সংবাদ
জাভা সাগরে ২৪০ যাত্রী নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জাহাজ নিখোঁজ

জাভা সাগরে ২৪০ যাত্রী নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জাহাজ নিখোঁজ

ইন্দোনেশিয়ার জাভা সাগরে ২৪০ জন আরোহী নিয়ে একটি যাত্রীবাহী জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) পূর্ব জাভা থেকে বোর্নিও দ্বীপের দক্ষিণ কালিমন্তানের দিকে যাওয়ার পথে জাহাজটি নিখোঁজ হয়। বর্তমানে নিখোঁজ জাহাজ ও এর যাত্রীদের উদ্ধারে জোর তৎপরতা শুরু করেছে দেশটির উদ্ধারকারী দল।আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে জানানো হয়, ‘ভার্গো ট্রান্সপোর্ট ৮’ নামের যাত্রীবাহী জাহাজটি পূর্ব জাভা প্রদেশের সুরাবায়া থেকে বানজারমাসিনের দিকে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে জাহাজটির যোগাযোগব্যবস্থায় আকস্মিক ত্রুটি দেখা দেয়। বানজারমাসিনের উদ্ধারকারী সংস্থা জানিয়েছে, বন্দর জেটি থেকে প্রায় ৯২ মাইল দূরে জাভা সাগরে অবস্থানকালে জাহাজটির সঙ্গে শেষবার যোগাযোগ হয়েছিল।উদ্ধারকারী দলের অভিযান বিভাগের প্রধান আরিয়ান্তো আরদি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার পরপরই উদ্ধারকর্মীদের ঘটনাস্থলের অভিমুখে পাঠানো হয়েছে এবং ট্রিসাক্তিতে একটি প্রধান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। জাহাজ পরিচালনা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্রপথের মাঝপথে এটি তীব্র দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মুখোমুখি হয়েছিল। এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর না পাওয়া গেলেও অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
১৫ মিনিট আগে

স্বর্ণের বাজারে আবার দরবৃদ্ধি, ভরি পেরোল ২ লাখ ৩২ হাজার

স্বর্ণের বাজারে আবার দরবৃদ্ধি, ভরি পেরোল ২ লাখ ৩২ হাজার

জাভা সাগরে ২৪০ যাত্রী নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জাহাজ নিখোঁজ

জাভা সাগরে ২৪০ যাত্রী নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জাহাজ নিখোঁজ

মেসির ৯৯তম গোলেও জয় পেল না মায়ামি

মেসির ৯৯তম গোলেও জয় পেল না মায়ামি

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন : ছুটির দিনেও অফিস খোলা রাখার নির্দেশ ইসির

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন : ছুটির দিনেও অফিস খোলা রাখার নির্দেশ ইসির

সাবালেঙ্কার হ্যাটট্রিক স্বপ্ন চুরমার, ইউএস ওপেন চ্যাম্পিয়ন রিবাকিনা!

সাবালেঙ্কার হ্যাটট্রিক স্বপ্ন চুরমার, ইউএস ওপেন চ্যাম্পিয়ন রিবাকিনা!

সৌদিতে হুতিদের হামলায় মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত, আহত ২

সৌদিতে হুতিদের হামলায় মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত, আহত ২

এমবাপ্পের জোড়া গোল, রায়োকে উড়িয়ে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে রিয়াল

এমবাপ্পের জোড়া গোল, রায়োকে উড়িয়ে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে রিয়াল

সাদুল্লাপুর সহকারী জজ আদালতে ১০ মাস বিচারক নেই, স্থবির ৪ হাজার মামলা

সাদুল্লাপুর সহকারী জজ আদালতে ১০ মাস বিচারক নেই, স্থবির ৪ হাজার মামলা

চলতি সপ্তাহে একনেকে অনুমোদন পেতে পারে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র

চলতি সপ্তাহে একনেকে অনুমোদন পেতে পারে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীবন্দরে সংকেত

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীবন্দরে সংকেত

মতামতমতামত

বোয়িং কেনার রাজনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াুবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর জানিয়েছেন, বাংলাদেশ বোয়িং থেকে আরও উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে নতুন এই চুক্তি আগের চেয়ে বড়। গর বলেন, ‘বাংলাদেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে’। এই ঘোষণার পরই আবার আলোচনায় এলো বিমানের উড়োজাহাজ কেনার রাজনীতি।স্মর্তব্য যে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে ক্ষমতায় বসেই বিএনপি সরকার আমেরিকার বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা খরচ করে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। সার্জিও গর বলেছেন, নতুন চুক্তি আগের চেয়ে বড়। কিন্তু কত বড় তা কেউ প্রকাশ করছে না। প্রশ্ন হলো, বোয়িং কেনার প্রধান উদ্দেশ্য কি শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানো? নাকি ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার কূটনীতিও এর পেছনে আছে?আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকার চাপকে অনেকে হস্তক্ষেপ হিসেবেই দেখে। বর্তমান বিশ্বে দুর্বলচিত্তের শাসকদের মনে আমেরিকা একটি আতঙ্ক তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে। ভেনিজুয়েলার সরকারপ্রধানকে ডনাল্ড ট্রাম্প সস্ত্রীক অপহরণ করে আমেরিকায় নিয়ে গেছেন। তৃতীয় বিশ্বের সরকার পরিবর্তনে আমেরিকার অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও নতুন নয়। তাই আমেরিকা তুষ্ট থাকলে ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকা সহজ হয়। অনেকে বলেন, মুহাম্মদ ইউনূসকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল আমেরিকা, তাই তিনি দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে আমেরিকার সঙ্গে তড়িঘড়ি করে একটি চুক্তি করেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, মুহাম্মদ ইউনূসের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার আকাঙ্ক্ষাও ছিল, কিন্তু জনসমর্থন না থাকায় সম্ভবত আমেরিকা মাথা ঘামায়নি।নতুন করে আবার বোয়িং কেনার চুক্তি হওয়ায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প খুব খুশি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি চিঠি পাঠিয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতে দেখা করার আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এই চুক্তির পেছনে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার প্রসঙ্গও ঘুরছে। শেখ হাসিনা তার প্রত্যাবর্তনের কথা না বললে হয়তো আমেরিকার এই বাণিজ্যিক তৎপরতা এতটা সামনে আসত না। সার্জিও গরের বাংলাদেশ সফরকে অনেকে সেভাবেই দেখেছিল। তবে এখন মনে হচ্ছে, তিনি এসেছিলেন মূলত ব্যবসার স্বার্থেই।আমেরিকা বিএনপি সরকারের কোন দুর্বলতাকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে না তো?এদিকে সাতাশটি দেশ নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের বোয়িং কেনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলছে, শুধু আমেরিকার বোয়িং নয়, ইউরোপের এয়ারবাসকেও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ দিতে হবে। একটি প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাবও দিয়েছে তারা। অথচ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পূর্বে আওয়ামী লীগ সরকার ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ইউনূস সরকার ‘স্বচ্ছতা নেই, দাম বেশি’ বলে সেটা বাতিল করে। এখন কিন্তু বিএনপি সরকার টেন্ডার ছাড়াই সরাসরি বোয়িং কেনার পথেই হাঁটছে। একই অজুহাতে এয়ারবাস বাতিল করে বোয়িং কেনা—এটা কি দ্বিমুখী নীতি নয়?শুধু বোয়িং নয়, চুক্তির শর্ত মোতাবেক কৃষিপণ্যসহ আরও বহু জিনিস বেশি দরে বিনা টেন্ডারে আমেরিকা থেকে কিনতে হতে পারে। তার চেয়ে বড় কথা, চুক্তির শর্তে যদি বাংলাদেশের কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেশের ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হয়, তবে তা হবে জাতীয় স্বার্থের জন্য বুমেরাং। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের গার্মেন্টসের সবচেয়ে বড় বাজার। আমেরিকার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি কেনে তারা। তারা যদি পাল্টা চাপ দেয়, তবে বিএনপি সরকারের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হবে।শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই। দেশে বিনিয়োগ প্রায় স্থবির, জ্বালানির তীব্র ক্রাইসিস, বন্ধ হচ্ছে কলকারখানা, কর্মহীন হচ্ছে প্রান্তিক মানুষ, মূল্যস্ফীতি প্রায় ডাবল ডিজিটে, খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি আর মব আতঙ্ক, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত। সরকার চলছে ঋণ নিয়ে। শুধু আমেরিকাকে তুষ্ট করলে হবে বলে মনে হয় না, দেশের অভ্যন্তরে অরাজকতা ও উত্তেজনার উচ্ছেদ না হলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘প্ল্যান’-এর বাস্তবায়ন জটিল হয়ে যাবে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বড় অংশ যদি বিদেশি চাপে ব্যয় হয়, তবে অভ্যন্তরীণ সংকট সরকার সামাল দেবে কীভাবে? বোয়িং আকাশে উড়বে, কিন্তু দেশের অর্থনীতির ডানা মেলবে তো?(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

