সংবাদ
বগুড়ার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

বগুড়ার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো নিজ জেলা বগুড়ায় যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ সোমবার (২০ এপ্রিল) সকাল ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকার গুলশানের বাসভবন থেকে সড়কপথে তিনি বগুড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন।দিনব্যাপী এই সফরে প্রধানমন্ত্রী দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন হিসেবে ‘বগুড়া সিটি করপোরেশন’-এর ফলক উন্মোচন করবেন। এছাড়া জেলাজুড়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।প্রধানমন্ত্রী সফরসূচি থেকে জানা যায়, বেলা ১১টায় জেলা আইনজীবী সমিতির নতুন ভবনের ফলক উন্মোচন, বেলা সোয়া ১১টায় জজ আদালতের ই-বেইলবন্ড উদ্বোধন, বেলা সাড়ে ১১টায় বগুড়া পৌরসভাকে নবসৃষ্ট বগুড়া সিটি করপোরেশনের ফলক উন্মোচন, দুপুর পৌনে ১২টায় বগুড়া শহর থেকে গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ীতে যাত্রা, বেলা পৌনে ১টায় বাগবাড়ীর জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতালে হামের টিকা ক্যাম্পেইন উদ্বোধন করবেন।বিকেল ৪টায় শহরের ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেবেন তারেক রহমান। জনসভা শেষে তিনি বগুড়া প্রেসক্লাবের নতুন ভবন ও বায়তুর রহমান কেন্দ্রীয় মসজিদের পুনর্র্নিমাণ কাজের উদ্বোধন করবেন।কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন। পথে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে যাত্রাবিরতি করবেন তিনি।
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

রাজনীতি, বাস্তবতা ও বার্তা কী দিলেন মোদি?

শনিবার রাত সাড়ে ৮টায় হঠাৎ দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছিল কৌতূহল ও জল্পনা। শেষ পর্যন্ত সেই ভাষণে ভার‌তের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্পষ্ট করেন, তার বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু মহিলা সংরক্ষণ বিল এবং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোয় নারীদের ভূমিকা।ভাষণের শুরুতেই তিনি বলেন, ভারত এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে উন্নয়ন শুধু অর্থনীতি বা পরিকাঠামোয় সীমাবদ্ধ নয়—সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও সমান অংশগ্রহণ জরুরি। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা অর্থাৎ মহিলাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হলে “বিকশিত ভারত” গড়া সম্ভব নয়।তিনি এই বিলকে একটি “ঐতিহাসিক দায়িত্ব” হিসেবে ব্যাখ্যা করে বলেন, গত ২৫-৩০ বছর ধরেই এই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল, কিন্তু নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।এখানেই তিনি বিরোধীদের দিকে পরোক্ষভাবে কটাক্ষ করে বলেন, যারা আজ প্রশ্ন তুলছেন, তাদেরই অতীতে সুযোগ ছিল এই ধরনের সংস্কার আনার। বর্তমান সরকার সেই দীর্ঘদিনের অপূর্ণ কাজ পূরণের চেষ্টা করছে। একইসঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন, এই বিল কার্যকর হলে কোনও রাজনৈতিক দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং দেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।ভাষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে ভার‌তের প্রধানমন্ত্রী পঞ্চায়েত স্তর থেকে উঠে আসা মহিলা নেতৃত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গ্রাম স্তরে ইতিমধ্যেই বহু মহিলা সফলভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এখন সময় এসেছে তাদের জাতীয় রাজনীতিতে বৃহত্তর ভূমিকা দেওয়ার। এই পরিবর্তন শুধু প্রতিনিধিত্ব বাড়াবে না, বরং নীতিনির্ধারণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও নিয়ে আসবে।তবে ভাষণের মধ্যে সবচেয়ে রাজনৈতিক বার্তা ছিল বিরোধীদের উদ্দেশে আবেদন। তিনি বলেন, এই বিষয়টিকে রাজনৈতিক রং না দিয়ে “বন্ধুত্বপূর্ণ পরামর্শ” হিসেবে দেখা উচিত এবং সব দলকে একসঙ্গে এগিয়ে এসে বিলটি পাশ করানো উচিত। দেশের মানুষ এই বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যারা নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাদের প্রতি জনমত কঠোর হতে পারে।অন্যদিকে, এই ভাষণের আগেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী অভিযোগ করেন, কেন্দ্র সরকার মহিলা সংরক্ষণ বিলকে সামনে রেখে ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চাইছে। তৃণমূল কংগ্রেস কখনওই বিলের বিরোধিতা করেনি, বরং বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েই তাদের আপত্তি।একইভাবে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বাদ্রা লোকসভায় বিল পাস না হওয়াকে “গণতন্ত্রের জয়” বলে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, বিরোধীদের ঐক্য সরকারকে আটকে দিয়েছে। এর পাল্টা হিসেবে বিজেপি নেতৃত্ব বিরোধীদের অবস্থানকে দ্বিচারিতা বলে আখ্যা দেয়।সংসদীয় অঙ্কের দিক থেকেও পরিস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ। সংবিধান সংশোধনী বিলটি পাসের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না পাওয়ায়, পক্ষে ২৯৮ এবং বিপক্ষে ২৩০ ভোট পড়ে বিলটি গৃহীত হয়নি। ফলে এই বিল এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে গেলেও তার বাস্তবায়ন অনিশ্চিত রয়ে গেছে।সব মিলিয়ে, শনিবার রাতের এই ভাষণ শুধু একটি নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাও বয়ে এনেছে। একদিকে সরকার এটিকে নারীর ক্ষমতায়নের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে বিরোধীরা বাস্তবায়নের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ফলে মহিলা সংরক্ষণ বিল এখন দেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করবে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও বাস্তব সিদ্ধান্তের উপর।

নির্বাচনী ধারাবাহিকতা না নির্বাচনপূর্ব ধারার এক্সটেনশন!

