সংবাদ
ব্যাংকে মিডিয়ার ২৪১ কোটি টাকা, টিভির চেয়ে এগিয়ে অনলাইন

ব্যাংকে মিডিয়ার ২৪১ কোটি টাকা, টিভির চেয়ে এগিয়ে অনলাইন

দেশের বেসরকারি পত্রিকা, টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইন পোর্টাল- সব মিডিয়ার ব্যাংক হিসাব একত্র করলে দাঁড়ায় ২৪১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চিত্র।গণমাধ্যমের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই প্রকাশিত হলো এই তথ্য। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে মিডিয়া খাতের জন্য খোলা নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবগুলোতে এই অর্থ জমা রয়েছে। এর মধ্যে চলতি হিসাবে আছে ১৬৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, বাকি ৭২ কোটি ৭২ লাখ টাকা মেয়াদি ও বিশেষ নোটিশে উত্তোলনযোগ্য হিসাবে।খাতভিত্তিক হিসাব বলছে, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ব্যাংক হিসাবে রয়েছে ৯৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা। অনলাইন পোর্টালগুলো এগিয়ে আছে সামান্য ব্যবধানে- তাদের হিসাবে ৯৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। পত্রিকার জন্য নির্দিষ্ট হিসাবে আছে ৪২ কোটি ৮১ লাখ টাকা। আর রেডিও খাতের অবস্থা একেবারেই করুণ। সব রেডিও মিলিয়ে ব্যাংকে তাদের জমা মাত্র ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, মিডিয়া খাতের বেশিরভাগ টাকাই রাখা আছে চলতি হিসাবে- যেখানে সুদ নেই। ১৫৫ কোটি ৯ লাখ টাকা আছে সুদবিহীন চলতি হিসাবে, আর সুদসহ চলতি হিসাবে আছে ১৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।বাকি অর্থ বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে আছে- মেয়াদি আমানতে ৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, স্পেশাল নোটিশে উত্তোলনযোগ্য হিসাবে ৫৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং দেশীয় বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে ১০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।পত্রিকাগুলোর হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের বেশিরভাগ টাকা চলতি হিসাবে- সুদবিহীন ২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, সুদসহ ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। বিশেষ মেয়াদি হিসাবে আছে ১২ কোটি ৫ লাখ টাকা, আর বৈদেশিক মুদ্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ টাকা।টেলিভিশন খাতে সবচেয়ে বেশি টাকা রাখা আছে সুদবিহীন চলতি হিসাবে- ৪৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। সুদসহ চলতি হিসাবে ১০ কোটি ২ লাখ টাকা। বিশেষ মেয়াদি হিসাবে ৩৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা, দেশীয় বৈদেশিক মুদ্রায় ৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা এবং দীর্ঘ মেয়াদি হিসাবে ১০ কোটি টাকা।প্রতিবেদনটি মিডিয়া খাতের আর্থিক স্বচ্ছতা ও অর্থনৈতিক অবস্থার একটি আভাস দিচ্ছে। বিশেষ করে রেডিও খাতের দুর্বল অবস্থা এবং অনলাইন পোর্টালগুলোর ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা থাকা- দুটি বিষয়ই আলোচনার জন্ম দিয়েছে।অনলাইন পোর্টালগুলোর হিসাবে ৯৮ কোটি টাকা জমা থাকা ইঙ্গিত দেয়, ডিজিটাল গণমাধ্যম ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। অন্যদিকে, রেডিও খাতে এই স্বল্প অর্থ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৫ ঘন্টা আগে

অস্ট্রিয়ার বিদায়, শেষ ষোলোতে দে লা ফুয়েন্তের স্পেন

অস্ট্রিয়ার বিদায়, শেষ ষোলোতে দে লা ফুয়েন্তের স্পেন

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জয়ের সুবাস পাচ্ছে স্পেন

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জয়ের সুবাস পাচ্ছে স্পেন

ওয়ারজাবালের গোলে এগিয়ে স্পেন, অস্ট্রিয়াকে বাঁচাচ্ছেন গোলরক্ষক শ্লাগার

ওয়ারজাবালের গোলে এগিয়ে স্পেন, অস্ট্রিয়াকে বাঁচাচ্ছেন গোলরক্ষক শ্লাগার

স্পেনের একাদশে দুই বদল, প্রধান লক্ষ্য ‘ইয়ামালকে বোতলবন্দি’ হুঙ্কার অস্ট্রিয়ার

স্পেনের একাদশে দুই বদল, প্রধান লক্ষ্য ‘ইয়ামালকে বোতলবন্দি’ হুঙ্কার অস্ট্রিয়ার

ব্যাংকে মিডিয়ার ২৪১ কোটি টাকা, টিভির চেয়ে এগিয়ে অনলাইন

ব্যাংকে মিডিয়ার ২৪১ কোটি টাকা, টিভির চেয়ে এগিয়ে অনলাইন

পেলের পায়ের জাদুতে থেমে গিয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ!

পেলের পায়ের জাদুতে থেমে গিয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ!

পরীক্ষা পরিচালনায় সম্মানী বাড়ল, নতুন খাত সংযোজন

পরীক্ষা পরিচালনায় সম্মানী বাড়ল, নতুন খাত সংযোজন

বাহাদুরাবাদ-বালাশীঘাটে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দাবিতে বিশাল শোভাযাত্রা

বাহাদুরাবাদ-বালাশীঘাটে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দাবিতে বিশাল শোভাযাত্রা

টিকটকার স্ত্রীর ‘পরকীয়া’, স্বামীর আত্মহত্যায় নতুন মোড়

টিকটকার স্ত্রীর ‘পরকীয়া’, স্বামীর আত্মহত্যায় নতুন মোড়

কালকিনিতে সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষা না করে নিজের টাকায় রাস্তা সংস্কার

কালকিনিতে সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষা না করে নিজের টাকায় রাস্তা সংস্কার

বিশ্বকাপ সময়সূচি: দেখতে ক্লিক করুন

মতামতমতামত

বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন: নতুন ক্যাম্পাস নয়, প্রয়োজন উচ্চমানের শিক্ষক ও গবেষণা

