সংবাদ
ঋণের ফাঁদে সরকার, বাজেটের বড় অংকের টাকা যাবে সুদ পরিশোধেই

ঋণের ফাঁদে সরকার, বাজেটের বড় অংকের টাকা যাবে সুদ পরিশোধেই

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আকারের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। তবে এর একটি বড় অংশই চলে যাবে ঋণের সুদ পরিশোধে। প্রস্তাবিত বাজেটে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ মেটাতেই বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি।অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিগত বছরগুলোর পুঞ্জীভূত ঋণ ও ডলারের বাড়তি দামের কারণেই এবার সুদ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো জনকল্যাণমূলক খাতে কাঙ্খিত বরাদ্দ বাড়ানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।খসড়া বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এবারের বাজেটে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন তথা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে এই জনকল্যাণমূলক বরাদ্দের পাশাপাশি অনুৎপাদনশীল খাতের বড় দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণের কিস্তি। অর্থাৎ আগের করা দেনা মেটাতে হিমশিম খেতে হবে সরকারকে।এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সংবাদকে বলেন, ‘এই ঋণ তো বর্তমান সরকারের না। তাই বর্তমান সরকারকে বলার কিছু নাই। এটা আমাদের আগের কর্মের ফল। আর এটা এখন বাদ দেওয়ার সুযোগ নাই। অর্থাৎ যে ঋণ নিয়েছি তা পরিশোধ করতেই হবে। তবে সরকার এখানে দক্ষতা দেখাতে পারে যে, এই ঋণ পরিশোধ কতটা দক্ষতার সাথে করবে সেটা। বাংলাদেশের সব জায়গায় তো দুর্নীতি হচ্ছে। এই দুর্নীতি কমাতে পারলে সব কিছুই সহজ হয়ে যাবে। আর নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে দেখতে হবে এই ঋণ কতটা প্রয়োজন।’ অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত বছরগুলোতে নেওয়া দেশি-বিদেশি ঋণের মেয়াদ বা গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসায় আগামী অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ এক কঠিন ঋণের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান সংকটকালে এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রমবর্ধমান এই ঋণের বোঝা।জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং অতীতে নেওয়া বড় বড় মেগা প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের সময় শুরু হওয়া এর প্রধান কারণ। বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো উৎপাদনশীল খাতে ভূমিকা না রেখে শুধু সুদের পেছনে এত বিপুল অর্থ চলে যাওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা। ফলে এটিই এখন আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় অনুৎপাদনশীল খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আসন্ন বাজেটে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই সরকারের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে মোট বাজেটের প্রায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ টাকাই খরচ হবে কেবল সুদের পেছনে। অর্থাৎ সরকার যদি ১০০ টাকা ব্যয় করে, তার মধ্যে প্রায় ১৩ টাকা ৭০ পয়সা চলে যাবে অতীতে নেওয়া দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ গুণতে।খসড়া বাজেটের তথ্য অনুযায়ী, এই বিশাল অঙ্কের সুদের সিংহভাগই যাবে অভ্যন্তরীণ বা দেশীয় ঋণের পেছনে। এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, বিদেশি ঋণের সুদ মেটাতে বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে আরও প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং অতীতে নেওয়া বড় বড় মেগা প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের সময় শুরু হওয়া এর প্রধান কারণ।বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো উৎপাদনশীল খাতে ভূমিকা না রেখে শুধু সুদের পেছনে এত বিপুল অর্থ চলে যাওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা। ফলে এটিই এখন আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় অনুৎপাদনশীল খাত হিসেবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ঋণ নেওয়া তো দোষের কিছু নয়। কিন্তু ঋণের টাকা আমি কোন কাজে ব্যয় করছি সেটাই আসল কথা। অর্থাৎ আমি ঋণের টাকা যদি এমন একটা খাতে ব্যয় করি যেটাতে নতুন করে টাকা আসবে না, তাহলে সেটা দেশের জন্য খারাপ। আবার যদি ঋণ নিয়ে এমন কাজে সেটা ব্যয় হয় যেটাতে হয় দেশের মানুষের কল্যাণ হবে বা সেই প্রকল্প থেকে অর্থ আসবে তাহলে সেটা ভালো।’বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত দুই বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ৩০ শতাংশেরও বেশি অবমূল্যায়ন হয়েছে। এর ফলে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ডলারে একই থাকলেও, দেশীয় মুদ্রায় তা পরিশোধ করতে সরকারকে অনেক বেশি টাকা বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ‘একদিকে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের শ্লথ গতি, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর এই বিশাল ঋণ পরিশোধের চাপ দেশের সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।’ রাজস্ব আয়ের সিংহভাগ সুদের পেছনে চলে গেলেও দেশের উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বড় রাখছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নতুন অর্থবছরের জন্য এডিপির মোট আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। তবে এই উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও পরনির্ভরশীলতা কাটছে না। খসড়া রূপরেখা অনুযায়ী, ৩ লাখ কোটি টাকার মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে সংস্থান করা হলেও, বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে।অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ৩৭ শতাংশই বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পরিকল্পনা কমিশনের সাময়িক মূল্যায়ন অনুযায়ী, অতীতে বিদেশি অর্থায়নে যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ধীরগতির কারণে প্রতি বছরই বিশাল অঙ্কের অর্থ পাইপলাইনে আটকে থাকে। অথচ প্রকল্প শেষ না হলেও ঋণের সুদের ঘড়ি সচল হয়ে যায়। ফলে নতুন করে আবার ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি ঋণ নেওয়ার এই লক্ষ্যমাত্রা দেশের ঋণের বোঝাকে আরও দীর্ঘমেয়াদি করবে।বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনুৎপাদনশীল খাত ও ঋণের সুদ মেটাতেই যদি বাজেটের সিংহভাগ অর্থ চলে যায়, তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো সামাজিক খাতগুলো মারাত্মকভাবে বরাদ্দ বঞ্চিত হয়। করের টাকা দিয়ে যেখানে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করার কথা, সেখানে সেই টাকা চলে যাচ্ছে বিগত দিনের ঋণের দায় মেটাতে। এর ফলে সরকার যে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের কথা বলছে, তা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, পুরনো ঋণ শোধ করার জন্য নতুন করে আবার ঋণ নেওয়ার এই প্রবণতা দেশকে একটি দুষ্টচক্র বা ঋণের ফাঁদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মেগা প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরও সাশ্রয়ী হওয়া এবং কম সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া উচিত। এছাড়া রাজস্ব আয় আশানুরূপ না বাড়লে আগামী বছরগুলোতে শুধু সুদের পেছনেই বাজেটের অর্ধেক টাকা চলে যাবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এখনই

