সংবাদ
রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাইবেন প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাইবেন প্রধানমন্ত্রী

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও বৈশ্বিক বৈষম্য দূরীকরনে বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেনযুক্তরাষ্ট্রে তারেক রহমানের সফর দেশের স্বার্থ রক্ষার মিশনএকই পরিবারের তৃতীয় প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মানুষের কথা বলবেন তারেক রহমানজাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতি শেষে বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কের পথে রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে তারেক রহমানের এই সফরকে দেশের স্বার্থ রক্ষার মিশন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে।প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এটি বিশ্বমঞ্চে তারেক রহমানের প্রথম অংশগ্রহণ, যার মাধ্যমে তিনি নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সফরের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাইবেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন।প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীদের নিয়ে তুর্কি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট সোমবার সকাল ৬টা ৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।ইস্তাম্বুলে ২ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট যাত্রাবিরতি শেষে স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১০ মিনিটে ফ্লাইটটি নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা দেয়। নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটে জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানটির অবতরণ করার কথা রয়েছে।জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান ও যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবেন। সফরকালে তিনি ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’ হোটেলে অবস্থান করবেন।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে। ওইদিন সকালে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব আয়োজিত স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেবেন এবং এরপর সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেবেন। সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের দেওয়া অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানেও তার যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক একটি বিশেষ পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাইবেন। একই দিন তিনি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও বৈশ্বিক বৈষম্য দূরীকরণ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য দেবেন এবং  বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলবেন।২৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক পর্বে ভাষণ দেবেন। তার ভাষণে নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, মানবাধিকার রক্ষা এবং বিশ্বশান্তি ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ফুটে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।এদিন তিনি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত হুমকি মোকাবিলাবিষয়ক সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরবেন।অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তান, কুয়েত, ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড ও হাইতির সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও তার সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে। অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে তিনি ওয়াল স্ট্রিট ও মেটার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরবেন।প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, ‘এটি কোনো আড়ম্বরপূর্ণ সফর নয় বরং দেশের স্বার্থ রক্ষার মিশন। যুক্তরাষ্ট্রে যেতে এক দিন, ফিরতে এক দিন। মাঝের মাত্র চার দিন। এক মুহূর্তও নষ্ট না করে, এই চার দিনেই একের পর এক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচি এবং বাংলাদেশের স্বার্থে কূটনৈতিক আলোচনায় সময় দিবেন তিনি।’ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক সফরসঙ্গী ৩৫ জন। এর মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী ১৫ জন। রয়েছেন নিরাপত্তা, মিডিয়া ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত অত্যাবশ্যকীয় ব্যক্তিরা।’সোমবার দুপুরে নিজের ভেরিফাইড ফেইসবুক পোস্টে মাহ্দী আমিন বলেন, ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পর একই পরিবারের তৃতীয় প্রতিনিধি হিসেবে তারেক রহমান জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মানুষের কথা বলবেন। বিশেষ এক মুহূর্তে তিনি ভাষণ দেবেন, যখন জাতিসংঘ অধিবেশনের সভাপতির আসনে থাকবেন বাংলাদেশেরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী।’প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। এই সফরের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
৪ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

কৃষিভিত্তিক সমবায়: নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

বাংলাদেশের কোনো একটি উপজেলার কথা ভাবুন। পাঁচজন শিক্ষিত তরুণ একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন—তারা পাঁচটি চাকরির জন্য আলাদাভাবে অপেক্ষা না করে নিজেরাই একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলবেন। একজন উৎপাদন দেখবেন, একজন কৃষকের সঙ্গে যোগাযোগ ও কাঁচামাল সংগ্রহ করবেন, একজন হিসাব ও অর্থায়ন সামলাবেন, একজন বিক্রয় ও বিপণন দেখবেন এবং অন্যজন খাদ্য নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ ও নতুন পণ্য উন্নয়নের দায়িত্ব নেবেন। এই পাঁচজন যদি নিজেদের পুঁজি, শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতাকে এক জায়গায় আনতে পারেন, তাহলে একটি ছোট উদ্যোগই একদিন বহু মানুষের কর্মসংস্থান এবং শতাধিক কৃষকের বাজার তৈরি করতে পারে।বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার আলোচনা সাধারণত একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে হয়। কিন্তু একজন তরুণের পক্ষে একই সঙ্গে পর্যাপ্ত মূলধন সংগ্রহ, কারখানা পরিচালনা, কাঁচামাল কেনা, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, হিসাব রাখা এবং বাজার তৈরি করা কঠিন। চার-পাঁচজন মিলে কাজ করলে পুঁজির পাশাপাশি ঝুঁকি ও দায়িত্বও ভাগ হয়ে যায়। এখানে ‘সমবায়’ বলতে শুধু আইনগত সমবায় সমিতি বোঝানো হচ্ছে না। উদ্যোগটি নিবন্ধিত সমবায়, অংশীদারি ব্যবসা কিংবা শেয়ারভিত্তিক কোম্পানি—যেকোনো উপযুক্ত কাঠামোতে হতে পারে। মূল বিষয় হলো সম্মিলিত মালিকানা ও দায়িত্ব।তবে বন্ধুত্ব দিয়ে ব্যবসা শুরু করা গেলেও শুধু বন্ধুত্ব দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা যায় না। শুরুতেই লিখিতভাবে ঠিক করতে হবে কে কত টাকা বিনিয়োগ করবেন, কার কত মালিকানা থাকবে, কে পূর্ণকালীন কাজ করবেন, কে বেতন পাবেন, মুনাফা কীভাবে বণ্টিত হবে, বড় সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হবে এবং কোনো অংশীদার ব্যবসা ছেড়ে যেতে চাইলে কী হবে। পাঁচজন মালিক হলেও প্রতিদিনের কারখানা পরিচালনার জন্য একজনকে প্রধান দায়িত্ব দিতে হবে। পাঁচজন পাঁচ ধরনের নির্দেশ দিলে ভালো ব্যবসাও দ্রুত সমস্যায় পড়তে পারে।বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগের জন্য কৃষিভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। মৌসুমে টমেটো, আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রচুর উৎপাদিত হয়। সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে গেলে দাম কমে যায় এবং দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন। অথচ একই কৃষিপণ্য শুকিয়ে, রান্না করে, পিউরি, চাটনি, আচার, পাউডার বা অন্য মূল্যসংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করলে কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব। অর্থাৎ কৃষকের কমমূল্যের মৌসুমি পণ্যই হতে পারে তরুণদের শিল্পের কাঁচামাল।ধরা যাক, পাঁচজন তরুণ একটি বহুমুখী ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তুলবেন। উদাহরণ হিসেবে প্রকল্পটির মোট বিনিয়োগ এক কোটি টাকা ধরা যেতে পারে। পাঁচজন প্রত্যেকে ১০ লাখ টাকা করে দিলে নিজস্ব মূলধন হবে ৫০ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ৫০ লাখ টাকা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণসহ উপযুক্ত ব্যবসায়িক অর্থায়ন থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে প্রথমবারের উদ্যোক্তার জন্য পুরো এক কোটি টাকা দিয়ে শুরু করাই একমাত্র পথ নয়। ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করে বাজার তৈরি হওয়ার পর ধাপে ধাপে বিনিয়োগ বাড়ানো অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ।এক কোটি টাকার সব অর্থ ভবন ও যন্ত্রপাতিতে ব্যয় করা উচিত নয়। উদাহরণ হিসেবে ১০–১৫ লাখ টাকা কারখানার স্থান, শেড ও প্রাথমিক অবকাঠামো; ৩০–৩৫ লাখ টাকা ওয়াশিং, কাটিং, ড্রায়ার, কুকিং কেটলি, মিক্সিং, ফিলিং ও প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি; ৮–১০ লাখ টাকা বিদ্যুৎ, পানি, গুদাম ও অন্যান্য ইউটিলিটি; ৫–৭ লাখ টাকা পরীক্ষাগার, পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রাখা যেতে পারে। ব্র্যান্ড, প্যাকেজিং উন্নয়ন, নিবন্ধন ও প্রাথমিক বাজারজাতকরণের জন্যও অর্থ প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তত ২৫–৩০ লাখ টাকা কার্যকরী মূলধনের ব্যবস্থা রাখা। কারণ কারখানা তৈরি হওয়ার পর কাঁচামাল, প্যাকেট, বেতন, পরিবহন ও বিদ্যুতের জন্য প্রতিদিন নগদ অর্থ দরকার হবে। এগুলো কেবল উদাহরণমূলক হিসাব; প্রকৃত বিনিয়োগের আগে স্থানীয় কোটেশন নিয়ে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।একটি মাত্র মৌসুমি পণ্যের জন্য কারখানা করা ঝুঁকিপূর্ণ। বরং একই অবকাঠামো ব্যবহার করে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা ভালো। শীতকালে টমেটো থেকে শুকনো টমেটো, টমেটো ফ্লেক্স বা পাউডার; আমের মৌসুমে ম্যাঙ্গো চাটনি, আচার ও শুকনো আম; অন্য সময়ে আনারস, কলা বা কাঁঠাল শুকিয়ে প্যাকেটজাত করা যেতে পারে। এতে যন্ত্রপাতি বছরের বেশি সময় ব্যবহৃত হবে এবং একটি পণ্যের বাজার খারাপ হলে অন্য পণ্য ব্যবসাকে সহায়তা করবে।সান-ড্রাইড বা নিয়ন্ত্রিতভাবে শুকানো টমেটো একটি ভালো উদাহরণ। মৌসুমে কম দামে টমেটো সংগ্রহ করে প্রথমে বাছাই ও ধোয়া হবে। এরপর সমান আকারে কেটে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শুকিয়ে নিরাপদ আর্দ্রতায় আনতে হবে এবং উপযুক্ত প্যাকেটে সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা দরকার—টমেটোর অধিকাংশই পানি। ১০ কেজি তাজা টমেটো থেকে হয়তো প্রায় ০.৭ থেকে ১.২ কেজি শুকনো পণ্য পাওয়া যেতে পারে; প্রকৃত ফলন জাত, পরিপক্বতা, বাছাইয়ের ক্ষতি এবং চূড়ান্ত আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করবে।ধরা যাক ১০ হাজার কেজি টমেটো প্রতি কেজি ১২ টাকা দরে কেনা হলো। কাঁচামালের দাম হলো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যদি ৮৫০ কেজি বিক্রয়যোগ্য শুকনো টমেটো পাওয়া যায়, তাহলে শুধু কাঁচা টমেটোর খরচই প্রতি কেজি শুকনো পণ্যে প্রায় ১৪১ টাকা। এর সঙ্গে শ্রম, শুকানোর বিদ্যুৎ বা জ্বালানি, পানি, প্যাকেজিং, পরিবহন, পরীক্ষাগার, কারখানার স্থায়ী খরচ, বিক্রয় কমিশন এবং অর্থায়নের ব্যয় যোগ হবে। সব মিলিয়ে যদি প্রতি কেজির প্রকৃত খরচ ৩০০–৪০০ টাকা হয়, তাহলে বাজারে ৪০০ টাকায় বিক্রি করে বড় মুনাফা হবে—এমন ধারণা করা ভুল। বাজার ৭০০, ৮০০ বা ১,০০০ টাকা দিতে প্রস্তুত কি না, সেটিই আগে পরীক্ষা করতে হবে।ম্যাঙ্গো চাটনির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। শুধু আম, চিনি ও মসলার দাম যোগ করলেই উৎপাদন খরচ পাওয়া যায় না। বোতল, ঢাকনা, লেবেল, কার্টন, শ্রম, রান্নার জ্বালানি, পানি, মান পরীক্ষা, পরিবহন, পরিবেশকের কমিশন এবং খুচরা বিক্রেতার মার্জিনও রয়েছে। ধরুন ৫০০ গ্রামের একটি বোতল চাটনির সম্পূর্ণ কারখানা-পর্যায়ের খরচ ১০০ টাকা। উৎপাদক ১২৫–১৩০ টাকায় পরিবেশককে দিলে এবং শেষ পর্যন্ত দোকানে ১৬০–১৮০ টাকায় বিক্রি হলে উৎপাদক, পরিবেশক ও দোকানদার—সবার জন্য ব্যবসাটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু ক্রেতা যদি ১২০ টাকার বেশি দিতে না চান, তাহলে পণ্যটি যত ভালোই হোক, ব্যবসার মডেল পরিবর্তন করতে হবে।এই কারণেই কারখানা তৈরির আগে বাজার পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। পাঁচজন তরুণ প্রথমেই লাখ লাখ প্যাকেট উৎপাদন না করে ৫০০ বা ১,০০০ প্যাকেট শুকনো টমেটো এবং কয়েকশ বোতল চাটনি তৈরি করতে পারেন। স্থানীয় রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ, অনলাইন ক্রেতা এবং পরিবারের কাছে বিক্রি করে জানতে হবে—স্বাদ কেমন, প্যাকেটের আকার ঠিক আছে কি না, কত দাম দিতে রাজি এবং দ্বিতীয়বার কিনতে চান কি না। বাজার পরীক্ষায় ব্যর্থ একটি পণ্যের জন্য ৩০ লাখ টাকার মেশিন কেনার কোনো অর্থ নেই।কারখানার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সস্তা জমি দেখলে হবে না। আশপাশে পর্যাপ্ত কাঁচামাল আছে কি না, কৃষকের কাছ থেকে দ্রুত কারখানায় আনা যায় কি না, নিরাপদ পানি ও বিদ্যুৎ আছে কি না, শ্রমিক পাওয়া যায় কি না এবং ঢাকা বা অন্য বড় বাজারে পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা কেমন—সব বিবেচনা করতে হবে। কৃষিপণ্য উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি প্রক্রিয়াজাতকরণ হলে পরিবহন ও সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি দুটিই কমানো সম্ভব।খাদ্য নিরাপত্তা শুরু থেকেই ব্যবসার কেন্দ্রে থাকতে হবে। ছোট কারখানা মানেই নিম্নমানের কারখানা নয়। নিরাপদ পানি, কর্মীদের পরিচ্ছন্নতা, কাঁচা ও প্রস্তুত পণ্যের পৃথক প্রবাহ, পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার লিখিত পদ্ধতি, তাপমাত্রা ও সময় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি ব্যাচের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। শুকনো পণ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী আর্দ্রতা ও পানির সক্রিয়তা এবং চাটনি বা সসে পিএইচ, অম্লতা ও তাপ প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। পণ্যভেদে বাংলাদেশের প্রযোজ্য খাদ্য আইন, মান, নিবন্ধন ও লেবেলিংয়ের শর্তও মেনে চলতে হবে।একইভাবে প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভালো পণ্য দুর্বল প্যাকেটে দিলে আর্দ্রতা ঢুকে মান নষ্ট হতে পারে। আবার অতি ব্যয়বহুল প্যাকেজিং করলে পণ্যের দাম ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। একটি নতুন ব্র্যান্ডের পরিচয়ও স্পষ্ট হওয়া দরকার—কোন অঞ্চলের কাঁচামাল, কীভাবে কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পণ্যটির বিশেষত্ব কী। প্রথমে স্থানীয় বাজার, রেস্টুরেন্ট ও অনলাইন বিক্রিতে অবস্থান তৈরি করে পরে বড় শহর ও রপ্তানির দিকে যাওয়া অধিক বাস্তবসম্মত।আর্থিক পরিকল্পনায় ব্রেক-ইভেন বোঝাও জরুরি। ধরুন কারখানার বেতন, ভাড়া, প্রশাসন, রক্ষণাবেক্ষণ, সুদসহ বছরে স্থায়ী ব্যয় ১৮ লাখ টাকা এবং কাঁচামাল, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বিক্রয় ব্যয় বাদ দেওয়ার পর বিক্রয়ের ৩০ শতাংশ স্থায়ী খরচ মেটাতে থাকে। তাহলে আনুমানিক ব্রেক-ইভেন বিক্রয় হবে বছরে ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এর পরের বিক্রয় থেকেই প্রকৃত পরিচালন মুনাফার সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি টমেটোর দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে গেলে, উৎপাদন ফলন কমলে বা বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৫ শতাংশ কম হলে ব্যবসাটি টিকবে কি না—আগেই হিসাব করা দরকার।এই মডেলের সবচেয়ে বড় সামাজিক সুবিধা হলো এর প্রভাব পাঁচজন মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ছোট কারখানায় ১০–১৫ জন স্থায়ী কর্মী এবং মৌসুমে আরও ২০–৩০ জন কাজ পেতে পারেন। কয়েক ডজন বা শতাধিক কৃষক নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারেন। পরিবহনকারী, প্যাকেজিং সরবরাহকারী, পরিবেশক ও দোকানদারও এই অর্থনৈতিক চক্রে যুক্ত হন। বাছাই, মান পরীক্ষা, প্যাকেজিং ও প্রশাসনিক কাজে স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থানেরও ভালো সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।তবে শুরুতেই বড় হওয়ার চেষ্টা না করে ধাপে ধাপে এগোনো উচিত। প্রথমে ৫–১০ লাখ টাকার পরীক্ষামূলক উৎপাদন, তারপর ২৫–৫০ লাখ টাকার ছোট ইউনিট এবং বাজার ও নগদ প্রবাহ স্থিতিশীল হলে এক কোটি বা তার বেশি বিনিয়োগ—এটি অনেক বেশি নিরাপদ পথ। প্রথম বছরের সাফল্য কোটি টাকার মুনাফা নয়; বরং এমন দুই-তিনটি পণ্য তৈরি করা, যা ক্রেতা একবার কেনার পর আবার কিনতে চান।আমরা তরুণদের দীর্ঘদিন ধরে জিজ্ঞেস করছি, ‘চাকরি পেয়েছ?’ হয়তো এখন আরেকটি প্রশ্ন করার সময় এসেছে—‘তোমরা পাঁচজন মিলে কী তৈরি করতে পারো?’ বাংলাদেশের কৃষি আছে, কাঁচামাল আছে, বিশাল ভোক্তা বাজার আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, তরুণ জনগোষ্ঠী আছে। এখন প্রয়োজন এই শক্তিগুলোকে এক জায়গায় আনা।আজ পাঁচজন তরুণের একটি ছোট শুকনো টমেটো, ম্যাঙ্গো চাটনি বা ফল প্রক্রিয়াজাত কারখানাকে হয়তো খুব বড় কিছু মনে হবে না। কিন্তু সঠিক প্রযুক্তি, আর্থিক শৃঙ্খলা, খাদ্য নিরাপত্তা, বাজারজ্ঞান এবং সততার সঙ্গে পরিচালিত হলে সেই ছোট উদ্যোগই একদিন একটি জাতীয় খাদ্য ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাই হয়তো লেখা হবে বড় কোনো করপোরেট ভবনে নয়—একটি উপজেলার ছোট কারখানায়, পাঁচজন তরুণের সম্মিলিত স্বপ্ন দিয়ে।[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা

