সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
তারেক রহমানের ভোটের খরচ ২৩ লাখ টাকা

তারেক রহমানের ভোটের খরচ ২৩ লাখ টাকা

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচিত বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার নির্বাচনী ব্যয় দেখিয়েছেন ২৩ লাখ টাকা।গত ১২ ফেব্রুয়ারি এই নির্বাচনের ভোট হয়। পরদিন ২৯৭ আসনে নির্বাচিতদের গেজেট প্রকাশ করা হয়। নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করে বিএনপি, তারেক রহমান হন প্রধানমন্ত্রী।নির্বাচনী ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচনী ব্যয়ের রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যানের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব ১১ মার্চ রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দেন তার নির্বাচনি এজেন্ট।সোমবার (৩০ মার্চ) ইসির যু্গ্ম-সচিব (নির্বাচন ব্যবস্থাপনা-২) মো. মঈন উদ্দীন খান বলেন, “প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব ডাকযোগে আসছে। মাঠ কর্মকর্তারাও ইসি সচিবালয়ে নির্ধারিত ছকে তথ্য দেবেন; একীভূত তথ্য পেতে একটু সময় লাগবে। ব্যয় রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হলে আরপিও অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”প্রচার, পরিবহন, জনসভা, নির্বাচনি ক্যাম্প, এজেন্ট ও স্টাফ খরচ, আবাসন ও প্রশাসনিক খরচ এবং সোশাল মিডিয়ায় প্রচারে এ ব্যয় হয়েছে বলে তারেক রহমানের ব্যয় বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে ভোটার প্রতি ১০ টাকা হারে ঢাকা-১৭ আসনে ৩৩ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের সুযোগ ছিল। প্রচার বাবদ ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, পরিবহন বাবদ ১ লাখ ১০ হাজার টাকা, জনসভা বাবদ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং নির্বাচনী ক্যাম্প বাবদ ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন তারেক রহমান।এজেন্ট ও অন্যান্য স্টাফ খরচ বাবদ ৯ লাখ ৮৪ হাজার টাকা, আবাসন ও প্রশাসনিক খরচ ৬৬ হাজার টাকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার বাবদ খরচ ৫০ হাজার টাকা। ঢাকা-১৭ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন; এবার ভোটার প্রতি ১০ টাকা করে ব্যয়ের সুযোগ ছিল।ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলে ২০২৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনি আইন অনুযায়ী সব প্রার্থীকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যয় বিবরণী রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হয় এবং এর অনুলিপি রেজিস্টার্ড ডাকযোগে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে পাঠাতে হয়। ব্যর্থ হলে অথবা এই আদেশ লঙ্ঘন করলে জরিমানাসহ দুই বছর থেকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।৯০ দিনের মধ্যে দলের ব্যয়ের হিসাবগণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, ফল গেজেট আকারে প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যেক প্রার্থীকে নির্বাচনি ব্যয়ের বিবরণী দাখিল করতে হয়। এছাড়া অংশগ্রহণকারী দলগুলোকেও ফল প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে ব্যয়ের বিবরণী দাখিল করতে হয়।দলগুলোকে নির্ধারিত সময়ে ইসি সচিবালয়ে ব্যয় রিটার্ন জমা দিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান ইসির উপসচিব (নির্বাচন পরিচালনা-২) মোহাম্মদ মনির হোসেন।ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৫০টি দলের ১৭৫৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরমধ্যে বিএনপির সর্বোচ্চ ২৯১ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২২৪ জন, জাতীয় পার্টির ২০০ জন, গণঅধিকার পরিষদের ৯৪ জন আর এনসিপির ৩২ জন ভোটে ছিলেন।কোনো দলের প্রার্থী ২০০ জনের বেশি হলে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং প্রার্থীর সংখ্য ১০০ থেকে ২০০ জনের কম হলে ৩ কোটি টাকা ব্যয় করার সুযোগ ছিল। কোনো দলের প্রার্থীর সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ হলে দেড় কোটি টাকা এবং ৫০ জনের কম হলে সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় করার বিধান রয়েছে।
২ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

