সংবাদ
জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: সিইসি

জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: সিইসি

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই সমান গুরুত্ব দিয়ে তদারকি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসিরউদ্দিন। পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া ঢাকা থেকে সরাসরি সিসিটিভি ক্যামেরায় কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটর করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি জানান, অংশীজনদের সহায়তায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করাই কমিশনের লক্ষ্য।বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন উপলক্ষে গড়ে তোলা কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল ও মনিটরিং বুথ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিইসি এসব কথা বলেন।সিইসি বলেন, “আমরা স্বচ্ছতায় বিশ্বাস করি। এই উপনির্বাচনকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই; জাতীয় নির্বাচনের মতো একই গুরুত্ব দিয়ে পুলিশ, প্রশাসন ও বিজিবিসহ সব বাহিনীকে মাঠে মোতায়েন করা হয়েছে।” ১১-দলীয় জোটের উত্থাপিত অভিযোগগুলো তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।   সংঘাতময় পরিবেশ পরিহার করার বিষয়ে জোর দিয়ে সিইসি বলেন, কমিশন নির্বাচনকে আনন্দঘন উৎসবের সংস্কৃতিতে রূপান্তর করতে চায়।উল্লেখ্য, ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। আজ সকাল ৮টা থেকে ১৮৫টি কেন্দ্রে একযোগে ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে, যা চলবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। নির্বাচনে বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন ও ১১-দলীয় ঐক্যের দেলাওয়ার হোসেনসহ পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সংঘাতহীন ভোট নিশ্চিতে ২১ প্লাটুন বিজিবি এবং হাজার হাজার পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।   / 
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

লালন আমাদের চেতনার বহ্নিশিখা

সমাজে যখন অস্থিরতা ও প্রতিহিংসাবোধের প্রকাশ ঘটে, তখন ফকির লালনের কথা মনে হয়। এই সুবর্ণ পলিমাটির দেশে লালনের মতো অসংখ্য মরমি সাধকের জন্ম হয়েছে। এ দেশের মানুষের জীবনদর্শনের প্রকাশ ঘটেছে তাদের সংগীত ও জীবনাচরণের মাধ্যমে। ফকির লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন ও সৃষ্টিশীলতা মূলত মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য জীবনদর্শন। তিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও সামাজিক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মানুষকে স্থান দিয়েছেন। লালনদর্শনকে একটি বৃত্ত কল্পনা করলে এর কেন্দ্রে আছে মানুষ।আবারও বলি, লালনদর্শনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘মানুষ’। তিনি মনে করতেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। সব মানুষের ভেতরেই ঈশ্বর বা ‘মনের মানুষ’ বসবাস করেন। তাই আলাদা করে কোনো উপাসনালয় বা বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে মানুষের সেবা ও মনকে চেনা বড় সাধনা।লালন কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বা গোঁড়া ধর্মের অনুসারী ছিলেন না। তিনি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধসহ সব ধর্মের সংকীর্ণতা ও বিভেদকে অস্বীকার করেছেন। তার গানে মানুষের পরিচয় কোনো জাতিগত বা ধর্মীয় কাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয়নি। ‘আপনারে আপনি চেনা, সেই বটে উপাসনা’—লালন এই বাণীর মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও নিজের ভেতরকার সত্যকে উপলব্ধি করার ওপর জোর দিয়েছেন। মহাত্মা লালনকে উপলব্ধি করতে হলে তার চেতনাকে জানতে হবে। আমরা তার চেতনার উত্তরাধিকারী না হয়ে লালনের মূর্ত রূপের উত্তরাধিকারী হতে চাই, বিপত্তি এখানেই। এর মধ্যে আমরা অনেকেই আছি, যারা লালনের চেতনা ও মূর্ত বাণী—দুটোকেই বাতিল করে দিতে চাই।বাংলাদেশের মরমি কবিদের দর্শন মূলত সৃষ্টিশীল আধ্যাত্মিকতা, মানবপ্রেম এবং স্রষ্টার সঙ্গে মিলনের ব্যাকুলতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মরমিবাদ বা সুফিবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া ও বাউল দর্শনের এক অপূর্ব মিশ্রণে এই অঞ্চলের মরমি সাহিত্য গড়ে উঠেছে। লালন শাহ, হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত এবং শাহ আবদুল করিমের মতো সাধকেরা এই দর্শনের প্রধান ধারক ও বাহক।লালনের সঙ্গে মরমি সাধকদের সাদৃশ্য থাকলেও লালনদর্শনের সঙ্গে অন্য সাধকদের দর্শনের কিছুটা পার্থক্য লক্ষ করা যায়। লালনদর্শনের সঙ্গে শাহ আবদুল করিমের দর্শনের কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে। লালন সাঁইয়ের সঙ্গে অন্য মরমি সাধকদের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, লালনের সমাজমনস্কতা ও মানবতাবোধ সরাসরি দৃশ্যমান, যা অন্যদের ক্ষেত্রে কিছুটা বিমূর্ত। লালন যেমন গভীরভাবে সমাজমনস্ক ছিলেন এবং সাম্যের সমাজের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন, শাহ আবদুল করিমও এই দর্শনের অনুসারী হয়েছেন।ড. আবুল আহসান চৌধুরী তার ‘লালন সাঁই প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ’ গ্রন্থে লালনকে সমাজমনস্ক সাধক-কবি বলে অভিহিত করেছেন। সনৎকুমার মিত্র সম্পাদিত ‘বাউল লালন রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে সুবোধচন্দ্র তার ‘গ্রাম্য সাহিত্য’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘লালন ফকির নাম শুনিয়াই হয়তো অনেকে মনে করিতে পারেন ইনি বিষয়হীন ফকির ছিলেন; বস্তুত তাহা নহে; ইনি সংসারী ছিলেন, সামান্য জোতজমা আছে; বাটিঘরও মন্দ নহে। জিনিসপত্র মধ্যবর্তী গৃহস্থের মতো, নগদ টাকা প্রায় ২ হাজার রাখিয়া মারা যান’ (মিত্র, পৃ. ১০২)। লেখাটির মূল বিষয়ের সঙ্গে এসব উক্তির যৌক্তিক প্রাসঙ্গিকতা হলো, লালন যেভাবে সমাজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সামাজিক বৈষম্য ও সংস্কার নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন, অন্য মরমি কবিদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি ছিল কিছুটা ভাবমূলক।ফিরে আসি লালনসহ মরমি কবিদের জীবনদর্শনে। আমাদের মরমি কবিদের জীবন ত্যাগে ভরপুর ছিল। ভোগ তাদের জীবনদর্শনে ছিল না। তাদের দর্শনের ভিন্নতা ছিল, ছিল বহুমুখিতা। লালনের সঙ্গে মরমি কবিদের মৌলিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কোনো বৈসাদৃশ্য ছিল না।আত্ম-অন্বেষণ, পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের আকুলতা (বিরহ ও প্রেম), সংসারজীবনের অনিত্যতা, লৌকিক জীবন নিয়ে বৈরাগ্য—বাংলার সব মরমি কবির মধ্যেই এসব বিষয় ছিল। বাংলার মরমি দর্শনের নিজস্বতা এসব উপাদানেই নিহিত আছে। তবে ভাবসম্পদ ও দর্শনে প্রত্যেকেই ছিলেন অনন্য। ফকির লালন সাঁইয়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল সমাজের অসামঞ্জস্যের প্রতি তার সংবেদনশীলতা। ভারতীয় সমাজে প্রশ্নের পরিসর অত্যন্ত ক্ষুদ্র। আধ্যাত্মিক জীবন হোক বা ইহলৌকিক জীবন, সৃষ্টি কিংবা সামাজিক নিয়মকে প্রশ্ন না করলে সত্যকে বের করে আনা বড় কঠিন। লালন তার অধিকাংশ গানে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন। এ ধরনের প্রশ্ন তোলা উপমহাদেশীয় সংস্কৃতিতে প্রথাবিরোধী কর্মকাণ্ড।লালনের জীবনদর্শন তার গানে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। গানের মধ্য দিয়ে লালন ফকির সে সময়ের সামাজিক সমস্যা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, আধ্যাত্মিকতা ও সমাজজীবনের সমস্যাগুলো তুলে ধরেছিলেন। দর্শনের অন্যতম একটি পদ্ধতি হলো প্রশ্ন করে বাস্তবতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস, প্লেটোসহ দর্শনের বিশ্বখ্যাত মনীষীরা এই পদ্ধতিতে মানুষকে আলোকিত করেছিলেন। লালন ফকিরও তার গানে নানাবিধ প্রশ্ন ও জবাবের মাধ্যমে একই পদ্ধতিতে সামাজিক অসংগতি, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির স্বরূপ তুলে ধরেছিলেন। বলা যায়, লালন ছিলেন একজন মানবতাবাদী সাধক, যিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সব প্রকার জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে তিনি তার গান রচনা করেছেন। লালন নিজের গানে নিজেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। (৬৫৭)প্রশ্ন হলো, লালনের দর্শনে সমৃদ্ধ এই জনপদে মানুষের মধ্যে বিভক্তি, অনৈক্য, অস্থিরতা ও হিংসার আগুন কেন নিয়ত প্রজ্বলিত? শুধু লালন নয়, যে দেশের লোকগানে লেখা হয়, ‘নানান বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ; জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত।’ (‘নকশী কাঁথার মাঠ’ (নবম পর্ব)-এর একটি বহুল প্রচলিত গাজীর গানের চরণ।) বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন কোণে যতটুকু বিচরণ করেছি, এরকম সংহতি, ভালোবাসা ও মানবতার বার্তা কোথাও খুঁজে পাইনি।লালনের মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক ধর্মমত সমাজের অপাঙ্ক্তেয়, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মুক্তির সনদ হয়ে সবার মনে নবজাগরণ এনেছিল। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে লালনদর্শনে দীক্ষিত হয়ে অনেকে মানবতাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। লালন এখনো অসীম সাগরে বাঙালির মানবতাদর্শনের প্রধান পথপ্রদর্শক। মানবতাদর্শনের চর্চা হলো সমাজের শ্রেণিবৈষম্যকে উপহাস করে নতুন সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। আমরা যখন ধর্মের গোঁড়ামি পরিহার করে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য সংগ্রাম করি, লালন তখন আমাদের চেতনার সাথি হয়ে অনুপ্রেরণা জোগান। প্রমিথিউসের মতো লালন আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে সাহস জোগান নিয়ত। লালনের গান ও তার জীবনের সামগ্রিক প্রয়াস বিবাদ, কলহ ও হিংস্রতায় নিমজ্জিত মানুষের মহামিলনের বার্তা। লালন বাঙালি সমাজ ও লোকায়ত জীবনে মানবতাবাদী মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হয়ে থাকবেন অনন্তকাল। এই বক্তব্যকে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করে তার এই বাণী: ‘এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে/যে দিন হিন্দু মুসলমান, বৌদ্ধ আর খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।’আমাদের সমাজে প্রবাহিত অন্ধকার দেখে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। পলিমাটির দেশের মানুষ, বিশেষত প্রান্তিক মানুষেরাই বিপর্যয়ে এগিয়ে আসেন। তারাই লালনচেতনা ধারণ করেন। মরমি কবিদের মতো তাদের জীবনদর্শনেও জাতপাত, ধর্ম বা বর্ণের কোনো ভেদাভেদ নেই। মানুষের কৃত্রিম, বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে তার ভেতরের ‘মানুষ’ তাদের কাছে আপন। লালনের গান শুধুমাত্র মরমি ভাবে ভাবাতুর নয়। তাতে সংশয়বাদী দর্শন আছে, আছে সঠিক পথ সন্ধানের আর্ত আকুতি। লালন তাই অন্ধকার থেকে আলোর পথে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একজন দার্শনিক অভিভাবক।[লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক]

কারখানার শ্রমিক থেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট: লুলা দা সিলভার দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই

দারিদ্র্য, শ্রমিক আন্দোলন, সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, নির্বাচনী পরাজয়, কারাবাস ও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন—কমরেড লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার জীবন কেবল একজন ব্যক্তির উত্থানের কাহিনি নয়; এটি ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং বামপন্থী রাজনীতির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।ইতিহাসে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থাকেন, যাদের জীবনকে শুধু নির্বাচনী সাফল্য কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাদের রাজনৈতিক যাত্রা একটি দেশের সামাজিক পরিবর্তন, শ্রেণিসংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। ব্রাজিলের বামপন্থী রাজনীতিক লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব।দারিদ্র্যের কারণে শৈশবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়া, জীবিকার তাগিদে অল্প বয়সে শ্রমবাজারে প্রবেশ, কারখানার কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হওয়া, সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে পৌঁছানো—লুলার জীবন এক অসাধারণ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। তিনি দেখিয়েছেন, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম থেকে উঠে এসেও জাতীয় নেতৃত্ব অর্জন করা সম্ভব। একই সঙ্গে তার রাজনৈতিক জীবন প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন এবং সমাজের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ক্ষমতাকাঠামো পরিবর্তন করা এক বিষয় নয়।ব্রাজিলের ওয়ার্কার্স পার্টি বা পার্তিদো দোস ত্রাবালিয়াদোরেসের (পিটি) এই নেতা প্রথমবার ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দেশ পরিচালনার পর ২০২২ সালের নির্বাচনে আবার জয়ী হয়ে ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেন। তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন লাতিন আমেরিকার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।লুলাকে বুঝতে হলে তার ব্যক্তিগত সংগ্রামের পাশাপাশি ব্রাজিলের শ্রমিক আন্দোলন, সামরিক শাসনের ইতিহাস, সামাজিক বৈষম্য, নির্বাচনী গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক সমঝোতার বাস্তবতাও বুঝতে হবে।দারিদ্র্যের শৈশব থেকে শিল্পশ্রমিক১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পারনামবুকো রাজ্যের গারানিউসে জন্মগ্রহণ করেন লুইজ ইনাসিও দা সিলভা। আট সন্তানের পরিবারে তিনি ছিলেন সপ্তম। তার বাবা আরিস্তিদেস ইনাসিও দা সিলভা এবং মা ইউরিদিস ফেরেইরা দে মেলো। পরবর্তী সময়ে তিনি লুলা নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ঐতিহাসিকভাবেই দারিদ্র্য, ভূমির অসম মালিকানা, সীমিত কর্মসংস্থান ও সামাজিক বৈষম্যের জন্য পরিচিত। কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল বহু পরিবারের পক্ষে সেখানে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন ছিল। কাজের সন্ধানে বিপুলসংখ্যক মানুষ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শিল্পনগরীগুলোতে পাড়ি জমাতেন। লুলার পরিবারও সেই বৃহত্তর অভিবাসনপ্রবাহের অংশ হয়ে ওঠে।১৯৫২ সালে মায়ের সঙ্গে সাও পাওলোর উদ্দেশে যাত্রা করেন শিশু লুলা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শিল্পায়নকেন্দ্রিক এই অঞ্চলে পৌঁছানোর পরও তাদের দারিদ্র্য দূর হয়নি। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে অল্প বয়সেই তাকে কাজ করতে হয়। কখনো জুতা পালিশ, কখনো দোকান ও অফিসের ছোটখাটো কাজ, আবার কখনো কারখানায় শ্রম বিক্রি করে পরিবারের জীবিকা নির্বাহে ভূমিকা রাখতে হয়েছে তাকে।প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকলেও কারিগরি দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যান লুলা। কিশোর বয়সে তিনি শিল্প প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান সেনাইতে ধাতব কাজের প্রশিক্ষণ নেন। পরে ধাতুশিল্পের কারখানায় দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কারখানায় কর্মরত অবস্থায় এক দুর্ঘটনায় বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুল হারান।এই অভিজ্ঞতা তার জীবনকে শুধু ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবিত করেনি; শ্রমিকের জীবন ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা সম্পর্কে তার উপলব্ধিও গভীর করেছে। শিল্পশ্রমিক হিসেবে তিনি জানতেন, শ্রমিকের কাছে মজুরি কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়। এটি পরিবারের খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা ও বেঁচে থাকার নিশ্চয়তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।পরবর্তী সময়ে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় লুলার বক্তব্যে এই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা গেছে। শ্রমিকদের কাছে তিনি ছিলেন না কোনো দূরের রাজনৈতিক নেতা। তাদের মতোই কারখানায় কাজ করা, মজুরি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকা এবং পরিবারের জন্য সংগ্রাম করার অভিজ্ঞতা তার ছিল।শ্রমিক ইউনিয়ন ও স্বৈরশাসনবিরোধী সংগ্রামলুলার রাজনৈতিক উত্থানের পটভূমি বুঝতে হলে ১৯৬৪ সালের সামরিক অভ্যুত্থান-পরবর্তী ব্রাজিলের দিকে তাকাতে হয়। ওই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশটিতে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী দুই দশকে রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন, সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ, শ্রমিক সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সীমিত করার ঘটনা ঘটে।দ্রুত শিল্পায়নের ফলে সাও পাওলো ও আশপাশের অঞ্চল ব্রাজিলের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে সাও বেরনার্দো দো কাম্পো, সাও কায়েতানো দো সুল ও দিয়াদেমাসহ এবিসি শিল্পাঞ্চলে গাড়ি ও ধাতুশিল্পের বিস্তার ঘটে। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এসব কারখানায় কর্মরত ছিলেন। কিন্তু শিল্পোৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি, কর্মপরিবেশ ও অধিকার নিয়ে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়তে থাকে।এই পরিস্থিতিতে লুলা শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তার ভাই ফ্রেই চিকোর মাধ্যমেও শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। ইউনিয়নের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে করতে তিনি সংগঠক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন।১৯৭৫ সালে সাও বেরনার্দো দো কাম্পো ও দিয়াদেমার ধাতুশ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন লুলা। তখন তার বয়স মাত্র ২৯ বছর। শ্রমিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সহজ ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার ক্ষমতা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তাকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।সত্তরের দশকের শেষ দিকে ব্রাজিলে মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত মজুরি হ্রাস এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৭৮ সাল থেকে এবিসি শিল্পাঞ্চলে বড় ধরনের শ্রমিক ধর্মঘট শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। বিপুলসংখ্যক ধাতুশ্রমিক এসব ধর্মঘটে অংশ নেন।এই আন্দোলন কেবল মজুরি বৃদ্ধির দাবি ছিল না। সামরিক শাসনের অধীনে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া, প্রকাশ্যে দাবি উত্থাপন করা এবং বৃহৎ সমাবেশ গড়ে তোলা রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। শ্রমিক আন্দোলন তখন স্বৈরশাসনের নিয়ন্ত্রিত জনপরিসরে গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হচ্ছিল।লুলার নেতৃত্বের বিশেষত্ব ছিল, তিনি শ্রমিকদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছিলেন। মজুরি, কর্মঘণ্টা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও শ্রমিকের মর্যাদা তার বক্তব্যে কেন্দ্রীয় স্থান পেত। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সংগঠিত শক্তি যে রাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখতে পারে, সেই ধারণা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে।১৯৮০ সালে ধর্মঘটের ধারাবাহিকতায় সামরিক সরকার লুলাসহ কয়েকজন শ্রমিকনেতাকে গ্রেপ্তার করে। জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় তিনি ৩১ দিন কারাবন্দি ছিলেন। তার গ্রেপ্তার শ্রমিক আন্দোলন দমনের প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এর বিপরীত প্রতিক্রিয়াও দেখা দেয়। লুলা ক্রমে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত শ্রমিকনেতা হয়ে ওঠেন।এই অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা আরও জরুরি।ওয়ার্কার্স পার্টির জন্ম: শ্রমিক আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক সংগঠন১৯৮০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিটি। দলটি গঠনে লুলার পাশাপাশি ভূমিকা রাখেন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, ছাত্র আন্দোলনের কর্মী, গ্রামীণ সংগঠক এবং প্রগতিশীল খ্রিষ্টান আন্দোলনের প্রতিনিধিরা।এই দল গঠনের পেছনে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপলব্ধি: শ্রমিকেরা যদি কেবল উৎপাদনক্ষেত্রে নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য সংগঠিত থাকেন, তবে অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার বৃহত্তর সিদ্ধান্তে তাদের প্রভাব সীমিত থেকে যাবে। তাই শ্রমিক আন্দোলনের শক্তিকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে রূপান্তর করা প্রয়োজন।পিটির জন্ম ব্রাজিলের প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে একটি নতুন সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। দলটির ভিত্তি ছিল শ্রমিক সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন। গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমিক অধিকার ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শ এর প্রাথমিক কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়।তবে পিটি কোনো একক মতাদর্শের কঠোর কাঠামোয় আবদ্ধ ছিল না। মার্ক্সবাদী, সমাজতান্ত্রিক, শ্রমিক আন্দোলনের নেতা, গণতান্ত্রিক বামপন্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের মানুষ এতে যুক্ত হন। এই বৈচিত্র্য দলটিকে বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি দেয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রও তৈরি করে।১৯৮৩ সালে ব্রাজিলের বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সেন্ট্রাল উনিকা দোস ত্রাবালিয়াদোরেসের (সিইউটি) প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াতেও লুলা ও তার রাজনৈতিক সহযাত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এর মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের সংগঠিত শক্তি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।১৯৮৪ সালে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবিতে গড়ে ওঠা দিরেতাস জা আন্দোলনেও লুলা সক্রিয় ছিলেন। এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। আন্দোলনটি ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে।১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হন লুলা। শ্রমিক আন্দোলনের একজন নেতা হিসেবে শুরু হওয়া তার রাজনৈতিক যাত্রা তখন জাতীয় আইনসভায় পৌঁছে গেছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি শুধু শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি নন, দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনা ও বিতর্কেরও একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠেন।পরাজয়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিপক্বতা১৯৮৯ সালে দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর ব্রাজিলে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পিটির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন লুলা। দ্বিতীয় দফায় ফের্নান্দো কলোর দে মেলোর কাছে পরাজিত হন তিনি।১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের নির্বাচনেও অংশ নেন লুলা। দুইবারই ফের্নান্দো এনরিকে কারদোসোর কাছে পরাজিত হন। পরপর তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যর্থতা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছিল। কিন্তু তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি।এই সময়ে পিটি স্থানীয় সরকার, শ্রমিক সংগঠন ও সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নিজেদের ভিত্তি বিস্তৃত করে। দলটি পৌরসভা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরে সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। লুলাও বুঝতে পারেন, কেবল শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহ্য কিংবা বামপন্থী আদর্শের প্রতি আনুগত্য দিয়ে একটি বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারকে আকৃষ্ট করা কঠিন।ব্রাজিলের নির্বাচনী রাজনীতিতে জয়ী হতে হলে শিল্পশ্রমিকের পাশাপাশি কৃষক, নিম্ন আয়ের শহুরে জনগোষ্ঠী, মধ্যবিত্ত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন আঞ্চলিক সামাজিক গোষ্ঠীর সমর্থন প্রয়োজন। এই বাস্তবতা পিটি ও লুলার রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আনে।২০০২ সালের নির্বাচনের আগে লুলা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, চুক্তিগত দায়বদ্ধতা রক্ষা এবং ব্যবসায়ী ও আর্থিক মহলের উদ্বেগ কমানোর বার্তা দেন। তার প্রচারণা আগের তুলনায় বেশি মধ্যপন্থী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামোর মধ্যেও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার গুরুত্ব পায়।এই কৌশল নিয়ে বামপন্থী মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। একাংশের মতে, রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছাতে বৃহত্তর সামাজিক জোট গঠন অপরিহার্য। অন্য অংশের আশঙ্কা ছিল, নির্বাচনী সাফল্যের জন্য রাজনৈতিক অবস্থান নরম করতে গিয়ে পিটি তার মৌলিক সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যেতে পারে।২০০২ সালের নির্বাচনে লুলার বিজয় দেখিয়ে দেয়, শ্রমিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা একটি রাজনৈতিক দল বৃহত্তর সামাজিক জোটের মাধ্যমে জাতীয় ক্ষমতায় পৌঁছাতে পারে।প্রথম দুই মেয়াদ: সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা২০০৩ সালের ১ জানুয়ারি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন লুলা। তার ক্ষমতায় আরোহণ ছিল প্রতীকী অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, শ্রেণিগত বিভাজন ও রাজনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাস বহনকারী একটি দেশে একজন সাবেক শিল্পশ্রমিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে বসেন।তবে প্রতীকী তাৎপর্যের বাইরে তার সরকারের সামনে ছিল বাস্তব অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। ব্রাজিল তখনো গভীর বৈষম্য, দারিদ্র্য, ভূমির অসম মালিকানা, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান এবং জনসেবার সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়ছিল।লুলা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্য কমানো। ফোমে জিরো বা ‘শূন্য ক্ষুধা’ কর্মসূচি এবং বোলসা ফামিলিয়া নামে পরিচিত নগদ সহায়তা কর্মসূচি এই নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। বোলসা ফামিলিয়ার মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এর সঙ্গে শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো কিছু শর্ত যুক্ত ছিল।এই কর্মসূচিগুলোর উদ্দেশ্য ছিল তাৎক্ষণিকভাবে দারিদ্র্য মোকাবিলার পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো। দরিদ্র পরিবারের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর ফলে খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করার সুযোগ বৃদ্ধি পায়।লুলার দুই মেয়াদে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশ্ববাজারে ব্রাজিলের পণ্য, বিশেষত কৃষিপণ্য ও খনিজ সম্পদের চাহিদা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও সরকারের সামাজিক নীতিগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করে।তবে দারিদ্র্য হ্রাসের কৃতিত্বকে কেবল একটি সরকারের একক অর্জন হিসেবে দেখা যথার্থ নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শ্রমবাজারের পরিবর্তন, ন্যূনতম মজুরির নীতি, সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি—সব মিলিয়েই এই পরিবর্তন ঘটেছিল।লুলার সমর্থকদের মতে, তার সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা। তাদের দৃষ্টিতে, সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি শুধু দারিদ্র্য কমায়নি, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে দরিদ্র মানুষের জীবনকেও আরও দৃশ্যমান করেছে।অন্যদিকে বামপন্থী সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল, সামাজিক সহায়তা ও মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদের মালিকানা, ভূমি সংস্কার, আর্থিক খাতের ক্ষমতা এবং উৎপাদনব্যবস্থার ওপর পুঁজির নিয়ন্ত্রণে কতটা পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে।এই আলোচনা ও বিতর্ক লুলার প্রথম দুই মেয়াদের মূল্যায়নের কেন্দ্রে রয়েছে। তার সরকার পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামো ভেঙে নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেনি। বরং বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সামাজিক সংস্কার, আয় পুনর্বণ্টন এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের পথ অনুসরণ করেছে।আন্তর্জাতিক রাজনীতি: ব্রাজিলের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টাদেশীয় সামাজিক নীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্রাজিলের ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করেন লুলা। তার সরকার লাতিন আমেরিকার আঞ্চলিক সহযোগিতা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণাকে গুরুত্ব দেয়।বিশ্ববাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে ব্রাজিলের কণ্ঠস্বর জোরালো করার চেষ্টা ছিল তার কূটনীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ব্রিকসের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্রাজিলের অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে এই জোটের বিস্তারে দেশটির ভূমিকা লুলার আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার কূটনীতির মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তির প্রভাবের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও বেশি পরিসর তৈরি করা।