বিশ্বকাপ সময়সূচি: দেখতে ক্লিক করুন

মতামতমতামত

রাত্রির অদৃশ্য আদালত ও এক ক্লান্ত আত্মার জবানবন্দি

সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্য অনেক আশ্চর্য জিনিস সৃষ্টি করেছেন— আকাশ, সমুদ্র, প্রেম, স্মৃতি, বিস্মৃতি এবং অবশ্যই ঘুম। তবে মানুষের দুর্ভাগ্য হলো, সে যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মনে করে, সেটাই সবচেয়ে বেশি হারিয়ে ফেলে। যেমন সুখের দিনে ঘুম আসে, আর দুঃসময়ে আসে দর্শন। যে রাতে মানুষের গভীর নিদ্রায় থাকার কথা, সেই রাতেই হঠাৎ সে হয়ে ওঠে সক্রেটিস, নীৎশে কিংবা নাম না-জানা কোনো গৃহপালিত দার্শনিক। রাতেরও একটি আলাদা রাষ্ট্র আছে। দিনের পৃথিবীতে তার কোনো মন্ত্রণালয় নেই, কোনো সংসদ নেই, কোনো প্রশাসনিক কাঠামোও নেই। কিন্তু গভীর নিশীথে সে নিঃশব্দে ক্ষমতা গ্রহণ করে। তখন পৃথিবীর সকল কোলাহল পদত্যাগ করে, যুক্তি অবসরে যায়, আর মানুষের কল্পনা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বসে। সেই রাষ্ট্রে আইন খুবই অদ্ভুত। সেখানে একটি সন্দেহ হাজারটি সত্যের চেয়ে বেশি শক্তিশালী, একটি অপবাদ হাজারটি অর্জনের চেয়ে বেশি দীর্ঘজীবী, আর একটি ভুল বোঝাবুঝি কখনো কখনো পুরো জীবনকেই জিম্মি করে রাখতে পারে। আমি আজকাল প্রায়ই সেই রাষ্ট্রের একজন অনিচ্ছুক নাগরিক হয়ে যাই। চোখ বন্ধ করি ঘুমের আশায়, কিন্তু ঘুম যেন আধুনিক আমলার মতো—অত্যন্ত প্রয়োজনের সময় তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং চোখ বন্ধ করলেই খুলে যায় এক অদৃশ্য আদালত। সেখানে বিচার চলছে, অভিযোগপত্র পড়া হচ্ছে, সাক্ষী হাজির হচ্ছে, রায় লেখা হচ্ছে। শুধু মজার বিষয় হলো—আমি ছাড়া আর কেউ বাস্তবে উপস্থিত নেই। বিচারক আমার কল্পনা, উকিল আমার ভয়, সাক্ষী আমার স্মৃতি এবং অভিযুক্তও আমি নিজেই। এই আদালতে সত্যের অবস্থা অনেকটা সেই ভদ্র মানুষের মতো, যে সভায় উপস্থিত থাকলেও কথা বলার সুযোগ পায় না। অন্যদিকে মিথ্যা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। সে বুক ফুলিয়ে হাঁটে, গলা খাঁকারি দিয়ে বক্তব্য দেয় এবং এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে যেন মহাবিশ্বের যাবতীয় সত্যের একমাত্র লাইসেন্স তার কাছেই সংরক্ষিত। রাত্রির গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আদালতের কার্যক্রমও জমে ওঠে। মনে হয়, অসংখ্য অদৃশ্য মানুষ আমাকে অনুসরণ করছে। কেউ অভিযোগ করছে, কেউ ব্যাখ্যা চাইছে, কেউ আবার এমন সব অপরাধের দায় চাপাচ্ছে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমিই অবগত নই। আমি দৌড়াতে থাকি। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ বাস্তব শত্রুর চেয়ে কল্পিত শত্রুর কাছ থেকেই বেশি পালায়। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। বাইরে পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে, অথচ ভেতরে যেন মহাযুদ্ধ চলছে। জানালার ওপারে নীরবতা, কিন্তু মনের ভেতর অবিরাম শোরগোল। তখন উপলব্ধি হয়—মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ কখনো অন্য মানুষের সঙ্গে নয়; নিজের ভেতরের অদৃশ্য প্রতিপক্ষের সঙ্গেই। বর্তমান সময়ে এই অভিজ্ঞতা আরও তীব্র। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সত্য ধীরে হাঁটে আর গুজব আলোর গতিতে ছুটে চলে। সামাজিক যোগাযোগের বিস্তৃত জগতে একটি মিথ্যা মুহূর্তেই হাজার মানুষের দরজায় পৌঁছে যায়, অথচ সত্য তখনও জুতোর ফিতা বাঁধতে ব্যস্ত থাকে। ফলে অপবাদ এখন আর কেবল শব্দ নয়; এটি এক সামাজিক প্রযুক্তি, এক মানসিক অস্ত্র, যা মানুষের আত্মবিশ্বাসকে নিঃশব্দে ক্ষয় করে। কিন্তু দার্শনিক সত্যটি হলো—মানুষকে যতটা না অন্যেরা বিচার করে, তার চেয়ে অনেক বেশি বিচার করে সে নিজেই। অন্যের অভিযোগ কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে, কিন্তু নিজের মনে গড়ে ওঠা আদালত বছরের পর বছর চলতে পারে। সেই আদালতে আপিলের সুযোগ নেই, জামিনের ব্যবস্থাও নেই। এই অবস্থায় ঘুম আর কেবল শারীরিক প্রয়োজন থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক গভীর অস্তিত্ববাদী মুক্তি। তখন নিদ্রা মানে শরীরের বিশ্রাম নয়, বরং চিন্তার অবসান। এমন একটি আশ্রয়, যেখানে কোনো ব্যাখ্যা দিতে হয় না, কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হয় না, কোনো অভিযোগের জবাব লিখতে হয় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ একটি বিষয় বুঝতে শেখে—পৃথিবীর সব মানুষের কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কেউ আপনাকে ভুল বুঝবেই, কেউ আপনাকে অপছন্দ করবেই, কেউ আপনার নীরবতার মধ্যেও ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করবেই। এ যেন মানবসভ্যতার এক প্রাচীন বিনোদন। তাই হয়তো প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো প্রতিটি যুদ্ধে অংশ না নেয়া। প্রতিটি পাথরের জবাবে আরেকটি পাথর ছুড়ে না মারা। কারণ সব যুদ্ধ জয় করা যায় না, আবার সব যুদ্ধ জয় করাও প্রয়োজন হয় না। রাত যত গভীর হয়, এই উপলব্ধিও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনে হয়, শান্তি আসলে কোনো বাহ্যিক অর্জন নয়। শান্তি হলো নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেয়ার শিল্প, নিজের সত্যকে ধারণ করার সাহস এবং পৃথিবীর সমস্ত ভুল ব্যাখ্যার মধ্যেও নিজের ভেতরের আলোটুকু অক্ষুণ্নœ রাখার ক্ষমতা। ধীরে ধীরে রাত ফুরোয়। অদৃশ্য আদালতের বিচারক ক্লান্ত হন, অভিযোগকারীরা নীরব হয়ে যায়, ছায়াগুলোও সরে দাঁড়ায়। তখন মনে হয়, নিদ্রা আসলে ঘুমের অন্য নাম নয়; সে এক প্রকার ক্ষমা। নিজের প্রতি ক্ষমা, মানুষের প্রতি ক্ষমা, সময়ের প্রতি ক্ষমা। আর সেই ক্ষমার ভেতরেই মানুষ খুঁজে পায় তার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আশ্রয়। একটি এমন ঘুম, যেখানে কোনো অপবাদ নেই, কোনো তাড়া নেই, কোনো অদৃশ্য বিচারসভা নেই। আছে শুধু নীরবতা। আর সেই নীরবতার গভীরে, সমস্ত ক্লান্তি অতিক্রম করে, মানুষ আবার নতুন ভোরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা এখানেই—সব প্রশ্নের উত্তর জানা নয়, বরং কিছু প্রশ্নকে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে যেতে দেয়ার মধ্যে। [লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

যোগাযোগ অবকাঠামোর নতুন ভূ-রাজনীতি

সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে একটি চিরন্তন সত্য আছে: যে পথ নিয়ন্ত্রণ করে, সে-ই শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে। রোমান সাম্রাজ্য তার সড়কপথের মাধ্যমে ক্ষমতা বিস্তার করেছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সমুদ্রপথ ও সংকীর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। জিব্রাল্টার, সুয়েজ কিংবা সিঙ্গাপুর কেবল মানচিত্রের কিছু বিন্দু ছিল না; এগুলো ছিল বৈশ্বিক শক্তির নিয়ন্ত্রক। একবিংশ শতাব্দীতে সেই বাস্তবতা বদলেছে, কিন্তু মূল নীতিটি বদলায়নি। যুদ্ধজাহাজের জায়গা নিয়েছে সাবমেরিন কেবল, সামরিক ঘাঁটির জায়গা নিয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর, আর সাম্রাজ্যের নতুন সীমানা তৈরি হচ্ছে ডেটা করিডোর ও স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। আজকের পৃথিবীতে যোগাযোগ ও সংযোগ অবকাঠামো কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবকাঠামো নয়; এটি ক্রমশ এক শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। বিশেষত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এই বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্বের অধিকাংশ বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবাহ এই অঞ্চলের মধ্য দিয়েই চলাচল করে। ফলে এখানে প্রতিযোগিতা আর কেবল ভূখণ্ড নিয়ে নয়; বরং অবকাঠামো, তথ্যপ্রবাহ এবং সংযোগ ব্যবস্থার নেটওয়ার্ক নিয়ে। বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা বিমানবাহী রণতরীর কথা প্রায়ই আসে। কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবেন যে আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আসলে সমুদ্রের হাজার মিটার নিচে শুয়ে আছে। বর্তমানে পৃথিবীর আন্তর্জাতিক ডেটা আদান-প্রদানের প্রায় ৯৫ শতাংশই এই সাবমেরিন ক্যাবলগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রতিদিন ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক লেনদেন, কূটনৈতিক বার্তা, সামরিক যোগাযোগ এবং ইন্টারনেট সেবা এই ক্যাবলগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আমরা যখন মোবাইল ফোনে একটি বার্তা পাঠাই বা অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর করি, তখন সেই তথ্যের বড় অংশই সমুদ্রতলের এই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক দিয়ে ভ্রমণ করে। এই কারণেই সাবমেরিন ক্যাবলগুলো এখন কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর একাধিক ঘটনা এই ঝুঁকিকে সামনে এনেছে। গত ২০২২ সালে শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের কাছে ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে উত্তর ইউরোপে যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটে। ২০২৪ সালে লোহিত সাগরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে ইন্টারনেট প্রবাহে উল্লেখযোগ্য সমস্যা দেখা দেয়। এসব ঘটনা দেখিয়েছে যে আধুনিক বিশ্ব কতটা ভঙ্গুর এক অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে রাষ্ট্র এই সংযোগ এবং যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত থাকে, সে কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধাই পায় না; বরং কৌশলগত সুবিধাও অর্জন করে। চীন দীর্ঘদিন ধরে এই ক্ষেত্রটিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। রাষ্ট্র-সমর্থিত চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে বেইজিং শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করছে না; বরং ভবিষ্যতের তথ্যপ্রবাহের মানচিত্র গঠনেও ভূমিকা রাখছে। ইতিহাসের প্রতিটি যুগে বন্দর ছিল শক্তির প্রতীক। ভেনিসের উত্থান, ব্রিটেনের সামুদ্রিক আধিপত্য কিংবা আমেরিকার বৈশ্বিক বাণিজ্যিক প্রভাব—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল সমুদ্রপথ। আজও সেই বাস্তবতা অপরিবর্তিত। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে সাধারণত উন্নয়ন ও অবকাঠামো কর্মসূচি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এর ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর। হাম্বানটোটা, গোয়াদর, জিবুতি কিংবা পিরিয়াস—এসব বন্দর কেবল বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয়; এগুলো একটি বিস্তৃত কৌশলগত নেটওয়ার্কের অংশ। সমালোচকেরা একে কখনো কখনো ‘ঋণ কূটনীতি’ বলে অভিহিত করেন। যদিও বিষয়টি বাস্তবে আরও জটিল। অনেক উন্নয়নশীল দেশ উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন চেয়েছে, আর চীন সেই সুযোগে অবকাঠামো বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু এর ফলে যে নির্ভরশীলতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের ঘটনা এই বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ঋণ পরিশোধে সমস্যার কারণে দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে বন্দরের পরিচালনা চীনা প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠে—অবকাঠামো বিনিয়োগ কোথায় শেষ হয় এবং কৌশলগত প্রভাব কোথায় শুরু হয়?ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মালাক্কা প্রণালী এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের প্রায় ৪০% সামুদ্রিক বাণিজ্য এই সংকীর্ণ জলপথ অতিক্রম করে। চীনের জ্বালানি নিরাপত্তাও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই বেইজিং বিকল্প বন্দর, স্থলপথ এবং নতুন করিডোর তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে ভারতও নিজস্ব কৌশলগত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। ইরানের চাবাহার বন্দর, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে সামরিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো উন্নয়ন, মালদ্বীপ ও ওমানে অংশীদারিত্ব—সবই একই উদ্দেশে পরিচালিত হচ্ছে। এটি মূলত যোগাযোগ পথগুলোর ওপর প্রভাব বজায় রাখার প্রতিযোগিতা। এক সময় ভৌগলিক সীমানা ছিল রাষ্ট্রশক্তির প্রধান পরিমাপক। পরে শিল্পায়ন ও অর্থনীতি সেই ধারণাকে বিস্তৃত করে। এখন ডিজিটাল অবকাঠামো সার্বভৌমত্বের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা, ক্লাউড সার্ভার, ফাইভ জি নেটওয়ার্ক এবং ডেটা সেন্টারগুলো আধুনিক রাষ্ট্রের স্নায়ুতন্ত্রের মতো কাজ করে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিমান চলাচল, জাহাজ পরিচালনা, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, এমনকি বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যন্ত অসংখ্য কার্যক্রম এগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ইউক্রেন যুদ্ধ এই বাস্তবতাকে নাটকীয়ভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এর মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়—ডিজিটাল অবকাঠামো এখন আর কেবল বাণিজ্যিক সম্পদ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। চীন তাই নিজস্ব বৃহৎ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাও বিকল্প অবকাঠামো জোট গড়ার চেষ্টা করছে। উভয় পক্ষই বুঝেছে যে ভবিষ্যতের শক্তি কেবল স্থল, নৌ ও আকাশে নয়; বরং মহাকাশ এবং সাইবার জগতেও নির্ধারিত হবে। ডেটা আজকের যুগের নতুন খনিজ তেল—এই কথাটি প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ডেটার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অবকাঠামো, যার মাধ্যমে ডেটা প্রবাহিত হয়। কারণ তথ্যের পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে তথ্যকেও প্রভাবিত করা যায়। অনেকেই মনে করেন ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন কিংবা হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের যুদ্ধ। বাস্তবে এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরও গভীরে একটি নীরব প্রতিযোগিতা চলছে— সংযোগব্যবস্থা ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা। কার তত্ত্বাবধানে বন্দর থাকবে, ক্যাবল থাকবে, স্যাটেলাইট থাকবে এবং ডেটা সেন্টার থাকবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামী দশকের ভূ-রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারণ করবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল সেই প্রতিযোগিতার প্রধান মঞ্চ। এখানকার সমুদ্রপথ, বন্দর, ক্যাবল এবং ডিজিটাল করিডোর শুধু বাণিজ্যিক অবকাঠামো নয়; এগুলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি। সবচেয়ে বড় ভুল হবে অবকাঠামোকে নিরপেক্ষ বলে ধরে নেওয়া। ইতিহাস দেখায়, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো একসময় রাজনৈতিক ও কৌশলগত অর্থ অর্জন করে। নির্ভরশীলতার জন্য নির্মিত সংযোগব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত তা আর থাকে না; বরং নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এই কারণেই সার্বভৌমত্বের ধারণা বদলে যাচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এখন শুধু তার মানচিত্রে আঁকা সীমান্ত দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং নির্ধারিত হয় সে কতটা স্বাধীনভাবে তার বাণিজ্য, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার মাধ্যমে। যে রাষ্ট্রগুলো এই বাস্তবতা দ্রুত উপলব্ধি করবে, তারাই ভবিষ্যতের নিয়ম নির্ধারণ করবে। আর যারা করবে না, তারা হয়তো একদিন আবিষ্কার করবে যে তাদের ভূখণ্ড অক্ষত আছে, পতাকা উড়ছে, কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অনেক আগেই অন্য কারও নির্মিত নেটওয়ার্কের মধ্যে বন্দী হয়ে গেছে। [লেখক: প্রাবন্ধিক]

