সংবাদ
প্রতিহিংসা নয়, জাতীয় ঐক্যই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের শক্তি

প্রতিহিংসা নয়, জাতীয় ঐক্যই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের শক্তি

জাতীয় নেতাদের যথাযথ সম্মান না দিলে ভবিষ্যৎ ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে নাপ্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা কিংবা অযথা বিতর্কের কোনো স্থান নেই বরং জাতীয় ঐক্য ও সহনশীলতাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।তিনি আরও বলেন, বিশ্বের সব দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, তবে জনদুর্ভোগের কথা চিন্তা করে দেশে এখনও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। এই খাতে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে হলেও সরকার আন্তরিকভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করছে।বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক ও ৫ প্রতিষ্ঠানের হাতে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ তুলে দেন।প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সকল জাতীয় নেতার অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।তিনি সতর্ক করে বলেন, দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় নেতাদের যথাযথ সম্মান না দিলে ভবিষ্যৎ ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না।জিয়াউর রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।’ দেশের স্বার্থবিরোধী চক্র এখনো সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে উল্লেখ করে তিনি সবাইকে অভ্যন্তরীণ বিভাজন এড়িয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে জানান, ভঙ্গুর অর্থনীতি ও দুর্বল শাসন কাঠামোর মধ্য দিয়ে সরকার যাত্রা শুরু করলেও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কর্মমুখী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং নারীদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেন। এছাড়া জুলাই সনদ ও নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘রাষ্ট্র মেরামত’ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিদ্যা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, পল্লী উন্নয়ন, সমাজসেবা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জনপ্রশাসন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ এবং অন্য কোনো ক্ষেত্রেও যারা গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এমন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাকে প্রতি বছর দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়।এ বছর দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, নারী শিক্ষাসহ দেশ গঠনে অসামান্য অবদানের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ‘দাদু’র এই পদকটি গ্রহণ করেন খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমান। খালেদা জিয়াসহ এ বছর মোট সাতজন মরণোত্তর সম্মাননা পেয়েছেন। এরা হলেন: মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য মেজর মোহাম্মদ আবদুল জলিল, সাহিত্যে ড. আশরাফ সিদ্দিকী, সমাজ সেবায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও মাহেরীন চৌধুরী, সংস্কৃতিতে বশির আহমেদ এবং জনপ্রশাসনে কাজী ফজলুর রহমান।মেজর জলিলের পক্ষে তার কণ্যা ব্যারিস্টার সারা জলিল, ড. আশরাফ সিদ্দিকীর পক্ষে তার মেয়ে ড. তাসনিম আরিফা সিদ্দিকা, জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পক্ষে তার ছেলে বারীশ হাসান চৌধুরী, মাহেরীন চৌধুরীর পক্ষে তার স্বামী মনসুর হেলাল, বশির আহমেদের পক্ষে তার মেয়ে হুমায়ারা বশির এবং কাজী ফজলুর রহমানের পক্ষে তার মেয়ে তাবাসুম শাহনাজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন।সরাসরি উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অধ্যাপক ড. জহুরুল করিম (পক্ষে তার পুত্র হারুনুর রশীদ), সংস্কৃতিতে একেএম হানিফ (হানিফ সংকেত), ক্রীড়ায় জোবেরা রহমান লিনু, সমাজসেবায় সাইদুল হক, গবেষণা ও প্রশিক্ষণে মোহাম্মদ আবদুল বাকী, অধ্যাপক ড. এম এ রহিম, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া এবং পরিবেশ সংরক্ষণে আব্দুল মুকিত মজুমদার বাবু। প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ (মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য)। চিকিৎসায় অবদানের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) পল্লী উন্নয়নে অবদানের জন্য এবং এসওএস শিশু পল্লী ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র জনসেবায় অবদানের জন্য।
৩ ঘন্টা আগে

মাজারের দিঘিতে কুকুরকে ফেলে দেওয়ার প্রমাণ মেলেনি

মাজারের দিঘিতে কুকুরকে ফেলে দেওয়ার প্রমাণ মেলেনি

প্রতিহিংসা নয়, জাতীয় ঐক্যই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের শক্তি

প্রতিহিংসা নয়, জাতীয় ঐক্যই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের শক্তি

জরিমানার খবর শুনেই জ্ঞান হারালেন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি

জরিমানার খবর শুনেই জ্ঞান হারালেন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি

চুয়াডাঙ্গায় পৃথক স্থানে বজ্রপাতে শিক্ষার্থীসহ নিহত ২

চুয়াডাঙ্গায় পৃথক স্থানে বজ্রপাতে শিক্ষার্থীসহ নিহত ২

আবু সাঈদকে আরাফাত-তাপসের ব্যঙ্গ ও যুবলীগের অস্ত্র মহড়ার বর্ণনা দিলেন সাক্ষী

আবু সাঈদকে আরাফাত-তাপসের ব্যঙ্গ ও যুবলীগের অস্ত্র মহড়ার বর্ণনা দিলেন সাক্ষী

হোমনায় স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ

হোমনায় স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ

বাংলাদেশিদের প্রতি ৫ জনের ১ জনের জিনে পরিবর্তন

বাংলাদেশিদের প্রতি ৫ জনের ১ জনের জিনে পরিবর্তন

সিআইডির জালে অপহরণকারী শাহাদাত, অপহরণ ও লুণ্ঠনের রোমহর্ষক বর্ণনা

সিআইডির জালে অপহরণকারী শাহাদাত, অপহরণ ও লুণ্ঠনের রোমহর্ষক বর্ণনা

টাইম ম্যাগাজিনে প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় প্রধানমন্ত্রী, সংসদে ধন্যবাদ

টাইম ম্যাগাজিনে প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় প্রধানমন্ত্রী, সংসদে ধন্যবাদ

