঁর শিক্ষাদর্শ ছিল গভীরভাবে মুক্তিকামী। তিনি এমন মানুষ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যে অন্যায়ের সামনে নীরব থাকবে না, ক্ষমতার ভয়কে সত্যের উপরে স্থান দেবে না এবং মানুষের মর্যাদাকে সব ধরনের সংকীর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মূল্যায়ন করবে।আজকের বাংলাদেশে, যেখানে কখনো কখনো মতভেদকে বিরোধিতা হিসেবে এবং প্রশ্ন করাকে অবাধ্যতা হিসেবে দেখা হয়, সেখানে নজরুলের এই মুক্তচেতা মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষা যদি সত্যিই মানুষের ভেতরে সাহস, সহনশীলতা, ন্যায়বোধ ও মানবিক সংবেদনশীলতা জাগিয়ে তুলতে না পারে, তবে তা কেবল তথ্য ও দক্ষতা অর্জনের একটি সীমিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়; মানুষের প্রকৃত বিকাশের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে না। এই কারণেই আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য কেবল ‘শিক্ষিত’ মানুষ তৈরি করা নয়; বরং আলোকিত, মানবিক, যুক্তিবাদী, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। জাতীয় উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য দক্ষ জনশক্তি অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে যদি নৈতিকতা, মানবিকতা, মুক্তবুদ্ধি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় না ঘটে, তাহলে সেই দক্ষতা কখনোই একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। শিক্ষা তখন কেবল কর্মসংস্থানের উপকরণ হয়ে ওঠে; মানুষ গড়ার শক্তি হয়ে উঠতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের অন্তর্গত সম্ভাবনার বিকাশের কথা; নজরুল আমাদের শিখিয়েছেন সেই মানুষকে অন্যায় ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে দাঁড়াতে হবে। একজন শিক্ষা দিয়েছেন স্বাধীন চিন্তার সৌন্দর্য, অন্যজন শিখিয়েছেন স্বাধীন চিন্তার সাহস। একজন দেখিয়েছেন মানবিক বিকাশের পথ, অন্যজন দেখিয়েছেন মানবিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা যদি এই দুই মহান মনীষীর মানবিক ও মুক্তিকামী দর্শন থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তাহলে শিক্ষা সত্যিকার অর্থেই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক রূপান্তরের শক্তিতে পরিণত হতে পারে।আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা হয়ে উঠুক মানুষের মানবিক উৎকর্ষ, মুক্তবুদ্ধির বিকাশ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সেই জীয়নকাঠি, যে শিক্ষা মানুষকে কেবল জীবিকা অর্জনের যোগ্য করে তুলবে না; তাকে নিজের বিবেকের কাছে স্বাধীন, সত্যের কাছে সৎ, সমাজের কাছে দায়িত্বশীল এবং মানবতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলবে। যে শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাবে, আবার শুনতেও শেখাবে; নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবে, আবার অন্যের অধিকারকে সম্মান করতেও উদ্বুদ্ধ করবে; নিজের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি গর্ববোধ জাগাবে, আবার বিশ্বমানবতার বৃহত্তর পরিসরের সঙ্গেও তাকে যুক্ত করবে। এমন শিক্ষাই পারে মুক্তচিন্তার শিক্ষাঙ্গন নির্মাণ করতে; এমন শিক্ষাই পারে একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করতে। আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য তাই কেবল ‘শিক্ষিত’ মানুষ তৈরি করা নয়; বরং আলোকিত, মানবিক, যুক্তিবাদী, সৃজনশীল, প্রতিবাদী ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য দক্ষ জনশক্তি অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে যদি নৈতিকতা, মানবিকতা, মুক্তবুদ্ধি, সৎসাহস ও নাগরিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় না ঘটে, তাহলে সেই দক্ষতা কখনোই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তাই আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা হয়ে উঠুক মানুষের মানবিক উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে মুক্তির সেই জীয়নকাঠি যে শিক্ষা মানুষকে কেবল জীবিকা অর্জনের যোগ্য করে তুলবে না, তাকে নিজের বিবেকের কাছে স্বাধীন, সমাজের কাছে দায়িত্বশীল এবং সত্যের কাছে সৎ মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

রম্যগদ্য: “বিশ দে, বিশ খাই, বিশের নিচে খাওয়া নাই...”

