সংবাদ
আন্তর্জাতিক বাজারে ‘দাম কমলেই’ দেশে জ্বালানি তেলের ‘দাম কমানো হবে’

আন্তর্জাতিক বাজারে ‘দাম কমলেই’ দেশে জ্বালানি তেলের ‘দাম কমানো হবে’

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের ‘দাম কমলেই’ দেশের বাজারেও ‘দ্রুত মূল্য সমন্বয় করে’ সেই সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাজারের বাস্তবতা ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে সরকার ‘বাধ্য হয়ে’ জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে।সোমবার (১ জুন) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।জ্বালানি তেলের দাম কমানোর বিষয়ে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘অতীতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও সব সময় তার সুফল মানুষ দ্রুত পায়নি। তবে বর্তমান সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। বিশ্ববাজারে দাম কমে এলে জনগণের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের একটি নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে। তবে এপ্রিল মাসে মূল্য সমন্বয় করা হওয়ায় মে মাসে নতুন করে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং বিশ্ববাজারে দামের ওঠানামার কারণে সরকারকে নতুন করে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।তিনি বলেন, ‘সরকার কখনোই অপ্রয়োজনীয়ভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে চায় না। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাবে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে কিছু ক্ষেত্রে মূল্য সমন্বয় ছাড়া বিকল্প ছিল না।’তিনি বলেন, ‘ডিজেলে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কম রাখতে এবারও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তারপরও পরিস্থিতির কারণে অন্যান্য কয়েকটি জ্বালানির ক্ষেত্রে মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে।’এর আগে রবিবার রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানো হয়।
৫২ মিনিট আগে

সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে মার্কেট-শপিংমল বন্ধের নির্দেশনা

সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে মার্কেট-শপিংমল বন্ধের নির্দেশনা

গণমাধ্যমের কাজে অনৈতিক বাধা দিলে ‘জিরো টলারেন্স’

গণমাধ্যমের কাজে অনৈতিক বাধা দিলে ‘জিরো টলারেন্স’

আন্তর্জাতিক বাজারে ‘দাম কমলেই’ দেশে জ্বালানি তেলের ‘দাম কমানো হবে’

আন্তর্জাতিক বাজারে ‘দাম কমলেই’ দেশে জ্বালানি তেলের ‘দাম কমানো হবে’

দিল্লীতে বসছে বিজিবি-বিএসএফের শীর্ষ সম্মেলন

দিল্লীতে বসছে বিজিবি-বিএসএফের শীর্ষ সম্মেলন

৬ নবজাতকের মৃত্যুর বিচার নিশ্চিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আলোচনা

৬ নবজাতকের মৃত্যুর বিচার নিশ্চিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আলোচনা

বাসের ভেতর শ্রমিকের মরদেহ লুকিয়ে রাখলেন সহকর্মীরা

বাসের ভেতর শ্রমিকের মরদেহ লুকিয়ে রাখলেন সহকর্মীরা

জাম কুড়াতে গিয়ে পুকুরে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু

জাম কুড়াতে গিয়ে পুকুরে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু

চট্টগ্রাম ও শরীয়তপুরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঝটিকা মিছিল

চট্টগ্রাম ও শরীয়তপুরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঝটিকা মিছিল

জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সততা, নিষ্ঠা ও সমন্বিত কাজের বিকল্প নেই

জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সততা, নিষ্ঠা ও সমন্বিত কাজের বিকল্প নেই

তীব্র গরমে ধান কাটতে গিয়ে প্রাণহানি

তীব্র গরমে ধান কাটতে গিয়ে প্রাণহানি

মতামতমতামত

ইন্দো-প্যাসিফিকে শক্তির নতুন সমীকরণ: সর্বোচ্চ উচ্চতায় ভারত-অস্ট্রেলিয়া প্রতিরক্ষা জোট

​ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দ্রুত বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দুই দেশই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, এই অংশীদারিত্ব এখন শুধু সাধারণ কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, বরং কৌশলগত নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ভারত–অস্ট্রেলিয়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সংলাপে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানো, প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ বিনিয়োগ এবং ইন্দো-প্যাসিফিকে নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ এবং অস্ট্রেলিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মারলেসের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে স্পষ্ট হয়েছে যে, দুই দেশের কৌশলগত জোট এখন এই অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণের বড় হাতিয়ার হয়ে উঠছে।​বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের পর থেকে দুই দেশের এই সম্পর্কের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। যৌথ সামরিক মহড়া, নৌ-সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের মতো সব ক্ষেত্রেই দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে। এই সংলাপ এখন দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, বাণিজ্য রুট এবং সামরিক ভারসাম্য—সবকিছুই এখন এই অঞ্চলের ওপর নির্ভর করছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার এমন ঘনিষ্ঠতা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।​অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকেও এই সম্পর্ক নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো বার্তা দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে অস্ট্রেলিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মারলেস বলেন, "ভারত ও অস্ট্রেলিয়া এখন কখনও এতটা কৌশলগতভাবে একমত ছিল না।" তার এই মন্তব্যকে বিশেষজ্ঞরা শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ভাষা হিসেবে দেখছেন না, বরং একে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি পরোক্ষ অবস্থান হিসেবেই বিবেচনা করছেন। ​বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে—বিশেষ করে যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে। এতে শুধু দুই দেশের নিরাপত্তাই বাড়বে না, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি শক্তিশালী বিকল্প শক্তি গড়ে উঠবে। সব মিলিয়ে, ভারত–অস্ট্রেলিয়া প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন আর শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে, যা আগামী দিনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।

ব্যাংক সংস্কার নাকি পুরনো মালিকদের পুনর্বাসন?

