সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
শুক্রবার সৌদিতে ঈদ বাংলাদেশে কবে

শুক্রবার সৌদিতে ঈদ বাংলাদেশে কবে

সৌদি আরবে পবিত্র ঈদুল ফিতরের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটিতে শুক্রবার (২০ মার্চ) ঈদ উদযাপিত হবে। বুধবার (১৮ মার্চ) শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা না যাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ।সন্ধ্যায় বৈঠকে বসে সৌদি চাঁদ দেখা কমিটি নিশ্চিত করে, আকাশে চাঁদ দেখা যায়নি। ফলে রমজান মাস ৩০ দিন পূর্ণ হবে। তার পরদিনই পালিত হবে ঈদুল ফিতর।এর আগে দেশটির বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছিল, মেঘলা আবহাওয়ার কারণে চাঁদ দেখা কঠিন হতে পারে। তুমাইর, সুদাইর ও আল-হারিকসহ গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় খালি চোখে চাঁদ দেখা সম্ভব হয়নি। দাম্মাম এলাকাতেও একই পরিস্থিতি ছিল।ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী নতুন মাস শুরুর জন্য চাঁদ দেখা বাধ্যতামূলক হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।বাংলাদেশে কবে ঈদসাধারণত সৌদি আরবের এক দিন পর বাংলাদেশে ঈদ উদযাপিত হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর শনিবার (২১ মার্চ) হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি, যারা দেশের আকাশে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে ঈদের তারিখ ঘোষণা করবে।এরই মধ্যে সৌদি মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেসরকারি ও অলাভজনক খাতের কর্মীদের জন্য ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে বুধবার সন্ধ্যা থেকে, যা চার দিন পর্যন্ত চলবে।মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, আগাম ছুটির ঘোষণা দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল কর্মী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া, যাতে জরুরি সেবা চালু রেখে অন্য খাতে কর্মীরা নির্বিঘ্নে ঈদ উদযাপন করতে পারেন।সব মিলিয়ে, সৌদিতে ঈদের দিন নির্ধারণ হলেও বাংলাদেশে কবে ঈদ হবে- সেটি নির্ভর করছে দেশের আকাশে শাওয়ালের চাঁদ দেখার ওপর।
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

জাকাত: দান নয়, একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

জাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি। এটি ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূলভিত্তি। জাকাতের উদ্দেশ্য হলো, সহায়তার মনোভাব পোষণ ও অথনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়ন। দারিদ্র্য বিমোচন ও মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ কমিয়ে আনা। মাহে রমজানের সঙ্গে জাকাতের রয়েছে ঐতিহ্যগত সম্পর্ক। যেহেতু জাকাত চন্দ্রবর্ষ দ্বারা হিসাব করা হয়; সেহেতু আমাদের দেশে অধিকতর কল্যাণের আশায় সাধারণত রমজান মাসেই জাকাত আদায় করা হয়। সুতরাং, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক কল্যাণ সাধনে জাকাত আদায় ও বণ্টনের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ইসলামের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কারা জাকাত আদায় করবেন, কোন কোন জিনিসের জাকাত আদায় করবেন, জাকাতের সঠিক হিসাব কীভাবে করবেন, কোন কোন খাতে কীভাবে জাকাত আদায় করবেন এবং জাকাতের হকদাররা কীভাবে জাকাত গ্রহণ করবেন— এ সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা জাকাত দাতা ও জাকাতগৃহীতা তথা সব মুসলিম নর-নারীর জন্যই ফরজ বা একান্ত অপরিহার্য। সঙ্গে সঙ্গে জাকাত আদায় না করা বা লোক দেখানো আদায় করার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কেও সবাইকে অবহিত, সচেতন ও সতর্ক করাও ইমাম, মুয়াল্লিম, মুবাল্লিগ ও উলামায়ে দ্বীনগণের পবিত্র জিম্মাদারি দায়িত্ব। জাকাত ব্যবস্থাই হলো বিশ্বের প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সমাজের অসহায়, দরিদ্র, নিপীড়িত ও পিছিয়ে পড়া জনগণকে অভাব ও অর্থনৈতিক দৈন্যদশা থেকে মুক্তি দিয়ে সচ্ছল ও স্বাবলম্বী করার জন্য ইসলামে জাকাতের বিধান করা হয়েছে। তাই জাকাত হলো গরিবের সামাজিক নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি ও তাদের অর্থনৈতিক রক্ষাকবচ। সামাজিক সাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজের সার্বিক উন্নয়ন ও একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথই হচ্ছে জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা। এ পৃথিবীর সব কিছুর মালিক মহান আল্লাহ। মানুষ তার প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর সব ধন-সম্পদ ভোগ করে মাত্র। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি জানো না, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব ও আধিপত্য কেবল আল্লাহরই, আর আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক কিংবা সাহায্যকারী নেই।’ (সূরা বাকারা, ১০৭) এই ভূমণ্ডল সৃষ্টির পরে তিনি মানুষকে ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু, সাদা কালো ইত্যাদি  তে ভাগ করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। এটিও তার সৃষ্টি রহস্যের একটি। এর মাধ্যমে তিনি তার বান্দাকে পরীক্ষা করেন। কাউকে তিনি ধন-সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করেন আবার কাউকে দারিদ্র্য দিয়ে। ধনীদের পরীক্ষা করার জন্য জাকাত আল্লাহর একটি উপলক্ষ মাত্র। এর মাধ্যমে সম্পদশালী ব্যক্তির আত্মার যেমন পরিশুদ্ধি আসে, তেমনই তার ধন-সম্পদ পবিত্র ও হালাল হয়। আর সমাজের অসহায়, ফকির, মিসকিন, দরিদ্ররা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়। জাকাতের মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। ইসলামে সম্পদ বণ্টনব্যবস্থায় ধনীরা তাদের সম্পদের কিছু অংশ জাকাত দিলে গরিবদের সম্পদ কিছুটা বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা মহানবী (সা.)-এর আদর্শ মদিনা রাষ্ট্র, খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য বিমোচন করে মুসলিম উম্মাহকে সমকালীন বিশ্বে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত জাতিতে পরিণত করেছিল। এভাবে জাকাত ফান্ডের অর্থ দিয়ে যদি অভাবীদের একটি তালিকা তৈরি করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশটি পরিবারকে বাছাই করে প্রত্যেক পরিবারকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে উপার্জনযোগ্য কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয় এবং যে পরিবারের কর্তা একজন শক্তিমান পুরুষ তাকে একটি ভ্যান বা মাঝারি নৌকা কিনে দেয়া হয়, যে পরিবারের কর্তা একজন বয়োবৃদ্ধ পুরুষ তাকে একটি ছোট পান-চায়ের দোকান করে দেয়া হয়, আর যে পরিবারের প্রধান একজন বিধবা নারী তাকে একটা ভালো সেলাই মেশিন কিনে দেয়া হয়— তাহলে এর সুষ্ঠু ও সঠিক ব্যবহার করে তারা দৈনন্দিন রোজগার করে সংসার চালাতে পারবে। এভাবে প্রতি বছর যদি বিশটি পরিবারকে স্বাবলম্বী করা যায় তাহলে মদিনায় যেমন খেলাফতে রাশেদিনের শেষ দিকে জাকাত নেয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যায়নি— তেমনই ২০ বছর পর হয়তো ওই মহল্লায়ও জাকাত নেয়ার মতো কোনো লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। এজন্য প্রয়োজন হবে সম্মিলিত সামাজিক অঙ্গীকার। আমরা বলতে পারি যে, আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাকাত এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জাকাত ব্যবস্থায় সমাজের অথনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় হয়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিরসনে এটি এক উত্তম ব্যবস্থা। সাম্য ও সমতার বিধান ছাড়া সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা সুরক্ষা হয় না। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণ হলেই সমাজ স্থিতিশীল হয়। অপরাধ কমে আসে। তাই এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, জাকাত সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসনে এক অপরিসীম ভূমিকা পালন করে থাকে। ইদানীং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলামী ব্যাংকগুলো সমাজে বিদ্যমান অসহনীয় দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনকল্পে জাকাতের অর্থ পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ করে তহবিল গঠন এবং সেই তহবিল থেকেই দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কার্যপরিকল্পনা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ইসলামী ব্যাংকগুলো নিজেদের তহবিলের জাকাত ছাড়াও তাদের গ্রাহকদের দেয়া জাকাত নিয়ে গড়ে তুলেছে জাকাত ফাউন্ডেশন। মূলত নগদ সাহায্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন এই তিনটি বৃহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এই তহবিলের অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে। অনুরূপভাবে কোনো এলাকার বিত্তবান লোকজন যদি জাকাতের তহবিল গঠন করে গরিব মানুষের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়, তাহলেও গ্রামবাংলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহজতর হবে। নতুবা জাকাত সরকারি জাকাত ফান্ডে জমা দিতে হবে এবং সেখান থেকে জনকল্যাণের প্রয়োজনীয় কার্যকর ভূমিকা নিলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। সরকারের বাস্তবমুখী উদ্যোগ, প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং কার্যকর ভূমিকা ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার পাশাপাশি ১৮ কোটি জনতা অধ্যুষিত এ দেশে যারা সাহেবে নিসাব; তারা সবাই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নিয়মিত জাকাতের অর্থ পরিকল্পিতভাবে ব্যয়ের জন্য উদ্যোগী হলে দেশে গরিব জনগণের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে। সরকারের রাজস্ব ফান্ডও হবে সমৃদ্ধ আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি হবে আরও বিস্তৃত। এজন্য প্রয়োজন সদিচ্ছার ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার। তাই রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় বাড়ানো আর জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার সব স্তরে জাকাত বিষয়ক ইসলামী অর্থনীতির শিক্ষা চালু করা; সর্বস্তরের মানুষের কাছে জাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা; সব মুসলিম দেশে সরকারিভাবে জাকাত আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।ইসলামে সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থায় ধনীরা তাদের সম্পদের কিছু অংশ জাকাত দিলে গরিবদের সম্পদ কিছুটা বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা মহানবী (সা.)-এর আদর্শ মদিনা রাষ্ট্র, খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য বিমোচন করে মুসলিম উম্মাহকে সমকালীন বিশ্বে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত জাতিতে পরিণত করেছিল। জাকাত আক্ষরিক অর্থেই সম্পদকে অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করে এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে সম্পদের পরিধি বৃদ্ধি করে। জাকাত দাতার মন থেকে লোভ-লালসা, অহংকার ও কৃপণতা দূর করে তাকে আত্মশুদ্ধি অর্জনে সহায়তা করে। এটি ধনীদের সঙ্গে দরিদ্রদের সুসম্পর্ক স্থাপন করে এবং সমাজে ন্যায়বিচার ও সামাজিক সংহতি রক্ষা করে। জাকাতের মাধ্যমে অভাবী, ঋণগ্রস্ত এবং অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিদের সাহায্য করে তাদের স্বাবলম্বী করা হয়। এটি একটি অবশ্য পালনীয় আর্থিক ইবাদত, যা ইসলামের মৌলিক ভিত্তিগুলোর অন্যতম। জাকাত কেবল দরিদ্রকে অর্থ দেয়া নয়, বরং এটি সম্পদ ও আত্মার পবিত্রতা অর্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের এক মহান মাধ্যম। এজন্য প্রয়োজন হবে সম্মিলিত সামাজিক অঙ্গীকার। পরিশেষে আমরা বলতে পারি, আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাকাত এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জাকাত ব্যবস্থায় সমাজের অথনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় হয়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিরসনে এটি এক উত্তম ব্যবস্থা। সাম্য ও সমতার বিধান ছাড়া সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা সুরক্ষা হয় না। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণ হলেই সমাজ স্থিতিশীল হয়। অপরাধ কমে আসে। তাই এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য, জাকাত সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসনে এক অপরিসীম ভূমিকা পালন করে থাকে। মোট কথা ইসলামী সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় জাকাত একদিকে যেমন গরিব অসহায়তা অবসানের গ্যারান্টি রাখে তেমনি অর্থনৈতিক চাকাকে গতিশীলও রাখে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও সুদৃঢ় ও সমুন্নত করে। এ সব কারণে জাকাতের আর্থসামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। [লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

স্কুল-কলেজ পরিচালনা কমিটিতে শিক্ষিত মানুষই প্রয়োজন?

