সংবাদ
জাপানের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে নজর বাংলাদেশের

জাপানের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে নজর বাংলাদেশের

২ লাখ কর্মসংস্থানের হাতছানিজাপানে আইটি খাতে বিপুল চাহিদা৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের  সম্ভাবনাসুফল পেতে প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার ও দক্ষ জনবলতীব্র জনবল সংকট মোকাবিলা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স ও ক্লাউড কম্পিউটিং খাতে বড় ধরনের পদক্ষেপে এগোচ্ছে জাপান।দেশটির ‘সোসাইটি ৫.০’ মহাপরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি খাতে তৈরি হয়েছে বিদেশি প্রকৌশলীদের বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ। একই সঙ্গে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। জাপানের এই প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতেই এখন নজর বাংলাদেশের।দেশটির এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশের জন্যও এক বিশাল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চার দিনের জাপান সফরে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছে, তার সঠিক বাস্তবায়ন ঘটলে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন) জাপানি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই বিনিয়োগ পুরোপুরি কার্যকর হলে দেশের শিল্প ও সেবা খাতে অন্তত দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।জাপানের অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জনসংখ্যা হ্রাস ও প্রবীণদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিতে প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার (প্রায় ৮ লাখ) আইটি কর্মীর বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হবে। কাজের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এবং সাইবার স্পেসের সঙ্গে বাস্তব জগতের সমন্বয় ঘটিয়ে ‘সোসাইটি ৫.০’ গড়ে তুলতে জাপান এখন উন্মুক্তভাবে বিদেশি সফটওয়্যার, এআই, রোবোটিক্স ও ক্লাউড বিশেষজ্ঞদের খুঁজছে।এই তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্ববাজারে ভারত, ভিয়েতনাম ও নেপালের মতো দেশগুলো নিজেদের অবস্থান পোক্ত করলেও বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। যেখানে সফটওয়্যার ও আইটি আউটসোর্সিংয়ে জাপানের বার্ষিক ৩০ বিলিয়ন ডলারের বাজারের প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশ একা ভিয়েতনাম দখল করে নিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব এখনো নামমাত্র। একই সঙ্গে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ফিলিপাইনের পেশাজীবীরা জাপানের করপোরেট সংস্কৃতিতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন।প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ২০২৬ সালের তথ্যমতে, বর্তমানে জাপানে প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করছেন ও কর্মরত আছেন। এদের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজারই শিক্ষার্থী, যারা ভাষা শিক্ষা বা উচ্চতর ডিগ্রি শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের অপেক্ষায়। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই বাজারে জাপানের মূল আইটি খাতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র হাজারখানেক বাংলাদেশি প্রকৌশলী।জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সংবাদকে জানান, বর্তমানে রাকুতেনসহ বিভিন্ন শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে সহস্রাধিক বাংলাদেশি আইটি প্রকৌশলী কাজ করছেন। দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে সরকার এখন ‘জাপান সেল’-এর মাধ্যমে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে।বিশ্লেষকদের দাবি, শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নিয়ে জাপানের বাজারে প্রবেশ করা অসম্ভব। তাদের মতে, বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং জাপানের শ্রমবাজারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি, আইটি শিক্ষার আধুনিকায়ন ও নীতিগত ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই এখন বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ।জাপানে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের তথ্য অনুযায়ী, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, এআই ও সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞদের জন্য জাপানে বার্ষিক ৪০ লাখ থেকে ২ কোটি ইয়েন পর্যন্ত বেতনের সুযোগ রয়েছে। তবে এই বাজারে টিকতে হলে কেবল ভাষাগত দক্ষতা নয়, বরং গভীর প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও প্রায়োগিক দক্ষতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।এই বিষয়ে জাপানে বসবাসকারী সিমেন্সে কর্মরত আইটি বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার মোঃ হাসান মাহবুব সংবাদকে বলেন, ‘বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে কারিগরি দক্ষতা থাকলে ভালো বেতনে কাজ করা সম্ভব, তবে স্থানীয় কোম্পানিতে এন-টু পর্যায়ের জাপানি ভাষা দক্ষতা জরুরি। তবে প্রযুক্তিতে অর্থাৎ কারিগরি দক্ষতায় ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে এখানে টিকে থাকা যাবে না, একদম বাস্তবসম্মত, প্রকল্পভিত্তিক ও প্রায়োগিক দক্ষতা থাকতে হবে।’২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে টোকিও সফর করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরে দুই দেশের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ৪টি সমঝোতা স্মারক, ২টি অনুদান চুক্তি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিডার তথ্য অনুযায়ী, এসব সমঝোতার মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জাপানি অটোমোবাইল জায়ান্ট টয়োটার বাংলাদেশে হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি অ্যাসেম্বলিং কারখানা স্থাপন এবং পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর (ফাস্ট রিটেইলিং) রফতানি ৩০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা। এছাড়া জ্বালানি খাতে ‘জেরা’ ও মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানির সাথে পরিবেশবান্ধব এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়েও চুক্তি হয়েছে।সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতে (ইপিএ) ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য জাপানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেও, বিনিময়ে বাংলাদেশকে ১ হাজার ৩৯টি জাপানি শিল্পপণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে। এটি দেশীয় হালকা প্রকৌশল ও অ্যাসেম্বলিং খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এছাড়া জাপানি ঋণের সুদের হার আগের ০.০১% থেকে বেড়ে ক্ষেত্রবিশেষে ১% থেকে ৩% হওয়া এবং উপকূলীয় নিরাপত্তা অনুদানের ফলে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের বিষয়টিও আলোচনায় আসছে।সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, ‘বিনিয়োগের এই প্রতিশ্রুতিগুলো যেন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। ঋণের উচ্চ সুদের হার নিয়ন্ত্রণ এবং ইপিএ চুক্তিতে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে এবং তথাকথিত দালাল চক্র নির্মূল করে এই বিপুল বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে তা বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানে ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে প্রমাণিত হবে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাধীনতার পর থেকেই জাপান বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরুর পর এই সম্পর্ক সাম্প্রতিককালে  নতুন উচ্চতা পায়। বিশেষ করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ এবং মেট্রোরেল সম্প্রসারণে জাপানের সহযোগিতা আরও জোরদার হচ্ছে।
২ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

রম্যগদ্য: “কিয়ের লেখা, কিয়ের পড়া, বিদেশ যামু লাইনে খাড়া”

হেঁঃ হেঁঃ হাগলনি কোনো, লেহাপড়া ছাড়া বিদেশ গেলে তো, পানি চায়াও খাবা পারবেন না?তুই বললেতো চলবে না! তুই দেখিসনি তোদের সব জেন-জির ছাত্ররা, ধরে ধরে সব শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করালো!হ, দেখছিতো। মাস্টার মানুষ মাস্টারি করবেন, পোলাপানরে মানুষ করবেন, আপনে ক্যান সরকারের পা-চাঁটবেন!ওম্মা কচি খোকা, সরকারের কথা না শুনলে এমপিওভুক্ত হবে না, পেনশন পাবে না, নিয়মিত বেতন পাবে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ পাবে না।শিক্ষকরা যদি বেতনই না পায় তাহলে তোর কথা মতো পোলাপানরে মানুষ করবে কীভাবে?এইসব ফালতু কথা কোয়েন না, পোলাপানরে মানুষ করবে কীভাবে! আপনেরা মিয়া শিক্ষক, আপনেরা ব্যাবাগতে এক লগে, এক হয়া যুদি কন, আমাগো পরবর্তী প্রজন্ম হ্যারাই ভবিষ্যতে আমাগো দেশ চালাইবো, হ্যাগোরে যুদি মানুষ না বানাই তায়লে জন্তু জানোয়ার দিয়া কি দেশ চলবো? কন কন, জন্তু জানোয়ার দিয়া কি দেশ চলবো?বাহ্! তোর কথায় যুক্তি আছে, বুঝলাম। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ওরাই ভবিষ্যতে আমাদের দেশ চালাবে। কিন্তু তোমার শিক্ষদের মাঝেইতো লাল, নীল,সবুজ, হলুদ, ভায়োলেট,অরেঞ্জ কত রকমের রঙের বাহার। তাহলে সব শিক্ষক এক হয়ে একত্রে কাজ করবে কীভাবে!ক্যান মিয়া ভাই রংধনু দ্যাখেন নাই! রংধনুর মইধ্যে সাতটা রং কিন্তু ব্যেবাগতে মিল্লা একটাই রংধনু তো, আপনেগো যত রঙই থাকুক নীতির প্রশ্নে আপোস না করলেইতো আপনেরা পরবর্তী প্রজন্মরে মানুষ করতে পারতেন।বাহ্ আমদের নিজ্স্ব রাজনৈতিক চিন্তাধারা থাকতে পারে না?আপনেরা মিয়া জিন্দেগীতে আর মানুষ হোইবে না! খেলার মইধ্যে রাজনীতি, পড়ার মইধ্যে রাজনীতি, বাথরুমের মইধ্যে রাজনীতি, বাজারের মইধ্যে রাজনীতি, ছেরিগো হলে রাজনীতি, ছ্যারাগো চান্দির মইধ্যে রাজনীতি, এই রাজনীতি করতে করতে বাঙালি জাতিটারে ছ্যারাভ্যারা কোইরালচ্চেন...বুঝলাম বুঝলাম সব ব্যাক্তিস্বার্থে রাজনীতিকে ব্যাবহার করে জাতিটার অবস্থা এমন করেছিস যে এখন কেউ আর তার নিজ মাতৃভূমিতে বসবাস করতে চায় না। সব বিদেশে পালাতে চায়।তো, আগে না আমাগো স্কুলের বাইল্য শিক্ষায় কোইতেন “জননীর জন্মভূমিশ্চঃ স্বর্গাদপী গরিয়সীঃ” মাত্তিভূমি বলে স্বর্গের চায়াও গরিমায় বড়, তো অহন পাবলিকে নিজ মাত্তিভূমি ছাইড়া ভাগবার চায় ক্যালা?“মাত্তিভূমি ছাইড়া ভাগবার চায়...কারণ তোমরা দেশ স্বাধীন করার পর এমন ভাবে দেশ পরিচালনা করছো যে পাবলিক বাপ বাপ বলে মাতৃভূমি ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে।হুনেন আপনেরাই শিক্ষিতরা বৃটিশ আমলে কোইতেন,“স্বদেশের কুকুর পুজা করো বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।” আর বর্তমানে আপনেগো দেশ পরিচালনার বাহার দেইখ্যা বাংলার ঠাকুররা বিদেশে যায়া সাবেগো কুকুর পাইল্লা জীবন চালাইতেছে।দ্যেখ পৃথিবীতে কেউ তার মাতৃভূমি ছেড়ে কোথাও থেকে শান্তি পায় না। ওই যে সারমেয়রা পর্যন্ত তুই বাড়ি থেকে যত দূরেই ছেড়ে দিয়ে আসিস ওরা ঠিকই আবার নিজ বাড়িতে ফিরে আসে। নাড়ীর টান তুই বুঝবি না।হ হ বুঝুম না ক্যালা, ভারত পাকিস্তান ভাগ হওনের সময় কত্ত লুকের কান্দন, তাগো চুক্ষের পানি শুকাইতে না শুকাইতে আপনেরা আবার ইস্ট-পাকিস্তান ওয়েস্ট-পাকিস্তান ভাগ হয়া গেলেন! আবার কত্ত পাবলিকের কান্দন, তাগো চুক্ষের পানি শুকাইতে না শুকাইতে আপনেরা আবার দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দল বানায়া আবার মাইরপিট, মারামারি, ফাটাফাটি লাগায়া রাখছেন! কী করবি বল, তোরা কিছু ব্যাক্তি কেবল মাত্র নিজেদের জাগতিক সুখের জন্য, টাকা টাকা করে পুরো বাঙালি জাতিটার বারটা বাজাচ্ছিস।এই যে কন ট্যাকা ট্যাকা, অহন তো দেখলেন, ট্যাকা ট্যাকা কোইরা যা করলেন, পাবলিকে আপনেগো ঘরের চৌকাঠভি খুইল্লা লয়া গেছে, ট্যাকা কি কব্বরে লোইবেন!এখন ওই টাকায় ওদের বিদেশে আরামে রাখছে আর নিজের দেশের আম পাবলিকের জীবন ত্রাহি মধূসুদন ত্রাহি মধূসুদন করছে।ভাইনা ভালা, আপনেরা এবার নতুন প্রজন্ম জেন-জি’রে কন ভাই তুরা যেন ট্যাকার কাছে নিজেরে না বেইচ্চা দেশটারে একটু মানুষের মতো মানুষ কর। আমি কি বলবো বল, কে যেন লিখেছিলো,“ টাকা কড়ির টানটা প্রবল/ গতিটা তার রকেট/ ভুলেই বসেন সব মহাজন/ কাফনের নাই পকেট।”বুঝলেন চুরে শুনে না ধর্মের কাহিনি, এইসব ছড়া মড়া দিয়া কাম হোইবো না। আপনেরা যুদি আইণ কড়া করার না পারেন, ব্যাংক লুটেরাগো ধইরা বাইন্দা না পিটান, তায়লে কুনো দিনও বাঙালি আর তার মাত্তিভূমিতে থাকতে চাইবো না! আমাগো পোলাপান ব্যেবাকতে আবার বৃটিশ আমলের মতুন বিদেশিগো চাকর হয়া জীবন পার করবো। এই ভারত বর্ষের স্বাধীনতা, স্বাধীন ভারত, স্বাধীন পাকিস্তান, স্বাধীন বাংলাদেশ ব্যেবাগ স্বাধীন পাবলিক আবার বিদেশি গো পাচাঁটবো। কোন কবি না কোইছিলো, “এই জীবন চেয়েছিলে বুঝি...!!কবির কথায় যখন তুললি, তাহলে কবি কিশোর সুকান্তের কবিতা শোন“ছাড়পত্র”...কন হুনি কবি কিশোর সুকান্তের“ছাড়পত্ত”...খালি কথার মাঝে কথা!ঠিক আছে ঠিক আছে কন হুনি, “ছাড়পত্ত”“ছাড়পত্র” কবি কিশোর সুকান্তের কবিতা“ছাড়পত্র” ...এসেছে নতুন শিশু/ তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান/ চলে যাবো/ তবু যতক্ষণ/ দেহে আছে প্রাণ/ প্রণপনে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল/ এ’বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার...ভাইডি বিশ্ব লাগবো না, আপনে খালি বাংলাদেশকে এই শিশুর বাসযোগ্য কোইরা দ্যান তায়লে কেউ আর বিদেশ যায়া মরবো না...ঠিক আছে,বাংলাদেশকে এই শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি, এই হোক আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার...   [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রাম: পরস্পরবিরোধী, নাকি পরিপূরক?

জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, শ্রেণিসংগ্রাম ইত্যাদি নিয়ে পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা চলছে। বামপন্থী এক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন, “কমিউনিস্টরা যখন সারা দেশে কলকারখানায়, ক্ষেতখামারে, চা-বাগানে শ্রেণিসংগ্রাম গড়ে তুলতে ব্যাপৃত, তখন একদল পুরোনো সেই খেলায় মেতে উঠেছে। পুরো আন্দোলনকে জাতীয়তাবাদের চোরাবালিতে ডুবিয়ে মারতে চাইছে।” উদ্ধৃত বক্তব্যটি জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের আন্তঃসম্পর্ক বিষয়ে কিছু মৌলিক তাত্ত্বিক প্রশ্ন সামনে এনেছে।জাতীয়তাবাদের বুর্জোয়া সীমাবদ্ধতা এবং শ্রেণিসংগ্রামের ওপর তার সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক রূপ ও রাজনৈতিক চরিত্রের মধ্যে পার্থক্য না করে তাকে সামগ্রিকভাবে শ্রেণিসংগ্রামের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করা কতটা যথার্থ? বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশের ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলন এবং বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি আরও গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।শ্রেণিসংগ্রাম কি জাতীয় প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন?মার্ক্সবাদে শ্রেণিসংগ্রাম কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। উৎপাদনসম্পর্ক ও তার অন্তর্নিহিত শ্রেণিগত দ্বন্দ্বের ভিত্তিতে, সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র, জাতীয় ও জাতিগত নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক আধিপত্যের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শ্রেণিসংগ্রাম বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানা রূপে বিকশিত হয়।শ্রেণিশোষণ ও জাতীয় নিপীড়ন অভিন্ন বিষয় নয়। কিন্তু ইতিহাসের নির্দিষ্ট পর্যায়ে এ দুটি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। বিশেষত ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের অধীনে জাতীয় নিপীড়ন প্রায়ই অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক অধিকারহীনতার সঙ্গে যুক্ত থেকেছে। ফলে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম অনেক ক্ষেত্রেই শ্রেণিসংগ্রামের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।তবে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে বিভিন্ন শ্রেণির অংশগ্রহণের অর্থ তাদের শ্রেণিস্বার্থের বিলুপ্তি নয়। জাতীয় ঐক্যের মধ্যেও শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত ও বুর্জোয়ার স্বার্থগত দ্বন্দ্ব বহাল থাকে। মার্ক্সবাদী রাজনীতির দায়িত্ব এই দ্বন্দ্বকে উপলব্ধি করে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের ভেতর শ্রমজীবী মানুষের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন ও মাও: জাতীয় প্রশ্নের ঐতিহাসিক উপলব্ধিমার্ক্স ও এঙ্গেলস জাতীয়তাবাদকে নির্বিচারে প্রত্যাখ্যান করেননি। তারা পোল্যান্ডের জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রামকে সমর্থন করেছিলেন। আয়ারল্যান্ডের প্রশ্নে মার্ক্স দেখিয়েছিলেন, আইরিশ জনগণের ওপর ব্রিটিশ আধিপত্য ইংরেজ শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক চেতনাকেও বিভক্ত ও দুর্বল করে। অর্থাৎ, নিপীড়ক জাতির শ্রমিকশ্রেণির মুক্তিও নিপীড়িত জাতির স্বাধীনতার প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।লেনিন এই উপলব্ধিকে আরও বিকশিত করেন। তিনি নিপীড়ক জাতির আধিপত্যবাদী জাতীয়তাবাদ এবং নিপীড়িত জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য করেছিলেন। তার কাছে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করা ছিল শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতি প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত।মার্ক্স ও এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ইশতেহার-এর ঐতিহাসিক আহ্বান ছিল—‘দুনিয়ার মজদুর, এক হও!’ পরবর্তী সময়ে লেনিনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ঔপনিবেশিক ও নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তিসংগ্রামকে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই রাজনৈতিক উপলব্ধি থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় সেই বিখ্যাত আহ্বান—‘দুনিয়ার শ্রমিক ও নিপীড়িত জাতিসমূহ, ঐক্যবদ্ধ হও!’১৯২০ সালের ডিসেম্বরে এক বক্তৃতায় লেনিন নিজেই এই সম্প্রসারিত স্লোগান উদ্ধৃত করে তার রাজনৈতিক যথার্থতা সমর্থন করেছিলেন। এটি মার্ক্সবাদের শ্রেণিগত অবস্থান পরিত্যাগের ঘোষণা ছিল না; বরং সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংগ্রামের সঙ্গে নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তিসংগ্রামকে যুক্ত করার রাজনৈতিক উপলব্ধি।মাও সেতুংয়ের চিন্তায় জাতীয় মুক্তি ও আন্তর্জাতিকতাবাদের এই সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। জাপানি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চীনের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রেক্ষাপটে ১৯৩৮ সালে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, একজন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদী হয়েও কি দেশপ্রেমিক হতে পারেন? মাওয়ের উত্তর ছিল দ্ব্যর্থহীন—একজন কমিউনিস্টের জন্য এটি কেবল সম্ভাবনার বিষয় নয়, তাকে অপরিহার্যভাবে তা হতে হবে।মাওয়ের কাছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেম সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিপন্থী ছিল না। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির স্বাধীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন ও মাওয়ের জাতীয় প্রশ্নসংক্রান্ত অবস্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাত্ত্বিক পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক শিক্ষা তাদের চিন্তায় পাওয়া যায়—জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণিমুক্তির সম্পর্ককে কোনো যান্ত্রিক সূত্রে নির্ধারণ করা যায় না; তার বিচার করতে হয় সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভিত্তিতে।ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ এবং উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদ কি এক?ইউরোপে আধুনিক জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছিল সামন্ততান্ত্রিক সমাজের রূপান্তর, পুঁজিবাদী বাজারের সম্প্রসারণ, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ এবং নাগরিক পরিচয়ের উত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায়। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন ধারা প্রধানত ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ, সাম্রাজ্যবাদ এবং জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। আবার কিছু ব্যতিক্রমও ছিল। যেমন, আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে নিপীড়িত জাতির মুক্তিকামী জাতীয়তাবাদও বিকশিত হয়েছিল।অন্যদিকে, ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক জাতীয়তাবাদের একটি প্রধান উৎস ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এখানে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে কৃষকের জমির অধিকার, শ্রমিকের শোষণমুক্তি, ঔপনিবেশিক সম্পদ লুণ্ঠনের অবসান এবং জনগণের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও যুক্ত হয়েছিল।তবে উপমহাদেশীয় জাতীয়তাবাদও কোনো একক রাজনৈতিক ধারা ছিল না। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদ, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মুসলিম জাতীয়তাবাদ, দক্ষিণপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং পরবর্তী সময়ে ভাষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে বিকশিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ—এসব ধারার সামাজিক ভিত্তি, রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ঐতিহাসিক পরিণতি এক ছিল না।আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তায় জাতীয়তাবাদকে তার ঐতিহাসিক উৎস, সামাজিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক চরিত্র অনুযায়ী বিভিন্ন ধারায় বিশ্লেষণ করা হয়—নাগরিক জাতীয়তাবাদ, জাতিগত জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ, ঔপনিবেশিকতাবিরোধী জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ এবং বামপন্থী বা সমাজতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি। একই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্যেও একাধিক প্রবণতা সহাবস্থান করতে পারে। এমনকি ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ও শ্রেণিশক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের সঙ্গে একই জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক চরিত্রও বদলে যেতে পারে।এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো কোনো বামপন্থী নেতা আসলে কোন জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন? বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে, আধিপত্যবাদী ও সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে, নাকি পাকিস্তানি রাষ্ট্রের জাতীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বাঙালির ঐতিহাসিক মুক্তিকামী জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধেও?উপমহাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম ও শ্রেণিসংগ্রামের ঐতিহাসিক সম্পর্কভারতীয় উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সমান্তরালেই এখানে শ্রমিক-কৃষকের শ্রেণিভিত্তিক সংগ্রাম বিকশিত হয়েছিল। ১৯২০-এর দশক থেকে শ্রমিক সংগঠন, কৃষক আন্দোলন এবং কমিউনিস্ট রাজনীতির বিস্তার ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী সংগ্রামকে নতুন সামাজিক ভিত্তি দিয়েছিল।বাংলার তেভাগা আন্দোলনে ভাগচাষিরা জোতদারি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিলেন। তেলেঙ্গানার কৃষক সংগ্রাম সামন্ততান্ত্রিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এসব আন্দোলন জাতীয় স্বাধীনতার বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না; আবার জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া নেতৃত্বের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজেদের আবদ্ধ রাখেনি।তবে উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে জাতীয় প্রশ্নে গুরুতর তাত্ত্বিক ও কৌশলগত বিভ্রান্তিও দেখা গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট পার্টির ‘জনযুদ্ধ’ নীতি এবং ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত জাতীয়তাবাদী গণআন্দোলনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে জটিল করে তোলে।একইভাবে, দেশভাগের প্রাক্কালে গঙ্গাধর অধিকারীর প্রতিবেদনে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে গৃহীত অবস্থান এবং মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দেয়। জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক জাতিসত্তা এবং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার পার্থক্য নির্ধারণে এই অভিজ্ঞতা আজও আলোচনার দাবি রাখে।এই ইতিহাসের শিক্ষা হলো, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক অন্ধ অনুসরণ কিংবা নির্বিচার বিরোধিতার নয়। জাতীয় মুক্তির প্রগতিশীল উপাদানগুলোকে ধারণ করেও শ্রমিক-কৃষকের স্বতন্ত্র শ্রেণিস্বার্থ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অক্ষুণ্ন থাকে।বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা: ভৌগোলিক স্বাধীনতা থেকে শ্রেণিমুক্তির অসমাপ্ত সংগ্রামপাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এখানে জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণিসংগ্রামের আন্তঃসম্পর্ক অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয় মুক্তির যে আকাঙ্ক্ষা বিকশিত হয়েছিল, তার পেছনে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নের পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকারহীনতা, আঞ্চলিক শোষণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সম্পদ বণ্টনের অন্যায্যতা মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল। অর্থাৎ, বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ভেতরেই শ্রেণিগত অসন্তোষের একটি শক্তিশালী উপাদান শুরু থেকেই উপস্থিত ছিল। তৎকালীন বামপন্থী ও কমিউনিস্টদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব ছিল এই জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে শ্রমিক-কৃষকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা।১৯৭১ সালে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জিত হলেও উৎপাদনসম্পর্ক ও সম্পদের ওপর শ্রেণিগত নিয়ন্ত্রণের কোনো মৌলিক রূপান্তর ঘটেনি। ফলে জাতীয় মুক্তির পরবর্তী ঐতিহাসিক দায়িত্ব ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির দিকে এগিয়ে নেওয়া। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সীমাবদ্ধতা এখানেই। স্বাধীনতার পর শ্রমিক-কৃষকের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা, জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা এবং মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বামপন্থীরা কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এই ব্যর্থতার দায় কেবল বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের ওপর চাপিয়ে দিলে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দুর্বলতার আত্মসমালোচনা আড়ালে পড়ে যায়।শ্রেণিসংগ্রামের কথা উচ্চারণ করা আর বাস্তবে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করা এক বিষয় নয়। শ্রেণিসংগ্রামকে কেবল কারখানার মালিক ও শ্রমিকের অর্থনৈতিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র, গণতান্ত্রিক অধিকার, ধর্মীয় আধিপত্য, সাম্রাজ্যবাদী নির্ভরতা এবং জাতীয় নিপীড়নের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো আড়ালে পড়ে যায়। অথচ এসব বিষয় শ্রেণিশক্তির ভারসাম্য ও রাজনৈতিক সংগ্রামের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। জাতীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্ন থেকে শ্রেণিসংগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করা মার্ক্সবাদী রাজনীতিকে সংকীর্ণ ‘অর্থনীতিবাদে’ নামিয়ে আনার ঝুঁকিও তৈরি করে।বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় জাতীয় প্রশ্নটি একটি নতুন তাৎপর্য নিয়ে সামনে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক ধারা এবং ধর্মান্ধ ও উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো যখন রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার করছে, এমন প্রেক্ষাপটে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক প্রগতিশীল উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন নতুন গুরুত্ব পায়।এখানে জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন নিছক কোনো আবেগ নয়; এটি রাষ্ট্রের আদর্শিক চরিত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অর্জন রক্ষার প্রশ্ন। গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হলে শ্রমিকশ্রেণির সংগঠন, প্রতিবাদ এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিসরও সংকুচিত হয়। তদুপরি, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা শ্রমজীবী মানুষকে বিভক্ত করে এবং তাদের অভিন্ন শ্রেণিস্বার্থের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।সে দিক থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ স্বাধীনতা-পরবর্তী যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ এটি এখন কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; বরং ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা রক্ষার রাজনৈতিক ঢাল।জাতীয় প্রশ্ন ও শ্রেণিপ্রশ্নের এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক সিপিবির বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেও দৃশ্যমান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর চুক্তি, দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ কিংবা জাতীয় সম্পদের ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সিপিবির যে প্রতিবাদ, তার মূল রাজনৈতিক ভিত্তি কী?এসব আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। এগুলো সরাসরি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ক্ষেত্র, যার সঙ্গে জাতীয় মুক্তির চেতনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সংগ্রাম এবং দেশের অভ্যন্তরে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পরস্পরের পরিপূরক।বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রগতিশীল উত্তরাধিকার ধারণ করার অর্থ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের আনুগত্য স্বীকার করা নয়; আবার পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর স্বতন্ত্র পরিচয় ও অধিকারকে অস্বীকার করাও নয়। জাতীয় চেতনার প্রকৃত গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য সব নাগরিকের সমান মর্যাদা এবং সব জাতিসত্তার অধিকার নিশ্চিত করতে পারাটাই মূল কথা। জাতীয় পরিচয়ের বৃত্তের বাইরে গিয়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ যদি স্বতন্ত্র আদিবাসী পরিচয়ে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি করেন, তবে তা প্রদানে বাধা কোথায়?জাতীয় মুক্তির অর্জন রক্ষা এবং শ্রেণিশোষণের অবসান—এই দুটি সংগ্রামকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করানো নয়, বরং দ্বান্দ্বিক ঐক্যে বিকশিত করাই আজকের দিনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ওপর প্রধান ঐতিহাসিক দায়িত্ব হিসেবে বর্তায়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক কর্মী; কানাডা প্রবাসী]

