সংবাদ
অপ্রতিম হত্যা: প্রধান অভিযুক্তসহ গ্রেপ্তার ৪, অপরাধ স্বীকার

অপ্রতিম হত্যা: প্রধান অভিযুক্তসহ গ্রেপ্তার ৪, অপরাধ স্বীকার

কুমিল্লায় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের কাছে থেকে নিহত কিশোরের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা অপ্রতিমকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। ​ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। এরপর থেকে সে নিখোঁজ ছিল। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে। ​সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "কুমিল্লার ঘটনাটা একটা মর্মান্তিক ঘটনা। সারাদেশবাসী খুব মর্মাহত। একটা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুই বলা যায়, তার বয়স সম্ভবত ১৩ বছর। নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায় এবং ডেড বডি উদ্ধার করা হয়। তার ১২ ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহভাজন সমস্ত আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবমতে, আগে তিনজন, আজ একজনসহ মোট চারজন গ্রেপ্তার হয়েছে এবং তারা অপরাধ স্বীকার করেছে। এখন বাকি আইনানুগ প্রক্রিয়া চলমান।" ​গ্রেপ্তারদের পরিচয় ও তাদের বয়স সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দুইজনের বয়স সম্ভবত ১৮ বছরের বেশি, একজনের কম হতে পারে, এখনও এনআইডি চেক করা হচ্ছে। তারা অনেকটা কিশোর অপরাধ চক্রের মতো। তাদের সঙ্গে এই ছেলের সম্পর্ক ছিল, ওঠাবসা ছিল, বন্ধুত্ব ছিল। প্রায় সময় আড্ডা দিত। খোঁজখবর এবং অন্যান্য তথ্য নিয়ে যা দেখা গিয়েছে, তারা এই ছেলের বয়সের ৫ থেকে ১০ বছর বড়। ​হত্যার প্রধান ক্লু ও ফোন উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি আরও বলেন, "যে মোবাইল নিয়ে ঘটনা, সেই মোবাইলটা উদ্ধার করা হয়েছে প্রধানতম সন্দেহভাজন আসামির কাছে। ওর নাম তুহিন। সমস্ত আলামত পাওয়া গেছে। তারা ঘটনা স্বীকার করেছে। এখন পুলিশ অন্যান্য আইনানুগ কার্যক্রম বা ১৬৪ করানো যায় কি না, এগুলো নিয়ে কাজ করছে।" ​তদন্তের অগ্রগতি ও পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "এখানে পুলিশের আমরা প্রশংসা করতে পারি যে তারা ১২ ঘণ্টার ভেতরে সমস্ত আসামিদেরকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে এবং আলামতসহ অন্যান্য বিষয়গুলো জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। তারা ফরেনসিক অ্যানালাইসিস করছে এবং নিহতের পোস্টমর্টেম করানো হয়েছে, তার দাফন হয়েছে আজকে।" ​আইনি প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে আশা প্রকাশ করে তিনি মন্তব্য করেন, "আশা করি, রামিসা হত্যার বিচারের মতো এই হত্যাকাণ্ডের বিচারটা আমরা সংক্ষিপ্ত সময়ে সমাপ্ত করাতে পারব। বিচার করবে আদালত। আমরা সহযোগিতা করব আমাদের সমস্ত যেটা আইনানুগ প্রক্রিয়া আছে, সেগুলো সম্পন্ন করে চার্জশিট দাখিলের মধ্য দিয়ে। আশা করি বিচার বিভাগ সে বিষয়টায় গুরুত্ব দিয়ে রামিসা হত্যাকাণ্ডের জন্য যেভাবে দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন হয়েছে, সেরকম একটা পদক্ষেপ নিবেন।"
৩৪ মিনিট আগে

