সংবাদ
মধ্যবিত্তের চোখে নীড় বাঁধার স্বপ্ন: ডানা মেলছে 'স্বপ্ন নগর-২'

মধ্যবিত্তের চোখে নীড় বাঁধার স্বপ্ন: ডানা মেলছে 'স্বপ্ন নগর-২'

ইটের পর ইট, তার মাঝে পিচঢালা পথ; ক্লান্ত এই নাগরিক জ্যামিতির মাঝে প্রতিটি মানুষেরই মনে সুপ্ত ইচ্ছে থাকে একটা এক চিলতে সবুজ বারান্দার, একটা নিরাপদ আশ্রয়ের। যেখানে দিনশেষে ঘরে ফিরে একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। কিন্তু এই তিলোত্তমা নগরী ঢাকায় মধ্যবিত্ত বা স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য একটি নিজস্ব ফ্ল্যাট কেনা যেন আকাশকুসুম কল্পনা। সেই কল্পনার ক্যানভাসে এবার বাস্তবতার রঙ তুলি নিয়ে হাজির হয়েছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ।রাজধানীর পল্লবী মেট্রোস্টেশনের ঠিক অদূরে, মিরপুর ৯ নম্বর সেকশনে ডানা মেলছে মধ্যবিত্তের স্বপ্নের আবাসন প্রকল্প—‘স্বপ্ন নগর ২য় পর্ব’। ১৫টি ১৪ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী ভবনের সারি যেন দূর থেকে জানান দিচ্ছে, এখানে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ডানা মেলতে শুরু করেছে। এই যেন এক নতুন ভোরের গল্প, যেখানে ঢাকা শহরের এক চিলতে আকাশ আর সবুজ চত্বরে বুক ভরে শ্বাস নেবে ১৫৬০টি পরিবার।ধ্বংসস্তূপ আর দখলদারদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে উত্থানএই বিশাল আবাসন গড়ে তোলা মোটেও সহজ ছিল না। এই প্রকল্প সফল করতে গিয়ে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের পদে পদে হতে হয়েছে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দীর্ঘদিন ধরে এই সরকারি জমিগুলো ছিল প্রভাবশালী অবৈধ দখলদার ও সিন্ডিকেটের কবলে। তবে মন্ত্রণালয়ের অনড় অবস্থান এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কঠোর শুদ্ধি অভিযানের সামনে পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে বছরের পর বছর ঘাপটি মেরে থাকা দালাল ও ফাইল আটকে রাখা সিন্ডিকেট চক্র।গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, এই উচ্ছেদ ও শুদ্ধি অভিযান চালাতে গিয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নানা হুমকি ও মিথ্যা অপপ্রচারের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুই দমাতে পারেনি এই উন্নয়নযজ্ঞকে। সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রতিটি ফ্ল্যাট, যাতে কোনো মধ্যবিত্তের স্বপ্ন মাঝপথে ফিকে হয়ে না যায়।১৬ ধরনের আধুনিক নাগরিক সুবিধা১৫ একরেরও বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই স্বপ্নের চত্বরটি মূলত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মিনি টাউনশিপ। এখানে থাকছে ৯ তলা বিশিষ্ট সুবিশাল কমিউনিটি ভবন, নিজস্ব অভ্যন্তরীণ চওড়া রাস্তা এবং দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে। প্রতিটি ভবনে যাতায়াতের জন্য থাকছে আলাদা প্যাসেঞ্জার ও বেড লিফটের ব্যবস্থা। এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য রয়েছে ১০০ ও ১৫০ কেভির জেনারেটর এবং ১৫০ ও ৬৩০ কেভিএ সাব-স্টেশন।পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার জন্য স্থাপন করা হয়েছে সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল, ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ তারের জন্য আরএমইউ, উন্নত অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা এবং সেন্ট্রিফিউগাল ও সাবমার্সিবল পাম্প। এছাড়াও থাকছে ইন্টারকম সুবিধা ও দৃষ্টিনন্দন প্রবেশদ্বার। পরিবেশ রক্ষায় ও পানি অপচয় রোধে নেওয়া হয়েছে যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যার মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) এবং ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ডব্লিউটিপি)।কঠোর তদারকিতে প্রকৌশলীরা, ২০২৬-এর ডিসেম্বরেই পূর্ণতা পাবে স্বপ্ন২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি যখন প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদিত হয়, তখন থেকেই একে ঘিরে ছিল ব্যাপক প্রত্যাশা। পরবর্তীতে সংশোধিত আকারে এই মেগা প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১১১৯৬৫ দশমিক ১৪ লাখ টাকা। কোনো প্রকার ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই প্রকল্পের চূড়ান্ত বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি বছরের ডিসেম্বর ২০২৬।প্রকল্পটির মাঠ পর্যায়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারিজুর রহমান জানান, তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজের মান নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রকল্প এলাকায় দায়িত্বরত মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, হারিজুর রহমান কাজের গুণগত মান ও নির্মাণ সামগ্রী তদারকি করতে নিয়মিত সাইট পরিদর্শন করেন এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। কাজের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হচ্ছে না।তিনটি ভিন্ন আকারে মধ্যবিত্তের সাধ ও সাধ্যের মেলবন্ধনএই আবাসন প্রকল্পে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতার কথা বিবেচনা করে তিন ক্যাটাগরির ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়েছে। ১৪ তলা বিশিষ্ট ৯টি ভবনে রয়েছে ১৫৪৫ বর্গফুটের ৯৩৬টি ফ্ল্যাট, যার প্রতিটির মূল্য ৭৮ দশমিক ৭২ লাখ টাকা। মাঝারি পরিবারের জন্য ১৪ তলা বিশিষ্ট ৪টি ভবনে রয়েছে ১৩৩৮ বর্গফুটের ৪১৬টি ফ্ল্যাট, যার মূল্য ৬৭ দশমিক ৯৯ লাখ টাকা। আর একদম সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য তৈরি হয়েছে ১৪ তলা বিশিষ্ট ২টি ভবনের ৮৭৮ বর্গফুটের ২০৮টি ফ্ল্যাট, যার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৪৪ দশমিক ৭০ লাখ টাকা। ইতিমধ্যেই নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া বেশ কয়েকটি ভবনের ফ্ল্যাট চাবি লটারির মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, বাকি ভবনগুলোর কাজও শেষ পর্যায়ে।গাফিলতি করা ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি অ্যাকশন ও ব্ল্যাকলিস্টের প্রস্তুতিকাজের গুণগত মান রক্ষা এবং নির্ধারিত সময়ে আবাসন বুঝিয়ে দিতে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, "পল্লবী মেট্রোস্টেশন থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে কালসি ও সিওএইচএস ফ্লাইওভার সংলগ্ন এই 'স্বপ্ন নগর-২' এলাকাটি আমরা একটি আদর্শ মডেল প্রকল্প হিসেবে গড়ে তুলছি। এখানে শিশুদের খেলার মাঠ থেকে শুরু করে গ্রিন স্পেস ও বয়স্কদের হাঁটার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।"তবে প্রকল্পের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করা কয়েকজন ঠিকাদারের গাফিলতির কথাও তিনি অকপটে স্বীকার করেন। সাখাওয়াত হোসেন স্পষ্ট করে বলেন, "কয়েকটি ভবন নির্মাণে গাফিলতি করায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের বাদ দিয়ে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং তাদের কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করার চিন্তাভাবনা চলছে।"ফ্ল্যাট মালিকদের স্বস্তি, তবে মশা ও নিরাপত্তা নিয়ে কিছু উদ্বেগইতিমধ্যেই যেসকল ভাগ্যবান মালিকরা ফ্ল্যাটের চাবি বুঝে পেয়ে বসবাস শুরু করেছেন, তাদের চোখে-মুখে এখন স্বস্তির আলো। তবে নতুন আবাসন এলাকা হওয়ায় কিছু প্রাথমিক সমস্যার কথাও জানিয়েছেন তারা। কয়েকজন ফ্ল্যাট মালিক বলেন, "শুরুতে এলাকাটিতে মশার উপদ্রব একটু বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মশা দমনে আমরা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতা কামনা করছি।"এছাড়াও তারা মেট্রোস্টেশন থেকে আবাসন এলাকার সংযোগ সড়ক পর্যন্ত রাতে যাতায়াতের নিরাপত্তার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মালিকদের দাবি, রাস্তার দুপাশে পর্যাপ্ত ল্যাম্পপোস্টের পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং পুলিশি পাহারা জোরদার করলে ১৫০০ পরিবারের নার ও শিশুরা নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে। যদিও নিকটস্থ ডিওএইচএস ও পল্লবী থানা পুলিশের নিয়মিত টহল দল এই এলাকায় নিরাপত্তা দিচ্ছে, তবুও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার হলে বাসিন্দারা মানসিকভাবে অনেক স্বস্তিতে থাকবেন।দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে এই মডেল: আশাবাদী চেয়ারম্যানপ্রকল্পের সামগ্রিক সাফল্য এবং ভবিষ্যতের রূপরেখা নিয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম মুঠোফোনে তার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি অত্যন্ত আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, "মিরপুরে আমাদের 'স্বপ্ন নগর-১' প্রকল্পের কাজ আগেই সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং সেখানে ফ্ল্যাট মালিকরা অত্যন্ত শান্তিতে ও নাগরিক সুবিধা ভোগ করে বসবাস করছেন। আমাদের দ্বিতীয় চেলেঞ্জিং প্রজেক্ট 'স্বপ্ন নগর-২'-এর নির্মাণ কাজও এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। অধিকাংশ ভবনের কাজ শেষ করে আমরা ফ্ল্যাটগুলো মালিকদের হাতে তুলে দিয়েছি। বাকি ভবনগুলোর চাবিও শিগগিরই বুঝিয়ে দেওয়া হবে।"ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম আরও যোগ করেন, "এই মডেল প্রকল্পটির সফল সমাপ্তির পর আমরা রাজধানীতে নতুন করে 'স্বপ্ন নগর-৩' ও 'স্বপ্ন নগর-৪' প্রকল্পের কাজ হাতে নিয়েছি। শুধু ঢাকাতেই নয়, দেশের আবাসন সংকট দূর করতে আমরা ৮টি বিভাগীয় শহর এবং দেশের বেশ কয়েকটি পুরাতন জেলা শহরেও মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের বৃহৎ উদ্যোগ নিয়েছি। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের পুরো টিম অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে দেশজুড়ে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।"সব মিলিয়ে মিরপুরের 'স্বপ্ন নগর-২' কেবল একটি আবাসন প্রকল্প নয়, এটি এক টুকরো ছাদ খোঁজা হাজারো মধ্যবিত্তের স্বপ্নপূরণের জ্বলজ্যান্ত দলিল। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই যখন সব ভবনে আলো জ্বলবে, তখন এই ইট-পাথরের ঢাকা শহর পাবে এক নতুন দৃষ্টিনন্দন পরিবেশবান্ধব মডেল উপশহর।
৪৯ মিনিট আগে

সৌদি বধের রাতে ইয়ামাল-ঝড়: ধ্বংসস্তূপ থেকে স্প্যানিশ আর্মাডার রাজকীয় প্রত্যাবর্তন

সৌদি বধের রাতে ইয়ামাল-ঝড়: ধ্বংসস্তূপ থেকে স্প্যানিশ আর্মাডার রাজকীয় প্রত্যাবর্তন

মধ্যবিত্তের চোখে নীড় বাঁধার স্বপ্ন: ডানা মেলছে 'স্বপ্ন নগর-২'

মধ্যবিত্তের চোখে নীড় বাঁধার স্বপ্ন: ডানা মেলছে 'স্বপ্ন নগর-২'

কুয়ালালামপুরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মুখোমুখি প্রধানমন্ত্রী

কুয়ালালামপুরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মুখোমুখি প্রধানমন্ত্রী

বাণিজ্য ও শ্রমবাজারে নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা: কুয়ালালামপুরে প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা

বাণিজ্য ও শ্রমবাজারে নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা: কুয়ালালামপুরে প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা

নবায়নযোগ্য জ্বালানি: লক্ষ্য অর্জনে বছরে প্রয়োজন ২১,৭৫০ কোটি টাকা

নবায়নযোগ্য জ্বালানি: লক্ষ্য অর্জনে বছরে প্রয়োজন ২১,৭৫০ কোটি টাকা

সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ বদলে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’

সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ বদলে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’

বাজেট ডিব্রিফিং সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে

বাজেট ডিব্রিফিং সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে

পাথরকাণ্ডের পর মাজার, ডিসি সারওয়ার প্রত্যাহারের নেপথ্যে...

