সংবাদ
ইনানীতে নলকূপ খননে মিলল গ্যাস ও কনডেনসেট

ইনানীতে নলকূপ খননে মিলল গ্যাস ও কনডেনসেট

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে নলকূপ বসানোর জন্য মাটি খুঁড়তে গিয়ে অনবরত গ্যাস নির্গমনের ঘটনা ঘটছে। আগুনের তীব্রতা না কমে দিন দিন বাড়তে থাকায় এবং নির্গত গ্যাসের সঙ্গে ‘কনডেনসেট’ বা তরল হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি পাওয়ায় সেখানে ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) ভূতাত্ত্বিক জরিপ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে উচ্চমাত্রার হাইড্রোকার্বনের আলামত নিশ্চিত করেছে। সাধারণত মাটির অগভীর স্তরে অণুজীবের মাধ্যমে তৈরি হওয়া ‘বায়োজেনিক’ গ্যাসের সঙ্গে শুধু পানি পাওয়া যায়। কিন্তু ইনানীতে অগভীর স্তরে নির্গত গ্যাসের সঙ্গে থার্মোজেনিক বৈশিষ্ট্যের কনডেনসেট মেলায় গভীর ভূস্তরে গ্যাসক্ষেত্রের উপস্থিতি নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠছেন বিশেষজ্ঞরা।বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিকুন আরহাম জানান, ভোলার শাহবাজপুরের অগভীর স্তরের বায়োজেনিক গ্যাসের সঙ্গে ইনানীর গ্যাসের স্পষ্ট তফাত রয়েছে। ইনানীতে কনডেনসেটের আলামত মেলায় প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে এখানে গ্যাসক্ষেত্র থাকতে পারে। তবে চূড়ান্ত রাসায়নিক পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।২৭ অক্টোবর সকাল ৮টার দিকে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী ছোট সেতুসংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় আবদুল্লাহর বাড়িতে প্রায় ৮০০ ফুট গভীর নলকূপ খননের সময় এই ঘটনা ঘটে। অবিরাম গ্যাস ও আগুন জ্বলতে থাকায় বর্তমানে এলাকায় বিস্ফোরণ ও ভূমিধসের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।নিরাপত্তার স্বার্থে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস দুর্ঘটনাস্থলের ২০০ মিটার ব্যাসার্ধজুড়ে লাল পতাকা টাঙিয়ে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে। সাময়িকভাবে স্থানীয় এলজিইডির সড়ক বন্ধ করে আশপাশের বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বাপেক্সের উপমহাব্যবস্থাপক জেবুন নাহার জানান, ঢাকা থেকে আসা টেকনিক্যাল টিম নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষা করছে এবং উচ্চচাপের কারণে জোরপূর্বক আগুন নেভানো বিপজ্জনক হওয়ায় আপাতত সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার রাখাই মূল লক্ষ্য।/ 
২ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

রম্যগদ্য: “বোইল্লা মারো হাসি, বাঁচবা একশ আশি”

হেঁ হেঁ, কথাটা ঠিক, আমি দেখছি রমনা পার্কে এক ব্যাটা বোইল্লা উডে “হাসো” ফাৎ করি বিশ তিরিশ জন পাবলিকে হো হো কইরা হাসে, আর কয় যত হাসবা, তত আয়ু বাড়বো!আরে বুড়বক, উড়ঝুড়ে বাঙাল, আমি যে হাঁসির কথা বলছি, সে হাঁসি তোর এই রমনা পার্কের হাসি নয়!আরে মিয়া ভাই আপনেই তো কোইতাছেন, “বোইল্লা মারো হাসি,বাঁচবা একশ আশি” হাসলে যে পাবলিকে বেশি দিন বাঁচে হেই কতাটা ব্যেবাগ পাবলিকেই জানে।হাসলেই যদি আয়ু বাড়ে, তাহলে বিশ্বের সবাই না হেসে কেবল রমনা পার্কের গুটি কয় লোক হাসছে ক্যানো?ক্যান, আপনে মিয়া দেখছেন না! রাস্তাঘাটে কত পাগলে একলা একলা হাসতাছে। কোনো কারণ ছাড়াই হাসতাছে। জানেন এই হাসির ঠেলায় এক এক পাগলে দেড়শ দুইশ বছর র্পযন্ত বাঁচে।তাহলে তুই রাস্তায় রাস্তায় হেসে হেসে ঘুরে বেড়াচ্ছিস না ক্যানো। তাহলেতো তুই দেড়শ দুইশ বছর র্পযন্ত বাঁচতে পারবি।হ’দেড়শ দুইশ বছর! বৌ-এর ছুট্টোভাই, মাত্র চুয়ান্ন বছর বাঁইচ্চায়, বাপ বাপ বইল্লা, কয় ছেইড়দে মা কেইন্দে বাঁচি।ক্যানো ক্যানো মাত্র চুয়ান্নো বছরেই কান্নাকাটি শুরু করেছিস...কাঁদবো না মিয়া, গাজর ১৮০ টাকা কেজি, এক লিটার তেল ২০০ টাকা, টমেটো ২০০টাকা, চাউল...থাম ভাই থাম, তোকে আর বাজার দর শোনাতে হবে না...ঠিক আছে ঠিক আছে, বাজার হিসাব না হয় ছাইড়া দিলাম, কিন্তু মাস্টারে যখন ছাত্রীরে অতিআচার করের তখন কি আমি হাসুম!“এতক্ষণে”— অরিন্দম কহিলা বিষাদে;— / “জানিনু কেমনে আসি লক্ষ্মণ পশিল / রক্ষঃপুরে।মানে কী! এহানে আবার মাইকেল হান্দাইলো কেমনে?মাইকেল মধূসুদন দত্তের “মেঘনাদ বধ” কাব্যের কথা বলছি না, বলছি তুই এতক্ষণে লাইনে এসেছিস।লাইনে আইছি মাইনে?তুই বললি না, মাস্টারে যখন ছাত্রীরে অতিআচার করের তখন কি আমি হাসুম! আমি তোর ওই হাসার কথায় বলছিলাম। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী” কবিতার দুটি পঙ্‌ক্তি শোন “আমি বেদূঈন, আমি চেঙ্গিস, / আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ... / ... আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!”হেঁ হেঁ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও কোইছে, আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া / হাসি পুষ্পের হাসি...আসলে কথাটা হোইবো “আমি বাংলদেশের দোজোখে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি...” হ্যাঁ হ্যাঁ শিক্ষক যখন ছাত্রীকে অত্যাচার করবে তখন ওই জাহান্নামের মতো নোংরা পরিবেশেও তুই পুষ্পের হাসি হাসবি!ওম্মা এইটা আপনি কি বলছেন!  নোংরা পরিবেশ, আপনে শুনেন নাই, আপনের বৌ-এর এক ছুট্টভাই কোইছে, মাস্টার গো কি স্বাদ আহাল্লাদ নাই, হ্যারা ছাত্রীরে ইকটু আধটু, আদর করলে আপনে কোইবেন ব্যাড টাচ! আপনেরা মিয়া নুংরা মানসিকতার অভিভাবক! মাস্টার সমাজে সম্মানিত ব্যাক্তিত্ব, হ্যায় আদর কোইরা আপনের আত্মজার ওষ্ঠে স্নেহের নির্দশন লেপন করছে, আর আপনে বর্বর অভিভাবক সম্মানিত মাস্টাররে থাপ্পড় মাইরা বোইলেন!একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে! তুই এইসব মাস্টারদের ছাত্রদের, ছাত্রীদের সাথে উন্নত দণ্ড দিয়ে আঘাত করাকে, অত্যাচার করাকে, ব্যাডটাচকে মেনে নিতে বলছিস!আরে আমি মাইন্না নিতে কমু ক্যা, আপনে দ্যাখেন নাই বাংলার ঘরে ঘরে, বাংলার পাড়ায় পাড়ায়, বাংলার মহল্লায় মহল্লায়, বাংলার গ্রামে গঞ্জে, শহরে শহরে  আপনের দেশে, আপনের কওমে বসবাসকারি ব্যাবাগ পাবলিকে মিছিল কোইরা কোইতাছে মাস্টারদের কোনো টাচ, ব্যাড টাচ বলা চলবে না। আত্মজার ওষ্ঠে স্নেহের নির্দশন লেপন করলে, সম্মানিত মাস্টাররে থাপ্পড় মারা চলবে না, চলবে না!এ কোন বাংলাদেশের কথা, এ কোন সোনার বাংলার কথা বলছিস, যেখানে মাস্টারদের ছাত্রদের, ছাত্রীদের সাথে অত্যাচার করাকে, ব্যাড টাচকে মিছিল মিটিং করে মেনে নিতে বলছিস!দ্যাখেন খুবতো তখন কোইছিলেন বর্বর পাকিস্তানিরা আমাগো শোষণ করে তাই পাকিস্তানি খ্যাদাও। আর আপনেগো ভায়ে ভায়ে ফাইটের চিপা দিয়া ইন্ডিয়া ঢুইক্কা দিল পাকিস্তান ভাইঙ্গা। আর পাকিস্তান ভাঙ্গার পরে আপনেরা কী করলেন পাকিস্তান আমলের, কান্দির পাড়া, নারায়ণগঞ্জের টানপাড়া, যশোর, খুলনা, চট্টগ্রাম, নাটোরের বনলতা সেনের, রাজশাহীর সব শাহী পাড়া ভাইঙ্গা দিলেন, লন এবার পাবলিকে তার মাল সামানা রাখবো কোই? কন কন এবার সারা দেশের ব্যাবাগ অবিবাহিত টগবগে তরুণ ও তরুণ মাস্টাররা তাগো মাল-সামানা রাখবো কোই? সব পাড়া তো ভাইঙ্গা দিছেন...এ্যাঁ তরুণদের মাল-সামানা মানে জিনিসপত্র রাখার জন্য তুই আবার পাকিস্তান আমলের সব পাড়া গড়তে বলছিস! আমি গড়তে কমুক্যা, আপনে দ্যাখেন না মিয়া, সারা বিশ্বে উন্নত দেশ মানে ফ্রান্সে, আমেরিকায়, ইংল্যান্ডে, রাশিয়ায়, মুলাঘুঁজ, পিকাডেলি স্কয়ার, লাসভেগাস, লেলিন গ্রাদ, ব্যাবাগ যায়গায় হ্যাগো দেশের টগবগে তরুণের ও তরুণ মাস্টারদের মাল সামান রাখার ব্যবস্থা করছে...বলিস কী? উন্নত বিশ্বে মানে ফ্রান্সে, আমেরিকায়, ইংল্যান্ডে, রাশিয়ায়, সব দেশে, দেশের টগবগে তরুণ মাস্টারদের মাল সামান রাখার ব্যবস্থা করেছে...করেছে মাইনে! আপনের প্রতিবেশী ভারতের বুধবার পেট, কলিকাতার সোনাগাছি, বম্বের কোলাবা, মাদ্রাসের আভিরামী ব্যাবাগ জায়গায় দেশের টগবগে তরুণের, তরুণ মাস্টারদের সমস্যা সমাধান করছে, আর ব্যাংককের পাতপোং কত্তবড় গোডাউন, সারা বিশ্বে জোড়া নাম...তাই বলে এই পবিত্র বাংলাদেশে এইসব গোডাউন মানে, পাকিস্তান আমলের সব পাড়াগুলো আবার গড়তে বলছিস!আমি কমুক্যা, বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম স্যারে কোইছেন, “ভাঙিছো গড়িছো নীতি ক্ষণে ক্ষণে, নিরজনে প্রভু নিরজনে...” আপনেরা সমাজের ভালোর জন্য নীতি ভাঙেন গড়েন...তার মানে সমাজের কোমলমতি শিশু ছাত্র-ছাত্রীদের পবিত্রতা রক্ষার জন্য, কোমলমতি শিশু ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক সুস্থ্যতার জন্য অপবিত্র পাড়া সৃষ্টি করতে হবে?আপনে মিয়া আছেন আপনের তালে, এই যে পুলিশের বড় স্যার তার নিজের দুই মেয়ের সাথে মিলে তরুণ ও তরুণ শিক্ষকদের সমস্যা সমাধান করছিলেন হ্যেইডাওতো আপনেগো সহ্য হোইলো না...তাইতো রে, তরুণ শিক্ষকদের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে উন্নত দণ্ড দিয়ে আঘাত করাকে, অত্যাচার করাকে, ব্যাড টাচকে মেনে নিবো, নাকি  উন্নত বিশ্বের মতো, আবার শহরে শহরে, জেলায় জেলায়, গঞ্জে গঞ্জে, পাড়া গড়বো![লেখক: চলচ্চিত্রকার]