শিক্ষা একটি জাতির আত্মপরিচয়, অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ব্যক্তির জ্ঞান, বিবেক, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটিয়ে তাকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু শিক্ষা যখন কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করা, মুখস্থবিদ্যা অর্জন এবং সনদ সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত গতানুগতিক শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল কারণ এখানেই।বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে; প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন, অর্থনীতি ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদা প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। অথচ আমাদের শিক্ষার একটি বড় অংশ এখনো মুখস্থনির্ভরতা, পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা ও প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে আবদ্ধ। ফলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করলেও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব জীবন ও কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। দেশের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্য যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের কোন বিকল্প নেই। আধুনিক অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদকে অধিক মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।গতানুগতিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তির পরিবর্তে স্মৃতিশক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখে ভালো নম্বর পাওয়া শিক্ষার সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থী কেন একটি বিষয় শিখছে, সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে কীভাবে প্রয়োগ করবে কিংবা কোনো সমস্যার নতুন সমাধান কীভাবে বের করবে—এসব প্রশ্ন অনেক সময় গৌণ হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীর মধ্যে অনুসন্ধিৎসা, যুক্তিবোধ ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা যথেষ্ট বিকশিত হয় না। পরীক্ষার পর মুখস্থ করা তথ্যের বড় অংশ ভুলে গেলেও পরীক্ষার ফলাফলই তার শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রধান পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়। গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা মূলত শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের সংকীর্ণ ধারণার ফল।শিক্ষা যদি কেবল সনদ, নম্বর ও চাকরির প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে একটি জাতি দক্ষতার কিছু সূচক অর্জন করলেও সৃজনশীল ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারবে না। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করবে, অনুসন্ধান করবে, ভুল থেকে শিখবে, নতুন ধারণা তৈরি করবে এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করবে। শিক্ষা হবে জীবনের প্রস্তুতি, শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার মান, উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতার ওপর। শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার কিংবা সনদ অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং একজন মানুষকে জ্ঞানী, দক্ষ, দায়িত্বশীল, মানবিক ও যুক্তিবাদী নাগরিকে পরিণত করার প্রধান উপায়। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে শিক্ষা। বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও “সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা”কে তার অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে অগ্রগতি হলেও শিক্ষার গুণগত মান, বৈষম্য, শিক্ষকতার মান, মুখস্থনির্ভরতা, পরীক্ষা-কেন্দ্রিকতা, দক্ষতার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের আলোচনা নতুন নয়।  তাই শিক্ষা সংস্কারকে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, জাতীয় অস্তিত্ব ও উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো সমাজের পিছিয়ে পড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা, যাতে তারা দারিদ্র‍্য, বেকারত্ব, অসুস্থতা বা অন্য কোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত না হয়। সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী-নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, খাদ্য সহায়তা, কর্মসংস্থান কর্মসূচি, শিক্ষাবৃত্তি এবং দুর্যোগকালীন ত্রাণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য শুধু দরিদ্র মানুষের মধ্যে অর্থ বা খাদ্য বিতরণ নয়; বরং তাদের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা ও জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা। সামাজিক নিরাপত্তা দারিদ্র‍্য ও বৈষম্য কমাতে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে বিপুল জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র‍্য ও বিভিন্ন সামাজিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি ক্রমেই বাড়ানো হয়েছে। তবে এসব কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শুধু মানুষের দুর্দশা লাঘব করে না; বরং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে।বর্তমান বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়; বরং এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যদি সঠিক ও ভুলের পার্থক্য নির্ণয় করতে শেখানো না হয় এবং ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে সততা ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দেওয়ার শিক্ষা না দেওয়া হয়, তবে কোনো দুর্নীতি দমন কমিশন, কোনো আইনগত সংস্কার কিংবা কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা একাই দুর্নীতি নির্মূল করতে পারবে না। এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হলো বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে শুধু কতজন স্নাতক তৈরি হলো তার ওপর নয়; বরং তারা সমাজে কী ধরনের মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং আদর্শ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে তার ওপর। তাই মূল্যবোধভিত্তিক উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ মানে শুধু মানবসম্পদে বিনিয়োগ নয়; এটি জাতির নৈতিক পুঁজিতে বিনিয়োগ। শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য পরীক্ষার খাতায় কত নম্বর পাওয়া গেল, তার মধ্যে নয়; বরং একজন শিক্ষার্থী কতটা যুক্তিবাদী, দক্ষ, সৃজনশীল, নৈতিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠল—তার মধ্যেই শিক্ষার আসল সার্থকতা। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অতীতের মতো আবারও এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক কাজটা অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে সম্পন্ন করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে একটা বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে সমাজের সর্বস্তরে যে আলাপ চলছে, সেখানে শিক্ষা একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে হাজির আছে। আলাপ উঠেছে শিক্ষা সংস্কারেরও। শিক্ষা সংস্কারে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে? গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা ও আমাদের করণীয় শীর্ষক বিভিন্ন সভা, সেমিনার এবং কর্মশালার মাধ্যমে একটি গণ আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে। গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা বিমোচনে শিক্ষা সংস্কার এর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা সংস্কার ছাড়া মানব সম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা সম্ভব নয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

