সংবাদ
উদ্যোক্তা তৈরিতে জোর: ৫০ কোটি টাকার পাইলট প্রকল্প

উদ্যোক্তা তৈরিতে জোর: ৫০ কোটি টাকার পাইলট প্রকল্প

দেশের প্রান্তিক বেকার জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে কর্মসংস্থান ব্যাংক আয়োজিত ‘ক্ষুদ্র ব্যবসা, ক্ষুদ্রঋণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ তহবিল প্রকল্প’-এর উদ্বোধন ও ঋণের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ​উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, "উদ্যোক্তা তৈরি করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। কর্মসংস্থান ব্যাংকের নতুন প্রকল্পটির আওতায় দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, "এটি ৫০ কোটি টাকার একটি পাইলট প্রকল্প। যারা ব্যাংকে যেতে ভয় পায় তাদের ঋণ দিয়ে কর্মসংস্থানে নিয়ে উদ্যোক্তা তৈরির জন্যই কর্মসংস্থান ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়।" ​দেশের প্রান্তিক প্রতিভাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার গুরুত্ব তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, "সরকার নতুন এক উদ্যোগ নিয়েছে ক্রিয়েটিভ বা সৃজনশীল অর্থনীতি। প্রান্তিক সৃজনশীল মানুষকে শুধু ঋণ দেওয়া হচ্ছে না, তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পণ্যের ব্র্যান্ডিংও করা হচ্ছে। মার্কেটিং ব্র্যান্ডিংও করা হচ্ছে। কর্মসংস্থান ব্যাংককেও বলবো এমন কর্মসূচি হাতে নিতে। এটা জিডিপি, চ্যারিটি নয়। এমনকি গানসহ বিভিন্ন সৃজনশীলতা যাদের আছে তাদেরও প্রমোট করা যায়। তারাও অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। সরকার এসবকে মনিটাইজ করতে চায়। সেক্ষেত্রে তাদের ভ্যালু অ্যাড করে মার্কেটেবল করতে চায়। তাদের অর্থনীতির মূল স্রোতে আনতে চায়। সরকার ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে মনোযোগ দিতে চায়, সহায়তা করতে চায়। এটা করতে পারলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।" ​ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা ও আর্থিক স্থায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "কর্মসংস্থান ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বা এনপিএল ৪ থেকে ১ বা ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারলে ভালো হবে। ব্যাংকটি ভালো করছে, প্রফিটও করছে।" ​কর্মসংস্থান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অরুন কুমার চৌধুরী জানান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উদ্যোগে বাস্তবায়িত এই বিশেষ পাইলট প্রকল্পের আওতায় ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী পুরুষ এবং ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারী বেকারদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা এলাকার জনগোষ্ঠীর জন্য জামানতবিহীন সহজ ঋণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মোট ঋণগ্রহীতার অন্তত ৫০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মাত্র ৬ শতাংশ নির্ধারিত সুদে ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হবে, যা পরিশোধের মেয়াদ ৬ থেকে ২৪ মাস। প্রাথমিক পর্যায়ে শেরপুর, কুড়িগ্রাম ও বরগুনা জেলায় এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
১১ মিনিট আগে

মতামতমতামত

বিচার না প্রতিশোধ, ন‍্যায‍্যতা ও সুশাসন তো রইলো অধরা!