সদ্য বিদায় নেয়া আলোচিত ও বিতর্কিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের মানুষ ক্রমাগত আশাহত হয়েছে। মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দিনগুলোতে দেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা ছিল অন্যরকম। মানুষ মুখিয়ে ছিল অভিনব কিছু দেখবে বলে। রাষ্ট্র পরিচালনায় এদের বছরদেড়েক সময়ের মধ্যে সংস্কার সংস্কার বলে যে আওয়াজ গণমানুষের কানে বেজে চলেছিল, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সে আওয়াজ যেন বন্যার জলের স্রোতের মতো ভেসে গেছে অনেক দূরে। সে অনভিজ্ঞ সরকার অনেক কিছুতে হাত দিলেও কাজের কাজ তেমন কিছু হয়নি। এমন বান্ধা ও শ্বাসরুদ্ধকর সময়ে যে দুয়েকটা ভালো উদ্যোগ তারা গ্রহণ করেছিল এর মধ্যে দেশের স্কুল-কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের পরিচালনা কমিটির প্রধানের শিক্ষাগত যোগ্যতা বেঁধে দেয়া ছিল অন্যতম। এটা করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকেই। কারণ পটপরিবর্তনে অব্যবহিত পরেই দেশব্যাপী স্কুল-কলেজ দখলে নেয়ার এক হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ/এমএ করার প্রজ্ঞাপন জারি করার পর গ্রাম-গঞ্জে, জনমনে একটা স্বস্তির পরিবেশ ফিরে এসেছিল। সরকার সঠিক কাজ করেছে বলে সাধারণ মানুষের মন্তব্যও শোনা গেছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠির শর্তের ফলে শিক্ষক-কর্মচারীও তা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিয়েছে।২.অতি সম্প্রতি নতুন সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর এক আকস্মিক  মন্তব্যের জের ধরে সমালোচনার ঝড় যেন স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দেশব্যাপী। রাস্তাঘাটে, হাটে-বাজারে, চায়ের দোকানে সর্বত্র কথা হচ্ছে। তিনি বলেছেন, স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা হবে। অমনি পত্রপত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমে শত শত ট্রল, বাঁকা মন্তব্য, রম্য নাটক, সংসদেও রাজনৈতিক নেতাদের কড়া বক্তব্য চলমান থাকে। এতে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে। কারণ হতে পারে যে, এই মন্ত্রীর কাছ থেকে গণমানুষের প্রত্যাশা তুলনামূলকভাবে বেশি। আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে তিনি ছিলেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। তখনকার দিনে দেশের পরীক্ষা কেন্দ্রগুলো থেকে নকল বন্ধ করার পেছনে তার জাদুকরী পদক্ষেপ, ঝটিকা সফর তথা অভূতপূর্ব শ্রমের কথা এতদিন পরেও মানুষ হয়তো ভুলে যায়নি। তখন মানুষ তার নাম দিয়েছিল হেলিকপ্টার মন্ত্রী। তাছাড়া আজকে যখন দেশের মানুষের শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭২%, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫ কোটির কাছাকাছি আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণ হারে। মন্ত্রীর নিজের দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষাসহ পিএইচডি ডিগ্রিধারী হওয়া ইত্যাদিও মানুষের নজর এড়ায়নি। তিনি শপথ নিয়েই শিক্ষা খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব তথা প্রাধান্য দেয়ার আশার বাণী শুনিয়েছেন। সেখানে তার মুখেই যদি সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতায় শিথিলতার বিষয় উত্থাপন করা হয়— তা দেশের মানুষকে হতাশ করবে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাছাড়া আগের তুলনায় মানুষ এখন অনেক বেশি সমাজ সচেতন অধিকতর তথ্যবান্ধব ও সমালোচনাপ্রিয় হয়েছে। মানুষ তর্কপ্রিয় তো বটেই।৩.এমনিতেই আধুনিক বিশ্বের বহুমাত্রিক প্রযুক্তি নাগালের মধ্যে পাওয়া এবং ব্যবহারের কারণে তা নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে চলেছে। গত কয়েক বছরে গ্রামীণ জনপদে অবস্থিত প্রায় সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি এর প্রভাব পড়েছে। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠ গ্রহণে বা পরীক্ষায় অংশ নিতে অনীহা প্রদর্শন করছে। যদিও বছরান্তে নিয়ম অনুযায়ী ফরম পূরণ করা হচ্ছে, ফি প্রদান করা হচ্ছে। পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তারা বেশিরভাগই ভালো কিছু লিখতে পারছে না। অথচ পাসের হার দেখানো হয়েছে অধিকতর। এটা ছিল আত্মতুষ্টির ফলাফল আর শিক্ষার হার বৃদ্ধির গোপন রহস্য। অন্যদিকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির পদ্ধতিতে নানা গবেষণা করার কারণে ছাত্রছাত্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। সংকট দেখা দেয় গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষকের। এমনকি বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। দেশে এমন নানাবিধ সমস্যা প্রকটভাবে বিরাজমান রয়েছে। অথচ গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বলা যায়, শুধু এমপিওভুক্তির আশীর্বাদ নিয়েই টিকে আছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ভালো শিক্ষকের আকাল ও দুঃসময়ের মধ্যে ম্যানেজিং কমিটির চাপে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হয়েছে। অনেক সময় যোগ্যতাসম্পন্ন জনপ্রিয় শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে কমিটি আরও বেশি স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে।এক্ষেত্রে স্কুল-কলেজের উন্নয়ন, শিক্ষার মান, লেখাপড়ার পরিবেশ, বাৎসরিক রেজাল্ট, শ্রেণিকক্ষের অবস্থা, ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি, অভিভাবক সম্মিলন এসব খেয়াল না করে এ ধরনের কমিটির নজর থাকে মূলত নিয়োগ প্রক্রিয়ার দিকে। আর নিয়োগ মানে টাকার বিনিময়ে অযোগ্য বেকারকে চেয়ারে বসানো। তখনই প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে নিত্য রুজিরোজগারের এক ব্যাংক। অনেক সময় শোনা গেছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য একদিন তার নিবেদিতপ্রাণ জনৈক কর্মীকে বলেছেন, ‘তোমার জন্য কিছু করতে পারিনি, তোমাকে একটা স্কুল/কলেজ দিয়ে দিচ্ছি। এটা দিয়েই তোমার চলে যাবে।’৪.এখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, স্কুল-কলেজে সভাপতি এবং এ জাতীয় কমিটির প্রয়োজন কী?কমিটি না থাকলে কী কোনো সমস্যা হতে পারে? বাস্তবতা হলো, ঐতিহ্যগতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয় অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত একটা কমিটি রয়েছে; যা মূলত শিক্ষার পরিবেশ এবং অন্যায়, অনিয়ম, অনাচার ইত্যাদি হচ্ছে কি না— তার নজরদারি করাই এ কমিটির কাজ। কিন্তু কালক্রমে তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দলের বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আধিপত্য প্রদর্শনের এক নিরাপদ স্থান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ কমিটির অস্তিত্ব না থাকলেও কিছু যায় আসে না। প্রত্যেক উপজেলা পর্যায়ে রয়েছে সব স্তরের জন্যে পৃথক পৃথক সরকারি কর্মকর্তার পদায়ন। প্রতিষ্ঠান সুপারভিশনের দাপ্তরিক দায় মূলত তাদের। তারাই ভালো মন্দের রিপোর্টিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। তথাপি এ কমিটির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে সর্বময় ক্ষমতা। এখানে লাগাম টেনে ধরতে পারলে বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন আশা করা যায়। অন্যথায় মাঠ পর্যায়ের গতানুগতিক ধারার শিক্ষা কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো ছাপ পড়বে না।কমিটির সভাপতি পদের জন্য অবশ্যই উচ্চ শিক্ষিত, গ্রহণযোগ্য, সৎ সাহসী মানুষ প্রয়োজন। তিনি হতে পারেন একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক ছাত্র, চাকরিরত বা অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সরকারি, বেসরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, শিল্পপতি ইত্যাদি পদাধিকারী। অর্থাৎ সমাজসেবা যার ব্রত। তবে তাকে অবশ্যই শিক্ষকগণের চেয়ে কম ডিগ্রিধারী হলে বিবেচনায় আনা যাবে না। কারণ এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। উচ্চশিক্ষিত সাবেক ছাত্ররা তার নিজের স্মৃতি-জাগানিয়া, নস্টালজিক প্রতিষ্ঠানের অমঙ্গল কখনও করতে পারে না। তাই সভাপতি হওয়ার জন্যে এদের অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে।৫.যতদূর জানা যায়, সরকার ম্যানেজিং কমিটির জন্যে শিক্ষাগত যোগ্যতার শৈথিল্যের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বা আরও পরিশীলিত কোনো আদেশ দানের অপেক্ষায় আছে। আসল কথা হলো, সভাপতি পদের জন্যে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বহাল রাখা হচ্ছে। দিনশেষে তা-ই যেন হয়। তবে তা যেন শতভাগ রাজনৈতিক বিবেচনায় না করা হয়। বরং দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহকে অন্তত একজন সজ্জন, বিদ্যানের হাতে দেয়া হয়। ভাবতে হবে, গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে আসার এটাই উপযুক্ত সময়। নতুন সরকারের কাছে দেশের জনগণ এমনটাই প্রত্যাশা করবে।[লেখক : গল্পকার]

প্রবাসীর ঈদ: এক দ্বৈত অনুভূতির সংমিশ্রণ

মুসলিমদের যে কয়টি ধর্মীয় উৎসব রয়েছে তার মধ্যে ঈদুল ফিতর অন্যতম। এটি ইসলামী বর্ষপুঞ্জির খুবই গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যা মুসলিমদের জন্য আনন্দের ও ধর্মীয় শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বিশেষ দিন। বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে যেখানে ঈদ উৎসবের আনন্দে পরিবার, বন্ধু এবং স্বজনরা একত্রিত হয়, সেখানে প্রবাসীদের জন্য ঈদ অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করে। প্রবাসে ঈদ পালন করার সময় প্রবাসীদের মাঝে এমন কিছু মিশ্র অনুভূতি পরিলক্ষিত হয়, যা তাদের এক ধরনের মানসিক চ্যালেঞ্জর মুখোমুখি নিয়ে দাঁড় করায়, আবার কখনও কখনও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা বিশেষ উষ্ণতা এবং নতুন কিছু সৃষ্টি বা আয়োজনের উপলক্ষ হিসেবেও কাজ করে।প্রবাস জীবনে ঈদ উদযাপন সত্যিকারার্থে খুব বেশি একটা সুখকর নয়। দেশে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ পালন করার যে আনন্দ— তা মোটেও প্রবাসে পাওয়া যায় না। এ না পাওয়ার দুঃখ কিছুটা হলেও হৃদয়ে দাগ কাটে। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে আজকাল প্রবাসীরা ভিডিও কল, সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য ডিজিটাল মাধ্যমে তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করার মাধ্যমে কিছুটা কষ্টের লাঘব ঘটাতে পারলেও একাকীত্বের অনুভূতি কিন্তু থেকেই যায়। প্রবাসীরা যখন তাদের মাতৃভূমি, পরিবারের মধ্যে ঈদ উৎসবের আনন্দঘন পরিবেশ দেখে, তখন তাদের ভেতরে যে আবেগ-অনুভূতির সৃষ্টি হয় তা প্রকাশ করা সত্যি কঠিন। কারও কারও মাঝে আবার নস্টালজিয়া এসে ভিড় করে; যা কি না নিয়ে যায় তাদের শৈশবের মধুর স্মৃতিবিজড়িত ঈদের আনন্দঘন মুহূর্তের মাঝে।প্রবাসে ঈদ উৎসবের প্রস্তুতিতে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। যেহেতু পরিবারের সব সদস্যরা কিংবা আত্মীয়-স্বজন কাছাকাছি থাকে না, তাই তাদের একাকী অথবা ছোট একটি প্রবাসী কমিউনিটির মধ্যে ঈদ উদযাপন করতে হয়। সেখানেও থাকে বিশেষ কিছু আয়োজন। সর্বপ্রথম সবাই ঘুম থেকে উঠেই ঈদের নামাজটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। একেকটি এলাকায় সাধারণত একেকটি মসজিদে ঈদের নামাজের আয়োজন করা হয়, সেখানে সবাই একত্রিত হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। আজকাল আবহাওয়া সদয় হলে অধিক সংখ্যক লোকের অংশগ্রহণের সুবিধার্থে কোনো কোনো এলাকায় খোলা মাঠেও ঈদের নামাজ আদায় করা হয়ে থাকে।নামাজ শেষে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানোর যে একটি রেওয়াজ ছিল, তা এখন নেই বললেই চলে। এর প্রথম কারণ, ঘুরে ঘুরে একদিনে সবার বাসায় যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায় না। দ্বিতীয়ত, কখনও কখনও দেখা যায় লোকজন ঘুরে-ফিরে কেবল নির্দিষ্ট কিছু বাড়িতে যায় শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য। এতে ওইসব বাড়ির লোকজন আর সেজেগুজে বাইরে বেরুনোর সুযোগ পান না। ফলে উৎসবমুখর দিনটি তাদের কাছে মাটি হয়ে যায়। তাই ঈদের দিনের আনন্দ থেকে যাতে কাউকে বঞ্চিত হতে না হয়, সেই চিন্তা-ভাবনা থেকে কমিউনিটির সদস্যরা একে অন্যকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে ইদানীং একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মিলিত হন। একই সঙ্গে সেখানে থাকে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। ঈদ উপলক্ষে প্রতিটি পরিবার নিজেদের জন্য যা রান্নাবান্না করেন তাই তারা সঙ্গে করে নিয়ে যান। ফলে অনুষ্ঠানস্থল বিশাল খাদ্যের সমাহারে পরিণত হয়। সেমাই, মিষ্টি, পায়েস, চটপটি, হালিম, কোর্মা-পোলাও, বিরিয়ানিসহ এমন কোনো ঐতিহ্যবাহী খাবার নেই যা সেখানে পাওয়া যায় না। সত্যিকারার্থে খাবারের দিক থেকে প্রবাসের অনুষ্ঠানগুলো এখন আর দেশীয় অনুষ্ঠানের তুলনায় কোনো অংশেই কম নয়।আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাসে ঈদ উদযাপন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের দেশে ঈদ করতে না পারার দুঃখ ভুলে থাকা ও নতুন প্রজন্মের মাঝে ঈদের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও ঐতিহ্যগত দিক তুলে ধরার জন্য ঈদের অনুষ্ঠান আয়োজন করা বেশ জরুরি। তাছাড়া ঈদ যে উৎসব বা ঐতিহ্যের বাইরে আমাদের ‘একাত্মতার প্রতীক’ এ জিনিসটি ফোটিয়ে তোলার জন্যও এসব অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই।তবে একটি সত্য কথা না বললেই নয়। প্রবাসে যতই জাঁকজমকভাবে অনুষ্ঠান পালন করা হোক না কেন, তবু প্রবাসীদের মন ভরে না।পারিবারিক স্মৃতির অনুপস্থিতি তাদের তাড়া করে বেড়ায়। এই দিনগুলোতে প্রবাসীরা তাদের পরিবারের সঙ্গে একত্রিত হতে না পারায় হৃদয়ের ভেতরে এক অজানা শূন্যতা অনুভব করেন। দেশের গ্রামের বাড়ি কিংবা শহরের দিকে মন ফিরে যায়, যেখানে তাদের প্রিয়জনরা ঈদ উদযাপন করে থাকে। এই সময় তাদের মধ্যে একটি প্রবল আবেগানুভূতি তৈরি হয়। বস্তুত একদিকে পরিবার ও স্বজনবিহীন নিঃসঙ্গতা এবং অন্যদিকে বন্ধু ও কমিউনিটির মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতা প্রবাসীদের মাঝে একটি দ্বৈত অনুভূতির সংমিশ্রণ ঘটায়।[লেখক : আয়ারল্যান্ড প্রবাসী]