কিছুদিন আগে সংসদে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন সাবেক মালিকরা, তাও তুলনামূলক সহজ শর্তে। ফলে নতুন সরকারের এই পদক্ষেপকে অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাংক সংস্কার উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখছেন।ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণ এবং একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেয়ায় ওয়াকিবহাল মহলে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল যে বিএনপি সরকার সম্ভবত পুঁজি-লুটেরা ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের পথে হাঁটতে যাচ্ছে। সম্প্রতি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ইসলামি ধারার পাঁচ ব্যাংকের একীভূত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি তিনি এ-ও জানিয়েছেন, নামমাত্র শর্তে পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ দেয়া হবে না।তবে ব্যাংক উদ্যোক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সংশোধিত আইনের ধারায় যাঁরা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে গেছেন, তাদের ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ নিয়ে তারা শঙ্কিত। তাদের মতে, অতীতে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আবার ফিরে এলে খাতে নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।কারা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে গেছে, তা সাধারণ মানুষও জানে। তাই তাদের ফেরার সুযোগ দেয়া হলে ব্যাংক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমে যেতে পারে। এতে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের আরও গভীরভাবে ভাবা উচিত। যদিও গভর্নর ব্যাংক মালিক-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠকে আশ্বস্ত করেছেন যে সংশোধিত আইনের শর্ত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে সাবেক মালিকদের ফেরার সুযোগ হবে না। একই সঙ্গে পাঁচটি ব্যাংকের চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে।এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। তাহলে সিদ্ধান্তগুলো আরও গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হতো।বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। একদিকে খেলাপি ঋণের পাহাড়, অন্যদিকে মূলধন ও নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতির তীব্র চাপ। এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধিত) আইন’ এবং এর বিশেষ কিছু ধারা নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের মধ্যে। বিশেষ করে, যারা একসময় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ বা লুটপাট করে চলে গেছেন, আইনি ফাঁকফোকরে তাদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ থাকা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো বাংলাদেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এমন সময়ে জবাবদিহির দুর্বলতা প্রকাশ পেলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি গভর্নরকে দেয়া চিঠিতে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সংস্কার প্রস্তাব পেশ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির জন্য মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার আদলে একটি পেশাদার ‘জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে স্থগিতাদেশের অপব্যবহার রোধ ও ফাস্ট-ট্র্যাক রিকভারি বেঞ্চ চালু করা।সংগঠনটি সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহভাতা বন্ধ না করার অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে দক্ষ জনবল ধরে রাখা সম্ভব হয়। ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে স্টক লভ্যাংশের ওপর অতিরিক্ত কর থেকে অব্যাহতি দাবি করেছে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলোকে সরাসরি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে না পাঠিয়ে একটি বিশেষ ‘ট্রান্সফরমেশন ক্যাটাগরিতে রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে।বিএনপি সরকার একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মালিকানা আবার পুরোনো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার সুযোগ রেখে আইন তৈরি করেছে। এটি একটি ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।১৯৮২ সাল থেকে দেশে বেসরকারি মালিকানায় ব্যাংক স্থাপিত হতে শুরু করে। বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে এখন মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৬১। অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, দেশে এতগুলো ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থে অতীতের সরকারগুলো বিপুলসংখ্যক বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়েছে। বাংলাদেশের ৫৫ বছরে যেসব ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ধনবান হয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশ কোনো না কোনো ব্যাংকের মালিক বা পরিচালক। তারা নিজেদের ব্যাংক থেকে খুব বেশি ঋণ নিতে না পারলেও একে অন্যের ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এভাবে তারা দেশের ব্যাংকঋণের ওপর প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশের খেলাপি ঋণের বড় অংশ তাদের কাছেই আটকে রয়েছে।বাংলাদেশের অধিকাংশ ধনকুবেরের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকের মালিকানা-বিতরণ ছিল সেই পৃষ্ঠপোষকতার অন্যতম মাধ্যম।সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ মোট ব্যাংকঋণের বড় অংশ। এই বিপুল খেলাপি ঋণ উদ্ধারের বিষয়ে বর্তমান সরকার কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বিশেষ করে পুরনো মালিকদের ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায়।দেশের দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকিং খাতকে পুনরুদ্ধারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এর মূল লক্ষ্য ছিল অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং দায়ীদের স্থায়ীভাবে মালিকানা থেকে অপসারণ করা। কিন্তু অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেয়ার সময় নতুন ধারা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।সব মিলিয়ে নতুন আইনটি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রক্রিয়াকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।আগের অধ্যাদেশে যেখানে দায়ীদের জন্য কোনো ধরনের ছাড় ছিল না, সেখানে এখন কিস্তিতে মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে এটি ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটে জড়িতদের জন্য এক ধরনের সুবিধা বা প্রণোদনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।নতুন আইনের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের নিয়ে ব্যাংকপাড়ায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। খাতসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা সতর্ক করে বলেছেন, একবার কোনো ব্যাংক সাবেক মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। যাদের কারণে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের হাতেই আবার নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়া সুশাসনের পরিপন্থী। অতীতে যেসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও ব্যাংককে মূলধন সংকটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে, তারা যদি আবার নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে, তাহলে সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এমনকি আতঙ্কিত হয়ে আমানতকারীরা অর্থ তুলে নেয়ার চেষ্টা করলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।সাবেক মালিকরা পুনরায় নিয়ন্ত্রণে এলে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা কাঠামো এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টিও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি তাদের প্রত্যাবর্তন চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকেও বিঘ্নিত করতে পারে।যেসব ব্যক্তি আগে ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার বা অনিয়মিত ঋণ গ্রহণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা যদি সামান্য অংশ পরিশোধ করে আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরতে পারেন, তবে তা আর্থিক খাতে দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। এতে অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার বদলে দায়ীদের কার্যত পুরস্কৃত করা হবে এবং ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

বরেন্দ্রভূমির আদিবাসীদের পানি সংকট

‘পানির অপর নাম জীবন’—সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এখন বলা হচ্ছে, বিশুদ্ধ পানির অপর নামই জীবন। আর এই পানি নিয়েই চলছে আদিবাসীদের জীবনসংগ্রাম। বিশেষত বরেন্দ্রভূমির আদিবাসীদের এ সংগ্রাম এখন নিরন্তর।সাধারণভাবে বরেন্দ্রভূমি বলতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলাগুলোকে বোঝায়। ৪০ বছর আগেও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ২১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি ছিল সহজলভ্য। সরকারের পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা ও ওয়াপদার জরিপে দেখা যায়, এই ২১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৮৭টি ইউনিয়নই বর্তমানে পানির চরম সংকটে রয়েছে।১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে বরেন্দ্র এলাকায় মাটির নিচে পানির গড় নিম্নস্তর ছিল ৩৫ ফুট। ২০২১ খ্রিস্টাব্দে তা ৭০ ফুটে নেমে আসে। কোনো কোনো এলাকায় এই স্তর ২০০ ফুটেরও নিচে চলে যায়। এই অঞ্চলের ভূমির গঠন ˆশলী উঁচু-নিচু সিঁড়ির মতো এবং লাল এঁটেল মাটির প্রাধান্য বেশি। বৃষ্টির অভাবে এই মাটি শক্ত হয়ে পাথরের মতো হয়ে যায়, আর সামান্য বৃষ্টিতেও পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে এই অঞ্চলের কৃষক ও প্রান্তিক মানুষদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়।খাদ্য ও পানি মানুষের মৌলিক মানবাধিকারের অন্যতম শর্ত। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলে (রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ) বসবাসরত সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, মালো, কোলসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে পানি আজ দীর্ঘস্থায়ী ও নির্মম সংগ্রামের নাম। একদিকে প্রকৃতির রুক্ষতা, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির আশঙ্কাজনক পতন এবং কাঠামোগত সামাজিক বৈষম্য—এই তিনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বরেন্দ্রভূমির আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন চরম অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত।ভৌগোলিক গঠনের কারণেই বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি লাল এবং এর পানি ধারণক্ষমতা অত্যন্ত কম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত দুই দশকে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। আগে যেখানে বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হতো, এখন সেখানে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা যাচ্ছে।গবেষকদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১ থেকে ২ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে (বিশেষ করে মার্চ থেকে মে) পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে ৭০-৮০ ফুট, এমনকি কোনো কোনো এলাকায় ২শ’ ফুটেরও নিচে নেমে যায়। ফলে সাধারণ হস্তচালিত টিউবওয়েল তো বটেই, অনেক গভীর নলকূপও পানি তুলতে ব্যর্থ হয়।আদিবাসী পাড়াগুলো সাধারণত মূল সমতল থেকে দূরে, উঁচু ঢিবি বা প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় এই সংকট তাদের ওপর সবচেয়ে আগে এবং সবচেয়ে মারাত্মকভাবে আঘাত করে।পানি সংকটের সবচেয়ে বড় ও প্রত্যক্ষ শিকার আদিবাসী নারীরা। সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, পাহান, তুরী, রাজোয়াড়, ভূঁইয়া, কর্মকারসহ আদিবাসী সমাজে ঐতিহ্যগতভাবে পানি সংগ্রহের প্রধান দায়িত্ব নারীদের ওপর বর্তায়।খরা মৌসুমে তীব্র রোদ ও ৪০-৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপেক্ষা করে নারীরা মাইলের পর মাইল হেঁটে দূরের সচল গভীর নলকূপ বা খাড়ি (প্রাকৃতিক খাল) থেকে পানি সংগ্রহ করে। এক কলস পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রতিদিন ৪-৫ ঘণ্টা শুধু পানি সংগ্রহে ব্যয় হওয়ায় তারা চরম শারীরিক ক্লান্তি ও পুষ্টিহীনতায় ভোগে।বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেক সময় তারা পুকুর, ডোবা বা দূষিত খাড়ির পানি পান ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। ফলে ডায়রিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েড ও আর্সেনিকোসিসসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ এবং নারীদের জরায়ুর সংক্রমণ ও চর্মরোগ ব্যাপকভাবে দেখা যায়।বরেন্দ্র অঞ্চলের অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা ধান চাষ, যা অত্যন্ত পানিনির্ভর। কিন্তু পানি বণ্টনে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান।বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পরিচালিত গভীর নলকূপগুলোর নিয়ন্ত্রণ সাধারণত স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী মহলের হাতে থাকে। ফলে প্রান্তিক ও আদিবাসী কৃষকেরা পানি বণ্টনে পিছিয়ে পড়ে। প্রভাবশালী কৃষকদের জমি আগে সেচ পায়, আর আদিবাসীদের জমি পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে যায়।২০২২ সালের ২৩ মার্চ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে সেচের পানি না পেয়ে ক্ষোভ ও হতাশায় দুই সাঁওতাল ভাই—অভিনাথ মারান্ডি ও রবি মারান্ডি—গভীর নলকূপের সামনে বিষপানে আত্মহত্যা করেন। এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; এটি বরেন্দ্র অঞ্চলের কাঠামোগত বৈষম্যের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।পানি সংকট শুধু জীবিকা নয়, আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোকেও ভেঙে দিচ্ছে। জীবিকার অভাবে বহু পরিবার গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছে। তারা গার্মেন্টস শিল্প, ইটভাটা ও নির্মাণশ্রমে যুক্ত হচ্ছে।ফলে গ্রামীণ আদিবাসী জনপদগুলো পুরুষশূন্য হয়ে পড়ছে এবং ঐতিহ্যবাহী উৎসব ও সামাজিক বন্ধন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে।এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পদ্মা নদীর পানি খালপথে বরেন্দ্র অঞ্চলে আনার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষর পানি ব্যবস্থাপনায় আদিবাসী কৃষকদের বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। প্রাচীন পুকুর, খাস জলাশয় ও খাড়ি পুনঃখনন ও সংরক্ষণ করা। কমিউনিটি ভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা। কম পানিনির্ভর ফসল চাষে কৃষকদের প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ দেয়া।বরেন্দ্রভূমির আদিবাসীদের পানি সংকট কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর মানবাধিকার সংকট। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সবার জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার তখনই অর্থবহ হবে, যখন এই অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও তার অন্তর্ভুক্ত হবে।রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই এই নীরব সংকটের দিকে মনোযোগ দিতে হবে—নইলে বরেন্দ্রভূমির এই জীবনসংগ্রাম আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।[লেখক: কলামিস্ট]