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমীন সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন ‘আমাদের সরকারের এই ৬০ দিনে সবচাইতে বড় অর্জন বাংলাদেশের জনগণ তারেক রহমানকে বিশ্বাস করেছেন এবং তারেক রহমান জনগণকে বিশ্বাস করেছেন।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী কয়েকদিন আগে ফেইসবুক পোস্টে বলেছেন, ‘পাহাড়সমান সমস্যার ভার এবং মানুষের সীমাহীন প্রত্যাশার মধ্যে যাত্রা শুরু করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তার বিনয়, রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হয়েও সহজ জীবনযাপন, একাগ্রতা ও সময়ানুবর্তিতা মানুষের মধ্যে আস্থা ও আশার সঞ্চার করেছে।’ সত্যতা থাকলেও এসব কথা বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের দু’মাস পার হওয়ার আগেই ব্যাকারনের বর্তমান কাল (প্রেজেন্ট টেন্স) থেকে অতীত কালে (পাস্ট টেন্স) পরিণত হতে চলেছে। অর্থাৎ তারেক রহমান মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন এবং মানুষের মধ্যে আশা ও আস্থার সঞ্চার করেছিলেন। কিন্তু অল্প সময়েই আশা ভরসার জায়গাটা নিম্নগামী।মানুষ প্রথমেই ধাক্কা খেলো তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের দিনেই বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেখে। ইউনূস মনে করেছিলেন ‘রাষ্ট্র নায়ক’ হিসেবে তার উপর যে বিশাল দায়িত্ব তা সামাল দেয়ার জন্য তারও একজন ‘অজিত দোভাল’ লাগবে। তাই চটজলদি মার্কিন মুলুক থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসা হলো খলিলুর রহমানকে। ব্যক্তি হিসেবে নিঃসন্দেহে তিনি বিনয়ী ও বন্ধুসুলভ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব পালনে তো বিনয়ী হলে চলে না। নিরাপত্তা ইস্যুর সঙ্গে তো দেশের পররাষ্ট্রনীতিও যুক্ত! তাই দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অনেকটা নিস্ক্রিয় করে পররাষ্ট্র বিষয়ক ইস্যুতেও তিনি তার হাতে স্টিয়ারিং তুলে নেন। করিডোর, বন্দর সহ নানা ইস্যুতে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রাখছিলেন। ঐ সময়ে বিএনপি নেতৃত্বও ছাত্র উপদেষ্টাদের সহ তার অপসারন দাবী করেছিলেন। আমেরিকার সঙ্গে যে দেশ বিরোধী গোপন বাণিজ্য চুক্তি তা সম্পাদনে তিনিই নেতৃত্ব দেন। তাকেই টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে দেখে সবাই টাসকি খেলো। বুঝে নিলো ইউনূস মার্কিনী স্বার্থের সঙ্গে দেশকে ১৮ মাসে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখে গেছেন যে সরকার বদল হলেও তার থেকে বের হওয়ার পথ নেই। হয়তোবা লন্ডন সমাঝোতার অপ্রকাশিত শর্তে এমনটা উল্লেখ ছিলো!বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেখেও সবাই বিষ্মিত হলো। বিশ্ববিদ্যালয় ভাইস চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন বা জেলা পরিষদে প্রশাসক সব ক্ষেত্রেই দলীয় বিবেচনা থেকে নিয়োগ দান বিএনপিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আর মানুষ ক্ষুব্ধ হলো, বিবেকের দংশনে জর্জরিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার সহযোগী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দন্ডপ্রাপ্তদের জন্য শোক প্রস্তাব গ্রহণের বহর দেখে। অথচ নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের দল দাবী করে নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি জনগণের কাছে ভোট প্রার্থনা করেছে। জামাতকে স্বাধীনতা বিরোধী আখ্যায়িত করে তাদেরকে পরাভূত করার আহ্বান জানিয়েছে। সংসদ নেতা তারেক জিয়ার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে যখন বিতর্কিত ঐ শোক প্রস্তাবসমূহ গৃহীত হিসেবে গণ্য হলো তখন মনে প্রশ্ন জাগছিলো ’৭১-এর ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করার পর জিয়াউর রহমান যদি নিরস্ত্র অবস্থায় এই নিজামী- মুজাহিদদের সামনে পড়তেন তার পরিনতি তখন কী হতো! কী পরিনতি হতো আজকের সংসদের স্পিকার সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধা বীর বিক্রম মেজর হাফিজ উদ্দিনের যদি তিনি ’৭১-এ জামাতীদের হাতে ধরা পড়তেন?ক্রিকেটপ্রেমী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিত। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই ক্রিকেট খেলা নিয়ে মানুষের আগ্রহ। ক্রিকেট বোর্ডের নতুন এডহক কমিটি গঠন দেখে সেই মানুষ হতবাক। কমিটিতে প্রাধান্য পেয়েছেন সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতারা উত্তরাধিকাররা। পত্রিকায় প্রকাশিত তাদের একমাত্র ক্রেডেনশিয়াল-কে কোনো মন্ত্রী বা নেতার ছেলে, মেয়ে বা ভাই-বোন। কমিটি দেখে ক্রিকেটপ্রেমীরা বলছেন বিশ্বকাপ আমাদের ঘরে এই এলো বলে! নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রধান আশা ছিলো যে সরকার কতৃত্ববাদ, দলবাজি ও পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে দল ও মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করবে। স্বাধীন বিচার বিভাগের ব্যবস্থা করে আইনের শাসন এবং নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলে সুশাসন নিশ্চিত করবে, সীমাহীন দুর্নীতির যে রাজত্ব কায়েম হয়েছে তার লাগাম টেনে ধরবে। কিন্তু প্রত্যাশাকে হতাশায় পরিণত করে সংসদের প্রথম অধিবেশনতো প্রায় শেষ হতে চলেছে।ইউনূস আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারী হয়েছিলো যার মধ্যে ১১৩টি অধ্যাদেশ চলতি অধিবেশনে গৃহীত হয়েছে। ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল বা তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, দুদক আইন সংশোধন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত জরুরি অধ্যাদেশ। অধ্যাদেশের কারনেই এগুলো আইনে পরিণত করতে হবে তা নয়। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, দলের ইশতেহার এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষা এসব বিবেচনায় অধ্যাদেশ সমূহ বা তা প্রয়োজন মতো সংশোধন করেও আইন করা যেতো। কিন্তু চলে আসা কতৃত্ববাদী ব্যবস্থায় আইন, বিচার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দুর্নীতি, মানবিক অধিকার সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়াদির উপর লাগাম বিএনপি সরকার দলীয় ভাবে রাখতে চায়। অথচ অতি নিকট অতীত আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে সর্বক্ষেত্রে কতৃত্ববাদ কি ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনে।বিএনপি সেই সব অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে সুপারিশ করেছে যেগুলো দলীয়ভাবে তার পক্ষে যায়। যেমন ইউনূস সরকার জনপ্রতিনিধিদের ইচ্ছেমতো বরখাস্তের সুযোগ রেখে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। বিএনপি সেটার সুযোগ নিয়ে ঐ অধ্যাদেশকে আইনে পরিনত করেছে। অতীতে সব সরকারই স্থানীয় সরকারকে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চেয়েছে। সেই প্রচেষ্টার বিপরীতে কিছু করা হলো না। আওয়ামী লীগ আমলেও জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ছিল প্রক্রিয়াভিত্তিক ও শর্তসাপেক্ষ। এখন আওয়ামী আমল অপেক্ষা খারাপ আইন হলো।ইউনূস সরকারের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বেআইনি ঘোষণার সময় বিএনপি বলেছিলো নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে তারা নয়। এ বিষয়ে জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে। এই রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েই তারা ভোটের সময় আওয়ামী সমর্থকদের কাছে যায় ও তাদের ভোট চায়। আওয়ামী লীগকে ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে জনগণকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন চব্বিশের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেখানেও রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ না করার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল। ইউনূস সরকার ঐ রিপোর্টকে বিচার প্রক্রিয়ায় এবং রাজনৈতিকভাবেও কাজে লাগালেন। কিন্তু রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না করার সুপারিশ মানলেন না। বিএনপিও পূর্বের ঘোষণা থেকে সরে এসে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আদেশকে আইনে পরিণত করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে রাখলো। সম্ভবত স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগকে দল গোছানোর সুযোগ না দেয়া এবং নৌকা সমর্থকদের যে ভোট এবার ধানের শীষে এসেছে তার একটা অংশ স্থায়ী করার লক্ষ্যে বিএনপির এ প্রচেষ্টা। আবার এ আইন ‘৭১ এর যুদ্ধাপরাধী দলের বিরুদ্ধে প্রয়োগের রাস্তাও কিন্তু খোলা থাকলো। কেননা বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বদল আনলেও এটা কিন্তু বহাল আছে যে, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন তারাই মুক্তিযোদ্ধা। অর্থাৎ দেশের আইন অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরোধী অবস্থানে রয়েছে জামাত।সংসদে কোনো সিদ্ধান্ত যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়, সেটি গণতন্ত্রের জন্য স্বস্তির সংবাদ হতে পারে না। আবার আওয়ামী লীগ নিয়ে পরিস্থিতিটা এমন, ‘যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়াপড়শীর ঘুম নাই’। তারা এ মূহুর্তে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান কিনা তাও স্পষ্ট নয়। দেশে যে বিরাট রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে গেছে, মানুষের বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মনোজগতে যে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে সেসব বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের হুঁশ আছে বলেও মনে হয় না। যাক আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগেরটা বুঝুক। কিন্তু ভয়টা অন্যখানে। ভয় হয় এ ধরনের আইন বুমেরাং না হয়ে আসে। এটাতো আমাদের অজানা নয় এক এগারোর ‘মাইনাস টু’ থিওরির প্রবক্তারা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে ক্রিয়াশীল ছিল এবং আছে। জুলাই অভ্যুত্থানে পরেও তারা কিন্তু সে লাইনে চেষ্টা করেছে। সেভাবে বয়ান সামনে এনেছে। কিন্তু পরিস্থিতির মোড় সে দিকে ঘুরানো সম্ভব না হওয়ায় ‘লন্ডন ˆবঠকের’ আয়োজনে যেতে হয়। বিএনপিরও তো অজানা নয়, এবারের নির্বাচনে জামাত আমীর এবং এনসিপির আহবায়কসহ কয়েকজনকে জিতিয়ে আনতে বিশেষ শক্তি যে কৌশলী ভূমিকা রেখেছে সে ক্ষেত্রে বিএনপিকে অসহায় মনে হয়েছে।তবে সবটা দেখে মনে হচ্ছে সরকারী দল ও বিরোধী দলের মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত সমঝোতার মধ্য দিয়েই সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হবে। সরকারী দল শোক প্রস্তাব, জুলাই যোদ্ধা দায়মুক্তি, জুলাই স্মৃতি ঘর প্রতিষ্ঠা, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখা ইত্যাদি বিষয়ে বিরোধী জোটকে খুশী করেছেন, বিপরীতে বিচারালয়, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, দুদক, মানবাধিকার বিষয়ক ব্যবস্থা নিজেদের কর্তৃত্বে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার লাগাম কতৃত্ববাদী পন্থায় আরো শক্তভাবে ধরতে চেয়েছেন। অবশ্য দুদক ও মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে আরও শক্তিশালী করে পরবর্তী সময়ে আইন করার প্রতিশ্রুতি বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। বিরোধী জোট যতটুকু অর্জন করেছে আপাত তাতেই খুশী। কিন্তু বিরোধী হিসেবে রাজনৈতিক স্টান্টবাজি অনুযায়ী যা যা বক্তব্য ও কর্মসূচী দেয়া প্রয়োজন তা বিরোধী জোট দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে। আসলে তারা কতৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরোধী নয় বরং কতৃত্ববাদী ব্যবস্থার মাধ্যমে উগ্রবাদী ও ধর্মান্ধ রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য— যেমনটা তারা করেছেন ইউনূসের কর্তৃত্ববাদী শাসনকে ব্যবহার করে। ‘সংস্কার’ শব্দটি তাদের দূরভিসন্ধি বাস্তবায়নের ঢাল মাত্র। তবে দায়মুক্তিসহ নানা বিষয় ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেয় বলা মুশকিল। ইউনূস আমলজুড়ে মব সন্ত্রাস সহ মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙা, মাজার ভাঙা, হত্যাকান্ড সংঘটিত করা, ছায়ানট-উদীচী ও সংবাদমাধ্যমে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় তো দায়মুক্তি দেয়া হয়নি। থানা থেকে অস্ত্র লুটের ঘটনায়ও দায় মুক্তি দেয়া হয়নি। কানে টান পড়লে মাথাও আসবে।ইউনূস আমল বা অনির্বাচিত আমলের সমাপ্তি হলেও যে কাউকে খুনের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে আটক করা, রিমান্ডে নেয়া ও জেলে পুরে রাখার ‘ ইউনূস - আসিফ নজরুল সংস্কৃতি’ বিএনপি আমলেও চালু আছে। প্রতিদিনই এ ধরণের গ্রেফতারি চলছে। ঘটনা কই আর গ্রেপ্তার কই— মানুষ মিলাতে পারে না। ঘটনার জন্য মামলা হচ্ছে, না মামলার জন্য ঘটনা সাজিয়ে রাখা আছে! বিএনপি আমলেও মাজারের উপর হামলা ও পীরকে পিটিয়ে মারার ‘তৌহিদী জনতা’ সংস্কৃতি চালু আছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ‘ডাস্টবিন শফিক’ এখনো ফেসবুকে উষ্কানিমূলক স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। জ্বালানি সংকটের এই সময়ে তিনি স্ট্যাটাস দিলেন আমাদের সময়ে এ পরিস্থিতি হলে ‘ওই চল যমুনা যাই!! ...... হতো।’ তিনি কি প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন (না থাকলেও সরকারিভাবে যমুনা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) ঘেরাও করার উষ্কানি দিলেন? অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মত, ২০০৮ সালের নির্বাচিত সরকারকে ক্রমান্বয়ে এক এগারো সরকারের এক্সটেনশনে পরিণত করা হয়েছিলো। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে জনমানসে প্রশ্ন জাগছে তাহলে ২০২৬-এ নির্বাচিত সরকারকেও কি ইউনূস সরকারের একধরনের এক্সটেনশনে পরিণত করার জন্য অপ্রকাশ্য কুশীলবরা সক্রিয়?(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