বাজেট ও জনআকাঙ্ক্ষা

আসন্ন বাজেটে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা করছে এবং ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করার কথা বিবেচনা করছে। বয়স্ক, বিধবা, নির্যাতিত স্ত্রী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা সহ বিভিন্ন ধরনের ভাতা বাড়ানোর বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। পূর্বে ৬ মিলিয়ন প্রবীণ নাগরিক মাসে ৬শ’ টাকা করে ভাতা পান, এবং ২.৭৭৫ মিলিয়ন বিধবা ও নির্যাতিত নারী ৫৫০ টাকা পান। প্রায় ৩.২৩৪ মিলিয়ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মাসে ৮৫০ টাকা ভাতা পান। পূর্ববর্তী সরকার হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ), বেদে (নদী যাযাবর), চা শ্রমিক এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য ভাতা প্রদান করেছিল— এগুলোও বিবেচনায় নেয়া হতে পারে। এছাড়াও অতি দরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ভিজিডি কর্মসূচি এবং জাতীয় সেবা কর্মসূচির বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জমা দেয়া প্রস্তাবের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে ভুল তথ্য ও পরিসংখ্যানগত অসামঞ্জস্যের কারণে অনেক সময় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয় না এবং নির্ধারিত লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হয়। পণ্যের মূল্য, জাতীয় বাজেট এবং জীবনযাত্রার মান গভীরভাবে পরস্পর সম্পর্কিত। একটি পরিবারের ˆদনন্দিন জীবন পরিচালনার সক্ষমতা তার আয়, মৌলিক চাহিদা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সাশ্রয়ী মূল্যের ওপর নির্ভর করে। যখন দাম সহনীয় থাকে, জীবন পরিচালনা সহজ হয়। কিন্তু যখন খরচ মানুষের আর্থিক সক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন দরিদ্র ও অতি দরিদ্র পরিবারগুলো ক্ষুধা, অস্থিরতা ও সংকটে পড়ে। নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি জনজীবনকে ব্যাহত করে, যা প্রায়ই মজুদদার ও মুনাফালোভীদের দ্বারা আরও খারাপ হয়, যারা লাভের জন্য বাজার অস্থিতিশীল করে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল প্রয়োজন যা কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণকে বাস্তবসম্মত বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করে। এই সমš^য় ছাড়া সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতি ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আসন্ন বাজেট বাস্তবায়নকে আরও কঠিন করে তুলেছে। জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র সামাজিক ব্যবসার সহায়তা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। নতুবা জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়বে এবং টিকে থাকা কঠিন হবে। বাজেট, এর কাঠামো ও প্রণয়ন যাই হোক না কেন, জনকল্যাণকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত। যেসব প্রকল্প অধিকাংশ মানুষের উপকারে আসে না, সেগুলোর ব্যয় এড়ানো উচিত। শুধুমাত্র জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় নেয়া হবে। এছাড়াও বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। সর্বোপরি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। কর্তৃপক্ষ যদি বাজার সঠিকভাবে পরিচালনা করে, তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফালোভী মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। তাদের উৎসাহ নিরুৎসাহিত করা উচিত। দাম বেড়ে গেলে ভোক্তাদেরও খরচ কমাতে হবে। উৎপাদন, আমদানি এবং সরবরাহে সমš^য় নিশ্চিত করতে হবে। মূল্যবৃদ্ধি নতুন কিছু নয়, তবে এর প্রভাব জনজীবনে প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। অসাধু ব্যবসায়ী, কালোবাজারি এবং মুনাফালোভীরা এর জন্য দায়ী। তাই সরকারকে সারাবছর নজরদারি বজায় রাখতে হবে। বাজারে সতর্কতা এবং জনসচেতনতা থাকতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্ট চালু রাখতে হবে। এখনও অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতি অপব্যবহার ও অতিরিক্ত বিস্তৃত হয়েছে। রাজনীতিবিদরা প্রায়ই জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে নিজেদের সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেন। তারা প্রায়ই ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভয় দেখান। এই দেশে প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপরও রাজনীতি করা হয়। বাংলাদেশকে কেন শুধু একটি দেশ যেমন ভারত থেকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে? অন্য দেশও আছে। কেন সেখান থেকে কেনা যাবে না? এটি একটি সরকারি মনিটরিং সেল এবং মোবাইল প্রশাসনিক বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। একটি জাতীয় বাজেটের মধ্যে একটি দর্শন থাকে এবং বাংলাদেশে আয়, সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্যের প্রেক্ষাপট থাকে। বাজেটকে একটি কৌশলগত ‘বৃদ্ধিসহ সমতা’ (নীতির মাধ্যমে আরও কার্যকর করা যেতে পারে। করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবের পর থেকে একটি শক্তিশালী রাজস্ব কাঠামোর প্রয়োজন আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হয়েছে। উচ্চ রাজস্ব আহরণ এবং যুক্তিসঙ্গত উচ্চ ব্যয় এমন লক্ষ্য যা একটি দুর্বল ব্যবস্থার মধ্যে অর্জন করা কঠিন, যা এসব বাস্তবায়ন ও বাধা মোকাবিলা করতে সক্ষম নয়। পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার জন্য বাজেট প্রণয়নের সময় নীতিনির্ধারকদের কর ব্যবস্থা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার উপেক্ষা করা উচিত নয়। মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হতে হবে। ব্যয় দিক থেকে, সরকারি ব্যয়ের বৃদ্ধি অবশ্যই মুদ্রাস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নিতে হবে। তাই বাজেট ঘাটতি পূর্ববর্তী বাজেটের তুলনায় কিছুটা কম রাখতে হবে, যা এউচ-এর ৬.২ শতাংশ নির্ধারিত ছিল। যখনই বাজেট নিয়ে আলোচনা হয়, প্রথম বিষয়টি যা সবার মনে আসে তা হলো কর। বাজেট হলো বিভিন্ন উপায়ে সম্পদ আহরণের বিষয়, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের আয়ের ওপর কর। এই সম্পদ পরে মূলত উন্নয়ন, নাগরিকদের বিভিন্ন সেবা প্রদান এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতনের জন্য ব্যবহৃত হয়। সরকার সাধারণত নাগরিকদের কাছ থেকেই সম্পদ সংগ্রহ করে— তা কর, ব্যাংক ঋণ বা জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে হয়ে থাকে। কখনও কখনও তারা বিদেশ থেকেও সহায়তা পায়। তারা আন্তর্জাতিক উৎস থেকেও ঋণ গ্রহণ করে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে করের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে এর কার্যকর সংগ্রহ ও ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা পুনরায় উল্লেখ করছি যে পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আমরা আবারও ˆনতিক মূল্যবোধ যেকোনো মূল্যে বজায় রাখার অঙ্গীকার করছি। হিসাববিজ্ঞান একটি দেশের আর্থিক কার্যক্রমের স্পষ্ট চিত্র প্রদান করে এবং কর্পোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। হিসাববিজ্ঞান ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, সিকিউরিটি, ডিলার এবং অন্যান্যদের জন্য অপরিহার্য যারা এগুলোর প্রয়োজন অনুভব করে। দেশের বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হিসাবরক্ষকদের দায়িত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশের আর্থিক খাতে ওঈঅই-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যথার্থভাবেই, এই প্রতিষ্ঠানটি সচেতনতা সৃষ্টি, ধারণা ও চিন্তা উৎপাদন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে, শুধু নিজেদের ক্ষেত্রেই নয় বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও। আমরা বিশ্বাস করি আমরা সংশ্লিষ্ট সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি। বাজেট মূলত বার্ষিক আয় ও ব্যয়ের একটি বিবৃতি ছাড়া কিছুই নয়। বাজেট প্রণয়ন তেমন কঠিন কাজ নয়। কিন্তু এর বাস্তবায়ন একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। প্রতি বছর আমরা বাজেট নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য দেখতে পাই। যেমন: বাজেট কি গরিবদের জন্য, বাজেট কি ধনীদের জন্য এবং বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো কী? বাজেট কীভাবে শ্রেণীবিন্যাস করা হবে ইত্যাদি। এসব সমালোচনা ও আলোচনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত একটি আদর্শ বাজেট রাষ্ট্রের সামনে উপস্থাপিত হয় যার মাধ্যমে সব রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে বাজেট দেশের সব মানুষের কথা বলে। বিশেষ করে বাজেটকে দারিদ্র্য বিমোচনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছরের বাজেটগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছে। সর্বোপরি বাজেটকে স্বচ্ছ, ভালোভাবে তদারকি ও পর্যবেক্ষণযোগ্য করতে হবে। এবারের বাজেটে উল্লেখযোগ্য দিক বাজেটের আর্থিক সংস্থানের প্রায় অর্ধেক ব্যাংক খাত থেকে আনা হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাংক গুলির সক্ষমতা কতটুকু তা আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে। বিগত সরকারের আমলে অধিকাংশ ব্যাংক বেসামাল অবস্থায় পড়ে দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। ব্যাংকের শৃঙ্খলা না ফেরাতে পারলে ব্যাংক উপর্যপুরি চাপের মুখোমুখি হবে। এছাড়া ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ব মন্দা অর্থনীতির প্রভাব বাংলাদেশের উপর পতিত হবে। এমনকি পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আমাদের অর্থব্যবস্থা প্রভাবিত করতে পারে। যা প্রকারান্তরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রাপ্তি আমাদের উন্নয়ন বাজেটে ইতিবাচকতা বা নেতিবাচকতার টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে। বাজেট এবং বাজার পরিস্থিতির মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ছাড়া সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আশা করা যায় নতুন বাজেট মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে। ২০২৬-২৭ বাজেট কি মুদ্রাস্ফীতির কারণে জনগণের ভোগান্তি কমাবে নাকি বাড়াবে? মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থে কতটা গুরুত্ব দেয়া হবে? বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচন নাকি অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে? কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষেত্রে কী গুরুত্ব দেয়া হবে? এসব প্রশ্ন প্রতি বছর মানুষ করে থাকে। সামগ্রিকভাবে বাজেটকে জনমুখী হওয়া উচিত। তাই বাজেট প্রণয়নের চেয়ে এর বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আসুন, জাতীয় উন্নয়নের চেতনা নিয়ে বাজেট বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে চলি। জনগণ আশা করছে, ২০২৬-২৭ বাজেট দারিদ্র্য হ্রাস, ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারণ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান-বান্ধব পরিবেশ গঠনের প্রতিশ্রুতি পূরণ, জন আকাঙ্খা ও চাহিদার প্রতিফলন ঘটাবে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