শেখ হাসিনার মনস্তত্ত্ব ও তার রাজনীতি এবং ক্ষমতার ব্যবহার

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই বলে থাকেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ট্রাজেডির পর শেখ হাসিনা ট্রমায় আক্রান্ত হলেও তা তিনি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিদেশে থাকায় তারা দুই বোন ছাড়া, রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন বঙ্গবন্ধুর শিশু সন্তান ও দুই পুত্রবধূসহ মুজিব পরিবারের সব সদস্যকেই ঘাতকরা হত্যা করেছিল। এমন নৃশংসতা ইতিহাসে বিরল। ঘাতকরা বিদেশের মাটিতেও মুজিব পরিবারের জীবিত দুই সদস্যের ওপর হামলার যে পরিকল্পনা বা প্রচেষ্টা নেয়নি— সে সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ ধরনের এক পরিস্থিতিতে ট্রমায় আচ্ছন্ন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর এবং এরশাদ আমলের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণসংগ্রামের দীর্ঘযাত্রা পথে রাজনীতির নানা বাঁক বদলে ভূমিকা রেখে তিনি রাজনীতি অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন। ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসেন।কিন্তু ২০০৪ সনের ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পরে শেখ হাসিনার মনে এমন এক ধারণার সৃষ্টি হয় যে, বিরোধীদের হাতে তার জীবন বিপন্ন। তার পিতা-মাতাসহ প্রায় পুরো পরিবার হত্যাযজ্ঞের শিকার হওয়ায়, তার ওপরও একাধিকবার হত্যা প্রচেষ্টা হওয়ায় এবং হত্যা প্রচেষ্টার যথাযথ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া অগ্রসর না হওয়ায় এ ধারনা তার বিশ্বাসে পরিণত হয়। কার্যত ধীরে ধীরে তিনি ‘ট্রমাটাইজড’ হয়ে পড়েন। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন, কতৃত্ববাদ ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ ঘটনা অন্যতম উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।তবে ছাত্র জীবনে এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময়ে তাকে আমার এমনটা মনে হয়নি। ১৯৮৩- ৮৪ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সঙ্গে একযোগে, আবার ১৯৮৮-৮৯ সালে ১৫ দলীয় জোটের ২-৩টি বৈঠকে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলার ও আলোচনার সুযোগ হয়েছে। পারিবারিক কতক ঘটনায় শেখ পরিবারের সঙ্গে সংযোগ থাকায়— যা শেখ হাসিনা কখনও জানতেন না, তারপরেও তার সঙ্গে একটা নৈকট্য অনুভব করতাম। তাই হয়তোবা তার কতৃত্ববাদী মনোভাব আমার চোখে নাও ধরা পড়ে থাকতে পারে।তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের আগেই একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম ১৯৮১ সনের শেষ দিকে ছাত্র ইউনিয়নের জাতীয় সম্মেলনে। সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে আরও অনেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে দর্শক আসনে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদ। উদ্বোধনী অধিবেশনে যে শোক প্রস্তাব উত্থাপিত হয় সেখানে শুরুতেই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের এবং ১৫ আগস্ট ও তৎপরবর্তীতে যে হত্যা-ক্যু-পাল্টা ক্যু’র রাজনীতির শুরু তার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করা হয় এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই জরুরি ভিন্ন কাজ আছে বলে রাজ্জাক ভাই এবং তোফায়েল ভাই সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন। আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি শোক প্রস্তাবটি বা শোক প্রস্তাবের ভাষা তাদের পছন্দ হয়নি বা তাদের নেত্রীর পছন্দ নয়। সম্মেলনের কিছুকাল পরেই সামরিক শাসন এবং জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখল।জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের গোড়ার দিকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা প্রথমবার শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সব শীর্ষ নেতারাই ছিলেন। শেখ হাসিনা কোনো সাহায্যকারী ছাড়া একাই ছিলেন। আমরা ভবনের অভ্যন্তরে সভার জন্য অপেক্ষা করছি। শেখ হাসিনা তার কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, চলেন আমরা লনে গিয়ে বসি। শেখ হাসিনাসহ আমরা লনের সবুজ ঘাসের ওপর সবাই গোল হয়ে বসি, যেমনটা অনেক সময় পার্কে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বন্ধুবান্ধবরা আড্ডাচ্ছলে বসে গল্প করি। শেখ হাসিনা ৩২ নম্বরে কর্মরত কর্মচারীদের বললেন, সরিষার তেল আর পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে মেখে মুড়ি আর চা দিতে। সেদিন কি আলোচনা হয়েছিল তার কিছুই মনে পড়ছে না। শুধু তার সারল্য, ঝালমুড়ি আর হাসিমাখা মুখটি স্মৃতিতে ভেসে আছে।এরপরের বৈঠকটি ছিল অভাবনীয়। সম্ভবত ১৯৮৫-এর শেষে বা ’৮৬-এর শুরুতে একদিন তৎকালীন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ আমাকে বললেন, শেখ হাসিনা আপনার সঙ্গে কিছু বিষয়ে কথা বলতে চান। আপনি যোগাযোগ করে কথা বলবেন। ওই সময়ে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন চলছিল। আমি একদিন দুপুরে গেলাম ৩২ নম্বরের বাড়িতে। গিয়ে দেখি দুপুরের খাওয়ার আয়োজন চলছে। ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী আর ছিলেন পরমাণু বিজ্ঞানী এমএ ওয়াজেদ। ছাত্রলীগের নেতারা ড. ওয়াজেদকে দুলাভাই সম্বোধন করে নানা রসিকতা করছেন। আমার সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি শুধু বললেন ‘ইপসু’। এর মধ্যে খাওয়া শুরু হলো। মাছ-ভাত আর সবজি ও ডাল। তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক আমাকেও জোর করে বসালেন।দুপুরের খাওয়া শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরে নানক ভাই আমাকে বললেন, নেত্রী আপনাকে ডাকছেন। তিনি আমাকে শেখ হাসিনার বসার ছোট কক্ষটিতে পৌঁছে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের আলোচনা হলো। মনে হলো উনি যেসব বিষয় যেভাবে আলোচনা করবেন বলে মনে করেছিলেন পরবর্তীতে সম্ভবত কিছুটা মত পরিবর্তন করেছিলেন। কুশল বিনিময়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক শক্তি সম্পর্কে আমার মতামত, আমার বিবেচনায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কার কেমন গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি বিষয় জানতে চাইলেন। আমি অনেকক্ষণ নীরব থাকায় তিনি নাম ধরে কয়েকজনের সাংগঠনিক দক্ষতা, ছাত্রদের মধ্যে, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি বিষয়ে কিছু প্রশ্ন করলেন। আমার নিজেরই ছাত্রদের মধ্যে পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল না, তাই এসব প্রশ্নে আমি খুবই বিব্রত বোধ করেছিলাম। তবে আমার বলা কথাগুলো তিনি শুধু শুনলেন। পাল্টা কোনো প্রশ্ন বা কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইলেন না। ফরহাদ ভাই আমাকে আগে থেকেই বলে দিয়েছিলেন শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে আমি যাতে আর কারো সঙ্গে আলোচনা না করি। এমনকি উনিও কোনো দিন জানতে চাননি। ছাত্রলীগেরও কেউ আমাকে কখনও কোনো প্রশ্ন করেননি। তবে শেখ হাসিনা আমার সঙ্গে একান্তে কথা বলায় ছাত্রলীগের মধ্যে আমার কদর বেড়ে গেল। ছাত্র আন্দোলনে থাকা অবস্থায় এর পরে আর কখনও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি।ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নেয়ার পরে আর একদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে পাশে গিয়েছিলাম। তখন শেখ হাসিনা গৃহবন্দী। ১৫ দলীয় ঐক্যজোটের নেতারাও গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে। একদিন সন্ধ্যায় ফরহাদ ভাই তার সাময়িক ডেরাতে ডেকে পাঠালেন। আমার হাতে একটা চিরকুট দিয়ে বললেন এটা শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছাতে হবে। পৌঁছানোর পথও তিনি বাতলে দিলেন। ৩২ নম্বরে পাশের বাড়িটি ছিল বেগম বদরুন্নেসা আহমদের। আমাকে বলা হলো সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ওই বাড়ির গেটে পৌঁছে পরিচয় দিলে আমাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হবে। ওই বাড়ির সঙ্গে ৩২ নম্বর বাড়ির একটা ছোট সংযোগ গেট রয়েছে, সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেই হবে। সে অনুযায়ী ঠিক সময়ে আমি পৌঁছে গেলাম সংযোগ গেটে। জায়গাটায় একটা ঘুটঘুটে অন্ধকার বিরাজ করছিল। দাঁড়াতেই শেখ হাসিনা এলেন, খুব স্পষ্টভাবে চেহারা দেখা যাচ্ছিল না। চিরকুট নিয়ে বললেন, একটু দাঁড়ান। আমি ২-৩ মিনিট অপেক্ষা করতেই তিনি একটি খাম আমার হাতে দিয়ে বললেন পৌঁছে দেবেন। যে পথে এসেছিলাম সে পথেই বিদায় হলাম।এরপর আরেকদিন দেখা হয়েছে ড. ওয়াজেদের মহাখালীর সরকারি কোয়ার্টারে। ১৫ দলের অধিকাংশ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া। কোনো একটি কর্মসূচি গ্রহণকে কেন্দ্র করে সম্ভবত সভাটি ছিল। অন্যান্য দলের আর কে কে ছিলেন, মনে পড়ছে না। শেখ হাসিনা কথা বলছিলেন। এমন সময় বরিশালের আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রবেশ করলেন। হাতে সেই আগেকার দিনের খালোই (বাঁশ দিয়ে তৈরি মাছ রাখার এক ধরনের ছোট ঝুড়ি)। ঢুকেই এক গাল হাসি দিয়ে বললেন, গ্রাম থেকে কৈ মাছ নিয়ে এসেছেন। হাসিনাও দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, আপনারা আলোচনা করেন। আমি এখন কৈ মাছ রান্না করব। আপনারা না খেয়ে কেউ যাবেন না। হয়ে গেলো কৈ উৎসব!আমি এভাবেই ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। অবশ্যই এ দেখা রাজনৈতিক বা শ্রেণীগতভাবে দেখা নয়। আমার চোখে ওই সময়ের একজন মানুষকে দেখা। অবশ্য এ সব দেখা সাক্ষাতে যেহেতু কোনো গভীর রাজনৈতিক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়নি তাই আমার দেখাটা একরকমের। ১৫ দল বা ৮ দলের শীর্ষ নেতরা যখন তার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনা করেছেন বিশেষত বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় ঐক্যজোটের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি, বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে একমঞ্চ থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা যায় কি না বা নির্বাচনী কৌশল কী হবে— তখন হয়তোবা তার রাজনৈতিক সংকীর্ণতার প্রকাশ ঘটেছে। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সেটা বুঝতাম। এ পরিস্থিতির ঐতিহাসিক কারণও ধারণা করতাম। কিন্তু সামনাসামনি তাকে যতটুকু দেখেছি সাধারণভাবে তার ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়েছি।১৯৯১ সনে রাজনৈতিক জীবনে ইতি টানার পর থেকে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা সাক্ষাৎ ছাড়া রাজনৈতিক কোনো নেতা এমনকি ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতাদের সঙ্গেও আর সেরকম কোনো যোগাযোগ নেই। শেখ হাসিনার সঙ্গেও আর কোনোদিন দেখা হয়নি। তাই পত্রপত্রিকার সংবাদ দেখে যতটুকু রাজনৈতিক ধারণা পেয়েছি সেটুকুতেই সন্তুষ্ট থেকেছি। দ্বিদলীয় রাজনীতির ধারায় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে পালাক্রমে একবার বিএনপি এবং একবার আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করে আসছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজিত নির্বাচনে বাই ডিফল্ট বিরোধী দল নির্বাচনে সুবিধা পায়। কেননা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেয়ার পরে সরকারি দলের সাজানো বাগানে পরিবর্তন আনে। শামিম ওসমান, জয়নাল হাজারী বা গিয়াসউদ্দীন আল মামুন, সিলভার সেলিমরা তখন আর যা খুশি তা করতে পারে না। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বড় ধরনের জনবিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়নি। যদিও শামিম ওসমান, জয়নাল হাজারীরা ‘স্বমহিমায় উজ্জ্বল’ ছিলেন, মায়ার ছেলে দীপু চৌধুরী, হাসানাত আবদুল্লার ছেলে সাদিক আবদুল্লাহ কিংবা ডা. এইচবিএম ইকবালের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দেশজুড়েই সমালোচিত ছিল। বড় ধরনের জনবিচ্ছিন্নতা না থাকলেও নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। এ নির্বাচনের আগে পরে সংখ্যালঘু অধিষ্ঠিত এলাকাগুলোতে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নির্যাতনের অভিযোগ আছে। তবে সাধারণভাবে ফ্লোটিং ভোট একবার আওয়ামী লীগ পরেরবার বিএনপি, সেই ধারায়ই নির্বাচন হয়েছে বলে মনে হয়।কিন্তু নির্বাচনের পরে শেখ হাসিনার কিছু বক্তব্য শুনে মনে হলো আমার দেখা একযুগ আগের শেখ হাসিনা আর নাই। শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার গোপালগঞ্জে গেলে তাকে যেন ‘আদর যত্ন করে বিদায় করা হয়’। ওই নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন আমার মামা আবু সাইদ। তিনি ডাকসাইটে গোছের আমলা ছিলেন। ওনার ভাই-বোন বা আমরা ভাগ্নে-ভাগ্নিররা তার কাছে ঘেষতে সাহস পেতাম না। শেখ হাসিনার মনে একটা অভিমান ছিল সাইদ সাহেবের বাড়ি গোপালগঞ্জ, সাইদ সাহেবের বাবা অর্থাৎ আমার নানা আব্দুল হাকিম ও তার দাদা শেখ লুৎফর রহমান বন্ধু ও চাকরি ক্ষেত্রে সহকর্মী ছিলেন, দুই বাসায় যাতায়াত ছিল। তারপরও তিনি দাপ্তরিক সভা বা প্রয়োজন ছাড়া কখনও ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন না। তার এ অভিমানের কথাটা আমি তোফায়েল ভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছি। শেখ হাসিনা আবু সাইদকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করতে গররাজী ছিলেন। বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের বিশেষ আগ্রহের কারণে শেখ হাসিনা রাজি হয়েছিলেন।