সংবাদ
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে চায় বাংলাদেশ

যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে চায় বাংলাদেশ

​বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান।​বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে মন্ত্রী এ প্রত্যাশার কথা জানান। বৈঠকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উপস্থিত ছিলেন।​সাক্ষাৎকালে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জনগণের সঙ্গে জনগণের (পিপল-টু-পিপল) যোগাযোগ বৃদ্ধি, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়।​গণতন্ত্র সুসংহত করতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগের কথা তুলে ধরে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, 'সরকার নগর উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামীণ অবকাঠামো ও অর্থনীতির টেকসই রূপান্তরে সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির মানোন্নয়নে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে অংশীদারত্বের নতুন সুযোগ রয়েছে। এই পারস্পরিক সহযোগিতার বিস্তার দেশের সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার করবে।'​ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মূল্যায়ন করে নাগরিকদের মধ্যকার যোগাযোগ আরও গভীর করার ওপর জোর দেন। তিনি নগর উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্তরাজ্যের চলমান সহায়তা সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ ছাড়া তৃণমূল পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ‘বটম-আপ গভর্ন্যান্স’ বা নিচের স্তর থেকে শাসনব্যবস্থা পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।​বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্যের সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বহুমুখী ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অর্থবছর যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সমন্বয় করায় চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।​এ সময় স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।\ 
১ ঘন্টা আগে

চুনারুঘাটে সিএনজি উল্টে প্রাণ গেল ব্যবসায়ীর

চুনারুঘাটে সিএনজি উল্টে প্রাণ গেল ব্যবসায়ীর

সুন্দরবনে 'নানা ভাই' বাহিনীর প্রধানসহ ১২ ডাকাতের আত্মসমর্পণ

সুন্দরবনে 'নানা ভাই' বাহিনীর প্রধানসহ ১২ ডাকাতের আত্মসমর্পণ

চাঁদা বন্ধ করায় বিএনপি নেতাকে হত্যার হুমকি, অপপ্রচারের অভিযোগ

চাঁদা বন্ধ করায় বিএনপি নেতাকে হত্যার হুমকি, অপপ্রচারের অভিযোগ

যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে চায় বাংলাদেশ

যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে চায় বাংলাদেশ

এক স্কুলেই ১৩ ছাত্রীর বাল্যবিয়ে, প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ

এক স্কুলেই ১৩ ছাত্রীর বাল্যবিয়ে, প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ

ঢাকায় শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক সিকিউরিটি ও সেফটি এক্সপো

ঢাকায় শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক সিকিউরিটি ও সেফটি এক্সপো

বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস: নীরবতা ও কুসংস্কার ভেঙে জীবন বাঁচানোর বার্তা

বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস: নীরবতা ও কুসংস্কার ভেঙে জীবন বাঁচানোর বার্তা

পল্লবীতে পানির সংকট কাটাতে নতুন পাম্প, সাথে নতুন সরকারি হাসপাতাল

পল্লবীতে পানির সংকট কাটাতে নতুন পাম্প, সাথে নতুন সরকারি হাসপাতাল

১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর লং মার্চ ঘোষণা জামায়াতের

১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর লং মার্চ ঘোষণা জামায়াতের

স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না

স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না

মতামতমতামত

শিশিরের শব্দের মতো ফিরে ফিরে আসে শরৎ

যারা প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, প্রকৃতির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকান, তাদের প্রতি আমার অন্যরকম ভালোবাসা। প্রকৃতিকে ভালোবাসে যে মানুষ, সে মানুষের হৃদয় সংকীর্ণ হতে পারে না। প্রকৃতিপ্রেমী মানুষেরা জাগতিক হলেও স্বচ্ছ জলাশয়ে শুভ্র মেঘের ছায়া দেখে তাদের মন অপার্থিব আনন্দে ভরে ওঠে। বর্ষা শেষে প্রকৃতি যখন স্নিগ্ধ উজ্জ্বল রূপে নিজেকে সাজায়, তখন মানুষের হৃদয়-আকাশেও রুপালি রোদ্দুরের উঁকিঝুঁকি! বর্ষাবসানে প্রখর উজ্জ্বলতা নয়, মায়াময় স্নিগ্ধতা মাখা অনির্বচনীয় সৌন্দর্য নিয়ে শরৎ উপস্থিত হয়। শরতের একধরনের স্তব্ধতা আছে। স্তব্ধতার ছন্দ আছে, গান আছে, ধ্বনি আছে, শব্দ আছে। কে শুনতে পায় সে শব্দ, ধ্বনি। বাংলার কবিরা তা শুনতে পান। তারা কান পেতে রাখেন সে শব্দ শোনার জন্য। জীবনানন্দ তাই বলেন, “সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে।” শিশিরের শব্দ শুনতে হলে কান পেতে থাকতে হয়। শরৎ, বসন্তের মতো উজ্জ্বল নয়। শরৎ নববধূর মতো লজ্জায় অবনত। লজ্জাবতী গাছের পাতার মতো। সামান্য স্পর্শে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। শরৎ অনেকটা বাঙালি জীবনের মতো। কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি। কখনো কাশের মতো সাদার ঢেউ খেলে যায় জীবনে, আবার নীল আকাশের মতো অনিন্দ্য সুন্দর রঙে জীবন ভরে ওঠে।শরতের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রোমান্টিক রবীন্দ্রনাথ শরতের শান্ত, সৌম্য রূপে বিভোর হয়ে প্রকৃতিতে ভেসে বেড়াতেন। শরতের নৈঃশব্দ্যের সৌন্দর্য তাকে নিয়ে যেত অন্য লোকে। বর্ষাবসানে ঝকঝকে প্রকৃতির আহ্বান তিনি শুনতে পেতেন। প্রকৃতির অনুষঙ্গগুলোর আগমনে তিনি পুলক বোধ করতেন। শরতের প্রতি অপার ভালোবাসা তিনি তার সঙ্গীতে, কবিতায় উন্মোচন করেছেন। তিনি যখন গীতিকবিতায় লেখেন—“শরতে আজ কোন্‌ অতিথি/ এল প্রাণের দ্বারে। / আনন্দগান গা রে হৃদয়, / আনন্দগান গা রে। / নীল আকাশের নীরব কথা / শিশির-ভেজা ব্যাকুলতা / বেজে উঠুক আজি তোমার / বীণার তারে তারে।”  আহা, কী অদ্ভুত শরৎবন্দনা। শরতের অনিন্দ্য সুন্দর কোমল সূর্যালোকে মুগ্ধ হয়ে তিনি লিখেছেন ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি।’ কী অপূর্ব বর্ণনা, মনে হয় যেন শরতের ছবি দৃশ্যমান করে তুললেন কলমের তুলি দিয়ে। এরকম বর্ণনা বাঙালি মনকে শরতের অপূর্ব রূপমাধুর্যকে অনুভব করার জন্য প্রস্তুত করেছে।বাংলাদেশের মানুষের জীবন বসন্তের উজ্জ্বল বাহারি রঙের মতো নয়, আবার শীতের প্রকৃতির মতো রুক্ষও বলা যাবে না। তবে বাঙালি জীবনে খরতপ্ত গ্রীষ্মের পর শান্তির বারি নিয়ে আসে বর্ষা। গ্রীষ্মের তপ্ত রোদ থেকে নিষ্কৃতি পেতে পাখিরাও আশ্রয় খোঁজে গাছের ডালে। রৌদ্রের তীব্রতা এড়াতে পথেঘাটে মানুষ খোঁজে একটুখানি ছায়া। প্রচণ্ড গরমে যখন প্রশান্তির ছায়ার আশ্রয় খোঁজে সকল শ্রেণির মানুষ, তখনও গ্রীষ্মের রৌদ্রতাপ থেকে বাঁচতে ছায়ায় আশ্রয় নেওয়ার মতো সময় পায় না শ্রমজীবী মানুষ। অসহ্য গরমকে উপেক্ষা করে অবিচলভাবে চলতে থাকে তাদের জীবন ও জীবিকা। প্রান্তিক বাঙালির কঠিন জীবনে রূপ, রসের ধারা বইয়ে দিয়ে বর্ষা আসে, বর্ষার অপরূপ ছন্দময় বৃষ্টি অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। বর্ষাবসানে স্নিগ্ধ, সুন্দর, মার্জিত বাঙালি বধুর মতো শরৎ ঘোমটা খোলে। প্রকৃতির ঘোমটা কিন্তু ঝলমলে উজ্জ্বল বেনারসি শাড়ির মতো নয়, বাংলার কারিগরদের শিল্পিত হাতে তৈরি মার্জিত জামদানি শাড়ি। এই শিল্পিত সুন্দর ঋতুকে ভালো না বেসে থাকতে পারেননি বাংলার কবি, চিত্রশিল্পী থেকে শুরু করে সকল সৃষ্টিশীল মানুষ। শরতের স্নিগ্ধতায় মোহগ্রস্ত হয়েছিলেন মহাকবি কালিদাস। কালিদাসই প্রথম বলেছিলেন শরৎ নববধূর মতো। কী অসাধারণ উপস্থাপনা। কালিদাস বলেছিলেন, “প্রিয়তম আমার ঐ চেয়ে দেখ/ নব বধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎকাল সমাগত”।আমরা কী দেখেছি নববধূর মতো সমাগত শরৎকালকে। যারা আমার মতো নগরে বসবাস করেন, তাদের বর্ষা ছাড়া আর কোনো ঋতুকে দেখার সুযোগ হয় না। অন্য ঋতুগুলোকে অনুভব করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক বদ্ধ ঘরের ভেতর নৃত্য, গীত সহকারে বসন্তবরণ, বর্ষা উদযাপন কিংবা হেমন্তকালে নবান্ন উৎসবে উপস্থিত হয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলার বকুলতলায় উদযাপন করা হয় প্রতি বছর শরৎ উৎসব। নাচ, গান আর আবৃত্তির মধ্য দিয়ে শরৎবন্দনায় অংশ নেন শিল্পীরা। চারুকলায় নবান্ন উদযাপিত হয়, বর্ষবরণ হয়, প্রতিটি ঋতুর আবাহন করে চারুকলার শিক্ষার্থীরা। একইভাবে সারা দেশে বিভিন্ন বদ্ধ ঘরে অথবা কৃষ্ণচূড়া, শিরীষ প্রাঙ্গণে ঋতু আবাহন ও বন্দনা করা হয়। প্রতিটি ঋতুর অপার্থিব সৌন্দর্যে স্নাত হওয়া আর বদ্ধ ঘরে কিংবা ছাদের নিচের কৃষ্ণচূড়া তলায় ঋতুকে আবাহন করার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। এভাবে অংশ নিয়ে ঋতুকে কী অনুভব করা যায় না। শুধু মাত্র ঋতুর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা যায়।আমরা যদি প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যকে পান করতে চাই, জীবনে সুন্দরকে আবাহন করতে চাই, তাহলে বৈচিত্র‍্যময় ঋতুর স্পর্শ পেতে হবে। শরৎ সন্ধ্যায় আল-ধরা পথ ধরে, ডানে-বামে সামান্য সোনালি রঙের ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে একা একা হেঁটে গেলে মানুষ উদাসী হয়ে যায়। এই যে মনের ঔদাসীন্য, তা হলো শরতের সঙ্গে মনের যোগসূত্র ঘটানো। খালি পায়ে শিশিরের স্পর্শের অনুভূতি, মনের ভেতরের বাউল মানুষকে জাগিয়ে তুলে। মানুষের ভেতরের দার্শনিক মানুষ যখন জেগে ওঠে, তখন মানুষ আর অমানুষ হতে পারে না। থোকা থোকা শিউলির সৌন্দর্য পিপাসু হয়ে পড়ে। সত্য, সুন্দর তার সহযাত্রী হয়।শরৎ মানেই শিউলি ফোটার দিন। শিউলির মধুগন্ধ ভেসে বেড়ানোর দিন। শিউলির আরেক নাম শেফালি। আগের দিনে কবিরা শেফালি নামটাই বেশি ব্যবহার করেছেন। শিউলি বা শেফালি যা-ই বলি না কেন, ফুলটি হলো বাংলার শরতের প্রতীক। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আরণ্যক' উপন্যাসে শিউলির বিশাল বন ও তার তীব্র ঘ্রাণের কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ সবাই বারবার শিউলির প্রশস্তি গেয়েছেন।প্রেমের কবি, প্রেমিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম সবার অলক্ষ্যে শিউলির সৌন্দর্য বিসর্জনকে দেখেছেন বিরহ জড়ানো গভীর দুঃখবোধ হিসেবে। তিনি গেয়েছেন “'তোমারি অশ্রু জলে শিউলি তলে সিক্ত শরতে/হিমানীর পরশ বুলাও ঘুম ভেঙে দাও...'। প্রেমের কবিকে শিউলির অপরূপ সৌন্দর্য অন্যরকম প্রেমাতুর করে তুলত। শারদ রাতে তিনি আকুল হয়ে উঠতেন। তার সেই অমর সঙ্গীতে শিউলির প্রতি তার ভালোবাসার মূর্তিমান হয়ে ওঠে। “শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ/এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথি কই।” শারদ রাতে শিউলি ফুলের প্রতি তার এই আকুলতা চিরদিন প্রেমিক হৃদয়ে ঢেউ তুলে যাবে।শরতে নদীর রূপে একধরনের স্নিগ্ধ মুগ্ধতা খুঁজে পাওয়া যায়। মনে হয় শান্ত মেয়ের আঁচল ওড়ে যায় শরতের নদীর ঢেউয়ের ছন্দের তালে। নদীর দু-কূল ছাপিয়ে বানের জলকে সরিয়ে দিয়ে আন্দোলিত হয় কাশবন। কাশের পেলব পাপড়িগুলো দিনমান হাওয়ায় দোলে, বাতাসে উড়ে যেতে চায়। কাশের বনের শ্বেত সমুদ্রের ঢেউ, ধ্যানমগ্ন হয়ে না দেখলে শরতের অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্যকে প্রায় দেখা হয়ে ওঠে না বললেই চলে। কাশের বন, নদীর ঢেউ, সুনীল আকাশের দূরগামী মেঘ যখন দিগন্ত ছাপিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে খেলা করে, তখন বাংলার শরৎ দৃশ্যমান হয় প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষের সম্মুখে।ফিরে আসি প্রথম কথায়, প্রকৃতিকে ভালোবাসার মানুষেরা মানুষকে ভালো না বেসে পারেন না, মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। মানুষ যদি প্রকৃতির অংশ হয়ে নিজ হাতে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, তাহলে প্রকৃতির অংশ হিসাবে মানুষ কোনোভাবেই তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হবে না। প্রকৃতিকে ভালোবাসা, হৃদয় থেকে যেমন উৎসারিত হয়, একইভাবে প্রকৃতিকে ভালোবাসার গুরুত্বও বুঝিয়ে দিতে হয়।শরতের দিনগুলোকে যেন স্বপ্নের মতোই মনে হয়। চারপাশে ছড়িয়ে থাকে অনেক স্বপ্ন। আমরা সেসব স্বপ্ন কুড়িয়ে নিয়ে ভাবতে বসি কত কিছু! শরতের এই শুভ্র রূপ পবিত্রতার প্রতীক। এই পবিত্রতা দিয়ে আমরা অমানবিক মনকে পরিবার, সমাজ, দেশ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাই আমাদের সুবর্ণ ভূমির অনেক বাইরে।[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় চাই খামারভিত্তিক কৌশল

দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ক্ষতিকর ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বা অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা ও প্রতিবেদন আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্লাস্টিক দূষণ যে এখন আর কেবল নদী, সমুদ্র কিংবা শহরের ডাস্টবিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা অত্যন্ত নীরবে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ঢুকে পড়েছে, দুধের এই চিত্র তারই অকাট্য প্রমাণ। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে এ নিয়ে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ফলে বাজারগুলোতে দুধ পরীক্ষার কড়াকড়ি এবং ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চারদিকে আলোচনা চলছে।ভোক্তাদের এই উদ্বেগ মোটেও অমূলক নয়। তবে এই চলমান জনআলোচনার আড়ালে সংকটের আসল গোড়াটি অধরাই থেকে যাচ্ছে। দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিক ধরা পড়া মানে সমস্যার শুরু নয়; বরং এটি আমাদের অসচেতন ও অপরিকল্পিত কৃষি-পরিবেশগত অব্যবস্থাপনার একটি অনিবার্য শেষ পরিণতি।নিশ্চিতভাবেই দুধ পরীক্ষা করা জরুরি।  এটি ভোক্তাকে সাময়িক সচেতনতা দেয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সতর্ক করে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ একটি ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ ব্যবস্থা। পরীক্ষা কেবল আমাদের বলে দেয় যে দুধ দূষিত হয়েছে, কিন্তু তা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়,সেই স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না।  মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে সত্যিকার অর্থে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের নজর দিতে হবে খামারের দিকে, যেখানে এই বিষাক্ত কণাগুলো প্রথম খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে।লক্ষণীয় বিষয় হলো, মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি দুধে তৈরি হয় না। এগুলো অনেক আগেই জমা হয় আমাদের কৃষিজমি, পশুখাদ্য এবং খামারের পানিতে।  দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পবর্জ্য মিশ্রিত পানি দিয়ে সেচ দেওয়া, স্লাজ সার হিসেবে ব্যবহার এবং কৃষিতে প্লাস্টিক মালচিং- এর অবাধ ব্যবহারের কারণে কৃষিজমিতে প্লাস্টিক কণা জমছে।  এ ছাড়া ফসলের মাঠের পাশে যেখানে-সেখানে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে তা ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে যায়।  এই মাটিতে যে ঘাস, ভুষি বা খড় উৎপাদিত হয়, তা গবাদিপশু খাওয়ার মাধ্যমে সরাসরি তাদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক বহন করে নিয়ে যায়।পশুখাদ্যের বাণিজ্যিক সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় ঝুঁকি আরও বেশি। বাণিজ্যিক পোলট্রি ফিড, গরুর দানাদার খাদ্য কিংবা মাছের খাবার সাধারণত প্লাস্টিকের বস্তায় সংরক্ষণ ও পরিবহন করা হয়।  পরিবহনকালীন ঘর্ষণ, অতিরিক্ত তাপ বা প্লাস্টিকের বস্তার ক্ষয় থেকে অতিক্ষুদ্র কণা খাদ্যের সঙ্গে মিশে যায়। আবার শহরতলির ডেইরি খামারগুলোতে দেখা যায়, গরু প্রায়ই রাস্তার পাশে বা আবর্জনার স্তূপ থেকে খাবার খুঁজতে গিয়ে পলিথিন গিলে ফেলে। এই প্লাস্টিক কণাগুলো প্রাণীর শরীরে ঢুকলে তা কেবল বর্জ্য হিসেবে মলমূত্রের সাথে বেরিয়ে যায় না, বরং প্রাণীর শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া করে।খামারের পানিও এই দূষণের আরেকটি বড় উৎস।  গবাদিপশু যে পুকুর, খাল বা ভূগর্ভস্থ পানি পান করে, তাতে সিন্থেটিক ফাইবার, গাড়ির টায়ারের ক্ষয় থেকে তৈরি অতিক্ষুদ্র কণা এবং প্লাস্টিকের ভাঙা অংশ মিশে থাকে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় এই উৎসগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত, এবং বাংলাদেশের কৃষি-পরিবেশও এখন হুবহু একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।প্রাণীর শরীরে এই প্লাস্টিক কণার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা খুবই সীমিত। মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রাণীর শরীরে ঢুকলে তা ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্রের দেয়ালে ক্রমাগত ঘর্ষণ ও প্রদাহ সৃষ্টি করে। এতে অন্ত্রের প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হজম ও রোগপ্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ‘মাইক্রোবায়োম’ -এর ভারসাম্য নষ্ট হয়। দুগ্ধবতী গাভী ও পোলট্রির ক্ষেত্রে এই অস্বাভাবিকতা খাদ্য হজমের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে এবং নানাবিধ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।মাইক্রোপ্লাস্টিকের আরেকটি ভয়ঙ্কর বৈশিষ্ট্য হলো ‘প্লাস্টিস্ফিয়ার’ তৈরি করা। এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলোর ওপর ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জমে একধরনের জৈব আস্তরণ বা ‘বায়োফিল্ম’ তৈরি করে, যেখানে বিভিন্ন রোগজীবাণু এবং অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া খুব সহজেই বংশবৃদ্ধি করতে পারে। যখন এই প্লাস্টিস্ফিয়ার প্রাণীর অন্ত্রে প্রবেশ করে, তখন তা ক্ষতিকর জীবাণুর বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।  এর ফলে প্রাণী ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ে, চিকিৎসায় জটিলতা দেখা দেয় এবং খামারিদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।  এটি মূলত বৈশ্বিক উদ্বেগের অন্যতম কারণ,অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধির একটি অন্যতম অনালোচিত পথ।এই পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তীব্র তাদপ্রবাহ। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে গবাদিপশু মারাত্মক ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপজনিত চাপের মধ্যে থাকে।  উচ্চ তাপমাত্রা এমনিতেই পশুর খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দেয় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে। এই তাপজনিত চাপের কারণে যখন অন্ত্রের সুরক্ষা ভেঙে পড়ে, তখন মাইক্রোপ্লাস্টিক আরও সহজে অন্ত্র ভেদ করে প্রাণীর রক্তপ্রবাহে ঢুকে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত দুধের মাধ্যমে মানবদেহে পৌঁছায়। সুতরাং, ল্যাবরেটরিতে দুধে যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে, তা আসলে খামারের সামগ্রিক পরিবেশগত সংকটের শেষ ধাপ মাত্র।দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের বর্তমান নীতিনির্ধারণী দৃষ্টিভঙ্গি এখনো সমস্যার ভুল জায়গায় আলো ফেলছে। প্লাস্টিক দূষণকে আমরা এখনো কেবল সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখি।  আর খাদ্য নিরাপত্তা তদারকি করা হয় কেবল শহরের বাজারে তৈরি পণ্য বা দুধ পরীক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু কৃষি জমি, পশুখাদ্য এবং খামারের পানি,যেখান থেকে মূল দূষণ ছড়াচ্ছে, তা পুরোপুরি নজরদারির বাইরে।  বাংলাদেশে পশুখাদ্যে বা কৃষিজমির পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো সর্বোচ্চ সহনশীলতার মানদণ্ড নেই। পাশাপাশি, ভেটেরিনারি জনস্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ও অত্যন্ত সীমিত।দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে আমাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও খামার ব্যবস্থা প্লাস্টিক দূষণের আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। যদি আমরা সত্যি সত্যি নিরাপদ দুধ ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চাই, তবে আমাদের কৌশল বদলাতে হবে।  বাজার থেকে নমুনা পরীক্ষা করার চিরাচরিত প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে খামার পর্যায় থেকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।কৃষিজমির পানি ও মাটিতে প্লাস্টিক কণার অনুপ্রবেশের ওপর নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে পশুখাদ্যের উৎপাদন, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণে প্লাস্টিকের বিকল্প নিরাপদ উপাদানের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। সর্বোপরি, ভেটেরিনারি জনস্বাস্থ্য গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব ও এএমআর ঝুঁকিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্ষতিকর উপাদানকে খাদ্যচক্রে ঢোকার আগেই যদি আমরা খামার পর্যায়ে রুখে দিতে না পারি, তবে কেবল শেষ মুহূর্তের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।[লেখক: সাবেক ডিন, ফ্যাকাল্টি অব অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন; সাবেক চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথশেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়]

পাহাড়ের উৎসবের দিন পাবলিক পরীক্ষা?

প্রতিবছর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পাবলিক পরীক্ষার রুটিনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সামাজিক উৎসব—বৈসুক, সাংগ্রাই, বিঝু, বিহু, চাংক্রান ও চৈত্রসংক্রান্তির দিনগুলোতে পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার রুটিনও এর ব্যতিক্রম নয়। গত ২৪ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রুটিনে দেখা যায়, ১৩ এপ্রিল জীববিজ্ঞান ও অর্থনীতি এবং ১৫ এপ্রিল সব ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের পরীক্ষা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ ১৩ এপ্রিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রধান উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ দিন। ফলে পরীক্ষার্থীদের একদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি, অন্যদিকে পারিবারিক ও সামাজিক উৎসবে অংশ নেওয়ার মধ্যে বেছে নিতে হবে—যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বর্ষবিদায় ও নববর্ষবরণ উপলক্ষে প্রতিবছর ১১ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত নানা সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উৎসব পালন করে। সম্প্রদায়ভেদে উৎসবের নাম ভিন্ন হলেও এর উদ্দেশ্য ও চেতনা অভিন্ন। পরিবারের সদস্যরা একত্র হন, সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করেন এবং নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনাচারের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করেন। বিঝু এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক উৎসব। নাচ-গানসহ নানা আয়োজনে পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে অনেক মানুষ এতে অংশ নেন। ফলে এসব উৎসব এখন শুধু কোনো একটি জনগোষ্ঠীর বিষয় নয়; পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরই অংশ।ঐতিহাসিকভাবেও এসব উৎসবের সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে বিঝু উৎসব উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয়, আদালত ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরে ছুটি থাকত। তাই এ সময়ের ছুটিকে বিঝু ছুটি বা বিঝু উৎসবের ছুটি বলা হতো। পরবর্তী সময়ে রমজান উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটি চালু হওয়ায় সেই প্রথা আর থাকেনি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সামাজিক উৎসবগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। অন্তত পাঁচ দিন—১১ থেকে ১৫ এপ্রিল—সাধারণ ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি বৈচিত্র‍্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে। সেই অন্তর্ভুক্তির বাস্তব প্রতিফলন শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাতেও থাকা প্রয়োজন। কোনো জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসবের দিন পাবলিক পরীক্ষা নির্ধারণ করা হলে সেই অন্তর্ভুক্তির চেতনা প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষ করে এসএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ পরীক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার্থী নয়; তারাও কোনো পরিবার, সম্প্রদায় ও সংস্কৃতির অংশ।এখনও ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার আগে যথেষ্ট সময় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষার রুটিনটি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। অন্তত ১১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে কোনো পাবলিক পরীক্ষা না রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের দিনগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এটি কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দাবি নয়; বরং একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মানের প্রকাশ।বৈসুক, সাংগ্রাই, বিঝু, বিহু, চাংক্রান, বিষু ও চৈত্রসংক্রান্তি আবহমান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। এসব উৎসব পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই প্রধান উৎসবের দিনগুলোতে পাবলিক পরীক্ষা না নেওয়া এবং উৎসব উপলক্ষে অন্তত পাঁচ দিনের সাধারণ ছুটি বিবেচনা করা সময়ের দাবি। রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে, যখন সংখ্যাগরিষ্ঠের পাশাপাশি প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উৎসবকে সমান মর্যাদা দেবে। ধর্ম যার যার, উৎসব হোক সবার—এই চেতনাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সভাপতি, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাজদ্বীপ, রাঙ্গামাটি]

