সংবাদ
মাছের খামারে বিষের থাবা: নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মিঠা পানির মাছ

মাছের খামারে বিষের থাবা: নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মিঠা পানির মাছ

মাছ চাষে অযৌক্তিক অ্যাণ্টিবায়োটিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সংক্রমণের হার শিং ও মাগুরে শতকরা ৬১%, গুলশা ও পাবদায় ৪২%, তেলাপিয়ায় ৩৮%, পাঙ্গাসে ৩৬%, কার্পে ১৮% সব মাছ রোগমুক্ত রাখতে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের উদ্যোগনদীর দেশ, রূপালী ইলিশ আর মিঠা পানির মাছের স্বর্গভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ শব্দবন্ধটি শুধু একটি প্রবাদ নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ, গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন। কিন্তু সেই স্বপ্নের মিঠা পানির মাছ চাষে এখন যেন এক নীরব মড়কের অন্ধকার ছায়া।একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা, অন্যদিকে রোগবালাইয়ের হাত থেকে মাছ বাঁচাতে খামারিদের অজ্ঞতা আর অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার—সব মিলিয়ে আমাদের রূপালী ফসল এখন এক বড় সংকটের মুখে। তবে এই অন্ধকারের মাঝে এক টুকরো আশার আলো নিয়ে হাজির হয়েছেন দেশের বিজ্ঞানীরা। মিঠা পানির মাছের মড়ক ঠেকাতে এবার দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে মাছের বিশেষ ভ্যাকসিন।অ্যান্টিবায়োটিকের মরণকামড়: থালায় রাখা মাছেই লুকিয়ে আছে মানব সভ্যতার বড় ঝুঁকিমাছ দ্রুত বড় করতে কিংবা সামান্য রোগবালাই থেকে বাঁচাতে অনেক অসাধু ও অসচেতন খামারি গবাদি পশুর জন্য ব্যবহৃত কড়া অ্যান্টিবায়োটিক মাছের খামারে প্রয়োগ করছেন। বিশেষজ্ঞ ছাড়াই, কোনো সঠিক রোগ নির্ণয় না করে এই ‘অ্যাকুয়া ড্রাগস’ ব্যবহারের ফলে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ ‘অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স’ বা এএমআর।এর সোজা অর্থ হলো, যে অ্যান্টিবায়োটিক মাছের শরীরে যাচ্ছে, সেই মাছ খাওয়ার মাধ্যমে তা চলে আসছে মানুষের শরীরে। ফলে একসময় সাধারণ অসুখেও মানুষের শরীরে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না। বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের এই ভয়াবহ সমস্যা যদি আমরা এখনই সমাধান করতে না পারি, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে প্রায় ১০ মিলিয়ন অর্থাৎ ১ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। আর এতে বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৬৬ ট্রিলিয়ন ডলার।পুকুরেই মরছে ৮০ থেকে ১০০% মাছ: লোকসানের আবর্তে নিঃস্ব খামারিএকটা সময় ছিল যখন পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, শিং, মাগুর বা কৈ মাছকে ভাবা হতো অত্যন্ত শক্তপোক্ত ও রোগপ্রতিরোধী। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম খেয়ালে আজ পরিস্থিতি বদলে গেছে। নতুন নতুন ভাইরাসের স্ট্রেইন ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে পুকুরে রোগ ছড়ানোর মাত্র ৫ থেকে ১২ দিনের মধ্যে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মাছ মারা যাচ্ছে।বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) তথ্য অনুযায়ী, মাছের রোগের কারণে আমাদের খামারিরা তাদের মোট আয়ের প্রায় ১৪ দশমিক ০৫ শতাংশ হারাচ্ছেন। খামারগুলোতে সংক্রমণের হার দেখলে শিউরে উঠতে হয়; শিং ও মাগুর মাছে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি—৬১ শতাংশ! এছাড়া গুলশা ও পাবদা ৪২ শতাংশ, তেলাপিয়া ৩৮ শতাংশ, পাঙ্গাস ৩৬ শতাংশ এবং কার্প জাতীয় মাছে ১৮ শতাংশ সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। এই বিশাল লোকসানের ধাক্কা সামলাতে না পেরে অনেক খামারি আজ নিঃস্ব হওয়ার পথে।ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প: ১৯৩০-এর ইতিহাস ও বাংলাদেশের নতুন স্বপ্নমাছের রোগ প্রতিরোধের ইতিহাস কিন্তু নতুন নয়। ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে বিশ্বে বাণিজ্যিক ভ্যাকসিনের ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৩০ সালে স্যামন মাছের হ্যাচারিতে এবং ১৯৩৮ সালে কার্প মাছে প্রথম ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে এবার বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) শুরু করেছে ‘মিঠা পানির মাছের মড়ক প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন’ প্রকল্প। সম্প্রতি এই প্রকল্পের ইনসেপশন ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য হলো, দেশীয় বাণিজ্যিক মাছ যেমন—পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, গুলশা, টেংরা, পাবদা, শিং ও মাগুর মাছের মড়কের কারণ সুনির্দিষ্টভাবে ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ ও মলিকুলার পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা। এরপর সেই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর দেশীয় ভ্যাকসিন বা টিকা তৈরি করা। এই প্রযুক্তি সফল হলে মাছের অকাল মৃত্যু যেমন ঠেকানো যাবে, তেমনি মাছ হবে সম্পূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত ও নিরাপদ।পানিই আসল নিয়ামক: সমন্বিত লড়াইয়ের ডাক নীতি নির্ধারকদেরমৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই বিশেষ কর্মশালায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, “দেশে মৎস্য খাতে বিপুল সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে। এই খাতের উন্নয়নে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। গবেষণার মাধ্যমে অবদান রাখতে হবে। সরকার তাদের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হিসাবে সম্মানিত করবেন।”তিনি আরও যোগ করেন, “পানির গুণগত মান মাছ চাষের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। পানিকে মাছের উপযোগী করে তুলতে পারলে মাছের রোগবালাই অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এই লক্ষ্যে বিজ্ঞানী ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সমন্বিত ভাবে কাজ করতে হবে। দেশের প্রাকৃতিক মাছের অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারসহ বিভিন্ন পরিবেশগত কারণে প্রাকৃতিক জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে গবেষণা, সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।”একই অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, “মানুষের দৈনিক খাদ্য তালিকায় থাকা মিঠা পানির মাছকে রোগমুক্ত ও টেকসই ভাবে সংরক্ষণের লক্ষ্যে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও মড়ক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর গবেষণা পরিচালনার কোন বিকল্প নেই। আর মাছ চাষে অযৌক্তিক ও অনিয়ন্ত্রিত ভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।”নিরাপদ মাছের এক নতুন সকালের অপেক্ষায় বাংলাদেশ বিজ্ঞানীদের এই নতুন লড়াই কেবল মাছের উৎপাদন বাড়ানোর লড়াই নয়, এটি মূলত মানুষের জীবন বাঁচানোর লড়াই। ল্যাবরেটরির টেস্টটিউব থেকে যখন চূড়ান্ত ভ্যাকসিনটি মাঠপর্যায়ে খামারিদের হাতে পৌঁছাবে, সেদিন সত্যি সত্যি বদলে যাবে বাংলাদেশের মৎস্য খাতের চেহারা। সেদিন এদেশের প্রতিটি মানুষ কোনো রকম বিষের ভয় ছাড়াই তৃপ্তিসহকারে পাতে তুলে নিতে পারবে রূপালী মাছ, আর খামারিদের মুখে ফুটবে এক চিলতে বিজয়ের হাসি। সেই নিরাপদ, অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত সোনালী সকালের অপেক্ষায় এখন পুরো বাংলাদেশ।
১ ঘন্টা আগে

আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসায় উৎসবে মাতলো মোকামতলা

আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসায় উৎসবে মাতলো মোকামতলা

প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ, সম্পাদক গ্রেপ্তার

প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ, সম্পাদক গ্রেপ্তার

রংপুরে ৬ মাস ধরে প্রধান নির্বাহী নেই,  দাপ্তরিক কাজে স্থবিরতা

রংপুরে ৬ মাস ধরে প্রধান নির্বাহী নেই, দাপ্তরিক কাজে স্থবিরতা

অস্তিত্ব সংকটে দেশের প্রাণ-প্রকৃতি: পরিবেশ রক্ষায় আইন সংস্কারের দাবি

অস্তিত্ব সংকটে দেশের প্রাণ-প্রকৃতি: পরিবেশ রক্ষায় আইন সংস্কারের দাবি

টাঙ্গাইলে পানিতে ডুবে প্রাণ গেলো একই পরিবারের ২ শিশুর

টাঙ্গাইলে পানিতে ডুবে প্রাণ গেলো একই পরিবারের ২ শিশুর

দাম্পত্য কলহের জেরে প্রাণ গেল কিশোরের

দাম্পত্য কলহের জেরে প্রাণ গেল কিশোরের

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘে জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ চাইলেন শামা ওবায়েদ

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘে জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ চাইলেন শামা ওবায়েদ

জাতীয় মঞ্চে কলাপাড়ার অর্জুন, ধারাবাহিক সাফল্যে ভাই-বোন

জাতীয় মঞ্চে কলাপাড়ার অর্জুন, ধারাবাহিক সাফল্যে ভাই-বোন

তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ দ্রুত শুরু হবে: পানিসম্পদ মন্ত্রী

তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ দ্রুত শুরু হবে: পানিসম্পদ মন্ত্রী

