সংবাদ
এনজিও পরিচালনায় বড় পরিবর্তনের খসড়া, ক্ষমতা বাড়বে নিয়ন্ত্রক সংস্থার

এনজিও পরিচালনায় বড় পরিবর্তনের খসড়া, ক্ষমতা বাড়বে নিয়ন্ত্রক সংস্থার

আইনে ৪১ নতুন ধারা বা সংশোধনের প্রস্তাবসংশোধন হলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা থেকে শুরু করে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ পদ্ধতি পরিবর্তন হবেপরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা পাবে এমআরএ​দেশের ক্ষুদ্রঋণ ও এনজিও খাতের পরিচালন ব্যবস্থা এবং তদারকি কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে ২০০৬ সালের মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথোরিটি (এমআরএ) আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।বিগত দুই দশকের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা খসড়া আইনে মোট ৪১টি পরিবর্তন প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক খাতের তদারকি সংস্থার মতো এনজিও খাতের অভিভাবক হিসেবে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথোরিটির (এমআরএ) আইনি ক্ষমতা ও এখতিয়ার বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, এনজিওগুলোর নতুন লাইসেন্স প্রদান, পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণ ও বাতিল, প্রশাসক নিয়োগ এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগের অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়গুলোর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে এমআরএর হাতে।​আইনের কাঠামোগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে 'মাইক্রোক্রেডিট' শব্দের পরিবর্তে 'মাইক্রোফাইন্যান্স' শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে সংস্থাটির নাম ‘বাংলাদেশ মাইক্রোফাইন্যান্স রেগুলেটরি অথোরিটি আইন’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।কারণ হিসেবে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু ক্ষুদ্রঋণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সঞ্চয় গ্রহণ, প্রবাসী আয় বিতরণ ও ক্ষুদ্র বীমাসহ নানামুখী আর্থিক সেবা প্রদান করছে। তবে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ) সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নামটিতে 'ডেভেলপমেন্ট' শব্দটি যুক্ত করে ‘বাংলাদেশ মাইক্রোফাইন্যান্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথোরিটি আইন’ রাখার পক্ষে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে।এছাড়া 'সনদ' শব্দের স্থানে 'লাইসেন্স' ব্যবহারের প্রস্তাব আনা হলেও সিডিএফ মনে করে, লাইসেন্স ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে এ খাতের স্বনিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, এমআরএর প্রশাসনিক প্রধানের পদবি 'এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান' পরিবর্তন করে 'ভাইস চেয়ারম্যান' এবং তার মর্যাদা যুগ্ম সচিব থেকে বাড়িয়ে অতিরিক্ত সচিব করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যেটিতে সিডিএফও সম্মতি প্রকাশ করেছে।​খসড়া আইনের বিধান অনুসারে, আইন কার্যকরের ছয় মাসের মধ্যে তালিকাভুক্ত সব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে নিজ নামের শেষে ‘এমএফআই’ যুক্ত করা, পৃথক গঠনতন্ত্র তৈরি, সাধারণ পরিষদ ও পর্ষদ গঠন এবং সম্পদ-দায় আলাদা করে এমআরএর কাছে নতুন লাইসেন্সের আবেদন জমা দিতে হবে। ব্যর্থতায় লাইসেন্স বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও সিডিএফ এই পৃথক আইনি সত্তা গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি তুলেছে।এছাড়া তদারকি জোরদারে পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে ছয় মাসের জন্য প্রশাসক বসানোর ক্ষমতা চাওয়া হয়েছে, যা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইনি ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমআরএর পক্ষ থেকে বলা হয়, "গ্রাহক ও জনস্বার্থ রক্ষায় কোনো প্রতিষ্ঠানের পুরো পরিচালনা পর্ষদ বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বিদ্যমান আইনে সে সুযোগ নেই। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইনের মতো এখানেও এ ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।" ​প্রতিষ্ঠানের সিইও নিয়োগে পর্ষদের স্বাধীনতার পাশাপাশি এমআরএর বাধ্যতামূলক অনাপত্তি সনদ নেওয়ার শর্ত যোগের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্ষদে সিইওর ভূমিকা তুলে ধরে এমআরএ জানায়, "প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ঝুঁকি ও দায়ভার সিইওর ওপর থাকে। তাই নীতিনির্ধারণে তাঁর অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন।"নতুন খসড়ায় আর্থিক আত্মসাৎ ও মিথ্যা তথ্য দেওয়ার শাস্তি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে কঠোর করার পাশাপাশি অনাদায়ি ঋণ পুনরুদ্ধারে ‘সরকারি পাওনা আদায় আইন’ ব্যবহারের সুবিধা যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এমআরএ উল্লেখ করেছে, জামানতহীন ক্ষুদ্রঋণে দীর্ঘমেয়াদি দেওয়ানি মামলা এড়াতে এই নতুন ব্যবস্থা পাওনা আদায় সহজ করবে। এছাড়া সরকার অনুমোদিত উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ, অলাভজনক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থের ব্যবহার এবং বিলুপ্ত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ সামাজিক কল্যাণে ব্যয় করার বিষয়ে স্পষ্ট আইনি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে এই সংশোধনীতে।
২ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

ইতিহাসের স্মৃতি মুছে ফেলার রাজনীতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় এবং শতবর্ষ পার করে আরও পাঁচটি বছর অতিক্রম করেছে। ঐতিহাসিক মুনতাসির মামুনের মতে, অনেকটা বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ও শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনীতি সহ সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়া পূর্ববঙ্গকে অগ্রসর করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূচনালগ্নেই এটি "প্রাচ্যের অক্সফোর্ড" নামে খ্যাতি লাভ করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও এ অঞ্চলের মানুষের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশের যে আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল, পাকিস্তানি শাসকরা সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা শুরুতেই উর্দু ভাষা ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে এ অঞ্চলকে অন্যায়ভাবে নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়।পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ধরনের সেই শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব বাংলার মানুষের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশের লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে গেছে। পাকিস্তান আমলে পূর্ববঙ্গে একটি অগ্রসর মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা।ভাষা আন্দোলনের আমতলা, আর স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের বটতলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্দোলনের মানচিত্রে যেমন ভিন্নভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, তেমনি এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আমাদের দুর্ভাগ্য, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এই প্রথম ছাত্রশিবির বা কোনো ধর্মীয় ছাত্রসংগঠনের সমর্থিত প্যানেল কিছুটা লিবারেল ভাবমূর্তির ছদ্মবেশে জয় পেয়েছে। জয় পাওয়ার পরই তারা ঘোষণা দেয়, তাদের ভাষায় ‘কালচারাল ফ্যাসিবাদ’কে তারা মুছে ফেলবে। সে অনুযায়ী এক সময়ের শিবির সদস্য প্রাক্তন ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানের সহযোগিতায় তারা অনেক দূর অগ্রসর হয়। টিএসসিতে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের ‘বীরত্বের প্রদর্শনী’ আয়োজন করে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবি রাখার কারণে ঢাবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ওই সময়ে সেই ছবিগুলো সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়।১১ সেপ্টেম্বর ছিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী যথাযথভাবে পালিত হয়েছে পাকিস্তানে। বাংলাদেশের পাকিস্তানপন্থীরাও তাদের পিতৃপুরুষকে স্মরণ করেছেন অভিন্ন আবেগে। এ বছর জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকীতে ডাকসু সংগ্রহশালায় তার তিনটি ছবি টানায় এবং ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হলেও তাদের কিছু অপছন্দের সকল ছবি তারা নামিয়ে ফেলে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই এক উত্তেজনার অবতারণা হয়। বর্তমানে সংগ্রহশালায় ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের কোনো ছবিতেই শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক ছবি নেই। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় ভাষা আন্দোলনের জন্ম, ঠিক সেখানেই ভাষা আন্দোলনের প্রতিপক্ষকে সম্মানের আসন দেওয়া খুবই পরিকল্পিত ও কথিত ‘কালচারাল ফ্যাসিবাদ’ তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলার রাজনৈতিক বার্তা। তাই তো তাদের সব আয়োজন শেখ মুজিবকে ও মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়ার জন্য। একজন সাংবাদিক ডাকসুর সংগ্রহশালার সমন্বয়কারীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, শেখ মুজিবের ৭ মার্চ বা স্বাধীনতা আন্দোলনের কোনো ছবি কেন রাখা হয়নি? ঔদ্ধত্যের সকল সীমা লঙ্ঘন করে তার উত্তর ছিল, ‘ইচ্ছে হয়নি, তাই।’তরুণ শেখ মুজিব ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। আর ১৯৪৮ সালের শুরুতেই পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা" ঘোষণা করলে ছাত্রসমাজ ফুঁসে ওঠে। গড়ে ওঠে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। শেখ মুজিবুর রহমান এই পরিষদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মনোনীত হন।ওই বছরের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। পিকেটিং থেকে গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিব। আবার ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে বক্তব্য দেন, তখন আব্দুল মতিন, অলি আহাদ, শেখ মুজিবসহ ছাত্রনেতারা তাৎক্ষণিকভাবে "নো, নো" বলে প্রতিবাদ জানান। এরপর ২১ ফেব্রুয়ারির ইতিহাস তো সবারই জানা।স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। এতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্র-ছাত্রীসহ অসংখ্য শহীদ হয়েছেন। আর এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলার পতাকা। এ বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন রেসকোর্স থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সংগ্রামের এক অমর কবিতা পাঠ করেছিলেন: ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ এর আগে স্বাধীনতার এমন কবিতা কে কবে শুনেছে! আর এ ঘোষণা দেওয়ার মতো জমিন তৈরি করতে শেখ মুজিবকে সংগ্রাম করতে হয়েছে পাকিস্তানি শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে ২৪টি বছর জুড়ে। সেই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে বামপন্থী আন্দোলনের সমন্বয় ও ঐক্য গড়ে ওঠায় আন্দোলন পেয়েছিল নতুন মাত্রা।দীর্ঘ ২৪ বছরের এই সংগ্রামে ১৪ বছরই শেখ মুজিবকে কারান্তরালে কাটাতে হয়েছে। দু’বার পাকিস্তানি শাসকরা তার জন্য তো ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুতের আয়োজন করেছিল। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি পাঁচ দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর আটক হয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি। এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে ৮০ দিন কারাভোগ করে মুক্তি পান ২৮ জুন। ওই দফায় তিনি ২৭ দিন কারাভোগ করেন। একই বছরের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন এবং পরের বছর ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টানা ৭৮৭ দিন কারাবন্দি ছিলেন।১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও তাকে কারাগারে যেতে হয়। সে সময়ে ২০৬ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির পর ১১ অক্টোবরে শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হন। এ সময়ে টানা ১ হাজার ১৫৩ দিন তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। এরপর ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি আবারও গ্রেপ্তার হয়ে মুক্তি পান ওই বছরের ১৮ জুন। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন। এরপর ’৬৪ ও ’৬৫ সালে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। ছয় দফা দেওয়ার পর যেখানে সমাবেশ করতে গেছেন, সেখানেই তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। ওই সময়ে তিনি ৩২টি জনসভা করে বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ৬৬ সালের ৮ মে আবারও গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পান। এ সময় তিনি ১ হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই পাকিস্তানের সামরিক সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে। এ দফায় তিনি কারাগারে ছিলেন ২৮৮ দিন।কয়েকদিন ‘হারুন আন্কেলের ভাতের হোটেলে’ থাকা ইউনূসের কিশোর-তরুণ বাহিনী এসব ইতিহাস জেনে বা না জেনেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তায় থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। দেশজুড়ে ভেঙে ফেলেছে মুজিবের স্মৃতি ভাস্কর্যসহ মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এবং স্বাধীন বাংলা সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সকল স্মৃতিচিহ্ন। ইউনূস বাহিনী আর জামাতীদের সব আয়োজন যেন শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়ার জন্য। সেই ধারাতেই জামাত নিয়ন্ত্রিত ডাকসু প্রতিশোধ হিসেবে স্বাধীনতার নেতার ছবি নামিয়ে তাদের পেয়ারা পাকিস্তানের জিন্নাহর ছবি টাঙিয়ে দিয়েছে। ইতিহাসের পাঠ ও প্রদর্শনীতে সংগতিপূর্ণভাবে জিন্নাহ থাকতেই পারেন। কিন্তু মুজিবের ছবি নামিয়ে জিন্নাহর ছবি উত্তোলন অনেকটা বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু তারা যা করেছে, তা তো রীতিমতো দেশদ্রোহী অপরাধ। সরকার কী করছে? সরকারের মনে রাখা উচিত, এখনই এদের নিয়ন্ত্রণ না করলে, আইনের আওতায় না আনলে তাদের উদ্ধত ফনার ছোবল কিন্তু খুব শীঘ্রই খেতে হবে।বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা শিক্ষক মূল্যায়নপদ্ধতির নব আবিষ্কার করেছেন। ডাকসু এখতিয়ারবহির্ভূত ওয়েবসাইট বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছে তাদের নিজেদের তৈরি প্রশ্নমালায়। শিক্ষকদের মূল্যায়ন শিক্ষার্থীরা করবেন—এটা স্বাভাবিক বিষয়। তবে শিক্ষার্থীরা কীভাবে শিক্ষকদের শিক্ষাদানকে মূল্যায়ন করবেন, তার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই প্রণয়ন করতে হবে। সেই মূল্যায়ন অবশ্যই হতে হবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দুই পক্ষেরই গোপনীয়তা বজায় রেখে। বিভাগীয় তত্ত্বাবধানে গোপনীয়তা বজায় রেখে সেগুলো পর্যালোচনা করে শিক্ষককে তার সারসংক্ষেপ জানানোর মাধ্যমে এ ব্যবস্থা কার্যকর করাই নিয়ম। শিক্ষক ফলাফল দেখে তার পাঠদানের প্রক্রিয়াটি প্রয়োজনমতো পুনর্বিন্যাস করবেন। এখানে ছাত্র সংসদের পুলিশি ভূমিকা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে।জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ চিহ্নিত করে শিক্ষকদের হেনস্তা করা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়জন ডিনকে পদত্যাগে বাধ্য করা ইত্যাদি এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ করেছেন। সারা দেশে শিক্ষক নির্যাতন, শিক্ষকদের অপদস্থ করা, জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো ইত্যাদির মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের চেহারায় কিছুসংখ্যক তরুণ আবির্ভূত হয়। তাদের উন্মাদনা এখনও অব্যাহত আছে। সম্প্রতি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর কার্যকলাপে জড়িত থাকার এক উদ্ভট অভিযোগে ৪৩৯ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করায় নৈরাজ্যবাদী তরুণরা শিক্ষক হেনস্তাকারী কার্যকলাপে আরও উৎসাহিত হয়েছে। সরকার, বিরোধীদল সবাই তো শেখ হাসিনাকে ফেরত আনতে মরিয়া! শিক্ষকরাও যদি সে প্রচেষ্টা নিয়ে থাকেন, তো তারা তো সরকারের পক্ষেই কাজ করেছেন। নাকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চান না শেখ হাসিনা ফিরে আসুক, বিচারের মুখোমুখি হোক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সরকারদলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে, অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারলে ক্যাম্পাসে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীরা পরাভূত হবে।শতবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস ও তার নানা পর্ব। ভাষা সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার সংগ্রাম, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান থেকে নানা সীমাবদ্ধতার এবং ভুল হাতে পড়া চব্বিশের জুলাই জাগরণ—সব ঐতিহ্য ইতিহাসের সাক্ষী ও সূতিকাগার এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়কে কূপমণ্ডূকতার শিকলে বেঁধে ফেলার যে প্রচেষ্টা চলছে, আমাদের মাতৃভূমিকে ধর্মান্ধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে অপচেষ্টা চলছে, তা সফল হবে না। কারণ জুলাইয়ে যে তরুণরা রাস্তায় নেমে এসেছিল, তাদের কণ্ঠে ছিল, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, ধনধান্য পুষ্পে ভরা, মুক্তির মন্দির সোপান তলে ..... ইত্যাদি দেশপ্রেমের গান। গুপ্ত ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকেও সেই গানে গলা মেলাতে হয়েছিল। জামাত-শিবির গোষ্ঠীকে এখনও উদার গণতন্ত্রের কথা বলতে হচ্ছে, একটা লিবারেল ছদ্মবেশ ধারণ করার জন্য কসরত করতে হচ্ছে। আসিফ নজরুল, আলী রিয়াজ প্রমুখদের সুর বদল করতে হচ্ছে। জুলাই পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের একটা অংশ বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মেলানোতে আমরা প্রতারিতবোধ করলেও নেতৃত্বের অনেকে সাহসের সঙ্গে জুলাই আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এ নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, সোচ্চার হচ্ছেন।বাংলাদেশের লড়াকু মানুষ অনেকবার প্রতারিত হয়েছে। আমরা বারবার প্রতারিত হতে পারি, আমরা হয়তো একদিন থাকবও না। কিন্তু পরের প্রজন্ম লড়বে এবং বিশ্ববাসী দেখবে ‘কারও দানে পাওয়া নয়—দাম দিয়ে কেনা বাংলাদেশ’ অন্ধকারের শক্তিকে পরাভূত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকসম ‘অপরাজেয় বাংলা’ অনির্বাণ শিখা হয়ে কলাভবনের সামনে দাঁড়িয়ে নিরন্তর সে ঘোষণা দিয়ে চলেছে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি কাদের হাতে

