সংবাদ
সুন্দরবন ও নলিয়ান পরিদর্শনের পর মোংলা নৌঘাঁটিতে প্রধানমন্ত্রী

সুন্দরবন ও নলিয়ান পরিদর্শনের পর মোংলা নৌঘাঁটিতে প্রধানমন্ত্রী

সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট এবং খুলনার দাকোপের নলিয়ান পরিদর্শন শেষে মোংলার নৌঘাঁটি ‘বানৌজা মোংলায়’ পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুর পৌনে একটার দিকে নৌপথে তিনি সেখানে গিয়ে পৌঁছান।উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সার্বিক উন্নয়ন পর্যালোচনা, সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত এই সফরে প্রধানমন্ত্রীর দিনব্যাপী নানা ব্যস্তসূচি রয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই উপকূলীয় এলাকায় এটাই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর।এর আগে সকালে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে রওনা হয়ে সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্টসহ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আকাশপথে পর্যবেক্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খুলনার দাকোপের নলিয়ানে অবতরণ করেন এবং সেখান থেকে নৌযানে চড়ে মোংলা নৌঘাঁটির উদ্দেশ্যে রওনা হন।নৌঘাঁটির ওয়ার্ডরুমে মধ্যাহ্নবিরতি শেষে স্থানীয় প্রশাসন, রূপপুর/উপকূলীয় বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার। পরবর্তীতে বেলা পৌনে তিনটার দিকে মোংলা বন্দরের জেটি ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্ধারিত স্থান পরিদর্শনে যাবেন তিনি।সফরকালে মোংলা বন্দরের চলমান আধুনিকায়ন কার্যক্রম, নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, আন্তর্জাতিক পণ্য খালাসের সুবিধাদি এবং পশুর চ্যানেলের ক্যাপিটাল ড্রেজিং বা খননকাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাবিত মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলও পরিদর্শন করার কথা রয়েছে তার।প্রধানমন্ত্রীর এই আগমন ঘিরে মোংলা বন্দরসংলগ্ন এলাকার ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। তাদের আশা, সরকারপ্রধানের এই সফরের মাধ্যমে বন্দরের সম্প্রসারণ, পশুর চ্যানেলের নাব্য বজায় রাখা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রক্রিয়া গতি পাবে।দিনব্যাপী একাধিক রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি শেষে আজ বিকেলেই হেলিকপ্টারে করে রাজধানী ঢাকায় ফিরে আসার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।/ 
৬ মিনিট আগে

মতামতমতামত

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চাই ওয়ান হেলথভিত্তিক জাতীয় কৌশল

বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর কোনো সাময়িক বা নির্দিষ্ট ঋতুভিত্তিক স্বাস্থ্য সমস্যা নয়। এটি ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডের ২০ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষ (১,১৫,৬১৭ জন) এবং মোট মারা গেছেন ৩৫৭ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়ও ১,৩৬৬ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৫ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া চলতি সপ্তাহের (সপ্তাহ ৪২) হিসাব অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যা ৫,৩০৫ জন এবং সাপ্তাহিক মৃত্যু ১৫ জন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) তীব্র সংকট, প্লাটিলেটের জন্য স্বজনদের হাহাকার এবং প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় হাজারের বেশি নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট করে যে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা কিংবা মশা নিধনের সাময়িক অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন বছরব্যাপী প্রতিরোধ, বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারি এবং সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।ডেঙ্গুর এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত ও দ্রুত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা এবং দুর্বল নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সরাসরি ও গভীর ভূমিকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং অনিয়মিত পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অসময়ে অতিবৃষ্টি এবং বাতাসে উচ্চ আর্দ্রতা এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ও ভাইরাসের বিস্তারকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করছে। উপযুক্ত তাপমাত্রায় মশার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের বহিঃস্থ ‘ইনকিউবেশন পিরিয়ড’ বা ভাইরাস সংক্রমণক্ষম হয়ে ওঠার সুপ্তিকাল বহুলাংশে কমে আসে। ফলে একটি সংক্রমিত এডিস মশা তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যেই নতুন নতুন মানবদেহে দ্রুত সংক্রমণ ঘটানোর সক্ষমতা অর্জন করে। অন্যদিকে, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ভবন নির্মাণ এলাকা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পাত্র এবং বাসাবাড়ির ছাদবাগানে জমে থাকা পানি মশার আদর্শ প্রজননস্থলে পরিণত হচ্ছে। ফলে কেবল হাসপাতালমুখী চিকিৎসা দিয়ে এই জটিল পরিবেশগত ও বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট সামলানো একেবারেই অসম্ভব।আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতিগুলো মূলত ‘সংকট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ানিર્ભর’। মহামারি বা প্রাদুর্ভাব বাড়লে কেবল হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো কিংবা মশা নিধনে রাসায়নিক ওষুধ ছিটানোর সাময়িক তৎপরতা চোখে পড়ে। অথচ কোথায় মশার বংশবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে, কোন কোন এলাকায় প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে এবং সিটি করপোরেশন কর্তৃক ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা কতখানি বজায় রয়েছে, তা প্রতিনিয়ত বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা জরুরি। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া নির্বিচারে কীটনাশক ছিটানো কেবল বিপুল অর্থেরই অপচয় ঘটায় না, বরং পরিবেশগত ভারসাম্য ও অন্যান্য উপকারী পতঙ্গের চরম ক্ষতি সাধন করে। তাই লার্ভার উৎস নির্মূল, নিয়মিত পতঙ্গতাত্ত্বিক জরিপ, নগর বর্জ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিজ্ঞানসম্মত পরিবেশবান্ধব নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।এ ক্ষেত্রে ‘ওয়ান হেলথ’ বা এক স্বাস্থ্য পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই পদ্ধতি মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। ডেঙ্গু প্রাণী থেকে সরাসরি মানুষের মধ্যে ছড়ানো রোগ নয়; সংক্রমিত এডিস মশার মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়ায়। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ওয়ান হেলথের প্রয়োগ বলতে মানুষ, বাহক মশা, পরিবেশ ও জলবায়ুর সম্পর্ককে একসঙ্গে বিবেচনা করা বোঝায়। এর মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, কীটতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী, জলবায়ু গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘বিশেষ টাস্কফোর্স’ গঠন করেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। তবে কেবল কাগজ-কলমে বা প্রশাসনিক সমন্বয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে এই টাস্কফোর্সে কীটতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী ও ওয়ান হেলথ বিশেষজ্ঞদের সরাসরি যুক্ত করে ওয়ান হেলথ ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার তথ্য, মশার ঘনত্ব, প্রজননস্থলের অবস্থান এবং হাসপাতালের রোগীসংক্রান্ত তথ্য সমন্বয় করে একটি জাতীয় নজরদারি ও আগাম সতর্কীকরণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা এবং সংক্রমণ বৃদ্ধির আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি পরীক্ষা ও মূল্যায়নের ব্যবস্থাও করতে হবে, যেন মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়।পাশাপাশি নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, নিয়মিত বর্জ্য পরিষ্কার এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জনগণকে সচেতন হতে হবে। তবে নাগরিকদের ওপর দায় চাপিয়ে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নালা পরিষ্কার ও কার্যকর পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব।ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক উদ্যোগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণানির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক জাতীয় কৌশল প্রয়োজন। চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত নজরদারি ও আন্তমন্ত্রণালয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সাফল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত শুধু কতজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হলো, তার ভিত্তিতে নয়; বরং কতটি সংক্রমণ প্রতিরোধ করা গেল এবং কতটি জীবন রক্ষা করা গেল, তার ভিত্তিতে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতিবছর প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।[লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; ওয়ান হেলথ বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয় কমিটির সাবেক সদস্য]