৭ বার এমপি হয়েছি, কিন্তু দুর্নীতি আমাকে স্পর্শ করেনি : স্পিকার

৭ বার এমপি হয়েছি, কিন্তু দুর্নীতি আমাকে স্পর্শ করেনি : স্পিকার

মতামতমতামত

ইতিহাসের নির্মোহ রূপকার

তাজউদ্দীন আহমদকে কেউ বলেন ইতিহাসের রূপকার, কেউ বলেন ইতিহাসের নির্মোহ নির্মাতা| তাজউদ্দীন আহমদ নিজে ইতিহাসের অজানা, অচেনা কেউ হয়ে থাকতে চেয়েছেন| ইতিহাস তাকে দৃশ্যমান করুক, তাজউদ্দীন তা’ কখনো প্রত্যাশা করেননি| তাজউদ্দীন সজ্ঞানে বলে গেছেন, ‘তুমি ইতিহাসে এমনভাবে কাজ করো যেন ইতিহাসে কোথাও তোমাকে খুঁজে পাওয়া না যায়|’ ইতিহাসের এমন নির্মোহ, নিরাকার, প্রত্যাশাহীন নির্মাতার সংখ্যা পৃথিবীতে যে খুব বেশি নেই তা’ আমরা বলতে পারি| মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের যতো গভীরে যাওয়া যায়, তাজউদ্দীন আহমদের অনন্য নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমীহের পরিমানও তত বেড়ে যায়| তাজউদ্দীন আহমদ, এমন একজন নীরব ও নির্মোহ ইতিহাসের রূপকার যাকে ইতিহাসের সিঁড়ি বেয়ে খুঁজে বের করে নিয়ে আসতে হয়| তিনি নিজে এসে উপস্থিত হননা| ছকে বাঁধা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় তাকে খুঁজে পাওয়া ভার| আমরা যখন তার অসীম সাহসী নেতৃত্ব, চরিত্রের দৃঢ়তা, উদ্দেশ্য লাভের জন্য আন্তরিক নিবেদন প্রত্যক্ষ করি তখন তাকে মনে হয়, ইতিহাসের ঘোর অন্ধকার থেকে আলোর পথে উত্তরণের একজন সাহসী ‘ত্রাতা’| তাজউদ্দীন আহমদের মতো বিশাল মানুষকে উন্মোচন করার জন্য প্রচুর গবেষণার প্রয়োজন আছে| তা যে খুব বেশি পরিমানে হচ্ছে তা না’ আমরা বলতে পারি| মুক্তিযুদ্ধকে জানার একটি ছক তৈরি হয়ে গেছে দেশে| সেই ছক বা বৃত্তের বাইরে কেউ যেতে ইচ্ছুক নন| ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত আমরা ইতিহাসকে অনুসন্ধান করি দফাওয়ারী আন্দোলনের ভাঁজে| সেই ভাঁজের ভেতরে থাকে প্রধানত আন্দোলনের রুটিন বা ধারাবাহিক বর্ণনা| ইতিহাসের পেছনের ইতিহাসকে গবেষণা করে উন্মোচন করার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় খুব কম| ২৫ মার্চ গভীর রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করার পর, জাতির ক্রান্তিলগ্নে নেতৃত্বের সব দায় অসীম সাহস নিয়ে গ্রহণ করেন তাজউদ্দীন আহমদ| জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ ও গৌরবের এই সময়ে তাজউদ্দীন যদি একটি মাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল করতেন তাহলে আমাদের ইতিহাস ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হতে পারতো| মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় তাকে একাই একটি সরু সুতার ওপর দিয়ে হাঁটতে হয়েছে যার নিচে ছিল অগ্নি স্ফুলিঙ্গ| তিনি জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য বানিয়ে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চে, পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর চোখ এড়িয়ে, ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামের সঙ্গে ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন| জীবনকে আগাম উৎসর্গ করেছিলেন তিনি মাতৃভূমির জন্য| বাঙালি জাতির এই অচেনা, ভয়াবহ পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তার পরিবারকে কী বার্তা দিয়ে গিয়েছিলেন? তিনি একটি চিরকূটে তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী’ সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন লিলিকে লিখেন ‘লিলি, আমি চলে গেলাম| যাবার সময় কিছুই বলে আসতে পারিনি| মাফ করে দিও| আবার কবে দেখা হবে জানি না’| তাজউদ্দীন আহমদ ব্যক্তিগত জীবনে আবেগকে তেমন প্রাধান্য দিতেন না, এর মানে এই নয় যে তিনি ছিলেন আবেগহীন| তাজউদ্দীন আহমদ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯২৫ সালে, বর্তমান ঢাকা জেলার, কাপাসিয়া উপজেলার দরদরিয়া গ্রামে| ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কারাগারে রাতের অন্ধকারে পাক-মার্কিন দোসর মোশতাক ও সামরিক বাহিনীর কিছু সংখ্যক পাক-মার্কিন এজেন্ট তাজউদ্দীনসহ জাতীয় চার নেতাকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে| সেই হত্যাকাণ্ড ও এর পেছনের গল্প বলা আজকের লেখার উদ্দেশ্য নয়| আজকের লেখার উদ্দেশ্য, তাজউদ্দীন আহমদ যে কতো বড় মহীরুহ ছিলেন সে সম্পর্কে সামান্য ঈঙ্গিত প্রদান করা| তাজউদ্দীনের এই সফল ও ত্যাগী জীবনকে চারটি পর্বে ভাগ করা যায়| ১৯২৫ থেকে পাকিস্তান অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত প্রথম পর্ব, পাকিস্তান অর্জনের পর থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্ব, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের মূহুর্ত পর্যন্ত তৃতীয় পর্ব এবং ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল থেকে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জীবনের শেষ পর্ব| তাকে গভীর ভাবে অধ্যয়ন করতে হলে তার জীবনের এই চারটি পর্বকেই বিবেচনায় নিয়ে আসতে হয়| তবে তার নেতৃত্বের বিকশিত সময় প্রত্যক্ষ করতে হলে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন পর্যন্ত তার ভূমিকাকে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে| তাজউদ্দীন আহমদ যখন সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে উপস্থিত হয়েছিলেন, তখন তাকে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে এবং ভারতের প্রভাব মুক্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার এক বিশাল চ্যালেঞ্জের সামনে নিয়ে আসে| তিনি ও ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম ৩০ মার্চ সীমান্ত পার হওয়ার পরেই তাদের সঙ্গে সাক্ষাত হয় ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তরক্ষী প্রধান ইন্সপেক্টর জেনারেল গোলোক মজুমদারের সঙ্গে| গোলক মজুমদারকে তাজউদ্দীন তার প্রখর ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয় ধরণে জানিয়ে দেন ভারত সরকারের সঙ্গে তার আলোচনা হবে তখনই যখন সরকারের পক্ষ থেকে তিনি ও মুক্তিযুদ্ধের নেতাদের আনুষ্ঠানিক ভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তিনি সুস্পষ্ট ভাবে গোল্পক মজুমদারকে অবগত করেন তিনি ও তার সহযোগী নেতারা স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতিনিধি| তাজউদ্দীনের কথা শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন আইজি মজুমদার| তার রাষ্ট্রনায়কোচিত ব্যক্তিত্ব ও দূরদর্শিতার প্রমাণ পেয়েছিলেন তিনি এই দুরদর্শী প্রস্তাবে| তাজউদ্দীন আহমদের প্রস্তাব অনুযায়ী ভারত সরকার এপ্রিল ৩, ১৯৭১ সালে, তাজউদ্দীন আহমদকে আমন্ত্রন জানায়| প্রথম সাক্ষাতে তাজউদ্দীন, একজন স্বাধীনতাকামী জাতির নেতা হিসাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সুস্পষ্ট ভাবে কিছু বিষয় বিনয়ের সঙ্গে উপস্থাপন করেন| তাজউদ্দীনের সুস্পষ্ট বক্তব্য শুনে আমরা বিস্মিত হই| তাজউদ্দীন বলেছিলেন, ‘এটা আমাদের যুদ্ধ| আমরা চাই ভারত এতে জড়াবে না| আমরা চাই না ভারত তার সৈন্য দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে আমাদের স্বাধীন করে দিক| এই স্বাধীনতার লড়াই আমাদের নিজেদের এবং আমরা এটা নিজেরাই করতে চাই|’বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে দিশেহারা করার জন্য, পাক, মার্কিন, চিনের নানা কূট কৌশলকে মোকাবিলা করতে হয়েছে, এই সহিষ্ণু, দুরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতাকে| সুশিক্ষিত, মেধাবী তাজউদ্দীন আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসে সবার সহযোগিতায় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন| সরকার গঠনের পর পরই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন বিশ্ববাসীকে নবজাত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান জানান| দেশের মাটিতেই শপথগ্রহণ হবে, এই ছিল তার ইচ্ছা| সেই আকাঙ্ক্ষা অনূসারেই, ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে দেশি-বিদেশি সাংবাদিক সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়| প্রকৃত পক্ষে এপ্রিল মাসের ভেতরেই বাংলাদেশ নামক দেশের গোড়া পত্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সব কর্মকাণ্ড, সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধরন অনুযায়ী তিনি সমাপ্ত করতে সক্ষম হন| সরকার গঠনের পর থেকেই তাকে বহুমুখী অভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করতে হয়| স্বাধীন বাংলা সরকারের মধ্যেই ছিল পাকিস্তানের পক্ষের ষড়যন্ত্রকারীরা| তাজউদ্দীন আহমদ এ সমস্ত ষড়যন্ত্রকে দৃঢ় ভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হন| ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করার বিষয়টিকে তার ভাষায় এভাবে ব্যাখ্যা করেন তাজউদ্দীন, ‘পাকিস্তান তার বন্ধুদের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল কিন্তু সফল হয়নি, সংগ্রামের এক পর্যায়ে আমেরিকা প্রশ্ন তোলে, স্বাধীনতা চাও নাকি মুজিবকে চাও| এর উত্তরে আমি বলেছিলাম স্বাধীনতাও চাই, মুজিবকেও চাই|’ তাজউদ্দীন আহমদ এতো নিবেদিত এবং শীতল মস্তিষ্কের নেতা ছিলেন, যিনি শত বাধার মুখেও লক্ষ্যে থেকে বিচ্যুত হননি| নীতি, নৈতিকতার দিক থেকে এক অনন্য মানুষ ছিলেন তাজউদ্দীন| পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক বিষয়কে সঠিক ভাবে অধ্যয়ণ করার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ| কৌশলী নেতৃত্ব ও কর্তব্যনিষ্ঠা, সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা প্রগতিশীল চিন্তার কারণে তার ভাষায় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় সফল ‘ধাত্রির’ ভূমিকা তাজউদ্দীন পালন করতে পেরেছিলেন| মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, সমগ্র জাতির সামরিক, বেসামরিক বাহিনী, নানা মত, নানা পথের মানুষদের সংহত করে জাতীয় ঐক্যকে সুদৃঢ় রাখার কৃতিত্ব তাকে না দিলে অবিচার করা হয়| তাজউদ্দীনকে না জানলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা হয় না| তাকে না বুঝলে বাংলাদেশকে বুঝা অসমাপ্ত থেকে যায়| জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে তাজউদ্দীন আহমদের জীবন দর্শন এবং নেতৃত্বের সৌন্দর্য জানা খুবই জরুরি| [লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

“বাংলা যখন হারাম”

