সংবাদ | বাংলা নিউজ পোর্টাল - সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন
বাগেরহাটে সড়ক দুর্ঘটনায় বর-নববধূসহ নিহত ১৩

বাগেরহাটে সড়ক দুর্ঘটনায় বর-নববধূসহ নিহত ১৩

খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাইব্রিজ এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বর-নববধূসহ ১৩ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১৫ জন।বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকাল ৩টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে নববধূসহ তিন নারী ও তিন শিশু রয়েছে।নিহতরা হলেন- নববধূ মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তার স্বামী সাব্বির, নববধূর বোন লামিয়া ও নববধূর নানি। তাৎক্ষণিকভাবে অন্যদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা এলাকায় বৃহস্পতিবার দুপুরে মার্জিয়া আক্তারের সঙ্গে বাগেরহাটের মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের শেলাবুনিয়া এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে সাব্বিরের বিয়ে হয়। বিয়ের পর বরযাত্রীদের নিয়ে মাইক্রোবাসযোগে নবদম্পতি মোংলার উদ্দেশ্যে রওনা দিলে পথে বাগেরহাটের রামপালে এ দুর্ঘটনা ঘটে।নিহত নববধূর মামা আবু তাহের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।রামপাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি বাসের সঙ্গে যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে হতাহতদের উদ্ধার করে রামপাল উপজেলা হাসপাতাল ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।রামপাল উপজেলা হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুকান্ত কুমার পাল জানান, তাদের হাসপাতালে চারজনের মরদেহ রয়েছে।খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মেহেনাজ মোশাররফ জানান, তাদের হাসপাতালে নববধূসহ ৯ জনের মরদেহ রাখা হয়েছে।স্থানীয় প্রশাসন দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছে। এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
৩ ঘন্টা আগে

সখীপুরে সিজারের ৭ দিন পর চিকিৎসাধীন উপজাতি প্রসূতির মৃত্যু

সখীপুরে সিজারের ৭ দিন পর চিকিৎসাধীন উপজাতি প্রসূতির মৃত্যু

ফরিদপুরে ড্যাবের দোয়া ও ইফতার মাহফিল

ফরিদপুরে ড্যাবের দোয়া ও ইফতার মাহফিল

ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত সাহেব আলীর পাশে বিপুল মাস্টার

ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত সাহেব আলীর পাশে বিপুল মাস্টার

কাজ করতে এসে আর বাড়ি ফেরা হলো না নয়নের; শ্মশানঘাটে মিলল নিথর দেহ

কাজ করতে এসে আর বাড়ি ফেরা হলো না নয়নের; শ্মশানঘাটে মিলল নিথর দেহ

চুলে তেল দেওয়ার সেরা সময় কোনটি, সকাল নাকি রাত?

চুলে তেল দেওয়ার সেরা সময় কোনটি, সকাল নাকি রাত?

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈঠক: স্মার্টফোনে নগদ সহায়তা ইন্টারনেটে ছাড়ের প্রস্তাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈঠক: স্মার্টফোনে নগদ সহায়তা ইন্টারনেটে ছাড়ের প্রস্তাব

নতুন গান নিয়ে আসছেন পান্থ কানাই

নতুন গান নিয়ে আসছেন পান্থ কানাই

ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক: বাজার স্থিতিশীলতা, নাকি দামের ওপর নতুন চাপ

ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক: বাজার স্থিতিশীলতা, নাকি দামের ওপর নতুন চাপ

যাদুকাটা নদীতে বালুখেকো চক্রের থাবা, হুমকিতে এশিয়ার সর্ববৃহৎ শিমুলবাগান

যাদুকাটা নদীতে বালুখেকো চক্রের থাবা, হুমকিতে এশিয়ার সর্ববৃহৎ শিমুলবাগান

যেসব খাবার থেকে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে, জানাল গবেষণা

যেসব খাবার থেকে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে, জানাল গবেষণা

গভীর সমুদ্রে কড়া পাহারায় নৌবাহিনী: নিরাপদ থাকছে জ্বালানিবাহী জাহাজ

গভীর সমুদ্রে কড়া পাহারায় নৌবাহিনী: নিরাপদ থাকছে জ্বালানিবাহী জাহাজ

তরমুজের বাড়তি দামে ক্রেতার নাভিশ্বাস

তরমুজের বাড়তি দামে ক্রেতার নাভিশ্বাস

নরসিংদীতে ৫ ইটভাটাকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা জরিমানা

নরসিংদীতে ৫ ইটভাটাকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা জরিমানা

বাগেরহাটে সড়ক দুর্ঘটনায় বর-নববধূসহ নিহত ১৩

বাগেরহাটে সড়ক দুর্ঘটনায় বর-নববধূসহ নিহত ১৩

নিরাপদ ঈদযাত্রায় পুলিশের একগুচ্ছ নির্দেশনা

নিরাপদ ঈদযাত্রায় পুলিশের একগুচ্ছ নির্দেশনা

রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর ১৫ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত হলো সংসদ

রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর ১৫ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত হলো সংসদ

ঈদের আগেই ৪ লাখ এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীর অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে বোনাস

ঈদের আগেই ৪ লাখ এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীর অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে বোনাস

একদিনের ব্যবধানে ২ দস্যু আটক, আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার

একদিনের ব্যবধানে ২ দস্যু আটক, আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার

খালেদা জিয়া থাকলে আজ সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

খালেদা জিয়া থাকলে আজ সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

চুয়াডাঙ্গায় মেয়াদোত্তীর্ণ দই-মিষ্টি ও নিষিদ্ধ প্রসাধনী বিক্রি, ৫ ব্যবসায়ীকে জরিমানা

চুয়াডাঙ্গায় মেয়াদোত্তীর্ণ দই-মিষ্টি ও নিষিদ্ধ প্রসাধনী বিক্রি, ৫ ব্যবসায়ীকে জরিমানা

মতামতমতামত

শিক্ষাপ্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব: শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে বিবেচ্য

সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের একটি প্রজ্ঞাপনের খবর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে কর্মরত ৮২ জন কর্মকর্তা যাদের মধ্যে সাঁট-লিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, হিসাবরক্ষণ কাম ক্লার্ক, উচ্চমান সহকারী ও প্রধান সহকারী রয়েছেন তাদের পদোন্নতি দিয়ে সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে কারও পদোন্নতিতে আপত্তি থাকার কথা নয়; বরং যে কোনো পেশাজীবনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ ক্যারিয়ার অগ্রগতির পথ থাকা অত্যন্ত জরুরি। একটি আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো তখনই কার্যকর হয়, যখন সেখানে কর্মরত মানুষ জানেন যে তাদের শ্রম, দক্ষতা ও সততার যথাযথ মূল্যায়ন একদিন পদোন্নতির মাধ্যমে স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু প্রশ্নটি আপত্তির নয়, বরং নীতিগত ও কাঠামোগত। সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের পদটি কি কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক পদ, যেখানে নথি যাচাই, অফিস ব্যবস্থাপনা বা দাপ্তরিক তদারকিই প্রধান কাজ? নাকি এটি মূলত এমন একটি একাডেমিক নেতৃত্বের অবস্থান, যার মাধ্যমে একটি উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান, শিক্ষার মান, শিক্ষকতার পেশাগত চর্চা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়? আধুনিক শিক্ষা-ব্যবস্থাপনা তত্তে¡ শিক্ষা কর্মকর্তাদেরকে কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দেখা হয় না; বরং তাদেরকে শিক্ষা-ব্যবস্থার শিখন-নেতৃত্বের ধারক (ইন্সট্রাকশানাল লিডার) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুতরাং এই পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি সরাসরি শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্ব কেবল দাপ্তরিক কাগজপত্র যাচাই বা প্রশাসনিক তদারকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি উপজেলার সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মান ও দিকনির্দেশনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাদের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে উপজেলার সব মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকি ও পর্যবেক্ষণ; শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা; স্থানীয় বাস্তবতা ও চাহিদা বিবেচনায় শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করা; এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা। অন্য কথায়, এই পদে কর্মরত ব্যক্তিকে একই সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষায় নেতৃত্ব এবং শিক্ষাবিষয়ক নীতিমালা বাস্তবায়নের সমন্বিত দায়িত্ব পালন করতে হয়। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব তত্তে¡ এ ধরনের পদকে কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্বের জায়গা হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটিকে শিখন নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিদ্যালয়ের পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা, পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং শিক্ষার পরিবেশ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা রাখতে হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে যে কেউ কি কেবল প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার জোরে এই একাডেমিক তদারকির দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারবেন? শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের পেশাগত সহায়তা প্রদান কিংবা বিদ্যালয়ের শিখন শেখার প্রক্রিয়া মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা মনোবিজ্ঞান, শিক্ষাক্রম তত্ত¡, পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার মৌলিক জ্ঞান। এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক নেতৃত্ব দেয়া কার্যত একটি জটিল দায়িত্ব, যা শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে পূরণ করা সবসময় সম্ভব নয়।আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও মানসিকতা’ নিয়ে কাজ করে এসেছে। ফলে শিক্ষাপ্রশাসন হয়ে উঠেছে সর্বত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের অংশ। ঔপনিবেশিক আমলে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল শাসন ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা; সৃজনশীল জ্ঞানচর্চা বা মানবিক বিকাশ তখন প্রশাসনিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল না। স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরেও সেই মানসিকতার ছাপ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রয়ে গেছে। বস্তুত, শিক্ষা প্রশাসনকেও অনেক সময় সাধারণ প্রশাসনের একটি সম্প্রসারিত শাখা হিসেবে দেখা হয়। তাই শিক্ষাপ্রশাসনের মূল কাজ মনে করা হয় দাপ্তরিক তদারকি, নিয়মনীতির প্রয়োগ এবং আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। কিন্তু শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্ব দিয়ে কাক্সিক্ষত ফল অর্জন করা যায় না।আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, শিক্ষা একটি বিশেষায়িত ও জ্ঞাননির্ভর ক্ষেত্র। এখানে শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত¡ বোঝা, শিক্ষাক্রমের দর্শন ও কাঠামো অনুধাবন করা, কার্যকর পাঠদান পদ্ধতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার ধারণা থাকা, এবং শিক্ষানীতির অন্তর্নিহিত লক্ষ্য বিশ্লেষণ করার মতো পেশাদার দক্ষতা প্রয়োজন। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান আমাদের শেখায় শিক্ষার্থীরা কীভাবে শেখে; শিক্ষাক্রম তত্ত¡ নির্দেশ করে জ্ঞানের সংগঠন ও উপস্থাপনের পদ্ধতি; আর শিক্ষাদর্শন আমাদের বলে দেয় শিক্ষা কেন এবং কোন সামাজিক ও নৈতিক উদ্দেশে পরিচালিত হবে। এসব জ্ঞান ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক তদারকি করা অনেকটা এমন, যেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা ছাড়াই একটি হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম মূল্যায়নের দায়িত্ব নেয়া। এ কারণেই সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে কেবল দাপ্তরিক অভিজ্ঞতাকে যথেষ্ট মনে করলে শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন প্রত্যাশা করা কঠিন। শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব সমস্যা বোঝা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর শিখন-শেখার প্রক্রিয়া মূল্যায়ন করা এবং বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক উন্নয়নে কার্যকর দিকনির্দেশনা দিতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মধ্যে শিক্ষাবিজ্ঞানের জ্ঞান ও পেশাগত নীতিনৈতিকতার উপলব্ধি থাকা অপরিহার্য। অন্যথায় শিক্ষাপ্রশাসন ধীরে ধীরে এমন একটি কাঠামোয় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, যেখানে নীতিমালা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিকতার বিকাশ পিছিয়ে পড়ে।বর্তমানে দেশে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিষয়ে চার বছর মেয়াদি অনার্স কোর্স থেকে প্রতিবছর শত শত গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজগুলোয় শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দীর্ঘদিন ধরেই চালু রয়েছে। এসব প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা সাধারণত ৩৫-৪০টি কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষাক্রম তত্ত¡ ও উন্নয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষা পরিকল্পনা, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষায় নেতৃত্ব, শিক্ষা গবেষণা পদ্ধতি, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে পদ্ধতিগত ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করেন। শুধু তাত্তি¡ক জ্ঞানই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তারা গবেষণা, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং প্র্যাকটিকামভিত্তিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো বোঝার সুযোগ পান। ফলে তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে নয়, বরং একটি জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক বিকাশের প্রক্রিয়া হিসেবে অনুধাবন করার সক্ষমতা অর্জন করেন। এছাড়াও দেশে এক বছর মেয়াদি অথবা পার্ট-টাইম দুই বছর মেয়াদি বিএড কোর্স থেকে পাশ করা বিপুলসংখ্যক শিক্ষক রয়েছেন, যারা পেশাগত প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘদিনের শ্রেণীকক্ষের অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজেদের কর্মজীবনে অগ্রসর হতে আগ্রহী। এই শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের বাস্তব পাঠদান প্রক্রিয়া, শিক্ষার্থীদের শেখার ধরণ, মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছেন। শিক্ষাতত্ত¡ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার এই সমন্বয় তাদেরকে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব ও একাডেমিক তদারকির ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করতে পারে। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে যেখানে শিক্ষাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদের এমন একটি সম্ভাবনাময় ভাÐার দেশে তৈরি হয়েছে, সেখানে শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তাদের দক্ষতা ও পেশাগত জ্ঞানকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে।পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যুগের চাহিদা মেটাতে শিক্ষা প্রশাসনকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করা এবং এতে পেশাদারত্বের ভিত্তি শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ মাঠপর্যায়ের পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাবিষয়ক পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। এ ধরনের পদে সরাসরি শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষা প্রশাসনে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও পেশাদার নেতৃত্বের ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে। কারণ শিক্ষাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা শিক্ষাক্রম, মূল্যায়ন, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষাব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে পদ্ধতিগত ধারণা রাখেন, যা বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক তদারকি ও উন্নয়নে কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে পারে।একই সঙ্গে পেশাগত উন্নয়ন ও পদোন্নতির সুযোগ দিতে বাস্তব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষকদের মধ্য থেকেও যারা সরকারি প্রশাসনে যেতে আগ্রহী তাদের নিয়োগের সুযোগ রাখা যেতে পারে। দীর্ঘদিনের শ্রেণীকক্ষ অভিজ্ঞতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার বাস্তব দক্ষতা এবং স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান তাদেরকে শিক্ষা প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত করতে পারে। এতে একদিকে যেমন পেশাগত অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত দক্ষতা সম্পন্ন নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি হবে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে শিক্ষাবিজ্ঞানের তাত্তি¡ক জ্ঞানের একটি কার্যকর সমন্বয় ঘটবে। পরবর্তীতে এই সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই ধাপে ধাপে পদোন্নতির মাধ্যমে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শিক্ষাপ্রশাসনের উচ্চতর পদগুলো পূরণ করা যেতে পারে। এমন একটি ধারাবাহিক পেশাগত সোপান গড়ে উঠলে শিক্ষা প্রশাসনে দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা সমাধানের প্রয়াস বৃদ্ধির মধ্যে দিয়ে দ্রæত শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে এটি একটি সুসংগঠিত পেশাগত ক্যারিয়ার কাঠামো তৈরি করবে, যেখানে শিক্ষা প্রশাসন আর কেবল দাপ্তরিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং জ্ঞাননির্ভর, দক্ষতাভিত্তিক ও পেশাদার নেতৃত্বের একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শিক্ষা কর্মকর্তার এই পদটি মূলত মাঠপর্যায়ের দায়িত্বনির্ভর। একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে হয়, শিক্ষকদের সঙ্গে পেশাগত আলোচনা করতে হয়, শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে হয় এবং বিভিন্ন বাস্তব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ নিতে হয়। অর্থাৎ এই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন উদ্যম, গতিশীলতা, পর্যবেক্ষণক্ষমতা এবং শিক্ষাবিষয়ক একটি সুস্পষ্ট পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষা প্রশাসনের আধুনিক ধারণায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরকে অনেক সময় ‘শিখন সহায়তার নেতা’ (ইন্সট্রাকশানাল সার্পোট লিডার) হিসেবে বিবেচনা করা হয় যারা বিদ্যালয়ের পাঠদান প্রক্রিয়া উন্নত করতে শিক্ষককে সহায়তা করেন, উদ্ভুত সমস্যার উৎস চিহ্নিত করেন এবং কার্যকর সমাধানের পথ নির্দেশ করেন। এই বাস্তবতায় কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে এসে কেবল প্রশাসনিক ধারার পদোন্নতির মাধ্যমে এই ধরনের মাঠমুখী পদে দায়িত্ব পাওয়া অনেক সময় কাক্সিক্ষত ফল বয়ে আনে না। কারণ দীর্ঘদিন দাপ্তরিক পরিবেশে কাজ করা কোনো কর্মকর্তার জন্য নিয়মিত বিদ্যালয়ভিত্তিক তদারকি, শিক্ষকদের সঙ্গে পেশাগত আলাপ-আলোচনা কিংবা শিখন-শেখার বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের মতো কাজগুলো নতুন করে গ্রহণ করা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এর সঙ্গে শারীরিক পরিশ্রম, নিয়মিত ভ্রমণ এবং দ্রæত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও যুক্ত থাকে, যা একটি গতিশীল কর্মপরিবেশ দাবি করে। অন্যদিকে, কর্মজীবনের একেবারে শেষদিকে এসে এই পদে নিয়োগ পেলে তাদের পক্ষে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ধাপে ধাপে উচ্চতর পর্যায়ে নেতৃত্বের ভ‚মিকা নেয়ার সুযোগও প্রায় থাকে না বললেই চলে।একটি কার্যকর ও টেকসই শিক্ষাপ্রশাসনের জন্য প্রয়োজন এমন একটি পেশাগত কাঠামো, যেখানে মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়ে একটি সুসংহত নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারেন। এতে প্রশাসনের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণের কালচার বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত শিক্ষাক্রম সংস্কার, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের মতো বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। নিঃসন্দেহে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু শিক্ষাপ্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে আড়ালেই থেকে যায়। অথচ শিক্ষার সমাজবিজ্ঞান ও প্রশাসন তত্তে¡র আলোকে বলা যায় কোনো শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা কেবল শিক্ষাক্রম বা নীতিমালার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই নীতিমালা মাঠপর্যায়ে কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার ওপরই শেষ পর্যন্ত শিক্ষার গুণগত মান নির্ধারিত হয়।যত উন্নত শিক্ষাক্রমই প্রণয়ন করা হোক না কেন, মাঠপর্যায়ে তা সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য যেমন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন, তেমনি তাদের পেশাগত দিকনির্দেশনা ও তদারকির জন্য দক্ষ শিক্ষাপ্রশাসকও অপরিহার্য। শিক্ষা ব্যবস্থাপনার আধুনিক ধারণায় প্রশাসনকে কেবল নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি একটি সহায়ক ও সক্ষমতাবর্ধক ব্যবস্থা যা শিক্ষকদের পেশাগত বিকাশে সহায়তা করে, সমস্যার সমাধানে দিকনির্দেশনা দেয় এবং বিদ্যালয়গুলোকে একটি ইতিবাচক শিখন কালচারের দিকে এগিয়ে নিতে ভ‚মিকা রাখে। এই বাস্তবতায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ভ‚মিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে তিনিই শিক্ষকদের জন্য প্রশাসনিক ও পেশাগত সহায়তার প্রথম আশ্রয়স্থল। কোনো বিদ্যালয়ে পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা, শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা বা প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিলে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানেরা সবার আগে এই দপ্তরের দ্বারস্থ হন। ফলে এই পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে কেবল দাপ্তরিক নিয়ম জানাই যথেষ্ট নয়; তার মধ্যে থাকতে হয় শিক্ষাবিষয়ক পেশাগত উপলব্ধি, সমস্যার বিশ্লেষণক্ষমতা এবং বাস্তবসম্মত সমাধান দেয়ার সক্ষমতা। এমন দক্ষ নেতৃত্বই মাঠপর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থাকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।যদি এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটিতে পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের যথাযথ সুযোগ না দেয়া হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই দক্ষ ও মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ শিক্ষকতা এবং শিক্ষাপ্রশাসন উভয় ক্ষেত্রেই আগ্রহ হারাতে পারেন। যেকোনো পেশার প্রতি আগ্রহ ও প্রতিশ্রæতি অনেকাংশেই নির্ভর করে সেখানে একটি সুস্পষ্ট পেশাগত স্বীকৃতি ও অগ্রগতির সম্ভাবনা থাকার ওপর। যদি শিক্ষাবিজ্ঞানে দীর্ঘ সময় ধরে অধ্যয়ন করা ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও সেই জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানোর উপযুক্ত ক্ষেত্র না তৈরি হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই অনেক তরুণ অন্য পেশার দিকে ঝুঁকবেন। এতে শিক্ষাখাত ধীরে ধীরে তার সম্ভাবনাময় মানবসম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। এর ফলাফল কেবল জনবল সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। শিক্ষাক্রম যত আধুনিকই হোক, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন উৎসাহী শিক্ষক, সহায়ক প্রশাসন এবং একটি পেশাদার পরিবেশ। কিন্তু যখন সেই কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নও হয়ে ওঠে খÐিত, অনুপ্রেরণাহীন এবং অনেক সময় বিশৃঙ্খল। নীতিমালা ও বাস্তবতার মধ্যে তখন একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয় কাগজে-কলমে সংস্কার থাকলেও শ্রেণীকক্ষের বাস্তবতায় তার প্রতিফলন দেখা যায় না। ফলে আমরা যে আধুনিক, মানবিক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি যেখানে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে তা বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়াতে পারে না। যথাযথ পেশাদার নেতৃত্ব ও সহায়ক প্রশাসনিক কাঠামো ছাড়া সেই স্বপ্ন অনেক সময় নীতিনির্ধারণের দলিল বা নীতিমালার পৃষ্ঠাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। তাই শিক্ষাব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নের জন্য পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত মানবসম্পদকে শিক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় স্থানে নিয়ে আসা এখন অত্যন্ত জরুরি।শিক্ষার জন্য নিবেদিত দুটো মন্ত্রণালয় কেবল সরকারের কার্যক্রম পরিচালনার দপ্তর নয়; এদুটো মূলত একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্প। উল্লেখ্য যে, উদ্ভুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার হাত থেকে রেহায় পেতে পূর্বে শিক্ষাপ্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণের ওপর একটি লেখায় দুটো মন্ত্রণালয়কে একীভ‚ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সে যাই হোক, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তি গড়ে ওঠে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অর্জন করেছে, তারা শিক্ষাকে কেবল প্রশাসনিক রুটিনের বিষয় হিসেবে দেখেনি; বরং জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়নে মাধ্যমে মানবসম্পদ এবং নৈতিক নাগরিক তৈরির একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করেছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা প্রশাসনের কাঠামোও হতে হয় সময়োপযোগী, পেশাদার এবং জ্ঞানভিত্তিক। কিন্তু যদি এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটিকে এখনও সেকেলে প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিচালিত করা হয়, তবে দেশের শিক্ষার গুণগত মান পরিবর্তন প্রত্যাশা করা বাতুলতা মাত্র।পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রশাসনকে নিয়ে নতুন করে ভাবার এবং তাকে পেশাদার ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর সুযোগ এসেছে। বিশেষ করে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার (এবং সহকারী কর্মকর্তাসহ) মতো গুরুত্বপূর্ণ মাঠপর্যায়ের পদগুলোতে শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকারমূলক নিয়োগ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রশাসনে এমন একটি পেশাদার নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে, যারা শিক্ষাবিজ্ঞানের জ্ঞান, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং শিক্ষানীতির লক্ষ্য এই তিনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হবে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত শিক্ষাপ্রশাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় নিয়োগ নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করে শিক্ষাবিষয়ক পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়া। কারণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাক্রম এবং শিক্ষানীতির মধ্যবর্তী যে প্রাতিষ্ঠানিক সেতুটি মাঠপর্যায়ে কাজ করে, সেটি মূলত শিক্ষাপ্রশাসনই। সেই সেতুটি যদি দুর্বল হয়, তবে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। আর যদি সেই সেতুটি জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে মজবুত করা যায়, তবে শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক রূপান্তরের পথও অনেকটাই সুগম হয়ে উঠবে। নতুন সরকারের এখনই সেই সেতুকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর উপযুক্ত সময়।[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

