সংবাদ
শ্রমিকদের বিক্ষোভে অস্থির শিল্পাঞ্চল, ৮০ কারখানায় ছুটি

শ্রমিকদের বিক্ষোভে অস্থির শিল্পাঞ্চল, ৮০ কারখানায় ছুটি

টানা কয়েকদিন ধরে চলা পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ অন্যান্য দাবিতে সৃষ্টি হওয়া অস্থিরতার জেরে রাজধানীর উপকণ্ঠে সাভার ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে রোববার (১ নভেম্বর) অন্তত ৮০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।এর মধ্যে গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও সাভারের বেশ কিছু এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং আগুন দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়ার বরাত দিয়ে জানা গেছে, শুধুমাত্র সাভারেই অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন জানিয়েছেন, কালিয়াকৈরসহ আশপাশের অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে।প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালে অধিকাংশ কারখানায় কাজ স্বাভাবিক থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সকাল পৌনে ১১টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় শারমিন গ্রুপের কারখানার সামনে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নেন কয়েকটি কারখানার একদল শ্রমিক। এ সময় তারা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।পরে শিল্প পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরে যেতে অনুরোধ করলে তারা সড়কের একপাশে অবস্থান নেন। এ সময় শারমিন গ্রুপের শ্রমিকরা অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদেরও তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শারমিন গ্রুপের কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি একই এলাকার হা-মীম গ্রুপ, নিউএইজসহ আশপাশের একাধিক কারখানাতেও ছুটি দেওয়া হয়।বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন জানান, দাবির বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের কেউ শ্রমিকদের সঙ্গে এখনো কোনো আলোচনায় বসেনি। এ নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে ধোঁয়াশা রয়েছে। তিনি দ্রুত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানান।গাজীপুরের কালিয়াকৈরেও শ্রমিকদের বিক্ষোভ তীব্র আকার নেয়। সকালে রতনপুর এলাকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে সফিপুর বাজার এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নেন এবং বিক্ষোভ শুরু করেন।এই অস্থিরতার সুযোগে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যানে এবং ট্রপিক্যাল নামের একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আগুন নেভাতে গেলে বিক্ষোভরত শ্রমিকেরা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের বাধা দেন বলে জানা গেছে।কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘শ্রমিক আন্দোলনের কারণে আমরা ঘটনাস্থলে যেতে পারছি না।’গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, বেতন বৈষম্য দূরীকরণ এবং চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহালের দাবিতে পোশাকশ্রমিকেরা আন্দোলন করে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েকদিনে সাভার ও গাজীপুরে শ্রমিক অসন্তোষ নতুন মাত্রা পায়। আজকের বিক্ষোভ তারই অংশ।শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে শ্রমিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবির বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্পাঞ্চলের সংশ্লিষ্টরা।
২৭ মিনিট আগে

পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলা গণমাধ্যমের জন্য অশনি সংকেত: জেজেইউ

পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলা গণমাধ্যমের জন্য অশনি সংকেত: জেজেইউ

কাঁচাবাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে জাল টাকাসহ নারী আটক

কাঁচাবাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে জাল টাকাসহ নারী আটক

শ্রমিকদের বিক্ষোভে অস্থির শিল্পাঞ্চল, ৮০ কারখানায় ছুটি

শ্রমিকদের বিক্ষোভে অস্থির শিল্পাঞ্চল, ৮০ কারখানায় ছুটি

দেশজুড়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হলো ‘জাতীয় যুব দিবস-২০২৬’

দেশজুড়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হলো ‘জাতীয় যুব দিবস-২০২৬’

অভাবের সংসার থেকে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব লিকার

অভাবের সংসার থেকে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব লিকার

তাহসিফের রহস্যজনক মৃত্যু : সিসিটিভিতে দেখা যাওয়া সেই তরুণী গ্রেপ্তার

তাহসিফের রহস্যজনক মৃত্যু : সিসিটিভিতে দেখা যাওয়া সেই তরুণী গ্রেপ্তার

মোদি সরকারের বিরুদ্ধে রামলীলা ময়দানে মানুষের ঢল

মোদি সরকারের বিরুদ্ধে রামলীলা ময়দানে মানুষের ঢল

দুই দশক পর পূর্ণাঙ্গ হৃদরোগ চিকিৎসার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে

দুই দশক পর পূর্ণাঙ্গ হৃদরোগ চিকিৎসার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে

গৌরনদী মেডিকেলে দুই মাস ধরে বেতন বন্ধ, বিপাকে ১৬১ কর্মী

গৌরনদী মেডিকেলে দুই মাস ধরে বেতন বন্ধ, বিপাকে ১৬১ কর্মী

ধানক্ষেতের গর্ত থেকে অজ্ঞাত নারী-পুরুষের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার

ধানক্ষেতের গর্ত থেকে অজ্ঞাত নারী-পুরুষের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার

মতামতমতামত

ধর্মের নামে মব, বিচারের নামে বর্বরতা

সৌদি আরবে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার সিতির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বাংলাদেশে অনেকেই মর্মাহত। কিন্তু এ তো শরিয়া আইনেরই প্রয়োগ। যারা এই যুক্তিতে দেশে তৌহিদী জনতার নামে পিটিয়ে মারা জায়েজ মনে করেন, তাদের এই কান্না ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়। শরিয়া আইনের বীভৎস রূপ দেখে হাহুতাশ করলে তো আর পুরো শরিয়া মানা হলো না। এমন মৃত্যুদণ্ড সৌদিতে অহর্নিশ হচ্ছে। সেখানে গড়ে বছরে ৩০০ জনের বেশি মানুষের শিরোচ্ছেদ হয়। তারপরও অপরাধ কমে না। এতে প্রমাণিত, প্রকাশ্য বীভৎস শাস্তি অপরাধ কমায় না।আমরা সৌদির শিরোচ্ছেদে মৃত্যুদণ্ডে কাঁদছি, কিন্তু বাংলাদেশের ভেতরে আমরা কী করছি? তৌহিদী জনতার নামে মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে, বস্তাবন্দি করে হত্যা করছি। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর এই জোশ আরও বেড়েছে। সর্বশেষ বলি সাতক্ষীরার দেবহাটার ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। ধর্ম অবমাননার একটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে প্রথম দফায় মারধর করা হয়। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করলে রাত সাড়ে আটটায় সেখানেও ঢুকে দ্বিতীয় দফায় পিটুনি দেওয়া হয়। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেলে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। পরিবারের ভাষ্য, এটি পরিকল্পিত হত্যা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে অনার্স-মাস্টার্স করা, দুই শিশু সন্তানের জনক শামীম মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। স্ত্রীর সঙ্গে কলহের কথোপকথন রেকর্ড করে ছড়ানো হয়। স্থানীয় জামায়াত অফিসে সংগঠিত হয়ে হামলা করা হয়। আর নিজেকে মুফতি পরিচয় দেওয়া ফজলুল হক আমিনী ফেসবুক লাইভে ডেকে মব তৈরি করেন।আমরা এখন প্রতিদিনই এমন বস্তাবন্দি লাশ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে ভয়ংকর। টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে, ঢাকায় এক সমাবেশে চরমপন্থীরা সরকারকে হুমকি দিয়েছে—ধর্ম অবমাননাকারীকে সরকার মৃত্যুদণ্ড না দিলে তারা নিজেরাই তা দেবে। এটি আইএস-আল-কায়েদার ভাষা। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনেক মিছিলে আইএসের পতাকা দেখা গেছে। রংপুরের তারাগঞ্জে মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ হয়েছে এক হুজুরের হুমকিতে। ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের সব সরকারই প্রশ্রয় দিয়েছে। টাইমের মতে, আওয়ামী লীগ একই সঙ্গে দমন ও তুষ্ট করেছে, ভোটের জন্য কওমি মাদ্রাসা ছড়িয়ে দিয়েছে, ব্লগার হত্যায় প্রথমে উদাসীন ছিল। আবার এই কঠোর অবস্থানের বিরোধিতা করেছে বিএনপি, এমনকি হলি আর্টিজানকেও নাটক বলেছে। ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত আমলে বাংলা ভাইয়ের উত্থান আমরা দেখেছি। প্রকাশ্যে হাত-পা বেঁধে উল্টো ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। ৩২টি লাশের পরিচয় মিলেছিল। সহায়তা করেছিল পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত নেতারা। তখন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন বাবর।আমাদের ধর্মীয় শিক্ষায় গলদ আছে কি না, ভাবতে হবে। অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ উঠলেই মানুষ এত হিংস্র হয় কেন? বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ অন্যায় করে, ঘুষ খায়, মানুষ ঠকায়। কিন্তু ধর্ম নিয়ে কটূক্তির কথা শুনলেই রাস্তায় নেমে পড়ে। অথচ ব্যক্তিজীবনে ধর্মকর্মে একনিষ্ঠ নয়। আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের শাস্তি আছে, কিন্তু ‘অনুভূতি’র কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই, দেওয়াও সম্ভব নয়। এই অস্পষ্টতার সুযোগেই চলছে হত্যার উৎসব। তালিকাটি দীর্ঘ। বাগেরহাটে ছয় বছরের শিশু মুসলিমার বস্তাবন্দি গলাকাটা লাশ, কুষ্টিয়ায় সুফি পীর শামীম রেজাকে পিটিয়ে হত্যা, ভালুকায় হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ মহাসড়কে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়া, গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পোড়ানো, পটিয়ায় পার্থ বিশ্বাস, পাটগ্রামে মানসিক ভারসাম্যহীন জুয়েলকে ৪২০ মিটার টেনে পুড়িয়ে হত্যা—যেখানে ৬৫ শতাংশ ছিল কিশোর।এই মবের চেহারা দেখুন। দরবার ভাঙচুর ও হত্যায় অংশ নেওয়াদের মধ্যে শিশু, কিশোর, যুবক—দু-একজন ছাড়া কারও মুখে দাড়ি-টুপি নেই। বেশির ভাগ হাফপ্যান্ট আর লুঙ্গি পরা। তবে এদের যারা উত্তেজিত করে, তারা ভিন্ন জগতের মানুষ। তাদের বলা হয় ‘তৌহিদী জনতা’। এই বিক্ষুব্ধ জনসমষ্টি প্রচলিত আইন মানে না, প্রশাসন মানে না। ধর্ম নিয়ে বিতর্ককারীদের হত্যায় তারা স্বর্গীয় সুখ পায়। জিহাদের উত্তেজনায় জীবিত মানুষকে পুড়িয়ে মারে, কবর থেকে লাশ তুলে উল্লাস করে। মানুষ পোড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও এটাকে তারা ধর্ম অবমাননা মনে করে না। এমন জনগোষ্ঠী বেশি দেখা যায় পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে। বাংলাদেশে ভোট হারানোর ভয়ে বাম-ডান সব দল এই উগ্রতাকে সমীহ করে। তাই গণতান্ত্রিক নির্বাচন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তুলছে।এখানেই গাজীপুরের আউচপাড়ার ঘটনাটি প্রাসঙ্গিক। সাত বছরের ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসাশিক্ষক মোসলেহ উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ‘চুমু’র কথা স্বীকার করতেই স্বজনরা চড় মেরে গণপিটুনি দেন। এরপর আলেম সমাজ বলতে শুরু করেছে, ‘আইন নিজের হাতে নেবেন কেন, শিক্ষক অপরাধ করলে আইন আছে।’ অথচ এই আলেম সমাজই এত দিন ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল। ন্যায্য ক্ষোভ থেকে যখন মানুষ আইন হাতে তুলে নেয়, তখন বিচার থাকে না, থাকে শুধু মব। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর—এই নয় মাসে মব সহিংসতায় ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান সাইদুর রহমান ২০২৫ সালের মূল্যায়নে বলেছিলেন, ‘সমাজে অভূতপূর্ব নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। সরকার মব সহিংসতা বন্ধে কোনো উদ্যোগই নেয়নি।’ উত্তরায় ছিনতাইকারীকে পিটিয়ে ঝুলিয়ে রাখা, টঙ্গীতে তরুণকে পিটিয়ে হত্যা তারই ধারাবাহিকতা।ইসলামে মুরতাদের শাস্তি নিয়ে হাদিস আছে—‘যে দ্বীন পরিবর্তন করবে, তাকে হত্যা করো’ (বুখারি ৬৯২২)। সূরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতে অশান্তি সৃষ্টিকারীর জন্য মৃত্যুদণ্ড, শূলবিদ্ধ করা বা হাত-পা কাটার কথা আছে। কিন্তু সেখানে তওবার সুযোগ, বিচারকের রায়, সাক্ষ্য-প্রমাণের বাধ্যবাধকতাও আছে। সৌদি রাষ্ট্র যখন সেই প্রক্রিয়া না মেনে তাজিরের নামে শিরোচ্ছেদ করে, তখন তা যেমন বর্বরতা, তেমনি বাংলাদেশে রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া তৌহিদী জনতা যখন পিটিয়ে, ঝুলিয়ে, পুড়িয়ে মারে, তখন তা আরও বড় বর্বরতা। সৌদিতে রাষ্ট্র কল্লা কাটে, বাংলাদেশে মব কল্লা কাটে—পার্থক্য শুধু তলোয়ার কার হাতে। দুটোই দেখিয়ে দেয়, ধর্মকে যখন বিচারের বদলে প্রতিশোধের হাতিয়ার বানানো হয়, তখন অপরাধ কমে না, শুধু লাশের সংখ্যা বাড়ে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