মতামতমতামত

একটি আইফোন কি জীবনের চেয়েও বড়

অপ্রতিমের মৃত্যু শুধুই একটি ফোনের গল্প নয়। মানুষ, বাজার, মর্যাদা, বৈষম্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে এক ভয়ংকর প্রশ্ন। অপ্রতিমের বাবা শোকে পাথর হয়ে প্রশ্ন করেছেন—“সামান্য একটা আইফোনের জন্য ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হলো?” এই প্রশ্নটির ভেতরে আটকে আছে পুরো ঘটনার ভয়াবহতা।তবে একটি ফোন; বিনিময়ে একটি শিশুর জীবন— এই প্রশ্নটি আরও গভীর। একটি আইফোন কি সত্যিই জীবনের চেয়ে বড় হয়ে গেছে, নাকি গভীর সামাজিক অসুখের দৃশ্যমান প্রতীক, যেখানে মানুষের মূল্য ক্রমশ তার মানবিকতার বদলে তার সম্পদ, ভোগক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা ও দৃশ্যমান সাফল্য দিয়ে মাপা হচ্ছে?অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়। এটি সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়। একটি ফোনের দাম আর একটি জীবনের মূল্য এক জিনিস নয়। একটি আইফোনের বাজারমূল্য যতই হোক, তার সঙ্গে একটি মানুষের জীবনের কোনো অর্থনৈতিক তুলনা সম্ভব নয়। মানুষের জীবনকে টাকার অঙ্কে মাপা যায় না।প্রশ্নটি আজ সামনে আসার কারণ হচ্ছে, অর্থনীতি আমাদের অদ্ভুত এক বাস্তবতা শিখিয়েছে। বাজারে কিছু জিনিসের দাম আছে ঠিকই, তবে সব কিছুর মূল্য কিন্তু নেই। একটি ফোনের দাম নির্ধারিত হয় তার উৎপাদন খরচ, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন, সরবরাহব্যবস্থা, ব্র্যান্ড, বিপণন, মুনাফা, কর ও বাজারের চাহিদাসহ বহু বিষয়ের মাধ্যমে। কিন্তু একটি শিশুর জীবনের কোনো ‘বাজারদর’ নেই। তার মূল্য অর্থনৈতিকভাবে বিচারও করা সম্ভব নয়। যা অন্তর্নিহিত মানবিক মূল্য। সভ্যতার মূল শিক্ষাও এখানেই। বাজারের মূল্য আর মানুষের মূল্য এক নয়। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন বাজারের মূল্যবোধ মানুষের নৈতিক মূল্যবোধকে গ্রাস করতে থাকে।আইফোন একটি প্রযুক্তিপণ্য। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক প্রতীকও। বিখ্যাত মার্কিন অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী থর্সটেইন ভেবলেনের ‘প্রদর্শনমূলক ভোগ’-এর ধারণাটি এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। মানুষ অনেক সময় কোনো বস্তু শুধু ব্যবহারিক প্রয়োজনের জন্য কেনে না; সেই বস্তুটি তার সামাজিক অবস্থান, রুচি, সামর্থ্য বা মর্যাদার সংকেতও বহন করে।যেমন একটি দামি গাড়ি শুধু যাতায়াতের যন্ত্র নয়। একইভাবে দামি ঘড়ি শুধু সময় দেখায় না, ব্র্যান্ডের পোশাকও শুধু শরীর ঢাকে না। তাই একটি আইফোন শুধু ফোন নয়, এর পেছনে পড়ে থাকে বড় একটা সামাজিক গল্প। এসব বস্তু কখনো কখনো সামাজিক ভাষায় বলে—‘আমি কে।’ অর্থাৎ পণ্যটি তখন ব্যবহারিক বস্তু থেকে ‘মর্যাদার প্রতীক’-এ পরিণত হয়।এখানে অপ্রতিমের ঘটনাটি আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। যে সমাজে বস্তু সামাজিক মর্যাদার সংকেত হয়ে ওঠে, সেই সমাজে সেই বস্তু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও কি কখনো অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হয়ে উঠতে পারে? এক কথায় উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, পারে।তবে আইফোনকে সরাসরি অপ্রতিম হত্যার কারণ বলা যাবে না। কারণ একটি দামি ফোন দেখা আর সেটি পাওয়ার জন্য হত্যাকাণ্ড ঘটানোর মাঝখানে অপরাধপ্রবণতা, সুযোগ, সিদ্ধান্ত, সামাজিক পরিবেশ, আইন প্রয়োগসহ বহু স্তর রয়েছে। যার মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই শহরে কেউ এমন একটি ফোন ব্যবহার করে যার দাম একজন নিম্নআয়ের মানুষের বহু মাসের আয়ের সমান। আবার অন্য কেউ সেই ফোনটিকে দেখে নিজের অক্ষমতার প্রতীক হিসেবে। এখানেই তৈরি হতে পারে “আপেক্ষিক বঞ্চনা”। নিজের জীবনকে কেউ কেবল নিজের অবস্থার সঙ্গে নয়, অন্যের অবস্থার সঙ্গেও তুলনা করতে শুরু করে।আমার নেই, তার আছে; সে পারছে, আমি পারছি না; সে সম্মান পাচ্ছে, আমি পাচ্ছি না; তার জীবন সফল, আমার জীবন ব্যর্থ —এসব তুলনা সবসময় যে অপরাধ তৈরি করে তা নয়। তবে তীব্র সামাজিক বৈষম্য, সীমিত সুযোগ, ভঙ্গুর সামাজিক সুরক্ষা, অপরাধী সংস্কৃতি, মাদক, সহিংসতার অভিজ্ঞতা আর দুর্বল সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যখন এই বঞ্চনাবোধ যুক্ত হয়, তখন ঝুঁকি বাড়তে পারে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শিশু ও কিশোর সহিংসতা বিষয়ক বিশ্লেষণেও দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য, বেকারত্ব, মাদক, সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ, দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ও দুর্বল আইন প্রয়োগকে বিভিন্ন স্তরের ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।অর্থাৎ অপ্রতিমের হত্যাকে শুধু ‘লোভী অপরাধীর কাজ’ বললে আমরা হয়তো অপরাধীকে ধরতে পারব, কিন্তু অপরাধের সামাজিক পরিবেশটি বুঝতে পারব না।আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রভাবশালী তাত্ত্বিক এমিল ডুর্খেইমের “অ্যানোমিয়া” ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। সহজ বাংলায়—সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যখন মানুষের আকাঙ্ক্ষা, আচরণ ও বাস্তবতার সঙ্গে তাল হারিয়ে ফেলে, তখন এক ধরনের নৈতিক-সামাজিক শূন্যতা তৈরি হয়।  যেমনটি আমরা কোনো তরুণদের বলি—সফল হও; কিন্তু কখনও বলি না, সফলতার অর্থ আসলে কী? আবার বলে বসি, বড় হও; অথচ, বড় হওয়ার মাপকাঠি কী, সেটাই ব্যাখ্যা করি না। ঠিক একইভাবে আমরা বলি, দামি ফোন রাখো, ভালো গাড়ি চালাও, ভালো বাড়িতে থাকো। বলি না, ভালো মানুষ হও।সাফল্যের এই দৃশ্যমান প্রতীকগুলো নৈতিক সাফল্যের জায়গা দখল করতে পারে। ফলে অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের সেই প্রশ্নই করে— আমরা সন্তানদের শুধুই সাফল্যের ভাষা শেখাচ্ছি, অথচ জীবনের মূল্য শেখাচ্ছি না? প্রশ্ন আসে, সন্তানদের শিক্ষা কি শুধুই চাকরির জন্য?এখানেই হাজির হয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রশ্ন। আমাদের শিক্ষার বড় অংশ এখনও পরীক্ষার ফল, জিপিএ, ভর্তি পরীক্ষা, চাকরি, আয়—এসবের চারপাশে ঘোরে। বলছি না এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়।  কিন্তু একটি শিশুকে কি আমরা কখনও শেখাই—কেন অন্য মানুষের জীবনকেও সম্মান করতে হবে? রাগ হলে কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়? প্রত্যাখ্যান কীভাবে সামলাতে হয়? লোভ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়? অন্যের সম্পদ দেখে হীনম্মন্যতা বা ঈর্ষা হলে কীভাবে তা মোকাবিলা করতে হয়? ডিজিটাল জগতে প্রলোভন ও অপরাধ থেকে কীভাবে নিজেকে দূরে রাখতে হয়? সহিংসতা কখনও সমস্যার সমাধান নয়—এই শিক্ষা কি আমরা দিচ্ছি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও কিশোর সহিংসতা প্রতিরোধে জীবনদক্ষতা, রাগ নিয়ন্ত্রণ, দ্বন্দ্ব সমাধান, সামাজিক দক্ষতা ও স্কুলভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ শিক্ষা শুধু কীভাবে উপার্জন করব, তা শেখালেই হবে না। শিক্ষাকে শেখাতে হবে—কীভাবে মানুষ হব।সরলীকরণের প্রশ্ন হচ্ছে, প্রযুক্তি কি অপরাধ তৈরি করে? এখানে প্রযুক্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও ভুল। মূলত, আইফোন কোনো হত্যাকারী তৈরি করে না।  স্মার্টফোন নিজেও অপরাধী নয়।প্রযুক্তি মানুষের সক্ষমতা বাড়ায়। সেই সক্ষমতা ভালো কাজেও ব্যবহার করা যায়, অপরাধেও।আজ অপ্রতিমের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজই তদন্তকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে এবং সেই সূত্রে ফোন উদ্ধার হয়েছে।  অর্থাৎ প্রযুক্তি একই সঙ্গে ঝুঁকি ও প্রতিরোধের হাতিয়ার।  সমস্যা তাই প্রযুক্তিতে নয়; প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটি কী ধরনের?এখানে আইফোনের আরেকটি ভয়ংকর দিক হচ্ছে, এটি ‘মূল্যবান বস্তু’ থেকে ‘লক্ষ্যবস্তু’ হয়ে যেতে পারে। একটি দামি ও সহজে বহনযোগ্য পণ্য অপরাধের বাজারে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। এখানে অর্থনীতির খুব সরল একটি সূত্র কাজ করে। বেশি দাম, সহজে বহনযোগ্য, সহজেই বেচাকেনা- সেখান থেকে অপরাধের লক্ষ্য। তবে এখানে শুধু শুধু পণ্যের দাম দায়ী নয়।  প্রশ্নটি হচ্ছে—অপরাধী কি মনে করছে সে সহজে পার পেয়ে যাবে?আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? চুরি করা ফোনের বাজার আছে কি? চুরি করা পণ্য শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? অপরাধীর ঝুঁকি কতটা? অপরাধের সম্ভাব্য লাভ ও শাস্তির সম্ভাব্য ক্ষতির মধ্যে কোনটি বেশি? এগুলো নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অপরাধতত্ত্বের প্রশ্ন।এখানে রাষ্ট্রতত্ত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ দার্শনিক টমাস হবসের সামাজিক চুক্তির ধারণায় রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক যুক্তি হলো—মানুষ যেন পরস্পরের বিরুদ্ধে অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতায় না যায়। আধুনিক রাষ্ট্রের শক্তি এখানেই যে, ব্যক্তিগত প্রতিশোধের বদলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।একজন মানুষের ফোন চুরি হয়েছে—সে নিজে বিচার করবে না। একজন মানুষ প্রতারিত হয়েছে—সে নিজে শাস্তি দেবে না। একজন মানুষ অপমানিত হয়েছে—সে খুনি হয়ে উঠবে না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বলবে—অপরাধ হয়েছে। তদন্ত হবে। প্রমাণ সংগ্রহ হবে। বিচার হবে।এই ব্যবস্থা দুর্বল হলে মানুষের কাছে অপরাধের সম্ভাব্য লাভ ও শাস্তির ভয়—দুটির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সহিংসতার সামাজিক ঝুঁকির মধ্যে দুর্বল শাসনব্যবস্থা, দুর্বল আইন প্রয়োগ, দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ও অপর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।তাই অপ্রতিমের হত্যার পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ‘খুনি ধরেছি’ বলায় শেষ নয়। রাষ্ট্রকে এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে খুন করার আগে অপরাধী জানবে—ধরা পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিচার এড়ানোর সুযোগ ক্ষীণ।বিবর্তনতত্ত্ব আমাদের আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য শেখায়। মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা নতুন নয়। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ খাদ্য, আশ্রয়, সঙ্গী, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা—সবকিছুর জন্য প্রতিযোগিতা করেছে। সামাজিক মর্যাদার সংকেতও মানবসমাজে নতুন নয়। অর্থাৎ মর্যাদার প্রতিযোগিতা বা সামাজিক অবস্থানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানবসমাজের একেবারে নতুন আবিষ্কার নয়।কিন্তু আধুনিক ভোক্তা অর্থনীতি এই প্রতিযোগিতাকে অভূতপূর্ব মাত্রায় দৃশ্যমান করেছে।সামাজিকমাধ্যম আবার সেই দৃশ্যমানতাকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। আগে আপনি জানতেন আপনার প্রতিবেশীর বাড়ি কত বড়। এখন আপনি একই দিনে শত মানুষের গাড়ি, ফোন, বাড়ি, ভ্রমণ, পোশাক, জীবনযাপন দেখতে পারেন। ফলে তুলনার ক্ষেত্রটি স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক হয়ে গেছে। মানুষের পুরোনো মর্যাদা-প্রতিযোগিতা পেয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির অসীম প্রদর্শনক্ষেত্র। বিপদ এখানেই।  অপ্রতিম আমাদের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি রেখে গেছে। অপ্রতিমের হত্যার বিচার অবশ্যই হতে হবে। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত হতে হবে। যারা দায়ী, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের নিজেদেরও বিচার করতে হবে। আমরা সন্তানকে কী শেখাচ্ছি? দামি ফোন রাখলে তুমি সফল, নাকি মানুষকে সম্মান করলে তুমি সফল? আমরা শিক্ষাকে কী বানাচ্ছি? শুধু উপার্জনের যন্ত্র নাকি মানুষ হওয়ার প্রশিক্ষণ? আমরা অর্থনীতিকে কী শেখাচ্ছি? আরও বেশি ভোগ নাকি ন্যায্য সুযোগ ও মর্যাদা? আমরা প্রযুক্তিকে কী বানাচ্ছি? মানুষের সময় ও মনোযোগ দখলের যন্ত্র, নাকি— জ্ঞান, নিরাপত্তা ও মানবিক সংযোগের মাধ্যম?আমরা রাষ্ট্রকে কী হিসেবে চাই? ঘটনার পর খুনি ধরুক নাকি অপরাধের আগে এমন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করুক, যেখানে অপরাধ করার ঝুঁকি বেশি এবং মানুষের জীবন নিরাপদ?অপ্রতিমের মৃত্যুর সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা হয়তো এটাই—আইফোনের দাম আছে। মানুষের জীবনের দাম নেই—কারণ মানুষের জীবনের মূল্য আছে।দাম আর মূল্য এক জিনিস নয়। বাজার কোনো পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে পারে। রাষ্ট্র কোনো অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করতে পারে। অর্থনীতি আয়-ব্যয়ের হিসাব করতে পারে। প্রযুক্তি মানুষের সময় মাপতে পারে। কিন্তু মানুষের মর্যাদার হিসাব কোনো বাজার, কোনো অ্যালগরিদম, কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো রাষ্ট্র কিংবা কোনো ফোন দিয়ে করা যায় না। ১৩ বছরের অপ্রতিমের জীবন আমাদের সেই মৌলিক সত্যটিই আবার মনে করিয়ে দিল। একটি ফোন হারিয়ে গেলে নতুন ফোন কেনা যায়। টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়। ক্ষমতা হারালে আবার ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করা যায়। কিন্তু—একটি শিশুর জীবন একবার চলে গেলে তাকে কোনো প্রযুক্তি, কোনো অর্থনীতি, কোনো রাষ্ট্র, কোনো বিচারই ফিরিয়ে দিতে পারে না।তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত আইফোনকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আমাদের নিয়ে। আমরা কি এমন একটি সমাজ বানাতে চাই, যেখানে মানুষ জিনিসের জন্য বাঁচবে—নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে জিনিস মানুষের জন্য থাকবে? অপ্রতিমের রক্তাক্ত শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে সভ্যতার কাছে প্রশ্নটি এখন একেবারেই সরল—একটি আইফোন কি জীবনের চেয়েও বড়? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে সেই ‘না’ শুধু কথায় নয়—আমাদের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগ, আইন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেও প্রমাণ করতে হবে।লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ব্রিকস সম্মেলন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক হিসাব