নিরাপদ সড়ক: আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার

সড়ক যোগাযোগ একটি দেশের অর্থনীতি, উন্নয়ন ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই সড়কই যখন মানুষের অকালমৃত্যু, পঙ্গুত্ব ও পরিবারে স্থায়ী শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন উন্নয়নের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একটি দেশের সড়ক কত প্রশস্ত, কতটি সেতু নির্মিত হয়েছে কিংবা যানবাহনের গতি কত বেড়েছে, শুধু তা দিয়ে উন্নয়ন পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের অন্যতম মানদণ্ড হলো, মানুষ কতটা নিরাপদে চলাচল করতে পারছে এবং তার জীবন কতটা সুরক্ষিত। ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ আমাদের সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এখন প্রয়োজন প্রতিপাদ্যের বক্তব্যকে বাস্তব জীবনের নিরাপত্তায় রূপান্তর করা। এ জন্য চাই কার্যকর আইন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জবাবদিহি।জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বেদনাবিধুর ইতিহাস। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন নিহত হন। ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে ইলিয়াস কাঞ্চন নিরাপদ সড়কের দাবিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) আন্দোলন দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা, জনসম্পৃক্ততা ও গণমাধ্যমের সহযোগিতার মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তার দাবি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৭ সালে ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে দিবসটি দশমবারের মতো পালিত হচ্ছে। এই দিবস আমাদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করার পাশাপাশি অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় মূল্যায়নের সুযোগ করে দিয়েছে।জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালন, আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা, ব্যানার ও স্লোগানের পরও সড়কে মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কেন যথেষ্ট কমছে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সড়ক দুর্ঘটনাকে কেবল চালকের ভুল কিংবা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, আইন অমান্য, দুর্বল যান চলাচল ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক নকশা, অনিরাপদভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম, চালকের ক্লান্তি, পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ার মতো একাধিক কারণ কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকি একসঙ্গে উপস্থিত থাকে। ফলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শুধু একজন চালককে দায়ী করা, জরিমানা বাড়ানো কিংবা বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক প্রচার চালানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত, ধারাবাহিক ও প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশবিষয়ক একই বছরের প্রতিবেদনে দেশে সরকারি হিসাবে ৫ হাজার ৮৪ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মডেলভিত্তিক অনুমান ছিল প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক অনুমানের এই বড় ব্যবধান দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সংজ্ঞা, মৃত্যুর হিসাব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। তবে এসব সংখ্যা ২০২১ সালের তথ্য, ২০২৬ সালের বর্তমান মৃত্যুসংখ্যা নয়। এই পার্থক্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: সড়ক নিরাপত্তার কার্যকর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য, সমন্বিত ও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যব্যবস্থা অপরিহার্য। প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছাড়া দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং গৃহীত পদক্ষেপের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা কঠিন।সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিরাপদ সড়ক শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নাগরিক অধিকার, পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রীয় সুশাসনের অংশ। সরকার সড়ক নির্মাণ করবে, যানবাহন চলাচলের নিয়ম নির্ধারণ করবে, চালকের যোগ্যতা যাচাই করবে, পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণ করবে এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে যাত্রী, পথচারী, সাইকেলচালক ও মোটরসাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সড়ক নির্মাণের পর সেটি কতটা নিরাপদ থাকছে, পরিবহন আইন কতটা মানা হচ্ছে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো কত দ্রুত সংশোধন করা হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিরা সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, এসব বিষয়ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কাজের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে এবং তাদের কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেবে না।সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর কার্যকর ও ধারাবাহিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনকভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম, অতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য বহন এবং যান চলাচলের সংকেত অমান্যের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু আইন থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। আইন প্রয়োগে শিথিলতা, অনিয়ম, পক্ষপাত কিংবা দায়িত্বহীনতা থাকলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। কোনো বিশেষ দুর্ঘটনার পর কয়েক দিন অভিযান জোরদার করে পরে তৎপরতা কমিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। আইন প্রয়োগ হতে হবে নিয়মিত, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সব শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর। পরিবহন মালিক, চালক, শ্রমিক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি—কেউই যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ না পান। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা, অযৌক্তিক জরিমানা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগও বন্ধ করতে হবে।শুধু বিদ্যমান আইন প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বর্তমান বাস্তবতার আলোকে একটি সমন্বিত ও কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এমন আইনে সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের নিরাপত্তামান, যানবাহনের কারিগরি নিরাপত্তা, চালকের প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা, গতিসীমা, পথচারীর অধিকার, জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা, দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ, তদন্ত, নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। আইন প্রণয়নের আগে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞদের মতামত, গবেষণালব্ধ ফলাফল এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক, নাগরিক সমাজ ও সড়ক নিরাপত্তা সংগঠনগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আইনটি যেন শুধু অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের দলিল না হয়, বরং দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা গঠন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্ব নিশ্চিত করার কার্যকর কাঠামো হয়ে ওঠে।নতুন আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ পরস্পরের বিকল্প নয়। নতুন আইন তৈরি করতে সময় লাগলেও বর্তমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ থেমে থাকতে পারে না। আবার বিদ্যমান আইনে কোনো ঘাটতি থাকলে সেটি চিহ্নিত করে সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগও পিছিয়ে দেওয়া উচিত নয়। আইন প্রণয়নের পর বিধিমালা, দায়িত্ব বণ্টন, প্রয়োজনীয় জনবল, প্রযুক্তি, বাজেট এবং বাস্তবায়ন নির্দেশনা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভালো আইনও কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে। আইনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান বাস্তবায়নের জন্য কে দায়িত্ব পালন করবে, কীভাবে তা পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট থাকতে হবে। আইন প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি এবং স্থায়ী জবাবদিহি। আমাদের দেশে অনেক সময় কোনো বড় দুর্ঘটনা বা জনদাবির পর তৎপরতা বাড়ে, অভিযান চলে, সভা হয়, নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পর সেই তৎপরতা কমে গেলে আগের অনিয়ম আবার ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়। এভাবে চলতে থাকলে কোনো আইন, নির্দেশনা কিংবা কর্মসূচিই স্থায়ী ফল দিতে পারবে না। তাই সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে সাময়িক অভিযাননির্ভর না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে প্রতিটি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাজ, সময়সীমা, লক্ষ্যমাত্রা ও অগ্রগতি মূল্যায়নের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। নিয়মিত পর্যালোচনা সভা, মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন, ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রকাশ্য অগ্রগতি প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের অবস্থা যাচাই করা যেতে পারে।বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বিত দায়িত্ব বণ্টন থাকা প্রয়োজন। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিত হওয়ার পর সেটি নিরাপদ করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কোনো যানবাহন বারবার আইন লঙ্ঘন করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসাসেবা পৌঁছাতে কত সময় লাগছে এবং গৃহীত পদক্ষেপে দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ঝুঁকি কমেছে কি না, এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু কতটি অভিযান পরিচালিত হলো কিংবা কত টাকা জরিমানা আদায় হলো, সেটিই সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। প্রকৃত সাফল্য হলো দুর্ঘটনা ও গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি কমানো এবং মানুষের জীবন রক্ষা করা।সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নজরদারি ব্যবস্থা যেন ব্যক্তিনির্ভর না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো কর্মকর্তা বদলি হলে, প্রশাসনিক অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হলে কিংবা কোনো বড় দুর্ঘটনা গণমাধ্যমের আলোচনার বাইরে চলে গেলে সড়ক নিরাপত্তার কার্যক্রম যেন থেমে না যায়। এ জন্য আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে স্থায়ী দায়িত্ব নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা থাকতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কোথাও নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন না হলে তার কারণ জানতে হবে এবং সংশোধনী পদক্ষেপ নিতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে সড়ক নিরাপত্তা দিবসের কর্মসূচি শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সারা বছর ধরে বাস্তবায়িত হবে।চালকদের দক্ষতা ও কর্মপরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। পেশাদার চালকের হাতে বহু মানুষের জীবন নির্ভর করে। তাই লাইসেন্স দেওয়ার আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা যাচাই করা জরুরি। চালকের কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, ঘুমের সুযোগ এবং দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানো, ক্লান্ত অবস্থায় স্টিয়ারিং ধরা কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর অযৌক্তিক চাপ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শুধু চালকের ওপর সব দায় চাপিয়ে পরিবহন মালিক ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। চালক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত দক্ষতা যাচাই, পেশাগত আচরণ উন্নয়ন এবং পরিবহন পরিচালনায় নিরাপত্তানীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। চালকের ভুলের জন্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনায় ভূমিকা রাখা অন্যান্য কারণও তদন্ত করতে হবে।সড়কের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সড়কে পর্যাপ্ত ফুটপাত নেই, কোথাও ফুটপাত দখল হয়ে আছে, কোথাও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, শিল্পাঞ্চল এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পথচারীর ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সড়ক পরিকল্পনা করতে হবে। বিপজ্জনক বাঁক, দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হওয়া স্থান, অপর্যাপ্ত সড়কবাতি, ত্রুটিপূর্ণ নির্দেশক চিহ্ন ও সড়কচিহ্ন, অরক্ষিত সড়ক বিভাজক এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রবেশপথ চিহ্নিত করে সংশোধন করতে হবে। মহাসড়কে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে নিরাপদ পারাপার, সংযোগ সড়ক, সঠিক বাসস্টপ, গতিনিয়ন্ত্রণ এবং পথচারীবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান সড়কের নিরাপত্তা নিরীক্ষা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থান দ্রুত সংশোধনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার জন্য ‘নিরাপদ সড়কব্যবস্থা পদ্ধতি’ অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ধারণার মূল কথা হলো, মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই ভুল যেন অনিবার্যভাবে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের কারণ না হয়, সে অনুযায়ী পুরো পরিবহনব্যবস্থাকে সাজাতে হবে। নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা—এই উপাদানগুলোকে সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সচেতনতার প্রচার কিংবা শুধু শাস্তি দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। অবকাঠামো, আইন, যানবাহন, চালকের প্রশিক্ষণ, জরুরি চিকিৎসা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমানোর জাতিসংঘের বৈশ্বিক লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশকেও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ এবং অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে।দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক মিনিট অনেক আহত মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানো, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী পাওয়া, আহত ব্যক্তিকে সঠিকভাবে হাসপাতালে স্থানান্তর এবং উপযুক্ত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। তাই জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্যকর জরুরি সাড়াদানব্যবস্থা, সমন্বিত অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক, হাসপাতালগুলোর মধ্যে রোগী স্থানান্তরের ব্যবস্থা, গুরুতর আঘাতের চিকিৎসাসক্ষমতা এবং প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা জরুরি। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও হাসপাতালের মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনাস্থলে আহত ব্যক্তিকে অদক্ষভাবে টানাহেঁচড়া না করে প্রশিক্ষিত সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সাধারণ মানুষকেও সচেতন করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনায় দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর জীবন রক্ষার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আরেকটি বড় সমস্যা হলো দুর্ঘটনার তথ্যের বিচ্ছিন্নতা। পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তথ্য এক জায়গায় সমন্বিত না হলে দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, মৃত্যুর কারণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ণয় কঠিন হয়। তাই একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনা তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দুর্ঘটনার স্থান, সময়, যানবাহনের ধরন, সড়কের অবস্থা, হতাহত, চিকিৎসা এবং তদন্তের ফলাফল নিয়মিত নথিভুক্ত করতে হবে। তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এবং অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে পদ্ধতি ও সংজ্ঞার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান তুলনা ও বিশ্লেষণ করা যায়।সড়ক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় জনগণের দায়িত্বও অনস্বীকার্য। চালককে গতিসীমা মানতে হবে, বৈধ লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করতে হবে, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার করতে হবে এবং গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। মোটরসাইকেলে চালক ও যাত্রী উভয়ের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার জরুরি। পথচারীদের নির্ধারিত স্থানে রাস্তা পারাপার, ফুটপাত ব্যবহার এবং যান চলাচলের সংকেত মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে দায়িত্বশীল আচরণ, চালকের প্রশিক্ষণ এবং যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে জনসচেতনতার নামে রাষ্ট্র ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আড়াল করা যাবে না। নিরাপদ আচরণের সুযোগ তৈরি করতে হবে নিরাপদ অবকাঠামো, কার্যকর আইন এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যক্রমে বয়সোপযোগী সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা এবং জনসচেতনতামূলক প্রচার বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর প্রকাশের পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ, প্রতিরোধের উপায়, আইনের প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন থাকা প্রয়োজন। কোনো বড় দুর্ঘটনার পর সাময়িক আলোচনা করে থেমে না গিয়ে সড়ক নিরাপত্তার অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে। জনমত ও গণমাধ্যমের নজরদারি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক জনসচেতনতা সৃষ্টি ও নীতিগত পরিবর্তনের দাবিতে কাজ করে আসছে। সংগঠনটির প্রায় ১২০টি শাখার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকার চাইলে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, চালক প্রশিক্ষণ এবং সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় গড়ে তোলা গেলে উদ্যোগগুলো আরও কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও নজরদারির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ নাগরিক সংগঠনগুলোর মতামত গ্রহণ করা উচিত। সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হলে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের জনসম্পৃক্ততা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা কোনো একক সংস্থার কাজ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের তাৎপর্য তাই শুধু শোক স্মরণ বা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এই দিন হতে হবে সড়ক নিরাপত্তার অগ্রগতি পর্যালোচনা, ব্যর্থতার কারণ শনাক্ত এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের অঙ্গীকারের দিন। সরকারকে বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সমন্বিত আইন প্রণয়ন করতে হবে, নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, দক্ষ চালক তৈরি করতে হবে, জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি কর্মসূচির বাস্তব অগ্রগতি নিয়মিত যাচাই এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো দুর্ঘটনা বা দিবসকেন্দ্রিক তৎপরতা যেন কিছুদিন পর থেমে না যায়, সে জন্য সড়ক নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থের অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবেন, একজন শিক্ষার্থী নিশ্চিন্তে বিদ্যালয়ে যেতে পারবে এবং একজন শ্রমজীবী মানুষ জীবিকার সন্ধানে বের হয়ে সুস্থভাবে পরিবারের কাছে ফিরতে পারবেন। সড়কে মৃত্যু যেন স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া না হয়, প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হয় এবং একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। উন্নয়নের প্রকৃত সার্থকতা মানুষের জীবন রক্ষায়। তাই জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির বাইরে এসে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা, কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন, আইনের নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং স্থায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রণয়ন করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না, আবার আইন প্রয়োগের নামে সাময়িক তৎপরতা দেখিয়েও থেমে থাকা যাবে না। ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয়কে শুধু স্লোগানে নয়, বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ, সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন, নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)]

আলবার্টার গণরায় ও কানাডার ঐক্য

২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর কানাডার আলবার্টা প্রদেশে অনুষ্ঠিত গণভোট দেশটির কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক রাজনীতি, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং জাতীয় ঐক্য নিয়ে বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত করেছে। গণভোটের দশম প্রশ্নে ভোটারদের সামনে দুটি বিকল্প ছিল—আলবার্টা কানাডার প্রদেশ হিসেবে থাকবে, নাকি কানাডার সংবিধান অনুযায়ী প্রদেশটির বিচ্ছিন্নতা নিয়ে একটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। প্রকাশিত অনানুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী, প্রায় ৭৬.৫ শতাংশ ভোটার কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে এবং ২৩.৪ শতাংশ পরবর্তী বিচ্ছিন্নতা-প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে মত দিয়েছেন। ইলেকশন কানাডা সূত্রে জানা যায়, সরকারি ফল প্রকাশের নির্ধারিত তারিখ ২৯ অক্টোবর ২০২৬।এই ফলাফলকে শুধু একটি প্রাদেশিক ভোটের পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করলে এর পূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এটি একদিকে কানাডার জাতীয় ঐক্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংকেত, অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলীয় অসন্তোষ, প্রাদেশিক ক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে চলমান বিতর্কের সুস্পষ্ট প্রতিফলন। তবে এই গণভোটকে আলবার্টার বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। ভোটাররা সরাসরি স্বাধীনতার প্রশ্নে নয়, বরং ভবিষ্যতে সে বিষয়ে বাধ্যতামূলক গণভোটের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে কি না, সে বিষয়ে মত দিয়েছেন।গণভোটের সাংবিধানিক তাৎপর্যকানাডার সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী, কোনো প্রদেশ একতরফাভাবে গণভোটের ফল বা স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে আইনগতভাবে কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। ১৯৯৮ সালের ‘কুইবেকের বিচ্ছিন্নতা বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মতামত’ মামলায় কানাডার সুপ্রিম কোর্ট ব্যাখ্যা করেন, বিচ্ছিন্নতার পক্ষে স্পষ্ট প্রশ্নে সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়া গেলে তা সাংবিধানিক আলোচনার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এমন ফলাফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না।২০০০ সালের ‘স্পষ্টতা আইন’ও এই নীতির ওপর গুরুত্ব দেয়। গণভোটের প্রশ্নের স্পষ্টতা, বিচ্ছিন্নতার পক্ষে সমর্থনের ব্যাপকতা এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনার পাশাপাশি সাংবিধানিক আলোচনা, সম্পদ ও দায়ের বণ্টন, সীমান্ত, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।২০২৬ সালের গণভোটে ভোটাররা সরাসরি স্বাধীনতার পক্ষে বা বিপক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। তারা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, স্বাধীনতার প্রশ্নে পরবর্তী বাধ্যতামূলক গণভোটের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে কি না। তাই ফলাফলটির তাৎপর্য মূলত পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের সঙ্গে সম্পর্কিত। কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন দেয়নি। তবে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে ভবিষ্যৎ বিতর্কের অবসানও ঘটায়নি।অর্থনীতি ও বিচ্ছিন্নতার সম্ভাব্য প্রভাবআলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক বিষয়গুলো অপরিহার্য। প্রদেশটির তেল, গ্যাস, পেট্রোরসায়ন, কৃষি ও অন্যান্য শিল্প কানাডার অভ্যন্তরীণ বাজার, পরিবহনব্যবস্থা এবং আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। বিচ্ছিন্নতা বাস্তবায়িত হলে আন্তপ্রাদেশিক পাইপলাইন, বাণিজ্য, মুদ্রা, ব্যাংকিং, সরকারি ঋণ, পেনশন, কর এবং বিদ্যমান আর্থিক দায়বদ্ধতার বণ্টন নিয়ে জটিল আলোচনা প্রয়োজন হতো।একইভাবে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি শিল্পপ্রকল্পকে প্রভাবিত করতে পারত। তবে এগুলো সম্ভাব্য প্রভাব, নিশ্চিত ফল নয়। প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিণতি নির্ভর করত বিচ্ছিন্নতার শর্ত, নতুন আইনি কাঠামো, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং কানাডা ও আলবার্টার মধ্যকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপর।এখানে মৌলিক প্রশ্ন হলো, আলবার্টার অর্থনৈতিক স্বার্থ কানাডার যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে থেকে অধিক কার্যকরভাবে রক্ষা করা সম্ভব, নাকি রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন প্রয়োজন? গণভোটের ফলাফল বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তাবকে সমর্থন করেনি। ফলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় অর্থনৈতিক ক্ষমতা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বাস্তবসম্মত সমাধান বিশেষ গুরুত্ব পাবে।আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাআলবার্টার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় ফার্স্ট নেশনস বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার উপেক্ষা করা যায় না। কানাডার ক্রাউনের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক চুক্তি রয়েছে, যা ভূমি, সম্পদ, শাসনব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো নতুন রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন উঠলে এসব চুক্তির ধারাবাহিকতা ও অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।আলবার্টার বিচ্ছিন্নতার উদ্যোগ নিয়ে আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর উদ্বেগের একটি প্রধান দিক হলো, কানাডার সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তিগত অধিকার ভবিষ্যৎ ব্যবস্থায় কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে। তাদের অধিকার কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ওপর নির্ভরশীল কোনো বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত।অতএব, আলবার্টার স্বাধীনতার প্রশ্নকে শুধু প্রাদেশিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয় হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। ভূমির অধিকার, চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থান যেকোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকা উচিত।জাতীয় ঐক্য ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভবিষ্যৎআলবার্টার গণভোটের ফলাফল কানাডার জাতীয় ঐক্যের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত। তবে এই ফলাফলকে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। জাতীয় ঐক্য টেকসই করতে হলে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, নীতিগত সংলাপ এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের ন্যায্য সমন্বয় প্রয়োজন।প্রথমত, আঞ্চলিক অসন্তোষকে শুধু বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করলে এর অন্তর্নিহিত কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে। জ্বালানি নীতি, রাজস্ব বণ্টন ও প্রাদেশিক ক্ষমতা নিয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান প্রয়োজন।দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রাজনৈতিক দাবির প্রতি জনসমর্থনের পরিসর নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আলবার্টার ভোটাররা বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই সিদ্ধান্তকে সম্মান করার পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতার পক্ষে মত দেওয়া নাগরিকদের উদ্বেগও গণতান্ত্রিক আলোচনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।তৃতীয়ত, জাতীয় ঐক্য কেবল ঐতিহাসিক পরিচয় বা আবেগের ওপর নির্ভর করে না। নাগরিকদের বিশ্বাস করতে হবে যে তাদের অঞ্চল, অর্থনীতি ও অধিকার নীতিনির্ধারণে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই ঐক্য রক্ষার জন্য শুধু বিচ্ছিন্নতার বিরোধিতা নয়, কার্যকর যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থাও জরুরি।কুইবেক ও আলবার্টার অভিজ্ঞতার তুলনা এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। কুইবেকের আন্দোলনে ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় প্রধান ভূমিকা পালন করেছে; আলবার্টার আন্দোলনে অর্থনৈতিক স্বার্থ, জ্বালানি নীতি এবং প্রাদেশিক ক্ষমতার প্রশ্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই পার্থক্য দেখায়, কানাডার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলোকে একই রাজনৈতিক ছাঁচে বিচার করা যায় না।গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট, আঞ্চলিক স্বার্থ ও জাতীয় ঐক্যের ভারসাম্যআলবার্টার ১৯ অক্টোবর ২০২৬-এর গণভোট কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্রকাশিত অনানুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী, অধিকাংশ ভোটার কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন এবং বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে পরবর্তী বাধ্যতামূলক গণভোটের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই ফলাফলকে কানাডার জাতীয় ঐক্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংকেত হিসেবে দেখা যায়। তবে এটি আলবার্টার আঞ্চলিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি বিলুপ্ত করে না।কানাডার অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়: কোনো যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়িত্ব শুধু বিচ্ছিন্নতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে আঞ্চলিক ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তার ওপর। আলবার্টার অর্থনৈতিক গুরুত্ব, কুইবেকের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।এই গণরায় বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে জনম্যান্ডেট দেয়নি। এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার ও আলবার্টার প্রাদেশিক সরকার এই ফলাফলকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা, ন্যায্য ক্ষমতা বণ্টন এবং পারস্পরিক আস্থায় রূপান্তর করবে। আঞ্চলিক অসন্তোষকে উপেক্ষা না করে সাংবিধানিক সংলাপ ও গণতান্ত্রিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করাই হবে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রকৃত পরীক্ষা।আলবার্টার গণরায় কানাডার ঐক্যের পক্ষে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার বার্তা দিয়েছে। কিন্তু সেই ঐক্যের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, দায়বদ্ধ ও কার্যকর যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তোলার ওপর—যেখানে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং জাতীয় সংহতি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সাংবিধানিক সমঝোতার মাধ্যমে সহাবস্থান করতে পারে।[লেখক: কানাডাপ্রবাসী]