সারের দেশে ক্ষুধার্ত মাটি

জৈব পদার্থের ঘাটতি, পুষ্টির ভারসাম্যহীনতা ও নিবিড় চাষের চাপে নীরবে দুর্বল হচ্ছে বাংলাদেশের মাটি। যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত এসে পড়বে খাদ্যনিরাপত্তায়।বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার গল্প আমরা সাধারণত ধানের ফলন, সারের দাম, সেচের খরচ কিংবা বাজারে চালের দামের মধ্যেই খুঁজি। অথচ এই পুরো ব্যবস্থার নিচে যে ভিত্তিটি নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছে সেই মাটির স্বাস্থ্যের দিকে আমাদের নজর তুলনামূলকভাবে কম।একটি জমি বছরের পর বছর ফসল দিতে থাকলেই যে সেই জমি সুস্থ আছে, বিষয়টি তেমন নয়। বরং অধিক ফসল উৎপাদনের চাপেই মাটি ধীরে ধীরে তার জৈব পদার্থ, পুষ্টির ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য এবং পানি ধারণক্ষমতা হারাতে পারে। এই কারণেই বাংলাদেশের কৃষিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হওয়া উচিত। আমরা কি শুধু ফসল উৎপাদন করছি, নাকি একই সঙ্গে মাটিকেও পুনর্গঠন করছি?জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশের নিচে। আর আরও প্রায় ২৮ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে তা ১ থেকে ১.৭ শতাংশের মধ্যে। এই চিত্র নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের কৃষিজমির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তা। জৈব পদার্থ কেবল গাছের খাদ্য নয়। এটি মাটির দানাদার গঠন উন্নত করে, পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে, পুষ্টি সংরক্ষণ করে এবং অণুজীবের কার্যক্রমকে সক্রিয় রাখে। ফলে মাটির জৈব পদার্থ কমে গেলে শুধু উর্বরতা নয়, মাটির সামগ্রিক কার্যক্ষমতাও দুর্বল হয়।সার বাড়ছে, কিন্তু মাটির স্বাস্থ্য কি বাড়ছে? এখানেই বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। বিশ্বব্যাংক-এর খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর আবাদি জমিতে প্রায় ৩৯১.৯ কেজি সার-পুষ্টি উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।কিন্তু বেশি সার ব্যবহার মানেই বেশি উর্বর মাটি নয়।সমস্যাটি সারের পরিমাণের পাশাপাশি পুষ্টির ভারসাম্য, মাটির প্রকৃত চাহিদা এবং প্রয়োগ পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি ফসল যখন জমি থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিংক, বোরনসহ বিভিন্ন পুষ্টি গ্রহণ করে, সেই পুষ্টির একটি অংশ শস্য ও খড়ের সঙ্গে মাঠের বাইরে চলে যায়। এই ঘাটতি যদি যথাযথভাবে পূরণ না হয়, তাহলে মাটি ধীরে ধীরে নিজের সঞ্চিত পুষ্টি হারাতে থাকে।কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মাটির পুষ্টি উপাদান নিঃশেষকরণ’। মাটি থেকে পুষ্টি আহরণ চলতে থাকে। কিন্তু পুনঃস্থাপন হয় তার চেয়ে কম।বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি নতুন নয়। বিশেষ করে নিবিড় চাষ, একাধিক ফসলের চাপ এবং গৌণ ও অণুপুষ্টির অসম ব্যবহারের কারণে অনেক এলাকায় মাটির পুষ্টিগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষিতে আরেকটি নীরব পরিবর্তন ঘটেছে। ফসলের অবশিষ্টাংশের বড় অংশ পশুখাদ্য, জ্বালানি বা অন্য কাজে মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। গোবরও আগের মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে জমিতে ফেরে না।ফলে যে জৈব পদার্থ স্বাভাবিকভাবে মাটিতে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, সেটিও কমে যাচ্ছে।  এফএও-এর মূল্যায়নেও নিবিড় চাষ, উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় জৈব পদার্থের দ্রুত পচন, কম জৈব সার ব্যবহার এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে না ফেরানোকে মাটির জৈব পদার্থ কমে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ আমরা জমি থেকে শুধু শস্য তুলে নিচ্ছি না, অনেক ক্ষেত্রে মাটির নিজস্ব পুনরুদ্ধারের উপাদানটুকুও সরিয়ে নিচ্ছি। ফলে একই ফলন ধরে রাখতে ক্রমে বাইরের ইনপুট-এর ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, অথচ মাটির নিজস্ব উৎপাদনক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য সতর্কবার্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির বাস্তবতা দেশের অনেক অংশের চেয়ে আলাদা। দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম, উচ্চ তাপমাত্রা, সীমিত মাটির আর্দ্রতা এবং সেচের ওপর নির্ভরতা সবকিছু একসঙ্গে এ অঞ্চলের কৃষিকে চাপের মধ্যে রাখে। এ অঞ্চলে একই জমিতে নিবিড়ভাবে ধান, গম, ভুট্টা, আলু কিংবা অন্যান্য ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে শুধু নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাসিয়ামনির্ভর চিন্তা যথেষ্ট নয়। সালফার, জিংক, বোরনসহ গৌণ ও অণুপুষ্টির ভারসাম্য যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি মাটিতে জৈব পদার্থ ফিরিয়ে দেওয়া।বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো পানি-সংকটাপন্ন এলাকায় মাটির স্বাস্থ্যকে শুধু মাটি উর্বরকরণ ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীলতার প্রশ্ন। কারণ সুস্থ, জৈব পদার্থসমৃদ্ধ মাটি তুলনামূলকভাবে বেশি পানি ধরে রাখতে পারে। খরার সময় এই বৈশিষ্ট্য ফসলকে টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। মাটির অসুখের চিকিৎসা শুধু কিন্তু ইউরিয়া নয়। যে কারণে আধুনিক কৃষিতে এখন শুধু “কত কেজি সার দেব”এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত কোন জমিতে, কোন ফসলে, কোন পুষ্টি, কতটুকু এবং কখন প্রয়োজন?বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)-এর সার সুপারিশমালা হাতবই ২০২৪-এও মাটির অবস্থা, স্থানভেদ এবং পরীক্ষাভিত্তিক সুপারিশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনা, জৈব অনুজীব সার, জৈব অঙ্গার, চুন প্রয়োগ, পুষ্টি উপাদান ব্যবহারের দক্ষতা এবং কৃষিতে উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদান ব্যবহারের কার্যকারিতা-এর মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।  এটাই ভবিষ্যতের পথ। প্রথমত, মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সার প্রয়োগ-কে নিয়মিত কৃষিচর্চার অংশ করতে হবে। মানুষের শরীর পরীক্ষা না করে যেমন ওষুধ দেওয়া যুক্তিসংগত নয়, তেমনি জমির অম্লত্ব, জৈব পদার্থ ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের অবস্থা না জেনে বছরের পর বছর একই মাত্রায় সার প্রয়োগ করাও বৈজ্ঞানিক নয়।দ্বিতীয়ত, সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা মাঠপর্যায়ে আরও শক্তভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এর অর্থ রাসায়নিক সার বাদ দেওয়া নয়; বরং রাসায়নিক সার, গোবর, কম্পোস্ট, সবুজ সার, ফসলের অবশিষ্টাংশ, ডালজাতীয় ফসল এবং প্রয়োজনমতো জৈবসার—সবকিছুর সমন্বিত ব্যবহার।তৃতীয়ত, কৃষকের কাছে শুধু সার পৌঁছানো নয়, মাটিতে জৈব পদার্থ ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় ও প্রণোদনাও পৌঁছাতে হবে।চতুর্থত, শস্যবিন্যাসে ডালজাতীয় ও মাটির স্বাস্থ্য পুনর্গঠনকারী ফসল বাড়াতে হবে।পঞ্চমত, ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনা-কে কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশের সব মাটির জন্য একই প্রেসক্রিপশন দেওয়া যাবে না। অঞ্চল, মাটির ধরন, ফসল এবং মাটি পরীক্ষার গুরুত্ব অনুযায়ী সুপারিশ আলাদা হওয়াই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। বলা ভালো, সমস্যা চিহ্নিত করলেই কাজ শেষ হয় না। এখন দরকার এমন কিছু পদক্ষেপ, যা একই সঙ্গে কৃষক, সম্প্রসারণব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারণ তিন স্তরেই কাজ করবে।এক. ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সহজলভ্য মাটি পরীক্ষার সেবা বাড়াতে হবে। মাটি পরীক্ষা যেন প্রকল্পনির্ভর বা কাগুজে কাজ না হয়ে নিয়মিত কৃষিচর্চার অংশ হয়।দুই. শুধু রাসায়নিক সারে ভর্তুকি নয়, জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনা-এও প্রণোদনা দিতে হবে। কম্পোস্ট, সবুজ সার, গোবরের কার্যকর ব্যবহার এবং স্থানীয়ভাবে জৈব উপাদান তৈরির উদ্যোগ বাড়ানো দরকার।তিন. ঢালাও মাত্রা-এর বদলে জমি-নির্দিষ্ট সার সুপারিশ চালু করতে হবে। একই ফসল হলেও ভিন্ন মাটি, ভিন্ন কৃষি-পরিবেশগত অঞ্চল ও ভিন্ন পুষ্টি অবস্থায় একই মাত্রার সার বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়।চার. শস্যবিন্যাসে ডালজাতীয় ও মাটি পুনরূদ্ধারকারী ফসল বাড়াতে হবে। শুধু উচ্চ পুষ্টি-গ্রাহী ফসলের পুনরাবৃত্তি না করে এমন ফসল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা মাটির ভারসাম্য পুনর্গঠনে সহায়তা করে।পাঁচ. শস্যের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো এবং সম্পূর্ণ অপসারণ কমিয়ে অবশিষ্টাংশ বা বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বাড়াতে হবে। যতটা সম্ভব ফসলের অবশিষ্টাংশকে মাটির সম্পদ হিসেবে ফিরিয়ে দিতে হবে।ছয়. বরেন্দ্রসহ পানি-সংকটাপন্ন অঞ্চলে জৈব পদার্থ ব্যবস্থাপনা, মাটি ঢাকা পদ্ধতি এবং পানি সাশ্রয়ী সেচ-কে একসঙ্গে নিতে হবে। এখানে মাটির স্বাস্থ্য ও পানির দক্ষ ব্যবহারকে আলাদা করে দেখা যাবে না।সাত. কৃষি সম্প্রসারণে ফলনের পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য নির্দেশক পর্যবেক্ষণ শুরু করতে হবে। শুধু কত টন ফসল হলো, তা নয় মাটির জৈব পদার্থ, অম্লত্ব, পুষ্টির ভারসাম্য ও পানি ধারণক্ষমতার পরিবর্তনও নীতিগতভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার।জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে সুস্থ মাটিই প্রথম প্রতিরক্ষা। তাই মাটির উর্বরতা এখন আর শুধু কৃষিবিজ্ঞানের বিষয় নয়। এটি সরাসরি জলবায়ু অভিযোজনের সঙ্গেও যুক্ত। বাংলাদেশে কখনো খরা, কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো বন্যা, আবার উপকূলে লবণাক্ততা কৃষিকে আঘাত করছে। এমন অবস্থায় শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন করলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।যে মাটিতে সেই জাতটি জন্মাবে, সেই মাটিকেও সহনশীল হতে হবে। সুস্থ মাটি পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে, পুষ্টি সংরক্ষণ করে এবং প্রতিকূল পরিবেশে ফসলকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেয়। তাই জলবায়ু-সপ্রতিভ কৃষি-এর আলোচনায় মাটির স্বাস্থ্য-কে কেন্দ্রীয় জায়গায় আনতে হবে।বাংলাদেশ বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও খাদ্য উৎপাদনে অসাধারণ অগ্রগতি করেছে। এখন আমাদের সামনে দ্বিতীয় প্রজন্মের চ্যালেঞ্জ এই উৎপাদনকে টেকসই করা। কোনো জমি আজ ৬ টন ধান দিল কি না, সেটিই তার স্বাস্থ্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। সেই জমি আরও ২০ বছর একই উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে কি না, সেটিও খাদ্যনিরাপত্তার হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। মাটিকে একটি ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে তুলনা করা যায়। প্রতিটি ফসলের সঙ্গে আমরা সেই ব্যাংক থেকে পুষ্টির একটি অংশ তুলে নিচ্ছি। কিন্তু জমা না দিয়ে শুধু উত্তোলন চলতে থাকলে একসময় মূলধন কমে যায়। আমাদের কৃষিতেও তেমনি ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে এক বিশাল মাটির ঋণ।আর সেই ঋণের মূল্য শুধু কৃষক দেবেন না। দেবে ভোক্তা উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও খাদ্যমূল্যের মাধ্যমে। দেবে জাতীয় অর্থনীতি বাড়তি কৃষি-ইনপুট ও সহায়তার মাধ্যমে। আর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কম উৎপাদনক্ষম কৃষিজমির মাধ্যমে। তাই বাংলাদেশের আগামী কৃষিনীতি শুধু “কত খাদ্য উৎপাদন হলো” এই প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না। পাশাপাশি জানতে হবে মাটির জৈব পদার্থ বাড়ছে না কমছে, পুষ্টির ভারসাম্য কোন দিকে যাচ্ছে, এবং দীর্ঘমেয়াদে আমাদের কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা কতটা টেকসই থাকছে।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সাধারণ। যে মাটি আমাদের প্রতিদিনের ভাতের থালা ভরে দিচ্ছে, সেই মাটিকে আমরা কতটুকু ফিরিয়ে দিচ্ছি? কারণ খাদ্যনিরাপত্তার শেষ লড়াইটি শুধু বাজারে নয়, সারের গুদামেও নয়। শেষ লড়াইটি হবে মাটির ভেতরে।মাটি ক্ষুধার্ত রেখে কোনো দেশ দীর্ঘদিন খাদ্যে নিরাপদ থাকতে পারে না।লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও শিক্ষক