বিদ্যুৎ সংকটের ফলে তীব্র গরমে ও লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় জনজীবন সম্পূর্ণ বেহাল। অন্যদিকে বাজারের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতিও খুবই উদ্বেগজনক। বেপরোয়াভাবে চলছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন। অন্যদিকে চলছে বেপরোয়া দলবাজি ও চাঁদাবাজি। এই দলবাজরা দলকেও ভয় পায় না। ‘দখলদারিত্বই প্রথম’ — এই নীতি বাস্তবায়নে তারা মরিয়া।তবে আমাদের বিমানভাগ্য চমৎকার! তীব্র জ্বালানি সংকটের এই সময়ে আপাতত ১৪টি বোয়িং আসছে মার্কিন মুলুক থেকে। এরপরে আরো আসবে, আসতেই থাকবে। দেশবাসীর উপর ‘দয়াপরবশ’ হয়ে এক বাণিজ্য চুক্তি করে মুহাম্মদ ইউনূস বিমানে চড়ার এ ধরনের সুব্যবস্থা করে গেছেন। দেশবাসীর এই উপকার করতে নির্বাচনের তিনদিন আগে দেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি করার বিষয়ে তিনি নাকি বিএনপি, জামায়াত এবং তার নিজের তরুণ তুর্কি দলের সম্মতিও নিয়ে নিয়েছিলেন। সারা দুনিয়াকে অস্থিতিশীল করায় পারঙ্গম ট্রাম্পও গদগদ হয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে এজন্য অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন শীঘ্রই দুজনের সাক্ষাৎ হবে। আর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর তার পোস্টে লিখেছেন, ‘এ সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরেকটি অভূতপূর্ব চুক্তি করেছেন, যেখানে বাংলাদেশ বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তাদের আগের অর্ডারের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি।’ অর্থাৎ আরো আসবে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটে মানুষের বাসায় চুলা জ্বলে না, বিদ্যুতের অভাবে আলো জ্বলে না। অনেকে রাত দুইটা-তিনটার সময় পরবর্তী দিনের রান্না করেন। হাসপাতালের চিকিৎসা চলছে মুঠোফোনের আলোয়। আর আমরা সবাই বোয়িং স্বপ্নে বিভোর!এ দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে জনপরিসরে অস্বস্তি, অস্থিরতা এবং ক্ষোভ বাড়লেও এসব সমস্যার একটা সুরাহা করতে সরকারকে আরো কিছুটা সময় হয়তোবা মানুষ দেবে। তবে অনন্তকাল তো মানুষ অপেক্ষা করবে না। অন্যদিকে দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি না দেখে বিশেষত এ সব বিষয়ে সদিচ্ছার প্রতিফলন না দেখে মানুষ আরো বেশি হতাশ ও উদ্বিগ্ন। মনে রাখা প্রয়োজন জুলাইয়ের কোটা আন্দোলন সরকার উৎখাতের আন্দোলনে পরিণত হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল দীর্ঘ সময় যাবৎ দেশের বুকে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি এবং বিচারহীনতা — যা বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষকেও রাজপথে টেনে আনে।প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন অবশ্য বলেছেন, “গত ছয় মাসে বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ মানবিকতা দেখেছি। একটি বারের জন্য কখনো কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন ঘটেনি।” সরকারি প্রেস ব্রিফিং-এ এমনটা বলাই স্বাভাবিক, এটাই রেওয়াজ। কিন্তু বাস্তবে এ ছয় মাসে বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ইউনূস আমল অপেক্ষা কি কোনো অগ্রগতি আছে? বরং সবকিছু দেখে শুনে মনে হয়, এ সব ক্ষেত্রে ইউনূস আমলের ধারাবাহিকতাই চলছে। একমাত্র ব্যতিক্রম নাগরিক আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করা। তবে তাতে তো আর জনজীবনের সংকট ও আইনের শাসনের যে অভাব তার সুরাহা হবে না।কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের সাথে সম্পর্ক আছে বা ছিল এ ফালতু অভিযোগে গ্রেফতার, আটক তো পূর্বের মতোই অব্যাহত আছে এবং আগের মতোই এখনো জুড়ে দেওয়া হচ্ছে বহুল আলোচিত তথাকথিত খুনের মামলা। পত্রিকায় দেখলাম এক কিশোরগঞ্জ জেলায়ই গত ৫ সেপ্টেম্বর একদিনে (২৪ ঘন্টায়) গড়ে প্রতি ঘন্টায় একজন করে আওয়ামী লীগ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঐ জেলায় গত তিনদিনে মোট ৫৮ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশ্লিষ্ট থানা সমূহে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে যে হাস্যকর খুনের মামলায় বছরের পর বছর রাজনীতিক, সাংবাদিক, অভিনেতা, আমলা, বিচারপতিরা আটক আছেন — এক মামলায় জামিন পেলেও ভিন্ন আরেকটি সাজানো মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয় — ইউনূস আমলের সেই নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত আছে। মানুষ আশা করেছিল নির্বাচিত সরকার আসার পরে এ ধরনের সাজানো খুনের মামলাগুলো প্রত্যাহার ও আইনানুগভাবে নিষ্পত্তি করা হবে। তা না করায় পরিস্থিতি অস্থিতিশীলই থাকছে।প্রবীণ রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেননের নামে ঢাকা শহরের বিভিন্ন থানায় একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারকার্য চালানো হচ্ছে। হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধেও ঢাকা ও কুষ্টিয়ার একাধিক থানায় বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আইসিটিতে ইতোমধ্যে সাজাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সবাই জানে ২০২৪ সালের মন্ত্রিসভায় তারা ছিলেন না, সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে ‘লিপ সার্ভিস’ দেওয়া ছাড়া ভিন্ন কোনো ক্ষমতা জোটের কোনো শরিকদের দীর্ঘদিন যাবৎ ছিল না। শুধুমাত্র নিরবচ্ছিন্নভাবে জামায়াত ও জঙ্গিবাদের কঠোর সমালোচনা করায় এবং জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করায় ইউনূস আমলে তাদেরকে আটক করে খুনের মামলা জুড়ে দেওয়া হয়। বিএনপির সাথে জামায়াতের ক্ষমতাকেন্দ্রিক ঘনিষ্ঠতা থাকায় তারা দু’জনেই কঠোর ভাষায় বিএনপিরও সমালোচনা করতেন। তাই আজ বিএনপি আমলেও তাদের উপর ইউনূসীয় প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ অব্যাহত আছে। আওয়ামী লীগ নেত্রী ডাঃ দীপু মনির বিরুদ্ধে প্রায় ৭০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার সংখ্যার বহর দেখেই বোঝা যায় তিনি আইনের আওতায় নয়, প্রতিশোধের আওতায় আছেন। আইনের সঠিক প্রয়োগ থাকলে এতদিনে অন্তত আসাদুজ্জামান নূর জামিন পেতেন। ঢাকা সহ সারা দেশে হাজারে হাজারে রাজনৈতিক নেতাকর্মী আটক আছেন এবং তাদেরকে জামিনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।এ কথা ঠিক গ্রেপ্তারকৃত অনেকেই জুলাই আন্দোলনে সরকারের কঠোর বলপ্রয়োগ এবং হত্যাযজ্ঞের নিন্দা না করে বরং নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা নেওয়ায়, এ রক্তাক্ত ঘটনার নৈতিক দায় এড়াতে পারবেন না। বিরোধী দলবিহীন একতরফা নির্বাচনে অংশ নিয়ে বা সমর্থন করে বা আয়োজনে সহযোগিতা করে তারা নৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। সেসব ধিকৃত ঘটনার সমালোচনা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনানুগ শাস্তিও জরুরি। তবে মনে রাখা প্রয়োজন ফৌজদারি অপরাধ এবং নৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আওয়ামী শাসনামলকে সমর্থন করা বা আওয়ামী লীগ দলের নেতাকর্মী হওয়া তো ফৌজদারি অপরাধ নয়। ফৌজদারি দায়বদ্ধতা অবশ্যই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই হতে হয় — ঢালাও হত্যা মামলা বা দুদকের নোটিশ ধরিয়ে দিলেই তা প্রমাণিত হয় না।রাজনৈতিক কারণে মামলা, নিবর্তনমূলক আটক এবং আইনের অসম প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে বহুদিন ধরেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০২৪-এ যে তারুণ্যের জাগরণ আমরা দেখেছি তা আমাদের প্রাথমিকভাবে আশ্বস্ত করেছিল যে, বিভাজনের বাংলাদেশকে পেছনে রেখে বৈষম্যমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং সুশাসনের পথে দেশ অগ্রসর হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগে তরুণ নেতৃত্বের একাংশ ধর্মীয় উগ্রবাদীদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে ওঠায় সাধারণ শিক্ষার্থী আর তরুণদের দেয়ালে আঁকা স্বপ্নগুলো হারিয়ে যেতে থাকল এবং শুরুতেই ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক যাত্রা সংকটের সম্মুখীন হয়। মানুষের মনের প্রত্যাশা দুরাশায় পরিণত হয়।তবে নির্বাচনের সময় থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলে আসছিলেন যে, এক উদার গণতান্ত্রিক সমাজ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার জন্য তাদের হাতে ‘প্ল্যান’ রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণে সে সব ‘প্ল্যান’ আর অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা এবং সাম্য, সুবিচার ও সুশাসন অধরাই রয়ে যাচ্ছে। অপরাধ করলে তার শাস্তি হওয়া উচিত। এটা সভ্য সমাজের রীতি। কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এক একটি হত্যা বা হত্যা প্রচেষ্টা মামলায় শতাধিক সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে বছরের পর বছর তাদের জেলে পুরে রাখা অবিচারের নামান্তর। অন্যদিকে কারো কারো ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে প্রথমে মিডিয়া ট্রায়াল, অতঃপর ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য চলছে। এসব দেখে ইতোমধ্যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আইসিটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আর বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায্যতার কোনো লক্ষণ না দেখে টিআইবি যথাযথভাবেই প্রশ্ন উত্থাপন করেছে যে ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের নির্মম ও বহুমাত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার আদৌ কিছু শিখেছে কি না?’(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বাণিজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রই সড়ক পরিবহনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গত এক দশকে মহাসড়ক সম্প্রসারণ, সেতু নির্মাণ, এক্সপ্রেসওয়ে, উড়ালপথ এবং আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়নের মাধ্যমে যোগাযোগ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামোগত এই উন্নয়নের পাশাপাশি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা বারবার সামনে আসে, আর তা হলো সড়ক দুর্ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব কিংবা গুরুতর আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব দুর্ঘটনা কেবল কয়েকটি পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি।সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক ক্ষতিও অত্যন্ত ব্যাপক। দুর্ঘটনায় একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে বা স্থায়ীভাবে পঙ্গু হলে শুধু একটি পরিবার নয়, জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়ে। চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, সম্পদের ক্ষতি, আইনি ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব মিলিয়ে প্রতিবছর বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সমাজের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, শিক্ষার্থী, পথচারী এবং নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেক শিশু তাদের বাবা-মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যায়, আবার অনেক পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও মানবিক সংকট।সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। দুর্ঘটনাকে ভাগ্য বা নিয়তির বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে এটিকে প্রতিরোধযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ বিশ্বের অনেক দেশ সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ, উন্নত প্রকৌশল, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সচেতনতার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশও চাইলে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে।নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সড়কের অবকাঠামো উন্নয়ন। দেশের অনেক মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, ভাঙাচোরা অংশ, অপর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, মানসম্মত সড়কচিহ্ন এবং লেন বিভাজনের অভাব রয়েছে। এসব ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংস্কার করতে হবে। নতুন সড়ক নির্মাণের সময় সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি পথচারীদের জন্য ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস, সাইকেল লেন এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একজন চালকের হাতে শুধু একটি গাড়ি নয়, বহু মানুষের জীবনও অর্পিত থাকে। তাই দক্ষতা যাচাই ছাড়া কোনোভাবেই গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেওয়া উচিত নয়। পেশাদার চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা এবং পুনঃপ্রশিক্ষণ কোর্স চালু করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় টানা গাড়ি চালানোর প্রবণতা বন্ধে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন প্রয়োজন।পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাও সময়ের দাবি। যাত্রী পরিবহনে অতিরিক্ত গতি, প্রতিযোগিতামূলকভাবে যাত্রী ওঠানামা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং অনিয়মিত স্টপেজ ব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। রুট পারমিট, ফিটনেস সনদ, চালকের লাইসেন্স এবং যানবাহনের কারিগরি সক্ষমতা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। গণপরিবহন পরিচালনায় জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে না। সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করতে হবে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব বিবেচনা না করে সমানভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অতিরিক্ত গতি, মাদক বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, মুঠোফোন ব্যবহার, হেলমেট বা সিটবেল্ট ব্যবহার না করা এবং উল্টো পথে চলাচলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।প্রযুক্তির ব্যবহার সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পারে। আধুনিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল, সিসিটিভি ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ, গতিসীমা শনাক্তকারী ক্যামেরা এবং ইলেকট্রনিক জরিমানা ব্যবস্থা সফলভাবে দুর্ঘটনা ও আইন লঙ্ঘন কমিয়েছে। বাংলাদেশেও এসব প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং গবেষণার জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়।সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ট্রাফিক আইন, পথচারীর আচরণ, সাইকেল চালানোর নিয়ম এবং নিরাপদ সড়ক ব্যবহারের শিক্ষা দিতে হবে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম, ট্রাফিক ক্লাব এবং নিরাপদ সড়ক বিষয়ক কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নাগরিক সমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলনের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংগঠন নিরাপদ সড়কের দাবিতে জনসচেতনতা সৃষ্টি, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং নীতিগত সুপারিশ প্রদান করে আসছে। এই ধরনের উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হলে জনসম্পৃক্ততা আরও বৃদ্ধি পাবে। কারণ সড়ক নিরাপত্তা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় সামাজিক আন্দোলনের বিষয়।দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও মৃত্যুহার কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়। দেশের মহাসড়কগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, ট্রমা কেয়ার সেন্টার, জরুরি উদ্ধার ইউনিট এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী নিয়োজিত করতে হবে। দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টাকে স্বর্ণঘণ্টা বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সড়ক দুর্ঘটনাকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বিশ্বের বহু দেশ পরিকল্পিত উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। বাংলাদেশও চাইলে সেই পথ অনুসরণ করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।[লেখক: যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), কেন্দ্রীয় কমিটি]