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নেতৃত্ব: যোগ্যতার মূল্যায়ন জরুরি

রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি প্রধান ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী পদে বেসরকারি ব্যাংক থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং অঙ্গনে নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এটি কেবল দুটি পদে নিয়োগের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, নিজস্ব নেতৃত্ব তৈরির সক্ষমতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবল এবং জনগণের আস্থার প্রশ্ন।একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারাই নবীন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তখন বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে নিজস্ব অভিজ্ঞ জনবল ও নেতৃত্বের ঘাটতি ছিল। সময়ের সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলেছে, দক্ষ জনবল তৈরি করেছে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এটি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতিরই পরিচায়ক।কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কয়েক দশক ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভিত্তি নির্মাণ করেছে, যাদের রয়েছে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, বিপুল জনবল এবং ঋণ, বৈদেশিক বাণিজ্য, ট্রেজারি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সেই ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য নিজেদের মধ্য থেকে যোগ্য নির্বাহী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কেন?রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে কি যথেষ্ট অভিজ্ঞ, সৎ ও দক্ষ নেতৃত্ব নেই? যদি থাকেন, তবে তাদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে কি? আর যদি তাদের মধ্য থেকে কাউকে যোগ্য মনে করা না হয়, তাহলে এত বছর ধরে বিভিন্ন স্তরে পদোন্নতির মাধ্যমে নেতৃত্বের যে কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কি স্বাভাবিক নয়?এখানে মূল বিষয় বেসরকারি ব্যাংকের নির্বাহীদের যোগ্যতা অস্বীকার করা নয়। বরং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব নেতৃত্বের সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই ও মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তোলা।বেসরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞ নির্বাহীরা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। তাদের দক্ষতা, কর্মপদ্ধতি ও অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের উন্নয়নে কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তির পরিচিতি, পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের সুনাম কিংবা বেসরকারি ব্যাংকে সাফল্যের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব তিনি নিচ্ছেন, তার কাঠামো, উদ্দেশ্য, সীমাবদ্ধতা ও সমস্যার সঙ্গে তার অভিজ্ঞতার কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক পরিচালনা ও বেসরকারি ব্যাংক পরিচালনার মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি রাষ্ট্রের নীতি বাস্তবায়ন, বিস্তৃত জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদান, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং নানা প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কাজ করতে হয়। এসব বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর ধারণা ছাড়া শুধু সাধারণ ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা দিয়ে একটি সংকটাপন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে ঘুরে দাঁড় করানো কঠিন হতে পারে।আমার বিবেচনায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রথমে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ, সৎ, দক্ষ ও ফলাফল অর্জনে সক্ষম নির্বাহীদের। কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া না গেলে অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকের যোগ্য ব্যাংকারদেরও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি এবং ব্যাংক পরিচালনার বাস্তব জ্ঞান এখনো দেশের ব্যাংকিং খাতের সম্পদ।একই সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞ নির্বাহীদের উপদেষ্টা, পরামর্শক কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে যুক্ত করার সুযোগও খোলা রাখা উচিত। এতে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব নেতৃত্ব বিকাশের পথও অযথা সংকুচিত হবে না।তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ব্যাংকের সংকটের দায় বা সমাধান শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ওপর নির্ভর করে না। একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কতটা দক্ষ, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্ষদে ব্যাংকিং, অর্থায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষা, আইন ও প্রযুক্তি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয় থাকা দরকার। কেবল প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে ব্যাংকের জটিল পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সব সময় সম্ভব নয়।পর্ষদ যদি কার্যকর তদারকি করতে না পারে, ঝুঁকির বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয় কিংবা ব্যবস্থাপনাকে পেশাগতভাবে কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে একজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পক্ষেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে। বিপরীতে, যোগ্য পর্ষদ, পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করলে ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা বাড়ে।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় তাই কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।প্রথমত, শীর্ষ নির্বাহী নিয়োগে স্বচ্ছ ও পরিমাপযোগ্য যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। সততা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণ আদায়, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ববর্তী কর্মস্থলে অর্জিত ফলাফলকে গুরুত্ব দিতে হবে।দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দক্ষতা ও কার্যকারিতা পর্যালোচনা করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পর্ষদে বাস্তব ব্যাংকিং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।তৃতীয়ত, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে ব্যাংকভিত্তিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়, নতুন ঋণ অনুমোদনে সতর্কতা, মূলধন ও তারল্য ব্যবস্থাপনা, অনিয়মের জবাবদিহি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমা নির্ধারণ করা দরকার।চতুর্থত, প্রয়োজনে অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যাংকার ও দক্ষ বেসরকারি ব্যাংকারদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শক দল গঠন করা যেতে পারে। তাদের কাজ হবে নির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করা, সমাধানের সুপারিশ দেওয়া এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নে সহায়তা করা।পঞ্চমত, শুধু নিয়োগ দিয়েই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না। নীতিগত সহায়তা, প্রয়োজনীয় সম্পদ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযুক্ত পরিবেশ এবং নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককেও নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হবে এবং বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের আওতায় প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সহায়তা দিতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংকট থেকে উত্তরণে সময় লাগবে। এক দিনে খেলাপি ঋণ আদায় হবে না, দুর্বল ঋণের মান ভালো হয়ে যাবে না কিংবা দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা রাতারাতি দূর হবে না। এ জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক উদ্যোগ, দৃঢ় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং ফলাফলভিত্তিক তদারকি।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নেতৃত্বে বেসরকারি ব্যাংকার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব নেতৃত্বের সক্ষমতা যাচাই না করে বাইরে থেকে নির্বাহী নিয়োগ দেওয়াও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। নিয়োগের সিদ্ধান্তের যথার্থতা বিচার করতে হবে যোগ্যতা, প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ ফলাফলের ভিত্তিতে।আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থায়ন এবং জনসাধারণের আর্থিক আস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচনে তাই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলার চিন্তা থাকা জরুরি।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব, দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ, কার্যকর জবাবদিহি এবং সরকারের সমন্বিত সহায়তা। নিয়োগের মাধ্যমে কারও মর্যাদা বাড়ানো বা কমানো নয়, বরং ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়ানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব অভিজ্ঞ জনবলকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন, দক্ষতার ঘাটতি থাকলে তা পূরণ এবং প্রয়োজনে বাইরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর মধ্য দিয়েই টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত কে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যাংকার আর কে বেসরকারি ব্যাংকার, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কে সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও জবাবদিহির সঙ্গে ব্যাংককে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারবেন এবং তাকে সফল হওয়ার জন্য কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া হবে।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এসব প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক]

শিক্ষানীতি: সমস্যা ও উত্তরণের পথ

কোনো দেশ বা জাতির উন্নতির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা। আর একটি সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট শিক্ষানীতি। এই নীতির আলোকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত ও বাস্তবায়িত হয়।শিক্ষানীতি কী?শিক্ষানীতি হলো শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা, কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশে শিল্প, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষানীতি এসব নীতিমালার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।সাধারণভাবে শিক্ষা বলতে মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, চিন্তাভাবনা ও আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনকে বোঝায়। অন্যদিকে, শিক্ষানীতি হলো একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনার আলোকে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর পরিচালনা এবং দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত শিক্ষা নিশ্চিত করার দিকনির্দেশনা।স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে একটি সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে।বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০। এটি প্রণয়নের এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তাই এখন এ নীতির বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা জরুরি। এই নীতিতে শিক্ষার সমতা, গুণগত মান, সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, সেই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোথায় সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে?জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রণীত একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অধ্যাপক কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নীতিটি চূড়ান্ত করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল নৈতিক, মানবিক, বিজ্ঞানমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলা।মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যক. সাংবিধানিক নির্দেশনা বাস্তবায়ন: শিক্ষার সব স্তরে সংবিধানের নির্দেশনার প্রতিফলন ঘটানো এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তোলা।খ. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ: শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের মানসিকতা তৈরি করা।গ. চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশ: মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তা, যুক্তিবোধ ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো।ঘ. তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানশিক্ষা: দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং উৎপাদনমুখী বিজ্ঞানশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া।ঙ. বৈষম্যহীন ও মানসম্মত শিক্ষা: সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং বৈষম্যহীন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা।সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের প্রস্তাবশিক্ষানীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে ভর্তির সুযোগ বেড়েছে, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং নারীশিক্ষার প্রসার ঘটেছে। অনেক এলাকায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।তবে এসব অগ্রগতির পাশাপাশি নানা সীমাবদ্ধতাও রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে অবকাঠামোগত সংকট, শিক্ষকঘাটতি ও শিক্ষার মানের বৈষম্য। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সুযোগ-সুবিধায় এখনো বড় পার্থক্য রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নেই। শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।শিক্ষাকে কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েন। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।আরেকটি বড় সমস্যা হলো শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাব। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই কম। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন মানদণ্ডে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ ব্যয়ের সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশে এ লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বরাদ্দের বড় ব্যবধান রয়েছে। অর্থের সীমাবদ্ধতায় অনেক পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়নি। তাই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।১. নীতিগত ও রাজনৈতিক উদ্যোগক. স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্থায়ী ও স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা যেতে পারে। কমিশনটি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে থেকে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করবে।খ. শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা: সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রমে আমূল পরিবর্তন করা উচিত নয়। আগের নীতির কার্যকর দিকগুলো বজায় রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আসবে।২. অবকাঠামোগত উন্নয়নক. শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি: শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।খ. দুর্নীতি ও অপচয় রোধ: শিক্ষা প্রশাসনের সব স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দ করা অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং উন্নয়নকাজের মান নিয়মিত তদারক করতে হবে।গ. পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে সুযোগ সৃষ্টি: শহর ও গ্রামের শিক্ষাবৈষম্য কমাতে প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। পথশিশু, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর জন্য উপযোগী শিক্ষার পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।৩. শিক্ষক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার মানোন্নয়নক. মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা: শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। এতে মেধাবী তরুণ-তরুণীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হবেন।খ. যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ: আধুনিক শিক্ষাক্রম, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদান, সৃজনশীল মূল্যায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়ে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রশিক্ষণ যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।৪. শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকায়নক. কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার: সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও যোগ্যতা অনুযায়ী এ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে বাস্তব কাজের প্রশিক্ষণ ও আত্মকর্মসংস্থানের পথ সহজ করতে হবে।খ. পরীক্ষানির্ভরতা ও মুখস্থবিদ্যা কমানো: শুধু জিপিএ বা সনদের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা বিচার করা উচিত নয়। তাদের সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ, বাস্তব জ্ঞান ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাইয়ের কার্যকর পদ্ধতি চালু রাখতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতি এমন হতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বুঝে শেখার প্রতি আগ্রহী হয়।একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তির ওপর। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পাশাপাশি বর্তমান সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী এর সীমাবদ্ধতাগুলো পর্যালোচনা করা জরুরি।এ জন্য প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ, দক্ষ শিক্ষক তৈরি, দুর্নীতি রোধ এবং শিক্ষার সব পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগেই একটি মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। দক্ষ, মানবিক ও সৃজনশীল প্রজন্ম তৈরি করতে পারলেই বাংলাদেশ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও সক্ষম হয়ে উঠবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রধান শিক্ষক, চরফ্যাসন টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়]

