সংবাদ | বাংলা নিউজ পোর্টাল - সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় গুলিতে যুবক নিহত

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় গুলিতে যুবক নিহত

রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলি ও ছুরিকাঘাতে রাকিব আহমেদ (২৫) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন। রোববার (১৫ মার্চ) রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটেছে।গুলিবিদ্ধ ও রক্তাক্ত অবস্থায় রাকিবকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।  ঘটনার পরই এক তরুণকে আটক করেছে পুলিশ।রাকিব আহমেদ ভোলা সদরের চৌমুহনী গ্রামের তারিকুল ইসলাম খোকনের ছেলে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৈত্রী হলের কর্মচারী। রাকিব পরিবার নিয়ে রাজধানীর নিমতলী নাজিম উদ্দিন রোড এলাকায় থাকতেন। পাশাপাশি বোরহান উদ্দিন কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।শাহবাগ থানা-পুলিশ জানায়, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সিঁড়িতে বসে রাত সোয়া নয়টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন রাকিব। এ সময় তিন-চারজন যুবক হঠাৎ এসে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে তাকে। ঘটনায় সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন রাকিব। গুরুতর আহত করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। পরে রাকিবকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।শাহবাগ থানার এসআই মিঠু ফকির ঘটনা নিশ্চিত করে জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসকেরা রাকিবকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। পরে রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে মৃত ঘোষণা করেন।আলামিন নামে রাকিবের এক বলেন, রাতে বন্ধুরা মিলে শহীদ মিনারে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় কয়েকজন যুবক এসে রাকিবকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত ও গুলি করে আহত করে পালিয়ে যায়। পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় এক যুবককে আটক করা হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে তদন্ত চলছে।
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

ঈদ উৎসবের অর্থনীতি

উৎসব আমাদের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী উৎসব হলো এমন আনন্দঘন অনুষ্ঠান, যা সাধারণত ধুমধাম বা জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপিত হয়। এসব আয়োজনে সমাজের বড় একটি অংশ সম্পৃক্ত থাকে। উৎসবকে আড়ম্বরপূর্ণভাবে উদযাপন করতে মানুষ নানা ধরনের পণ্য ও সেবা ক্রয় করে এবং নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করে। উৎসব উপলক্ষে উপহার দেয়া-নেয়াও আমাদের সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতির অংশ।বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এ ধরনের উৎসবকে ঘিরে আবর্তিত হয়, যা সাধারণভাবে উৎসবের অর্থনীতি নামে পরিচিত। উৎসবকে কেন্দ্র করে শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য, আমদানিকৃত পণ্য এবং বিভিন্ন সেবা খাতে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। চাহিদা বাড়লে পণ্যের জোগানও বাড়ে, যা স্থানীয় উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। পণ্য আমদানি, উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে সরকারও বাড়তি রাজস্ব পায়। এই সমগ্র অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্যই উৎসবের অর্থনীতির অংশ।বাংলাদেশে প্রধানত দুটি ঈদ উদযাপিত হয়Ñ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এর মধ্যে ঈদুল ফিতরকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাÐ সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ঈদকে ঘিরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, সেবা খাতের চাহিদা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের প্রসার এবং বাজারে অর্থের প্রবাহÑসব মিলিয়ে অর্থনীতিতে এক ধরনের গতি সৃষ্টি হয়।ঈদকে কেন্দ্র করে কত পরিমাণ অতিরিক্ত পণ্য ও সেবা বিক্রি হয়, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। তবে এর ব্যাপ্তি যে বিশাল, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ব্যবসায়ীদের ধারণা, দেশের পোশাকশিল্পের বার্ষিক বিক্রির প্রায় ৬০ শতাংশই হয় দুই ঈদকে ঘিরে। ঈদের সময় মিষ্টিজাতীয় পণ্যের বিক্রিও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। গত এক দশকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঈদ উপলক্ষে উপহার বিতরণের প্রবণতাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।কৃষি, শিল্প, আমদানি, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, সেবা খাত, কর্মসংস্থান এবং সরকারের রাজস্ব আহরণÑসব ক্ষেত্রেই ঈদের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। উৎসবের সময় পোশাক, জুতা, গয়না, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই চাহিদা পূরণে উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যস্ত সময় পার করে।পোশাকশিল্পের কথাই ধরা যাক। দেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পোশাকের একটি বড় অংশ আসে রাজধানীর পুরান ঢাকা, কেরানীগঞ্জ ও কালীগঞ্জ এলাকার কারখানাগুলো থেকে। ঈদুল ফিতরের তিন-চার মাস আগে থেকেই এসব কারখানায় প্রায় ২৪ ঘণ্টা উৎপাদন চলে। পুরান ঢাকার বংশাল, সিদ্দিকবাজারসহ আশপাশের এলাকায় ছোট ছোট কারখানায় জুতা ও ব্যাগ তৈরিরও ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলে। একইভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা কুটিরশিল্প ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পকারখানাগুলোতেও উৎপাদন বাড়ে। তেল, চিনি, আটা, ময়দা, সেমাই, নুডলসসহ নানা ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যস্ততাও এ সময় বাড়ে।উৎসবের সময় শহরের বড় শপিংমল থেকে শুরু করে গ্রামের ছোট দোকান পর্যন্ত ক্রেতার ভিড়ে জমজমাট হয়ে ওঠে। এমনকি মুদিদোকানের বিক্রিও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের বিস্তার ঘটেছে। সময়ের অভাব, যানজট এড়ানো এবং যাতায়াত ব্যয় সাশ্রয়ের কারণে ক্রেতাদের মধ্যে এসব প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। উৎসবের সময় এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে পণ্য ও সেবার বিক্রি অনেক বেড়ে যায়, যা খাতটির বিকাশে সহায়ক ভ‚মিকা রাখছে।ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের চলাচলও বেড়ে যায়। অনেকেই পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে শহর থেকে গ্রামে বা গ্রাম থেকে শহরে যান। আবার অনেকে ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে ভ্রমণে বের হন। এতে পরিবহন ও পর্যটন খাতে সেবার চাহিদা বাড়ে।ঈদ কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখে এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থানের প্রায় ৬০ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতের ওপর নির্ভরশীল। এসব শিল্প অনেকাংশেই উৎসবকেন্দ্রিক চাহিদার ওপর ভর করে টিকে থাকে।এছাড়া ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের মাধ্যমে অসংখ্য তরুণ-তরুণী স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। উৎসবের সময় এসব প্ল্যাটফর্মে বিক্রি বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগও বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে কৃষক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকÑযেমন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, নৌকার মাঝি, মুটে বা ডেলিভারি কর্মীদের আয়ও বাড়ে।ঈদ গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন প্রাণসঞ্চার করে। উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ উৎপাদকদের পণ্য বিক্রি বাড়ে। আবার ঈদ সামনে রেখে শহর ও প্রবাসে থাকা মানুষজন স্বজনদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ পাঠান, যাতে তারা উৎসবের ব্যয় নির্বাহ করতে পারেন। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।ঈদের ছুটিতে লাখ লাখ মানুষ নাড়ির টানে গ্রামে ফিরে যান। তারা স্থানীয় বাজার থেকে নানা পণ্য কেনেন এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন। এতে বিনোদনশিল্পসহ আরও অনেক খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমনকি টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের মতো গণমাধ্যম শিল্পেও এর প্রভাব পড়ে। ঈদ উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল বিজ্ঞাপন দেয়, যা গণমাধ্যমের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।ঈদের বাজারে দেশীয় অনেক বস্ত্র ও পোশাক ভারতীয় বা পাকিস্তানি নাম ব্যবহার করে বিক্রি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার বিদেশি কিছু পণ্যও ঈদকে লক্ষ্য করে আগেভাগেই দেশের বাজারে প্রবেশ করেছে। বাস্তবে দেশীয় বস্ত্র ও পোশাকের অনেক আইটেমের মান ভারত বা পাকিস্তানের পণ্যের চেয়েও উন্নত। এ কারণেই দেশীয় পণ্যকে বিদেশি বলে চালিয়ে দেয়া অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয়েছে।তবে নানা কারণে এবারের ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাÑএসব বিষয় ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এতে কৃষক, শ্রমিক ও ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।তারপরও আশা করা যায়, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঈদুল ফিতর শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হবে এবং এর ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব সমাজের বিভিন্ন স্তরে পৌঁছাবে।[লেখক: সাবেক ডিন (ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ) ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]

নিরাপদ হোক ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক

ঈদ বাঙালির জীবনে আনন্দ, ভালোবাসা এবং পারিবারিক মিলনের এক অনন্য উৎসব। সারা বছর জীবিকার তাগিদে শহরের ব্যস্ত জীবনে ছুটে চলা মানুষগুলো ঈদের সময়টুকুর জন্যই অপেক্ষা করে। এই সময়েই তারা ফিরে যেতে চায় শৈশবের সেই পরিচিত গ্রামে, মা-বাবার স্নেহমাখা ছায়ায়, আপনজনদের সান্নিধ্যে। তাই ঈদযাত্রা কেবল একটি ভ্রমণ নয়; এটি আবেগ, স্মৃতি এবং পারিবারিক বন্ধনের এক গভীর প্রতীক। কিন্তু যখন সেই আনন্দময় যাত্রা আতঙ্কের রূপ নেয়, যখন প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয় এই বুঝি দুর্ঘটনা ঘটল, তখন সেই যাত্রা আর আনন্দের থাকে না; হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা ও ভয়ের প্রতীক। দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের কাছে ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক আজ অনেকটা তেমনই এক বাস্তবতার নাম। প্রতি ঈদেই এই সড়ক ধরে হাজার হাজার মানুষ ঘরে ফেরেন, কিন্তু তাদের অনেকের মনে আনন্দের চেয়ে উদ্বেগই বেশি কাজ করে - এই পথ কি নিরাপদ?দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণরেখা: ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা হয়ে মাদারীপুর, বরিশাল এবং পর্যটন নগরী কুয়াকাটা পর্যন্ত বিস্তৃত এই মহাসড়ক দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির প্রধান অবলম্বন। বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর এই ছয়টি জেলার মানুষ রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রধানত এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জের বিশাল জনগোষ্ঠীরও প্রধান যাতায়াতপথ এটি। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই মহাসড়কের গুরুত্ব অপরিসীম। দক্ষিণাঞ্চল দেশের অন্যতম কৃষি উৎপাদন অঞ্চল। এখানকার ধান, মাছ, সবজি এবং অন্য কৃষিপণ্য প্রতিদিন এই সড়কপথেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা হয়। একই সঙ্গে কুয়াকাটা দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র। ফলে পর্যটন শিল্পের বিকাশেও এই সড়কের ভ‚মিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।পদ্মা সেতুর সুফল, কিন্তু অসম্পূর্ণ প্রস্তুতি: পদ্মা সেতু চালুর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এসেছে। বহু বছরের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। এই সেতু দেশের অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।কিন্তু পদ্মা সেতুর পূর্ণ সুফল পেতে হলে সংযোগ মহাসড়কগুলোকে আধুনিক ও নিরাপদ করা অত্যন্ত জরুরি। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে-ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের অনেক অংশ এখনও সংকীর্ণ, ভাঙাচোরা এবং ঝুঁকিপূর্ণ।পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার যানবাহন এই মহাসড়কে চলাচল করে। কিন্তু সড়কের বড় অংশ এখনও মাত্র ১৮ থেকে ২৪ ফুট প্রশস্ত। ফলে দুই দিক থেকে দ্রæতগতির যানবাহন চলাচলের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।ভাঙ্গা থেকে বরিশাল: দুর্ভোগের দীর্ঘ পথ : ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত প্রায় ৯৭ কিলোমিটার পথের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নাজুক।অনেক জায়গায় রাস্তার বিটুমিন উঠে গিয়ে নিচের সুরকি বেরিয়ে এসেছে। কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও রাস্তা দেবে গিয়ে অসমান হয়ে গেছে। বরিশালের কাশীপুর চৌমাথা থেকে রহমতপুর, গৌরনদীর জয়শ্রী থেকে কাশেমাবাদ এবং মাদারীপুরের ভুরঘাটা থেকে মস্তফাপুর পর্যন্ত অংশে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ। এই গর্তগুলো অনেক সময় বৃষ্টির পানিতে ঢেকে যায়। ফলে চালকরা বুঝতেই পারেন না কোথায় গভীর গর্ত রয়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা বা ছোট যানবাহনের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।দুর্ঘটনার উদ্বেগজনক বাস্তবতা: বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুর অংশেই গত ছয় মাসে প্রায় ৪৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই মহাসড়কের প্রায় ৪৭ কিলোমিটার অংশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই পুরো মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত আটকে থাকে, যা আহতদের জন্য আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে।বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক, ভয়ঙ্কর বাঁকের ফাঁদ: ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশাপাশি বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কের অবস্থাও কম উদ্বেগজনক নয়। পটুয়াখালীর শাখারিয়া থেকে বরগুনার আমতলী উপজেলার বান্দ্রা পর্যন্ত প্রায় ৩৭ কিলোমিটার মহাসড়কে রয়েছে ১৭টি ভয়ঙ্কর বাঁক। এই বাঁকগুলোতে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। গত ছয় মাসে এখানে শতাধিক দুর্ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন এবং ৪৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।অনেক বাঁকে কোনো কার্যকর সংকেতচিহ্ন নেই। কোথাও থাকা সংকেতগুলোও বিবর্ণ হয়ে গেছে। রাতের বেলায় চালকরা বুঝতেই পারেন না সামনে কী অপেক্ষা করছে।বাসচালকরা বলছেন, বড় বাঁকগুলোতে কনভেক্স মিরর বা উন্নত সতর্কসংকেত স্থাপন করা হলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।বহু প্রতীক্ষিত ছয় লেন প্রকল্প : ২০১৫ সালে ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে ভ‚মি অধিগ্রহণের জন্য অর্থও বরাদ্দ দেয়া হয় এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়। কিন্তু নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়নের অভাবে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের আলো দেখেনি। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আজও অপেক্ষা করছে কবে শুরু হবে এই মহাসড়কের প্রকৃত উন্নয়ন। [লেখক: প্রশিক্ষক, গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বরিশাল]