এআই: আমরা ফিরছি অতীতে, বিশ্ব বানাচ্ছে ভবিষ্যৎ

কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি নতুন প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে মানুষ নিজেদের ছবি আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকের আদলে তৈরি করছেন। পুরোনো পোশাক, পুরোনো চুলের স্টাইল, ফিল্ম ক্যামেরার আবহ - কয়েক সেকেন্ডেই বর্তমানের মানুষ ফিরে যাচ্ছেন অতীতে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমও এই রেট্রো এআই ফটো ট্রেন্ড নিয়ে প্রতিবেদন করেছে।ছবিগুলো সুন্দর, মজার এবং নিরীহ বিনোদন। প্রযুক্তি দিয়ে মানুষ আনন্দ নেবে - এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু এই ছোট্ট ট্রেন্ডটি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে: আমাদের কাছে এআই কি শেষ পর্যন্ত আরেকটি বিনোদনের খেলনাই হয়ে থাকবে?কারণ ঠিক যে সময়ে আমরা এআই দিয়ে অতীতে ফিরে যাচ্ছি, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগামী দশকগুলোর অর্থনীতি, শিল্প, চিকিৎসা, পরিবহন ও কর্মক্ষেত্র নতুন করে নির্মিত হচ্ছে। সমস্যাটি ছবি নয়; সমস্যাটি আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার।এআই শুধু ছবি বানানোর প্রযুক্তি নয়আজকের এআই শুধু ছবি, ভিডিও বা মজার কনটেন্ট তৈরির প্রযুক্তি নয়। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, চিকিৎসাবিজ্ঞান, নতুন ওষুধ আবিষ্কার, মেশিন ভিশন, রোবোটিকস, ব্যাংকিং, অ্যাগ্রিকালচার, লজিস্টিকস, সাইবারসিকিউরিটি, এডুকেশন - প্রায় প্রতিটি খাতে এআই মানুষের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে।অটোনোমাস গাড়ি এখন আর সায়েন্স ফিকশন নয়। ২০২৬ সালে ওয়েমো অরল্যান্ডো-সহ কয়েকটি মার্কিন শহরে ফুললি অটোনোমাস রাইড-হেইলিং সার্ভিস সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করেছে। কারখানায় রোবট মানুষের পাশে কাজ করছে, ওয়্যারহাউসে অটোমেটেড সিস্টেম পণ্য সরাচ্ছে, আর নলেজ ওয়ার্কে এআই মানুষের প্রোডাক্টিভিটি বহুগুণ বাড়াচ্ছে।চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বড় অর্থনীতিগুলো এখন এআই চিপ, মডেল, রোবোটিকস, ডেটা সেন্টার, অটোনোমাস ট্রান্সপোর্টেশন এবং ইন্টেলিজেন্ট সফটওয়্যারের বাজারে নেতৃত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতায়। আর আমাদের সামাজিক আলোচনার বড় অংশ যদি আটকে থাকে “এআই দিয়ে আমাকে নব্বইয়ের দশকে দেখতে কেমন লাগে” - তাহলে প্রযুক্তিগত ব্যবধান আরও বড় হবে।আমরা আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় হারিয়েছিবাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। ছোট ব্যবসা তৈরি হয়েছে, উদ্যোক্তারা বাজার পেয়েছেন, মানুষ দ্রুত তথ্য পাচ্ছেন। কিন্তু এর অন্য দিকটিও স্পষ্ট। বছরের পর বছর কখনো ইনফ্লুয়েন্সারের ব্যক্তিগত জীবন, কখনো ভাইরাল কনট্রোভার্সি, কখনো সেলিব্রিটি বা পারিবারিক ঘটনার মতো বিষয় আমাদের বিপুল কালেকটিভ অ্যাটেনশন দখল করে রেখেছে। একটি ট্রেন্ড শেষ হয়েছে, আরেকটি এসেছে।কিন্তু প্রযুক্তিগত বিপ্লব কাউকে অপেক্ষা করে না। পৃথিবীর অন্য দেশগুলো যখন রিসার্চ, সেমিকন্ডাক্টর, এআই মডেল, রোবোটিকস এবং অটোমেশনে বিনিয়োগ করেছে, তখন আমাদেরও একই গতিতে দক্ষতা, গবেষণা ও শিল্প সক্ষমতা তৈরি করার কথা ছিল। এআই রেভল্যুশনও আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে না।সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে আমাদের তরুণেরাবাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান ইতোমধ্যে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৪ অনুযায়ী টারশিয়ারি-এডুকেটেড বা বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত মানুষের আনএমপ্লয়মেন্ট রেট ছিল ১৩.৫৪ শতাংশ - শিক্ষার স্তরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।একই সময়ে এআই এমন অনেক কাজ দ্রুত বদলে দিচ্ছে, যেগুলোতে বাংলাদেশের তরুণরা গত এক দশকে আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে জায়গা তৈরি করেছিলেন। বেসিক গ্রাফিক ডিজাইন, সাধারণ ওয়েবসাইট ওয়ার্ক, এসইও কনটেন্ট, ট্রান্সলেশন, ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সাপোর্ট কিংবা রিপিটেটিভ ডিজিটাল টাস্ক - এসব ক্ষেত্রে এআই একজন দক্ষ কর্মীর প্রোডাক্টিভিটি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।এর অর্থ ফ্রিল্যান্সিং শেষ হয়ে যাচ্ছে না। বরং লো-স্কিল ফ্রিল্যান্সিংয়ের অর্থনীতি বদলে যাচ্ছে। যে ফ্রিল্যান্সার এআই ব্যবহার করতে জানবে, অটোমেশন তৈরি করতে পারবে, অ্যাডভান্সড সফটওয়্যার সলিউশন, সাইবারসিকিউরিটি, ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা এআই এজেন্ট নিয়ে কাজ করতে পারবে - তার মূল্য বাড়বে। কিন্তু একই স্কিল সেট নিয়ে দীর্ঘদিন স্থির থাকলে বাজার কঠিন হবে।ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বড় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে প্রায় ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে, আবার প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ কাজ ডিসপ্লেসমেন্টের মুখে পড়তে পারে। একই রিপোর্ট বলছে, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার প্রায় ৩৯ শতাংশ ২০৩০ সালের মধ্যে বদলে যেতে পারে।তাই ভয় পাওয়ার সঠিক বাক্যটি “এআই সব চাকরি নিয়ে নেবে” নয়। আরও বাস্তব বাক্য হলো - এআই জানা মানুষ এআই না-জানা মানুষের কাজ নিয়ে নেবে; এআই-দক্ষ দেশ এআই-অদক্ষ দেশের বাজার নিয়ে নেবে।গার্মেন্টস: অটোমেশন থামানো নয়, অটোমেশনের মালিক হওয়াবাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারিং অটোমেশন দ্রুত এগোচ্ছে। কাটিং, ইন্সপেকশন, সর্টিং, প্যাকেজিং ও ওয়্যারহাউস ম্যানেজমেন্টে অটোমেশন এবং রোবোটিকসের ব্যবহার বাড়ছে। ব্র‍্যাক ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন ও সলিডারিডাডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় পর্যবেক্ষিত প্রোডাকশন প্রসেসে অটোমেশনের সঙ্গে মোট ওয়ার্কফোর্স রিকোয়ারমেন্ট প্রায় ৩০.৫৮ শতাংশ কমার চিত্র পাওয়া গেছে; সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে কম দক্ষতার কাজগুলোতে।অটোমেশন বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। অন্য দেশ অটোমেশন ব্যবহার করে দ্রুত, কম খরচে ও কম ভুলে উৎপাদন করলে আমরা শুধু চিপ লেবার দিয়ে প্রতিযোগিতা করতে পারব না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত অটোমেশনের মালিক হওয়া - বাংলাদেশি তরুণরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এআই বানাবে, রোবট মেইনটেইন করবে, মেশিন ভিশন সিস্টেম তৈরি করবে, অটোমেটেড কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং স্মার্ট সাপ্লাই চেইন পরিচালনা করবে।প্রবাসী শ্রমবাজারও চিরদিন একই থাকবে নাবাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে ড্রাইভার, ক্লিনার, ওয়্যারহাউস ওয়ার্কার, ডেলিভারি ওয়ার্কার, কনস্ট্রাকশন সাপোর্ট এবং নানা ম্যানুয়াল প্রফেশনে কাজ করেন। এসব কাজ আগামীকালই শেষ হয়ে যাবে - এ কথা অবাস্তব। কিন্তু অটোনোমাস ভেহিকল, রোবোটিক ক্লিনিং, ওয়্যারহাউস অটোমেশন এবং সার্ভিস রোবোটিকস যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে আগামী ১০ বা ২০ বছরের শ্রমবাজার আজকের মতো থাকবে - এ ধারণাও নিরাপদ নয়।তাই আমাদের প্রবাসী কর্মীদের পরবর্তী প্রজন্মকে শুধু বর্তমানের কাজ শেখালে চলবে না। ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজি, অটোমেশন সুপারভিশন, রোবোটিকস মেইনটেন্যান্স, স্মার্ট লজিস্টিকস, হেলথকেয়ার টেকনোলজি এবং এআই-অ্যাসিস্টেড প্রফেশনের দিকে তাদের প্রস্তুত করতে হবে।বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকটেও এআই হতে পারে সমাধানের অংশবাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। অথচ এআইকে আমরা খুব কমই এসব জাতীয় সমস্যার সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করি। এআই দিয়ে ইলেকট্রিসিটি ডিমান্ড ফোরকাস্ট, গ্রিড অ্যানোমালি ডিটেকশন, প্রেডিক্টিভ মেইনটেন্যান্স, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এনার্জি অপটিমাইজেশন, রিনিউএবল এনার্জি ফোরকাস্টিং এবং জিওলজিক্যাল বা সিসমিক ডেটা অ্যানালাইসিস উন্নত করা সম্ভব।অর্থাৎ যে প্রযুক্তি দিয়ে আমরা পুরোনো দিনের ছবি বানাচ্ছি, একই প্রযুক্তি আমাদের বাস্তব সমস্যার সমাধানেও ব্যবহার করা যায়। আমাদের প্রয়োজন বাংলাদেশের সমস্যার জন্য বাংলাদেশের এআই রিসার্চ - কৃষি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গার্মেন্টস, বাংলা ভাষা এবং সরকারি সেবায়।এআইয়ের প্রতিটি ব্যবহারেরও একটি মূল্য আছেএআই কোনো জাদু নয়। প্রতিটি বড় এআই রিকোয়েস্টের পেছনে ডেটা সেন্টার, জিপিইউ, ইলেকট্রিসিটি এবং কুলিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার কাজ করে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির এনার্জি অ্যান্ড এআই বিশ্লেষণ অনুযায়ী গ্লোবাল ডেটা-সেন্টার ইলেকট্রিসিটি কনজাম্পশন ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণের বেশি হয়ে প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-আওয়ারে পৌঁছাতে পারে; এআই এই বৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালকদের একটি।এ তথ্যের মানে এআই দিয়ে আনন্দ করা নিষিদ্ধ - এটা নয়। প্রশ্ন হলো, এই অসাধারণ কম্পিউটেশনাল পাওয়ার থেকে আমরা কতটা অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভ্যালু তৈরি করছি। একটি এআই যদি কৃষকের ফসল বাঁচায়, ফ্যাক্টরির এনার্জি ওয়েস্ট কমায়, ছাত্রকে শেখায়, রোগ শনাক্ত করতে সাহায্য করে কিংবা একজন বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারকে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক কাজ করতে সক্ষম করে - তাহলে একই প্রযুক্তি জাতীয় উৎপাদনশীলতায় অবদান রাখে।বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষের মস্তিষ্কআমরা প্রায়ই বলি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু মাটির নিচে নয়; আমাদের মানুষের মস্তিষ্কও একটি ন্যাশনাল রিসোর্স। ধরা যাক, এক কোটি তরুণ প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিংয়ের মাত্র এক ঘণ্টা কমিয়ে সেই সময় এআই, প্রোগ্রামিং, ইংলিশ, রোবোটিকস, সাইবারসিকিউরিটি, এন্টারপ্রেনারশিপ কিংবা নিজের প্রফেশনের অ্যাডভান্সড স্কিল শেখে। এক বছরে সেটি দাঁড়ায় প্রায় ৩৬৫ কোটি ঘণ্টা লার্নিং টাইম।এই হিসাবটি কোনো অর্থনৈতিক মডেল নয়; এটি অপরচুনিটি কস্ট বোঝানোর একটি সরল উদাহরণ। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সময় নিতে পারে, আবার এআই সেই সময়ের মূল্য বহুগুণ বাড়ানোর সুযোগও দিতে পারে। সিদ্ধান্ত আমাদের।এআই বন্ধ নয়, এআইয়ের ব্যবহার বদলাতে হবেআমি এআই দিয়ে নব্বইয়ের দশকের ছবি বানানো বন্ধ করার কথা বলছি না। ফেসবুক বন্ধ করার কথাও বলছি না। একটি ছবি বানান, বন্ধুদের দেখান, আনন্দ করুন। তারপর নিজের কাছে আরেকটি প্রশ্ন করুন: এই এআই দিয়ে আমি আমার ভবিষ্যতের জন্য কী বানালাম?একটি নতুন স্কিল? একটি সফটওয়্যার? একটি বিজনেস? একটি রিসার্চ প্রজেক্ট? একটি অটোমেশন? একটি ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস? একটি বাংলা এআই প্রোডাক্ট? নাকি শুধু আরেকটি ফেসবুক পোস্ট?বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে এআই লিটারেসি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্ডাস্ট্রি-ওরিয়েন্টেড এআই রিসার্চ, ফ্রিল্যান্সিং ট্রেনিংয়ে হাই-ভ্যালু স্কিল, শিল্পে অটোমেশন রিস্কিলিং এবং বাংলা ভাষার নিজস্ব এআই ইকোসিস্টেম - এই পাঁচটি দিককে এখন জাতীয় অগ্রাধিকারে আনা দরকার।এবার আমাদের ইন্টেলিজেন্স এক্সপোর্ট করার সময়বাংলাদেশ একসময় শ্রম রপ্তানি করেছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। পরে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল সার্ভিস এক্সপোর্ট করেছে। এআই রেভল্যুশন আমাদের সামনে আরেকটি সুযোগ এনে দিয়েছে। এবার আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ইন্টেলিজেন্স এক্সপোর্ট করা।বাংলাদেশের তরুণরা যদি এআই ইঞ্জিনিয়ার, রিসার্চার, রোবোটিকস স্পেশালিস্ট, সাইবারসিকিউরিটি এক্সপার্ট, এআই এন্টারপ্রেনার এবং অ্যাডভান্সড সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট হিসেবে তৈরি হয়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা শুধু প্রবাসী শ্রম কিংবা তৈরি পোশাক থেকে আসবে না; আমাদের মেধা, টেকনোলজি, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি এবং এআই প্রোডাক্ট থেকেও আসবে।বাংলাদেশের জন্য এআই যদি শুধু বিনোদনের খেলনা হয়ে থাকে, তবে আমরা হয়তো অনেক সুন্দর ছবি তৈরি করব, কিন্তু নতুন অর্থনীতি তৈরি করতে পারব না। আর পৃথিবী আমাদের জন্য থেমে থাকবে না।আজ আমরা এআই দিয়ে নব্বইয়ের দশকে ফিরে যাচ্ছি। অন্যদিকে পৃথিবী এআই দিয়ে ২০৩৫, ২০৪০ কিংবা ২০৫০ সালের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই বাংলাদেশের প্রতিটি তরুণ, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকের সামনে আজ প্রশ্নটি থাকা উচিত - আমরা কি এআই দিয়ে শুধু অতীতের ছবি বানাব, নাকি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বানাব?এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এখনই।[লেখক: এআই গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র]