জানা যায়, বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ইত্যাদির ম্যানেজিং কমিটি পরিচালনার জন্য সভাপতি নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠি তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটা প্রজ্ঞাপনে শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা বলা হলেও সম্প্রতি তা নাকি বাতিল করা হয়েছে। এতে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং সাধারণ মানুষও চায় লেখাপড়া জানা উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ পরিচালনা করুক। এমনকি যে মানুষটি নিজে স্কুল-কলেজে যায়নি, সে-ও চায় না তার মতো আরেকজন গিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের ওপর খবরদারি করুক। এটা শত্রুতা নয় বা হিংসা নয়, স্রেফ একটা মনস্তাত্ত্বিক ভাবনার বিষয়। আমি অকৃতি অধম বলে উত্তমকে অস্বীকার করি কেমনে?আজকাল খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটা প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনেও উঁকি দিয়ে চলেছে; তা হলো, এই যে শিক্ষা-দীক্ষা, রাজনীতি, সমাজনীতি, নীতি-নির্ধারণী বা জনপ্রতিনিধিত্ব—কোথাও যদি শিক্ষাগত সনদপত্রের কোনো মূল্য না থাকে বা গুরুত্ব দেওয়া না হয়, তবে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে এত হৈচৈ, এত পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার হেতু কী? সমাজে রাষ্ট্রে যার কোনো প্রয়োজনীয়তা থাকছে না, তার জন্য লাখ কোটি টাকার বাজেটই বা কেন? দেশের উচ্চশিক্ষা কী তবে কেবল বিদেশের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হওয়া আর পরদেশের সরকারের অধীনে চাকর হওয়ার দায়ে? যে দেশে শিক্ষার একাডেমিক সার্টিফিকেটের কোনো মূল্য দেওয়া হবে না, সেখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম হতাশা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষার মূল বিষয় হলো, সৃষ্টিশীলতা ও সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটানো, যা শিক্ষিত মানুষের পক্ষেই সম্ভব। অশিক্ষিত মানুষের দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে কখনো নতুনত্ব বা সৃষ্টিশীল কার্যক্রম আশা করা যায় না। সে প্রতিষ্ঠান সরকারের হোক বা নিজেরই হোক।২.ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এসব কমিটিতে কেবল সভাপতি নয়, অন্যান্য পদগুলো যেমন, অভিভাবক সদস্য, বিদ্যোৎসাহী সদস্য—এদেরও শিক্ষাগত যোগ্যতার একটা মাপকাঠি রাখা দরকার। একটা প্রতিষ্ঠানকে সুষ্ঠু, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে পরিচালিত করতে হলে পুরো টিমকে নিয়েই কাজ করতে হয়। সভাপতি/চেয়ারম্যান একা সফলতা আনতে পারে না।দেশে তখন ১/১১ নামে পরিচিত সরকার ক্ষমতায় আছে। আমি সরকারের চাকরিতে উপসচিব পদমর্যাদায় পরিচালক, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক) কর্মরত। কিছুদিন হলো একটা জেলার এডিসির পদ থেকে ঢাকায় ফিরেছি। এক দুপুরে ফোন আসে তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ঢাকার কাছ থেকে। ডিসি’র নাম মো. কামাল উদ্দিন। একজন সৎ, দক্ষ ও সাহসী কর্মকর্তা হিসেবে তার সুনাম ছিল। তিনি বললেন,আপনার বাসা কোন এলাকায়?বললাম, আজিমপুর গভ. কোয়ার্টারে থাকি।খুব ভালো হয়েছে, আপনাকে ওই এলাকার একটা ঐতিহ্যবাহী স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দিতে চাই।জিজ্ঞেস করলাম, স্কুলের নামটা কী?তিনি বললেন, 'ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুল'।এবার আমি জানতে চাইলাম, স্কুলের বিশেষ কোনো সমস্যা আছে কি না?তিনি বললেন, না, কোনো সমস্যা নেই। ঢাকার প্রায় সকল স্কুলই এ সময়ে ফাঁকা। জেলা প্রশাসন থেকে আমরা মাঠ প্রশাসনে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্কুলের দায়িত্ব দিচ্ছি। এক্ষেত্রে ঢাকায় তাদের স্ব স্ব বাসার কাছাকাছি স্কুলগুলোতে দিতে চাচ্ছি, যাতে যাতায়াতের অসুবিধা না হয়। আর কিছু নয়।আমি তাৎক্ষণিক রাজি হয়ে গেলাম। একটা পুরোনো ইতিহাস-খ্যাত স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলে বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা যাবে। শিক্ষক, ছাত্র, স্থানীয় সুশীল সমাজের সঙ্গেও যোগাযোগ হবে, তাতে মন্দ কী? তাছাড়া বাসা থেকে পদব্রজে স্কুলে পৌঁছে যাওয়া যায়। ছুটির একটা দিন এমন প্রতিষ্ঠানের জন্য নিবেদন করলে কোনো ক্ষতি হবে না। তা-ই হলো, যথারীতি দায়িত্ব গ্রহণ করলাম। বলাবাহুল্য, স্কুলটি ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত। জনশ্রুতি আছে, সেকালে ঢাকা নগরীর পশ্চিম প্রান্ত বরাবর স্কুলটি গড়ে ওঠে বলেই নাকি ব্রিটিশ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর কর্তৃক এমন নামকরণ করা হয়েছিল। তাছাড়া এ স্কুলের বেশ কজন শিক্ষক '৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। বিশেষ করে মুহাম্মদ সুলতান এবং রাজনীতিবিদ আবদুস সামাদের কথা বলা আছে।৩.সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর, এক শনিবার সকাল ১০টার দিকে প্রথমবারের মতো স্কুলে গিয়ে উপস্থিত হলাম। সরকারি ছুটির দিন, তবে স্কুল-কলেজ, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এসব খোলা আছে। প্রধান শিক্ষক আলী হোসেন মিয়াকে একজন বিনয়ী, সৎ ও শিক্ষিত মানুষ বলে মনে হলো। অন্তত প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। স্কুলটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম, আমার সঙ্গে বেশ কজন সদস্য রয়েছে। তারা নির্বাচিত সদস্য এবং স্থানীয় প্রভাবশালী বিশেষজন। পরিচয় হলো, তারা পূর্ববর্তী সংসদ সদস্যের সময়ে এখানে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কেউ কেউ তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এমন। তখনই জানি, স্কুলের এসব পদের জন্যও বেশ ব্যয়বহুল নির্বাচন হয়। এতে টাকা-পয়সার ছড়াছড়ি হয়। আমি ধীরে ধীরে খোঁজখবর নিতে থাকি। আসলে এদের কাজটা কী?দেশে তখন রাজনীতি নেই, অযাচিত চাপ নেই, বরং জনমনে স্বস্তির আবহ বিরাজ করছিল। শুরুতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে স্কুলের ভেতরে ও বাইরে একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন নিয়ে আসা হলো। হেডমাস্টার এবং সহকারী শিক্ষকদের বসার স্থানে পরিবর্তন আনা হলো। শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনমাফিক নতুন নতুন ফ্যান-লাইট সংযোগ তথা ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের পৃথক শৌচাগারের সংস্কার করা হলো। দীর্ঘ বন্ধ থাকা লাইব্রেরিতে বসার পরিবেশ ফেরানো হলো। নিয়মিত সভা আহ্বান করে শিক্ষার পরিবেশবান্ধব অসংখ্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির কক্ষে নতুন আধুনিক টিভি সংযোজন হলো। অভিভাবকদের অপেক্ষার স্থানেও নতুনত্ব আনা হলো। সভায় অংশ নেওয়ার সম্মানী অর্থের বিষয়ে একটু রাশটানা হলো, সকল সভার জন্য সম্মানী থাকবে না। এটা কেবল বিশেষ সিদ্ধান্তকারী সভার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তখন শতভাগ নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতার মাধ্যমে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ হলো। সেসময়ে বার্ষিক খেলাধুলা ও জাতীয় অনুষ্ঠানে সরকারের সচিবগণকে আমন্ত্রণ জানিয়ে স্কুলে আনা হয়েছে। এদের কেউ কেউ এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন। প্রায় দু’বছরে এমন অসংখ্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়ায় স্কুলের ভেতরটায় এক অনুকূল পরিবেশ পাওয়া গিয়েছিল।৪.ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করার অল্প কিছুদিনের মধ্যে লক্ষ করলাম, তিনজন নির্বাচিত সদস্যেরই মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। প্রথমে তারা আমাকে জয় করে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। যেমন, সীমাহীন প্রশংসা ও অতিরিক্ত বিনয় প্রদর্শন করা, কথাবার্তা ছাড়াই হঠাৎ করে পুরান ঢাকার রয়েল রেস্তোরাঁর বিরিয়ানির প্যাকেট বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া। এটা বন্ধ করার ব্যবস্থা নিলে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব আসতে থাকে, কিছু দিন পরে টেলিফোনের ভাষায় হুমকির আওয়াজ। সেনাবাহিনীর পদস্থ অফিসারের কর্কশ ও ভারিক্কি কণ্ঠের সতর্ক সংকেত।তারও কিছুদিন পরে ঢাকার ডিসি সাহেবকে মোটিভেট করার জন্য সচিব পর্যায়ে তদবির হতে থাকে। আসল কাজ আমাকে সরিয়ে তাদের পছন্দের একজন অফিসারকে বসানো। কারণ, তারা যা চান, আমাকে দিয়ে যে তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেটা তারা বুঝে গেছে। যেমন, তাদের পছন্দের লোক নিয়োগ করা, কয়েকজন শিক্ষকের যোগ্যতা না থাকলেও তাদের পদোন্নতি দেওয়া, টেস্ট পরীক্ষায় ভালো করেনি কিন্তু এসএসসিতে অনুমতি দিতে হবে, স্কুলের অভ্যন্তরীণ ছোটখাটো পূর্ত কাজ তারা নিজেরাই করবেন ইত্যাদি। আর আমি চাচ্ছিলাম, স্কুলের গচ্ছিত ফান্ড থেকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করে মানসম্মত শিক্ষার এবং একাডেমিক রেজাল্টের ওপর গুরুত্ব দিতে। মনে পড়ে, এমন প্রচ্ছন্ন অসহযোগিতা ও বৈপরীত্যের সময়ে, তখনও স্কুলটি হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। আর এটা সম্ভব হয়েছিল মূলত সভাপতি হিসেবে আমার অর্জিত শিক্ষা, দেশপ্রেমবোধ, দৃঢ়চেতা মনোভাব ও অদম্য সাহস প্রদর্শন করার মানসিকতার কারণে।৫.কাজেই দেশব্যাপী হাজার হাজার এমপিও-নন-এমপিও স্কুল, কলেজ, মাদরাসার পরিচালনা পর্ষদ বা কমিটিতে অশিক্ষিত মানুষের প্রবেশ-অনুপ্রবেশ—সবই বন্ধ করতে হবে। প্রকৃত শিক্ষার মূল্য কখনো হারিয়ে যাবে না। প্রয়োজনে অবসরপ্রাপ্ত গণকর্মচারী, শিক্ষক, বিভিন্ন পেশাজীবী থেকে শিক্ষিত, সৎ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচন করা যেতে পারে। তাহলে প্রতিষ্ঠানসমূহ দ্রুত অধোগামী হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে না।একটা জ্বলন্ত উদাহরণ কিন্তু চোখের সামনে আছে, তা হলো দেশের সকল সরকারি স্কুল জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন থেকে বছরের পর বছর ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভর্তি নিয়ে বা অন্য কোনো প্রশাসনিক, আর্থিক বড় অনিয়মের অভিযোগ সচরাচর পাওয়া যায় না। এর কারণ ডেপুটি কমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার সম্পর্কে সব সময়ই সচেতন থাকেন। অন্যায়, অবিচার বা দুর্নীতি তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা মানে, তার পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। যা কম শিক্ষিত দলীয় নেতা-কর্মীদের ক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়। তাদের দায়-দায়িত্ব নেহাত কম।কাজেই গ্রামীণ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু ধারা থেকে রক্ষা করার স্বার্থে সরকার সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্তকে পুনর্বিবেচনা করার নিমিত্ত উচ্চ আদালতের পরামর্শকে আমলে নিতে পারে। এটা কারও একক দল বা মতের কথা নয়, সম্পূর্ণ জনস্বার্থ সহায়ক বিষয়। সবকিছুতে শিথিলতা আনয়ন করা শুভ হয় না, আবার সব সময় গণতান্ত্রিকও নয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার ও প্রবন্ধকার]