‘বঙ্গমাতার জন্তুপোলা’

‘তুই যে কোথা হোতে কীসব নিয়ে আসিস, মানে চিন্তা করলে মাথা গরম হয়ে যায়! বঙ্গমাতার জন্তুপোলা! মানে কী? বঙ্গমাতার জন্তুপোলা!’‘ওম্মারে, আন্নেরা যার নাম হুনলে টব্বস হোই বোই থাকেন, হ্যেরে আন্নেরা সকাল-সন্ধ্যা সন্মান করেন, অঁাঁই তো হ্যের কথা কোইলাম, আর আন্নেনি আঁরে কন, বঙ্গমাতার জন্তুপোলা! মানে কী?’‘এ-আবার কী কথা আমরা কাকে সকাল-সন্ধ্যা শ্রদ্ধা করি যার কথা তুই বলাতে আমরা বিরক্ত হচ্ছি?’‘ক্যান আপনেগো ঠাকুর কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হ্যেয়তো কোইছে, বঙ্গমাতার জন্তুপোলা!’‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন ‘বঙ্গমাতার জন্তুপোলা! উনি আবার কবে এ-কথা বললেন?’‘ক্যান আপনে না অনেক শিক্ষিত, ঢাবি বাংলা অনার্স, আন্নে কি হুনেন নাই আপনেগো ঠাকুর, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘বঙ্গমাতা’ কবিতায় লিখছেন, বঙ্গমাতার জন্তুপোলা।’‘সেকিরে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবে লিখলেন, বঙ্গমাতার জন্তুপোলা!’‘অতো ঢং কোইরেন না, আপনেগো ঠাকুরে ‘বঙ্গমাতা’ কবিতায় লিখছে না, ‘সাতকোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি কোরে মানুষ কর নি।’ ‘হ্যাঁ, উনিতো ঠিকই লিখেছেন, আমরাতো আজও মানুষ হোতে পারলামনা, নিজেরা নিজেরা, বাঙালি হোয়ে বাঙালিরা মারামারি খুনাখুনি করে মোরছি। আমরা বাঙালিই থেকে গেলাম কিন্তু মানুষ হোতে পারলাম না!’‘মানুষ হোইতে না পারলে আপনেরা জন্তু, তাই আমি কোইলাম ‘বঙ্গমাতার জন্তু পোলা’ বঙ্গমাতার পোলাপান জীন্দেগীতে আর মানুষ হোইবো না হালারা জন্তু জানোয়ারের মতুন নিজেরা নিজেরা কামড়া কামড়ি কোইরা মোরবো।’‘তা-তুই কথাটা খুব খারাপ বলিসনি, ‘বঙ্গমাতা’ কবিতায় কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু মনকষ্ট থেকে লিখেছেন, ‘সাতকোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি কোরে মানুষ কর নি।’ ‘আপনেরা মানুষ হোইবেন ক্যেমনে, এইযে দেখেন, ময়মনসিংহের, জামালপুরের, বোলতা গ্রামের মেলান্দা-দুর্মুঠের, কাদামিয়ার পোলার বংশধর, মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারগো সাহায্য কোইরা, দেশ স্বাধীনের পর হালার বাপেরে আখ খেতে ফালায়া মুন্সিগঞ্জের, আটপাড়ার মুক্তিযোদ্ধা, কি যেন নাম, হ্যেরা কি মাইরটাই না মারলো! তারপর হালারা কয়দিন আগে, নিজেগো মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি কয়া ক্যেমন মালটা কামায়লো! আর অহন কয়কি, হালার পোলা আগস্ট মুক্তিসেনা, এবার বুজেন আপনের ‘বঙ্গমাতার জন্তুপোলা’র কারবার। আবার হুনছি কাদা মিয়ার নাতি নাকি নিজেরে সাংবাদিক কয়া, বর্তমান পুরধানমন্ত্রীর কাছে ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ আবেদন করছে!’‘বলিস কী? ময়মনসিংহের, জামালপুরের, বোলতা গ্রামের মেলান্দা-দুর্মুঠের কাদামিয়া চেয়ারম্যানের বংশধররা এখন ‘ফ্যমিলি কার্ডের’ জন্য আবেদন করেছে! কিন্তু এটাতো দুস্থ পরিবারের জন্য, কাদামিয়া চেয়ারম্যানের বংশধর, কীভাবে আবেদন করবে?’‘ওম্মা আপনে জানেন না, কাদামিয়ার নাতি যেইটা নিজেরে সাংবাদিক কয়, হ্যেয়তো রহিমার বেডিরে বিয়া করছে, অহন রহিমার বেডি স্নো-পাওডার ধুয়া অরিজিনাল কামের বেডির মতুন পোষাক পিন্দা হেইদিন কড়াইল বস্তির পাশের টিএ্যান্ডটি’র মাঠে লাইন দিয়া দাঁড়ায়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’ লোইছে, ইউটিউবে দ্যেইখা আপনের ভাবি আমারে কয় দ্যেহ দ্যেহ আমাগো পুরধান মন্ত্রীর হাত থ্যেইক্কা কাদামিয়া চেয়ারম্যনের সাংবাদিক পোলার বৌ, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ লোইতাছে!”‘এই টাকা টাকা কোরে তোরা যে কোথায় নামিছিস তা তোরাই জানিস!’‘কারে দোষ দিবেন কন, এই যে কত বড় বড় একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধারা ট্যাকা ট্যাকা কোইরা পুরা বাঙালি জাতিটার বারটা বাজাইলো। আবার হুনছেননি, যুদ্ধ হোইলো ইরানে, আর এহানের বাঙালিরা পেট্রল কিননের লাই হ্যেতাগো লাইন দ্যেহেন!’‘যুদ্ধ বেশিদিন দীর্ঘায়িত হলে তেলের সাপ্লাই কমে যেতে পারে, তাই’‘ওপব্বারে, আব্রাহাম লিংকনের নাতি গাড়ি ছাড়া হ্যেরা ছলতে পারে না। আরে ব্যাটা খড়ম পায়ে তোরা বড় হোইছস। তেল নাই তো কয়দিন গাড়ি চালাবি না! কাদাময়ি, বগামিয়ার পোলা তোগো হালায় গাড়ি ছাড়া চলে না! আরে ব্যাটা মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় সৈন্যগো লগে মিল্লা দেশটা স্বাধীন না করলে, এইসব বগামিয়া, কাদামিয়া, চানমিয়া, শুকরমিয়া তোরানি পাজেরো চালাইতি? পাকিস্তান থাকলে তোর বাপে পাজেরা না, বইল গাড়ি চালাইতো বুঝছস।’‘আসলেই তুই ঠাট্টা-মশকরা যাই কর বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে, আমরা সারা জীবনেও এ্যতো প্রাচুর্য্য দেখতে পেতাম নারে। আজ বাঙালি উড়োজাহাজের মালিক, নিজস্ব স্যাটালাইটে সংবাদ প্রেরণ, ভাবতে পারিস!’‘তো এ্যতোই যদি বুঝছেন তয় এবার বাঙালি না থাইক্কা মানুষ হন তায়লেতো পৃথিবীর বুকে পাবলিকে আপনেগো সম্মান করবো।’‘জানিস কথাশিল্পী শওকত ওসমানও কবিগুরুর মতো বলতেন; কথাটা ঠিক মনে নেই... মানুষ হওয়া নিয়ে কি যেন বলতেন...’‘ কথাশিল্পী শওকত ওসমানও কবিগুরুর মতো বলতেন, ‘এ-দেশে মানুষ হওয়ার আগে হিন্দু বা ক্রীশ্চান হওয়া লাগে।’‘আরে না উনি হিন্দু বা ক্রীশ্চান না, অন্য কোনো ধর্মের কথা বোলেছেন।’‘আরে ছাড়েন ভাই আপনের, হিন্দু না ক্রীশ্চান, এইসব তর্ক থুয়া, দ্যেখেন ক্যেমনে বাঙালিরে মানুষ করবেন হেই কথা ভাবেন!’‘বাঙালি মানুষ হবে, মানুষ হবে বাঙালি, যারা তিন বছরের শিশুকে অত্যাচার করে, বৃদ্ধা মাকে গোয়ালে রাখে, রাস্তায় ফেলেদ্যেয়, মায়ের অন্যায় দেখে ‘ভয় পাইলে তো চোলবো না, মাইনষ্যে পারেনা এমন কোনো কামনাই, দেখি আমাগো নবনির্বাচিত সরকার বাঙালিরে মানুষ করা পারেনি?’‘দ্যেখ আশায় বুকবাঁধ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো বলেইছেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। এখন এই প্ল্যান যদি বাঙালিকে মানুষ করার প্ল্যান হয় তাহলেতো কথাই নেই।’‘যাক রোজার মাসে আপনের কথা যদি কবুল হয় তয়লেতো বাঙালি মানুষ হোইবোই।’‘আমারও মনে বড্ড আশা, আমাদের প্রধানমন্ত্রী হয়তো পারবেন বাঙালিকে মানুষ কোরতে।’‘চলেন তায়লে আমরা ব্যেবগতে মিল্লা কোই, ওই বাঙ্গালী এবার তোরা মানুষ হ...’‘তুই ঠিকই বলেছিস, মানুষই পারবে মানুষকে মানুষ করতে।’‘তায়লে আর কি, আপনের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো কন, ‘আরে তুই একেবারে আমার মনের কথা বলেছিস,নিশ্চয় বাঙালি একদিন মানুষ হবে, ‘মানুষে বিশ্বাস হারোনো পাপ’।[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