রাষ্ট্রের শক্তি: এলিয়েদা থেকে সৌদিতে দুই বাংলাদেশি

মার্কিন তরুণী এলিয়েদা ম্যাকর্ড। জন্ম টেক্সাসের হিউস্টনে ১৯৭৩ সালে। ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৮ বছর বয়সে আসেন বাংলাদেশে। তৎকালীন ঢাকার জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে যাত্রার আগে আটক হন। তার পোশাকের নিচে লুকানো চার প্যাকেটে প্রায় সাড়ে তিন কেজি হেরোইন পাওয়া যায়।পরে তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে হেরোইন পাচারের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মাদক মামলা হয়। বিচারে তাকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়। অবশ্য পরে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা ও মার্কিন কংগ্রেসম্যানের তদবিরে মুক্তি পান। ম্যাকর্ড স্বীকার করেছিলেন, প্রায় ১০ হাজার ডলারের প্রলোভনে তিনি হেরোইন বহনে রাজি হয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল পড়াশোনার খরচ ও পরিবারকে সাহায্য করা। চাঞ্চল্যকর সেই মামলাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় এনেছেন সিনিয়র সাংবাদিক জায়েদুল আহসান পিন্টু। ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি লেখেন, ‘র্কিন নাগরিক আটক হওয়ার পর থেকেই ঢাকায় তাদের দূতাবাস সব রকমের সহায়তা করে যায়। প্রচলিত আইন, মাদক বহন আর আসামির স্বীকারোক্তি থাকায় তেমন কিছু করতে পারছিল না। তবে কারাগারে বিশেষ মর্যাদা আদায় করতে পেরেছিল।’ জায়েদুল আহসান আরও লেখেন, ‘এলিয়েদার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যখন চূড়ান্ত রায় দেয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে মুক্ত করার নতুন উদ্যোগ নেয়। তারা এলিয়েদাকে দিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করায়। তৎকালিন রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত এলিয়েদার দণ্ড মওকুফ করে দেন।’পিন্টুর লেখায় আর এসেছে, ‘৩০ জুলাই, ১৯৯৬। দিনের প্রথমভাগে মার্কিন কংগ্রেসম্যান বিল রিচার্ডসন বিশেষ বিমানে বাংলাদেশে আসেন। (এই মার্কিন জনপ্রতিনিধি তার দেশের মেয়েকে বাঁচানোর জন্য শুরু থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।) ওইদিন সকালে জেল কর্তৃপক্ষ এলিয়েদাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেন। সেখানে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারাও ছিলেন। তারা এলিয়েদাকে রিচার্ডসনের ক্ষণিকের আবাসস্থল রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন মেঘনায় নিয়ে যান। সন্ধ্যায় বিল রিচার্ডসন এলিয়েদাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। যাবার আগে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে তারা সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।‘তার পোস্টে আরও লেখেন, ‘ওই যে, গুডি ওচিন্ডো। যিনি একই মামলায় খালাস পেয়েছিলেন। পাসপোর্ট সংক্রান্ত মামলায় দুই মাসের জেল হয়েছিল। তার খবর আর কেউ রাখেনি। দুই মাস পার হয়, দুই বছর পার হয় কিন্তু গরীব নাইজেরিয়ানের মুক্তি মেলে না। এই তরুণ তার বাংলাদেশি আইনজীবীর কাছে ১৪২১ ডলার জমা রেখেছিলেন। সেই আইনজীবী ওই ডলার আর ফেরত দেন না।’আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন দশক আগের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়, এলিয়েদা ম্যাকর্ডের মুক্তিতে মার্কিন কূটনীতি ও জনপ্রতিনিধির তৎপরতা, গুডি ওচিন্ডোর মুক্তিতে সাংবাদিকতা ও আদালতের ভূমিকা। ঠিক যেভাবে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর বাংলাদেশ জানতে পেরেছে ঘটনার অনেক পরে। ঘটনা তিনটি দেখায়, বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকের পাশে রাষ্ট্র কতটা দাঁড়ায়, তার ওপরও নির্ভর করে ন্যায়বিচারের বাস্তবতা। বিদেশের কারাগারে বন্দী একজন মার্কিন তরুণীর মুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসম্যান ছুটে এসেছিলেন। দূতাবাস সক্রিয় ছিল, রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন পৌঁছেছিল, শেষ পর্যন্ত বিশেষ বিমানে দেশে ফিরেছিলেন সেই তরুণী। অথচ, একই মামলায় দণ্ডিত আরেক বিদেশি তরুণের মুক্তির জন্য কাউকে পাওয়া যায়নি। পাঁচ বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটানোর পর তার কথা সামনে এনেছিল সাংবাদিকতা; হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত ফিরতে পেরেছিলেন নিজ দেশে।ঘটনা দুটি বাংলাদেশের। সময় ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০০১ সাল। আর ২০২৬ সালের অক্টোবরে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সামনে আসার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে: বিদেশে কোনো নাগরিকের জীবন যখন রাষ্ট্রের হাতে নয়, তখন তার পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্বটি কে পালন করে?প্রতীকী ছবিসৌদির মক্কায় গত ১৪ অক্টোবর নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশন জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের এ বিষয়ে জানানো হয়নি। পরে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিচারপ্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ। এই তথ্যই প্রশ্ন তুলেছে—বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের মুখে থাকা নাগরিকদের বিষয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক নজরদারি কতটা কার্যকর?এলিয়েদার মুক্তিতে রাষ্ট্রের সক্রিয়তামাদক পাচারের মামলায় ১৯৯৩ সালের জুলাইয়ে এলিয়েদা আর নাইজেরীয় নাগরিক রবার্ট ব্ল্যাংকসনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল আদালত। এলিয়েদার ঘটনা তখন বাংলাদেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত হয়। প্রথম দিকে তিনি দাবি করেছিলেন, মাদকের বিষয়ে না জেনেই বহন করেছিলেন। পরে ১৯৯৬ সালে মুক্তির পর স্বীকার করেন, অর্থের বিনিময়ে হেরোইন বহনে রাজি হয়েছিলেন। অর্থাৎ, তার মুক্তির প্রশ্নটি কেবল নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার বিষয় ছিল না; দণ্ডিত একজন নাগরিকের জন্য রাষ্ট্র কীভাবে মানবিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়, সেটিই ছিল বড় বিষয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১৯৯৬ সালের জুলাইয়ের শুরুতে তার দণ্ড বহাল রাখে। এরপর ক্ষমার আবেদনকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্যোগ শুরু হয়। নিউ মেক্সিকোর ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান বিল রিচার্ডসন এসে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেন। রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় ১৯৯৬ সালে মুক্তি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। এলিয়েদার মুক্তি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বাইরে গোপন পথে হয়নি। আদালতের রায় বহাল ছিল; মুক্তি এসেছিল রাষ্ট্রপতির ক্ষমার সাংবিধানিক পথ ধরে। কিন্তু সেই পথ সক্রিয় করতে পেরেছিল একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের ধারাবাহিক যোগাযোগ, দূতাবাসের তৎপরতা আর একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত উদ্যোগ।ব্ল্যাংকসনের পাশে কেউ নেইএলিয়েদার সঙ্গে একই মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ড পেয়েছিলেন নাইজেরীয় নাগরিক রবার্ট ব্ল্যাংকসন। তার ভাগ্যে একই ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ জোটেনি। তার পরবর্তী পরিণতি নিয়েও জনপরিসরে তথ্য খুব কম। একই মামলায় অভিযুক্ত আরেক নাইজেরীয় তরুণ গুডি ওচিন্ডোর অভিজ্ঞতা আরও নির্মম বৈপরীত্য সামনে আনে।গুডি ছিলেন ১৯ বছরের তরুণ। মূল মাদক মামলায় তিনি খালাস পেয়েছিলেন বলে তৎকালীন প্রতিবেদকের বিবরণে উঠে আসে। কিন্তু মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট ব্যবহারের একটি মামলায় দুই মাসের কারাদণ্ড ভোগ করার পরও তিনি মুক্তি পাননি। তার দেশে ফেরার ব্যবস্থা ছিল না, টিকিট কেনার টাকাও ছিল না। বাংলাদেশি আইনজীবীর কাছে রাখা ১ হাজার ৪২১ ডলার ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে নতুন মামলা হওয়ায় তার দুর্দশা আরও বাড়ে। মামলার শুনানি না হওয়ায় মুক্তির পথও বন্ধ হয়ে যায়। কারাগারে পাঁচ বছরের বেশি সময় কাটানোর পর কারা কর্মকর্তা ফরমান আলী বিষয়টি প্রতিবেদকের নজরে আনেন। ২০০১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টার-এ গুডিকে নিয়ে প্রতিবেদন লেখেন সাংবাদিক জায়েদুল আহসান। ওই দিনই হাইকোর্ট বিভাগ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করে। আদালতের হস্তক্ষেপের পর নাইজেরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা হয়।এখানে বৈপরীত্যটি স্পষ্ট। ম্যাকর্ডের জন্য দূতাবাস ও কংগ্রেসম্যান সক্রিয় হয়েছিলেন; গুডির ক্ষেত্রে তার দুর্দশা জনসমক্ষে আনতে হয়েছিল সাংবাদিককে, আর মুক্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়েছিল আদালতকে। একজনের পেছনে ছিল শক্তিশালী রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সক্ষমতা, অন্যজনের পেছনে ছিল না কার্যকর কোনো রাষ্ট্রীয় সহায়তা।সৌদি আরবের ঘটনায় বাংলাদেশের প্রশ্নসৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এই পুরোনো অভিজ্ঞতাগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার ও সৌদি আরবে বাংলাদেশ মিশন আগে থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানত না। মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা ও বিচারসংক্রান্ত তথ্য চেয়েছে।এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বিচারপ্রক্রিয়া, আইনজীবী পাওয়ার সুযোগ, আপিলের অবস্থা এবং কনস্যুলার সহায়তা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো সব নথি প্রকাশ্যে নেই। তাই এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত তথ্য জরুরি। বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়া নাগরিকের বিচার থামিয়ে দেওয়া বা অন্য দেশের আদালতের রায় বাতিল করানো কোনো দূতাবাসের ক্ষমতা নয়। তবে নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী, তিনি আইনজীবী পেয়েছেন কি না, তার আত্মপক্ষ সমর্থন ও আপিলের সুযোগ আছে কি না, মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির আগে পরিবার ও নিজ দেশের কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, আইনি সহায়তা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।কনস্যুলার সুরক্ষার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইনও প্রাসঙ্গিক। ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিক আটক হলে তিনি অনুরোধ করলে তাকে নিজের দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সে যোগাযোগে সহায়তা করতে হয়। তবে এই বিধান কীভাবে প্রয়োগ হয়েছে, দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে তারা কনস্যুলার যোগাযোগ চেয়েছিলেন কি না—তা নির্ধারণে মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।দুই বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীর মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা পরে জেনেছে কনস্যুলেটবাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ; সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। ফলে বিষয়টি শুধু দুই ব্যক্তির ভাগ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে কর্মরত নাগরিকের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা, মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রস্তুতি ও নজরদারির প্রশ্ন এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।রাষ্ট্র কি ভাগ্য নির্ধারণ করেএখানে ‘শক্তিশালী রাষ্ট্র’ বলতে শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি বোঝালে চলবে না। রাষ্ট্রের শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকের জন্য কত দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, আইনগত সহায়তা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রয়োজন হলে উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ম্যাকর্ডের ক্ষেত্রে সেই সক্ষমতা দেখিয়েছিল। গুডি ওচিন্ডোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সহায়তার ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও আদালতকে এগিয়ে আসতে হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি শুধু সৌদি আরবকে ব্যাখ্যা দিতে বলার মধ্যে সীমিত থাকলে চলবে না। মৃত্যুদণ্ডের মুখে থাকা বাংলাদেশিদের বিষয়ে দূতাবাস কীভাবে আগেভাগে তথ্য পাবে, কারাগার ও আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, পরিবারকে জানাবে এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করবে—তার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। কোনো নাগরিক অপরাধে দণ্ডিত হলেও তার ন্যায্য বিচার ও আইনি অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।এলিয়েদার ঘটনা দেখিয়েছে, দণ্ডিত নাগরিকের ভাগ্য বদলাতে কূটনীতি ও জনপ্রতিনিধির উদ্যোগ কতটা কার্যকর হতে পারে। গুডি ওচিন্ডোর ঘটনা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রীয় সহায়তা না থাকলে একজন মানুষ কীভাবে আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার মধ্যে হারিয়ে যেতে পারেন। আর সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে—নিজের নাগরিকের জীবন-মৃত্যুর মতো বিষয়ে বাংলাদেশ কতটা আগে জানতে পারে, কতটা পাশে দাঁড়াতে পারে?রাষ্ট্রের মর্যাদা কেবল বিদেশি সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতায় মাপা যায় না। সেই সম্পর্কের ভেতর নিজের নাগরিকের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা কতটা রক্ষা করা গেল, সেটিও তার বড় পরীক্ষা।