তবে তার পররাষ্ট্রনীতিও আলোচনা ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত, কর্তৃত্ববাদী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মানবাধিকার প্রশ্নে ব্রাজিলের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। বাস্তববাদী কূটনীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা তার সরকারের জন্য একটি জটিল চ্যালেঞ্জ ছিল।দুর্নীতির অভিযোগ, কারাবাস ও বিচারিক প্রত্যাবর্তনলুলার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো দুর্নীতির মামলা ও কারাবাস। তার সরকারের সময় এবং পরবর্তী বছরগুলোতে ব্রাজিলের রাজনীতিতে একাধিক দুর্নীতির কেলেঙ্কারি সামনে আসে।২০০৫ সালে মেনসালাও কেলেঙ্কারি এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেত্রোব্রাসকে কেন্দ্র করে অপারেশন কার ওয়াশ তদন্ত দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এসব তদন্তে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ঘুষ, অর্থ পাচার এবং সরকারি চুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।লুলাও বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন। ২০১৭ সালে একটি দুর্নীতির মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পরবর্তী আপিলপ্রক্রিয়ায় দণ্ড বহাল থাকায় ২০১৮ সালে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় ৫৮০ দিন কারাবন্দি ছিলেন তিনি।লুলা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার সমর্থকেরা বলেছেন, বিচারপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে এবং তাকে নির্বাচনের বাইরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে তার বিরোধীদের মতে, দুর্নীতির অভিযোগে তার জবাবদিহি হওয়া জরুরি।এই আলোচনা ও বিতর্ক বোঝার জন্য বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম ফেডারেল কোর্ট লুলার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর দণ্ডাদেশ বাতিলের পথ উন্মুক্ত করে। এর মধ্যে বিচারিক এখতিয়ারসংক্রান্ত ত্রুটি এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আদালতের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে তার রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম হন।এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি: দণ্ডাদেশ বাতিল হওয়া, বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এবং কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা—এগুলো এক বিষয় নয়। আদালতের সিদ্ধান্তের আইনগত তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে হলে সংশ্লিষ্ট মামলার নির্দিষ্ট রায় ও তার পরিধি বিবেচনা করতে হয়।লুলার প্রত্যাবর্তন ব্রাজিলের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা সৃষ্টি করে। তার সমর্থকেরা একে রাজনৈতিকভাবে অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবে দেখেন। সমালোচকেরা আবার তার রাজনৈতিক জোট, অতীতের দুর্নীতির কেলেঙ্কারি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।এই অভিজ্ঞতা দেখায়, গণতন্ত্রে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিচারিক জবাবদিহির সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিচারব্যবস্থাকে দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোও অপরিহার্য।২০২২ সালের নির্বাচন: রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে প্রত্যাবর্তন২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল ব্রাজিলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো। একদিকে ছিল লুলার নেতৃত্বাধীন বামপন্থী ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক জোট; অন্যদিকে বলসোনারোর সমর্থনে সংগঠিত ছিল রক্ষণশীল, ডানপন্থী এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠী।নির্বাচনের কেন্দ্রীয় প্রশ্নগুলোর মধ্যে ছিল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক বৈষম্য, ক্ষুধা, অর্থনীতি, পরিবেশনীতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা। নির্বাচনের আগে ব্রাজিলের রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি অবিশ্বাস এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্কও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।প্রথম দফায় কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৩০ অক্টোবর ২০২২-এর দ্বিতীয় দফায় লুলা ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ ভোট পেয়ে জাইর বলসোনারোকে পরাজিত করেন। বলসোনারো পান ৪৯ দশমিক ১০ শতাংশ ভোট। ব্যবধান ছিল খুবই সামান্য।এই বিজয়ের মাধ্যমে লুলা তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি তিনি নতুন মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।লুলার প্রত্যাবর্তনকে শুধু তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ফল হিসেবে দেখলে নির্বাচনের সামাজিক তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি ছিল বলসোনারোর শাসনকালে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক মেরুকরণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, বামপন্থী ও মধ্যপন্থী শক্তির একটি বিস্তৃত নির্বাচনী জোটের সাফল্য।তবে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরও বলসোনারোর রাজনৈতিক সমর্থন উল্লেখযোগ্য ছিল। অল্প ব্যবধানের ফলাফল দেখিয়ে দেয়, ব্রাজিলের সমাজে ডানপন্থী রাজনীতির সামাজিক ভিত্তিও কম নয়। ফলে লুলার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ ছিল না; বিভক্ত সমাজে কার্যকর সরকার পরিচালনা করাও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ।তৃতীয় মেয়াদ: প্রত্যাশা, সীমাবদ্ধতা ও নতুন চ্যালেঞ্জতৃতীয় মেয়াদে লুলার সামনে ছিল একাধিক জটিল সমস্যা। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মোকাবিলা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পরিবেশ ও আমাজন বন সংরক্ষণ, জনসেবার মান উন্নয়ন, সরকারি অর্থব্যবস্থার ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ কমানোর মতো বিষয়গুলো তার সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে ছিল।একই সঙ্গে তার সরকারকে এমন একটি সংসদীয় বাস্তবতার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে, যেখানে রক্ষণশীল ও মধ্য-ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও সংসদে আইন পাস, বাজেট অনুমোদন ও সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দলের সঙ্গে সমঝোতা প্রয়োজন হয়।এ কারণে লুলার রাজনৈতিক জোট কেবল আদর্শগতভাবে একমত শক্তিগুলোর সমন্বয়ে গঠিত নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে তাকে এমন দল ও গোষ্ঠীর সঙ্গেও কাজ করতে হয়, যাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পিটির সংগ্রামী ঐতিহ্য ও কর্মসূচির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।এখানেই লুলার রাজনৈতিক কৌশলের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। তিনি সংগ্রামের পাশাপাশি সমঝোতাকেও রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন ও ধরে রাখার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন। এই কৌশল তাকে নির্বাচনী জোট সম্প্রসারণে সাহায্য করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তার সরকারের সংস্কারের পরিধি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।ব্রাজিলের মতো বৃহৎ ও বৈষম্যপূর্ণ সমাজে সামাজিক পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য শুধু প্রেসিডেন্টের সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়। সংসদীয় সমর্থন, প্রশাসনিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক আন্দোলনের শক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।তাই লুলার তৃতীয় মেয়াদের মূল্যায়নে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তবায়নের ফলাফল, সামাজিক সূচক, সরকারি নীতি এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ওপর তার প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।লুলার রাজনীতি: সংস্কার, আপস ও বামপন্থী বিতর্কলুলার রাজনৈতিক জীবনকে ঘিরে বামপন্থী মহলে দীর্ঘদিনের একটি বিতর্ক রয়েছে: শ্রমিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা একজন নেতা রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে কতটা কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারেন?লুলার সমর্থকেরা মনে করেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার বাস্তব সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে তিনি দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সামাজিক সহায়তা, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকারের মতো ক্ষেত্রে তার সরকারের উদ্যোগ বহু মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।তাদের যুক্তি, একটি বৈষম্যপূর্ণ সমাজে সব পরিবর্তন একসঙ্গে সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন অর্জন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সামাজিক কর্মসূচির জন্য সম্পদ সংগ্রহ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে লুলার রাজনীতি বাস্তববাদী সামাজিক রূপান্তর ও সংস্কারের উদাহরণ।অন্যদিকে বামপন্থী সমালোচকদের মতে, দরিদ্র মানুষের জন্য সহায়তা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থনৈতিক ক্ষমতার মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে বৈষম্যের উৎস দূর করা যায় না। ভূমির মালিকানা, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের প্রভাব, বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষমতা এবং উৎপাদনের উপায়ের ব্যক্তিগত মালিকানা—এসব প্রশ্নে মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব নয়।এই সমালোচকদের মতে, পিটি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে বিস্তৃত রাজনৈতিক জোট গঠন করেছে, তার কারণে দলটিকে অনেক ক্ষেত্রেই বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আপস করতে হয়েছে। ফলে শ্রমিক আন্দোলনের প্রাথমিক কর্মসূচির কিছু অংশ বাস্তবায়নের বাইরে থেকে গেছে।তবে এই বিতর্কের মূল্যায়নে লুলার রাজনৈতিক বিকল্পগুলোও বিবেচনা করতে হবে। ব্রাজিলের সংবিধান, সংসদীয় ভারসাম্য, বিচারব্যবস্থা, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রভাবের মধ্যে সরকার পরিচালনা করা সহজ কাজ নয়। রাজনৈতিক আপস কখনো সংস্কারের সুযোগ সৃষ্টি করে, আবার কখনো সেই সংস্কারের সীমা নির্ধারণ করে দেয়।লুলার অভিজ্ঞতা তাই একদিকে সামাজিক গণতন্ত্র ও কল্যাণমূলক নীতির সম্ভাবনা দেখায়; অন্যদিকে বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে সংস্কারমূলক রাজনীতির সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে।ব্যক্তিগত নেতৃত্বের বাইরে শ্রমিক আন্দোলনের ভূমিকালুলার জীবনকে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের উত্থানের গল্প হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ। কিন্তু তাতে শ্রমিক আন্দোলনের সম্মিলিত ভূমিকা আড়াল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।লুলার রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে ছিল হাজার হাজার শ্রমিকের সংগঠিত প্রচেষ্টা, ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ড, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের অবদান। তার নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু সেই নেতৃত্ব বিকশিত হয়েছিল একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।১৯৭০-এর দশকের ধর্মঘট, ১৯৮০ সালে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিষ্ঠা এবং আশির দশকের গণতান্ত্রিক আন্দোলন দেখিয়েছে, সংগঠিত শ্রমিকশক্তি শুধু কর্মক্ষেত্রের দাবি আদায়ের জন্য নয়, জাতীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।এই অভিজ্ঞতা অন্য দেশগুলোর শ্রমিক আন্দোলনের জন্যও প্রাসঙ্গিক। শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবি ও রাজনৈতিক অধিকার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। মজুরি, কর্মঘণ্টা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠনের স্বাধীনতার প্রশ্ন বৃহত্তর গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।তবে শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করতে শুধু নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘস্থায়ী সাংগঠনিক ভিত্তি, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, কর্মসূচির ধারাবাহিকতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।লুলার অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে এই সম্ভাবনা ও সতর্কবার্তা সামনে আনে। শ্রমিক আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছাতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার পর শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সংগঠনের সম্পর্ক কীভাবে বজায় থাকবে, সেটিও একটি মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্ন।বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শিক্ষাব্রাজিলের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। যদিও দুই দেশের ইতিহাস, রাজনৈতিক কাঠামো, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও সামাজিক বাস্তবতা এক নয়, তবু শ্রমিক অধিকার, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রশ্নে তুলনামূলক আলোচনা প্রাসঙ্গিক।বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পোৎপাদন, রপ্তানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শ্রমিকদের অবদান থাকলেও ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।ব্রাজিলের শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা দেখায়, শ্রমিকদের দাবি কার্যকরভাবে তুলে ধরতে স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক শ্রমিক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংগঠনকে কেবল মজুরি নিয়ে দরকষাকষির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বৃহত্তর সামাজিক নীতিতে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ সীমিত থেকে যেতে পারে।দারিদ্র্য মোকাবিলায় সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এসব কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের বিকল্প নয়। মানসম্মত শিক্ষা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ন্যায্য শ্রমনীতি এবং সম্পদের সুযোগে অধিকতর ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।আরেকটি শিক্ষা হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বিভিন্ন স্তরে কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তা উন্নয়নের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মোট দেশজ উৎপাদন বা রপ্তানি বৃদ্ধির হিসাব দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনমানের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। প্রকৃত মজুরি, দারিদ্র্যের হার, আয়ের বৈষম্য, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং সামাজিক সেবায় প্রবেশাধিকারের মতো সূচকও বিবেচনা করতে হয়।তবে ব্রাজিলের কোনো একটি নীতি সরাসরি বাংলাদেশের ওপর প্রয়োগ করলেই একই ফল পাওয়া যাবে—এমন ধারণাও সঠিক নয়। প্রতিটি দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সামাজিক চাহিদা অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।অসমাপ্ত রাজনৈতিক যাত্রালুলা দা সিলভার জীবনকে এক বাক্যে সংক্ষেপ করা কঠিন। তিনি দরিদ্র পরিবারের সন্তান, শিল্পশ্রমিক, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, সামরিক স্বৈরশাসনের বিরোধী, রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা, নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী, প্রেসিডেন্ট এবং কারাবন্দি রাজনীতিক—একাধিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে গেছেন।তার জীবনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত এই যে, তিনি ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষের অভিজ্ঞতাকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। শ্রমিকের জীবন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, মজুরি ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নকে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন।তার শাসনামলে সামাজিক উন্নয়নের কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক সমঝোতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো এবং বামপন্থী কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তাকে মূল্যায়ন করতে হলে তার অর্জন ও সীমাবদ্ধতা—দুই দিকই বিবেচনা করতে হবে।লুলার রাজনৈতিক যাত্রা মনে করিয়ে দেয়, একজন শ্রমিকের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে ওঠা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা নয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।একটি সমাজে দরিদ্র মানুষের জন্য নীতি গ্রহণ, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমিকের অধিকার, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, কার্যকর গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হয়।কারখানার শ্রমিক থেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে লুলা ইতিহাসে নিজের স্থান তৈরি করেছেন। তার জীবন যেমন প্রমাণ করে, সংগঠিত মানুষের রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার দরজা খুলে দিতে পারে, তেমনি এটিও মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছানো সংগ্রামের শেষ নয়।বরং সেখান থেকেই শুরু হয় আরও কঠিন প্রশ্ন: ক্ষমতা কার স্বার্থে ব্যবহৃত হবে, উন্নয়নের সুফল কারা পাবে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন কতটা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্থায়ী রূপান্তর ঘটাতে পারবে?লুলা দা সিলভার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর দেয় না। বরং ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং বামপন্থী রাজনীতির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে প্রশ্নগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এই কারণেই তার জীবন কেবল ব্রাজিলের ইতিহাসের অংশ নয়; বিশ্বজুড়ে শ্রমিক আন্দোলন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]