সংকটে তেল কমে, চরিত্রে তেলেসমাতি বাড়ে

বিশ্ব রাজনীতির আকাশে যুদ্ধের মেঘ ঘন হলে তার ছায়া শুধু সীমান্ত বা বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ঢুকে পড়ে রাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে, সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিটি হিসাব-খাতায়। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি প্রবাহে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, তেলের দাম ওঠানামা করে, বৈশ্বিক বাজারে উদ্বেগ ছড়ায়। একই সঙ্গে এই সংকট নতুন সম্ভাবনার দরজাও খুলে দেয়—বিকল্প জ্বালানি, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা এবং নীতিগত পুনর্গঠনের বাস্তব প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। অর্থনীতি তখন একদিকে সংকটে কাঁপে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের পথ খুঁজতে বাধ্য হয়।কিন্তু এই বৈশ্বিক আলোড়নের ভেতরে আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় আরেকটি অদৃশ্য প্রবাহ নীরবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক সংকট যত দৃশ্যমান হয়, ততই সমাজের ভেতরে এক ধরনের আচরণগত প্রাচুর্য বেড়ে যায়। এই প্রাচুর্যের নাম তেলেসমাতি— যা কোনো জ্বালানি নয়, বরং ক্ষমতা, সুবিধা ও টিকে থাকার এক সূক্ষ্ম সামাজিক কৌশল।রাষ্ট্র যখন সাশ্রয়ের আহ্বান জানায়, নাগরিক জীবন তখন হিসাব কষে সংকুচিত হয়। বাজারে দাম বাড়ে, চাপ বাড়ে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে ওঠে। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি সমান্তরাল বাস্তবতা চলতে থাকে— যেখানে সংকটের কোনো দৃশ্যমান প্রভাব নেই। সেখানে তেলের ঘাটতি নেই, বরং তেলেসমাতির প্রবাহ আরও স্বচ্ছন্দ ও বিস্তৃত।এই প্রবাহ কোনো শিল্পকারখানার উৎপাদন নয়, বরং মানুষের আচরণের উৎপাদন। এটি জন্ম নেয় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার আকাঙ্ক্ষা, সুবিধা নিশ্চিত করার কৌশল এবং সত্যকে আড়াল করে গ্রহণযোগ্যতার মোড়কে উপস্থাপনের অভ্যাস থেকে। এটি নরম, অদৃশ্য, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কার্যকর—এমন এক সামাজিক জ্বালানি, যা বহু কাঠামোকে নিঃশব্দে চালিয়ে নিয়ে যায়।রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এই তেলেসমাতির উপস্থিতি সবচেয়ে স্পষ্ট। মহান সংসদ থেকে প্রশাসনিক করিডোর পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে যুক্তির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অবস্থান, আর অবস্থানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সম্পর্কের সূক্ষ্ম সমীকরণ। কে কী বলছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কাকে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে। সত্য সেখানে উচ্চারিত হয় না; বরং তাকে সাজানো হয়, পরিমার্জিত করা হয়, এবং গ্রহণযোগ্যতার মোড়কে পরিবেশন করা হয়।এই সংস্কৃতি কেবল রাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি এখন সমাজের প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত। পরিবারে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে অনেক সময় সত্যকে নরম করা হয়, অসম্পূর্ণ রাখা হয় বা পরিস্থিতির সুবিধামতো রূপ দেয়া হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধার চেয়ে আচরণগত সামঞ্জস্য অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ে চিন্তার স্বাধীনতার পাশাপাশি গড়ে ওঠে সুবিধা-নির্ভর এক নীরব সমঝোতা, যেখানে প্রশ্নের চেয়ে নীরবতা অনেক সময় নিরাপদ।অনলাইন জগতে এই তেলেসমাতি আরও দ্রুত, আরও তীক্ষ্ণ এবং আরও নির্লজ্জভাবে কাজ করে। এখানে প্রশংসা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। জনপ্রিয়তা অনেক সময় সত্যের চেয়ে বড় মাপকাঠি হয়ে ওঠে। ফলে বাস্তবতা নয়, বরং উপস্থাপনাই নির্ধারণ করে কে গুরুত্বপূর্ণ, কে অপ্রাসঙ্গিক। এই ডিজিটাল তেলেসমাতি অফলাইনের চেয়েও অনেক বেশি আক্রমণাত্মক এবং প্রভাবশালী।এই বাস্তবতায় সমাজ ধীরে ধীরে এক উল্টো মূল্যবোধের দিকে অগ্রসর হয়। যেখানে সরলতা দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়, আর কৌশল দক্ষতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। যোগ্যতা অনেক সময় নীরব থাকে, কিন্তু তোষামোদ কথা বলে। সত্য আড়ালে যায়, আর সুবিধা সামনের সারিতে উঠে আসে। এভাবেই গড়ে ওঠে এক নীরব প্রতিযোগিতা— কে কত নিখুঁতভাবে তেল ব্যবহার করতে পারে।তেলের সংকট আমাদের শেখায় সীমাবদ্ধতা, বাস্তবতার কঠোর হিসাব। কিন্তু তেলেসমাতি শেখায় সেই সীমাবদ্ধতাকে কীভাবে অস্বীকার করা যায়, কীভাবে বাস্তবতাকে ভাষার কৌশলে আড়াল করা যায়। এই দুই শিক্ষা একসঙ্গে সমাজকে এক অদ্ভুত দ্বৈত অবস্থানে দাঁড় করায়—একদিকে বাস্তব চাপ, অন্যদিকে কৃত্রিম স্বস্তি। আর ধীরে ধীরে এই কৃত্রিম স্বস্তিই স্বাভাবিক বাস্তবতার রূপ নেয়।রাষ্ট্রীয় নীতি, সংসদীয় আলোচনা, পারিবারিক সম্পর্ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অনলাইন ও অফলাইন সামাজিক পরিসর—সবখানেই এই প্রবাহ একইভাবে কাজ করে। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নয়, কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী অদৃশ্য কাঠামো। এটি বন্ধ হয় না, কারণ এর জ্বালানি মানুষের ভয়, আকাঙ্ক্ষা, নিরাপত্তাহীনতা এবং সুবিধার প্রবণতা। এই অদৃশ্য চেইনই সমাজকে ভেতর থেকে চালিয়ে নিয়ে যায়—নিঃশব্দে, নিয়মিতভাবে।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কেবল অর্থনীতির নয়; এটি আমাদের চরিত্রের প্রশ্ন। আমরা কি শুধু জ্বালানির সংকটে ভুগছি, নাকি তার চেয়েও গভীর সংকটে—আমাদের আচরণগত জ্বালানির সংকটে?তেলের সংকট হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেটে যাবে, নতুন প্রযুক্তি আসবে, বিকল্প জ্বালানি তৈরি হবে, বাজার স্থিতিশীল হবে। কিন্তু যদি তেলেসমাতির এই সংস্কৃতি স্থায়ীভাবে সমাজের ভেতরে শিকড় গেঁড়ে বসে, তাহলে সংকট কেবল রূপ বদলাবে, সমাধান নয়।কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে শুধু তেল নয়, চালায় তার নৈতিক জ্বালানিও। আর সেই জ্বালানি যখন তোষামোদ, সুবিধা আর নীরব সম্মতির ওপর দাঁড়িয়ে যায়—তখন সংকট আর বাইরে থাকে না, তা ভেতরেই স্থায়ী হয়ে যায়।[লেখক : সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

পরিবর্তিত জলবায়ু ও বাড়তে থাকা রোগঝুঁকির বাস্তবতা

বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল শুরু হলেই তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এপ্রিল-মে মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা প্রায়ই ৩৮ ডিগ্রি থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। কোনো কোনো এলাকায় তা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। এই তীব্র তাপপ্রবাহ জনজীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে— বিশেষ করে শহরাঞ্চল, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ এবং নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য এটি হয়ে ওঠে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৪.৮ লক্ষ মানুষ তাপপ্রবাহজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। দক্ষিণ এশিয়ার মতো উষ্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে এই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে আরও বেশি। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপজনিত অসুস্থতা, হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী দশকে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণে বাড়তে পারে।তীব্র গরম শুধু অস্বস্তি নয়; এটি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে এবং একাধিক রোগের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। ফলে গ্রীষ্মকাল এখন আর কেবল মৌসুমি সময় নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সতর্কতার সময় হিসেবে বিবেচিত হওয়া জরুরি।মানবদেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৬.৫ ডিগ্রি থেকে ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। অতিরিক্ত গরমে শরীর ঘামের মাধ্যমে তাপ বের করে দেয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু দীর্ঘসময় রোদে কাজ করলে শরীর দ্রুত পানি ও লবণ হারায়।গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মাত্র ২ শতাংশ পানি কমে গেলে কর্মক্ষমতা প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। এই অবস্থায় দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমিভাব, অতিরিক্ত ঘাম, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। পরিস্থিতি গুরুতর হলে এটি হিটস্ট্রোকে রূপ নিতে পারে, যা দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতী হতে পারে।এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী গরম মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে— বিরক্তি, অনিদ্রা, ক্লান্তি এবং মনোযোগের ঘাটতি এই সময় অনেক বেড়ে যায়। গরমকালীন সময়ে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ না করলে ডিহাইড্রেশন দেখা দেয়। এতে রক্তচাপ কমে যায়, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ এই সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হন। দীর্ঘসময় রোদে কাজ করলে হিট এক্সহস্টশন ও হিটস্ট্রোক হতে পারে। ডব্লিউএইচওর মতে, তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে তাপজনিত মৃত্যুঝুঁকি ১-৩% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। গরমে জীবাণু দ্রুত বৃদ্ধি পায়। দূষিত পানি ও খাবারের কারণে ডায়রিয়া ও আমাশয় ছড়িয়ে পড়ে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বছরে প্রায় ৪ লক্ষাধিক শিশু ডায়রিয়ায় মারা যায়, যার বড় অংশ গরমকালে ঘটে। দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে টাইফয়েড দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে। ঘাম, ধুলাবালি ও আর্দ্র পরিবেশে ফুসকুড়ি, চুলকানি ও ছত্রাকজনিত রোগ বৃদ্ধি পায়। বায়ুদূষণ ও ধুলাবালির কারণে হাঁপানি ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ বেড়ে যায়। তীব্র গরমে শিশুদের শরীর দ্রুত পানিকূন্য হয়ে যায়। তাদের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে বিকশিত না হওয়ায় তারা সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় হিটস্ট্রোক, হৃদরোগ ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি। অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি রোগ গরমে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরম মা ও শিশুর উভয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পানিশূন্যতা ও শারীরিক চাপ প্রসবকালীন জটিলতা বাড়াতে পারে। তাই বিশেষ যত্ন অপরিহার্য। শহরাঞ্চলে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ পরিস্থিতি তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামাঞ্চলের তুলনায় ২ ডিগ্রি থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। কংক্রিটের ঘনবসতি, সবুজের অভাব, যানবাহনের ধোঁয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। বিদ্যুৎচালিত শীতলীকরণ যন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহার পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে এবং বিদ্যুৎচাপ বাড়ায়। ফলে নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠী— যারা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন— তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। ব্যক্তিগত দায়িত্বই প্রথম সুরক্ষা। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা উচিত। হালকা ও সুতির পোশাক ব্যবহার করতে হবে। দুপুর ১২টা-৩টা পর্যন্ত রোদ এড়িয়ে চলাই ভালো। বাসি ও খোলা খাবার পরিহার করা উচিত। তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় প্রশাসনকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। গণমাধ্যমে নিয়মিত হিটওয়েভ সতর্কতা প্রচার জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা দরকার। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ‘হিট অ্যাকশন প্ল্যান’ আরও শক্তিশালী করতে হবে। শ্রমিকদের জন্য কাজের সময় পুনর্বিন্যাস ও ছায়াযুক্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।[লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]

ধর্মের নামে সহিংসতা: কোথায় আমাদের সীমারেখা?