ব্যতিক্রম অবস্থার সড়ক: মৃত্যু, প্রান্তিকতা এবং শাসন-ব্যর্থতার স্থাপত্য

বাংলাদেশে প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়— এটি একটি গভীর কাঠামোগত অভিযোগের শক্তিশালী তথ্যবিন্দু। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এই রক্তপাত এখন আর কেবল চালকের অসতর্কতা বা যান্ত্রিক ত্রুটির সরল অঙ্কে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। প্রশ্নটি এখন আর এটি নয় যে মানুষ কেন রাস্তায় মরে; বরং সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতির নিরিখে প্রশ্ন হলো— কারা এই মৃত্যুর ধারাবাহিকতা থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পায়। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতর পরবর্তী দিনগুলোতে আমরা যখন লাশের মিছিল দেখি, তখন তা আমাদের পরিবহন শাসনের কদর্য রূপটিকেই উন্মোচিত করে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭,৫৮৪ জন এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫,৫৫০ কোটি টাকায়। অথচ ২০২৬ সালের কেবল ঈদের ১০ দিনেই মৃত্যুর সংখ্যা ২৭৪ জন ছাড়িয়ে গেছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। এই মৃত্যুগুলো অব্যাহত থাকা অদক্ষতা বা দুর্ভাগ্যের ভাষায় ব্যাখ্যার দাবি রাখে না; এর জন্য প্রয়োজন সমাজবিজ্ঞানের নিবিড় ভাষা।এই সংকটের মূলে রয়েছে ইউহান গালটুংয়ের ‘কাঠামোগত সহিংসতা’ তত্ত্ব। গালটুং প্রত্যক্ষ সহিংসতা এবং কাঠামোগত সহিংসতার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্যরেখা টেনেছিলেন। তার মতে, যখন কোনো ব্যক্তি সরাসরি কাউকে আঘাত না করেও একটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যবস্থার বিন্যাসের মাধ্যমে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তখনই তা কাঠামোগত সহিংসতা। বাংলাদেশে যখন বিআরটিএ চলাচলের অযোগ্য যানবাহনকে ফিটনেস সনদ দেয়, কিংবা যখন হাইওয়ে পুলিশের জনবল সংকটের কারণে দুই লাখ কিলোমিটার রাস্তায় আইন প্রয়োগ অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন কোনো একক আমলা বা পুলিশ কর্মকর্তা খুনি হিসেবে চিহ্নিত হন না। অথচ এই ব্যবস্থার প্রতিটি রন্ধ্রে থাকা গাফিলতিগুলো সম্মিলিতভাবে হাজার হাজার মানুষকে হত্যার দিকে ঠেলে দেয়। ২০২৬ সালের ২৫ মার্চ দৌলতদিয়ায় একটি বাস পদ্মা নদীতে ডুবে ২৬ জন মানুষের মৃত্যু কোনো নিয়তির লিখন ছিল না। এটি ছিল দশকের পর দশক ধরে ফেরি পারাপার আধুনিক না করার এবং চালকদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ না করার কাঠামোগত সিদ্ধান্তের সঞ্চিত পরিণতি। গালটুং সরাসরি সহিংসতা— মুষ্টি বা বুলেট এবং কাঠামোগত সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন, যেখানে ক্ষতটি মানুষের জীবন কেমন হতে পারত এবং কাঠামো তাদের কেমন হতে দেয়— এই ব্যবধান থেকে জন্ম নেয়। বাংলাদেশের রাস্তায় সেই ব্যবধান মারাত্মক এবং পরিমাপযোগ্য।বাংলাদেশের যাতায়াত ব্যবস্থায় অসাম্য বোঝার জন্য গাই স্ট্যান্ডিংয়ের ‘প্রিকারিয়েট’ বা প্রান্তিক শ্রমজীবী শ্রেণি তত্ত্বটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। স্ট্যান্ডিং এই শ্রেণিকে কেবল দারিদ্র্য দিয়ে নয়, বরং কাজ, পরিচয় এবং সময়ে নিরাপত্তার কাঠামোগত অনুপস্থিতি দিয়ে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের তথ্যানুসারে, রাস্তায় নিহতদের প্রায় ৭৮ শতাংশই ছিলেন ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ, যারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তাদের মৃত্যু এলোমেলো ছিল না; এটি মূলত তাদের ওপরই কেন্দ্রীভূত ছিল যাদের কাছে নিরাপদ যাতায়াতের কোনো বিকল্প নেই। ঘিঞ্জি বাস, অলাইসেন্সপ্রাপ্ত মোটরসাইকেল কিংবা পণ্য ও যাত্রী একসঙ্গে বহন করা ট্রাকই তাদের ভাগ্যের লিখন হয়ে দাঁড়ায়।মোটরসাইকেল, যা এখন মোট সড়ক মৃত্যুর ৩৬ শতাংশের জন্য দায়ী, তা হয়ে উঠেছে আমাদের প্রিকারিয়েট শ্রেণীর প্রধান বাহন। এটি সাশ্রয়ী এবং ঢাকা মহানগর ও তার উপশহরগুলোর বিশৃঙ্খল রাস্তায় দ্রুত চলাচলের একমাত্র উপায়। এটি ডেলিভারি রাইডার, ছোট ব্যবসায়ী কিংবা গ্রাম থেকে আসা সেই তরুণের বাহন যার কর্মস্থলে সিএনজি ভাড়া দেয়ার সামর্থ্য নেই। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন যখন পর্যবেক্ষণ করে যে অধিকাংশ মোটরসাইকেল শিকার ১৪ থেকে ৪৫ বছর বয়সী তরুণ পুরুষ— তখন এটি পরিসংখ্যানের ভাষায় বাংলাদেশের প্রান্তিক শ্রমশক্তির স্থানিক পদচিহ্ন বর্ণনা করছে। রাস্তা এখানে এলোমেলোভাবে কাউকে মারে না; এটি শ্রেণির সীমারেখা ধরে আঘাত করে। যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে বা সুরক্ষিত সরকারি কনভয়ে চলেন, তারা এই মরণফাঁদগুলো অনায়াসেই এড়িয়ে যেতে পারেন।এই শাসনব্যবস্থার স্থায়ী অচলবস্থাকে ব্যাখ্যা করা যায় জর্জিও আগামবেনের ‘ব্যতিক্রমের রাষ্ট্র’ বা ‘ব্যতিক্রমী অবস্থা’ ধারণা দিয়ে। আগামবেন দেখিয়েছেন কীভাবে জরুরি অবস্থা বা ব্যতিক্রমী অবস্থাই একসময় স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলাকে স্থগিত করে স্থায়ী রূপ নেয়। এটি মূলত কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি বর্ণনায় তৈরি হয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশের সড়ক শাসনে এটি গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়— পদ্মার বাস ডুবি বা কুমিল্লার লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কা, কিন্তু সেই প্রতিবেদনগুলো প্রায় কখনই প্রকাশিত হয় না, বাস্তবায়িত হয় না কিংবা কোনো কার্যকর জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয় না। এখানে জরুরি অবস্থাই হলো স্থায়ী অবস্থা এবং ব্যতিক্রমই হলো নিয়ম।এটি কেবল আমলাতান্ত্রিক সক্ষমতার ব্যর্থতা নয়। বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা আইনের অভাব নেই; সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ একটি সারগর্ভ সংস্কার ছিল। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল বিদ্যমান রয়েছে এবং বিআরটিএ, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের আলাদা ম্যান্ডেট আছে— যা নেই তা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ব্যতিক্রমের এই রাষ্ট্র বিশৃঙ্খলা থেকে জন্ম নেয় না, বরং এটি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যখন আইন প্রয়োগের চেয়ে আইনের তোয়াক্কা না করা বেশি লাভজনক হয়, তখন রাস্তাই হয়ে ওঠে অরাজকতার চারণভূমি।পরিবহন খাতের এই ক্ষমতা কাঠামোটি মূলত পিয়ের বুর্দিয়ের ‘ক্ষেত্র তত্ত্ব’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বুর্দিয়ের মতে, সামাজিক জীবন ক্ষমতার পরস্পরাচ্ছন্ন ক্ষেত্রগুলোর চারপাশে সংগঠিত হয়, যেখানে অভিনেতারা বিভিন্ন ধরনের পুঁজি ব্যবহার করে প্রতিযোগিতা করে। বাংলাদেশের পরিবহন খাত কেবল একটি যাতায়াত ব্যবস্থা বা বাজার নয়; এটি রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। পরিবহন শ্রমিক ও মালিক ফেডারেশনগুলো ঐতিহাসিকভাবে সর্বাধিক সংগঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত। একাধিক সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রেখে তারা একটি ‘ছায়া-রাষ্ট্র’ গড়ে তুলেছে।এই ক্ষেত্রে সড়ক নিরাপত্তা সংগঠনগুলো প্রতীকী পুঁজিতে সমৃদ্ধ হলেও রাজনৈতিক পুঁজিতে অত্যন্ত অক্ষম। তারা তথ্য উৎপাদন করে, সংবাদ সম্মেলন করে এবং মোটরসাইকেল পর্যবেক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তির সুপারিশ করে। তাদের সুপারিশগুলো প্রযুক্তিগতভাবে সুচিন্তিত কিন্তু রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়। বছরে সাত হাজার মৃত্যু হলো সেই বীভৎস মূল্য যা এই ক্ষেত্রটি তাদের কাছ থেকে আদায় করে যারা এই রাজনৈতিক খেলায় অংশ নেয় না। সিন্ডিকেটের প্রভাবে ফিটনেসবিহীন গাড়ি যেমন রাস্তায় টিকে থাকে, তেমনই অদক্ষ চালকের হাতে লাইসেন্স পৌঁছে যায় অবলীলায়।কেন সমাজ এই বৃহৎ মাত্রার ট্র্যাজেডি দেখেও নীরব থাকে বা দ্রুত ভুলে যায়, তা ব্যাখ্যা করে স্ট্যানলি কোহেনের ‘অস্বীকারের রাষ্ট্র’ বিশ্লেষণ। কোহেন দেখিয়েছেন কীভাবে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজগুলো বৃহৎ মাত্রার ক্ষতি সম্পর্কে তাদের কাছে থাকা তথ্যে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশ তার সড়ক দুর্ঘটনার সংকট সম্পর্কে অজ্ঞ নয়। প্রতিদিন পরিসংখ্যান প্রকাশিত হচ্ছে, সংবাদপত্র লাশের ছবি দিচ্ছে, নাগরিক সমাজ কারণগুলো স্পষ্টভাবে বলছে। তবুও নির্বাচনের পর নির্বাচনে বা বাজেটের পর বাজেটে এই সমস্যাটি পুনরাবৃত্তি হয়।বিশেষ করে ঈদের সময় সড়ক মৃত্যুর ঢেউ এই অস্বীকারের সর্বাধিক দৃশ্যমান প্রকাশ। প্রতি বছর ঈদের আগে নিরাপত্তা সংগঠনগুলো সতর্কতা জারি করে, কিন্তু প্রতি বছরই উৎসবমুখর ঘরে ফেরার স্রোত অব্যবস্থাপিত ও অতিরিক্ত বোঝাই সড়কে গণমৃত্যু ঘটায়। ২০২৬ সালের ঈদের মৃত্যুর সংখ্যা ১০ দিনে ২৭৪ জন নিহত হওয়া গত বছরের তুলনায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন আসেনি। তথ্য এখানে কাঠামোকে পরিবর্তন করতে পারে না কারণ কাঠামোই এমনভাবে তৈরি যা তথ্যকে কেবল একটি সংখ্যায় পরিণত করে এবং মানুষের স্মৃতি থেকে দ্রুত মুছে দেয়।এই সংকটের গভীরে যেতে কিম্বার্লে ক্রেনশর ‘ইন্টারসেকশনালিটি’ বা ‘পরস্পরচ্ছেদী দুর্বলতা’ তত্ত্বটি আবশ্যক। এটি দাবি করে যে আমরা যেন সমষ্টিগত পরিসংখ্যান ভেঙে দেখি। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের তথ্যানুসারে, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ১৫ শতাংশ ছিল শিশু এবং ১২ শতাংশ ছিল নারী। শিশুরা মারা যায় লেভেল ক্রসিংয়ে, স্কুলের বাসে কিংবা মহাসড়ক পার হওয়ার সময়— যেখানে কোনো নিরাপদ অবকাঠামো নেই। নারীরা মারা যান তাদের গতিশীলতার সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে— যাত্রী হিসেবে যানবাহনের অবস্থা বা চালকের আচরণের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।জুডিথ বাটলারের ‘প্রিকারিয়াস লাইফ’ বা ‘ভঙ্গুর জীবন’ ধারণাটি এখানে আলোকপাত করে কেন এই মৃত্যুগুলো টেকসই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। বাটলারের মতে, কিছু জীবন অন্যদের তুলনায় বেশি ‘শোকযোগ্য’ এবং দৃশ্যমান। ফরিদপুরের মহাসড়কে নিহত একজন অজ্ঞাত পথচারী সংসদকে নাড়া দেয় না। অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে পিষ্ট শিশুকে কেবল একটি গ্রাম শোক করে, কিন্তু একটি মন্ত্রণালয় তা দ্রুত ভুলে যায়। সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের প্রধান শ্রম হলো এই মৃত্যুগুলোকে কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং শোকযোগ্য ও গণনাযোগ্য জীবনে পরিণত করা।কলিন ক্রাউচের ‘পোস্ট-ডেমোক্রেসি’ বা ‘উত্তর-গণতন্ত্র’ তত্ত্ব বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা রাজনীতির সংস্কার চক্রকে চিহ্নিত করে। এই তত্ত্বে গণতান্ত্রিক শাসনের রূপগুলো— যেমন আইন প্রণয়ন বা কাউন্সিল গঠন অব্যাহত থাকে যখন প্রকৃত জবাবদিহিতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ ছিল ঠিক এমন একটি মুহূর্ত: ব্যাপক ও প্রগতিশীল একটি আইন যা মূলত অপ্রয়োগকৃত রয়ে গেছে। আন্তোনিও গ্রামশির ‘আধিপত্য’ বা ‘হেজেমনি’ ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শাসক শ্রেণী কেবল বলপ্রয়োগ নয়, বরং সম্মতির আড়ালে নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখে। সড়ক নিরাপত্তা সপ্তাহ পালন বা মন্ত্রীদের প্রতিশ্রুতি আসলে আধিপত্য রক্ষারই একটি অংশ, যা মূল সমস্যা সমাধানের চেয়ে মানুষকে আশ্বস্ত রাখতেই বেশি ব্যবহৃত হয়।বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তার সংকট যা দাবি করে তা আরেকটি তদন্ত কমিটি নয়, আরেকটি ট্রাফিক সচেতনতা সপ্তাহ নয়, কিংবা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে আরেকটি মন্ত্রিসভার বিবৃতি নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক-পরিবহন সংযোগের সেই অশুভ আঁতাত ভাঙা যা আইন প্রয়োগকে অসম্ভব করে তোলে। প্রয়োজন একটি স্বাধীন সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ, যানবাহন ফিটনেস জালিয়াতির অপরাধীকরণ এবং অবকাঠামো নির্মাণের দর্শনে মৌলিক পরিবর্তন। এগুলো কারিগরি সুপারিশ নয়, এগুলো রাজনৈতিক দাবি।বাংলাদেশে আসলে সড়ক নিরাপত্তার কোনো যান্ত্রিক সমস্যা নেই; এখানে একটি গভীর শাসন-সমস্যা আছে— যা সড়ক মৃত্যুর মাধ্যমে বীভৎসভাবে প্রকাশিত হয়। শেষ পর্যন্ত, রাস্তা একটি সামাজিক আয়না। এটি একটি সমাজের শ্রেণিবিন্যাস প্রতিফলিত করে— কে সুরক্ষিত, কে উন্মুক্ত, কার মৃত্যু জবাবদিহিতা তৈরি করে আর কার মৃত্যু কেবল একটি সংখ্যা হয়ে ডাটাবেজে জমা হয়।২০২৬ সালের এই ঈদ-পরবর্তী ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা এক ধরনের ‘মৃত্যুর স্থাপত্যে’ বসবাস করছি। বাংলাদেশ যতদিন না সেই আয়নায় নিজের কদর্য রূপটি দেখবে, ততদিন ঈদের লাশের মিছিল কমবে না। তদন্ত কমিটিগুলো তাদের অপঠিত প্রতিবেদন দাখিল করতে থাকবে এবং প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষ তাদের রক্ত ও ঘাম দিয়ে সেই রাষ্ট্রের মূল্য বহন করতে থাকবে, যে রাষ্ট্র রূপান্তরের কঠিন পথের চেয়ে অস্বীকারের স্বস্তিকে বেছে নিয়েছে। রাস্তা থেকে রক্ত মুছলেই দায় মুক্তি ঘটে না, বরং সেই রক্তের প্রতিটি বিন্দু ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি জানায়।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