চিকিৎসাসেবার এক আলোকবর্তিকা

জীবনের চলমানতার মধ্যে অল্পসংখ্যক মানুষ পৃথিবীতে আসেন, যারা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। এই স্বপ্নের মধ্য দিয়ে মানুষকে আলোর পথে নিয়ে আসেন। বাঁচার প্রেরণা জোগান। তেমনই এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম। বারডেম হাসপাতালের বড় স্যার। কতখানি আন্তরিকতা থাকলে একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে বড় স্যার হয়ে উঠতে পারেন, এটাও একটা বিস্ময়।তিনি জন্মেছিলেন আমাদের দেশের অসহায় রোগাক্রান্ত মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে। উপলব্ধি করেছিলেন, রোগ-শোক শুধুমাত্র ব্যক্তি ও পরিবারকে আক্রান্ত করে না, এটি সুন্দর সমাজের প্রতিবন্ধক হিসেবেও কাজ করে। তিনি বলতেন, আর্ত-রুগ্ন মানুষের সেবা করা রাব্বুল আলামীনের খুব পছন্দনীয় কাজ। তাই রোগীর সেবাকে তিনি ইবাদত মনে করতেন। সকাল থেকে রাত অবধি রোগীদের চিন্তায় তিনি মগ্ন থাকতেন। কীভাবে রোগীদের উন্নত সেবা দেওয়া যায়, ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজের উন্নতি ঘটানো যায়, টেকনিশিয়ানদের কীভাবে আরও দক্ষ করে তোলা যায়, এটাই ছিল তার সার্বক্ষণিক চিন্তা। মূলত রোগীর সেবা করাই ছিল তার ধ্যান-ধারণা ও সাধনা।তিনি কখনও টাকার সাধনা করেন নাই। রোগী দেখে টাকা উপার্জনের কথা তিনি ভাবতেই পারতেন না। এই কারণে কখনোই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন নাই। অর্থাৎ চিকিৎসাকে অর্থকরি লাভজনক পেশা হিসেবে দেখেননি।১৯৫৬ সালে ঢাকার সেগুনবাগিচায় ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য তিনি একটি চারা রোপণ করেছিলেন। সেটি আজ বটবৃক্ষে পরিণত হয়ে ডালপালা ছড়িয়েছে। অর্থাৎ দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় এর বিস্তৃতি ঘটেছে। যার ফলে সারা দেশের রোগীরা এর সুফল পাচ্ছে। এই ব্যাপারে তার পরিবারের সদস্যদের অবদান রয়েছে প্রচুর।ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম কম বয়সী ডায়াবেটিক রোগী—যারা ইনসুলিন নির্ভরশীল অর্থাৎ টাইপ ১ ডায়াবেটিক রোগী তাদের জন্য বেশি চিন্তা করতেন। যে বয়সে বাচ্চারা খেলাধুলা, ছুটাছুটি, পড়াশোনা করে, সে বয়সে রোগটি বাধা হয়ে দাঁড়াবে সেটা তিনি মানতে পারতেন না। এইজন্য অভিভাবকদের আশ্বস্ত করতেন যে, যদি ঠিকমতো ডায়াবেটিসের নিয়ম-নীতি মেনে চলা যায়, তাহলে তারাও অন্য বাচ্চাদের মতো স্বাচ্ছন্দ্যে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।তিনি ভাবতেন, একজন রোগীর রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ডাক্তার নয়, এক্ষেত্রে রোগী নিজে, পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। তাই সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। রোগীর প্রতি তার ব্যবহার ছিল পিতৃসুলভ। প্রতিটি রোগীই হয়ে উঠত তার আত্মার আত্মীয়। তিনি তাদের প্রতি এত বেশি সহানুভূতিশীল ও আন্তরিক ছিলেন যে, যে কেউ দেখলে ভাবতেন—উক্ত রোগী বুঝি তার নিকট আত্মীয়।কোনো রোগী তার কাছে আসলে তিনি প্রথমে রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তারপর যথাযথ ব্যবস্থা করে রোগীর সমস্যা সমাধান করে অন্য কাজে মনোনিবেশ করতেন। অথচ আজ এ ধরনের কর্মতৎপরতা একেবারেই অনুপস্থিত। তার সফল কাজের মূলেই ছিল ডায়াবেটিক রোগীর রোগ নিয়ন্ত্রণ করা ও সকলকে সচেতন করা।তিনি প্রতিষ্ঠানের সকলকে বলতেন চিকিৎসাসেবাকে চাকরি হিসেবে না নিয়ে সেবা হিসেবে নিতে হবে। চিকিৎসকেরা রোগীকে ব্যবস্থাপত্র লিখে দেবার পর তিনি জানতে চাইতেন সেই রোগীর নির্দেশিত ওষুধ কেনার সামর্থ্য আছে কিনা। রোগের বাইরেও রোগীর পারিবারিক ইতিহাস জানার আগ্রহ তার বরাবর ছিল। তিনি মনে করতেন রোগীর পারিবারিক অবস্থান জানা থাকলে চিকিৎসা করা সহজ হয়। রোগী যদি ডাক্তারকে বিশ্বাস করে তাহলে রোগীর মনোবল বৃদ্ধি পায় বলে তার ধারণা।রোগাক্রান্ত, অসহায়, আর্ত পীড়িত মানুষ যাতে সুস্থ-কর্মঠ এবং সম্মানের সাথে বাঁচতে পারে সেই লক্ষ্যেই সারাজীবন কাজ করে গেছেন। তিনি নিজে রোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের সুন্দরভাবে রোগের জটিলতাগুলো বুঝিয়ে বলতেন। যাতে রোগী ও পরিবারের সদস্যগণ রোগ নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট হয়। জটিলতাগুলো হলো—অন্ধত্ব, কিডনির রোগ, যক্ষ্মা, হৃদরোগ, পক্ষাঘাত, মাড়ির রোগ, গর্ভপাত ইত্যাদি।তিনি বলতেন রোগীর প্রতি সহানুভূতি থাকাটা বড় কথা নয়, থাকতে হবে সমানুভূতি। রোগীর যন্ত্রণাকে নিজের যন্ত্রণা মনে করলেই সেই সেবক হবে সার্থক ও সফল। তার অভিমত হলো, একজন ব্যবসায়ীর টাকা উপার্জনের নেশা আর একজন ডাক্তারের টাকা উপার্জনের নেশা কখনোই এক হতে পারে না। আবার রোগ ভালো না করে টাকা নেওয়াটাকে তিনি লজ্জাজনক মনে করতেন। একারণেই আজীবনের রোগ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা বিনা পয়সায় করতেন। যাতে রোগীর ব্যয়ভার কিছুটা লাঘব হয়।ডাক্তারদের শিক্ষাদানের সময় বলতেন, প্রতিটি রোগীই তোমার পাঠ্যবই। রোগের সমাধান কল্পে যা তুমি শিখবে সেটাতেই তোমার চিকিৎসাবিদ্যার অনেক জ্ঞান অর্জিত হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি প্রদীপ থেকে শত শত প্রদীপ জ্বালালে যেমন আলো এতটুকু কমে না। তেমনি তোমার শিক্ষার আলো যত বেশি দান করা যাবে ততই মঙ্গল। এতে চারদিক হবে আলোকিত।বারডেম হাসপাতালের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে যদি বেলা ২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে যেতে দেখতেন, তখন তিনি বলতেন, এই যে গন্ডারের মতো ছুটছিস কেন? আগে আমার রোগী, তারপর তোর ঘর সংসার। রোগী চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাবে, এটা তিনি কিছুতেই সহ্য করতেন না। কতদিন এমন হয়েছে—ছুটি হয়েছে, বাড়ির পথ ধরেছি, সেখান থেকে তার ডাকে ফিরে এসেছি। তার সান্নিধ্যে এসে আমাদের মানসিকতা এমনভাবে গড়ে উঠেছিল যে, আমরা এতে কেউ বিরক্ত হতাম না। কর্তব্য মনে করেই ফিরে আসতাম। কখনও মনে হলে তিনি ছুটির দিনেও আমাদের ডেকে পাঠাতেন।তিনি বলতেন, রোগীরা আমার মেহমান। তবে সে বেড়াতে আসেনি, তার কপাল খারাপ, তাই সে আমাদের কাছে এসেছে। আমাদের উচিত তাকে সাহায্য করা। তার ক্ষেত্রে বলা যায়, মহৎ মানুষের হৃদয় আকাশের চাইতে বড় আর সাগরের চাইতে গভীর হয়।তার সময়ে ডায়াবেটিস আছে এবং চাকরি প্রয়োজন, সে সমস্ত ব্যক্তিকে ডায়াবেটিক হাসপাতালে চাকরি দিয়েছেন। এই কারণে অনেক রোগী চিকিৎসা নিতে এসে আমাদের প্রশ্ন করতেন—‘আপনার কি ডায়াবেটিস আছে? শুনেছি ডায়াবেটিস থাকলে সহজেই এখানে চাকরি হয়ে যায়।’ রোগীদের এ ধরনের কথায় লজ্জা পেতাম ঠিকই, কিন্তু এই ভেবে ভালো লাগত যে, তিনি বেকার ডায়াবেটিক রোগীদের কথা ভাবতেন বলেই আজ তারা এখানে চাকরি করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, জীবনকে নতুন করে ভাবতে শিখেছেন।তিনিই প্রথম বলেছেন, নিয়ম-নীতি মেনে মনে চললে ডায়াবেটিস কোনো রোগই নয়। রোগীদের সমস্যা নিরূপণে সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। যাতে কোনো ভুল-ত্রুটি না হয়। তিনি বলতেন, আমরা গরিব হলেও সেবার মান নিম্ন হবে তা হতে পারে না। তিনি রোগীর ব্যবস্থাপত্রে অল্প ওষুধ দেওয়া পছন্দ করতেন।বাংলাদেশের ডাক্তারদের মধ্যে ডা. মো. ইব্রাহিমই প্রথম জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা পেয়েছেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে তিনি একটি বিপ্লবের সূচনা করে গেছেন। যে রোগটি মানুষের অজানা ছিল, চিকিৎসাও ছিল না অথচ রোগটি মানুষের দেহে বাসা বেঁধে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিত। সেই রোগ চিহ্নিত করে তার উপশমের ব্যবস্থা করে দিয়ে মানুষকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পথ বাতলে দিয়েছেন। যদিও এটি সারাজীবনের রোগ তবুও একে নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্মময় জীবনযাপন সম্ভব করে তুলেছিলেন।তার জীবনযাপন প্রণালী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যারা মূর্খ, কোনো কালেই কিছু করবে না, তারাই শুধু বলে অসম্ভব। আসলে অসম্ভব বলে কিছু নেই—থাকতেও পারে না। যদি চেষ্টা থাকে, ইচ্ছা থাকে, মানুষ সে লক্ষ্যে পৌঁছুবেই। যত বাধা-বিপত্তিই আসুক না কেন, শাহবাগের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ১৬ তলা বিশিষ্ট বারডেম হাসপাতালের ইমারতটি তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।[লেখক: সাবেক চিফ নিউট্রিশন অফিসার ও বিভাগীয় প্রধান, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল এবং সভাপতি, ডায়াবেটিস নিউট্রিশনিস্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ]

