সংবাদ
ডিনারের পর যমদূত সেজে এলো ভাগ্নেরা

ডিনারের পর যমদূত সেজে এলো ভাগ্নেরা

একই পাতে বসে মামার সঙ্গে রাতের খাবার খেল দুই ভাগ্নে। ডিনার শেষে বিদায় নিয়ে বেরিয়েও গেল স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরেই যমদূত হয়ে ফিরে এসে মামা-মামিসহ দুই শিশুকে জবাই করে মেটাল জমির লালসা। নওগাঁর নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় এমন লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে পুলিশ।বুধবার (২২ এপ্রিল) দুপুরে নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম। এ ঘটনায় নিহতের দুই ভাগ্নে সবুজ ও শাহীন এবং দুলাভাই শহিদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।পুলিশ সুপার জানান, উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের একমাত্র ছেলে হাবিবুর রহমানের সঙ্গে তার বোনদের জমির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। মূলত এই বিরোধের চিরস্থায়ী সমাধান করতেই হাবিবুরকে ‘নির্বংশ’ করার পরিকল্পনা করা হয়।তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার রাতে হাবিবুরের বাড়িতেই তার সঙ্গে রাতের খাবার খান দুই ভাগ্নে সবুজ ও শাহীন। সেখান থেকে বেরিয়ে পাশের একটি খোলা মাঠে গিয়ে দুলাভাই শহিদুলসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে খুনের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন তারা। রাত একটার দিকে তারা কৌশলে আবার বাড়িতে ঢোকেন। ঘরে ঢুকে প্রথমে মামা হাবিবুর রহমানকে ঝাপটে ধরে জবাই করেন দুই ভাগ্নে।ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে মামি পপি আক্তার ঘর থেকে বেরিয়ে এলে তাকেও বাড়ির আঙিনায় ধরে গলা কেটে হত্যা করা হয়। সবশেষে হত্যার কোনো সাক্ষী না রাখতে এবং জমির উত্তরাধিকার নিশ্চিহ্ন করতে ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ৯ বছরের পারভেজ ও ৩ বছরের শিশু সাদিয়াকেও জবাই করে পালিয়ে যান তারা।পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। হাবিবুরের বংশে বাতি দেওয়ার মতো কেউ যেন না থাকে, সেই উদ্দেশ্যেই ছোট শিশুদেরও রেহাই দেয়নি ঘাতকেরা। আমরা তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় দ্রুততম সময়ে আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি।’উল্লেখ্য, গত সোমবার দিবাগত রাতে নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিহত পপি আক্তারের বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন।
২৯ মিনিট আগে

মতামতমতামত

ত্রিমুখী সংকটে জনজীবন: জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও বাজার

গ্রীষ্মের প্রখর খরতাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে এক অভূতপূর্ব ত্রিমুখী সংকট| একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন সংঘাতের উত্তাপে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচু¤^ী, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে কয়লা ও তেলের তীব্র সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন তলানিতে এসে ঠেকেছে| এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, যা দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের চুলায় হাঁড়ি চাপানোকেই আজ এক অনিশ্চিত ও কষ্টকর বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিয়েছে| ঢাকার মিরপুরের বিয়াল্লিশ বছর বয়সী ডেলিভারি রাইডার রশিদ আহমেদ যখন ভোররাতে তেলের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তিনি জানতেন না যে তার মোটরসাইকেলের চাকা থমকে যাওয়ার সুতাটি বাঁধা আছে হাজার মাইল দূরের হরমুজ প্রণালীতে| তিনটি ফুয়েল স্টেশন ঘুরেও তেল না পেয়ে রশিদ আহমেদের দিনটি যখন অসম্পূর্ণ ডেলিভারি আর শূন্য পকেটে শেষ হয়, তখন তা কেবল একজন ব্যক্তির দুর্ভোগ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে এক অবরুদ্ধ অর্থনীতির করুণ আর্তি| ‘গ্লোবাল ভয়েসেস’ এ উল্লিখিত রশিদের এই অভিজ্ঞতা আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটিই এখন বাংলাদেশের সেই নতুন সাধারণ বাস্তবতা, যেখানে অন্যের শুরু করা যুদ্ধ আমাদের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ঘরের আলো নিভিয়ে দিচ্ছে এবং রান্নাঘরের হাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে| পারস্য উপসাগরের সেই ভূ-রাজনৈতিক বিস্ফোরণ কেন বাংলাদেশের এক প্রান্তিক কৃষকের ভিটায় বা শহুরে শ্রমিকের ঘরে অন্ধকার নিয়ে আসে, তা বুঝতে হলে হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক গুরুত্ব অনুধাবন করা জরুরি| এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়| ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে শুরু হওয়া সংঘাতের প্রভাবে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১০২ থেকে ১১৪ ডলারের দিকে ছুটতে শুরু করেছে| বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম এই পরিস্থিতিকে কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এক কাঠামোগত আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে| বাংলাদেশের মতো দেশ, যা তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তার জন্য এটি একটি অস্তিত্বের সংকট| আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার মতে, এটি ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ˆবশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট| এই সংকটের ঢেউ যখন বাংলাদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ছে, তখন দেখা যাচ্ছে আমাদের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত এক গভীর পক্ষাঘাতের শিকার হয়েছে| সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি চরম আর্থিক সংকটের কারণে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল কেনার টাকা দিতে পারছেন না| সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পক্ষ থেকে পিডিবির কাছে বকেয়া পাওনার পরিমাণ এখন ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে| কয়লা ও তেলের এই তীব্র সংকটের প্রভাবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন সক্ষমতার অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে| দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে উৎপাদন ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘরে নেমে এসেছে| বাঁশখালীর ১৩২০ মেগাওয়াট এসএস পাওয়ার এবং মাতারবাড়ী ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন কয়লার অভাবে ধুঁকছে| এসএস পাওয়ারের উৎপাদন ৩০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে এবং মাতারবাড়ীর উৎপাদন ১৫০ মেগাওয়াটে ঠেকেছে| এসএস পাওয়ারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর কয়লাবোঝাই জাহাজের ভাড়া প্রতি টনে অন্তত ১০ ডলার বেড়েছে, যা সরকার বহন করতে না চাওয়ায় কয়লা আমদানি এখন লোকসানের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে| মাতারবাড়ী কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানি ব্যাহত হচ্ছে কারণ সে দেশের সরকার উৎপাদন পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে| এর ফলে, ১৬ এপ্রিল একটি কয়লার জাহাজ আসলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য| কয়লার পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও বকেয়া বিল না পাওয়া এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে| প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ২০ টাকা থেকে বেড়ে ২৬ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা পিডিবির লোকসান ও ভর্তুকির বোঝাকে আরও ভারী করছে| গত অর্থবছরে ৩৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়ার পরও পিডিবির লোকসান ছিল ১৭ হাজার কোটি টাকা; বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অঙ্ক কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা সহজেই অনুমেয়| বিদ্যুতের এই ঘাটতি এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য সরাসরি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের কৃষি ও সাধারণ মানুষের খাদ্য তালিকায়| হরমুজ প্রণালী কেবল তেলের নয়, বরং সারেরও এক সংকীর্ণ জীবনরেখা| কাতার, সৌদি আরব এবং ওমান থেকে আসা বিশ্বের বড় অংশের ইউরিয়া ও ফসফেট এই পথ দিয়েই বাংলাদেশে আসে| ২০২৬ সালের মার্চ মাসে কাতার এনার্জি ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করার পর পেট্রোবাংলা নিশ্চিত করেছে যে, পূর্বনির্ধারিত এলএনজি কার্গো সময়মতো পৌঁছাবে না| এর ফলে দেশের পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ করে দিতে হয়েছে| সেই সময়টি ছিল বাংলাদেশের বোরো ধানের মৌসুমের মাঝামাঝি—যখন কৃষকের ধানক্ষেতে সবচেয়ে বেশি সেচ ও সারের প্রয়োজন হয়| ডিজেলের মজুত কমে মাত্র নয় দিনের সরবরাহে এসে দাঁড়িয়েছিল| যদিও সরকার ভারত থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৫,০০০ মেট্রিক টন ডিজেল এনেছে, কিন্তু তা ছিল সাগরে এক ফোঁটা জলের মতো| এই সার ও সেচ সংকটের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে ধানের ফলনে, যা আগামী কয়েক মাস পর দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ সংকেত হয়ে দেখা দেবে| জ্বালানি সংকটের এই উত্তাপ এখন রান্নাঘরের চুলায় গিয়ে ঠেকেছে| এলপিজি সংকটের কারণে ১২.৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ১,৫০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে| বাংলাদেশের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি যেখানে ১২, ৫০০ টাকা, সেখানে আয়ের ১০ শতাংশই চলে যাচ্ছে কেবল রান্নার গ্যাসের পেছনে| পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নওগাঁ থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চাল পরিবহনের খরচ এক সপ্তাহেই ১৪,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ২২,০০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে| জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের এই সম্মিলিত প্রভাব বাজারে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দামকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে| কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে গরিবের মোটা ¯^র্ণা চাল এখন ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর সরু মিনিকেট চাল কিনতে ক্রেতার লাগছে ৮৫ টাকা| সবজির বাজারে উত্তাপ আরও ভয়াবহ; বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা, আর করলা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে| ৮০ টাকা কেজির নিচে বাজারে এখন কোনো সবজি মেলাই ভার| মাছ-মাংসের বাজারেও একই অস্থিরতা বিরাজ করছে| কেজিপ্রতি সোনালি মুরগি ৪০০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে| গরুর মাংসের দাম ৮০০ টাকা ছুঁয়েছে, যা নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তের জন্যও বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে| মুদি পণ্যের দোকানে সরু মসুর ডাল ১৫০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ২০৫ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে| এই ত্রিমুখী সংকটের ফলে বাংলাদেশের জনজীবন আজ দিশেহারা| রাজধানী ঢাকার বাইরে বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে দিনে-রাতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে| চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থেকে শুরু করে কুমিল্লা ও বরিশালের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু ও বৃদ্ধরা| চট্টগ্রামে ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬টি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে| লোডশেডিংয়ের কারণে বাসাবাড়িতে ওয়াসার পানি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না, ফলে তীব্র পানির সংকটে পড়েছেন নগরবাসী| কালুরঘাট ও বায়েজিদ বোস্তামী শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে| গার্মেন্টস মালিকরা জেনারেটর চালিয়েও উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন| বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশের উৎস ˆতরি পোশাক শিল্প আজ জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে, যার ফলে রপ্তানি আয় অন্তত ২ শতাংশ কমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে| এটি ˆবদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে, যা টাকাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে| দুর্বল টাকা মানেই হলো আমদানি করা প্রতিটি চালের দানা আর প্রতিটি ফোঁটা তেল আগের চেয়ে বেশি দামে কেনা| হরমুজ প্রণালীর যুদ্ধবিরতি সাময়িক ¯^স্তি দিলেও, আমাদের আমদানিনির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব আজ প্রতিটি ঘরকে অন্ধকার ও ক্ষুধার মুখে ঠেলে দিয়েছে| যে যুদ্ধ রশিদ আহমেদের আয়ের পথ বন্ধ করেছে, সেই একই যুদ্ধ আজ ভ্যানচালক এনায়েতউল্লাহর ডাল-ভাতের ¯^প্নকে কেড়ে নিচ্ছে| ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা এবং ৪২ হাজার কোটি টাকার বকেয়া পাওনার এই বোঝা নিয়ে আমরা কতদিন চলতে পারব, সেই প্রশ্ন এখন প্রতিটি লোডশেডিংয়ের অন্ধকার রাতে এবং প্রতিটি বাজারের অসহনীয় মূল্যে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে| পঁচানব্বই শতাংশ জ্বালানি আমদানির ওপর এই যে আকাশচু¤^ী নির্ভরশীলতা, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়| এটি আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি দক্ষতার প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার ফলাফল| পদ্ধতিগত সংস্কার, বাজার তদারকিতে কঠোর নজরদারি এবং দেশীয় জ্বালানি উৎসের কার্যকর ব্যবহার ছাড়া এই বহুমুখী সংকট থেকে মুক্তির আর কোনো সহজ পথ খোলা নেই| আমাদের এখন এমন এক অর্থনীতির দিকে যাত্রা করতে হবে যেখানে আমাদের রাতের খাবারের দাম পারস্য উপসাগরের কামান দাগানোর ওপর নির্ভর করবে না| পদ্ধতিগতভাবে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোই হলো এই অদৃশ্য যুদ্ধের হাত থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারকে বাঁচানোর একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী সমাধান| আপাতত, রশিদ আহমেদরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, আর মধ্যপ্রাচ্যের সেই আগুন আমাদের জাতীয় উন্নয়নের সোনালি ¯^প্নগুলোকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে| [লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী|]