গ্রাম থেকে বিশ্ববাজার: গড়ে উঠুক বাংলাদেশ ব্র্যান্ড

বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকশিল্পনির্ভর রপ্তানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এই খাত কয়েক যুগ ধরে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অসাধারণ সাফল্য এনে দিয়েছে, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে একটি বাস্তবতা স্পষ্ট- রপ্তানিতে একক প্রধান খাতনির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে, বৈশ্বিক বাজারে সামান্য মন্দা, বাণিজ্যনীতি পরিবর্তন, বৈদেশিক মুদ্রার দামের ওঠা নামা বা রাজনৈতিক অস্থিরতা, অঞ্চলিক যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলেই তার প্রভাব পড়ে আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় সময়ের দাবি হলো রপ্তানি পণ্যের বহুমাত্রিকীকরণ; বর্তমান সরকারের ভিশনারি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে- কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প, গ্রামীণ জনপদের এস এম ই উদ্যোগ, পরিবেশবান্ধব পণ্য এবং অপ্রচলিত পন্যের রপ্তানি খাতে; যাকে আমরা এলাকা ভিত্তিক সার্কুলার শিল্প অঞ্চল যা আধুনিক গ্রীন সার্কুলার ইকোনমি বলব।বর্তমানে বিশ্ববাজারে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল খাতগুলোর একটি হলো পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ পণ্যের বাজার। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ, পাট বা অন্যান্য গাছের তন্তু-ফাইবার কম্পোজিট, নারিকেল আঁশের পণ্য, সুপারি গাছের খোল, কলাপাতার প্লেট, কচুরিপানাজাত পন্য, এলজি ও খুদিপানা থেকে প্রস্তুত উন্নত মানের পশু খাদ্য, বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিং, কাঠের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী, বায়োমস, অটোরাইস মিলের ছাই ও ছাই থেকে উৎপন্য পন্য, চারকোল, সুপারি থেকে উৎপন্ন নানান রকমের পরিবেশ বান্ধব পন্য, বায়ো সার- এসব পণ্যের চাহিদা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়, মিডেলইস্টে দ্রুত বাড়ছে। এই প্রবণতা সার্কুলার ইকোনমির ধারণার সঙ্গে যুক্ত, যেখানে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা হয় এবং উৎপাদন-ব্যবহার-পুনর্ব্যবহার একটি টেকসই চক্রে আবর্তিত হয়। বাংলাদেশের কৃষিজ পন্যের অবশিষ্টাংশ- ধানের তুষ, পাটের আঁশ, নারিকেলের ছোবড়া, আখের ও ভুট্টাগাছের বর্জ্য- এসবই হতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পরিবেশ বান্ধব সবুজ শিল্পের মূল্যবান কাঁচামাল। সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এগুলোকে রপ্তানিযোগ্য পরিবেশবান্ধব পণ্যে রূপ দেয়া সম্ভব।বাংলাদেশের বীজ উৎপাদনও একটি সম্ভাবনাময় খাত; দেশে উন্নতমানের ধান, সবজি ও ফলের বহু হাইব্রিড (উচ্চ ফলনশীল) জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে এসব বীজের চাহিদা রয়েছে। সরকারের অপ্রচলিত পন্য রপ্তানির ওয়ানস্টপ সাপোর্ট সার্ভিস, কৃষক,গবেষক ও উদ্যোক্তার সমন্বিত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বীজ শিল্প গড়ে তোলা গেলে তা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি কৃষকের আয় বহুগুণ বাড়াতে পারে, এর জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, চাষাবাদ, সংরক্ষণ, সার্টিফিকেশন ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল ব্যবস্থা।অপ্রচলিত পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকবে গ্রামীণ স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কিন্তু বাস্তবতা হলো- গ্রামে ব্যবসা শুরু করতে সবচেয়ে বড় বাধা মূলধনের সহজ প্রাপ্যতা ও বাজারসংযোগের অভাব। ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের জায়গা থেকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারকে গ্রামীণ স্টার্টআপের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। স্বল্পসুদে ঋণ, স্টার্টআপ ফান্ড, বিশেষ ভর্তুকি এবং রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা দিলে নতুন উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত হবেন।কৃষি ও গ্রামীণ শিল্পভিত্তিক উদ্যোগের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক প্যাকেজ প্রয়োজন, যেখানে জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বিপণন সহায়তা একসঙ্গে থাকবে। সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একক কৃষক বা কারিগরের পক্ষে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা কঠিন কিন্তু একটি সমবায় বা উৎপাদক সংগঠন সহজেই মাননিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং এবং বড় অর্ডার সরবরাহ করতে সক্ষম। গ্রামে প্রডিউসার কোম্পানি বা প্রোডাকশন কো-অপারেটিভ গড়ে উঠলে কৃষক, নারী ও যুবকদের আয় স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা গেলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন একসঙ্গে সম্ভব হবে।রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি, অনেক সময় গ্রামীণ উৎপাদক জানেন না যে তার তৈরি পণ্য উচ্চমূল্যে বিদেশে বিক্রি হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মশালা, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ব্যবহারের শিক্ষা, কনটেন্ট তৈরি, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, ক্রয়াদেশ গ্রহণ, সময়মতো সরবরাহ, সার্টিফিকেশন, কাস্টমস প্রক্রিয়া, ট্যাক্স-ভ্যাট ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রামীণ উদ্যোক্তাকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগী কমবে এবং লাভ বাড়বে।গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা মান, হারবাল পণ্যের কার্যকারিতা, পরিবেশবান্ধব উপকরণ উন্নয়ন- এসব বিষয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন ছাড়া রপ্তানিযোগ্য শিল্প গড়ে উঠবে না। গবেষণা-উদ্যোক্তা-শিল্প সংযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে উদ্ভাবন সরাসরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে রূপ নেয়। প্রযুক্তি স্থানান্তর ও ইনোভেশন হাব গড়ে তোলা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।সরকারি নীতিতেও প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পের জন্য আলাদা রপ্তানি অঞ্চল, সহজ রেজিস্ট্রেশন, দ্রুত মানসনদ প্রদান, কম খরচে পরীক্ষাগার সুবিধা এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনে কর-ছাড় ও বিশেষ প্রণোদনা দিলে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ ও ব্র্যান্ডিং সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বহুমুখীকরণ উদ্যোগের সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্রামীণ জনপদের কর্মসংস্থানে। গ্রামেই যদি শিল্প ও ব্যবসা গড়ে ওঠে, তবে শহরমুখী অভিবাসন কমবে। নারী, যুবক ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য নতুন আয়-উৎস সৃষ্টি হবে। পরিবারের আর্থিক স্থিতি বাড়বে, স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং জাতীয় জিডিপিতে অবদান বৃদ্ধি পাবে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠবে, যেখানে উন্নয়নের সুফল তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাবে।অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি কেবল একটি বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নয়; এটি একটি সামগ্রিকভাবে আগামীর উন্নয়ন কৌশল। গ্রাম, কৃষি, পরিবেশ, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তোলা সম্ভব— যেখানে উৎপাদন হবে স্থানীয় কিন্তু বাজার হবে বৈশ্বিক। এই পথেই বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ‘বাংলাদেশ ব্র্যান্ড’ গড়ে তুলে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে।[লেখক: কনসালট্যান্ট, বাংলাদেশ অরগানিক হাব]

পশ্চিমবঙ্গের ভোট এবং এসআইআর

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন ঘোষিত হয়েছে। এখানকার শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস, এই নির্বাচনে জিতে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য মরিয়া। বামপন্থীরা এই নির্বাচনকে নিছক ক্ষমতায় ফিরে আসবার একটা লড়াই হিসেবে দেখছেন না। এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপি এবং তাদের সহযোগী প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক শক্তি তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে, বাংলার বুকে মানুষের সব থেকে বড় বিপদকে গুরুত্ব দিয়ে বিভাজনের রাজনীতিকে প্রতিহত করতে, তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিরন্তন বাংলাকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পরিচালিত করছেন। ভোটের প্রচার পর্বকেও সেই ভাবে পরিচালিত করছেন।অন্যপক্ষে আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি, তারাও এই রাজ্যে ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে তাদের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। পশ্চিমবঙ্গবাসীর আর্থ- সামাজিক উন্নয়নের জন্য তাদের কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে, উগ্র রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রকাশই তাদের লক্ষ্য। গোটা ভারতজুড়ে তারা যে নিজেদের মস্তিষ্ক আরএসএসের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তারই একটি অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে সংযুক্ত করবার জন্য, বিজেপি এখন সবথেকে বেশি সচেষ্ট।ভোট প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার অব্যবহিত আগেই পশ্চিমবঙ্গের বুকে এসআইআর করতে শুরু করে নির্বাচন কমিশন। এসআইআর প্রক্রিয়াটি কোনো নতুন প্রক্রিয়া নয়। বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া হয়েছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া ঘিরে এখন যে ধরনের রাজনৈতিক উত্তাপ, বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকার বা তাদের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ, তার বিন্দু বিসর্গ অতীতে ২০০২ সালের এসআইআরের সময় আমরা দেখতে পাইনি। সেদিনের সেই এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কোনো ভীতির সঞ্চার হয়নি। যেটা এখন তৈরি হয়েছে, প্রশাসনিক উদ্যোগের প্রশ্নে কেন্দ্র-রাজ্যের সমন্বয়ে। ভোটার তালিকার সংশোধন, এটা ভারতের সংবিধান প্রদত্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্ষেত্রে একটি অতি স্বাস্থ্যকর বিষয়। সেই স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও কোনো অন্যথা সেদিন ঘটেনি। সেদিন পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্ট সরকার, কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার, যে সরকারের মন্ত্রী ছিলেন মমতা স্বয়ং, বা নির্বাচন কমিশন, সর্বোপরি সাধারণ মানুষ-- কোনো জায়গা থেকে কোনো রকম সাম্প্রদায়িক বিভাজনের লক্ষ্যে, প্রশাসনকে ব্যবহার করবার দৃষ্টিভঙ্গি-- এই এসআইআরকে ঘিরে ওঠেনি।ভারতের নাগরিক মুসলমানদের, বেনাগরিক করবার পরিকল্পনাটা আরএসএসের স্বাধীনতার (১৯৪৭) পরবর্তী কাল থেকেই একটি গৃহীত নীতি। এই পরিকল্পনার কথা তাদের তাত্ত্বিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান নির্মাতা এমএস গোলওয়ালকার, তার, ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ নামক তত্ত্বের মধ্যে অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলে গিয়েছেন। সেদিন একক ক্ষমতায় বিজেপি কেন্দ্রে সরকার পরিচালনা করছিল না। আর সেই কারণেই হয়তো বিজেপির পক্ষে এসআইআর ঘিরে সেদিন, আজকের মতো ভয়াবহ হিন্দু সম্প্রদায়িক অবস্থান নেয়া, জোট রাজনীতির নিরিখে, অর্থাৎ কেন্দ্রে সরকার পরিচালনা করবার বিষয়টিকে মাথায় রেখে বাস্তবায়নের দিকে এগোনো সম্ভবপর ছিল না।পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই আরও চারটি রাজ্যের নির্বাচন হচ্ছে। যার মধ্যে কেরালাম অন্যতম। এই রাজ্যে বামপন্থীরা ক্ষমতায় রয়েছে। তারা রাজ্য বিধানসভায় প্রস্তাব নিয়ে খুব স্পষ্টভাবেই বলেছেন; কোনো অবস্থাতেই তারা কেরলমে এসআইআর প্রক্রিয়া লাগু হতে দেবেন না। সেটা তারা দেনওনি। সেই রাজ্যে ভোট প্রক্রিয়া চলছে। ভোটার তালিকা নিয়ম মাফিক সংশোধিত হয়েছে। কিন্তু কোথাও কোনো অবস্থাতেই এসআইআর প্রক্রিয়া সেখানকার মানুষের ওপরে, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কমিশন যা ইতোমধ্যে ভারতবাসীর কাছে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে নির্যাতন কমিশন নামে অভিহিত হতে শুরু করেছে, তারা লাগু করতে পারেনি।এরকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গবাসী কে ফেলে দেয়ার সার্বিক দায়টি একই সঙ্গে কেন্দ্রের শাসক বিজেপি এবং রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর বর্তায়। রাজ্যের ভোটার তালিকায় বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে আসা মানুষদের দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে বামফ্রন্ট সরকার। আর তাদের ভোটেই তারা দীর্ঘদিন রাজ্যে ক্ষমতাশীল আছেন-- অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারের আমলে এটাই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি। এই দাবি ঘিরে খোদ লোকসভার মধ্যেও তিনি নানা ধরনের অসংসদীয় কাজ করেছিলেন। আরএসএসের যে মুসলিমমুক্ত ভারতের পরিকল্পনা, যেটি তারা তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির মাধ্যমে ভারতের লাগু করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে আসছে, সেই কাজটি তারা বিজেপি সরকারের মন্ত্রী মমতাকে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রথম শুরু করেছিল।ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এসআইআর ঘিরে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান্যতায় পশ্চিমবঙ্গে এখনও ৬০ লাখের বেশি মানুষ ভোটার তালিকার বাইরে রয়েছেন। এই বিপুলসংখ্যক মানুষদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছেন মুসলমানরা। এটা বিজেপির মুসলমান মুক্ত ভারতের রাজনৈতিক কর্মসূচির একটি অঙ্গ। বিজেপির এই ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক বিভাজনমূলক প্রক্রিয়াকে ফলো প্রশ্ন করবার লক্ষ্যে সব থেকে বেশি সহায়ক ছিলেন মমতা।গত ১৫ বছর ধরে যে সীমাহীন দুর্নীতি, ব্যর্থতা অপদার্থতার ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা শূন্যগর্ভ জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন। তার থেকে পুনরুদ্ধার জীবনে একটা প্রত্যাশা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। সিপিআই (এম) সিপিআইএম লিবারেশন, সিপিআই, অন্যান্য বামপন্থী দলগুলো এবং আইএসএফ, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে যে ধরনের রাজনৈতিক ইস্যুগুলোকে তুলে ধরেছেন, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির প্রশ্নে, যেভাবে রাজনীতির প্রধান বিষয় হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন, তা থেকে মানুষের মনকে ঘুরিয়ে দিতে বিজেপি এবং তৃণমূল উভয় সাম্প্রদায়িক শক্তি চেষ্টার বিরাম করছে না। কংগ্রেস দল এই ভোটে অতীতের মতো বামপন্থীদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেনি এ ঘিরে ওই দলের রাজ্য নেতৃত্বের মধ্যেই একাধিক মতবিরোধের কথা শুনতে পাওয়া যায়। যদিও সাম্প্রদায়িকতাকে প্রতিহত করবার প্রশ্নে ওই দলের হাতেগোনা দুয়েকজন নেতা ছাড়া আর কারো মধ্যে এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অবস্থান দেখতে পাওয়া যায়নি। [লেখক: ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