লাউয়াছড়া ছেড়ে সাপ লোকালয়ে, বন কার দখলে

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের পরিচয় শুধু চা-বাগানের সবুজে নয়। পাহাড়-টিলা, বনভূমি ও নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী মিলিয়ে এ অঞ্চল দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক ভূখণ্ড। প্রকৃতিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পর্যটনশিল্প, তৈরি হয়েছে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। কিন্তু সেই প্রকৃতির নিরাপত্তা নিয়েই এখন বাড়ছে উদ্বেগ।বনভূমি দখল, মূল্যবান গাছ কাটা ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ নতুন নয়। এর সঙ্গে যখন লোকালয়ে সাপসহ নানা বন্যপ্রাণীর উপস্থিতির খবর সামনে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে—প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য কি বিঘ্নিত হচ্ছে? বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল কতটা নিরাপদ? আর বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোই বা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে?সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলে মাত্র তিন দিনে চারটি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল একটি বিষধর শঙ্খিনী ও তিনটি অজগর। কোনোটি পাওয়া গেছে বসতবাড়ির পাশে, কোনোটি সড়কের ধারে, আবার কোনোটি জালে আটকে ছিল। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা সাপগুলো উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেন। উদ্ধার হওয়া একটি অজগরকে লাউয়াছড়া বনে অবমুক্ত করা হয়।তিন দিনে চারটি সাপ উদ্ধারের ঘটনা একাই বন ধ্বংসের প্রমাণ নয়। তবে এমন ঘটনা বারবার ঘটলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। প্রাণীরা কেন লোকালয়ে আসছে, তাদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র কতটা নিরাপদ, মানুষের বসতি ও অবকাঠামো সম্প্রসারণে তাদের চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে তথ্য ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে।আর সেই অনুসন্ধানে কমলগঞ্জের ভানুগাছের পাহাড় ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান কেবল একটি বন নয়; এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত এ বনাঞ্চলে রয়েছে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী। স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও এর গুরুত্ব অপরিসীম।কিন্তু স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে ভানুগাছের পাহাড় ও আশপাশের বনাঞ্চল ঘিরে মূল্যবান বৃক্ষ নিধন, বনজ সম্পদ লুট এবং বনভূমি দখলের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। প্রকাশিত সংবাদেও বনভূমি দখল, গাছ কাটা ও বনের জমিতে স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগ উঠে এসেছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বনে প্রবেশ করে সেগুনসহ মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে গেছে। বনভূমি দখল করে কোথাও বসতি, কোথাও রিসোর্ট, আবার কোথাও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ জরুরি। অভিযোগগুলো সত্য হলে বিষয়টি শুধু পরিবেশ ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সরকারি সম্পদ রক্ষা, বন আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের প্রশ্নও।এখানেই কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। দীর্ঘদিন ধরে বন দখল ও মূল্যবান বৃক্ষ নিধনের অভিযোগ উঠে থাকলে সেসব ঘটনার তদন্ত কত দূর এগিয়েছে? কতটুকু বনভূমি দখলের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে? কতটি স্থাপনার বৈধতা যাচাই করা হয়েছে? কতটি মামলা হয়েছে, কতটির নিষ্পত্তি হয়েছে, আর কতটুকু জমি উদ্ধার করা গেছে?এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, নথি ও তথ্য দিয়ে দিতে হবে। বন বিভাগের কাছে এ-সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য থাকা এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি।বন রক্ষার কাজ শুধু গাছ লাগানো কিংবা মাঝেমধ্যে অভিযান চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সরকারি সম্পদ দখল বা বনজ সম্পদ লুটের অভিযোগ উঠলে তার সত্যতা যাচাই, অপরাধ প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।লাউয়াছড়ার বনাঞ্চল ঘিরে স্থানীয়ভাবে আলোচিত অভিযোগগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও রয়েছে। অভিযোগ আছে, বনভূমি দখল ও বনজ সম্পদ আহরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে আলোচিত কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগও স্থানীয়ভাবে শোনা যায়।বনভূমি দখল ও বনজ সম্পদ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে আলোচিত কয়েকজনের রাজনৈতিক উত্থান, অর্থবল ও পেশিশক্তির ব্যবহার এবং জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ভোট কেনা কিংবা রাজনৈতিক মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও এসব আলোচনায় উঠে আসে। এ ধরনের অভিযোগ গুরুতর। তবে অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যায় না। আবার অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী বলে অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ভূমির রেকর্ড যাচাই, মামলার নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গ্রহণ। রাজনৈতিক পরিচয় বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য কারও জন্য আইনের বাইরে থাকার সুযোগ তৈরি করতে পারে না। সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ হবে, অথচ প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে তা থেমে যাবে—এমন বৈষম্য আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।সরকার ও প্রশাসনের সদিচ্ছার আসল পরীক্ষা এখানেই। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে রাজনৈতিক দলেরই হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা একই মানদণ্ডে পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।বন ধ্বংসের ক্ষতি শুধু কতটি গাছ কাটা হলো, সেই হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। একটি বন অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়, খাদ্য সংগ্রহের জায়গা ও প্রজননক্ষেত্র। অনেক প্রাণীর জন্য বনাঞ্চলের এক অংশ থেকে অন্য অংশে যাওয়ার প্রাকৃতিক পথও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব জায়গা নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো বাস্তুতন্ত্রে।সাপের কথাই ধরা যাক। বিষধর শঙ্খিনীরও প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অজগরও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। সাপসহ বিভিন্ন শিকারি প্রাণী ইঁদুর ও অন্যান্য প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। অথচ মানুষের চোখে সাপ প্রায়ই আতঙ্কের কারণ। লোকালয়ে দেখা গেলেই অনেক সময় তাকে মেরে ফেলা হয়।কিন্তু সাপ কেন লোকালয়ে আসছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। বন উজাড়, ঝোপঝাড় পরিষ্কার, পাহাড়-টিলা কাটা, সড়ক নির্মাণ কিংবা অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। খাদ্য ও আশ্রয়ের খোঁজে তারা মানুষের বসতির কাছাকাছিও চলে আসতে পারে।তবে শ্রীমঙ্গলে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি সাপের লোকালয়ে আসার কারণ যে আবাসস্থল সংকোচন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। এ জন্য প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক তথ্য। কোথায় বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার হচ্ছে, কোন এলাকায় বনভূমির পরিবর্তন ঘটছে, কোথায় প্রাণীদের চলাচলের পথ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে—এসব তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে।অর্থাৎ, সাপ উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি যে পরিবেশে তারা বাস করে, সেটি কতটা নিরাপদ আছে, তা নিয়েও ভাবতে হবে।শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের পর্যটনের সবচেয়ে বড় সম্পদ প্রকৃতি। চা-বাগান, পাহাড়, বনভূমি আর বন্যপ্রাণীর উপস্থিতিই এ অঞ্চলকে অন্য জায়গা থেকে আলাদা করেছে। অথচ পর্যটনের নামে যদি বনাঞ্চলের আশপাশে অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে ওঠে, বনভূমি দখলের অভিযোগ উপেক্ষিত থাকে কিংবা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত পর্যটনের ভিত্তিকেই দুর্বল করবে।রিসোর্ট বা পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ মানেই অপরাধ নয়। কিন্তু কোনো স্থাপনা সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে গড়ে উঠেছে কি না, প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না কিংবা পরিবেশগত বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করছে কি না—এসব যাচাই করা অপরিহার্য।লাউয়াছড়ার মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চলের ক্ষেত্রে সীমানা নির্ধারণ, ভূমির নথি হালনাগাদ এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারি রেকর্ড মিলিয়ে দেখা দরকার। বনভূমির আশপাশে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলোর বৈধতা ও পরিবেশগত প্রভাবও খতিয়ে দেখতে হবে। কোনো স্থাপনা অবৈধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।প্রশ্নটি উন্নয়ন হবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই উন্নয়নের সুবিধা কারা পাচ্ছে আর ক্ষতির বোঝা বইছে কারা? কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি বনভূমি দখল করে আর্থিক সুবিধা পায়, অথচ ক্ষতিগ্রস্ত হয় জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, তাহলে তাকে জনস্বার্থের উন্নয়ন বলা যায় না।লোকালয়ে বন্যপ্রাণী দেখা গেলে উদ্ধারকাজে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। খবর পেয়ে তাদের সদস্যরা ছুটে যাচ্ছেন, প্রাণী উদ্ধার করছেন এবং বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করছেন। এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।কিন্তু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষে বন দখল বন্ধ করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা কিংবা বন আইন কার্যকর করা সম্ভব নয়। এসব দায়িত্ব মূলত বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের।গত সেপ্টেম্বর মাসে শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকা থেকে ২৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছিল বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। এর আগে আগস্ট মাসেও শঙ্খিনী ও অজগরসহ অন্তত ১৭টি সাপ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল সংগঠনটি। এসব তথ্য উদ্ধারকাজের পরিধি সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে শুধু উদ্ধারসংখ্যা দিয়ে কোনো এলাকার বন্যপ্রাণীর মোট সংখ্যা কিংবা আবাসস্থল সংকোচনের মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।তবু এসব তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কোন প্রজাতির প্রাণী কোথায়, কখন এবং কী পরিস্থিতিতে উদ্ধার হচ্ছে, তা নিয়মিত নথিভুক্ত করা হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা সহজ হবে। বন বিভাগ, গবেষক ও পরিবেশবিদেরা একসঙ্গে কাজ করলে এসব তথ্য সংরক্ষণ পরিকল্পনায় কাজে লাগাতে পারবেন।একই সঙ্গে বনভূমির সীমানা রক্ষা, অবৈধ দখল শনাক্ত করা, বনজ সম্পদ পাচার প্রতিরোধ এবং অভিযোগের তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকতে হবে। শুধু প্রাণী উদ্ধার করে সাময়িক স্বস্তি দিলেই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হবে না।লাউয়াছড়া রক্ষার জন্য নতুন করে বড় বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও বাস্তব পদক্ষেপ। প্রথমত, বনভূমির সীমানা ও মালিকানাসংক্রান্ত সরকারি নথি হালনাগাদ করে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। কোথায় দখলের অভিযোগ রয়েছে, কতটুকু জমি নিয়ে বিরোধ, কোন স্থাপনা কী অনুমোদনে গড়ে উঠেছে—এসব তথ্য যাচাই করে প্রকাশ করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, মূল্যবান বৃক্ষ নিধন ও বনভূমি দখলের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকলেও তদন্ত যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বনাঞ্চলের ভেতরে ও আশপাশে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলোর বৈধতা এবং পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করতে হবে। অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বৈধ স্থাপনাগুলোও পরিবেশগত শর্ত মেনে চলছে কি না, তা নজরদারিতে রাখতে হবে। চতুর্থত, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও চলাচলের পথ নিয়ে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। কোথায় প্রাণীদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কোথায় মানুষের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে, তা চিহ্নিত করে সংরক্ষণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। পঞ্চমত, স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং অভিযোগের ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, এসব উদ্যোগের অগ্রগতি জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। কতটুকু বনভূমি উদ্ধার হলো, কতটি অভিযোগ তদন্ত করা হলো, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় কী অগ্রগতি হয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। কারণ, স্বচ্ছতা ছাড়া জবাবদিহি আসে না। আর জবাবদিহি ছাড়া বন রক্ষার প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত কাগজেই থেকে যায়।  লাউয়াছড়া রক্ষায় তাই আর প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ, নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ এবং সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর জবাবদিহি। কারণ, বন হারালে শুধু গাছ হারায় না; হারিয়ে যায় জীববৈচিত্র্য, প্রকৃতির ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি নিরাপদ পৃথিবী পাওয়ার অধিকার।