পিংক বাস ও নিরাপদ গণপরিবহনের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে একজন নারীর নিরাপদে চলাচলের অধিকার এখনো অনেকাংশে তার সামাজিক পরিচয়, পোশাক, বৈবাহিক অবস্থা কিংবা পারিবারিক অবস্থানের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে আছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে বহু ক্ষেত্রে সমাজ নারীকেই নিরাপদ থাকার দায় চাপিয়ে দেয়। গণপরিবহনেও এর ব্যতিক্রম নেই। ফলে নারীদের জন্য আলাদা বাস চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক একটি পদক্ষেপ হলেও এর বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা জরুরি।১৯ আগস্ট ঢাকায় নারীদের জন্য আলাদা ‘পিংক বাস’ সেবা চালু হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) উদ্যোগে মোট ১৪টি বাস এই সেবায় যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে এবং চারটি চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় পরিচালিত হচ্ছে। বাসগুলোর চালক ও কন্ডাক্টর নারী। উদ্যোগটির উদ্দেশ্য ইতিবাচক এবং এটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার কোনো কারণ নেই। বরং নারীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এটিকে স্বাগত জানানো উচিত। তবে প্রশ্ন হলো, এই উদ্যোগের পরিসর কি সমস্যার ব্যাপ্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?২০২৬ সালের উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ০.৫২৬-এ নেমে এসেছে যা সূচকটিতে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন অবস্থান। গত তিন বছর ধরে দেশের অবস্থান অবনতির দিকে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ। ২০১৭ সালে থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের এক জরিপে ঢাকা নারীদের জন্য বিশ্বের সপ্তম বিপজ্জনক মহানগর হিসেবে উঠে এসেছিল।এদিকে দেশের কর্মশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৩৮.৪ শতাংশ নারী। অর্থাৎ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কারণে নারীর গণপরিবহনের ওপর নির্ভরতা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। কিন্তু নিরাপত্তার পরিস্থিতি সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত হয়নি। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় ঢাকার প্রায় ৭৯ শতাংশ নারী যাত্রী কোনো না কোনো সময় গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ রোড সেফটি নেটওয়ার্কের হিসাবেও এই হার ৮৩ শতাংশ। এই বাস্তবতায় পিংক বাসের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু অভিজ্ঞতা নতুন একটি উদ্বেগ সামনে আনছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিওতে অভিযোগ এসেছে, কিছু সাধারণ বাসের কন্ডাক্টর ও হেলপার নারী যাত্রীদের উদ্দেশে বলছেন ‘আপনাদের জন্য তো আলাদা বাস আছে, ওটাতে উঠুন।’ অথচ সংশ্লিষ্ট রুটে কোনো পিংক বাসের সেবা নেই। কোথাও নারী যাত্রী নির্ধারিত স্টপেজে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বাস পাননি; কোথাও অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়েছে; আবার কোনো শিক্ষার্থী ক্লাসে সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি। অভিযোগগুলোর প্রবণতা যদি বাস্তবতার প্রতিফলন হয়, তাহলে বিষয়টি উদ্বেগজনক। কারণ নারীর নিরাপত্তার জন্য চালু করা একটি বিশেষায়িত সেবা যেন সাধারণ গণপরিবহনে নারীর অধিকার সীমিত করার অজুহাত না হয়ে ওঠে।এখানেই তৈরি হয় পিংক বাসের প্যারাডক্স। মাত্র ১৪টি বাস দিয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক নারী যাত্রীর পরিবহন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়, এটি সহজেই অনুমেয়। এমনকি একটি শহরের সব রুটেও এই সেবা পৌঁছানো সম্ভব নয়। ফলে পিংক বাসকে যদি সাধারণ গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় অংশের নারী যাত্রী এর বাইরে থেকে যাবেন। অথচ তাঁদের যদি সাধারণ বাসেও নিরুৎসাহিত করা হয়, তাহলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে তাঁদের চলাচলের সুযোগই সংকুচিত হবে।এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক মানসিকতা। বাংলাদেশের সমাজে নারীর ঘরের বাইরে কাজ করা, একা চলাফেরা করা কিংবা রাত পর্যন্ত বাইরে থাকা নিয়ে এখনো নানা ধরনের সামাজিক আপত্তি রয়েছে। উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি সূচকের ২০২১-২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের ৫৭ শতাংশেরও বেশি মনে করেন, পরিবারের নারীদের বাইরে গিয়ে বেতনের কাজ করা গ্রহণযোগ্য নয়। এই মানসিকতার সঙ্গে যদি এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা যুক্ত হয়, যেখানে ‘নারীদের জন্য আলাদা বাস’কে তাঁদের সাধারণ পরিবহনে চলাচলের বিকল্প হিসেবে দেখা হয়, তাহলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই একটি বিপজ্জনক বার্তা তৈরি হতে পারে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় নারীর জন্য আলাদা ব্যবস্থা তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, সাধারণ পরিবহনব্যবস্থাকে নিরাপদ করার দায় যেন আর নেই।প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে করাচি-হায়দরাবাদ এবং পেশোয়ারেও নারী-চালিত পিংক বাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সীমিত রুট ও সংখ্যার কারণে এসব সেবা মূলত নির্দিষ্ট শ্রেণির নারীদের কাছেই বেশি পৌঁছেছে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও তুলনামূলক সচ্ছল নারীদের। নিম্ন-আয়ের নারী, দিনমজুর কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীদের জন্য সীমিত রুটের বিশেষায়িত বাস অনেক সময় বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।ভারতের কিছু উদ্যোগ অবশ্য ভিন্ন ধরনের শিক্ষা দেয়। বেঙ্গালুরুতে পুরো বাস নারীদের জন্য আলাদা না রেখে প্রতিটি বাসে নির্দিষ্ট কিছু আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং সেই আসনে পুরুষ বসলে জরিমানার বিধান রয়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলোর মূল শিক্ষা হলো নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তাঁদের আলাদা করে দেওয়া একমাত্র সমাধান নয়। বরং গোটা গণপরিবহনব্যবস্থাকে নিরাপদ, জবাবদিহিমূলক এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল করে তোলাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে।বাংলাদেশেও তাই পিংক বাসের সংখ্যা বাড়ানো অবশ্যই জরুরি। এর পাশাপাশি ডিজিটাল টিকিটিং, সিসিটিভি, জিপিএস ট্র্যাকিং, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে প্রযুক্তি ও অবকাঠামো একা সমস্যার সমাধান করবে না। বাসের চালক, কন্ডাক্টর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পরিবহন কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকে দৃশ্যমান ও কার্যকর করতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। একজন নারী কেন বাইরে যাবেন, কী পোশাক পরবেন, কখন বাড়ি ফিরবেন কিংবা কোন পরিবহনে উঠবেন এসব প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে যদি তাঁর স্বাধীনতার বদলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থাকে, তাহলে কোনো বিশেষ বাসই সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না।নারীরা বহু বাধা অতিক্রম করে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। তাদের চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি তাদের নাগরিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত। পিংক বাস সেই অধিকার বাস্তবায়নের একটি অতিরিক্ত সুযোগ হতে পারে। কিন্তু সেটি যেন কখনোই সাধারণ বাসে নারীর সমান অধিকার খর্ব করার যুক্তি না হয়ে ওঠে। নারীর জন্য আলাদা বাস থাকতে পারে, কিন্তু নিরাপদ সাধারণ গণপরিবহনে ওঠার অধিকারও তার সমানভাবে থাকতে হবে।[লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]

খাদ্যে ভেজাল: অজ্ঞতা, অভ্যাস নাকি লোভ?

বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল নতুন কোনো সমস্যা নয়। কখনো মসলায় অননুমোদিত রং, কখনো নিম্নমানের কাঁচামালকে উন্নতমানের বলে বিক্রি, কখনো খাবারের রং, গঠন বা বাহ্যিক সৌন্দর্য পরিবর্তনের জন্য অননুমোদিত রাসায়নিকের ব্যবহার—বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম আমাদের সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জিলাপি, মুড়ি, গুড়সহ কিছু খাদ্যে ‘হাইড্রোজ’ নামে পরিচিত রাসায়নিক ব্যবহারের খবর বিষয়টিকে আবারও আলোচনায় এনেছে। অভিযান হচ্ছে, জরিমানা হচ্ছে, সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এসব ঘটনার মধ্যেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—একজন মানুষ কেন অন্য মানুষের খাবারে এমন কিছু মেশাবেন, যা সেখানে থাকার কথা নয়? তিনি কি জানেন না, নাকি জেনেও করেন? আর জেনেও করলে কীভাবে একটি অন্যায় কাজ ধীরে ধীরে তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে?প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। খাদ্যে ভেজাল দেওয়াকে বাংলাদেশের মানুষের কোনো ‘মানসিক সমস্যা’ বা বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। খাদ্য প্রতারণা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই ঘটে। এখানে আচরণগত বা মনস্তাত্ত্বিক বিষয় বলতে কোনো মানসিক রোগ বোঝানো হচ্ছে না। বরং মানুষ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, অন্যের আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়, লাভ ও ঝুঁকির মধ্যে তুলনা করে, নিজের ভুলের পক্ষে যুক্তি তৈরি করে এবং একই ভুল বারবার করতে করতে একসময় সেটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়—সেই প্রক্রিয়াকে বোঝানো হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কোন পরিস্থিতি কিছু মানুষের মধ্যে এমন আচরণ তৈরি করতে এবং টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে?সাম্প্রতিক আলোচিত ‘হাইড্রোজ’ বলতে সাধারণত Sodium dithionite বা Sodium hydrosulfite নামে পরিচিত একটি রাসায়নিক পদার্থকে বোঝানো হয়। এটি একটি শক্তিশালী বিজারক ও বিরঞ্জক পদার্থ এবং বিভিন্ন শিল্পে এর ব্যবহার রয়েছে। অথচ খাবারকে অস্বাভাবিক সাদা, উজ্জ্বল বা বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় করার উদ্দেশ্যে এর অপব্যবহারের অভিযোগ বাংলাদেশে রয়েছে। এখানেই প্রশ্ন আসে—একজন মুড়ি প্রস্তুতকারক কেন তার মুড়িকে অস্বাভাবিক সাদা করতে চাইবেন? একজন গুড় উৎপাদক কেন গুড়ের স্বাভাবিক রং পরিবর্তন করবেন? একজন মিষ্টি প্রস্তুতকারক কেন এমন একটি রাসায়নিক ব্যবহার করবেন, যার খাদ্যে থাকার কথা নয়?এর প্রথম উত্তর হতে পারে—অজ্ঞতা। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাদ্যখাতের বড় একটি অংশে আনুষ্ঠানিক খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় রাস্তার খাবার বিক্রেতাদের বড় অংশের খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকার চিত্র উঠে এসেছে। ফলে খাদ্যমানের রাসায়নিক আর শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকের পার্থক্য, কোন খাদ্য-সংযোজনী অনুমোদিত, কোনটি নয়, কতটুকু ব্যবহার করা যায় কিংবা ভুল রাসায়নিক ব্যবহারে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এসব বিষয়ে অনেকের পর্যাপ্ত ধারণা নাও থাকতে পারে।একজন নতুন কারিগরের কথা ভাবা যাক। তিনি একটি মুড়ির কারখানায় কাজ শিখতে গেলেন। সেখানে দেখলেন অভিজ্ঞ কারিগর একটি বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। পাশের কারখানাতেও একই পদ্ধতি চলছে। জানতে চাইলে তাকে বলা হলো, “এটা দিলে মুড়ি সুন্দর হয়, আমরা তো বহু বছর ধরে এভাবেই করছি।” নতুন কর্মী হয়তো আর প্রশ্ন করলেন না—পদার্থটি আসলে কী, এটি খাদ্যে ব্যবহারের অনুমতি আছে কি না কিংবা এর নিরাপদ বিকল্প কী। তার কাছে সেটিই হয়ে গেল শেখা পদ্ধতি। কয়েক বছর পর তিনিই হয়তো আরেকজনকে একই পদ্ধতি শেখাবেন।এভাবেই একটি ভুল পদ্ধতি একজন থেকে আরেকজনের কাছে যেতে যেতে একসময় ‘প্রচলিত পদ্ধতি’ হয়ে উঠতে পারে। অথচ কোনো কাজ বহু বছর ধরে করা হচ্ছে বলেই সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক বা নিরাপদ হয়ে যায় না।কিন্তু অজ্ঞতা দিয়ে পুরো সমস্যাটি ব্যাখ্যা করা যায় না। খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—মানুষ যা জানে, বাস্তবে সবসময় তা অনুসরণ করে না। অর্থাৎ জানা এবং মানার মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার নিয়ম সম্পর্কে ধারণা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে সেই নিয়ম অনুসরণ না করার ঘটনা দেখা যায়। তাই শুধু তথ্য দিলেই মানুষের আচরণ পরিবর্তিত হবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়।মানুষ সামাজিক জীব। আশপাশের মানুষ যা করছে, সেটিকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা আমাদের মধ্যে রয়েছে। একটি বাজারে যদি দশজন উৎপাদকের মধ্যে আটজন একই অননুমোদিত পদ্ধতি অনুসরণ করেন, বাকি দুজনের ওপরও সেই পদ্ধতি অনুসরণের চাপ তৈরি হতে পারে। তখন একটি অত্যন্ত পরিচিত যুক্তি সামনে আসে—“সবাই তো করছে।”সবাই যখন করছে, নিশ্চয় খুব খারাপ নয়। এত বছর ধরে চলছে, সমস্যা হলে এত দিনে হতো। আমি একা নিয়ম মেনে কী লাভ? এই ধরনের চিন্তা ব্যক্তির নিজের দায়িত্ববোধকে দুর্বল করতে পারে। ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের দায় গোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে যায়।এর সঙ্গে যখন ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা যুক্ত হয়, তখন চাপ আরও বাড়ে। একজন ব্যবসায়ী দেখলেন পাশের দোকানের মুড়ি বেশি সাদা বলে বেশি বিক্রি হচ্ছে। অন্যের গুড় বেশি উজ্জ্বল বলে ক্রেতা সেটিকেই উন্নতমানের মনে করছেন। তার স্বাভাবিক পণ্য দেখতে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয়। তখন তার সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে—নিয়ম মেনে বাজার হারাবেন, নাকি অন্যদের মতো করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবেন?এখানেই খাদ্যে ভেজালের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রণোদনা যুক্ত হয়। নিম্নমানের কাঁচামালকে উন্নত দেখানো, উৎপাদন খরচ কমানো, পণ্যের বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানো, বিক্রি বাড়ানো কিংবা বেশি মূল্য পাওয়ার সুযোগ থাকলে একজন দুর্বল নৈতিকতার ব্যবসায়ীর কাছে অনিয়ম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। সিদ্ধান্তটি তখন শুধু “এটি ঠিক না ভুল”—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয়—“এতে আমার কত লাভ হবে?”এরপর আসে মানুষের নিজের ঝুঁকিকে ছোট করে দেখার প্রবণতা। কেউ হয়তো জানেন কাজটি পুরোপুরি ঠিক নয়, কিন্তু নিজেকে বোঝাতে শুরু করেন—“আমি তো খুব সামান্য দিচ্ছি”, “একটু দিলে কী আর হবে”, “অন্যরা আমার চেয়েও বেশি দেয়”, “এত বছর মানুষ খাচ্ছে, কিছু তো হয়নি।”এসব বক্তব্য বৈজ্ঞানিক ঝুঁকি নিরূপণ নয়। এগুলো নিজের আচরণকে নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার মানসিক উপায়। বিশেষ করে কোনো অনিরাপদ কাজের ক্ষতি সঙ্গে সঙ্গে চোখে না পড়লে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হতে পারে। আজ একটি অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করা হলো, কাল কোনো অভিযোগ এল না। পরদিন আবার ব্যবহার করা হলো। কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর সেই ব্যক্তির কাছে কাজটি আর অস্বাভাবিক বলে মনে নাও হতে পারে।এভাবেই শুরু হয় সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তন—অন্যায়ের স্বাভাবিকীকরণ। প্রথমবার একটি ভুল কাজ করার সময় মানুষের মনে দ্বিধা থাকতে পারে। দ্বিতীয়বার সেই দ্বিধা কিছুটা কমে। একই কাজ বারবার করতে করতে সেটি পরিচিত অভ্যাসে পরিণত হয়। একসময় সেই ব্যক্তিই নতুন কর্মীকে বলেন, “আমরা তো সবসময় এভাবেই করি।” তখন অতীতের অভ্যাসই যেন কাজটির সঠিকতার প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিজের ভুলের পক্ষে নৈতিক যুক্তি তৈরি করা। মানুষ সাধারণত নিজেকে অসৎ মানুষ হিসেবে দেখতে চায় না। তাই ভুল কাজ করলেও নিজের কাছে সেটিকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য নানা ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারে—“ক্রেতাই তো এমন পণ্য চায়”, “সাদা না হলে মুড়ি বিক্রি হয় না”, “উজ্জ্বল না হলে গুড় কেউ কিনবে না”, “আমি বন্ধ করলেও অন্যরা তো বন্ধ করবে না”, “এভাবে না করলে ব্যবসায় লাভ থাকবে না।”এভাবে নিজের সিদ্ধান্তের দায় কখনো ক্রেতা, কখনো প্রতিযোগী, কখনো বাজারের ওপর সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু একজন খাদ্য উৎপাদক তার পণ্যে কী ব্যবহার করছেন, সেই দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তারই।তবে ভোক্তার ভূমিকাও উপেক্ষা করা যায় না। আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করা দরকার—আমরা কেন ধবধবে সাদা মুড়িকে ভালো মুড়ি মনে করি? কেন অস্বাভাবিক উজ্জ্বল গুড়কে বেশি বিশুদ্ধ ভাবি? কেন অতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙের মিষ্টি আমাদের বেশি আকর্ষণ করে?প্রাকৃতিক খাদ্যের নিজস্ব রং, গন্ধ, স্বাদ ও গঠন রয়েছে এবং তাতে স্বাভাবিক তারতম্য থাকতেই পারে। সব গুড় একই রঙের হবে না। সব মুড়ি বরফের মতো সাদা হওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি পণ্য অস্বাভাবিক সুন্দর দেখালেই সেটি বেশি নিরাপদ বা উন্নতমানের—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই।কিন্তু ভোক্তা যদি বাহ্যিক সৌন্দর্যকে গুণমানের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখেন, বাজার সেই চাহিদার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবে। ক্রেতা অস্বাভাবিক সাদা পণ্য পছন্দ করেন, উৎপাদক আরও সাদা করার উপায় খোঁজেন, সেই পণ্য বেশি বিক্রি হয়, অন্য উৎপাদকও তা অনুসরণ করেন। একসময় অস্বাভাবিক চেহারাই আমাদের কাছে ‘স্বাভাবিক ভালো মান’ হয়ে উঠতে পারে।অবশ্য ভোক্তার পছন্দ কোনোভাবেই খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার বৈধতা তৈরি করে না। একজন ক্রেতা সুন্দর পণ্য চাইতে পারেন; তার অর্থ এই নয় যে উৎপাদক অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু ভেজালের বাজার কেন তৈরি হয় এবং কেন টিকে থাকে, সেটি বুঝতে হলে ভোক্তার প্রত্যাশাকেও আলোচনায় আনতে হবে।এরপর আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ধরা পড়ার সম্ভাবনা। আইন কত কঠোর, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আইন ভাঙলে বাস্তবে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কতটুকু, সেটিও মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। একজন ব্যবসায়ী যদি মনে করেন অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করে তিনি নিয়মিত বাড়তি লাভ করতে পারবেন, অথচ তার পণ্যের নমুনা পরীক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, তাহলে তার কাছে অনিয়মটি ‘লাভজনক ঝুঁকি’ বলে মনে হতে পারে।তাই শুধু বড় অঙ্কের জরিমানা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি, যাতে অনিয়ম করলে ধরা পড়ার সম্ভাবনাটিও বাস্তব বলে মনে হয়। কোন খাবারে কোন ভেজাল বেশি হচ্ছে, কোন এলাকায় সমস্যা বেশি, কোন মৌসুমে নির্দিষ্ট অনিয়ম বাড়ছে এবং কোন রাসায়নিক খাদ্য উৎপাদকের কাছে যাচ্ছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে নজরদারি পরিচালনা করা প্রয়োজন।হাইড্রোজের মতো শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকের ক্ষেত্রে শুধু শেষের মুড়ি প্রস্তুতকারক, গুড় উৎপাদক বা মিষ্টির দোকানকে জরিমানা করলেই সমস্যার মূল উৎস বন্ধ হবে না। দেখতে হবে রাসায়নিকটি কোথা থেকে আসছে, কে বিক্রি করছে, কে কিনছে এবং খাদ্য উৎপাদকের কাছে কীভাবে পৌঁছাচ্ছে। অর্থাৎ শেষের দোকান থেকে শুরু করে রাসায়নিকের উৎস পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার অনুসরণযোগ্যতা প্রয়োজন।এই জায়গাতেই খাদ্যবিজ্ঞানী ও খাদ্যপ্রযুক্তিবিদদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যে ভেজালের সব সমস্যার সমাধান শুধু আইন প্রয়োগ করে সম্ভব নয়। অনেক সময় একজন ক্ষুদ্র উৎপাদক একটি অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করেন একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত উদ্দেশ্যে—মুড়ি আরও সাদা করা, গুড়ের রং হালকা করা, মিষ্টির গঠন ভালো রাখা, পণ্যের স্বাদ উন্নত করা কিংবা বেশি সময় ভালো রাখার জন্য। তাকে শুধু বলা হলো, “এটি ব্যবহার করা যাবে না”—তাতে সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়। একই সঙ্গে তাকে বলতে হবে—তাহলে নিরাপদভাবে কাজটি কীভাবে করা যাবে?এখানেই খাদ্যবিজ্ঞানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। যদি মুড়ির রং বা গঠন সমস্যা হয়, তাহলে কাঁচামালের মান, ধানের জাত, ভিজিয়ে রাখার সময়, তাপমাত্রা, শুকানো ও ভাজার প্রক্রিয়া পরীক্ষা করে নিরাপদ উপায়ে কাঙ্ক্ষিত গুণমান অর্জনের পথ বের করা যেতে পারে। গুড়ের ক্ষেত্রে রস সংগ্রহের স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি, দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ছাঁকন ও জ্বাল দেওয়ার পদ্ধতি উন্নত করে রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ থাকতে পারে। মিষ্টি, বেকারি ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ক্ষেত্রেও সঠিক কাঁচামাল, অনুমোদিত খাদ্য-সংযোজনী এবং উপযুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে নিরাপদ বিকল্প তৈরি করা সম্ভব।এখানে নীতিটি হওয়া উচিত—“নিষেধের সঙ্গে বিকল্পও দিতে হবে।”একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে বলা হলো হাইড্রোজ ব্যবহার করবেন না, কিন্তু হাইড্রোজ ছাড়া কীভাবে তার পণ্যের গ্রহণযোগ্য রং, স্বাদ বা গঠন বজায় রাখা যাবে তা শেখানো হলো না—তাহলে তার পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। খাদ্যবিজ্ঞানীর কাজ সেই প্রযুক্তিগত ব্যবধানটি পূরণ করা।খাদ্যবিজ্ঞানীর আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো জটিল খাদ্যবিজ্ঞান ও আইনকে সাধারণ উৎপাদকের ভাষায় পৌঁছে দেওয়া। একজন ক্ষুদ্র মুড়ি প্রস্তুতকারকের Sodium dithionite-এর জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া জানার প্রয়োজন নেই। তার জানা প্রয়োজন—কোনটি ব্যবহার করা যাবে না, কেন যাবে না এবং তার পরিবর্তে তিনি কী করবেন। একইভাবে খাদ্য-সংযোজনীর অনুমোদিত ব্যবহার, খাদ্যমানের ও শিল্পমানের রাসায়নিকের পার্থক্য, পরিচ্ছন্নতা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ, জীবাণু নিয়ন্ত্রণ ও মোড়কজাতকরণের মৌলিক বিষয়গুলো হাতে-কলমে শেখানো প্রয়োজন।বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, খাদ্যশিল্প এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র উৎপাদকদের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতা তৈরি করা গেলে গবেষণাগারের জ্ঞান সরাসরি বাজারের সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করা সম্ভব। খাদ্যবিজ্ঞানীর কাজ তখন শুধু নমুনায় ভেজাল শনাক্ত করা থাকবে না; বরং ভেজাল দেওয়ার প্রয়োজনটাই কমিয়ে আনা হবে। কোনো উৎপাদক যদি নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রহণযোগ্য খরচে ভালো রং, স্বাদ, গঠন ও সংরক্ষণকাল অর্জন করতে পারেন, তাহলে অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহারের প্রণোদনাও কমবে।বাংলাদেশে তাই খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের একটি কার্যকর দর্শন হতে পারে—আইন বলবে কী করা যাবে না, আর খাদ্যবিজ্ঞান দেখাবে নিরাপদভাবে কীভাবে করা যাবে।সবকিছু মিলিয়ে খাদ্যে ভেজালের পেছনের ধারাবাহিকতাটি অনেকটা এমন—অজ্ঞতা থেকে ভুল পদ্ধতি শেখা, অন্যকে দেখে সেটি গ্রহণ করা, “সবাই করছে” বলে নিজেকে বোঝানো, ছোট অনিয়ম দিয়ে শুরু করা, তাৎক্ষণিক ক্ষতি দেখতে না পাওয়া, একই কাজ বারবার করা, সেখান থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়া, নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি তৈরি করা এবং ধরা পড়ার আশঙ্কা কম মনে করতে করতে একসময় অনিয়মকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া।এই চক্র ভাঙতে হলে যিনি জানেন না তাকে শিক্ষা দিতে হবে, যিনি ভুল পদ্ধতি শিখেছেন তাকে সঠিক পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দিতে হবে, ভোক্তাকে প্রাকৃতিক খাদ্যের স্বাভাবিক রং ও গঠন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং সৎ ব্যবসায়ী যেন নিয়ম মেনে চলার কারণে বাজারে পিছিয়ে না পড়েন, সেটিও দেখতে হবে। আর যিনি সবকিছু জানার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে আর্থিক লাভের জন্য মানুষের খাবারে অননুমোদিত পদার্থ ব্যবহার করেন, তার ক্ষেত্রে কার্যকর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই।সবশেষে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার সংস্কৃতিতে। একজন খাদ্য ব্যবসায়ীর মনে যদি প্রধান প্রশ্ন হয়—“এটা করলে আমি ধরা পড়ব কি না?”, তাহলে তার আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সবসময় একজন পরিদর্শকের প্রয়োজন হবে। কিন্তু প্রশ্নটি যদি হয়—“এই খাবারটি যদি আমার নিজের সন্তান বা পরিবারের কাউকে খাওয়াতে হয়, আমি কি একইভাবে তৈরি করব?”—তাহলে খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিবেক ও সামাজিক দায়িত্বও যুক্ত হয়।বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল তাই শুধু অজ্ঞতার সমস্যা নয়, আবার শুধু লোভের সমস্যাও নয়। এটি অজ্ঞতা, ভুল শিক্ষা, সামাজিক অনুকরণ, অর্থনৈতিক প্রণোদনা, ভোক্তার প্রত্যাশা, নিজের ঝুঁকিকে ছোট করে দেখা, নিজের ভুলের পক্ষে যুক্তি তৈরি এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সম্মিলিত ফল। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত—শিক্ষা, খাদ্যবিজ্ঞান, নিরাপদ প্রযুক্তি, দায়িত্বশীল ব্যবসা, সচেতন ভোক্তা, নিয়মিত নজরদারি এবং কার্যকর আইন প্রয়োগকে একই সঙ্গে কাজ করতে হবে।কারণ অন্যায় যখন বারবার ঘটে, আশপাশের সবাই সেটি করতে থাকে, বাজারে তার পুরস্কার পাওয়া যায় এবং ধরা পড়ার আশঙ্কা কম থাকে—তখন একসময় সেই অন্যায়ই স্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে। খাদ্য নিরাপত্তায় আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সম্ভবত সেখানেই—অন্যায়কে কখনোই স্বাভাবিক হয়ে উঠতে না দেওয়া।[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