প্রসঙ্গ: যৌতুক ও নারী নির্যাতন মামলা

সমাজে পারিবারিক কলহ, বিশেষ করে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাকের পর, অনেক সময় ফৌজদারি মামলার রূপ নেয়। যৌতুক নিরোধ আইন বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো নারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি হলেও কখনো কখনো এসব আইন ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে আদালত ও আইন একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে কীভাবে সুরক্ষা দেয়?ধরা যাক, ‘ক’ ও ‘খ’ নামে এক দম্পতির দীর্ঘদিনের সংসারে কলহ চলছিল। একপর্যায়ে স্বামী ‘ক’ তার স্ত্রী ‘খ’-কে তালাক দেন এবং তা যথাযথভাবে ডাকযোগে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে ও স্ত্রীর ঠিকানায় প্রেরণ করেন। তালাকের প্রায় এক মাস পর ‘খ’ একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় দাবি করা হয়, তালাকের দিনই তাকে যৌতুকের জন্য নির্মমভাবে মারধর করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।এ ক্ষেত্রে দেখা গেল—সাক্ষীরা একে অপরের বক্তব্যের সঙ্গে মিল রাখতে পারেননি; ঘটনার সময় ও তারিখ নিয়ে তারা পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন। কোনো প্রতিবেশী বা নিরপেক্ষ সাক্ষী আদালতে হাজির হননি—যারা এসেছেন, তারা সবাই বাদিনীর নিকটাত্মীয়। চিকিৎসা সনদে নাম, বয়স ও অন্যান্য তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে। যিনি রোগীকে শনাক্ত করেছেন, তিনি বাদী বা আসামি কারও প্রতিবেশীও নন। তদন্ত প্রতিবেদনে যৌতুক দাবির নির্দিষ্ট তারিখ বা সময় উল্লেখ নেই। এজাহার দায়েরে দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছে, যার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নেই। আসামিপক্ষ তালাকের বৈধ কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করেছেন, যা বাদীপক্ষ অস্বীকার করতে পারেননি।এমন পরিস্থিতিতে ফৌজদারি বিচারের প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলো কী বলে?১. ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক আসামিকে নির্দোষ বলে গণ্য করতে হবে। বিচারের প্রতিটি স্তরে এই নীতি অনুসরণ করতে হয় (৪২ ডিএলআর ৩১, আপিল বিভাগ)।২. বিচারকার্যে আবেগ, অনুভূতি বা ব্যক্তিগত ধারণার কোনো স্থান নেই। ন্যায়বিচার অন্ধ—এখানে কেবল আইন ও নথিতে থাকা সাক্ষ্য-প্রমাণই অনুসরণযোগ্য (১৮ বিএলটি ৪৬৫, আপিল বিভাগ)।৩. যখন মামলার সব সাক্ষীই বাদীপক্ষের আত্মীয়স্বজন এবং কোনো নিরপেক্ষ বা স্বার্থহীন সাক্ষীকে পরীক্ষিত করা হয় না, তখন আদালত এ ধরনের সাক্ষ্যকে সন্দেহের চোখে দেখে। প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো—স্বার্থযুক্ত সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা দেওয়ার আগে অবশ্যই সমর্থনযোগ্য প্রমাণ থাকতে হবে। আদালতের দায়িত্ব শুধু সাজা নিশ্চিত করা নয়, বরং প্রয়োজনে খালাসও প্রদান করা (৪৮ ডিএলআর ১৮৪)।আইন আরও বলে—একজন অভিযোগকারী বা সংবাদদাতা নিজেই স্বার্থযুক্ত সাক্ষী; স্বতন্ত্র ও নিষ্কলঙ্ক প্রমাণ দ্বারা তার বক্তব্য সমর্থিত না হলে তার ওপর নির্ভর করা যায় না (৪৪ ডিএলআর ৫৫৪)।৪. যদি সাক্ষীদের বক্তব্যের মধ্যে বস্তুগত অমিল, পরস্পরবিরোধিতা বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ঘাটতি থাকে, তাহলে আসামি ‘সন্দেহের সুবিধা’ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন এবং খালাস পান (৪৩ ডিএলআর ৬, আপিল বিভাগ)।৫. ঘটনার পর সন্তোষজনক কারণ ছাড়া এজাহার দায়েরে বিলম্ব হলে আদালত তা সন্দেহের চোখে দেখে। ধরে নেওয়া হয়, এই বিলম্বের সময়টি মামলার কাহিনি সাজানোর কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে (৪৪ ডিএলআর ৪৯২)।৬. আসামিপক্ষের বক্তব্য—যেমন তালাকের ঘটনা—সম্পূর্ণরূপে অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে না পারলেও, যদি তা যুক্তিসংগতভাবে সত্য হতে পারে বলে মনে হয়, তাহলে গোটা রাষ্ট্রপক্ষের মামলার ওপর তার প্রভাব পড়ে এবং আসামি সন্দেহের সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হন। এটি করুণা নয়, বরং তার আইনগত অধিকার (৭ বিএলটি ০৩)।৭. সন্দেহ যতই তীব্র হোক না কেন, তা কখনো প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না। সামান্য বা ক্ষীণ সন্দেহ নয়, বরং যুক্তিসংগত সন্দেহের ভিত্তিতেই আসামি খালাস পাওয়ার অধিকারী (৭ বিএলডি ২৬৫, আপিল বিভাগ)।[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