বিচারব্যবস্থায় আস্থা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা শুধু একটি প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়—এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। আদালত শুধু আইন প্রয়োগের স্থান নয়; এখানেই নাগরিক আস্থার সর্বোচ্চ পরীক্ষা ঘটে। মানুষ যখন আদালতের দ্বারস্থ হয়, তখন তারা শুধু একটি রায় প্রত্যাশা করে না; তারা ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা খোঁজে। কিন্তু বিচারব্যবস্থার ভেতর থেকেই যদি অনৈতিক আচরণ, ঘুষের অভিযোগ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত উঠে আসে, তবে সেই আঘাত কোনো একক মামলার সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তা সরাসরি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, বিচারিক নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থাকে নাড়া দেয়। তখন প্রশ্ন জাগে—ন্যায়বিচারের মন্দির কি সত্যিই অমলিন রয়েছে, নাকি তার ভেতরেই ধীরে ধীরে বিশ্বাসের ক্ষয় শুরু হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই আজ সময়ের দাবি।সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে কেন্দ্র করে যে বিতর্কের জন্ম হয়েছে, তা দেশের বিচারব্যবস্থা ও আইনি নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে যুদ্ধাপরাধের মতো সংবেদনশীল ও গুরুতর অপরাধের বিচার পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠিত এই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়ে আসছে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে অনিয়ম বা অনৈতিকতার অভিযোগ উঠলে তা স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক জনমনোযোগ আকর্ষণ করে। এই ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা আইনগত ও নৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কারাবন্দি এক সাবেক সংসদ সদস্যকে জামিনে মুক্তি দেয়ার বিষয়ে সহায়তার আশ্বাস দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকার কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।বিতর্কটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে যখন সংশ্লিষ্ট কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডিং গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় বলে জানা যায়। সেই রেকর্ডিংয়ে অর্থ লেনদেন এবং জামিনের বিষয়ে সম্ভাব্য প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিত রয়েছে—এমন দাবি সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যদিও এই অডিও রেকর্ডিংয়ের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা বিচারিক যাচাই সম্পন্ন হয়নি, তবুও বিষয়টি জনপরিসরে একটি গুরুতর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।অন্যদিকে অভিযুক্ত প্রসিকিউটর অভিযোগটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন যে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবুও এ ধরনের অভিযোগ সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই বিচারব্যবস্থার নৈতিক মানদণ্ড প্রসিকিউটরদের পেশাগত দায়িত্ব এবং বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আচরণ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; তা সরাসরি রাষ্ট্রের আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি জনগণের আস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিযোগের বিষয় নয়; বরং এটি বিচারিক নৈতিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং আইনি দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। তাই বিষয়টি আইন ও নীতির দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর নির্দিষ্ট নৈতিক, পেশাগত ও সাংবিধানিক দায়িত্ব আরোপিত থাকে। বিচারক, প্রসিকিউটর, আইনজীবী এবং তদন্তকারীÑ সবার সম্মিলিত ভ‚মিকার মাধ্যমেই একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বা প্রসিকিউটরের দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি শুধু কোনো পক্ষের প্রতিনিধি নন; বরং রাষ্ট্রের পক্ষে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষা করেন। এই কারণেই ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় প্রসিকিউটরকে প্রায়ই ‘মিনিস্টার অব জাস্টিস’ বা ন্যায়বিচারের সহায়ক হিসেবে অভিহিত করা হয়। তার প্রধান দায়িত্ব শুধু দোষ প্রমাণ করা নয়; বরং আদালতের সামনে নিরপেক্ষভাবে প্রমাণ উপস্থাপন করা, সাক্ষ্য-প্রমাণের সত্যতা যাচাই করা এবং বিচারিক সত্য উদ্ঘাটনে সহায়তা করা। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রসিকিউটরের এই নৈতিক ভ‚মিকা স্বীকৃত। যেমন—‘ইউনাইটেড নেশনস গাইডলাইনস অন দ্য রোল অব প্রসিকিউটরস’-এ বলা হয়েছে যে প্রসিকিউটরদের অবশ্যই নিরপেক্ষতা, সততা ও পেশাগত সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং কোনো ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা আর্থিক প্রভাবের অধীনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না।বাংলাদেশের আইনব্যবস্থাতেও এই নীতিগত দায়িত্ব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ার কাঠামো নির্ধারণকারী ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ অনুযায়ী রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতের সহায়ক হিসেবে কাজ করেন এবং তার প্রধান দায়িত্ব হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আদালতের সামনে যথাযথ তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করা। একইভাবে আইনজীবীদের পেশাগত আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী ‘দি বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল ওয়ার্ডার-১৯৭২’ (রাষ্ট্রপতি আদেশ নং-৪৬, ১৯৭২) এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিল-এর আচরণ বিধিতেও সততা, স্বচ্ছতা ও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কোনো প্রসিকিউটর যদি ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন—যেমন অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধার বিনিময়ে জামিন, অভিযোগ গঠন বা মামলা পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারÑ তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত অনৈতিকতা নয়; বরং গুরুতর পেশাগত অসদাচরণ এবং আইনের শাসনের পরিপন্থী আচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে।বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আলোকে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা একাধিক ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। বিশেষত দুর্নীতি বা অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন-এর। একই সঙ্গে দণ্ডবিধি আইন-১৮৬০-এর বিভিন্ন ধারায় সরকারি কর্মচারীর অসদাচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারিক কার্যক্রমে অনৈতিক হস্তক্ষেপকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বিচারপ্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার হাতে ন্যস্ত। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় জামিন দেয়া বা না দেয়ার ক্ষমতা একমাত্র আদালতের এখতিয়ারভুক্ত এবং তা বিচারকের স্বাধীন বিচারিক বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। তবে বাস্তবে প্রসিকিউটর আদালতের সামনে মামলার নথি উপস্থাপন করেন, তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এবং জামিন শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন। ফলে প্রমাণ উপস্থাপনের ধরন বা যুক্তির কাঠামো কখনও কখনও বিচারিক সিদ্ধান্তে পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে।এই প্রেক্ষাপটে বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপকে কেন্দ্র করে অনৈতিক প্রস্তাব বা দুর্নীতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তাই প্রসিকিউটরসহ বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির পেশাগত সততা ও নৈতিক দায়িত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিজিটাল প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা। অভিযোগকারী পক্ষ কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডিং সংরক্ষণ করেছে বলে দাবি করেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে অডিও, ভিডিও এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক তথ্য এখন বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনে ইলেকট্রনিক রেকর্ডের গ্রহণযোগ্যতা স্বীকৃত রয়েছে সাক্ষ্য আইন-১৮৭২-এর সংশোধিত বিধানে। তবে আদালতে এ ধরনের প্রমাণ গ্রহণযোগ্য হতে হলে তার উৎস, সত্যতা এবং অখণ্ডতা যাচাই করা অপরিহার্য। সন্দেহ দেখা দিলে আদালত প্রয়োজনে ফরেনসিক পরীক্ষার নির্দেশ দিতে পারেন। এ ধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে অডিওর সম্পাদনা, ভয়েস শনাক্তকরণ এবং ডিজিটাল মেটাডাটা বিশ্লেষণ করা হয়, যা সাধারণত পরিচালনা করে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের ফরেনসিক ল্যাবরেটরি বা অন্যান্য স্বীকৃত পরীক্ষাগার। বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অভিযোগ ওঠার পর নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। এ ধরনের অভিযোগ তদন্তের এখতিয়ার রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের এবং পেশাগত শৃঙ্খলার প্রশ্নে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের।আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো ‘ন্যাচারাল জাস্টিস’ বা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার, যার অন্যতম উপাদান হলো—কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়ার আগে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যায্য সুযোগ দেয়া। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণ বিশ্লেষণ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অপরিহার্য। অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মান পুনরুদ্ধার করা যেমন জরুরি, তেমনই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণও অপরিহার্য। কারণ বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।কাজেই, এ ধরনের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন অভিযোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি বিচারপ্রক্রিয়ার নৈতিক ভিত্তি, পেশাগত আচরণবিধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে স্বচ্ছতা, সততা এবং আইনের শাসনের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি বজায় থাকে। ন্যায়বিচারের প্রকৃত শক্তি শুধু আদালতের রায়ে নয়—বরং সেই রায়ের প্রতি মানুষের অবিচল বিশ্বাসে নিহিত। আর সেই বিশ্বাস রক্ষা করা রাষ্ট্র, বিচারক, আইনজীবী, প্রসিকিউটর এবং বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব।[লেখক: আইনজীবী] 