প্রশ্ন করতে শেখাই আসল শিক্ষা

একদিন একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক বোর্ডে লিখলেন, “বাংলাদেশে বন্যা হয় কেন?” সবাই চুপ। শিক্ষক বললেন, “বইয়ে যে উত্তর আছে, সেটিই লিখবে।” একজন শিক্ষার্থী হাত তুলে বলল, “স্যার, আমাদের এলাকায় তো প্রতিবছর বন্যা হয়। কিন্তু বন্যার পানি এলে আমাদের স্কুল বন্ধ হয়ে যায় কেন?” শিক্ষক কিছুক্ষণ থামলেন। আরেকজন বলল, “আমাদের বাড়ির পাশে খালটি ভরাট হয়ে গেছে। এটা কি বন্যার কারণ হতে পারে?” আরেকজন বলল, “বন্যা শুধু দুর্যোগ, নাকি এর সঙ্গে মানুষের কাজও জড়িত?”হঠাৎ একটি সাধারণ প্রশ্ন বদলে গেল অনেকগুলো প্রশ্নে। শ্রেণিকক্ষও বদলে গেল। বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে আলোচনা চলে গেল শিক্ষার্থীদের জীবনে। এই মুহূর্তটিই পাওলো ফ্রেইরের দর্শনের প্রাণ। শিক্ষা শুধু শিক্ষক যা জানেন তা শিক্ষার্থীর মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া নয়। শিক্ষা হলো মানুষকে নিজের চারপাশকে দেখতে, প্রশ্ন করতে, বুঝতে, নিজের মত প্রকাশ করতে এবং প্রয়োজন হলে পরিবর্তনের পথ খুঁজতে শেখানো।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দর্শন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের জগতে বাস করে না। তারা এমন এক বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে ওঠে যেখানে পরিবার, অর্থনীতি, সামাজিক প্রত্যাশা, পরীক্ষার চাপ, ভবিষ্যৎ পেশা, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবী প্রতিদিন তাদের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। তাই আজকের শিক্ষার কাজ শুধু “সঠিক উত্তর” শেখানো নয়; বরং শিক্ষার্থীকে এমন মানসিক শক্তি দেওয়া, যাতে সে অনিশ্চয়তার মধ্যেও শান্তভাবে চিন্তা করতে পারে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে গড়ে তুলতে পারে।পাওলো ফ্রেইরে এই জায়গাতেই অসাধারণ। তিনি শিক্ষার্থীকে খালি পাত্র মনে করেননি। তার কাছে শিক্ষার্থী একজন মানুষ, যার নিজস্ব অভিজ্ঞতা আছে, প্রশ্ন আছে, অনুভূতি আছে, চিন্তা আছে। শিক্ষকও শুধু বক্তা নন। শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে জ্ঞান অনুসন্ধানের যাত্রায় অংশ নেন। অর্থাৎ শিক্ষক বলবেন না, “আমি জানি, তুমি জানো না।” বরং তিনি এমন পরিবেশ তৈরি করবেন যেখানে দুজনেই বলতে পারেন, “চলো, আমরা বিষয়টি বুঝে দেখি।”এখানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী উত্তর দিতে ভয় পায়। কারণ ভুল উত্তর দিলে হাসাহাসি হতে পারে, শিক্ষক বকা দিতে পারেন, সহপাঠী উপহাস করতে পারে কিংবা পরীক্ষায় নম্বর কমে যেতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করাও বন্ধ করে দেয়। অথচ প্রশ্ন না করার শিক্ষা কখনো গভীর শিক্ষা হতে পারে না।ফ্রেইরের দর্শন এই ভয় কমাতে সাহায্য করে। শিক্ষক যদি বলেন, “তোমার উত্তর ভুল হলেও সমস্যা নেই। তুমি কেন এমন মনে করছ, সেটা বলো”, তাহলে শিক্ষার্থীর মনে নিরাপত্তা তৈরি হয়। সে বুঝতে পারে, ভুল করা মানেই ব্যর্থ হওয়া নয়। ভুল থেকে শেখাও শিক্ষার অংশ।এই মানসিক শান্তির বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু যদি সারাক্ষণ মনে করে, “আমাকে অবশ্যই সঠিক উত্তর দিতে হবে”, তাহলে তার মধ্যে শেখার আনন্দের বদলে ভয় তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি সে জানে, “আমি প্রশ্ন করতে পারি, না জানলে বলতে পারি, ভুল করলে আবার চেষ্টা করতে পারি”, তাহলে শেখা হয়ে ওঠে আনন্দের বিষয়। ফ্রেইরের সংলাপভিত্তিক শিক্ষা তাই শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন ঘটায় না; এটি শ্রেণিকক্ষে সম্মান, নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।ধরা যাক, শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন, “ভালো শিক্ষার্থী কাকে বলে?” প্রচলিত উত্তর হতে পারে, যে নিয়মিত পড়ে, পরীক্ষায় ভালো করে এবং শিক্ষকের কথা শোনে। কিন্তু শিক্ষক যদি আরও প্রশ্ন করেন, “যে শিক্ষার্থী অন্যায় দেখলে প্রশ্ন করে, সে কি ভালো শিক্ষার্থী?” তখন চিন্তার নতুন দরজা খুলবে। কেউ বলবে, “হ্যাঁ।” কেউ বলবে, “কী ধরনের প্রশ্ন তার ওপর নির্ভর করে।” কেউ বলবে, “প্রশ্ন করার আগে বিষয়টি জানতে হবে।” তখন শিক্ষার্থীরা বুঝতে শিখবে যে ভালো শিক্ষা মানে শুধু অনেক তথ্য জানা নয়; যুক্তিসহ চিন্তা করাও শিক্ষা।বাংলাদেশের জন্য ফ্রেইরের দর্শনের প্রথম বড় প্রয়োজন তাই মুখস্থ থেকে চিন্তার দিকে যাওয়া।একজন শিক্ষার্থী যদি মুখস্থ করে, “গণতন্ত্র হলো জনগণের শাসন”, তাহলে সে একটি সংজ্ঞা জানে। কিন্তু শিক্ষক যদি প্রশ্ন করেন, “বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মতামতের কোনো মূল্য থাকা কি গণতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত?” তখন শিক্ষার্থী নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে ভাবতে শুরু করবে। শ্রেণিকক্ষে হয়তো একটি ছোট নির্বাচন আয়োজন করা হলো। শিক্ষার্থীরা প্রার্থী হলো, প্রচার করল, ভোট দিল, ফলাফল মেনে নিল। এরপর আলোচনা হলো, “পরাজিত প্রার্থীকে সম্মান করা কেন প্রয়োজন?” তখন গণতন্ত্র আর বইয়ের সংজ্ঞা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে জীবন্ত অভিজ্ঞতা।দ্বিতীয় বড় প্রয়োজন হলো বাস্তব জীবনকে শিক্ষার অংশ করা।বাংলাদেশের একজন কৃষকের সন্তান যখন কৃষি বিষয়ে পড়ে, তার নিজের পরিবারের অভিজ্ঞতা একটি মূল্যবান জ্ঞান। উপকূলের শিক্ষার্থী যখন লবণাক্ততার কথা বলে, হাওরের শিক্ষার্থী যখন বন্যার কথা বলে, নদীভাঙন এলাকার শিক্ষার্থী যখন ঘর হারানোর অভিজ্ঞতা বলে, তখন এগুলোকে “পাঠের বাইরের বিষয়” মনে করলে আমরা শিক্ষার বড় একটি সম্পদ হারাই।একটি হাওর বিদ্যালয়ে জলবায়ু পরিবর্তন পড়ানো হচ্ছে। শিক্ষক বইয়ের সংজ্ঞা পড়ানোর পর বললেন, “তোমাদের এলাকায় বর্ষার সময় গত কয়েক বছরে কী পরিবর্তন দেখেছ?” শিক্ষার্থীরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলল। কেউ বলল আগে পানি আসত নির্দিষ্ট সময়ে, এখন সময় বদলে গেছে। কেউ বলল বিদ্যালয়ে যাতায়াত কঠিন হয়। কেউ বলল কৃষিকাজের সময়সূচি বদলে যায়। শিক্ষক তখন বললেন, “এসব তথ্য কীভাবে যাচাই করবে?” শিক্ষার্থীরা তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করল।এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষার্থী শুধু উত্তর গ্রহণ করছে না; সে নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।তৃতীয় প্রয়োজন হলো প্রশ্ন করার সংস্কৃতি তৈরি করা।আমাদের শ্রেণিকক্ষে অনেক সময় শিক্ষক প্রশ্ন করেন, কিন্তু শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জন্য আলাদা জায়গা থাকে না। ফ্রেইরের দর্শন এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিক্ষার্থীর প্রশ্নকে শেখার সূচনা হিসেবে দেখা হয়।প্রতিটি ক্লাসে শিক্ষক চাইলে একটি “আজকের প্রশ্ন” রাখতে পারেন। যেমন, বিজ্ঞান ক্লাসে, “গাছ আমাদের জন্য অক্সিজেন দেয়, কিন্তু রাতে কী ঘটে?” ইতিহাসে, “একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটার আগে সাধারণ মানুষের জীবনে কী ঘটছিল?” সমাজবিজ্ঞানে, “আইন থাকলেই কি সামাজিক সমস্যা শেষ হয়ে যায়?” বাংলা ক্লাসে, “একটি গল্প আমাদের নিজের সমাজ সম্পর্কে কী ভাবতে শেখায়?”এই প্রশ্নগুলো শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহল সৃষ্টি করবে। কৌতূহল থেকে অনুসন্ধান, অনুসন্ধান থেকে জ্ঞান, আর জ্ঞান থেকে বিচারবোধ তৈরি হতে পারে।চতুর্থ প্রয়োজন হলো শিক্ষার্থীর নিজের মতকে সম্মান করা।একজন শিক্ষার্থী হয়তো বলল, “আমি মনে করি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিক্ষার্থীদের জন্য উপকারী।” অন্যজন বলল, “আমি মনে করি এটি ক্ষতিকর।” শিক্ষক যদি বলেন, “কে ঠিক?” তাহলে আলোচনা দ্রুত একটি পক্ষ জেতানোর প্রতিযোগিতায় পরিণত হবে। কিন্তু শিক্ষক যদি বলেন, “তোমরা দুজনেই তোমাদের মতের পক্ষে প্রমাণ দাও”, তাহলে চিন্তার মান বদলে যাবে।শিক্ষার্থীরা শিখবে, শুধু মত থাকলেই হয় না; মতের পক্ষে কারণ ও প্রমাণও দরকার। একই সঙ্গে তারা বুঝবে, অন্যের মত আলাদা হলেই সে শত্রু নয়।এটি বাংলাদেশের সামাজিক জীবনের জন্যও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শিক্ষা। কারণ মতভেদকে আমরা অনেক সময় বিরোধ হিসেবে দেখি। বিদ্যালয় যদি শিক্ষার্থীকে শেখায়, “তোমার সঙ্গে আমার মত আলাদা হতে পারে, কিন্তু আমরা পরস্পরকে সম্মান করব”, তাহলে শ্রেণিকক্ষ থেকেই সহনশীল নাগরিকত্বের চর্চা শুরু হবে।পঞ্চম প্রয়োজন হলো শিক্ষার্থীকে নিজের জীবনের সমস্যার সমাধান খুঁজতে শেখানো।ধরা যাক, একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাচ্ছে। শিক্ষক শুধু বললেন, “নিয়মিত স্কুলে আসতে হবে।” এতে হয়তো সাময়িকভাবে সমস্যা কমবে। কিন্তু ফ্রেইরীয় পদ্ধতিতে শিক্ষক প্রশ্ন করবেন, “কেন অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত আসে না?”শিক্ষার্থীরা দল গঠন করবে। তারা সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলবে। কেউ হয়তো বলবে, যাতায়াত সমস্যা। কেউ বলবে পরিবারের কাজ করতে হয়। কেউ বলবে পাঠ বুঝতে অসুবিধা হয়। কেউ বলবে বিদ্যালয়ে ক্লাস আনন্দদায়ক নয়। তখন সমস্যাটিকে শুধু “অমনোযোগী শিক্ষার্থী” হিসেবে দেখা হবে না; বরং সমস্যার বিভিন্ন কারণ খুঁজে দেখা হবে।এখানেই শিক্ষার মানবিকতা।ষষ্ঠ প্রয়োজন হলো শিক্ষককে নতুনভাবে দেখা।ফ্রেইরের দর্শনে শিক্ষক দুর্বল হয়ে যান না; বরং আরও দক্ষ হয়ে ওঠেন। কারণ শিক্ষককে শুধু ভালো বক্তা হলেই চলে না। তাকে ভালো প্রশ্ন তৈরি করতে হবে, শিক্ষার্থীর কথা শুনতে হবে, ভুল ধারণা শনাক্ত করতে হবে, প্রমাণ চাইতে হবে, ভিন্ন মতকে জায়গা দিতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আলোচনাকে সঠিক দিকে পরিচালিত করতে হবে।অর্থাৎ শিক্ষক হবেন এমন একজন পথপ্রদর্শক, যিনি শিক্ষার্থীর হয়ে পথ হাঁটবেন না; বরং শিক্ষার্থীকে নিজের পথ খুঁজে নিতে সাহায্য করবেন।সপ্তম প্রয়োজন হলো প্রযুক্তির যুগে স্বাধীন চিন্তা রক্ষা করা।আজ শিক্ষার্থীর হাতে বিপুল তথ্য। কয়েক সেকেন্ডে সে উত্তর পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু তথ্য পাওয়া আর সত্য জানা এক বিষয় নয়। একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা কোনো উত্তর দিলেই তা সঠিক হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার মানুষ কোনো দাবি করলেই তা সত্য হয়ে যায় না।তাই শিক্ষক যদি বলেন, “উত্তরটি মুখস্থ করো”, শিক্ষার্থী তথ্যের ভোক্তা হয়ে থাকবে। কিন্তু যদি বলেন, “তথ্যটি কোথা থেকে এসেছে? প্রমাণ কী? অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে কি?” তখন শিক্ষার্থী তথ্য যাচাই করতে শিখবে। ফ্রেইরের সমালোচনামূলক চেতনার সঙ্গে আধুনিক তথ্যযুগের এই প্রয়োজনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।তবে ফ্রেইরের দর্শন প্রয়োগের অর্থ এই নয় যে শিক্ষক আর কিছু শেখাবেন না বা বইয়ের প্রয়োজন নেই। এটি একটি ভুল ধারণা। জ্ঞান, পাঠ্যবই, শিক্ষক এবং সরাসরি নির্দেশনা সবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এগুলো যেন শিক্ষার্থীর চিন্তার জায়গা দখল না করে। একজন দক্ষ শিক্ষক প্রথমে প্রয়োজনীয় জ্ঞান দেবেন, তারপর সেই জ্ঞান নিয়ে শিক্ষার্থীকে ভাবতে দেবেন, প্রশ্ন করতে দেবেন এবং বাস্তবে প্রয়োগ করতে দেবেন।অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন জ্ঞান ও চিন্তার সমন্বয়।আর এখানেই ফ্রেইরের দর্শনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি আমাদের শেখান, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল একজন ভালো পরীক্ষার্থী তৈরি করা নয়; একজন সচেতন মানুষ তৈরি করা। যে মানুষ নিজের জীবনকে বুঝতে পারে, অন্যের জীবনকে সম্মান করতে পারে, সমস্যার কারণ খুঁজতে পারে এবং নিজের অবস্থান যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারে।আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসিক শান্তির জন্যও এই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি শিশুকে সব প্রশ্নের উত্তর এখনই জানতে হবে না। তাকে জানতে হবে, না জানা স্বাভাবিক। ভুল করা স্বাভাবিক। প্রশ্ন করা স্বাভাবিক। নিজের মত পরিবর্তন করাও স্বাভাবিক। এই মানসিক স্বাধীনতা শেখার আনন্দ ফিরিয়ে আনতে পারে।শেষ পর্যন্ত শিক্ষা এমন হওয়া উচিত নয় যেখানে শিক্ষক বলেন, “আমি যা বলেছি, সেটিই শেষ কথা।” বরং এমন হওয়া উচিত যেখানে শিক্ষক বলেন, “আমি তোমাকে একটি ধারণা দিলাম; এবার তুমি ভেবে দেখো, প্রশ্ন করো, প্রমাণ খুঁজে দেখো এবং নিজের সিদ্ধান্ত তৈরি করো।”বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু কতজন শিক্ষার্থী উচ্চ নম্বর পেল তার ওপর নয়; বরং কতজন তরুণ যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারল, মতভেদকে সম্মান করতে পারল, ভুল থেকে শিখতে পারল, সমস্যার সমাধান খুঁজতে পারল এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারল তার ওপর।পাওলো ফ্রেইরের দর্শন তাই আমাদের সামনে একটি সহজ কিন্তু গভীর আহ্বান রাখে: শিশুর মাথা উত্তর দিয়ে ভরে দেওয়ার আগে তার মনে প্রশ্নের জানালা খুলে দিন।কারণ উত্তর মুখস্থ করা মানুষকে পরীক্ষায় সফল করতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন করতে শেখা মানুষকে জীবনের জন্য প্রস্তুত করে। আর যে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে, সেখানে শুধু জ্ঞান জন্ম নেয় না; জন্ম নেয় আত্মবিশ্বাস, সহনশীলতা, যুক্তিবোধ এবং মানসিক স্বাধীনতা।সত্যিকারের শিক্ষা তখনই শুরু হয়, যখন শিক্ষার্থী ভয় না পেয়ে বলতে পারে, “আমি জানি না, কিন্তু আমি জানতে চাই।” সেই “জানতে চাই” থেকেই নতুন চিন্তার জন্ম। আর নতুন চিন্তার মানুষই পারে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণ করতে।[লেখক: প্রশিক্ষক ও সহকারী অধ্যাপক, সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, ময়মনসিংহ]