ঐতিহ্যের বিকৃতি: বাসিয়াহাট মেলা কেন ‘বউমেলা’ হলো

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোপালগঞ্জের একটি ঐতিহ্যবাহী মেলাকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর ও মুখরোচক তথ্য ছড়াতে দেখা গেছে। মেলাটিকে ‘বউমেলা’ বা ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা’ হিসেবে উপস্থাপন করায় আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বিবাহরীতি ও সামাজিক প্রথা নিয়ে অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের মনগড়া বর্ণনা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে। একই সঙ্গে নারীদের আত্মসম্মানকেও হেয় করা হচ্ছে।প্রতি বছরের মতো এবারও ২৩ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার, দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বাসিয়াহাট মেলা’, যা ‘বাসিয়া মেলা’ নামেও পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবে মেলাটি শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরদিন অনুষ্ঠিত হয়। মেলার প্রধান পুরোহিত একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ। এখানে আদিবাসীদের পুরোহিত হওয়ার কোনো ঐতিহাসিক নজির নেই। মেলায় আদিবাসী তরুণ-তরুণী ও নারী-পুরুষের পাশাপাশি সনাতন ও ইসলাম ধর্মাবলম্বী স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।এই ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মিলনমেলার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখা। এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী ‘দাসায় নাচ’ ও গান। দাসায় নাচ সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি তাদের ইতিহাস, বিশ্বাস, সামাজিক জীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই নাচের মাধ্যমে সাঁওতালরা পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে চলেছেন।স্থানীয় আদিবাসী নারীশিল্পী ও সমাজসেবিকা রিতা হেমব্রমের মতে, বীরগঞ্জের এই আদিবাসী মিলনমেলাকে ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘বউমেলা’ হিসেবে প্রচার করা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে তাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মূলত নিজস্ব পোশাক ও সংস্কৃতি উদ্‌যাপনের জন্য দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আদিবাসীরা এখানে আসেন। তাদের দাসায় নাচ, গান ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের সমাগমেই মেলাটি পূর্ণতা পায়। তাই এই ঐতিহাসিক মিলনমেলা আদিবাসীদের সংস্কৃতি, পরিচয় ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।তথ্য যাচাই না করে সংবাদ ও ভিডিও ছড়িয়ে দিলে সমাজে কতটা ক্ষতি হতে পারে, তা অনেকেই হয়তো উপলব্ধি করেন না। কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাব আদিবাসী সমাজে পড়েছে। বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের জন্য সাংবাদিক ও কনটেন্ট নির্মাতাদের দায় থাকলেও মেলা আয়োজকদের অসচেতনতাও কম দায়ী নয়। মূলধারার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমেও বিভিন্ন সময়ে মেলাটি নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। যেমন, প্রথম আলো ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর ‘পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজতে ২০০ বছর ধরে যেখানে জড়ো হন তরুণ-তরুণীরা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অথচ ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর একই পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার ঐতিহ্য নেই, তবু টিকে আছে দিনাজপুরের মেলাটি’। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর যুগান্তরে ‘যে মেলায় মেলে পছন্দের জীবনসঙ্গী’, ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর দৈনিক টাইমস ন্যাশনালে ‘দিনাজপুরে বসছে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বউ মেলা’’ এবং ২০ অক্টোবর বাংলা টেলিগ্রাফে ‘২০০ বছরের ‘বউ মেলা’র ভেতর-বাহির’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব শিরোনাম মেলাটির প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য ও বীরগঞ্জ থানা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক শ্যামলাল মুরমু জানান, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই মেলা শুরু করে গেছেন, আমরা কেবল তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করছি। তবে ঠিক কবে থেকে এ মেলার প্রচলন শুরু হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। মেলায় সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ অংশ নেন।’ভবিষ্যতে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর সংবাদ, সাক্ষাৎকার ও অপপ্রচার রোধে আয়োজক কমিটিকে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।প্রথমত, তথ্যপুস্তিকা বিতরণ: মেলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরে একটি তথ্যপুস্তিকা বা প্রচারপত্র প্রকাশ করা যেতে পারে। মেলার প্রবেশদ্বারে তা দর্শনার্থীদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে, যাতে তারা সঠিক তথ্য জানতে পারেন। সাংবাদিকদের জন্য আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা প্রয়োজন।দ্বিতীয়ত, তথ্য ও প্রচার সম্পাদক নিয়োগ: মেলা কমিটির একজন নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রচার সম্পাদক থাকা দরকার। তিনি প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মী, গবেষক ও দর্শনার্থীদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবেন।তৃতীয়ত, ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: অনুমতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তা বিকৃতভাবে প্রকাশ কিংবা হয়রানির উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। মেলায় সাংবাদিক ও ইউটিউবারদের পরিচয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সংবাদ সংগ্রহের অধিকারও বিবেচনায় রাখতে হবে।চতুর্থত, স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন ও নজরদারি: নির্দিষ্ট টি-শার্ট, টুপি ও পরিচয়পত্রধারী স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা প্রয়োজন। তারা মেলাপ্রাঙ্গণে শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন এবং দর্শনার্থীদের, বিশেষ করে নারীদের, হয়রানি প্রতিরোধে কাজ করবেন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দ্রুত আয়োজক কমিটিকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।পঞ্চমত, মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা: মেলাপ্রাঙ্গণে নিয়মিত মাইকিং করে দর্শনার্থীদের সচেতন করতে হবে। অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ধারণ করে কাউকে হয়রানি করা কিংবা মেলার পরিবেশ নষ্ট করার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা প্রচার করতে হবে।এ প্রসঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম জেলার শিলদার কাছে ওড়গোন্দায় অনুষ্ঠিত পাঁটাবিন্দো মেলার কথা উল্লেখ করা যায়। বিজয়া দশমীর পরদিন শুরু হওয়া এ মেলায় পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, বিহারসহ বিভিন্ন রাজ্য এবং বাংলাদেশ থেকে মানুষ অংশ নেন। এই বৈচিত্র্যময় সমাগমের কারণে মেলাটি আন্তর্জাতিক সাঁওতাল মেলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এটি শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং সাঁওতাল সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনক্ষেত্র। এখানে হস্তশিল্প, কৃষি উপকরণ, সাংস্কৃতিক সামগ্রী, পোশাক, অলংকার, বাসনপত্র ও বাদ্যযন্ত্র পাওয়া যায়। আদিবাসী নাচ, গান, লোককাহিনি এবং তাদের হাতে তৈরি বিশেষ খাবার—যেমন মাংস পিঠা, হাও রিং ও সাং তিকি—মেলাটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। এ আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি সংস্কৃতি সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।দিনাজপুরের বীরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মিলনমেলাটিও এমন একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্র। এখানে সাঁওতাল, ওরাঁও, পাহান, মাহাতোসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ অংশ নেন। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলা থেকেও বহু মানুষ মেলায় আসেন। এই আয়োজন আদিবাসীদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, নাচ ও গানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।তাই মেলাটির প্রকৃত পরিচয় ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। গণমাধ্যমে আদিবাসীদের পরিচয় উঠে আসুক মর্যাদার সঙ্গে, আর সংবাদ প্রকাশিত হোক দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে। আয়োজক কমিটি কার্যকর উদ্যোগ নিলে মেলাটিকে ঘিরে বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদেরও কোনো শিরোনাম বা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করতে হবে। কারণ, একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি নিয়ে ভুল বর্ণনা শুধু তাদের আত্মমর্যাদায় আঘাত করে না, সমাজেও বিভাজন তৈরি করতে পারে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