কৈবর্ত বিদ্রোহ ও বরেন্দ্র অঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহ্য

বরেন্দ্র বিদ্রোহ বা কৈবর্ত বিদ্রোহ বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন। কৈবর্ত বিদ্রোহ ছিল সামন্ত রাজা দিব্যের নেতৃত্বে পাল রাজাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি বিপ্লবী আন্দোলন। তৎকালীন পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপালের (১০৭০-১০৭৫) শাসনের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ সংগঠিত হয়।দশম-একাদশ শতকে বরেন্দ্র অঞ্চলে ‘মাৎস্যন্যায়’ প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে সেখানে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। এই চরম অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন সামন্তশক্তি একত্রিত হয়। তাদের সম্মিলিত উদ্যোগেই বাংলার উত্তরাংশে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহের মাধ্যমে সামন্ত রাজা দিব্য বরেন্দ্রভ‚মিতে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।পাল আমলের সামন্ত রাজা দিব্য বিভিন্ন সামন্তরাজাদের একত্রিত হয়ে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানান। সামন্তরা তার ডাকে সাড়া দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা বাংলার বরেন্দ্র অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। রাজা দ্বিতীয় মহীপাল বিদ্রোহ দমন করতে এসে যুদ্ধে নিহত হন। ফলে পাল সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।দিব্য তার দক্ষ নেতৃত্বে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে বরেন্দ্রে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। দিব্যের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন তার ছোট ভাই রুদোক এবং পরে রুদোকের পুত্র ভীম (বরেন্দ্র রাজা)। ভীম নিজেকে একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং প্রায় ৩০ বছর বরেন্দ্র শাসন করেন। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বরেন্দ্রকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যান।ভীম সুবিধাভোগী ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে কর আদায় করতেন এবং সেই অর্থ সাধারণ প্রজাদের কল্যাণে ব্যয় করতেন। বর্তমান বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার দিবর ইউনিয়নে অবস্থিত দিবর দিঘি ও দিব্য বিজয়স্তম্ভ আজও এই রাজবংশের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়া বর্তমান ভারতের মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘিতেও বীর দিব্য ও ভীমের কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতিস্বরূপ একটি বিজয়স্তম্ভ ছিল, যা পরবর্তীকালে পাল রাজারা পুনরায় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পর ভেঙে ফেলে।রাজা ভীমের নানা কীর্তির মধ্যে ‘ভীমের সাগর’, ‘ভীমের জাঙ্গাল’, ‘ভীমের ডাইং’ ও ‘ভীমের পান্টি’ উল্লেখযোগ্য। দিনাজপুর, রাজশাহী ও বগুড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে এসব স্থাপনার নিদর্শন এখনও পাওয়া যায়।রামপাল সিংহাসনে আরোহণ করার পর ভীমের জনপ্রিয়তা, দক্ষতা ও উদারতা দেখে ভীত হয়ে পড়েন। তখন পাল রাজাদের ক্ষমতা সম্ভবত ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী বদ্বীপ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু শক্তিশালী রাজা ভীমের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামার সাহস রামপালের ছিল না। ভূমি হারানোর আশঙ্কায় তিনি প্রতিবেশী ও সামন্তরাজাদের বিপুল অর্থ ও ভূমি দান করেন এবং তাদের সহায়তায় ভীমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।ভীম বন্দী হওয়ার পর তার বিশ্বস্ত সহযোগী হরি পরাজিত সৈন্যদের একত্রিত করে রামপালের বিরুদ্ধে শেষ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেন। হরির নেতৃত্বে যখন সেনারা প্রায় বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন রামপাল বিপুল অর্থ বিতরণ করে তাদের একাংশকে নিজের পক্ষে টেনে নিতে সক্ষম হন। এর ফলে বরেন্দ্রের স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায় এবং অঞ্চলটি আবার পাল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।বিদ্রোহীরা যেন আর কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সে জন্য পাল রাজারা ভীমের প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করে। তার পরিবারের সদস্যদের তার সামনেই হত্যা করা হয় এবং পরে ভীমকেও হত্যা করা হয়।এই বিদ্রোহ সম্পর্কে দার্শনিক ও গবেষক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, কৈবর্ত বিদ্রোহের সঙ্গে সিদ্ধ আন্দোলনের সম্পর্ক ছিল এবং চুরাশি সিদ্ধের কাহিনি বিদ্রোহীদের অনুপ্রাণিত করেছিল। কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী লিখেছেন, কৈবর্তরা যদি পরাজিত না হতেন, তবে বাংলায় একটি শক্তিশালী দেশজ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে পারত।ঐতিহাসিক রায়োসুকে ফুরুই উল্লেখ করেছেন, কৈবর্ত বিদ্রোহ বাংলার আদি মধ্যযুগের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই বিদ্রোহ সাময়িকভাবে পালদের তাদের পৈতৃক অঞ্চল বরেন্দ্র থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং অধস্তন শাসকদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দেয়। এর ফলেই পরবর্তীকালে পাল শক্তির পতন এবং সেনাদের উত্থানের পথ প্রশস্ত হয়।বরেন্দ্র অঞ্চলের সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রাচীন। এই অঞ্চলে টেরাকোটা বা পোড়ামাটির শিল্প বাংলার ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। মাটি পুড়িয়ে তৈরি করা নকশাযুক্ত ফলক ও মূর্তিতে কৃষ্ণলীলা, রামায়ণ, সামাজিক জীবন এবং দেব-দেবীর কাহিনি ফুটে ওঠে। দিনাজপুর ও নওগাঁ জেলা এই শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।একইভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের মৃৎশিল্প হাজার বছরের প্রাচীন লোকশিল্প। অতীতে মাটির কলস, হাঁড়ি, পুতুল ও পূজার সামগ্রী তৈরি হতো। কিন্তু আধুনিকতার আগ্রাসন ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে।বরেন্দ্র অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির মূল উৎস আদিবাসী সমাজ। সাঁওতাল, ওরাঁও ও মুণ্ডা জনগোষ্ঠীর জীবনপ্রণালী প্রকৃতিনির্ভর ও কৃষিভিত্তিক। তাদের সমাজব্যবস্থা ‘মাঝি-পরগনা’ বা ‘পাঁচ মোড়ল’ দ্বারা পরিচালিত হয়। সোহরাই, বাহা ও কারাম তাদের প্রধান উৎসব। এসব উৎসবে নৃত্য-গীতি ও বাদ্যের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি প্রকাশ পায়।এছাড়া বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে গম্ভীরা ও আলকাপ গানও জনপ্রিয় লোকসংস্কৃতি।কিন্তু আজ বৈচিত্র্যময় বরেন্দ্র সংস্কৃতি নানা ধর্মান্ধ রাজনৈতিক প্রবণতার চাপে সংকুচিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাচীন সংস্কৃতিকে ‘বিধর্মীয়’ আচার হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে। ফলে কৈবর্ত বিদ্রোহের সেই সংগ্রামী ঐতিহ্যও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। অথচ কয়েক দশক আগেও এই অঞ্চলের মানুষ সংস্কৃতিকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন করত না।তাই বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাচীন সংস্কৃতি রক্ষায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনুশীলন আজ অত্যন্ত জরুরি।[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির রাজনীতি: প্রযুক্তি, ক্ষমতা ও মুসলিম বিশ্বের সংকট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ প্রায় ৫০ জন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি । অন্যদিকে ইসরায়েলের সৈন্য লেবাননের ভেতরে ঢুকে ইরানের সমর্থক হিজবুল্লাহদেরও হামাসের মতো নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। দেড় কোটি ইহুদি ২শ’ কোটি মুসলমানকে জিম্মি করে রেখেছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ১৯৭৩ সনে যুদ্ধে নেমে মিশর হঠাৎ যুদ্ধ থামিয়ে আপোষ করে ফেলে; কেন যুদ্ধ থামিয়ে দিল এই প্রশ্নের উত্তরে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারি, কিন্তু আমেরিকার বিরুদ্ধে নয়’। শুধু প্রযুক্তি আর অস্ত্র নয়, অর্থ সম্পদেও আমেরিকা বর্তমান বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দী। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রযুক্তি আমেরিকার চেয়েও উন্নততর। ইতোমধ্যে ইরানের নৌশক্তি ধ্বংস হয়ে গেছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তছনছ হয়ে গেছে, আমেরিকা এবং ইসরায়েলের বিমান খুশিমত ইরানের আকাশে ঘুরে ঘুরে ইচ্ছা মতো স্থাপনায় বোমা ফেলছে, সব তেল শোধনাগার জ্বলছে, ধোঁয়ায় তেহরান অন্ধকারাচ্ছন্ন ।