খাবার অপচয়ের অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক

খাবার মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। ক্ষুধা নিবারণের জন্য মানুষ প্রতিদিন পরিশ্রম করে, অর্থ ব্যয় করে এবং খাদ্য সংগ্রহ করে। অথচ আমাদের সমাজেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাবার নানা কারণে অপচয় হয়। কারও ঘরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রান্না হয়, কোথাও অনুষ্ঠানে প্লেটে অতিরিক্ত খাবার নেওয়া হয়, আবার কোথাও খাবার পরিবেশন ও সংরক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় খাবার নষ্ট হয়ে যায়।খাবারের অপচয়কে আমরা অনেক সময় স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখি। বিয়ের অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজন, রেস্তোরাঁ কিংবা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে প্লেটে খাবার রেখে উঠে আসা যেন অনেকের কাছে বড় কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু একটি প্লেটে ফেলে রাখা খাবারের পেছনে কৃষকের শ্রম, জমি, পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, অর্থ—সবকিছুই জড়িয়ে আছে। ফলে খাবার অপচয় শুধু একটি খাবার নষ্ট করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সম্পদ ও শ্রমের অপচয়ও।প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নেওয়ার সংস্কৃতিখাবার অপচয়ের অন্যতম কারণ আমাদের ভোগের মানসিকতা। কোনো অনুষ্ঠানে নানা ধরনের খাবার দেখলে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার প্লেটে নেন। খাওয়া সম্ভব না হলেও প্লেটে পড়ে থাকা খাবার শেষ পর্যন্ত ফেলে দিতে হয়।অন্যদিকে সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার আয়োজনের প্রবণতাও দেখা যায়। অতিথি কম হলেও খাবারের পরিমাণ বেশি না হলে যেন আয়োজন অসম্পূর্ণ—এমন একটি ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে।অতিথিকে ভালো খাবার খাওয়ানো অবশ্যই সৌজন্যের অংশ। কিন্তু সৌজন্য ও অপচয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। আয়োজনের সৌন্দর্য খাবারের পরিমাণে নয়, বরং ব্যবস্থাপনা ও আন্তরিকতায়।খাবারের পেছনে কত মানুষের শ্রমআমরা যখন একটি প্লেট ভাত সামনে পাই, তখন হয়তো শুধু ভাতটুকুই দেখি। কিন্তু সেই ভাতের পেছনে রয়েছে কৃষকের দীর্ঘ পরিশ্রম। জমি প্রস্তুত করা, বীজ বোনা, সেচ দেওয়া, ফসলের পরিচর্যা, ধান কাটা, মাড়াই, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ—প্রতিটি ধাপে মানুষের শ্রম রয়েছে।একইভাবে মাছ, মাংস, শাকসবজি, ফল কিংবা অন্যান্য খাদ্যের পেছনেও রয়েছে অসংখ্য মানুষের পরিশ্রম।তাই খাবার নষ্ট করার আগে আমাদের একবার ভাবা উচিত—যে খাবারটি আমরা সহজে ফেলে দিচ্ছি, সেটি আমাদের প্লেটে পৌঁছাতে কত মানুষের শ্রম ব্যয় হয়েছে?খাবারের প্রতি সম্মান দেখানো মানে শুধু খাবার না ফেলা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রমের প্রতিও সম্মান দেখানো।একদিকে অপচয়, অন্যদিকে খাদ্যনিরাপত্তার চিন্তাসমাজে এমন অনেক পরিবার রয়েছে যাদের প্রতিদিনের খাবারের হিসাব করতে হয়। মাসের শুরুতে যে বাজার করা সহজ মনে হয়, মাসের শেষ দিকে সেটিই অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতার মধ্যে যখন অন্যদিকে খাবার অনায়াসে ফেলে দেওয়া হয়, তখন বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানবিক প্রশ্নও তৈরি করে। অবশ্য খাবারের অপচয় বন্ধ করলেই সমাজের সব মানুষের খাদ্যসংকট দূর হয়ে যাবে—এমন সরল সমীকরণ করা ঠিক নয়। তবে অপচয় কমানো খাদ্যসম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।খাদ্য মানুষের অধিকার ও প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। তাই খাদ্য নিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ একটি মানবিক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।রেস্তোরাঁ ও অনুষ্ঠানে সচেতনতা জরুরিখাবার অপচয়ের বড় একটি ক্ষেত্র হতে পারে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও খাবারের আয়োজন। এখানে আয়োজক এবং অতিথি—দুই পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে।আয়োজকদের উচিত অতিথির সম্ভাব্য সংখ্যা বিবেচনা করে খাবারের পরিকল্পনা করা। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত রান্না না করা, সঠিকভাবে খাবার সংরক্ষণ করা এবং খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অতিথিদেরও দায়িত্ব রয়েছে। একবারে অনেক খাবার প্লেটে না নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী নেওয়া যেতে পারে। কোনো খাবার ভালো না লাগলে সেটি প্লেটে তুলে রেখে দেওয়ার পরিবর্তে অল্প পরিমাণ নেওয়াই ভালো।ছোট একটি অভ্যাস বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।অপচয় বন্ধে শুধু আবেগ নয়, ব্যবস্থাপনাও দরকারখাবার অপচয় নিয়ে আমরা অনেক আবেগপূর্ণ কথা বলি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন বাস্তব ব্যবস্থাপনা।খাদ্য সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা, সরবরাহব্যবস্থায় অপচয় কমানো, বাজার ও রেস্তোরাঁয় প্রয়োজনভিত্তিক পরিকল্পনা এবং মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।কৃষকের উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহের প্রতিটি ধাপে কোথায় অপচয় হচ্ছে, সেটি চিহ্নিত করা জরুরি।শুধু ভোক্তাকে দায়ী করলেই হবে না। উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও ভোগ—প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।[লেখক :প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]