লালন আমাদের চেতনার বহ্নিশিখা

সমাজে যখন অস্থিরতা ও প্রতিহিংসাবোধের প্রকাশ ঘটে, তখন ফকির লালনের কথা মনে হয়। এই সুবর্ণ পলিমাটির দেশে লালনের মতো অসংখ্য মরমি সাধকের জন্ম হয়েছে। এ দেশের মানুষের জীবনদর্শনের প্রকাশ ঘটেছে তাদের সংগীত ও জীবনাচরণের মাধ্যমে। ফকির লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন ও সৃষ্টিশীলতা মূলত মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য জীবনদর্শন। তিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও সামাজিক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মানুষকে স্থান দিয়েছেন। লালনদর্শনকে একটি বৃত্ত কল্পনা করলে এর কেন্দ্রে আছে মানুষ।আবারও বলি, লালনদর্শনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘মানুষ’। তিনি মনে করতেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। সব মানুষের ভেতরেই ঈশ্বর বা ‘মনের মানুষ’ বসবাস করেন। তাই আলাদা করে কোনো উপাসনালয় বা বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে মানুষের সেবা ও মনকে চেনা বড় সাধনা।লালন কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বা গোঁড়া ধর্মের অনুসারী ছিলেন না। তিনি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধসহ সব ধর্মের সংকীর্ণতা ও বিভেদকে অস্বীকার করেছেন। তার গানে মানুষের পরিচয় কোনো জাতিগত বা ধর্মীয় কাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয়নি। ‘আপনারে আপনি চেনা, সেই বটে উপাসনা’—লালন এই বাণীর মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও নিজের ভেতরকার সত্যকে উপলব্ধি করার ওপর জোর দিয়েছেন। মহাত্মা লালনকে উপলব্ধি করতে হলে তার চেতনাকে জানতে হবে। আমরা তার চেতনার উত্তরাধিকারী না হয়ে লালনের মূর্ত রূপের উত্তরাধিকারী হতে চাই, বিপত্তি এখানেই। এর মধ্যে আমরা অনেকেই আছি, যারা লালনের চেতনা ও মূর্ত বাণী—দুটোকেই বাতিল করে দিতে চাই।বাংলাদেশের মরমি কবিদের দর্শন মূলত সৃষ্টিশীল আধ্যাত্মিকতা, মানবপ্রেম এবং স্রষ্টার সঙ্গে মিলনের ব্যাকুলতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মরমিবাদ বা সুফিবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া ও বাউল দর্শনের এক অপূর্ব মিশ্রণে এই অঞ্চলের মরমি সাহিত্য গড়ে উঠেছে। লালন শাহ, হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত এবং শাহ আবদুল করিমের মতো সাধকেরা এই দর্শনের প্রধান ধারক ও বাহক।লালনের সঙ্গে মরমি সাধকদের সাদৃশ্য থাকলেও লালনদর্শনের সঙ্গে অন্য সাধকদের দর্শনের কিছুটা পার্থক্য লক্ষ করা যায়। লালনদর্শনের সঙ্গে শাহ আবদুল করিমের দর্শনের কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে। লালন সাঁইয়ের সঙ্গে অন্য মরমি সাধকদের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, লালনের সমাজমনস্কতা ও মানবতাবোধ সরাসরি দৃশ্যমান, যা অন্যদের ক্ষেত্রে কিছুটা বিমূর্ত। লালন যেমন গভীরভাবে সমাজমনস্ক ছিলেন এবং সাম্যের সমাজের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন, শাহ আবদুল করিমও এই দর্শনের অনুসারী হয়েছেন।ড. আবুল আহসান চৌধুরী তার ‘লালন সাঁই প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ’ গ্রন্থে লালনকে সমাজমনস্ক সাধক-কবি বলে অভিহিত করেছেন। সনৎকুমার মিত্র সম্পাদিত ‘বাউল লালন রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে সুবোধচন্দ্র তার ‘গ্রাম্য সাহিত্য’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘লালন ফকির নাম শুনিয়াই হয়তো অনেকে মনে করিতে পারেন ইনি বিষয়হীন ফকির ছিলেন; বস্তুত তাহা নহে; ইনি সংসারী ছিলেন, সামান্য জোতজমা আছে; বাটিঘরও মন্দ নহে। জিনিসপত্র মধ্যবর্তী গৃহস্থের মতো, নগদ টাকা প্রায় ২ হাজার রাখিয়া মারা যান’ (মিত্র, পৃ. ১০২)। লেখাটির মূল বিষয়ের সঙ্গে এসব উক্তির যৌক্তিক প্রাসঙ্গিকতা হলো, লালন যেভাবে সমাজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সামাজিক বৈষম্য ও সংস্কার নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন, অন্য মরমি কবিদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি ছিল কিছুটা ভাবমূলক।ফিরে আসি লালনসহ মরমি কবিদের জীবনদর্শনে। আমাদের মরমি কবিদের জীবন ত্যাগে ভরপুর ছিল। ভোগ তাদের জীবনদর্শনে ছিল না। তাদের দর্শনের ভিন্নতা ছিল, ছিল বহুমুখিতা। লালনের সঙ্গে মরমি কবিদের মৌলিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কোনো বৈসাদৃশ্য ছিল না।আত্ম-অন্বেষণ, পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের আকুলতা (বিরহ ও প্রেম), সংসারজীবনের অনিত্যতা, লৌকিক জীবন নিয়ে বৈরাগ্য—বাংলার সব মরমি কবির মধ্যেই এসব বিষয় ছিল। বাংলার মরমি দর্শনের নিজস্বতা এসব উপাদানেই নিহিত আছে। তবে ভাবসম্পদ ও দর্শনে প্রত্যেকেই ছিলেন অনন্য। ফকির লালন সাঁইয়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল সমাজের অসামঞ্জস্যের প্রতি তার সংবেদনশীলতা। ভারতীয় সমাজে প্রশ্নের পরিসর অত্যন্ত ক্ষুদ্র। আধ্যাত্মিক জীবন হোক বা ইহলৌকিক জীবন, সৃষ্টি কিংবা সামাজিক নিয়মকে প্রশ্ন না করলে সত্যকে বের করে আনা বড় কঠিন। লালন তার অধিকাংশ গানে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন। এ ধরনের প্রশ্ন তোলা উপমহাদেশীয় সংস্কৃতিতে প্রথাবিরোধী কর্মকাণ্ড।লালনের জীবনদর্শন তার গানে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। গানের মধ্য দিয়ে লালন ফকির সে সময়ের সামাজিক সমস্যা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, আধ্যাত্মিকতা ও সমাজজীবনের সমস্যাগুলো তুলে ধরেছিলেন। দর্শনের অন্যতম একটি পদ্ধতি হলো প্রশ্ন করে বাস্তবতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস, প্লেটোসহ দর্শনের বিশ্বখ্যাত মনীষীরা এই পদ্ধতিতে মানুষকে আলোকিত করেছিলেন। লালন ফকিরও তার গানে নানাবিধ প্রশ্ন ও জবাবের মাধ্যমে একই পদ্ধতিতে সামাজিক অসংগতি, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির স্বরূপ তুলে ধরেছিলেন। বলা যায়, লালন ছিলেন একজন মানবতাবাদী সাধক, যিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সব প্রকার জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে তিনি তার গান রচনা করেছেন। লালন নিজের গানে নিজেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। (৬৫৭)প্রশ্ন হলো, লালনের দর্শনে সমৃদ্ধ এই জনপদে মানুষের মধ্যে বিভক্তি, অনৈক্য, অস্থিরতা ও হিংসার আগুন কেন নিয়ত প্রজ্বলিত? শুধু লালন নয়, যে দেশের লোকগানে লেখা হয়, ‘নানান বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ; জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত।’ (‘নকশী কাঁথার মাঠ’ (নবম পর্ব)-এর একটি বহুল প্রচলিত গাজীর গানের চরণ।) বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন কোণে যতটুকু বিচরণ করেছি, এরকম সংহতি, ভালোবাসা ও মানবতার বার্তা কোথাও খুঁজে পাইনি।লালনের মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক ধর্মমত সমাজের অপাঙ্ক্তেয়, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মুক্তির সনদ হয়ে সবার মনে নবজাগরণ এনেছিল। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে লালনদর্শনে দীক্ষিত হয়ে অনেকে মানবতাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। লালন এখনো অসীম সাগরে বাঙালির মানবতাদর্শনের প্রধান পথপ্রদর্শক। মানবতাদর্শনের চর্চা হলো সমাজের শ্রেণিবৈষম্যকে উপহাস করে নতুন সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। আমরা যখন ধর্মের গোঁড়ামি পরিহার করে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য সংগ্রাম করি, লালন তখন আমাদের চেতনার সাথি হয়ে অনুপ্রেরণা জোগান। প্রমিথিউসের মতো লালন আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে সাহস জোগান নিয়ত। লালনের গান ও তার জীবনের সামগ্রিক প্রয়াস বিবাদ, কলহ ও হিংস্রতায় নিমজ্জিত মানুষের মহামিলনের বার্তা। লালন বাঙালি সমাজ ও লোকায়ত জীবনে মানবতাবাদী মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হয়ে থাকবেন অনন্তকাল। এই বক্তব্যকে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করে তার এই বাণী: ‘এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে/যে দিন হিন্দু মুসলমান, বৌদ্ধ আর খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।’আমাদের সমাজে প্রবাহিত অন্ধকার দেখে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। পলিমাটির দেশের মানুষ, বিশেষত প্রান্তিক মানুষেরাই বিপর্যয়ে এগিয়ে আসেন। তারাই লালনচেতনা ধারণ করেন। মরমি কবিদের মতো তাদের জীবনদর্শনেও জাতপাত, ধর্ম বা বর্ণের কোনো ভেদাভেদ নেই। মানুষের কৃত্রিম, বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে তার ভেতরের ‘মানুষ’ তাদের কাছে আপন। লালনের গান শুধুমাত্র মরমি ভাবে ভাবাতুর নয়। তাতে সংশয়বাদী দর্শন আছে, আছে সঠিক পথ সন্ধানের আর্ত আকুতি। লালন তাই অন্ধকার থেকে আলোর পথে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একজন দার্শনিক অভিভাবক।[লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক]

কারখানার শ্রমিক থেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট: লুলা দা সিলভার দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই

দারিদ্র্য, শ্রমিক আন্দোলন, সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, নির্বাচনী পরাজয়, কারাবাস ও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন—কমরেড লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার জীবন কেবল একজন ব্যক্তির উত্থানের কাহিনি নয়; এটি ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং বামপন্থী রাজনীতির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।ইতিহাসে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থাকেন, যাদের জীবনকে শুধু নির্বাচনী সাফল্য কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাদের রাজনৈতিক যাত্রা একটি দেশের সামাজিক পরিবর্তন, শ্রেণিসংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। ব্রাজিলের বামপন্থী রাজনীতিক লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব।দারিদ্র্যের কারণে শৈশবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়া, জীবিকার তাগিদে অল্প বয়সে শ্রমবাজারে প্রবেশ, কারখানার কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হওয়া, সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে পৌঁছানো—লুলার জীবন এক অসাধারণ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। তিনি দেখিয়েছেন, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম থেকে উঠে এসেও জাতীয় নেতৃত্ব অর্জন করা সম্ভব। একই সঙ্গে তার রাজনৈতিক জীবন প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন এবং সমাজের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ক্ষমতাকাঠামো পরিবর্তন করা এক বিষয় নয়।ব্রাজিলের ওয়ার্কার্স পার্টি বা পার্তিদো দোস ত্রাবালিয়াদোরেসের (পিটি) এই নেতা প্রথমবার ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দেশ পরিচালনার পর ২০২২ সালের নির্বাচনে আবার জয়ী হয়ে ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেন। তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন লাতিন আমেরিকার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।লুলাকে বুঝতে হলে তার ব্যক্তিগত সংগ্রামের পাশাপাশি ব্রাজিলের শ্রমিক আন্দোলন, সামরিক শাসনের ইতিহাস, সামাজিক বৈষম্য, নির্বাচনী গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক সমঝোতার বাস্তবতাও বুঝতে হবে।দারিদ্র্যের শৈশব থেকে শিল্পশ্রমিক১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পারনামবুকো রাজ্যের গারানিউসে জন্মগ্রহণ করেন লুইজ ইনাসিও দা সিলভা। আট সন্তানের পরিবারে তিনি ছিলেন সপ্তম। তার বাবা আরিস্তিদেস ইনাসিও দা সিলভা এবং মা ইউরিদিস ফেরেইরা দে মেলো। পরবর্তী সময়ে তিনি লুলা নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ঐতিহাসিকভাবেই দারিদ্র্য, ভূমির অসম মালিকানা, সীমিত কর্মসংস্থান ও সামাজিক বৈষম্যের জন্য পরিচিত। কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল বহু পরিবারের পক্ষে সেখানে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন ছিল। কাজের সন্ধানে বিপুলসংখ্যক মানুষ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শিল্পনগরীগুলোতে পাড়ি জমাতেন। লুলার পরিবারও সেই বৃহত্তর অভিবাসনপ্রবাহের অংশ হয়ে ওঠে।১৯৫২ সালে মায়ের সঙ্গে সাও পাওলোর উদ্দেশে যাত্রা করেন শিশু লুলা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শিল্পায়নকেন্দ্রিক এই অঞ্চলে পৌঁছানোর পরও তাদের দারিদ্র্য দূর হয়নি। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে অল্প বয়সেই তাকে কাজ করতে হয়। কখনো জুতা পালিশ, কখনো দোকান ও অফিসের ছোটখাটো কাজ, আবার কখনো কারখানায় শ্রম বিক্রি করে পরিবারের জীবিকা নির্বাহে ভূমিকা রাখতে হয়েছে তাকে।প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকলেও কারিগরি দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যান লুলা। কিশোর বয়সে তিনি শিল্প প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান সেনাইতে ধাতব কাজের প্রশিক্ষণ নেন। পরে ধাতুশিল্পের কারখানায় দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কারখানায় কর্মরত অবস্থায় এক দুর্ঘটনায় বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুল হারান।এই অভিজ্ঞতা তার জীবনকে শুধু ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবিত করেনি; শ্রমিকের জীবন ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা সম্পর্কে তার উপলব্ধিও গভীর করেছে। শিল্পশ্রমিক হিসেবে তিনি জানতেন, শ্রমিকের কাছে মজুরি কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়। এটি পরিবারের খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা ও বেঁচে থাকার নিশ্চয়তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।পরবর্তী সময়ে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় লুলার বক্তব্যে এই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা গেছে। শ্রমিকদের কাছে তিনি ছিলেন না কোনো দূরের রাজনৈতিক নেতা। তাদের মতোই কারখানায় কাজ করা, মজুরি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকা এবং পরিবারের জন্য সংগ্রাম করার অভিজ্ঞতা তার ছিল।শ্রমিক ইউনিয়ন ও স্বৈরশাসনবিরোধী সংগ্রামলুলার রাজনৈতিক উত্থানের পটভূমি বুঝতে হলে ১৯৬৪ সালের সামরিক অভ্যুত্থান-পরবর্তী ব্রাজিলের দিকে তাকাতে হয়। ওই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশটিতে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী দুই দশকে রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন, সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ, শ্রমিক সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সীমিত করার ঘটনা ঘটে।দ্রুত শিল্পায়নের ফলে সাও পাওলো ও আশপাশের অঞ্চল ব্রাজিলের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে সাও বেরনার্দো দো কাম্পো, সাও কায়েতানো দো সুল ও দিয়াদেমাসহ এবিসি শিল্পাঞ্চলে গাড়ি ও ধাতুশিল্পের বিস্তার ঘটে। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এসব কারখানায় কর্মরত ছিলেন। কিন্তু শিল্পোৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি, কর্মপরিবেশ ও অধিকার নিয়ে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়তে থাকে।এই পরিস্থিতিতে লুলা শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তার ভাই ফ্রেই চিকোর মাধ্যমেও শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। ইউনিয়নের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে করতে তিনি সংগঠক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন।১৯৭৫ সালে সাও বেরনার্দো দো কাম্পো ও দিয়াদেমার ধাতুশ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন লুলা। তখন তার বয়স মাত্র ২৯ বছর। শ্রমিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সহজ ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার ক্ষমতা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তাকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।সত্তরের দশকের শেষ দিকে ব্রাজিলে মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত মজুরি হ্রাস এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৭৮ সাল থেকে এবিসি শিল্পাঞ্চলে বড় ধরনের শ্রমিক ধর্মঘট শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। বিপুলসংখ্যক ধাতুশ্রমিক এসব ধর্মঘটে অংশ নেন।এই আন্দোলন কেবল মজুরি বৃদ্ধির দাবি ছিল না। সামরিক শাসনের অধীনে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া, প্রকাশ্যে দাবি উত্থাপন করা এবং বৃহৎ সমাবেশ গড়ে তোলা রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। শ্রমিক আন্দোলন তখন স্বৈরশাসনের নিয়ন্ত্রিত জনপরিসরে গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হচ্ছিল।লুলার নেতৃত্বের বিশেষত্ব ছিল, তিনি শ্রমিকদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছিলেন। মজুরি, কর্মঘণ্টা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও শ্রমিকের মর্যাদা তার বক্তব্যে কেন্দ্রীয় স্থান পেত। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সংগঠিত শক্তি যে রাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখতে পারে, সেই ধারণা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে।১৯৮০ সালে ধর্মঘটের ধারাবাহিকতায় সামরিক সরকার লুলাসহ কয়েকজন শ্রমিকনেতাকে গ্রেপ্তার করে। জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় তিনি ৩১ দিন কারাবন্দি ছিলেন। তার গ্রেপ্তার শ্রমিক আন্দোলন দমনের প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এর বিপরীত প্রতিক্রিয়াও দেখা দেয়। লুলা ক্রমে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত শ্রমিকনেতা হয়ে ওঠেন।এই অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা আরও জরুরি।ওয়ার্কার্স পার্টির জন্ম: শ্রমিক আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক সংগঠন১৯৮০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিটি। দলটি গঠনে লুলার পাশাপাশি ভূমিকা রাখেন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, ছাত্র আন্দোলনের কর্মী, গ্রামীণ সংগঠক এবং প্রগতিশীল খ্রিষ্টান আন্দোলনের প্রতিনিধিরা।এই দল গঠনের পেছনে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপলব্ধি: শ্রমিকেরা যদি কেবল উৎপাদনক্ষেত্রে নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য সংগঠিত থাকেন, তবে অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার বৃহত্তর সিদ্ধান্তে তাদের প্রভাব সীমিত থেকে যাবে। তাই শ্রমিক আন্দোলনের শক্তিকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে রূপান্তর করা প্রয়োজন।পিটির জন্ম ব্রাজিলের প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে একটি নতুন সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। দলটির ভিত্তি ছিল শ্রমিক সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন। গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমিক অধিকার ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শ এর প্রাথমিক কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়।তবে পিটি কোনো একক মতাদর্শের কঠোর কাঠামোয় আবদ্ধ ছিল না। মার্ক্সবাদী, সমাজতান্ত্রিক, শ্রমিক আন্দোলনের নেতা, গণতান্ত্রিক বামপন্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের মানুষ এতে যুক্ত হন। এই বৈচিত্র্য দলটিকে বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি দেয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রও তৈরি করে।১৯৮৩ সালে ব্রাজিলের বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সেন্ট্রাল উনিকা দোস ত্রাবালিয়াদোরেসের (সিইউটি) প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াতেও লুলা ও তার রাজনৈতিক সহযাত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এর মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের সংগঠিত শক্তি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।১৯৮৪ সালে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবিতে গড়ে ওঠা দিরেতাস জা আন্দোলনেও লুলা সক্রিয় ছিলেন। এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। আন্দোলনটি ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে।১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হন লুলা। শ্রমিক আন্দোলনের একজন নেতা হিসেবে শুরু হওয়া তার রাজনৈতিক যাত্রা তখন জাতীয় আইনসভায় পৌঁছে গেছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি শুধু শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি নন, দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনা ও বিতর্কেরও একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠেন।পরাজয়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিপক্বতা১৯৮৯ সালে দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর ব্রাজিলে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পিটির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন লুলা। দ্বিতীয় দফায় ফের্নান্দো কলোর দে মেলোর কাছে পরাজিত হন তিনি।১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের নির্বাচনেও অংশ নেন লুলা। দুইবারই ফের্নান্দো এনরিকে কারদোসোর কাছে পরাজিত হন। পরপর তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যর্থতা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছিল। কিন্তু তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি।এই সময়ে পিটি স্থানীয় সরকার, শ্রমিক সংগঠন ও সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নিজেদের ভিত্তি বিস্তৃত করে। দলটি পৌরসভা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরে সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। লুলাও বুঝতে পারেন, কেবল শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহ্য কিংবা বামপন্থী আদর্শের প্রতি আনুগত্য দিয়ে একটি বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারকে আকৃষ্ট করা কঠিন।ব্রাজিলের নির্বাচনী রাজনীতিতে জয়ী হতে হলে শিল্পশ্রমিকের পাশাপাশি কৃষক, নিম্ন আয়ের শহুরে জনগোষ্ঠী, মধ্যবিত্ত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন আঞ্চলিক সামাজিক গোষ্ঠীর সমর্থন প্রয়োজন। এই বাস্তবতা পিটি ও লুলার রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আনে।২০০২ সালের নির্বাচনের আগে লুলা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, চুক্তিগত দায়বদ্ধতা রক্ষা এবং ব্যবসায়ী ও আর্থিক মহলের উদ্বেগ কমানোর বার্তা দেন। তার প্রচারণা আগের তুলনায় বেশি মধ্যপন্থী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামোর মধ্যেও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার গুরুত্ব পায়।এই কৌশল নিয়ে বামপন্থী মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। একাংশের মতে, রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছাতে বৃহত্তর সামাজিক জোট গঠন অপরিহার্য। অন্য অংশের আশঙ্কা ছিল, নির্বাচনী সাফল্যের জন্য রাজনৈতিক অবস্থান নরম করতে গিয়ে পিটি তার মৌলিক সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যেতে পারে।২০০২ সালের নির্বাচনে লুলার বিজয় দেখিয়ে দেয়, শ্রমিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা একটি রাজনৈতিক দল বৃহত্তর সামাজিক জোটের মাধ্যমে জাতীয় ক্ষমতায় পৌঁছাতে পারে।প্রথম দুই মেয়াদ: সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা২০০৩ সালের ১ জানুয়ারি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন লুলা। তার ক্ষমতায় আরোহণ ছিল প্রতীকী অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, শ্রেণিগত বিভাজন ও রাজনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাস বহনকারী একটি দেশে একজন সাবেক শিল্পশ্রমিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে বসেন।তবে প্রতীকী তাৎপর্যের বাইরে তার সরকারের সামনে ছিল বাস্তব অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। ব্রাজিল তখনো গভীর বৈষম্য, দারিদ্র্য, ভূমির অসম মালিকানা, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান এবং জনসেবার সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়ছিল।লুলা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্য কমানো। ফোমে জিরো বা ‘শূন্য ক্ষুধা’ কর্মসূচি এবং বোলসা ফামিলিয়া নামে পরিচিত নগদ সহায়তা কর্মসূচি এই নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। বোলসা ফামিলিয়ার মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এর সঙ্গে শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো কিছু শর্ত যুক্ত ছিল।এই কর্মসূচিগুলোর উদ্দেশ্য ছিল তাৎক্ষণিকভাবে দারিদ্র্য মোকাবিলার পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো। দরিদ্র পরিবারের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর ফলে খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করার সুযোগ বৃদ্ধি পায়।লুলার দুই মেয়াদে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশ্ববাজারে ব্রাজিলের পণ্য, বিশেষত কৃষিপণ্য ও খনিজ সম্পদের চাহিদা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও সরকারের সামাজিক নীতিগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করে।তবে দারিদ্র্য হ্রাসের কৃতিত্বকে কেবল একটি সরকারের একক অর্জন হিসেবে দেখা যথার্থ নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শ্রমবাজারের পরিবর্তন, ন্যূনতম মজুরির নীতি, সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি—সব মিলিয়েই এই পরিবর্তন ঘটেছিল।লুলার সমর্থকদের মতে, তার সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা। তাদের দৃষ্টিতে, সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি শুধু দারিদ্র্য কমায়নি, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে দরিদ্র মানুষের জীবনকেও আরও দৃশ্যমান করেছে।অন্যদিকে বামপন্থী সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল, সামাজিক সহায়তা ও মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদের মালিকানা, ভূমি সংস্কার, আর্থিক খাতের ক্ষমতা এবং উৎপাদনব্যবস্থার ওপর পুঁজির নিয়ন্ত্রণে কতটা পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে।এই আলোচনা ও বিতর্ক লুলার প্রথম দুই মেয়াদের মূল্যায়নের কেন্দ্রে রয়েছে। তার সরকার পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামো ভেঙে নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেনি। বরং বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সামাজিক সংস্কার, আয় পুনর্বণ্টন এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের পথ অনুসরণ করেছে।আন্তর্জাতিক রাজনীতি: ব্রাজিলের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টাদেশীয় সামাজিক নীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্রাজিলের ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করেন লুলা। তার সরকার লাতিন আমেরিকার আঞ্চলিক সহযোগিতা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণাকে গুরুত্ব দেয়।বিশ্ববাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে ব্রাজিলের কণ্ঠস্বর জোরালো করার চেষ্টা ছিল তার কূটনীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ব্রিকসের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্রাজিলের অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে এই জোটের বিস্তারে দেশটির ভূমিকা লুলার আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার কূটনীতির মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তির প্রভাবের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও বেশি পরিসর তৈরি করা।