কৃষির ভবিষ্যৎ: উৎপাদন বাড়ুক, বৈচিত্র‍্যও থাকুক

ক্রমবর্ধমান খাদ্যচাহিদা ও সীমিত কৃষিজমির বাস্তবতায় প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ জরুরি। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য মূল্যবান স্থানীয় জাতের জিনগত সম্পদ সংরক্ষণ করাও প্রয়োজন। এ জন্য দরকার বুদ্ধিমান ও ভারসাম্যপূর্ণ জাতনীতি।বাংলাদেশের কৃষি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রশ্নটি আর শুধু ‘কী চাষ করব’—এতে সীমাবদ্ধ নেই। বড় প্রশ্ন হলো, ক্রমশ কমতে থাকা কৃষিজমি থেকে ক্রমবর্ধমান মানুষের জন্য কীভাবে আরও বেশি খাদ্য উৎপাদন করা যাবে? একদিকে বাড়ছে জনসংখ্যা, খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা। অন্যদিকে কৃষিজমি সীমিত, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন কৃষিকে নতুন নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এই বাস্তবতায় কৃষিজমির পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ যতটা সীমিত, প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজন ততটাই অনিবার্য।এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ কোনো সাময়িক প্রবণতা নয়। এটি খাদ্যনিরাপত্তার বৃহত্তর প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত একটি কৃষিগত বাস্তবতা। একই জমিতে বেশি ফলন, স্বল্প জীবনকাল, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং অঞ্চলভেদে উপযোগী বৈশিষ্ট্যের কারণে উচ্চফলনশীল জাত কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে এই পরিবর্তনের অর্থ স্থানীয় জাতকে অস্বীকার করা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কোন জাত কোথায় কৃষকের জন্য বেশি লাভজনক, জাতীয় খাদ্যচাহিদা পূরণে বেশি কার্যকর এবং ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য বেশি মূল্যবান?সুতরাং উচ্চফলনশীল জাত ও স্থানীয় জাতের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করার চেয়ে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক একটি বুদ্ধিমান জাতনীতি। যেখানে অধিক উৎপাদন জরুরি, সেখানে উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ করতে হবে। আর যেসব স্থানীয় জাতের মধ্যে ভবিষ্যতে নতুন জাত উদ্ভাবন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া কিংবা পুষ্টি ও খাদ্যসংস্কৃতির জন্য মূল্যবান বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু বেশি উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য উৎপাদনশীলতা, লাভজনকতা, অভিযোজনক্ষমতা ও জিনগত বৈচিত্র‍্যরে মধ্যে সঠিক ভারসাম্যও জরুরি।বাংলাদেশের কৃষিতে স্থানীয় জাতের অবদান ঐতিহাসিক। কৃষকের বাছাই ও সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে অঞ্চলভেদে নানা বৈশিষ্ট্যের জাত গড়ে উঠেছে। কোনোটি খরা সহনশীল, কোনোটি জলাবদ্ধতা বা লবণাক্ততা সহনশীল। কোনোটি আবার স্বাদ, পুষ্টিমান কিংবা স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। এসব জাত আমাদের কৃষির ঐতিহ্য এবং মূল্যবান জিনগত সম্পদ। কিন্তু কৃষির প্রয়োজনও স্থির নয়। যে জাত একসময় একটি অঞ্চলের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট ছিল, বৃহত্তর খাদ্যচাহিদার বাস্তবতায় তা সব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। বেশি ফলন, স্বল্প জীবনকাল, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও বাজারের চাহিদা পূরণের সুবিধার কারণে উচ্চফলনশীল জাত কৃষির স্বাভাবিক বিবর্তনের অংশ হয়ে উঠেছে।উচ্চফলনশীল জাতের সঙ্গে সেচ, সুষম সার, যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত বালাই ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক চাষপদ্ধতির সমন্বয় কৃষির উৎপাদনক্ষমতায় বড় পরিবর্তন এনেছে। একই জমি থেকে বেশি ফলন এবং স্বল্প জীবনকালের জাতের মাধ্যমে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সীমিত কৃষিজমির দেশে এই পরিবর্তনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অধিক ফলনের তাগিদে জমির উল্লম্ব উৎপাদন বৃদ্ধির এটিই একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।তবে বেশি ফলনই শেষ কথা নয়। কোনো জাতের ফলন বেশি হলেও উৎপাদন ব্যয় বেশি হলে, ঝুঁকি বাড়লে কিংবা বাজারমূল্য কমে গেলে কৃষকের প্রকৃত লাভ নাও বাড়তে পারে। তাই জাতের সাফল্য মাপতে হবে ফলনের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, বাজারমূল্য, ঝুঁকি ও নিট আয়ের ভিত্তিতে। ভবিষ্যতের জাতনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতি হেক্টরে সর্বোচ্চ ফলনের পাশাপাশি টেকসই সর্বোচ্চ নিট আয় নিশ্চিত করা।জাত উন্নয়ন কর্মসূচির প্রত্যক্ষ ফল হলো নতুন জাত উদ্ভাবন, বীজ উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও সম্প্রসারণ। কিন্তু এর প্রকৃত সুফল আরও বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, জাতীয় উৎপাদন বাড়ানো, খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, উৎপাদনের ঝুঁকি কমানো এবং খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী করা। তাই শুধু কতটি নতুন জাত উদ্ভাবিত হলো, সেটিই বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, কৃষকের মাঠে এসব জাত কী পরিবর্তন আনতে পারল।এখানে স্থানীয় জাত ও উচ্চফলনশীল জাতকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। উচ্চফলনশীল জাত যেখানে উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বেশি উপযোগী, সেখানে তার সম্প্রসারণ অগ্রাধিকার পাবে। অন্যদিকে স্থানীয় জাতের যেসব বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতের কৃষির জন্য মূল্যবান, সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ প্রতিস্থাপন মানে বিলুপ্তি নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন।স্থানীয় জাতের গুরুত্ব এখানেই নতুনভাবে সামনে আসে। খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা কিংবা নির্দিষ্ট রোগ সহনশীলতার মতো বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতে নতুন জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সব স্থানীয় জাতকে বাণিজ্যিক চাষে ধরে রাখার প্রয়োজন না থাকলেও মূল্যবান জিনগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলা যাবে না। জিনব্যাংক, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে সংরক্ষণের মাধ্যমে এই সম্পদ নিরাপদ রাখতে হবে।জাত পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষকের বীজ ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় কৃষক নিজের উৎপাদিত ফসল থেকে বীজ সংরক্ষণ করতেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে বিনিময় করতেন। এখন প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক বীজব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এর সুফল হলো মানসম্মত বীজ ও উন্নত প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার। তবে একই সঙ্গে বীজের মান, দাম, প্রাপ্যতা এবং কৃষকের পছন্দের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও জরুরি। ভবিষ্যতের উচ্চফলনশীল জাতকে তাই শুধু বেশি ফলন দিলেই চলবে না। সেগুলোকে হতে হবে জলবায়ু সহনশীল, রোগ প্রতিরোধী, পানি ও অন্যান্য উপকরণ সাশ্রয়ী এবং কৃষকের জন্য লাভজনক।খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও নতুন রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বিবেচনায় জাত উন্নয়নের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত করতে হবে। এ জন্য প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির পাশাপাশি দ্রুত প্রজননপ্রযুক্তি (স্পিড ব্রিডিং) ও চিহ্নকনির্ভর নির্বাচন পদ্ধতির (মার্কার অ্যাসিস্টেড সিলেকশন) ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জাতের মূল্যবান বৈশিষ্ট্য আধুনিক প্রজননপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। উৎপাদনশীলতা ও অভিযোজনক্ষমতার এই সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতের জাত উন্নয়নের মূল শক্তি।এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলভেদে জাতের ফলন, উৎপাদন ব্যয়, নিট আয়, ঝুঁকি ও পরিবেশের উপযোগিতা মূল্যায়ন করতে হবে। নতুন জাত অবমুক্তির ক্ষেত্রে কৃষকের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানসম্মত বীজের উৎপাদন ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বীজ খাতের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যবান স্থানীয় জাত শনাক্ত করে সংরক্ষণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাতের সাফল্য মূল্যায়নের পদ্ধতিও বদলাতে হবে। শুধু ফলন নয়, কৃষকের নিট আয়, খাদ্যনিরাপত্তা, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, পরিবেশের ওপর প্রভাব ও জলবায়ু সহনশীলতাকেও মূল্যায়নের অংশ করতে হবে।বাংলাদেশের কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাতের গুরুত্ব ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। খাদ্যচাহিদা বাড়ছে, অথচ কৃষিজমি বাড়ছে না। ফলে প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে এই পরিবর্তন যেন একমুখী না হয়। সব অঞ্চলের মাটি, পানি, জলবায়ু ও বাজারের অবস্থা এক নয়। কোথাও সর্বোচ্চ ফলন গুরুত্বপূর্ণ, কোথাও খরা বা লবণাক্ততা সহনশীলতা। আবার কোথাও পুষ্টিমান কিংবা বাজারমূল্য বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। তাই ভবিষ্যতের কৃষিনীতির মূল কথা হওয়া উচিত—‘এক জাত সবার জন্য’ নয়, বরং ‘উপযোগী অঞ্চলে উপযোগী জাত’।কৃষির এই পরিবর্তনকে শুধু স্থানীয় জাতের জায়গায় উচ্চফলনশীল জাত বসানোর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আসলে সীমিত সম্পদে অধিক উৎপাদন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। একটি ভালো জাত এক মৌসুমের ফলন বাড়াতে পারে। কিন্তু একটি দূরদর্শী জাতনীতি বদলে দিতে পারে একটি দেশের খাদ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদনে উচ্চফলন, কৃষকের জন্য বেশি নিট লাভ, জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের জন্য জিনগত বৈচিত্র‍্য সংরক্ষণ। স্থানীয় জাত আমাদের কৃষির শিকড়, আর উচ্চফলনশীল জাত তার নতুন ডানা। শিকড়কে অস্বীকার করে নয়, বরং তার শক্তিকে কাজে লাগিয়েই কৃষিকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে হবে।[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)]