তামাকের প্রলোভন থেকে কিশোর-তরুণদের বাঁচান

তামাকের ক্ষতি জানে না এমন মানুষ নেহায়েত কম। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, তামাক সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর বড় কারণ। বিশ্বের এক নিরব মহামারীর নাম ‘তামাক’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে ৮৭ লক্ষাধিক মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এর মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়, যার বড় অংশ শিশু ও নারী। বাংলাদেশেও তামাক একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা বহুমাত্রিক সংকট আরো প্রকট করে তুলছে। দেশে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তামাকজনিত রোগে বিশেষ করে- ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালমৃত্যুবরণ করেন। টোব্যাকো এটলাস-২০২৫ এর তথ্য মতে, তামাকজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৯৯ হাজারের অধিক মানুষ প্রাণ হারায়! তামাকের সৃষ্ট রোগের চিকিৎসা খরচ ৮৭ হাজার কোটি টাকা! এই লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং আর্থিক ও অন্যান্য সব ক্ষয়-ক্ষতি প্রতিরোধ সম্ভব হবে, যদি প্রকৃতপক্ষে তামাক নিয়ন্ত্রণ করা যায়।সর্বগ্রাসী তামাকের ভয়াবহতা রুখে দিতে ১৯৮৭ সাল থেকে ৩১ মে দিনটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলোর উদ্যোগে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ৯০’র দশক থেকে বাংলাদেশেও তামাকমুক্ত দিবস পালিত হচ্ছে। জনসাধারণের মাঝে তামাক বিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি এবং তামাক বিরোধী সামাজিক আন্দোলনটি জোরদারকরণে দিবসটির ভূমিকা অগ্রগণ্য। এক সময় আমরা ব্যক্তি উদ্যোগে ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর তৎপরতায় দিবসটি পালন করা হতো। সরকার এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের আওতায় ‘জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল’ গঠন করে ২০০৭ সালে।সরকারি-বেসরকারি সংস্থা/দপ্তরসমূহের সমন্বয়ে এবছরও বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০২৬ পালনে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবছর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি।’ বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিপাদ্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তামাক ও নিকোটিন পণ্য উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের লক্ষ্য করে নতুন নতুন কৌশলে নেশায় আসক্তির অপকৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে তামাক পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করছে। এমনকি তামাক কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রীয় আইন, বিধিমালা, নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করছে না! তাদের প্রধান টার্গেট আমাদের ভষ্যিত প্রজন্ম, যাদেও নেশায় আসক্ত করে বছরের পর বছর মুনাফা অর্জন করতে চায়। উদ্বেগের বিষয় হলো- বাংলাদেশ যখন ‘ইয়ুথ ডিভিডেন্ট’ এর সুফল পেতে চলেছে, সেই সময়ে তামাক কোম্পানিগুলোও তরুণদের নেশার জালে আটকাতে ফাঁদ পেতেছে।কিশোর-তরুণ: তামাক কোম্পানির প্রধান লক্ষ্য:তামাক কোম্পানিগুলো জানে, অধিকাংশ ব্যবহারকারী কৈশোরেই নিকোটিন পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। নিকোটিন অত্যন্ত আসক্তি সৃষ্টিকারী পদার্থ; অল্প বয়সে এটি মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য মাদকাসক্তির ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে অন্তত ১ জন তামাক বা নিকোটিনজাত পণ্য ব্যবহার করে। বাংলাদেশেও ১৩-১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধূমপান ও অন্যান্য তামাক ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বিদ্যমান। এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; বরং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যও ক্ষেত্রেও বড় হুমকি। শিশু-কিশোরদের মধ্যে তামাক পণ্য সেবনের ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশকে কোনভাবেই ‘ইয়ুথ ডিভিডেন্ট’ এর সুবিধা তো দিবেই না, বরং আমাদের একটি অসুস্থ প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা রাষ্ট্রের বোঝা হতে পারে!ই-সিগারেট বা ভেপ: নিরাপদ নয়, নেশায় আসক্তির নতুন ফাঁদ: তামাক কোম্পানিগুলোর অপ্রচারে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে মনে করেন, ই-সিগারেট বা ভেপিং তুলনামূলক নিরাপদ। বাস্তবে এটি নিকোটিন আসক্তির আধুনিক রূপ। গ্রামাঞ্চলেও ই-সিগারেট বিপণন, ব্যবহার বাড়ছে। কারণ, ই-সিগারেট পণ্যগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং এর মধ্যে বিভিন্ন ফ্লেভার ব্যবহার করে থাকে, যা তরুণ ও উঠতি বয়সিদের আর্কষণের মূল কারণ। উপরন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে এগুলোকে তরুণদের কাছে ‘ফ্যাশন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে সেগুলো বেচা-কেনা চলছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ই-সিগারেটসহ উদীয়মান তামাকজাত পণ্যসমূহ প্রচলিত তামাকের মতোই আসক্তি সৃষ্টিকারী। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আরও অধিক ক্ষতিকর। আরেকটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ক্ষতিকর! ই-সিগারেট ব্যবহারে ফুসফুসের ক্ষতি, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, স্ট্রোক এবং আচরণগত সমস্যার আশঙ্কা বাড়ে। জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার ই-সিগারেট আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ক্ষতিকর বিবেচনায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারতসহ বিশ্বের অন্তত ৪৭টি দেশ ই-সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। অন্তবর্তী সরকার ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারী করে দেশে ই-সিগারেট ও ইমাজিং তামাক পণ্য নিষিদ্ধ এবং বিক্রয়স্থলে তামাক পণ্য প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু, পরিতাপের বিষয় এ বছর সংশোধিত আইনে এ দুটো অতি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাদ দেয়া হয়। ফলে তামাক কোম্পানিগুলো আরো আগ্রাসী হতে পারে। তরুণ প্রজন্মের সুরক্ষায় প্রয়োজনে নতুন আইন করে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পণ্য নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। মহামান্য আপিল বিভাগ সিভিল আপিল নং ২০৪-২০৫/২০০১ মামলায় ০১/০৩/২০১৬ তারিখের রায়ে দেশে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন। রায়ে দেশে নতুন কোনো তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন না দেয়া এবং বিদ্যমান তামাক কোম্পানিগুলোকে বিকল্প পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করার নির্দেশনাও দেয়া হয়। সুতরাং এটি মানতে হবে।তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো জরুরি-আইন প্রয়োগের মাধমে তামাক পণ্যের সব ধরনের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা কঠোরভাবে বন্ধ করা; নাটক, চলচ্চিত্র, ওয়েবসিরিজ, সোস্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল কনটেন্টে ধূমপান, তামাক পণ্য সেবনের দৃশ্য প্রদর্শন বন্ধ করা; প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ করে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ ও ইমার্জিং তামাক পণ্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ অথবা নিষিদ্ধ করা; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে ও আশপাশে তামাকপণ্য বিক্রয় ও প্রচারণা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা; শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা; তামাক কোম্পানি থেকে সরকারের অংশীদারিত্ব প্রত্যাহার করা। বাংলাদেশ তরুণ ও যুবশক্তির দেশ। এই তরুণরাই আমাদের সামগ্রীক উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের মূল চালিকাশক্তি। এই বিপুল জনগোষ্ঠিকে নিকোটিন ও তামাকের আসক্তি থেকে রক্ষা করা মানে, দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখা। আসুন তামাক কোম্পানির ছলনার মুখোশ খুলে দিই। তামাকের বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেকে রক্ষা করি এবং প্রিয়জনদের ও আপনার আশপাশে সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করি। তামাকমুক্ত সমাজ ও দেশ গড়ি।[লেখক: অধ্যাপক, ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ]

