সংবাদ
কাকে দিয়ে হাদিকে হত্যা করা হয়েছে আমি জানি: মমতা

কাকে দিয়ে হাদিকে হত্যা করা হয়েছে আমি জানি: মমতা

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভার নির্বাচনে পরাজয়ের প্রায় এক মাস পর মঙ্গলবার (২ জুন) প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েই এমন মন্তব্য করেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলায় আয়োজিত কর্মসূচি ধর্ণা মঞ্চে বক্তব্য দিতে গিয়ে মমতা হাদির হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল? আজকের সরকার পরিবর্তন হলেও আমি সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা কথার ভান্ডার। তথ্য ভান্ডার।’সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ভিত্তিতে বিবিসি বাংলা এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে মমতার দাবির বিষয়টি উঠে এসেছে। মমতা দাবি করে বলেছেন, রাজ্য পুলিশের এসটিএফ হাদি হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোন পান মমতা। তাকে বলা হয়, এই বিষয়টি যেন বাইরে না জানানো হয়।ভোট-পরবর্তী অশান্তি, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ, নিট পরীক্ষার জালিয়াতি ও বিজেপি সরকারের প্রতিহিংসামূলক আচরণের প্রতিবাদে ওয়াই চ্যানেলে ধরনা কর্মসূচিতে মমতা এসব দাবি করেন।মমতা হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনিকে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল, যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন হয়।’মমতা বলেন, ‘অন্য দেশের কথা আমি বলছি না। আমার অধিকারও নেই বলার। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাই তা হলো- ওই হত্যাকারীরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে। বাংলায় আসার পর আমাদের এসটিএফ তাদের ধরে। এইটা তাদের কৃতিত্ব। ’সেই ঘটনার পরের বিষয় তুলে ধরে মমতা বলেন, ‘তারপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, আপনি রাজ্য পুলিশকে জানিয়ে দিন এটা যেন বাইরে না যায়। কারণ এটা দেশের ব্যাপার।’এতদিন ধরে কেন বিষয়টা গোপন রেখেছিলেন তৃণমূল নেত্রী তা উল্লেখ করে বলেন, ‘এতদিন আমি বলিনি। কিন্তু আজকে অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছে বলে আমাকে মুখ খুলতে হয়েছে। আমি সেই নামটা বলতে চাইছি না, বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে। আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি। দেশের স্বার্থে ওই নাম আমি বলবো না।’ ধর্ণা কর্মসূচি শুরু করার আগে মমতা বন্দোপাধ্যায় রেড রোডে অবস্থিত ভারতীয় সংবিধানের রচয়িতা বি আর আম্বেদকর ও জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানান। এরপর সেখান থেকে চলে আসেন ওয়াই চ্যানেলে। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করে দলের নেতাকর্মীদের সমাবেশে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হলেও বিধায়ক ও সাংসদদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি।উল্লেখ্য, চলতি বছরেরই মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বাংলাদেশে ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে দুই মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে। তাদের নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং আলমগীর হোসেন।অভিযুক্তরা মেঘালয় হয়ে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকেছিল বলে জানিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। এর পরে অভিযুক্ত ফিলিপ সাংমা নামে একজনকে নদিয়ার শান্তিপুরের কাছ থেকে গ্রেপ্তার করে এসটিএফ।এর আগে ফয়সাল করিম মাসুদকে শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজ শেষে ফেরার পথে আনুমানিক দুপুর ২টা ২০ মিনিটে পল্টন থানার বক্স কালভার্ট রোডে দুষ্কৃতকারীরা ওসমান হাদিকে গুলি করে পালিয়ে যায়।ঘটনার দুদিন পর ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। আহত ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পরে ২০ ডিসেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা (হত্যা) সংযোজনের আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্দিক আজাদ।চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি ১৭ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের(ডিবি) পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ। ডিবির দাখিল করা চার্জশিটে মোট ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। যাদের মধ্যে ১১ জন বর্তমানে কারাগারে এবং বাকি ৬ জন পলাতক রয়েছেন।মামলার পলাতক আসামিরা হলেন- প্রধান শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ, তার সহযোগী আলমগীর হোসেন, রাজধানী মিরপুরের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, ফিলিপ স্মাল পিলিপস, মুক্তি আক্তার ও ফয়সালের বোন জেসমিন আক্তার।অন্যদিকে, কারাগারে আটক থাকা আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা মো. হুমায়ুন কবির, মা মোসা. হাসি বেগম, স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা এবং শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু।
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

তোফায়েল আহমেদ: হারিয়ে যাবেন না