আনন্দময় শৈশব চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই

রবিবারের ভোরের সূর্য, চোখ মেলে তাকালেই মনটা আঁকুপাঁকু করে উঠত। সপ্তাহজুড়ে অপেক্ষা ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবারের জন্য। সকাল দশটায় খেলাঘর আসরের আবৃত্তি প্রশিক্ষণ। আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, অসমাপ্ত গল্প সমাপ্তকরণ আরও কত কিছু। কত অসমাপ্ত গল্প সমাপ্ত করেছি কিন্তু যে সমাজে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছি সে সমাজের অসমাপ্ত গল্পের উপসংহারে পৌঁছানোর পথটি মনে হয় অনন্তে মিলিয়ে গেছে।আমাদের শৈশব-কৈশোর ছিল সোনায় মোড়ানো। ছুটির দিনে মাঝে মাঝে শরীরচর্চা বিশেষ করে ব্রতচারী নৃত্য। “চল কোদাল চালাই, ভুলে মনের বালাই, ঝেড়ে অলস মেজাজ, হবে শরীর ঝালাই...।” এই ব্রতচারী নৃত্যের প্রবর্তক যে ছিলেন শ্রদ্ধেয় গুরুসদয় দত্ত, যার বাড়ি ছিল সিলেটের জকিগঞ্জের বীরগ্রামে, সে তথ্য জানা ছিল না। তাঁর গৌরবময় জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলাম। ব্রতচারী নৃত্যে অংশগ্রহণ করেই আনন্দ। ছন্দে, ছন্দে শরীরচর্চা, দেহ মনকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। আমাদের শৈশবে মুকুল ফৌজের কার্যক্রম কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। খেলাঘর আসর, চাঁদের হাট, কচিকাঁচার মেলা, শাপলার মেলা ছিল দারুণ সক্রিয়। শহরের এ পাড়ায় খেলাঘর তো অন্য পাড়ায় কচিকাঁচার মেলা। এভাবে চাঁদের হাট, শাপলার মেলা সহ নাম না জানা অনেক শিশু, কিশোর সংগঠন সারা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। সব শিশুদের জন্য দ্বার অবারিত। সৃজনশীল কিছু শেখার বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ দেনা-পাওনার বাইরের বিষয়। বাণিজ্য তখনো প্রবেশ করতে পারেনি এসব সৃষ্টিশীল কার্যক্রমে। যারা শেখাতেন তারা মনে করতেন পরের প্রজন্মকে তৈরি করে যাওয়া তাদের কর্তব্য। যারা শিখত তারা প্রাণের আনন্দে মনপ্রাণ ঢেলে দিত সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।ষাট, সত্তর এমন কী আশির দশক পর্যন্ত এসব শিশু সংগঠনের নামের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না, এরকম সত্যিকার শিক্ষিত মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার ছিল আমাদের দেশে। শৈশব-কৈশোরের কোনো না কোনো পর্বে এইসব শিশু-কিশোর সংগঠনের কোনোটার সদস্য কিংবা তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন না, এরকম মানুষের সংখ্যাও প্রগতিশীল, সংস্কৃতিলগ্ন সমাজে খুব কম ছিল বলে মনে করি। বাংলাদেশের সমাজ, ইতিহাস, উত্থান এবং জাতিগঠনের পেছনে এই সংগঠনসমূহ ও তাদের সভ্যদের গুরুত্বপূর্ণ, গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে। অথচ এখনকার শিশু, কিশোর, তরুণ এমনকি মাঝবয়সীদেরও অনেকেই এই সংগঠনসমূহের অস্তিত্ব ও তাদের কার্যকলাপ বিষয়ে একেবারেই অবগত নয় বলেই আমার ধারণা। এর কারণ, বাস্তবে এখন আর এই সংগঠনগুলোর তেমন কোনো জোরালো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।খেলাঘরের মূল স্লোগান ছিল, “আনন্দময় শৈশব চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই।” শিশুদের জন্য এত সুন্দর এবং যথাযথ স্লোগান খুব কম শুনেছি। আনন্দময় শৈশব না থাকলে কী হয়। সমাজ সুস্থ থাকে না। সমাজ অসুস্থ এবং অস্থির থাকলে শিশুরা দায়িত্বহীন, বিকল মস্তিষ্কের মানুষ হিসেবে বাড়তে থাকে। সচেতন মানুষেরা কী কিছুটা টের পাচ্ছেন। হাজার হাজার শিশু নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। সৃষ্টিশীলতায় মগ্ন থেকে জীবন ধারণ তো দূরের কথা, কোথায় কোন দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে ছোট, ছোট শিশুরা সে খবর, রাষ্ট্র, সমাজ কেউ জানে না। আর একটি বিষয় ভাবলে অবাক হতে হয়, নাগরিক সমাজ কিংবা রাজনৈতিক দলগুলো নির্লিপ্ত, উদাসীন। উদাসীন মানুষ কিংবা সমাজ, সংগঠনের মনের কথা পাঠ করা খুব কঠিন। এই যে অগণন শিশু নানা ভাবে ধর্ষিত হচ্ছে, এর জন্য জোরালো, দলবদ্ধ প্রতিবাদ কর্ণকুহরে এখনও পৌঁছেনি। আসলে এ দেশে শিশুরা ভালো নেই, তাদের নিরাপত্তাও নেই, আনন্দ-বিনোদনের ব্যবস্থাও নেই। শিশু কেন, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা কি সুস্থুস্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারছে, যাতে তারা দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠতে পারে? সমাজে যে প্রবল অস্থিরতা ও মারাত্মক নিষ্ঠুরতার প্রবাহ চলছে, তা সমাজ ও রাষ্ট্রের অবহেলায় দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা এক গভীর সামাজিক ব্যাধি। বড় ভয় হয়, আমাদের এগোনোর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে।শৈশব থেকে যে শিশু সৃষ্টিশীলতার বিকাশের অবাধ সুযোগ পেয়ে থাকে সে শিশু আকাশের মতো বড় হয়ে ওঠে। ওই যে সুনির্মল কুমার বসুর অসাধারণ সেই কবিতা, “আকাশ আমায় শিক্ষা দিলে উদার হতে ভাইরে/ কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাইরে।” জীবনের শুরুতেই উদার মনোবৃত্তি ধারণ করে সবার কাছে শিক্ষা নিয়ে মানবিক মানুষ হওয়ার শিক্ষা নেওয়ার ব্রত ধারণ করা; সেই শিক্ষা এবং ব্রত কোথায়।কে না জানে যে মানুষের মানবিক হয়ে ওঠার জন্য তার সুকুমারবৃত্তি চর্চার এবং সুকুমার কলা উপভোগের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। নাগরিকের সব পেশাগত দক্ষতা, বৃত্তিমূলক কাজের উৎকর্ষ অর্জন নিশ্চয়ই করতে হবে, মৌলিক শিক্ষাতেও তাকে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। কিন্তু তার চাপে একজন সংবেদনশীল দায়িত্ববান মানুষ হয়ে ওঠায় কোনো ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। আমরা সবাই উল্টোরথে মনে হয় উল্টো পথেই চলছি।সময় পাল্টেছে, বাস্তবতা পাল্টেও গেছে, পাল্টে গেছে ভূগ্রাম। জীবনের প্রয়োজন, চাওয়া-পাওয়া ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন রকম হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক শিশু সাহায্য সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘চুরি হয়ে যাওয়া শৈশব’-বিষয়ক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন বা তারও বেশি শিশুর শৈশব নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা বাংলাদেশে চরম পর্যায়ে। এখানে চলছে সন্তানকে জোরজবরদস্তি করে কিছু একটা বানানোর অসম প্রতিযোগিতা। শহরের শিশুদের খেলার জায়গা নেই, তাই শিশুরা মুঠোফোন গেমসে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মার্কিন জার্নাল ‘পেডিয়াট্রিক্স’-এ প্রকাশিত একটি জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব শিশু প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভি দেখে বা কম্পিউটারে খেলার জন্য স্ক্রিনের সামনে বসে থাকে, তারা অন্য শিশু যারা এসব করে না তাদের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বেশি সমস্যায় ভোগে। তারা বেশি আবেগপ্রবণ হয় তাই তাদের সবকিছুই অতিরিক্ত পর্যায়ে চলে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে স্মার্টফোন, আইফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, ডিজিটাল ক্যামেরার প্রতি বড়দের দেখে শিশুদেরও আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। শিশুদের স্ক্রিন আসক্তি নিয়ে ‘গ্লো কিডস : হাউ স্ক্রিন এডিকশন ইস হাইজেকিং আওয়ার কিডস অ্যান্ড হাউ টু ব্রেক দ্য ট্রেন্স’ নামে বই লিখেছেন মার্কিন সাইকোথেরাপিস্ট ও আসক্তি বিশেষজ্ঞ ড. নিকোলাস কারদারাস। তিনি স্ক্রিন এডিকশনকে ‘নতুন শতাব্দীর মাদক’ বলে উল্লেখ করেছেন।প্রশ্ন হলো আমরা কী প্রযুক্তির বিকাশ রোধ করতে পারব। প্রযুক্তি তাঁর উৎকর্ষ নিয়ে এগিয়ে যাবে, কোন কালেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তির চলার পথে কেউ বাঁধ নির্মাণ করতে পারেনি। তাহলে কী করা প্রয়োজন প্রযুক্তির সংস্কৃতি সংলগ্ন ব্যবহারের পথ খুঁজতে হবে। প্রযুক্তি তো সারা বিশ্বের মানুষ ব্যবহার করছে। কোন পথে হাঁটলে “ঠাকুরমার ঝুলি”, রূপকথা, দস্যু বনহুর, হাসন, লালন এবং তাদের মানবিক বাণীকে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় প্রবেশ করানো যায়। কীভাবে অন্যান্য শিক্ষার সঙ্গে আমাদের গাজীর গানকে যুক্ত করা যায়। “নানা বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ, জগত ভরমিয়া দেখালাম একই মায়ের পুত” বিশ্বচরাচর ঘুরে আসলে এরকম মানবিক বাণী কী খুঁজে পাওয়া যাবে, জানি না। প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংযোগ না ঘটলে কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে কাজটা কঠিন। বহু বছরে বেশ কয়েকটি প্রজন্ম সংস্কৃতি-চিন্তা ও বোধ ছাড়াই বড় হয়েছে; গান শোনে না, নাটক দেখে না, বই পড়ে না এমন মানুষ স্কুল শিক্ষকতায় এত বেশি যুক্ত রয়েছেন যে তাঁদের পক্ষে কিশোর তরুণদের হারাতে বসা সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানো কঠিন হবে বলে মনে হয়।শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সংযোগ ঘটানোর কথা আমরা বহুকাল ধরে বলে আসছি। আশার কথা, বর্তমান সরকার গুরুত্বটা অনুধাবন করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে কাজটা কঠিন। একে বহু বছরে বেশ কয়েকটি প্রজন্ম সংস্কৃতি-চিন্তা ও বোধ ছাড়াই বড় হয়েছে; গান শোনে না, নাটক দেখে না, বই পড়ে না এমন মানুষ স্কুল শিক্ষকতা এত বেশি রয়েছেন যে তাঁদের পক্ষে কিশোর তরুণদের হারাতে বসা সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তারপরও অভিভাবকদেরও একই অবস্থা—সুকুমারবৃত্তির চর্চায় সন্তানদের উৎসাহিত করার সক্ষমতা তাঁদেরও তো নেই। এ অবস্থায় দেশে আজ একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ সময়ের দাবি। মানুষের মানবিক অভিযাত্রা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