টার্নওভার কর: রাজস্ব সুরক্ষা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার বাস্তবতা

রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি রাজস্ব, আর রাজস্ব আহরণের প্রধান উৎস কর। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য করের বিকল্প নেই। তবে একটি কার্যকর করব্যবস্থার সাফল্য শুধু কত রাজস্ব আদায় হলো, তার ওপর নির্ভর করে না, বরং সেটি কতটা ন্যায়সংগত, বাস্তবসম্মত এবং করদাতার অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তার ওপরও নির্ভর করে। এই প্রেক্ষাপটে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ এবং অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে আনা সংশোধনী নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কর প্রশাসনের দৃষ্টিতে এটি ন্যূনতম রাজস্ব নিশ্চিত করার একটি কার্যকর ব্যবস্থা হলেও অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর কাছে এটি বাড়তি আর্থিক চাপের কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩-এ টার্নওভার করের বিধান রয়েছে। অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে সংশোধিত ধারা ১৬৩(৬) অনুযায়ী, উপধারা (৩) অনুসারে নির্ধারিত কর যদি নির্ধারিত টার্নওভার করের চেয়ে কম হয়, তাহলে ব্যবসা বা পেশার মোট গ্রস প্রাপ্তির ওপর নির্ধারিত হারে টার্নওভার কর পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, আইন যেসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করেছে, সেখানে প্রকৃত মুনাফার পরিবর্তে মোট বিক্রয় বা গ্রস প্রাপ্তিই কর নির্ধারণের ভিত্তি হবে।সংশোধিত বিধান অনুযায়ী তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারকের ক্ষেত্রে টার্নওভার করের হার ৩ শতাংশ, কার্বনেটেড ও মিষ্টি পানীয় প্রস্তুতকারকের ক্ষেত্রে ২.৫ শতাংশ, মোবাইল ফোন অপারেটর ও এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১.৫ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থা কর্তৃক সার, বীজ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আমদানি ও বিক্রয়, কমিশন ব্যবসা, ডেলিভারি অর্ডার ব্যবসা এবং মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসাকে এই বিধানের বাইরে রাখা হয়েছে।এই বিধানের পেছনে সরকারের উদ্দেশ্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মুনাফা নির্ধারণ করা কঠিন হয়। কেউ কেউ সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করেন না, আবার কেউ আয় গোপন বা অতিরঞ্জিত ব্যয় দেখিয়ে করযোগ্য আয় কমিয়ে ফেলেন। ফলে ন্যূনতম রাজস্ব নিশ্চিত করা এবং কর ফাঁকি প্রতিরোধের লক্ষ্যে টার্নওভারভিত্তিক করের বিধান রাখা হয়েছে। কর প্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার একটি উপায়।তবে বাস্তব ব্যবসায়িক পরিবেশে এর প্রভাব সব ক্ষেত্রে একরকম নয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা সীমিত মূলধন নিয়ে পরিচালিত হয়। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ ব্যাংক সুদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে অনেক ব্যবসা খুব কম মুনাফায় কিংবা লোকসানে পরিচালিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃত লাভের পরিবর্তে টার্নওভারের ওপর কর নির্ধারণ অনেক উদ্যোক্তার জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।ধরা যাক, রহিম ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বছরে মোট বিক্রয় ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু পণ্য ক্রয়, দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, পরিবহন ব্যয়, ব্যাংক ঋণের সুদ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় পরিশোধের পর দেখা গেল প্রতিষ্ঠানটি ১ লাখ টাকা লোকসানে রয়েছে। সাধারণ আয়কর ব্যবস্থায় করযোগ্য আয় না থাকায় তার কর দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু ধারা ১৬৩-এর আওতায় প্রতিষ্ঠানটি যদি ১ শতাংশ টার্নওভার করের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে তাকে ৫০ হাজার টাকা টার্নওভার কর পরিশোধ করতে হতে পারে। অর্থাৎ, প্রকৃত মুনাফা না থাকলেও করের দায় সৃষ্টি হবে।আরেকটি উদাহরণ ধরা যাক। একটি মুদি দোকানের বার্ষিক বিক্রয় ১ কোটি টাকা। বছরের শেষে ব্যবসায়ীর প্রকৃত মুনাফা হলো মাত্র ২ লাখ টাকা। যদি টার্নওভারের ওপর ১ শতাংশ কর প্রযোজ্য হয়, তাহলে তাকে ১ লাখ টাকা কর দিতে হবে। অর্থাৎ, অর্জিত মুনাফার অর্ধেকই কর হিসেবে চলে যাবে। এতে ব্যবসার কার্যকর মূলধন কমে যাবে এবং ভবিষ্যতে ব্যবসা সম্প্রসারণের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।অবশ্য টার্নওভার করকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলাও সঠিক হবে না। ন্যূনতম কর নিশ্চিত করা, কর ফাঁকি প্রতিরোধ করা এবং কর প্রশাসনের কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা রয়েছে। তবে কর ফাঁকি রোধের ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যাতে সৎ করদাতা ও প্রকৃত লোকসানগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। করনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রাজস্ব আহরণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি করা।এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকরা প্রকৃত লোকসানে থাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য যুক্তিসঙ্গত রেয়াত, কম মুনাফার ব্যবসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা অথবা নির্দিষ্ট শর্তে টার্নওভার কর পুনর্বিবেচনার সুযোগ বিবেচনা করতে পারেন। একই সঙ্গে ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ, স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদন এবং কার্যকর নিরীক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে প্রকৃত আয় নির্ধারণ সহজ হবে এবং টার্নওভারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রয়োজনও কমে আসবে।বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই করনীতি এমন হওয়া উচিত, যা একদিকে সরকারের রাজস্ব নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা ও সম্প্রসারণে উৎসাহিত করবে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ এবং অর্থ আইন, ২০২৬-এর সংশোধনী নিঃসন্দেহে রাজস্ব সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এর বাস্তব প্রয়োগে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার বাস্তবতা, প্রকৃত লাভ-লোকসান এবং করদাতার আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।করব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন রাষ্ট্র ন্যায্যভাবে রাজস্ব আহরণ করতে পারে এবং সৎ করদাতাও স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত হন। টার্নওভার কর যেন রাজস্ব সুরক্ষার কার্যকর হাতিয়ার হয়, কিন্তু প্রকৃত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য অযৌক্তিক বোঝায় পরিণত না হয়, সেই ভারসাম্য নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সময়ের দাবি।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: আয়কর আইনজীবী]

বিচার না প্রতিশোধ, ন‍্যায‍্যতা ও সুশাসন তো রইলো অধরা!