গতিশীলতা থেকে মৃত্যুঝুঁকি: ই-রিকশার সস্তা ব্যাটারির চড়া মাশুল

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা (যা ই-রিকশা বা ইজি-বাইক নামে পরিচিত) চলাচল করছে। বিশেষ করে ঢাকার মতো শহরগুলোতে এই যানবাহনগুলো লাখো মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। যানবাহনের সংখ্যাটি বিশাল হলেও, এই খাতটি এখনো বড় অংশ অনিয়ন্ত্রিত রয়ে গেছে। ফলে এর ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে।ধারণা করা হয়, বাংলাদেশের ৪০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রায় সবকটিতেই বর্তমানে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রস্তুতকারক থেকে শুরু করে কিছু সরকারি উদ্যোগও স্বীকার করে যে, এই খাতে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারিই প্রধান প্রযুক্তি।বাংলাদেশে ই-রিকশায় লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহারের মূল কারণ হলো এগুলো তুলনামূলক সস্তা এবং সহজলভ্য। দেশের রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ানো স্বল্পমূল্যের রিকশাগুলোর জন্য এটিই সবচেয়ে ব্যবহারিক পছন্দ। যদিও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে অনেক সুবিধা রয়েছে, তবুও কম প্রাথমিক খরচ এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর কারণে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারিই আধিপত্য বজায় রেখেছে।সাধারণত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আয়ু লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, প্রায় ৩ থেকে ৪ গুণ। লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির আয়ু সাধারণত ৩-৫ বছর হলেও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ১০ বছর বা তার বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ই-রিকশার লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির আয়ু সাধারণত ২ বছরেরও কম হয়। এর পেছনে প্রতিকূল অপারেটিং পরিবেশ, ত্রুটিপূর্ণ চার্জিং ব্যবস্থা এবং নিম্নমানের ব্যাটারি দায়ী। একটি ই-রিকশায় সাধারণত ৪ থেকে ৬টি ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। যদি আমরা লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির গড় আয়ু ৪ বছর ধরি এবং রিকশা প্রতি ৪টি ব্যাটারি হিসাব করি, তবে বছরে প্রায় ৪০ লাখ ব্যাটারি অকেজো হয়ে পড়ছে। বাস্তবে এই সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি।লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং বা পুনর্প্রক্রিয়াজাতকরণের চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। পিওর আর্থ এবং ইউনিসেফ-এর ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবহৃত লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির মাত্র ৩০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক বা বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে রিসাইকেল করা হয়। বাকি ৭০ শতাংশই অনিয়ন্ত্রিত এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে কোনো ধরনের নিরাপত্তা মান না মেনেই প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে।যখন ব্যাটারিগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে রিসাইকেল করা হয়, তখন এর প্রায় সবটুকু সীসা ধূলিকণা, ধোঁয়া এবং দূষিত বর্জ্যের মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা মারাত্মক দূষণ ঘটায়। বিপরীতে, নিয়ন্ত্রিত ও বৈধ উপায়ে রিসাইক্লিং করলে ৯৫ শতাংশের বেশি সীসা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, যা দূষণের হার ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনে।ইউনিসেফ-এর মতে, বাংলাদেশে আনুমানিক ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম এর বেশি, যা অনুমোদিত সীমার ওপরে। অনিরাপদ ব্যাটারি রিসাইক্লিং থেকে সৃষ্ট সীসা দূষণকে এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মনে করা হয়।পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর অধীনে সুনির্দিষ্ট বিধিমালা এবং এসআরও (SRO) জারি করা হলেও এর প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। স্থানীয় সরকারগুলোর কাছে প্রায়ই এই অনিবন্ধিত রিকশাগুলো নিয়ন্ত্রণ করার বা অবৈধ রিসাইক্লিং কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সক্ষমতা বা আইনি ম্যান্ডেট থাকে না। এছাড়া একটি কেন্দ্রীয় তদারকি ব্যবস্থা না থাকায় ব্যাটারি বর্জ্য নিরাপদে সংগ্রহ ও অপসারণ নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।সীসা দূষণ কেবল জনস্বাস্থ্য সমস্যাই নয়, এটি একটি বড় অর্থনৈতিক বোঝাও বটে। ইউনিসেফ ও পিওর আর্থ-এর তথ্যমতে, সীসা দূষণের ফলে বাংলাদেশে বার্ষিক প্রায় ১৫.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়, যার মূল কারণ উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং চিকিৎসা ব্যয়ের বৃদ্ধি। আনুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থা, নিরাপদ ব্যাটারি বিকল্প এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সীসা দূষণ রোধ করা গেলে তা কেবল স্বাস্থ্যই রক্ষা করবে না, বরং বিশাল অর্থনৈতিক সুফলও দেবে।ই-রিকশার অনিয়ন্ত্রিত প্রসারের ফলে সৃষ্ট সীসা দূষণ সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।প্রথমত, ক্ষতিকর ও অবৈধ রিসাইক্লিং বন্ধে বিদ্যমান ব্যাটারি অপসারণ বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি নজরদারি ও জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো জরুরি।দ্বিতীয়ত, সকল ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় এনে পৌরসভা বা স্থানীয় সরকার পর্যায়ে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।তৃতীয়ত, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার বিভাগের তত্ত্বাবধানে আনুষ্ঠানিক ও নিরাপদ রিসাইক্লিং অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।চতুর্থত, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি কমাতে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবর্তে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতো আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করতে হবে।সবশেষে, রিকশা মালিক, চালক এবং ব্যাটারি বিক্রেতাদের মাঝে সীসা দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে, যাতে একটি জনবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়। ই-রিকশার উত্থান মানুষের যাতায়াত সহজ করেছে এবং অনেকের জীবিকার সংস্থান করেছে, কিন্তু এটি একই সাথে একটি নীরব স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা তৈরি করেছে। এখনই যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে, যে যানবাহনটি আমাদের সাশ্রয়ী যাতায়াতের কথা ছিল, সেটিই হয়তো আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বিষ হয়ে দাঁড়াবে।