পাথরকাণ্ডের পর মাজার, ডিসি সারওয়ার প্রত্যাহারের নেপথ্যে...

সমন্বিত ‘সিভিল এভিয়েশন মাস্টারপ্ল্যান’ প্রণয়নের কাজ শুরু জানা‌লেন বিমানমন্ত্রী

সমন্বিত ‘সিভিল এভিয়েশন মাস্টারপ্ল্যান’ প্রণয়নের কাজ শুরু জানা‌লেন বিমানমন্ত্রী

নবীগঞ্জে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

নবীগঞ্জে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

বিশ্বকাপ সময়সূচি: দেখতে ক্লিক করুন

মতামতমতামত

বাবা হওয়া সহজ, পিতা হওয়া কঠিন

একটি শিশু স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে পুরস্কার নিতে মঞ্চে উঠেছে। তার হাতে সনদ, মুখে আনন্দের ঝলক। মঞ্চ থেকে নেমে আসার আগে সে একবার দর্শকসারির দিকে তাকায়। সেখানে মা আছেন, শিক্ষক আছেন, আত্মীয়স্বজন আছেন। কিন্তু যে মানুষটিকে সে খুঁজছে, তিনি নেই। হয়তো দূর দেশে কাজ করছেন, হয়তো কর্মব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে গেছেন, হয়তো কাছেই আছেন কিন্তু সন্তানের জীবনে নেই। এই দৃশ্যটিতেই পিতৃত্বের বহু রূপ লুকিয়ে আছে।বাংলাদেশে প্রতিদিন হাজার হাজার শিশুর জন্ম হয়। প্রতিটি জন্মের সঙ্গে একটি নতুন পরিচয়ও তৈরি হয়। কেউ না কেউ বাবা হন। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়, সবাই কি পিতা হয়ে উঠতে পারেন?বছরের একটি দিন আসে, যেদিন আমরা বাবা দিবস পালন করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার গল্পে। নিঃসন্দেহে একজন ভালো বাবা একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। কিন্তু এই দিনটি শুধু উদযাপনের নয়; আত্মসমালোচনারও দিন। কারণ সমাজের সব শিশুর অভিজ্ঞতা এক নয়, সব বাবার গল্পও এক নয়।আমরা সাধারণত বাবাকে একটি একক পরিচয়ে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু বাস্তবে বাবা একটি বহুমাত্রিক চরিত্র। একজন বাবা আছেন, যিনি নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করেন। নিজে ভালো মন্দ না খেয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন। এমনকি তার মৃত্যুর পর সন্তানদের দুধে ভাতে খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করে রাখেন। আবার এমন বাবাও আছেন, যিনি সন্তানের জীবনে উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত। কেউ সন্তানের জন্য আশ্রয়, কেউ অভাব; কেউ সাহস, কেউ দীর্ঘশ্বাস।একজন শিশুর জীবনে বাবা সাধারণত প্রথম নায়ক। ছোট্ট শিশুটি বিশ্বাস করে, তার বাবা সব পারেন। এই বিশ্বাস গড়ে ওঠে বাবার উপস্থিতি, স্নেহ এবং দায়িত্ববোধের ওপর। বাবা যখন সন্তানের হাত ধরে রাস্তা পার করেন, স্কুলে নিয়ে যান, ভুল করলে ধৈর্য নিয়ে শেখান কিংবা ব্যর্থতার সময় পাশে দাঁড়ান, তখন তিনি শুধু একটি দায়িত্ব পালন করেন না; তিনি একটি মানুষ গড়ে তোলেন।বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে, বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ সন্তানের মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক আচরণের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। যে শিশু বাবার সঙ্গে কথা বলতে পারে, নিজের ভয় ও স্বপ্ন ভাগ করে নিতে পারে, সে জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে বেশি প্রস্তুত থাকে।কিন্তু বাস্তবতা সব সময় এত সুন্দর নয়। আমাদের সমাজে এমন বহু শিশু রয়েছে, যাদের বাবারা জীবিত থাকলেও তাদের জীবনে কার্যত অনুপস্থিত। কেউ কর্মব্যস্ততার অজুহাতে সন্তানের জন্য সময় বের করেন না। কেউ মনে করেন অর্থ উপার্জনই পিতৃত্বের একমাত্র দায়িত্ব। কেউ আবার ব্যক্তিগত স্বার্থ, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা উদাসীনতার কারণে সন্তানদের আবেগিক চাহিদাকে উপেক্ষা করেন।আবার অন্যদিকে এমন অসংখ্য বাবাও আছেন, যাদের ত্যাগের গল্প খুব কমই আলোচনায় আসে। গ্রামের কৃষক বাবা, যিনি খরার মাঠে দাঁড়িয়ে সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি জোগাড় করেন। রিকশাচালক বাবা, যিনি নিজের নতুন জামা না কিনে সন্তানের বই কেনেন। প্রবাসী বাবা, যিনি হাজার মাইল দূরে শ্রমিক ক্যাম্পে বসে মোবাইলের পর্দায় সন্তানের বড় হয়ে ওঠা দেখেন। তাদের অনেকেই সন্তানের প্রথম হাঁটা, প্রথম স্কুলে যাওয়া কিংবা প্রথম পুরস্কার জেতার মুহূর্তে পাশে থাকতে পারেন না। কিন্তু অনুপস্থিতির ভেতরেও তাদের ভালোবাসা উপস্থিত থাকে। এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। সন্তানের জন্ম দেওয়া কি একজন মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পিতা বানিয়ে দেয়? জৈবিক অর্থে হয়তো দেয়, কিন্তু সামাজিক ও নৈতিক অর্থে নয়। পিতৃত্ব একটি সম্পর্কের নাম, কিন্তু তার চেয়েও বেশি একটি দায়িত্বের নাম। একজন মানুষ সন্তান জন্ম দিতে পারেন, কিন্তু পিতা হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন সময়, যত্ন, আত্মত্যাগ, ধৈর্য এবং দায়বদ্ধতা। রক্তের সম্পর্ক মানুষকে বাবা পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু পিতৃত্বের মর্যাদা অর্জন করতে হয় কাজের মাধ্যমে।আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত, বাবা মানেই উপার্জনকারী। ফলে অনেকেই মনে করেন সংসারের খরচ বহন করলেই পিতৃত্বের দায়িত্ব শেষ। অথচ আধুনিক গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, সন্তানের শুধু খাবার, পোশাক ও শিক্ষার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন সময়, মনোযোগ এবং আবেগিক সংযোগ।একজন শিশু তার বাবার কাছ থেকে শুধু অর্থ চায় না, সে চায় গল্প, সঙ্গ, প্রশ্রয়, পরামর্শ এবং নিরাপত্তা। সে চায় এমন একজন মানুষ, যার কাছে ব্যর্থতার কথা বলা যায়, ভয় ভাগ করা যায়, স্বপ্নের কথা বলা যায়। আবার অনেক বাবা অর্থ থাকলেও সন্তানদের বিষয়ে বেশ উদাসীন।অনেক সময় দেখা যায়, একজন বাবা সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করেছেন, কিন্তু সন্তানের সঙ্গে হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। আবার সীমিত আয়ের একজন বাবা সন্তানের জীবনে এত গভীরভাবে জড়িত থেকেছেন যে তার উপস্থিতিই সন্তানের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ একজন বাবার প্রকৃত মূল্য তার আয় দিয়ে নয়, তার প্রভাব দিয়ে পরিমাপ করা উচিত।পিতৃত্বের আরেকটি দিক নিয়েও আমাদের কথা বলা দরকার। আমরা বাবাদের কাছ থেকে সব সময় শক্ত থাকার প্রত্যাশা করি। সমাজ তাদের শেখায় কাঁদবে না, দুর্বলতা দেখাবে না, ভেঙে পড়বে না। ফলে অনেক বাবা তাদের উদ্বেগ, ব্যর্থতা, হতাশা কিংবা মানসিক চাপ নিজের ভেতরেই লুকিয়ে রাখেন। পরিবারের সবার জন্য আশ্রয় হতে গিয়ে তারা নিজের জন্য কোনো আশ্রয় খুঁজে পান না। এই নীরব কষ্টের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। কারণ একজন বাবা কোনো যন্ত্র নন। তারও ক্লান্তি আছে, অপূর্ণতা আছে, স্বপ্ন আছে, ব্যর্থতা আছে। তিনি মানুষ। তবে এই মানবিক সত্য স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে দায়িত্বহীনতাকে প্রশ্রয় দিতে হবে।সমাজে এমন বাবাও আছেন, যাদের সিদ্ধান্ত বা উদাসীনতা সন্তানের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। কোনো সন্তান তার বাবাকে বেছে নেওয়ার সুযোগ পায় না। কিন্তু একজন বাবা প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নেন তিনি কেমন বাবা হবেন। তিনি কি সন্তানের জীবনে আশ্রয় হয়ে উঠবেন, নাকি অনুপস্থিতির আরেকটি নাম হয়ে থাকবেন সেই সিদ্ধান্ত তার নিজের।আজ পরিবার কাঠামো বদলাচ্ছে। অভিবাসন বাড়ছে, বিচ্ছেদ বাড়ছে, কর্মজীবনের চাপ বাড়ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যেও পিতৃত্বের গুরুত্ব কমে যায়নি; বরং আরও বেড়েছে। কারণ দ্রুত পরিবর্তনশীল এই সমাজে একটি শিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরাপদ সম্পর্ক। আর সেই সম্পর্ক গঠনে বাবার ভূমিকা অপরিসীম। আমরা যখন একজন মহান বাবার গল্প শুনি, তখন শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি মূল্যবোধকে সম্মান জানাই। আবার যখন কোনো দায়িত্বহীন বাবার কথা শুনি, তখন বুঝতে পারি পিতৃত্ব কেবল জৈবিক পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না।বাবা দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই বাবা হওয়া সহজ, কিন্তু পিতা হয়ে ওঠা কঠিন।একজন সত্যিকারের পিতা সন্তানের জীবনে শুধু জন্মের কারণ হন না; তিনি হয়ে ওঠেন সাহসের উৎস, নৈতিকতার ভিত্তি, নিরাপত্তার ছায়া এবং ভবিষ্যতের দিশারি। তার উপস্থিতি সন্তানকে শক্তি দেয়, আর তার অনুপস্থিতি অনেক সময় একটি দীর্ঘ শূন্যতা তৈরি করে।একজন বাবা তার সন্তানের জন্য কত টাকা রেখে গেলেন, ইতিহাস তা মনে রাখে না। কিন্তু তিনি সন্তানের মনে কতটা সাহস, সততা, মানবিকতা এবং নিরাপত্তা রেখে গেলেন, সেটিই প্রকৃত উত্তরাধিকার।তাই বাবা দিবসে প্রশ্নটি শুধু বাবাদের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য। আমরা কি আগামী প্রজন্মের জন্য দায়িত্বশীল পিতৃত্বের সংস্কৃতি তৈরি করছি, নাকি শুধু জন্মদাতার সংখ্যা বাড়াচ্ছি? কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় শুধু তার অর্থনীতি বা অবকাঠামো দিয়ে নয়; নির্ধারিত হয় তার পরিবারগুলো কেমন, তার শিশুরা কেমন পরিবেশে বড় হচ্ছে, আর তাদের বাবারা পিতৃত্বকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন তার ওপরও।বাবা দিবসে তাই শ্রদ্ধা সেই সব বাবাকে, যারা শুধু সন্তান জন্ম দেননি... মানুষ গড়েছেন।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক

বাজেট ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন

জাতীয় বাজেট কোনো দেশের শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দর্শন, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার প্রতিচ্ছবি| বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট-২০২৬ সে অর্থে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক| বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ ব্যয় নির্ধারণ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে| বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম এ খাতে জিডিপির ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে| একই সঙ্গে জাতীয় বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দও একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি| সরকার এবারের বাজেটে জাতীয় উন্নয়নের জন্য দশটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে| গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দশটি লক্ষ্যই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্যখাতের সঙ্গে সম্পর্কিত| কারণ একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই হতে পারে না| এবারের জাতীয় বাজেটের প্রথম লক্ষ্য হলো ˆবষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা| অর্থনৈতিক ˆবষম্য কমাতে হলে স্বাস্থ্যসেবার ˆবষম্য দূর করা অপরিহার্য| দরিদ্র, নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব নয়| এ লক্ষ্যে ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হৃদরোগের স্টেন্ট এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ওপর কর ও ভ্যাট ছাড় দেয়ার উদ্যোগ চিকিৎসা ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে| দ্বিতীয় লক্ষ্য গুণগত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা| শিক্ষা ও স্বাস্থ্য একে অপরের পরিপূরক| অসুস্থ, অপুষ্ট বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিক্ষার্থী কখনোই তার পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে না| তাই প্রতিটি ইউনিয়ন ও নগর ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন, ই-হেলথ কার্ড চালু এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার সম্প্রসারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক বিনিয়োগ| একই সঙ্গে আধুনিক এমবিবিএস কারিকুলাম চালুর উদ্যোগ দেশের চিকিৎসা শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সহায়ক হবে| তৃতীয় লক্ষ্য সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা| বাংলাদেশে প্রতিবছর বহু পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে| স্বাস্থ্যবিমা, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সহায়তা সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা আর্থিক দুর্ভোগ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে| একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অন্যতম ˆবশিষ্ট্য হলো অসুস্থতার কারণে কোনো নাগরিক যেন দারিদ্র্েযর কষাঘাতে না ভোগে| চতুর্থ লক্ষ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রবৃদ্ধি| স্বাস্থ্যখাত নিজেই একটি বৃহৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র| পাঁচ হাজার চিকিৎসক এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা শুধু স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে না, একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে| চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং ওষুধশিল্পে কাঁচামাল আমদানির সুবিধা স্থানীয় শিল্পের বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে এবং স্বাস্থ্যখাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করবে| পঞ্চম লক্ষ্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি| সুস্থ শ্রমশক্তি ছাড়া উৎপাদনশীল অর্থনীতি কল্পনা করা যায় না| শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, কর্মঘণ্টা অপচয় কমে এবং শিল্পখাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে| উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়| ষষ্ঠ লক্ষ্য আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা| স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত ব্যয় বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ| শক্তিশালী সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিমা চালু হলে মানুষের সঞ্চয় রক্ষা পাবে, ঋণগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে| সপ্তম লক্ষ্য জ্বালানি নিরাপত্তা| আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর| আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, ল্যাবরেটরি, অক্সিজেন প্ল্যান্ট, ডিজিটাল রেকর্ড এবং টেলিমেডিসিন—সবকিছুই বিদ্যুৎনির্ভর| তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা| অষ্টম লক্ষ্য ডিজিটাল রূপান্তর ও তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়ন| ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, টেলিমেডিসিন, ইলেকট্রনিক হেলথকার্ড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ নির্ণয় ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ| তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করে তুলতে পারে| নবম লক্ষ্য জীবন, প্রকৃতি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা| নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত| ডেঙ্গু, তাপপ্রবাহ, বন্যা এবং পানিবাহিত রোগের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত উন্নয়ন নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| দশম ও শেষ লক্ষ্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা| স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা ছাড়া জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে না| মেধাভিত্তিক নিয়োগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন সম্ভব| একটি জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে এবং রাষ্ট্রীয় সেবার কার্যকারিতা নিশ্চিত করে| স্বাস্থ্য জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু| মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং পরিবেশ সুরক্ষা—সবকিছুর ভিত্তি একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী| তাই স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত| জাতীয় বাজেট ২০২৬ সে উপলব্ধিরই প্রতিফলন| এখন প্রয়োজন ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, সুশাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা| কারণ বাজেটের প্রকৃত সাফল্য কাগজে নয়, মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়| একটি সুস্থ, সক্ষম ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের পথে এ বাজেট আশার নতুন আলো জ্বালাবে এটাই প্রত্যাশা| (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

কোম্পানির চেক ডিজঅনার হলে মামলা কার বিরুদ্ধে করবেন?

ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের চেক এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা কোম্পানির চেকের আইনি মারপ্যাঁচ সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোম্পানির দেয়া চেক ডিজঅনার হলে মামলা কার বিরুদ্ধে হবে— কোম্পানি নাকি তার পরিচালকদের বিরুদ্ধে? সব পরিচালককে আসামি করলেই কি মামলার জয় নিশ্চিত, নাকি বাদী নিজেই আইনি মারপ্যাঁচে ফেঁসে যেতে পারেন? আবার চেকে স্বাক্ষর না করেও কোনো নিষ্ক্রিয় পরিচালক কীভাবে বছরের পর বছর আদালতের চক্কর কাটছেন এবং এর থেকে মুক্তির উপায়ই বা কী? দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ধারা ১৩৮ ও ১৪০ এবং উচ্চ আদালতের সর্বশেষ বিভিন্ন নজির বিশ্লেষণ করলে এই জটিল বিষয়ের কিছু সূক্ষ্ম টেকনিক্যাল দিক পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কোম্পানিকে পক্ষ করার বাধ্যবাধকতা ও আইনি বিতর্ক:আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে একটি লিমিটেড কোম্পানি নিজেই একটি পৃথক আইনগত স্বত্ব (Separate Legal Entity)। এনআই অ্যাক্টের ১৪০ ধারা অনুযায়ী, অপরাধটি যদি কোনো কোম্পানি দ্বারা সংঘটিত হয়, তবে কোম্পানি নিজে এবং অপরাধের সময় কোম্পানির ব্যবসার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি—উভয়ই অপরাধী বলে গণ্য হবেন। এই ধারার ব্যাখ্যায় উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে কিছু ভিন্নধর্মী পর্যবেক্ষণ রয়েছে, যা মামলা করার আগে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত:কোম্পানিকে ১ নম্বর আসামি করার বাধ্যবাধকতা: অনেক নজিরে দেখা গেছে, কোম্পানিকে আসামি না করে কেবল পরিচালকদের বিরুদ্ধে মামলা করায় পরবর্তীতে উচ্চ আদালত তা বাতিল (Quashment) করে দিয়েছেন। যেমন— মুসলিম উদ্দীন বনাম রাষ্ট্র [৭২ BLD (২০২০) ৪৫২] মামলায় দেখা যায়, যিনি চেকে স্বাক্ষর করেছেন তিনি হয়তো কোম্পানির প্রতিনিধি মাত্র। কোম্পানিকে যথাযথভাবে যুক্ত না করায় প্রাতিষ্ঠানিক দায় ব্যক্তির ঘাড়ে চাপানোর ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা ˆতরি হয়। কোম্পানিকে পক্ষ না করার ভিন্নমত: আবার, আলহাজ্ব মো. হারুন-অর রশিদ এবং অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র [৩৬ BLD (২০১৬) ২০০] মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ উল্লেখ করেন যে, চেক ডিজঅনারের মামলায় কোম্পানিকে পক্ষ করা না হলে তা মামলার মারাত্মক ত্রুটি নয়। কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যাবলী পরিচালনায় জড়িত চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলতে আইনত বাধা নেই। ভুল সংশোধনের সুযোগ: অন্যদিকে, শরিফুল হক বনাম রাষ্ট্র [৭০ DLR (২০১৮) ২০৯] মামলায় আদালত মন্তব্য করেছেন যে, মামলায় অনুরূপ ত্রুটি না রেখে নালিশী দরখাস্ত সংশোধনের মাধ্যমে কোম্পানিকে পক্ষ করে নেয়াই উত্তম এবং ফৌজদারী কার্যবিধির ২২৭ ধারা অনুযায়ী চার্জ পরিবর্তনের সুযোগও রয়েছে। শুধু কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা: মোহাম্মদ ইউসুফ বাবু বনাম জন প্রোভিশন চৌধুরী [৩ LM (AD) ৫৬২] মামলায় আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো পরিচালক বা কর্মকর্তাকে পক্ষ না করে শুধুমাত্র কোম্পানির বিরুদ্ধেও ১৩৮ ধারায় মামলা চালানো সম্ভব। এতে কোম্পানির সম্পদ থেকে পাওনা আদায় সহজ হয়। ঢালাওভাবে সব পরিচালককে আসামি করার পরিণতি:মামলা মজবুত করার উদ্দেশে অনেক সময় নালিশি পিটিশনে কোম্পানির সব পরিচালকের নাম বসিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা হলো—আরজিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে, চেক ইস্যু এবং অপরাধ সংঘটনের সময় ওই পরিচালকরা কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে সরাসরি নিয়োজিত ছিলেন এবং তাদের জ্ঞাতসারেই এটি ঘটেছে। মো. শহিদুল আলম বনাম রাষ্ট্র [২৩ ALR (Vol-৩) (HCD) ২০২১, ৬২] মামলায় বলা হয়েছে, ঢালাওভাবে সবাইকে আসামি করলে আদালত অনেক সময় তাদের অব্যাহতি দেন। আইনি নোটিশ জারির নিয়ম:কোম্পানির পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক চেকে স্বাক্ষর করলে এবং চেক ডিজঅনার হলে, মামলা দায়েরের আগে কেবল ওই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ওপর নোটিশ জারি করলেই চলবে, কোম্পানির ওপর আলাদাভাবে নোটিশ জারির প্রয়োজন নেই—এমনটিই সিদ্ধান্ত এসেছে ইউসুফ বাবু বনাম রাষ্ট্র [৬৮ DLR (AD) ২০১৬, ২৯৮] মামলায়। তবে কোম্পানিকে ১ নম্বর আসামি করে মামলা করলে অন্য পরিচালকদের জন্য পৃথক পৃথক নোটিশ জারির বাধ্যবাধকতা নেই। নিষ্ক্রিয় পরিচালকদের মুক্তির উপায়:যারা কোম্পানির সাধারণ বা নিষি&ক্রয় পরিচালক এবং দৈনন্দিন লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত নন, তারা যদি ত্রুটিপূর্ণ মামলার কারণে বিড়ম্বনায় পড়েন, তবে কোম্পানি আইনের এই মৌলিক ত্রুটিগুলো (যেমন— ব্যবসায়িক পরিচালনায় তার সুনির্দিষ্ট ভূমিকার অনুপস্থিতি) আদালতের সামনে তুলে ধরে ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৬১এ ধারা অনুযায়ী উচ্চ আদালতে ‘কোয়াশমেন্ট’ বা মামলা বাতিলের আবেদন করতে পারেন। কাজেই, কোম্পানির চেকে লেনদেনের ক্ষেত্রে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর আগেই নিশ্চিত হোন চেকটি ব্যক্তিগত নাকি প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট থেকে দেয়া। সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে যেমন পাওনা টাকা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে, ঠিক তেমনি নির্দোষ ব্যক্তিও আইনি হয়রানির শিকার হতে পারেন। [লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