দুর্গোৎসবের ক্রম-বিবর্তন এবং অন্তর্নিহিত বার্তা

শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুদের এক বৃহৎ উৎসব। বাঙালি হিন্দুদের প্রাণের সঙ্গে, আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আনন্দোৎসবের নাম দুর্গাপূজা। মহালয়ায় আগমনবার্তা জানিয়ে, ষষ্ঠীতে আরম্ভ হয়ে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী শেষে দশমীতে সিঁদুরখেলা ও বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয় পাঁচ দিনের দুর্গোৎসব। হিন্দুদের এক বহুল আরাধ্যা ও জনপ্রিয় দেবী হলেন দুর্গা। সনাতন হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মা দুর্গার বাস হিমালয়ের কৈলাসে। দুর্গতি নাশের জন্য তিনি পৃথিবীতে নেমে আসেন পাঁচ দিনের জন্য।হিন্দু পুরাণ অনুসারে, অসুরদের রাজা মহিষাসুর তপস্যা করে ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে দেবতাদের কাছ থেকে স্বর্গ কেড়ে নেয়। অসুর হলো অশুভ শক্তির প্রকাশ। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালে মহাত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূতা হয়ে দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তাই হিন্দুধর্মাবলম্বীরা অশুভ শক্তির বিনাশ ও দুর্গতি নাশের আশায় শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিবছর দুর্গাপূজা করে থাকেন।‘দুর্গা’ শব্দটি দুর্গ থেকে আগত। পুরাণমতে, দুর্গ নামক অসুরকে বধ করার জন্য তিনি দুর্গা। দুর্গা শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো ‘অপরাজেয়’, ‘দুর্গম’। আবার দুর্গতিনাশিনী অর্থেও দুর্গা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। শশীভূষণ দাশগুপ্ত ভারতীয় শক্তিসাধনা নিয়ে গবেষণায় দুর্গা শব্দের উৎপত্তির স্তরগুলো পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন। তার মতে, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো, দুর্গা হলেন ‘দুর্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী’, অর্থাৎ দুর্গের রক্ষাকর্ত্রী। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, দুর্গা দশভুজা, দশপ্রহরণধারিণী, সিংহবাহিনী, মহিষাসুরমর্দিনী। দুর্গাপ্রতিমায় তাকে সেভাবেই দেখতে পাই। তিনি অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে বধ করছেন। আবার তিনি মাতৃস্বরূপা, শক্তির প্রতীক, সমগ্র জগতের মা। হিন্দুধর্মমতে, তিনি সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের শক্তি, মাতৃরূপ, পরম ব্রহ্মময়ী। তিনি সমস্ত সৃষ্টিসংসারকে মায়ের মতো আগলে রাখেন। হিন্দুধর্মের শাক্ত উপাসনা ও তন্ত্র শাখার প্রধান দেবী হলেন দুর্গা। দুর্গাপূজা মূলত শক্তির উপাসনা; মাতৃশক্তি ও নারীশক্তির উপাসনার উৎসব।আবার এই বাংলাতেই কেবল তিনি সপরিবারে পূজিতা। ‘দুর্গা’ শব্দের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্‌বেদ ও অথর্ববেদে। তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দেবীরূপে দুর্গাকে প্রথম দেখা যায়। এ ছাড়া রামায়ণ ও মহাভারতেও দেবী দুর্গার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে বেদে দুর্গা দেবী হিসেবে এত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না। দুর্গাপূজা ও মহিষাসুরবধের কাহিনি—এসব কিছুই হিন্দুদের মূল ধর্মগ্রন্থ বেদে পাওয়া যায় না। গুরুত্বপূর্ণ দেবী হিসেবে দুর্গার আবির্ভাব হয় বৌদ্ধধর্ম-পরবর্তী যুগে; প্রথম মার্কণ্ডেয় পুরাণের ‘দেবীমাহাত্ম্যে’ (৪০০ু৬০০ খ্রিস্টাব্দ), যা ৭০০ শ্লোকবিশিষ্ট ‘দুর্গাসপ্তশতী’ বা ‘চণ্ডী’ নামে পরিচিত। এখানেই রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের দুর্গাপূজার কাহিনি, মহিষাসুরবধ, শুম্ভ-নিশুম্ভ ও চণ্ড-মুণ্ডবধের কাহিনি পাওয়া যায়।দুর্গাপূজার প্রচলন সম্পর্কে একাধিক কিংবদন্তি প্রচলিত থাকলেও ‘পৌরাণিক কাহিনি’ অনুযায়ী, ‘সত্যযুগে’ রাজা সুরথ প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। ‘ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে’ আছে, দুর্গাপূজার ‘প্রথম প্রবর্তক’ ছিলেন ‘শ্রীকৃষ্ণ’; দ্বিতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন স্বয়ং ‘ব্রহ্মা’। তৃতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন ‘মহাদেব’। ‘দেবীভাগবত পুরাণ’ অনুসারে, ‘ব্রহ্মার মানসপুত্র’ ‘মনু’ ‘ক্ষীরোদসাগরের তীরে’ দুর্গার আরাধনা করে বর লাভ করেছিলেন। এসব কাহিনি পুরাণের।শাস্ত্র ও পুরাণ থেকে বেরিয়ে এসে মর্ত্যে, অর্থাৎ অবিভক্ত বাংলায়, দুর্গাপূজার আয়োজন প্রথম কে করেছিলেন, এ নিয়ে গবেষকদের কাছ থেকে বেশ কিছু তথ্য জানা যায়। সবকিছুর প্রথম নিয়ে মানুষের মনে একটি কৌতূহল কাজ করে, অর্থাৎ ‘কে প্রথম প্রবর্তক’। দুর্গাপূজার ক্ষেত্রেও ‘কে প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন’, তা নিয়ে আপামর জনগণের মধ্যে একটি কৌতূহল আছে। ‘পৌরাণিক মতে’ ‘সত্যযুগে’ ‘রাজা সুরথ’ এই পূজার প্রবর্তক। তেমনি ‘কলিযুগে’, অর্থাৎ আধুনিক যুগে, এই পূজার প্রবর্তক কে? তা নিয়েও কৌতূহলের শেষ নেই।আনন্দের বিষয়, বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত বিশ্বাস এবং বিভিন্ন তথ্যের ওপর নির্ভর করে আধুনিক যুগে বাংলার মানচিত্রে প্রথম দুর্গাপূজাটি করেছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর শেষে ‘রাজশাহীর তাহেরপুরের ভুঁইঞা রাজা’ ‘কংসনারায়ণ’। সেটা ‘তৃতীয় মোগল সম্রাট আকবরের আমলে’—এটি হলো প্রচলিত বিশ্বাস। ‘কংসনারায়ণের’ পরে ‘ভাদুড়িয়ার রাজা’ ‘জগৎনারায়ণ’ দুর্গাপূজা শুরু করেছিলেন। অন্য একটি সূত্রে জানা যায়, ‘কংসনারায়ণের’ পূজার ৩৮ বছর আগে ‘শেরশাহের’ কাছ থেকে ‘জায়গির’ পেয়ে ‘দামোদর নদে’র কোনো এক ধারে পূজা করেছিলেন ‘যশোচন্দ্র’ (১৫৪৫)।‘খান চৌধুরী আমানতুল্লা’ সাহেব তার ‘কোচবিহারের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন—‘অহোমরাজের প্রতিভূগণ আসামে প্রত্যাবৃত হইয়া কামতারাজ্যের বিবিধ আচার-ব্যবহারের সংবাদ অহোমরাজের সমক্ষে প্রকাশ করিয়াছিলেন, কামতাপুরে দশভুজা দুর্গার মূর্তির আড়ম্বরযুক্ত পূজাপদ্ধতির বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অহোমরাজ নিজ রাজ্যে উক্ত পূজার প্রবর্তন করিয়াছিলেন।’বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি ও ঐতিহাসিক তথ্যনির্ভর হয়ে বলা যায়, সন-তারিখের বিচারে ‘রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের’ ‘মনুসংহিতার টীকাকার’, তথা ‘কুল্লুক ভট্ট’র পৌত্র ‘কংসনারায়ণ’ প্রবর্তিত দুর্গাপূজার (১৫৮০) ১৮ বছর আগে ‘মহারাজা নরনারায়ণ’ ‘কোচরাজ্যে’ দুর্গাপূজা করেছিলেন। যা বাংলার মানচিত্রের বাইরে প্রথম দুর্গাপূজা। (৬২৮)দুর্গাপূজা আদিকালে ছিল রাজা-রাজড়াদের পূজা। সচ্ছল জমিদার কিংবা রাজাদের ছাড়া এ পূজা সাধারণের জন্য আয়োজন করা দুরূহ ছিল। দুর্গাপূজা কীভাবে উচ্চবিত্তদের মণ্ডপ থেকে সাধারণের কাছে এসেছিল, সেই গল্পটি বড় মধুর। দুর্গাপূজার সর্বজনীনতার সূচনা হয়েছিল ‘বারোয়ারি’ পূজার মাধ্যমে।বারোয়ারি দুর্গাপূজা প্রথম শুরু হয় ১৭৯০ সালে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায়। বারোজন যুবক মিলে চাঁদা তুলে এ পূজা শুরু করেন। তারা দেখেন, দুর্গাপূজায় প্রচুর খরচ, যা সর্বসাধারণের সাধ্যের বাইরে। তাই তারা সর্বসাধারণের জন্য এ ‘একচালা’ প্রতিমা নির্মাণ করে পূজার আয়োজন করেন।বারোজন বন্ধু বা ‘ইয়ার’ (ফারসিতে ‘ইয়ার’ মানে বন্ধু) মিলে এ পূজা আরম্ভ করায় একে বলা হয় বারোয়ারি দুর্গাপূজা। এরপর কালের বিবর্তনে দুর্গাপূজা বর্তমান সর্বজনীন রূপ নেয়। কালে কালে পূজার জৌলুশ বৃদ্ধিতে নিত্যনতুন অনুষঙ্গ যোগ হয়। আজকাল ঐতিহ্যবাহী একচালা ভেঙে বহুচালাবিশিষ্ট দুর্গাপূজা হয়। বাংলাদেশের কুমারটুলিগুলোতেও বিভিন্ন আঙ্গিকে নানা ঢঙের, নানা রূপের বৈচিত্র‍্যময় প্রতিমা নির্মাণ হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশাল আকৃতির দৃষ্টিনন্দন পূজামণ্ডপে আলোকোজ্জ্বল দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের পূজাগুলো থিমের ভিত্তিতে না হলেও এর বর্ণিল ও আন্তরিক আয়োজন ভক্তদের হৃদয় হরণ করে। বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছেন। এই ভূগ্রামের প্রধান শহরগুলো, বিশেষ করে লন্ডন, প্যারিস, টরন্টো, মন্ট্রিয়েল, নিউইয়র্ক, মিশিগানসহ পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট বাংলাদেশ। এসব বনলতাময় প্রবাসে প্রাণের উচ্ছ্বাসে বাঙালি হিন্দুরা দুর্গাপূজার আয়োজন করে থাকেন। রাজাদের পরিবার থেকে বারোয়ারি দুর্গাপূজা এখন বিশ্বজনীন রূপ পেয়েছে।মা দুর্গা হলেন দুর্গতিনাশিনী, অর্থাৎ সব দুঃখ-দুর্দশার বিনাশকারী। তিনি অন্যায় ও অসত্যের প্রতীক মহিষাসুরকে নিধন করার জন্যই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বিশ্বজুড়ে অন্যায়, অসত্য, যুদ্ধবিগ্রহের এই ক্রান্তিকালে মা দুর্গার আদর্শ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। মাতৃ-আরাধনার উদ্দেশ্যকে সফল করার লক্ষ্যে প্রতিটি পূজার আয়োজন যদি নিবেদিত হয়, তাহলে দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য সারা বিশ্বের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার সঙ্গে গৃহীত হবে এবং বিশ্ববাসী মাতৃ-আরাধনার তাৎপর্য সহজেই অনুধাবন করতে সমর্থ হবে। দুর্গাপূজা তাই পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, এমনকি বৈশ্বিক সংহতি রক্ষায় এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী একটি পূজা। পৃথিবীর সকল রাবণরূপী অসুরের বিনাশের জন্য দেবী দুর্গার আরাধনার গুরুত্ব অসীম। ‘রাবণস্য বিনাশায় রামসানুগ্রহায় চ অকালে বোধিতা দেবী।’ অর্থাৎ, রাবণকে বিনাশের জন্য রামের প্রতি অনুগ্রহবশত অকালে দেবী দুর্গা বোধিত হয়েছিলেন। দুষ্ট শক্তি রাবণকে বধ করার জন্য রাম নিদ্রিত অবস্থায় দেবীর পূজা করেছিলেন অকালবোধনের মাধ্যমে। আমাদের অন্তরের রাবণকে বিনাশ এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য তাই দুর্গাপূজার আয়োজন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ভক্তিসহকারে করা উচিত।[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

