সংবাদ
নানা সংকটে চালু হচ্ছে বিমানবন্দর থার্ড টার্মিনাল!

নানা সংকটে চালু হচ্ছে বিমানবন্দর থার্ড টার্মিনাল!

সাড়ে ৯’শ জনবল প্রস্তাবের ফাইল মন্ত্রণালয়ে ঝুলছে বিমানবন্দরে প্রতিবছর ১ কোটি ১০ লাখ যাত্রীর যাতায়াত ডিসেম্বর চালুর লক্ষ্য, কিন্তু জনবল ও আধুনিক সার্ভার সংকটে থার্ড টার্মিনাল! রেমিট্যান্স যোদ্ধাসহ যাত্রীদের কষ্টের আশংকাঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত ‘থার্ড টার্মিনাল’ আগামী ডিসেম্বর মাসেই চালু করার চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা বা টার্গেট নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দৃশ্যমান অবকাঠামো আর নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে এটি এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। তবে এই চোখধাঁধানো ভবনের আড়ালে রয়ে গেছে এক বড় দুশ্চিন্তা।দেশী-বিদেশী যাত্রীদের আসা-যাওয়ার সময় ইমিগ্রেশনসহ বিভিন্ন পয়েন্টে সেবা দেওয়ার জন্য যে বিপুল পরিমাণ দক্ষ জনবলের প্রয়োজন, তা এখনো নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার এই টার্মিনালটি চালু হলেও জনবল সংকটে যাত্রীদের ভোগান্তি কমার চেয়ে উল্টো বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।৬ মাস ধরে ফাইলেই বন্দি ৯০০ জনের প্রস্তাবসংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, থার্ড টার্মিনালের কার্যক্রম পুরোদমে সচল করতে অন্তত ৯০০ জনের বেশি নতুন জনবল চেয়ে প্রায় ছয় মাস আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, গতকাল পর্যন্ত সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। বর্তমানে বিমানবন্দরের পুরনো টার্মিনালে ইমিগ্রেশন বিভাগে প্রায় ৬০০ জন সদস্য ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে দিনরাত দায়িত্ব পালন করছেন।এর মধ্যে অসুস্থতা, জরুরি ছুটিসহ নানা কারণে অনেকেই অনুপস্থিত থাকলে দ্রুত ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা চরম কষ্টকর হয়ে পড়ে। তখন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা রেমিটেন্স যোদ্ধা ও সাধারণ যাত্রীদের ক্ষোভ ও ভোগান্তির শেষ থাকে না। এই ভোগান্তির অভিযোগ বিমান থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন উচ্চপর্যায় পর্যন্ত পৌঁছায়, যার ফলে কর্তব্যরত কর্মকর্তাদের প্রায়ই অনাকাঙ্ক্ষিত সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।পুরনো সার্ভারের জটলা ও ৬০ কোটির নতুন চ্যালেঞ্জজনবলের পাশাপাশি আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা। বিমানবন্দরে এখনো পুরনো ও ধীরগতির সার্ভার দিয়ে ইমিগ্রেশনের কাজ চালানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন টার্মিনালের বিশাল চাপ সামলাতে হলে জরুরি ভিত্তিতে নতুন সার্ভার সিস্টেম স্থাপন ও তা আপডেট করা বাধ্যতামূলক। একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, "থার্ড টার্মিনাল চালুর আগে জরুরি ভিত্তিতে নতুন সার্ভার সিস্টেম স্থাপন করা দরকার।"তবে নতুন সার্ভার সিস্টেম চালু করতে হলেও কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার বড় অংকের বরাদ্দের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সিনিয়র কর্মকর্তারা। স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও ইমিগ্রেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে এসবি-তে ৫ হাজার ৬শর বেশি জনবল রয়েছে। তবে বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি ও আধুনিকায়ন আরও জোরদার করতে মন্ত্রণালয়ে আরও ৯০০ জনবল বৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যা দ্রুত পাস হওয়া জরুরি।১ কোটি ১০ লাখ যাত্রীর নিরাপত্তা ও চোরাচালান রোধের চ্যালেঞ্জসিনিয়র কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ যাত্রী আসা-যাওয়া করেন, যার অর্থ মাসে প্রায় ৯ লাখের বেশি যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। এত বিশাল সংখ্যক মানুষের ইমিগ্রেশন, শুল্ক ও চেকিং প্রক্রিয়ার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল অপরিহার্য। শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোতেও জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে অপরাধ দমন করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।ইমিগ্রেশন সূত্রের খবর, এই পয়েন্টগুলো ব্যবহার করে মানব পাচার, সোনা চোরাচালান, মাদক বহন এবং দেশী-বিদেশী অপরাধীদের যাতায়াত ঠেকাতে স্পেশাল ব্রাঞ্চের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মালিবাগে অবস্থিত এসবির প্রধান কার্যালয় থেকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিমানবন্দরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে।দালাল চক্রের অপতৎপরতা ও ইমিগ্রেশনের কঠোর অবস্থান অভিযোগ রয়েছে, একটি সুসংগঠিত মানব পাচারকারী চক্র ট্রাভেল এজেন্সির আড়ালে ট্যুরিস্ট ভিসার মাধ্যমে বিদেশে মানুষ পাচার করছে। অনেক যাত্রী জেনেবুঝেই দালালদের খপ্পরে পড়ে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে। আবার অনেকে লিবিয়া হয়ে বিপজ্জনক ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে করুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এ ধরনের অপরাধ রুখতে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সন্দেহভাজনদের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং পুরো চেকপোস্টকে কঠোর নজরদারির আওতায় এনেছে। তবে পোশাক ও সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করা বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বসার জায়গা এবং টার্মিনালে লাউঞ্জের ব্যবস্থা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত আলোচনা শেষ হয়নি।স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার কার্যালয়ে এই প্রতিবেদককে দৃঢ়তার সাথে বলেন, "জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন সার্ভার পাওয়া গেলে প্রশাসন হার্ডলাইনে থেকে যে কোন ধরনের দেশী বিদেশী অপরাধী চক্রকে শনাক্ত করতে বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালন করবে। থার্ড টার্মিনালে আধুনিক সুযোগ সুবিধা বাড়ালে সকল ধরনের পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।"
১ ঘন্টা আগে