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নে ইসলাম ধর্ম বিকৃতির অভিযোগে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামে এক সুফি পীরকে পিটিয়ে হত্যা করেছে এলাকাবাসী। তার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করা হয়েছে। তাকে যেদিন হত্যা করা হয় সেদিন সকালে কিছু লোক গোপনে বৈঠক করে এবং বৈঠকের পর কাটছাঁট করা তার ৩৬ সেকেণ্ডের একটি ভিডিও তিনটি ফেইসবুক পেইজ ও চারটি ব্যক্তিগত আইডি থেকে প্রচার করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘সত্যের সন্ধানে ফিলিপনগর’। ভিডিওটি পুলিশের নজরে এলে তারা এলাকায় গিয়ে খোঁজ-খবরও নিয়েছে। দুপুরে জনা পঞ্চাশেক লোক শামীমের দরবারে উপস্থিত হয়ে পুলিশের সম্মুখেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে। পুলিশ ৫০ জন লোককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, অবশ্য পারার কথাও নয়। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় মব সৃষ্টির কাহিনী পুলিশ সম্যকভাবে অবহিত, তখন মব নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের এক্তিয়ার বহির্ভূত। বিএনপি সরকার মব নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিলেও তার নিয়ন্ত্রণ পুলিশের এক্তিয়ারভুক্ত কিনা তা তারা এখনো বুঝে ওঠতে পারছে না।দরবার ভাঙচুর ও হত্যায় অংশগ্রহণ করেছে যারা তাদের মধ্যে রয়েছে শিশু, কিশোর ও যুবক, দুয়েকজন ব্যতীত দাঙ্গাবাজদের কারো মুখে দাড়ি বা টুপি ছিল না। অনুভূতিতে আঘাত লাগার অজুহাতে আওয়ামী লীগ আমলেও যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সৃষ্টি করেছে তাদের বেশিরভাগ ছিল হাফপেন্ট আর লুঙ্গিপরা। তবে এদের যারা উত্তেজিত করে তারা ভিন্ন জগতের মানুষ, এদের বলা হয় ‘তৌহিদি জনতা’ বা ধর্মীয় ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ বিক্ষুব্ধ মুসলিম জনসমষ্টি। এই বিক্ষুব্ধ জনসমষ্টি প্রচলিত আইন মানে না, প্রশাসন মানে না, সরকারও মানে না। ভিকটিম শামীম রেজার যে ভিডিওটি পরিকল্পিতভাবে ঘটনার দিন প্রচার করা হয়েছিল তা ছিল ২০২১ বা ২০২৩ সনের, ওই ভিডিওতে তাকে কৃষ্ণ সাজে দেখা গেছে, তখন তার দাড়ি-চুল ছিল কালো।তিনি নাকি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সম্রাট আকবরের মতো একটা সমন্বয় করতে চেয়েছিলেন। ১৫৮২ সনে মুঘল সম্রাট আকবর তার প্রবর্তিত ‘দীন-ই-ইলাহি’র মাধ্যমে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে গেছেন। তার ওই মতবাদ কেউ গ্রহণ না করলেও মুসলিম ইতিহাসে তিনি কখনো ‘দীন-ই-ইলাহি’ প্রচারের জন্য অসম্মানিত হননি। শুধু তাই নয়, এবার পহেলা বৈশাখে মুসলিম বাঙালিরা ‘বৈশাখ-ই আকবর’ নামে একটি কর্মসূচিও পালন করেছে। শামীম রেজার ভিডিওটি ২০২১-২৫ সাল পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছিল। কিন্তু তাতে কোন অসুবিধা হয়েছে বলে কেউ অভিযোগ করেনি। কেউ তার ভিডিও দেখে ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলেও শোনা যায়নি। তাহলে ৫ বছর পর ২০২৬ সালে হঠাৎ কেন কিছু লোকের অনুভূতিতে আঘাত লাগলো?ধর্মীয় ইস্যুতে এমন বিক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠী বেশি দেখা যায় পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে। এই তিন দেশে ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষ ভিন্নমতের লোকদের হত্যা করার উন্মাদনায় উন্মত্ত। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতাকে নির্বিঘ্ন রাখতে এদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করে, তাই এদের বিরুদ্ধে লোক দেখানো ব্যবস্থা নিতেও গড়িমসি করে। বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভোট হারানোর ভয়ে বাম-ডান সব রাজনৈতিক দল এই উগ্রতাকে সমীহ করে, তাই গণতান্ত্রিক নির্বাচন এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তুলছে। সরকারের উদাসীনতা আর প্রশাসনের নির্লিপ্তায় ধর্মীয় ইস্যুতে বিক্ষুব্ধ এই জনগোষ্ঠী বেপরোয়া। ধর্ম নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টিকারীদের হত্যা করতে পারার মধ্যে তারা স্বর্গীয় সুখ পায়, জেহাদের উত্তেজনায় ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে জীবিত মানুষকে পুড়িয়ে মারে, কবর থেকে লাশ তুলে পিটাতে পিটাতে উল্লাস করে, মরদেহের ওপর ওঠে নৃত্য করে, পিটিয়ে মারা মৃতদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পোড়ায়।মানুষ পোড়ানো ইসলাম ধর্মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও এটাকে তারা ধর্ম অবমাননা মনে করে না। বিভিন্ন আলেম ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করলেও এদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে না, আঘাত বেশি লাগে যখন কোন সুফি বা হিন্দু ধর্ম নিয়ে কথা বলে। মানুষ হিংস্র বলেই খান জাহান আলী মাজারের পুকুর ঘাটে মানত করে বেঁধে রাখে ছাগল বা কুকুর, ছুঁড়ে মারে হাঁস-মোরগ, পুকুরের কুমিরগুলো যখন অসহায় প্রাণীগুলো খেতে থাকে তখন পাড়ে অপেক্ষমান জনতা আনন্দে হাত তালি দেয়। আনন্দ পায় বলেই নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেয়া হয়, আনন্দ পায় বলেই ২৮ বছর বয়সী পোষাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে শুধু পিটিয়ে হত্যা করা হয় না, গাছের ডালে টাঙিয়ে পুড়িয়েও দেয়া হয়। মানুষ হিংস্র। হিংস্র বলেই এক সময় হিংস্র পশুর খাঁচায় অপরাধীদের ফেলে দিয়ে তার বাঁচার আকুতি ও অসহায়ত্ব দেখে দর্শক আনন্দ পেত। এখনো সউদি আরবে গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর চোর-ডাকাত-ব্যভিচারীর হাত ও গর্দান কাটার সময় মুসল্লিদের আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা যায়। ৭০-৭২ খ্রিস্টাব্দে দুই গ্ল্যাডিয়েটরের আমৃত্যু লড়াইয়ে ভয়ঙ্কর মৃত্যুদৃশ্য দেখার জন্য রাজা-রাণীসহ ইতালির কলোসিয়ামে ৮০ হাজার দর্শকের সমাগম হতো। অনেক সময় বাঘ, সিংহের মতো হিংস্র প্রাণীর সঙ্গেও গ্লাডিয়েটরদের বদ্ধ খাঁচায় লড়াই করতে হতো, লড়াইরত গ্লাডিয়েটরের করুন মৃত্যু দেখে দর্শকরা কলোসিয়ামের গ্যালারিতে আনন্দে উল্লাস করতো। মানুষ হত্যায় যেই মানুষগুলো এত মজা পায় তারা সৃষ্টিকর্তার আশরাফুল মাখলুকাত হতে পারে না।ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে বাড়াবাড়ির খবর নতুন কিছু নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে যে রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে তা হিংস্র মানুষের বীভৎস রূপ। কোরআনে পা রাখার গুজব ছড়িয়ে জুয়েল নামে যে লোককে পিটিয়ে আর আগুনে পুড়ে হত্যা করা হয়েছিল তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না। অসুস্থ্য হলেও তিনি যে কোরআনে পা রাখেননি তা মসজিদের খাদেম বারবার উল্লেখ করেছেন। জুয়েল রোজা রাখত, নামাজ পড়ত, সেইদিনও নামাজ পড়ে মসজিদে রাখা কোরআন শরীফ দেখছিলেন। কোরআনে পা রাখার গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শত শত লোক এসে জুয়েলকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল। নিহত জুয়েলের দুই হাত, গলায় ও কোমরে রশি লাগিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর থেকে প্রায় ৪২০ মিটার দূরে টেনেহিঁচড়ে আন্তজেলা মহাসড়কে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পিটিয়ে হত্যা, টেনেহিঁচড়ে নেয়া ও আগুন লাগানোর কাজে উৎসাহীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ ছিল কিশোর।মব সৃষ্টি করে যে কোন মানুষকে বাংলাদেশে পিটিয়ে মেরে ফেলা সহজ। ‘ছেলেধরা’ অভিহিত করে বাংলাদেশে বহু লোককে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। রাস্তায় যে কোন লোককে দেখিয়ে চোর বা ছিনতাইকারী বললেই আশপাশের কেউ যাচাই না করেই পিটাতে শুরু করে দেয়। অনুভুতির মব যত্রতত্র। প্রতিটি সরকারের প্রশ্রয়ে এই জাতীয় দানবীয় কর্মকাণ্ডের জন্য ইসলাম শান্তির ধর্ম হয়ে উঠতে পারল না। এআই-এর ভয়ানক আধিপত্যে এখন বোঝা যায় না, কোনটি আসল বা কোনটি নকল। আসল হলেও পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে কেন? ধর্ম কি এতই ঠুনকো যে, কেউ কিছু একটা বললেই তা বিলীন হয়ে যাবে! মনে হচ্ছে আমাদের ধর্মীয় শিক্ষায় কোন গলদ আছে, নতুবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ ওঠলেই মানুষ এত হিংস্র হয়ে উঠে কেন ? বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ অন্যায় করে, ঘুষ খায়, মানুষ ঠকায়, মিথ্যা বলে, ধর্ষণ করে, বলাৎকার করে, কিন্তু কারো ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করার কথা শোনা মাত্রই প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে পড়ে। ব্যক্তি জীবনে হয়তো এদের কেউই ধর্মকর্মে একনিষ্ঠ নয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হলে শাস্তির বিধান আছে, কিন্তু দণ্ডবিধি বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘ধর্মীয় অনুভূতির’ কোন স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। অবশ্য সংজ্ঞা দেয়া সম্ভবও নয়, কারণ কোন কথায় কার অনুভুতিতে কিভাবে আঘাত লাগবে তা সুনির্দিষ্ট করা কঠিন।১৯৫৩ সনে পাকিস্তানে আহমদিয়া বিরোধী দাঙ্গায় ২ হাজার কাদিয়ানিকে হত্যা করা হয়, দাঙ্গায় উসকানি দেয়ার অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। আহমদিয়া বিরোধী দাঙ্গার পর পাকিস্তান সরকার এর তদন্তে লাহোর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ মুনিরকে প্রধান করে ‘পাঞ্জাব ডিস্টারবেন্সেস ইনকোয়ারি কোর্ট’ গঠন করে। ‘মুসলমান কাকে বলে’- মুনির কমিশনের এমন প্রশ্নের উত্তরে পাকিস্তানের নামকরা ১০ জন আলেম ১০ রকম সংজ্ঞা দেন এবং প্রত্যেক আলেমের সংজ্ঞা অনুযায়ী অন্য আলেমরা ‘কাফের’ হয়ে যান। মুনির রিপোর্ট আরও উল্লেখ করে যে, যদি সব আলেমের সংজ্ঞা একসাথে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে পাকিস্তানে কোনো মুসলমানই থাকে না। বাংলাদেশেও একজন আলেম আরেকজন আলেমকে ‘কাফের’ ফতোয়া দিচ্ছে। তারপরও ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লাগার অভিযোগ উত্থাপনের আইন বলবৎ আছে।শক্তি প্রয়োগে ভীতি সৃষ্টি হয়, কিন্তু মন জয় করা যায় না। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের দুইজন নামকরা আলেমের ভিসা বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া। জাপানে মসজিদ নির্মাণে বাধা দিচ্ছে স্থানীয় জাপানিরা। শুধু জাপান নয়, গ্রীস এবং ইতালিও মসজিদ করতে দিচ্ছে না। জাপান মুসলমানদের কবর দিয়ে জায়গা নষ্ট করারও ঘোর বিরোধী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলাম ধর্ম নিয়ে ফোবিয়া বা ভীতি রয়েছে। আমার এক সহকর্মীর নামের শেষ অংশে ‘ইসলাম’ থাকায় আমেরিকা ভিসা দেয়নি, বোম্বে সিনেমার অভিনেতা শাহরুখের নামের শেষে ‘খান’ থাকায় তাকে আমেরিকার বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা ধরে জেরা করা হয়েছে, অবসর নেয়ার পর ভারতের রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের মুসলিম নামের কারণে আমেরিকার বিমানবন্দরে তাকে নাজেহাল করা হয়। ২০২৪ সনের পিউ রিসার্চের রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে মুসলিমদের প্রতি সামাজিক ম্বৈরিতা ‘খুব উচ্চ’ পর্যায়ে রয়েছে। তাই ইসলাম ধর্মকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে সুরা নিসার ১৪০ নম্বর আয়াত মেনে চলা ফরজ, যাতে বলা হয়েছে, ‘যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করা হচ্ছে ও তাকে বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন তোমরা তাদের সঙ্গে বসবে না, যে পর্যন্ত না তারা অন্য কোনো প্রসঙ্গে লিপ্ত হবে’।[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