ইরান যুদ্ধ করতে চায়নি, জোর করে এই যুদ্ধ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইরান বুঝতে পেরেছিল, ইসরায়েল এবং আমেরিকার তুলনায় ইরানের প্রযুক্তি জ্ঞান জিরো। আশির দশকের শুরুতে ইরান-ইরাকের ৮ বছর ব্যাপী যুদ্ধের অতন্দ্র সতর্কতার মধ্যেও ইসরায়েলের যুদ্ধ বিমান ইরাকের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দিয়েছিল, ইরাক টেরও পায়নি। ঠিক একইভাবে গত বছর জুন মাসে প্রায় ১৩ হাজার কেজির ‘বাঙ্কার বাস্টার’ মেরে ইরানের ৩টি পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসকরণে যে বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছে তা কেবল আমেরিকার কাছেই আছে, এই ‘বি-টু স্টেলথ বোমারু বিমান’ সনাক্ত করার ক্ষমতাও ইরানের ছিল না, ধ্বংস করে বিমানগুলো ফেরত যাওয়ার পর ইরান টের পেয়েছে। আমেরিকা তাদের ঘাতক অস্ত্র ‘গ্র্যাভিটি বোমা’ও ইরানের ওপর প্রয়োগ করার কথা ভাবছে; এই বোমা মজবুত বাঙ্কার এবং ভ‚গর্ভস্থ সামরিক স্থাপনাকে ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হয়।কিছুদিন আগে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়ার পরও ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। হয়নি বলেই ইরানের রেজিম চেঞ্জ জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল বিরোধী কোনো শাসক বা সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেয়া হচ্ছে না। আমেরিকা এবং ইসরায়েল নির্ধারণ করে দিচ্ছে কোন দেশ কে শাসন করবে। ইসরায়েলের বিরোধিতা করে সাদ্দাম হোসেন টিকেননি, মুয়াম্মের গাদ্দাফির হয়েছে করুণ মৃত্যু, রাশিয়ায় পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচাতে হয়েছে বশির আল আসাদকে। হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াহ এবং হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুও হয়েছে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়। শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বর্তমান পৃথিবীতে আমেরিকা আর ইসরায়েল ব্যতীত আর কোন দেশের স্বার্বভৌমত্বও নেই। ১৯৮৯ সনে লাতিন আমেরিকার দেশ পানামায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির তৎকালীন প্রধান জেনারেল ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ঠিক একইভাবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকেও অপহরণ করে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। কথা অগ্রাহ্য করায় শেখ হাসিনার পতনে আমেরিকা খরচ করেছে মাত্র ২৯ মিলিয়ন ডলার, আমেরিকার কথা না শোনায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখন জেলের ভেতর।পশ্চিমের দেশগুলোর সরকার ব্যবস্থায় এখন ধর্ম আর নিয়ন্তা নয়, খ্রিস্টান ধর্ম ও তার যাজকের জন্য ‘ভ্যাটিকান সিটি’ নামক একটি দেশ দিয়ে ধর্মকে ওখানে আবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। খ্রিস্টান ধর্ম ভ্যাটিকান সিটিতে আবদ্ধ থাকায় ইউরোপসহ পশ্চিমের দেশগুলোয় এখন আর ধর্ম ও সরকারের মধ্যে আগের মতো সংঘাত হয় না, সংঘাত হয় না বলেই অবাধে বিজ্ঞানচর্চা সম্ভব হচ্ছে, নতুন নতুন প্রযুক্তির আবিস্কারে ধর্ম প্রতিবন্ধক হচ্ছে না। রেজিম চেঞ্জ করা আমেরিকার লক্ষ্য হলেও ইরানে পশ্চিমা ধাঁচে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা তাদের লক্ষ্য নয়। আমেরিকা ইসলাম ধর্ম বিরোধী নয়, ইসলামের উগ্রপন্থারও বিরোধী নয়- বিরোধী হচ্ছে উগ্রপন্থার আমেরিকান স্বার্থ বিরোধী কর্মকাণ্ডের। মুসলমান পশ্চিমের মতো আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক হোক, এটাও আমেরিকা চায় না। চাইলে ধর্মনিরপেক্ষ সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মের গাদ্দাফি বা বশির আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় মোল্লাতন্ত্র কায়েমে আমেরিকা সহায়তা করতো না। ইরানের মতো ধর্মভিত্তিক বহু মুসলিম দেশের সঙ্গে আমেরিকার ঘনিষ্ট সম্পর্ক, হিজাব বিরোধী আন্দোলনে শতাধিক ব্যক্তিকে রাস্তায় প্রতিদিন ফাঁসি দিলেও আলী খামেনিকে হত্যা করা হতো না, যদি ইরান আমেরিকা এবং ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করতো।বাংলাদেশের মুসলিম বাঙালি ও চীনপন্থি বামেরা ইরানের ধর্মভিত্তিক সরকার ব্যবস্থার কড়া সমর্থক। চীনের সঙ্গে ভালো-খারাপ সম্পর্ক থাকা সাপেক্ষে আমাদের দেশের চীনপন্থিরা তাদের পছন্দ-অপছন্দ নির্ধারণ করে। অন্যদিকে আলেমদের তরফ থেকে শিয়াদের ‘কাফের’ বলার পরও তাদের প্রতি সাধারণ মুসলমানদের সমর্থনের কোন হেরফের হচ্ছে না, তারা প্রতি মুহুর্তে ইসরায়েলের ধ্বংস কামনা করছে। শুধু তাই নয়, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সমৃদ্ধ মুসলিম দেশগুলোতে ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র আঘাত হানলেও মুসলিম বাঙালিরা ঈদের খুশি উপভোগ করে। বিজ্ঞান বিচ্যুত মুসলমানদের অসহায়ত্ব এত গভীর হয়ে ওঠেছে যে, তারা মনে মনে ইরানের পক্ষে ‘আবাবিল’ পাখির আগমনও কামনা করে, এরা বিশ্বাস করে, ১৯৬৫ সনের যুদ্ধে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে ফেরেস্তারা লড়েছে। আজগুবি ক্ষমতায় বিশ্বাস করে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন মরেছেন, মরেছেন লিবিয়ার মুয়াম্মের গাদ্দাফিও। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন প্রভৃতি দেশে শিয়া মিলিশিয়াদের অস্ত্র সরবরাহ করে ইরান শুধু ইসরায়েলের শত্রু হয়নি, মুসলিম দেশগুলোরও শত্রæ হয়েছে। সৌদি আরব, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আমির আমিরাত প্রভৃতি দেশের শাসকেরা ইরানকে যমের মতো ভয় করে, ভয় ইরানের ক্ষেপনাস্ত্রে নয়, ভয় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের। এই ভয় থেকে লাভ হয়েছে ইসরায়েল এবং আমেরিকার,- আমেরিকা কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির সুযোগ পেয়েছে, সুযোগ পেয়েছে সামরিক ঘাঁটি করার। কী ইমানদার মুসলমান, একটি মুসলিম দেশ আরেকটি মুসলিম দেশের আক্রমণ থেকে রক্ষার পাওয়ার আশায় ‘নাসারাদের’ সামরিক ঘাঁটি রেখেছে। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস থাকলে ‘নাসারাদের’ সামরিক ঘাঁটি লাগে কেন? মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো ইসরায়েলকে ভয় করে না, ভয় করে ইরান, গাজার হামাস আর মিশরের ব্রাদারহুডদের। ১৯৯০ সনে সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত দখলের পর তাদের এই ভীতি আরও শতগুণে বেড়ে যায়, তাই তারা ইরানের পারমাণবিক শক্তি অর্জনকে তাদের জন্য অভিশাপ মনে করে। অধিকাংশ মুসলিম দেশ ইসলামের কট্টরপন্থা বা মৌলবাদ বিরোধী। তাই ১৯৭০ সনে পাকিস্তানি সৈন্য দিয়ে পিটিয়ে সশস্ত্র প্যালেস্টাইনিদের জর্ডান থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল, হামাসের করুণ পরাজয়ে কোনো মুসলিম দেশ কাতর হয়নি, মিশরের উগ্রপন্থী ব্রাদারহুডের ক্ষমতাচ্যুতি হলেও কোনো মুসলিম দেশের হাহুতাশ ছিল না। একইভাবে ইরানের অপমানজনক পরাজয়েও কোন মুসলিম দেশ আহা, উহু করবে না, কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মুসলিম বাঙালিদের মধ্যে চরম হতাশা নেমে আসবে। কারণ তারা আমারিকার ধ্বংসও চায়, আবার আমেরিকার ভিসাও চায়। তারা ভারতের বিনাশ চায়, আবার ভারতে পেঁয়াজ না হলেও চলে না।ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো মুসলমান দেশকে একসঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করার দিন শেষ, তাই মুসলমানদের হৃত গৌরবও আর ফিরে আসবে না। ভারতবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষা চালু করেছে ইংরেজরা। নাসারাদের সবকিছু পরিত্যজ্য হলেও মাদ্রাসা শিক্ষা বাংলাদেশে দিন দিন বাড়ছেই। কিন্তু এই শিক্ষা দিয়ে বর্তমান দুনিয়ায় অন্য জাতির প্রযুক্তির মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। পরিবেশ অনুক‚ল না থাকায় বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত লোকের অবদানও প্রায় জিরো। ইরান যদি যুদ্ধ কিছুদিন প্রলম্বিত করতে পারে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখতে পারে তাহলেই বাংলাদেশ আবার আরেকটি ঝাঁকুনি খাবে, ইতোপূর্বে করোনা আর ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের ঝাঁকুনি খেয়েছে, কিন্তু মোহাম্মদ ইউনূসের রেখে যাওয়া মুমূর্ষু বাংলাদেশ আর কোনো ঝাঁকুনি সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। অন্যদিকে ইরানের দুঃখজনক পরাজয়ে ইরানের তেল-গ্যাস ও হরমুজ প্রণালী স্থায়ীভাবে আমেরিকার কব্জায় চলে যাবে, বিশ্ব রাজনীতিতে পতন হবে রাশিয়া ও চীনের, কুর্দিরা ইরানের অংশ দখল করে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে, প্যালেস্টাইনিদের প্রতিরোধ সক্ষমতার অনুপস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে ফিরে আসবে ইসরায়েল প্রদত্ত অনুকম্পার শান্তি, আর জাতিসংঘ হবে মোহাম্মদ ইউনূসদের বনভোজনের বাগানবাড়ি, আর মুণ্ডহীন ধড়। [লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শিক্ষাপ্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব: শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে বিবেচ্য

সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের একটি প্রজ্ঞাপনের খবর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে কর্মরত ৮২ জন কর্মকর্তা যাদের মধ্যে সাঁট-লিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, হিসাবরক্ষণ কাম ক্লার্ক, উচ্চমান সহকারী ও প্রধান সহকারী রয়েছেন তাদের পদোন্নতি দিয়ে সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে কারও পদোন্নতিতে আপত্তি থাকার কথা নয়; বরং যে কোনো পেশাজীবনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ ক্যারিয়ার অগ্রগতির পথ থাকা অত্যন্ত জরুরি। একটি আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো তখনই কার্যকর হয়, যখন সেখানে কর্মরত মানুষ জানেন যে তাদের শ্রম, দক্ষতা ও সততার যথাযথ মূল্যায়ন একদিন পদোন্নতির মাধ্যমে স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু প্রশ্নটি আপত্তির নয়, বরং নীতিগত ও কাঠামোগত। সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের পদটি কি কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক পদ, যেখানে নথি যাচাই, অফিস ব্যবস্থাপনা বা দাপ্তরিক তদারকিই প্রধান কাজ? নাকি এটি মূলত এমন একটি একাডেমিক নেতৃত্বের অবস্থান, যার মাধ্যমে একটি উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান, শিক্ষার মান, শিক্ষকতার পেশাগত চর্চা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়? আধুনিক শিক্ষা-ব্যবস্থাপনা তত্তে¡ শিক্ষা কর্মকর্তাদেরকে কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দেখা হয় না; বরং তাদেরকে শিক্ষা-ব্যবস্থার শিখন-নেতৃত্বের ধারক (ইন্সট্রাকশানাল লিডার) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুতরাং এই পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি সরাসরি শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্ব কেবল দাপ্তরিক কাগজপত্র যাচাই বা প্রশাসনিক তদারকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি উপজেলার সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মান ও দিকনির্দেশনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাদের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে উপজেলার সব মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকি ও পর্যবেক্ষণ; শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা; স্থানীয় বাস্তবতা ও চাহিদা বিবেচনায় শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করা; এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা। অন্য কথায়, এই পদে কর্মরত ব্যক্তিকে একই সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষায় নেতৃত্ব এবং শিক্ষাবিষয়ক নীতিমালা বাস্তবায়নের সমন্বিত দায়িত্ব পালন করতে হয়। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব তত্তে¡ এ ধরনের পদকে কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্বের জায়গা হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটিকে শিখন নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিদ্যালয়ের পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা, পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং শিক্ষার পরিবেশ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা রাখতে হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে যে কেউ কি কেবল প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার জোরে এই একাডেমিক তদারকির দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারবেন? শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের পেশাগত সহায়তা প্রদান কিংবা বিদ্যালয়ের শিখন শেখার প্রক্রিয়া মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা মনোবিজ্ঞান, শিক্ষাক্রম তত্ত¡, পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার মৌলিক জ্ঞান। এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক নেতৃত্ব দেয়া কার্যত একটি জটিল দায়িত্ব, যা শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে পূরণ করা সবসময় সম্ভব নয়।আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও মানসিকতা’ নিয়ে কাজ করে এসেছে। ফলে শিক্ষাপ্রশাসন হয়ে উঠেছে সর্বত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের অংশ। ঔপনিবেশিক আমলে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল শাসন ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা; সৃজনশীল জ্ঞানচর্চা বা মানবিক বিকাশ তখন প্রশাসনিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল না। স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরেও সেই মানসিকতার ছাপ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রয়ে গেছে। বস্তুত, শিক্ষা প্রশাসনকেও অনেক সময় সাধারণ প্রশাসনের একটি সম্প্রসারিত শাখা হিসেবে দেখা হয়। তাই শিক্ষাপ্রশাসনের মূল কাজ মনে করা হয় দাপ্তরিক তদারকি, নিয়মনীতির প্রয়োগ এবং আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। কিন্তু শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্ব দিয়ে কাক্সিক্ষত ফল অর্জন করা যায় না।আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, শিক্ষা একটি বিশেষায়িত ও জ্ঞাননির্ভর ক্ষেত্র। এখানে শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত¡ বোঝা, শিক্ষাক্রমের দর্শন ও কাঠামো অনুধাবন করা, কার্যকর পাঠদান পদ্ধতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার ধারণা থাকা, এবং শিক্ষানীতির অন্তর্নিহিত লক্ষ্য বিশ্লেষণ করার মতো পেশাদার দক্ষতা প্রয়োজন। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান আমাদের শেখায় শিক্ষার্থীরা কীভাবে শেখে; শিক্ষাক্রম তত্ত¡ নির্দেশ করে জ্ঞানের সংগঠন ও উপস্থাপনের পদ্ধতি; আর শিক্ষাদর্শন আমাদের বলে দেয় শিক্ষা কেন এবং কোন সামাজিক ও নৈতিক উদ্দেশে পরিচালিত হবে। এসব জ্ঞান ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক তদারকি করা অনেকটা এমন, যেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা ছাড়াই একটি হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম মূল্যায়নের দায়িত্ব নেয়া। এ কারণেই সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে কেবল দাপ্তরিক অভিজ্ঞতাকে যথেষ্ট মনে করলে শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন প্রত্যাশা করা কঠিন। শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব সমস্যা বোঝা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর শিখন-শেখার প্রক্রিয়া মূল্যায়ন করা এবং বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক উন্নয়নে কার্যকর দিকনির্দেশনা দিতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মধ্যে শিক্ষাবিজ্ঞানের জ্ঞান ও পেশাগত নীতিনৈতিকতার উপলব্ধি থাকা অপরিহার্য। অন্যথায় শিক্ষাপ্রশাসন ধীরে ধীরে এমন একটি কাঠামোয় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, যেখানে নীতিমালা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিকতার বিকাশ পিছিয়ে পড়ে।বর্তমানে দেশে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিষয়ে চার বছর মেয়াদি অনার্স কোর্স থেকে প্রতিবছর শত শত গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজগুলোয় শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দীর্ঘদিন ধরেই চালু রয়েছে। এসব প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা সাধারণত ৩৫-৪০টি কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষাক্রম তত্ত¡ ও উন্নয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষা পরিকল্পনা, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষায় নেতৃত্ব, শিক্ষা গবেষণা পদ্ধতি, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে পদ্ধতিগত ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করেন। শুধু তাত্তি¡ক জ্ঞানই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তারা গবেষণা, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং প্র্যাকটিকামভিত্তিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো বোঝার সুযোগ পান। ফলে তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে নয়, বরং একটি জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক বিকাশের প্রক্রিয়া হিসেবে অনুধাবন করার সক্ষমতা অর্জন করেন। এছাড়াও দেশে এক বছর মেয়াদি অথবা পার্ট-টাইম দুই বছর মেয়াদি বিএড কোর্স থেকে পাশ করা বিপুলসংখ্যক শিক্ষক রয়েছেন, যারা পেশাগত প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘদিনের শ্রেণীকক্ষের অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজেদের কর্মজীবনে অগ্রসর হতে আগ্রহী। এই শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের বাস্তব পাঠদান প্রক্রিয়া, শিক্ষার্থীদের শেখার ধরণ, মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছেন। শিক্ষাতত্ত¡ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার এই সমন্বয় তাদেরকে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব ও একাডেমিক তদারকির ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করতে পারে। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে যেখানে শিক্ষাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদের এমন একটি সম্ভাবনাময় ভাÐার দেশে তৈরি হয়েছে, সেখানে শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তাদের দক্ষতা ও পেশাগত জ্ঞানকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে।পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যুগের চাহিদা মেটাতে শিক্ষা প্রশাসনকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করা এবং এতে পেশাদারত্বের ভিত্তি শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ মাঠপর্যায়ের পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাবিষয়ক পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। এ ধরনের পদে সরাসরি শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষা প্রশাসনে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও পেশাদার নেতৃত্বের ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে। কারণ শিক্ষাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা শিক্ষাক্রম, মূল্যায়ন, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষাব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে পদ্ধতিগত ধারণা রাখেন, যা বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক তদারকি ও উন্নয়নে কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে পারে।একই সঙ্গে পেশাগত উন্নয়ন ও পদোন্নতির সুযোগ দিতে বাস্তব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষকদের মধ্য থেকেও যারা সরকারি প্রশাসনে যেতে আগ্রহী তাদের নিয়োগের সুযোগ রাখা যেতে পারে। দীর্ঘদিনের শ্রেণীকক্ষ অভিজ্ঞতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার বাস্তব দক্ষতা এবং স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান তাদেরকে শিক্ষা প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত করতে পারে। এতে একদিকে যেমন পেশাগত অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত দক্ষতা সম্পন্ন নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি হবে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে শিক্ষাবিজ্ঞানের তাত্তি¡ক জ্ঞানের একটি কার্যকর সমন্বয় ঘটবে। পরবর্তীতে এই সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই ধাপে ধাপে পদোন্নতির মাধ্যমে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শিক্ষাপ্রশাসনের উচ্চতর পদগুলো পূরণ করা যেতে পারে। এমন একটি ধারাবাহিক পেশাগত সোপান গড়ে উঠলে শিক্ষা প্রশাসনে দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা সমাধানের প্রয়াস বৃদ্ধির মধ্যে দিয়ে দ্রæত শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে এটি একটি সুসংগঠিত পেশাগত ক্যারিয়ার কাঠামো তৈরি করবে, যেখানে শিক্ষা প্রশাসন আর কেবল দাপ্তরিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং জ্ঞাননির্ভর, দক্ষতাভিত্তিক ও পেশাদার নেতৃত্বের একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শিক্ষা কর্মকর্তার এই পদটি মূলত মাঠপর্যায়ের দায়িত্বনির্ভর। একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে হয়, শিক্ষকদের সঙ্গে পেশাগত আলোচনা করতে হয়, শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে হয় এবং বিভিন্ন বাস্তব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ নিতে হয়। অর্থাৎ এই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন উদ্যম, গতিশীলতা, পর্যবেক্ষণক্ষমতা এবং শিক্ষাবিষয়ক একটি সুস্পষ্ট পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষা প্রশাসনের আধুনিক ধারণায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরকে অনেক সময় ‘শিখন সহায়তার নেতা’ (ইন্সট্রাকশানাল সার্পোট লিডার) হিসেবে বিবেচনা করা হয় যারা বিদ্যালয়ের পাঠদান প্রক্রিয়া উন্নত করতে শিক্ষককে সহায়তা করেন, উদ্ভুত সমস্যার উৎস চিহ্নিত করেন এবং কার্যকর সমাধানের পথ নির্দেশ করেন। এই বাস্তবতায় কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে এসে কেবল প্রশাসনিক ধারার পদোন্নতির মাধ্যমে এই ধরনের মাঠমুখী পদে দায়িত্ব পাওয়া অনেক সময় কাক্সিক্ষত ফল বয়ে আনে না। কারণ দীর্ঘদিন দাপ্তরিক পরিবেশে কাজ করা কোনো কর্মকর্তার জন্য নিয়মিত বিদ্যালয়ভিত্তিক তদারকি, শিক্ষকদের সঙ্গে পেশাগত আলাপ-আলোচনা কিংবা শিখন-শেখার বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের মতো কাজগুলো নতুন করে গ্রহণ করা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এর সঙ্গে শারীরিক পরিশ্রম, নিয়মিত ভ্রমণ এবং দ্রæত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও যুক্ত থাকে, যা একটি গতিশীল কর্মপরিবেশ দাবি করে। অন্যদিকে, কর্মজীবনের একেবারে শেষদিকে এসে এই পদে নিয়োগ পেলে তাদের পক্ষে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ধাপে ধাপে উচ্চতর পর্যায়ে নেতৃত্বের ভ‚মিকা নেয়ার সুযোগও প্রায় থাকে না বললেই চলে।একটি কার্যকর ও টেকসই শিক্ষাপ্রশাসনের জন্য প্রয়োজন এমন একটি পেশাগত কাঠামো, যেখানে মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়ে একটি সুসংহত নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারেন। এতে প্রশাসনের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণের কালচার বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত শিক্ষাক্রম সংস্কার, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের মতো বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। নিঃসন্দেহে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু শিক্ষাপ্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে আড়ালেই থেকে যায়। অথচ শিক্ষার সমাজবিজ্ঞান ও প্রশাসন তত্তে¡র আলোকে বলা যায় কোনো শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা কেবল শিক্ষাক্রম বা নীতিমালার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই নীতিমালা মাঠপর্যায়ে কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার ওপরই শেষ পর্যন্ত শিক্ষার গুণগত মান নির্ধারিত হয়।যত উন্নত শিক্ষাক্রমই প্রণয়ন করা হোক না কেন, মাঠপর্যায়ে তা সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য যেমন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন, তেমনি তাদের পেশাগত দিকনির্দেশনা ও তদারকির জন্য দক্ষ শিক্ষাপ্রশাসকও অপরিহার্য। শিক্ষা ব্যবস্থাপনার আধুনিক ধারণায় প্রশাসনকে কেবল নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি একটি সহায়ক ও সক্ষমতাবর্ধক ব্যবস্থা যা শিক্ষকদের পেশাগত বিকাশে সহায়তা করে, সমস্যার সমাধানে দিকনির্দেশনা দেয় এবং বিদ্যালয়গুলোকে একটি ইতিবাচক শিখন কালচারের দিকে এগিয়ে নিতে ভ‚মিকা রাখে। এই বাস্তবতায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ভ‚মিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে তিনিই শিক্ষকদের জন্য প্রশাসনিক ও পেশাগত সহায়তার প্রথম আশ্রয়স্থল। কোনো বিদ্যালয়ে পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা, শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা বা প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিলে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানেরা সবার আগে এই দপ্তরের দ্বারস্থ হন। ফলে এই পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে কেবল দাপ্তরিক নিয়ম জানাই যথেষ্ট নয়; তার মধ্যে থাকতে হয় শিক্ষাবিষয়ক পেশাগত উপলব্ধি, সমস্যার বিশ্লেষণক্ষমতা এবং বাস্তবসম্মত সমাধান দেয়ার সক্ষমতা। এমন দক্ষ নেতৃত্বই মাঠপর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থাকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।যদি এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটিতে পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের যথাযথ সুযোগ না দেয়া হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই দক্ষ ও মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ শিক্ষকতা এবং শিক্ষাপ্রশাসন উভয় ক্ষেত্রেই আগ্রহ হারাতে পারেন। যেকোনো পেশার প্রতি আগ্রহ ও প্রতিশ্রæতি অনেকাংশেই নির্ভর করে সেখানে একটি সুস্পষ্ট পেশাগত স্বীকৃতি ও অগ্রগতির সম্ভাবনা থাকার ওপর। যদি শিক্ষাবিজ্ঞানে দীর্ঘ সময় ধরে অধ্যয়ন করা ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও সেই জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানোর উপযুক্ত ক্ষেত্র না তৈরি হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই অনেক তরুণ অন্য পেশার দিকে ঝুঁকবেন। এতে শিক্ষাখাত ধীরে ধীরে তার সম্ভাবনাময় মানবসম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। এর ফলাফল কেবল জনবল সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। শিক্ষাক্রম যত আধুনিকই হোক, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন উৎসাহী শিক্ষক, সহায়ক প্রশাসন এবং একটি পেশাদার পরিবেশ। কিন্তু যখন সেই কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নও হয়ে ওঠে খÐিত, অনুপ্রেরণাহীন এবং অনেক সময় বিশৃঙ্খল। নীতিমালা ও বাস্তবতার মধ্যে তখন একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয় কাগজে-কলমে সংস্কার থাকলেও শ্রেণীকক্ষের বাস্তবতায় তার প্রতিফলন দেখা যায় না। ফলে আমরা যে আধুনিক, মানবিক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি যেখানে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে তা বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়াতে পারে না। যথাযথ পেশাদার নেতৃত্ব ও সহায়ক প্রশাসনিক কাঠামো ছাড়া সেই স্বপ্ন অনেক সময় নীতিনির্ধারণের দলিল বা নীতিমালার পৃষ্ঠাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। তাই শিক্ষাব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নের জন্য পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত মানবসম্পদকে শিক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় স্থানে নিয়ে আসা এখন অত্যন্ত জরুরি।শিক্ষার জন্য নিবেদিত দুটো মন্ত্রণালয় কেবল সরকারের কার্যক্রম পরিচালনার দপ্তর নয়; এদুটো মূলত একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্প। উল্লেখ্য যে, উদ্ভুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার হাত থেকে রেহায় পেতে পূর্বে শিক্ষাপ্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণের ওপর একটি লেখায় দুটো মন্ত্রণালয়কে একীভ‚ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সে যাই হোক, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তি গড়ে ওঠে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অর্জন করেছে, তারা শিক্ষাকে কেবল প্রশাসনিক রুটিনের বিষয় হিসেবে দেখেনি; বরং জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়নে মাধ্যমে মানবসম্পদ এবং নৈতিক নাগরিক তৈরির একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করেছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা প্রশাসনের কাঠামোও হতে হয় সময়োপযোগী, পেশাদার এবং জ্ঞানভিত্তিক। কিন্তু যদি এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটিকে এখনও সেকেলে প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিচালিত করা হয়, তবে দেশের শিক্ষার গুণগত মান পরিবর্তন প্রত্যাশা করা বাতুলতা মাত্র।পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রশাসনকে নিয়ে নতুন করে ভাবার এবং তাকে পেশাদার ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর সুযোগ এসেছে। বিশেষ করে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার (এবং সহকারী কর্মকর্তাসহ) মতো গুরুত্বপূর্ণ মাঠপর্যায়ের পদগুলোতে শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকারমূলক নিয়োগ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রশাসনে এমন একটি পেশাদার নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে, যারা শিক্ষাবিজ্ঞানের জ্ঞান, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং শিক্ষানীতির লক্ষ্য এই তিনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হবে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত শিক্ষাপ্রশাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় নিয়োগ নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করে শিক্ষাবিষয়ক পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়া। কারণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাক্রম এবং শিক্ষানীতির মধ্যবর্তী যে প্রাতিষ্ঠানিক সেতুটি মাঠপর্যায়ে কাজ করে, সেটি মূলত শিক্ষাপ্রশাসনই। সেই সেতুটি যদি দুর্বল হয়, তবে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। আর যদি সেই সেতুটি জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে মজবুত করা যায়, তবে শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক রূপান্তরের পথও অনেকটাই সুগম হয়ে উঠবে। নতুন সরকারের এখনই সেই সেতুকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর উপযুক্ত সময়।[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