বিশ্বকাপ সময়সূচি: দেখতে ক্লিক করুন

মতামতমতামত

উদার গণতন্ত্র এবং প্রান্তিকের স্বপ্ন

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এর পেছনে সুশাসনের ঘাটতি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা। স্বাধীনতার পর থেকে যেসব রাজনৈতিক দল দেশ শাসনের ভার নিয়েছে, তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার ফল হিসেবেই গণুআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান আমাদের ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কারণও ছিলো সুশাসন এবং গণতন্ত্র বাস্তবায়নের ব্যর্থতা। নির্মোহ ভাবে বলতে গেলে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির কারণ হলো কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণ। আওয়ামীলীগের পতনের পর সাধারণ প্রান্তিক মানুষেরা স্বপ্ন দেখেছিলো অন্তর্চভুক্তি মূলক সমাজ ও রাজনীতির। স্বপ্ন দেখান কিন্তু রাজনৈতিক দলের নেতারা কিন্তু স্বপ্ন ভঙ্গের যাতনা ভোগ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক মানুষের দল। কী হলো আওয়ামী লীগ পতনের পর। আকুল আগ্রহ এবং কৌতূহল নিয়ে নাগরিকেরা অপেক্ষা করলেন, অবলোকন করলেন। আমাদের আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে যা দেখতে পেলাম তা মোটেই স্বস্তিদায়ক ছিলনা। সংবদ্ধ সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলটি নাগরিকদের জন্য অস্বস্তিদায়ক ছিল। তবে চব্বিশের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার একটি বড় সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন অনেকেই। বিশেষত সাধারণ মানুষ। প্রান্তিক বা সাধারণ মানুষ কিন্তু ‘ছাত্রজনতা’, ‘তৌহীদী জনতা’ নয়। তারা তকমাহীন নিবেদিত প্রাণ দেশ প্রেমিক নাগরিক। পঞ্চান্ন বছর ধরে তারা স্বপ্ন দেখছেন আর স্বপ্ন ভাঙ্গার বেদনা বুকে নিয়ে জীবনকে যাপন করছেন। আমার মতো অনেকেই এরজন্য গণতন্ত্রহীনতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। যদিও আমরা ডান, বাম, মধ্যপন্থী এমন কী ধর্মাশ্রয়ী দলের নেতারা যখন মেঠো বক্তৃতা দিয়ে থাকেন তখন তাদের কাছ থেকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের কথা শুনে থাকি। পঞ্চান্ন বছর বয়সী বাংলাদেশে এখনও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হিসেবে গণতন্ত্রকে দেখতে পাইনা। অথচ গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম নিয়েছিলো। বায়ান্ন, থেকে উনসত্তর, একাত্তর হয়ে চব্বিশের আন্দোলনে রাজনৈতিক দল গুলো নাগরিক সমাজকে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়ে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করেছে। বাংলাদেশের জনগণ অত্যন্ত উদার, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ, আবেগপ্রবণ যা উদার গণতন্ত্রের উপাদানের সঙ্গে সামজস্য-পুর্ণ। এ কারণেই সুবর্ণ পলিমাটির এ’দেশে মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নানা ভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছে। আধুনিক পৃথিবীতে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য শাসনতান্ত্রিক মতবাদ হচ্ছে গণতন্ত্র। পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ দেশে রয়েছে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। নব্বইয়ের দশকে স্নায়ুযুদ্ধের পতনের পরে পৃথিবির অধিকাংশ দেশেই স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটে, বিকাশ লাভ করে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। কিন্তু, পৃথিবীর প্রায় সবগুলো দেশই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে নিজেদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন বিকল্পসহ গ্রহণ করেছে। ফলে, পৃথিবীর যে দুই-তৃতীয়াংশ দেশে গণতন্ত্র রয়েছে, তার মধ্যে একদেশের গণতন্ত্রের সঙ্গে আরেক দেশের গণতন্ত্রের হুবহু মিল পাওয়া কার্যত অসম্ভব। প্রত্যেক দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই কিছু স্বাতন্ত্র্য দেখা যায়। আমাদের দেশেও স্বকীয় বৈশিষ্ঠ নিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো। রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা, নিবেদন, এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের যতোটুকু ত্যাগের প্রয়োজন ছিল আমরা সেরকম রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি এখনও। উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, পাপ এবং দুঃখের এই বিশ্বে অনেক ধরনের সরকার ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা এবং পরীক্ষা, নিরীক্ষা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এরকম পরীক্ষা বহমান থাকবে। গণতন্ত্র প্রেমীরা এ’কথা বলেনা যে গণতন্ত্র নিখুঁত বা সব চেয়ে ভালো রাজনৈতিক ব্যবস্থা। গণতন্ত্র নিয়ে বলা হয়, গণতন্ত্র হলো সরকারের অন্যতম খারাপ রূপ, তবে অন্য সব রকমের সরকার ব্যবস্থা থেকে খারাপ বা দুর্বল নয়। প্রকৃতপক্ষে এটি একমাত্র সরকারব্যবস্থা, যা বেশির ভাগ জাতি গণতন্ত্রের ত্রুটি এবং অন্তর্নিহিত দুর্বলতা সত্ত্বেও পেতে চায়। গণতন্ত্র যতোটূকু গণমুখী, জন কল্যাণকর তার থেকে গণতন্ত্রের ত্রুটি কিছুটা হলেও বেশি। অগণতান্ত্রিক দেশের তুলনায় গণতান্ত্রিক শাসনে জনগণের অংশগ্রহণ বেশি থাকে, যার ফলে জনসাধারণের সেবার কাঠামো গঠন করা হয়, যা জনগণের কল্যাণের জন্য প্রকৃত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। এসব আলোচনার মর্ম কথা হলো গণতন্ত্র নিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারে অনেক সমালোচনা করা যায় কিন্তু গণতন্ত্রের বিকল্প তৈরি করা যায়না। গণতন্ত্র হলো এ’ যাবত কালে পরীক্ষিত সর্বোত্তম রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বৈচিত্র্যময় বিতর্ক আর চর্চার রাজনীতির মধ্যেও, গণতন্ত্রের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ভ্যারিয়েন্টটি হচ্ছে উদার গণতন্ত্র। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গণতন্ত্র বলতে উদার গণতন্ত্রকেই বুঝানো হয়। মানুষের প্রতি শাসকের সমদৃষ্টি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। গণতান্ত্রিক অধিকার মূলত মানুষের জন্মগত মৌলিক অধিকারের কথাই বলে থাকে। আর এই মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারে সুশাসন। এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক রায়ের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের অবজ্ঞা ও অস্বীকৃতিই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল। অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রকে এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া যায়নি। আমরা আশা করি, বর্তমান সংসদের সরকারি দল ও বিরোধী দল দুই পক্ষই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এবং জাতীয় সংসদকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলবে। সুশাসনের জন্য প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থা। সুশাসন ন্যায় ও সমতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। যখন প্রশাসন দলীয়রূপ ধারণ করে তখন আমলাতন্ত্র শাসকদলের লেজুড়বৃত্তি করে। দুর্নীতি ও লাল ফিতার দৌরাত্মে প্রশাসন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। জনসমর্থন না থাকলে শাসকগোষ্ঠী আমলা নির্ভর হয়ে পড়ে এবং দেশ পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। শাসকবর্গ যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে প্রশাসনে ও বিচারালয়ে নিজেদের অনুগত লোকদেরকে নিয়োগ দেয় যাতে এদের সমর্থনে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে। ফলে প্রশাসন দুর্নীতিবাজ, অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ আমলাদের আখড়ায় পরিণত হয়। এসব কারণে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি শ্লথ হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি না থাকলে শাসকদলের নেতা-কর্মীদের দৌরাত্ম বেড়ে যায়, তারা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সমস্ত সমাজ জুড়ে এক ধরণের নীরবতার সংস্কৃতি নেমে আসে। অল্প সংখ্যক মানুষের দাপুটে অবস্থানকে শাসকদের কাছে মূল্যবান হয়ে পড়ে কারণ তাদের চেতনা এবং শাসকদের চেতনার একটি দৃশ্য অদৃশ্য সামঞ্জস্য লক্ষ করা যায়। প্রান্তজনের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন বিভিন আন্দোলন থেকে ওঠে আসা জনগণের স্বপ্নের বাস্তবায়ন। ছেষট্টি থেকে চব্বিশ পর্যন্ত সকল আন্দোলনের মূল কথা ছিলো সমতার বাংলাদেশ, বৈষম্যহীন মানবিক বাংলাদেশ। এই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য আমাদের পেছন ফিরে তাকাতে হবে। স্বপ্নের অনুবাদ করার দক্ষতা, যোগ্যতা এবং নিবেদন প্রয়োজন। এপ্রসঙ্গে, একটি জাতীয় সংবাদপত্রে জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার জনাব হাফিজ উদ্দীন আহমদ এর একটি সাক্ষাৎকারের অংশ তুলে ধরে লেখাটি সমাপ্ত করতে চাই। তিনি বলেছিলেন ‘আমাদের বহু সাফল্যের পেছনে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বিজয় একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। সেই শক্তি ও চেতনাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। আর একটি বিষয় হলো—গণতান্ত্রিক, মুক্তমনা সমাজ গড়ে তোলা; যেখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল সামাজিক সুবিচার, সাম্য ও মানবিক চেতনা প্রতিষ্ঠা করা। এসব মূল্যবোধকে আবার রিস্টোর করতে হবে। বৈষম্য কমাতে হবে—ধনী-গরিবের বৈষম্য, অঞ্চলভেদে বৈষম্য, নারী-পুরুষের বৈষম্য—সবই কমাতে হবে।’ আমরা কী পারবো প্রান্তজনের বাংলাদেশ প্রতিষথা করতে। আইনের শাসন ভেঙে গেলে দেশ প্রেমিক নাগরিকদের মধ্যে এক ধরণের ভীতি সৃষ্টি হয়। এর ফলে সমাজে অরাজকতার সৃষ্টি হয়। গুম, খুন, সন্ত্রাস, সরকারী অর্থ লোপাট ও সম্পদের অপচয় বৃদ্ধি পায়। সমাজ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মিডিয়া ও সুশীল সমাজ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলে। এ অবস্থা যেকোন দেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র মানুষের মৌলিক অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নের রক্ষাকবচ। এ ধরনের গণতন্ত্র সুশাসনকে নিশ্চিত করে। প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতি এবং সমাজ আমাদের কাঙ্ক্ষিত। আমরা ফেব্রিয়ারির নির্বাচনের পূর্বে অন্তর্ভুক্তি মূলক রাজনীতি এবং সমাজের কথা শুনেছিলাম। আমরা চব্বিশের আন্দোলনের পূর্বে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার কথা শুনে আশান্বিত হয়েছিলাম। বৈষম্যহীনতার কথা আমরা খুব কম শুনে হতাশ হই। জাতীয় ভাবে আমরা কিজবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র ও সুশাসন উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আমাদেরকে গণতন্ত্র ও সুশাসনের পথে হাঁটতে হবে এবং উন্নত অবকাঠামো তৈরীতে আরও মনোযোগি হতে হবে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও নাগরিক অংশগ্রহণ গণতন্ত্রকে সুসংহত করবে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করবে। সপ্তদশ শতাব্দীর বৃটিশ সমাজ বিজ্ঞানী জন লকের ’সোশিয়াল কন্ট্র্যাক্ট’ বা সামজিক চুক্তি মতবাদ এ মতটিকেই সমর্থন করে। তার মতে একনায়কতন্ত্র বা একদলীয় শাসন কখনও গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক নয়, কেননা তা জনগণের অধিকারকে খর্ব করে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। স্বৈরতন্ত্র নাগরিকের সব অধিকারকে শুধু খর্বই করে না, উন্নয়নের ধারাকেও রুদ্ধ করে দেয়। স্বৈরাচারী আমলে এর অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে। জন লক রাষ্ট্রের এ ধরনের অপরিমেয় সাংবিধানিক ক্ষমতার বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে জনগণ রাষ্ট্রকে ক্ষমতার লাইসেন্স প্রদান করে না। তৃণমূল জনগণের অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। বিকেন্দ্রীকরণ তৃণমূল পর্যায়ের জনগণকে সচেতন, দায়িত্বশীল ও স্বনির্ভর করে তোলে। সুশাসনের জন্য প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থা। সুশাসন ন্যায় ও সমতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। যখন প্রশাসন দলীয়রূপ ধারণ করে তখন আমলাতন্ত্র শাসকদলের লেজুড়বৃত্তি করে। দুর্নীতি ও লাল ফিতার দৌরাত্মে প্রশাসন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। জনসমর্থন না থাকলে শাসকগোষ্ঠী তখন আমলা নির্ভর হয়ে পড়ে এবং দেশ পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। শাসকবর্গ যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে প্রশাসনে ও বিচারালয়ে নিজেদের অনুগত লোকদেরকে নিয়োগ দেয় যাতে এদের সমর্থনে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে। ফলে প্রশাসন দুর্নীতিবাজ, অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ আমলাদের আখড়ায় পরিণত হয়। এসব কারণে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি শ্লথ হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি না থাকলে শাসকদলের নেতা-কর্মীদের দৌরাত্ম বেড়ে যায়, তারা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আইন ও বিচারের ধরা-ছোঁয়ার ঊর্দ্ধে এরা অবস্থান করে। ফলে আইনের শাসন ভেঙ্গে পড়ে, অরাজকতার সৃষ্টি হয়। গুম, খুন, সন্ত্রাস, সরকারী অর্থ লোপাট ও সম্পদের অপচয় বৃদ্ধি পায়। সমাজ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মিডিয়া ও সুশীল সমাজ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলে এবং কলম ও মুখ বন্ধ রাখে। এভাবে দেশের বিরোধীদল, বিচারক, মিডিয়া, বুদ্ধিজীবি ও সুশীল সমাজ অপারগ হয়ে পড়ে। এ অবস্থা যেকোন দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র মানুষের মৌলিক অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নের রক্ষাকবচ। এ ধরনের গণতন্ত্র সুশাসন কে নিশ্চিত করে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

বৈদেশিক ঋণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার: সামনে কঠিন বাস্তবতা

বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে তিন বছর মেয়াদি নতুন ঋণ কর্মসূচির আবেদন করেছে। এ লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে আইএমএফকে আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠানো হয়েছে। ঋণের সম্ভাব্য পরিমাণ সম্পর্কে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও বিভিন্ন সূত্রে ধারণা করা হচ্ছে, এর পরিমাণ ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদ। আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেয়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। অর্থনৈতিক চাপের মুখে বিশ্বের অনেক দেশই সংস্থাটির সহায়তা নেয়। কারণ, তুলনামূলক কম সুদে ঋণ পাওয়া যায়। তবে এই ঋণের সঙ্গে কঠোর সংস্কার-শর্তও যুক্ত থাকে। সেই শর্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে ঋণের কিস্তি স্থগিত হওয়ার নজিরও রয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে বাজারভিত্তিক পদ্ধতি চালু করাসহ বেশ কয়েকটি নীতিগত পরিবর্তন আইএমএফের শর্তের অংশ হিসেবেই বাস্তবায়িত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হওয়ার পর ২০২৩ সালে তৎকালীন সরকার আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। কিন্তু সংস্কার-শর্ত পূরণে অগ্রগতি সন্তোষজনক না হওয়ায় ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড় আর সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ আলোচনা সত্ত্বেও আইএমএফকে রাজি করানো যায়নি। বর্তমান সরকার এমন সময়ে নতুন ঋণ কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে, যখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। তবে এই উন্নতির বড় কারণ আমদানি কমে যাওয়া। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হয়ে আমদানি বাড়লে রিজার্ভ আবারও চাপে পড়তে পারে। একই সময়ে বড় বাজেট বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ব্যয় এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারের অতিরিক্ত অর্থেরও প্রয়োজন রয়েছে। ফলে নতুন ঋণ কর্মসূচির উদ্যোগকে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। সরকার আইএমএফকে জানিয়েছে, আগের কর্মসূচি গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন পরিবর্তিত হয়েছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে কয়েকটি সংস্কার নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার সংস্কার থেকে সরে আসতে চায় না; বরং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের কথা বলেছে। আগামী মাসে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে এসে নতুন কর্মসূচির সম্ভাবনা, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাতের সুশাসন, বিনিময় হার, ঋণ নীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের রাজস্ব আহরণের হার দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত নিম্ন। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও প্রায় ৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম। চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব ঘাটতি বড় আকার ধারণ করতে পারে। ফলে উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহে সরকারকে ক্রমেই বেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি ঋণের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে সামনে রয়েছে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের বাস্তবতা। এর ফলে ভবিষ্যতে আগের মতো সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমে যাবে। বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের বড় অংশই রেয়াতি হলেও আগামী বছরগুলোতে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ফলে ঋণ ব্যবস্থাপনায় এখন থেকেই আরও সতর্ক ও দূরদর্শী নীতি গ্রহণের বিকল্প নেই। রাজস্ব ঘাটতির পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বলতাও অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সরকারের মোট ঋণের বড় অংশই এখন দেশীয় উৎস, বিশেষ করে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নেওয়া হচ্ছে। অথচ একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণের বিস্তার, বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক আস্থার ঘাটতির কারণে নতুন বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতায়। কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ায় বেকারত্বও ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকও মিশ্র চিত্র তুলে ধরছে। রপ্তানি আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। অন্যদিকে প্রবাসী আয় আশাব্যঞ্জক হলেও এককভাবে তা অর্থনীতির সব দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট নয়। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য রপ্তানি, বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ এবং উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই সমান অগ্রগতি প্রয়োজন। এই বাস্তবতায় নতুন ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার একদিকে বৈদেশিক অর্থায়নের নিশ্চয়তা চায়, অন্যদিকে আগের কর্মসূচিতে অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়া সংস্কারগুলো নতুন বাস্তবতার আলোকে এগিয়ে নিতে আগ্রহী। তবে আগের কর্মসূচি কেন কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি, তার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি। জ্বালানি মূল্যের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়, রাজস্ব সংস্কার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং ব্যাংক খাতের সুশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়াই মূল বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আইএমএফও ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। তাই নতুন কর্মসূচিতে আগের শর্তগুলো হুবুহু বহাল রাখার পরিবর্তে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সংস্কার এজেন্ডা পুনর্গঠনের সুযোগ রয়েছে। এ লক্ষ্যে সংস্থাটির একটি প্রতিনিধিদল সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করে অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা, সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পর্যালোচনা করবে। নতুন কর্মসূচির আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, কর-ছাড়ের যৌক্তিকীকরণ, ভ্যাটব্যবস্থার সংস্কার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, ব্যাংক খাতের সুশাসন এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ। এসব সংস্কার দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়নের গতি ছিল ধীর। ফলে নতুন কর্মসূচিতেও একই বিষয়গুলো আবার সামনে আসবে। তবে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা যতটা বাস্তব, এর সামাজিক প্রভাবও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। করের আওতা বৃদ্ধি, ঋর্ণুকি হ্রাস, জ্বালানি মূল্যের সমন্বয় কিংবা বিনিময় হার আরও বাজারনির্ভর হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে পারে। তাই সংস্কার বাস্তবায়নে এমন ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে, যাতে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হয়, আবার নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপও সৃষ্টি না হয়। এদিকে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে অর্থ আসছে, তার বড় অংশই এখন অতীতে নেয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। ফলে বৈদেশিক অর্থায়ন থেকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নতুন করে যে সম্পদ যুক্ত হওয়ার কথা, তার পরিমাণ দ্রুত কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন ঋণ, অনুদান এবং অর্থছাড়—সব ক্ষেত্রেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অর্থায়নের জন্য উদ্বেগের বিষয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের তথ্য বলছে, বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে যে অর্থ এসেছে, তার প্রায় পুরো অংশই ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহারযোগ্য নিট বৈদেশিক অর্থায়নের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এটি সরাসরি ঋণ নিয়ে ঋণ শোধ করার পরিস্থিতি না হলেও সামগ্রিক অর্থপ্রবাহের দৃষ্টিকোণ থেকে একই ধরনের চাপের ইঙ্গিত দেয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের ব্যয় প্রতিবছর বাড়ছে। গত এক দশকে বাস্তবায়িত বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অনেক ঋণের অবকাশকাল শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন যুক্ত হওয়ায় একই পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতেও সরকারকে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে ঋণের চাপ শুধু ডলারের হিসাবে নয়, দেশীয় মুদ্রার হিসাবেও দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি এবং অর্থছাড় কমে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রতিশ্রুত অর্থ সময়মতো ছাড় হচ্ছে না। এর ফলে উন্নয়ন অর্থায়নের ভারসাম্য দুর্বল হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নেও অর্থসংস্থানের চাপ বাড়তে পারে। বাংলাদেশ এখনও বৈদেশিক ঋণসংকটে পড়েনি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দেশের বৈদেশিক ঋণের অনুপাত এখনও সহনীয় পর্যায়েই রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রবণতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ঋণ ব্যবস্থাপনায় আগের মতো নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ আর নেই। নতুন ঋণের প্রবাহ কমছে, অনুদান হ্রাস পাচ্ছে, ঋণ পরিশোধের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে এবং রেয়াতি ঋণের সুযোগও ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসছে। ফলে অর্থনীতির জন্য এটি সতর্ক হওয়ার সময়। এই বাস্তবতায় আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচিকে কেবল অর্থসংস্থানের উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, অর্থনীতির দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করার সুযোগ হিসেবে এই কর্মসূচিকে কাজে লাগানো। রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, করব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ব্যাংক খাতের সুশাসন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি—এসব সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সংস্কারের সাফল্য কেবল শর্ত পূরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। তাই সংস্কার এমনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি না হয় এবং উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের গতি বাধাগ্রস্ত না হয়। ঋণ গ্রহণ নিজেই কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয় না বা তা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। তাই এখন প্রয়োজন ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা নয়, বরং প্রতিটি ঋণের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ফল নিশ্চিত করা। যে প্রকল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে, অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত সেই প্রকল্পই। বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। স্বল্পমেয়াদি ঋণনির্ভর সমাধানের পরিবর্তে যদি কার্যকর সংস্কার, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে বর্তমান চ্যালেঞ্জই ভবিষ্যতের টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় ঋণের বোঝা, রাজস্ব দুর্বলতা ও ব্যাংক খাতের সংকট মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। এখন প্রয়োজন বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত, দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং সংস্কার বাস্তবায়নে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। [লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