প্রেসক্লাবে ফল উৎসব: নতুন প্রজন্মের কাছে দেশীয় ফল তুলে ধরার আহ্বান

প্রেসক্লাবে ফল উৎসব: নতুন প্রজন্মের কাছে দেশীয় ফল তুলে ধরার আহ্বান

বিশ্বকাপ সময়সূচি: দেখতে ক্লিক করুন

মতামতমতামত

লাল স্রোতের নীরব বীর

পৃথিবীতে অনেক ধরনের বীর আছেন। যুদ্ধক্ষেত্রের বীর, বন্যায় মানুষ বাঁচানো বীর, আগুনে ঝাঁপ দিয়ে জীবন রক্ষাকারী বীর, কিংবা সংকটের মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানো বীর। কিন্তু এক ধরনের বীর আছেন, যাদের আমরা খুব কমই চিনি। তারা কোনো পদক পান না, কোনো সংবর্ধনা চান না, কোনো মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দেন না। তারা নীরবে আসেন, নীরবে চলে যান।তিনি একটি হাসপাতালের কক্ষে নীরবে শুয়ে পড়েন। একটি সূচ তার বাহুতে প্রবেশ করে। আধা ঘণ্টা পর উঠে দাঁড়ান, একটু পানি পান করেন, তারপর নিজের কাজে ফিরে যান। তিনি জানেন না তার রক্ত কার শরীরে যাবে। যিনি সেই রক্ত পাবেন, তিনিও জানেন না তার জীবনরক্ষাকারী মানুষটির নাম। তবু এই অচেনা দুজন মানুষের মধ্যে তৈরি হয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্ক। তিনি একজন স্বেচ্ছারক্তদাতা। আজ ১৪ জুন, বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। পৃথিবীর কোটি কোটি স্বেচ্ছারক্তদাতার প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাতে প্রতি বছর এই দিনটি পালিত হয়। মানবতার এই নীরব সৈনিকদের সম্মান জানাতেই দিনটির আয়োজন। আজ তাই সেই মানুষগুলোর কথা বলার সময়, যাদের রক্তে বেঁচে থাকে অসংখ্য জীবন।রক্তদান পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্তৃত মানবিক আন্দোলনগুলোর একটি। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন। প্রতিটি ব্যাগ রক্তের পেছনে রয়েছে একটি সিদ্ধান্ত, একটি মানবিকতা, একটি জীবন বাঁচানোর অঙ্গীকার। রক্তদানের বিশেষত্ব এখানেই যে, এটি এমন একটি দান যার মাধ্যমে একজন মানুষ সরাসরি আরেকজন মানুষের জীবন বাঁচাতে পারেন। পৃথিবীতে অনেক কিছুর বিকল্প আছে। এক ওষুধের পরিবর্তে আরেক ওষুধ ব্যবহার করা যায়। এক প্রযুক্তির জায়গায় আরেক প্রযুক্তি আসে। কিন্তু রক্তের কোনো বিকল্প নেই। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান কৃত্রিম হৃদযন্ত্র তৈরি করেছে, জটিল অঙ্গ প্রতিস্থাপন করছে, মহাকাশে মানুষ পাঠিয়েছে; কিন্তু এখনো মানুষের রক্তের পূর্ণ বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।এক ব্যাগ রক্তের একমাত্র উৎস আরেকজন মানুষ। এই সত্যটিই রক্তদানকে পৃথিবীর সবচেয়ে অনন্য মানবিক কর্মকাণ্ডে পরিণত করেছে। উন্নত দেশগুলোতে প্রতি হাজারে বহু মানুষ নিয়মিত রক্তদান করেন। ফলে জরুরি মুহূর্তে রক্তের জন্য মানুষের পরিবারকে ছুটোছুটি করতে হয় না। বাংলাদেশে পরিস্থিতি এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আমাদের দেশে রক্তের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে এখনো একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।তবে আশার কথা হলো, স্বেচ্ছারক্তদানের সংস্কৃতি ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের নেপথ্যে কাজ করছেন অসংখ্য নীরব মানুষ।বাংলাদেশে স্বেচ্ছারক্তদান আন্দোলনের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবের। ১৯৭৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সন্ধানী’। এই সংগঠনটি বাংলাদেশে স্বেচ্ছারক্তদান আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা শুধু রক্ত সংগ্রহই করেনি, মানুষের মধ্যে মানবিক চেতনা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং স্বেচ্ছাসেবার সংস্কৃতিও গড়ে তুলেছে।পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে জন্ম নেয় ‘বাঁধন’। অরাজনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবকল্যাণমূলক এই সংগঠনটি আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান নেটওয়ার্ক। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন এবং অসংখ্য সংগঠন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।রক্তদান আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দেশের তরুণ সমাজ।বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার তরুণ আজ মানবতার এক নীরব বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।মধ্যরাতে অপরিচিত কারও জন্য রক্তের খোঁজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেদন ছড়িয়ে দেওয়া, হাসপাতালে ছুটে যাওয়া এসব কাজ তারা করেন নিঃস্বার্থভাবে। সংবাদপত্রে তাদের ছবি ছাপা হয় না, টেলিভিশনের পর্দায় তাদের দেখা যায় না, কিন্তু অসংখ্য পরিবার তাদের কাছে চিরঋণী হয়ে থাকে। এই তরুণদের হাত ধরেই বাংলাদেশের রক্তদান আন্দোলন এগিয়ে যাচ্ছে।একজন সুস্থ মানুষ বছরে কয়েকবার রক্ত দিতে পারেন। অর্থাৎ একটি ছোট সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি একাধিক মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। রক্তদাতা কোনো অর্থ নেন না। কোনো প্রতিদান চান না। অনেক সময় নিজের পরিচয় পর্যন্ত প্রকাশ করেন না।তবুও তারা আসেন।তারা জানেন, হাসপাতালের কোনো শয্যায় একজন মা অপেক্ষা করছেন, একজন শিশু অপেক্ষা করছে, একজন তরুণ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। সেই অপেক্ষার পাশে দাঁড়ানোর নামই রক্তদান।আমরা প্রায়ই সমাজের অনেক অবদানের কথা বলি, অনেক পেশা ও অনেক অর্জনকে সম্মান জানাই। কিন্তু যে মানুষগুলো বছরের পর বছর নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের রক্ত দিয়ে অন্যের জীবন বাঁচিয়ে চলেছেন, তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এখনো যথেষ্ট নয়।একজন নিয়মিত স্বেচ্ছারক্তদাতা শুধু রক্ত দেন না। তিনি অসংখ্য পরিবারের হাসি ফিরিয়ে দেন, অসংখ্য মায়ের সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখেন, অসংখ্য শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষা করেন। হয়তো তার দান করা রক্তের কারণে কোনো থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু আজ স্কুলে যেতে পারছে, কোনো ক্যান্সার রোগী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন, কোনো প্রসূতি মা নবজাতক সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারছেন।এই মানুষগুলো সত্যিকার অর্থেই সমাজের নীরব সম্পদ। তাদের প্রতি আমাদের শুধু ধন্যবাদ জানালেই চলবে না; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিরও। রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত রক্তদাতাদের জন্য সম্মাননাপত্র, ডিজিটাল সার্টিফিকেট, জাতীয় স্বীকৃতি এবং বিভিন্ন জনসেবামূলক ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। কারণ স্বীকৃতি শুধু পুরস্কার নয়, এটি অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করে। একজন মানুষ যখন দেখবেন যে সমাজ তার মানবিক অবদানকে মূল্যায়ন করছে, তখন আরও অনেকে রক্তদানে উৎসাহিত হবেন।আমাদের সন্তানদেরও জানতে হবে...সত্যিকারের নায়ক শুধু পর্দার মানুষ নন; সত্যিকারের নায়ক সেই মানুষটিও, যিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখে অন্যের শিরায় জীবন প্রবাহিত করেন।বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে তাই দেশের প্রতিটি স্বেচ্ছারক্তদাতাকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিক অভিনন্দন এবং স্যালুট। আপনারা আছেন বলেই অসংখ্য মানুষ নতুন করে বাঁচার সুযোগ পান। আপনারা আছেন বলেই মানবতার এই লাল স্রোত এখনো অবিরাম প্রবাহিত হচ্ছে। দুর্যোগের সময় মানবতার পরীক্ষাও শুরু হয়। বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, ভবনধস, নৌদুর্ঘটনা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর মুহূর্তের মধ্যে বিপুল পরিমাণ রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। তখন বোঝা যায়, রক্ত কোনো ওষুধ নয় যা কারখানায় তৈরি হবে। সংকটের সময় যে মানুষটি রাত দুটায় ফোন পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান, তিনিই হয়ে ওঠেন একজন অচেনা মানুষের শেষ আশ্রয়।রক্ত যাদের প্রাণের শ্বাস। রক্ত শুধু অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজন হয় না। প্রসূতি মায়েদের জীবন রক্ষায়, দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের চিকিৎসায়, ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসায়, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া, হিমোফিলিয়া এবং অন্যান্য রক্তরোগের ক্ষেত্রে রক্ত অপরিহার্য।বাংলাদেশে প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ এখনো মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ। একজন মায়ের জীবন বাঁচাতে সময়মতো কয়েক ব্যাগ নিরাপদ রক্তই কখনো কখনো সবচেয়ে বড় ওষুধ হয়ে ওঠে।নারীরাও হতে পারেন জীবনদাত্রী। রক্তদানের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো তুলনামূলকভাবে কম।এর অন্যতম কারণ নানা সামাজিক ভুল ধারণা। অথচ একজন সুস্থ নারী, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, নিরাপদে রক্তদান করতে পারেন।একজন মা যেমন একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনেন, তেমনি একজন নারী রক্তদাতা তার রক্তের মাধ্যমে আরেকটি জীবন বাঁচানোর অংশীদার হতে পারেন।রক্তদান আন্দোলনে নারীদের আরও বেশি অংশগ্রহণ সময়ের দাবি।থ্যালাসেমিয়া- যে যুদ্ধের শেষ নেই। সব রোগের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া সম্ভবত সবচেয়ে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর সংগ্রামের নাম। কারণ এই রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কোনো বিরতি নেই। বাংলাদেশে হাজার হাজার শিশু ও তরুণ থ্যালাসেমিয়া নিয়ে বেঁচে আছে। তাদের অনেকের জীবন নিয়মিত রক্তসঞ্চালনের ওপর নির্ভরশীল। থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তরোগ। এই রোগে শরীর পর্যাপ্ত সুস্থ হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। ফলে তীব্র রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর প্রতি মাসে এক থেকে তিন ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হতে পারে।একবার হিসাব করে দেখুন।একজন রোগী যদি প্রতি মাসে গড়ে দুই ব্যাগ রক্ত নেন, তাহলে বছরে তাঁর প্রয়োজন হয় চব্বিশ ব্যাগ রক্ত।চব্বিশ ব্যাগ রক্ত মানে চব্বিশটি মানবিক সিদ্ধান্ত।চব্বিশজন মানুষের ভালোবাসা।চব্বিশটি অচেনা হাত।এই রক্ত না পেলে শিশুটি স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে না। স্কুলে যেতে পারবে না। স্বপ্ন দেখতে পারবে না। অনেক সময় একটি শিশুর পুরো শৈশব দাঁড়িয়ে থাকে কিছু স্বেচ্ছারক্তদাতার ওপর। সংকট কিন্তু আরও গভীরে। সমস্যা শুধু রক্তের ঘাটতি নয়; নিরাপদ রক্তেরও ঘাটতি রয়েছে।অর্থের বিনিময়ে সংগৃহীত রক্তে বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।তাই নিরাপদ, পরীক্ষিত ও স্বেচ্ছায় দানকৃত রক্তের গুরুত্ব অপরিসীম।স্বেচ্ছারক্তদাতার রক্ত শুধু জীবন বাঁচায় না; নিরাপদ জীবনও নিশ্চিত করে।প্রতিরোধই হচ্ছে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।থ্যালাসেমিয়া মোকাবিলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো প্রতিরোধ।বিবাহপূর্ব থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।একটি সাধারণ পরীক্ষা ভবিষ্যতের অসংখ্য কষ্ট ও ভোগান্তি প্রতিরোধ করতে পারে।পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে এই বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।মানবতার ভাষা একটাই- রক্তের কোনো ধর্ম নেই, কোনো জাত নেই, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। একজন মুসলমানের রক্ত একজন হিন্দুর শরীরে প্রবাহিত হতে পারে। একজন বৌদ্ধের রক্ত একজন খ্রিস্টানের জীবন বাঁচাতে পারে। হাসপাতালের শয্যায় মানুষের পরিচয় একটাই তা হচ্ছে তিনি একজন মানুষ।আর রক্তদানের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই।রাষ্ট্রের দায়িত্ব, সমাজের কর্তব্য হচ্ছে রক্তদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার দায়িত্ব। রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, করপোরেট সংস্থা সবারই ভূমিকা রয়েছে।প্রতিটি উপজেলায় কার্যকর ব্লাড ব্যাংক, নিরাপদ রক্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, রক্তদান ক্লাব এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করতে হবে।একই সঙ্গে রক্তদান সম্পর্কে মানুষের অযৌক্তিক ভয়ও দূর করতে হবে।আমার একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন- হয়তো কোনো একদিন আমাদের নিজেদের পরিবারও রক্তের প্রয়োজনের মুখোমুখি হবে।হয়তো কোনো অপারেশন থিয়েটারের বাইরে দাঁড়িয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলব, “এক ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করা যাবে?”সেদিন আমরা চাইব, কোনো অচেনা মানুষ এগিয়ে আসুক।তাহলে আজ কেন আমরা সেই অচেনা মানুষটি হব না?আমার ও আমাদের আজকের আহ্বান বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে যারা ইতোমধ্যে রক্ত দিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। আপনারা হয়তো জানেন না, আপনাদের রক্ত কোথায় গেছে, কাকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু সেই মানুষটি জানেন। তার পরিবার জানে।তারা হয়তো আপনাদের নাম জানে না, কিন্তু আপনাদের জন্য দোয়া করে।কারণ রক্তের কোনো কারখানা নেই।পৃথিবীর সব হাসপাতাল, সব চিকিৎসক, সব আধুনিক প্রযুক্তি একসঙ্গে মিলেও এক ফোঁটা মানুষের রক্ত তৈরি করতে পারে না।সেই রক্ত আসে সেই মহান মানুষের কাছ থেকে, মহান হৃদয় থেকে, মানুষের ভালোবাসা থেকে। বাঁধনের স্লোগানটি তাই আজও সমান সত্য “একের রক্ত অন্যের জীবন, রক্তই হোক আত্মার বাঁধন।”সত্যি হলো ,রক্ত কেনা যায় না।চেয়ে পাওয়া যায় না।পাওয়া যায় শুধু মানুষের ভালোবাসায়।আসুন, এই ভালোবাসাটুকু আমরা দিই। কারণ জীবন বাঁচানোর এই লাল স্রোত প্রবাহিত থাকে কেবল মানুষের হৃদয় থেকে মানুষের হৃদয়ে।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, পানি ও জলবায়ু গবেষক।