সার নিরাপত্তা: সংকট ব্যবস্থাপনা থেকে আগাম প্রস্তুতি

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আর আধুনিক কৃষিতে সার এমন একটি অপরিহার্য উপকরণ, যার সময়মতো প্রাপ্যতা ফসলের উৎপাদনশীলতা, উৎপাদন ব্যয় এবং কৃষকের আয়কে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাই সার ব্যবস্থাপনাকে কেবল সার সংগ্রহ, মজুদ ও বিতরণের প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষির স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি কৌশলগত বিষয়।বাংলাদেশে কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমদানি, দেশীয় উৎপাদন, সরকারি মজুদ, পরিবহন ও কৃষক পর্যায়ে বিতরণের সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে ভবিষ্যতের কৃষি বাস্তবতা বিবেচনায় সার ব্যবস্থাপনার ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। প্রশ্নটি শুধু ‘কত টন সার প্রয়োজন’—এখানে সীমাবদ্ধ না রেখে ভাবতে হবে, ‘কোন সময়ে, কোন অঞ্চলে, কোন ফসলে, কত ধরনের সার প্রয়োজন হবে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি দেখা দিলে কত দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’সারের চাহিদা কোনো স্থির সংখ্যা নয়। আবাদ এলাকা, ফসলের ধরন, উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ব্যবহার, সেচ সুবিধা, আবহাওয়া, উৎপাদন প্রযুক্তি এবং কৃষকের অর্থনৈতিক সক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সারের চাহিদাও পরিবর্তিত হয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ে মোট মজুদ পর্যাপ্ত থাকলেও কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা নির্দিষ্ট সময়ে কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহে সাময়িক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এখানেই ‘মজুদ’ ও ‘প্রাপ্যতা’র মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। গুদামে সার থাকা এবং কৃষকের জমির কাছাকাছি প্রয়োজনের সময়ে সঠিক মূল্যে সার পাওয়া একই বিষয় নয়।সার ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা। আন্তর্জাতিক বাজারদর, জাহাজভাড়া, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, রপ্তানিকারক দেশের নীতি এবং জ্বালানি মূল্যের পরিবর্তন আমদানি ব্যয় ও সরবরাহকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে ইউরিয়া উৎপাদনের সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। দেশীয় উৎপাদনে কোনো কারণে বিঘ্ন ঘটলে তা সামাল দিতে অতিরিক্ত আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি বা রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেখা দিলে আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।তাই সার সংকটকে শুধু গুদাম খালি হওয়ার পরিস্থিতি হিসেবে দেখলে চলবে না। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, আমদানির দীর্ঘ লিড টাইম, পরিবহন সমস্যা, বন্দর জট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সবই সার নিরাপত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকি। ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনায় তাই সংকট দেখা দেওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানানোর পরিবর্তে ঝুঁকি শনাক্ত করে আগেই প্রস্তুতি নেওয়াকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।এ জন্য প্রথম প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক চাহিদা পূর্বাভাস। কৃষি সম্প্রসারণ, গবেষণা, বিএডিসি, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য সমন্বয় করে একটি আধুনিক ‘সারের চাহিদা পূর্বাভাস ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা যেতে পারে। আবাদ এলাকা, ফসলভিত্তিক সার সুপারিশ, পূর্ববর্তী বছরের ব্যবহার, আবহাওয়া, মাটির উর্বরতা, সম্ভাব্য উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এই পূর্বাভাস ব্যবস্থার উপাদান হতে পারে। এমন ব্যবস্থা থাকলে সম্ভাব্য চাহিদা বাড়ার আগেই আমদানি, মজুদ ও পরিবহন পরিকল্পনা করা সম্ভব হবে।এর সঙ্গে চালু করা যেতে পারে একটি ‘জাতীয় সার নিরাপত্তা সূচক’। জাতীয় মজুদ, পাইপলাইনে থাকা সার, আমদানির লিড টাইম, মৌসুমি চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাজারদর, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি এবং পরিবহন সক্ষমতার মতো সূচক এতে বিবেচনায় আসতে পারে। সূচক নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে গেলে সতর্কতা, প্রস্তুতি বা জরুরি সংগ্রহ—এই তিন পর্যায়ের ব্যবস্থা সক্রিয় করার সুযোগ থাকবে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও তথ্যনির্ভর হবে এবং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় সময় পাওয়া যাবে।মজুদের ক্ষেত্রেও শুধু জাতীয় মোট পরিমাণ জানা যথেষ্ট নয়। কোন গুদামে কত সার রয়েছে, কোন অঞ্চলে কত দিনের চাহিদা পূরণ করা যাবে এবং কোন এলাকায় দ্রুত সরবরাহ প্রয়োজন—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক ‘কার্যকর মজুদ’ ধারণা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে গুদাম থেকে ডিলার এবং ডিলার থেকে কৃষক পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহের তথ্য পর্যবেক্ষণ করা গেলে কোথায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে বা কোথায় সরবরাহ বিলম্বিত হচ্ছে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।তবে কৌশলগত মজুদের পরিমাণ নির্ধারণেও ভারসাম্য প্রয়োজন। অতিরিক্ত মজুদ যেমন অর্থ আটকে রাখে ও সংরক্ষণ ব্যয় বাড়ায়, তেমনি কম মজুদ সরবরাহ ঝুঁকি বাড়ায়। তাই ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারের জন্য আলাদা ঝুঁকি, আমদানির সময়, দেশীয় উৎপাদনক্ষমতা এবং মৌসুমি চাহিদা বিবেচনায় কৌশলগত মজুদের বৈজ্ঞানিক সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে।সরবরাহের উৎসেও বৈচিত্র‍্য আনা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি সরকারি পর্যায়ের চুক্তি সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে কোনো একটি উৎস বা সরবরাহপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই একাধিক দেশ, বিকল্প বন্দর ও পরিবহনপথ এবং প্রয়োজনে বিকল্প ক্রয়ব্যবস্থার প্রস্তুতি থাকা দরকার। চুক্তিতে সরবরাহ বিলম্ব, গুণগত মান, জরুরি পরিমাণ, জাহাজীকরণ ও বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট শর্ত থাকলে অনিশ্চয়তার সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সার সংগ্রহ, আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিএডিসি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তবে সার নিরাপত্তাকে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হিসেবে দেখার পরিবর্তে এটি উৎপাদন, আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রা, বন্দর, পরিবহন, গুদাম, বাজার এবং কৃষক পর্যায়ের চাহিদার সমন্বিত ফল হিসেবে বিবেচনা করা অধিক বাস্তবসম্মত।সার ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং দৃশ্যমান ধাপ হলো কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ। জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও যদি স্থানীয় পর্যায়ে সময়মতো সার না পৌঁছায়, তাহলে কৃষকের কাছে সেটিই সংকট হিসেবে প্রতিভাত হয়। তাই ডিলার নেটওয়ার্ককে সার নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ডিলারদের দায়িত্ব শুধু সার বিক্রি করা নয়; বরাদ্দ ও মজুদের সঠিক হিসাব রাখা, নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা, কৃষকের চাহিদা ও স্থানীয় ঘাটতির তথ্য জানানো এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না করার মতো বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত।ভবিষ্যতে ডিলার পর্যায়ে সহজ ডিজিটাল রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। মোবাইল অ্যাপ, ওয়েব বা এসএমএসের মাধ্যমে ডিলাররা নিয়মিত মজুদ, বিক্রি, অবশিষ্ট পরিমাণ এবং সম্ভাব্য চাহিদার তথ্য জানাতে পারেন। এসব তথ্য কেন্দ্রীয় পূর্বাভাস ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হলে মাঠের বাস্তব চিত্র দ্রুত নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হবে। একই সঙ্গে ডিলারদের প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ বরাদ্দ, ন্যায্য কমিশন, নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।সারের পরিমাণের পাশাপাশি সুষম ব্যবহারও ভবিষ্যৎ সার নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাটির পরীক্ষার ভিত্তিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করা গেলে একদিকে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে, অন্যদিকে মাটির দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা রক্ষা করা সম্ভব হবে। জমির মাটি, ফসল, জাত ও সম্ভাব্য ফলনের ভিত্তিতে ডিজিটাল সার সুপারিশ কৃষকের মোবাইল ফোনে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা ভবিষ্যতে আরও কার্যকর হতে পারে।এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—প্রযুক্তি যেন শুধু প্রযুক্তি প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। ডিজিটাল ব্যবস্থা তখনই কার্যকর হবে, যখন মাঠপর্যায়ে তা সহজে ব্যবহারযোগ্য, তথ্যনির্ভর এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হবে। তথ্যের মালিকানা, হালনাগাদের দায়িত্ব, যাচাই পদ্ধতি এবং ভুল তথ্য সংশোধনের ব্যবস্থা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।সার ব্যবস্থাপনায় তথ্যের স্বচ্ছতাও কৃষকের আস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এলাকায় সাময়িক সরবরাহ বিলম্ব দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সার সংকট’ হিসেবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার জাতীয় মজুদ পর্যাপ্ত থাকলেও কৃষকের কাছে সময়মতো সার না পৌঁছালে বাস্তবে সমস্যা তৈরি হয়। তাই কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের তথ্যপ্রবাহকে দ্বিমুখী, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য করা দরকার। সার মজুদ, আমদানির পাইপলাইন, সম্ভাব্য সরবরাহ সময়সূচি এবং অঞ্চলভিত্তিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত ও যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা গেলে অযৌক্তিক আতঙ্ক ও মজুদপ্রবণতা কমানো সম্ভব।ভবিষ্যতের জন্য একটি তিনস্তরীয় সার নিরাপত্তা কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথম স্তরে থাকবে দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রহ ও কৌশলগত মজুদ; দ্বিতীয় স্তরে মৌসুমভিত্তিক আঞ্চলিক মজুদ ও দ্রুত পুনর্বণ্টন; তৃতীয় স্তরে থাকবে জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত সংগ্রহের ব্যবস্থা। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, বন্দর অচলাবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য আগেই একটি ‘আপৎকালীন সার পরিকল্পনা‘’ তৈরি করা যেতে পারে।এই পরিকল্পনায় শুধু করণীয় নির্ধারণ করলেই হবে না; কে কখন সিদ্ধান্ত নেবে, কোন পর্যায়ে অতিরিক্ত সংগ্রহ শুরু হবে, কীভাবে অঞ্চলভিত্তিক পুনর্বণ্টন হবে এবং কৃষকদের কীভাবে তথ্য দেওয়া হবে—এসব বিষয়ও স্পষ্ট থাকতে হবে। নিয়মিত মহড়া ও পর্যালোচনার মাধ্যমে পরিকল্পনাটির কার্যকারিতা যাচাই করা যেতে পারে।সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের কৃষি যত আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, সার ব্যবস্থাপনাকেও তত বেশি তথ্যনির্ভর, পূর্বাভাসভিত্তিক ও ঝুঁকি-সহনশীল হতে হবে। ভবিষ্যতের সারনীতি শুধু ‘আরও সার সংগ্রহ’ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সঠিক সার, সঠিক পরিমাণে, সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে এবং সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন নিশ্চিত করা হবে এর মূল লক্ষ্য।সার নিরাপত্তার প্রকৃত সাফল্য সংকটের সময় কত দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো গেল, শুধু তার ওপর নির্ভর করে না। বরং সংকট তৈরি হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় মজুদ গড়ে তোলা, বিকল্প উৎস প্রস্তুত রাখা এবং কৃষকের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যেই এর প্রকৃত সাফল্য নিহিত। কৃষকের হাতে সময়মতো সার পৌঁছানো মানে শুধু একটি কৃষি উপকরণ পৌঁছে দেওয়া নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ফসলের সম্ভাবনা, একটি পরিবারের আয় এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা। তাই সার ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ দর্শন হওয়া উচিত একটাই—  সংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নয়, সংকটের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ার আগেই প্রস্তুতি।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)]