বার্ধক্যের নতুন বাস্তবতা

সত্তরোর্ধ্ব নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের পর সবাই হতবাক। ঘরভর্তি আবর্জনা, স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে ছত্রাক, ছোট খাটে পড়ে ছিল অর্ধগলিত দেহ। কবে মারা গেছেন কেউ জানে না, সন্তানরাও না। রান্নাঘর দেখে বোঝা যায় বছর ধরে চুলা জ্বলেনি। এই নোংরা পরিবেশই বলে দেয় কতটা অবহেলায় ছিলেন তিনি। বৃদ্ধার এক ছেলে যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক। মেয়ে স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক। মায়ের সঙ্গে মেয়েই থাকতেন। সাড়া না পেয়ে মেয়ে ক্লিনিক থেকে নার্স ডাকেন, নার্সই পুলিশে খবর দেয়। সুস্থ মানুষ এমন পরিবেশে থাকতে পারেন না। মেয়ের মানসিক অসুস্থতা না থাকলে মায়ের লাশের গন্ধও তিনি টের পেতেন।বাংলাদেশে সাধারণত সন্তানই মা-বাবাকে দেখে। তবুও ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন হয়েছে। সেখানে সামর্থ্যবান সন্তানকে বাবা-মায়ের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, সঙ্গ ও সেবা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। আইন ভাঙলে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মুম্বাইয়ে আমেরিকা প্রবাসী ছেলেকে মা অনুরোধ করেছিলেন আমেরিকায় নিতে অথবা বৃদ্ধাশ্রমে রাখতে। ছেলে সময় পায়নি। কোটি টাকার ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় কঙ্কাল। আজ মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের সন্তানেরা উচ্চশিক্ষা ও অভিবাসনের জন্য বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। দেশের ভেতরেও স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চাকরি করেন। ফলে মা-বাবা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। গৃহকর্মীর কাছে বৃদ্ধ মা-বাবাকে রেখে যাওয়া সবসময় নিরাপদ নয়। সামাজিক মাধ্যমে দেখা গেছে, বিছানায় প্রসাব করার অপরাধে গৃহকর্মী বৃদ্ধাকে চড় মারছে। তবু সমাজের ভয়ে আমরা ঘরেই রাখি, কারণ ধর্মীয় মূল্যবোধে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো পাপ মনে করি।অথচ বহু সন্তান চাইলেও দায়িত্ব নিতে পারে না। নিজের খাবার জোগাড় করতে না পেরে কেউ ছিনতাই করে, কেউ চুরি করে, কেউ দেহ বিক্রি করে। কখন জেলে যায় বা হাসপাতালে পড়ে থাকে মা-বাবাও জানেন না। দিনরাত খেটেও স্ত্রী-সন্তানের মুখে ভাত তুলে দিতে না পারলে বৃদ্ধ মা-বাবার গুরুত্ব কমে যায়। অনেক পরিবারে প্রতিবন্ধী বা দুরারোগ্য সন্তান আছে, যারা আজীবন অন্যের ওপর নির্ভরশীল। যেসব পরিবারে শুধু মেয়ে, সেখানে বিবাহিত মেয়ের পক্ষে মা-বাবাকে সেবা দেয়া কঠিন। আবার অসংখ্য প্রবীণের সন্তান নেই, আত্মীয় নেই। সম্পদ না থাকলে ভাড়া করা লোক রাখাও সম্ভব নয়। এরাই রাস্তায় ভিক্ষা করে, স্টেশন বা ফুটপাতে ঘুমায়, পুলিশের লাঠি খায়। তাই সব মা-বাবা সন্তানের নির্যাতনে ঘর ছাড়েন, এই কথা সত্য নয়।দেশে এখনো দশ শতাংশ মানুষ চরম দরিদ্র। বসতি নেই, বস্ত্র নেই, চিকিৎসা নেই, খাবারের নিশ্চয়তা নেই। ত্রিশ শতাংশ মানুষের তিন বেলা ভাত জোটে না। অর্থনীতি যতই বাড়ক, সবাইকে কাজ দেয়া কোনো সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কোটি মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনিতে এনে সহায়তা দেয়াও সম্ভব নয়। ফলে রোজগারের আশায় সন্তানেরা বৃদ্ধ মা-বাবাকে ফেলে বিদেশে যাচ্ছে। যাদের সে সামর্থ্য নেই তারা শহরে এসে ফুটপাতে কচু, লতি, পিঠা বিক্রি করছে। স্বল্প আয়ের এই মানুষগুলোর কাছ থেকেও পুলিশ আর মাস্তান চাঁদা নেয়। রাস্তায় প্রায়ই দেখা যায়, রোগে কাতর বা স্মৃতিভ্রষ্ট বৃদ্ধ নারী-পুরুষ ফুটপাতে পড়ে আছে। ফেইসবুকে পোস্ট দেয়া পথিকেরা তাদের ডিঙিয়ে চলে যায়। জীবিত না মৃত, খোঁজ নেয়ার তাগিদও থাকে না। ধর্মের দোহাই দিয়ে লাভ নেই। পুলিশ আর দারোয়ানের গুঁতা খাওয়া এই মানুষগুলোর কাছে ফুটপাতের চেয়ে বৃদ্ধাশ্রম স্বর্গ।নিঃস্ব বিধবা, নিঃসন্তান, বিপত্নীক বা অকৃতদার প্রবীণদের জন্য বৃদ্ধাশ্রমই উত্তম জায়গা। দেশের অধিকাংশ বৃদ্ধাশ্রম দুস্থ ও অসহায় প্রবীণের বিনা পয়সায় থাকা-খাওয়ার স্থান। সহায়-সম্বলহীন বয়োবৃদ্ধদের নিশ্চিত জীবনযাপনের একমাত্র আশ্রয় এটিই। মূল্যবোধ বদলাচ্ছে। বৃদ্ধাশ্রমে রাখা মানেই মা-বাবাকে ফেলে দেয়া নয়। প্রয়োজনের কাছে ধর্মের বাণীও অশ্রুত থাকছে। অভাবের তাড়নায় প্রবীণদের শ্রদ্ধা করার তাগিদও কাজে আসছে না।এখন ভালো বৃদ্ধাশ্রমকে কমিউনিটি লিভিং প্লেস বলা যায়। এখানে সমবয়সীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, ভাব বিনিময় হয়, যা অনেক সময় পরিবারেও মেলে না। চার হাজার বছর আগে চীনে অসহায় প্রবীণদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। সেই প্রয়োজন আজও ফুরায়নি, বরং বেড়েছে। পাশ্চাত্যে সাবালক সন্তানেরা আলাদা থাকে, মা-বাবাও তাদের জীবনে বাধা হতে চান না। অনেকে বৃদ্ধাশ্রমে নিজের জগৎ গড়ে নেন। সব বৃদ্ধাশ্রম বিনা খরচে নয়, কোথাও প্রচুর অর্থ লাগে। তবু মানুষ সঙ্গ পায়, গল্প করে, টেলিভিশন দেখে সময় কাটায়। প্রতি বছর দল বেঁধে দেশ-বিদেশে ঘুরতে যায়। নিজেরাই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। সেলিব্রিটিরা উপহার নিয়ে আসেন। সন্তানেরাও দেখতে যায়। তাই উন্নত বিশ্বে প্রবীণ নিবাস আরামদায়ক। বৃদ্ধাশ্রম মানেই এতিমখানা নয়, এটি নিঃসঙ্গতা কাটানোর উত্তম স্থান।আমাদের দেশেও বৃদ্ধাশ্রমের প্রতি আতঙ্ক কমছে। অনেক বৃদ্ধাশ্রমে এখন নিরাপত্তা, চিকিৎসা, বইপড়া, বিনোদন, ভ্রমণের সুবিধা আছে। ঘরে সন্তান বা আত্মীয়ের সান্নিধ্য না পেলে সমবয়সীদের সঙ্গে বৃদ্ধাশ্রমে থাকাই শ্রেয়। পাশ্চাত্যে যারা বৃদ্ধাশ্রমে যান না তারা নিঃসঙ্গতা কাটাতে কুকুর-বিড়াল পোষেন। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ ও দরিদ্র দেশ হওয়ায় প্রবীণদের সমস্যা ব্যাপক। সরকার বয়স্ক ভাতা চালু করলেও তা পর্যাপ্ত নয়। সরকারি-বেসরকারি বৃদ্ধাশ্রমও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। যে পরিবারে সন্তানের সামর্থ্য নেই, সেসব মা-বাবার ভরণপোষণ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেয়া উচিত। নচিকেতার গান শুনে যারা কেঁদেছেন, সামর্থ্যবানদেরও বৃদ্ধাশ্রম গড়ার শপথ নেয়া দরকার।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