বিরোধিতাহীন রাজনীতির বিপদ

বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকারি দল, আর বিরোধী বেঞ্চে বসা জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। সংসদের আচরণ অদ্ভুত, হামে শিশু মারা যাচ্ছে, ধর্ষণের পর হত্যা হচ্ছে, আমেরিকার সঙ্গে বিতর্কিত চুক্তি হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার লোক বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা চলছে— অথচ সংসদে এসব নিয়ে আলোচনা নেই, আলোচনার প্রস্তাবও নেই।  সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা মার্কিন চুক্তি নিয়ে কথা তুলতে চাইলে স্পিকার বলেন, নোটিশ দিতে। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়ে আলোচনা করতে চাইলে ৩৪১ বিধিতে নোটিশ দিতে হয় এবং সেই নোটিশে ন্যূনতম ৫ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন লাগে। নোটিশ দেবে কী করে, রুমিন ফারহানা ব্যতীত নোটিশের পাশে দাঁড়ানোর মতো আর একজনও নেই। পাশে নেই গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। কেন নেই ? কারণ অতি বিপ্লবীরা সরকারেরও অংশ। এটা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের পুরনো রোগ। দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়া মানেই বিরোধী দলকে অকার্যকর করে দেয়া। বিরোধী দল অকার্যকর মানেই সংসদ অকার্যকর। সংসদ অকার্যকর মানেই স্বৈরতন্ত্রের জন্ম। জামায়াত ও এনসিপির কর্মকাণ্ড দেখলে কি মনে হয়, সংবিধান সংস্কার কমিশন স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিজমকে ইউনূসের জাদুঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে ? ১৯৭৩ সন থেকে অদ্যাবধি একই মানসিকতায় সরকার ও সংসদ চলছে। আমেরিকার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে দেশে বিতর্ক আছে, চুক্তিতে আছে দেশের স্বার্থবিরোধী অনেক শর্ত। সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গোপন চুক্তি না হলে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তি সংসদে উপস্থাপন ও আলোচনা করার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু অতীতের কোনো সরকার এই শর্ত মানেনি, বর্তমান সরকারও মানছে না। রুমিন ফারহানা সংসদে কথা বলতে চাইলেন। স্পিকার নিয়মের কথা বলে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির কবর দিয়ে দিলেন, নোটিশের পক্ষে কোন সাংসদ দাঁড়ালেন না।  একই অবস্থা হাম রোগের ক্ষেত্রেও। শত শত শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, মারা যাচ্ছে ধর্ষণের তীব্রতায়। রামিসা, আয়েশা, দীপু চন্দ্র দাস— নামগুলো কাগজে আসে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসে, কিন্তু সংসদে আসে না। কারণ সমঝোতা, বিএনপি সরকারকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে বিব্রত করতে চায় না জামায়াত এবং এনসিপি, তারা নামকাওয়াস্তে বিরোধী দল। এই পরিবেশ বাংলাদেশে নতুন নয়; ১৯৭৩ সনের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩ আসন পায়। ফলে প্রথম জাতীয় সংসদে কোন বিরোধী দলীয় নেতাই ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে সামরিক বাহিনীর অনুপ্রবেশ ঘটে। ১৯৭৯ সনের সংসদেও বিএনপির ছিল দুই তৃতীয়াংশ আসন। সামরিক আইন জারী থাকা অবস্থায় সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি ছিল বিতর্কিত।’ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৌশল ছিল আওয়ামী লীগকে জব্দ করে দেশের রাজনীতির মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করা’- কথাটি কিন্তু আমার নয়, বিএনপির মওদুদ আহমদের। ১৯৮৬ সনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। পরের বছর সংসদ থেকে বিরোধী দলগুলোর সংসদ সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ করলে মাত্র ১৭ মাসের মাথায় সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৯৮৮ সনের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ অধিকাংশ দল অংশগ্রহণ না করায় সংসদের বিরোধী দলের নেতা হয়েছিলেন আ স ম আব্দুর রব। সেই বিরোধী দল তখন ‘গৃহপালিত’ বিশেষণ পেয়েছিল। এই সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর সাত মাস। ১৯৯১ সনে জেনারেল এরশাদের পতন পর্যন্ত সংসদে 'বিরোধী দলের' অস্তিত্বকে ‘গৃহপালিত বিরোধী দলের’ ইতিহাস বলা যায়। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কিন্তু সংসদে বিরোধী দলের কোন ভূমিকাই ছিল না, বিরোধী দল সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতো না, তাদের বেতন-ভাতাদির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে যতদিন যোগ দেওয়ার দরকার ছিল ততদিন যোগ দিয়েছে। এই অবস্থাকে স্বাগত জানিয়ে বিএনপির স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার বলেছিলেন, ‘বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সংসদে না থাকায় সংসদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চলছে’। বিরোধী দল না থাকলে সংসদ সুষ্ঠু চলে— এই ধারণাই স্বৈরতন্ত্র। ১৯৯৬ সনে দুইবার জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়, প্রথমবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে অস্বীকার করায় অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। ১০ জন স্বতন্ত্র সদস্যকে নিয়ে ফ্রিডম পার্টি থেকে বিজয়ী বঙ্গবন্ধুর খুনি লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশিদও সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। সংসদে বিরোধী দলীয় কোন নেতা ছিল না। সংসদের স্থায়ীত্ব ছিল মাত্র ১১ দিন। ২০১৪ সনের নির্বাচনে বিএনপি এবং জামায়াত অংশগ্রহণ না করায় জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সহযোগী হয়ে বিরোধী দলের বেঞ্চ দখল করে, সংসদে জাতীয় পার্টি একদিকে সরকারের মন্ত্রীসভায় ছিল, অন্যদিকে তারা বিরোধী দলের আসনেও বসেছিল। ২০১৮ সনের নির্বাচনে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্ট পায় মাত্র ৭ আসন। ২০২৪ সনের নির্বাচন বিএনপি ও জামায়াত বয়কট করে, মাত্র ১১টি আসন পাওয়া জাতীয় পার্টিকে ঘোষণা করা হয় বিরোধী দল। আজ আবার একই ছবি। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে বসে আছে। জামায়াত ও এনসিপি বিরোধী বেঞ্চে বসে সরকারি দলের মতো আচরণ করছে। বাস্তবে সংসদ হয়ে গেছে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের মঞ্চ। ইউনূসের সংস্কার কমিশন শত শত পাতা লিখে সংসদকে কার্যকর করার উপায় বাতলে দিয়েছে। তারা এখন ডিউটিবিহীন গাড়ি নেবেন না, নেবেন আরও বেশি সুবিধা স¤^লিত সরকারি গাড়ি। মার্কিন চুক্তি, হামে শিশু মৃত্যু, ধর্ষণ আর ভারতের পুশইন নিয়ে আলোচনা করলে, সরকার কোন ইস্যুতে বিব্রত হলে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন ত্বরান্বিত হয়ে যাবে। সংসদে প্রতি মিনিটে খরচ হচ্ছে দুই লাখ ৭২ হাজার টাকা। সংসদ পরিচালনায় জনগণের বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়া সত্বেও সংসদকে জবাবদিহিমূলক করার সদিচ্ছা কোন সরকার দেখায়নি, অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলকে বলা হয় বিকল্প বা ছায়া সরকার। বর্তমান সংসদে বিরোধী দলের ‘গৃহপালিত’ ভূমিকা অব্যাহত থাকলে বর্তমান সরকারেরও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ ও ফ্যাসিস্ট মনোভাব দৃশ্যমান হতে পারে। একপাক্ষিক সংসদ প্রতিটি সরকারের জন্য বিপজ্জনক। সরকারের ওপর বিরোধী দলের চাপ না থাকলে সরকারের স্বেচ্ছাচারের পথ অবারিত থাকে, শাসক হয়ে ওঠে ফ্যাসিস্ট। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

পলিটিক্যাল সিগন্যাল গেমে নতুন মাস্টারস্ট্রোক!

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনার ঝড় উঠেছে—তৃণমূলের অন্দরের অস্থিরতার মাঝেই সামনে আসছে বড় সমীকরণের ইঙ্গিত। মমতা ব্যানার্জী কি সত্যিই কংগ্রেসের পথে হাঁটছেন, নাকি এটি কেবল কৌশলগত চাপের রাজনীতি? দিল্লিতে সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। এর মাঝেই তৃণমূলের ভেতরের বিদ্রোহ, দলত্যাগ এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে করেছে আরও জটিল। তাহলে কি সবটাই বড় কোনো রাজনৈতিক চাল—নাকি সত্যিই বদলে যাচ্ছে বাংলার রাজনীতির সমীকরণ?এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়ে উঠছে—এটি নিছক কোনো ঘটনাপ্রবাহ নয়, বরং সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। বিদ্রোহ দমন, ক্ষমতার সমীকরণে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় স্তরে প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যেই কি এই পদক্ষেপ? এই প্রশ্নগুলিকেই ঘিরে এখন তীব্র হচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও জল্পনা।পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে দর্শনীয় ফলাফলের পর একের পর এক নির্বাচিত বিধায়ক ও সাংসদদের আচরণ এখন প্রশ্নের মুখে। যাঁরা একসময় দলের প্রতীক ও নেত্রীর মুখে ভর করে জয়লাভ করেছিলেন, তাঁরাই কি আজ সুবিধাবাদী রাজনীতির পথে হাঁটছেন? অভিযোগ উঠছে, ‘লোটাস স্পর্শের’ প্রলোভনে ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান বদলাচ্ছেন অনেকেই—ফলে যাদের কাঁধে ভর করে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেই নেত্রীকেই আজ বিপদের মুখে একা ফেলে দেওয়ার ছবি সামনে আসছে।এই সমস্ত জনপ্রতিনিধিরা যে শুধু দলের প্রতীকে জেতেননি, বরং নেত্রীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও জনসমর্থনের উপর দাঁড়িয়ে জয় পেয়েছেন—তা রাজনৈতিক মহলে স্বীকৃত। অথচ দলের দুর্দিনে, ক্ষমতার সমীকরণ বদলানোর আভাস পেতেই তাদের একাংশের আচরণে পরিবর্তন সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি করছে। এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কথায়, “এটা আদর্শের লড়াই নয়, এটা এখন সম্পূর্ণ ক্ষমতার অঙ্ক।”আরেকজন পর্যবেক্ষকের মতে, “নেত্রীর জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে জেতা, তারপর সুবিধামতো অবস্থান বদলানো—বাংলার রাজনীতিতে নতুন নয়, কিন্তু এবার তা অনেক বেশি স্পষ্ট।”এই পটভূমিতেই তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রায় তিন দশক পর মমতা ব্যানার্জীর কংগ্রেসে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে জল্পনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস–এর জন্মই হয়েছিল কংগ্রেসের বিকল্প শক্তি হিসেবে, ফলে সেই দলের নেত্রীরই আবার কংগ্রেসের ছত্রছায়ায় যাওয়ার সম্ভাবনা নিছক দলবদল নয়—বরং এক গভীর রাজনৈতিক সংকেত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।দিল্লিতে সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের পর যে বার্তা সামনে এসেছে—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব এবং অভিষেক ব্যানার্জী–কে সাধারণ সম্পাদক করার সম্ভাবনা—তা অনেকের মতে সরাসরি যোগদানের ইঙ্গিত নয়, বরং অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সাজানো একটি কৌশল। এই ধরনের বার্তা ইচ্ছাকৃতভাবেই বাইরে আসতে পারে, যাতে তৃণমূলের ভেতরে তৈরি হওয়া বিদ্রোহী মানসিকতায় ধাক্কা দেওয়া যায়।কারণ, যখন দলের একাংশ আলাদা ব্লক তৈরির কথা ভাবছে, তখন নেতৃত্ব যদি ইঙ্গিত দেয় যে জাতীয় স্তরে তাদের সামনে আরও বড় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম খোলা রয়েছে, তখন বিদ্রোহীদের হিসাব বদলে যায়। এতে তারা বুঝতে বাধ্য হয় যে নেতৃত্ব এখনও জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী, ফলে আলাদা হয়ে গেলে তাদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। অর্থাৎ, এই প্রস্তাবকে ব্যবহার করা হতে পারে একধরনের ‘মনস্তাত্ত্বিক চাপ’ হিসেবে, যাতে দলের ভিতরের ভাঙন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।একইসঙ্গে কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও এই প্রস্তাবের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী ঐক্যকে শক্তিশালী করতে গেলে মমতা ব্যানার্জীর মতো আঞ্চলিক শক্তিকে পাশে টানা গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাজ্য কংগ্রেসের ভেতরে দ্বিধা রয়েছে, যা প্রতিফলিত হয়েছে রাজ্য কংগ্রেস প্রধান শুভঙ্কর সরকার–এর মন্তব্যে—যেখানে আদর্শ ও বাস্তব রাজনীতির টানাপোড়েন স্পষ্ট।অন্যদিকে বিজেপি এই পরিস্থিতিকে বিরোধীদের অস্থিরতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ নিচ্ছে। বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার–এর কটাক্ষ সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক ন্যারেটিভের অংশ, যেখানে বিরোধীদের বিভক্ত ও অনিশ্চিত হিসেবে দেখানো হচ্ছে।সব মিলিয়ে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কংগ্রেসে ফেরার জল্পনা আপাতত বাস্তব পদক্ষেপের চেয়ে অনেক বেশি একটি কৌশলগত ‘সিগন্যাল গেম’। এই খেলায় তৃণমূল নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ সামলাতে চাইছে, কংগ্রেস জাতীয় স্তরে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে চাইছে, আর বিজেপি সেই বিভ্রান্তিকেই রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে ঘটনাটি যতটা না দলবদল, তার চেয়ে অনেক বেশি হিসেবি চাপের রাজনীতি—যেখানে প্রতিটি পক্ষ নিজেদের সুবিধামতো চাল চালছে।এই জল্পনার চূড়ান্ত পরিণতি যা-ই হোক না কেন, আপাতত এটিকে একটি ‘পলিটিক্যাল সিগন্যাল গেম’ হিসেবেই দেখা বেশি বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক কারবারিদের একাংশ l

