সংবাদ
এক দশক পর কাউন্সিলের পথে বিএনপি

এক দশক পর কাউন্সিলের পথে বিএনপি

বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে জোবায়দা রহমানের নাম স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই অঙ্গ সংগঠনসহ সব মহানগর ও জেলা কমিটি পুনর্গঠনসাংগঠনিক স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে এবং নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি। দীর্ঘ ১০ বছর পর দলটির সপ্তম এই কাউন্সিল চলতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।মূলত দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’র ৫টি শূন্য পদসহ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির শতাধিক শূন্য পদ পূরণ করাই এই আয়োজনের প্রধান লক্ষ্য। কাউন্সিলের মাধ্যমে সব অঙ্গসংগঠনও ঢেলে সাজানোর প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি। সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।বৈঠক শেষে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছিলেন, বৈঠকে দলের সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। দলকে শক্তিশালী করতে দ্রুততম সময়ে কাউন্সিল করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি সরকারের নানা কর্মসূচি নিয়ে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করা হয়েছে।তিনি বলেন, ‘যত দ্রুত কাউন্সিলের দিকে যাওয়া যায়, সেই বিষয়ে আমরা চেষ্টা করবো।’বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক ভিত্তি চাঙা করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে স্বল্প সময়ে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা ১৯ জন হলেও বর্তমানে ৫টি পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া জাতীয় নির্বাহী কমিটির শতাধিক পদ নানা কারণে খালি পড়ে আছে। এর মধ্যে ভাইস চেয়ারম্যানের ১৬টি এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার ১০টি পদ উল্লেখযোগ্য। তবে কাউন্সিলের আগেই স্থায়ী কমিটির শূন্য পদ পূরণের বিষয়েও দলের ভিতরে আলোচনা রয়েছে।দলের শীর্ষ নেতাদের মতে, দীর্ঘ দিন কমিটি হালনাগাদ না হওয়ায় তৃণমূল থেকে নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দলীয় কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। এরপর বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতির কারণে কাউন্সিল আয়োজন সম্ভব হয়নি।দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে সব মহানগর ও জেলা কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। সামনে জাতীয় কাউন্সিল ও বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দলকে আরও সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।কেন্দ্রিয় নেতাদের মতে, দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে গেলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো সুযোগ নিতে পারে। তাই এখন দল পুনর্গঠনই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।স্থায়ী কমিটির ১৯টি পদের মধ্যে বর্তমানে ১৪ জন সদস্য রয়েছেন। তারা হলেন, দলটির চেয়ারপার্সন তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, জমির উদ্দিন সরকার, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, বেগম সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং এ জেড এম জাহিদ হোসেন। এই ১৪ জনের মধ্যে অনেকেই বার্ধক্যজনিত কারণে গুরুতর অসুস্থ।অসুস্থদের মধ্যে রয়েছেন: খন্দকার মোশাররফ হোসেন, জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস এবং রফিকুল ইসলাম মিয়া (২০১৮ সাল থেকে নিষ্ক্রিয়)।গত কয়েক বছরে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, তরিকুল ইসলাম, আ স ম হান্নান শাহ এবং এম কে আনোয়ারের মতো প্রভাবশালী নেতাদের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন।২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্থায়ী কমিটিতে পদায়ন করা হলেও ২০২৬ সালের ১২ মার্চ তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় দলীয় সব পদ থেকে ইস্তফা দেন।দলের দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, দীর্ঘদিন ধরে দলের স্থায়ী কমিটির কয়েকটি পদ শূন্য থাকায় নীতিনির্ধারনী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিতে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে দলের স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠনের ব্যাপারে হাইকমান্ড নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালনের পরও অনেকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাচ্ছেন না। আবার সম্প্রতি কাউকে কাউকে অতিমূল্যায়ন করা হয়েছে। পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ, যারা দীর্ঘদিন ধরে দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে দক্ষতা দেখিয়েছেন এমন নবীন ও প্রবীণ নেতাদের আগামীতে উপযুক্ত পদে পদায়ন করা হবে বলে দলীয় সূত্র বলছে।জানা গেছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির ৫টি শূন্য পদের বিপরীতে বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এবং যুগ্ম মহাসচিব পর্যায়ের প্রায় ২০ জন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নুল আবেদীন, জয়নুল আবদিন ফারুক, আসাদুজ্জামান রিপন ও আহমেদ আজম খান এবং উপদেষ্টামণ্ডলী থেকে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জহির উদ্দিন স্বপন ও ফরহাদ হালিম ডোনারের নাম।এছাড়া যুগ্ম মহাসচিব ও অন্যান্য পদের মধ্য থেকে আলোচনায় রয়েছেন রুহুল কবির রিজভী (সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব), শহিদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, হাবিবুন নবী খান সোহেল, মাহবুব উদ্দীন খোকন এবং শ্যামা ওবায়েদের নাম।তবে বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে জোবায়দা রহমানের নাম। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দাবি, ক্লিন ইমেজের অধিকারী হিসেবে তাকে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করলে দল আরও সুসংগঠিত হবে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারপার্সন তারেক রহমান।বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, কাউন্সিলের সময় এখনও সুনির্দিষ্ট না হলেও তা ‘শিগগিরই’ অনুষ্ঠিত হবে। দলের নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য হলো, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই নিষ্ক্রিয়দের বাদ দিয়ে তরুণ, ত্যাগী ও সাহসী নেতৃত্বের হাতে দলের চাবিকাঠি তুলে দেওয়া।
২ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