পুণ্ড্রনগরে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আর বিতর্ক নয়

পুণ্ড্র সভ্যতা বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন ও সমৃদ্ধ জনপদ, যার কেন্দ্র ছিল বর্তমান বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতক বা তারও আগে প্রায় চার হাজার বছর আগে দ্বিতীয় নগর সভ্যতার সময়ে উত্তরবঙ্গে এই উন্নত নগর সভ্যতা গড়ে ওঠে।অষ্টম শতকে প্রাচীন বাংলার একটি অন্যতম প্রধান বৌদ্ধ মঠ ও উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র ছিল বগুড়ার ভাসুবিহার। এটি ছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বের প্রথম ও প্রাচীন ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এটি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। অর্থাৎ আমাদের ভাসুবিহার ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। বিহার ছিল মূলত একটি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ধর্মশিক্ষা, যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা ও শিল্পকলা পঠিত হতো।সভ্যতা এক জায়গায় স্থির থাকে না। সভ্যতা চলমান। একবার ভাবুন, আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা ফিরে এসে আবারও আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। আর আমরা সঠিক সময়ে দরজা না খুলতে পারার কারণে সভ্যতার জাহাজটি নোঙর করছে অন্য তীরে!যেমনটি ঘটেছিল ২০০১ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে। ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন’ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগ বগুড়ায় নেওয়া হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত আর স্থান নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের কারণে প্রতিষ্ঠানটি বগুড়া থেকে গিয়ে নোঙর করেছিল বন্দর নগরী চট্টগ্রামে।একবার ভাবুন, হারিয়ে যাওয়া সেই দ্বিতীয় নগর সভ্যতার পুণ্ড্র অঞ্চল তথা বগুড়া মহানগরে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব তৈরি করা হয়েছে। মেধাবী ও যোগ্য গবেষকদের সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ল্যাবগুলো দিন-রাত খোলা। সেগুলোতে কাজ করছে আমাদের ছেলেমেয়েরা। সরকার তাদের গবেষণা কর্মের বিনিময়ে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। টিউশনি করে তাদের আর সময় নষ্ট করতে হচ্ছে না। ল্যাবগুলোর সঙ্গে আছে ক্যাফেটেরিয়া। তারা সেখানে ধোঁয়াওঠা কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে নতুন নতুন ভাবনার দৃশ্যপট তৈরি করছে। সমস্ত ক্লান্তি ও অবসাদ ঝেড়ে ফেলে আবারও হাসতে হাসতে, গাইতে গাইতে কাজ করে যাবে।আমাদের কাছে এসব স্বপ্নের মতো শোনালেও এমন পরিবেশেই সারা দুনিয়ার ছেলেমেয়েরা কাজ করছে। আমরা যদি এমন পরিবেশ তৈরি করে দিই, তাহলে দেশকে নিয়ে আর ভাবতে হবে না। দেশ এগিয়ে যাবে তার আপন গতিতে। পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা কেন পিছিয়ে থাকব? ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ আর উন্নত বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণ গবেষকদের হাত ধরেই।সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৭ বছর উন্নয়নবঞ্চিত এই জনপদে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৬ গেজেট আকারে প্রকাশের পর ‘বগুড়া ইউনিভার্সিটি’ নামে পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি সনদ প্রদানকারী গতানুগতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, উদ্ভাবন আর আঞ্চলিক তথা পুরো দেশের উন্নয়নের এক নতুন পৃষ্ঠা উন্মোচন করবে।বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা দিয়েছিলেন, কিন্তু কেউ কথা রাখেননি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার মতো “তেত্রিশ বছর কেটে গেল, কেউ কথা রাখেনি”। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের গেজেট প্রকাশ করে কথা রেখেছেন। এ জন্য এই জনপদের গণমানুষের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে জানাই আন্তরিক অভিলাষ ও কৃতজ্ঞতা।আইন পাস হওয়ার পর এই জনপদের মানুষ বিজয় মিছিল ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে স্থান নির্ধারণকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক টানে বিভক্ত হয়ে মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধ ও ফেসবুকে একের পর এক বিষোদ্গার ছড়াচ্ছেন। গণতান্ত্রিক সমাজে মত প্রকাশের অধিকার সবারই আছে; তবে সেই অধিকার যেন জনস্বার্থ, সামাজিক সম্প্রীতি ও জেলার তথা প্রধানমন্ত্রীর সম্মান ক্ষুণ্ণ না করে, সেদিকে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় হবে, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোন স্থানটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, পরিবেশ, প্রতিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা আর ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বেশি উপযোগী, সেটা সবার আগে ভাবা উচিত। এই সিদ্ধান্ত আবেগ বা আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে না নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত ও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় গ্রহণ করা উচিত। পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি না করে যুক্তিনির্ভর আলোচনার মাধ্যমে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্থান নির্ধারণ করা জরুরি। আমরা যেন এমন কোনো কাজ না করি, যাতে বগুড়ার ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন’-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয়টি হারিয়ে না ফেলি।দুনিয়ার সবকিছু তৈরি করে মেধাবীরা, আর মেধাবীদের তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান বগুড়ার যেখানেই হোক—আমাদের ছেলেমেয়েরা বিশ্বমানের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাবে, এতেই আমরা খুশি।সৈয়দ শামসুল হকের কবিতার ভাষায় বলি—“গোল হয়ে আসুন, সকলে ঘন হয়ে আসুন সকলে,/ আমার মিনতি আজ স্থির হয়ে বসুন সকলে। ...”প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাকে অভিবাদন জানিয়ে বলি—তোমাকে অভিবাদন বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার মানচিত্রের ভেতরে, যার ডানা এখন রক্ত আর অশ্রুতে ভেজা।লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট

দাগে সরকারি জমি থাকলেও ব্যক্তিমালিকানার জমির নামজারি করা যাবে

অনেক জমির মালিক প্রায়ই একটি সমস্যার মুখে পড়েন। জমি কিনেছেন কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন, কাগজপত্রও ঠিক আছে। তবু নামজারি করতে গেলে ভূমি অফিস থেকে বলা হয়, ‘আপনার দাগে সরকারি খাসজমি আছে, তাই নামজারি হবে না।’ ভূমি উন্নয়ন কর দিতে চাইলেও অনেক ক্ষেত্রে তা নেওয়া হয় না। ফলে বৈধ মালিক হয়েও বছরের পর বছর জমির মালিকানাসংক্রান্ত নথি হালনাগাদ করা যায় না। এতে জমি বিক্রি, ব্যাংকঋণ নেওয়া কিংবা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি ভাগ করে দেওয়ার কাজ আটকে থাকে।এই ভোগান্তি দূর করতে ভূমি মন্ত্রণালয় ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে একটি পরিপত্র জারি করেছে।সমস্যাটি কোথায় ছিল?জমির নথিতে ‘দাগ’ বলতে নির্দিষ্ট একটি জমির খণ্ডকে বোঝায়। অনেক সময় একই দাগের একাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন থাকে, আর অন্য অংশ থাকে সরকারের খাসজমি বা সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট জমি। মন্ত্রণালয় লক্ষ করেছে, এমন ক্ষেত্রে অনেক ভূমি অফিস ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারির আবেদন গ্রহণ বা অনুমোদন করছিল না। ভূমি উন্নয়ন করও আদায় করা হচ্ছিল না। ফলে দাগের একটি অংশ সরকারি হওয়ার কারণে ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের মালিকেরাও ভোগান্তিতে পড়ছিলেন।নতুন পরিপত্রে কী বলা হয়েছে?সহজ কথায়, একই দাগে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থাকলে দুই অংশের সীমানা নির্ধারণ করে আলাদা করা হবে। এরপর ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের ব্যবস্থা করা হবে। পরিপত্রের প্রধান নির্দেশনাগুলো হলো—১. সহকারী কমিশনার (ভূমি) সীমানা নির্ধারণ করবেনযে দাগে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি একসঙ্গে রয়েছে, সেখানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) দুই অংশের সীমানা নির্ধারণের ব্যবস্থা করবেন। এ কাজে জরিপকারীর সহায়তা নেওয়া হবে। হালনাগাদ রেকর্ড, দাগসূচি, মৌজা নকশা, মালিকানার ধারাবাহিকতা ও দলিলপত্র যাচাই করা হবে। শুধু কাগজপত্রের ভিত্তিতে নয়, সরেজমিনে গিয়ে জমির সীমানাও চিহ্নিত করতে হবে।২. নামজারির আবেদন আটকে রাখা যাবে নানামজারির আবেদন যাচাই করতে গিয়ে দেখা গেল, সংশ্লিষ্ট দাগের একটি অংশ সরকারি জমি। এ কারণে পুরো আবেদন বাতিল করা যাবে না। সরকারি অংশ আলাদা করে ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারি অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।৩. সরকারি জমি সরকারেরই থাকবেএই প্রক্রিয়ায় সরকারি বা খাসজমি কোনোভাবেই ব্যক্তির নামে নামজারি করা যাবে না। সরকারি অংশ সরকারের নামে সুরক্ষিত থাকবে। নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর আদায় হবে কেবল ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের জন্য।৪. আলাদা নথি খোলার প্রয়োজন কমবেনামজারির আবেদনের সূত্রে জমির সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশ আলাদা করার প্রয়োজন হলে একই নামজারি নথিতে কাজটি করা হবে। এ জন্য আলাদা নথি খোলার প্রয়োজন হবে না। তবে নামজারির আবেদন ছাড়াই শুধু সীমানা পৃথক করার জন্য কেউ আবেদন করলে আলাদা নথি খুলতে হবে।৫. ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া যাবেব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের ভূমি উন্নয়ন কর নিয়মিত আদায় করা হবে। ফলে মালিক কর পরিশোধ করে দাখিলা নিতে পারবেন। জমির অন্যান্য কাগজপত্রের সঙ্গে এই দাখিলাও সংরক্ষণ করা যাবে।৬. অনলাইন ভূমিসেবায় পরিবর্তন আনা হবেই-নামজারি ও অনলাইন ভূমিসেবার সফটওয়্যারে নতুন পদ্ধতি চালু করতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।পরিপত্রটি জনস্বার্থে জারি করা হয়েছে এবং অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।সাধারণ মানুষের কী লাভ হবে?যাদের নামজারি শুধু ‘দাগে খাসজমি আছে’—এই কারণ দেখিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল, তারা এখন নতুন নির্দেশনার আলোকে প্রতিকার চাইতে পারবেন। নামজারি সম্পন্ন হলে জমি বিক্রি, হস্তান্তর, বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি ভাগ করা সহজ হবে। ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের সুযোগও তৈরি হবে।অন্যদিকে, সরকারি জমির সীমানা সরেজমিনে চিহ্নিত করা হলে খাসজমি অবৈধভাবে দখলের ঝুঁকি কমতে পারে। এতে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির অধিকার সুরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি সম্পত্তি রক্ষাও সহজ হবে।জমির মালিকদের করণীয়আপনার জমির দাগে সরকারি বা খাসজমি থাকার কারণে নামজারি কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া আটকে থাকলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন। প্রয়োজনে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে আবেদন করুন।আবেদনের সময় জমির দলিল, আগের মালিকের দলিল, খতিয়ান, পুরোনো ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা (যদি থাকে) এবং ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন। সরেজমিনে জমি মাপার সময় উপস্থিত থেকে নিজের জমির সীমানা দেখিয়ে দিন।কোনো দালালের শরণাপন্ন না হয়ে সরাসরি ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের সহায়তা নিন। সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।শেষ কথাভূমি মন্ত্রণালয়ের এই পরিপত্র একই দাগে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থাকার কারণে সৃষ্ট দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমানোর একটি উদ্যোগ। এর মূল কথা হলো, সরকারি জমি সরকারের থাকবে, আর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির মালিকানা যাচাই করে সেই অংশের নামজারি করা যাবে। দাগের একাংশ সরকারি হওয়ার কারণে অন্য অংশের বৈধ মালিককে অযথা ভোগান্তিতে রাখা উচিত নয়।তবে পরিপত্রের নির্দেশনা বাস্তবে কার্যকর করতে ভূমি কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা, সঠিক জরিপ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলেই জমির মালিকেরা এই উদ্যোগের সুফল পাবেন এবং সরকারি জমিও সুরক্ষিত থাকবে।[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

জগন্নাথের গরুভোজ, শিলিগুড়ির পোস্টার: অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের দুই ভাষা