’৬৯ আর ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি-ঘর কোথায়

অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ নামে তড়িঘড়ি করে একটি অধ্যাদেশ জারি করে গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করার কার্যক্রম শুরু করে। ঐ গণভবনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থাকতেন এবং জুলাই আন্দোলনের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সব কার্যক্রম গণভবন থেকেই পরিচালিত হচ্ছিল। জুলাই আন্দোলনে অগণিত মৃত্যু, চোখ হারানো, পংগু হয়ে পড়া আহতের আর্তনাদ, স্বজনহারা পরিবারের মানুষগুলোর আহাজারি মানুষের বিবেককে স্পর্ষ করেছিল। সেই আবেগকে ব্যবহার করে মুহাম্মদ ইউনূস ‘প্রতিহিংসার বশে’ গণভবনকে জুলাই স্মৃতি যাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিনা। সেটা একটা বড় প্রশ্ন। কিন্তু গণভবন তো শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাড়ি না, এটা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সরকার প্রধানের আবাসিক ভবন। এটা ইউনূস সাহেবের পৈতৃক সম্পত্তি নয় যে, তিনি ইচ্ছা করলেন আর সরকারি সম্পত্তিকে তার ‘স্মৃতির যাদুঘর’ বানিয়ে ফেললেন।জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ঘর থাকতেই পারে। তবে সেটা সরকার প্রধানের বাসভবনের জন্য নির্মিত স্থাপনায় কেনো করতে হবে? বিশেষত সরকার প্রধানের বাসভবনের মত স্পর্শকাতর স্থাপনার জন্য স্থান, জায়গার পরিসর, নিরাপত্তা ইস্যু ইত্যাদি নানা বিষয় বিবেচনা করে তা নির্ধারণ করতে হয়। জুলাই স্মৃতি ঘরের জন্য সেগুলো অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অন্য যেকোনো স্থানেই তা হতে পারে। আর এ দেশটাই তো গণঅভ্যুত্থানের দেশ। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পথ বেয়েই তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের এবং দীর্ঘ সময়ের নামে বেনামে সামরিক শাসনের পতন। ’৬৯ বা ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের জন্য তো পৃথক কোনো স্মৃতি ঘর নাই। তাহলে শুধু ’২৪-এর জন্য আলাদা স্মৃতি ঘর লাগবে কেনো? বরং স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের স্মৃতি যাদুঘর নির্মাণ করে ’৬৯, ’৯০, ’২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। যা থেকে পরবর্তী প্রজন্মসহ সবাই একপেশে বা খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির বদলে দেশ এবং দেশের গণআন্দোলনের বৈচিত্র্যময় নানা পর্ব ও উপাদান সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা পেতে পারেন।কিন্তু না, মুহাম্মদ ইউনূস ‘ইতিহাসের একক নায়ক’ হতে চান। আর তা হতে হলে মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের সব গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের ক্ষেত্রে তো রিসেট বাটন চাপ দিতে লাগবে। আবার ’২৪-এর জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে উগ্রবাদী ধর্মান্ধ শক্তির উত্থান ঘটেছে, তারাও এদেশের মানুষের গণসংগ্রামের ইতিহাসকে এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী নিজেদের কলঙ্কিত অধ্যায়কে যে কোনো প্রকারে ঢেকে ফেলার গভীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। সে ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই তারা জুলাই ’২৪ দিয়ে ’৭১ কে ঢেকে ফেলার প্রয়াস চালিয়ে আসছে। সে লক্ষ্যেই জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে তারা আঘাত হানে মুক্তিযুদ্ধের সব স্মারক, স্মৃতি, স্তম্ভ ও ভাস্কর্যের ওপর। ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশ্রয়ে একাধিকবার আঘাত হেনে ও অগ্নিসংযোগ করে ধানমন্ডি বত্রিশের ঐতিহাসিক বাড়িটি গুড়িয়ে দেয়া হয়।আজকের প্রজন্ম ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সম্পর্কে, শহীদদের সম্পর্কে কতটুকু জানেন? জানেন কি ঐ অভ্যুত্থানে কতজন শহীদ হয়েছিলেন? কি ভাবে জানবেন? সারা দেশে ’৬৯-এর অসংখ্য শহীদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা পর্যন্ত করা হয়নি। শহীদদের মধ্যে তরুণ আসাদ, কিশোর মতিউর, রুস্তম, গৃহবধূ আনোয়ারা কিংবা শহীদ ড. শামসুজ্জোহা এরকম কয়েকটি নাম আমরা গণঅভ্যুত্থান দিবসের দিনে শুনতে পাই। অথচ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক, কর্মচারী শহীদী মৃত্যুবরণ করেন। নরসিংদীর হাতিরদিয়া ও রায়পুরায় কৃষক এবং ঢাকার আদমজী, ডেমরা, টঙ্গী এবং খুলনার দৌলতপুর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ও আত্মদান আন্দোলনে বিশেষ মাত্রা সৃষ্টি করে।তৎকালীন ডাকসু, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের উভয় অংশ এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সমন্বয়েছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ’৬৯-এর জানুয়ারি থেকেই শুরু হয় আন্দোলনের নানা কর্মসূচি। এক পর্যায়ে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের একাংশও এসে মিলিত হয় এ আন্দোলনে। এই আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থী বা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নয়, বরং কৃষকদের মধ্যে, শ্রমিকদের মধ্যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৬৬ সনে সূচিত ছয়দফা দাবিতে যে স্বাধীকার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল তা পূর্ণতা পায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচিতে।জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী রাজনীতির ঐক্যের ফলে ছাত্র সমাজ ও মেহনতি জনতার মাঝে এক ধরনের একতার বাতাবরণ সৃষ্টি হয়। আন্দোলন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আইউব শাহীর পতনের মধ্য দিয়ে গনঅভ্যুত্থান সফলতা লাভ করে। কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন শেখ মুজিব, মনি সিংহ সহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সেল বলা যেতে পারে। তাই এই ঐতিহাসিক ও গৌরবের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের বিরোধীরা পাশ কাটাতে চায়- যেমনটা তারা বলে বাংলা ভাষা আন্দোলন করা ভুল হয়েছিল। তাদের নেতা গোলাম আজমের স্পষ্ট বয়ান ছিলো, ’মুসলমানদের তমুদ্দীন ও ধর্মীয় জ্ঞানের ভাণ্ডার উর্দু ভাষায় সংরক্ষিত রয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ হইতে ভাষা আন্দোলন করা সঠিক হয় নাই।’আবার এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে গোলাম আজমের দল কখনও সরবে ও কখনও নীরবে যুক্ত থাকলেও ১৯৯০-এর গনঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বীরত্ব গাঁথা ও আত্মত্যাগকে তারা খুব একটা সামনে আনতে চায় না। কারণ ’৯০ এর গণঅভ্যুত্থান সামনে আসা মানেই অভ্যুত্থানের মশাল জ্বালানো ডা. মিলন, কমরেড তাজুল, পুলিশ কতৃক ট্রাকের চাকায় পিষ্ট ছাত্র নেতা সেলিম, দেলোয়ার, রাউফুন বসুনিয়া, শাহজাহান সিরাজ, এক জটিল পর্বে আসলাম কিংবা ছাত্র কর্মী জয়নাল, জাফর, কান্চন, মোজাম্মেল, জেহাদ, খেতমজুর নেতা টিটো, বা রাজনৈতিক নেতা ময়েজউদ্দীনের আত্মদানের কাহিনী সামনে আসা। ’৯০ কে সামনে আনা মানেই অতি সাধারণ মানুষের হাতে লেখা ও বুকে পিঠে আঁকা ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ হয়ে যায় সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা। শহীদ নূর হোসেন যেন গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতীক।এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের আয়োজন পর্ব তথা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী গণসংগ্রাম এবং তার সমাপ্তি পর্বের মূল শক্তি ছিলো দেশের গনতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তি। এ অভ্যুত্থানের পথ বেয়েই বিএনপি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও অভ্যুত্থানে শহীদের তালিকা প্রণয়ন ও স্মৃতি সংরক্ষণে বিশেষ কিছু করা হয় নি। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে নতুন সরকারকে এ দায়িত্ব নিতে হবে।’৬৯ আর ’৯০কে, ’৫২ আর ’৭১ কে উগ্রবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ২০২৪ দিয়ে ঢেকে ফেলার প্রচেষ্টায় উন্মত্ত। ইউনূসও ‘রিসেট বাটন’ টিপে দেশের সব গৌরব গাঁথাকে বিশেষত দেশের মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলার প্রয়াসকে ১৮ মাস যাবত মদত দিয়ে গেলেন। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন সম্পন্ন না হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দেশে এখন একটি নির্বাচিত সরকার। বিজয়ী দল বিএনপি দাবি করে তাদের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ঘোষক’। নিশ্চয়ই ২৫ মার্চের কাল রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নিরস্ত্র জনতার উপর সশস্ত্র আক্রমণ এবং নির্বিচার গনহত্যার পরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার ঘোষণার ঐতিহাসিক মূল্য আছে। বেংগল রেজিমেন্ট তথা বাঙালি সশস্ত্র বাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনতা যুদ্ধে শামিল হওয়ায় গোটা জাতি উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। এই ভূমিকাকে অস্বীকার করা মানে ইতিহাসকে এককেন্দ্রীক করে ফেলা। তবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘ ২৫ বছরের গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম ও আত্মদানের ইতিহাস এবং সেই সব সংগ্রামের নেতৃত্বকে যদি অস্বীকার করা হয় বা ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গণরায়কে গুরুত্ব দেয়া না হয় তাহলেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ফলে জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ে। যার সুযোগ নিয়ে দেশের জন্ম যুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এবারে যদি এসব প্রশ্নে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে পারে, তবে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।তবে গত বছরের ৫ আগস্ট ইউনূসের ‘জুলাই ঘোষণা’ তে কিন্তু ইতিহাসের চরম বিকৃতি করা হয়েছে। এবং তার পরে ঘোষণা করলেন ‘জুলাই সনদ’। সেখানেও রয়েছে ইতিহাসের বিকৃতি। ইউনূসকে ইতিহাসের বয়ান রচনা করার দায়িত্ব তো দেয়া হয়নি। তবু তিনি তা করলেন এবং দেশের ইতিহাসকে জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেললেন কোন ক্ষমতা বলে? বাংলাদেশের সংগ্রাম মুখর ইতিহাসে তার ভূমিকা কি? অসংখ্য ইতিহাস বিকৃতির এক বয়ান নোবেল লরিয়েট পঠিত ঘোষণাপত্রে উঠে এসেছে- যা নতুন করে বিভাজন সৃষ্টির ঘোষণা হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে। জুলাই সনদ ঘোষণার পরে বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতিহাস বিকৃতির বিষয়ে আপত্তি না জানালেও ভিন্ন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘এটা জনগণের সঙ্গে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের একটা প্রতারণা’। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেয়ার অধিকার প্রধান উপদেষ্টা বা অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। বিশ্বাসভংগ ও প্রতারণা করে আমাদের অগোচরে জুলাই সনদের স্বাক্ষরিত কপি বদলে ফেলা হয়েছে। যা আলোচনা হয়েছে তা সুপারিশে নাই।’সুতরাং খুব স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী দলের উপর বিতর্কিত জুলাই সনদকে বা জুলাই গণুঅভ্যুত্থান অধ্যাদেশকে আইনি ভিত্তি দেয়ার দায়িত্ব পড়ে না। জুলাই গনঅভ্যুত্থানের জন্য দায়মুক্তি লাগবে কেনো? ’৬৯ ও ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে তো দায়মুক্তি লাগে নাই। তাহলে কি অভ্যুত্থানের আড়ালে এমন কিছু করা হয়েছে যার জন্য দায়মুক্তি লাগবে? দেশি-বিদেশি পত্র-পত্রিকায় ও মিডিয়ায় ‘স্নাইপার শুট’ এবং পুলিশ হত্যা ও অস্ত্র লুট ( যা এখনও জমা পড়েনি বা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি) নিয়ে নানা কথা আসছে। জীবনকে সম্মান জানাতে হবে। সে জীবন আন্দোলনকারীর হোক আর পুলিশেরই হোক। সুতরাং এ বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া দায় মুক্তি কার্যকর করা হলে আইনের প্রতি অবিচার করা হবে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মদানকারীদের পরিবাররা এবং অভ্যুত্থানের পরে মব হামলায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে সহায়তা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগ জারী রাখতে হবে।জুলাই আন্দোলনে আত্মদানের আবেগকে পুজি করে ‘প্রতিহিংসা মূলক’ জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশকেও আইনি স্বীকৃতি দেয়ার দায় নির্বাচিত সংসদের নেই। জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি রক্ষায় নির্বাচিত সরকার একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে ভারসাম্যপূর্ন একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের স্মৃতি যাদুঘর নির্মাণ করে ’৬৯, ’৯০, ’২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। একটি অনির্বাচিত সরকার যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একপেশে অধ্যাদেশগুলো জারি করেছে, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে পরিবর্তন এনে নির্বাচিত সরকারকেই ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।গত কয়েকদিনে ১/১১-এর অন্যতম কুশিলব লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (অব.) ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মামুন খালেদের গ্রেপ্তারের খবর দেখে মনে পড়লো পশ্চিমা শক্তির উপর নির্ভরশীল ইউনূসও তো ধোয়া তুলসী পাতা নন। তিনি কিন্তু ১/১১-এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ তত্ত্বে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনোভাব পরিবর্তন করায় ঐ ফর্মুলা কার্যকর হবে না বুঝতে পেরে দ্রুত তিনি দল গঠনের প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসেন। ড. ইউনূসকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও ১/১১-এর অনেক রহস্য উদ্ঘাটিত হতে পারে।ইউনূস পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তার দোস্তির দায় বিএনপির উপর চাপিয়ে দিয়ে গেলেন। নির্বাচনের তিনদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অপ্রকাশযোগ্য যে দেশ বিরোধী চুক্তি তিনি তাড়াহুড়ো করে করলেন তা সামাল দিতে পশ্চিমা পছন্দের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাদের মন্ত্রীসভায় জায়গা করে দিতে হলো। ড. ইউনূস দিল্লির জেন জির থেকে বের হওয়ার ভান করে কৌশলে বাংলাদেশকে আষ্টে পৃষ্ঠে বেধে দিয়ে গেলেন মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে। জামাত ও এনসিপিও আপাতত মার্কিনী স্বার্থের বিরোধী অবস্থানে যাবে না। বরং নানাভাবেই তারা মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ক্ষমতার বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার মোহে।কিন্তু বিএনপিকে এটা মনে রাখতে হবে ভোটারদের একটা বড় অংশ যারা বিএনপিকে পছন্দ না করলেও ধানের শীষে ভোট দিয়েছে এই আশা নিয়ে যে, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপোষ করবে না। উগ্র ধর্মান্ধ শক্তির কাছে নত হবে না। দেশে আর মব সংস্কৃতির চাষাবাদ করতে দেবে না এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সব রাজনৈতিক দলের স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার পরিবেশকে নিশ্চিত করবে। শুধু ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করে বিএনপি বেশি দিন জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারবে না। এ রকম বহু কার্ড পূর্বের সরকারও বিতরণ করেছে। সরকারকে নজর দিতে হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আর ব্যবসা বানিজ্যে কর্মচঞ্চলতা ফিরিয়ে আনতে। সরকারকে নজরে রাখতে হবে, দীর্ঘ কাল যাবত চলে আসা দখলদারী আর চাঁদাবাজির যে সংস্কৃতি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আস্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে তা থেকে বেরিয়ে এসে কিভাবে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা যায়। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে খণ্ডিতভাবে নয় বরং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ক্যানভাসে ধারণ করতে হবে ’৫২-এর ভাষা সংগ্রাম, ’৬৯, ’৯০, আর ২০২৪-এর স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামকে।দেশে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনে বিচার বিভাগ সহ-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ অবস্থা থেকে মুক্ত করে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা, সাংবিধানিক পদাধিকারীগণের জন্য স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কমানো ও রাষ্ট্রপতির পদকে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর আজ্ঞাবহ অবস্থা থেকে বের করে আনা এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও পরিবারতন্ত্রের অবসানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা কিন্তু বিমূর্তভাবে হলেও মানুষের মাঝে রয়েছে। নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি তো দীর্ঘদিনের।সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে এ সব সংস্কারে বিএনপিকে উদ্যোগী হতে হবে। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সংবিধানে এমন কোনো সংযোজন বিয়োজন করে সমাজে বিভাজন ও অস্থিরতা সৃষ্টি করা যাবে না। আদিবাসীসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ নানাবিধ সংস্কার কাজ সামনের দিনগুলোতে রয়েছে।[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা](লেখকের নিজস্ব মত)