খাদ্যে ভেজাল: নীরব বিপর্যয়

ভেজাল খাদ্য মানুষের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে এটি মানুষের নৈতিকতারও অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। আধুনিক সভ্যতায় ‘ভেজাল’ শব্দটি আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এটি এখন কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং মানবতার জন্য এক নীরব বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। অতিমুনাফালোভী কিছু মানুষের কারণে আজ আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মিশছে বিষ।বর্তমানে চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি থেকে শুরু করে ফলমূল ও দুগ্ধজাত পণ্য—সব ধরনের খাদ্যেই রাসায়নিক ও ক্ষতিকর উপাদান মেশানোর অভিযোগ রয়েছে। ফরমালিন, কার্বাইড, বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত রং, ইউরিয়া এবং ক্ষতিকর সংরক্ষণকারী উপাদানের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে যকৃত ও কিডনির ক্ষতি, ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল পূর্ণ হওয়ার আগেই অনেকে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ, ভেজাল খাদ্যের এই আগ্রাসন মানুষের পার্থিব জীবনকে সংকুচিত করছে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।আজকের দিনে বাজার থেকে নির্ভেজাল খাদ্যপণ্য কেনা যেন ভাগ্যের ব্যাপার। চাল পালিশ করে চকচকে করা থেকে শুরু করে ফলমূল, শাকসবজি ও মাছে ফরমালিন ও কার্বাইডের যথেচ্ছ ব্যবহার এখন বহুল আলোচিত বিষয়। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ডিটারজেন্ট ও ইউরিয়া, গুঁড়া মসলায় ইটের গুঁড়া ও বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত রং, এমনকি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও শিশুখাদ্যেও ভেজালের অভিযোগ পাওয়া যায়। ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতুযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে যকৃতের রোগ, কিডনি বিকল, হৃদ্‌রোগ এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। আমরা পুষ্টির বদলে প্রতিনিয়ত শরীরে প্রবেশ করাচ্ছি দীর্ঘমেয়াদি বিষ।ভেজাল খাদ্যের এই রমরমা ব্যবসার পেছনে রয়েছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর চরম অনৈতিকতা এবং রাতারাতি ধনী হওয়ার অন্ধ লোভ। একশ্রেণির মানুষ অধিক মুনাফার জন্য অবলীলায় কোটি কোটি মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এই চক্র শুধু মানুষের পকেট কাটছে না, তাদের স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনও কেড়ে নিচ্ছে। যে সমাজ খাদ্যের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত জাঁকজমক অনেকটাই অর্থহীন।বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে খাদ্যে ভেজালের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর্তৃপক্ষ ১ হাজার ৭১৩টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ৫৭১টি নমুনায়, অর্থাৎ ৩৩ দশমিক ৩০ শতাংশে, ভেজাল, দূষণ কিংবা মানহীন উপাদান পাওয়া গেছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ৩০ শতাংশে পৌঁছায়। আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের রস ও পানীয়, সরিষার তেল, মাখন, সয়াবিন তেল, ডালডা এবং মধুতে সবচেয়ে বেশি ভেজাল বা দূষণ পাওয়া গেছে বলে কর্তৃপক্ষের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও আইসিডিডিআরবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিরাপদ খাদ্যের অভাবে দেশে প্রতিবছর বহু মানুষ ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।খাদ্যে ভেজাল দেওয়া বা খাদ্য নিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করাকে প্রায় সব বড় ধর্মেই গুরুতর অন্যায়, পাপ ও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। প্রধান ধর্মগুলোতে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও সততা ও মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়ে তাদের মধ্যে মিল রয়েছে।খাদ্যে ভেজাল ও বিষক্রিয়া রোধে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আইন প্রণয়ন, নিয়মিত তদারকি এবং উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের মাধ্যমে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এবং ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫ গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যে ভেজাল রোধ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকর করতে উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। ভেজাল খাদ্য উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রির বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাজার তদারকি ও পরিদর্শন কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হয়। মাঝেমধ্যে জরিমানা বা কারখানা সিলগালা করার খবর আমরা গণমাধ্যমে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব শাস্তি অপরাধের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত এবং সাময়িক। নিয়মিত ও কঠোর তদারকির অভাব, দুর্নীতির সুযোগ এবং আইনের ফাঁকফোকর গলে পার পেয়ে যাওয়ার কারণে অপরাধীরা বারবার একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। শুধু নামমাত্র জরিমানা করে এই সুসংগঠিত অপরাধচক্রকে দমন করা সম্ভব নয়। খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে এ ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে।তবে শুধু সরকারের সদিচ্ছা বা আইনের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। নাগরিক সমাজকেও এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। ভোক্তা হিসেবে আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। কৃত্রিম উপায়ে চকচকে করা কিংবা অসময়ে বাজারে আসা ফলমূল কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে অসাধু ব্যবসায়ীদের বর্জন করতে হবে। রাসায়নিকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করে পরিবেশবান্ধব কৃষিকাজকে উৎসাহিত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্যের উৎস তৈরি এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদে তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করা এখন সময়ের দাবি।খাদ্য মানুষের জীবনধারণের জন্য, জীবন কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। অথচ ভেজাল খাদ্যের এই নীরব আক্রমণ আমাদের প্রতিনিয়ত অসুস্থতার দিকে এবং পরিণামে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একটি সুস্থ ও সবল জাতি ছাড়া কোনো দেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে পারে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অসুস্থতা ও অকালমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাজার থেকে বিষের আধিপত্য দূর করতে হবে। অন্যথায় খাদ্যের মোড়কে মোড়ানো এই বিষ আমাদের সবাইকে অসময়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে।ভেজাল খাদ্য শুধু আমাদের সংক্ষিপ্ত জীবনের আয়ু কেড়ে নিচ্ছে না, মানুষের নৈতিকতাও নষ্ট করছে। যিনি খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছেন, তিনি মানবজীবনের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছেন। আর যিনি জেনেশুনে তা মুখ বুজে সহ্য করছেন, তিনিও এই সামাজিক অপরাধের বিস্তার রোধে নিজের দায়িত্ব পালন করছেন না।[লেখক: উপপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন]

১৩ সাংসদ হারানোর দাবি ঘিরে তুঙ্গে রাজনৈতিক জল্পনা!