আমার মা মাঝে-মধ্যেই গর্ব করে বলতেন, জানিস আমার বিয়ের রান্না করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর বাবা। ভাবতাম এগুলো কথার কথা। পরে এসব কথার সত্যতা পেলাম বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ে। বইয়ের ১০ম পৃষ্ঠার বঙ্গবন্ধুর ভাষ্য থেকে উদ্ধৃতি করছি, ‘আমার আব্বাকে আমি খুব ভয় করতাম। আর একজন লোককে ভয় করতাম, তিনি আব্দুল হাকিম মিয়া। তিনি আমার আব্বার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। একসঙ্গে চাকরি করতেন, আমাকে কোথাও দেখলেই আব্বাকে বলে দিতেন, অথবা নিজেই ধমকে দিতেন। যদিও আব্বাকে ফাঁকি দিতে পারতাম, তাকে ফাঁকি দিতে পারতাম না। হাকিম সাহেব বেঁচে নেই। ... তার এক ছেলে সিএসপি হয়েছে।’ সেই সিএসপি অফিসারই ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। আর বঙ্গবন্ধুর বাবা প্রকৃত অর্থেই আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের বাড়িতে খাবারের বড় আয়োজন হলে তার তদারকি করতে পছন্দ করতেন, বাবুর্চিদের সঙ্গে নিজেও রান্নায় হাত লাগাতেন। যাক সেসব কথা।২০০১ সনের নির্বাচনের সপ্তাহ খানেক পরেই আমার নানি অর্থাৎ আবু সাইদের মা ঢাকায় মারা যান। নানির শবদেহ নিয়ে মামার সঙ্গে আমরা গোপালগঞ্জে রওনা হলাম। যেহেতু শেখ হাসিনা আদর-যত্ন করার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন, তাই প্রায় পুরো রাস্তায়ই মনে হলো পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা ছিল। যাওয়ার পথে মামা আমাকে একাধিকবার প্রশ্ন করছিলেন, আনোয়ার, এ রকম খারাপ ফলাফল কীভাবে হয়? তোফায়েল আহমেদ কীভাবে হারে? আমি বললাম মোট ভোটে দুই দলের পার্থক্য তো খুবই সামান্য। এই সামান্য ভোট পার্থক্য নিয়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিএনপির বিজয় তো কোনো হিসাবেই মিলছে না। রসিকতা করে বললাম, হারুন ভাই, (তার খুব বিশ্বস্ত পিএস ছিলেন এবং বিএনপির কড়া সমর্থক ছিলেন। স্কুল জীবনে আমাদের সিনিয়র ভাই ও নামকরা ক্রীড়াবিদ ছিলেন) হয়তো বলতে পারবেন।গোপালগঞ্জে থানা পাড়ার বাসায় পৌঁছানোর পর দেখলাম সিপিবির সম্পাদক আমার মামা আবু হোসেন সিপিবির ২০-২৫ জনসহ অপেক্ষা করছেন। আর ডিসি এসপিসহ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা আছেন। আমরা বসে আছি কিন্তু তেমন কোনো লোকজন আসে না। অথচ এই থানা পাড়ায় একসময় প্রতি ঘরে ছাত্র ইউনিয়ন ছিল। কলেজ সংসদে ছাত্র ইউনিয়ন জয়লাভ করত। কিন্তু অধিকাংশই একটা সময়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। নারী অধিকার কর্মী হিসেবে নানি গোপালগঞ্জে জনপ্রিয় মুখ ছিলেন। এদের সবাই একবার হলেও নানির হাতের খাবার খেয়েছেন। এরা অনেকেই আমার মামাদের স্কুল কলেজ জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু কেউ আসছে না। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা অতিক্রান্ত হওয়ার পর হঠাৎ দেখি গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু ভাইয়ের (আসলে সম্পর্কে মামা) নেতৃত্বে অনেকটা মিছিল আকারে ৪০০-৫০০ জন উপস্থিত হলেন। সেখানে আমার পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন ছিলেন। তারা আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে বললেন, প্রায় ৪৫ মিনিট যাবত নেত্রীর সঙ্গে তর্ক বিতর্ক হলো। তার কড়া নির্দেশ আবু সাইদ উপস্থিত থাকলে কেউ জানাজায় যেতে পারবা না। অনেক তর্কাতর্কীর পর তিনি বললেন, ‘পরিস্থিতি অনুযায়ী যা ভালো মনে হয় করো, তবে আমার সায় নেই।’ ধারণা করলাম ট্রমাচ্ছন্ন না হলেও ভারসাম্যের সমস্যা হয়েছে। অবশ্য বিএনপি সরকারের সঙ্গেও সাঈদ সাহেবের দিন ভালো যায়নি। কয়েকটি উপনির্বাচনে তার ভূমিকা পছন্দ না হওয়ায় আইনি মারপ্যাঁচে তার বেতন বন্ধ করে দেয়া হয়। যতদিন ছিলেন, বেতনবিহীন ছিলেন। এ দায়িত্ব থেকে বিদায় নিয়ে ড. কামাল হোসেনকে দিয়ে মামলা লড়ে বকেয়া বেতন আদায় করেন।এতক্ষণ বললাম শুধু আমার ব্যক্তিগত পারিবারিক অভিজ্ঞতা। শেখ হাসিনার বিগত শাসনকালে যা ঘটেছে তাতে এ সব ঘটনা তো অতি তুচ্ছ। বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে তিন তিনটি নির্বাচনের চেয়েও ভয়ানক সব ঘটনা হলো গুম-খুন। একটা উদাহরণই যথেষ্ট। নারায়নগঞ্জের ত্বকী হত্যা গোটা দেশের বিবেককে নাড়া দিলেও, ওসমান পরিবার বাদে দল, মত নির্বিশেষে মেয়র আইভীসহ গোটা নারায়ণগঞ্জবাসী এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করলেও খুনিরা শেখ হাসিনার প্রশ্রয়ে ওসমান পরিবারের ছত্রছায়ায় নির্বিঘ্নে ছিল। এ রকম ঘটনা তো একটি দুটি নয়। খুন হওয়া, গুম হওয়া পরিবারগুলোর অসহায়ত্ব মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে, সমাজের মাঝে ধীরে ধীরে বারুদ জমা হচ্ছিল। সামান্য অ্যাকাউন্টস ট্রিটমেন্টের ভ্রান্তিকে ব্যবহার করে বেগম জিয়াকে কারাগারে প্রেরণ এবং কথায় কথায় তাকে ‘এতিমের টাকা চোর’ বলে অপমান করা শেখ হাসিনার একটি রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়— যা মানুষ ভালোভাবে নেয়নি, প্রতিহিংসা হিসেবে বিবেচনা করেছে। খালেদা জিয়াকে ছোট করতে যেয়ে নিজেই ছোট হয়েছেন।এ সব কাজই শেখ হাসিনার ট্রমাটাইজড হওয়ার পরিণতি। নির্বাচনী পরাজয়ে ট্রমাচ্ছন্ন না হলেও ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার পর থেকে তিনি ট্রমাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এক-এগারোর সময়ে তার দলের গোটা সিনিয়র নেতৃত্ব সহ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতারা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তিনি পুরোপুরি ট্রমাটাইজড হয়ে যান। এরপর ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পরে তিনি মনে করেছিলেন ক্ষমতাই তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। ইতিহাসের পাঠ থেকে শিক্ষা না নিয়ে এই ক্ষমতাকে কুক্ষীগত রাখার জন্য তিনি ন্যায়-অন্যায় করে গিয়েছেন তার বিবেচনামতো। তিনি কাউকেই বিশ্বাস করতেন না। স্তুতি বাক্য ছাড়া ভিন্ন কিছুই তিনি সন্দেহের চোখে দেখতেন। আমার এক রাজনৈতিক বন্ধু সাবেক সংসদ সদস্য, যিনি ১৪ দলের শীর্ষ নেতাদের একজন এবং শেখ হাসিনারও ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার বাসাও ছিল গণভবনের কাছাকাছি। জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই গণভবনে যেতেন। সরকার পতনের দিন পাঁচেক আগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সামনে বললেন, একটার পর একটা গ্যারিসন মিটিংয়ে একই আওয়াজ উঠছে যে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ করা প্রয়োজন। শেখ হাসিনা উত্তর দিলেন, এ সব বাজে খবর নিয়ে এখানে আসেন কেনো? তিনি ধারণা করতেন যে, তিনি অপরাজেয়।কোনো ক্ষমতাই অপরাজেয় নয়। রাজনীতি নীতির পাশাপাশি কৌশলের খেলাও বটে। ক্ষমতাকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনে অনেক সময় ক্ষমতা ছেড়েও দিতে হয়। ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ইন্দিরা গান্ধি আমলে জরুরি আইন জারী একটি বিতর্কিত এবং কালো অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে নির্বাচন ঘোষণার মাধ্যমে সেই কালো অধ্যায়ের অবসান ঘটে এবং ইন্দিরা গান্ধী ও কংগ্রেস দল নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। কংগ্রেস জিতেছিল মাত্র ১৫৩টি এবং হেরেছিল ১৯৭টি আসন। ইন্দিরা গান্ধী ও তার ছেলে সঞ্জয় গান্ধী উভয়েই পরাজয় বরণ করেছিলেন। পরাজয়কে মেনে নিয়ে ইন্দিরা গান্ধী জনসংযোগে নেমে পড়েন। ভুল স্বীকার করে সারাদেশে জনসংযোগে তার আওয়াজ ছিল— ‘মাফি মাংতি হু’। জনতার কাছে ক্ষমা চাওয়ার শিক্ষা হচ্ছে ১৯৮০ সালেই লোকসভা নির্বাচনে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি ক্ষমতায় ফিরে আসেন। রাজনীতির মাঠে তিনি পূর্বাপেক্ষা শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। আমরা তো এ সব পত্রপত্রিকায় পড়েছি। আর শেখ হাসিনা ওই সময়ে ভারতবর্ষে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকায় খুব কাছ থেকেই দেখেছেন। কিন্তু কী শিখলেন?আন্দোলনের নেতৃত্বে যে শক্তিই থাকুক কোটা আন্দোলনের ন্যায্য দাবি মেনে না নিয়ে তা দমন করতে যাওয়া কি সঠিক ছিল? তারপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে পুলিশ বাহিনী এবং তার দলের বাড়াবাড়িতে রক্তাক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পরেও তার সামনে সুযোগ ছিল— জনতার আদালতে দাঁড়িয়ে বলা, ‘মাফি মাংতি হু’ এবং নতুন করে জনতাকে পছন্দের সরকার বেছে নিতে সুযোগ করে দেয়া। সে পথে অগ্রসর না হওয়ায়, পরের ইতিহাস তো সবারই জানা। তিনি গেলেন এবং যাওয়ার আগে শুধু তার নিজ দল নয়, তার বিরোধী তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী বিকৃতি থেকে মুক্ত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ধারায় দেশকে অগ্রসর করতে চায় এমন সব শক্তির মুখেও চুনকালি মেখে তিনি গেলেন। আওয়ামী লীগকে ভারতে আশ্রয়পুষ্ট দলের বদনাম নিয়ে অনিশ্চয়তার গিরিখাতে ধুঁকতে হচ্ছে। আর দেশের বুকে এক উগ্র ধর্মান্ধ ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান হয়েছে। কিন্তু আজ অবধি তাদের কোনো অনুশোচনা নাই, নাই কোনো আত্মসমালোচনা।তবে যত বড় অপরাধই আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব করে থাকুক বাংলাদেশের ইতিহাসের গভীরে শিকড় প্রোথিত আছে ৭৫ বছরের পুরনো এই দলটির। রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে আওয়ামী লীগকে সহজে মুছে ফেলা যাবে না। কিন্তু যে ভুল তারা করেছেন তিন তিনটি নির্বাচন একতরফাভাবে করে, বিরোধীদের দমন পীড়ন করে, গণতন্ত্রকে সংকুচিত করে স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করে এবং জুলাই আন্দোলনে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করে— এর জন্য জনতার কাছে তাদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। তা নাহলে রাজনীতির মাঠে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা কঠিন হবে। আবার যে ধরনের প্রতিহিংসা মূলক বিচার চলছে তার বিপরীতে অভিযুক্তদের আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ করে না দিলে, জামিন পাওয়ার অধিকারকে মেনে না নিলে দেশে কিন্তু এক ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হবে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে তাকে ‘মজলুম’ বানানো হয়েছে। মজলুমের প্রতি কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের সহানুভূতি তৈরি হয়। তাই নির্বাচিত সরকারের উচিত হবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর যে স্থগিতাদেশ জারী আছে তা অবিলম্বে তুলে নেয়া এবং প্রতিহিংসামূলক বিচারের পরিবর্তে, শাসকদলের পছন্দমতো নয়, বরং সার্বজনীন ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা।রাজনীতিতে শেষ কথা না থাকলেও অনেকে এটা ধরেই নিয়েছেন শেখ হাসিনা তার জীবদ্দশায় বাংলাদেশে ফিরছেন না। দেশের রাজনীতিতে তার পুনরাগমন এবং ভবিষ্যতে দেশে ফিরতে পারার সুযোগ যথেষ্টই কম। তাহলে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন কি থেমে থাকবে? এই বয়সে প্রবাসে বসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আঁকড়ে রাখলে আওয়ামী লীগের ক্ষতিই করা হবে। কোনো নেতা বা নেত্রী, তা তিনি যত ক্ষমতাধরই হন না কেন, অপরিহার্য নন। আওয়ামী লীগের ভাগ্য নির্ধারণের ভার আওয়ামী লীগ কর্মীদের হাতে ছেড়ে না দিলে নেতৃত্বের এ সমস্যার সুরাহা হবে না।১৯৭৫ সালের ট্র্যাজেডি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব গঠনে একটি কেন্দ্রীক ভূমিকা পালন করেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হলো ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের কাছে পরাস্ত হয়ে, যাকে তিনি প্রতিপক্ষ হিসেবে কল্পনা করতেন তিনিই বাস্তবে ১৮ মাসের জন্য ক্ষমতায় আসীন হলেন। যদিও অ্যামনেস্টি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ‘এই বিচার ও সাজা কোনোটিই সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত হয়নি’, তারপরও ইউনূস আমলের প্রতিশোধমূলক বিচারে ফাঁসির আদেশ মাথায় নিয়ে তার এখন প্রবাস জীবন। রাজনীতি কখনও কখনও এমনই নির্মম! আর যে বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে এমনকি প্রধান বিরোধী দল হওয়া থেকেও দূরে রাখতে একের পর এক সাজানো নির্বাচনী আয়োজন করা হলো সেই বিএনপিই এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। ট্রমাচ্ছন্ন অবস্থা থেকে বের হওয়ার সুযোগ কই? তারপরেও আজ যখন রাস্তার দেয়ালে বিক্ষুব্ধ তরুণদের আঁকা তার বিকৃত ছবি দেখি, মনে প্রশ্ন জাগে- সেই ’৮২ সনের প্রথম দেখায় যে শেখ হাসিনাকে দেখেছিলাম সেই ছবি কেন হারিয়ে গেল!(সংবাদ-এর মতামত নয়, এটি লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা] 

