সংবাদ
শনিবার থেকে তিন মাসের ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান

শনিবার থেকে তিন মাসের ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান

ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় আগামী তিন মাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করে দেশব্যাপী বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামী শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) এই তিন মাসব্যাপী বিশেষ অভিযানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় সংক্রান্ত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি মোস্তফা জুলফিকার হাসান গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।সভায় প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কেবল গতানুগতিক মশক নিধন কার্যক্রমের ওপর এককভাবে নির্ভর করা যাবে না। এর পরিবর্তে সার্বিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সর্বসাধারণের মধ্যে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।এই লক্ষে স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঠপর্যায়ে সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেন তিনি।নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, মহানগর এলাকায় সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এবং জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকরা এই পুরো কার্যক্রমের সমন্বয় করবেন। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) স্থানীয় কার্যক্রম পরিচালনার মূল দায়িত্বে থাকবেন। এই জনসচেতনতামূলক অভিযানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি বাংলাদেশ স্কাউটস, বিএনসিসি, গার্ল গাইডস, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক এবং স্কুল-কলেজের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেবেন। প্রতি শনিবার এই স্বেচ্ছাসেবক ও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সরাসরি অংশ নেবেন এবং এডিস মশার প্রজননস্থলগুলো চিহ্নিত করবেন।মাঠপর্যায়ের অভিযানের পাশাপাশি গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানোর ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, টেলিভিশনে জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করতে হবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া এই মহামারী রোধ করা সম্ভব নয়।নিজ নিজ বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে ডেঙ্গু মোকাবিলায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। উক্ত সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
৩৫ মিনিট আগে

মতামতমতামত

খাদ্যে ভেজাল: অজ্ঞতা, অভ্যাস নাকি লোভ?

বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল নতুন কোনো সমস্যা নয়। কখনো মসলায় অননুমোদিত রং, কখনো নিম্নমানের কাঁচামালকে উন্নতমানের বলে বিক্রি, কখনো খাবারের রং, গঠন বা বাহ্যিক সৌন্দর্য পরিবর্তনের জন্য অননুমোদিত রাসায়নিকের ব্যবহার—বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম আমাদের সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জিলাপি, মুড়ি, গুড়সহ কিছু খাদ্যে ‘হাইড্রোজ’ নামে পরিচিত রাসায়নিক ব্যবহারের খবর বিষয়টিকে আবারও আলোচনায় এনেছে। অভিযান হচ্ছে, জরিমানা হচ্ছে, সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এসব ঘটনার মধ্যেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—একজন মানুষ কেন অন্য মানুষের খাবারে এমন কিছু মেশাবেন, যা সেখানে থাকার কথা নয়? তিনি কি জানেন না, নাকি জেনেও করেন? আর জেনেও করলে কীভাবে একটি অন্যায় কাজ ধীরে ধীরে তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে?প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। খাদ্যে ভেজাল দেওয়াকে বাংলাদেশের মানুষের কোনো ‘মানসিক সমস্যা’ বা বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। খাদ্য প্রতারণা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই ঘটে। এখানে আচরণগত বা মনস্তাত্ত্বিক বিষয় বলতে কোনো মানসিক রোগ বোঝানো হচ্ছে না। বরং মানুষ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, অন্যের আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়, লাভ ও ঝুঁকির মধ্যে তুলনা করে, নিজের ভুলের পক্ষে যুক্তি তৈরি করে এবং একই ভুল বারবার করতে করতে একসময় সেটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়—সেই প্রক্রিয়াকে বোঝানো হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কোন পরিস্থিতি কিছু মানুষের মধ্যে এমন আচরণ তৈরি করতে এবং টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে?সাম্প্রতিক আলোচিত ‘হাইড্রোজ’ বলতে সাধারণত Sodium dithionite বা Sodium hydrosulfite নামে পরিচিত একটি রাসায়নিক পদার্থকে বোঝানো হয়। এটি একটি শক্তিশালী বিজারক ও বিরঞ্জক পদার্থ এবং বিভিন্ন শিল্পে এর ব্যবহার রয়েছে। অথচ খাবারকে অস্বাভাবিক সাদা, উজ্জ্বল বা বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় করার উদ্দেশ্যে এর অপব্যবহারের অভিযোগ বাংলাদেশে রয়েছে। এখানেই প্রশ্ন আসে—একজন মুড়ি প্রস্তুতকারক কেন তার মুড়িকে অস্বাভাবিক সাদা করতে চাইবেন? একজন গুড় উৎপাদক কেন গুড়ের স্বাভাবিক রং পরিবর্তন করবেন? একজন মিষ্টি প্রস্তুতকারক কেন এমন একটি রাসায়নিক ব্যবহার করবেন, যার খাদ্যে থাকার কথা নয়?এর প্রথম উত্তর হতে পারে—অজ্ঞতা। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাদ্যখাতের বড় একটি অংশে আনুষ্ঠানিক খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় রাস্তার খাবার বিক্রেতাদের বড় অংশের খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকার চিত্র উঠে এসেছে। ফলে খাদ্যমানের রাসায়নিক আর শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকের পার্থক্য, কোন খাদ্য-সংযোজনী অনুমোদিত, কোনটি নয়, কতটুকু ব্যবহার করা যায় কিংবা ভুল রাসায়নিক ব্যবহারে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এসব বিষয়ে অনেকের পর্যাপ্ত ধারণা নাও থাকতে পারে।একজন নতুন কারিগরের কথা ভাবা যাক। তিনি একটি মুড়ির কারখানায় কাজ শিখতে গেলেন। সেখানে দেখলেন অভিজ্ঞ কারিগর একটি বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। পাশের কারখানাতেও একই পদ্ধতি চলছে। জানতে চাইলে তাকে বলা হলো, “এটা দিলে মুড়ি সুন্দর হয়, আমরা তো বহু বছর ধরে এভাবেই করছি।” নতুন কর্মী হয়তো আর প্রশ্ন করলেন না—পদার্থটি আসলে কী, এটি খাদ্যে ব্যবহারের অনুমতি আছে কি না কিংবা এর নিরাপদ বিকল্প কী। তার কাছে সেটিই হয়ে গেল শেখা পদ্ধতি। কয়েক বছর পর তিনিই হয়তো আরেকজনকে একই পদ্ধতি শেখাবেন।এভাবেই একটি ভুল পদ্ধতি একজন থেকে আরেকজনের কাছে যেতে যেতে একসময় ‘প্রচলিত পদ্ধতি’ হয়ে উঠতে পারে। অথচ কোনো কাজ বহু বছর ধরে করা হচ্ছে বলেই সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক বা নিরাপদ হয়ে যায় না।কিন্তু অজ্ঞতা দিয়ে পুরো সমস্যাটি ব্যাখ্যা করা যায় না। খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—মানুষ যা জানে, বাস্তবে সবসময় তা অনুসরণ করে না। অর্থাৎ জানা এবং মানার মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার নিয়ম সম্পর্কে ধারণা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে সেই নিয়ম অনুসরণ না করার ঘটনা দেখা যায়। তাই শুধু তথ্য দিলেই মানুষের আচরণ পরিবর্তিত হবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়।মানুষ সামাজিক জীব। আশপাশের মানুষ যা করছে, সেটিকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা আমাদের মধ্যে রয়েছে। একটি বাজারে যদি দশজন উৎপাদকের মধ্যে আটজন একই অননুমোদিত পদ্ধতি অনুসরণ করেন, বাকি দুজনের ওপরও সেই পদ্ধতি অনুসরণের চাপ তৈরি হতে পারে। তখন একটি অত্যন্ত পরিচিত যুক্তি সামনে আসে—“সবাই তো করছে।”সবাই যখন করছে, নিশ্চয় খুব খারাপ নয়। এত বছর ধরে চলছে, সমস্যা হলে এত দিনে হতো। আমি একা নিয়ম মেনে কী লাভ? এই ধরনের চিন্তা ব্যক্তির নিজের দায়িত্ববোধকে দুর্বল করতে পারে। ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের দায় গোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে যায়।এর সঙ্গে যখন ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা যুক্ত হয়, তখন চাপ আরও বাড়ে। একজন ব্যবসায়ী দেখলেন পাশের দোকানের মুড়ি বেশি সাদা বলে বেশি বিক্রি হচ্ছে। অন্যের গুড় বেশি উজ্জ্বল বলে ক্রেতা সেটিকেই উন্নতমানের মনে করছেন। তার স্বাভাবিক পণ্য দেখতে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয়। তখন তার সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে—নিয়ম মেনে বাজার হারাবেন, নাকি অন্যদের মতো করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবেন?এখানেই খাদ্যে ভেজালের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রণোদনা যুক্ত হয়। নিম্নমানের কাঁচামালকে উন্নত দেখানো, উৎপাদন খরচ কমানো, পণ্যের বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানো, বিক্রি বাড়ানো কিংবা বেশি মূল্য পাওয়ার সুযোগ থাকলে একজন দুর্বল নৈতিকতার ব্যবসায়ীর কাছে অনিয়ম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। সিদ্ধান্তটি তখন শুধু “এটি ঠিক না ভুল”—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয়—“এতে আমার কত লাভ হবে?”এরপর আসে মানুষের নিজের ঝুঁকিকে ছোট করে দেখার প্রবণতা। কেউ হয়তো জানেন কাজটি পুরোপুরি ঠিক নয়, কিন্তু নিজেকে বোঝাতে শুরু করেন—“আমি তো খুব সামান্য দিচ্ছি”, “একটু দিলে কী আর হবে”, “অন্যরা আমার চেয়েও বেশি দেয়”, “এত বছর মানুষ খাচ্ছে, কিছু তো হয়নি।”এসব বক্তব্য বৈজ্ঞানিক ঝুঁকি নিরূপণ নয়। এগুলো নিজের আচরণকে নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার মানসিক উপায়। বিশেষ করে কোনো অনিরাপদ কাজের ক্ষতি সঙ্গে সঙ্গে চোখে না পড়লে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হতে পারে। আজ একটি অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করা হলো, কাল কোনো অভিযোগ এল না। পরদিন আবার ব্যবহার করা হলো। কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর সেই ব্যক্তির কাছে কাজটি আর অস্বাভাবিক বলে মনে নাও হতে পারে।