বাগদা ফার্মের আন্দোলন: সাঁওতালদের অসহায়ত্বের অবসান কবে?

সমতল ভূমির আদিবাসীদের রয়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অধিকার হারানোর বেদনা এবং নীরবে দেশত্যাগের করুণ অধ্যায়। গত কয়েক দশকে সবচেয়ে আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাগুলোর একটি হলো গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের জমি আন্দোলন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলন কেবল ভূমির অধিকার আদায়ের লড়াই নয়; এটি প্রান্তিক আদিবাসী, বিশেষ করে সাঁওতালদের টিকে থাকার সংগ্রাম, আত্মপরিচয়ের লড়াই এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অসহায়ত্বের এক করুণ দলিল। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বরের রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পেরিয়ে গেছে ১০ বছর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনো বাগদা ফার্মের সাঁওতালসহ আদিবাসীদের জীবনে স্বস্তি বা স্থায়ী সমাধান আসেনি। তাদের পৈতৃক জমি উদ্ধার তো দূরের কথা, নিত্যনতুন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে তারা দিন কাটাচ্ছেন উচ্ছেদের আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায়।বাগদা ফার্মের সংকটের সূত্রপাত ১৯৬২ সালে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার মহিমাগঞ্জ চিনিকলের জন্য আখ চাষের উদ্দেশ্যে স্থানীয় সাঁওতালসহ আদিবাসী ও বাঙালিদের কাছ থেকে ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে। অধিগ্রহণের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল, কখনো ওই জমিতে আখ চাষ বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা চিনিকল বন্ধ হয়ে গেলে জমি মূল মালিক বা তাদের উত্তরাধিকারীদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। ২০০৪ সালে লোকসানের মুখে চিনিকলটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ চুক্তির শর্ত না মেনে আখ চাষের পরিবর্তে অন্যান্য ফসল চাষ এবং প্রভাবশালীদের কাছে জমি ইজারা দেওয়া শুরু করে। আদিবাসীরা দেখলেন, তাদের পৈতৃক জমিতে চুক্তির শর্ত মানা হচ্ছে না। ফলে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ও তিন ফসলি জমি ফেরত পাওয়ার দাবিতে তারা গড়ে তোলেন ‘সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি’। পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, এই ন্যায্য দাবিই যেন তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।সাঁওতালসহ আদিবাসীদের কাছে ৬ নভেম্বর ন্যায়বিচার না পাওয়ার এক কালো অধ্যায়। দিনটির কথা মনে পড়লে এখনো তারা শিউরে ওঠেন। সেদিন আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ, চিনিকল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় একদল প্রভাবশালী সশস্ত্র ব্যক্তির যৌথ হামলায় সাঁওতাল পল্লী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত হন শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু নামের তিন সাঁওতাল। হামলা শুধু হত্যাকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সাঁওতালদের সহায়-সম্পদ, রিকশা-ভ্যান, মাটির ঘর ও বসতবাড়িতে একযোগে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার ভিডিওচিত্র পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। শত শত সাঁওতাল পরিবার সবকিছু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি, ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসীরা পাননি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি প্রক্রিয়ার স্থবিরতা সাঁওতালদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সামনে চরম অসহায়ত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের রক্তভেজা তিন ফসলি জমিতে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) মাধ্যমে একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনের সরকারি সিদ্ধান্ত নতুন সংকট তৈরি করেছে। জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ইপিজেড নির্মিত হলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ সাঁওতাল পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত চাষের জমি হারাবে। আবারও আদিবাসীরা নিজ দেশে গৃহহীন ও উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রকল্প নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের বৈঠকগুলোতে মূল অংশীজন তথা ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতাল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না। আদিবাসীদের বাদ দেওয়ার এই প্রবণতা প্রমাণ করে, তাদের মতামত ও জীবনযাত্রার চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উন্নয়নের এই ধারায় আদিবাসীদের দীর্ঘশ্বাস ও কান্নার কোনো প্রতিফলন নেই।২০২৬ সালের বাস্তবতায় বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের অসহায়ত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের কোন্দল ও বিভেদ। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ক্লান্তি, প্রশাসনের চাপ এবং সুযোগসন্ধানী মহলের সূক্ষ্ম উসকানিতে ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির মধ্যে ভাঙন ধরেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসেও বাগদা ফার্মের নিয়ন্ত্রণ ও আন্দোলনের পথ নিয়ে সাঁওতালদের দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একসময়ের ঐক্যবদ্ধ আদিবাসী সমাজের মধ্যে যখন অবিশ্বাস, সন্দেহ ও অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা জায়গা করে নেয় এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মূল দাবিগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে। এই অভ্যন্তরীণ বিভেদ তাদের অসহায়ত্বকে আরও প্রকট করেছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও ন্যায্য অধিকার না পাওয়ার হতাশা থেকেই মূলত এই পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে।বর্তমানে মাদারপুর ও জয়পুরপাড়া এলাকার সাঁওতাল পরিবারগুলো চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যেকোনো মুহূর্তে উচ্ছেদ হওয়ার ভয় তাদের তাড়া করে ফিরছে। কৃষিই যাদের একমাত্র জীবিকা, সেই তিন ফসলি জমি থেকে উচ্ছেদ করা হলে তারা কোথায় যাবে, কীভাবে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেবে—তার কোনো সদুত্তর রাষ্ট্র বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নেই। আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির অধিকার আইনিভাবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় তারা আজ নিজ ভূমিতেই পরবাসী। সাঁওতালদের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ভূমি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও অস্তিত্বের ভিত্তি। ভূমি হারালে তাদের সামাজিক কাঠামো, ঐতিহ্য, জীবিকা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের সংবিধান সব নাগরিকের সমান অধিকার ও আইনের আশ্রয় লাভের নিশ্চয়তা দিয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ২৩ক অনুচ্ছেদে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের কথা বলা হয়েছে। এসব সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।বাগদা ফার্মের এই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট ও আদিবাসীদের অসহায়ত্ব দূর করতে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে।প্রথমত, চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। ১৯৬২ সালের মূল চুক্তি অনুযায়ী, চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জমির মালিকানা ও অধিকারসংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি করে প্রকৃত সাঁওতাল ও আদিবাসী মালিকদের উত্তরাধিকারীদের কাছে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।দ্বিতীয়ত, আদিবাসীদের বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া যাবে না। তিন ফসলি জমিতে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে জোরপূর্বক ইপিজেড নির্মাণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় আদিবাসী প্রতিনিধিদের সরাসরি অংশগ্রহণ ও তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।তৃতীয়ত, ২০১৬ সালের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ হত্যার সুষ্ঠু বিচার করতে হবে। একই সঙ্গে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর উপযুক্ত পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের আন্দোলন কেবল এক টুকরো জমির মালিকানার লড়াই নয়; এটি বাংলাদেশের আদিবাসীদের মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রতীক। রক্তের দাগ মাখা এই তিন ফসলি জমি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হলে তা দেশের মানবাধিকার ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর বড় আঘাত হবে। রাষ্ট্রকে শক্তি প্রদর্শনের পথ পরিহার করে সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের দিকে তাকাতে হবে। আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের অসহায়ত্বের অবসান ঘটিয়ে তাদের পৈতৃক ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই হবে রাষ্ট্রের অন্যতম বড় গণতান্ত্রিক ও মানবিক দায়িত্ব।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