সড়ক দুর্ঘটনা: জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি, কারণ ও করণীয়

সম্প্রতি রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার ঝুঁকিপূর্ণ চিত্রকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সার্বিক অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। বর্তমান বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনা একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে, আর বাংলাদেশে এটি এখন এক ভয়াবহ সামাজিক সংকট। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক বা নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটছে, যার ফলে ঝরে যাচ্ছে অমূল্য প্রাণ, ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার।বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার উন্নত বিশ্বের তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। বিআরটিএর জরিপ মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ২৩ হাজার ১৬৬ জন মানুষ নিহত হয়। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক যুগে দেশে ৬৭ হাজার ৮৯০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৭২৬ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২১ জন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশ। রাজধানী ঢাকা এবং মহাসড়কগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনার চিত্রও কম ভয়াবহ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় এবং প্রতিদিন এক হাজারের বেশি শিশু ও তরুণ প্রাণ হারায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর প্রায় ৯৬ শতাংশই ঘটে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে। অর্থাৎ বাংলাদেশসহ এ ধরনের দেশগুলোয়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৬,৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯,১১১ জন নিহত এবং ১৪,৮১২ জন আহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় সারা দেশে ৮ হাজার ৫৪৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছে ১২ হাজার ৬০৮ জন। এর মধ্যে ২ হাজার ৩২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ৩ হাজার ১৫১ জন। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ১.৫৪ শতাংশ, নিহতের সংখ্যা ৭.৫০ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ১৭.৭৩ শতাংশ বেড়েছে। নৌ ও রেলপথেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটে। তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে রেলপথে ৪৯৭টি দুর্ঘটনায় ৫১২ জন নিহত এবং ৩১৫ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ১১৮টি দুর্ঘটনায় ১৮২ জন নিহত, ২৬৭ জন আহত এবং ১৫৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ২ হাজার ৩২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত এবং ৩ হাজার ১৫১ জন আহত হয়েছেন। গত ১০ বছরে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে বেড়ে ৬০ লাখ হয়েছে। নতুন করে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তায় চলাচলের পাশাপাশি ছোট যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং এসব যানবাহনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে ১৬৮ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১ হাজার ৯৫২ চালক, ১ হাজার ৮৭৯ পথচারী, ৬২২ পরিবহন শ্রমিক, ৭৫৫ শিক্ষার্থী, ১২৬ শিক্ষক, ১ হাজার ২০৬ নারী, ৬৫৮ শিশু, ৪৮ সাংবাদিক, ১৭ চিকিৎসক, ১৬ বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১ চিত্রনায়ক, ৬ আইনজীবী, ১২ প্রকৌশলী এবং ২১৫ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় পাওয়া গেছে।তথ্যানুযায়ী, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৫০.৮৪ শতাংশ পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়া, ২৪.৩৯ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৮.৯২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া, ৪.৯৯ শতাংশ বিবিধ কারণে এবং ০.৭৩ শতাংশ ট্রেনের সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষের কারণে হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার ৩৫.৬৭ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে, ২১.৬৬ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ৩৫.৮১ শতাংশ ফিডার রোডে এবং ৪.৯৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঢাকা মহানগরীতে এবং ১.২০ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে ঘটেছে। শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬২১টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬০৮ এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১ হাজার ১০০ জন মানুষ। এর মধ্যে ২৭১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৬৪ জন, ৪টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৬ জন ও দুজন আহত হয়েছেন। ২২টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন।বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো চালকদের অদক্ষতা, অসচেতনতা এবং বেপরোয়া মনোভাব। অনেক চালকই যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই গাড়ি চালান, আবার অনেকেই লাইসেন্সবিহীন। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলফোন ব্যবহার— এসব আচরণ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। অনেক পুরনো ও অচল যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে, যা যে কোনো সময় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতাও একটি বড় সমস্যা। ভাঙাচোরা রাস্তা, ডিভাইডারের অভাব, অপর্যাপ্ত ট্রাফিক সিগন্যাল ও ফুটওভারব্রিজের স্বল্পতা দুর্ঘটনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং দুর্নীতিও একটি বড় কারণ। ট্রাফিক আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ ও অনিয়মের কারণে অযোগ্য চালক লাইসেন্স পেয়ে যায় এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল অব্যাহত থাকে। একই সঙ্গে পথচারীদের অসচেতনতা যেমন যেখানে-সেখানে রাস্তা পারাপার-দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু প্রাণহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে পুরো পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। এ ছাড়া প্রতি বছর দেশের অর্থনীতিতে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়, যা জাতীয় উন্নয়নকে ব্যাহত করে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যে ক্ষতি হয় তার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির দুই ভাগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, আন্তর্জাতিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ডলার। উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে এর পরিমাণ ৬৫ বিলিয়ন ডলার।এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং আইন ভঙ্গকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও কঠোর করতে হবে, যাতে অযোগ্য কেউ গাড়ি চালাতে না পারে। তৃতীয়ত, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি-প্রশস্ত রাস্তা, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।এ ছাড়া যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা নিয়মিত করা এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষকে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। চালক, যাত্রী ও পথচারী-সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল আচরণই পারে দুর্ঘটনা কমাতে।সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; বরং এটি প্রতিরোধযোগ্য। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং কার্যকর পদক্ষেপ। আমরা যদি সবাই নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি এবং আইন মেনে চলি, তাহলে সড়ককে মৃত্যুকূপ থেকে নিরাপদ যাত্রাপথে রূপান্তর করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, জীবনের মূল্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