জলবায়ু পরিবর্তন: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি

মানবসভ্যতা আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উন্নয়ন ও ধ্বংস প্রায় পাশাপাশি চলেছে| প্রযুক্তির অগ্রগতি মানবজীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে প্রকৃতির ওপর চাপও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে| এই বাস্তবতায় বিশ্ব ধরিত্রী দিবস আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ ˆতরি করে এবং ভবিষ্যতের জন্য দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানায়| ˆবজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর বা ৪৫৪ কোটি বছর| এই দীর্ঘ সময়ের শুরুতে পৃথিবী ছিল উত্তপ্ত গ্যাস ও অগ্নিময় এক গ্রহ| ধীরে ধীরে শীতল হয়ে এটি কঠিন ভূ-পৃষ্ঠ, পানি ও বায়ুমণ্ডল গঠন করে| প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে প্রথম এককোষী জীবের উদ্ভব ঘটে| এরপর দীর্ঘ বিবর্তনের ধারায় বহুকোষী জীব, উদ্ভিদ, সামুদ্রিক প্রাণী এবং পরবর্তীতে স্থলজ প্রাণীর বিকাশ ঘটে| এই বিবর্তন প্রক্রিয়াই পৃথিবীকে জীববৈচিত্র্যময় গ্রহে রূপ দিয়েছে| মানবজাতির আবির্ভাব পৃথিবীর ইতিহাসের তুলনায় অত্যন্ত সাম্প্রতিক—মাত্র প্রায় ৩ লাখ বছর আগে| অর্থাৎ পৃথিবীর পুরো বয়সের তুলনায় মানুষের উপস্থিতি একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র| বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৮০০ কোটি মানুষের বসবাস রয়েছে| এই বিশাল জনসংখ্যা সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে| পানি, খাদ্য, জ্বালানি ও ভূমি ব্যবহারের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পরিবেশগত ভারসাম্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে| বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীতে মোট ৮০ লাখেরও বেশি প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে| তবে এর মধ্যে বড় একটি অংশ এখনও অজানা| দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক প্রজাতি ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে এবং আরও বহু প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে| এই তথ্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য জানিয়ে দেয়—পৃথিবী কেবল মানুষের নয়, বরং কোটি কোটি জীবের এক যৌথ আবাস| পৃথিবী আমাদের একমাত্র আবাসভূমি, যার বিকল্প নেই| এই গ্রহের মাটি, পানি, বায়ু, বন, পাহাড় ও সমুদ্র—সব মিলিয়ে একটি সূক্ষ্ম ও জটিল পরিবেশগত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যার ওপর সকল জীবের অস্তিত্ব নির্ভরশীল| মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়, বরং প্রকৃতির অংশমাত্র| প্রকৃতির ওপর অবিবেচক হস্তক্ষেপ মানে নিজের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করা| উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা হতে হবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই| প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত নয়, বরং সহাবস্থানই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একমাত্র নিরাপদ পথ| বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক| দ্রুত শিল্পায়ন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভোগবাদী জীবনধারা পরিবেশের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে| বায়ুদূষণ এখন নগরজীবনের নীরব ঘাতক| কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন দূষিত বায়ু গ্রহণ করছে, যার ফলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, হৃদরোগ এবং ফুসফুসের রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে| পানিদূষণের ফলে নদী ও জলাশয়গুলো ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়ছে| কৃষিজমিতে রাসায়নিক ও শিল্পবর্জ্যের প্রভাব পড়ছে, যার ফলে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং খাদ্য উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে| জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে মানবজাতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি| ˆবশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার অ¯^াভাবিক পরিবর্তন এই সংকটের প্রধান লক্ষণ| বাংলাদেশসহ উপকূলীয় দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে| ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততা মানুষের জীবন ও জীবিকাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে| কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, মৎস্য সম্পদ কমে যাচ্ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে| জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে সামাজিক সংকট ˆতরি করতে পারে| বনভূমি পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম প্রধান উপাদান| কিন্তু নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, বন দখল এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বনভূমি দ্রুত কমে যাচ্ছে| গাছপালা কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশকে স্থিতিশীল রাখে| বন কমে যাওয়ায় এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ˆবশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে| অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে, যা পুরো বাস্তুতন্ত্রকে অস্থিতিশীল করে তুলছে| একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক আজ বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে| এটি সহজে পচে না এবং শত শত বছর ধরে পরিবেশে থেকে যায়| নদী ও সমুদ্রের প্লাস্টিক দূষণ সামুদ্রিক জীবের জন্য মারাত্মক হুমকি| খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এই ক্ষতিকর উপাদান মানবদেহেও প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ¯^াস্থ্যঝুঁকি ˆতরি করছে| অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ন পরিবেশের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে| কলকারখানার ধোঁয়া ও বর্জ্য বায়ু ও পানি দূষিত করছে| নগর এলাকায় সবুজের অভাব ‘শহুরে তাপ দ্বীপ’ সৃষ্টি করছে, যেখানে তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় অনেক বেশি| এটি জনজীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে| পরিবেশের অবক্ষয় সরাসরি মানুষের ¯^াস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে| বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসযন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ ও দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বাড়ছে| দূষিত পানি পান করার ফলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগ ছড়াচ্ছে| অতিরিক্ত তাপমাত্রা হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও ত্বকের রোগ বৃদ্ধি করছে| পরিবেশ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি| বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে| প্লাস্টিক ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব বিকল্প গ্রহণ করতে হবে| নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌর ও বায়ু শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে| বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে| নগর পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব নীতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে|  [লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]

বিশ্লেষণ: মন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করে এমপি কেন পরীক্ষাকেন্দ্রে?

শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করে কুমিল্লার একটি এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ এবং সেখান থেকে ফেইসবুক লাইভ করেছেন একজন সংসদ সদস্য (এমপি)। প্রশ্ন উঠেছে, একজন আইন প্রণেতা হয়েও কেন তিনি শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা ভুলে গেলেন? এটা কি বিচ্ছিন্ন ভুল, নাকি জটিল মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার প্রতিফলন।  বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই মনে করেন, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তারা ‘সাধারণ মানুষ’ থেকে আলাদা হয়ে যান। তাদের কাছে আইন ও নির্দেশনা শুধুই ‘সাধারণ মানুষের জন্য’, তাদের জন্য নয়। ‘ক্ষমতার অহংকার’ তাদের চোখে পড়তে দেয় না যে, তারা ভুল করছেন।আবার অনেক এমপি মনে করেন, এলাকার মানুষ তাদের ‘বেশি সক্রিয়’ দেখতে চান। পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে লাইভ করাটা তাদের দৃষ্টিতে ‘দায়িত্ব পালন’। কারণ এটি ভোটারদের কাছে বার্তা দেয় যে ‘আমি আছি, আমি দেখছি, আমি অনেক বেশি তৎপর।’ অনেক এমপি এমন ‘ভোট-বান্ধব ইমেজ’ তৈরির তাড়নায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশের কথা ভুলে যান।অনেক এমপি মনে করেন শিক্ষামন্ত্রী তথা সরকারের নির্দেশ জাতীয় পর্যায়ের। সেক্ষেত্রে তারা ‘আমার এলাকায় আমার কর্তৃত্বই বড়’ মনে করেন।এমন মানসিকতা তাকে নির্দেশ অমান্য করতে উদ্বুদ্ধ করে। এমপি ভেবে বসেন, ‘মন্ত্রী ঢাকায় বসে নির্দেশ দিয়েছেন।কিন্তু আমি তো মাঠে আছি। তাই আমার সিদ্ধান্তটাই এখানে প্রাসঙ্গিক।’সরকার বা মন্ত্রীদের এমন নির্দেশনা অমান্য করার শাস্তি খুবই বিরল।শিক্ষাবোর্ড ‘খতিয়ে দেখার’ কথা বললেও সাধারণ জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির নজির নেই বললেই চলে। তাছাড়া দলীয় শৃঙ্খলাও খুব একটা কাজ করে না। ফলে ‘কিছুই হবে না’- এমন আত্মবিশ্বাস ভর করে তাদের ওপর।তাছাড়া দেশের প্রান্তিক সমাজে এখনও ‘বড়মানুষি’ মানসিকতা রয়ে গেছে। এমপিরা এলাকার ‘বড় মানুষ’ হিসেবে বিবেচিত হন। তাই প্রথাগত বা সামাজিক বিবেচনায় তারা মনে করেন সব জায়গায় বিনা বাধায় তাদের প্রবেশের অধিকার রয়েছে। পরীক্ষাকেন্দ্রকে তারা ব্যতিক্রম ভাবেন না। সামাজিকভাবে তাদের প্রত্যাশা থাকে ‘আমি এমপি, আমাকে তো কেউ আটকাবে না’।সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আবার ‘জনদরদি নেতা’ হওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। যে নেতা বা জনপ্রতিনিধি যত বেশি লাইভ করবেন, ছবি ছড়াবেন- তিনি তত বেশি সক্রিয় বলে বিবেচিত হন। পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘কুশল বিনিময়’ বা তাদের সঙ্গে ছবি তোলা কিংবা ভিডিও করা দায়িত্বশীল নেতার কাজ বলেই মনে করেন।  অনেক জনপ্রতিনিধি নিজের এলাকার পরীক্ষাকেন্দ্রকেও ‘নিজের প্রতিষ্ঠান’ ভেবে বসেন। ফলে সেখানে ঢোকার অনুমতি নেওয়ার দরকার মনে করেন না। কারণ তারা ভাবেন, ‘আমি তো ভালোর জন্যই যাচ্ছি’।কিন্তু ভালো উদ্দেশ্য যে কখনও অনিয়মকে জায়েজ করে না, সেটা তারা ভুলেই বসেন।সাধারণত দেখা যায়, অধিকাংশ পরীক্ষা কেন্দ্রের কর্মকর্তা জনপ্রতিনিধিকে ‘না’ বলতে সাহস পান না। জনপ্রতিনিধি বা এমপিরা ‘বিরক্ত’ হলে ভবিষ্যতে তাকে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেই ভয়ে কর্মকর্তারা চুপ থাকেন। এই নীরবতাই জনপ্রতিনিধির মনে শক্তি যোগায়।মনোবিজ্ঞানের পরিচিত ঘটনা হচ্ছে, ক্ষমতা মানুষের আচরণ পরিবর্তন করে দিতে পারে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ডেবোরি গ্রুনফেল্ড ও অন্যান্য গবেষকদের গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিয়ম ভাঙতে কম দ্বিধাবোধ করেন। তাদের মধ্যে ‘আমি আলাদা’ ও ‘আমার জন্য আলাদা নিয়ম’ এই ভাবনা তৈরি হয়।আবার দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘ইলিউশন অব ইনভালনারেবিলিটি’ (অভেদ্যতা বা অপরাজেয়তার ভ্রম) তৈরি হয়। তিনি মনে করেন, ‘আমার কিছুই হবে না, আমাকে কেউ কিছু বলতে পারবে না।’ এই ভ্রম থেকেই তিনি উপরের নির্দেশকেও ‘আমার জন্য প্রযোজ্য নয়’ ভাবেন।সেই জনপ্রতিনিধি নিজেকে বোঝান যে, ‘আমি তো পরীক্ষা দেখতে গিয়েছি- যেটা খারাপ কাজ নয়। যাওয়া যদি ভালো কাজ হয়, তাহলে নির্দেশ অমান্য করলেও তো সমস্যা নেই।’ তিনি নির্দেশের চেয়ে তার মতো করে নিজের কাজের ‘ভালো’ দিকটাকে বেশি গুরুত্ব দেন। অনেক সময় এলাকার মানুষের প্রত্যাশার চাপে পড়ে জনপ্রতিনিধিরা ‘বাড়তি’ কাজ করেন। কেউ তাকে বলতে পারেন, ‘এমপি সাহেব, পরীক্ষার হল একবার দেখে আসুন না।’ তিনি ‘না’ বলতে পারেন না। পরে নিজেকে বোঝান, ‘এটা তো আমার দায়িত্ব।’যে জনপ্রতিনিধি পরীক্ষাকেন্দ্র বা এমন কোনো জায়গায় ফেইসবুক লাইভ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তিনি মূলত ‘স্বীকৃতি’ চান।  অনেকটা এরকম, ‘আমি কত ভালো কাজ করছি, মানুষ দেখুক’। এই আত্মমুগ্ধতা তাকে ভুলিয়ে দেয় পরীক্ষাকেন্দ্রের পরিবেশের কথা। পরীক্ষার্থীদের কথা তার মাথায় আসে না, আসে শুধু নিজের ইমেজ।কোনো জনপ্রতিনিধির এমন আচরণ শিক্ষার্থীদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তারা নেতাবাচকভাবে প্রভাবিত হয়। শিক্ষার্থীরা যখন দেখে যে, আইন প্রণেতা নিজেই নির্দেশ অমান্য করছেন, তখন তাদের মনে ‘আইন কেবল ছোটদের জন্য, বড়রা যা খুশি করতে পারেন’ জাতীয় ধারণা তৈরি হয়। নির্দেশ অমান্যের এই ঘটনা আবার একটা ‘দৃষ্টান্ত’ বা ‘উদাহরণ’ তৈরি করে। ফলে অন্য জনপ্রতিনিধিরা বলেন, ‘অমুক তো গিয়েছে, আমিও যেতে পারি।’ এমন ধারণা থেকে শিক্ষার্থীরাও ভবিষ্যতে নিয়ম ভাঙতে কম দ্বিধাবোধ করবে।পাশাপাশি পরীক্ষাকেন্দ্রে অপরিচিত ক্যামেরা ও লাইভ সম্প্রচার শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। তারা পরীক্ষায় মনোয়োগের পরিবর্তে ক্যামেরার দিকে তাকায়। এটি পরীক্ষার ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।শুধু যে শিক্ষার্থীদের ওপরেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তা নয়, শিক্ষকদের কর্তৃত্বও হ্রাস করে দিতে পারে এমন চর্চা। যখন একজন এমপি কেন্দ্রের প্রধান শিক্ষককে ইশারায় সরে যেতে বলেন, তখন ওই শিক্ষকের কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীরা সেই শিক্ষককে কম গুরুত্ব দেবে।নির্দেশ অমান্যের বিষয়ে কড়া সতর্কতা জারি করতে হবে, শাস্তির ব্যবস্থাও করতে হবে- তা খুবই জরুরি। কারণ আইন প্রণেতারাই যদি আইন বা নির্দেশ অমান্য করতে শুরু করে তাহলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভারসাম্য নষ্ট হবে। যে কারণে শুধু ‘খতিয়ে দেখা’ নয়, যিনি নির্দেশ অমান্য করেছেন, তার বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সেজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষাবোর্ডের কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। বিশেষত, জনপ্রতিনিধিদের সংসদীয় আচরণবিধি ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। ‘আমি যা ইচ্ছা করতে পারি’- এই মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কীভাবে আইন ভঙ্গকারী জনপ্রতিনিধিকে ‘না’ বলতে হয়, তা শেখাতে হবে। তাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।গণমাধ্যমকে এমন ঘটনা তুলে ধরতে হবে জনপ্রতিনিধিদের ‘লজ্জিত’ করার জন্য। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন কাজ করতে সাহস না পান। তাছাড়া এমপি যে দলের প্রতিনিধিত্ব করছে সেই দলকেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা রাখতে হবে।মূলত, আইন প্রণেতা হয়েও নির্দেশ অমান্য বা আইন ভাঙা ‘ক্ষমতার অহংকারের’ ফলাফল। একজন এমপিকে মনে রাখতে হবে, তিনি প্রথমে একজন নাগরিক, পরে জনপ্রতিনিধি। শিক্ষামন্ত্রী তথা সরকারের নির্দেশ তার জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।