ভাই না ভালা, কী শুরু করলেন সাত সক্কাল বেলা! এইভাবে যদি সবাই পয়জন খায়া মইরা যায়, তায়লে এই দেশ স্বাধীন কোইরে লাভ কী হোইলে? এই দেশে থাকপে কারা, সাঁপ ব্যাঙ, সেলিনা হোসেন?তুই বাঙাল এর মধ্যে পুরষ্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় সেলিনা হোসেনের নাম আবার পেলি কোথায়?না কোই পুরষ্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় সেলিনা হোসেন লিখছিলেন, “পোকা-মাকড়ের ঘর বসতি” তাই সংক্ষেপে কোইলাম এইভাবে যদি সবাই পয়জন খায়া মইরা যায়, তায়লে এই দেশে থাকপে কারা, সাঁপ ব্যাঙ, সেলিনা হোসেন, মানে পুকা মাকড়?ওরে উড়ঝুড়ে বাঙাল আমিতো তোকে বলিনি যে দেশে সাঁপ ব্যাঙ, পোকা মাকড়রা বসবাস করছে...ঠিক আছে আপনে কন নাই যে দেশে সাঁপ ব্যাঙ, পোকা মাকড় বসবাস করছে কিন্তু আপনে কোইছেন বর্তমান দেশের যা অবস্থা তাতে “বিশ দে, বিশ খাই, বিশের নিচে খাওয়া নাই...সব যদি বিষ খায়া মইরা যায়, তখন দেশে থাকপে কারা সাঁপ ব্যাঙ আর পুরষ্কার প্রাপ্ত সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় সেলিনা হোসেন মানে পোকা মাকড়...নারে ভাই তুই আমার কথার মানেই বুঝবার চেষ্টা করিস নাই, আমি বলেছি “বিশ দে, বিশ খাই, বিশের নিচে খাওয়া নাই, আর তুই ভাবছিস আমি বলেছি, বিষ দে, বিষ খাই, বিষের নিচে খাওন নাই! আমিতো কখোনাই বলি নাই যে, তুই বিষ মানে পয়জন খা। আমার বিশ মানে বিশ বিশ, মানে, আঠারো, উনিশ-বিশ, সেই বিশ, মানে সংখ্যার বিশ, অনেকে বলে কুড়ি...হ হ, হুনছি হুনছি, বাপ দাদাগো আমলে পাবলিকে কোইতো, কুড়িতে বুড়ি, মাইনে যেই মাইয়া কুড়ি বছরেও কুমারী হ্যেরে বিয়া করলে ডাব পাইবানা, পাইবা ঝুনা নারিকেল!তোর যত উড়ঝুড়ে কথা। আমি বলছি, আজকাল বাংলাদেশে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে, কেউ আর অল্পস্বল্প ঘুষ খায় না, ঘুষ খেলেও মিনিমাম, বিশ হাজারের নিচে  ঘুষ খায় না! তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কেউ ঘুষ খায় না, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘুষ চলে না। এটা সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরির বিধি মালার মধ্যে ঘুষ খাওয়া অ্যালও না। তাই বেচারি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এর মাঝে মানে ঘুষ কেলেংকারীতে জড়ায় না।ওম্মারে মা, এটা আপনে কী বলচেন যে, সরকারি অফিসাররা নজীরবিহীন, মানে বেনজীর ঘুষ খেলো হাজার কোটি টাকা, তার পাসপোর্ট পনেরোটা, স্থাবর সম্পত্তির হিসাব নিতে ষোল জন দুদকের বাঘা বাঘা মোমেনুল মোমেন লাগছে হিসাব নিতে, আর আপনে মিয়া বলচেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরির বিধিমালার মধ্যে ঘুষ খাওয়া অ্যালও না!আরে সেতো তুই ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের কতা বলছিস, সেদিন শেষ। এখন জেন-জি’র যুগ। বর্তমানে যেসব প্রতিনিধিরা জাতিস্বংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে সব নতুন প্রজন্মের সন্তান,“জেন-জি” এঁদের মাঝে তুই কিছুতেই বলতে পারবি না যে “বিশ দে, বিশ খাই, বিশের নিচে খাওয়া নাই...”তাহলে আপনি বলচেন যে, এই বিশ বিষ নয়/ আসলে তো সংখ্যা সে/ বিশের নিচে ঘুষ খেলে/ বাংলার পাবলিকের/ সন্মান যায় রে...”বাহ্ বাঙাল দেখি আবার স্বভাব কবি ডি.এল.রায়ের মতো পাঁচ লাইনের লিমেরিক লিখে ফেললি!গুরু লিমেরিক কী?আরে লিমেরিক হলো আয়ারল্যান্ডের একটা জায়গার নাম। এই জায়গার অধিবাসীরা পাঁচ লাইনের হাস্যরসাত্মক ছড়া বলতো। যেটা পরে ইংরেজি সাহিত্যে প্রবেশ করে, আর “ননসেন্স রাইম” নামে খ্যাতি পায়।  হেঁ হেঁ কি যে কন, দোয়েল শালিকের দেশে ব্যেবাগ বাঙালিই ননসেন্স কবি, আপনে হুনচেন না, স্বর্গীয় হোমো স্যারও পাবলিকরে দিয়া কবিতা ল্যেইখ্যা নিজের নামে চালাইতো! কবিতা আমাগো রক্তে আছে। যার জন্য আমাগো সিনেমার নায়িকা ববিতা, মৌমিতা, কবিতা, সবাইরে নিয়া কতো কবি কবিতা লিখছে, তার শেষ নাই।তুই তোর নায়িকা ববিতা, মৌমিতা, কবিতা, নিয়ে থাক, কিন্তু আমার কথা হচ্ছে “বিশ দে, বিশ খাই, বিশের নিচে খাওয়া নাই” তোর এই যে কর্মচারীরা সকলে মিলে হাজার কোটি টাকার ঘুষ খাচ্ছে এটা বন্ধ কোরবি কীভাবে?হায়রে কপাল মন্দ/ চোখ থাকিতে অন্ধ/ নিশিদিন জ্বইল্লা পুইড়া/ ঘুষ টুষ খাওন/ শেষ তো হোইবো রে...”তোর মুখে ফুল চন্দন। এবার বাংলাদেশে ঘুষ খাওয়া বন্ধ হবে! বলিস কী?ক্যান আপনে শুনেন নাই। সব ঘুষখোর চান্দাবাজ গো, লিস্টি বানাইবার জন্য পাঁচ সদস্যের কমিটি হোইছে, অলরেডি বিশ লক্ষ নাম লিষ্ট করা হোইছে...বিশলক্ষ, ঘুষখোর চাঁদাবাজ, এতো দেখছি, ঠগ বাছতে গাঁ’উজাড়! এ্যতো লোক রাখার জেল পাবি কোথায়? পৃথিবীর যে সব দেশে জেল বন্ধ হোচ্ছে সে গুলো কি ভাড়া নিবি?আরে হালায়, আপনে আছেন আপনের তালে, এইটা মিয়া আপনেরে বুঝতে হোইবো, লিস্ট করা মানে অ্যারেস্ট করা না...ও রে বাব্ববা, যাক ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। আমি তো ভেবেছিলাম লিস্টে যাদের নাম থাকবে তাদের ধরে ধরে জেলে পুরবে!আরে না, আগে লিস্ট হোউক পরে ডিসিশন লোইবো কী করবো না করবো...থাক তাহলে আর চিন্তা নেই, লিস্টে নাম থাকলেও অ্যারেস্টতো আর হবো না! জয়য়য়...থাক বাবা ব্যান্ড সঙ্গীত না গাইলেও চলবে...সেইটাই ভালা বর্তমানে ব্যান্ড সঙ্গীত, ব্যান্ড... [লেখক: চলচ্চিত্রকার]   

প্রবীণদের দিনরাত্রি

