সংবাদ
কারিনা কায়সার আর নেই

কারিনা কায়সার আর নেই

জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সার আর নেই। লিভার-সংক্রান্ত জটিলতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (১৫ মে) দিবাগত রাতে ভারতের চেন্নাইয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।তার মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন বাবা ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় কায়সার হামিদ। তিনি জানান, ফুসফুসে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সময় হঠাৎ কারিনার প্রেশার অনেক নিচে নেমে যায়। এরপর ডাক্তাররা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।কারিনা কায়সারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহকর্মী শিল্পী, নির্মাতা, গুণগ্রাহী ও ভক্তরা ভাঙা কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করছেন।কেউ লিখছেন, ‘আপনার গল্প বলার ভঙ্গি অপূর্ব ছিল।’ কেউ আবার লিখেছেন, ‘এত কম বয়সে চলে গেলেন, বিশ্বাস হচ্ছে না।’ তার অকাল প্রয়াণে বিনোদন অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের গাম্ভীর্য। এক অনন্য প্রতিভার অপমৃত্যুতে নীরবতা ও কান্না।পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কারিনা প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হন। পরে তার শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়ে। একই সঙ্গে হেপাটাইটিস এ ও ই-জনিত জটিলতায় লিভার ফেইলিউর দেখা দেয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১১ মে রাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ভারতের চেন্নাই নেওয়া হয়। সেখানে ভেলোরের খ্রিস্টান মেডিকেল কলেজ (সিএমসি) হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছিল।চিকিৎসকেরা প্রথমে তার ফুসফুসের চিকিৎসা শুরু করেন। লিভার ট্রান্সপ্লান্টের প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু সব চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণবন্ত উপস্থাপনা আর জীবনঘনিষ্ঠ কনটেন্ট দিয়ে তরুণ দর্শকদের হৃদয় জয় করেছিলেন কারিনা কায়সার। অনায়াসে গল্প বলা, নিজেকে মেলে ধরা- এসব গুণ তাকে স্বতন্ত্র ও জনপ্রিয় করে তুলেছিল।শুধু কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে নয়, অভিনয় ও চিত্রনাট্য লেখার কাজেও ব্যস্ত ছিলেন তিনি। ওটিটি ও নাটকের জগতে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন এই তরুণ শিল্পী।তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘ইন্টার্নশিপ’ ও ‘৩৬-২৪-৩৬’। অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্যকার হিসেবেও বেশ সুনাম কুড়িয়েছিলেন তিনি।যে তরুণী অনায়াস গল্প বলা, প্রাণবন্ত উপস্থাপনা আর আন্তরিকতায় জয় করে নিয়েছিলেন দর্শকহৃদয়- তিনি আর নেই। রেখে গেলেন নানা অনুষঙ্গ, আর ভক্তদের মনেও অসংখ্য অমোঘ স্মৃতি।
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত: রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা ও মনস্তত্ত্ব