নিরাপত্তা জোটে যোগ দেওয়ার আগে চাই স্বার্থের নির্মোহ হিসাব

৭ আগস্ট ২০২৬ সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করেন। চুক্তির মূল শর্ত, তিন দেশের যে কোন একটিতে সশস্ত্র হামলা হলে তা তিন দেশের ওপর হামলা বলে গণ্য হবে। ভিত্তি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হওয়া সৌদি-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। সৌদি বলছে এটি প্রতিরক্ষামূলক, নির্দিষ্ট কোন দেশকে টার্গেট করে নয়। তুরস্ক বলছে এটি ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো, তবে এখনো স্থায়ী কমাণ্ড বা সদর দপ্তর নেই। ওআইসি একে স্বাগত জানিয়েছে এবং মিসর, কাতার, কুয়েতসহ আরও দেশকে যুক্ত করার আলোচনা আছে। এর মধ্যেই তুরস্কে তিন দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের প্রথম বৈঠক হয়েছে। সেখানে যৌথ মহড়া ও প্রযুক্তি সহযোগিতার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।কিন্তু আগ্রহ আর মাঠের বাস্তবতা এক নয়।সম্মিলিত প্রতিরক্ষা মানেই স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা নয়, এটা ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে। ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা করলে পাকিস্তান আমেরিকাকে ভূখণ্ড দিতে বাধ্য হয়েছিল। চুক্তি থাকলেও চুক্তিবদ্ধ দেশগুলো জোটবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে না। ইরান-আমেরিকার যুদ্ধে ন্যাটোর সব সদস্য আমেরিকার পক্ষে একসাথে যুদ্ধে নামেনি ; স্পেন আমেরিকাকে নিজ ভূমি ব্যবহার করতেই দেয়নি। মক্কা চুক্তির ভাষাও একই রকম শর্তসাপেক্ষ। হামলা হলে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে তা পরিস্থিতি অনুযায়ী আলোচনায় ঠিক হবে। অর্থাৎ বাধ্যবাধকতা নমনীয়। নমনীয় নিরাপত্তা মানে রাজনীতির দরকষাকষি, আর দরকষাকষিতে ছোট দেশের পাল্লা হালকা। ইউক্রেনের উদাহরণ সামনে। ন্যাটোর ছায়া চেয়ে ইউক্রেন আজ ধ্বংস দেখছে।এই জোট কার বিরুদ্ধে, সেটাও স্পষ্ট নয়। সৌদির উদ্বেগ ইরান, পাকিস্তানের উদ্বেগ ভারত ও আফগান সীমান্ত, তুরস্কের উদ্বেগ সিরিয়া ও কুর্দি ইস্যু। তিনটি ভিন্ন শত্রু, চুক্তি একটি। গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের সময় এই তিন দেশের যৌথ সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। জর্ডান বরং ইসরায়েলকে বাঁচাতে আকাশ প্রতিরক্ষা চালিয়ে ইরানের সব ক্ষেপনাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করেছে। তাহলে যে জোট ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না, সে জোট মুসলিম বিশ্বের ‘কমন শত্রু’র বিরুদ্ধে কীভাবে লড়বে? আবার তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য। ফলে আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ তার নেই। শেষ পর্যন্ত এই জোটের প্রধান চাপ গিয়ে পড়তে পারে ইরানের ওপর, যা সৌদির রাজনৈতিক অগ্রাধিকার।বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও জটিল। আমরা পানির দেশ, ভারত উজানের। সিন্ধু চুক্তি স্থগিত হওয়ায় পাকিস্তান আজ চাপে। কাল যদি ভারত-পাকিস্তান সংঘাত বাধে, চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে কি পাকিস্তানের পক্ষে যেতে হবে? পাকিস্তান-আফগানিস্তান কয়েক মাস আগেও সংঘর্ষে জড়িয়েছে। তখন কি বাংলাদেশকে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে? মায়ানমার ইস্যুতে চীনের ঘনিষ্ঠ পাকিস্তান কি বাংলাদেশের জন্য ঝাঁপাবে? এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর নেই। কারণ প্রতিটি দেশ নিজের স্বার্থ আগে দেখবে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ নিরাপত্তা চুক্তিতে থেকেও নিজেকে অনিরাপদ ভাবছে বলেই নতুন জোট খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে রক্ষা করতে না পারলে পাকিস্তান-তুরস্ক কীভাবে পারবে?সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অবশ্যই অন্য কোন দেশের অনুমোদননির্ভর হবে না। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নিজের নিরাপত্তা অংশীদার নিজেই নির্ধারণ করার অধিকার রাখে। আমাদের দরকার খাবার, বিদ্যুৎ, পানি, বাণিজ্য ও জলবায়ু নিরাপত্তা। ইরানের তেল আছে, যুদ্ধের পর পুনর্গঠন করতে পারবে। বাংলাদেশের সে সামর্থ্য নেই। চুক্তিবদ্ধ জোটের একটি ভুলের কারণে অবরোধ আরোপ বা বিনিয়োগ প্রত্যাহার হলে তার খেসারত আমাদেরই দিতে হবে। কুয়েত পাকিস্তানের সঙ্গে যেমন চুক্তি করছে, আবার ভারতের সঙ্গেও করছে। এটাই বাস্তব কূটনীতি, ভারসাম্য। একপাক্ষিক সামরিক ছাতায় ঢুকলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবেশীর কাছে ‘ঝুঁকি’ হয়ে উঠব। তখন সীমান্ত, পানি, বিদ্যুৎ, বাণিজ্যে চাপ বাড়বে।যৌথ রক্ষাকবচের নামে সার্বভৌমত্বের ক্ষয়ও হবে। ন্যাটোভুক্ত অনেক দেশে যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটি বসিয়ে খরচ আদায় করে। মক্কা চুক্তিতে যৌথ গবেষণা, ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা বিনিময়ের কথা আছে। তুরস্কের বৈঠকে এর রূপরেখাও ঠিক হয়েছে। শুনতে ভালো, কিন্তু এর মানে ক্রয়-নীতি ও প্রশিক্ষণও সমন্বয়ে চলবে। আমাদের সিদ্ধান্তের জায়গা ছোট হয়ে আসবে। ফারাক্কা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ফোরাম থেকে সরে আসতে হয়েছিল বাইরের চাপে। আবার যদি কোনো জোটের স্বার্থে আমাদের কণ্ঠ চুপ করানো হয়, সেটি হবে দ্বিতীয় ফাঁদ। জোটের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। স্থায়ী কমাণ্ড নেই। সংকটের সময় বসে সিদ্ধান্ত নিতে নিতে দেরি হয়ে যাবে। ‘একজনের ওপর হামলা সবার ওপর’ চালু হলে বাংলাদেশ অকারণে শত্রু বাড়াবে। বন্ধু বাড়াতে গিয়ে শত্রু আমদানি করা সবচেয়ে বড় ভুল।মক্কা চুক্তি তিন দেশের জন্য একটি রাজনৈতিক বার্তা হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি ব্যয়বহুল বিভ্রম। যুদ্ধ আমাদের মিশন নয়, ভিশনও নয়। আমাদের ভিশন স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত। জোটে নাম লেখানোর আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে,-এই চুক্তি আমাদের পেট ভরবে, নাকি পেটের ভাত কেড়ে নেবে? নিরাপত্তা মানে শুধু অস্ত্র নয়। নিরাপত্তা মানে অর্থনীতি, কূটনীতি ও জনগণের আস্থা।আমেরিকার সঙ্গে অসম বাণিজ্য চুক্তির তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। তাই মক্কার ছায়া প্রয়োজন বলেই অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া যাবে না। বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা দিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আদিবাসী নেই! আদিবাসী আছে!

গত ১১ আগস্ট রাজধানী ঢাকায় একটি গোলটেবিল বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের একটিই পরিচয়—আমরা সবাই ‘বাংলাদেশি’। এখানে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই। আমরা সবাই বাংলাদেশের ‘অধিবাসী’। সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে সুরক্ষিত।” তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী সেখানে বলেছেন, “বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এবং অযৌক্তিক। এই আন্তর্জাতিক পরিভাষা ব্যবহারের পেছনে এক ধরনের ‘পূর্বপরিকল্পিত ফাঁদ’ বা ভূরাজনৈতিক এজেন্ডা থাকতে পারে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।”প্রশ্ন হচ্ছে, ‘আদিবাসী’ শব্দটি যদি এতটাই অপ্রাসঙ্গিক ও অযৌক্তিক হয়, তাহলে অতীতে রাষ্ট্র ও রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে এই শব্দের ব্যবহার হলো কীভাবে? বিএনপির নেত্রী ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করে বাণী দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছিলেন, সুযোগ এলে সংবিধান সংশোধন করে আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা, আয়কর আইন ২০২৩, অর্থ আইন ১৯৯৫ এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-সহ বিভিন্ন আইন ও নীতিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণের বিশেষ বিধান রয়েছে।২০২৬ সালের বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘দেশব্যাপী কর্মসংস্থান’ শিরোনামের ‘সমঅধিকার ও অন্তর্ভুক্তি’ অংশে বলা হয়েছে, ‘বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি, হরিজন, তৃতীয় লিঙ্গ, দলিত, আদিবাসী এবং পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি ও বেসরকারি খাতকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে বাস্তবমুখী নীতি প্রণয়ন করা হবে।’ বর্তমান ডেপুটি স্পিকার বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে ও সংসদে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও প্রকৃতি, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র‍্যে সমৃদ্ধ। এই ভূখণ্ডের মাটির সঙ্গে বহু জনগোষ্ঠীর রয়েছে দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্ক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এখানেই বসবাস করে আসছেন। অথচ রাজনৈতিক, আইনি ও সামাজিক এক জটিলতার কারণে আজ এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।কাগজে-কলমে ‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে আপত্তি থাকলেও বাস্তবতার বাংলাদেশে এসব জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পরিভাষায় তাদের ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ ইত্যাদি পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়। এর পর থেকেই পরিচয়ের প্রশ্নে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে—রাজপথে, সেমিনারে, আলোচনা সভায় সর্বত্রই। প্রতিবছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে তারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, সংস্কৃতি ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়, সাহিত্যের পাতায় এবং বাস্তবতার জমিনে ‘আদিবাসী’ পরিচয়টি তাই টিকে আছে।রাষ্ট্রীয় পরিভাষা যা-ই হোক, দেশের গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন এবং ইতিহাস-সংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনায় ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলে ‘আছে’ এবং ‘নাই’-এর এই দোলাচলের পেছনে একটি গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট রয়েছে বলেই মনে হয়। রাষ্ট্রের একটি আশঙ্কা হতে পারে যে, ‘আদিবাসী’ শব্দটির সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক আইন ও অধিকার কাঠামোর আলোকে ভূমি, সংস্কৃতি, স্বায়ত্তশাসনসহ নানা প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসতে পারে। কিন্তু সম্ভাব্য রাজনৈতিক বা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় কি কোনো জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা যায়? জাতীয় ঐক্য রক্ষা এবং নাগরিকের স্বতন্ত্র পরিচয় স্বীকার—এই দুটি বিষয়কে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখারও কোনো কারণ নেই।সাঁওতাল, উরাঁও, কোল, কোডা, মাহালী, রাজোয়াড়, তুরী, সিং, পাহান, মুণ্ডা ও মালপাহাড়িয়ার মতো বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রসীমা প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই বরেন্দ্রভূমি ও সমতল অঞ্চলে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে বসবাস করে আসছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করেছে, যেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত ভূমি ও সংস্কৃতি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধেও বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ অংশ নিয়েছেন; স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাদেরও অবদান রয়েছে। সমতল ও পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সামাজিক রীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনার কাঠামো রয়েছে। অনেকের নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও রয়েছে। ফলে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়কে স্বীকার করা বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈচিত্র‍্যকেই স্বীকার করা।মন্ত্রীদ্বয়ের বক্তব্যের পর আদিবাসী সংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, পরিচয় ও নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অস্বীকার করা ইতিহাস বিকৃতির শামিল। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। বাস্তবতা হলো, শুধু নাম বদলে দিলে মানুষের সংকট বদলে যায় না। সাঁওতাল, উরাঁও, কোল, কোডা, মাহালী, মুণ্ডা, মালপাহাড়িয়া, পাহান, রাজোয়াড় ও তুরীসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ, ভূমি হারানো, ভাষা ও সংস্কৃতি হারানোর মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন—এমন খবর প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে আসে। স্বাধীনতার এত বছর পরও যদি তাদের নিজেদের পরিচয় ও অধিকার নিয়ে লড়াই করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় পরিভাষার বিতর্কের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাদের বাস্তব অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন।রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের ‘আদিবাসী’ বলা হবে, নাকি ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’—এই বিতর্কের একটি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দিক অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, পরিচয়ের প্রশ্নটি মানুষের মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত। একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ভূমির অধিকার, শিক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ, বৈষম্য দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া শুধু পরিভাষা পরিবর্তন করে সমস্যার সমাধান হবে না।বাংলাদেশকে যদি প্রকৃত অর্থেই একটি অসাম্প্রদায়িক, বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে দেশের বৈচিত্র‍্যকে স্বীকার করতেই হবে। জাতীয় পরিচয় সবার জন্য অভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সেই অভিন্ন পরিচয়ের ভেতরেও ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জাতিগত পরিচয়ের বৈচিত্র‍্য থাকতে পারে। তাই ‘আদিবাসী’ শব্দটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে অস্বীকার বা দমন করার পরিবর্তে সংবিধান, আইন, ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আলোকে একটি সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রীয় অবস্থান নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে তাদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই হবে একটি পরিণত, ন্যায়ভিত্তিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের পরিচয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