জন্ম ও মৃত্যুর মতো মানুষের জীবনচক্রেও রয়েছে কয়েকটি স্বাভাবিক ধাপ-শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং বার্ধক্য। যারা দীর্ঘজীবন লাভ করে বার্ধক্যে উপনীত হন, তাদের অধিকাংশেরই একটি স্বপ্ন থাকে-জীবনের শেষ দিনগুলো স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনিদের সান্নিধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে কাটিয়ে একদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া। টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনে আমরা এমন সুখী পরিবারের ছবি প্রায়ই দেখি। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন।বাংলাদেশে সাধারণত ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ।একদিকে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ইতিবাচক ফল, অন্যদিকে এত বিশাল সংখ্যক প্রবীণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যাঁরা একসময় দুই হাতে সংসার সামলেছেন, প্রকৃতির নিয়মে আজ তাঁদের অনেকেই অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।প্রবীণদের প্রধান সমস্যা: প্রবীণদের সমস্যা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, একাকীত্ব, আয়ের অভাব, পরনির্ভরতা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, সামাজিক অবহেলা, প্রযুক্তিগত পিছিয়ে থাকা, শারীরিক পরিবর্তন।শিশুকালে যেমন সন্তানদের সার্বক্ষণিক যত্ন নিতে হয়, বার্ধক্যে এসে অনেক প্রবীণ আবার একই রকম সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করেন। হাঁটাচলা, গোসল, পোশাক পরিবর্তন, এমনকি দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজেও অন্যের সহযোগিতা লাগে। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই জীবিত থাকলে একে অপরের যত্ন নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু একজনের মৃত্যু হলে অন্যজনের জীবন অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে। তখন একাকীত্ব, অসহায়ত্ব এবং নিরাপত্তাহীনতা প্রবীণ জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।যৌথ পরিবার ভাঙনের প্রভাব: একসময় যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সমাজের ভিত্তি। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন প্রবীণ সদস্যরা। তাঁদের মতামতই ছিল শেষ কথা। নগরায়ন, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন, বিদেশমুখী অভিবাসন এবং একক পরিবারব্যবস্থার প্রসারের ফলে আজ সেই সামাজিক কাঠামো অনেকটাই বদলে গেছে। প্রবীণরা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। ফলে প্রবীণ সমস্যা এখন আর কেবল পারিবারিক নয়; এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং জাতীয় ইস্যু।একাকীত্ব-সবচেয়ে বড় সংকট: প্রবীণদের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত একাকীত্ব। আমরা এমন ঘটনাও দেখেছি, যেখানে একজন বৃদ্ধা নিজ বাসায় কয়েক দিন আগে মৃত্যুবরণ করে পড়ে ছিলেন, অথচ কেউ জানত না। দেশে এমন অসংখ্য পরিবার আছে যেখানে অর্থের অভাব নেই, কিন্তু সন্তানরা সবাই বিদেশে বা অন্য শহরে থাকেন। বাবা কিংবা মা একা বাসায় দিন কাটান।অসুস্থ স্বামী বা স্ত্রীকে রেখে সামান্য সময়ের জন্য বাইরে গেলেও উদ্বেগ পিছু ছাড়ে না। বাইরে যাওয়ার আগে বলা হয়-‘ফোনটা কাছে রেখো, সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে।’ কিন্তু ফোন করলেই যে সবসময় সাহায্য পাওয়া যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।জীবনসঙ্গীহীন প্রবীণদের দুর্ভোগ: যাঁদের স্বামী বা স্ত্রী নেই, তাঁদের কষ্ট আরও বেশি। আমাদের প্রজন্মের অনেক পুরুষ রান্না করে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেননি। আবার অনেক প্রবীণ নারী অসুস্থ অবস্থায় একা বাইরে যেতে সাহস পান না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্বকে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর ফলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্নতা, স্মৃতিভ্রংশ এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।স্বাস্থ্যসেবা: বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ক্যান্সার, বাত, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, হৃদরোগসহ নানা জটিলতা বৃদ্ধি পায়। শহরে বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকলেও গ্রামীণ অঞ্চলে প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা এখনও খুব সীমিত। চিকিৎসার ব্যয়ও অধিকাংশ প্রবীণের নাগালের বাইরে।আর্থিক অনিশ্চয়তা: অবসরের পর নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশন পান। কিছু প্রবীণ সরকারি ভাতা পান। কিন্তু বর্তমানে দ্রব্যমূল্য ও চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় এই সহায়তা অত্যন্ত অপ্রতুল। বর্তমানে প্রায় ৩৪.২৫ লাখ প্রবীণ মাসিক ৬৫০ টাকা বয়স্ক ভাতা পান, যা মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ।প্রবীণ নির্যাতন: মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। একসময় যারা ছিলেন পরিবারে সম্মানিত-শ্রদ্ধেয়, আজ তারা শিকার হচ্ছেন নির্যাতনের। কখনও কর্কশ ভাষা, কখনও অবহেলা, কখনও খাবার থেকে বঞ্চিত করা, আবার কখনও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। সম্পত্তি লিখে না দেওয়ায় বাবা-মাকে নির্যাতনের ঘটনাও আমাদের সমাজে অজানা নয়।