“এইডা কী কন বাংলা যখন হারাম! আপনে তো মিয়া আস্ত নাজায়েজ কথা কন! বাংলা যখন হারাম! মিয়া বাংলাদেশ না হইলে এই পানিওয়ালীর পোলারানি, এয়ারলাইনসের মালিক হোইতো? ওর্য়াল্ডবেস্ট অল রাউন্ডার হোইতেন! লজ্জা করে না মিয়া ফালতু কথা কোইতে!”“আরে মনু তুমি চ্যেতকা| আমি কী বলতে চাইছি আর তুই কী বুঝছিস!”“ক্যান আমার বুঝতে অসুবিধা কি? আপনে তো বাংলা ভাষায় কথা কোইতাছেন| হীব্রু ভাষায়তো মাতেন ন’| তো, এইডা বুঝতে আমার কি অসুবিধা| বাংলা যখন হারাম| বাংলাদেশ স্বাধীনতা না পাইলে আপনে মিয়া হোটেলের বেয়ারা থাকতেন| রম্য লেখক! ভুইল্লা যান মিয়া| বাংলাদেশ স্বাধীন না হোইলে আপনের বাপের নামও ভুইল্লা যাইতেন!”“বুঝলাম বাংলাদেশর স্বাধীনতার আগে বাঙালিদের ওপর অনেক অন্যায় হয়েছে| সেনাবাহিনিতে বাঙালিদের নিতো না... ” “তো বুঝেন না মিয়া| মেজর জেনারেল! বাংলাদেশ স্বাধীন না হোইলে সাধারণ সিপাইভি হোইবার পারতেন না| আবার কতা কন মিয়া, বাংলা যখন হারাম! মেডিকেল কলেজের ডিরেক্টার! ডিরেক্টার জেনারেল ফোর্সেস ইন্টালিজেন্সের চিফ, উঁহ মরে যাই সখী তোর আতরের গন্ধে! মিয়া, লাখ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগে দেশ স্বাধীন, আর অহন কন বাংলা যখন হারাম! এই লাখ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগের কী কোনোই দাম নাই! আসলে আপনে মিয়া আস্ত নাজায়েজ পোলা| আপনের মিয়া জন্মেরই ঠিক নাই!”“দ্যেখ এভাবে আমার পূর্ব পুরুষকে টানছিস ক্যেনো! বুঝলাম বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়াতে সারাবিশ্বে বাঙালি জাতি একটা ভুখণ্ড পেয়েছে| বাঙালি এবং বাংলাদেশ এখন সারাবিশ্বে একটা পরিচিত নাম| তোরা দাদাদের ভাষায় তথাকথিত মুচুরম্যানরা পৃথিবীর বুকে লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে বাঙালি জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিস| যেটা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর মতো ন্যাশানালিষ্টরা পারেননি, আর বর্তমান কোটি কোটি দাদারা নিজেদের প্রথমে ভারতীয় তারপর বাঙালি বলে একটা আত্মতৃপ্তি পায়| কিন্তু বাঙালি হিসেবে আমাদের মতো আলাদা কোনো মর্যাদা নেই| এই দাদারাই এক সময় লিখতেন, স্বাধীনতা হীনতা কে বাঁচিতে চায় রে, কে বাঁচিতে চায়| সব কাগুজে বাঘ| আর তোর দিদিতো তোদের ধর্মের লোকেদের কাছে ভোটের জন্য পা চাঁটে, কিন্তু সৃষ্টির সৃষ্ট পানির হিসসা দেয়না| দু’মুখো শর্প এই তোর কাউলা দিদি|”“থাক ভাই হ্যাগো মানে দাদাগো কথা ছাড়েন, হ্যেরাতো বাউন্ড্রী লাইনে পা-লাগায়া ক্যাচ ধইরা ছক্কা না দিয়া আউট দিয়াদ্যেয়| ওই খাচ্চরগো কথা থুয়া মিয়া আপনের কথা কন, আপনে মিয়া বাঙালি হয়া, বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক হয়া আপনে ক্যেমনে কন বাংলা যখন হারাম! আপনের লজ্জা করে না নিজেরে নিজে ছোট করতে?”“আমি বলছিলাম কি, এবার পয়লা বৈশাখকে অনেকে নাজায়েজ কাজ বলেছে”“ধ্যারর মিয়া আপনে হালায় আস্ত প্যাচাইল্লা মানুষ, আপনে ইংরেজি বছরের পেরথমে থার্টি ফার্স্ট ডিসেম্বরে পার্টি করা পারেন, আর বাঙালিগো বছরের পয়লা দিন পহেলা বৈশাখ পালন করতে আপনের দোষ কিতা!”“না অনেকে মানে আমাদের টাওয়ারের ম্যানেজার বলছিল, এসব পহেলা বৈশাখ শেরেকি কায়কারবার! তাই আমরা যদি...”“আরে মিয়া, মরার জ্বালা আপনের টাওয়ারে ম্যানেজার বাঙালি না?”“নিশ্চয় বাঙালি| আলবৎ বাঙালি | ও তো আর পাকিস্তান থেকে বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসেনি|”“তায়লে! বাঙালি হোইলে ওর বাংলা মাসকে উই মানবো না? প্রতিটা খবরের কাগজে, প্রতিদিন ইংরেজি, বাংলা, হিজরী সনের দিন তারিখ লেখা থাকে| তো আপনের টাওয়ারের ম্যানেজার মানলো নাতো বাংলা মাস বাংলা তারিখ বন্ধ হয়া যাইবো?”“না তা না| সর্বপ্রথম আমরা বাঙালি, তারপর কেউ মুসলমান, কেই হিন্দু, কেউ বুদ্ধ, কেউ জৈন, কেউ ব্রাহ্মধর্মে দিক্ষীত, সে যাই হোক প্রথমে আমরা সবাই বাঙালি, তারপর যার যার ধর্ম, যে ব্যক্তি যেই ধর্মে বিশ্বাস করে তা পালন করবে, সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার কিন্তু প্রথমে আমরা সবাই বাঙালি|”“জ্বী-অয়, প্রথমে আমরা সবাই বাঙালি, হেরপর লক্ষপ্রাণের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক| ধর্ম যার যার সংস্কৃতি মানে পয়লা বৈশাখ সব্বার| এখানে হিন্দু, বুদ্ধ, ˆজন, ব্রাহ্মধর্মে বইলা কিছু নাই| বুজচোইন|”“আমিতো বুঝলাম, কিন্তু অনেক বাঙালি, বাঙালি হয়েও বুঝতে চায় না|”“আচ্ছা মুরুক্ষু হ্যেরা না বুঝুক, কিন্তু আপনে ক্যেমনে কোইলেন, বাংলা যখন হারাম?”“তুইতো আমার কথা শুনতেই চাসনা, খালি ভুল বুঝিস!”“কি ভুল বুঝলাম, বাংলা যখন হারাম, এতে আমি কি ভুল বুঝলাম কন?”“আরে আমি বলছিলাম তোরা যেমন নিউ ইয়ারস’ডে তে, অনেকে ওই পাগলা পানি টানি পানা করে, ঠিক তেমনি পহেলা বৈশাখেও অনেক বাঙালি বাংলা টাংলা পান করে| সেটা বন্ধকরা যায় কিনা| মানে বাংলা চোলাই কারণবারিটা বাদ দেয়া যায় কিনা?”“হেঁ হেঁ, মিয়া আপনে আমারে হাসাইলেন! নিউ ইয়ার্স’ডে কন আর পহেলা বৈশাখ কন, পাগলা পানি সব সময় পরিত্যাজ্য|”“হেঁ হেঁ আমিও তো তাই বলছিলাম, পহেলা বৈশাখে বাংলা হবে হারাম...” “শুধু পহেলা বৈশাখ না, হারা বছরই বাংলা কারণ বারি, হোইবো হারাম| হেঁ হেঁ হেঁ...”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

রোজকার পানি কিনে খাওয়া যেখানে স্বাভাবিক

শহরে আমরা যখন তৃষ্ণা মেটাতে বোতলজাত পানি কিনি তখন সেটি নাগরিক জীবনের একটি অতি সাধারণ চিত্র| অনেক সময় এটি আভিজাত্য, স্বাচ্ছন্দ্য বা স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়| কিন্তু বাংলাদেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন| সেখানে প্রতিদিনের খাবার পানি কেনা কোনো শৌখিনতা বা বিলাসিতা নয়| এটি স্রেফ টিকে থাকার এক নির্মম ও রূঢ় সংগ্রাম| চারদিকে থৈ থৈ করছে নদী আর সমুদ্রের জল| অথচ পান করার মতো এক ফোঁটা নিরাপদ ও মিষ্টি পানি তাদের কাছে নেই| নদীমাতৃক এই ভূখণ্ডের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট কিংবা পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ প্রান্তিক জনপদে গেলে এই বাস্তবতা খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে| এত নদীর দেশে বসে এক গ্লাস সুপেয় পানির জন্য মানুষের এমন সংগ্রাম সত্যিই অবিশ্বাস্য মনে হয়| কিন্তু উপকূলের লাখো মানুষের কাছে এটিই এখন প্রতিদিনের অলঙ্ঘনীয় নিয়তি| একসময় এই এলাকার প্রতিটি বাড়িতে নিজস্ব পুকুর ছিল| বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রাচীন এবং কার্যকর পদ্ধতি এখানকার মানুষের খুব ভালোভাবে জানা ছিল| সমাজবদ্ধভাবে তারা মিষ্টি পানির আধারগুলো সযত্নে রক্ষা করতেন| কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর থেকে এই দৃশ্যপট ক্রমশ বদলাতে শুরু করে| একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে| অন্যদিকে সিডর, আইলা, আম্পান বা রেমালের মতো একের পর এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় উপকূলের সমস্ত হিসাব চিরতরে পাল্টে দিয়েছে| জলোচ্ছ্বাসে সমুদ্রের নোনা জল প্রবল বেগে ঢুকে পড়েছে উপকূলের বুক চিরে| নিমেষেই তলিয়ে গেছে মিষ্টি পানির সমস্ত আধার| এরপর শুরু হয়েছে আরেক মানবসৃষ্ট এবং ভয়ঙ্কর দুর্যোগ| অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের জন্য যত্রতত্র বাঁধ কেটে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে তোলা হয়েছে| বেশি