এভাবেই শুরু হয় সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তন—অন্যায়ের স্বাভাবিকীকরণ। প্রথমবার একটি ভুল কাজ করার সময় মানুষের মনে দ্বিধা থাকতে পারে। দ্বিতীয়বার সেই দ্বিধা কিছুটা কমে। একই কাজ বারবার করতে করতে সেটি পরিচিত অভ্যাসে পরিণত হয়। একসময় সেই ব্যক্তিই নতুন কর্মীকে বলেন, “আমরা তো সবসময় এভাবেই করি।” তখন অতীতের অভ্যাসই যেন কাজটির সঠিকতার প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিজের ভুলের পক্ষে নৈতিক যুক্তি তৈরি করা। মানুষ সাধারণত নিজেকে অসৎ মানুষ হিসেবে দেখতে চায় না। তাই ভুল কাজ করলেও নিজের কাছে সেটিকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য নানা ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারে—“ক্রেতাই তো এমন পণ্য চায়”, “সাদা না হলে মুড়ি বিক্রি হয় না”, “উজ্জ্বল না হলে গুড় কেউ কিনবে না”, “আমি বন্ধ করলেও অন্যরা তো বন্ধ করবে না”, “এভাবে না করলে ব্যবসায় লাভ থাকবে না।”এভাবে নিজের সিদ্ধান্তের দায় কখনো ক্রেতা, কখনো প্রতিযোগী, কখনো বাজারের ওপর সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু একজন খাদ্য উৎপাদক তার পণ্যে কী ব্যবহার করছেন, সেই দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তারই।তবে ভোক্তার ভূমিকাও উপেক্ষা করা যায় না। আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করা দরকার—আমরা কেন ধবধবে সাদা মুড়িকে ভালো মুড়ি মনে করি? কেন অস্বাভাবিক উজ্জ্বল গুড়কে বেশি বিশুদ্ধ ভাবি? কেন অতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙের মিষ্টি আমাদের বেশি আকর্ষণ করে?প্রাকৃতিক খাদ্যের নিজস্ব রং, গন্ধ, স্বাদ ও গঠন রয়েছে এবং তাতে স্বাভাবিক তারতম্য থাকতেই পারে। সব গুড় একই রঙের হবে না। সব মুড়ি বরফের মতো সাদা হওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি পণ্য অস্বাভাবিক সুন্দর দেখালেই সেটি বেশি নিরাপদ বা উন্নতমানের—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই।কিন্তু ভোক্তা যদি বাহ্যিক সৌন্দর্যকে গুণমানের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখেন, বাজার সেই চাহিদার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবে। ক্রেতা অস্বাভাবিক সাদা পণ্য পছন্দ করেন, উৎপাদক আরও সাদা করার উপায় খোঁজেন, সেই পণ্য বেশি বিক্রি হয়, অন্য উৎপাদকও তা অনুসরণ করেন। একসময় অস্বাভাবিক চেহারাই আমাদের কাছে ‘স্বাভাবিক ভালো মান’ হয়ে উঠতে পারে।অবশ্য ভোক্তার পছন্দ কোনোভাবেই খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার বৈধতা তৈরি করে না। একজন ক্রেতা সুন্দর পণ্য চাইতে পারেন; তার অর্থ এই নয় যে উৎপাদক অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু ভেজালের বাজার কেন তৈরি হয় এবং কেন টিকে থাকে, সেটি বুঝতে হলে ভোক্তার প্রত্যাশাকেও আলোচনায় আনতে হবে।এরপর আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ধরা পড়ার সম্ভাবনা। আইন কত কঠোর, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আইন ভাঙলে বাস্তবে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কতটুকু, সেটিও মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। একজন ব্যবসায়ী যদি মনে করেন অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করে তিনি নিয়মিত বাড়তি লাভ করতে পারবেন, অথচ তার পণ্যের নমুনা পরীক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, তাহলে তার কাছে অনিয়মটি ‘লাভজনক ঝুঁকি’ বলে মনে হতে পারে।তাই শুধু বড় অঙ্কের জরিমানা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি, যাতে অনিয়ম করলে ধরা পড়ার সম্ভাবনাটিও বাস্তব বলে মনে হয়। কোন খাবারে কোন ভেজাল বেশি হচ্ছে, কোন এলাকায় সমস্যা বেশি, কোন মৌসুমে নির্দিষ্ট অনিয়ম বাড়ছে এবং কোন রাসায়নিক খাদ্য উৎপাদকের কাছে যাচ্ছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে নজরদারি পরিচালনা করা প্রয়োজন।হাইড্রোজের মতো শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকের ক্ষেত্রে শুধু শেষের মুড়ি প্রস্তুতকারক, গুড় উৎপাদক বা মিষ্টির দোকানকে জরিমানা করলেই সমস্যার মূল উৎস বন্ধ হবে না। দেখতে হবে রাসায়নিকটি কোথা থেকে আসছে, কে বিক্রি করছে, কে কিনছে এবং খাদ্য উৎপাদকের কাছে কীভাবে পৌঁছাচ্ছে। অর্থাৎ শেষের দোকান থেকে শুরু করে রাসায়নিকের উৎস পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার অনুসরণযোগ্যতা প্রয়োজন।এই জায়গাতেই খাদ্যবিজ্ঞানী ও খাদ্যপ্রযুক্তিবিদদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যে ভেজালের সব সমস্যার সমাধান শুধু আইন প্রয়োগ করে সম্ভব নয়। অনেক সময় একজন ক্ষুদ্র উৎপাদক একটি অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করেন একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত উদ্দেশ্যে—মুড়ি আরও সাদা করা, গুড়ের রং হালকা করা, মিষ্টির গঠন ভালো রাখা, পণ্যের স্বাদ উন্নত করা কিংবা বেশি সময় ভালো রাখার জন্য। তাকে শুধু বলা হলো, “এটি ব্যবহার করা যাবে না”—তাতে সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়। একই সঙ্গে তাকে বলতে হবে—তাহলে নিরাপদভাবে কাজটি কীভাবে করা যাবে?এখানেই খাদ্যবিজ্ঞানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। যদি মুড়ির রং বা গঠন সমস্যা হয়, তাহলে কাঁচামালের মান, ধানের জাত, ভিজিয়ে রাখার সময়, তাপমাত্রা, শুকানো ও ভাজার প্রক্রিয়া পরীক্ষা করে নিরাপদ উপায়ে কাঙ্ক্ষিত গুণমান অর্জনের পথ বের করা যেতে পারে। গুড়ের ক্ষেত্রে রস সংগ্রহের স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি, দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ছাঁকন ও জ্বাল দেওয়ার পদ্ধতি উন্নত করে রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ থাকতে পারে। মিষ্টি, বেকারি ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ক্ষেত্রেও সঠিক কাঁচামাল, অনুমোদিত খাদ্য-সংযোজনী এবং উপযুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে নিরাপদ বিকল্প তৈরি করা সম্ভব।এখানে নীতিটি হওয়া উচিত—“নিষেধের সঙ্গে বিকল্পও দিতে হবে।”একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে বলা হলো হাইড্রোজ ব্যবহার করবেন না, কিন্তু হাইড্রোজ ছাড়া কীভাবে তার পণ্যের গ্রহণযোগ্য রং, স্বাদ বা গঠন বজায় রাখা যাবে তা শেখানো হলো না—তাহলে তার পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। খাদ্যবিজ্ঞানীর কাজ সেই প্রযুক্তিগত ব্যবধানটি পূরণ করা।খাদ্যবিজ্ঞানীর আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো জটিল খাদ্যবিজ্ঞান ও আইনকে সাধারণ উৎপাদকের ভাষায় পৌঁছে দেওয়া। একজন ক্ষুদ্র মুড়ি প্রস্তুতকারকের Sodium dithionite-এর জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া জানার প্রয়োজন নেই। তার জানা প্রয়োজন—কোনটি ব্যবহার করা যাবে না, কেন যাবে না এবং তার পরিবর্তে তিনি কী করবেন। একইভাবে খাদ্য-সংযোজনীর অনুমোদিত ব্যবহার, খাদ্যমানের ও শিল্পমানের রাসায়নিকের পার্থক্য, পরিচ্ছন্নতা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ, জীবাণু নিয়ন্ত্রণ ও মোড়কজাতকরণের মৌলিক বিষয়গুলো হাতে-কলমে শেখানো প্রয়োজন।বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, খাদ্যশিল্প এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র উৎপাদকদের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতা তৈরি করা গেলে গবেষণাগারের জ্ঞান সরাসরি বাজারের সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করা সম্ভব। খাদ্যবিজ্ঞানীর কাজ তখন শুধু নমুনায় ভেজাল শনাক্ত করা থাকবে না; বরং ভেজাল দেওয়ার প্রয়োজনটাই কমিয়ে আনা হবে। কোনো উৎপাদক যদি নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রহণযোগ্য খরচে ভালো রং, স্বাদ, গঠন ও সংরক্ষণকাল অর্জন করতে পারেন, তাহলে অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহারের প্রণোদনাও কমবে।বাংলাদেশে তাই খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের একটি কার্যকর দর্শন হতে পারে—আইন বলবে কী করা যাবে না, আর খাদ্যবিজ্ঞান দেখাবে নিরাপদভাবে কীভাবে করা যাবে।সবকিছু মিলিয়ে খাদ্যে ভেজালের পেছনের ধারাবাহিকতাটি অনেকটা এমন—অজ্ঞতা থেকে ভুল পদ্ধতি শেখা, অন্যকে দেখে সেটি গ্রহণ করা, “সবাই করছে” বলে নিজেকে বোঝানো, ছোট অনিয়ম দিয়ে শুরু করা, তাৎক্ষণিক ক্ষতি দেখতে না পাওয়া, একই কাজ বারবার করা, সেখান থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়া, নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি তৈরি করা এবং ধরা পড়ার আশঙ্কা কম মনে করতে করতে একসময় অনিয়মকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া।এই চক্র ভাঙতে হলে যিনি জানেন না তাকে শিক্ষা দিতে হবে, যিনি ভুল পদ্ধতি শিখেছেন তাকে সঠিক পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দিতে হবে, ভোক্তাকে প্রাকৃতিক খাদ্যের স্বাভাবিক রং ও গঠন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং সৎ ব্যবসায়ী যেন নিয়ম মেনে চলার কারণে বাজারে পিছিয়ে না পড়েন, সেটিও দেখতে হবে। আর যিনি সবকিছু জানার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে আর্থিক লাভের জন্য মানুষের খাবারে অননুমোদিত পদার্থ ব্যবহার করেন, তার ক্ষেত্রে কার্যকর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই।সবশেষে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার সংস্কৃতিতে। একজন খাদ্য ব্যবসায়ীর মনে যদি প্রধান প্রশ্ন হয়—“এটা করলে আমি ধরা পড়ব কি না?”, তাহলে তার আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সবসময় একজন পরিদর্শকের প্রয়োজন হবে। কিন্তু প্রশ্নটি যদি হয়—“এই খাবারটি যদি আমার নিজের সন্তান বা পরিবারের কাউকে খাওয়াতে হয়, আমি কি একইভাবে তৈরি করব?”—তাহলে খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিবেক ও সামাজিক দায়িত্বও যুক্ত হয়।বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল তাই শুধু অজ্ঞতার সমস্যা নয়, আবার শুধু লোভের সমস্যাও নয়। এটি অজ্ঞতা, ভুল শিক্ষা, সামাজিক অনুকরণ, অর্থনৈতিক প্রণোদনা, ভোক্তার প্রত্যাশা, নিজের ঝুঁকিকে ছোট করে দেখা, নিজের ভুলের পক্ষে যুক্তি তৈরি এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সম্মিলিত ফল। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত—শিক্ষা, খাদ্যবিজ্ঞান, নিরাপদ প্রযুক্তি, দায়িত্বশীল ব্যবসা, সচেতন ভোক্তা, নিয়মিত নজরদারি এবং কার্যকর আইন প্রয়োগকে একই সঙ্গে কাজ করতে হবে।কারণ অন্যায় যখন বারবার ঘটে, আশপাশের সবাই সেটি করতে থাকে, বাজারে তার পুরস্কার পাওয়া যায় এবং ধরা পড়ার আশঙ্কা কম থাকে—তখন একসময় সেই অন্যায়ই স্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে। খাদ্য নিরাপত্তায় আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সম্ভবত সেখানেই—অন্যায়কে কখনোই স্বাভাবিক হয়ে উঠতে না দেওয়া।[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