প্রাক-প্রাথমিকের ব্লক টিচিং

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি। এই পর্যায়ে শিশুকে শুধু বই পড়ানো নয়; বরং খেলাধুলা, গল্প, গান, ছবি, কথোপকথন, হাতে-কলমে কাজ এবং নানা ধরনের আনন্দময় কার্যক্রমের মাধ্যমে শেখার প্রতি আগ্রহী করে তোলা হয়। তাই প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষকতা অন্যান্য শ্রেণির তুলনায় আলাদা দক্ষতা, ধৈর্য, সৃজনশীলতা ও শারীরিক-মানসিক প্রস্তুতি দাবি করে।বর্তমান ব্যবস্থায় একজন শিক্ষককে প্রায় আড়াই ঘণ্টার একটি দীর্ঘ ব্লকে প্রাক-প্রাথমিকের পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ৩০ মিনিট নির্দেশিত খেলা ও মুক্ত খেলার জন্য নির্ধারিত থাকে। অনেকের কাছে এটি হয়তো 'খেলার সময়' মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে একজন শিক্ষকের জন্য এটিও যথেষ্ট দায়িত্বপূর্ণ সময়। কারণ শিশুদের খেলাধুলার সময়ও শিক্ষককে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে হয়, প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশনা দিতে হয় এবং তাদের অংশগ্রহণে সহায়তা করতে হয়।অর্থাৎ, আড়াই ঘণ্টার পুরো সময়টিই শিক্ষককে সক্রিয়ভাবে শিশুদের সঙ্গে থাকতে হয়।এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—একজন শিক্ষক কি একটানা আড়াই ঘণ্টা একই মাত্রার শারীরিক ও মানসিক উদ্যম নিয়ে এতগুলো শিশুকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারেন?বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, কাজটি অত্যন্ত কঠিন।প্রাক-প্রাথমিকের শিশুরা স্বভাবতই চঞ্চল। তাদের মনোযোগের স্থায়িত্ব তুলনামূলকভাবে কম। ফলে তাদের মনোযোগ ধরে রাখতে শিক্ষককে বারবার কার্যক্রম পরিবর্তন করতে হয়, প্রত্যেক শিশুকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়, দুর্বল বা অনাগ্রহী শিশুকে আলাদাভাবে উৎসাহিত করতে হয় এবং একই সঙ্গে পুরো শ্রেণির পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।একজন শিক্ষক দীর্ঘ সময় ধরে এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন। আর শিক্ষক ক্লান্ত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিশুদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এবং সর্বোপরি কাঙ্ক্ষিত শিখনফলের ওপর।তাই বিষয়টি শুধু শিক্ষকের কাজের চাপের প্রশ্ন নয়; এটি শিশুর শিক্ষার গুণগত মানের প্রশ্নও।এক শিক্ষকনির্ভরতার আরেকটি বড় সমস্যাবর্তমান ব্যবস্থার আরেকটি বাস্তব সমস্যা হলো—অনেক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রম একজন নির্দিষ্ট প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল।তিনি কোনো কারণে ছুটিতে, প্রশিক্ষণে, সরকারি দায়িত্বে, অসুস্থতায় বা চিকিৎসা জনিত ছুটিতে থাকলে প্রাক-প্রাথমিকের কার্যক্রম অনেক সময় প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতায় পরিচালিত হয় না। অন্য কোনো শিক্ষক শ্রেণি নিলেও তিনি যদি প্রাক-প্রাথমিকের বিশেষ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষিত না হন, তাহলে কার্যক্রমটি অনেক সময় মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয় না।ফলে একটি শিশুর শিক্ষার ধারাবাহিকতায় সাময়িক হলেও বিঘ্ন ঘটে।এখানে প্রশ্ন হলো—একটি বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেন একজন নির্দিষ্ট শিক্ষকের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল থাকবে? একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যক্তি নির্ভর না হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হওয়া উচিত।সমাধান কী হতে পারে?আমার বিবেচনায় এর একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে—প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ন্যূনতম দুইজন প্রাক-প্রাথমিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করা।এটি মানেই যে দুজন শিক্ষককে সবসময় একই সময়ে শ্রেণিকক্ষে থাকতে হবে—তা নয়। বরং দুজন শিক্ষক একটি সমন্বিত রুটিন তৈরি করে আড়াই ঘণ্টার কার্যক্রম ভাগ করে নিতে পারেন।একজন শিক্ষক একটি নির্দিষ্ট অংশ পরিচালনা করবেন, অন্যজন পরবর্তী অংশ পরিচালনা করবেন। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু কার্যক্রম দুজন যৌথভাবে পরিচালনা করতে পারেন। এতে শিক্ষক একটানা দীর্ঘ সময়ের চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত থাকবেন এবং শিশুদের সঙ্গে আরও প্রাণবন্তভাবে কাজ করতে পারবেন।এর ফলে শুধু শিক্ষকের চাপ কমবে না; বরং শিশুদের প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগ দেওয়ার সুযোগও বাড়বে।খেলাধুলাকে শুধু ‘খেলা’ হিসেবে দেখলে চলবে নাপ্রাক-প্রাথমিকের নির্দেশিত ও মুক্ত খেলা আসলে শিশুর বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খেলতে খেলতেই শিশু সামাজিক আচরণ, যোগাযোগ, সহযোগিতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা সমাধান, শারীরিক সমন্বয় এবং আত্মবিশ্বাসের মতো নানা দক্ষতা অর্জন করে।তাই খেলাধুলার সময় শিক্ষককে শুধু দূর থেকে নজরদারি করলেই হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে অংশগ্রহণ করতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, উৎসাহ দিতে হবে এবং শিশুদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে হবে।দুইজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকলে এই কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল কী?দুইজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে—প্রথমত: শিক্ষকের ক্লান্তি কমবে এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের কর্মদক্ষতা বাড়বে। দ্বিতীয়ত: একজন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেও অন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবেন। তৃতীয়ত: শিশুদের প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ বাড়বে। চতুর্থত: খেলাভিত্তিক ও শিশুকেন্দ্রিক কার্যক্রম আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। পঞ্চমত: দুইজন শিক্ষক পরস্পরের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও যৌথ পরিকল্পনা করতে পারবেন। ষষ্ঠত: প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকবে না; বরং বিদ্যালয়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম হিসেবে শক্তিশালী হবে।নতুন করে ভাবার সময় এসেছেবাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পর প্রায় এক যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তবু মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত শিখনফল পুরোপুরি অর্জন করতে পারছি?যদি প্রত্যাশিত ফলাফল সর্বত্র সমানভাবে অর্জিত না হয়, তাহলে শুধু শিশুর শেখার সমস্যা বা শিক্ষকের দক্ষতাকে দায়ী না করে আমাদের শিক্ষাদান পদ্ধতি, সময় ব্যবস্থাপনা, শিক্ষকসংখ্যা এবং শ্রেণি পরিচালনার কাঠামো নিয়েও ভাবতে হবে।কারণ একটি ভালো কারিকুলাম তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি বাস্তবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ ও পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।এখন প্রয়োজন একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগএটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরাসরি সারাদেশে পরিবর্তন আনার আগে নির্বাচিত কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে 'টু-ট্রেইন্ড-টিচার মডেল' পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে।কয়েক মাস বা এক শিক্ষাবর্ষের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যেতে পারে— শিশুদের অংশগ্রহণ কতটা বাড়ছে; শিক্ষক ক্লান্তি কতটা কমছে; শ্রেণিকক্ষের পরিবেশের কী পরিবর্তন আসছে; খেলাভিত্তিক কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে; শিক্ষক অনুপস্থিতির সময় শ্রেণির ধারাবাহিকতা কতটা বজায় থাকছে; এবং সর্বোপরি শিশুদের শিখনফলে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে।পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের ফলাফল ইতিবাচক হলে পর্যায়ক্রমে এটি বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।শেষ কথাপ্রাক-প্রাথমিক কোনো সাধারণ শ্রেণি নয়। এখানেই একটি শিশুর বিদ্যালয়ভীতি দূর হয়, শেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। তাই এই স্তরে বিনিয়োগ মানে শুধু বর্তমানের শিশুদের জন্য বিনিয়োগ নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার ভিত্তিকে শক্তিশালী করা।একজন শিক্ষককে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা এককভাবে পুরো প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে আমরা হয়তো সময়সূচি পূরণ করতে পারি, কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি কাঙ্ক্ষিত মানের শিখনফল নিশ্চিত করতে পারছি?সময়ের দাবি হলো বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা।আমার প্রস্তাব খুব সরল—"ওয়ান স্কুল - ওয়ান ট্রেইন্ড প্রি-প্রাইমারি টিচার" থেকে আমাদের ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হবে—"ওয়ান স্কুল - এট লিস্ট টু ট্রেইন্ড প্রি-প্রাইমারি টিচার্স"। কারণ প্রাক-প্রাথমিকের লক্ষ্য শুধু একটি শ্রেণি পরিচালনা করা নয়; লক্ষ্য হলো প্রতিটি শিশুর জন্য একটি আনন্দময়, নিরাপদ, অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করা।[লেখক: সহকারী শিক্ষক, নিশিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভালুকা, ময়মনসিংহ]

মক্কাচুক্তি: ঢাকার সিদ্ধান্তে কি বদলাবে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণ?