সংরক্ষিত আসন এবং উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারী

স্বাধীনোত্তর যতগুলো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, আদিবাসী পুরুষরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কখনোই নির্বাচিত হতে পারেননি| আর নারীরা সংরক্ষিত আসন ব্যতীত সাহস দেখাতে পারেননি| বিগত সময়ে দু-একজন নারী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দিলেও দলীয়ভাবে মনোনয়ন আদায় করতে পারেননি| সংরক্ষিত নারী আসনে বারবার বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা উপেক্ষিত, অবহেলিত ও বঞ্চিত হয়ে আসছে| আমরা লক্ষ্য করেছি, অতীতে আদিবাসীদের পক্ষে জাতীয় সংসদে চাকমা, রাখাইন, মারমা ও তঞ্চঙ্গ্যা নারীরা একাধিকবার প্রতিনিধিত্ব করেছেন—এর বাইরে তেমন নজির নেই| স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের পরও উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীরা সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাননি| পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচনী আসনগুলো থেকে আদিবাসীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়ে আসছেন, যা এখনও বিদ্যমান; পাশাপাশি সংরক্ষিত আসনেও নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে| কিন্তু জাতীয় সংসদে নির্বাচিত আদিবাসী নারী-পুরুষেরা নিজেদের নির্বাচনী এলাকা নিয়েই ব্যস্ত থেকেছেন; অন্য অঞ্চলের আদিবাসীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখের বিষয়ে তাদের তেমন সরব হতে দেখা যায়নি| ফলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ক্ষমতায়নের দিক থেকে উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা এখনও প্রান্তিক পর্যায়েই অবস্থান করছেন| আমরা বিশ্বাস করি, একমাত্র সুযোগের অভাবেই তাদের মেধা, মনন ও দক্ষতার বিকাশ ঘটেনি| নির্বাচন কমিশন ৮ এপ্রিল তফসিল ঘোষণার পর সংরক্ষিত নারী আসনে ইতোমধ্যে ৩৬১ জন বিএনপি, ১৩ জন জামায়াতে ইসলামী এবং একজন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন| ২১ এপ্রিল মনোনয়নপত্র জমা, ২৯ এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ৩০ এপ্রিল প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে| তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ মে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে| কমিশনের তথ্য অনুযায়ী বিএনপি ও তার জোট ৩৬টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ও তার শরিকরা ১৩টি আসন এবং ছয়জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের জোট একটি আসন পাবে| ৬ এপ্রিল সংরক্ষিত নারী আসনের ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে; তালিকা অনুযায়ী ২৯৮ জন সংসদ সদস্য ভোট দেবেন| দলের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত মনোনীত ব্যক্তিরাই সংরক্ষিত আসনে আগামী পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন| আমরা জেনেছি, বৃহত্তর উত্তরবঙ্গ থেকে একাধিক আদিবাসী নারী সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন| অতীতের সরকারগুলো উত্তরবঙ্গকে যথাযথ মূল্যায়ন করেনি; লাখ লাখ আদিবাসীর দাবি-দাওয়া ও মনের কথা অপ্রকাশিতই থেকে গেছে| বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলই এ বিষয়ে কিছুটা সক্রিয়তা দেখিয়েছে| ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ৭ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের বিরামপুর সরকারি কলেজ মাঠে এক জনসভায় বলেন, ‘এই এলাকার মুসলমান, হিন্দু, আদিবাসী, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—সবাই মিলে আমরা আমাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করব| আমাদের পরিচয় হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে; ধর্ম নয়|’ প্রধানমন্ত্রীর পারিবারিক শিকড় দিনাজপুরের বিরামপুরে| এ অঞ্চলে সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, রাজোয়াড় ও পাহান সম্প্রদায় বহু শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছে| তাদের পূর্বপুরুষরা পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করেছেন| আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের সংরক্ষিত আসনে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেবেন| সরকার গঠনের পর থেকেই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার আদিবাসী প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন| গত ৩১ মার্চ ঢাকায় এক আলোচনা সভায় তিনি আদিবাসীদের ‘ভূমিপুত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তারা এ দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাদের অধিকার অন্য সব নাগরিকের মতোই সমান| তিনি একটি বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এবং আদিবাসী সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরার কথাও বলেন| একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার সংরক্ষিত নারী আসনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারেন| আমরা উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা আশাবাদী| দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নেতার জন্ম ও শিকড় উত্তরবঙ্গেই| সংরক্ষিত নারী আসনের মাধ্যমে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের কথা জাতীয় সংসদে প্রতিফলিত হলে তা নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে| অতীতে বাসন্তী চাকমা, গ্যোরভতি তঞ্চঙ্গ্যা, মানজু মারমা, এথিন রাখাইন, ম্যাম্যাচিন মারমাদের উপস্থিতি আমাদের গর্বিত করেছে| এবার উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের সুযোগ দেয়া হলে সাঁওতাল, মাহালী, উরাঁও, মুণ্ডা, রাজোয়াড়, সিং, রায়, বর্মন, পাহান, কোলসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রান্তিক বাস্তবতা সামনে আসবে| কোডা, কোড়া, ভীল, তুরী ও পাহাড়িয়াদের সংগ্রামের কথাও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পাবে| সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তই আদিবাসীদের ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ম্ববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহায়ক হবে| তাই আর উপেক্ষা নয়—সময়ের দাবি বিবেচনায় সংরক্ষিত নারী আসনের একটি উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের জন্য বরাদ্দ করা হলে তা হবে ন্যায়সংগত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ| [লেখক: কলামিস্ট]

জন্ম নয়, কর্মেই মানুষের পরিচয়

গ্রামগঞ্জের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতারা একটি প্রবাদ প্রায়ই উচ্চারণ করেন—‘বারো হাত বাঙি, তেরো হাত বিচি (বীজ)’| প্রথম শুনলে এই কথাটি অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হতে পারে| কারণ, কোনো ফলের বীজ তার নিজের চেয়ে বড় হওয়া বাস্তবসম্মত নয়| কিন্তু লোকজ প্রবাদ কখনও সরল অর্থে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে গভীর জীবনবোধ, অভিজ্ঞতা এবং সমাজ বাস্তবতার প্রতিফলন| এই প্রবাদটির মধ্যেও তেমনই এক অন্তর্নিহিত তাৎপর্য রয়েছে| এখানে বোঝানো হয়েছে— অনেক সময় ছোট, অবহেলিত বা অপ্রত্যাশিত উৎস থেকেও বড়, বিস্ময়কর ও মূল্যবান কিছু সৃষ্টি হতে পারে| অর্থাৎ, জন্মের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কর্ম ও যোগ্যতার মাধ্যমে মানুষ নিজের অবস্থানকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যেতে পারে| এই সত্যটি বোঝাতে একটি সহজ কাহিনি উল্লেখ করা যায়| বহুদিন আগের কথা| এক গ্রামে রাম বিলাস দাস নামে এক দরিদ্র দিনমজুর বাস করতেন| জীবিকার তাগিদে তিনি রাস্তার পাশে বসে পুরনো স্যান্ডেল-জুতা মেরামত ও বুট পালিশ করতেন| সামান্য আয় দিয়ে কোনোমতে সংসার চলত| দীর্ঘদিন পর তার ঘরে এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়| সন্তানের নাম রাখা হয় খোকন দাস| অর্থকষ্ট ছিল নিত্যসঙ্গী, তবুও সন্তানের লালন-পালনে তিনি কখনও অবহেলা করেননি| খোকন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে| একসময় তাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়| শুরুতে সহপাঠীদের উপহাস ও অবজ্ঞার শিকার হতে হলেও তার মেধা, অধ্যবসায় ও নম্র আচরণের কারণে সে দ্রুত সবার প্রিয় হয়ে ওঠে| তার ফলাফল সবসময় ভালো হতে থাকে| সন্তানের এই অগ্রগতি দেখে রাম বিলাস দাসের মনে এক নতুন স্বপ্ন জন্ম নেয়— তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন, যে করেই হোক ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন| প্রাথমিক শিক্ষা শেষে খোকনকে দূরের একটি হাইস্কুলে ভর্তি করানো হয়| দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না| অনেক সময় তাকে প্রয়োজনীয় বই-খাতা জোগাড় করতে কষ্ট করতে হয়েছে| তবুও সে থেমে থাকেনি| কঠোর পরিশ্রম ও একাগ্রতার মাধ্যমে সে মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়| পরবর্তীতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যায় এবং একসময় বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়| আজ খোকন দাস সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি| মানুষ তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করে| কিন্তু তার পিতা এখনও রাস্তার পাশে বসে জুতা মেরামতের কাজ করে যাচ্ছেন| এই বৈপরীত্য অনেকের চোখে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে| কেউ কেউ বিদ্রূপ করে বলেন—‘বারো হাত বাঙি, তেরো হাত বিচি’| আবার কেউ বলেন—‘গোবরে পদ্মফুল’| যদিও বাস্তবে গোবরে পদ্মফুল জন্মায় না, তবুও এই উপমার মাধ্যমে বোঝানো হয়— অপ্রত্যাশিত বা অবহেলিত স্থান থেকেও অনন্য সাফল্য জন্ম নিতে পারে| এই কাহিনি কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি সমাজের বাস্তব চিত্রের প্রতিফলন| ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ও সফল মানুষই প্রতিকূল পরিবেশ থেকে উঠে এসেছেন| তাদের জীবনের শুরু ছিল দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও সংগ্রামের মধ্যে, কিন্তু তারা সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে নিজেদের যোগ্যতায় শীর্ষে পৌঁছেছেন| উদাহরণস্বরূপ, আব্রাহাম লিংকন দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন| তার শৈশব কেটেছে অভাবের মধ্যে, কিন্তু তিনি আত্মশিক্ষার মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন| ড. বি. আর. আম্বেদকর চর্মকার পরিবারে জন্ম নিয়েও উচ্চশিক্ষা অর্জন করে ভারতের সংবিধানের প্রধান স্থপতি হন| তিনি সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন| জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও অভাবের মধ্যে বড় হয়েছেন| জীবিকার তাগিদে ছোটবেলায় বিভিন্ন কাজ করতে হলেও তিনি সাহিত্য ও সঙ্গীতে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন| একইভাবে এ. পি. জে. আব্দুল কালাম দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়ে সংবাদপত্র বিক্রি করে পড়াশোনার খরচ জোগাতেন, অথচ পরবর্তীতে তিনি একজন খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ও ভারতের রাষ্ট্রপতি হন| এছাড়াও বিশ্ব ইতিহাসে আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে—যারা বস্তি, গ্রাম বা নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে রাষ্ট্রনায়ক, দার্শনিক, সাহিত্যিক বা বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন| তাদের সবার জীবনে একটি বিষয় অভিন্ন—তারা নিজেদের জন্মপরিস্থিতিকে সীমাবদ্ধতা হিসেবে মেনে নেননি| বরং কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং দৃঢ় মানসিকতার মাধ্যমে তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্মাণ করেছেন| সমাজে এখনও পেশাভিত্তিক ও শ্রেণীভিত্তিক ম্ববৈষম্য বিদ্যমান| অনেক সময় মানুষ জন্ম বা পারিবারিক অবস্থান দেখে অন্যকে মূল্যায়ন করে| কিন্তু এই ধরনের চিন্তাভাবনা সমাজের অগ্রগতির জন্য বাধা| একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য তার কর্ম, চরিত্র ও যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে| জন্মস্থান বা পারিবারিক পটভূমি নয়, বরং তার কাজই তাকে সম্মানিত করে| ‘বারো হাত বাঙি, তেরো হাত বিচি’—এই প্রবাদের প্রকৃত অর্থ এখানেই নিহিত| এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ হওয়ার সম্ভাবনা সব মানুষের মধ্যেই রয়েছে| প্রয়োজন শুধু সুযোগ, পরিশ্রম এবং সঠিক দিকনির্দেশনা| অতএব, আমাদের সমাজে এমন পরিবেশ ˆতরি করা প্রয়োজন, যেখানে প্রতিটি মানুষ তার যোগ্যতা অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়| দরিদ্র বা অবহেলিত পরিবারের সন্তানদের প্রতি অবজ্ঞা না করে তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত| কারণ, আজ যে শিশু অবহেলিত, সঠিক সুযোগ পেলে সে-ই আগামী দিনের নেতৃত্ব দিতে পারে| জন্ম মানুষের হাতে নয়, কিন্তু কর্ম তার নিজের হাতে| তাই ‘জন্ম হোক যেথায়-সেথায়, কর্ম হোক ভালো’—এই আদর্শকে সামনে রেখে এগিয়ে গেলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই উপকৃত হবে| এই চেতনা আমাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেই ‘বারো হাত বাঙি, তেরো হাত বিচি’ আর কেবল প্রবাদ থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে বাস্তব জীবনের এক অনুপ্রেরণার শক্তি| [লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

