সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
নানামুখী সংকটে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল

নানামুখী সংকটে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল

বৃষ্টিতে নিচতলার ফ্লোরে জমে পানি নেই পর্যাপ্ত ওষুধ ও সরঞ্জাম আছে কুকুর-বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত শত শত রোগী রোগীর চাপে দিশেহারা চিকিৎসক-নার্সরা চরম দুর্ভোগে সাধারণ মানুষরাজধানীর মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একেবারে নাকে ডগায় অবস্থিত দেশের একমাত্র সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি এখন নিজেই যেন রোগাক্রান্ত। জরাজীর্ণ ভবন, প্রকট জনবল সংকট আর উপচে পড়া রোগীর ভিড়ে এখানে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে।প্রতিদিন কুকুর-বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত কয়েকশ রোগীর পাশাপাশি হাম ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় বাড়ছে জনভোগান্তি।জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকির চিকিৎসাসেবাস্বাধীনতার ঠিক পরেই নির্মিত হাসপাতালটির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়লে ১৫০ জনেরও বেশি রোগীকে ভর্তি রাখতে হয়। হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার থেকে দেড় হাজার রোগী ভিড় করেন। কুকুর ও বিড়ালের কামড়, জলবসন্ত, জলাতঙ্ক ও এইডস আক্রান্ত রোগীরা এখানে চিকিৎসার জন্য আসেন।সরেজমিনে দেখা গেছে, সামান্য বৃষ্টিতেই পুরনো এই ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে এবং নিচে পানি জমে থাকে। মাত্র একটি লিফট থাকায় রোগী ও স্বজনদের ওঠানামায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। লিফটটি প্রায়ই নষ্ট থাকে, ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিতে হয়।তীব্র জনবল সংকট ও নার্সদের দিয়ে টিকিট কাটানোহাসপাতালটিতে বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ২৩ জন, যেখানে প্রয়োজন অন্তত ৪০ জন। আইসিইউতে ১০ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ৪ জন। নার্সিং স্টাফের চিত্র আরও ভয়াবহ; ৭০ জন নার্স দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে যেখানে প্রয়োজন ১০০ জনেরও বেশি। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকট এতটাই তীব্র যে, নার্সদের দিয়ে টিকিট কাউন্টার পরিচালনা করতে হচ্ছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনবল সংকটের কারণে শিফট অনুযায়ী ডিউটি করাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে। চিকিৎসক ও কর্মীরা নিজেরাও সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে কাজ করছেন। অথচ তাদের জন্য বরাদ্দ ঝুঁকিভাতা মাত্র ৭৫০ টাকা, যা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত নগণ্য।কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে আক্রান্তদের ভিড়হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, সারা দেশে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে ভ্যাকসিনের জন্য ছুটছেন। মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ নতুন রোগীকে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে, যা মাঝে মাঝে দেড় হাজার ছাড়িয়ে যায়। গত এক বছরে এক লাখেরও বেশি রোগীকে এই সেবা দেওয়া হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হাসপাতালে শুধু হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি ছিলেন ৬১ জন।হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আরিফুল বাসার পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, হামের রোগী ছাড়াও নতুন করে কুকুর ও বিড়ালের কামড়ের রোগী বাড়ছে। ওই সব রোগীকে নিয়মিত ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। গত কিছু দিন ধরে সারা বাংলাদেশ মিলে প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কুকুর ও বিড়ালের কামড়ের রোগীকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। জলাতঙ্ক রোগীও ভর্তি করা হয়। গত বছর এক লাখের বেশি রোগীকে আমরা ভ্যাকসিন দিয়েছি।নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশাদীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের ছোঁয়া না লাগা এই হাসপাতালটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। আধুনিকায়ন, শয্যা সংখ্যা বাড়ানো এবং আইসিইউ সুবিধা পর্যাপ্ত না করলে আগামীতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।হাসপাতালের একজন সিনিয়র চিকিৎসক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের অদূরেই আমাদের হাসপাতাল। সমস্যাগুলো হয়তো উনারা দেখবেন। এখন নতুন সরকার আসছে, ডাক্তার সংকটসহ অন্যান্য সমস্যা তারা গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন বলে আমরা আশা করছি। নানা প্রতিকূলতা আর সংকটের পাহাড় থাকলেও চিকিৎসকরা সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে জরুরি ভিত্তিতে আধুনিকায়ন ও জনবল নিয়োগ না করলে এই বিশেষায়িত হাসপাতালটি তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।
৩ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

হয় দেবতা না হয় দানব!