কৃষির পরিবর্তনের সঙ্গে বদলাক বিএডিসি

বাংলাদেশের কৃষি বদলে গেছে। বদলে গেছে কৃষকের চাহিদা, উৎপাদনব্যবস্থা, বাজারের ধরন এবং কৃষির ঝুঁকি। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ, রোগবালাই, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে কৃষি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। একই সঙ্গে কৃষক এখন শুধু পরামর্শ চান না; তিনি চান উন্নতমানের বীজ, সময়মতো সার, নির্ভরযোগ্য সেচ, আধুনিক প্রযুক্তি, তথ্য, পরামর্শ এবং দ্রুত সেবা।এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় দেশের কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন—বিএডিসিকেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হবে। তাই এ প্রজন্মের কৃষকের চাহিদা পূরণে বিএডিসির সংস্কার এখন আর উচ্চবিলাসী নয়, সময়ের অপরিহার্য দাবি। বিএডিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ, সার ব্যবস্থাপনা, সেচ উন্নয়ন, কৃষি উপকরণ বিতরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অবদান সুদীর্ঘ।কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কাঠামো, জনবল, প্রযুক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। পুরোনো কাঠামো দিয়ে নতুন প্রজন্মের কৃষকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা কঠিন। ফলে প্রয়োজন এমন একটি আধুনিক ও গতিশীল বিএডিসি, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, মাঠের বাস্তবতা বুঝবে এবং কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো সেবা পৌঁছে দিতে পারবে। বিএডিসির সংস্কার বলতে কোনোভাবেই শুধু জনবল কমানো, পদ বিলুপ্ত করা কিংবা সাংগঠনিক কাঠামো সংকুচিত করাকে বোঝানো উচিত নয়। বরং সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কাজের গতি বাড়ানো, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন, মাঠপর্যায়ে ক্ষমতায়ন এবং দক্ষ জনবলকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো।কৃষির মতো মৌসুমনির্ভর ও জরুরি খাতে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের ওপর। বীজ, সার বা সেচের ক্ষেত্রে এক ঘণ্টার বিলম্বও অনেক সময় একটি মৌসুমের উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই বিএডিসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও ফলাফলভিত্তিক করা প্রয়োজন। বিএডিসির সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এর অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনবল। এই শক্তি শুধু কর্মকর্তা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মচারী, দক্ষ টেকনিশিয়ান, মাঠকর্মী, কারিগরি জনবল এবং কর্মকর্তাদের সম্মিলিত দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের মাঠ অভিজ্ঞতার মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিহিত।দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষি উপকরণ, বীজ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনায় কাজ করতে গিয়ে এই জনবল যে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা কোনো কাগুজে সাংগঠনিক কাঠামো দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই সংস্কারের নামে এই অভিজ্ঞ জনশক্তিকে অবমূল্যায়ন করা বা অকার্যকর করে দেওয়া হবে আত্মঘাতী। অভিজ্ঞ জনবলকে বাদ দিয়ে নয়, তাঁদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটিয়েই ভবিষ্যতের বিএডিসি গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে সার সরবরাহ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রে উদ্বেগ ও আলোচনা দেখা যাচ্ছে।এই বাস্তবতায় বিএডিসির নন-ইউরিয়া সার ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। ডিএপি, টিএসপি ও এমওপিসহ নন-ইউরিয়া সার আমদানি ও সরবরাহে বিএডিসি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে আসছে। সার ব্যবস্থাপনার সাফল্য শুধু কত টন সার আমদানি করা হলো, তার ওপর নির্ভর করে না; প্রকৃত সাফল্য হলো প্রয়োজনের সময়ে, প্রয়োজনীয় স্থানে, প্রয়োজনীয় পরিমাণে এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষকের কাছে সার পৌঁছে দেওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়, জাহাজীকরণ, বন্দরে খালাস, সংরক্ষণ, অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা বিবেচনা এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহ পুরো প্রক্রিয়ায় দক্ষতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।ভবিষ্যতে সার ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। চাহিদা নিরূপণ, মজুত ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ও মাঠপর্যায়ে বিতরণে সমন্বিত পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গেলে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা আরও বাড়বে। কারণ কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সামান্য ভুল বা বিলম্বও অনেক সময় উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিএডিসির বীজ ব্যবস্থাপনাতেও একইভাবে নতুন চিন্তার প্রয়োজন। জলবায়ু সহনশীল, উচ্চফলনশীল, রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতের বীজ উৎপাদন, উন্নতমানের প্লান্টিং ম্যাটেরিয়াল ও সরবরাহকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।আধুনিক বীজ প্রযুক্তি, টিস্যু কালচার, বীজ পরীক্ষাগার, সংরক্ষণ প্রযুক্তি, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। কৃষকের হাতে শুধু বীজ পৌঁছে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়; সেই বীজের মান, বিশুদ্ধতা, অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ও উপযোগিতা নিশ্চিত করাও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অংশ। এছাড়াও যুক্ত হয়েছে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বৃহৎ পরিসরে চারা সরবরাহ।সেচ ব্যবস্থাপনাতেও সময়ের দাবি অনুযায়ী পরিবর্তন প্রয়োজন। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং অঞ্চলভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সৌরশক্তি, স্মার্ট সেচ, সেন্সরভিত্তিক প্রযুক্তি এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা কৃষির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এছাড়াও সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখনন এবং নবায়নযোগ্য সেচ প্রযুক্তি।বিএডিসির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাও সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। একজন দক্ষ কর্মীকে শুধু একটি পদ দিয়ে মূল্যায়ন করলে তাঁর প্রকৃত সক্ষমতার মূল্যায়ন হয় না। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, কারিগরি দক্ষতা, মাঠপর্যায়ের জ্ঞান এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে সাংগঠনিক পরিকল্পনায় যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি তরুণ ও নতুন প্রজন্মের জনবলকে আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও নতুন কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে একটি আন্তঃপ্রজন্মীয় দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তুলতে হবে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের শক্তির সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতের বিএডিসির অন্যতম প্রধান সম্পদ।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রেরণা। বিএডিসিতে সরকারি চাকরির মতো পূর্ণাঙ্গ পেনশন ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর-পরবর্তী নিয়মিত আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিএডিসিতে গ্র‍্যাচুইটি সংক্রান্ত বিধান রয়েছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পেনশন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি কর্মীদের জন্য একটি পৃথক বাস্তবতা তৈরি করে। তাই মানবসম্পদ সংস্কারের অংশ হিসেবে কর্মীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যদি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সম্পর্কে আস্থাশীল থাকেন, তাহলে তাদের কর্মপ্রেরণা, দায়িত্ববোধ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যও আরও শক্তিশালী হয়। এ কারণে বিএডিসির নতুন সাংগঠনিক কাঠামো বা অর্গানোগ্রাম প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু পদসংখ্যা কমানো বা বাড়ানোর হিসাব যথেষ্ট নয়। কোন কাজের জন্য কত জনবল প্রয়োজন, কোন পর্যায়ে কী ধরনের কারিগরি দক্ষতা দরকার, মাঠপর্যায়ে কতটা ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন, কোথায় নতুন পদ সৃষ্টি করা দরকার এবং কোথায় প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে পদমর্যাদা, ক্যারিয়ার প্রগ্রেশন, প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব ও জবাবদিহির মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিএডিসিকে শুধু একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনের কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। কৃষকের হাতে সময়মতো মানসম্মত বীজ, সার ও সেচ পৌঁছানো মানে শুধু একটি সরকারি সেবা দেওয়া নয়; এর সঙ্গে দেশের খাদ্য উৎপাদন, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ জড়িত। তাই বিএডিসির সংস্কার হতে হবে কৃষককেন্দ্রিক, উৎপাদনমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর ও ভবিষ্যতমুখী। সংস্কারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষ কমানো নয়; প্রয়োজনীয় মানুষকে সঠিক কাজে, সঠিক দক্ষতায় এবং সর্বোচ্চ কার্যকারিতার সঙ্গে কাজে লাগানো। প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি রক্ষা করে নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং তরুণ জনশক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কথা শুনতে হবে, তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব দিতে হবে এবং কৃষকের প্রয়োজনকে সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।এখন প্রশ্ন হলো বিএডিসি কি পুরোনো কাঠামোর ভারবহন করে ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা হারাবে, নাকি সময়ের দাবি মেনে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলবে? উত্তরটি শুধু বিএডিসির জন্য নয়, দেশের কৃষির ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি যদি আধুনিক হয়, কৃষক যদি পরিবর্তিত হন, প্রযুক্তি যদি প্রতিনিয়ত এগিয়ে যায়, তাহলে কৃষির সহায়ক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও একই গতিতে এগিয়ে যেতে হবে। তাই এখন সময় এসেছে বাস্তবভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক ও দূরদর্শী সংস্কারের। বিএডিসিকে ছোট করার সময় নয়—এ প্রজন্মের কৃষকের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণে বিএডিসিকে আরও শক্তিশালী, দক্ষ, অভিজ্ঞতানির্ভর, প্রযুক্তিনির্ভর ও গতিশীল করে গড়ে তোলার সময় এখন। পুরোনো কাঠামোয় ভবিষ্যতের কৃষি নয়; প্রয়োজন ভবিষ্যতের কৃষির জন্য নতুন বিএডিসি।[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)]

আদিবাসী: ভাষা-সংস্কৃতি ও ভূমির অধিকার চাই

আদিবাসীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি ও নানা কর্মসূচি চলছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের উন্নয়নের নামে কাজ করছে। দেশি-বিদেশি দাতাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থও আসছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের সুফল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বড় অংশের কাছে কতটা পৌঁছেছে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ব্যবহার করে অন্যরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার ও জীবনমানের পরিবর্তন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে হয়নি।এ অবস্থায় আদিবাসীদের নিজেদেরই সামনে আসতে হবে। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, শিক্ষা ও জ্ঞানকে সমন্বিত করে বিশ্বের কাছে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে হবে। নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যও তাদের আরও সংগঠিত হতে হবে। অন্যের সহানুভূতির ওপর নির্ভর করে কোনো জনগোষ্ঠীর স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়।বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যেও আদিবাসীদের অধিকার ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়। ২০০৩ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আদিবাসীদের দেশের সমান মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বলেছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে আদিবাসীদের ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি আদিবাসীদের উন্নয়নে তাদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষকেরাও বহুবার বলেছেন, তাদের মানবাধিকার নিশ্চিত না করে দারিদ্র‍্য বিমোচন বা উন্নয়নের কথা বলা অর্থহীন। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের প্রতিটি পর্যায়ে আদিবাসীদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন।গণমাধ্যমেও আদিবাসীদের বিষয় যথাযথভাবে উঠে আসে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভূমি দখল, নির্যাতন, উচ্ছেদসহ নানা ঘটনা ঘটলেও অনেক সময় তা জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে না। ফলে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও আদিবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সীমিত। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ, নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার এখনো যথেষ্ট নয়। অথচ একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা তার অস্তিত্ব রক্ষার সঙ্গেই সম্পর্কিত।আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের কিছু দাবি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির আইনগত অধিকার, বেদখল হওয়া জমি পুনরুদ্ধার, ছিন্নমূলদের পুনর্বাসন, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা, প্রতিটি জেলায় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, নির্যাতন বন্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা, পৃথক মন্ত্রণালয় এবং ভূমি অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা। এসব দাবি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত অবস্থান প্রয়োজন।দুঃখজনক হলো, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো আদিবাসীদের অধিকারের কথা বললেও পরে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে আদিবাসীদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।আদিবাসীদের উন্নয়ন কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি তাদের নাগরিক ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। তাদের উন্নয়নের নামে প্রকল্প গ্রহণ করে তাদের বাইরে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। তাদের নিজেদের অংশগ্রহণেই উন্নয়নের পরিকল্পনা করতে হবে। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি ও পরিচয় রক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।বাংলাদেশের বৈচিত্র‍্যই দেশের শক্তি। তাই আদিবাসীদের পিছিয়ে রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দূর করতে হবে। লোকদেখানো বক্তব্য নয়, আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগই এখন প্রয়োজন।[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