বাজেট ও বাজার: জনগণের কাঁধে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা

বাজেটের আগে বাজার, বাজারের আগে আতঙ্ক। দিন যায় কথা থাকে গানের মতো প্রতিবছরই বাজেট আসে বাজেট যায়। প্রতিবছরই এপ্রিল-মে মাসে শুরু হয় বাজেটা প্রণয়নের তুমুল তোড়জোর। অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘাম ছুটে যায় বাজেট তৈরি করতে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কর্মকর্তাদের দ্বি-পক্ষীয়, ত্রি-পক্ষীয়, বহুপক্ষীয় সভা। সেখানে নানা ধরনের আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক আর দর কষাকষির পর পূর্বের বছরের তুলনায় শতকরা পাঁচ বা দশভাগ বরাদ্দ বাড়িয়ে যা তৈরি করা হয় তারই নাম বাজেট। প্রতিবছর জুন মাসের প্রথম বৃহস্পতিবারে বাংলাদেশের সংসদে বাজেট উপস্থাপনের একটা রীতি রয়েছে। তবে এর যে হেরফের হয় না এমন নয়। অর্থমন্ত্রী তার ব্রিফকেসে করে বাজেটের সকল কাগজপত্র নিয়ে সংসদে হাজির হন। সেই ব্রিফকেসে থাকে অনেক ডকুমেন্ট যাদেরকে বলা হয় বাজেট ডকুমেন্ট। সেই ডকুমেন্টটা চটের ব্যাগে করে আগেই সংসদ সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী যে বইটি রিডিং পড়েন তার নাম বাজেট বক্তৃতা। সে কয়েক ঘণ্টার ইতিহাস। বাজেট বক্তৃতা করতে করতে মন্ত্রীকে কয়েকবার পানি পান করতে হয়। সংসদসদস্যগণের অনেকই বক্তৃতা শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে হাই তুলতে থাকেন, যাদের বয়স একটু বেশি তারা ঘুমিয়ে পড়েন। তারপর মাসব্যাপী সেই বাজেটের ওপর সংসদে আলোচনা হয়, পাশ হয় বাজেট। বিরোধীদলের সদস্যরা বাজেটকে গণবিরোধী বলে তুলোধূনা করেন আর সরকারি দলের লোকজন বলেন ইতোপূর্বে এ ধরণের জনবান্ধব বাজেট জাতীয় সংসদে আর উপস্থাপিত হয়নি। মাঝেমধ্যে বাজেট রেখে অন্যবিষয় নিয়েও তুমুল বকাবকি হয়ে থাকে। টকশোওয়লাদের কাছে বাজেট এক আনন্দ উৎসব। টেলিভিশনে তাদের কদর বেড়ে যায়। তাদের আলোচনা-সমালোচনায় দর্শকদের কান ঝালাপালা হয়ে উঠে। দীর্ঘ ষোলো বছর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে কাজ করার সুবাধে এমনটিই দেখেছি। যা বলছিলাম, গানের সেই কথার মতোই বাজেটের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট থেকে যায় কিংবা আরও বাড়ে। সাধারণ মানুষের কাছে বাজেট কিছু দুর্বোধ্য সংখ্যা, কর বাড়ানোর এক মোক্ষম হাতিয়ার আর জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে যাবার আতঙ্ক। আর তাদের আশঙ্কা সত্য করে দিয়ে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায় আমাদের চোখের সামনেই। অধিকাংশ ক্ষেত্র এটি ঘটে বাজেট প্রণয়ের বেশ আগেই। ধান্দাবাজ ব্যবসায়ীরা তক্ষে তক্ষে থাকে যে কোনো অছিলায় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিতে। বাজেটের আগে একবার বাড়ায়, আর বাজেটের পরে আর একবার। অর্থাৎ বাজেটের অছিলায় আমাদের দেশে দুইদফা জিনিস-পত্রের দাম বাড়ানো হয়ে থাকে। বাজেটের আগে ব্যবসায়ী এবং মজুতদারা বাজারে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে। কৃত্রিমভাবে জিনিসপত্রের সরবারাহ বাজারে কমিয়ে ফেল। বাজারে জিনিসপত্রের স্বাভাবিক সরবরাহ না থাকলে খোলাবাজার নীতির নিয়ম অনুযায়ী জিনিসত্রের দাম বেড়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক এবং হচ্ছেও তাই। তারা গুজব ছড়ায় বিভিন্ন পণ্যের আমদানি শুল্ক বেড়ে যাবে, নতুন কর আরোপ করা হবে, আর আমদানি শুল্ক ও কর বেড়ে গেলে বেড়ে গেলে দাম বেড়ে যাবে। হয়তো দেখা গেল খুব কমসংখ্যক পণ্যের উপর বাজেটে আমদআনি শুল্ক বাড়ানো হয়েছ, কিন্তু দাম বেড়ে গেলো প্রায় সকল আমদানিকৃত পণ্যের। আমদানি শুল্ক তখন ও কিন্তু বাড়ানো হয়নি, শুধু বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছ। এর জন্য আপনি কাকে দায়ী করবেন। গ্রাম অঞ্চলে একটা কথা আছে- আঁধার ঘরে সাপ, পুরো ঘরে সাপ। ঘর অন্ধকার থাকলে ঘরের যেকোনো জায়গাই সাপ থাকার সম্ভাবানা থাকে। তাই বলে ঘরের সবজায়গায় সাপ থাকে না। সবজায়গায় না থাকলেও আপনি কিন্তু ঘরের মেঝের কোথাও পা ফেলতে সাহস করবেন না। বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নে প্রচণ্ড রকমের লুকোচুরি করা হয়। বাজেট প্রণয়ন কওে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। বাজেট প্রণয়নের একমাস আগ থেকই সেখানে সাংবাদিক, সাধারণ জনগণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। যে ফ্লোরে বাজেট তৈরি করা হয় সেই ফ্লোরের কলাপসিবল গেইটে তালা মেরে রাখা হতো। গেইটে সশস্ত্র প্রহরী। এক যুদ্ধংদেহী অবস্থা। সাংবাদিকগণ ঘুর ঘুর করছেন বাজেটের তথ্য সংগ্রহের জন্য। নানা কায়দায় তারা তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা চালিয়ে যান। অনির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তারা ‘নির্ভরযোগ্য’ তথ্যে পত্রিকার পাতা ভরে ফেলেন। সেখানে সত্যের সঙ্গে আধা-সত্যেও কিংবা মিথ্যার একটা মিশেল থাকে। তাদের পত্রিকার শিরোনাম থেকে আপনার মনে হতেই পারে আসন্ন বাজেটে বাজারে আগুন লাগানোর সকল আয়োজন রাখা হয়েছে যে আগুনে আপনার সাজানো সংসার পুড়ে ছারখার হয়ে যেতে পারে। বাজেটের সঙ্গে অনেক পণ্যের হয়তো কোনো সরাসরি সমপৃক্তাই নেই, তবুও দাম বাড়ছে। আপনিও তেল, ডাল, গুড়া দুধের পিছনে ছুটে সেগুলোর দাম বাড়াতে যে একটা ভূমিকা রাখছেন সেটি হয়তো বুঝতে পারছেন না। বাজেট তৈরিতে এই গোপনীয়তা কেনো? তার কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে। এটি কি একটা ট্যাবু যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে? পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও কি বাজেট তৈরিতে এতো গোপনীয়তা পালন করা হয়? হয়তো হয়, হয়তো না। গোপনীয় জিনিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ চিরন্তন। যেকোনো গোপনীয় জিনিস নিয়ে মানুষ কল্পনার জাল বুনে, নানা রকমের অনুমান আন্দাজ তৈরি করে। সেই অনুমান, আন্দাজ সেই রহস্যময়তা ফ্যাক্ট বা সত্য তথ্য বিকৃতি ঘটায়। বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেট প্রণয়নে গোপনীয়তার যে রীতি প্রচলিত আছে তার যুক্তিসংগতভাবে গোপনীয়তার খোলস থেকে বের করে আনা যায় কিনা তা অর্থ মন্ত্রণালয় ভেবে দেখতে পারে। এবার আসুন বাজেট তৈরির পরের কাহিনীতে। বাজেট তো পাস হলো। কিছু কিছু পণ্যেও উপর সত্যি সত্যিই আমদানি শুল্ক বাড়ানে হলো, কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয় তো নতুন ট্যাক্স আরোপ করা হলো কিংবা বাড়ানো হলো। এবার শুরু হলো পণ্যের দাম বাড়ানোর নতুন ঢেউ। ব্যবসায়ীদের দাবি তাদের এখন আর করার কিছু নেই। সরকার শুল্ক বাড়িয়ে দিয়েছে, ট্যাক্স বাড়িয়ে দিয়েছ তাদের করার কী আছে?সত্যিই তাদের করার কিছু নেই? সরকার হয়তো শুল্ক বাড়িয়েছ শতকরা একভাগ, তারা সেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিল শতকরা দশভাগ। সরকার হয়তো দশটা পণ্যের ওপর ট্যাক্স বাড়িয়েছে তারা বাড়িয়ে দিলেন একশ একটা পণ্যের দাম। আপনি বাজারে গিয়েছেন মাছ কিনবেন, তিতাস নদীর সেই মাছে যেটি আপনি দুই দিন আগে কিনেছেন তিনশ টাকা কেজি দরে আজেকে আপনাকে কিনতে হচ্ছে চারশ টাকা কেজি। মাছ তো আর আমদানি হয়ে আসেনি তবু তার দাম বেড়েছ। দোকানিকে জিজ্ঞেস করলে তার নিরীহ জবাব- বাজেটে দাম বেড়েছে। একই ক্রিছা মুরগিওয়ালার ক্ষেত্রেও। দেশি মুরগি খাওয়া আপনি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছন ট্যাকের জোর নেই বলে এবার ব্রয়লারটাও ছাড়তে হবে। ছাড়তে ছাড়তে একসময় দেখা যাবে আপনাকে সবকিছুই ছাড়তে হচ্ছে। ছাড় দেয়ার আর কিছুই নেই। তখন আর কী করবেন! কী আর করবেন- যা করার বাজেটই করবে। মাছের দাম কিংবা মুরগির দাম বেড়ে গিয়েছে কেনো এমন প্রশ্নের জবাবে দোকানি আপনাকে যে জবাব দেবে তা শুনে হয় তো আপনি লা-জবাব। নন্দঘোষের মত সব দোষ বাজেটের। আপনি একজন সীমিত আয়ের মানুষ, ছোটো একটা চাকরি করেন, আপনার উপরি আয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই কিংবা আপনি একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারি প্রতিবছরের বাজেট আপনার জীবনীশক্তিকে খেয়ে দিচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়াকে আপনি লাগাম পড়াতে না পেরে আপনার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন, প্রোটিন আর পুষ্টিকর খাদ্য বাদ দিয়ে আপনি ঝুঁকছেন গাদা গাদা কার্বহাইড্রেটের দিকে। অকালেই আপনি বুড়িয়ে যাচ্ছেন কিংবা রোগো শোকো পতিত হচ্ছেন। কিন্তু এর জন্য দায়ী কারা? শুধু ব্যবসায়ীরা?ব্যবসায়ীরাতো বটেই। তবে পুরোপুরি নয়। এদেশে ব্যবসার সঙ্গে নীতি-নৈতিকতার মেলবন্দন তেমন ঘটেনি। আগেও ছিলো না। বাইন্যা (স্বর্ণকার) নিজ মায়ের স্বর্ণ চুরি করত এধরণের কাহিনী, প্রবাদ আমাদের পুরনো সাহিত্যে আছে। সুতারাং তাদের কাছ থেকে আপনি সহজে নিস্তার পেয়ে যাবেন এমনটা আশা করা বাতুলতা মাত্র। এক্ষেত্রে সরকারের একটা ভূমিকা আছে। বাজার নজরদারী করে সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু বাজার নজরদারীতে সরকার কতটুকু দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছে, সরকারের সক্ষমতা কতটুকু? সিন্ডকেটের বিরুদ্ধে সরকার সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। মাঝে মধ্যেই মনে হয় সরকার দেশ চালায় না, দেশ চালায় বিভিন্ন সিন্ডিকেট। যিনি রানীতি করেন তিনিই আবার ব্যবসায়ী, তিনিই আবার ঠিকাদার। এ অবস্থায় কে কারে সামলাবে? এ যেনো সার্টের চেয়ে গেঞ্জি বড় অর্থাৎ সরকারের চেয়ে সিন্ডিকেট বড়। রাশান একটা জোক মনে পড়ে গেলো। সেকালে রাশান শাশুড়িদের খুব বদনাম ছিল। তাদের দাপটে বেচারি স্বামী সবসময় কেঁচু হয়ে থাকত। শুধু জামাই-ই (নিজের ও মেয়ের) না, জামাইকুলের চৌদ্দগুষ্টি ভয়ে ইচামাছ হয়ে থাকত। এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলছে- ধর, তোর শ্বাশুড়ি এক গহীন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। এমনসময় একটা বাঘ হালুম করে তার সামনে এসে পড়লো। বলো তো বাঘটি তোর শ্বাশুড়িকে কী করবে?দ্বিতীয় বন্ধুর উত্তর- বাঘে আমার শ্বাশুড়িকে কী করবে? যা কিছু করার আমার শ্বাশুড়িই তো বাঘকে করবে। বেচারি বাঘ। দ্রব্যমূল্য বাড়বে, আপনার আমার কী করার আছে। সেই রাশান শ্বাশুড়ির মতো বাজেটই কিংবা ব্যবসায়ীরাই কি যা কিছু করার করবে?[লেখক: সাবেক অতিরিক্ত সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়]

আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকার

‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’— এই স্লোগান দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী সব মানুষের স্বার্থকে সামনে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। দেশের স্বার্থই সর্বাগ্রে অগ্রগণ্য। জাতীয় নির্বাচনকালে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি)-এর এই স্লোগান বিজয়ের নীরব হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল। আদিবাসীসহ সর্বস্তরের মানুষ এ স্লোগানে উজ্জীবিত হয়েছিল। বৃহত্তর রাজনৈতিক দলটির নির্বাচনী ইশতেহারও তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিএনপি তাদের ইশতেহারে উল্লেখ করেছে, ‘এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই আমাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা— এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।’ জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে অন্যান্য নাগরিকদের মতো প্রান্তিক আদিবাসীরাও আশ্বস্ত হয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন, ভোট দিয়েছেন এবং ভোটের প্রতিফলনস্বরূপ বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে নানা অজুহাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, হামলা এবং উচ্ছেদের মতো পরিস্থিতির শিকার হয়ে আসছে। সহজ-সরল এই জনগোষ্ঠী দিন দিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে এবং বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। বারবার বসতভিটা থেকে উচ্ছেদের ফলে ভাসমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান হারে গ্রাম থেকে শহরমুখী হওয়ার কারণে নিজেদের শেকড়, পরিচয় এবং ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে হস্তান্তরিত হচ্ছে না। ফলে ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ধীরে ধীরে তার স্বাতন্ত্র্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে। স্থানীয় পর্যায়ে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য বিষয়গুলোতেও অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসীদের প্রতি ন্যায়সংগত আচরণের পরিবর্তে পক্ষপাতমূলক মনোভাব দেখা যায়। এর ফলে তারা উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিজেদের অবদান সীমিত করে ফেলতে বাধ্য হয়। দুর্বল, প্রান্তিক, অন্ত্যজ ও সংখ্যালঘু আদিবাসীদের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা, ন্যায্যতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ব্যাহত হলে বাংলাদেশ কখনোই প্রকৃত অর্থে ‘সবার বাংলাদেশ’ হয়ে উঠবে না। আদিবাসী নারীরা মাঠে-ময়দানে পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করে থাকেন। নারী-পুরুষের এই অংশীদারিত্ব আদিবাসী সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, নির্যাতন, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আদিবাসী নারীরা রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। একসময় তারা মূলত সমাজের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ থাকতেন। কয়েক দশক আগেও অধিকাংশ নারী ঘরকন্নার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে নিজেদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার প্রয়োজনে তারা প্রকাশ্যে প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছেন। এটি আদিবাসী সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, কোনো জনগোষ্ঠীর নারীরা যখন ধারাবাহিকভাবে লাঞ্ছনা, শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ ও অপমানের শিকার হন, তখন তা সেই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের জন্য অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়ায়। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আদিবাসীদের ওপর যে মাত্রায় সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে, তা কোনো সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয়। বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির বিষয়ে আদিবাসীদের মধ্যে কিছুটা সংশয় রয়েছে। এখন প্রয়োজন কথার সঙ্গে কাজের মিল। কারণ, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’— এই স্লোগানটি তাদেরও আশা ও প্রত্যাশার প্রতীক। বাংলাদেশে প্রায় শতাধিক জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। কারও মাতৃভাষা এখনও জীবিত রয়েছে, আবার কারও ভাষা বিলুপ্তির পথে। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বাংলা ভাষাসহ প্রায় ৪১টি মাতৃভাষায় দেশের মানুষ যোগাযোগ করে থাকে। যেসব মাতৃভাষা বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কোল, কোডা, কড়া, ভুনজার, মুসহর, কোচ, রেমিংটচা, লালেং, শৌরা, কন্দ ও খাড়িয়াসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা উল্লেখযোগ্য। এসব জনগোষ্ঠী স্মরণাতীতকাল থেকে বাংলার ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছে। দেশের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধ করতে আদিবাসীদের প্রতি সরকারের বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন। সংখ্যালঘু আদিবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব দায়সারাভাবে পালন করা চলবে না। কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নাগরিক অধিকার ও সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারের আলোকে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য সরকারকে আরও যত্নশীল হতে হবে। বাংলাদেশ ও আদিবাসীদের সম্পর্ক মূলত এ দেশের বৈচিত্র্য ও বহুমাত্রিক সৌন্দর্যের প্রতীক। সমতল ও পাহাড়ে বসবাসকারী আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনধারার মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন। তারা বাংলাদেশের কোনো বিচ্ছিন্ন অংশ নন; বরং এ দেশের অমূল্য সম্পদ। মা, মাটি ও মাতৃভূমির জন্য আদিবাসীদের অবদান অবিস্মরণীয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কিংবা মহান মুক্তিযুদ্ধ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একটি অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার, ভূমির অধিকার এবং বিপন্ন মাতৃভাষাগুলো সংরক্ষণ করা রাষ্ট্র ও নাগরিক— উভয়েরই অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। [লেখক: কলামিস্ট]