জাতি হিসেবে আমরা আবেগী। সুড়ঙ্গ শেষের ক্ষীণ আলোক রেখা দেখেই মনে করি, এই বুঝি আলোঝলমল মুক্ত আকাশের নিচে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু সে পর্যন্ত পৌঁছাতে যে কত খানাখন্দ, বাধা বিপত্তি অতিক্রম করতে হবে তা আর বিবেচনায় থাকে না। এই যেমন জুলাই আন্দোলনের সফলতার প্রথম পর্যায়ে ছাত্রনেতৃত্বের ভুলগুলোকে সমালোচনার চোখে দেখা হয়নি। বরং সবখানেই প্রশংসার জোয়ারে তাদেরকে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের পক্ষে এমনভাবে বয়ান তৈরি করা হয়েছে, যেন তারা সব ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বয়ানটি পুরোপুরি বদলে গেছে। নেতৃত্বের একটা অংশের মনে গোপন এজেন্ডা থাকলেও সারা দেশে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রদের সামনে রাজনৈতিক দিশা না থাকায় খুব তাড়াতাড়ি তারা দিশাহীন হয়ে পড়েন। নানা গোষ্ঠী তাদের অনেককে ব্যবহার করতে শুরু করে। বদলিবাণিজ্য, তদবিরুবাণিজ্য, মব সহিংসতা থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি- ধীরে ধীরে এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে অনেকে জড়িয়ে পড়তে থাকেন। যারা একদিন শ্লোগান তুলেছিলেন ‘দেশটা কারো বাপের নয়’ তাদের কারো কারো বক্তব্য শুনে ও কার্যক্রম দেখে মনে হয়েছিল দেশটা একান্তই তাদের বাপের। সমন্বয়ক নামটি কোথাও ভীতি সৃষ্টি আবার কোথাও উপহাসে পরিণত হয়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় চলে যায় যে, কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক কমিটি ছাড়া সারাদেশের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করতে হয়। জুলাই অভ্যুত্থান দানবীয় মবতন্ত্রের পকেটস্থ হয়ে পড়ে। জুলাই আন্দোলনের পরে ৮ আগস্ট এক অলৌকিক বিভা নিয়ে ইউনূস যখন দেশে ফিরলেন তখন তো তিনি আলোর দিশারী! যিনি বাংলাদেশকে দুর্নীতি এবং কুশাসনের গহ্বর থেকে বের করে এক রূপকথার দেশে নিয়ে যেতে এসেছেন। মনে পড়ে পাকিস্তান আমলে সেই কৈশোরের দিনগুলোতে রাস্তার মোড়ে জেনারেল আইউব খানের ছবি সহ বিল বোর্ডে লেখা দেখতাম ‘ দি সেভিয়্যার হ্যাজ কাম টু সেইভ দি কান্ট্রি’। এস.এস.সি পরীক্ষার ইংরেজি প্রশ্নপত্রের রচনা অংশে ‘মাই ফেভারিট বুক’ কমন পড়ে যাওয়ায় শিক্ষকের শিখিয়ে দেয়ার মতো আইউব খানের আত্মজীবনীমূলক বই ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টারস’ রচনা লিখলাম। অথচ কৈশোর শেষ হওয়ার আগেই চোখের সামনে দেখলাম দেবতা বেশে আসা বন্ধু শুধু শত্রু নয় দানবের বেশেই বিদায় নিলেন। বিমানবন্দরে নেমেই ইউনূস বললেন, ‘কোনো রকম প্রতিহিংসামূলক কাজ করা যাবে না। আমার ওপর যদি আস্থা এবং বিশ্বাস রাখেন, তা হলে এটা নিশ্চিত করতে হবে। কারও ওপরে কোনো রকম হামলা করা যাবে না। বিশৃঙ্খলা করা যাবে না। আমাদের সারা বাংলাদেশ একটা পরিবার। যারা বিপথে গিয়েছিলেন তাদেরও সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার কথা মানতে হবে। যদি না মানেন তবে এখানে আমার প্রয়োজন নেই, আমাকে বিদায় দেন।’ একেবারে দেবতাসম চরিত্র!সেই তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে শপথ গ্রহণের চার দিন পরে একটি সাংবাদিক বৈঠক করে বললেন, ‘আমি ছাত্রদের বলেছি, আপনাদের সম্মান করি। আর আপনারা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন বলেই এই দায়িত্ব আমি গ্রহণ করেছি।’ এর পরেই ইউনূস বলেন, ‘অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এসেছে। দানবী বিদায় নিয়েছে দেশ থেকে।’ এই শেষ বাক্যটি উচ্চারণ করে ইউনূস ঘৃণার আগুন ছড়িয়ে দিলেন সবখানে, সারাদেশে। দেশ জুড়ে নতুন গতি পেলো মবউল্লম্ফন আর প্রতিপক্ষ ও কাল্পনিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা নির্যাতন এবং অবশেষে খুনের মামলা দিয়ে আটক। গণঅভ্যুত্থান বন্দী হয়ে পড়ে দানবীয় মব সন্ত্রাস আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কাছে। যেন জুলুম জবরদস্তি প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের মধ্যেই নিহিত ছিল জুলাইয়ের অভিপ্রায়, যেন এভাবেই ন্যায্যতা ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়!ইউনূস ঘোষিত ‘দানবী’ তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কিন্তু তার সম্পর্ক একটা সময় পর্যন্ত ভালোই ছিলো। ১৯৯৭ সালের ২-৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্রঋত সম্মেলনে যৌথ সভাপতি হিসেবে ইউনূসই শেখ হাসিনাকে মার্কিন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিন্টনের সঙ্গে একত্রে দায়িত্ব দেন। হাসিনা তার বক্তব্যে "অধ্যাপক ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের অসামান্য কাজের" প্রশংসা করেন। তিনি বলেন "গ্রামীণ ব্যাংকের সাফল্য দরিদ্রদের ক্ষুদ্রঋত প্রদানে নিযুক্ত ব্যাংকগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে আশাবাদ তৈরি করেছে"। ইউনূসও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এবং নারী ক্ষমতায়নে তাঁর অবদানের প্রশংসা করে বক্তব্য দেন। একটি দেশের কোনো নাগরিকের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি শুধু প্রাপকের গর্বের বিষয় নয়, তাঁর দেশের জন্যও গৌরবের। কিন্তু ২০০৬ সালের নোবেলে আমাদের কপাল পুড়লো! দেশে বিতর্ক শুরু হলো অর্থনীতিতে অবদান রেখে শান্তিতে নোবেল কেনো? এদিকে নোবেল লরিয়টও শুধু নোবেল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকলেন না। ২০০৬ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্েয তিনি বছরের প্রথমার্ধ থেকেই দেশের প্রথিতযশা কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে সৎ প্রার্থীদের নির্বাচিত করার এক কর্মসূচি নিয়ে জেলায় জেলায় নাগরিক সভা শুরু করেন। এরই মাঝে আসে এক এগারো যাকে ডিপ স্টেইট কাঠামোরই বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে গুরুতর অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতার ফলে সৃষ্ট নৈরাজ্য এবং শাসকদলের ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার নানামুখী প্রচেষ্টার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাষ্ট্রের স্থায়ী কাঠামো তথা সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থা প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে নিয়ে নেয়। এক এগারোর সরকার বা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ডিপ স্টেইটের ভূমিকার একটি স্থানীয় সংস্করণ হিসেবে অভিহিত করা যায়। এই পরিবর্তনে পরাশক্তিগুলোরও এক ধরনের মৌন বা প্রত্যক্ষ সমর্থন বিদ্যমান ছিল। আবার সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এমন ভাবমূর্তি সৃষ্টি করে মনে হয় যেন দেবতার আবির্ভাব হয়েছে। এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে এক এগারো কিন্তু মানুষের মাঝে প্রাথমিকভাবে স্বস্তি নিয়ে আসায় জনসমর্থনও পেয়েছিলো। এরই মাঝে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুহাম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। মজার বিষয় হচ্ছে ‘ দিল্লির জিনিজর’ থেকে দেশকে মুক্ত করার অবিরাম যোদ্ধা ইউনূস এ ঘোষণার আগে জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে ভারত সফরে যান। সে সফরে অধ্যাপক ইউনূস ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এবং ৩১ জানুয়ারি দিল্লীতে এক সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, দেশের পরিস্থিতি ‘বাধ্য করলে’ তিনি রাজনীতিতে ‘যোগ দেবেন’। দিল্লিতে বসে রাজনীতিতে যোগ দেয়ার সময় তিনি সম্ভবত শ্লোগানটি ভুলে গিয়েছিলেন, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’!দেশে ফিরে ২০০৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক ইউনূস পত্রিকার মাধ্যমে দেশের মানুষের উদ্দেশে খোলা চিঠি দিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল কীভাবে গঠন করা যায়, কিভাবে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচনে মনোনীত করা যায় - এসব বিষয় নিয়ে তিনি মানুষের মতামত এবং পরামর্শ জানতে চান। আর এক চিঠিতে তিনি বলেন তার দলের মূল শ্লোগান হবে এগিয়ে চলো বাংলাদেশ। আর দলের নীতি ও আদর্শ হবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সুশাসন এবং দুর্নীতি ও দলীয়করণ মুক্ত প্রশাসন। পাঠক লক্ষ্য করুন দেড় যুগ আগে ইউনূসের দল ‘নাগরিক জনশক্তি’র নীতি ও আদর্শে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। দেবতাই বটে!অধ্যাপক ইউনূস যখন রাজনীতিতে আসার প্রক্রিয়া শুরু করেন তখন সেটির কড়া সমালোচনা করেছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, ‘যারা রাজনীতিতে নতুন আসে তারা ভয়ঙ্কর হয়। তাদের তৎপরতা সন্দেহ করার মতো। তারা জাতির ভালো করার পরিবর্তে আরও বেশি খারাপ করে।’ ইসলামী ঐক্যজোট নেতা ফজলুল হক আমিনী আরও কঠোর মন্তব্য করে বলেন, ‘ড. ইউনুস দেশ, জাতি ও ইসলামের শত্রু।’ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন হবার পরে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে জোরেশোরে চেষ্টা করেছিল। অধ্যাপক ইউনূস সেনা সমর্থিত সরকারের সমর্থন নিয়ে সে পরিস্থিতিরই সুযোগ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এপ্রিল মাসের শেষ দিকে এসে মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে না। সে পরিস্থিতিতে ইউনূস দল ঘোষণার তিন মাস পরেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ফকরুদ্দিনের সঙ্গে এক বৈঠকের পরে ঘোষণা করেন রাজনৈতিক দল করা তার কাজ নয়। ২০০৭ সালে যেটা তার কাজ না বলেছিলেন বা ব্যর্থ হয়েছিলেন সে কাজে তিনি সফল হলেন দেড় যুগ পরে এসে ইসলামপন্থীদের সহযোগিতায়। তবে এর আগে ইসলামপন্থীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিলো না। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋত কার্যক্রমে ব্যাপক সংখ্যায় নারীদের অংশগ্রহণ ইসলাম পন্থীরা বা তার বর্তমান মিত্র জামাত কখনোই ভালো চোখে দেখে নাই। দেশের বহু স্থানে একসময় জামাত- শিবিরের কর্মীরা গ্রামীন ব্যাংকের শাখা অফিস আক্রমণ করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে, সদস্যা নারীদের নিগ্রহ করেছে। ২০১২ সালে ইউনূস উগান্ডায় সমকামীদের বিচারের সমালোচনা করে অন্য তিন নোবেলজয়ীর সঙ্গে একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। এর জন্যও ইসলাম পন্থীরা ইউনূসকে ‘ধর্মত্যাগী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তার বিরুদ্ধে দেশে সভা সমাবেশও করে। কিন্তু আজ দু’জনে দুজনার!ইউনূসের ২০০৭ সালের ‘নাগরিক শক্তি’ দলের আদর্শের মাঝে ছিলো ধর্ম নিরপেক্ষতা, আর আজ তার নতুন দল ‘নাগরিক পার্টি‘ সংবিধান থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতা ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার লড়াই করছে। নাগরিক শক্তির আদর্শের মাঝে ছিলো মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। আর আজ নাগরিক পার্টি দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামাতের কোলেই শুধু নয়; জামাত তাদের চালিকা শক্তি। এ যেন ২০০৭ এর ‘দেবতা’ ২০২৫ এ এসে ‘দানব’। ইউনূস তার প্রতিহিংসা চরিতার্থে সফল হয়েছেন, কিন্তু তাঁর চেয়ে বেশি সফল হয়েছে উগ্র ধর্মান্ধ শক্তি। দুনিয়ার কোনো দেশে নিজ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছে এমন কোনো দল জামাতের মতো ক্ষমতার কাছাকাছি নেই। গণতান্ত্রিক দেশে মানুষ যদি ইসলামপন্থীদের এমনকি ধর্মীয় উগ্রবাদীদেরও সমর্থন করে তাদের সঙ্গে রাজনীতি ও যুক্তির লড়াই চলবে। তারা সমাজে বিভাজন চাপিয়ে দিতে চাইলে তখন প্রতিরোধও কর্তব্য হয়ে দাঁড়াবে। সর্বাত্মক প্রতিরোধই হবে সেই সময়ের ডাক। কিন্তু দেশের জন্মযুদ্ধের বিরোধিতা শুধু নয় হানাদার বাহিনীর মন্ত্রীসভায় জায়গা নিয়ে, তাদের অক্সিলিয়ারি ফোর্স হিসেবে বাঙালি নিধন, সংখ্যালঘু নিধন, মুক্তিযোদ্ধা নিধন, নারী ধর্ষন ও খুনের অপরাধী দল তাদের দলীয় ফোরামে প্রস্তাব নিয়ে এবং প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা না করে দেশের রাজনৈতিক বন্দোবস্তে নৈতিক ও আইনগতভাবে জায়গা নিতে পারে না— তা সে দল সংগঠনগত ও আর্থিকভাবে যত শক্তিশালীই হোক না কেন। আর যুদ্ধ অপরাধী দল হিসেবে জামায়াত ইসলামকে আজ অব্দি কিভাবে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার বাইরে আছে সে জবাব বর্তমান অতীত সব শাসকদেরকেই দিতে হবে। ইউনূস ক্ষমতায় থেকে ব্যবসায়ী (তার ভাষায় সামাজিক ব্যবসা) হিসাবেও সফল হয়েছেন। অনেকে বলেন, ইউনূস গ্রামীণের নামে ৪,০০০ কোটি টাকার একচেটিয়া ব্যবসা করিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের কাছে গ্রামীণের বকেয়া ছিল ৬৬৬ কোটি টাকা। ইউনূস ক্ষমতায় এসেই সেটা প্রথমে মওকুব করিয়েছেন। গত তিন-চার মাসের মধ্যে গ্রামীণের নামেই তিন-চারটি লাইসেন্স নিয়েছেন। গ্রামীণ জনশক্তি রপ্তানি, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। অর্থাৎ, তার সরকারই তার সংস্থাকে বিবিধ সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে। কেমন নীতিবান নোবেল লরিয়েট! আর বিদায়ের আগে গোপন চুক্তি করে তিনি দেশটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দিয়ে গেলেন মার্কিনী স্বার্থের কাছে। এমন মার্কিনী বংশবদ বানিয়ে গেছেন যে আজ ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্বর হামলা, আগ্রাসন ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কোনো সাহসী প্রতিবাদ বিবৃতি পর্যন্ত দিতে পারে না। জামাত সহ ইসলাম পছন্দ দলগুলোও মিনমিন ভাষায় বিবৃতি দিচ্ছে। কোনো দেশ থেকে তেল আমদানি করার আগে বাংলাদেশ সরকারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুমতি চেয়ে আবেদনপত্র পাঠাতে হয়। হায়রে দ্বিতীয় স্বাধীনতা! আর এবার নাকি আমরা সভ্য হলাম!তিনি ব্যবসা করছেন, করুন। কিন্তু একটা প্রজন্মকে বিশেষত তরুণদের একটা অংশকে তিনি যে পথে (জামাতের পথে) নিয়ে গেলেন এবং তাদেরকে বিনয়ী হওয়ার বিপরীতে উদ্ধত করে গেলেন— দেশের জন্য এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কি হতে পারে? দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতে ছাত্রদের একাংশের মাঝে এমন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যে, তারা আর শিক্ষকদের সালাম দেয় না; শিক্ষককেই নতজানু হয়ে ঐ সব ছাত্রকে সালাম দিতে হয়। শিক্ষক হেনস্তার যে রেকর্ড দেশে হয়েছে তা কলংকের মানে ‘গ্রীনিচ বুক অব রেকর্ডস’ এ জায়গা পেতে পারে। শিক্ষার ভবিষ্যৎ কি?এক যুগেরও বেশি সময়কাল গণতন্ত্রকে বন্দী করে রেখে, নানা কৌশলে নির্বাচন থেকে বিরোধী দলকে বাইরে রেখে, নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বা অলিগার্কদের প্রভাব এবং আমলাতন্ত্র ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকাকে প্রাধান্য দিয়ে, সামান্য কোটা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে হত্যাযজ্ঞ সংঘঠিত করে ‘ডিপ স্টেইটকে’ রেজিম চেঞ্জের সুযোগ করে দিয়ে শেখ হাসিনা বিদায় হলেন। এ পরিস্থিতি সৃষ্টির দায় তো প্রধানত তাকেই নিতে হবে। আওয়ামী লীগ বিহীন একটি নির্বাচন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। বিএনপি এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। তাদের ক্ষমতায় আরোহনের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ এখনও পার হয় নি। তাই ডিপ স্টেইটের বাঁধন তারা ছিন্ন করতে পারছেন কিনা সে বিষয়ে এত তাড়াতাড়ি মন্তব্য নাই বা করলাম। বিএনপিকে এটা বিবেচনায় রাখতে হবে তাদের দলকে সমর্থন করেন না এমন বিপুলসংখ্যক ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন এই আশা নিয়ে যে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এবার দেশ পরিচালনা করবেন। দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী শক্তির কাছে এবার অন্তত নত হবেন না। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আগের মতো একতরফা বয়ান না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেই সামরিক নেতৃত্বকে মর্যাদা দেয়ার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তারা নেবেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাকে স্বীকৃতি দেয়া যা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন সেটা বিএনপি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হলে বিভাজনের শক্তি ও উগ্রপন্থা পরাজিত হবে। দেশের মানুষের চাহিদা কিন্তু বেশি নয়। দলবাজির বিপরীতে দেশের মানুষ চায় দলনিরপেক্ষ প্রশাসন, দখলবাজদের হাত থেকে স্বস্তি। চায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, কথা বলার, মত প্রকাশের ও সংগঠন করার মুক্ত পরিবেশ। ধনিক শ্রেণীর তেলা মাথায় বেশি বেশি তেল দিয়ে উপচেপড়া তেলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কোনোরকমে দিন গুজরান করবে— মানুষ এই অমানবিক আর্থিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। মানুষ চায় ন্যায্য কর্ম সংস্থান, আইনের শাসন, সুশাসন। বাংলাদেশের মানুষ আর দেবতা দেখতে চায় না, দানব তো নয়ই![ লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা](লেখকের নিজস্ব মত)