সরকার বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। বলা হয়েছে, সেখানে নার্সিং, মেডিকেল সায়েন্স, উদ্ভাবন, সৃজনশীলতা এবং তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও ভবিষ্যতমুখী করে তোলার লক্ষ্যে এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং উচ্চাভিলাষী। বিশেষত শ্রমবাজারের দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্মকে উপযোগী দক্ষতায় গড়ে তোলার চিন্তা অবশ্যই সময়োপযোগী। তবে উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই: বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান সংকট কি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যার ঘাটতি, নাকি বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুণগত দুর্বলতা? বাস্তবতা হলো, গত কয়েক দশকে দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উচ্চশিক্ষার কাক্সিক্ষত অগ্রগতি খুবই সীমিত। ফলে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণে আবেগ, প্রতীকী উন্নয়ন বা রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পরিবর্তে জাতীয় প্রয়োজন, বৈশ্বিক পরিবর্তন, শ্রমবাজারের চাহিদা এবং জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষাপরিকল্পনার ভিত্তি হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় দর্শন, জাতীয় লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল; সাময়িক রাজনৈতিক বিবেচনা নয়। উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে সৃজনশীলতার বিকাশ, গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি প্রস্তুত করা। এ কারণেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেয়ে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কার্যকর, গবেষণামুখী এবং জ্ঞানসৃষ্টির কেন্দ্রে পরিণত করার প্রশ্নটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ, উদ্ভাবন, সামাজিক রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্র। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, শিক্ষক ও গবেষকদের পরিবর্তে কেবল অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন বাহ্যিক বৃদ্ধি ঘটলেও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। অতএব নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতেই হলে সবার আগে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে: বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় কি নতুন বিভাগ খোলা, দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে গড়ে ওঠে, নাকি তার প্রাণশক্তি নিহিত থাকে একাডেমিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশ, উচ্চমানের শিক্ষক এবং শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতির মধ্যে? বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের মর্যাদার ভিত্তি ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; বরং উৎকৃষ্ট শিক্ষক, মৌলিক গবেষণা, মেধার মূল্যায়ন এবং স্বাধীন জ্ঞানচর্চা। তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান। জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তাদের প্রকৃত শক্তি আকর্ষণীয় ব্র্যান্ডিং বা আধুনিক অবকাঠামোয় নয়; বরং প্রশাসনিক নেতৃত্ব, শিক্ষকসমাজ, গবেষক, গবেষণার পরিধি এবং শক্তিশালী একাডেমিক সংস্কৃতিতে নিহিত। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় তার উৎপাদিত জ্ঞান, গবেষণার প্রভাব, উদ্ভাবনের সক্ষমতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে অবদানের মাধ্যমে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিশ্বের বহু খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের যাত্রার শুরুতে আজকের মতো সমৃদ্ধ অবকাঠামোর অধিকারী ছিল না। কিন্তু তারা শুরু থেকেই মেধাবী শিক্ষক, গবেষণা এবং একাডেমিক স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিল। ফলস্বরূপ তারা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ কেবল উচ্চ ডিগ্রি বা পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না; বরং গবেষণার মৌলিকত্ব, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা, গবেষণা নেতৃত্ব, বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে বাস্তব অবদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। একই সঙ্গে একাডেমিক সততা, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণেই হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড কিংবা ক্যামব্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল শিক্ষাদানেই নয়, জ্ঞান উৎপাদন ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবতা বিবেচনা করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, আমরা কি এমন মানবসম্পদ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও কাঠামো নির্মাণ করতে পেরেছি? নিঃসন্দেহে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক মেধাবী, প্রতিশ্রুতিশীল এবং গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষক রয়েছেন, যাদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাও প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন সাফল্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এক বিষয় নয়। সামগ্রিকভাবে এখনও গবেষণাকেন্দ্রিক একাডেমিক সংস্কৃতি, পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণাভিত্তিক পদোন্নতি ব্যবস্থা এবং সুস্থ একাডেমিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ সীমিত পরিসরে বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টনে গবেষণাগত উৎকর্ষের চেয়ে অন্য বিবেচনা বেশি প্রভাব বিস্তার করে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান উৎপাদন ক্ষমতাকে দুর্বল করে। ফলে বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমপর্যায়ের শিক্ষকসমাজ ও গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলার কাজ কোনো স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রকল্প নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের বিষয়। নতুন ভবন নির্মাণ বা নতুন বিভাগ খোলার মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানের পেশাগত উন্নয়ন, পোস্টডক্টরাল গবেষণার সুযোগ, পর্যাপ্ত গবেষণা অনুদান, জবাবদিহিমূলক একাডেমিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত জ্ঞানচর্চার পরিবেশ। বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা প্রায়ই দৃশ্যমান অবকাঠামোর আলোকে মূল্যায়ন করার প্রবণতা দেখাই। নতুন ভবন, সুবিশাল ক্যাম্পাস, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা নতুন বিভাগ সাধারণ মানুষের কাছে উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে প্রতিভাত হয়। কারণ এগুলো চোখে দেখা যায় এবং রাজনৈতিক সাফল্যের প্রদর্শনী হিসেবেও উপস্থাপন করা সম্ভব। কিন্তু ইতিহাস ও শিক্ষাদর্শন উভয়ই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি এমন কিছু অদৃশ্য কিন্তু মৌলিক উপাদানের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠে। গবেষণার স্বাধীনতা, বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল, মুক্ত বিতর্কের পরিবেশ, জ্ঞান উৎপাদনের সংস্কৃতি এবং সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ- বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি। জার্মান চিন্তাবিদ ও শিক্ষাদার্শনিক ভিলহেলম ফন হুমবোল্ট (১৭৬৭-১৮৩৫) যে আধুনিক গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল গবেষণা ও শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। সেই ধারণা অনুসারে, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি একই সঙ্গে জ্ঞানস্রষ্টা, গবেষক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের বাহক। ফলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় তার শিক্ষকদের চিন্তার গভীরতা ও ব্যাপ্তি, গবেষণার বিষয়বস্তু ও মান এবং জ্ঞানসৃষ্টিতে তাদের একাগ্রতা ও অবদানের মাধ্যমে। ভবনের উচ্চতা নয়, জ্ঞানের উচ্চতাই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা নির্ধারণ করে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশের অনেক যোগ্য শিক্ষক, গবেষক এবং সম্ভাবনাময় তরুণ একাডেমিক বিভিন্ন কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানে পেশাগত ভবিষ্যৎ খুঁজছেন। এমন কি অনেকেই বিদেশী পাড়ি জমাচ্ছেন। এটি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; বরং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। উচ্চশিক্ষা রাজনীতিকীকরণ, গবেষণা তহবিলের অভাব, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতা, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, একাডেমিক স্বাধীনতার সংকট, দুর্বল প্রণোদনা এবং পদোন্নতিতে গবেষণার তুলনায় অন্য বিবেচনার প্রভাব অনেক মেধাবী ব্যক্তিকে বিকল্প পরিবেশের দিকে আকৃষ্ট করছে। ফলে দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়ই তাদের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মানবসম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে: বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কীভাবে অধিক গবেষণাবান্ধব, মেধাকেন্দ্রিক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যায়? কারণ নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেয়ে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অনেক ক্ষেত্রেই অধিক ফলপ্রসূ, সাশ্রয়ী এবং টেকসই বিনিয়োগ। আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের আলোচনা তাই নতুন ভবন নির্মাণ, নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন কিংবা নতুন বিষয় খোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে শিক্ষক নিয়োগের কঠোর ও মেধাভিত্তিক মানদণ্ড এবং সেগুলো অনুসরণের নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা, গবেষণার জন্য সহায়ক পরিবেশ, একাডেমিক স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং গবেষণাকেন্দ্রিক পদোন্নতি ব্যবস্থা। একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় শিক্ষক ও গবেষক উন্নয়ন কৌশল। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচি, গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা সম্প্রসারণ, পোস্টডক্টরাল প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি, গবেষণাগার ও গ্রন্থাগারের আধুনিকীকরণ এবং বিদেশে প্রশিক্ষিত গবেষক ও বিজ্ঞানীদের দেশে ফিরে কাজ করার জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশ্বের যেসব দেশ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে, তারা প্রথমেই তাদের মানবসম্পদে বিনিয়োগ করেছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুঁজি হলো ‘মানব পুঁজি’ (হিউম্যান ক্যাপিটাল); আর বিশ্ববিদ্যালয় সেই মানব পুঁজি গঠনের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় কোনো অবকাঠামোগত কিংবা রাজনৈতিক প্রকল্প নয়; এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তুতন্ত্র (ইকোসিস্টেম), যেখানে শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং জ্ঞানসৃষ্টির সংস্কৃতি পরস্পরকে শক্তিশালী করে। এমন পরিবেশ রাতারাতি গড়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার ও পরিকল্পনা, ধারাবাহিক বিনিয়োগ, নীতিগত স্থিতিশীলতা, যোগ্য নেতৃত্ব এবং জ্ঞান ও গবেষণার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অবশ্যই স্বাগতযোগ্য। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ভবন নির্মাণ বা বিভাগ খোলার চেয়ে বেশি জরুরি হলো বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাবান্ধব, মেধাকেন্দ্রিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত করা। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক নেতৃত্বে মেধা ও গবেষণাগত উৎকর্ষকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে; একই সঙ্গে গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং গবেষকদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি ইট-পাথর-বালি, কংক্রিট বা প্রশাসনিক আদেশে নির্মিত হয় না; তা নির্মিত হয় বিশ্বমানের শিক্ষক, গবেষক, মুক্ত জ্ঞানচর্চা এবং উৎকর্ষের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের ওপর। যে জাতি তার উচ্চশিক্ষায় মেধা, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়, ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতাও শেষ পর্যন্ত সেই জাতিই অর্জন করে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য] 