বাবা: জীবনের প্রথম নায়ক ও এক বটবৃক্ষ

মানবজীবনের ক্যানভাসে সম্পর্কের রঙগুলো নানাভাবে বিন্যস্ত। কোনো সম্পর্ক স্নেহের, কোনোটি সখ্যের, কোনোটি আবার মায়ায় জড়ানো। তবে এই সমস্ত অনুভূতির ঊর্ধ্বে যে মানুষটি এক বিশাল আকাশ হয়ে আমাদের অস্তিত্বকে আগলে রাখেন, তিনি হলেন বাবা। ‘বাবা’ শব্দটির গভীরতা পরিমাপ করা কোনো দাঁড়িপাল্লার পক্ষে সম্ভব নয়। এটি কেবল একটি সম্পর্ক বা ডাক নয়; বরং এটি এক পরম নিশ্চিন্ততার আশ্রয়, যেন এক অলিখিত সুরক্ষাকবচ। মা যদি হন সন্তানের জীবনের প্রথম সুর ও মমতা, তবে বাবা হলেন সেই সুরের পেছনের গুরুগম্ভীর তান, যা পুরো জীবনটাকে একটি সুশৃঙ্খল ছন্দে বেঁধে রাখে। একজন বাবার জীবন মূলত এক নিঃশব্দ ত্যাগের মহাকাব্য। সমাজের চাকা সচল রাখতে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি প্রতিদিন যে সংগ্রাম করেন, তার সিংহভাগই অলক্ষিত থেকে যায়। বাবার ভালোবাসা প্রকাশ পায় তার রুক্ষ হাতের তালুতে, কপালে জমে থাকা ঘামের বিন্দুতে এবং সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অক্লান্ত পথচলায়। ˆশশবের অবুঝ দিনগুলো থেকে শুরু করে যৌবনের জটিল মোড় পর্যন্ত বাবা হলেন জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শিক্ষক। বাবার আঙুল ধরে প্রথম হাঁটতে শেখা কেবল শারীরিক ভারসাম্য রক্ষা করা নয়, বরং জীবনের পথে পা বাড়ানোর প্রথম আত্মবিশ্বাস। যখন সন্তান পড়ে যেতে নেয়, তখন যে শক্ত হাতটি তাকে টেনে তোলে, সেটিই তাকে শেখায়—পড়ে যাওয়া মানেই শেষ নয়; বরং নতুন শক্তিতে আবার উঠে দাঁড়াতে হবে। মা যেখানে সন্তানকে পৃথিবীর সমস্ত নির্মমতা থেকে আড়াল করে রাখতে চান, বাবা সেখানে সন্তানকে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে শেখান। তিনি শেখান কীভাবে ঝড়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। তিনি মুখে হয়তো বড় বড় তত্ত্বকথা বলেন না, কিন্তু তার জীবনযাপনই হয়ে ওঠে সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় অনুকরণীয় আদর্শ। সংসারে অভাব-অনটন যতই থাকুক না কেন, সন্তানের ছোট ছোট আবদারগুলো পূরণ করতে বাবা নিজের ইচ্ছাগুলোকে নির্দ্বিধায় বিসর্জন দেন। নিজের জীর্ণ জুতোজোড়া তালি দিয়ে হলেও সন্তানের পায়ে নতুন জুতো পরিয়ে দেয়ার মাঝে তিনি যে স্বর্গীয় আনন্দ পান, তা কেবল একজন বাবার পক্ষেই সম্ভব। এই সুরক্ষার প্রাচীরটি যখন মাথার ওপর থাকে, তখন মানুষ যেকোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়ার সাহস পায়। বাবার ভালোবাসা সবসময় এক রহস্যময় চাদরে ঢাকা থাকে। তিনি হয়তো প্রতিদিন জড়িয়ে ধরে ‘ভালোবাসি’ বলেন না; বরং অবাধ্যতার জন্য মাঝেমধ্যে শাসন করেন। কিন্তু সেই শাসনের আড়ালে যে কত বড় উদ্বেগের নদী বয়ে চলে, তা কেবল একজন বাবাই জানেন। সন্তান যখন দেরিতে বাড়ি ফেরে, তখন বাইরে রাগী মুখে পায়চারি করা মানুষটির ভেতরে যে তীব্র উৎকণ্ঠা কাজ করে, সেটিই হলো বাবার ভালোবাসা। সন্তানের সামান্য সাফল্যে যে মানুষটির বুক গর্বে ভরে ওঠে, অথচ লোকসমক্ষে যিনি কেবল এক চিলতে মৃদু হাসি দিয়ে নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখেন, তিনিই বাবা। মায়ের অশ্রু জল হয়ে ঝরে পড়ে, কিন্তু বাবার অশ্রু বুকের ভেতরে জমাট বেঁধে পাথর হয়ে যায়, যা কেউ কোনোদিন দেখতে পায় না। এই নীরব ভালোবাসার ভাষা বুঝতে পারাটাই সন্তানের জীবনের অন্যতম বড় সার্থকতা। সময়ের নিষ্ঠুর নিয়মে যে বাবা একদিন ছিলেন পরিবারের একমাত্র চালিকাশক্তি, যার বলিষ্ঠ পদচারণায় মুখরিত থাকত চারপাশ, তিনিও একসময় বার্ধক্যে উপনীত হন। তার টানটান চামড়া কুঁচকে যায়, চোখের দৃষ্টি ধোঁয়াটে হয়ে আসে এবং একসময়ের শক্ত হাত দুটি কাঁপতে শুরু করে। এই সময়টা একজন বাবার জন্য বড় বিষণ্নতার। ˆশশবে তিনি যেভাবে সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন, বার্ধক্যে এসে তিনিও ঠিক তেমনই একটুখানি সময়, একটুখানি মনোযোগ ও স্নেহের কাঙাল হয়ে পড়েন। তখন সন্তানের দায়িত্ব হয়ে ওঠে সেই ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করার, যদিও বাবার ঋত কখনো পুরোপুরি শোধ করা সম্ভব নয়। তার জীর্ণ হাতটি ধরে তাকে আশ্বস্ত করা— ‘বাবা, আমি আছি’—এটাই হতে পারে তার জীবনের শেষ বয়সের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা। আজকের এই যান্ত্রিক ও ব্যস্ত জীবনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রতিটি সন্তানের উচিত বাবার নিঃশব্দ অবদানকে শ্রদ্ধা জানানো। যতদিন বাবা বেঁচে আছেন, তার চরণে যেন থাকে পরম শ্রদ্ধা; আর তিনি যদি ওপারে চলে গিয়ে থাকেন, তবে তার স্মৃতি যেন হয় আমাদের সৎ পথে চলার পাথেয়। স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ উপহারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাবা। তার ছায়াতলে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই জীবনের পরম প্রাপ্তি। বাবা কেবল একজন মানুষ নন; তিনি সন্তানের জীবনের প্রথম নায়ক, প্রথম শিক্ষক এবং এক বিশাল বটবৃক্ষ, যার ছায়া জীবনভর আমাদের আগলে রাখে। [লেখক: শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

নদীভাঙনে বিলীন জনপদ: বিষখালী থেকে তিস্তা

বাংলাদেশের ইতিহাসের শুরু নদী দিয়ে, সভ্যতার উন্মেষ নদীকে ঘিরে, আর বাঙালির জীবনযাত্রার প্রতিটি অধ্যায়ে জড়িয়ে আছে নদীর অমলিন ছোঁয়া। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, বিষখালী, কীর্তনখোলা কিংবা পায়রা এই নদীগুলো শুধু জলধারা নয়; তারা আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, সাহিত্য ও জনপদের প্রাণস্পন্দন। শত শত বছর ধরে এই নদীগুলোর বুকে ভেসে এসেছে জীবনের গান, আবার তাদের উন্মত্ত স্রোতে হারিয়ে গেছে অসংখ্য বসতি, অগণিত মানুষের স্বপ্ন আর প্রজন্মের স্মৃতি। নদী যখন হাসে, তখন বাংলার মাঠে সোনালি ধান দোলে; নদী যখন রুদ্ররূপ ধারণ করে, তখন নিঃস্ব হয়ে যায় হাজারো পরিবার। বিষখালী থেকে তিস্তা, পদ্মা থেকে ব্রহ্মপুত্র দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত একই দীর্ঘশ্বাস, একই আর্তনাদ। নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যায় শত বছরের বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির, পূর্বপুরুষের কবর আর মানুষের শেকড়। ভাঙনের যন্ত্রণা কেবল মাটি হারানোর নয়, এটি অস্তিত্ব হারানোর বেদনা; এটি স্মৃতি, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ হারানোর নাম। বিষখালীর বুকে হারিয়ে যাওয়া ভবানীপুর বাজার: ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার নাচনমহল ইউনিয়নের ভবানীপুর বাজার একসময় ছিল শত বছরের প্রাণকেন্দ্র। দুই শতাধিক দোকানের কোলাহল আর মানুষের জীবিকার স্পন্দনে মুখর সেই বাজার আজ বিষখালীর গর্ভে বিলীন। পুরোনো বাজার হারিয়ে এক কিলোমিটার দূরে নতুন বাজার গড়ে উঠেছে। কিন্তু নতুন বাজারের অধিকাংশ মানুষই নদীভাঙনের শিকার। তাদের জীবনের গল্প যেন একই বাড়ি নেই, জমি নেই, আছে শুধু বেঁচে থাকার সংগ্রাম। চাঁদপুরা গ্রামের হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্ব: ভবানীপুরের পাশের চাঁদপুরা গ্রাম আজ শুধু স্মৃতির নাম। যেখানে ছিল ধান খেত, নারকেল-সুপারির বাগান, সেখানে আজ নদীর জল। ভাঙনের শিকার মানুষগুলো বাঁধের ওপর টিনের ঘরে জীবন কাটাচ্ছেন। মানুষ ও গবাদিপশু একই ছাদের নিচে রাত কাটাচ্ছে। এই চিত্র শুধু চাঁদপুরের নয়; বাংলাদেশের হাজারো গ্রামের। ভাঙনের সঙ্গে হারিয়ে যায় স্মৃতি ও শেকড়: নদীভাঙন শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস করে না, ধ্বংস করে মানুষের আবেগ ও সামাজিক বন্ধন। বহু মানুষ পূর্বপুরুষের কবর রক্ষার চেষ্টা করেন, কিন্তু নদীর কাছে সবকিছুই অসহায়। প্রতিবেশীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আত্মীয়রা ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। হারিয়ে যায় সামাজিক পরিচয় ও শেকড়। পদ্মা থেকে তিস্তা: একই বেদনার গল্প: শরীয়তপুর, মাদারীপুর, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট কিংবা নীলফামারী সবখানেই নদীভাঙনের একই চিত্র। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ৮,৭০০ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয় এবং প্রায় দুই লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  বাস্তুচ্যুত মানুষের নতুন জীবন: যাদের সামর্থ্য আছে, তারা নতুন জায়গায় ঘর তোলেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ আশ্রয় নেন বাঁধের ওপর কিংবা অন্যের জমিতে। কৃষক হয়ে যান দিনমজুর, ব্যবসায়ী হয়ে যান রিকশাচালক, শিক্ষিত মানুষ হয়ে পড়েন বেকার। নদীভাঙন শুধু ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরেরও নাম। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশুরা: নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলোতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় নারী ও শিশুরা। বিদ্যালয় হারিয়ে শিশুরা শিক্ষার বাইরে চলে যায়। অনেক মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। আশ্রয়হীন নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে একটি প্রজন্ম ঝুঁকির মুখে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তন সংকটকে আরও গভীর করছেবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীর প্রবাহ ও চরিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অতিবৃষ্টি, অনিয়মিত বন্যা ও পলি জমার কারণে ভাঙনের মাত্রা বাড়ছে। ফলে নদীভাঙন এখন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি জলবায়ুজনিত মানবিক সংকট। পুনর্বাসনের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা: বাংলাদেশে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নদীভাঙনের শিকার অনেক পরিবারও এই কর্মসূচির মাধ্যমে উপকৃত হয়েছে। যদিও এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবু এটি একটি ইতিবাচক ভিত্তি ˆতরি করেছে। নদীশাসনে চলমান উদ্যোগ: বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভিন্ন অঞ্চলে নদীতীর সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ ও ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। রাজশাহীতে পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও নদীতীর রক্ষা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে। জনমুখী নেতৃত্বের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা :দেশের মানুষের প্রত্যাশা, বর্তমান জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে নদীভাঙনকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখা হবে। উন্নয়ন শুধু সেতু, সড়ক ও ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থেকে নদীভাঙা মানুষের পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনর্গঠনের দিকেও সমান গুরুত্ব পাবে এমন প্রত্যাশা আজ সাধারণ মানুষের। শিক্ষাবিদের দৃষ্টিতে নদীভাঙন: মানবিক ও বৈজ্ঞানিক সমাধানের আহ্বান: পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান মনে করেন, নদীভাঙন কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটের সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। তার ভাষায়, ‘নদীভাঙনের ফলে মানুষ শুধু জমি বা ঘরবাড়ি হারায় না, হারিয়ে ফেলে তার শেকড়, স্মৃতি, সামাজিক পরিচয় ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক নদীশাসন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য মানবিক পুনর্বাসন ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে নদীর গতিপ্রকৃতি, পলি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণ নিয়ে সমন্বিত গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্র, স্থানীয় প্রশাসন, গবেষক সমাজ ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই নদীভাঙনের ক্ষতি কমিয়ে একটি নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, নদী আমাদের সভ্যতার উৎস; তাই নদীকে শত্রু নয়, বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পদ হিসেবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি নদীভাঙনের শিকার মানুষদের পুনর্বাসনকে মানবিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা : ভারতের আসাম ও বিহার, নেপাল কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নদীভাঙন ও বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি রয়েছে। বাংলাদেশেও স্থানীয় সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সমš^য়ে স্থায়ী সমাধান গড়ে তোলা সম্ভব। প্রয়োজন জাতীয় নদীভাঙন নীতি: নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তথ্যভান্ডার ˆতরি, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় নীতি প্রণয়ন জরুরি। নদীভাঙাকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় অংশে নিয়ে আসতে হবে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন মানুষ বাঁচে : হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প তখনই অর্থবহ হবে, যখন ভিটেমাটি হারানো মানুষের মুখে হাসি ফিরবে। নদীভাঙা মানুষের জন্য জমি, ঘর, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হতে পারে মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয়। বাংলার নদীগুলো আমাদের জীবন দিয়েছে, সভ্যতা দিয়েছে, দিয়েছে শস্য-শ্যামল এই ভূখণ্ডের অফুরন্ত প্রাচুর্য। অথচ আজ সেই নদীর বুকেই ভেসে বেড়ায় অসংখ্য মানুষের দীর্ঘশ্বাস। বিষখালীর পাড়ে হারিয়ে যাওয়া ভবানীপুর বাজার, চাঁদপুরার বিলীন স্মৃতি কিংবা তিস্তার তীরে আশ্রয়হীন মানুষের অশ্রু এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের নীরব বেদনার প্রতিচ্ছবি। নদীভাঙনের শিকার মানুষ কোনো পরিসংখ্যান নয়, তারা এ দেশের কৃষক, জেলে, শিক্ষক, শ্রমিক, মা-বাবা ও সন্তান তারা আমাদেরই মানুষ। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল পৌঁছে যায় নদীর পাড়ে বসবাসকারী সর্বস্ব হারানো মানুষটির কাছেও। তাই সময়ের দাবি, নদীভাঙনকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে বিজ্ঞানভিত্তিক নদীশাসন, টেকসই পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনর্গঠনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মুখে আবারও হাসি ফিরিয়ে আনা। দেশের মানুষের প্রত্যাশা, জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে মানবিক ও জনমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার অঙ্গীকারের ধারাবাহিকতায় নদীভাঙা মানুষের জীবন-সংগ্রাম নতুন গুরুত্ব পাবে এবং বিষখালী থেকে তিস্তা পর্যন্ত প্রতিটি জনপদ ফিরে পাবে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন। কারণ নদীর কান্না থামানো মানেই মানুষের কান্না থামানো, আর সেই দায়িত্ব পালনেই নির্মিত হবে আরও সমৃদ্ধ, মানবিক ও স্বপ্নময় বাংলাদেশ। [লেখক: প্রশিক্ষক, গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বরিশাল]