লাভের আশায় ঘের মালিকরা পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন তার চড়া মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ| ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আজ পুরোপুরি পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে| অতিরিক্ত লবণ এবং আর্সেনিকের বিষাক্ত উপস্থিতিতে খাবার পানির এই তীব্র হাহাকার এখন বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে| প্রকৃতি ও মানুষের লোভের এই দ্বিমুখী আক্রমণে উপকূলের মিষ্টি পানি আজ শুধুই এক সোনালি অতীত| এই বিপন্ন জনপদের মানুষের প্রতিটি সকাল শুরু হয় কেবল এক কলসি পানির সন্ধানে| মাটির কলস বা প্লাস্টিকের পাত্র হাতে নারীদের মাইলের পর মাইল হাঁটার দৃশ্য সেখানে একসময় নৈমিত্তিক ঘটনা ছিল| প্রখর রোদে বা ভারী বৃষ্টিতে হেঁটে এক কলসি পানি আনতে তাদের দিনের একটি বড় অংশ ব্যয় হতো| তবে আজকাল সেই দৃশ্য কিছুটা কমে এসেছে| গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথে এখন নিয়মিত দেখা যায় ইঞ্জিনচালিত ভ্যান| সেই ভ্যানে প্লাস্টিকের বড় বড় জারে করে বিক্রি হচ্ছে খাবার পানি| স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট থেকে এই পানি সরবরাহ করা হয়| ভ্যানচালকরা হাঁকডাক দিয়ে পাড়ায় পাড়ায় এই পানি বিক্রি করেন| ফিল্টার করা এই পানি কিনে পান করাটাই এখন উপকূলের নতুন স্বাভাবিক চিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে| রোজকার পানি কিনে খাওয়ার এই রীতি এখন তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ| ঘুম থেকে উঠেই তাদের হিসাব করতে হয় আজ কত জার পানি লাগবে এবং তার দাম কীভাবে মেটানো হবে| কিন্তু আমাদের গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার এই স্বাভাবিকতা আসলে কতটা অস্বাভাবিক| বেঁচে থাকার সবচেয়ে আদিম ও মৌলিক উপাদানটি যখন চড়া দামে কিনতে হয় তখন রাষ্ট্রের কল্যাণকামী চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক| উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানির তীব্র সংকট নিয়ে সংবাদমাধ্যমে অনেক প্রতিবেদন হয়| কিন্তু এর আড়ালে সাধারণ মানুষের যে বিশাল অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা খুব কমই চোখে পড়ে| একজন দিনমজুর, জেলে বা প্রান্তিক কৃষক হয়তো সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে সামান্য কিছু টাকা আয় করেন| সেই সামান্য আয়ের একটি বড় অংশ তাকে ব্যয় করতে হয় কেবল পরিবারের খাবার পানি কিনতে| ত্রিশ লিটারের এক জার পানির দাম নেয়া হয় ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা পর্যন্ত| শুষ্ক মৌসুমে বা গ্রীষ্মকালে পানির সংকট বাড়লে এই দাম আরও বেড়ে যায়| যে পানি প্রকৃতি থেকে তাদের বিনামূল্যে পাওয়ার কথা ছিল তা আজ চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা| এটি কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়| এটি প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন| পানির পেছনে এই বাড়তি খরচের কারণে তাদের পুষ্টিকর খাবার কেনার বাজেট বাধ্য হয়ে কমাতে হয়| ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তাদের হিমশিম খেতে হয়| জরুরি চিকিৎসায় তারা অর্থ ব্যয় করতে পারেন না| ফলে দারিদ্রে?্যর চক্র থেকে তারা কোনোভাবেই বের হতে পারছেন না| পানি নামক এই তৃষ্ণার বাণিজ্য তাদের অর্থনৈতিকভাবে চিরতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে| সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো এই চড়া দামে কেনা পানির প্রকৃত মান কেমন! যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব স্থানীয় পানি শোধনাগারে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয় না| প্লাস্টিকের নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর জারে করে বছরের পর বছর ধরে একইভাবে পানি বিক্রি হচ্ছে| সেখানে সরকারি কোনো তদারকি বা মান নিয়ন্ত্রণের ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই| ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে পানি কিনেও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে পারছেন না| এটি অনেকটা নিরুপায় হয়ে বিষ পানের মতো একটি করুণ অবস্থা| নিরাপদ পানির নামে তারা আসলে কী পান করছেন তা দেখার কেউ নেই| এর পাশাপাশি গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যগত সংকট তৈরি হচ্ছে| বিশুদ্ধ পানির অভাবে উপকূলের মানুষ নানা ধরনের পানিবাহিত জটিল রোগে ভুগছেন| বিশেষ করে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে ভয়াবহভাবে| গোসল বা কাপড় ধোয়ার মতো নিত্যদিনের কাজে নোনা পানি ব্যবহারে বাধ্য হয়ে তারা জরায়ুর নানা রোগ এবং চর্মরোগসহ দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন| অনেক ক্ষেত্রে এই সমস্যা এতই প্রকট আকার ধারণ করে যে অল্প বয়সেই নারীদের জরায়ু কেটে ফেলতে হয়| এটি এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় যা নীরবে ঘটে চলেছে| পানি কিনে খাওয়ার এই নতুন প্রবণতা আমাদের একটি গভীর রাষ্ট্রীয় সংকটের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে| রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে হোঁচট খায় ঠিক তখনই এমন অমানবিক বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হয়| মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কিছু মানুষ রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে| উপকূলের এই পানি সংকটকে কেবল একটি ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক সমস্যা ভাবলে বড় ভুল হবে| এটি একটি জাতীয় সমস্যা এবং এর দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন| আমাদের নীতিনির্ধারকদের এই রূঢ় বাস্তবতা অনুধাবন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি| কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ত্রাণের মতো করে কিছু পানির ট্যাংক বা বোতলজাত পানি পাঠিয়ে এই গভীর সমস্যার সমাধান হবে না| এনজিও বা বেসরকারি সংস্থাগুলোর খণ্ডিত ও সাময়িক উদ্যোগও এর দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে| প্রয়োজন সমন্বিত এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই উদ্যোগ| বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য প্রতিটি গ্রামে সরকারি উদ্যোগে বড় আকারের জলাধার বা মেগা রেইনওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম নির্মাণ করতে হবে| এই জলাধারগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্থানীয় জনগণের হাতে অর্পণ করতে হবে যাতে তারা এর মালিকানা অনুভব করেন| পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ভিত্তিক উন্নত ও নিরাপদ পানি শোধনাগার স্থাপন করে বিনামূল্যে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে| ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বেদখল হওয়া পুকুর এবং খালগুলো খনন করে মিষ্টি পানির আধার হিসেবে পুনরায় গড়ে তুলতে হবে| অবৈধভাবে চিংড়ি ঘেরে নোনা পানি তোলা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে| যারা পরিবেশের ক্ষতি করে নোনা পানি লোকালয়ে ঢোকাচ্ছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে| [লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