১২-১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত হলো ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। ২০০৬ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের হাতে এই ফোরামের যাত্রা শুরু। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে নাম হয় ব্রিকস। বর্তমানে সদস্য ১১টি—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া। এছাড়া ১০টি অংশীদার দেশ আছে—বেলারুশ, বলিভিয়া, কিউবা, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নির্মাণ’। এই জোট এখন বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ, জনসংখ্যার ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ ও বাণিজ্যের ২৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। বৈশ্বিক দক্ষিণের এই বৃহৎ সমাবেশে জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধানসহ আসিয়ান, আফ্রিকান ইউনিয়ন, লাতিন আমেরিকার সেলাক, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ ও বিমসটেকের চেয়ারদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।সম্মেলনের মূল অর্জন যৌথ ঘোষণা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, ইরান-আমিরাত বৈরিতা এবং চীন-ভারত সীমান্তের টানাপোড়েনের মধ্যেও ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা ২০২৬’ সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে সর্বোচ্চ সংযম, বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা, গাজায় যুদ্ধবিরতি, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, বাছবিচারহীন শুল্ক ও একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের সংস্কারের আহ্বান আছে। ঘোষণায় জাতিসংঘের কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, যা পরোক্ষভাবে ভারত ও ব্রাজিলের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের দাবির পক্ষে যায় এবং ভবিষ্যতে এ নিয়ে চীনের বাধা শিথিল হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে।অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্রিকস এখন পশ্চিমা আধিপত্যের বিকল্প তৈরির চেষ্টা করছে। আন্তঃব্যাংক লেনদেনের সুইফট নেটওয়ার্ক থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়ার পর রাশিয়া ও চীন নিজস্ব বিকল্প নেটওয়ার্ক জোরদার করেছে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানো, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত বিভিন্ন দেশের অর্থ বাজেয়াপ্ত করার মতো ঘটনার পর রিজার্ভের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ভাবনা এবং ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর আলোচনা এবার জোর পেয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনা প্রাসঙ্গিক, কারণ দেশের আমদানির বড় অংশ ডলারে পরিশোধ করতে হয়।এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যোগদান না করা নিয়ে দুই ধরনের যুক্তি আছে। ভারত তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়নি, আমন্ত্রণ ছিল বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর বহুপাক্ষিক অনুষ্ঠানের ফাঁকে হতে পারে না। আবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৩ সালের ২২-২৪ আগস্ট জোহানেসবার্গে ১৫তম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে। ফলে এবার না যাওয়াকে অনেকে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন।কিন্তু না যাওয়ার পেছনে শুধু প্রটোকল নয়, দেশের ভেতরের রাজনীতিও কাজ করেছে। সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সচিবালয়ে বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সহজীকরণের জন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরসহ সব পলাতক আসামিকে ফেরত দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও ১৬ আগস্ট বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন না বলে ভারতীয় হাইকমিশনারকে জানানো হয়েছে। বিরোধী রাজনীতিতেও ভারতবিরোধী সুর চড়া। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি নিয়মিতভাবে কারণে-অকারণে ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে। এই চাপের মধ্যে ব্রিকসের মতো মঞ্চে গেলে সরকার দেশে সমালোচনার মুখে পড়ত, এমন আশঙ্কাও ছিল।এখন প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্তে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব পড়বে কি না। যোগ দিলে সাইডলাইনে ইরানের প্রেসিডেন্ট ও আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্সের মতো নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, চীন-ভারতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে করমর্দনের সুযোগ, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে কম সুদে অর্থায়নের আলোচনা এবং সৌদি আরব, আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার মতো প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ত। এসব দেশ আমেরিকার ঘনিষ্ঠ হয়েও ব্রিকসে আছে, তাই যোগ দিলে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ হতো না। না যাওয়ায় সেই সুযোগ হাতছাড়া হলো। আবার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও অনিশ্চিত হয়ে গেল, কারণ প্রত্যর্পণের শর্ত জুড়ে দেওয়ায় দিল্লি সহজে ইতিবাচক সাড়া দেবে না। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হচ্ছে। তিস্তা ও সীমান্ত ইস্যুতে ওয়ান-টু-ওয়ান আলোচনা জরুরি। কিন্তু আলোচনার টেবিলে বসার পরিবেশ যদি প্রতিদিনের বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যে নষ্ট হয়, তবে ক্ষতি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই।ব্রিকসে বিমসটেক চেয়ার হিসেবে যোগ দিলে গুরুত্ব কমত, একথা ঠিক। কিন্তু একেবারে অনুপস্থিত থেকে একটি বড় বৈশ্বিক মঞ্চে নিজের অনুপস্থিতি জানান দেওয়াও কৌশলগত ক্ষতি। প্রত্যর্পণের দাবি থাকতেই পারে, কিন্তু সেই দাবিকে ভারত সফরের পূর্বশর্ত বানালে সম্পর্ক এগোবে কীভাবে? ভারতবিরোধিতা দিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হয়তো হাততালি পাওয়া যায়, কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য ও জ্বালানির মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান হয় না। বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য চলতে থাকলে সুসম্পর্কের পথ আরও কঠিন হবে। বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন আবেগ নয়, হিসাবি কূটনীতি—যেখানে প্রতিবাদ থাকবে, কিন্তু দরজা বন্ধ হবে না।(লেখকের নিজস্ব মত)লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

হঠাৎ কেন ‘জিন্নাহ গীতি’

নতুন এক বুদ্ধিবৃত্তিক মতলবি বয়ানের মুখোমুখি হয়েছেন দেশবাসী। ফেসবুক তোলপাড়; জিন্নাহ, জিন্নাহর কিসসা! গত ৫৬ বছরেও এমন হয়নি। হঠাৎ এ বছরে কেন এই জিন্নাহ গীতির এত দরকার হলো?দুই বছর আগের আগস্ট মাসে দেশে একটা রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল। প্রাণহানিসহ বহু বিধ্বংসী ঘটনা তাতে দেখতে হয়েছিল। তো, নাটক তা নিয়ে কম হয়নি। অবশেষে মাত্র ৬ মাস আগে নির্বাচিত নতুন এক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সংসদে বিরোধী দল নামে জামায়াতে ইসলামী আর কিংস পার্টি খ্যাত এনসিপি সরকারের বিরোধিতায় সকাল-বিকেল সরব। যেন এগুলো করাই তাদের একমাত্র কাজ। তবে ছায়া বাজেট, ছায়া মন্ত্রিসভার কথাও শোনা যায়; যা নিয়ে বুঝমান পাবলিক তুমুল হাসাহাসি করে।এই যে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত, তারা একাত্তর সালে এই বাঙালির জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে স্বজাতির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল। গড়ে তুলেছিল কুখ্যাত খুনি সংগঠন রাজাকার, আলবদর, আলশাম নামের নির্মম ঘাতক বাহিনী। যদিও সে অতীত কৃতকর্মের জন্য এরা কখনো অনুশোচনার ধার ধারেনি। বরং জাতিকেই নানা ঘোরপ্যাঁচে ফেলতে সব সময় মুখিয়ে থেকেছে। এই অবস্থায়, হঠাৎ চাগাড় দেওয়া উদ্দেশ্যমূলক জিন্নাহ গীতির কারণ কী?বিগত চব্বিশের তথাকথিত ৩৬ জুলাই সফল হলে এই জামায়াতি হার্মাদরাই জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার সমান্তরালে নতুন মতলবি বয়ান হাজির করেছিল। তাদের ভাষায়—চব্বিশ, জুলাই যুদ্ধ এবং জুলাই যোদ্ধা। এইটাকে তারা ব্র‍্যান্ডিং করার আপ্রাণ চেষ্টা করে এসেছে। তবে সাময়িক বিভ্রম জাগালেও গণরোষের মুখে ওই বয়ান ক্রমেই অচল। বরং জুলাই বললেই এখন পাবলিকের ধুম পিটুনি মিস হয় না!কারণ দীর্ঘ ১৮ মাস এই জুলাই নামের সংঘবদ্ধ অনাসৃষ্টি দেখেছে দেশবাসী। ফলে জামায়াতীরা বুঝে গেছে, এই দেশের আপাত নিরীহ শান্ত মানুষেরা জুলাই যুদ্ধ খাবে না; লাগবে কোনো নতুন আইটেম। তাই বাজারে এনেছে তাদের ‘মরহুম ফাদারে মিল্লাত’ জিন্নাহ নামের ফেলে দেওয়া গীতিকাব্য।এবার, ইতিহাসের ইমানদারিতে জিন্নাহ কাব্যটা খতিয়ে দেখা যাক! এই বাংলা ভূখণ্ড ১৯৪৭ সালেই এক স্বাধীন সত্তায় বিকশিত হতে পারত, যদি না দৃশ্যপটে জিন্নাহ থাকত! ২৩ বছরের পাকিস্তানি শোষণ ও নির্যাতন; একাত্তরে শতাব্দীর নির্মম গণহত্যা, গণধর্ষণ এই বাঙালি জাতিকে সইতে হতো না।১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে তখনকার নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশন বসেছিল। সেই অধিবেশনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক প্রস্তাব করেছিলেন—ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলমানদের জন্য কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে এবং রাষ্ট্রগুলো স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম থাকবে।বস্তুত, এইটি ছিল তখনকার প্রকৃত বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর গণমানুষের মনের কথা। এটিই পরে লাহোর প্রস্তাব নামে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছে। সেই স্মৃতি লাহোরে নির্মিত মনুমেন্টের গায়ে বহু ভাষায় আজও সংরক্ষিত রয়েছে। প্রস্তাবটি তখনকার মুসলিম লীগের প্রধান নেতা ফাদারে মিল্লাত ব্যারিস্টার জিন্নাহ বদলে ফেলেন। তিনি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস’-এর ‘এস’ কেটে শুধু ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেট’ বানিয়ে উপস্থাপন করেন।এ ঘটনায় শেরেবাংলার সঙ্গে তখন জিন্নাহর তুমুল বিরোধ হয়। তিনি ক্ষোভে-দুঃখে মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা থেকে মুসলিম লীগকে বের করে দেন এবং জোট করেন হিন্দু মহাসভার সঙ্গে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে করেন অর্থমন্ত্রী। মনে রাখা দরকার, সেই লাহোর প্রস্তাবের প্রণেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টির সভাপতি হিসেবে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে যোগদান করেছিলেন। সেই সময় তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। মুসলিম লীগও সেই জোট সরকারের অংশ ছিল। যদিও এই ঘটনায় পরে সে জোট ভেঙে যায়।উল্লেখ্য যে, তখনকার আরেক জনপ্রিয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী লাহোর সম্মেলনে যোগ দেননি। তার দাবি ছিল, দুই বাংলা মিলে একটি স্বাধীন যুক্তবাংলা করা। অর্থাৎ ১৯৪০ সালেই স্বাধীন ও সুবৃহৎ বাংলা নামের দেশ গড়ার সুযোগ এবং সম্ভাবনা এসেছিল। যা বিনষ্ট করেছে জিন্নাহ এবং তার অনুসারীরা।জিন্নাহ বুঝেছিলেন, ভারতের দুই দিকে একাধিক মুসলিমপ্রধান স্বাধীন রাষ্ট্র হলে বাঙালিদের নেতৃত্বে পূর্ব এলাকা হবে সবচেয়ে শক্তিশালী। আর পূর্ব-পশ্চিম এক রাষ্ট্র বানালে ক্ষমতা থাকবে পশ্চিমের হাতে, যার কেন্দ্র হবে করাচি। সহজ কথায়, তখনকার পরিস্থিতিতে, জিন্নাহ হলো স্টেটস-এর এস কেটে স্টেট বানানোর মুখ্য খেলোয়াড়; কংগ্রেসি নেহরু সেই খেলার সুযোগ করে দেওয়া ধূর্ত বানর এবং অর্ধ-উলঙ্গ বাপুজি গান্ধী ছিল দৃশ্যত এক নিমরাজি রেফারি!সেই একটি ‘এস’ শব্দ পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ বুঝতে সক্ষম দূরদর্শী শেরেবাংলা ফজলুল হক তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, লাহোর প্রস্তাবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তারই ফলশ্রুতি পরবর্তী ২৪ বছরের পাকিস্তানি জুলুম, নির্যাতন, দুঃশাসন; এবং শেষে একাত্তরে বাঙালির প্রাণঘাতী মুক্তিযুদ্ধ।এক নজরে—এই হলো মরহুম জিন্নাহ গীতি, যা হঠাৎ করে সামনে আনার কারণটা বোধগম্য। সবাই বোঝেন, চব্বিশের জামায়াতি পুঁজি এই যে জুলাই, তা আদতে কোনো যুদ্ধ নয়, স্রেফ সরকারবিরোধী স্থানীয়, স্বতঃস্ফূর্ত একটি গণঅভ্যুত্থান মাত্র। এমন হয়েছে এ দেশে আগেও একাধিকবার।সেগুলো কেউ যুদ্ধ বলেনি। পক্ষান্তরে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বিশ্ব কাঁপানো আন্তর্জাতিক ঘটনা; যাতে বিশ্ব পরাশক্তিগুলো ভয়ংকরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল একে অপরের বিরুদ্ধে। জুলাই তেমন কিছু নয় মোটেই। মুক্তিযুদ্ধে বিলোনিয়ার এক যুদ্ধের সঙ্গে গোটা জুলাই এক করলে আংশিক সমতাও আসবে না। ওটা জানেন জুলাই ব্যবসার তালেবরগণ। তবু মুক্তিযুদ্ধ খাটো করতে জুলাই যুদ্ধ সামনে আনার এত আয়োজন।দেখা যাচ্ছে, জুলাইয়ের দাপুটেরা এখন একে একে ‘জুলাই কৃতিত্ব’ অস্বীকারে লাইন ধরেছে। খোদ জাতিসংঘে ইউনূস কর্তৃক পরিচয় করিয়ে দেওয়া কথিত ‘জুলাই মাস্টারমাইন্ড’ উপদেষ্টা মাহফুজ সেই খেতাব নিতে নারাজ। দুঃস্বপ্নের ১৮ মাস যার দাপটে ধরণী কেঁপেছে, সেই উপদেষ্টা সজিব ভূঁইয়া এখন ছিপি পার্টি থেকে ভাগতে চাইছে। বহু হাজার কোটি টাকা লুট ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অন্যরাও খামোশ; তড়পানি আর নেই। কেউ আর জুলাইযুদ্ধের দায় নিতে চাইছে না।ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তো প্রকাশ্যেই দায় অস্বীকার করেছে; লুটপাটের সকল দায় সে চাপিয়েছে আসিফ, হাসনাত, মাহফুজ, নাহিদ এবং অন্য আরও জুলাইয়াদের ঘাড়ে। এমন ক্ষেত্রে আসলে এমনই ঘটে থাকে। কেউ আর দায় নিতে চায় না। এক মহা ধড়িবাজ আন্তর্জাতিক ঘোড়েলের সঙ্গে খেলতে গিয়েছিল কিছু না খেতে পাওয়া চুনোপুঁটির আন্ডারা!জামায়াতি ঘোড়েল টাকিগুলো ভালো করেই জানে, জুলাইয়ে সংঘটিত কায়েমি অনাসৃষ্টির দায় তাদের সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক দল বিএনপি ১৬ বছরব্যাপী আন্দোলন ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জুলাইকে একটি মোক্ষম আন্দোলন বিবেচনা করেছিল। কিন্তু এতে জড়িত অন্যদের ধান্দা ছিল ভিন্ন; যা তারা ঘটিয়েছে দেশবাসীর চোখের সামনে। তাদের রাজনীতিবিযুক্ত আক্রমণের চাপ বিএনপিকেও সইতে হয়েছে। এখন জুলাইয়ের বিধ্বংসী জামায়াতি দায়গুলো একে একে সামনে আসছে। তা থেকে নিষ্কৃতি পেতে, ভুক্তভোগী মানুষের নজর ভিন্ন খাতে সরাতে অতএব শুরু হয়েছে জিন্নাহ ক্যারিকেচার। আহা, যেন জিন্নাহ কত বড় ইমানদার ছিল! হায়, কোল্যাটারাল ড্যামেজ কন্ট্রোল; সমান্তরাল ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, প্রাবন্ধিক]