“ক্ষমতার ‘ক্রিম’ খেয়ে এখন লোটাসে ঝোঁক? তৃণমূলে দলত্যাগের ঝড়”

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একের পর এক ভূমিকম্পের পর এবার তার অভিঘাত সরাসরি আছড়ে পড়ল দিল্লির সংসদে। বিধানসভায় ভাঙনের পর এবার তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদরাও কার্যত বিদ্রোহের পথেই হাঁটলেন—যা শুধু একটি দলীয় সংকট নয়, বরং এক বৃহত্তর রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।সোমবার, লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা-র কাছে তৃণমূলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জন লিখিতভাবে নিজেদের অবস্থান জানালেন। নেতৃত্বে ছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। শুধু তাই নয়, তাঁরা সংসদে আলাদা ব্লকের দাবিও জানিয়েছেন এবং সূত্রের খবর—এনডিএ-কে সমর্থনের ইঙ্গিতও দিয়েছেন।এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজনৈতিক মহলে চরম চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তার আগে মতিলাল নেহরু মার্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব-এর বাসভবনে বিদ্রোহী সাংসদদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক আরও জল্পনা উস্কে দেয়। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শতাব্দী রায়, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিত মাল, সুখেন্দু শেখর রায়-সহ একাধিক সাংসদ। এমনকি রাজনৈতিক মহলের দাবি—এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-ও।সংখ্যার অঙ্কই এখানে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। দলত্যাগ বিরোধী আইনের চোখে বাঁচতে গেলে প্রয়োজন দলের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন—এবং বিদ্রোহীদের হাতে এখন সেই সংখ্যাই রয়েছে। ২৮ জনের মধ্যে ২০ জন সাংসদ বিদ্রোহী শিবিরে—অর্থাৎ আইনি জটিলতা এড়ানোর পথ প্রায় পরিষ্কার।অন্যদিকে, এই পুরো পরিস্থিতিতে কার্যত কোণঠাসা তৃণমূল নেতৃত্ব। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে উপস্থিত থাকলেও এই ভাঙন রোখা যায়নি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা শুধু সাংসদদের বিদ্রোহ নয়—এটা নেতৃত্বের উপর আস্থাহীনতার সরাসরি প্রতিফলন।একই চিত্র দেখা গিয়েছে রাজ্যেও। ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন ইতিমধ্যেই বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়েছেন। অর্থাৎ, বিধানসভা হোক বা লোকসভা—তৃণমূলের ভিত কার্যত ভেঙে পড়ছে দুই দিক থেকেই।এখানেই প্রশ্ন উঠছে—এটা কি আদর্শগত লড়াই, নাকি নিছক ক্ষমতার রাজনীতি?সমালোচকদের দাবি, এতদিন তৃণমূলের ‘ক্রিম’ খেয়ে, ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করে, এখন পরিস্থিতি বদলাতেই অনেকেই নতুন করে ‘লোটাস’-এর দিকে ঝুঁকছেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক আদর্শ নয়—লোভ, সুযোগ আর ভবিষ্যতের নিরাপত্তাই এই দলত্যাগের মূল কারণ।এই প্রবণতা শুধু তৃণমূলের ক্ষতি করছে না—গণতন্ত্রের জন্যও এক বড় সতর্কবার্তা। কারণ, ভোটাররা যাদের নির্দিষ্ট মতাদর্শের ভিত্তিতে নির্বাচিত করেছিলেন, তাঁদের একাংশ আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন—যা জনমতের প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।এদিকে কলকাতাতেও চমক অব্যাহত। মেয়র পদ থেকে ফিরহাদ হাকিম-এর পদত্যাগ এবং তাঁর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক—এই জল্পনাকে আরও জোরদার করেছে যে, তৃণমূলের ভাঙন এখন সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে।সব মিলিয়ে, বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে—যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস আর আগের জায়গায় নেই। প্রশ্ন একটাই—এই ভাঙনের শেষ কোথায়? এবং সবচেয়ে বড় কথা—জনতা কি এই ‘দলবদল রাজনীতি’কে মেনে নেবে?সময়ই তার উত্তর দেবে।

দুই রাষ্ট্রের মাঝে নীরব প্রশ্নচিহ্ন

সীমান্তের শূন্যরেখায় বসে আছেন ১১ জন মানুষ। একজন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, চারটি শিশু, একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। তিন দিনের বেশি সময় ধরে তারা না পারছেন বাংলাদেশে ঢুকতে, না পারছেন ভারতে ফিরতে। উন্মুক্ত আকাশের নিচে রোদ, বৃষ্টি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের দিন কাটছে। বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে এই দৃশ্য যেন মানবতার জন্য এক নীরব প্রশ্নচিহ্ন।এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় সাহিত্যের কালজয়ী চরিত্র ‘টোবা টেক সিংহ’কে। যে ব্যক্তি ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের সময় রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছিল। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সাদাত হাসান মাণ্টোর ‘টোবা টেক সিংহ’ গল্পের সেই নায়ক বারবার প্রশ্ন করত, “পাকিস্তান কুন জায়গা হ্যায়?” বিভক্তির বিভীষিকায় মাঝখানে পড়ে লোকটি কখনো নিজের পরিচয় খুঁজে পায়নি। ঠিক একই ট্র্যাজেডি ঘটছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। তবে এটা শুধু সাহিত্যের গল্প নয়,  শতভাগ বাস্তবতা। গত কয়েক মাসে হাজার দেড়েক বাংলাভাষীকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে ভারতে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। তবে তারা আটক পড়েছেন ‘অবৈধ ঢোকার’ অভিযোগে।  গেল ২০২৫ সালের জুনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার অন্তঃসত্ত্বা সোনালী বিবিসহ তার ছেলেকে দিল্লিতে আটক করেছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। পরে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ করার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জে সোনালী বিবি ও তার শিশুসন্তান আটক হয়। পরে তাদের ভারতে ফেরত পাঠানো হলেও স্বামীকে ফেরত নেয়নি বিএসএফ।সেই ঘটনায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টকে একপর্যায়ে এই মন্তব্য করতে হয়েছিল- “আইনকে কখনো কখনো মানবিক স্বার্থের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়”। আদালত নির্দেশ দিলেও স্বামীকে নিয়ে ফেরানোর ব্যবস্থা হয়নি, সোনালি একাই সন্তান জন্ম দিয়েছেন।মশালগাঁও সীমান্তের সেই ১১ জনের গল্পটাও যেন একই। প্রতিবন্ধী শিশুটির বাবা হয়তো বৃদ্ধ। কিন্তু দুই দেশের মাঝখানে আটকা পড়ে তারা নিজেদের ‘পরিচয়ের’ অপেক্ষায় কাতর। বাংলাদেশ বলছে আইন অনুসরণ করো। ভারত বলছে প্রমাণ দেখাও। এই দুই প্রশ্নের উত্তরের মাঝখানে অমানবিকতার শিকার অসহায় ১১টি প্রাণ।বিখ্যাত জার্মান-মার্কিন ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক হান্না অ্যারেন্ডট বলেছিলেন, ‘সবচেয়ে বড় মানবাধিকার হলো অধিকার থাকার অধিকার’। এই সীমান্তের রেখা যখন মানুষের দেহে ছেদচিহ্ন আঁকে, তখন দুই দেশের আইনের ফাঁক দিয়ে “মানুষ” পরিণত হয় ‘সমস্যা’য়। একদলকে ভাবা হয় ‘বোঝা’। অন্য দলকে ‘শত্রু’ আখ্যা দেওয়া হয়। অথচ কেউই তাদের বুকে টেনে নেয় না।রাষ্ট্রের পতাকা ও সীমানা মানুষের শরীরে এত গভীর দাগ কাটে যে সেসব কখনো মিলিয়ে যায় না। টোবা টেক সিংহ আজও জীবিত- সে লুকিয়ে আছে মশালগাঁওয়ের শূন্যরেখায় অপেক্ষারত অন্তঃসত্ত্বা ওই নারীর চোখে।মানচিত্রের সীমানার দাগ যখন রক্তে রূপ নেয়, তখন বুঝতে হবে- সীমানার চেয়ে বড় কিছু আছে: মানবতা। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলোর ‘মানুষ’ থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারব? নাকি তাদের ‘পরিচয়ের লড়াইয়ে’ মাঠে ছেড়ে দেব; যতক্ষণ না তারা হারিয়ে যায় সময়ের গহ্বরে?রাষ্ট্রহীনতার এই অমানবিক কাণ্ড নিয়ন্ত্রিত না হলে প্রতিটি বাস্তুচ্যুত নাগরিক ভবিষ্যতে ‘মানুষ’ না হয়ে হয়ে যেতে পারে ‘একটি সংখ্যা’। সভ্যতার নামে এই ব্যর্থতার বিরুদ্ধে নীরব কণ্ঠস্বর জাগবে।এই আটকে পড়া মানুষগুলো বাস্তব জীবনের ‘টোবা টেক সিংহ’, যারা জীবন্ত অবস্থায় ইতিহাসের করুণ সাক্ষী হয়ে আছে।এমন কোনো আইন নেই যা মানুষকে ‘অমানুষ’ করার অনুমতি দেয়। রাষ্ট্র যখন নাগরিককে ছুঁড়ে ফেলে, তখন মানবতার সভ্যতা বিব্রত হয়। সীমান্তের দুই পাশের প্রশাসন কি আজও তাদের ‘প্রমাণের’ অঙ্কে ব্যস্ত, যখন সামনে দাঁড়িয়ে আছে অসহায় ১১টি প্রাণ?