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রথম অধ্যায়ে মূল সমীকরণ ছিল সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ঘিরে। কিন্তু এখন এই ত্রিপাক্ষিক নিরাপত্তা কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য সম্প্রসারণের প্রশ্নটি এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের সামনে। বাংলাদেশ এখনও চুক্তির সদস্য নয়, কিন্তু ঢাকার পক্ষ থেকে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার ইঙ্গিত এসেছে এবং সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে যুক্ত করার আগ্রহের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।বাংলাদেশের অবস্থান এখনও চূড়ান্ত নয়। তবে সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলিতে ঢাকার মনোভাব যে সম্পূর্ণ নেতিবাচক নয়, তা স্পষ্ট। ৩০ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ কোনও ঝুঁকির মুখে পড়বে না এবং এর ফলে অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সীমিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ঢাকা সম্ভাব্য সদস্যপদকে কোনও একটি দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে নয়, বরং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখাতে চাইছে।কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। বাংলাদেশ যদি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে একই নিরাপত্তা কাঠামোয় তার অবস্থান তৈরি হবে। আর পাকিস্তান ভারতের প্রধান নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটি। ফলে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে নয়াদিল্লি নিছক আরেকটি দেশের আন্তর্জাতিক জোটে যোগদানের ঘটনা হিসেবে দেখবে না। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান সংবেদনশীল পরিবেশে এর কৌশলগত তাৎপর্য অনেক বেশি।তবে এখানেও সরলীকরণ বিপজ্জনক। বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলেই যে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বিরুদ্ধে কোনও যৌথ সামরিক অবস্থান গ্রহণ করবে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনীতি, ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক সম্পর্ক, সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নদীর জল এবং বঙ্গোপসাগর–সবকিছুই ঢাকার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের অংশ। ফলে কোনও নতুন নিরাপত্তা কাঠামোয় যোগ দিলেও ভারতকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত হবে না।বরং বাংলাদেশের সম্ভাব্য আগ্রহের পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার। তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কও বাড়ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কেও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে ঢাকা যদি মক্কা কাঠামোয় প্রবেশ করে, তাহলে একদিকে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ বাড়াতে পারবে, অন্যদিকে নতুন অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দরজাও খুলতে পারে।কিন্তু এই সম্ভাব্য লাভের পাশাপাশি বড় ঝুঁকিও রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বহির্মুখী এবং রপ্তানি, প্রবাসী শ্রমিক ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে কোনও নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে পড়লে অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। Reuters-এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের non-alignment বা ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির পরীক্ষা হতে পারে এবং ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতো শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে।ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে–বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে নয়াদিল্লি কীভাবে মোকাবিলা করবে। যদি ভারত এটিকে সরাসরি পাকিস্তান-সমর্থিত বা ভারতবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখে কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। বিপরীতে, যদি ভারত বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে তার বহুমুখী কূটনীতির অংশ হিসেবে গ্রহণ করে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বাস্তব ক্ষেত্রগুলিকে আরও শক্তিশালী করে, তাহলে মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।এখানেই শশী থারুরের প্রথম পর্বের যুক্তি দ্বিতীয় পর্বে এসে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, ভারতের উত্তর হওয়া উচিত Gulf-কে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং Gulf-এর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রযোজ্য হতে পারে। ভারত যদি বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় নিজের গুরুত্ব আরও বাড়াতে পারে, তাহলে কোনও নতুন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোয় বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে ভারতবিরোধী অক্ষ হিসেবে রূপ নেওয়া কঠিন হবে।অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিঃসন্দেহে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হতে পারে। কারণ এতে মক্কা চুক্তির ভৌগোলিক পরিসর পশ্চিম এশিয়া থেকে সরাসরি বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। পাকিস্তান তখন শুধু সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সঙ্গেও একই নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে থাকবে। এর ফলে ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক ও মুসলিম বিশ্বের ফোরামগুলিতে আরও বেশি কূটনৈতিক leverage পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।তবে বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও গভীর–চুক্তিতে যোগ দিয়ে ঢাকা কি নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়াবে, নাকি নতুন নির্ভরতা তৈরি করবে? একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু সহযোগিতার সুযোগ দেয় না; প্রয়োজনে অংশীদারের নিরাপত্তা সংকটের ক্ষেত্রেও অবস্থান নেওয়ার রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রে সেই বাধ্যবাধকতা বাস্তবে কতটা হবে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। চুক্তির বিস্তারিত operational framework-ও প্রকাশ্যে সম্পূর্ণভাবে জানা যায়নি।এই কারণে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমান পথ হতে পারে কোনও তাড়াহুড়ো না করে চুক্তির বাস্তব শর্ত, সদস্যদের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির সীমা পরিষ্কারভাবে যাচাই করা। কারণ “collective defence” কথাটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও বাস্তবে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, threat perception এবং সামরিক সক্ষমতা আলাদা।ভারতের জন্যও একই শিক্ষা। বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক বা চাপ নয়, প্রয়োজন কৌশলগত সংলাপ। ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের যে ক্ষেত্রগুলি সরাসরি দুই দেশের জনগণের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত–বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদী ও বঙ্গোপসাগর–সেগুলিকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। কারণ একটি দেশকে কোনও জোট থেকে দূরে রাখার চেয়ে তার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক এতটাই গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা বেশি কার্যকর, যাতে সেই দেশ বহুমুখী অংশীদারিত্ব বজায় রেখেও ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ককে অপরিহার্য মনে করে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মক্কা চুক্তিকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করলে এর আসল ভূরাজনৈতিক চরিত্র আড়ালে চলে যাবে। এটি একইসঙ্গে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় কৌশলগত autonomy-র প্রশ্ন। বাংলাদেশ যদি এতে যোগ দেয়, তার সিদ্ধান্তও ধর্মীয় আবেগের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং কৌশলগত স্বাধীনতার ভিত্তিতেই বিচার করতে হবে।শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান মক্কা চুক্তিকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করবে–এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটিকে অবধারিতভাবে ভারতবিরোধী সামরিক অক্ষে পরিণত করবে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না। বরং এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক কূটনৈতিক পরীক্ষার সূচনা। পাকিস্তান চাইবে এর মাধ্যমে নিজের প্রভাব বাড়াতে, সৌদি আরব চাইবে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব সম্প্রসারিত করতে, তুরস্ক চাইবে নিজের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে, আর বাংলাদেশ চাইবে নতুন অংশীদারিত্বের সুবিধা নিতে গিয়ে নিজের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে।ভারতের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে ঠেকানো নয়; বরং এমন একটি কৌশল তৈরি করা, যাতে বাংলাদেশের নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ভারতের সঙ্গে তার মৌলিক সম্পর্ককে দুর্বল না করে। আর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা–মক্কা চুক্তিতে প্রবেশ করে কতটা নতুন কৌশলগত সুযোগ পাওয়া যাবে, আর সেই সুযোগের বিনিময়ে কতটা কূটনৈতিক স্বাধীনতা ধরে রাখা সম্ভব হবে।মক্কা চুক্তির পরবর্তী অধ্যায় তাই শুধু রিয়াদ, আঙ্কারা বা ইসলামাবাদে লেখা হবে না। তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ লেখা হবে ঢাকাতেও। আর সেই সিদ্ধান্তের দিকে এখন নজর শুধু ভারত বা পাকিস্তানের নয়–পুরো দক্ষিণ এশিয়ার।আরো পড়ুন...মক্কা চুক্তি: ভারতের সামনে নতুন সমীকরণ/ 

রম্যগদ্য: “পিটাও অ্যারিস্টোটল, মারেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”

এইডা আবার কী শুরু করলেন, হিডান অ্যারিস্টোটল, হিডান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? আপনে মিয়া পারেনও, এই দুই বিশ্বনন্দিত পাবলিকরেনি আন্নে হিডাইবেন! এগোরে হিডাইলে, পাবলিক আন্নেরে হিডি মারি হালাইবো। পাবলিক আমাকে পিটাক বা মব করে মেরে ফেলুক, এনিয়ে আমার চিন্তা নেই, কিন্তু এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যাক্তিত্ব যে বাংলাদেশের বারটা বাজাচ্ছে তার কী হবে?এ্যাঁ, যীষু খৃষ্টের জন্মেরও ৩৮৪ বছর আগে এ্যাথেনসের, জারা শহরে জন্ম লোইলো, অ্যারিস্টোটল, তখনতো বাংলাদেশের বাপেরও জন্ম হয় নাই! আর আন্নেনি কন বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক অ্যারিস্টোটল আন্নের বাংলাদেশের ... মারের! আন্নের মিয়া লজ্জা শরম নাই, অ্যারিস্টোটল আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথরে উপর এইসব অলীক মন গড়া অভিযোগ করতে!আরে উড়ঝুড়ে বাঙাল, তুইতো কিছু না বুঝেই কাটা টিকটিকির লেজের মতো লাফালাফি করিস। তড়প তড়প করে তড়পাস। তুই জানিস, তোর কথার এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের শুধু... মারেনি, ইঁনারা বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের ...জেন-জিরও... মেরে বসে আছেন।হ, কোইলেই হোইলো। এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের, বাংলার পরবর্তী প্রজন্মেরও... মারের! মনে রাইখেন মিয়া এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব অ্যারিস্টোটল পৃথিবীর ইতিহাসে, আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে যে অবদান রেখেছেন, আন্নের হাজার গুষ্টি আইলেও হ্যাগো বাম-পায়ের কানি আঙুলের ধারে কাছেও যাইতে পারবেন না!  আরে ভাই আমার আর আমার চৌদ্দগুষ্টির কারো এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্বের কাছেও যেতে হবে না। কিন্তু ইঁনারা দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশের শুধু ... মারেনি, তারা পুরো বাঙালি জাতির ... মেরেছেন। তুই বলতে পারিস আমরা কি এমন পাপ করলাম যে তোর ভাষায় এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্বের প্রচেষ্টায় আজ আমরা বাঙালি নাকি মধ্যপ্রাচ্যে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া ওঁচা মিসকিন হিসেবে পৃথিবীতে বিচরণ করবো! ভাবতে পারিস তোর এই দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্বের ঠেলায় আমাদের জাতিসত্তা নিয়ে টানাটানি শুরু হোয়েছে। আমরা কি বাঙালি নাকি আমরা ভিনগ্রহের প্রাণী উট সাবক!এইটা আপনি কি বলচেন যে, কবি শামসুর রাহমান বলেচেন, “অদ্ভুত এক উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ” কিন্তু কবি শামসুর রাহমান কখোনোই বলেননি যে বাঙালি আর বাঙালি নাই হ্যারা ব্যেবাগতে উষ্ট্র সাবক!কিন্তু ভাবেতো তাই দেখা যাচ্ছে, তোরা মরুভুমির কঠিন আবহাওয়ায় বসবাসরত পাবলিকের আচার অনুষ্ঠান লালন পালন করলে তোকে কে বলবে যে তুই বাঙালি নাকি পবিত্র উষ্ট্র দেশের বাসিন্দা?আপনে মিয়া কথা ঘুরায়েন না, এ্যাতক্ষণ কোইছেন, দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব অ্যারিস্টোটল আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশের জী-মারের অহন আবার বাঙালিরে পবিত্র উটের দেশে নিয়া ফালাইতে চান! সোজাসাপটা কন মিয়া আপনে ক্যান কোইছেন দুই বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব অ্যারিস্টোটল আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশের তথা বাঙালির বারটা বাজাইছে?দ্যাখ, বিশ্বখ্যাত, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, তর্কশাস্ত্রবিদ, গাণিতিক জনাব অ্যারিস্টোটল তার পোয়েটিকসসে বলেছেন, একটি দেশ সব সময় পরিচালিত হয় ওই দেশের জনপ্রিয় নেতা দ্বারা, জনপ্রিয় নেতা জনগণের ভোটে সব সময় দেশ পরিচালনার ভার লাভ করে। কিন্তু দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠি কখোনোই জনতার ভোটে দেশ পরিচালনার সুযোগ পান না।  এই অ্যারিস্টোটলের কথা শুনে তোর বাংলাদেশের লোকেরা ১৯৭১-এ যেমন জনপ্রিয় নেতাকে ভোট দিলেন, তারপর তার দেশ পরিচালনার বহর দেখে তাকে ফুটো করলো। দেশ পড়লো অথৈ আঁধারে। বাঙালি জাতির বারোটা। তার পরবর্তীতে “টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সবাই বলে জিয়া জিয়া”। এমনি অপর এক জনপ্রিয় নেতাকে তোরা আবার গুলি কোরে হত্যা করলি। আবার বাঙালি অথৈ পাথারে। এ্যাখোন বাঙালি যদি  বিশ্বনন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব অ্যারিস্টোটলের কথা না শুনতো তাহলে আজ বাঙলার ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লেখা হতো। তোরা অ্যারিস্টোটলের কথা শুনলি আর মরলি।এইডা আবার কী কথা! বিদেশে কি পাবলিক জনপ্রিয় নেতারে ভোট দ্যায় না?জ্বী, বিদেশে পাবলিক জনপ্রিয় নেতাকে ভোট দ্যায়, কিন্তু ওই নেতারা সিনেট মিনেট, কংগ্রেস, আপার বেঞ্চ লোয়ার বেঞ্চ করে সব শিক্ষিতদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দ্যায়, ফলে তোর ওই জনপ্রিয় নেতাকে কখোনোই স্বৈরাচার হবার চান্স দেয়া হয় না। কিন্তু তোর দেশের শিক্ষিতরা তো কোণঠাসা, কারণ তোর জনপ্রিয় নেতাটি তার জনপ্রিয়তায় এ্যাতোই অন্ধ যে, কখন জেন-জি তার ...’ মারছে তাও টের পেলেন না। আচ্ছা বুঝলাম হালার অ্যারিস্টোটলের কথা হুনি বাঙালি পাবলিক শিক্ষিতরে বাদদি জনপ্রিয় নেতারে ভুট প্রদান করি, নিজের...নিজেই ধ্বংস করছে। কিন্তু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররে এর মইধ্যে হান্দাইলেন ক্যামনে? হ্যায় ক্যেমনে বাঙালি জাতির...মারের?আরে অশিক্ষিত বর্বর বাঙাল, মবগোষ্টির সক্রিয় কাঙাল, তুই কেন জানিস না যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার শ্যামা নৃত্যনাট্যে, রাজকোষে চুরি হবার পর লিখলেন, “চুরি হয়ে গেছে রাজকোষে, চোর চাই, চোর চাই, যে কোরেই হোক, হোক সে অন্য কোনো লোক...”তো হ্যায়তো ঠিকই কোইছে, চোর চাই, চোর চাই, যে কোরেই হোক...ব্যাস পুলিশ তো চুর ধোরবোই।“আরে জঙ্গল পুলিশ তো চোর ধরবেই, এটাই ওদের ডিউটি। কিন্তু পুলিশ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কথা শুনে করলো কি, ছিনতাই করলো নীল মোটর সাইকেল, পুলিশ ধরলো লাল মোটর সাইকেল, কারণ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “চোর চাই, চোর চাই, যে কোরেই হোক, হোক সে অন্য কোনো লোক...” ব্যাস বিশ্ব কবির কথামতো পুলিশ অন্যলোককে ধরে আনলো। এখন তুইই বল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এইসব নোংরা বুদ্ধি না দিলে, পুলিশ কি এই বাঁকা পথে যেতো?তুই বল?গুরু আপনে ঠিকই কোইছেন, এই দুই বিশ্ব নন্দিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব শুধু বাংলাদেশের  ...মারেনি, ইঁনারা বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের ...জেন-জিরও... মেরে বসে আছেন। ইঁনাদের বাংলাদেশে ব্যান্ড করা উচিৎ। আন্নের কথাই ঠিক হালাগোরে হিডান।তাহলে তুইও আমার সাথে বল “পিটাও অ্যরিস্টোটল, মারেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর...”আরে শুধু আমি কমু ক্যান পুরা বাংলাদেশের পাবলিকে কোইবো, “পিটাও অ্যরিস্টোটল, মারেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর...” [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