শব্দদূষণ: অসহনীয় শব্দ থেকে মুক্তি চাই

আমাদের দেশে পানি, মাটি, বায়ু ও শব্দদূষণ—এই চার ধরনের দূষণ ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এর বাইরে রয়েছে আলোকদূষণ, যা এখনো তেমন আলোচনায় আসেনি। মোবাইলফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও টেলিভিশনের পর্দা থেকে নির্গত নীল আলো ঘুম ও শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বর্তমানে দেশের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় শব্দদূষণ। অতিরিক্ত শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তি, ঘুম, মনোযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রতিনিয়ত শব্দের মধ্যে বসবাস করতে করতে মানুষ যেন এই দূষণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছে। অথচ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।শব্দের সহনীয় মাত্রা স্থান ও সময়ভেদে ভিন্ন হয়। শব্দদূষণ বিধিমালা অনুযায়ী, নীরব এলাকায় দিনের বেলায় শব্দের মাত্রা ৫০ ডেসিবল এবং রাতে ৪০ ডেসিবলের মধ্যে থাকা উচিত। আবাসিক এলাকায় দিনের বেলায় ৫৫ ডেসিবল ও রাতে ৪৫ ডেসিবল নির্ধারিত। বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকাতেও নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব মাত্রা কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ঘর থেকে কর্মস্থলে যাওয়া, যানবাহনে ভ্রমণ কিংবা বাসায় অবস্থান—কোথাও যেন শব্দের হাত থেকে রেহাই নেই। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালতের মতো নীরব এলাকায়ও প্রায়ই উচ্চ শব্দ শোনা যায়। ফলে রোগীর বিশ্রাম, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়।দেশে শব্দদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস যানবাহনের হর্ন। বিশেষ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলাচলের সময় অনেক গাড়ির হর্নের বিকট শব্দে মনে হয়, মাথার ভেতর হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে। আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করা হয়। দ্রুত পথ পরিষ্কার করা, অন্য যানবাহনকে ভয় দেখানো কিংবা যাত্রী আকৃষ্ট করার জন্য এসব হর্ন বাজানো হয়। বাসস্ট্যান্ডে অবৈধ দখল ও যানজটের কারণে একসঙ্গে অনেক গাড়ি হর্ন বাজায়। ফলে পরিস্থিতি আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। কিছু কিশোর ও তরুণ মোটরসাইকেলের শব্দনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র খুলে চালানোর সময় বিকট শব্দ সৃষ্টি করে। এতে পথচারী ও আশপাশের বাসিন্দারা ভোগান্তিতে পড়েন। অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানোর এই প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে সড়কে শব্দদূষণ কমানো কঠিন হবে।শিল্পকারখানার জেনারেটরও শব্দদূষণের বড় উৎস। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় কারখানা স্থাপন করা হলে এর শব্দে বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে বাড়ি পরিবর্তন করতেও বাধ্য হতে হয়। অন্যদিকে, শপিং মল, বিপণিবিতান, কাপড় ও জুতার দোকান, রোগনির্ণয়কেন্দ্র এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার করা হয়। ঈদ ও অন্যান্য উৎসবের সময় এ প্রবণতা আরও বাড়ে। হকার ও ভাসমান দোকানিরা বৈদ্যুতিক বাঁশি, ঘণ্টা কিংবা রেকর্ড করা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। উচ্চ স্বরে গানবাজনা ও ধর্মীয় বক্তৃতাও অনেক সময় আশপাশের মানুষের জন্য শব্দদূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিনোদন কিংবা ব্যবসার উদ্দেশ্য থাকলেও অন্যের শান্তি ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এমন উচ্চ শব্দ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।মোবাইলফোনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শব্দদূষণের নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। অনেকে জনসমাগমপূর্ণ স্থানে উচ্চ স্বরে কথা বলেন কিংবা লাউডস্পিকার চালিয়ে অন্যদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করেন না। ব্যক্তিগত ফোনালাপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও উচ্চ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। এ ছাড়া সড়ক ও মহাসড়কের পাশ থেকে নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সবুজের পরিমাণ কমছে। গাছপালা শব্দ শোষণে কিছুটা ভূমিকা রাখে। তাই বৃক্ষহীন পরিবেশে শব্দের প্রভাব আরও তীব্রভাবে অনুভূত হতে পারে। পরিকল্পিত নগরায়ণ, পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা এবং আবাসিক এলাকার পাশে শিল্পকারখানা স্থাপনে নিয়ন্ত্রণ শব্দদূষণ কমাতে সহায়ক হতে পারে।শব্দদূষণের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর। অতিরিক্ত শব্দে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন শব্দের মধ্যে থাকলে ঘুমের ব্যাঘাত, মাথাব্যথা, মানসিক চাপ ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, রোগী ও শব্দসংবেদনশীল মানুষের জন্য এর প্রভাব বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। তাই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। যানবাহনে অবৈধ হর্ন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো, উচ্চ শব্দে মাইক চালানো এবং মোটরসাইকেলের শব্দনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র খুলে চালানোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিল্পকারখানার জেনারেটর ও যন্ত্রপাতিতে শব্দ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। হকারদেরও বিকল্প উপায়ে পণ্য বিক্রির অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি বেশি করে গাছ লাগাতে হবে এবং বিদ্যমান গাছ রক্ষা করতে হবে।শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; আইনের যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত শব্দের মাত্রা পরিমাপ, বিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নীরব এলাকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। অপ্রয়োজনে হর্ন না বাজানো, নির্ধারিত মাত্রার মধ্যে মাইক ব্যবহার করা এবং জনসমাগমস্থলে সংযতভাবে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যই সম্পদ। নিজের সুবিধার জন্য অন্যের শান্তি ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।[লেখক: শিক্ষক]