জ্বালানি সংকট সমাধানে চাই দীর্ঘমেয়াদি পথনকশা

বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। এটি এখন জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন, কৃষি, বিনিয়োগ, নগর উন্নয়ন, পরিবহন, পরিবেশ এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় উন্নয়ন প্রশ্ন।বাংলাদেশের প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, শিল্পখাত ও সরকারের সমন্বয়ে অন্তত আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের একটি বাস্তবসম্মত জাতীয় জ্বালানি পথনকশা তৈরি করা।শুধু উৎপাদন নয়, বিদ্যুৎ ব্যবহারের সময়ও গুরুত্বপূর্ণআমাদের আলোচনায় প্রায়ই প্রশ্ন আসে, দেশে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কখন বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি?দিনের সব সময় বিদ্যুতের চাহিদা সমান নয়। সন্ধ্যায় যখন ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ে, দোকানপাট খোলা থাকে এবং শিল্পকারখানাও উৎপাদনে থাকে, তখন জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়ে যায়। ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল বাড়লে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক যানবাহন চার্জ দেওয়াও নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। তাই সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ও কম চাহিদার সময় অনুযায়ী বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু করা যেতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল চার্জ, কৃষির সেচ পাম্প এবং যেসব শিল্পে সম্ভব, তাদের কিছু কার্যক্রম কম চাহিদার সময়ে স্থানান্তরে আর্থিক সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।কৃষকদের জন্য নির্দিষ্ট কম চাহিদার সময়ে সেচের বিদ্যুতে বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথাও ভাবা যায়। এতে কৃষকের ব্যয় কমবে এবং জাতীয় ব্যবস্থার ওপর চাপও কমবে।একই সঙ্গে দিনের আলোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, ঋতু, মানুষের জীবনযাত্রা, ধর্মীয় কার্যক্রম, ব্যবসা ও পরিবহন বিবেচনায় সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কিছু ব্যবসার সময় মৌসুমভিত্তিক পরিবর্তন করলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয় কি না, তা পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করা যেতে পারে।বড় শিল্পকে জ্বালানি নিরাপত্তার অংশীদার করতে হবেএকটি বড় শিল্পকারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চল বা বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে উঠলে বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তা ও অন্যান্য সরকারি অবকাঠামোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হয়। তাই বড় উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের সময় একটি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা উচিত।বড় শিল্পের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি নির্দিষ্ট অংশ নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ সঞ্চয় বা অন্য গ্রহণযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার বিধান বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো প্রকল্পের কারণে নতুন বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র বা বিতরণ অবকাঠামো প্রয়োজন হলে উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ ও যৌক্তিক নিয়মে সেই ব্যয়ের একটি অংশ বহন করতেও বলা যেতে পারে।অর্থাৎ, যে উন্নয়ন নতুন জ্বালানি চাহিদা সৃষ্টি করবে, তাকে সেই চাহিদা সামাল দেওয়ার ব্যবস্থারও অংশীদার হতে হবে।প্রতি ১০টি বা ২০টি বাড়ির জন্য যৌথ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাবাংলাদেশের জমি সীমিত। তাই শুধু বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, ছাদ ও স্থানীয় পর্যায়ের বিদ্যুৎ উৎপাদনকে গুরুত্ব দিতে হবে।নতুন আবাসিক এলাকায় প্রতি ১০ বা ২০টি বাড়ির জন্য যৌথ সৌরবিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ সঞ্চয়ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে। দিনে উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্থানীয়ভাবে ব্যবহার হবে, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করা যাবে অথবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকলে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় দেওয়া যাবে।মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, গির্জা এবং অন্যান্য উপাসনালয়ের বিপুল ছাদকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। নতুন বড় উপাসনালয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখা এবং পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ অর্থায়নের মাধ্যমে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। একই নীতি বিদ্যালয়, কলেজ, হাসপাতাল, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং সরকারি ভবনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব।প্রয়োজন জাতীয় ‘বিদ্যুৎ ভান্ডার’সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের বড় সীমাবদ্ধতা হলো সব সময় সমান উৎপাদন হয় না। তাই ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ধরে রাখার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বড় ব্যাটারিভিত্তিক বিদ্যুৎ সঞ্চয়কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। চাহিদা কম অথচ উৎপাদন বেশি হলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সেখানে সংরক্ষণ করা হবে। আবার সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদা, হঠাৎ কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়া বা জরুরি পরিস্থিতিতে সেই বিদ্যুৎ জাতীয় ব্যবস্থায় ফেরত দেওয়া যাবে। এগুলো এক ধরনের ‘বিদ্যুৎ ভান্ডার’ হিসেবে কাজ করবে।সরকারের পাশাপাশি যথাযথ নীতিমালার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীকেও এমন সঞ্চয়কেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের কাছেও এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু আমরা কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করি তার ওপর নয়, প্রয়োজনের জন্য কতটা বিদ্যুৎ ধরে রাখতে পারি তার ওপরও নির্ভর করবে।নদী, বৃষ্টি, সূর্য ও মৌসুমি প্রকৃতিকে কাজে লাগাতে হবেবাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। আমাদের নদী, খাল-বিল, হাওর, বৃষ্টিপাত ও মৌসুমি আবহাওয়াকে শুধু দুর্যোগের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। এগুলোকে কীভাবে জ্বালানি ও পানি নিরাপত্তার অংশ করা যায়, তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।সব নদীতে বড় বাঁধ বাস্তবসম্মত নয়। তবে কোথায় ছোট আকারের জলবিদ্যুৎ বা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, তা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা যেতে পারে। উপযুক্ত জলাশয়ে ভাসমান সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা যায়, অবশ্যই মৎস্যসম্পদ, নৌচলাচল, জীববৈচিত্র‍্য ও স্থানীয় জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করে।একইভাবে বর্ষার বিপুল পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা প্রয়োজন। নতুন বড় আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপের পাশাপাশি পানি উত্তোলন ও সরবরাহে ব্যবহৃত বিদ্যুতের চাহিদাও কমবে। নদী, বৃষ্টি, সূর্য ও বাতাসকে শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারযোগ্য জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে।জ্বালানি সাশ্রয়ও এক ধরনের উৎপাদননতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি অপচয় কমানোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিপুল অর্থ, জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু উন্নত ভবন নকশা, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, দক্ষ শীতাতপ ব্যবস্থা, কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী যন্ত্রপাতি এবং উন্নত শিল্পযন্ত্রের মাধ্যমে চাহিদা কমানো অনেক ক্ষেত্রে আরও সাশ্রয়ী। তাই সাশ্রয় করা বিদ্যুৎও এক অর্থে উৎপাদিত বিদ্যুৎ।প্রয়োজন জাতীয় টেকসই জ্বালানি সূচকআমার পিএইচডি গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র জ্বালানি, পরিবেশ ও পানির টেকসই উন্নয়ন সূচক। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় টেকসই জ্বালানি সূচক কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।শুধু কত মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে তা দিয়ে সাফল্য বিচার না করে দেখতে হবে, জ্বালানির কত অংশ নিজস্ব উৎস থেকে আসছে, আমদানিনির্ভরতা কত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ কত, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রকৃত ব্যয় কত, অপচয় কত, বিদ্যুৎ বিভ্রাট কতক্ষণ হচ্ছে এবং সাধারণ পরিবার ও শিল্পের জন্য জ্বালানি কতটা সাশ্রয়ী।যা আমরা নিয়মিত পরিমাপ করি না, তা কার্যকরভাবে উন্নত করাও কঠিন।শেষ কথাবাংলাদেশের প্রয়োজন ২০৩০, ২০৪০ এবং ২০৫০ সালকে সামনে রেখে একটি সমন্বিত জাতীয় জ্বালানি পথনকশা। সেখানে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, সৌর ও বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ সঞ্চয়, বৈদ্যুতিক যানবাহন, কৃষি, শিল্প, পানি এবং জ্বালানি সাশ্রয়কে একই পরিকল্পনায় আনতে হবে।বাংলাদেশ চাইলে বর্তমান সংকট থেকেই ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী পথ তৈরি করতে পারে। প্রয়োজন খণ্ডিত সিদ্ধান্তের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অনুমানের পরিবর্তে তথ্য ও গবেষণা এবং একক প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সরকার, বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ।জ্বালানি শুধু আলো জ্বালানোর বিষয় নয়। এটি কৃষকের উৎপাদন, শিল্পের শক্তি, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, হাসপাতালের নিরাপত্তা, বিনিয়োগের আস্থা, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ভিত্তি। তাই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা আসলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশেরই পরিকল্পনা।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক:ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, অস্ট্রেলিয়ান লোকাল গভর্নমেন্ট; পিএইচডি গবেষক, সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া]