তবে তার পররাষ্ট্রনীতিও আলোচনা ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত, কর্তৃত্ববাদী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মানবাধিকার প্রশ্নে ব্রাজিলের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। বাস্তববাদী কূটনীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা তার সরকারের জন্য একটি জটিল চ্যালেঞ্জ ছিল।দুর্নীতির অভিযোগ, কারাবাস ও বিচারিক প্রত্যাবর্তনলুলার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো দুর্নীতির মামলা ও কারাবাস। তার সরকারের সময় এবং পরবর্তী বছরগুলোতে ব্রাজিলের রাজনীতিতে একাধিক দুর্নীতির কেলেঙ্কারি সামনে আসে।২০০৫ সালে মেনসালাও কেলেঙ্কারি এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেত্রোব্রাসকে কেন্দ্র করে অপারেশন কার ওয়াশ তদন্ত দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এসব তদন্তে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ঘুষ, অর্থ পাচার এবং সরকারি চুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।লুলাও বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন। ২০১৭ সালে একটি দুর্নীতির মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পরবর্তী আপিলপ্রক্রিয়ায় দণ্ড বহাল থাকায় ২০১৮ সালে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় ৫৮০ দিন কারাবন্দি ছিলেন তিনি।লুলা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার সমর্থকেরা বলেছেন, বিচারপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে এবং তাকে নির্বাচনের বাইরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে তার বিরোধীদের মতে, দুর্নীতির অভিযোগে তার জবাবদিহি হওয়া জরুরি।এই আলোচনা ও বিতর্ক বোঝার জন্য বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম ফেডারেল কোর্ট লুলার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর দণ্ডাদেশ বাতিলের পথ উন্মুক্ত করে। এর মধ্যে বিচারিক এখতিয়ারসংক্রান্ত ত্রুটি এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আদালতের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে তার রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম হন।এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি: দণ্ডাদেশ বাতিল হওয়া, বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এবং কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা—এগুলো এক বিষয় নয়। আদালতের সিদ্ধান্তের আইনগত তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে হলে সংশ্লিষ্ট মামলার নির্দিষ্ট রায় ও তার পরিধি বিবেচনা করতে হয়।লুলার প্রত্যাবর্তন ব্রাজিলের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা সৃষ্টি করে। তার সমর্থকেরা একে রাজনৈতিকভাবে অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবে দেখেন। সমালোচকেরা আবার তার রাজনৈতিক জোট, অতীতের দুর্নীতির কেলেঙ্কারি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।এই অভিজ্ঞতা দেখায়, গণতন্ত্রে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিচারিক জবাবদিহির সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিচারব্যবস্থাকে দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোও অপরিহার্য।২০২২ সালের নির্বাচন: রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে প্রত্যাবর্তন২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল ব্রাজিলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো। একদিকে ছিল লুলার নেতৃত্বাধীন বামপন্থী ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক জোট; অন্যদিকে বলসোনারোর সমর্থনে সংগঠিত ছিল রক্ষণশীল, ডানপন্থী এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠী।নির্বাচনের কেন্দ্রীয় প্রশ্নগুলোর মধ্যে ছিল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক বৈষম্য, ক্ষুধা, অর্থনীতি, পরিবেশনীতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা। নির্বাচনের আগে ব্রাজিলের রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি অবিশ্বাস এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্কও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।প্রথম দফায় কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৩০ অক্টোবর ২০২২-এর দ্বিতীয় দফায় লুলা ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ ভোট পেয়ে জাইর বলসোনারোকে পরাজিত করেন। বলসোনারো পান ৪৯ দশমিক ১০ শতাংশ ভোট। ব্যবধান ছিল খুবই সামান্য।এই বিজয়ের মাধ্যমে লুলা তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি তিনি নতুন মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।লুলার প্রত্যাবর্তনকে শুধু তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ফল হিসেবে দেখলে নির্বাচনের সামাজিক তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি ছিল বলসোনারোর শাসনকালে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক মেরুকরণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, বামপন্থী ও মধ্যপন্থী শক্তির একটি বিস্তৃত নির্বাচনী জোটের সাফল্য।তবে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরও বলসোনারোর রাজনৈতিক সমর্থন উল্লেখযোগ্য ছিল। অল্প ব্যবধানের ফলাফল দেখিয়ে দেয়, ব্রাজিলের সমাজে ডানপন্থী রাজনীতির সামাজিক ভিত্তিও কম নয়। ফলে লুলার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ ছিল না; বিভক্ত সমাজে কার্যকর সরকার পরিচালনা করাও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ।তৃতীয় মেয়াদ: প্রত্যাশা, সীমাবদ্ধতা ও নতুন চ্যালেঞ্জতৃতীয় মেয়াদে লুলার সামনে ছিল একাধিক জটিল সমস্যা। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মোকাবিলা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পরিবেশ ও আমাজন বন সংরক্ষণ, জনসেবার মান উন্নয়ন, সরকারি অর্থব্যবস্থার ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ কমানোর মতো বিষয়গুলো তার সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে ছিল।একই সঙ্গে তার সরকারকে এমন একটি সংসদীয় বাস্তবতার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে, যেখানে রক্ষণশীল ও মধ্য-ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও সংসদে আইন পাস, বাজেট অনুমোদন ও সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দলের সঙ্গে সমঝোতা প্রয়োজন হয়।এ কারণে লুলার রাজনৈতিক জোট কেবল আদর্শগতভাবে একমত শক্তিগুলোর সমন্বয়ে গঠিত নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে তাকে এমন দল ও গোষ্ঠীর সঙ্গেও কাজ করতে হয়, যাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পিটির সংগ্রামী ঐতিহ্য ও কর্মসূচির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।এখানেই লুলার রাজনৈতিক কৌশলের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। তিনি সংগ্রামের পাশাপাশি সমঝোতাকেও রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন ও ধরে রাখার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন। এই কৌশল তাকে নির্বাচনী জোট সম্প্রসারণে সাহায্য করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তার সরকারের সংস্কারের পরিধি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।ব্রাজিলের মতো বৃহৎ ও বৈষম্যপূর্ণ সমাজে সামাজিক পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য শুধু প্রেসিডেন্টের সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়। সংসদীয় সমর্থন, প্রশাসনিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক আন্দোলনের শক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।তাই লুলার তৃতীয় মেয়াদের মূল্যায়নে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তবায়নের ফলাফল, সামাজিক সূচক, সরকারি নীতি এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ওপর তার প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।লুলার রাজনীতি: সংস্কার, আপস ও বামপন্থী বিতর্কলুলার রাজনৈতিক জীবনকে ঘিরে বামপন্থী মহলে দীর্ঘদিনের একটি বিতর্ক রয়েছে: শ্রমিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা একজন নেতা রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে কতটা কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারেন?লুলার সমর্থকেরা মনে করেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার বাস্তব সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে তিনি দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সামাজিক সহায়তা, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকারের মতো ক্ষেত্রে তার সরকারের উদ্যোগ বহু মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।তাদের যুক্তি, একটি বৈষম্যপূর্ণ সমাজে সব পরিবর্তন একসঙ্গে সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন অর্জন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সামাজিক কর্মসূচির জন্য সম্পদ সংগ্রহ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে লুলার রাজনীতি বাস্তববাদী সামাজিক রূপান্তর ও সংস্কারের উদাহরণ।অন্যদিকে বামপন্থী সমালোচকদের মতে, দরিদ্র মানুষের জন্য সহায়তা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থনৈতিক ক্ষমতার মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে বৈষম্যের উৎস দূর করা যায় না। ভূমির মালিকানা, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের প্রভাব, বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষমতা এবং উৎপাদনের উপায়ের ব্যক্তিগত মালিকানা—এসব প্রশ্নে মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব নয়।এই সমালোচকদের মতে, পিটি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে বিস্তৃত রাজনৈতিক জোট গঠন করেছে, তার কারণে দলটিকে অনেক ক্ষেত্রেই বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আপস করতে হয়েছে। ফলে শ্রমিক আন্দোলনের প্রাথমিক কর্মসূচির কিছু অংশ বাস্তবায়নের বাইরে থেকে গেছে।তবে এই বিতর্কের মূল্যায়নে লুলার রাজনৈতিক বিকল্পগুলোও বিবেচনা করতে হবে। ব্রাজিলের সংবিধান, সংসদীয় ভারসাম্য, বিচারব্যবস্থা, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রভাবের মধ্যে সরকার পরিচালনা করা সহজ কাজ নয়। রাজনৈতিক আপস কখনো সংস্কারের সুযোগ সৃষ্টি করে, আবার কখনো সেই সংস্কারের সীমা নির্ধারণ করে দেয়।লুলার অভিজ্ঞতা তাই একদিকে সামাজিক গণতন্ত্র ও কল্যাণমূলক নীতির সম্ভাবনা দেখায়; অন্যদিকে বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে সংস্কারমূলক রাজনীতির সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে।ব্যক্তিগত নেতৃত্বের বাইরে শ্রমিক আন্দোলনের ভূমিকালুলার জীবনকে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের উত্থানের গল্প হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ। কিন্তু তাতে শ্রমিক আন্দোলনের সম্মিলিত ভূমিকা আড়াল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।লুলার রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে ছিল হাজার হাজার শ্রমিকের সংগঠিত প্রচেষ্টা, ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ড, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের অবদান। তার নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু সেই নেতৃত্ব বিকশিত হয়েছিল একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।১৯৭০-এর দশকের ধর্মঘট, ১৯৮০ সালে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিষ্ঠা এবং আশির দশকের গণতান্ত্রিক আন্দোলন দেখিয়েছে, সংগঠিত শ্রমিকশক্তি শুধু কর্মক্ষেত্রের দাবি আদায়ের জন্য নয়, জাতীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।এই অভিজ্ঞতা অন্য দেশগুলোর শ্রমিক আন্দোলনের জন্যও প্রাসঙ্গিক। শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবি ও রাজনৈতিক অধিকার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। মজুরি, কর্মঘণ্টা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠনের স্বাধীনতার প্রশ্ন বৃহত্তর গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।তবে শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করতে শুধু নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘস্থায়ী সাংগঠনিক ভিত্তি, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, কর্মসূচির ধারাবাহিকতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।লুলার অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে এই সম্ভাবনা ও সতর্কবার্তা সামনে আনে। শ্রমিক আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছাতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার পর শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সংগঠনের সম্পর্ক কীভাবে বজায় থাকবে, সেটিও একটি মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্ন।বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শিক্ষাব্রাজিলের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। যদিও দুই দেশের ইতিহাস, রাজনৈতিক কাঠামো, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও সামাজিক বাস্তবতা এক নয়, তবু শ্রমিক অধিকার, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রশ্নে তুলনামূলক আলোচনা প্রাসঙ্গিক।বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পোৎপাদন, রপ্তানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শ্রমিকদের অবদান থাকলেও ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।ব্রাজিলের শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা দেখায়, শ্রমিকদের দাবি কার্যকরভাবে তুলে ধরতে স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক শ্রমিক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংগঠনকে কেবল মজুরি নিয়ে দরকষাকষির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বৃহত্তর সামাজিক নীতিতে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ সীমিত থেকে যেতে পারে।দারিদ্র্য মোকাবিলায় সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এসব কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের বিকল্প নয়। মানসম্মত শিক্ষা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ন্যায্য শ্রমনীতি এবং সম্পদের সুযোগে অধিকতর ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।আরেকটি শিক্ষা হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বিভিন্ন স্তরে কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তা উন্নয়নের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মোট দেশজ উৎপাদন বা রপ্তানি বৃদ্ধির হিসাব দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনমানের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। প্রকৃত মজুরি, দারিদ্র্যের হার, আয়ের বৈষম্য, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং সামাজিক সেবায় প্রবেশাধিকারের মতো সূচকও বিবেচনা করতে হয়।তবে ব্রাজিলের কোনো একটি নীতি সরাসরি বাংলাদেশের ওপর প্রয়োগ করলেই একই ফল পাওয়া যাবে—এমন ধারণাও সঠিক নয়। প্রতিটি দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সামাজিক চাহিদা অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।অসমাপ্ত রাজনৈতিক যাত্রালুলা দা সিলভার জীবনকে এক বাক্যে সংক্ষেপ করা কঠিন। তিনি দরিদ্র পরিবারের সন্তান, শিল্পশ্রমিক, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, সামরিক স্বৈরশাসনের বিরোধী, রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা, নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী, প্রেসিডেন্ট এবং কারাবন্দি রাজনীতিক—একাধিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে গেছেন।তার জীবনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত এই যে, তিনি ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষের অভিজ্ঞতাকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। শ্রমিকের জীবন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, মজুরি ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নকে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন।তার শাসনামলে সামাজিক উন্নয়নের কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক সমঝোতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো এবং বামপন্থী কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তাকে মূল্যায়ন করতে হলে তার অর্জন ও সীমাবদ্ধতা—দুই দিকই বিবেচনা করতে হবে।লুলার রাজনৈতিক যাত্রা মনে করিয়ে দেয়, একজন শ্রমিকের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে ওঠা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা নয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।একটি সমাজে দরিদ্র মানুষের জন্য নীতি গ্রহণ, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমিকের অধিকার, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, কার্যকর গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হয়।কারখানার শ্রমিক থেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে লুলা ইতিহাসে নিজের স্থান তৈরি করেছেন। তার জীবন যেমন প্রমাণ করে, সংগঠিত মানুষের রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার দরজা খুলে দিতে পারে, তেমনি এটিও মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছানো সংগ্রামের শেষ নয়।বরং সেখান থেকেই শুরু হয় আরও কঠিন প্রশ্ন: ক্ষমতা কার স্বার্থে ব্যবহৃত হবে, উন্নয়নের সুফল কারা পাবে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন কতটা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্থায়ী রূপান্তর ঘটাতে পারবে?লুলা দা সিলভার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর দেয় না। বরং ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং বামপন্থী রাজনীতির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে প্রশ্নগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এই কারণেই তার জীবন কেবল ব্রাজিলের ইতিহাসের অংশ নয়; বিশ্বজুড়ে শ্রমিক আন্দোলন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]