তরুণ সমাজের চিন্তার মাধ্যমে দেশ গঠন সম্ভব

একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি সামাজিক পরিবর্তনের একটি প্রধান চালিকাশক্তি। মানুষ তাদের ˆদনন্দিন জীবনে সেই অগ্রগতির প্রভাব অনুভব করে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পারস্পরিক সম্পর্ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি দরিদ্র দেশ, তার পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেনো, সাধারণত যুদ্ধ বা সংঘাতের দ্বারা ব্যাহত না হলে এগিয়ে চলতে থাকে। নেতৃত্বের গুণমান এবং জনগণের সৃজনশীলতা ও পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে সেই অগ্রগতি ধীর বা দ্রুত হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিশ্বায়নের শক্তি। বাংলাদেশের ১৬০ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে সবসময় এমন স্বপ্নদ্রষ্টারা রয়েছেন, যারা নিজেদের জীবন এবং অন্যদের জীবন উন্নত করতে চান। এই সম্মিলিত শক্তিই ব্যাপক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির মধ্যেও দেশ ও অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। মানুষ গ্রাম, শহর এবং পল্লীসমাজ সবখানেই অগ্রগতির আদর্শ অনুসন্ধান করে। কিন্তু মৌলিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মানুষ প্রায়ই এক ধরনের উদাসীনতা প্রদর্শন করে। তবে আমি মনে করি, বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রে রূপান্তরমূলক পরিবর্তন নিয়ে বিদ্যমান নীরবতার পেছনে দু’টি কারণ রয়েছে। আমি মনে করি, একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে মৌলিক পরিবর্তন দুইভাবে ঘটতে পারে। প্রথমত, মানুষকে এই বিষয়ে আশ্বস্ত হতে হবে যে প্রতিশ্রুত পরিবর্তন বাস্তবেই ঘটবে এবং যারা সেই পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলছেন তারা বিশ্বাসযোগ্য। বিশ্বাস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এটি শুধু শিক্ষা ও দক্ষতার বিষয় নয়; বরং সততা, নৈতিকতা এবং সক্রিয় সম্পৃক্ততার সঙ্গেও সম্পর্কিত। মানুষ সাধারণত দেখতে চায় যে যারা পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছেন, তারা বৃহত্তর স্বার্থে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করেছেন, ঝুঁকি নিয়েছেন এবং অবিচল অঙ্গীকার প্রদর্শন করেছেন। দ্বিতীয়ত, পরিবর্তন ঘটতে পারে যদি দুঃশাসন নিজস্ব ভারেই ভেঙে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে একটি বড় সংকট সৃষ্টি হয় এবং লাখো সাধারণ মানুষ হঠাৎ করেই তাদের জীবিকা নিয়ে গুরুতর হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং অত্যন্ত অস্থির একটি দেশ শাসন করা সহজ নয়। এই কারণেই দীর্ঘমেয়াদি কর্তৃত্ববাদী শাসন শেষ পর্যন্ত টেকসই হয় না। কেউ কেউ এমন একটি পতনের অপেক্ষায় থাকতে পারেন। কিন্তু তার পরিণতি হতে পারে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য, যা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন সৃষ্টি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত, এমন একটি পরিবর্তনের সুফলও আবার ভিন্ন একটি অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে।স্বাধীনতার জন্য জনগণের নিজস্ব সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই। এমন সংগ্রাম দীর্ঘ, কঠিন এবং নানাবিধ বাধায় পরিপূর্ণ। দুর্ভাগ্যবশত, খুব কম মানুষই সেই পথে হাঁটতে ইচ্ছুক। যারা হাঁটেন, তারাই শ্রদ্ধার যোগ্য হয়ে ওঠেন। তারাই প্রকৃত নেতা হয়ে ওঠেন। তবে নেতৃত্ব নিজেই সামাজিক রূপান্তরের সমগ্র প্রক্রিয়ার কেবল একটি অংশ। একজন নেতার আবির্ভাব দীর্ঘ সময়ের পরীক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং ভুল-শুদ্ধির মধ্য দিয়ে ঘটে। বাংলাদেশে যারা বছরের পর বছর গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছেন যদিও অনেক সময় আপসও করেছেন তারা মূলত পূর্ববর্তী প্রজন্মের মানুষ। বর্তমান রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলো অনেক দিক থেকেই সেই আগের সংগ্রামের সুফলভোগী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সমকালীন নির্বাচনী গণতন্ত্রের ব্যবস্থা সেইসব সংগ্রামেরই ফল। দেশকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে বিকল্প নেতৃত্ব এবং একটি নতুন বয়ান নির্মাণ প্রয়োজন, যার কোনোটিই রাতারাতি সৃষ্টি হতে পারে না। একজন ব্যক্তি নিজের জীবনমান উন্নত করার জন্য জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় ব্যয় করতে পারেন। কিন্তু একটি সমাজের মূল্যবোধ পরিবর্তন করতে হলে শত শত, হাজার হাজার মানুষের শিক্ষা, অভ্যাস এবং আচরণ পরিবর্তন করতে হয়। এ কারণেই একটি সামাজিক ব্যবস্থা এক, দুই কিংবা দশ বছরের মধ্যে পরিবর্তিত হয় না। প্রজন্ম পেরিয়ে যায়। একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক রূপান্তর হলো শত শত ও হাজার হাজার সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘটিত অসংখ্য ক্ষুদ্র পরিবর্তনের সমষ্টি।এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের কেন্দ্রীয় বয়ানে পরিণত হয়েছিল, যা পরে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ নামে পুনঃব্র্যান্ডিং করা হয়। এটিকে উন্নয়নের প্রতীক, জনসেবা সম্প্রসারণের একটি পদ্ধতি এবং নাগরিক ক্ষমতায়নের একটি মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। আমাদের বলা হয়েছিল যে ডিজিটাল সংযোগ মানেই অগ্রগতি, মোবাইল ব্যাংকিং মানেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সিসিটিভি ক্যামেরা মানেই নিরাপত্তা এবং জাতীয় ডাটাবেস মানেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা। কিন্তু বাস্তবে এই কাঠামো ধীরে ধীরে এমন একটি নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার যন্ত্রে পরিণত হয়, যেখানে প্রযুক্তি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নয়, বরং নীরব আনুগত্য গড়ে তোলার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নয়, বরং প্রশ্নহীন আনুগত্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা জোরদার করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের রাষ্ট্র নির্মাণ কৌশলের একটি অংশ। এর মাধ্যমে প্রযুক্তিকে আধুনিকতার বাহ্যিক চিত্র তুলে ধরার জন্য ব্যবহার করা হলেও মানুষকে আরও গভীর অন্ধকারে রাখা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, যার মাধ্যমে সামান্য ভিন্নমতও কঠোরভাবে দমন করা হতো; বহু ক্ষেত্রে মানুষ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কারাবরণ, গুম এবং এমনকি মৃত্যুর শিকার হয়েছে।এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্প কার্যত এমন একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করেছে যারা তথ্য গ্রহণ করে, কিন্তু সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করে না। এই নাগরিকরা স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে, ফরম পূরণ করে এবং ক্যামেরার সামনে দাঁড়ায়, কিন্তু খুব কমই রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে। তারা সার্ভারের আপডেট নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে, কিন্তু গণতন্ত্রের ধারণা সম্পর্কেই উদাসীন থাকে। এই একমাত্রিক নীরবতার বিপরীতে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব একটি মোড় ঘোরানোর মুহূর্তের ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল রাজপথের একটি আন্দোলন ছিল না; বরং ডিজিটাল পরিসরেও একটি বিকল্প বয়ানের সূচনা করেছিল। ভিডিও, ইনফোগ্রাফিক, প্রামাণ্যচিত্র, অনুবাদ এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ চিন্তাশীল ডিজিটাল প্রতিরোধের নতুন রূপ নির্মাণ শুরু করে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে তথ্যপ্রযুক্তি কেবল রাষ্ট্রের নজরদারির বাহন হওয়ার প্রয়োজন নেই; এটি বিকল্প সংগঠন এবং সম্মিলিত কর্মকাণ্ডেরও একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। আন্তোনিও গ্রামশির ভাষায়, তারা ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’-এ পরিণত হয়েছে—এমন ব্যক্তি, যারা বিদ্যমান ব্যবস্থার ভাষা পুনরাবৃত্তি না করে, প্রতিরোধের নতুন বয়ান সৃষ্টি করতে সক্ষম।তরুণরা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে একটি স্মার্টফোন শুধু টিকটকের জন্য ব্যবহৃত একটি যন্ত্র নয়; এটি রাষ্ট্র সম্পর্কে চিন্তা করার একটি মোবাইল প্ল্যাটফর্মও হতে পারে। একটি ফেইসবুক পোস্ট একটি ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হতে পারে। একটি টেলিগ্রাম চ্যানেল বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। তাদের অনেকেই শুধু প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ নয়; নৈতিকভাবে দৃঢ় এবং রাজনৈতিকভাবেও সচেতন। এই অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে রাষ্ট্র সম্পর্কে একটি বিকল্প কল্পনার পথ উন্মুক্ত করে—যাকে আমরা বলি ক্রিটিক্যাল বাংলাদেশ: এমন একটি চিন্তাশীল, নৈতিক এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের কল্পনা, যা প্রচলিত উন্নয়নের মিথের বাইরে বিকল্প বাস্তবতা নির্মাণ করতে চায়। এটি কোনো সরকারি প্রকল্প নয়। এটি এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন, যা চিন্তাশীল, জবাবদিহিমূলক, নৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে মুক্ত। এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনার স্থান নয়, বরং বিতর্ক ও মতভেদের ক্ষেত্র। যেখানে গণমাধ্যম প্রচারণার যন্ত্র নয়, সত্য অনুসন্ধানের প্ল্যাটফর্ম। যেখানে তরুণরা কেবল ভোটার নয়, বরং ধারণা সৃষ্টির সহ-নির্মাতা।প্রযুক্তি নাগরিকদের সহযোগী হতে পারে, কিন্তু যখন এটি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা গণতন্ত্রের শত্রু হয়ে ওঠে। প্রশ্নহীন উন্নয়ন আধুনিক দাসত্বের এক ধরনের রূপ। মৌলিক প্রশ্ন হলো: আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই? এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে এক ক্লিকেই নাগরিকদের নীরব করে দেয়া যায়, নাকি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে একটি মাত্র প্রশ্নই পুরো ব্যবস্থাকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে পারে? বাংলাদেশের বহু তরুণ এখনও রাজনীতি থেকে দূরে রয়েছে, কারণ তাদের ˆশশব গড়ে উঠেছে ভয়, নজরদারি এবং প্রোপাগান্ডার মধ্যে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম তাদের সামনে এমন একটি আদর্শ উপস্থাপন করেছিল, যেখানে বিরোধিতা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহ, প্রশ্ন তোলা মানেই ষড়যন্ত্র, আর সমালোচনা মানেই বিদেশি স্বার্থের সেবা করা। সুতরাং, সমালোচনামূলক চিন্তা বনাম ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’—এটি এমন একটি নিয়ন্ত্রিত তথ্যব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল, যা বাহ্যিক আলোকচ্ছটায় উজ্জ্বল হলেও জ্ঞান ও সমালোচনামূলক চিন্তার অনুপস্থিতিতে অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। তবুও এখনও এমন তরুণ রয়েছে, যারা শুধু ডিজিটাল দক্ষতাই নয়, সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতাও অর্জন করছে। তারা জানে কীভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে হয়, সত্যতা যাচাই করতে হয় এবং নিজেদের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হয়। এই তরুণদের মাধ্যমেই একটি নতুন নাগরিক সমাজ গড়ে উঠতে পারে—যা শুধু কাগজে-কলমে নয়, বরং নৈতিক সাহস, বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে প্রযুক্তি বিচ্ছিন্নতার নয়, সংযোগের হাতিয়ার। যেখানে প্রতিটি মোবাইল ফোন শুধু সেলফি তোলার যন্ত্র নয়, বরং সত্যের সাক্ষী। এই অর্থে, ক্রিটিক্যাল বাংলাদেশ কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়; এটি সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পুনর্গঠনের একটি প্রকল্প। এটি মানুষকে রাষ্ট্রের বয়ানকে প্রশ্ন করতে, গণমাধ্যমের বার্তা যাচাই করতে এবং নিজেদের অবস্থান থেকে নতুন বয়ান নির্মাণ করতে আহ্বান জানায়—এমন বয়ান, যা প্রতিক্রিয়াশীল নয়; বরং মুক্তিকামী, ভবিষ্যতমুখী এবং সৃজনশীল।আমাদের যুব সমাজ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে একটি নতুন বাংলাদেশের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, এবং সেই আশার কেন্দ্রে রয়েছে এই বিপ্লবী চিন্তার প্রজন্ম। যদি রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব এই প্রজন্মের হাতে ন্যস্ত হয়, তবে উন্নয়ন হবে অংশগ্রহণমূলক, গণতন্ত্র প্রশ্ন করার সংস্কৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে এবং প্রযুক্তি স্বাধীনতার পথে পরিণত হবে। নতুন প্রজন্মের প্রতি একটাই আহ্বান: নীরব থেকো না। নীরবতা অন্যায়ের সঙ্গে এক ধরনের সহযোগিতা। প্রশ্ন করো—কারণ প্রশ্নহীন উন্নয়ন এক ধরনের নীরব মৃত্যু। আর সেই মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতা একমাত্র প্রশ্নেরই রয়েছে। কোনো পেশার প্রক...ত মর্যাদা তার সামাজিক ক্ষমতা বা প্রভাব দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় তার দায়বদ্ধতা, আত্মশুদ্ধির সক্ষমতা এবং জনগণের আস্থা অর্জনের ক্ষমতা দিয়ে। অপমানের ভাষা সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা কখনও সমস্যার সমাধান দেয় না। সমাধান আসে সংলাপ, আত্মসমালোচনা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকে। এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে কথায়, আচরণে এবং আত্মসমালোচনায়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

ব্ল্যাঙ্ক চেক বা সিকিউরিটি চেক কি গলার ফাঁস?