গ্রামীণ হাট-বাজারের কথা

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তরঙ্গে ভেসে আসা একটা ভিডিও ক্লিপ থেকে জানা গেল বাজারটির নাম আমতলী। আসলে কোন জেলার কোন আমতলীর   হাটের দৃশ্য তা পুরোপুরি ধরা যাচ্ছিল না। তবে নিজের গ্রাম, শৈশবকাল, বাড়ির কাছের রেলস্টেশন সংলগ্ন বাজার, কৃষিনির্ভর গ্রামবাসীর জীবন-জীবিকার কথা চোখে ভেসে উঠেছে। স্বাধীনতার পূর্বে এবং পরবর্তী কয়েক বছরও গ্রামের হাটবাজারে এমন রূপচিত্র দেখা গেছে। সাধারণ মানুষ হাঁস, মুরগি, কবুতর, ডিম নিয়ে বাজারের খোলা জায়গায় বসে আছে। ক্রেতা পছন্দ করলে কিনে নিবে। তবে এগুলো সংখ্যায় খুব কম ছিল, একটি বা দুটি। নিজেদের গৃহপালিত যত্নে পোষা প্রাণী। ক্রেতাও সাধারণ শ্রেণীর মানুষ। তারা এগুলো বিক্রি করে অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস  ক্রয় করতো। আজকাল এই দৃশ্যপট হারিয়ে গেছে বললেই চলে। এখন গ্রামেও পোল্ট্রি খামার, মাছের ফিশারি, হাইব্রিড প্রজাতি, কক, পাকিস্তানি, লেয়ার কত নাম হয়েছে। গ্রামের দোকানে দোকানে চিপস, ফ্যান্টা, স্প্রাইট, মোজো, পাউরুটি, চানাচুর আর নকল কারখানায় তৈরি নানা মুখরোচক দ্রব্যে সয়লাব হয়ে গেছে। ফলে  অফুরন্ত, অগণন এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার দেশে মানুষ যেখানে যা পাচ্ছে, তা-ই খাচ্ছে। দেশি অর্গানিক জাতের সেই তাজা মাছ, মুরগি, ডিম, দুধ, মাটির মটকিজাত চেপা শুটকি, শাকসবজি, ফলমূল কোনোটাই এখন আর গ্রামবাংলার মানুষেরও নাগালের মধ্যে নেই। মনে হয় শহরটা টুকরো টুকরো হয়ে চলে গেছে গ্রাম, গ্রামান্তরে। ২. বাস্তবতা হলো, গ্রামের হাট- বাজারগুলোও সেই সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে গেছে। একেবারে অজপাড়াগাঁয়ের মেঠো রাস্তার হাটও এখন উপজেলা পরিষদ/প্রশাসন থেকে ইজারার বন্দোবস্ত  করে নিয়ে আসা হচ্ছে। যেগুলোর হয়তো প্রয়োজনই ছিল না। থাকতে পারতো গ্রামের আটপৌরে  সাধারণের জন্যে উন্মুক্ত। কিন্তু গ্রামের এক শ্রেণীর অসাধু রাজনীতিসংশ্লিষ্ট (যখন যে দল ক্ষমতাসীন হয়) ব্যক্তিরা স্বউদ্যোগে রাজস্ব আদায়ের নামে এসব করে চলেছে। তারা গ্রামীণ হাট- বাজারকে নিলামে তুলে এনে সাধারণ কৃষক, গরীব, দিনমজুর শ্রেণীর ওপর আর্থিক চাপ ও মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে চলেছে। এদের প্রচ্ছন্ন চাঁদাবাজির কারণে কৃষক তার পণ্য যথাযথ মূল্যে বিক্রি করতে পারছে না। তারা স্বাধীনভাবে হাটে বসে বা দাঁড়িয়ে নিজের গৃহের আঙ্গিনায় উৎপাদিত  পণ্য বা শাকসবজি বিক্রি করতে গেলেও চাঁদা দিতে হচ্ছে। কারণ তারা ইজারাদার, সরকারকে রাজস্ব দিয়ে এনেছে। ফলশ্রুতিতে হাটে টাটকা জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয় না হয়ে বাজারের অভ্যন্তরীন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কম মূল্যে ক্রয় করে নিয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি করে  চলেছে। তারা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাজারে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে এবং ক্রেতাকে তাদের দামেই কিনতে বাধ্য করে। এক্ষেত্রে পঁচনশীল কাঁচা সবজি পর্যন্ত উচ্চ মূল্যে বিক্রি করা হয়ে থাকে। জানা যায়, কাঁচামাল বা সবজি বাসী বা পঁচে গেলেও তারা কম দামে বিক্রি করে না। প্রয়োজনে আবর্জনা হিসেবে ফেলে দিবে তবুও না। কাজেই মানুষ বাধ্য হয়েই চড়া দামে কিনে নেয়। অথচ অতীতের মতন বাজারে গ্রামের মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকলে ভালো টাটকা জিনিস কম মূল্যে ক্রয় করতে পারতো। অবস্থাদৃষ্ঠে দেখা যায়, সারাদেশেই এমন দুর্বিষহ সিন্ডিকেটের এক অভয়ারণ্য সৃষ্টি হয়ে আছে। একে স্পর্শ করে সাধ্য কার ? কে ভাঙতে পারে এমন প্রকাশ্যে দৌরাত্ম্য ও ˆনরাজ্য? ৩. গ্রামীণ জনপদে আরও একটি অদ্ভুত দৃশ্য নজর কাড়ে, তা হলো যত্রতত্র হাট বাজারের সৃষ্টি। বিগত দুই দশকে দেশজুড়ে সড়ক যোগাযোগের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আশীর্বাদে রাস্তার ওপর গড়ে ওঠছে বাজার। কোনো একটা সংযোগ সড়ক বা ছোটখাটো চৌরাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্টান ঘিরে  রাতের মধ্যে মাজার সৃষ্টি হওয়ার মত বাজার বসে যাচ্ছে। এ যেন হঠাৎ গজে ওঠা এক আশ্চর্য জনঅরণ্য। প্রাথমিকভাবে সঙ্গে দুয়েকটা চা স্টল, কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার, একজন পান সিগারেটের বাক্স নিয়ে বসে পড়লো, একপাশে ব্রয়লার মুরগির একটা উদাম চাল, সকালে দুধ বিক্রির জন্য দু'চারজন বৃদ্ধ কৃষক হাতে জগ নিয়ে হাজির। এসব নিয়েই হয়ে গেল আজগুবি এক বাজার। আর ঠেকায় কে? কারও অনুমতি নেয়ার অবকাশ নেই, সরকার, জনপ্রশাসন নীরব। রাস্তায় যানজট, দুর্ঘটনা, মৃত্যু, কলহ, মামলা মোকদ্দমার অবস্থা সবই নিত্যদিনের চিত্র। আর এজাতীয় পথবাজারগুলোও চাঁদাবাজির হাত থেকে মুক্ত নয়। হাটবাজারের জন্যে সরকারের বিদ্যমান নীতিমালা রয়েছে, যদিও এ-সবের তোয়াক্কা করছে না কেউ । গ্রামে রাস্তা দখল করে হাট বসানোর পেছনে থাকে স&হানীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য। আজকাল বাজার হাট, ছোটখাটো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ওয়ার্ড পর্যায়ের পদ-পদবি, রাস্তায় বুকচিতিয়ে দাঁড়িয়ে যানবাহনের টোকেন দেয়ার দায়িত্ব প্রদান ইত্যাদি বিতরণ করেই তৃণমূল রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। এগুলোই গ্রামীণ রাজনীতির মূলমন্ত্র হয়ে ওঠেছে। ধীরে ধীরে এটাই যেন দেশের জন্যে এক অপ্রতিরোধ্য নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর থেকে বেরিয়ে না আসা অবধি নির্বাচন, গণতন্ত্র, সুশাসন প্রত্যাশা করা নিরর্থক এবং অরণ্যেরোদন ছাড়া কিছু আর কিছু হবে না।  ৪. সকলের জানা আছে, গ্রামের বাজারগুলোতে নিজস্ব কমিটি রয়েছে। এদের প্রধান কাজ হলো অভ্যন্তরীন শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ কমিটির নির্বাচনেও সরকার দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এটা সবসময়ই কমবেশি ছিল। স&হানীয় নেতাদের মধ্য থেকে ভোটের মাধ্যমে বা ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন হয়ে থাকে। হাট-বাজারের জন্যে পাহারাদার, ঝাড়ুদার, সুইপার নিয়োগ করা এদের কাজ। যদিও পয়ঃপ্রণালী, পাবলিক টয়লেট, শেড, ভেতরের গলি মেরামতের দায়িত্ব সরকারের। এর জন্য সহানীয় সরকার বিভাগের বাৎসরিক বরাদ্দ আছে। তথাপি এ-সবের অজুহাতে বাজারের  সহায়ী দোকান এবং বাইরে বসা ভাসমান বিক্রেতাকেও চাঁদা গুনতে হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সভা-সমিতি, পূজা-পার্বন, উৎসব উদযাপন, নেতার আগমন, তোরণ নির্মাণ, সংবর্ধনা ইত্যাদি নানা কারণে চাঁদা তোলা হয়। এসব বাড়তি ব্যয় নির্বাহ করতে নিত্যকার পণ্যের ওপর মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। আজকাল লাখ করা গেছে, যে গ্রামে শাক-সবজি, কলা, পেপে, আনারস, কচুর লতি, তরমুজ প্রচুর পরিমানে উৎপাদিত হচ্ছে সেখানকার নিকটবর্তী হাটে এসবের দাম শহরের তুলনায় অধিকতর। তার মূল কারণ, পণ্যগুলো সরাসরি হাটে বিক্রি করার সুযোগ না থাকা। যা একসময়ে অবাধে হাটে প্রবেশ করতে পারতো ও বিক্রির সুবিধা ছিল। জনসাধারণ স্বাধীনভাবে যাছাই বাছাই করে কিনতে পারতো। ফলশ্রুতিতে এখন গ্রামে গিয়ে নির্ভেজাল, প্রাকৃতিক, তরতাজা সবুজ কিছু ক্রয় করে খাওয়ার দিনও ফুরিয়ে গেছে। ঘুরে ফিরে সমগ্র দেশ, সমুদ্র থেকে পাহাড়, উজান থেকে ভাটি পর্যন্ত কোনো একটা জনপদ চাঁদা তোলার নতুন নতুন উদ্ভাবনী কলাকৌশলের বাইরে যেতে পারছে না। মনে হয়, কেন্দ্র-প্রান্ত, ঊর্ধ্ব-অধো একাকার হয়ে সরবে, নিভৃতে চলছে একে অন্যের কাছ থেকে  তোলা চাঁদার মহোৎসব। সমাজের অন্য সবকিছু সত্য বা অর্ধ সত্য হলেও চাঁদা আদায় শতভাগ সত্য। যেন চারদিকে চাঁদার জয়জয়কার, চাঁদাই শক্তি। ৫. দেশে নতুন সরকার এসেছে। তাকে অনেক কিছু নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। তবে গতানুগতিকতা দিয়ে গণমানুষের আসহা, বিশ্বাস অর্জন করা কঠিন হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্টার লক্ষে গ্রাম এবং গ্রামীণ জনপদকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারের পরিবর্তন হলে জনগণও নড়েচড়ে বসে, এক আকাশ প্রত্যাশা বুকে লালন করে। একেবারে অভিনব, অভূতপূর্ব কিছুর আশা করে অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে সবকিছু যেন ধূসর বিবর্ণ আবছায়ায় পরিণত হয়। এদেশে দশকের পর দশক এটাই হয়ে আসছে। কাজেই দেশের সহানীয় সরকার ব্যবসাকে আরও গতিশীল, জোরদার এবং কার্যকর করার বিকল্প নেই। ভালো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়ে এদের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। এদের ওপর জাতীয় নেতৃত্বের সরাসরি খবরদারি থাকবে না। ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলাপরিষদে জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকেও তাৎক্ষণিক আইনের শাসনের অধীন করতে হবে। দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে এসবের ওপর দৃষ্টিপাত খুবই জরুরি। তবেই পরিবর্তন সম্ভব অন্যথায় নয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার]

জনস্বাস্থ্য সংকট ও নীরব হুমকি: বাংলাদেশের টিকা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র