অজ্ঞতার উত্তরাধিকার ভেঙে জ্ঞানের আলোকযাত্রা

মানুষ জন্মের সঙ্গে শুধু রক্তের উত্তরাধিকার বহন করে না; সে বহন করে একটি পরিবারের চিন্তাধারা, বিশ্বাস, সংস্কার, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের অদৃশ্য পুঁটুলি। কোনো পরিবারে সেই পুঁটুলিতে থাকে জ্ঞানের প্রদীপ, মানবিকতার সুবাস ও বিবেকের নির্মলতা; আবার কোনো পরিবারে জমে থাকে অজ্ঞতার ধুলো, কুসংস্কারের জাল, সংকীর্ণতার কুয়াশা এবং পুরোনো ভুল বিশ্বাসের পাথর। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—অজ্ঞতা কখনো কখনো সম্পদের মতোই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উত্তরাধিকারসূত্রে স্থানান্তরিত হয়।একটি পরিবারকে যদি একটি বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে পরিবারপ্রধান তার মূলের মতো। মূল যদি সুস্থ হয়, বৃক্ষের কাণ্ড দৃঢ় হয়, শাখা-প্রশাখা সবুজ হয়, ফুল ও ফলের সম্ভাবনাও বাড়ে। কিন্তু মূলের ভেতর যদি পচন বাসা বাঁধে, বাইরে থেকে বৃক্ষ যতই সবুজ দেখাক, তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তেমনি পরিবারের প্রধান ব্যক্তি যদি অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও সংকীর্ণতার আবর্তে বন্দী থাকেন, তবে তাঁর সন্তানদের সামনে পৃথিবীটি অনেক সময় একটি খোলা জানালা নয়—বরং হয়ে ওঠে লোহার শিকযুক্ত একটি ঘর।তবে এখানে একটি সত্য মনে রাখা জরুরি—অজ্ঞতা কোনো বংশগত রোগ নয়, কিন্তু অজ্ঞতার সংস্কৃতি প্রজন্মগত হতে পারে। একজন বাবা-মা যে চিন্তার সীমারেখা আঁকেন, সন্তান অনেক সময় সেটিকেই পৃথিবীর শেষ সীমানা বলে মনে করে।একজন পিতা যদি মনে করেন, “আমার সময়ে পড়াশোনা করে কী লাভ হয়েছে, তোমারও এত পড়াশোনার প্রয়োজন নেই”—তবে তাঁর একটি বাক্য হয়তো সন্তানের সামনে বহু বছরের সম্ভাবনার দরজা বন্ধ করে দিতে পারে। যে শিশু বইয়ের বদলে শুধু পারিবারিক সংকীর্ণতার পাঠ পায়, সে হয়তো বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসেও জ্ঞানের প্রকৃত অর্থ আবিষ্কার করতে পারে না। কারণ শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতা থেকে আসে না; শিক্ষা আসে প্রশ্ন করার সাহস থেকে, যুক্তি গ্রহণের মানসিকতা থেকে এবং ভুলকে সংশোধন করার বিনয় থেকে।একটি প্রদীপের আলো যেমন ঘরের অন্ধকার দূর করে, তেমনি একটি শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ পুরো পরিবারের মানসিক অন্ধকারে প্রথম আলোকরেখা হয়ে উঠতে পারেন। কখনো কখনো একটি সন্তানই সেই প্রদীপ, যে পূর্বপুরুষের অন্ধকার ঘরে প্রথমবার জানালা খুলে দেয়।কিন্তু সেই জানালা খোলা সহজ নয়। কারণ দীর্ঘদিনের অন্ধকারেরও এক ধরনের অভ্যাস তৈরি হয়। অন্ধকারে থাকা মানুষ হঠাৎ আলো পেলে যেমন চোখ কুঁচকে ফেলে, তেমনি অজ্ঞতার দীর্ঘ অনুশীলনে অভ্যস্ত পরিবার জ্ঞান, যুক্তি ও নতুন চিন্তাকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখে। তখন শিক্ষিত সন্তানকে বলা হয়—“বেশি বুঝতে যেও না”, “আমাদের পরিবারে এসব কখনো হয়নি”, “বড়রা যা বলে সেটাই ঠিক”, “সমাজ কী বলবে?”এই ‘সমাজ কী বলবে’ নামের অদৃশ্য প্রহরীটি বহু প্রতিভার কারাগারের রক্ষক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।একটি পাখিকে যদি খাঁচায় জন্ম দেওয়া হয়, সে অনেক সময় আকাশকে নিজের প্রয়োজন বলেই মনে করে না। খাঁচার তারগুলোই তার কাছে পৃথিবীর সীমানা। অথচ আকাশ তার জন্যই অপেক্ষা করছে। তেমনি অজ্ঞতার পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষ অনেক সময় নিজের সম্ভাবনার ব্যাপ্তিই বুঝতে পারে না। সে জানে না যে তার সামনে আরও একটি পৃথিবী আছে—যেখানে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়, মতভিন্নতা শত্রুতা নয়, নারী-পুরুষের শিক্ষা বৈষম্যের বিষয় নয়, বিজ্ঞানকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখাই সভ্যতার প্রথম পাঠ। এখানেই সুশিক্ষার প্রকৃত ভূমিকা।সুশিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম নয়। ডিগ্রি মানুষের হাতে একটি কাগজ দিতে পারে, কিন্তু সুশিক্ষা মানুষের ভেতরে একটি আয়না স্থাপন করে। সেই আয়নায় মানুষ নিজের অজ্ঞতা, অহংকার, ভুল ও সীমাবদ্ধতাকে দেখতে শেখে। সত্যিকারের শিক্ষা মানুষকে শুধু ‘কী জানি’ শেখায় না; বরং ‘কী জানি না’—সেই উপলব্ধিও দেয়।একজন অশিক্ষিত মানুষ হয়তো ভুল করতে পারেন; কিন্তু একজন শিক্ষিত অথচ অসচেতন মানুষ কখনো কখনো নিজের ভুলকে সত্য প্রমাণ করার জন্য আরও বিপজ্জনক যুক্তি তৈরি করতে পারেন। তাই শিক্ষার সঙ্গে বিবেক, মানবিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও নৈতিকতার সংযোগ অপরিহার্য।ধরা যাক, একটি পরিবারের বাবা-মা মেয়েকে মনে করেন শুধু রান্নাঘর ও সংসারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। মেয়েটির পড়াশোনা অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। সেই পরিবার হয়তো বুঝতে পারে না—তারা শুধু একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ সংকুচিত করছে না; তারা একটি সম্ভাব্য চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা কিংবা সমাজনির্মাতার জন্মের পথও সংকুচিত করছে।আবার কোনো পরিবারে যদি সন্তানকে বলা হয়, “তুমি আমাদের মতোই হবে”—তাহলে তার স্বপ্নের ওপর অদৃশ্য একটি ছাদ তৈরি হয়। অথচ সন্তানের প্রয়োজন কখনো কখনো পরিবারের অনুকরণ নয়; প্রয়োজন পরিবারের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার স্বাধীনতা।প্রজন্মের অন্ধকার ভাঙতে তাই প্রয়োজন বিদ্রোহ নয়, প্রয়োজন বোধের বিপ্লব।একটি নদী তার উৎসকে অস্বীকার করে না; কিন্তু সে উৎসের কাছে স্থিরও থাকে না। পাহাড়ের বুক থেকে জন্ম নিয়ে সে পথের পাথর ভাঙে, বাঁক নেয়, জনপদ অতিক্রম করে, শেষে সাগরের সঙ্গে মিলিত হয়। মানুষের জীবনও তেমন। পূর্বপুরুষ আমাদের সূচনা দিতে পারেন, কিন্তু আমাদের গন্তব্য নির্ধারণ করার অধিকার কেবল তাঁদের হাতে থাকা উচিত নয়।অতীত আমাদের শিকড়; ভবিষ্যৎ আমাদের দিগন্ত।শিকড় ছাড়া বৃক্ষ টেকে না, আবার শুধু শিকড় আঁকড়ে থাকলে বৃক্ষ আকাশও ছুঁতে পারে না।আজকের পৃথিবীতে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি মানুষের হাতে পৃথিবী এনে দিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞানের ভাণ্ডারকে হাতের মুঠোয় এনেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্যের স্রোত তৈরি করেছে। কিন্তু তথ্যের প্রাচুর্য আর জ্ঞানের প্রাচুর্য এক বিষয় নয়। ভুল তথ্য, গুজব, কুসংস্কার ও অর্ধসত্যের যুগে সুশিক্ষা এখন শুধু প্রয়োজনীয় নয়—অপরিহার্য।একজন অভিভাবক যদি সন্তানকে বলেন, “ইন্টারনেটে যা দেখবে, সব বিশ্বাস করবে না; যাচাই করবে”—তবে তিনি শুধু একটি শিশুকে শিক্ষা দিচ্ছেন না; তিনি ভবিষ্যতের একজন সচেতন নাগরিক তৈরি করছেন।একটি কম্পাস যেমন নাবিককে পথ চিনতে সাহায্য করে, সুশিক্ষা তেমনি মানুষকে তথ্যের সমুদ্রে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে শেখায়।তবে পরিবারের অজ্ঞতার বেড়াজালে জন্ম নেওয়া কোনো সন্তানকে আজীবন সেই বেড়াজালের বন্দী থাকতে হবে—এমন কোনো বিধান প্রকৃতিতে নেই। ইতিহাসে বহু মানুষ প্রতিকূল পরিবেশ থেকে উঠে এসে নিজেদের ভাগ্যের ভাষা বদলেছেন। তাঁদের কেউ বইকে সঙ্গী করেছেন, কেউ শিক্ষককে পথপ্রদর্শক করেছেন, কেউ নিজের কৌতূহলকে জ্বালানি বানিয়েছেন। একজন মানুষের জাগরণ কখনো কখনো একটি পরিবারের বহু বছরের ঘুম ভাঙাতে পারে।একটি আগুনের স্ফুলিঙ্গ যেমন শুকনো অরণ্যে দাবানলের সূচনা করতে পারে, তেমনি একটি জাগ্রত মন একটি পরিবারের চিন্তার কাঠামো পাল্টে দিতে পারে।তাই পরিবারপ্রধানের অজ্ঞতা যদি সন্তানদের পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই দেয়াল ভাঙার প্রথম হাতুড়ি হতে পারে শিক্ষা। কিন্তু সেই আঘাত হতে হবে ঘৃণার নয়, যুক্তির; অবজ্ঞার নয়, প্রজ্ঞার; সংঘাতের নয়, আলোর।কারণ মানুষকে অজ্ঞতার জন্য অপমান করলে সে আরও শক্ত করে তার দরজা বন্ধ করতে পারে; কিন্তু তাকে সম্মান দিয়ে জ্ঞানের দরজা খুলে দিলে সে হয়তো নিজেই একদিন আলোকে ঘরে আমন্ত্রণ জানাবে।একটি পরিবারের সত্যিকারের উন্নতি তখনই শুরু হয়, যখন সেখানে প্রশ্ন করার অধিকার জন্ম নেয়। সন্তান যখন বাবাকে প্রশ্ন করতে পারে, বাবা যখন সন্তানের কাছ থেকেও কিছু শিখতে প্রস্তুত থাকেন, মা যখন মেয়ের স্বপ্নকে নিজের অসম্পূর্ণ স্বপ্নের উত্তরাধিকার না বানিয়ে তার নিজস্ব আকাশটি নির্মাণে সাহায্য করেন—তখনই পরিবার একটি জীবন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।শেষ পর্যন্ত মানুষ তার পূর্বপুরুষের ভুলের জন্য দায়ী নয়; কিন্তু সেই ভুলকে পরবর্তী প্রজন্মের ভাগ্য বানিয়ে দেওয়ার দায় এড়াতে পারে না।আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো বৃক্ষের ফল। আমাদের শিকড়ে পূর্বপুরুষের মাটি, কিন্তু আমাদের ডালে ভবিষ্যতের পাখিরা বসবে। তাই প্রশ্ন শুধু—আমরা কী পেয়েছি? প্রশ্ন হলো—আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে কী দিয়ে যাচ্ছি? অজ্ঞতার অন্ধকার, নাকি জ্ঞানের প্রদীপ? কুসংস্কারের শিকল, নাকি মুক্ত চিন্তার ডানা? ভয়ের উত্তরাধিকার, নাকি প্রশ্ন করার সাহস?সুশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখানেই—মানুষকে শুধু শিক্ষিত করা নয়, তাকে এমন এক আলোকিত মানুষে রূপান্তরিত করা, যে নিজের অন্ধকার চিনতে পারে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি উন্মুক্ত আকাশ রেখে যেতে পারে। কারণ একটি পরিবারের ভাগ্য বদলাতে কখনো কখনো সম্পদের পাহাড় প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় মাত্র একজন জাগ্রত মানুষের।আর সেই একজন মানুষটি—হয়তো আপনার পরিবারেই জন্ম নিচ্ছে।[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