ব্যবসায়িক লেনদেন, ব্যাংক লোন কিংবা ব্যক্তিগত ধারদেনার ক্ষেত্রে ‘সিকিউরিটি চেক’ বা ব্ল্যাঙ্ক চেক’ দেয়ার প্রচলন আমাদের সমাজে বেশ পুরোনো। অনেকেই বিশ্বাসের খাতিরে শুধু একটা স্বাক্ষর করে ফাঁকা চেক অন্য পক্ষের হাতে তুলে দেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখন, যখন সেই বিশ্বাসের অপব্যবহার করে চেকে ইচ্ছামতো মোটা অঙ্কের টাকা ও তারিখ বসিয়ে আদালতে এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা ঠুকে দেয়া হয়।হঠাৎ এমন আইনি মারপ্যাঁচে পড়ে অনেকেই দিশেহারা হয়ে যান। কিন্তু আইন কাউকে অন্ধভাবে শাস্তি দেয় না। আপনার দেয়া চেকটি যদি সত্যিই কেবল ‘সিকিউরিটি’ বা ‘নিরাপত্তা স্মারক’ হিসেবে দেয়া হয়ে থাকে এবং সেখানে যদি জালিয়াতি করা হয়, তবে আদালতে মুখের কথায় নয়, আইনি ও ˆবজ্ঞানিক যুক্তিতে লড়াই করতে হবে।আদালতে আসামিপক্ষে লড়াই করার এবং খালাস পাওয়ার প্রধান ৫টি আইনি অস্ত্র নিচে আলোচনা করা হলো:১. চেকের ভিন্ন হাতের লেখা ও ভিন্ন কালি (ধারা ৮৭)একটি চেকের মূল চরিত্র হচ্ছে এর সত্যতা। হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ৮৭ ধারা অনুযায়ী, চেকে যদি ড্রয়ারের (চেক দাতা) সম্মতি ছাড়া কোনো মৌলিক পরিবর্তন করা হয়, তবে সেই চেকটি বাতিল বলে গণ্য হবে। আপনার স্বাক্ষর যদি সঠিকও হয়, কিন্তু চেকের ভেতরের তারিখ, টাকার অঙ্ক এবং নাম যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন হাতের লেখায় এবং ভিন্ন কালিতে লেখা হয়, তবে তা আদালতে বড় একটি ডিফেন্স। বাদীকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, এই ভিন্ন লেখার পেছনে চেক দাতার সম্মতি ছিল।২. স্বাক্ষর থাকলেই কি তা ‘ইস্যু করা চেক’?আমাদের দেশের উচ্চ আদালতের একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত রয়েছে এম.এ মজিদ বনাম মো. আব্দুল মোতালেব (৫৬ ডিএলআর, ৬৩৬) মামলায়। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট বলেছেন:‘আসামির স্বাক্ষর, টাকার অঙ্ক এবং পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখায় থাকলে এর ধারা ৩ (ন) অনুসারে উহাকে ‘ইস্যুয়েন্স অব চেক’ বলা যাইবে না।’ অর্থাৎ, আপনি শুধু স্বাক্ষর দিয়েছেন মানেই এই নয় যে আপনি পুরো চেকটি ওই টাকা বসিয়ে আইনসম্মতভাবে ইস্যু করেছেন।৩. প্রমাণের দায় কার? (৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭):সাম্প্রতিক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির হলো এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র (৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭) মামলা। এই সিদ্ধান্তে মহামান্য হাইকোর্ট আরও কঠোরভাবে বলেছেন যদি ড্রয়ার নিজে চেক সম্পূর্ণ পূরণ না করেন এবং হস্তাক্ষরে স্পষ্ট অসঙ্গতি থাকে, তবে বাদীকে (যিনি মামলা করেছেন) অবশ্যই আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে, অন্যের দ্বারা চেকটি পূরণের ক্ষেত্রে চেক দাতার স্পষ্ট অনুমতি বা সম্মতি ছিল। বাদী এই ব্যাখ্যার সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারলে মামলার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়।৪. ফরেনসিক পরীক্ষা: আসামির মৌলিক অধিকারঅনেকেই ভাবেন, চেকে স্বাক্ষর যখন মিলে গেছে, তখন আর বাঁচার উপায় নেই। এটি ভুল ধারণা। সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী, চেকের লেখার বয়স এবং কালির ভিন্নতা পরীক্ষার জন্য সরকারি ফরেনসিক ল্যাবে (যেমন সিআইডি বা পিবিআই-এর হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞ) চেকটি পাঠানোর আবেদন করা আসামির আইনগত অধিকার।ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের দু’টি বিখ্যাত সিদ্ধান্তত্ম কল্যাণী ভাস্কর বনাম এম.এস. সম্পূর্ণম (২০০৭) এবং টি. নাগাপ্পা (২০০৮) মামলায় বলা হয়েছে, আইনে বাদীর পক্ষে প্রাথমিক অনুমানের সুযোগ থাকলেও, আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ বা ন্যায়বিচারের অধিকার কেড়ে নেয়া যাবে না। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যদি প্রমাণ হয় যে স্বাক্ষরটি ৫ বছর আগের আর ভেতরের লেখাগুলো ২ মাস আগের তবে জালিয়াতি সহজেই ধরা পড়বে।৫. সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার অপরাধ নয়মহামান্য আপিল বিভাগের একটি লিডিং জাজমেন্ট হলো হুমায়ুন রশিদ বনাম শাহিন আকন্দ (৭১ ডিএলআর (এডি))। এই মামলার মূল নীতি হলো কোনো ব্ল্যাঙ্ক চেক যদি শুধুমাত্র সিকিউরিটি বা জামানত হিসেবে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে পাওনাদার যদি নিজের ইচ্ছামতো বড় অঙ্ক বসিয়ে তার অপব্যবহার করে মামলা করে, তবে এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার অধীনে কোনো অপরাধ গঠিত হয় না।শেষ কথাআইন সচেতনতাই আইনি ফাঁদ থেকে বাঁচার প্রধান উপায়। কারো বিরুদ্ধে সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার করে মিথ্যা মামলা হলে, ভয় না পেয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে শুরুতেই চেকটি ফরেনসিক পরীক্ষার আবেদন করা উচিত এবং উচ্চ আদালতের এই চমৎকার নজিরগুলো যুক্তিতর্কের সময় উপস্থাপন করা উচিত। আইন যেমন অপরাধীকে সাজা দেয়, তেমনি কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যাতে জালিয়াতির শিকার না হন, তার সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।সতর্কতা: যেকোনো আইনি লেনদেনে ব্ল্যাঙ্ক চেক দেয়া থেকে বিরত থাকুন। যদি দিতেই হয়, তবে চেকে ‘সিকিউরিটি চেক’ লিখে দিন এবং কোনো চুক্তির অধীনে দিচ্ছেন তা লিখিত আকারে রাখুন।[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

রম্যগদ্য: ফ্যাসিস্ট খ্যাদাইলাম, ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম

“হি হি হি, আনন্দের আর সীমা নাই, দারুণ কোইছেন, “ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যাদাইলাম, ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম”। “ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যেদাইলাম, হেইডা তো, সিম্পেল, বুইজাইলচ্চি, কিন্তু ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম, এইডার মাজেজাটাতো ঠিক বুজা পারতাছিনা?”“ওম্মা, কচি খোকা! এই সামান্য জিনিসটা তুমি বুঝতে পারছো না! কথাটাতো একদম জলবৎ তরলং, ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যাদাইলাম, ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম। একজনকে তাড়ালাম আর একজনের ভয়ে পালালাম।”“একজনরে খ্যাদাইলেন, বুঝলাম, আর একজনের ভয়ে পলাইলেন? কিন্তু কখন পলাইলেন কার ভয়ে পলাইলেন, তার নাম কিতা? কিছুইতো বুজা পারতাছিনা?”“ওই জঙ্গল, ভাশুরের নাম কি মুখে নেয়া যায়?”“না, কহোনই না। ভাশুর তো শশুরেরই রিডিউস ফুটোকপি, হ্যার নাম মুখে ক্যান, স্বপ্নেও দ্যেহন যাইবো না। বুজছোইন!”“জ্বী, আমি ঠিকই বুঝেছি, তাই যার ভয়ে পালালাম তার নাম মুখে নিচ্ছিনা, আর প্রিন্ট মাধ্যমেও প্রকাশ করছি না।”“তয় আপনে যে এ্যতো ফুটানি মারতাছেন, ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যাদাইলাম, জনগনের সার্পুট না পাইলে, ফ্যাসিস্ট সরকাররে খ্যেদাইতে পারতেন?”“তুই কি, আজকাল ইউটিউব দ্যেখা ছেড়ে দিয়েছিস, ইউটিউবে দেখিসনি সবাই ক্যেমন গাল ফুলিয়ে বলছেন, যে আমরা জুলাইয়ের পুরো আন্দোলন পরিচালনা করেছি। আমাদের নাম প্রকাশ পেলে, জনগনের সাপোর্ট পাবনা বলেই আমাদের নাম প্রকাশ করিনি। আর জনগনও আমাদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে সংগ্রামকে বেগবান করে সহজেই সাম্রাজ্যবাদ কায়েম করলাম।”“কিন্তু আপনে তো, দেড় হাজার জীবন বলি দিয়া, এক ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যেদাইয়া আর এক ইউনুস ফ্যাসিস্ট সরকার আইন্না বসাইলেন। লাভটা কি হোইলো!’“অ্যাঁএ, ড. ইউনূস, ফ্যাসিস্ট! তুই ফ্যাসিস্টের মানে বোজো? ফ্যাসিস্ট হোইলো গোঁড়া জাতীয়তাবাদ, এক ব্যাক্তির ইচ্ছার ওপর দেশ চলবে। বিরোধী দলকে দমন, পীড়ন, মারণ, গুম-হত্যা, সেভেন মার্ডার, ব্যাক্তির কোনোই ইচ্ছা থাকবে না, গোষ্টির মতো চলতে হবে। যেটা বিগত কালে তোরা বাংলার বুকে দেখেছিস।”“ক্যা ইউনূসের সময় আপনে গুম-খুন করেন নাই?”“আরে ভাই ওই সময় গুমের কোনোই ইতিহাস নেই। আরে ব্যাটা বিশ্ব ইতিহাসে ফ্যাসিস্ট হচ্ছেন মাত্র দুইজন, বেনিতো মুসোলিনি (১৯২২-১৯৪৩) আর আমাদের জামার্নির এ্যাডলফ হিটলার (১৯৩৩-১৯৪৫) আর তোদেরটা সেই তুলনায় চুনোপুঁটি, নস্যিরে নস্যি। তোদের সময় এক সেনাসদস্য ভাষ্যানুসারে এক সেনা কর্মকর্তার গুম খুনের সংখ্যা আর কটা হবে, তিনশ’চারশ’ এক হাজার, দুহাজার, তিন হাজার-পাঁচ হাজার, কিন্তু এক হিটালেরর সময় সারা বিশ্বে মানুষ মারা গেছে ছয় (৬) কোটি। বুঝতে পারিস কোথায় চার-পাঁচ হাজার আর কোথায় ছয় কোটি! আর ড.ইউনুসের সময় কয়টা হাতে গোনা যায়।”“বুলডোজার দিয়া বাড়ির চৌকাঠ পর্যন্ত গুড়ায়া দিলেন, মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরাইলেন, চিফের গালে জুতার বাড়ি মারলেন, এইগুলা ফ্যাসিস্টের কাম না?”“শোন ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রতীক মাঝে একটি কুঠার, এই হচ্ছে ততকালীন ফ্যাসিস্টের প্রতীক। ড. ইউনূসের সময় এই প্রতীক দেখা যায়নাই। তিনি কখনোই তার ইচ্ছা মতো কাজ করেন নাই। জনগন যা চেয়েছে তিনি তাতে সাপোর্ট দিয়েছেন।”“হ’ নন ডিসক্লোজার এ্যাগ্রিমেন্ট তো জনগন চাইছিল?”“আরে এটাতো ততকালীন সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন, ড. ইউনূস কি করবেন। সবাই জনগণের ইচ্ছা।”“হ, জনগন শুয়োর খাওনের এ্যাগ্রিমেন্টে সই করবো! আন্নে হাগলনি কোনো!”“আমাকে এ’কথা বলে লাভ নেই, তোরা তখন ড.ইউনুসকে ক্যাপ্টেন বানিয়েছিস, ক্যাপ্টেন যা করবার তার লাইসেন্স তাকে তোরাই দিয়েছিস!”“আচ্ছা বুজছি বুজছি ড. ইউনূস ফ্যাসিস্ট হোইলে তারেও আপনেরা খ্যেদাইতেন, কিন্তু অহন কন আপনেরা ভাইগ্যা আইলেন কার ডরে?”“দ্যেখ একে ঠিক ভাইগ্যা আইলাম বা পালিয়ে এলাম বললে হবে না। এটা হচ্ছে মহান বাম পন্থীনেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেলিনের কথা, “ওয়ান স্টেপ ফরওর্য়াড, টু’স্টেপস ব্যাক” মানে যদিও তুমি সংগ্রামে একপা এগিয়েছো, তাহলে আরোও আগানোর জন্য প্রয়োজনে দু’পা পিছিয়ে আসতে পারো।”“ও! তার মানে আপনেরা এখন পলান নাই? ভ্লাদিমির ইলিচ লেলিনের কথা মত, “ওয়ান স্টেপ ফরওর্য়াড, টু’স্টেপস ব্যাক গিয়ার মারছেন। তারপর আবার ঝোপ বুইজ্ঝা কোপ দিবেন!”“ব্যাপারটা অনেকটা তাই। যেমন দ্যেখ বর্তমানে বাংলার জনগন প্রায় ৫৪ বছর ধরে লাঞ্ছনার গঞ্জনার বঞ্চনার শিকার হতে হতে তোরা আজ সরকারের প্রতি, নেতাদের প্রতি, মন্ত্রীদের প্রতি আস্থা হারিয়ে, আজ জীবন ছেড়ে মরণের পরে শুখে থাকার জন্য লালায়িত। আর এই লালসা তোদের জীবন বিমুখ করে, চুরি-ডাকাতি, খুন-জখম রাহাজানী, অবলা নারীর প্রতি অত্যাচার সব কিছুই সহজ ভাবে গ্রহণ করছিস, মেনে নিচ্ছিস। কিন্তু ক্যেন ক্যেন, ক্যেন সমাজে এই বিশৃঙ্খলা, কোনো সুস্থ্য মস্তিষ্ক কি অনাচার মেনে নিতে পারে!”“না না না, এইডা, এই অতিআচার মাইনষ্যে ক্যেমনে মাইন্না নিবো কন, কন, কন?”“কিন্তু তোরা তো সকাল-সন্ধ্যা সব মেনে নিচ্ছিস। বিগত ৫৪ বছর খালি এ’দল আর ও’দল করে মরলি। কাজের কাজ কিছুই হলোনা, তোরা যেই তিমিরে সেই তিমিরেই পড়ে রইলি।”“আমরা সাধারণ মাইনষ্যে কি করমু কন?”“খামাখা ফালতু কথা বলিস না, “আমরা সাধারণ মাইনষ্যে কি করমু কন!” আরে তোরা সাধারণ মানুষ এক হলে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনিস, তোরা সাধারণ মানুষ এক হলে ˆস্বরাচার হোমোকে ফেলতে পারিস, তোরা সাধারণ মানুষ এক হলে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়, আর তুই কিনা বলিস “আমরা সাধারণ মাইনষ্যে কি করমু কন!”“ক্যান এইবার তো ভুটে আমরা আমাগো মার্কায় ভুট দিছিলাম কিন্তু ফলতো পাইলাম না!”“কোন মার্কায় ভোট দিয়েছিলি গ্রীক গডেস মানে গ্রীসের দেবী থেমিসের বাঁ-হাতে ধরে রাখা প্রতীককে তুই আপামর জনসাধারণের মুক্তির প্রতীক ভেবেছিস?”“গ্রীসের দেবী কন আর যাই কন, হ্যেই যেইডা বাম হাতে ধইরালচ্চে, হেই মার্কাই আমাগো গরীবের মুক্তির মার্কা।”“আরে ভাই তুই একজন নারী, গ্রীসের দেবী থেমিসের মুর্তি হাইকোর্টের সামনে থেকে নিয়ে চিপায় ফেলে দিলি। কারণ তোর মতে নারী নেতৃত্ব হারাম! আবার সেই দেবী থেমিসেরই বাঁ-হাতে ধরে থাকা বস্তুটি, প্রতীকটি, মার্কাটি গরীবের মুক্তির মার্কা হয়ে উঠল! আশ্চর্য্য তুই যেই দেবীটাকেই ঘৃণা করিস আবার সেই দেবীর বাম’হাতে ধরে থাকা মার্কাকে মাথায় তুলে নাচিস! লজ্জা হয়না তোর!”“ভাই লাজ লজ্জা বুঝিনা, আমাগো দেশে নারী নেতৃত্ব চলবো না আমাগো লাগলে একটা হিটলার আইন্নাদেন হ্যেয়ই দেশ চালাক, গরীবরে বাঁচাক। কিন্তুক কুনো বেডি আইন্না দিয়েন না।”“দেবী থেমিসকে অপমান করে, তার বাঁ’হাতে ধরে থাকা প্রতীক নিয়ে নাচা নাচি করলে মহান সৃষ্টিকর্তা ব্যেজার হন। যার জন্য আমরা মানে মানে, চুপি সারে সরে এলাম। যদি কোনোদিন সত্যিকারে মানুষ হোই, মানুষকে মানুষ মনে করে শ্রদ্ধা করতে পারি, সেইদিন আবার আসবো মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে, ততদিন জনগণের চোখের আড়ালে বা লোক চক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে থাকি।”“দেখি আমরা যদি ব্যেবাগ গরীবরা এক হোইতে পারি, তায়লে দেবী থেমিসরে থুয়া কেবল হ্যের বাম হাতের মার্কা লয় নাচুমনা। নাচলে দেবীরে লয়া দেবীর মার্কালয়া নাচুম। কিন্তুক আপনি যে কোইলেন, “ফ্যাসিস্ট সরকার খ্যেদাইলাম, ভাশুরের ভয়ে পলাইলাম। তয় এই ভাশুরটা ক্যেডা?”“আরে বুঝিসনা ক্যেন, ভাশুরের নাম মুখে আনা নিষেধ।”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

সততার বিড়ম্বনা সর্বকালে

সরকারি চাকরিতে সৎ, সাহসী ও বিবেকবান হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। সঙ্গে দেশপ্রেম থাকলে সেটা আরও বিপজ্জনক। অবস্থাদৃষ্ঠে মনে হয়, সততা, নিরপেক্ষতা বা দেশপ্রেমিক হওয়ার দায় সরকারি কর্মচারীর মধ্যে না থাকাই ভালো। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা হবে শতভাগ আজ্ঞাবহ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সদা তৎপর, কর্মচঞ্চল। দেশের ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনায় নিমগ্ন হওয়া তার জন্যে নয়। দেশ ও জনগণের ভালো মন্দের দায় পুরোটা জনপ্রতিনিধির হাতে থাকবে। কারণ জনগণ জেনেশুনেই তাদেরকে সেই ম্যান্ডেট দিয়েছে। সেখানে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় জীবিকা করা বেতনভুক্ত কর্মচারী কেন নাক গলাবে? তার কাজ হবে ওপরের আদেশ মোতাবেক সঠিক দায়িত্ব পালন করা। কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ, কল্যাণ-অকল্যাণ এটা সরকার বুঝবে। সম্প্রতি সিলেটের ডেপুটি কমিশনারের (ডিসি) ক্ষেত্রে যা হল, তাতে জনগণের জন্যে মেসেজটা এমনই মনে হয়। ডেপুটি কমিশনারের (ডিসি) কাজের অন্ত নেই। বস্তুত তার অধিক্ষেত্রের সকল সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারির একটা সাধারণ এখতিয়ার তার কর্মপরিধির মধ্যে পড়ে। জেলা প্রশাসনের সুদূর অতীতের ইতিহাসে এমন একটা ঐতিহ্যগত অনুশাসন রয়েছে। জনসাধারণের স্বার্থ ও কল্যাণ নিহিত আছে এমন ইস্যুতে জেলা প্রশাসক স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসকই তৎক্ষনাৎ জনগণের পাশে দাঁড়ান। তখনই এটা তার দাপ্তরিক কাজের অন্তর্ভুক্ত বিষয় হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, রুটিন কাজের বাইরে না গিয়ে একদম গতানুগতিক ধারায় গা ভাসিয়ে দিয়েও চাকরি করা যায়। অধিকাংশ ডিসি এটাই অনুসরণ করেন এবং সময় কাটিয়ে নির্বিঘ্নে, নিরাপদে ফিরে আসেন। এদের কোনো নাম গন্ধও থাকে না, বিপদগ্রস্ত হন না, বিতর্ক হয় না, এরা সব সময়ই সুসময়ে বাস করেন। সমস্যা কেবল তাদের, যারা বক্সের বাইরে গিয়ে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে জনস্বার্থকে রক্ষা করার নিমিত্ত খানিকটা ঝুঁকি গ্রহণ করেন। ২.জেলা প্রশাসনের আড়াই শো বছরের অধিক কালের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এমন অসংখ্য নজির স্থাপিত হয়ে আছে। নিম্ন-গাঙেয় বদ্বীপের এ দেশে স্মরণাতীত কাল থেকে বন্যা, খরা, প্লাবন, জলোচ্ছ্বাস আর মহামারী লেগেই ছিল। আজও এর রেশ চলমান আছে। আর এর সঙ্গে জেলা প্রশাসনের দাপ্তরিক দায়িত্ব ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ফলে মাঠ প্রশাসনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার নানা কিংবদন্তিও প্রচলিত আছে। অতীতের সিভিল সার্ভেন্টদের আত্মজীবনীমূলক লেখায় এমন ঘটনার অবতারণা রয়েছে। দেশের জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিকার হিসেবে জনগণের পাশে সবার আগে ডেপুটি কমিশনারই (ডিসি) দাঁড়ান। তিনিই দায়িত্ব নিয়ে ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেন। সরকারের সঙ্গে পত্র যোগাযোগও করে থাকে জেলা প্রশাসন। ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহ, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখাসহ সব দায়িত্ব নেন। যেমন— খাদ্য গুদামের গেইট খোলার কাজ, বাঁধ নির্মাণের কাজ, রিলিফ পৌঁছানোর কাজ, প্রাথমিক চিকিৎসার কাজ, সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে মত বিনিময়ের কাজ ইত্যাদি। বৃটিশ ভারতে এবং পরবর্তীকালের পূর্ব পাকিস্তানে এমন সিদ্ধান্ত নিতে কারও অনুমতির প্রয়োজন হত না। জনশ্রুতি আছে, গুদামের মজুতকৃত খাদ্য বিতরণ করে পূর্ববঙ্গের কোনো এক মহকুমায় সাময়িক দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করেছিলেন বিখ্যাত আইসিএস অফিসার এবং কুমিল্লা মডেল তথা বার্ডের প্রতিষ্ঠাতা জনাব আখতার হামিদ খান। এবং এর সূত্র ধরেই পরবর্তীতে তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। অবশ্য তিনি চাকরিকে ত্যাগ না করলে এতো বিপুল খ্যাতিমান হতেন না। এ সবই নিয়তি। ৩.মনে হয়, এ কারণেই ট্রেনিং প্রতিষ্ঠানসমূহে পড়ানো হত, সরকারি দায়িত্ব পালনে অতি উৎসাহী হওয়ার প্রয়োজন নেই। দায়িত্ব আমন্ত্রণ করা মানে একই সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত শত্রু ও ঝুঁকিকে আমন্ত্রণ করা। এরচেয়ে সব সময়ই নির্বিকার, অনুৎসাহী, লিপ-সার্ভিস সর্বস্ব, মধ্যম মানের গোবেচারা ধরনের ডিসি’র কোনো প্রতিপক্ষ থাকে না। তারা অজাতশত্রু ও জনপ্রিয় আমলা নামে পরিচিতি লাভ করেন। এবং বিনা বাধায়, বিনা প্রশ্নে চাকরির উচ্চতর শিখরে আসীন হয়ে যান। তারা ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং সরকার কাছেও সর্বদা প্রথম পছন্দের তালিকায় থাকেন। সময় বদলে গেছে, যুগের পরিবর্তন হয়েছে। সিভিল সার্ভিসে এখন আর হিরোইজম প্রদর্শনের অবকাশ নেই। এক সময়ে এসব ছিল, এর পক্ষে জনমতও ছিল। মানুষের মধ্যে নীতি নৈতিকতা, আদর্শিক প্রেরণা ছিল। অন্যায়কে সমর্থন জোগানোর মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। যা এখন সম্পূর্ণ বিপরীত। ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে কেউ বিপদগ্রস্ত হতে চায় না। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চায় না। তাই কেউ কারও রক্ষক হয়ে এগিয়ে আসছে না। কাজেই সময়ের সঙ্গে গা ভাসিয়ে, গা বাঁচানো চাকরির কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া সততা, নিরপেক্ষতা, দেশপ্রেমবোধ এসব পড়াশোনা করাই ভালো, প্রয়োগে, চর্চায়, অনুশীলনে খুব বেশি দরকার নেই। ৪.বিগত কয়েক বছরে দেশের কয়েকজন আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট/ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কথা বলা যায়। বিশেষ করে জনাব রোকন-উদ দৌলা, মুনীর চৌধুরী এবং সারোয়ার আলমের দিকে তাকানো যায়। প্রথমোক্ত দু’জন অতিরিক্ত সচিব থেকে অবসরে চলে যান। এদের প্রত্যাশিত সচিব পদে পদোন্নতি পাননি। কেন পাননি সে বিষয়ে আলোকপাত করছি না তবে জনগণের প্রত্যাশা ছিল তারা তাদের সততার পুরস্কার পাবেন। শেষোক্ত সারোয়ার আলমের নাম কেবল দেশের মিডিয়ায় নয়, সর্বত্র সর্বজনের কাছে পরিচিত ছিল। কিন্তু যথাসময়ে তারও পদোন্নতি হয়নি। পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে মানসিক ভাবে প্রায় ভেঙে পড়েছিলেন। এতে গণপ্রত্যাশাও হোঁচট খেয়ে পড়েছিল। একজন সৎ মানুষের চাকরি এবং ক্যারিয়ার বিবেচনায় এটা মারাত্মক এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে থাকছে। এ-সব নিয়ে সুশীল সমাজের ভাবনার বিস্তর অবকাশ রয়েছে। সময় এসেছে ব্যক্তির সততাকে উর্ধ্বে তুলে ধরার। ছোট্ট একটা কথা দিয়ে শেষ করা যায়, ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারির বিকেলে ভারতের স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধীকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। পরদিন ইংল্যান্ড থেকে প্রেরিত এক শোকবার্তায় জর্জ বার্নার্ড শ’ লিখেছিলেন, ‘যদি এমনই হবে এত ভালো হওয়ার দরকার কি ছিল’?[লেখকের নিজস্ব মত][লেখক: গল্পকার, সাবেক সচিব]