ডেঙ্গু: সংখ্যার আড়ালে ব্যর্থতা

সংখ্যাগুলো একসাথে সাজালে চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জুনে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন প্রায় তিন হাজার মানুষ। জুলাইয়ে তা তিনগুণ বেড়ে নয় হাজারের বেশিতে পৌঁছায়। আগস্টে সেই সংখ্যা আরও লাফিয়ে বেড়ে বিশ হাজার পার হয়ে যায়। আর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই একদিনে দেড় হাজারের বেশি রোগী ভর্তির নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে—চলতি বছরের সর্বোচ্চ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ, প্রাণ গেছে ১২১ জনের। এই ঊর্ধ্বমুখী রেখা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়—এটি একটি প্যাটার্ন, যা প্রতিবছর প্রায় একই সময়ে ফিরে আসে।ইতিহাস ঘাঁটলে এই প্যাটার্ন আরও স্পষ্ট হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর তথ্য সংরক্ষণ করছে। এই দুই দশকের মধ্যে ২০২৩ সাল সবচেয়ে ভয়াবহ বছর হিসেবে রেকর্ড হয়ে আছে—সে বছর তিন লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং মৃত্যু হয়েছিল ১ হাজার ৭০৫ জনের, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এরপর ২০২৫ সালেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি—চার শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান এবং হাসপাতালে ভর্তি হন প্রায় এক লাখ দুই হাজার রোগী। এই তিন বছরের তুলনামূলক চিত্র একটি জিনিস স্পষ্ট করে দেয়—আগস্ট থেকে অক্টোবর সময়টা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, আর এবারও ঠিক সেই ধারাবাহিকতাই দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরজুড়ে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।ভৌগোলিক বিস্তারের তথ্যও উদ্বেগজনক। ঢাকা বিভাগে সংক্রমণ সর্বোচ্চ হলেও এককভাবে আর রাজধানীর সমস্যা এটি নয়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ পুরো ঢাকা বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। বরিশালে প্রায় ৬ হাজার, চট্টগ্রামে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জেও আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। ময়মনসিংহ, কক্সবাজার, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরেও সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি। গত কয়েক বছর ধরে দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও। ২০১৯ সালের আগে যে রোগ মূলত বড় শহরকেন্দ্রিক ছিল, তা এখন গ্রামীণ জনপদেও পৌঁছে গেছে—অর্থাৎ এডিস মশার বিস্তারও আর শহরের সীমানায় আটকে নেই।এই বিস্তারের পেছনে কারণ হিসেবে কীটতত্ত্ববিদরা দেখাচ্ছেন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। আগে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরকে এডিস মশার প্রধান প্রজননকাল ধরা হতো। কিন্তু এখন সারাদেশে প্রায় সারা বছরই এই মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। শহরে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম কিছুটা দৃশ্যমান হলেও গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের উদ্যোগ তুলনামূলক দুর্বল, ফলে এডিস মশার প্রজননস্থল অনেকাংশে অনিয়ন্ত্রিত থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় জেলাগুলোতেও ডেঙ্গুর বিস্তার নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে, যা আগে তেমন লক্ষ্য করা যায়নি।পরিসংখ্যানের আরেকটি স্তরে গেলে দেখা যায় একটি লিঙ্গভিত্তিক অসামঞ্জস্য। এ বছর হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের প্রায় ৬২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ শতাংশ নারী। কিন্তু মৃত্যুর চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত—এখন পর্যন্ত মৃতদের প্রায় ৫৬ শতাংশ নারী। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পুরুষরা কর্মসূত্রে শহরে থাকার সুবাদে সহজে পরীক্ষা করানোর সুযোগ পান, নারীদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ তুলনামূলক কম। ফলে আক্রান্ত নারীর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানে হয়তো কম প্রতিফলিত হচ্ছে, আর রোগ নির্ণয়ে বিলম্বের কারণে জটিলতা বেড়ে মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ছে। এই তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যানগত খুঁত নয়—এটি স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে থাকা বাস্তব বৈষম্যের একটি প্রতিফলন, যা নীতিনির্ধারণে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।সরকারি পর্যায়ে সাড়া দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। প্রধানমন্ত্রী দেশজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন, যেখানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা স্বেচ্ছাসেবক, বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্ট কর্মীদের সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও গতিশীল ও সমন্বিত করার নির্দেশনা জারি করেছে। এসব পদক্ষেপ ইতিবাচক, তবে বাস্তবতা হলো—এই সক্রিয়তা প্রতিবারই আসে সংক্রমণ শীর্ষে পৌঁছানোর পর, প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি হিসেবে নয়।সংখ্যাগুলো একত্র করলে একটি স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়—আগামী দুই মাস, বিশেষত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর, বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য নির্ধারক সময়। এই সময়ে পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা কেবল হাসপাতালের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে মশার প্রজননস্থল কতটা ধ্বংস করা যাচ্ছে, শহর ও গ্রামজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে কতটা কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা যাচ্ছে তার ওপর। বাড়ির আঙিনা, ছাদের টব, নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা করানো এবং বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের মতো সাধারণ সতর্কতাগুলোই এখন সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা।গত তিন বছরের তথ্য-উপাত্ত একটি বার্তাই বারবার দিচ্ছে—ডেঙ্গু আর কোনো এককালীন মহামারি নয়, এটি বাংলাদেশের বার্ষিক স্বাস্থ্যচিত্রের স্থায়ী অংশ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে যদি আমরা মৌসুমভিত্তিক প্রতিক্রিয়ার বদলে বছরজুড়ে প্রতিরোধমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে প্রতিবছরই সংখ্যাগুলো নতুন রেকর্ড ছুঁয়ে যাবে—আর তার মূল্য দিতে হবে মানুষের প্রাণ দিয়েই। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]

সমস্যা কি ব্যাটারিচালিত রিকশায় নাকি পরিকল্পনায়?