এ কোন্ বাংলাদেশ, এ কোন্ ভারতবর্ষ আজ আমরা দেখছি? ধর্মীয় বিভাজন আর ভেদবিভেদের নোংরা রাজনীতি সমাজকে বিষাক্ত করে তুলছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গাপূজার সময় আমরা দেখলাম, রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নামে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে গরু জবাই করে ভোজের আয়োজন করেছে। এর আগে গরু নিয়ে ভোজ মিছিলও করেছে। সঙ্গে ছিল রংবেরঙের তরুণ ইউনূস বাহিনী। এসব ঘটনায় সাহসী হয়ে জামাত শিবির বাহিনী পিরোজপুরে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পসারির দাফন কার্যক্রমসহ পরিবারের স্বাভাবিক ধর্মীয় আচারে এবং মুক্তিযোদ্ধার অন্তিম সম্মান প্রদানে বাধা দিলো। আর কয়েক দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরজুড়ে পোস্টার সাঁটানো হয়েছে—‘হিন্দুর দোকান থেকে মাংস কিনুন। বিরিয়ানি খান, তবে হিন্দু রেস্টুরেন্টে’। আমাদের কিংবা আমাদের জ্যেষ্ঠ প্রজন্মের কাছে এসব কথা ও দৃশ্য তো একান্তই অজানা, অচেনা।পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুত্ববাদী নতুন মুখ্যমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পরে প্রথম যে কাজটি করলেন, তা হলো প্রায় একশ বছর ধরে কলকাতায় ঈদের প্রধান জামাত রেড রোডে অনুষ্ঠিত হয়ে এলেও যানজটের অজুহাতে সেখানে এর আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া। অথচ, কয়েক দিন পরেই এই রেড রোড তিন দিনের যোগ দিবসের জন্য সপ্তাহব্যাপী বন্ধ রাখা হলো।এদিকে আবার শারদোৎসবে কেন মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউ ভিন্ন ধর্মের প্রতি সম্মান জানাতে পূজামণ্ডপে যাবেন, তা নিয়ে ইসলামি উগ্রবাদীরা বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবিরাম কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ ইসলাম ধর্মে বহুত্ববাদ ও ভিন্ন ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা ও সম্মান প্রদর্শন অত্যন্ত মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি। ইসলাম মনে করে, পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের উপস্থিতি আল্লাহর ইচ্ছারই অংশ।নড়াইল শহরের চিত্রা নদীর পাড় ঘেঁষে সুন্দর, ছিমছাম একটি রিসোর্ট আছে—নাম চিত্রা রিসোর্ট। প্রথমবার সেখানে গিয়ে নদীর অপর পাড়ের মহিষখোলা পুরোনো রেজিস্ট্রি অফিসের পাশে একটি টং দোকানে চা খাওয়ার সময় আমার স্ত্রী দোকানিকে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে দেখার মতো কী আছে? দোকানি সরাসরি সামনের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললেন, “অই মন্দির আর মসজিদডা দেহেন।” চার দশক ধরে একেবারে পাশাপাশি অবস্থিত সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ এবং মহিষখোলা সার্বজনীন পূজামন্দির সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বুঝলাম, ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন উজ্জ্বল নিদর্শন এলাকার সাধারণ মানুষের কাছেও গর্বের, অহংকারের। দোকানির কাছ থেকেই শুনলাম, শহরের কুড়িগ্রাম এলাকায় নিশিনাথতলা মন্দির ও পুলিশ ফাঁড়ি জামে মসজিদ এবং পুলিশ লাইন জামে মসজিদ ও সর্বমঙ্গলা মন্দিরও পাশাপাশি অবস্থিত।এ ছাড়া পত্রিকায় তো এ ধরনের সংবাদ প্রায়ই প্রকাশিত হয়। টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা সদরে একই সীমানাপ্রাচীরের মধ্যে বাঁ পাশে মসজিদ ও ডান পাশে মন্দির অবস্থিত। প্রায় ৫৬ বছর ধরে একই প্রাঙ্গণে সহাবস্থান করছে এই দুই উপাসনালয়। ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্রে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী জয় কালী মন্দির এবং ফেনী কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদ। লালমনিরহাটের পুরোনো বাজার এলাকায় রয়েছে প্রায় দুই শত বছরের প্রাচীন কালীমন্দির। তার পাশেই রয়েছে এক শত বছরের পুরোনো বাজার জামে মসজিদ। মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ভূঁয়াই বাজার এলাকায় প্রায় ৫০ বছর আগে পাশাপাশি নির্মাণ করা হয় মসজিদ ও মন্দির—যা এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাক্ষী হয়ে আছে।দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাশাপাশি এ ধরনের আরও মসজিদ ও মন্দির রয়েছে। এসব স্থানে একই আঙিনায় পূজার্চনা ও নামাজ আদায় চলছে। স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় এসব মন্দির ও মসজিদকে কেন্দ্র করে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালন করছেন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা শোনা যায় না। মসজিদে নামাজের সময় এসব মন্দিরের ঢাক, উলুধ্বনি ও সাউন্ড সিস্টেম বন্ধ রাখা হয়। ফলে মুসল্লিরা সম্পূর্ণ নিরবচ্ছিন্নভাবে নামাজ আদায় করতে পারেন। আবার পূজা-পার্বণেও মসজিদের মুসল্লিরা সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভিন্ন ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতিকে ধারণ করে একই আঙিনায় এভাবে চলছে আজান ও উলুধ্বনি। একই উঠানে জ্বলতে থাকা প্রদীপ আর মিনারের সুর দুই সম্প্রদায়কে বেঁধে রেখেছে শতবর্ষের সম্প্রীতির বন্ধনে। অথচ মসজিদের সামনে শূকরের মাংস রান্নার আয়োজন হলে যারা আপত্তি করতেন, মন্দিরের কাছে গরুর মাংস রান্নায় হিন্দু শিক্ষার্থীদের আপত্তি বুঝতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সব তরুণের অসুবিধা কোথায়?ভারতবর্ষেও বিভিন্ন স্থানে—যেমন কলকাতা, হুগলি, ঝাড়গ্রাম, মথুরা, বারাণসী, নয়ডা, শ্রীনগর এবং কর্ণাটক ও কেরালার বিভিন্ন এলাকাসহ বহু স্থানে—মন্দির ও মসজিদ পাশাপাশি, একই সীমানার মধ্যে রয়েছে। সে আলোচনায় না গিয়ে ভিন্ন একটি ঘটনার উল্লেখ করছি, যা ২০২২ সালে পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল প্রচারিত হয়েছিল। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে গোটা ভারতবর্ষ যখন বিপর্যস্ত, সেই সময় কেরালার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মৃত্যুপথযাত্রী এক মুসলিম নারীকে কলেমা পড়ে শুনিয়েছিলেন এক নারী চিকিৎসক। ৫৬ বছর বয়সী কোভিড রোগী বিভাথু ১৭ দিন আইসিইউতে কেরালার একটি হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি যখন নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছিলেন, তখন ধর্মবিশ্বাসে হিন্দু চিকিৎসক রেখা কৃষ্ণান মুসলিমদের জন্য দোয়া বা প্রার্থনার কলেমা পাঠ করতে থাকেন। তিনি যখন কলেমার পঙ্‌ক্তিগুলো পড়ছিলেন, রোগী ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।ডাক্তার রেখা বলেন, “প্রায় ১৭ দিন ধরে বিভাথুর চিকিৎসা চলছিল। এ সময় তার ছেলে ও জামাই প্রবল বৃষ্টি কিংবা লকডাউন উপেক্ষা করে প্রতিদিন হাসপাতালে আসতেন, শুধু তাদের মায়ের খোঁজখবর নিতে। ভেতরে ঢুকতে না পারলেও তারা শুধু আমাকে দেখতে এবং তার অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিতে পার্কিং লটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তারা এও জানতেন যে তার স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে না। তবুও মনের শান্তি পেতে তারা প্রতিদিন ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। যখন আমি ভাবলাম, তার শেষ মুহূর্তে তারা পাশে থাকলে কী করতেন, তখন আমি প্রার্থনাটি জপ করতে শুরু করলাম।” ডক্টর রেখা বলেন, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে বড় হয়েছেন। এ কারণে তিনি ইসলামি প্রার্থনা জানতেন।কেরালায় যখন ডা. রেখা এ মানবিক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলেন, তখন নরেন্দ্র মোদির গুজরাটে ঘটল উল্টো ঘটনা। সেখানে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন করে করোনা আক্রান্ত হিন্দুদের রাখার জন্য একটি ওয়ার্ড এবং মুসলিম রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড তৈরি করা হলো। হিন্দুদের ওয়ার্ডে ঠাঁই পেতেন না মুসলিম রোগীরা, আর মুসলিমদের ওয়ার্ডে রাখা হতো না হিন্দুদের। এটি শুধু অমানবিক ঘটনা নয়, অসাংবিধানিকও। কারণ, ভারতীয় সংবিধান অনুসারে ধর্মের ভিত্তিতে যত ভারতীয়কে এভাবে আলাদা করে দেখা যায় না। কিন্তু মোদির ভারতে সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে, গায়ের জোরে ও কৌশলী ভোটের জোরে এ বিভাজন আজ চরম পর্যায়ে চলে গেছে।নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করার লক্ষ্য থেকে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনে এসআইআরের আওতায় পরিকল্পিতভাবে ২০ লক্ষেরও বেশি ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বিজেপির বিজয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে একই ঘটনা ঘটেছে বিহারে। সেখানে ৫২ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। আসামে নাগরিকপঞ্জি হওয়ার পর ১৯ লাখ মানুষ তার বাইরে রয়েছেন। সারা দেশজুড়ে এ প্রক্রিয়া চলছে। সব ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘু, বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়, আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায় এবং জনজাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা এই তথাকথিত এসআইআরের শিকারে পরিণত হচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বাদ-প্রতিবাদ করলেও বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি।কিন্তু অতিসম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিরোধী আন্দোলনে এক নাটকীয় পরিবর্তন ও নতুন গতি সৃষ্টি করে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষে নিযুক্ত তিনজন সম-পদমর্যাদার নির্বাচন কমিশনার মতবিনিময় করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বা সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচনপ্রক্রিয়া-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, বহু ক্ষেত্রে দুজন নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি সত্ত্বেও, এমনকি তাদের অন্ধকারে রেখে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ও অনেক নির্দেশ জারি করা হয়েছে। সেসব নির্দেশের বেশির ভাগই ছিল ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-সংক্রান্ত, যার সঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের বাদ পড়ার বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। অনেকটা আগুনে ঘি ঢালার মতো এ সংবাদ বিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চার করে।গোটা ভারতবর্ষে সাড়া জাগানো তরুণদের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টি, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও তাতে সমর্থন জানালে দিল্লিসহ সারা ভারতবর্ষজুড়ে ছাত্র-তরুণ, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা রাজপথে নেমে আসেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্দোলনের স্টিয়ারিংয়ে আসছেন। তরুণদের নেতৃত্বে শুধু ‘ককরোচ’রাই নয়, বরং বামপন্থী ছাত্রী নেত্রী নেহা বোরাও আইকন হয়ে উঠছেন। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একটি মন্তব্য (যা খণ্ডিতভাবে প্রচার করা হয়, পরে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে শুধরে নিয়েছেন) করা ছাড়া তিনি এ আন্দোলনে গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ঐশী ঘোষসহ আরও বেশ কয়েকজন বামপন্থী ছাত্রনেতা-নেত্রীও আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠছেন।যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো প্রস্তুতি নিয়ে দিল্লিতে বিরোধী আন্দোলন সামাল দিলেও মোদি সরকার ও তার অনুসৃত সাম্প্রদায়িক নীতিসমূহ সরাসরি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। মোদি ও অমিত শাহর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ছে। ভারতবর্ষের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি তুলে দেওয়ার যে স্বপ্ন তারা দেখছেন, তা কি কার্যকর করা যাবে? এই তরুণদের বড় অংশই আগামী নির্বাচনে নতুন ভোটার হিসেবে অংশ নেবেন। এই তরুণদের বাবা-মা, কাকা-কাকিরাই তো বিগত দুটি নির্বাচনে বিজেপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। তাদের সন্তানেরাই আজ নতুন পথের সন্ধান করছেন—যা তাদের অভিভাবকদের চিন্তার জগৎকেও প্রভাবিত করছে।বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর উগ্র ধর্মান্ধ শক্তি ও ছাত্রনেতৃত্বের একাংশ ক্ষমতা দখলের যে স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল, তাতে এখন অনেকটাই ভাটার টান। ইউনূস আমলে সরকারের ওপর তাদের যে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব ছিল, তা ক্রমেই শিথিল হচ্ছে। আর নিয়ন্ত্রণের রাশ যত আলগা হচ্ছে, ততই তাদের আচরণ, বক্তব্য ও শারীরিক ভাষায় ফুটে উঠছে এক অদ্ভুত দ্বৈততা—একদিকে উগ্রতার আস্ফালন, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ভীতি ও অস্থিরতা।অন্যদিকে, হিন্দুধর্মের বহুত্ববাদী ও যুক্তিনির্ভর ঐতিহ্যকে আড়াল করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ভারতের বহুভাষিক, বহুধর্মীয়, বহুজাতিসত্তার ও বহুসংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় সমাজকে কর্তৃত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার ছাঁচে বন্দি করতে চাইছে। কিন্তু ভারতবর্ষের নতুন প্রজন্ম সেই বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে আসছে। এই প্রতিরোধ কেবল ভারতের ভবিষ্যতের জন্য নয়, উপমহাদেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।সাম্প্রদায়িকতার এই অন্ধকার ভেদ করার এক অন্তর্নিহিত শক্তি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের মধ্যেও রয়েছে। রয়েছে বলেই তো জুলাই আন্দোলনে যেসব ছদ্মবেশী ছাত্রনেতৃত্বের মধ্যে কৌশলী অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদেরও মাথায় লাল-সবুজের পট্টি বাঁধতে হয়েছিল, আর সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মতো তাদেরও কণ্ঠে তুলে নিতে হয়েছিল ‘আমার সোনার বাংলা ….’-এর পাশাপাশি ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা …’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে …’, ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে …’, ‘মোরা একটি ফুলকে …’, ‘ও আমার দেশের মাটি …’—এসব দেশাত্মবোধক গান। আজ খুব বেশি প্রয়োজন দেশাত্মবোধের সেই শক্তিকে জাগিয়ে তোলা এবং বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা।বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। তবে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বিভাজনের বিরুদ্ধে দুই দেশের লড়াই অনেকখানি একই জায়গায় এসে মেলে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুভোজ ও গরু নিয়ে ভোজ মিছিলের নামে ভিন্ন ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করা হোক, কিংবা শিলিগুড়িতে ‘বিরিয়ানি খান, তবে হিন্দু রেস্টুরেন্টে’—এমন আহ্বানের মধ্য দিয়ে খাদ্যাভ্যাস ও ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা হোক, উভয়ের অন্তর্নিহিত রাজনীতি একই; মানুষের মধ্যে ঘৃণা, হিংসা, অবিশ্বাস আর বিভাজনের দেয়াল তুলে দেওয়া। এই দেয়াল ভাঙতে হবে সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতার শক্তিতে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