নারীদের নিয়ন্ত্রণে সোশ্যাল মিডিয়া যখন নতুন হাতিয়ার

এক দশকেরও বেশি সময় আগে যখন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর রূপকল্পটি জাতীয় এজেন্ডা হিসেবে উত্থাপিত হয়েছিল, তখন এর প্রধানতম ভিত্তি ছিল প্রযুক্তিগত সংযোগের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন| বিশেষ করে বাংলাদেশের নারী সমাজের জন্য ডিজিটাল বিপ্লবকে মনে করা হয়েছিল এক বৈশ্বিক জ্ঞান অর্থনীতিতে লাফিয়ে ওঠার সোপান| আশা করা হয়েছিল, সোশ্যাল মিডিয়া হবে এমন একটি ‘গ্রেট লেভেলার’ বা সমতাকারী শক্তি, যা গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করবে, ভৌগোলিক ও সামাজিক বাধাগুলো ভেঙে ফেলবে এবং নীরবদের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেবে| কিন্তু ২০২৬ সালের দাঁড়িয়ে এই উজ্জ্বল আশাবাদী বয়ানের নিচে লুকিয়ে থাকা একটি অন্ধকার ও বিপজ্জনক বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রযুক্তি কেবল মুক্তির পথ নয়, বরং এটি পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের এক আধুনিক ও ডিজিটাল কারারক্ষী হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে| নারীদের শরীর, কণ্ঠস্বর এবং প্রকাশকে অভূতপূর্ব নিপুণতায় নজরদারি, পণ্যায়ন এবং শাস্তি দেয়ার এক বিশাল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এই ভার্চুয়াল জগত|র‌্যাডিক্যাল ফেমিনিস্ট বা আমূল নারীবাদী তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ডিজিটাল সহিংসতা কোনো আকস্মিক ত্রুটি নয়, বরং এটি পিতৃতন্ত্রের এক বিবর্তনশীল কৌশল| পিতৃতন্ত্র তার আধিপত্য বজায় রাখতে সবসময়ই নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়| অতীতে যখন নিয়ন্ত্রণ কেবল চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা স্মার্টফোনের স্ক্রিনের মাধ্যমে নারীর ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে পড়েছে| এখানে নারীর যৌনতা ও স্বায়ত্তশাসনকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে| অন্যদিকে, উত্তর-আধুনিক নারীবাদের প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে এই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো আসলে একেকটি ‘ডিজিটাল প্যানোপটিকন’| ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো যে নজরদারি ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, যেখানে বন্দি সবসময় অনুভব করে যে সে নজরদারির নিচে আছে, সোশ্যাল মিডিয়া বাংলাদেশের নারীদের জন্য ঠিক সেই জেলখানায় পরিণত হয়েছে| এখানে প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি পোশাকের পছন্দ বা প্রতিটি সাহসী মন্তব্য একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক ও ডিজিটাল জনতার বিচারে প্রতিনিয়ত ব্যবচ্ছেদ করা হচ্ছে|২০২৪ সালের জাতীয় নারী নির্যাতন জরিপ, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউএনএফপিএর কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত হয়েছে, এই নতুন ধরনের সহিংসতার এক ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে| প্রথমবারের মতো এই সরকারি পরিসংখ্যানে ‘প্রযুক্তি-সহায়তায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’ বা টিএফজিবিভি পরিমাপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে| এই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহারকারী নারীদের ৮.৩ শতাংশ তাদের জীবনে অন্তত একবার অবাঞ্ছিত যৌন যোগাযোগ, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেল, ছবি-ভিত্তিক নির্যাতন বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন| ২০-২৪ বছর বয়সী তরুণীদের ক্ষেত্রে এই হারের চিত্র আরও আঁতকে ওঠার মতো—প্রায় ১৬ শতাংশ| শহরাঞ্চলেও এই হার ১২ শতাংশের কাছাকাছি| সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঐতিহ্যগত শারীরিক সহিংসতার ক্ষেত্রে যেখানে পরিচিত ব্যক্তি বা নিকটাত্মীয়রাই প্রধান অপরাধী হয়ে থাকেন, সেখানে ডিজিটাল সহিংসতার ক্ষেত্রে ৪৬ শতাংশ অপরাধীই হলো সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি| এটি প্রমাণ করে যে, অনলাইন পিতৃতন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না; এটি একটি নামহীন ও সর্বব্যাপী শক্তি হিসেবে নারীর ডিজিটাল উপস্থিতিকে প্রতিনিয়ত আক্রমণ করছে|পিতৃতন্ত্রের মূল লক্ষ্যই হলো নারীর শরীরকে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ, আনন্দ এবং তথাকথিত ‘পারিবারিক সম্মান’-এর মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা| বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে যেখানে ‘লজ্জা’ এবং ‘পর্দা’র সাংস্কৃতিক চাপ অত্যন্ত প্রবল, সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া এই অবদমনকে বহুগুণ শক্তিশালী করেছে| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অপব্যবহার এখন এই ডিজিটাল পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে| বর্তমানে ‘ডিপফেক রিভেঞ্জ পর্ন’ তৈরির জন্য কোনো নারীর ব্যক্তিগত গ্যালারিতে প্রবেশ করার আর প্রয়োজন হয় না| ফেইসবুক বা টিকটক প্রোফাইল থেকে সাধারণ একটি ছবি নিয়ে এআই টুলের মাধ্যমে যে কারো মুখকে আপত্তিকর ভিডিওতে বসিয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে| সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে নারী অ্যাক্টিভিস্ট, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানি কয়েক গুণ বেড়েছে| এই ধরনের আক্রমণ কেবল সম্মানহানি নয়, বরং নারীর অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে| কারণ আমাদের সমাজে নারীর ‘পবিত্রতা’ ও ‘মর্যাদা’র ওপরই তার বিয়ের সম্ভাবনা, শিক্ষার সুযোগ এবং পরিবারের নিরাপত্তা সরাসরি নির্ভরশীল|সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলো এই লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার পেছনে এক অদৃশ্য ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করে| এই প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবসায়িক মডেলটি এমনভাবে তৈরি যেখানে ‘এনগেজমেন্ট’ বা সম্পৃক্ততা যত বেশি, মুনাফা তত বেশি| গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক সংবাদের চেয়ে নেতিবাচক ও ক্ষোভ সৃষ্টিকারী বিষয়বস্তু দ্রুত ভাইরাল হয়| ফলে যখনই কোনো নারীর পোশাক বা চলাফেরা নিয়ে কোনো পুরুষতান্ত্রিক অ্যাকাউন্ট থেকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা ভিডিও প্রকাশ করা হয়, অ্যালগরিদম সেই বিদ্বেষমূলক পোস্টকেই হাজার হাজার মানুষের ফিডে পৌঁছে দেয়| এর মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলো ˆলঙ্গিক বৈষম্য ও অবমাননাকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করছে| জুডিথ বাটলারের ‘লিঙ্গ পারফরম্যাটিভিটি’ তত্ত্ব এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক| অনলাইনে নারীদের প্রতিনিয়ত একটি আদর্শায়িত এবং সমাজ-অনুমোদিত নারীত্ব ‘পারফর্ম’ করতে বাধ্য করা হচ্ছে| যদি কোনো নারী তার স্বাধীন মতামত দেয় বা প্রথাগত ছকের বাইরে গিয়ে কোনো আচরণ করে, তবে ডিজিটাল জনতা তাকে ‘শেইমিং’ বা লজ্জিত করার মাধ্যমে সীমানা মনে করিয়ে দেয়| এটি এক প্রকার ডিজিটাল গণপিটুনি, যা নারীর স্ব-প্রকাশের অধিকারকে কেড়ে নেয়|২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার যে উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা সাইবার জগতকে নারীদের জন্য আরও বেশি প্রতিকূল করে তুলেছে| বিভিন্ন কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে লিঙ্গ সমতার বিরুদ্ধাচারণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে| নারী উন্নয়ন নীতি বা নারীর জনজীবনে অংশগ্রহণকে ‘সংস্কৃতিবিরোধী’ বা ‘ধর্মবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে যে ডিজিটাল প্রচারণা চালানো হয়, তা সরাসরি নারীর শারীরিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে| এর ফলে অনেক মেধাবী নারী তাদের পেশাগত কাজ বা সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে পিছিয়ে আসছেন| তারা পোস্ট করার আগে শতবার ভাবছেন, পাছে কোনো সাইবার হামলায় তাদের ব্যক্তিগত জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়| এই যে ‘ভয়’ এবং ‘স্ব-সেন্সরশিপ’—এটাই হলো ডিজিটাল পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিজয়| যখন একজন নারী হয়রানির ভয়ে নিজের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেন, তখন পিতৃতন্ত্র বিনা রক্তপাতে তার লক্ষ্য অর্জন করে|এই সমস্যার সমাধান হিসেবে যেসব আইনি বা কারিগরি ব্যবস্থার কথা বলা হয়, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অপর্যাপ্ত| বর্তমান ডিজিটাল আইনগুলো প্রযুক্তির দ্রুত গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না| এআই-জেনারেটেড সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনি প্রমাণ সংগ্রহ করা বা অপরাধীকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জটিল| আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারী আইনি সাহায্য নিতেও ভয় পান, কারণ আইনি প্রক্রিয়াটি অনেক সময় তাকে আবারও মানসিকভাবে হেনস্তা করে| তথাকথিত লিবারেল সমাধানগুলো কেবল উপরিভাগের ক্ষত সরানোর চেষ্টা করে, কিন্তু মূল কাঠামোগত সমস্যা—অর্থাৎ সমাজে বদ্ধমূল থাকা নারীবিদ্বেষ এবং প্রযুক্তির ওপর পুরুষের একাধিপত্যকে প্রশ্ন করে না| একটি প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল স্থাপত্যের এমন এক মৌলিক পুনর্বিন্যাস, যেখানে মুনাফার চেয়ে নাগরিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা বেশি গুরুত্ব পাবে|তবে এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু আশার আলো দেখতে পাওয়া যায়| বাংলাদেশের নারীরা ডিজিটাল স্পেসকে কেবল আক্রমণের জায়গা হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধের দুর্গ হিসেবেও গড়ে তুলছেন| বিভিন্ন ফেমিনিস্ট নেটওয়ার্ক, হ্যাশট্যাগ মুভমেন্ট এবং আইনি সহায়তা সংস্থাগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত| তারা সাইবার হয়রানির বিরুদ্ধে সরব হচ্ছে, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছে এবং সরকারকে নীতি পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে| ২০২৪ সালের সরকারি জরিপে প্রযুক্তি-সহায়তায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অন্তর্ভুক্তি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র এখন এই সংকটের গভীরতা বুঝতে পারছে| কিন্তু পরিসংখ্যানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন|ডিজিটাল বাংলাদেশ কেবল উচ্চগতির ইন্টারনেট বা স্মার্টফোনের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়| এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এদেশের নারীরা এই ডিজিটাল স্পেসে কতটা নিরাপদ এবং স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারছেন তার ওপর| পিতৃতন্ত্র তার খোলস বদলে অনলাইনে যে প্যানোপটিকন তৈরি করেছে, তা ভাঙতে হলে সম্মিলিত লড়াই প্রয়োজন| আমাদের বুঝতে হবে যে, ডিজিটাল সহিংসতা কোনো ‘ভার্চুয়াল’ সমস্যা নয়; এটি একটি বাস্তব অপরাধ যা রক্তমাংসের মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়| যতক্ষণ না আমরা পুঁজিবাদী প্রযুক্তির লাভমুখী চরিত্র এবং পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের এই মেলবন্ধনকে রুখতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত ডিজিটাল ক্ষমতায়নের স্বপ্ন এদেশের নারীদের জন্য একটি নিষ্ঠুর মরীচিকা হয়েই থাকবে| যে নারীরা আজ কারখানায় সেলাই করছেন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাবে গবেষণা করছেন, তাদের কণ্ঠস্বর যেন কোনো অ্যালগরিদমিক যান্ত্রিকতায় বা সাইবার বুলিংয়ের ডিজিটাল চাবুকে স্তব্ধ হয়ে না যায়— সেটি নিশ্চিত করাই হোক আগামীর অঙ্গীকার|[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