রাষ্ট্র কি তার ইতিহাস ধারণে অক্ষম?

বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, “আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।”এই একটি বাক্যেই বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস, রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং জনগণের আত্মপরিচয়ের মূল কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র কি আজ সেই ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদায় ধারণ করছে?গত ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পূর্বনির্ধারিত একটি বিশেষ প্রদর্শনী উদ্বোধনের আগমুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় চার নেতা’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি ৩ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত চলার কথা ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুরোধে প্রদর্শনীটি স্থগিত করা হয়েছে। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, এটি কেবল একটি প্রদর্শনীর আয়োজন ছিল না, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় চার নেতার অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি উদ্যোগও ছিল। যে চার নেতা-সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান-১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভূমিকা স্মরণ করা কি রাষ্ট্রের জন্য কোনো অস্বস্তির বিষয় হওয়ার কথা? ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে তুলে এনে আরও পূর্ণাঙ্গ, সত্যনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাসকে একটি রাজনৈতিক দল নিজেদের একক সম্পত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। পরিবর্তনের পর বলা হয়েছিল, ইতিহাসের সব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ও অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখেছি? অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৭ মার্চ ও ৪ নভেম্বরসহ আটটি জাতীয় দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অথচ ৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ তারিখে গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়েছিল। একটি রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস, তার সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস এবং স্বাধীনতার জন্য নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের অবদান-এসব কি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্ব হারাতে পারে?ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করলে বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ-এসব আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত হয় বাংলাদেশের সংবিধান। আর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারের অভ্যন্তরে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। ঘটনাগুলো ভিন্ন সময়ের হলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, স্বাধীনতার সংগ্রাম ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কোনো একটি অধ্যায়কে আড়াল করে বা কোনো ব্যক্তির অবদানকে খাটো করে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা যায় না।এখানেই বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমান সরকার বিএনপির নেতৃত্বাধীন। দলটি নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে দাবী করে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁরই সন্তান। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি দলটির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। সেই প্রত্যাশা থেকেই প্রশ্ন উঠছে-অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি হওয়া ইতিহাসের মূল্যায়নসংক্রান্ত বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে বর্তমান সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে? জাতীয় চার নেতার স্মরণে একটি প্রদর্শনী নিরাপত্তাজনিত কারণে স্থগিত হওয়ার ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। স্বাধীনতার পক্ষে যাঁরা লড়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, সংগঠিত করেছেন, জীবন দিয়েছেন-তাঁদের অবদান বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসের অংশ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্কও হতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের সমাধান হওয়া উচিত গবেষণা, তথ্য-প্রমাণ ও মুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে- কোনো অধ্যায় বাদ দিয়ে, কোনো স্মরণানুষ্ঠান সংকুচিত করে কিংবা কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে আড়াল করে নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল বর্তমান পরিচালনা করা নয়, অতীতের সত্য ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতাও সংরক্ষণ করা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তার ইতিহাসের সুবিধাজনক অংশটুকু গ্রহণ করবে আর অস্বস্তিকর অংশটুকু এড়িয়ে যাবে-এমন হতে পারে না। জাতীয় চার নেতার অবদান, সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস কিংবা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্ব-সবকিছুর যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নিরাপত্তার বাস্তব উদ্বেগ থাকলে তা মোকাবিলা করে আয়োজনের বিকল্প ব্যবস্থা করা যায়, কিন্তু বারবার স্থগিত হওয়া বা বাদ পড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ইতিহাসচর্চার পরিসর সংকুচিত হলে তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।বাংলাদেশের জনগণ কোনো দলের মনোনীত ইতিহাস চায় না। তারা চায় সত্যনিষ্ঠ, পূর্ণাঙ্গ ও পক্ষপাতহীন ইতিহাস। কারণ ইতিহাসের মালিক কোনো সরকার নয়, কোনো রাজনৈতিক দলও নয়-ইতিহাসের উত্তরাধিকারী বাংলাদেশের জনগণ। লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