বোনের হক কেড়ে নেয়া ভাই: আইন, ধর্ম ও বাস্তবতার নির্মম বৈপরীত্য

বাংলাদেশে অসংখ্য নারী আজও বাবার সম্পত্তিতে নিজেদের বৈধ অংশ পান না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের উত্তরাধিকার অধিকার কাগজে-কলমে স্বীকৃত থাকলেও বাস্তবে তা ভাইদের দখলে থেকে যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীর ক্ষমতায়ন, সমঅধিকার ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে যতই আলোচনা হোক না কেন, পারিবারিক বাস্তবতায় এখনও বহু নারী তাদের অন্যতম মৌলিক অধিকার উত্তরাধিকার সম্পত্তির ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—  এই বঞ্চনাকে অনেক পরিবার অন্যায় বলেও মনে করে না। বরং ‘পারিবারিক সমঝোতা’, ‘সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে ত্যাগ’ কিংবা ‘ভাইয়ের দয়া’র মতো শব্দের আড়ালে একজন নারীর বৈধ অধিকার নীরবে হারিয়ে যায়। বাস্তবতা হচ্ছে, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি আইন, ধর্ম ও ন্যায়বিচার স্বীকৃত একটি নির্ধারিত প্রাপ্য। অথচ আমাদের সমাজে এই অধিকারকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না। দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুল ধারণা সমাজে প্রচলিত রয়েছে— মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে তারা ‘পরের ঘরের মানুষ’ হয়ে যায়। ফলে বাবার সম্পত্তিতে তাদের অধিকার যেন স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। অথচ বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী একজন কন্যা কিংবা বোন নির্দিষ্ট অংশের বৈধ উত্তরাধিকারী। একজন নারীর বিবাহ তার উত্তরাধিকার অধিকারকে কোনোভাবেই বাতিল করে না। ইসলাম নারীকে উত্তরাধিকার সম্পত্তির অধিকার দিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বের বহু সমাজেই নারীদের কোনো সম্পত্তিগত স্বীকৃতি ছিল না। পবিত্র কুরআনে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীর প্রাপ্য অধিকার খর্ব করার কোনো সুযোগ নেই। বরং কারও বৈধ অংশ আত্মসাৎ করা ধর্মীয় ও নৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুতর অন্যায়। বাংলাদেশে মুসলিমদের উত্তরাধিকার বণ্টন ইসলামী উত্তরাধিকার নীতিমালা ও প্রচলিত আইনের আলোকে নির্ধারিত হয়। কোনো উত্তরাধিকারীকে তার বৈধ অংশ থেকে বঞ্চিত করা হলে তিনি আদালতের মাধ্যমে অংশ নির্ধারণ, দখল পুনরুদ্ধার কিংবা অন্যান্য আইনগত প্রতিকার চাইতে পারেন। অর্থাৎ উত্তরাধিকার অধিকার কেবল নৈতিক বা ধর্মীয় বিষয় নয়; এটি একটি স্বীকৃত আইনগত অধিকারও। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটে?অসংখ্য পরিবারে দেখা যায়, বাবা মৃত্যুবরণ করার পর ভাইয়েরা জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন, নামজারি সম্পন্ন করেন, এমনকি সম্পত্তি বিক্রিও করে ফেলেন; অথচ বোনদের মতামত নেয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বোনদের বলা হয়— ‘তোমার তো স্বামীর বাড়ি আছে।’‘সম্পত্তি নিলে সম্পর্ক নষ্ট হবে।’‘ভাইদের বিরুদ্ধে যেও না।’‘মেয়েরা সম্পত্তি চাইলে পরিবারে অশান্তি হয়।’এভাবেই আবেগ, সামাজিক চাপ এবং পারিবারিক প্রভাব ব্যবহার করে একজন নারীকে তার বৈধ অধিকার থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই এমন বাস্তব ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে একজন নারী বহু বছর পর জানতে পারেন যে তিনি বাবার সম্পত্তির বৈধ অংশীদার ছিলেন। কিন্তু ততদিনে ভাইয়েরা সম্পত্তি নিজেদের নামে নামজারি করে ফেলেছেন, বিক্রি করে দিয়েছেন অথবা কৌশলে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে তাকে বঞ্চিত করেছেন। অনেক নারী পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে আইনি অধিকার দাবি করতেও সাহস পান না। ফলে নীরব বঞ্চনাই তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। উত্তরাধিকার বণ্টনের একটি সাধারণ উদাহরণ ধরা যাক, একজন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলেন। তিনি রেখে গেলেন স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ইসলামী উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী প্রথমে মৃত ব্যক্তির ঋণ ও বৈধ খরচ পরিশোধ করা হবে। এরপর স্ত্রী মোট সম্পত্তির ১/৮ অংশ পাবেন, কারণ মৃত ব্যক্তির সন্তান রয়েছে। অবশিষ্ট সম্পত্তি ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে বণ্টন হবে, যেখানে একজন ছেলে একজন মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পাবে। অর্থাৎ দুই ছেলে ও এক মেয়ের ক্ষেত্রে সম্পত্তি পাঁচ ভাগে ভাগ হবে প্রত্যেক ছেলে দুই ভাগ করে এবং মেয়ে এক ভাগ পাবে। আবার যদি কোনো ব্যক্তি শুধুমাত্র এক কন্যা সন্তান রেখে মৃত্যুবরণ করেন এবং কোনো ছেলে না থাকে, তাহলে সেই কন্যা মোট সম্পত্তির অর্ধেকের বৈধ উত্তরাধিকারী হবেন। একাধিক কন্যা থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অংশীদার হতে পারেন। অনেকেই প্রশ্ন করেন নারীরা কেন ছেলেদের তুলনায় কম অংশ পান?এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে। ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় পুরুষের উপর পরিবার পরিচালনা, স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ এবং অন্য আর্থিক দায়দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে একজন নারীর ব্যক্তিগত সম্পদের উপর স্বামী বা অন্য কারও কোনো অধিকার নেই। তিনি তার প্রাপ্ত সম্পত্তির পূর্ণ মালিক। উত্তরাধিকার বণ্টনের এই কাঠামো পারিবারিক আর্থিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নির্ধারিত বিধান। কিন্তু বাস্তব সমস্যা অন্য জায়গায়। আমাদের সমাজে বহু নারী তাদের নির্ধারিত অংশটুকুও পান না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রবণতা শুধু গ্রামাঞ্চল বা অশিক্ষিত সমাজে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারেও একই চিত্র দেখা যায়। অনেক শিক্ষিত ভাইও মনে করেন, বোন অংশ নিলে সম্পত্তি ‘অন্য পরিবারে চলে যাবে’। অথচ একজন ছেলে বিয়ে করলে তার সম্পত্তি নিয়ে কখনো এমন প্রশ্ন তোলা হয় না। এই দ্বৈত মানসিকতাই আমাদের সামাজিক বৈষম্যের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি। উত্তরাধিকার বঞ্চনার প্রভাব কেবল একটি সম্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাস্তবে বহু নারী স্বামীর মৃত্যু, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা আর্থিক সংকটের সময় চরম অসহায় অবস্থায় পড়েন। তখন তারা উপলব্ধি করেন— বাবার সম্পত্তিতে ন্যায্য অংশ পেলে হয়তো জীবন এত কঠিন হতো না। আমরা একদিকে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি, অন্যদিকে পরিবারের ভেতরেই তার অর্থনৈতিক অধিকার অস্বীকার করি। এটি নিঃসন্দেহে এক ধরনের সামাজিক ভণ্ডামি। কারণ প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন একজন নারী তার আইনগত ও অর্থনৈতিক অধিকার বাস্তবে ভোগ করতে পারবেন। বোনের প্রাপ্য অংশ আটকে রাখা শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়; এটি ন্যায়বিচার, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় নির্দেশনারও পরিপন্থী। একজন ভাই যখন বোনের অধিকার অস্বীকার করেন, তখন তিনি শুধু সম্পত্তি নয়, পারিবারিক আস্থা ও সম্পর্কের ভিত্তিও দুর্বল করে দেন। বর্তমান সময়ে প্রয়োজন কেবল আইনের প্রয়োগ নয়, সামাজিক মানসিকতারও ইতিবাচক পরিবর্তন। পরিবারগুলোকে বুঝতে হবে— বোনকে তার প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেয়া মানে সম্পদ হারানো নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। একজন ভাই যখন স্বেচ্ছায় বোনের অধিকার নিশ্চিত করেন, তখন সম্পর্ক আরও মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক হয়। অন্যদিকে অধিকার বঞ্চনা পারিবারিক বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এবং দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব সৃষ্টি করে। গণমাধ্যম, আইনজীবী, শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সচেতন নাগরিকদের এ বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারীদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজন হলে আইনি সহায়তা নিতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধান আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায়বিচারের যে আদর্শ ধারণ করে, উত্তরাধিকার ক্ষেত্রে নারীর বৈধ অধিকার নিশ্চিত করাও সেই আদর্শেরই অংশ। তাই একজন নারীকে তার ন্যায্য উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা শুধু পারিবারিক বা সামাজিক অন্যায় নয়; এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক চেতনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সবশেষে মনে রাখতে হবে, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার কোনো দয়া নয়; এটি তার বৈধ, ধর্মসম্মত ও আইনস্বীকৃত প্রাপ্য। একজন বোনকে তার ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা শুধু একটি ব্যক্তিগত অন্যায় নয়, বরং একটি সামাজিক অবিচার। যে সমাজে একজন বোনকে তার প্রাপ্য অধিকার পেতে ভাইয়ের দয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়, সেই সমাজকে প্রকৃত অর্থে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বলা যায় না। একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন পরিবারের মেয়েরাও সম্মানের সঙ্গে তাদের বৈধ ও ন্যায্য অধিকার ভোগ করতে পারবেন। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা]

সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা

সততা মানুষের চরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। এটি শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিষয় নয়; পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থারও ভিত্তি। সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, বিশ্বস্ততা, দায়িত্ববোধ ও স্বচ্ছ আচরণ— এসবের সমন্বয়েই সততার প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায়। যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সততার চর্চা করে, তারা মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে; আর যেখানে সততার ঘাটতি দেখা দেয়, সেখানে ধীরে ধীরে আস্থা, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। কাথায় আছে, সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। এই কথার তাৎপর্য কেবল নৈতিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়; ব্যক্তি ও সমাজজীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও এর সত্যতা প্রমাণ করে। অসততা হয়তো সাময়িক সুবিধা এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। সন্ত গুরু রবিদাস তার বাণীতে বাহ্যিক ধর্মীয় আড়ম্বরের চেয়ে অন্তরের পবিত্রতাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্যের সারমর্ম হলো— কপালে তিলক, হাতে জপমালা বা বিশেষ পোশাক ধারণ করলেই কেউ সত্যিকার অর্থে ধার্মিক বা সৎ হয়ে ওঠেন না। প্রকৃত সাধুতা মানুষের চরিত্র, আচরণ ও মানবিকতায় প্রকাশ পায়। একই শিক্ষা আমরা সন্ত কবীর দাসসহ বহু সাধক ও মনীষীর বাণীতেও দেখতে পাই। তাদের মূল আহ্বান ছিল— মানুষ যেন ভণ্ডামি নয়, সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথ অনুসরণ করে। বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সময়ে সময়েই ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এমন ঘটনাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কোনো প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা কেবল তার ঐতিহ্য বা পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিক মানদণ্ডের ওপর। যেখানে দানের অর্থ, জনসম্পদ বা মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, সেখানে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা কয়েকজন দায়িত্বশীল মানুষের অপরাধ বা অনিয়মের দায় পুরো ধর্ম, সম্প্রদায় কিংবা প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপ করা ন্যায়সংগত নয়। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই বিচার্য। আইন ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে প্রত্যেক অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং দোষী প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষের সম্মানও অক্ষত্নু রাখতে হবে। সততার অভাব কেবল আর্থিক দুর্নীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। মিথ্যা, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল মানুষের অধিকার হরণ কিংবা ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার— এসবও অসততারই বিভিন্ন রূপ। ব্যক্তি যখন নিজের স্বার্থকে নৈতিকতার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়, তখন সমাজে অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সন্ত কবীর দাস বলেছেন—  ‘রাম নামকে লুট হে তো লুট, / অন্ত কাল মে পস্তায়েগা, যব প্রাণ যায়েগা ছুট। ’এই বাণীর মূল শিক্ষা হলো, ধর্ম বা নৈতিকতার নামে প্রতারণা করে সাময়িক লাভবান হওয়া সম্ভব হলেও শেষ পর্যন্ত তার পরিণতি অনুশোচনা ছাড়া আর কিছু নয়। সত্য ও সততার বিকল্প নেই। আজকের বিশ্বে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন যতই হোক, নৈতিকতার ভিত্তি দুর্বল হলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একটি দেশের অগ্রগতি নির্ভর করে শুধু সম্পদের ওপর নয়; বরং নাগরিকের সততা, প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা এবং আইনের সুশাসনের ওপরও। তাই পরিবারে শিশুদের নৈতিক শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধের চর্চা এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলা সময়ের দাবি। সততা এমন একটি মূল্যবোধ, যা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা দেশের সম্পদ নয়; এটি মানবজাতির সার্বজনীন নৈতিক আদর্শ। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—  সবার কল্যাণের জন্যই সততার চর্চা অপরিহার্য। বাহ্যিক পরিচয় নয়, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার চরিত্র, কর্ম ও নৈতিকতার মাধ্যমে। এ কারণেই যুগে যুগে জ্ঞানীজন এক বাক্যে বলেছেন—  সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। [লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ

বিশ্বের নবম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট জিডিপির আকার ৪৫০ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বাংলাদেশ অর্থনীতির ক্ষেত্রে পুরোপুরি স্বনির্ভর হতে পারেনি। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বাজেট ঘাটতি পূরণে দেশকে এখনও বৈদেশিক সহায়তাদাতা সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়, যা কোনোভাবেই একটি শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য সম্মানজনক নয়। সরকারের বাজেট ঘাটতি প্রায় উন্নয়ন বাজেটের সমান। অর্থের অভাবে অনেক সময় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। আবার কোনো অর্থবছরেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জিত হয় না। যেমন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কর-জিডিপি অনুপাতের দিক থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের দেশি-বিদেশি মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ১৭১ কোটি টাকা। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সরকারের ঋণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, ট্রেজারি বন্ড, সঞ্চয়পত্র, প্রাইজ বন্ডসহ বিভিন্ন আর্থিক উৎস। কিন্তু প্রতিবছরই সরকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। কর ফাঁকির পরিমাণ বাড়ছে, করের আওতা প্রত্যাশিত হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে না এবং পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে এক হাজার কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে। এই অর্থে ‘অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ’ নামে একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক ঋত থেকে ১ হাজার কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ইতোমধ্যে এ ঋণ সহায়তার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির পথে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের আওতায় প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে। চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ২৫ কোটি মার্কিন ডলারের একটি ঋণ অনুমোদন করেছে। এই ঋণের আওতায় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কারের পাশাপাশি আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে প্রকল্পটির ঋণচুক্তি কবে সম্পন্ন হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে ইআরডি। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ দেশের উন্নয়ন চাহিদার তুলনায় এখনও অপর্যাপ্ত। ২০১২ অর্থবছরে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ছিল ৯ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে। একই সময়ে কর-জিডিপি অনুপাত ৭-৮ শতাংশের মধ্যে স্থবির ছিল এবং সর্বশেষ তা নেমে এসেছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে। এটি বিশ্বের সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি এবং দক্ষিণ এশিয়ার সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কম। সরকার রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে। প্রথমত, বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। দ্বিতীয়ত, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থা কার্যকর হলেও এতে অসংখ্য করছাড় ও বিভিন্ন হারের কারণে কাক্সিক্ষত রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না। তৃতীয়ত, আয়করের ক্ষেত্রে ব্যাপক করছাড়, কর অবকাশ এবং বিভিন্ন ধরনের কর-সুবিধা রাজস্ব আহরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যদিও এসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরেই চিহ্নিত, তবু রাজনৈতিক অর্থনীতি, নীতিগত দ্বিধা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে ঐকমত্যের অভাবে রাজস্ব ব্যবস্থা প্রত্যাশিত মাত্রায় উন্নত করা সম্ভব হয়নি। এ বাস্তবতায় রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক প্রকল্পটিতে অর্থায়নে সম্মত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক কার্যপ্রক্রিয়া (বিজনেস প্রসেস) পুনর্গঠন ও বাস্তবায়ন, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা, নীতি বিশ্লেষণ সক্ষমতা উন্নয়ন, গবেষণা ও পরিসংখ্যান ইউনিট শক্তিশালীকরণ এবং অভ্যন্তরীণ ও বহিঃযোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হবে। পাশাপাশি রাজস্ব প্রশাসনের সেবাব্যবস্থা ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া আয়কর প্রশাসনকে আরও কার্যকর করতে কর ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপ সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করা, বিদ্যমান ও নতুন ডিজিটাল সিস্টেমের মধ্যে কার্যকর আন্তঃসংযোগ স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় নতুন প্রযুক্তি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এনবিআর সংস্কারের অংশ হিসেবে আয়কর ও মূল্য সংযোজন করÑউভয় ক্ষেত্রেই একটি সমন্বিত ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। করদাতাদের জন্য স্বয়ংক্রিয় কল সেন্টার প্রতিষ্ঠা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আধুনিক ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম চালু, কর প্রশাসনের জনবলের দক্ষতা উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং একটি পূর্ণাঙ্গ আয়কর প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নও প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ভ্যাট কার্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। [লেখক: সাবেক ডিন (ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ) ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি]

ইন্দো-প্যাসিফিকে নতুন শক্তির সমীকরণ

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন স্পষ্ট—অর্থনীতি আর শুধু উন্নয়নের হাতিয়ার নয়, এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ভারত ও জাপান তাদের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাইছে। মোদি–তাকাইচি বৈঠক সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।আগের ভারত-জাপান বৈঠকগুলিতে যেখানে মূলত অবকাঠামো, বুলেট ট্রেন বা বিনিয়োগের মতো বিষয় প্রাধান্য পেত, সেখানে এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সম্পূর্ণ আলাদা। সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্রিটিক্যাল মিনারেলস, ডিজিটাল অবকাঠামো, এই সমস্ত বিষয় এখন কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত শক্তির নির্ধারক।বিশ্ব পরিস্থিতিও এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন বাণিজ্য নীতির অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ভারত ও জাপানকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান দুই দেশকেই বুঝিয়ে দিয়েছে নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন জরুরি।এই প্রেক্ষাপটে “ইকোনমিক সিকিউরিটি ” বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা একটি প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। ভারত এখনও অনেক ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর, বিশেষ করে প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ উপকরণে। অন্যদিকে জাপানের রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ ক্ষমতা। এই দুইয়ের সমন্বয় ভারতকে একটি শক্তিশালী উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, যা ভবিষ্যতে চীনের বিকল্প হিসেবেও উঠে আসতে পারে।জ্বালানি নিরাপত্তাও এই বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। স্ট্রেইট অফ হড়মুজকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা দেখিয়ে দিয়েছে, ভারত ও জাপান কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফলে LNG সহযোগিতা, বিকল্প জ্বালানি উৎস এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সমন্বয় এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলতে পারে এই বৈঠক। দুই দেশের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং সামরিক সমন্বয়ের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কোয়াদৃলেটরেল সিকিউরিটি ডায়ালগ বা QUAD–এর ভূমিকা, যা ইন্দো-প্যাসিফিকে একটি শক্তিশালী কৌশলগত জোট হিসেবে গড়ে উঠছে।তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভারত ও জাপান কেউই সরাসরি চীনের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চায় না। বরং তারা “সিলেক্টিভ ডাইভার্সফিকেশন ” নীতি অনুসরণ করছে, অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করে ঝুঁকি কমানো, কিন্তু একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা।সব মিলিয়ে মোদি–তাকাইচি বৈঠক একটি নতুন যুগের সূচনা নির্দেশ করছে—যেখানে যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে নয়, বরং প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং সাপ্লাই চেইনের মাধ্যমে লড়া হবে। এই বৈঠক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সুশাসনের চাবিকাঠি: নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়, চাই নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ

আজকের পরিবর্তনশীল বিশ্বে ‘সুশাসন’ বা ‘গভর্ন্যান্স’ শব্দবন্ধটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যখনই কোনো রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা নিয়ে কথা ওঠে, তখনই অবধারিতভাবে সুশাসনের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আমরা সাধারণত সুশাসনকে পরিমাপ করি স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব, দক্ষ আমলাতন্ত্র, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং আইনের কঠোর শাসনের পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু এই পুরো সমীকরণ বা কাঠামোর ভেতরের সবচেয়ে প্রাণবন্ত এবং অপরিহার্য উপাদানটি প্রায়শই আমাদের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় উপেক্ষিত থেকে যায়; আর তা হলো সাধারণ নাগরিকের সক্রিয় সম্পৃক্ততা। রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিকরা যদি কেবল পাঁচ বছর পর পর ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আঙুলে কালির দাগ লাগিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করেন এবং বাকি সময়টা নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকেন, তবে পৃথিবীর কোনো সরকারের পক্ষেই একা সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গণতন্ত্র বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তখনই সবচেয়ে কার্যকর হয়, যখন সাধারণ মানুষ জনজীবনে অংশ নেয়, প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ওপর কড়া নজর রাখে এবং নীতি নির্ধারণে নিজের কণ্ঠস্বরকে যুক্ত করে। নাগরিক সম্পৃক্ততা মূলত শাসনব্যবস্থাকে একটি ওপর-থেকে-নিচ প্রশাসনিক আদেশের বৃত্ত থেকে বের করে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার একটি দ্বিমুখী সহযোগিতামূলক সামাজিক চুক্তিতে রূপান্তরিত করে। নাগরিক সম্পৃক্ততার এই ধারণাটি কোনো আধুনিক বিলাসিতা নয়, এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত গভীর তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ফরাসি রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অ্যালেক্সিস ডি টকভিল তার যুগান্তকারী ‘ডেমোক্রেসি ইন আমেরিকা’ গ্রন্থে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে আমেরিকার তৎকালীন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তির মূল উৎস ছিল সেখানকার মানুষের ছোট ছোট স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও নাগরিক সমিতি। নাগরিকরা যখন নিজেদের উদ্যোগে সংগঠিত হয়ে স্থানীয় সাধারণ সমস্যার সমাধান করতে শেখে, তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও যৌথ দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। টকভিলের মতে, এই সুশীল সমাজই মূলত ব্যক্তি এবং বিশাল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সংযোগকারী সেতু হিসেবে কাজ করে, যা স্বৈরতন্ত্রের উত্থানকে রোধ করে। আধুনিক সময়ে এই তত্ত্বকে আরও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট ডি. পুটনাম। তার বিখ্যাত ‘বোলিং অ্যালোন’ এবং ‘মেকিং ডেমোক্রেসি ওয়ার্ক’ গ্রন্থে তিনি ‘সামাজিক পুঁজি’ বা সোশ্যাল ক্যাপিটালের ধারণাটি প্রবর্তন করেন। পুটনামের কাজ দেখায় যে সমাজে পারস্পরিক আস্থা, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং নাগরিক অংশগ্রহণ যত বেশি, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তত বেশি কার্যকর এবং দুর্নীতি তত কম হয়, কারণ সচেতন নাগরিকরা সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করেন এবং ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। একইভাবে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ এলিনর অস্ট্রম তার ‘গভর্নিং দ্য কমন্স’ গ্রন্থে রাষ্ট্র বা বাজারের বাইরে গিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সাধারণ মানুষ যখন কোনো জনসেবা বা সরকারি সম্পদের নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা না হয়ে এর সহ-উৎপাদক হিসেবে ভূমিকা রাখে, তখন সেই ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যায়। সমসাময়িক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাই সহযোগিতামূলক শাসনের কোনো বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, জটিল নগর পরিকল্পনা কিংবা বৈশ্বিক মহামারির মতো সংকটগুলো কোনো সরকারের পক্ষে একা আমলাতান্ত্রিক ফাইল চালাচালি করে সমাধান করা সম্ভব নয়। ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নরওয়ের মতো নর্ডিক দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা এর বাস্তব প্রমাণ পাই। এই দেশগুলো বিশ্ব শাসন সূচকে এবং জনগণের আস্থার দিক থেকে প্রতিনিয়ত শীর্ষে অবস্থান করে। এর মূল রহস্য কেবল তাদের শক্তিশালী অর্থনীতি বা দক্ষ আমলাতন্ত্র নয়, বরং নীতিনির্ধারণের প্রতিটি স্তরে সাধারণ মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল প্রযুক্তি নাগরিক সম্পৃক্ততার সুযোগকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ই-গভর্নেন্স প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন গণপরামর্শ, অংশগ্রহণমূলক বাজেট, ডিজিটাল পিটিশন এবং উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহের কারণে আজ ঘরে বসেই সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো জনমত গঠনের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে এই প্রযুক্তির একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। ভুল তথ্যের অবাধ প্রবাহ, তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ডিজিটাল বিভাজন-অর্থাৎ প্রযুক্তির সুবিধার অসম বণ্টন নাগরিক অংশগ্রহণের গুণগত মানকে অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই প্রযুক্তিকে সুশাসনের হাতিয়ার করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত করা জরুরি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে নাগরিক সম্পৃক্ততার গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেশি। এসব দেশে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আইনের শাসনের ঘাটতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষের পক্ষে সরকারি সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সামাজিক জবাবদিহিতার উদ্যোগগুলো দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও ওইসিডির বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার যেসব দেশে সাধারণ নাগরিকদের সামাজিক নিরীক্ষা, কমিউনিটি স্কোরকার্ড এবং অংশগ্রহণমূলক বাজেট প্রণয়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, সেখানে সরকারি ব্যয়ে অপচয় ও দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এটি স্থানীয় পর্যায়ে একচেটিয়া ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা রুখে দিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল সুশাসনের ক্ষেত্রে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে কিছু প্রশংসনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে। আইনগতভাবেই ইউনিয়ন পরিষদের উন্মুক্ত বাজেট সভা, ওয়ার্ড সভা এবং অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার বিধান রাখা হয়েছে। গ্রামীণ পর্যায়ে স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি এবং কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনা দলগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া দেশের সুশীল সমাজ, যুব সংগঠন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠী সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্যোগ মোকাবিলা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশ আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো থাকা সত্ত্বেও বাস্তব ক্ষেত্রে নাগরিক সম্পৃক্ততার গভীরতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। আমাদের দেশের শাসনব্যবস্থায় এখনও কিছু কাঠামোগত অন্তরায় বা চ্যালেঞ্জ প্রকটভাবে দৃশ্যমান। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি গণপরামর্শ বা বাজেট সভাগুলো কেবল কাগজে-কলমে বা আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার জন্য করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিমালার মূল জায়গায় পরিবর্তন আনার নজির বেশ কম, যাকে বলা চলে প্রতীকী অংশগ্রহণ। এর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত তীব্র রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ভিন্নমতাবলম্বী বা সাধারণ নাগরিকদের একটি বড় অংশ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখে। তথ্য অধিকার আইন থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পৌঁছায় না এবং তথ্যের এই অসামঞ্জস্যতা নাগরিক তদারকিকে দুর্বল করে দেয়। সবচেয়ে বড় কথা, নারী, যুবসমাজ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর অনেক সময়ই এসব আনুষ্ঠানিক সভায় উপেক্ষিত থেকে যায়। এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে যদি আমরা সত্যিকার অর্থেই একটি সুশাসিত রাষ্ট্র গঠন করতে চাই, তবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমত, সরকারকে নাগরিক সমালোচনা বা ভিন্নমতকে হুমকি হিসেবে না দেখে নীতি সংশোধনের একটি অত্যন্ত মূল্যবান এবং নিখরচায় পাওয়া উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রশাসন যখন নাগরিকদের উদ্বেগের প্রতি স্বচ্ছভাবে ও দ্রুত সাড়া দেবে, তখনই রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নাগরিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একজন নাগরিক যদি তার সাংবিধানিক অধিকার, রাষ্ট্রের প্রতি তার কর্তব্য এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে না জানেন, তবে তার পক্ষে গঠনমূলক অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রম থেকেই এই সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং অনুসন্ধিৎসু গণমাধ্যমই পারে প্রশাসনের ভেতরের ত্রুটিগুলো সামনে এনে নাগরিক সমাজকে সচেতন করতে এবং জনবিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করতে। নাগরিক অংশগ্রহণের সুফল কেবল রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজের গভীরের সংহতিকে শক্তিশালী করে। যেসব দেশে নাগরিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী, তারা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক ধাক্কা কিংবা জাতীয় সংকটে অনেক বেশি সহনশীলতা প্রদর্শন করে, কারণ সেখানে মানুষ সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে পারস্পরিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। একবিংশ শতাব্দীর এই জটিল সময়ে দাঁড়িয়ে কোনো দেশের সুশাসনের মানদণ্ড কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে মাপা যাবে না। শাসনব্যবস্থা তখনই সফল হবে যখন রাষ্ট্র জনগণের কথা শুনবে, প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকের প্রয়োজনে সাড়া দেবে এবং নাগরিকরা অধিকার আদায়ের পাশাপাশি দায়িত্বশীলভাবে রাষ্ট্রের চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। নিষ্ক্রিয় প্রজা নয়, বরং সচেতন ও সংগঠিত নাগরিক সমাজই হলো একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং স্থায়ী গণতান্ত্রিক সুশাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর। [লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।]