জেলে ও জলমহাল

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জেলে পেশাধারী এই মৎস্যজীবিরা নানাবিধ সংকটের মধ্যে তাদের জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করে যাচ্ছে| একসময় প্রতিটি জেলে পল্লীতে দেখা যেত দেশি সুতোর জাল বোনার প্রচলন| জেলে পল্লীর গৃহিনীরা রাতদিন বসে বসে জাল বুনতেন| এই জাল দিয়ে জেলেরা মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে তাই দিয়ে সংসার চালাতেন| কেবল তাই-ই নয়, ওই জাল নিজেরা মাছ ধরার কাজে খুব কমই ব্যবহার করতেন| বিক্রি করতেন বেশি জাল| বাইরের জেলা থেকে ক্রেতা এসে জাল কিনে নিয়ে যেতেন| একেকটি জাল বিক্রি করলে তখনকার দিনে পাঁচ কেজি চাউল ও বাজার খরচের টাকা হয়ে যেত| এক কথায় জাল বোনা ছিল জেলেদের একমাত্র অবলম্বন| সেই চল্লিশ বছর আগেই ভাটা পড়ে গেল সেই জাল বোনায়| কারণ ছিল এখনকার দিনের এই কারেন্ট জাল| এই কারেন্ট জাল যখনই দেশে এলো তখনই মানুষ দেশী সুতোর জাল কেনা ছেড়ে দিল| কারণ দেশি সুতোর জালের দাম বেশি, আর কারেন্ট জালের দাম অনেক কম| তাছড়া দেশি সুতোর জালের চেয়ে কারেন্ট জালে মাছ পাওয়া যায় অনেক বেশি| এই সুবিধা পেয়ে মানুষ ঝুঁকে পড়লো কারেন্ট জালের প্রতি| আর ধ্বংস হয়ে জেলে পল্লীর হস্তশিল্পটি| এই হস্তশিল্পজাত জাল এখন আর কোথাও পাওয়া যায় না| এই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া হস্তশিল্পজাত দেশি সুতোর ফাঁস জালের উৎপাদন আবার শুরু করে এই ক্ষুদ্রশিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় কি না, এমন আশা নিয়ে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম তখনকার সেই জাল বোনা গৃহিনীরা এখন আর বেঁচে নেই বেশির ভাগ| যা-ও আছেন তারা চোখে দেখেন না| কারো হাত কাঁপে| অনেক বয়স হয়ে গেছে তো তাই| তবুও চেষ্টা করে সম্ভব হতো, যদি সে জালগুলো বিক্রি করা যেতো| তারা বলেন, একটি জাল বুনে আগেকার দিনের হিসেবে যদি দাম ধরা হয়, তাহলে তা কেউ কিনবে না| কারণ একটি জালের দামে তারা কমপক্ষে পাঁচটি জাল কিনতে পারছে| এখন জাল বুনলে তাদের পুরোটাই লোকসান হবে| বৈধ সরঞ্জামের কথা বলতে গেলে সত্যি বলতে কী, বর্তমানে মাছ ধরার জন্য কোনো বৈধ সরঞ্জামই নেই| জাল বলতে সবই কারেন্ট জাল| ভেসাল জাল অবৈধ| খেপলা, উড়নী, খেও, ঝাঁকি (স্থান ভেদে) জাল বৈধ, কিন্তু এখন তো আর হাতে বোনা জাল নেই| কারেন্ট জাল দিয়েই তৈরি হচ্ছে এই উড়নী জাল| এখন, যদি কেউ একবার খাওয়ার জন্যও মাছ ধরতে যায় তাকে ওই অবৈধ সরঞ্জাম কারেন্ট জাল দিয়েই মাছ ধরতে হবে| এছাড়া উপায় নেই| এছাড়া বর্তমানে আরেকটি মরণঘাতী উপায় রয়েছে চায়না দুয়াড়ী| এই চায়না দুয়াড়ীর ব্যাপারে জানতে চাইলে বলেন, বাজারে না পেলে তারা কিনবে কোথা থেকে? কেউ কেউ বলেন তারা মাছ বেশি ধরার প্রতিযোগিতায় পাল্লা দিয়ে এই চায়না দুয়াড়ী কিনে আনে| প্রশাসন অভিযানে এসে সব জাল নিয়ে পুড়িয়ে দেয়| পরদিন আবার তারা আগের চেয়ে বেশি কিনে আনে| তারাও জানে এটা ভুল ও অপরাধ| তবু এছাড়া তাদের অন্য কোনো উপায় নেই বলেই তারা জানায়| বাংলাদেশ মৎস্য আইনের আওতায় ‘উন্মুক্ত জলাশয়’ নীতিতে এই উক্তিটির ভুল ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ফলে মৎস্যজীবিরা মৎস্য আহরনের ক্ষেত্র তথা নদী, নালা, খাল, বিল থেকে বিতাড়িত হওয়ার প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে| ‘উন্মুক্ত জলাশয়’- এর দোহায় দিয়ে স্থানীয় অবস্থাশালী লোকেরাও মাছ ধরার সরঞ্জাম তৈরি করে নিয়ে জলাশয় দখল করে নিয়ে মাছ ধরছে তারা| এ কারণে প্রকৃতপক্ষে মাছ ধরেই যাদের জীবন জীবিকা চলে তারা সেই সব জলাশয় থেকে মাছ ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে গেছে বললে ভুল হবে না| স্থায়ীভাবে মাছ ধরার কাজ তারাই করছে যাদের মাছ না ধরলেও কৃষিকাজ, ব্যবসা বা অন্য উপায়ে তাদের সংসার যথেষ্ট গ্রচলভাবেই চলছে| তাদের কারণে পেশাগত মৎস্যজীবিরা মাছ ধরতে পারছে না| দেশের অধিকাংশ বিল বাওড়ই প্রভাবশালী লোকেদের দখলে চলে গেছে| বিল-বাঁওড় দখলের প্রতিবাদে আমরা প্রায়ই মৎস্যজীবিদেরকে রাজপথে দাঁড়াতে দেখি| শুধু বিল-বাঁওড়ই নয়, নদ নদীগুলোতেও চলছে এই দখলদারিত্বের রাজত্ব| আসলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের এই ভুল ব্যাখ্যা এবং এই এটাকে আশ্রয় করে সুযোগ নিয়ে মৎস্যজীবিদেরকে জলাশয় থেকে উৎখাত করার পায়তারা থেকে সরে আসতে হবে| এ ব্যাপারে প্রশাসনকে বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে| আসলে এ ব্যবস্থার একটি সুষ্ঠ সমাধান দরকার| আর সমাধানের জন্য আমাদের ভাবনাটাকে আরও গভীরে নিয়ে যেতে হবে| সেই আলোকে আমার একটি ঘটনা মনে পড়ে| তা হলো, এখন থেকে বছর দশের আগে ইউটিউব, ফেইসবুকে দেখতাম চীনারা তাদের দেশের জঙ্গলে এই চায়না দুয়াড়ী পেতে সাপ ধরতো| মূলত চীন থেকে আগত বলেই এর নাম হয় চায়না দুয়াড়ী| জেলেরা যা সেদিন চোখেও দেখেনি, সেই চায়না দুয়াড়ী চীনের সুপ্রশস্ত প্রাচীর ডিঙিয়ে, ভারতের ত্রিপুরা ও মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য পেরিয়ে ঠিকই বাংলাদেশে চলে এসেছে| এটা কিভাবে সম্ভব হলো! কোনো জেলে তো সেদিন ডোঙা কিংবা নৌকা বেয়ে এই দুয়াড়ী জাল চীন থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেনি! তাহলে কে বা কারা আনলো এই জাল! এটা খুঁজেবের করাটা আজ খুব জরুরি নয় কি?যদি বলি বা মেনে নিই এটা অবশ্যই কোনো অসাধু ব্যবসায়ীর কাজ| তাহলে এটা আমদানি করার কাজে অবশ্যই প্রশাসনিক অনুমতি কেউ না কেউ তো অবশ্যই দিয়েছিল| তাছাড়া তো আমদানি করা সম্ভব হয়নি| সেই অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে তাকেও খুঁজে করাটাও জরুরি কি না এটাও এখন ভেবে দেখা দরকার| যদি আমরা আমাদের সামগ্রীক ভালো চাই তাহলে অবশ্যই এদিকে গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে| হ্যাঁ, বর্তমানে এই দুয়াড়ীসহ সমস্ত প্রকার কারেন্ট জালই আমাদের দেশে উৎপাদন হচ্ছে| এই উৎপাদন বন্ধ করতে হবে| যেখান থেকে এই অবৈধ সরঞ্জাম তৈরি করা হচ্ছে সেখানেই পদক্ষেপ নেয়াটা সবচেয়ে উত্তম| এই দুয়াড়ীসহ সমস্ত প্রকার কারেন্ট জাল উৎপাদন বন্ধ হলে আমাদের দেশের এই হস্তশিল্পটাকে আবার পুনরুজ্জীবিত করে সেটাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে| সেই সঙ্গে জলজ জীব বৈচিত্র্য ধ্বংসকারী এই কারেন্ট জাল না থাকলে আমাদের দেশের ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ প্রবাদকেও বাঁচিয়ে রাখা অবশ্যই সম্ভব| [লেখক: সংবাদকর্মী]