নরেন্দ্র মোদীর সরকার কি এবার সত্যিই জোটের চাপে পড়তে চলেছে? একদিকে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতে সমাজবাদী পার্টির সাফল্য, অন্যদিকে এনডিএ-র গুরুত্বপূর্ণ শরিকদের নিয়ে নতুন রাজনৈতিক জল্পনা। সব মিলিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।তবে  টিডিপি এবং জেডিইউ এনডিএ ছেড়ে দিয়েছে, আভাস ভাসলেও  ভেতরের নিশ্চিত খবর এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে দুই শরিক দল জোট ছেড়েছে এবং মোদী সরকার এক ধাক্কায় ১৩ জন সাংসদ হারিয়েছে—এমন দাবি এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠিত নয়!২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলুগু দেশম পার্টি এবং নীতীশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড। দুই দলের সম্মিলিত সাংসদ সংখ্যা ২৮। এর বাইরে চিরাগ পাসোয়ানের লোক জনশক্তি পার্টি (রামবিলাস)-এর পাঁচ সাংসদও এনডিএ-র শক্তির অন্যতম স্তম্ভ।অর্থাৎ, জোটের কোনও গুরুত্বপূর্ণ শরিক সমর্থন প্রত্যাহার করলে তার রাজনৈতিক প্রভাব যথেষ্ট বড় হতে পারে। তবে রাজনৈতিক অসন্তোষ, সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি এবং আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছেড়ে দেওয়া—এই তিনটি বিষয় এক নয়।নাইডুর অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ?চন্দ্রবাবু নাইডুর রাজনৈতিক গুরুত্ব শুধু তাঁর দলের সাংসদ সংখ্যার জন্য নয়। অন্ধ্রপ্রদেশের উন্নয়ন, রাজ্যের আর্থিক সহায়তা এবং কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সম্পর্ক—এই বিষয়গুলিতে তাঁর অবস্থান এনডিএ-র সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ।অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশে সাম্প্রতিক বিধান পরিষদ নির্বাচনে বিজেপি ছয়টি এবং সমাজবাদী পার্টি পাঁচটি আসন পেয়েছে। বারাণসী ও লখনউয়ের মতো এলাকায় বিজেপির ধাক্কা রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই ফলাফলের পর উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য বলেছেন, সমাজবাদী পার্টি এমন জায়গায় জিতেছে যেখানে তাদের জেতার কথা ছিল না। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাহলে মোদী সরকারের সামনে আসল সংকট কোথায়?আসল প্রশ্ন, এনডিএ-র শরিকরা কি কেবল নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য কেন্দ্রের উপর চাপ বাড়াচ্ছে, নাকি জোটের ভিতরেই বড় কোনও পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে?বিরোধীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্ক এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অসন্তোষের প্রভাব এবার এনডিএ-র শরিকদের উপরেও পড়ছে। তবে শরিকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেই সরকার পড়ে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি।মোদী সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা—শরিকদের আস্থা ধরে রাখা এবং বিরোধীদের ক্রমবর্ধমান চাপ সামলানো।আর চন্দ্রবাবু নাইডু যদি ভবিষ্যতে কোনও বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেন, তার প্রভাব শুধু অন্ধ্রপ্রদেশে নয়, দিল্লির ক্ষমতার সমীকরণেও পড়তে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে এখনই জোট ভাঙনের নিশ্চিত খবর account করা যায়না।

‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ জয় বাংলা’ স্লোগান!

“জয় বাংলা বলতে মনরে আমার এখনো কেন ভাবো/আমার হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাবো/অন্ধকারে পুবাকাশে উঠবে আবার দিনমণি”। —মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এ গান শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের নয়, গোটা দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করত স্বাধীনতার মরণপণ লড়াইয়ে। মুক্তিযুদ্ধ তো শুধু স্বাধীনতার যুদ্ধ নয়, আমাদের কাছে এক আবেগময় অনুভূতিও বটে। মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি জয় বাংলা স্লোগানও আমাদের ভালোবাসার ও অতি আপন স্লোগান।১৯৭০ সালে ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আবুল খায়ের ছয় দফার আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে প্রখ্যাত অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, সৈয়দ হাসান ইমাম ও কবরী অভিনীত ‘জয় বাংলা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। গীতিকার ছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। চলচ্চিত্রটি সে বছর সেন্সরে জমা পড়লেও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার চলচ্চিত্রটির মুক্তি আটকে দিলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে তা মুক্তি পায়। কিন্তু ‘৭০ সালেই এ সিনেমার জন্য রেকর্ড করা শাহনাজ রহমতুল্লাহ এবং মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের কণ্ঠে কালজয়ী গান “জয় বাংলা বাংলার জয়/হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়/কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে/নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়...” প্রকাশ পেলে তা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনাসংগীত হিসেবে প্রচারিত হতো।জয় বাংলা, বাংলার জয়—মিশে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। জয় বাংলা স্লোগানের প্রতীকী শক্তিকে তুলে ধরতে একটি কৌতুকের প্রচলন হয়েছিল। গল্পটি এমন—১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী চুল কাটাচ্ছেন। হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে এল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান! ভয়ে তাঁর চুল খাড়া হয়ে গেল। নাপিত তখন মুচকি হেসে বললেন, ‘স্যার, আমি যখনই জয় বাংলা বলি, আপনার চুল খাড়া হয়ে যায়, আর আমার চুল কাটতে সুবিধা হয়!’ এটি নিছক একটি রম্য গল্প বা কাল্পনিক কৌতুক হলেও এর মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের প্রতীকী শক্তি এবং একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য।এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয় যে, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বা দেশের সংবিধানে ঘোষিত মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ বা বিরোধী গোষ্ঠী তথা জামায়াতে ইসলামী ও রাজাকার-আলবদর বাহিনীর বর্তমান সংস্করণ যারা আছেন, তাদের এ স্লোগানে গাত্রদাহ হয়। কিন্তু বিএনপির কেন গাত্রদাহ হতে যাবে? জয় বাংলা তো বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বা বাংলাদেশ চিরজীবী হোক স্লোগানকে নাকচ করে না। বা এর সঙ্গে বিরোধাত্মকও নয়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত কোনো এক মিছিল থেকে নাকি জয় বাংলা ধ্বনি শোনা গেছে। এ অভিযোগে বিএনপির নাম ব্যবহার করে সিপিবি অফিসের সামনে গভীর রাতে মব করা হলো। কয়েকজনকে মারধর করা হলো। সিপিবি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া দল। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় সিপিবির কোনো কর্মী এ স্লোগান উচ্চারণ করতেই পারে। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংযোগ বা সংশ্লিষ্টতা নেই, সংশ্লিষ্টতা আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের। মুক্তিযোদ্ধার দাফনে জামায়াত-শিবির বাধা প্রদান করলে বা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির ওপর হামলা হলে এবং তার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হতে হলে ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি উচ্চারিত হতেই পারে। যদিও সিপিবির মূল রণধ্বনি এটা নয়, আবার এ স্লোগান পরিত্যক্তও নয়। যতটুকু জানি, স্বাধীন দেশে সিপিবির মূল স্লোগান—ভাত, কাপড়, জমি, কাজ। তবে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাই যদি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, স্লোগানও তো পরিবর্তিত হতে পারে।এটাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে বাংলার মানুষ জয় বাংলাকে কিন্তু শুধু স্লোগান হিসেবেই দেখেনি। জয় বাংলার মাঝে খুঁজে পেতে চেয়েছে শোষণমুক্তি, গণতন্ত্র, সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা। ভালোবাসার রত্নকে মানুষ যত্রতত্র ব্যবহার করে না। তাতে রত্ন তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলে। ঠিক তেমনি আমাদের ভালোবাসার মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনিও সারাক্ষণ জপ করার বিষয় নয়। বিশেষত, যদি কোনো শাসকদল তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, কর্তৃত্ববাদী শাসন, জবরদস্তি ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা, আর্থিক খাতে লুণ্ঠন ও বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন ইত্যাদি গণবিরোধী কর্মকাণ্ডকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ও চেতনাকে হরহামেশা জপ করে থাকেন, তখন আর মুক্তিযুদ্ধ ও তার রণধ্বনি মানুষের মাঝে, বিশেষত বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মাঝে গভীর আবেদন সৃষ্টি করে না।বাংলাদেশের গৌরবময় জন্ম-ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘ সময় যাবৎ যে একঘেয়ে রেকর্ড বাজানো হয়েছে এবং ইতিহাসকে অনেকটা পারিবারিক সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, তা তরুণ প্রজন্মের মাঝে বিরক্তি সৃষ্টি করেছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক ইতিহাসও ঠিক ষাটোর্ধ্ব প্রজন্মের ন্যায় আজকের তরুণদের মনে একই ধরনের আবেগ সৃষ্টি করে না। অথচ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নির্মাণে মোট কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৮০ শতাংশ হচ্ছে তরুণ সমাজ। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গণতন্ত্রের চশমা পরে মুক্তিযুদ্ধকে দেখতে চায়। এসব চাহিদা পূরণ না হলে মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুও তাদের কাছে অপ্রধান হয়ে দাঁড়ায়। সেই তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষায় যদি রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপন করা না যায়, কথায় কথায় জয় বাংলা বলে মনের ঝাল মেটানো হয়তো যাবে, কিন্তু রাজনীতিটা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই আজ যারা দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথাসহ দেশের ইতিহাসকেই মুছে ফেলতে চায়, তাদের পরাভূত করতে হলে রাজনীতিটাকে পাথরের মতো স্থির হিসেবে না দেখে সৃজনশীলতার সঙ্গে তা নতুন ভাষায়, নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে হবে।আবার অপব্যবহার হয়েছে বলেই কি মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি পরিত্যাগ করতে হবে? নিশ্চয়ই নয়। তবে ফাঁপা বুলি হিসেবে না জপে অসমাপ্ত জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আর বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তার যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে। সেটাই সৃজনশীলতা। এ ক্ষেত্রে লেজুড়বৃত্তির জুজু দেখলে বিচ্ছিন্নতার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।এটা তো স্পষ্ট যে ২০২৪-এর রক্তাক্ত ঘটনাবলির পরে এমন এক উগ্রবাদী ধর্মান্ধ শক্তির উত্থান হয়েছে, তারা মুখে যা-ই বলুক, তাদের আক্রোশ কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা রেজিমের চেয়ে ’৭১-এর ওপরই বেশি। শুধু মুখ ফুটে বলতে পারছে না, ’৭১-এর আগেই ভালো ছিলাম। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিএনপি কর্মীরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সিপিবি অফিসে মব হামলা করবে, এটা বিশ্বাস হতে চায় না। ধারণা করি, দেশকে আরও অস্থিতিশীল করতে চায়, এমন শক্তি এ ঘটনার পেছনে থাকতে পারে।অস্থিতিশীলতার বিপদকে মোকাবিলা করতে হলে বিএনপিকে এটা বিবেচনায় রাখতে হবে, তাদের দলকে সমর্থন করেন না, এমন বিপুলসংখ্যক ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন এই আশা নিয়ে যে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এবার দেশ পরিচালনা করবেন। দেশের জন্মযুদ্ধবিরোধী শক্তির কাছে এবার অন্তত নত হবেন না। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আগের মতো একতরফা বয়ান না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেই সামরিক নেতৃত্বকে মর্যাদা দেওয়ার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বিএনপিকে নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়া, যা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেটা বিএনপি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হলে বিভাজনের শক্তি ও উগ্রপন্থা পরাজিত হবে। কিন্তু বিএনপি ইতিমধ্যে ‘আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের’ ইউনূসীয় ভূতে আচ্ছন্ন। এখন ‘জয় বাংলা স্লোগানের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করে’ কি বিএনপি অস্থিতিশীলতার শক্তির পাতা ফাঁদে পা দেবে?(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

