সংবাদ
গ্যাস-সংকট ভোগাবে আরও ২-৩ দিন, আশ্বাস জ্বালানি মন্ত্রীর

গ্যাস-সংকট ভোগাবে আরও ২-৩ দিন, আশ্বাস জ্বালানি মন্ত্রীর

কক্সবাজারের মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনাল থেকে আবার জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর বুধবার (৫ আগস্ট) দিবাগত রাত ৩টার পর টার্মিনালটির একটি ইউনিট পুনরায় চালু করা হয়। তবে আরেকটি ইউনিট বন্ধ আছে।পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে দৈনিক ১১ কোটি ৫০ লাখ (১১৫ মিলিয়ন) ঘনফুট হারে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। সামিটের এফএসআরইউ থেকে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৫৫ কোটি ঘনফুট। এতে আমদানি করা এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ঘনফুট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এই দুটি টার্মিনাল থেকে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস পাওয়া কথা। সূত্র বলছে, এক্সিলারেটের টার্মিনালটির কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করা হচ্ছে। আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে এটি আরও বেশি সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কার্গো পাওয়া গেলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়বে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের সংকটও ধীরে ধীরে কমতে পারে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবাসিকে রান্নার চুলায় গ্যাসের চাপ কোন কোন এলাকায় বাড়লেও অনেক এলাকায় এখনো চাপ কম তবে চুলা জ্বলছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও পর্যাপ্ত চাপ ফিরে না আসলেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। সিএনজি (সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস) নিতে আসা যানবাহনের ভীড় আগের চেয়ে কমেছে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বৃহস্পতিবার রাতে সংবাদকে বলেন, ‘গত কয়েকদিন অনেক স্টেশন গ্যাস একেবারেই পাচ্ছিল না। এখন কিছুটা পাওয়া যাচ্ছে। এতে সরবরাহ সংকট কমতে শুরু করেছে।’চলমান গ্যাস সংকটের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বিকেলে সচিবালয়ে সাংবদিকদের বলেন, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে সারাদেশে গ্যাসের সরবরাহ ‘স্বাভাবিক হবে’।তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) বর্তমানে ফ্রিজিং চলছে। ফ্রিজিং শেষ হলে বিকেল থেকেই গ্যাস সঞ্চালন শুরু হবে। এর ফলে গ্যাসের অভাবে বন্ধ থাকা পাওয়ার স্টেশনগুলো আবারও চালু হবে। তবে আগের মতো গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে অন্তত দুই থেকে তিন দিন লাগবে।’গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে সেটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়। আমদানি করা এলএনজির সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় দেশজুড়ে গ্যাসের চাপ কমে যায়। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন আবাসিক গ্রাহক, শিল্প উদ্যোক্তা ও সিএনজি ব্যবহারকারীরা। একই সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংও বেড়ে যায়।বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ হয় প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে প্রায় ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এক্সিলারেটের টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় সেই সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, এলএনজি টার্মিনালের একটি ইউনিট চালু হওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হলেও সংকট পুরোপুরি কাটতে এখনও কয়েক দিন সময় লাগবে। কারণ টার্মিনালটি এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। পাশাপাশি নিয়মিত এলএনজি কার্গো খালাস নিশ্চিত করাও জরুরি। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাসের চাপ আরও বাড়বে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।এদিকে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল বা ‘ভুতুরে বিল’ নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ প্রসঙ্গেও কথা বলেন মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।  সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিলের অভিযোগের বিষয়ে যখন আমাদের কাছে আসতে বলা হয়, তখন কেউ তো আসে না। তবে যেসব অভিযোগ আসছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।’বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠক প্রসেঙ্গ এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘ভারতের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আজ (বৃহস্পতিবার) রুটিন বৈঠক হয়েছে। যেহেতু প্রতিবেশী দেশ, দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয় আছে, সেগুলো নিয়ে কথা হয়েছে।’এ সময় মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সহযোগিতা আরো বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আরও বেশি ডিজেল দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য ইস্যুতে এক প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘শেখ হাসিনা সম্পর্কে কিছু বলতে চাই না, তিনি অনেক কিছুই বলেন। দেশকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন।’
৪ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