সাঁওতাল জীবনের টানে বিদ্যাসাগর

সাঁওতালদের সহজ-সরল জীবন, প্রশান্তিময় হাসি ও উচ্ছল আনন্দে ভরা দিনযাপন সংগ্রামের কঠিন পাতাগুলোকেও রঙিন করে তোলে| সভ্যতার প্রান্তে অবস্থান করা আরণ্যক সাঁওতালদের এই সারল্য বহু মনীষীকেই গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে— যেমন মুগ্ধ করেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে| তাদের জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেই চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন আলোড়িত হয়েছিলেন| ছাত্রজীবনেই সাঁওতাল পরগনার দুমকা, ময়ূরাক্ষী নদী এবং সাঁওতালদের ছন্দময় জীবনযাত্রা তার মনে দোলা দিয়েছিল| বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন| ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কেন সাঁওতাল অধ্যুষিত কর্মাটাঁড়কে নিজের আবাস হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন—এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর না মিললেও নানা ঘটনা ও প্রেক্ষাপট থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়| একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ১৮৭২ সালে তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেন তিনি| এর কিছুদিন পর প্রিয় স্ত্রীর মৃত্যু তার জীবনে গভীর কূন্যতা তৈরি করে| কেউ কেউ মনে করেন, শহুরে শিক্ষিত সমাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি মানসিক শান্তির খোঁজে কর্মাটাঁড়ে চলে যান| তবে এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নয়| বরং বলা যায়, কাছের মানুষের কাছ থেকে আঘাত ও প্রতারণা পেলেও বিদ্যাসাগরের চরিত্রে আত্মসমর্পণের বদলে সংগ্রামের দৃষ্টান্তই বেশি স্পষ্ট| সম্ভবত শুরুতে সস্তায় জমি পাওয়া এবং নিরিবিলি পরিবেশে পড়াশোনা ও লেখালেখির উদ্দেশেই তিনি কর্মাটাঁড়কে বেছে নিয়েছিলেন| কিন্তু সেখানে এসে তিনি প্রত্যক্ষ করেন সাঁওতালদের কঠিন জীবনসংগ্রাম—অন্ন-বস্ত্রের অভাব, শিক্ষার অনুপস্থিতি, দারিদ্র্য ও বঞ্চনা| এই বাস্তবতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়| তিনি উপলব্ধি করেন, এই মানুষদের পাশে দাঁড়ানোই তার প্রকৃত কর্তব্য| ফলে ব্যক্তিগত সাধ-আহ্লাদকে পাশ কাটিয়ে তিনি আত্মনিয়োগ করেন তাদের উন্নয়নে| সাঁওতালদের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অবৈতনিক বিদ্যালয়, চালু করেন দাতব্য চিকিৎসালয়| খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে নিরলসভাবে কাজ করতে থাকেন| একই সঙ্গে নিজের পড়াশোনা ও লেখালেখিও চালিয়ে যান কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে| ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয়া বিদ্যাসাগর ১৮৭৩ সালে জামতাড়া-মধুপুর রেলপথের মাঝামাঝি কর্মাটাঁড়ে একটি বাড়ি ক্রয় করেন| প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই বাড়িতেই তিনি জীবনের শেষ ১৮ বছর অতিবাহিত করেন| ‘নন্দন কানন’ নামের এই বাসভবনে বসেই তিনি সাঁওতালদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন| তাদের মধ্যে তিনি খুঁজে পান সরলতা, সততা ও আন্তরিকতার এক বিরল সমš^য়| সাঁওতালদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আত্মীয়তার মতো| কেউ তাকে দাদা, কেউ বাবা, কেউ জেঠা বলে ডাকত| তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বালিকা বিদ্যালয় ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রাত্রিকালীন শিক্ষা কার্যক্রম| বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা দিতেন এবং দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অকাতরে সাহায্য করতেন| সাঁওতালদের সত্যবাদিতা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল| একটি ঘটনার বর্ণনায় দেখা যায়, জমি-সংক্রান্ত এক মামলায় মিথ্যা বলতে বাধ্য হলেও সাঁওতালরা শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশ করে| এই সরল সত্যনিষ্ঠা বিদ্যাসাগরের মনে তাদের প্রতি অটল ভালোবাসা সৃষ্টি করে| তিনি প্রায়ই বলতেন, ভদ্রসমাজের চেয়ে সাঁওতালদের সান্নিধ্যেই তিনি বেশি আনন্দ পান| তাদের সঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা, চিকিৎসা করা—সবকিছুতেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এক অনাবিল মানবিকতা| তাদের দুঃখে তিনি কেঁদেছেন, অসুখে ছুটে গিয়েছেন, প্রয়োজন মেটাতে নিজের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন| সাঁওতালদের কাছেও বিদ্যাসাগর ছিলেন আপনজনের চেয়েও বেশি কিছু—একজন আশ্রয়দাতা, পথপ্রদর্শক, এমনকি অনেকের কাছে ঈশ্বরতুল্য| তার অসুস্থতার খবর পেয়ে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠত, আবার তার সামান্য আঘাতেও প্রতিবাদে ফেটে পড়ত| ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই বিদ্যাসাগরের মৃত্যু হলে কর্মাটাঁড়ের সাঁওতালরা গভীর শোকাহত হয়ে পড়ে| তাদের জীবনে তিনি যে মানবিকতার আলো জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে| বিদ্যাসাগরের এই কর্মযজ্ঞ শুধু সমাজসংস্কারের উদাহরণ নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক বিরল দলিল| তার কর্মভূমি কর্মাটাঁড় আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রকৃত মানবতা কোনো শ্রেণী, জাতি বা অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তা হৃদয়ের গভীরতম স্থান থেকেই উৎসারিত হয়| [লেখক: কলামিস্ট]

নতুন অধ্যায়ে বিহার-সম্রাট চৌধুরীর হাতে নেতৃত্ব, বিজেপির বড় বাজি

বিহারের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান ঘটিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। সম্রাট চৌধুরিকে বিজেপি বিধায়ক দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত করার পর কার্যত পরিষ্কার, তিনিই হচ্ছেন রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এর পদত্যাগের পর এই পরিবর্তন রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় রদবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।সম্প্রতি পাটনায় বিজেপির রাজ্য দপ্তরে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিবরাজ সিংহ চৌহান। বৈঠকে উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয় কুমার সিনহা সম্রাট চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেন, যা সমর্থন করেন প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী রেনু দেবী। কোনও বিরোধিতা না থাকায় সর্বসম্মতভাবে তাঁর নাম গৃহীত হয়।এর আগে, প্রথা মেনে রাজভবনে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন নীতীশ কুমার এবং তাঁর মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিহারের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী এক অধ্যায়ের অবসান ঘটে।নীতীশ যুগ: জোট রাজনীতি ও বারবার ‘পালাবদল’নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক যাত্রা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বহুবার মোড় ঘোরানো। জনতা দল (ইউনাইটেড )-এর নেতা হিসেবে তিনি একাধিকবার বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধেছেন, আবার কখনও রাষ্ট্রয় জনতা দল এর সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।২০১৩ সালে বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে শুরু করে ২০১৭ সালে আবার সেই জোটে ফেরা, তারপর ২০২২ সালে আরজেডি-কংগ্রেসের সঙ্গে সরকার গঠন এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনই তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল।শাসনকালে তিনি ‘সুশাসন বাবু’ হিসেবে পরিচিতি পান। বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়ন, নারী শিক্ষা ও আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের জন্য। তবে বিরোধীরা বারবার অভিযোগ তুলেছে প্রশাসনিক স্থবিরতা, বেকারত্ব এবং শিল্পোন্নয়নের ঘাটতি নিয়ে।সম্রাট চৌধুরী: বিজেপির নতুন মুখসম্রাট চৌধুরী বিহার বিজেপির মধ্যে তুলনামূলকভাবে তরুণ এবং আক্রমণাত্মক মুখ হিসেবে পরিচিত। সংগঠনগতভাবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দলের সঙ্গে যুক্ত এবং রাজ্যের বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি এবার বিহারে সম্পূর্ণ নিজের মুখে সরকার চালানোর দিকেই এগোচ্ছে যেখানে আঞ্চলিক দলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে দল।রাজনৈতিক তাৎপর্য ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জএই পরিবর্তন শুধু মুখ্যমন্ত্রীর বদল নয়, বরং বিহারের রাজনৈতিক কৌশলের বড় পরিবর্তন।বিজেপি এখন রাজ্যে নিজের শক্তি প্রতিষ্ঠার একক সুযোগ পাচ্ছে।জোট রাজনীতির পরিবর্তে একক নেতৃত্বের পরীক্ষা।বিরোধী শিবিরে নতুন করে সমীকরণ তৈরির সম্ভাবনা।তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন।শিল্প বিনিয়োগ টানা।গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন।এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের আস্থা অর্জন।সব মিলিয়ে, নীতীশ কুমারের দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের ইতি টেনে বিহার এখন এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। সম্রাট চৌধুরীর নেতৃত্বে বিজেপি কতটা স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নির্ভর করবে প্রশাসনিক দক্ষতা, উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ এবং জনআস্থার উপর।লবিহারের রাজনীতিতে একটাই প্রশ্ন-এটা কি সত্যিই নতুন যুগের শুরু, নাকি আরেকটি রাজনৈতিক পরীক্ষার মঞ্চ?