একজন অসাধারণ বাগ্মী, মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে উঠে আসা বিরলপ্রজ রাজনীতিক, জাতীয় নেতা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তোফায়েল আহমেদ বেঁচে থাকবেন। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, ইতিহাসের উত্থান-পতন ও নানা বাঁক বদলে একজন নেতা হিসেবে তিনি কখনো বিস্মৃতির অতল অন্ধকারে হারিয়ে যাবেন না।সরকারি চাকরির সুবাদে তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখেছিলাম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বকালীন তাঁর সঙ্গে মোট সাড়ে তিনবছর কাজ করেছি। তখনই তাঁর সান্নিধ্যে যাবার এক অপার সুযোগ আসে। স্মার্ট, পরিপাটি এবং অসামান্য স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি। দাপ্তরিক  নথি, নোটাংশ, সারসংক্ষেপ, ক্ষণ, তারিখ ইত্যাদি বিস্ময়করভাবে মনে রাখতে পারতেন। নথিতে সিদ্ধান্ত দিতেন ব্যক্তিগত দায় নিয়ে। কোনো জটিল বিষয়ে কর্মকর্তাগণ সিদ্ধান্তে দোদুল্যমান হয়ে গেলে বা মৌনতা অবলম্বন করলে তিনি বলতেন, -নথিটা দাও আমি নিজেই লিখে দিচ্ছি। ভবিষ্যতে সমস্যা হলে সেটা আমি দেখবো।তিনি সবসময় হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করতেন। তাঁর মুখের ওপর বিষণ্ণতার কালোছায়া কখনো দেখি নি। হঠাৎ  মেজাজ দেখেছি, তবে তা একেবারে  হারাতে দেখি নি। হয়তো তাঁরও অনেক দুঃখবোধ ছিল যা প্রকাশিত নয় এবং অফিসারদের কাছে কখনো ভাগ করার ছিল না। তাঁর মধ্যে চাপা, প্রচ্ছন্ন এবং দৃঢ়চেতা মানুষের নানাবিধ গুণাবলী ছিল।বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য-শৌর্য ও বিদ্যায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়।  আলাদা একজন। তখনকার বাণিজ্য সচিব আপাদমস্তক বিনয়ী মানুষ হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন এবং আমি মাঝেমধ্যে তাঁর সামনে উপবিষ্ট হয়ে বলতাম, -স্যার, আমরা কিন্তু বাইরে গিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করি তা কখনো বলি না, বরঞ্চ বলে থাকি, আমরা তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে আছি। এমন কথায় তিনি মনে মনে আনন্দিতবোধ করতেন। আবার সস্নেহে বলতেন,-নিশ্চয় তোমরা কোনো একটা মতলব নিয়ে এসেছো।পোশাক-আশাকে এত রুচিবান, পরিচ্ছন্ন, শৌখিন ও অভিজাত এদেশের মন্ত্রীদের মধ্যে সচরাচর দেখা যেত না। পাজামা, পাঞ্জাবি, মুজিবকোট, স্যুট, ব্লেজার, জুতো পরতেন নামি দামি ব্র্যান্ডের। ব্যতিক্রম মানের হিসেবে সহজেই বুঝা যেত। এ বিষয়ে তিনি ছিলেন উদার এবং দরাজ স্বভাবের মানুষ।মনে পড়ে, তখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস হবে। দুপুরের পরপর অফিসে ঢুকে তিনি বললেন,-দ্যাখো, বাইরে কেমন প্রচন্ড দাবদাহ চলছে। গাড়ি থেকে নামাই যায় না। বাইরে তাকানো মুশকিল। গুমোট পরিবেশ। বৃষ্টি-বাদল হওয়া জরুরি। ঢাকার আবহাওয়াটা কেমন যেন বদলে গেছে। তাছাড়া আমি তো আবার সানগ্লাস পরি না। তাৎক্ষণিক জিজ্ঞেস করলাম,-কেন স্যার? তিনি বললেন,-সিরাজ ভাই একবার (সিরাজুল আলম খান) মানা করেছিলেন। তিনি বলতেন, 'সানগ্লাস নাকি এদেশের  গণমানুষের রাজনীতির সঙ্গে মানানসই নয়'। সেই থেকে সানগ্লাস বাদ দিয়েছিলাম, আর কোনোদিন পরি নি।২.একদিন অপরাহ্নে অফিসে এসেই আমাকে ইন্টার-কমে কল করলেন।  'এখুনি উপরে আস'। এভাবে তিনি আমাকে প্রায়ই ডেকে পাঠাতেন। কিন্তু  সেদিনের কণ্ঠস্বরটা কেমন যেন ছিল!  আমি বের হয়ে লিফটের দরজায় দাঁড়ালাম। চারতলার দক্ষিণ প্রান্তে মন্ত্রীর কক্ষ, আমি দোতলায়। কাজেই লিফটেই যেতে চাই। ভাবছিলাম, কোন বিষয়ে জানতে চাচ্ছেন, বুঝতে পারছি না। তাঁর কক্ষে প্রবেশের মুখে পৌঁছাতেই ব্যক্তিগত স্টাফরা বললো, -শিগগিরই ঢুকেন স্যার, এরমধ্যেই কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছেন আপনি কোথায়?দরজার ভেতরে পা রেখেই সালাম জানালাম, দেখি মন্ত্রীর নির্ধারিত চেয়ারে বসে আছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু।আমি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে। কী, আশ্চর্য! পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, তোফায়েল আহমেদ সোফায় সহাস্যে বসে আছেন। আমি খানিকটা অপ্রস্তুত হলাম। তিনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন,-আমু ভাই, ওর কথাই বলেছিলাম, সে চট্টগ্রামের ডিসি ছিল। আমু সাহেব বললেন, -হ্যাঁ আপনাকে দেখেছি বলে মনে হয়, সবাই তো চিনে-জানেও ।এবার কাজের কথা। মন্ত্রী বললেন, -দেখো, আমু ভাই আমার নেতা। সেই বরিশালের বি,এম কলেজ থেকেই আমি আমু ভাইয়ের সাথে আছি। তোমার কাছে আমু ভাইয়ের একটা কাজ আছে। এটা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাড়াতাড়ি করে দিতে হবে।সেদিন এক সঙ্গে চা খেয়ে আমি নিচে নেমে আসি। পরদিন আবার মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা। তিনি নিজে থেকেই  হাসিমুখে বললেন, -শোন মান্নান, গতকাল আমু ভাইকে একটু বেশি সম্মান দেখালাম আর কি! তিনি আমার নেতা, ঠিকই আছে। তবে '৭০ এ তিনি প্রাদেশিক পরিষদের নেতা ছিলেন। একই সময়ে আমি কিন্তু ছিলাম পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে।আমি বললাম, -জ্বি স্যার, আপনি নাকি তখন বয়সের দিক থেকে সর্ব কনিষ্ঠ এমএনএ ছিলেন?৩.আরও একদিনের ঘটনা। মুন্সিগঞ্জের জনৈক হিন্দু এমপি একটা ওষুধ প্রস্তুতকারী সংগঠনের আসন্ন নির্বাচনে তাঁর লোককে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য আমাকে একটি অনৈতিক ও গর্হিত প্রস্তাব করে বসেন। আমার রুমে বসেই তিনি এমন লোভনীয় প্রস্তাব দেন। তখন মহামান্য হাইকোর্ট থেকে আমাকে ঐ সংগঠনের ‘প্রশাসক’ নিয়োগ করা হয়েছিল। আমি তাঁর কথা শুনতে চাই নি। এমনকি আমার রুম থেকে তাঁকে দয়া করে চলে যেতে বলেছিলাম। সেদিন তিনি বেশ রাগান্বিত বদনে আমার কক্ষ ত্যাগ করেছিলেন। পরে জানতে পারি, সেদিনই তিনি সরাসরি মন্ত্রীর কক্ষে ঢুকে আমার সম্পর্কে আজেবাজে মন্তব্য করেন। এবং বলেছিলেন, - তোফায়েল ভাই, কোত্থেকে যে এসব জামায়াতি অফিসার খুঁজে পান জানি না। সেদিন মন্ত্রী তাঁর কথা শুনেছেন বটে। যদিও তেমন কিছু মন্তব্য করেন নি। তবে দুয়েকদিন পরে, হঠাৎ করে অনেকের উপস্থিতিতে বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলে ওঠলেন, -সেদিন তো মান্নানকে একজন এমপি জামায়াতের লোক বলে গেল। তখন কেউ কথা বলছেন না। সবাই চুপ,বিব্রত। নীরবতা ভেঙে আমি নিজেই বললাম, -স্যার, আমি এই প্রথম এমনটা শুনলাম। অবশ্য আগে আমাকে জাসদ, বাসদ, ছাত্রদল, নাস্তিক অনেক কিছু বলা হয়েছে। এবারই একেবারে চুড়ান্ত অভিধায় অভিষিক্ত হলাম স্যার! মন্ত্রী বললেন, -যাক এসব। আমি বুঝতে পেরেছি। তুমি তাকে কোনো পাত্তাই দাওনি মনে হয়। ৪.