‘বঙ্গমাতার জন্তুপোলা’

‘তুই যে কোথা হোতে কীসব নিয়ে আসিস, মানে চিন্তা করলে মাথা গরম হয়ে যায়! বঙ্গমাতার জন্তুপোলা! মানে কী? বঙ্গমাতার জন্তুপোলা!’‘ওম্মারে, আন্নেরা যার নাম হুনলে টব্বস হোই বোই থাকেন, হ্যেরে আন্নেরা সকাল-সন্ধ্যা সন্মান করেন, অঁাঁই তো হ্যের কথা কোইলাম, আর আন্নেনি আঁরে কন, বঙ্গমাতার জন্তুপোলা! মানে কী?’‘এ-আবার কী কথা আমরা কাকে সকাল-সন্ধ্যা শ্রদ্ধা করি যার কথা তুই বলাতে আমরা বিরক্ত হচ্ছি?’‘ক্যান আপনেগো ঠাকুর কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হ্যেয়তো কোইছে, বঙ্গমাতার জন্তুপোলা!’‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন ‘বঙ্গমাতার জন্তুপোলা! উনি আবার কবে এ-কথা বললেন?’‘ক্যান আপনে না অনেক শিক্ষিত, ঢাবি বাংলা অনার্স, আন্নে কি হুনেন নাই আপনেগো ঠাকুর, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘বঙ্গমাতা’ কবিতায় লিখছেন, বঙ্গমাতার জন্তুপোলা।’‘সেকিরে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবে লিখলেন, বঙ্গমাতার জন্তুপোলা!’‘অতো ঢং কোইরেন না, আপনেগো ঠাকুরে ‘বঙ্গমাতা’ কবিতায় লিখছে না, ‘সাতকোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি কোরে মানুষ কর নি।’ ‘হ্যাঁ, উনিতো ঠিকই লিখেছেন, আমরাতো আজও মানুষ হোতে পারলামনা, নিজেরা নিজেরা, বাঙালি হোয়ে বাঙালিরা মারামারি খুনাখুনি করে মোরছি। আমরা বাঙালিই থেকে গেলাম কিন্তু মানুষ হোতে পারলাম না!’‘মানুষ হোইতে না পারলে আপনেরা জন্তু, তাই আমি কোইলাম ‘বঙ্গমাতার জন্তু পোলা’ বঙ্গমাতার পোলাপান জীন্দেগীতে আর মানুষ হোইবো না হালারা জন্তু জানোয়ারের মতুন নিজেরা নিজেরা কামড়া কামড়ি কোইরা মোরবো।’‘তা-তুই কথাটা খুব খারাপ বলিসনি, ‘বঙ্গমাতা’ কবিতায় কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু মনকষ্ট থেকে লিখেছেন, ‘সাতকোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি কোরে মানুষ কর নি।’ ‘আপনেরা মানুষ হোইবেন ক্যেমনে, এইযে দেখেন, ময়মনসিংহের, জামালপুরের, বোলতা গ্রামের মেলান্দা-দুর্মুঠের, কাদামিয়ার পোলার বংশধর, মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারগো সাহায্য কোইরা, দেশ স্বাধীনের পর হালার বাপেরে আখ খেতে ফালায়া মুন্সিগঞ্জের, আটপাড়ার মুক্তিযোদ্ধা, কি যেন নাম, হ্যেরা কি মাইরটাই না মারলো! তারপর হালারা কয়দিন আগে, নিজেগো মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি কয়া ক্যেমন মালটা কামায়লো! আর অহন কয়কি, হালার পোলা আগস্ট মুক্তিসেনা, এবার বুজেন আপনের ‘বঙ্গমাতার জন্তুপোলা’র কারবার। আবার হুনছি কাদা মিয়ার নাতি নাকি নিজেরে সাংবাদিক কয়া, বর্তমান পুরধানমন্ত্রীর কাছে ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ আবেদন করছে!’‘বলিস কী? ময়মনসিংহের, জামালপুরের, বোলতা গ্রামের মেলান্দা-দুর্মুঠের কাদামিয়া চেয়ারম্যানের বংশধররা এখন ‘ফ্যমিলি কার্ডের’ জন্য আবেদন করেছে! কিন্তু এটাতো দুস্থ পরিবারের জন্য, কাদামিয়া চেয়ারম্যানের বংশধর, কীভাবে আবেদন করবে?’‘ওম্মা আপনে জানেন না, কাদামিয়ার নাতি যেইটা নিজেরে সাংবাদিক কয়, হ্যেয়তো রহিমার বেডিরে বিয়া করছে, অহন রহিমার বেডি স্নো-পাওডার ধুয়া অরিজিনাল কামের বেডির মতুন পোষাক পিন্দা হেইদিন কড়াইল বস্তির পাশের টিএ্যান্ডটি’র মাঠে লাইন দিয়া দাঁড়ায়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’ লোইছে, ইউটিউবে দ্যেইখা আপনের ভাবি আমারে কয় দ্যেহ দ্যেহ আমাগো পুরধান মন্ত্রীর হাত থ্যেইক্কা কাদামিয়া চেয়ারম্যনের সাংবাদিক পোলার বৌ, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ লোইতাছে!”‘এই টাকা টাকা কোরে তোরা যে কোথায় নামিছিস তা তোরাই জানিস!’‘কারে দোষ দিবেন কন, এই যে কত বড় বড় একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধারা ট্যাকা ট্যাকা কোইরা পুরা বাঙালি জাতিটার বারটা বাজাইলো। আবার হুনছেননি, যুদ্ধ হোইলো ইরানে, আর এহানের বাঙালিরা পেট্রল কিননের লাই হ্যেতাগো লাইন দ্যেহেন!’‘যুদ্ধ বেশিদিন দীর্ঘায়িত হলে তেলের সাপ্লাই কমে যেতে পারে, তাই’‘ওপব্বারে, আব্রাহাম লিংকনের নাতি গাড়ি ছাড়া হ্যেরা ছলতে পারে না। আরে ব্যাটা খড়ম পায়ে তোরা বড় হোইছস। তেল নাই তো কয়দিন গাড়ি চালাবি না! কাদাময়ি, বগামিয়ার পোলা তোগো হালায় গাড়ি ছাড়া চলে না! আরে ব্যাটা মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় সৈন্যগো লগে মিল্লা দেশটা স্বাধীন না করলে, এইসব বগামিয়া, কাদামিয়া, চানমিয়া, শুকরমিয়া তোরানি পাজেরো চালাইতি? পাকিস্তান থাকলে তোর বাপে পাজেরা না, বইল গাড়ি চালাইতো বুঝছস।’‘আসলেই তুই ঠাট্টা-মশকরা যাই কর বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে, আমরা সারা জীবনেও এ্যতো প্রাচুর্য্য দেখতে পেতাম নারে। আজ বাঙালি উড়োজাহাজের মালিক, নিজস্ব স্যাটালাইটে সংবাদ প্রেরণ, ভাবতে পারিস!’‘তো এ্যতোই যদি বুঝছেন তয় এবার বাঙালি না থাইক্কা মানুষ হন তায়লেতো পৃথিবীর বুকে পাবলিকে আপনেগো সম্মান করবো।’‘জানিস কথাশিল্পী শওকত ওসমানও কবিগুরুর মতো বলতেন; কথাটা ঠিক মনে নেই... মানুষ হওয়া নিয়ে কি যেন বলতেন...’‘ কথাশিল্পী শওকত ওসমানও কবিগুরুর মতো বলতেন, ‘এ-দেশে মানুষ হওয়ার আগে হিন্দু বা ক্রীশ্চান হওয়া লাগে।’‘আরে না উনি হিন্দু বা ক্রীশ্চান না, অন্য কোনো ধর্মের কথা বোলেছেন।’‘আরে ছাড়েন ভাই আপনের, হিন্দু না ক্রীশ্চান, এইসব তর্ক থুয়া, দ্যেখেন ক্যেমনে বাঙালিরে মানুষ করবেন হেই কথা ভাবেন!’‘বাঙালি মানুষ হবে, মানুষ হবে বাঙালি, যারা তিন বছরের শিশুকে অত্যাচার করে, বৃদ্ধা মাকে গোয়ালে রাখে, রাস্তায় ফেলেদ্যেয়, মায়ের অন্যায় দেখে ‘ভয় পাইলে তো চোলবো না, মাইনষ্যে পারেনা এমন কোনো কামনাই, দেখি আমাগো নবনির্বাচিত সরকার বাঙালিরে মানুষ করা পারেনি?’‘দ্যেখ আশায় বুকবাঁধ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো বলেইছেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। এখন এই প্ল্যান যদি বাঙালিকে মানুষ করার প্ল্যান হয় তাহলেতো কথাই নেই।’‘যাক রোজার মাসে আপনের কথা যদি কবুল হয় তয়লেতো বাঙালি মানুষ হোইবোই।’‘আমারও মনে বড্ড আশা, আমাদের প্রধানমন্ত্রী হয়তো পারবেন বাঙালিকে মানুষ কোরতে।’‘চলেন তায়লে আমরা ব্যেবগতে মিল্লা কোই, ওই বাঙ্গালী এবার তোরা মানুষ হ...’‘তুই ঠিকই বলেছিস, মানুষই পারবে মানুষকে মানুষ করতে।’‘তায়লে আর কি, আপনের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো কন, ‘আরে তুই একেবারে আমার মনের কথা বলেছিস,নিশ্চয় বাঙালি একদিন মানুষ হবে, ‘মানুষে বিশ্বাস হারোনো পাপ’।[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