রাজা গিয়ে রাজা আসে, রাষ্ট্রের নীরবতায় ঝাপসা হয় বিচার

শক্তিমান কবি আবুল হাসানের বই ‘রাজা যায় রাজা আসে।’ ভাবনার নকল নয়, সমর্থন জারি রেখে শিরোনাম করেছি—রাজা গিয়ে রাজা আসে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন বক্তব্য লোকমুখের কিংবদন্তি। এর উত্তম নমুনা নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচার ১৩ বছর ঠেকিয়ে রাখা।রাষ্ট্র বদলায়, সরকার বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়—এরপরও যদি অবিচার থাকে, সেই পরিবর্তনের মূল্য কী? প্রশ্নটি আজ আবার সামনে এসেছে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের তেরো বছর পূর্তিতে।২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সুধীজন পাঠাগারে যাওয়ার পথে বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে অপহৃত হয়েছিল এক মেধাবী কিশোর। দুই দিন পর, ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে পাওয়া যায় তার নিথর দেহ। সেই কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সমাজের সম্ভাবনা এবং একটি রাষ্ট্রের বিবেক—সবকিছুকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল সেই দিনে।তেরো বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এই হত্যার বিচার এখনও শুরুই হয়নি। এটি শুধু একটি মামলার বিলম্ব নয়—এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো—অপরাধ হলে বিচার হবে। কিন্তু যখন সেই বিচারই বছরের পর বছর আটকে থাকে, তখন মানুষের মনে ভয় জন্মায়— রাষ্ট্র কি সত্যিই তার নাগরিককে রক্ষা করতে সক্ষম?খুনের দায় খুনির। এটি একটি নৈতিক ও আইনি সত্য। কিন্তু বিচার নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার। এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ খুনের বিচার শুধু ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য নয়; এটি সমগ্র সমাজের নিরাপত্তার প্রশ্ন।ত্বকী হত্যাকাণ্ড সেই কারণেই আজ একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে—ক্ষমতার ছায়ায় আটকে থাকা ন্যায়বিচারের প্রতীক।ঘটনার পর তদন্তে একাধিকবার অগ্রগতির দাবি এসেছে। আবার সেই অগ্রগতি থেমেও গেছে রহস্যময়ভাবে। তদন্তে উঠে এসেছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, এসেছে হত্যার বিস্তারিত বিবরণ। মামলার আসামি সুলতান শওকত ভ্রমর এবং ইউসুফ হোসেন লিটন ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছিলেন লোমহর্ষক তথ্য—তৎকালীন প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের টর্চার সেলে আজমেরী ওসমানের উপস্থিতিতে গজারির লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এবং শ্বাসরোধ করে ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছিল।২০১৪ সালে র‌্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হাসান সংবাদ সম্মেলনে এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছিলেন। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো—তারপরও এক যুগের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও মামলার চার্জশিট আদালতে জমা পড়েনি। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত অচল হয়ে আছে।এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—রাষ্ট্র কি সত্যিই এই হত্যার বিচার করতে চায়? না কি ক্ষমতার প্রভাবের কাছে বিচার প্রক্রিয়া বারবার থেমে যায়?একসময় নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা প্রায় কিংবদন্তির মতো শোনা যেত। সেই প্রভাবের ছায়া কি এখনও বিচার প্রক্রিয়াকে আটকে রেখেছে? যদি তাই হয়, তবে এটি শুধু একটি পরিবারের অপরাধের প্রশ্ন নয়—এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতার নির্মম স্বীকারোক্তি।এখন আর শুধু ওসমান পরিবারের ওপর দায় চাপিয়ে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ তেরো বছর ধরে বিচার না হওয়া মানে রাষ্ট্র নিজেই একটি নীরব দায় বহন করছে।একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা দরকার—মৃত্যুর কোনো প্রতিস্থাপন নেই। কোনো ক্ষতিপূরণ, কোনো সান্ত¡না, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য—কিছুই একটি সন্তানের মৃত্যু পূরণ করতে পারে না। যে পরিবার সন্তান হারায়, তাদের জীবনে সেই শূন্যতা আজীবনের। সুতরাং ত্বকীর বাবা-মায়ের কাছে বিচারও হয়তো সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না।তবুও বিচার দরকার। কেন?কারণ বিচার মানে প্রতিশোধ নয়; বিচার মানে ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা। বিচার মানে এই বার্তা দেয়া—এই সমাজে অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে না। বিচার মানে রাষ্ট্র খুনির পক্ষে নয়, মানুষের পক্ষে।ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি সেই লড়াইটাই করে যাচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমাজ, সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি মাসের ৮ তারিখ মোমবাতি হাতে আলোকপ্রজ্ব¡লন কর্মসূচি যেন রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দেয়Ñ একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনও বাকি।এটি শুধু একটি পরিবারের শোকের অনুষ্ঠান নয়; এটি রাষ্ট্রের বিবেক জাগানোর চেষ্টা।এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বিচার চাওয়ার ‘অপরাধে’ ত্বকীর পরিবার ও আন্দোলনকারীদের ওপর নেমে এসেছে দমন-পীড়ন। সাতটি মিথ্যা মামলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হয়রানি, প্রাণনাশের হুমকি—এসবের মধ্য দিয়েও আন্দোলন থামেনি। বরং দেশের সীমানা পেরিয়ে ২৩টি দেশেও এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ হয়েছে।এই দৃশ্য বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের জন্য গৌরবের। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার।গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন—হয়তো এবার দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটবে। কিন্তু এখনও সেই আশার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রায় দেড় বছর পার করে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু ত্বকী হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এতে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—খুনিদের প্রভাব কি এখনও এতটাই শক্তিশালী যে, রাষ্ট্রও তাদের সামনে নীরব?যদি সেটিই সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি হবে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় বিচারিক ব্যর্থতা।আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বহু ঘটনায় দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তাহলে একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার কেন বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে? ন্যায়বিচারের প্রশ্ন কি এখনও ক্ষমতার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ?এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আদালতের কাগজে নেই; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন।সংবিধান কোনো সরকারকে নাগরিক হত্যার বিচার আটকে রাখার অধিকার দেয় না। আইনের শাসনের মৌলিক নীতি একটাই—অপরাধীর বিচার হতে হবে। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, সেই নীতির পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়।ত্বকী হত্যার তেরো বছর পর এসে তাই প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই হত্যার বিচার কি সত্যিই হবে? নাকি এটি বাংলাদেশের বিচারহীনতার দীর্ঘ তালিকায় আরেকটি নাম হয়ে থাকবে?রাষ্ট্রের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে—আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আর সেই পথের প্রথম পরীক্ষাগুলোর একটি ত্বকী হত্যার বিচার।কারণ শেষ পর্যন্ত সত্যই সরল। খুনের দায় খুনির।আর বিচারের দায় বিচার ব্যবস্থার।এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই।[লেখক : কবি ও সাংবাদিক] 