সাঁওতাল বিদ্রোহে নারীর বীরত্ব

আজ সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৭১তম বার্ষিকী। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের আদিবাসী সাঁওতালরা গভীর শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে সাঁওতাল বিদ্রোহের শহীদদের স্মরণে র‍্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। ইতিহাসের নানা দিক উন্মোচিত হলেও পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণ ও বীরত্বপূর্ণ অবদান বারবারই আড়ালে থেকে গেছে। শুধু সাঁওতাল বিদ্রোহ নয়, উপমহাদেশের প্রায় সব আদিবাসী বিদ্রোহেই নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। পুরুষদের সাহস ও মনোবল জোগাতে যেমন নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি প্রতিরোধযুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। ফুলো মুরমু ও ঝানো মুরমুর নেতৃত্ব সেই ইতিহাসেরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভারতের ঝাড়খণ্ডের ভগনাডিহি, দুমকাসহ বিভিন্ন স্থানে ফুলো ও ঝানো মুরমুর আবক্ষ ভাস্কর্য আজও সেই বীরত্বগাথার সাক্ষ্য বহন করছে। ইতিহাসে আদিবাসী সাঁওতাল নারীদের অবদান দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকলেও এসব স্মারক সেই সত্যকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে সমগ্র ভারতবর্ষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই দুর্ভিক্ষের অভিঘাতে বহু সাঁওতাল নিজ নিজ গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। একই সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও বিভিন্ন শ্রমনির্ভর কাজে আদিবাসীদের নিয়োজিত করতে শুরু করে। ফলে ধীরে ধীরে সাঁওতালরা ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ এবং বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। বর্তমানে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম আদিবাসী জনগোষ্ঠী হলো সাঁওতাল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৮৩২ সালে সাঁওতালদের ‘দামিন-ই-কোহ’ অঞ্চলে বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। ফারসি ভাষায় ‘দামিন-ই-কোহ’ অর্থ পাহাড়ের প্রান্তদেশ। সাহেবগঞ্জ, গোড্ডা, দুমকা, দেওঘর, পাকুড় এবং জামতাড়ার কিছু অংশ নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত হয়। পাশাপাশি বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, ভাগলপুর, বরাভূম, মানভূম, পালামৌ ও ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত সাঁওতালদেরও সেখানে বসবাসের সুযোগ দেয়া হয়।  ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের দেশীয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব, ফুলো ও ঝানো মুরমুর নেতৃত্বে সাঁওতাল সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ব্রিটিশ শাসকদের দেশীয় সহযোগীদের মধ্যে ছিল জমিদার, জোতদার, মহাজন, দারোগা এবং উচ্চবর্ণের প্রভাবশালী শ্রেণী। সাঁওতালরা নিজেদের শ্রমে পাহাড়ি বনভূমি পরিষ্কার করে আবাদযোগ্য জমি তৈরি করলেও পরে নানা কৌশলে সেই জমি তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত খাজনা আদায়, ঋণের ফাঁদ, ব্যক্তিগত নির্যাতন এবং নানা ধরনের ধারাবাহিক শোষণ তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন প্রায় ৪০০টি গ্রামের সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা করেন। এই বিদ্রোহে ফুলো ও ঝানো মুরমুর নেতৃত্বে প্রায় এক হাজার নারী যোদ্ধার একটি বাহিনী গড়ে ওঠে। সিধু মুরমুর স্ত্রী সুমি মুরমুও সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সিধু ও কানুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সাঁওতাল নারীরা গ্রামে গ্রামে সংগঠিত হন। বিদ্রোহের চেতনা তাদেরও সমানভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল। নারীরা শুধু পুরুষ যোদ্ধাদের সহায়ক হিসেবেই কাজ করেননি; অনেক ক্ষেত্রেই তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। বিদ্রোহীদের জন্য খাদ্য সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং রাতের অন্ধকারে ব্রিটিশ শিবিরে আকস্মিক হামলা চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি-এসব ক্ষেত্রেই তাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। যুদ্ধের খবর ও নির্দেশনা ছড়িয়ে দিতে নারীরা এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে শালগাছের পাতা ও ডাল পাঠাতেন। সাঁওতালি ভাষায় এই সংকেতকে ‘গিরা’ বলা হতো। এর মাধ্যমে বিদ্রোহের ডাক এবং যুদ্ধের সময়সূচি গোপনে পৌঁছে দেয়া হতো। আবার অনেক নারী বাজারে জ্বালানি কাঠ বা ফল বিক্রেতার ছদ্মবেশে ঝুড়ির নিচে তীর-ধনুক, পাথরসহ বিভিন্ন যুদ্ধসামগ্রী লুকিয়ে যোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। গুলতিতে ব্যবহারের জন্য পাথরও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রসামগ্রী। সাঁওতাল পরগনা ও বীরভূমের স্পেশাল কোর্টের নথিতে আরও কয়েকজন নারীর নাম ও তাদের ভূমিকার উল্লেখ পাওয়া যায়। অভিযোগ ছিল, তারা ব্রিটিশদের নির্মিত রেললাইন ধ্বংস, যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা, যুদ্ধের জন্য তীর তৈরি এবং লুণ্ঠিত সামগ্রী বহনে অংশ নিয়েছিলেন। এসব অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তারও করা হয়। ক্ষুব্ধ সাঁওতাল নারীরা দলবদ্ধভাবে রেললাইন উপড়ে ফেলা, কোম্পানির গুদাম থেকে খাদ্যশস্য উদ্ধার এবং পুরুষ যোদ্ধাদের কাছে গোপন তথ্য পৌঁছে দেয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নির্ভীকভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। অভিযুক্তদের মধ্যে সিংগি, বারকি, সোনা ও মণির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তৎকালীন ব্রিটিশ আদালতের বন্দি তালিকায় রাধা ও হীরা নামের দুই বীর নারীর নাম স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত রয়েছে। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় বন্দি হন। বন্দি হওয়ার পরও তারা ব্রিটিশ শাসকদের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি বা নতি স্বীকার করেননি। ভগনাডিহি অঞ্চলে আজও লোকমুখে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, ফুলো ও ঝানো মাত্র ২১ জন সাঁওতাল নারীকে সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতে ছদ্মবেশে ব্রিটিশ শিবিরে প্রবেশ করেন এবং তিনজন উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ সেনাকে হত্যা করেন। ঘটনাটি লিখিত ইতিহাসে সর্বত্র সমভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলেও সাঁওতাল লোকস্মৃতিতে এটি তাদের অসাধারণ সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে বেঁচে আছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সমগ্র সাঁওতাল সমাজে নতুন উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। রাধা, হীরা, সিংগি, বারকি ও সোনাসহ অনেক নারীকে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের পর বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে কয়েকজন নারী পরবর্তীকালে মুক্তিও পান। ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, সিধু ও কানু গ্রেপ্তার হওয়ার পর আন্দোলনে নেতৃত্বের সংকট দেখা দেয়। সেই সময় গ্রামের মাঝিদের (মোড়ল) স্ত্রীরা, অর্থাৎ মাঝিয়ানরা, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে গ্রামের প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এটি প্রমাণ করে যে, সাঁওতাল বিদ্রোহে নারীরা কেবল সহযোদ্ধাই ছিলেন না; প্রয়োজনে নেতৃত্বও দিয়েছেন। ফুলো ও ঝানো মুরমুর সাংগঠনিক দক্ষতায় প্রায় এক হাজার নারী যোদ্ধার একটি সুসংগঠিত বাহিনী গড়ে ওঠে। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এটি নারীদের সংগঠিত প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। সাঁওতাল সমাজে ডাইনি-সংক্রান্ত বিশ্বাস আজও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। বিদ্রোহের শেষ পর্যায়ে যখন সাঁওতাল যোদ্ধারা ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন এবং গ্রামে গ্রামে মহামারির প্রকোপ দেখা দিয়েছিল, তখন সেই বিপর্যয়ের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের দায়ী করা হয়। তাদের ‘ডাইনি’ আখ্যা দিয়ে নানা ধরনের নিপীড়ন ও কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হয়। ফলে বহিরাগত শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের পাশাপাশি সমাজের অভ্যন্তরীণ কুসংস্কারও নারীদের জন্য আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আজ, সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৭১তম বার্ষিকীতে ফুলো মুরমু, ঝানো মুরমু, সুমি মুরমু, রাধা, হীরা, সিংগি, বারকি, সোনা, মণিসহ অসংখ্য পরিচিত ও অপরিচিত নারী সংগ্রামীর অবদান নতুন করে স্মরণ করা জরুরি। তাদের ইতিহাস কেবল সাঁওতাল সমাজের নয়, সমগ্র উপমহাদেশের প্রতিরোধ সংগ্রামের এক অমূল্য সম্পদ। ইতিহাসের মূলধারায় তাদের যথাযথ স্থান নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাদের বীরত্বগাথা তুলে ধরাই হবে সাঁওতাল বিদ্রোহের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। [লেখক: কলামিস্ট]

নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বাস্তবতা ও বাধা

সম্প্রতি ঘোষিত জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেয়ার ইতিহাস বাংলাদেশের এই প্রথম। গত অর্থবছরের (২০২৫-২৬) সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে থাকে, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা উচিত। তবে এই প্রথমবার ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে এবার স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অতীতে এমনও দেখা যায়নি। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। সর্বশেষ সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী দেশের সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে প্রায় ১, ১৫,০০০-১, ২৫,০০০ নিবন্ধিত চিকিৎসক রয়েছেন। নার্স ও মিডওয়াইফের সংখ্যা প্রায় ১, ১০,০০০-১, ২০,০০০ জন। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট,রেডিওগ্রাফার, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার কল্যাণ সহকারী এবং অন্যান্য প্যারামেডিকসহ কয়েক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩,০০০-এর বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক, ৪৯০-এর বেশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৬৪টি জেলা হাসপাতাল এবং জাতীয় ও বিশেষায়িত হাসপাতালসহ বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে এসব জনবল স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। দেশের স্বাস্থ্যখাতে জনবল কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো জনবলের ঘাটতি ও অসম বণ্টন। শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীর ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি হলেও গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় চিকিৎসক, নার্স ও বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট এখনও উল্লেখযোগ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এ পরিস্থিতিতে দেশের স্বাস্থ্য ব্যাবস্থার উন্নয়নে প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বাজেটে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী হবে- এমন ঘোষণা সত্যিই চমকপ্রদ। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নের বাস্তবিক উদ্যোগ। তবে এর বাস্তবতা ও সম্ভাবনার সঙ্গে এবং বহুবিধ চ্যালেঞ্জ সম্পর্কিত। বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কর্মী, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী, মিডওয়াইফ, পুষ্টিকর্মী এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের বড় অংশই নারী। নতুন নিয়োগের অধিকাংশ যদি এসব পদে হয়, তাহলে ৮০ শতাংশ নারী নিয়োগ অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশে নার্সদের মধ্যে নারী ও পুরুষের অনুপাত প্রায় ৯০:১০। অর্থাৎ, নার্সিং পেশায় শতকরা ৯০ ভাগের বেশি নারী এবং পুরুষ নার্স রয়েছেন প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ। উপরন্তু দেশের নিবন্ধিত নার্সদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক নারী। নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগে যদি নার্স ও মিডওয়াইফদের বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে নারী অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য খাতে নারীরা বৈশ্বিক কর্মীবাহিনীর প্রায় ৬৭% এবং চিকিৎসা শিক্ষা গ্র্যাজুয়েটদের ৫৯% হলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বা শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ মাত্র ২৫%। নার্সিং এবং মিডওয়াইফারি খাতে নারী স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাধিক্য থাকলেও, লিঙ্গবৈষম্য, বেতন বৈষম্য এবং পেশাগত প্রতিবন্ধকতার মতো সমস্যাগুলো এখনো দৃশ্যমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক কর্মীবাহিনীর বেশিরভাগ অংশই নারী, যা তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে বৃহৎ বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোতে প্রধান পদে নারীদের উপস্থিতি বেশ কম (প্রায় ৩০%)। তাছাড়া, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো থেকে শীর্ষ পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ৫%। স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা খাতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২৪% কম উপার্জন করেন। স্বাস্থ্য খাতে নারীরা অবৈতনিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সিংহভাগই সম্পন্ন করে থাকেন। এছাড়া নারীরা তুলনামূলকভাবে কম বেতনভুক্ত নার্সিং ও মিডওয়াইফারি পেশায় বেশি নিয়োজিত। নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রায়শই কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হন, যা তাদের কর্মদক্ষতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাজেটে ঘোষিত স্বাস্থ্যকর্মী বলতে কি চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, টেকনোলজিস্ট, স্বাস্থ্য সহকারী, নাকি সব মিলিয়ে বোঝানো হয়েছে- এটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। যদি ১ লাখের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ চিকিৎসক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও বিশেষায়িত জনবল হয়, তাহলে ৮০ শতাংশ নারী নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। ১ লাখ জনবল নিয়োগের পূর্বে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, শিক্ষক, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং মানসম্মত কারিকুলাম। দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করলে দক্ষতার প্রশ্ন উঠতে পারে। নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পর তাদের নিরাপদ আবাসন, যাতায়াত ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করলে প্রত্যন্ত গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি পদায়ন কঠিন হবে। শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশাসনিক, ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। ১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ৮০ শতাংশ নারী করার লক্ষ্য অসম্ভব নয়, তবে এটি মূলত সম্ভব হবে যদি নিয়োগের বড় অংশ নার্স, মিডওয়াইফ, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী পদে হয়। অন্যদিকে, যদি এই সংখ্যা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য পেশাজীবীদেরও সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে লক্ষ্য অর্জন অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে যদি পরিকল্পনাটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে-মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে সহায়ক হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হবে। গ্রামীণ নারীদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের হার বাড়বে। নারী কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে এবং স্বাস্থ্য খাতে লিঙ্গ বৈষম্য কমাতে সাহায্য করবে। অতএব, ঘোষণাটি প্রশংসনীয় হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে কোন পদে নিয়োগ হবে, কীভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে এবং কোথায় তাদের কাজে লাগানো হবে-তার ওপর।[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