ইরান যুদ্ধ: বাংলাদেশের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রভাব আর শুধু আঞ্চলিক সীমায় আটকে নেই। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং বৈশ্বিক বাজারব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার ঢেউ এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। জ্বালানি তেলের দাম থেকে শুরু করে রান্নাঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার— সবকিছুতেই ব্যয়ের চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে।বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানির একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। সেখানে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জ্বালানি ও পণ্যের পরিবহন ব্যয়ে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্যমতে, শিপিং খরচ বাড়ার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে খুচরা বাজারে না পড়লেও কিছু সময় পর তা মুদ্রাস্ফীতিকে দীর্ঘমেয়াদে উসকে দেয়। ইতোমধ্যে সুপারট্যাংকারের ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া এই সংকটের গভীরতাকে স্পষ্ট করে।বাংলাদেশ যেহেতু বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল, গ্যাস এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য আমদানি করে, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশে দ্রুত অনুভূত হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, যা সরাসরি পণ্য পরিবহন ব্যয়ে প্রতিফলিত হয়। এর ফলে পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দাম বাড়তে থাকে। বাস ভাড়া, ট্রাক ভাড়া, এমনকি নৌপথের খরচও বেড়ে গিয়ে সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায়।এই সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতে। বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন অনেকাংশে নির্ভর করে রাসায়নিক সার, সেচব্যবস্থা এবং জ্বালানির ওপর। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল সারের কাঁচামাল এবং ইউরিয়া উৎপাদনের একটি প্রধান উৎস। সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হলে বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে। ইতোমধ্যে ইউরিয়া সারের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে, যা বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে।বর্তমানে বোরো ধান উৎপাদনের মৌসুম চলছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মৌসুমে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও সঠিক মূল্য নিশ্চিত না হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে সারের দাম কেজিপ্রতি কয়েক টাকা থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না, যা উৎপাদন পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।সারের পাশাপাশি সেচব্যবস্থার খরচও বাড়ছে। দেশের অধিকাংশ সেচপাম্প ডিজেলচালিত হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সেচ খরচও বেড়ে যায়। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে কৃষকের লাভের পরিমাণ কমে যায়। ফলে কৃষকের ওপর দ্বৈত চাপ সৃষ্টি হয়— একদিকে বাড়তি বিনিয়োগ, অন্যদিকে অনিশ্চিত বাজারমূল্য।এই বাড়তি উৎপাদন খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপিয়ে দেয়া হয়। ফসল বাজারে এলে কৃষকরা সেই বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হন। একই সময়ে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি ধাপে দাম আরও বাড়ে। ফলে শহর ও গ্রামের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠী, খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপে পড়ে।বাংলাদেশের জ্বালানি খাতও এই সংকটে ঝুঁকির মুখে। এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা থাকায় বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বাড়লে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে প্রভাব পড়ে। এতে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়ে এবং উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পায়। শিল্প খাতে এই চাপ অর্থনীতির সামগ্রিক গতিকে মন্থর করতে পারে।একই সময়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনও চলমান, যা জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন ধরে অস্থির করে রেখেছে। এর সঙ্গে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যুক্ত হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয় যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো আঞ্চলিক সংঘাতও দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমদানিনির্ভরতার কারণে বহির্বিশ্বের অস্থিরতা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। তাই দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতা কমানোর বিকল্প নেই। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সারের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি নাগরিক পর্যায়েও সচেতনতা জরুরি। বাড়ির আঙিনা, ছাদ বা পতিত জমিতে চাষাবাদ বাড়ানো একটি সহায়ক উদ্যোগ হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে পারলে বাজারের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য সহায়তা, বাজার তদারকি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।সব মিলিয়ে, দূরের যুদ্ধ এখন আর দূরের বিষয় নয়। এর প্রভাব আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় সরাসরি অনুভূত হচ্ছে। তাই এই সংকটকে সাময়িক হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নেয়াই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়। বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশে প্রতিটি ইঞ্চি জমির সঠিক ব্যবহার এবং সুসংগঠিত নীতি বাস্তবায়নই হতে পারে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কার্যকর পথ।[লেখক: সাবেক ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা] 

সম্পর্কের ভাঙন ও আত্মহনন: উত্তরণের পথ

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী কিংবা নববিবাহিত শিক্ষিত নারীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো আমাদের সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; বরং এগুলো আমাদের সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক মূল্যবোধ, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। প্রেমে ব্যর্থতা বা দাম্পত্য জীবনের সংকটকে কেন্দ্র করে যে মানসিক বিপর্যয় তৈরি হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে এমন এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়, যা সমাজে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে, অথচ প্রতিরোধযোগ্য ছিল। তাই এই বিষয়গুলোকে আবেগ দিয়ে নয়, বরং যুক্তি, সহমর্মিতা এবং সামাজিক বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করা জরুরি। আত্মহত্যার এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়; অতীতেও আমরা বারবার একই চিত্র দেখেছি। প্রেমঘটিত ব্যর্থতা, দাম্পত্য কলহ, মানসিক আঘাত— এইসব কারণকে সামনে রেখে অনেকেই জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। প্রথম দৃষ্টিতে বিষয়টি ব্যক্তিগত আবেগের বিস্ফোরণ বা দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ মনে হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে এর পেছনে রয়েছে জটিল সামাজিক কাঠামো, মানসিক চাপ, সাংস্কৃতিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সংকটের সমন্বিত প্রভাব।বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোতে পরিবার, বিবাহ এবং সামাজিক মর্যাদা একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বিবাহকে জীবনের এক অনিবার্য ও চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষিত নারীরাও এই প্রচলিত ধারণা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নন। ফলে যখন কোনো প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যায় কিংবা দাম্পত্য জীবনে অশান্তি দেখা দেয়, তখন তা শুধু একটি সম্পর্কের সমাপ্তি নয়; বরং ব্যক্তির আত্মপরিচয়, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে অনুভূত হয়। এই আঘাত অনেক সময় এতটাই গভীর হয় যে ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, অপ্রয়োজনীয় কিংবা অসহায় মনে করতে শুরু করে।পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে। এখানে নারীর পরিচয় প্রায়ই নির্ধারিত হয় তার পারিবারিক সম্পর্কের মাধ্যমে— সে কার মেয়ে, কার স্ত্রী, কিংবা কার মা। এই নির্ভরশীল পরিচয় কাঠামো নারীদের আত্মমর্যাদাকে ভঙ্গুর করে তোলে। যখন সম্পর্ক ভেঙে যায়, তখন সেই ভাঙন কেবল আবেগগত নয়, অস্তিত্বগত সংকটে রূপ নেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ, গুজব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারও সহানুভূতির জায়গা থেকে পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়; বরং ‘মানসম্মান’ রক্ষার মানসিকতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে ভুক্তভোগী নারী নিজেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন, একা এবং অসহায় মনে করতে থাকে।মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত সাধারণত হঠাৎ করে নেয়া হলেও এর পেছনে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও দমিয়ে রাখা কষ্ট কাজ করে। প্রেমের ব্যর্থতা বা দাম্পত্য দ্বন্দ্ব অনেক সময় একটি ট্রিগার হিসেবে কাজ করে, যা আগে থেকে জমে থাকা হতাশা, একাকিত্ব, আত্মসম্মানহীনতা এবং অবমূল্যায়নের অনুভূতিকে বিস্ফোরিত করে। এই অবস্থায় ব্যক্তি একটি সংকীর্ণ মানসিক ফ্রেমে আটকে পড়ে, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কগনিটিভ টানেলিং’ বলা হয়। এই অবস্থায় মানুষ তার বর্তমান কষ্ট ছাড়া আর কিছু দেখতে পায় না; ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, আশেপাশের মানুষের ভালোবাসা কিংবা জীবনের অন্য অর্থপূর্ণ দিকগুলো তার দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। মা-বাবার স্নেহ, ভাই-বোনের ভালোবাসা, বন্ধুদের আন্তরিকতা— সবকিছু যেন মুহূর্তের জন্য গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। এটি কোনো ইচ্ছাকৃত অবহেলা নয়; বরং গভীর মানসিক বিপর্যয়ের একটি লক্ষণ।নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা জীবনকে অমূল্য বলে মনে করি এবং আত্মহত্যাকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও বেদনাদায়ক পরিণতি হিসেবে দেখি। প্রায় সব ধর্ম ও সংস্কৃতিতেই জীবন রক্ষার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তবে কেবল ‘আত্মহত্যা ভুল’ এই বক্তব্য দিয়ে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন সহমর্মিতা, বোঝাপড়া এবং কার্যকর সহায়তা ব্যবস্থা। নৈতিকতার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে মানবিকতায়— মানুষের কষ্টকে উপলব্ধি করা এবং সেই কষ্ট লাঘবে পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নৈতিক দায়িত্বের বাস্তব প্রয়োগ ঘটে। এই প্রেক্ষাপটে সমাজ, পরিবার এবং রাষ্ট্র— সবারই একটি সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। আমাদের সমাজে এখনও মানসিক সমস্যাকে দুর্বলতা বা লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়, যা মানুষকে সাহায্য নিতে নিরুৎসাহিত করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদার কাউন্সেলিং সেবা চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক উন্মুক্ত আলোচনা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত, পরিবারকে হতে হবে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল, যেখানে সন্তানরা নির্ভয়ে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। বিচার নয়, প্রয়োজন সহানুভূতি এবং মনোযোগ দিয়ে শোনা। তৃতীয়ত, নারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর না হলে অনেক নারী অস্বাস্থ্যকর বা নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকেও বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে তারা এক ধরনের মানসিক বন্দীত্বের মধ্যে বসবাস করে, যা দীর্ঘমেয়াদে হতাশা ও আত্মঘাতী প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে নারীদের আত্মনির্ভর করে তোলা এই সমস্যার একটি মৌলিক সমাধান হতে পারে। চতুর্থত, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অপরিহার্য। প্রেমে ব্যর্থতা, সম্পর্ক ভাঙন কিংবা বিবাহবিচ্ছেদকে এখনও আমাদের সমাজে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে মানুষ তার ব্যক্তিগত সংকটকে লজ্জার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করবে এবং সাহায্য চাইতে দ্বিধা বোধ করবে। সম্পর্কের ভাঙনকে জীবনের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ব্যর্থতা মানেই জীবনের সমাপ্তি নয়— বরং নতুনভাবে শুরু করার একটি সুযোগ। পঞ্চমত, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে জাতীয় নীতি প্রণয়ন, জরুরি হেল্পলাইন চালু, সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম যেন সংবেদনশীলভাবে এই ঘটনাগুলো উপস্থাপন করে এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নববিবাহিত শিক্ষিত নারীদের জন্য কিছু বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে না দেখে, এটিকে জীবনের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। নিজের স্বপ্ন, লক্ষ্য এবং ব্যক্তিগত পরিচয় বজায় রাখা জরুরি। দাম্পত্য সম্পর্কে খোলামেলা যোগাযোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়; সমস্যা হলে তা চেপে না রেখে আলোচনা করা উচিত। পাশাপাশি, বিবাহের পরেও বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য সহায়ক। প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলিং নেয়াও একটি ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গেলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। এখনও অনেক মানুষ মানসিক সমস্যাকে দুর্বলতা বা লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখে, ফলে তারা সাহায্য নিতে সংকোচ বোধ করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কাউন্সেলিং সেবা চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন।দ্বিতীয়ত, পারিবারিক যোগাযোগের উন্নতি অপরিহার্য। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তানরা তাদের সমস্যাগুলো পরিবারকে বলতে পারে না, কারণ তারা ভয় পায়— তাদের বিচার করা হবে বা বোঝা হবে না। পরিবারকে এমন একটি নিরাপদ স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সন্তানরা নির্ভয়ে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে।তৃতীয়ত, নারীদের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখায় উল্লেখিত বিষয়, পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা ছাড়া বিয়ে না করা— এটি একটি বাস্তবসম্মত পরামর্শ। অনেক নারী অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হওয়ার কারণে একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক থেকেও বেরিয়ে আসতে পারে না। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের স্বনির্ভর করে তোলা হলে তারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আরও স্বাধীনভাবে নিতে পারবে।চতুর্থত, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের সমাজে এখনও প্রেম, সম্পর্ক ভাঙন কিংবা বিবাহবিচ্ছেদকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে মানুষ সম্পর্কের সংকটে পড়ে নিজেকে একা ও অসহায় মনে করবে। সম্পর্ক ভাঙনকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।পঞ্চমত, রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধ নীতি, হেল্পলাইন সেবা এবং সহজলভ্য কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এ ছাড়া গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ— তারা যেন দায়িত্বশীলভাবে এই বিষয়গুলো উপস্থাপন করে এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।নববিবাহিত নারীদের জন্য বিশেষভাবে কিছু দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বিবাহকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে না দেখে, এটি একটি অংশ হিসেবে দেখা উচিত। নিজের ব্যক্তিগত স্বপ্ন, লক্ষ্য এবং পরিচয় বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত, দাম্পত্য সম্পর্কে খোলামেলা যোগাযোগ অপরিহার্য। সমস্যা হলে তা চেপে না রেখে আলোচনা করা উচিত।তৃতীয়ত, সামাজিক সহায়তা নেটওয়ার্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহের পর অনেক নারী তাদের বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়, যা তাদের একাকীত্ব বাড়ায়। এই সম্পর্কগুলো বজায় রাখা মানসিকভাবে শক্তিশালী থাকতে সাহায্য করে।চতুর্থত, প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নেয়া উচিত। কাউন্সেলিং বা থেরাপি কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়; বরং এটি নিজের যত্ন নেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সবশেষে বলা যায়, আত্মহত্যা একটি জটিল সামাজিক ও মানসিক সমস্যা, যার সমাধান একক কোনো পদক্ষেপে সম্ভব নয়। এটি মোকাবিলার জন্য ব্যক্তিগত সচেতনতা, পারিবারিক সহমর্মিতা, সামাজিক পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ— সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। জীবন সত্যিই অমূল্য, কিন্তু এই সত্যটি উপলব্ধি করার জন্য মানুষের প্রয়োজন সহানুভূতি, সমর্থন এবং একটি নিরাপদ পরিবেশ, যেখানে তারা তাদের কষ্ট ভাগ করে নিতে পারে এবং নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়।সবকিছু বিবেচনায় স্পষ্ট হয় যে আত্মহত্যা কোনো একক কারণের ফল নয়; এটি ব্যক্তিগত কষ্ট, সামাজিক চাপ এবং মানসিক অস্থিরতার জটিল সমন্বয়। এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ— পরিবারের সহানুভূতিশীল ভূমিকা, সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর নীতি গ্রহণ। একই সঙ্গে ব্যক্তিকেও বুঝতে হবে যে জীবনের সংকট সাময়িক, কিন্তু জীবনের সম্ভাবনা অসীম। সহায়তা চাইতে পারা দুর্বলতা নয়, বরং তা বেঁচে থাকার শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ। একটি সহমর্মী, সচেতন এবং সমর্থনশীল সমাজই পারে এই নীরব সংকটকে প্রতিরোধ করতে এবং মানুষকে নতুন করে বাঁচার সাহস দিতে। [লেখক: অধ্যাপক; সদস্য, শিক্ষাক্রম, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড]