আকাশ যখন স্কুলের দরজা বন্ধ করে দেয়

বাংলাদেশের কোনো গ্রামে বন্যার পানি যখন স্কুলের গেট ছাড়িয়ে উপরে উঠতে থাকে, তখন সেখানে এক বিশেষ নিস্তব্ধতা নেমে আসে। পাঠদান বন্ধ হয়ে যায় এবং শিশুরা তাদের পরিবারের সাথে উঁচু কোনো স্থানে আশ্রয় নেয়। দুর্যোগ মোকাবিলার হিসাব-নিকাশের এক পর্যায়ে শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত স্কুল ভবনটি নীরবে আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ দেশের বর্ষাকাল প্রত্যক্ষ করা মানুষের কাছে এই দৃশ্যটি অত্যন্ত পরিচিত; তবে ইউনিসেফের নতুন এক বিশ্লেষণে বিষয়টিকে এক চমকপ্রদ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়েছে। এর পরিসংখ্যানগুলো কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, বরং নীতিনির্ধারকদেরও গভীর ভাবনায় ফেলার মতো।“লার্নিং ইন্টারাপ্টেড: গ্লোবাল স্ন্যাপশট অফ ক্লাইমেট-রিলেটেড স্কুল ডিসরাপশনস ইন ২০২৫” শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধুমাত্র গত বছরেই বিশ্বজুড়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের অন্তত ১৭ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা জলবায়ু-জনিত দুর্যোগের কারণে ব্যাহত হয়েছে। ১০৬টি দেশ বা অঞ্চলের স্কুলগুলো এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর মধ্যে ৪০টি দেশে বছরের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার এমন বিঘ্ন ঘটেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছরই এই সংকটের মুখোমুখি হতে হয় এবং তথ্য-উপাত্ত বলছে যে, এই সংকট ক্রমশ আরও তীব্র হচ্ছে।২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রতি দশজন শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্তত একজনের পড়াশোনা জলবায়ু-জনিত দুর্যোগের কারণে ব্যাহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ কোটি ১০ লাখ শিশুর মধ্যে ৭৫ শতাংশই বাস করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে—অর্থাৎ সেই সব দেশে, যারা এই সংকট সৃষ্টিকারী নিঃসরণের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী এবং যাদের এই সংকটের প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতাও সবচেয়ে কম। জলবায়ু বিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মৌলিক অবিচারটিকেই এখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইউনিসেফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই বিঘ্নের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের আজীবন আয়ের ক্ষেত্রে অন্তত ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর ক্ষেত্রে গড়ে আঠারো দিন স্কুল বন্ধ থাকা এবং পাঠদানের সময় নষ্ট হওয়া ও ভবিষ্যৎ আয় কমে যাওয়ার সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই এই হিসাব করা হয়েছে।বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটানোর ক্ষেত্রে ঝড় ছিল সবচেয়ে বড় দুর্যোগ; এতে আনুমানিক ১০ কোটি ৯০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পরেই রয়েছে বন্যা (৭ কোটি শিক্ষার্থী) এবং তাপপ্রবাহ (অন্তত দশটি দেশে প্রায় ৫ কোটি শিশু)। বিশ্বব্যাপী আগস্ট মাসটি ছিল সবচেয়ে বিপর্যয়কর; মূলত বন্যার কারণেই ওই মাসে ২ কোটি ৮০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, অক্টোবর মাসে দক্ষিণ এশিয়ায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় 'মন্থা'র প্রভাবে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে হারিকেন 'মেলিসা'র কারণে ৩০ লাখের বেশি শিশু শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকতে বাধ্য হয়। ২০২৫ সালে অন্তত এগারোটি দেশে দেশজুড়ে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে ১১ লাখ ২৫ হাজার ৭২৬ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বন্যাকে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই সংখ্যাটি একটি রক্ষণশীল হিসাব। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানেও আগস্ট মাসে মৌসুমি বন্যার কারণে ২ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে স্কুলে ফিরতে পারেনি। একইভাবে নাইজারে বন্যার কারণে ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর স্কুল শুরু হতে দুই সপ্তাহ দেরি হয়েছে।বিশ্বজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশকে সরাসরি স্কুল বন্ধের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে; অন্যদিকে ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে ফিরতে বিলম্বের শিকার হয়েছে কারণ তাদের স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল অথবা সেগুলোকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। স্কুলে যাওয়ার রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাওয়া কিংবা শ্রেণিকক্ষে বাস্তুচ্যুত পরিবার আশ্রয় নেওয়ায় কোনো শিশু যদিকয়েক সপ্তাহ পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে পানি সরে যাওয়ার পর সে আগের অবস্থান থেকে পড়াশোনা শুরু করতে পারে না। সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার এই ঘাটতি বাড়তেই থাকে। যারা আগে থেকেই প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে—যেমন রক্ষণশীল গ্রামীণ পরিবারের মেয়েশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং অত্যন্তদরিদ্র পরিবারের সন্তান—তাদের ক্ষেত্রে মাত্র একটি শিক্ষাবর্ষের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়া মানেই হতে পারে শিক্ষা থেকে চিরতরে ছিটকে পড়া। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়া শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা ২.৫ শতাংশ কমে যায় এবং এতে মেয়েশিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।বাংলাদেশে স্কুল ভবনগুলো প্রায়শই কোনো এলাকার সবচেয়ে মজবুত কাঠামো হওয়ায় এগুলো একই সাথে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিঃসন্দেহে এই ব্যবস্থা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন বাঁচিয়ে আসছে, তবে শিক্ষার ধারাবাহিকতার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। যেমন জ্যামাইকায় হারিকেন মেলিসার সাত মাস পরেও শত শত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় মেরামত করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে অনেক শিক্ষার্থী সপ্তাহে মাত্র দুই বা তিন দিন ক্লাসে অংশ নিতে পেরেছে। এর সমাধান স্কুলগুলোর সুরক্ষামূলক ভূমিকা কেড়ে নেওয়া নয়, বরং শ্রেণিকক্ষ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও বিশেষায়িত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে জরুরি ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা; যাতে ঘূর্ণিঝড়ের সময় জীবন রক্ষা এবং শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।আরেকটি নীরব হুমকি হলো তীব্র তাপপ্রবাহ। ২০২৫ সালে অন্তত দশটি দেশের প্রায় ৫ কোটি শিশুর পড়াশোনা তাপপ্রবাহের কারণে ব্যাহত হয়েছে; যার মধ্যে দক্ষিণ সুদান টানা দ্বিতীয় বছরের মতো দেশজুড়ে স্কুল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি বেলজিয়াম, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডস মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ শিশু তাপমাত্রাজনিত কারণে পরিবর্তিত সময়সূচির মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশেও বর্ষা-পূর্ববর্তী তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাঝেমধ্যেই স্কুলের সময়সীমা কমিয়ে আনতে বা ক্লাস স্থগিত করতে হচ্ছে। অত্যধিক তাপ প্রারম্ভিক শিশু-বিকাশকে ব্যাহত করে এবং সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতার মতো মৌলিক ভিত্তি দুর্বল করে দেয়, যা তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।বিশ্বের সবচেয়ে তীব্র মানবিক সংকটের সম্মুখীন ২১টি দেশের মধ্যে ১৯টি দেশই ২০২৫ সালে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের শিকার হয়েছে। ইউনিসেফের সম্পূরক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির মতো পরিস্থিতির কারণে এসব এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রায় ৯০ লাখ বেশি হতে পারে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবে বাংলাদেশকে এই সতর্কবার্তাটি বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানটি হলো—বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সংক্রান্ত মোট অর্থায়নের মাত্র ১.৫ শতাংশ শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের ফলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আনুমানিক আরও ৬০ লাখ শিশু স্কুল-বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যাদের এক-তৃতীয়াংশই মানবিক সংকটের শিকার। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ফোরামগুলোতে জলবায়ু অভিযোজন এবং ‘ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি’ সংক্রান্ত অর্থায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষাকে যেন কেবল মানবিক সহায়তার সাথে জুড়ে দেওয়া কোনো গৌণ বিষয় না ভেবে একটি ‘অগ্রাধিকার খাত’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—সেই দাবি বাংলাদেশের জোরালোভাবে তোলা উচিত।জলবায়ু-সহনশীল স্কুল অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা নীতিতে দুর্যোগ প্রস্তুতির বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং জলবায়ু বিষয়ক পরিকল্পনায় তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এর মধ্যে রয়েছে দেশের প্রথম ‘জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষা কাঠামো’ প্রণয়নে ইউনিসেফের সহায়তাও। এখনকার কাজ হলো সহনশীলতাকে শ্রেণিকক্ষের গভীরে পৌঁছে দেওয়া, যাতে পরবর্তী কোনো দুর্যোগের কারণে দেশের শিক্ষার্থীদের কেবল কয়েক দিনের স্কুলই বন্ধ না হয়, বরং কোনো শিশুর ভবিষ্যতের মূল্যবান বছরগুলো যেন হারিয়ে না যায়।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।]