উচ্চশিক্ষার সংস্কার: সমতা, জবাবদিহি ও আধুনিকায়ন জরুরি

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা গভীর কাঠামোগত স্থবিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সনদকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়েছিল। বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গেও এর তেমন সংযোগ ছিল না। ইউনেসকোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ৬ শতাংশ অথবা জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ করা উচিত। তবে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর আমাদের শিক্ষা বাজেট জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২৬ু২৭ অর্থবছরে তা ২ শতাংশে উন্নীত করা হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এটি এখনো সর্বনিম্ন। ইউনেসকোর বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বারবার বাজেটের এই সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তা ছাড়া, এই বরাদ্দের বড় অংশ অবকাঠামো ও প্রশাসনিক খাতে ব্যয় হয়। উদ্ভাবন ও গবেষণায় এর অবদান সামান্য।বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘ সময় পরও উপযুক্ত কর্মসংস্থান পেতে ব্যর্থ হয়। এর প্রধান কারণ শিল্প খাতের ব্যবহারিক চাহিদা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তথ্য বিশ্লেষণ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই যুগেও আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো দুই দশক আগের পাঠ্যসূচি আঁকড়ে ধরে রয়েছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। ঔপনিবেশিক শাসনামলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা মূলত পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একধরনের ঐতিহাসিক সামাজিক চুক্তির ফল ছিল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গের মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পর যে রাজনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল আংশিকভাবে একটি প্রতিকারমূলক উদ্যোগ। ফলে সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।প্রকৃতপক্ষে, এটি সুবিধাভোগীদের জন্য নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই অর্থে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সামাজিক অগ্রগতির একটি প্রতিষ্ঠান। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এটি গ্রামীণ কৃষক, জেলে, শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা এবং সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান সোপান হিসেবে কাজ করেছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে: বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান কি এখন নতুন ধরনের বৈষম্যকে বৈধতা দেয়, এমন নীতি গ্রহণ করবে?বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাধারা বা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ভর্তি করার বিষয়টি জুলাই-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য একটি নৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থীদের জন্য সাম্প্রতিক ভর্তি মানদণ্ড এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) বলেছিলেন, ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক শর্ত হলো একই ধরনের পরিস্থিতিতে একই নীতি প্রয়োগ করা। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদনকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড চালু করা হলে ন্যায়বিচারের এই সর্বজনীন নীতি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।মার্কিন দার্শনিক জন রলসের (১৯২১-২০০২) ‘এ থিওরি অব জাস্টিস’ গ্রন্থ অনুযায়ী, বৈষম্য কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উপকারে আসে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন প্রশ্ন হলো, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা কি সেই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, যাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন? প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, দেশীয় ও বিদেশি উভয় পাঠ্যক্রম অনুসরণকারী ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও অভিজাত শিক্ষাধারাগুলোর একটি। এই ধারার শিক্ষার্থীরা সাধারণত তুলনামূলকভাবে উন্নত ভাষাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং বৈশ্বিক শিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে। অবশ্যই এর ব্যতিক্রম রয়েছে। কিন্তু নীতি প্রণয়ন করতে হয় সামগ্রিক বাস্তবতার ভিত্তিতে, ব্যতিক্রমের ভিত্তিতে নয়। সামাজিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে কোথাও বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হলে তা হওয়া উচিত তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য। ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত সুবিধা পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য নয়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামাজিক কল্পনা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোরও অংশ। এর ইতিহাস সাধারণ মানুষের ইতিহাস। এর অর্জন সামাজিক অগ্রগতির প্রতিফলন। আর এর নৈতিক শক্তি নিহিত রয়েছে মেধার প্রতি অঙ্গীকারের মধ্যে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, অন্যান্য শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং সাফল্য অর্জনের সুযোগ থাকতে হবে। তবে সেই সাফল্য আসতে হবে সমান প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে নয়।কারণ, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দায়িত্ব কেবল শিক্ষার্থী নির্বাচন করা নয়। সমাজকে এই নৈতিক বার্তা দেওয়াও তার দায়িত্ব যে, সব শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ সমান। তবে স্বীকৃতি অর্জন করতে হবে ব্যক্তিগত মেধা, কঠোর পরিশ্রম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। অতএব, আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রশ্ন একটাই: বিশ্ববিদ্যালয়টি কি তার শতাব্দীপ্রাচীন প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ, সামাজিক ন্যায়বিচারের ঐতিহ্য এবং জনগণের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অর্জিত মর্যাদা সংরক্ষণ করবে? নাকি দেশের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের অসুবিধায় ফেলে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে?প্রশ্ন উঠছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি প্রকৃতপক্ষে ১৯৭৩ সালের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ বা আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে? এই আইন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিচালিত হওয়ার কথা। আইনে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে কি উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে? বিভিন্ন পর্যায়ে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি নিজের পরিচালনাসংক্রান্ত আইন মেনে চলতে না পারে, তাহলে সমসাময়িক চাহিদা পূরণের জন্য সেই আইন আধুনিকায়ন করা উচিত নয় কি? এ ধরনের আধুনিকায়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি?বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষকদের ব্যাপক স্বাধীনতা দিয়েছে, কিন্তু তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে অনেক শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হন না। কখনো কখনো কেবল তাঁদের ইচ্ছা না হওয়ার কারণেই ক্লাসে যান না। অনেক শিক্ষক সময়মতো পাঠ্যসূচি শেষ করতে পারেন না। এতে সেশনজট তৈরি হয়। শিক্ষকদের মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের প্রতিও তাঁদের যথেষ্ট মনোযোগ নেই। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের রাজনীতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সুনাম বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে স্বীকার করতে হবে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল না মিলিয়ে কেবল মৌখিক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ করা কোনো সুবিবেচনাপ্রসূত পদ্ধতি নয়। ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও অর্থবহ গবেষণা—দুই ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে পড়বে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বৃহত্তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা আশা করি, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগরসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুসৃত পদ্ধতি গ্রহণ করবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে এবং যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে—এটাই প্রত্যাশা।প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যখন বুঝতে পেরেছে যে, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে মানসম্পন্ন একাডেমিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা অসম্ভব, তখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই বাস্তবতা স্বীকার করতে অনিচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে, কেবল মৌখিক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে পেশাদারত্বের সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ করা সম্ভব নয়।সাহসিকতার সঙ্গে উদ্যোগ নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম উপাচার্য শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা সংশোধন করেন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সংশোধিত বিধিমালা অনুমোদন করান। এরপর মৌখিক সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা, উপস্থাপনা, প্রদর্শনীমূলক ক্লাসসহ অন্যান্য পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও একই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ শুরু করে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো বিষয়টি বিবেচনায় নেয়নি।বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের ভুলে গেলে চলবে না যে, কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এক ডজনেরও বেশি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। অথচ জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য কোনো কমিশন গঠন করেনি। ফলে সংবিধান, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের মতো ক্ষেত্রে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া এখনো চলছে। কিন্তু ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া শিক্ষাব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি।বিএনপি সরকার গঠনের পর শিক্ষাব্যবস্থার নিম্নস্তরে, বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনার জন্য কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকার যদি বিশ্ববিদ্যালয় খাতের সংস্কার করতে চায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনৈতিক আনুগত্যের চর্চা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক মান উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনে ১৯৭৩ সালের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ বা আইন আধুনিকায়ন করতে হবে। সরকার চাইলে তা করতে পারে, কারণ বর্তমান সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।শিক্ষা কোনো দাতব্য অনুদান নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি। সততা ও নৈতিকতাবিহীন এবং দুর্নীতিতে জর্জরিত শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তির ওপর শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা অসম্ভব। ২০২৪ সালের তরুণ প্রজন্ম তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। তারা পরিবর্তনের একটি নতুন পথ উন্মুক্ত করেছে। এখন তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব। নতুন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় অঙ্গীকার হয়ে উঠুক এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, যা তরুণদের আনুগত্যের পরিবর্তে স্বাধীন চিন্তা, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