ঢাকার রাত কেন এত গরম হচ্ছে?

সন্ধ্যা মানে দিনের তপ্ত কপালে একটু শীতল বাতাসের স্পর্শ। রোদের বিদায়, পাখির ঘরে ফেরা, ক্লান্ত মানুষের স্বস্তির অপেক্ষা। সারাদিনের উত্তাপ পেছনে ফেলে পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে বিশ্রামের প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু ঢাকায় এখন কোনো কোনো সন্ধ্যায় অন্ধকার নামে, শীতলতা নামে না। সূর্য ডুবে যায়, অথচ গরম থেকে যায় আরও ভ্যাপসা, আরও আবদ্ধ হয়ে।সম্প্রতি ঢাকায় পরপর কয়েকটি রাতে এই অস্বস্তি গভীরভাবে অনুভব করেছি। পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহীর তীব্র গরম আমার অপরিচিত নয়। দীর্ঘদিন সেখানে বসবাস ও মাঠপর্যায়ে কাজ করার সুবাদে সেই রুক্ষ তাপের সঙ্গে পরিচয় আছে। তবু ঢাকার রাতের গরম যেন অন্য রকম। গায়ে ঘাম জমে, শরীর জুড়ায় না। এমনকি এসি চালানোর পরও স্বস্তি পেতে সময় লাগে। মনে হয়, দিনের উত্তাপ রাতের মধ্যেও আমাদের পিছু ছাড়ছে না। সন্ধ্যার পর যে শহরের ধীরে ধীরে শীতল হওয়ার কথা, সেখানে রাতও কেন এত অস্বস্তিকর? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তাপমাত্রার সংখ্যায় নেই। সন্ধ্যায় বেশি গরম অনুভব করা মানেই দুপুরের চেয়ে বাতাসের তাপমাত্রা বেড়েছে, তা নয়। তাপমাত্রা কিছুটা নামলেও আর্দ্রতা, বাতাসের স্থবিরতা আর চারপাশের উত্তপ্ত দেয়াল ও রাস্তা থেকে আসা তাপ মিলিয়ে শরীরের অস্বস্তি বাড়তে পারে। কয়েক রাতের অভিজ্ঞতা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের প্রমাণ নয়; তবে তা আমাদের নগরজীবনের একটি জরুরি সমস্যার দিকে দৃষ্টি ফেরায়।দিনের পুরোটা সময় ভবন, ছাদ ও পিচঢালা রাস্তা সূর্যের তাপ গ্রহণ করে। সূর্যাস্তের পর সেই সঞ্চিত তাপ ধীরে ধীরে বের হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা ইপিএর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নির্মাণসামগ্রী থেকে ধীরে তাপ বের হওয়ার কারণে সন্ধ্যার পর নগর তাপদ্বীপের প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। আশপাশের কম নির্মিত এলাকার তুলনায় শহর উষ্ণ থেকে যাওয়ার এই ঘটনাই ‘নগর তাপদ্বীপ’।পাশাপাশি উঁচু ভবন ও সরু রাস্তার বিন্যাসও সমস্যাটিকে জটিল করে। মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা, ইউনাইটেড স্টেটস এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি (ইপিএ) ইপিএর তথ্যানুসারে, এ ধরনের ভবনঘেরা পথ প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহে বাধা দিতে পারে; ঘন নির্মাণের মধ্যে জমে থাকা তাপও সহজে বের হতে পারে না। ফলে রোদ চলে গেলেও দিনের উত্তাপের রেশ থেকে যায়। এর সঙ্গে আর্দ্রতা যুক্ত হলে গরমের চরিত্র বদলে যায়। শরীর ঠান্ডা হওয়ার জন্য শুধু ঘাম হওয়া যথেষ্ট নয়; সেই ঘাম বাষ্পীভূত হয়ে ত্বক থেকে তাপ সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকলে প্রক্রিয়াটি ধীর হয়। তখন ঘামলেও স্বস্তি আসে না। সন্ধ্যায় বাতাস কিছুটা ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বাড়তেও পারে। বাতাস চলাচল কম থাকলে ভ্যাপসা অনুভূতি আরও প্রকট হয়।যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যানুসারে, তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা একসঙ্গে বিবেচনা করে ‘হিট ইনডেক্স’ নির্ধারণ করা হয়, যা অনুভূত গরমের একটি সূচক। রোদ, বাতাস ও শারীরিক পরিশ্রমের প্রভাব বুঝতে আরও বিষয় বিবেচনা করতে হয়। অর্থাৎ একই তাপমাত্রা দুই জায়গায় মানুষের শরীরে একই অনুভূতি তৈরি করবে, এমন নয়।  রাজশাহীর গরমের সঙ্গে ঢাকার গরমের পার্থক্য অনুভব করার পেছনেও এই বিষয়গুলো কাজ করতে পারে। রাজশাহীর রাত সব সময় শীতল, এমন দাবি করছি না। তবে শুষ্ক পরিস্থিতিতে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যে স্বস্তি দিতে পারে, আর্দ্র ও বাতাসহীন পরিবেশে তা পাওয়া কঠিন। দুই শহরের যথাযথ তুলনার জন্য একই সময়ের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাসের তথ্য প্রয়োজন।সম্প্রতি ওমরাহ পালনের সময় মক্কা-মদিনার প্রচণ্ড গরমের সঙ্গেও ঢাকার গরমের একটি পার্থক্য অনুভব করেছি। সেখানে তীব্র তাপের মধ্যেও গায়ে ঘাম জমে থাকার অনুভূতি ঢাকার মতো ছিল না। এর অর্থ শরীর ঘামছিল না, তা নয়। শুষ্ক বাতাসে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে বলে ত্বকের ভেজাভাব কম টের পাওয়া যায়। ঢাকার আর্দ্র পরিবেশে সেই ঘামই সহজে শুকাতে চায় না।অবশ্য মক্কা-মদিনার আবহাওয়াও প্রতিদিন এক রকম নয়। শুষ্ক গরমকে নিরাপদ ভাবারও সুযোগ নেই; ঘাম চোখে না পড়লেও শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যেতে থাকে। এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, গরমের কষ্ট শুধু থার্মোমিটারের সংখ্যায় ধরা পড়ে না।ঘর কিংবা গাড়ির এসির অভিজ্ঞতাতেও তাপ সঞ্চয়ের বিষয়টি বোঝা যায়। রোদে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির কাচ দিয়ে আসা সৌরশক্তি আসন, ড্যাশবোর্ড ও ভেতরের অংশ গরম করে। এসি চালানোর পর ঠান্ডা বাতাস এলেও ওই অংশগুলো তাপ ছাড়তে থাকে। ফলে পুরো কেবিন আরামদায়ক হতে সময় লাগে। ঘরের ছাদ, দেয়াল ও আসবাবও দিনের তাপ ধরে রাখতে পারে। এসিকে বাতাস ঠান্ডা করার পাশাপাশি আর্দ্রতাও সরাতে হয়।যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ও পরিবেশ সংস্থার পরিচালিত ফুয়েল ইকোনমি ওয়েবসাইট-এর তথ্যানুসারে, অত্যন্ত গরমে এসি ব্যবহারে প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির জ্বালানি-দক্ষতা ২৫ শতাংশেরও বেশি কমতে পারে, বিশেষ করে ছোট যাত্রায়। বাইরের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও রোদের তীব্রতায় এই প্রভাব বদলায়। তাদের নির্দেশনায় ছায়ায় গাড়ি রাখা, সানশেড ব্যবহার এবং নিরাপদ পরিবেশে প্রথমে জমে থাকা গরম বাতাস বের করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এসি দেরিতে ঠান্ডা করার পেছনে যন্ত্রের সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ বা ত্রুটিও থাকতে পারে। সব দায় বাইরের গরমের নয়। একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, এসি তাপ নিশ্চিহ্ন করে না; ভেতর থেকে বাইরে সরায় এবং যন্ত্র চালানোর শক্তিও তাপ যোগ করে। ইপিএ যানবাহন, এসি ও শিল্পকারখানার বর্জ্যতাপকে নগরের উষ্ণতায় অবদান রাখা উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ঢাকার মোট তাপে কোন উৎসের অবদান কত, স্থানীয় গবেষণা ছাড়া তা নির্দিষ্ট করা যাবে না।এই পরিস্থিতিতে গাছপালা, উন্মুক্ত মাটি ও জলাশয়ের গুরুত্ব গভীর। গাছ ছায়া দেয় এবং পাতার প্রস্বেদনের মাধ্যমে শীতলতায় সাহায্য করে। ইপিএর ব্যাখ্যাতেও এই দুই প্রক্রিয়ার গুরুত্ব রয়েছে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের জায়গা পাকা করে পাশে কয়েকটি টব বসালে হারানো ছায়া ফিরে আসে না।  হাতিরঝিলের কথাই ধরা যাক। এর পানির দুর্গন্ধের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জলাশয় থাকলেই তার পাশে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয় না। মানুষ যদি পানির ধারে গিয়েও দুর্গন্ধে অস্বস্তি বোধ করেন, তবে সেই উন্মুক্ত পরিসরের সম্ভাবনা অপূর্ণ থেকে যায়। এতো বিশাল পানির উৎস হাতিরঝিলকে ঘিরে শক্তিশালী পরিকল্পনায় আসা উচিত। পানির মান, গাছের ছায়া, হাঁটার পথ ও বিশ্রামের জায়গা একসঙ্গে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।দুর্গন্ধের উৎস শনাক্ত করে দূষিত প্রবাহ বন্ধ করা এবং প্রয়োজনমতো শোধনের ব্যবস্থা এখানে প্রথম কাজ। শুধু ভাসমান আবর্জনা সরিয়ে স্থায়ী সমাধান হবে না। নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা করে ফল প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি হাঁটার পথ ও বসার জায়গায় উপযুক্ত ছায়াদানকারী গাছ বাড়ানো দরকার। গাছের অবস্থান এমন হতে হবে, যাতে বাতাস চলাচল ও মানুষের নিরাপদ যাতায়াত বজায় থাকে। আশপাশের পাড়ায় শীতলতার সুবিধা কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটিও পরিমাপ করা প্রয়োজন।একটি হাতিরঝিল অবশ্য পুরো ঢাকার শীতলতার দায়িত্ব নিতে পারে না। নিজের পাড়াতেই ছায়া, মাঠ ও জলাশয়ের সুযোগ থাকা দরকার। জলাশয়ের পরিমাণ বাড়াতে আগে বিদ্যমান পুকুর ও খাল রক্ষা, পুনরুদ্ধারযোগ্য অংশ ফিরিয়ে আনা এবং নতুন উন্নয়ন এলাকায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জায়গা নিশ্চিত করা বাস্তবসম্মত। তবে পানি বাড়ালেই রাতের ভ্যাপসা গরম কমবে এমন সরল হিসাব কিন্তু নয়। জলাশয়ের সঙ্গে সবুজ, বায়ুপ্রবাহ, পানির মান ও স্থানীয় আর্দ্রতার প্রভাব মিলিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। রাতের গরমকে শুধু আরামের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, দীর্ঘ সময় দিন ও রাতের উচ্চ তাপমাত্রা শরীরে তাপের চাপ বাড়ায় এবং অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি করে। নিম্নমানের আবাসন ও শীতল হওয়ার সুযোগের অভাবে নিম্ন আয়ের মানুষ বিশেষভাবে বিপন্ন হন। যে মানুষ সারাদিন বাইরে শ্রম দেন, রাতে গরম ঘরে ফিরেও যদি বিশ্রাম না পান, তার জন্য উত্তাপ দিনের শেষে শেষ হয় না। একই শহরে কেউ এসির তাপমাত্রা কমিয়ে স্বস্তি খোঁজেন, কেউ একটি ফ্যানের নিচে পরিবারের সবাইকে নিয়ে রাত কাটান। তাই শীতলতা জনস্বাস্থ্য ও ন্যায্যতারও প্রশ্ন। সমাধানের অগ্রাধিকার নির্ধারণে এই মানুষদের অবস্থাই আগে দেখতে হবে।বিদেশের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এখানে বাস্তব শিক্ষা নিতে পারি। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার ‘ক্লাইমেট-অ্যাডাপ্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের বাসেলে ২০০২ সালের বিধানে নতুন ও সংস্কার করা সমতল ছাদে সবুজায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়; ২০১০ সালে তা আরও জোরদার হয়। এর আগে আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে ছাদ সবুজ করার উদ্যোগ উৎসাহিত করা হয়েছিল। অর্থাৎ শুধু নির্দেশ দেওয়া হয়নি; সহায়তা ও নকশার নির্দেশনাও ছিল। এটি পুরো সুইজারল্যান্ডের প্রত্যেক বাড়ির জন্য একই নিয়ম এমনটা কিন্তু নয়। ঢাকায় এই ধারণা প্রয়োগ করতে হলে সবুজ ছাদকে ভবনের নকশার অংশ করতে হবে। ইপিএর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পরিকল্পিত উদ্ভিদ আচ্ছাদন ছাদের শীতলতায় সাহায্য করতে পারে। কিন্তু কয়েকটি টব রেখে পুরো ছাদ সবুজ হয়েছে বলা যায় না; জলরোধক স্তর, উপযুক্ত রোপণমাধ্যম ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাও প্রয়োজন। নির্দিষ্ট শ্রেণির নতুন ভবনে উপযোগী ছাদের অংশে সবুজায়নের শর্ত আনার প্রস্তাব বিবেচনা করা যায়। পানির ট্যাংক, সৌরবিদ্যুৎ, অগ্নিনিরাপত্তা ও চলাচলের জায়গা হিসাব করে মান নির্ধারণ করতে হবে। পুরোনো ভবনে ভেজা মাটিসহ অতিরিক্ত ওজন বহনের সক্ষমতা প্রকৌশলী দিয়ে পরীক্ষা ছাড়া বাগান চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। ঢাকার বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমের উপযোগী উদ্ভিদ, পরিচর্যা এবং পানি জমতে না দেওয়ার ব্যবস্থা একই পরিকল্পনায় থাকতে হবে। যেসব ভবনে সবুজ ছাদ সম্ভব নয়, সেখানে তাপ-প্রতিফলক প্রলেপ ও তাপ নিরোধক বিকল্প হতে পারে। ইপিএর উল্লেখ করা গবেষণায় এসিবিহীন আবাসিক ভবনে শীতল ছাদ সর্বোচ্চ অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা প্রায় ১.