প্রশ্ন করতে শেখাই আসল শিক্ষা

একদিন একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক বোর্ডে লিখলেন, “বাংলাদেশে বন্যা হয় কেন?” সবাই চুপ। শিক্ষক বললেন, “বইয়ে যে উত্তর আছে, সেটিই লিখবে।” একজন শিক্ষার্থী হাত তুলে বলল, “স্যার, আমাদের এলাকায় তো প্রতিবছর বন্যা হয়। কিন্তু বন্যার পানি এলে আমাদের স্কুল বন্ধ হয়ে যায় কেন?” শিক্ষক কিছুক্ষণ থামলেন। আরেকজন বলল, “আমাদের বাড়ির পাশে খালটি ভরাট হয়ে গেছে। এটা কি বন্যার কারণ হতে পারে?” আরেকজন বলল, “বন্যা শুধু দুর্যোগ, নাকি এর সঙ্গে মানুষের কাজও জড়িত?”হঠাৎ একটি সাধারণ প্রশ্ন বদলে গেল অনেকগুলো প্রশ্নে। শ্রেণিকক্ষও বদলে গেল। বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে আলোচনা চলে গেল শিক্ষার্থীদের জীবনে। এই মুহূর্তটিই পাওলো ফ্রেইরের দর্শনের প্রাণ। শিক্ষা শুধু শিক্ষক যা জানেন তা শিক্ষার্থীর মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া নয়। শিক্ষা হলো মানুষকে নিজের চারপাশকে দেখতে, প্রশ্ন করতে, বুঝতে, নিজের মত প্রকাশ করতে এবং প্রয়োজন হলে পরিবর্তনের পথ খুঁজতে শেখানো।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দর্শন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের জগতে বাস করে না। তারা এমন এক বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে ওঠে যেখানে পরিবার, অর্থনীতি, সামাজিক প্রত্যাশা, পরীক্ষার চাপ, ভবিষ্যৎ পেশা, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবী প্রতিদিন তাদের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। তাই আজকের শিক্ষার কাজ শুধু “সঠিক উত্তর” শেখানো নয়; বরং শিক্ষার্থীকে এমন মানসিক শক্তি দেওয়া, যাতে সে অনিশ্চয়তার মধ্যেও শান্তভাবে চিন্তা করতে পারে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে গড়ে তুলতে পারে।পাওলো ফ্রেইরে এই জায়গাতেই অসাধারণ। তিনি শিক্ষার্থীকে খালি পাত্র মনে করেননি। তার কাছে শিক্ষার্থী একজন মানুষ, যার নিজস্ব অভিজ্ঞতা আছে, প্রশ্ন আছে, অনুভূতি আছে, চিন্তা আছে। শিক্ষকও শুধু বক্তা নন। শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে জ্ঞান অনুসন্ধানের যাত্রায় অংশ নেন। অর্থাৎ শিক্ষক বলবেন না, “আমি জানি, তুমি জানো না।” বরং তিনি এমন পরিবেশ তৈরি করবেন যেখানে দুজনেই বলতে পারেন, “চলো, আমরা বিষয়টি বুঝে দেখি।”এখানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী উত্তর দিতে ভয় পায়। কারণ ভুল উত্তর দিলে হাসাহাসি হতে পারে, শিক্ষক বকা দিতে পারেন, সহপাঠী উপহাস করতে পারে কিংবা পরীক্ষায় নম্বর কমে যেতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করাও বন্ধ করে দেয়। অথচ প্রশ্ন না করার শিক্ষা কখনো গভীর শিক্ষা হতে পারে না।ফ্রেইরের দর্শন এই ভয় কমাতে সাহায্য করে। শিক্ষক যদি বলেন, “তোমার উত্তর ভুল হলেও সমস্যা নেই। তুমি কেন এমন মনে করছ, সেটা বলো”, তাহলে শিক্ষার্থীর মনে নিরাপত্তা তৈরি হয়। সে বুঝতে পারে, ভুল করা মানেই ব্যর্থ হওয়া নয়। ভুল থেকে শেখাও শিক্ষার অংশ।এই মানসিক শান্তির বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু যদি সারাক্ষণ মনে করে, “আমাকে অবশ্যই সঠিক উত্তর দিতে হবে”, তাহলে তার মধ্যে শেখার আনন্দের বদলে ভয় তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি সে জানে, “আমি প্রশ্ন করতে পারি, না জানলে বলতে পারি, ভুল করলে আবার চেষ্টা করতে পারি”, তাহলে শেখা হয়ে ওঠে আনন্দের বিষয়। ফ্রেইরের সংলাপভিত্তিক শিক্ষা তাই শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন ঘটায় না; এটি শ্রেণিকক্ষে সম্মান, নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।ধরা যাক, শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন, “ভালো শিক্ষার্থী কাকে বলে?” প্রচলিত উত্তর হতে পারে, যে নিয়মিত পড়ে, পরীক্ষায় ভালো করে এবং শিক্ষকের কথা শোনে। কিন্তু শিক্ষক যদি আরও প্রশ্ন করেন, “যে শিক্ষার্থী অন্যায় দেখলে প্রশ্ন করে, সে কি ভালো শিক্ষার্থী?” তখন চিন্তার নতুন দরজা খুলবে। কেউ বলবে, “হ্যাঁ।” কেউ বলবে, “কী ধরনের প্রশ্ন তার ওপর নির্ভর করে।” কেউ বলবে, “প্রশ্ন করার আগে বিষয়টি জানতে হবে।” তখন শিক্ষার্থীরা বুঝতে শিখবে যে ভালো শিক্ষা মানে শুধু অনেক তথ্য জানা নয়; যুক্তিসহ চিন্তা করাও শিক্ষা।বাংলাদেশের জন্য ফ্রেইরের দর্শনের প্রথম বড় প্রয়োজন তাই মুখস্থ থেকে চিন্তার দিকে যাওয়া।একজন শিক্ষার্থী যদি মুখস্থ করে, “গণতন্ত্র হলো জনগণের শাসন”, তাহলে সে একটি সংজ্ঞা জানে। কিন্তু শিক্ষক যদি প্রশ্ন করেন, “বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মতামতের কোনো মূল্য থাকা কি গণতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত?” তখন শিক্ষার্থী নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে ভাবতে শুরু করবে। শ্রেণিকক্ষে হয়তো একটি ছোট নির্বাচন আয়োজন করা হলো। শিক্ষার্থীরা প্রার্থী হলো, প্রচার করল, ভোট দিল, ফলাফল মেনে নিল। এরপর আলোচনা হলো, “পরাজিত প্রার্থীকে সম্মান করা কেন প্রয়োজন?” তখন গণতন্ত্র আর বইয়ের সংজ্ঞা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে জীবন্ত অভিজ্ঞতা।দ্বিতীয় বড় প্রয়োজন হলো বাস্তব জীবনকে শিক্ষার অংশ করা।বাংলাদেশের একজন কৃষকের সন্তান যখন কৃষি বিষয়ে পড়ে, তার নিজের পরিবারের অভিজ্ঞতা একটি মূল্যবান জ্ঞান। উপকূলের শিক্ষার্থী যখন লবণাক্ততার কথা বলে, হাওরের শিক্ষার্থী যখন বন্যার কথা বলে, নদীভাঙন এলাকার শিক্ষার্থী যখন ঘর হারানোর অভিজ্ঞতা বলে, তখন এগুলোকে “পাঠের বাইরের বিষয়” মনে করলে আমরা শিক্ষার বড় একটি সম্পদ হারাই।একটি হাওর বিদ্যালয়ে জলবায়ু পরিবর্তন পড়ানো হচ্ছে। শিক্ষক বইয়ের সংজ্ঞা পড়ানোর পর বললেন, “তোমাদের এলাকায় বর্ষার সময় গত কয়েক বছরে কী পরিবর্তন দেখেছ?” শিক্ষার্থীরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলল। কেউ বলল আগে পানি আসত নির্দিষ্ট সময়ে, এখন সময় বদলে গেছে। কেউ বলল বিদ্যালয়ে যাতায়াত কঠিন হয়। কেউ বলল কৃষিকাজের সময়সূচি বদলে যায়। শিক্ষক তখন বললেন, “এসব তথ্য কীভাবে যাচাই করবে?” শিক্ষার্থীরা তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করল।এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষার্থী শুধু উত্তর গ্রহণ করছে না; সে নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।তৃতীয় প্রয়োজন হলো প্রশ্ন করার সংস্কৃতি তৈরি করা।আমাদের শ্রেণিকক্ষে অনেক সময় শিক্ষক প্রশ্ন করেন, কিন্তু শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জন্য আলাদা জায়গা থাকে না। ফ্রেইরের দর্শন এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিক্ষার্থীর প্রশ্নকে শেখার সূচনা হিসেবে দেখা হয়।প্রতিটি ক্লাসে শিক্ষক চাইলে একটি “আজকের প্রশ্ন” রাখতে পারেন। যেমন, বিজ্ঞান ক্লাসে, “গাছ আমাদের জন্য অক্সিজেন দেয়, কিন্তু রাতে কী ঘটে?” ইতিহাসে, “একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটার আগে সাধারণ মানুষের জীবনে কী ঘটছিল?” সমাজবিজ্ঞানে, “আইন থাকলেই কি সামাজিক সমস্যা শেষ হয়ে যায়?” বাংলা ক্লাসে, “একটি গল্প আমাদের নিজের সমাজ সম্পর্কে কী ভাবতে শেখায়?”এই প্রশ্নগুলো শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহল সৃষ্টি করবে। কৌতূহল থেকে অনুসন্ধান, অনুসন্ধান থেকে জ্ঞান, আর জ্ঞান থেকে বিচারবোধ তৈরি হতে পারে।চতুর্থ প্রয়োজন হলো শিক্ষার্থীর নিজের মতকে সম্মান করা।একজন শিক্ষার্থী হয়তো বলল, “আমি মনে করি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিক্ষার্থীদের জন্য উপকারী।” অন্যজন বলল, “আমি মনে করি এটি ক্ষতিকর।” শিক্ষক যদি বলেন, “কে ঠিক?” তাহলে আলোচনা দ্রুত একটি পক্ষ জেতানোর প্রতিযোগিতায় পরিণত হবে। কিন্তু শিক্ষক যদি বলেন, “তোমরা দুজনেই তোমাদের মতের পক্ষে প্রমাণ দাও”, তাহলে চিন্তার মান বদলে যাবে।শিক্ষার্থীরা শিখবে, শুধু মত থাকলেই হয় না; মতের পক্ষে কারণ ও প্রমাণও দরকার। একই সঙ্গে তারা বুঝবে, অন্যের মত আলাদা হলেই সে শত্রু নয়।এটি বাংলাদেশের সামাজিক জীবনের জন্যও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শিক্ষা। কারণ মতভেদকে আমরা অনেক সময় বিরোধ হিসেবে দেখি। বিদ্যালয় যদি শিক্ষার্থীকে শেখায়, “তোমার সঙ্গে আমার মত আলাদা হতে পারে, কিন্তু আমরা পরস্পরকে সম্মান করব”, তাহলে শ্রেণিকক্ষ থেকেই সহনশীল নাগরিকত্বের চর্চা শুরু হবে।পঞ্চম প্রয়োজন হলো শিক্ষার্থীকে নিজের জীবনের সমস্যার সমাধান খুঁজতে শেখানো।ধরা যাক, একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাচ্ছে। শিক্ষক শুধু বললেন, “নিয়মিত স্কুলে আসতে হবে।” এতে হয়তো সাময়িকভাবে সমস্যা কমবে। কিন্তু ফ্রেইরীয় পদ্ধতিতে শিক্ষক প্রশ্ন করবেন, “কেন অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত আসে না?”শিক্ষার্থীরা দল গঠন করবে। তারা সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলবে। কেউ হয়তো বলবে, যাতায়াত সমস্যা। কেউ বলবে পরিবারের কাজ করতে হয়। কেউ বলবে পাঠ বুঝতে অসুবিধা হয়। কেউ বলবে বিদ্যালয়ে ক্লাস আনন্দদায়ক নয়। তখন সমস্যাটিকে শুধু “অমনোযোগী শিক্ষার্থী” হিসেবে দেখা হবে না; বরং সমস্যার বিভিন্ন কারণ খুঁজে দেখা হবে।এখানেই শিক্ষার মানবিকতা।ষষ্ঠ প্রয়োজন হলো শিক্ষককে নতুনভাবে দেখা।ফ্রেইরের দর্শনে শিক্ষক দুর্বল হয়ে যান না; বরং আরও দক্ষ হয়ে ওঠেন। কারণ শিক্ষককে শুধু ভালো বক্তা হলেই চলে না। তাকে ভালো প্রশ্ন তৈরি করতে হবে, শিক্ষার্থীর কথা শুনতে হবে, ভুল ধারণা শনাক্ত করতে হবে, প্রমাণ চাইতে হবে, ভিন্ন মতকে জায়গা দিতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আলোচনাকে সঠিক দিকে পরিচালিত করতে হবে।অর্থাৎ শিক্ষক হবেন এমন একজন পথপ্রদর্শক, যিনি শিক্ষার্থীর হয়ে পথ হাঁটবেন না; বরং শিক্ষার্থীকে নিজের পথ খুঁজে নিতে সাহায্য করবেন।সপ্তম প্রয়োজন হলো প্রযুক্তির যুগে স্বাধীন চিন্তা রক্ষা করা।আজ শিক্ষার্থীর হাতে বিপুল তথ্য। কয়েক সেকেন্ডে সে উত্তর পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু তথ্য পাওয়া আর সত্য জানা এক বিষয় নয়। একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা কোনো উত্তর দিলেই তা সঠিক হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার মানুষ কোনো দাবি করলেই তা সত্য হয়ে যায় না।তাই শিক্ষক যদি বলেন, “উত্তরটি মুখস্থ করো”, শিক্ষার্থী তথ্যের ভোক্তা হয়ে থাকবে। কিন্তু যদি বলেন, “তথ্যটি কোথা থেকে এসেছে? প্রমাণ কী? অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে কি?” তখন শিক্ষার্থী তথ্য যাচাই করতে শিখবে। ফ্রেইরের সমালোচনামূলক চেতনার সঙ্গে আধুনিক তথ্যযুগের এই প্রয়োজনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।তবে ফ্রেইরের দর্শন প্রয়োগের অর্থ এই নয় যে শিক্ষক আর কিছু শেখাবেন না বা বইয়ের প্রয়োজন নেই। এটি একটি ভুল ধারণা। জ্ঞান, পাঠ্যবই, শিক্ষক এবং সরাসরি নির্দেশনা সবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এগুলো যেন শিক্ষার্থীর চিন্তার জায়গা দখল না করে। একজন দক্ষ শিক্ষক প্রথমে প্রয়োজনীয় জ্ঞান দেবেন, তারপর সেই জ্ঞান নিয়ে শিক্ষার্থীকে ভাবতে দেবেন, প্রশ্ন করতে দেবেন এবং বাস্তবে প্রয়োগ করতে দেবেন।অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন জ্ঞান ও চিন্তার সমন্বয়।আর এখানেই ফ্রেইরের দর্শনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি আমাদের শেখান, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল একজন ভালো পরীক্ষার্থী তৈরি করা নয়; একজন সচেতন মানুষ তৈরি করা। যে মানুষ নিজের জীবনকে বুঝতে পারে, অন্যের জীবনকে সম্মান করতে পারে, সমস্যার কারণ খুঁজতে পারে এবং নিজের অবস্থান যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারে।আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসিক শান্তির জন্যও এই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি শিশুকে সব প্রশ্নের উত্তর এখনই জানতে হবে না। তাকে জানতে হবে, না জানা স্বাভাবিক। ভুল করা স্বাভাবিক। প্রশ্ন করা স্বাভাবিক। নিজের মত পরিবর্তন করাও স্বাভাবিক। এই মানসিক স্বাধীনতা শেখার আনন্দ ফিরিয়ে আনতে পারে।শেষ পর্যন্ত শিক্ষা এমন হওয়া উচিত নয় যেখানে শিক্ষক বলেন, “আমি যা বলেছি, সেটিই শেষ কথা।” বরং এমন হওয়া উচিত যেখানে শিক্ষক বলেন, “আমি তোমাকে একটি ধারণা দিলাম; এবার তুমি ভেবে দেখো, প্রশ্ন করো, প্রমাণ খুঁজে দেখো এবং নিজের সিদ্ধান্ত তৈরি করো।”বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু কতজন শিক্ষার্থী উচ্চ নম্বর পেল তার ওপর নয়; বরং কতজন তরুণ যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারল, মতভেদকে সম্মান করতে পারল, ভুল থেকে শিখতে পারল, সমস্যার সমাধান খুঁজতে পারল এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারল তার ওপর।পাওলো ফ্রেইরের দর্শন তাই আমাদের সামনে একটি সহজ কিন্তু গভীর আহ্বান রাখে: শিশুর মাথা উত্তর দিয়ে ভরে দেওয়ার আগে তার মনে প্রশ্নের জানালা খুলে দিন।কারণ উত্তর মুখস্থ করা মানুষকে পরীক্ষায় সফল করতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন করতে শেখা মানুষকে জীবনের জন্য প্রস্তুত করে। আর যে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে, সেখানে শুধু জ্ঞান জন্ম নেয় না; জন্ম নেয় আত্মবিশ্বাস, সহনশীলতা, যুক্তিবোধ এবং মানসিক স্বাধীনতা।সত্যিকারের শিক্ষা তখনই শুরু হয়, যখন শিক্ষার্থী ভয় না পেয়ে বলতে পারে, “আমি জানি না, কিন্তু আমি জানতে চাই।” সেই “জানতে চাই” থেকেই নতুন চিন্তার জন্ম। আর নতুন চিন্তার মানুষই পারে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণ করতে।[লেখক: প্রশিক্ষক ও সহকারী অধ্যাপক, সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, ময়মনসিংহ]

টার্নওভার কর: রাজস্ব সুরক্ষা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার বাস্তবতা

রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি রাজস্ব, আর রাজস্ব আহরণের প্রধান উৎস কর। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য করের বিকল্প নেই। তবে একটি কার্যকর করব্যবস্থার সাফল্য শুধু কত রাজস্ব আদায় হলো, তার ওপর নির্ভর করে না, বরং সেটি কতটা ন্যায়সংগত, বাস্তবসম্মত এবং করদাতার অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তার ওপরও নির্ভর করে। এই প্রেক্ষাপটে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ এবং অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে আনা সংশোধনী নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কর প্রশাসনের দৃষ্টিতে এটি ন্যূনতম রাজস্ব নিশ্চিত করার একটি কার্যকর ব্যবস্থা হলেও অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর কাছে এটি বাড়তি আর্থিক চাপের কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩-এ টার্নওভার করের বিধান রয়েছে। অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে সংশোধিত ধারা ১৬৩(৬) অনুযায়ী, উপধারা (৩) অনুসারে নির্ধারিত কর যদি নির্ধারিত টার্নওভার করের চেয়ে কম হয়, তাহলে ব্যবসা বা পেশার মোট গ্রস প্রাপ্তির ওপর নির্ধারিত হারে টার্নওভার কর পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, আইন যেসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করেছে, সেখানে প্রকৃত মুনাফার পরিবর্তে মোট বিক্রয় বা গ্রস প্রাপ্তিই কর নির্ধারণের ভিত্তি হবে।সংশোধিত বিধান অনুযায়ী তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারকের ক্ষেত্রে টার্নওভার করের হার ৩ শতাংশ, কার্বনেটেড ও মিষ্টি পানীয় প্রস্তুতকারকের ক্ষেত্রে ২.৫ শতাংশ, মোবাইল ফোন অপারেটর ও এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১.৫ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থা কর্তৃক সার, বীজ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আমদানি ও বিক্রয়, কমিশন ব্যবসা, ডেলিভারি অর্ডার ব্যবসা এবং মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসাকে এই বিধানের বাইরে রাখা হয়েছে।এই বিধানের পেছনে সরকারের উদ্দেশ্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মুনাফা নির্ধারণ করা কঠিন হয়। কেউ কেউ সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করেন না, আবার কেউ আয় গোপন বা অতিরঞ্জিত ব্যয় দেখিয়ে করযোগ্য আয় কমিয়ে ফেলেন। ফলে ন্যূনতম রাজস্ব নিশ্চিত করা এবং কর ফাঁকি প্রতিরোধের লক্ষ্যে টার্নওভারভিত্তিক করের বিধান রাখা হয়েছে। কর প্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার একটি উপায়।তবে বাস্তব ব্যবসায়িক পরিবেশে এর প্রভাব সব ক্ষেত্রে একরকম নয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা সীমিত মূলধন নিয়ে পরিচালিত হয়। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ ব্যাংক সুদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে অনেক ব্যবসা খুব কম মুনাফায় কিংবা লোকসানে পরিচালিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃত লাভের পরিবর্তে টার্নওভারের ওপর কর নির্ধারণ অনেক উদ্যোক্তার জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।ধরা যাক, রহিম ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বছরে মোট বিক্রয় ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু পণ্য ক্রয়, দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, পরিবহন ব্যয়, ব্যাংক ঋণের সুদ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় পরিশোধের পর দেখা গেল প্রতিষ্ঠানটি ১ লাখ টাকা লোকসানে রয়েছে। সাধারণ আয়কর ব্যবস্থায় করযোগ্য আয় না থাকায় তার কর দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু ধারা ১৬৩-এর আওতায় প্রতিষ্ঠানটি যদি ১ শতাংশ টার্নওভার করের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে তাকে ৫০ হাজার টাকা টার্নওভার কর পরিশোধ করতে হতে পারে। অর্থাৎ, প্রকৃত মুনাফা না থাকলেও করের দায় সৃষ্টি হবে।আরেকটি উদাহরণ ধরা যাক। একটি মুদি দোকানের বার্ষিক বিক্রয় ১ কোটি টাকা। বছরের শেষে ব্যবসায়ীর প্রকৃত মুনাফা হলো মাত্র ২ লাখ টাকা। যদি টার্নওভারের ওপর ১ শতাংশ কর প্রযোজ্য হয়, তাহলে তাকে ১ লাখ টাকা কর দিতে হবে। অর্থাৎ, অর্জিত মুনাফার অর্ধেকই কর হিসেবে চলে যাবে। এতে ব্যবসার কার্যকর মূলধন কমে যাবে এবং ভবিষ্যতে ব্যবসা সম্প্রসারণের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।অবশ্য টার্নওভার করকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলাও সঠিক হবে না। ন্যূনতম কর নিশ্চিত করা, কর ফাঁকি প্রতিরোধ করা এবং কর প্রশাসনের কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা রয়েছে। তবে কর ফাঁকি রোধের ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যাতে সৎ করদাতা ও প্রকৃত লোকসানগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। করনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রাজস্ব আহরণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি করা।এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকরা প্রকৃত লোকসানে থাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য যুক্তিসঙ্গত রেয়াত, কম মুনাফার ব্যবসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা অথবা নির্দিষ্ট শর্তে টার্নওভার কর পুনর্বিবেচনার সুযোগ বিবেচনা করতে পারেন। একই সঙ্গে ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ, স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদন এবং কার্যকর নিরীক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে প্রকৃত আয় নির্ধারণ সহজ হবে এবং টার্নওভারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রয়োজনও কমে আসবে।বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই করনীতি এমন হওয়া উচিত, যা একদিকে সরকারের রাজস্ব নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা ও সম্প্রসারণে উৎসাহিত করবে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ এবং অর্থ আইন, ২০২৬-এর সংশোধনী নিঃসন্দেহে রাজস্ব সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এর বাস্তব প্রয়োগে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার বাস্তবতা, প্রকৃত লাভ-লোকসান এবং করদাতার আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।করব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন রাষ্ট্র ন্যায্যভাবে রাজস্ব আহরণ করতে পারে এবং সৎ করদাতাও স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত হন। টার্নওভার কর যেন রাজস্ব সুরক্ষার কার্যকর হাতিয়ার হয়, কিন্তু প্রকৃত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য অযৌক্তিক বোঝায় পরিণত না হয়, সেই ভারসাম্য নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সময়ের দাবি।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: আয়কর আইনজীবী]

বিচার না প্রতিশোধ, ন‍্যায‍্যতা ও সুশাসন তো রইলো অধরা!

বিদ্যুৎ সংকটের ফলে তীব্র গরমে ও লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় জনজীবন সম্পূর্ণ বেহাল। অন্যদিকে বাজারের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতিও খুবই উদ্বেগজনক। বেপরোয়াভাবে চলছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন। অন্যদিকে চলছে বেপরোয়া দলবাজি ও চাঁদাবাজি। এই দলবাজরা দলকেও ভয় পায় না। ‘দখলদারিত্বই প্রথম’ — এই নীতি বাস্তবায়নে তারা মরিয়া।তবে আমাদের বিমানভাগ্য চমৎকার! তীব্র জ্বালানি সংকটের এই সময়ে আপাতত ১৪টি বোয়িং আসছে মার্কিন মুলুক থেকে। এরপরে আরো আসবে, আসতেই থাকবে। দেশবাসীর উপর ‘দয়াপরবশ’ হয়ে এক বাণিজ্য চুক্তি করে মুহাম্মদ ইউনূস বিমানে চড়ার এ ধরনের সুব্যবস্থা করে গেছেন। দেশবাসীর এই উপকার করতে নির্বাচনের তিনদিন আগে দেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি করার বিষয়ে তিনি নাকি বিএনপি, জামায়াত এবং তার নিজের তরুণ তুর্কি দলের সম্মতিও নিয়ে নিয়েছিলেন। সারা দুনিয়াকে অস্থিতিশীল করায় পারঙ্গম ট্রাম্পও গদগদ হয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে এজন্য অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন শীঘ্রই দুজনের সাক্ষাৎ হবে। আর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর তার পোস্টে লিখেছেন, ‘এ সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরেকটি অভূতপূর্ব চুক্তি করেছেন, যেখানে বাংলাদেশ বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তাদের আগের অর্ডারের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি।’ অর্থাৎ আরো আসবে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটে মানুষের বাসায় চুলা জ্বলে না, বিদ্যুতের অভাবে আলো জ্বলে না। অনেকে রাত দুইটা-তিনটার সময় পরবর্তী দিনের রান্না করেন। হাসপাতালের চিকিৎসা চলছে মুঠোফোনের আলোয়। আর আমরা সবাই বোয়িং স্বপ্নে বিভোর!এ দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে জনপরিসরে অস্বস্তি, অস্থিরতা এবং ক্ষোভ বাড়লেও এসব সমস্যার একটা সুরাহা করতে সরকারকে আরো কিছুটা সময় হয়তোবা মানুষ দেবে। তবে অনন্তকাল তো মানুষ অপেক্ষা করবে না। অন্যদিকে দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি না দেখে বিশেষত এ সব বিষয়ে সদিচ্ছার প্রতিফলন না দেখে মানুষ আরো বেশি হতাশ ও উদ্বিগ্ন। মনে রাখা প্রয়োজন জুলাইয়ের কোটা আন্দোলন সরকার উৎখাতের আন্দোলনে পরিণত হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল দীর্ঘ সময় যাবৎ দেশের বুকে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি এবং বিচারহীনতা — যা বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষকেও রাজপথে টেনে আনে।প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন অবশ্য বলেছেন, “গত ছয় মাসে বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ মানবিকতা দেখেছি। একটি বারের জন্য কখনো কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন ঘটেনি।” সরকারি প্রেস ব্রিফিং-এ এমনটা বলাই স্বাভাবিক, এটাই রেওয়াজ। কিন্তু বাস্তবে এ ছয় মাসে বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ইউনূস আমল অপেক্ষা কি কোনো অগ্রগতি আছে? বরং সবকিছু দেখে শুনে মনে হয়, এ সব ক্ষেত্রে ইউনূস আমলের ধারাবাহিকতাই চলছে। একমাত্র ব্যতিক্রম নাগরিক আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করা। তবে তাতে তো আর জনজীবনের সংকট ও আইনের শাসনের যে অভাব তার সুরাহা হবে না।কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের সাথে সম্পর্ক আছে বা ছিল এ ফালতু অভিযোগে গ্রেফতার, আটক তো পূর্বের মতোই অব্যাহত আছে এবং আগের মতোই এখনো জুড়ে দেওয়া হচ্ছে বহুল আলোচিত তথাকথিত খুনের মামলা। পত্রিকায় দেখলাম এক কিশোরগঞ্জ জেলায়ই গত ৫ সেপ্টেম্বর একদিনে (২৪ ঘন্টায়) গড়ে প্রতি ঘন্টায় একজন করে আওয়ামী লীগ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঐ জেলায় গত তিনদিনে মোট ৫৮ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশ্লিষ্ট থানা সমূহে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে যে হাস্যকর খুনের মামলায় বছরের পর বছর রাজনীতিক, সাংবাদিক, অভিনেতা, আমলা, বিচারপতিরা আটক আছেন — এক মামলায় জামিন পেলেও ভিন্ন আরেকটি সাজানো মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয় — ইউনূস আমলের সেই নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত আছে। মানুষ আশা করেছিল নির্বাচিত সরকার আসার পরে এ ধরনের সাজানো খুনের মামলাগুলো প্রত্যাহার ও আইনানুগভাবে নিষ্পত্তি করা হবে। তা না করায় পরিস্থিতি অস্থিতিশীলই থাকছে।প্রবীণ রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেননের নামে ঢাকা শহরের বিভিন্ন থানায় একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারকার্য চালানো হচ্ছে। হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধেও ঢাকা ও কুষ্টিয়ার একাধিক থানায় বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আইসিটিতে ইতোমধ্যে সাজাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সবাই জানে ২০২৪ সালের মন্ত্রিসভায় তারা ছিলেন না, সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে ‘লিপ সার্ভিস’ দেওয়া ছাড়া ভিন্ন কোনো ক্ষমতা জোটের কোনো শরিকদের দীর্ঘদিন যাবৎ ছিল না। শুধুমাত্র নিরবচ্ছিন্নভাবে জামায়াত ও জঙ্গিবাদের কঠোর সমালোচনা করায় এবং জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করায় ইউনূস আমলে তাদেরকে আটক করে খুনের মামলা জুড়ে দেওয়া হয়। বিএনপির সাথে জামায়াতের ক্ষমতাকেন্দ্রিক ঘনিষ্ঠতা থাকায় তারা দু’জনেই কঠোর ভাষায় বিএনপিরও সমালোচনা করতেন। তাই আজ বিএনপি আমলেও তাদের উপর ইউনূসীয় প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ অব্যাহত আছে। আওয়ামী লীগ নেত্রী ডাঃ দীপু মনির বিরুদ্ধে প্রায় ৭০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার সংখ্যার বহর দেখেই বোঝা যায় তিনি আইনের আওতায় নয়, প্রতিশোধের আওতায় আছেন। আইনের সঠিক প্রয়োগ থাকলে এতদিনে অন্তত আসাদুজ্জামান নূর জামিন পেতেন। ঢাকা সহ সারা দেশে হাজারে হাজারে রাজনৈতিক নেতাকর্মী আটক আছেন এবং তাদেরকে জামিনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।এ কথা ঠিক গ্রেপ্তারকৃত অনেকেই জুলাই আন্দোলনে সরকারের কঠোর বলপ্রয়োগ এবং হত্যাযজ্ঞের নিন্দা না করে বরং নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা নেওয়ায়, এ রক্তাক্ত ঘটনার নৈতিক দায় এড়াতে পারবেন না। বিরোধী দলবিহীন একতরফা নির্বাচনে অংশ নিয়ে বা সমর্থন করে বা আয়োজনে সহযোগিতা করে তারা নৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। সেসব ধিকৃত ঘটনার সমালোচনা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনানুগ শাস্তিও জরুরি। তবে মনে রাখা প্রয়োজন ফৌজদারি অপরাধ এবং নৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আওয়ামী শাসনামলকে সমর্থন করা বা আওয়ামী লীগ দলের নেতাকর্মী হওয়া তো ফৌজদারি অপরাধ নয়। ফৌজদারি দায়বদ্ধতা অবশ্যই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই হতে হয় — ঢালাও হত্যা মামলা বা দুদকের নোটিশ ধরিয়ে দিলেই তা প্রমাণিত হয় না।রাজনৈতিক কারণে মামলা, নিবর্তনমূলক আটক এবং আইনের অসম প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে বহুদিন ধরেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০২৪-এ যে তারুণ্যের জাগরণ আমরা দেখেছি তা আমাদের প্রাথমিকভাবে আশ্বস্ত করেছিল যে, বিভাজনের বাংলাদেশকে পেছনে রেখে বৈষম্যমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং সুশাসনের পথে দেশ অগ্রসর হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগে তরুণ নেতৃত্বের একাংশ ধর্মীয় উগ্রবাদীদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে ওঠায় সাধারণ শিক্ষার্থী আর তরুণদের দেয়ালে আঁকা স্বপ্নগুলো হারিয়ে যেতে থাকল এবং শুরুতেই ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক যাত্রা সংকটের সম্মুখীন হয়। মানুষের মনের প্রত্যাশা দুরাশায় পরিণত হয়।তবে নির্বাচনের সময় থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলে আসছিলেন যে, এক উদার গণতান্ত্রিক সমাজ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার জন্য তাদের হাতে ‘প্ল্যান’ রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণে সে সব ‘প্ল্যান’ আর অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা এবং সাম্য, সুবিচার ও সুশাসন অধরাই রয়ে যাচ্ছে। অপরাধ করলে তার শাস্তি হওয়া উচিত। এটা সভ্য সমাজের রীতি। কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এক একটি হত্যা বা হত্যা প্রচেষ্টা মামলায় শতাধিক সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে বছরের পর বছর তাদের জেলে পুরে রাখা অবিচারের নামান্তর। অন্যদিকে কারো কারো ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে প্রথমে মিডিয়া ট্রায়াল, অতঃপর ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য চলছে। এসব দেখে ইতোমধ্যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আইসিটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আর বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায্যতার কোনো লক্ষণ না দেখে টিআইবি যথাযথভাবেই প্রশ্ন উত্থাপন করেছে যে ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের নির্মম ও বহুমাত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার আদৌ কিছু শিখেছে কি না?’(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বাণিজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রই সড়ক পরিবহনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গত এক দশকে মহাসড়ক সম্প্রসারণ, সেতু নির্মাণ, এক্সপ্রেসওয়ে, উড়ালপথ এবং আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়নের মাধ্যমে যোগাযোগ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামোগত এই উন্নয়নের পাশাপাশি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা বারবার সামনে আসে, আর তা হলো সড়ক দুর্ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব কিংবা গুরুতর আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব দুর্ঘটনা কেবল কয়েকটি পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি।সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক ক্ষতিও অত্যন্ত ব্যাপক। দুর্ঘটনায় একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে বা স্থায়ীভাবে পঙ্গু হলে শুধু একটি পরিবার নয়, জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়ে। চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, সম্পদের ক্ষতি, আইনি ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব মিলিয়ে প্রতিবছর বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সমাজের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, শিক্ষার্থী, পথচারী এবং নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেক শিশু তাদের বাবা-মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যায়, আবার অনেক পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও মানবিক সংকট।সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। দুর্ঘটনাকে ভাগ্য বা নিয়তির বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে এটিকে প্রতিরোধযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ বিশ্বের অনেক দেশ সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ, উন্নত প্রকৌশল, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সচেতনতার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশও চাইলে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে।নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সড়কের অবকাঠামো উন্নয়ন। দেশের অনেক মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, ভাঙাচোরা অংশ, অপর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, মানসম্মত সড়কচিহ্ন এবং লেন বিভাজনের অভাব রয়েছে। এসব ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংস্কার করতে হবে। নতুন সড়ক নির্মাণের সময় সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি পথচারীদের জন্য ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস, সাইকেল লেন এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একজন চালকের হাতে শুধু একটি গাড়ি নয়, বহু মানুষের জীবনও অর্পিত থাকে। তাই দক্ষতা যাচাই ছাড়া কোনোভাবেই গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেওয়া উচিত নয়। পেশাদার চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা এবং পুনঃপ্রশিক্ষণ কোর্স চালু করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় টানা গাড়ি চালানোর প্রবণতা বন্ধে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন প্রয়োজন।পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাও সময়ের দাবি। যাত্রী পরিবহনে অতিরিক্ত গতি, প্রতিযোগিতামূলকভাবে যাত্রী ওঠানামা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং অনিয়মিত স্টপেজ ব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। রুট পারমিট, ফিটনেস সনদ, চালকের লাইসেন্স এবং যানবাহনের কারিগরি সক্ষমতা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। গণপরিবহন পরিচালনায় জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে না। সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করতে হবে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব বিবেচনা না করে সমানভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অতিরিক্ত গতি, মাদক বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, মুঠোফোন ব্যবহার, হেলমেট বা সিটবেল্ট ব্যবহার না করা এবং উল্টো পথে চলাচলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।প্রযুক্তির ব্যবহার সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পারে। আধুনিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল, সিসিটিভি ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ, গতিসীমা শনাক্তকারী ক্যামেরা এবং ইলেকট্রনিক জরিমানা ব্যবস্থা সফলভাবে দুর্ঘটনা ও আইন লঙ্ঘন কমিয়েছে। বাংলাদেশেও এসব প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং গবেষণার জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়।সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ট্রাফিক আইন, পথচারীর আচরণ, সাইকেল চালানোর নিয়ম এবং নিরাপদ সড়ক ব্যবহারের শিক্ষা দিতে হবে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম, ট্রাফিক ক্লাব এবং নিরাপদ সড়ক বিষয়ক কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নাগরিক সমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলনের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংগঠন নিরাপদ সড়কের দাবিতে জনসচেতনতা সৃষ্টি, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং নীতিগত সুপারিশ প্রদান করে আসছে। এই ধরনের উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হলে জনসম্পৃক্ততা আরও বৃদ্ধি পাবে। কারণ সড়ক নিরাপত্তা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় সামাজিক আন্দোলনের বিষয়।দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও মৃত্যুহার কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়। দেশের মহাসড়কগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, ট্রমা কেয়ার সেন্টার, জরুরি উদ্ধার ইউনিট এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী নিয়োজিত করতে হবে। দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টাকে স্বর্ণঘণ্টা বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সড়ক দুর্ঘটনাকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বিশ্বের বহু দেশ পরিকল্পিত উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। বাংলাদেশও চাইলে সেই পথ অনুসরণ করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।[লেখক: যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), কেন্দ্রীয় কমিটি]