এবার কি নদী দখলকে বৈধতা দেওয়ার পালা

একটি নদী কীভাবে মরে যায়? শুধু তার পানিতে বিষ মিশলে, পয়োবর্জ্য পড়লে কিংবা শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যে জলজ প্রাণের অস্তিত্ব বিপন্ন হলেই কি একটি নদীর মৃত্যু ঘটে? নাকি নদীর মৃত্যুর শুরু আরও আগে-যখন তার প্রবাহের জায়গা দখল হয়, তীরের উন্মুক্ত জমিতে একের পর এক স্থাপনা গড়ে ওঠে, জলাভূমির স্বাভাবিক চরিত্র বদলে যায়, আর এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব যাদের, তাদের সামনেই ধীরে ধীরে বদলে যায় প্রকৃতির মানচিত্র? বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের দখল, দূষণ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে বারবার এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। নদীর তীরবর্তী এলাকায় দখল কীভাবে বিস্তৃত হয়, জলাশয় কীভাবে সংকুচিত হতে হতে একসময় হারিয়ে যায় এবং প্রাকৃতিক জলপথ কীভাবে জমির কাগজপত্রের বিতর্কে আটকে পড়ে-এসবের কিছু চিত্র সরেজমিনে দেখার সুযোগ হয়েছে।২০২২ সালের ২২ অক্টোবর মাছরাঙা টেলিভিশনে প্রচারিত আমার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘ঢাকা বাঁচবে তো?’-তে কেরানীগঞ্জ, বছিলা, তারানগর, শ্যামলাপুর ও আশপাশের এলাকার এমনই কিছু বাস্তবতা তুলে ধরেছিলাম। তখন দেখেছিলাম, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের সঙ্গে সংযুক্ত একটি জলপথকে ব্যক্তিমালিকানার জমি হিসেবে দেখিয়ে বিক্রির চেষ্টা চলছে। একই অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল টোটাইল বিলের ওপর দখল ও ভরাটের চাপ। ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপে জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত থাকার পরও বিলটির একাংশে মাটি ফেলার কর্মকাণ্ড চলছিল।চার বছর পর সেই অভিজ্ঞতা আরও তীব্রভাবে সামনে এসেছে। টোটাইল বিলের যে জলাধারকে একসময় সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত থাকতে দেখেছিলাম, সেটি এখন পুরোপুরি ভরাট। সেখানে স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। অন্যদিকে, গেল ১৭ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত বণিক বার্তার একটি প্রতিবেদন রাজধানীর বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানকে ভারী শিল্পের জন্য নির্ধারণ এবং ড্যাপে চিহ্নিত বিরোধপূর্ণ বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্প নির্মাণের সুযোগ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।দুটি ঘটনা একই ধরনের নয়। একটি জলাশয় ভরাট হয়ে সেখানে নির্মাণকাজ চলার বাস্তবতা, অন্যটি ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনায় পরিবর্তনের বিষয়। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই মূল প্রশ্নটি অভিন্ন: ঢাকার নদী, খাল, বিল ও বন্যাপ্রবাহ এলাকার মতো প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার কী?নদীর শাখা যখন ব্যক্তিগত জমি২০২২ সালের অনুসন্ধানে শ্যামলাপুর মৌজায় গিয়ে এমন একটি জলপথের সন্ধান পাই, যেটিকে স্থানীয় বাসিন্দারা খাল হিসেবে চিনতেন। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সংযুক্ত এই জলপথ একসময় মাছের অভয়ারণ্য হিসেবেও পরিচিত ছিল। অথচ জায়গাটি জমি হিসেবে বিক্রির চেষ্টা চলছিল।২০২২ সালের আগের টোটাইল বিলের দৃশ্যমিরপুর থেকে আসা এক সম্ভাব্য ক্রেতা জমির কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে জানতে পারেন, তাকে যে জমি দেখানো হয়েছে, সেটি সরকারি খালের অংশ বলে দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও জায়গাটিকে খাল হিসেবে চিনতেন। কিন্তু ভূমি রেকর্ডে সেটি ‘জলা’ হিসেবে উল্লেখ ছিল এবং ব্যক্তির নামে রেকর্ড ও খাজনা-খারিজের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। আমাদের হাতে থাকা সিএস ও আরএস মানচিত্রের সঙ্গে বর্তমান রেকর্ডের অসংগতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করেছিলাম।একজন ভূমি কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, রেকর্ডে জমিটি ব্যক্তির নামে থাকলেও মানচিত্রে সেটি খাল হিসেবে চিহ্নিত। আরেকজন সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার বক্তব্য ছিল, কাগজপত্র ঠিক মনে হলে রেকর্ড দেওয়া হয়; জমিটি নদী, খাল, বিল না অন্য কিছু, তা যাচাই করার সুযোগ তাদের নেই।কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপের মানচিত্রের মধ্যে অসংগতি জমিটির আইনগত অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছিল। জমিটির প্রকৃত মালিকানা ও আইনগত পরিচয় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিল, জরিপ, রেকর্ড এবং অন্যান্য নথি যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অনুসন্ধানটি যে মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছিল, তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। একটি প্রাকৃতিক জলপথের পরিচয় ও ভূমি রেকর্ডের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে সেটি যাচাই ও নিষ্পত্তির দায়িত্ব কার? জমির কাগজে ব্যক্তির নাম উঠে গেলেই কোনো জলপথের প্রাকৃতিক পরিচয় মুছে যায় না। আবার কোনো জলপথের অস্তিত্ব রেকর্ডের আড়ালে চাপা পড়ে গেলে তার পরিবেশগত গুরুত্বও বিলীন হয়ে যায় না। এমন পরিস্থিতিতে শুধু জমি কেনাবেচার কাগজপত্র যাচাই করাই যথেষ্ট নয়। জায়গাটি জলপ্রবাহের অংশ কি না, নদীর সঙ্গে তার সংযোগ রয়েছে কি না এবং প্রযোজ্য আইনে সেটি কীভাবে সংরক্ষিত-এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে।কারণ, জলপথের পরিচয় নিয়ে বিরোধ দেখা দেওয়ার পর যথাযথ যাচাই না হলে একদিকে যেমন প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ কঠিন হয়, অন্যদিকে তেমনি জলপ্রবাহের জায়গা স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন বিরোধটি আর শুধু জমির কাগজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তার প্রভাব পড়ে পুরো এলাকার পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর।ড্যাপে জলাশয়, বাস্তবে নির্মাণএকই অনুসন্ধানে আমরা গিয়েছিলাম শ্যামলাপুর এলাকার টোটাইল বিলে। প্রায় ৩০ বিঘা আয়তনের এই জলাধারটি তখন দখল ও ভরাটের চাপে ছিল। একদিকে স্থানীয়ভাবে জমির মালিকানা দাবি করা ব্যক্তির ভরাট কার্যক্রম, অন্যদিকে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের মাটি ফেলার তৎপরতা দেখতে পেয়েছিলাম আমরা। অথচ তৎকালীন ড্যাপে বিলটিকে জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, বিলটি ভরাট করা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জলাশয় রক্ষা ও ভরাট বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।কিন্তু অনুসন্ধানের সময় মাঠে যে বাস্তবতা দেখেছিলাম, তা ছিল উদ্বেগজনক। সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত একটি জলাধারের অস্তিত্বই ঝুঁকির মধ্যে ছিল। আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বিলের একটি অংশ ভরাটের কথা বলেছিলেন। জায়গাটির সঙ্গে বুড়িগঙ্গার সম্পর্কের প্রসঙ্গও আলোচনায় এসেছিল। এসব বক্তব্যের আইনগত তাৎপর্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই প্রয়োজন হলেও, জলাশয়ের ওপর দখল ও ভরাটের চাপ যে বাস্তব ছিল, তা আমাদের সরেজমিন অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়েছিল।এরপর সময় গড়িয়েছে, সরকারের পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু টোটাইল বিলের বর্তমান বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। সরেজমিনে দেখা এবং আমার কাছে থাকা ছবিতে যে পরিস্থিতি ধরা পড়েছে, তাতে বিলটির পুরো এলাকাই ভরাট হয়ে গেছে, সেখানে এখন স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। যে জায়গায় একসময় জলাধার ছিল, যে জলাশয়কে পরিকল্পনায় সংরক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেখানে এখন নির্মাণের দৃশ্য।এটি শুধু একটি বিল হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটি সংরক্ষণের পরিকল্পনা, প্রশাসনিক আশ্বাস এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানেরও প্রতিচ্ছবি। ২০২২ সালে যখন ভরাটের তৎপরতা দেখেছিলাম, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ছিল। আজ সেই বিলের জায়গায় নির্মাণকাজ চলতে দেখা গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে, সেই আশ্বাসের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? ভরাট বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি? নেওয়া হয়ে থাকলে তা সত্ত্বেও বিলটি কীভাবে পুরোপুরি ভরাট হলো?২০২২ সালে টোটাইল বিলপাড়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের আনাগোনানির্মাণকাজের অনুমোদন রয়েছে কি না, কোন নথি বা মালিকানার ভিত্তিতে কাজ চলছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে-এসব প্রশ্নের উত্তর নথি যাচাই ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন। কিন্তু বিলটির ভরাট হয়ে যাওয়া এবং সেখানে নির্মাণকাজ চলার যে বাস্তবতা এখন দেখা যাচ্ছে, তা গুরুতর উদ্বেগের কারণ।কোনো জলাশয় পরিকল্পনায় সংরক্ষিত থাকার পরও যদি তা ভরাট হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু দখলকারীর সম্ভাব্য দায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নজরদারি, অনুমোদন এবং আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরিকল্পনায় সংরক্ষণের কথা লেখা থাকাই যথেষ্ট নয়, সেই সংরক্ষণ বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ।সরকারের পরিবর্তন হয়, জলাশয়ের ভাগ্য বদলায় কি?নদী ও জলাভূমি রক্ষার প্রশ্নটি কোনো একটি সরকারের মেয়াদে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২২ সালে যখন অনুসন্ধানটি করি, তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারও দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু টোটাইল বিলের পরিণতি দেখায়, শুধু সরকারের পরিবর্তন ঘটলেই জলাশয় রক্ষার বাস্তবতা বদলে যায় না।কোনো নির্দিষ্ট সরকারের সময় ঠিক কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কোন কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং কার দায়িত্বে ঘাটতি ছিল-এসব নির্ধারণের জন্য নথি ও ঘটনাক্রম যাচাই জরুরি। তবে জলাশয়টি যখন ভরাট হয়ে নির্মাণকাজের পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন দায় নির্ধারণের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং এখন প্রয়োজন, বিলটি কীভাবে ধাপে ধাপে ভরাট হলো, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কখন বিষয়টি জেনেছিল, কী পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং সেগুলো কেন কার্যকর হয়নি-এসবের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান। জলাশয় রক্ষার দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক সরকারের সাময়িক অঙ্গীকারের বিষয় হতে পারে না। এটি আইন, পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক দায়িত্ব। দখল প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণও একমাত্রিক নয়। কোথাও ভূমি রেকর্ডের অসংগতি থাকতে পারে, কোথাও নজরদারির ঘাটতি, কোথাও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের অভাব। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় স্থানীয় প্রভাব বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠলে তা-ও প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কোনো জলাশয়ের অস্তিত্ব ঝুঁকির মধ্যে থাকলে প্রশাসনের কাছে জবাব চাওয়াই স্বাভাবিক। কোন কর্তৃপক্ষ কখন বিষয়টি জেনেছে, কী ব্যবস্থা নিয়েছে, কেন সেই ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি এবং অবশিষ্ট জলাশয় রক্ষায় এখন কী করা সম্ভব-এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে থাকা উচিত।একটি জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার পর দায় নির্ধারণ করা যেমন জরুরি, তেমনি দখল চলাকালীন তা ঠেকাতে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করাও জরুরি। আর যদি জলাশয় ভরাটের পর সেখানে স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়, তাহলে শুধু নির্মাণকাজের বর্তমান বৈধতা যাচাই করাই যথেষ্ট নয়, কীভাবে পরিস্থিতি এই পর্যায়ে পৌঁছাল, সেটিও তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত। নইলে প্রতিবারই নতুন সরকার নতুন প্রতিশ্রুতি দেবে, নতুন পরিকল্পনায় সংরক্ষণের কথা লেখা থাকবে, অথচ প্রকৃতির মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়া জায়গাগুলো আর ফিরে আসবে না।এখন আবার ভূমি ব্যবহারের নিয়ম বদলানোর প্রশ্নবণিক বার্তার ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্যাপের সংশোধনীতে রাজধানীর আইলবহর মৌজার ১০৪৭, ১০৪৮ ও ১০৫০ নম্বর দাগে আগে উন্মুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত জমিকে ভারী শিল্প এলাকার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ড্যাপে চিহ্নিত বিরোধপূর্ণ বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে বাধা না থাকার বিধান যুক্ত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।প্রতিবেদনে নগর পরিকল্পনাবিদেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এসব পরিবর্তনের ফলে বন্যার পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে এবং নদীতীরবর্তী এলাকায় পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত জমির ব্যবহার পরিবর্তনের বিষয়টি তাই শুধু ভূমির শ্রেণিবিন্যাসের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এর সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাবও মূল্যায়ন করা জরুরি। একটি মৌলিক নীতি এখানে মনে রাখা প্রয়োজন। আর সেটা হল কোনো জমি খালি পড়ে আছে বলেই সেটি অনাবশ্যক নয়। বিশেষ করে নদীতীর, জলাভূমি ও বন্যাপ্রবাহ এলাকায় উন্মুক্ত জমি পানি ধারণ, পানি নিষ্কাশন, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। এসব জমির কার্যকারিতা সব জায়গায় এক রকম নয়, তাই ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন বিবেচনার আগে স্থানভিত্তিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন দরকার।শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করতে হলে জানতে হবে, সেখানে শিল্প গড়ে উঠলে কী ধরনের পরিবেশগত প্রভাব তৈরি হতে পারে, বন্যাপ্রবাহ ও পানি নিষ্কাশনের ওপর কী প্রভাব পড়বে এবং আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রা কতটা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত স্থান ভারী শিল্পের জন্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। নদীটি দীর্ঘদিন ধরে দখল ও দূষণের চাপ বহন করছে। এ অবস্থায় নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে পরিবেশগত বিধিবিধান, নদীর বর্তমান অবস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে।বণিক বার্তার প্রতিবেদনে ড্যাপের আরও একটি সংশোধনীর কথা বলা হয়েছে, যেখানে ঝিলমিল ও পূর্বাচলে পাঁচ কাঠা বা তার বেশি আয়তনের প্লটে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদন নেওয়ার শর্তে অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা এফএআর সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ধরনের সুবিধার নগর পরিকল্পনাগত যুক্তি ও সম্ভাব্য প্রভাবও স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কারণ আবাসন ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে নগরের ঘনত্ব, অবকাঠামোর সক্ষমতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের সম্পর্ক রয়েছে।বদলে যেতে শুরু করে টোটাইল বিলের চিত্র।ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করলেই পরিবেশগত ছাড়পত্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা অন্যান্য আইনগত বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে, প্রস্তাবিত ব্যবহার প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না।পরিকল্পনা সংশোধনের আগে জবাবদিহি চাইড্যাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সময়ের প্রয়োজনে সংশোধিত হতে পারে। নগরের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিকল্পনার পর্যালোচনাও প্রয়োজন। কিন্তু সংশোধনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নগরের বাস্তব সমস্যা সমাধান করা-প্রাকৃতিক সম্পদের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করে জমির ব্যবহার বদলে দেওয়া নয়।বণিক বার্তার প্রতিবেদনে রাজউক চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি সর্বশেষ সংশোধনী সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। প্রতিবেদনে তিনি আরও বলেছেন, ড্যাপের বিধি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কারিগরি কমিটির সুপারিশসহ নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজন রয়েছে। এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংশোধনীর পূর্ণাঙ্গ নথি, প্রস্তাবের উৎস, কারিগরি মূল্যায়ন এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। যদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়েও স্পষ্টভাবে জানা না থাকে, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, দায়িত্ব বণ্টন ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে প্রক্রিয়াগত অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট নথি ও অনুমোদনের ধারাবাহিকতা যাচাই করা প্রয়োজন। স্বচ্ছতার স্বার্থেই এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত।একই সঙ্গে বন্যাপ্রবাহ এলাকার ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনের আগে পানি প্রবাহ, পানি ধারণক্ষমতা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি নিয়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি সমীক্ষা করা দরকার। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকায় শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব এবং প্রযোজ্য আইনগত বিধিনিষেধের সঙ্গে সামঞ্জস্যও নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ, স্থানীয় বাসিন্দা ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মতামত গ্রহণের সুযোগ থাকলে সিদ্ধান্তের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।টোটাইল বিলের অভিজ্ঞতা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সেখানে একসময় জলাশয় সংরক্ষণের পরিকল্পনা ছিল, ভরাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও ছিল। কিন্তু এখন বিলটি পুরোপুরি ভরাট হয়ে সেখানে নির্মাণকাজ চলছে। এই পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিকল্পনায় সংরক্ষণের কথা থাকলেই প্রকৃতি সুরক্ষিত থাকে না। সংরক্ষণের বিধান কার্যকর করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা, নজরদারি ও জবাবদিহিও থাকতে হয়।অতীতের দখল ও ভরাটের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে নতুন ভূমি ব্যবহারনীতি গ্রহণ করা হলে একই ধরনের ঝুঁকি আরও বড় পরিসরে তৈরি হতে পারে। যে শহর ইতিমধ্যে জলাবদ্ধতা, দূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির চাপ বহন করছে, সেখানে অবশিষ্ট উন্মুক্ত স্থান ও জলপ্রবাহের পথের গুরুত্ব আরও বেশি করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।ঢাকা বাঁচবে কীভাবে?নদী ও জলাশয় রক্ষার জন্য প্রথম প্রয়োজন অবশিষ্ট জলাধারগুলোর সীমানা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করা। সরকারি মানচিত্র, ভূমি রেকর্ড, ড্যাপের শ্রেণিবিন্যাস এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মিলিয়ে দেখতে হবে-কোথায় দখল হয়েছে, কোথায় ভরাট চলছে এবং কোথায় রেকর্ডের অসংগতি রয়েছে। এসব তথ্য সমন্বিতভাবে প্রকাশ করা গেলে দখল শনাক্ত করা, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং দায়িত্ব নির্ধারণ সহজ হবে।দ্বিতীয়ত, দখল ও ভরাটের অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অবৈধ দখল হয়ে যাওয়ার পর উচ্ছেদ অভিযান চালানোর চেয়ে দখল শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা অনেক বেশি কার্যকর। এ জন্য নিয়মিত মাঠপর্যায়ের নজরদারি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় এবং অভিযোগের পর গৃহীত ব্যবস্থার স্বচ্ছ নথি থাকা জরুরি।তৃতীয়ত, ড্যাপের সর্বশেষ সংশোধনীগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করে সেগুলোর কারিগরি ভিত্তি ও পরিবেশগত প্রভাব ব্যাখ্যা করতে হবে। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানকে ভারী শিল্পের জন্য নির্ধারণ কিংবা বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্পের সুযোগ দেওয়ার মতো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের যুক্তি, সম্ভাব্য লাভ ও পরিবেশগত ঝুঁকি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।চতুর্থত, টোটাইল বিলের মতো জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলোর পৃথক তদন্ত প্রয়োজন। বিলের সীমানা ও পূর্ববর্তী শ্রেণিবিন্যাস, জমির রেকর্ড, ভরাটের সময়কাল, নির্মাণকাজের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ যাচাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যেখানে সম্ভব, জলাশয়ের অবশিষ্টাংশ ও পানি প্রবাহের পথ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ২০২২ সালে ‘ঢাকা বাঁচবে তো?’ প্রতিবেদন তৈরির সময় টোটাইল বিলের পাশে দাঁড়িয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলাম, আজও তার উত্তর খুঁজছি। একটি খালকে ব্যক্তিগত জমি হিসেবে দেখিয়ে বিক্রির চেষ্টা কীভাবে সম্ভব হয়? সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত একটি বিলের ওপর ভরাটের চাপ তৈরি হলেও কার্যকর প্রতিরোধ কেন নিশ্চিত করা যায় না? আর দীর্ঘদিনের দখল ও পরিবেশগত ক্ষতির অভিজ্ঞতার পরও ভূমি ব্যবহারের নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সেই অভিজ্ঞতা কতটা গুরুত্ব পায়?টোটাইল বিলের বর্তমান চিত্র এই প্রশ্নগুলোকে আরও জরুরি করে তুলেছে। যে জলাশয় একসময় ছিল, সেটি এখন ভরাট, সেখানে নির্মাণকাজ চলছে। এই পরিবর্তনের ছবি কেবল একটি জায়গার অতীত ও বর্তমানের পার্থক্য দেখায় না, এটি পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানও সামনে আনে। এখন প্রয়োজন, সেই ব্যবধানের কারণ অনুসন্ধান করা এবং ভবিষ্যতে যেন অন্য জলাশয়ের পরিণতিও একই না হয়, তা নিশ্চিত করা।এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া নদী রক্ষার ঘোষণা কিংবা নতুন পরিকল্পনা-কোনোটিই যথেষ্ট নয়।২০২৬ সালে এসে টোটাইল বিলের চিত্র পুরোটাই ভিন্ন।রূপ নিচ্ছে আবাসিক এলাকায়।বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: নদী হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া ধীর হলেও তার ক্ষতি সুদূরপ্রসারী। জলাশয় হারালে শুধু জমির চেহারা বদলায় না, বদলে যায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল এবং মানুষের বসবাসের পরিবেশ। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় নগরবাসীকেই-জলাবদ্ধতা, দূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার অবনতির মধ্য দিয়ে।উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। শিল্প, আবাসন ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু উন্নয়নের সিদ্ধান্তে জমির তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ব্যবহারই একমাত্র বিবেচ্য হতে পারে না। নদী, খাল, বিল ও বন্যাপ্রবাহ এলাকার পরিবেশগত মূল্যও পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। কারণ প্রাকৃতিক জলাধার একবার হারিয়ে গেলে কেবল অর্থ ব্যয় করে তার আগের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা কঠিন। যে জলাশয় দখল ও ভরাট থেকে রক্ষা করা যায়নি, তার পরিণতি থেকে শিক্ষা না নিয়ে নতুন করে নদীতীর ও বন্যাপ্রবাহ এলাকার ভূমি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে অতীতের ব্যর্থতা আরও বড় পরিসরে ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে। তাই রাষ্ট্রকে জবাব দিতে হবে-আগের অভিজ্ঞতা থেকে কী শিক্ষা নেওয়া হয়েছে, আর সেই শিক্ষা বাস্তব সিদ্ধান্তে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে?ঢাকাকে বাঁচাতে হলে নদী ও জলাভূমিকে উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে নয়, নগরকে টিকিয়ে রাখার অপরিহার্য প্রাকৃতিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পরিকল্পনার সার্থকতা জমির শ্রেণি বদলানোর ক্ষমতায় নয়, বরং মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য প্রকৃতির প্রয়োজনীয় জায়গাটুকু অক্ষুণ্ণ রাখতে পারার মধ্যে। নইলে একদিন হয়তো মানচিত্রে খাল-বিলের নাম থাকবে, পুরোনো নথিতে নদীর শাখার অস্তিত্বও পাওয়া যাবে-কিন্তু বাস্তবে সেগুলো খুঁজে পাওয়ার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তখন প্রশ্নটি আর শুধু নদী বাঁচবে কি না, তা থাকবে না- প্রশ্ন হবে, নদী ছাড়া এই শহর আদৌ কত দিন বাসযোগ্য থাকবে?লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টিভি