স্পিকারের বক্তব্যের আয়নায় সমাজের চিত্র

‘এখানে সমাজের নিকৃষ্ট যে লোকটা, সে-ই এমপি, মন্ত্রী হয়। সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজেরা সমাজের নেতা হয়ে গেছেন। সমাজব্যবস্থাটাই এমন হয়েছে, এখানে ভালো মানুষের নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই’—জাতীয় সংসদের স্পিকার।তিনি কঠিন সত্য কথা বলেছেন। তার কথায় প্রবল ক্ষোভ ও আত্মবিশ্বাস ছিল। দুটি বাক্যের মধ্যেই যেন গোটা দেশের চিত্র ফুটে উঠেছে। যদিও এমন কথা অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন। তবে জাতীয় সংসদের স্পিকার যখন এ কথা বলেন, তখন এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য ভিন্নতর হয়ে ওঠে।মনে পড়ে, আশির দশকের গোড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় এমনই একটি বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়েছিল। তখনকার দিনের একজন বিখ্যাত বিচারপতি তার প্রধান অতিথির ভাষণে একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। সেই বিচারপতির ছাত্ররাজনীতির পটভূমি ছিল খুবই প্রণিধানযোগ্য। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের ভিপি হিসেবে মাতৃভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ডাকসুর এক অভিষেক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘দেশে বর্তমানে ভালো মানুষের কোনো মূল্য নেই, সমাজে তারা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।’ একই সঙ্গে তরুণদের অবক্ষয়ের কথা তুলে ধরে বলেছিলেন, ‘যেখানে তরুণেরা বিপথগামী হবে, সেখান থেকে মুক্তি আশা করা যায় না।’এখন ভাবলে মনে হয়, বিগত চার দশকের বেশি সময়ে দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হওয়া ছাড়া মানুষের শ্রেণিচরিত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। আজও সেই বক্তব্য শতভাগ সত্য ও প্রাসঙ্গিক।২.বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সমাজের সৎ, বিবেকবান, দেশপ্রেমিক, ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষগুলো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা অসৎ, অসাধু, লুটেরা ও প্রতারকদের কালোটাকার আড়ালে ক্রমাগত ঢাকা পড়ে গেছেন। সমাজে তারা এতটাই অসহায় যে মুখ খুলে বলতেও পারছেন না, তারা ভালো নেই। একদিকে তারা পারছেন না নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে, অন্যদিকে অবৈধ অর্থের মালিক এবং নব্য চাঁদাবাজ ও দখলদার শ্রেণির কবলে পড়ে রক্ষা করতে পারছেন না নিজেদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। দেশের অরাজনৈতিক, দেশপ্রেমিক ভালো মানুষগুলোর মুখে যেন কোনো শব্দ নেই। তারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।গত কয়েক বছরে গ্রামে-গঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায় সর্বত্র একশ্রেণির উঠতি বয়সী তরুণের উত্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে এ জাগরণ সমাজহিতৈষী নয়, বরং সমাজবিরোধী। তারা লেখাপড়ায় নেই, থাকলেও যৎসামান্য। তারা ব্যবহৃত হচ্ছে নানা অপকর্মের হাতিয়ার হিসেবে। তাদের ব্যবহার করছেন তথাকথিত দলবাজ, পল্টিবাজ ও ক্ষমতালোভী নেতারা।নেতাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ আলোকিত। তারা বিদেশে পড়াশোনা করছে কিংবা অন্য উদ্দেশ্যে সেখানে বসবাস করছে। তাদের অর্থবিত্তের জোগান আসে এ দেশ থেকে। বিদেশে তারা আরাম-আয়েশের জীবন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে অন্যের সন্তানদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মাদক, নেশার উপকরণ, মোটরসাইকেলের চাবি। তাদের দেওয়া হচ্ছে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির দায়িত্ব। সারা দেশে তারাই এখন জাতীয় সমস্যার আরেক নাম।এদের কোনো দলমত নেই, আদর্শ নেই। তারা সব সময় ক্ষমতাসীন দলের কাছাকাছি থাকা পাতিনেতাদের পদলেহন করে, ভোল পাল্টে সুযোগ নেয়। নেতাদের দেওয়া আদেশ-নির্দেশ পালন করাই তাদের প্রধান কাজ।স্পিকার খেদের সঙ্গে আরও একটি মূল্যবান কথা বলেছেন, ‘নেতারা মাদক খায়, কর্মীরাও মাদক খায়। সব বাটপারের কারখানা হয়ে গেছে এসব জায়গা। ধীরে ধীরে চোখের সামনে সমাজটা নষ্ট হয়ে গেল।’ এ যেন চারদিকে এক অদ্ভুত আঁধার নেমে আসছে।৩.আশির দশকের আরও একটি সংবাদ শিরোনামের কথা মনে পড়ে। মাসিক গণস্বাস্থ্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এক ভয়াবহ প্রচ্ছদ কাহিনি—‘নেশার কবলে বাংলাদেশ’। তখন এমন শিরোনাম ছিল অবিশ্বাস্য। প্রয়াত আলোচিত সাংবাদিক মিনার মাহমুদ এ প্রচ্ছদ কাহিনি রচনা করেছিলেন। তৎকালীন ঢাকার চানখাঁরপুল, সদরঘাট, মিরপুরসহ নানা স্থানের মাদকের আখড়ার কথা উল্লেখ ছিল এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। এতে দেশে নেশা ও মাদকের সর্বগ্রাসী ছোবলের ইঙ্গিত ছিল। যদিও তখন পর্যন্ত এ বিষয়ে দেশের সাধারণ মানুষের তেমন কোনো ধারণাই ছিল না।অথচ আজকের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতায় পণ্য হিসেবে মাদকের অবাধ বিচরণ অনেক বেশি সহজলভ্য হয়েছে। দেশের গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায়, ঘরে ঘরে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। এদের পেছনে রয়েছে নেতারা, যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করছেন অন্য সবকিছু। চিহ্নিত মাদকসেবী ও মাদক কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনে দিনরাত নিরাপদে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। হাটবাজারে সবার জ্ঞাতসারে কেনাবেচা হচ্ছে মাদকদ্রব্য। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ছে। একশ্রেণির তরুণ রাতে মাদক সেবন করে, দিনে চাঁদাবাজি করে এলাকা চষে বেড়াচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এদের রোখার ক্ষমতা যেন কারও হাতে নেই। সত্যিকার অর্থেই এখন সমগ্র বাংলাদেশ নেশার কবলে।৪.এবার স্পিকারের কথায় ফিরে আসা যাক। কেন এ দেশে নিকৃষ্ট দুর্নীতিবাজেরা এমপি-মন্ত্রী হন? অতীতে এ বিষয়ে অনেক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। হালের টক শো তো আছেই। কিন্তু কোনো সমাধান কি এসেছে? আসেনি। কারণ, যাঁরা সভায় সভাপতির আসনে বসে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, কালোটাকা ও মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলেন, দিনের শেষে তারাই আবার মনোনয়ন-বাণিজ্যেরও হোতা হয়ে ওঠেন।যে দেশে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরাও এমপি পদে মনোনয়নের জন্য আদাজল খেয়ে তদবিরে নেমে যান, সেখানে শিক্ষিত, সৎ, দেশপ্রেমিক ও ভালো মানুষের নির্বাচিত হওয়া সম্ভব কি? দেশের গত কয়েক বছরের চিত্র তো তা-ই বলে।এমনও দেখা গেছে, একাধিক উচ্চশিক্ষিত ও যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় অশিক্ষিত একজন বিত্তবান পাদুকা ব্যবসায়ীর পক্ষে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দেনদরবার হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারই মনোনয়নপ্রাপ্তি ঘটেছে। তিনি এমপি হয়েছেন। বছরের পর বছর এলাকার হাজার হাজার দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষিত মানুষের ওপর খবরদারি চালিয়েছেন।এখানে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি বিবেচ্য নয় বলে তারা নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে বাহিনী নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন। সংসদের পাঁচ বছরে এরা মোটামুটি নীরবতা পালন করেন। কারণ, এটাই তাদের নিরাপদে ও শত্রুমুক্ত থাকার কৌশল। কেবল নিভৃতে নিজেদের ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যে আলাদিনের প্রদীপের মতো জ্বলে ওঠেন। নির্বাচনের আগে করা বিপুল ব্যয় পুষিয়ে নিয়ে রাতারাতি ফুলেফেঁপে ওঠেন।এ দেশে এমপির গাড়ি ও জাতীয় সংসদের মূল্যবান প্রতীক যেন বাণিজ্যে লক্ষ্মীর মতো কাজ করে। এটি এখন ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পপতি হওয়ার এক অসাধারণ সোপানের নাম।বলাবাহুল্য, দেশে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা মাঠপর্যায়ে কাজ করে থাকে। নির্বাচন এলে তারা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তৎপর হয়। গত এক দশক ধরে লক্ষণীয় যে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এসব সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। তাদের লিখিত মতামত ও জনপ্রিয়তা যাচাইবিষয়ক গোপন প্রতিবেদন পাওয়ার জন্য প্রায় সবাই ছোটাছুটি করেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সাধ্যাতীত চেষ্টা করে সরকারকে অবহিত করে। কিন্তু বাস্তবে এসব তথ্য খুব বেশি আমলে নেওয়া হয় না। দলগুলোর সর্বোচ্চ নেতৃত্বের তালিকাই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়।মনে হয়, এটিও এক অদ্ভুত রাষ্ট্রীয় আচার ও প্রথায় পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে না। ফলে জাতীয় সংসদ যেন এক দুর্বোধ্য প্রাচীরের ভেতরে আটকে পড়েছে। এ প্রাচীর ভেদ করে বেরিয়ে আসা সহজ হবে না। কেননা, সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় অর্থের শক্তিতে।৫.অথচ জাতীয় সংসদের সদস্য, উচ্চ আদালতের বিচারক, সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণের দায়িত্ব জাতীয় সংসদের হাতেই রয়েছে। কিন্তু কোনো আমলেই বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সর্বোচ্চ অবস্থানে থেকেও এ বিষয়ে কখনো আইন পাস হয় না। এতেই বোঝা যায়, আইন প্রণয়নের পথে বাধা বা অন্তরায় কোথায়।এমনকি কখনো কখনো উচ্চ আদালতের সম্মতি তথা নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এসব বাস্তবায়িত হয়নি। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর পথ পেরিয়ে এসেও জাতি আজ একই তিমিরে ঘুরপাক খাচ্ছে।বর্তমান স্পিকার একজন আইনপ্রণেতা, বহুবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি অশীতিপর একজন ঝানু পার্লামেন্টারিয়ানও বটে। তার মুখ থেকে এমন হতাশার মন্তব্য সমগ্র জাতির সামনে প্রশ্নের জন্ম দেবে, এটাই স্বাভাবিক।আশির দশকের আরও একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। জেনারেল হোসেন মুহাম্মদ এরশাদ তখন ক্ষমতায়। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী ছিলেন এর প্রতিবেদক। তিনি গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস, নাকি আফগান মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন, তা ঠিক মনে নেই। বাণীটি ছিল, ‘এমন এক সময় আসবে, যখন জ্ঞানীরা জ্ঞানী হওয়ার কারণে অনুশোচনা করবেন, মূর্খরা তাদের মূর্খতার জন্য গর্ব করবেন, আর দুর্নীতিবাজেরা তাদের দুর্নীতির জন্য উল্লাস করবেন।’যত দূর মনে পড়ে, ওই প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে সেই সাংবাদিককে তখন অনেক খেসারত দিতে হয়েছিল। এখন দেশের যেদিকেই তাকানো যায়, এমন উল্লাসের নৃত্যই চোখে পড়ে। আর সমাজের উৎকৃষ্ট ও ভালো মানুষগুলো যেন অনুশোচনার আগুনে তিলে তিলে দগ্ধ হচ্ছেন।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার]

স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োজন সমন্বিত জনবল পরিকল্পনা

একটি উপজেলা হাসপাতালের কথা ভাবুন। সেখানে একজন চিকিৎসক আছেন, কিন্তু রোগীকে ইনজেকশন দেওয়া, স্যালাইন চালানো, রক্তচাপ মাপা, পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা কিংবা এক্স-রে করার মতো পর্যাপ্ত কর্মী নেই। ফলে চিকিৎসককে নিজের কাজের বাইরেও অনেক দায়িত্ব সামলাতে হয়। আর রোগীকে দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। এটি কোনো একটি হাসপাতালের চিত্র নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিচিত বাস্তবতা। সমস্যার মূলে শুধু জনবলের ঘাটতি নয়, জনবলের অসম কাঠামোও রয়েছে।১:৩:৭ অনুপাত কেন গুরুত্বপূর্ণস্বাস্থ্যসেবা কখনোই একক কোনো পেশার কাজ নয়। চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন। নার্স ও ধাত্রী রোগীর শয্যাপাশে সরাসরি সেবার বড় অংশ নিশ্চিত করেন। আর প্যারামেডিক ও সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীরা পরীক্ষাগার, রোগের চিত্রায়ণ, ওষুধ সরবরাহ, ফিজিওথেরাপি, জরুরি সেবা ও স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখেন।বৈশ্বিক আলোচনায় সাধারণত প্রতি একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স ও পাঁচজন সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীর কথা বলা হয়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবানির্ভর দেশে আমার প্রস্তাব, কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে চিকিৎসক:নার্স:প্যারামেডিক অনুপাত ১:৩:৭ নির্ধারণ করা। এতে চিকিৎসকের সময় বাঁচবে, সেবার মান বাড়বে এবং ব্যয়ও তুলনামূলক কমবে।বাস্তব চিত্র: সংখ্যায় এগিয়েছি, কাঠামোয় পিছিয়েস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মানবসম্পদবিষয়ক তথ্যপত্র ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত এমবিবিএস চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার। এর মধ্যে সেবায় নিয়োজিত আছেন প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার। নিবন্ধিত নার্সের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার। ২০১৯ সালের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রীর সম্মিলিত ঘনত্ব ২০১৯ সালে প্রতি ১০ হাজারে ৮ দশমিক ৩ জন থেকে বেড়ে ১৫ দশমিক ১৬ জনে পৌঁছেছে।কিন্তু এই অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাবিত মানদণ্ড প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে ৪৪ দশমিক ৫ জন। অর্থাৎ আমরা এখনো এই মানদণ্ডের অর্ধেকেরও অনেক নিচে রয়েছি।আরও উদ্বেগের বিষয় হলো জনবলের অনুপাতের ভারসাম্যহীনতা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স আছেন একেরও কম, প্রায় ০ দশমিক ৭৫ থেকে ১ দশমিক ১ জন। অথচ কাঙ্ক্ষিত অনুপাত তিনজন। সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাও কাঙ্ক্ষিত পাঁচজনের তুলনায় দুইয়ের কম। ২০১৯ সালে পরিস্থিতি ছিল আরও করুণ। তখন অনুপাত ছিল ১:০.৬:০.৩। অর্থাৎ আমরা উন্নতি করেছি, কিন্তু গন্তব্য এখনো অনেক দূরে।নিয়োগে ভারসাম্যহীনতাসমস্যার একটি বড় কারণ জনবল নিয়োগ ও পদ সৃষ্টির প্রচলিত ধারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ প্রায় ৩৮ হাজার ২৫৫টি। অন্যদিকে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে নার্স ও ধাত্রীর পদ প্রায় ৫০ হাজার ৮২৫টি। অর্থাৎ পদ কাঠামোতেই ১:৩ অনুপাতের ধারেকাছেও যাওয়া সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেছেন, অতীতে জনবল সংকট দেখা দিলে নিয়োগের ক্ষেত্রে মূলত চিকিৎসকদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজনীয় ভারসাম্য উপেক্ষিত থাকত।এর সঙ্গে রয়েছে শূন্য পদের সমস্যা। ২০২৫ সালের মানবসম্পদবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের প্রায় ৪ হাজার ৩০৮টি এবং নার্সের প্রায় ১ হাজার ৬৫৩টি পদ শূন্য ছিল। পরবর্তী সময়ের তথ্যে অনুমোদিত পদ ও শূন্য পদের সংখ্যা দুটোই বেড়েছে। চিকিৎসকের প্রায় ৯ হাজার ৯৯০টি এবং নার্সের ৪ হাজার ৮৭০টি পদ খালি রয়েছে। একদিকে পদ শূন্য, অন্যদিকে কয়েক হাজার প্রশিক্ষিত নার্স বেকার। এটি পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রমাণ।চাহিদার হিসাব২০২৫ সালে প্রকাশিত স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার জন্য সরকারি খাতে প্রয়োজন প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার চিকিৎসক, ৩ লাখ ৫০ হাজার নার্স এবং ৫ লাখ ১৭ হাজার অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী।সহজ হিসাবেই বিষয়টি বোঝা যায়। বর্তমানে সেবায় নিয়োজিত প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার চিকিৎসকের জন্য ১:৩ অনুপাতে প্রয়োজন প্রায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার নার্স। অথচ আছেন প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার। অর্থাৎ ঘাটতি ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। একই চিকিৎসকসংখ্যার বিপরীতে ১:৭ অনুপাতে প্রয়োজন প্রায় ৮ লাখ ১০ হাজার প্যারামেডিক ও সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মী। এই বিশাল ঘাটতি রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একটি কৌশলগত পরিকল্পনা।করণীয় কীপ্রথমত, জাতীয় স্বাস্থ্য জনবল পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতাল—প্রতিটি পর্যায়ের জন্য ১:৩:৭ অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে জনবলের কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। চিকিৎসক নিয়োগের সময়ই প্রয়োজনীয় নার্স ও প্যারামেডিকের পদ অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা উচিত।দ্বিতীয়ত, নার্সিং ও প্যারামেডিক শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কলেজে আসনসংখ্যা বাড়ানো, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পরীক্ষাগার ও আবাসনসুবিধা নিশ্চিত করা এবং মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউটগুলোকে শক্তিশালী করা জরুরি। শিক্ষার মানের সঙ্গে আপস না করে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ কর্মী তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।তৃতীয়ত, এসব পেশায় কর্মজীবনের আকর্ষণ বাড়াতে হবে। নার্স ও প্যারামেডিকদের জন্য স্পষ্ট পদোন্নতির কাঠামো, ন্যায্য বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং দুর্গম এলাকায় কাজের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। তা না হলে প্রশিক্ষিত জনবল দেশের বাইরে চলে যাবে অথবা পেশা ছেড়ে দেবে।চতুর্থত, অপরিকল্পিত নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার জনবলসংক্রান্ত তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল তথ্যভান্ডারে আনতে হবে। কোথায় কত পদ শূন্য, কোথায় কতজন প্রশিক্ষিত কর্মী বেকার—এসব তথ্য এক জায়গায় পাওয়া গেলে নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর ও তথ্যভিত্তিক হবে।পঞ্চমত, বেসরকারি খাতকেও এই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। দেশের স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই লাইসেন্স প্রদান ও মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সেখানেও ন্যূনতম নার্স ও কারিগরি স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপাত নিশ্চিত করা উচিত।ষষ্ঠত, দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। প্রশিক্ষিত নার্স বা প্যারামেডিক যেসব কাজ নিরাপদে করতে পারেন, সেসব দায়িত্ব তাঁদের হাতে দিতে হবে। এতে চিকিৎসকেরা জটিল রোগীর চিকিৎসায় বেশি সময় দিতে পারবেন।স্বাস্থ্যসেবা একটি দলগত কাজ। চিকিৎসক সেখানে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, কিন্তু একা তিনি সাফল্য নিশ্চিত করতে পারেন না। শুধু চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ালে হাসপাতালের ভবন ও শয্যা পূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেবা পূর্ণতা পাবে না। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে জনবল পরিকল্পনায় সংখ্যার চেয়ে ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।১:৩:৭ অনুপাতকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তা হলে আগামী এক দশকে আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব, যেখানে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—সবখানেই মানুষ সময়মতো মানসম্মত সেবা পাবেন।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন]