চিকিৎসাসেবার এক আলোকবর্তিকা

জীবনের চলমানতার মধ্যে অল্পসংখ্যক মানুষ পৃথিবীতে আসেন, যারা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। এই স্বপ্নের মধ্য দিয়ে মানুষকে আলোর পথে নিয়ে আসেন। বাঁচার প্রেরণা জোগান। তেমনই এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম। বারডেম হাসপাতালের বড় স্যার। কতখানি আন্তরিকতা থাকলে একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে বড় স্যার হয়ে উঠতে পারেন, এটাও একটা বিস্ময়।তিনি জন্মেছিলেন আমাদের দেশের অসহায় রোগাক্রান্ত মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে। উপলব্ধি করেছিলেন, রোগ-শোক শুধুমাত্র ব্যক্তি ও পরিবারকে আক্রান্ত করে না, এটি সুন্দর সমাজের প্রতিবন্ধক হিসেবেও কাজ করে। তিনি বলতেন, আর্ত-রুগ্ন মানুষের সেবা করা রাব্বুল আলামীনের খুব পছন্দনীয় কাজ। তাই রোগীর সেবাকে তিনি ইবাদত মনে করতেন। সকাল থেকে রাত অবধি রোগীদের চিন্তায় তিনি মগ্ন থাকতেন। কীভাবে রোগীদের উন্নত সেবা দেওয়া যায়, ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজের উন্নতি ঘটানো যায়, টেকনিশিয়ানদের কীভাবে আরও দক্ষ করে তোলা যায়, এটাই ছিল তার সার্বক্ষণিক চিন্তা। মূলত রোগীর সেবা করাই ছিল তার ধ্যান-ধারণা ও সাধনা।তিনি কখনও টাকার সাধনা করেন নাই। রোগী দেখে টাকা উপার্জনের কথা তিনি ভাবতেই পারতেন না। এই কারণে কখনোই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন নাই। অর্থাৎ চিকিৎসাকে অর্থকরি লাভজনক পেশা হিসেবে দেখেননি।১৯৫৬ সালে ঢাকার সেগুনবাগিচায় ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য তিনি একটি চারা রোপণ করেছিলেন। সেটি আজ বটবৃক্ষে পরিণত হয়ে ডালপালা ছড়িয়েছে। অর্থাৎ দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় এর বিস্তৃতি ঘটেছে। যার ফলে সারা দেশের রোগীরা এর সুফল পাচ্ছে। এই ব্যাপারে তার পরিবারের সদস্যদের অবদান রয়েছে প্রচুর।ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম কম বয়সী ডায়াবেটিক রোগী—যারা ইনসুলিন নির্ভরশীল অর্থাৎ টাইপ ১ ডায়াবেটিক রোগী তাদের জন্য বেশি চিন্তা করতেন। যে বয়সে বাচ্চারা খেলাধুলা, ছুটাছুটি, পড়াশোনা করে, সে বয়সে রোগটি বাধা হয়ে দাঁড়াবে সেটা তিনি মানতে পারতেন না। এইজন্য অভিভাবকদের আশ্বস্ত করতেন যে, যদি ঠিকমতো ডায়াবেটিসের নিয়ম-নীতি মেনে চলা যায়, তাহলে তারাও অন্য বাচ্চাদের মতো স্বাচ্ছন্দ্যে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।তিনি ভাবতেন, একজন রোগীর রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ডাক্তার নয়, এক্ষেত্রে রোগী নিজে, পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। তাই সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। রোগীর প্রতি তার ব্যবহার ছিল পিতৃসুলভ। প্রতিটি রোগীই হয়ে উঠত তার আত্মার আত্মীয়। তিনি তাদের প্রতি এত বেশি সহানুভূতিশীল ও আন্তরিক ছিলেন যে, যে কেউ দেখলে ভাবতেন—উক্ত রোগী বুঝি তার নিকট আত্মীয়।কোনো রোগী তার কাছে আসলে তিনি প্রথমে রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তারপর যথাযথ ব্যবস্থা করে রোগীর সমস্যা সমাধান করে অন্য কাজে মনোনিবেশ করতেন। অথচ আজ এ ধরনের কর্মতৎপরতা একেবারেই অনুপস্থিত। তার সফল কাজের মূলেই ছিল ডায়াবেটিক রোগীর রোগ নিয়ন্ত্রণ করা ও সকলকে সচেতন করা।তিনি প্রতিষ্ঠানের সকলকে বলতেন চিকিৎসাসেবাকে চাকরি হিসেবে না নিয়ে সেবা হিসেবে নিতে হবে। চিকিৎসকেরা রোগীকে ব্যবস্থাপত্র লিখে দেবার পর তিনি জানতে চাইতেন সেই রোগীর নির্দেশিত ওষুধ কেনার সামর্থ্য আছে কিনা। রোগের বাইরেও রোগীর পারিবারিক ইতিহাস জানার আগ্রহ তার বরাবর ছিল। তিনি মনে করতেন রোগীর পারিবারিক অবস্থান জানা থাকলে চিকিৎসা করা সহজ হয়। রোগী যদি ডাক্তারকে বিশ্বাস করে তাহলে রোগীর মনোবল বৃদ্ধি পায় বলে তার ধারণা।রোগাক্রান্ত, অসহায়, আর্ত পীড়িত মানুষ যাতে সুস্থ-কর্মঠ এবং সম্মানের সাথে বাঁচতে পারে সেই লক্ষ্যেই সারাজীবন কাজ করে গেছেন। তিনি নিজে রোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের সুন্দরভাবে রোগের জটিলতাগুলো বুঝিয়ে বলতেন। যাতে রোগী ও পরিবারের সদস্যগণ রোগ নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট হয়। জটিলতাগুলো হলো—অন্ধত্ব, কিডনির রোগ, যক্ষ্মা, হৃদরোগ, পক্ষাঘাত, মাড়ির রোগ, গর্ভপাত ইত্যাদি।তিনি বলতেন রোগীর প্রতি সহানুভূতি থাকাটা বড় কথা নয়, থাকতে হবে সমানুভূতি। রোগীর যন্ত্রণাকে নিজের যন্ত্রণা মনে করলেই সেই সেবক হবে সার্থক ও সফল। তার অভিমত হলো, একজন ব্যবসায়ীর টাকা উপার্জনের নেশা আর একজন ডাক্তারের টাকা উপার্জনের নেশা কখনোই এক হতে পারে না। আবার রোগ ভালো না করে টাকা নেওয়াটাকে তিনি লজ্জাজনক মনে করতেন। একারণেই আজীবনের রোগ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা বিনা পয়সায় করতেন। যাতে রোগীর ব্যয়ভার কিছুটা লাঘব হয়।ডাক্তারদের শিক্ষাদানের সময় বলতেন, প্রতিটি রোগীই তোমার পাঠ্যবই। রোগের সমাধান কল্পে যা তুমি শিখবে সেটাতেই তোমার চিকিৎসাবিদ্যার অনেক জ্ঞান অর্জিত হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি প্রদীপ থেকে শত শত প্রদীপ জ্বালালে যেমন আলো এতটুকু কমে না। তেমনি তোমার শিক্ষার আলো যত বেশি দান করা যাবে ততই মঙ্গল। এতে চারদিক হবে আলোকিত।বারডেম হাসপাতালের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে যদি বেলা ২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে যেতে দেখতেন, তখন তিনি বলতেন, এই যে গন্ডারের মতো ছুটছিস কেন? আগে আমার রোগী, তারপর তোর ঘর সংসার। রোগী চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাবে, এটা তিনি কিছুতেই সহ্য করতেন না। কতদিন এমন হয়েছে—ছুটি হয়েছে, বাড়ির পথ ধরেছি, সেখান থেকে তার ডাকে ফিরে এসেছি। তার সান্নিধ্যে এসে আমাদের মানসিকতা এমনভাবে গড়ে উঠেছিল যে, আমরা এতে কেউ বিরক্ত হতাম না। কর্তব্য মনে করেই ফিরে আসতাম। কখনও মনে হলে তিনি ছুটির দিনেও আমাদের ডেকে পাঠাতেন।তিনি বলতেন, রোগীরা আমার মেহমান। তবে সে বেড়াতে আসেনি, তার কপাল খারাপ, তাই সে আমাদের কাছে এসেছে। আমাদের উচিত তাকে সাহায্য করা। তার ক্ষেত্রে বলা যায়, মহৎ মানুষের হৃদয় আকাশের চাইতে বড় আর সাগরের চাইতে গভীর হয়।তার সময়ে ডায়াবেটিস আছে এবং চাকরি প্রয়োজন, সে সমস্ত ব্যক্তিকে ডায়াবেটিক হাসপাতালে চাকরি দিয়েছেন। এই কারণে অনেক রোগী চিকিৎসা নিতে এসে আমাদের প্রশ্ন করতেন—‘আপনার কি ডায়াবেটিস আছে? শুনেছি ডায়াবেটিস থাকলে সহজেই এখানে চাকরি হয়ে যায়।’ রোগীদের এ ধরনের কথায় লজ্জা পেতাম ঠিকই, কিন্তু এই ভেবে ভালো লাগত যে, তিনি বেকার ডায়াবেটিক রোগীদের কথা ভাবতেন বলেই আজ তারা এখানে চাকরি করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, জীবনকে নতুন করে ভাবতে শিখেছেন।তিনিই প্রথম বলেছেন, নিয়ম-নীতি মেনে মনে চললে ডায়াবেটিস কোনো রোগই নয়। রোগীদের সমস্যা নিরূপণে সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। যাতে কোনো ভুল-ত্রুটি না হয়। তিনি বলতেন, আমরা গরিব হলেও সেবার মান নিম্ন হবে তা হতে পারে না। তিনি রোগীর ব্যবস্থাপত্রে অল্প ওষুধ দেওয়া পছন্দ করতেন।বাংলাদেশের ডাক্তারদের মধ্যে ডা. মো. ইব্রাহিমই প্রথম জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা পেয়েছেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে তিনি একটি বিপ্লবের সূচনা করে গেছেন। যে রোগটি মানুষের অজানা ছিল, চিকিৎসাও ছিল না অথচ রোগটি মানুষের দেহে বাসা বেঁধে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিত। সেই রোগ চিহ্নিত করে তার উপশমের ব্যবস্থা করে দিয়ে মানুষকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পথ বাতলে দিয়েছেন। যদিও এটি সারাজীবনের রোগ তবুও একে নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্মময় জীবনযাপন সম্ভব করে তুলেছিলেন।তার জীবনযাপন প্রণালী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যারা মূর্খ, কোনো কালেই কিছু করবে না, তারাই শুধু বলে অসম্ভব। আসলে অসম্ভব বলে কিছু নেই—থাকতেও পারে না। যদি চেষ্টা থাকে, ইচ্ছা থাকে, মানুষ সে লক্ষ্যে পৌঁছুবেই। যত বাধা-বিপত্তিই আসুক না কেন, শাহবাগের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ১৬ তলা বিশিষ্ট বারডেম হাসপাতালের ইমারতটি তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।[লেখক: সাবেক চিফ নিউট্রিশন অফিসার ও বিভাগীয় প্রধান, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল এবং সভাপতি, ডায়াবেটিস নিউট্রিশনিস্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ]