প্রবীণদের নিঃসঙ্গ মৃত্যু: সমাজের আয়নায় দেখা বাস্তবতা

একটি নগর ফ্ল্যাটে কয়েক দিন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। প্রতিবেশীদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে যে দৃশ্য দেখল, তা কেবল একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য লজ্জার। ৭৫ বছর বয়সী এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ পড়ে আছে ঘরের এক কোণে—নিঃসঙ্গ, পরিত্যক্ত ও অনাদরে। একই ছাদের নিচে থেকেও তার মৃত্যু এক-দুই দিন কারও নজরে পড়েনি। এই একটি ঘটনাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে—আমরা আসলে কেমন সমাজে বাস করছি?একটি সমাজ কতটা মানবিক, ন্যায়পরায়ণ ও সভ্য সেটা কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো বা উন্নয়নের সূচক দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং সেই সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল ও নির্ভরশীল মানুষদের—বিশেষত প্রবীণ ও শিশুদের—কতটা নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা দিতে পারে, সেটিই তার প্রকৃত মানবিকতার মাপকাঠি। এই পরীক্ষায় আমরা কতটা উত্তীর্ণ হচ্ছি, তা নিয়ে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বাংলাদেশ দ্রুত বার্ধক্যমুখী সমাজে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘের জনসংখ্যা পূর্বাভাস অনুযায়ী দেশে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-দশমাংশ প্রবীণ, এবং আগামী দুই দশকে এই হার আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রবীণদের সুরক্ষা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের প্রশ্নটি আর কেবল পারিবারিক বিষয় নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জননীতি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ একসময় পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। যৌথতা, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ছিল এর প্রধান শক্তি। যৌথ পরিবার কেবল সহাবস্থানের একটি কাঠামো ছিল না; এটি ছিল অনুভূতি, দায়িত্ব ও আন্তঃপ্রজন্মীয় সম্পর্কের এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। প্রবীণরা ছিলেন সেই কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা শুধু পরিবারের সদস্য ছিলেন না; ছিলেন অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার, মূল্যবোধের ধারক এবং পরিবারের আবেগিক কেন্দ্রবিন্দু। তাদের উপস্থিতি পরিবারকে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি ধারাবাহিক সংযোগ প্রদান করতো। কিন্তু সময় বদলেছে। দ্রুত নগরায়ন, জীবিকার প্রয়োজনে স্থানান্তর, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্েযর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব সেই পারিবারিক কাঠামোকে গভীরভাবে পরিবর্তন করেছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপান্তরিত হয়েছে; কমেছে পারস্পরিক নির্ভরতা ও দায়বোধ। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে প্রবীণদের। যারা একসময় পরিবারের কেন্দ্র ছিলেন, তারা আজ অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তিক, উপেক্ষিত, এমনকি অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই রূপান্তরের একটি নির্মম প্রতীক। আরও বেদনাদায়ক হলো, ওই নারীর সন্তানরা সমাজের তথাকথিত সফল মানুষ— কেউ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তবুও জীবনের শেষ সময় তাকে এমন নিঃসঙ্গ ও অবহেলিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এটি কেবল একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের সময়ের নৈতিক সংকটের প্রতিফলন। এই ঘটনা একটি প্রচলিত ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা প্রায়ই মনে করি, সন্তানদের উচ্চশিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা বার্ধক্যে পিতা-মাতার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। বাস্তবতা বলছে, তা সবসময় সত্য নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে দক্ষ করে, প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে এবং পেশাগত সাফল্য এনে দিতে পারে; কিন্তু সেই শিক্ষা যদি সহমর্মিতা, নৈতিকতা ও মানবিক দায়বোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবে তা অসম্পূর্ণ মানুষ তৈরি করে। তখন আমরা সফল হই, কিন্তু সংবেদনশীল হই না; প্রতিষ্ঠিত হই, কিন্তু দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলি। এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো সামাজিক পুঁজির ক্ষয়। সমাজবিজ্ঞানীরা পারস্পরিক আস্থা, সম্পর্ক ও সহযোগিতার নেটওয়ার্ককে সামাজিক পুঁজি বলে অভিহিত করেন। শহুরে জীবনে এই সামাজিক পুঁজি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। পাশের ফ্ল্যাটে কে আছে, কেমন আছে, কোনো সমস্যায় আছে কি না—এসব জানার প্রয়োজনীয়তাও আমরা অনেক সময় অনুভব করি না। ফলে একজন মানুষ দিনের পর দিন নিঃসঙ্গ থাকলেও তা অদৃশ্য থেকে যায়। এমনকি মৃত্যুর পর দুর্গন্ধ ছড়ানো পর্যন্ত সমাজ তা জানতে পারে না। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক অসুখের লক্ষণ। বাংলাদেশে প্রবীণদের সুরক্ষার জন্য ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ রয়েছে। আইনটি সন্তানদের ওপর পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা, যোগাযোগ এবং যত্নের দায়িত্ব আরোপ করেছে। কাগজে-কলমে এটি একটি প্রগতিশীল উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। প্রথমত, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগ ছাড়া আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয় না। দ্বিতীয়ত, সামাজিক বাস্তবতায় প্রবীণরা নিজের সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে অনিচ্ছুক। তৃতীয়ত, বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা অনেকের জন্য এই পথকে প্রায় অকার্যকর করে তোলে। চতুর্থত, অবহেলাজনিত মৃত্যুর মতো বিষয় প্রমাণ করাও সহজ নয়। ফলে বহু ঘটনা নীরবে চাপা পড়ে যায়। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—শুধু একটি ভালো আইন কি যথেষ্ট? অভিজ্ঞতা বলছে, নয়। আইন প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কার্যকর প্রয়োগ আরও গুরুত্বপূর্ণ। আইনের সঙ্গে যদি সহজ প্রতিকারব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা যুক্ত না হয়, তবে আইন অনেক সময় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। তাই সমস্যার সমাধান কেবল আইন কঠোর করা নয়; বরং আইনকে কার্যকর করার পাশাপাশি একটি সমšি^ত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তৃতীয় পক্ষের অভিযোগের সুযোগ সৃষ্টি, ঝুঁকিপূর্ণ প্রবীণদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা এবং জরুরি সহায়তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে প্রবীণদের জন্য আরও কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি নিশ্চিত করতে হবে। তবে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আইন বা প্রশাসনের নয়; এটি মূল্যবোধের প্রশ্ন। পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেই মানুষ হয়ে ওঠার বীজ রোপিত হয়। যদি একটি প্রজন্ম এই শিক্ষা না পায় যে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন কোনো দয়া নয়, কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং স্বাভাবিক মানবিক কর্তব্য—তবে আইনের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়। এ ধরনের ঘটনা আমাদের জন্য কেবল সংবাদ নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। আমরা যদি এখনই পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তিকে পুনর্গঠন করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা ও অবহেলা আরও গভীর সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে। প্রবীণদের প্রতি আমাদের আচরণই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম কী শিখবে। আজ আমরা যদি আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের একা ফেলে যাই, কাল সেই একাকীত্বই আমাদের প্রতীক্ষা করবে। তাই এই সংকট কেবল অন্য কারও নয়; এটি আমাদের সবার ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার যদি সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নেয়, আইনকে কার্যকর করে, সামাজিক সচেতনতা বাড়ায় এবং মানবিক মূল্যবোধকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে, তবে এই অমানবিকতা রোধ করা সম্ভব। অন্যথায় নিঃসঙ্গতা ও অবহেলায় ভরা বার্ধক্য আমাদের সময়ের এক নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হবে, যা কোনো উন্নয়নের সূচক দিয়ে আড়াল করা যাবে না। সময়ের আগে যদি আমরা সতর্ক না হই, তবে একদিন হয়তো আমাদের শহরগুলো নীরব, বন্ধ দরজা আর নিঃসঙ্গ মৃত্যুর খবরেই ভরে যাবে। উন্নয়নের আলো তখনও জ্বলবে, কিন্তু তার ছায়ায় লুকিয়ে থাকবে মানবিকতার গভীর অন্ধকার। [লেখক: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক ]

রাত্রির অদৃশ্য আদালত ও এক ক্লান্ত আত্মার জবানবন্দি

সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্য অনেক আশ্চর্য জিনিস সৃষ্টি করেছেন— আকাশ, সমুদ্র, প্রেম, স্মৃতি, বিস্মৃতি এবং অবশ্যই ঘুম। তবে মানুষের দুর্ভাগ্য হলো, সে যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মনে করে, সেটাই সবচেয়ে বেশি হারিয়ে ফেলে। যেমন সুখের দিনে ঘুম আসে, আর দুঃসময়ে আসে দর্শন। যে রাতে মানুষের গভীর নিদ্রায় থাকার কথা, সেই রাতেই হঠাৎ সে হয়ে ওঠে সক্রেটিস, নীৎশে কিংবা নাম না-জানা কোনো গৃহপালিত দার্শনিক। রাতেরও একটি আলাদা রাষ্ট্র আছে। দিনের পৃথিবীতে তার কোনো মন্ত্রণালয় নেই, কোনো সংসদ নেই, কোনো প্রশাসনিক কাঠামোও নেই। কিন্তু গভীর নিশীথে সে নিঃশব্দে ক্ষমতা গ্রহণ করে। তখন পৃথিবীর সকল কোলাহল পদত্যাগ করে, যুক্তি অবসরে যায়, আর মানুষের কল্পনা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বসে। সেই রাষ্ট্রে আইন খুবই অদ্ভুত। সেখানে একটি সন্দেহ হাজারটি সত্যের চেয়ে বেশি শক্তিশালী, একটি অপবাদ হাজারটি অর্জনের চেয়ে বেশি দীর্ঘজীবী, আর একটি ভুল বোঝাবুঝি কখনো কখনো পুরো জীবনকেই জিম্মি করে রাখতে পারে। আমি আজকাল প্রায়ই সেই রাষ্ট্রের একজন অনিচ্ছুক নাগরিক হয়ে যাই। চোখ বন্ধ করি ঘুমের আশায়, কিন্তু ঘুম যেন আধুনিক আমলার মতো—অত্যন্ত প্রয়োজনের সময় তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং চোখ বন্ধ করলেই খুলে যায় এক অদৃশ্য আদালত। সেখানে বিচার চলছে, অভিযোগপত্র পড়া হচ্ছে, সাক্ষী হাজির হচ্ছে, রায় লেখা হচ্ছে। শুধু মজার বিষয় হলো—আমি ছাড়া আর কেউ বাস্তবে উপস্থিত নেই। বিচারক আমার কল্পনা, উকিল আমার ভয়, সাক্ষী আমার স্মৃতি এবং অভিযুক্তও আমি নিজেই। এই আদালতে সত্যের অবস্থা অনেকটা সেই ভদ্র মানুষের মতো, যে সভায় উপস্থিত থাকলেও কথা বলার সুযোগ পায় না। অন্যদিকে মিথ্যা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। সে বুক ফুলিয়ে হাঁটে, গলা খাঁকারি দিয়ে বক্তব্য দেয় এবং এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে যেন মহাবিশ্বের যাবতীয় সত্যের একমাত্র লাইসেন্স তার কাছেই সংরক্ষিত। রাত্রির গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আদালতের কার্যক্রমও জমে ওঠে। মনে হয়, অসংখ্য অদৃশ্য মানুষ আমাকে অনুসরণ করছে। কেউ অভিযোগ করছে, কেউ ব্যাখ্যা চাইছে, কেউ আবার এমন সব অপরাধের দায় চাপাচ্ছে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমিই অবগত নই। আমি দৌড়াতে থাকি। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ বাস্তব শত্রুর চেয়ে কল্পিত শত্রুর কাছ থেকেই বেশি পালায়। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। বাইরে পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে, অথচ ভেতরে যেন মহাযুদ্ধ চলছে। জানালার ওপারে নীরবতা, কিন্তু মনের ভেতর অবিরাম শোরগোল। তখন উপলব্ধি হয়—মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ কখনো অন্য মানুষের সঙ্গে নয়; নিজের ভেতরের অদৃশ্য প্রতিপক্ষের সঙ্গেই। বর্তমান সময়ে এই অভিজ্ঞতা আরও তীব্র। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সত্য ধীরে হাঁটে আর গুজব আলোর গতিতে ছুটে চলে। সামাজিক যোগাযোগের বিস্তৃত জগতে একটি মিথ্যা মুহূর্তেই হাজার মানুষের দরজায় পৌঁছে যায়, অথচ সত্য তখনও জুতোর ফিতা বাঁধতে ব্যস্ত থাকে। ফলে অপবাদ এখন আর কেবল শব্দ নয়; এটি এক সামাজিক প্রযুক্তি, এক মানসিক অস্ত্র, যা মানুষের আত্মবিশ্বাসকে নিঃশব্দে ক্ষয় করে। কিন্তু দার্শনিক সত্যটি হলো—মানুষকে যতটা না অন্যেরা বিচার করে, তার চেয়ে অনেক বেশি বিচার করে সে নিজেই। অন্যের অভিযোগ কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে, কিন্তু নিজের মনে গড়ে ওঠা আদালত বছরের পর বছর চলতে পারে। সেই আদালতে আপিলের সুযোগ নেই, জামিনের ব্যবস্থাও নেই। এই অবস্থায় ঘুম আর কেবল শারীরিক প্রয়োজন থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক গভীর অস্তিত্ববাদী মুক্তি। তখন নিদ্রা মানে শরীরের বিশ্রাম নয়, বরং চিন্তার অবসান। এমন একটি আশ্রয়, যেখানে কোনো ব্যাখ্যা দিতে হয় না, কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হয় না, কোনো অভিযোগের জবাব লিখতে হয় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ একটি বিষয় বুঝতে শেখে—পৃথিবীর সব মানুষের কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কেউ আপনাকে ভুল বুঝবেই, কেউ আপনাকে অপছন্দ করবেই, কেউ আপনার নীরবতার মধ্যেও ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করবেই। এ যেন মানবসভ্যতার এক প্রাচীন বিনোদন। তাই হয়তো প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো প্রতিটি যুদ্ধে অংশ না নেয়া। প্রতিটি পাথরের জবাবে আরেকটি পাথর ছুড়ে না মারা। কারণ সব যুদ্ধ জয় করা যায় না, আবার সব যুদ্ধ জয় করাও প্রয়োজন হয় না। রাত যত গভীর হয়, এই উপলব্ধিও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনে হয়, শান্তি আসলে কোনো বাহ্যিক অর্জন নয়। শান্তি হলো নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেয়ার শিল্প, নিজের সত্যকে ধারণ করার সাহস এবং পৃথিবীর সমস্ত ভুল ব্যাখ্যার মধ্যেও নিজের ভেতরের আলোটুকু অক্ষুণ্নœ রাখার ক্ষমতা। ধীরে ধীরে রাত ফুরোয়। অদৃশ্য আদালতের বিচারক ক্লান্ত হন, অভিযোগকারীরা নীরব হয়ে যায়, ছায়াগুলোও সরে দাঁড়ায়। তখন মনে হয়, নিদ্রা আসলে ঘুমের অন্য নাম নয়; সে এক প্রকার ক্ষমা। নিজের প্রতি ক্ষমা, মানুষের প্রতি ক্ষমা, সময়ের প্রতি ক্ষমা। আর সেই ক্ষমার ভেতরেই মানুষ খুঁজে পায় তার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আশ্রয়। একটি এমন ঘুম, যেখানে কোনো অপবাদ নেই, কোনো তাড়া নেই, কোনো অদৃশ্য বিচারসভা নেই। আছে শুধু নীরবতা। আর সেই নীরবতার গভীরে, সমস্ত ক্লান্তি অতিক্রম করে, মানুষ আবার নতুন ভোরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা এখানেই—সব প্রশ্নের উত্তর জানা নয়, বরং কিছু প্রশ্নকে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে যেতে দেয়ার মধ্যে। [লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