নারীদের নিয়ন্ত্রণে সোশ্যাল মিডিয়া যখন নতুন হাতিয়ার

এক দশকেরও বেশি সময় আগে যখন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর রূপকল্পটি জাতীয় এজেন্ডা হিসেবে উত্থাপিত হয়েছিল, তখন এর প্রধানতম ভিত্তি ছিল প্রযুক্তিগত সংযোগের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন| বিশেষ করে বাংলাদেশের নারী সমাজের জন্য ডিজিটাল বিপ্লবকে মনে করা হয়েছিল এক বৈশ্বিক জ্ঞান অর্থনীতিতে লাফিয়ে ওঠার সোপান| আশা করা হয়েছিল, সোশ্যাল মিডিয়া হবে এমন একটি ‘গ্রেট লেভেলার’ বা সমতাকারী শক্তি, যা গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করবে, ভৌগোলিক ও সামাজিক বাধাগুলো ভেঙে ফেলবে এবং নীরবদের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেবে| কিন্তু ২০২৬ সালের দাঁড়িয়ে এই উজ্জ্বল আশাবাদী বয়ানের নিচে লুকিয়ে থাকা একটি অন্ধকার ও বিপজ্জনক বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রযুক্তি কেবল মুক্তির পথ নয়, বরং এটি পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের এক আধুনিক ও ডিজিটাল কারারক্ষী হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে| নারীদের শরীর, কণ্ঠস্বর এবং প্রকাশকে অভূতপূর্ব নিপুণতায় নজরদারি, পণ্যায়ন এবং শাস্তি দেয়ার এক বিশাল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এই ভার্চুয়াল জগত|র‌্যাডিক্যাল ফেমিনিস্ট বা আমূল নারীবাদী তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ডিজিটাল সহিংসতা কোনো আকস্মিক ত্রুটি নয়, বরং এটি পিতৃতন্ত্রের এক বিবর্তনশীল কৌশল| পিতৃতন্ত্র তার আধিপত্য বজায় রাখতে সবসময়ই নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়| অতীতে যখন নিয়ন্ত্রণ কেবল চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা স্মার্টফোনের স্ক্রিনের মাধ্যমে নারীর ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে পড়েছে| এখানে নারীর যৌনতা ও স্বায়ত্তশাসনকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে| অন্যদিকে, উত্তর-আধুনিক নারীবাদের প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে এই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো আসলে একেকটি ‘ডিজিটাল প্যানোপটিকন’| ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো যে নজরদারি ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, যেখানে বন্দি সবসময় অনুভব করে যে সে নজরদারির নিচে আছে, সোশ্যাল মিডিয়া বাংলাদেশের নারীদের জন্য ঠিক সেই জেলখানায় পরিণত হয়েছে| এখানে প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি পোশাকের পছন্দ বা প্রতিটি সাহসী মন্তব্য একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক ও ডিজিটাল জনতার বিচারে প্রতিনিয়ত ব্যবচ্ছেদ করা হচ্ছে|২০২৪ সালের জাতীয় নারী নির্যাতন জরিপ, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউএনএফপিএর কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত হয়েছে, এই নতুন ধরনের সহিংসতার এক ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে| প্রথমবারের মতো এই সরকারি পরিসংখ্যানে ‘প্রযুক্তি-সহায়তায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’ বা টিএফজিবিভি পরিমাপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে| এই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহারকারী নারীদের ৮.৩ শতাংশ তাদের জীবনে অন্তত একবার অবাঞ্ছিত যৌন যোগাযোগ, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেল, ছবি-ভিত্তিক নির্যাতন বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন| ২০-২৪ বছর বয়সী তরুণীদের ক্ষেত্রে এই হারের চিত্র আরও আঁতকে ওঠার মতো—প্রায় ১৬ শতাংশ| শহরাঞ্চলেও এই হার ১২ শতাংশের কাছাকাছি| সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঐতিহ্যগত শারীরিক সহিংসতার ক্ষেত্রে যেখানে পরিচিত ব্যক্তি বা নিকটাত্মীয়রাই প্রধান অপরাধী হয়ে থাকেন, সেখানে ডিজিটাল সহিংসতার ক্ষেত্রে ৪৬ শতাংশ অপরাধীই হলো সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি| এটি প্রমাণ করে যে, অনলাইন পিতৃতন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না; এটি একটি নামহীন ও সর্বব্যাপী শক্তি হিসেবে নারীর ডিজিটাল উপস্থিতিকে প্রতিনিয়ত আক্রমণ করছে|পিতৃতন্ত্রের মূল লক্ষ্যই হলো নারীর শরীরকে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ, আনন্দ এবং তথাকথিত ‘পারিবারিক সম্মান’-এর মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা| বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে যেখানে ‘লজ্জা’ এবং ‘পর্দা’র সাংস্কৃতিক চাপ অত্যন্ত প্রবল, সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া এই অবদমনকে বহুগুণ শক্তিশালী করেছে| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অপব্যবহার এখন এই ডিজিটাল পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে| বর্তমানে ‘ডিপফেক রিভেঞ্জ পর্ন’ তৈরির জন্য কোনো নারীর ব্যক্তিগত গ্যালারিতে প্রবেশ করার আর প্রয়োজন হয় না| ফেইসবুক বা টিকটক প্রোফাইল থেকে সাধারণ একটি ছবি নিয়ে এআই টুলের মাধ্যমে যে কারো মুখকে আপত্তিকর ভিডিওতে বসিয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে| সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে নারী অ্যাক্টিভিস্ট, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানি কয়েক গুণ বেড়েছে| এই ধরনের আক্রমণ কেবল সম্মানহানি নয়, বরং নারীর অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে| কারণ আমাদের সমাজে নারীর ‘পবিত্রতা’ ও ‘মর্যাদা’র ওপরই তার বিয়ের সম্ভাবনা, শিক্ষার সুযোগ এবং পরিবারের নিরাপত্তা সরাসরি নির্ভরশীল|সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলো এই লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার পেছনে এক অদৃশ্য ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করে| এই প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবসায়িক মডেলটি এমনভাবে তৈরি যেখানে ‘এনগেজমেন্ট’ বা সম্পৃক্ততা যত বেশি, মুনাফা তত বেশি| গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক সংবাদের চেয়ে নেতিবাচক ও ক্ষোভ সৃষ্টিকারী বিষয়বস্তু দ্রুত ভাইরাল হয়| ফলে যখনই কোনো নারীর পোশাক বা চলাফেরা নিয়ে কোনো পুরুষতান্ত্রিক অ্যাকাউন্ট থেকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা ভিডিও প্রকাশ করা হয়, অ্যালগরিদম সেই বিদ্বেষমূলক পোস্টকেই হাজার হাজার মানুষের ফিডে পৌঁছে দেয়| এর মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলো ˆলঙ্গিক বৈষম্য ও অবমাননাকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করছে| জুডিথ বাটলারের ‘লিঙ্গ পারফরম্যাটিভিটি’ তত্ত্ব এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক| অনলাইনে নারীদের প্রতিনিয়ত একটি আদর্শায়িত এবং সমাজ-অনুমোদিত নারীত্ব ‘পারফর্ম’ করতে বাধ্য করা হচ্ছে| যদি কোনো নারী তার স্বাধীন মতামত দেয় বা প্রথাগত ছকের বাইরে গিয়ে কোনো আচরণ করে, তবে ডিজিটাল জনতা তাকে ‘শেইমিং’ বা লজ্জিত করার মাধ্যমে সীমানা মনে করিয়ে দেয়| এটি এক প্রকার ডিজিটাল গণপিটুনি, যা নারীর স্ব-প্রকাশের অধিকারকে কেড়ে নেয়|২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার যে উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা সাইবার জগতকে নারীদের জন্য আরও বেশি প্রতিকূল করে তুলেছে| বিভিন্ন কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে লিঙ্গ সমতার বিরুদ্ধাচারণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে| নারী উন্নয়ন নীতি বা নারীর জনজীবনে অংশগ্রহণকে ‘সংস্কৃতিবিরোধী’ বা ‘ধর্মবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে যে ডিজিটাল প্রচারণা চালানো হয়, তা সরাসরি নারীর শারীরিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে| এর ফলে অনেক মেধাবী নারী তাদের পেশাগত কাজ বা সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে পিছিয়ে আসছেন| তারা পোস্ট করার আগে শতবার ভাবছেন, পাছে কোনো সাইবার হামলায় তাদের ব্যক্তিগত জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়| এই যে ‘ভয়’ এবং ‘স্ব-সেন্সরশিপ’—এটাই হলো ডিজিটাল পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিজয়| যখন একজন নারী হয়রানির ভয়ে নিজের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেন, তখন পিতৃতন্ত্র বিনা রক্তপাতে তার লক্ষ্য অর্জন করে|এই সমস্যার সমাধান হিসেবে যেসব আইনি বা কারিগরি ব্যবস্থার কথা বলা হয়, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অপর্যাপ্ত| বর্তমান ডিজিটাল আইনগুলো প্রযুক্তির দ্রুত গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না| এআই-জেনারেটেড সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনি প্রমাণ সংগ্রহ করা বা অপরাধীকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জটিল| আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারী আইনি সাহায্য নিতেও ভয় পান, কারণ আইনি প্রক্রিয়াটি অনেক সময় তাকে আবারও মানসিকভাবে হেনস্তা করে| তথাকথিত লিবারেল সমাধানগুলো কেবল উপরিভাগের ক্ষত সরানোর চেষ্টা করে, কিন্তু মূল কাঠামোগত সমস্যা—অর্থাৎ সমাজে বদ্ধমূল থাকা নারীবিদ্বেষ এবং প্রযুক্তির ওপর পুরুষের একাধিপত্যকে প্রশ্ন করে না| একটি প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল স্থাপত্যের এমন এক মৌলিক পুনর্বিন্যাস, যেখানে মুনাফার চেয়ে নাগরিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা বেশি গুরুত্ব পাবে|তবে এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু আশার আলো দেখতে পাওয়া যায়| বাংলাদেশের নারীরা ডিজিটাল স্পেসকে কেবল আক্রমণের জায়গা হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধের দুর্গ হিসেবেও গড়ে তুলছেন| বিভিন্ন ফেমিনিস্ট নেটওয়ার্ক, হ্যাশট্যাগ মুভমেন্ট এবং আইনি সহায়তা সংস্থাগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত| তারা সাইবার হয়রানির বিরুদ্ধে সরব হচ্ছে, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছে এবং সরকারকে নীতি পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে| ২০২৪ সালের সরকারি জরিপে প্রযুক্তি-সহায়তায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অন্তর্ভুক্তি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র এখন এই সংকটের গভীরতা বুঝতে পারছে| কিন্তু পরিসংখ্যানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন|ডিজিটাল বাংলাদেশ কেবল উচ্চগতির ইন্টারনেট বা স্মার্টফোনের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়| এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এদেশের নারীরা এই ডিজিটাল স্পেসে কতটা নিরাপদ এবং স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারছেন তার ওপর| পিতৃতন্ত্র তার খোলস বদলে অনলাইনে যে প্যানোপটিকন তৈরি করেছে, তা ভাঙতে হলে সম্মিলিত লড়াই প্রয়োজন| আমাদের বুঝতে হবে যে, ডিজিটাল সহিংসতা কোনো ‘ভার্চুয়াল’ সমস্যা নয়; এটি একটি বাস্তব অপরাধ যা রক্তমাংসের মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়| যতক্ষণ না আমরা পুঁজিবাদী প্রযুক্তির লাভমুখী চরিত্র এবং পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের এই মেলবন্ধনকে রুখতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত ডিজিটাল ক্ষমতায়নের স্বপ্ন এদেশের নারীদের জন্য একটি নিষ্ঠুর মরীচিকা হয়েই থাকবে| যে নারীরা আজ কারখানায় সেলাই করছেন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাবে গবেষণা করছেন, তাদের কণ্ঠস্বর যেন কোনো অ্যালগরিদমিক যান্ত্রিকতায় বা সাইবার বুলিংয়ের ডিজিটাল চাবুকে স্তব্ধ হয়ে না যায়— সেটি নিশ্চিত করাই হোক আগামীর অঙ্গীকার|[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