স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা কোথায়

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘বিএনপির সাংবাদিক হইয়েন না, সাংবাদিক হোন একটু। এইখান থেকে মোটেই সরিয়েন না’। স্বাধীনতার পর ‘বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন’ই ছিল সাংবাদিকদের একমাত্র জাতীয় ইউনিয়ন। ’৯১ সনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়, এক গ্রুপ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে, অন্য গ্রুপ আওয়ামী লীগ বিরোধী। দলীয় সরকার এদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। সরকার বদল হলে সরকারের মদতপুষ্ট গ্রুপ সুবিধা পায়, আরেক গ্রুপ কোণঠাসা হয়। সাংবাদিকদের দলীয় রাজনীতি ও সরকারের লেজুড়বৃত্তি করার অন্যতম প্রধান কারণ, এর মাধ্যমে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা যায়। আরও একটি কারণ আছে, অধিকাংশ পত্রিকার মালিক ব্যবসায়ী, তাদের অগাধ সম্পদ নিরাপদ রাখার জন্য সরকারের কাছে থাকার চেষ্টা করে, কারণ সরকার পরিশুদ্ধ নয়, অর্থ ও তোষামোদ তাদের দরকার। পত্রিকার মালিক পক্ষের পছন্দ অনুযায়ী লিখতে হলে সাংবাদিকদের কলমের স্বাধীনতা আর থাকে না। ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফ ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পলিটিকোর মালিক প্রতিষ্ঠান অ্যাক্সেল স্প্রিঞ্জারের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিয়াস ডফনার সম্প্রতি বলেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক ইসরায়েলকে সমর্থন না করলে পদত্যাগ করা উচিত। মোহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই বর্তমান অর্থমন্ত্রীর মতো সরকারের ভুল-ভ্রান্তি তুলে ধরে দলীয় সরকারের রুদ্ধদ্বার পরিবেশ থেকে দেশকে মুক্ত করতে সাংবাদিকদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু মেইনস্ট্রিম অনেক মিডিয়া এই সুযোগ গ্রহণ করেনি, অথচ ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট নতুন বন্দোবস্তের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতিই ছিল মিডিয়ার স্বাধীনতা। চতুর ব্যবস্থাপনায় মিডিয়াকে সেই স্বাধীনতা দেয়া হয়নি, তখন দেশে ˆতরি করা হয়েছিল এক শ্বাসরোধক দুর্বিষহ অবস্থা। মব সন্ত্রাসের ভয়ে মিডিয়া সত্য প্রকাশে সংযত হয়ে যায়। শিক্ষককে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো, রগ কাটা, প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা, গাঁজা কেনার অভিযোগে প্রকাশ্যে যুবকদের পাছার ওপর সজোরে লাঠিপেটা করা, পতিতা নাম দিয়ে প্রকাশ্যে এবং পুলিশের সম্মুখে লাঠি দিয়ে নির্দয়ভাবে পেটানো, মাজার ভাঙার ঘটনা অনেক মিডিয়া সযত্নে এড়িয়ে যায়। সত্য জানার জন্য জনগণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর। সরকারকে তোষামোদ না করে তখন উপায় ছিল না, কারণ সাংবাদিকদেরও সংসার আছে, জীবনের মায়া আছে, জীবিকার প্রতি দরদ আছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিসে আগুন দেয়ার আগে এই দুই অফিসের সামনে গরুর ওপর উক্ত দুই পত্রিকার সম্পাদকের নাম লিখে জবাই করা হয়েছে। শত শত লোককে কুপিয়ে, পিটিয়ে জনসম্মুখে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, এর বিরুদ্ধে বর্তমান অর্থমন্ত্রী, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতারা একটি কথাও বলেননি। বলেননি বলেই ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সম্মুখে ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে পাথর ও কনক্রিট দিয়ে মাথা-শরীর থেঁতলে হত্যা করার সংবাদ কোন নামকরা মিডিয়ায় সঙ্গে সঙ্গে আসেনি, আসেনি শত শত বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও। ফ্যাসিস্টদের পক্ষে যায় এমন সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকতে মিডিয়াকে মব গ্রুপের পক্ষ থেকে বারবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে; এই নির্দেশ অমান্য করার হিম্মত তখন কারো ছিল না। তাই সরকারের অবারিত প্রশ্রয়ে সৃষ্ট মব সন্ত্রাস থেকে রেহাই পেতে মিডিয়া সত্য খবর লুকাতে বাধ্য হয়েছে। তবে মিডিয়ার এই সংযত আচরণ সব ক্ষেত্রে যে ভয়ে হয়েছে তা কিন্তু নয়, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন মিডিয়ায় যে ক্যু হয় তাতে রাতারাতি অনেক পরিবর্তন আসে, মিডিয়া ব্যবস্থাপনায় নতুন নতুন মুখের আবির্ভাব ঘটে, মিডিয়া বিএনপি আর জামায়াত পন্থীদের দখলে চলে যায়। অবশ্য আগুন আর সন্ত্রাস থেকে বাঁচার জন্য মিডিয়ার মালিকেরাই অনেক ক্ষেত্রে সম্পাদক ও প্রতিবেদকদের বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, ৫ আগস্টে অভ্যুত্থানের পর বিএনপি ও জামায়াত প্রশাসনকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। ভাগাভাগির এই প্রশাসনে তোষামোদ না চাইলেও হবে। এই অবস্থায় নীতিবান সাংবাদিক সরকার বিরোধী সত্য প্রকাশে দুইবার ভাববে, কারণ তারা দেখেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে বেয়াড়া প্রশ্ন করে তিন সাংবাদিক চাকুরি হারিয়েছেন। আবার তোষামোদ করলেও যে মুক্তি পাওয়া যায় তা কিন্তু নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কলম ধরায় ৫ আগস্টের পর শতাধিক সাংবাদিক কারাগারে, ওদের মুক্তির জন্য কোন সাংবাদিক ইউনিয়ন রাস্তায় নামেনি। বাংলাদেশে সামরিক-বেসামরিক সব সরকারের আমলে কথিত বাক স্বাধীনতায় সরকারকে প্রশ্ন করতে আপত্তি করা হয় না, কিন্তু শর্ত একটি, প্রশ্নগুলো উত্তরদাতার মনঃপূত হওয়া চাই। শেখ হাসিনার পতনের মূল কারণ এখানেই। প্রশ্ন পর্বে সাংবাদিকরা যেভাবে শেখ হাসিনাকে হাস্যকর প্রশ্ন করতেন তাতে নির্বোধ লোকেরাও লজ্জা পেত। এটা তোষামোদও হতে পারে, আবার বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে জ্ঞানের অভাবও হতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী মোরারজি দেশাই ১৯৭৯ সনে সরকারি সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের ধরন দেখে বিরক্ত হন ; তিনি ‘অবিবেচক’ বা ‘সিলি’ প্রশ্ন না করে বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো আলাদা, এগুলো মাঝে মাঝে আজগুবি খবর প্রচার করে থাকে। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা আওয়ামী সরকারও করেছিল, কিন্তু পারেনি ; কারণ তখন এগুলোর পৃষ্ঠপোষক ছিল বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াত। এখন বিএনপি বলছে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু পারবে বলে মনে হয় না, কারণ একই, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা এখন ওই সকল নিউজ পোর্টালের পৃষ্ঠপোষক। পশ্চিমা জগতেও আজগুবি খবরের ছড়াছড়ি আছে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনে অসংখ্য কাহিনী মিডিয়ায় গুরুত্ব সহকারে প্রচার হয়েছে। ট্রাম্পের উদ্ভট আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে মিডিয়া তাকে অপ্রকৃতস্থ ব্যক্তি হিসেবেও চিহ্নিত করেছে, তারপরও কিন্তু আমেরিকার ভোটার ট্রাম্পের পাগলামীকেই দ্বিতীয়বার ভোট দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও মিডিয়ার ভুয়া খবরে অতিষ্ঠ হয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, এবিসি নিউজ, সিএনএন, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, টাইম ম্যাগাজিন এবং নিউজউইক-কে 'ফেইক নিউজ অ্যাওয়ার্ড’ দিয়ে পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প মিডিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বলে শোনা যায়নি। সাংবাদিকদের অবাধ স্বাধীনতা আছে পশ্চিমা বিশ্বে। সেখানে সরকার প্রধানকে ব্যাঙ বা কুকুরের চেহারায় চিত্রায়ন করে মিডিয়ায় প্রকাশ করলেও প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির অপমান হয় না, মান যায় না, মিডিয়া বা লেখকের হাতে হাতকড়া লাগানো হয় না। বাংলাদেশ সরকার নিজেদের বিরুদ্ধে সমালোচনা পছন্দ করে না, পছন্দ করে তোষামোদ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় প্রায় দেড় বছর ধরে জেলে বন্দি ইসকনের সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী। এরপর বাংলাদেশে ভারতের পতাকা এবং ভারতে বাংলাদেশের পতাকার অবমাননা শুরু হয়। বাংলাদেশের পতাকার অবমাননা করায় ভারতে তিন যুবককে গ্রেপ্তার করা হলেও বাংলাদেশে কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে শোনা যায়নি। আমেরিকায় পতাকার চেয়ে বাক স্বাধীনতার গুরুত্ব বেশি। আমেরিকায় নিজের অধীনে থাকা জাতীয় পতাকা জনসম্মুখে দুমড়েমুচড়ে ছিন্নভিন্ন করা হলেও রাষ্ট্র বিরোধী কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় না। তাদের আদালত বলছে, এগুলো কোন অপরাধ নয়। আদালতের অভিমত হচ্ছে, নিজের মালিকানাধীন পতাকায় আগুন দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা নাগরিকের অধিকার, কিন্তু অন্যের পতাকা ছিনিয়ে এনে তাতে আগুন লাগালে তা হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পশ্চিমা জগতের লোকজন তাদের জাতীয় পতাকার ডিজাইনে বিকিনি, ব্রা, সুইমিং কস্টিউম বানিয়ে ব্যবহার করছে, তাতে কিন্তু তাদের দেশে জাতীয় পতাকার অবমাননা হচ্ছে না। বাক স্বাধীনতার সঙ্গে সত্যাসত্যের প্রশ্ন জড়িত, কিন্তু সরকারের জন্য গ্রহণযোগ্য সত্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। ভয় এবং স্বার্থ- এই দুইয়ের তাড়নায় সনাতনী তোষামোদের অভ্যাস অক্ষুণ্ন রেখেছেন বাংলাদেশের সাংবাদিকরা। রাজনৈতিক দলের নেতারা পরিশুদ্ধ না হলে শুদ্ধ রাজনীতি আসবে না, শুদ্ধ রাজনীতি না এলে মিডিয়া এবং সাংবাদিকদের লেজুড়বৃত্তিও বন্ধ হবে না। নেতা শুধু আমলা আর দলীয় কর্মীর কাছ থেকে নয়, সাংবাদিকদের কাছ থেকেও প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রত্যাশা করেন। তাই সাংবাদিকতায় তোষামোদ থাকবে এবং সরকারের আশির্বাদপুষ্ট সাংবাদিকরা হবেন মেরুদণ্ডহীন। মেরুদণ্ড সোজা রেখে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে কাউকে কাউকে সব সরকারের আমলেই নিগৃহীত হতে হয়েছে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী যা বলেছেন তা বিএনপি সরকারের নীতি হলে বিএনপি সরকার এবং জাতি উপকৃত হবে; কিন্তু সাংবাদিক মাত্রই জানে, সরকার ‘বাঘ আর সিংহের প্রশংসা করলেও পছন্দ করে গাধাকে’। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আলু সংরক্ষণের ভাড়া: প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও সমঝোতা