যোগাযোগ অবকাঠামোর নতুন ভূ-রাজনীতি

সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে একটি চিরন্তন সত্য আছে: যে পথ নিয়ন্ত্রণ করে, সে-ই শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে। রোমান সাম্রাজ্য তার সড়কপথের মাধ্যমে ক্ষমতা বিস্তার করেছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সমুদ্রপথ ও সংকীর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। জিব্রাল্টার, সুয়েজ কিংবা সিঙ্গাপুর কেবল মানচিত্রের কিছু বিন্দু ছিল না; এগুলো ছিল বৈশ্বিক শক্তির নিয়ন্ত্রক। একবিংশ শতাব্দীতে সেই বাস্তবতা বদলেছে, কিন্তু মূল নীতিটি বদলায়নি। যুদ্ধজাহাজের জায়গা নিয়েছে সাবমেরিন কেবল, সামরিক ঘাঁটির জায়গা নিয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর, আর সাম্রাজ্যের নতুন সীমানা তৈরি হচ্ছে ডেটা করিডোর ও স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। আজকের পৃথিবীতে যোগাযোগ ও সংযোগ অবকাঠামো কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবকাঠামো নয়; এটি ক্রমশ এক শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। বিশেষত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এই বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্বের অধিকাংশ বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবাহ এই অঞ্চলের মধ্য দিয়েই চলাচল করে। ফলে এখানে প্রতিযোগিতা আর কেবল ভূখণ্ড নিয়ে নয়; বরং অবকাঠামো, তথ্যপ্রবাহ এবং সংযোগ ব্যবস্থার নেটওয়ার্ক নিয়ে। বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা বিমানবাহী রণতরীর কথা প্রায়ই আসে। কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবেন যে আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আসলে সমুদ্রের হাজার মিটার নিচে শুয়ে আছে। বর্তমানে পৃথিবীর আন্তর্জাতিক ডেটা আদান-প্রদানের প্রায় ৯৫ শতাংশই এই সাবমেরিন ক্যাবলগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রতিদিন ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক লেনদেন, কূটনৈতিক বার্তা, সামরিক যোগাযোগ এবং ইন্টারনেট সেবা এই ক্যাবলগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আমরা যখন মোবাইল ফোনে একটি বার্তা পাঠাই বা অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর করি, তখন সেই তথ্যের বড় অংশই সমুদ্রতলের এই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক দিয়ে ভ্রমণ করে। এই কারণেই সাবমেরিন ক্যাবলগুলো এখন কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর একাধিক ঘটনা এই ঝুঁকিকে সামনে এনেছে। গত ২০২২ সালে শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের কাছে ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে উত্তর ইউরোপে যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটে। ২০২৪ সালে লোহিত সাগরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে ইন্টারনেট প্রবাহে উল্লেখযোগ্য সমস্যা দেখা দেয়। এসব ঘটনা দেখিয়েছে যে আধুনিক বিশ্ব কতটা ভঙ্গুর এক অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে রাষ্ট্র এই সংযোগ এবং যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত থাকে, সে কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধাই পায় না; বরং কৌশলগত সুবিধাও অর্জন করে। চীন দীর্ঘদিন ধরে এই ক্ষেত্রটিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। রাষ্ট্র-সমর্থিত চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে বেইজিং শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করছে না; বরং ভবিষ্যতের তথ্যপ্রবাহের মানচিত্র গঠনেও ভূমিকা রাখছে। ইতিহাসের প্রতিটি যুগে বন্দর ছিল শক্তির প্রতীক। ভেনিসের উত্থান, ব্রিটেনের সামুদ্রিক আধিপত্য কিংবা আমেরিকার বৈশ্বিক বাণিজ্যিক প্রভাব—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল সমুদ্রপথ। আজও সেই বাস্তবতা অপরিবর্তিত। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে সাধারণত উন্নয়ন ও অবকাঠামো কর্মসূচি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এর ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর। হাম্বানটোটা, গোয়াদর, জিবুতি কিংবা পিরিয়াস—এসব বন্দর কেবল বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয়; এগুলো একটি বিস্তৃত কৌশলগত নেটওয়ার্কের অংশ। সমালোচকেরা একে কখনো কখনো ‘ঋণ কূটনীতি’ বলে অভিহিত করেন। যদিও বিষয়টি বাস্তবে আরও জটিল। অনেক উন্নয়নশীল দেশ উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন চেয়েছে, আর চীন সেই সুযোগে অবকাঠামো বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু এর ফলে যে নির্ভরশীলতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের ঘটনা এই বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ঋণ পরিশোধে সমস্যার কারণে দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে বন্দরের পরিচালনা চীনা প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠে—অবকাঠামো বিনিয়োগ কোথায় শেষ হয় এবং কৌশলগত প্রভাব কোথায় শুরু হয়?ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মালাক্কা প্রণালী এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের প্রায় ৪০% সামুদ্রিক বাণিজ্য এই সংকীর্ণ জলপথ অতিক্রম করে। চীনের জ্বালানি নিরাপত্তাও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই বেইজিং বিকল্প বন্দর, স্থলপথ এবং নতুন করিডোর তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে ভারতও নিজস্ব কৌশলগত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। ইরানের চাবাহার বন্দর, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে সামরিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো উন্নয়ন, মালদ্বীপ ও ওমানে অংশীদারিত্ব—সবই একই উদ্দেশে পরিচালিত হচ্ছে। এটি মূলত যোগাযোগ পথগুলোর ওপর প্রভাব বজায় রাখার প্রতিযোগিতা। এক সময় ভৌগলিক সীমানা ছিল রাষ্ট্রশক্তির প্রধান পরিমাপক। পরে শিল্পায়ন ও অর্থনীতি সেই ধারণাকে বিস্তৃত করে। এখন ডিজিটাল অবকাঠামো সার্বভৌমত্বের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা, ক্লাউড সার্ভার, ফাইভ জি নেটওয়ার্ক এবং ডেটা সেন্টারগুলো আধুনিক রাষ্ট্রের স্নায়ুতন্ত্রের মতো কাজ করে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিমান চলাচল, জাহাজ পরিচালনা, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, এমনকি বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যন্ত অসংখ্য কার্যক্রম এগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ইউক্রেন যুদ্ধ এই বাস্তবতাকে নাটকীয়ভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এর মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়—ডিজিটাল অবকাঠামো এখন আর কেবল বাণিজ্যিক সম্পদ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। চীন তাই নিজস্ব বৃহৎ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাও বিকল্প অবকাঠামো জোট গড়ার চেষ্টা করছে। উভয় পক্ষই বুঝেছে যে ভবিষ্যতের শক্তি কেবল স্থল, নৌ ও আকাশে নয়; বরং মহাকাশ এবং সাইবার জগতেও নির্ধারিত হবে। ডেটা আজকের যুগের নতুন খনিজ তেল—এই কথাটি প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ডেটার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অবকাঠামো, যার মাধ্যমে ডেটা প্রবাহিত হয়। কারণ তথ্যের পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে তথ্যকেও প্রভাবিত করা যায়। অনেকেই মনে করেন ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন কিংবা হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের যুদ্ধ। বাস্তবে এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরও গভীরে একটি নীরব প্রতিযোগিতা চলছে— সংযোগব্যবস্থা ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা। কার তত্ত্বাবধানে বন্দর থাকবে, ক্যাবল থাকবে, স্যাটেলাইট থাকবে এবং ডেটা সেন্টার থাকবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামী দশকের ভূ-রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারণ করবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল সেই প্রতিযোগিতার প্রধান মঞ্চ। এখানকার সমুদ্রপথ, বন্দর, ক্যাবল এবং ডিজিটাল করিডোর শুধু বাণিজ্যিক অবকাঠামো নয়; এগুলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি। সবচেয়ে বড় ভুল হবে অবকাঠামোকে নিরপেক্ষ বলে ধরে নেওয়া। ইতিহাস দেখায়, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো একসময় রাজনৈতিক ও কৌশলগত অর্থ অর্জন করে। নির্ভরশীলতার জন্য নির্মিত সংযোগব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত তা আর থাকে না; বরং নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এই কারণেই সার্বভৌমত্বের ধারণা বদলে যাচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এখন শুধু তার মানচিত্রে আঁকা সীমান্ত দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং নির্ধারিত হয় সে কতটা স্বাধীনভাবে তার বাণিজ্য, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার মাধ্যমে। যে রাষ্ট্রগুলো এই বাস্তবতা দ্রুত উপলব্ধি করবে, তারাই ভবিষ্যতের নিয়ম নির্ধারণ করবে। আর যারা করবে না, তারা হয়তো একদিন আবিষ্কার করবে যে তাদের ভূখণ্ড অক্ষত আছে, পতাকা উড়ছে, কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অনেক আগেই অন্য কারও নির্মিত নেটওয়ার্কের মধ্যে বন্দী হয়ে গেছে। [লেখক: প্রাবন্ধিক]