অক্ষরের অলিন্দে আত্মজিজ্ঞাসার আয়না

লন্ডন এমন এক শহর, যেখানে বর্তমানের ব্যস্ততার পাশেই অতীত নীরবে বসবাস করে। রাজপথে হাঁটতে হাঁটতে কখনো মনে হয়, পুরোনো ভবনগুলো যেন সময়ের কাছে লেখা দীর্ঘ চিঠি—যার প্রতিটি জানালায় আটকে আছে কোনো এক যুগের গল্প। টেমসের জল বয়ে যায়, বদলায় নগরীর চেহারা, বদলায় মানুষের জীবনযাপন; তবু ইতিহাসের কিছু চিহ্ন থেকে যায় অবিচল। এমন এক শহরে আমার গন্তব্য ব্রিটিশ লাইব্রেরি। সেখানে যাচ্ছিলাম একটি বিখ্যাত গ্রন্থাগার দেখতে, কিন্তু ফিরে এলাম নিজের সমাজ, ইতিহাস ও জ্ঞানচর্চা নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন সঙ্গে নিয়ে।সেন্ট প্যানক্রাসের ব্যস্ত এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটির স্থাপত্যে প্রথমেই চোখে পড়ে লাল ইটের গাম্ভীর্য। বিশাল অথচ সংযত অবয়ব; যেন নিজের গুরুত্ব ঘোষণা না করেও তা জানান দিতে জানে। বাইরে মানুষের দ্রুত পদচারণা, যানবাহনের শব্দ, স্টেশনের ব্যস্ততা। ভেতরে প্রবেশ করতেই সেই কোলাহল যেন কয়েক ধাপ দূরে সরে যায়। এখানে নীরবতা শূন্য নয়; বরং অসংখ্য মানুষের চিন্তা, শ্রম ও আবিষ্কারের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ।ব্রিটিশ লাইব্রেরি ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই যুক্তরাজ্যের স্বতন্ত্র জাতীয় গ্রন্থাগার হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তবে এর শেকড় আরও পুরোনো। ১৭৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্রন্থসংগ্রহের মধ্যেই এর ইতিহাসের সূচনা। সেন্ট প্যানক্রাসে বর্তমান ভবনটি ১৯৯৮ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ উদ্বোধন করেন। সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্রন্থাগারে পরিণত হয়েছে। এর সংগ্রহে রয়েছে ১৭ কোটিরও বেশি উপাদান—বই, পাণ্ডুলিপি, সংবাদপত্র, মানচিত্র, চিঠি, আলোকচিত্র, শব্দরেকর্ডিং, সংগীতের স্বরলিপি ও অসংখ্য ঐতিহাসিক দলিল।সংখ্যাটি বিস্ময়কর, কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় বিস্ময় এর ভেতরে জমা মানুষের জীবন। কোনো বিবর্ণ চিঠিতে হয়তো অপেক্ষার কথা লেখা আছে, কোনো পুরোনো সংবাদপত্রে ধরা আছে একটি সময়ের রাজনৈতিক উত্তাপ, কোনো মানচিত্রে চিহ্নিত হয়েছে আজ আর নেই এমন জনপদ। কাগজের গায়ে কালি শুকিয়ে গেছে বহু আগে, কিন্তু তার ভেতরের সময় এখনো শুকায়নি। একটি দলিল খুললে কখনো রাষ্ট্রের ইতিহাস সামনে আসে, কখনো সাধারণ মানুষের অজানা জীবনের দরজা খুলে যায়। এখানে ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ কিংবা যুদ্ধজয়ের বিবরণ নয়; মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার চিহ্নও।ট্রেজারিজ গ্যালারিতে গিয়ে সেই অনুভূতি আরও তীব্র হলো। ম্যাগনা কার্টা, শেক্‌সপিয়রের প্রথম ফোলিও, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নোটবুকের মতো ঐতিহাসিক নিদর্শন মানুষের চিন্তার অসাধারণ ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কয়েক শতাব্দী আগে লেখা কোনো পঙ্‌ক্তি কিংবা আঁকা কোনো রেখার সামনে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, মানুষের সৃষ্টিশীলতা সময়ের সীমানা মানে না। একটি দলিল নাগরিক অধিকার সম্পর্কে রাষ্ট্রের ধারণা বদলে দিতে পারে, একটি সাহিত্যকর্ম ভাষার প্রকাশভঙ্গিকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে পারে। এসব নিদর্শন তাই কেবল অতীতের স্মারক নয়, মানুষের চিন্তার বিবর্তনেরও সাক্ষ্য।তবে এই সংগ্রহের সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধতার পাশাপাশি কিছু কঠিন প্রশ্নও মনে আসে। ইতিহাসের সম্পদ কার? কোন পথে, কার অনুমতিতে, কোন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক নিদর্শন অন্য ভূখণ্ডের সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে? ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক অতীত বিবেচনায় প্রশ্নগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উপনিবেশ থেকে সংগৃহীত বহু নিদর্শনের মালিকানা ও প্রত্যর্পণ নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। কোনো ঐতিহাসিক বস্তু যত্নে সংরক্ষণ করা জরুরি, কিন্তু তার উৎস, অধিকার ও সংগ্রহের ইতিহাসের প্রতিও দায়বদ্ধ থাকা প্রয়োজন। অতীতকে কেবল প্রদর্শন করাই যথেষ্ট নয়; অতীতের অন্যায় নিয়েও সৎ আলোচনা দরকার।এই বিশাল সংগ্রহে দক্ষিণ এশিয়ার ভাষা, সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতির বহু উপাদান রয়েছে। দূরদেশের একটি গ্রন্থাগারে উপমহাদেশের পরিচিত সাংস্কৃতিক চিহ্ন দেখে নিজের শেকড়ের কথা মনে পড়ল। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যও এই বৃহত্তর ইতিহাসের অংশ। আমাদের পুঁথি, পুরোনো সংবাদপত্র, সাহিত্যকর্ম ও সামাজিক দলিল শুধু আমাদের নিজস্ব সম্পদ নয়; মানবসভ্যতার ইতিহাস বোঝারও উপকরণ। অথচ দেশে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি ও ঐতিহাসিক দলিল এখনো যথাযথ সংরক্ষণের অপেক্ষায়। কোথাও পরিচর্যার অভাব, কোথাও অর্থের সংকট, কোথাও আবার প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ঘাটতি। অন্যের সংগ্রহশালায় নিজের ঐতিহ্যের চিহ্ন দেখে গর্বিত হওয়া সহজ; নিজের ঘরের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব নেওয়াই কঠিন।ব্রিটিশ লাইব্রেরির প্রকৃত শক্তি শুধু তার সংগ্রহের বিশালতায় নয়, জ্ঞানচর্চার ব্যবস্থাতেও। নির্ধারিত নিয়মে রিডার পাস নিয়ে গবেষক, শিক্ষার্থী ও পাঠকেরা পাঠকক্ষে কাজ করতে পারেন। কেউ পুরোনো দলিল ঘেঁটে ইতিহাসের অজানা অধ্যায় খুঁজছেন, কেউ ভাষার বিবর্তন অনুসন্ধান করছেন, কেউ সংবাদপত্রের পাতায় খুঁজছেন কোনো ঘটনার হারিয়ে যাওয়া সূত্র। তাঁদের নীরব শ্রমে বোঝা যায়, জ্ঞান কোনো সাজানো প্রদর্শনী নয়; এটি নিরন্তর অনুসন্ধানের বিষয়। সংরক্ষিত তথ্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠাভ্যাসের কথাও মনে হলো। বাংলাদেশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগার আছে, কিন্তু সবখানে তা শিক্ষার্থীদের জীবন্ত অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠতে পারেনি। কোথাও বইয়ের ঘাটতি, কোথাও পাঠকক্ষের অনুপযুক্ত পরিবেশ, কোথাও আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল সংরক্ষণের অভাব। আমরা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে যতটা সময় দিই, মুক্তভাবে পড়া ও জানার আনন্দে ততটা সময় দিই কি? যে শিক্ষার্থী শুধু নির্ধারিত পাঠের উত্তর মুখস্থ করে, তার সামনে পৃথিবীর বিস্তৃত প্রশ্নগুলো অনেক সময় অদেখাই থেকে যায়।গ্রন্থাগার তাই কোনো প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত আয়োজন নয়; এটি একটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি। সড়ক মানুষের চলার পথ তৈরি করে, গ্রন্থাগার তৈরি করে চিন্তার পথ। হাসপাতাল যেমন শরীরের সুরক্ষায় প্রয়োজন, তেমনি পাঠাগার প্রয়োজন সমাজের মননশীলতা ও বিচারবোধের বিকাশে। উন্নয়নের হিসাব শুধু সেতু, ভবন কিংবা বড় প্রকল্প দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না। সেই হিসাবের মধ্যে থাকতে হয় কত শিশু বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, কত তরুণ গবেষণার সুযোগ পাচ্ছে, কত পুরোনো দলিল নিরাপদে সংরক্ষিত হচ্ছে—এসব প্রশ্নও।ব্রিটিশ লাইব্রেরির সাধারণ প্রবেশ বিনা মূল্যে। স্থায়ী ট্রেজারিজ গ্যালারিও সাধারণত বিনা টিকিটে দেখা যায়; বিশেষ প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে আলাদা টিকিট লাগতে পারে। এই উন্মুক্ততা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জ্ঞানচর্চার দরজা যত বেশি মানুষের জন্য খোলা থাকবে, সমাজে কৌতূহল ও অনুসন্ধানের পরিসরও তত বাড়বে। কোনো শিশু প্রথমবার কয়েক শ বছরের পুরোনো পাণ্ডুলিপি দেখে হয়তো ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে। সেই ছোট্ট বিস্ময়ই একদিন বড় কোনো অনুসন্ধানের শুরু হতে পারে।গ্রন্থাগার থেকে বেরিয়ে আবার ইউস্টন রোডের ব্যস্ততায় ফিরে এলাম। শহর তার নিজস্ব গতিতে ছুটছে। অথচ মনে হচ্ছিল, ভেতরে দেখা প্রতিটি নিদর্শন যেন একটি করে প্রশ্ন রেখে গেছে। আমাদের ইতিহাস কতটা নিরাপদ, আমাদের পাঠাগার কতটা প্রাণবন্ত, জ্ঞান ও গবেষণা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে কতটা জায়গা পাচ্ছে? ব্রিটিশ লাইব্রেরি দেখে বুঝলাম, একটি জাতির পরিচয় শুধু তার অতীতের গৌরবে নয়; সেই অতীতকে সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ববোধেও। সেদিন তাই শুধু একটি গ্রন্থাগার দেখে ফিরিনি; নিজের সমাজের দিকে নতুন করে তাকানোর প্রয়োজন অনুভব করেছি।[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী]