বিদ্যুৎ সংকটের ফলে তীব্র গরমে ও লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় জনজীবন সম্পূর্ণ বেহাল। অন্যদিকে বাজারের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতিও খুবই উদ্বেগজনক। বেপরোয়াভাবে চলছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন। অন্যদিকে চলছে বেপরোয়া দলবাজি ও চাঁদাবাজি। এই দলবাজরা দলকেও ভয় পায় না। ‘দখলদারিত্বই প্রথম’ — এই নীতি বাস্তবায়নে তারা মরিয়া।তবে আমাদের বিমানভাগ্য চমৎকার! তীব্র জ্বালানি সংকটের এই সময়ে আপাতত ১৪টি বোয়িং আসছে মার্কিন মুলুক থেকে। এরপরে আরো আসবে, আসতেই থাকবে। দেশবাসীর উপর ‘দয়াপরবশ’ হয়ে এক বাণিজ্য চুক্তি করে মুহাম্মদ ইউনূস বিমানে চড়ার এ ধরনের সুব্যবস্থা করে গেছেন। দেশবাসীর এই উপকার করতে নির্বাচনের তিনদিন আগে দেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি করার বিষয়ে তিনি নাকি বিএনপি, জামায়াত এবং তার নিজের তরুণ তুর্কি দলের সম্মতিও নিয়ে নিয়েছিলেন। সারা দুনিয়াকে অস্থিতিশীল করায় পারঙ্গম ট্রাম্পও গদগদ হয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে এজন্য অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন শীঘ্রই দুজনের সাক্ষাৎ হবে। আর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর তার পোস্টে লিখেছেন, ‘এ সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরেকটি অভূতপূর্ব চুক্তি করেছেন, যেখানে বাংলাদেশ বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তাদের আগের অর্ডারের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি।’ অর্থাৎ আরো আসবে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটে মানুষের বাসায় চুলা জ্বলে না, বিদ্যুতের অভাবে আলো জ্বলে না। অনেকে রাত দুইটা-তিনটার সময় পরবর্তী দিনের রান্না করেন। হাসপাতালের চিকিৎসা চলছে মুঠোফোনের আলোয়। আর আমরা সবাই বোয়িং স্বপ্নে বিভোর!এ দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে জনপরিসরে অস্বস্তি, অস্থিরতা এবং ক্ষোভ বাড়লেও এসব সমস্যার একটা সুরাহা করতে সরকারকে আরো কিছুটা সময় হয়তোবা মানুষ দেবে। তবে অনন্তকাল তো মানুষ অপেক্ষা করবে না। অন্যদিকে দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি না দেখে বিশেষত এ সব বিষয়ে সদিচ্ছার প্রতিফলন না দেখে মানুষ আরো বেশি হতাশ ও উদ্বিগ্ন। মনে রাখা প্রয়োজন জুলাইয়ের কোটা আন্দোলন সরকার উৎখাতের আন্দোলনে পরিণত হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল দীর্ঘ সময় যাবৎ দেশের বুকে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি এবং বিচারহীনতা — যা বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষকেও রাজপথে টেনে আনে।প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন অবশ্য বলেছেন, “গত ছয় মাসে বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ মানবিকতা দেখেছি। একটি বারের জন্য কখনো কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন ঘটেনি।” সরকারি প্রেস ব্রিফিং-এ এমনটা বলাই স্বাভাবিক, এটাই রেওয়াজ। কিন্তু বাস্তবে এ ছয় মাসে বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ইউনূস আমল অপেক্ষা কি কোনো অগ্রগতি আছে? বরং সবকিছু দেখে শুনে মনে হয়, এ সব ক্ষেত্রে ইউনূস আমলের ধারাবাহিকতাই চলছে। একমাত্র ব্যতিক্রম নাগরিক আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করা। তবে তাতে তো আর জনজীবনের সংকট ও আইনের শাসনের যে অভাব তার সুরাহা হবে না।কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের সাথে সম্পর্ক আছে বা ছিল এ ফালতু অভিযোগে গ্রেফতার, আটক তো পূর্বের মতোই অব্যাহত আছে এবং আগের মতোই এখনো জুড়ে দেওয়া হচ্ছে বহুল আলোচিত তথাকথিত খুনের মামলা। পত্রিকায় দেখলাম এক কিশোরগঞ্জ জেলায়ই গত ৫ সেপ্টেম্বর একদিনে (২৪ ঘন্টায়) গড়ে প্রতি ঘন্টায় একজন করে আওয়ামী লীগ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঐ জেলায় গত তিনদিনে মোট ৫৮ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশ্লিষ্ট থানা সমূহে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে যে হাস্যকর খুনের মামলায় বছরের পর বছর রাজনীতিক, সাংবাদিক, অভিনেতা, আমলা, বিচারপতিরা আটক আছেন — এক মামলায় জামিন পেলেও ভিন্ন আরেকটি সাজানো মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয় — ইউনূস আমলের সেই নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত আছে। মানুষ আশা করেছিল নির্বাচিত সরকার আসার পরে এ ধরনের সাজানো খুনের মামলাগুলো প্রত্যাহার ও আইনানুগভাবে নিষ্পত্তি করা হবে। তা না করায় পরিস্থিতি অস্থিতিশীলই থাকছে।প্রবীণ রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেননের নামে ঢাকা শহরের বিভিন্ন থানায় একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারকার্য চালানো হচ্ছে। হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধেও ঢাকা ও কুষ্টিয়ার একাধিক থানায় বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আইসিটিতে ইতোমধ্যে সাজাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সবাই জানে ২০২৪ সালের মন্ত্রিসভায় তারা ছিলেন না, সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে ‘লিপ সার্ভিস’ দেওয়া ছাড়া ভিন্ন কোনো ক্ষমতা জোটের কোনো শরিকদের দীর্ঘদিন যাবৎ ছিল না। শুধুমাত্র নিরবচ্ছিন্নভাবে জামায়াত ও জঙ্গিবাদের কঠোর সমালোচনা করায় এবং জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করায় ইউনূস আমলে তাদেরকে আটক করে খুনের মামলা জুড়ে দেওয়া হয়। বিএনপির সাথে জামায়াতের ক্ষমতাকেন্দ্রিক ঘনিষ্ঠতা থাকায় তারা দু’জনেই কঠোর ভাষায় বিএনপিরও সমালোচনা করতেন। তাই আজ বিএনপি আমলেও তাদের উপর ইউনূসীয় প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ অব্যাহত আছে। আওয়ামী লীগ নেত্রী ডাঃ দীপু মনির বিরুদ্ধে প্রায় ৭০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার সংখ্যার বহর দেখেই বোঝা যায় তিনি আইনের আওতায় নয়, প্রতিশোধের আওতায় আছেন। আইনের সঠিক প্রয়োগ থাকলে এতদিনে অন্তত আসাদুজ্জামান নূর জামিন পেতেন। ঢাকা সহ সারা দেশে হাজারে হাজারে রাজনৈতিক নেতাকর্মী আটক আছেন এবং তাদেরকে জামিনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।এ কথা ঠিক গ্রেপ্তারকৃত অনেকেই জুলাই আন্দোলনে সরকারের কঠোর বলপ্রয়োগ এবং হত্যাযজ্ঞের নিন্দা না করে বরং নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা নেওয়ায়, এ রক্তাক্ত ঘটনার নৈতিক দায় এড়াতে পারবেন না। বিরোধী দলবিহীন একতরফা নির্বাচনে অংশ নিয়ে বা সমর্থন করে বা আয়োজনে সহযোগিতা করে তারা নৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। সেসব ধিকৃত ঘটনার সমালোচনা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনানুগ শাস্তিও জরুরি। তবে মনে রাখা প্রয়োজন ফৌজদারি অপরাধ এবং নৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আওয়ামী শাসনামলকে সমর্থন করা বা আওয়ামী লীগ দলের নেতাকর্মী হওয়া তো ফৌজদারি অপরাধ নয়। ফৌজদারি দায়বদ্ধতা অবশ্যই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই হতে হয় — ঢালাও হত্যা মামলা বা দুদকের নোটিশ ধরিয়ে দিলেই তা প্রমাণিত হয় না।রাজনৈতিক কারণে মামলা, নিবর্তনমূলক আটক এবং আইনের অসম প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে বহুদিন ধরেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০২৪-এ যে তারুণ্যের জাগরণ আমরা দেখেছি তা আমাদের প্রাথমিকভাবে আশ্বস্ত করেছিল যে, বিভাজনের বাংলাদেশকে পেছনে রেখে বৈষম্যমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং সুশাসনের পথে দেশ অগ্রসর হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগে তরুণ নেতৃত্বের একাংশ ধর্মীয় উগ্রবাদীদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে ওঠায় সাধারণ শিক্ষার্থী আর তরুণদের দেয়ালে আঁকা স্বপ্নগুলো হারিয়ে যেতে থাকল এবং শুরুতেই ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক যাত্রা সংকটের সম্মুখীন হয়। মানুষের মনের প্রত্যাশা দুরাশায় পরিণত হয়।তবে নির্বাচনের সময় থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলে আসছিলেন যে, এক উদার গণতান্ত্রিক সমাজ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার জন্য তাদের হাতে ‘প্ল্যান’ রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণে সে সব ‘প্ল্যান’ আর অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা এবং সাম্য, সুবিচার ও সুশাসন অধরাই রয়ে যাচ্ছে। অপরাধ করলে তার শাস্তি হওয়া উচিত। এটা সভ্য সমাজের রীতি। কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এক একটি হত্যা বা হত্যা প্রচেষ্টা মামলায় শতাধিক সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে বছরের পর বছর তাদের জেলে পুরে রাখা অবিচারের নামান্তর। অন্যদিকে কারো কারো ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে প্রথমে মিডিয়া ট্রায়াল, অতঃপর ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য চলছে। এসব দেখে ইতোমধ্যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আইসিটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আর বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায্যতার কোনো লক্ষণ না দেখে টিআইবি যথাযথভাবেই প্রশ্ন উত্থাপন করেছে যে ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের নির্মম ও বহুমাত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার আদৌ কিছু শিখেছে কি না?’(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

ভিডিও আরও দেখুন

চ্যাম্পিয়নস লিগে জয় দিয়ে শুরু দুই ইংলিশ ক্লাবের

চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন মৌসুমে জয় দিয়ে অভিযান শুরু করেছে ইংলিশ দুই ক্লাব লিভারপুল ও আর্সেনাল। অ্যানফিল্ডে আতলেতিকো মাদ্রিদকে ২-১ গোলে হারিয়েছে লিভারপুল। অন্যদিকে নেপলসে নাপোলিকে ১-০ গোলে পরাজিত করেছে আর্সেনাল।অ্যানফিল্ডে শুরুটা ভালো হয়নি লিভারপুলের। ১৭ মিনিটে জুলিয়ান আলভারেজের থ্রু পাস ধরে বাঁ পায়ের শটে স্বাগতিকদের জালে বল পাঠান মার্কোস লরেন্তে। চ্যাম্পিয়নস লিগে লিভারপুলের বিপক্ষে অ্যানফিল্ডে এটি তার পঞ্চম গোল।তবে পিছিয়ে পড়ে দ্রুতই ম্যাচে ফেরে লিভারপুল। ৪০ মিনিটে রোনাল্দ আরাউহোর ব্যাক-হিল ফ্লিক থেকে পাওয়া বলে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান দমিনিক সোবোসলাই।বিরতির পর ৫০ মিনিটে লিভারপুলকে এগিয়ে দেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। বক্সের বাইরে থেকে তাঁর জোরালো শট আতলেতিকোর জালে আশ্রয় নেয়। শেষ পর্যন্ত ওই গোলই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে।ম্যাচের আগের দিনই নতুন চুক্তির প্রস্তাব না পাওয়ার বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন ম্যাক অ্যালিস্টার। তাঁর বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত। তবে মাঠে গোল করে দলকে জয় এনে দিয়ে নিজের গুরুত্ব আরও একবার জানান আর্জেন্টাইন এই মিডফিল্ডার।নাপোলির মাঠে আর্সেনালের জয় এসেছে অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডের নৈপুণ্যে। ম্যাচের ৭৫ মিনিট পর্যন্ত গোলের দেখা পায়নি গানাররা। এরপর ক্রিস্টোস জলিসের কাটব্যাক থেকে বক্সের বাইরে বল পেয়ে বাঁকানো শটে নাপোলির জাল কাঁপান ওডেগার্ড। ম্যাচে ২৬টি শট নেয় আর্সেনাল, যার আটটি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে নাপোলি পাঁচটি শট নিয়ে তিনটি লক্ষ্যে রাখতে পেরেছে।গোলের আগে আর্সেনালের আক্রমণ তৈরি হয়েছিল টানা ২৯টি পাসের মাধ্যমে। চ্যাম্পিয়নস লিগে ২০০৩-০৪ মৌসুমের পর আর্সেনালের কোনো গোলের ক্ষেত্রে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাসের সমন্বয়। এর চেয়ে বেশি, ৩৩টি পাসের পর গোল হয়েছিল ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বাসেলের বিপক্ষে লুকাস পেরেজের গোলে।চলতি মৌসুমে কমিউনিটি শিল্ডসহ পাঁচ ম্যাচে এটি ওডেগার্ডের চতুর্থ গোল। গত মৌসুমে টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠা আর্সেনাল এবারও ইতালির মাটিতে জয় দিয়ে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাব প্রতিযোগিতায় যাত্রা শুরু করল।/ 

চ্যাম্পিয়নস লিগে জয় দিয়ে শুরু দুই ইংলিশ ক্লাবের