“সমঝোতার ইঙ্গিত না কৌশলগত বার্তা? ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় সতর্ক আশাবাদ”

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সাম্প্রতিক বক্তব্যে যে ইঙ্গিত মিলেছে—ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক সমঝোতা ঘনিয়ে এসেছে—তা প্রথম দর্শনে যতটা বড় “ব্রেকথ্রু” মনে হচ্ছে, বাস্তবে ছবিটা অনেক বেশি জটিল এবং কৌশলনির্ভর। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “there will be no nuclear weapons,” এবং দাবি করেছেন যে Iran এই বিষয়ে সম্মত হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির অভিজ্ঞতায় এমন সরল সম্মতি সচরাচর দেখা যায় না। বরং এখানে ভাষার সূক্ষ্ম ব্যবহার এবং ব্যাখ্যার জায়গা খোলা রাখাই বেশি সম্ভাব্য। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, কিন্তু একই সঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার ব্যাপারে তারা কখনোই স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ফলে ট্রাম্পের এই দাবি আসলে একটি রাজনৈতিক বার্তা—যার উদ্দেশ্য আমেরিকার অভ্যন্তরীণ জনমত এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের আশ্বস্ত করা।একই সঙ্গে ট্রাম্প যে কৌশলটি ব্যবহার করছেন, সেটি হল “deal এবং threat”—একদিকে তিনি বলছেন একটি “very good deal” খুব কাছাকাছি, অন্যদিকে সরাসরি ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক বিকল্পও প্রস্তুত রয়েছে। ইউনাইটেড স্টেটস-এর এই দ্বিমুখী অবস্থান নতুন নয়; এটি বহুদিনের পরীক্ষিত কূটনৈতিক চাপের পদ্ধতি, যেখানে আলোচনার দরজা খোলা রাখা হয়, কিন্তু একই সঙ্গে প্রতিপক্ষকে ভয়ের মধ্যে রাখা হয়। এর ফলে ইরান আলোচনার টেবিল ছাড়তে পারে না, আবার পুরোপুরি নিজের অবস্থান থেকেও সরে আসে না। এই টানাপোড়েনই আসলে বর্তমান আলোচনার মূল বৈশিষ্ট্য।তবে এই সমঝোতার প্রভাব শুধু ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। ইজরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো চাইছে স্থিতিশীলতা এবং সংঘাতহীন পরিবেশ। ফলে ট্রাম্পের এই বক্তব্য একধরনের বহুমুখী বার্তা—একদিকে ইজরায়েলকে আশ্বস্ত করা যে ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে আরব দেশগুলোকে বোঝানো যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে না। অর্থাৎ এটি শুধুমাত্র একটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনা নয়, বরং একটি আঞ্চলিক কৌশলগত সমীকরণের অংশ।অর্থনৈতিক দিকটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প যে “মাড়িটাইম রুটস ” পুনরায় সচল হওয়ার কথা বলেছেন, তা সরাসরি হরমুজ প্রণালীর সঙ্গে সম্পর্কিত—যেখান দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল পরিবাহিত হয়। ইরান-আমেরিকা উত্তেজনা কমে গেলে এই রুট নিরাপদ হবে, তেলের দামের উপর চাপ কমবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসতে পারে। তাই এই চুক্তি কেবল পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—এই আলোচনার মূল কারিগরি দিকগুলো এখনও অনির্ধারিত রয়ে গেছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা কী হবে, ইতিমধ্যে সমৃদ্ধ করা উপাদান কোথায় যাবে, এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের কাঠামো কীভাবে কাজ করবে—এই প্রশ্নগুলোর কোনও স্পষ্ট উত্তর এখনও সামনে আসেনি। এই বিষয়গুলো নিষ্পত্তি না হলে কোনও চুক্তিকেই কার্যকর বা দীর্ঘস্থায়ী বলা যায় না। ফলে “breakthrough” শব্দটি এখানে কিছুটা আগেভাগেই ব্যবহার করা হচ্ছে বলেই মনে হয়।সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে বলা যায়—একটি নিয়ন্ত্রিত আশাবাদ এবং কৌশলগত চাপের মিশ্রণ। আলোচনার অগ্রগতি আছে, কিন্তু চূড়ান্ত সমাধান এখনও দূরে। ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে রাজনৈতিকভাবে সাফল্যের বার্তা দিতে চাইছে, অন্যদিকে বাস্তবে কঠোর অবস্থান বজায় রেখে ইরানের উপর চাপ অব্যাহত রাখছে। এই দ্বৈত কৌশল কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কারা কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত এবং সেই ছাড় কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত করা যায় তার উপর।

ত্যাগের ঈদ, না প্রদর্শনের?