মেধা না বিশেষ সুবিধা: কোন পথে ঢাবি?

একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল তার প্রাকৃতিক সম্পদ দ্বারা নির্ধারিত হয় না, বরং সেটা হয়ে থাকে তার মেধাসম্পদের বিকাশ দ্বারা। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যেসব জাতি তাদের নাগরিকদের জন্য এমন একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পেরেছে যেখানে জন্মগত সুযোগ-সুবিধা নয়, বরং মেধা, শ্রম ও যোগ্যতা সামাজিক অগ্রগতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা-সাহিত্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে যেসব সমাজে বিশেষ সুবিধা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা শ্রেণিগত অবস্থান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করেছে, সেখানে মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী ও বামপন্থি রাজনীতিবিদ মাইকেল ইয়ং (১৯১৫-২০০২) তাঁর বিখ্যাত ‘মেধাতন্ত্রের উত্থান’ (দ্য রাইজ অব দ্য মেরিটোক্রেসি, ১৯৫৮) গ্রন্থে মেধাতন্ত্রের নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন বটে, কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি নিয়ে তাঁরও কোন দ্বিমত ছিল না। সেটা হলো রাষ্ট্রকে এমন একটি কাঠামো নির্মাণ করতে হবে যেখানে সুযোগের ক্ষেত্রটি সর্বাধিক উন্মুক্ত থাকবে এবং প্রতিযোগিতার নিয়ম হবে সবার জন্য অভিন্ন। কারণ মেধা তখনই সামাজিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, যখন তা অবাধ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে স্বীকৃতি লাভ করে। স্বৈরাচারী বিরোধী বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্ন নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। চব্বিশের জুলাইয়ের গণ-আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ভাষ্যই ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং সমান সুযোগের দাবি।অ এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষার জন্য পৃথক প্রশ্নপত্র প্রবর্তনের আলোচনা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারবোধ, উচ্চশিক্ষার দর্শন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রশ্ন।বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ একটি সামাজিক চুক্তির নাম। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য বোঝা যাবে না। উপনিবেশিক শাসনামলে এবিশ্ববিদ্যালয়টির জন্ম মূলত পূর্ববঙ্গের মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের এক ধরনের ঐতিহাসিক সামাজিক চুক্তির ফসল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গের মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল শিক্ষাগত প্রতিনিধিত্ব ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে যে রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ছিল আংশিকভাবে তার প্রতিকারমূলক উদ্যোগ। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্মের সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি ধারণা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। প্রকৃতপক্ষে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সুবিধাপ্রাপ্তদের জন্য নয়; বরং যারা শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারা থেকে ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে ছিল, তাদের জন্য। এই অর্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সামাজিক গতিশীলতার একটি প্রতিষ্ঠান (ইনস্টিটিউশন অব সোস্যাল মবিলিটি)। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গ্রামের কৃষক, জেলে, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য এটি উচ্চশিক্ষা ও সামাজিক উত্তরণের প্রধান সোপান হিসেবে কাজ করেছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে প্রতিষ্ঠানটি জন্ম নিয়েছিল বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে, সেই প্রতিষ্ঠান কি এখন এমন একটি নীতি গ্রহণ করবে যা নতুন ধরনের বৈষম্যের ধারণাকে বৈধতা দেয়?গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর বাস্তবতায় ‘সমান সুযোগ’ বনাম ‘বিশেষ সুবিধা’ গণমুখী রাজনৈতিক আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনে ‘সমান সুযোগ’ (ইকুয়েলিটি অব অপরচ্যুনিটি) এবং ‘বিশেষ সুবিধা’  (প্রিভিলেজ) এই দুটি ধারণার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সমান সুযোগের অর্থ হলো, প্রতিযোগিতার দরজা সবার জন্য খোলা থাকবে এবং সাফল্য নির্ধারিত হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে। অন্যদিকে বিশেষ সুবিধা এমন একটি অবস্থা, যেখানে কোনো বঞ্চিত গোষ্ঠীকে তার পরিচয় কিংবা অবস্থান কারণে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পৃথক প্রশ্নপত্রের ধারণাটি এই কারণেই বিতর্কিত। কারণ এটি ভর্তি-পরীক্ষার্থীদের মেধার ভিত্তিতে নয়, বরং তাদের শিক্ষামাধ্যম বা শিক্ষাধারার ভিত্তিতে আলাদা শ্রেণিতে বিভক্ত করে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে শিক্ষার্থীর পরিচয় হওয়া উচিত ভর্তিচ্ছুক পরীক্ষার্থী হিসেবে; কোন বিশেষ মাধ্যম বা ধারা তথা ‘ইংরেজি মাধ্যম’, ‘বাংলা মাধ্যম’; ‘মূল ধারা’, ‘কারিগরি ও পেশাগত ধারা’, ‘মাদ্রাসা ধারা’ (আলিয়া মাদ্রাসা ও কাওমি মাদ্রাসা ধারা) নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত কে অধিক প্রস্তুত, যোগ্য ও সক্ষম এবং কে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিজ নিজ পছন্দের বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য অধিক উপযুক্ত।জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) বলেছিলেন, ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত হলো একই ধরনের পরিস্থিতিতে একই ধরনের নীতি প্রয়োগ করা। যদি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন মানদণ্ড তৈরি করা হয়, তবে ন্যায়বিচারের সেই সার্বজনীন নীতি ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। মার্কিন দার্শনিক জন রলসের (১৯২১-২০০২) ‘ন্যায়বিচার তত্ত্ব’ (এ থিয়োরি অব জাস্টিস) গ্রন্থ অনুযায়ী, বৈষম্য তখনই গ্রহণযোগ্য যখন তা সমাজের সবচেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের উপকারে আসে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখন প্রশ্ন হলো, ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা করা শিক্ষার্থীরা কি সেই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত যাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন? তথ্য-উপাত্ত বলছে, ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থা (দেশি ও বিদেশি দুটো ধারাই) দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও উচ্চশ্রেণির (এলিট) শিক্ষাধারা। এর শিক্ষার্থীরা সাধারণত তুলনামূলকভাবে উন্নত ভাষাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং বৈশ্বিক শিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে; কিন্তু নীতি নির্ধারণ ব্যতিক্রম দিয়ে নয়, সামগ্রিক বাস্তবতা দিয়ে করা হয়। সামাজিক ন্যায়বিচারের আলোকে দেখলে, বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন যদি কোথাও থাকে, তবে তা অপেক্ষাকৃত প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য; সেই গোষ্ঠীর জন্য নয় যারা ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত সুবিধা ভোগ করছে।ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুর্দিয়ু (১৯৩০-২০০২) দেখিয়েছেন যে শিক্ষা কেবল জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়; এটি সামাজিক ক্ষমতা পুনরুৎপাদনেরও একটি ক্ষেত্র। পরিবার থেকে প্রাপ্ত ভাষাগত দক্ষতা, সামাজিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এসবই শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ (কালচারাল ক্যাপিটাল)। এই সাংস্কৃতিক পুঁজি উচ্চশিক্ষার ভর্তি কিংবা চাকুরির প্রতিযোগিতার শুরুতেই কিছু শিক্ষার্থীকে এগিয়ে দেয়। বাংলাদেশে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার সঙ্গে এই সাংস্কৃতিক পুঁজির সম্পর্ক অস্বীকার করা কঠিন। ফলে যে গোষ্ঠী ইতোমধ্যেই তুলনামূলকভাবে বেশি সাংস্কৃতিক পুঁজির অধিকারী, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক সুবিধা সৃষ্টি করা সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে আরও জটিল করে তোলে। রাষ্ট্রের কাজ প্রতিযোগিতার মাঠকে সমতল করা; ইতোমধ্যে এগিয়ে থাকা অংশকে আরও এগিয়ে দেওয়া নয়।ভর্তি-পরীক্ষার পৃথক প্রশ্নপত্রের পক্ষে সবচেয়ে জনপ্রিয় যুক্তিটি হলো মেধাপাচার রোধ। জনসাধারণের চক্ষু ধোলায়ে (আই ওয়াশ) মেধাপাচারের সমস্যাটি মূলত উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগের অভাবের সাথে যুক্ত করার একটি রাজনৈতিক অপ্রয়াস মাত্র। ইংরেজি মাধ্যমকে বিশেষ সুযোগ দেওয়ার আসল বিষয়টি কিন্তু দেশে এই বিশেষ শিক্ষাধারার বাজার সম্প্রসারণ করা। অপরদিকে তথাকথিত ‘অভিজাত শ্রেণী’র ছেলেমেয়েদের জন্য বিশেষ কায়দায় বিশেষ সুবিধা দিয়ে উচ্চশিক্ষার সার্বিক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিতে দলীয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষকরাজনীতি নিশ্চিত করা। আর রাজনৈতিক ও শ্রেণি স্বার্থে সেটা করার জন্য ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে ভুল ও ক্ষতিকর উদ্যোগ। আমাদের বুঝতে হবে যে, দেশ থেকে মেধাপাচার মূলত একটি কাঠামোগত সমস্যা; যদিও এর মূল নিহিত রয়েছে সর্বক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতার অভাবে। অপরদিকে গবেষণা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার সুযোগের অভাব, দেশি চাকুরির বাজারে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি, শিক্ষা ও প্রশাসনের রাজনীতিকিকরণ, বৈশ্বিক চাকরির বাজার, উন্নত জীবনমান এবং অর্থনৈতিক সুযোগ এসবই মেধাবীদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রধান কারণ। সে যাই হোক, কোনো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ধরন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী প্রবাহের প্রধান নিয়ামক নয়। যদি সত্যিই দেশ থেকে মেধাপাচার কমাতে হয়, তবে শিক্ষকতায় মেধাবীদের নিয়োগ নিশ্চিতকরণ, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, গবেষকদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক মান উন্নয়নই হতে পারে কার্যকর পথ।একটি বিশেষ ধারা বা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের বিশেষ ব্যবস্থায় ভর্তির বিষয়টি জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য একটি নৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, চব্বিশের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তনের প্রশ্ন ছিল না; এটি ছিল ন্যায়বিচার, মর্যাদা এবং সমান সুযোগের প্রশ্ন। সেই আন্দোলনের অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল রাষ্ট্র কোনো বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর জন্য নয়; রাষ্ট্র সকল নাগরিকের জন্য। দেশে শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তখনই তার নৈতিক বৈধতা ধরে রাখতে পারে, যখন সে প্রতিযোগিতার নিয়মকে সবার জন্য সমান রাখে এবং অন্য কোন পরিচয়কে নয়, কেবল মেধাকে ভর্তির যোগ্যতা মূল্যায়নের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সামনে সামাজিক চুক্তির নৈতিকতার প্রশ্নটি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিশ্লেষণের উপজীব্য হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামাজিক কল্পনার এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি অংশ। এর ইতিহাস সাধারণ মানুষের ইতিহাস, এর সাফল্য সামাজিক গতিশীলতার সাফল্য, আর এর নৈতিক শক্তি নিহিত রয়েছে মেধার প্রতি তার অঙ্গীকারে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, অন্য সব ধারার শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিযোগিতা করবে এবং সফল হবে। কিন্তু সেই সফলতা আসা উচিত সমান প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে, বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে নয়। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দায়িত্ব কেবল শিক্ষার্থী নির্বাচন নয়; বরং সমাজকে একটি নৈতিক বার্তা দেওয়া যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ সব ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য সমান; কিন্তু স্বীকৃতি অর্জিত হবে নিজ নিজ মেধা, শ্রম এবং যোগ্যতার মাধ্যমে। আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তাই প্রশ্ন একটাই: সে কি তার শতবর্ষের প্রতিষ্ঠাদর্শন, সামাজিক ন্যায়বিচারের ঐতিহ্য এবং জনগণের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অর্জিত মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখবে, নাকি উচ্চশিক্ষায় দেশের মূলধারার শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করে বিশেষ ধারার শিক্ষার্থীদের ভর্তি সুযোগ তৈরি করার জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদানের একটি নজির স্থাপন করবে?(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