দুই বাংলার প্রাণের এক চিরন্তন গল্প

বাংলা নববর্ষ, এই দুটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত টান, এক গভীর আবেগ, এক অমলিন পরিচয়।বছরের প্রথম দিন, কিন্তু শুধুই ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়, এ যেন বাঙালির হৃদয়ের নতুন করে স্পন্দিত হওয়া। পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন সূর্য, নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা, আর সেই সঙ্গে পুরনো কষ্ট, গ্লানি, ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলার এক প্রতিজ্ঞা।কিন্তু এই আবেগের শিকড় আজকের নয় এর ইতিহাস বহু পুরনো, প্রাচীন বাংলার মাটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।একসময় বাংলার মানুষ প্রকৃতির ছন্দে জীবন কাটাত। বৈশাখ মাসের শুরু মানেই ছিল নতুন কৃষি বছরের সূচনা। মাঠে নামার প্রস্তুতি, ফসলের নতুন চক্র; এই সবকিছু ঘিরেই নববর্ষের সূচনা হতো।গ্রামবাংলায় বসত মেলা, শোনা যেত লোকগান, মানুষ একত্র হয়ে ভাগ করে নিত আনন্দ। কোনো জাঁকজমক ছিল না, কিন্তু ছিল এক গভীর আন্তরিকতা, মাটির গন্ধে ভরা এক উৎসব।পরে সম্রাট আকবর এর সময় বাংলা সনের আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য চালু হওয়া এই বর্ষপঞ্জি ধীরে ধীরে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। শুরু হয় ‘হালখাতা’, পুরনো হিসাব মিটিয়ে নতুন খাতা খোলার প্রথা, যা আজও নববর্ষের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎসব গ্রাম থেকে শহরে, সরলতা থেকে আড়ম্বরের পথে এগিয়েছে; কিন্তু আবেগ একই রয়ে গেছে।ভোর না হতেই দুই বাংলার আকাশে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের রঙ। ঢাকার রমনা বটমূল থেকে শুরু করে কলকাতার রবীন্দ্রসদন; সব জায়গাতেই যেন এক সুর, এক আহ্বান। বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা রঙে-রূপে-প্রতীকে হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা, অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক। বিশাল মুখোশ, বর্ণিল শোভাযাত্রা; সব মিলিয়ে এক অনন্য দৃশ্য, যা আজ বিশ্বমঞ্চেও স্বীকৃত।অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে সকাল শুরু হয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে। বিশেষ করে এসো হে বৈশাখ যেন প্রতিটি ঘরে ঘরে নতুন বছরের আহ্বান নিয়ে আসে “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...”। এই সুর যেন গরম হাওয়ার সঙ্গে মিশে পুরনো ক্লান্তি উড়িয়ে নিয়ে যায় দূরে।খাবারের কথা বললে পান্তা-ইলিশ ছাড়া কি আর নববর্ষ সম্পূর্ণ হয়? বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পান্তা ভাত, ইলিশ ভাজা, কাঁচা ম‌রিচ, পেঁয়াজ; এক সরল অথচ ঐতিহ্যবাহী স্বাদ। পশ্চিমবঙ্গে যদিও ইলিশের পাশাপাশি মিষ্টি, লুচি, আলুর দম বা রেস্তোরাঁর ‘বৈশাখী থালি’ এখন বেশ জনপ্রিয়। নতুন জামাকাপড় পরে, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ যেন চারদিকে।আজকের দিনে নববর্ষ শুধু ঐতিহ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি আধুনিকতার সঙ্গেও তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার শুভেচ্ছা, ইউটিউব লাইভ, কর্পোরেট কনসার্ট, সব মিলিয়ে এটি এখন গ্লোবাল বাঙালির উৎসব।তবে দুই বাংলার উদযাপনে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্যও রয়েছে। বাংলাদেশে এটি একটি জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়, যেখানে বাঙালি পরিচয়ের জোরালো প্রকাশ ঘটে। পশ্চিমবঙ্গে এটি মূলত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উৎসব। তবুও আবেগের দিক থেকে কোনো অংশে কম নয়।সবচেয়ে বড় কথা, এই উৎসব বাঙালিকে এক করে দেয়। সীমান্তের বিভাজন, রাজনৈতিক মতভেদ, সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে এই একদিনে দুই বাংলার মানুষ একই অনুভূতিতে ভেসে যায়।তাই বলতে হয়, প্রাচীন বাংলার মাটির গন্ধ, কৃষকের ঘাম, লোকসংস্কৃতির সুর, সব মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের এই রঙিন, আধুনিক পহেলা বৈশাখ।সময়ের সঙ্গে রূপ বদলেছে, কিন্তু আত্মা বদলায়নি। আর তাই পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্ব, আবেগ আর চিরন্তন পরিচয়ের এক অমলিন প্রতীক।

মৈত্রী-সম্প্রীতির বার্তাবহ উৎসব বাংলা নববর্ষ

পৃথিবীর নানা দেশে মার্চের শেষে এপ্রিলের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে নববর্ষ উদযাপিত হয়| এথনিক কালচারের প্রকাশই এখানে মুখ্য| তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্যে ‘নওরোজ’ বা নতুন বছর হিসেবে পালিত হয়| অঞ্চলভেদে নাম ‘নয়রোজ’ ‘নিউরোজ’ উপলক্ষে তিনদিন/সাতদিনব্যাপী বিশাল মেলা, উৎসব| আমাদের জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ| এ দিনটি প্রত্যেক বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে উৎসবের আমেজ আর ফুরফুরে বাতাসের এক অনিন্দ্য সুন্দর মিলনের বার্তা| আলপনা আঁকা শাড়ি আর পাঞ্জাবি ছাড়া যেন এ দিনটিকে আর পালন করাই যায় না| সঙ্গে লাল সবুজ আর সাদার মিশেলে হাতে, গালে ফুলকি আঁকা নগর বাঙালির হালফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে| লেখাটির ভুমিকা অংশেই বাংলাপঞ্জিকা সূচনার গল্প সংক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থাপনা না করলে সামগ্রিক আলোচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে| কী ভাবে শুরু হলো বাংলা ও বাঙালির বর্ষ গণনা| ভারতবর্ষে মুঘল সামাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন| কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না| এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো| খাজনা পরিশোধে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন| সম্রাটের আদেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের প্রবর্তন করেন| ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়| তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে| প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন পরে বাংলা বর্ষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে| ধর্মজাতপাত নিয়ে সম্রাট আকবরের কোনও গোঁড়ামি ছিল না, বরং খাঁটি অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন তিনি| ইতিহাস তা-ই বলে| বাংলাদেশে ক্রমশ বাড়ছে বর্ষবরণের আমেজ| বাংলা নববর্ষ নিছক উৎসব নয়, বরং এটি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির এক শক্তিশালী প্রতীক| মোগল সম্রাট আকবরের আমলে কর আদায়ের সুবিধার্থে প্রবর্তিত এই ঐতিহ্য বর্তমানে বাঙালির ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, যা একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও ঐক্যের বার্তা বহন করে| বর্ষবরণ মিলনের এমন এক উৎসব যা ঐক্যের বার্তা বহন করে আসে প্রতি বছর| ওই যে ঐক্যের বার্তা, এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এক অসাধারণ বার্তা দিয়েছেন তার উৎসব নামক প্রবন্ধে| কী বলেছেন রবি ঠাকুর:“...উৎসব একলার নহে| মিলনের মধ্যেই সত্যের প্রকাশ— সেই মিলনের মধ্যেই সত্যকে অনুভব করা উৎসবের সম্পূর্ণতা| একলার মধ্যে যাহা ধ্যানযোগে বুঝিবার চেষ্টা করি, নিখিলের মধ্যে তাহাই প্রত্যক্ষ করিলে তবেই আমাদের উপলব্ধি সম্পূর্ণ হয়| মিলনের মধ্যে যে সত্য, তাহা কেবল বিজ্ঞান নহে তাহা আনন্দ, তাহা রসস্বরূপ, তাহা প্রেম| তাহা আংশিক নহে, তাহা সমগ্র; কারণ, তাহা কেবল বুদ্ধিকে নহে, তাহা হৃদয়কেও পূর্ণ করে|  আজ আমাদের কিসের উৎসব? শক্তির উৎসব| মানুষের মধ্যে কী আশ্চর্য শক্তি আশ্চর্য রূপে প্রকাশ পাইতেছে! আপনার সমস্ত ক্ষুদ্র প্রয়োজনকে অতিক্রম করিয়া মানুষ কোন‌ ঊর্ধ্বে গিয়া দাঁড়াইয়াছে| “বাঙালির নববর্ষ তাই আংশিক নহে, এটি সমগ্র| রবীন্দ্রনাথের চিরায়ত ঐক্য ও মিলনের দর্শন যুক্ত ও মূর্ত্ত হচ্ছে বাঙালির নববর্ষ উদযাপনে| নববর্ষ উদযাপনে আরও যুক্ত হচ্ছে বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, বিপ্লব-বেঁচে থাকা, লোকজ সংস্কৃতি, কুটির শিল্প ও সংগ্রামের শেকড়| আমাদের ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধের ওপর বহুবার আঘাত এসেছে পাকিস্তান আমলে| আঘাত এসেছে বাংলাদেশ আমলেও| ষড়যন্ত্র করা হয়েছে ধর্মের নামে ভিনদেশি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার| বাঙালি বীরের জাতি, সেটা মেনে নেয়নি| বাংলা নববর্ষে আনন্দের বাঁধভাঙা জোয়ারে সেই ঘৃণ্য অপচেষ্টা ভেসে গেছে কচুরিপানার মতো| ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বাংলা নববর্ষ অনুঘটকের মতো কাজ করেছে| জুগিয়েছে সামনে চলার অনন্ত প্রেরণা| তাই প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ প্রবল শক্তি, সাহস ও সংগ্রামের সংকল্প নিয়ে হাজির হয় বাংলাদেশে| বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতা চেতনার চিরন্তন শিখা বাংলা নববর্ষ| পহেলা বৈশাখের উৎসব শুরুর দিকে ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক| গ্রামীণ-মেলা, লোকজ খেলাধুলা ও নৃত্য-সংগীত ছিল প্রধান আকর্ষণ| দিনে-দিনে তা শহরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে| বাঙালির আদি সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনকারী এই অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আমাদের বিশেষ প্রেরণা জুগিয়েছে| এ ভূখণ্ডের বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেছে বাংলা নববর্ষের সাংস্কৃতিক-উৎসব ও চেতনা| ষাটের দশকে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির সশস্ত্র-মুক্তিসংগ্রামসহ বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামকে বেগবান করে| বৈশাখের সংস্কৃতি আমাদের জীবন-সাহিত্য ও বাঙালি জীবনে জড়িয়ে পড়ে ওতপ্রোতভাবে| নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক অনন্য বৈশিষ্ট্য মিলে নববর্ষ উৎসব এখন বাঙালির এক প্রাণের উৎসব-প্রাণবন্ত এক মিলনমেলা| নববর্ষ আদিম মানব গোষ্ঠীর কাছে ছিল সিজনাল ফেস্টিভ্যাল| নববর্ষ হিসেবে ‘পহেলা বৈশাখ’ সভ্য মানুষের ‘এগ্রিকালচারাল ফেস্টিভ্যাল’| বাংলা নববর্ষ এ দেশের একটা প্রাচীনতম ঐতিহ্য| পহেলা বৈশাখের উৎসবের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে| বৈশাখী মেলায় সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের আনাগোনা| মৈত্রী-সম্প্রীতির এক উদার মিলনক্ষেত্র| নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই আসে মেলায়| এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিকিকিনির আশা আর বিনোদনের টান| বাংলা নববর্ষ, বাংলা পঞ্জিকা প্রণয়ের ইতিহাস অনন্য| পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নাই বললেই চলে| মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে এর প্রচলন, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো| বিশ্বের বড় বড় উৎসব ধর্মকেন্দ্রিক বা জাতিকেন্দ্রিক| এদিক থেকে ব্যতিক্রম বাঙালির পহেলা বৈশাখের নানা আয়োজন| বাঙালির নববর্ষে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অনুষঙ্গ প্রবল| মূলত এ কারণেই, বাংলা নববর্ষ উদযাপনে জাতীয় ঐক্য এতো দৃঢ় হয় যেখানে আর কোন দীনতা, পশ্চাতপদতা কাজ করতে পারেনা| বাঙালির জাতীয় জীবুনের বিভেদ, সংকীর্ণতা, অনৈক্য দূর করে জাতীয় শক্তিকে বলিয়ান করতে নববর্ষের মতো উৎসব নিয়ত প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে| আমাদের অন্তর্মূলের শক্তি হলো, শেকড়ে ফিরে যাওয়া| শেকড় থেকে আমরা ঐক্যতান বা কাছে আসার শক্তি সঞ্চয় করি| বাংলা নববর্ষ আমাদের সেই শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছে| লোকজ উৎসব বাঁচিয়ে রাখার জন্য কোন বিশেষ প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হয়না| প্রান্তিক বাঙালিদের জীবন প্রবাহের শক্তিই বাংলা নববর্ষকে আরও রঙিন আরও উৎসবমুখর করে তুলবে| শুভ নববর্ষ![লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