রিয়া সরেনের মৃত্যু যে প্রশ্নগুলো রেখে গেল

বাংলাদেশের মানচিত্রে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ একটি সুপরিচিত শিল্পাঞ্চল। কলকারখানার ধোঁয়া, যন্ত্রের গর্জন আর হাজার হাজার শ্রমিকের ব্যস্ততা এই অঞ্চলের চেনা অবয়ব। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হতদরিদ্র মানুষ দুমুঠো ভাতের আশায় এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এই শিল্পনগরীতে ছুটে আসেন। তাদেরই একজন ছিলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার কুশদহ ইউনিয়নের বাঘদাবডা গ্রামের সাঁওতাল পরিবারের তরুণী রিয়া সরেন। তার বয়স ১৯ বছর বলে উল্লেখ করা হলেও কোনো কোনো তথ্যে বয়স ১৪ বছর বলা হয়েছে। বিধবা মায়ের একমাত্র ভরসা রিয়া প্রায় সাত-আট মাস আগে রূপগঞ্জের মুরাপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালি এলাকায় এসে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। সেখানে স্থানীয় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এসিআই সল্ট লিমিটেডে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু গত ৭ সেপ্টেম্বর সকালে সেই ভাড়া বাসা থেকেই উদ্ধার করা হয় তার নিথর দেহ।রিয়ার আকস্মিক ও সন্দেহজনক মৃত্যু আমাদের সামনে কিছু কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এটি কি আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে রয়েছে হত্যাকাণ্ড? পরবাসে কাজ করতে আসা প্রান্তিক আদিবাসী নারীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।রিয়া সরেনের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রথম থেকেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঘটনার দিন সকালে তার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের পর রূপগঞ্জ থানা পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করে। পুলিশের বক্তব্য ছিল, আলামত দেখে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলেই মনে হয়েছে। তবে রিয়ার পরিবার, স্বজন ও স্থানীয় আদিবাসী অধিকারকর্মীদের দাবি ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সময় রিয়ার মা রিবিকা মুরমু দিনাজপুরের গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। রিয়া বাসায় একা ছিলেন।লাশ উদ্ধারের পর রিয়ার শরীর ও ঘটনাস্থলের কিছু আলামতে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে স্বজনদের দাবি। তাদের অভিযোগ, মৃত্যুর আগে রিয়ার কর্মস্থল বা আবাসন এলাকায় এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকতে পারে, যা তাকে চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আবার তাকে শ্বাসরোধ করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলেও তারা সন্দেহ করছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনার কয়েক দিন পর রিয়ার পরিবার রূপগঞ্জ থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি বলে গণমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগে তারা হত্যা মামলা নিতে পারছে না। এই অবস্থান ও মামলার বিষয়ে অনিশ্চয়তা নিহতের পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস তৈরি করেছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফল পাওয়ার আগেই ঘটনাটিকে হত্যা বা আত্মহত্যা হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা উচিত নয়।রিয়া সরেনের মৃত্যুর ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কাজ করতে আসা আদিবাসী, বিশেষ করে সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, মালপাহাড়িয়া, কোল, কোডা, রাজোয়াড়, তুরী ও পাহান নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে জীবিকার তাগিদে আসা এসব মানুষ ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তিক। নতুন পরিবেশে তাদের কয়েকটি বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।প্রথমত, ভৌগোলিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতি ছেড়ে একজন আদিবাসী নারী রূপগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলে এলে তাকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে অপরিচিতি এবং পরিচিত সামাজিক সহায়তার অভাব তাকে অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্র ও আবাসনে হয়রানির ঝুঁকি। প্রান্তিক নারী শ্রমিকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কর্মক্ষেত্র, আবাসন কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে কেউ হয়রানি বা নির্যাতন করতে পারে। সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক হওয়ার কারণে অনেকে এসব ঘটনার প্রতিবাদ বা অভিযোগ জানাতেও সংকোচ বোধ করেন। ফলে কোনো কোনো ঘটনা আড়ালেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।তৃতীয়ত, আইনি সহায়তার সীমাবদ্ধতা। কোনো আদিবাসী নারী অন্যায়ের শিকার হলে ভাষাগত সমস্যা, আইনি জ্ঞানের অভাব, আর্থিক সংকট এবং থানা-পুলিশের কাছে যাওয়ার ভয় তার অভিযোগ জানানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। রিয়া সরেনের পরিবারের ক্ষেত্রেও দূর দিনাজপুর থেকে এসে নারায়ণগঞ্জে আইনি লড়াই চালানো কঠিন। তাই দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য সহজলভ্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।রিয়া সরেনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং সাঁওতালসহ দেশের সব প্রান্তিক শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, প্রশাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। রিয়া সরেনের মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপের বাইরে থেকে তদন্ত করতে হবে। ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য এবং রিয়ার কর্মস্থল ও আবাসনসংক্রান্ত তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করতে হবে।পরিবারের অভিযোগের আইনগত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। রিয়ার পরিবার যদি হত্যার অভিযোগ করে থাকে, তবে প্রচলিত আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজন হলে দরিদ্র পরিবারটিকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিতে হবে। কোনো পরিবারের আর্থিক অক্ষমতা যেন ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা না হয়।শিল্পাঞ্চলে আদিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। রূপগঞ্জসহ দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কতজন আদিবাসী শ্রমিক কাজ করছেন, তাদের কর্মস্থল ও আবাসনের অবস্থা কী—এসব তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আবাসন এলাকায় নিরাপত্তা, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে।মানবাধিকার ও আদিবাসী সংগঠনগুলোর নজরদারি বাড়াতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সংশ্লিষ্ট আদিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো ঘটনাটির ওপর নজর রাখতে পারে। রিয়ার সহকর্মী, প্রতিবেশী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার প্রকৃত তথ্য সামনে আনার ক্ষেত্রেও নাগরিক সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।কর্মক্ষেত্রে কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। এসিআই সল্ট লিমিটেডসহ সব কারখানায় নারী ও প্রান্তিক শ্রমিকদের জন্য কার্যকর অভিযোগ সেল থাকা প্রয়োজন। সেখানে শ্রমিকরা যাতে নিরাপদে হয়রানি, নির্যাতন বা বৈষম্যের অভিযোগ জানাতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের প্রতিকারও হতে হবে স্বচ্ছ ও দ্রুত।সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় তাদের পূর্বপুরুষেরা সংগ্রাম করেছেন। অথচ আজও তাদেরই একজন তরুণীকে জীবিকার সন্ধানে নিজ এলাকা ছেড়ে এসে এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে—এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।রিয়া সরেনের মৃত্যু হত্যা হয়ে থাকলে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি এটি আত্মহত্যা হয়ে থাকে, তাহলে কী কারণে একজন তরুণী এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন, তার ওপর কোনো চাপ বা প্ররোচনা ছিল কি না—সেসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ আত্মহত্যার ঘটনাও অনেক সময় বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।আমরা উন্নত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। সেই বাংলাদেশে প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনও সমান মূল্যবান হতে হবে। রূপগঞ্জের মঙ্গলখালির সেই অন্ধকার ঘরের রহস্য উদঘাটন করে রিয়া সরেনের পরিবারকে ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। কোনো শ্রমিকের জীবন যেন তার দারিদ্র‍্য, জাতিগত পরিচয় বা ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে কম মূল্যবান হয়ে না পড়ে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