প্রযুক্তিগত বৈষম্য: বর্তমান পৃথিবী দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা, ট্রেন বা বাসের টিকিট বুকিং-সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু অধিকাংশ প্রবীণ প্রযুক্তিতে দক্ষ নন। ফলে প্রতিটি কাজেই তাঁদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এছাড়া প্রতিনিয়ত কোন না কোন প্রবীণ শিকার হচ্ছে স্ক্যাম এর।প্রবীণবান্ধব অবকাঠামোর অভাব: আমাদের শহর ও গ্রাম এখনও প্রবীণবান্ধব নয়। পার্ক কম, নিরাপদ ফুটপাত নেই, রাস্তা পারাপারে অসুবিধা, গণপরিবহনে সংরক্ষিত আসন থাকলেও অনেক সময় তরুণরা তা ব্যবহার করেন। এসব ছোট ছোট বিষয়ও প্রবীণদের জীবনকে প্রতিদিন কঠিন করে তোলে।করণীয়: প্রবীণদের সব সমস্যা সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব না হলেও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে অনেকটাই লাঘব করা যায়। একাকীত্ব দূরীকরণ, সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, প্রতিটি এলাকায় প্রবীণ ক্লাব গঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রবীণ সহায়তা নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেতে পারে।স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে স্বল্পমূল্যে জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা, জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জেরিয়াট্রিক বিভাগ এবং হাসপাতালগুলোতে প্রবীণ কর্নার চালু করা, কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় চিকিৎসা সহায়তা, এনজিও’র মাধ্যমে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত হিসাব করে এলাকার প্রবীণদের খবর নেওয়া, প্রবীণ স্বাস্থ্যবীমা চালু করা যেতে পারে।এছাড়া আর্থিক নিরাপত্তায় বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি,উপযোগী খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত শরীরচর্চা,ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চর্চা, কাউন্সেলিং সুবিধা প্রদান ও সামাজিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা জরুরি।প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আইনি সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, প্রবীণবান্ধব নগর পরিকল্পনা, নিরাপদ ফুটপাত, সহজ রাস্তা পারাপার, র‍্যাম্প ও হুইলচেয়ার সুবিধা, গণপরিবহনে অগ্রাধিকারভিত্তিক আসন, রেলস্টেশনে সহায়তা কেন্দ্র ও পর্যাপ্ত উন্মুক্ত পার্ক প্রতিষ্ঠা দরকার।বৃদ্ধাশ্রম-বাস্তবতার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি: একসময় ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শব্দটি আমাদের কাছে নির্মম মনে হতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি মানবিক বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নিজ বাসায় সম্পূর্ণ একা থাকার চেয়ে সমবয়সী মানুষের সঙ্গে নিরাপদ পরিবেশে থাকা, নিয়মিত চিকিৎসা পাওয়া এবং সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত হওয়া অনেক প্রবীণের জন্য অধিকতর স্বস্তিদায়ক হতে পারে। যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তাঁদের জন্য উন্নত সেবাকেন্দ্র রয়েছে। আবার কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠান বিনামূল্যে আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা প্রদান করে।অবশ্যই সবচেয়ে আদর্শ ব্যবস্থা হলো পরিবারের সঙ্গে থাকা। কিন্তু যখন সন্তানেরা কর্মব্যস্ত, বিদেশে অবস্থান করেন, অথবা প্রবীণের সার্বক্ষণিক পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, তখন বিকল্প ব্যবস্থাকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই।প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন; তাঁরা জাতির অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। তাঁদের মেধা, শ্রম, ত্যাগ ও প্রজ্ঞার ওপর দাঁড়িয়েই আজকের সমাজ গড়ে উঠেছে। তাই তাঁদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও সেবা প্রদান আমাদের নৈতিক এবং সামাজিক দায়িত্ব। আজকের নবীনই আগামী দিনের প্রবীণ। আমরা যদি আজ প্রবীণদের যথাযথ মর্যাদা না দিই, আগামী প্রজন্মের কাছ থেকেও সেই মর্যাদা প্রত্যাশা করা কঠিন হবে।একটি সভ্য সমাজের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে সমাজ তার প্রবীণ নাগরিকদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেয়- তার ওপর। পরিবার, সমাজ, স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে একটি সত্যিকার প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল, পরিবেশ সংগঠক]

অধিকার চর্চায় চাই পরমতসহিষ্ণুতা

মুক্তচিন্তা বা বাকস্বাধীনতা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। প্রশ্ন হলো, বাকস্বাধীনতার সীমানা কতটুকু? আর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে এর পরিণতিই বা কী?ইতিহাসের পাতা থেকে কিছু দৃষ্টান্তধর্ম অবমাননা বা ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধিতা করার কারণে অতীতে এবং বর্তমানে বহু বিতর্ক ও শাস্তির নজির রয়েছে।কোপারনিকাসের ট্র‍্যাজেডি: পোলিশ বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপারনিকাস যখন গাণিতিক সূত্রে প্রমাণ করলেন যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, তখন তৎকালীন খ্রিষ্টান গির্জার পাদ্রিরা বাইবেলের ব্যাখ্যার পরিপন্থী হওয়ায় তার বইটি নিষিদ্ধ করেন। ধর্মীয় যাজকদের ক্ষোভের মুখে পড়ে তাকে নির্মমভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।