ঐতিহ্যের বিকৃতি: বাসিয়াহাট মেলা কেন ‘বউমেলা’ হলো

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোপালগঞ্জের একটি ঐতিহ্যবাহী মেলাকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর ও মুখরোচক তথ্য ছড়াতে দেখা গেছে। মেলাটিকে ‘বউমেলা’ বা ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা’ হিসেবে উপস্থাপন করায় আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বিবাহরীতি ও সামাজিক প্রথা নিয়ে অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের মনগড়া বর্ণনা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে। একই সঙ্গে নারীদের আত্মসম্মানকেও হেয় করা হচ্ছে।প্রতি বছরের মতো এবারও ২৩ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার, দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বাসিয়াহাট মেলা’, যা ‘বাসিয়া মেলা’ নামেও পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবে মেলাটি শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরদিন অনুষ্ঠিত হয়। মেলার প্রধান পুরোহিত একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ। এখানে আদিবাসীদের পুরোহিত হওয়ার কোনো ঐতিহাসিক নজির নেই। মেলায় আদিবাসী তরুণ-তরুণী ও নারী-পুরুষের পাশাপাশি সনাতন ও ইসলাম ধর্মাবলম্বী স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।এই ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মিলনমেলার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখা। এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী ‘দাসায় নাচ’ ও গান। দাসায় নাচ সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি তাদের ইতিহাস, বিশ্বাস, সামাজিক জীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই নাচের মাধ্যমে সাঁওতালরা পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে চলেছেন।স্থানীয় আদিবাসী নারীশিল্পী ও সমাজসেবিকা রিতা হেমব্রমের মতে, বীরগঞ্জের এই আদিবাসী মিলনমেলাকে ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘বউমেলা’ হিসেবে প্রচার করা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে তাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মূলত নিজস্ব পোশাক ও সংস্কৃতি উদ্‌যাপনের জন্য দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আদিবাসীরা এখানে আসেন। তাদের দাসায় নাচ, গান ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের সমাগমেই মেলাটি পূর্ণতা পায়। তাই এই ঐতিহাসিক মিলনমেলা আদিবাসীদের সংস্কৃতি, পরিচয় ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।তথ্য যাচাই না করে সংবাদ ও ভিডিও ছড়িয়ে দিলে সমাজে কতটা ক্ষতি হতে পারে, তা অনেকেই হয়তো উপলব্ধি করেন না। কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাব আদিবাসী সমাজে পড়েছে। বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের জন্য সাংবাদিক ও কনটেন্ট নির্মাতাদের দায় থাকলেও মেলা আয়োজকদের অসচেতনতাও কম দায়ী নয়। মূলধারার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমেও বিভিন্ন সময়ে মেলাটি নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। যেমন, প্রথম আলো ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর ‘পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজতে ২০০ বছর ধরে যেখানে জড়ো হন তরুণ-তরুণীরা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অথচ ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর একই পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার ঐতিহ্য নেই, তবু টিকে আছে দিনাজপুরের মেলাটি’। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর যুগান্তরে ‘যে মেলায় মেলে পছন্দের জীবনসঙ্গী’, ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর দৈনিক টাইমস ন্যাশনালে ‘দিনাজপুরে বসছে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বউ মেলা’’ এবং ২০ অক্টোবর বাংলা টেলিগ্রাফে ‘২০০ বছরের ‘বউ মেলা’র ভেতর-বাহির’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব শিরোনাম মেলাটির প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য ও বীরগঞ্জ থানা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক শ্যামলাল মুরমু জানান, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই মেলা শুরু করে গেছেন, আমরা কেবল তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করছি। তবে ঠিক কবে থেকে এ মেলার প্রচলন শুরু হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। মেলায় সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ অংশ নেন।’ভবিষ্যতে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর সংবাদ, সাক্ষাৎকার ও অপপ্রচার রোধে আয়োজক কমিটিকে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।প্রথমত, তথ্যপুস্তিকা বিতরণ: মেলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরে একটি তথ্যপুস্তিকা বা প্রচারপত্র প্রকাশ করা যেতে পারে। মেলার প্রবেশদ্বারে তা দর্শনার্থীদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে, যাতে তারা সঠিক তথ্য জানতে পারেন। সাংবাদিকদের জন্য আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা প্রয়োজন।দ্বিতীয়ত, তথ্য ও প্রচার সম্পাদক নিয়োগ: মেলা কমিটির একজন নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রচার সম্পাদক থাকা দরকার। তিনি প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মী, গবেষক ও দর্শনার্থীদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবেন।তৃতীয়ত, ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: অনুমতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তা বিকৃতভাবে প্রকাশ কিংবা হয়রানির উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। মেলায় সাংবাদিক ও ইউটিউবারদের পরিচয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সংবাদ সংগ্রহের অধিকারও বিবেচনায় রাখতে হবে।চতুর্থত, স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন ও নজরদারি: নির্দিষ্ট টি-শার্ট, টুপি ও পরিচয়পত্রধারী স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা প্রয়োজন। তারা মেলাপ্রাঙ্গণে শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন এবং দর্শনার্থীদের, বিশেষ করে নারীদের, হয়রানি প্রতিরোধে কাজ করবেন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দ্রুত আয়োজক কমিটিকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।পঞ্চমত, মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা: মেলাপ্রাঙ্গণে নিয়মিত মাইকিং করে দর্শনার্থীদের সচেতন করতে হবে। অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ধারণ করে কাউকে হয়রানি করা কিংবা মেলার পরিবেশ নষ্ট করার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা প্রচার করতে হবে।এ প্রসঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম জেলার শিলদার কাছে ওড়গোন্দায় অনুষ্ঠিত পাঁটাবিন্দো মেলার কথা উল্লেখ করা যায়। বিজয়া দশমীর পরদিন শুরু হওয়া এ মেলায় পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, বিহারসহ বিভিন্ন রাজ্য এবং বাংলাদেশ থেকে মানুষ অংশ নেন। এই বৈচিত্র্যময় সমাগমের কারণে মেলাটি আন্তর্জাতিক সাঁওতাল মেলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এটি শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং সাঁওতাল সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনক্ষেত্র। এখানে হস্তশিল্প, কৃষি উপকরণ, সাংস্কৃতিক সামগ্রী, পোশাক, অলংকার, বাসনপত্র ও বাদ্যযন্ত্র পাওয়া যায়। আদিবাসী নাচ, গান, লোককাহিনি এবং তাদের হাতে তৈরি বিশেষ খাবার—যেমন মাংস পিঠা, হাও রিং ও সাং তিকি—মেলাটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। এ আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি সংস্কৃতি সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।দিনাজপুরের বীরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মিলনমেলাটিও এমন একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্র। এখানে সাঁওতাল, ওরাঁও, পাহান, মাহাতোসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ অংশ নেন। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলা থেকেও বহু মানুষ মেলায় আসেন। এই আয়োজন আদিবাসীদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, নাচ ও গানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।তাই মেলাটির প্রকৃত পরিচয় ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। গণমাধ্যমে আদিবাসীদের পরিচয় উঠে আসুক মর্যাদার সঙ্গে, আর সংবাদ প্রকাশিত হোক দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে। আয়োজক কমিটি কার্যকর উদ্যোগ নিলে মেলাটিকে ঘিরে বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদেরও কোনো শিরোনাম বা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করতে হবে। কারণ, একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি নিয়ে ভুল বর্ণনা শুধু তাদের আত্মমর্যাদায় আঘাত করে না, সমাজেও বিভাজন তৈরি করতে পারে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