সমান সুযোগের অর্থনীতি চাই

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার কঠিন পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতিকে উত্তরণের চেষ্টা করছে এবং এ কাজে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের কথাও বলেছেন। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণতন্ত্র শুধু রাজনৈতিক অধিকার ও নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সমতা, সামাজিক ন্যায় এবং সুযোগের সমতাও জড়িত।অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা। এর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানি ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক সেবায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভূমি, ঋণ, আর্থিক সম্পদ, কর্মসংস্থান ও তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগেও বৈষম্য কমাতে হবে। নাগরিকদের জীবনে প্রভাব ফেলে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ যথেষ্ট নয়; দরিদ্র, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরও নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পেতে হবে।বাংলাদেশের বাস্তবতায় অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের প্রয়োজন আরও বেশি। অঞ্চল, গ্রাম-শহর, নারী-পুরুষ এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণির মধ্যে এখনো বড় বৈষম্য রয়েছে। দারিদ্র‍্যরে হারও বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্পদ ও আয়ের বণ্টনে বৈষম্য প্রকট। মূল লেখায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ, বিপরীতে নিচের ৫০ শতাংশের হাতে মাত্র ৪ শতাংশ। উচ্চ ও নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে শিশু মৃত্যুর হারেও বড় পার্থক্য রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগেও একই ধরনের বৈষম্য দেখা যায়।নারীর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় অনেক কম। ব্যবস্থাপনা পর্যায় ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ সীমিত। এর সঙ্গে রয়েছে কর্মক্ষেত্র ও ঘরে নানা ধরনের হয়রানি ও সহিংসতা। ফলে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে নারী-পুরুষের সুযোগের বৈষম্য কমানো জরুরি।তবে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন। ব্যাংক খাত, আমদানি-রপ্তানি এবং বড় প্রকল্পে গুটিকয়েক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাজারে প্রতিযোগিতা সীমিত হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়েন। রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ব্যবহার করে ঋণ নেওয়া, ঋণখেলাপি হওয়া কিংবা অর্থ পাচারের প্রবণতা থাকলে তা অর্থনীতিতে বৈষম্য আরও বাড়ায়। তাই ব্যাংক খাতের সংস্কার, সুশাসন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা জরুরি।প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির জন্য সামাজিক সহায়তা ও বিভিন্ন কার্ডভিত্তিক কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এসব কর্মসূচির পাশাপাশি মূল অর্থনৈতিক কাঠামোতেও সংস্কার প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত করা, পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা নিশ্চিত করা দরকার। সরকারি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়ানো যেতে পারে।অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের জন্য একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানব্যবস্থা অপরিহার্য। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছতা ছাড়া বৈষম্য কমানোর নীতি কার্যকর করা কঠিন। দরিদ্র, নারী, প্রতিবন্ধী, প্রবীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করে নীতি প্রণয়ন করতে হবে। অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে মানুষের সক্ষমতা ও মর্যাদাকে।রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পাশাপাশি অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের সুফল যদি সমাজের একটি সীমিত অংশের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারে না। সরকারের সামনে তাই শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর নয়, সুযোগ ও সম্পদের বৈষম্য কমানোরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সুস্পষ্ট লক্ষ্য, কার্যকর সংস্কার, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ বাস্তব রূপ পেতে পারে।[লেখক: সাবেক ব্যাংকার]

রম্যগদ্য: “দাড়ি না দাঁড়ি?”

হেঁ হেঁ হেঁ, দাড়ি না দাঁড়ি। দাড়ির লগে চন্দ্রবিন্দু দি আন্নেনি ক্রুসেড লাগাইবার চান! বাংলাদেশে আন্নে আর ক্রুসেড লাগাইতে পারবেন না। বাঙালি অহন বহুত সেয়ানা। হ্যাতারা প্রফিট না পাইলে ক্রুসেড কোইরতো ন’ বুইচেননি।নাহ্ তোর মতো উড়ঝুড়ে বাঙাল নিয়ে আর পারা যাবে না। আমি বলছি শব্দটা “দাড়ি না দাঁড়ি” আর তুই দাড়ির উপর ক্রুসেড মানে ধর্মযুদ্ধ শুরু করলি।আন্নে জানেন না মিয়া। ইউরোপে দুই খ্রিষ্টান ক্যাথোলিক আর প্রটেষ্টানরা ছত্রিশ বছর ক্রুসেড কোইরা তারপর ১৬৪০ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির মাইধ্যমে এই ক্রুসেড বন্ধ কোরছে। আপনে আবার দাড়ি না দাঁড়ি লই মাইরপিট করবেন নি?আরে বাঙাল, আমি বাঙলা একাডেমির এক প্রখ্যাত লেখকের লেখার পৃষ্ঠা দশে দেখলাম যে, “চুলগুলো উশকোখুশকো, দাঁড়ি কাটেননি কতদিন কে জানে।”তো। আন্নের অসুবিধা কী? হ্যাতারা বাঙলা একাডেমি। হ্যাতারা কোনায়  হ্রস্ব “”ি দিবো কোনায় র্দীঘ “ী” দিবো, এইসব আন্নেরে কোইবোনি? হ্যাতেগো প্রতিবছরের সরকারে থোক বরাদ্দ কত টিয়া দেয়, হ্যেইডা আন্নে জানেননি?মানে কী?   হ্রস্ব “”ি, র্দীঘ“ী” এর সাথে থোক বরাদ্দের কী সম্পর্ক!মিয়া বোজেন না! আন্নেতো মিয়া বাপের নাম বেঁচি খান। এক “মাছের রাজা ইলিশ আর বাত্তির রাজা ফিলিপস” বানাই নিজেরে ইয়াবড়া চুয়ালওয়ালা ইন্টেলেকচ্যুয়াল ভাবেন! আরে মিয়া ইন্টেলেকচ্যুয়াল হোইলো বাঙলা একাডেমির চৌকোস অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ ইন্টেলেকচ্যুয়ালস, যারা কেবল ফোকলোরের ফান্ড ব্যাবহার করি মোঘল সুলতানের মতুন জীবন যাপন করের। উঁহ্, খালি মোঘল সুলতানের কথা বলছিস, আর তোমার প্রিয় স্বয়ং বজ্জাত স্যারের কথা বলবি না, যিনি মাল খেয়ে মৃত মানুষ ছেড়ে জীবিত মানুষের রচনাবলী বের করেছে। কিন্তু ২৭ বছর ধরে বাংলাদেশের অন্যতম কথাশিল্পী শওকত ওসমানের রচনাবলী ছাপেননি!এইডা আবার কী কন, আমি নিজে দেখছি বাঙলা একাডেমির মহাপরিচালক, অধ্যাপক মোহাম্মদ আযম স্যার নিজে লিখিত আদেশ দিছেন যে কথাশিল্পী শওকত ওসমান স্যারের জেষ্ঠপুত্র বুলবন ওসমানের সম্পাদনায় কথাশিল্পী শওকত ওসমানের রচনাবলী ছাপতে। উপপরিচালক ড. এ. কে. এম. কুতুবউদ্দিন স্যার অলরেডি মিটিং করি কাম আগার।আরে ভাই সে তো এই জুম্মা জুম্মা সাত দিনের ব্যাপার, তুই বিগত ২৭ বছরের কথা ভুলে গেলি।হেই কথা কোইলে তো, আন্নের ফ্যাসিস্ট সরকাররে জিগান। আইঁ কোই কী, বেটার লেট দ্যান নেভার। আকামে কথা বাড়ায়েন না। বাঙলা একাডেমির মহা পরিচালক, অধ্যাপক মোহাম্মদ আযম স্যাররে ধন্যবাদদি, রচনাবলীর কাজটা শেষ করেন।ঠিক আছে বেটার লেট দ্যান নেভার। কিন্তু তাই বলে বাঙলা একাডেমি, দাড়ি, মানে গন্ডলোম অর্থাৎ শ্মশ্রুকে দাঁড়ি বললে তাও মেনে নিতে হবে? দাঁড়ি মানে পূর্ণচ্ছেদ সূচক দন্ডায়মান রেখা। এখন দাড়ি আর দাঁড়িকে এককরে একাকার করবো?না না, হ্যেইডা আমি কমু না। আন্নে দাড়ি আর দাঁড়িকে একাকার কইরেন না। আন্নে দাড়ি মানে গন্ডলোম অর্থাৎ শ্মশ্রুকে শ্মশ্রুই কন, আর দাঁড়িরে পূর্ণচ্ছেদ সূচক দন্ডায়মান রেখাই কন। আপনে এই দুইটারে এক কোইরেন না।কিন্তু ভাইরে তুই যে এক করতে বারণ করছিস অথচ কলকাতায়, মুসলিম পুলিশ কর্মীরা দাড়ি রাখতে পারবে না! বাহ্ তা হয় নাকি! পুলিশ তো সমাজের ব্যাবাগ ব্যাক্তির স্বার্থ রক্ষা করবো, হ্যারা মানবতা রক্ষা করবো, ব্যাক্তি স্বাধীনতায় হাত দিলে বাধা দিবো। আর আন্নে কন ভারতীয় সরকার পুলিশের ব্যাক্তি স্বধীনতায় হাত দিছে! দাড়ির লগে পুলিশের ডিউটির কী সম্পর্ক?জ্বী, পুলিশের দাড়ির সাথে ডিউটির সম্পর্ক আছে রে আছে।মানে কী? দাড়ি দেখলে চুরে আরোও চুরি করবো।আরে না, বৃটিশ আমলে সাহেবরা দেখলো যে অনেক মৌলানা বলেন মুসলমানদের দাড়ি রাখা সুন্নত।ঠিকই তো কয়।ঠিকতো কয়। কি›তু বৃটিশরা দেখলো যে মুসলমান পুলিশ দাড়ি রেখেও ঘুষ খায়, উৎকোচ গ্রহণ করে। কিন্তু ইসলামে ঘুষ খাওয়া হারাম। তাই বৃটিশ সরকার ইসলামের পবিত্রতা রক্ষার জন্য পুলিশদের দাড়ি রাখা বন্ধ করলেন। কিন্তু শিখ পুলিশ দাড়ি রাখতে পারবেন।ওম্মারে একই যাত্রায় পৃথক ফল! পুলিশ ঠিকমতো ডিউটি করের কিনা হ্যাইডা না দ্যেইক্ষা পুলিশে কোথায় দাড়ি রাখছে হ্যেইডা দেখারলাই ভারত সরকার বোই আচে! আইশ্চার্য্য! তায়লে এই যে হিন্দু ধর্মালম্বী ঋষি এ্যাকরোয়েড অরবিন্দ ঘোষ, শ্রী শ্রী রাম কৃষ্ম পরমহংস দেব হ্যাগোতো দাড়ি আছিলো? হেঁ হেঁ উনারা যদি ভারতীয় পুলিশে যোগ দিতেন তাহলে দাড়ি কাটতে হোতো।আমার মনে লয় এইসব দাড়ি কাটাকাটি, পুলিশের দাড়িরাখি ঘুষ খাওয়া এইসবের একটা দাঁড়ি দেওয়া উচিৎ।ঠিক ঠিক তুই ঠিক বলেছিস, সব ঘুষ খাওয়ার, সব অন্যায়ের একটা দাঁড়ি মানে, পূর্ণচ্ছেদ সূচক দন্ডায়মান রেখা দিয়ে এবার এগুলো থামানো মানে শেষ করা উচিৎ।আন্নে ঠিকই কোইছেন মিয়া ভাই অহন ব্যেবাগ অন্যায়ের দাঁড়ি দিবেন না কি দিবেন হ্যেইডা আপনেরা মানে জনগণই ঠিক করেন.... দাঁড়ি দিবেন না কী দিবেন?[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