সালমান রুশদী প্রসঙ্গ: গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষের দিকে (মূলত ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত) ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বইটির মাধ্যমে তীব্র ধর্ম অবমাননার দায়ে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ইমাম খোমেনী লেখক সালমান রুশদীর বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছিলেন, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।সাম্প্রতিক পাকিস্তান ও বাংলাদেশ: সম্প্রতি ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম ও মহানবী (সা.) সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করার অপরাধে ‘তৈমুর’ নামের এক ব্যক্তিকে পাকিস্তানের সন্ত্রাস দমন আদালত মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। বাংলাদেশেও ধর্মীয় উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের দায়ে কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়ার নজির রয়েছে।আন্তর্জাতিক আইনে বাকস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাঅনেকেই মনে করেন, বাকস্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তা-ই বলা বা লেখার অবাধ লাইসেন্স। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদগুলো এর তীব্র বিরোধিতা করে।মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (১৯৪৮): এর ১৯ নম্বর ধারায় বাকস্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হলেও ১২ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিবার, বসতবাড়ি কিংবা সম্মান ও সুনামের ওপর খেয়ালখুশিমতো আক্রমণ করা চলবে না।মানবাধিকার কনভেনশন (১৯৬১): এর ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বাক ও চিন্তার স্বাধীনতাকে সমর্থন করার পাশাপাশি বলা হয়েছে, “বাকস্বাধীনতা ব্যক্তির মর্যাদা, জনগণের মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলার প্রতি আক্রমণাত্মক হতে পারবে না।”সুতরাং, স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় যে কাউকে গালি দেওয়া, বিদ্বেষ ছড়ানো বা মিথ্যাচার করা কখনোই বাকস্বাধীনতা হতে পারে না। বাকস্বাধীনতা মানে সত্য প্রকাশের অধিকার, অন্যকে আঘাত করার অস্ত্র নয়।বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে শাস্তিআমাদের দেশের প্রচলিত আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (ধারা ২৯৫ক): স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে লিখিত, মৌখিক বা দৃশ্যমান অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে কোনো নাগরিকের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া বা অবমাননার চেষ্টা করা হলে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ড।ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (ধারা ৯৯): কোনো সংবাদপত্রে রাষ্ট্রবিরোধী, নাগরিকদের মধ্যে শত্রুতা-ঘৃণা সৃষ্টিকারী বা ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাতকারী কিছু প্রকাশ করা হলে সরকার উক্ত সংবাদপত্রের সংশ্লিষ্ট কপিগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারবে।সাইবার/ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: ওয়েবসাইট বা যেকোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো মিথ্যা, অশ্লীল, মানহানিকর বা উসকানিমূলক তথ্য প্রকাশ ও সম্প্রচার করা হলে অপরাধের তীব্রতা অনুযায়ী কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড।আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে মামলার বিধানকোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা বাস্তবে আপনার ধর্মীয় বিশ্বাসকে অবমাননা করে, তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। এর জন্য দেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় নিতে হবে।কী করবেন এবং কোথায় মামলা করবেন?১. থানায় এজাহার: অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য, স্ক্রিনশট বা প্রমাণাদিসহ আপনার নিকটস্থ থানায় গিয়ে এজাহার বা মামলা দায়ের করতে পারেন।২. আদালতে সিআর মামলা: থানা যদি কোনো কারণে মামলা না নেয়, তবে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি নালিশি মামলা দায়ের করা যায়।৩. সাইবার ক্রাইম ইউনিট: ডিজিটাল মাধ্যমে ধর্ম অবমাননা হলে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে লিখিত অভিযোগ বা অনলাইনের মাধ্যমে প্রমাণ জমা দিয়ে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।উপসংহারপরমতসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ একটি সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি। নিজের অধিকার চর্চা করতে গিয়ে যেন অন্যের বিশ্বাসে আঘাত না লাগে, এই সচেতনতা আমাদের সবার থাকা উচিত।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