পান্তার সাতকাহন

পান্তা- গ্রামীণ বাংলার সকালের খাবার যা পুষ্টি সমৃদ্ধ এবং ঐতিহ্যের স্মারক| এটি বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির অংশ| ‘পান্তা’ প্রত্যয় সাধিত শব্দ; পানি+তা (ভাত) = পান্তা অর্থাৎ পানিতে ভেজানো ভাত বা পানি ভাত| সাধারণত রাতের খাবার শেষে যে অতিরিক্ত ভাত থেকে যায় সেটাতে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখলে বিভিন্ন ধরনের গাজনকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক ভাতের শর্করা ভেঙে ইথানলওল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে| ফলে ভাতের অম্লত্ব বেড়ে যায় এবং তখন পচনকারী ব্যাকটেরিয়া আর ভাত নষ্ট করতে পারে না- এজন্যই এটি স্বীকৃত ভাত সংরক্ষণ পদ্ধতি| সকালে সেই ভাত সাধারণত পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা ও লবণসহ খাওয়া হয়| তাছাড়া, বিভিন্ন ধরনের ভর্তা, যেমন: আলুভর্তা, বেগুনভর্তা, শুটকিভর্তা, ডালভর্তা, মরিচপোড়া, সরিষার তেল, শাক ভাজা, ডালের বড়া, মাছ ভাজা ও তরকারি দিয়ে পান্তা খাওয়া হয়| আবার, পান্তা আর নারকেল, সে এক চমৎকার সমন্বয়! একবার কেউ খেলে বার বার খেতে ইচ্ছা করবে| কখনো আলাদা করে পান্তা ভাতের শুধু জলীয় অংশটুকু যা আমানি নামে পরিচিত - খাওয়া হয়| যেকোনো ধরনের ভাতেই পানি মিশিয়ে পান্তা ভাত তৈরি করা যায়| তবে, সাধারণত তলাল বা আতপ চালের ভাতের পান্তা স্বাদে এবং পুষ্টিগুণে এগিয়ে| আর ভাত যদি হয় সুগন্ধি চালের, যেমন: বাসমতি, রানী স্যালুট, কাঁচড়া, চিনিগুঁড়া, বাংলামতি বা কালোজিরার, তাহলে তা স্বাদে হয় অনন্য| বাংলাদেশে অঞ্চল ভেদে পান্তা খাওয়ার প্রবণতার ভিন্নতা দেখা যায়, যেমন: বরিশাল অঞ্চলের মানুষ পান্তা বেশি খেয়ে থাকেন| দেশে গরমকালে অর্থাৎ মার্চ থেকে জুলাই-আগস্ট মাস পর্যন্ত পান্তাভাত খাওয়ার প্রচলন বেশি| মূলত ভাত যাদের প্রধান খাদ্য, পান্তা তাদের কাছে পরিচিত| বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পান্তা খাওয়ার সংস্কৃতি চালু আছে| গ্রীষ্মে এসব অঞ্চলে তাপমাত্রাও আর্দ্রতা অত্যন্ত বেশি হওয়ায় ভাত খুব সহজেই নষ্ট হয়ে যায়| কিন্তু, ভাত যদি পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় তাহলে তা আর নষ্ট হয় না| এভাবেই ভাত সংরক্ষণের পদ্ধতি হিসেবেই পান্তা ভাতের প্রচলন| পান্তা বাংলাদেশের বাইরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার, উড়িষ্যা, তামিলনাড়ু, অন্ধপ্রদেশ ও কেরালায় খাওয়া হয়| তবে, অঞ্চল ভেদে পান্তাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়| যেমন: আসামে পান্তা ভাতকে পঁইতা ভাত বা পন্তা ভাত বলে; উড়িষ্যায় বলে পোখালো, আর তামিলনাড়ুতে বলে প্যাযায়সাদাম| তবে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চীন, ইন্দোনেশিয়াতে ও পান্তার মতো খাবারের প্রচলন আছে, যা তৈরির প্রক্রিয়া যেমন ভিন্ন, স্বাদও তেমন ভিন্ন| পান্তা ভাতের ইতিহাস আনুমানিক দুই হাজার বছরের পুরনো হলেও কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে মুঘল আমলে এ খাবারের প্রচলন বাড়ে| সেসময় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আগতদর্শক শ্রোতাদেরকে পান্তা খেতে দেয়া হতো| আর বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে শহুরে বাঙালি সমাজ বাংলা নববর্ষকে ঘটা করে পালন শুরু করে| এসব অনুষ্ঠানে পান্তা ভাতই আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু| আর এখন শহুরে সমাজে পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়াতো হালের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে| উল্লেখ্য, পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশে ফুটপাত থেকে শুরু করে পাঁচ তারকা হোটেলে পান্তা খাওয়ার ধুমপড়ে যায়| আমাদের মনে আছে, বছর পাঁচেক আগে পান্তা ভাতের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ আলো হয়েছিল| এর বড় কারণ ছিল ‘মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া’ প্রতিযোগিতা ২০২১| উক্ত প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিশোয়ার চৌধুরী পান্তা ভাতের মতো একটি অত্যন্ত সাদামাটাও আটপৌরে খাবার পরিবেশন করে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন| কিশোয়ার ওই প্রতিযোগিতায় পান্তা ভাতের সঙ্গে আলুভর্তা ও সার্ডিন মাছ ভাজা উপস্থাপন করে এ পুরস্কার জিতে নেন| পান্তা ভাত এতই জনপ্রিয় যে যুগে যুগে একে নিয়ে অনেক প্রবাদ-প্রবচন রচিত হয়েছে| এসব প্রবাদ-প্রবচনের কোন কোনটি শক্তি ও সক্ষমতার পরিচায়ক, যেমন: পান্তা ভাতের জল, তিন পুরুষের বল; শাশুড়ি নাই, ননদ নাই, কার বা করি ডর, আগে খাই পান্তা, শেষে লেপি ঘর| অথবা, বাঁদির কামে জোসনাই, পান্তা ভাত খাস নাই| আবার, কোন কোনটি আর্থিক সামর্থ্যের ইঙ্গিতবহ| যেমন:পান্তা ভাতে নুন জোটে না, বেগুন পোড়ায় ঘি; নুন আনতে পান্তা ফুরায়| মোটে মা রাঁধে না, তপ্ত আর পান্তা| অথবা, মাগা ভাত তার আবার বাসি আর পান্ত| আবার, কোন কোনটি স্বতন্ত্র অর্থ প্রকাশক| যেমন:কী কথা বলবো সই, পান্তা ভাতে টক দই| অথবা, কিসের মধ্যে কী, পান্তা ভাতে ঘি| পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ সাধারণ ভাতের তুলনায় অনেক বেশি| বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এবং আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক পৃথক গবেষণায় বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে| গবেষণা লব্ধ ফলাফল বলছে, পান্তা ভাতে (প্রতি ১০০ গ্রাম) আয়রনের পরিমাণ ৩.৪ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে ৭৩.৯১ মিলিগ্রাম (২২ গুণ), ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ২১ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে ৮৫০মিলিগ্রাম (৪০ গুণ), আর পটাশিয়ামের পরিমাণ ৭৭ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে ৮৩৯ মিলিগ্রাম (১১ গুণ) হয়| অন্যদিকে, সোডিয়াম এর পরিমাণ ৪৭৫ মিলিগ্রাম থেকে কমে ৩০৩ মিলি গ্রাম হয়| আর সেজন্যই পান্তা ভাতের স্বাদ কিছুটা পানসে এবং আমরা লবণ মিশিয়ে খেয়ে থাকি| অন্য একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, পান্তা ভাতে জিংক এবং ভিটামিন-বি (বি২- রাইবোফ্লাভিন, বি৬- পাইরিডক্সিন, বি১২-সায়ানোকোবালামিন) এর পরিমাণও অনেক বেড়ে যায়| তাহলে প্রশ্ন জাগে, পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ কীভাবে বাড়ে? চাল তথা শস্য জাতীয় সকল খাবারে ফাইটেট নামক অ্যান্টিনিউট্রিয়েন্ট থাকে যা খনিজ লবণসমূহ, যেমন: আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক শক্ত বন্ধনের মাধ্যমে আবদ্ধ করে রাখে| ফলে, আমাদের শরীর এই সমস্ত খনিজ লবণ শোষণ করতে পারে না| কিন্তু ভাতকে যখন কয়েক ঘণ্টা (৮-১২ঘণ্টা) ভিজিয়ে রাখা হয়, তখন ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি হয় যার ফলে ভাতের অম্লত্ব বেড়ে যায়| ফলাফল, ফাইটেটে আবদ্ধ খনিজ লবণসমূহ মুক্ত হয় এবং আমাদের দেহ সহজেই সেগুলো শোষণ করতে পারে| ফলশ্রুতিতে, পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ সাধারণ ভাতের তুলনায় অনেকগুণ বেড়ে যায়| তাছাড়া, পান্তা ভাত শরীর ঠান্ডা রাখে, রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণ করে, কোলেস্টেরল কমায়, অধিকশক্তিযোগায়, হজমের সহায়তা করে, ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ত্বকের শ্রীবৃদ্ধি করে, পেটের আলসার নিরাময় করে এবং এলার্জি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে| পান্তা ভাত আমাদের জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া (সাধারণত দই এ যে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়) এর উৎস হিসেবে ও কাজ করে| তবে, এত সব উপকারিতার সঙ্গে কিছু ক্ষতি কর দিকও বিদ্যমান, যেমন: অনেক সময় তৈরির প্রক্রিয়ার ক্রুটি বা অসাবধানতার কারণে পান্তা ভাতে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে এবং তার ফলে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগ-ব্যাধি হতে পারে| আবার, দীর্ঘক্ষণ (১৮ ঘণ্টার অধিক) ভাত ভিজিয়ে রাখলে অ্যালকোহল তৈরি হয় যা খেলে শরীর ম্যাজম্যাজ করে এবং ঘুম ঘুম হতে পারে| আর ও মনে রাখা দরকার যে পান্তা ভাত আর বাসি ভাত এক নয়| রাতের অতিরিক্ত ভাত কক্ষ তাপমাত্রায় রেখে দিলে সকালে তাকে বাসি ভাত বলে| পান্তা ভাত যেখানে উপাদেয়, স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিগুণে অনন্য, বাসি ভাত সেখানে জীবাণুযুক্ত, অস্বাস্থ্যকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ| তাই, পান্তা ভাত আদরনীয় হলে ও বাসি ভাত বর্জনীয়!পান্তা- বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি, আপন ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক| গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে শরীর সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে পান্তা টনিক হিসেবে কাজ করে| যদিও পান্তা হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির অংশ, শুধুমাত্র নিকট অতীতে পান্তার এতসব গুণের কথা জানতে পেরেছি আমরা| জয় হোক পান্তার, জয় হোক বাঙালি সংস্কৃতির![লেখক: অধ্যাপক, অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়]