চব্বিশের জুলাই: রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি

ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর গতিশীলতা। ইতিহাস কখনো স্থির নয়; এটি অবিরাম পরিবর্তন, অভিযোজন ও পুনর্গঠনের এক চলমান প্রক্রিয়া। একটি জাতির ইতিহাস কখনোই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়; এটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, অর্জন এবং আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক অভিযাত্রা। কোনো জাতি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না। সময়ের প্রবাহে নতুন বাস্তবতা, নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন সংকট এবং নতুন প্রত্যাশার মুখোমুখি হতে হয়। সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার সক্ষমতাই নির্ধারণ করে একটি জাতির অগ্রযাত্রার দিকনির্দেশনা। যে জাতি অতীতের অভিজ্ঞতা ও অর্জনকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই কথা বলে। পক্ষান্তরে, যে জাতি অতীতের গৌরবকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ না করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে পরিণত করে, নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও দ্বন্দ্বকে স্থায়ী করে তোলে, তারা একসময় অগ্রগতির পথ হারিয়ে ফেলে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো অতীতকে অস্বীকার করা যেমন আত্মঘাতী, তেমনি অতীতের মধ্যেই বন্দী হয়ে থাকাও সমান ক্ষতিকর।পলাশী-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৪৭-পূর্ব ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম, তারপর ১৯৭৪-উত্তর ভাষার জন্য সংগ্রাম, রাজনৈতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রাম, আত্মনিয়ন্ত্রণের তথা স্বাধিকারের সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম- এর সবকিছু মিলিয়েই আমাদের জাতীয় ইতিহাস নির্মিত হয়েছে। এ ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পূর্ববর্তী অধ্যায়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তার আত্মপরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করেছে; ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুসংহত করেছে; ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান গণশক্তির সক্ষমতাকে প্রকাশ করেছে; আর ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ সেই দীর্ঘ সংগ্রামকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পরিণতি দিয়েছে। নিঃসন্দেহে স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় এবং নির্ধারক মাইলফলক, যার মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একটা জাতির ইতিহাসের পথচলা কোনো একক ঘটনার মধ্যেই থেমে থাকে না। ১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার পরাজয় যেমন এই অঞ্চলে একটি দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা করেছিল এবং তার অভিঘাত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাতির জীবনকে প্রভাবিত করেছে, তেমনি ১৯৭১ সালের বিজয়ও কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি ছিল না। স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়, কিন্তু সেই রাষ্ট্রকে কতটা ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন করা যাবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার সংগ্রাম তখনই শুরু হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, স্বাধীনতা একটি ঘটনা; কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় কখনো অগ্রগতি আসে, কখনো পশ্চাৎপদতা দেখা দেয়; কখনো জনগণের আকাক্সক্ষা রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নেয়, আবার কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন সেই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বৈরাচারী ভূমিকায় জালেম শাসক শ্রেণীর যাতাকলে পিষ্ট মজলুম জনগণ মুক্তির পথ খোঁজে গণঅভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লবের পথে। এই কারণেই স্বাধীনতা কোনো গন্তব্য নয়; এটি রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, জনগণের অধিকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ যাত্রার সূচনা মাত্র। একটি জাতির ইতিহাসের ক্রমধারায় নতুন নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে, এবং তাদের সামনে নতুন প্রশ্ন ও নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়। ফলে স্বাধীনতার মৌলিক চেতনা তথা মানবিক মর্যাদা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সাম্য প্রভৃতি বিষয় প্রতিটি যুগে নতুন বাস্তবতায় নতুনভাবে ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নের দাবি তোলে। বাংলাদেশের ইতিহাসও সেই ধারাবাহিকতার বাইরে নয়। তাই আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান অভিযাত্রা হিসেবে দেখতে হবে যেখানে প্রতিটি সংগ্রাম পূর্ববর্তী সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করে এবং পরবর্তী সংগ্রামের ভিত্তি নির্মাণ করে। এই ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রবাহের মধ্যেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে; একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ও সমাজকে আরও ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত করার দীর্ঘ অভিযাত্রার একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে।বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা একই বাস্তবতা দেখতে পাই। কোনো জাতির ইতিহাসে একটি বড় অর্জন কখনোই চূড়ান্ত পরিণতি নয়; বরং তা নতুন সংগ্রাম, নতুন দায়িত্ব এবং নতুন প্রত্যাশার সূচনা করে। ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির পথ খুলে দিলেও সেখানে নাগরিক অধিকার, বর্ণসমতা এবং গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে দীর্ঘ সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। স্বাধীনতার প্রায় দুই শতাব্দী পরও আফ্রিকান-আমেরিকানদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে ব্যাপক নাগরিক অধিকার আন্দোলন গড়ে উঠতে হয়েছে। একইভাবে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মহান আদর্শ সামনে নিয়ে এলেও গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সুসংহত করতে ফরাসি সমাজকে বহু উত্থান-পতন, সংঘাত ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনের পরও সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে নতুন সংগ্রামের সূচনা হয়েছে। ইতিহাসের এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের শেখায় যে রাজনৈতিক মুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, কিন্তু সেই অর্জনের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।ইতিহাসের প্রতিটি বিজয় নতুন দায়িত্বের জন্ম দেয়, প্রতিটি অর্জন নতুন প্রত্যাশাকে সামনে নিয়ে আসে। কোনো জাতি যদি অর্জনের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করেই সন্তুষ্ট থাকে, কিন্তু সেই অর্জনের অন্তর্নিহিত আদর্শ বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর না হয়, তাহলে ইতিহাসের অগ্রযাত্রা থমকে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে  গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের যে স্বপ্ন জনগণ লালন করেছিল তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনও একটি চলমান প্রক্রিয়া। ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে যখনই সেই আকাক্সক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক বেড়েছে, তখনই নতুন করে পরিবর্তনের দাবি উত্থাপিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, আকস্মিক বিস্ফোরণ বা সাময়িক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘ বিবর্তনধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ও বিশেষ অধ্যায়। এটি এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন নতুন প্রজন্ম রাষ্ট্রের সামনে জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা, ন্যায্য অধিকার এবং নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নগুলোকে নতুন করে উত্থাপন করেছে। যে প্রশ্নগুলো এক অর্থে স্বাধীনতার মূল চেতনার সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন ভাষা, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনরায় উচ্চারিত হয়েছে।২০২৪-এর এই গণঅভ্যুত্থান বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মের সেই ঐতিহাসিক ভূমিকাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা যুগে যুগে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন জবাবদিহিতার পরিসর সংকুচিত করে, যখন নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে এবং যখন ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হতে থাকে, তখন পরিবর্তনের দাবি সবচেয়ে জোরালোভাবে উচ্চারিত হয় তরুণদের কণ্ঠে। কারণ তরুণেরা কেবল বর্তমানের প্রতিনিধিত্ব করে না; তারা ভবিষ্যতের দাবিদার এবং অংশীদারও বটে। তাদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং বঞ্চনার অভিজ্ঞতা সমাজের গভীর পরিবর্তনের আকাক্সক্ষাকে দৃশ্যমান করে তোলে। ফলে ইতিহাসের প্রতিটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের পেছনে তরুণদের সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের আন্দোলন সব ক্ষেত্রেই তরুণরাই অগ্রণীর ভূমিকা পালন করেছে। তারাই সাহসিকতার সঙ্গে প্রচলিত বাস্তবতাকে প্রশ্ন করেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনও সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারারই অংশ, যেখানে নতুন প্রজন্ম কেবল একটি তাৎক্ষণিক দাবির জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র নিয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সেই কারণেই জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ নিয়ে জনগণের নতুন আকাঙ্ক্ষা এবং বিশেষত তরুণ প্রজন্মের ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। আমাদের জাতীয় জীবনের প্রায় প্রতিটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তরুণদের সাহস, স্বপ্ন এবং আত্মত্যাগ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখেও তরুণ ছাত্রসমাজ মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তারুণ্যের নেতৃত্বেই স্বৈরশাসনের ভিত কেঁপে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অসংখ্য তরুণ অস্ত্র হাতে নিয়ে স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিল। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রসমাজ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। একই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনও প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের ইতিহাসে পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি এখনও তরুণ প্রজন্ম। যুগ বদলেছে, প্রেক্ষাপট বদলেছে, কিন্তু ন্যায়, মর্যাদা এবং অধিকারের প্রশ্নে তারুণ্যের ঐতিহাসিক ভূমিকা অপরিবর্তিত রয়েছে।সঙ্গত কারণে তরুণেরা সাধারণত বিদ্যমান ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার সাহস রাখে। তারা প্রতিষ্ঠিত সত্য তথা বন্দোবস্তকে অন্ধভাবে মেনে নিতে চায় না; বরং বাস্তবতার সঙ্গে আদর্শের ফারাককে চিহ্নিত করতে চায়। তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ কল্পনার শক্তি থাকে, নতুন সম্ভাবনা নির্মাণের সাহস থাকে এবং প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতাও থাকে। জার্মান বংশোদ্ভুত মার্কিন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হানা আরেন্টের (১৯০৬-১৯৭৫) মতে, প্রতিটি নতুন প্রজন্ম পৃথিবীতে নতুন সূচনার সম্ভাবনা নিয়ে আসে। ইতিহাসের নানা পর্যায়ে আমরা দেখেছি, সমাজ যখন স্থবির হয়ে পড়ে বা রাষ্ট্র যখন জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে, তখন সেই নতুন সূচনার আহ্বান সবচেয়ে প্রবলভাবে এসেছে তরুণদের কাছ থেকেই। বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানও সেই অর্থে কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল না; এটি ছিল নতুন প্রজন্মের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের উদ্দেশে একটি মৌলিক প্রশ্ন: রাষ্ট্র কার জন্য, ক্ষমতা কার স্বার্থে এবং স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কী? সে যাই হোক, ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনা-পরম্পরা নয়; এটি বর্তমানের রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ক্ষমতার রাজনীতিতে অতীতের স্মৃতি প্রায়ই মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়। ইতিহাস তখন শুধু গবেষণা, বিশ্লেষণ বা শিক্ষা গ্রহণের বিষয় থাকে না; বরং রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন, জনসমর্থন সংগঠিত করা এবং নৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়োর (১৯৩০-২০০২) ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘প্রতীকী পুঁজি’ (সিম্বোলিক ক্যাপিটাল), যার মাধ্যমে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের বৈধতা ও মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত এবং পুনরুৎপাদন করার চেষ্টা করে। অর্থনৈতিক পুঁজি যেমন সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তেমনি প্রতীকী পুঁজি মানুষের চিন্তা, আবেগ ও স্মৃতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসকে প্রতীকী পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা কমবেশি বিদ্যমান। মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, জনগণের সংগ্রাম কিংবা রাষ্ট্রগঠনের বিভিন্ন অধ্যায়কে অনেক সময় এমনভাবে ব্যাখ্যা ও উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন সেগুলোর ওপর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, পরিবার, দল বা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র মালিকানা রয়েছে। ফলে জাতীয় ইতিহাস, যা হওয়া উচিত ছিল সমগ্র জাতির সম্মিলিত উত্তরাধিকার, তা অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ইতিহাসের বহুমাত্রিক বাস্তবতা এবং জনগণের সম্মিলিত অবদানকে আড়াল করে একদিকে একে সংকীর্ণ দলীয় বয়ানের মধ্যে আবদ্ধ করার প্রবণতা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করেছে এবং অপরদিকে ইতিহাসের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই কারণেই ইতিহাসকে কোনো একক ব্যক্তি, দল বা প্রজন্মের সম্পত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ কিংবা ২০২৪ বাংলাদেশের ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় হলেও একই জাতীয় অভিযাত্রার গতিধারায় ভিন্ন ভিন্ন মাইলফলক। একটির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটির গুরুত্ব খাটো করার চেষ্টা যেমন ইতিহাসবিরোধী, তেমনি একটি অর্জনকে অন্য অর্জনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানোও জাতির জন্য ক্ষতিকর। ইতিহাসের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার ধারাবাহিকতার মধ্যে। যে জাতি তার অতীতের বিভিন্ন সংগ্রামকে পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরস্পর-সম্পূরক হিসেবে দেখতে শেখে, সেই জাতিই ভবিষ্যতের জন্য একটি সুদৃঢ় ভিত্তি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই উপলব্ধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যও ঠিক এই বৃহত্তর ধারাবাহিকতার মধ্যেই নিহিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে একদেশদর্শিতার ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার স্বাভাবিক ও বহুমাত্রিক বিকাশ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হয়েছে। ইতিহাস নিয়ে মুক্ত গবেষণা, যুক্তিনির্ভর বিতর্ক এবং সমালোচনামূলক আলোচনা উৎসাহিত হওয়ার পরিবর্তে অনেক সময় তা রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ফলে ইতিহাসের নানা স্তর, নানা অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন প্রজন্মের অবদানকে সমন্বিতভাবে মূল্যায়নের পরিবর্তে একরৈখিক ব্যাখ্যার প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে। ইতিহাসের রাজনীতিকীকরণ ও ইতিহাসকে প্রতীকী পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সংহতি এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির। কারণ ইতিহাস যখন সমগ্র জাতির অভিন্ন উত্তরাধিকার না হয়ে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক শক্তির দলীয় সম্পদে পরিণত হয়, তখন নাগরিকদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে, পারস্পরিক আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে। ইতিহাসের মূল কাজ হওয়া উচিত জাতিকে সংযুক্ত করা; কিন্তু যখন ইতিহাসকে বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা উল্টো জাতিকে বিভাজিত করে। এই বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ‘স্মৃতির রাজনীতি’ (পলিটিক্স অব মেমোরি)-এর ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই অতীতের নির্দিষ্ট ঘটনাকে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতার প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। ফলে ইতিহাসের কিছু অংশ অতিরঞ্জিতভাবে সামনে আসে, আবার কিছু অংশ আড়ালে চলে যায়। জাতীয় স্মৃতিকে তখন একটি জীবন্ত ও বহুমাত্রিক উত্তরাধিকার হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা রক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাতেও দীর্ঘদিন ধরে এই প্রবণতার বিভিন্ন প্রকাশ দেখা গেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস, যা সমগ্র জাতির সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল, তাকে অনেক সময় এমনভাবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যেন তার ব্যাখ্যা দেওয়ার নৈতিক অধিকার কেবল বিশেষ কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে ন্যস্ত।এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ জুলাই আন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা সংগঠনের একচ্ছত্র উদ্যোগ ছিল না। এর প্রাণশক্তি ছিল সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, যেখানে নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পটভূমির মানুষ একটি অভিন্ন আকাক্সক্ষাকে সামনে নিয়ে একত্রিত হয়েছিল। ফলে জুলাইয়ের ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ‘প্রতীকী পুঁজি’ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করার সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হয়ে গেছে। সর্বস্তরের মানুষের এই গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ইতিহাসের প্রকৃত মালিক কোনো দল নয়, দেশের জনগণ; আর গণআন্দোলনের প্রকৃত শক্তি কোনো সংগঠনের একক কর্তৃত্বে নয়, বরং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে নিহিত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই একটি রাজনৈতিক প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যেন স্বাধীনতার চেতনা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। একদিকে কেউ কেউ জুলাইয়ের তাৎপর্য প্রতিষ্ঠার নামে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে খাটো করতে চেয়েছেন; অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে এনে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। উভয় প্রবণতাই ইতিহাসের প্রকৃত স্বরূপকে অস্বীকার করে, যুক্তির বিচারে অসংগত এবং জাতীয় স্বার্থের ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতার পরিপন্থী। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ এবং ২০২৪ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস নয়; বরং একই জাতীয় অর্জনের অব্যাহত অভিযাত্রার ভিন্ন দুই অধ্যায়। ১৯৭১ আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে, আর ২০২৪ সেই স্বাধীন রাষ্ট্রকে আরও বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং স্বৈরাচারমুক্ত করার গণআকাক্সক্ষাকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি অর্জনকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য অর্জনকে অস্বীকার করার চেষ্টা ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে না; বরং জাতির সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রসংস্কারের যে জনআকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুটি মৌলিক দাবি- একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রযন্ত্র এবং একটি স্বৈরাচারমুক্ত শাসনব্যবস্থা। এই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবেই ‘জুলাই সনদ’-এর ধারণা সামনে আসে, যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি নির্মাণ করা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্রসংস্কার থেকে সরে গিয়ে ইতিহাসের মালিকানা নিয়ে প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই সংস্কার-এজেন্ডা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে যে তরুণেরা জুলাইয়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল রাষ্ট্র পুনর্গঠনের স্বপ্ন নিয়ে, তাদের অনেক প্রত্যাশাই অপূর্ণ থেকে যায়; পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন বন্দোবস্ত নির্মাণের যে প্রত্যয় আন্দোলনের ভেতরে জন্ম নিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হয়।তবে স্বীকার করতে হবে যে, এসব সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতার মধ্যেও জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন কিন্তু অন্যত্র। এই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের জনগণকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতির একক ব্যাখ্যা নয়; বরং জনগণের অব্যাহত সম্মতি, অংশগ্রহণ এবং আস্থার ওপরই রাষ্ট্রযন্ত্রের কিংবা সরকারের শক্তি নির্ভর করে। কোনো শাসকগোষ্ঠী অতীতের গৌরব, ঐতিহাসিক অবদান কিংবা রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কথা যতই উচ্চারণ করুক না কেন, বর্তমানের জনগণের বাস্তব আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদে শাসন ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠির প্রকৃত শক্তি জাতির অতীতের স্মৃতিতে নয়, বরং বর্তমানের জনগণের বিদ্যমান আস্থায় নিহিত। জুলাই সেই সত্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে যেমন উন্মোচিত করেছে, তেমনি সমগ্র জাতিকেও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ন্যায়, ইনসাফ এবং নাগরিক মর্যাদাভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের সংগ্রাম কখনো অতীতের কোনো অর্জনের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সেই অর্জনেরই যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক পরিণতি।ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়মেই একটি বড় অর্জন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন দায়িত্ব ও নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছে; দিয়েছে একটি ভূখণ্ড, একটি পতাকা এবং বিশ্বের মানচিত্রে একটি সার্বভৌম পরিচয়। স্বাধীনতার জন্য যেসব বীর শহীদ জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের আত্মত্যাগ ছাড়া বাংলাদেশের অস্তিত্ব কল্পনা করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের ভিত্তি, আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রধান উৎস এবং আমাদের রাষ্ট্রীয় যাত্রার সূচনাবিন্দু। কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেই রাষ্ট্রকে কীভাবে পরিচালিত করা হবে, কীভাবে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা হবে, কীভাবে ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে এবং কীভাবে স্বাধীনতার সুফল সব নাগরিকের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে এসব প্রশ্নও স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য কেবল তার অস্তিত্বে নয়; বরং সেই রাষ্ট্র তার জনগণের জন্য কতটা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত। আর এই জায়গাতেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিহিত। এটি ১৯৭১-এর বিকল্প নয়; বরং ১৯৭১-এর অসমাপ্ত আকাক্সক্ষাগুলোর একটি নতুন ঐতিহাসিক প্রকাশ। ১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, আর ২০২৪ সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে জনগণের নতুন করে প্রশ্ন তোলার সাহস দিয়েছে। স্বাধীনতার অর্থ কেবল একটি রাষ্ট্রের জন্ম নয়; বরং সেই রাষ্ট্রে নাগরিকের মর্যাদা, ন্যায়বিচার, সমতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা। একটি রাষ্ট্রের বাহ্যিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার নাগরিকরা অভ্যন্তরীণভাবে স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ এবং অধিকারসম্পন্ন জীবনযাপনের সুযোগ লাভ করে। এই অর্থে ২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ‘রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি’। যুগসন্ধি এমন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন পুরনো বাস্তবতা ও নতুন সম্ভাবনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়; যখন একটি সমাজ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য নতুন পথ নির্মাণের সুযোগ লাভ করে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানও তেমন একটি সন্ধিক্ষণ, যেখানে জনগণের একটি বড় অংশ কেবল সরকার পরিবর্তনের দাবি করেনি; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের দাবি তুলেছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিক পরিচয় কোনো বিশেষ সুবিধা বা বৈষম্যের ভিত্তি হবে না; যেখানে আইন সবার জন্য সমান হবে; যেখানে ক্ষমতা জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক থাকবে। চব্বিশের জুলাইয়ের প্রকৃত ঐতিহাসিক সাফল্য কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার ব্যবহার পদ্ধতির বড় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে প্রকৃত রূপান্তর কেবল শাসকের পরিবর্তনে আসে না; আসে জনগণের রাজনৈতিক চেতনার পরিবর্তনের মাধ্যমে। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এটি সাধারণ মানুষকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্র কোনো শাসকগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র জনগণের, এবং জনগণই তার প্রকৃত মালিক। এটি নাগরিকদের মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে যে অন্যায়, বৈষম্য এবং জবাবদিহিতাহীনতার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাদের রয়েছে। এই চেতনার মূল্য দীর্ঘমেয়াদি। কারণ একটি গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল তার তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ফলাফলে পরিমাপ করা যায় না; বরং পরিমাপ করা হয় সমাজের চিন্তা, মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক আচরণে তার প্রভাবের মাধ্যমে। জুলাইয়ের উত্তরাধিকার নিহিত রয়েছে সেই নতুন প্রত্যাশার মধ্যে, যেখানে তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রকে কেবল ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়। প্রকৃতপক্ষে এই আকাক্সক্ষাই জুলাইকে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক মাইলফলকে পরিণত করেছে।রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ১৯৭১ এবং ২০২৪-কে মুখোমুখি দাঁড় করানোর যেকোনো অপচেষ্টাই ইতিহাসের প্রতি অবিচার। একটি জাতির শক্তি তার অর্জনগুলোকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার মধ্যে নয়; বরং সেগুলোকে একই ঐতিহাসিক অভিযাত্রার ধারাবাহিক মাইলফলক হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যেই নিহিত। ১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে, আর ২০২৪ আমাদের সেই স্বাধীনতাকে আরও অর্থবহ, ন্যায়ভিত্তিক ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তাই জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপরীতে নয়, বরং স্বাধীনতার চেতনাকে আরও গভীর ও পূর্ণাঙ্গ করার ইতিহাসের একটি অনিবার্য অধ্যায় হিসেবেই মূল্যায়ন করতে হবে। আর সেটি করতে হলে বর্তমান বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতীতের বিতর্ক, বিভাজন ও স্মৃতির রাজনৈতিক ব্যবহারে আটকে না থেকে ভবিষ্যৎ নির্মাণে মনোনিবেশ করা। ইতিহাসের স্মৃতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ একটি জাতি তার অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা লাভ করে। কিন্তু স্মৃতির বন্দীত্ব কখনো অগ্রগতির পথ তৈরি করতে পারে না। যে জাতি অতীতের গৌরব কিংবা বেদনার ব্যাখ্যা নিয়েই অনন্তকাল ব্যস্ত থাকে, কিন্তু বর্তমানের বাস্তব সমস্যা মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নির্মাণে ব্যর্থ হয়, সে জাতি ইতিহাসের গতিপথে পিছিয়ে পড়ে। অতীত আমাদের শক্তির উৎস হতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের বিকল্প হতে পারে না।বাংলাদেশের সামনে আজ যে চ্যালেঞ্জগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো মূলত ভবিষ্যৎমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার সার্বজনীনতা, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিকাশ, টেকসই শিল্পায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জন প্রভৃতি ক্ষেত্রেই আমাদের সামনে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে। যদি একটি জাতি কেবল অতীতের অর্জনের মালিকানা নিয়ে বিতর্কে আবদ্ধ থাকে, তবে বর্তমানের বাস্তব সংকটগুলো অমীমাংসিত থেকে যায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার মূল্য দেয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার ইতিহাসের গৌরবে যেমন নিহিত, তেমনি নিহিত তার জ্ঞান, দক্ষতা, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সক্ষমতার মধ্যেও। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাষ্ট্রসংস্কারের আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার গুরুত্ব বিশেষভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। জুলাইয়ের আন্দোলনের অন্যতম মৌলিক দাবি ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে বৈষম্য, স্বেচ্ছাচারিতা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি দূর হবে। রাষ্ট্রসংস্কারের যে গভীর প্রত্যাশা নিয়ে তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছিল, সেই প্রত্যাশার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো একটি অসমাপ্ত প্রক্রিয়া। পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পরিবর্তে একটি নতুন, অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক ও জনগণকেন্দ্রিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছিল, তা নানা রাজনৈতিক জটিলতা, মতপার্থক্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে কাক্সিক্ষত গতিতে এগিয়ে যেতে পারেনি। ফলে অনেক তরুণের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে: যে পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে তারা আত্মত্যাগ করেছে, সেই পরিবর্তন কতটা বাস্তব রূপ লাভ করবে? তবে কোনো ঐতিহাসিক আন্দোলনের মূল্য কেবল তার তাৎক্ষণিক সাফল্য বা অসম্পূর্ণতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যায় না। ইতিহাসে বহু গণআন্দোলন প্রথম পর্যায়ে সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, কিন্তু তারা সমাজের চিন্তা, মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীর পরিবর্তনের সূচনা করেছে। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই যে, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টেকসইভাবে গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক হতে পারে না। রাষ্ট্রসংস্কার কোনো একক সরকার, দল বা সময়ের কাজ নয়; এটি একটি চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের সব অংশীজনের ভূমিকা রয়েছে।আজকের তরুণ প্রজন্মের সামনে তাই দ্বৈত দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, ইতিহাসের বিকৃতি, কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা এবং অতীতের প্রতীকী পুঁজির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা; কারণ গণতান্ত্রিক সমাজে ইতিহাসের মালিকানা কোনো গোষ্ঠীর নয়, এটি জনগণের সম্মিলিত সম্পদ। দ্বিতীয়ত, কেবল প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্র নির্মাণের ইতিবাচক ও সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা। একটি উন্নত রাষ্ট্র কেবল স্লোগান, আবেগ বা প্রতিবাদের মাধ্যমে নির্মিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা, নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা এবং কঠোর পরিশ্রম। জুলাইয়ের চেতনা তখনই প্রকৃত অর্থে সফল হবে, যখন তা একটি নতুন নাগরিক সংস্কৃতির জন্ম দেবে যেখানে মানুষ অধিকার যেমন দাবি করবে, তেমনি দায়িত্বও পালন করবে; যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, জনগণের কল্যাণে পরিচালিত হবে; যেখানে রাষ্ট্রের লক্ষ্য হবে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়, বরং মানুষের মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে জুলাইয়ের শিক্ষা হবে শুধু পুরোনো ব্যবস্থার বিরোধিতা নয়, বরং একটি উন্নততর বিকল্প ব্যবস্থা নির্মাণের সক্ষমতা অর্জন করা। কারণ কোনো গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত সার্থকতা নিহিত থাকে কেবল অন্যায়ের পতনে নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক নতুন বাস্তবতা নির্মাণের সক্ষমতার মধ্যে।মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের গর্ব; চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানও আমাদের গর্ব। একটি আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বের ভিত্তি নির্মাণ করেছে, অন্যটি সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র, কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মসমালোচনা এবং আত্মসংশোধনের শক্তিকে প্রকাশ করেছে। একটি আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার দরজা খুলেছে, অন্যটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে স্বাধীনতার সুফলকে অর্থবহ করতে হলে রাষ্ট্রকে হতে হবে বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণকেন্দ্রিক। এই দুটি ঘটনাই বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য ও অনিবার্য অংশ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণে উভয়ই আমাদের জন্য প্রেরণা, শিক্ষা ও দিকনির্দেশনার উৎস। অতএব, আমাদের সামনে পথ হতে হবে বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতি; প্রতিহিংসার সংস্কৃতির পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি; ‘প্রতীকী পুঁজি’ ব্যবহার করে ইতিহাসের একচেটিয়া মালিকানা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুমাত্রিক স্মৃতিচর্চার সংস্কৃতি; এবং অতীতের অন্তহীন বিতর্কে আবদ্ধ থাকার পরিবর্তে ভবিষ্যৎ নির্মাণের দৃঢ় অঙ্গীকার। ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা হলো একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন সে তার অতীতকে সম্মান করে, বর্তমানের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন স্বপ্ন নির্মাণ করে। চব্বিশের জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই কেবল একটি আন্দোলনের স্মৃতি নয়; এটি জনগণের রাজনৈতিক জাগরণ, অধিকার সচেতনতা এবং রাষ্ট্রকে আরও ন্যায়ভিত্তিক করার আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই চেতনাকে ধারণ করে স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে কঠোর পরিশ্রম, জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন, সুশাসন, উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় সংহতির নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের আগামীর পথচলার মূলমন্ত্র। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয় কোনো একটি মুহূর্তের সাফল্যে নয়; বরং সেই মুহূর্তের চেতনাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস্তব জীবনে রূপ দেয়ার মধ্যেই নিহিত।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