শাস্তির প্রদর্শন নয়, বিচার নিশ্চিত হোক

গত ১৯ মে ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ৮ বছরের রামিসা আক্তার স্কুলে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়। আর ফেরেনি। পাশের ফ্ল্যাটের সোহেল রানা তাকে ডেকে নিয়ে বাথরুমে ধর্ষণ করে, ধামাচাপা দিতে গলা কেটে হত্যা করে, মাথা আলাদা করে বালতিতে লুকিয়ে রাখে। রামিসাই বাংলাদেশে প্রথম শিশু নয়, তার আগে এবং পরেও অনেক শিশুর এমন করুণ পরিণতি হয়েছে। রামিসার পরেই একটি মাদ্রাসার বাথরুমে একটি মৃতশিশু পাওয়া যায়, যার পায়ুপথ রক্তাক্ত ছিল ! আছিয়া, পথশিশু আয়েশা— প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণ, গণপিটুনি, প্রকাশ্যে খুনের খবর আসছে। ধর্ষণ এবং খুনের নৃশংসতা দেখে অনেকেই দেশে শরিয়া আইন চায়। শরীয়া আইনে ‘ধর্ষণ’ বলতে কোন শব্দই নেই, আছে জেনা, ব্যভিচার। জেনা, ব্যভিচার হচ্ছে সম্মতি-অসম্মতি নির্বিশেষে বিবাহ বহির্ভূত যৌনকর্ম, আর ধর্ষণ হচ্ছে সম্পূর্ণ অসম্মতিতে যৌনকর্ম। জেনার শরিয়া বিধান ধর্ষণেও প্রয়োগ করা যায় কি-না আমার জানা নেই, প্রয়োগ করা গেলে সেই ক্ষেত্রে ধর্ষিতাকেই ৪ জন মুসলমান সাক্ষী হাজির করতে হবে। কেবল ৪ জন সাক্ষী হলেই হবে না, চোর-ডাকাত-চরিত্রহীন-মিথ্যুক সাক্ষী গ্রহণযোগ্য নয়, সাক্ষীকে হতে হবে সাচ্চা ইমানদার, সত্যবাদী ও চরিত্রবান। কারো কাছে শুনে সাক্ষী দিলে হবে না, ধর্ষণকর্ম স্বচক্ষে দেখেছে এমন সাক্ষী লাগবে। কিন্তু ধর্ষক কি কখনো ৪ জন ইমানদার লোককে সম্মুখে বসিয়ে রেখে ধর্ষণ করে ? আবার নারী সাক্ষী নয়, ৪ জন পুরুষ সাক্ষী লাগবে, নারী সাক্ষী হলে সম্ভবত ৮ জন লাগবে। সাক্ষী হাজির করতে না পারলে মিথ্যা অভিযোগ আনার দায়ে ধর্ষিতাকেই শাস্তি পেতে হয়। কারণ ধর্ষিতার বিচার করে শাস্তির দিতে সাক্ষীর প্রয়োজন হয় না, কারণ ধর্ষিতা তার গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ লুকাতে পারে না। ধর্ষক বা খুনি স্বীকারোক্তি দিলে সাক্ষী ব্যতিরেকেও শাস্তি দেয়া যায়। এই ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে নির্যাতন করেও স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। বাংলাদেশের এমন একটি ঘটনা বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে দিয়েছিল, ২০২০ সনে নারায়ণগঞ্জের এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে মর্মে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়; কিন্তু কিছুদিন পর মেয়েটি ফেরত আসে এবং এতে পুরো বিচার কাজ প্রশ্নের মুখে পড়ে। ততদিনে খুনির ফাঁসি হয়ে গিয়েছিল কি-না তা আর মনে নেই। বারবার রিমাণ্ডে নিয়ে নির্যাতন করা না হলে এমন স্বীকারোক্তি দেয়ার কথা নয়। তাই শুধু স্বীকারোক্তি অপরাধ নিরূপণে একমাত্র নিয়ামক হওয়া উচিত নয়। শরিয়া আইনের অপরিহার্য ৪ জন পুরুষ সাক্ষীর অভাবে পাকিস্তানে ১৯৭৯ সন থেকেই ধর্ষণের প্রায় সব মামলাই ঝুলে গেছে, অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। ডিএনএ বা ফরেনসিক পরীক্ষার কথা শরিয়া আইনে নেই, কারণ এগুলো সাম্প্রতিককালের আবিস্কার। দ্বিতীয়ত শরিয়া আইনের সঙ্গে মনুষ্য আবিস্কৃত ফরেনসিক পরীক্ষা যোগ করা কতটুকু শরিয়া সম্মত তা আমার জানা নেই, কারণ মানুষ সৃষ্ট আইন হচ্ছে ‘তাগুত’, যা ইসলাম ধর্মমতে পরিত্যজ্য। মনুষ্য সৃষ্ট তাগুত আইন দ্বারা বিচারকার্য পরিচালনা করার কারণে বাংলাদেশের কয়েকটি আদালতে বোমাও মারা হয়েছিল। শরিয়া আইন থাকলেই যে হত্যা-খুন-ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে তা কিন্তু প্রমাণিত সত্য নয়। বহু মুসলিম দেশে শরিয়া আইন আছে, তারমধ্যে আফগানিস্তান, সৌদি আরব, ইরানে শরিয়া আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, কিন্তু এই তিনটি দেশেও ধর্ষণ-খুন বন্ধ হয়নি। আফগানিস্তানে তালেবানের আমলে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড, হাত-পা কাটা হচ্ছে, কিন্তু অপরাধ থামেনি। সউদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বিশ্বে সর্বোচ্চ, কিন্তু গার্হস্থ্য সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ কমেনি। সউদি আরব দরিদ্র দেশগুলো থেকে গৃহকর্মী নিয়ে ধর্ষকদের মুখে ঠেলে দেয়। সউদি আরবে পিতা-সন্তান পালাক্রমে গৃহকর্মীদের ধর্ষণ করে। এই কারণেই ফিলিপিন্স, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া মাঝে মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দেয়। শরিয়া শাসিত দেশে গৃহকর্মী ধর্ষণের নানা করুণ চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এলেও আজ পর্যন্ত কোন ধর্ষকের শরিয়া আইনে বিচার হয়েছে বলে শোনা যায়নি। বাংলাদেশে শরিয়া আইন না থাকলেও আলেমদের মনে তা গেঁথে থাকার কথা, তারা শরিয়া আইন পড়ান, নিয়মিত শরিয়া আইন চালুর পক্ষে কথা বলে থাকেন। যারা শরিয়া আইনের পক্ষে কথা বলছেন তাদের অনেকেই আবার ধর্ষকও। ‘তারাও মানুষ, তাদেরও যৌনাকাঙ্খা আছে’ - এমন বয়ান ইদানীং শোনা যাচ্ছে। কওমী মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ স্বাধীন। মাদ্রাসার ভেতরে শরিয়ার মত কঠোর আইন অনুসৃত হয়। কওমী মাদ্রাসায় কোন রকম সরকারী হস্তক্ষেপ চলে না, স্ব-স্ব মাদ্রাসা তাদের নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হয়, মাদ্রাসায় কী পড়ানো হবে তাও তারাই নির্ধারণ করে থাকেন। এমন একটি পরিবেশে ইসলামী জীবনযাপনে অভ্যস্ত আলেমগণও যদি ধর্ষণ এবং বলাৎকার থেকে বের হতে না পারেন তাহলে শরিয়া আইন কীভাবে শিশু শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দেবে ? মাদ্রাসার শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম ধর্ষক হলে তার বিরুদ্ধে ৪ জন সাক্ষী যোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। কারণ কোরআন-হাদিসে মুসলমানদের দোষত্রুটি গোপন রাখতে বলা হয়েছে। আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে একটি নাম হচ্ছে ‘আস-সিত্তির’, যার অর্থ যিনি দোষত্রুটি গোপন রাখেন। মানুষ যখন বিচার পায় না, তখন তারা বিকল্প খোঁজে- কেউ শরিয়া আইন চায়, কেউ গণপিটুনিতে ন্যায় বিচার খুঁজে বেড়ায়। বাংলাদেশে একটি ধর্ষণ মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে ৫-৭ বছর লাগে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০২৩ সনের তথ্য অনুযায়ী ধর্ষণ মামলায় সাজা হয় মাত্র ৩-৪ শতাংশের। রামিসা হত্যার পর প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং স্বারাষ্ট্রমন্ত্রীর তৎপরতায় বিচার ব্যবস্থার আড়মোড়া কেটেছে, আইনমন্ত্রী ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৫-৭ দিনে বিচার শেষ হওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন। তবে এত দ্রুত বিচার সম্ভব নয়। এত তাড়াহুড়োও ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। যত নিকৃষ্ট অপরাধীই হোক না কেন, তারও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। ভিক্টিম ও অপরাধী উভয়ই যখন ন্যায় বিচার পায় শুধু তখনই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই, অভাব আছে আইনের দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। নির্ভয়া কাণ্ডের পর ভারতে গঠিত ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের মতো বাংলাদেশেও কোর্ট গঠন করা যায়, যেগুলো ৬ মাসের মধ্যে রায় দিতে বাধ্য থাকবে। ভিডিও কনফারেন্সে সাক্ষ্য, সাক্ষী সুরক্ষা আইনের বাস্তব প্রয়োগও জরুরি। জনগণ যদি দেখে যে রাষ্ট্র অপরাধীকে ছাড় দেয় না, তাহলে মানুষ প্রচলিত আইনের বিকল্প খুঁজবে না। তবে শাস্তি প্রদানে তদন্ত, প্রমাণ ও বিচার প্রক্রিয়া নির্ভরযোগ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। জনসম্মুখে বিভৎস ও নৃশংস কায়দায় শাস্তি দেয়ার বিধান প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহাকে তৃপ্ত করলেও সভ্য দুনিয়া তা গ্রহণ করেনি। কারণ প্রতিশোধ আর বিচার এক নয়। কপালে পট্টি বেঁধে সিনেমার নায়কের মতো প্রতিশোধ নেওয়ার হুঙ্কার সমর্থন করা আদালতের কাজ নয়। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