বর্তমান যুগে রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখল বা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিযোগিতা নয়; এটি ভাষা, প্রতীক, আবেগ, মনস্তত্ত্ব এবং কৌশলগত যোগাযোগের এক বহুমাত্রিক ক্ষেত্র। দৃশ্যমান বক্তব্যের আড়ালে প্রায়শই কাজ করে অদৃশ্য বয়ান-নির্মাণের প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য থাকে গণমানুষের চিন্তা, অনুভূতি, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করা। রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই ভাষা কখনও নিছক যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং তা হয়ে ওঠে প্রভাব বিস্তার, বৈধতা নির্মাণ, প্রতিপক্ষকে অবমাননা এবং জনমত নিয়ন্ত্রণের একটি সূক্ষ্ম অস্ত্র। এই জটিল বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ‘উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত’ ধারণাটি তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণী কাঠামো হিসেবে সামনে আনা যেতে পারে, যা রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা, তার মনস্তত্ত্ব এবং এর অন্তর্নিহিত অনৈতিক কৌশলকে উন্মোচন ও ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে। এ শব্দবন্ধটিকে কেবল ভাষার একটি অলঙ্কারিক রূপক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি রাজনৈতিক যোগাযোগ (পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন), প্রোপাগান্ডা স্টাডিজ, মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবতত্ত্ব এবং সমালোচনামূলক বচন-বিশ্লেষণের (ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স অ্যানালাইসিস) আলোকে বিশ্লেষণযোগ্য একটি কাঠামো, যেখানে ভাষা কেবল বাস্তবতাকে বর্ণনা করে না, বরং বাস্তবতাকে নির্মাণও করে। ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক নরম্যান ফেয়ারক্লাফ (১৯৪১-) দেখিয়েছেন, ক্ষমতা ও ভাষার সম্পর্ক কখনো নির্দোষ নয়; রাজনৈতিক ভাষা প্রায়ই এমনভাবে নির্মিত হয় যাতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বৈধ এবং অন্য গোষ্ঠীকে অগ্রহণযোগ্য বা ‘অপর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। ফলে রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষায় ধীরে ধীরে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের জায়গা দখল করে আবেগ, ভয়, সন্দেহ ও ঘৃণার রাজনীতি ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস। এই প্রেক্ষাপটে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর (১৯২৬-১৯৮৪) ‘ক্ষমতা ও জ্ঞান’ (পাওয়ার এন্ড নলেজ) ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, জ্ঞান ও সত্য কখনও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়; বরং ক্ষমতার বিন্যাসের মধ্য দিয়েই ‘সত্য’ গঠিত, প্রচারিত এবং পুনর্গঠিত হয়। অর্থাৎ যে গোষ্ঠী ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করে, তারা অনেক সময় ভাষা ও বয়ানের মাধ্যমেই ঠিক করে দেয় কোনটি গ্রহণযোগ্য সত্য এবং কোনটি অগ্রহণযোগ্য। একইভাবে ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ (কালচারাল হেজিমনি) তত্ত্ব দেখায়, শাসকগোষ্ঠী কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমেও নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখে। গণমাধ্যম, রাজনৈতিক ভাষণ, সামাজিক প্রচারণা কিংবা সাংস্কৃতিক বয়ানের মাধ্যমে এমন এক মানসিক পরিবেশ তৈরি করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ নিজেদের অজান্তেই অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘অপরিহার্য’ বলে মেনে নিতে শুরু করে। রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা তাই কেবল প্রতিপক্ষকে সমালোচনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষকে ‘অপরায়ন’ (আদারিং) প্রক্রিয়ায় কোণঠাসা করে ফেলে। এই অপরায়ণের লক্ষ্য হয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে যুক্তির ময়দান থেকে সরিয়ে নৈতিক, সামাজিক কিংবা মানসিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম শিক্ষা হলো, ঘৃণা, অপবাদ, গুজব কিংবা মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণের ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত রাজনৈতিক বয়ান সাময়িকভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই সামাজিক আস্থা গড়ে তুলতে পারে না। কারণ মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম প্রচারণার সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেই ফেলে। সাধারণ জনগণের কাছে রাজনৈতিক সম্মতি আদায়ের কূটকৌশলী প্রক্রিয়াটি প্রায়শই শুরু হয় ‘উপ্ত’ স্তরের মধ্য দিয়ে। এই স্তরে মূলত গণমানুষের চেতনায় একটি নির্দিষ্ট ধারণা, ভয় কিংবা সন্দেহের বীজ বপন করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘিরে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করার লক্ষ্যে সচেতনভাবে কিছু শব্দ, প্রতীক, অভিযোগ ও ইঙ্গিত ছড়িয়ে দেয়া হয়। এখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণটি সাধারণত প্রত্যক্ষ নয়; বরং এটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের মনে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে অবিশ্বাস, আশঙ্কা কিংবা নৈতিক অস্বস্তি গড়ে তোলা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বপনকৃত ধারণাগুলো সামাজিক আলোচনায়, গণমাধ্যমে, রাজনৈতিক বক্তৃতায় এবং ˆদনন্দিন কথোপকথনে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে একসময় তা অনেকের কাছেই ‘স্বাভাবিক সত্য’ বলে মনে হতে শুরু করে। সামাজিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘কাঠামোবদ্ধতার প্রভাব’ (ফ্রেইমিং ইফেক্ট) এবং ‘ঊদ্দেশ্য নির্ধারণ’ (এজেন্ডা সেটিং) কৌশলের একটি সম্মিলিত প্রয়োগ, যেখানে একটি নির্দিষ্ট বয়ানকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে মানুষের উপলব্ধি ও বিচারবোধ সেই কাঠামোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অর্থাৎ মানুষ কী ভাববে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষকে কী নিয়ে ভাবানো হবে। মার্কিন অর্থনীতিবিদ এডওয়ার্ড স্যামুয়েল হারম্যান (১৯২৫-২০১৭) এবং ভাষাতাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কিও (১৯২৮-) ‘প্রোপাগান্ডা মডেল’ এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে। তাদের মতে, গণমাধ্যম প্রায়ই নিরপেক্ষ তথ্যবাহক হিসেবে নয়, বরং একটি ‘ছাকনি পদ্ধতি’ (ফিল্টারিং সিস্টেম) হিসেবে কাজ করে, যা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে কোনো ধারণা বারবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে তা প্রশ্নাতীত সত্যের মর্যাদা পেয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অপরায়ণ প্রক্রিয়ায় এই ‘উপ্ত’ ধাপের বহুমাত্রিক প্রয়োগ বারবার দৃশ্যমান হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বা ট্যাগকে পরিকল্পিতভাবে প্রচার করা হয়েছে। কখনো ‘রাজাকার’, কখনো ‘স্বৈরাচার’, কখনও ‘দেশবিরোধী’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি’, আবার কখনও ‘পাকিস্তানি দালাল’ বা ‘ভারতীয় দালাল’— এই ধরনের ভাষাগত লেবেলিং কেবল রাজনৈতিক মতভেদের পরিচায়ক নয়; বরং এটি একটি নৈতিক বিচারের রায় আরোপের কৌশলও বটে। এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে যুক্তি কিংবা তথ্য-উপাত্তনির্ভর প্রমাণের ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়। ফলে রাজনীতি আর কেবল নীতিগত মতবিনিময়ের ক্ষেত্র থাকে না; তা পরিণত হয় ‘নৈতিক বৈধতা বনাম নৈতিক অযোগ্যতা’র এক সংঘাতে। এখানেই ভাষা প্রতিপক্ষকে আক্রমণের অস্ত্র হয়ে ওঠে, আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ধীরে ধীরে ‘অপর’-এ রূপান্তরিত হয়। এরপর আসে ‘সুপ্ত’ স্তর, যেখানে সম্ভাব্য পরিবর্তন, নতুন চিন্তা কিংবা সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে নিঃশব্দে নিস্তেজ করে দেয়া হয়। এটি সরাসরি দমন নয়; বরং জনমনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ক্লান্তি উৎপাদনের কৌশল। যখন কোনো সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের দাবি জোরালো হতে শুরু করে, তখন সেই দাবিকে প্রকাশ্যে অস্বীকার না করে বরং সময়ক্ষেপণ, আংশিক স্বীকৃতি, বিভ্রান্তিকর আশ্বাস কিংবা অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ‘ঘুম পাড়িয়ে’ দেয়া হয়। যেমনটি দেখা গিয়েছে সাম্প্রতিক জুলাই সনদ নিয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থানে। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে তার প্রতিবাদী শক্তি ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। এখানে ওয়াল্টার লিপম্যানের (১৮৮৯-১৯৭৪) ‘সম্মতি তৈরি’ (ম্যানুফেকচারিং কনসেন্ট) ধারণা এবং উল্লেখিত হারম্যান-চমস্কির বিশ্লেষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ক্ষমতাসীন বয়ান এমনভাবে পরিবেশিত হয় যে মানুষ নিজের অজান্তেই সেই বয়ানের সঙ্গে আপস করে ফেলে, কিংবা অন্তত বিরোধিতা করার নৈতিক তাগিদ হারিয়ে ফেলে। মনোবিজ্ঞানে একে অনেক সময় ‘চেনাজানা অসহায়ত্ব’ (লার্ন্ড হেল্পলেসনেস)-এর সঙ্গেও তুলনা করা যায়, যেখানে মানুষ বারবার ব্যর্থতা বা প্রতিরোধহীনতার অভিজ্ঞতায় একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করে যে পরিবর্তন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শিক্ষার্থী আন্দোলন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আন্দোলন কিংবা নাগরিক সমাজের বিভিন্ন দাবিকে প্রায়ই এই ‘সুপ্ত’ কৌশলের মুখোমুখি হতে দেখা গেছে। আন্দোলনকে সরাসরি দমন না করে কখনো সংলাপের আশ্বাস, কখনো বিভক্তি সৃষ্টি, কখনো আংশিক দাবি মেনে নেওয়ার অভিনয়— এসবের মাধ্যমে তার গতি মন্থর করে দেওয়া হয়েছে। ফলে জনমনে জন্ম নেয় ক্লান্তি, হতাশা ও দীর্ঘস্থায়ী অনীহা; যা শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাকেই শক্তিশালী করে। তৃতীয় ধাপ ‘গুপ্ত’; এটি হলো অন্তরাল থেকে পরিচালিত মনস্তাত্ত্বিক ও তথ্যগত কৌশলের স্তর। এখানে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে থেকে গোপনে প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি কিংবা চরিত্রহননের কাজ পরিচালিত হয়। এই পর্যায়ে তথ্য বিকৃতি, গুজব ছড়ানো, আংশিক সত্যকে পূর্ণ সত্য হিসেবে উপস্থাপন, কিংবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করা হয়। ফলে জনগণ অনেক সময় বুঝতেই পারে না কোনটি বাস্তব, আর কোনটি নির্মিত বয়ান। সত্য ও মিথ্যার সীমানা ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাপসা করে দেয়া হয়। ডিজিটাল যুগে এই ‘গুপ্ত’ প্রক্রিয়া আরও জটিল ও বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। অ্যালগরিদমিক বায়াস, ইকো-চেম্বার, বট-নিয়ন্ত্রিত প্রচারণা, মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষের মনোজগৎকে প্রভাবিত করার নতুন নতুন কৌশল তৈরি হয়েছে। মার্কিন সমাজ-মনোবিজ্ঞানী সোসানা জুবফের (১৯৫১-) ‘নজরদারি পুঁজিবাদ’ (সার্ভাইল্যান্স ক্যাপিটালিজম) ধারণা এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের আচরণগত তথ্য (বিহেভিয়ারাল ড্যাটা) সংগ্রহ করে তাদের সিদ্ধান্ত, পছন্দ ও রাজনৈতিক প্রবণতাকে প্রভাবিত করার এক নতুন অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই ‘গুপ্ত’ কৌশল আরও সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী হয়েছে। নামবিহীন প্রচারণা, সংগঠিত ট্রল-সংস্কৃতি, বিভ্রান্তিমূলক ভিডিও, বিকৃত তথ্য কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফটোকার্ড গুজবের মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সরাসরি মোকাবিলা না করেও তাকে ঘিরে এক ধরনের নেতিবাচক আবহ তৈরি করা সম্ভব হয়, যা ধীরে ধীরে সামাজিক উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে। সবশেষে আসে ‘লুপ্ত’ স্তর, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কার্যত জনপরিসর থেকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এটি কেবল প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে না; বরং সামাজিক বা সামষ্টিক স্মৃতি, নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জনআলোচনার পরিসর থেকেও তাকে অদৃশ্য করে দেয়ার প্রয়াস চালানো হয়। কোনো ব্যক্তি, দল বা মতাদর্শকে যদি দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়, তবে একসময় তার বক্তব্য, উপস্থিতি ও রাজনৈতিক বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন তার মতামতকে গুরুত্বহীন, অপ্রাসঙ্গিক কিংবা বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়ে যায়। যোগাযোগতত্ত্বে এই প্রক্রিয়াকে ‘প্রতীকী নিশ্চিহ্নকরণ’ (সিম্বলিক অ্যানাইহিলেশন) বলা হয়। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুর্দিয়োর (১৯৩০-২০০২) ‘প্রতীকী ক্ষমতা’ (সিম্বলিক পাওয়ার) ধারণাটিও এখানে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি দেখিয়েছেন, ভাষা, প্রতীক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মাধ্যমে এমন এক ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়, যা অনেক সময় প্রত্যক্ষ সহিংসতার চেয়েও কার্যকর। কারণ দৃশ্যমান দমন প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু প্রতীকী দমন মানুষের চেতনাকেই পরিবর্তন করে দেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরোধী কণ্ঠকে প্রান্তিক করে দেওয়া, তাদের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করা, কিংবা তাদের বক্তব্যকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা এই ‘লুপ্ত’ প্রক্রিয়ারই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি গভীর সত্য হলো, কোনো মত, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তিকে ভাষাগত ও প্রতীকীভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা সাময়িক সাফল্য আনতে পারলেও তা স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতি বা সামাজিক আস্থা তৈরি করতে পারে না। কারণ দমন করা বাস্তবতা প্রায়শই নতুন রূপে, নতুন ভাষায় এবং নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে আবার ফিরে আসে। প্রতিপক্ষকে অপরায়ণের আলোচ্য এই চার ধাপ তথা ‘উপ্ত’, ‘সুপ্ত’, ‘গুপ্ত’ ও ‘লুপ্ত’ পর্যায়ের সমন্বিত প্রয়োগই গড়ে তোলে রাজনৈতিক আক্রমণের একটি সুসংগঠিত মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো। এখানে ভাষা কেবল বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম নয়; বরং মানুষের উপলব্ধি, আবেগ, ভয়, ঘৃণা এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশলগত প্রযুক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু ইতিহাস আমাদের বারবার একটি মৌলিক শিক্ষা দিয়েছে যে, এই ধরনের কুটকৌশল সবসময় ক্ষমতাসীনদের জন্য প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনে না; বরং অনেক সময় তা উল্টো বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। কারণ সাধারণ মানুষের চেতনা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জীবন যখন এক পর্যায়ে গিয়ে আরোপিত বয়ানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, তখন চাপা দেওয়া কণ্ঠস্বর আরও প্রবল প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। যে ভাষা দিয়ে মানুষকে নীরব করতে চাওয়া হয়েছিল, সেই ভাষার ভেতর থেকেই জন্ম নেয় প্রতিবাদের নতুন অভিধান। ভাষা তখন আর কেবল শাসনের হাতিয়ার থাকে না; এটি হয়ে ওঠে প্রতিরোধের অস্ত্র। ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি গণআন্দোলনই এ সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। ক্ষমতার একমুখী ভাষাকে মানুষ শেষ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ করেছে স্লোগানে, কবিতায়, দেয়াললিখনে, গণসমাবেশে এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধে। তখন ভাষা হয়ে ওঠে নিপীড়নের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থানের ঘোষণাপত্র। ফরাসি দার্শনিক জ্যাক দেরিদার (১৯৩০-২০০৪) ভাষায়, কোনো বয়ান কখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত থাকে না; তার ভেতরেই থাকে বিপরীত অর্থের সম্ভাবনা। অর্থাৎ যে ভাষা দিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়, সেই ভাষাই একসময় প্রতিরোধের শক্তিতে রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০২৪-এর শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেখা গেছে, রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর আরোপিত ভাষা ও পরিচয়ের বিপরীতে আন্দোলনকারিরা নিজেদের বিকল্প ভাষা তৈরি করেছে। ক্ষমতার ভাষা যেখানে মানুষকে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছে, জনগণ সেখানে সেই সংজ্ঞাকেই উল্টে দিয়েছে। ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’ এই স্লোগান যেমন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানকে প্রতিষ্ঠা করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, তেমনি ‘কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ প্রতি-স্লোগান হিসেবে ফিরে এসে সেই বয়ানের বিরুদ্ধে গণঅসন্তোষ ও প্রতিরোধের ভাষায় পরিণত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, ভাষা কখনো একমুখী নয়; ঊদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাষার ভেতরেই নিহিত থাকে প্রতিরোধের সম্ভাবনা, প্রতিবাদের শক্তি এবং জালেমের মুখে মজলুমের চপেটাঘাত করার মোক্ষম সামর্থ্য। বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতাসীনদের এই ধরনের কুটকৌশল নতুন কিছু নয়। যুগে যুগে, নানা ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় কেবল এর ভাষা ও প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু রাজনৈতিক কুটকৌশলের মূল মনস্তত্ত্ব প্রায় একই থেকেছে। প্রাচীন সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে শুরু করে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র পর্যন্ত সর্বত্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শক্তি প্রায়ই প্রতিপক্ষকে সাধারণ মানুষের কাছে ‘অপর’ বানানোর রাজনীতি ব্যবহার করেছে। আর সেটা করেছে কখনো ধর্মের নামে, কখনো জাতীয়তাবাদের নামে, কখনো নিরাপত্তার অজুহাতে, আবার কখনো নৈতিকতার ভাষায়। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, ইতিহাসের এই পুনরাবৃত্তি থেকেও মানুষ খুব কমই শিক্ষা নিয়েছে। অতীতের অপকৌশল, বিভাজন ও তার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা থাকা সত্ত্বেও, একই ধরনের রাজনৈতিক কৌশল নতুন মোড়কে বারবার ফিরে আসে। তাই এখানে ইতিহাসের দ্বান্দ্বিকতা (হিস্টোরিক্যাল ডায়ালেক্টিক্স) এবং ক্ষমতার পুনরুৎপাদনের (রিপ্রোডাকশন অব পাওয়ার) তত্ত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আন্তোনিও গ্রামশি, লুই আলথুসার (১৯১৮-১৯৯০) কিংবা মিশেল ফুকোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রের মাধ্যমে টিকে থাকে না; বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা, গণমাধ্যম এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য দিয়েও নিজেকে পুনরুৎপাদন করে। দক্ষিণ এশিয়ার উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রগুলোতে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। শাসনব্যবস্থার বাহ্যিক রূপ পরিবর্তিত হলেও, শাসনের ভাষা, রাজনৈতিক বিভাজনের কৌশল এবং ‘দেশপ্রেম বনাম দেশদ্রোহিতা’র দ্বৈত বয়ান প্রায়ই একই থেকে যায়। ফলে স্বাধীনতার পরও অনেক সমাজ ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের নতুন সংস্করণ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারে না। অতএব, প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক দল, ক্ষমতা বা কৌশল নিয়ে নয়; বরং আমাদের ‘সামষ্টিক রাজনৈতিক চেতনা’ (কলেক্টিভ পলিটিক্যাল কন্সাসনেস) নিয়েও। আমরা কি সত্যিই এই ভাষার রাজনীতি ও মনস্তাত্ত্বিক খেলাকে বুঝতে পারছি? আমরা কি তথ্য, স্লোগান ও প্রচারণাকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করছি, নাকি অজান্তেই নির্মিত বাস্তবতার অংশ হয়ে যাচ্ছি? কারণ রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই ঘটে, যখন মানুষ বুঝতেই পারে না যে তার চিন্তার কাঠামোও ধীরে ধীওে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই জায়গায় ‘সমালোচনামূলক নাগরিকত্ব’ (ক্রিটিক্যাল সিটিজেনশীপ) এবং জনশিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়; বরং ইতিহাসবোধ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা এবং ভিন্নমতকে সহ্য করার মানসিকতাও একটি সচেতন নাগরিক সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। গণসচেতনতা ছাড়া নেতিবাচক রাজনীতির এই কায়েমী স্বার্থবাদী কুটকৌশলের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় নাগরিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, দলীয় আনুগত্যের সংস্কৃতি, ব্যক্তিপূজার প্রবণতা, পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি চর্চা এবং প্রশাসনে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে অনেক সময় রাজনৈতিক মতভেদ যুক্তি বা নীতিনৈতিকতার ক্ষেত্র থেকে সরে গিয়ে পরিচয়গত বৈরিতায় রূপ নেয়, যেখানে প্রতিপক্ষকে বোঝার চেয়ে ধ্বংস করার আকাঙ্ক্ষাই বড় হয়ে ওঠে। আর সেখানেই গণতন্ত্রের ভাষা ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি এবং স্বৈরতন্ত্র আরও পেশিনির্ভর ও মারমুখী হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আমাদের মনে রাখা দরকার যে, গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে নিহিত থাকে না; তা নিহিত থাকে সচেতন, সমালোচনামুখর ও নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজের মধ্যে। তারা কেবল শোনে না, প্রশ্ন তোলে; কেবল বিশ্বাস করে না, বিশ্লেষণ করে; কেবল আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয় না, বরং যুক্তি, ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার আলোকে সত্যকে অনুধাবনের চেষ্টা করে। কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হলো ‘সমালোচনামূলক নাগরিক চেতনা’ (ক্রিটিক্যাল সিভিক কন্সাসনেস), আর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো অন্ধ আনুগত্য, ভয়, গুজবও নির্মিত বিভ্রমের কাছে আত্মসমর্পণ। যে সমাজে মানুষ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সেখানে গণতন্ত্র ধীওে ধীরে কেবল নির্বাচনী আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু যে সমাজে নাগরিকেরা চিন্তা করে, বিতর্ক করে এবং ক্ষমতার ভাষাকে বিশ্লেষণ করে, সেখানেই গণতন্ত্র তার প্রকৃত প্রাণশক্তি খুঁজে পায়। এই ‘উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত’ অপরায়ন প্রক্রিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশলের বর্ণনা নয়; এটি ক্ষমতা কীভাবে ভাষা, মনস্তত্ত্ব ও প্রতীকের মাধ্যমে বয়ান তৈরি করে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তারই এক গভীর প্রতিফলন। এই কুটকৌশল ভাঙার একমাত্র উপায় হলো সেই সমালোচনামূলক সচেতনতা, যা সত্যকে আড়াল থেকে তুলে এনে প্রকাশ্যে দাঁড় করাতে পারে; যা প্রচারণার শব্দগুচ্ছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে শনাক্ত করতে পারে; যা রাজনৈতিক লেবেলিং, দলীয় আনুগত্য কিংবা আবেগতাড়িত বিভাজনের পরিবর্তে ন্যায়, যুক্তিসঙ্গত বিচার-বিশ্লেষণ ও মানবিকতার ভিত্তিতে ব্যক্তি, ঘটনা ও মতাদর্শকে মূল্যায়ন করতে শেখায়। অন্যথায়, সমাজ ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থার দিকে এগোয়, যেখানে ভাষা আর যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না; তা হয়ে ওঠে বিভাজন, ভয় এবং নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই কোনো ক্ষমতাকাঠামো নিজেকে চিরস্থায়ী বলে মনে করেছে, তখনই ভাষাকে ব্যবহার করা হয়েছে প্রতিপক্ষকে অমানবিক, অপ্রাসঙ্গিক কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। লক্ষ্যণীয় যে, প্রাচীন সাম্রাজ্য থেকে আধুনিক রাষ্ট্র পর্যন্ত ক্ষমতার এই প্রবণতা প্রায় একই থেকেছে। কখনো ‘জাতির শত্রু’, কখনও ‘দেশদ্রোহী’, কখনও ‘অসভ্য’, কখনও ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ এসব ভিন্ন ভিন্ন শব্দের আড়ালে একই মনস্তত্ত্ব কাজ করেছে। মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষকে এমনভাবে চিহ্নিত করা, যেন তাকে আর সমান নাগরিক বা বৈধ রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে বিবেচনা না করা হয়। জার্মান বংশোদ্ভুত মার্কিন চিন্তক হান্না আরেন্ট (১৯০৬-১৯৭৫) তার ‘সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণবাদের উৎস’ (দ্যা অরিজিন্স অব টোটালিটারিয়ানিজম) বইটিতে দেখিয়েছিলেন, কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ভাষাকে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে মানুষ ধীরে ধীরে বাস্তবতা ও প্রচারণার পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তখন সত্য আর তথ্য-উপাত্ত বা দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় ক্ষমতার প্রয়োজন অনুযায়ী আগ্রাসী প্রোপাগান্ডায়। ফলে যে সমাজে প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হয়, সেখানে প্রতিরোধের স্লোগান বা গালিই একসময় ইতিহাসের বিকল্প ভাষা হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, আমরা যদি এই মনস্তাত্ত্বিক রাজনৈতিক কৌশলগুলোকে বুঝতে ব্যর্থ হই, তবে হয়তো বারবার একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সাক্ষী হয়ে থাকব- কখনো প্রত্যক্ষভাবে, কখনো নীরব সমর্থক হিসেবে, কখনো আবার নিজেদের অজান্তেই তার অংশ হয়ে। তখন ব্যক্তি বদলাবে, দল বদলাবে, শাসনের মুখ বদলাবে; কিন্তু শাসনের ভাষা, অপকৌশল ও মানসিক কাঠামো একই থেকে যাবে। আর সেখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম সত্যটি ফিরে আসে- মানুষ প্রায়ই ইতিহাসের সাক্ষী হয়, ইতিহাস পড়ে, ইতিহাস নিয়ে কথা বলে; কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। অপরদিকে ইতিহাস এটাও দেখিয়েছে যে, মানুষের ভেতরে জমে থাকা নীরব ক্ষোভ, অপমানবোধ ও বঞ্চনার অভিজ্ঞতা একসময় প্রতিরোধের ভাষায় বিস্ফোরিত হয়েছে। চাপা দেওয়া কণ্ঠস্বর কখনো কবিতায়, কখনো গানে, কখনো দেয়াললিখনে, কখনো স্লোগানে বা গালিগালাজে, কখনো গণঅভ্যুত্থানের গর্জনে ফিওে এসেছে। শাসকের আরোপিত শব্দই অনেক সময় শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্লোগানে পরিণত হয়েছে। কারণ ভাষার একটি দ্বৈত চরিত্র আছে। এটি যেমন আধিপত্যের হাতিয়ার, তেমনি মুক্তি ও প্রতিরোধেরও শক্তি। ফলে যে সমাজে প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হয়, সেখানে স্লোগানই একসময় ইতিহাসের বিকল্প ভাষা হয়ে ওঠে যা নিপীড়িত ক্ষুব্ধ মানুষের জমে থাকা অভিজ্ঞতা ও প্রতিবাদকে প্রকাশ করে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, আমরা যদি এই মনস্তাত্ত্বিক রাজনৈতিক কৌশলগুলোকে বুঝতে ব্যর্থ হই, তবে হয়তো বারবার একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সাক্ষী হয়ে থাকবে জাতি। তখন ব্যক্তি বদলাবে, দল বদলাবে, শাসনের মুখ বদলাবে; কিন্তু শাসনের ভাষা, বিভাজনের কৌশল এবং ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব একই থেকে যাবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘অপর’ বানানোর সংস্কৃতি নতুন নতুন নামে ফিরে আসবে, আর সমাজ বারবার একই চক্রে আবর্তিত হতে থাকবে।  (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