বারুদের গন্ধে ঈদের চাঁদ: অস্থির বিশ্ব রাজনীতি ও মানবিকতার শাশ্বত আহ্বান

রমজান মাসের এক মাসব্যাপী আত্মসংযম ও সিয়াম সাধনার সমাপ্তিতে সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর দুয়ারে সমাগত হয় ঈদুল ফিতর। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং আত্মিক শুদ্ধি, সামাজিক সংহতি এবং মানবিক সহমর্মিতার এক গভীর ও ব্যঞ্জনাময় প্রতীক। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন আমরা ঈদের আনন্দ নিয়ে আলোচনা করি, তখন আমাদের চারপাশের পৃথিবী আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল, অস্থির এবং কণ্টকাকীর্ণ। বিশেষ করে ইরান, আমেরিকা এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ত্রিমুখী উত্তেজনা ও সংঘাতের ছায়া আজ গোটা মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের কিনারে দাঁড় করিয়েছে। এই টালমাটাল বৈশ্বিক বাস্তবতায় ঈদুল ফিতরের অন্তর্নিহিত চেতনা-শান্তি, ন্যায়বিচার এবং সাম্যের ডাকÑনতুন করে এবং আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।ঈদুল ফিতরের ধর্মতাত্ত্বক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তিটি নিহিত রয়েছে পবিত্র রমজানের কৃচ্ছসাধনের মধ্যে। রোজা কেবল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার বর্জন নয়, বরং এটি মানুষের নফস বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার এক কঠিন প্রশিক্ষণ। এই দীর্ঘ এক মাস মানুষ নিজের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অনাহারী মানুষের কষ্টকে অনুভব করতে শেখে। ইসলামের দৃষ্টিতে এই আত্মিক পরিশুদ্ধিই মানুষকে প্রকৃত মানবিক গুণাবলিতে ভ‚ষিত করে। ঈদ হলো সেই অর্জিত নৈতিক বিজয়ের এক সামষ্টিক উদযাপন। ঈদের নামাজ, ফিতরা আদায় এবং পারস্পরিক আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়, তা মূলত বিভেদহীন এক সমাজ গঠনেরই মহড়া।আজকের এই আনন্দ উৎসবকে যখন আমরা বৃহত্তর বৈশ্বিক ক্যানভাসে দেখি, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিষণ্ন ছবি। মধ্যপ্রাচ্য আজ এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমর্থন ও হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গাজা উপত্যকায় দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়, লেবানন সীমান্তে অস্থিরতা এবং লোহিত সাগরে উত্তেজনার কারণে লাখ লাখ মানুষের জীবন আজ বিপন্ন। যে শিশুটির হাতে আজ নতুন রঙিন জামা থাকার কথা ছিল, অনেক ক্ষেত্রে তার হাতে আজ একমুঠো ত্রাণের রুটি জোটে না। গাজা বা রাফাহর মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের ধ্বংসস্তূপের ওপর যখন ঈদের চাঁদ ওঠে, তখন তা আনন্দ নয়, বরং হারানো স্বজনদের জন্য দীর্ঘশ্বাস বয়ে আনে। সেখানে ‘ঈদ মোবারক’ ধ্বনি ছাপিয়ে বোমা হামলার ভয়ঙ্কর শব্দ আর ড্রোন হামলার আতঙ্ক মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই বৈশ্বিক হাহাকার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ঈদের প্রকৃত আনন্দ কেবল নিজের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হলো আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানো এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার সংকল্প গ্রহণ করা।ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা কেন্দ্রিক এই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব অনুভ‚ত হচ্ছে সুদূর উত্তর আমেরিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত। বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি তেল, যার বড় একটি অংশ উৎপাদিত ও পরিবাহিত হয় এই অঞ্চল দিয়ে। পারস্য উপসাগর বা হরমুজ প্রণালী যদি যুদ্ধের কারণে অচল হয়ে পড়ে, তবে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যমূল্য এবং পরিবহন খরচের ওপর। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই অস্থিরতা থেকে মুক্ত নয়। জ্বালানি বাজারের ওঠানামা আমাদের মতো দেশের মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষের ঈদ উদযাপনের বাজেটে টান পড়ে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য ঈদের সেমাই বা নতুন পোশাক আজ বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা ঈদের সাম্যের বার্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবুও এই সংকটের মাঝেও মানুষ যে হাসিমুখে একে অন্যের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেয়, সেখানেই লুকিয়ে আছে ঈদুল ফিতরের আসল মহিমা।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদুল ফিতর কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাড়ির টানে শহর থেকে গ্রামে ফেরার যে জনস্্রে আমরা প্রতি বছর দেখি, তা পৃথিবীর অন্য কোথাও বিরল। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, আধুনিক যান্ত্রিকতা সত্তে¡ও আমাদের পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক শেকড়ের টান কতটা শক্তিশালী। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত নগরীগুলো যখন ফাঁকা হয়ে যায়, আর নিভৃত পল্লী যখন উৎসবে মুখর হয়, তখন তৈরি হয় এক অনন্য মেলবন্ধন। এই যাতায়াত কেবল শরীরের নয়, বরং এটি আত্মার এক পুনর্মিলন।ইসলামী জীবনদর্শনে ‘যাকাতুল ফিতর’ বা ফিতরা আদায়ের বাধ্যবাধকতা ঈদের আনন্দকে সর্বজনীন করার একটি চমৎকার মাধ্যম। এটি কোনো দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি দরিদ্র মানুষের প্রাপ্য অধিকার। যখন সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দুস্থদের হাতে তুলে দেন, তখন সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়। আজকের চরম পুঁজিবাদী বিশ্বে, যেখানে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান আকাশচুম্বী, সেখানে ঈদের এই দানশীলতার সংস্কৃতি একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের অনুপ্রেরণা হতে পারে। বিশেষ করে প্যালেস্টাইন বা ইয়েমেনের মতো ক্ষুধার্ত জনপদের জন্য বৈশ্বিক যাকাত ও ফিতরা তহবিল হতে পারে জীবনরক্ষাকারী এক মাধ্যম।বিশ্বায়নের এই যুগে ঈদের রূপরেখাও পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমানে লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। মরুভ‚মির তপ্ত বালুচর থেকে শুরু করে ইউরোপের তুষারপাত-সবখানেই প্রবাসী ভাই-বোনরা ঈদ পালন করেন। তাদের কাছে ঈদ মানে একরাশ নস্টালজিয়া। প্রযুক্তির কল্যাণে ভিডিও কলে হয়তো পরিবারের সবার মুখ দেখা যায়, কিন্তু মায়ের হাতের সেমাইয়ের স্বাদ বা ছোটবেলার সেই পাড়া-বেড়ানো আনন্দ কি ডিজিটাল পর্দায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব? প্রবাসীদের এই ত্যাগ এবং দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈদের পরিধি ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে আজ বিশ্বময়।বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষতগুলোর একটি হলো শরণার্থী সমস্যা। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আজ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ নিজেও এই মানবিক সংকটের সরাসরি সাক্ষী। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে যখন ঈদের চাঁদ ওঠে, তখন তা আমাদের মানবিকতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। যুদ্ধের কারণে যারা নিজ ভ‚মি হারিয়েছে, তাদের জন্য ঈদ মানে কেবল একবেলা পেটভরে খাওয়ার স্বপ্ন। ঈদের শিক্ষা হলো মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানো। যদি আমরা আমাদের উৎসবের সময় এই নিঃস্ব মানুষগুলোর কথা ভুলে যাই, তবে আমাদের রোজা ও ঈদ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে।বর্তমান সময়ে অতি-ভোক্তাবাদ বা ‘কনজিউমারিজম’ ঈদের আধ্যাত্মিকতাকে কিছুটা হলেও গ্রাস করছে। ঈদের বাজার করা বা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা অনেক সময় উৎসবের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দেয়। দামি পোশাক বা বিলাসিতা নয়, বরং আত্মসংযম এবং বিনয়ই হওয়া উচিত ঈদের ভূষণ। আধুনিকতার এই জোয়ারে আমাদের মনে রাখা দরকার যে, ঈদের মূল সার্থকতা নিহিত রয়েছে অন্তরের পবিত্রতায়, বাইরের চাকচিক্যে নয়। যখন মধ্যপ্রাচ্যে মানুষ জীবন বাঁচানোর লড়াই করছে, তখন আমাদের অতি-বিলাসিতা হওয়া উচিত পরিমিত ও সংবেদনশীল।ঈদুল ফিতরের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ক্ষমা। দীর্ঘ এক বছরের রেষারেষি, মান-অভিমান এবং তিক্ততা ভুলে যাওয়ার দিন হলো ঈদের দিন। রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতার এই যুগে ক্ষমার সংস্কৃতি অত্যন্ত জরুরি। আমরা যদি ব্যক্তি পর্যায়ে একে অপরকে ক্ষমা করতে না শিখি, তবে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। ইরান, ইসরায়েল বা আমেরিকা-রাষ্ট্রনায়করা যদি একে অপরের প্রতি প্রতিহিংসা ত্যাগ করে সমঝোতার পথে হাঁটতেন, তবে আজ হাজার হাজার নিরপরাধ প্রাণ বেঁচে যেত। ঈদ আমাদের অন্তরকে প্রশস্ত করার এবং ঘৃণা ত্যাগের দীক্ষা দেয়।পরিবর্তনশীল ও অস্থির এই বিশ্বে ঈদুল ফিতর আমাদের জন্য একটি আশার প্রদীপ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকার যত গভীরই হোক না কেন, ত্যাগের পর আনন্দের সূর্য উদিত হবেই। রমজানের কঠোর সাধনা যেমন আমাদের ধৈর্য শেখায়, ঈদ তেমনি আমাদের সেই ধৈর্যের মিষ্টি ফল উপহার দেয়। আজকের অশান্ত পৃথিবীতে যেখানে সংঘাত ও ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে, সেখানে ঈদের সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বার্তা হতে পারে নিরাময়ের মহৌষধ। ঈদের সকালে যখন ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে সিজদাবনত হয়, তখন পৃথিবীর সব কৃত্রিম আভিজাত্য চূর্ণ হয়ে যায়। এই সাম্যই ইসলামের সৌন্দর্য এবং এটাই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। আমরা যদি ঈদের এই চেতনাকে কেবল একদিনের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছরের পাথেয় করতে পারি, তবেই পৃথিবীটা হবে বাসযোগ্য ও শান্তিময়।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