প্রতিটি গুম-খুনের বিচার চাই

‘গুম-খুন’ শব্দবন্ধটি এ লেখায় সচেতনভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে| কারণ এই দুটি কুকাজ, ভিন্ন প্রক্রিয়ায় বা ধরণে হলেও, মানুষের জীবনের ওপর একই চূড়ান্ত ফলাফল বয়ে আনে- জীবনের চলমান পর্দা থেকে হারিয়ে যাওয়া| মানবিক, নৈতিক বা ধর্মীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে গুম-খুনের বিচারের দাবিতে আমাদের সম্মিলিত অবস্থান আজও অস্পষ্ট ও দ্বিধাবিভক্ত| নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যগুলোর একটি| মানুষের প্রাণহরণ কিংবা কাউকে জোরপূর্বক অদৃশ্য করে দেয়ার পক্ষে কোনো নৈতিক, মানবিক বা ধর্মীয় ভিত্তি নেই যা নীতিশাস্ত্রের মৌলিক স্বীকার্য| দর্শনের ভাষায় বললে, মানুষের জীবন একটি ‘অন্তর্নিহিত মূল্য’ বহন করে| তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে সেই জীবনকে হরণ করা কখনোই ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না| তবুও আমাদের সমাজে গুম-খুনের বিচার চাইতে গিয়ে আমরা ভয়াবহভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ি| কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ নীরব থাকে, আবার কেউ কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গুম-খুনকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে| এই বিভাজন কেবল রাজনৈতিক মতভেদের ফল নয়; এটি সামাজিক মনোবিজ্ঞানেরও একটি প্রতিফলন, যেখানে ‘দলগত পক্ষপাত’ বা ‘শ্রেণী দ্বন্দ্ব’ মানুষকে ন্যায়-অন্যায়ের সার্বজনীন মানদণ্ড থেকে বিচ্যুত করে| অথচ অন্যায়ের মুখে নীরব থাকা নিজেই এক ধরনের নৈতিক অবস্থান এবং সেই নীরবতা প্রায়শই অন্যায়কারীর পক্ষেই কাজ করে| এপ্রসঙ্গে বর্ণবাদ বিরোধী নোবেল বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকান ধর্মযাজক (আর্চবিশপ) ডেসমন্ড টুটু (১৯৩১-২০২১) উক্তিটি উল্লেখযোগ্য, ‘অন্যায়ের পরিস্থিতিতে আপনি যদি নিরপেক্ষ থাকেন, তবে আপনি অত্যাচারীর পক্ষ নিয়েছেন’|আমাদের পক্ষপাতিত্বের ফলে বাস্তবতা দাঁড়ায় এমন যে, গুম-খুনের বিচার চায় এক পক্ষ, কিন্তু নীরবতা থাকা ও অপরাধের পক্ষে ছাফাই গাওয়ার মাধ্যমে এর বিপক্ষে অবস্থান নেয় অন্তত দুই পক্ষ| এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ নৈতিক ভারসাম্যহীনতার কারণে আমাদের দেশে বিচারহীনতা ক্রমে একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়; একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়| ফরাসী সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খাইম (১৮৫৮-১৯১৭) যাকে ‘নৈতিক বিশৃঙ্খলা’ (অ্যানোমি) বলেছেন, সেই অবস্থাই যেন আমাদের বাস্তবতায় প্রতিফলিত হয়, যেখানে ন্যায়-অন্যায়ের স্পষ্ট সীমারেখা মুছে যায়| ফলে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং তা আমাদের সামষ্টিক নৈতিক দুর্বলতার অনিবার্য পরিণতিতে রূপ নেয়| এই পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের যে মৌলিক সত্যটি নির্ভুলভাবে ধারণ করতে হবে, তা হলো, ‘গুম-খুন সর্বাবস্থায় গুম-খুনই’| কোনো পরিস্থিতি, আবেগ বা আপাত যুক্তি দিয়ে এই অপরাধকে বৈধতা দেয়া যায় না| নৈতিক দর্শনের ইতিহাসে এই অবস্থানটি এক ধরনের ‘অপরিবর্তনীয় নীতি’ (ক্যাটাগরিক্যাল ইম্পারেটিভ)-এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ যেখানে মানুষকে কখনোই কোনো লক্ষ্য অর্জনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা যায় না| বরং তাকে নিজেই একটি উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হয়| সুতরাং কাউকে গুম করা বা হত্যা করা মানে কেবল তার জীবন হরণ করা নয়; বরং তার মানবিক মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং অস্তিত্বের মৌলিক ভিত্তিকেই অস্বীকার করা|জীবন স্রষ্টার দেয়া এক অমূল্য দান; এই বিশ্বাস ধর্মীয় দৃষ্টিকোণেই নয়, মানবতাবাদী চিন্তাধারাতেও সমানভাবে প্রতিধ্বনিত| জীবন নামক সময়ের সীমার মধ্যে মানুষকে যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, যেমন চিন্তা করার, মতপ্রকাশের, নিজের জীবনচর্যা নির্ধারণের, তা কেড়ে নেয়া মানে সেই সৃষ্টির অন্তর্নিহিত নীতির বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়া| ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ‘গুম’ শব্দটি কেবল শারীরিক অনুপস্থিতিকে নির্দেশ করে না; এটি এক ধরনের জোরপূর্বক নীরবতা আরোপের প্রতীক, যেখানে একজন মানুষের কণ্ঠ, পরিচয় ও অস্তিত্ব সবকিছুকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়| ফলে ‘গুম’ অনেক ক্ষেত্রেই ‘খুন’-এর একটি প্রলম্বিত প্রক্রিয়া কিংবা আড়াল করা রূপ যেখানে মৃত্যু হয়তো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু পারিবারিক, সামাজিক কিংবা জাতীয় জীবনে তার অনুপস্থিতির মধ্যেই সেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে|পৃথিবীর প্রতিটি খুনীই নিজের পক্ষে কোনো না কোনো যুক্তি দাঁড় করায়—এটি মনোবিজ্ঞানের সুপরিচিত বাস্তবতা| কেউ আত্মরক্ষার কথা বলে, কেউ প্রতিশোধের, কেউ ধর্মীয় বা সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার কথা তুলে ধরে| কিন্তু এই সব যুক্তিই মূলত ‘নৈতিক বৈধতা’ তৈরি করার এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা, যা ব্যক্তিকে নিজের অপরাধকে সহনীয় করে তুলতে সাহায্য করে| রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, যখন এই ধরনের যুক্তিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় বা নীরব সমর্থন লাভ করে, তখন তা ‘কাঠামোগত সন্ত্রাস‘ (স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স)-এ রূপ নেয় অর্থাৎ সহিংসতা তখন কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ থাকে না, বরং একটি কাঠামোগত বাস্তবতায় পরিণত হয়| অথচ, জন্মের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক মানুষের জীবনের ওপর তার একটি অবিচ্ছেদ্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় যা আধুনিক মানবাধিকার ধারণার কেন্দ্রবিন্দু| এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার নৈতিক বা আইনগত ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাষ্ট্রের নেই, যদি না তা একটি স্বচ্ছ, ন্যায়ভিত্তিক ও আইনের শাসন-নির্ভর বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়| অন্যথায়, গুম-খুন কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক ভিত্তির ওপর এক গভীর আঘাত, যা শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক ন্যায়বোধকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়|কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের রাষ্ট্র কি সত্যিই সেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে? একটি রাষ্ট্রের মৌলিক নৈতিক দায় অন্তত তিনটি: নাগরিকের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা| রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাথমিক তত্ত্বেই বলা হয়, সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে মানুষ তার কিছু স্বাধীনতা রাষ্ট্রকে অর্পণ করে এই প্রত্যাশায় যে, রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা ও ন্যায়ের নিশ্চয়তা দেবে| কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় আমরা দেখি এর উল্টো এক চিত্র; বিচারহীনতার এক দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতি, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে| এই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গুম-খুন হওয়া মানুষের পরিবারের বেদনায়| খুন হওয়া চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের, এবং বাংলাদেশ পুলিশের নিহত সদস্যদের পরিবারগুলোসহ সাম্প্রতিক সময়ে শরিফ ওসমান হাদির পরিবার যেমন আজও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় দিন গুনছে, তেমনি সড়ক দুর্ঘটনার নামে পরিকল্পিত হত্যার শিকার কিংবা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া অসংখ্য মৃত্যুর পেছনেও লুকিয়ে থাকে অপ্রকাশিত সত্য| ইতিহাসের নানা বাঁকে, বিশেষ করে বিভিন্ন আন্দোলন, রাজনৈতিক সংঘাত বা সামাজিক অস্থিরতার সময়ে প্রাণ হারানো মানুষের পরিবারগুলোও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত| এই দীর্ঘ বিচারহীনতা কেবল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকেই ক্ষতবিক্ষত করে না; বরং এটি পুরো সমাজের ওপর এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও হতাশার ছায়া ফেলে| ফলে মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের আস্থা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে, যা একটি স্থিতিশীল, কল্যাণমুখী ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়|সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, যখন অপরাধের বিচার হয় না, তখন আইনের শাসন ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার জায়গা দখল করে নেয় শক্তির নীতি, ‘জোর যার মুল্লুক তার’| এর ফলে ন্যায়বোধের পরিবর্তে ভয়, প্রতিশোধ এবং স্বেচ্ছাচারিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়| মানুষ তখন আইনের ওপর আস্থা হারিয়ে নিজেরাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, যা শেষ পর্যন্ত আরও সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়| এই প্রক্রিয়াটি একটি সমাজকে ধীরে ধীরে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে অন্যায় আর ব্যতিক্রম নয়; বরং এক ধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়| এই অবস্থার পরিবর্তনে আমাদের ঐতিহাসিক দায় স্বীকার করা জরুরি| পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে এই ভূখণ্ডে সংঘটিত অসংখ্য খুন ও নিপীড়নের একটি ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে, যার বড় একটি অংশ আজও বিচারহীন| এই প্রেক্ষাপটে একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যেখানে সময়কালভিত্তিক তিনটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে| একটি পলাশী থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ঔপনিবেশিক সময়ের জন্য, একটি পুরো পাকিস্তান আমলের জন্য, এবং আরেকটি স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের জন্য| এই ধরনের উদ্যোগ কেবল বিচার নিশ্চিত করার একটি কাঠামোই তৈরি করবে না; বরং একটি জাতির ইতিহাসের সঙ্গে ন্যায়বিচারের সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের পথও খুলে দেবে| আইন ও বিচার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বিস্তারিত রূপরেখা প্রণয়ন করতে পারেন যাতে বিচারপ্রক্রিয়া হয় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং উচ্চমান সম্পন্ন|এর মাধ্যমে কেবল গুম-খুনের বিচারের দাবি পূরণই নয়, একটি বৃহত্তর নৈতিক পুনর্জাগরণের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হতে পারে| ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ অতীতের অন্যায়কে স্বীকার করে এবং তার বিচার নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়, সেই সমাজই টেকসই শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়| অন্যদিকে, রাষ্ট্রে বিচারহীনতা যতদিন বহাল থাকে, ততদিন সমাজে প্রতিশোধপরায়ণতা, বিশৃঙ্খলা এবং স্বেচ্ছাচারিতা নতুন নতুন রূপে ফিরে আসে| তাই ন্যায়বিচার কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির নৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অপরিহার্য পূর্বশর্ত| তবে মনে রাখতে হবে, কেবল বিচারহীনতাই নয়, আমাদের সমাজকে গ্রাস করেছে আরও দুটি গভীর ও বিপজ্জনক প্রবণতা: পক্ষপাতিত্ব এবং ‘জল ঘোলা করার সংস্কৃতি’| পক্ষপাতিত্বের এই প্রবণতা আমাদের নৈতিক মেরুদণ্ডকে ক্রমাগত দুর্বল করে দিয়েছে| আমরা নিজের ক্ষতি হলে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করি, কিন্তু অন্যের ক্ষতির ক্ষেত্রে নীরব থাকি, আমাদের ন্যায়বোধও যেন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীভেদে ভিন্ন হয়ে যায়| ফলে অন্যায়কে আমরা বিচার করি না ন্যায়-অন্যায়ের সার্বজনীন মানদণ্ডে; বরং বিচার করি ব্যক্তি, পরিবার, দল, শ্রেণী কিংবা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে| অথচ নৈতিক দর্শনের একেবারে মৌলিক সত্য হলো, অন্যায়, যেই করুক, অন্যায়ই থাকে| এই সত্যকে অস্বীকার করা মানে ন্যায়ের ধারণাকেই আপেক্ষিক করে তোলা, যা শেষ পর্যন্ত সমাজের সব স্তরে অন্যায়ের স্বাভাবিকীকরণ ঘটায়|সমাজবিজ্ঞান ও নৈতিক মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় দেখা যায়, এই ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণ মানুষের ‘নৈতিক বিচ্ছিন্নতা’ (মোরাল ডিসএনগেইজমেন্ট)-এর একটি রূপ, যেখানে ব্যক্তি নিজের অবস্থান বা স্বার্থ রক্ষার জন্য নৈতিক বিচারকে আংশিক বা বিকৃত করে নেয়| এর ফলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কোনো স্তরেই ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না| কারণ ন্যায় তখন আর একটি সর্বজনীন মূল্যবোধ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে সুবিধাভিত্তিক একটি অবস্থান| তাই ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রথম ও অপরিহার্য শর্ত হলো, পক্ষপাতহীনতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক অবস্থান গ্রহণ করা, তা নিজের বিরুদ্ধেও হোক বা আপনজনের বিরুদ্ধেই হোক| এর পাশাপাশি, একটু আগেই বলা হয়েছে, আমাদের আরেকটি ভয়াবহ প্রবণতা হলো ‘জল ঘোলা করার সংস্কৃতি’| দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিমন্ডলে বার বার প্রতারিত হতে হতে অন্যের উপর, এমনকি নিজের ওপরও মানুষ বিশ্বাস হারিয়েছে| ফলে কোনো স্পষ্ট ঘটনা ঘটার পর সেটিকে জটিল, অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর করে তোলার এক অদ্ভুত সামাজিক প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করি| তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি সুবিধাবাদী অংশ, কিছু দায়িত্বহীন চাটুকার গণমাধ্যম এবং ভুঁইফোড় জনপ্রিয়তাবাদী অনলাইন কর্মীরা প্রায়শই একটি স্পষ্ট অপরাধের পেছনে ‘তৃতীয় শক্তি’, ‘অজ্ঞাতচক্র’ বা ‘গভীর ষড়যন্ত্র’-এর নানামুখী গল্প দাঁড় করিয়ে মূল সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করে| ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে, এটি এক ধরনের ‘আলোচনার উদ্দেশ্যমূলক কারসাজি’ (ডিসকারসিভ মেনিপুলেশান), যেখানে ভাষা ও বয়ানকে ব্যবহার করে বাস্তবতাকে বিকৃত করা হয়, যাতে প্রকৃত ঘটনা কিংবা অপরাধী আড়ালে থেকে যায়|গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই প্রবণতা কেবল জনমতকে বিভ্রান্তই করে না; বরং বিচারপ্রক্রিয়াকেও সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে| কারণ যখন সত্যকে অস্পষ্ট করে ফেলা হয়, তখন দায় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে, আর সেই সুযোগে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়| ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, ‘বিভাজন ও শাসন’ (ডিভাইড এন্ড রুল)-এর কৌশল প্রয়োগ করে সমাজকে দুর্বল করা হয় মানুষকে সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে, সন্দেহ ও বিভ্রান্তির জালে আবদ্ধ করে| ফলে গণঐক্য বা সংঘশক্তির যে চাপ তা আর থাকে না| দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা বার বারই জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞতাবশত সেই একই ফাঁদে পা দিচ্ছি, যা শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের পথকে আরও কঠিন করে তোলে এবং অন্যায়ের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে| জাতি হিসেবে আমাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, যারা চোখের সামনে খুন দেখেও দায় এড়িয়ে যায়, তারা কেবল নিরপেক্ষ দর্শক নয়; বরং নৈতিক অর্থে অপরাধেরই অংশীদার| নৈতিক দর্শনে ‘উপেক্ষা’ (ওমিশান) বা নিষ্ক্রিয়তার দায়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়| কারণ কখনো কখনো  নীরবতা নিজেই অপরাধে পরিণত হয়| খুনের মতো চরম অন্যায়ের ক্ষেত্রে এই নীরবতা আর নিরপেক্ষ থাকে না; এটি কার্যত অন্যায়কে টিকে থাকার অবকাশ করে দেয়| গুমকারী বা খুনীকে আড়াল করা, মিথ্যা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো কিংবা সচেতনভাবে নীরব থাকা এসবই প্রকারান্তরে গুম-খুনকে বৈধতা দেয়া এবং অপরাধীকে রক্ষা করার শামিল|ফলে ন্যায়বিচারের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে পড়ে, বিচারের বাণী যেন নিরবে, নিভৃতে কাঁদে| সাহিত্যিক উপমায় যে আর্তনাদের কথা আমরা শুনি, বাস্তবে তা রূপ নেয় মানুষের আস্থাহীনতা, ভীতি ও হতাশায়| রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্ণধার যদি হন এমন মানুষেরা, সত্যিকার অর্থে তাদের ওপর ভরসা করা যায় না| কারণ তারা নৈতিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে কৌশল আর ছলচাতুরির মাধ্যমে সুবিধাবাদী নিরপেক্ষতার আশ্রয় নেয়| সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় এই প্রবণতাকে ‘সামাজিক আস্থার অবক্ষয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়| যখন মানুষ নিশ্চিত হতে পারে না যে অন্যায় ঘটলে সমাজ তার পাশে দাঁড়াবে, তখন সামষ্টিক ন্যায়বোধ ভেঙে পড়ে এবং ব্যক্তি ক্রমশ একা ও অনিরাপদ হয়ে ওঠে| অতএব, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সময় ও সুযোগ এসেছে আমাদের জন্য জাতি হিসেবে  একটি সুস্পষ্ট, আপসহীন অবস্থান নেয়ার| সেই অবস্থানটি হতে হবে সার্বজনীন; ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে বেছে বেছে নয়, বরং আমরা সব গুম-খুনের বিচার চাই| যেমনটি বলেছিলেন শহীদ শরীফ ওসমান হাদী, ‘আমি আমার শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ করতে চাই’| আমরা তেমন একটি ইনসাফের রাষ্ট্র চাই, যেখানে ‘কোনো গুম-খুনকে সমর্থন নয়, কোনো গুমকারী বা খুনীকেই ছাড় নয়’- এই নীতিগত দৃঢ়তাই হতে পারে আমাদের পক্ষপাতহীন, কল্যাণমুখী রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের প্রথম ধাপ| কারণ খুনের বিচার নিশ্চিত করা মানে কেবল একজন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং তা মানবতার পক্ষে অবস্থান নেয়া, সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকে সংরক্ষণ করা, ‘রাষ্ট্র’কে নৈতিক ভিত্তির ওপর সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত করা| ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ ন্যায়ের প্রশ্নে আপস করে, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে| তাই ন্যায়বিচারের দাবিতে আপসহীনতা কেবল একটি নৈতিক আহ্বান নয়; এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা নিয়ে সগৌরবে টিকে থাকার পূর্বশর্ত|চিরন্তন আপ্তবাক্য হলো, ‘সত্য বড্ডই তিতা’| কিন্তু সেই তিতা সত্যকে গ্রহণ করার নৈতিক সাহস না থাকলে কোনো রাষ্ট্র বা সমাজই ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো নির্মাণ করতে পারে না| দর্শনের ভাষায়, সত্য স্বীকারের মধ্য দিয়েই নৈতিক আত্মশুদ্ধি শুরু হয়| আর সেই আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা কেবল একটি স্লোগানসর্বস্ব বুলি হয়েই থেকে যায়| আমরা যদি বাস্তবতাকে আড়াল করি কিংবা সুবিধামতো সত্যকে অস্বীকার করি, তবে অন্যায় কেবল টিকে থাকে না, বরং আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে| ফলে দুর্বৃত্তায়ণে সমাজ ও রাষ্ট্র সয়লাব হয়ে যায়; আর রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্রীড়ানকেরা ক্রমে স্বৈরাচারী আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে| তাই আজ প্রয়োজন একটি সম্মিলিত নৈতিক জাগরণ, যেখানে আমরা একযোগে বিচারহীনতা, পক্ষপাতিত্ব এবং বিভ্রান্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করি| আমাদের শিখতে হবে গুমকারী বা খুনীকে নির্ভয়ে গুমকারী ও খুনী বলতে, অন্যায়কে স্পষ্টভাবে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করতে এবং তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে| কারণ ভাষা কেবল প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেয়ারও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার| যখন আমরা সত্যকে সঠিক নামে ডাকতে ব্যর্থ হই, তখন আমরা অজান্তেই অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিই| একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাই আমাদের অবস্থান হতে হবে অবিচল, আপসহীন এবং সর্বজনীন| কারণ ন্যায়বিচারহীন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজেই এক নীরব গুমকারী ও খুনীতে পরিণত হয়, যেখানে অন্যায় শুধু ঘটে না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয় পায়| আর যে রাষ্ট্র অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, সে রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা হারায়; মানবিকতার দাবিও তখন আর তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য থাকে না| অতএব, ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কোনো একক ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের; এটি একটি জাতির সামষ্টিক দায়িত্ব| এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি প্রাণের মূল্য স্বীকৃত হবে এবং কোনো গুম-খুনই আর নীরবে হারিয়ে যাবে না; বরং রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে ন্যায়ের আলোয় প্রতিটি অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত হবে| দেশের জনগণ ‘মগের মুল্লক’-এর নয়, প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ নামক সার্বভৌম ‘রাষ্ট্র’-এর গৌরবান্বিত নাগরিক হতে চায়, যে ‘রাষ্ট্র’ তার নাগরিকদের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তার বিধান করবে সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে| জাতি সেই সোনালি দিনের অপেক্ষায় ‘তীর্থের কাক’-এর মতই দিন গুনছে|(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