পুণ্ড্রনগরে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আর বিতর্ক নয়

পুণ্ড্র সভ্যতা বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন ও সমৃদ্ধ জনপদ, যার কেন্দ্র ছিল বর্তমান বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতক বা তারও আগে প্রায় চার হাজার বছর আগে দ্বিতীয় নগর সভ্যতার সময়ে উত্তরবঙ্গে এই উন্নত নগর সভ্যতা গড়ে ওঠে।অষ্টম শতকে প্রাচীন বাংলার একটি অন্যতম প্রধান বৌদ্ধ মঠ ও উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র ছিল বগুড়ার ভাসুবিহার। এটি ছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বের প্রথম ও প্রাচীন ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এটি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। অর্থাৎ আমাদের ভাসুবিহার ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। বিহার ছিল মূলত একটি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ধর্মশিক্ষা, যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা ও শিল্পকলা পঠিত হতো।সভ্যতা এক জায়গায় স্থির থাকে না। সভ্যতা চলমান। একবার ভাবুন, আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা ফিরে এসে আবারও আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। আর আমরা সঠিক সময়ে দরজা না খুলতে পারার কারণে সভ্যতার জাহাজটি নোঙর করছে অন্য তীরে!যেমনটি ঘটেছিল ২০০১ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে। ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন’ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগ বগুড়ায় নেওয়া হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত আর স্থান নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের কারণে প্রতিষ্ঠানটি বগুড়া থেকে গিয়ে নোঙর করেছিল বন্দর নগরী চট্টগ্রামে।একবার ভাবুন, হারিয়ে যাওয়া সেই দ্বিতীয় নগর সভ্যতার পুণ্ড্র অঞ্চল তথা বগুড়া মহানগরে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব তৈরি করা হয়েছে। মেধাবী ও যোগ্য গবেষকদের সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ল্যাবগুলো দিন-রাত খোলা। সেগুলোতে কাজ করছে আমাদের ছেলেমেয়েরা। সরকার তাদের গবেষণা কর্মের বিনিময়ে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। টিউশনি করে তাদের আর সময় নষ্ট করতে হচ্ছে না। ল্যাবগুলোর সঙ্গে আছে ক্যাফেটেরিয়া। তারা সেখানে ধোঁয়াওঠা কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে নতুন নতুন ভাবনার দৃশ্যপট তৈরি করছে। সমস্ত ক্লান্তি ও অবসাদ ঝেড়ে ফেলে আবারও হাসতে হাসতে, গাইতে গাইতে কাজ করে যাবে।আমাদের কাছে এসব স্বপ্নের মতো শোনালেও এমন পরিবেশেই সারা দুনিয়ার ছেলেমেয়েরা কাজ করছে। আমরা যদি এমন পরিবেশ তৈরি করে দিই, তাহলে দেশকে নিয়ে আর ভাবতে হবে না। দেশ এগিয়ে যাবে তার আপন গতিতে। পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা কেন পিছিয়ে থাকব? ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ আর উন্নত বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণ গবেষকদের হাত ধরেই।সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৭ বছর উন্নয়নবঞ্চিত এই জনপদে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৬ গেজেট আকারে প্রকাশের পর ‘বগুড়া ইউনিভার্সিটি’ নামে পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি সনদ প্রদানকারী গতানুগতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, উদ্ভাবন আর আঞ্চলিক তথা পুরো দেশের উন্নয়নের এক নতুন পৃষ্ঠা উন্মোচন করবে।বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা দিয়েছিলেন, কিন্তু কেউ কথা রাখেননি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার মতো “তেত্রিশ বছর কেটে গেল, কেউ কথা রাখেনি”। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের গেজেট প্রকাশ করে কথা রেখেছেন। এ জন্য এই জনপদের গণমানুষের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে জানাই আন্তরিক অভিলাষ ও কৃতজ্ঞতা।আইন পাস হওয়ার পর এই জনপদের মানুষ বিজয় মিছিল ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে স্থান নির্ধারণকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক টানে বিভক্ত হয়ে মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধ ও ফেসবুকে একের পর এক বিষোদ্গার ছড়াচ্ছেন। গণতান্ত্রিক সমাজে মত প্রকাশের অধিকার সবারই আছে; তবে সেই অধিকার যেন জনস্বার্থ, সামাজিক সম্প্রীতি ও জেলার তথা প্রধানমন্ত্রীর সম্মান ক্ষুণ্ণ না করে, সেদিকে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় হবে, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোন স্থানটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, পরিবেশ, প্রতিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা আর ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বেশি উপযোগী, সেটা সবার আগে ভাবা উচিত। এই সিদ্ধান্ত আবেগ বা আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে না নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত ও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় গ্রহণ করা উচিত। পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি না করে যুক্তিনির্ভর আলোচনার মাধ্যমে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্থান নির্ধারণ করা জরুরি। আমরা যেন এমন কোনো কাজ না করি, যাতে বগুড়ার ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন’-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয়টি হারিয়ে না ফেলি।দুনিয়ার সবকিছু তৈরি করে মেধাবীরা, আর মেধাবীদের তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান বগুড়ার যেখানেই হোক—আমাদের ছেলেমেয়েরা বিশ্বমানের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাবে, এতেই আমরা খুশি।সৈয়দ শামসুল হকের কবিতার ভাষায় বলি—“গোল হয়ে আসুন, সকলে ঘন হয়ে আসুন সকলে,/ আমার মিনতি আজ স্থির হয়ে বসুন সকলে। ...”প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাকে অভিবাদন জানিয়ে বলি—তোমাকে অভিবাদন বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার মানচিত্রের ভেতরে, যার ডানা এখন রক্ত আর অশ্রুতে ভেজা।লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট

দাগে সরকারি জমি থাকলেও ব্যক্তিমালিকানার জমির নামজারি করা যাবে

অনেক জমির মালিক প্রায়ই একটি সমস্যার মুখে পড়েন। জমি কিনেছেন কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন, কাগজপত্রও ঠিক আছে। তবু নামজারি করতে গেলে ভূমি অফিস থেকে বলা হয়, ‘আপনার দাগে সরকারি খাসজমি আছে, তাই নামজারি হবে না।’ ভূমি উন্নয়ন কর দিতে চাইলেও অনেক ক্ষেত্রে তা নেওয়া হয় না। ফলে বৈধ মালিক হয়েও বছরের পর বছর জমির মালিকানাসংক্রান্ত নথি হালনাগাদ করা যায় না। এতে জমি বিক্রি, ব্যাংকঋণ নেওয়া কিংবা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি ভাগ করে দেওয়ার কাজ আটকে থাকে।এই ভোগান্তি দূর করতে ভূমি মন্ত্রণালয় ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে একটি পরিপত্র জারি করেছে।সমস্যাটি কোথায় ছিল?জমির নথিতে ‘দাগ’ বলতে নির্দিষ্ট একটি জমির খণ্ডকে বোঝায়। অনেক সময় একই দাগের একাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন থাকে, আর অন্য অংশ থাকে সরকারের খাসজমি বা সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট জমি। মন্ত্রণালয় লক্ষ করেছে, এমন ক্ষেত্রে অনেক ভূমি অফিস ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারির আবেদন গ্রহণ বা অনুমোদন করছিল না। ভূমি উন্নয়ন করও আদায় করা হচ্ছিল না। ফলে দাগের একটি অংশ সরকারি হওয়ার কারণে ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের মালিকেরাও ভোগান্তিতে পড়ছিলেন।নতুন পরিপত্রে কী বলা হয়েছে?সহজ কথায়, একই দাগে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থাকলে দুই অংশের সীমানা নির্ধারণ করে আলাদা করা হবে। এরপর ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের ব্যবস্থা করা হবে। পরিপত্রের প্রধান নির্দেশনাগুলো হলো—১. সহকারী কমিশনার (ভূমি) সীমানা নির্ধারণ করবেনযে দাগে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি একসঙ্গে রয়েছে, সেখানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) দুই অংশের সীমানা নির্ধারণের ব্যবস্থা করবেন। এ কাজে জরিপকারীর সহায়তা নেওয়া হবে। হালনাগাদ রেকর্ড, দাগসূচি, মৌজা নকশা, মালিকানার ধারাবাহিকতা ও দলিলপত্র যাচাই করা হবে। শুধু কাগজপত্রের ভিত্তিতে নয়, সরেজমিনে গিয়ে জমির সীমানাও চিহ্নিত করতে হবে।২. নামজারির আবেদন আটকে রাখা যাবে নানামজারির আবেদন যাচাই করতে গিয়ে দেখা গেল, সংশ্লিষ্ট দাগের একটি অংশ সরকারি জমি। এ কারণে পুরো আবেদন বাতিল করা যাবে না। সরকারি অংশ আলাদা করে ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারি অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।৩. সরকারি জমি সরকারেরই থাকবেএই প্রক্রিয়ায় সরকারি বা খাসজমি কোনোভাবেই ব্যক্তির নামে নামজারি করা যাবে না। সরকারি অংশ সরকারের নামে সুরক্ষিত থাকবে। নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর আদায় হবে কেবল ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের জন্য।৪. আলাদা নথি খোলার প্রয়োজন কমবেনামজারির আবেদনের সূত্রে জমির সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশ আলাদা করার প্রয়োজন হলে একই নামজারি নথিতে কাজটি করা হবে। এ জন্য আলাদা নথি খোলার প্রয়োজন হবে না। তবে নামজারির আবেদন ছাড়াই শুধু সীমানা পৃথক করার জন্য কেউ আবেদন করলে আলাদা নথি খুলতে হবে।৫. ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া যাবেব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের ভূমি উন্নয়ন কর নিয়মিত আদায় করা হবে। ফলে মালিক কর পরিশোধ করে দাখিলা নিতে পারবেন। জমির অন্যান্য কাগজপত্রের সঙ্গে এই দাখিলাও সংরক্ষণ করা যাবে।৬. অনলাইন ভূমিসেবায় পরিবর্তন আনা হবেই-নামজারি ও অনলাইন ভূমিসেবার সফটওয়্যারে নতুন পদ্ধতি চালু করতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।পরিপত্রটি জনস্বার্থে জারি করা হয়েছে এবং অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।সাধারণ মানুষের কী লাভ হবে?যাদের নামজারি শুধু ‘দাগে খাসজমি আছে’—এই কারণ দেখিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল, তারা এখন নতুন নির্দেশনার আলোকে প্রতিকার চাইতে পারবেন। নামজারি সম্পন্ন হলে জমি বিক্রি, হস্তান্তর, বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি ভাগ করা সহজ হবে। ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের সুযোগও তৈরি হবে।অন্যদিকে, সরকারি জমির সীমানা সরেজমিনে চিহ্নিত করা হলে খাসজমি অবৈধভাবে দখলের ঝুঁকি কমতে পারে। এতে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির অধিকার সুরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি সম্পত্তি রক্ষাও সহজ হবে।জমির মালিকদের করণীয়আপনার জমির দাগে সরকারি বা খাসজমি থাকার কারণে নামজারি কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া আটকে থাকলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন। প্রয়োজনে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে আবেদন করুন।আবেদনের সময় জমির দলিল, আগের মালিকের দলিল, খতিয়ান, পুরোনো ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা (যদি থাকে) এবং ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন। সরেজমিনে জমি মাপার সময় উপস্থিত থেকে নিজের জমির সীমানা দেখিয়ে দিন।কোনো দালালের শরণাপন্ন না হয়ে সরাসরি ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের সহায়তা নিন। সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।শেষ কথাভূমি মন্ত্রণালয়ের এই পরিপত্র একই দাগে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থাকার কারণে সৃষ্ট দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমানোর একটি উদ্যোগ। এর মূল কথা হলো, সরকারি জমি সরকারের থাকবে, আর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির মালিকানা যাচাই করে সেই অংশের নামজারি করা যাবে। দাগের একাংশ সরকারি হওয়ার কারণে অন্য অংশের বৈধ মালিককে অযথা ভোগান্তিতে রাখা উচিত নয়।তবে পরিপত্রের নির্দেশনা বাস্তবে কার্যকর করতে ভূমি কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা, সঠিক জরিপ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলেই জমির মালিকেরা এই উদ্যোগের সুফল পাবেন এবং সরকারি জমিও সুরক্ষিত থাকবে।[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

ভিডিও আরও দেখুন

ব্যালন ডি’অর অব অলটাইম জিতলেন রোনালদো

আধুনিক ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ব্যক্তিগত লড়াইয়ে আরও একটি পালক যুক্ত হলো। উয়েফা ও ‘ফ্রান্স ফুটবল’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ ভোটাভুটিতে মেসিকে পেছনে ফেলে ‘ব্যালন ডি’অর অব অলটাইম’ (সর্বকালের সেরা ব্যালন ডি’অর) জিতেছে পর্তুগিজ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ২০০৮ সালের মৌসুম।‘বোট’ (বেস্ট অব অল টাইম) নামের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনে অন্তত দুবার ব্যালন ডি’অর জয়ী ১০ জন কিংবদন্তি ফুটবলারের সেরা মৌসুমগুলোর মধ্যে থেকে সেরাটি বেছে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সমর্থকেরা। প্রতিটি ভোটের জন্য সমর্থকদের ১ ইউরো করে ফি দিতে হয়েছিল। মঙ্গলবার ও বুধবারের মধ্যবর্তী রাতে ব্যালন ডি’অরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এই অনলাইন ভোটিংয়ের পর্দা নামে।ভোটারদের রায়ে ২০০৮ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে রোনালদোর পারফর্ম করা মৌসুমটি প্রথম স্থান অর্জন করেছে। ওই বছরই ক্যারিয়ারের প্রথম ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন তিনি। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে বার্সেলোনার হয়ে জাদুকরী পারফরম্যান্স উপহার দেওয়া লিওনেল মেসির ২০১২ সালের মৌসুম। এ ছাড়া তালিকার তৃতীয় স্থানেও রয়েছে রোনালদোর ২০১৭ সালের রিয়াল মাদ্রিদ ক্যারিয়ারের মৌসুমটি।ব্যালন ডি’অর জয়ের রেকর্ডে আটটি ট্রফি নিয়ে পর্তুগিজ ফরোয়ার্ডের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও এই বিশেষ জনমত জরিপে রোনালদোর পেছনেই থাকতে হলো আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে। এই প্রতিযোগিতায় আরও অংশ নিয়েছিলেন মার্কো ফন বাস্তেন, মিশেল প্লাতিনি, ইয়োহান ক্রুইফ, রোনালদো নাজারিও, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, কেভিন কিগান, আলফ্রেডো দি স্তেফানো ও কার্ল-হাইনৎস রুমেনিগের মতো কিংবদন্তিরা। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ভোটারদের মধ্য থেকে সৌভাগ্যবান একজনকে ২০২৭ সালের ব্যালন ডি’অর মূল অনুষ্ঠানের দুটি ফ্রি টিকিট উপহার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে উয়েফা।/ 

ব্যালন ডি’অর অব অলটাইম জিতলেন রোনালদো