কোরবানির ঈদ মুসলমানদের জন্য শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি আত্মত্যাগ, সংযম, মানবতা ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের এক গভীর শিক্ষা। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই যুগ যুগ ধরে মুসলমানরা কোরবানির মাধ্যমে নিজেদের ভেতরের অহংকার, লোভ ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে বিসর্জনের শিক্ষা গ্রহণ করে এসেছে।কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উৎসব পালনের ধরনও বদলেছে। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি ব্যক্তিগত অনুভূতি ও ধর্মীয় অনুশীলনের ভেতরেও এক নতুন ধরনের প্রদর্শন প্রবণতা তৈরি করেছে। এখন কুরবানির ঈদ এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় গরুর ছবি, ভিডিও, লাইভ, দাম নিয়ে আলোচনা ও ব্যক্তিগত প্রদর্শনের নানা উপস্থাপনায়। কোথাও বিশাল আকৃতির গরুর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি, কোথাও “সবচেয়ে দামি গরু” কেনার গল্প, আবার কোথাও কোরবানির মুহূর্তকে রিল বানিয়ে প্রচার। প্রশ্ন জাগে কোরবানি কি ধীরে ধীরে ত্যাগের চেয়ে প্রদর্শনের উৎসবে পরিণত হচ্ছে?একসময় কোরবানির আনন্দ ছিল পরিবার ও প্রতিবেশীকে ঘিরে। বাড়ির উঠানে গরু আসত, শিশুরা আনন্দ করত, পরিবারের সবাই মিলে প্রস্তুতি নিত। কোরবানির মূল গুরুত্ব ছিল ভাগাভাগি ও সহমর্মিতায়। মাংসের একটি বড় অংশ দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হতো, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হতো। এখনো সেই চর্চা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তবে তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি বিষয় নিজেকে দৃশ্যমান করে তোলার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে যেন প্রতিটি অনুভূতিকেই “দেখাতে” হয়। কী খাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি, কী কিনছি- সবকিছুই প্রকাশের প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠেছে। কোরবানির ঈদও সেই সংস্কৃতির বাইরে নেই। অনেকে গরু কেনার আগেই পরিকল্পনা করেন কীভাবে সেটি ফেসবুকে উপস্থাপন করবেন। গরুর নাম, ওজন, দাম সবকিছু যেন সামাজিক মর্যাদার এক অলিখিত প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।অবশ্য সবাই প্রদর্শনের জন্য এমনটি করেন না। অনেকেই আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য ছবি দেন। কিন্তু সমস্যাটি তখনই তৈরি হয়, যখন ধর্মীয় একটি অনুশীলন সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। কারণ কোরবানির মূল শিক্ষা কখনোই বাহ্যিক আড়ম্বর নয়; বরং আত্মার পরিশুদ্ধি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” অর্থাৎ কোরবানির প্রকৃত মূল্য নিহিত রয়েছে মানুষের নিয়ত ও আত্মিক চেতনায়।আজকের সমাজে এই বিষয়টি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ওপর এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু যখন দেখে কোরবানির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে গরুর দাম, আকার বা সামাজিক মর্যাদা, তখন তার মনেও ধর্মীয় অনুশীলনের একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হতে পারে। সে হয়তো ভাবতে শুরু করে বড় কোরবানি মানেই বড় সম্মান। অথচ ইসলাম কখনো সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে প্রতিযোগিতা করতে বলেনি।এই প্রদর্শন সংস্কৃতির আরেকটি সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। সমাজে এখনো এমন বহু মানুষ আছেন, যারা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কোরবানি দিতে পারেন না। কেউ কেউ সামর্থ্য না থাকলেও সামাজিক চাপে পড়ে ঋণ করে কোরবানি দেন। কারণ আশপাশের মানুষের চোখে ছোট হয়ে যাওয়ার ভয় কাজ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন একের পর এক “বিলাসী কোরবানির” ছবি ভেসে আসে, তখন নিম্ন আয়ের মানুষের ভেতরে এক ধরনের মানসিক অস্বস্তি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।আমি দেখেছি, অনেক মানুষ সারা বছর শহরে সীমিত আয়ে কষ্ট করে জীবনযাপন করলেও কোরবানির ঈদে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান এক ধরনের সামাজিক প্রদর্শনের মানসিকতা নিয়ে। বড় একটি গরু কিনে গ্রামের মানুষকে দেখানো, আত্মীয়স্বজনের প্রশংসা পাওয়া কিংবা “তারা এখন বেশ ভালো অবস্থায় আছে” এই ধারণা তৈরি করার এক অদৃশ্য চাপ কাজ করে। অথচ সেই একই মানুষ হয়তো শহরে ফিরে সন্তানের টিউশন ফি, সংসারের খরচ কিংবা নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খান। অনেক সময় আত্মসম্মান রক্ষার জন্য মানুষ নিজের বাস্তব কষ্টটুকুও আড়াল করে রাখেন। প্রশ্ন হলো, এই অতিরিক্ত সামাজিক প্রতিযোগিতা কি সত্যিই কোরবানির চেতনার সঙ্গে যায়? যে উৎসব মানুষকে ত্যাগ, সংযম ও বিনয়ের শিক্ষা দেয়, সেটি যদি অন্যের চোখে নিজের অবস্থান প্রমাণের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে সেখানে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন থেকেই যায়। ধর্মীয় উৎসবের সবচেয়ে সুন্দর দিক হওয়া উচিত অন্তর্ভুক্তি ও সহমর্মিতা। কিন্তু যদি সেটি তুলনা, প্রতিযোগিতা ও আত্মপ্রদর্শনের জায়গায় চলে যায়, তাহলে তার মানবিক সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোরবানির ঈদের মূল শিক্ষা ছিল নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার মানসিকতা অর্জন। অথচ এখন অনেক সময় দেখা যায়, ত্যাগের চেয়ে প্রদর্শনের অংশটিই বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।ডিজিটাল সংস্কৃতি মানুষের মনস্তত্ত্বেও পরিবর্তন এনেছে। এখন “দেখানো” যেন এক ধরনের সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার উপায়। একটি ছবি কত লাইক পেল, কে মন্তব্য করল, কার পোস্ট বেশি ভাইরাল হলো এসব বিষয় মানুষের আত্মতৃপ্তির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে ধর্মীয় অনুভূতিও অনেক সময় ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতার জায়গা থেকে সরে এসে প্রকাশ্য সামাজিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে পড়ে।তবে এই বাস্তবতার মধ্যেও আশার জায়গা রয়েছে। এখনো বহু মানুষ নীরবে কোরবানি করেন, গোপনে সাহায্য করেন, দরিদ্র মানুষের ঘরে মাংস পৌঁছে দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রচার না করেও মানবিকতার চর্চা করে যাচ্ছেন। তারাই আমাদের মনে করিয়ে দেন কোরবানির আসল সৌন্দর্য শব্দে নয়, প্রদর্শনে নয়; বরং নীরব আন্তরিকতায়।আমাদের মনে রাখতে হবে, ইসলাম কখনো সৌন্দর্য বা আনন্দ প্রকাশকে নিষিদ্ধ করেনি। উৎসব মানুষ উদযাপন করবে, আনন্দ ভাগাভাগি করবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আনন্দ যদি অন্যের মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি করে কিংবা আত্মপ্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে সেখানে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন আছে।কোরবানির ঈদ মূলত মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দেওয়ার শিক্ষা দেয়। এটি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং নিজের অহংকার, লোভ, হিংসা ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে কোরবানি করার আহ্বান। সমাজে সহমর্মিতা, সাম্য ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য উপলক্ষ।হয়তো আমাদের আবার নতুন করে ভাবতে হবে আমরা কোরবানির মাধ্যমে কী প্রকাশ করতে চাই? নিজের সামাজিক অবস্থান, নাকি নিজের বিশ্বাস? আমরা কি মানুষের প্রশংসা অর্জনে বেশি আগ্রহী, নাকি স্রষ্টার সন্তুষ্টিতে?হয়তো তাই কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশে নয়, অনুভবে। ত্যাগের এই উৎসব আমাদের শিখিয়েছে বিনয়। শিখিয়েছে মানুষের পাশে দাঁড়াতে। শিখিয়েছে হৃদয়ের ভেতরকার অহংকারকে ভেঙে ফেলতে। তাই কোরবানির ঈদ যদি শুধুই সামাজিক প্রদর্শনের মঞ্চ হয়ে যায়, তাহলে তার আধ্যাত্মিক গভীরতা হারিয়ে যাবে।তাই কুরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশে নয়, অনুভবে।” সময়ের সঙ্গে সমাজ বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, উৎসব পালনের ধরনও বদলাবে। কিন্তু কোরবানির মূল চেতনা যেন না বদলায়। কারণ কোরবানির সবচেয়ে বড় শিক্ষা গরুর আকারে নয়, ছবির সংখ্যায় নয়, বরং মানুষের হৃদয়ের বিনয়ে।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক।

অনুপ্রবেশ ও নিরাপত্তা প্রশ্নে কেন্দ্রের পদক্ষেপ: অমিত শাহ-এর ঘোষণায় নতুন সমীকরণ

অনুপ্রবেশ, জনবিন্যাস এবং তার রাজনৈতিক প্রভাব এই ইস্যুটি বর্তমানে দেশের অন্যতম বিতর্কিত ও সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রের তরফে উচ্চস্তরীয় কমিটি গঠনের ঘোষণার পর এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিতশাহ-এর ঘোষণায় স্পষ্ট, কেন্দ্র এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক ভারসাম্য এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অনুপ্রবেশের ফলে জনসংখ্যার গঠন অস্বাভাবিকভাবে বদলাচ্ছে, যার প্রভাব আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদী-এর “ভিশন ডেমোগ্রাফি” ধারণার বাস্তবায়ন হিসেবেই এই কমিটি গঠনকে দেখা হচ্ছে। বিজেপির যুক্তি হল, দীর্ঘদিন ধরে কিছু রাজ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে অনুপ্রবেশ বেড়েছে, এবং এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।অন্যদিকে, বিরোধী শিবির এই পুরো বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছে। কংগ্রেসের বক্তব্য অনুযায়ী, জনবিন্যাস পরিবর্তনের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে সামনে এনে শাসক দল আসলে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়াতে চাইছে। তাদের অভিযোগ, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, বেকারত্ব বা মূল্যবৃদ্ধির মতো বাস্তব সমস্যাগুলি থেকে জনমানসের দৃষ্টি সরাতে এই ধরনের ইস্যু তুলে ধরা হচ্ছে। একই সুর শোনা গেছে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফেও। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল দাবি করেছে, “অনুপ্রবেশ” ইস্যুটি অনেক ক্ষেত্রেই অতিরঞ্জিত এবং এর মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। তাদের মতে, কেন্দ্র রাজ্যের উপর দায় চাপিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।বামপন্থী দলগুলি আরও কড়া ভাষায় এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, “ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ” একটি জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া, যাকে সরলভাবে অনুপ্রবেশের সঙ্গে যুক্ত করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। জন্মহার, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, শিক্ষা ও আর্থসামাজিক পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলিও জনসংখ্যার গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে, পর্যাপ্ত তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ছাড়া এই ধরনের সিদ্ধান্ত সমাজে বিভ্রান্তি এবং উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে এই ইস্যুর প্রভাব আরও গভীর। অসম বা ত্রিপুরার মতো রাজ্যে অনুপ্রবেশ নিয়ে বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন হয়েছে। ফলে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে সেখানে একাংশ সমর্থন করলেও, অন্য অংশ এটিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই দেখছে। একই সঙ্গে NRC বা ডিটেনশন ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে অনেকেই মানবাধিকার এবং আইনি জটিলতার বিষয়টিও তুলে ধরছেন।বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ বলছেন, “জনবিন্যাস পরিবর্তন” বিষয়টি অত্যন্ত বহুমাত্রিক এবং সংবেদনশীল। শুধুমাত্র অনুপ্রবেশকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বোঝা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক সুযোগের খোঁজে মানুষের স্থানান্তর, শহরায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি—সব মিলিয়েই জনসংখ্যার গঠন বদলে যায়। তাই তারা মনে করছেন, কেন্দ্রের গঠিত কমিটির কাজ হবে তথ্যনির্ভর ও স্বচ্ছ বিশ্লেষণ তুলে ধরা, যাতে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যায়।সব মিলিয়ে, অনুপ্রবেশ ও জনবিন্যাসের এই বিতর্ক এখন শুধুমাত্র প্রশাসনিক বা নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে। শাসক দল যেখানে এটিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে, বিরোধীরা সেখানে এটিকে রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। আগামী দিনে কেন্দ্রের কমিটির রিপোর্ট এবং তার ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, এই বিতর্ক কোন দিকে এগোবে এবং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে তার কী প্রভাব পড়বে।