২ থেকে ৩.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানোর ফল পাওয়া গেছে। ঢাকাতেও একই ফল হবে ধরে না নিয়ে স্থানীয় ভবনে পরীক্ষা করতে হবে।আগামী গরম মৌসুমের আগে নির্বাচিত বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও নিম্ন আয়ের আবাসনে এসব ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা সম্ভব। কাজের আগে ও পরে ঘরের তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ ব্যবহার, খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণ তুলনা করা হোক। কার্যকর উদ্যোগে যাচাইসাপেক্ষ অনুদান বা করের ছাড় বিবেচনা করা যেতে পারে। নিয়মের সঙ্গে সামর্থ্য তৈরির সহায়তা না থাকলে বাস্তবায়ন দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যৌথভাবে পাড়াভিত্তিক রাতের তাপ পর্যবেক্ষণ শুরু করতে পারে। ঘনবসতি, বাজার, শ্রমজীবী মানুষের আবাসন এবং তুলনামূলক সবুজ এলাকায় একই পদ্ধতিতে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাস মাপতে হবে। শুধু উপগ্রহে দেখা ছাদ বা রাস্তার পৃষ্ঠতাপ নয়, মানুষের বসবাসের উচ্চতায় বাতাস এবং নির্বাচিত ঘরের ভেতরের অবস্থাও জানা দরকার। তথ্য প্রকাশ করে সবচেয়ে বিপন্ন এলাকাকে বরাদ্দে অগ্রাধিকার দিতে হবে।বৃক্ষরোপণের সাফল্যও চারার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখা চলবে না। তিন বছর পর কতটি গাছ বেঁচে আছে, কতটা ছায়া তৈরি হয়েছে সেই হিসাব চাই। পুরোনো বড় গাছ সংরক্ষণ, শিকড়ের জন্য জায়গা এবং পরিচর্যার বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ, বাসস্ট্যান্ড ও হাসপাতালের প্রবেশপথ আগে ছায়া পাক। ছাদের সবুজ দিয়ে মাটির গাছ রক্ষার দায়িত্ব পূরণ হয় না। নতুন বড় প্রকল্প অনুমোদনের সময় আশপাশের আলো-বাতাসের ওপর প্রভাব গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। অনুমোদিত নকশার ফাঁকা জায়গা বাস্তবে অক্ষুণ্ণ আছে কি না, নির্মাণশেষেও যাচাই করতে হবে। পরিবহনেও চাই নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন, ছায়াযুক্ত যাত্রীছাউনি এবং নিরাপদ হাঁটার পথ। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষমাণ গাড়ির অপ্রয়োজনীয় ইঞ্জিন চালু রাখা কমাতে সুশৃঙ্খল ওঠানামার ব্যবস্থা ও চালকদের ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থল দরকার।সবশেষে প্রয়োজন রাতকেও অন্তর্ভুক্ত করে তাপ-স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা। তীব্র গরমে নিরাপদ শীতল আশ্রয় কোথায় খোলা থাকবে, পানীয় জল কোথায় মিলবে, বিদ্যুৎ গেলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র কীভাবে চলবে এবং অসহায় প্রবীণদের খোঁজ কে নেবে আগেই ঠিক করতে হবে। বিদ্যমান কমিউনিটি সেন্টার ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে নিরাপত্তা, কর্মী, বিদ্যুৎ ও পরিচালন ব্যয় নিশ্চিত করেই।প্রতিটি উদ্যোগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, বাজেট ও সময়সীমা প্রকাশ করা জরুরি। বছর শেষে সাফল্য মাপতে হবে মানুষের পাওয়া সুবিধায় কত ঘরে উত্তাপ কমল, কত পথ ছায়া পেল, কত জলাশয়ের পানি ভালো হলো এবং কতজন বিপন্ন মানুষ সহায়তা পেলেন। সন্ধ্যা একসময় দিনের ক্লান্তি শেষে স্বস্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসত। ঢাকার মানুষ সেই সামান্য স্বস্তিটুকু ফিরে পাওয়ার দাবি রাখেন। শহরকে রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু আরও উত্তপ্ত করে তোলার সিদ্ধান্তগুলো থামানো সম্ভব। মাটি, পানি, গাছ ও বাতাসের জন্য জায়গা রেখে উন্নয়ন করাও সম্ভব।শহর ঘুমাতে চায়, মানুষও ঘুমাতে চায় কিন্তু কংক্রিটে জমে থাকা তাপ জেগে থাকে। ঢাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের পরিকল্পনায় তাই রাতেরও একটি জায়গা থাকা দরকার। একটি শহর কতটা বাসযোগ্য, তা শুধু দিনের ব্যস্ততা ও উঁচু ভবনে বোঝা যায় না বরং মানুষ রাতে কতটা স্বস্তিতে বিশ্রাম নিতে পারেন, সেই উত্তরেও বোঝা যায়।লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও শিক্ষক

ইশারা ভাষায় সমান অধিকার নিশ্চিত হোক

আজ ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস। শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও বধির মানুষের অধিকার, মর্যাদা এবং সমাজে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ এ দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়। ইশারা ভাষার ব্যবহার ও স্বীকৃতি বাড়ানো, শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তাদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের মানবাধিকার ঘোষণা’। একই সঙ্গে ২১ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বধির সপ্তাহ। এ বছর বিশ্ব বধির ফেডারেশনের ৭৫ বছর এবং জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদের ২০ বছর পূর্তিও হচ্ছে।শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের মৌলিক অধিকার অন্য সবার মতোই। তাদের অধিকার কারও দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও সামাজিক জীবনে তাঁদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। ইশারা ভাষা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, পরিচয়, সংস্কৃতি ও আত্মপ্রকাশের ভাষা।ইশারা ভাষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পেছনে দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৫১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রোমে বিশ্বের ২৫টি শ্রবণপ্রতিবন্ধী সংগঠনের সমন্বয়ে বিশ্ব বধির ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে সংগঠনটি ইশারা ভাষার স্বীকৃতির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করে। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের কাছে ২৩ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস ঘোষণার প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই বছরের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করে। ২০১৮ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। অবশ্য এরও আগে ১৯৫৮ সালে বিশ্ব বধির ফেডারেশনের উদ্যোগে প্রথম আন্তর্জাতিক বধির সপ্তাহ পালিত হয়েছিল।ইশারা ভাষা কোনো বিকল্প বা অসম্পূর্ণ ভাষা নয়। এর নিজস্ব ব্যাকরণ ও শব্দভান্ডার রয়েছে। উচ্চারিত ভাষার সঙ্গে এর গঠনগত পার্থক্য থাকলেও এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক ভাষা। মুখের অভিব্যক্তি ও দেহভঙ্গিও এ ভাষায় অর্থ প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ইশারা ভাষা প্রচলিত। আবার ভিন্ন ভাষার ইশারা ভাষা ব্যবহারকারীদের পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষাও ব্যবহৃত হয়। ইশারা ভাষার বিকাশ শুধু শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের জীবনকে সহজ করেনি, ভাষাবিজ্ঞান ও শিক্ষা প্রযুক্তির বিকাশেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মাত্রায় শ্রবণশক্তি হ্রাসের সমস্যায় ভুগতে পারে। তাদের মধ্যে ৭০ কোটির বেশি মানুষের শ্রবণ পুনর্বাসনের প্রয়োজন হতে পারে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য শ্রবণশক্তি পরীক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শ্রবণসহায়ক যন্ত্র এবং ইশারা ভাষাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য হলেও যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে তা শিক্ষা ও কর্মজীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।বাংলাদেশেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো না কোনো মাত্রায় শ্রবণপ্রতিবন্ধকতার শিকার। জন্মগত কারণ ছাড়াও বয়স, কানের বিভিন্ন রোগ, কানে ময়লা জমা, অতিরিক্ত শব্দ এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শ্রবণশক্তি কমতে পারে। নগর জীবনের অতিরিক্ত শব্দও এ সমস্যার অন্যতম কারণ। কিন্তু দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়। বধিরতার চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারও অনেকের জন্য ব্যয়বহুল এবং সহজলভ্য নয়।বাংলাদেশে বাংলা ইশারা ভাষা সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে ২০০৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। এর আগে ১৮৯৩ সালে কলকাতা মূক ও বধির বিদ্যালয়ে বাংলা ইশারা ভাষার চর্চার সূচনা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এর ব্যবহার ও বিকাশ নতুনভাবে এগোয়। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থা বাংলা ইশারা ভাষার একটি অভিধান প্রকাশ করে। বর্তমানে বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগেও ইশারা ভাষার ব্যবহার বাড়ছে। এসব উদ্যোগ শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও শ্রবণক্ষম মানুষের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।তবে বাস্তব চিত্র এখনও সন্তোষজনক নয়। দেশে শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ফরিদপুর, চাঁদপুর, সিলেট ও ঝিনাইদহে আটটি বাক্‌-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ৭২০ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। বেসরকারি পর্যায়েও ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু দেশের বিপুলসংখ্যক শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুর তুলনায় এ সুযোগ খুবই সীমিত। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যালয়ের অভাব প্রকট। ফলে অনেক শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের সমস্যার আরেকটি দিক হলো কর্মসংস্থান ও সামাজিক বৈষম্য। ইশারা ভাষা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান কম। অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইশারা ভাষায় যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। ফলে একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি চিকিৎসা নিতে গিয়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে গিয়ে কিংবা চাকরির ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়েন। শুধু বিশেষ বিদ্যালয় স্থাপন করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায়ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ইশারা ভাষার শিক্ষক, প্রশিক্ষিত দোভাষী ও সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক ও লাইন ডাইরেক্টর (এমআইএস), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর; ট্রেজারার, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন]