তিনি অসুস্থ। একদিন সন্ধ্যা বেলায় তাঁর বনানীর বাসায় দেখতে যাই। জানলাম তিনি উপরে রেস্ট নিচ্ছেন। ইদানিং তিনি বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে থাকেন। আমি ঘুরে ঘুরে বাসার নিচ তলায় সাজানো তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের দুর্লভ আলোকচিত্র ও সাদাকালো ফটোগ্রাফগুলি দেখছিলাম। যার সঙ্গে '৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়-স্মৃতির অমূল্য ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এমন সময় বাসায় প্রবেশ করলেন আরেক কিংবদন্তী ও জাতীয় ব্যক্তিত্ব তোফায়েল আহমেদের ঘনিষ্ঠ রাজনীতি-সহচর প্রয়াত নেতা আবদুর রাজ্জাকের পুত্র নাহিন রাজ্জাক। কথা বলছিলাম রাজ্জাক তনয়ের সঙ্গে। খানিক পরে তিনি শারীরিক অসুবিধা নিয়েই স্টিক হাতে ড্রয়িং রুমে নেমে আসলেন। নাহিনকে দেখে,- আরে তুই কখন আসলি?আমি লক্ষ করলাম, একজন বাবা ছেলেকে যেমন আদরের সুরে বলেন, তেমনি করে নাহিনকে বললেন এবং তাদের পারিবারিক খোঁজ-খবর নিলেন। তাঁর আম্মার কথা জিজ্ঞেস করলেন। সেদিন আমি এবং নাহিন এক সাথেই তাঁর সামনে বসেছিলাম।  কী আশ্চর্য, সেদিনও তিনি আমার মেয়ের নতুন সংসার এবং জামাতার কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলেন নি।৫.মন্ত্রীর সামনে বসে দাপ্তরিক নানা বিষয়ে কথা বলার সময় প্রায়ই একটি বিষয় লক্ষ করতাম, তাঁর চেয়ার বরাবর পেছনের দেয়ালে ঝুলছে সাদা কাগজের ওপর কাঁচা হাতে আঁকা ফুল, পাখি, নীল আকাশ, নদী, বৃক্ষ ইত্যাদির নানান দৃশ্য। এগুলো তাঁর ছোট্ট নাতনির হাতের আঁকা। কাগজগুলি বাতাসে নড়ে গেলে তিনি নিজের হাতে সযত্নে দেয়ালে সেঁটে দিতেন। সেই ক্ষুদে অংকন শিল্পী তাঁর একমাত্র কন্যার মেয়ে। চেয়ার ঘুরিয়ে দেখতেন এবং নাতনির সঙ্গে হাসিমুখে আলাপ করতেন। মনে হয়, একজন সংবেদনশীল, কোমলপ্রাণ, শিশুবান্ধব মানুষ হিসেবেও তিনি অতুলনীয় ছিলেন। ৬.২০১৭ সালের শেষের দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হতে বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম হিসেবে বদলি হয়ে যাই। যাওয়ার আগে তিনি বললেন,-মান্নান তুমি তো চলে যাচ্ছ। তোমার স্থলাভিষিক্ত করে সেখানে কাকে দিব? আমি বললাম,- স্যার, এটা আপনার একান্ত পছন্দ।  অনেকেই তো আছেন। - আচ্ছা, দেখি, কী করা যায়।চট্টগ্রামে চলে আসার মাস-দুই পরে একদিন রাত ১০টার দিকে হঠাৎ তাঁর ফোন। আমি কমিশনার বাংলোর ভেতরের ওয়াকওয়ে ধরে হাঁটছিলাম। রাতে হাঁটাহাঁটির অভ্যাস আমার বহু বছরের। হাঁটার অভ্যাসটা বোধকরি জীবিত কর্মক্ষম মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তোফায়েল আহমেদ বললেন,- মান্নান 'আই মিস ইউ'। তোমার মেয়েটা কোথায়? ও কি এখন ভালো আছে?আমি বিস্মিত হয়ে যাই। কথা বলতে পারছিলাম না। সঙ্গে সঙ্গে চোখে জল আসার মতন অবস্থা হলো।-স্যার আপনি ভালো আছেন?-খুব ভালো নেই। তোমার কাজটা এখন আগের মতো ওরা করতে পারছে না। তুমি করে দিতে পারতে।- স্যার, ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো কিছু দিন সময় লাগবে।ফোন শেষ করে মনে মনে বলছিলাম, ‘আই মিস ইউ’ এমন একটা বাক্য সারা জীবনে আমাকে আর কেউ কোনোদিন বলেনি। এটাই প্রথম এবং শেষ। ৭.আরেক দিনের কথা। তখন ২০২০ সাল। আমি করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। শারীরিক অবস্থা ভালো নেই। কয়েক মাস আগেই আমার স্ত্রী করোনায় মৃত্যুবরণ করেন। হাসপাতালে থাকাবস্থায় আমাকে বদলি করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হলো। বিষয়টি খুব অমানবিক ছিল। তবু কর্তৃপক্ষের ইচ্ছায় তা হয়েছিল। আমার কোনো কিছু বলার ছিল না। দু’দিন পরে হঠাৎ তোফায়েল আহমেদের ফোন।-মান্নান তোমাকে ওরা বদলি করে দিয়েছে? যাক্ কষ্ট নিও না। ওরা তোমাকে চিনতে পারে নি। থাকো কিছু দিন। দেখা যাবে।পরে শুনেছিলাম, সংসদেও তিনি আমার বদলির বিষয়টি তুলেছিলেন।৮.পৃথিবীর প্রতিটি কিংবদন্তির বাহ্যিক আচরণ ও অবয়বের আড়ালে একান্ত নিভৃতে, হৃদয়ের গহীন ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক মানবীয় কোমলপ্রাণ সত্তা। যা সহজে চোখে পড়ে না। সচরাচর বাইরে অদৃশ্য হয়ে থাকে তাঁর ভেতরের ভিন্নতর এমন রূপ। আর এসব গুণই কালক্রমে তাঁকে সাধারণ থেকে বিশেষ করে তোলে। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন সমগ্র দেশ, জাতি ও গণমানুষের বিবেক তথা মুখপাত্র। তখন তাঁর পরিচয় হয়ে যায় তিনি একজন জাতীয় নেতা বা জাতীয় ব্যক্তিত্ব। রাজনীতিবিদ এর ব্যক্তিক চরিত্রের ভালো মন্দ ছাপিয়ে গিয়ে, একজন ধ্রুবতারা নেতা, প্রাণবন্ত মানুষ তোফায়েল আহমেদের আত্মার চিরশান্তির জন্যে প্রার্থনা করছি। লেখক: সাবেক সচিব ও গল্পকার

বিভাজনের রাজনীতি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঐক্যের প্রশ্ন

ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘকাল ধরে সমাজকে বিভিন্ন বর্ণ ও শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রচলিত বর্ণব্যবস্থায় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এই চারটি শ্রেণীর কথা উল্লেখ করা হয়। ব্রাহ্মণদের জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে, ক্ষত্রিয়দের শাসন ও প্রতিরক্ষার সঙ্গে, বৈশ্যদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে এবং শূদ্রদের সেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত করা হতো। ঐতিহাসিকভাবে শূদ্রদের সমাজের নিম্নস্তরে অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের অচ্ছুত বা অস্পৃশ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। প্রথাগতভাবে চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুত, ঝাড়ু দেয়া, মলমূত্র অপসারণসহ বিভিন্ন শ্রমনির্ভর পেশায় শূদ্র শ্রেণীর মানুষদের নিয়োজিত রাখা হতো। ভারতে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অবস্থা পর্যালোচনার জন্য ১৯৭৯ সালে বিহারের সাবেক মন্ত্রী ও নেতা শ্রী বিন্দেশ্বরী প্রসাদ মণ্ডলের নেতৃত্বে মণ্ডল কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের প্রতিবেদন ১৯৮০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভারতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনে অনগ্রসর ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়। অনেকের মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত ও দুর্বল রাখার জন্য বিভিন্ন উপগোষ্ঠী, পদবি ও সামাজিক পরিচয়ের বিস্তার ঘটানো হয়েছে। এর ফলে একই ধরনের পেশা বা সামাজিক অবস্থানের মানুষদের মধ্যেও পারস্পরিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন পরিচয়, বিশ্বাস ও প্রথার কারণে তারা একক সামাজিক শক্তিতে পরিণত হতে পারেনি। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকার কারণে বহু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছে। মৌলিক অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত ছিল। জীবিকার তাগিদে এবং চরম দারিদ্র্যের কারণে তাদের অনেককে অত্যন্ত কষ্টকর জীবন পার করতে হয়েছে। নানা ধরনের সামাজিক বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনা সহ্য করেও তারা টিকে আছে। যারা জুতা তৈরি, মেরামত বা বুট পালিশের কাজ করেন, তাদের মধ্যে বিভিন্ন পদবি দেখা যায়। যেমন—মুচি, চামার, ঋষি, রবিদাস, মেঘওয়াল, সৎনামী, দাস, অন্ত্যজ প্রভৃতি। একই ধরনের পেশায় যুক্ত হলেও এসব সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সামাজিক রীতি-নীতি অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। ফলে তাদের মধ্যে আত্মীয়তা বা সামাজিক যোগাযোগ সীমিত থাকে। এই বিভক্ত অবস্থার কারণে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব অর্জনও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে ‘হরিজন’ পরিচয়ের আওতায় থাকা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যেও নানা পদবি ও সামাজিক বিভাজন বিদ্যমান। ডোম, হাড়ি, বাল্মিকী, বাঁশফোর, লালবেগী, হেলা, ভক্তসহ বিভিন্ন সম্প্রদায় একই ধরনের পেশায় নিয়োজিত হলেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখে। ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ঐক্য গড়ে তোলা কঠিন হয়ে ওঠে। আদিবাসী পরিচয় নিয়েও দেশে-বিদেশে নানা বিতর্ক রয়েছে। সাধারণভাবে যারা প্রাচীনকাল থেকে নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করে নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনধারা বজায় রেখেছে, তাদের আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশে সরকারিভাবে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী’ বা ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী এসব জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, প্রথা ও সামাজিক কাঠামো একে অন্যের থেকে ভিন্ন। সমতলে সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, রবিদাসসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বসবাস করে। অন্যদিকে ময়মনসিংহ অঞ্চলের গারো জনগোষ্ঠী নিজেদের ‘আচিক’ পরিচয়ে পরিচিত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীরও স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই পদবির মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ, আবার কোথাও আত্মীয়তার নিজস্ব নিয়ম বিদ্যমান। এসব সামাজিক রীতিনীতি তাদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করলেও বৃহত্তর ঐক্যের পথে কিছু বাধা তৈরি করে। সমাজে আবার এমন একটি অংশ রয়েছে যারা নিজেদের সংখ্যালঘু পরিচয়ে চিহ্নিত করেন, কিন্তু দলিত, আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত মনে করেন না। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরও বৈচিত্র্য ও বিভাজন সৃষ্টি হয়। অনেকের মতে, এই বিভাজন শাসন ও নিয়ন্ত্রণকে সহজ করে তোলে। প্রশ্ন হলো, এই ধরনের বিভক্তি কি সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ বয়ে আনে? বাস্তবতা হলো, বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সমর্থনের ঘাটতি তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নকে দুর্বল করে। ফলে তারা প্রায়ই উন্নয়নের মূল ধারা থেকে পিছিয়ে থাকে এবং বঞ্চনার শিকার হয়। এই পরিস্থিতিতে পারস্পরিক দোষারোপ না করে সংলাপ, সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। বিভিন্ন পরিচয় ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান বজায় রেখেও সাধারণ স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করা সম্ভব। সামাজিক ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংহতি আরও জোরদার করা জরুরি। [লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: সুবিধার প্রবাহ বাড়লেও আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতায় রয়ে গেছে বড় প্রশ্ন

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ পরিচালিত হয় এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৬ হাজার ৯৩টি এবং এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৮৯৮ জন। দেশের মোট শিক্ষার্থীর বিশাল অংশ এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করে। রাষ্ট্রও এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার বা এমপিও ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার বড় একটি অংশ বহন করে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকার বেতন-ভাতা, উৎসব বোনাস ও অন্যান্য সুবিধাও বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- সুবিধা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কি আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? নাকি সরকারি অর্থের প্রবাহ বাড়লেও নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার জায়গাটি এখনও রয়ে গেছে দুর্বল ও অবহেলিত? একটা সময় ছিল, যখন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবন ছিল সীমাহীন আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভরা। মূল বেতন ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো সুবিধা ছিল না বললেই চলে। বাড়িভাড়া ভাতা ছিল নামমাত্র, চিকিৎসা ভাতা ছিল অপ্রতুল, খুবই নগণ্য হারে উৎসব ভাতা দেয়া হতো, ছিল না বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের সুবিধাও। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, দেন-দরবার, মানববন্ধন, স্মারকলিপি এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক দাবির মুখে সরকার ধীরে ধীরে এ খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত কোনো বেতন স্কেল ছিল না। তৎকালীন পাকিস্তান আমলে তারা সরকারি কোষাগার থেকে স্বল্প পরিমাণ মাসিক ভাতা পেতেন। স্বাধীনতার পর ভাতার পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও দীর্ঘদিন একই পদ্ধতি বহাল ছিল। ১৯৭৭ সালে শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকরা প্রথমবারের মতো জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় আসেন ১৯৮০ সালে। সে সময় থেকেই তারা মূল বেতনের শতকরা ৫০ ভাগ সরকারি তহবিল থেকে পাওয়া শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এমপিও প্রথা চালু হয় এবং সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। ধীরে ধীরে সরকারি অংশও বৃদ্ধি পেতে থাকে- সরকার ১৯৮৪ সালে ৬০ শতাংশ, ১৯৮৬ সালে ৭০ শতাংশ, ১৯৯৫ সালে ৮০ শতাংশ, ২০০০ সালে ৯০ শতাংশ এবং ২০০৬ সালে এসে ১০০ শতাংশ মূল বেতন প্রদান শুরু করে। এটি ছিল বেসরকারি শিক্ষকদের দীর্ঘ সংগ্রামের একটি বড় অর্জন। বিভিন্ন সময়ের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালে চালু হয় অবসর সুবিধা ও উৎসব ভাতা। শুরুতে মূল বেতনের ২৫ শতাংশ হারে উৎসব ভাতা প্রদান করা হলেও বর্তমানে তা ৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এমনকি এটিকে ১০০ শতাংশে উন্নীত করার বিষয়েও সরকারের নীতিগত চিন্তাভাবনা রয়েছে। ২০১৮ সালের জুলাই থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও সরকারি কর্মচারীদের মতো নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেতে শুরু করেন। পাশাপাশি প্রতি বছরের জুলাই মাসে মূল বেতনের ১০ শতাংশ হারে বিশেষ সুবিধাও তাদের বেতনে যুক্ত হচ্ছে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর সম্প্রতি বাড়ি ভাড়া ভাতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত নভেম্বর থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের ৭.৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া ভাতা পাচ্ছেন, যা আগামী জুলাই থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২১ এবং ২০২৫-এর মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীদের টাইমস্কেল সুবিধা চালু করা হয়েছে; পদোন্নতি ব্যবস্থাও তুলনামূলক সহজ করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এসব পদক্ষেপ শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করেছে এবং শিক্ষকতা পেশাকে কিছুটা হলেও মর্যাদার জায়গায় নিয়ে গেছে। কারণ একজন আর্থিকভাবে অনিরাপদ শিক্ষক থেকে কখনও মানসম্মত শিক্ষা আশা করা যায় না। শিক্ষক যদি ন্যূনতম মর্যাদা ও আর্থিক স্বচ্ছলতা না পান, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার ভিতও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই সরকারের এসব উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে, যা খুব কমই আলোচনায় আসে। সরকার যখন হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াচ্ছে, তখন এই আর্থিক সুবিধার বিপরীতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি সরকারি আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে?সরকারের প্রাপ্য ভ্যাট, ট্যাক্স ও আয়কর কি যথাযথভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে? শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে আদায়কৃত অর্থের স্বচ্ছ হিসাব কি সংরক্ষিত হচ্ছে? বাস্তবতা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তরগুলো আশাব্যঞ্জক নয়। সরকার ২০২৩ সালে ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিসংক্রান্ত নীতিমালা’ প্রণয়ন করে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত সরকারি আর্থিক বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত সব ধরনের ফি ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করার নির্দেশনা রয়েছে; নগদ অর্থ গ্রহণ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে বলা হয়েছে, এক খাতে আদায়কৃত অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করা যাবে না এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ভ্যাট ও আয়কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টিউশন ফি নীতিমালা-২০২৪’-নীতিমালায়ও একই ধরনের নির্দেশনা রয়েছে। এ নীতিমালায় মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ২৫টি এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৬টি খাত অর্থ আদায়ের জন্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে- মাসিক বেতন, ভর্তি ফি, পরীক্ষার ফি, ম্যাগাজিন ফি, পরিচয়পত্র ফি, দরিদ্র তহবিল, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ফি, রোভার স্কাউট, বিএনসিসি প্রভৃতি। এতেও খাতভিত্তিক হিসাব সংরক্ষণ ও ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্ধারিত খাতের বাইরেও বিভিন্ন নামে সৃষ্ট খাতে ফি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সব খাতের টাকা এক বা দুইটি ব্যাংক হিসাবের মধ্যেই ঘুরপাক খায়। পৃথক হিসাব রেজিস্টার বা ক্যাশবই নিয়মিত সমন্বয় না করার ফলে কোন খাতে কত টাকা আদায় হলো, কত ব্যয় হলো, কত অবশিষ্ট আছে- তার সুনির্দিষ্ট হিসাব অনেক সময় পাওয়া যায় না। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য সংগৃহীত অর্থ, ম্যাগাজিন প্রকাশের অর্থ কিংবা সহশিক্ষা কার্যক্রমের অর্থ অনেক সময় কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে ম্যাগাজিন প্রকাশ হয় না, নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয় না, সাংস্কৃতিক চর্চাও হারিয়ে যায় আনুষ্ঠানিকতার ভিড়ে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকারের প্রাপ্য ভ্যাট ও কর আদায়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের নীরব অনিয়ম চলমান। বিভিন্ন পণ্য ও সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ৫-১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট পরিশোধের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কর্তনেরও নিয়ম আছে। কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব নিয়ম কার্যত উপেক্ষিত। বিভিন্ন উন্নয়ন ব্যয় কিংবা অবকাঠামো নির্মাণে চচজ নীতিমালা অনুসরণ করা হয়না। এমনকি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিভিন্ন সম্মানির ক্ষেত্রেও উৎসে কর কর্তনের সংস্কৃতি প্রায় অনুপস্থিত। পাবলিক পরীক্ষার প্রত্যবেক্ষণ, পরীক্ষা কমিটির কাজ, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন কিংবা ব্যবহারিক পরীক্ষার দায়িত্ব পালনের বিপরীতে শিক্ষকরা যে সম্মানি পান, সেখান থেকেও নিয়ম অনুযায়ী উৎসে আয়কর কর্তনের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে তা অনুসরণ করা হয় না। ফলে বছরের পর বছর বিপুল অঙ্কের সম্ভাব্য রাজস্ব কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সম্প্রতি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিভিন্ন পরিদর্শনে ১ম দফায় ৪৭১ জন ও ২য় দফায় ২৬২ জন জাল সনদধারী শিক্ষকের তালিকা প্রকাশ করেছে। এর আগে ২০২৩ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৬৭৮ জন জাল সনদধারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান ও পরিচালনা কমিটির যথাযথ তদারকির অভাবে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশ্রয় কিংবা যোগসাজশে জাল সনধধারী শিক্ষকরা সরকারের বিপুল অর্থ অবৈধভাবে গ্রহণ করেছেন। এখন তাদের এমপিও ও অবসর সুবিধা বাতিলের প্রস্তাব করা হলেও বাস্তবে তা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডিকে ঘিরেও দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, ¯ে^চ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বাস্তবে এসব কমিটি অনেক ক্ষেত্রে একটি প্রায় স্বায়ত্তশাসিত ক্ষমতা কাঠামো হিসেবে পরিচালিত হয়। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, বরখাস্ত, বাজেট প্রণয়ন, আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাদের প্রভাব থাকে নিরঙ্কুশ। তাত্ত্বিকভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসন এসব কমিটির কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব পালন করলেও মাঠপর্যায়ে সেই নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি অনেক সময় সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি কার্যত ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ক্ষমতার বলয়ে পরিণত হয়, যেখানে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি বা রাজনৈতিক প্রভাবই মুখ্য হয়ে ওঠে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে এসব কমিটির গঠন ও ক্ষমতার ভারসাম্যও পরিবর্তিত হয়। এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। শিক্ষক রাজনীতি, দলীয় আনুগত্য এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শিক্ষার পরিবেশ ও মান- উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি করে। এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও আর্থিক শৃঙ্খলার গভীর দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর অনেক সময় পরিদর্শন ও প্রতিবেদন তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু অনিয়ম প্রতিরোধ, আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কিংবা জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য যে শক্তিশালী ও কার্যকর তদারকি কাঠামো প্রয়োজন, বাস্তবে তার ঘাটতি এখনও স্পষ্ট। রাষ্ট্র যখন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াচ্ছে, তখন একইসঙ্গে প্রয়োজন আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। খাতভিত্তিক ব্যাংক হিসাব বাধ্যতামূলক করা, ডিজিটাল আর্থিকব্যবস্থাপনা চালু করা, নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করা এবং ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধে কঠোর নজরদারি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজনে শিক্ষা প্রশাসন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মধ্যে সমন্বিত তদারকি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কারণ শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ কেবল ব্যয় নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাষ্ট্রের বিনিয়োগ। সেই বিনিয়োগের প্রতিটি টাকার সঠিক ব্যবহার এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান- সবার যৌথ দায়িত্ব। অন্যথায় সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও আর্থিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন থেকেই যাবে, আর সেই প্রশ্নের ভার শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকেই। (লেখকদের নিজস্ব মত) [লেখকদ্বয় শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ সিভিল এডুকেশন সার্ভিস বিষয়ক থিংকার্স প্ল্যাটফর্ম দি অ্যাডভাইজর্স-এর সদস্য]

গ্রামে ঈদ এবং কোরবানির চামড়া

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব কোরবানির ঈদের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। তবে গ্রামেগঞ্জে এখনো এর আমেজ রয়ে গেছে। রাস্তা ঘাটে হাজার হাজার তরুণ তরুণীর অবাধ চলাফেরা, হোন্ডার পিঠে চেপে  ছুটছে এদিক ওদিক। চারদিকে হর্ণ বাজছে নিরন্তর। ধীরে ধীরে গ্রামও হয়ে উঠেছে যান্ত্রিক শহুরে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিজলি বাতি, চা, কফির দোকান হয়েছে, চলছে অন্তহীন আড্ডা। এখন জাতীয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাঠশালা এগুলো। বাহ্যিক ভাবে দেখলে মনে হবে, মানুষ ভাবলেশহীন, নির্ভার প্রাণোচ্ছল জীবন কাটাচ্ছে। নিত্য দুর্ঘটনা মাথায় নিয়ে যন্ত্রচালিত দ্বিচক্রযানে সয়লাব হয়ে গেছে সারাদেশ। এর সহজলভ্যতা যদি উন্নয়নের মাপকাঠি হয় তবে  বর্তমান বাংলাদেশ নিশ্চয় একটা উন্নত দেশ। বলা যায়, ঘরে ঘরে জনপ্রতি একটি হোন্ডার দেশ। একসময় গণচীনকে বলা হত, যত মানুষ তত বাইসাইকেলের দেশের আরেক নাম মহাচীন।২.