ঈদুল আজহার সমাজবাস্তবতার অন্তর্গত পাঠ

বাংলাদেশে ঈদুল আজহা প্রতি বছর কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবে আসে না; এটি সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শ্রেণীবিন্যাস, পারিবারিক সম্পর্ক এবং নৈতিকতার একটি গভীর প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে শহর ও গ্রামজুড়ে শুরু হয় প্রস্তুতি, পশুর হাট জমে ওঠে, ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে, বাজারে বাড়ে ব্যস্ততা, পরিবারগুলোতে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। কিন্তু এই উৎসবের অন্তরালে এমন কিছু সামাজিক বাস্তবতা থাকে, যা আমাদের সমকালীন বাংলাদেশের গভীর সংকট, পরিবর্তন এবং সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসে। ঈদুল আজহা তাই কেবল আনন্দ, ভোজন বা ধর্মীয় আচার নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের সমাজকে নতুনভাবে দেখতে পারি।ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা নিহিত রয়েছে আত্মত্যাগের দর্শনে। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর আত্মসমর্পণ, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং প্রিয়তম বস্তুকে ত্যাগ করার মানসিকতা এই উৎসবের কেন্দ্রীয় বার্তা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আজকের বাংলাদেশে ঈদের এই আত্মিক শিক্ষা কতটা সামাজিক বাস্তবতায় প্রতিফলিত হচ্ছে? আত্মত্যাগ কি এখনও নৈতিকতার প্রশ্ন, নাকি ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠছে সামাজিক মর্যাদা ও প্রদর্শনের অংশ?বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের সঙ্গে ঈদুল আজহার চরিত্রও বদলেছে। গত দুই দশকে নগরায়ণ, প্রবাসী আয়, ভোক্তাশ্রেণীর বিস্তার এবং মধ্যবিত্তের জীবনধারার পরিবর্তন ঈদের সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করেছে। একসময় গ্রামে কোরবানির আয়োজন ছিল সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, এমনকি আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলোও সম্মিলিতভাবে অংশ নিত। এখন শহুরে জীবনে কোরবানি অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক, প্রতিযোগিতামূলক এবং সামাজিক প্রতীকের অংশ হয়ে উঠছে।বিশেষত শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে কোরবানির পশু এখন অনেক সময় ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও দেখা দেয়। পশুর দাম, ওজন, জাত, আকার কিংবা বিরলতা নিয়ে সামাজিক আলোচনার এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পশুর ছবি, দাম বা ‘বিশেষত্ব’ তুলে ধরা যেন নীরবভাবে একটি বার্তা দেয়—আমি কতটা সক্ষম। এখানে প্রশ্ন সম্পদের নয়; প্রশ্ন হলো ধর্মীয় অনুশীলন কি প্রদর্শনের সংস্কৃতির ভেতরে হারিয়ে যাচ্ছে? আত্মত্যাগের উৎসব যদি সামাজিক মর্যাদার প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়, তবে তার নৈতিক ভিত্তি কতটা অক্ষুণ্ন থাকে?তবে ঈদুল আজহাকে শুধুই ভোগবাদ বা প্রদর্শনের আলোকে দেখা অন্যায় হবে। কারণ বাংলাদেশে এই উৎসব এখনও সামাজিক সংহতি ও বণ্টনের অন্যতম শক্তিশালী উপলক্ষ। কোরবানির মাংস ভাগাভাগির যে সংস্কৃতি আছে, তা আমাদের সমাজে নৈতিক অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। বহু দরিদ্র পরিবার বছরের এই সময়টাতেই হয়তো প্রথম পর্যাপ্ত মাংস খাওয়ার সুযোগ পায়। নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর, গৃহকর্মী, বিধবা, একাকি বৃদ্ধ কিংবা অনিশ্চিত জীবনে থাকা পরিবারগুলোর জন্য ঈদুল আজহা এখনও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে।বাংলাদেশের সমাজে এখনও এক ধরনের নীরব মানবিকতা টিকে আছে। অনেক পরিবার প্রচার ছাড়া, সামাজিক স্বীকৃতি ছাড়া, নীরবে অসচ্ছল প্রতিবেশীদের ঘরে মাংস পৌঁছে দেয়। এই অদৃশ্য দয়ার চর্চাগুলোই প্রকৃতপক্ষে ঈদের সামাজিক সৌন্দর্য। এগুলো প্রমাণ করে যে ধর্মীয় অনুশীলনের গভীরে এখনও সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সহমর্মিতা কাজ করে।ঈদুল আজহার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মাত্রা হলো অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের বাস্তবতা। প্রতি ঈদে লাখো মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরে। কারখানার শ্রমিক, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অফিসকর্মী কিংবা নিম্নআয়ের নগরবাসী দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছিন্নতার পর পরিবারে ফিরে যায়। এই যাত্রা কেবল ভৌগোলিক নয়; এটি আবেগেরও প্রত্যাবর্তন। যারা বছরের বড় সময়টুকু নগরের ব্যস্ততা, নিঃসঙ্গতা ও অনিশ্চয়তায় কাটায়, তাদের জন্য ঈদ পারিবারিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ।নগরজীবনের একটি বড় বৈপরীত্য এখানেই—মানুষ আয় বাড়ায়, কিন্তু সামাজিক সম্পর্ক হারায়। বিশেষ করে ঢাকার ছাদঘেরা জীবন, ভাড়াবাড়ির সংকুচিত সম্পর্ক, বিচ্ছিন্ন পারিবারিক কাঠামো এবং ব্যস্ত পেশাজীবনের মধ্যে ঈদ এখনও মানুষকে সাময়িকভাবে সমাজে ফিরিয়ে আনে। গ্রামের বাড়ি হয়ে ওঠে পরিচয়ের জায়গা, শেকড়ের স্মারক এবং আবেগের নিরাপদ আশ্রয়।তবে ঈদুল আজহা বাংলাদেশের বৈষম্যকেও নগ্নভাবে দৃশ্যমান করে। সমাজের এক অংশ যেখানে বিপুল ব্যয়ে কোরবানি করে, সেখানে অন্য অংশ মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বৈষম্যের দৃশ্যমানতাকে আরও তীব্র করে। সমৃদ্ধ জীবনের প্রদর্শন অনেক সময় নীরবে বঞ্চিত মানুষের মনে অসমতা, কষ্ট কিংবা অস্বস্তির অনুভূতি তৈরি করে। ফলে উৎসব কখনও কখনও আনন্দের পাশাপাশি শ্রেণীগত ব্যবধানের অনুভূতিকেও জোরালো করে তোলে।এই বাস্তবতায় একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে— বৈষম্যময় সমাজে কোরবানির প্রকৃত অর্থ কী? যদি ঈদের শিক্ষা হয় ত্যাগ, তবে সেই ত্যাগ কি কেবল পশু কোরবানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি আধুনিক সমাজে এর অর্থ হতে পারে অপচয় কমানো, শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা, অভাবী আত্মীয়কে সহায়তা করা, কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি শক্তিশালী করা? হয়তো আজকের বাংলাদেশে কোরবানির গভীরতর অর্থ হলো— নিজের ভোগের কিছু অংশ ত্যাগ করে অন্যের মর্যাদা নিশ্চিত করা।ঈদুল আজহা নগর ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত সচেতনতারও পরীক্ষা নেয়। বিশেষত ঢাকার মতো বড় শহরে কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ড্রেন বন্ধ হওয়া, রক্ত ও বর্জ্যের কারণে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া কিংবা নাগরিক অসচেতনতা শহরের জীবনকে সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত করে। অথচ পরিচ্ছন্নতা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অংশ। তাই ধর্মীয় অনুশীলনের সঙ্গে নাগরিক দায়িত্ববোধের সংযোগও নতুনভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।একই সঙ্গে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সংস্কৃতিও ঈদের চরিত্র বদলে দিচ্ছে। এখন অনেকে অনলাইনে পশু কেনেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কোরবানির অর্থ পাঠান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কোরবানি সম্পন্ন করেন কিংবা অনলাইন দান কার্যক্রমে অংশ নেন। নতুন প্রজন্মের কাছে ঈদ ক্রমশ প্রযুক্তিনির্ভর ও সংগঠিত রূপ নিচ্ছে। তবে এর মধ্যেও মানবিক সম্পর্কের জায়গা যেন সংকুচিত না হয়, সেটিই বড় প্রশ্ন।নারীদের শ্রমের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের আনন্দের অন্তরালে বিপুল গৃহস্থালি শ্রম অনেক সময় নারীদের কাঁধেই গিয়ে পড়ে। রান্না, সংরক্ষণ, অতিথি আপ্যায়ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা—সবকিছু সামলাতে গিয়ে অনেক নারী উৎসব উপভোগের চেয়ে দায়িত্বের ভার বেশি বহন করেন। পরিবারকেন্দ্রিক আনন্দের কথা বলা হলেও গৃহস্থালি দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্ন এখনও প্রাসঙ্গিক।সবচেয়ে বড় কথা, ঈদুল আজহা এখনও বাংলাদেশের সমাজে সাময়িক সামাজিক সংহতি সৃষ্টি করতে পারে। সম্পর্কের দূরত্ব কমে, মান-অভিমান ভুলে অনেকে একত্রিত হয়, সামাজিক বিভাজন সাময়িকভাবে নরম হয়। রাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক চাপ, নগর নিঃসঙ্গতা এবং সামাজিক মেরুকরণের সময়ে এই সংহতির গুরুত্ব আরও বেশি।তবে উৎসবের মানবিকতা যদি তিন দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়, তবে তার সামাজিক শক্তি সীমিত থেকে যায়। গরিব মানুষের প্রয়োজন শুধু মৌসুমি সহানুভূতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি ন্যায়বিচার। শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজন কেবল ঈদের বোনাস নয়, সারা বছরের মর্যাদা। অভাবী মানুষের প্রয়োজন কেবল একদিনের মাংস নয়, টেকসই জীবিকার নিশ্চয়তা। ঈদের চেতনা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সামাজিক দায়িত্ববোধে রূপ নেয়।আজকের বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, নগর নিঃসঙ্গতা এবং বাড়তে থাকা বৈষম্যের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ঈদুল আজহা কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি নৈতিক আত্মসমালোচনারও সময়। আমরা কীভাবে উদযাপন করি, কীভাবে ভাগ করি, কীভাবে সহমর্মিতা দেখাই—এসব প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের ভবিষ্যৎ।ঈদুল আজহা আমাদের শেখায়—একটি সমাজ কেবল সম্পদ দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা এবং ভাগাভাগির সংস্কৃতির ওপর। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের ভেতরের অহংকার, লোভ, বৈষম্য এবং উদাসীনতাকে ত্যাগ করার আহ্বান। বাংলাদেশ যদি এই শিক্ষা ধারণ করতে পারে, তবে ঈদুল আজহা কেবল একটি উৎসব হবে না; এটি হয়ে উঠতে পারে আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের এক নৈতিক প্রেরণা।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