ক্রেডিট-ডিপোজিট তথ্যে নতুন মডেল আইসিডিআইআর

১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) প্রতিষ্ঠা করে। উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে বিতরণকৃত সমস্ত প্রকার ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ-তথ্য একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসা। যাতে করে ঋণসংক্রান্ত ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব হয়। শুরুতে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তথ্য ব্যাবস্থাপনা দিয়ে শুরু হলেও ২০০১ সাল থেকে কম্পিউটারাইজড তথ্য ব্যবস্থাপনার দিকে যায় সিআইবির কার্যক্রম। ২০১১ সালে অনলাইন পদ্ধতি প্রবর্তনের পর থেকে ব্যাংকগুলো অনলাইনের মাধ্যমে সিআইবি আবেদন ও তথ্য পেতে শুরু করে; যা একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন ছিল। এরপর থেকে বিভিন্ন আঙ্গিকে সিআইবির কার্যক্রম সম্প্রসারিত হওয়ায় বর্তমানে কয়েক ঘণ্টায় সিআইবি রিপোর্ট পাওয়া সম্ভব। যা থেকে ব্যাংকগুলো একজন গ্রাহকের সকল প্রকার ঋণের তথ্য খুব সহজেই বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী গত মার্চ মাস শেষে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা; যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রচুর ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ-গ্রহিতা রয়েছে, যারা সামর্থ থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ করছেন না। সরকার দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখা ও ব্যাংকিং কার্ক্রমকে গতিশীল রাখতেই এ ধরণের নীতি সহায়তা প্রদান করে থাকে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ-গ্রহিতাগণ এ সকল নীতি সহায়তার সুযোগ নিয়ে থাকেন।  তবে বাস্তবতা হলো, একদিকে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আমানত হিসাবগুলোতে কোটি কোটি টাকা পড়ে আছে, অন্যদিকে তারা খেলাপি ঋণগ্রস্ত। ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকগুলো তাদের কাছ থেকে ঋণ আদায় করতে পারছে না। ইন্টিগ্রেটেড ক্রেডিট অ্যান্ড ডিপোজিট ইনফরমেশন রিপোর্টিং (আইসিডিআইআর) এই জটিলতার নিরসন করতে পারে। কীভাবে কাজ করবে আইসিডিআইআর আইসিডিআইআর হবে প্রচলিত সিআইবির একটি আধুনিক সংষ্করণ। এই রিপোর্টিং ব্যবস্থা সিআইবির মতো শুধুমাত্র ঋণের তথ্যই রিপোর্ট করবে না বরং ঋণের পাশাপাশি একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় ব্যাংকিং আমানতের তথ্যও রিপোর্ট করবে। বর্তমান ও অতীতের ঋণের ইতিহাসের পাশাপাশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সকল ক্যাটাগরির আমানত হিসাবের তথ্য, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ইউটিলিটি দেনার তথ্য, ট্যাক্স সংক্রান্ত ব্যয় ও দেনার তথ্য, ঋণ পরিশোধের ইতিহাস, ঋণ পুনঃতফসিল সংক্রান্ত তথ্য, যানবাহন মালিকানা ও স্থাবর সম্পত্তির তথ্যও সন্নিবেশিত থাকবে এনআইডি, টিআইএন ও বিআইএন-এর অধীনে। প্রচলিত সিআইবিতে শুধুমাত্র ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ঋণের তথ্য রিপোর্ট করে। আইসিডিআইআর-এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন- জাতীয় রাজস্ব রোর্ড, ভুমি অফিস, বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষসমূহ, বিআরটিএ, গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিসমূহ, বিভিন্ন আঞ্চলিক ওয়াসাসমূহ তাদের নিজ নিজ গ্রাহকের বর্তমান অবস্থা নির্দিষ্ট মেয়াদ অন্তর অন্তর রিপোর্ট করবে।  আইসিডিআইআর তার অধীনে রিপোর্টকৃত ডাটা থেকে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ঋণ খোলাপিদের একটি রেটিং তৈরি করবে এবং সিদ্ধান্ত প্রস্তাব করতে পারবে।  এতে করে কোনো গ্রাহক ব্যাংক ঋণ নিয়ে দীর্ঘদিনের জন্য খেলাপি হলে বা ইচ্ছাকৃত খেলাপি হয়ে থাকলে ঋণ গ্রহিতার ব্যাংক ওইসব গ্রাহকের অধীনে থাকা অন্যসব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট করা গ্রাহকের আমানত হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, দায়-দেনা ইত্যাদির তথ্য অনুসন্ধান করতে পারবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক প্রয়োজনে নিজের অনাদায়ী ঋণ সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমের মাধ্যেমে আবেদন করে গ্রাহকের অন্য প্রতিষ্ঠানে রক্ষিত আমানত হিসাব হতে সংশ্লিষ্ট ঋণের সমুদয় অথবা আংশিক সমন্বয় করে নিতে পারবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শুধুমাত্র সহায়ক জামানতের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সন্বয়ের প্রক্রিয়া আইনগতভাবে জটিল, সময় সাপেক্ষ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলতার হার সন্তোষজনক নয়। কিন্তু স্বয়ং বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে আইসিডিআইআর প্রবর্তন করা গেলে তা দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হ্রাসকল্পে অত্যন্ত স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও কার্যকরী পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।আইসিডিআইআর প্রবর্তনের ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে যে ধরণের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে-খেলাপি ঋণ হ্রাস: যখন একজন খেলাপি ঋণগ্রহিতার (ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান) সামগ্রিক আর্থিক দায়ের পাশাপাশি যাবতীয় আমানত ব্যাংকের কাছে দৃশ্যমান হবে তখন অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ এবং তথ্য গোপনের সুযোগ কমে যাবে। ফলে ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসবে।আমানতের মাধ্যমে ঋণের দায় পরিশোধের ব্যবস্থা থাকবে: আইসিডিআইআর ডাটাবেজ ব্যবহারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা প্রণয়ন করে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঞ্চিত আমানত হিসাব থেকে খেলাপি ঋণের দায় পরিশোধের মতো কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ফলে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণও হ্রাস পাবে।গ্রাহকের ধরণ অনুযায়ী সুবিধা প্রদান: যে সকল গ্রাহক নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন তারা দ্রুত ঋণ অনুমোদন পাবেন। তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণদান অথবা অধিক‍ পরিমাণে ঋণ-সুবিধা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে যে সকল গ্রাহকের অতীত ইতিহাস সন্তোষজনক নয়, তাদের অবস্থা বিবেচনা করে তাকে তার সুবিধাজনক বা কাস্টমাইজ বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করা সম্ভব হবে।প্রতারণা সনাক্তকরণ ও খেলাপির আগাম সতর্কতা: আইসিডিআইআর-এর মাধ্যমে সহজেই আর্থিক প্রতারণা সনাক্তকরণ সম্ভব হবে। কারণ তখন গ্রাহকের ঋণ-তথ্যের পাশাপাশি আমানত পরিস্থিতিও জানা সম্ভব হবে। ফলে খেলাপি ঋণ গ্রহিতার দিক থেকে উপর্যুপরি ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে প্রতারণার সুযোগ আগে থেকেই সনাক্ত করা সম্ভব হবে। যা পক্ষান্তরে ঋণের খেলাপি হওয়ার ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা হিসাবে কাজ করবে।ব্যাসেল ফ্রেমওয়ার্ক ও আইএফআরএস ৯ বাস্তবায়নে সহায়ক: আধুনিক ব্যাংকিংয়ে এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস (ইসিএল) বা ঋণগ্রহিতার খেলাপির কারণে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ক্ষতি নির্ধারণের জন্য সমন্বিত তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ অপরিহার্য। আইসিডিআইআর এই তথ্য চাহিদাকে কার্ক্ররভাবে পূরণ করতে সক্ষম। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সম্ভবনা: বিগ ডাটা এনালাইসিসি এবং আইসিডিআইআর এর সকল পক্ষের ব্যবহারকারীদের মধ্যে ব্লক চেইন পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে অত্যন্ত কার্যকরভাবে একজন খেলাপি ঋণ-গ্রহিতার নতুন ঋণ গ্রহণের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করা যাবে। পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আদায় কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা সম্ভব হবে।দেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে, শিল্পায়ন ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে, ঋণ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ও ধরণ পরিবর্তিত হচ্ছে, খেলাপি ঋণ বাড়ছে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণগ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। অন্যদিকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ মূল্যায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা অশানুরূপ নয়।আবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে, অর্থনীতি সচল রাখতে ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণদানের বিকল্পও নেই। এতোসব সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাংকিং খাত ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় ব্যাংকের খেলাপি ঋণগ্রহিতাদের আমানতের তথ্য ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকের পদক্ষেপ বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজীকরণ করবে এই আইসিডিআইআর।লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

গুপ্ত ধনের সন্ধানে!