নিরাপত্তা জোটে যোগ দেওয়ার আগে চাই স্বার্থের নির্মোহ হিসাব

৭ আগস্ট ২০২৬ সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করেন। চুক্তির মূল শর্ত, তিন দেশের যে কোন একটিতে সশস্ত্র হামলা হলে তা তিন দেশের ওপর হামলা বলে গণ্য হবে। ভিত্তি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হওয়া সৌদি-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। সৌদি বলছে এটি প্রতিরক্ষামূলক, নির্দিষ্ট কোন দেশকে টার্গেট করে নয়। তুরস্ক বলছে এটি ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো, তবে এখনো স্থায়ী কমাণ্ড বা সদর দপ্তর নেই। ওআইসি একে স্বাগত জানিয়েছে এবং মিসর, কাতার, কুয়েতসহ আরও দেশকে যুক্ত করার আলোচনা আছে। এর মধ্যেই তুরস্কে তিন দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের প্রথম বৈঠক হয়েছে। সেখানে যৌথ মহড়া ও প্রযুক্তি সহযোগিতার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।কিন্তু আগ্রহ আর মাঠের বাস্তবতা এক নয়।সম্মিলিত প্রতিরক্ষা মানেই স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা নয়, এটা ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে। ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা করলে পাকিস্তান আমেরিকাকে ভূখণ্ড দিতে বাধ্য হয়েছিল। চুক্তি থাকলেও চুক্তিবদ্ধ দেশগুলো জোটবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে না। ইরান-আমেরিকার যুদ্ধে ন্যাটোর সব সদস্য আমেরিকার পক্ষে একসাথে যুদ্ধে নামেনি ; স্পেন আমেরিকাকে নিজ ভূমি ব্যবহার করতেই দেয়নি। মক্কা চুক্তির ভাষাও একই রকম শর্তসাপেক্ষ। হামলা হলে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে তা পরিস্থিতি অনুযায়ী আলোচনায় ঠিক হবে। অর্থাৎ বাধ্যবাধকতা নমনীয়। নমনীয় নিরাপত্তা মানে রাজনীতির দরকষাকষি, আর দরকষাকষিতে ছোট দেশের পাল্লা হালকা। ইউক্রেনের উদাহরণ সামনে। ন্যাটোর ছায়া চেয়ে ইউক্রেন আজ ধ্বংস দেখছে।এই জোট কার বিরুদ্ধে, সেটাও স্পষ্ট নয়। সৌদির উদ্বেগ ইরান, পাকিস্তানের উদ্বেগ ভারত ও আফগান সীমান্ত, তুরস্কের উদ্বেগ সিরিয়া ও কুর্দি ইস্যু। তিনটি ভিন্ন শত্রু, চুক্তি একটি। গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের সময় এই তিন দেশের যৌথ সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। জর্ডান বরং ইসরায়েলকে বাঁচাতে আকাশ প্রতিরক্ষা চালিয়ে ইরানের সব ক্ষেপনাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করেছে। তাহলে যে জোট ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না, সে জোট মুসলিম বিশ্বের ‘কমন শত্রু’র বিরুদ্ধে কীভাবে লড়বে? আবার তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য। ফলে আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ তার নেই। শেষ পর্যন্ত এই জোটের প্রধান চাপ গিয়ে পড়তে পারে ইরানের ওপর, যা সৌদির রাজনৈতিক অগ্রাধিকার।বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও জটিল। আমরা পানির দেশ, ভারত উজানের। সিন্ধু চুক্তি স্থগিত হওয়ায় পাকিস্তান আজ চাপে। কাল যদি ভারত-পাকিস্তান সংঘাত বাধে, চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে কি পাকিস্তানের পক্ষে যেতে হবে? পাকিস্তান-আফগানিস্তান কয়েক মাস আগেও সংঘর্ষে জড়িয়েছে। তখন কি বাংলাদেশকে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে? মায়ানমার ইস্যুতে চীনের ঘনিষ্ঠ পাকিস্তান কি বাংলাদেশের জন্য ঝাঁপাবে? এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর নেই। কারণ প্রতিটি দেশ নিজের স্বার্থ আগে দেখবে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ নিরাপত্তা চুক্তিতে থেকেও নিজেকে অনিরাপদ ভাবছে বলেই নতুন জোট খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে রক্ষা করতে না পারলে পাকিস্তান-তুরস্ক কীভাবে পারবে?সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অবশ্যই অন্য কোন দেশের অনুমোদননির্ভর হবে না। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নিজের নিরাপত্তা অংশীদার নিজেই নির্ধারণ করার অধিকার রাখে। আমাদের দরকার খাবার, বিদ্যুৎ, পানি, বাণিজ্য ও জলবায়ু নিরাপত্তা। ইরানের তেল আছে, যুদ্ধের পর পুনর্গঠন করতে পারবে। বাংলাদেশের সে সামর্থ্য নেই। চুক্তিবদ্ধ জোটের একটি ভুলের কারণে অবরোধ আরোপ বা বিনিয়োগ প্রত্যাহার হলে তার খেসারত আমাদেরই দিতে হবে। কুয়েত পাকিস্তানের সঙ্গে যেমন চুক্তি করছে, আবার ভারতের সঙ্গেও করছে। এটাই বাস্তব কূটনীতি, ভারসাম্য। একপাক্ষিক সামরিক ছাতায় ঢুকলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবেশীর কাছে ‘ঝুঁকি’ হয়ে উঠব। তখন সীমান্ত, পানি, বিদ্যুৎ, বাণিজ্যে চাপ বাড়বে।যৌথ রক্ষাকবচের নামে সার্বভৌমত্বের ক্ষয়ও হবে। ন্যাটোভুক্ত অনেক দেশে যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটি বসিয়ে খরচ আদায় করে। মক্কা চুক্তিতে যৌথ গবেষণা, ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা বিনিময়ের কথা আছে। তুরস্কের বৈঠকে এর রূপরেখাও ঠিক হয়েছে। শুনতে ভালো, কিন্তু এর মানে ক্রয়-নীতি ও প্রশিক্ষণও সমন্বয়ে চলবে। আমাদের সিদ্ধান্তের জায়গা ছোট হয়ে আসবে। ফারাক্কা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ফোরাম থেকে সরে আসতে হয়েছিল বাইরের চাপে। আবার যদি কোনো জোটের স্বার্থে আমাদের কণ্ঠ চুপ করানো হয়, সেটি হবে দ্বিতীয় ফাঁদ। জোটের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। স্থায়ী কমাণ্ড নেই। সংকটের সময় বসে সিদ্ধান্ত নিতে নিতে দেরি হয়ে যাবে। ‘একজনের ওপর হামলা সবার ওপর’ চালু হলে বাংলাদেশ অকারণে শত্রু বাড়াবে। বন্ধু বাড়াতে গিয়ে শত্রু আমদানি করা সবচেয়ে বড় ভুল।মক্কা চুক্তি তিন দেশের জন্য একটি রাজনৈতিক বার্তা হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি ব্যয়বহুল বিভ্রম। যুদ্ধ আমাদের মিশন নয়, ভিশনও নয়। আমাদের ভিশন স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত। জোটে নাম লেখানোর আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে,-এই চুক্তি আমাদের পেট ভরবে, নাকি পেটের ভাত কেড়ে নেবে? নিরাপত্তা মানে শুধু অস্ত্র নয়। নিরাপত্তা মানে অর্থনীতি, কূটনীতি ও জনগণের আস্থা।আমেরিকার সঙ্গে অসম বাণিজ্য চুক্তির তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। তাই মক্কার ছায়া প্রয়োজন বলেই অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া যাবে না। বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা দিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আদিবাসী নেই! আদিবাসী আছে!