এবার যাচ্ছি মঙ্গলে

স্টিফেন হকিংয়ের সোজা ভবিষ্যৎ বাণী ছিল, শতাব্দী ব্যবধানে মানব জাতিকে ভিনগ্রহে বসতি গড়তেই হবে। স্পেস এক্সের মালিক ইলন মাস্ক বলছেন এই শতাব্দীর প্রথমার্ধে মঙ্গলে মানুষ পাঠাবেন। ব্লু অরিজিনের মালিক মার্ক বেজোস শান্ত অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন ২০৪০ সালের মধ্যে মানুষ অবশ্যই মঙ্গলে পদার্পণ করবেই। সোজা কথা হলো সৌরজগতে পৃথিবীর কাছের গ্রহ বুধ বা শুক্রে বা উপগ্রহ চাঁদে পানি না থাকায় মনুষ্য বসতি সম্ভব নয়। তবে একটু দূরের মঙ্গল গ্রহে সম্ভব, কারণ মঙ্গলে একসময় পানি ছিল, জলাশয় ছিল, খাল, নদী ছিল। এখনও মাটির নিচে পানির ভান্ডার আছে। যেমন পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠের নিচে পানি আছে। সোজা কথায় মঙ্গলে বেঁচে থাকার জন্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে মনুষ্য বসতি সম্ভব। মঙ্গলে বাতাস আছে, তবে তা পৃথিবীর চেয়ে হালকা। মেরু অঞ্চলে জমাট বরফও আছে।বৈরী হলো গ্রহটি প্রচণ্ড ঠান্ডা। মাইনাস ২০০ (বিশ ডিগ্রির) নিচে তাপমাত্রা। পৃষ্ঠে আয়রন অক্সাইড বেশি থাকায় পৃথিবীর অর্ধেক আয়তনের গ্রহটি পুরোপুরি লালচে। ২৪ ঘণ্টা ৩৭ মিনিটে ১ দিন ও ৬৮৭ দিনে ১ বছর। মানুষের বাস উপযোগী করতে হলে বাতাসের পরিমাণ ও বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতেই হবে। তার ওপর নিশ্চিত করতে হবে বৃষ্টিপাত। ইলন মাক্সের বক্তব্য, নিউক্লিয়ার চার্জ করে কয়েক বছরের জন্য ধুলায় ঢেকে দেয়া হবে মঙ্গলের আকাশ। ধুলার আবরণে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়বে। তাপমাত্রা বাড়লে মরুর বরফ গলে মেঘ সৃষ্টি হবে। কয়েক দশকের ব্যবধানে ধীরে ধীরে বৃষ্টিপাত বাড়বে। একাধিক ঋতুর আবির্ভাব হতে বাধ্য।মঙ্গলে বসতি স্থাপনের প্রধানতম প্রতিবন্ধকতা হলো চুম্বক ক্ষেত্রের অভাব। কোটি কোটি বছর আগে থেকে গ্রহটির ভূ-অভ্যন্তরে মিথস্ক্রিয়া ধীরে ধীরে স্থিমিত হয়ে পড়ায় ও পৃষ্ঠদেশ থেকে মেঘ-বৃষ্টির ঋতুচক্র হারিয়ে যাওয়ায়, গ্রহটি চুম্বকত্বহীন হয়ে পড়েছে। সৌর তাপ ও আলোর ক্ষতিকর বিকিরণ ঊর্ধ্বাকাশে আটকানোর একমাত্র প্রাকৃতিক ব্যবস্থা হলো বায়ুমণ্ডলের চুম্বকক্ষেত্র। সৌর ও মহাকাশের বহু ক্ষতিকর পদার্থ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঊর্ধ্বাকাশে ঠেকিয়ে দেয় বলে আমরা ভূ-পৃষ্ঠে বেঁচে আছি। মঙ্গলে পৃথিবীর মতো বায়ুমণ্ডল, একাধিক ঋতু ও চৌম্বক ক্ষেত্র ন্যূনতম ভারসাম্যে এলে মনুষ্য বসতি গড়ে তোলা সম্ভব। শত শত বছরের ব্যবধানে গ্রিন হাউস প্রযুক্তি ব্যবহার করে রবিশষ্য উৎপাদন হবে। কৃত্রিম জলপ্রবাহে চাষ হবে। প্রথম দিকে অক্সিজেন আটকে রেখে হয়তো ঘরে থাকতে হবে। বাড়ি থেকে বের হলেই হয়তো পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে বের হতে হবে- এই যা। আরও কত প্রতিবন্ধকতা দেখা দেবে। আবার এসব অতিক্রমও করা যাবে। লাগুক না এর জন্য দশকের পর দশক বা শত শত বছর। ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে নাসা মিউজিয়ামে মোটামুটি ১ বেলা ঘুরেছিলুম। তৃতীয় তলায় মঙ্গলে পাঠানো ল্যান্ডার পারসিভিয়ারেন্সের প্রাথমিক টেস্টিং মেশিনটি ডিসপ্লেতে দেখে পুলকিত হলাম। পৃথিবীতে পরীক্ষা চালানো হয়েছে এটি দিয়ে। অতঃপর হুবহু আরেকটি এখন মঙ্গলে। দিন-রাত ব্যস্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণায়।ষাটের দশক থেকে মঙ্গলের প্রতি মানুষের অব্যাহত অভিযান মনুষ্য ল্যান্ডিং করার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে চলেছে। দীর্ঘ অর্ধশতক ধরে মঙ্গলে ৩ ধরনের যন্ত্রদানব পাঠানো হয়েছে। দীর্ঘ এক দশকের ব্যর্থতার পর ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর সোভিয়েত মঙ্গলযান ‘মার্স-৩’ মঙ্গলে ল্যান্ড করে। এরপর থেকে চাঁদে ল্যান্ড করেছে রুশ (রসকসমস) আমেরিকান (NASA), ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA), চীনের মহাকাশ সংস্থা (CNSA), ভারতীয় মহাকাশ সংস্থার (ISRO) একাধিক ল্যান্ডার। প্রথম অভিযানেই ল্যান্ডিং করে চমক দেখিয়েছে ভারতের ইসরো। ল্যান্ডারের পেটের ভেতর থেকে যে যন্ত্রটি বেরিয়ে এসে আশে পাশে রাজার হালে হেলে দুলে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালায়, সেটির নাম রোভার। ইসরোর রোভার, রসকসমসের রোভার, চীনের রোভার ‘তিয়ানওয়েন- ১’ এটি ল্যান্ড ‘ঝুরুং’-এর পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে মে ২০২১ থেকে চালিয়ে যাচ্ছে বৈজ্ঞানিক গবেষণা। ইউরোপীয় অর্থাৎ ESA-এর রোভার বর্তমানে রীতিমতো প্রতিযোগিতা দিয়ে মঙ্গলে মনুষ্য বসতি গড়ে তোলার করণীয় নিয়ে গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যস্ত। বিশ্ববাসীর জন্য সুখবর আছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘অ্যানাবেনা’ ও ‘নস্টক’ নামক অনুজীব বা ব্যাকটেরিয়াকে মঙ্গলে ছেড়ে দেয়া গেলে সময়ের ব্যবধানে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর মতো ভারসাম্যপূর্ণ অক্সিজেনে ভরপুর হবে। নাসা আরও এককাঠি সরস হাওয়াই দ্বীপে এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের একটি ভূখণ্ডে ১টি বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। চতুর্দিকে মনুষ্যহীন এই বাড়িতে একাকী থাকবেন ৬ নভোচারী। মূলত ৬ জন মানুষ একসঙ্গে একটি ঘরে বহির্জগতের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন থাকলে কিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় তার পরীক্ষা চলছে। নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী শ্রীঘ্রই একাধিক মনুষ্যবিহীন অরবিটার পাঠানো হবে। মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসবে ‘স্পেস এক্সের’ হ্যাংগারে। আবার ওই রকেটে করে মনুষ্যবাহী অরবিটার পাঠানো হবে মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করার জন্য। এরপর শুরু হবে নভোচারীদের মঙ্গলে ল্যান্ডিং করানোর চূড়ান্ত পর্ব। দীর্ঘ ৭ মাসের মঙ্গল যাত্রার জন্য নাসা পথিমধ্যে অর্থাৎ কক্ষপথে ‘ল্যাগরেঞ্চ-২’ পয়েন্টে যাত্রাবিরতি দিতে চায়। যদি যাত্রাপথ ৪ মাসে নামিয়ে আনার উদ্যোগ সফল হয় তবে বিশ্রাম না দিয়েও সরাসরি মঙ্গলে ল্যান্ডিংয়ের চিন্তা প্রাধান্য পাবে। কারণ এ ক্ষেত্রে আসা যাওয়ায় লাগবে মাত্র ৮ মাস। অবশ্য রাশিয়ার প্লাজমা জ্বালানির রকেট পাঠানোর ঘোষণা যদি সত্যি সফল হয় তবে মঙ্গলে মানুষ হাঁটবে, খেলবে, চাষ করবে, বাজার করবে, হোক না তা দুই প্রজন্ম পর। ‘রসকসমসের’ বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লাজমা প্রযুক্তির রকেটের গতি এতদিনকার জ্বালানির সমস্ত সক্ষমতা অতিক্রম করবে। প্লাজমা জ্বালানি দিয়ে রকেট স্টার্ট দেয়ার ১ মাসের মধ্যে পৌঁছে যাবে মঙ্গলে। বিশ্ববাসী রইল সেই শুভদিনের প্রত্যাশায়। [লেখক: আইনজীবী, আপিল বিভাগ]