কৃষিভিত্তিক সমবায়: নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

বাংলাদেশের কোনো একটি উপজেলার কথা ভাবুন। পাঁচজন শিক্ষিত তরুণ একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন—তারা পাঁচটি চাকরির জন্য আলাদাভাবে অপেক্ষা না করে নিজেরাই একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলবেন। একজন উৎপাদন দেখবেন, একজন কৃষকের সঙ্গে যোগাযোগ ও কাঁচামাল সংগ্রহ করবেন, একজন হিসাব ও অর্থায়ন সামলাবেন, একজন বিক্রয় ও বিপণন দেখবেন এবং অন্যজন খাদ্য নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ ও নতুন পণ্য উন্নয়নের দায়িত্ব নেবেন। এই পাঁচজন যদি নিজেদের পুঁজি, শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতাকে এক জায়গায় আনতে পারেন, তাহলে একটি ছোট উদ্যোগই একদিন বহু মানুষের কর্মসংস্থান এবং শতাধিক কৃষকের বাজার তৈরি করতে পারে।বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার আলোচনা সাধারণত একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে হয়। কিন্তু একজন তরুণের পক্ষে একই সঙ্গে পর্যাপ্ত মূলধন সংগ্রহ, কারখানা পরিচালনা, কাঁচামাল কেনা, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, হিসাব রাখা এবং বাজার তৈরি করা কঠিন। চার-পাঁচজন মিলে কাজ করলে পুঁজির পাশাপাশি ঝুঁকি ও দায়িত্বও ভাগ হয়ে যায়। এখানে ‘সমবায়’ বলতে শুধু আইনগত সমবায় সমিতি বোঝানো হচ্ছে না। উদ্যোগটি নিবন্ধিত সমবায়, অংশীদারি ব্যবসা কিংবা শেয়ারভিত্তিক কোম্পানি—যেকোনো উপযুক্ত কাঠামোতে হতে পারে। মূল বিষয় হলো সম্মিলিত মালিকানা ও দায়িত্ব।তবে বন্ধুত্ব দিয়ে ব্যবসা শুরু করা গেলেও শুধু বন্ধুত্ব দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা যায় না। শুরুতেই লিখিতভাবে ঠিক করতে হবে কে কত টাকা বিনিয়োগ করবেন, কার কত মালিকানা থাকবে, কে পূর্ণকালীন কাজ করবেন, কে বেতন পাবেন, মুনাফা কীভাবে বণ্টিত হবে, বড় সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হবে এবং কোনো অংশীদার ব্যবসা ছেড়ে যেতে চাইলে কী হবে। পাঁচজন মালিক হলেও প্রতিদিনের কারখানা পরিচালনার জন্য একজনকে প্রধান দায়িত্ব দিতে হবে। পাঁচজন পাঁচ ধরনের নির্দেশ দিলে ভালো ব্যবসাও দ্রুত সমস্যায় পড়তে পারে।বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগের জন্য কৃষিভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। মৌসুমে টমেটো, আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রচুর উৎপাদিত হয়। সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে গেলে দাম কমে যায় এবং দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন। অথচ একই কৃষিপণ্য শুকিয়ে, রান্না করে, পিউরি, চাটনি, আচার, পাউডার বা অন্য মূল্যসংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করলে কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব। অর্থাৎ কৃষকের কমমূল্যের মৌসুমি পণ্যই হতে পারে তরুণদের শিল্পের কাঁচামাল।ধরা যাক, পাঁচজন তরুণ একটি বহুমুখী ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তুলবেন। উদাহরণ হিসেবে প্রকল্পটির মোট বিনিয়োগ এক কোটি টাকা ধরা যেতে পারে। পাঁচজন প্রত্যেকে ১০ লাখ টাকা করে দিলে নিজস্ব মূলধন হবে ৫০ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ৫০ লাখ টাকা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণসহ উপযুক্ত ব্যবসায়িক অর্থায়ন থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে প্রথমবারের উদ্যোক্তার জন্য পুরো এক কোটি টাকা দিয়ে শুরু করাই একমাত্র পথ নয়। ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করে বাজার তৈরি হওয়ার পর ধাপে ধাপে বিনিয়োগ বাড়ানো অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ।এক কোটি টাকার সব অর্থ ভবন ও যন্ত্রপাতিতে ব্যয় করা উচিত নয়। উদাহরণ হিসেবে ১০–১৫ লাখ টাকা কারখানার স্থান, শেড ও প্রাথমিক অবকাঠামো; ৩০–৩৫ লাখ টাকা ওয়াশিং, কাটিং, ড্রায়ার, কুকিং কেটলি, মিক্সিং, ফিলিং ও প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি; ৮–১০ লাখ টাকা বিদ্যুৎ, পানি, গুদাম ও অন্যান্য ইউটিলিটি; ৫–৭ লাখ টাকা পরীক্ষাগার, পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রাখা যেতে পারে। ব্র্যান্ড, প্যাকেজিং উন্নয়ন, নিবন্ধন ও প্রাথমিক বাজারজাতকরণের জন্যও অর্থ প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তত ২৫–৩০ লাখ টাকা কার্যকরী মূলধনের ব্যবস্থা রাখা। কারণ কারখানা তৈরি হওয়ার পর কাঁচামাল, প্যাকেট, বেতন, পরিবহন ও বিদ্যুতের জন্য প্রতিদিন নগদ অর্থ দরকার হবে। এগুলো কেবল উদাহরণমূলক হিসাব; প্রকৃত বিনিয়োগের আগে স্থানীয় কোটেশন নিয়ে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।একটি মাত্র মৌসুমি পণ্যের জন্য কারখানা করা ঝুঁকিপূর্ণ। বরং একই অবকাঠামো ব্যবহার করে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা ভালো। শীতকালে টমেটো থেকে শুকনো টমেটো, টমেটো ফ্লেক্স বা পাউডার; আমের মৌসুমে ম্যাঙ্গো চাটনি, আচার ও শুকনো আম; অন্য সময়ে আনারস, কলা বা কাঁঠাল শুকিয়ে প্যাকেটজাত করা যেতে পারে। এতে যন্ত্রপাতি বছরের বেশি সময় ব্যবহৃত হবে এবং একটি পণ্যের বাজার খারাপ হলে অন্য পণ্য ব্যবসাকে সহায়তা করবে।সান-ড্রাইড বা নিয়ন্ত্রিতভাবে শুকানো টমেটো একটি ভালো উদাহরণ। মৌসুমে কম দামে টমেটো সংগ্রহ করে প্রথমে বাছাই ও ধোয়া হবে। এরপর সমান আকারে কেটে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শুকিয়ে নিরাপদ আর্দ্রতায় আনতে হবে এবং উপযুক্ত প্যাকেটে সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা দরকার—টমেটোর অধিকাংশই পানি। ১০ কেজি তাজা টমেটো থেকে হয়তো প্রায় ০.৭ থেকে ১.২ কেজি শুকনো পণ্য পাওয়া যেতে পারে; প্রকৃত ফলন জাত, পরিপক্বতা, বাছাইয়ের ক্ষতি এবং চূড়ান্ত আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করবে।ধরা যাক ১০ হাজার কেজি টমেটো প্রতি কেজি ১২ টাকা দরে কেনা হলো। কাঁচামালের দাম হলো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যদি ৮৫০ কেজি বিক্রয়যোগ্য শুকনো টমেটো পাওয়া যায়, তাহলে শুধু কাঁচা টমেটোর খরচই প্রতি কেজি শুকনো পণ্যে প্রায় ১৪১ টাকা। এর সঙ্গে শ্রম, শুকানোর বিদ্যুৎ বা জ্বালানি, পানি, প্যাকেজিং, পরিবহন, পরীক্ষাগার, কারখানার স্থায়ী খরচ, বিক্রয় কমিশন এবং অর্থায়নের ব্যয় যোগ হবে। সব মিলিয়ে যদি প্রতি কেজির প্রকৃত খরচ ৩০০–৪০০ টাকা হয়, তাহলে বাজারে ৪০০ টাকায় বিক্রি করে বড় মুনাফা হবে—এমন ধারণা করা ভুল। বাজার ৭০০, ৮০০ বা ১,০০০ টাকা দিতে প্রস্তুত কি না, সেটিই আগে পরীক্ষা করতে হবে।ম্যাঙ্গো চাটনির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। শুধু আম, চিনি ও মসলার দাম যোগ করলেই উৎপাদন খরচ পাওয়া যায় না। বোতল, ঢাকনা, লেবেল, কার্টন, শ্রম, রান্নার জ্বালানি, পানি, মান পরীক্ষা, পরিবহন, পরিবেশকের কমিশন এবং খুচরা বিক্রেতার মার্জিনও রয়েছে। ধরুন ৫০০ গ্রামের একটি বোতল চাটনির সম্পূর্ণ কারখানা-পর্যায়ের খরচ ১০০ টাকা। উৎপাদক ১২৫–১৩০ টাকায় পরিবেশককে দিলে এবং শেষ পর্যন্ত দোকানে ১৬০–১৮০ টাকায় বিক্রি হলে উৎপাদক, পরিবেশক ও দোকানদার—সবার জন্য ব্যবসাটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু ক্রেতা যদি ১২০ টাকার বেশি দিতে না চান, তাহলে পণ্যটি যত ভালোই হোক, ব্যবসার মডেল পরিবর্তন করতে হবে।এই কারণেই কারখানা তৈরির আগে বাজার পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। পাঁচজন তরুণ প্রথমেই লাখ লাখ প্যাকেট উৎপাদন না করে ৫০০ বা ১,০০০ প্যাকেট শুকনো টমেটো এবং কয়েকশ বোতল চাটনি তৈরি করতে পারেন। স্থানীয় রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ, অনলাইন ক্রেতা এবং পরিবারের কাছে বিক্রি করে জানতে হবে—স্বাদ কেমন, প্যাকেটের আকার ঠিক আছে কি না, কত দাম দিতে রাজি এবং দ্বিতীয়বার কিনতে চান কি না। বাজার পরীক্ষায় ব্যর্থ একটি পণ্যের জন্য ৩০ লাখ টাকার মেশিন কেনার কোনো অর্থ নেই।কারখানার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সস্তা জমি দেখলে হবে না। আশপাশে পর্যাপ্ত কাঁচামাল আছে কি না, কৃষকের কাছ থেকে দ্রুত কারখানায় আনা যায় কি না, নিরাপদ পানি ও বিদ্যুৎ আছে কি না, শ্রমিক পাওয়া যায় কি না এবং ঢাকা বা অন্য বড় বাজারে পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা কেমন—সব বিবেচনা করতে হবে। কৃষিপণ্য উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি প্রক্রিয়াজাতকরণ হলে পরিবহন ও সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি দুটিই কমানো সম্ভব।খাদ্য নিরাপত্তা শুরু থেকেই ব্যবসার কেন্দ্রে থাকতে হবে। ছোট কারখানা মানেই নিম্নমানের কারখানা নয়। নিরাপদ পানি, কর্মীদের পরিচ্ছন্নতা, কাঁচা ও প্রস্তুত পণ্যের পৃথক প্রবাহ, পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার লিখিত পদ্ধতি, তাপমাত্রা ও সময় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি ব্যাচের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। শুকনো পণ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী আর্দ্রতা ও পানির সক্রিয়তা এবং চাটনি বা সসে পিএইচ, অম্লতা ও তাপ প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। পণ্যভেদে বাংলাদেশের প্রযোজ্য খাদ্য আইন, মান, নিবন্ধন ও লেবেলিংয়ের শর্তও মেনে চলতে হবে।একইভাবে প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভালো পণ্য দুর্বল প্যাকেটে দিলে আর্দ্রতা ঢুকে মান নষ্ট হতে পারে। আবার অতি ব্যয়বহুল প্যাকেজিং করলে পণ্যের দাম ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। একটি নতুন ব্র্যান্ডের পরিচয়ও স্পষ্ট হওয়া দরকার—কোন অঞ্চলের কাঁচামাল, কীভাবে কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পণ্যটির বিশেষত্ব কী। প্রথমে স্থানীয় বাজার, রেস্টুরেন্ট ও অনলাইন বিক্রিতে অবস্থান তৈরি করে পরে বড় শহর ও রপ্তানির দিকে যাওয়া অধিক বাস্তবসম্মত।আর্থিক পরিকল্পনায় ব্রেক-ইভেন বোঝাও জরুরি। ধরুন কারখানার বেতন, ভাড়া, প্রশাসন, রক্ষণাবেক্ষণ, সুদসহ বছরে স্থায়ী ব্যয় ১৮ লাখ টাকা এবং কাঁচামাল, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বিক্রয় ব্যয় বাদ দেওয়ার পর বিক্রয়ের ৩০ শতাংশ স্থায়ী খরচ মেটাতে থাকে। তাহলে আনুমানিক ব্রেক-ইভেন বিক্রয় হবে বছরে ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এর পরের বিক্রয় থেকেই প্রকৃত পরিচালন মুনাফার সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি টমেটোর দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে গেলে, উৎপাদন ফলন কমলে বা বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৫ শতাংশ কম হলে ব্যবসাটি টিকবে কি না—আগেই হিসাব করা দরকার।এই মডেলের সবচেয়ে বড় সামাজিক সুবিধা হলো এর প্রভাব পাঁচজন মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ছোট কারখানায় ১০–১৫ জন স্থায়ী কর্মী এবং মৌসুমে আরও ২০–৩০ জন কাজ পেতে পারেন। কয়েক ডজন বা শতাধিক কৃষক নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারেন। পরিবহনকারী, প্যাকেজিং সরবরাহকারী, পরিবেশক ও দোকানদারও এই অর্থনৈতিক চক্রে যুক্ত হন। বাছাই, মান পরীক্ষা, প্যাকেজিং ও প্রশাসনিক কাজে স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থানেরও ভালো সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।তবে শুরুতেই বড় হওয়ার চেষ্টা না করে ধাপে ধাপে এগোনো উচিত। প্রথমে ৫–১০ লাখ টাকার পরীক্ষামূলক উৎপাদন, তারপর ২৫–৫০ লাখ টাকার ছোট ইউনিট এবং বাজার ও নগদ প্রবাহ স্থিতিশীল হলে এক কোটি বা তার বেশি বিনিয়োগ—এটি অনেক বেশি নিরাপদ পথ। প্রথম বছরের সাফল্য কোটি টাকার মুনাফা নয়; বরং এমন দুই-তিনটি পণ্য তৈরি করা, যা ক্রেতা একবার কেনার পর আবার কিনতে চান।আমরা তরুণদের দীর্ঘদিন ধরে জিজ্ঞেস করছি, ‘চাকরি পেয়েছ?’ হয়তো এখন আরেকটি প্রশ্ন করার সময় এসেছে—‘তোমরা পাঁচজন মিলে কী তৈরি করতে পারো?’ বাংলাদেশের কৃষি আছে, কাঁচামাল আছে, বিশাল ভোক্তা বাজার আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, তরুণ জনগোষ্ঠী আছে। এখন প্রয়োজন এই শক্তিগুলোকে এক জায়গায় আনা।আজ পাঁচজন তরুণের একটি ছোট শুকনো টমেটো, ম্যাঙ্গো চাটনি বা ফল প্রক্রিয়াজাত কারখানাকে হয়তো খুব বড় কিছু মনে হবে না। কিন্তু সঠিক প্রযুক্তি, আর্থিক শৃঙ্খলা, খাদ্য নিরাপত্তা, বাজারজ্ঞান এবং সততার সঙ্গে পরিচালিত হলে সেই ছোট উদ্যোগই একদিন একটি জাতীয় খাদ্য ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাই হয়তো লেখা হবে বড় কোনো করপোরেট ভবনে নয়—একটি উপজেলার ছোট কারখানায়, পাঁচজন তরুণের সম্মিলিত স্বপ্ন দিয়ে।[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা

শিক্ষা একটি জাতির আত্মপরিচয়, অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ব্যক্তির জ্ঞান, বিবেক, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটিয়ে তাকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু শিক্ষা যখন কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করা, মুখস্থবিদ্যা অর্জন এবং সনদ সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত গতানুগতিক শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল কারণ এখানেই।বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে; প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন, অর্থনীতি ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদা প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। অথচ আমাদের শিক্ষার একটি বড় অংশ এখনো মুখস্থনির্ভরতা, পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা ও প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে আবদ্ধ। ফলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করলেও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব জীবন ও কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। দেশের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্য যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের কোন বিকল্প নেই। আধুনিক অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদকে অধিক মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।গতানুগতিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তির পরিবর্তে স্মৃতিশক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখে ভালো নম্বর পাওয়া শিক্ষার সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থী কেন একটি বিষয় শিখছে, সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে কীভাবে প্রয়োগ করবে কিংবা কোনো সমস্যার নতুন সমাধান কীভাবে বের করবে—এসব প্রশ্ন অনেক সময় গৌণ হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীর মধ্যে অনুসন্ধিৎসা, যুক্তিবোধ ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা যথেষ্ট বিকশিত হয় না। পরীক্ষার পর মুখস্থ করা তথ্যের বড় অংশ ভুলে গেলেও পরীক্ষার ফলাফলই তার শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রধান পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়। গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা মূলত শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের সংকীর্ণ ধারণার ফল।শিক্ষা যদি কেবল সনদ, নম্বর ও চাকরির প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে একটি জাতি দক্ষতার কিছু সূচক অর্জন করলেও সৃজনশীল ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারবে না। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করবে, অনুসন্ধান করবে, ভুল থেকে শিখবে, নতুন ধারণা তৈরি করবে এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করবে। শিক্ষা হবে জীবনের প্রস্তুতি, শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার মান, উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতার ওপর। শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার কিংবা সনদ অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং একজন মানুষকে জ্ঞানী, দক্ষ, দায়িত্বশীল, মানবিক ও যুক্তিবাদী নাগরিকে পরিণত করার প্রধান উপায়। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে শিক্ষা। বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও “সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা”কে তার অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে অগ্রগতি হলেও শিক্ষার গুণগত মান, বৈষম্য, শিক্ষকতার মান, মুখস্থনির্ভরতা, পরীক্ষা-কেন্দ্রিকতা, দক্ষতার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের আলোচনা নতুন নয়।  তাই শিক্ষা সংস্কারকে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, জাতীয় অস্তিত্ব ও উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো সমাজের পিছিয়ে পড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা, যাতে তারা দারিদ্র‍্য, বেকারত্ব, অসুস্থতা বা অন্য কোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত না হয়। সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী-নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, খাদ্য সহায়তা, কর্মসংস্থান কর্মসূচি, শিক্ষাবৃত্তি এবং দুর্যোগকালীন ত্রাণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য শুধু দরিদ্র মানুষের মধ্যে অর্থ বা খাদ্য বিতরণ নয়; বরং তাদের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা ও জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা। সামাজিক নিরাপত্তা দারিদ্র‍্য ও বৈষম্য কমাতে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে বিপুল জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র‍্য ও বিভিন্ন সামাজিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি ক্রমেই বাড়ানো হয়েছে। তবে এসব কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শুধু মানুষের দুর্দশা লাঘব করে না; বরং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে।বর্তমান বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়; বরং এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যদি সঠিক ও ভুলের পার্থক্য নির্ণয় করতে শেখানো না হয় এবং ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে সততা ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দেওয়ার শিক্ষা না দেওয়া হয়, তবে কোনো দুর্নীতি দমন কমিশন, কোনো আইনগত সংস্কার কিংবা কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা একাই দুর্নীতি নির্মূল করতে পারবে না। এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হলো বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে শুধু কতজন স্নাতক তৈরি হলো তার ওপর নয়; বরং তারা সমাজে কী ধরনের মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং আদর্শ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে তার ওপর। তাই মূল্যবোধভিত্তিক উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ মানে শুধু মানবসম্পদে বিনিয়োগ নয়; এটি জাতির নৈতিক পুঁজিতে বিনিয়োগ। শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য পরীক্ষার খাতায় কত নম্বর পাওয়া গেল, তার মধ্যে নয়; বরং একজন শিক্ষার্থী কতটা যুক্তিবাদী, দক্ষ, সৃজনশীল, নৈতিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠল—তার মধ্যেই শিক্ষার আসল সার্থকতা। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অতীতের মতো আবারও এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক কাজটা অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে সম্পন্ন করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে একটা বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে সমাজের সর্বস্তরে যে আলাপ চলছে, সেখানে শিক্ষা একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে হাজির আছে। আলাপ উঠেছে শিক্ষা সংস্কারেরও। শিক্ষা সংস্কারে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে? গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা ও আমাদের করণীয় শীর্ষক বিভিন্ন সভা, সেমিনার এবং কর্মশালার মাধ্যমে একটি গণ আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে। গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা বিমোচনে শিক্ষা সংস্কার এর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা সংস্কার ছাড়া মানব সম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা সম্ভব নয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

খাবার অপচয়ের অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক

খাবার মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। ক্ষুধা নিবারণের জন্য মানুষ প্রতিদিন পরিশ্রম করে, অর্থ ব্যয় করে এবং খাদ্য সংগ্রহ করে। অথচ আমাদের সমাজেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাবার নানা কারণে অপচয় হয়। কারও ঘরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রান্না হয়, কোথাও অনুষ্ঠানে প্লেটে অতিরিক্ত খাবার নেওয়া হয়, আবার কোথাও খাবার পরিবেশন ও সংরক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় খাবার নষ্ট হয়ে যায়।খাবারের অপচয়কে আমরা অনেক সময় স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখি। বিয়ের অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজন, রেস্তোরাঁ কিংবা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে প্লেটে খাবার রেখে উঠে আসা যেন অনেকের কাছে বড় কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু একটি প্লেটে ফেলে রাখা খাবারের পেছনে কৃষকের শ্রম, জমি, পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, অর্থ—সবকিছুই জড়িয়ে আছে। ফলে খাবার অপচয় শুধু একটি খাবার নষ্ট করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সম্পদ ও শ্রমের অপচয়ও।প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নেওয়ার সংস্কৃতিখাবার অপচয়ের অন্যতম কারণ আমাদের ভোগের মানসিকতা। কোনো অনুষ্ঠানে নানা ধরনের খাবার দেখলে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার প্লেটে নেন। খাওয়া সম্ভব না হলেও প্লেটে পড়ে থাকা খাবার শেষ পর্যন্ত ফেলে দিতে হয়।অন্যদিকে সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার আয়োজনের প্রবণতাও দেখা যায়। অতিথি কম হলেও খাবারের পরিমাণ বেশি না হলে যেন আয়োজন অসম্পূর্ণ—এমন একটি ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে।অতিথিকে ভালো খাবার খাওয়ানো অবশ্যই সৌজন্যের অংশ। কিন্তু সৌজন্য ও অপচয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। আয়োজনের সৌন্দর্য খাবারের পরিমাণে নয়, বরং ব্যবস্থাপনা ও আন্তরিকতায়।খাবারের পেছনে কত মানুষের শ্রমআমরা যখন একটি প্লেট ভাত সামনে পাই, তখন হয়তো শুধু ভাতটুকুই দেখি। কিন্তু সেই ভাতের পেছনে রয়েছে কৃষকের দীর্ঘ পরিশ্রম। জমি প্রস্তুত করা, বীজ বোনা, সেচ দেওয়া, ফসলের পরিচর্যা, ধান কাটা, মাড়াই, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ—প্রতিটি ধাপে মানুষের শ্রম রয়েছে।একইভাবে মাছ, মাংস, শাকসবজি, ফল কিংবা অন্যান্য খাদ্যের পেছনেও রয়েছে অসংখ্য মানুষের পরিশ্রম।তাই খাবার নষ্ট করার আগে আমাদের একবার ভাবা উচিত—যে খাবারটি আমরা সহজে ফেলে দিচ্ছি, সেটি আমাদের প্লেটে পৌঁছাতে কত মানুষের শ্রম ব্যয় হয়েছে?খাবারের প্রতি সম্মান দেখানো মানে শুধু খাবার না ফেলা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রমের প্রতিও সম্মান দেখানো।একদিকে অপচয়, অন্যদিকে খাদ্যনিরাপত্তার চিন্তাসমাজে এমন অনেক পরিবার রয়েছে যাদের প্রতিদিনের খাবারের হিসাব করতে হয়। মাসের শুরুতে যে বাজার করা সহজ মনে হয়, মাসের শেষ দিকে সেটিই অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতার মধ্যে যখন অন্যদিকে খাবার অনায়াসে ফেলে দেওয়া হয়, তখন বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানবিক প্রশ্নও তৈরি করে। অবশ্য খাবারের অপচয় বন্ধ করলেই সমাজের সব মানুষের খাদ্যসংকট দূর হয়ে যাবে—এমন সরল সমীকরণ করা ঠিক নয়। তবে অপচয় কমানো খাদ্যসম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।খাদ্য মানুষের অধিকার ও প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। তাই খাদ্য নিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ একটি মানবিক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।রেস্তোরাঁ ও অনুষ্ঠানে সচেতনতা জরুরিখাবার অপচয়ের বড় একটি ক্ষেত্র হতে পারে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও খাবারের আয়োজন। এখানে আয়োজক এবং অতিথি—দুই পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে।আয়োজকদের উচিত অতিথির সম্ভাব্য সংখ্যা বিবেচনা করে খাবারের পরিকল্পনা করা। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত রান্না না করা, সঠিকভাবে খাবার সংরক্ষণ করা এবং খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অতিথিদেরও দায়িত্ব রয়েছে। একবারে অনেক খাবার প্লেটে না নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী নেওয়া যেতে পারে। কোনো খাবার ভালো না লাগলে সেটি প্লেটে তুলে রেখে দেওয়ার পরিবর্তে অল্প পরিমাণ নেওয়াই ভালো।ছোট একটি অভ্যাস বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।অপচয় বন্ধে শুধু আবেগ নয়, ব্যবস্থাপনাও দরকারখাবার অপচয় নিয়ে আমরা অনেক আবেগপূর্ণ কথা বলি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন বাস্তব ব্যবস্থাপনা।খাদ্য সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা, সরবরাহব্যবস্থায় অপচয় কমানো, বাজার ও রেস্তোরাঁয় প্রয়োজনভিত্তিক পরিকল্পনা এবং মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।কৃষকের উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহের প্রতিটি ধাপে কোথায় অপচয় হচ্ছে, সেটি চিহ্নিত করা জরুরি।শুধু ভোক্তাকে দায়ী করলেই হবে না। উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও ভোগ—প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।[লেখক :প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]