মাদকের আগ্রাসন প্রতিরোধে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি

মাদকদ্রব্য, ধূমপান ও তামাক সেবন মানুষের অকাল মৃত্যু এবং স্বাস্থ্যহানীর অন্যতম প্রধান কারণ। মাদকাসক্তি একটি রোগ। মাদকাসক্ত ব্যক্তির আসক্তি তাকে মানসিক ও শারীরিক রোগসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম মাদকের নেশায় বুদ হয়ে বিপথগামী হয়ে পড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বড় অংশের জনগোষ্ঠী কিশোর-তরুণ, যে কারণে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে বলা হয় ইয়ুথ ডিভিডেন্ট। বেসরকারি হিসেব মতে, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। মাদকসেবীদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। ভয়ঙ্কর তথ্য হচ্ছে, ইয়াবা সেবনকারী শতকরা ৮৫ ভাগই তরুণ যুবসমাজ! আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন রোগের মতো এইচআইভি এইডসের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা মাদক গ্রহণকালীন সময়ে অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ। গবেষণায় দেখা যায়, মাদকাসক্তদের মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগই ধূমপায়ী এবং তাদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, যা গবেষণায় প্রমাণিত। ধূমপানে অভ্যস্ততার মধ্য দিয়ে তরুণরা মাদকদ্রব্য সেবন শুরু করে থাকে। পরবর্তীতে ইয়াবা, ফেনসিডিল, সিসা, হেরোইন, কোকেন, আফিম, কোডিন, মরফিন, এলএসডিসহ বিভিন্ন মরণ নেশায় আসক্ত হয়। ক্রমাš^য়ে মাদকাসক্তরা কিডনি, লিভার, মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। এটা অনস্বীকার্য যে, তরুণদের মাদকের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে হলে মাদক নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নাই। সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে ও স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য তরুণদের ধূমপান, মাদকসহ সব নেশা থেকে দূরে থাকা জরুরি। কিন্তু, বিভিন্ন পদক্ষেপ স্বত্ত্বেও থেমে নেই সর্বণাশা মাদকের বিস্তার। মাদকের সঙ্গে জড়িত অসাধু চক্র আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংসের দারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।মাদক নির্মূল কার্যক্রম বাস্তবায়নে সমন্বিত প্রতিরোধ কার্যক্রম বাস্তবায়ন জরুরি। যেখানে মনোসামাজিক, নৈতিক ও সামাজিকরণ শিক্ষা প্রদান এর বিষয়সমূহ সর্বস্তরে পরিচালনার উদ্যেগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। মাদকাসক্তির চিকিৎসা: মাদক শব্দটি শুনলে বেশিরভাগ মানুষই বিচলিত হয় বা ভয় পায়, আর মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের ঘৃণা ও নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদেরকে শাষণ, ঘৃণা বা অবহেলা না করে তাকে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে নিরাময় কেন্দ্রে পরিপূর্ণ চিকিৎসা দেয়া জরুরি। যাতে তারা সমাজের বোঝা না হয়ে সুস্থ হয়ে আবার পরিবারে ফিরে আসতে পারে। তাই পিতা-মাতার প্রতি অনুরোধ আপনার সন্তানকে মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে লুকিয়ে রাখবেন না, ঘৃণা করবেন না বরং তাকে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যান। তাকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিন। সঠিক চিকিৎসা সহায়তা পাওয়ার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে একদিন তারাই সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্তি প্রতিরোধে চাহিদা, সরবরাহ কমানোর সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা ও পূণর্বাসনকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি: বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যসমূহে মাদকদ্রব্য বিক্রি, কৌশলী প্রচার ও ক্রেতা আকর্ষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই মাদকের বিস্তার রোধে সামাজিক মাধ্যমে কঠোর নজরদারি জোরদার করা জরুরি। এ লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাদকসংক্রান্ত পোস্ট, পেজ, গ্রুপ ও অ্যাকাউন্ট দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট সামাজিক মাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের (যেমন: বিটিআরসি, আইসিটি বিভাগ, সাইবার নিরাপত্তা) সঙ্গে সমš^য় জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইনে মাদক বিক্রির কলা- কৌশল ও ডার্কয়েব ইত্যাদি শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ সক্রিয় করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচারণা বৃদ্ধি, বেআইনি অনলাইন কার্যক্রম রিপোর্ট করার ব্যবস্থা চালু এবং সাইবার অপরাধ দমনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। করণীয়: কিশোর-তরুণ প্রজন্মকে মাদকমুক্ত রাখতে শক্তিশালী প্রতিরোধ কার্যক্রম জরুরি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ অর্থাৎ- চিকিৎসার চাইতে প্রতিরোধ ভালো। এটা যদিও স্বাস্থ্যগত অসুখ ও তার চিকিৎসা এবং রোগ প্রতিরোধকে বুঝায় ও একই পদ্ধতি ব্যবহার করে মাদকাসক্তি সমস্যা মোকাবিলা ও তার সুষ্ঠু সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়াই ভালো। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা, মাদকের বিস্তার, সামাজিক অবক্ষয় এবং শিক্ষার মানের অবনতিসহ বিভিন্ন কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাদকের উৎপাদন, পাচার ও অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তরুণদের জন্য সুস্থ সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ, মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং অনেককে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তেও প্ররোচিত করে। তাই মাদকের বিস্তার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সামাজিক অপরাধ হ্রাস এবং নিরাপদ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব আমাদের সন্তান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে সঠিকভাবে পথ- নির্দেশনা দিয়ে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। সমাজে অনেক প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি আছে যারা স্ব উদ্যোগে এ বিষয়ে কাজ করছে। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় এবং সুনির্দিষ্ট দপ্তর আছে যারা তরুণদের উন্নয়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। কাজ হচ্ছে তবে ভয় জেঁকে বসছে। মাদক জোঁকের মতো জেকে বসেছে তরুণদের দেহে। যদি এই জোঁকের পাল থেকে তরুণদের রক্ষা করা না যায় তাহলেই সর্বণাশ। যে বৈষম্যহীন সমাজ ও নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেরাব কথা আমারে তরুণদের, তারাই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। আগামীর বাংলাদেশ পগড়ে ঘোরতর অমানিশায়, অনিশ্চয়তায়! দেশ থেকে মাদকের বিস্তার রোধে শক্তিশালী সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশের পাশাপাশি সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে মাদক পাচার ও সরবরাহ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা। মাদক পাচার ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক কারবারের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি ভেঙে দিয়ে এর নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে হবে। মাদকাসক্তির চিকিৎসায় সরকারকে আরও বিনিয়োগ করতে হবে। বর্তমানে সারা দেশে সরকারিভাবে ৬টি বেসরকারিভাবে ৩৮০টি মাদকনিরাময় কেন্দ্র রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্যমান সেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এসব কেন্দ্রে শুধু মাদক থেকে বিরত রাখাই নয়, বরং পরিকল্পিত পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা, মানসিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর জন্য নিজ নিজ ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে কাউন্সেলিং ও নৈতিক দিকনির্দেশনার সুযোগ নিশ্চিত করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে পুনর্বাসিত ব্যক্তিরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে সমাজ ও রাষ্ট্রে দায়িত্বশীল ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।[লেখক: সদস্য, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স কমিটি (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়)] 