শোভাযাত্রা এগোয়, আমরা কি এগোই?

পহেলা বৈশাখ আমাদের ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন, কিন্তু বাস্তবে এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক নীরব প্রশ্নপত্র| প্রতি বছর যখন বৈশাখ আসে, আমরা রঙে রঙিন হই, শোভাযাত্রায় হাঁটি, শুভেচ্ছা বিনিময় করি| শহরের রাজপথ মুখোশ, পুতুল, ঢাকের শব্দ আর উৎসবের উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে| মনে হয়, আমরা এক নতুন পৃথিবীতে প্রবেশ করেছি| কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— এই বাহ্যিক অগ্রগতির ভেতরে আমাদের মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক অগ্রগতি কতটা সত্যি?বাংলা নববর্ষের ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে| কৃষিভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাকে সহজ করার জন্য হিজরি চান্দ্র সনের সঙ্গে সৌর সনের সমন্বয়ে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়| শুরুতে এটি ছিল প্রশাসনিক প্রয়োজন, কিন্তু সময়ের প্রবাহে তা রূপ নেয় এক সাংস্কৃতিক উৎসবে| ইতিহাসের এই রূপান্তরই প্রমাণ করে— যে কোনো প্রথা মানুষের জীবন ও অনুভূতির সঙ্গে মিশে গেলে তা কেবল হিসাবের বিষয় থাকে না, হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের অংশ| আজ পহেলা বৈশাখ শুধু ক্যালেন্ডারের প্রথম পাতা নয়; এটি এক সামাজিক মিলনমেলা| ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম, শিক্ষিত-অশিক্ষিত—সবাই এক কাতারে এসে দাঁড়ায়| শুভ নববর্ষ শব্দটি তখন আর কেবল শুভেচ্ছা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের সমতার ভাষা| কিন্তু বাস্তব জীবনে এই সমতা কতটা স্থায়ী? উৎসব শেষে কি আমরা আবার পুরনো বিভাজনের দেয়াল তুলে দিই না?হালখাতা এই দিনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক| ব্যবসায়ীরা পুরনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খোলেন| গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করানো হয়, সম্পর্ক নবায়ন করা হয়| এই প্রথা কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি বিশ্বাসের পুনর্গঠন| কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিশ্বাস কি কেবল উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা, নাকি বাস্তব জীবনে তা টিকে থাকে? নাকি বছরের বাকি সময় আমরা আবার সন্দেহ, অবিশ্বাস আর স্বার্থের জালে জড়িয়ে পড়ি?রমনার বটমূলে ভোরের সূর্যের সঙ্গে যখন - এসো হে বৈশাখ - ধ্বনিত হয়, তখন মনে হয় প্রকৃতি নিজেই নতুন জীবনের আহ্বান জানাচ্ছে| এই গান শুধু সংগীত নয়, এটি এক দার্শনিক আহ্বান—পুরনো জীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে নতুন করে বাঁচার| কিন্তু আমরা কি সত্যিই সেই আহ্বান শুনি, নাকি এটি কেবল উৎসবের পটভূমির সুর হয়ে থাকে?সবার অংশগ্রহণে শোভাযাত্রা এই দিনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক| রঙিন মুখোশ, বিশাল প্রতীকী কাঠামো, লোকজ শিল্পের সমাহার—সব মিলিয়ে এটি এক চলমান শিল্পকর্ম| এর ভেতরে আছে অশুভের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ| কিন্তু সেই প্রতিবাদ কি কেবল কাগজে-রঙে সীমাবদ্ধ, নাকি বাস্তব জীবনের অন্যায়, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধেও আমাদের অবস্থান দৃঢ়? শোভাযাত্রা যখন এগোয়, আমরা কি সত্যিই এগোই?খাবারের দিক থেকেও পহেলা বৈশাখ এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা| পান্তা-ইলিশ, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ কিংবা হরেক রকমের ভর্তা —এই খাবারগুলো বাঙালির মাটির সঙ্গে সম্পর্কের প্রতীক| কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটি যখন শহুরে অভিজাত সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে, তখন এক ধরনের সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটে| ঐতিহ্য কি তখন তার সহজতা হারায়? নাকি সেটিই তার বিবর্তন?গ্রামবাংলায় পহেলা বৈশাখের চিত্র আরও প্রাণবন্ত| সেখানে মেলা বসে, লোকজ গান গাওয়া হয়, খেলাধুলা ও নানান আয়োজন চলে| এই মেলা শুধু আনন্দের কেন্দ্র নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি চালিকাশক্তি| ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিল্পীরা এখানে তাদের জীবিকার সুযোগ পান| সংস্কৃতি ও অর্থনীতি এখানে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় স্বাভাবিকভাবে| বিশ্বায়নের এই যুগে পহেলা বৈশাখ আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার ডাক দেয়| প্রযুক্তি, নগরায়ণ ও আধুনিকতার প্রবাহে আমরা যতই এগোই, ততই আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধরে রাখার প্রয়োজন বেড়ে যায়| কারণ পরিচয়হীন অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত কূন্যতায় পরিণত হতে পারে| তাই বৈশাখ কেবল উৎসব নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধও| এই দিনে আমরা নতুন পোশাক পরি, ছবি তুলি, সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানাই| কিন্তু প্রশ্ন হলো— আমাদের চিন্তা, মনন ও আচরণ কি সত্যিই নতুন হয়? নাকি এটি কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন, ভেতরের স্থবিরতা অক্ষণ্ন রেখে?পহেলা বৈশাখ আসলে এক আয়নার মতো| এটি আমাদের দেখায় আমরা কেমন হতে পারতাম, আর বাস্তবে আমরা কেমন হয়ে আছি| এই আয়নায় যদি আমরা শুধু সাজসজ্জা দেখি, তবে তা অপূর্ণ দর্শন| কিন্তু যদি আমরা নিজেদের ভেতরের সমাজ, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধকে দেখি, তবে সেটিই হবে প্রকৃত উপলব্ধি| শহরের আলো, ঢাকের শব্দ, শোভাযাত্রার রং—সব মিলিয়ে এক দিনের জন্য আমরা যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করি| কিন্তু সেই জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এসে আমরা কতটা বদলাই? এই প্রশ্নই পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন| এক কথায় পহেলা বৈশাখ আমাদের কেবল আনন্দ দেয় না; এটি আমাদের প্রশ্ন করে| আমাদের জাগিয়ে তোলে| আমাদের নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়| শোভাযাত্রা হয়তো এগোয়, কিন্তু আমরা যদি না এগোই, তবে সেই রঙিন যাত্রা কেবল একটি প্রদর্শনী হয়েই থেকে যাবে| তাই নতুন বছরের এই দিনে প্রত্যাশা একটাই—আমরা যেন কেবল উৎসব উদযাপন না করি, বরং নিজেদের ভেতরেও এক নতুন সূচনা ঘটাই| চিন্তায়, চেতনায়, দায়িত্ববোধে ও মানবিকতায়| সবাইকে শুভ নববর্ষ| [লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