বিচারব্যবস্থায় আস্থা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা শুধু একটি প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়—এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। আদালত শুধু আইন প্রয়োগের স্থান নয়; এখানেই নাগরিক আস্থার সর্বোচ্চ পরীক্ষা ঘটে। মানুষ যখন আদালতের দ্বারস্থ হয়, তখন তারা শুধু একটি রায় প্রত্যাশা করে না; তারা ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা খোঁজে। কিন্তু বিচারব্যবস্থার ভেতর থেকেই যদি অনৈতিক আচরণ, ঘুষের অভিযোগ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত উঠে আসে, তবে সেই আঘাত কোনো একক মামলার সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তা সরাসরি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, বিচারিক নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থাকে নাড়া দেয়। তখন প্রশ্ন জাগে—ন্যায়বিচারের মন্দির কি সত্যিই অমলিন রয়েছে, নাকি তার ভেতরেই ধীরে ধীরে বিশ্বাসের ক্ষয় শুরু হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই আজ সময়ের দাবি।সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে কেন্দ্র করে যে বিতর্কের জন্ম হয়েছে, তা দেশের বিচারব্যবস্থা ও আইনি নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে যুদ্ধাপরাধের মতো সংবেদনশীল ও গুরুতর অপরাধের বিচার পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠিত এই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়ে আসছে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে অনিয়ম বা অনৈতিকতার অভিযোগ উঠলে তা স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক জনমনোযোগ আকর্ষণ করে। এই ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা আইনগত ও নৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কারাবন্দি এক সাবেক সংসদ সদস্যকে জামিনে মুক্তি দেয়ার বিষয়ে সহায়তার আশ্বাস দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকার কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।বিতর্কটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে যখন সংশ্লিষ্ট কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডিং গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় বলে জানা যায়। সেই রেকর্ডিংয়ে অর্থ লেনদেন এবং জামিনের বিষয়ে সম্ভাব্য প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিত রয়েছে—এমন দাবি সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যদিও এই অডিও রেকর্ডিংয়ের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা বিচারিক যাচাই সম্পন্ন হয়নি, তবুও বিষয়টি জনপরিসরে একটি গুরুতর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।অন্যদিকে অভিযুক্ত প্রসিকিউটর অভিযোগটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন যে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবুও এ ধরনের অভিযোগ সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই বিচারব্যবস্থার নৈতিক মানদণ্ড প্রসিকিউটরদের পেশাগত দায়িত্ব এবং বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আচরণ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; তা সরাসরি রাষ্ট্রের আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি জনগণের আস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিযোগের বিষয় নয়; বরং এটি বিচারিক নৈতিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং আইনি দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। তাই বিষয়টি আইন ও নীতির দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর নির্দিষ্ট নৈতিক, পেশাগত ও সাংবিধানিক দায়িত্ব আরোপিত থাকে। বিচারক, প্রসিকিউটর, আইনজীবী এবং তদন্তকারীÑ সবার সম্মিলিত ভ‚মিকার মাধ্যমেই একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বা প্রসিকিউটরের দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি শুধু কোনো পক্ষের প্রতিনিধি নন; বরং রাষ্ট্রের পক্ষে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষা করেন। এই কারণেই ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় প্রসিকিউটরকে প্রায়ই ‘মিনিস্টার অব জাস্টিস’ বা ন্যায়বিচারের সহায়ক হিসেবে অভিহিত করা হয়। তার প্রধান দায়িত্ব শুধু দোষ প্রমাণ করা নয়; বরং আদালতের সামনে নিরপেক্ষভাবে প্রমাণ উপস্থাপন করা, সাক্ষ্য-প্রমাণের সত্যতা যাচাই করা এবং বিচারিক সত্য উদ্ঘাটনে সহায়তা করা। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রসিকিউটরের এই নৈতিক ভ‚মিকা স্বীকৃত। যেমন—‘ইউনাইটেড নেশনস গাইডলাইনস অন দ্য রোল অব প্রসিকিউটরস’-এ বলা হয়েছে যে প্রসিকিউটরদের অবশ্যই নিরপেক্ষতা, সততা ও পেশাগত সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং কোনো ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা আর্থিক প্রভাবের অধীনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না।বাংলাদেশের আইনব্যবস্থাতেও এই নীতিগত দায়িত্ব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ার কাঠামো নির্ধারণকারী ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ অনুযায়ী রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতের সহায়ক হিসেবে কাজ করেন এবং তার প্রধান দায়িত্ব হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আদালতের সামনে যথাযথ তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করা। একইভাবে আইনজীবীদের পেশাগত আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী ‘দি বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল ওয়ার্ডার-১৯৭২’ (রাষ্ট্রপতি আদেশ নং-৪৬, ১৯৭২) এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিল-এর আচরণ বিধিতেও সততা, স্বচ্ছতা ও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কোনো প্রসিকিউটর যদি ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন—যেমন অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধার বিনিময়ে জামিন, অভিযোগ গঠন বা মামলা পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারÑ তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত অনৈতিকতা নয়; বরং গুরুতর পেশাগত অসদাচরণ এবং আইনের শাসনের পরিপন্থী আচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে।বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আলোকে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা একাধিক ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। বিশেষত দুর্নীতি বা অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন-এর। একই সঙ্গে দণ্ডবিধি আইন-১৮৬০-এর বিভিন্ন ধারায় সরকারি কর্মচারীর অসদাচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারিক কার্যক্রমে অনৈতিক হস্তক্ষেপকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বিচারপ্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার হাতে ন্যস্ত। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় জামিন দেয়া বা না দেয়ার ক্ষমতা একমাত্র আদালতের এখতিয়ারভুক্ত এবং তা বিচারকের স্বাধীন বিচারিক বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। তবে বাস্তবে প্রসিকিউটর আদালতের সামনে মামলার নথি উপস্থাপন করেন, তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এবং জামিন শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন। ফলে প্রমাণ উপস্থাপনের ধরন বা যুক্তির কাঠামো কখনও কখনও বিচারিক সিদ্ধান্তে পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে।এই প্রেক্ষাপটে বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপকে কেন্দ্র করে অনৈতিক প্রস্তাব বা দুর্নীতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তাই প্রসিকিউটরসহ বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির পেশাগত সততা ও নৈতিক দায়িত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিজিটাল প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা। অভিযোগকারী পক্ষ কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডিং সংরক্ষণ করেছে বলে দাবি করেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে অডিও, ভিডিও এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক তথ্য এখন বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনে ইলেকট্রনিক রেকর্ডের গ্রহণযোগ্যতা স্বীকৃত রয়েছে সাক্ষ্য আইন-১৮৭২-এর সংশোধিত বিধানে। তবে আদালতে এ ধরনের প্রমাণ গ্রহণযোগ্য হতে হলে তার উৎস, সত্যতা এবং অখণ্ডতা যাচাই করা অপরিহার্য। সন্দেহ দেখা দিলে আদালত প্রয়োজনে ফরেনসিক পরীক্ষার নির্দেশ দিতে পারেন। এ ধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে অডিওর সম্পাদনা, ভয়েস শনাক্তকরণ এবং ডিজিটাল মেটাডাটা বিশ্লেষণ করা হয়, যা সাধারণত পরিচালনা করে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের ফরেনসিক ল্যাবরেটরি বা অন্যান্য স্বীকৃত পরীক্ষাগার। বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অভিযোগ ওঠার পর নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। এ ধরনের অভিযোগ তদন্তের এখতিয়ার রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের এবং পেশাগত শৃঙ্খলার প্রশ্নে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের।আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো ‘ন্যাচারাল জাস্টিস’ বা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার, যার অন্যতম উপাদান হলো—কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়ার আগে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যায্য সুযোগ দেয়া। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণ বিশ্লেষণ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অপরিহার্য। অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মান পুনরুদ্ধার করা যেমন জরুরি, তেমনই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণও অপরিহার্য। কারণ বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।কাজেই, এ ধরনের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন অভিযোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি বিচারপ্রক্রিয়ার নৈতিক ভিত্তি, পেশাগত আচরণবিধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে স্বচ্ছতা, সততা এবং আইনের শাসনের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি বজায় থাকে। ন্যায়বিচারের প্রকৃত শক্তি শুধু আদালতের রায়ে নয়—বরং সেই রায়ের প্রতি মানুষের অবিচল বিশ্বাসে নিহিত। আর সেই বিশ্বাস রক্ষা করা রাষ্ট্র, বিচারক, আইনজীবী, প্রসিকিউটর এবং বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব।[লেখক: আইনজীবী] 