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য

দেশের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্য যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের কোন বিকল্প নেই। আধুনিক অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদকে অধিক মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীই একটি দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। এ কারণেই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো শিক্ষাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। ইউনেস্কোসহ বেশ কিছু উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শিক্ষায় বিনিয়োগ দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মানুষের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কেবল নিজেদের জীবনমান উন্নত করে না; তারা জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। অর্থনীতিবিদদের প্রদত্ত ‘মানবসম্পদ তত্ত্ব’ (হিউম্যান ক্যাপিটাল থিওরি) অনুসারে শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও কর্মক্ষমতাকে উন্নত করে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের অর্থনৈতিক লাভে পরিণত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি অতিরিক্ত বছর একজন ব্যক্তির আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। শিক্ষিত মানুষ সাধারণত উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করে, নতুন প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করতে পারে এবং পরিবর্তিত শ্রমবাজারের সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জাতীয় উৎপাদন, কর রাজস্ব, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির (টেকনোলজি-বেইস&ড নলেজ ইকোনোমি) দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, অটোমেশন, বিগ ডেটা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ অর্থনীতি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশ্ব শ্রমবাজারের কাঠামোকে আমূল পরিবর্তন করছে। ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ক্রমশ এমন দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, যা প্রচলিত শিক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান, ডিজিটাল সাক্ষরতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আজীবন শেখার সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের নিশ্চয়তার পাশাপাশি গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি এবং দক্ষ শিক্ষক প্রস্তুতির উদ্যোগ। বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী যথাযথ শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেলে দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। কিন্তু যদি তাদের আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ অর্থনীতি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী জ্ঞান ও দক্ষতায় শিক্ষিত করা না যায়, তাহলে এই সম্ভাবনাময় জনশক্তি বেকারত্ব, অর্ধবেকারত্ব এবং দক্ষতার ঘাটতির কারণে জাতীয় অর্থনীতির জন্য বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। অর্থনীতিতে যাকে ‘জনসংখ্যাগত সুবিধা’ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) বলা হয়, তা তখন ‘জনসংখ্যাগত বোঝা’ (ডেমোগ্রাফিক বার্ডেন)-য় রূপ নিতে পারে। বার্ষিক জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি কেবল শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রশ্ন নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রশ্ন। যে রাষ্ট্র তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে যুগোপযোগী শিক্ষা ও দক্ষতায় সজ্জিত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই আগামী দিনের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। অন্যদিকে শিক্ষায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে ব্যর্থতা একটি জাতির উন্নয়ন সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত করে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ভিত্তিও শিক্ষা। রাষ্ট্রের নাগরিকদের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, তেমনি সেই নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজন সচেতন, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিকসমাজ। শিক্ষা সেই নাগরিকসমাজ গঠনের প্রধান মাধ্যম। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব, অপরাধপ্রবণতা, মাদকাসক্তি, চরমপন্থা, শিশুবিবাহ, লিঙ্গবৈষম্য এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। কারণ শিক্ষা মানুষকে কেবল তথ্য ও দক্ষতা প্রদান করে না; এটি তার বিচারবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। ফলে শিক্ষিত ব্যক্তি নিজের জীবন ও পরিবারের কল্যাণে যেমন ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাজবিজ্ঞানীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সামাজিক সংহতি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইমের (১৮৫৮-১৯১৭) মতে, শিক্ষা সমাজের অভিন্ন মূল্যবোধ, নৈতিক আদর্শ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ নতুন প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করে। অন্যদিকে অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও সামাজিক বঞ্চনা প্রায়শই অপরাধ, সহিংসতা, উগ্রবাদ এবং সামাজিক অস্থিরতার উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। যে সমাজে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তৃত হয়, সেখানে নাগরিকরা অধিকতর আইনমান্যকারী, সহনশীল এবং গণতান্ত্রিক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগকে কেবল একটি উন্নয়নমূলক উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিকনিরাপত্তা ও জাতীয় স্থিতিশীলতার কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত। এ কারণেই শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল কখনোই শিক্ষা খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ইতিবাচক প্রভাব স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবার পরিকল্পনা, নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক সম্প্রীতি, উৎপাদনশীলতা, আইনশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় সেবার গুণগত মান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। একজন শিক্ষিত মা তার সন্তানের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষার বিষয়ে অধিক সচেতন হন; একজন শিক্ষিত নাগরিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন; একজন দক্ষ শিক্ষিত কর্মী অর্থনীতিতে অধিক অবদান রাখেন; আর একজন সচেতন ভোটার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেন। ফলে শিক্ষায় ব্যয়িত প্রতিটি অর্থ রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রতিফলন সৃষ্টি করে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কেবল শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করাই চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং সেই বরাদ্দের কার্যকর, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হলো পরিকল্পনার ধারাবাহিকতার অভাব, প্রকল্পভিত্তিক চিন্তার আধিক্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং গুণগত মানের প্রশ্নে দীর্ঘস্থায়ী উদাসীনতা। ফলে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও যদি তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হয়, কিংবা মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে রাষ্ট্রীয় অর্থের নয়ছয়ে শুভঙ্করের ফাঁকিটাই প্রধান হয়ে ওঠে, তবে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করা সম্ভব হবে না। এজন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, নৈতিক ও নাগরিক শিক্ষা শক্তিশালীকরণ এবং প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সমতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বিকাশের পরিবর্তে পরীক্ষাকেন্দ্রিক সনদ অর্জনের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়লেও দক্ষ ও উদ্ভাবনী মানবসম্পদের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে তা কেবল চাকরিপ্রার্থী তৈরি না করে; বরং সমস্যা সমাধানে সক্ষম, প্রযুক্তি-সচেতন, উদ্ভাবনী, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করে। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে কতজন মানুষ চাকরি খুঁজছে তার ওপর নয়; বরং কতজন মানুষ নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে, নেতৃত্ব দিতে এবং সমাজের কল্যাণে ইতিবাচক অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে তার ওপর। অতএব শিক্ষায় অধিক বরাদ্দ এবং সেই বরাদ্দের কার্যকর ব্যবস্থাপনা- এই দুটি বিষয়কে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষা যদি মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রসংস্কারের ভিত্তি হয়, তবে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে আর কোনো টেকসই বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্বে যেসব দেশ মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা এবং সুশাসনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, তাদের উন্নয়নের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তারা প্রায় সবাই শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক জনশক্তির চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত, সম্পদস্বল্প কিংবা ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ অনেক দেশও শিক্ষায় ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে যেসব রাষ্ট্র শিক্ষাকে অবহেলা করেছে, সেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং জাতীয় ঐক্য দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইতিহাস তাই বারবার প্রমাণ করেছে যে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান দ্বারা। টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো শিক্ষা। কারণ শিক্ষাই মানুষকে অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে, নির্ভরশীলতা থেকে আত্মনির্ভরতার দিকে, সংকীর্ণতা থেকে মানবিকতার দিকে এবং বিভক্তি থেকে জাতীয় ঐক্যের দিকে নিয়ে যায়। একটি রাষ্ট্র যত বেশি শিক্ষিত, দক্ষ এবং সচেতন নাগরিক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি তত বেশি শক্তিশালী হয়। সুতরাং রাষ্ট্রীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি কোনো নির্দিষ্ট খাতকে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছি, যেখানে রাষ্ট্রসংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের ব্যাপক জনআকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কেবল আইন, নীতি বা প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে এই আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী করে তুলতে হলে প্রয়োজন এমন এক নাগরিকসমাজ, যারা জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ। আর সেই নাগরিকসমাজ গড়ে তোলার প্রধান ভিত্তি হলো একটি মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা। জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে, তাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষাসংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষার আত্মঘাতী রাজনীতিকরণ, জাতীয় দর্শনের আলোকে শিক্ষানীতির ধারাবাহিক উৎকর্ষ ও প্রয়োগের অভাব, শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি, গবেষণায় অনাগ্রহ এবং দক্ষতা উন্নয়নের সীমাবদ্ধতার মতো বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করে শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ (ন্যূনতম জিডিপির ৫%) নিশ্চিত করতে হবে এবং সেই বরাদ্দের স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে কেবল বিদ্যালয়, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ নয়; এটি মানুষের সম্ভাবনায় বিনিয়োগ, জাতীয় ঐক্যে বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। বর্তমান বিশ্বে একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, বরং তার মানবসম্পদে নিহিত। একটি দেশের সড়ক, সেতু বা অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার নাগরিকদের জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের ওপর। যে জাতি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেই জাতিই টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সুশাসনের পথে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রসংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন জ্ঞানসমৃদ্ধ, দক্ষ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিকসমাজ। আর সেই নাগরিকসমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি হলো একটি মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা। তাই শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং জনশক্তির চাহিদাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। শিক্ষাকে ব্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষাখাতে ন্যূনতম জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেই অর্থের স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষিত, দক্ষ, সৃজনশীল ও নৈতিক নাগরিকরাই একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে আজ আমরা শিক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি তার ওপর। [লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

ভিডিও আরও দেখুন

ফুটবলের উৎস ২৩০০ বছর আগে চীনে

আমাদের অনেকের ধারণা, ফুটবলের জন্ম কেবল ইংল্যান্ডে। কিন্তু ফিফা স্বীকৃতি দিয়েছে, ফুটবলের সবচেয়ে প্রাচীন প্রাতিষ্ঠানিক রূপটির উৎপত্তি হয়েছিল প্রায় ২৩০০ বছর আগে প্রাচীন চীনে।তখন এই খেলার নাম ছিল ‘কুজু’। সামরিক প্রশিক্ষণ থেকে রাজকীয় বিনোদন- কীভাবে ‘কুজু’ আধুনিক ফুটবলে রূপান্তরিত হলো, সেই ইতিহাস ভীষণ রোমাঞ্চকর।‘কুজু’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে- ‘কু’ মানে পায়ে লাথি মারা। আর 'জু' মানে চামড়ার তৈরি বল। অর্থাৎ, পায়ে বল লাথি মেরে খেলা। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় ও দ্বিতীয় শতকে চীনের যুদ্ধরত রাজ্যসমূহের যুগে এবং পরবর্তীতে হান রাজবংশের আমলে এই খেলার ব্যাপক প্রচলন ঘটে।কুজুর জন্ম হয়েছিল মূলত যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে। হান রাজবংশের সামরিক জেনারেলরা লক্ষ্য করলেন, যুদ্ধ না থাকলে সৈন্যরা দীর্ঘ সময় অলস হয়ে পড়ে। তাদের পায়ের পেশি দুর্বল হয়ে যায়। সৈন্যদের শারীরিক ফিটনেস, ক্ষিপ্রতা আর দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কুজু বাধ্যতামূলক করা হয়।বলটি ছিল পশুর শক্ত চামড়ার ভেতরে চুল বা পালক ঠাসা। আজকের ফুটবলের মতো বাউন্স করত না, বরং বেশ ভারী ছিল। পরবর্তীতে হান সম্রাট লিউ বাং নিজে কুজুর ভক্ত হয়ে ওঠেন। তিনি রাজপ্রাসাদের ভেতরেই ‘কুজু মাঠ’ তৈরি করেছিলেন। যেখানে পেশাদার দলগুলো রাজার সামনে প্রতিযোগিতায় নামত।ট্যাংক যুগে (৬১৮-৯০৭ খ্রি.) চীনারা পালক বা চুলের পরিবর্তে পশুর মূত্রথলি ব্যবহার করে বাতাসভর্তি বল তৈরি করতে শেখে। বলটি হালকা হয়। বাতাসে ভেসে থাকার ক্ষমতা পায়।প্রাচীন কুজু মূলত দুই পদ্ধতিতে খেলা হতো। ‘ঝু কিউ’ পদ্ধতিতে মাঠের মাঝখানে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু বাঁশের জাল থাকত। দুই দলের খেলোয়াড়রা কেবল পা, বুক বা মাথা দিয়ে বল পাস করে সেই উঁচু নেটের ভেতর বল ঢোকানোর চেষ্টা করত।পেশাদার ক্লাবসং রাজবংশের আমলে (৯৬০-১২৭৯ খ্রি.) কুজু সম্পূর্ণ পেশাদার রূপ নেয়। ‘কিশি শে’ নামে বিশ্বের প্রথম পেশাদার ফুটবল ক্লাবের জন্ম হয়। খেলোয়াড়রা টাকা বা রাজকীয় উপাধির বিনিময়ে খেলতেন। নির্দিষ্ট নিয়ম অমান্য করলে রেফারি বা বিচারক দ্বারা শাস্তির বিধান ছিল।কুজু খেলার পেছনে প্রাচীন চীনাদের গভীর সামাজিক ও যুদ্ধকালীন মনস্তত্ত্ব কাজ করত। প্রথমত, এই খেলার এক ধরনের অহিংস যুদ্ধ। কনফুসীয় দর্শনে বিশ্বাসী চীনারা সরাসরি সহিংসতা পছন্দ করত না। কুজু ছিল রক্তপাতহীন এক কৃত্রিম যুদ্ধ- তরবারি বা বল্লম দিয়ে মানুষ হত্যা না করে, একটি বলকে জয় করার মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মনস্তাত্ত্বিক বিকল্প।চীনের রাজনৈতিক কাঠামো সবসময় ‘সমষ্টিগত শৃঙ্খলাকে’ প্রাধান্য দিয়েছে। কুজুতে একা কেউ গোল দিতে পারত না- নিখুঁত পাসের মাধ্যমে পুরো দলকে বল জালের কাছে নিয়ে যেতে হতো। এই খেলাটি শেখাত কীভাবে ব্যক্তিগত অহংকার ভুলে দলের স্বার্থে একসাথে কাজ করতে হয়।আধুনিক ফুটবলের জন্ম১৪শ শতকে মিং রাজবংশের শাসনে কুজু তার গৌরব হারায়। অতিরিক্ত জুয়া, মদ্যপান এবং বিনোদনের নামে রাজনৈতিক অবক্ষয়ের কারণে মিং শাসকরা নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তবে সিল্ক রোড এবং সমুদ্রযাত্রার মাধ্যমে পায়ে বল খেলার ধারণা এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপে পৌঁছায়।১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ড এই আদি ধারণাকে পুঁজি করে, হাত দিয়ে বল ছোঁয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে এবং মাঠের দুই প্রান্তে গোলপোস্ট বসিয়ে আধুনিক ফুটবলের নিয়মকানুন চূড়ান্ত করে।আজকের মেসি বা রোনালদোর নিখুঁত ড্রিবলিং বা বাইসাইকেল কিকের পেছনের অদৃশ্য সুতোটি বাঁধা রয়েছে হাজার বছর আগের প্রাচীন চীনা সৈন্যদের কুজু খেলার মাঠে। চীন ফুটবলকে দিয়েছিল প্রাণ আর পা। ইংল্যান্ড দিয়েছে আধুনিক পোশাক ও বৈশ্বিক নিয়ম।

ফুটবলের উৎস ২৩০০ বছর আগে চীনে
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৯৯ জন