রাতারগুল: সিলেটে একখণ্ড সুন্দরবন

বাংলাদেশের পর্যটক শিল্পের প্রকৃতি কন্যা বলা হয় সিলেট জেলাকে। সিলেট জেলার নৈসর্গিক সৌন্দর্য অনন্য এবং বাংলাদেশের অন্য জেলা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সিলেট বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান শহর ও ঐতিহাসিক শহর হিসাবেও পরিচিত। সিলেট জেলা হচ্ছে ৩৬০ আউলিয়ার পবিত্র ও পূন্যভূমি। সিলেট জেলা পাহাড়, নদী আর শীতল পানির ঝরনার এক নিসর্গ ভূমি। এ জেলার পর্যটন কেন্দ্র জাফলং, তামাবিল, ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর, বিছানা কান্দি, রাতারগুল পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে। বিশেষ করে রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্র অন্য পর্যটন কেন্দ্র থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই পর্যটন কেন্দ্র যেন সিলেটে একখণ্ড সুন্দর বন। সিলেট জেলার রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্র পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে তার পিঠাজল ও জলের মধ্যে বেড়ে ওঠা বনভূমি। ৯৭২ একর আয়তনের এ বনভূমি পুরোটাই পানি দ্বারা আবৃত। বিশেষ করে বর্ষাকালে বনের ভিতর নৌকায় করে পর্যটকরা পরিভ্রমণ করতে পারে। রাতারগুল জলাবন বাংলাদেশের একমাত্র ও বিশ্বের ২২টি মিঠাপানির সোয়াম্প ফরেস্টের অন্যতম একটি, যা সিলেটের গোয়াইনঘাটে অবস্থিত। এটি ‘সিলেটের সুন্দরবন’ বা ‘বাংলাদেশের আমাজন’ নামে পরিচিত। বর্ষাকালে এই বন ২০-৩০ ফুট পানির নিচে ডুবে থাকে। এই বনের মূল সৌন্দর্য দেখার সেরা সময় জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। রাতারগুল বন সিলেট জেলা থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মোট আয়তন ৩,৩২৫.৬১ একর, যার মধ্যে ৫০৪ একর মূল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। হিজল, করচ, বরুণ, কদম, জালিবেত ইত্যাদি জলসহিষ্ণু চিরহরিৎ বৃক্ষ এখানের মূল আকর্ষণ। এখানে ২৫ প্রজাতির জলসহিষ্ণু গাছ, পাখি, মাছ ও নানা প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। সিলেটের অন্য পর্যটন কেন্দ্র থেকে রাতারগুলের আকর্ষণ একটু বেশি। এটা দুটো কারণে হয়। এক. সিলেট শহর থেকে অল্প দূরত্বে মাত্র ২৭ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাটের ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। সিএনজি কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে যেতে সময় লাগে মাত্র ৪০ মিনিট থেকে ৫০ মিনিট। দুই হিজল করচ কদম বৃক্ষের ভিতর দিয়ে নৌকা নিয়ে ঘুরে ঘুরে পুরো বন দেখা যায়। শুষ্ক মৌসুমে নৌকা নিয়ে বনে প্রবেশ করে হেঁটে হেঁটে পুরো বন পরিদর্শন করা যায়। এই বিষয়টি পর্যটকদের মাঝে এডভেঞ্চার সৃষ্টি করে। গত ২৩ মার্চ তারিখ আমি সপরিবারে সিলেটের রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট ভ্রমণে গিয়েছিলাম। রাতারগুল যাওয়ার পর বনের ভিতর ঘুরে দেখার জন্য একটি নৌকা ভাড়া করি। নৌকা ভাড়া দিতে হয়েছে ৮০০ টাকা। নৌকা ঘাটেই বাঁধা ছিল। আমরা বনে যাওয়ার জন্য নৌকায় উঠে বসি। আমাদেরকে একজন তরুণ মাঝি বৈঠা চালিয়ে নৌকা নিয়ে এগিয়ে যায় জলাবনের দিকে। সরু চিকন খাল ধরে নৌকা এগিয়ে যায়। আমাদের আগে পিছনে এই রকম আরও নৌকা এগিয়ে চলে বন দেখার জন্য। ইতোমধ্যে অনেকেই আবার বন দেখে ফিরেও আসে। যতই আমরা বনের ভিতরে প্রবেশ করি ততই আমাদের রোমাঞ্চকর অনুভূতি বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে আমরা মূল পয়েন্টে চলে আসি। চারদিকে গাছপালা বেষ্টিত মাঝখানে উন্মুক্ত জলরাশি রোমাঞ্চকর অনুভূতিকে আরও প্রাঞ্জল করে তোলে। আমরা মুগ্ধ হই সবাই। মাঝি আমাদেরকে বনের মাঝখানের একটা জায়গায় নামিয়ে দেয়। আমরা ঘুরে ঘুরে বনের গাছগুলো পর্যবেক্ষণ করি আর পুলকিত হই। রাতারগুল জলাবন ঘুরে দেখার মুহুর্তগুলো মোবাইলে ক্যামেরাবন্দী করি। আমাদেরকে যে মাঝি নৌকায় করে বন ঘুরিয়ে দেখায় তার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি রাতারগুল জলাবন পরিদর্শনের জন্য ইজারা ঘাটে ১৩৫টি নৌকা ব্যবহার করা হয়। নৌকাগুলো দুই ধরনের। এক ধরনের নৌকা একটু বড় সাইজ যা আটজন বহন করতে পারে। আরেক ধরনের নৌকা একটু ছোট সাইজ যা চারজন বহন করতে পারে। মাঝি আরও জানায়- প্রতি টুরিস্টকে এই বনে প্রবেশের জন্য ৯৭.৫০ টাকা দিতে হয়। আর নৌকা প্রতি পে করতে হয় ১১৫ টাকা। অর্থাৎ একটা নৌকা বনে প্রবেশ করলেই ১১৫ টাকা দিতে হয়। দুই বছর আগে রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্রে গাড়ি পার্কিংসহ একটি গণশৌচাগার নির্মাণ করা হয়। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তবে চৌমৌহনী বাজার থেকে রাতারগুল নৌকার ঘাট পর্যন্ত রাস্তাটি সরু এবং খানাখন্দে ভরা। পর্যটকদের জন্য বহনকারী পরিবহনের চলাচল কষ্ট হয়। শুষ্ক মৌসুমে চলাচল কিছুটা সহজ হলেও বর্ষাকালে পর্যটকদের কষ্ট বেশি হয়। রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্রে শুষ্ক মৌসুমের চেয়ে বর্ষাকালে পর্যটক অনেক বেশি আসে। এর কারণ হচ্ছে- বর্ষাকালে পুরো বন জলমগ্ন হয়। বৃক্ষগুলো ২০ ফুট পানির ওপরে ভেসে থাকে। পুরো বন নৌকা করে গাছগাছালির ফাঁকে ঘুরে ঘুরে দেখা যায়। বনের মাঝখানে একটা ওয়াচ-টাওয়ার ছিল যেটা ১০ বছর আগে নির্মাণ করা হয়। এই ওয়াচটাওয়ারের উপরে উঠে পর্যটকরা পুরো বন দেখতে পারতো। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে- নির্মাণ ত্রুটির কারণে দুই বছর আগে ওয়াচ-টাওয়ারটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ওয়াচ-টাওয়ার ব্যবহার করতে না পারায় পর্যটকরা ওপর থেকে পুরো জলাবন দেখতে বঞ্চিত হচ্ছে। কেউ কেউ ওয়াচ-টাওয়ার নষ্ট থাকায় ক্ষোভও প্রকাশ করছে। রাতারগুল সিলেটের এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় পর্যটন কেন্দ্র। সিলেট ভ্রমণ পিপাসুদের অন্যতম পছন্দের জায়গা হচ্ছে এই রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট। একে সিলেটের সুন্দরবন নামেও ডাকা হয়। রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্রকে আরও আকর্ষনীয় করার জন্য প্রবেশ পথ সংস্কার ও প্রশস্ত করা প্রয়োজন। প্রয়োজন ওয়াচ-টাওয়ারটি পুনর্নির্মাণ করা। [লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

অর্জনের বিসর্জন ও শিশুদের সুরক্ষায় কেন ব্যর্থ হলো আমাদের স্বাস্থ্য খাত

হাম মানবজাতির প্রাচীনতম এবং অন্যতম প্রাণঘাতী রোগগুলোর মধ্যে একটি। এর ইতিহাস অন্তত সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত প্রসারিত, যখন বিশ্বখ্যাত পারস্য চিকিৎসক রাজেস— যার পুরো নাম আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাজি তার যুগান্তকারী চিকিৎসাগ্রন্থে হামকে গুটিবসন্ত থেকে প্রথমবার সম্পূর্ণ আলাদাভাবে চিহ্নিত করেন এবং রোগটির নিখুঁত ক্লিনিক্যাল বর্ণনা দেন। তিনি এর বৈশিষ্ট্যময় ফুসকুড়ি, তীব্র জ্বর এবং জনগোষ্ঠীর মধ্যে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতার কথা সবিস্তারে উল্লেখ করেছিলেন। তার পরে এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে হাম অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ কেড়েছে। কোনো টিকা আবিষ্কারের আগে, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হতো কেবল এই একটি রোগে। এই রোগের জন্য দায়ী জীবাণু হলো মিজেলস মর্বিলিভাইরাস— প্যারামিক্সোভিরিডি পরিবারের একটি একক-সূত্রী আরএনএ ভাইরাস। বেশিরভাগ মহামারি বিশেষজ্ঞের মতে, এটি মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে এমন সংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোঁয়াচে। এর মূল প্রজনন সংখ্যা বা বেসিক রিপ্রোডাকশন নম্বর ১২-১৮ এর মধ্যে। তুলনার জন্য বলা যায়, সাধারণ মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার মাত্র ১.৫। একজন অটিকাহীন ব্যক্তি একটি ঘরে প্রবেশ করলে আঠারোজন পর্যন্ত মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। সংক্রমিত ব্যক্তি ঘর ছেড়ে যাওয়ার দুই ঘণ্টা পর পর্যন্তও বায়ুতে এই ভাইরাস ভাসমান থাকে। এর কোনো মধ্যবর্তী প্রাণী বাহক নেই, কোনো কীটপতঙ্গ বাহক নেই, কোনো খাদ্যসূত্র নেই—শুধু মানুষের নিঃশ্বাসই এর ছড়িয়ে পড়ার জন্য যথেষ্ট। হামের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের বিপ্লব শুরু হয়েছিল ১৯৫৪ সালে, যখন মার্কিন ভাইরোলজিস্ট জন ফ্র্যাংকলিন এন্ডার্স এবং তার সহকর্মী থমাস চামার্স পিবলস বোস্টনের একটি স্কুলের ১১ বছর বয়সী ডেভিড এডমন্সটন নামের এক ছাত্রের কাছ থেকে সফলভাবে হামের ভাইরাস আলাদা করতে সক্ষম হন। জন ফ্র্যাংকলিন এন্ডার্স পোলিও ভাইরাসে তার কাজের জন্য ইতোমধ্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন এবং সমান নিষ্ঠায় তিনি হামকেও মোকাবিলা করেছিলেন। এই ‘এডমন্সটন স্ট্রেইন’ পরবর্তী সময়ে আবিষ্কৃত সমস্ত হামের টিকার প্রধান জৈবিক ভিত্তি হয়ে ওঠে। এরপর মার্কিন অণুজীববিজ্ঞানী মরিস হিলম্যান ১৯৬৮ সালে এন্ডার্সের কাজের ওপর ভিত্তি করে আরও উন্নত ‘মোরেটেন স্ট্রেইন’ তৈরি করেন—যা আধুনিক হামের টিকার মূল মেরুদণ্ড এবং আজও শিশুদের সার্বিক সুরক্ষা দিয়ে চলেছে। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত এমএমআর টিকা (হাম, মাম্পস ও রুবেলা একত্রিত) চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটি হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যবহৃত মিজেলস-রুবেলা টিকা এই মহান বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকারেরই প্রত্যক্ষ উত্তরসূরি। একটি ডোজ প্রায় ৯৩ শতাংশ সুরক্ষা দেয়; দুটি ডোজে তা বেড়ে ৯৭ শতাংশ হয়। দুটি টিকার ডোজ, একটি কোল্ড চেইন এবং একজন নিষ্ঠাবান স্বাস্থ্যকর্মী—এটুকুই একটি শিশু ও অন্ধত্ব, বধিরতা, মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি এবং মৃত্যুর মাঝখানে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হাম এখানে থাকার কথা ছিল না। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের মধ্যেই হামের স্থানীয় সংক্রমণ সম্পূর্ণ নির্মূল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল—ঠিক সেই বছরেই ভাইরাসটি ফিরে এসে তার শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করছে। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে চালু হওয়া বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই ন্যায়সঙ্গতভাবেই দেশের অন্যতম শীর্ষ এবং গর্বিত জনস্বাস্থ্য অর্জনগুলোর মধ্যে গণ্য হয়। ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশে, যেখানে দারিদ্র্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ ছিল নিরন্তর, সেখানে ইপিআই লাখ লাখ শিশুর কাছে জীবন রক্ষাকারী টিকা পৌঁছে দিয়েছে। পোলিও নির্মূল হয়েছে, ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং হামের প্রকোপ বছরের পর বছর কমেছে। ২০২০-এর দশকের শুরুতে দেশটি হাম নির্মূলের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ২০২৫ সালে হামের প্রকোপ ছিল মাত্র প্রতি দশ লক্ষে ০.৭২ জন। ২০২৬ সালে সেটি শূন্যে নেমে আসার কথা ছিল। পরিবর্তে এটি এখন প্রতি দশ লক্ষে ১৬.৮-এ বিস্ফোরিত হয়েছে এবং সংক্রমণ আরও বাড়ছে। তবে ফাটলগুলো সবসময়ই ছিল, শিরোনামের জমকালো সংখ্যার আড়ালে যা অনেকটা লুকিয়ে ছিল। ২০২৩ সালের কভারেজ মূল্যায়ন জরিপে দেখা গেছে যে, ১২ মাস বয়সের মধ্যে সম্পূর্ণ বৈধ টিকাদান কভারেজ ২০১৯ সালের ৮৩.৯ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৮১.৬ শতাংশে নেমে গেছে। ঢাকা বিভাগে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৭৬.৫ শতাংশ। দেশজুড়ে শহরাঞ্চলে কভারেজ ছিল মাত্র ৭৯ শতাংশ—যা গ্রামাঞ্চলের চেয়েও কম। এটি আংশিকভাবে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, ক্ষণস্থায়ী বস্তিবাসী এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় নগর দরিদ্রদের অদৃশ্যতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। হামের মতো চরম সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি বা জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক সুরক্ষা বজায় রাখতে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ প্রয়োজন। বাংলাদেশ সেই মাত্রার ধারেকাছেও ছিল না, এবং এই বিপজ্জনক ব্যবধানটি বছরের পর বছর কেবল প্রসারিতই হচ্ছিল। বাংলাদেশ প্রতি চার বছর অন্তর বিশেষ জাতীয় হাম টিকাদান অভিযান পরিচালনা করে, যাতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া শিশুদের সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আনা যায়। সর্বশেষ এই ধরনের বড় অভিযান হয়েছিল ২০২০ সালে। পরবর্তীটি হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের জুনে। কিন্তু সেটি আর হয়নি। তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল এবং ক্ষমতা পরিবর্তনের চরম বিশৃঙ্খলায় নির্ধারিত টিকাদান অভিযানটি আড়ালে চুপচাপ স্থগিত হয়ে যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভেতরের আমলাতান্ত্রিক পক্ষাঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কর্মকর্তারা সরাসরি ক্রয় করবেন নাকি ইউনিসেফ-এর মাধ্যমে তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কে মেতে রইলেন। মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং দাতা সংস্থাগুলো শুধু আর্থিক প্রক্রিয়ার ফাইলের মারপ্যাঁচে আবর্তিত হতে থাকলে, অথচ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভ্যাকসিনের মজুত তখন প্রায় শেষ হয়ে আসছিল। যখন কেউ জরুরিভিত্তিতে কাজ করার কথা ভাবল, ততক্ষণে অটিকাহীন শিশুদের একটি বড় প্রজন্ম তৈরি হয়ে গিয়েছিল—যেন একটি বারুদে ঠাসা গুদাম, যা শুধু একটি আগুনের ফুলকির অপেক্ষায় ছিল। সেই ফুলকি এলো ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে, যখন ঢাকা ও রাজশাহী অঞ্চলে হামের রোগী আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে শুরু করল। ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে পড়লো। ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক রোগ হাসপাতাল এই সংকটের মর্মান্তিক কেন্দ্রে পরিণত হলো। শিশুরা আসছিল টাঙ্গাইল, পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে—কেউ কেউ ছয় মাসেরও কম বয়সী, যে বয়সে বাংলাদেশে আগে হামের সংক্রমণ ছিল অত্যন্ত বিরল। রোগ প্রতিরোধের এই বিরাট গ্যাপের কারণে মায়ের শরীর থেকে নবজাতকের শরীরে যাওয়া প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের ডাটা অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট। এই প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশে নিশ্চিত হামের রোগীদের ৬৯ শতাংশই হলো দুই বছরের কম বয়সী দুগ্ধপোষ্য শিশু। পূর্ণ ৩৪ শতাংশের বয়স নয় মাসের কম—যারা স্ট্যান্ডার্ড টিকাদান সময়সূচি অনুযায়ী হামের প্রথম ডোজের জন্যও এখনও যোগ্য হয়ে ওঠেনি। প্রায় সব ভর্তি রোগীই ছিল অটিকাহীন। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ হাম পুষ্টির ঘাটতির সঙ্গে একটি ভয়ঙ্কর মরণচক্রে মিলিত হয়: ভাইরাসটি শরীর থেকে ভিটামিন এ শোষণ করে নেয়, যা নিজেই মানুষের রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমের জন্য অপরিহার্য। ফলে একটি তীব্র দুর্বলতার সর্পিল বা স্পাইরাল তৈরি হয়। নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস, কানের গুরুতর সংক্রমণ ও তীব্র ডায়রিয়ার মতো জটিলতা হামে বিরল নয়—এগুলো অপুষ্ট ও অটিকাহীন শিশুদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্বাভাবিক পরিণতি এবং এভাবেই একটি প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বলদের এই ভাইরাস মেরে ফেলছে। মার্চের শেষ নাগাদ হাম বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৬টিতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। ঢাকা বিভাগে জাতীয় মোটের সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ নিশ্চিত রোগী পাওয়া গেছে, এরপর রাজশাহীতে ২০ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে প্রায় ১৪ শতাংশ। রাজশাহী অঞ্চল একটি বিশেষ সংকটবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো তথ্যের অমিল। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো ইতোমধ্যেই প্রায় ১২টি শিশুর মৃত্যুর খবর দিয়েছে, যেখানে জাতীয় অফিশিয়াল প্রতিবেদনে মাত্র একটি মৃত্যু স্বীকার করা হয়েছে। এই তথ্যের বৈষম্য ও সমন্বয়হীনতা প্রমাণ করে যে রিয়েল-টাইম রোগ নজরদারি কাঠামো কতটা বিপর্যয়করভাবে অপর্যাপ্ত। ভাইরাসটি বাংলাদেশকে বুদ্ধিতে হারায়নি। বাংলাদেশ কেবল অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল—প্রথমে রাজনৈতিক আত্মরক্ষার স্বার্থে এবং শেষমেশ অন্ধ আমলাতান্ত্রিক জড়তায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি জরুরি জাতীয় পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন এবং গতকাল থেকে একটি নতুন জরুরি টিকাদান অভিযানের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সরকার প্রথম ভ্যাকসিন ডোজের বয়সসীমা নয় মাস থেকে কমিয়ে সাময়িকভাবে ছয় মাস করেছে—এটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বৈজ্ঞানিকভাবে সুষম একটি জরুরি পদক্ষেপ, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও-র নির্দেশিকা দ্বারা অনুমোদিত যখন নিশ্চিত রোগীদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি স্ট্যান্ডার্ড টিকাদান বয়সের নিচে থাকে। তবে ৫৬টি জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি একক জরুরি অভিযানই যথেষ্ট নয়। হাসপাতালগুলিতে আইসিইউ সক্ষমতা অবিলম্বে বাড়াতে হবে এবং হামের জন্য সম্পূর্ণ নিবেদিত আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন করতে হবে। ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টেশন প্রতিটি চিকিৎসা প্রোটোকলে বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নজরদারি রিয়েল-টাইম করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা যেকোনো অস্থিতিশীলতার সময়েও এই জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিগুলোকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে বা ‘অলঙ্ঘনীয়’ বলে বিবেচনা করতে হবে। জন ফ্র্যাংকলিন এন্ডার্স, যিনি হামের ভাইরাস প্রথম আলাদা করেছিলেন, তিনি বুঝতেন যে বিজ্ঞানের পরম দায়িত্ব হলো তার অবদানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। একটি জীবনরক্ষাকারী টিকা যা শুধুই কোল্ড স্টোরেজে বা ঠান্ডা মজুতঘরে পড়ে থাকে কিন্তু কোনো শিশুর শরীরে প্রবেশ করে না, তা ফলাফলের দিক থেকে কোনো টিকাই নয়। পঞ্চাশেরও বেশি নিষ্পাপ শিশু মারা গেছে এমন একটি প্রাচীন রোগে যা আধুনিক বিজ্ঞান আজ থেকে ষাট বছর আগেই পুরোপুরি জয় করেছিল। প্রতিটি মৃত্যুই এখানে প্রতিরোধযোগ্য ছিল। এটি কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়; এটি এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি অকাট্য অভিযোগনামা। যে সুচটির বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে সেটি কেবল একটি সামান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম ছিল না। এটি এই দেশে জন্ম নেয়া প্রতিটি অসহায় শিশুর প্রতি রাষ্ট্রের একটি বড় প্রতিশ্রুতি ছিল। সেই প্রতিশ্রুতি এখন জরুরিভিত্তিতে এবং স্থায়ীভাবে রক্ষা করতে হবে। [লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার: এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না

দেশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা অপমৃত্যু, তথা খুনের পরিপ্রেক্ষিতেই এই লেখাটির শিরোনাম নেয়া হয়েছে দুটি কালজয়ী গান ও কবিতা থেকে। হায়দার হোসেন (১৯৬৩) যে আত্মগ্লানি থেকে ‘নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার’ উচ্চারণ করেছিলেন, এটি কেবল সেই গানের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং আজকের বাস্তবতায় বেদনাহত অসংখ্য মানুষের মতো আমিও আমার ঘৃণা ও ক্ষোভের ভাষা খুঁজেছি এই উচ্চারণে। এই সুতীব্র ধিক্কার আসলে নিজের অক্ষমতার বিরুদ্ধে, আমাদের সম্মিলিত বিবেকের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে, এবং একই সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা ও সরকারের উন্নাসিক মনোভাবের বিরুদ্ধে এক নৈতিক প্রতিবাদ। এখানে ‘আমি’ ব্যক্তিগত হলেও, এর অন্তর্গত বোধটি গভীরভাবে সামষ্টিক; এটি আমাদের সবার দায়বোধের প্রতিফলন। অন্যদিকে, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’- এই উচ্চারণ কেবল একটি কবিতার শিরোনাম বা পঙ্ক্তি নয়; এটি এক গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রত্যাখ্যান। এই পঙ্ক্তিটি উচ্চারণ করতে গিয়েই হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হয়। যদি এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না-ই হয়, তবে আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? আমি কি এর বাইরে, নাকি এই নির্মম বাস্তবতার নীরব অংশীদার? নবারুণ ভট্টাচার্য (১৯৪৮-২০১৪) যে ‘মৃত্যু উপত্যকা’র কথা বলেছেন, তা কোনো ভৌগোলিক সীমানা নয়; বরং একটি নির্লিপ্ত রাষ্ট্র ও সমাজের ভীতিকর অবস্থার প্রতীক। আজকের লেখার শিরোনাম হিসেবে এই প্রতিবাদী উচ্চারণ আর কেবল গানের কলি ও কবিতার পঙ্ক্তি নয়; এটি আমার নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই দেয়া এক তীব্র ধিক্কার। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে মৃত্যু আর ব্যতিক্রম নয়; বরং ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে ওঠা এক নির্মম বাস্তবতা। এখানে মানুষের জীবন নিরাপদ নয়; মৃত্যু হয়ে ওঠে দৈনন্দিন ঘটনা, আর জীবনের মূল্য ধীরে ধীরে অবমূল্যায়িত হচ্ছে। মানুষের মৃত্যুতে মানুষ এতটা আবেগহীন, অনুভূতিহীন ও প্রতিক্রিয়াহীন থাকতে পারে- এই ভাবনাই হৃদয়কে শঙ্কিত ও স্তম্ভিত করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও নৈতিক দর্শনের ভাষায় বললে, এটি সেই পর্যায়, যেখানে রাষ্ট্র তার মৌলিক ‘সামাজিক চুক্তি’ (সোসাল কন্ট্রাক্ট) রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় এবং নাগরিকের জীবনরক্ষার ন্যূনতম দায়িত্বটুকুও পালন করতে পারে না। ফলে সামষ্টিক কল্যাণের বোধ থেকে জন্ম নেয়া ‘দেশ’ ধারণাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কারণ যে ভূখণ্ডে জীবন অনিরাপদ, তা মানচিত্রে একটি রাষ্ট্র হতে পারে, কিন্তু নৈতিক অর্থে সেটা একজন নাগরিকের কাছে ‘আমার দেশ’ হয়ে উঠতে পারে না। রাষ্ট্রতত্ত্বের প্রাচীন ধারণা অনুযায়ী, রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছে মানুষের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। ইংরেজ চিন্তক থমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লেভিয়াথান’-এ রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পূর্ববর্তী ‘প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষের অবস্থা’র যে চিত্র তুলে ধরেছেন, সেখানে মানুষের জীবন ছিল ‘নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, নিকৃষ্ট, হিংস্র এবং সংক্ষিপ্ত’ (সলিটারি, পুওর, নাস্টি, ব্রুটিস অ্যান্ড শট) তথা অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। যেখানে মানুষের জন্য জীবন ছিল অনিরাপদ, বিশৃঙ্খল এবং টিকে থাকার সংগ্রামে ভরপুর। সেই ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতেই মানুষ পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে যে রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করে, সেটিই ‘রাষ্ট্র’ যার মূল ভিত্তি একটি অলিখিত ‘সামাজিক চুক্তি’, যেখানে নাগরিক তার কিছু স্বাধীনতা ত্যাগ করে নিরাপত্তার বিনিময়ে। কিন্তু এখানেই মৌলিক প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে: যদি রাষ্ট্র সেই ন্যূনতম দায়িত্ব অর্থাৎ নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ব্যর্থ হয়, তবে সেই সামাজিক চুক্তির বৈধতা কোথায় দাঁড়ায়?প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের ভিত্তি একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি, যেখানে নাগরিক তার কিছু স্বাধীনতা ত্যাগ করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিনিময়ে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখানেই এক মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে। যদি রাষ্ট্র সেই ন্যূনতম দায়িত্ব তথা নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ব্যর্থ হয়, তবে সেই সামাজিক চুক্তির বৈধতা কোথায়? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এটি কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র বা সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির গভীর সংকট। কারণ যে চুক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্র তার বৈধতা অর্জন করে, সেই চুক্তির প্রধান শর্তই যদি ভঙ্গ হয়, তবে নাগরিকের আনুগত্য, আস্থা ও কর্তব্যবোধসহ সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে রাষ্ট্র কেবল একটি ক্ষমতার কাঠামোতে পরিণত হয়; কিন্তু ন্যায়, নিরাপত্তা ও মানবিকতার আশ্রয়স্থল হিসেবে তার অস্তিত্ব ক্রমেই ফাঁপা হয়ে যায়। আমাদের দেশের বাস্তবতায় মৃত্যুর প্রকৃতি ও স্বাভাবিকতার ধারণা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। ‘দুর্ঘটনা’, ‘আত্মহত্যা’, ‘গণপিটুনী’, ‘গণধোলাই’, ‘ক্রসফায়ার’, ‘রাজনৈতিক সংঘর্ষ’- এই শব্দগুলো যেন একেকটি বিশেষ পর্দা বা চাঁদর, যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম সত্য। সাধারণ মানুষের ‘সিস্টেমিক’ ও ‘সিস্টেম্যাটিক’ অপমৃত্যুকে ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেওয়া হচ্ছে। ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শব্দের নির্বাচন বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে, এমনকি সহিংসতাকেও এক ধরণের নীরব বৈধতা দিতে পারে। ফলে ঘটনাগুলো আর বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি হিসেবে প্রতিভাত হয় না; বরং সেগুলো একটি অভ্যস্ত, পুনরাবৃত্ত সামাজিক বাস্তবতায় রূপ নেয়। কিন্তু এই স্বাভাবিকীকরণ আসলে এক ধরনের ‘কাঠামোগত সহিংসতা’, যেখানে হত্যার দায় কোনো একক ব্যক্তি বা ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা একটি সমগ্র সামাজিক-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর বর্তায়। নরওয়েজিয়ান সমাজবিজ্ঞানী জোহান গালতুং (১৯৩০-২০২৪) যে ‘কাঠামগত সহিংসতা’-র (স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স) ধারণা দিয়েছেন, তার সঙ্গে এই বাস্তবতার গভীর সাযুজ্য রয়েছে। এখানে সহিংসতা সবসময় দৃশ্যমান না হলেও তার প্রভাব প্রতিনিয়ত জীবনহানির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অর্থাৎ এখানে হত্যা কোনো আকস্মিক বিচ্যুতি নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার অবধারিত পরিণতি। এই প্রেক্ষাপটে ফরাসী ইতিহাসবিদ ও চিন্তক মিশেল ফুকোর (১৯২৬-১৯৮৪) ‘জৈব-রাজনীতি’ (বায়োপলিটিক্স) ধারণাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্র কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শাসন করে না; বরং মানুষের জীবন, দেহ এবং সমগ্র জনগোষ্ঠির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই ক্ষমতা প্রয়োগ করে। ফলে কে বাঁচবে, কে মরবে, কোন জীবন মূল্যবান, আর কোন জীবন অবহেলিত- এই প্রশ্নগুলো নিছক নৈতিক বা মানবিক নয়; এগুলো গভীরভাবে রাজনৈতিকও বটে। যখন রাষ্ট্রের উদাসীনতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা ইচ্ছাকৃত নীতির ফলে কিছু মানুষের মৃত্যু ‘স্বাভাবিক’ হয়ে ওঠে, তখন তা আর নিছক দুর্ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার এক নীরব কিন্তু কার্যকর রূপ, যেখানে জীবনরক্ষা নয়, বরং জীবনের অবমূল্যায়নই রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে, ইটালীয় চিন্তক জর্জিও আগামবেনের (১৯৪২-) ‘হত্যাযোগ্য’ (হোমো সাকের) ধারণাটি আমাদের এই বাস্তবতাকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। তার বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়ে যে, আধুনিক রাষ্ট্র এমন এক শ্রেণীর মানুষ তৈরি করে, যাদের জীবন আইনের দৃষ্টিতে কার্যত সুরক্ষাহীন; যাদেরকে হত্যা করা যায়, কিন্তু তা বিশেষভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। অর্থাৎ তারা আইনের ভেতরে থেকেও আইনের সুরক্ষার বাইরে অবস্থান করে; রাষ্ট্রে বা সমাজে তারা এক ধরনের ‘জীবন্ত পরিত্যক্ততা’-র (লিভিং এবানডনমেন্ট) শিকারহয়ে থাকে। আমাদের সমাজে যখন গণপিটুনি, গুম, খুন-খারাবি বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো ঘটনা ঘটে এবং তা কার্যত শাস্তিহীন থেকে যায়, তখন সেই ভুক্তভোগীরা যেন প্রাচীন রোমান আইনের ‘হোমো সাকের’ ধারণারই আধুনিক প্রতিরূপ হয়ে ওঠে। কারণ তখন তাদের মৃত্যু আর বিচারের বিষয় থাকে না; বরং তা এক ধরনের নীরব স্বীকৃতি পেয়ে যায় যেন এই মৃত্যুগুলো ঘটতেই পারে, কিংবা ঘটাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই নির্মম বাস্তবতার মানবিক ব্যথা আমাদের লোকস্মৃতি ও সাহিত্যও প্রতিফলিত হয়েছে। হায়দার হোসেনের গানের পঙক্তি, ‘যার চলে যায় সেই বোঝে, হায় বিচ্ছেদে কী যন্ত্রণা’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে একেকটি ভাঙা পরিবার, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি আর কূন্যতা। সে যাই হোক, এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আমাদের এক অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় যে, এদেশে অপমৃত্যু কেবল বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা। আর এই কাঠামোর মধ্যে আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছি। রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতা, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, রাজনৈতিক স্বার্থের প্রাধান্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং সামাজিক নীরবতা সব মিলিয়ে এদেশে এক ধরনের ‘মৃত্যুর সংস্কৃতি’ গড়ে ওঠেছে। এই সংস্কৃতিতে জীবনের চেয়ে মৃত্যু বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, আর ন্যায়বিচারের চেয়ে অবিচার বেশি স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ফলে প্রশ্নটি কেবল রাষ্ট্রের ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি আমাদের সামষ্টিক নৈতিকতার গভীর সংকটকেও উন্মোচন করে। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় উৎসবগুলোর তাৎপর্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ঈদ বা স্বাধীনতা দিবসের মতো উদযাপন তখন এক ধরনের নৈতিক বৈপরীত্যের সৃষ্টি করে। একদিকে আমরা স্বাধীনতার গৌরব উদযাপন করি, অন্যদিকে সেই স্বাধীনতার মৌলিক প্রতিশ্রুতি তথা মানুষের নিরাপদ জীবন ও মর্যাদার নিশ্চয়তা বাস্তবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে উৎসবগুলো নিছক আনন্দের উপলক্ষ না হয়ে বরং এক ধরনের অস্বস্তিকর আত্মপ্রতারণায় রূপ নেয়, যেখানে উদযাপন আর বাস্তবতার মধ্যে এক গভীর ফাঁক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দর্শনের ভাষায় একে বলা যেতে পারে ‘কার্যসম্পাদনমূলক জাতীয়তাবাদ’ (পারফরমেটিভ ন্যাশানালিজম) যেখানে প্রতীকী উদযাপন বাস্তব দায়বদ্ধতার অভাবকে আড়াল করে। প্রশ্ন হলো, তাহলে সমাধান কোথায়?প্রথমত, আমাদের এই বাস্তবতাকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেয়ার প্রবণতা ভাঙতে হবে। সহিংসতার এই স্বাভাবিকীকরণই সংকটকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি। সমাজমনোবিজ্ঞানের আলোচনায় একে ‘সংবেদনশীলতা হ্রাস’ (ডিসেন্সিটাইজেশান) বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ বারবার সহিংসতার মুখোমুখি হতে হতে আমাদের আবেগ, অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা ভোঁতা হয়ে যায়। এই মানসিক অবস্থা পরিবর্তন ছাড়া কোনো কাঠামোগত সংস্কারপ্রয়াসই টেকসই হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রকে তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে হবে যাতে করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সমান মূল্য নিশ্চিত করা যায়। এখানে ‘আইনের শাসন’ কেবল একটি প্রশাসনিক নীতি নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, যা ছাড়া নাগরিকের নিরাপত্তা ও আস্থা কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তৃতীয়ত, সমাজকে তার নৈতিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হবে, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা আর গ্রহণযোগ্য থাকবে না। কারণ নীরবতা কখনো নিরপেক্ষ থাকে না; তা অনিবার্যভাবে অন্যায়ের পক্ষেই কাজ করে। নাগরিক সচেতনতা, নৈতিক সাহস, এবং সক্রিয় সামাজিক প্রতিরোধ- এই তিনটির সম্মিলনেই একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে, যেখানে মানুষের জীবন আর অবহেলার শিকার হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই ‘সিস্টেমিক’ ও ‘সিস্টেম্যাটিক’ সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কারণ এই মৃত্যু উপত্যকা কোনো বাইরের শক্তির তৈরি নয়; এটি আমাদের সম্মিলিত কর্ম, নীরবতা এবং উদাসীনতারই ফল। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটি এক ধরনের ‘সামষ্টিক দায়’ (কালেক্টিভ রিসপন্সিবিলিটি), যেখানে অপরাধটি কেবল কিছু মানুষের নয়; বরং একটি সামগ্রিক নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। আমরা যখন অন্যায়ের প্রতিবাদ করি না, প্রশ্ন তুলি না, কিংবা নিজেকে দায়মুক্ত ভাবি, তখন নিজেদের অজান্তেই এই সহিংস কাঠামোটিকে টিকিয়ে রাখি। এই নির্মম বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে, আমাদের হয়তো আবারও ফিরে যেতে হয় সেই আত্মধিক্কারের গভীরতম উচ্চারণে, যা কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) ভাষায়, ‘মনে হয়- ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠি, ‘মা বসুধা দ্বিধা হও!/ ঘৃণাহত মাটি-মাখা ছেলেরে তোমার/ এ নির্লজ্জ মুখ-দেখা আলো হতে অন্ধকারে টেনে লও’! এই কাব্যিক আর্তনাদ কেবল ব্যক্তিগত বেদনার প্রকাশ নয়; এটি এক গভীর নৈতিক লজ্জা ও প্রতিবাদের ভাষা, যেখানে নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। অতএব এই ধিক্কার কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র বা সমাজের প্রতি নয়; এটি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের প্রতি নিবেদিত এক আত্মসমালোচনা। কারণ সত্যটি যতই অস্বস্তিকর হোক না কেন, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা’ প্রকৃতপক্ষে আমাদেরই নির্মাণ, আমাদেরই অর্জন। এই স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়েই হয়তো শুরু হতে পারে পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ, যেখানে আমরা কেবল ভুক্তভোগী নই, বরং দায়-স্বীকারকারী এবং পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হয়ে উঠি। সবশেষে, প্রশ্নটি আর কেবল একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা কিংবা কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি আমাদের অস্তিত্বের গভীরে গিয়ে আঘাত হানে। আমরা কেমন সমাজ গড়ছি? আমরা কি এমন এক ভূখণ্ডে বাস করছি, যেখানে মানুষের জীবন নিরাপদ, নাকি এমন এক বাস্তবতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, যেখানে মৃত্যু-ই হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের বাস্তবতা? এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। কারণ প্রতিটি অনিরাপদ জীবন বা অপমৃত্যু আমাদের সম্মিলিত মানবিকতার ওপর একেকটি আঘাত, প্রতিটি অন্যায়-অবিচার আমাদের নৈতিক কাঠামোর ভাঙনের সাক্ষ্য। প্রতিটি অপমৃত্যুর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া অপরিহার্য। অপরাধ দমনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই। অতএব এই ‘মৃত্যু উপত্যকা’ থেকে উত্তরণের পথ শুরু হয় স্বীকারোক্তি থেকে অর্থাৎ আমাদের নিজেদের ব্যর্থতা, উদাসীনতা ও নীরবতার দায় স্বীকার করার মধ্য দিয়ে। এর পরেই প্রয়োজন জাগ্রত বিবেক, সক্রিয় নাগরিকতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকার। সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রকে তার দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা, সমাজকে তার নৈতিক ভিত্তিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, এবং ব্যক্তিকে তার মানবিক দায়বোধে উদ্দীপ্ত করা- এই ত্রিমাত্রিক রূপান্তর ছাড়া কোনো স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। নইলে ‘নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার’ কেবল একটি উচ্চারণ হয়েই থেকে যাবে, আর ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ বলে প্রত্যাখ্যানও একদিন নিছক বাগাড়ম্বর হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা যদি সত্যিই এই ধিক্কারকে দায়বোধে, এবং এই প্রত্যাখ্যানকে পরিবর্তনের অঙ্গীকারে রূপ দিতে পারি, তবে হয়তো একদিন আমরা বলতে পারব, ‘এই দেশ মৃত্যু উপত্যকা নয়’; এটি এমন এক মানবিক ভূখণ্ড, যেখানে মানুষের জীবন শুধু টিকে থাকে না, মর্যাদার সঙ্গে বিকশিতও হয়। তখনই গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের (১৯২৫-১৯৮৬) মতই দেশবাসী মুগ্ধতায় সমবেত কন্ঠে গেয়ে উঠতে পারবে, ‘বিশ্ব কবির ‘সোনার বাংলা’,/নজরুলের ‘বাংলাদেশ’,/জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’/রূপের যে তার নেই কো শেষ, বাংলাদেশ’। [লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