উদার গণতন্ত্র এবং প্রান্তিকের স্বপ্ন

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এর পেছনে সুশাসনের ঘাটতি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা। স্বাধীনতার পর থেকে যেসব রাজনৈতিক দল দেশ শাসনের ভার নিয়েছে, তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার ফল হিসেবেই গণুআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান আমাদের ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কারণও ছিলো সুশাসন এবং গণতন্ত্র বাস্তবায়নের ব্যর্থতা। নির্মোহ ভাবে বলতে গেলে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির কারণ হলো কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণ। আওয়ামীলীগের পতনের পর সাধারণ প্রান্তিক মানুষেরা স্বপ্ন দেখেছিলো অন্তর্চভুক্তি মূলক সমাজ ও রাজনীতির। স্বপ্ন দেখান কিন্তু রাজনৈতিক দলের নেতারা কিন্তু স্বপ্ন ভঙ্গের যাতনা ভোগ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক মানুষের দল। কী হলো আওয়ামী লীগ পতনের পর। আকুল আগ্রহ এবং কৌতূহল নিয়ে নাগরিকেরা অপেক্ষা করলেন, অবলোকন করলেন। আমাদের আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে যা দেখতে পেলাম তা মোটেই স্বস্তিদায়ক ছিলনা। সংবদ্ধ সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলটি নাগরিকদের জন্য অস্বস্তিদায়ক ছিল। তবে চব্বিশের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার একটি বড় সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন অনেকেই। বিশেষত সাধারণ মানুষ। প্রান্তিক বা সাধারণ মানুষ কিন্তু ‘ছাত্রজনতা’, ‘তৌহীদী জনতা’ নয়। তারা তকমাহীন নিবেদিত প্রাণ দেশ প্রেমিক নাগরিক। পঞ্চান্ন বছর ধরে তারা স্বপ্ন দেখছেন আর স্বপ্ন ভাঙ্গার বেদনা বুকে নিয়ে জীবনকে যাপন করছেন। আমার মতো অনেকেই এরজন্য গণতন্ত্রহীনতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। যদিও আমরা ডান, বাম, মধ্যপন্থী এমন কী ধর্মাশ্রয়ী দলের নেতারা যখন মেঠো বক্তৃতা দিয়ে থাকেন তখন তাদের কাছ থেকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের কথা শুনে থাকি। পঞ্চান্ন বছর বয়সী বাংলাদেশে এখনও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হিসেবে গণতন্ত্রকে দেখতে পাইনা। অথচ গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম নিয়েছিলো। বায়ান্ন, থেকে উনসত্তর, একাত্তর হয়ে চব্বিশের আন্দোলনে রাজনৈতিক দল গুলো নাগরিক সমাজকে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়ে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করেছে। বাংলাদেশের জনগণ অত্যন্ত উদার, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ, আবেগপ্রবণ যা উদার গণতন্ত্রের উপাদানের সঙ্গে সামজস্য-পুর্ণ। এ কারণেই সুবর্ণ পলিমাটির এ’দেশে মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নানা ভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছে। আধুনিক পৃথিবীতে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য শাসনতান্ত্রিক মতবাদ হচ্ছে গণতন্ত্র। পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ দেশে রয়েছে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। নব্বইয়ের দশকে স্নায়ুযুদ্ধের পতনের পরে পৃথিবির অধিকাংশ দেশেই স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটে, বিকাশ লাভ করে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। কিন্তু, পৃথিবীর প্রায় সবগুলো দেশই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে নিজেদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন বিকল্পসহ গ্রহণ করেছে। ফলে, পৃথিবীর যে দুই-তৃতীয়াংশ দেশে গণতন্ত্র রয়েছে, তার মধ্যে একদেশের গণতন্ত্রের সঙ্গে আরেক দেশের গণতন্ত্রের হুবহু মিল পাওয়া কার্যত অসম্ভব। প্রত্যেক দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই কিছু স্বাতন্ত্র্য দেখা যায়। আমাদের দেশেও স্বকীয় বৈশিষ্ঠ নিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো। রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা, নিবেদন, এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের যতোটুকু ত্যাগের প্রয়োজন ছিল আমরা সেরকম রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি এখনও। উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, পাপ এবং দুঃখের এই বিশ্বে অনেক ধরনের সরকার ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা এবং পরীক্ষা, নিরীক্ষা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এরকম পরীক্ষা বহমান থাকবে। গণতন্ত্র প্রেমীরা এ’কথা বলেনা যে গণতন্ত্র নিখুঁত বা সব চেয়ে ভালো রাজনৈতিক ব্যবস্থা। গণতন্ত্র নিয়ে বলা হয়, গণতন্ত্র হলো সরকারের অন্যতম খারাপ রূপ, তবে অন্য সব রকমের সরকার ব্যবস্থা থেকে খারাপ বা দুর্বল নয়। প্রকৃতপক্ষে এটি একমাত্র সরকারব্যবস্থা, যা বেশির ভাগ জাতি গণতন্ত্রের ত্রুটি এবং অন্তর্নিহিত দুর্বলতা সত্ত্বেও পেতে চায়। গণতন্ত্র যতোটূকু গণমুখী, জন কল্যাণকর তার থেকে গণতন্ত্রের ত্রুটি কিছুটা হলেও বেশি। অগণতান্ত্রিক দেশের তুলনায় গণতান্ত্রিক শাসনে জনগণের অংশগ্রহণ বেশি থাকে, যার ফলে জনসাধারণের সেবার কাঠামো গঠন করা হয়, যা জনগণের কল্যাণের জন্য প্রকৃত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। এসব আলোচনার মর্ম কথা হলো গণতন্ত্র নিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারে অনেক সমালোচনা করা যায় কিন্তু গণতন্ত্রের বিকল্প তৈরি করা যায়না। গণতন্ত্র হলো এ’ যাবত কালে পরীক্ষিত সর্বোত্তম রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বৈচিত্র্যময় বিতর্ক আর চর্চার রাজনীতির মধ্যেও, গণতন্ত্রের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ভ্যারিয়েন্টটি হচ্ছে উদার গণতন্ত্র। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গণতন্ত্র বলতে উদার গণতন্ত্রকেই বুঝানো হয়। মানুষের প্রতি শাসকের সমদৃষ্টি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। গণতান্ত্রিক অধিকার মূলত মানুষের জন্মগত মৌলিক অধিকারের কথাই বলে থাকে। আর এই মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারে সুশাসন। এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক রায়ের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের অবজ্ঞা ও অস্বীকৃতিই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল। অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রকে এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া যায়নি। আমরা আশা করি, বর্তমান সংসদের সরকারি দল ও বিরোধী দল দুই পক্ষই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এবং জাতীয় সংসদকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলবে। সুশাসনের জন্য প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থা। সুশাসন ন্যায় ও সমতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। যখন প্রশাসন দলীয়রূপ ধারণ করে তখন আমলাতন্ত্র শাসকদলের লেজুড়বৃত্তি করে। দুর্নীতি ও লাল ফিতার দৌরাত্মে প্রশাসন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। জনসমর্থন না থাকলে শাসকগোষ্ঠী আমলা নির্ভর হয়ে পড়ে এবং দেশ পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। শাসকবর্গ যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে প্রশাসনে ও বিচারালয়ে নিজেদের অনুগত লোকদেরকে নিয়োগ দেয় যাতে এদের সমর্থনে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে। ফলে প্রশাসন দুর্নীতিবাজ, অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ আমলাদের আখড়ায় পরিণত হয়। এসব কারণে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি শ্লথ হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি না থাকলে শাসকদলের নেতা-কর্মীদের দৌরাত্ম বেড়ে যায়, তারা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সমস্ত সমাজ জুড়ে এক ধরণের নীরবতার সংস্কৃতি নেমে আসে। অল্প সংখ্যক মানুষের দাপুটে অবস্থানকে শাসকদের কাছে মূল্যবান হয়ে পড়ে কারণ তাদের চেতনা এবং শাসকদের চেতনার একটি দৃশ্য অদৃশ্য সামঞ্জস্য লক্ষ করা যায়। প্রান্তজনের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন বিভিন আন্দোলন থেকে ওঠে আসা জনগণের স্বপ্নের বাস্তবায়ন। ছেষট্টি থেকে চব্বিশ পর্যন্ত সকল আন্দোলনের মূল কথা ছিলো সমতার বাংলাদেশ, বৈষম্যহীন মানবিক বাংলাদেশ। এই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য আমাদের পেছন ফিরে তাকাতে হবে। স্বপ্নের অনুবাদ করার দক্ষতা, যোগ্যতা এবং নিবেদন প্রয়োজন। এপ্রসঙ্গে, একটি জাতীয় সংবাদপত্রে জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার জনাব হাফিজ উদ্দীন আহমদ এর একটি সাক্ষাৎকারের অংশ তুলে ধরে লেখাটি সমাপ্ত করতে চাই। তিনি বলেছিলেন ‘আমাদের বহু সাফল্যের পেছনে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বিজয় একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। সেই শক্তি ও চেতনাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। আর একটি বিষয় হলো—গণতান্ত্রিক, মুক্তমনা সমাজ গড়ে তোলা; যেখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল সামাজিক সুবিচার, সাম্য ও মানবিক চেতনা প্রতিষ্ঠা করা। এসব মূল্যবোধকে আবার রিস্টোর করতে হবে। বৈষম্য কমাতে হবে—ধনী-গরিবের বৈষম্য, অঞ্চলভেদে বৈষম্য, নারী-পুরুষের বৈষম্য—সবই কমাতে হবে।’ আমরা কী পারবো প্রান্তজনের বাংলাদেশ প্রতিষথা করতে। আইনের শাসন ভেঙে গেলে দেশ প্রেমিক নাগরিকদের মধ্যে এক ধরণের ভীতি সৃষ্টি হয়। এর ফলে সমাজে অরাজকতার সৃষ্টি হয়। গুম, খুন, সন্ত্রাস, সরকারী অর্থ লোপাট ও সম্পদের অপচয় বৃদ্ধি পায়। সমাজ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মিডিয়া ও সুশীল সমাজ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলে। এ অবস্থা যেকোন দেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র মানুষের মৌলিক অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নের রক্ষাকবচ। এ ধরনের গণতন্ত্র সুশাসনকে নিশ্চিত করে। প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতি এবং সমাজ আমাদের কাঙ্ক্ষিত। আমরা ফেব্রিয়ারির নির্বাচনের পূর্বে অন্তর্ভুক্তি মূলক রাজনীতি এবং সমাজের কথা শুনেছিলাম। আমরা চব্বিশের আন্দোলনের পূর্বে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার কথা শুনে আশান্বিত হয়েছিলাম। বৈষম্যহীনতার কথা আমরা খুব কম শুনে হতাশ হই। জাতীয় ভাবে আমরা কিজবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র ও সুশাসন উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আমাদেরকে গণতন্ত্র ও সুশাসনের পথে হাঁটতে হবে এবং উন্নত অবকাঠামো তৈরীতে আরও মনোযোগি হতে হবে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও নাগরিক অংশগ্রহণ গণতন্ত্রকে সুসংহত করবে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করবে। সপ্তদশ শতাব্দীর বৃটিশ সমাজ বিজ্ঞানী জন লকের ’সোশিয়াল কন্ট্র্যাক্ট’ বা সামজিক চুক্তি মতবাদ এ মতটিকেই সমর্থন করে। তার মতে একনায়কতন্ত্র বা একদলীয় শাসন কখনও গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক নয়, কেননা তা জনগণের অধিকারকে খর্ব করে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। স্বৈরতন্ত্র নাগরিকের সব অধিকারকে শুধু খর্বই করে না, উন্নয়নের ধারাকেও রুদ্ধ করে দেয়। স্বৈরাচারী আমলে এর অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে। জন লক রাষ্ট্রের এ ধরনের অপরিমেয় সাংবিধানিক ক্ষমতার বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে জনগণ রাষ্ট্রকে ক্ষমতার লাইসেন্স প্রদান করে না। তৃণমূল জনগণের অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। বিকেন্দ্রীকরণ তৃণমূল পর্যায়ের জনগণকে সচেতন, দায়িত্বশীল ও স্বনির্ভর করে তোলে। সুশাসনের জন্য প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থা। সুশাসন ন্যায় ও সমতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। যখন প্রশাসন দলীয়রূপ ধারণ করে তখন আমলাতন্ত্র শাসকদলের লেজুড়বৃত্তি করে। দুর্নীতি ও লাল ফিতার দৌরাত্মে প্রশাসন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। জনসমর্থন না থাকলে শাসকগোষ্ঠী তখন আমলা নির্ভর হয়ে পড়ে এবং দেশ পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। শাসকবর্গ যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে প্রশাসনে ও বিচারালয়ে নিজেদের অনুগত লোকদেরকে নিয়োগ দেয় যাতে এদের সমর্থনে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে। ফলে প্রশাসন দুর্নীতিবাজ, অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ আমলাদের আখড়ায় পরিণত হয়। এসব কারণে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি শ্লথ হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি না থাকলে শাসকদলের নেতা-কর্মীদের দৌরাত্ম বেড়ে যায়, তারা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আইন ও বিচারের ধরা-ছোঁয়ার ঊর্দ্ধে এরা অবস্থান করে। ফলে আইনের শাসন ভেঙ্গে পড়ে, অরাজকতার সৃষ্টি হয়। গুম, খুন, সন্ত্রাস, সরকারী অর্থ লোপাট ও সম্পদের অপচয় বৃদ্ধি পায়। সমাজ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মিডিয়া ও সুশীল সমাজ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলে এবং কলম ও মুখ বন্ধ রাখে। এভাবে দেশের বিরোধীদল, বিচারক, মিডিয়া, বুদ্ধিজীবি ও সুশীল সমাজ অপারগ হয়ে পড়ে। এ অবস্থা যেকোন দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র মানুষের মৌলিক অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নের রক্ষাকবচ। এ ধরনের গণতন্ত্র সুশাসন কে নিশ্চিত করে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