গুপ্তধন বলতে সাধারণত মাটির নিচে, সমুদ্রের গভীরে বা গোপন কোনো স্থানে লুকিয়ে থাকা মূল্যবান সম্পদকে বোঝায়। পৃথিবীতে এমন অনেক ধন-সম্পদ লুকিয়ে আছে যা আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুরোনো মন্দির, ডুবন্ত জাহাজ বা অজানা দ্বীপে এই ধরনের গুপ্তধন লুকিয়ে থাকার কথা শোনা যায়। সাহিত্য ও কল্পবিজ্ঞানেও এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বিষয়। বাংলা ভাষায় প্রধানত ফেলুদা ও ব্যোমকেশ বক্সী চরিত্র দু’টিকে নিয়েই সবচেয়ে জনপ্রিয় গোয়েন্দা কাহিনি ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। এর বাইরেও  ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’, ‘গুপ্তধন কষ্টিপাথর’ এ ধরনের অ্যাডভেঞ্চার ও রহস্যধর্মী বিভিন্ন বাংলা নাটক ও সিনেমা রয়েছে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল রচিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতেও ভিন্নধর্মী রোমাঞ্চকর সব গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুপ্তধন বা গুপ্তধর্মী রাজনীতি যা জুলাই আন্দোলনের পূর্ব পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় ছিলো তা প্রকৃতই বিষ্ময় সৃষ্টি করেছে। শুধু বাংলাদেশই নয় গোটা উপমহাদেশ জুড়েই চলছে সুপ্ত মনে গুপ্তধনের সন্ধান! আমাদের পাশের দেশ ভারত বর্ষের দিকে তাকালেও দেখা যায় সেই কবে থেকে সেখানে ‘গুপ্তধনের’ সন্ধান চলছে। গুপ্তধন সন্ধানের নামে তারা বাবরি মসজিদের নীচে ‘হিন্দু মন্দিরের স্থাপনা’ আবিষ্কার করলেন, মসজিদকে গুঁড়িয়ে দিলেন। গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে হিন্দুত্ববাদের আস্ফালন শুরু হলো। চূড়ান্ত পর্বে এসে হিন্দুত্ববাদীরা এককালের বামপন্থী প্রভাবিত রাজ্য যা দখলে নিয়েছিলো মমতা ব্যনার্জীর তৃণমূল কংগ্রেস, তাদের ১৫ বছরের অপশাসনের জেরে সে রাজ্যপাট তুলে দিতে হলো ‘গুপ্তধনের’ সন্ধানে নিয়োজিত হিন্দুত্ববাদীদের হাতে। সেখানেও নির্বাচনের পরে গুপ্তধর্মী রাজনীতিবিদরা দলে দলে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে হিন্দুত্ববাদীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।  পিছিয়ে পড়া বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভোটকে নিজপক্ষে এক রাখতে মমতা ব্যানার্জি সুযোগ পেলেই মুসলিমদের সুড়সুড়ি দেয়ার যে রাজনীতি করেছেন তাতে আপাত লাভ পেলেও শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়েছে। তার এ ভূমিকায় কার্যত হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার পালে হাওয়া লেগেছে এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় অংশ বিজেপির সাথে একাট্টা হয়েছে। বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগের অপশাসন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল বিএনপিকে জবরদস্তিমূলকভাবে পার্লামেন্টারী রাজনীতির বাইরে রাখায় এখানেও উত্থান হয়েছে ইসলামী উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক ও বিভাজনের শক্তির। যে ধরনের অসুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশে মৌলবাদের উত্থান হয় তারই চাষাবাদ চলেছিল দীর্ঘ সময়ের আওয়ামী শাসনামলে।লেখালেখির অভ্যাস না থাকলেও দু’বছর আগের রক্তাক্ত জুলাই মাসে যখন রক্তপাতের বিরুদ্ধে কলম তুলে নেই তখন কিছু শুভার্থী আমাকে ‘জুলাই কলামিস্ট’ হিসাবে উপহাস করতে থাকেন। তারা জুলাই আন্দোলনের ঘোর বিরোধী। তারা মনে করেন কোনো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন নয় বরং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। আর এ ধারণা থেকেই ইদানীং কালের বহুল আলোচিত দুটি শব্দ ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে। জুলাই আন্দোলনের আগে মেটিকুলাস ডিজাইন নিয়ে দেশের রাজনীতিতে কখনও এতো আলোচনা নজরে আসেনি। এমনকি আন্দোলনের দিনগুলোতেও এ আলোচনা তেমনটা হয় নি। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বিজিত শক্তি ও তাদের সমর্থকদের দিক থেকে আমরা শুনে আসছি ‘সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও ছক মাফিক এক ষড়যন্ত্র মূলক ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে সরকার উৎখাত করা হয়েছে। তাদের উল্লেখিত এই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’- কেই সংক্ষেপে বলা হচ্ছে মেটিকুলাসলি ডিজাইনড। আবার বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক গুপ্তধর্মী রাজনীতি যা জুলাই আন্দোলনের পূর্ব পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় ছিল,  আন্দোলনের সমাপ্তিকালে যে রূপে তার আবির্ভাব হলো তা ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইনড’ তত্ত্বকে কিছতা হলেও প্রাসঙ্গিক করে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কিছু উক্তিও এ তত্ত্বের সারবত্তাকে কিছতা প্রতিষ্ঠিত করেছে।জুলাই জাগরণের শুরুটা কিন্তু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতাব্দী পার হয়ে যাওয়ার পরেও চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রথা এবং তার রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে। সাধারণ ছাত্র এবং চাকুরী প্রার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে ইতিপূর্বেও আন্দোলন করেছিলেন। ২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ক্ষোভ ও টানা বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দেন। কোটা সংস্কারের পথে না যেয়ে তিনি রাগান্বিত স্বরে এবং অভিমানের সুরে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘কোটা নিয়ে যখন এত কথা, তখন সব কোটাই বাতিল করে দিলাম’। তখন আন্দোলন বন্ধ হলেও কার্যতঃ তিনি সমস্যা সমাধান না করে সমস্যা জিইয়ে রাখলেন। তার এ অভিমানী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হলো বা করানো হলো।২০২৪ সালে নিরপেক্ষ ব্যবস্থায় সংসদ নির্বাচনের দাবীতে দেশের বুকে গড়ে ওঠা বিশাল আন্দোলনকে দমন করে তিনি যখন তার মত করে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সমর্থ হলেন, তখন মামলাটা দ্রুত নিষ্পত্তি করে রায় বের করার জন্য তোড়জোড় শুরু হলো। আদালত কোটা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করলে, নতুন করে আবার শুরু হ’ল আন্দোলন। আন্দোলনের শুরুতে শ্লোগান শুনলাম কোটা না মেধা - মেধা মেধা, বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই, শেখ হাসিনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই - ইত্যাদি। তৎকালীন দুই ছাত্র সমন্বয়ক, বর্তমানে এনসিপির দুই সিপাহসালার ছাত্রলীগের সাথেই ছিলেন। সারজিস আলম ছাত্রলীগের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে হল সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে গনভবনে যেয়ে শেখ হাসিনার সাথে ফটোশুটে অংশ নিয়েছিলেন। হাসনাত আব্দুল্লাহ কোনো কমিটিতে না থাকলেও ফেসবুকে শেখ মুজিবের গুনগান করতেন। মুজিব শতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর গুনগান করে তার লেখা ২০২০ সালের পত্রিকা ঘাঁটলেই পাওয়া যায়। আর ছাত্র শিবির নেতা এবং বর্তমান ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম সহ শিবিরের অনেকেই ছাত্র লীগের অভ্যন্তরে সুপ্ত বা গুপ্ত অবস্থায় ছিলেন। অবশ্য শেখ হাসিনার সরকার পরিবর্তনের পরে সাদিক কায়েম বললেন হাসিনার নামে জয়ধ্বনি দিতে ‘বাধ্য’ হয়েছি। অবশ্য কে কিভাবে তাকে বাধ্য করলেন তার বয়ান আমাদের জানা না থাকলেও জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র লীগের অভ্যন্তরে থাকা সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সাদিক কায়েম সহ অনেক ‘গুপ্তধনের’ সন্ধান আমরা পেয়েছি।এই গুপ্ত বাহিনী যে ধরনের শ্লোগানই দিক না কেনো, যেহেতু কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তটি  ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ‘অভিমানী সিদ্ধান্ত’, তাই আদালতের রায়ের পর আন্দোলনকারীদের সমর্থন না করে, বরং আন্দোলনকে দমন করতে সরকার একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ নিতে থাকে। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগকেও লাঠিসোটা দিয়ে নামানো হয় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে। আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্র লীগের হামলায় আহত ছাত্রীদের রক্তাক্ত ছবি সারাদেশের ছাত্র ছাত্রীদের আরও বিক্ষুব্ধ করে তোলে। আর রংপুরে দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে টার্গেট করে একটার পর একটা গুলি করে হত্যার দৃশ্য প্রচারিত হওয়ার পর ছাত্রদের প্রতিবাদী আন্দোলনে যেনো এক বাঁধ ভাঙা জোয়ারের সৃষ্টি হয়। আর তা রোধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে যেয়ে গুলিবিদ্ধ ‘পানি ওয়ালা’ মুগ্ধ, রিক্সার পাদানিতে গুলিবিদ্ধ গোলাম নাফিজ, পিতার বুকে গুলিবিদ্ধ শিশুর ছবি — বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার এক প্লাবন সৃষ্টি করে। বিনা ভোটে, নৈশ ভোটে ও ড্যামি ভোটে ক্ষমতা দখলে রাখতে পারলেও জনবিচ্ছিন্নতা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, ক্ষমতাসীন সরকার এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। দলের বিশাল কর্মীবাহিনীরও নৈতিক মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। একদিকে গোটা দেশের সকল শহর এলাকায় আন্দোলনের ব্যাপকতা ও প্রায় প্রতিদিন শতাধিক তরুণের আত্মাহুতির মত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর বন্দুকের নল ঘুরে যায় এবং পর্দার অন্তরালের খেলায়ও শেখ হাসিনা পরাভূত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবের পরিবারকে নির্বংশ করার সেই পুরানো শক্তিও এই সুযোগে রাজনীতিতে ও স্টাবলিশমেন্টে শক্ত অবস্থান নেয়। এ পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা দেশত্যাগের প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হন। একই সাথে ৫ আগস্টের পরেও রাজপথে থাকা আন্দোলনকারীদের বড়ো অংশেরই আওয়ামী বিরোধী রোষ এতো তীব্র ছিল যে উপরতলা থেকে একেবারে নিচুতলার নেতৃত্বও আপাতত দেশ ছেড়ে যাওয়া সবথেকে নিরাপদ মনে করেন। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালে বিরোধীরা যেমন আইনি সুরক্ষা পায় নি, তেমনি তারাও পাবেন না এবং প্রতিশোধ প্রতিহিংসার শিকার হবেন - এ বিবেচনা থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা গনহারে দেশত্যাগ করেন।সামরিক বেসামরিক স্টাবলিশমেন্ট ও রাজনৈতিক সমঝোতায় মুহাম্মদ ইউনূস একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে সেনাসদরে সেনানেতৃত্বের বাছাইকৃত রাজনৈতিক নেতাদের সভায়, সেনাবাহিনী প্রধান সভার উপস্থিতিকে পরিচিত করাতে যেয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াতে ইসলামের আমীরের নাম সর্বপ্রথম ঘোষণা করায় এবং একাধিকবার তা উচ্চারণ করায় সর্বসাধারণ অফিসিয়ালী সর্বপ্রথম ‘গুপ্তধনের’ সন্ধান পায়। স্বৈরাচার পতনে উচ্ছ্বাসিত সাধারণ মানুষ সেনাপ্রধানের এ আচরণে একটা ধাক্কা খেলেও মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেয়ায় আবার কিছুটা আশ্বস্তও হয়। নোবেলজয়ী  ইউনূস পশ্চিমা দুনিয়ার সমর্থনপুষ্ট হলেও সাধারণভাবে মানুষের মাঝে ‘উদার গণতন্ত্রী, অসাম্প্রদায়িক ও নারী ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী’ একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছিলেন।শেখ হাসিনার সাথে তার সম্পর্ক সাপে নেউলে হলেও আওয়ামী লীগের অনেকেই ইউনূসকে প্রতিদ্বন্দ্বী বানানোটা সমর্থন করতেন না এবং তার প্রতি নমনীয় ছিলেন। পেশাগত প্রয়োজনে ২০২২- ২৩ সালে আমার একজন প্রবীণ আওয়ামী লীগার ও জাতীয় সংসদ সদস্যের ড্রইংরুমে যাতায়াত ছিলো। আমি অবাক হয়ে দেখতাম একজন সিটিং এমপির ড্রইংরুমে একটিমাত্র ছবি শোভা পেত এবং সেটা তার সঙ্গে ইউনূসের ছবি। অনেক বিষয়েই বিশেষত অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন না করায় নেতৃত্বের প্রতি তার ক্ষোভ ছিল। তিনি আমাকে বলতেন তার মতালম্বী অনেকেই আওয়ামী লীগে আছেন।ইউনূসের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও তার দুই ভাইকে চিনতাম। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র হওয়ায় পরিচিত ছিলেন এবং তাকে একজন অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিবাদী মানুষ হিসেবেই দেখেছি। অপর একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার সাথে সরাসরি কথা না হলেও দূর থেকেই দেখতাম জানতাম। তিনি বিজ্ঞান আন্দোলনে প্রগতিশীল শিশু কিশোর সংগঠন খেলাঘরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। ইউনূস বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রবাসে থাকাকালীন মুক্তিযুদ্ধের সাথে সংহতি সমাবেশগুলোতে  যোগ দিতেন। তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে যত বিতর্ক ও সমালোচনা হোক না কেন তারপরেও এটাই সত্য আশির দশক জুড়ে গ্রামীণ ব্যাংক নারী ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদান রেখেছে। জামায়াত ইসলামসহ ধর্মীয় উগ্রবাদীরা গ্রামীণ ব্যাংক কার্যক্রমের বিরোধী ছিলো। তাই সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে এক অস্থির ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ইউনূস দেশের রক্ষনশীল অংশের মানুষের পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিবাদীদেরও সমর্থন পেয়েছেন। তবে দেশের অভ্যন্তরে একটা কথা প্রচলিত ছিলো যে, একমাত্র শেখ হাসিনাই ইউনূসকে ঠিকমতো চিনেছিলেন। আর আমরা তার শাসনামল দেখে তাকে নতুন করে জানলাম, চিনলাম। তিনিই প্রকৃত ‘গুপ্তধন’ যিনি জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত হলেন এক নতুন বেশে, নতুন রূপে। নিশ্চয়ই শেখ হাসিনা তার প্রতি সুবিচার করেননি। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে অসাম্প্রদায়িক ও একজন নোবেল জয়ী মানুষ শুধুমাত্র একজনের প্রতি প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে মিলিত হয়ে দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিলেন! এমনকি বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে যেহেতু আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব, মুক্তিযুদ্ধ মিশে আছে তাই দেশের ইতিহাসকেই তিনি পাল্টে দিতে চাইলেন। জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এবং তারই পৃষ্টপোষকতায় যে তরুণ নেতৃত্বের আবির্ভাব হলো ইতিহাস মুছে ফেলার আকাঙ্ক্ষা থেকে তাদের বিকাশের সম্ভাবনাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়ে তিনি তাদেরকে ঠেলে দিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াতে ইসলামের কোলে। জুলাই আন্দোলনের তরুণ নেতৃত্বের বড় অংশটি তার পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতা, বিলাসিতা,উগ্রতা ও প্রতিহিংসার পথ বেছে নিলেন। শেখ হাসিনা আমলের ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের চেয়েও নিম্নমানের কিছু যে থাকতে পারে, এদের কাউকে কাউকে না দেখলে আমরা বিশ্বাসই করতাম না! জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী দিনগুলোতে যখন মব উল্লম্ফনের সংস্কৃতি আবির্ভূত হলো, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, ভাস্কর্য এবং ৩২নং এর ঐতিহাসিক বাড়িটি ভেঙে ফেলা হলো, তখন অনেকেই এসব  ঘটনাকে মনে করেছিলেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দূর্বল অন্তর্বর্তী সরকারের অক্ষমতা হিসেবে। কিন্তু পরবর্তীতে এটা পরিষ্কার হতে থাকে ইউনূস ইতিহাসের নতুন নায়ক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে এবং দূর ভবিষ্যতেও আওয়ামী প্রত্যাবর্তন রুখে দিতে পুরনো ইতিহাস সবটাই মুছে ফেলতে চান। তাই অনেকটা অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের মৌন সমর্থনেই চলেছিল ইতিহাস মুছে ফেলার উগ্রবাদী মব উল্লম্ফন ও ধংসাত্মক অভিযান। ক্রোধ, প্রতিহিংসা ও ঘৃণার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিয়ে নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, বাঙালির শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা হলো। আবার এ ধরনের অনেক কার্যক্রমকে শুধু ইনডেমনিটি দিয়েই  ইউনূস স্বস্তিতে ছিলেন না, পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে বানিজ্য চুক্তির নামে দেশটাই তুলে দিলেন বিশ্ব মোড়লের হাতে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানই হয়ে উঠলেন উগ্রবাদীদের ‘গুপ্ত ধন’। আর ‘ক্ষমতা মানুষের আসল রূপটি প্রকাশ করে’ উর্দু সাহিত্যিক সাদাত হাসান মান্টোর এ উক্তিটির সত্যতাকেও ইউনূস গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করলেন।দীর্ঘ সময়কাল ক্ষমতায় থাকার গভীর আকাঙ্ক্ষা থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করতে না পারায় ইউনূসের জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পায়। অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা এবং বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি লন্ডন বৈঠক করতে ও নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। নিজ পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে তোলা দলের নির্বাচনী রাজনীতিতে বিশেষ সম্ভাবনা না থাকায় তাদেরকে জুড়ে দেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক দল ও শক্তি সমূহের সঙ্গে। কথিত আছে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার স্বার্থে কিছু আসনে  ইউনূস সমর্থিত তরুণদের দল এমনকি জামাতেরও কয়েকটি আসনে বিএনপিকে পরাজয় মেনে নিতে হয়। বিএনপির এই নমনীয়তা ও আপোষকামীতার সুযোগে বিএনপি সরকারকেও অন্তর্বর্তী সরকারের বর্ধিত সংস্করণ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা খুবই জোরালোভাবে ক্রিয়াশীল। সরকারি বিভিন্ন সিদ্ধান্তেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য যে ধরনের শক্তি — তথা সামাজিক, রাজনৈতিক, মতাদর্শিক শক্তি দরকার — সেই শক্তি তো বাংলাদেশে খুবই দুর্বল। তার ফলে সরকার পতন হলে নতুন আর একটা বিপদের মধ্যে দেশ পড়ে যেতে পারে - এই আশঙ্কা তো ছিলই । জুলাই আন্দোলনে নির্বিচার হত্যা যজ্ঞের বিরুদ্ধে যেসকল উদার গণতন্ত্রী ও বামপন্থার সমর্থকরা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগে সংগঠিত নয় তবে আওয়ামী সমর্থক এমন অনেকেই বলা শুরু করলেন, ‘এই তো আপনাদের জন্য এরকম হলো। আগেই তো জানা ছিল এটা কার হাতে যাবে।’ অথচ এই কথাটা যারা বলেন তারা যদি নিজেরা মনে করতেন যে আওয়ামী লীগের শাসন থাকা দরকার, তাহলে তো আওয়ামী লীগের অপকর্ম কিংবা লুণ্ঠন, দুর্নীতি, স্বৈরতন্ত্র -- এগুলোর বিরুদ্ধে তাদেরই আগ বাড়িয়ে মুখ খোলা উচিত ছিল। আওয়ামী লীগকে চাপে রাখা দরকার ছিলো। তাতো তারা করেননি। আবার সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের ‘শবযাত্রায়’ও তারা শামিল হননি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক নাগাড়ে তারা গেয়ে চলেছেন ‘ আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’! বামপন্থী রাজনীতিতে ‘বিলোপবাদ’ নামে তত্বের কথা জানা ছিল। এখন এক নতুন তত্ত্বের আবিষ্কার আমাদের সমাজে দেখতে পাচ্ছি যাকে বলা যেতেপারে ‘বিলাপবাদ’। যার মূল সুর আওয়ামী লীগ সরকার পতনে বিলাপ।বিলাপ করে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো যাবেনা। আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় হুমকি ধামকি দিয়েও গ্রহনযোগ্যতা সৃষ্টি হবে না। এ কথা ঠিক দেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে করে রাজনৈতিক অংগনে আওয়ামী লীগের বা জনসমর্থনপুষ্ট ভিন্ন কোনো সামাজিক গণতন্ত্রী দলের উপস্থিতি থাকলে সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ শক্তির উগ্র মূর্তিকে নিয়ন্ত্রনে রেখে কিছতা ইতিবাচক রাজনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি হতে পারতো। তবে আওয়ামী লীগের উপস্থিতির কলাকৌশল, আইনি লড়াই, জনমত গঠন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকেই করতে হবে, সেজন্য তারা কতটুকু প্রস্তুত স্পষ্ট নয়। আত্মসমালোচনা না করে শুধু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ফেরী করে ভবিষ্যতের পথ রচনায় কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখা যাবে বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা কিভাবে অস্বীকার করবেন যে, দীর্ঘ দিনের স্বৈরাচারী ও কতৃত্ববাদী শাসন এবং অবাধ লুন্ঠনের রাজত্ব কায়েম করায় তাদের কথিত ষড়যন্ত্রের ভ্রুণ আওয়ামী লীগের জঠরেই সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা পর্বে আওয়ামী লীগের যেমন রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তেমনি এক দীর্ঘ সময় অপশাসন আর দুঃশাসনের ফলশ্রুতিতে ‘৭১ এর পরাজিত ধর্মান্ধ শক্তিকে ক্ষমতার মসনদের অংশীদার বা ক্ষমতার কাছাকাছি আনার কলঙ্কের ইতিহাসও তারা সৃষ্টি করেছেন। তাই কেবল এক উজ্জ্বল অতীতের দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অথবা হুমকি ধামকির মনস্টার ইমেজ নিয়ে বিরাজমান বাস্তবতাকে মোকাবেলা করা যাবে না।সবার জন্য বাসযোগ্য একটি বাংলাদেশের জন্য কি আমাদের নতুন কোনো গুপ্তধনের সন্ধানে নামতে হবে? বাংলাদেশ নামক দেশটার অভ্যন্তরেই রয়েছে এক অন্তর্নিহিত শক্তি। ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ‘৬৯ -এর গন অভ্যুত্থান এবং ‘৭১ এর মুক্তি যুদ্ধ এ দেশটির মাঝে এক অন্তর্নিহিত শক্তি সৃষ্টি করে দিয়েছে। সেই শক্তি ১৯৯০ -এ স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। ভুল নেতৃত্বের হাতে পড়লেও সেই অন্তর্নিহিত শক্তিই তারুণ্যের বাঁধভাংগা জোয়ারে জুলাই’২৪  জাগরণ সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের সামনে এক নতুন প্রজন্মকে হাজির করেছে, যাদের চিন্তাভাবনা ও মনোজগৎ আমাদের অনেকেরই জানা-বোঝার বাইরে। জুলাইয়ের তারুণ্য যে বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়েছিলো, সেখানে সুস্পষ্টভাবে বৈষম্যমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এক সমাজের স্বপ্ন এঁকেছিল তারা। যে নেতৃত্বের পিছনে এ স্বপ্ন নিয়ে তারা শামিল হয়েছিলো সে নেতৃত্ব ভিন্ন পথে, বিভাজনের পথে অগ্রসর হওয়ায় এবং শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় উগ্রবাদীদের কোলে আশ্রয় নেওয়ায় তাদের স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে। জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পূর্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মলিন হয়ে পড়া গ্রাফিতি সমূহ আবার উজ্জ্বল করার কাজ চলছে। কিন্তু আমাদের নতুন প্রজন্মের ফিকে হয়ে যাওয়া স্বপ্নকে আবার উজ্জ্বল করার জন্য দেশের বুকে যে অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে তা পূনর্জীবিত করার রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি কোথায়?(মতামত লেখকের নিজস্ব)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও প্রবাসীদের ঘুমহীন রাত: স্বদেশচেতনা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ

ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে রাজনৈতিক গতিধারা নতুন মোড় নেয়। সেই মুহূর্তগুলো কেবল একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ হয়ে থাকে না। বরং সেটা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সকল মানুষের সমগ্র জাতিসত্তার চেতনাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। ইতিহাসের প্রতিটি বড় গণআন্দোলন, গণজাগরণ কিংবা রাষ্ট্ররূপান্তরের প্রক্রিয়ায় দেখা গিয়েছে যে, দেশের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে অবস্থান করেও প্রবাসীরা নানাভাবে সেই পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান তেমনই একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ, যা দেশের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনোজগতে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও তাঁরা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রশ্নে প্রত্যক্ষ অংশীদারের মতোই উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত ও সক্রিয় ছিলেন।আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবাসীদের জীবনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, জীবন-বাস্তবতায় তাঁরা দেশান্তরিত হলেও স্বদেশ তাঁদের চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে দেশ ছাড়তে পারে, কিন্তু মনোজগতে দেশ কখনোই প্রবাসীদেরকে ছেড়ে যায় না। জন্মভূমির মাটি ও মানুষ, শৈশবের স্মৃতি, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ও ইতিহাসের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের যে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা স্বদেশ থেকে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। সমাজবিজ্ঞানীরা একে ‘প্রবাসী পরিচয়’ (ডায়াসপোরিক আইডেন্টিটি)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শারীরিকভাবে প্রবাসীরা হয়তো স্বদেশের বাইরে অন্য কোন দেশে অবস্থান করে, কিন্তু তাঁদের যাপীত-জীবনের স্মৃতি, আবেগ-অনুভূতি ও আত্মপরিচয়ের একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে সংযুক্ত থাকে প্রিয় জন্মভূমির সঙ্গে।প্রবাসীদের কাছে বাংলাদেশ কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি তাদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের চিন্তাচেতনা, আবেগ-অনুভূতি, ইচ্ছে-আকাক্সক্ষা-স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বড় একটি অংশ জুড়েই থাকে প্রিয় স্বদেশ। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন তারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন, সন্তানের কাছে বাংলাদেশের গল্প বলেন, জাতীয় দিবসগুলো পালন করেন কিংবা দেশের খবর অনুসরণ করেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তাঁরা তাঁদের অস্তিত্বের একটি অংশকে দৈনন্দিন জীবন-চর্যায় বাঁচিয়ে রাখেন। নাড়ির এই অদৃশ্য সংযোগই প্রবাসীদের স্বদেশচেতনাকে জীবন্ত রাখে। তাই দেশের সংকট তাঁদের হৃদয়কে নাড়া দেয়, আর জাতীয় অর্জন তাঁদের গর্বিত করে। দেশের মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখন প্রবাসীরাও মানসিকভাবে সেই সংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠেন। ঐতিহাসিক সত্যের অংশ হিসেবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।স্বদেশচেতনার পাশাপাশি প্রবাসীদের উদ্বেগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো দেশে রেখে আসা আপনজনদের কল্যাণ-চিন্তা ও স্বদেশের প্রতি গভীর টান। পৃথিবীর যেখানেই তারা থাকুন না কেন, তাঁদের ধ্যানজ্ঞান জুড়ে থাকে বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং ফেলে আসা জীবনের অসংখ্য দূর-অতীত ও নিকট-অতীতের স্মৃতি। দূরদেশে অবস্থান করলেও প্রতিদিন তাঁদের মন পড়ে থাকে দেশের খোঁজখবরে। কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা সামাজিক সংকট দেখা দিলে প্রথমেই তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমার আপনজনেরা কেমন আছে’? চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় এই উদ্বেগ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত, সহিংসতা, দমন-পীড়ন এবং অনিশ্চয়তার খবর তাদের উৎকণ্ঠিত করে তুলেছিল। উদ্বেগ ও উৎকন্ঠায় অনেকেই রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করেছেন, ফোনে পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং তাদের নিরাপত্তার সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রেখেছেন। কেউ বারবার একই নম্বরে ফোন করেছেন, কেউ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচিতজনদের খুঁজেছেন, কেউ আবার সামান্য একটি বার্তার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন। প্রবাসীদের এই মানসিক অবস্থাকে কেবল রাজনৈতিক উদ্বেগ বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে; এটি ছিল স্বজন, স্বজাতি এবং স্বদেশের প্রতি গভীর আবেগ, দায়িত্ববোধ ও মানবিক সংযোগের বহিঃপ্রকাশ।চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে বিভীষিকাময় মুহূর্ত ছিল যখন স্বৈরাচারী সরকার বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। আধুনিক বিশ্বে ইন্টারনেট কেবল একটি প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা কিংবা উপযোগিতা নয়; এটি প্রবাসী মানুষের জন্য স্বদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সেতুবন্ধন। প্রতিদিনের ফোনকল, ভিডিও আলাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা কিংবা সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণ প্রভৃতি সবকিছু মিলিয়েই নানা মাধ্যমে প্রবাসীরা তাঁদের দেশকে কাছে অনুভব করেন। সেই সেতুবন্ধন যখন হঠাৎ ভেঙে পড়ে, তখন দূরত্বের বাস্তবতা নির্মমভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়, নিজেদেরকে ভাবতে হয় ভিন গ্রহের বাসিন্দা। ১৯ জুলাই ২০১৪-এর সেই যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতার মুহূর্তে অসংখ্য প্রবাসীর কাছে মনে হয়েছিল যেন বাংলাদেশ হঠাৎ করেই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে আড়াল হয়ে গেছে। আমার মতো অনেকের চেতনায় বাংলাদেশ যেন এ দুনিয়া হতে হারিয়ে গিয়েছিল। সময় কাটাতে হয়েছিল দুর্যোগকালীন উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা নিয়ে। দেশে কী ঘটছে, কারা নিরাপদ আছে, কারা বিপদের মধ্যে আছে, কিভাবে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা যেতে পারে এসব কোনো কিছুই আর নিশ্চিতভাবে জানার উপায় ছিল না।রাষ্ট্র যখন তথ্যপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দেয়, তখন মানুষের কল্পনা ও আশঙ্কা বাস্তবতার চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, তথ্যের অভাব প্রায়ই মানুষের উদ্বেগ ও উৎকন্ঠাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সেই অজানাকে, যার সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য ও ধারণা পাওয়া যায় না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত অসংখ্য বাংলাদেশির কাছে সেই দিনগুলো ছিল অসহায়ত্ব, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং মানসিক যন্ত্রণার এক দীর্ঘ অধ্যায়। অনেক প্রবাসী রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন। কর্মস্থলে থেকেও কাজে মনোযোগ দিতে পারেননি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বসেও মন পড়ে ছিল বাংলাদেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে। দেশে বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্তুতি, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো সুযোগ না থাকায় তাঁদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছিল অনিশ্চয়তার মধ্যে। কোনো অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে মনে হতো হয়তো দেশের কারও খবর পাওয়া যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য কোনো তথ্যের সন্ধানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছেন অনেকে। কিন্তু তথ্যের চেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, ভয়তাড়িত অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তার ভারই তখন ছিল বেশি।আমি নিজেও সত্যিকার অর্থে সেই জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে কোনো কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারিনি। প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা, পেশাগত দায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত কাজ সবকিছুই যেন অর্থহীন মনে হচ্ছিল। সারাক্ষণ মনে হতো, দেশে কী হচ্ছে? আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা কেমন আছে? পরিচিতজনদের কেউ বিপদে পড়েছে কি না? নানাভাবে মানুষের সাথে যুক্ত থাকার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বহু প্রবাসী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বাংলাদেশের সর্বশেষ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্য। কেউ তাঁদের পরিবারের খোঁজ জানতে চেয়েছেন, কেউ বন্ধুদের খবর জানতে চেয়েছেন, আবার কেউ কেবল নিশ্চিত হতে চেয়েছেন যে তাঁদের প্রিয় মানুষগুলো এখনো নিরাপদ আছেন। সেই ফোনকল, বার্তা এবং উদ্বেগভরা প্রশ্নগুলো আজও স্মৃতিতে স্পষ্ট হয়ে আছে। সেই সময় প্রবাসীদের অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁদের সম্মিলিত মানসিক যন্ত্রণা। একজনের উৎকণ্ঠা আরেকজনের উদ্বেগকে স্পর্শ করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্রবাসী গ্রুপ, কমিউনিটি ফোরাম এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের নেটওয়ার্কগুলো তখন পরিণত হয়েছিল উদ্বিগ্ন মানুষের অনানুষ্ঠানিক সহায়তা ব্যবস্থায়। কেউ সামান্য কোনো তথ্য পেলেই অন্যদের জানাতেন, কেউ সম্ভাব্য যোগাযোগের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন, কেউ আবার শুধু মানসিক সমর্থন দেওয়ার জন্য অন্যদের পাশে দাঁড়াতেন। এই সম্মিলিত উদ্বেগ ও পারস্পরিক সংযোগই প্রমাণ করে যে, প্রবাসী সম্প্রদায় কেবল বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের সমষ্টি নয়; বরং একটি বিস্তৃত মানবিক ও আবেগিক নেটওয়ার্ক, যার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে স্বদেশচেতনা।প্রবাসীদের জীবনে হয়তো অনেক স্মৃতি আসে-যায়, কিন্তু দেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার জুলাইয়ের সেই মুহূর্তগুলো তারা কোনোদিন ভুলতে পারবেন না। তখন ভৌগোলিক দূরত্ব যেন হঠাৎ করেই বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। প্রবাসীরা নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন যে, দূরে থাকলেও তাঁদের হৃদয়, চিন্তা এবং অস্তিত্বের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের সঙ্গেই বাঁধা। স্বদেশের সংকট তখন তাঁদের ব্যক্তিগত সংকটে পরিণত হয়েছিল। সেই ঘুমহীন রাতগুলো, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটানো দীর্ঘ প্রহরগুলো এবং একটি ফোনকলের অপেক্ষায় থাকা অসংখ্য মানুষের মুখ আজ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের এক নীরব কিন্তু গভীর মানবিক দলিল হয়ে আছে।প্রবাসীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা। দেশের লাখো পরিবার প্রবাসীদের উপার্জনের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। পরিবার-পরিজনের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, ব্যবসা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় নির্বাহে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। তাঁরা কেবল অর্থ পাঠান না; দেশের সুখ-দুঃখ, উন্নয়ন ও সংকটের অর্থনৈতিক দায়ভারও বহন করেন। ফলে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাঁদের জন্য কেবল একটি সংবাদ নয়; বরং তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু পরিবারের জীবনমান উন্নত করে না; জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ফলে প্রবাসীরা যখন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, তখন সেই উদ্বেগের সঙ্গে অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে। তাঁরা জানেন, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন কেবল দেশের মানুষের জন্যই নয়; তাঁদের নিজেদের পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।উপরে তুলে ধরা এই তিনটি বাস্তবতা তথা স্বদেশচেতনা, আপনজনের প্রতি আবেগগত বন্ধন এবং অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা- চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রবাসীদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ফলে তাঁরা কেবল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাননি; বরং নানাপন্থায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেছেন এই নাগরিক অধিকার আদায়ের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সংগ্রামে। ভৌগোলিক দূরত্ব তাঁদের শারীরিক উপস্থিতিকে সীমিত করতে পেরেছিল, কিন্তু তাঁদের চিন্তাভাবনা, গণদাবীর পক্ষে অবস্থান এবং স্বৈরাচারী সরকার বিরোধী কর্মতৎপরতাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে দূর থেকে পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ তাঁদেরকে আন্দোলনের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর বিশেষ সক্ষমতা দিয়েছে। ফলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নাগরিকদের আন্দোলন ছিল না; এটি ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক বাংলাদেশি চেতনারও বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়েছিল, যার সক্রিয় অংশীদার ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা।গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের সবচেয়ে দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল তথ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় তথ্য কেবল সংবাদ নয়; এটি ক্ষমতা, প্রতিরোধ এবং জনমত গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যখন কোনো রাষ্ট্র তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তখন বিকল্প তথ্যব্যবস্থা সামাজিক প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যখন তথ্যপ্রবাহ নানা সীমাবদ্ধতা, বিভ্রান্তি এবং নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়ছিল, তখন প্রবাসীরা বিকল্প তথ্যপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবিনার, লাইভ আলোচনা, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাঁরা দেশের পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া খণ্ডিত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, ভিডিওচিত্র, আলোকচিত্র এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগসমূহ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচারে অনেক প্রবাসী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই সঙ্গে দেশের ভেতরের আন্দোলনকারী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মধ্যে একটি কার্যকর যোগাযোগ-সেতু তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, অনুবাদ, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দেশের অভ্যন্তরে যে কণ্ঠস্বর কখনো কখনো সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল, তা প্রবাসীদের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিসরে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। প্রবাসীরা কেবল তথ্যের গ্রহীতা ছিলেন না; বরং তাঁরা তথ্য-নিয়ন্ত্রণ ও তথ্য-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তথ্যসংগ্রাম তথা ‘ইনফরমেশন অ্যাক্টিভিজম’-এর সক্রিয় অংশে পরিণত হয়েছিলেন। একবিংশ শতাব্দীর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আন্দোলন-সংগ্রামে তথ্যপ্রবাহের গুরুত্ব বিবেচনা করলে এই ভূমিকার তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।প্রবাসীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, আহত ব্যক্তি, নিহতদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে বহু প্রবাসী ব্যক্তি ও সংগঠন আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন। বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা নিজ নিজ উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহ করেছেন, সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এবং সংকটাপন্ন পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানবিক সহায়তার এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং এটি ছিল জাতীয় সংহতি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের একটি শক্তিশালী প্রকাশ। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ সাময়িকভাবে স্থগিত বা সীমিত করার আহ্বানও দেখা যায়, যা সরকারের প্রতি এক ধরনের প্রতীকী এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। প্রবাসীদের একটি অংশ মনে করেছিল যে, রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাঁদের অবস্থান প্রকাশের অধিকার রয়েছে। এই উদ্যোগের ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও এটি ঐক্য ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে প্রবাসীরা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের প্রভাব প্রয়োগের সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং প্রয়োজনে অর্থনৈতিক শক্তিকেও নাগরিক অবস্থানের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত ছিলেন।চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের ভূমিকার একটি বিশেষ দিক ছিল তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় ‘নাগরিক কূটনীতি’ (সিটিজেন ডিপ্লোমেসি) বলা হয়, যেখানে সাধারণ নাগরিকরাই আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করেছিলেন। তারা স্থানীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফিং দেন, বিবৃতি প্রদান করেন, তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। অনেক দেশে স্মারকলিপি প্রদান, চিঠি প্রেরণ, গোলটেবিল আলোচনা আয়োজন, সংবাদ সম্মেলন এবং প্রতিনিধি বৈঠকের মাধ্যমে তাঁরা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন। বৈশ্বিক যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক ব্যবহারের এই সক্ষমতা আধুনিক প্রবাসী সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বাইরে থেকেও তাঁরা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছেন।রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, আলোচনা সভা এবং সংহতি কর্মসূচির আয়োজন করেন। লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি, বার্লিন, প্যারিস, রোম, স্টকহোমসহ বিশ্বের নানা শহরে অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও জনমতের দৃষ্টি আকর্ষণে সহায়ক হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে এসব কর্মসূচিতে শুধু বাংলাদেশিরাই নয়, বরং স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফলে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ একটি জাতীয় ইস্যুর গণ্ডি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। বিদেশের মাটিতে এই সংহতি প্রকাশ দেশের আন্দোলনকারীদের জন্য নৈতিক শক্তির উৎস হয়ে ওঠে। এটি তাদের এই বার্তা দেয় যে, তাঁরা একা নন; বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি বাংলাদেশি তাদের সংগ্রামের পাশে রয়েছে। সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে নৈতিক সমর্থনের গুরুত্ব কখনোই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আন্দোলনের কঠিন সময়ে মানুষ কেবল সাংগঠনিক বা আর্থিক সহায়তাই খোঁজে না; তারা জানতে চায়, তাদের কণ্ঠস্বর অন্যরাও শুনছে এবং তাদের সংগ্রাম বৃহত্তর মানবিক ও নৈতিক সমর্থন লাভ করছে। প্রবাসীদের সংহতির এই কর্মসূচিগুলো সেই সময় আন্দোলনকারীদেরকে শক্তি যুগিয়েছিল।প্রবাসীদের এই ভূমিকা অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও প্রবাসীরা আন্তর্জাতিক জনমত গঠন, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। লন্ডন, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে তখনকার প্রবাসী বাংলাদেশিরা যে জনমত-সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন, তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি স্বীকৃত অধ্যায়। ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতারই আধুনিক রূপ আমরা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষ করেছি। পার্থক্য শুধু এই যে, আজকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রবাসীদের প্রভাব বিস্তারের পরিধি, গতি এবং কার্যকারিতা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। চব্বিশের অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে যে প্রবাসীদের ভূমিকা কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন-আলোচনায় প্রবাসীদের অবদানকে প্রায়শই অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, তারা দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাঁরা রাষ্ট্রকে কেবল একটি সরকার বা রাজনৈতিক দলের সমার্থক হিসেবে দেখেন না; বরং একটি বৃহত্তর জাতীয় চুক্তি, নাগরিক অধিকার এবং সম্মিলিত ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন। তাই রাষ্ট্র যখন সংকটে পড়ে, তখন তাদের উদ্বেগও নাগরিক দায়িত্ববোধের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে।চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এই পরিবর্তনের সময়ে দেশের মানুষের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, প্রত্যাশা এবং আশার এক অনন্য অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। তারা দূরে থেকেও দেশের জন্য ভেবেছেন, কথা বলেছেন, সংগঠিত হয়েছেন এবং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাদের অনেকেই হয়তো আন্দোলনের ময়দানে উপস্থিত ছিলেন না, কিন্তু তাদের কণ্ঠ, তাদের শ্রম, তাঁদের যোগাযোগ, তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা এবং তাদের অবিচল স্বদেশপ্রেম এই গণঅভ্যুত্থানের বিস্তৃত সামাজিক শক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। সেই অর্থে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান শুধু বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরের মানুষের গল্প নয়; এটি বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির হৃদস্পন্দনেরও ইতিহাস।গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সময়ে প্রবাসীদের এই সম্পৃক্ততাকে কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল মূলত স্বদেশপ্রেম, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ। মানুষ সাধারণত সেই বিষয় নিয়েই উদ্বিগ্ন হয়, যার সঙ্গে তার আবেগ, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রবাসীদের অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখনও তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা ভৌগোলিকভাবে দূরে অবস্থান করলেও নিজেদেরকে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নৈতিক ভবিষ্যৎ থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন মনে করেননি। সমাজবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, আধুনিক বিশ্বে জাতিসত্তার ধারণা কেবল একটি ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা বিস্তৃত হয় সীমান্ত অতিক্রম করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মানুষের চেতনা, অভিজ্ঞতা এবং সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে সত্য। আজকের বাংলাদেশ শুধু বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসরত মানুষের নয়; এটি একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত পেশাজীবীদের, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি প্রবাসী বাংলাদেশিরও। তাদের প্রত্যেকের জীবন, স্বপ্ন এবং পরিচয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ফলে দেশের সংকট, সংগ্রাম কিংবা অর্জন তাদের ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশে পরিণত হওয়াই স্বাভাবিক।প্রবাসীরা কেবল অর্থনৈতিক অবদানের উৎস নন; তারা একই সঙ্গে জাতীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক শক্তি। দেশ ও দশের কল্যাণে তাদের ভূমিকা বহুমাত্রিক। তারা আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে পারেন, মানবাধিকার প্রশ্নে বৈশ্বিক সংহতি সৃষ্টি করতে পারেন, তথ্যপ্রবাহের বিকল্প পথ নির্মাণ করতে পারেন, কূটনৈতিক যোগাযোগকে প্রভাবিত করতে পারেন এবং সংকটকালে দেশের মানুষের পাশে মানবিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়াতে পারেন। অর্থাৎ তারা শুধু অর্থনীতির অংশ নন; তারা জাতীয় জীবনেরও সক্রিয় অংশীদার। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের এই সক্রিয় অংগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী নাগরিক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আরও শক্তিশালী, প্রাতিষ্ঠানিক এবং টেকসই সেতুবন্ধন গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ একটি জাতির শক্তি কেবল তার ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তার মানুষের জ্ঞান, শ্রম, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা, ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতার মধ্যেও নিহিত থাকে। যে রাষ্ট্র তার প্রবাসীদের কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস হিসেবে দেখে, সে রাষ্ট্র তাদের প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে না। তাই আমাদের প্রয়োজন এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা যেখানে প্রবাসীদেরকে দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, নীতিনির্ধারণ এবং রাষ্ট্রগঠনের বৃহত্তর অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা কখনো কেবল ভৌগোলিক উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। দেশের জন্য উদ্বিগ্ন হতে, দেশের জন্য কাঁদতে, দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে কিংবা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে দেশের মাটিতে উপস্থিত থাকা সবসময় প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় হাজার হাজার মাইল দূরে বসে থাকা একজন মানুষও স্বদেশের প্রতি এমন দায়বদ্ধতা অনুভব করতে পারেন, যা তাকে নীরব দর্শক হয়ে থাকতে দেয় না। বর্তমানে নানা জনের হাতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস লেখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও লেখা হবে ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ-প্রতিরোধে উত্তাল রাজপথের বীরত্বগাথা, তরুণদের আত্মত্যাগ, মানুষের সাহস, প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের ইতিহাস দিয়ে; কিন্তু সেই ইতিহাসের আরেকটি অনুচ্চারিত অধ্যায় হিসেবেও রয়ে যাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের অশ্রুসিক্ত উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার বেদনাবিদ্ধ সময়ের গল্প, ঘুমহীন রাতের অভিজ্ঞতা এবং স্বদেশের জন্য নিরন্তর প্রার্থনার স্মৃতি। ইতিহাসের আনুষ্ঠানিক দলিলে হয়তো তাদের নাম খুব বেশি লেখা থাকবে না, কিন্তু তাদের উদ্বেগ, অপেক্ষা এবং সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল এই বৃহত্তর গণজাগরণের নীরব শক্তিগুলোর একটি। রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রবাসীদের এই অভিজ্ঞতাগুলো হয়তো পরিসংখ্যান হয়ে ওঠবে না, কিন্তু জাতির সমষ্টিগত স্মৃতিতে এগুলো গভীর মানবিক সাক্ষ্য হিসেবে বেঁচে থাকবে।একদিন যখন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস পাঠ করবে, তখন তারা রাজপথের সংগ্রামের পাশাপাশি হয়তো এই নীরব অধ্যায়ের কথাও জানবে। শুনবে সেইসব প্রবাসী মানুষের কথা, যারা দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্তে বাংলাদেশের সঙ্গেই ছিলেন। তারা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন, তথ্যের জন্য অপেক্ষা করেছেন, আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে কাজ করেছেন, মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছেন, প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন করেছেন এবং নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কারণ তারা দেশ থেকে বহুদূরে ছিলেন, কিন্তু বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তাদের ঠিকানা ছিল ভিন্ন দেশে, কিন্তু তাদের হৃদয়ের ঠিকানা ছিল বাংলাদেশ। তাদের শরীর অবস্থান করছিল পৃথিবীর অন্য দেশের বিভিন্ন নগরে, কিন্তু তাদের চিন্তা, উদ্বেগ, প্রার্থনা এবং স্বপ্নের একটি বড় অংশ তখনও বাংলাদেশের রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয়, শহর, গ্রাম এবং সংগ্রামী মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। তাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে প্রবাসীদের অবদান কেবল একটি পরিশিষ্ট নয়; বরং এটি সেই বৃহত্তর জাতীয় সংগ্রামের কাহিনিরই অংশ, যেখানে দেশের ভেতর ও বাইরের বাংলাদেশিরা মিলিতভাবে অন্যায়, বৈষম্য ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল। আর সেই কারণেই বলা যায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশের মাটিতে সংঘটিত একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; বরং এটি ছিল সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের হৃদয়ে একযোগে ধ্বনিত হওয়া স্বদেশচেতনার এক ঐতিহাসিক জাগরণ।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