ভিডিও আরও দেখুন

ইরানকে নিয়ে বিপাকে ফিফা

এবারের ফিফা বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এতে পড়তে হচ্ছে বিপাকেও। দলের খেলোয়াড়রা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি। তার ওপর মামলার হুঁশিয়ারিও রয়েছে।ফিফা উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ মাঠগুলোতে ইরানের প্রাক-বিপ্লব পতাকা, অর্থাৎ ‘সিংহ ও সূর্য’ চিহ্নের পতাকা নিষিদ্ধ করতে চাইছে। এই পতাকা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানের প্রতীক ছিল।‘ইনস্টিটিউট ফর ভয়েসেস অব লিবার্টি’ নামের একটি সংস্থা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফিফাকে চিঠি দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, এ বিষয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার রাজ্য বা ফেডারেল আদালতে মামলা করা হতে পারে।সংস্থার আইনজীবী শাহরখ মোখতারজাদেহ গত সপ্তাহে জানান, তিন দিনেও ফিফার কাছ থেকে কোনো জবাব আসেনি। তিনি বলেন, ‘সিংহ ও সূর্য পতাকা বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হলে আমরা উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ফিফা সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে শুধু নিষিদ্ধ বস্তুর তালিকা দেখিয়েছে। সেই তালিকায় বলা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক, আপত্তিকর বা বৈষম্যমূলক’ কিছু নিয়ে মাঠে ঢোকা যাবে না। তবে ‘সিংহ ও সূর্য’ পতাকা ঠিক কোন কারণে নিষিদ্ধ হচ্ছে, তা ফিফা স্পষ্ট করেনি।যুক্তরাষ্ট্র ও প্রবাসী ইরানিদের মধ্যে এই পতাকা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই পতাকা তাদের কাছে গভীর সাংস্কৃতিক ও আবেগের প্রতীক। অন্যদিকে, মেহদি তাজ আগেই বলেছিলেন, অনানুষ্ঠানিক পতাকা, বিশেষত প্রাক-বিপ্লব সিংহ ও সূর্য পতাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা না থাকলে ইরান বিশ্বকাপে অংশ নাও নিতে পারে।রাজনৈতিক পরিস্থিতিও জটিল। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে ইরানকে বিশ্বকাপ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন। পরে তিনি কিছুটা নরম হন। এর জবাবে ইরান বলেছিল, বরং যুক্তরাষ্ট্রকেই ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়া উচিত।নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কারণে ইরান তাদের ম্যাচ মেক্সিকোতে সরানোর কথাও ভেবেছিল। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাউম সেই প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছিলেন। পরে ফিফা নিশ্চিত করে, দলের অনুশীলন মাঠ অ্যারিজোনার টুকসন থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রে খেলতে হবে। ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে, ২১ জুন সফি স্টেডিয়ামে বেলজিয়ামের সঙ্গে এবং ২৬ জুন সিয়াটেলে মিশরের মুখোমুখি হবে ইরান।

ইরানকে নিয়ে বিপাকে ফিফা
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৭৯ জন