রম্যগদ্য: “আরে আমি বিয়াই তো করি নাই...”

“ব্যাপার কী, কোন ব্যাটায় বিয়া করলো না কোন ব্যাটায় বিয়া বইলো এইসব কি জেন-জি’র পোলাপানে বুঝবো!”“কেন কেন বিবাহ একটি পবিত্র পারিবারিক বন্ধন এটা বর্তমান জেনারেশন বুঝবে না কেন?”“আরে বিবাহ তো একটি পবিত্র পারিবারিক বন্ধন, এইডা পিরথীবির ব্যাবাক জেনারেশন মানবো এবং বুইজ্জা নিবো এই নিয়া কুনোই সন্দ নাই, কিন্তু বিয়াই করিনাই এইডার মাইনে আপনে কি কোইতে চান হ্যেইডা বুজবো না।”“বুঝবে বুঝবে, আমাদের ছোট বেলার একটা ছোট্ট ছড়া আছে ওটা বললেই তোর পৃথিবীর সব জেনারেশনই ব্যাপারটা বুঝবে। ”“ঠিক আছে, কন চাইন দেহি আপনের ছুট্টু বেলার ছড়া না কবিতা।”“ওরে এটা পয়ার ছন্দের কবিতা না, এটা হলো প্রচলিত ছড়া। ”“ধাৎ হালায় বাঙালি খালি প্যাঁচায় “টা পয়ার ছন্দের কবিতা না, এটা হলো প্রচলিত ছড়া” ভাইডিনা ভালা, আকামে ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ না কয়া আসল ছড়া কনতো শুনি?”“শোন তাহলে আমাদের ছোটবেলার ছড়া। ”“লন শুরু করেন।”“আতা গাছে তোতা পাখি / ডালিম গাছে মৌ / গভীর রাতে উঠে দেখি / পাশে নাই বৌ / রাতের বেলা কোথা গেল / কোথায় তারে পাই/ হঠাৎ করে পড়ল মনে / আরে আমি বিয়াই তো করি নাই।”“হি হি, দারুণ জিনিস হুনাইলেন মিয়া। অহনো হি হি, হাসি চাইপ্পা রাখার পারি না, হি হি।”“ঠিক আছে ছড়াটা হাস্যরসের আবেদন রাখে, কিন্তু তাই বলে তোর মতো এ্যতো হাসির কিছু নেই যে, ছড়া শোনার পর থেকে এখনও খ্যাক খ্যাক করে হাসছিস।”“হাসমু না! কন কী? কী সুন্দর ছড়া, যেই জিনিসটার কুনোই ঠিকানা নাই, কুনোই অস্তিত্ব নাই, হালায় হেই বেডির মানে হেই বৌ’এর তালাশ করতাছে। হি হি।”“এটাতো কেবল একটা ছড়ারে, এটা নিয়ে অস্তিত্ববাদ, নাস্তিত্ববাদ এসবের মাঝে জড়াচ্ছিস কেন?”“ভাই না ঢাবি বাংলায় অনার্স?”“হ্যাঁ, তো কী হয়েছে!” এই কথা কোইতে আপনের লজ্জা করে না! আপনে বুঝেন না, “আতা গাছে তোতা পাখি / ডালিম গাছে মৌ/ গভীর রাতে উঠে দেখি / পাশে নাই বৌ / রাতের বেলা কোথা গেল / কোথায় তারে পাই? / হঠাৎ করে পড়লো মনে / আরে আমি বিয়াই তো করি নাই। এই ছড়ার মূল বক্তব্য কী?”“ছড়াতো ছড়াই এর আবার মূল বক্তব্য কী?”“হুর মিয়া আপনে বুঝছেন, এই ছড়া কতো সুন্দর কোইরা আমাগো বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুইল্লা ধরছে। যেই জিনিসটা নাই, যেই জিনিসটার জন্মও হয় নাই, হেই জিনিসটা আমরা খুঁইজ্জা বেড়াইতেছি। মনে করেন বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে? কাজীর খাতায় আছে, কিন্তু গোয়ালে নাই! বাংলাদেশে নিয়মের শাসন? কাজীর খাতায় আছে, কিন্তু কাচারিতে নাই! বাংলাদেশে মানবাধিকার? কাজীর খাতায় আছে, কিন্তু সমাজে নাই! আপনের সার্বভৌমত্তের চারটা পয়েন্ট...”“থাম ভাই থাম, আমার ঘাট হয়েছে। তোকে আমার ছড়া বলাটাই ভুল হোয়েছে।”“ভুল হোইসে মাইনে! এই যে কয়’দিন আগে এক শুভ্রকেশ মহিলা কোইলেন, বাংলাদেশে যাগো গুল্লি ফুটানের কথা হ্যারা ময়রার পোলার মতো, মিষ্টি বেচে। যাগো দ্যাশের সীমান্তে ব্যাড়া দেয়ার কথা, হেই কাম থুয়া, হ্যারা প্রইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপের মানে পিপিপি-এর, ব্যাবাগ ব্যাবসা বাগায়া লইতাছে।”“ভদ্রমহিলাতো বাংলাদেশের বাস্তাব চিত্র তুলে ধরেছেন, ওদের ব্যাংক আছে, হসপিটাল আছে, মেডিকেল কলেজ রয়েছে, মরার আগে হোলেওতো কেউ একজন সাহস করে সত্যি কথা বলেছেন, এটা তুই অ্যাপ্রেশিয়েট কোরবি না?”“অ্যপ্রিশিয়েট! আপনে তো দেখি চোখ থাকিতে অন্ধ! লজ্জা করে না মিয়া, রাজনৈতিক নেতারা, হ্যাগো পায়ে ত্যেল মাইরা, ক্ষমতায় বওনের লাইগ্যা বৌ-বাচ্চা, পোলাপান ব্যেবাগতে মিল্লা হ্যেগো পাঁ’চাটেন, তো হ্যেগোরে ব্যবসা দিবেন না! হ্যারা আপনে আপনে, আপনেরে গদিত বহায়া চৌদ্দগুষ্টিসহ মাল কামাইনের সুযোগ কোইরা দিবো, আর আপনে হ্যেগোরে কিছু দিবেন না! হ্যাগো বাজেট ওপেন না গোপেন, হ্যেই লয়া আপনের জ্বলে ক্যা। আমি কিন্তু কয়া দিলাম হ্যারা আছে বইল্লাই দেশটা অহনো টিক্কা আছে। নাইলে আপনেগো মতো পিচাশ পলিটিশিয়ানগো হাতে দেশটা পড়লে কবেই আপনেগো নিজেগো, কামড়াকামড়ির ঠ্যেলায়, পাবলিকে আমেরিকারে, নাইলে চীন বা ভারতরে হাইদ্দা ডাইক্কা আইন্না দেশ চালানোর সুযোগ দিতো।”“এটা আবার কী বলছিস, জনগণ, লক্ষ মুক্তিযোদ্ধার প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আবার বিসর্জন দিতো!”“দিবো না মিয়া, গত চুয়ান্ন বছরে আপনেরা হালায় ট্যাকা ট্যাকা কোইরা, সাধারণ পাবলিকের কথা ভুইল্লা, অহন মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরাইছেন, বুলডোজার দিয়া ঘরবাড়ি গুড়া গুড়া কোরছেন! এই নাকি আপনের স্বাধীনতা! চিফ ইলেকশান কমিশনারের গালে জুতার বাড়ি মারলেন, জুতার মালা পরাইলেন...আপনেরা কুনোই বাঙালি এর প্রতিবাদ কোরলেন না! অথচ ভারতের মুদির লোকেরা কোইছে, যেই ব্যাডায় মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরাইছিলা, হ্যাগো এবার গলায় দড়ি পড়বো। মাইনে হ্যাগোরে ফাঁসিতে লটকাইবো।”“যাহ তাই হয় নাকি? ভিন দেশ থেকে এসে আমাদের দেশের নাগরিক, আমাদের ভাইব্রাদারদের ফাঁসি দিবে তা হয় নাকি!”“তা হয় নাকি, না কী হয়, হেই ভবিষ্যৎ তো আমি কয়া পারুম না। তয় দেহেন সামনে কী হয়। তয় বর্তমান বাংলদেশ লয়া আমিভি, একটা ছড়া লিখছি...”“তুই লিখেছিস ছড়া? ভ্যারেন্ডা আবার বৃক্ষ!”“খামখা মজা কোইরেন না। হুইন্না দ্যাখেন মজা পাইবেন। ”“বল শুনি, কুঁজো যখন চিৎ হোয়ে শুতে চায়, তখন আমার কী? বল তোর ছড়া।”“চারিদিকে হাম হাম / বাচ্চা মরে হাজার / বদ্যির কাছে ছুইট্টা গ্যালো/ বাপে-মায়ে ব্যাজার/ বদ্যি কয়এ্যতো রোগী / অষুধ কোথা পাই/ হঠাৎ করে পড়ল মনে/ আরে হামের টিকাই কিনি নাই” হি হি হি। ক্যেমন লাগলো ছড়াটা?”“তোর ছড়া হাসির নয়রে বোধের...”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