আনন্দময় শৈশব চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই

রবিবারের ভোরের সূর্য, চোখ মেলে তাকালেই মনটা আঁকুপাঁকু করে উঠত। সপ্তাহজুড়ে অপেক্ষা ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবারের জন্য। সকাল দশটায় খেলাঘর আসরের আবৃত্তি প্রশিক্ষণ। আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, অসমাপ্ত গল্প সমাপ্তকরণ আরও কত কিছু। কত অসমাপ্ত গল্প সমাপ্ত করেছি কিন্তু যে সমাজে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছি সে সমাজের অসমাপ্ত গল্পের উপসংহারে পৌঁছানোর পথটি মনে হয় অনন্তে মিলিয়ে গেছে।আমাদের শৈশব-কৈশোর ছিল সোনায় মোড়ানো। ছুটির দিনে মাঝে মাঝে শরীরচর্চা বিশেষ করে ব্রতচারী নৃত্য। “চল কোদাল চালাই, ভুলে মনের বালাই, ঝেড়ে অলস মেজাজ, হবে শরীর ঝালাই...।” এই ব্রতচারী নৃত্যের প্রবর্তক যে ছিলেন শ্রদ্ধেয় গুরুসদয় দত্ত, যার বাড়ি ছিল সিলেটের জকিগঞ্জের বীরগ্রামে, সে তথ্য জানা ছিল না। তাঁর গৌরবময় জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলাম। ব্রতচারী নৃত্যে অংশগ্রহণ করেই আনন্দ। ছন্দে, ছন্দে শরীরচর্চা, দেহ মনকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। আমাদের শৈশবে মুকুল ফৌজের কার্যক্রম কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। খেলাঘর আসর, চাঁদের হাট, কচিকাঁচার মেলা, শাপলার মেলা ছিল দারুণ সক্রিয়। শহরের এ পাড়ায় খেলাঘর তো অন্য পাড়ায় কচিকাঁচার মেলা। এভাবে চাঁদের হাট, শাপলার মেলা সহ নাম না জানা অনেক শিশু, কিশোর সংগঠন সারা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। সব শিশুদের জন্য দ্বার অবারিত। সৃজনশীল কিছু শেখার বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ দেনা-পাওনার বাইরের বিষয়। বাণিজ্য তখনো প্রবেশ করতে পারেনি এসব সৃষ্টিশীল কার্যক্রমে। যারা শেখাতেন তারা মনে করতেন পরের প্রজন্মকে তৈরি করে যাওয়া তাদের কর্তব্য। যারা শিখত তারা প্রাণের আনন্দে মনপ্রাণ ঢেলে দিত সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।ষাট, সত্তর এমন কী আশির দশক পর্যন্ত এসব শিশু সংগঠনের নামের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না, এরকম সত্যিকার শিক্ষিত মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার ছিল আমাদের দেশে। শৈশব-কৈশোরের কোনো না কোনো পর্বে এইসব শিশু-কিশোর সংগঠনের কোনোটার সদস্য কিংবা তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন না, এরকম মানুষের সংখ্যাও প্রগতিশীল, সংস্কৃতিলগ্ন সমাজে খুব কম ছিল বলে মনে করি। বাংলাদেশের সমাজ, ইতিহাস, উত্থান এবং জাতিগঠনের পেছনে এই সংগঠনসমূহ ও তাদের সভ্যদের গুরুত্বপূর্ণ, গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে। অথচ এখনকার শিশু, কিশোর, তরুণ এমনকি মাঝবয়সীদেরও অনেকেই এই সংগঠনসমূহের অস্তিত্ব ও তাদের কার্যকলাপ বিষয়ে একেবারেই অবগত নয় বলেই আমার ধারণা। এর কারণ, বাস্তবে এখন আর এই সংগঠনগুলোর তেমন কোনো জোরালো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।খেলাঘরের মূল স্লোগান ছিল, “আনন্দময় শৈশব চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই।” শিশুদের জন্য এত সুন্দর এবং যথাযথ স্লোগান খুব কম শুনেছি। আনন্দময় শৈশব না থাকলে কী হয়। সমাজ সুস্থ থাকে না। সমাজ অসুস্থ এবং অস্থির থাকলে শিশুরা দায়িত্বহীন, বিকল মস্তিষ্কের মানুষ হিসেবে বাড়তে থাকে। সচেতন মানুষেরা কী কিছুটা টের পাচ্ছেন। হাজার হাজার শিশু নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। সৃষ্টিশীলতায় মগ্ন থেকে জীবন ধারণ তো দূরের কথা, কোথায় কোন দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে ছোট, ছোট শিশুরা সে খবর, রাষ্ট্র, সমাজ কেউ জানে না। আর একটি বিষয় ভাবলে অবাক হতে হয়, নাগরিক সমাজ কিংবা রাজনৈতিক দলগুলো নির্লিপ্ত, উদাসীন। উদাসীন মানুষ কিংবা সমাজ, সংগঠনের মনের কথা পাঠ করা খুব কঠিন। এই যে অগণন শিশু নানা ভাবে ধর্ষিত হচ্ছে, এর জন্য জোরালো, দলবদ্ধ প্রতিবাদ কর্ণকুহরে এখনও পৌঁছেনি। আসলে এ দেশে শিশুরা ভালো নেই, তাদের নিরাপত্তাও নেই, আনন্দ-বিনোদনের ব্যবস্থাও নেই। শিশু কেন, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা কি সুস্থুস্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারছে, যাতে তারা দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠতে পারে? সমাজে যে প্রবল অস্থিরতা ও মারাত্মক নিষ্ঠুরতার প্রবাহ চলছে, তা সমাজ ও রাষ্ট্রের অবহেলায় দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা এক গভীর সামাজিক ব্যাধি। বড় ভয় হয়, আমাদের এগোনোর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে।শৈশব থেকে যে শিশু সৃষ্টিশীলতার বিকাশের অবাধ সুযোগ পেয়ে থাকে সে শিশু আকাশের মতো বড় হয়ে ওঠে। ওই যে সুনির্মল কুমার বসুর অসাধারণ সেই কবিতা, “আকাশ আমায় শিক্ষা দিলে উদার হতে ভাইরে/ কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাইরে।” জীবনের শুরুতেই উদার মনোবৃত্তি ধারণ করে সবার কাছে শিক্ষা নিয়ে মানবিক মানুষ হওয়ার শিক্ষা নেওয়ার ব্রত ধারণ করা; সেই শিক্ষা এবং ব্রত কোথায়।কে না জানে যে মানুষের মানবিক হয়ে ওঠার জন্য তার সুকুমারবৃত্তি চর্চার এবং সুকুমার কলা উপভোগের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। নাগরিকের সব পেশাগত দক্ষতা, বৃত্তিমূলক কাজের উৎকর্ষ অর্জন নিশ্চয়ই করতে হবে, মৌলিক শিক্ষাতেও তাকে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। কিন্তু তার চাপে একজন সংবেদনশীল দায়িত্ববান মানুষ হয়ে ওঠায় কোনো ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। আমরা সবাই উল্টোরথে মনে হয় উল্টো পথেই চলছি।সময় পাল্টেছে, বাস্তবতা পাল্টেও গেছে, পাল্টে গেছে ভূগ্রাম। জীবনের প্রয়োজন, চাওয়া-পাওয়া ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন রকম হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক শিশু সাহায্য সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘চুরি হয়ে যাওয়া শৈশব’-বিষয়ক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন বা তারও বেশি শিশুর শৈশব নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা বাংলাদেশে চরম পর্যায়ে। এখানে চলছে সন্তানকে জোরজবরদস্তি করে কিছু একটা বানানোর অসম প্রতিযোগিতা। শহরের শিশুদের খেলার জায়গা নেই, তাই শিশুরা মুঠোফোন গেমসে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মার্কিন জার্নাল ‘পেডিয়াট্রিক্স’-এ প্রকাশিত একটি জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব শিশু প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভি দেখে বা কম্পিউটারে খেলার জন্য স্ক্রিনের সামনে বসে থাকে, তারা অন্য শিশু যারা এসব করে না তাদের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বেশি সমস্যায় ভোগে। তারা বেশি আবেগপ্রবণ হয় তাই তাদের সবকিছুই অতিরিক্ত পর্যায়ে চলে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে স্মার্টফোন, আইফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, ডিজিটাল ক্যামেরার প্রতি বড়দের দেখে শিশুদেরও আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। শিশুদের স্ক্রিন আসক্তি নিয়ে ‘গ্লো কিডস : হাউ স্ক্রিন এডিকশন ইস হাইজেকিং আওয়ার কিডস অ্যান্ড হাউ টু ব্রেক দ্য ট্রেন্স’ নামে বই লিখেছেন মার্কিন সাইকোথেরাপিস্ট ও আসক্তি বিশেষজ্ঞ ড. নিকোলাস কারদারাস। তিনি স্ক্রিন এডিকশনকে ‘নতুন শতাব্দীর মাদক’ বলে উল্লেখ করেছেন।প্রশ্ন হলো আমরা কী প্রযুক্তির বিকাশ রোধ করতে পারব। প্রযুক্তি তাঁর উৎকর্ষ নিয়ে এগিয়ে যাবে, কোন কালেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তির চলার পথে কেউ বাঁধ নির্মাণ করতে পারেনি। তাহলে কী করা প্রয়োজন প্রযুক্তির সংস্কৃতি সংলগ্ন ব্যবহারের পথ খুঁজতে হবে। প্রযুক্তি তো সারা বিশ্বের মানুষ ব্যবহার করছে। কোন পথে হাঁটলে “ঠাকুরমার ঝুলি”, রূপকথা, দস্যু বনহুর, হাসন, লালন এবং তাদের মানবিক বাণীকে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় প্রবেশ করানো যায়। কীভাবে অন্যান্য শিক্ষার সঙ্গে আমাদের গাজীর গানকে যুক্ত করা যায়। “নানা বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ, জগত ভরমিয়া দেখালাম একই মায়ের পুত” বিশ্বচরাচর ঘুরে আসলে এরকম মানবিক বাণী কী খুঁজে পাওয়া যাবে, জানি না। প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংযোগ না ঘটলে কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে কাজটা কঠিন। বহু বছরে বেশ কয়েকটি প্রজন্ম সংস্কৃতি-চিন্তা ও বোধ ছাড়াই বড় হয়েছে; গান শোনে না, নাটক দেখে না, বই পড়ে না এমন মানুষ স্কুল শিক্ষকতায় এত বেশি যুক্ত রয়েছেন যে তাঁদের পক্ষে কিশোর তরুণদের হারাতে বসা সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানো কঠিন হবে বলে মনে হয়।শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সংযোগ ঘটানোর কথা আমরা বহুকাল ধরে বলে আসছি। আশার কথা, বর্তমান সরকার গুরুত্বটা অনুধাবন করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে কাজটা কঠিন। একে বহু বছরে বেশ কয়েকটি প্রজন্ম সংস্কৃতি-চিন্তা ও বোধ ছাড়াই বড় হয়েছে; গান শোনে না, নাটক দেখে না, বই পড়ে না এমন মানুষ স্কুল শিক্ষকতা এত বেশি রয়েছেন যে তাঁদের পক্ষে কিশোর তরুণদের হারাতে বসা সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তারপরও অভিভাবকদেরও একই অবস্থা—সুকুমারবৃত্তির চর্চায় সন্তানদের উৎসাহিত করার সক্ষমতা তাঁদেরও তো নেই। এ অবস্থায় দেশে আজ একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ সময়ের দাবি। মানুষের মানবিক অভিযাত্রা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