ভাওয়ালের বন আগুনে পোড়ে, দেখে না কেউ

প্রতি বছর মার্চ মাস আসলেই ভাওয়ালগড়ের বনভ‚মিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। কে বা কারা এই কাজটি করে তার কোনো হদিস পাওয়া যায় না। ভাওয়ালগড়ের বনভ‚মি পত্র পতনশীল বৃক্ষের বনভূমি। এখানের প্রায় সব গাছই শাল বৃক্ষ যা স্থানীয়ভাবে গজারি নামে পরিচিত। এই জন্য এই বনভ‚মিকে গজারি বৃক্ষের বনভূমিও ডাকা হয়। এই বৃক্ষের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে - শীতের শেষে সব পাতা ঝরে পড়ে।ভাওয়ালগড় মূলত বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক ভূমিরূপ প্লাস্টোসিন চত্বরের ভূমিরূপের অংশ যা গাজীপুর জেলায় অবস্থিত। প্লাস্টোসিন চত্বরের আরও কিছু অংশ রয়েছে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলায়। ভাওয়ালের বনভ‚মি গাজীপুর জেলার গাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়ালগড়, শ্রীপুর উপজেলার পশ্চিমাংশ এবং কালিয়াকৈর উপজেলার অংশ বিশেষ নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান।ভাওয়ালগড়ের বনভ‚মিতে দেখা যায় প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়গা আগুনে পুড়ছে। দেখেই বুঝা যায় আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। বিঘার পর বিঘা বনভূমি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে অথচ দেখার কেউ নেই।ভাওয়ালগড়ের বনভূমিতে যে গজারি বৃক্ষ জন্মে তার সব পাতা ফেব্রæয়ারীর শেষের দিকে কিংবা মার্চ মাসে ঝরে পড়ে। এই সব পাতা মাটিতে পড়ে জমা হয়। পুরো বন জুড়ে শুকনো পাতা ও ডালপালায় ভরে যায়। এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহল কিংবা অতি উৎসাহী অসচেতন মানুষ এই সব পড়ে থাকা শুকনো পাতা ও ডালপালায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এর ফলে বনভূমি আগুনে পুড়তে থাকে দাউদাউ করে। বনের পাশ দিয়ে গেলেই এই দৃশ্য দেখা যায়।বাংলাদেশে বনভূমি প্রতিনিয়ত কমছে। একক বনভূমি হিসাবে ভাওয়াল ও মধুপুরের গড় ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ আধার। দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এ বনভূমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে। অথচ এই বনভূমি আজ দখল, দূষণ ও আগুনে পুড়ে হুমকির সম্মুখীন।আগুন ধরিয়ে দেয়ার যতগুলো কারণ আছে এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে - কিছু মানুষের খামখেয়ালিপনা। বনের ভিতর বাইদ জমিতে গরুছাগল নেয়া হয় ঘাস খাওয়ানোর জন্য। গরুছাগল যারা দেখাশোনা করে তারাই বনে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আরও একটি বিষয় হচ্ছে- ভাওয়ালগড় ও শ্রীপুর অঞ্চল শিল্প অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় এখানে রয়েছে অসংখ্য মানুষের বসবাস। নিম্ন আয়ের মানুষ রান্নার জ্বালানি হিসাবে এ বনের পাতা লতা ও ডালপালা ব্যবহার করে। শুষ্ক মৌসুম আসলেই এরা বনে আগুন দেয় এবং পুড়ে যাওয়া ডালপালা গাছ সংগ্রহ করে নিয়ে যায় রান্নার জন্য।ভাওয়ালের বনে প্রতি বছর আগুন দেয়ার কারণে গাছ মরে যাচ্ছে, উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত্যু ঘটছে, নতুন বৃক্ষের জন্ম ও বেড়ে উঠা ব্যাহত হচ্ছে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। সর্বোপরি দিন দিন ভাওয়ালগড়ের আয়তন কমে আসছে।ভাওয়ালগড়ের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুই পাশের গাছগুলোর দিকে তাকালে এই দৃশ্য চোখে পড়ে। দুই পাশের গাছগুলো দিনদিন উজাড় হচ্ছে এবং বিভিন্ন রকমের দোকানপাট ও স্থাপনা গড়ে উঠছে। রাস্তার পাশের গাছগুলো মরে যাওয়ার পেছনে আগুন ধরিয়ে দেয়া যেমন কাজ করে তেমনি গাছের গোড়ায় গরম পানি ঢেলে দিয়ে মেরে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। আগুনের তাপে ছোট বড় সকল ধরনের গাছই জীবনী-শক্তি হারিয়ে আস্তে আস্তে মারা যায়। বিশেষ করে ছোট ছোট চারা গাছগুলো বড় হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে বন আগুন দেয়া।বনে আগুন দেয়ার কারণে প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। লোকমুখে কথিত আছে, ভাওয়ালগড়ে একসময় বাঘ বসবাস করতো। এছাড়া নানা রকমের পশুপাখি তো ছিলোই। কালের পরিক্রমায় ভাওয়ালগড়ে এখন বন্য প্রাণীর সংখ্যাও অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। প্রতিবছর বনে আগুন দেয়ার কারণে ছোট ছোট পোকামাকড় সাপ বেঁজি গুইসাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। গাছ মরে যাওয়ার কারণে বন্য প্রাণীগুলো খাদ্য সংকটে ভুগছে। প্রায় সময়ই দেখা যায় বনের বানরগুলো খাদ্য সংগ্রহ করতে লোকালয়ে চলে আসে।শুধুমাত্র বনে আগুন দেয়ার কারণে নতুন বৃক্ষের জন্ম ও বেড়ে উঠা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মার্চের এই সময়টাতে বনে আগুন দেয়ার কারণে বনের নিচে পড়ে থাকা লতাপাতা ও ডালপালা পোড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট গাছগুলোও পুড়ে যায়। চারাগাছ বড় হওয়ার জন্য প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবেশ প্রয়োজন। এভাবে আগুন দিয়ে বন পুড়িয়ে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যহত করা হচ্ছে প্রতিবছর।ভাওয়ালগড়ের বনে আগুন সন্ত্রাসের কারণে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সহাবস্থান ধ্বংস হচ্ছে প্রতি নিয়ত। নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। ভাওয়ালগড়ের স্থল, জল ও বায়ুতে বসবাসকারী উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীবের মধ্যে যে জিনগত, প্রজাতিগত এবং বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য বা ভিন্নতা দেখা যায় তাই এখানকার জীববৈচিত্র্য। এটি মূলত জীবকূলের ভিন্নতা ও জীবন ধারণের বৈচিত্র্যময়তাকে বোঝায়, যা প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। ভাওয়ালগড়ের বনভূমির জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন।ভাওয়ালগড়ের বনভূমিতে আগুন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বন বিভাগের দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। প্রয়োজনে জনবল বাড়িয়ে বাড়তি মনিটরিং এর ব্যবস্থা করা। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। এর জন্য বনে আগুন দেয়ার কুফল সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। বন বিভাগের উদ্যোগে বনে আগুন দেয়া প্রতিরোধে প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে। আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য ফায়ার সার্ভিসের তত্বাবধানও প্রয়োজন। প্রয়োজন প্রশাসনিক তদারকি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ।সুন্দরবনের পরেই একক বনভূমি হিসাবে ভাওয়ালের বনভূমির অবস্থান। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবশ্যই অবশ্যই ভাওয়ালের বনে আগুন দেয়া বন্ধ করতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ এবং সবার সচেতনতা বৃদ্ধি।[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

ব্যাংক খাতে কেন নারী কর্মী কমছে

বাংলাদেশ জনবহুল ছোট্ট একটি দেশ। জনসংখ্যার তুলনায় এখানে কর্মসংস্থানের বড়ই অভাব। ফলে বেকারত্বের হার অনেক বেশি। কর্মসংস্থান তৈরি করাই যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানে নারীদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন উপেক্ষিতই থেকে যায়। অতি সম্প্রতি গণমাধ্যমে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নারী ব্যাংকার কমেছে ৭৭০ জন’। বিষয়টি বড়ই উদ্বেগজনক। যেখানে নারীদের কর্মসংস্থান তৈরি করাই বড় কঠিন, সেখানে নারী কর্মীদের কর্মসংস্থান ধরে রাখা আরও বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটু ব্যাখ্যা করা যাক-ব্যাংকিং একটি সম্মানিত পেশা হওয়া সত্ত্বেও কেন নারীর সংখ্যা কমছে।নারীর ক্ষমতায়ন ঘটাতে গেলে নারীর কর্মসংস্থান অবশ্যই জরুরি। কর্মসংস্থান ব্যতীত নারীর ক্ষমতায়ন চিন্তা করাই অসম্ভব। কিন্তু কেন এমন একটি সম্মানিত পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন নারীরা? এর জন্য রয়েছে একাধিক কারণ। তবে প্রথম কারণ হিসেবে বলা যায়, ছোট্ট এই দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংক অনেক বেশি। ব্যাংকের সংখ্যা কেন বেশি, তার একটু ব্যাখ্যা দেয়া যাক। ২০১৯ ও ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র বলছে, বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল ৩২৩ বিলিয়ন ডলার, ভারতের ২ হাজার ৬৬০ বিলিয়ন ডলার, থাইল্যান্ডের ৫০০ বিলিয়ন ডলার এবং মালয়েশিয়ার ৩৩৭ বিলিয়ন ডলার। দেশগুলোর লাইসেন্সপ্রাপ্ত দেশীয় ব্যাংকের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে বাংলাদেশে ৫২টি, ভারতে ৩৪টি, থাইল্যান্ডে ১৮টি এবং মালয়েশিয়ায় ৮টি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এই তথ্য। আবার বিশাল অর্থনীতির দেশ চীনে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা মাত্র ১২টি। অথচ বাংলাদেশে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে এবং রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার জন্য কারণে-অকারণে ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। তাই ব্যাংকারদের গ্রাহক পর্যায়ে ও ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাছে কদর একদমই কম। গ্রাহক পর্যায়ে গিয়ে ব্যাংকার পরিচয় দিলে কিছু গ্রাহক বলেন একটু আগেই অমুক ব্যাংক এসেছিলেন। এখন আবার আপনারা আসলেন, কি বলবেন বলেন! যা এই অবস্থা নারী সহকর্মীরা মানতে পারে না।শুধু ব্যাংকিং খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা কম এমনটা নয়। দেশের অন্যান্য পেশাতেও তুলনামূলকভাবে নারীর সংখ্যা কম। যেমন বিক্রয় প্রতিনিধি এবং ফুটপাতের হকার। অনেকেই হয়তো উপহাস করবেন, কিন্তু বাস্তবতা থেকেই বলছি। ছোট্ট এই দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংক বেশি হওয়ায় ব্যাংকারদের সম্মানীয় পেশাটি এখন অনেকটা বীমা কোম্পানির প্রতিনিধিদের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা সময় ঢাকা শহরে দেখতাম, ফুটপাতে সিম কার্ড বিক্রির মতো একটি ছাতার নিচে একটি চেয়ার-টেবিল আর বক্স নিয়ে বসে গেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা ব্যাংক হিসাব খুলতে। সঙ্গে অফার দিচ্ছেন, হিসাব খুললেই ডেবিট কার্ড ফ্রি, আরও অনেক কিছু। বিষয়টি সত্যিই উপহাসের মতো মনে হয়। যেন ব্যাংকারদের হকার বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এছাড়াও শীর্ষস্থানীয় অনেক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অলিগলিতে দেখা যায়-সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন। সহজ কথায় যাকে বলে বাজারজাতকরণ। আবার প্রত্যেক ব্যাংকারকে একটি নির্দিষ্ট টার্গেট দেয়া হয়। সেই টার্গেট পূরণ করাও বাধ্যতামূলক। যেমন দিনের শুরুতেই জানতে চাওয়া হয়—আজ কতটি অ্যাকাউন্ট খুলবেন এবং কত টাকা ডিপোজিট আনবেন। দিন শেষে তার হিসাব নেয়া হয়। পারলে ভালো, না পারলে ভদ্রভাবে দু’একটি কথা শুনতে হয়। পরিস্থিতিটা অনেকটা স্কুলজীবনের মতো পড়া হলে ভালো, না হলে শিক্ষকের বেতের প্রহার সইতে হতো। এখানে পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, বেতের বদলে ভদ্রভাবে কিছু কথা শুনতে হয়। কিন্তু সেই কথাগুলোও অনেক নারী কর্মীর জন্য মানসিকভাবে কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। ফলে অনেকেই নীরবে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। অর্থাৎ তারা চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। অনেক নারী ব্যাংকারের মতে, এটিও নারী কর্মীর সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। যেসব নারীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছে, তাদের অনেকেই এমনটাই জানিয়েছেন। পরিচিত আরও অনেক নারী সহকর্মীও চাকরি ছেড়ে দেয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।দ্বিতীয় যে কারণটি রয়েছে, তা হলো ব্যাংকারদের কাজের চাপ অনেক বেশি। এই পেশায় নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে পৌঁছাতে হয়, কিন্তু ঠিক কখন বাড়ি ফেরা যাবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না। দিনের সব হিসাব মিলাতে হয় এবং সারাদিনে যে সেবাগুলো দেয়া হয়েছে, সেগুলোর কাজ একটি নির্দিষ্ট ফাইলে সংরক্ষণ করতে হয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে ব্যাংকারদের মধ্যেই উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। এর প্রধান কারণ অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং নীতিনির্ধারকদের অতিমাত্রায় চাপ। দীর্ঘ সময় ধরে একই চেয়ারে বসে সেবা প্রদান করাও এর একটি কারণ। সবকিছু মিলিয়ে এটি এক ব্যতিক্রমধর্মী পেশা যেখানে হয়তো অর্থ আছে, কিন্তু নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তেমন কোনো সময় থাকে না। মাঝেমধ্যে ছুটির দিনগুলোতেও অফিস করতে বাধ্য হতে হয়। এছাড়া এটি এমন একটি পেশা, যেখানে দেশের জরুরি অবস্থার মধ্যেও সেবা বন্ধ রাখা যায় না; অথচ সেই অনুযায়ী স্বীকৃতি খুব একটা পাওয়া যায় না।উপরোক্ত বিষয়গুলো সার্বিকভাবে তুলে ধরা হলেও এখানে নারীপুরুষের একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। পুরুষ সহকর্মীদের সাধারণত সংসারের কাজ সামলাতে হয় না। অর্থাৎ পুরুষ সহকর্মীদের সন্তান লালন-পালনে নারীদের তুলনায় খুব বেশি সময় না দিলেও চলে। কিন্তু একজন নারী একই সঙ্গে একজন ব্যাংকার, একজন মা এবং অনেক ক্ষেত্রে সংসারের প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তি। এসব দায়িত্ব একত্রে সামলানো একজন নারী কর্মীর জন্য, বিশেষ করে একজন নারী ব্যাংকারের জন্য, অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। সন্ধ্যা সাতটা বা আটটায় বাসায় ফিরে আবার সংসারের কাজ সামলানো এবং সন্তানের লালন-পালন করা এটি অনেক সময় এক ধরনের নির্মম জীবনযাপনের মতো হয়ে ওঠে। ফলে বাধ্য হয়েই অনেক নারী কর্মী স্বেচ্ছায় এই পেশা থেকে সরে দাঁড়ান। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই কর্মজীবী হলেও শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকেই কর্মক্ষেত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হয়। তিনি সন্তানের লালন-পালনে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেন, যাতে সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা যায়। কিন্তু একজন কর্মজীবী, বিশেষ করে একজন ব্যাংকার মায়ের পক্ষে এটি অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই বাধ্য হয়েই অনেক নারী ব্যাংকার স্বেচ্ছায় অবসরে যান।ফলে নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। অথচ আমরা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনের টক-শো থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে জোরালোভাবে কথা বলি। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে বিষয়টি খুব কমই বিবেচনা করি। নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন ঘটাতে গেলে উপরোক্ত বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় নিয়ে নারীদের পথ চলা আরও সহজ করতে হবে। তবেই হয়তো সম্ভব হবে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন। তখন রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। এতে নারী যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি দেশ ও জাতিও হবে আরও সমৃদ্ধ।[লেখক: ব্যাংকার]