হোয়াইট কালার ক্রাইম: অর্থনীতির নীরব ঘাতক

আমরা যখন অপরাধের কথা ভাবি, তখন সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে চোর, ডাকাত বা ছিনতাইকারীর চিত্র। এ ধরনের অপরাধ দৃশ্যমান, তাৎক্ষণিক এবং অনেক সময় সহিংসতার সঙ্গে জড়িত। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ‘ব্লু-কলার ক্রাইম’। কিন্তু আধুনিক সমাজে এমন এক ধরনের অপরাধ রয়েছে, যার কোনো রক্তাক্ত দৃশ্য নেই, অথচ এর ক্ষতি একটি দেশের অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের জীবনযাত্রাকে দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত করে দেয়। এই অপরাধই হলো ‘হোয়াইট কালার ক্রাইম’।সাদারল্যান্ডের তত্ত্বের আলোকে১৯৩৯ সালে আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানী এডউইন সাদারল্যান্ড প্রথম ‘হোয়াইট কালার ক্রাইম’ ধারণাটি উপস্থাপন করেন। তার মতে, সমাজে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো ব্যক্তি দায়িত্ব পালনের সময় নিজের অবস্থানের অপব্যবহার করে যে অপরাধ করেন, সেটিই হোয়াইট কালার ক্রাইম।এই সংজ্ঞার সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, অসাধু ব্যবসায়ী, ব্যাংকার কিংবা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা যখন ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তখন তার ক্ষতি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবন এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।বাংলাদেশে হোয়াইট কালার ক্রাইমবাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াইট কালার ক্রাইমের সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেত্র হলো ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি, ভুয়া বা শেল কোম্পানির নামে ঋণ গ্রহণ, শেয়ারবাজারে কারসাজি, কর ফাঁকি, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো ঘটনাগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।এসব অপরাধের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো অপরাধীরা অনেক সময় সমাজে সম্মানিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত থাকেন। বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে তাদের আর্থিক অনিয়মের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে। মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থাহীনতা এসবই এমন অপরাধের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব।অন্যদিকে, সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও হোয়াইট কালার অপরাধে বিচারপ্রক্রিয়া প্রায়ই দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আইনি জটিলতার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে আরও অপরাধ সংঘটনের পথ সহজ করে দেয়।অর্থনীতির জন্য নীরব হুমকিহোয়াইট কালার ক্রাইমের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর অদৃশ্য প্রভাব। একটি ব্যাংক থেকে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ কিংবা বিদেশে অর্থ পাচার শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে না; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যাহত করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করে, বিনিয়োগ পরিবেশ দুর্বল করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, এই অপরাধের শিকার শেষ পর্যন্ত গোটা সমাজ।উত্তরণের পথহোয়াইট কালার ক্রাইমকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার সংকটও বটে। তাই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজন শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।একই সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জনগণের মধ্যে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। আইনের চোখে সবাই সমান এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলেই হোয়াইট কালার ক্রাইমের বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দৃশ্যমান অপরাধের পাশাপাশি এই অদৃশ্য অর্থনৈতিক মহামারীর বিরুদ্ধেও সমান গুরুত্ব দিয়ে লড়াই করতে হবে। কারণ, একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য সব সময় অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো একটি কলমের স্বাক্ষর, একটি জালিয়াতিপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারই যথেষ্ট।লেখক: শিক্ষার্থী, অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

তেলাপোকা ফিরেছে, কারণ ক্ষত শুকায়নি

ভারতের রাজনীতিতে আবার উচ্চারিত হচ্ছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। ককরোচ মানে তেলাপোকা। যে পতঙ্গটিকে দেখলে মানুষ জুতা খোঁজে, বিষ ছেটায়, অথচ কোটি বছরেও যাকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলা যায়নি, সেই তেলাপোকাকেই এবার নিজেদের প্রতীক বানিয়েছে ভারতের বেকার তরুণেরা। ২০২৪ সালের জুনে নিট প্রশ্নফাঁস এবং সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতির ‘তেলাপোকা’ মন্তব্যের জেরে যে ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্মের জন্ম হয়েছিল, তা দুই বছর পর ২০২৬ এর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে এসে আবার দিল্লির যন্তর মন্তর কাঁপাচ্ছে। প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে, পুরনো ঘটনা নিয়ে এখন আন্দোলন কেন? উত্তর একটাই, পুরনো ক্ষতের ওপর নতুন ঘা পড়েছে। সরকার ২০২৪ এ যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন ধীরগতির। উল্টো ২০২৬ এর মে-জুনে এসএসি, রেলওয়ে এবং রাজ্য পুলিশের নিয়োগ পরীক্ষায় আবারও বড় আকারের প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছে, সিবিআই-এর তদন্তে একাধিক রাজ্যের যোগসূত্রের কথা এসেছে। তাই হতাশা কেবল মেডিকেল প্রত্যাশীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা এখন সরকারি চাকরিপ্রার্থী কোটি তরুণের ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। পুরনো অপমান আর নতুন হতাশা মিলে আবার বিস্ফোরণ ঘটেছে।২০২৪ এর ঘটনাপ্রবাহ এখন ইতিহাস। সেবার নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের পর সারা দেশে বিক্ষোভ হয়। কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর আসে। ঠিক সেই সময় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিতে বেকার যুবকদের প্রসঙ্গে বলেন, কাজ নেই বলেই তারা তেলাপোকার মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বোস্টনের শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকের ‘সব তেলাপোকা এক হলে কী হবে’ পোস্টটি তখন ভাইরাল হয়। চাপের মুখে সরকার নিট পুনঃপরীক্ষা, তদন্ত কমিটি এবং কঠোর আইনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আন্দোলন থামায়। কিন্তু সেই আইন সংসদে পাস হলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। দুর্নীতির চক্র পুরোপুরি ভাঙা যায়নি। ফলে তেলাপোকা প্ল্যাটফর্মটি সুপ্ত অবস্থায় ছিল, মরেনি।বিস্ফোরণের দ্বিতীয় কারণ হলো ডিজিটাল মেমোরি। ২০২৬ এর জুনে হঠাৎ করে বিচারপতির সেই পুরনো বক্তব্যের ১৫ সেকেন্ডের ক্লিপটি ইনস্টাগ্রাম রিল এবং ইউটিউব শর্টসে ভাইরাল হয়ে যায়। কোটি ভিউ। যারা ২০২৪ এ স্কুলে ছিল, তারা এবার প্রথমবার এই অবজ্ঞা দেখেছে। পুরনো অপমান নতুন করে রক্তাক্ত করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন প্রশ্নফাঁসের খবর। চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, কিন্তু সুযোগ বাড়েনি। তাই ২০২৪ এ যে আগুন নেভানো হয়েছিল, ২০২৬ এ এসে তা আবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। এই সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আরেকটি তত্ত্বও ছড়ায়। সরকার এফসিআরএ বিল পাস করতে যাচ্ছে, আর সেই বিল আটকাতেই কিছু এনজিও নাকি যুবকদের উসকাচ্ছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি। তাই ২০২৪ এর ক্ষোভ আর ২০২৬ এর বাস্তবতা মিলে এক ভয়ঙ্কর মিশ্রণ তৈরি হয়েছে। অভিজিৎ দীপক আবার সামনে এসে যন্তর মন্তরে জমায়েতের ডাক দেন।যন্তর মন্তরের চিত্র এবারও একই, কিন্তু মাত্রা বড়। দেশের ১৮টি রাজ্য থেকে তরুণেরা ট্রেনে-বাসে এসে হাজির হয়েছে। সরকার আগের মতোই মেট্রো বন্ধ করেছে, ইন্টারনেট স্লো করেছে। কিন্তু লাভ হয়নি। হিন্দু-মুসলিম-দলিত সবাই এক প্ল্যাকার্ডে লিখেছে ‘চাকরি চাই, সম্মান চাই’। পুলিশ লাঠি চালিয়েছে, মঞ্চ ভেঙেছে। রাতের মধ্যে আবার মঞ্চ তৈরি হয়েছে। তেলাপোকার প্রতীকী শক্তি এখানেই। তাকে মারলে সে মরে না, বরং অন্ধকারে আরও ছড়িয়ে পড়ে। এবারের আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক দলের পতাকা ছিল না। ছিল কেবল মোবাইল, মিম আর অভিমান। তেলাপোকার মতোই তারা প্রমাণ করে, চাপ দিলে এরা মরে না, বরং আরও ছড়ায়।সরকার এবারও পুরনো কৌশলেই ফিরেছে। প্রথমে কঠোরতা, পরে সংলাপ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাতির উদ্দেশে বলেন, ৯০ দিনের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল হবে এবং প্রশ্নফাঁস রোধে নতুন টাস্কফোর্স গঠন হবে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি ২০২৪ এর আইনে প্রথমবারের মতো বড় গ্রেপ্তারও হয়েছে। কেন্দ্রীয় দুই মন্ত্রী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আন্দোলনকারীরা ১৫ দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করেছে, ফলাফল দেখার শর্তে। রক্তপাত হয়নি, এটি স্বস্তির। একটি বড় সংকট সংলাপের মাধ্যমে আপাতত নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এখানেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র রাজনৈতিক তাৎপর্য। তারা রাষ্ট্র ভাঙতে চায়নি, তারা চেয়েছে রাষ্ট্র তাদের শুনুক।ভারতের গণতন্ত্রের বিশেষত্ব এখানেই। ২৮টি রাজ্যের এই দেশে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও আন্দোলন হয়। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়ে না। কারণ এখানে সেনাবাহিনী ব্যারাকে থাকে, আদালত সরকারের বিরুদ্ধে রায় দেয়, গণমাধ্যম প্রশ্ন করে। তাই ক্ষোভ রাস্তায় আটকে থাকে না, ক্ষোভ জমে বিস্ফোরণ হয় না, প্রতিষ্ঠানের দরজা পর্যন্ত যায়। তেলাপোকা আন্দোলনও সেই দরজা পর্যন্ত গেছে। এটি বিপ্লবের ডাক দেয়নি, এটি দাবি করেছে জবাবদিহিতার।শেষ কথা হলো, তেলাপোকা টিকে থাকে কারণ সে অভিযোজিত হতে জানে। ভারতের গণতন্ত্রও টিকে আছে কারণ সে চাপকে অস্বীকার করে না, আত্মস্থ করে। যারা একদিন তেলাপোকা বলে ব্যঙ্গ করেছিল, তারা আজ টেবিলে বসে কথা বলতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এই জয় ততক্ষণই জয়, যতক্ষণ প্রতিশ্রুতি কাগজে না থেকে মাঠে নামে। না হলে ২০২৮ এ আবার নতুন কোনো ক্লিপ ভাইরাল হবে, আবার নতুন তেলাপোকা জন্ম নেবে। রাষ্ট্রের কাজ হলো মানুষকে এতটা কোণঠাসা না করা, যাতে তাকে তেলাপোকা হয়ে বাঁচতে হয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে

ছন্দে ছন্দে অঝোর ধারায় বর্ষায় যখন বৃষ্টি ঝরতে থাকে, মাসটি শ্রাবণ না হলেও কর্ণ কূহরে সেই অমর গানটি বাজতে থাকে। অফিসের কাজ, খাওয়া দাওয়া, আড্ডা আলাপে মশগুল থাকলেও অনবরত কানে অনুরণন হতে থাকে ‘শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে / তোমারি সুরটি আমার মুখের ’পরে, বুকের’ পরে/পুরবের আলোর সঙ্গে পড়ুক পাতে দুই নয়ানে/–নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে।/” আহা কী অসাধারণ গান। এবারের শ্রাবণে সেই অমর গানকে ছাপিয়ে আর একটি গান বাঙালির হৃদয় মন দখল করে ফেলেছে ইতোমধ্যে। সে গানটি হঠাত করে প্রতিটি বাঙালির অন্তর আবার জয় করলো কী ভাবে, সেই গল্পটি পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। সিলেট জেলা শহরের খুব কাছেই ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা। সিলেট শহর থেকে মাত্র ত্রিশ, চল্লিশ মিনিটের দুরত্ব। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পাল। বিউটি রাণী পাল সিলেটের শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেছেন। প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল। চোখের ভেতরে অপার স্বপ্ন। শিশু শিক্ষার জন্য উপযুক্ত একজন শিক্ষক। সাধারণত প্রধান শিক্ষকেরা খুব বেশি ক্লাস নিতে দেখা যায়না। বিউটি রানী পাল ব্যতিক্রম। তার ফেসবুকে প্রবেশ করে দেখা গেলো তিনি শিশুদের অঙ্ক শেখান নানা সৃজনশীল, আনন্দময় ভঙ্গীতে । একই ভাবে দেখতে পেলাম তিনি সাত বারের নাম ছড়ার ছন্দে শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছেন। কী আনন্দময় শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ। তার ফেইসবুক আইডিতে বিদ্যালয়ে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা করানো, নাচ-গানের মাধ্যমে গণিতের বিভিন্ন চিহ্ন ও পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু শেখানো, শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ এবং গাছের চারা বিতরণের বিভিন্ন ভিডিও দেখা যায়। তার আইডি সকলের জন্য উন্মুক্ত। এরকম আইডিতে প্রবেশ করলে মন ভালো হয়ে যায়। প্রধাণ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতি তার নিবেদন দেখলে এই অন্ধকার সময়ে কিছুটা হলেও আলোর রেখার অস্তিত্ব উপলব্ধি করা যায়। সম্প্রতি ২৩ জুলাই তারিখে এই নিবেদিত প্রাণ প্রধান শিক্ষিকার একটি ভিডিও সামজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। খুব সাধারণ একটি ভিডিও। তাকে দেখা যায় নব্বইয়ের দশকের সাড়া জাগানো ‘ডিফারেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের একটি শ্রুতি মধুর গানের সঙ্গে হেটে যেতে। গানটির কথা ছন্দময়। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে/অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবনে ঝরায়ে/আজ কেন মন উদাসী হয়ে/দূর অজানায় চায় হারাতে’, কাব্যময় গীতিকবিতা। ডিফারেন্ট টাচের শিল্পী মেজবাহ্ রহমান গানটি গেয়েছিলেন নব্বই সালে। তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিলো গানটি। বিউটি রাণী পাল স্কুল সময়ের বাইরে গানটির সঙ্গে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তালে তালেও নয় শুধুমাত্র হেঁটে। নৃত্যের ভঙ্গিতে হাঁটা নয়। অত্যন্ত সহজ সরল হাঁটা তবে নান্দনিক। এই ভিডিওটি ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেইসবুক পেজ থেকে নেতিবাচক ক্যাপশন দিয়ে আসিফ ইকবাল ইরন নামে এক প্রবাসী তরুণ ভিডিওটি ছড়িয়ে দেন। ‘ছড়িয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোক প্রানবন্ত এই শিক্ষককে সাইবার বুলিং শুরু করেন। অশ্লীলতা, শিষ্টাচার বহির্ভুত ভিডিও হিসেবে অনেকেই চিহ্নিত করে অশালীন ভাবে গালি গালাজ শুরু করেন। তবে দেশের অধিকাংশ শুভ চিন্তার মানুষ এর মধ্যে কোন অভব্যতার চিহ্ন খোঁজে পাননি। বিউটি রানীর সহকর্মীরা তাকে অকুন্ঠ সুমর্থন জানিয়ে এ’গান দিয়ে নিজেরা এক ভিন্ন ধর্মী প্রতিবাদের সূচনা করেন। গত কয়েকদিন ফেইসবুকের নিউজফিড ছেয়ে গেছে অগণন শিক্ষক এবং সুশীল নাগরিকদের অভিনব সঙ্গীত ময় প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। সকলের একি কথা,একজন নারী শিক্ষক কি তার প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের বাইরে একটি ব্যক্তিগত জীবন যাপন করতে পারেন না? শিশুবান্ধব আধুনিক শিক্ষাদান ও শিক্ষকের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে কেন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে? ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো গুণী শিক্ষকের চরিত্রহনন কি সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়? শিশু মনস্তত্ব এবং শিশু শিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করে থাকেন তারা জানেন আনন্দঘন পরিবেশে শিশুদের শিক্ষা দানের বিকল্প কিছু নেই। খেলার মাধ্যমে শিখন, গানের মাধ্যমে শিখন সর্বোপরি আনন্দের মাধ্যমে শিখন হলো শিশুদের নির্ভয়ে শিক্ষাজীবনে প্রবেশের উপযুক্ত উপাদান। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকতা কেবল ব্লাকবোর্ড, খড়ি কিংবা একমুখী বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে কোমলমতি শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ, মনোযোগ আকর্ষণ এবং ভীতিহীন পরিবেশ তৈরির জন্য 'আনন্দদায়ক শিখন' বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও বাধ্যতামূলক একটি মাধ্যম। বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিক্ষক কর্তৃক শ্রেণীকক্ষে বা সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রমে নাচের তালে ছড়া ও গান শেখানো এবং তা শিক্ষামূলক ভিডিও বা রিলস আকারে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়টি আইনি, প্রশাসনিক, শিক্ষাতাত্ত্বিক ও সাংবিধানিক- প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও সমর্থনযোগ্য। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তাই শিক্ষা দানের জন্য নৃত্য, গীত, চারুকলা, ক্রীড়ার মাধ্যমে শিক্ষক প্রশিক্ষন দেয়া হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তাই নিজেদেরকে প্রশিক্ষিত করে রাখতে হয় শিশু মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী পাঠদানের জন্য। এই প্রস্তুতি সরকারি প্রশিক্ষানালয় ‘প্রাথিমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট’ থেকে প্রদান করা হয়। দক্ষ, নিবেদিত শিক্ষকেরা স্বতঃপ্রণদিত হয়ে নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে নিজেদেরকে প্রস্তুত রাখতে চেষ্টা করেন। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল এরকম স্বঃউদয়োগী শিক্ষক। তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সৃজনশীলতার জন্য তিনি চলমান বছরে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে জেলা শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হন। এরকম সম্ভাবনাময় শিক্ষকের উদ্যমকে পেছন থেকে টেনে ধরার কী এখন আমাদের জাতীয় জীবনে অগ্রাধিকার। বিষয়টি গভীর ভাবে ভেবে দেখতে হবে। সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক বিউটি পালের পক্ষে এগিয়ে এসেছে সরকার, সুশীল সমাজের লোক, মূল ধারার সংবাদ মাধ্যম। নেতি বাচক অসংখ্য ঘটনা ও পরিবেশ পরিস্থিতির মধ্যে বড়ই আশাপ্রদ বিষয় এটি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, ঘটনাটিকে তিনি কোনো অন্যায় বা অপরাধ হিসেবে দেখছেন না। গান গাওয়া অন্যায় কোন বিষয় নয়।’ এরকম বিষয় নিয়ে সরকার এবং নাগরিক সমাজের যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে আগামীর যে কোন সময়ে। বিশ্ব জুড়ে শিশু শিক্ষাকে সব চেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। কেনো দেখা হয় এর ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন য়াছে বলে মনে করিনা। নাগরিক সমাজকে সচেতন থাকতে হবে। শিশুর নিজস্ব ধারায় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়ে বেড়ে উঠতে সাহায্য করতে হবে। শিক্ষকের আচরণ হবে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সহযোগিতামূলক। শিশুর অবুঝ মন বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে। পাঠদান পদ্ধতি হবে আনন্দপূর্ণ। যা শিশুরা শিক্ষকের সঙ্গে হাসতে-খেলতে শিখবে। এ’ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ রাখতে হবে। তিনি বলেছেন: ‘আনন্দহীন শিক্ষা, শিক্ষা নয়, যে শিক্ষায় আনন্দ নেই সে শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না’। লেখাটি শেষ করি বিউটি রাণী পালের মুখের কথা দিয়ে। সম্প্রতি তিনি বিডি নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা মুখে বলব কারিকুলাম উন্নত, আর আমাদের মন-মানসিকতা থাকবে সংকীর্ণ-তাহলে আমরা কীভাবে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নেব?’। সংকীর্নতা ছেড়ে আকাশের মতো উদার না হলে শিশু শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমরা আধুনিক বিশ্বের উপযোগি করে গড়ে তুলতে পারবো না। বিষয়টি যে কতো গুরুত্বপূর্ণ জাতি হিসেবে আমাদের অষ্ট প্রহর মনে রাখতে হবে।[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

রুনা লায়লার ক্ষোভ ও পদত্যাগপত্রে বানান ভুল

গতকালের পত্রিকাজুড়ে দেশ-বিদেশের বিচিত্র খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে দুটো খবরের ওপর বিশেষ নজর পড়লো। একটা দেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব রুনা লায়লার প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ প্রকাশ এবং অপরটি মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দীন চুপ্পুর পদত্যাগ পত্রের লেখায় অসংখ্য বানান ভুল। দুটো সংবাদই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হলো। তবে বানানের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই বেশি স্থান করে নিয়েছে।রুনা লায়লা উপমহাদেশের সংগীতের এক জীবন্ত কিংবদন্তির নাম। বাংলাদেশ এবং বাঙালির অহংকার বললেও অত্যুক্তি হবে না। এদেশে জন্মগ্রহণ করলেও তার শৈশব কেটেছে পাকিস্তানে। স্বাধীনতার পরে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। জন্মভূমির প্রতি তার রয়েছে প্রগাঢ় অনুভূতি এবং ভালোবাসা। যা তার বিভিন্ন সময়ের দেয়া সাক্ষাৎকারে অকপটে প্রকাশিত। তাকে বিশেষ কোনো  বিশেষণ দিয়ে বর্ণনা করা যাবে বলে মনে হয় না। ছয় দশকের বেশি তার সংগীত জীবনের সময়কাল। নানা ধরনের গান, নানা ভাষায় গেয়ে দুনিয়াজুড়ে বিপুল খ্যাতি পেয়েছেন। বলা হয়, ১৮টি ভাষায় ১৩ হাজারের বেশি গান তার কণ্ঠে গীত হয়েছে। তাকে নিয়ে গর্ব করার মতন অগণিত গল্প আছে। সুরের রানী হিসেবে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে তার সমান জনপ্রিয়তা রয়েছে।২.জানা যায়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি গতকালই তাঁকে প্রথমবারের মতন আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা প্রদান করে। একইসাথে শ্রাবণের বৃষ্টিস্নাত সায়াহ্নে তার একক সংগীতানুষ্টানের আয়োজন করে শিল্পকলা একাডেমি। এতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকতারা উপস্থিত ছিলেন। পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছে ‘রুনার গানে ভিজল শ্রাবণসন্ধ্যা’। একপর্যায়ে মিডিয়ার সামনে তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ‘নিজের দেশের শিল্পকলা একাডেমিতে একক সংগীত আয়োজন করতে আমাকে ৬২ বছর অপেক্ষা করতে হলো'। এটা এমন একজন প্রতিভাবান, গুণী সংগীত শিল্পীর জন্যে মোটেও কাঙ্খিত নয়। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুরনো শিল্পকলায় তিনি ইতোপূর্বে সংগীত পরিবেশন করলেও তার একক আয়োজন এ-ই প্রথম। আরও জানা যায়, তার এই একক সংগীতানুষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত অর্থ সম্প্রতিকালের বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় ব্যয় করা হবে।এমন আয়োজনকে তিনি তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শামিল বলেও বিবেচনা করেছেন। রুনা লায়লা বরাবরই খুব রসাত্মক ও উইটি ভাষায় কথা বলেন। যা দর্শক শ্রোতাকে দ্রুত সংযোগ করে করতে পারে। শিল্পকলায়ও এর ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। তবে প্রশ্ন হলো, তাকে নিয়ে একক সংগীতানুষ্ঠান না হওয়ার পেছনে কী কোনো রহস্য আছে? যেখানে শিল্প কলায় বিদেশি শিল্পীদেরও একক অনুষ্ঠান হয়েছে। ভক্তরা মনে করেন এটা সরকারের পক্ষ থেকে অবহেলা বা অবজ্ঞা নয় বরং অতীতে সুবিধাজনক সময় না হওয়ায় আসল কারণ। শিল্পী নিজেও সারাবছর ধরে বিদেশে নানাবিধ সংগঠনের আমন্ত্রণে থাকায় হয়তো হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া শিল্পী রুনা লায়লার শিডিউল, সম্মতি এবং সংস্থার সিদ্ধান্ত সবমিলিয়ে হয়তো সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য যে, ইচ্ছে  করলেই শিল্পী রুনা লায়লাকে যেকোনো সময়ে এমনকি জাতীয় প্রোগ্রামেও আনা সম্ভব হয় না।৩.এ প্রসঙ্গে বলা যায়, ২০১০ সালে প্রথম দিকে অফিসার্স ক্লাব ঢাকার এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে শিল্পী রুনা লায়লাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের মিলনমেলা হয়েছিল। ক্লাবের নবনির্বাচিত কমিটির অভিষেকের আয়োজন ছিল।এতে আরও কয়েকজন শিল্পীর মধ্যে সাবিনা ইয়াসমিনও ছিলেন। অনেক ধরনের গান হয়েছে। রাতের প্রহরও ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে। সবশেষে মাইক্রোফোনে ঘোষণা হল এবারের শিল্পী দেশের সেরা লিজেন্ড রুনা লায়লা। তার গান শুরুর শুভ মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। সবাই নড়েচড়ে বসেছেন। শিল্পীর কণ্ঠসুধায় সিক্ত হবেন। মনে আছে, গান শুরুর আগে দুয়েকটা কথা বলার সময় তিনি লক্ষ করলেন, শ্রোতাদের পেছনের সারিগুলোতে টুংটাং শব্দ হচ্ছে। তখন কেউ কেউ খাবারে হাত লাগাচ্ছেন। তাদের দাবি, তারা ডায়াবেটিসের রোগী। কিছু খেতে হবে, বেশি অপেক্ষা করতে পারছিলেন না। কাজেই খেতে খেতেই গান শুনবেন।শিল্পী রুনা লায়লা এটাকে তার প্রতি এক ধরনের অসম্মান প্রদর্শন বলে মনে করেছেন এবং কালবিলম্ব না করে মঞ্চ থেকে নেমে সোজা বাসায়। সেদিন তার পেছনে বেশ ক'জন সিনিয়র কর্মকর্তা ক্লাবের সিংহ দুয়ার পর্যন্ত দৌড়ালেন। না, কাজ হল না। তাকে ফেরানো গেল না। ফেরানো যায়নি। এর নাম রুনা লায়লা।৪.দ্বিতীয় বিষয় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ পত্রে ১৬টি বানান ভুল। সব কাজ ফেলে যারা এটা আবিষ্কার করেছেন, একে স্রেফ বাড়াবাড়ি হয়েছে বলতে হবে। নতুন শুদ্ধ বানান রীতিতে তিনটা বানান ভিন্নতর হয়েছে। তাছাড়া ইংরেজি শব্দকে বাংলায় লিখতে গেলে যেটাকে ভুল ধরা হয়েছে সেটা গর্হিত কিছু নয়।মনে হয়, সবকিছুতে ভুল ধরা, সন্দেহ করা, অধৈর্য হওয়ার একটা মারাত্মক প্রবণতার ভেতর দিয়ে চলেছে দেশ। সবাইকে আরও সহনশীল সংবেদনশীল হওয়ার ওপর জোর দিতে হবে। সাধারণ  মানুষকেও বিদ্যমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে অধিকতর মহৎ ও জনকল্যাণমুখী কাজে ব্যবহার করতে হবে। এবিষয়ে গ্রামে-গঞ্জে সামাজিক শিক্ষা ও গণসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করার সময় এসেছে। যা শিক্ষণীয় হবে, মাদক বিরোধী হবে বা যুবসমাজকে স্বাবলম্বী করে তোলার প্ল্যাটফর্ম হবে। অন্যথায় অন্তত ফেইসবুক মাধ্যমটি বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্যে সুফল নয় বরং একদিন অসহনীয় কুফল নিয়ে আসবে।[লেখক: গল্পকার]