ইতিহাসের স্মৃতি মুছে ফেলার রাজনীতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় এবং শতবর্ষ পার করে আরও পাঁচটি বছর অতিক্রম করেছে। ঐতিহাসিক মুনতাসির মামুনের মতে, অনেকটা বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ও শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনীতি সহ সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়া পূর্ববঙ্গকে অগ্রসর করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূচনালগ্নেই এটি "প্রাচ্যের অক্সফোর্ড" নামে খ্যাতি লাভ করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও এ অঞ্চলের মানুষের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশের যে আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল, পাকিস্তানি শাসকরা সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা শুরুতেই উর্দু ভাষা ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে এ অঞ্চলকে অন্যায়ভাবে নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়।পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ধরনের সেই শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব বাংলার মানুষের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশের লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে গেছে। পাকিস্তান আমলে পূর্ববঙ্গে একটি অগ্রসর মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা।ভাষা আন্দোলনের আমতলা, আর স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের বটতলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্দোলনের মানচিত্রে যেমন ভিন্নভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, তেমনি এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আমাদের দুর্ভাগ্য, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এই প্রথম ছাত্রশিবির বা কোনো ধর্মীয় ছাত্রসংগঠনের সমর্থিত প্যানেল কিছুটা লিবারেল ভাবমূর্তির ছদ্মবেশে জয় পেয়েছে। জয় পাওয়ার পরই তারা ঘোষণা দেয়, তাদের ভাষায় ‘কালচারাল ফ্যাসিবাদ’কে তারা মুছে ফেলবে। সে অনুযায়ী এক সময়ের শিবির সদস্য প্রাক্তন ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানের সহযোগিতায় তারা অনেক দূর অগ্রসর হয়। টিএসসিতে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের ‘বীরত্বের প্রদর্শনী’ আয়োজন করে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবি রাখার কারণে ঢাবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ওই সময়ে সেই ছবিগুলো সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়।১১ সেপ্টেম্বর ছিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী যথাযথভাবে পালিত হয়েছে পাকিস্তানে। বাংলাদেশের পাকিস্তানপন্থীরাও তাদের পিতৃপুরুষকে স্মরণ করেছেন অভিন্ন আবেগে। এ বছর জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকীতে ডাকসু সংগ্রহশালায় তার তিনটি ছবি টানায় এবং ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হলেও তাদের কিছু অপছন্দের সকল ছবি তারা নামিয়ে ফেলে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই এক উত্তেজনার অবতারণা হয়। বর্তমানে সংগ্রহশালায় ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের কোনো ছবিতেই শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক ছবি নেই। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় ভাষা আন্দোলনের জন্ম, ঠিক সেখানেই ভাষা আন্দোলনের প্রতিপক্ষকে সম্মানের আসন দেওয়া খুবই পরিকল্পিত ও কথিত ‘কালচারাল ফ্যাসিবাদ’ তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলার রাজনৈতিক বার্তা। তাই তো তাদের সব আয়োজন শেখ মুজিবকে ও মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়ার জন্য। একজন সাংবাদিক ডাকসুর সংগ্রহশালার সমন্বয়কারীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, শেখ মুজিবের ৭ মার্চ বা স্বাধীনতা আন্দোলনের কোনো ছবি কেন রাখা হয়নি? ঔদ্ধত্যের সকল সীমা লঙ্ঘন করে তার উত্তর ছিল, ‘ইচ্ছে হয়নি, তাই।’তরুণ শেখ মুজিব ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। আর ১৯৪৮ সালের শুরুতেই পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা" ঘোষণা করলে ছাত্রসমাজ ফুঁসে ওঠে। গড়ে ওঠে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। শেখ মুজিবুর রহমান এই পরিষদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মনোনীত হন।ওই বছরের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। পিকেটিং থেকে গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিব। আবার ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে বক্তব্য দেন, তখন আব্দুল মতিন, অলি আহাদ, শেখ মুজিবসহ ছাত্রনেতারা তাৎক্ষণিকভাবে "নো, নো" বলে প্রতিবাদ জানান। এরপর ২১ ফেব্রুয়ারির ইতিহাস তো সবারই জানা।স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। এতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্র-ছাত্রীসহ অসংখ্য শহীদ হয়েছেন। আর এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলার পতাকা। এ বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন রেসকোর্স থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সংগ্রামের এক অমর কবিতা পাঠ করেছিলেন: ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ এর আগে স্বাধীনতার এমন কবিতা কে কবে শুনেছে! আর এ ঘোষণা দেওয়ার মতো জমিন তৈরি করতে শেখ মুজিবকে সংগ্রাম করতে হয়েছে পাকিস্তানি শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে ২৪টি বছর জুড়ে। সেই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে বামপন্থী আন্দোলনের সমন্বয় ও ঐক্য গড়ে ওঠায় আন্দোলন পেয়েছিল নতুন মাত্রা।দীর্ঘ ২৪ বছরের এই সংগ্রামে ১৪ বছরই শেখ মুজিবকে কারান্তরালে কাটাতে হয়েছে। দু’বার পাকিস্তানি শাসকরা তার জন্য তো ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুতের আয়োজন করেছিল। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি পাঁচ দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর আটক হয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি। এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে ৮০ দিন কারাভোগ করে মুক্তি পান ২৮ জুন। ওই দফায় তিনি ২৭ দিন কারাভোগ করেন। একই বছরের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন এবং পরের বছর ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টানা ৭৮৭ দিন কারাবন্দি ছিলেন।১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও তাকে কারাগারে যেতে হয়। সে সময়ে ২০৬ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির পর ১১ অক্টোবরে শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হন। এ সময়ে টানা ১ হাজার ১৫৩ দিন তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। এরপর ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি আবারও গ্রেপ্তার হয়ে মুক্তি পান ওই বছরের ১৮ জুন। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন। এরপর ’৬৪ ও ’৬৫ সালে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। ছয় দফা দেওয়ার পর যেখানে সমাবেশ করতে গেছেন, সেখানেই তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। ওই সময়ে তিনি ৩২টি জনসভা করে বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ৬৬ সালের ৮ মে আবারও গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পান। এ সময় তিনি ১ হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই পাকিস্তানের সামরিক সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে। এ দফায় তিনি কারাগারে ছিলেন ২৮৮ দিন।কয়েকদিন ‘হারুন আন্কেলের ভাতের হোটেলে’ থাকা ইউনূসের কিশোর-তরুণ বাহিনী এসব ইতিহাস জেনে বা না জেনেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তায় থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। দেশজুড়ে ভেঙে ফেলেছে মুজিবের স্মৃতি ভাস্কর্যসহ মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এবং স্বাধীন বাংলা সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সকল স্মৃতিচিহ্ন। ইউনূস বাহিনী আর জামাতীদের সব আয়োজন যেন শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়ার জন্য। সেই ধারাতেই জামাত নিয়ন্ত্রিত ডাকসু প্রতিশোধ হিসেবে স্বাধীনতার নেতার ছবি নামিয়ে তাদের পেয়ারা পাকিস্তানের জিন্নাহর ছবি টাঙিয়ে দিয়েছে। ইতিহাসের পাঠ ও প্রদর্শনীতে সংগতিপূর্ণভাবে জিন্নাহ থাকতেই পারেন। কিন্তু মুজিবের ছবি নামিয়ে জিন্নাহর ছবি উত্তোলন অনেকটা বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু তারা যা করেছে, তা তো রীতিমতো দেশদ্রোহী অপরাধ। সরকার কী করছে? সরকারের মনে রাখা উচিত, এখনই এদের নিয়ন্ত্রণ না করলে, আইনের আওতায় না আনলে তাদের উদ্ধত ফনার ছোবল কিন্তু খুব শীঘ্রই খেতে হবে।বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা শিক্ষক মূল্যায়নপদ্ধতির নব আবিষ্কার করেছেন। ডাকসু এখতিয়ারবহির্ভূত ওয়েবসাইট বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছে তাদের নিজেদের তৈরি প্রশ্নমালায়। শিক্ষকদের মূল্যায়ন শিক্ষার্থীরা করবেন—এটা স্বাভাবিক বিষয়। তবে শিক্ষার্থীরা কীভাবে শিক্ষকদের শিক্ষাদানকে মূল্যায়ন করবেন, তার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই প্রণয়ন করতে হবে। সেই মূল্যায়ন অবশ্যই হতে হবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দুই পক্ষেরই গোপনীয়তা বজায় রেখে। বিভাগীয় তত্ত্বাবধানে গোপনীয়তা বজায় রেখে সেগুলো পর্যালোচনা করে শিক্ষককে তার সারসংক্ষেপ জানানোর মাধ্যমে এ ব্যবস্থা কার্যকর করাই নিয়ম। শিক্ষক ফলাফল দেখে তার পাঠদানের প্রক্রিয়াটি প্রয়োজনমতো পুনর্বিন্যাস করবেন। এখানে ছাত্র সংসদের পুলিশি ভূমিকা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে।জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ চিহ্নিত করে শিক্ষকদের হেনস্তা করা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়জন ডিনকে পদত্যাগে বাধ্য করা ইত্যাদি এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ করেছেন। সারা দেশে শিক্ষক নির্যাতন, শিক্ষকদের অপদস্থ করা, জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো ইত্যাদির মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের চেহারায় কিছুসংখ্যক তরুণ আবির্ভূত হয়। তাদের উন্মাদনা এখনও অব্যাহত আছে। সম্প্রতি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর কার্যকলাপে জড়িত থাকার এক উদ্ভট অভিযোগে ৪৩৯ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করায় নৈরাজ্যবাদী তরুণরা শিক্ষক হেনস্তাকারী কার্যকলাপে আরও উৎসাহিত হয়েছে। সরকার, বিরোধীদল সবাই তো শেখ হাসিনাকে ফেরত আনতে মরিয়া! শিক্ষকরাও যদি সে প্রচেষ্টা নিয়ে থাকেন, তো তারা তো সরকারের পক্ষেই কাজ করেছেন। নাকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চান না শেখ হাসিনা ফিরে আসুক, বিচারের মুখোমুখি হোক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সরকারদলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে, অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারলে ক্যাম্পাসে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীরা পরাভূত হবে।শতবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস ও তার নানা পর্ব। ভাষা সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার সংগ্রাম, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান থেকে নানা সীমাবদ্ধতার এবং ভুল হাতে পড়া চব্বিশের জুলাই জাগরণ—সব ঐতিহ্য ইতিহাসের সাক্ষী ও সূতিকাগার এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়কে কূপমণ্ডূকতার শিকলে বেঁধে ফেলার যে প্রচেষ্টা চলছে, আমাদের মাতৃভূমিকে ধর্মান্ধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে অপচেষ্টা চলছে, তা সফল হবে না। কারণ জুলাইয়ে যে তরুণরা রাস্তায় নেমে এসেছিল, তাদের কণ্ঠে ছিল, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, ধনধান্য পুষ্পে ভরা, মুক্তির মন্দির সোপান তলে ..... ইত্যাদি দেশপ্রেমের গান। গুপ্ত ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকেও সেই গানে গলা মেলাতে হয়েছিল। জামাত-শিবির গোষ্ঠীকে এখনও উদার গণতন্ত্রের কথা বলতে হচ্ছে, একটা লিবারেল ছদ্মবেশ ধারণ করার জন্য কসরত করতে হচ্ছে। আসিফ নজরুল, আলী রিয়াজ প্রমুখদের সুর বদল করতে হচ্ছে। জুলাই পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের একটা অংশ বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মেলানোতে আমরা প্রতারিতবোধ করলেও নেতৃত্বের অনেকে সাহসের সঙ্গে জুলাই আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এ নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, সোচ্চার হচ্ছেন।বাংলাদেশের লড়াকু মানুষ অনেকবার প্রতারিত হয়েছে। আমরা বারবার প্রতারিত হতে পারি, আমরা হয়তো একদিন থাকবও না। কিন্তু পরের প্রজন্ম লড়বে এবং বিশ্ববাসী দেখবে ‘কারও দানে পাওয়া নয়—দাম দিয়ে কেনা বাংলাদেশ’ অন্ধকারের শক্তিকে পরাভূত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকসম ‘অপরাজেয় বাংলা’ অনির্বাণ শিখা হয়ে কলাভবনের সামনে দাঁড়িয়ে নিরন্তর সে ঘোষণা দিয়ে চলেছে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

ভিডিও আরও দেখুন

বিসিবির নতুন উদ্যোগ, ডি থ্রি ট্রফি

দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটকে নতুন রূপ দিতে এবং আরও আকর্ষণীয় ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। তিনটি ভিন্ন আসরকে এক ছাতার নিচে এনে শুরু হতে যাচ্ছে বোর্ডের নতুন টুর্নামেন্ট ‘ডি থ্রি ট্রফি’। ডোমেস্টিক তিনটি প্রতিযোগিতার সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে এই নামকরণ। এতে থাকছে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) চার দিনের ম্যাচ, ৫০ ওভারের ওয়ানডে টুর্নামেন্ট এবং জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) টি-টোয়েন্টি আসর। আজ রোববার সন্ধ্যায় জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে টুর্নামেন্টের নাম, লোগো ও অংশগ্রহণকারী ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করবে বিসিবি।রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই অনুষ্ঠানে টুর্নামেন্টের বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরা হবে। বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, টুর্নামেন্টে মোট ৬টি ফ্র্যাঞ্চাইজি অংশ নেবে। বোর্ড সভাপতি তামিম ইকবালের নিজস্ব উদ্যোগে দেশের স্বনামধন্য করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এই আয়োজনে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে এসেছে। বিপিএলে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানা নিয়ে অতীতে যে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা যেন এখানে না ঘটে, সে কারণেই বড় ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে দলের মালিকানা দেওয়া হচ্ছে।ফরচুন গ্রুপ, ব্লু স্টার লিমিটেড, সিটিজেন ব্যাংক, ওয়ালটন, একমি ও সেভেন রিংস সিমেন্টের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো টুর্নামেন্টে দল নিচ্ছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি নাবিল গ্রুপও এতে আগ্রহ দেখিয়েছে।চলতি জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল) শেষ হওয়ার পরই মাঠে গড়াবে নতুন এই টুর্নামেন্ট। আগামী ১২ ডিসেম্বর বরিশালে টি-টোয়েন্টি আসর দিয়ে পর্দা উঠবে ডি থ্রি ট্রফির। এরপর অনুষ্ঠিত হবে বিসিএলের ওয়ানডে টুর্নামেন্ট এবং সবশেষে চার দিনের বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেট। মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ফাইনাল দিয়ে শেষ হবে এই আসর।ক্রিকেটারদের আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টি এবার বিসিবি নিজেই তদারকি করবে। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর কাছ থেকে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক আগেই সংগ্রহ করে রাখা হবে এবং গ্রেডিং পদ্ধতি অনুযায়ী প্লেয়ারদের কাছে ধারাবাহিকভাবে তা বুঝিয়ে দেবে বোর্ড। টুর্নামেন্টের সার্বিক ব্যয়ের বিষয়টিও একটি নিপুণ ছকের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে বিসিবি। মাঠে এই পরিচ্ছন্ন পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়িত হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

বিসিবির নতুন উদ্যোগ, ডি থ্রি ট্রফি