গত ১১ আগস্ট রাজধানী ঢাকায় একটি গোলটেবিল বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের একটিই পরিচয়—আমরা সবাই ‘বাংলাদেশি’। এখানে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই। আমরা সবাই বাংলাদেশের ‘অধিবাসী’। সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে সুরক্ষিত।” তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী সেখানে বলেছেন, “বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এবং অযৌক্তিক। এই আন্তর্জাতিক পরিভাষা ব্যবহারের পেছনে এক ধরনের ‘পূর্বপরিকল্পিত ফাঁদ’ বা ভূরাজনৈতিক এজেন্ডা থাকতে পারে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।”প্রশ্ন হচ্ছে, ‘আদিবাসী’ শব্দটি যদি এতটাই অপ্রাসঙ্গিক ও অযৌক্তিক হয়, তাহলে অতীতে রাষ্ট্র ও রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে এই শব্দের ব্যবহার হলো কীভাবে? বিএনপির নেত্রী ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করে বাণী দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছিলেন, সুযোগ এলে সংবিধান সংশোধন করে আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা, আয়কর আইন ২০২৩, অর্থ আইন ১৯৯৫ এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-সহ বিভিন্ন আইন ও নীতিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণের বিশেষ বিধান রয়েছে।২০২৬ সালের বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘দেশব্যাপী কর্মসংস্থান’ শিরোনামের ‘সমঅধিকার ও অন্তর্ভুক্তি’ অংশে বলা হয়েছে, ‘বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি, হরিজন, তৃতীয় লিঙ্গ, দলিত, আদিবাসী এবং পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি ও বেসরকারি খাতকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে বাস্তবমুখী নীতি প্রণয়ন করা হবে।’ বর্তমান ডেপুটি স্পিকার বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে ও সংসদে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও প্রকৃতি, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র‍্যে সমৃদ্ধ। এই ভূখণ্ডের মাটির সঙ্গে বহু জনগোষ্ঠীর রয়েছে দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্ক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এখানেই বসবাস করে আসছেন। অথচ রাজনৈতিক, আইনি ও সামাজিক এক জটিলতার কারণে আজ এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।কাগজে-কলমে ‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে আপত্তি থাকলেও বাস্তবতার বাংলাদেশে এসব জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পরিভাষায় তাদের ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ ইত্যাদি পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়। এর পর থেকেই পরিচয়ের প্রশ্নে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে—রাজপথে, সেমিনারে, আলোচনা সভায় সর্বত্রই। প্রতিবছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে তারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, সংস্কৃতি ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়, সাহিত্যের পাতায় এবং বাস্তবতার জমিনে ‘আদিবাসী’ পরিচয়টি তাই টিকে আছে।রাষ্ট্রীয় পরিভাষা যা-ই হোক, দেশের গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন এবং ইতিহাস-সংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনায় ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলে ‘আছে’ এবং ‘নাই’-এর এই দোলাচলের পেছনে একটি গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট রয়েছে বলেই মনে হয়। রাষ্ট্রের একটি আশঙ্কা হতে পারে যে, ‘আদিবাসী’ শব্দটির সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক আইন ও অধিকার কাঠামোর আলোকে ভূমি, সংস্কৃতি, স্বায়ত্তশাসনসহ নানা প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসতে পারে। কিন্তু সম্ভাব্য রাজনৈতিক বা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় কি কোনো জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা যায়? জাতীয় ঐক্য রক্ষা এবং নাগরিকের স্বতন্ত্র পরিচয় স্বীকার—এই দুটি বিষয়কে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখারও কোনো কারণ নেই।সাঁওতাল, উরাঁও, কোল, কোডা, মাহালী, রাজোয়াড়, তুরী, সিং, পাহান, মুণ্ডা ও মালপাহাড়িয়ার মতো বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রসীমা প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই বরেন্দ্রভূমি ও সমতল অঞ্চলে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে বসবাস করে আসছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করেছে, যেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত ভূমি ও সংস্কৃতি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধেও বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ অংশ নিয়েছেন; স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাদেরও অবদান রয়েছে। সমতল ও পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সামাজিক রীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনার কাঠামো রয়েছে। অনেকের নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও রয়েছে। ফলে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়কে স্বীকার করা বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈচিত্র‍্যকেই স্বীকার করা।মন্ত্রীদ্বয়ের বক্তব্যের পর আদিবাসী সংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, পরিচয় ও নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অস্বীকার করা ইতিহাস বিকৃতির শামিল। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। বাস্তবতা হলো, শুধু নাম বদলে দিলে মানুষের সংকট বদলে যায় না। সাঁওতাল, উরাঁও, কোল, কোডা, মাহালী, মুণ্ডা, মালপাহাড়িয়া, পাহান, রাজোয়াড় ও তুরীসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ, ভূমি হারানো, ভাষা ও সংস্কৃতি হারানোর মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন—এমন খবর প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে আসে। স্বাধীনতার এত বছর পরও যদি তাদের নিজেদের পরিচয় ও অধিকার নিয়ে লড়াই করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় পরিভাষার বিতর্কের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাদের বাস্তব অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন।রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের ‘আদিবাসী’ বলা হবে, নাকি ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’—এই বিতর্কের একটি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দিক অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, পরিচয়ের প্রশ্নটি মানুষের মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত। একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ভূমির অধিকার, শিক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ, বৈষম্য দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া শুধু পরিভাষা পরিবর্তন করে সমস্যার সমাধান হবে না।বাংলাদেশকে যদি প্রকৃত অর্থেই একটি অসাম্প্রদায়িক, বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে দেশের বৈচিত্র‍্যকে স্বীকার করতেই হবে। জাতীয় পরিচয় সবার জন্য অভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সেই অভিন্ন পরিচয়ের ভেতরেও ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জাতিগত পরিচয়ের বৈচিত্র‍্য থাকতে পারে। তাই ‘আদিবাসী’ শব্দটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে অস্বীকার বা দমন করার পরিবর্তে সংবিধান, আইন, ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আলোকে একটি সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রীয় অবস্থান নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে তাদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই হবে একটি পরিণত, ন্যায়ভিত্তিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের পরিচয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

জ্বালানি সংকট সমাধানে চাই দীর্ঘমেয়াদি পথনকশা

বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। এটি এখন জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন, কৃষি, বিনিয়োগ, নগর উন্নয়ন, পরিবহন, পরিবেশ এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় উন্নয়ন প্রশ্ন।বাংলাদেশের প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, শিল্পখাত ও সরকারের সমন্বয়ে অন্তত আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের একটি বাস্তবসম্মত জাতীয় জ্বালানি পথনকশা তৈরি করা।শুধু উৎপাদন নয়, বিদ্যুৎ ব্যবহারের সময়ও গুরুত্বপূর্ণআমাদের আলোচনায় প্রায়ই প্রশ্ন আসে, দেশে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কখন বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি?দিনের সব সময় বিদ্যুতের চাহিদা সমান নয়। সন্ধ্যায় যখন ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ে, দোকানপাট খোলা থাকে এবং শিল্পকারখানাও উৎপাদনে থাকে, তখন জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়ে যায়। ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল বাড়লে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক যানবাহন চার্জ দেওয়াও নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। তাই সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ও কম চাহিদার সময় অনুযায়ী বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু করা যেতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল চার্জ, কৃষির সেচ পাম্প এবং যেসব শিল্পে সম্ভব, তাদের কিছু কার্যক্রম কম চাহিদার সময়ে স্থানান্তরে আর্থিক সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।কৃষকদের জন্য নির্দিষ্ট কম চাহিদার সময়ে সেচের বিদ্যুতে বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথাও ভাবা যায়। এতে কৃষকের ব্যয় কমবে এবং জাতীয় ব্যবস্থার ওপর চাপও কমবে।একই সঙ্গে দিনের আলোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, ঋতু, মানুষের জীবনযাত্রা, ধর্মীয় কার্যক্রম, ব্যবসা ও পরিবহন বিবেচনায় সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কিছু ব্যবসার সময় মৌসুমভিত্তিক পরিবর্তন করলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয় কি না, তা পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করা যেতে পারে।বড় শিল্পকে জ্বালানি নিরাপত্তার অংশীদার করতে হবেএকটি বড় শিল্পকারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চল বা বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে উঠলে বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তা ও অন্যান্য সরকারি অবকাঠামোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হয়। তাই বড় উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের সময় একটি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা উচিত।বড় শিল্পের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি নির্দিষ্ট অংশ নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ সঞ্চয় বা অন্য গ্রহণযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার বিধান বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো প্রকল্পের কারণে নতুন বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র বা বিতরণ অবকাঠামো প্রয়োজন হলে উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ ও যৌক্তিক নিয়মে সেই ব্যয়ের একটি অংশ বহন করতেও বলা যেতে পারে।অর্থাৎ, যে উন্নয়ন নতুন জ্বালানি চাহিদা সৃষ্টি করবে, তাকে সেই চাহিদা সামাল দেওয়ার ব্যবস্থারও অংশীদার হতে হবে।প্রতি ১০টি বা ২০টি বাড়ির জন্য যৌথ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাবাংলাদেশের জমি সীমিত। তাই শুধু বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, ছাদ ও স্থানীয় পর্যায়ের বিদ্যুৎ উৎপাদনকে গুরুত্ব দিতে হবে।নতুন আবাসিক এলাকায় প্রতি ১০ বা ২০টি বাড়ির জন্য যৌথ সৌরবিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ সঞ্চয়ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে। দিনে উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্থানীয়ভাবে ব্যবহার হবে, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করা যাবে অথবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকলে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় দেওয়া যাবে।মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, গির্জা এবং অন্যান্য উপাসনালয়ের বিপুল ছাদকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। নতুন বড় উপাসনালয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখা এবং পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ অর্থায়নের মাধ্যমে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। একই নীতি বিদ্যালয়, কলেজ, হাসপাতাল, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং সরকারি ভবনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব।প্রয়োজন জাতীয় ‘বিদ্যুৎ ভান্ডার’সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের বড় সীমাবদ্ধতা হলো সব সময় সমান উৎপাদন হয় না। তাই ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ধরে রাখার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বড় ব্যাটারিভিত্তিক বিদ্যুৎ সঞ্চয়কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। চাহিদা কম অথচ উৎপাদন বেশি হলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সেখানে সংরক্ষণ করা হবে। আবার সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদা, হঠাৎ কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়া বা জরুরি পরিস্থিতিতে সেই বিদ্যুৎ জাতীয় ব্যবস্থায় ফেরত দেওয়া যাবে। এগুলো এক ধরনের ‘বিদ্যুৎ ভান্ডার’ হিসেবে কাজ করবে।সরকারের পাশাপাশি যথাযথ নীতিমালার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীকেও এমন সঞ্চয়কেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের কাছেও এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু আমরা কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করি তার ওপর নয়, প্রয়োজনের জন্য কতটা বিদ্যুৎ ধরে রাখতে পারি তার ওপরও নির্ভর করবে।নদী, বৃষ্টি, সূর্য ও মৌসুমি প্রকৃতিকে কাজে লাগাতে হবেবাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। আমাদের নদী, খাল-বিল, হাওর, বৃষ্টিপাত ও মৌসুমি আবহাওয়াকে শুধু দুর্যোগের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। এগুলোকে কীভাবে জ্বালানি ও পানি নিরাপত্তার অংশ করা যায়, তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।সব নদীতে বড় বাঁধ বাস্তবসম্মত নয়। তবে কোথায় ছোট আকারের জলবিদ্যুৎ বা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, তা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা যেতে পারে। উপযুক্ত জলাশয়ে ভাসমান সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা যায়, অবশ্যই মৎস্যসম্পদ, নৌচলাচল, জীববৈচিত্র‍্য ও স্থানীয় জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করে।একইভাবে বর্ষার বিপুল পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা প্রয়োজন। নতুন বড় আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপের পাশাপাশি পানি উত্তোলন ও সরবরাহে ব্যবহৃত বিদ্যুতের চাহিদাও কমবে। নদী, বৃষ্টি, সূর্য ও বাতাসকে শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারযোগ্য জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে।জ্বালানি সাশ্রয়ও এক ধরনের উৎপাদননতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি অপচয় কমানোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিপুল অর্থ, জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু উন্নত ভবন নকশা, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, দক্ষ শীতাতপ ব্যবস্থা, কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী যন্ত্রপাতি এবং উন্নত শিল্পযন্ত্রের মাধ্যমে চাহিদা কমানো অনেক ক্ষেত্রে আরও সাশ্রয়ী। তাই সাশ্রয় করা বিদ্যুৎও এক অর্থে উৎপাদিত বিদ্যুৎ।প্রয়োজন জাতীয় টেকসই জ্বালানি সূচকআমার পিএইচডি গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র জ্বালানি, পরিবেশ ও পানির টেকসই উন্নয়ন সূচক। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় টেকসই জ্বালানি সূচক কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।শুধু কত মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে তা দিয়ে সাফল্য বিচার না করে দেখতে হবে, জ্বালানির কত অংশ নিজস্ব উৎস থেকে আসছে, আমদানিনির্ভরতা কত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ কত, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রকৃত ব্যয় কত, অপচয় কত, বিদ্যুৎ বিভ্রাট কতক্ষণ হচ্ছে এবং সাধারণ পরিবার ও শিল্পের জন্য জ্বালানি কতটা সাশ্রয়ী।যা আমরা নিয়মিত পরিমাপ করি না, তা কার্যকরভাবে উন্নত করাও কঠিন।শেষ কথাবাংলাদেশের প্রয়োজন ২০৩০, ২০৪০ এবং ২০৫০ সালকে সামনে রেখে একটি সমন্বিত জাতীয় জ্বালানি পথনকশা। সেখানে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, সৌর ও বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ সঞ্চয়, বৈদ্যুতিক যানবাহন, কৃষি, শিল্প, পানি এবং জ্বালানি সাশ্রয়কে একই পরিকল্পনায় আনতে হবে।বাংলাদেশ চাইলে বর্তমান সংকট থেকেই ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী পথ তৈরি করতে পারে। প্রয়োজন খণ্ডিত সিদ্ধান্তের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অনুমানের পরিবর্তে তথ্য ও গবেষণা এবং একক প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সরকার, বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ।জ্বালানি শুধু আলো জ্বালানোর বিষয় নয়। এটি কৃষকের উৎপাদন, শিল্পের শক্তি, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, হাসপাতালের নিরাপত্তা, বিনিয়োগের আস্থা, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ভিত্তি। তাই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা আসলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশেরই পরিকল্পনা।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক:ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, অস্ট্রেলিয়ান লোকাল গভর্নমেন্ট; পিএইচডি গবেষক, সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া]