একটি আইফোন কি জীবনের চেয়েও বড়

অপ্রতিমের মৃত্যু শুধুই একটি ফোনের গল্প নয়। মানুষ, বাজার, মর্যাদা, বৈষম্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে এক ভয়ংকর প্রশ্ন। অপ্রতিমের বাবা শোকে পাথর হয়ে প্রশ্ন করেছেন—“সামান্য একটা আইফোনের জন্য ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হলো?” এই প্রশ্নটির ভেতরে আটকে আছে পুরো ঘটনার ভয়াবহতা।তবে একটি ফোন; বিনিময়ে একটি শিশুর জীবন— এই প্রশ্নটি আরও গভীর। একটি আইফোন কি সত্যিই জীবনের চেয়ে বড় হয়ে গেছে, নাকি গভীর সামাজিক অসুখের দৃশ্যমান প্রতীক, যেখানে মানুষের মূল্য ক্রমশ তার মানবিকতার বদলে তার সম্পদ, ভোগক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা ও দৃশ্যমান সাফল্য দিয়ে মাপা হচ্ছে?অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়। এটি সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়। একটি ফোনের দাম আর একটি জীবনের মূল্য এক জিনিস নয়। একটি আইফোনের বাজারমূল্য যতই হোক, তার সঙ্গে একটি মানুষের জীবনের কোনো অর্থনৈতিক তুলনা সম্ভব নয়। মানুষের জীবনকে টাকার অঙ্কে মাপা যায় না।প্রশ্নটি আজ সামনে আসার কারণ হচ্ছে, অর্থনীতি আমাদের অদ্ভুত এক বাস্তবতা শিখিয়েছে। বাজারে কিছু জিনিসের দাম আছে ঠিকই, তবে সব কিছুর মূল্য কিন্তু নেই। একটি ফোনের দাম নির্ধারিত হয় তার উৎপাদন খরচ, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন, সরবরাহব্যবস্থা, ব্র্যান্ড, বিপণন, মুনাফা, কর ও বাজারের চাহিদাসহ বহু বিষয়ের মাধ্যমে। কিন্তু একটি শিশুর জীবনের কোনো ‘বাজারদর’ নেই। তার মূল্য অর্থনৈতিকভাবে বিচারও করা সম্ভব নয়। যা অন্তর্নিহিত মানবিক মূল্য। সভ্যতার মূল শিক্ষাও এখানেই। বাজারের মূল্য আর মানুষের মূল্য এক নয়। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন বাজারের মূল্যবোধ মানুষের নৈতিক মূল্যবোধকে গ্রাস করতে থাকে।আইফোন একটি প্রযুক্তিপণ্য। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক প্রতীকও। বিখ্যাত মার্কিন অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী থর্সটেইন ভেবলেনের ‘প্রদর্শনমূলক ভোগ’-এর ধারণাটি এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। মানুষ অনেক সময় কোনো বস্তু শুধু ব্যবহারিক প্রয়োজনের জন্য কেনে না; সেই বস্তুটি তার সামাজিক অবস্থান, রুচি, সামর্থ্য বা মর্যাদার সংকেতও বহন করে।যেমন একটি দামি গাড়ি শুধু যাতায়াতের যন্ত্র নয়। একইভাবে দামি ঘড়ি শুধু সময় দেখায় না, ব্র্যান্ডের পোশাকও শুধু শরীর ঢাকে না। তাই একটি আইফোন শুধু ফোন নয়, এর পেছনে পড়ে থাকে বড় একটা সামাজিক গল্প। এসব বস্তু কখনো কখনো সামাজিক ভাষায় বলে—‘আমি কে।’ অর্থাৎ পণ্যটি তখন ব্যবহারিক বস্তু থেকে ‘মর্যাদার প্রতীক’-এ পরিণত হয়।এখানে অপ্রতিমের ঘটনাটি আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। যে সমাজে বস্তু সামাজিক মর্যাদার সংকেত হয়ে ওঠে, সেই সমাজে সেই বস্তু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও কি কখনো অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হয়ে উঠতে পারে? এক কথায় উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, পারে।তবে আইফোনকে সরাসরি অপ্রতিম হত্যার কারণ বলা যাবে না। কারণ একটি দামি ফোন দেখা আর সেটি পাওয়ার জন্য হত্যাকাণ্ড ঘটানোর মাঝখানে অপরাধপ্রবণতা, সুযোগ, সিদ্ধান্ত, সামাজিক পরিবেশ, আইন প্রয়োগসহ বহু স্তর রয়েছে। যার মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই শহরে কেউ এমন একটি ফোন ব্যবহার করে যার দাম একজন নিম্নআয়ের মানুষের বহু মাসের আয়ের সমান। আবার অন্য কেউ সেই ফোনটিকে দেখে নিজের অক্ষমতার প্রতীক হিসেবে। এখানেই তৈরি হতে পারে “আপেক্ষিক বঞ্চনা”। নিজের জীবনকে কেউ কেবল নিজের অবস্থার সঙ্গে নয়, অন্যের অবস্থার সঙ্গেও তুলনা করতে শুরু করে।আমার নেই, তার আছে; সে পারছে, আমি পারছি না; সে সম্মান পাচ্ছে, আমি পাচ্ছি না; তার জীবন সফল, আমার জীবন ব্যর্থ —এসব তুলনা সবসময় যে অপরাধ তৈরি করে তা নয়। তবে তীব্র সামাজিক বৈষম্য, সীমিত সুযোগ, ভঙ্গুর সামাজিক সুরক্ষা, অপরাধী সংস্কৃতি, মাদক, সহিংসতার অভিজ্ঞতা আর দুর্বল সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যখন এই বঞ্চনাবোধ যুক্ত হয়, তখন ঝুঁকি বাড়তে পারে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শিশু ও কিশোর সহিংসতা বিষয়ক বিশ্লেষণেও দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য, বেকারত্ব, মাদক, সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ, দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ও দুর্বল আইন প্রয়োগকে বিভিন্ন স্তরের ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।অর্থাৎ অপ্রতিমের হত্যাকে শুধু ‘লোভী অপরাধীর কাজ’ বললে আমরা হয়তো অপরাধীকে ধরতে পারব, কিন্তু অপরাধের সামাজিক পরিবেশটি বুঝতে পারব না।আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রভাবশালী তাত্ত্বিক এমিল ডুর্খেইমের “অ্যানোমিয়া” ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। সহজ বাংলায়—সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যখন মানুষের আকাঙ্ক্ষা, আচরণ ও বাস্তবতার সঙ্গে তাল হারিয়ে ফেলে, তখন এক ধরনের নৈতিক-সামাজিক শূন্যতা তৈরি হয়।  যেমনটি আমরা কোনো তরুণদের বলি—সফল হও; কিন্তু কখনও বলি না, সফলতার অর্থ আসলে কী? আবার বলে বসি, বড় হও; অথচ, বড় হওয়ার মাপকাঠি কী, সেটাই ব্যাখ্যা করি না। ঠিক একইভাবে আমরা বলি, দামি ফোন রাখো, ভালো গাড়ি চালাও, ভালো বাড়িতে থাকো। বলি না, ভালো মানুষ হও।সাফল্যের এই দৃশ্যমান প্রতীকগুলো নৈতিক সাফল্যের জায়গা দখল করতে পারে। ফলে অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের সেই প্রশ্নই করে— আমরা সন্তানদের শুধুই সাফল্যের ভাষা শেখাচ্ছি, অথচ জীবনের মূল্য শেখাচ্ছি না? প্রশ্ন আসে, সন্তানদের শিক্ষা কি শুধুই চাকরির জন্য?এখানেই হাজির হয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রশ্ন। আমাদের শিক্ষার বড় অংশ এখনও পরীক্ষার ফল, জিপিএ, ভর্তি পরীক্ষা, চাকরি, আয়—এসবের চারপাশে ঘোরে। বলছি না এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়।  কিন্তু একটি শিশুকে কি আমরা কখনও শেখাই—কেন অন্য মানুষের জীবনকেও সম্মান করতে হবে? রাগ হলে কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়? প্রত্যাখ্যান কীভাবে সামলাতে হয়? লোভ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়? অন্যের সম্পদ দেখে হীনম্মন্যতা বা ঈর্ষা হলে কীভাবে তা মোকাবিলা করতে হয়? ডিজিটাল জগতে প্রলোভন ও অপরাধ থেকে কীভাবে নিজেকে দূরে রাখতে হয়? সহিংসতা কখনও সমস্যার সমাধান নয়—এই শিক্ষা কি আমরা দিচ্ছি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও কিশোর সহিংসতা প্রতিরোধে জীবনদক্ষতা, রাগ নিয়ন্ত্রণ, দ্বন্দ্ব সমাধান, সামাজিক দক্ষতা ও স্কুলভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ শিক্ষা শুধু কীভাবে উপার্জন করব, তা শেখালেই হবে না। শিক্ষাকে শেখাতে হবে—কীভাবে মানুষ হব।সরলীকরণের প্রশ্ন হচ্ছে, প্রযুক্তি কি অপরাধ তৈরি করে? এখানে প্রযুক্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও ভুল। মূলত, আইফোন কোনো হত্যাকারী তৈরি করে না।  স্মার্টফোন নিজেও অপরাধী নয়।প্রযুক্তি মানুষের সক্ষমতা বাড়ায়। সেই সক্ষমতা ভালো কাজেও ব্যবহার করা যায়, অপরাধেও।আজ অপ্রতিমের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজই তদন্তকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে এবং সেই সূত্রে ফোন উদ্ধার হয়েছে।  অর্থাৎ প্রযুক্তি একই সঙ্গে ঝুঁকি ও প্রতিরোধের হাতিয়ার।  সমস্যা তাই প্রযুক্তিতে নয়; প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটি কী ধরনের?এখানে আইফোনের আরেকটি ভয়ংকর দিক হচ্ছে, এটি ‘মূল্যবান বস্তু’ থেকে ‘লক্ষ্যবস্তু’ হয়ে যেতে পারে। একটি দামি ও সহজে বহনযোগ্য পণ্য অপরাধের বাজারে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। এখানে অর্থনীতির খুব সরল একটি সূত্র কাজ করে। বেশি দাম, সহজে বহনযোগ্য, সহজেই বেচাকেনা- সেখান থেকে অপরাধের লক্ষ্য। তবে এখানে শুধু শুধু পণ্যের দাম দায়ী নয়।  প্রশ্নটি হচ্ছে—অপরাধী কি মনে করছে সে সহজে পার পেয়ে যাবে?আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? চুরি করা ফোনের বাজার আছে কি? চুরি করা পণ্য শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? অপরাধীর ঝুঁকি কতটা? অপরাধের সম্ভাব্য লাভ ও শাস্তির সম্ভাব্য ক্ষতির মধ্যে কোনটি বেশি? এগুলো নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অপরাধতত্ত্বের প্রশ্ন।এখানে রাষ্ট্রতত্ত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ দার্শনিক টমাস হবসের সামাজিক চুক্তির ধারণায় রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক যুক্তি হলো—মানুষ যেন পরস্পরের বিরুদ্ধে অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতায় না যায়। আধুনিক রাষ্ট্রের শক্তি এখানেই যে, ব্যক্তিগত প্রতিশোধের বদলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।একজন মানুষের ফোন চুরি হয়েছে—সে নিজে বিচার করবে না। একজন মানুষ প্রতারিত হয়েছে—সে নিজে শাস্তি দেবে না। একজন মানুষ অপমানিত হয়েছে—সে খুনি হয়ে উঠবে না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বলবে—অপরাধ হয়েছে। তদন্ত হবে। প্রমাণ সংগ্রহ হবে। বিচার হবে।এই ব্যবস্থা দুর্বল হলে মানুষের কাছে অপরাধের সম্ভাব্য লাভ ও শাস্তির ভয়—দুটির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সহিংসতার সামাজিক ঝুঁকির মধ্যে দুর্বল শাসনব্যবস্থা, দুর্বল আইন প্রয়োগ, দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ও অপর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।তাই অপ্রতিমের হত্যার পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ‘খুনি ধরেছি’ বলায় শেষ নয়। রাষ্ট্রকে এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে খুন করার আগে অপরাধী জানবে—ধরা পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিচার এড়ানোর সুযোগ ক্ষীণ।বিবর্তনতত্ত্ব আমাদের আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য শেখায়। মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা নতুন নয়। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ খাদ্য, আশ্রয়, সঙ্গী, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা—সবকিছুর জন্য প্রতিযোগিতা করেছে। সামাজিক মর্যাদার সংকেতও মানবসমাজে নতুন নয়। অর্থাৎ মর্যাদার প্রতিযোগিতা বা সামাজিক অবস্থানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানবসমাজের একেবারে নতুন আবিষ্কার নয়।কিন্তু আধুনিক ভোক্তা অর্থনীতি এই প্রতিযোগিতাকে অভূতপূর্ব মাত্রায় দৃশ্যমান করেছে।সামাজিকমাধ্যম আবার সেই দৃশ্যমানতাকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। আগে আপনি জানতেন আপনার প্রতিবেশীর বাড়ি কত বড়। এখন আপনি একই দিনে শত মানুষের গাড়ি, ফোন, বাড়ি, ভ্রমণ, পোশাক, জীবনযাপন দেখতে পারেন। ফলে তুলনার ক্ষেত্রটি স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক হয়ে গেছে। মানুষের পুরোনো মর্যাদা-প্রতিযোগিতা পেয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির অসীম প্রদর্শনক্ষেত্র। বিপদ এখানেই।  অপ্রতিম আমাদের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি রেখে গেছে। অপ্রতিমের হত্যার বিচার অবশ্যই হতে হবে। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত হতে হবে। যারা দায়ী, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের নিজেদেরও বিচার করতে হবে। আমরা সন্তানকে কী শেখাচ্ছি? দামি ফোন রাখলে তুমি সফল, নাকি মানুষকে সম্মান করলে তুমি সফল? আমরা শিক্ষাকে কী বানাচ্ছি? শুধু উপার্জনের যন্ত্র নাকি মানুষ হওয়ার প্রশিক্ষণ? আমরা অর্থনীতিকে কী শেখাচ্ছি? আরও বেশি ভোগ নাকি ন্যায্য সুযোগ ও মর্যাদা? আমরা প্রযুক্তিকে কী বানাচ্ছি? মানুষের সময় ও মনোযোগ দখলের যন্ত্র, নাকি— জ্ঞান, নিরাপত্তা ও মানবিক সংযোগের মাধ্যম?আমরা রাষ্ট্রকে কী হিসেবে চাই? ঘটনার পর খুনি ধরুক নাকি অপরাধের আগে এমন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করুক, যেখানে অপরাধ করার ঝুঁকি বেশি এবং মানুষের জীবন নিরাপদ?অপ্রতিমের মৃত্যুর সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা হয়তো এটাই—আইফোনের দাম আছে। মানুষের জীবনের দাম নেই—কারণ মানুষের জীবনের মূল্য আছে।দাম আর মূল্য এক জিনিস নয়। বাজার কোনো পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে পারে। রাষ্ট্র কোনো অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করতে পারে। অর্থনীতি আয়-ব্যয়ের হিসাব করতে পারে। প্রযুক্তি মানুষের সময় মাপতে পারে। কিন্তু মানুষের মর্যাদার হিসাব কোনো বাজার, কোনো অ্যালগরিদম, কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো রাষ্ট্র কিংবা কোনো ফোন দিয়ে করা যায় না। ১৩ বছরের অপ্রতিমের জীবন আমাদের সেই মৌলিক সত্যটিই আবার মনে করিয়ে দিল। একটি ফোন হারিয়ে গেলে নতুন ফোন কেনা যায়। টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়। ক্ষমতা হারালে আবার ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করা যায়। কিন্তু—একটি শিশুর জীবন একবার চলে গেলে তাকে কোনো প্রযুক্তি, কোনো অর্থনীতি, কোনো রাষ্ট্র, কোনো বিচারই ফিরিয়ে দিতে পারে না।তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত আইফোনকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আমাদের নিয়ে। আমরা কি এমন একটি সমাজ বানাতে চাই, যেখানে মানুষ জিনিসের জন্য বাঁচবে—নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে জিনিস মানুষের জন্য থাকবে? অপ্রতিমের রক্তাক্ত শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে সভ্যতার কাছে প্রশ্নটি এখন একেবারেই সরল—একটি আইফোন কি জীবনের চেয়েও বড়? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে সেই ‘না’ শুধু কথায় নয়—আমাদের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগ, আইন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেও প্রমাণ করতে হবে।লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ব্রিকস সম্মেলন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক হিসাব