আগুনের বাজারে সভ্যতার মুখোশ

পৃথিবী যেন এখন এক বিশাল হাট—নামের আগে সভ্যতা, ভেতরে নিখাদ ব্যবসা। এই হাটে সবকিছুই বিক্রি হয়: নীতি, নৈতিকতা, মানবতা—এমনকি মানুষের জীবনও। শুধু দরকার নিখুঁত প্যাকেজিং আর কিছু মেকি ভাষা। আগুনের গন্ধকে বলা হয় স্থিতিশীলতা, ধ্বংসকে নিরাপত্তা, আর রক্তকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। শব্দের এই কারসাজিতে সত্য এতটাই ঢেকে যায় যে মানুষ একসময় মিথ্যাকেই বাস্তব মনে করতে শুরু করে।এই হাটের মাঝখানে জ্বলছে এক অনির্বাণ চুলা। সেখানে কাঠ নয়, জ্বলে মানুষের ঘর; কয়লা নয়, পুড়ে শিশুর স্বপ্ন। তবু বিস্ময়কর—চুলার পাশে দাঁড়ানো লোকগুলো সাদা পোশাকে সজ্জিত। তাদের মুখে শান্তির বুলি, হাতে আগুনের দাহ। তারা বলে, আগুন নেভাতে এসেছে—কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখে, সেই নেভানোর নামেই তারা আরও তেল ঢালছে। আগুন এখানে শুধু ধ্বংসের প্রতীক নয়, এটি ক্ষমতার এক দৃশ্যমান রূপ— যেখানে জ্বলতে থাকা প্রতিটি শিখা একেকটি স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।এরা এক অদ্ভুত জাতের কারিগর। তাদের কারখানায় তৈরি হয় ন্যায়ের বুলেট, শান্তির বোমা আর মানবিকতার মিসাইল। প্রতিটি অস্ত্রের গায়ে লেখা থাকে কোনো মহৎ শব্দ, যেন শব্দের ঝলকে রক্তের দাগ মুছে যায়। তারা জানে—মানুষ শব্দে বেশি বিশ্বাস করে, সত্যে নয়। তাই তারা শব্দকে অস্ত্র বানায়, আর অস্ত্রকে ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে। একসময় মানুষ এতটাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে যে, ধ্বংসকেও সে উন্নয়নের অংশ মনে করতে শুরু করে।এই হাটে আছে একদল হিসাবরক্ষকও। তারা ঠাণ্ডা মাথায় হিসাব কষে—আজ কত ঘর পুড়লো, কাল কত মানুষ মরবে, আর তাতে কত মুনাফা আসবে। তাদের খাতায় মানুষের নাম নেই, আছে শুধু সংখ্যা। শূন্যের পাশে যত সংখ্যা বাড়ে, তাদের চোখে তত উজ্জ্বল হয় আনন্দের আলো। এই সংখ্যার খেলায় মানবিকতা হারিয়ে যায়, আর লাভ-ক্ষতির অঙ্কই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত সত্য। তারা কখনও দেখে না একটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে থাকা একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি জীবনের গল্প।সবচেয়ে বড় কৌতুক—এই আগুনের বাজারেই বসে শান্তির মেলা। সেখানে হয় বড় বড় বক্তৃতা, ছুটে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, আর কাগজে কাগজে লেখা হয় চুক্তি। ক্যামেরার সামনে করমর্দন, হাসি আর কূটনৈতিক ভাষার চাতুর্য দেখে মনে হয়—এই বুঝি পৃথিবী বদলে যাবে। কিন্তু মেলা শেষ হলেই সেই কাগজ উড়ে যায় আগুনে—আর আগুন আরও উঁচু হয়ে জ্বলে ওঠে। তখন বোঝা যায়, শান্তির মেলা আসলে আগুন টিকিয়ে রাখারই এক অভিনব কৌশল।নীরব দর্শকদের ভূমিকাও এখানে কম নয়। তারা আগুন দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তারপর নিজ নিজ ঘরে ফিরে যায়। কেউ কেউ আবার আগুনের ছবি তুলে রাখে—স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, যেন একদিন বলতে পারে, আমরা সেই সময় বেঁচে ছিলাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা শোক প্রকাশ করে, ক্ষোভ জানায়, কিন্তু বাস্তবতায় তারা নিস্তব্ধ। তারা ভুলে যায়—দর্শকও এক ধরনের অংশগ্রহণকারী; শুধু তাদের হাত রক্তে ভেজে না। নীরবতা অনেক সময় শব্দের চেয়েও বেশি শক্তিশালী সমর্থন হয়ে ওঠে।এই আগুনের শহরে শিশুরা বড় হয় ধোঁয়ার গন্ধে। তারা জানে না ফুলের সুবাস কেমন; তারা চেনে শুধু বারুদের গন্ধ। তাদের খেলনা ট্যাংকের মতো, তাদের স্বপ্ন বাঙ্কারের মতো। তারা শিখে যায়—বাঁচতে হলে লুকাতে হয়, হাসতে হলে চুপ থাকতে হয়। তাদের শৈশব কেড়ে নেয়া হয় খুব ধীরে, খুব নিঃশব্দে। একদিন তারা বড় হয়, আর সেই একই আগুনের অংশ হয়ে যায়—কারও হাতে অস্ত্র, কারও হাতে পতাকা, কারও হাতে প্রতিশোধের শপথ।আর যারা এই আগুন জ্বালায়, তারা থাকে অনেক দূরে—শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে, কাঁচের দেয়ালের আড়ালে। তাদের কাছে আগুন মানে একটি গ্রাফ, একটি রিপোর্ট, একটি কৌশল। তারা আগুনের তাপ অনুভব করে না, শুধু তার আলো ব্যবহার করে নিজেদের ছায়া বড় করে। তাদের সিদ্ধান্তে জ্বলে ওঠে শহর, ভেঙে পড়ে সভ্যতা, কিন্তু তাদের জীবনে সেই আগুনের কোনো ছোঁয়া লাগে না। এই দূরত্বই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি—এবং সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা।সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সত্যটি হলো—এই পৃথিবীতে আগুন কখনো নিজে নিজে জ্বলে না। কেউ তা জ্বালায়, কেউ তাতে হাওয়া দেয়, আর কেউ সেই আগুন দেখে মুনাফার হাসি হাসে। এই ত্রিমুখী সম্পর্কের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আধুনিক সভ্যতার এক নির্মম বাস্তবতা—যেখানে ধ্বংস একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া, আর শান্তি একটি কৌশলগত শব্দমাত্র।তাই এই আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে যদি কেউ প্রশ্ন করে—দোষ কার? উত্তরটি সহজ নয়। দোষ শুধু তাদের নয়, যারা আগুন জ্বালায়; দোষ তাদেরও, যারা আগুনকে মেনে নেয়, যারা আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে উষ্ণতা উপভোগ করে, আর যারা আগুনের গল্প শুনে হাততালি দেয়। এই সম্মিলিত নীরবতা আর স্বার্থপরতা আগুনকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।শেষ পর্যন্ত, হয়তো একদিন এই আগুন নিভে যাবে। কিন্তু তার ছাইয়ে থেকে যাবে এক নির্মম সাক্ষ্য—সভ্যতার মুখোশ যতই চকচকে হোক, তার ভেতরের মুখ সবসময় ততটা সুন্দর নয়। সেই ছাই একদিন ইতিহাস হয়ে বলবে—এই পৃথিবী আগুন নেভাতে জানতো, কিন্তু আগুন জ্বালাতে ছিল আরও বেশি দক্ষ। [লেখক : সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

ভিডিও

ক্রীড়া ভাতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য ক্রীড়া ভাতা প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ সোমবার (৩০ মার্চ) সকাল সোয়া ১০টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘শাপলা হলে’ এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তিনি।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী খেলোয়াড়দের মাঝে ‘ক্রীড়া কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমেরও সূচনা করেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জনকারী ক্রীড়াবিদদের সম্মাননা প্রদান করা হয়।এবারের ক্রীড়া ভাতা কর্মসূচি বেতন কাঠামোর আওতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কর্মসূচির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’।অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

ক্রীড়া ভাতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
৩০ মার্চ ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
২০১৮ সালের পর জন্ম নেওয়া শিশুরা হামের টিকার আওতায় আসেনি। সে জন্যই মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে? আপনি কি মনে করেন?

২০১৮ সালের পর জন্ম নেওয়া শিশুরা হামের টিকার আওতায় আসেনি। সে জন্যই মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে? আপনি কি মনে করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ জন