রাজা গিয়ে রাজা আসে, রাষ্ট্রের নীরবতায় ঝাপসা হয় বিচার

শক্তিমান কবি আবুল হাসানের বই ‘রাজা যায় রাজা আসে।’ ভাবনার নকল নয়, সমর্থন জারি রেখে শিরোনাম করেছি—রাজা গিয়ে রাজা আসে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন বক্তব্য লোকমুখের কিংবদন্তি। এর উত্তম নমুনা নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচার ১৩ বছর ঠেকিয়ে রাখা।রাষ্ট্র বদলায়, সরকার বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়—এরপরও যদি অবিচার থাকে, সেই পরিবর্তনের মূল্য কী? প্রশ্নটি আজ আবার সামনে এসেছে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের তেরো বছর পূর্তিতে।২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সুধীজন পাঠাগারে যাওয়ার পথে বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে অপহৃত হয়েছিল এক মেধাবী কিশোর। দুই দিন পর, ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে পাওয়া যায় তার নিথর দেহ। সেই কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সমাজের সম্ভাবনা এবং একটি রাষ্ট্রের বিবেক—সবকিছুকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল সেই দিনে।তেরো বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এই হত্যার বিচার এখনও শুরুই হয়নি। এটি শুধু একটি মামলার বিলম্ব নয়—এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো—অপরাধ হলে বিচার হবে। কিন্তু যখন সেই বিচারই বছরের পর বছর আটকে থাকে, তখন মানুষের মনে ভয় জন্মায়— রাষ্ট্র কি সত্যিই তার নাগরিককে রক্ষা করতে সক্ষম?খুনের দায় খুনির। এটি একটি নৈতিক ও আইনি সত্য। কিন্তু বিচার নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার। এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ খুনের বিচার শুধু ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য নয়; এটি সমগ্র সমাজের নিরাপত্তার প্রশ্ন।ত্বকী হত্যাকাণ্ড সেই কারণেই আজ একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে—ক্ষমতার ছায়ায় আটকে থাকা ন্যায়বিচারের প্রতীক।ঘটনার পর তদন্তে একাধিকবার অগ্রগতির দাবি এসেছে। আবার সেই অগ্রগতি থেমেও গেছে রহস্যময়ভাবে। তদন্তে উঠে এসেছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, এসেছে হত্যার বিস্তারিত বিবরণ। মামলার আসামি সুলতান শওকত ভ্রমর এবং ইউসুফ হোসেন লিটন ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছিলেন লোমহর্ষক তথ্য—তৎকালীন প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের টর্চার সেলে আজমেরী ওসমানের উপস্থিতিতে গজারির লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এবং শ্বাসরোধ করে ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছিল।২০১৪ সালে র‌্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হাসান সংবাদ সম্মেলনে এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছিলেন। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো—তারপরও এক যুগের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও মামলার চার্জশিট আদালতে জমা পড়েনি। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত অচল হয়ে আছে।এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—রাষ্ট্র কি সত্যিই এই হত্যার বিচার করতে চায়? না কি ক্ষমতার প্রভাবের কাছে বিচার প্রক্রিয়া বারবার থেমে যায়?একসময় নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা প্রায় কিংবদন্তির মতো শোনা যেত। সেই প্রভাবের ছায়া কি এখনও বিচার প্রক্রিয়াকে আটকে রেখেছে? যদি তাই হয়, তবে এটি শুধু একটি পরিবারের অপরাধের প্রশ্ন নয়—এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতার নির্মম স্বীকারোক্তি।এখন আর শুধু ওসমান পরিবারের ওপর দায় চাপিয়ে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ তেরো বছর ধরে বিচার না হওয়া মানে রাষ্ট্র নিজেই একটি নীরব দায় বহন করছে।একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা দরকার—মৃত্যুর কোনো প্রতিস্থাপন নেই। কোনো ক্ষতিপূরণ, কোনো সান্ত¡না, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য—কিছুই একটি সন্তানের মৃত্যু পূরণ করতে পারে না। যে পরিবার সন্তান হারায়, তাদের জীবনে সেই শূন্যতা আজীবনের। সুতরাং ত্বকীর বাবা-মায়ের কাছে বিচারও হয়তো সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না।তবুও বিচার দরকার। কেন?কারণ বিচার মানে প্রতিশোধ নয়; বিচার মানে ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা। বিচার মানে এই বার্তা দেয়া—এই সমাজে অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে না। বিচার মানে রাষ্ট্র খুনির পক্ষে নয়, মানুষের পক্ষে।ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি সেই লড়াইটাই করে যাচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমাজ, সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি মাসের ৮ তারিখ মোমবাতি হাতে আলোকপ্রজ্ব¡লন কর্মসূচি যেন রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দেয়Ñ একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনও বাকি।এটি শুধু একটি পরিবারের শোকের অনুষ্ঠান নয়; এটি রাষ্ট্রের বিবেক জাগানোর চেষ্টা।এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বিচার চাওয়ার ‘অপরাধে’ ত্বকীর পরিবার ও আন্দোলনকারীদের ওপর নেমে এসেছে দমন-পীড়ন। সাতটি মিথ্যা মামলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হয়রানি, প্রাণনাশের হুমকি—এসবের মধ্য দিয়েও আন্দোলন থামেনি। বরং দেশের সীমানা পেরিয়ে ২৩টি দেশেও এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ হয়েছে।এই দৃশ্য বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের জন্য গৌরবের। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার।গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন—হয়তো এবার দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটবে। কিন্তু এখনও সেই আশার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রায় দেড় বছর পার করে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু ত্বকী হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এতে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—খুনিদের প্রভাব কি এখনও এতটাই শক্তিশালী যে, রাষ্ট্রও তাদের সামনে নীরব?যদি সেটিই সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি হবে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় বিচারিক ব্যর্থতা।আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বহু ঘটনায় দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তাহলে একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার কেন বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে? ন্যায়বিচারের প্রশ্ন কি এখনও ক্ষমতার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ?এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আদালতের কাগজে নেই; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন।সংবিধান কোনো সরকারকে নাগরিক হত্যার বিচার আটকে রাখার অধিকার দেয় না। আইনের শাসনের মৌলিক নীতি একটাই—অপরাধীর বিচার হতে হবে। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, সেই নীতির পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়।ত্বকী হত্যার তেরো বছর পর এসে তাই প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই হত্যার বিচার কি সত্যিই হবে? নাকি এটি বাংলাদেশের বিচারহীনতার দীর্ঘ তালিকায় আরেকটি নাম হয়ে থাকবে?রাষ্ট্রের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে—আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আর সেই পথের প্রথম পরীক্ষাগুলোর একটি ত্বকী হত্যার বিচার।কারণ শেষ পর্যন্ত সত্যই সরল। খুনের দায় খুনির।আর বিচারের দায় বিচার ব্যবস্থার।এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই।[লেখক : কবি ও সাংবাদিক] 