পর্যটনে নিরাপত্তা: আগুন লাগে, দায় নেয় না কেউ

কক্সবাজারের ইনানীতে আগুনে দশজন পর্যটকের মৃত্যু আমাদের পর্যটনশিল্পের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। হাসপাতালে বসে এক স্বামী বলছিলেন, আর দশ মিনিট সময় পেলে তার স্ত্রীও নিচে নেমে আসতে পারতেন। এই কথায় দুর্ঘটনার গভীর বেদনা ফুটে ওঠে। মানুষগুলো শুধু আগুনে প্রাণ হারাননি, হারিয়েছেন সময়মতো উদ্ধার ও নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগও। পর্যটককে স্বাগত জানাতে আমরা যতটা আগ্রহী, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ততটাই পিছিয়ে।গত ১৭ অক্টোবর উখিয়ার পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। কাঠ ও বাঁশে তৈরি তিনতলা ভবনটিতে নিচে ছিল রেস্তোরাঁ। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ওপরের তলা ধসে যায়। নিহতদের মধ্যে একজন নারী ও পাঁচ বছরের একটি শিশুও রয়েছে। প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাতের সন্দেহ করা হয়েছে। তবে আগুনের কারণ তদন্তে নিশ্চিত হবে। তার চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হলো, সামান্য আগুনে এত মানুষের মৃত্যু কীভাবে সম্ভব হলো?ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ছিল না। জুন মাসেই ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। অথচ অতিথি রাখা বন্ধ হয়নি। ভবনে জরুরি বহির্গমন পথও ছিল না। একমাত্র কাঠের সিঁড়িটি ছিল রান্নাঘর ও জেনারেটর কক্ষের মাঝখানে। নিকটতম ফায়ার স্টেশনও ছিল প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে। অর্থাৎ বিপদের আশঙ্কা জানা থাকলেও প্রতিরোধ ও উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। প্রথম কয়েক মিনিটের যথাযথ প্রস্তুতি হয়তো অনেক প্রাণ বাঁচাতে পারত।এই ব্যর্থতা কোনো একক ভুলের ফল নয়। অনিরাপদ ভবন, দাহ্য নির্মাণসামগ্রী, পালানোর পথের অভাব, দুর্বল তদারকি এবং দমকলের দূরত্ব—সব মিলিয়ে বিপর্যয় ঘটেছে। কক্সবাজারে পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এর অনেকগুলো বাধ্যতামূলক অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন ছাড়াই চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ে দশটি উপজেলার জন্য জনবল মাত্র আটজন। এই সীমাবদ্ধতা তদারকির দুর্বলতা বোঝায়। তবে জনবলসংকটকে দায় এড়ানোর অজুহাত করা যাবে না।এখানে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করার পর ব্যবস্থা নেওয়ার দায় কার, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। এক সংস্থা সতর্ক করবে, অন্য সংস্থা ব্যবস্থা নেবে—এমন অস্পষ্টতার সুযোগে বিপজ্জনক প্রতিষ্ঠান চালু থাকলে শেষ পর্যন্ত প্রাণহানির দায় কেউ স্বীকার করবে না। তাই শুধু তদন্ত কমিটি গঠন নয়, দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।পর্যটন মূলত আস্থার ওপর নির্ভরশীল। একজন পর্যটক সুন্দর দৃশ্যের পাশাপাশি নিরাপদ আবাসনও চান। বাংলাদেশের সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন ও নদী পর্যটনের বড় সম্পদ। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডে শিশু ও নারীসহ মানুষের মৃত্যুর খবর ছড়ালে সেই সম্পদের আকর্ষণ কমে যায়। এ বছরের আগস্টে কলকাতার একটি হোটেলে আগুনে নিহত নয়জনের মধ্যে আটজনই ছিলেন বাংলাদেশি। এ ধরনের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা পুরো অঞ্চলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত সব হোটেল ও রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই। ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে সংস্কারের সময় দিতে হবে; গুরুতর ঝুঁকি থাকলে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে। নিরীক্ষার ফল প্রবেশপথে দৃশ্যমানভাবে প্রকাশ এবং অনলাইন বুকিংয়ের সময় তা জানানো যেতে পারে। এতে পর্যটকেরা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে সরকারি পর্যটন পোর্টাল ও বুকিং প্ল্যাটফর্ম থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা দরকার।দ্বিতীয়ত, ইনানী, মেরিন ড্রাইভ ও টেকনাফের মতো দূরবর্তী এলাকায় দ্রুত অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা গড়তে হবে। ছোট অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্র, পর্যাপ্ত পানির উৎস, বহনযোগ্য সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী দল তৈরি করা যেতে পারে। প্রতিটি আবাসনে বিকল্প নির্গমন পথ, ধোঁয়া শনাক্তকরণ যন্ত্র ও কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। রান্নাঘর ও জেনারেটর কক্ষ আবাসন থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে। কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও অগ্নিনির্বাপণ মহড়াও জরুরি।পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কাজের সমন্বয় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা তদারকির জন্য একক সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ গঠন করা যেতে পারে। দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। সংস্কারের অগ্রগতিও নিয়মিত জানাতে হবে। শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়; দৃশ্যমান পরিবর্তন দরকার।ইনানীর দশটি প্রাণ আমাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে। এই শোক কি কয়েক দিনের আলোচনা ও তদন্ত প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নিরাপদ পর্যটনব্যবস্থা গড়ার সূচনা হবে? আতিথেয়তার অর্থ শুধু অতিথিকে স্বাগত জানানো নয়, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও। আর দশ মিনিট সময় পেলে যাঁরা বেঁচে যেতে পারতেন, তাদের সেই সময় ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতের কোনো পর্যটককে যেন একই পরিণতির মুখে পড়তে না হয়, সেই দায়িত্ব এখনই নিতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট]

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এমডি নিয়োগে চাই স্বচ্ছতা

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকট মোকাবিলা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দক্ষ নেতৃত্বের বিকল্প নেই। অথচ এসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক চলছে। গত সেপ্টেম্বরে অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) ও বেসিক ব্যাংকের এমডিদের চুক্তি বাতিল করে সরকার। নতুন এমডি নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না—এমন আলোচনার মধ্যে নিয়োগনীতির পরিবর্তনও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদে অভিজ্ঞ, সৎ, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করা এখন জরুরি।আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের জন্য ২০২৬ সালের নতুন নীতিমালা জারি করেছে। এতে এমডি বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগের জন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত রাখা হয়েছে। প্রার্থীকে বর্তমানে বা আগে কোনো ব্যাংকের এমডি পদে দায়িত্ব পালন করতে হবে, অথবা অব্যবহিত আগের পদে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে বিশেষ দক্ষতা, পেশাগত যোগ্যতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও সুনামসম্পন্ন প্রার্থীর ক্ষেত্রে এ শর্ত শিথিল করা যাবে। এ ছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতা, সততা, কর্মজীবনের সুনাম এবং তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা ও অর্থ পাচার প্রতিরোধ বিষয়ে জ্ঞানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে নমনীয়তা রাখা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সেই সুযোগ যেন নির্দিষ্ট কাউকে নিয়োগ দেওয়ার পথ তৈরি না করে। এক বছরে বারবার নিয়োগনীতি পরিবর্তন কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। প্রচলিত নিয়মে যোগ্যতা অর্জন করেও অনেকে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করে নতুন প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। নীতিমালা পরিবর্তনের কারণ, অনুমোদনপ্রক্রিয়া এবং তার ভিত্তিতে নিয়োগের ফলাফল প্রকাশ করা হলে স্বচ্ছতা বাড়বে।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিন কাজ করা অনেক কর্মকর্তার শাখা ব্যবস্থাপনা, ঋণ প্রশাসন, বৈদেশিক বাণিজ্য, নিরীক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও মানবসম্পদ বিভাগে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতাও অর্জন করেছেন। তাঁদের মধ্যে যোগ্য ব্যক্তিদের যথাযথ মূল্যায়ন করা দরকার। পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক যোগাযোগ বা ব্যক্তিগত প্রভাব নয়, সততা, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও কর্মদক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংক থেকে যোগ্য প্রার্থী নেওয়ার সুযোগ থাকলে তাঁদেরও একই মানদণ্ডে যাচাই করতে হবে।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি নেতৃত্বের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সোনালী ব্যাংক ছাড়া অন্য সরকারি ব্যাংকগুলোর লোকসান, খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও প্রভিশনসংকট উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন ঋণ অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুর্বল তদারকির কারণে ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থায় তারল্য সহায়তা দিয়েও সব সমস্যার সমাধান করা যায়নি। কারণ, খেলাপি ঋণই একমাত্র সমস্যা নয়। দুর্বল করপোরেট সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং জবাবদিহির অভাবও ব্যাংকগুলোর সংকট বাড়িয়েছে।এ অবস্থায় এমডি নিয়োগের জন্য শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা ও চাকরির মেয়াদ বিবেচনা করলেই চলবে না। প্রার্থীর ঋণ ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম শনাক্তকরণ, খেলাপি ঋণ আদায়, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা যাচাই করতে হবে। অতীতে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতা ও সুশাসনের রেকর্ডও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বাছাই কমিটির সুপারিশ, গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনার বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। নিয়োগের প্রতিটি ধাপে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি।একই সঙ্গে নিয়োগনীতি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল হওয়া দরকার। প্রয়োজন ছাড়া বারবার শর্ত পরিবর্তন করলে কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বাড়বে এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার ওপর আস্থা কমবে। নীতিমালা সংশোধন করতে হলে তার যৌক্তিকতা প্রকাশ করতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে কতজন কর্মকর্তা এমডি পদে নিয়োগের যোগ্যতা পূরণ করছেন, তাঁদের কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না কেন—এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত। এতে অযথা বিতর্ক কমবে এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।ব্যাংক খাতের সংকট কাটাতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া ঋণ আদায়, সম্পদের মান যাচাই, মূলধন ঘাটতি মোকাবিলা এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করাও জরুরি। এসব কাজে এমডিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। তাই তাঁদের নিয়োগে পেশাগত সততার পাশাপাশি কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও যাচাই করা প্রয়োজন।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদ কেবল একটি চাকরি নয়। এর সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থ, সরকারি সম্পদ এবং দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা জড়িত। তাই এ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষের পছন্দ বা প্রভাবের পরিবর্তে যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। স্বচ্ছ নিয়োগনীতি, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে সংকট থেকে উত্তরণের পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