অস্পৃশ্যতার শিকল ভাঙার লড়াই

আমার বাড়ি উত্তরের জেলা বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার ডেমাজানী গ্রামে। আমাদের গ্রামে আমরাই একমাত্র রবিদাস পরিবার। রবিদাস একটি ঐতিহ্যবাহী জনগোষ্ঠী, যাদের পেশার সঙ্গে জুতা তৈরি, মেরামত ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের পরিবারের প্রতি উচ্চবর্ণের হিন্দুদের নেতিবাচক মনোভাব দীর্ঘদিনের। পরিবারের প্রায় সব সদস্যকেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে অস্পৃশ্যতামূলক আচরণের শিকার হতে হয়েছে। আমরা নয় ভাই-বোনের মধ্যে আমি অষ্টম। বড় দাদা-দিদিদের জীবনেও এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো আমাদের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এসব ঘটনার কিছু তাদের মুখে শুনেছি, আবার কিছু নিজের চোখেই দেখেছি।২০১৩ সালের দুর্গাপূজার কথা। তখন আমি ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। আমাদের পাড়ার সার্বজনীন মন্দিরে দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে পূজার্চনায় অংশ নিতে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করি। সে সময় অনেক মানুষের ভিড় থাকায় কেউ কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও প্রসাদ নেওয়ার জন্য মন্দিরে ঢুকতে বাধা দেন তৎকালীন দায়িত্বরত পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক। ২০০৫ সালে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তার কাছে তিন-চার মাস প্রাইভেট পড়েছিলাম। সেই সুবাদে তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতাম। দিনে যতবারই তার সঙ্গে দেখা হতো, ততবারই তাকে নমস্কার জানাতাম। তাকে যথেষ্ট সম্মান করতাম।যাহোক, তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি পা ধুয়ে মন্দিরে ঢুকছো?’ প্রত্যুত্তরে বললাম, ‘কীভাবে শুচিতা বজায় রেখে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়, সেটা অন্তত জানি। আপনি এমন কথা বললেন কেন, স্যার?’তার কাছ থেকে এমন আচরণ পেয়ে আমি ভীষণ ব্যথিত হয়েছিলাম। পরক্ষণেই তিনি আমতা আমতা করে বললেন, ‘তুমি জানো না তোমরা কী জাত? মুচি জাতের মানুষ পূজার সময় মন্দিরে ঢুকলে পূজার উপকরণ অপবিত্র হয়ে যাবে। দেবী দুর্গার পূজার পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যাবে। পূজার সময় মন্দিরের উপকরণে নিম্নজাতের মানুষের স্পর্শ করা অনুচিত।’কথাগুলো শোনার পর মনোকষ্ট ও অপমানবোধ থেকে প্রতিবাদ করে বলেছিলাম, ‘সার্বজনীন পূজামণ্ডপে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র-সনাতন ধর্মাবলম্বী সবার সমান অধিকার রয়েছে। আমরা সবাই হিন্দু। তাই পূজার্চনার অধিকারও সবার সমান। তা ছাড়া পূজার চাঁদা আমরাও দিই। সে ক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে এমন বৈষম্য আমি মানি না, মানব না। আপনার সামনেই মন্দিরে ঢুকে প্রসাদ নিয়ে আসছি। পারলে বাধা দিন।’ঘটনাটি সেখানেই শেষ হলেও এর ক্ষত আমার মনে গভীরভাবে থেকে যায়। বাড়ি ফিরে আমি আর কান্না থামাতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ আগেই রাগে-দুঃখে প্রতিবাদ করে এসেছি, অথচ বাড়িতে এসে নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। পরিবারের কাউকে প্রথমে কিছু বুঝতে দিইনি। কিন্তু মা বিষয়টি আঁচ করতে পারেন। তিনি জানতে চাইলে তাকে সব খুলে বলি।আমার অবিরাম কান্না দেখে মা-ও নিজেকে সামলাতে পারেননি। তিনি মন্দিরে গিয়ে প্রতিবাদ করতে চাইলে আমি তাকে থামাই। মা একেবারেই নিরক্ষর। কিন্তু সেদিন তিনি হঠাৎ এমন একটি কথা বলেছিলেন, যা আমার জীবনের জন্য গভীর শিক্ষণীয় হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা চর্মকার। যে ঢাক না বাজলে দেবী দুর্গার পূজা সম্পন্ন হয় না, সেই ঢাক তৈরির সঙ্গে আমাদের পেশার সম্পর্ক রয়েছে। আমরা যদি অস্পৃশ্য হই, তাহলে চামড়ার তৈরি ঢাকও অস্পৃশ্য। পূজামণ্ডপ থেকে সেই ঢাক আমি ছিনিয়ে আনব। দেখি, ঢাক ছাড়া দেবী মায়ের পূজা কীভাবে হয়!’ মায়ের সেই কথার মধ্যে ছিল শত বছরের বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আত্মমর্যাদার দাবি এবং জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যের প্রতি এক গভীর প্রশ্ন।২০১৩ সালের ঘটনার পরও আমাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের অবসান হয়নি। ২০২০ সালের দুর্গাপূজার সময় আমি দুর্গামন্দিরের একটি প্রদীপদানি স্পর্শ করায় আশুতোষ সাহা সেটি পুকুরে ফেলে দেন। একই সঙ্গে পূজায় নিযুক্ত পুরোহিতকে সতর্ক করে দেন, যাতে আমি কিংবা আমার পরিবারের কোনো সদস্য মন্দিরে প্রবেশ করতে না পারি।আমার প্রদীপদানি স্পর্শ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলাদা একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় আমি সাংগঠনিক কাজে বগুড়ার বাইরে অবস্থান করছিলাম। সভা চলাকালে আমাদের সংগঠনের একজন কর্মী ফোন করে আমাকে বিষয়টি জানান।একটি পূজামণ্ডপে ব্যবহৃত প্রদীপদানি স্পর্শ করার কারণে সেটি ফেলে দেওয়া এবং একটি পরিবারের সদস্যদের মন্দিরে প্রবেশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা আমাকে গভীরভাবে মর্মাহত করে। ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রবেশের মতো মৌলিক অধিকারের প্রশ্নটি যে কতটা অবহেলিত হতে পারে, তা আবারও উপলব্ধি করি।২০২১ সালে আমাদের সংগঠনের একজন কর্মীকেও অপমান করেন আমার সেই প্রাইভেট টিউটর। আমাদের পাড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন গোত্রের মানুষের বসবাস। রবিদাস ও রাজভর জনগোষ্ঠীর দুর্গাপূজার চাঁদা সংগ্রহের দায়িত্বে ছিল সেই কর্মীর। দুর্গাপূজার তৃতীয় দিন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের বাড়িতে সুজন সংগৃহীত চাঁদার টাকা জমা দিতে যান। কিন্তু সাধারণ সম্পাদক তার হাত থেকে টাকা না নিয়ে মাটিতে রাখতে বলেন। পরে মাটিতে রাখা টাকার ওপর জল ছিটিয়ে তিনি তা গ্রহণ করেন। চাঁদার টাকা সংগ্রহের সময় দু’-তিনজনের চাঁদা বাকি থাকায় সেই কর্মীকে ভর্ৎসনাও করা হয়। তাকে বলা হয়, ‘দুর্গাপূজা ফকিন্নিদের পূজা না, রাজা-বাদশার পূজা। ঠিকমতো পূজার চাঁদা দিতে না পারলে বারোয়ারিতে থাকার দরকার নেই।’ নিজের হাত থেকে টাকা গ্রহণ না করায় সেই কর্মী গভীর মনোকষ্টে কান্না করতে থাকে।সেদিন রাতে মন্দিরে গিয়ে সবার সামনে আমি এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এর ফলে পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও তার কতিপয় অনুসারীর বিরাগভাজন হয়ে পড়ি। তারা আমাদের অস্পৃশ্য মনে করতেন এবং আমার ও আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করতেন। এভাবে বছরের পর বছর ধরে আমাদের আত্মমর্যাদা ক্ষুন্ন করা হয়েছে। অথচ আমরা এই সমাজেরই মানুষ। আমরাও ধর্মীয় উৎসবে অংশ নিতে চাই, পূজার্চনা করতে চাই, অন্য সবার মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চাই।২০২২ সালের দুর্গাপূজার আগে আমার মনে আশঙ্কা জাগে, আগের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। এত দিন স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়ায় আমি অনেকটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত মানবাধিকারের এমন চরম লঙ্ঘনের প্রতিকার চেয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে গিয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিই।আমার মনে হয়েছিল, হয়তো কোনো সমাধানই হবে না। কিন্তু দুর্গাপূজার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিষয়ে পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদকে অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করে শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযোগকারী হিসেবে আমিও চিঠি পাই।এরপর থেকেই আমার এলাকায় অস্পৃশ্যতার বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হতে শুরু করে। অনেকেই এমন ঘটনার নিন্দা জানান এবং দ্রুত সমাধানের দাবি তোলেন। আমার সাহসী ভূমিকার জন্য কেউ কেউ প্রশংসা করেন, আবার কেউ কেউ একে বাড়াবাড়ি বলেও মন্তব্য করেন।তবে আমি বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট সন্তুষ্ট ছিলাম। কারণ, আমাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অমানবিক আচরণের একটি সুষ্ঠু সমাধান আসন্ন-এমন আশা করতে শুরু করেছিলাম। এরই মধ্যে বিভিন্ন মানুষের মাধ্যমে আমাকে বিষয়টি এখানেই শেষ করে দেওয়ার অনুরোধ, প্রস্তাব এমনকি হুমকিও দেওয়া হতে থাকে। কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থানে অটল ছিলাম। এমন কথাও প্রচার করা হয়, ‘মাস্টারের মতো সম্মানী ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিপন মামলা করেছে। এটা কি ঠিক?’আমি বিষয়টিকে ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখিনি। আমার কাছে এটি ছিল মানবাধিকার, সামাজিক মর্যাদা ও সমান অধিকারের প্রশ্ন। তাই জনমত গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে জমা দেওয়া আবেদনের ফটোকপি বিভিন্ন নাগরিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠন এবং সংগঠকদের কাছে পাঠাতে থাকি।এই উদ্যোগের ফলে অনেকেই জাতপাতের কুফল সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। তারা উপলব্ধি করতে পারেন, জাতপাতের ধারণা কীভাবে নীরব ঘাতকের মতো মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও সামাজিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। জনমত গঠনের এই প্রক্রিয়া আমাকে অনেক বেশি সাহস ও শক্তি জুড়িয়েছিল।অবশেষে পূর্বনির্ধারিত সময়ে উভয় পক্ষকে নিয়ে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইউএনও মহোদয় উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন। পরে বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে কারও প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন। অভিযুক্ত পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা নিয়ে বিষয়টির সমাধান করা হয়। আমিও অভিযোগকারী হিসেবে আমি পূজা কমিটির সঙ্গে মিলেমিশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে লিখিত দিই। পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদকে ও তার অনুসারীরা ভবিষ্যতে রবিদাসসহ দলিত জনগোষ্ঠীর সদস্যদের মন্দিরে প্রবেশ, পূজার্চনা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য না করার বিষয়ে লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেন। এভাবেই দীর্ঘদিনের অপমান, বঞ্চনা ও প্রতিবাদের পর মন্দিরে প্রবেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একটি ইতিবাচক সমাধান আসে।ঘটনাটির একটি সুষ্ঠু সমাধান এসেছে বলা যায়। কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরও জটিল। ওই দিনের পর থেকে আমি লক্ষ করেছি, পাড়ার বেশ কয়েকজন আমাকে এড়িয়ে চলেন। যদিও আমি তাদের সঙ্গে আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে মিশতে চেষ্টা করেছি। আমার জীবনের এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, অস্পৃশ্যতার শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত। জাতপাতের ধারণায় বিশ্বাসী মানুষের মধ্যে এমন এক মনস্তত্ত্ব গড়ে ওঠে, যা কেবল নির্দেশ কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাতারাতি বদলে দেওয়া সম্ভব নয়।আমরা যতই বৈষম্য বিলোপের আইন দাবি করি না কেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সমাজ থেকে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য দূর হবে না। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের পরিবর্তন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সম্মিলিত উদ্যোগে বৈষম্যবিরোধী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।তবে বাংলাদেশে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতা প্রতিরোধে কার্যকর আইন থাকা অত্যন্ত জরুরি। এমন আইন ও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জাতপাতের ধারণা থেকে উদ্ভূত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটানোর সাহস কেউ না পায়। পাশাপাশি অপরাধের প্রতিকার, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সেই সময়ের উদ্যোগ আমার পাড়ায় অন্তত মানবতার একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। আমি উপলব্ধি করেছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। বৈষম্যের শিকার হয়ে নীরব থাকলে বৈষম্য আরও শক্তিশালী হয়। নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সচেতনতা, সাহস, সংগঠিত উদ্যোগ এবং আইনি প্রতিকার গ্রহণের মানসিকতা থাকা জরুরি।আমার এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি পরিবারের কিংবা একটি জনগোষ্ঠীর মন্দিরে প্রবেশের অধিকারের লড়াই নয়; এটি মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। কোনো মানুষের পরিচয় তার পেশা, জন্ম কিংবা জাতপাত দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেরই সমান মর্যাদা, অধিকার ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রয়েছে।আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কাউকে তার জন্মপরিচয়ের কারণে অপমানিত হতে হবে না; যেখানে ধর্মীয় উপাসনালয়ের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে; যেখানে মানুষের মূল্যায়ন হবে তার মানবিক গুণাবলি ও কর্মের ভিত্তিতে, জাতপাতের পরিচয়ে নয়। মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে-পেশা কিংবা জাতপাতের পরিচয়ে নয়। এমন সমাজই আমাদের কাম্য।(মতামত লেখকের নিজস্ব)[লেখক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, বগুড়া-৫]