ডিগ্রির পাহাড় ও দক্ষতার মরুভূমি

একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্ন সাধারণত শুরু হয় সন্তানের হাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের আকাক্সক্ষা দিয়ে। বছরের পর বছর ধরে বাবা-মায়ের হাড়ভাঙা খাটুনি আর জমানো শেষ সম্বলটুকু বাজি রেখে সন্তানকে উচ্চশিক্ষার আঙিনায় পাঠানো হয় এই বিশ্বাসে যে, একটি ডিগ্রি মানেই হলো উন্নত জীবনের চাবিকাঠি। কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের দিকে তাকালে এক রূঢ় ও বিষণ্ন চিত্র ফুটে ওঠে। একদিকে রাজপথে হাজার হাজার স্নাতকের দীর্ঘশ্বাস, যারা পকেটে সিভির স্তূপ নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন; অন্যদিকে বড় বড় শিল্পপতি ও নিয়োগকর্তাদের আক্ষেপ যে, তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য যোগ্য ও দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছেন না।এই যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত বেকারের পাশে শূন্য পড়ে থাকা উচ্চপদস্থ চাকরির অবস্থানÑ একে অর্থনীতিবিদরা ‘স্কিল মিসম্যাচ’ বা দক্ষতার অসংগতি বলে অভিহিত করেন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিপুল পরিমাণ সনদ তৈরি করছে ঠিকই, কিন্তু সেই সনদগুলো যখন কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতায় পা রাখছে, তখন সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে অকেজো কাগজে পরিণত হচ্ছে। এই কাঠামোগত অসংগতি কেবল শিক্ষিত তরুণদের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বড় ধরনের অন্তরায়।বাংলাদেশের এই উন্নয়ন যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকটি হলো স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চ‚ড়ান্ত উত্তরণ। ১৯৭৫ সাল থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালে জাতিসংঘের নির্ধারিত তিনটি শর্ত মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানব সম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক সফলভাবে পূরণ করে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই উত্তরণ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডভ্যালু বাড়িয়ে দেবে, বৈদেশিক বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দেবে এবং ঋণের ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতা প্রমাণ করবে।তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটিও আমাদের অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা বা জিএসপি হারাব, ওষুধের মেধাস্বত্ব বা ট্রিপস চুক্তির বিশেষ ছাড় সংকুচিত হবে এবং সহজ শর্তের ঋণের পরিবর্তে আমাদের কঠিন শর্তে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থায়ন করতে হবে। এই পরিবর্তিত ও প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে আমাদের সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উচ্চতর উৎপাদনশীলতায় মনোনিবেশ করতে হবে। আর সেই উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করার একমাত্র হাতিয়ার হলো দক্ষ জনবল। এলডিসি উত্তরণের পক্ষে যেমন আমাদের মর্যাদা বৃদ্ধির যুক্তি রয়েছে, তেমনই বিপক্ষে রয়েছে বাণিজ্য সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাÑ যা মোকাবিলা করার জন্য আমাদের বর্তমানের ‘শিক্ষা-চাকরি সংযোগের ব্যর্থতা’ দূর করা এখন জাতীয় নিরাপত্তার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।আমাদের উচ্চশিক্ষার একটি বড় ট্র্যাজেডি হলো তাত্তি¡ক জ্ঞানের ওপর অত্যধিক নির্ভরতা। শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর ধরে ক্লাসরুমে গাদা গাদা বই মুখস্থ করছে এবং পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়নে জিপিএ-৫ পাওয়ার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হচ্ছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় সফট স্কিল যেমনÑ দলগত কাজ, কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা, সৃজনশীল সমস্যা সমাধান এবং অভিযোজন ক্ষমতা শেখার কোনো সুযোগ তারা পাচ্ছে না। একজন শিক্ষার্থী চার বছর একটি বিষয়ে স্নাতক শেষ করার পরেও যখন দেখা যায় সে একটি সাধারণ পেশাদার ইমেইল লিখতে পারছে না কিংবা মাইক্রোসফট এক্সেলের প্রাথমিক কাজগুলো করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন বুঝতে হবে আমাদের শিক্ষাক্রমের গোড়াতেই গলদ রয়ে গেছে। এই তত্ত¡সর্বস্ব শিক্ষা তরুণদের মনে এক ধরনের কৃত্রিম আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, যা চাকরির বাজারের প্রথম ইন্টারভিউতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ফলে ডিগ্রি অর্জনের আনন্দ দ্রæতই বেকারত্বের বিষাদে রূপ নেয়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প খাতের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব। উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরাসরি গবেষণাগার হিসেবে কাজ করে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য। সেখানে কারিকুলাম তৈরি করা হয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী। কিন্তু বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে এই সেতুবন্ধনটি এখনও অত্যন্ত দুর্বল। নিয়োগকর্তারা কী ধরনের কর্মী চান আর শিক্ষকরা কী পড়াচ্ছেন এই দুইয়ের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই বললেই চলে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিশ্ববাজারে যে প্রযুক্তির চাহিদা দশ বছর আগে শেষ হয়ে গেছে, আমাদের পাঠ্যবইয়ে এখনও সেই পুরনো প্রযুক্তিই পড়ানো হচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশন বা শিল্প-শিক্ষা সংযোগ না থাকার ফলে শিক্ষার্থীরা তাত্তি¡কভাবে শক্তিশালী হলেও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে পুরোপুরি আনাড়ি থেকে যাচ্ছে। ইন্টার্নশিপ বা হাতে-কলমে শিক্ষার সুযোগগুলো এখনও কেবল কিছু মুষ্টিমেয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যা দেশের বৃহত্তর স্নাতক জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ধরনের বঞ্চনা।চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আমাদের শ্রমবাজারকে আমূল বদলে দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স এবং অটোমেশন এখন কোনো শৌখিন শব্দ নয়, বরং এগুলো এখন পেশাদার জীবনের অপরিহার্য অংশ। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের উচ্চশিক্ষার একটি বড় অংশ এখনও এই নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। নিয়োগকর্তারা এখন আর কেবল সনদের নাম দেখেন না, তারা দেখেন প্রার্থীর ডিজিটাল লিটারেসি বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। যে শিক্ষার্থী দ্রুত পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না, তার জন্য এখনকার বৈশ্বিক বাজারে কোনো জায়গা নেই। কিন্তু আমাদের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও পুরনো শিক্ষাদান পদ্ধতি আঁকড়ে ধরে আছে এবং নতুন যুগের কারিগরি দক্ষতাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে অনীহা দেখাচ্ছে। এই স্থবিরতা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কয়েক ধাপ পিছিয়ে দিচ্ছে।সামাজিকভাবে আমাদের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি অবজ্ঞা। আমাদের সমাজে একজন সাধারণ স্নাতক ডিগ্রিকে যতটা সম্মানের চোখে দেখা হয়, একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান বা মেকানিককে ততটা মূল্যায়ন করা হয় না। এই ভ্রান্ত মানসিকতার কারণে মেধা ও আগ্রহ থাকা সত্তে¡ও অনেক তরুণ কারিগরি শিক্ষার পরিবর্তে তথাকথিত সাধারণ ডিগ্রির পেছনে ছুটছে। এর ফলে বাজারে বিএ বা এমএ পাস করা বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অথচ দক্ষ প্লাম্বার, এসি টেকনিশিয়ান বা আধুনিক মেশিন অপারেটরের জন্য আমাদের বিদেশিদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। এই সামাজিক কলঙ্ক বা স্টিগমা দূর করা না গেলে শ্রমবাজারের ভারসাম্য কখনই ফিরবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতির উন্নয়নের জন্য কেবল পিএইচডিধারী গবেষক প্রয়োজন নেই, তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন একঝাঁক দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন পেশাদার।এই দক্ষতার ঘাটতি কেবল ব্যক্তিগত বেকারত্ব বাড়াচ্ছে না, বরং আমাদের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাকেও কমিয়ে দিচ্ছে। যখন একটি কোম্পানি উপযুক্ত কর্মী পায় না, তখন তারা হয় উচ্চ বেতনে বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেয় অথবা তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়। উভয় ক্ষেত্রেই দেশের টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে অথবা জাতীয় প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ যখন তার তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে অন্য খাতগুলোতে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে, তখন এই স্কিল মিসম্যাচ একটি বড় দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং হালকা প্রকৌশল শিল্পের বিকাশের জন্য যে ধরনের বিশেষায়িত জ্ঞান প্রয়োজন, তা আমাদের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে আমরা সস্তা শ্রমের বৃত্তে আটকে আছি, যা এলডিসি-পরবর্তী সময়ে আমাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্রমবর্ধমান এই বেকারত্ব এক ধরনের সামাজিক অস্থিরতারও জন্ম দিচ্ছে। যখন একজন যুবক তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো পড়ালেখায় ব্যয় করে শূন্য হাতে ঘরে ফেরে, তখন তার মধ্যে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি এক ধরনের চরম অনীহা ও হতাশা তৈরি হয়। এই হতাশা থেকেই অনেক সময় মাদকাসক্তি বা অনৈতিক কর্মকাÐের পথে পা বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দেয়। মেধাবী তরুণদের এই অপচয় একটি দেশের জন্য বিশাল অপূরণীয় ক্ষতি। বর্তমান এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের সময়টিকে যদি আমরা সঠিক দক্ষতায় রূপান্তর করতে না পারি, তবে এই লভ্যাংশ অচিরেই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিজাস্টার’ বা জনমিতিক বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্যকে কেবল জ্ঞান আহরণ নয়, বরং কর্মমুখী যোগ্যতায় রূপান্তরিত করতে হবে।এই সংকট উত্তরণের জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শক্তিশালী ক্যারিয়ার গাইডেন্স এবং প্লেসমেন্ট সেল থাকতে হবে- যা সরাসরি শিল্প খাতের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। পাঠ্যক্রমে তাত্তি¡ক জ্ঞানের পাশাপাশি অন্তত ছয় মাসের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ বা প্রজেক্টভিত্তিক কাজ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারিগরি শিক্ষাকে সামাজিকভাবে জনপ্রিয় করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে এবং কারিগরি শিক্ষার সুযোগ গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কেবল মগজের উন্নয়ন নয়, এটি হাতের কাজের উন্নয়নও বটে। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং রিফ্রেশার কোর্সের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত রাখতে হবে যাতে তারা শিক্ষার্থীদের সঠিক দিশা দিতে পারেন। শিল্প খাতের নেতাদেরও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। নিয়োগকর্তাদের উচিত হবে কেবল অভিজ্ঞ কর্মী না খুঁজে নবীন স্নাতকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তোলার মানসিকতা রাখা। প্রতিটি বড় প্রতিষ্ঠানে লার্নিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থাকা উচিতÑ যা নতুন কর্মীদের আধুনিক দক্ষতায় ঝালিয়ে নেবে। সরকার নীতিগত প্রণোদনার মাধ্যমে সেই সব প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করতে পারে যারা ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া পার্টনারশিপে সক্রিয় ভ‚মিকা রাখছে। আমাদের তরুণরা মেধাবী, কেবল প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা এবং সুযোগের। শিক্ষা আর কর্মসংস্থানের মাঝখানের এই সাঁকোটি যদি আমরা মজবুত করতে পারি, তবেই ২০২৬ পরবর্তী উন্নয়নশীল বাংলাদেশ তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।শিক্ষা হওয়া উচিত মুক্তির আনন্দ, বোঝার বোঝা নয়। একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হবে, তখন তার হাতে কেবল একটি কাগজ নয় বরং একটি নিশ্চিত আত্মবিশ্বাস থাকা উচিত যে, সে তার মেধা দিয়ে যেকোনো কর্মক্ষেত্রে নিজের জায়গা করে নিতে পারবে। আমাদের জাতীয় আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন তখনই সার্থক হবে যখন আমাদের ডিগ্রির পাহাড় দক্ষতার মরুভ‚মিতে হারিয়ে যাবে না, বরং প্রতিটি সনদ একেকটি দক্ষ হাতের শক্তিতে রূপান্তরিত হবে। এলডিসি উত্তরণের এই ক্রান্তিকালে আমাদের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং স্মার্ট কর্মসংস্থান। তবেই আমরা বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।[লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

ভিডিও

তামিমের সেঞ্চুরিতে লড়াকু বাংলাদেশ

মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আজ উৎসবের আমেজ। টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামলেও শুরু থেকেই দাপট দেখিয়েছে স্বাগতিক বাংলাদেশ।তানজিদ হাসান তামিমের নান্দনিক সেঞ্চুরিতে ভর করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ২৯০ রানের চ্যালেঞ্জিং পুঁজি সংগ্রহ করেছে টাইগাররা। সিরিজের শেষ ও নির্ণায়ক এই ম্যাচে জয়ের জন্য বাবর আজমের দলের প্রয়োজন ২৯১ রান।রোববার দুপুরে টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন পাকিস্তান অধিনায়ক। তবে তার সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করতে সময় নেননি বাংলাদেশের দুই ওপেনার সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিম।উদ্বোধনী জুটিতেই তারা ১৭.৪ ওভারে স্কোরবোর্ডে ১০০ রান যোগ করেন। শাহিন আফ্রিদি ও হারিস রউফদের ওপর শুরু থেকেই চড়াও হয়ে খেলেন তানজিদ তামিম। মাত্র ৪৭ বলে চলতি সিরিজে নিজের দ্বিতীয় হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করেন এই বাঁহাতি ওপেনার, যা তার ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ওয়ানডে ফিফটি।ব্যক্তিগত ৩৬ রানে সাইফ হাসান বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফিরলে ভাঙে ১০৫ রানের উদ্বোধনী জুটি। এরপর নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়ে ইনিংস মেরামতের কাজ শুরু করেন তামিম। এই জুটিতে যোগ হয় আরও ৫৩ রান।তবে ২৭ রান করে হারিস রউফের বলে এলবিডব্লিউর শিকার হন শান্ত। এক প্রান্ত আগলে রাখা তানজিদ তামিম এরপর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন এবং দর্শনীয় এক ছক্কায় ৯৮ বলে পূর্ণ করেন ক্যারিয়ারের দর্শনীয় এক সেঞ্চুরি। শেষ পর্যন্ত আবরার আহমেদের বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরার আগে ১০৭ বলে ১০৭ রানের ইনিংস খেলেন তিনি, যেখানে ছিল ৬টি চার ও ৭টি ছক্কার মার।ইনিংসের শেষ দিকে অভিজ্ঞ লিটন দাস ৫১ বলে ৪১ রানের ধীরস্থির ইনিংস খেলে বাংলাদেশকে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে নেন।আর শেষ মুহূর্তে তাওহিদ হৃদয়ের অপরাজিত ৪৮ রানের ক্যামিও ইনিংসটি বাংলাদেশকে তিন’শর কাছাকাছি পৌঁছে দেয়। আফিফ হোসেন দ্রুত ফিরলেও হৃদয় ৪৪ বলে ৪টি বাউন্ডারি হাঁকিয়ে দলের লড়াকু পুঁজি নিশ্চিত করেন। পাকিস্তানের পক্ষে হারিস রউফ ৩টি উইকেট শিকার করলেও টাইগার ব্যাটসম্যানদের দাপট কমাতে পারেননি।

তামিমের সেঞ্চুরিতে লড়াকু বাংলাদেশ
১২ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাঝে চলমান ODI সিরিজে কে জিতবে ?

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাঝে চলমান ODI সিরিজে কে জিতবে ?

  বাংলাদেশ
  পাকিস্তান
  মন্তব্য করা কঠিন
মোট ভোটদাতাঃ জন