মাদকাসক্তি প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স

আজকাল খবরের কাগজে কিংবা বিভিন্ন মিডিয়ায় শিরোনাম হচ্ছে, পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে একটির পর একটি অমানবিক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। যার কারণ হচ্ছে- মাদকাসক্তি। মাদকাসক্তির কারণে ছেলের হাতে খুন হচ্ছেন মা, বাবার হাতে ছেলে অথবা মেয়ে! কখনও ছেলে-মেয়ে নিজেরাই আত্মহত্যা করছে। ২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট মাদকাসক্ত তরুণী ঐশীর হাতে একইভাবে নিহত হন তার বাবা-মা। সম্প্রতি এক মাদকাসক্ত পিতার আছাড়ে প্রাণ হারিয়েছে এক বছরের শিশুপুত্র। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তথ্য বিবরণীতে জানা যায়, গত কয়েক বছরে নেশাখোর সন্তানের হাতে প্রায় ২০০ বাবা-মা খুন হয়েছেন, স্বামী হত্যা করেছে স্ত্রীকে, স্ত্রী হত্যা করেছে স্বামীকে। খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, পরকীয়া প্রেম, দাম্পত্য কলহ, অস্ত্র বা অর্থ লেনদেন, হত্যা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম সব কিছুর মূলেই রয়েছে এই মাদকের নেশা। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, কিন্তু সেই মানুষ মাদকের নেশায় হয়ে উঠে হিংস্র দানব, নরপশু!মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ মাদকের বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এশিয়ার গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট ও গোল্ডেন ওয়েজ নামে পরিচিত মাদক চোরাচালানের তিনটি প্রধান অঞ্চলের কেন্দ্রে বাংলাদেশের অবস্থান। এ কারণেই আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিরা বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে সহজে ব্যবহার করছে। বিগত কয়েক বছরে আইস ছাড়াও দেশে কয়েক ধরনের অপ্রচলিত মাদক ধরা পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফেনইথাইলামিন (দেখতে কোকেনের মতো), এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড), ডায়মিথাইলট্রিপ্টামাইন বা ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম এবং খাত (ইথিওপিয়ার উঁচু ভূমিতে জন্মানো এক ধরনের উদ্ভিদের পাতা)। কয়েক বছর ধরে আইসের চালান বেশি আসছে। আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে ইয়াবার মতোই আইসের বিস্তার ঘটতে পারে। একটি গবেষণার তথ্য বলছে, দেশের প্রায় ১০ লাখ মানুষ মাদক কারবারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। এর মধ্যে মাদক পাচারে এক লাখ নারী ও শিশুকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। যেসব নারী ও শিশুকে মাদকের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাদের অধিকাংশই দরিদ্র। সামান্য অর্থের বিনিময়ে তাদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর মাদকাসক্তদের মধ্যে চার ভাগের এক ভাগই তরুণ। তাদের অধিকাংশ আবার শিক্ষার্থী। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে প্রায় ১৫ হাজার মাদকাসক্ত চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে প্রায় নয় হাজার ইয়াবা সেবী। একটানা মাত্র দুই-আড়াই বছর ইয়াবা সেবনের ফলেই তারা মারাতড়বকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাদের নার্ভগুলো সম্পূর্ন বিকল হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে- দেশের তরুণ প্রজন্মের এক চতুর্থাংশই কোন না কোন ধরনের নেশায় আসক্ত। এমনকি উচ্চ শিক্ষিত বেকার যুবকদের একটা বিপুল অংশ নিয়মিত ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে টেনশন থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছে। চিকিৎসকদের মতে এটাও এক ধরনের মাদকাসক্তি। বিত্ত্ববানদের একটা অংশ ছেলে এবং মেয়েরা মদ না খেলেও নিয়মিত সিসা খায় এবং পরবর্তীতে তারা মাদকে আসক্ত হয়। বস্তি কিংবা রাজপথে দেখা যায়- ছিন্নমূল শিশু কিশোররা জুতা তৈরির গাম যা ডান্ডি নামে পরিচিত- সেগুলো দিয়ে নিয়মিত নেশা করে। আইস বা ক্রিস্টাল মেথ ইয়াবার চেয়েও ভয়ঙ্কর মাদক। কারণ, ইয়াবা তৈরির মূল উপাদান মেথঅ্যাম্ফিটামিন হলেও ইয়াবায় মেথঅ্যাম্ফিটামিন থাকে মাত্র ১৫ শতাংশ। আর আইস বা ক্রিস্টাল মেথের ৯৬ শতাংশই এ মেথঅ্যাম্ফিটামিন। এটি দেখতে স্বচ্ছ কাচের (ক্রিস্টাল) মতো। এ মাদক সেবনে নিদ্রাহীনতা, স্মৃতিবিভ্রম, মস্তিস্কবিকৃতিসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে এ মাদক সেবনে ওজন হারানো, কিডনি ও হৃদযন্ত্রের সমস্যা হয় এবং বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটির মতো মাদকাসক্ত রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে ধারণা করা হয়। দেশে এত বিপুল সংখ্যক রোগীর জন্য নেই প্রয়োজনীয় হাসপাতাল বা নিরাময় কেন্দ্র। এদের চিকিৎসার জন্য দেশের ৪৪ জেলায় অনুমোদনপ্রাপ্ত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র আছে মোটে ৩৫১টি। এর মধ্যে শতাধিক ঢাকায়। অনুমোদনপ্রাপ্ত কেন্দ্রগুলোর মোট শয্যাসংখ্যা ৪ হাজার ৭২৮। এখানে মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা হৃদরোগসহ অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত কিনা, তা নির্ণয়ের জন্য এক্স-রে, ইসিজিসহ নানা পরীক্ষার দরকার হয়। কিন্তু এসব পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই সেখানে। একটি অনুসন্ধানে দেখা যায়, দিন দিনই বাড়ছে মাদকসেবীর সংখ্যা। মাদকসেবী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাদকের বাজারও বিস্তৃত হচ্ছে। শহর থেকে তা গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে ১৫ বছরের বেশি মাদক সেবী আছে ৬৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। এতে করে প্রতি ১৭ জনে একজন তরুণ মাদকাসক্ত। বাংলাদেশে একটি ভয়ঙ্কর চিত্র হচ্ছে যে, ইয়াবা গ্রহণকারী শতকরা ৮৫ ভাগই তরুণ যুবসমাজ। যার ফলে এসব ইয়াবা গ্রহণকারী মাদকাসক্তরা নানান ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বর্তমানে মেয়েদের মধ্যেও মাদকের নেশা এখন অনেকাংশে বেড়েছে। মাদকাসক্তদের মধ্যে শতকরা ৫ শতাংশ নারী। তাদের বয়স ১৫-৩৫ বছরের মধ্যে। নারী মাদকাসক্তদের শতকরা ৪৩ শতাংশ ইয়াবাসেবী। কিছু ভ্রান্ত ধারনা থেকে তারা মাদক নেয় যেমন স্লিম হওয়া যায়, রাত জেগে পড়া যায়, যৌনশক্তি বৃদ্ধি হওয়া ইত্যাদি। নিয়মিত মাদক গ্রহণে তরুণদের মধ্যে নানা ধরণের লক্ষণ দেখা যায়। পরিসংখ্যানে জানা যায় দেশে গত তিন বছরে নারী ও শিশু মাদকাসক্ত বেড়েছে তিন গুণ। অপরিকল্পিত গর্ভপাতসহ বিভিন্ন কারণে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন নারীরা। উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীদের মধ্যে এ নিয়ে চিকিৎসা নেয়ার প্রবণতা বাড়লেও, মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্তের মধ্যে তা বাড়েনি। সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে এখনও অধিকাংশ মাদকাসক্ত নারী চিকিৎসার বাইরে। সূত্র থেকে জানা যায় আমাদের দেশে মাদকাসক্তদের ৮৪ ভাগ পুরুষ ১৬ ভাগ নারী এর মধ্যে ৮০ ভাগ তরুণ, ৬০ ভাগ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, ৯৮% ভাগ ধূমপায়ী, ৫৭% যৌন অপরাধী এবং ৭% নেশা গ্রহণকারী এইচআইভি আক্রান্ত। বাংলাদেশে বর্তমানে জনপ্রিয় নেশা ইয়াবা এবং এই ইয়াবা আসক্তদের ৮০ ভাগ শিক্ষার্থী। ইয়াবা এমনই একটি ধংসাত্বক মাদক যেটা গ্রহণ করলে সাময়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলেও চরম শারীরিক ও মানসিক অবসাদ হয় এবং সেটা থেকে চরম হতাশা, নৈরাজ্য ও বিষাদে পতিত হয় শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে পারে এই ইয়াবা গ্রহণকারী। দেশে মাদকের বিস্তৃতি আজ ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে। দেশের বর্তমান আর ভবিষ্যতের সব সম্ভাবনা ধ্বংসের মূলেই মাদক। মাদকাসক্তদের শীর্ষে দেশের তরুণ সমাজ। সর্বনাশা মাদকের মরণ ছোবলে আক্রান্ত তরুণ ও যুবসমাজ আজ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে। বর্তমান সমাজে মাদক জন্ম দিচ্ছে একের পর এক অপরাধ। এছাড়া মাদক সেবনে কিডনি, স্নায়ুর জটিলতাসহ শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি হয়। পাশাপাশি বদমেজাজ, চরম অবসাদ, আত্মহত্যার প্রবণতা, অসংলগ্ন ব্যবহার, হ্যালুসিনেশন, ভুলে যাওয়া, দুর্বলচিত্ততা, হতাশা ইত্যাদি মানসিক বিকারের শিকার হয় মাদকাসক্ত ব্যক্তি। মাদক ধীরে ধীরে জীবনীশক্তি হ্রাস করে। শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে সংক্রমনের হার ২২ শতাংশ। বাংলাদেশ জনসংখ্যার ৪৯% ভাগ মানুষ বয়সে তরুণ অর্থাৎ দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১ কোটি ৫৬ লাখ। মাদক ব্যবসায়ীরা এই কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীকে মাদকের ভোক্তা হিসেবে পেতে চায়। একটি সমীক্ষায় বলা হয়, মাদকসেবী বছরে অন্তত ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে। একজন মাদকাসক্তির ব্যক্তির মাদক ব্যবহারজনিত ব্যয় বছরে ৫৬ হাজার ৫৬০ টাকা থেকে ৯০ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। ৭৫ লাখ মাদকসেবী বছরে অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে। এখন মাদকাসক্তের সংখ্যা আরও বেশি। অবধারিতভাবে ব্যয় আরও অনেক বেশি। রাজধানীসহ দেশের বড় বড় বানিজ্যিক শহরগুলোতে কিশোর অপরাধ ও গ্যাং সংস্কৃতি ভয়াবহ রূপ ধারন করেছে। একটি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে মাদকসেবীরা গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করে থাকে, হিসাব অনুযায়ী মাসে ৬০০ কোটি টাকা অন্যদিকে সারাদেশে প্রায় ৩০ লাখ মাদক ব্যবসায়ী প্রতিদিন কমপক্ষে প্রায় ২০০ কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা করে। দেশে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো মাদক বলে জানিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে বর্তমানে মরণব্যাধি ও সংক্রামকসহ নানা ধরনের রোগ ব্যাধি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো মাদক। মাদকাসক্তি- আমাদের করণীয়:আমাদের দেশে মাদকাসক্তি প্রতিরোধে অন্যতম বড় অন্তরায় হচ্ছে সন্তান বা অন্যদের মাদক গ্রহণ সম্পর্কে অভিভাবকদের বা শিক্ষা কার্যক্রমে অনেক দেরিতে জানতে পারা (গড়ে দেড় থেকে দু’বছর পর)। অথচ সন্তানের মাদক গ্রহণের ব্যপারে যত তাড়াতাড়ি জানা সম্ভব হয়-পূর্ণ আসক্তি সৃষ্টির আগেই তাকে পরিপূর্ণ সুস্থ করে তোলা ততটা সহজ হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষায় পরিবার ও স্থানীয় মুরব্বিদের ভূমিকা ছিল। তারা কিশোরদের বখাটেপনার প্রশ্রয় দিতেন না। এখন মুরব্বিদের জায়গাটি নিয়েছেন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। তারা কিশোরদের ব্যবহার করেন। ঘর থেকে শুরু করে সব পেশার সমন্বয়ে এবং রাজনীতিবিদদের মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে মাদক নির্মূলের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। তাহলেই মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। সম্ভব হবে ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা করা। মাদকসক্তি একটি রোগ। তাই মাদকাসক্তদেরকে শাষণ বা ঘৃণা অবহেলা না করে তাকে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ চিকিৎসা দিতে হবে। সে সুস্থ হয়ে আবার পরিবারে ফিরে আসবে। তাই পিতা-মাতার প্রতি অনুরোধ আপনার সন্তানকে মাদকাসক্ত হওয়ার কারনে লুকিয়ে রাখবেন না, ঘৃণা করবেন না, বরং তাকে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যান, তাকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিন। মাদকাসক্তরা সমাজের এই পরিস্থিতির স্বীকার। তাই পাপকে ঘৃণা করুন পাপীকে নয়। বর্তমানে সরকার মাদকাসক্ত তরুণদের রক্ষায় বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসু পদক্ষেপ হতে পারে- প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক ক্লাস/ওরিয়েন্টেশন (অভিভাবক এবং শিক্ষকসহ)। উদাহরণস্বরুপ, জাপানের স্কুলে শিশুদের পড়াশোনা শুরুতেই চাপ দেয়া হয় না। বরং প্রথম থেকেই তাদের শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা, ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচার শেখানো হয়। নির্দিষ্ট শ্রেণী পর্যন্ত শিশুদের কোনো বই পড়ানো হয় না। সেখানে এর পরিবর্তে, শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণকারী এবং বুদ্ধিমত্তা বাড়াতে সহায়ক কাজ করানো হয়। এই শিক্ষার মাধ্যমে ˆশশব থেকেই তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা, সময়নিষ্ঠা, পরিশ্রম এবং সহযোগিতার মানসিকতা গড়ে ওঠে। তারা বড় হয়ে হয় দায়িত্বশীল এবং সামাজিকভাবে সচেতন মানুষ, যারা সমাজের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটাও চিন্তা করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন অপরিহার্য। একই সঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক চর্চা ও খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখতে হবে এবং উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।  [লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)]