ঘরে ঘরে পাটওয়ারী তৈরি হলে তবেই আমরা সভ্য হব!

এনসিপির পৃষ্ঠপোষক মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই সনদ ঘোষণার অনুষ্ঠানে বলেছিলেন এবার আমরা সভ্য হলাম। ইউনূসও রাজনীতিবিদদের মতো বক্তৃতা দিয়ে দিলেন। সেদিন এনসিপি ওই অনুষ্ঠান বর্জন করে এবং জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগ পর্যন্ত তারা ‘সনদে’ স্বাক্ষর দেয় নাই। এনসিপি-বিহীন অনুষ্ঠানে এনসিপির স্বাক্ষর ছাড়া সনদ ঘোষণা করা হলো। তাহলে আমরা কীভাবে সভ্য হলাম! না আমরা তখনও সভ্য হইনি। সভ্য হতে হলে আমাদের ঘরে ঘরে পাটওয়ারী লাগবে।এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বরিশালে এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেছেন, এখন থেকে ঘরে ঘরে পাটওয়ারী তৈরি হবে। কেন ঘরে ঘরে পাটওয়ারী তৈরি করতে হবে? কারণ এবারের নির্বাচনী প্রচার অভিযানে তার মতো পারঙ্গমতা আর কেউ প্রদর্শন করতে পারেননি। নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত সবার থেকে এগিয়ে ছিলেন ‘রাজুতে আয়’-এর পারঙ্গম শিল্পী হাসনাত আব্দুল্লাহ। কিন্তু নির্বাচনে হাসনাতের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাওয়ায় তাকে আর বিশেষ পারঙ্গমতা প্রদর্শন করতে হয়নি। অবশ্য সংসদ সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণের সময় সাধারণ পোশাকের বদলে স্পোর্টস জার্সি পরে এসে বুঝিয়ে দিলেন সংসদে তিনি ‘মব খেলোয়াড়’ হিসেবেই এসেছেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন জুলাই আন্দোলনের পরে কথায় কথায় রাত বিরাতে ‘রাজুতে আয়’ ডাক দিয়ে মব সৃষ্টিতে যে পারঙ্গমতা দেখিয়েছিলেন, সংসদেও ‘অপেশাদার’ ও ‘অসম্মানজনক’ আচরণের মধ্য দিয়ে তা তিনি অব্যাহত রাখবেন।তারপরও এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সভ্য-ভব্যতার প্রতীক হিসেবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকেই এগিয়ে রেখেছেন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নির্বাচনী অভিযানে জামায়াত-হেফাজতকে নিয়ে মাঠে নামলেও, গত বছরই ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পথরেখা’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় পাটওয়ারী জামায়াতে ইসলামীর ইসলামকে ‘মওদুদীর ইসলাম’ বলে আখ্যায়িত করেন। আর হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে বলেন, হেফাজত কওমি অঙ্গনে ঘুরে ঘুরে আলেমদের ‘ট্যাবলেট খাইয়ে’ ইসলামের নামে আগামী নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেয়ার পাঁয়তারা করছে। তিনি জামায়াত ইসলামকে দিল্লির এক্সটেনশন হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন ধর্মের নামে চেতনা ব্যবসা করছে জামায়াত ইসলাম। তারা অতীতে ধানের শীষে ভোট করেছে, এখন তাদের পাখনা গজিয়েছে।জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী বা আদর্শিক ঐক্য কোনোটাই তার এ সব বক্তব্যের সঙ্গে যায় না। আবার এ বছরের ১১ ফেব্রæয়ারি তিনি ফেসবুকে পোস্ট দেন, ‘১৩ ফেব্রুয়ারি ঘুম থেকে উঠে যদি দেখি জামায়াত আমির প্রধানমন্ত্রী হইছেন, সেটা আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হবে।’ বাহ্! দিল্লির ‘এক্সটেনশনের প্রতিনিধি’ প্রধানমন্ত্রী হলে তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হবে। আবার গত বছর ২১ মার্চ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেয়া একটি পোস্টে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লিখেছিলেন, ‘গত ৫৩ বছরে জামায়াতে ইসলামীকে বারংবার রাজনীতিতে পুনর্বাসন করার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। ‘সেনা-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল লুটকারী জিয়া’ জনগণের অভিপ্রায়ের তোয়াক্কা না করে গায়ের জোরে এ অবৈধ শক্তিকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়। জেনারেল জিয়ার হাত ধরেই এ অবৈধ কাজ সম্পন্ন হয়।’ সমালোচনার মুখে পড়ে অবশ্য পোস্টটি ডিলেট করেন তিনি।যা হোক নির্বাচনী মাঠে ও নির্বাচনের পরেও হাসনাতের মতো জার্সি না পরলেও তিনিই এনসিপির ক্যাপ্টেন। কিন্তু ক্যাপ্টেন কি সুস্থ আছেন? ওপরে উল্লেখিত তার স্ববিরোধী বয়ানসমূহ দেখে তো মনে হয় না তিনি সুস্থ মস্তিষ্কের। মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে তিনি নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছিলেন। হেরে গেলেও ভালো ভোট পেয়েছেন। কিন্তু লড়াইটা তো হতে হবে রাজনৈতিক। কে কত কুৎসা প্রচার করতে পারেন-সেটাই দেখছি তরুণ দলের নেতা হয়ে ওঠার প্রধান যোগ্যতা। বিএনপির প্রবীণ নেতা মীর্জা আব্বাস নিশ্চয়ই সাধু পুরুষ নন। তার অনেক সমালোচনা থাকতেই পারে। নিজ দলের মাঝেও আছে। তার সমালোচনা করা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু যেভাবে, যে পদ্ধতিতে, যে ভাষায় পাটওয়ারী সারাক্ষণ লেগে আছেন তাতে মনে হয়েছে তিনি পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া-ফ্যাসাদ বা বড় ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইছেন। এমনকি ইফতারি ও মিলাদ মাহফিলের বক্তব্যেও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একদিকে আল্লাহ খোদার নাম নিচ্ছেন, আর একই সঙ্গে ছাপার অযোগ্য অশ্লীল ভাষায় মীর্জা আব্বাসকে গালাগাল করছেন।এ সব বক্তব্য পাটওয়ারীর ব্যক্তিগত বক্তব্য নয়, গোটা এনসিপিরই বক্তব্য। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এনসিপি নামক দলটির আওয়ামী লীগ বিরোধিতা ছাড়া নিজের রাজনৈতিক আদর্শ কি-তা তারা নিজেরাই জানে বলে মনে হয় না। কখনও জামায়াতকে ‘পালিশ’ করছেন, আবার কখনও বিএনপিকে ‘ধোলাই’ করছেন। নির্বাচনের আগে দুই দলের কাছেই ধরনা দিলেন। বিএনপি অপেক্ষা জামায়াত আসন বেশি দেওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে গেলেন। বললেন, এটা শুধু নির্বাচনী ঐক্য, দল দাঁড়া করাইতে সংসদে সিট লাগবে, নির্বাচনের পরে বাউন্স ব্যাক করবেন। কিসের বাউন্স ব্যাক, জামায়াত জোটের হুইপ পদে আসীন হলেন। এটা তো সবাই বুঝে হুইপকে হুইপ করবে জামায়াত। অর্থাৎ এনসিপি অনেকটা প্রকাশ্যেই জামায়াতের বিটিমের ভূমিকায় নেমে গেল। এরই মাঝে জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যের বিরোধীতাকারী এনসিপি নেত্রী সামান্থা শারমিন সুর পাল্টিয়ে খুব গর্ব করে এক হাস্যকর দাবি করেছেন যে, ‘এনসিপিই এখন জামায়াতকে লিড দিচ্ছে’। জামায়াতের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য নানা টিম আছে। ইতোপূর্বে তারা বিপদ-আপদে প্রকাশ্য রাজনীতিতে যাতে থাকা যায় সেজন্য এবি পার্টি নামে ফ্রন্ট খুলেছিল। এনসিপিকে পেয়ে অবশ্য এবি পার্টির কদর কমে গেছে। তাই এনসিপিই এখন ‘লিডে’ আছে।এনসিপির লিডের দাবী অনুযায়ী এ কথা বলা কি ভুল হবে যে, জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই উত্থাপিত শোক প্রস্তাবে ’৭১-এর যুদ্ধ অপরাধীদের নাম সহ যে সব বিতর্কিত নাম জামায়াত প্রস্তাব করেছে তার খসড়া এনসিপিই প্রস্তুত করেছে? এমন লিডে আছে যে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই উত্থাপিত শোক প্রস্তাবে দন্ডপ্রাপ্ত ’৭১-এর যুদ্ধ অপরাধীদের নাম এসেছে।মুহাম্মদ ইউনূস তরুণ দলকে এবং তার নেতৃত্বকে কী পৃষ্ঠপোষকতা করলেন, যে দলটি ও দলের নেতারা এমন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে? এর দায় তো তাকেই নিতে হবে। হতে পারে তারা ট্রমায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাদের চিকিৎসার জন্য ‘রিহ্যাব সেন্টার’-এ না পাঠিয়ে তিনি তাদের বানিয়ে দিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা। তারা আরও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়লেন। ভারসাম্যহীন রোগীরা নিজ ইচ্ছায় চিকিৎসা নিতে চায় না। ক্ষেত্র বিশেষে বল প্রয়োগ করে চিকিৎসা স্থলে নিয়ে যেতে হয়। ইউনূস যে কাজটি করেননি, সে কাজটি কাউকে না কাউকে তো করতে হবে। তাদের ভারসাম্যহীনতাকে ব্যবহার না করে, তাদের বর্তমান মুরুব্বি জামায়াত ইসলামের আমির শফিকুল ইসলাম এ উদ্যোগটি নিতে পারেন। অন্যথায় তো এসব বিষয় আইন আদালত ও আইনানুগ কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। হাজিরার জন্য সমন জারি হয়েছে। আদালতে আবার এ সব অশ্লীল শব্দ নিয়ে উভয় পক্ষের আইনজীবীরা তর্ক-বিতর্ক করবেন এবং আরও দুর্গন্ধ ছড়াবে। আর আমরা প্রকৃতই সভ্য হয়ে উঠব!আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় আমরা পুরনো দিনের মানুষরা এনসিপির জুলাই যোদ্ধাদের ভাষা পড়তে ভুল করছি না তো। তাদের অশ্লীল এবং ঔদ্ধত্য শব্দভান্ডারই আধুনিক যুগের ভাষাকে সমৃদ্ধ করছে হয়তো বা। তাই পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে আমিও আমার এক বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথন তুলে ধরছি যা অশ্লীল না হলেও তার কাছাকাছি বা অপকথা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের বীরত্বগাথা, সরকারি-বেসরকারি বাহিনীর গুলি ও হামলায় অগণিত মৃত্যু, আহতের আর্তনাদ, স্বজনহারা পরিবারের মানুষগুলোর আহাজারি গোটা জাতির বিবেককে স্পর্শ করেছিল। এ পটভূমিতে আনু মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন নাগরিক সমাজ ও শিক্ষক নেটওয়ার্কের ডাকে ২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে দ্রোহযাত্রার ডাক দেয়া হয়। মিডিয়াতে প্রচারিত সংবাদে দ্রোহযাত্রার মিছিলে আমাকে দেখা যাওয়ায় আমার স্কুল জীবনের এক বন্ধু ফোনে আমাকে বলে, খুব তো মিছিল করছিস! পরিণতি ‘আজ বুঝবি না, বুঝবি কাল; পিছে থাবড়াবি, মারবি ফাল’। বিষয় হচ্ছে, গ্রাম দেশে ছেলেকে অতিরিক্ত শুকনো মরিচ ডলে পান্তা খেতে দেখে পিতা তাকে এ কথা বলে এটাই বুঝাতে চাইছেন যে, অতিরিক্ত শুকনা মরিচ দিয়ে পান্তা খাইতে খুব মজা লাগলেও আগামীকাল ভোরে মলত্যাগের সময় মলদ্বারের যন্ত্রণায় লাফ দিয়ে দিয়ে পেছন চাপড়াতে হবে। দ্রোহযাত্রায় যোগ দেয়ার এতদিন পরে কেন জানি বন্ধুর বলা অপকথাটি মনে পড়ছে। আমরা কি এখন ফাল মেরে পেছন চাপড়াতে চাপড়াতে সভ্য হয়ে উঠছি!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