ডিগ্রির পাহাড় ও দক্ষতার মরুভূমি

একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্ন সাধারণত শুরু হয় সন্তানের হাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের আকাক্সক্ষা দিয়ে। বছরের পর বছর ধরে বাবা-মায়ের হাড়ভাঙা খাটুনি আর জমানো শেষ সম্বলটুকু বাজি রেখে সন্তানকে উচ্চশিক্ষার আঙিনায় পাঠানো হয় এই বিশ্বাসে যে, একটি ডিগ্রি মানেই হলো উন্নত জীবনের চাবিকাঠি। কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের দিকে তাকালে এক রূঢ় ও বিষণ্ন চিত্র ফুটে ওঠে। একদিকে রাজপথে হাজার হাজার স্নাতকের দীর্ঘশ্বাস, যারা পকেটে সিভির স্তূপ নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন; অন্যদিকে বড় বড় শিল্পপতি ও নিয়োগকর্তাদের আক্ষেপ যে, তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য যোগ্য ও দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছেন না।এই যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত বেকারের পাশে শূন্য পড়ে থাকা উচ্চপদস্থ চাকরির অবস্থানÑ একে অর্থনীতিবিদরা ‘স্কিল মিসম্যাচ’ বা দক্ষতার অসংগতি বলে অভিহিত করেন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিপুল পরিমাণ সনদ তৈরি করছে ঠিকই, কিন্তু সেই সনদগুলো যখন কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতায় পা রাখছে, তখন সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে অকেজো কাগজে পরিণত হচ্ছে। এই কাঠামোগত অসংগতি কেবল শিক্ষিত তরুণদের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বড় ধরনের অন্তরায়।বাংলাদেশের এই উন্নয়ন যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকটি হলো স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চ‚ড়ান্ত উত্তরণ। ১৯৭৫ সাল থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালে জাতিসংঘের নির্ধারিত তিনটি শর্ত মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানব সম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক সফলভাবে পূরণ করে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই উত্তরণ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডভ্যালু বাড়িয়ে দেবে, বৈদেশিক বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দেবে এবং ঋণের ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতা প্রমাণ করবে।তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটিও আমাদের অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা বা জিএসপি হারাব, ওষুধের মেধাস্বত্ব বা ট্রিপস চুক্তির বিশেষ ছাড় সংকুচিত হবে এবং সহজ শর্তের ঋণের পরিবর্তে আমাদের কঠিন শর্তে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থায়ন করতে হবে। এই পরিবর্তিত ও প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে আমাদের সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উচ্চতর উৎপাদনশীলতায় মনোনিবেশ করতে হবে। আর সেই উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করার একমাত্র হাতিয়ার হলো দক্ষ জনবল। এলডিসি উত্তরণের পক্ষে যেমন আমাদের মর্যাদা বৃদ্ধির যুক্তি রয়েছে, তেমনই বিপক্ষে রয়েছে বাণিজ্য সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাÑ যা মোকাবিলা করার জন্য আমাদের বর্তমানের ‘শিক্ষা-চাকরি সংযোগের ব্যর্থতা’ দূর করা এখন জাতীয় নিরাপত্তার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।আমাদের উচ্চশিক্ষার একটি বড় ট্র্যাজেডি হলো তাত্তি¡ক জ্ঞানের ওপর অত্যধিক নির্ভরতা। শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর ধরে ক্লাসরুমে গাদা গাদা বই মুখস্থ করছে এবং পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়নে জিপিএ-৫ পাওয়ার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হচ্ছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় সফট স্কিল যেমনÑ দলগত কাজ, কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা, সৃজনশীল সমস্যা সমাধান এবং অভিযোজন ক্ষমতা শেখার কোনো সুযোগ তারা পাচ্ছে না। একজন শিক্ষার্থী চার বছর একটি বিষয়ে স্নাতক শেষ করার পরেও যখন দেখা যায় সে একটি সাধারণ পেশাদার ইমেইল লিখতে পারছে না কিংবা মাইক্রোসফট এক্সেলের প্রাথমিক কাজগুলো করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন বুঝতে হবে আমাদের শিক্ষাক্রমের গোড়াতেই গলদ রয়ে গেছে। এই তত্ত¡সর্বস্ব শিক্ষা তরুণদের মনে এক ধরনের কৃত্রিম আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, যা চাকরির বাজারের প্রথম ইন্টারভিউতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ফলে ডিগ্রি অর্জনের আনন্দ দ্রæতই বেকারত্বের বিষাদে রূপ নেয়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প খাতের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব। উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরাসরি গবেষণাগার হিসেবে কাজ করে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য। সেখানে কারিকুলাম তৈরি করা হয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী। কিন্তু বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে এই সেতুবন্ধনটি এখনও অত্যন্ত দুর্বল। নিয়োগকর্তারা কী ধরনের কর্মী চান আর শিক্ষকরা কী পড়াচ্ছেন এই দুইয়ের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই বললেই চলে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিশ্ববাজারে যে প্রযুক্তির চাহিদা দশ বছর আগে শেষ হয়ে গেছে, আমাদের পাঠ্যবইয়ে এখনও সেই পুরনো প্রযুক্তিই পড়ানো হচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশন বা শিল্প-শিক্ষা সংযোগ না থাকার ফলে শিক্ষার্থীরা তাত্তি¡কভাবে শক্তিশালী হলেও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে পুরোপুরি আনাড়ি থেকে যাচ্ছে। ইন্টার্নশিপ বা হাতে-কলমে শিক্ষার সুযোগগুলো এখনও কেবল কিছু মুষ্টিমেয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যা দেশের বৃহত্তর স্নাতক জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ধরনের বঞ্চনা।চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আমাদের শ্রমবাজারকে আমূল বদলে দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স এবং অটোমেশন এখন কোনো শৌখিন শব্দ নয়, বরং এগুলো এখন পেশাদার জীবনের অপরিহার্য অংশ। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের উচ্চশিক্ষার একটি বড় অংশ এখনও এই নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। নিয়োগকর্তারা এখন আর কেবল সনদের নাম দেখেন না, তারা দেখেন প্রার্থীর ডিজিটাল লিটারেসি বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। যে শিক্ষার্থী দ্রæত পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না, তার জন্য এখনকার বৈশ্বিক বাজারে কোনো জায়গা নেই। কিন্তু আমাদের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও পুরনো শিক্ষাদান পদ্ধতি আঁকড়ে ধরে আছে এবং নতুন যুগের কারিগরি দক্ষতাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে অনীহা দেখাচ্ছে। এই স্থবিরতা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কয়েক ধাপ পিছিয়ে দিচ্ছে।সামাজিকভাবে আমাদের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি অবজ্ঞা। আমাদের সমাজে একজন সাধারণ স্নাতক ডিগ্রিকে যতটা সম্মানের চোখে দেখা হয়, একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান বা মেকানিককে ততটা মূল্যায়ন করা হয় না। এই ভ্রান্ত মানসিকতার কারণে মেধা ও আগ্রহ থাকা সত্তে¡ও অনেক তরুণ কারিগরি শিক্ষার পরিবর্তে তথাকথিত সাধারণ ডিগ্রির পেছনে ছুটছে। এর ফলে বাজারে বিএ বা এমএ পাস করা বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অথচ দক্ষ প্লাম্বার, এসি টেকনিশিয়ান বা আধুনিক মেশিন অপারেটরের জন্য আমাদের বিদেশিদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। এই সামাজিক কলঙ্ক বা স্টিগমা দূর করা না গেলে শ্রমবাজারের ভারসাম্য কখনই ফিরবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতির উন্নয়নের জন্য কেবল পিএইচডিধারী গবেষক প্রয়োজন নেই, তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন একঝাঁক দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন পেশাদার।এই দক্ষতার ঘাটতি কেবল ব্যক্তিগত বেকারত্ব বাড়াচ্ছে না, বরং আমাদের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাকেও কমিয়ে দিচ্ছে। যখন একটি কোম্পানি উপযুক্ত কর্মী পায় না, তখন তারা হয় উচ্চ বেতনে বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেয় অথবা তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়। উভয় ক্ষেত্রেই দেশের টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে অথবা জাতীয় প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ যখন তার তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে অন্য খাতগুলোতে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে, তখন এই স্কিল মিসম্যাচ একটি বড় দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং হালকা প্রকৌশল শিল্পের বিকাশের জন্য যে ধরনের বিশেষায়িত জ্ঞান প্রয়োজন, তা আমাদের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে আমরা সস্তা শ্রমের বৃত্তে আটকে আছি, যা এলডিসি-পরবর্তী সময়ে আমাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্রমবর্ধমান এই বেকারত্ব এক ধরনের সামাজিক অস্থিরতারও জন্ম দিচ্ছে। যখন একজন যুবক তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো পড়ালেখায় ব্যয় করে শূন্য হাতে ঘরে ফেরে, তখন তার মধ্যে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি এক ধরনের চরম অনীহা ও হতাশা তৈরি হয়। এই হতাশা থেকেই অনেক সময় মাদকাসক্তি বা অনৈতিক কর্মকাÐের পথে পা বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দেয়। মেধাবী তরুণদের এই অপচয় একটি দেশের জন্য বিশাল অপূরণীয় ক্ষতি। বর্তমান এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের সময়টিকে যদি আমরা সঠিক দক্ষতায় রূপান্তর করতে না পারি, তবে এই লভ্যাংশ অচিরেই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিজাস্টার’ বা জনমিতিক বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্যকে কেবল জ্ঞান আহরণ নয়, বরং কর্মমুখী যোগ্যতায় রূপান্তরিত করতে হবে।এই সংকট উত্তরণের জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শক্তিশালী ক্যারিয়ার গাইডেন্স এবং প্লেসমেন্ট সেল থাকতে হবেÑ যা সরাসরি শিল্প খাতের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। পাঠ্যক্রমে তাত্তি¡ক জ্ঞানের পাশাপাশি অন্তত ছয় মাসের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ বা প্রজেক্টভিত্তিক কাজ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারিগরি শিক্ষাকে সামাজিকভাবে জনপ্রিয় করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে এবং কারিগরি শিক্ষার সুযোগ গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কেবল মগজের উন্নয়ন নয়, এটি হাতের কাজের উন্নয়নও বটে। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং রিফ্রেশার কোর্সের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত রাখতে হবে যাতে তারা শিক্ষার্থীদের সঠিক দিশা দিতে পারেন। শিল্প খাতের নেতাদেরও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। নিয়োগকর্তাদের উচিত হবে কেবল অভিজ্ঞ কর্মী না খুঁজে নবীন স্নাতকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তোলার মানসিকতা রাখা। প্রতিটি বড় প্রতিষ্ঠানে লার্নিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থাকা উচিতÑ যা নতুন কর্মীদের আধুনিক দক্ষতায় ঝালিয়ে নেবে। সরকার নীতিগত প্রণোদনার মাধ্যমে সেই সব প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করতে পারে যারা ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া পার্টনারশিপে সক্রিয় ভ‚মিকা রাখছে। আমাদের তরুণরা মেধাবী, কেবল প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা এবং সুযোগের। শিক্ষা আর কর্মসংস্থানের মাঝখানের এই সাঁকোটি যদি আমরা মজবুত করতে পারি, তবেই ২০২৬ পরবর্তী উন্নয়নশীল বাংলাদেশ তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।শিক্ষা হওয়া উচিত মুক্তির আনন্দ, বোঝার বোঝা নয়। একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হবে, তখন তার হাতে কেবল একটি কাগজ নয় বরং একটি নিশ্চিত আত্মবিশ্বাস থাকা উচিত যে, সে তার মেধা দিয়ে যেকোনো কর্মক্ষেত্রে নিজের জায়গা করে নিতে পারবে। আমাদের জাতীয় আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন তখনই সার্থক হবে যখন আমাদের ডিগ্রির পাহাড় দক্ষতার মরুভ‚মিতে হারিয়ে যাবে না, বরং প্রতিটি সনদ একেকটি দক্ষ হাতের শক্তিতে রূপান্তরিত হবে। এলডিসি উত্তরণের এই ক্রান্তিকালে আমাদের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং স্মার্ট কর্মসংস্থান। তবেই আমরা বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।[লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