বদলি বাণিজ্য, দুর্নীতির সিন্ডিকেট এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীর সংকট

বাংলাদেশে আজ এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে দুর্নীতির অভিযোগ আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না। বরং রাষ্ট্রের বহু স্তরে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ এত ঘন ঘন সামনে আসছে যে সাধারণ মানুষের এক বড় অংশ এখন মনে করে, পুরো ব্যবস্থাটিই যেন ধীরে ধীরে দুর্নীতির জালে আটকে পড়েছে। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক আলোচনা, প্রশাসনিক অন্দরমহল, এমনকি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের কথাবার্তায়ও এখন একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে: রাষ্ট্র কি জনগণের জন্য কাজ করছে, নাকি একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবান্ধব চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে?সম্প্রতি জেলা পুলিশ সুপার ও থানার ওসি বদলিকে কেন্দ্র করে যে অভিযোগগুলো বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে, তা দেশের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জেলার শ্রেণীভেদে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের মাধ্যমে পদায়ন ও বদলি হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, ছোট জেলার ক্ষেত্রে প্রায় ২ কোটি টাকা, বি ক্যাটাগরির জেলার জন্য ৩ কোটি টাকা, প্রথম শ্রেণীর জেলার জন্য ৫ কোটি টাকা এবং বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পদায়নের ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এসব তথ্য বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল, প্রশাসনিক সূত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমের আলোচনায় উঠে এসেছে বলে প্রচার হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তারপরও জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, বদলি ও পদায়ন এখন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়, বরং এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। যেখানে পদ মানে শুধু দায়িত্ব নয়, বরং ভবিষ্যৎ আয়ের উৎস হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ফলে একটি জেলার দায়িত্ব পাওয়ার পেছনে অর্থ বিনিয়োগ হলে পরে সেই অর্থ তোলার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আশঙ্কা বাড়ছে। আরও অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু ক্ষেত্রে মামলা বাণিজ্য, মাদক সিন্ডিকেট, চোরাকারবারি, অবৈধ বালু উত্তোলন, ভূমি দখল, বাজার সিন্ডিকেট এবং বিভিন্ন অপরাধচক্রের সঙ্গে প্রশাসনের অসাধু অংশের যোগসাজশ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোথাও কোথাও সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রভাব ও অর্থের শক্তিকেই বেশি কার্যকর মনে করছে। ফলে জনগণের একটি অংশের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আইনের শাসনের বদলে অদৃশ্য সিন্ডিকেটই বাস্তব নিয়ন্ত্রণ করছে। বিভিন্ন মহলে আরও আলোচনা হচ্ছে যে, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণকারী কিছু সিন্ডিকেট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি, মূল্য বৃদ্ধি, চাঁদাবাজি এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগ বহুবার সামনে এলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে জনগণের আস্থা তৈরি করা যায়নি বলে অনেকে মনে করেন। সাধারণ মানুষ প্রতিদিন দ্রব্যমূল্যের চাপের মধ্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে, অথচ ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান জবাবদিহিতা দেখা যায় না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জনগণের একাংশ এখন প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেছে যে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভয় আগের মতো কার্যকর নেই। বরং কোথাও কোথাও এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে যে, অপরাধী চক্রের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত নয়, তারপরও এ ধরনের আলোচনা নিজেই রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার একটি বড় সংকেত। একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত তখনই আসে, যখন জনগণ বিশ্বাস হারাতে শুরু করে। কারণ আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর না হয়, যদি প্রশাসনের প্রতি আস্থা কমে যায়, যদি মানুষ মনে করে অর্থ ও ক্ষমতাই শেষ সত্য, তাহলে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শুধুই আলোচনা কি যথেষ্ট? যদি অভিযোগগুলো মিথ্যা হয়, তাহলে স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সত্য প্রকাশ করতে হবে। আর যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে ক্ষমতা, পদ বা রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেট রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া শুধু রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, এটি রাষ্ট্র রক্ষার প্রশ্ন। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রশাসন যদি জনগণের আস্থা হারায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো দেশ, পুরো সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। সত্যকে চাপা দিয়ে কখনো স্থিতিশীলতা তৈরি করা যায় না। বরং সত্য প্রকাশ, স্বাধীন গণমাধ্যম, জবাবদিহিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগই একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করে। আজ বাংলাদেশে সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি দূর পরবাসে, হাজার মাইল দূরে থেকেও যখন শুনতে পাই প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠছে, আর সেই অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দিব্যি প্রভাব, ক্ষমতা এবং পদ ব্যবহার করে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে, তখন ভেতরে এক ধরনের গভীর অস্বস্তি, ক্ষোভ এবং অনিরাপত্তা তৈরি হয়। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সিভিল প্রশাসনের কিছু অংশও যদি এই দুর্নীতিবান্ধব সিন্ডিকেট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অস্বচ্ছ প্রভাব বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে রাষ্ট্রের ভেতরের ভারসাম্যই ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে। যেখানে আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা মানুষদের বিরুদ্ধেই অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, যেখানে জবাবদিহিতার পরিবর্তে প্রভাবশালী মহলের ছায়া শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যেখানে জনগণের আস্থার জায়গাগুলো একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, সেখানে সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত কার কাছে নিরাপত্তা খুঁজবে? জনগণ কি রাষ্ট্রের কাছে নিরাপদ, নাকি রাষ্ট্রই ধীরে ধীরে কিছু ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত কাঠামোতে পরিণত হচ্ছে?একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু সেনাবাহিনী, অর্থনীতি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি হচ্ছে জনগণের বিশ্বাস। কিন্তু যখন মানুষ মনে করতে শুরু করে যে দুর্নীতি করেও পার পাওয়া যায়, ক্ষমতার ছত্রছায়ায় অপরাধ চাপা পড়ে যায়, আর সৎ মানুষ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সেই রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত বিপজ্জনকভাবে ক্ষয় হতে শুরু করে। আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, শুধু রাজনৈতিকও নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে আস্থার সংকট, নৈতিকতার সংকট এবং জবাবদিহিতার সংকট। কারণ দুর্নীতি যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করে, তখন সেটি শুধু অর্থ লুট করে না, সেটি মানুষের আশা ধ্বংস করে, ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে এবং পুরো সমাজকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। রাষ্ট্র যদি সত্যিই শক্তিশালী হতে চায়, তাহলে ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, জনগণের আস্থা রক্ষা করতে হবে। দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, প্রশাসনিক অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অপরাধী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ এবং কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া কোনো সভ্য রাষ্ট্র দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, জনগণের নীরব ক্ষোভ যখন জমতে জমতে বিস্ফোরণে রূপ নেয়, তখন কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী থাকে না। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন]