জেলে ও জলমহাল

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জেলে পেশাধারী এই মৎস্যজীবিরা নানাবিধ সংকটের মধ্যে তাদের জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করে যাচ্ছে| একসময় প্রতিটি জেলে পল্লীতে দেখা যেত দেশি সুতোর জাল বোনার প্রচলন| জেলে পল্লীর গৃহিনীরা রাতদিন বসে বসে জাল বুনতেন| এই জাল দিয়ে জেলেরা মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে তাই দিয়ে সংসার চালাতেন| কেবল তাই-ই নয়, ওই জাল নিজেরা মাছ ধরার কাজে খুব কমই ব্যবহার করতেন| বিক্রি করতেন বেশি জাল| বাইরের জেলা থেকে ক্রেতা এসে জাল কিনে নিয়ে যেতেন| একেকটি জাল বিক্রি করলে তখনকার দিনে পাঁচ কেজি চাউল ও বাজার খরচের টাকা হয়ে যেত| এক কথায় জাল বোনা ছিল জেলেদের একমাত্র অবলম্বন| সেই চল্লিশ বছর আগেই ভাটা পড়ে গেল সেই জাল বোনায়| কারণ ছিল এখনকার দিনের এই কারেন্ট জাল| এই কারেন্ট জাল যখনই দেশে এলো তখনই মানুষ দেশী সুতোর জাল কেনা ছেড়ে দিল| কারণ দেশি সুতোর জালের দাম বেশি, আর কারেন্ট জালের দাম অনেক কম| তাছড়া দেশি সুতোর জালের চেয়ে কারেন্ট জালে মাছ পাওয়া যায় অনেক বেশি| এই সুবিধা পেয়ে মানুষ ঝুঁকে পড়লো কারেন্ট জালের প্রতি| আর ধ্বংস হয়ে জেলে পল্লীর হস্তশিল্পটি| এই হস্তশিল্পজাত জাল এখন আর কোথাও পাওয়া যায় না| এই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া হস্তশিল্পজাত দেশি সুতোর ফাঁস জালের উৎপাদন আবার শুরু করে এই ক্ষুদ্রশিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় কি না, এমন আশা নিয়ে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম তখনকার সেই জাল বোনা গৃহিনীরা এখন আর বেঁচে নেই বেশির ভাগ| যা-ও আছেন তারা চোখে দেখেন না| কারো হাত কাঁপে| অনেক বয়স হয়ে গেছে তো তাই| তবুও চেষ্টা করে সম্ভব হতো, যদি সে জালগুলো বিক্রি করা যেতো| তারা বলেন, একটি জাল বুনে আগেকার দিনের হিসেবে যদি দাম ধরা হয়, তাহলে তা কেউ কিনবে না| কারণ একটি জালের দামে তারা কমপক্ষে পাঁচটি জাল কিনতে পারছে| এখন জাল বুনলে তাদের পুরোটাই লোকসান হবে| বৈধ সরঞ্জামের কথা বলতে গেলে সত্যি বলতে কী, বর্তমানে মাছ ধরার জন্য কোনো বৈধ সরঞ্জামই নেই| জাল বলতে সবই কারেন্ট জাল| ভেসাল জাল অবৈধ| খেপলা, উড়নী, খেও, ঝাঁকি (স্থান ভেদে) জাল বৈধ, কিন্তু এখন তো আর হাতে বোনা জাল নেই| কারেন্ট জাল দিয়েই তৈরি হচ্ছে এই উড়নী জাল| এখন, যদি কেউ একবার খাওয়ার জন্যও মাছ ধরতে যায় তাকে ওই অবৈধ সরঞ্জাম কারেন্ট জাল দিয়েই মাছ ধরতে হবে| এছাড়া উপায় নেই| এছাড়া বর্তমানে আরেকটি মরণঘাতী উপায় রয়েছে চায়না দুয়াড়ী| এই চায়না দুয়াড়ীর ব্যাপারে জানতে চাইলে বলেন, বাজারে না পেলে তারা কিনবে কোথা থেকে? কেউ কেউ বলেন তারা মাছ বেশি ধরার প্রতিযোগিতায় পাল্লা দিয়ে এই চায়না দুয়াড়ী কিনে আনে| প্রশাসন অভিযানে এসে সব জাল নিয়ে পুড়িয়ে দেয়| পরদিন আবার তারা আগের চেয়ে বেশি কিনে আনে| তারাও জানে এটা ভুল ও অপরাধ| তবু এছাড়া তাদের অন্য কোনো উপায় নেই বলেই তারা জানায়| বাংলাদেশ মৎস্য আইনের আওতায় ‘উন্মুক্ত জলাশয়’ নীতিতে এই উক্তিটির ভুল ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ফলে মৎস্যজীবিরা মৎস্য আহরনের ক্ষেত্র তথা নদী, নালা, খাল, বিল থেকে বিতাড়িত হওয়ার প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে| ‘উন্মুক্ত জলাশয়’- এর দোহায় দিয়ে স্থানীয় অবস্থাশালী লোকেরাও মাছ ধরার সরঞ্জাম তৈরি করে নিয়ে জলাশয় দখল করে নিয়ে মাছ ধরছে তারা| এ কারণে প্রকৃতপক্ষে মাছ ধরেই যাদের জীবন জীবিকা চলে তারা সেই সব জলাশয় থেকে মাছ ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে গেছে বললে ভুল হবে না| স্থায়ীভাবে মাছ ধরার কাজ তারাই করছে যাদের মাছ না ধরলেও কৃষিকাজ, ব্যবসা বা অন্য উপায়ে তাদের সংসার যথেষ্ট গ্রচলভাবেই চলছে| তাদের কারণে পেশাগত মৎস্যজীবিরা মাছ ধরতে পারছে না| দেশের অধিকাংশ বিল বাওড়ই প্রভাবশালী লোকেদের দখলে চলে গেছে| বিল-বাঁওড় দখলের প্রতিবাদে আমরা প্রায়ই মৎস্যজীবিদেরকে রাজপথে দাঁড়াতে দেখি| শুধু বিল-বাঁওড়ই নয়, নদ নদীগুলোতেও চলছে এই দখলদারিত্বের রাজত্ব| আসলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের এই ভুল ব্যাখ্যা এবং এই এটাকে আশ্রয় করে সুযোগ নিয়ে মৎস্যজীবিদেরকে জলাশয় থেকে উৎখাত করার পায়তারা থেকে সরে আসতে হবে| এ ব্যাপারে প্রশাসনকে বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে| আসলে এ ব্যবস্থার একটি সুষ্ঠ সমাধান দরকার| আর সমাধানের জন্য আমাদের ভাবনাটাকে আরও গভীরে নিয়ে যেতে হবে| সেই আলোকে আমার একটি ঘটনা মনে পড়ে| তা হলো, এখন থেকে বছর দশের আগে ইউটিউব, ফেইসবুকে দেখতাম চীনারা তাদের দেশের জঙ্গলে এই চায়না দুয়াড়ী পেতে সাপ ধরতো| মূলত চীন থেকে আগত বলেই এর নাম হয় চায়না দুয়াড়ী| জেলেরা যা সেদিন চোখেও দেখেনি, সেই চায়না দুয়াড়ী চীনের সুপ্রশস্ত প্রাচীর ডিঙিয়ে, ভারতের ত্রিপুরা ও মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য পেরিয়ে ঠিকই বাংলাদেশে চলে এসেছে| এটা কিভাবে সম্ভব হলো! কোনো জেলে তো সেদিন ডোঙা কিংবা নৌকা বেয়ে এই দুয়াড়ী জাল চীন থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেনি! তাহলে কে বা কারা আনলো এই জাল! এটা খুঁজেবের করাটা আজ খুব জরুরি নয় কি?যদি বলি বা মেনে নিই এটা অবশ্যই কোনো অসাধু ব্যবসায়ীর কাজ| তাহলে এটা আমদানি করার কাজে অবশ্যই প্রশাসনিক অনুমতি কেউ না কেউ তো অবশ্যই দিয়েছিল| তাছাড়া তো আমদানি করা সম্ভব হয়নি| সেই অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে তাকেও খুঁজে করাটাও জরুরি কি না এটাও এখন ভেবে দেখা দরকার| যদি আমরা আমাদের সামগ্রীক ভালো চাই তাহলে অবশ্যই এদিকে গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে| হ্যাঁ, বর্তমানে এই দুয়াড়ীসহ সমস্ত প্রকার কারেন্ট জালই আমাদের দেশে উৎপাদন হচ্ছে| এই উৎপাদন বন্ধ করতে হবে| যেখান থেকে এই অবৈধ সরঞ্জাম তৈরি করা হচ্ছে সেখানেই পদক্ষেপ নেয়াটা সবচেয়ে উত্তম| এই দুয়াড়ীসহ সমস্ত প্রকার কারেন্ট জাল উৎপাদন বন্ধ হলে আমাদের দেশের এই হস্তশিল্পটাকে আবার পুনরুজ্জীবিত করে সেটাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে| সেই সঙ্গে জলজ জীব বৈচিত্র্য ধ্বংসকারী এই কারেন্ট জাল না থাকলে আমাদের দেশের ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ প্রবাদকেও বাঁচিয়ে রাখা অবশ্যই সম্ভব| [লেখক: সংবাদকর্মী]

সাঁওতাল জীবনের টানে বিদ্যাসাগর

সাঁওতালদের সহজ-সরল জীবন, প্রশান্তিময় হাসি ও উচ্ছল আনন্দে ভরা দিনযাপন সংগ্রামের কঠিন পাতাগুলোকেও রঙিন করে তোলে| সভ্যতার প্রান্তে অবস্থান করা আরণ্যক সাঁওতালদের এই সারল্য বহু মনীষীকেই গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে— যেমন মুগ্ধ করেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে| তাদের জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেই চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন আলোড়িত হয়েছিলেন| ছাত্রজীবনেই সাঁওতাল পরগনার দুমকা, ময়ূরাক্ষী নদী এবং সাঁওতালদের ছন্দময় জীবনযাত্রা তার মনে দোলা দিয়েছিল| বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন| ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কেন সাঁওতাল অধ্যুষিত কর্মাটাঁড়কে নিজের আবাস হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন—এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর না মিললেও নানা ঘটনা ও প্রেক্ষাপট থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়| একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ১৮৭২ সালে তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেন তিনি| এর কিছুদিন পর প্রিয় স্ত্রীর মৃত্যু তার জীবনে গভীর কূন্যতা তৈরি করে| কেউ কেউ মনে করেন, শহুরে শিক্ষিত সমাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি মানসিক শান্তির খোঁজে কর্মাটাঁড়ে চলে যান| তবে এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নয়| বরং বলা যায়, কাছের মানুষের কাছ থেকে আঘাত ও প্রতারণা পেলেও বিদ্যাসাগরের চরিত্রে আত্মসমর্পণের বদলে সংগ্রামের দৃষ্টান্তই বেশি স্পষ্ট| সম্ভবত শুরুতে সস্তায় জমি পাওয়া এবং নিরিবিলি পরিবেশে পড়াশোনা ও লেখালেখির উদ্দেশেই তিনি কর্মাটাঁড়কে বেছে নিয়েছিলেন| কিন্তু সেখানে এসে তিনি প্রত্যক্ষ করেন সাঁওতালদের কঠিন জীবনসংগ্রাম—অন্ন-বস্ত্রের অভাব, শিক্ষার অনুপস্থিতি, দারিদ্র্য ও বঞ্চনা| এই বাস্তবতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়| তিনি উপলব্ধি করেন, এই মানুষদের পাশে দাঁড়ানোই তার প্রকৃত কর্তব্য| ফলে ব্যক্তিগত সাধ-আহ্লাদকে পাশ কাটিয়ে তিনি আত্মনিয়োগ করেন তাদের উন্নয়নে| সাঁওতালদের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অবৈতনিক বিদ্যালয়, চালু করেন দাতব্য চিকিৎসালয়| খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে নিরলসভাবে কাজ করতে থাকেন| একই সঙ্গে নিজের পড়াশোনা ও লেখালেখিও চালিয়ে যান কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে| ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয়া বিদ্যাসাগর ১৮৭৩ সালে জামতাড়া-মধুপুর রেলপথের মাঝামাঝি কর্মাটাঁড়ে একটি বাড়ি ক্রয় করেন| প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই বাড়িতেই তিনি জীবনের শেষ ১৮ বছর অতিবাহিত করেন| ‘নন্দন কানন’ নামের এই বাসভবনে বসেই তিনি সাঁওতালদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন| তাদের মধ্যে তিনি খুঁজে পান সরলতা, সততা ও আন্তরিকতার এক বিরল সমš^য়| সাঁওতালদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আত্মীয়তার মতো| কেউ তাকে দাদা, কেউ বাবা, কেউ জেঠা বলে ডাকত| তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বালিকা বিদ্যালয় ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রাত্রিকালীন শিক্ষা কার্যক্রম| বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা দিতেন এবং দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অকাতরে সাহায্য করতেন| সাঁওতালদের সত্যবাদিতা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল| একটি ঘটনার বর্ণনায় দেখা যায়, জমি-সংক্রান্ত এক মামলায় মিথ্যা বলতে বাধ্য হলেও সাঁওতালরা শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশ করে| এই সরল সত্যনিষ্ঠা বিদ্যাসাগরের মনে তাদের প্রতি অটল ভালোবাসা সৃষ্টি করে| তিনি প্রায়ই বলতেন, ভদ্রসমাজের চেয়ে সাঁওতালদের সান্নিধ্যেই তিনি বেশি আনন্দ পান| তাদের সঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা, চিকিৎসা করা—সবকিছুতেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এক অনাবিল মানবিকতা| তাদের দুঃখে তিনি কেঁদেছেন, অসুখে ছুটে গিয়েছেন, প্রয়োজন মেটাতে নিজের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন| সাঁওতালদের কাছেও বিদ্যাসাগর ছিলেন আপনজনের চেয়েও বেশি কিছু—একজন আশ্রয়দাতা, পথপ্রদর্শক, এমনকি অনেকের কাছে ঈশ্বরতুল্য| তার অসুস্থতার খবর পেয়ে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠত, আবার তার সামান্য আঘাতেও প্রতিবাদে ফেটে পড়ত| ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই বিদ্যাসাগরের মৃত্যু হলে কর্মাটাঁড়ের সাঁওতালরা গভীর শোকাহত হয়ে পড়ে| তাদের জীবনে তিনি যে মানবিকতার আলো জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে| বিদ্যাসাগরের এই কর্মযজ্ঞ শুধু সমাজসংস্কারের উদাহরণ নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক বিরল দলিল| তার কর্মভূমি কর্মাটাঁড় আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রকৃত মানবতা কোনো শ্রেণী, জাতি বা অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তা হৃদয়ের গভীরতম স্থান থেকেই উৎসারিত হয়| [লেখক: কলামিস্ট]