পুনরুত্থান দিবস: আশা, বিশ্বাস ও বিজয়ের বার্তা

আজ পবিত্র পুনরুত্থান দিবস। মানব ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তি যিশু খ্রিস্ট, যিনি মৃত্যুকে জয় করে পুনরুত্থিত হয়েছেন। পবিত্র বাইবেল সাক্ষ্য দেয় যে, কবর থেকে উঠে তিনি এক-দু’জন নয়, শতাধিক মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়েছিলেন। তার শিষ্যদের মধ্যে থোমার মনে সন্দেহ জাগলে পুনরুত্থিত যিশু তার সামনে উপস্থিত হন। তিনি তার দু’হাত বাড়িয়ে দেন এবং কুক্ষিদেশ দেখান, যেখানে রোমান সৈন্যরা পেরেক গেঁথেছিল এবং আঘাত করেছিল। তখন অবিশ্বাসী থোমা অন্তর থেকে বলে উঠলেন— ‘হে আমার প্রভু, হে আমার ঈশ্বর’। যিশু শিষ্যদের সঙ্গে আহার করে প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনি কোনো আত্মা নন, বরং সশরীরে জীবিত হয়েছেন (যোহন ২০:১৯-২৯)। এর আগে কূন্য কবরে স্বর্গদূত উপস্থিত থেকে মগদালিনী মরিয়ম, অন্য নারী এবং শিষ্যদের জানান— যিশু কবরে নেই, তিনি পুনরুত্থিত হয়েছেন (লূক ২৪:১৬)। খ্রিস্টবিশ্বাসীদের কাছে যিশুর পুনরুত্থান হলো পাপ ও মৃত্যুর ওপর পরম বিজয়। যদি প্রভু যিশু পুনরুত্থিত না হতেন, তবে খ্রিস্টীয় বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি থাকত না। এ থেকেই প্রমাণিত হয়, তিনি ঈশ্বরের পুত্র (১ করিন্থীয় ১৫:১৪)। পুনরুত্থানের শক্তিতে শিষ্যরা সাহসী হয়ে ওঠেন। যারা একসময় ধর্মীয় নেতাদের ভয়ে আত্মগোপনে ছিলেন, তারাই পরে অসীম সাহসে ঘুরে দাঁড়ান। নানা বাধা ও বিপদের মধ্যেও তারা প্রভু যিশুর আদর্শকে সমুন্নত রাখেন। যিরূশালেম, যিহুদা, শমরিয়া থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রান্ত পর্যন্ত তারা ভালোবাসার বাণী পৌঁছে দেন। যিশু মানুষের অন্তর পরিবর্তনের শিক্ষা দিয়েছেন, নতুন জীবনের চেতনা জাগ্রত করেছেন। আশ্চর্যের বিষয়, মৃত্যুভয় তাদের টলাতে পারেনি। যিশুর শিষ্যরা কঠিন যন্ত্রণা ও মৃত্যুর মুখেও নিজেদের বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি। প্রভু যিশুর মৃত্যু ও পুনরুত্থান তাদের অনুপ্রাণিত করেছিল, যার প্রভাব আজও বিদ্যমান। খ্রিস্টের বাণী ধারণ করে মিশনারিরা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। অজানা-অচেনা ভূমিতে, প্রতিকূল পরিবেশেও তারা এই বাণী প্রচার করেছেন। অনেকে নিজ মাতৃভূমিতে আর ফিরে আসেননি; বিদেশের মাটিতেই তাদের সমাধি হয়েছে। এসবই সম্ভব হয়েছে প্রভু যিশুর পুনরুত্থানের শক্তিতে। সপ্তাহের প্রথম দিন, অর্থাৎ রোববার প্রভাতেই, সূর্যের আলো পৃথিবী আলোকিত করার আগেই প্রভু যিশু পুনরুত্থিত হন। তিনি শয়তানের শক্তিকে পরাজিত করে নতুন আশার দ্বার উন্মোচন করেন। পুনরুত্থান মানুষের জীবনে আশা জাগায়, নতুন উদ্যম সৃষ্টি করে। যারা যিশুকে অনুসরণ করেন, তারা মৃত্যুকে শেষ বলে মনে করেন না; বরং এটিকে চিরন্তন জীবনের পথে এক ধাপ হিসেবে দেখেন। শাস্ত্র অনুযায়ী, বিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে একটিই মৃত্যু— জাগতিক মৃত্যু; কিন্তু অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে জাগতিক মৃত্যুর পাশাপাশি অনন্ত শাস্তি। তাই পুনরুত্থান কেবল একটি ধর্মীয় ঘটনা নয়, এটি এক জীবনদায়ী চেতনা। আসুন, আমরা সত্যকে ধারণ করি এবং সত্যময় ঈশ্বরের উপাসনা করি। কারণ সত্যই ঈশ্বর। পবিত্র পুনরুত্থান দিবসে এই কামনা— পুনরুত্থানের আলো আমাদের প্রত্যেকের জীবনে বয়ে আনুক শান্তি, সৌভ্রাতৃত্ব, প্রেম ও স্বর্গীয় ভালোবাসা। [লেখক: কলামিস্ট]