ভিডিও আরও দেখুন

পেলের পায়ের জাদুতে থেমে গিয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ!

ফুটবলের রাজার সামনে নত হয়েছিল কি সত্যিই যুদ্ধের শক্তি? ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমান্টিক কিংবদন্তি- পেলে যখন নাইজেরিয়ায় পা রাখেন, তখন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন দুই শত্রুপক্ষ। সত্যি নাকি মিথ্যে?১৯৬৯ সাল। নাইজেরিয়া জ্বলছে। পূর্বাঞ্চলের ইগো জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘বিয়াফ্রা প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করেছে, আর কেন্দ্রীয় সরকার তা মেনে নিতে রাজি নয়। রক্তক্ষয়ী এই গৃহযুদ্ধে তখন প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ।ডিপ্লোম্যাটদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ। সেখানে হাজির হন ‘ও রেই’- ফুটবলের সম্রাট পেলে। আর সাথে সাথেই ম্যাজিক ঘটে যায়! বিশ্বমাধ্যম খবর দেয়- যুদ্ধরত দুই পক্ষ ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়, শুধু পেলের খেলা দেখার জন্য।খবরটি ২০০৫ সালে টাইম ম্যাগাজিনে এসেছে এভাবে: ‘দুই বছর ধরে কূটনীতিকরা যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে সফল হলেন পেলে। ১৯৬৯ সালে নাইজেরিয়ায় এলেন ব্রাজিলের ফুটবল সম্রাট- এবং এলো তিন দিনের যুদ্ধবিরতি!’কিন্তু ইতিহাস যত গভীরে যায়, কিংবদন্তি তত ধোঁয়াশায় ঢেকে যায়। গবেষকরা যখন নাইজেরিয়ার সংবাদপত্রের আর্কাইভ ঘাঁটলেন- সেখানে তখনকার ‘নাইজেরিয়ান ডেইলি টাইমস’ ও ‘অবজারভার’- কোনো যুদ্ধবিরতির উল্লেখ নেই! যা অবিশ্বাস্য, কারণ সান্তোসের প্রতিটি পদক্ষেপ তখন সংবাদপত্রে উঠে এসেছে।পেলে নিজেও দ্বিধায় ছিলেন। ১৯৭৭ সালের প্রথম আত্মজীবনীতে এই কিংবদন্তির কথা নেই। ২০০৭ সালের আত্মজীবনীতে এসে তিনি লেখেন, ‘নিশ্চিত নই পুরোপুরি সত্যি কিনা... তবে নাইজেরিয়ানরা নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করেছিল বিয়াফ্রানরা যেন লাগোসে হামলা না করে, যতক্ষণ আমরা সেখানে আছি।’তাহলে আসলে কী ঘটেছিল? ইতিহাসবিদ জোসে পাওলো ফ্লোরেঞ্জানোর গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। সান্তোসের খেলা বসেছিল লাগোস ও বেনিন সিটিতে- যুদ্ধের মূলক্ষেত্র থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে। সেখানকার পরিস্থিতি ছিল তুলনামূলক নিরাপদ। যুদ্ধবিরতির কোনো প্রয়োজনই ছিল না। বরং পেলেকে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘প্রোপাগান্ডা টুল’ হিসেবে। নাইজেরিয়া সরকার চেয়েছিল বিশ্বকে দেখাতে- দেশে যুদ্ধ চললেও স্বাভাবিক জীবন আছে। মানুষ ফুটবল উপভোগ করছে। তাই সান্তোসকে আবার ফিরিয়ে আনা হলো বেনিন সিটিতে। স্থানীয় গভর্নর স্যামুয়েল ওগবেমুডিয়া পাবলিক হলিডে ঘোষণা করেন, যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে ব্রিজ খুলে দেওয়া হয়- যাতে মানুষ খেলা দেখতে পারে। পেলের সতীর্থ এডুর ভাষ্য, ‘আমাদের দল যুদ্ধ বন্ধ করবে- এমন কথা কেউ বলেনি।’ তবে সেই সাক্ষীও আছেন, যারা এখনও স্বপ্ন দেখেন। স্থানীয় ফুটবলার গডউইন ইজিলেইন বিবিসিকে বলেছেন, ‘ম্যাচের দিন কেউ আর বন্দুকের কথা ভাবেনি।’ পেলের দল যখন খেলা শেষে বিমানে উঠল, তখন নিচ থেকে ভেসে এল গুলির শব্দ- যুদ্ধ আবার শুরু হয়েছে।সেটাই হয়তো আসল সত্যি- কিংবদন্তি শুধু যুদ্ধ থামায়নি; আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধের মাঝে মানুষকে ফিরিয়ে দিয়েছিল স্বাভাবিক জীবনে, ৯০ মিনিটের জন্য হলেও।

পেলের পায়ের জাদুতে থেমে গিয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ!
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ১০৩ জন