‘দূষণ’ হয়ে উঠছে সম্পদ

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে দাঁড়ালে যা দেখা যায় তা শুধু দূষণ নয়, সেখানে আসলে কোটি টাকার কাঁচামালও ভাসছে। প্রতিটি পানির বোতল, প্রতিটি পলিথিন ব্যাগ, প্রতিটি প্লাস্টিকের চেয়ার- শুধু বর্জ্য নয়, এক একটি নতুন শিল্পের ভিত্তি হতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে ‘দূষণকে’ সম্পদে পরিণত করেছে। অথচ বহুমুখী দূষণে ভারাক্রান্ত বাংলাদেশের এই অপার সুযোগ এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে।বিষয়টি শুধু পরিবেশ সুরক্ষার নয়, বরং তিনস্তরীয় একটি ব্যবসায়িক মডেল। যেখানে একই প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে একসঙ্গে তিনটি আয়ের উৎস তৈরি করা সম্ভব। প্রথমত, ফার্নিচার হিসেবে বিক্রি করা যাবে। দ্বিতীয়ত, কার্বন ক্রেডিট হিসেবে বিক্রি করা যাবে। আর তৃতীয়ত সরকারি পরিবেশ প্রণোদনা। এসব মিলিয়ে যে মডেল দাঁড়ায়, তা বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য এক অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। একটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক চেয়ার তৈরিতে যতটুকু কার্বন ডাই-অক্সাইড সাশ্রয় হয়, তা কার্বন ক্রেডিট হিসেবে বিক্রি করলে চেয়ারের দামের অতিরিক্ত ২০-৩০ শতাংশ আয় আসতে পারে।প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে ফার্নিচার তৈরির মূল প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে সহজ। সংগ্রহ করা এইচডিপিই (উচ্চ ঘনত্বের পলিইথিলিন) ও পিপি (পলিপ্রোপিলিন) ধরনের প্লাস্টিক প্রথমে পরিষ্কার করা হয়। তারপর নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় গলিয়ে মোল্ডে ঢালা হয়। ঠান্ডা হলে বেরিয়ে আসে মজবুত ফার্নিচার, যা কাঠের চেয়ে টেকসই, পানিরোধী এবং পোকামাকড়মুক্ত।এসব পণ্যের বিশেষত্ব হলো এগুলো পুনরায় গলিয়ে নতুন করে ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ এটি সত্যিকারের সার্কুলার ইকোনমি বর্জ্য। যা শেষ হয় না, রবং রূপান্তরিত হয়।বাজারে এই পণ্যগুলোর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। স্কুল, হাসপাতাল, সরকারি অফিস ও পার্কে এই ধরনের টেকসই ফার্নিচারের জন্য ক্রয় নীতি তৈরি হচ্ছে। ইউরোপে এসব পণ্যের বাজার ইতোমধ্যে বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশেও রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। বিশেষত কম দামের কারণে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অনেক বেশি। দ্বিতীয় পর্যায়ে আসে কার্বন ক্রেডিটের কথা। যা পরিবেশ রক্ষার আন্তর্জাতিক মুদ্রা। যখন কোনো উদ্যোগ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হ্রাস করে বা কার্বন শোষণ করে, তখন সেই পরিমাণটি একটি ক্রেডিট হিসেবে স্বীকৃতি পায়। যা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা যায়। প্রতিটি ক্রেডিটের অর্থ হচ্ছে এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সাশ্রয়।প্রশ্ন হচ্ছে, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং এখানে কীভাবে কাজ করছে। মূলত, নতুন প্লাস্টিক তৈরিতে যে কার্বন ডাই-অক্সাইড খরচ হতো, তা রিসাইক্লিং দিয়ে বাঁচানো হচ্ছে। এই ‘বাঁচানো’ কার্বন ডাই-অক্সাইড-ই হলো ক্রেডিটের উৎস।  এক টন প্লাস্টিক রিসাইকেল করলে প্রায় ১ দশমিক পাঁচ থেকে দুই টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সাশ্রয় হয় অর্থাৎ সমপরিমাণ ক্রেডিট। কার্বন ক্রেডিট বিক্রির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে স্বীকৃত দুটি সংস্থা হচ্ছে- গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড এবং ভেরা (ভিসিএস-ভেরিফায়েড কার্বন স্ট্যান্ডার্ড)। সংস্থা দুটো প্রকল্প যাচাই করে সার্টিফিকেট দেয়। একবার সার্টিফিকেট পেলে ‘এক্সপ্যানসিভ’, ‘সাউথ পোল’ বা ‘ক্লাইমেট ট্রেডের’ মতো আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে ক্রেডিট বিক্রি করা যায়।অবশ্য, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া বেশ জটিল হলেও অসম্ভব নয়। একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ৬-১২ মাসের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করা সম্ভব। সহজ বিকল্প হিসেবে দেশীয় বহুজাতিক কোম্পানি যেমন গার্মেন্টস রপ্তানিকারক বা ব্যাংক তাদের ইএসজি (পরিবেশ, সমাজ ও সুশাসন) লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরাসরি কার্বন ক্রেডিট কিনতে পারে। বেশি নয়, মাত্র ৫-১০ লাখ টাকা বিনিয়োগে দেশে প্লাস্টিক ফার্নিচার ইউনিট চালু করা সম্ভব। যেখানে প্রথম বছর ফার্নিচার বিক্রিতে মনোযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয় বছরে এসে শুরু করতে হবে উৎপাদন ডেটা সংগ্রহ। তৃতীয় বছরে কার্বন ক্রেডিট নিবন্ধনের আবেদন করা যেতে পারে। এভাবে তিন বছরের রোডম্যাপ অনুসরণ করলে দেশেই একটি স্থায়ী ও লাভজনক সবুজ ব্যবসা দাঁড় করানো সম্ভব।বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে সরকার ক্রমেই সবুজ উদ্যোগকে নীতিগত সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন ‘সবুজ সাপ্লাই চেইন’ চাইছেন। বিশেষত ইউরোপীয় ক্রেতারা পণ্যের কার্বন ফুটপ্রিন্ট দেখছেন। এই প্রেক্ষাপটে প্লাস্টিক থেকে ফার্নিচার ও কার্বন ক্রেডিটের মডেলটি শুধু একটি ব্যবসা নয় দেশের বৃহত্তর পরিবেশগত রূপান্তরেরই একটি অংশ। যেসব উদ্যোক্তা এই পথে হাঁটবেন, তারা কেবল মুনাফাই করবেন না, হয়ে উঠবেন একটি নতুন শিল্পের পথপ্রদর্শকও।বর্জ্য বিষয়ে আমাদের গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গি সত্যিই বদলাতে হবে। সময়েরও দাবি সেটাই।কারণ বর্জ্য এখন আর আমাদের সমস্যা নয়, বরং সম্ভাবনাময় এক শিল্পের কাঁচামাল।  লেখক: সহকারী অধ্যাপক, পানি ও জলবায়ু গবেষক।

ভারত-ব্রিটেন বাণিজ্য চুক্তি: নতুন গতি, কূটনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ভারত ও ব্রিটেন তাদের কম্প্রোরেন্সিভ ইকোনমিক এন্ড ট্রেড এগ্রিমেন্ট বাস্তবায়নে নতুন গতি আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। মঙ্গলবার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে চুক্তির অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয় এবং দ্রুত বাস্তবায়নের পথ খোঁজা হয়।ভারতের বাণিজ্য সচিব রাজেশ আগরওয়াল ব্রিটেনের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি আমান্ডা ব্রুকস-এর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই বৈঠকে চুক্তির বাস্তবায়নে থাকা জটিলতা ও নতুন সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়।অন্যদিকে, ব্রিটেনের ব্যবসা ও বাণিজ্য সচিব পিটার কাইল বর্তমানে ভারতে সফরে রয়েছেন। তিনি কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পিয়ূষ গোয়াল-এর সঙ্গে বৈঠক করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা করেন।বর্তমানে ভারত-ব্রিটেন বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন পাউন্ড। সিইটিএা কার্যকর হলে এই পরিমাণ আরও দ্রুত বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।ব্রিটিশ সরকারের মতে, এই চুক্তির ফলে বছরে অতিরিক্ত ২৫.৫ বিলিয়ন পাউন্ড বাণিজ্য বৃদ্ধি পেতে পারে এবং উভয় দেশের এউচ প্রায় ৫ বিলিয়ন পাউন্ড করে বাড়তে পারে।বিশ্ব বাণিজ্যে অস্থিরতা, বিশেষ করে স্ট্রেইট অফ হরমুজে অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতির মধ্যেও এই চুক্তি দুই দেশের জন্য একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে।সব মিলিয়ে, ভারত ও ব্রিটেন ঈঊঞঅ-কে শুধু বাণিজ্য চুক্তি ঢ়নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব হিসেবে দেখছে এবং দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট।