নতুন অধ্যায়ে বিহার-সম্রাট চৌধুরীর হাতে নেতৃত্ব, বিজেপির বড় বাজি

বিহারের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান ঘটিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। সম্রাট চৌধুরিকে বিজেপি বিধায়ক দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত করার পর কার্যত পরিষ্কার, তিনিই হচ্ছেন রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এর পদত্যাগের পর এই পরিবর্তন রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় রদবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।সম্প্রতি পাটনায় বিজেপির রাজ্য দপ্তরে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিবরাজ সিংহ চৌহান। বৈঠকে উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয় কুমার সিনহা সম্রাট চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেন, যা সমর্থন করেন প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী রেনু দেবী। কোনও বিরোধিতা না থাকায় সর্বসম্মতভাবে তাঁর নাম গৃহীত হয়।এর আগে, প্রথা মেনে রাজভবনে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন নীতীশ কুমার এবং তাঁর মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিহারের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী এক অধ্যায়ের অবসান ঘটে।নীতীশ যুগ: জোট রাজনীতি ও বারবার ‘পালাবদল’নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক যাত্রা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বহুবার মোড় ঘোরানো। জনতা দল (ইউনাইটেড )-এর নেতা হিসেবে তিনি একাধিকবার বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধেছেন, আবার কখনও রাষ্ট্রয় জনতা দল এর সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।২০১৩ সালে বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে শুরু করে ২০১৭ সালে আবার সেই জোটে ফেরা, তারপর ২০২২ সালে আরজেডি-কংগ্রেসের সঙ্গে সরকার গঠন এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনই তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল।শাসনকালে তিনি ‘সুশাসন বাবু’ হিসেবে পরিচিতি পান। বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়ন, নারী শিক্ষা ও আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের জন্য। তবে বিরোধীরা বারবার অভিযোগ তুলেছে প্রশাসনিক স্থবিরতা, বেকারত্ব এবং শিল্পোন্নয়নের ঘাটতি নিয়ে।সম্রাট চৌধুরী: বিজেপির নতুন মুখসম্রাট চৌধুরী বিহার বিজেপির মধ্যে তুলনামূলকভাবে তরুণ এবং আক্রমণাত্মক মুখ হিসেবে পরিচিত। সংগঠনগতভাবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দলের সঙ্গে যুক্ত এবং রাজ্যের বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি এবার বিহারে সম্পূর্ণ নিজের মুখে সরকার চালানোর দিকেই এগোচ্ছে যেখানে আঞ্চলিক দলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে দল।রাজনৈতিক তাৎপর্য ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জএই পরিবর্তন শুধু মুখ্যমন্ত্রীর বদল নয়, বরং বিহারের রাজনৈতিক কৌশলের বড় পরিবর্তন।বিজেপি এখন রাজ্যে নিজের শক্তি প্রতিষ্ঠার একক সুযোগ পাচ্ছে।জোট রাজনীতির পরিবর্তে একক নেতৃত্বের পরীক্ষা।বিরোধী শিবিরে নতুন করে সমীকরণ তৈরির সম্ভাবনা।তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন।শিল্প বিনিয়োগ টানা।গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন।এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের আস্থা অর্জন।সব মিলিয়ে, নীতীশ কুমারের দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের ইতি টেনে বিহার এখন এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। সম্রাট চৌধুরীর নেতৃত্বে বিজেপি কতটা স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নির্ভর করবে প্রশাসনিক দক্ষতা, উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ এবং জনআস্থার উপর।লবিহারের রাজনীতিতে একটাই প্রশ্ন-এটা কি সত্যিই নতুন যুগের শুরু, নাকি আরেকটি রাজনৈতিক পরীক্ষার মঞ্চ?

দুই বাংলার প্রাণের এক চিরন্তন গল্প

বাংলা নববর্ষ, এই দুটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত টান, এক গভীর আবেগ, এক অমলিন পরিচয়।বছরের প্রথম দিন, কিন্তু শুধুই ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়, এ যেন বাঙালির হৃদয়ের নতুন করে স্পন্দিত হওয়া। পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন সূর্য, নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা, আর সেই সঙ্গে পুরনো কষ্ট, গ্লানি, ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলার এক প্রতিজ্ঞা।কিন্তু এই আবেগের শিকড় আজকের নয় এর ইতিহাস বহু পুরনো, প্রাচীন বাংলার মাটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।একসময় বাংলার মানুষ প্রকৃতির ছন্দে জীবন কাটাত। বৈশাখ মাসের শুরু মানেই ছিল নতুন কৃষি বছরের সূচনা। মাঠে নামার প্রস্তুতি, ফসলের নতুন চক্র; এই সবকিছু ঘিরেই নববর্ষের সূচনা হতো।গ্রামবাংলায় বসত মেলা, শোনা যেত লোকগান, মানুষ একত্র হয়ে ভাগ করে নিত আনন্দ। কোনো জাঁকজমক ছিল না, কিন্তু ছিল এক গভীর আন্তরিকতা, মাটির গন্ধে ভরা এক উৎসব।পরে সম্রাট আকবর এর সময় বাংলা সনের আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য চালু হওয়া এই বর্ষপঞ্জি ধীরে ধীরে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। শুরু হয় ‘হালখাতা’, পুরনো হিসাব মিটিয়ে নতুন খাতা খোলার প্রথা, যা আজও নববর্ষের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎসব গ্রাম থেকে শহরে, সরলতা থেকে আড়ম্বরের পথে এগিয়েছে; কিন্তু আবেগ একই রয়ে গেছে।ভোর না হতেই দুই বাংলার আকাশে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের রঙ। ঢাকার রমনা বটমূল থেকে শুরু করে কলকাতার রবীন্দ্রসদন; সব জায়গাতেই যেন এক সুর, এক আহ্বান। বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা রঙে-রূপে-প্রতীকে হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা, অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক। বিশাল মুখোশ, বর্ণিল শোভাযাত্রা; সব মিলিয়ে এক অনন্য দৃশ্য, যা আজ বিশ্বমঞ্চেও স্বীকৃত।অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে সকাল শুরু হয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে। বিশেষ করে এসো হে বৈশাখ যেন প্রতিটি ঘরে ঘরে নতুন বছরের আহ্বান নিয়ে আসে “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...”। এই সুর যেন গরম হাওয়ার সঙ্গে মিশে পুরনো ক্লান্তি উড়িয়ে নিয়ে যায় দূরে।খাবারের কথা বললে পান্তা-ইলিশ ছাড়া কি আর নববর্ষ সম্পূর্ণ হয়? বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পান্তা ভাত, ইলিশ ভাজা, কাঁচা ম‌রিচ, পেঁয়াজ; এক সরল অথচ ঐতিহ্যবাহী স্বাদ। পশ্চিমবঙ্গে যদিও ইলিশের পাশাপাশি মিষ্টি, লুচি, আলুর দম বা রেস্তোরাঁর ‘বৈশাখী থালি’ এখন বেশ জনপ্রিয়। নতুন জামাকাপড় পরে, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ যেন চারদিকে।আজকের দিনে নববর্ষ শুধু ঐতিহ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি আধুনিকতার সঙ্গেও তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার শুভেচ্ছা, ইউটিউব লাইভ, কর্পোরেট কনসার্ট, সব মিলিয়ে এটি এখন গ্লোবাল বাঙালির উৎসব।তবে দুই বাংলার উদযাপনে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্যও রয়েছে। বাংলাদেশে এটি একটি জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়, যেখানে বাঙালি পরিচয়ের জোরালো প্রকাশ ঘটে। পশ্চিমবঙ্গে এটি মূলত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উৎসব। তবুও আবেগের দিক থেকে কোনো অংশে কম নয়।সবচেয়ে বড় কথা, এই উৎসব বাঙালিকে এক করে দেয়। সীমান্তের বিভাজন, রাজনৈতিক মতভেদ, সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে এই একদিনে দুই বাংলার মানুষ একই অনুভূতিতে ভেসে যায়।তাই বলতে হয়, প্রাচীন বাংলার মাটির গন্ধ, কৃষকের ঘাম, লোকসংস্কৃতির সুর, সব মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের এই রঙিন, আধুনিক পহেলা বৈশাখ।সময়ের সঙ্গে রূপ বদলেছে, কিন্তু আত্মা বদলায়নি। আর তাই পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্ব, আবেগ আর চিরন্তন পরিচয়ের এক অমলিন প্রতীক।