সড়ক দুর্ঘটনার দায়মুক্তি ও প্রাণহানির খতিয়ান

বাংলাদেশে প্রতিটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার পর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে: শোকার্ত পরিবার, জনরোষ, তদন্তের দাবি এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হওয়ার আগেই ঘটে যায় আরেকটি দুর্ঘটনা। সড়কপথ বিপজ্জনক হতে পারে, চালকরা ভুলও করতে পারেন—তবে এটিই মূল সমস্যা নয়। আসল সমস্যা হলো, যে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব, তারা বারবার সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করতে পারছে না এবং কোনো অঘটন ঘটলে তার দায়বদ্ধতাও এড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের সড়ক নিরাপত্তা সংকট মূলত একটি জবাবদিহিতার সংকট।কত মানুষ মারা যাচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের কোনো ঐকমত্যই নেই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪,২৮৫টি দুর্ঘটনায় ৪,১৫৭ জন নিহত এবং ৫,৩৯১ জন আহত হয়েছে। অন্যদিকে, ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’-এর হিসাব অনুযায়ী, কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই ৪৪২টি দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত ও ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’ ৯,১১১ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে, যেখানে ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’-এর হিসাবে এই সংখ্যা ৭,৩৫৯। বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করায় এই পরিসংখ্যানগুলোর মধ্যে পার্থক্য দেখা দেয়।আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রকৃত চিত্র হয়তো আরও ভয়াবহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১,৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, অথচ সরকারি নথিতে এই সংখ্যা ৫,০৮৪। এত বড় ব্যবধান ইঙ্গিত দেয় যে, সরকারি নথিতে মৃত্যুর একটি বড় অংশই বাদ পড়ে যাচ্ছে। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ছাড়া সরকারের পক্ষে এটি জানা সম্ভব নয় যে, কোন সড়কগুলো সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক, কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে অথবা কোনো নীতি আদৌ কার্যকর হচ্ছে কি না।এর সমাধান হলো একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা, যেখানে পুলিশি প্রতিবেদন, হাসপাতালের তথ্য, মৃত্যু নিবন্ধন এবং বিমা দাবির মতো সব উপাত্ত একত্রিত থাকবে। প্রতিটি মৃত্যুকে একই পদ্ধতিতে নথিবদ্ধ করতে হবে—যার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিদের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।সঠিক পরিসংখ্যান কেবল একটি সূচনা মাত্র। মূল দুর্বলতাটি হলো—বিদ্যমান নিরাপত্তা বিধিগুলো কার্যকর করার ক্ষেত্রে। যদি গাড়ির ফিটনেস সনদ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র হয়, ত্রুটিগুলো মেরামত না করা হয়, অথবা সনদটি অর্থের বিনিময়ে কেনা হয়ে থাকে—তবে তা কাউকে সুরক্ষা দিতে পারে না। ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক, ক্ষয়ে যাওয়া টায়ার, নষ্ট বাতি, অনিরাপদ পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত বোঝাই যানবাহন একটি ছোট ভুলকেও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় রূপ দিতে পারে। গাড়ির পরিদর্শন হতে হবে প্রকৃত কারিগরি যাচাই-বাছাই, যার নথিপত্র থাকবে উন্মুক্ত এবং যার ওপর থাকবে নিরপেক্ষ তদারকি।চালকদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন একই ধরনের কঠোর নজরদারি। যখন নিয়োগকর্তারা অত্যন্ত কঠিন সময়সূচী চাপিয়ে দেন, চালকরা বিশ্রামের সুযোগ পান না এবং মুনাফার দৌড়ে বেপরোয়া আচরণকে উৎসাহিত করা হয়, তখন ড্রাইভিং লাইসেন্সের গুরুত্ব আর থাকে না। পরিবহন পরিচালনাকারীদের নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের চালকরা যোগ্য, দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিকভাবে সক্ষম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম পেয়েছেন কি না। কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি যখন যাত্রী পরিবহনকারী যানবাহন চালানোর সুযোগ পান, তখন কেবল চালককেই নয়, বরং যারা তাকে অনুমতি দিয়েছে, তাদেরও দায়বদ্ধ করতে হবে।মোটরসাইকেল আরোহী এবং পথচারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন। ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২,৯৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রশিক্ষণ, বৈধ লাইসেন্স, সঠিক মানের হেলমেট ব্যবহার এবং দ্রুতগতির যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া—এসবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ডেলিভারি কর্মীকে যেন কখনোই কঠোর সময়সীমা মেনে চলা এবং নিরাপদে বাড়ি ফেরার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে না হয়।পথচারীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি প্রায়শই থাকে রাস্তা বা অবকাঠামোতেই। ফুটপাতগুলো ভাঙাচোরা, হকারদের দখলে থাকা, অথবা অনেক জায়গায় ফুটপাতই নেই। স্কুল, বাজার বা বাস স্টপের মতো জায়গাগুলোর আশেপাশে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। স্থানীয় কাউন্সিল এবং সড়ক সংস্থাগুলোর উচিত জনবহুল এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন ফুটপাত, স্পষ্টভাবে চিহ্নিত পারাপারের স্থান, পর্যাপ্ত আলোকব্যবস্থা এবং যৌক্তিক গতিসীমা নিশ্চিত করা।সড়ক নকশার বিষয়টি যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, বাস্তবে তা পায় না। প্রতিটি মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনার পর ওভারটেকিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, লেন বিভাজন, দিকনির্দেশক চিহ্ন, সংযোগস্থল এবং দ্রুতগতির সড়কে ধীরগতির যানবাহনের উপস্থিতি—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠা উচিত। মিডিয়ান ব্যারিয়ার, নিরাপদ সংযোগস্থল, বাস্তবসম্মত গতিসীমা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে পারে যেন একজন চালকের ভুলে অনেক মানুষের প্রাণহানি না ঘটে।দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অ্যাম্বুলেন্সের ধীরগতি এবং হাসপাতালে নিম্নমানের চিকিৎসা সেবা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী নয় এমন আঘাতকেও মৃত্যুর কারণ করে তুলতে পারে। জরুরি পরিষেবা, পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স ও হাসপাতালগুলোর মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় প্রয়োজন; পাশাপাশি প্রশিক্ষিত প্রাথমিক সহায়তাকারী এবং ট্রমা কেয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।প্রস্তাবিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০২৬’-এ এসব ঘাটতির বেশ কয়েকটি সমাধানের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জরুরি চিকিৎসা সেবা, দুর্ঘটনাকবলিতদের সহায়তাকারীদের সুরক্ষা, খারাপ ড্রাইভিংয়ের জন্য পয়েন্টভিত্তিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং বারবার আইন লঙ্ঘনকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান। তবে এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে আইনের চূড়ান্ত খসড়া এবং তা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে তার ওপর।জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস কেবল বক্তৃতা, র্যালি বা সচেতনতামূলক প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আসল পরীক্ষাটি হলো—আইন পাস হলো কি না তা নয়, বরং এর ফলে মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমে কি না।প্রতিটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার দ্রুত তদন্ত হওয়া উচিত। যদি অবহেলা, জাল নথিপত্র ব্যবহার, অননুমোদিত ড্রাইভিং বা সরকারি কর্মকর্তাদের অসদাচরণ প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে কোনো অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান করতে হবে।বাংলাদেশের এমন একটি সড়ক নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রয়োজন, যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ থাকবে, সময়সীমা নির্ধারণ করা থাকবে এবং ফলাফলের পরিমাপ করা হবে। একটি জাতীয় টাস্ক ফোর্স গঠন করা যেতে পারে, যার বিআরটিএ, পুলিশ, সড়ক সংশ্লিষ্ট সংস্থা, স্থানীয় সরকার এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার মধ্যে সমন্বয় সাধনের কর্তৃত্ব থাকবে।নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে কেবল নথিপত্রনির্ভর না রেখে বাস্তব প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। বিআরটিএ-এর উচিত যানবাহনের ফিটনেস সনদ, পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং পরিদর্শন ফলাফলের একটি উন্মুক্ত ও অনুসন্ধানযোগ্য ডিজিটাল রেকর্ড রাখা। প্রতিটি বড় সড়ক প্রকল্প চালুর আগে একটি নিরপেক্ষ নিরাপত্তা নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।জরুরি সেবাদানকারী কর্মী, অ্যাম্বুলেন্স এবং উপযুক্ত হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই জবাবদিহিতার কাঠামো থাকা জরুরি। প্রতিটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার দ্রুত তদন্ত হতে হবে এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্দিষ্ট সংস্থার ওপর অর্পণ করতে হবে।এর মূল পরীক্ষাটি খুবই সহজ। প্রতিটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে জানতে হবে তাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে; প্রতিটি ব্যর্থতার কারণ খতিয়ে দেখতে হবে এবং প্রতিটি ফলাফল জনসমক্ষে উন্মুক্ত রাখতে হবে। যেসব মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য, সেগুলোকে ‘যাতায়াতের অনিবার্য মূল্য’ হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।যতদিন পর্যন্ত প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিতভাবে জবাবদিহিতার আওতায় না আনা হবে, ততদিন সড়ক নিরাপত্তা আমাদের নিজেদের জনগণের সুরক্ষায় ব্যর্থতারই একটি পরিমাপক হয়ে থাকবে। কোনো মানুষ মারা যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ কী প্রতিক্রিয়া দেখাল, তা দিয়ে অগ্রগতি বিচার করা যাবে না; বরং যাতায়াত ব্যবস্থাকে কতটা নিরাপদ করা সম্ভব হলো, তার ওপর ভিত্তি করেই প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

ভিডিও আরও দেখুন

ব্যালন ডি’অর অব অলটাইম জিতলেন রোনালদো

আধুনিক ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ব্যক্তিগত লড়াইয়ে আরও একটি পালক যুক্ত হলো। উয়েফা ও ‘ফ্রান্স ফুটবল’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ ভোটাভুটিতে মেসিকে পেছনে ফেলে ‘ব্যালন ডি’অর অব অলটাইম’ (সর্বকালের সেরা ব্যালন ডি’অর) জিতেছে পর্তুগিজ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ২০০৮ সালের মৌসুম।‘বোট’ (বেস্ট অব অল টাইম) নামের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনে অন্তত দুবার ব্যালন ডি’অর জয়ী ১০ জন কিংবদন্তি ফুটবলারের সেরা মৌসুমগুলোর মধ্যে থেকে সেরাটি বেছে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সমর্থকেরা। প্রতিটি ভোটের জন্য সমর্থকদের ১ ইউরো করে ফি দিতে হয়েছিল। মঙ্গলবার ও বুধবারের মধ্যবর্তী রাতে ব্যালন ডি’অরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এই অনলাইন ভোটিংয়ের পর্দা নামে।ভোটারদের রায়ে ২০০৮ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে রোনালদোর পারফর্ম করা মৌসুমটি প্রথম স্থান অর্জন করেছে। ওই বছরই ক্যারিয়ারের প্রথম ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন তিনি। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে বার্সেলোনার হয়ে জাদুকরী পারফরম্যান্স উপহার দেওয়া লিওনেল মেসির ২০১২ সালের মৌসুম। এ ছাড়া তালিকার তৃতীয় স্থানেও রয়েছে রোনালদোর ২০১৭ সালের রিয়াল মাদ্রিদ ক্যারিয়ারের মৌসুমটি।ব্যালন ডি’অর জয়ের রেকর্ডে আটটি ট্রফি নিয়ে পর্তুগিজ ফরোয়ার্ডের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও এই বিশেষ জনমত জরিপে রোনালদোর পেছনেই থাকতে হলো আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে। এই প্রতিযোগিতায় আরও অংশ নিয়েছিলেন মার্কো ফন বাস্তেন, মিশেল প্লাতিনি, ইয়োহান ক্রুইফ, রোনালদো নাজারিও, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, কেভিন কিগান, আলফ্রেডো দি স্তেফানো ও কার্ল-হাইনৎস রুমেনিগের মতো কিংবদন্তিরা। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ভোটারদের মধ্য থেকে সৌভাগ্যবান একজনকে ২০২৭ সালের ব্যালন ডি’অর মূল অনুষ্ঠানের দুটি ফ্রি টিকিট উপহার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে উয়েফা।/ 

ব্যালন ডি’অর অব অলটাইম জিতলেন রোনালদো