জ্বালানি সংকটের চেয়ে বড় সংকট আস্থাহীনতা

অতি সম্প্রতি নড়াইলে জ্বালানি তেল না পেয়ে তানভীর ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক নাহিদ সরকারকে হত্যার অভিযোগে এক ট্রাক চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তেল না পেয়ে ট্রাক ড্রাইভার সুজাত আলী পাম্পের ম্যানেজারের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হন, এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ম্যানেজারকে হত্যা করার হুমকি দেন। অভিযোগ ওঠেছে যে, রাত ২টার দিকে পেট্রল পাম্প বন্ধ করে ম্যানেজার নাহিদ সরদার ও তার সহকর্মী জিহাদ ইসলাম তাদের মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা দিলে পেছন দিক থেকে সুজাত আলী তার ট্রাক দিয়ে মোটরসাইকেলে সজোরে ধাক্কা দেন, ঘটনাস্থলেই নাহিদ সরদার নিহত হন, তার সহকর্মী জিহাদ ইসলামের অবস্থাও গুরুতর। জ্বালানি তেলের জন্য সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত দীর্ঘ আট ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাননি ট্রাকচালক সুজাত আলী। বেশ কিছুদিন যাবত দেশের বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে যানবাহনের বিরাট বিরাট লাইন পরিলক্ষিত হচ্ছে, কয়েক কিলোমিটার লম্বা। চাহিদা মোতাবেক তেল না থাকায় মবের ভয়ে বহু পেট্রল পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে। যানবাহনের চালকদের মধ্যে লাইনের আগেপরের অবস্থান নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ও মারামারি হচ্ছে। সারা দেশের পেট্রল পাম্পগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার, সরকারি মনিটরিং বৃদ্ধি ও বিশৃঙ্খলা রোধে উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছে পেট্রাল পাম্পের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। তেল সরবরাহ করতে গিয়ে পাম্প কর্তৃপক্ষও হিমশিম খাচ্ছে। পুলিশ ও পাম্পের কর্মীরা ক্রেতাদের শান্ত রাখতে হ্যাণ্ডমাইক ব্যবহার করছেন। মোটরসাইকেলের চাপে পাম্পে অ্যাম্বুলেন্সও ঢুকতে পারছে না। ক্রেতারা লাইনে অপেক্ষা করতে করতে শুধু অতীষ্ট হয়ে ওঠে না, উদ্বিগ্নও থাকে; কারণ যে কোনো মুহুর্তে পাম্প কর্তৃপক্ষ হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দিতে পারে ‘তেল নাই’। বিভিন্ন পাম্পে প্রতিদিন হঠাৎ ‘নাই’ ঘোষণা শুনতে শুনতে ক্রেতারা আর ধৈর্য রাখতে পারছে না। ‘নাই’ ঘোষণার আগেই তেল পাওয়া নিশ্চিত করতে কেউ কেউ লাইন ভাঙছেন, কেউ কেউ ক্ষমতা জাহির করে বিশেষ ব্যবস্থায় লাইন ছাড়াই তেল পেয়ে যাচ্ছেন। মোটরসাইকেল এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছুটাছুটি করছে, কিন্তু তেল পাচ্ছে না, কারণ ফিলিং স্টেশনগুলোকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। কসকরের ট্রাকের মতো তেলের গাড়ি কোন একটি ফিলিং স্টেশনে পৌঁছার সংবাদ পেলেই সব ক্রেতারা সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। অফিসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একাধিক আদেশ জারি করেছে সরকার। শুধু প্রয়োজনীয় সংখ্যক বাতি, পাখা চালু করে অফিস ছাড়ার সময় তা বন্ধ করা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকারের আরেকটি ইন্টারেস্টিং নির্দেশনা হচ্ছে, এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি রাখতে হবে। শুধু তাই নয়, জ্বালানি খরচ কমাতে বেশিরভাগ সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জ্বালানি সঙ্কট মোকাবিলায় বহুপাক্ষিক দাতাদের কাছ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋত চাওয়া হয়েছে। এত পদক্ষেপ নিয়েও সরকার সামাল দিতে পারছে না, বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে হানা দিয়ে বোতলে রাখা তেলও জব্দ করা হচ্ছে। এতে হিতে বিপরীত হচ্ছে। বিএনপি সরকার কেন এই দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবস্থা আগে থেকে গ্রহণ করেনি তা স্পষ্ট নয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে কত ধূর্ত তা প্রতিপন্ন হয় ১৯৭১ সনে অবলম্বিত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের আরেকটি ধূর্তামি থেকে। ১৯৭০ সনের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হওয়ার পরও আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন চরম পর্যায়ে উপনীত হয়। আন্দোলনকে দমন করতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও অস্ত্র আনার সুবিধার্থে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েই ঢাকায় চলে আসেন। আলোচনা একই প্রক্রিয়া ট্রাম্প যখন ইরানের ক্ষেত্রে অবলম্বন করে যাচ্ছিলেন তখনই প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহে আমাদের যত্নবান হওয়া উচিত ছিল। তারপরও দৃশ্যমান তেল সঙ্কট কৃত্রিম, সরকারের অতিরিক্ত সতর্কতার কারণে ভোক্তার মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তাদের মধ্যে এই মর্মে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে যে, শীঘ্র আর তেল পাওয়া যাবে না, পাওয়া গেলেও দাম বেশি হবে। পেট্রল পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেলের ভিড় বেশি, কারণ অনেকেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের মোটরসাইকেল দিয়ে। তাই তারা শুধু দৈনন্দিনের প্রয়োজনীয় তেল নয়, ছোট ছোট পানির বোতলেও তেল ভরে মজুত করছেন। তাদের যদি প্রথমেই এই মর্মে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়া হতো যে, পেট্রল এবং অকটেন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় না, বাংলাদেশে ব্যবহৃত পেট্রলের প্রায় পুরোটাই এবং অকটেনের সিংহভাগ আমাদের গ্যাস খনির উপজাত বা কনডেনসেট থেকে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কনডেনসেট অনেক সময় পুড়িয়ে ফেলতে হয়, কারণ পেট্রল এবং অকটেনের চাহিদা মোট জ্বালানি তেলের মাত্র ৬ শতাংশ। এছাড়াও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে শোধন করেও ডিজেল, পেট্রল, ফার্নেস তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি পাওয়া যায়। সমস্যা এখন কিছুটা এলপিজি এবং ডিজেল নিয়ে, বছরে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার ৬৩ শতাংশই ডিজেল। ডিজেল নিয়েও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন দিয়ে ইতোমধ্যে ডিজেল আনা হয়েছে। তবে এলপিজির পুরোটাই বেসরকারি খাতে আনা হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিক্রি মূল্য নির্ধারণ নিয়ে ইতস্তত থাকায় বেসরকারি খাত এলপিজি আমদানিতে উৎসাহী নাও হতে পারে। যুদ্ধের মধ্যেও পরিশোধিত ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস তেল ও জেট ফুয়েলও ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে কেনার চেষ্টা হচ্ছে। তারপরও পেট্রল, অকটেন এবং ডিজেল নিয়ে দেশব্যাপী এত হাহাকার কেন ?দেশে জ্বালানি সংকট নেই মর্মে সংসদে বিবৃতি দিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তার মতে পেট্রল পাম্পে যে দীর্ঘ লাইন দেখা যায় তা প্রকৃত চিত্র নয়। ৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে ট্রাক ড্রাইভার পেট্রল পাম্পের ম্যানেজারকে হত্যা করলো, আর মন্ত্রী বলছেন তা প্রকৃত চিত্র নয়। মন্ত্রীর কথা হচ্ছে গত বছর এই সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছিল, এ বছর তার চেয়ে বেশি সরবরাহ করা হয়েছে। কথা মিথ্যা নয়, কিন্তু যুদ্ধের শুরুতে রেশনিং বা সাশ্রয়ের কথা বলে ভোক্তাদের আস্থা নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। একই কাজ করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। গভর্নর হয়েই তিনি তারল্য সঙ্কটের সম্মুখীন কোন ব্যাংককে একটি টাকাও দেবেন না বলে ঘোষণা দেন; কিন্তু তিনি যখন তার ভুল বুঝতে পারলেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়েও ব্যাংকগুলোকে আর রক্ষা করতে পারলেন না। তেলের মজুত রোধ করতে অবৈধ মজুতদারির তথ্যদাতাকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তেলের দাম বাড়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকায় মজুত করার প্রবনতা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাসের অপশাসনে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, এই অবস্থায় জ্বালানি তেলের সঙ্কট আরও গভীর হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে, লোডশেডিং হবে যখন তখন, শিল্পকারখানায় নেমে আসবে বিপর্যয়। তবে দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পারঙ্গম, ২০২২ সনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট জ্বালানি সঙ্কট তৎকালীন সরকার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। শুধু তাই নয়, সারা বিশ্ব দেখেছে, করোনা এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিশ্ব মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি, উন্নত দেশগুলোর নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি মধ্যেও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৮ শতাংশ। বিএনপি সরকারকে মনে রাখতে হবে যে, যুদ্ধের শুরুতে বাংলাদেশের বিবৃতি ইরানের পক্ষে যায়নি, গেছে বিপক্ষে। এছাড়াও আমেরিকার ওপর বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ইরানকে রুষ্ট করে তুলতে পারে, তাই হরমুজ প্রণালী বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে কি না তা অনিশ্চিত। ইরানের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করার পর অর্থনৈতিক স্থাপনায় ব্যাপক আঘাত হানা হলে ইরানও শেষ মরণকামড় দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর তেলক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করবে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো আক্রান্ত হলে প্রাবাসীদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। এভাবে ইরানকে ধ্বংস করতে গিয়ে বাংলাদেশের মতো গরীব দেশগুলোকে ধ্বংস করে দেবে মি. ডনাল্ড ট্রাম্প। সন্ধ্যা ৬টার পর ঢাকা শহর এখন প্রায় অন্ধকার; যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু অন্ধকার নয়, উৎপাদন প্রায় রুদ্ধ হয়ে যাবে, মূল্যস্ফীতি ঘটবে, দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাতীয় এই দুর্যোগেও সংসদে যা নিয়ে আলোচনা চলছে তা গতানুগতিক, কারোর মধ্যে শোনার আগ্রহ নেই; তেল নিয়ে উদ্ভুত সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে আলোচনা হলে সংসদের ওপর জনগণের আস্থা বাড়ত।[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