বারুদের বাজারে শান্তির সেল

পৃথিবী যেন আবার এক পুরনো শব্দের কাছে ফিরে গেছে; বিস্ফোরণ। আকাশে ধোঁয়ার রেখা, সংবাদে জরুরি ব্রেকিং, আর কূটনীতির ভাষায় ন্যস্ত সতর্কবার্তা। ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- এই ত্রিমুখী সমীকরণে উত্তাপ শুধু সীমান্তের নয়; তা আমাদের মানসিক আবহাওয়াকেও দগ্ধ করছে। প্রতিটি পক্ষই নিজেদের যুক্তি তুলে ধরছে; নিরাপত্তা, প্রতিরোধ, ভারসাম্য। তিন ভাষ্য, কিন্তু বারুদের গন্ধ একটাই। গোলাপ ফোটে না; ফোটে কেবল শোকসংবাদ।যুদ্ধের নিজস্ব নন্দনতত্তব আছে ভয়াবহ অথচ আকর্ষণীয়। মানচিত্রে তীরচিহ্ন, বিশ্লেষণে কৌশল, টেলিভিশনের পর্দায় চলমান গ্রাফিক্স সব মিলিয়ে যেন সমকালীন নাট্যমঞ্চ। আগুনের রঙ উজ্জ্বল, ধোঁয়ার ছায়া ঘন। কিন্তু মঞ্চের আলোর বাইরে অন্ধকার; ভাঙা ঘর, আতঙ্কিত শিশু, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ইতিহাস শিখিয়েছে অস্ত্রের ঝলকানি যতই চোখ ধাঁধাক, শান্তির আলো ততই ক্ষীণ।ইসরায়েলের নিরাপত্তা-চিন্তা তার ভূগোলের ভেতরেই নিহিত; চারপাশে সন্দেহ, অতীতের স্মৃতি, ভবিষ্যতের আশঙ্কা। যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়। ইরান তার সার্বভৌম অবস্থান ও আঞ্চলিক প্রভাবকে আত্মমর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে দেখে। এই ভিন্ন বোধের সংঘাতে তৈরি হয়েছে অবিশ্বাসের ঘূর্ণিঝড়। প্রত্যেকেই নিজেকে রক্ষাকর্তা ভাবছে; কিন্তু রক্ষার নামে যে আগুন জ্বলে, তা প্রায়ই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।যুদ্ধের অর্থনীতি আরেকটি নীরব বাস্তবতা। প্রতিটি উত্তেজনায় জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, শেয়ারবাজারে প্রতিক্রিয়া, প্রতিরক্ষা বাজেটে নতুন বরাদ্দ। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো এক প্রান্তে বিস্ফোরণ ঘটলে তার প্রতিধ্বনি দূরদেশের বাজারে শোনা যায়। উন্নয়নশীল অর্থনীতির কাঠামো কেঁপে ওঠে। ক্ষেপণাস্ত্র কেবল স্থাপনা ধ্বংস করে না; তা অদৃশ্যভাবে বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।দক্ষিণ এশিয়ার পাহাড়ি সীমান্তেও উদ্বেগের ছায়া। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা স্মরণ করিয়ে দেয় সন্দেহের রাজনীতি সর্বত্র একই রকম। সীমান্তরেখা কখনও কেবল মানচিত্রে নয়, মানুষের মনে আঁকা হয়। পারস্পরিক আস্থা ক্ষয়ে গেলে ভয় কাঁটাতারের চেয়েও তীক্ষè। সেই ভয়ই সংঘাতের ভাষাকে উসকে দেয়।যুদ্ধের ভাষা সহজ, শান্তির ভাষা কঠিন। যুদ্ধ তাৎক্ষণিক দৃশ্যমানতা দেয়- শক্তির প্রদর্শন, দৃঢ়তার ঘোষণা। শান্তি চায় ধৈর্য, সংলাপ, আপস। আপস রাজনৈতিক অভিধানে প্রায়ই দুর্বলতার সমার্থক। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- সর্বশ্রেষ্ঠ স্থিতিশীলতা আলোচনার টেবিল থেকে এসেছে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নয়।আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দ্বৈততা স্পষ্ট। একদিকে সামরিক প্রস্তুতি, অন্যদিকে ক‚টনৈতিক আহ্বান। বিবৃতিতে শোনা যায়- ‘উত্তেজনা প্রশমন জরুরি।’ কিন্তু উত্তেজনা অস্ত্রের মাধ্যমে প্রকাশ পেলে প্রশমন জটিল হয়। আস্থা একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করতে সময় লাগে; ক্ষেপণাস্ত্রের গতির চেয়ে বহু গুণ বেশি সময়।মানবিক মূল্য সবচেয়ে উচ্চ। সীমান্তবর্তী মানুষ প্রতিদিন অনিশ্চয়তার ভেতর বাস করে। শিক্ষা ব্যাহত, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দুর্বল, জীবিকা অনিশ্চিত। শরণার্থী শিশুটি জানে না ভ‚রাজনীতির মানচিত্র, কিন্তু জানে ক্ষুধা ও ভয়। কোনো পক্ষই ন্যায়বান নয়; কেবল আকাশের শব্দ ভীতিকর।‘বারুদের বাজারে শান্তির সেল’ এই রূপক আমাদের সময়ের বৈপরীত্যকে স্পষ্ট করে। আমরা নিরাপত্তা চাই, কিন্তু সেই নিরাপত্তা অর্জনের পথ হিসেবে বেছে নিই শক্তির প্রদর্শন। আমরা স্থিতিশীলতা চাই, কিন্তু স্থিতির ভিত্তি হিসেবে আস্থাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিই না। ফলে সংঘাতের চক্র ঘুরতেই থাকে।বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন সংযম ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি। পারমাণবিক ও সামরিক ইস্যুতে স্বচ্ছতা, আঞ্চলিক সংলাপের পুনরুজ্জীবন, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলাÑ এসবই উত্তেজনা প্রশমনের অপরিহার্য শর্ত। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যকর ভ‚মিকা এবং মধ্যস্থতার উদ্যোগ সময়ের দাবি।শেষ প্রশ্নটি নৈতিক। শক্তির প্রদর্শন কি সত্যিই নিরাপত্তা দেয়, না কি নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়? ইতিহাস বলছে, যুদ্ধের প্রতিটি অধ্যায় শেষে মানুষই শান্তির পথ খুঁজেছে। আগুন দীর্ঘস্থায়ী নয়; ছাই দীর্ঘস্থায়ী। সেই ছাই থেকে ভবিষ্যৎ নির্মাণ কঠিন।বিশ্ব এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অগ্নিকুণ্ডকে আরও প্রজ্বলিত করা সহজ; নিবিয়ে ফেলা কঠিন। তবু মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রা প্রমাণ করে- কঠিন পথই টেকসই। বারুদের বাজারে যদি কোনো সেল দিতে হয়, তা হোক অবিশ্বাসের ওপর; কম দামে বিক্রি হোক অহংকার, বিনামূল্যে বিতরণ হোক সংলাপ। শান্তির বিকল্প নেই- এ সত্য যত দ্রæত উপলব্ধি করা যাবে, ততই আগুনের বদলে আলোয় ভরবে বিশ্বমঞ্চ।[লেখক : সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

ধূমপান ছাড়ার জন্য উপযুক্ত সময়

যারা ধূমপান বা তামাক পাতা, জর্দ্দা গ্রহণ করেন তারা এর ক্ষতিকর দিক চিন্তা করে ছেড়ে দেয়ার কথা সবসময়ই ভাবেন, তবে কোন সময়টা তাদের জন্য উপযুক্ত সময়, সেটা খুঁজে পান না। এদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বলা যায়, পবিত্র এই রমজান মাসে ধূমপান বা তামাক পাতা, জর্দ্দা ছেড়ে দেয়ার উপযুক্ত সময়। একটা মানুষ যখন সারা দিন কোনো কিছু না খেয়ে থাকতে পারেন এবং দিনের এই দীর্ঘ প্রায় ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকতে পারেন এবং সেই সময়ে সিগারেট জর্দ্দা, পান কোনো কিছুই না খেয়ে থাকতে পারেনÑ তারা কেন জীবনের বাকি সময়ের জন্য ধূমপান বা তামাক ছাড়তে পারবেন না? এটাতো সম্পূর্ণভাবে একজন মানুষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। তাছাড়া রমজান মাসটা হচ্ছে সংযমের মাস, এই সময়ে মানুষ অনেক সংযমী হয় এবং সারাটা দিন একটি নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে ধর্মীয় নিয়মনীতির সঙ্গে চলতে হয়।তামাক বা ধূমপান কোনো খাদ্যতালিকার মধ্যে পড়ে না। এটি এক ধরনের নেশা। বহুকাল থেকে এদেশে এই তামাকের ব্যবহার দুই ভাবেই মানুষ গ্রহণ করে আসছে, একটি হচ্ছে ধোঁয়াহীন তামাক বা জর্দা আর একটি হচ্ছে ধোঁয়াযুক্ত তামাক বা সিগারেট, চুরুট ইত্যাদি। বিজ্ঞানের গবেষণায় এই দুই ধরনের তামাকই দেহের জন্য ক্ষতিকর। তামাক এবং বিড়ি- সিগারেটের ধোঁয়ায় ৭০০০-এর বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে; যার মধ্যে ৭০টি রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টিতে সক্ষম। এর মধ্যে নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, বেনজোপাইরিন, ফরমালডিহাইড, অ্যামোনিয়া, পোলোনিয়াম ২১০ উল্লেখযোগ্য। সব মৃত্যুর ৬৩ শতাংশ অসংক্রামক রোগ এবং তার মধ্যে একমাত্র দায়ী হচ্ছে তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য। বিশ্বব্যাপী তামাক গ্রহণ মৃত্যুর প্রতিরোধমূলক একমাত্র কারণ হিসেবে বিবেচিত এবং প্রতি দশ জনে একজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে সরাসরি দায়ী।ধূমপান বা তামাক পাতা যারা ব্যবহার করেন তারা জানেন এর ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে। এক কথায় বলতে গেলে মাথার চুল থেকে পায়ের নখ ও আমাদের দেহের সব অঙ্গ-প্রতঙ্গ তামাকের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন- মাথার চুল পড়া, দৃষ্টিশক্তি নষ্ট, মুখের ক্যানসার, গলার ক্যানসার, ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, পাকস্থলির ক্যানসার, স্তন ক্যানসার, যৌনশক্তি নাশ, গর্ভপাত, মৃতশিশু জন্ম, পায়ের পচনশীল রোগ, গ্যাংগ্রিন রোগে পা কেটে ফেলা ইত্যাদি। এই ধূমপান যে শুধু ধূমপায়ীকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা নয়, একজন পাশে থাকা অধূমপায়ীকে সমানভাবে রোগাক্রান্ত করছে।যারা পানের সঙ্গে জর্দ্দা খান এবং নিয়মিত অনেকবার পান খান তাদের মুখের ঘা বেশি হয় এবং লক্ষ্য করা গেছে অনেকেই তামাক পাতাকে হাতের মধ্যে নিয়ে চুনের সঙ্গে মিশিয়ে গালের মধ্যবর্তী স্থানে রাখেন, তাতে দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ওই স্থানে ঘা হতে পারে। শুধু ঘা নয়, পরবর্তীতে এই ঘা ক্যানসারেও রূপ নিতে পারে। শুধু বাংলাদেশেই নয় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে যেখানে তামাক পাতা নেশার মতো ব্যবহৃত হয়, সে সমস্ত অঞ্চলেও মুখের ক্যানসার রোগীর সংখ্যা অন্যান্য এলাকার চাইতে বেশি। বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির তথ্যানুযায়ী এবং ডায়াবেটিস সমিতির বারডেম হাসপাতালে ডেন্টাল বিভাগের দুটি জরিপে দেখা যায় যে, যারা নিয়মিত ধূমপান করেন এবং তামাক পাতা, জর্দ্দা দিয়ে পান খান অথবা তামাক পাতা গালের মধ্যে রেখে ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে মুখের ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ যারা জর্দ্দা খান বা তামাক পাতা খান তাদের রিস্কফ্যাক্টর বা ঝুঁকি হতে পারে ৬০ ভাগ এবং যারা ধূমপান করেন এবং সেই সঙ্গে তামাক পাতা ও পানের সঙ্গে গ্রহণ করেন তাদের ঝুঁকি শতকরা ৮০ ভাগ। সুতরাং যাদের মুখের ঘা রয়েছে এবং এই সমস্ত অভ্যাস ছাড়তে পেরেছেন তাদের মুখের ঘা থেকে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ১০০ ভাগ নিশ্চিতভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। তবে মনে রাখবেন, যদি মুখের মধ্যে এই সমস্ত ঘা লক্ষ্য করেন এবং চিকিৎসার পরও দুসপ্তাহ থেকে তিন সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে অবশ্যই বায়োপসি অথবা মাংসের টিস্যু পরীক্ষা করে দেখতে হবে, কারণ মুখের এই সমস্ত অনেক ঘা বা সাদা ক্ষতগুলোকে বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন প্রি-ক্যানসার লিশন বা ক্যানসারের পূর্বাবস্থার ক্ষত। সংক্ষেপে বলতে হয় যাদের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, রিউমাটিক ডিজিজ ও পরিপাকতন্ত্রের রোগ রয়েছে এবং যারা দীর্ঘদিন নিয়মিতভাবে ওষুধ গ্রহণ করছেন, যারা কৃত্রিম দাঁত ব্যবহার করেন, যারা ধূমপান করেন বা তামাক পাতা বা জর্দ্দা, গুল গ্রহণ করেন তারা অবশ্যই দাঁত ও মুখের যতœ নেবেন এবং এই সমস্ত ঘা দেখা দেয়া মাত্রই চিকিৎসার ব্যবস্থা নেবেন। যারা ধূমপান করেন বা তামাক পাতা, জর্দ্দা খান তাদের যেহেতু মুখের ক্যানসার হওয়া সম্ভাবনা বা ঝুঁকি ৮০ ভাগ, সেহেতু মুখের ঘা বা ক্যানসার প্রতিরোধে ধূমপান ও সেই সঙ্গে তামাক পাতা বা জর্দ্দা গ্রহণ বন্ধ করা প্রয়োজন।সুতারং, এই রমজান মাসেই যদি সিগারেট বা জর্দ্দা না খেয়ে তারা থাকতে পারেন তবে বছরের বাকিটা সময় থাকতে পারা যাবে না কেন? অতএব এই সময়ে যদি রোজা রাখার আগেই বা রোজা রাখার সময় থেকেই একজন ধূমপায়ী প্রতিজ্ঞা করেন যে, আমি এই পবিত্র এই রমজান মাসে যেহেতু রোজা রাখব, নামাজ পড়ব, সংযমী হবÑ সেহেতু আমি এই সময় থেকেই আমার এই বদঅভ্যাসটিকে বা নেশাকেও পরিত্যাগ করব। এবং এই দৃঢ় সিদ্ধান্ত থেকেই একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি এই ধরনের বদঅভ্যাস বা নেশা থেকে মুক্ত হতে পারেন।সুতরাং, এই রমজান মাস থেকেই শুরু হোক তামাক বর্জন।[লেখক: অনারারি সিনিয়র কনসালটেন্ট, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল]

ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবায় নজর দিন

জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র চার বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ১৯৮০ সালে নির্মিত এই কেন্দ্রটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা সেবার গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে, দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। ভবনটি অনেক আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ফলে কর্তৃপক্ষ এটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। এরপর থেকে সেবা স্থানান্তরিত হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের একটি কক্ষে। সেখানে শুধু একজন ফার্মাসিস্টের মাধ্যমে সীমিত সেবা দেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে সংবাদে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র পরিত্যক্ত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা চরম অসুবিধার মুখোমুখি হচ্ছেন। আগে চিকিৎসক, নারী পরিদর্শিকাসহ পূর্ণাঙ্গ স্টাফের উপস্থিতিতে প্রাথমিক চিকিৎসা, পরামর্শ ও জরুরি সেবা পাওয়া যেত। এখন সেটা থেকে স্থানীয়রা বঞ্ছিত হচ্ছেন। অনেককে স্বাস্থ্যসেবা নিতে দূরের উপজেলা হাসপাতালে যেতে হয়। গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য এ অবস্থা বিশেষ করে কষ্টদায়ক। স্বাস্থ্যসেবার অভাবে প্রাথমিক চিকিৎসায় বিলম্ব ঘটছে, যা সংশ্লিষ্ট মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে।উক্ত কেন্দ্রে পরিত্যক্ত অবস্থা দেখে ধারণা করা যায় যে, গ্রামীণ স্বাস্থ্য অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে যথাযথ মনোযোগের অভাব রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অবহেলায় ছোটখাটো সমস্যা বড় আকার ধারণ করে। ফলে স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রের বিনিয়োগের সুফল থেকে জনগণ বঞ্চিত হয়। স্থানীয়রা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দ্রæত পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। আমরা আশা করব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে দ্রæত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। কেবল আশ^াস দিয়ে দায়িত্ব সারলে চলবে না, আশ্বাস যেন দ্রæত বাস্তবে রূপ নেয় সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।আমরা মনে করি, মোহাম্মদপুরের এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে অন্যান্য এলাকায়ও একই ধরনের সমস্যা এড়ানো সম্ভব। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে নিয়মিত পরিদর্শন করা প্রয়োজন। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র সময়মতো সংস্কার করা দরকার।

গবাদি পশুর ভ্যাকসিনে বাড়তি টাকা নেয়ার অভিযোগ সুরাহা করুন

ভোলার চরফ্যাশনে গবাদিপশুর ভ্যাকসিন বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের কয়েকজন উপসহকারী কর্মকর্তা ও অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাড়তি দামে ভ্যাকসিন বিক্রির অভিযোগ করেছেন খামারিরা। হাঁস-মুরগির ভ্যাকসিনের সরকার নির্ধারিত মূল্য ২৫ টাকার পরিবর্তে ৩০ টাকা নেয়া হচ্ছে। গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজের ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও প্রতি ডোজে অতিরিক্ত টাকা নেয়ার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।এ ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে বলে সেবাগ্রহীতাদের দাবি। সরকারি ভ্যাকসিনের উদ্দেশ্যই হলো কম খরচে রোগ প্রতিরোধ করে খামারিদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং পশুসম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু নির্ধারিত দামের বাইরে অর্থ নেয়া হলে সেই লক্ষ্য ব্যাহত হয়। অভিযুক্তদের একটি যুক্তি হলো, কিছু ভ্যাকসিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এমনটা করা হয়। তবে এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারি নিয়ম অনুসারে ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ও বিতরণের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। নষ্ট হওয়ার ক্ষতি ব্যক্তিগতভাবে সেবাগ্রহীতার ওপর চাপানো যায় না। এছাড়া ভ্যাকসিন বাড়িতে রেখে বিক্রি করা এবং অফিসে পর্যাপ্ত ফ্রিজ থাকা সত্তে¡ও তা না ব্যবহার করার বিষয়টিও সংশয় সৃষ্টি করে।উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাও অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিভাগীয় শাস্তির কথা বলেছেন। আমরা বলব, এ প্রতিশ্রæতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা দরকার।সরকারি ভ্যাকসিন বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ভ্যাকসিনের মূল্য তালিকা স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং করা জরুরি। যে কোনো অভিযোগের দ্রæত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা জোরদার করা উচিত। এতে খামারিরা সঠিক মূল্যে সেবা পাবেন এবং পশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হবে।

২০৯ বল হাতে রেখেই পাকিস্তানকে উড়িয়ে দিলো বাংলাদেশ

মিরপুরের আকাশে তখনও সন্ধ্যা নামেনি, কিন্তু শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের ডুবে গিয়েছিল পাকিস্তান দলের সূর্য । বাংলাদেশ টস জিতে প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, আর সেখান থেকেই যেন ম্যাচের গতি বদলে যেতে শুরু করে।​পাকিস্তান নামে নতুন মুখে ঠাশা ১১ জনের দল নিয়ে , নেতৃত্বে শাহিন শাহ আফ্রিদি। কাগজে কলমে সেটি ছিল সম্ভাবনাময় একটি দল, কিন্তু মাঠের গল্প খুব দ্রুত অন্যদিকে মোড় নেয়।​শুরুর কয়েক ওভারেই বোঝা যায়, বাংলাদেশ শুধু ম্যাচ খেলতে নামেনি, চাপ তৈরি করতে নেমেছে। প্রতিটি বল, প্রতিটি লাইন, প্রতিটি লেংথ পাকিস্তানের ব্যাটারদের ক্রমশ অস্বস্তির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছিল। রান আসে ধীরে, আর উইকেট পড়তে থাকে এমন দ্রুত লয়ে, যা পাকিস্তানকে ম্যাচে আর স্থির হতে দেয়নি।একসময় স্কোরবোর্ডই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চাপ। পাকিস্তান থেমে যায় মাত্র ১১৪ রানে, ফলে বাংলাদেশের সামনে দাঁড়ায় ছোট কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষ্য।কিন্তু ক্রিকেটে ছোট লক্ষ্যও অনেক সময় ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। সেখানেই ছিল আসল পরীক্ষা। বাংলাদেশ কি শান্ত থাকবে, নাকি অযথা তাড়াহুড়োয় ম্যাচ জটিল করবে সেটিই ছিল বড় প্রশ্ন ?সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিম ক্রিজে নেমে হিসেবি ভঙ্গিতে খেলা শুরু করেন । অযথা ঝুঁকি নয়, অস্থিরতা নয় শুধু নিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস এবং ম্যাচকে নিজের দিকে টেনে নেওয়ার পরিণত মানসিকতা।​তারপর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই ম্যাচে আর কোনো নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের জায়গা নেই। বাংলাদেশ শুধু জয়ের দিকে এগোয়নি, এগিয়েছে কর্তৃত্ব নিয়ে, ছন্দ নিয়ে, এক ধরনের নির্মম নিশ্চয়তা নিয়ে।আর শেষ পর্যন্ত আসে সেই মুহূর্ত বাংলাদেশের অভাবনীয় জয়, তাও ২০৯ বল হাতে রেখে। এটি শুধু একটি জয় নয়, এটি ছিল প্রতিপক্ষকে শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রণে রেখে, শেষে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়ার এক পরিপূর্ণ প্রদর্শনী।আজকের মিরপুরে শুধু স্কোরলাইন লেখা হয়নি লেখা হয়েছে একটি বার্তা। বাংলাদেশ যখন ছন্দে থাকে, তখন তারা শুধু জেতে না,  প্রতিপক্ষকে অনুভব করিয়ে দেয় যে এই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত, শুধুই টাইগারদের হাতে ।  

২০৯ বল  হাতে রেখেই পাকিস্তানকে উড়িয়ে দিলো বাংলাদেশ
১২ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাঝে চলমান ODI সিরিজে কে জিতবে ?

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাঝে চলমান ODI সিরিজে কে জিতবে ?

  বাংলাদেশ
  পাকিস্তান
  মন্তব্য করা কঠিন
মোট ভোটদাতাঃ জন