বিস্মৃত প্রজ্ঞার আলোকধারা

‘নির্ভীক সাংবাদিকতার কোনো বন্ধু নেই’, ‘দেশ নষ্ট কপটে, প্রজা মরে চপটে, কী করিবে রিপোর্টে’, ‘(ওহে) হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হলো— পার কর আমারে’, ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়িয়ে দেখ তাই, পেলেও পাইতে পার লুকানো রতন’সহ অসংখ্য নীতিকথার জনক কে বলতে পারবেন?অনেকেই অনেকের নাম বলবেন, কিন্তু সঠিক ব্যক্তির নামটি অনেকেই জানেন না| কারণ, তিনি মৃত্যুর ১২৯ বছর পরও অখ্যাতই থেকে গেছেন| যেমনটি করা হয়েছিল ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে লিখিত ‘বিজয় বসন্ত’ উপন্যাসকে উপেক্ষা করে ‘আলালের ঘরের দুলাল’কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে| অনেকে আবার তার কর্ম ব্যবহার করে অস্কারের মতো পুরস্কার অর্জন করেছেন| কেউ কেউ তার ওপর বিভিন্ন বিষয়ে লিখে ডিগ্রি অর্জন করেছেন| অথচ কোনো এক অজানা কারণে আমরা তাকে হারিয়ে ফেলতে বসেছি|তিনি আর কেউ নন— বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার কুণ্ডুপাড়া গ্রামে বিখ্যাত মজুমদার পরিবারে অত্রষি বংশে মাতা কমলিনীর কোলজুড়ে এবং হলধর মজুমদারের পুত্র হয়ে ২০ জুলাই ১৮৩৩ সালের বৃহস্পতিবার জন্মগ্রহণকারী শ্রী হরিনাথ মজুমদার, ওরফে কাঙাল হরিনাথ মজুমদার| তার জীবনকাল ছিল মাত্র ৬৩ বছর| তিনি ১৮৯৬ সালের ১৮ এপ্রিল মারা যান| এই স্বল্প সময়ে তিনি ৭২টি গ্রন্থ রচনা করেন| এর মধ্যে ৪২টি প্রকাশিত এবং ৩০টি অপ্রকাশিত| ব্যবসা পরিচালনার জন্য তিনি এমএন প্রেস নামে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন| সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে ১১টি দল ও ৮টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন| ডাকঘরে মানি অর্ডার চালুর প্রস্তাব তিনি নিজ সম্পাদিত ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন| ক্ষুধা ও লজ্জা নিবারণের জন্য অন্যের দোকানে কাজ করতেও দ্বিধা করেননি| প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তিনি নারীশিক্ষার দীপ জ্বালাতে ১৮৫৭ সালের ১৩ জানুয়ারি নিজ চণ্ডীমণ্ডপে কুমারখালী বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে|জমিদার পান্নালাল মজুমদার, শিলাইদহ ঠাকুর এস্টেট, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদধূলিধন্য ভূমি, সোনাবন্ধুর দরগা, তন্ত্রাচার্য শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণবের সর্বমঙ্গলা মন্দির, খোরশেদপুরের পীরের মাজার, রানি রাসমণি নির্মিত গোপীনাথ মন্দির, তালোয়ার মাজার শরীফ, কুমারখালীর ঐতিহাসিক পুতুলবাড়ি, কাঙাল কুটির, ছেউড়িয়ার লালন শাহের মাজার, লাহিনীপাড়ার মীর মশাররফ হোসেনের বাসভিটা— এসব মিলিয়ে কুমারখালী এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের আধার| সেই কুমারখালীতেই জন্ম নিয়েছিলেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার| তার কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক বর্তমান প্রেক্ষাপটে কী অবস্থায় আছে, তা নিয়ে আলোচনা জরুরি|স্বশিক্ষিত কাঙাল হরিনাথের ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়া শেখার প্রবল ইচ্ছা ছিল| কিন্তু অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও পিতামাতাহীন অবস্থার কারণে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পূর্ণতা পায়নি| তবুও তিনি নিজ প্রচেষ্টায় বই সংগ্রহ করতেন— কখনও ভিক্ষা করে, কখনও সহপাঠীদের কাছ থেকে ধার নিয়ে| ভাষাশিক্ষায় কবি ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে| ১৮৫৪ সালে তিনি কুমারখালীতে বাংলা পাঠশালা স্থাপন করেন এবং ১৮৫৭ সালে নারীশিক্ষার জন্য বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন| শুরুতে কোনো বেতন না থাকলেও বিদ্যালয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়লে পরিদর্শকদের সুপারিশে তিনি বেতন গ্রহণ করেন|সেই সময় জমিদার, মহাজন ও নীলকরদের অত্যাচারে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ ছিল| এই প্রেক্ষাপটে ১৮৬৩ সালে তিনি ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন| মফস্বল কুমারখালী থেকে এমন উদ্যোগ ছিল সত্যিই যুগান্তকারী| তিনি শিলাইদহ ও শাহজাদপুর এস্টেটে জমিদারদের প্রজাপীড়নের কাহিনী তুলে ধরতেন| তবে নানা কারণে সেই প্রতিবেদনগুলোর অনেকেই হারিয়ে যায়| ধারণা করা হয়, প্রভাবশালী মহলের চাপে এসব লেখা প্রকাশে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল| তবুও কাঙাল হরিনাথ ছিলেন নির্ভীক সাংবাদিক| পায়ে হেঁটে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করতেন বলেই তিনি গ্রামীণ সাংবাদিকতার জনক হিসেবে খ্যাত|কাঙাল হরিনাথের গঠিত বাউল গানের দলের নাম ছিল ‘ফিকির চাঁদের দল’| তিনি পাবনা, নদীয়া, ফরিদপুর, ঢাকা, বরিশাল, যশোর ও কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে সুপরিচিত ছিলেন| তিনি প্রায় হাজারখানেক গান রচনা করেন| তার উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে— ‘ওরে মন পাগলারে, হরদমে আল্লাহজির নাম নিও’, ‘ওরে দোকানদার দোকানি ভাই’, ‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো’ ইত্যাদি|সাহিত্যেও তার অবদান অসামান্য| ‘আলালের ঘরের দুলাল’ রচনার আগেই তিনি ‘বিজয় বসন্ত’ রচনা করেন, যা বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে| শিবনাথ শাস্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন— ‘বিজয় বসন্ত’ ও ‘আলালের ঘরের দুলাল’— দুটিই বাংলার প্রথম উপন্যাস হিসেবে গণ্য হতে পারে| তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— ‘পদ্য পুণ্ডরীক’, ‘চারু চরিত্র’, ‘কবিতা কৌমুদী’, ‘বিজয়া’, ‘কবিকল্প’, ‘অক্রুর সংবাদ’, ‘সাবিত্রী নাটিকা’, ‘চিত্তচপলা’, ‘কাঙাল ফকির চাঁদের গীতাবলী’, ‘ব্রহ্মাণ্ডবেদ’ প্রভৃতি|তার মৃত্যুর পর বহু গুণীজন তাকে স্মরণ করেছেন— জলধর সেন, অক্ষয় কুমার ˆমত্রেয়, শিবনাথ শাস্ত্রী, রামতনু লাহিড়ী প্রমুখ| কিন্তু বাস্তবে তার স্মৃতি সংরক্ষণে তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি| তার বংশধররা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন| অবশেষে ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর তৎকালীন সরকার তার স্মৃতিতে জাদুঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন| ২০১৭ সালের ৯ ডিসেম্বর এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়|অবশেষে, দীর্ঘ ১২৪ বছর পর কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের নাম নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হলো| তার ব্যবহৃত মুদ্রণযন্ত্র, বই ও স্মারকসমূহ আজ সেই জাদুঘরে সংরক্ষিত| তবুও প্রশ্ন থেকে যায়— আমরা কি যথাযথভাবে তার অবদানকে মূল্যায়ন করতে পেরেছি?[লেখক : কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের পঞ্চম বংশধর]

ভিডিও

মিলারের শেষ ওভারের তাণ্ডব: বেঙ্গালুরুকে হারিয়ে দিল্লির নাটকীয় জয়

আইপিএলের এক রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ডেভিড মিলারের শেষ ওভারের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে দিল্লি ক্যাপিটালস রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিপক্ষে নাটকীয়ভাবে ৬ উইকেটের জয় তুলে নিয়েছে। ১৭৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শেষ ওভারে দিল্লির প্রয়োজন ছিল ১৫ রান, এবং মিলার সেই মুহূর্তে জ্বলে উঠে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ছক্কা হাঁকিয়ে এক স্মরণীয় জয় নিশ্চিত করেন।প্রথমে ব্যাট করে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু তাদের ২০ ওভারে ৮ উইকেটে ১৭৫ রান তোলে। ফিল সল্ট এবং বিরাট কোহলির দ্রুত সূচনার সুবাদে ইনিংসটি আক্রমণাত্মকভাবে শুরু হয়। ষষ্ঠ ওভারে দলের মোট রান ৫১-এ পৌঁছালে কোহলি ১৩ বলে ১৯ রান করে আউট হন। তবে সল্ট তার আক্রমণাত্মক ধারা বজায় রেখে ৩৮ বলে ৬৩ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন। পরে টিম ডেভিড দ্রুত ২৬ রান যোগ করলেও, বাকি ব্যাটিং লাইনআপ সেই গতি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় এবং বেঙ্গালুরুকে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কিন্তু তাড়া করার মতো স্কোরে সীমাবদ্ধ রাখে।জবাবে, দিল্লি ক্যাপিটালসের শুরুটা নড়বড়ে ছিল। একেবারে প্রথম ওভারেই আউট হন পাথুম নিসঙ্কা, এরপর আউট হন করুণ নায়ার, যিনি মাত্র ৫ রান করতে সক্ষম হন। ফর্মে থাকা সমীর রিজভিও একই ওভারে সস্তায় আউট হয়ে যান, ফলে তিন ওভারের মধ্যেই ৩ উইকেটে ১৮ রানে ধুঁকতে থাকে দিল্লি।সেই সংকটময় মুহূর্তে, কেএল রাহুল এবং ট্রিস্টান স্টাবস একটি সংযত অথচ প্রভাবশালী জুটি গড়ে ইনিংসকে স্থিতিশীল করেন। রাহুল ৩৪ বলে ৫৭ রানের একটি চমৎকার ইনিংস খেলেন, অন্যদিকে স্টাবস দারুণভাবে রান তাড়া করার দায়িত্ব সামলে নেন। দিল্লি আরও একটি ধাক্কা খায় যখন অধিনায়ক অক্ষর প্যাটেল তীব্র ক্র্যাম্পের কারণে ২৬ রানে আহত হয়ে মাঠ ছাড়েন, যা কিছুক্ষণের জন্য ম্যাচের মোড় বেঙ্গালুরুর দিকে ঘুরিয়ে দেয়।তবে, স্টাবস স্নায়ুচাপ ধরে রাখেন এবং শেষদিকে ডেভিড মিলারের কাছ থেকে শক্তিশালী সমর্থন পান। ম্যাচটি যখন দোদুল্যমান অবস্থায় ছিল এবং শেষ ওভারে ১৫ রান প্রয়োজন ছিল, তখন মিলার দুটি বিশাল ছক্কা মেরে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেন এবং ২২ রানে অপরাজিত থাকেন। অন্যদিকে, স্টাবস ৬০ রানে অপরাজিত থেকে দিল্লিকে এক অসাধারণ জয় এনে দেন।এই জয়ের ফলে দিল্লি ক্যাপিটালস ৫ ম্যাচ থেকে ৬ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু হারলেও ৬ ম্যাচ থেকে ৮ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানেই রয়েছে, যদিও ম্যাচের শুরুতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার পর এই পরাজয়টি তাদের জন্য অবশ্যই বেদনাদায়ক হবে।  

মিলারের শেষ ওভারের তাণ্ডব: বেঙ্গালুরুকে হারিয়ে দিল্লির নাটকীয় জয়
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৩৩ জন