ঢাকার শিশুদের কান্না আর গ্রামের মায়েদের দীর্ঘশ্বাস, এই নীরব শব্দগুলোই এখনও প্রতিধ্বনি করছে দেশের মনোজগতে। সাম্প্রতিক হাম (মিজলস) প্রাদুর্ভাব, যেখানে মাত্র এক মাসে শতাধিক শিশু প্রাণ হারিয়েছে এবং হাজারেরও বেশি আক্রান্ত হয়েছে, তা প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের টিকা ব্যবস্থাপনা আজ কেবল রোগ প্রতিরোধের হাতিয়ার নয়, এটি একটি জীবনের মূল্যবান জনস্বাস্থ্য পরীক্ষার মঞ্চ। এই পরীক্ষায়, যদি সরকারের মূল প্রতিশ্রুতি, প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মানুষের প্রতি মানবিক দায়িত্ব পরিমাপ করা হয়, তাহলে ফলাফলটি হবে উদ্বেগজনক। সারাদেশের শিশু, মায়েরা, প্রবীণরা আজ নীরব হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, কারণ টিকা কার্যক্রম প্রায় স্থগিত, মজুত নেই বা খুব কম, এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। গভীর সংকটের মুখে কর্তৃপক্ষ কতটা প্রস্তুত ছিল?বাংলাদেশ বছর দশেক ধরে সফলভাবে টিকাদান কর্মসূচি চালিয়েছে। ১৯৭৯ সালে মাত্র ২ শতাংশ থেকে আজ ৮১.৬ শতাংশ পর্যন্ত সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে। তবে এই কভারেজের ভেতর অন্তত ৪ লাখ শিশু এখনও সম্পূর্ণ টিকাযুক্ত নয়, এবং প্রায় ৭০ হাজার শিশু কোনো টিকা পায়নি, এটি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে বড় উদ্বেগের বিষয়। ঘাটতি এবং সংগঠনিক বিভ্রাটকরোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ে পরিকল্পনায় বিরতি, ইপিআই কর্মসূচির অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) স্থগিত, সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা এবং স্বাস্থ্যকর্মী সংকট, এসব মিলিয়ে টিকা বিতরণ প্রক্রিয়া ক্রমশ ঠেকছে। প্রায় ৪০ শতাংশ ভ্যাকসিনেশন পোস্ট শূন্য এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ৪৩ শতাংশ পদ এখনও পূরণ করা হয়নি, এটি একটি কার্যকর জনস্বাস্থ্য কাঠামো চলমান রাখার জন্য গুরুতর সংকেত। এখানে শুধু সংখ্যা নয়, মানবিক পরিণতি আছে: গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা না পেয়ে শিশুরা অসুস্থ হচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং প্রিয়জনদের চোখের সামনে জীবনের আলো নিভে যাচ্ছে। এই সংকট শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যর্থতা নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংগঠনিক ত্রুটি, দুর্নীতি ও সদিচ্ছার অভাবের প্রতিফলন, যেখানে সময়মতো সিদ্ধান্ত, পর্যাপ্ত মজুত ও কার্যকর সমন্বয় নেই। টিকা ও রোগ প্রতিরোধ: বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের রক্ষাকবচ কি ভঙ্গুর?টিকা মানবজীবনের অন্যতম রক্ষাকবচ, যা সমাজে রোগের আগ্রাসন ঠেকায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শক্ত রাখে। হাম, পোলিও, ডিফথেরিয়া, টিটেনাস, হেপাটাইটিস—এই রোগগুলোতে টিকাদানই একমাত্র মিত্র, একমাত্র নিরাপত্তা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে টিকাদানের সময়মতো শেষ ডোজ না পৌঁছানো, মজুদের অভাব ও সংগঠনিক ফাঁক-ফোকর শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে দিয়ে তাদের প্রাণকেন্দ্রিক ঝুঁকিতে ফেলছে। প্রচলিত তথ্যমতে পূর্ণ টিকাদান কভারেজ থাকলেও প্রায় ৪ লাখ শিশু এখনও সম্পূর্ণ টিকা পাননি এবং কয়েক হাজার শিশু এখনও আংশিক টিকাপ্রাপ্ত; এই গ্যাপগুলোই বর্তমানে হামের মতো সংক্রামক রোগের পুনরুত্থানে সহায়তা করছে। একটি সামান্য ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা, যেমন টিকা মজুতের গাফিলতি বা সময়মতো ডোজ না পৌঁছানো, সে কোনো ‘ছোট ভুল’ নয়। সাম্প্রতিক হাম মহামারী, যেখানে এক মাসের কম সময়েই ১০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু ঘটেছে এবং হাজারেরও বেশি শিশু আক্রান্ত হয়েছে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে প্রতিটি অনিয়ম, প্রতিটি অধ্যায় ভুলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাচ্ছে, এবং মহামারীর আশঙ্কা দিনে দিনে বেড়ে উঠছে। রোগ বিস্তারের কারণগুলো: একটি জটিল বাস্তব চিত্রপ্রতিটি মৃত শিশুর পেছনে সহজ কারণ নেই; এখানে জটিল বহু কারণ আছে, যার মধ্যে:অপর্যাপ্ত টিকাদান ও পরিকল্পনা: নিয়মিত কর্মসূচি ও বিশেষ টিকা উদ্যোগের মধ্যে বিরতি রোগ প্রতিরোধ কাঠামোকে দুর্বল করেছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে বড় টিকা ক্যাম্পেইন না হওয়ায় আগের মতো শক্ত ইমিউনিটি গড়ে ওঠেনি। জনসংখ্যার ঘনত্ব ও অপুষ্টি: তরুণ শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা ইমিউনিটি কমায়, রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়ায়। স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা: টিকা কেন্দ্রগুলোতে ভ্যাকসিন না থাকলেই শিশুর পরিবারগুলোকে ঘুরে বেড়াতে হয়; অনেক সময় সুবিধা মিলেও সময়মতো ডোজ পায় না। দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের ছায়া: সরবরাহ শৃঙ্খল সরল না থাকায় অসংগতি ও গড়বড়ের সুযোগ ˆতরি হয়, যা সেবায় বিলম্ব ও টিকা পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করে। জনসচেতনতার অভাব: অনেক অভিভাবক প্রথম ডোজ পেলেই চিন্তামুক্ত থাকেন; কিন্তু ডাক্তাররা বলছেন, ডোজ ছেদ ঘটলে রোগের বিরুদ্ধে সমগ্র নিরাপত্তাজাল ভঙ্গুর হয়ে যায়। সরবরাহ ও তথ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা: সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা শিশুদের টিকাদান ইতিহাসের তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ না হলে কোন শিশুর কোন ডোজ বাকি তা জানাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আগাম পদক্ষেপের জরুরি কারণ: বাংলাদেশ কেন এক নিঃশব্দ সংকটের মুখোমুখি?বাংলাদেশে জনসংখ্যার চাপ, পরিবেশগত ঝুঁকি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, এই তিনটির সমন্বয়ে একটি সংকট ˆতরি হয়েছে, যা দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলে দেশকে সংক্রামক রোগের পুনরুত্থান ও প্রাণহানির ঝাঁপটা ধরা অবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। শুধু সংখ্যাটুকু নয়, এই সংকটের পেছনে সামাজিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার বাস্তব চিত্রও রয়েছে। বাংলাদেশের মতো বিশ্বে অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশে প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি শিশু, প্রতিটি প্রান্তিক এলাকা, সবাইকে টিকাদানের আওতায় আনতে বিশাল উদ্যোগ প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হলো:দক্ষ জনশক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক দুর্বলতা প্রকৃত সমাধানের পথকে বারবার ব্যাহত করছে, যেখানে সিদ্ধান্তগ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাঝে ইচ্ছাশক্তি ও কর্মদক্ষতার ফাঁক বিরাজমান। দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের ছায়া টিকাদান ও সরবরাহ শৃঙ্খলে অসঙ্গতি ˆতরি করছে, যার ক্ষেত্রে কখনো ভ্যাকসিন বিলম্ব, কখনো পরিবহন ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা অমিলই বিভিন্ন অঞ্চলে টিকা পৌঁছাতে ব্যর্থতা সৃষ্টি করছে। জবাবদিহিতার ঘাটতি প্রশাসনিক ভুল, দেরি বা অনজরদারি কোথায় হচ্ছে, তা জানতে এবং সংশোধন করতে বাধা সৃষ্টি করছে, এটিই আজকের সংকটের বড় অন্তর্হিত কারণ। এই সব মিলিয়ে পরিস্থিতি শুধু ‘জটিল’ নয়, বরং এক আগাম পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা, যার প্রতিটি দিক এখনই শক্ত হাতে নেয়া উচিত। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার উপায়: পথের মানচিত্রপ্রতিটি দেশই আজ শিক্ষা নিচ্ছে, শুধু পরিকল্পনা করা নয়, পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেয়াই বাঁচিয়ে রাখে মানবজীবন। বাংলাদেশকে যদি সত্যিকারের নিরাপদ জনস্বাস্থ্য কাঠামো গড়ে তুলতে হয়, তাহলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলোকে আর অভিসন্ধি হিসেবে দেখা যাবে না, এগুলো এখনই বাস্তবায়নযোগ্য অপরিহার্য কর্মসূচি:১. শক্তিশালী জাতীয় টিকা নীতি প্রণয়নএকটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি নীতি ˆতরি করতে হবে, যা শুধু টিকা কেনা বা বিতরণের হিসাব রাখবে না; তা হবে সম্পূর্ণ টিকা জীবনচক্র ও রোগ প্রতিরোধ পরিকল্পনার একটি রূপরেখা, যাতে স্বচ্ছতা, নিরীক্ষণ ও ফলাফলের মাপ আছে। ২. ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও নজরদারি ব্যবস্থা চালুদেশব্যাপী টিকা গ্রহণ ও রোগের বিস্তারকে একক, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নজরদারি করলে জানতে সহজ হবে কোথায় গ্যাপ আছে, কোন খাতে অগ্রগতি কম, কারা এখনও সুরক্ষিত হয়নি। এটি শুধু তথ্য রাখবে না; এটি হবে অগ্রগতির পথনির্দেশক মানচিত্র। ৩. সরবরাহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নভ্যাকসিন স্টককে সঠিকভাবে ট্র্যাক করা, পরিবহনে জট কমানো, টিকা ফ্রিজ বা কোল্ড চেইন ব্যবস্থা সব জায়গায় শক্ত করা—এগুলো রোগ প্রতিরোধের নীরব ঘাতকগুলোকে অচল করে দেবে। ৪. স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাসরকারি ও ব্যক্তিগত খাতে যেসব অনিয়ম, সিন্ডিকেট বা দুর্নীতি আছে, তার বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতার কাঠামো ˆতরি করতে হবে। তখনই সরকারি প্রচেষ্টা জনমানুষের আস্থা ও অংশগ্রহণে রূপান্তরিত হবে। ৫. গবেষণা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বৃদ্ধিশুধু টিকা না কিনে, শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রের বিনিয়োগ বাড়ালে রোগের প্রকৃতি, বিস্তার ও প্রতিরোধ কৌশলগুলোর উচ্চ মানের বিশ্লেষণ সম্ভব হবে। এটি ভবিষ্যতের প্রস্তুতিও নিশ্চিত করবে। ৬. জনসচেতনতা ও অংশগ্রহণ বাড়ানোশিক্ষা আর বার্তা শুধু প্রদর্শনের কথা নয়; তা জনগণের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় ঢুকে যাবে, তখনই রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম সফল হবে, যেন প্রতিটি পরিবারই একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ৭. আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করাবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, গ্যাভি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় হলে শুধু টিকা পাওয়া নিশ্চিত হবে না; বিশ্বমানের পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও কার্যকর বাস্তবায়নও সুদৃঢ় হবে। সরকারের জন্য সুপারিশ: এখনই সময়শুধু সমস্যাগুলো জানলেই হবে না, এগুলো মোকাবিলার জন্য রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বকে নিচের পথগুলো শক্ত হাতে নিতে হবে। স্বাস্থ্যখাতে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন: একটি শক্ত, রাজনৈতিক প্রভাবহীন কমিশন গঠন করা, যাতে ভুল, গাফিলতি, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের উৎসগুলো নির্ধারণ করা যায় এবং সংশোধনের রোডম্যাপ ˆতরি হয়। বাজেট বৃদ্ধি ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার: শুধু বেশি টাকা বরাদ্দ নয়, যেটুকু বরাদ্দ হয়, তা অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক জায়গায় ও সময়মতো খরচ হওয়া নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করা: শুধুমাত্র পদাধিকারী নয়, দক্ষ, শিক্ষিত, মানবিক ও সতর্ক নেতৃত্ব টিকাদান কর্মসূচির সব স্তরেই প্রয়োজন। নেতৃত্ব দেবে এমন ব্যক্তি নির্বাচিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সুইডেনের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলোকে ভিত্তি করে জাতীয় নীতির কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেন সেটি শুধু নথিতে না থেকে বাস্তবে কার্যকর হয়। পরিশেষে: বাংলাদেশে নিরাপদ স্বাস্থ্য, একটি জাতির দায়িত্বমানবজীবনের সুরক্ষা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব। একটি কার্যকর টিকা কর্মসূচি কেবল সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের হাতিয়ার নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানুষের জীবনের মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যকে শক্তিশালী করতে আজ দরকার সৎ নেতৃত্ব, নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছ প্রশাসন। প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি নীতি এবং প্রতিটি কার্যক্রম যেন মানুষের জীবনে বাস্তব সুরক্ষা এবং বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটায়। সুইডেনের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক মানের নির্দেশনা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতি অনুসরণ করলে দেশটি গড়ে তুলতে পারবে একটি মানবিক, টেকসই ও নিরাপদ স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে রোগ প্রতিরোধ কেবল লক্ষ্য নয়; এটি হবে প্রতিটি শিশুর হাসি, প্রতিটি পরিবারের নিরাপত্তা এবং প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি। একটি নিরাপদ, সুস্থ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার, আমাদের দায়িত্ব এবং আমাদের সময়ের চূড়ান্ত পরীক্ষা। [লেখক: সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন]