বাউল ও সাম্যবাদ

বাংলাদেশে সাম্যবাদী সমাজ গড়ার আন্দোলন দীর্ঘদিনের। ইউরোপীয় ও রুশ নানা দর্শনের ভিত্তিতে বাংলা অঞ্চলে সাম্যবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত। তবে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার বহু আগে ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্যবাদী প্রথা চালু ছিল। প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকায়িত আছে সাম্যবাদের অনুশীলন। ইংরেজ শাসনের পূর্বে বাংলা জনপদের প্রতিটি গ্রাম ছিল স্বনির্ভর। এই অঞ্চলে ইংরেজ শাসনের আগে পণ্যবিনিময় প্রথা চালু ছিল। প্রতিটি গ্রাম ছিল বহুমাত্রিক উৎপাদনব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং এখানকার গ্রামগুলো গড়ে উঠেছিল বহুবিধ পেশার শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে। মানুষের চাহিদাভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থা ছিল প্রতিটি গ্রামে। যেমন— কৃষকরা খাদ্যের চাহিদা মেটাতেন, তাঁতিরা কাপড়ের, জেলেরা মাছের, গোয়ালারা দুধের যোগান দিতেন। এছাড়া ধোপা, নাপিত, কামার, স্বর্ণকার, কুমোর, চিকিৎসার জন্য কবিরাজসহ নানা পেশার মানুষ একই গ্রামে বাস করত। গ্রামের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে এসব পেশার মানুষ প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন বা সেবা প্রদান করত। এই সময়টায় প্রাচীন বাংলার গ্রামগুলো এক ধরনের সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার আওতাধীন ছিল। ইংরেজ শাসনের পর থেকে মুদ্রার ব্যাপক প্রচলন ঘটে এবং আদি সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। তবে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকারীরা প্রাচীন বাংলার এই সমাজব্যবস্থার ওপর অনুশীলন করে সমাজ পরিবর্তনের জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেননি। তারা সাম্যবাদ অনুশীলনের প্রক্রিয়া চালিয়েছেন রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক আদলে। তাই বর্তমানে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্যবাদী রাজনীতি অনেকটা তলানিতে পড়ে আছে। এর মূল কারণ হলো, সমাজতান্ত্রিক নেতারা এই দেশের সংস্কৃতির হাজার বছরের সাম্যবাদী ঐতিহ্যের কথা রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে আসেন না। সাম্যবাদী বিষয়গুলো অনুধাবন করা যায় বাউল সমাজের জীবনপ্রণালী পর্যবেক্ষণ করলে। বাউল হলো বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলের এক অনন্য সাধন-ভজন গোষ্ঠী ও লোকজ সংগীতধারা। বাউলরা মূলত সুফিবাদ ও বৈষ্ণব সহজিয়া মতের মিশ্রণে মানবপ্রেম ও আত্মার সন্ধানের গান গেয়ে বেড়ায়। অনেকেই বলেন, ‘বাউল’ শব্দের অর্থ সাধারণত উন্মাদ বা পাগল— যারা সামাজিক বিধিনিষেধ মানে না। প্রকৃতপক্ষে তারা আদি সাম্যবাদের কথা বলে বলেই কায়েমি স্বার্থবাদীরা তাদের পাগল বলে আখ্যা দেয়। বাউল গান মূলত মানুষের জীবন ও প্রকৃতির কথা বলে। ২০০৫ সালে ইউনেস্কো বাউল গানকে অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাউল গান কেন সাম্যবাদী ধারা বহন করে, তার কয়েকটি দিক উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, বাউল মতবাদ দেহের ভেতরেই ঈশ্বরের অবস্থান বা ‘আত্মা’র সন্ধানে বিশ্বাসী, যা ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয় বহন করে। দ্বিতীয়ত, বাউল গানে মানবতাবাদ প্রবল, যেখানে জাত-পাত বা ধর্মের কড়াকড়ি নেই। তৃতীয়ত, বাউলরা একতারা, দোতারা, ঢোল, খঞ্জনি, বাঁশিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে গান পরিবেশন করেন, যেখানে পুঁজিবাদী তথাকথিত আধুনিকতার প্রভাব নেই। চতুর্থত, বাউলদের সাধনা সংগীতের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়; এই সাধনায় জাত, কাল, পাত্র, ধনী-গরিবের ভেদাভেদ থাকে না। পঞ্চমত, বাউল গানে মাটি, মানুষ, সাম্য, মানবতাবাদ এবং আধ্যাত্মিক ভাবের গভীর প্রকাশ পাওয়া যায়। অন্যদিকে সাম্যবাদ বা কমিউনিজম (ল্যাটিন শব্দ থেকে উদ্ভূত, অর্থ ‘সাধারণ’ বা ‘সর্বজনীন’) একটি সামাজিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক এবং অর্থনৈতিক মতবাদ, যা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ। এর লক্ষ্য একটি কমিউনিস্ট সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে উৎপাদন, বিতরণ ও বিনিময়ের উপায়গুলো সাধারণ মালিকানাধীন হবে এবং পণ্য বণ্টন হবে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী। একটি কমিউনিস্ট সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, সামাজিক শ্রেণী এবং পরবর্তীকালে অর্থ ও রাষ্ট্র (বা জাতিররাষ্ট্র) বিলুপ্ত হবে। ‘দ্য অক্সফোর্ড হ্যান্ডবুক অব কার্ল মার্ক্স’-এর মতে, মার্ক্স পুঁজিবাদ-পরবর্তী সমাজ বোঝাতে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন— যেমন পজিটিভ হিউম্যানিজম, সোশালিজম, কমিউনিজম, মুক্ত ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্র, উৎপাদকদের মুক্ত সমিতি ইত্যাদি। তিনি এগুলোকে প্রায় সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ‘সোশালিজম’ ও ‘কমিউনিজম’কে পৃথক ঐতিহাসিক ধাপ হিসেবে দেখার ধারণা তাঁর মূল লেখায় ছিল না; এটি পরবর্তীতে মার্ক্সবাদী পরিভাষায় যুক্ত হয়। অন্যদিকে বাউল দর্শন ধর্মীয় চিন্তা থেকে উদ্ভূত আত্ম-অন্বেষণের এক বিশেষ রূপ, যা মূলত আত্মার আধ্যাত্মিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের লোকসাহিত্য ও লোকঐতিহ্য বিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, আরব অঞ্চলের রাজনৈতিক শক্তির প্রতিক্রিয়ায় সুফিবাদের জন্ম, যা পরে পারস্যে বিকশিত হয় এবং ইরান ও মধ্য এশিয়ায় বিস্তার লাভ করে। ক্রমে এটি পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় এসে চর্যাগীতির সঙ্গে মিশে নতুন রূপ লাভ করে। তুর্কি বিজয়ের পর সুফি দরবেশদের আগমনে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের মানবতাবাদ ও সুফিবাদ মিলিত হয়ে মরমি ভাবধারার জন্ম দেয়। গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল, ড. আশরাফ সিদ্দিকী প্রমুখের মতে, মধ্যযুগের শুরুতে বাংলায় অদ্বৈতবাদের প্রভাবে চৈতন্যবাদ বিকশিত হয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে। ভাগবতধর্ম, আদি রামধর্ম ও কৃষ্ণধর্মের মিলনে বৈষ্ণবধর্ম আত্মপ্রকাশ করে। এর সঙ্গে প্রাচীন মরমীবাদের সংমিশ্রণ ঘটে। বাউল ও বাউল মতবাদের উৎপত্তিকাল আনুমানিক ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ। ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’ গ্রন্থে প্রফেসর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য এ মত প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করেন, বৌদ্ধদের মহাযান পন্থা থেকে বাউলদের উদ্ভব। কমিউনিজমে স্বশাসিত সমাজ গঠনের লক্ষ্য থাকলেও তা অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে— কোথাও স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব ও শ্রমিকদের স্ব-পরিচালনার ওপর জোর দেয়া হয়, আবার কোথাও রাষ্ট্রনির্ভর পদ্ধতির কথা বলা হয়। রাজনৈতিক পরিসরে কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলোকে সাধারণত বাম বা দূর-বামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস উল্লেখ করেন, ১৮৪৮ সালে ‘দ্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশের সময় ইউরোপে সোশালিজম ছিল গ্রহণযোগ্য, কিন্তু কমিউনিজম ততটা নয়। প্রাচীন বাংলার সমাজব্যবস্থার পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই সময় ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্যবাদী প্রথার চর্চা ছিল। উত্তর ভারতের যোদ্ধেয় জাতির জীবনব্যবস্থায়ও সাম্যবাদী উপাদান লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতির ক্ষেত্রে অনেকেই দেশীয় সংস্কৃতির চেয়ে সোভিয়েত সংস্কৃতির প্রভাব বেশি গ্রহণ করেছেন। একটি প্রচলিত প্রবাদ ছিল— সোভিয়েত রাশিয়ায় বৃষ্টি হলে বাংলাদেশের বামপন্থীরা এখানে ছাতা মেলে ধরতেন। দেশীয় বাস্তবতায় রাজনীতি অনুশীলন করেছেন এমন বামপন্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার আগ পর্যন্ত এদেশে বামপন্থীরা কমিউনিস্ট আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। সোভিয়েত ভাঙনের পরও অনেকেই বিভিন্ন ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে বামপন্থী পরিচয় ব্যবহার করছেন— এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রকৃত সাম্যবাদী চেতনার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, এদেশের অনেক বামপন্থী বাস্তবিক অর্থে সাম্যবাদকে অন্তরে ধারণ করতে পারেননি। এক অর্থে বাউলরাই তাদের জীবনাচরণ ও দর্শনের মাধ্যমে সাম্যের বাণী বাংলার জনপদে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সুতরাং, প্রকৃত সাম্যবাদী চেতনার ধারক হিসেবে বাউলদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। [লেখক: উন্নয়নকর্মী]

সুয়েজ থেকে হরমুজ: ইতিহাসের স্রোতে শক্তির সাঁঝবেলা

ইতিহাসকে যদি একটি দীর্ঘ, অবিরাম নদীর মতো ধরা যায়, তবে তার স্রোত কখনও সরল নয়। নদী বাঁকে বাঁকে চলে, কখনও থমথমে হ্রদে থেমে যায়, আবার কখনও ঝরনার মতো উজ্জ্বল হয়ে ছুটে চলে। ইতিহাসও তেমনি—প্রতিটি অধ্যায় লেখা হয় মানুষের রক্ত, স্বপ্ন, ভুলভ্রান্তি এবং পুনর্জাগরণের মিশেলে। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল ছিল সেই নদীর এক প্রবল স্রোতের সংকেত—যেখানে বিশ্ব দেখেছিল এক প্রাচীন সাম্রাজ্যের ক্লান্তি। আজ, পারস্য উপসাগরের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা হরমুজ প্রণালী যেন নতুন করে প্রশ্ন তোলে ইতিহাস কি আবারও কোনো সন্ধিক্ষণের দিকে এগোচ্ছে?সুয়েজ খাল উনিশ ও বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে ছিল এক কৌশলগত সেতু। ইউরোপ ও এশিয়ার সংক্ষিপ্ত পথ হিসেবে এর নিয়ন্ত্রণ মানে ছিল বৈশ্বিক বাণিজ্য, সামরিক চলাচল এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব। যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স দীর্ঘ সময় ধরে এই নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের শক্তির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাস্তবতা পরিবর্তিত হতে থাকে; কাঠামোটিতে ফাটল ধরতে শুরু করে। মিশরের রাষ্ট্রনায়ক কামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণের ঘোষণা দিলে তা ছিল ঔপনিবেশিক প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি সাহসী রাজনৈতিক উচ্চারণ। প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইসরায়েল সামরিক পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু তারা যে আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল, তা তাদের প্রত্যাশার বাইরে। যুক্তরাষ্ট্র সেই অভিযানের বিরোধিতা করে এবং অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ব্রিটেনকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে। একই সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন -এর কূটনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলাফল—ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে অপমানজনকভাবে সরে আসতে হয়। এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয়, ঔপনিবেশিক যুগের অবসান আসন্ন এবং বিশ্বরাজনীতির নেতৃত্ব নতুন শক্তির হাতে স্থানান্তরিত হচ্ছে। সুয়েজ সংকটের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি একটি প্রতীকী ভাঙন। ব্রিটেনের সামরিক শক্তি তখনও ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে সীমাবদ্ধ করে। ক্ষমতা কেবল অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না; তা নির্ভর করে আন্তর্জাতিক সমীকরণ, অর্থনৈতিক শক্তি, কূটনৈতিক প্রভাব এবং সময়ের চলমান ধারা—সব কিছুর সমন্বয়ে। আজকের হরমুজ প্রণালী সেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি বহন করে। এটি শুধু ভৌগোলিক স্থান নয়; বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ, যার প্রতিটি নৌযান, প্রতিটি কূটনৈতিক বিবৃতি, এমনকি নীরবতাও বহন করে সম্ভাব্য সংঘর্ষের ছায়া। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী অবিশ্বাস, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এই প্রণালীকে জটিল ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে। সুয়েজের মতো নাটকীয় মুহূর্তের সঙ্গে হরমুজ পরিস্থিতির তুলনা করাটা সরল নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল দৃশ্যমান এবং উপনিবেশভিত্তিক, যার পতনও ছিল সহজে চিহ্নিত। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বহুমাত্রিক—সামরিক উপস্থিতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং জোটব্যবস্থা—সবই এতে অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক বিশ্ব আরও জটিল। সুয়েজ সংকটের সময় বিশ্ব ছিল দ্বিমেরু—যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন-এর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিভক্ত। বর্তমানে বিশ্ব বহু-মেরু, যেখানে চীন এবং রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই বাস্তবতায় কোনো একক ঘটনার মাধ্যমে একটি পরাশক্তির পতন তাড়াহুড়োর ফল নয়। তবুও, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বড় ধরনের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এটি তার বৈশ্বিক নেতৃত্বের ওপর প্রশ্ন তুলতে পারে, বিশেষত যদি সে তার মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। তবে এটিকে একটি ‘সুয়েজ মুহূর্ত’ হিসেবে দেখা যাবে না; কারণ আধুনিক বিশ্বে ক্ষমতার রূপ অনেক বেশি জটিল এবং বিস্তৃত। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, সাম্রাজ্যের পতন সাধারণত ধীরগতির এবং বহুমাত্রিক। অর্থনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে একটি শক্তি ধীরে ধীরে তার প্রভাব হারায়। সেই অর্থে হরমুজ কোনো চূড়ান্ত পরিণতি নয়; বরং একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। সুয়েজ থেকে হরমুজ—এই তুলনা আমাদের শেখায় যে, শক্তির স্রোত কখনও স্থির থাকে না। এটি ধীরে ধীরে, নিখুঁতভাবে রূপান্তরিত হয়। নাটকীয় পতনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো গভীর, সূক্ষ্ম পরিবর্তন। কারণ ইতিহাসের সাঁঝবেলা কখনও অন্ধকারের সূচনা নয়; বরং তা নতুন ভোরের প্রস্তুতি। [লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