বাবার পরিচয়ে কি সন্তানের চাকরি আটকানো যায়

লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও শুধু পরিবারের কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা মামলার কারণে চূড়ান্ত নিয়োগ থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ নতুন নয়। সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগেও অনেক প্রার্থী এমন বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের জন্য এক যুগ আগের একটি রায় গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে। সে রায়ে হাইকোর্ট বলেছিলেন, প্রার্থীকে বিচার করতে হবে তার নিজের যোগ্যতা, চরিত্র ও পূর্ববৃত্তান্ত দিয়ে, বাবা-মায়ের রাজনৈতিক পরিচয় বা তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা দিয়ে নয়।শাহনাজ খাতুন ও মো. রাজশ খান ৩২তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় অংশ নেন। শাহনাজ ছিলেন স্বাস্থ্য ক্যাডারের সহকারী সার্জন পদের প্রার্থী, রাজশ সড়ক ও জনপথ ক্যাডারের সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদের প্রার্থী। তাদের বাবা মো. হাসান আলী একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সম্মানী ভাতা পেতেন।দুজনই প্রাথমিক বাছাই, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষাও সম্পন্ন করেন। কিন্তু ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর সরকার ১ হাজার ৬১৯ জনের নিয়োগের যে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে, তাতে তাদের নাম বা রোল নম্বর ছিল না।পরে তারা জানতে পারেন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ২০১৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের একটি গোপনীয় প্রতিবেদন তাদের নিয়োগ আটকে দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তাদের বাবা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন। অথচ দুই প্রার্থীর নিজেদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো অভিযোগ ছিল না, কোনো মামলাও ছিল না।এরপর তারা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন (রিট পিটিশন নম্বর ৪৮২ ও ৪৮৩/২০১৪)।প্রার্থীদের আইনজীবী মোহাম্মদ জিশান হায়দার দুটি যুক্তি তুলে ধরেন। প্রথমত, নাম বাদ দেওয়ার আগে প্রার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়নি, বক্তব্য শোনার সুযোগও দেওয়া হয়নি, যা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন। দ্বিতীয়ত, বাবার কারণে সন্তানকে বঞ্চিত করা সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) ও ২৯(১) অনুচ্ছেদের (সরকারি চাকরিতে সুযোগের সমতা) পরিপন্থী। তার মতে, সরকার প্রার্থীর উপযুক্ততা যাচাই করতে পারে, তবে সেই যাচাইয়ের যৌক্তিক সম্পর্ক থাকতে হবে প্রার্থীর নিজের যোগ্যতা, চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে।সরকারপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমাতুল করিম ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নুসরাত জাহান বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮১-এর ওপর নির্ভর করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, সরাসরি নিয়োগের আগে প্রার্থীর পূর্ববৃত্তান্ত যাচাই বাধ্যতামূলক এবং এনএসআইয়ের প্রতিবেদন নেতিবাচক হওয়ায় নিয়োগ দেওয়া যায়নি। তারা আরও বলেন, সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশ পেলেই নিয়োগ পাওয়ার নিরঙ্কুশ অধিকার তৈরি হয় না।বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দ ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৪ সালের ৪ জুন রায় দেন। আদালত প্রথমেই দেখেন, প্রার্থীদের পরীক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। বাবার বিষয়ে প্রতিবেদনের কথা সরকার জবাবি হলফনামায় কাগজপত্র দিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে অস্বীকারও করেনি। ২০১৪ সালের ১৩ জানুয়ারির একটি অফিস আদেশে এনএসআই ১৮ জন প্রার্থীর বিষয়ে "পুনঃ আপত্তি" জানিয়েছিল, কিন্তু এই দুজনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ কী, তা সেখানে বলা হয়নি।এরপর আদালত বিধিমালার ৩(৩)(খ) বিধির ভাষা বিশ্লেষণ করেন। বিধিটি বলছে, নির্বাচিত ব্যক্তির পূর্ববৃত্তান্ত উপযুক্ত সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করে তাকে প্রজাতন্ত্রের চাকরির অনুপযুক্ত মনে না হলে তবেই নিয়োগ দেওয়া যাবে। আদালতের ব্যাখ্যায়, যাচাইয়ের বিষয় হলেন প্রার্থী নিজে, তার পরিবারের অন্য কেউ নন।সরকার এমন কোনো তথ্য দেখাতে পারেনি যে প্রার্থীরা নিজেরা রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজে জড়িত। তাই আদালত বলে, বাবা রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত বা তার বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন, শুধু এই কারণে সন্তানদের নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা যায় না। বাবার রাজনৈতিক পরিচয় বা মামলা সন্তানের পূর্ববৃত্তান্ত হয়ে যায় না।আদালত গাজী জসিমউদ্দিন বনাম বাংলাদেশ (৫০ ডিএলআর ৩১) মামলার নীতি অনুসরণ করেন। সে মামলায় বলা হয়েছিল, সংবিধানের ২৭ ও ২৯ অনুচ্ছেদ সরকারকে যুক্তিসংগত নিয়োগবিধি, পরীক্ষা বা যোগ্যতা নির্ধারণে বাধা দেয় না। তবে সেই শর্ত হতে হবে যুক্তিসংগত, স্বেচ্ছাচারমুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট পদের উপযুক্ততার সঙ্গে যৌক্তিকভাবে সম্পর্কিত। কেবল রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে কাউকে আলাদা করে বাদ দিলে এবং একই নীতি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না করলে বৈষম্যের প্রশ্ন ওঠে।একই সূত্রে বাংলাদেশ বনাম মো. মতিয়ার রহমান (১৯৮২ বিএলডি (এডি) ১০৯) মামলার নীতিও উল্লেখ করা হয়। সরকারি কর্ম কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তাই তার সুচিন্তিত মতামত সরকারকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।অর্থাৎ প্রার্থীর পরিচ্ছন্ন অতীত, দেশের প্রতি আনুগত্য, ব্যক্তিগত সততা ও শৃঙ্খলা যাচাই করা বৈধ। কিন্তু যাচাইয়ের নামে নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন বা স্বেচ্ছাচারী বৈষম্য বৈধ নয়।হাইকোর্ট দুটি রুলই চূড়ান্ত (অ্যাবসলিউট) ঘোষণা করেন। ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে দুই আবেদনকারীর নাম অন্তর্ভুক্ত না করাকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনত অকার্যকর ঘোষণা করা হয়। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে শাহনাজ খাতুনকে সহকারী সার্জন এবং মো. রাজশ খানকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে নিয়োগ দিতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। রায়টি ৩ সিএলআর (এইচসিডি) ২০১৫-তে প্রকাশিত।এই রায় বিসিএস নিয়োগ বিধিমালার প্রেক্ষাপটে দেওয়া। তবে এর ভিত্তি সংবিধানের ২৭ ও ২৯ অনুচ্ছেদ, যা প্রজাতন্ত্রের সব চাকরির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সহকারী শিক্ষকের পদও তার বাইরে নয়। তাই যারা সব ধাপে উত্তীর্ণ হয়েও শুধু বাবা-মা বা স্বজনের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মামলার কারণে বাদ পড়েছেন, তাদের সামনে আইনি পথ খোলা আছে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

ভিডিও আরও দেখুন

১৬ গোল খেয়েও ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি বাংলাদেশের

এশিয়ান গেমসের নারী ফুটবল ইভেন্টে উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে ১৬ গোল হজমের বড় ধাক্কা সত্ত্বেও ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে এক ধাপ উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের। ১০৭তম স্থান থেকে এক ধাপ এগিয়ে ১০৬ নম্বরে উঠে এসেছেন ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমারা।বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার প্রকাশিত সর্বশেষ নারী ফুটবল র‍্যাঙ্কিংয়ে দেখা যায়, পয়েন্ট রেটিংয়ে বাংলাদেশের বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। উত্তর কোরিয়া (১০-০) ও দক্ষিণ কোরিয়ার (৬-০) সঙ্গে বাংলাদেশের র‍্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধান প্রায় ১০০ ধাপের কাছাকাছি হওয়ায় এই দুটি বড় হারের পরও বাংলাদেশের পয়েন্ট কমেছে যথাক্রমে মাত্র ০.০৬ ও ০.২৮।বাংলাদেশের এই উন্নতির মূল অনুঘটক ছিল গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে শক্তিশালী মিয়ানমারের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র। বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৫০ ধাপ এগিয়ে থাকা মিয়ানমারকে রুখে দেওয়ার সুবাদে ঝুলিতে যোগ হয় গুরুত্বপূর্ণ ৪.৬৪ পয়েন্ট। ফলে সাবিনাদের মোট পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৭৫.৩৫। উল্টো বাংলাদেশের সঙ্গে ড্র করায় ৫.৫৪ পয়েন্ট হারিয়ে এক ধাপ পিছিয়ে ৫৬তম স্থানে নেমে গেছে মিয়ানমার।এদিকে ফিফা নারী র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন (২১২১.৫০ পয়েন্ট)। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দ্বিতীয়, আর জার্মানি ও ইংল্যান্ড রয়েছে যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে। এ ছাড়া দুই ধাপ এগিয়ে দশম স্থানে উঠে এসেছে ডেনমার্ক।এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা জাপান (৫ম) ঘরের মাঠে আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসের ফাইনালে উত্তর কোরিয়াকে টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলে হারিয়ে স্বর্ণপদক নিশ্চিত করেছে।/ 

১৬ গোল খেয়েও ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি বাংলাদেশের