প্রতারণা, জালিয়াতির আইনি প্রতিকার

বিশ্বয়ানের যুগে প্রতারণার ধরণ পাল্টেছে। চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে প্রতারণা, জমি নিয়ে প্রতারণা, ভুয়া, জাল কাগজপত্র দেখিয়ে প্রতারণা, অনলাইন প্রতারণা, ব্যাংকিং প্রতারণা ইত্যাদি। দণ্ডবিধির ৪১৭ ধারায় প্রতারণার শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, যদি কোন ব্যক্তি প্রতারণা করে তাহলে সেই ব্যক্তি এক বৎসর পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে কিংবা অর্থদণ্ডে কিংবা উভয়দন্ডেই দণ্ডিত হবে। আমাদের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা কথা বা ভুল তথ্য দিয়ে অন্যকে বিভ্রান্ত করে তার কাছ থেকে টাকা, সম্পদ, মালামাল বা কোনও সুবিধা আদায় করাকে সাধারণত প্রতারণা বলা হয়। আরও সহজ করে বলতে গেলে কারও বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাকে ক্ষতির মুখে ফেলা মানেই প্রতারণা। যেমন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেয়া, চাকরি দেয়ার নাম করে টাকা নেয়া, সরকারি প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে টাকা নেয়া, ভিসা, ইমিগ্রেশন দেয়ার কথা বলে টাকা নেয়া ইত্যাদি। আবার অনেকে পণ্য বা সম্পত্তি নিয়ে প্রতারণা করে থাকে। যেমন ভুল তথ্য দিয়ে জমি বিক্রি করা, ভাড়া বাড়ি দিতে গিয়ে ডাবল বুকিং করা, নকল পণ্যকে আসল বলে বিক্রি করা। অনেকে নথিপত্র জাল করে থাকে। যেমন-ভুয়া সনদ, ভুয়া পাসপোর্ট, ভুয়া কাগজ দেখিয়ে ব্যবসা বা লেনদেন করা, জাল স্বাক্ষর ব্যবহার ইত্যাদি। অনলাইনে প্রতারণার মধ্যে রয়েছে বিকাশ/নগদ/রকেট অটিপি নিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়া, অনলাইন শপে টাকা নিয়ে পণ্য না পাঠানো, ফেইসবুকে লটারি, গিফট বা অফারের নাম করে টাকা নেয়া ইত্যাদি। আর ব্যাংকিং বা আর্থিক প্রতারণার মধ্যে রয়েছে চেক জাল করা, হঠাৎ ‘আপনি লোন পেয়েছেন’ বলে টাকা হাতিয়ে নেয়া ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতারণা। যেমন পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা, অন্যের নাম বা আইডি ব্যবহার করে সুবিধা নেয়া। ভুয়া আইনজীবী, ভুয়া ডাক্তার পরিচয় ইত্যাদি। আপনি এ জাতীয় প্রতারণার শিকার হলে প্রতিকার চাওয়ার প্রধান উপায় হচ্ছে নিকটস্থ থানা। প্রতারণার প্রমাণ সংগ্রহ করে নিকটস্থ থানায় লিখিতভাবে এজাহার দায়ের করুন। আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে থানা কোনো অভিযোগ পেলে মামলা নিতে আইনত বাধ্য, কারণ এ ধরনের গুরুতর অপরাধে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই তদন্ত ও গ্রেপ্তার করতে পারে। পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল (পিআরবি), ১৯৪৩ এর ২৪৩, ২৪৩ (চ), ২৪৪ (ক) ও ২৪৫ প্রবিধান এবং ফৌজদারি কার্যবিধির, ১৮৯৮’র ১৫৪ ধারানুযায়ী, ‘আমলযোগ্য প্রত্যেক অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের সামনে প্রদত্ত প্রথম তথ্য রেকর্ড করতে হবে সেটা প্রাথমিকভাবে সত্য হোক বা মিথ্যা হোক কিংবা গুরুতর হোক বা ক্ষুদ্র হোক অথবা দণ্ডবিধি বা অন্য কোন স্পেশাল বা আঞ্চলিক আইনের অধীন শাস্তিযোগ্য যাহাই হোক না কেন। আবার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৭ (১) (গ) ধারায় বলা হয়েছে যে, থানার ওসি কাছে যদি এটা প্রতীয়মান হয় যে, মামলাটির পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই, তাহলে তিনি মামলাটির তদন্ত করবেন না। আবার দণ্ডবিধিতে উল্লেখিত ২১১ ধারায় মিথ্যা মামলা দায়েরের পাল্টা ব্যবস্থা রাখার ফলে থানায় মামলা রেকর্ড করার বিষয়টিকে ভারসাম্য করা হয়েছে। কোন কারণে থানা মামলা না নিলে আপনি সংশ্লিষ্ট জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে সরাসরি অভিযোগপত্র সি.আর মামলা দায়ের করতে পারবেন। আর অনলাইন প্রতারণার ক্ষেত্রে সাইবার ক্রাইম ইউনিট সিআইডি, সাইবার পুলিশের ওয়েবসাইটেও গিয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন। ব্যাংক, মোবাইল বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আপনি প্রতারিত হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইনে সাইবার ট্রাইবুনালে মামলা করে প্রতিকার পেতে পারেন। তবে মামলা করতে হলে অবশ্যই প্রমাণপত্র সংগ্রহ করতে হবে। প্রতারণার প্রমাণ হিসেবে স্ক্রিনশর্ট, রেকর্ডিং, চুক্তি, মেসেজ, টাকা লেনদেনের প্রমাণ (বিকাশ/ব্যাংক/চেক), ব্যক্তির নাম ঠিকানা, মোবাইল নম্বর (যতটুকু জানা হয়), সঙ্গে উপযুক্ত সাক্ষী-তাহলেই আপনি প্রতারককে শাস্তি দিতে পারবেন। [লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

দিল্লির নজরে ঢাকা পোস্টিং

হাইকমিশনার পদে নতুন মুখ, জল্পনায় দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার নিয়োগ ঘিরে জল্পনা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় বর্মা ২০২২ সাল থেকে ঢাকায় দায়িত্বে রয়েছেন। কূটনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন, তাঁকে শীঘ্রই বেলজিয়ামে পাঠানো হতে পারে।এই প্রেক্ষাপটে নতুন মুখ হিসেবে সামনে এসেছে এক চমকপ্রদ নাম দীনেশ ত্রিবেদী। যদিও এখনো পর্যন্ত ভারত সরকারের তরফে এই নিয়োগ নিয়ে কোনও সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি, তবুও দেশের একাধিক জাতীয় সংবাদমাধ্যমে এই সম্ভাবনার কথা প্রকাশ্যে এসেছে।আগেও দু’একজনের নাম ভেসে উঠেছিল, তবে এখন ফের আলোচনার কেন্দ্রে দীনেশ ত্রিবেদী।সাধারণত এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদে Indian Foreign Service-এর অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদেরই নিয়োগ করা হয়। সেই জায়গায় একজন সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে পাঠানোর সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই কূটনৈতিক মহলে বিস্ময় তৈরি করেছে।দীনেশ ত্রিবেদীর রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক। জনতা দল থেকে শুরু করে তৃণমূল কংগ্রেস—এবং পরবর্তীতে বিজেপি বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্ব অতিক্রম করেছেন তিনি। একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে দিল্লির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ২০০৯ সালে লোকসভায় নির্বাচিত হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এবং পরে রেলমন্ত্রী হন।তবে রেলভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয় এবং শেষপর্যন্ত ২০২১ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি সংসদের ডিজিটাল লাইব্রেরি সংক্রান্ত দায়িত্বে রয়েছেন।উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, দীনেশ ত্রিবেদী বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি এবং গুজরাতি চারটি ভাষাতেই সাবলীল, যা বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগে একটি বাড়তি সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।এই প্রসঙ্গে ত্রিবেদী নিজে জানিয়েছেন, “সরকার যদি আমাকে এই দায়িত্ব দেয়, তা হলে সেটা আমার জন্য সম্মানের। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নে আমি আমার সাধ্যমতো কাজ করব।”তবে সবশেষে বলা যায়, এখনও পর্যন্ত এই নিয়োগ পুরোপুরি জল্পনার স্তরেই রয়েছে। সরকারিভাবে কোনও ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।তবে এই সম্ভাব্য নিয়োগ যদি বাস্তবায়িত হয়, তা হলে এটি হবে একটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ কারণ কূটনৈতিক পরিষেবার বাইরে থেকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি মিশনে পাঠানো বিরল ঘটনা। এর ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের রাজনৈতিক মাত্রা আরও স্পষ্ট হতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।  

রাজনীতি, বাস্তবতা ও বার্তা কী দিলেন মোদি?