বগুড়া বিয়ামে শিক্ষককে ছাত্রের প্রহার, আমাদের করণীয়

বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষককে শারীরিকভাবে প্রহার করেছে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্র। খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদপত্রে আমরা দেখেছি। যা আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একজন ছাত্রের জীবনে শিক্ষকের ভূমিকা আধ্যাত্মিক গুরু বা বাবা-মায়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। যে শিক্ষকের হাত ধরে একটি শিশু বর্ণমালা শেখে, সেই শিক্ষককে আমরা পিতৃতুল্য সম্মান করি। অথচ সেই শিক্ষকের গায়ে ছাত্রের হাত ওঠা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের একটা ভয়াবহ সতর্ক সংকেত। সেই ঘটনার পর অনেকেই দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাচ্ছেন—‘জেন-জি উচ্ছন্নে গেছে’। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, একটি প্রজন্মকে এভাবে ট্যাগ দেওয়ার আগে আমাদের গভীরে গিয়ে কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। আজকের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রটি জেন-আলফা ও জেন-জির সন্ধিক্ষণে যে প্রযুক্তির কোলে বড় হয়ে উঠছে তা নিয়ে ভাবতে হবে। তাদের অপ্রত্যাশিত এমন আচরণের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গভীর কারণ।প্রথমত, পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চার অভাব: আগে যৌথ পরিবারে দাদা-দাদী, বাবা-মা, চাচা-চাচীরা মিলে একটি শিশুকে শাসন ও আদর দিয়ে বড় করতেন। এখন একক পরিবারে বাবা-মা দুজনেই কর্মব্যস্ত। সন্তানকে সময় না দিয়ে তার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে দামি মোবাইল। সন্তান কী দেখছে, কার সঙ্গে মিশছে, তার মানসিক বিকাশ কেমন হচ্ছে—তার খবর রাখার সময় আমাদের নেই। আমরা মনে করছি, ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেই সন্তান মানুষ হবে। কিন্তু পারিবারিক শিক্ষাই যে প্রাথমিক ও প্রধান শিক্ষা, তা আমরা ভুলে যাচ্ছি।দ্বিতীয়ত, শিক্ষকের নৈতিক স্খলন: দেশে যে কেবল শিক্ষা বা শিক্ষাঙ্গনের পতন ঘটেছে তা-ই নয়, পতন ঘটেছে শিক্ষাঙ্গনের সবচেয়ে বড় স্তম্ভটির—যার নাম শিক্ষক। শিক্ষকের নৈতিক স্খলন কচিমনের শিক্ষার্থীরা মেনে নিতে পারে না। তারা তাদের শিক্ষককে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে দেখতে চায়।তৃতীয়ত, প্রযুক্তির অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার: আজকের কিশোরের হাতে ইন্টারনেট মানে গোটা পৃথিবী। কিন্তু এই পৃথিবীর ভালো-মন্দ বাছাই করার বোধ তার এখনো তৈরি হয়নি। টিকটক, রিলস, ইউটিউবে ভায়োলেন্স, গালাগালি, শিক্ষককে অপমান করে মজা করা—এসব কনটেন্ট ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা তাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা তৈরি করছে যে, উদ্ধত আচরণই হলো স্মার্টনেস। তারা বাস্তব ও ভার্চুয়াল জগতের পার্থক্য করতে পারছে না। চতুর্থত, শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অতিরিক্ত আদর: বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের শাসন করার অধিকার প্রায় কেড়ে নেওয়া হয়েছে। একটু শাসন করলেই অভিভাবক এসে শিক্ষককে হুমকি দিচ্ছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তা করছেন। ফলে শিক্ষকেরা ভয়ে ছাত্রদের অন্যায়কেও এড়িয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে পরিবারে এক-দুটি সন্তান হওয়ায় আমরা তাদের কোনো ‘না’ বলছি না। সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দম্পতির একমাত্র কিশোর সন্তানের খুনের নেপথ্যে দামি বাইক ও আইফোন—সন্তানদের সব আবদার পূরণ করতে গিয়ে আমরা তাদের সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধ শেখাতে ব্যর্থ হচ্ছি।পঞ্চমত, সামাজিক অবক্ষয় ও আদর্শের সংকট: শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা যখন দেখে রাজনীতিতে, সমাজে, টেলিভিশনে বড়রা একে অপরকে অসম্মান করছে, গালাগালি করছে, শক্তি প্রদর্শন করছে, তখন তারাও মনে করছে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের সমাজে এখন আর বিনয়, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতাকে বড় গুণ হিসেবে দেখা হয় না।তাহলে প্রতিকার কী? এই প্রজন্মকে কি আমরা গালমন্দ করবো, বখে যাওয়া বলে উপেক্ষা করবো? না, তা করা যাবে না। তাদের পথ দেখাতে হবে।১. পরিবারকে ফিরতে হবে তার ভূমিকায়: সন্তানকে ‘কোয়ালিটি টাইম’ দিতে হবে বাবা-মায়ের। প্রতিদিন অন্তত একবেলা একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা, সন্তানদের বন্ধুদের সম্পর্কে জানা। সন্তানের সামনে শিক্ষক ও বড়দের সম্মান করে কথা বলা। মোবাইল ফোন ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও সময় বেঁধে দেওয়া।২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার পুনরুজ্জীবন: বিয়াম স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু ‘এ প্লাস’ নয়, মূল্যবোধের শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতি সপ্তাহে গল্পের মাধ্যমে শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও ধৈর্যের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের সামাজিক-পারিবারিক মেলবন্ধন ও মানবিক দিক জাগ্রত হয় এমন সিনেমা স্কুলে দেখানোর সুযোগ করে দিতে হবে। শিক্ষকদের হাতে যৌক্তিক শাসনের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে, তবে তা অবশ্যই শারীরিক নির্যাতন নয়। ৩. কাউন্সেলিং ও মেন্টারিং: প্রতিটি স্কুলে একজন প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর থাকা জরুরি। যে ছাত্রটি শিক্ষককে প্রহার করেছে, সে হয়তো ভেতরে ভেতরে কোনো মানসিক যন্ত্রণা, হতাশা বা পারিবারিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য কলহ প্রায় প্রতিটি পরিবারেই লক্ষ করা যাচ্ছে। সন্তানরা বাবা-মায়ের ঝগড়া-মারামারি দেখে বেড়ে উঠছে, ফলে তারা দিন দিন অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যাচ্ছে। বিয়াম স্কুলের এই ছাত্রটিকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ও স্কুল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারই কি এর সমাধান? এই ছাত্রটি এখন কোন স্কুলে ভর্তি হবে, তার মানসিক অবস্থা কী হবে? নতুন বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাকে কোন দৃষ্টিতে দেখবে? তাই এসব নতুন করে ভাবতে হবে। বহিষ্কার নয়, তার কাউন্সেলিং প্রয়োজন। পাশাপাশি পুরো বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও কাউন্সেলিং প্রয়োজন।৪. প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার শেখানো: প্রযুক্তিকে শত্রু  না বানিয়ে বন্ধু বানাতে হবে। শিক্ষার্থীদের গণিত অলিম্পিয়াড, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক, আবৃত্তি, উপস্থাপনা, চিত্রাঙ্কন, প্রোগ্রামিং, কোডিংয়ের মতো সৃজনশীল কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা ফালতু টিকটক দেখার সময় না পায়। বগুড়ার এই ঘটনা আমাদের জন্য একটি ‘ওয়েক-আপ কল’। আসুন, আমরা জেন-জিকে দোষারোপ না করে তাদের হাত ধরে সঠিক পথ দেখাই। কারণ এই প্রজন্মের কাছেই আমরা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে রেখে যাব। এই প্রজন্মই আগামীর বাংলাদেশ। তাদের যদি আমরা সঠিক পথে পরিচালিত করতে না পারি, তবে সেই দায় আমাদেরই নিতে হবে। কবি হেলাল হাফিজের ভাষায় বলতে হয়— মানব জন্মের নামে হবে কলঙ্ক, এরকম দুঃসময়ে আমরা যদি আমাদের সন্তানকে সঠিক পথ দেখাতে না পারি, তাহলে উত্তরপুরুষে ভীরু, স্বার্থপর, কাপুরুষের উপমা হব। এমন দুর্দিনে সন্তান মানুষ না করে যদি শুধু আমরা সম্পদের পাহাড় গড়ি, তবে লাভ নেই। শিক্ষক-ছাত্রের এই পবিত্র সম্পর্ককে রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট

প্রান্তিক মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির অধিকার নিশ্চিত হোক

খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সবার খাবারের থালায় সমান পুষ্টি থাকে না। আয়, পেশা, বসবাসের পরিবেশ ও সামাজিক অবস্থানের কারণে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পার্থক্য তৈরি হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, দলিত, বঞ্চিত ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের খাদ্যতালিকা অনেকটাই নির্ভর করে তাদের আয় ও চারপাশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর। তাদের খাবারে পুষ্টির নানা উপাদান থাকলেও দারিদ্র‍্যরে কারণে প্রয়োজনীয় ও বৈচিত্র‍্যময় খাবার নিয়মিত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। তাদের জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসও এক রকম নয়। পাহাড়, বন, নদী, হাওর কিংবা সমতলের পরিবেশের সঙ্গে তাদের খাদ্যসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। অনেকেই স্থানীয় বনজ ফল, শাকপাতা, কন্দ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক খাদ্য সংগ্রহ করে থাকেন। কলমিশাক, কচুশাক, সজনে পাতা, বুনো ওল, বিভিন্ন লতাপাতা এবং কচি বাঁশের ডগা তাদের খাবারের পরিচিত উপকরণ। এসব খাবারে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় নানা পুষ্টি উপাদান রয়েছে। কেউ কেউ মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করেন। নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি তা বিক্রি করেও জীবিকা নির্বাহ করেন।নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় থেকেও প্রান্তিক মানুষ খাবার সংগ্রহ করেন। ছোট মাছ, চিংড়ি ও শুঁটকি তাদের খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বড় মাছ বা মাংস নিয়মিত কেনার সামর্থ্য না থাকলেও এসব ছোট মাছ থেকে তারা প্রোটিনসহ নানা পুষ্টি উপাদান পান। একসময় অনেক পরিবার খাসির পায়ের মতো অপেক্ষাকৃত সস্তা অংশও যত্ন করে রান্না করে খেত। এসব খাবার তাদের খাদ্যসংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে ছিল।ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, দলিত ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের খাবারের তালিকায় ভাত, ডাল ও আলুভর্তারও বিশেষ জায়গা রয়েছে। পান্তাভাত তাদের অনেকের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ। পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, লবণ ও সরিষার তেল দিয়ে পান্তাভাত খাওয়ার চল দীর্ঘদিনের। সামান্য উপকরণে তৈরি এই খাবার অনেকের কাছে তৃপ্তির হলেও এর পেছনে রয়েছে সীমিত আয়ের বাস্তবতা। এমন পরিবারও আছে, যাদের কাছে নিয়মিত প্রয়োজনীয় খাবার কেনার অর্থ থাকে না। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’—প্রবাদটি তাদের জীবনের কঠিন বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।দরিদ্র মানুষের খাদ্যাভ্যাসের আরেকটি দিক হলো খাবারের অপচয় না করা। অনেক সচ্ছল পরিবার যে সবজি বা খাবারের অংশ ফেলে দেয়, দরিদ্র পরিবার তা দিয়েই নতুন পদ তৈরি করে। যেমন পটলের খোসা ফেলে না দিয়ে ভর্তা বা অন্য খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সামান্য খাবারও কাজে লাগানোর এই অভ্যাস তাদের জীবনসংগ্রামের পরিচয় বহন করে। তবে সীমিত উপকরণ দিয়ে খাবার তৈরি করতে পারা আর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া এক বিষয় নয়। দারিদ্র‍্যরে কারণে অনেক পরিবার পর্যাপ্ত আমিষ, ফল, দুধ, ডিম ও শাকসবজি কিনতে পারে না। ফলে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক মানুষের অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ে।শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পুষ্টিকর খাবার অপরিহার্য। অপুষ্টির কারণে শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ীও হতে পারে। কোনো শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি কম হওয়ার পেছনে অপুষ্টির পাশাপাশি বংশগত ও হরমোনজনিত কারণসহ নানা বিষয় থাকতে পারে। তাই বিষয়টি অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি।দেশের নদীভাঙনকবলিত এলাকা, চরাঞ্চল, হাওর এবং শহরের বস্তিতে বসবাসকারী বহু মানুষ দারিদ্র‍্যরে মধ্যে জীবনযাপন করেন। তাদের অনেকেরই নিয়মিত ও পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। এর প্রভাব পড়ে পরিবারের শিশুদের ওপর। অথচ শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির সুযোগ থেকে কোনো শিশু যেন বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।এ অবস্থায় সরকারকে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবতে হবে। প্রথমত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, দলিত, দরিদ্র শ্রমজীবী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে একটি নির্ভুল তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। সেই তালিকার ভিত্তিতে তাদের জন্য স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহ, রেশন কার্ড কিংবা পরিবারভিত্তিক সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সহায়তা যেন প্রকৃত অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।দ্বিতীয়ত, গর্ভবতী মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া দরকার। মায়েদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় টিকা, পুষ্টি পরামর্শ ও বিনা মূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করতে হবে। গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার সুযোগও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হলে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।তৃতীয়ত, প্রান্তিক মানুষের খাদ্যসংস্কৃতি ও স্থানীয় খাদ্যসম্পদকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের পরিচিত ও সহজলভ্য শাকসবজি, ছোট মাছ, ডাল, ফলমূলসহ পুষ্টিকর খাবারের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়ানো যেতে পারে। এতে একদিকে পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতিও টিকে থাকবে।বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু খাদ্যের উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; সবার জন্য পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্যও তৈরি করতে হবে। দরিদ্র মানুষের খাবার নিয়ে কৌতূহল বা প্রশংসা নয়, তাদের পুষ্টির অধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। একটি শিশুও যেন দারিদ্র‍্যরে কারণে অপুষ্টিতে বেড়ে না ওঠে। রাষ্ট্রের নীতি ও সামাজিক উদ্যোগের কেন্দ্রে এই মানবিক দায়িত্বকে স্থান দিতে হবে।[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

রম্যগদ্য: “বোইল্লা মারো হাসি, বাঁচবা একশ আশি”