বাজেট ও জনআকাঙ্ক্ষা

আসন্ন বাজেটে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা করছে এবং ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করার কথা বিবেচনা করছে। বয়স্ক, বিধবা, নির্যাতিত স্ত্রী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা সহ বিভিন্ন ধরনের ভাতা বাড়ানোর বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। পূর্বে ৬ মিলিয়ন প্রবীণ নাগরিক মাসে ৬শ’ টাকা করে ভাতা পান, এবং ২.৭৭৫ মিলিয়ন বিধবা ও নির্যাতিত নারী ৫৫০ টাকা পান। প্রায় ৩.২৩৪ মিলিয়ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মাসে ৮৫০ টাকা ভাতা পান। পূর্ববর্তী সরকার হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ), বেদে (নদী যাযাবর), চা শ্রমিক এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য ভাতা প্রদান করেছিল— এগুলোও বিবেচনায় নেয়া হতে পারে। এছাড়াও অতি দরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ভিজিডি কর্মসূচি এবং জাতীয় সেবা কর্মসূচির বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জমা দেয়া প্রস্তাবের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে ভুল তথ্য ও পরিসংখ্যানগত অসামঞ্জস্যের কারণে অনেক সময় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয় না এবং নির্ধারিত লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হয়। পণ্যের মূল্য, জাতীয় বাজেট এবং জীবনযাত্রার মান গভীরভাবে পরস্পর সম্পর্কিত। একটি পরিবারের ˆদনন্দিন জীবন পরিচালনার সক্ষমতা তার আয়, মৌলিক চাহিদা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সাশ্রয়ী মূল্যের ওপর নির্ভর করে। যখন দাম সহনীয় থাকে, জীবন পরিচালনা সহজ হয়। কিন্তু যখন খরচ মানুষের আর্থিক সক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন দরিদ্র ও অতি দরিদ্র পরিবারগুলো ক্ষুধা, অস্থিরতা ও সংকটে পড়ে। নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি জনজীবনকে ব্যাহত করে, যা প্রায়ই মজুদদার ও মুনাফালোভীদের দ্বারা আরও খারাপ হয়, যারা লাভের জন্য বাজার অস্থিতিশীল করে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল প্রয়োজন যা কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণকে বাস্তবসম্মত বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করে। এই সমš^য় ছাড়া সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতি ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আসন্ন বাজেট বাস্তবায়নকে আরও কঠিন করে তুলেছে। জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র সামাজিক ব্যবসার সহায়তা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। নতুবা জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়বে এবং টিকে থাকা কঠিন হবে। বাজেট, এর কাঠামো ও প্রণয়ন যাই হোক না কেন, জনকল্যাণকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত। যেসব প্রকল্প অধিকাংশ মানুষের উপকারে আসে না, সেগুলোর ব্যয় এড়ানো উচিত। শুধুমাত্র জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় নেয়া হবে। এছাড়াও বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। সর্বোপরি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। কর্তৃপক্ষ যদি বাজার সঠিকভাবে পরিচালনা করে, তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফালোভী মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। তাদের উৎসাহ নিরুৎসাহিত করা উচিত। দাম বেড়ে গেলে ভোক্তাদেরও খরচ কমাতে হবে। উৎপাদন, আমদানি এবং সরবরাহে সমš^য় নিশ্চিত করতে হবে। মূল্যবৃদ্ধি নতুন কিছু নয়, তবে এর প্রভাব জনজীবনে প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। অসাধু ব্যবসায়ী, কালোবাজারি এবং মুনাফালোভীরা এর জন্য দায়ী। তাই সরকারকে সারাবছর নজরদারি বজায় রাখতে হবে। বাজারে সতর্কতা এবং জনসচেতনতা থাকতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্ট চালু রাখতে হবে। এখনও অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতি অপব্যবহার ও অতিরিক্ত বিস্তৃত হয়েছে। রাজনীতিবিদরা প্রায়ই জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে নিজেদের সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেন। তারা প্রায়ই ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভয় দেখান। এই দেশে প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপরও রাজনীতি করা হয়। বাংলাদেশকে কেন শুধু একটি দেশ যেমন ভারত থেকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে? অন্য দেশও আছে। কেন সেখান থেকে কেনা যাবে না? এটি একটি সরকারি মনিটরিং সেল এবং মোবাইল প্রশাসনিক বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। একটি জাতীয় বাজেটের মধ্যে একটি দর্শন থাকে এবং বাংলাদেশে আয়, সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্যের প্রেক্ষাপট থাকে। বাজেটকে একটি কৌশলগত ‘বৃদ্ধিসহ সমতা’ (নীতির মাধ্যমে আরও কার্যকর করা যেতে পারে। করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবের পর থেকে একটি শক্তিশালী রাজস্ব কাঠামোর প্রয়োজন আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হয়েছে। উচ্চ রাজস্ব আহরণ এবং যুক্তিসঙ্গত উচ্চ ব্যয় এমন লক্ষ্য যা একটি দুর্বল ব্যবস্থার মধ্যে অর্জন করা কঠিন, যা এসব বাস্তবায়ন ও বাধা মোকাবিলা করতে সক্ষম নয়। পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার জন্য বাজেট প্রণয়নের সময় নীতিনির্ধারকদের কর ব্যবস্থা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার উপেক্ষা করা উচিত নয়। মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হতে হবে। ব্যয় দিক থেকে, সরকারি ব্যয়ের বৃদ্ধি অবশ্যই মুদ্রাস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নিতে হবে। তাই বাজেট ঘাটতি পূর্ববর্তী বাজেটের তুলনায় কিছুটা কম রাখতে হবে, যা এউচ-এর ৬.২ শতাংশ নির্ধারিত ছিল। যখনই বাজেট নিয়ে আলোচনা হয়, প্রথম বিষয়টি যা সবার মনে আসে তা হলো কর। বাজেট হলো বিভিন্ন উপায়ে সম্পদ আহরণের বিষয়, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের আয়ের ওপর কর। এই সম্পদ পরে মূলত উন্নয়ন, নাগরিকদের বিভিন্ন সেবা প্রদান এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতনের জন্য ব্যবহৃত হয়। সরকার সাধারণত নাগরিকদের কাছ থেকেই সম্পদ সংগ্রহ করে— তা কর, ব্যাংক ঋণ বা জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে হয়ে থাকে। কখনও কখনও তারা বিদেশ থেকেও সহায়তা পায়। তারা আন্তর্জাতিক উৎস থেকেও ঋণ গ্রহণ করে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে করের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে এর কার্যকর সংগ্রহ ও ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা পুনরায় উল্লেখ করছি যে পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আমরা আবারও ˆনতিক মূল্যবোধ যেকোনো মূল্যে বজায় রাখার অঙ্গীকার করছি। হিসাববিজ্ঞান একটি দেশের আর্থিক কার্যক্রমের স্পষ্ট চিত্র প্রদান করে এবং কর্পোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। হিসাববিজ্ঞান ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, সিকিউরিটি, ডিলার এবং অন্যান্যদের জন্য অপরিহার্য যারা এগুলোর প্রয়োজন অনুভব করে। দেশের বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হিসাবরক্ষকদের দায়িত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশের আর্থিক খাতে ওঈঅই-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যথার্থভাবেই, এই প্রতিষ্ঠানটি সচেতনতা সৃষ্টি, ধারণা ও চিন্তা উৎপাদন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে, শুধু নিজেদের ক্ষেত্রেই নয় বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও। আমরা বিশ্বাস করি আমরা সংশ্লিষ্ট সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি। বাজেট মূলত বার্ষিক আয় ও ব্যয়ের একটি বিবৃতি ছাড়া কিছুই নয়। বাজেট প্রণয়ন তেমন কঠিন কাজ নয়। কিন্তু এর বাস্তবায়ন একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। প্রতি বছর আমরা বাজেট নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য দেখতে পাই। যেমন: বাজেট কি গরিবদের জন্য, বাজেট কি ধনীদের জন্য এবং বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো কী? বাজেট কীভাবে শ্রেণীবিন্যাস করা হবে ইত্যাদি। এসব সমালোচনা ও আলোচনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত একটি আদর্শ বাজেট রাষ্ট্রের সামনে উপস্থাপিত হয় যার মাধ্যমে সব রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে বাজেট দেশের সব মানুষের কথা বলে। বিশেষ করে বাজেটকে দারিদ্র্য বিমোচনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছরের বাজেটগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছে। সর্বোপরি বাজেটকে স্বচ্ছ, ভালোভাবে তদারকি ও পর্যবেক্ষণযোগ্য করতে হবে। এবারের বাজেটে উল্লেখযোগ্য দিক বাজেটের আর্থিক সংস্থানের প্রায় অর্ধেক ব্যাংক খাত থেকে আনা হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাংক গুলির সক্ষমতা কতটুকু তা আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে। বিগত সরকারের আমলে অধিকাংশ ব্যাংক বেসামাল অবস্থায় পড়ে দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। ব্যাংকের শৃঙ্খলা না ফেরাতে পারলে ব্যাংক উপর্যপুরি চাপের মুখোমুখি হবে। এছাড়া ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ব মন্দা অর্থনীতির প্রভাব বাংলাদেশের উপর পতিত হবে। এমনকি পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আমাদের অর্থব্যবস্থা প্রভাবিত করতে পারে। যা প্রকারান্তরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রাপ্তি আমাদের উন্নয়ন বাজেটে ইতিবাচকতা বা নেতিবাচকতার টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে। বাজেট এবং বাজার পরিস্থিতির মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ছাড়া সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আশা করা যায় নতুন বাজেট মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে। ২০২৬-২৭ বাজেট কি মুদ্রাস্ফীতির কারণে জনগণের ভোগান্তি কমাবে নাকি বাড়াবে? মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থে কতটা গুরুত্ব দেয়া হবে? বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচন নাকি অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে? কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষেত্রে কী গুরুত্ব দেয়া হবে? এসব প্রশ্ন প্রতি বছর মানুষ করে থাকে। সামগ্রিকভাবে বাজেটকে জনমুখী হওয়া উচিত। তাই বাজেট প্রণয়নের চেয়ে এর বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আসুন, জাতীয় উন্নয়নের চেতনা নিয়ে বাজেট বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে চলি। জনগণ আশা করছে, ২০২৬-২৭ বাজেট দারিদ্র্য হ্রাস, ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারণ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান-বান্ধব পরিবেশ গঠনের প্রতিশ্রুতি পূরণ, জন আকাঙ্খা ও চাহিদার প্রতিফলন ঘটাবে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

ভিডিও আরও দেখুন

বিশ্বকাপে বলের ভেতরে কম্পিউটার!

বর্তমানে ফুটবল বল আর নিছক চামড়া-রাবার নয়, তা ‘ইন্টারনেট অফ থিংস’ ডিভাইস! ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে অ্যাডিডাস ‘টেলস্টার ১৮’ বাজারে আনে। যার ভেতরে ছিল ‘নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন’ চিপ বসানো। আপনার স্মার্টফোনকে বলের কাছে ধরলেই তা সঙ্গে সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে। বলে লেখা থাকতো বিশেষ ডেটা।২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আসে ‘আল রিহলা’।  আরবি এই শব্দের অর্থ ‘যাত্রা’। এটি ছিল পুরোপুরি সাসটেইনেবল উপাদানে তৈরি। আর ছিল অভ্যন্তরীণ সেন্সর। যা প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার তথ্য পাঠাত।২০২৬ বিশ্বকাপে চমকঅ্যাডিডাস ‘কনেভার্স’ বল নিয়ে আসছে যার ভেতরে থাকবে ইনর্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট চিপ। এটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের ত্বরণ, স্পিন, ঘূর্ণন ও গতিপথ রেকর্ড করবে। এই ডেটা সরাসরি চলবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি সিস্টেমে। ফলে হাতে বল লাগা, অফসাইডের আগে-পরে টাচ- এসব সিদ্ধান্ত হবে যান্ত্রিকভাবে নির্ভুল। বিজ্ঞান বলছে, হাতের স্পর্শ এখন চিপের কাছে ধরা খাবে!একটি ফুটবল বলের দাম যেমন ১৫ ডলার থেকে ১৫০ ডলার (বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল)। তার বাজার কিন্তু কয়েক বিলিয়ন ডলারের। শুধু অ্যাডিডাস প্রতি বিশ্বকাপে ৪০ মিলিয়নেরও বেশি বল বিক্রি করে। চীন, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডে তৈরি হয় পৃথিবীর ৭০ শতাংশ ফুটবল বল। সিয়ালকোট (পাকিস্তান) শহরটি ‘বিশ্বের ফুটবল রাজধানী’ এখানে হাতে সেলাই করা বলের কারিগরির ঐতিহ্য এখনও টিকে আছে।কিন্তু বাণিজ্যের আরেক অধ্যায় হলো নকল বল। বিশ্বের ৩০ শতাংশ ফুটবল বল নকল, যা ব্র্যান্ডের কঠিন চ্যালেঞ্জ- এমনকি বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বলের নকলও বাজারে ছড়িয়ে পড়ে ফাইনালের আগেই!বলের সবুজ বিপ্লবজলবায়ু পরিবর্তনের যুগে ফুটবল বলও বদলাচ্ছে। অ্যাডিডাস ঘোষণা করেছে, ২০২৬ বিশ্বকাপের বলগুলো তৈরি করা হবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পলিয়েস্টার এবং উদ্ভিদভিত্তিক উপাদানে। আগের সিনথেটিক বলগুলোতে পেট্রোকেমিক্যাল ব্যবহার হতো, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। নতুন এই বলগুলো কার্বন নিঃসরণ কমাবে। সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিকও ব্যবহার করা হচ্ছে।আপনি কি কখনো লক্ষ্য করেছেন, কোনো ফ্রি-কিকে বল বাঁকা পথে ঘুরে গোল হয়? এটি কিন্তু জাদু নয়, এটি ম্যাগনাস ইফেক্ট। যখন বল নিজের অক্ষে ঘুরতে থাকে, তখন তার পাশ দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হয়। বলের এক পাশে চাপ কম, অন্য পাশে বেশি হয়- ফলে বল বাঁকে।রোনালদোর নাকি ‘নকল-ফ্লাইট’ বল আছে যা বাতাসে অপ্রত্যাশিতভাবে দুলে ওঠে। আদতে এটি অ্যারোডাইনামিক অস্থিরতা- বলের প্যানেলের সীমা রেখা এবং বাতাসের ঘর্ষণ তার গতিপথকে বিশৃঙ্খল করে তোলে। আর এই বিশৃঙ্খলাই ফুটবলকে ফুটবল করে তোলে!এআই ছবিপৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্লাব, সবচেয়ে বড় তারকা, সবচেয়ে উত্তপ্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা- সবকিছুই কেন্দ্রীভূত হয় এই ৪১০-৪৫০ গ্রাম ওজনের একটি বস্তুর ওপর। যে বল আজ একটি শিশুর হাতে খেলনা, কাল এক জাতির স্বপ্ন, পরশু এক ব্যবসায়ীর পণ্য আর ফাইনালের ৯০ মিনিটে তা হয়ে ওঠে ৮০০ কোটি মানুষের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু।তাই পরের বার যখন কোনো ফুটবল ম্যাচ দেখবেন, মনে রাখবেন- শুধু খেলোয়াড়রা নয়, সেই বলটিও বহন করছে ইতিহাসের গাম্ভীর্য, বিজ্ঞানের নির্ভুলতা, ব্যবসার হিসেব, এবং অজস্র মানুষের বিশ্বাস, কুসংস্কার আর আবেগ। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোটো কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোলক এটি।

বিশ্বকাপে বলের ভেতরে কম্পিউটার!
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৯৩ জন