ঈদের পরে গ্রামজুড়ে একটা করুণ চিত্র দেখলাম। পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থোকা থোকা পড়ে আছে জবাই করা গোরুর চামড়া। দুয়েকজন গ্রাম্য ছোট ক্রেতা চামড়া কিনতে আসলেও খুব বেশি আগ্রহভরে নয়। এসে দাম বলতেও নারাজ ভাব প্রদর্শন করছে। যেন এটা মূল্যহীন এক পঁচনশীল বস্তু। হয় সামান্য দামে বিক্রি করুন অথবা দুর্গন্ধময় পরিবেশ সৃষ্টি করন। চোখের সামনে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার গোরুর চামড়া নিয়ে গেল ৫শ’ টাকায়। তা-ও ক্রেতার দয়ার বদৌলতে বাড়ির আঙিনার পরিবেশকে বাসযোগ্য করা গেল। ফলে ক্রেতা অল্প পুঁজিতে অনেক সংখ্যক চামড়া ক্রয় করতে সক্ষম হলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, সে ক্রয়কৃত চামড়াগুলোতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ লবন সংযোগ না করে অপেক্ষাকৃত বড় ক্রেতার জন্যে বসে থেকে চামড়ার গুণাবলি নষ্ট করে ফেলেছে। ফলে ছোট চামড়া ব্যবসায়ীরা প্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পথে পড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চামড়া নিয়ে বিড়ম্বনার চিত্র ভেসে আসছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোনো এক এলাকায় কোরবানির অসংখ্য  চামড়া ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেওয়ার সংবাদ পড়ে বেদনার্ত হলাম। অবস্থা যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে মনে হয়, আগামী দিনগুলোতে গোরুর দাম ক্রমাগত বেড়ে চলবে আর বিপরীতক্রমে চামড়ার মূল্য ২০০/১০০ টাকায় নেমে আসবে। এবং মানুষ হতাশ হয়ে বিক্রি না করে এগুলোকে মাটিতে সমাধিস্থ করে দিবে।৩.পশুর চামড়ার ভাগ্যে পাটের পরিণতির ভয়ংকর চিত্রকল্প দিব্য চোখে ভাসছে। একসময় এ পূর্ববঙ্গ পরিচিত ছিল সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে। এদেশের পাটের খ্যাতি ছিল বিশ্বব্যাপী। এদেশ থেকে পাট নারায়ণগঞ্জ হয়ে নৌপথে  ইংল্যান্ডের ডান্ডিতে পৌঁছে যেত। কথিত আছে বৃটিশরা রেলপথ আবিষ্কার করেছিল মূলত পাট পরিবহনের জন্যে। দুনিয়ার বাহারি বস্ত্র আর পাটজাত পণ্য তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ছিল এই সোনালি আঁশ। এদেশেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে পৃথিবীর সেরা পাটকল আদমজী। এর লভ্যাংশ দিয়ে গড়ে উঠেছিল লতিফ বাওয়ানী, করিম, ইউএমসি’র মতন আরও অনেক  বিখ্যাত জুটমিলস। কালক্রমে পাটের গুরুত্ব কমে যায়, জাতীয়করণ নীতি, শ্রমিক ফেডারেশন/ ইউনিয়নের অপ রাজনীতি, সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়া, আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি,পাটের বিকল্প দ্রব্য সৃষ্টি হওয়া এসব নানাবিধ কারণে দেশের পাট এবং পাট-শিল্পের অপমৃত্যু ঘটে।একই কথা শোনা গেল সরকারের একজন মন্ত্রীর মুখ থেকেও। চামড়ার মূল্যহীনতা বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘এটা আমার কাজ নয়, আমার কাজ জবাইয়ের আগের। আমি প্রাণিসম্পদ’। তিনি আরও বলেছেন, ‘পৃথিবীতে চামড়ার বিকল্প সিনথেটিক জাতীয় দ্রব্যের চাহিদা বেশি থাকায় এর উপযুক্ত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না'। এতে দেখা গেল, পাটের সঙ্গে এর একটা অদ্ভুত ও চমৎকার মিল আছে। পাট শিল্পের মতো চামড়াও বিশ্ববাজারের আধুনিক  প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে যাচ্ছে। অথচ এদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্য বলতে একসময় পাটের পরে চামড়ার নাম ছিল। বর্তমানে পোশাকশিল্পের কথা বাদ দিলে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ শতকোটি ডলার আয় করতে পারতো। চামড়া বা লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর অধিকতর জোর দেয়া হতো। বলা বাহুল্য, বর্তমান সরকার ঈদের আগে কোরবানির চামড়ার ফুট প্রতি একটা মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এতে শহরে এবং গ্রামের সর্বনিম্ন দাম বলা হয়েছিল। কোনো কিছুই কাজ করেনি চামড়ার সঠিক মূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে। বিগত কয়েক বছর ধরে যে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত ছিল কোরবানির চামড়া এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। একটা ˆদনিক পত্রিকার সংবাদে প্রাপ্ত এমন তথ্য যে, ‘এক কাপ চায়ের দামে মিলেছে ছাগলের কাঁচা চামড়া। দেশের কিছু এলাকায় কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয়ের কোনো ক্রেতাই পাওয়া যায় নি।  বিক্রি করতে না পেরে শত শত কাঁচা চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা ঘটেছে’।৪.চামড়ার মূল্য বিপর্যয়ের এমন দুর্বিষহ অবস্থার জন্যে দায়ী কে? সাধারণ মানুষ কাকে দায়ী করবে, তারা যাবে কোথায়? জানা যায়, এবারে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় তারল্য সংকটের কারণে। ট্যানারি কারখানাগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর কোনো না কোনো অযুহাতকে সামনে নিয়ে এসে দাঁড়ায়। তারা বলছে, ব্যাংক থেকে তারা প্রয়োজনীয় টাকা ঋণ হিসেবে পায়নি। পূর্বের তুলনায় এক চতুর্থাংশ টাকাও ব্যাংক সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে গ্রাম পর্যায়ে তারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে অর্থ সরবরাহ করতে পারেনি। দেশের মানুষও চামড়ার যথোপযুক্ত দাম পায়নি। এখন বাজেট প্রনয়ণ ও ঘোষণার সময় সরকার বাজেট নিয়ে ত্রস্তব্যস্ত। বড় বাজেটই সব। কোরবানির আগেই চামড়া বাঁচানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি ছিল বলে সচেতন সমাজ মনে করে। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রনালয় থেকে যথেষ্ট পূর্বেই সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা করা হয়নি। ফলে সারা দেশে বিপুল সংখ্যক কাঁচা চামড়ার এমন অপচয় ও অবর্ণনীয় আর্থিক ক্ষতি হলো। এটা ব্যক্তিক নয় জাতীয় ক্ষতি। এর দায় সরকারকে নিতে হবে এবং দিন শেষে সবই সরকারের ক্ষতি। সাধারণ মানুষের নয়।