হিমবাহ ধস এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা

গত ১ সেপ্টেম্বর নেপাল সরকার কর্তৃক প্রকাশিত প্রাথমিক পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুসারে, ২৬ আগস্ট ২০২৬-এ হিমালয়ে একটি ভয়াবহ হিমবাহ ধসের ফলে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত বরাবর বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস দেখা দেয়, যাতে শত শত বিদেশি পর্যটকসহ ১,২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ৪,০০০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ হন এবং ১৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। চীন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী ১৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ২৬১ জন বিদেশিসহ নিখোঁজ ৫৪৬ জনের সন্ধান অব্যাহত রয়েছে। দৈনিক কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে যে জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) রাসুয়া এবং নুয়াকোটকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ধাদিঙ, গোর্খা এবং চিতওয়ানকে মাঝারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।নেপাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র বিবিসিকে জানিয়েছে যে গ্রামগুলো সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তারা আরও উল্লেখ করেছেন যে, ‘নদীতে ২০ মিলিয়ন ঘনমিটার অতিরিক্ত পানি ছিল এবং তা ছিল আকাশ থেকে নেমে আসা সুনামির মতো।’ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই অঞ্চলের নদীগুলোতে ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ বিপজ্জনক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে পরবর্তীতে আরও আকস্মিকভাবে বন্যার সৃষ্টি হতে পারে। আমরা দেখেছি যে, যখন শিলা ও বরফের বিশাল স্তূপ এমন বিস্ফোরণের সঙ্গে মাটিতে আঘাত করে, তখন তা পানিতে রূপান্তরিত হয়। ২,০০০ ফুট চওড়া শিলায় সঞ্চিত সমস্ত স্থিতিশক্তি খুব অল্প সময়ের মধ্যে গতিশক্তি এবং তরলে রূপান্তরিত হয়।হিমালয় অঞ্চলে এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত জুলাই মাসে, লেন্ডে খোলা নদীর সীমান্তে একটি ‘হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা’ নদীর পানির স্তরে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটায়। ২০২৩ সালে ভারতে প্রায় ১৭,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত দক্ষিণ লোনাক হ্রদে একটি ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট বন্যা বাংলাদেশের তিস্তা নদী বরাবর ৩৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। ২০২১ সালে, ভারতেরই চামোলির কাছে একটি বিশাল বরফ-পাথরের ধস প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ঘন লিটার পানি নদীপথে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং এতে ৭০ জন নিহত হন।জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, নেপালে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকাল ক্রমশ উষ্ণ হতে থাকায় ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন দশকে হিমবাহগুলো তাদের বরফের আয়তনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। এটি উল্লেখ্য যে, ভূমিকম্প এবং ভূমিধসের মতো অন্যান্য প্রাকৃতিক কার্যকলাপ থেকে সৃষ্ট ভূকম্পীয় সংকেত একই রকম হয় না। মূল পার্থক্য হলো, ভূমিকম্পে পি-তরঙ্গ নামে পরিচিত তীক্ষ্ণ, আকস্মিক প্রাথমিক সংকেত এবং এস-তরঙ্গ নামে পরিচিত স্পষ্ট উচ্চ কম্পাঙ্কের গৌণ সংকেত উৎপন্ন হয়। অন্যদিকে, বিস্ফোরণের মতো অন্যান্য ঘটনায় আরও শক্তিশালী সংকোচন ঘটে এবং আগ্নেয়গিরি বা ভূমিধসে একটানা, ধীর গড়গড় শব্দে সংকেত পাওয়া যায়। কিন্তু নেপালি কর্তৃপক্ষ যে ভূকম্পীয় সংকেত পেয়েছিল, তা ভূমিকম্পের সঙ্গে মেলেনি, যা জনসাধারণকে সতর্ক করতে পারত, এবং ভাটির নদীগুলোর জলমাপক যন্ত্রগুলোও কোনো ভয়াবহ বন্যার জন্য তৈরি করা হয়নি। যদি কোনো যোগাযোগ টাওয়ার ভেঙে পড়ত, তাহলে নেপালি কর্তৃপক্ষকে বাসিন্দাদের সতর্ক করার জন্য বাড়ি বাড়ি যেতে হতো। বর্তমান আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতের দুর্যোগে জীবন বাঁচাতে হিমালয় অঞ্চলজুড়ে বন্যা সেন্সর স্থাপন করতে হবে।দ্য নেচার পত্রিকা তাদের ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংখ্যায় জানিয়েছে যে, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সেন্টিনেল-১ স্যাটেলাইট থেকে ৮ জানুয়ারি থেকে ১৮ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে সংগৃহীত রাডার ডেটা থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, দৃশ্যমান ধস এলাকার কাছে হিমবাহ-শিলা ব্যবস্থাটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসছিল, যার গতিবেগ ছিল প্রতি মাসে প্রায় ১০ মিলিমিটার। প্রকৃতপক্ষে, এটি ধসে পড়ার এবং একটি মারাত্মক আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত করার মাত্র কয়েক দিন আগে একটি হিমবাহ-শিলাপুঞ্জের ত্বরান্বিত গতিকে প্রকাশ করে। আমরা দুটি পরিস্থিতি সম্পর্কে ভাবতে পারি। হয় দুর্যোগটি একটি বিশাল ভূমিধসের মাধ্যমে শুরু হতে পারে, যা হিমবাহের একটি অংশকে নিচের দিকে টেনে নিয়ে যায়, অথবা হিমবাহটি প্রথমে ভেঙে যেতে পারে, যার ফলে শিলাগুলো অস্থিতিশীল হয়ে ভূমিধসে পরিণত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলের পরিস্থিতি বিবেচনা করে, আমি দ্বিতীয় বিকল্পটিই ধরে নিচ্ছি; এর অর্থ হলো প্রথমে হিমবাহের ধস।যেহেতু বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে, এই ধরনের দুর্যোগ আবার ঘটতে পারে। এই বছর, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) ‘লিমিটিং ওভারশুট’ (২০২৬) শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির যুগে প্রবেশের পরিণতি এবং উপলব্ধ বিকল্পগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি একটি গতিশীল পথ, যা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম, সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন এবং পরবর্তী তাপমাত্রা হ্রাসকে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রতিবেদনটিতে উচ্চ মাত্রার উষ্ণায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি ও প্রভাব, সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন সীমিত করতে এবং তাপমাত্রা হ্রাসে সক্ষম করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশমন পথ, এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন ও হ্রাসের পথে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজন ও উন্নয়ন পদ্ধতিগুলোকে কীভাবে সাড়া দিতে হবে, তা অন্বেষণ করা হয়েছে। প্রমাণগুলো ধারাবাহিকভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, উচ্চতর সর্বোচ্চ উষ্ণায়ন এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি মানুষ ও প্রকৃতির জন্য বৃহত্তর ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।ইউএনইপির প্রতিবেদনে হিমালয় এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে, যার মধ্যে নেপালও অন্তর্ভুক্ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এতে পূর্ব হিমালয়ের হিমবাহের পশ্চাদপসরণ, পানিসম্পদ এবং বাস্তুতন্ত্রের সেবা সম্পর্কিত গবেষণা এবং পার্বত্য অঞ্চলে পানি, শক্তি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হিমবাহের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্য হিমালয়ে অবস্থিত হওয়ায় এবং কৃষি, জলবিদ্যুৎ ও পানীয় জলের জন্য হিমবাহের গলিত জলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই গবেষণাগুলো নেপালের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। নেপালে কৃষি ব্যবস্থাপনায় হিমবাহের গলিত পানির প্রয়োজন হলেও, দেশটি এর আকস্মিক বিস্ফোরণ চায় না। সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে শুধুমাত্র নেপালেই আনুমানিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। নেপাল সরকার জলবায়ু দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য জাতিসংঘের তহবিলের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে।সর্বোপরি, এই ধরনের ঘটনা মোকাবিলার জন্য বিদ্যমান পর্যবেক্ষণ কৌশল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট নয়। নেপালের জন্য একটি জাতীয় দুর্যোগ পূর্বাভাস কর্তৃপক্ষ থাকা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি, চীন, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশকে নিয়ে গঠিত একটি বহুজাতিক হিমালয় অঞ্চল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পূর্বাভাস বোর্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যে অঞ্চল থেকে এই দুর্যোগের সূত্রপাত হয়েছে, তা নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি বা তার ওপারে অবস্থিত। এটি একটি আন্তঃসীমান্ত পরিস্থিতি, যেখানে কার্যকর সতর্কবার্তা দেশগুলোর মধ্যে পর্যবেক্ষণ এবং বিপদ সম্পর্কিত তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদানের ওপর নির্ভর করে।[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী অধ্যাপক]

ভিডিও আরও দেখুন

বাংলাদেশ ম্যাচেই সুজি বেটসকে টপকে বিশ্বরেকর্ড স্মৃতি মান্ধানার

বাংলাদেশের বিপক্ষে নামার দিনেই বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস লিখলেন ভারতের সহ-অধিনায়ক স্মৃতি মান্ধানা। আন্তর্জাতিক নারী টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এককভাবে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের বিশ্বরেকর্ডটি এখন এই বাঁহাতি ওপেনারের দখলে। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ব্যাটিংয়ে নেমে নিউজিল্যান্ডের কিংবদন্তি সুজি বেটসকে পেছনে ফেলেন তিনি।ইতিহাস গড়ার জন্য এই ম্যাচে মান্ধানার প্রয়োজন ছিল মাত্র ৭ রান। ইনিংসের তৃতীয় ওভারে বাংলাদেশের পেসার মারুফা আক্তারের শেষ দুই বলে পরপর দুটি দর্শনীয় চার মেরে কাঙ্ক্ষিত সেই মাইলফলক স্পর্শ করেন ভারতের এই তারকা ব্যাটার।আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটিই মান্ধানার প্রথম কোনো বড় বিশ্বরেকর্ড নয়। চলতি নারী এশিয়া কাপেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন ফরম্যাট মিলিয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছিলেন তিনি। হংকংয়ের বিপক্ষে হাঁকানো শতরান দিয়ে অধিনায়ক ও সাবেক কিংবদন্তিদের ছাড়িয়ে যান মান্ধানা।বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এদিন আরও একটি বিরল অর্জনের খাতায় নাম লেখান তিনি। প্রথম ভারতীয় নারী ক্রিকেটার হিসেবে টি-টোয়েন্টি সংস্করণে ১০০টি ছক্কা হাঁকানোর মাইলফলক অতিক্রম করেছেন মান্ধানা। তবে রেকর্ডের দিনে তার ইনিংসটি বেশিদূর এগোয়নি; ১৯ বলে ৫টি চার ও ২টি ছক্কায় ৩৭ রান করে সাজঘরে ফেরেন এই ভারতীয় ওপেনার।উল্লেখ্য, বর্তমানে নারী ক্রিকেটের ওয়ানডে ফরম্যাটে সর্বোচ্চ সংগ্রাহকের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক মিতালি রাজ এবং টেস্টে সবার ওপরে অবস্থান করছেন ইংল্যান্ডের জ্যান ব্রিটিন। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে মান্ধানা ও সুজি বেটসের পেছনে পরবর্তী স্থানগুলোতে রয়েছেন হারমানপ্রীত কৌর, চামারি আতাপাত্তু ও সোফি ডিভাইন।

বাংলাদেশ ম্যাচেই সুজি বেটসকে টপকে বিশ্বরেকর্ড স্মৃতি মান্ধানার