সবাইকে কি পরীক্ষায় পাস করতেই হবে?

পাস কর, নইলে মর!প্রথম কথাটি উচ্চারিত হলেও পরের কথাটি অনুচ্চারিত। অথচ বাস্তবে তা যথেষ্ট সত্য। একজন পরীক্ষার্থী কত কারণে খারাপ ফল করতে পারে, তা সমাজের অনেকেই জানেন না। যেসব বাবা-মায়ের নিজের কোনো সনদ নেই, তাদেরও সন্তানকে নিয়ে আশা আকাশছোঁয়া! একটি পরীক্ষা যেকোনো কারণে খারাপ হতে পারে। এমনকি কোনো কারণে অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।আমার মেয়ে এবার জিপিএ-৫ পায়নি। আত্মীয়স্বজনের আড়চোখে তাকানো দেখেছি। অনেকে মুখে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে নেতিবাচক মন্তব্য করে ঢোক গিলে ফেলেছেন। আবার কেউ কেউ প্রচণ্ড সমালোচনাও করেছেন। বুঝেও চুপ থেকেছি। আরেকটু দেখে নিয়েছি মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।কিন্তু এরপরও আমি জানি, আমার সন্তান ভালো ফল করেছে। এটাই তার সত্যিকারের ফলাফল। শিক্ষামন্ত্রীও চেয়েছেন প্রকৃত ফলাফল বেরিয়ে আসুক। আমরা যেন অনেক বেশি নম্বর পাওয়া বা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো ফল দেখে আপ্লুত না হই!আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঠিক করতে হলে সত্যিকার অর্থেই মানসম্মত শিক্ষার দিকে যেতে হবে। আমার সন্তানের মা বলেছেন, তুমি অনেক কিছু করতে পারবে। কারণ, তুমি পরীক্ষা শেষ করে এখন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার উপযোগী করে নিজেকে গড়ে তুলেছ। আমাদের কাছে যোগ্যতা অর্জনই অনেক বড় বিষয়।তিনি আরও বলেছেন, তুমি যদি অকৃতকার্যও হতে, তবে মানুষকে কী বলব, সেটাও আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম। তোমাকে ছোট করে এমন কোনো কথা অন্তত পরিবার থেকে উচ্চারণ করব না।আত্মহত্যার ঘটনাগুলো বরাবরের মতোই কানে আসছে। গাজীপুরের শ্রীপুরে সিয়াম নামে এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর শুনলাম। চিরকুটে লিখেছে, ‘মা, আমি তোমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারলাম না।’ কথাটির ওজন অনেক। সন্তানেরও হয়তো স্বপ্ন অনেক বড় ছিল। ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে পানি ঝরেছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই অনেক কিছু মিথ্যা মনে হয়েছে। ভেবেছি, আমরা পেরে উঠছি না। আমরা শুধু শিক্ষিত বানানোর নামে একটি প্রতিযোগিতায় নেমেছি! এ খেলা অসম, এ খেলা নিজেদের শেষ করে দেওয়ার!সমাজে এমন সব রোগ ছড়িয়ে পড়েছে, যার কারণে আমাদের মনোজগতে একধরনের মৃত্যু ঘটছে। প্রতিযোগিতা চলছে নম্বরে নম্বরে। বাবা-মায়েরা ঘেমে যান সন্তানের প্লে-শ্রেণির ফল প্রকাশের দিন থেকেই। আধা নম্বর কম পেলেও শিক্ষকের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেন, কেন কম পেল!শিক্ষকেরাও আধা নম্বর বাড়িয়ে সন্তানকে পাস করিয়ে মায়েদের মুখে অমলিন হাসি দেখার অভ্যাস করে ফেলেছেন!আমরা যারা সামাজিক মানুষ, কোনো শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলে আগেই বলে দিই, ‘আগেই জানতাম, এমনই হবে!’যে শিক্ষার্থীর মা-বাবা তাকে খোঁটা দেন, তার ওপর সামাজিকভাবেও এমন আচরণ করা হলে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে বাধ্য। তার কাছে তখন এ কথাটিই সত্য হয়ে ওঠে—‘পাস কর, অথবা মর!’পাসের প্রতিযোগিতায় আমরা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছি যে গত বছরগুলোতে আমাদের পাসের ফল কিনতেও বাধ্য করা হয়েছে! এবার অন্তত ক্ষান্ত দিন। মানসম্মত শিক্ষার দিকে আসুন। সন্তান সবাই পাস করবে, পড়বে, সনদ নেবে, চাকরি করবে, টাকা আনবে—শুধু এটাই কি জীবনের লক্ষ্য?সেদিন কক্সবাজারে একটি ছেলের সঙ্গে দেখা হলো। দারুণ গান গায়। ছেলেটি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। পড়াশোনায় খুব ভালো ফল করে না। কিন্তু সে ভালো গান গায়। সে যদি শুধু গানই গায়, তবুও কি জীবিকা অর্জন করতে পারবে না? যদি শুধু জীবিকার জন্যই পড়াশোনা করতে হয়, তবে যেকোনো সৎ উপায়েই সে তা করতে পারে। যাই হোক, সবাই একই পথে হাঁটবে না।আমাদের বাচ্চাদের একটু শান্তিতে পড়াশোনা করার সুযোগ দিন। পাস-ফেল পাশাপাশি শব্দ। আবার ‘ব্যর্থতাই সাফল্যের স্তম্ভ’—কথাটিও পরীক্ষিত সত্য। তাদের প্রতিযোগিতা করার সুযোগ দিন।যে শিক্ষার্থী ফেল করেছে, তার বাবা-মা হিসেবে তার পাশে গিয়ে বলুন, জীবনটা এমনই। এবার তুমি খারাপ করেছ, তার মানে এই নয় যে তুমি আর ভালো করতে পারবে না। পরেরবার তুমি সবার চেয়ে ভালো করবে। আর পড়াশোনায় ভালো না করলেও জীবনে ভালো মানুষ হবে।কষ্টের সময় তাকে জাপটে ধরে ছোটবেলার মতো বলুন, ‘বাবা/মা, চলো ঘুরতে যাই। দূরে কোথাও ঘুরে আসি। শক্তি নিয়ে আসি, আবার পড়বে!’পড়াশোনা তো বাঁচার জন্যই, সুন্দরভাবে বাঁচার জন্যই। পড়তে গিয়ে মৃত্যুর শিক্ষা কে দিল এই জগতে! সন্তানকে মানসিক নিরাপত্তা দেওয়াও আপনার দায়িত্ব।শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও এ বিষয়ে কিছু নীতিমালা জারি করা প্রয়োজন। আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয় কারা, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রকাশ করা দরকার।অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষার জন্য কীভাবে সহায়তা দেওয়া যায়, সবাই মিলে তার একটি কাঠামো তৈরির সময় এসেছে।সন্তানেরা বাঁচার জন্য পড়ুক। মানুষের মতো মানুষ হওয়ার জন্য পড়ুক!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: রসায়নবিদ]