রংপুরকে বলা হচ্ছে আলুর নতুন রাজধানী। গত কয়েক বছর ধরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আলু উৎপাদনের যে তালিকা করে তার চূড়ায় থাকে এই জেলা। এর আগে শীর্ষে থাকতো মুন্সীগঞ্জ। তখন তার ভাগ্যেই জুটেছিল আলুর রাজধানীর তকমা। রংপুরে এবছর ১৬ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি আলু ফলেছে। এরমধ্যে আলু পঁচেছে অনেক। বীজ ˆতরির জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে কিছু। এরপরও মেরেকেটে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ মেট্রিক টন আলু উদ্বৃত্ত আছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ। এখন বিক্রি না করে আগামী দিনে দুপয়সা লাভের মুখ দেখার আশায় অনেক কৃষক হিমাগারে আলু রাখেন। তবে তাদের আশার গুড়ে বালু ফেলেছে বাড়তি ভাড়া। রংপুরে হিমাগারে প্রতি বস্তা আলু রাখার ভাড়া ছিল ২৬০-২৮০ টাকা। এবার সেই ভাড়া হয়েছে ৪৫০ টাকা। কৃষকরা একে যৌক্তিক বলে মানতে পারছেন না। ভাড়া বাড়ানোর প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভ করেছেন। গত বুধবার তারা রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। হিমাগারের দবাড়তি ভাড়া নিয়ে বগুড়ার আলুচাষিদেরও আপত্তি আছে। সেখানকার কৃষকদের একটি সংগঠন বলছে, তিন বছরে হিমাগার ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৩ সালে ৬৫ কেজির এক বস্তা আলুর সংরক্ষণ ভাড়া ছিল ২৮০ টাকা। ২০২৪ সালে সেটা বেড়ে হয় ৩০০ টাকা। আর ২০২৫ সালে হিমাগার মালিকরা ভাড়া নির্ধারণ করে ৫২০ টাকা। এই হিসাবে কেজিপ্রতি সংরক্ষণ ভাড়া হয় ৮ টাকা। যদিও সরকার কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করেছে। বগুড়ার কৃষকদের দাবি, এই ভাড়া ৫ টাকায় নামিয়ে আনতে হবে। কৃষকের হিসাব সহজ। আলু উৎপাদনে কেজিপ্রতি তার খরচ হয় ১৩ টাকা। তার ওপর আছে পরিবহন, শ্রমিক, বস্তা খরচ। আরও যোগ হয় হিমাগার ভাড়া। শেষে প্রতি কেজি আলুর খরচ প্রায় ২৫ টাকায় গিয়ে ঠেকে। কৃষকের আশঙ্কা, এত খরচের আলু বাজারে নিলে মুনাফার দেখা মিলবে না। উল্টো লোকসান গুণতে হবে। আলু এখন বিক্রি করলে লোকসান। গাঁটের আরও কড়ি খরচ করে হিমাগারে রেখে পরে বিক্রি করলেও লোকসান। হিমাগারের ভাড়া না কমালে কৃষকের তাই চলছে না। হিমাগারের ভাড়া নিয়ে নাখোশ হয়েছে রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের দাবিতে তারা দিন কয়েক হিমাগার থেকে আলু বেচাকেনা বন্ধও রেখেছিলেন। হিমাগারের মালিকদের বিরুদ্ধে সাধারণ অভিযোগ হচ্ছে, নিজেদের পকেট ভারি করতে তারা ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ায়। হিমাগার মালিকেরা অবশ্য এই অভিযোগ স্বীকার করেন না। তারা বলছেন, পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া সমন্বয় করা ছাড়া তাদের উপায় নেই। হিমাগার পরিচালনায় খরচ কম নয়। বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল, ঋণের সুদ, জ্বালানি খরচ, ভবন রক্ষণাবেক্ষণ সব মিলিয়ে হিমাগার একটি ব্যয়বহুল অবকাঠামো। দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ কয়েক দফায় বেড়েছে। অনেক হিমাগার মালিক দাবি করছেন, পরিচালন খরচ বেড়েছে বলেই তারা ভাড়া বাড়িয়েছেন। হিমাগার মালিকদের ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজনকে অস্বীকার না করেও এই প্রশ্ন তোলা যায় যে, যে হারে তারা ভাড়া বাড়িয়েছেন সেটা যৌক্তিক কিনা। পরিচালন ব্যয় বাড়ার হার আর সংরক্ষণ ভাড়া বাড়ানোর হারের হিসাব কষা হলে অনেক প্রশ্নের উত্তরই মিলবে। এই সংকট কেবল কৃষক ও হিমাগার মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে ভোক্তার স্বার্থও জড়িত। কৃষক যদি ধারাবাহিকভাবে লোকসান করেন, তাহলে ভবিষ্যতে আলু চাষে তাদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। এতে উৎপাদন কমবে, বাজারে সরবরাহ কমবে। যার জের শেষ পর্যন্ত টানতে হবে ভোক্তাকে। আবার হিমাগারগুলো যদি আর্থিকভাবে টেকসই না হয়, তাহলে সংরক্ষণ সক্ষমতা কমবে। তখনও বাজারে অস্থিরতা ˆতরি হবে। কৃষক ও হিমাগার উভয়ই দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষকদের ক্ষোভকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। আবার হিমাগার মালিকদের ভাড়া বাড়ানোর দাবিকে অযৌক্তিক বলেও ধরে নেওয়া যায় না। কোনো একটি পক্ষকে দোষারোপ করে টেকসই সমাধান হবে না। কৃষকের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করতে হবে। হিমাগারের ব্যবসাকেও টেকসই করতে হবে। এক পক্ষকে উপেক্ষা করে অন্য পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হলে সাময়িকভাবে কেউ লাভবান হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো খাত। সমাধান খুঁজতে হবে আলোচনায়। সিদ্ধান্ত টানতে হবে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে স্বচ্ছ ভাড়া কাঠামো ঠিক করতে হবে। উৎপাদনের ভিত্তি হচ্ছে কৃষক। আবার ফসল সংরক্ষণ করা ছাড়া আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা টিকতে পারে না। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে একটি ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা যায় কীভাবে সেই পথ খুঁজতে হবে। সরকার, কৃষক প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং হিমাগার মালিকরা আন্তরিক হলে সেই পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না। দেশে যে হারে উৎপাদন বেড়েছে সে হারে সংরক্ষণ সুবিধা গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘমেয়াদে তাই শুধু ভাড়া কমানো বা বাড়ানোর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। হিমাগার খাতের সামগ্রিক সংস্কার নিয়ে ভাবতে হবে। [লেখক: সাংবাদিক]