শনিবার রাত সাড়ে ৮টায় হঠাৎ দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছিল কৌতূহল ও জল্পনা। শেষ পর্যন্ত সেই ভাষণে ভার‌তের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্পষ্ট করেন, তার বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু মহিলা সংরক্ষণ বিল এবং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোয় নারীদের ভূমিকা।ভাষণের শুরুতেই তিনি বলেন, ভারত এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে উন্নয়ন শুধু অর্থনীতি বা পরিকাঠামোয় সীমাবদ্ধ নয়—সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও সমান অংশগ্রহণ জরুরি। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা অর্থাৎ মহিলাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হলে “বিকশিত ভারত” গড়া সম্ভব নয়।তিনি এই বিলকে একটি “ঐতিহাসিক দায়িত্ব” হিসেবে ব্যাখ্যা করে বলেন, গত ২৫-৩০ বছর ধরেই এই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল, কিন্তু নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।এখানেই তিনি বিরোধীদের দিকে পরোক্ষভাবে কটাক্ষ করে বলেন, যারা আজ প্রশ্ন তুলছেন, তাদেরই অতীতে সুযোগ ছিল এই ধরনের সংস্কার আনার। বর্তমান সরকার সেই দীর্ঘদিনের অপূর্ণ কাজ পূরণের চেষ্টা করছে। একইসঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন, এই বিল কার্যকর হলে কোনও রাজনৈতিক দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং দেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।ভাষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে ভার‌তের প্রধানমন্ত্রী পঞ্চায়েত স্তর থেকে উঠে আসা মহিলা নেতৃত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গ্রাম স্তরে ইতিমধ্যেই বহু মহিলা সফলভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এখন সময় এসেছে তাদের জাতীয় রাজনীতিতে বৃহত্তর ভূমিকা দেওয়ার। এই পরিবর্তন শুধু প্রতিনিধিত্ব বাড়াবে না, বরং নীতিনির্ধারণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও নিয়ে আসবে।তবে ভাষণের মধ্যে সবচেয়ে রাজনৈতিক বার্তা ছিল বিরোধীদের উদ্দেশে আবেদন। তিনি বলেন, এই বিষয়টিকে রাজনৈতিক রং না দিয়ে “বন্ধুত্বপূর্ণ পরামর্শ” হিসেবে দেখা উচিত এবং সব দলকে একসঙ্গে এগিয়ে এসে বিলটি পাশ করানো উচিত। দেশের মানুষ এই বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যারা নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাদের প্রতি জনমত কঠোর হতে পারে।অন্যদিকে, এই ভাষণের আগেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী অভিযোগ করেন, কেন্দ্র সরকার মহিলা সংরক্ষণ বিলকে সামনে রেখে ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চাইছে। তৃণমূল কংগ্রেস কখনওই বিলের বিরোধিতা করেনি, বরং বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েই তাদের আপত্তি।একইভাবে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বাদ্রা লোকসভায় বিল পাস না হওয়াকে “গণতন্ত্রের জয়” বলে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, বিরোধীদের ঐক্য সরকারকে আটকে দিয়েছে। এর পাল্টা হিসেবে বিজেপি নেতৃত্ব বিরোধীদের অবস্থানকে দ্বিচারিতা বলে আখ্যা দেয়।সংসদীয় অঙ্কের দিক থেকেও পরিস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ। সংবিধান সংশোধনী বিলটি পাসের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না পাওয়ায়, পক্ষে ২৯৮ এবং বিপক্ষে ২৩০ ভোট পড়ে বিলটি গৃহীত হয়নি। ফলে এই বিল এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে গেলেও তার বাস্তবায়ন অনিশ্চিত রয়ে গেছে।সব মিলিয়ে, শনিবার রাতের এই ভাষণ শুধু একটি নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাও বয়ে এনেছে। একদিকে সরকার এটিকে নারীর ক্ষমতায়নের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে বিরোধীরা বাস্তবায়নের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ফলে মহিলা সংরক্ষণ বিল এখন দেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করবে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও বাস্তব সিদ্ধান্তের উপর।

নির্বাচনী ধারাবাহিকতা না নির্বাচনপূর্ব ধারার এক্সটেনশন!