মৈত্রী-সম্প্রীতির বার্তাবহ উৎসব বাংলা নববর্ষ

পৃথিবীর নানা দেশে মার্চের শেষে এপ্রিলের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে নববর্ষ উদযাপিত হয়| এথনিক কালচারের প্রকাশই এখানে মুখ্য| তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্যে ‘নওরোজ’ বা নতুন বছর হিসেবে পালিত হয়| অঞ্চলভেদে নাম ‘নয়রোজ’ ‘নিউরোজ’ উপলক্ষে তিনদিন/সাতদিনব্যাপী বিশাল মেলা, উৎসব| আমাদের জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ| এ দিনটি প্রত্যেক বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে উৎসবের আমেজ আর ফুরফুরে বাতাসের এক অনিন্দ্য সুন্দর মিলনের বার্তা| আলপনা আঁকা শাড়ি আর পাঞ্জাবি ছাড়া যেন এ দিনটিকে আর পালন করাই যায় না| সঙ্গে লাল সবুজ আর সাদার মিশেলে হাতে, গালে ফুলকি আঁকা নগর বাঙালির হালফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে| লেখাটির ভুমিকা অংশেই বাংলাপঞ্জিকা সূচনার গল্প সংক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থাপনা না করলে সামগ্রিক আলোচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে| কী ভাবে শুরু হলো বাংলা ও বাঙালির বর্ষ গণনা| ভারতবর্ষে মুঘল সামাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন| কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না| এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো| খাজনা পরিশোধে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন| সম্রাটের আদেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের প্রবর্তন করেন| ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়| তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে| প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন পরে বাংলা বর্ষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে| ধর্মজাতপাত নিয়ে সম্রাট আকবরের কোনও গোঁড়ামি ছিল না, বরং খাঁটি অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন তিনি| ইতিহাস তা-ই বলে| বাংলাদেশে ক্রমশ বাড়ছে বর্ষবরণের আমেজ| বাংলা নববর্ষ নিছক উৎসব নয়, বরং এটি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির এক শক্তিশালী প্রতীক| মোগল সম্রাট আকবরের আমলে কর আদায়ের সুবিধার্থে প্রবর্তিত এই ঐতিহ্য বর্তমানে বাঙালির ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, যা একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও ঐক্যের বার্তা বহন করে| বর্ষবরণ মিলনের এমন এক উৎসব যা ঐক্যের বার্তা বহন করে আসে প্রতি বছর| ওই যে ঐক্যের বার্তা, এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এক অসাধারণ বার্তা দিয়েছেন তার উৎসব নামক প্রবন্ধে| কী বলেছেন রবি ঠাকুর:“...উৎসব একলার নহে| মিলনের মধ্যেই সত্যের প্রকাশ— সেই মিলনের মধ্যেই সত্যকে অনুভব করা উৎসবের সম্পূর্ণতা| একলার মধ্যে যাহা ধ্যানযোগে বুঝিবার চেষ্টা করি, নিখিলের মধ্যে তাহাই প্রত্যক্ষ করিলে তবেই আমাদের উপলব্ধি সম্পূর্ণ হয়| মিলনের মধ্যে যে সত্য, তাহা কেবল বিজ্ঞান নহে তাহা আনন্দ, তাহা রসস্বরূপ, তাহা প্রেম| তাহা আংশিক নহে, তাহা সমগ্র; কারণ, তাহা কেবল বুদ্ধিকে নহে, তাহা হৃদয়কেও পূর্ণ করে|  আজ আমাদের কিসের উৎসব? শক্তির উৎসব| মানুষের মধ্যে কী আশ্চর্য শক্তি আশ্চর্য রূপে প্রকাশ পাইতেছে! আপনার সমস্ত ক্ষুদ্র প্রয়োজনকে অতিক্রম করিয়া মানুষ কোন‌ ঊর্ধ্বে গিয়া দাঁড়াইয়াছে| “বাঙালির নববর্ষ তাই আংশিক নহে, এটি সমগ্র| রবীন্দ্রনাথের চিরায়ত ঐক্য ও মিলনের দর্শন যুক্ত ও মূর্ত্ত হচ্ছে বাঙালির নববর্ষ উদযাপনে| নববর্ষ উদযাপনে আরও যুক্ত হচ্ছে বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, বিপ্লব-বেঁচে থাকা, লোকজ সংস্কৃতি, কুটির শিল্প ও সংগ্রামের শেকড়| আমাদের ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধের ওপর বহুবার আঘাত এসেছে পাকিস্তান আমলে| আঘাত এসেছে বাংলাদেশ আমলেও| ষড়যন্ত্র করা হয়েছে ধর্মের নামে ভিনদেশি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার| বাঙালি বীরের জাতি, সেটা মেনে নেয়নি| বাংলা নববর্ষে আনন্দের বাঁধভাঙা জোয়ারে সেই ঘৃণ্য অপচেষ্টা ভেসে গেছে কচুরিপানার মতো| ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বাংলা নববর্ষ অনুঘটকের মতো কাজ করেছে| জুগিয়েছে সামনে চলার অনন্ত প্রেরণা| তাই প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ প্রবল শক্তি, সাহস ও সংগ্রামের সংকল্প নিয়ে হাজির হয় বাংলাদেশে| বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতা চেতনার চিরন্তন শিখা বাংলা নববর্ষ| পহেলা বৈশাখের উৎসব শুরুর দিকে ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক| গ্রামীণ-মেলা, লোকজ খেলাধুলা ও নৃত্য-সংগীত ছিল প্রধান আকর্ষণ| দিনে-দিনে তা শহরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে| বাঙালির আদি সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনকারী এই অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আমাদের বিশেষ প্রেরণা জুগিয়েছে| এ ভূখণ্ডের বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেছে বাংলা নববর্ষের সাংস্কৃতিক-উৎসব ও চেতনা| ষাটের দশকে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির সশস্ত্র-মুক্তিসংগ্রামসহ বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামকে বেগবান করে| বৈশাখের সংস্কৃতি আমাদের জীবন-সাহিত্য ও বাঙালি জীবনে জড়িয়ে পড়ে ওতপ্রোতভাবে| নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক অনন্য বৈশিষ্ট্য মিলে নববর্ষ উৎসব এখন বাঙালির এক প্রাণের উৎসব-প্রাণবন্ত এক মিলনমেলা| নববর্ষ আদিম মানব গোষ্ঠীর কাছে ছিল সিজনাল ফেস্টিভ্যাল| নববর্ষ হিসেবে ‘পহেলা বৈশাখ’ সভ্য মানুষের ‘এগ্রিকালচারাল ফেস্টিভ্যাল’| বাংলা নববর্ষ এ দেশের একটা প্রাচীনতম ঐতিহ্য| পহেলা বৈশাখের উৎসবের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে| বৈশাখী মেলায় সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের আনাগোনা| মৈত্রী-সম্প্রীতির এক উদার মিলনক্ষেত্র| নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই আসে মেলায়| এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিকিকিনির আশা আর বিনোদনের টান| বাংলা নববর্ষ, বাংলা পঞ্জিকা প্রণয়ের ইতিহাস অনন্য| পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নাই বললেই চলে| মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে এর প্রচলন, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো| বিশ্বের বড় বড় উৎসব ধর্মকেন্দ্রিক বা জাতিকেন্দ্রিক| এদিক থেকে ব্যতিক্রম বাঙালির পহেলা বৈশাখের নানা আয়োজন| বাঙালির নববর্ষে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অনুষঙ্গ প্রবল| মূলত এ কারণেই, বাংলা নববর্ষ উদযাপনে জাতীয় ঐক্য এতো দৃঢ় হয় যেখানে আর কোন দীনতা, পশ্চাতপদতা কাজ করতে পারেনা| বাঙালির জাতীয় জীবুনের বিভেদ, সংকীর্ণতা, অনৈক্য দূর করে জাতীয় শক্তিকে বলিয়ান করতে নববর্ষের মতো উৎসব নিয়ত প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে| আমাদের অন্তর্মূলের শক্তি হলো, শেকড়ে ফিরে যাওয়া| শেকড় থেকে আমরা ঐক্যতান বা কাছে আসার শক্তি সঞ্চয় করি| বাংলা নববর্ষ আমাদের সেই শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছে| লোকজ উৎসব বাঁচিয়ে রাখার জন্য কোন বিশেষ প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হয়না| প্রান্তিক বাঙালিদের জীবন প্রবাহের শক্তিই বাংলা নববর্ষকে আরও রঙিন আরও উৎসবমুখর করে তুলবে| শুভ নববর্ষ![লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

ভিডিও

গেট থেকে সিট, পানি থেকে খাবার- সবকিছুই বদলাবেন তামিম

দর্শকদের মাঠে এসে খেলা দেখা যেন সত্যিকারের এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে, সেটাই এখন চিন্তা ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অ্যাডহক কমিটির সভাপতি তামিম ইকবাল। দীর্ঘদিন পর ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডারদের দিকে ফিরে তাকানোর সময় এসেছে বলে মনে করছেন তিনি।বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিসিবির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তামিম জানান, খেলোয়াড়, কোচ, স্টাফ- সবার বিষয় নিয়ে বোর্ড নিয়মিত আলোচনা করলেও দর্শকদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কখনো ভাবা হয়নি। সেটাই তিনি বদলাতে চান।তামিম বলেন, ‘আমরা আমাদের সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার- আমাদের দর্শক, যারা মাঠে খেলা দেখতে আসেন- তাদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কখনও কথা বলিনি। আমি এই বিষয়টা বদলাতে চাই।’শুধু উদ্যোগ নয়, দর্শকদের কাছ থেকে সরাসরি অভিজ্ঞতা শুনতে চান তিনি। গেট থেকে শুরু করে সিটে বসা, পানি ও খাবারের ব্যবস্থা- সবকিছু নিয়েই জানতে চান সমর্থকদের কথা।তামিম বলেন, ‘সবাইকে একসঙ্গে ডেকে কথা বলা সম্ভব নয়। আমরা র্যান্ডমভাবে ৫ থেকে ১০ জন দর্শককে বেছে নিয়ে তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বসব। তাদের অভিজ্ঞতা জানব—কোথায় সমস্যা, কী উন্নতি করা যায়।’এ ছাড়া বিসিবির কর্মীরা বিভিন্ন গ্যালারিতে গিয়ে দর্শকদের মতামত সংগ্রহ করে সরাসরি তাঁকে রিপোর্ট করবেন।শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ থেকেই এই কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তামিম। তিনি দর্শকদের মাঠে এসে দলকে সমর্থন জানানোর পাশাপাশি নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানান।‘সামনের হোম সিরিজগুলোতে আপনাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে চাই। শুক্রবার প্রথম ওয়ানডেতে আপনারা সবাই মাঠে আসবেন, বাংলাদেশ দলকে সমর্থন করবেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করবেন। যাতে আমরা বিসিবির পক্ষ থেকে আরও উন্নতি করতে পারি,’ বলেন তামিম।ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক স্বস্তির খবর। দীর্ঘদিন পর দর্শকদের কথা ভাবা শুরু করায় সমর্থক মহলে ইতিমধ্যেই ইতিবাচক সাড়া পড়েছে। এখন দেখার বিষয়, মাঠে তা বাস্তবায়িত হয় কতখানি।

গেট থেকে সিট, পানি থেকে খাবার- সবকিছুই বদলাবেন তামিম
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ২৮ জন