ঈদ উৎসবের অর্থনীতি

উৎসব আমাদের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী উৎসব হলো এমন আনন্দঘন অনুষ্ঠান, যা সাধারণত ধুমধাম বা জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপিত হয়। এসব আয়োজনে সমাজের বড় একটি অংশ সম্পৃক্ত থাকে। উৎসবকে আড়ম্বরপূর্ণভাবে উদযাপন করতে মানুষ নানা ধরনের পণ্য ও সেবা ক্রয় করে এবং নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করে। উৎসব উপলক্ষে উপহার দেয়া-নেয়াও আমাদের সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতির অংশ।বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এ ধরনের উৎসবকে ঘিরে আবর্তিত হয়, যা সাধারণভাবে উৎসবের অর্থনীতি নামে পরিচিত। উৎসবকে কেন্দ্র করে শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য, আমদানিকৃত পণ্য এবং বিভিন্ন সেবা খাতে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। চাহিদা বাড়লে পণ্যের জোগানও বাড়ে, যা স্থানীয় উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। পণ্য আমদানি, উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে সরকারও বাড়তি রাজস্ব পায়। এই সমগ্র অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্যই উৎসবের অর্থনীতির অংশ।বাংলাদেশে প্রধানত দুটি ঈদ উদযাপিত হয়Ñ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এর মধ্যে ঈদুল ফিতরকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাÐ সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ঈদকে ঘিরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, সেবা খাতের চাহিদা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের প্রসার এবং বাজারে অর্থের প্রবাহÑসব মিলিয়ে অর্থনীতিতে এক ধরনের গতি সৃষ্টি হয়।ঈদকে কেন্দ্র করে কত পরিমাণ অতিরিক্ত পণ্য ও সেবা বিক্রি হয়, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। তবে এর ব্যাপ্তি যে বিশাল, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ব্যবসায়ীদের ধারণা, দেশের পোশাকশিল্পের বার্ষিক বিক্রির প্রায় ৬০ শতাংশই হয় দুই ঈদকে ঘিরে। ঈদের সময় মিষ্টিজাতীয় পণ্যের বিক্রিও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। গত এক দশকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঈদ উপলক্ষে উপহার বিতরণের প্রবণতাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।কৃষি, শিল্প, আমদানি, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, সেবা খাত, কর্মসংস্থান এবং সরকারের রাজস্ব আহরণÑসব ক্ষেত্রেই ঈদের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। উৎসবের সময় পোশাক, জুতা, গয়না, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই চাহিদা পূরণে উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যস্ত সময় পার করে।পোশাকশিল্পের কথাই ধরা যাক। দেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পোশাকের একটি বড় অংশ আসে রাজধানীর পুরান ঢাকা, কেরানীগঞ্জ ও কালীগঞ্জ এলাকার কারখানাগুলো থেকে। ঈদুল ফিতরের তিন-চার মাস আগে থেকেই এসব কারখানায় প্রায় ২৪ ঘণ্টা উৎপাদন চলে। পুরান ঢাকার বংশাল, সিদ্দিকবাজারসহ আশপাশের এলাকায় ছোট ছোট কারখানায় জুতা ও ব্যাগ তৈরিরও ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলে। একইভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা কুটিরশিল্প ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পকারখানাগুলোতেও উৎপাদন বাড়ে। তেল, চিনি, আটা, ময়দা, সেমাই, নুডলসসহ নানা ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যস্ততাও এ সময় বাড়ে।উৎসবের সময় শহরের বড় শপিংমল থেকে শুরু করে গ্রামের ছোট দোকান পর্যন্ত ক্রেতার ভিড়ে জমজমাট হয়ে ওঠে। এমনকি মুদিদোকানের বিক্রিও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের বিস্তার ঘটেছে। সময়ের অভাব, যানজট এড়ানো এবং যাতায়াত ব্যয় সাশ্রয়ের কারণে ক্রেতাদের মধ্যে এসব প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। উৎসবের সময় এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে পণ্য ও সেবার বিক্রি অনেক বেড়ে যায়, যা খাতটির বিকাশে সহায়ক ভ‚মিকা রাখছে।ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের চলাচলও বেড়ে যায়। অনেকেই পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে শহর থেকে গ্রামে বা গ্রাম থেকে শহরে যান। আবার অনেকে ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে ভ্রমণে বের হন। এতে পরিবহন ও পর্যটন খাতে সেবার চাহিদা বাড়ে।ঈদ কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখে এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থানের প্রায় ৬০ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতের ওপর নির্ভরশীল। এসব শিল্প অনেকাংশেই উৎসবকেন্দ্রিক চাহিদার ওপর ভর করে টিকে থাকে।এছাড়া ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের মাধ্যমে অসংখ্য তরুণ-তরুণী স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। উৎসবের সময় এসব প্ল্যাটফর্মে বিক্রি বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগও বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে কৃষক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকÑযেমন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, নৌকার মাঝি, মুটে বা ডেলিভারি কর্মীদের আয়ও বাড়ে।ঈদ গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন প্রাণসঞ্চার করে। উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ উৎপাদকদের পণ্য বিক্রি বাড়ে। আবার ঈদ সামনে রেখে শহর ও প্রবাসে থাকা মানুষজন স্বজনদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ পাঠান, যাতে তারা উৎসবের ব্যয় নির্বাহ করতে পারেন। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।ঈদের ছুটিতে লাখ লাখ মানুষ নাড়ির টানে গ্রামে ফিরে যান। তারা স্থানীয় বাজার থেকে নানা পণ্য কেনেন এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন। এতে বিনোদনশিল্পসহ আরও অনেক খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমনকি টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের মতো গণমাধ্যম শিল্পেও এর প্রভাব পড়ে। ঈদ উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল বিজ্ঞাপন দেয়, যা গণমাধ্যমের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।ঈদের বাজারে দেশীয় অনেক বস্ত্র ও পোশাক ভারতীয় বা পাকিস্তানি নাম ব্যবহার করে বিক্রি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার বিদেশি কিছু পণ্যও ঈদকে লক্ষ্য করে আগেভাগেই দেশের বাজারে প্রবেশ করেছে। বাস্তবে দেশীয় বস্ত্র ও পোশাকের অনেক আইটেমের মান ভারত বা পাকিস্তানের পণ্যের চেয়েও উন্নত। এ কারণেই দেশীয় পণ্যকে বিদেশি বলে চালিয়ে দেয়া অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয়েছে।তবে নানা কারণে এবারের ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাÑএসব বিষয় ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এতে কৃষক, শ্রমিক ও ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।তারপরও আশা করা যায়, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঈদুল ফিতর শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হবে এবং এর ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব সমাজের বিভিন্ন স্তরে পৌঁছাবে।[লেখক: সাবেক ডিন (ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ) ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]

ভিডিও

রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তায় সিরিজ জিতল বাংলাদেশ

শেষ ওভারে ১৪ রানের সমীকরণ, হাতে মাত্র এক উইকেট। প্রতিপক্ষের ব্যাটে শাহিন আফ্রিদি- যে কোনো মুহূর্তে ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা। কিন্তু রিশাদ হোসেনের করা সেই ওভারেই যেন নাটকের মোড় ঘুরে গেল।  টেনশনের চরম মুহূর্ত পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ১১ রানের অবিশ্বাস্য জয়ে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নিল বাংলাদেশ। রোববার (১৫ মার্চ) শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে স্নায়ুক্ষয়ী এক লড়াই প্রত্যক্ষ করল দর্শকরা। টস হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে তানজিদ হাসানের ঝোড়ো সেঞ্চুরিতে (১০৭ বলে ১০৭) বাংলাদেশ তোলে ৫ উইকেটে ২৯০ রান। জবাবে পাকিস্তানও জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছিল সালমান আগাকে (৫২ বলে ৭৫) ঘিরে। কিন্তু শেষ দিকে তাসকিনের করা ৪৮তম ওভারে সালমানের বিদায়েই যেন খেই হারায় পাকিস্তান।তার আগে অবশ্য মোস্তাফিজকে নিয়ে একবার শঙ্কায় পড়তে হয়েছিল বাংলাদেশ শিবিরকে। ৪৯তম ওভারে শাহিন আফ্রিদির মারাত্মক শট লেগে হাঁটুতে গুরুতর আঘাত পান মোস্তাফিজ। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পরও তিনি ওভার শেষ করেন। শেষ বলে হারিস রউফকে ক্যাচ বানিয়ে বাংলাদেশকে এনে দেন বিপুল স্বস্তি।শেষ ওভারে বাংলাদেশকে নিয়ে আসেন রিশাদ। আগের ওভার শেষে পাকিস্তানের দরকার ছিল ১৪ রান। রিশাদের প্রথম বলেই আম্পায়ার ওয়াইড দিলে শঙ্কা আরও বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের তৎক্ষণাৎ রিভিউ নেওয়ায় সেই সিদ্ধান্ত বদলে যায়। বলটি ব্যাট ছোঁয়ায় ডিআরএসের পক্ষে প্রমাণিত হয়। এরপর আর রান নিতে পারেননি আফ্রিদিরা; বরং শেষ বলে স্টাম্পড হয়ে যান আফ্রিদি নিজেই।এর আগে বাংলাদেশের ইনিংসটা ছিল তানজিদের ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস। ৩০তম ওয়ানডেতে এসে প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নেন এই ওপেনার। ৭ ছক্কা ও ৬ চারে সাজানো তার ইনিংসটি বাংলাদেশের সংগ্রহকে ভিত শক্ত করে দেয়। সাইফ হাসানের (৩৭) সঙ্গে তার উদ্বোধনী জুটিতে আসে ১০৫ রান। পরে লিটন দাসের ৪১ ও তাওহিদ হৃদয়ের অপরাজিত ৪৮ রানে ভর করে বাংলাদেশ নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে পৌঁছে ২৯০ রানে।২০১৫ সালের পর দুই দলের প্রথম ওয়ানডে সিরিজে এমন রুদ্ধশ্বাস লড়াই উপহার দিয়ে জয় ছিনিয়ে নেওয়াটা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শুরুতে পাওয়ারপ্লেতে বিনা উইকেটে ৫০ রান তোলার পর শেষ ১০ ওভারে মাত্র ৭৭ রান- ব্যাটিংয়ে কিছু ধীরগতি থাকলেও শেষ হাসি বাংলাদেশের বোলাররাই হাসেন।

রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তায় সিরিজ জিতল বাংলাদেশ
১৭ মার্চ ২০২৬, ০৩:১৬ পিএম
এবার বাংলাদেশে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর কবে হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

এবার বাংলাদেশে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর কবে হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

  ২০ মার্চ ২০২৬
  ২১ মার্চ ২০২৬
  নিশ্চিত নই
মোট ভোটদাতাঃ জন