ভিডিও আরও দেখুন

ঘোড়ার পিঠে ঐতিহ্যের গল্প, বিশ্বমঞ্চে যাযাবর সংস্কৃতি

কিরগিজস্তানের আকাশে তখন উৎসবের রং। মাঠজুড়ে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে নানা দেশের প্রতিযোগী, ছুটে চলেছে ঘোড়া, বাজছে লোকবাদ্যের সুর। আধুনিক স্টেডিয়ামের চেনা দৃশ্যের বদলে এখানে খেলাধুলার সঙ্গে মিশে আছে শত শত বছরের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও ইতিহাস। ২০২৬ সালের বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়া (World Nomad Games 2026) তাই নিছক একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি যাযাবর জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার এক অনন্য আয়োজন। ঘোড়সওয়ারি, তীরন্দাজি, কুস্তি কিংবা কোক-বোরুর মতো খেলায় প্রতিযোগিতার উত্তাপ থাকলেও এর গভীরে রয়েছে প্রকৃতি, ঘোড়া ও মানুষের সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস। উদ্বোধনী আয়োজন থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে–এখানে জয়-পরাজয়ের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা। ফলে বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়া একই সঙ্গে ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক ব্যতিক্রমী মিলনমেলা।বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়া বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়া কীবিশ্ব যাযাবর ক্রীড়া হলো বিশ্বের বিভিন্ন যাযাবর জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার একটি বহুজাতিক ক্রীড়া আয়োজন। আধুনিক অলিম্পিক বা অন্যান্য প্রচলিত ক্রীড়া আসরের মতো এর মূল লক্ষ্য শুধু প্রতিযোগিতা নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকে সংরক্ষণ ও বিশ্বব্যাপী পরিচিত করা। ঘোড়সওয়ারি, তীরন্দাজি, কুস্তি, কোক-বোরুর মতো খেলাগুলো এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের লোকসংস্কৃতি, পোশাক, সংগীত ও জীবনযাপনও এখানে বিশেষ গুরুত্ব পায়।২০১৪ সালে কিরগিজস্তানে প্রথমবারের মতো বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়ার আয়োজন করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে এর পরিসর বাড়তে থাকে এবং মধ্য এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণ দেখা যায়। ২০২২ সালে তুরস্ক এবং ২০২৪ সালে কাজাখস্তানে আয়োজনের পর ২০২৬ সালে আবারও কিরগিজস্তানে বসে এই আন্তর্জাতিক আসর। ৩১ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ আসরে ক্রীড়ার পাশাপাশি যাযাবর সভ্যতার ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরা হয়। ফলে বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়া হয়ে উঠেছে এমন এক মঞ্চ, যেখানে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নিজেদের শিকড় ও ঐতিহ্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পান অংশগ্রহণকারী দেশগুলো।২০২৬ সালে কিরগিজস্তানে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়া উদ্বোধনী আয়োজনকিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ষষ্ঠ বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়া। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত বিভিন্ন দেশের ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণ পুরো আয়োজনকে দেয় উৎসবের আবহ। ঘোড়সওয়ার, তীরন্দাজ ও ঐতিহ্যবাহী কুস্তিগিরদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা দিক তুলে ধরেন। মাঠজুড়ে ছিল ঘোড়ার ছুট, লোকজ বাদ্যের সুর এবং রঙিন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।উদ্বোধনী আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল কিরগিজ জাতির ঐতিহ্য ও যাযাবর জীবনধারার নানা উপাদানের উপস্থাপন। ঘোড়া, শিকার, যুদ্ধকৌশল, লোকসংগীত ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় মধ্য এশিয়ার প্রাচীন জীবনযাত্রার গল্প। বিভিন্ন দেশের ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণে উদ্বোধনী প্যারেডও হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক সম্প্রীতির প্রতীক। ২০২৬ সালের এই আসরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন এবং ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকে আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে তুলে ধরেন।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বিভিন্ন মুহূর্ত উদ্বোধন থেকেই বোঝা যায়, এই আয়োজনের উদ্দেশ্য কেবল পদক জেতা নয়। বরং খেলার মধ্য দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে কাছাকাছি নিয়ে আসাই বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়ার বড় বার্তা। খেলা ও প্রতিযোগিতাবিশ্ব যাযাবর ক্রীড়ার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো। আধুনিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পরিচিত মাঠ ও নিয়মের বাইরে এসব খেলায় ফুটে ওঠে যাযাবর জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, শারীরিক সক্ষমতা এবং ঘোড়ার সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক। ২০২৬ সালের আসরে ঘোড়দৌড়, ঘোড়সওয়ারি, তীরন্দাজি, বিভিন্ন ধরনের কুস্তি, শক্তির খেলা ও বুদ্ধির খেলাসহ নানা ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এবারের আসরে ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও ছিল আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত প্রতিযোগিতাগুলোর একটি কোক-বোরু। ঘোড়ার পিঠে চড়ে দুই দলের খেলোয়াড় একটি মাঠে প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে ছাগলের চামড়ায় তৈরি বল পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। খেলাটিতে একই সঙ্গে প্রয়োজন হয় ঘোড়ার নিয়ন্ত্রণ, অসাধারণ শারীরিক শক্তি, গতি ও কৌশল। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়া এবং ঘোড়া সামলে দ্রুত গোলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিটি মুহূর্তেই তৈরি হয় তীব্র উত্তেজনা। ২০২৬ সালের প্রতিযোগিতাতেও কোক-বোরু দর্শকদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল।কোক-বোরুঘোড়দৌড় ও অন্যান্য ঘোড়সওয়ারি প্রতিযোগিতা বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়ার আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ। যাযাবর সমাজে ঘোড়া শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়; জীবনযাপন, শিকার, যুদ্ধ ও সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গেও প্রাণীটির সম্পর্ক গভীর। তাই বিভিন্ন দূরত্বের দৌড়, দ্রুতগতির ঘোড়সওয়ারি এবং ঘোড়ার দক্ষতা যাচাইয়ের খেলাগুলোতে সেই ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন দেখা যায়। ধুলোময় মাঠে পাশাপাশি ছুটে চলা ঘোড়া ও আরোহীদের দৃশ্য পুরো আয়োজনকে দেয় আলাদা মাত্রা। ঘোড়ার পিঠে তীরন্দাজিও দর্শকদের মুগ্ধ করে। ছুটন্ত ঘোড়ার ওপর ভারসাম্য রেখে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে তীর ছোড়া সহজ কোনো কৌশল নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিখুঁত নিশানা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ঘোড়ার গতির সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখার দক্ষতা। এই প্রতিযোগিতায় প্রাচীন যাযাবরদের শিকার ও যুদ্ধকৌশলের স্মৃতিও যেন ফিরে আসে।ঘোড়ার পিঠে তীরন্দাজিকুস্তিও বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আলিশ, কিরগিজ কুরোশ, কাজাখ কুরেসিসহ বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী কুস্তির ধরন এখানে জায়গা পেয়েছে। কোথাও কোমরবন্ধ ধরে প্রতিপক্ষকে মাটিতে ফেলার লড়াই, কোথাও শক্তি ও ভারসাম্যের পরীক্ষা–প্রতিটি খেলায় স্থানীয় সংস্কৃতির আলাদা ছাপ রয়েছে। ফলে একই আসরে বিভিন্ন জাতির কুস্তির কৌশল ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিভিন্ন ধরনের ক্রীড়া প্রতিযোগিতাসব মিলিয়ে বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়ার প্রতিটি প্রতিযোগিতা যেন একটি করে জীবন্ত ইতিহাস। কোথাও ঘোড়ার ক্ষিপ্রতা, কোথাও তীরন্দাজের নিখুঁত নিশানা, আবার কোথাও কুস্তিগিরের শক্তি–সবকিছু মিলিয়ে এই আসর প্রমাণ করে, খেলাধুলা শুধু বিনোদন নয়; একটি জনগোষ্ঠীর জীবন, স্মৃতি ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখারও শক্তিশালী মাধ্যম। যাযাবর সংস্কৃতির প্রদর্শনবিশ্ব যাযাবর ক্রীড়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো–খেলার মাঠের বাইরে গড়ে ওঠা যাযাবর সংস্কৃতির জীবন্ত প্রদর্শনী। কিরগিজস্তানের ইসিক-কুল অঞ্চলের কিরচিন এলাকায় তৈরি করা হয় বিশাল নৃ-সাংস্কৃতিক গ্রাম বা ‘এথনোভিলেজ’। সারি সারি সাদা ইউর্ট বা ঐতিহ্যবাহী গোলাকার তাঁবু, পাহাড়ের পাদদেশে ছড়িয়ে থাকা তাঁবুর শহর এবং সেখানে মানুষের আনাগোনা পুরো আয়োজনকে যেন কয়েক শতাব্দী আগের যাযাবর জনপদে পরিণত করে। ২০২৬ সালের আসরে এই এথনোভিলেজে ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প, জাতীয় খাবার, সংগীত, নৃত্য, আচার-অনুষ্ঠান ও জীবনযাপনের নানা দিক তুলে ধরা হয়। ইউর্টের ভেতরের সাজসজ্জাতেও ছিল স্বাতন্ত্র্য। রঙিন বোনা কাপড়, কারুকাজ করা গালিচা, কাঠের সামগ্রী ও ঐতিহ্যবাহী অলংকরণে ফুটে ওঠে কিরগিজ সংস্কৃতির নান্দনিকতা। বিভিন্ন দেশের কারুশিল্পীরা নিজেদের হাতে তৈরি সামগ্রী প্রদর্শন করেন। কোথাও দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও টুপি, কোথাও পশম ও চামড়ার তৈরি ব্যবহার্য সামগ্রী। ফলে দর্শনার্থীরা শুধু চোখে দেখার সুযোগই পাননি, বরং অনেক ক্ষেত্রে কারুশিল্প তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গেও পরিচিত হয়েছেন। খাবারের আয়োজনও ছিল এই সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইউর্টের ভেতরে অতিথিদের সামনে পরিবেশন করা হয় স্থানীয় নানা খাবার ও দুগ্ধজাত পানীয়। বড় পাত্রে রান্না করা মাংস, রুটি, পিঠা-জাতীয় খাবার এবং নানা ঐতিহ্যবাহী পদে ফুটে ওঠে মধ্য এশিয়ার খাদ্যসংস্কৃতি। খাবার পরিবেশনের ধরনেও ছিল আতিথেয়তার ছাপ–একসঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা এবং অতিথিকে স্বাগত জানানোর ঐতিহ্য।যাযাবর সংস্কৃতির প্রদর্শনসংগীত ও লোকনৃত্য এই আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের পরিবেশনা এবং স্থানীয় লোকগানের সুরে তুলে ধরা হয় যাযাবরদের স্মৃতি, প্রকৃতি ও জীবনসংগ্রামের গল্প। এমনকি ঘোড়াকে ঘিরেও ছিল নানা সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা। অর্থাৎ বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়ার এ অংশে খেলা দেখার পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ যাযাবর জীবনকে অনুভব করার সুযোগ পেয়েছেন দর্শনার্থীরা। আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের মেলবন্ধনবিশ্ব যাযাবর ক্রীড়ার সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এখানেই যে, এটি অতীতকে কেবল জাদুঘরে আটকে রাখে না; বরং ঐতিহ্যকে বর্তমান প্রজন্মের সামনে জীবন্ত করে তোলে। আধুনিক প্রযুক্তি, নগরায়ণ ও দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার সময়ে যাযাবর জনগোষ্ঠীর অনেক পুরোনো রীতি ও খেলা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সেই বাস্তবতায় বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়া ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকে নতুন দর্শক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে।এই আয়োজনের মাঠে যেমন আধুনিক ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক সম্প্রচার ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে, তেমনি প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে রয়েছে প্রাচীন জীবনধারার নানা অনুষঙ্গ। ঘোড়ার পিঠে তীর ছোড়া, কুস্তি কিংবা কোক-বোরুর মতো খেলাগুলো একসময় ছিল যাযাবর জীবনের প্রয়োজন ও দক্ষতার অংশ। এখন সেগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন পরিচিতি পাচ্ছে। ফলে তরুণেরা নিজেদের পূর্বপুরুষদের দক্ষতা ও সংস্কৃতিকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।এখানে প্রযুক্তি ও ঐতিহ্য একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরস্পরের সহযোগী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ভিডিও ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মাধ্যমে যাযাবর সংস্কৃতির গল্প এখন বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একজন তরুণ দর্শক হয়তো প্রথমবার কোক-বোরু বা ঘোড়সওয়ারি দেখছেন, কিন্তু সেই খেলার মধ্য দিয়েই তিনি জানতে পারছেন একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও জীবনযাপনের কথা।আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের মেলবন্ধনসবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়া তরুণ প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয়–আধুনিক হওয়া মানেই শিকড়কে ভুলে যাওয়া নয়। বরং প্রযুক্তি ও আধুনিকতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুরোনো ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলাই হতে পারে সংস্কৃতি সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর পথ সমাপনী ও উপসংহারছয় দিনের আয়োজন শেষে সমাপ্তির মঞ্চে এসে যেন আবারও ফিরে আসে বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়ার মূল বার্তা–খেলা শেষ হলেও ঐতিহ্যের যাত্রা থেমে থাকে না। ২০২৬ সালের এই আসরে বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীরা নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শনের পাশাপাশি তুলে ধরেছেন নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার নানা অনুষঙ্গ। ঘোড়ার ক্ষিপ্রতা, কুস্তির শক্তি, তীরন্দাজির নিখুঁত নিশানা কিংবা কোক-বোরুর উত্তেজনা–সব মিলিয়ে পুরো আয়োজন পরিণত হয়েছিল যাযাবর সভ্যতার এক জীবন্ত প্রদর্শনীতে।সমাপনী আয়োজনে প্রতিযোগীদের বিদায় জানানো হলেও এর মধ্য দিয়ে নতুন একটি যাত্রার সূচনা হয়েছে। কারণ এই ক্রীড়ার সবচেয়ে বড় অর্জন পদক বা জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়; বরং হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আধুনিক পৃথিবীতে যাযাবর জীবনযাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হলেও তাদের ঐতিহ্যবাহী খেলা, পোশাক, সংগীত, কারুশিল্প ও ঘোড়াকেন্দ্রিক সংস্কৃতি এখনো মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।সমাপনী অনুষ্ঠানের বিভিন্ন মুহূর্তভবিষ্যতে বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়ার পরিসর আরও বিস্তৃত হলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় ও প্রাচীন খেলাগুলোও আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেতে পারে। তরুণ প্রজন্ম যদি এসব খেলায় অংশ নেয় এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে নতুনভাবে আবিষ্কার করে, তবেই এই আয়োজনের প্রকৃত সার্থকতা। তাই বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়া শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়–এটি অতীতকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক সাংস্কৃতিক সেতু।/

ঘোড়ার পিঠে ঐতিহ্যের গল্প, বিশ্বমঞ্চে যাযাবর সংস্কৃতি