শিক্ষককে মানুষ থাকতে দিন, তবেই মানুষ গড়া সম্ভব

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং দ্রুত পরিবর্তিত বৈশ্বিক কর্মবাজার; অন্যদিকে এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ, যারা হবে দক্ষ, সৃজনশীল, মানবিক এবং মূল্যবোধসম্পন্ন। এই বাস্তবতায় শিক্ষা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু নতুন কারিকুলাম বা প্রযুক্তি নয়; বরং সেই মানুষটি, যিনি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। রাষ্ট্র আজ স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ গড়ছে, ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী তৈরি করছে, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে থেকেই যায়। একজন আধুনিক শিক্ষক ছাড়া কি আধুনিক শিক্ষা সম্ভব? আমার বিশ্বাস, এর উত্তর ‘না’।কারণ একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ কখনো প্রযুক্তি নয়; একজন শিক্ষক। একটি স্মার্ট বোর্ড, একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কিংবা একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার শিক্ষার্থীর শেখাকে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু শেখার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে পারে না। সেই অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেন একজন চিন্তাশীল, সৃজনশীল, মানবিক এবং দায়িত্বশীল শিক্ষক। প্রযুক্তি শিক্ষকের বিকল্প নয়; বরং একজন দক্ষ শিক্ষকের হাতেই প্রযুক্তি শিক্ষাকে আরও কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক এবং আনন্দময় করে তোলে।এ কারণেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনেস্কোর ‘রেকমেন্ডেইশন কনসার্নিং দ্য স্টেটাস অফ টিচার্স’ -এ শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত স্বাধীনতাকে মানসম্মত শিক্ষার মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষকের মানোন্নয়ন ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।বাংলাদেশও শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণার প্রসার এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। যে মানুষটি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলেন, তার পেশাগত বিকাশ, সৃজনশীলতা, গবেষণার সুযোগ এবং মানসিক স্বাধীনতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনো অনেক সময় শিক্ষকের জ্ঞান, গবেষণা, পাঠদানের দক্ষতা কিংবা মানুষ গড়ার অবদানের চেয়ে তাঁর ব্যক্তিজীবনের শালীন প্রকাশ বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। আমরা চাই তিনি শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তা শেখান, অথচ তার নিজের মুক্ত ও মানবিক প্রকাশকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি না। আমরা চাই তিনি সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তুলুন, অথচ তার নিজের সৃজনশীলতাকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখি। এই বৈপরীত্য দূর না করলে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্যও পূর্ণতা পাবে না। একজন শিক্ষক সর্বাগ্রে একজন মানুষ। তারও অনুভূতি আছে, পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ থাকতে পারে। তিনি যদি পেশাগত নৈতিকতা, শালীনতা এবং দায়িত্ববোধ অক্ষুণ্ন রাখেন, তাহলে তার মানবিক সত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো শিক্ষাগত বা নৈতিক ভিত্তি নেই।আজকের পৃথিবীতে একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদবি বা বয়স নয়; তার শেখার ক্ষমতা। যে শিক্ষক প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান অর্জন করেন, প্রযুক্তিকে কাজে লাগান, গবেষণায় যুক্ত থাকেন, সংস্কৃতিচর্চা করেন এবং শিক্ষার্থীদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলেন, তিনিই প্রকৃত আধুনিক শিক্ষক। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু বই থেকে শেখে না; তারা শেখে শিক্ষকের চিন্তা, আচরণ, মূল্যবোধ এবং জীবনদর্শন থেকেও।এই কারণেই শিক্ষকের মানবিক সত্তা, সৃজনশীলতা এবং পেশাগত বিকাশকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একজন শিক্ষক যত বেশি জ্ঞানচর্চা করবেন, সংস্কৃতিমনা হবেন, সময়ের সঙ্গে নিজেকে আপডেট রাখবেন এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হবেন, তার শ্রেণিকক্ষও তত বেশি প্রাণবন্ত, চিন্তাশীল ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক হয়ে উঠবে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু নীতিমালায় লেখা হয় না; প্রতিদিন নীরবে লেখা হয় শ্রেণিকক্ষে। আর সেই ভবিষ্যতের প্রধান নির্মাতা একজন শিক্ষক। তাই শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা কোনো একটি পেশার স্বার্থ রক্ষা নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতারই অংশ।শিক্ষা কখনো কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়; এটি মানুষ গড়ার একটি অবিরাম প্রক্রিয়া। আর মানুষ গড়ার এই কাজটি যিনি করেন, তিনি নিজেও একজন পূর্ণ মানুষ। তাই শিক্ষককে এমন একটি সত্তায় পরিণত করা উচিত নয়, যেখানে তার ব্যক্তিত্ব, অনুভূতি এবং সৃজনশীলতার কোনো স্থান থাকবে না।আমাদের সমাজে এখনো একটি ভুল ধারণা রয়ে গেছে শিক্ষক মানেই তিনি সব সময় গম্ভীর থাকবেন, ব্যক্তিজীবনকে আড়ালে রাখবেন এবং কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবেন। কিন্তু একজন শিক্ষক যদি শালীনতা ও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রেখে নিজের স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন, সংস্কৃতিচর্চা করেন, বই পড়েন, গবেষণা করেন কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন, তাহলে তা তার শিক্ষকতার পরিপন্থী নয়; বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ করে। আজকের পৃথিবীতে একজন শিক্ষকের পরিচয় তার বয়স নয়; তার মনের বয়স। একজন শিক্ষক ষাট বছর বয়সেও আধুনিক হতে পারেন, যদি তিনি নতুন কিছু শেখার আগ্রহ না হারান। আবার কম বয়সেও কেউ যদি পরিবর্তনের প্রতি অনাগ্রহী হন, তবে তিনি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবেন না। তাই আধুনিক শিক্ষক বলতে আমরা এমন একজন মানুষকে বুঝি, যিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন জ্ঞান, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত করেন।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষা, ভার্চুয়াল ল্যাব, ওপেন এডুকেশনাল রিসোর্স এবং বৈশ্বিক জ্ঞানভাণ্ডার আজ শিক্ষকের হাতের নাগালে। এগুলোকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই; বরং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য এগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। যে শিক্ষক প্রযুক্তিকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযাত্রী হিসেবে গ্রহণ করবেন, তিনিই ভবিষ্যতের শ্রেণিকক্ষের নেতৃত্ব দেবেন।একইভাবে, যে শিক্ষক বই পড়েন, গবেষণা করেন, নতুন ধারণা নিয়ে ভাবেন, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেন এবং সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন, তিনি কখনো পুরোনো হয়ে যান না। কারণ একজন শিক্ষক আজীবন শিক্ষার্থী; শেখা থেমে গেলে শিক্ষকতাও থেমে যায়।এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন শিক্ষককে আমরা কেমন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই? এমন একজন মানুষ, যিনি কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবেন, নাকি এমন একজন, যিনি জীবনকে জানবেন, সমাজকে বুঝবেন এবং সংস্কৃতির আলোয় নিজেকে সমৃদ্ধ করবেন? একজন শিক্ষক যদি শালীনতা ও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রেখে গান শোনেন, কবিতা আবৃত্তি করেন, সাহিত্যচর্চা করেন, গবেষণা করেন কিংবা শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন, তাহলে তা তার শিক্ষকতার পরিপন্থী নয়; বরং শিক্ষকতাকে আরও সমৃদ্ধ করে। কারণ শিক্ষা কেবল তথ্যের নয়; রুচি, মানবিকতা, সৌন্দর্যবোধ ও মূল্যবোধেরও চর্চা। একজন সংস্কৃতিমনা শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব গুণ বিকাশে অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষকের বয়স নয় শিক্ষকের মনের বয়সই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যিনি প্রতিদিন নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করেন, নতুন বই পড়েন, নতুন ধারণা নিয়ে ভাবেন এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেন, তিনিই প্রকৃত আধুনিক শিক্ষক। আর এমন শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের শেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেন। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষকের পাঠ নয়; তার কৌতূহল, উদ্যম ও জীবনবোধ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে।প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব? কীভাবে এমন একটি শিক্ষা-পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, যেখানে শিক্ষক একই সঙ্গে আধুনিক, দক্ষ, সৃজনশীল এবং মর্যাদাসম্পন্ন পেশাজীবী হিসেবে বিকশিত হতে পারেন? কেবল সমস্যা চিহ্নিত করলেই চলবে না; এর কার্যকর সমাধানের পথও নির্ধারণ করতে হবে। কারণ একজন শিক্ষকের বিকাশ মানেই একটি প্রজন্মের বিকাশ। তাই এই পরিবর্তনের দায় শুধু শিক্ষকের নয়; রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ.. সবার। এ লক্ষ্য অর্জনে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।প্রথমত, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষণ-পদ্ধতি, গবেষণা, যোগাযোগ দক্ষতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সৃজনশীল শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।দ্বিতীয়ত, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা, মেন্টরশিপ এবং পারস্পরিক শেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একজন শিক্ষকের ভালো উদ্যোগ যেন অন্য শিক্ষকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়; নিরুৎসাহ বা ঈর্ষার কারণ নয়। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। শালীন ব্যক্তিজীবনকে বিতর্কের বিষয় না বানিয়ে, তার শ্রেণিকক্ষের কাজ, গবেষণা, সততা এবং মানুষ গড়ার অবদানকে মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড করতে হবে।চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অযাচিত ট্রল, অপপ্রচার এবং সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত অপমান বা চরিত্রহনন কখনোই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।পঞ্চমত, শিক্ষা নীতির বাস্তবায়নে শিক্ষককে অংশীদার করতে হবে। নতুন কারিকুলাম, প্রযুক্তি ব্যবহার, মূল্যায়ন পদ্ধতি বা শিক্ষা সংস্কারের সিদ্ধান্তে মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিলে বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।সবশেষে, শিক্ষকদের প্রতিও একটি প্রত্যাশা রয়েছে। সমাজ যখন তাদের সম্মান দেয়, তখন সেই সম্মানের প্রতিদানও তাদের দিতে হবে নিষ্ঠা, সততা, আজীবন শেখার মানসিকতা এবং পেশাগত নৈতিকতার মাধ্যমে। একজন শিক্ষককে প্রতিদিনই নিজেকে নতুন করে গড়তে হবে। কারণ তিনি শুধু পাঠদান করেন না; তিনি আগামী দিনের নাগরিক তৈরি করেন। আমরা যদি সত্যিই একটি স্মার্ট, মানবিক ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে শিক্ষকের হাতে শুধু প্রযুক্তি তুলে দিলেই হবে না; তার চিন্তার স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।কারণ একজন শিক্ষককে মানুষ থাকতে দিলে তবেই তিনি মানুষ গড়তে পারবেন। একজন শিক্ষকের হাসি, তার সংস্কৃতিচর্চা, তার গবেষণা এবং তার মানবিক সত্তা তার শিক্ষকতাকে ছোট করে না; বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ, আরও অনুপ্রেরণাদায়ী করে তোলে। আর এমন শিক্ষকই একটি আলোকিত জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষকআরও পড়ুন-বাবা হওয়া সহজ, পিতা হওয়া কঠিনলাল স্রোতের নীরব বীর‘দূষণ’ হয়ে উঠছে সম্পদরক্তের দামে কেনা বিষণ্ণ জীবনজলবায়ু পরিবর্তনের নীরব শিকার বাংলাদেশের শ্রমিকরা

ভিডিও আরও দেখুন

লিগস কাপে মেসির ইতিহাসগড়া নতুন রেকর্ড

বিশ্বকাপের পর প্রথমবারের মতো ইন্টার মায়ামির শুরুর একাদশে ফিরেই নিজের জাদু দেখালেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টাইন এই মহাতারকার জোড়া গোল ও এক অ্যাসিস্টে লিগস কাপে মেক্সিকান ক্লাব সান লুইসকে ৪-২ ব্যবধানে হারিয়েছে ইন্টার মায়ামি।বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকালে ফ্লোরিডার ঘরের মাঠে মায়ামির হয়ে লিগস কাপে নতুন ইতিহাসও গড়েছেন মেসি। এই প্রতিযোগিতায় তার মোট গোল এখন ১৪টি, যা লিগস কাপের ইতিহাসে যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ। তিনি লস অ্যাঞ্জেলেস এফসির দেনি বুয়াঙ্গার রেকর্ডটি নিজের করে নিলেন।ম্যাচের শুরুটা অবশ্য মায়ামির জন্য সুখকর ছিল না। মাত্র ৪ মিনিটেই ডেভিড রদ্রিগেজের গোলে পিছিয়ে পড়ে তারা। তবে সমতায় ফিরতে সময় নেননি মেসি। ১১ মিনিটে অ্যালেনের ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক ভলিতে লক্ষ্যভেদ করেন তিনি। এরপর ২৬ মিনিটে তেলাসকো সেগোভিয়ার গোলে লিড নেয় মায়ামি। বিরতিতে যাওয়ার ঠিক আগে ৪৪ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান ৩-১ করেন মেসি। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে মেসির কর্নার থেকে হেডে মিকায়েল গোল করলে ৪-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় স্বাগতিকেরা।দ্বিতীয়ার্ধের ৫১ মিনিটে সান লুইসের রাফায়েল লোরেন্তে একটি গোল শোধ দিলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৪-২। এরপর প্রবল বৃষ্টির কারণে খেলা প্রায় ৩০ মিনিট বন্ধ থাকে। পুনরায় খেলা শুরু হলে সান লুইস ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও মায়ামির রক্ষণ ভাঙতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ৪-২ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে টাটা মার্টিনোর শিষ্যরা।এই জয়ে লিগস কাপের মিশন দারুণভাবে শুরু করল ইন্টার মায়ামি। আগামী ৯ আগস্ট তাদের পরবর্তী ম্যাচে প্রতিপক্ষ মেক্সিকোর আরেক ক্লাব মন্তেরেই।/ 

লিগস কাপে মেসির ইতিহাসগড়া নতুন রেকর্ড