হেঁ হেঁ, কথাটা ঠিক, আমি দেখছি রমনা পার্কে এক ব্যাটা বোইল্লা উডে “হাসো” ফাৎ করি বিশ তিরিশ জন পাবলিকে হো হো কইরা হাসে, আর কয় যত হাসবা, তত আয়ু বাড়বো!আরে বুড়বক, উড়ঝুড়ে বাঙাল, আমি যে হাঁসির কথা বলছি, সে হাঁসি তোর এই রমনা পার্কের হাসি নয়!আরে মিয়া ভাই আপনেই তো কোইতাছেন, “বোইল্লা মারো হাসি,বাঁচবা একশ আশি” হাসলে যে পাবলিকে বেশি দিন বাঁচে হেই কতাটা ব্যেবাগ পাবলিকেই জানে।হাসলেই যদি আয়ু বাড়ে, তাহলে বিশ্বের সবাই না হেসে কেবল রমনা পার্কের গুটি কয় লোক হাসছে ক্যানো?ক্যান, আপনে মিয়া দেখছেন না! রাস্তাঘাটে কত পাগলে একলা একলা হাসতাছে। কোনো কারণ ছাড়াই হাসতাছে। জানেন এই হাসির ঠেলায় এক এক পাগলে দেড়শ দুইশ বছর র্পযন্ত বাঁচে।তাহলে তুই রাস্তায় রাস্তায় হেসে হেসে ঘুরে বেড়াচ্ছিস না ক্যানো। তাহলেতো তুই দেড়শ দুইশ বছর র্পযন্ত বাঁচতে পারবি।হ’দেড়শ দুইশ বছর! বৌ-এর ছুট্টোভাই, মাত্র চুয়ান্ন বছর বাঁইচ্চায়, বাপ বাপ বইল্লা, কয় ছেইড়দে মা কেইন্দে বাঁচি।ক্যানো ক্যানো মাত্র চুয়ান্নো বছরেই কান্নাকাটি শুরু করেছিস...কাঁদবো না মিয়া, গাজর ১৮০ টাকা কেজি, এক লিটার তেল ২০০ টাকা, টমেটো ২০০টাকা, চাউল...থাম ভাই থাম, তোকে আর বাজার দর শোনাতে হবে না...ঠিক আছে ঠিক আছে, বাজার হিসাব না হয় ছাইড়া দিলাম, কিন্তু মাস্টারে যখন ছাত্রীরে অতিআচার করের তখন কি আমি হাসুম!“এতক্ষণে”— অরিন্দম কহিলা বিষাদে;— / “জানিনু কেমনে আসি লক্ষ্মণ পশিল / রক্ষঃপুরে।মানে কী! এহানে আবার মাইকেল হান্দাইলো কেমনে?মাইকেল মধূসুদন দত্তের “মেঘনাদ বধ” কাব্যের কথা বলছি না, বলছি তুই এতক্ষণে লাইনে এসেছিস।লাইনে আইছি মাইনে?তুই বললি না, মাস্টারে যখন ছাত্রীরে অতিআচার করের তখন কি আমি হাসুম! আমি তোর ওই হাসার কথায় বলছিলাম। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী” কবিতার দুটি পঙ্‌ক্তি শোন “আমি বেদূঈন, আমি চেঙ্গিস, / আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ... / ... আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!”হেঁ হেঁ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও কোইছে, আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া / হাসি পুষ্পের হাসি...আসলে কথাটা হোইবো “আমি বাংলদেশের দোজোখে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি...” হ্যাঁ হ্যাঁ শিক্ষক যখন ছাত্রীকে অত্যাচার করবে তখন ওই জাহান্নামের মতো নোংরা পরিবেশেও তুই পুষ্পের হাসি হাসবি!ওম্মা এইটা আপনি কি বলছেন!  নোংরা পরিবেশ, আপনে শুনেন নাই, আপনের বৌ-এর এক ছুট্টভাই কোইছে, মাস্টার গো কি স্বাদ আহাল্লাদ নাই, হ্যারা ছাত্রীরে ইকটু আধটু, আদর করলে আপনে কোইবেন ব্যাড টাচ! আপনেরা মিয়া নুংরা মানসিকতার অভিভাবক! মাস্টার সমাজে সম্মানিত ব্যাক্তিত্ব, হ্যায় আদর কোইরা আপনের আত্মজার ওষ্ঠে স্নেহের নির্দশন লেপন করছে, আর আপনে বর্বর অভিভাবক সম্মানিত মাস্টাররে থাপ্পড় মাইরা বোইলেন!একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে! তুই এইসব মাস্টারদের ছাত্রদের, ছাত্রীদের সাথে উন্নত দণ্ড দিয়ে আঘাত করাকে, অত্যাচার করাকে, ব্যাডটাচকে মেনে নিতে বলছিস!আরে আমি মাইন্না নিতে কমু ক্যা, আপনে দ্যাখেন নাই বাংলার ঘরে ঘরে, বাংলার পাড়ায় পাড়ায়, বাংলার মহল্লায় মহল্লায়, বাংলার গ্রামে গঞ্জে, শহরে শহরে  আপনের দেশে, আপনের কওমে বসবাসকারি ব্যাবাগ পাবলিকে মিছিল কোইরা কোইতাছে মাস্টারদের কোনো টাচ, ব্যাড টাচ বলা চলবে না। আত্মজার ওষ্ঠে স্নেহের নির্দশন লেপন করলে, সম্মানিত মাস্টাররে থাপ্পড় মারা চলবে না, চলবে না!এ কোন বাংলাদেশের কথা, এ কোন সোনার বাংলার কথা বলছিস, যেখানে মাস্টারদের ছাত্রদের, ছাত্রীদের সাথে অত্যাচার করাকে, ব্যাড টাচকে মিছিল মিটিং করে মেনে নিতে বলছিস!দ্যাখেন খুবতো তখন কোইছিলেন বর্বর পাকিস্তানিরা আমাগো শোষণ করে তাই পাকিস্তানি খ্যাদাও। আর আপনেগো ভায়ে ভায়ে ফাইটের চিপা দিয়া ইন্ডিয়া ঢুইক্কা দিল পাকিস্তান ভাইঙ্গা। আর পাকিস্তান ভাঙ্গার পরে আপনেরা কী করলেন পাকিস্তান আমলের, কান্দির পাড়া, নারায়ণগঞ্জের টানপাড়া, যশোর, খুলনা, চট্টগ্রাম, নাটোরের বনলতা সেনের, রাজশাহীর সব শাহী পাড়া ভাইঙ্গা দিলেন, লন এবার পাবলিকে তার মাল সামানা রাখবো কোই? কন কন এবার সারা দেশের ব্যাবাগ অবিবাহিত টগবগে তরুণ ও তরুণ মাস্টাররা তাগো মাল-সামানা রাখবো কোই? সব পাড়া তো ভাইঙ্গা দিছেন...এ্যাঁ তরুণদের মাল-সামানা মানে জিনিসপত্র রাখার জন্য তুই আবার পাকিস্তান আমলের সব পাড়া গড়তে বলছিস! আমি গড়তে কমুক্যা, আপনে দ্যাখেন না মিয়া, সারা বিশ্বে উন্নত দেশ মানে ফ্রান্সে, আমেরিকায়, ইংল্যান্ডে, রাশিয়ায়, মুলাঘুঁজ, পিকাডেলি স্কয়ার, লাসভেগাস, লেলিন গ্রাদ, ব্যাবাগ যায়গায় হ্যাগো দেশের টগবগে তরুণের ও তরুণ মাস্টারদের মাল সামান রাখার ব্যবস্থা করছে...বলিস কী? উন্নত বিশ্বে মানে ফ্রান্সে, আমেরিকায়, ইংল্যান্ডে, রাশিয়ায়, সব দেশে, দেশের টগবগে তরুণ মাস্টারদের মাল সামান রাখার ব্যবস্থা করেছে...করেছে মাইনে! আপনের প্রতিবেশী ভারতের বুধবার পেট, কলিকাতার সোনাগাছি, বম্বের কোলাবা, মাদ্রাসের আভিরামী ব্যাবাগ জায়গায় দেশের টগবগে তরুণের, তরুণ মাস্টারদের সমস্যা সমাধান করছে, আর ব্যাংককের পাতপোং কত্তবড় গোডাউন, সারা বিশ্বে জোড়া নাম...তাই বলে এই পবিত্র বাংলাদেশে এইসব গোডাউন মানে, পাকিস্তান আমলের সব পাড়াগুলো আবার গড়তে বলছিস!আমি কমুক্যা, বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম স্যারে কোইছেন, “ভাঙিছো গড়িছো নীতি ক্ষণে ক্ষণে, নিরজনে প্রভু নিরজনে...” আপনেরা সমাজের ভালোর জন্য নীতি ভাঙেন গড়েন...তার মানে সমাজের কোমলমতি শিশু ছাত্র-ছাত্রীদের পবিত্রতা রক্ষার জন্য, কোমলমতি শিশু ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক সুস্থ্যতার জন্য অপবিত্র পাড়া সৃষ্টি করতে হবে?আপনে মিয়া আছেন আপনের তালে, এই যে পুলিশের বড় স্যার তার নিজের দুই মেয়ের সাথে মিলে তরুণ ও তরুণ শিক্ষকদের সমস্যা সমাধান করছিলেন হ্যেইডাওতো আপনেগো সহ্য হোইলো না...তাইতো রে, তরুণ শিক্ষকদের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে উন্নত দণ্ড দিয়ে আঘাত করাকে, অত্যাচার করাকে, ব্যাড টাচকে মেনে নিবো, নাকি  উন্নত বিশ্বের মতো, আবার শহরে শহরে, জেলায় জেলায়, গঞ্জে গঞ্জে, পাড়া গড়বো![লেখক: চলচ্চিত্রকার]

ভিডিও আরও দেখুন

আলাভেসকে উড়িয়ে লা লিগার শীর্ষে ফিরল বার্সা

উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে পিএসজি এবং লা লিগায় এল ক্লাসিকোয় রিয়াল মাদ্রিদের কাছে হারের ধাক্কা কাটিয়ে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বার্সেলোনা। দুর্বল আলাভেসকে ৬-১ গোলের বড় ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে ফের পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করেছে হ্যান্সি ফ্লিকের দল।ঘরের মাঠে শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের ওপর একক আধিপত্য বজায় রাখে বার্সেলোনা। ম্যাচে ৭৭ শতাংশ বলের দখল রেখে তারা গোলের জন্য ৭টি শট লক্ষ্যে রাখে। স্বাগতিকদের বড় এই জয়ে জোড়া গোল করেছেন দুই তারকা লামিনে ইয়ামাল ও রাফিনিয়া। এছাড়া ফারমিন লোপেজ ও অ্যান্থনি গর্ডন একটি করে গোল করেন। অন্যদিকে, আলাভেসের হয়ে একমাত্র সান্ত্বনাসূচক গোলটি করেন মারিয়ানো দিয়াজ।শনিবার দিনের প্রথম ম্যাচে লেভান্তেকে ২-০ গোলে হারিয়ে সাময়িকভাবে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠে গিয়েছিল অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদ। তবে নিজেদের ম্যাচ জিতে শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করতে ভুল করেনি কাতালানরা। ১১ ম্যাচে ৩০ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের ১ নম্বরে অবস্থান করছে বার্সা। সমান ম্যাচে ২৮ পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদ এবং এক ম্যাচ কম খেলে ২৪ পয়েন্ট নিয়ে তিনে রয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ।ম্যাচের মাত্র অষ্টম মিনিটে পেদ্রির পাস থেকে গোল করে বার্সাকে এগিয়ে নেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রাফিনিয়া। ২৩ মিনিটে লোপেজ দুরূহ কোণ থেকে গোল করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। চলতি মৌসুমে এটি তাঁর ষষ্ঠ গোল। বিরতির ঠিক আগে ৪১ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের জোরালো শটে নিজের দ্বিতীয় ও দলের তৃতীয় গোল করেন রাফিনিয়া। চলতি লা লিগায় ১০ ম্যাচে এটি তাঁর ১৫তম গোল। এরপর প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে জোয়াও কান্সেলোর পাস থেকে স্কোরশিটে নাম লেখান লামিনে ইয়ামালও।দ্বিতীয়ার্ধেও একই ছন্দ ধরে রাখে ব্লুগ্রানারা। ৬২ মিনিটে বদলি নামার দুই মিনিটের মাথায় গ্যাব্রিয়েল জেসুসের পাস থেকে ম্যাচে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন ইয়ামাল। চলতি লিগে ১১ ম্যাচে এটি তাঁর দশম গোল। ৭৪ মিনিটে বদলি নামার পর রদ্রির পাস থেকে গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান ৬-০ করেন ইংলিশ উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডন। এরপর ৮৪ মিনিটে আলাভেসের মারিয়ানো দিয়াজ একটি গোল শোধ করলেও বড় হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় সফরকারীদের।

আলাভেসকে উড়িয়ে লা লিগার শীর্ষে ফিরল বার্সা