ঢাকার রাস্তায় যানজট নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু যানজটের চরিত্র বদলেছে। আগে যেখানে বাস, প্রাইভেট কার, সিএনজি, রিকশা ও মোটরসাইকেল নিয়ে মূলত প্রতিযোগিতা ছিল, এখন সেখানে যোগ হয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের বিশাল বহর। তারা কখনো প্রধান সড়কে উঠে আসছে, কখনো হঠাৎ থেমে যাত্রী তুলছে, কখনো ইউটার্ন নিচ্ছে, আবার কখনো ফুটপাতের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে। ফলে রাস্তার শৃঙ্খলা আরও দুর্বল হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।এখন তাই ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু পরিবহনের বিষয় নয়। এটি হয়ে উঠেছে নগর পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান, সড়ক নিরাপত্তা, রাজস্ব এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।দেশে গণপরিবহন পর্যাপ্ত নয়। শহরের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে অনেক সময় বাস পাওয়া যায় না। বড় বাস অলিগলিতে ঢুকতে পারে না। গ্রাম, উপজেলা কিংবা ছোট শহরে তো আধুনিক গণপরিবহনের সুযোগ আরও সীমিত। ফলে মানুষের প্রয়োজন থেকেই ছোট যানবাহনের বাজার তৈরি হয়েছে। যেখানে বাস যায় না, সেখানে রিকশা যায়। যেখানে রিকশায় দূরত্ব বেশি, সেখানে ইজিবাইক যায়। যেখানে যাত্রী কম, সেখানে বড় বাস চালানো লাভজনক নয়, কিন্তু ছোট যানবাহন চলতে পারে।অর্থাৎ ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু যানজট তৈরি করেনি। আমাদের দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থার শূণ্যতাও পূরণ করেছে।সমস্যা অন্য জায়গায়। প্রয়োজনের কারণে একটি পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার পরও আমরা সেটিকে পরিকল্পনার মধ্যে আনিনি। যানবাহন বাড়তে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়নি। চালকরা গাড়ি চালাচ্ছেন, কিন্তু প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। গাড়ি তৈরি হচ্ছে, কিন্তু উৎপাদনের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে, কিন্তু চার্জিং স্টেশন কোথায় এবং কীভাবে পরিচালিত হবে, তারও পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ নেই।সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, দেশে ঠিক কতগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে, সেটিও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ। অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাবে দেশে ই-থ্রি-হুইলারের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। শুধু ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ২০ লাখ। সংখ্যার এই পার্থক্যকে ছোট বিষয় মনে করার কারণ নেই। যে খাতে কয়েক মিলিয়ন যানবাহন চলছে, সেই খাতের সঠিক পরিসংখ্যানই যদি রাষ্ট্রের কাছে না থাকে, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করবে কীভাবে?আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অনেক সময় কোনো একটি বিষয়কে অবজ্ঞা করতে করতে সেটিকে বড় হতে দেয়। যখন সেটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেটিকে সমস্যা হিসেবে আবিষ্কার করে। এরপর শুরু হয় অভিযান, উচ্ছেদ, নিষেধাজ্ঞা এবং নতুন নীতিমালা। কিন্তু যে জায়গা থেকে সমস্যাটি তৈরি হয়েছে, সেই উৎসে খুব কমই যাওয়া হয়।ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রেও যদি শুধু চালকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়, তাহলে সমস্যার খুব সামান্য অংশই ধরা পড়বে।একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার পেছনে আছে চালক, মালিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, স্থানীয় কারখানা, বডি নির্মাতা, ব্যাটারি বিক্রেতা, চার্জিং স্টেশন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি পুরো ইনফরমাল অর্থনীতি। এই পুরো ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে শুধু রাস্তা থেকে রিকশা সরানো অনেকটা নদীর ওপরের পানি সরিয়ে নদীর উৎস বন্ধ করার চেষ্টা করার মতো।ঢাকার যানজটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তার যে কোনো স্থানে হঠাৎ থামলেই হয়তো বড় কোনো সমস্যা মনে হয় না। কিন্তু এমন শত শত যানবাহন যখন একই সময়ে নিজেদের মতো করে যাত্রী ওঠানামা করায়, ইউটার্ন নেয় এবং প্রধান সড়কে ঢোকে, তখন পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ে। একটি ছোট অনিয়ম তখন বড় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।আরেকটি সমস্যা হলো, ঢাকার সড়কগুলোতে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। বাসের নিজস্ব রুট, রিকশার নিজস্ব চলাচল, মোটরসাইকেলের আলাদা গতি এবং প্রাইভেট কারের আলাদা বন্দোবস্ত প্রয়োজন। এর সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু শহরকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা তৈরি হয়নি।ফলে একই রাস্তা সবাই ব্যবহার করছে, কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে সমন্বয় করে চলছে না।এটি শুধু যানজটের কারণ নয়, সড়ক নিরাপত্তারও বড় সমস্যা। বেশিরভাগ চালকের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। অনেক যানবাহনের ফিটনেস সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই। অনেক গাড়ি স্থানীয়ভাবে তৈরি বা পরিবর্তন করা হচ্ছে। যাত্রী বহনের ক্ষমতা, ব্রেক, আলো, ব্যাটারি এবং অন্যান্য নিরাপত্তা উপকরণের মানও সব ক্ষেত্রে এক নয়।এই অবস্থায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে, সেটিই স্বাভাবিক।তবে ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় সমস্যা সম্ভবত রাস্তা নয়, বিদ্যুৎ।সাধারণত মধ্যরাতের পর বিদ্যুতের চাহিদা কমে আসার কথা। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা দেখছেন, প্রত্যাশিত হারে চাহিদা কমছে না। তাদের ধারণা, বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক রাতের বেলায় চার্জ দেওয়ার কারণে এই চাহিদা থেকে যাচ্ছে।সিপিডির হিসাবে, ই-থ্রি-হুইলার খাত দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করছে। এর পরিমাণ প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট। একটি পরিবহন খাতের জন্য এটি ছোট কোনো সংখ্যা নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এখন এমন একটি বড় ব্যবহারকারী তৈরি হয়েছে, যাকে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ পরিকল্পনার মূল আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।আরও বড় সমস্যা হলো চার্জিং ব্যবস্থা।সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। এর বিপরীতে অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬। এই পরিসংখ্যান সত্য হলে বিষয়টি শুধু বিদ্যুৎ চুরির নয়। এটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রমাণ।এই অবৈধ চার্জিং ব্যবস্থার কারণে সরকার প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে সিপিডি জানিয়েছে। অর্থাৎ একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ছে, বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে এবং সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।এত বড় একটি ব্যবস্থা এতদিন কীভাবে অদৃশ্য থাকল?কয়েকটি অবৈধ দোকান বা চার্জিং পয়েন্ট একদিনে ৪৮ হাজারে পৌঁছায় না। ধীরে ধীরে তারা তৈরি হয়। মানুষ ব্যবহার করে। স্থানীয়ভাবে অনুমতি বা সমঝোতা তৈরি হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ আসে। ব্যবসা চলে। তারপর একসময় সংখ্যাটি এত বড় হয় যে রাষ্ট্রের নজরে পড়ে।এ কারণেই শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না।সরকার এখন ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন, লাইসেন্স, নির্দিষ্ট রুট, জিপিএস, জিও-ফেন্সিং এবং উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করছে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। ঢাকাকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে নির্দিষ্ট রঙ ও নম্বরের মাধ্যমে যানবাহন পরিচালনার পরিকল্পনাও কার্যকর হতে পারে। প্রধান সড়ক থেকে এসব যানবাহন সরিয়ে ফিডার রুটে চালানোর উদ্যোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ।কিন্তু পরিকল্পনা কাগজে থাকলে কোনো লাভ নেই।বাংলাদেশে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগের অভাব নেই। অভাব রয়েছে নিয়মিত ও সমানভাবে তা বাস্তবায়নের। একজন রিকশাচালককে আটক করা বা তার গাড়ি জব্দ করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু অনুমোদনহীন কারখানা বন্ধ করা, অবৈধ যন্ত্রাংশের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা, অবৈধ চার্জিং স্টেশন বন্ধ করা এবং এসবের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা অনেক কঠিন।রাষ্ট্র যদি শুধু রাস্তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির ওপর আইন প্রয়োগ করে, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ নয়, সেটি লোক দেখানো আইনের প্রয়োগ মাত্র।ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোন মডেলের গাড়ি তৈরি হবে, কতজন যাত্রী বহন করতে পারবে, ব্যাটারির মান কী হবে, ব্রেক ও আলো কেমন হবে, এসব নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি গাড়ির নিবন্ধন থাকতে হবে। চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ফিটনেস পরীক্ষা ছাড়া কোনো যানবাহন রাস্তায় চলতে দেওয়া উচিত নয়।চার্জিং ব্যবস্থাকেও বৈধ করতে হবে। প্রতিটি চার্জিং স্টেশনকে নিবন্ধনের আওতায় এনে বিদ্যুতের আলাদা হিসাব রাখা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট সময়ে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে বিদ্যুৎ চুরি কমবে এবং সরকার জানতে পারবে এই খাতে আসলে কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে।ব্যাটারিচালিত রিকশাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার বদলে এটিকে গণপরিবহনের অংশ করা যেতে পারে। বড় বাস প্রধান সড়কে চলবে, আর ব্যাটারিচালিত ছোট যানবাহন আবাসিক এলাকা ও অলিগলি থেকে যাত্রী এনে বাস, মেট্রোরেল বা অন্যান্য বড় পরিবহনের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে। এতে এগুলো মূল গণপরিবহনের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহায়ক হতে পারে।এ ধরনের ব্যবস্থা হলে একজন যাত্রীকে পুরো যাত্রার জন্য রিকশার ওপর নির্ভর করতে হবে না। বাস বা মেট্রোরেল হবে মূল পরিবহন, আর ছোট বৈদ্যুতিক যানবাহন হবে ছোট দূরত্বের বাহন। তখন একটি বিশৃঙ্খল পরিবহন খাত ধীরে ধীরে একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে।ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ও আমাদের ভাবতে হবে। ব্যাটারি শেষ হয়ে হলে সেটি কোথায় যায়? নিম্নমানের ব্যাটারি, ব্যবহৃত ব্যাটারি এবং সেগুলোর বর্জ্য ভবিষ্যতে পরিবেশের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই শুধু গাড়ি নিবন্ধন করলেই হবে না। ব্যাটারি উৎপাদন, ব্যবহার, পরিবর্তন এবং পুনর্ব্যবহারের জন্যও নীতিমালা প্রয়োজন।শেষ পর্যন্ত লড়াইটা ব্যাটারিচালিত রিকশার সঙ্গে নয়। লড়াইটা আমাদের পরিকল্পনাহীনতার সঙ্গে। কয়েক মিলিয়ন ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে বোঝা হিসেবে না দেখে একটি নিয়ন্ত্রিত, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। তবে তার জন্য প্রয়োজন শুধু অভিযান নয়, তথ্য; শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, নীতি; শুধু নীতি নয়, বাস্তবায়ন।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রভাষক, ডিপার্টমেন্ট অব ইংলিশ অ্যান্ড মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ, আইইউবিএটি]

ভিডিও আরও দেখুন

মেসির ৯৯তম গোলেও জয় পেল না মায়ামি

লিওনেল মেসির দারুণ এক পারফরম্যান্সের পরও জয়ের দেখা পেল না ইন্টার মায়ামি। ইস্টার্ন কনফারেন্সের শীর্ষ দল ন্যাশভিল এসসির বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোলে নাটকীয় ২-২ ব্যবধানে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে ইন্টার মায়ামিকে।শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাতে নু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচের শুরুতেই পিছিয়ে পড়ে মায়ামি। ম্যাচের শুরুতে স্যাম সারিজের গোলে এগিয়ে যায় ন্যাশভিল। এরপর মেসির নেওয়া কর্নার কিক প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার রিড বেকার-হোয়াইটিংয়ের গায়ে লেগে আত্মঘাতী গোল হলে সমতায় ফেরে সফরকারীরা।দ্বিতীয়ার্ধের ষাট মিনিটের মাথায় রদ্রিগো দে পলের বাড়ানো বল ধরে প্রায় ২০ গজ দূর থেকে নিচু শটে চমৎকার এক গোল করেন মেসি। এই গোলেই জয়ের সুবাতাস পাচ্ছিল মায়ামি। এটি ছিল মায়ামির গোলাপি জার্সিতে মেসির ৯৯তম গোল। তবে ম্যাচের যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে রক্ষণভাগের ভুল মার্কিংয়ের সুযোগ নিয়ে সারিজ তার দ্বিতীয় গোলটি করলে জয় হাতছাড়া হয় গিলের্মো হয়েসের দলের।এই ড্রয়ের পরও ২৫ ম্যাচে ৪৫ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট তালিকার দ্বিতীয় স্থান ধরে রেখেছে ইন্টার মায়ামি। তবে শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে ড্র করায় শীর্ষ দল ন্যাশভিলের সঙ্গে পয়েন্ট ব্যবধান কমানোর সুযোগ হাতছাড়া করল তারা।

মেসির ৯৯তম গোলেও জয় পেল না মায়ামি