ইলিশের ঘরবাড়ি

ষাটের দশকের কথা। আমাদের ˆশশব-ˆকশোর কাল। বাংলার পাড়াগাঁয়ে বড় হয়েছি। বলতে পারি, গ্রামীণ জনপদের বিচিত্র সংস্কৃতির শাখা-প্রশাখায় বিচরণ করে এক পর্যায়ে এসে শহুরে পরিবেশ পেয়েছি এবং নাগরিক জীবনের বাঁধাধরা ছকে আবদ্ধ হয়েছি। গ্রামের বিল-ঝিল, মাঠ-ঘাট, খালের জলে ডুব দিয়েছি। দেশি জাতের মাছ ধরার বিচিত্র আনন্দস্মৃতির কথা জীবনকালে কখনও বিস্মরণের অবকাশ নেই। একসময় গ্রামের খালে বিলে নানা জাতের মাছ পাওয়া যেত। ছোট বড়ো বহু প্রজাতির মাছের সীমাহীন প্রাচুর্য ছিল। যা আজকের দিনে চিন্তা করাও অকল্পনীয়। সবই ছিল প্রাকৃতিক সুস্বাদু মিঠা পানির মাছ। তখন পর্যন্ত গ্রামবাংলার মানুষ মাছ চাষের কথা ভাবতেই শিখেনি। এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ এমন গৌরবের অভিধা কী সাধে মিলে ছিল?২.মনে পড়ে, এত সব মাছের ভিড়েও গ্রামের হাটবাজারে কদাচিৎ ইলিশের সাক্ষাৎ পাওয়া যেত। কালেভদ্রে কোনো একজন বিক্রেতা হয়তো দূর-দূরান্তর থেকে দু’চারটি ইলিশ নিয়ে বাজারে এসেছে। অমনি সহানীয় বিত্তবানদের কেউ কেউ তা কিনে নিয়েছে। বাকিরা শুধু দর্শন করেছে। কেনার সংগতি ছিল না বললেই চলে। তখনও ইলিশের দাম অন্য যেকোনো দেশি মাছের চেয়ে বেশি ছিল। কেননা ইলিশ গ্রামে কখনও সহজলভ্য ছিল না। তাই এরা সাধারণের নাগালের বাইরে ছিল। যে যা-ই বলুক, ইলিশ আসলে মাছের রাজাধিরাজ হিসেবেই এর গৌরবময় অতীত লালন এবং ধারণ করে এসেছে। এদের বংশানুক্রমিক আভিজাত্য, কৌলিন্য এবং অহংকারকে অবজ্ঞা করার সুযোগ কারো নেই। বাংলায় চিরকাল ইলিশের প্রতিদ্বন্দী কেবল ইলিশই। ৩.আমাদের ˆকশোরে ইলিশের এক রূপান্তরিত বাজারজাত প্রক্রিয়া দেখেছি। তা হলো— লবন-ছিটানো ও হালকা মশলা মাখানো ইলিশ। ইলিশ মাছকে চাক-চাক করে কেটে লবন লাগিয়ে উন্মুক্ত অবস্থায় বাজারে বিক্রি করা হতো। এটাকে লোনা ইলিশ বলা হতো। বর্ষাকালে গ্রামের হাটবাজারে সহজেই তা পাওয়া যেত। বাবার পছন্দের এক অন্যতম খাবার ছিল সেই লোনা ইলিশ। এ যেনো তাজা রূপালী ইলিশের পরিবর্তে পুরনো বাসি-পঁচা ইলিশের মনোহরা ঘ্রাণ নিয়ে মধ্যবিত্তের নাসিকাকে তৃপ্ত করা। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতন। ৪.ইলিশ বরাবরই অসূর্যস্পর্শা এক অভিমানী মৎস্য প্রজাতি। এরা স্বচ্ছ জলের বাসিন্দা। সমুদ্র বা বড় নদীর গভীর জলে বসবাসকারী এই মাছ নিজেদের স্বজন ছাড়া অন্য কারও মুখ দর্শন করতে চায় না। এরা সংঘবদ্ধ এবং গোষ্ঠীবদ্ধ। এদের কাছে অন্য জলজ প্রাণিকুল সবই যেনো অছ্যুত অস্পৃশ্য। এরা জলের ওপরে এক মিনিটের বেশি সময় বেঁচে থাকার পক্ষে নয়। এরা নিজের এমন পরাভূত অসহায় জীবনকে দেখাতে রাজি নয়। এমনকি এই সুন্দর পৃথিবীর আলো-বাতাসও এরা নিতে চায় না। এমনকি মানুষ নামের শ্রেষ্ঠ জীবকেও এরা এক নজর দেখে যেতে লজ্জাবোধ করে থাকে। ৫.ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর। এটা জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের স্লোগান। সেখানে একবার সরকারি চাকরিতে ছিলাম। পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়ার মোহনায় কিছুদিন বসবাস করে ইলিশদের কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। যদিও সেখানে ইলিশ ফেলনা কোনো জিনিস নয় বরং পরম আরাধ্য বস্তুর ন্যায়। মনের মতো ইলিশের চেহারা দেখতে চাইলে সেই চাঁদপুরেও অনেক কষ্টসাধ্য কাজ। আজকাল ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের কবলে গোটা দেশ। চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে পছন্দের আম কেনার চেয়ে রাজধানীতে যেমন সহজ এবং সুলভ, ইলিশের ক্ষেত্রে চাঁদপুরও তাই। জ্যান্ত ইলিশ মাছ ধরা সম্পর্কে একটা ঘটনার কথা বলি, দেশে তখন ১/১১’র তত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে আছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সরকারের নজরদারি জোরদার হয়েছে। ছায়া সামরিক শাসনের মতন একপ্রকার আবহ বিরাজমান। একদিন দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একজন অতিরিক্ত সচিব চাঁদপুর জেলা সফরে এসেছেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে এক নির্ধারিত মতবিনিময় সভায় যোগ দেন। দিনের কর্মসূচিতে ছিল মধ্যাহ্নভোজের পরে তিনি পদ্মা-মেঘনার সংযোগ স্থলের ভাটিতে গিয়ে জেলেদের ইলিশ মাছ ধরা সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন। এটা দাপ্তরিক নয়, তার একান্তই ব্যক্তিগত মনোবাঞ্ছা। আমার ওপর তার প্রটোকল এবং গাইড হওয়ার দায়িত্ব পড়ে। সার্কিট হাউস হতে সড়ক পথে নদীর ঘাট পর্যন্ত গিয়ে স্পিডবোটে চেপে বসি। চালকসহ তিনজন স্রোতের বিপরীতে খানিকটা ঝুঁকি নিয়ে মাঝ নদীতে গিয়ে হাজির হই। কিন্তু বিরূপ আবহাওয়া বা জোয়ার ভাটার কোনো অলৌকিক কারণে সেদিন জেলেদের জালে ইলিশ ধরা একেবারেই পড়ছিল না। আমরা জেলের নৌকার কাছাকাছি বোটখানা থামিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। অতিরিক্ত সচিবও আজ জ্যান্ত ইলিশের চেহারা না দেখে নদী ত্যাগ করবেন না। আমি রীতিমতো টেনশনে পড়ে গেলাম। এমন ভিআইপি অতিথিকে ইলিশ না দেখাতে পারলে কিসের এডিসি? খানিক পরে হঠাৎ একজন প্রবীণ জেলের জালে দুটো মাঝারি সাইজের রূপার মতন ঝকঝকে ইলিশের নৃত্য দেখে আমার মনের গহীনে আচমকা আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। অতিথির মুখেও তাৎক্ষণিক হাসির রেখা ফুটে উঠলো। তিনি জীবনে প্রথমবার একটি জীবিত ইলিশকে স্পর্শ করে দারুণ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। সেই মুহূর্তে ইলিশটি তার মুখ দর্শন করেছিল কিনা জানি না, তবে তার করতলেই এর জীবনাবসান হতে দেখেছিলাম। সেদিন খুশিতে তিনি বৃদ্ধ জেলের ভেজা হাতে একশো টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে পরম আত্মতৃপ্তি লাভ করেছিলেন। বলা বাহুল্য, সেই অতিরিক্ত সচিব জন্মসূত্রে চাঁদপুরের সন্তান ছিলেন। নিজে কখনও জীবন্ত ইলিশের গায়ে হাত বুলানোর সুযোগ পাননি, এমনটা তিনি হয়তো মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই তার আনন্দের সীমাহীন ছিল না। সেদিনই যেনো তার জীবন সার্থক হয়েছে। ৬.এদেশের ইলিশ কেবল বৈশাখ মাসের প্রথম দিনের পান্তা-ইলিশ নামেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। বৈশাখ আর ইলিশ যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে বেঁচে আছে। তবে পদ্মার ইলিশের বিচরণ এখন সারা পৃথিবীতে। সে কেবল আমাদের পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গ সফর কওে তা-ও সত্য নয়। এত সংক্ষিপ্ত সফর এদের কাছে মোটেও পছন্দের নয়। এরা মূলত দূরদেশি, দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়াতে হতে চায়। যদিও প্রতিবেশী দেশের কাছে এদেও বাধ্য হয়ে যেতে হয়। বাস্তবতা হলো— পৃথিবীর নানা দেশে এদের অবাধ প্রবেশাধিকার আছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা এদের কাছে কোনো বিষয় নয়। বলা যায়, ইলিশরা ভিসামুক্ত দুনিয়ার অধিবাসী। ভিসার জন্য এদেরকে কোনো দালাল ফরিয়ার দ্বারস্থ হতে হয় না। অ্যা¤ে^সির আরোপিত কোনো শর্তের ধার এরা ধারে না। আমাদের স্বদেশীয় লুটেরা, রপ্তানির দালালরাই এদের বিশ্বব্যাপী সফরকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করে দেয়। তখন এরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সজ্জিত কফিনের ভেতরে শুয়ে আরাম-আয়েশে রাজকীয় বেশে সাতসমুদ্র তের নদী পাড়ি দেয়। এবং আকাশ পথের দীর্ঘ সফর শেষে পরভূমে গিয়ে উপস্থিত হয়। বিশ্বব্রম্মান্ডের কোথাও এদের মানমর্যাদা ও সম্মান একবিন্দু কম নয়। বরঞ্চ এতদিন পাশের দেশের গরীব বাঙালিদের নিকট থেকে এরা অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদা পেয়ে এসেছে। আশা করা যায়, আগামী দিনগুলোতে ইলিশরাজ এদের হৃতগৌরব ফিরে পাবে। এবিষয়ে পদ্মা-মেঘনার ইলিশরা মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছে। জানা যায়, ইতোমধ্যে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে এরা স্মরণকালের বৃহৎ সলিল মিছিলে হর্ষধ্বনি দিয়েছে। আরেকটা ছোট্ট অভিজ্ঞতা। ২০০০ সালে অর্থাৎ মিলিনিয়াম বছরে জীবনে প্রথম মার্কিন মুল্লুকে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) সহকর্মীদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সেখানকার বিভিন্ন স্টেটে ঘোরাঘুরি করার এক সুবর্ণ সুযোগ হয়েছিল। সেখানেই দলের সদস্যদের কারও না কারও স্বজনের বাসায় আমন্ত্রিত হয়েছি। বিশেষ করে নিউইয়র্ক ও নিউজার্সিতে। দুটো বাসায় বেড়াতে গিয়ে অনেক কিছুর সঙ্গে ইলিশ দ্বারা আমরা সবাই আপ্যায়িত হয়েছিলাম। আপ্যায়নকারী হোস্ট বলেছিলেন, ' পদ্মার দুই কেজি ওজনের ইলিশ দেশে না পেলেও নিউইয়র্কে পাবেন’। সত্যি কথা বলতে, এমন বৃহদাকার ডিম্বজ ইলিশের টুকরো পরবর্তীতে না চাঁদপুরে না ঢাকায় কোথাও আর নজরে পড়েনি। এতে বোঝা যায়, ইলিশের প্রবীণ ও নেতৃস্থানীয় স্বগোত্রীয়রা এদের রাজসিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নিমিত্ত পাশের দেশ ভারত নয় বরঞ্চ পশ্চিমা দুনিয়াকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। ৭.ইলিশের আদি-ঠিকানা যদি বঙ্গোপসাগর বা পদ্মা-মেঘনার মতো বড় নদী হয়, স্বাভাবিকভাবেই এদের ওপর বাংলাদেশি মানুষের অধিকার সর্বাধিক। তাছাড়া এদের প্রজনন সময়ে কয়েক মাস ধরে এখানকার নদীবিধৌত গরীব মানুষগুলোই অপেক্ষার প্রহর গুণে থাকে। এটা ইলিশকুলও জানে। কিন্তু নানাবিধ সামাজিক, ভূরাজনৈতিক ও বৈশ্বিক কারণে কখনো কখনও আমাদের রূপালী চাঁদবর্ণ সুন্দরী ইলিশদের ব্যবহার করতে হয়েছে। ইতোপূর্বে এদের দিয়ে রাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপাক্ষিক কূটনৈতিক সাফল্যও লাভ করতে হয়েছে। এদিক থেকে ইলিশ কেবল আমাদের জাতীয় মাছ নয়, বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্রের উন্নয়ন এবং ঐক্যের প্রতীকও বটে। তবে অন্যরা যেভাবে যতই ভোগ করুক না কেন, দিনের শেষে ইলিশ আর বাংলাদেশ সমার্থক। কাজেই বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশির নীলাভ রেখায় ঝাঁকবেঁধে ক্ষীপ্র গতিতে ধাবমান ইলিশগুলো অনন্তকাল ধরে কেবল আমাদেরই সম্পদ হয়ে থাক। [লেখক: গল্পকার]

কৃত্রিম মোটাতাজাকরণ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি

কাজী রফিকুল ইসলামঈদুল আজহা মুসলিম বিশ্বে আত্মত্যাগ, সংযম ও মানবিকতার এক অনন্য প্রতীক। এই ঈদে কোরবানি কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি বৃহৎ প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে প্রতিবছর এই সময় ঘিরে গবাদিপশুর বাজারে যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়, তা দেশের কৃষি অর্থনীতি, পশুপালন খাত এবং জনস্বাস্থ্য—সবকিছুকেই স্পর্শ করে। কোরবানির মৌসুমে গরুর চাহিদা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ফলে খামার পর্যায়ে পশু উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর একটি চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপের সুযোগে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও খামারি দ্রুত লাভের আশায় অনৈতিক উপায় গ্রহণ করেন বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিমভাবে পশু মোটাতাজাকরণের প্রবণতা এই খাতে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কৃত্রিম মোটাতাজাকরণ: বাস্তবতা, প্রবণতা ও বৈজ্ঞানিক সতর্কতা : গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অত্যন্ত সুস্পষ্ট সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পরিচর্যা, সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা এবং ভেটেরিনারি তত্ত্বাবধান। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারে দ্রুত লাভের প্রতিযোগিতা এবং ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে কিছু অসাধু চক্র অস্বাভাবিক দ্রুত ওজন বৃদ্ধির জন্য হরমোন ও রাসায়নিক নির্ভর পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব অনিয়ন্ত্রিত চর্চায় বিভিন্ন ধরনের গ্রোথ প্রমোটিং হরমোন, কর্টিকোস্টেরয়েড, বেটা-অ্যাগোনিস্ট জাতীয় পদার্থ এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথ বারবার সতর্ক করে জানিয়েছে যে, প্রাণীতে অযৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার শুধু পশুর স্বাস্থ্য নয়, বরং মানবস্বাস্থ্যের জন্যও দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষত WHO-এর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স রিপোর্ট অনুযায়ী, পশু খাতে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে ব্যাকটেরিয়া ধীরে ধীরে ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণকেও প্রাণঘাতী করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত হরমোন ব্যবহারের ফলে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করা অবশিষ্টাংশ এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে যা বৈশ্বিকভাবে একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ।  পশুর দেহে জৈবিক পরিবর্তন ও অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয় :কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশুর ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে দ্রুত ওজন বৃদ্ধি দেখা গেলেও এর অন্তর্নিহিত জৈবিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গবেষণায় দেখা যায়, স্টেরয়েড বা হরমোন প্রয়োগের ফলে পশুর শরীরে অস্বাভাবিক লিপিড ও তরল জমা ঘটে, যার কারণে শরীর ফুলে ওঠে কিন্তু পেশির স্বাভাবিক ঘনত্ব তৈরি হয় না। এই প্রক্রিয়ার ফলে পেশি টিস্যু দুর্বল ও নরম হয়ে পড়ে, লিভার ও কিডনির ওপর অতিরিক্ত বিপাকীয় চাপ সৃষ্টি হয়, হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক পাম্পিং ক্ষমতা ব্যাহত হয়, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের শারীরিক চাপ পশুর দেহে মাল্টি-অর্গান ডিসফাংশন সিনড্রোম (গঙউঝ)-এর ঝুঁকি বাড়ায়, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণীর অকাল মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এছাড়া পশুর স্বাভাবিক আচরণগত পরিবর্তনও দেখা যায় চাঞ্চল্য কমে যাওয়া, পরিবেশের প্রতি উদাসীনতা এবং খাদ্য গ্রহণে অনিয়ম। এসব লক্ষণ প্রমাণ করে যে, বাহ্যিকভাবে স্বাস্থ্যবান মনে হলেও অভ্যন্তরীণভাবে পশুটি গুরুতর শারীরিক সংকটে থাকতে পারে। জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি: বৈশ্বিক গবেষণা ও বাস্তবতা : মাংস মানবদেহের অন্যতম প্রধান প্রাণিজ প্রোটিন উৎস হলেও এর গুণগত মান সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশুর মাংসে সাধারণত অতিরিক্ত পানি ও ফ্যাটের অনুপাত বৃদ্ধি পায়।বিপাকীয় অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে, অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের চিহ্ন থেকে যেতে পারে, বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্য শৃঙ্খলের যেকোনো পর্যায়ে রাসায়নিক অনিয়ম ঘটলে তা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার শরীরে প্রভাব ফেলে। এর ফলে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতালিভার ও কিডনি ফাংশনের ধীর অবনতি, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি, অন্ত্র ও হজমতন্ত্রে জটিলতা, ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে যাওয়া, বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যা শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং এটি একটি পাবলিক হেলথ ক্রাইসিস-এর সম্ভাব্য ইঙ্গিত বহন করে। কারণ খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এই ঝুঁকি সমগ্র জনগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রাকৃতিক পশুপালন: টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি : বর্তমান বৈশ্বিক কৃষি প্রবণতা ধীরে ধীরে টেকসই ও নৈতিক পশুপালনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশেও অনেক সচেতন খামারি এখন বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক পদ্ধতি অনুসরণ শুরু করেছেন, যা একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। প্রাকৃতিক পশুপালনের মূল উপাদানগুলো হলো সুষম ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা প্রদান, পর্যাপ্ত চলাফেরা ও স্ট্রেসমুক্ত পরিবেশ, পরিচ্ছন্ন খামার ও বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থাপনাভেটেরিনারি চিকিৎসকের নিয়মিত তত্ত্বাবধান, এই পদ্ধতিতে পশু ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, যার ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুস্থ থাকে এবং মাংসের গুণগত মানও উন্নত হয়। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিকভাবে পালিত পশুর মাংসে প্রোটিনের গুণগত মান বেশি থাকে, ফ্যাটের ভারসাম্য স্বাভাবিক থাকে, রাসায়নিক অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি প্রায় অনুপস্থিত থাকে, স্বাদ ও টেক্সচার তুলনামূলকভাবে উন্নত হয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই, কারণ রোগ কম হয় এবং উৎপাদন স্থিতিশীল থাকে। সাধারণ ক্রেতার সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব সমস্যা : বাংলাদেশের সাধারণ ক্রেতাদের বড় একটি অংশের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্বাভাবিকভাবে পালিত পশু এবং কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশুর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন। বাহ্যিকভাবে দুটি পশুই প্রায় একই রকম দেখাতে পারে। তবে কিছু সাধারণ পর্যবেক্ষণ সহায়ক হতে পারে। যেমন সুস্থ পশু সাধারণত সক্রিয় থাকে এবং পরিবেশে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখায়, খাবারের প্রতি আগ্রহ বেশি থাকে, চোখ ও নাক স্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার থাকে, চামড়ায় স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা থাকে। অন্যদিকে কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশু অনেক সময় নিস্তেজ, কম চলাফেরা করা এবং পরিবেশের প্রতি উদাসীন আচরণ করতে পারে। তবে শুধুমাত্র এসব লক্ষণ দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, ক্রেতাদের উচিত নির্ভরযোগ্য খামার, পরিচিত উৎস বা পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কোরবানির পশু নির্বাচন করা। বাজার ব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় তদারকির প্রয়োজনীয়তা :কোরবানির পশুর বাজার একটি বিশাল অর্থনৈতিক খাত, যেখানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু এই বাজারে যদি অনিয়ম ও ভেজাল প্রবেশ করে, তবে তা পুরো ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি নিয়মিত ভেটেরিনারি মনিটরিং, খামার পর্যায়ে ওষুধ ব্যবহারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, বাজারে পশু স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা, অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম, এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং ভোক্তা অধিকার সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নৈতিকতা ও দায়িত্বশীল খামার ব্যবস্থাপনা : পশুপালন শুধু ব্যবসা নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও বটে। একটি জীবকে খাদ্য উৎপাদনের জন্য লালন-পালন করার ক্ষেত্রে মানবিকতা ও বিজ্ঞান উভয়ের সমš^য় থাকা জরুরি। অল্প সময়ে অধিক লাভের জন্য পশুর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এমন পদ্ধতি গ্রহণ করা কেবল অনৈতিকই নয়, দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো শিল্পের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। বরং খামারিদের উচিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা, ভেটেরিনারি সাপোর্ট নিশ্চিত করা, টেকসই উৎপাদন মডেল গ্রহণ করা, কোরবানির সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা, কোরবানির মূল শিক্ষা ত্যাগ, সংযম ও মানবিকতার মধ্যে নিহিত। এই শিক্ষা তখনই পূর্ণতা পায় যখন কোরবানির পশু নির্বাচন থেকে শুরু করে মাংস বিতরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় ন্যায়, সততা ও দায়িত্বশীলতা বজায় থাকে। অসুস্থ বা অনৈতিকভাবে উৎপাদিত পশু কোরবানি কেবল ধর্মীয় উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। পরিশেষে, একটি সুস্থ ভবিষ্যতের আহ্বান: কোরবানির ঈদ আমাদের শুধু ধর্মীয় অনুশাসনের শিক্ষা দেয় না, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের বার্তাও বহন করে। পশু উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যদি সততা, বিজ্ঞান ও নৈতিকতা নিশ্চিত করা যায়, তবে কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে। একটি সুস্থ জাতি গঠনের জন্য নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা অপরিহার্য। আর সেই নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে দায়িত্বশীল পশুপালন, কঠোর নজরদারি এবং সচেতন ভোক্তা আচরণের মাধ্যমে। অতএব, কোরবানির আনন্দ যেন শুধু উৎসবেই সীমাবদ্ধ না থাকে তা যেন একটি নিরাপদ, নৈতিক ও সুস্থ সমাজ গঠনের পথে আমাদের সবাইকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে। [লেখক: ভাইস-চ্যান্সেলর, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়]