খাপড়া ওয়ার্ড থেকে জেলহত্যা

ইতিহাসের দুই সময়, দুটি কারাগার, দুটি রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৫০ সালে রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে সাত বিপ্লবী বন্দির মৃত্যু, আর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড। সময় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও দুটি ঘটনাই আমাদের ইতিহাসে কারাগারের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় হেফাজত এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের এক নির্মম প্রশ্ন রেখে গেছে।৩ নভেম্বর। জাতীয় জেলহত্যা দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক শোকাবহ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো একটি সুরক্ষিত স্থানে হত্যা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের চার জাতীয় নেতাকে। তারা হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান। যে কারাগার বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হেফাজতে থাকা মানুষের জীবন রক্ষা করা, সেই কারাগারের অভ্যন্তরেই সংঘটিত হয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক হত্যাকাণ্ড।কিন্তু কারাগারের দেয়ালের ভেতরে রাজনৈতিক বন্দিদের রক্ত ঝরার ইতিহাস কি কেবল ১৯৭৫ সালেই সীমাবদ্ধ? ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমাদের ফিরে যেতে হয় আরও ২৫ বছর আগে। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল। স্থান রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ড।জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের আগে এই খাপড়া ওয়ার্ডেই গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সাত কমিউনিস্ট রাজনৈতিক বন্দিকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যা খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। একে উপমহাদেশের প্রথম জেলহত্যার ঘটনাগুলোর অন্যতম হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।দুটি ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান ২৫ বছর। রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা, শাসনব্যবস্থা আলাদা, হত্যাকাণ্ডের পটভূমিও আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় ভয়াবহ মিল, সেটি হল কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দিদের জীবনও নিরাপদ ছিল না।খাপড়া ওয়ার্ড: প্রতিবাদ থেকে রক্তাক্ত পরিণতি১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় নানা পরিবর্তন আসে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মী, কৃষক আন্দোলনের সংগঠক, শ্রমিক নেতা ও বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে অনেকে কারাবন্দি হন। কিন্তু কারাগারের ভেতরেও তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল অমানবিক পরিবেশ।কারাবন্দিদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, তামাক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, তেলের ঘানি টানা, গম মাড়াই ও পেষাইয়ের মতো কঠোর শ্রমে বাধ্য করা-এসব ছিল বন্দিদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। সামান্য বিশ্রাম কিংবা কাজে দেরি হলেই নেমে আসত শারীরিক নির্যাতন।প্রথমে রাজশাহী কারাগারের কমিউনিস্ট বন্দিরা এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন। অনশন ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য কারাগারেও। ১৯৪৯ সালে ঢাকা ও রাজশাহী কারাগারে কয়েক দফায় দীর্ঘ অনশন চলে। খুলনা কারাগারে বিষ্ণু বৈরাগী এবং ঢাকা কারাগারে শিবেন রায়ের মৃত্যুর ঘটনাও বন্দিদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাদের মৃত্যুকে ঘিরে আত্মহত্যার প্রচার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে সেসময়। রাজবন্দিরা শুধু নিজেদের অধিকারের জন্যই লড়ছিলেন না, সাধারণ বন্দিদের ওপর চলা নির্যাতনের বিরুদ্ধেও তাঁরা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিলেন। তাদের দাবি ছিল-কারাগারে নির্যাতন বন্ধ করতে হবে, বন্দিদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে এবং কারাবিধি অনুযায়ী প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।এই আন্দোলনকে দমাতে কারা কর্তৃপক্ষ বন্দিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে। হিন্দু, মুসলমান ও আদিবাসী বন্দিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয় বলেও ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে। কিন্তু বন্দিরা সেই বিভাজনের চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেন।১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বন্দিদের দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কার্যকর কোনো সমাধান না আসায় ৫ এপ্রিল শুরু হয় অনশন। ক্রমেই অনশনকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দিরা তাদের দাবি আদায়ে অনড় থাকেন। এরপর আসে ২৪ এপ্রিল। যে দিনটি ইতিহাসে রক্তাক্ত হয়ে আছে।২৪ এপ্রিল ১৯৫০: খাপড়া ওয়ার্ডে গুলির শব্দসেদিন সকাল। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে বন্দিরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ তাদের অন্য একটি সেলে স্থানান্তর করতে চেয়েছিল। কিন্তু বন্দিরা সেই নির্দেশ মানতে রাজি হননি। তাদের আশঙ্কা ছিল, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও সংক্রামক রোগে আক্রান্ত বন্দিদের জন্য নির্ধারিত ১৪ নম্বর সেলে তাদের পাঠানো হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।জেল সুপার ডব্লিউ এফ বিলের সঙ্গে বন্দিদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে তিনি ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে বাইরে চলে যান। এরপর কারারক্ষীরা ওয়ার্ড ঘিরে ফেলে। বন্দিরা ভেতর থেকে দরজা আটকে দেন। চৌকি, তোশক, বালিশ ও শরীরের শক্তি দিয়ে তাঁরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।কিন্তু সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি। কারারক্ষীরা জানালার কাচ ভেঙে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে। মুহূর্তেই গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে কারাগারের পরিবেশ। বন্দিদের আর্তচিৎকার, রক্তাক্ত শরীর আর মৃত্যুর বিভীষিকায় খাপড়া ওয়ার্ড পরিণত হয় এক ভয়াবহ হত্যাক্ষেত্রে। সেদিন পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সাতজন কমিউনিস্ট রাজনৈতিক বন্দি। তারা হলেন-সুধীন ধর, বিজন সেন, হানিফ শেখ, সুখেন্দু ভট্টাচার্য, দেলোয়ার হোসেন, কম্পরাম সিং ও আনোয়ার হোসেন। আহত হন আরও ৩২ জন। এই সাতজনের মধ্যে কেউ ছিলেন শ্রমিক নেতা, কেউ ছাত্রনেতা, কেউ কৃষক আন্দোলনের সংগঠক, কেউবা রাজনৈতিক কর্মী। তাদের সবার পরিচয়ের মধ্যে একটি বিষয় ছিল অভিন্ন-তারা রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে কারাগারে ছিলেন।খাপড়া ওয়ার্ডের হত্যাকাণ্ড শুধু সাতটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, অসংখ্য বন্দির জীবনকেও বিপর্যস্ত করেছিল। আহতদের অনেকেই দীর্ঘদিন শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করেন। কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেন। হত্যাকাণ্ডের পর শহীদদের মরদেহ ও ঘটনার বিবরণ গোপন রাখার অভিযোগও ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের কাছে আড়ালেই থেকে যায় এই রক্তাক্ত অধ্যায়। পরে প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণ, লেখালেখি এবং ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের বিবরণ মানুষের সামনে আসতে শুরু করে। এই ইতিহাস সংরক্ষণে প্রথম আলো সম্পাদক ও লেখক মতিউর রহমানের ‘খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড ১৯৫০’ বইটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।২৫ বছর পর আবারও কারাগারে রক্তপাতখাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের ২৫ বছর পর, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, বাংলাদেশের আরেকটি কারাগার হয়ে ওঠে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী। এবার স্থান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকাকালে যে চার নেতা মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর তাদেরই একজনের পর একজনকে বন্দি করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে।এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ভোররাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে সশস্ত্র ঘাতকেরা। হত্যা করা হয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া চার জাতীয় নেতাকে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা অবস্থায় এভাবে হত্যা করা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত। খাপড়া ওয়ার্ডে বন্দিদের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল কারা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। আর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল সশস্ত্র ঘাতকদের অভিযানে। হত্যাকাণ্ড দুটির চরিত্র ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয়। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।ইতিহাসের দায়, স্মৃতির প্রশ্নএকটি বিষয় লক্ষণীয়, খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড এবং জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ড-দুটিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু জাতীয় স্মৃতি ও আলোচনায় দুই ঘটনার অবস্থান সমান নয়। ৩ নভেম্বর জাতীয় পর্যায়ে জেলহত্যা দিবস হিসেবে পরিচিত হলেও ২৪ এপ্রিলের খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড আজও তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।অথচ খাপড়া ওয়ার্ডের সাত শহীদের আত্মত্যাগকে বাদ দিয়ে এ ভূখণ্ডের রাজনৈতিক আন্দোলন, শ্রমিক অধিকার, কৃষক সংগ্রাম ও বামপন্থি রাজনীতির ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে লেখা সম্ভব নয়। তাদের রাজনৈতিক আদর্শ বা মতাদর্শের সঙ্গে কারও দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু বন্দি অবস্থায় তাদের ওপর গুলিবর্ষণ এবং প্রাণহানির ঘটনাকে ইতিহাস থেকে আড়াল করার সুযোগ নেই।একইভাবে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডও কেবল চারটি প্রাণহানির ঘটনা নয়। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, স্বাধীনতার রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার ওপর ভয়াবহ আঘাত।প্রশ্ন হচ্ছে, যে কারাগার বন্দিদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেই কারাগার কীভাবে হত্যাকাণ্ডের স্থানে পরিণত হয়? রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা মানুষের জীবন রক্ষার দায় কার? কারাগারের দেয়ালের ভেতরে সংঘটিত অপরাধের বিচার ও ইতিহাস সংরক্ষণের দায়িত্বই বা কার? ইতিহাসের এই দুটি অধ্যায় আমাদের সেই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করায়। ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে স্মরণ করার পাশাপাশি ২৪ এপ্রিলের খাপড়া ওয়ার্ডের সাত শহীদের কথাও আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন। কারণ, ইতিহাসের কোনো আত্মত্যাগই ছোট নয়। রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের ঊর্ধ্বে মানুষের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্নটি সব সময় গুরুত্বপূর্ণ।কারাগারের দেয়াল হয়তো অনেক ঘটনা আড়াল করতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের রক্তের দাগ মুছে দিতে পারে না। খাপড়া ওয়ার্ড থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার-দুটি সময়, দুটি হত্যাকাণ্ড। ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কারাগারের দরজা বন্ধ থাকলেই বন্দির জীবন নিরাপদ হয়ে যায় না।লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

ভিডিও আরও দেখুন

বিশ্ব ফুটবলে ইতি টানলেন পর্তুগিজ মহাতারকা

আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি পর্দার আলাড়ে চলে গেলেন। দীর্ঘ ২৩ বছরের রেকর্ডভাঙা পথচলার ইতি টানলেন পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। অবশেষে থামল সেই পা, যা বিশ্ব ফুটবলের প্রতিটি বড় মঞ্চে প্রতিপক্ষের জাল কাঁপিয়েছে। শুধু গোলের হিসেব নয়, ফুটবলের প্রতি তার চরম নিবেদন আর একাগ্রতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে গেল এক অনন্য দৃষ্টান্ত।বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন ৪১ বছর বয়সী এই তারকা।বিবৃতিতে রোনালদো বলেন, ‘সময় এসেছে জাতীয় দলের সাত নম্বর জার্সিটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার। এই জার্সি কখনোই শুধু আমার ছিল না। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার, রক্ষা করার এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্টেডিয়ামে বয়ে নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব আমার ছিল।’সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না জানিয়ে রোনালদো আরও লেখেন, ‘কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নেওয়া যায় না, হৃদয়েরও ভূমিকা থাকে।’২০০৩ সালের আগস্টে কাজাখস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের মাধ্যমে পর্তুগালের জার্সিতে অভিষেক হয় রোনালদোর। এরপর দীর্ঘ ২৩ বছরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তিনি পরিণত হয়েছেন এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে।ম্যাচ ও গোল: পর্তুগালের হয়ে ২২০টির বেশি ম্যাচ খেলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের (১৪০+) রেকর্ড গড়েছেন তিনি।ট্রফি: ২০১৬ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০১৯ উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপা জিতেছেন।ব্যক্তিগত স্বীকৃতি: পাঁচবার ব্যালন ডি'অর জয়ের পাশাপাশি রয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে।আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিলেও, ক্লাব ফুটবলে রোনালদোর ধারাবাহিকতা এবং প্রভাব কোনোদিনই হারিয়ে যাবে না। স্পোর্টিং লিসবন থেকে শুরু করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস—প্রতিটি ক্লাবেই তিনি রেখেছেন নিজের অমোচনীয় ছাপ। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে জিতেছেন চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ।মাঠের বাইরেও তার ফিটনেস, ডিসিপ্লিন এবং খেলার প্রতি অদম্য ইচ্ছা তাকে পরিণত করেছে 'সিআর সেভেন' ব্র্যান্ডে।রোনালদো জানিয়েছেন, গত দুই দশকে দেশের জার্সি গায়ে যে সম্মান ও ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, তা কখনো ভুলবেন না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, আমার এই যাত্রা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।’সোশ্যাল মিডিয়ায় তার এই বিদায় বার্তার পর ভক্তদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকে বলছেন, আন্তর্জাতিক ফুটবল মানেই রোনালদো—এই চিন্তা থেকে বের হওয়া সহজ হবে না। তবে ফুটবলপ্রেমীরা আশাবাদী, ক্লাব ফুটবলে তিনি আরও কিছুদিন মাঠ মাতাবেন।

বিশ্ব ফুটবলে ইতি টানলেন পর্তুগিজ মহাতারকা