১২-১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত হলো ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। ২০০৬ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের হাতে এই ফোরামের যাত্রা শুরু। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে নাম হয় ব্রিকস। বর্তমানে সদস্য ১১টি—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া। এছাড়া ১০টি অংশীদার দেশ আছে—বেলারুশ, বলিভিয়া, কিউবা, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নির্মাণ’। এই জোট এখন বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ, জনসংখ্যার ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ ও বাণিজ্যের ২৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। বৈশ্বিক দক্ষিণের এই বৃহৎ সমাবেশে জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধানসহ আসিয়ান, আফ্রিকান ইউনিয়ন, লাতিন আমেরিকার সেলাক, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ ও বিমসটেকের চেয়ারদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।সম্মেলনের মূল অর্জন যৌথ ঘোষণা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, ইরান-আমিরাত বৈরিতা এবং চীন-ভারত সীমান্তের টানাপোড়েনের মধ্যেও ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা ২০২৬’ সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে সর্বোচ্চ সংযম, বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা, গাজায় যুদ্ধবিরতি, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, বাছবিচারহীন শুল্ক ও একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের সংস্কারের আহ্বান আছে। ঘোষণায় জাতিসংঘের কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, যা পরোক্ষভাবে ভারত ও ব্রাজিলের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের দাবির পক্ষে যায় এবং ভবিষ্যতে এ নিয়ে চীনের বাধা শিথিল হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে।অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্রিকস এখন পশ্চিমা আধিপত্যের বিকল্প তৈরির চেষ্টা করছে। আন্তঃব্যাংক লেনদেনের সুইফট নেটওয়ার্ক থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়ার পর রাশিয়া ও চীন নিজস্ব বিকল্প নেটওয়ার্ক জোরদার করেছে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানো, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত বিভিন্ন দেশের অর্থ বাজেয়াপ্ত করার মতো ঘটনার পর রিজার্ভের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ভাবনা এবং ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর আলোচনা এবার জোর পেয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনা প্রাসঙ্গিক, কারণ দেশের আমদানির বড় অংশ ডলারে পরিশোধ করতে হয়।এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যোগদান না করা নিয়ে দুই ধরনের যুক্তি আছে। ভারত তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়নি, আমন্ত্রণ ছিল বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর বহুপাক্ষিক অনুষ্ঠানের ফাঁকে হতে পারে না। আবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৩ সালের ২২-২৪ আগস্ট জোহানেসবার্গে ১৫তম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে। ফলে এবার না যাওয়াকে অনেকে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন।কিন্তু না যাওয়ার পেছনে শুধু প্রটোকল নয়, দেশের ভেতরের রাজনীতিও কাজ করেছে। সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সচিবালয়ে বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সহজীকরণের জন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরসহ সব পলাতক আসামিকে ফেরত দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও ১৬ আগস্ট বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন না বলে ভারতীয় হাইকমিশনারকে জানানো হয়েছে। বিরোধী রাজনীতিতেও ভারতবিরোধী সুর চড়া। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি নিয়মিতভাবে কারণে-অকারণে ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে। এই চাপের মধ্যে ব্রিকসের মতো মঞ্চে গেলে সরকার দেশে সমালোচনার মুখে পড়ত, এমন আশঙ্কাও ছিল।এখন প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্তে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব পড়বে কি না। যোগ দিলে সাইডলাইনে ইরানের প্রেসিডেন্ট ও আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্সের মতো নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, চীন-ভারতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে করমর্দনের সুযোগ, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে কম সুদে অর্থায়নের আলোচনা এবং সৌদি আরব, আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার মতো প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ত। এসব দেশ আমেরিকার ঘনিষ্ঠ হয়েও ব্রিকসে আছে, তাই যোগ দিলে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ হতো না। না যাওয়ায় সেই সুযোগ হাতছাড়া হলো। আবার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও অনিশ্চিত হয়ে গেল, কারণ প্রত্যর্পণের শর্ত জুড়ে দেওয়ায় দিল্লি সহজে ইতিবাচক সাড়া দেবে না। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হচ্ছে। তিস্তা ও সীমান্ত ইস্যুতে ওয়ান-টু-ওয়ান আলোচনা জরুরি। কিন্তু আলোচনার টেবিলে বসার পরিবেশ যদি প্রতিদিনের বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যে নষ্ট হয়, তবে ক্ষতি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই।ব্রিকসে বিমসটেক চেয়ার হিসেবে যোগ দিলে গুরুত্ব কমত, একথা ঠিক। কিন্তু একেবারে অনুপস্থিত থেকে একটি বড় বৈশ্বিক মঞ্চে নিজের অনুপস্থিতি জানান দেওয়াও কৌশলগত ক্ষতি। প্রত্যর্পণের দাবি থাকতেই পারে, কিন্তু সেই দাবিকে ভারত সফরের পূর্বশর্ত বানালে সম্পর্ক এগোবে কীভাবে? ভারতবিরোধিতা দিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হয়তো হাততালি পাওয়া যায়, কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য ও জ্বালানির মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান হয় না। বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য চলতে থাকলে সুসম্পর্কের পথ আরও কঠিন হবে। বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন আবেগ নয়, হিসাবি কূটনীতি—যেখানে প্রতিবাদ থাকবে, কিন্তু দরজা বন্ধ হবে না।(লেখকের নিজস্ব মত)লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

হঠাৎ কেন ‘জিন্নাহ গীতি’