সাইবার নিরাপত্তা ও নারী

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি নতুন কিছু ঝুঁকিরও জন্ম দিয়েছে। আর সেই ঝুঁকির অন্যতম বড় ক্ষেত্র হলো সাইবার অপরাধ, যার শিকার হচ্ছেন অসংখ্য নারী। বর্তমান বিশ্ব তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগ। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের জীবন যাত্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি সেবা, বিনোদন সবক্ষেত্রেই প্রযুক্তির প্রভাব আজ সুস্পষ্ট। বাংলাদেশও ডিজিটাল রূপান্তরের পথে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। দেশের নারীরা আজ অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, মোবাইল ব্যাংকিং এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন। কিন্তু এই অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে সাইবার অপরাধের ঝুঁকি। বিশেষ করে নারী ও কিশোরীরা অনলাইন হয়রানি, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল এবং পরিচয় চুরির মতো অপরাধের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। ফলে সাইবার নিরাপত্তা এখন শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি নারীর নিরাপত্তা, সম্মান ও মানবাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাইবার নিরাপত্তা বলতে কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, তথ্য, সফটওয়্যার, নেটওয়ার্ক এবং অনলাইন অ্যাকাউন্টকে অবৈধ প্রবেশ, তথ্য চুরি, হ্যাকিং, ভাইরাস ও অন্যান্য ডিজিটাল আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখাকে বোঝায়। একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ভিডিও, আর্থিক তথ্য এবং অনলাইন পরিচয় নিরাপদ রাখা সাইবার নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে মানুষের জীবনের একটি বড় অংশ অনলাইনের সঙ্গে যুক্ত। তাই ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নারীরা নিজেদের মতামত প্রকাশ করছেন, ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এসবপ্ল্যাট ফর্মে তারা নানা ধরনের সাইবার হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অশালীন মন্তব্য, আপত্তিকর বার্তা, ভুয়া আইডি থেকে বিরক্ত করা, ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা—এসব ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। অনেক নারী সামাজিক লজ্জা, ভয় বা মানসিক চাপের কারণে এসব বিষয়ে অভিযোগও করেননা।সাইবার অপরাধের আরেকটি ভয়াবহ রূপ হলো ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাক মেইল করা। অনেক সময় ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি সংগ্রহ করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয় অথবা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করার হুমকি দেওয়া হয়। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করেও নারীদের হয়রানি করা হচ্ছে। এসব অপরাধ শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবন নয়, তার পরিবার, কর্মজীবন ও সামাজিক অবস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।ফিশিং বর্তমানে অন্যতম সাধারণ সাইবার প্রতারণা। প্রতারকরা ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বা পরিচিত কোনো সংস্থার নাম ব্যবহার করে ভুয়া বার্তা পাঠায় এবং ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড, ওটিপি বা ব্যাংক তথ্য সংগ্রহ করে। অনেকেই না বুঝে এসব তথ্য শেয়ার করেন। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল আর্থিক সেবার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে বন্ধু বা আত্মীয়দের কাছ থেকেও অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে সাইবার বুলিং একটি উদ্বেগ জনক সমস্যা। অনলাইনে অপমান, বিদ্রূপ, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে অনেককে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করাহয়। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতির মধ্যে থাকলে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং পড়াশোনায় অনীহার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই অনলাইন হয়রানিকে কখনোই ছোট করে দেখা উচিত নয়। নারীর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথমেই প্রয়োজন সচেতনতা। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, নিয়মিত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন এবং একই পাসওয়ার্ড একাধিক অ্যাকাউন্টে ব্যবহার না করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি দুইস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু রাখলে অ্যাকাউন্ট আরও নিরাপদ থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের সময় ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে সতর্ক থাকতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ব্যাংক তথ্য, ওটিপি কিংবা বাসার ঠিকানা প্রকাশ করা উচিত নয়। অপরিচিত ব্যক্তির পাঠানো লিংক, ফাইল বা অ্যাপ ডাউন লোড করার আগে অবশ্যই যাচাই করতে হবে। কারণ একটি ভুল সিদ্ধান্তই বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহার থেকে বিরত না রেখে নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহারের শিক্ষা দিতে হবে। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, যাতে তারা অনলাইনে কোনো সমস্যায় পড়লে সহজেই জানাতে পারে। অনেক সময় ভয় বা লজ্জার কারণে কিশোরীরা সমস্যার কথা গোপন রাখে, যা পরে বড় সংকটে পরিণত হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার, তথ্যের গোপনীয়তা, সাইবার অপরাধ শনাক্তকরণ এবং অনলাইন নৈতিকতা বিষয়ে নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তির সুফল গ্রহণের পাশাপাশি ঝুঁকি মোকাবিলার দক্ষতাও অর্জন করতে হবে। সরকারের দায়িত্বহলো সাইবার অপরাধ দমনে কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। ভুক্তভোগীদের জন্য সহজ অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা, আইনি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। আইন শৃঙ্খলার ক্ষাকারী বাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে তারা দ্রুত অপরাধ শনাক্ত ও দমন করতে পারে।প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পরিচালনা কারী প্রতিষ্ঠান গুলোর উচিত ভুয়া অ্যাকাউন্ট দ্রুত শনাক্ত করা, ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ করা এবং ব্যবহারকারীর অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপদ গোপনীয়তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর ডিজিটাল ক্ষমতায়নের জন্য প্রযুক্তি শিক্ষায়তাদের অংশ গ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। তথ্য প্রযুক্তি, সফটওয়্যার উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে তারা শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, প্রযুক্তির উদ্ভাবক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। এতে দেশের প্রযুক্তিখাত আরও সমৃদ্ধহবে।সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল সরকারের কাজ নয়; এটি সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে এক যোগে কাজ করতে হবে। অনলাইনে শালীন আচরণ, অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান এবং আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নারী সাইবার হয়রানির শিকার হলে তাকে দোষারোপ না করে সহযোগিতা ও আইনি সহায়তা প্রদান করা উচিত। ডিজিটাল যুগে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই দেশের উন্নয়নকে আরও শক্তিশালী করা। কারণ নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং নেতৃত্ব বিকাশ সম্ভবনয়। তাই সাইবার নিরাপত্তাকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। সচেতনতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, কার্যকর আইন এবং সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে এমন একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে প্রতিটি নারী ভয়হীনভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন, নিজের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশ করবেন এবং দেশের উন্নয়নে সমানভাবে অবদান রাখবেন। একটি নিরাপদ সাইবার পরিবেশ হতে পারে নারীর ক্ষমতায়ন এবং একটি আধুনিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।[লেখক: সহকারী মহাব্যবস্থাপক, বেসিক ব্যাংক পিএলসি]