লাল স্রোতের নীরব বীর

পৃথিবীতে অনেক ধরনের বীর আছেন। যুদ্ধক্ষেত্রের বীর, বন্যায় মানুষ বাঁচানো বীর, আগুনে ঝাঁপ দিয়ে জীবন রক্ষাকারী বীর, কিংবা সংকটের মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানো বীর। কিন্তু এক ধরনের বীর আছেন, যাদের আমরা খুব কমই চিনি। তারা কোনো পদক পান না, কোনো সংবর্ধনা চান না, কোনো মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দেন না। তারা নীরবে আসেন, নীরবে চলে যান।তিনি একটি হাসপাতালের কক্ষে নীরবে শুয়ে পড়েন। একটি সূচ তার বাহুতে প্রবেশ করে। আধা ঘণ্টা পর উঠে দাঁড়ান, একটু পানি পান করেন, তারপর নিজের কাজে ফিরে যান। তিনি জানেন না তার রক্ত কার শরীরে যাবে। যিনি সেই রক্ত পাবেন, তিনিও জানেন না তার জীবনরক্ষাকারী মানুষটির নাম। তবু এই অচেনা দুজন মানুষের মধ্যে তৈরি হয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্ক। তিনি একজন স্বেচ্ছারক্তদাতা। আজ ১৪ জুন, বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। পৃথিবীর কোটি কোটি স্বেচ্ছারক্তদাতার প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাতে প্রতি বছর এই দিনটি পালিত হয়। মানবতার এই নীরব সৈনিকদের সম্মান জানাতেই দিনটির আয়োজন। আজ তাই সেই মানুষগুলোর কথা বলার সময়, যাদের রক্তে বেঁচে থাকে অসংখ্য জীবন।রক্তদান পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্তৃত মানবিক আন্দোলনগুলোর একটি। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন। প্রতিটি ব্যাগ রক্তের পেছনে রয়েছে একটি সিদ্ধান্ত, একটি মানবিকতা, একটি জীবন বাঁচানোর অঙ্গীকার। রক্তদানের বিশেষত্ব এখানেই যে, এটি এমন একটি দান যার মাধ্যমে একজন মানুষ সরাসরি আরেকজন মানুষের জীবন বাঁচাতে পারেন। পৃথিবীতে অনেক কিছুর বিকল্প আছে। এক ওষুধের পরিবর্তে আরেক ওষুধ ব্যবহার করা যায়। এক প্রযুক্তির জায়গায় আরেক প্রযুক্তি আসে। কিন্তু রক্তের কোনো বিকল্প নেই। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান কৃত্রিম হৃদযন্ত্র তৈরি করেছে, জটিল অঙ্গ প্রতিস্থাপন করছে, মহাকাশে মানুষ পাঠিয়েছে; কিন্তু এখনো মানুষের রক্তের পূর্ণ বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।এক ব্যাগ রক্তের একমাত্র উৎস আরেকজন মানুষ। এই সত্যটিই রক্তদানকে পৃথিবীর সবচেয়ে অনন্য মানবিক কর্মকাণ্ডে পরিণত করেছে। উন্নত দেশগুলোতে প্রতি হাজারে বহু মানুষ নিয়মিত রক্তদান করেন। ফলে জরুরি মুহূর্তে রক্তের জন্য মানুষের পরিবারকে ছুটোছুটি করতে হয় না। বাংলাদেশে পরিস্থিতি এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আমাদের দেশে রক্তের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে এখনো একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।তবে আশার কথা হলো, স্বেচ্ছারক্তদানের সংস্কৃতি ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের নেপথ্যে কাজ করছেন অসংখ্য নীরব মানুষ।বাংলাদেশে স্বেচ্ছারক্তদান আন্দোলনের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবের। ১৯৭৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সন্ধানী’। এই সংগঠনটি বাংলাদেশে স্বেচ্ছারক্তদান আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা শুধু রক্ত সংগ্রহই করেনি, মানুষের মধ্যে মানবিক চেতনা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং স্বেচ্ছাসেবার সংস্কৃতিও গড়ে তুলেছে।পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে জন্ম নেয় ‘বাঁধন’। অরাজনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবকল্যাণমূলক এই সংগঠনটি আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান নেটওয়ার্ক। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন এবং অসংখ্য সংগঠন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।রক্তদান আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দেশের তরুণ সমাজ।বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার তরুণ আজ মানবতার এক নীরব বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।মধ্যরাতে অপরিচিত কারও জন্য রক্তের খোঁজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেদন ছড়িয়ে দেওয়া, হাসপাতালে ছুটে যাওয়া এসব কাজ তারা করেন নিঃস্বার্থভাবে। সংবাদপত্রে তাদের ছবি ছাপা হয় না, টেলিভিশনের পর্দায় তাদের দেখা যায় না, কিন্তু অসংখ্য পরিবার তাদের কাছে চিরঋণী হয়ে থাকে। এই তরুণদের হাত ধরেই বাংলাদেশের রক্তদান আন্দোলন এগিয়ে যাচ্ছে।একজন সুস্থ মানুষ বছরে কয়েকবার রক্ত দিতে পারেন। অর্থাৎ একটি ছোট সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি একাধিক মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। রক্তদাতা কোনো অর্থ নেন না। কোনো প্রতিদান চান না। অনেক সময় নিজের পরিচয় পর্যন্ত প্রকাশ করেন না।তবুও তারা আসেন।তারা জানেন, হাসপাতালের কোনো শয্যায় একজন মা অপেক্ষা করছেন, একজন শিশু অপেক্ষা করছে, একজন তরুণ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। সেই অপেক্ষার পাশে দাঁড়ানোর নামই রক্তদান।আমরা প্রায়ই সমাজের অনেক অবদানের কথা বলি, অনেক পেশা ও অনেক অর্জনকে সম্মান জানাই। কিন্তু যে মানুষগুলো বছরের পর বছর নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের রক্ত দিয়ে অন্যের জীবন বাঁচিয়ে চলেছেন, তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এখনো যথেষ্ট নয়।একজন নিয়মিত স্বেচ্ছারক্তদাতা শুধু রক্ত দেন না। তিনি অসংখ্য পরিবারের হাসি ফিরিয়ে দেন, অসংখ্য মায়ের সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখেন, অসংখ্য শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষা করেন। হয়তো তার দান করা রক্তের কারণে কোনো থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু আজ স্কুলে যেতে পারছে, কোনো ক্যান্সার রোগী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন, কোনো প্রসূতি মা নবজাতক সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারছেন।এই মানুষগুলো সত্যিকার অর্থেই সমাজের নীরব সম্পদ। তাদের প্রতি আমাদের শুধু ধন্যবাদ জানালেই চলবে না; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিরও। রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত রক্তদাতাদের জন্য সম্মাননাপত্র, ডিজিটাল সার্টিফিকেট, জাতীয় স্বীকৃতি এবং বিভিন্ন জনসেবামূলক ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। কারণ স্বীকৃতি শুধু পুরস্কার নয়, এটি অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করে। একজন মানুষ যখন দেখবেন যে সমাজ তার মানবিক অবদানকে মূল্যায়ন করছে, তখন আরও অনেকে রক্তদানে উৎসাহিত হবেন।আমাদের সন্তানদেরও জানতে হবে...সত্যিকারের নায়ক শুধু পর্দার মানুষ নন; সত্যিকারের নায়ক সেই মানুষটিও, যিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখে অন্যের শিরায় জীবন প্রবাহিত করেন।বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে তাই দেশের প্রতিটি স্বেচ্ছারক্তদাতাকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিক অভিনন্দন এবং স্যালুট। আপনারা আছেন বলেই অসংখ্য মানুষ নতুন করে বাঁচার সুযোগ পান। আপনারা আছেন বলেই মানবতার এই লাল স্রোত এখনো অবিরাম প্রবাহিত হচ্ছে। দুর্যোগের সময় মানবতার পরীক্ষাও শুরু হয়। বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, ভবনধস, নৌদুর্ঘটনা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর মুহূর্তের মধ্যে বিপুল পরিমাণ রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। তখন বোঝা যায়, রক্ত কোনো ওষুধ নয় যা কারখানায় তৈরি হবে। সংকটের সময় যে মানুষটি রাত দুটায় ফোন পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান, তিনিই হয়ে ওঠেন একজন অচেনা মানুষের শেষ আশ্রয়।রক্ত যাদের প্রাণের শ্বাস। রক্ত শুধু অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজন হয় না। প্রসূতি মায়েদের জীবন রক্ষায়, দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের চিকিৎসায়, ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসায়, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া, হিমোফিলিয়া এবং অন্যান্য রক্তরোগের ক্ষেত্রে রক্ত অপরিহার্য।বাংলাদেশে প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ এখনো মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ। একজন মায়ের জীবন বাঁচাতে সময়মতো কয়েক ব্যাগ নিরাপদ রক্তই কখনো কখনো সবচেয়ে বড় ওষুধ হয়ে ওঠে।নারীরাও হতে পারেন জীবনদাত্রী। রক্তদানের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো তুলনামূলকভাবে কম।এর অন্যতম কারণ নানা সামাজিক ভুল ধারণা। অথচ একজন সুস্থ নারী, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, নিরাপদে রক্তদান করতে পারেন।একজন মা যেমন একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনেন, তেমনি একজন নারী রক্তদাতা তার রক্তের মাধ্যমে আরেকটি জীবন বাঁচানোর অংশীদার হতে পারেন।রক্তদান আন্দোলনে নারীদের আরও বেশি অংশগ্রহণ সময়ের দাবি।থ্যালাসেমিয়া- যে যুদ্ধের শেষ নেই। সব রোগের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া সম্ভবত সবচেয়ে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর সংগ্রামের নাম। কারণ এই রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কোনো বিরতি নেই। বাংলাদেশে হাজার হাজার শিশু ও তরুণ থ্যালাসেমিয়া নিয়ে বেঁচে আছে। তাদের অনেকের জীবন নিয়মিত রক্তসঞ্চালনের ওপর নির্ভরশীল। থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তরোগ। এই রোগে শরীর পর্যাপ্ত সুস্থ হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। ফলে তীব্র রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর প্রতি মাসে এক থেকে তিন ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হতে পারে।একবার হিসাব করে দেখুন।একজন রোগী যদি প্রতি মাসে গড়ে দুই ব্যাগ রক্ত নেন, তাহলে বছরে তাঁর প্রয়োজন হয় চব্বিশ ব্যাগ রক্ত।চব্বিশ ব্যাগ রক্ত মানে চব্বিশটি মানবিক সিদ্ধান্ত।চব্বিশজন মানুষের ভালোবাসা।চব্বিশটি অচেনা হাত।এই রক্ত না পেলে শিশুটি স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে না। স্কুলে যেতে পারবে না। স্বপ্ন দেখতে পারবে না। অনেক সময় একটি শিশুর পুরো শৈশব দাঁড়িয়ে থাকে কিছু স্বেচ্ছারক্তদাতার ওপর। সংকট কিন্তু আরও গভীরে। সমস্যা শুধু রক্তের ঘাটতি নয়; নিরাপদ রক্তেরও ঘাটতি রয়েছে।অর্থের বিনিময়ে সংগৃহীত রক্তে বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।তাই নিরাপদ, পরীক্ষিত ও স্বেচ্ছায় দানকৃত রক্তের গুরুত্ব অপরিসীম।স্বেচ্ছারক্তদাতার রক্ত শুধু জীবন বাঁচায় না; নিরাপদ জীবনও নিশ্চিত করে।প্রতিরোধই হচ্ছে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।থ্যালাসেমিয়া মোকাবিলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো প্রতিরোধ।বিবাহপূর্ব থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।একটি সাধারণ পরীক্ষা ভবিষ্যতের অসংখ্য কষ্ট ও ভোগান্তি প্রতিরোধ করতে পারে।পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে এই বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।মানবতার ভাষা একটাই- রক্তের কোনো ধর্ম নেই, কোনো জাত নেই, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। একজন মুসলমানের রক্ত একজন হিন্দুর শরীরে প্রবাহিত হতে পারে। একজন বৌদ্ধের রক্ত একজন খ্রিস্টানের জীবন বাঁচাতে পারে। হাসপাতালের শয্যায় মানুষের পরিচয় একটাই তা হচ্ছে তিনি একজন মানুষ।আর রক্তদানের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই।রাষ্ট্রের দায়িত্ব, সমাজের কর্তব্য হচ্ছে রক্তদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার দায়িত্ব। রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, করপোরেট সংস্থা সবারই ভূমিকা রয়েছে।প্রতিটি উপজেলায় কার্যকর ব্লাড ব্যাংক, নিরাপদ রক্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, রক্তদান ক্লাব এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করতে হবে।একই সঙ্গে রক্তদান সম্পর্কে মানুষের অযৌক্তিক ভয়ও দূর করতে হবে।আমার একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন- হয়তো কোনো একদিন আমাদের নিজেদের পরিবারও রক্তের প্রয়োজনের মুখোমুখি হবে।হয়তো কোনো অপারেশন থিয়েটারের বাইরে দাঁড়িয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলব, “এক ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করা যাবে?”সেদিন আমরা চাইব, কোনো অচেনা মানুষ এগিয়ে আসুক।তাহলে আজ কেন আমরা সেই অচেনা মানুষটি হব না?আমার ও আমাদের আজকের আহ্বান বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে যারা ইতোমধ্যে রক্ত দিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। আপনারা হয়তো জানেন না, আপনাদের রক্ত কোথায় গেছে, কাকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু সেই মানুষটি জানেন। তার পরিবার জানে।তারা হয়তো আপনাদের নাম জানে না, কিন্তু আপনাদের জন্য দোয়া করে।কারণ রক্তের কোনো কারখানা নেই।পৃথিবীর সব হাসপাতাল, সব চিকিৎসক, সব আধুনিক প্রযুক্তি একসঙ্গে মিলেও এক ফোঁটা মানুষের রক্ত তৈরি করতে পারে না।সেই রক্ত আসে সেই মহান মানুষের কাছ থেকে, মহান হৃদয় থেকে, মানুষের ভালোবাসা থেকে। বাঁধনের স্লোগানটি তাই আজও সমান সত্য “একের রক্ত অন্যের জীবন, রক্তই হোক আত্মার বাঁধন।”সত্যি হলো ,রক্ত কেনা যায় না।চেয়ে পাওয়া যায় না।পাওয়া যায় শুধু মানুষের ভালোবাসায়।আসুন, এই ভালোবাসাটুকু আমরা দিই। কারণ জীবন বাঁচানোর এই লাল স্রোত প্রবাহিত থাকে কেবল মানুষের হৃদয় থেকে মানুষের হৃদয়ে।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, পানি ও জলবায়ু গবেষক।