কৃষির পরিবর্তনের সঙ্গে বদলাক বিএডিসি

বাংলাদেশের কৃষি বদলে গেছে। বদলে গেছে কৃষকের চাহিদা, উৎপাদনব্যবস্থা, বাজারের ধরন এবং কৃষির ঝুঁকি। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ, রোগবালাই, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে কৃষি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। একই সঙ্গে কৃষক এখন শুধু পরামর্শ চান না; তিনি চান উন্নতমানের বীজ, সময়মতো সার, নির্ভরযোগ্য সেচ, আধুনিক প্রযুক্তি, তথ্য, পরামর্শ এবং দ্রুত সেবা।এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় দেশের কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন—বিএডিসিকেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হবে। তাই এ প্রজন্মের কৃষকের চাহিদা পূরণে বিএডিসির সংস্কার এখন আর উচ্চবিলাসী নয়, সময়ের অপরিহার্য দাবি। বিএডিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ, সার ব্যবস্থাপনা, সেচ উন্নয়ন, কৃষি উপকরণ বিতরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অবদান সুদীর্ঘ।কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কাঠামো, জনবল, প্রযুক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। পুরোনো কাঠামো দিয়ে নতুন প্রজন্মের কৃষকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা কঠিন। ফলে প্রয়োজন এমন একটি আধুনিক ও গতিশীল বিএডিসি, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, মাঠের বাস্তবতা বুঝবে এবং কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো সেবা পৌঁছে দিতে পারবে। বিএডিসির সংস্কার বলতে কোনোভাবেই শুধু জনবল কমানো, পদ বিলুপ্ত করা কিংবা সাংগঠনিক কাঠামো সংকুচিত করাকে বোঝানো উচিত নয়। বরং সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কাজের গতি বাড়ানো, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন, মাঠপর্যায়ে ক্ষমতায়ন এবং দক্ষ জনবলকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো।কৃষির মতো মৌসুমনির্ভর ও জরুরি খাতে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের ওপর। বীজ, সার বা সেচের ক্ষেত্রে এক ঘণ্টার বিলম্বও অনেক সময় একটি মৌসুমের উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই বিএডিসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও ফলাফলভিত্তিক করা প্রয়োজন। বিএডিসির সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এর অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনবল। এই শক্তি শুধু কর্মকর্তা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মচারী, দক্ষ টেকনিশিয়ান, মাঠকর্মী, কারিগরি জনবল এবং কর্মকর্তাদের সম্মিলিত দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের মাঠ অভিজ্ঞতার মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিহিত।দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষি উপকরণ, বীজ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনায় কাজ করতে গিয়ে এই জনবল যে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা কোনো কাগুজে সাংগঠনিক কাঠামো দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই সংস্কারের নামে এই অভিজ্ঞ জনশক্তিকে অবমূল্যায়ন করা বা অকার্যকর করে দেওয়া হবে আত্মঘাতী। অভিজ্ঞ জনবলকে বাদ দিয়ে নয়, তাঁদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটিয়েই ভবিষ্যতের বিএডিসি গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে সার সরবরাহ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রে উদ্বেগ ও আলোচনা দেখা যাচ্ছে।এই বাস্তবতায় বিএডিসির নন-ইউরিয়া সার ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। ডিএপি, টিএসপি ও এমওপিসহ নন-ইউরিয়া সার আমদানি ও সরবরাহে বিএডিসি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে আসছে। সার ব্যবস্থাপনার সাফল্য শুধু কত টন সার আমদানি করা হলো, তার ওপর নির্ভর করে না; প্রকৃত সাফল্য হলো প্রয়োজনের সময়ে, প্রয়োজনীয় স্থানে, প্রয়োজনীয় পরিমাণে এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষকের কাছে সার পৌঁছে দেওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়, জাহাজীকরণ, বন্দরে খালাস, সংরক্ষণ, অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা বিবেচনা এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহ পুরো প্রক্রিয়ায় দক্ষতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।ভবিষ্যতে সার ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। চাহিদা নিরূপণ, মজুত ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ও মাঠপর্যায়ে বিতরণে সমন্বিত পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গেলে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা আরও বাড়বে। কারণ কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সামান্য ভুল বা বিলম্বও অনেক সময় উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিএডিসির বীজ ব্যবস্থাপনাতেও একইভাবে নতুন চিন্তার প্রয়োজন। জলবায়ু সহনশীল, উচ্চফলনশীল, রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতের বীজ উৎপাদন, উন্নতমানের প্লান্টিং ম্যাটেরিয়াল ও সরবরাহকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।আধুনিক বীজ প্রযুক্তি, টিস্যু কালচার, বীজ পরীক্ষাগার, সংরক্ষণ প্রযুক্তি, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। কৃষকের হাতে শুধু বীজ পৌঁছে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়; সেই বীজের মান, বিশুদ্ধতা, অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ও উপযোগিতা নিশ্চিত করাও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অংশ। এছাড়াও যুক্ত হয়েছে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বৃহৎ পরিসরে চারা সরবরাহ।সেচ ব্যবস্থাপনাতেও সময়ের দাবি অনুযায়ী পরিবর্তন প্রয়োজন। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং অঞ্চলভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সৌরশক্তি, স্মার্ট সেচ, সেন্সরভিত্তিক প্রযুক্তি এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা কৃষির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এছাড়াও সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখনন এবং নবায়নযোগ্য সেচ প্রযুক্তি।বিএডিসির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাও সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। একজন দক্ষ কর্মীকে শুধু একটি পদ দিয়ে মূল্যায়ন করলে তাঁর প্রকৃত সক্ষমতার মূল্যায়ন হয় না। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, কারিগরি দক্ষতা, মাঠপর্যায়ের জ্ঞান এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে সাংগঠনিক পরিকল্পনায় যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি তরুণ ও নতুন প্রজন্মের জনবলকে আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও নতুন কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে একটি আন্তঃপ্রজন্মীয় দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তুলতে হবে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের শক্তির সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতের বিএডিসির অন্যতম প্রধান সম্পদ।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রেরণা। বিএডিসিতে সরকারি চাকরির মতো পূর্ণাঙ্গ পেনশন ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর-পরবর্তী নিয়মিত আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিএডিসিতে গ্র‍্যাচুইটি সংক্রান্ত বিধান রয়েছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পেনশন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি কর্মীদের জন্য একটি পৃথক বাস্তবতা তৈরি করে। তাই মানবসম্পদ সংস্কারের অংশ হিসেবে কর্মীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যদি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সম্পর্কে আস্থাশীল থাকেন, তাহলে তাদের কর্মপ্রেরণা, দায়িত্ববোধ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যও আরও শক্তিশালী হয়। এ কারণে বিএডিসির নতুন সাংগঠনিক কাঠামো বা অর্গানোগ্রাম প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু পদসংখ্যা কমানো বা বাড়ানোর হিসাব যথেষ্ট নয়। কোন কাজের জন্য কত জনবল প্রয়োজন, কোন পর্যায়ে কী ধরনের কারিগরি দক্ষতা দরকার, মাঠপর্যায়ে কতটা ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন, কোথায় নতুন পদ সৃষ্টি করা দরকার এবং কোথায় প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে পদমর্যাদা, ক্যারিয়ার প্রগ্রেশন, প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব ও জবাবদিহির মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিএডিসিকে শুধু একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনের কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। কৃষকের হাতে সময়মতো মানসম্মত বীজ, সার ও সেচ পৌঁছানো মানে শুধু একটি সরকারি সেবা দেওয়া নয়; এর সঙ্গে দেশের খাদ্য উৎপাদন, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ জড়িত। তাই বিএডিসির সংস্কার হতে হবে কৃষককেন্দ্রিক, উৎপাদনমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর ও ভবিষ্যতমুখী। সংস্কারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষ কমানো নয়; প্রয়োজনীয় মানুষকে সঠিক কাজে, সঠিক দক্ষতায় এবং সর্বোচ্চ কার্যকারিতার সঙ্গে কাজে লাগানো। প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি রক্ষা করে নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং তরুণ জনশক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কথা শুনতে হবে, তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব দিতে হবে এবং কৃষকের প্রয়োজনকে সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।এখন প্রশ্ন হলো বিএডিসি কি পুরোনো কাঠামোর ভারবহন করে ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা হারাবে, নাকি সময়ের দাবি মেনে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলবে? উত্তরটি শুধু বিএডিসির জন্য নয়, দেশের কৃষির ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি যদি আধুনিক হয়, কৃষক যদি পরিবর্তিত হন, প্রযুক্তি যদি প্রতিনিয়ত এগিয়ে যায়, তাহলে কৃষির সহায়ক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও একই গতিতে এগিয়ে যেতে হবে। তাই এখন সময় এসেছে বাস্তবভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক ও দূরদর্শী সংস্কারের। বিএডিসিকে ছোট করার সময় নয়—এ প্রজন্মের কৃষকের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণে বিএডিসিকে আরও শক্তিশালী, দক্ষ, অভিজ্ঞতানির্ভর, প্রযুক্তিনির্ভর ও গতিশীল করে গড়ে তোলার সময় এখন। পুরোনো কাঠামোয় ভবিষ্যতের কৃষি নয়; প্রয়োজন ভবিষ্যতের কৃষির জন্য নতুন বিএডিসি।[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)]

ভিডিও আরও দেখুন

নারী রেফারিকে লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য ও হেনস্তা, চাকরি হারালেন হিগুয়েইন

নারী রেফারিকে উদ্দেশ্য করে লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য এবং ম্যাচ শেষে হাত না ছাড়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় চরম মাশুল গুনতে হলো ফেদেরিকো হিগুয়েইনকে। মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) দল কলম্বাস ক্রুর ডেভেলপমেন্ট টিমের কোচের পদ থেকে তাকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ফেদেরিকো আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা ফরোয়ার্ড গঞ্জালো হিগুয়েইনের বড় ভাই এবং ইন্টার মায়ামির সাবেক ফুটবলার।এমএলএসের জুনিয়র টুর্নামেন্ট ‘এমএলএস নেক্সট প্রোর’ একটি ম্যাচ চলাকালে এই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। ম্যাচ চলাকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত নারী রেফারিকে লক্ষ্য করে ফেদেরিকো কটূক্তি করে বলেন, ‘মনে রেখো, এটি পুরুষদের খেলা।’ এখানেই শেষ নয়; ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সৌজন্যতার খাতিরে করমর্দন করতে গেলে তিনি ওই রেফারিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চেপে ধরেন এবং হাত ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। এই অশোভন আচরণের কারণে তাকে তৎক্ষণাৎ লাল কার্ড দেখানো হয় এবং লিগ কর্তৃপক্ষ দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা জারি করে।তবে বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয় কলম্বাস ক্রু কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ক্লাবের তরফ থেকে হিগুয়েইনকে কোচের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়।ক্লাবের জেনারেল ম্যানেজার ইসা তাল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখেছি যে, ফেদেরিকো হিগুয়েইনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়াই আমাদের ক্লাব, খেলোয়াড় এবং সহযোগী স্টাফদের জন্য সবচেয়ে মঙ্গলজনক। বিগত এক মাসের ঘটনা এবং ক্লাবের নীতিমালার নিরিখে দেখা গেছে, নেতৃত্বদানকারী হিসেবে যে পেশাদারত্ব ও মানদণ্ড প্রত্যাশিত, তা তিনি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।’প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরখাস্তের আগে ক্লাবের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে নিজের কৃতকর্মের জন্য কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি ফেদেরিকো, এমনকি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতেও অস্বীকৃতি জানান। অন্যদিকে পেশাদার সকার রেফারি অ্যাসোসিয়েশন (পিএসআরএ) লিগের দেওয়া দুই ম্যাচের শাস্তিকে অপর্যাপ্ত উল্লেখ করে অন্তত ছয় ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার দাবি তুলেছিল।

নারী রেফারিকে লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য ও হেনস্তা, চাকরি হারালেন হিগুয়েইন