ভূমি রক্ষার সংগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থাপনা সমতল অঞ্চলের ভূমি ব্যবস্থাপনা থেকে ভিন্ন। বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় এখন পর্যন্ত কোনো ভূমি জরিপ হয়নি। ফলে সেখানে সিএস, এমআরআর/এসএ বা আরএস—কোনো খতিয়ানই প্রস্তুত হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বংশপরম্পরায় দখলস্বত্বের ভিত্তিতে ভূমি ব্যবহার করে আসছেন। যদিও তিন জেলায় জেলা প্রশাসক রয়েছেন।এ কারণে ২০১৯ সালের ৭ এপ্রিল দৈনিক জনকণ্ঠ-এর শিরোনাম ছিল, ‘পার্বত্য এলাকায় ভূমি জরিপ ও খতিয়ানের পূর্ণাঙ্গ আইন হচ্ছে’। পার্বত্য অঞ্চলে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কারবারি রাজতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে খাজনা সংগ্রহ করেন এবং তা হেডম্যানের কাছে জমা দেন। হেডম্যান আবার তা রাজার রাজস্ব আদায়কারী ব্যক্তির কাছে জমা দেন। রাঙামাটি জেলায় চাকমা সার্কেল বা চাকমা রাজা   রয়েছেন।অন্যদিকে, সমতল অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য দীর্ঘদিনের আইন রয়েছে। সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব ১৮৫৫-৫৬ সালে ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিলেন। ইতিহাসে এ সংগ্রাম ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। ব্রিটিশ সরকার কঠোর হাতে এ বিদ্রোহ দমন করে এবং সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরবসহ অনেককে ফাঁসি দেয়। পরবর্তী সময়ে ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ সরকার বেঙ্গল টেন্যান্সি আইন প্রণয়ন করে। এ আইনের ৪৯ ধারায় আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমি-অধিকারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এর ভিত্তিতে সিএস রেকর্ড প্রস্তুত হয়।১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বিভক্ত হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তান সরকার ১৯৫০ সালে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাস করে। এর মাধ্যমে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়। ওই আইনের ৯৭ ধারায় আদিবাসীদের ভূমি হস্তান্তরের ওপর বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। এরপর পূর্ব পাকিস্তান সরকার ভূমি জরিপ শুরু করে। এ সময় প্রস্তুত করা হয় এসএ খতিয়ান। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৫ সালে দেশে নতুন করে ভূমি জরিপ শুরু হয়। এর নাম আরএস খতিয়ান; একে মাঠ খতিয়ানও বলা হয়।সমতল অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে প্রস্তুত করা খতিয়ানের মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের সিএস বা ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে, পাকিস্তান আমলের এসএ বা স্টেট অ্যাকুইজিশন এবং বাংলাদেশ আমলের আরএস বা রিভিশনাল সার্ভে। কেউ কেউ বাংলাদেশ সার্ভেকে সংক্ষেপে বিএস খতিয়ানও বলে থাকেন।আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বিভিন্ন সমস্যা থাকলেও ভূমি সমস্যা প্রধান। ভূমির অধিকার নিয়ে তাদের ওপর হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনা সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবের সময় থেকে শুরু হয়ে এখনো পরিলক্ষিত হয়।২০০০ সালের ১৮ আগস্ট নওগাঁ জেলার ভীমপুর গ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পল্লিতে ভূমি জবরদখলকে কেন্দ্র করে আলফ্রেড সরেন নিহত হন। পল্লবীর ১১টি পরিবারের বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। ভূমি জবরদখলকারীদের হামলায় নারী ও শিশুসহ প্রায় ৩০ জন আহত হন। কিন্তু নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডের মামলাটি ২৬ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি।নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলায় জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে বন্দুকের গুলিতে মিঠুন ওরাঁও (১২) নামের এক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিশোর নিহত হয়। এ ঘটনায় পুলিশ ১৬ জনকে আটক করেছে বলে জানা যায়। যে বন্দুক দিয়ে গুলি করা হয়েছিল, সেটিও জব্দ করা হয়েছে।গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জে রংপুর চিনিকলের ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর সম্পত্তি নিয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে বিরোধের সূত্র ধরে ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর সাঁওতালদের ওপর গুলি চালানো হয়। এতে শ্যামল হেমরম, মঙ্গল মারডি ও রমেশ টুডু নিহত হন। এ ছাড়া হামলা, মারধর, বসতবাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। আলামত ধ্বংসের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় বিচার কার্যক্রম চলমান।বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও ভূমি দখলের খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে খাস জলমহাল বরাদ্দের দাবিতে আদিবাসীদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও, ভূমি হারানোর আতঙ্ক, উচ্ছেদের আশঙ্কা এবং জমি দখলমুক্ত করতে না পেরে আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধার আত্মহত্যার মতো ঘটনাও সংবাদপত্রে এসেছে। এসব ঘটনা থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমি সমস্যার গভীরতা সহজেই বোঝা যায়।১৯৬৪ সালে তৎকালীন সরকার স্থাপনাসহ প্রায় ২৫ কাঠা জমি সাগরাম মাঝি ও তাঁর নামে একটি ছাত্রাবাসের জন্য বরাদ্দ দেয়। রাজশাহী নগরের সাগরপাড়া মহল্লায় অবস্থিত সাগরাম মাঝি আদিবাসী ছাত্রাবাসে বহু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছেন। সম্প্রতি স্থানীয় একটি মহল ওই জমি দখলে তৎপর হয়ে উঠেছে।ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ভূমি সমস্যা দিন দিন জটিল হচ্ছে। তাদের ভূমি রক্ষার জন্য বিভিন্ন আইন ও বিধান থাকলেও ভূমিদস্যুরা সেসবের তোয়াক্কা করছে না। ভুয়া, তঞ্চকতাপূর্ণ ও মিথ্যা দলিল কিংবা অনুমোদনহীন কাগজপত্র তৈরি করে জমি জবরদখলের অভিযোগ রয়েছে।ভূমি রক্ষা ও উদ্ধারের জন্য জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি, গণকপাড়া, সাহেববাজার, রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরে মামলা-মোকদ্দমা ও বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনটি ১৯৯৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়। ভূমি সমস্যা সমাধান এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের উন্নয়ন ও টিকে থাকার লক্ষ্যে তাদের এ সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। অনেক জ্ঞানী-গুণী, চিন্তাবিদ ও গবেষক মনে করেন, ভূমি সমস্যা সমাধান এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার ও উন্নয়নের জন্য জাতীয় আদিবাসী পরিষদের এই সংগ্রাম প্রশংসার দাবিদার।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

ভিডিও আরও দেখুন

দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের টেস্ট দল ঘোষণা অস্ট্রেলিয়ার

দীর্ঘদিন ধরে রানখরায় ভুগলেও মারনাস লাবুশেনের ওপরই আস্থা রাখল অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আসন্ন তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজের জন্য ঘোষিত ১৬ সদস্যের দলে জায়গা ধরে রেখেছেন এই ব্যাটার। সর্বশেষ বাংলাদেশ সিরিজেও ব্যর্থ হওয়ায় লাবুশেনের বাদ পড়া নিয়ে জোরালো গুঞ্জন ছিল, তবে নির্বাচকেরা অভিজ্ঞতার ওপরই ভরসা রেখেছেন।আগামী অক্টোবর মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে শুরু হতে যাওয়া এই সিরিজের জন্য প্যাট কামিন্সকে অধিনায়ক করে শক্তিশালী দল ঘোষণা করেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ)। বাংলাদেশের বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজে না থাকলেও প্রোটিয়া কন্ডিশন বিবেচনায় দলে ফেরানো হয়েছে কুপার কনোলি, স্পিনার ম্যাথিউ কুনেম্যান ও পেসার মাইকেল নেসারকে।লাবুশেনকে নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ের পর থেকে টেস্টে তার ব্যাটে কোনো সেঞ্চুরি নেই। গত ২২ টেস্টে তার ব্যাটিং গড় ৩০-এর নিচে। সাবেক ক্রিকেটারদের অনেকেই তাঁকে দল থেকে বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিলেও বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (ডব্লিউটিসি) মহাগুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের আগে কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি অজি নির্বাচকেরা।পেস আক্রমণে কামিন্সের সঙ্গে থাকছেন অভিজ্ঞ জশ হ্যাজলউড, মিচেল স্টার্ক ও স্কট বোলান্ড। স্পিন বিভাগে নাথান লায়নের সঙ্গী কুনেম্যান। ২০১৮ সালের বিতর্কিত সফরের পর এই প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট খেলবে অস্ট্রেলিয়া। সেই সফরের মাত্র ৫ জন সদস্য বর্তমান দলে রয়েছেন।বর্তমানে ডব্লিউটিসি পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া এবং দ্বিতীয় স্থানে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা। সিরিজের প্রথম টেস্ট শুরু হবে আগামী ৯ অক্টোবর ডারবানে।অস্ট্রেলিয়া টেস্ট স্কোয়াড:প্যাট কামিন্স (অধিনায়ক), স্কট বোলান্ড, অ্যালেক্স ক্যারি, কুপার কনোলি, ক্যামেরন গ্রিন, জশ হ্যাজলউড, ট্রাভিস হেড, জশ ইংলিস, ম্যাথিউ কুনেম্যান, মারনাস লাবুশেন, নাথান লায়ন, মাইকেল নেসার, ম্যাথিউ রেনশ, স্টিভ স্মিথ, মিচেল স্টার্ক ও বিউ ওয়েবস্টার।/ 

দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের টেস্ট দল ঘোষণা অস্ট্রেলিয়ার