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমীন সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন ‘আমাদের সরকারের এই ৬০ দিনে সবচাইতে বড় অর্জন বাংলাদেশের জনগণ তারেক রহমানকে বিশ্বাস করেছেন এবং তারেক রহমান জনগণকে বিশ্বাস করেছেন।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী কয়েকদিন আগে ফেইসবুক পোস্টে বলেছেন, ‘পাহাড়সমান সমস্যার ভার এবং মানুষের সীমাহীন প্রত্যাশার মধ্যে যাত্রা শুরু করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তার বিনয়, রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হয়েও সহজ জীবনযাপন, একাগ্রতা ও সময়ানুবর্তিতা মানুষের মধ্যে আস্থা ও আশার সঞ্চার করেছে।’ সত্যতা থাকলেও এসব কথা বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের দু’মাস পার হওয়ার আগেই ব্যাকারনের বর্তমান কাল (প্রেজেন্ট টেন্স) থেকে অতীত কালে (পাস্ট টেন্স) পরিণত হতে চলেছে। অর্থাৎ তারেক রহমান মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন এবং মানুষের মধ্যে আশা ও আস্থার সঞ্চার করেছিলেন। কিন্তু অল্প সময়েই আশা ভরসার জায়গাটা নিম্নগামী।মানুষ প্রথমেই ধাক্কা খেলো তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের দিনেই বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেখে। ইউনূস মনে করেছিলেন ‘রাষ্ট্র নায়ক’ হিসেবে তার উপর যে বিশাল দায়িত্ব তা সামাল দেয়ার জন্য তারও একজন ‘অজিত দোভাল’ লাগবে। তাই চটজলদি মার্কিন মুলুক থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসা হলো খলিলুর রহমানকে। ব্যক্তি হিসেবে নিঃসন্দেহে তিনি বিনয়ী ও বন্ধুসুলভ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব পালনে তো বিনয়ী হলে চলে না। নিরাপত্তা ইস্যুর সঙ্গে তো দেশের পররাষ্ট্রনীতিও যুক্ত! তাই দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অনেকটা নিস্ক্রিয় করে পররাষ্ট্র বিষয়ক ইস্যুতেও তিনি তার হাতে স্টিয়ারিং তুলে নেন। করিডোর, বন্দর সহ নানা ইস্যুতে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রাখছিলেন। ঐ সময়ে বিএনপি নেতৃত্বও ছাত্র উপদেষ্টাদের সহ তার অপসারন দাবী করেছিলেন। আমেরিকার সঙ্গে যে দেশ বিরোধী গোপন বাণিজ্য চুক্তি তা সম্পাদনে তিনিই নেতৃত্ব দেন। তাকেই টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে দেখে সবাই টাসকি খেলো। বুঝে নিলো ইউনূস মার্কিনী স্বার্থের সঙ্গে দেশকে ১৮ মাসে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখে গেছেন যে সরকার বদল হলেও তার থেকে বের হওয়ার পথ নেই। হয়তোবা লন্ডন সমাঝোতার অপ্রকাশিত শর্তে এমনটা উল্লেখ ছিলো!বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেখেও সবাই বিষ্মিত হলো। বিশ্ববিদ্যালয় ভাইস চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন বা জেলা পরিষদে প্রশাসক সব ক্ষেত্রেই দলীয় বিবেচনা থেকে নিয়োগ দান বিএনপিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আর মানুষ ক্ষুব্ধ হলো, বিবেকের দংশনে জর্জরিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার সহযোগী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দন্ডপ্রাপ্তদের জন্য শোক প্রস্তাব গ্রহণের বহর দেখে। অথচ নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের দল দাবী করে নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি জনগণের কাছে ভোট প্রার্থনা করেছে। জামাতকে স্বাধীনতা বিরোধী আখ্যায়িত করে তাদেরকে পরাভূত করার আহ্বান জানিয়েছে। সংসদ নেতা তারেক জিয়ার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে যখন বিতর্কিত ঐ শোক প্রস্তাবসমূহ গৃহীত হিসেবে গণ্য হলো তখন মনে প্রশ্ন জাগছিলো ’৭১-এর ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করার পর জিয়াউর রহমান যদি নিরস্ত্র অবস্থায় এই নিজামী- মুজাহিদদের সামনে পড়তেন তার পরিনতি তখন কী হতো! কী পরিনতি হতো আজকের সংসদের স্পিকার সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধা বীর বিক্রম মেজর হাফিজ উদ্দিনের যদি তিনি ’৭১-এ জামাতীদের হাতে ধরা পড়তেন?ক্রিকেটপ্রেমী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিত। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই ক্রিকেট খেলা নিয়ে মানুষের আগ্রহ। ক্রিকেট বোর্ডের নতুন এডহক কমিটি গঠন দেখে সেই মানুষ হতবাক। কমিটিতে প্রাধান্য পেয়েছেন সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতারা উত্তরাধিকাররা। পত্রিকায় প্রকাশিত তাদের একমাত্র ক্রেডেনশিয়াল-কে কোনো মন্ত্রী বা নেতার ছেলে, মেয়ে বা ভাই-বোন। কমিটি দেখে ক্রিকেটপ্রেমীরা বলছেন বিশ্বকাপ আমাদের ঘরে এই এলো বলে! নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রধান আশা ছিলো যে সরকার কতৃত্ববাদ, দলবাজি ও পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে দল ও মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করবে। স্বাধীন বিচার বিভাগের ব্যবস্থা করে আইনের শাসন এবং নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলে সুশাসন নিশ্চিত করবে, সীমাহীন দুর্নীতির যে রাজত্ব কায়েম হয়েছে তার লাগাম টেনে ধরবে। কিন্তু প্রত্যাশাকে হতাশায় পরিণত করে সংসদের প্রথম অধিবেশনতো প্রায় শেষ হতে চলেছে।ইউনূস আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারী হয়েছিলো যার মধ্যে ১১৩টি অধ্যাদেশ চলতি অধিবেশনে গৃহীত হয়েছে। ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল বা তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, দুদক আইন সংশোধন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত জরুরি অধ্যাদেশ। অধ্যাদেশের কারনেই এগুলো আইনে পরিণত করতে হবে তা নয়। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, দলের ইশতেহার এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষা এসব বিবেচনায় অধ্যাদেশ সমূহ বা তা প্রয়োজন মতো সংশোধন করেও আইন করা যেতো। কিন্তু চলে আসা কতৃত্ববাদী ব্যবস্থায় আইন, বিচার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দুর্নীতি, মানবিক অধিকার সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়াদির উপর লাগাম বিএনপি সরকার দলীয় ভাবে রাখতে চায়। অথচ অতি নিকট অতীত আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে সর্বক্ষেত্রে কতৃত্ববাদ কি ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনে।বিএনপি সেই সব অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে সুপারিশ করেছে যেগুলো দলীয়ভাবে তার পক্ষে যায়। যেমন ইউনূস সরকার জনপ্রতিনিধিদের ইচ্ছেমতো বরখাস্তের সুযোগ রেখে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। বিএনপি সেটার সুযোগ নিয়ে ঐ অধ্যাদেশকে আইনে পরিনত করেছে। অতীতে সব সরকারই স্থানীয় সরকারকে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চেয়েছে। সেই প্রচেষ্টার বিপরীতে কিছু করা হলো না। আওয়ামী লীগ আমলেও জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ছিল প্রক্রিয়াভিত্তিক ও শর্তসাপেক্ষ। এখন আওয়ামী আমল অপেক্ষা খারাপ আইন হলো।ইউনূস সরকারের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বেআইনি ঘোষণার সময় বিএনপি বলেছিলো নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে তারা নয়। এ বিষয়ে জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে। এই রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েই তারা ভোটের সময় আওয়ামী সমর্থকদের কাছে যায় ও তাদের ভোট চায়। আওয়ামী লীগকে ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে জনগণকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন চব্বিশের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেখানেও রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ না করার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল। ইউনূস সরকার ঐ রিপোর্টকে বিচার প্রক্রিয়ায় এবং রাজনৈতিকভাবেও কাজে লাগালেন। কিন্তু রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না করার সুপারিশ মানলেন না। বিএনপিও পূর্বের ঘোষণা থেকে সরে এসে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আদেশকে আইনে পরিণত করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে রাখলো। সম্ভবত স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগকে দল গোছানোর সুযোগ না দেয়া এবং নৌকা সমর্থকদের যে ভোট এবার ধানের শীষে এসেছে তার একটা অংশ স্থায়ী করার লক্ষ্যে বিএনপির এ প্রচেষ্টা। আবার এ আইন ‘৭১ এর যুদ্ধাপরাধী দলের বিরুদ্ধে প্রয়োগের রাস্তাও কিন্তু খোলা থাকলো। কেননা বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বদল আনলেও এটা কিন্তু বহাল আছে যে, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন তারাই মুক্তিযোদ্ধা। অর্থাৎ দেশের আইন অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরোধী অবস্থানে রয়েছে জামাত।সংসদে কোনো সিদ্ধান্ত যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়, সেটি গণতন্ত্রের জন্য স্বস্তির সংবাদ হতে পারে না। আবার আওয়ামী লীগ নিয়ে পরিস্থিতিটা এমন, ‘যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়াপড়শীর ঘুম নাই’। তারা এ মূহুর্তে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান কিনা তাও স্পষ্ট নয়। দেশে যে বিরাট রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে গেছে, মানুষের বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মনোজগতে যে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে সেসব বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের হুঁশ আছে বলেও মনে হয় না। যাক আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগেরটা বুঝুক। কিন্তু ভয়টা অন্যখানে। ভয় হয় এ ধরনের আইন বুমেরাং না হয়ে আসে। এটাতো আমাদের অজানা নয় এক এগারোর ‘মাইনাস টু’ থিওরির প্রবক্তারা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে ক্রিয়াশীল ছিল এবং আছে। জুলাই অভ্যুত্থানে পরেও তারা কিন্তু সে লাইনে চেষ্টা করেছে। সেভাবে বয়ান সামনে এনেছে। কিন্তু পরিস্থিতির মোড় সে দিকে ঘুরানো সম্ভব না হওয়ায় ‘লন্ডন ˆবঠকের’ আয়োজনে যেতে হয়। বিএনপিরও তো অজানা নয়, এবারের নির্বাচনে জামাত আমীর এবং এনসিপির আহবায়কসহ কয়েকজনকে জিতিয়ে আনতে বিশেষ শক্তি যে কৌশলী ভূমিকা রেখেছে সে ক্ষেত্রে বিএনপিকে অসহায় মনে হয়েছে।তবে সবটা দেখে মনে হচ্ছে সরকারী দল ও বিরোধী দলের মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত সমঝোতার মধ্য দিয়েই সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হবে। সরকারী দল শোক প্রস্তাব, জুলাই যোদ্ধা দায়মুক্তি, জুলাই স্মৃতি ঘর প্রতিষ্ঠা, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখা ইত্যাদি বিষয়ে বিরোধী জোটকে খুশী করেছেন, বিপরীতে বিচারালয়, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, দুদক, মানবাধিকার বিষয়ক ব্যবস্থা নিজেদের কর্তৃত্বে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার লাগাম কতৃত্ববাদী পন্থায় আরো শক্তভাবে ধরতে চেয়েছেন। অবশ্য দুদক ও মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে আরও শক্তিশালী করে পরবর্তী সময়ে আইন করার প্রতিশ্রুতি বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। বিরোধী জোট যতটুকু অর্জন করেছে আপাত তাতেই খুশী। কিন্তু বিরোধী হিসেবে রাজনৈতিক স্টান্টবাজি অনুযায়ী যা যা বক্তব্য ও কর্মসূচী দেয়া প্রয়োজন তা বিরোধী জোট দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে। আসলে তারা কতৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরোধী নয় বরং কতৃত্ববাদী ব্যবস্থার মাধ্যমে উগ্রবাদী ও ধর্মান্ধ রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য— যেমনটা তারা করেছেন ইউনূসের কর্তৃত্ববাদী শাসনকে ব্যবহার করে। ‘সংস্কার’ শব্দটি তাদের দূরভিসন্ধি বাস্তবায়নের ঢাল মাত্র। তবে দায়মুক্তিসহ নানা বিষয় ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেয় বলা মুশকিল। ইউনূস আমলজুড়ে মব সন্ত্রাস সহ মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙা, মাজার ভাঙা, হত্যাকান্ড সংঘটিত করা, ছায়ানট-উদীচী ও সংবাদমাধ্যমে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় তো দায়মুক্তি দেয়া হয়নি। থানা থেকে অস্ত্র লুটের ঘটনায়ও দায় মুক্তি দেয়া হয়নি। কানে টান পড়লে মাথাও আসবে।ইউনূস আমল বা অনির্বাচিত আমলের সমাপ্তি হলেও যে কাউকে খুনের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে আটক করা, রিমান্ডে নেয়া ও জেলে পুরে রাখার ‘ ইউনূস - আসিফ নজরুল সংস্কৃতি’ বিএনপি আমলেও চালু আছে। প্রতিদিনই এ ধরণের গ্রেফতারি চলছে। ঘটনা কই আর গ্রেপ্তার কই— মানুষ মিলাতে পারে না। ঘটনার জন্য মামলা হচ্ছে, না মামলার জন্য ঘটনা সাজিয়ে রাখা আছে! বিএনপি আমলেও মাজারের উপর হামলা ও পীরকে পিটিয়ে মারার ‘তৌহিদী জনতা’ সংস্কৃতি চালু আছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ‘ডাস্টবিন শফিক’ এখনো ফেসবুকে উষ্কানিমূলক স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। জ্বালানি সংকটের এই সময়ে তিনি স্ট্যাটাস দিলেন আমাদের সময়ে এ পরিস্থিতি হলে ‘ওই চল যমুনা যাই!! ...... হতো।’ তিনি কি প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন (না থাকলেও সরকারিভাবে যমুনা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) ঘেরাও করার উষ্কানি দিলেন? অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মত, ২০০৮ সালের নির্বাচিত সরকারকে ক্রমান্বয়ে এক এগারো সরকারের এক্সটেনশনে পরিণত করা হয়েছিলো। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে জনমানসে প্রশ্ন জাগছে তাহলে ২০২৬-এ নির্বাচিত সরকারকেও কি ইউনূস সরকারের একধরনের এক্সটেনশনে পরিণত করার জন্য অপ্রকাশ্য কুশীলবরা সক্রিয়?(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

ভিডিও

টস হেরে ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশ

তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আজ সোমবার সকালে টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিউই অধিনায়ক টম ল্যাথাম। ফলে টস হেরে শুরুতে ফিল্ডিংয়ে নামছে স্বাগতিক বাংলাদেশ।সিরিজের প্রথম ম্যাচে ২৬ রানে হারার পর আজ শান্ত-মিরাজদের জন্য এটি এক বাঁচা-মরার লড়াই। সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচে জয়ের কোনো বিকল্প নেই টাইগারদের সামনে। বিপরীতে, আইপিএল ও পিএসএলের কারণে নিয়মিত একাদশের অনেক তারকাকে ছাড়াই খেলতে আসা নিউজিল্যান্ডের সামনে সুযোগ আজই সিরিজ নিশ্চিত করার।দুই দলের একাদশ:বাংলাদেশ আজ পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে মাঠে নামলেও কিউইরা খেলছে অনেকটা নতুন চেহারার দল নিয়ে।বাংলাদেশ একাদশ: তানজিদ হাসান তামিম, সাইফ হাসান, সৌম্য সরকার, নাজমুল হোসেন শান্ত, লিটন দাস, তাওহীদ হৃদয়, মেহেদী হাসান মিরাজ, রিশাদ হোসেন, তাসকিন আহমেদ, নাহিদ রানা ও শরীফুল ইসলাম।নিউজিল্যান্ড একাদশ: হেনরি নিকোলস, নিক কেলি, উইল ইয়ং, ডিন ফক্সক্রফ্ট, টম ল্যাথাম, মুহাম্মদ আব্বাস, জশ ক্লার্কসন, নাথান স্মিথ, ব্লেয়ার টিকনার, উইল ও'রুর্ক ও জেডেন লেনক্স।  

টস হেরে ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশ
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৩৬ জন