গণিতভীতি বনাম গণিতপ্রীতি

 সমস্যা, অনুসন্ধান, যুক্তি এবং সমাধান— এই চারের সমন্বিত রূপ গণিত। গণিতকে বলা হয় বিজ্ঞানের রাজা। বলা হয়, এই মহাবিশ্বের ভাষা হলো গণিত। গণিতের মাধ্যমেই একের পর এক রহস্য উদ্ঘাটন ও সমাধান করেছেন বিজ্ঞানীরা, যার ধারায় বিশ্ব আজ আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে। অথচ এশিয়া, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় গণিতের প্রতি ভীতি প্রবল। যেখানে গণিত খোলে মহাবিশ্বের কঠিন রহস্যের জট, সেই জট খোলার প্রাথমিক হাতেখড়িতেই আতঙ্কগ্রস্ত বাংলাদেশসহ এশিয়ার বহু দেশের শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতকে ভয়ের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে। শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, তাদের অভিভাবকরাও গণিতে প্রাপ্ত নম্বরের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এছাড়া সমাজেও প্রচলিত রয়েছে গণিত সবাই পারে না, এটি অনেক কঠিন বিষয়। এই ভয় ও মানসিকতা থেকেই বন্ধ হয়ে যায় গণিত জয়ের স্বপ্ন। ফলে অনেকেই তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে পিছিয়ে পড়েন। কিন্তু গণিত কি আসলেই ভয়ের কিছু? নাকি এর পেছনে রয়েছে পাঠ্যক্রমের অযৌক্তিক জটিলতা, আর পাঠদানের গতানুগতিক পদ্ধতি?গণিতের প্রতি ভয় সাধারণ কোনো বিষয় মনে হলেও গবেষণা বলছে, গণিতভীতি এক ধরনের মানসিক বাধা। গণিতভীতি বলতে এমন একটি মানসিক অবস্থাকে বোঝানো হয়, যাতে শিক্ষার্থী গণিতের কথা শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, গণিতের সমস্যা সমাধান করতে ভয় পায় এবং গণিতের প্রতি নিজের সক্ষমতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে। এটি সরাসরি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। অনেকের মাঝে সমস্যা সমাধানের স্বাভাবিক বুদ্ধি তৈরিতে বাধা তৈরি করে। শুধু তাই নয়, গণিতভীতি একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ‘অ্যাক্টা সাইকোলোজিকা’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতভীতি তাদের সামগ্রিক ফলাফলকে উল্লেখযোগ্যভাবে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। এছাড়া গবেষণায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা এসএসসি ও এইচএসসিতে দুর্বল ফল করেছিল, তাদের ৬৫.৭ শতাংশই ভুগছিল তীব্র গণিতভীতিতে। সেই সঙ্গে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এই ভীতির শিকার হয় প্রায় ৫৩ শতাংশ বেশি।২০২৪ সালে ৮৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪৮৬ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর চালানো একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, নেতিবাচক অতীত অভিজ্ঞতা ও শিক্ষকের অপর্যাপ্ত সমর্থন সরাসরি শিক্ষার্থীর নিজের কার্যক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। মূলত গণিতের ভিত্তিটাই থাকে দুর্বল। ‘ব্রিং লার্নিং টু লাইফ’ শীর্ষক এক ইউনিসেফ প্রতিবেদনে একটি তথ্য উঠে আসে— প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠে ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণীর অর্ধেক প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। অর্থাৎ ভিত্তি মজবুত না থাকায় তারা কেবল মুখস্থ করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল।আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হলো ‘মুখস্থ নির্ভরতা’। গণিতভীতি শুধু পাঠ্যক্রমের সমস্যা নয়, শিক্ষকের ভূমিকাও যথেষ্ট। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মাঝে শিক্ষকের কাছে প্রশ্ন করা ও শেখার মানসিকতা তৈরি হতে পারছে না। এর জন্য শিক্ষকের পাঠদান প্রক্রিয়া ও তার আচরণ অনেকাংশে দায়ী। শ্রেণীর অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে শুধু সময় পার করে অন্যমনস্কতা ও অবহেলায়। এছাড়া তারা পরীক্ষায় ভুল করলেও সেই ভুল শুধরে দেওয়ার সংস্কৃতি শিক্ষকের মাঝে নেই বললেই চলে, আর শিক্ষার্থীরাও সেটা জানতে আগ্রহ বোধ করে না। মূল সংকট তৈরি হচ্ছে পাঠদান প্রক্রিয়ায়। শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের কাছে গণিতকে সহজভাবে উপস্থাপনের দক্ষতার অভাবে ভুগছেন; এর জন্য প্রয়োজন ছিল যথেষ্ট প্রশিক্ষণ প্রদান। ফলে শিক্ষার্থীরা গণিতকে জটিল ও একঘেয়ে মনে করে। অন্যদিকে নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নকারীরা অভিযোগ করেন যে, বর্তমান শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নযোগ্য নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উচ্চ পর্যায়ের গণিত বাদ দিয়ে এবং বারবার সংস্কারের নামে অর্ধশিক্ষিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর ফলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে পারছে না।পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন করা জরুরি। গণিত শুধু সমাধানের পাশাপাশি বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা ও গল্প, খেলার মাধ্যমে গণিতের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য বাধ্যতামূলক শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বইয়ের পরিমার্জন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা করতে হবে। গণিতের ক্লাসে ভুল করা মানে আরও ভালো করে শেখা— এই ধারণা প্রচলন করতে হবে। এজন্য শিক্ষক ও অভিভাবককে শিক্ষার্থীর ভুল শুধরে দিতে উদ্যোগী হতে হবে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মতো ‘ভুল বিশ্লেষণ ক্লাস’ চালু করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থী নির্দ্বিধায় বলতে পারে, ‘আমি এটা কেন ভুল করলাম?’ যে শিক্ষার্থী এক ক্লাসে থাকা অবস্থায় গণিতের প্রতি পারদর্শিতা অর্জনের আগে তাকে কোনোমতে পাস করিয়ে পরবর্তী ক্লাসে উত্তরণের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে বইয়ের মতো হুবহু অঙ্ক পরীক্ষার প্রশ্নে দেয়া কমিয়ে আনতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করার পদ্ধতি থেকে বের হতে বাধ্য হয়। [লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