তোফায়েল আহমেদ: হারিয়ে যাবেন না

একজন অসাধারণ বাগ্মী, মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে উঠে আসা বিরলপ্রজ রাজনীতিক, জাতীয় নেতা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তোফায়েল আহমেদ বেঁচে থাকবেন। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, ইতিহাসের উত্থান-পতন ও নানা বাঁক বদলে একজন নেতা হিসেবে তিনি কখনো বিস্মৃতির অতল অন্ধকারে হারিয়ে যাবেন না।সরকারি চাকরির সুবাদে তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখেছিলাম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বকালীন তাঁর সঙ্গে মোট সাড়ে তিনবছর কাজ করেছি। তখনই তাঁর সান্নিধ্যে যাবার এক অপার সুযোগ আসে। স্মার্ট, পরিপাটি এবং অসামান্য স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি। দাপ্তরিক  নথি, নোটাংশ, সারসংক্ষেপ, ক্ষণ, তারিখ ইত্যাদি বিস্ময়করভাবে মনে রাখতে পারতেন। নথিতে সিদ্ধান্ত দিতেন ব্যক্তিগত দায় নিয়ে। কোনো জটিল বিষয়ে কর্মকর্তাগণ সিদ্ধান্তে দোদুল্যমান হয়ে গেলে বা মৌনতা অবলম্বন করলে তিনি বলতেন, -নথিটা দাও আমি নিজেই লিখে দিচ্ছি। ভবিষ্যতে সমস্যা হলে সেটা আমি দেখবো।তিনি সবসময় হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করতেন। তাঁর মুখের ওপর বিষণ্ণতার কালোছায়া কখনো দেখি নি। হঠাৎ  মেজাজ দেখেছি, তবে তা একেবারে  হারাতে দেখি নি। হয়তো তাঁরও অনেক দুঃখবোধ ছিল যা প্রকাশিত নয় এবং অফিসারদের কাছে কখনো ভাগ করার ছিল না। তাঁর মধ্যে চাপা, প্রচ্ছন্ন এবং দৃঢ়চেতা মানুষের নানাবিধ গুণাবলী ছিল।বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য-শৌর্য ও বিদ্যায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়।  আলাদা একজন। তখনকার বাণিজ্য সচিব আপাদমস্তক বিনয়ী মানুষ হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন এবং আমি মাঝেমধ্যে তাঁর সামনে উপবিষ্ট হয়ে বলতাম, -স্যার, আমরা কিন্তু বাইরে গিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করি তা কখনো বলি না, বরঞ্চ বলে থাকি, আমরা তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে আছি। এমন কথায় তিনি মনে মনে আনন্দিতবোধ করতেন। আবার সস্নেহে বলতেন,-নিশ্চয় তোমরা কোনো একটা মতলব নিয়ে এসেছো।পোশাক-আশাকে এত রুচিবান, পরিচ্ছন্ন, শৌখিন ও অভিজাত এদেশের মন্ত্রীদের মধ্যে সচরাচর দেখা যেত না। পাজামা, পাঞ্জাবি, মুজিবকোট, স্যুট, ব্লেজার, জুতো পরতেন নামি দামি ব্র্যান্ডের। ব্যতিক্রম মানের হিসেবে সহজেই বুঝা যেত। এ বিষয়ে তিনি ছিলেন উদার এবং দরাজ স্বভাবের মানুষ।মনে পড়ে, তখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস হবে। দুপুরের পরপর অফিসে ঢুকে তিনি বললেন,-দ্যাখো, বাইরে কেমন প্রচন্ড দাবদাহ চলছে। গাড়ি থেকে নামাই যায় না। বাইরে তাকানো মুশকিল। গুমোট পরিবেশ। বৃষ্টি-বাদল হওয়া জরুরি। ঢাকার আবহাওয়াটা কেমন যেন বদলে গেছে। তাছাড়া আমি তো আবার সানগ্লাস পরি না। তাৎক্ষণিক জিজ্ঞেস করলাম,-কেন স্যার? তিনি বললেন,-সিরাজ ভাই একবার (সিরাজুল আলম খান) মানা করেছিলেন। তিনি বলতেন, 'সানগ্লাস নাকি এদেশের  গণমানুষের রাজনীতির সঙ্গে মানানসই নয়'। সেই থেকে সানগ্লাস বাদ দিয়েছিলাম, আর কোনোদিন পরি নি।২.একদিন অপরাহ্নে অফিসে এসেই আমাকে ইন্টার-কমে কল করলেন।  'এখুনি উপরে আস'। এভাবে তিনি আমাকে প্রায়ই ডেকে পাঠাতেন। কিন্তু  সেদিনের কণ্ঠস্বরটা কেমন যেন ছিল!  আমি বের হয়ে লিফটের দরজায় দাঁড়ালাম। চারতলার দক্ষিণ প্রান্তে মন্ত্রীর কক্ষ, আমি দোতলায়। কাজেই লিফটেই যেতে চাই। ভাবছিলাম, কোন বিষয়ে জানতে চাচ্ছেন, বুঝতে পারছি না। তাঁর কক্ষে প্রবেশের মুখে পৌঁছাতেই ব্যক্তিগত স্টাফরা বললো, -শিগগিরই ঢুকেন স্যার, এরমধ্যেই কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছেন আপনি কোথায়?দরজার ভেতরে পা রেখেই সালাম জানালাম, দেখি মন্ত্রীর নির্ধারিত চেয়ারে বসে আছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু।আমি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে। কী, আশ্চর্য! পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, তোফায়েল আহমেদ সোফায় সহাস্যে বসে আছেন। আমি খানিকটা অপ্রস্তুত হলাম। তিনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন,-আমু ভাই, ওর কথাই বলেছিলাম, সে চট্টগ্রামের ডিসি ছিল। আমু সাহেব বললেন, -হ্যাঁ আপনাকে দেখেছি বলে মনে হয়, সবাই তো চিনে-জানেও ।এবার কাজের কথা। মন্ত্রী বললেন, -দেখো, আমু ভাই আমার নেতা। সেই বরিশালের বি,এম কলেজ থেকেই আমি আমু ভাইয়ের সাথে আছি। তোমার কাছে আমু ভাইয়ের একটা কাজ আছে। এটা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাড়াতাড়ি করে দিতে হবে।সেদিন এক সঙ্গে চা খেয়ে আমি নিচে নেমে আসি। পরদিন আবার মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা। তিনি নিজে থেকেই  হাসিমুখে বললেন, -শোন মান্নান, গতকাল আমু ভাইকে একটু বেশি সম্মান দেখালাম আর কি! তিনি আমার নেতা, ঠিকই আছে। তবে '৭০ এ তিনি প্রাদেশিক পরিষদের নেতা ছিলেন। একই সময়ে আমি কিন্তু ছিলাম পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে।আমি বললাম, -জ্বি স্যার, আপনি নাকি তখন বয়সের দিক থেকে সর্ব কনিষ্ঠ এমএনএ ছিলেন?৩.আরও একদিনের ঘটনা। মুন্সিগঞ্জের জনৈক হিন্দু এমপি একটা ওষুধ প্রস্তুতকারী সংগঠনের আসন্ন নির্বাচনে তাঁর লোককে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য আমাকে একটি অনৈতিক ও গর্হিত প্রস্তাব করে বসেন। আমার রুমে বসেই তিনি এমন লোভনীয় প্রস্তাব দেন। তখন মহামান্য হাইকোর্ট থেকে আমাকে ঐ সংগঠনের ‘প্রশাসক’ নিয়োগ করা হয়েছিল। আমি তাঁর কথা শুনতে চাই নি। এমনকি আমার রুম থেকে তাঁকে দয়া করে চলে যেতে বলেছিলাম। সেদিন তিনি বেশ রাগান্বিত বদনে আমার কক্ষ ত্যাগ করেছিলেন। পরে জানতে পারি, সেদিনই তিনি সরাসরি মন্ত্রীর কক্ষে ঢুকে আমার সম্পর্কে আজেবাজে মন্তব্য করেন। এবং বলেছিলেন, - তোফায়েল ভাই, কোত্থেকে যে এসব জামায়াতি অফিসার খুঁজে পান জানি না। সেদিন মন্ত্রী তাঁর কথা শুনেছেন বটে। যদিও তেমন কিছু মন্তব্য করেন নি। তবে দুয়েকদিন পরে, হঠাৎ করে অনেকের উপস্থিতিতে বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলে ওঠলেন, -সেদিন তো মান্নানকে একজন এমপি জামায়াতের লোক বলে গেল। তখন কেউ কথা বলছেন না। সবাই চুপ,বিব্রত। নীরবতা ভেঙে আমি নিজেই বললাম, -স্যার, আমি এই প্রথম এমনটা শুনলাম। অবশ্য আগে আমাকে জাসদ, বাসদ, ছাত্রদল, নাস্তিক অনেক কিছু বলা হয়েছে। এবারই একেবারে চুড়ান্ত অভিধায় অভিষিক্ত হলাম স্যার! মন্ত্রী বললেন, -যাক এসব। আমি বুঝতে পেরেছি। তুমি তাকে কোনো পাত্তাই দাওনি মনে হয়। ৪.তিনি অসুস্থ। একদিন সন্ধ্যা বেলায় তাঁর বনানীর বাসায় দেখতে যাই। জানলাম তিনি উপরে রেস্ট নিচ্ছেন। ইদানিং তিনি বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে থাকেন। আমি ঘুরে ঘুরে বাসার নিচ তলায় সাজানো তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের দুর্লভ আলোকচিত্র ও সাদাকালো ফটোগ্রাফগুলি দেখছিলাম। যার সঙ্গে '৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়-স্মৃতির অমূল্য ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এমন সময় বাসায় প্রবেশ করলেন আরেক কিংবদন্তী ও জাতীয় ব্যক্তিত্ব তোফায়েল আহমেদের ঘনিষ্ঠ রাজনীতি-সহচর প্রয়াত নেতা আবদুর রাজ্জাকের পুত্র নাহিন রাজ্জাক। কথা বলছিলাম রাজ্জাক তনয়ের সঙ্গে। খানিক পরে তিনি শারীরিক অসুবিধা নিয়েই স্টিক হাতে ড্রয়িং রুমে নেমে আসলেন। নাহিনকে দেখে,- আরে তুই কখন আসলি?আমি লক্ষ করলাম, একজন বাবা ছেলেকে যেমন আদরের সুরে বলেন, তেমনি করে নাহিনকে বললেন এবং তাদের পারিবারিক খোঁজ-খবর নিলেন। তাঁর আম্মার কথা জিজ্ঞেস করলেন। সেদিন আমি এবং নাহিন এক সাথেই তাঁর সামনে বসেছিলাম।  কী আশ্চর্য, সেদিনও তিনি আমার মেয়ের নতুন সংসার এবং জামাতার কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলেন নি।৫.মন্ত্রীর সামনে বসে দাপ্তরিক নানা বিষয়ে কথা বলার সময় প্রায়ই একটি বিষয় লক্ষ করতাম, তাঁর চেয়ার বরাবর পেছনের দেয়ালে ঝুলছে সাদা কাগজের ওপর কাঁচা হাতে আঁকা ফুল, পাখি, নীল আকাশ, নদী, বৃক্ষ ইত্যাদির নানান দৃশ্য। এগুলো তাঁর ছোট্ট নাতনির হাতের আঁকা। কাগজগুলি বাতাসে নড়ে গেলে তিনি নিজের হাতে সযত্নে দেয়ালে সেঁটে দিতেন। সেই ক্ষুদে অংকন শিল্পী তাঁর একমাত্র কন্যার মেয়ে। চেয়ার ঘুরিয়ে দেখতেন এবং নাতনির সঙ্গে হাসিমুখে আলাপ করতেন। মনে হয়, একজন সংবেদনশীল, কোমলপ্রাণ, শিশুবান্ধব মানুষ হিসেবেও তিনি অতুলনীয় ছিলেন। ৬.২০১৭ সালের শেষের দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হতে বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম হিসেবে বদলি হয়ে যাই। যাওয়ার আগে তিনি বললেন,-মান্নান তুমি তো চলে যাচ্ছ। তোমার স্থলাভিষিক্ত করে সেখানে কাকে দিব? আমি বললাম,- স্যার, এটা আপনার একান্ত পছন্দ।  অনেকেই তো আছেন। - আচ্ছা, দেখি, কী করা যায়।চট্টগ্রামে চলে আসার মাস-দুই পরে একদিন রাত ১০টার দিকে হঠাৎ তাঁর ফোন। আমি কমিশনার বাংলোর ভেতরের ওয়াকওয়ে ধরে হাঁটছিলাম। রাতে হাঁটাহাঁটির অভ্যাস আমার বহু বছরের। হাঁটার অভ্যাসটা বোধকরি জীবিত কর্মক্ষম মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তোফায়েল আহমেদ বললেন,- মান্নান 'আই মিস ইউ'। তোমার মেয়েটা কোথায়? ও কি এখন ভালো আছে?আমি বিস্মিত হয়ে যাই। কথা বলতে পারছিলাম না। সঙ্গে সঙ্গে চোখে জল আসার মতন অবস্থা হলো।-স্যার আপনি ভালো আছেন?-খুব ভালো নেই। তোমার কাজটা এখন আগের মতো ওরা করতে পারছে না। তুমি করে দিতে পারতে।- স্যার, ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো কিছু দিন সময় লাগবে।ফোন শেষ করে মনে মনে বলছিলাম, ‘আই মিস ইউ’ এমন একটা বাক্য সারা জীবনে আমাকে আর কেউ কোনোদিন বলেনি। এটাই প্রথম এবং শেষ। ৭.আরেক দিনের কথা। তখন ২০২০ সাল। আমি করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। শারীরিক অবস্থা ভালো নেই। কয়েক মাস আগেই আমার স্ত্রী করোনায় মৃত্যুবরণ করেন। হাসপাতালে থাকাবস্থায় আমাকে বদলি করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হলো। বিষয়টি খুব অমানবিক ছিল। তবু কর্তৃপক্ষের ইচ্ছায় তা হয়েছিল। আমার কোনো কিছু বলার ছিল না। দু’দিন পরে হঠাৎ তোফায়েল আহমেদের ফোন।-মান্নান তোমাকে ওরা বদলি করে দিয়েছে? যাক্ কষ্ট নিও না। ওরা তোমাকে চিনতে পারে নি। থাকো কিছু দিন। দেখা যাবে।পরে শুনেছিলাম, সংসদেও তিনি আমার বদলির বিষয়টি তুলেছিলেন।৮.পৃথিবীর প্রতিটি কিংবদন্তির বাহ্যিক আচরণ ও অবয়বের আড়ালে একান্ত নিভৃতে, হৃদয়ের গহীন ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক মানবীয় কোমলপ্রাণ সত্তা। যা সহজে চোখে পড়ে না। সচরাচর বাইরে অদৃশ্য হয়ে থাকে তাঁর ভেতরের ভিন্নতর এমন রূপ। আর এসব গুণই কালক্রমে তাঁকে সাধারণ থেকে বিশেষ করে তোলে। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন সমগ্র দেশ, জাতি ও গণমানুষের বিবেক তথা মুখপাত্র। তখন তাঁর পরিচয় হয়ে যায় তিনি একজন জাতীয় নেতা বা জাতীয় ব্যক্তিত্ব। রাজনীতিবিদ এর ব্যক্তিক চরিত্রের ভালো মন্দ ছাপিয়ে গিয়ে, একজন ধ্রুবতারা নেতা, প্রাণবন্ত মানুষ তোফায়েল আহমেদের আত্মার চিরশান্তির জন্যে প্রার্থনা করছি। লেখক: সাবেক সচিব ও গল্পকার