বিরোধিতাহীন রাজনীতির বিপদ

বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকারি দল, আর বিরোধী বেঞ্চে বসা জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। সংসদের আচরণ অদ্ভুত, হামে শিশু মারা যাচ্ছে, ধর্ষণের পর হত্যা হচ্ছে, আমেরিকার সঙ্গে বিতর্কিত চুক্তি হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার লোক বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা চলছে— অথচ সংসদে এসব নিয়ে আলোচনা নেই, আলোচনার প্রস্তাবও নেই।  সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা মার্কিন চুক্তি নিয়ে কথা তুলতে চাইলে স্পিকার বলেন, নোটিশ দিতে। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়ে আলোচনা করতে চাইলে ৩৪১ বিধিতে নোটিশ দিতে হয় এবং সেই নোটিশে ন্যূনতম ৫ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন লাগে। নোটিশ দেবে কী করে, রুমিন ফারহানা ব্যতীত নোটিশের পাশে দাঁড়ানোর মতো আর একজনও নেই। পাশে নেই গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। কেন নেই ? কারণ অতি বিপ্লবীরা সরকারেরও অংশ। এটা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের পুরনো রোগ। দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়া মানেই বিরোধী দলকে অকার্যকর করে দেয়া। বিরোধী দল অকার্যকর মানেই সংসদ অকার্যকর। সংসদ অকার্যকর মানেই স্বৈরতন্ত্রের জন্ম। জামায়াত ও এনসিপির কর্মকাণ্ড দেখলে কি মনে হয়, সংবিধান সংস্কার কমিশন স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিজমকে ইউনূসের জাদুঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে ? ১৯৭৩ সন থেকে অদ্যাবধি একই মানসিকতায় সরকার ও সংসদ চলছে। আমেরিকার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে দেশে বিতর্ক আছে, চুক্তিতে আছে দেশের স্বার্থবিরোধী অনেক শর্ত। সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গোপন চুক্তি না হলে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তি সংসদে উপস্থাপন ও আলোচনা করার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু অতীতের কোনো সরকার এই শর্ত মানেনি, বর্তমান সরকারও মানছে না। রুমিন ফারহানা সংসদে কথা বলতে চাইলেন। স্পিকার নিয়মের কথা বলে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির কবর দিয়ে দিলেন, নোটিশের পক্ষে কোন সাংসদ দাঁড়ালেন না।  একই অবস্থা হাম রোগের ক্ষেত্রেও। শত শত শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, মারা যাচ্ছে ধর্ষণের তীব্রতায়। রামিসা, আয়েশা, দীপু চন্দ্র দাস— নামগুলো কাগজে আসে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসে, কিন্তু সংসদে আসে না। কারণ সমঝোতা, বিএনপি সরকারকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে বিব্রত করতে চায় না জামায়াত এবং এনসিপি, তারা নামকাওয়াস্তে বিরোধী দল। এই পরিবেশ বাংলাদেশে নতুন নয়; ১৯৭৩ সনের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩ আসন পায়। ফলে প্রথম জাতীয় সংসদে কোন বিরোধী দলীয় নেতাই ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে সামরিক বাহিনীর অনুপ্রবেশ ঘটে। ১৯৭৯ সনের সংসদেও বিএনপির ছিল দুই তৃতীয়াংশ আসন। সামরিক আইন জারী থাকা অবস্থায় সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি ছিল বিতর্কিত।’ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৌশল ছিল আওয়ামী লীগকে জব্দ করে দেশের রাজনীতির মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করা’- কথাটি কিন্তু আমার নয়, বিএনপির মওদুদ আহমদের। ১৯৮৬ সনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। পরের বছর সংসদ থেকে বিরোধী দলগুলোর সংসদ সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ করলে মাত্র ১৭ মাসের মাথায় সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৯৮৮ সনের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ অধিকাংশ দল অংশগ্রহণ না করায় সংসদের বিরোধী দলের নেতা হয়েছিলেন আ স ম আব্দুর রব। সেই বিরোধী দল তখন ‘গৃহপালিত’ বিশেষণ পেয়েছিল। এই সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর সাত মাস। ১৯৯১ সনে জেনারেল এরশাদের পতন পর্যন্ত সংসদে 'বিরোধী দলের' অস্তিত্বকে ‘গৃহপালিত বিরোধী দলের’ ইতিহাস বলা যায়। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কিন্তু সংসদে বিরোধী দলের কোন ভূমিকাই ছিল না, বিরোধী দল সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতো না, তাদের বেতন-ভাতাদির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে যতদিন যোগ দেওয়ার দরকার ছিল ততদিন যোগ দিয়েছে। এই অবস্থাকে স্বাগত জানিয়ে বিএনপির স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার বলেছিলেন, ‘বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সংসদে না থাকায় সংসদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চলছে’। বিরোধী দল না থাকলে সংসদ সুষ্ঠু চলে— এই ধারণাই স্বৈরতন্ত্র। ১৯৯৬ সনে দুইবার জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়, প্রথমবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে অস্বীকার করায় অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। ১০ জন স্বতন্ত্র সদস্যকে নিয়ে ফ্রিডম পার্টি থেকে বিজয়ী বঙ্গবন্ধুর খুনি লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশিদও সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। সংসদে বিরোধী দলীয় কোন নেতা ছিল না। সংসদের স্থায়ীত্ব ছিল মাত্র ১১ দিন। ২০১৪ সনের নির্বাচনে বিএনপি এবং জামায়াত অংশগ্রহণ না করায় জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সহযোগী হয়ে বিরোধী দলের বেঞ্চ দখল করে, সংসদে জাতীয় পার্টি একদিকে সরকারের মন্ত্রীসভায় ছিল, অন্যদিকে তারা বিরোধী দলের আসনেও বসেছিল। ২০১৮ সনের নির্বাচনে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্ট পায় মাত্র ৭ আসন। ২০২৪ সনের নির্বাচন বিএনপি ও জামায়াত বয়কট করে, মাত্র ১১টি আসন পাওয়া জাতীয় পার্টিকে ঘোষণা করা হয় বিরোধী দল। আজ আবার একই ছবি। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে বসে আছে। জামায়াত ও এনসিপি বিরোধী বেঞ্চে বসে সরকারি দলের মতো আচরণ করছে। বাস্তবে সংসদ হয়ে গেছে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের মঞ্চ। ইউনূসের সংস্কার কমিশন শত শত পাতা লিখে সংসদকে কার্যকর করার উপায় বাতলে দিয়েছে। তারা এখন ডিউটিবিহীন গাড়ি নেবেন না, নেবেন আরও বেশি সুবিধা স¤^লিত সরকারি গাড়ি। মার্কিন চুক্তি, হামে শিশু মৃত্যু, ধর্ষণ আর ভারতের পুশইন নিয়ে আলোচনা করলে, সরকার কোন ইস্যুতে বিব্রত হলে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন ত্বরান্বিত হয়ে যাবে। সংসদে প্রতি মিনিটে খরচ হচ্ছে দুই লাখ ৭২ হাজার টাকা। সংসদ পরিচালনায় জনগণের বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়া সত্বেও সংসদকে জবাবদিহিমূলক করার সদিচ্ছা কোন সরকার দেখায়নি, অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলকে বলা হয় বিকল্প বা ছায়া সরকার। বর্তমান সংসদে বিরোধী দলের ‘গৃহপালিত’ ভূমিকা অব্যাহত থাকলে বর্তমান সরকারেরও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ ও ফ্যাসিস্ট মনোভাব দৃশ্যমান হতে পারে। একপাক্ষিক সংসদ প্রতিটি সরকারের জন্য বিপজ্জনক। সরকারের ওপর বিরোধী দলের চাপ না থাকলে সরকারের স্বেচ্ছাচারের পথ অবারিত থাকে, শাসক হয়ে ওঠে ফ্যাসিস্ট। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

ভিডিও আরও দেখুন

পাতাগোনিয়ায় ২৬ মিটার উঁচু মেসি!

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল জাদুকরকে নিয়ে বানানো হলো পৃথিবীর অন্যতম বড় ভাস্কর্য। প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলের কাট্রাল কো শহরে উন্মোচিত হলো লিওনেল মেসির ২৬ মিটার উঁচু বিশাল এক প্রতিকৃতি। যার ওজন ৭০ টন!যখন ফুটবল বিশ্বকাপের মাতম চলছে, আর আলজেরিয়া ম্যাচের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আর্জেন্টিনা, তখন এই ভাস্কর্যটি যেন ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গীয় উপহার।জাতীয় মহাসড়ক ২২ এবং ম্যানুয়েল সাভিও সড়কের সংযোগস্থলে বসে থাকা মেসির এই বিশাল মূর্তিটি বসে থাকা অবস্থায় তৈরি করা হয়েছে- যেন তিনি বিশ্বকাপ ট্রফির দিকে তাকিয়ে আছেন।এর ভেতরের অংশ তৈরি হয়েছে ইস্পাত দিয়ে, বাইরে তিন স্তরের কংক্রিটের আবরণ। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সি পরিহিত এই দৈত্যের বুকে জ্বলজ্বল করছে তিনটি সোনালি তারা- যেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের গৌরবগাথা। সামনে রাখা হয়েছে বিশ্বকাপ ট্রফির আদলে একটি অংশ, যা এই ভাস্কর্যকে আরও জীবন্ত করেছে।ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন অ্যালদো বেরোইসা নামে এক শিল্পী। কাট্রাল কো শহরের স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের সঙ্গে এক বছর ধরে কাজ করেছেন তিনি। উদ্বোধনের আগের রাত পর্যন্ত তারা শেষ মুহূর্তের খুঁটিনাটি কাজ করেছেন। মেসির স্বভাবসুলভ ভঙ্গি যেন ফুটে উঠেছে পুরোপুরি।মজার ব্যাপার হলো, শুরুতে মেসির প্রকৃত উচ্চতা অনুযায়ী ১.৭২ মিটার একটি ভাস্কর্য তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ভাস্করকে। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ২৬ মিটার উঁচু এই বিশাল মূর্তি বানানোর প্রস্তাব দেন। তার সেই কল্পনা আজ বাস্তবে রূপ পেয়েছে।এর আগে গত বছর কলকাতায় মেসির ২১ মিটার উঁচু একটি ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু প্রবল বাতাসে কাঠামোটির স্থিতিশীলতা নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর কর্তৃপক্ষ তা সরিয়ে ফেলে। সেই ভাস্কর্যের চেয়েও বড় এই ভাস্কর্যটি যেন মেসি ভক্তদের জন্য এক নতুন মাইলফলক।ফুটবলের জাদুকরের এই বিশাল মূর্তি দেখতে এখন পর্যটকদের ভিড় জমবে পাতাগোনিয়ায়। আর্জেন্টিনার জাতীয় গর্ব লিওনেল মেসি- যিনি বিশ্বকাপ জয় করেছেন, রেকর্ড গড়েছেন, এখন তিনি পাথর আর ইস্পাতে বন্দি হয়ে রয়েছেন প্যাটাগোনিয়ার বুকে। সত্যিই, ২৬ মিটার উঁচু এই মেসি যেন বলছে- আমি আসল মেসির চেয়েও বড়!

পাতাগোনিয়ায় ২৬ মিটার উঁচু মেসি!
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৯৩ জন