কারাগারে চিন্তার স্বাধীনতা

 মানুষ কারাগারে যায় শাস্তি প্রাপ্ত হয়ে। শাস্তির চারটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো—১. প্রতিশোধ: এটি সবচেয়ে পুরনো ধারণা। এখানে বলা হয়, অপরাধী তার কৃতকর্মের জন্য সমান বা উপযুক্ত মাত্রার কষ্ট ভোগ করবে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিশোধের অনুভূতি আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা। ২. প্রতিরোধ: এই উদ্দেশে অপরাধ ও তার শাস্তি অন্য লোকেদের জন্য একটি ভয়ঙ্কর উদাহরণ হিসেবে কাজ করে। শাস্তির কঠোরতা দেখে সাধারণ মানুষ অপরাধ করতে ভয় পায়। এটিকে আবার দুই ভাগেও ভাগ করা যায়—সাধারণ প্রতিরোধ: সমাজের সবাই যেন অপরাধ না করে। বিশেষ প্রতিরোধ: নির্দিষ্ট অপরাধী যেন পুনরায় অপরাধ না করে। ৩. অপসারণ: এখানে মূল লক্ষ্য অপরাধীকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা, যাতে সে তখন আর কোনো ক্ষতি করতে না পারে। জেলখানায় বন্দী করা বা মৃত্যুদণ্ড এর উদাহরণ। ৪. সংশোধন: এটি হচ্ছে আধুনিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। শাস্তির মাধ্যমে অপরাধীকে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ করে দিয়ে উপযোগী নাগরিক হিসেবে সমাজে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের জেলখানায় বই পড়ার অনুমতি দেয়াটাও সংশোধন প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। বাংলাদেশের কারাগার ব্যবস্থা তাত্ত্বিকভাবে ‘সংশোধন’-এর ওপরে গুরুত্ব দিলেও বাস্তবে আসলে কতটা কাজ করে তা ভেবে দেখার বিষয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হলো নেলুফার ইয়াসমিন-এর ÔRecidivism of Prisoners in Bangladesh: Trends and CausesÕ (২০২২)। (ইয়াসমিন ও মৌ, ২০২২)-এর মতে,’ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে, ভারতের বন্দীদের পুনরায় অপরাধের হার (Recidivism Rate) ২০১৩ সালে ৭.২% থেকে ২০১৪ সালে বেড়ে ৭.৮% হয় (রাইজ ফর ইন্ডিয়া, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)। পাকিস্তানে বন্দীদের এই হার ২০১২ সালে ছিল ২৬.৩% এবং ২০১৩ সালে ২৬.৮% (দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ২০১৪)। বাংলাদেশে কারাবন্দী জনসংখ্যার প্রবণতা হলো: ২০১২ সালে ৪৪%, ২০১৪ সালে ৪২% এবং ২০১৬ সালে ৪৫%। মোট জনসংখ্যার তুলনায় কারাবন্দীর হার ২০০৩ সালে ছিল ৬১.১%, ২০১০ সালে ৭৩.২%, ২০১৫ সালে ৭৩.৮% এবং ২০১৭ সালে ৭৭.৭% (ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফ, ডিসেম্বর ২০১৭)। সুতরাং, বাংলাদেশে বন্দীর হার দিন দিন বাড়ছে, যা আমাদের জন্য একটি সমস্যা এবং আমাদের দেশের জন্য একটি জ্বলন্ত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।’একাডেমিক জার্নালগুলোতে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায় যে, পুনর্বাসনমূলক বিচার পুনরায় অপরাধের হার কার্যকরভাবে কমাতে পারে। এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আসা যাক। কারাগারে চিন্তার স্বাধীনতার বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারাগারে বন্দীদের চিন্তার স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার, যা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে এর প্রয়োগ সীমিত কিনা তা খুঁজে দেখা উচিত। কারাগারে জ্ঞানচর্চার বিধান থাকলেও এর মান নির্ভর করে বন্দীর শ্রেণীর ওপর। প্রথম শ্রেণীর বন্দী: কাশিমপুর কারাগারের মতো জেলগুলোতে তাদের জন্য আলাদা লাইব্রেরি রয়েছে। সাধারণ বন্দী: লাইব্রেরি থাকলেও সংগ্রহ সীমিত। বেশিরভাগ সময়ই বইগুলো পুরনো, মানসম্মত নয়। এছাড়া চিন্তার স্বাধীনতা ও সেই স্বাধীন চিন্তাকে বিকাশের ও প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা ঠিক কতটা আছে তা খুঁজে দেখা দরকার। বর্তমান বিশ্বে, মুক্ত ইন্টারনেট ও অও তো দূরের কথা, বেশিরভাগ জেলখানাতেই মৌলিক ডিজিটাল অ্যাক্সেস আজও সীমিত। তবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অস্ট্রিয়ার কিছু কারাগার নিয়ন্ত্রিত ও প্রশিক্ষণের উদ্দেশে অও ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যুক্তরাষ্ট্র (ম্যাসাচুসেটস): ইন্টারনেট ছাড়াই কঠোর নিয়ন্ত্রিত ট্যাবলেটে চ্যাটবট ও অও রিজিউম বিল্ডার ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে, যা কর্মসংস্থানের জন্য সহায়ক। চীন (গুয়াংসি ও গুয়াংজু): জেল কর্তৃপক্ষ সীমিত পরিবেশে VR রিলিজ ট্রেনিং (গাড়ি ও ট্রেনের টিকেট কেনা শেখানো) চালু করেছে। অস্ট্রিয়া (স্টার্ন প্রকল্প): ২০২৫-২৭ সালের এই প্রকল্পের আওতায় নিয়ন্ত্রিত ভিডিও কল ও নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে অ্যাক্সেস দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে কারাগারগুলোতে বন্দীদের জন্য সীমিত মাত্রায় হলেও ডিজিটাল অ্যাক্সেস দেয়া কি সময়ের দাবি নয়? ভেবে দেখার বিষয়। অও চ্যাটবট বন্দীর শিক্ষাগত যোগ্যতার স্তর অনুযায়ী ব্যক্তিগত টিউটর হিসেবে কাজ করতে পারে, যা বন্দীর পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া তো উপায় নেই। আর বর্তমান পৃথিবীতে অও কে ছাড়া থাকার অর্থই হলো পৃথিবীর গতি থেকে পিছিয়ে পড়া। আর কারাবন্দীদের পজিটিভ এনগেইজমেন্ট ও জরুরি। আপনি তাকে শারীরিক ভাবে বন্দী করতে পারেন কিন্তু মানসিক ভাবে তো নয়। এবং বন্দীদের মানসিক প্রশান্তি ও বিকাশ বিঘ্নিত হলে শাস্তি প্রদানের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। [লেখক: প্রভাষক (দর্শন), বকশীগঞ্জ সরকারি কিয়ামত উল্লাহ কলেজ, জামালপুর]

সংবিধান সংশোধনের রাজনীতি

সংসদে ৭ মার্চের ভাষণ সংবিধান থেকে বাদ দেয়া কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এই বিষয়ে আরেকটি কলাম লেখার ইচ্ছে আছে। আজ শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু বিধান বাতিল করার তাৎপর্য তুলে ধরব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অনেক ‘আইনি প্রতারণা’ করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ সরকার ৫৪টি পরিবর্তন এনেছিল, এই ৫৪টির মধ্যে ৫ আগস্টের পর হাইকোর্ট বাতিল করেছে ৬টি, বর্তমান সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর বাকিগুলো ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এখন সংসদ বাকি বিধানগুলো বাতিল বা সংশোধন করবে, অথবা হুবুহু রেখে দেবে। তবে এক্ষেত্রে আরেকটি জটিলতা আছে, পঞ্চদশ সংশোধনীর সম্পূর্ণ বাতিল চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়েছে। হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোট পুনর্বহাল করেছে, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলকারীকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে, সংশোধন অযোগ্য সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলী সংশ্লিষ্ট ৭ ক এবং ৭ খ অনুচ্ছেদ এবং নিম্ন আদালতকে ক্ষমতা অর্পন সম্পর্কিত বিধান বাতিল করেছে।তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং পুনর্বহাল দুটোই করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। জনগণের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় ২০১১ সনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। অথচ ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর ২০ নভে¤^র, ২০২৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায়কে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বিবেচনায় অবৈধ ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ এক রায়ে বলা হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ, আরেক রায়ে বলা হয়ে অবৈধ ঘোষিত রায় ত্রুটিপূর্ণ ও অবৈধ। সর্বশেষ রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে পুনরুজ্জীবিত হয়ে গেল। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকার মিলেমিশে ১৮ মাস প্রশাসনকে ভাগবাটোয়ারা করে দেশ শাসন ও নির্বাচন করেছে। নিজেদের পছন্দমত লোক দিয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশন ও সরকার দ্বারা অনুষ্ঠিত নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অপরিহার্যতা কেন তা বোধগম্য হয় না।পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা আওয়ামী লীগ গণভোট বাতিল করেছিল, হাইকোর্টের রায়ে তা পুনর্বহাল হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গণভোট হয়েছে, কিন্তু বিএনপি গণভোটের রায় মানছে না। না মানার এই শক্তি বিএনপি পেয়েছে জনগণের কাছ থেকেই। কারণ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে জনগণই। সংসদ এবং গণভোট দুটোই সরকারের কাজের বৈধতা দেয়, রাষ্ট্রের জন্য আইন পাস করে। সংসদের কাজ সম্পাদিত হয় জনগণের প্রতিনিধির মাধ্যমে, আর গণভোটের মাধ্যমে আইন পাসকরণে জনগণ সরাসরি অংশগ্রহণ করে থাকে। গণভোট প্রক্রিয়ায় ভোটারদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে আইন পাসের ব্যবস্থা থাকলে সংসদ রাখার প্রয়োজন থাকে না। ভিন্ন বিবেচনায়, সংসদ থাকলে গণভোটেরও প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ দুটোর একটি থাকলেই হয়। অভিজ্ঞতা বলে সংসদ লাগবে, কারণ ঘন ঘন গণভোট আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। দ্বিতীয়ত অধিকাংশ ভোটারের আইন বিষয়ক জ্ঞান নেই। কিছুদিন আগে যে বিষয়ের ওপর গণভোট হয়েছে তার আগামাথা কেউ বোঝেনি, ভোট দাতারা অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছে। তাই সংসদ ও গণভোট দুটোর প্রয়োগ যুক্তিসঙ্গত বিবেচিত না হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে বাদ দিয়েছিল।পঞ্চদশ সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ সরকার ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়ে একটা গোঁজামিল তৈরি করেছিল। কারণ সংবিধানের প্রস্তাবনায় রাখা হয়েছে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’। ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে কোন একটি বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান সঙ্গতিপূর্ণ নয়, পরষ্পর বিরোধী। রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকে না, ধর্ম হয় মানুষের। ধর্ম নাযিল হয়েছে মানুষের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য নয়। ধর্ম হচ্ছে বিশ্বাস, সম্পর্ক সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে, সেই ধর্মকে রাষ্ট্রীয়করণ অয়ৌক্তিক। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্রের কোন ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকবে না। কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্রের নাগরিকরা ধর্মনিরপেক্ষ নয়, প্রত্যেক নাগরিক তার নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করার অধিকার রাখে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোন একটি ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া স্ববিরোধী এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নাগরিকের সমঅধিকার না থাকলে তা কখনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা হতে পারে না। তাই গোঁজামিলের ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে থাকা-না থাকা সমান।জোর করে ক্ষমতা দখল রোধে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে যে পরিবর্তন এনেছিল তাও অপ্রয়োজনীয়। এই পরিবর্তনে বলা হয়েছিল, কোন ব্যক্তির ক্ষমতাবলে অসংবিধানিকভাবে সংবিধান বাতিল, পরিবর্তন করলে বা পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র করলে তার অপরাধ হবে দেশদ্রোহিতার এবং শাস্তি হবে মৃত্যদণ্ড বা যাবজ্জীবন। পাকিস্তানের সংবিধান থেকে সম্ভবত এই পরিবর্তন নকল করা হয়েছে। পাকিস্তানের সংবিধানে একই বিধান থাকা সত্বেও পাকিস্তানে বারবার সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। পাকিস্তানের জেনারেল জিয়াউল হক জোর করে শাসন ক্ষমতা দখল করেছিলেন, কিন্তু তার কোন শাস্তি হয়নি, শাস্তি হয়েছিল এই আইনের প্রণেতা প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর, তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয়েছে। অস্ত্রের মুখে ক্ষমতা দখলকারী পাকিস্তানের জেনারেল পারভেজ মোশাররফের কোন বিচার হয়নি, বিচার হয়নি বাংলাদেশের হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের, বরং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যখন এই আইন পাস হয় তখন তিনি সংসদেই ছিলেন। আওয়ামী লীগের পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা সংবিধানে দণ্ডবিধি অন্তর্ভুক্ত করে অবৈধ ক্ষমতা দখল রোধ করা যায়নি, বরং আইন প্রণেতা আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। তাই এই বিধান রাখা বা বাতিল করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা আওয়ামী লীগ সংসদে নারী আসন ৪৫ থেকে ৫০টিতে উন্নীত করেছিল। মনে হচ্ছে এই পরিবর্তন বাতিল হবে না, বাতিল করার ইচ্ছে থাকলে বর্তমান সংসদে ৫০ জন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতেন না। সংরক্ষিত আসন নিয়ে কত কথা, শফিক রেহমানের সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এ এই নারী সাংসদদের ‘সংসদের শোভা ত্রিশ সেট অলংকার’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল। ১৯৮৬ সনে এরশাদ সাহেবের আমলে নারীদের জন্য ৩০টি আসন সংরক্ষণ রাখা হয়। দেশের নারীরাও তাদের জন্য এভাবে আসন সংরক্ষিত রাখার বিপক্ষে, তারা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হতে চায়, তারা চায় তাদের জন্য দেশব্যাপী ১শ’টি আসন নির্ধারণ করা হোক, তারা দলের মনোনয়ন নিয়ে বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। কিন্তু এই পরিবর্তন অদ্যাবধি হয়নি।রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশর জনগণের বিভাজন বিপরীতধর্মী, এই বিপরীত মনোভাব সংবিধান সংশোধন, পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। এক পক্ষ ক্ষমতায় এসে নিজের মনোভাব অনুযায়ী সংবিধানে যা যা সংযোজন-বিয়োজন করে, আরেক পক্ষ ক্ষমতায় এসে তা তা বাতিল করে সংবিধানে নিজেদের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটায়। তাই সংবিধানের কাটাছেঁড়া এভাবে চলতে থাকলে এক সময় সংবিধানের আদি রূপ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

ভিডিও আরও দেখুন

বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের প্রস্তুতি সূচি ঘোষণা

আসন্ন নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ঘাম ঝরাচ্ছে অংশগ্রহণকারী দলগুলো। মাঠের লড়াই শুরুর আগে নিজেদের ঝালিয়ে নিতে আইসিসি আগামী ৬ থেকে ১০ জুন পর্যন্ত প্রস্তুতি ম্যাচের সময়সূচি ঘোষণা করেছে। এই সূচিতে বাংলাদেশের মেয়েরাও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলার সুযোগ পাচ্ছে।প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য এই বিশ্বকাপের মূল আসরে নামার আগে ৬ জুন প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। লাফবরায় স্থানীয় সময় বিকেল ৩টায় নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে নিগার সুলতানা জ্যোতির দল। এরপর ৯ জুন একই ভেন্যুতে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের দ্বিতীয় ও শেষ প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।আইসিসির আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি ম্যাচের বাইরেও টাইগ্রেসদের জন্য থাকছে বাড়তি সুযোগ। ইংল্যান্ড সফরের আগে স্কটল্যান্ডে একটি বিশেষ প্রস্তুতি সিরিজ খেলবে বাংলাদেশ। সেখানে স্কটল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে নিজেদের শক্তিমত্তা যাচাই করার সুযোগ পাবেন জ্যোতি-নাহিদা-মারুফারা।এবারের নারী বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলবে 'এ' গ্রুপে। যেখানে তাদের লড়তে হবে বিশ্বসেরা সব প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গী হিসেবে আছে: ভারত, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নেদারল্যান্ডস।  

বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের প্রস্তুতি সূচি ঘোষণা
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৬৭ জন