ভিডিও আরও দেখুন

‘মেসির মতোই সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ পেয়েছে ইয়ামাল’

অল্প বয়সেই তারকা হয়ে উঠেছেন ইয়ামাল। বার্সেলোনার মতো বড় দলের আক্রমণভাগ এগিয়ে নিচ্ছেন তিনি। সমান কার্যকর তিনি স্পেন দলেও। তাকে মেসির মতোই অন্য একজন সহজাত প্রতিভা মনে হয় দে লা ফুয়েন্তের। স্পেনের কোচের মতে, ইয়ামালের যে নৈপুণ্য, তা দেখা যায় কেবল ফুটবলের সত্যিকারের জিনিয়াসদের মধ্যে। বার্সেলোনার হয়ে অন্য একটি সফল মৌসুম কাটিয়েছেন ইয়ামাল। দলকে জিতিয়েছেন লা লিগা। নির্বাচিত হয়েছেন আসরের সেরা খেলোয়াড়। বিশ্বকাপের আগে ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানে দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন দে লা ফুয়েন্তে। সেখানে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বড় মঞ্চের চাপে এলেমোলো হয়ে যাবেন না ইয়ামাল, বরং আরও বেশি উজ্জীবিত থাকবেন তিনি। ‘ইয়ামালের জন্মই হয়েছে এটার জন্য। সে সাহসী এক চরিত্র। সম্ভবত চাপ আপনাকে বা আমাকে বিহ্বল করে ফেলতে পারে। তবে এই ছেলেরা স্পেশাল। কতবার আমরা একজন খেলোয়াড় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি: ‘সে কতটা ভালো। তার কী হয়েছে? সে কেনো এটা করতে পারলো না?’ কারণ, ফুটবলে ভালো হতে হবে এবং আরও হাজারটা বিষয়েও।’‘লামিনের বয়স কেবল ১৬ ছিল (ইউরোর সময়)। তার বয়স এখন ১৮। তাকে গণমাধ্যমের নির্মম চাপ সইতে হয় এবং সে খুব কমই ভুল করে। এক মিনিট, একটা ভুল এবং সেটাই চলে আসে আলোচনার কেন্দ্রে, এটা ন্যায্য নয়।’স্পেন কোচের বিশ্বাস, তরুণ উইঙ্গার একটি অভিজাত ক্যাটাগরির অংশ যারা বিশেষ প্রতিভায় আশীর্বাদপুষ্ট। মেসিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার বোঝা এই তরুণের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হোক, চান না স্পেন কোচ। সিনিয়র ফুটবলে ইয়ামাল পা রাখার পর থেকে আর্জেন্টিনা অধিনায়কের সঙ্গে তার তুলনা চলছে। যদিও ইয়ামাল নিজে এই ধরনের আলোচনা উড়িয়ে দিয়েছেন।তবে দে লা ফুয়েন্তে মনে করেন, মেসির মতো একই উপহার পেয়েছেন ইয়ামালও। স্পেন কোচের বিশ্বাস, এতো অল্প বয়সে, এমন উঁচু পর্যায়ে ম্যাচের ভাগ্য পরিবর্তনের সামর্থ্য কেবল অল্প কয়েকজন প্রতিভাবান ফুটবলারের আছে।‘ফুটবলাররা সবাই বড় কিছু করার সামর্থ্য রাখে, খুবই বুদ্ধিমান। তারা জিনিয়াস এবং এরপর আছে যারা সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ পেয়েছে, তবে এই সংখ্যাটা খুবই সীমিত। লামিনে, মেসি।’আপাতত মাঠের বাইরে আছেন ইয়ামাল। বিশ্বকাপের আগেই অবশ্য তার সেরে ওঠার আশায় আছে স্পেনের মানুষ। আগামী মঙ্গলবার পেরুর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলবে দলটি। আগামী ১৫ জুন কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা। ‘এইচ’ গ্রুপে তাদের অন্য প্রতিপক্ষ সৌদি আরব ও উরুগুয়ে।

‘মেসির মতোই সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ পেয়েছে ইয়ামাল’
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৮৪ জন