ইংরেজি শেখানোর উদ্দেশ্য, পড়ানোর ধরন ও মূল্যায়ন

আমাদের দেশের ইংরেজি পরীক্ষায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশ্নপত্র, পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, বিসিএসের এবং যে কোন নিয়োগ পরীক্ষার (সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) প্রশ্নপত্র দেখলে কি মনে হয়? প্রশ্নের সঙ্গে ইংরেজি পড়ার বা ইংরেজি বিষয়টিকে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে পড়ানোর উদ্দেশের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়না। ইংরেজি প্রশ্ন দেখলে মনে হয়, শিক্ষার্থী কিংবা বিসিএস পরীক্ষার্থী অথবা কোন নিয়োগ কর্তৃপক্ষ জানতে চান যে শিক্ষার্থী বা কোন প্রার্থী ইংরেজি ভাষার গঠন প্রণালী বা ব্যাকরণ নিয়ে গভীর গবেষণা করছেন কিনা। আমাদের দরকার ছিল তারা ইংরেজিতে তার নিজ সম্পর্কে, তার চারপাশ সম্পর্কে কিছু বলতে পারে কিনা এবং সেই বিষয়গুলোই ইংরেজিতে লিখতে পারছে কিনা, অন্যের ইংরেজি বল বুঝতে পারে কিনা এবং সেই অনুযায়ী উত্তর দিতে পারে কিনা। সেটি নিশ্চিত করার জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা সেই ধরনের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা দেখছি তারা সবাই এমন সব বিষয় প্রশ্নে তুলে দেন বা জিজ্ঞেস করেন যার দ্বারা বুঝা যায় যে, শিক্ষার্থী বা প্রার্থী ইংরেজি গ্রামাওে এমফিল করছে কিনা কিংবা পিএইচডি করছে কিনা। এখানে আমি পাবলিক পরীক্ষার কয়েকটি প্রশ্ন এবং ক্যাডেট কলেজে প্রশ্ন দেখলাম। দেখলেই যে কেউ বুঝতে পারবেন এখানে কি টেস্ট করতে চাওয়া হয়েছে?এই অবস্থা শিক্ষার্থীদের ভাষা ব্যবহারকে, ব্যবহার করার অনুশীলনকে যে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে এবং যে উদ্দেশে এই বিষয়টি পড়ানো হচ্ছে সেই উদ্দেশের ধারে কাছেও নেই। প্রশ্নপত্র এমনভাবে করা হয় তাতে মনে হয়, একজন শিক্ষার্থী ইংরেজি ভাষার ব্যবহার ভালোভাবে আয়ত্ত্ব কওে ফেলেছে সেটি ইতোমধ্যে পরীক্ষিত এবং এখন ভাষায় তার কতটা গভীর দখল আছে সেটি পরীক্ষা করা হয়েছে। সে ভাষার ভেতরের কারণগুলো এবং সম্পর্কগুলো আরও একটু গভীরভাবে জানে কিনা সেগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে। এগুলো করতে গিয়ে শিক্ষার্থীর ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা মোটেই বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ভাষা নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা হয়তো এসব বিষয় কারণ ও সম্পর্ক বের করে লিপিবদ্ধ করে রাখেন যাতে আরও যারা এসব বিষয় গবেষণা করতে চান তারা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন যা সাধারণ ইংরেজি শিক্ষক বিশেষ করে যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয় তাদের জন্য নয় এবং তাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে তেমন কোনো কাজেও আসেনা, আর লক্ষ কোটি শিক্ষার্থীদের এ নিয়ে কোনো কাজও নেই, এতে তাদের কোন উপকারও হয়না। আর এজন্যই রাষ্ট্রীয় খরচে যে বার বছর ধরে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ইংরেজি পড়ানো হচ্ছে তাতে উদ্দেশ্য সফল হচ্ছেনা। যদিও কারিকুলামে লেখা আছে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি বিষয়ে নিজেকে স্বতস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করতে পারবে, ইংরেজি শুনে বুঝতে পারবে, ইংরেজি নিজে লিখতে পারবে এবং ইংরেজি বিষয় পড়ে বুঝতে পারবে এবং ভেতরকার মেসেজ গ্রহন করতে পারবে। জাতীয়ভাবে আমাদের শিক্ষার্থীদের যে ইংরেজি পড়ানোর উদ্দেশ্য এবং তারা কি অর্জন করবে তার সঙ্গে প্রচলিত মূল্যায়নব্যবস্থা কোনেওভাবেই যায়না। এসব প্রশ্নকেই আমাদের শিক্ষকরা, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অনেকেই (সবাই নয়) বলছেন এ তো চমৎকার প্রশ্ন। কেউ বলছেন, এ প্রশ্ন এত সহজ কেনো? এ গ্রামার তো যে কেউ পারব ইত্যাদি। প্রশ্ন এমনভাবে করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীদের আরও চিন্তা করতে হয়, শিক্ষকদের ভীষণভাবে বেগ পেতে হয়। যাতে তারা সহজে বুঝতে না পারে, এখানে দ্যাট কেনো আডজেকটিভ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ইত্যাদি। তার মানে উদ্দেশের সঙ্গে কোনো মিল নেই এবং ইংরেজি যারা পড়াচ্ছেন বা বিষয়টি যেভাবে ডিল করছেন তাদের কাছে ইংরেজি পড়ানোর উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়। আমদের বুঝতে হবে, ইংরেজি একটি বাধ্যতামূলক বিষয হিসেবে আমাদের দেশে পড়ানো হয় মূলত বাণিজ্যিক কারণে। কিন্তু প্রশ্নপত্র, পড়ানোর ধরন এবং সবার ভাব-ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে বাঙালিরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বাদ দিয়ে যেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ওপর সবার গবেষণা করতে বসেছেন এবং এর কঠিন থেকে কঠিনতর বিষয়গুলো আয়ত্ত্ব তাদের করতেই হবে তবেই না ইংরেজি শেখা হয়ে যাবে! আমাদের সব শিক্ষার্থীদের শেক্সপিয়ার আর ওয়ার্ডসওয়ার্থ ভালোভাবে জানতে হবে, বুঝতে হবে তাদের সাহিত্যের সব বিষয়গুলো গভীরভাবে আয়ত্ব করতে হবে এবং একইভাবে ইংরেজি ভাষার উৎপত্তি, ইতিহাস এর ক্রমবিকাশ, অর্থনীতির সঙ্গে এর সম্পর্ক, সমাজ পরিবর্তন, মানব ইতিহাসের অগ্রগতির সঙ্গে এর সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়গুলো যে সাধারণ সব শিক্ষার্থীদের জানতে হবে তা নয়। আমাদের শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ইংরেজি জানতে হবে যাতে তারা বিদেশে চাকরি কিংবা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে বিপদে না পড়েন। সুন্দরভাবে তাদের কাজগুলো ভিন্নভাষী দেশে চালিয়ে আসতে পারেন। আমাদের দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি করেন। তারা না জানেন ইংরেজি, না জানেন আরবী। মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে শুনে শুনে আরবী ভাষা তাদের মধ্যে অনেকেই আয়ত্ব করে ফেলেন এবং চমৎকার ভাবে আরবী ভাষায় কথা বলেন। তারা যদি ইংরেজি ভাষাটিও অনেকটা আয়ত্ব করে যেতে পারতেন তাহলে সেটি হয়তো সোনায় সোহাগা। কারণ তারা শুধুমাত্র শ্রমিক হিসেবে নয়, আরও বেশি বেতনের কাজ করতে পারতেন। আর তাদের কাজ করে অর্থ উপার্জন মানে শুধু তার নিজের উপার্জন নয়, দেশের উপার্জন। কিন্তু এই বিষয়টিকে আমরা বাস্তবে রূপ দিতে পারছিনা। কারণ শিক্ষাজীবনে তাদের শিখিয়েছি নউন কত প্রকার ও কি কি, কোনটি কোন ধরনের নাউন এবং কেনো ইত্যাদি যা মরুভূমির দেশে কিংবা শীতপ্রধান দেশ কোথাও তেমন কাজে লাগছে না। ফলে, তারা আবার অতিরিক্ত পয়সা ও সময় ব্যয় করে বিভিন্ন ধরনের কোচিংয়ে ভর্তি হন ইংরেজি শেখার জন্য। কিন্তু সেই কোচিংগুলোর অবস্থাও তো একই- তারা শেখাচ্ছেন কিছু অনুবাদ, স্বতস্ফূর্তভাবে ভাষা ব্যবহারের কোনো অনুশীলন নেই। দ্বিতীয় একটি কারণ হচ্ছে যারা উচ্চশিক্ষা কিংবা অন্যকোন কাজের জন্য বিদেশে যান তারা যাতে ভালোভাবে ইংরেজি ভাষাভাষী কিংবা অন্যভাষাভাষী দেশে সব কাজ মোটামুটি ভালোভাবে চালিয়ে যেতে পারেন। আমাদের ইংরেজি পড়ানো, ইংরেজির ক্লাস, ইংরেজির সিলেবাস ও মূল্যায়ন সে রকম হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তারা সবাই সারা জীবন ভারব কত প্রকার, কোন শব্দটি একটি বাক্যে কোন ধরনের নাউন এবং কেনো, এবং এগুলো আবার পড়েছেন সব বাংলায় ব্যাখ্যা অর্থাৎ ভাষা শেখার কোন পদ্ধতিতে নয়। জটিল বাক্য কাকে বলে, কেনো বলে, গঠনপ্রণালী কি কি ইত্যাদি। পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন দেখলেই তো বুঝা যাচেছ প্রায় সবকিছুই এগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ আর লিখিত একটি অংশ থাকে যা পুরোপুরি ট্রেডিশনাল। আর সেই সুযোগ কিছু শিক্ষক ও কোচিং সেন্টার একটি প্যারাগ্রাফ থেকে কিভাবে অন্য যে কোন প্যারাগ্রাফ লেখা যায় ইত্যাদি কসরত শেখায় শিক্ষার্থীদের। নিজের ভাষা উন্নত করার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। এখনে প্রশ্ন হলো তাদেরকে কি কেউ এসব কথা জিজ্ঞেস করবে কোন বিদেশি কোম্পানিতে কিংবা, বিদেশের মাটিতে কিংবা বিদেশের কোন অফিসে যে কোনটি অ্যাকটিভ ভয়েস, কোনটি নাউন ইন অ্যাপোজিশন ইত্যাদি? তারা বরং দেখবেন আমাদের শিক্ষার্থীরা বা গ্রাজুয়েটরা বিদেশিদের ইংরেজি বলা কতটা বুঝেন, সেইভাবে উত্তর দিতে পারেন কিনা, নিজেও বলে প্রকাশ করতে পারেন কিনা এবং নিজে লিখে প্রকাশ করতে পারেন কিনা।[লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজ] 

ভিডিও

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে কোন পুরস্কার কার ঝুলিতে

সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে টাইব্রেকারে ভারতকে ৪-৩ গোলে হারিয়েছে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা ঘরে তুললো বাংলাদেশ। বয়সভিত্তিক এই টুর্নামেন্টে চতুর্থবারের চেষ্টায় ফাইনালে এসে প্রথমবার ভারতকে হারানোর স্বাদ পেল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।বাংলাদেশের গোলরক্ষক ইসমাইল মাহিনের পারফরম্যান্স পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ছিলো ধারাবাহিক। শেষ পর্যন্ত তিনি টুর্নামেন্ট সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কারও জিতেছেন।টাইব্রেকারে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম তিন শটে সফল ছিলেন মুর্শেদ আলি, চন্দ্রন রয় ও আব্দুল ফাহিম। তবে চতুর্থ শটে এসে ব্যর্থ হন স্যামুয়েল রাকশাম, তার শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ফলে তখন দুদলই সমানে সমান অবস্থানে ছিল।কিন্তু ভারতের শেষ শটে আর সফলতা আসেনি। টুর্নামেন্টের টপ স্কোরার ওমাং দোদুমও লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হন। তার শট মিস করার পরই সুযোগ কাজে লাগায় বাংলাদেশ, আর তাতেই নিশ্চিত হয় শিরোপা জয়।এদিকে, বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে আলোচনায় থাকেন রোনান সুলিভান, যিনি ভারতীয় গোলরক্ষক সুরাজ সিংকে বোকা বানিয়ে পানেনকা শটে জয়সূচক গোলটি করেন। তার এই সাহসী শটেই আবারও ইতিহাসের পাতায় নাম লেখায় বাংলাদেশ।জয়ের পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক দলকে অভিনন্দন জানান এবং আর্থিক পুরস্কারের ঘোষণা দেন। দেশে ফিরলেই খেলোয়াড়দের হাতে সেই পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।মাহিন ছাড়াও বাংলাদেশের ঝুলিতে আরও পুরস্কার স্থান পেয়েছে। সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন ইলান ইমরান ও ওমাং দোদুম (৩ গোল করে)। টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ভারতের ওমাং দোদুম। আর ফেয়ার প্লে ট্রফি জিতেছে মালদ্বীপ।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে কোন পুরস্কার কার ঝুলিতে
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ জন