নতুন এক বুদ্ধিবৃত্তিক মতলবি বয়ানের মুখোমুখি হয়েছেন দেশবাসী। ফেসবুক তোলপাড়; জিন্নাহ, জিন্নাহর কিসসা! গত ৫৬ বছরেও এমন হয়নি। হঠাৎ এ বছরে কেন এই জিন্নাহ গীতির এত দরকার হলো?দুই বছর আগের আগস্ট মাসে দেশে একটা রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল। প্রাণহানিসহ বহু বিধ্বংসী ঘটনা তাতে দেখতে হয়েছিল। তো, নাটক তা নিয়ে কম হয়নি। অবশেষে মাত্র ৬ মাস আগে নির্বাচিত নতুন এক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সংসদে বিরোধী দল নামে জামায়াতে ইসলামী আর কিংস পার্টি খ্যাত এনসিপি সরকারের বিরোধিতায় সকাল-বিকেল সরব। যেন এগুলো করাই তাদের একমাত্র কাজ। তবে ছায়া বাজেট, ছায়া মন্ত্রিসভার কথাও শোনা যায়; যা নিয়ে বুঝমান পাবলিক তুমুল হাসাহাসি করে।এই যে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত, তারা একাত্তর সালে এই বাঙালির জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে স্বজাতির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল। গড়ে তুলেছিল কুখ্যাত খুনি সংগঠন রাজাকার, আলবদর, আলশাম নামের নির্মম ঘাতক বাহিনী। যদিও সে অতীত কৃতকর্মের জন্য এরা কখনো অনুশোচনার ধার ধারেনি। বরং জাতিকেই নানা ঘোরপ্যাঁচে ফেলতে সব সময় মুখিয়ে থেকেছে। এই অবস্থায়, হঠাৎ চাগাড় দেওয়া উদ্দেশ্যমূলক জিন্নাহ গীতির কারণ কী?বিগত চব্বিশের তথাকথিত ৩৬ জুলাই সফল হলে এই জামায়াতি হার্মাদরাই জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার সমান্তরালে নতুন মতলবি বয়ান হাজির করেছিল। তাদের ভাষায়—চব্বিশ, জুলাই যুদ্ধ এবং জুলাই যোদ্ধা। এইটাকে তারা ব্র‍্যান্ডিং করার আপ্রাণ চেষ্টা করে এসেছে। তবে সাময়িক বিভ্রম জাগালেও গণরোষের মুখে ওই বয়ান ক্রমেই অচল। বরং জুলাই বললেই এখন পাবলিকের ধুম পিটুনি মিস হয় না!কারণ দীর্ঘ ১৮ মাস এই জুলাই নামের সংঘবদ্ধ অনাসৃষ্টি দেখেছে দেশবাসী। ফলে জামায়াতীরা বুঝে গেছে, এই দেশের আপাত নিরীহ শান্ত মানুষেরা জুলাই যুদ্ধ খাবে না; লাগবে কোনো নতুন আইটেম। তাই বাজারে এনেছে তাদের ‘মরহুম ফাদারে মিল্লাত’ জিন্নাহ নামের ফেলে দেওয়া গীতিকাব্য।এবার, ইতিহাসের ইমানদারিতে জিন্নাহ কাব্যটা খতিয়ে দেখা যাক! এই বাংলা ভূখণ্ড ১৯৪৭ সালেই এক স্বাধীন সত্তায় বিকশিত হতে পারত, যদি না দৃশ্যপটে জিন্নাহ থাকত! ২৩ বছরের পাকিস্তানি শোষণ ও নির্যাতন; একাত্তরে শতাব্দীর নির্মম গণহত্যা, গণধর্ষণ এই বাঙালি জাতিকে সইতে হতো না।১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে তখনকার নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশন বসেছিল। সেই অধিবেশনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক প্রস্তাব করেছিলেন—ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলমানদের জন্য কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে এবং রাষ্ট্রগুলো স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম থাকবে।বস্তুত, এইটি ছিল তখনকার প্রকৃত বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর গণমানুষের মনের কথা। এটিই পরে লাহোর প্রস্তাব নামে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছে। সেই স্মৃতি লাহোরে নির্মিত মনুমেন্টের গায়ে বহু ভাষায় আজও সংরক্ষিত রয়েছে। প্রস্তাবটি তখনকার মুসলিম লীগের প্রধান নেতা ফাদারে মিল্লাত ব্যারিস্টার জিন্নাহ বদলে ফেলেন। তিনি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস’-এর ‘এস’ কেটে শুধু ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেট’ বানিয়ে উপস্থাপন করেন।এ ঘটনায় শেরেবাংলার সঙ্গে তখন জিন্নাহর তুমুল বিরোধ হয়। তিনি ক্ষোভে-দুঃখে মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা থেকে মুসলিম লীগকে বের করে দেন এবং জোট করেন হিন্দু মহাসভার সঙ্গে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে করেন অর্থমন্ত্রী। মনে রাখা দরকার, সেই লাহোর প্রস্তাবের প্রণেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টির সভাপতি হিসেবে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে যোগদান করেছিলেন। সেই সময় তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। মুসলিম লীগও সেই জোট সরকারের অংশ ছিল। যদিও এই ঘটনায় পরে সে জোট ভেঙে যায়।উল্লেখ্য যে, তখনকার আরেক জনপ্রিয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী লাহোর সম্মেলনে যোগ দেননি। তার দাবি ছিল, দুই বাংলা মিলে একটি স্বাধীন যুক্তবাংলা করা। অর্থাৎ ১৯৪০ সালেই স্বাধীন ও সুবৃহৎ বাংলা নামের দেশ গড়ার সুযোগ এবং সম্ভাবনা এসেছিল। যা বিনষ্ট করেছে জিন্নাহ এবং তার অনুসারীরা।জিন্নাহ বুঝেছিলেন, ভারতের দুই দিকে একাধিক মুসলিমপ্রধান স্বাধীন রাষ্ট্র হলে বাঙালিদের নেতৃত্বে পূর্ব এলাকা হবে সবচেয়ে শক্তিশালী। আর পূর্ব-পশ্চিম এক রাষ্ট্র বানালে ক্ষমতা থাকবে পশ্চিমের হাতে, যার কেন্দ্র হবে করাচি। সহজ কথায়, তখনকার পরিস্থিতিতে, জিন্নাহ হলো স্টেটস-এর এস কেটে স্টেট বানানোর মুখ্য খেলোয়াড়; কংগ্রেসি নেহরু সেই খেলার সুযোগ করে দেওয়া ধূর্ত বানর এবং অর্ধ-উলঙ্গ বাপুজি গান্ধী ছিল দৃশ্যত এক নিমরাজি রেফারি!সেই একটি ‘এস’ শব্দ পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ বুঝতে সক্ষম দূরদর্শী শেরেবাংলা ফজলুল হক তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, লাহোর প্রস্তাবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তারই ফলশ্রুতি পরবর্তী ২৪ বছরের পাকিস্তানি জুলুম, নির্যাতন, দুঃশাসন; এবং শেষে একাত্তরে বাঙালির প্রাণঘাতী মুক্তিযুদ্ধ।এক নজরে—এই হলো মরহুম জিন্নাহ গীতি, যা হঠাৎ করে সামনে আনার কারণটা বোধগম্য। সবাই বোঝেন, চব্বিশের জামায়াতি পুঁজি এই যে জুলাই, তা আদতে কোনো যুদ্ধ নয়, স্রেফ সরকারবিরোধী স্থানীয়, স্বতঃস্ফূর্ত একটি গণঅভ্যুত্থান মাত্র। এমন হয়েছে এ দেশে আগেও একাধিকবার।সেগুলো কেউ যুদ্ধ বলেনি। পক্ষান্তরে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বিশ্ব কাঁপানো আন্তর্জাতিক ঘটনা; যাতে বিশ্ব পরাশক্তিগুলো ভয়ংকরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল একে অপরের বিরুদ্ধে। জুলাই তেমন কিছু নয় মোটেই। মুক্তিযুদ্ধে বিলোনিয়ার এক যুদ্ধের সঙ্গে গোটা জুলাই এক করলে আংশিক সমতাও আসবে না। ওটা জানেন জুলাই ব্যবসার তালেবরগণ। তবু মুক্তিযুদ্ধ খাটো করতে জুলাই যুদ্ধ সামনে আনার এত আয়োজন।দেখা যাচ্ছে, জুলাইয়ের দাপুটেরা এখন একে একে ‘জুলাই কৃতিত্ব’ অস্বীকারে লাইন ধরেছে। খোদ জাতিসংঘে ইউনূস কর্তৃক পরিচয় করিয়ে দেওয়া কথিত ‘জুলাই মাস্টারমাইন্ড’ উপদেষ্টা মাহফুজ সেই খেতাব নিতে নারাজ। দুঃস্বপ্নের ১৮ মাস যার দাপটে ধরণী কেঁপেছে, সেই উপদেষ্টা সজিব ভূঁইয়া এখন ছিপি পার্টি থেকে ভাগতে চাইছে। বহু হাজার কোটি টাকা লুট ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অন্যরাও খামোশ; তড়পানি আর নেই। কেউ আর জুলাইযুদ্ধের দায় নিতে চাইছে না।ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তো প্রকাশ্যেই দায় অস্বীকার করেছে; লুটপাটের সকল দায় সে চাপিয়েছে আসিফ, হাসনাত, মাহফুজ, নাহিদ এবং অন্য আরও জুলাইয়াদের ঘাড়ে। এমন ক্ষেত্রে আসলে এমনই ঘটে থাকে। কেউ আর দায় নিতে চায় না। এক মহা ধড়িবাজ আন্তর্জাতিক ঘোড়েলের সঙ্গে খেলতে গিয়েছিল কিছু না খেতে পাওয়া চুনোপুঁটির আন্ডারা!জামায়াতি ঘোড়েল টাকিগুলো ভালো করেই জানে, জুলাইয়ে সংঘটিত কায়েমি অনাসৃষ্টির দায় তাদের সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক দল বিএনপি ১৬ বছরব্যাপী আন্দোলন ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জুলাইকে একটি মোক্ষম আন্দোলন বিবেচনা করেছিল। কিন্তু এতে জড়িত অন্যদের ধান্দা ছিল ভিন্ন; যা তারা ঘটিয়েছে দেশবাসীর চোখের সামনে। তাদের রাজনীতিবিযুক্ত আক্রমণের চাপ বিএনপিকেও সইতে হয়েছে। এখন জুলাইয়ের বিধ্বংসী জামায়াতি দায়গুলো একে একে সামনে আসছে। তা থেকে নিষ্কৃতি পেতে, ভুক্তভোগী মানুষের নজর ভিন্ন খাতে সরাতে অতএব শুরু হয়েছে জিন্নাহ ক্যারিকেচার। আহা, যেন জিন্নাহ কত বড় ইমানদার ছিল! হায়, কোল্যাটারাল ড্যামেজ কন্ট্রোল; সমান্তরাল ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, প্রাবন্ধিক]

ভিডিও আরও দেখুন

১৩ বছর বয়সেই পুল মাতিয়ে সোনা জয় চীনা কিশোরীর

​মাত্র ১৩ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক সাঁতারের মঞ্চে ইতিহাস গড়েছেন চীনের উদীয়মান সাঁতারু ইউ জিদি। এশিয়ান গেমসে নিজের অভিষেক ইভেন্টেই তিনি দেশের জন্য সোনা জয় করেছেন। ২০ সেপ্টেম্বর জাপানের টোকিওতে আয়োজিত নারীদের ২০০ মিটার বাটারফ্লাই ইভেন্টে তিনি ২ মিনিট ৫.০৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং একই সঙ্গে নতুন এশিয়ান গেমস রেকর্ড গড়েছেন। তিন বছর আগের হাংঝু এশিয়ান গেমসে চীনেরই ঝাং ইউফেই ২ মিনিট ৫.৫৭ সেকেন্ড সময় নিয়ে রেকর্ড ও সোনা জিতেছিলেন, যা এবার প্রায় আধা সেকেন্ড কম সময় নিয়ে ভেঙে দিলেন এই কিশোরী। ইভেন্টে নিজের রূপাজয়ী স্বদেশি প্রতিযোগী চ্যাং মোহানের চেয়ে ৩.৩৬ সেকেন্ড এগিয়ে থেকে রেস শেষ করে ক্যারিয়ারের প্রথম বড় একক সোনা নিজের করে নেন তিনি। ​আগামী মাসে ১৪ বছরে পা দিতে যাওয়া ইউ জিদির জন্য এই অর্জন ক্যারিয়ারের একটি বড় মাইলফলক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সাঁতার অঙ্গনে তিনি গত বছর থেকেই তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে আসছেন। ২০১৫ সালের বিশ্ব সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপে মাত্র ১২ বছর বয়সে চীনের ৪ গুণন ২০০ মিটার ফ্রি-স্টাইল রিলে দলের হয়ে ব্রোঞ্জ জিতে তিনি ওই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ পদকজয়ী হয়েছিলেন। যদিও সেখানে তিনটি ব্যক্তিগত ইভেন্টে চতুর্থ স্থান পেয়ে পদক হাতছাড়া হয়েছিল, তবু তিনি দমে যাননি। এ বছরের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত একটি প্রতিযোগিতায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন রেগান স্মিথকেও পরাজিত করতে সক্ষম হন। ​মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি এত কম বয়সে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মানসিক ও শারীরিক চাপ সামলানো নিয়েও প্রতিনিয়ত আলোচনা তৈরি হচ্ছে। নিজের ওপর থাকা মানসিক চাপের বিষয়ে তিনি এর আগে স্মৃতিচারণ করে জানিয়েছিলেন, গত বছর চীনের ন্যাশনাল গেমসের আগে ৪০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলেতে ভালো করার প্রত্যাশা তার জন্য এতটাই চাপ তৈরি করেছিল যে একপর্যায়ে সেটি প্রায় অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। তবে সেসময় তার কোচ তাকে সাহস জুগিয়ে এগিয়ে যেতে এবং নিজের ওপর আস্থা রাখতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। পরে সেই জাতীয় আসরে তিনি মোট চারটি পদক অর্জন করতে পেরেছিলেন। ​বিশ্ব অ্যাকুয়াটিকসের নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য সর্বনিম্ন বয়স ১৪ বছর নির্ধারিত থাকে। তবে বিশেষ যোগ্যতা অর্জন করলে এর চেয়ে কম বয়সী প্রতিযোগীরাও অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। সেই ব্যতিক্রমী নিয়মের মধ্য দিয়েই বিশ্বমঞ্চে ইউ জিদির এই চোখধাঁধানো আগমন। ২০২৮ সালে যখন লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হবে, তখন তার বয়স হবে ১৫ বছর। ফলে ক্রীড়াবিশ্বে এখন থেকেই তাকে নিয়ে ব্যাপক প্রত্যাশা ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

১৩ বছর বয়সেই পুল মাতিয়ে সোনা জয় চীনা কিশোরীর