পহেলা বৈশাখ: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সন্ধিক্ষণ

পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব| তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎসবের ধরণ, উদযাপন পদ্ধতি এবং সামাজিক তাৎপর্যেও এসেছে নানা পরিবর্তন| একসময় গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত এই দিনটি এখন শহুরে আয়োজনে আরও জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে উঠেছে| তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—এই আধুনিকতার ভিড়ে আমরা কি আমাদের মূল ঐতিহ্যকে ঠিকভাবে ধরে রাখতে পারছি?প্রাচীনকালে পহেলা বৈশাখ ছিল কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ| কৃষকরা নতুন বছরের শুরুতে নতুন ফসলের পরিকল্পনা করতেন, ব্যবসায়ীরা হালখাতার মাধ্যমে নতুন হিসাব শুরু করতেন| কিন্তু বর্তমান সময়ে কৃষির গুরুত্ব কমে যাওয়া এবং নগরায়ণের ফলে এই দিকটি অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে| শহরের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এই ঐতিহ্যের গভীরতা সম্পর্কে তেমন অবগত নয়| ফলে পহেলা বৈশাখ অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র একটি উৎসব বা ছুটির দিনে পরিণত হচ্ছে| আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে| এখন মানুষ ঘরে বসেই অনলাইনে শুভেচ্ছা বিনিময় করছে, ভার্চুয়াল আয়োজনে অংশ নিচ্ছে| এটি একদিকে যেমন সহজ করেছে যোগাযোগ, অন্যদিকে সরাসরি মিলনমেলার যে উষ্ণতা, তা কিছুটা হলেও কমিয়ে দিয়েছে| উৎসবের প্রাণবন্ততা অনেকাংশে নির্ভর করে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণের ওপর, যা প্রযুক্তির কারণে কিছুটা সীমিত হয়ে পড়ছে| আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাণিজ্যিকীকরণ| পহেলা বৈশাখ এখন অনেক ক্ষেত্রেই একটি বড় ব্যবসায়িক সুযোগে পরিণত হয়েছে| পোশাক, খাবার, সাজসজ্জা—সবকিছুতেই উৎসবকে ঘিরে বাড়তি বাণিজ্যিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়| যদিও এটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক, তবে অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ উৎসবের মূল চেতনাকে আড়াল করে ফেলতে পারে| ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিবর্তে যদি কেবল বাহ্যিক আড়ম্বরই প্রাধান্য পায়, তাহলে তা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে| তবে সবকিছুর মধ্যেও আশার দিক রয়েছে| মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো উদ্যোগগুলো আমাদের সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরছে| মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বদলে এবার করা হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’| তরুণ প্রজন্মের অনেকেই আবার নতুনভাবে লোকসংগীত, গ্রামীণ মেলা এবং ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে| বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পহেলা বৈশাখকে ঘিরে নানা আয়োজন করছে, যা নতুন প্রজন্মকে এই উৎসবের সঙ্গে পরিচিত করে তুলছে| এই প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় কী? প্রথমত, পহেলা বৈশাখের ইতিহাস ও তাৎপর্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করতে হবে| পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে| দ্বিতীয়ত, উৎসব উদযাপনে সরলতা ও আন্তরিকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে মূল চেতনা অক্ষণ্ন থাকে| তৃতীয়ত, গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতিকে আরও বেশি প্রাধান্য দিতে হবে, যাতে শহর-গ্রামের সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ় হয়| পহেলা বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতির একটি জীবন্ত প্রতীক| সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আসবে, সেটাই স্বাভাবিক| তবে সেই পরিবর্তনের মাঝেও আমাদের শিকড়কে ভুলে গেলে চলবে না| ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয় ঘটিয়ে যদি আমরা এই উৎসবকে উদযাপন করতে পারি, তবেই পহেলা বৈশাখ তার প্রকৃত সৌন্দর্য ও তাৎপর্য বজায় রাখতে সক্ষম হবে| [লেখক: সাংবাদিক]

ভিডিও

ম্যানসিটিতে ভাঙনের ইঙ্গিত

ক্যারাবাও কাপ জয়ের আনন্দ এখনো ভোলেননি ম্যানচেস্টার সিটি সমর্থকেরা। কিন্তু ট্রফি হাতে পেপ গার্দিওলা ও বের্নাদো সিলভার উজ্জ্বল হাসির পেছনে যেন লুকিয়ে আছে অশনি সংকেত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, সিলভার ভবিষ্যৎ নিয়ে গার্দিওলার ‘গ্রাম্পি’ (খিটখিটে) মনোভাব দলের ভেতরে অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।দীর্ঘদিন ধরে সিটির মিডফিল্ডের অপরিহার্য অংশ বের্নাদো সিলভা। প্রতিটি ম্যাচে তার অদম্য দৌড়, টেকনিক ও ফুটবল বুদ্ধি দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সম্প্রতি পর্তুগিজ এই তারকার ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা বেড়েছে। গার্দিওলার সাম্প্রতিক আচরণ বিশ্লেষকদের চোখে পড়েছে, যা ভাঙনের ইঙ্গিত বহন করছে।গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিলভা প্রসঙ্গে গার্দিওলার মনোভঙ্গি ‘বিরক্তিকর। যদিও সরাসরি কোনো মুখোমুখি সংঘাতের খবর নেই, কিন্তু পর্দার আড়ালে নাকি পরিস্থিতি খুব একটা স্বাভাবিক নয়। সিলভা বহুবারই ইউরোপের অন্য ক্লাবে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। বার্সেলোনা ও পিএসজির মতো ক্লাবগুলোতে তার নাম জড়িয়েছে বারবার। এই নিয়েই নাকি গার্দিওলার সঙ্গে মতপার্থক্য দেখা দিচ্ছে।প্রিমিয়ার লিগের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসেছে এই অস্থিরতার খবর। সিটি এখনও শিরোপা দৌঁড়ে আছে। কিন্তু দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়দের একজনকে নিয়ে এই অনিশ্চয়তা পছন্দ করবেন না গার্দিওলা। অন্যদিকে, সিলভা হয়তো চান ক্যারিয়ারের শেষভাগে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে।ম্যানসিটি ভক্তদের জন্য বড় প্রশ্ন হলো- সিলভা কি থাকছেন, না কি যাচ্ছেন? যদি তিনি চলে যান, তাহলে তার জায়গা কে নেবে? আর পেপ কি সত্যিই ‘গ্রাম্পি’ নাকি এটা কেবলই গুঞ্জন? উত্তর মিলবে হয়তো আগামী কয়েক সপ্তাহের ট্রান্সফার বাজারে। 

ম্যানসিটিতে ভাঙনের ইঙ্গিত
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ২৪ জন