সরকার আসে সরকার যায়। মানুষ একবুক আশা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। এবার নতুন কিছু হবে, আমূল পরিবর্তন আসবে। জনপ্রশাসনে, নীতিতে, শাসণে, সুশাসনের সর্বত্র মঙ্গলছায়ায় জনসাধারণ সিক্ত হবে। এটা বেশি কিছু চাওয়া নয়, খুব স্বাভাবিক চাওয়া। মানুষ গতানুগতিক ধারা থেকে বের হতে চায়। এটাও মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। এদেশে অনেকদিন যাবৎ একই ধারার সমাজ বাস্তবতা, রাজনীতি, অর্থনীতি আর অপ-সংস্কৃতি চলমান আছে। মানুষ এই বৃত্ত থেকে বের হয়ে বাইরের  জগতের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হতে চাইবে, এটা কোনো অভিনব বিষয় নয়।৫.দেশে উৎপাদিত কাঁচা চামড়াকে বাঁচাতে হবে, জরুরি রপ্তানিতে কাজে লাগাতে হবে। চামড়াজাত পণ্য জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ছাড়াও নানা প্রকার অভিজাত দ্রব্যাদি তৈরিতে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। ট্যানারি শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ঈদুল আজহার মৌসুমের পর্যাপ্ত কাঁচা চামড়ার সঠিক ব্যবহার করতে না পারা রাষ্ট্রীয় ও জাতীয়  ব্যর্থতার শামিল হবে। সিন্ডিকেট করে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করা যায় না। এটা পাপের পর্যায়ে পড়ে। তাছাড়া কোরবানির চামড়ার মূল্যের প্রকৃত মালিক হল সমাজের গরিব, মিসকিন, অসহায় মানুষ। তারাই এর হকদার। এদেরকে ঠকানোর অর্থ ধর্মীয় বিধান ও অনুশাসনকে অমান্য করা। এ বিষয়ে দলমতের ঊর্ধে ওঠে সকলকে সোচ্চার হতে হবে, সচেতন হতে হবে। চোখের সামনেই পশুর চামড়াজাত পণ্যে সারা দুনিয়া চলছে। মানুষের হাতে হাতে এ-সব পণ্য। বিজ্ঞান প্রযুক্তির উৎকর্ষতার চূড়ান্ত পর্যায়েও পৃথিবীর দেশে দেশে আভিজাত্যের প্রতীক মানে চামড়ার তৈরি ব্যবহার্য জিনিসপত্র। সেখানে এদেশে কাঁচা চামড়াকে অপ্রয়োজনীয় বস্তুতে পরিণত করে ভাগাড়ে ফেলে দেয়া কী স্বাভাবিক কোনো ঘটনা? কাজেই একটুও বিলম্ব না করে, সরকারকে এখনই ভাবতে হবে, কোরবানি থেকে পাওয়া কোটি কোটি কাঁচা চামড়ার ভবিষ্যৎ সদ্ব্যবহার কেমন করে  হবে?[লেখক: গল্পকার]

ইন্দো-প্যাসিফিকে শক্তির নতুন সমীকরণ: সর্বোচ্চ উচ্চতায় ভারত-অস্ট্রেলিয়া প্রতিরক্ষা জোট

​ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দ্রুত বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দুই দেশই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, এই অংশীদারিত্ব এখন শুধু সাধারণ কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, বরং কৌশলগত নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ভারত–অস্ট্রেলিয়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সংলাপে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানো, প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ বিনিয়োগ এবং ইন্দো-প্যাসিফিকে নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ এবং অস্ট্রেলিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মারলেসের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে স্পষ্ট হয়েছে যে, দুই দেশের কৌশলগত জোট এখন এই অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণের বড় হাতিয়ার হয়ে উঠছে।​বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের পর থেকে দুই দেশের এই সম্পর্কের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। যৌথ সামরিক মহড়া, নৌ-সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের মতো সব ক্ষেত্রেই দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে। এই সংলাপ এখন দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, বাণিজ্য রুট এবং সামরিক ভারসাম্য—সবকিছুই এখন এই অঞ্চলের ওপর নির্ভর করছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার এমন ঘনিষ্ঠতা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।​অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকেও এই সম্পর্ক নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো বার্তা দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে অস্ট্রেলিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মারলেস বলেন, "ভারত ও অস্ট্রেলিয়া এখন কখনও এতটা কৌশলগতভাবে একমত ছিল না।" তার এই মন্তব্যকে বিশেষজ্ঞরা শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ভাষা হিসেবে দেখছেন না, বরং একে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি পরোক্ষ অবস্থান হিসেবেই বিবেচনা করছেন। ​বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে—বিশেষ করে যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে। এতে শুধু দুই দেশের নিরাপত্তাই বাড়বে না, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি শক্তিশালী বিকল্প শক্তি গড়ে উঠবে। সব মিলিয়ে, ভারত–অস্ট্রেলিয়া প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন আর শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে, যা আগামী দিনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।

ব্যাংক সংস্কার নাকি পুরনো মালিকদের পুনর্বাসন?

কিছুদিন আগে সংসদে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন সাবেক মালিকরা, তাও তুলনামূলক সহজ শর্তে। ফলে নতুন সরকারের এই পদক্ষেপকে অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাংক সংস্কার উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখছেন।ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণ এবং একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেয়ায় ওয়াকিবহাল মহলে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল যে বিএনপি সরকার সম্ভবত পুঁজি-লুটেরা ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের পথে হাঁটতে যাচ্ছে। সম্প্রতি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ইসলামি ধারার পাঁচ ব্যাংকের একীভূত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি তিনি এ-ও জানিয়েছেন, নামমাত্র শর্তে পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ দেয়া হবে না।তবে ব্যাংক উদ্যোক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সংশোধিত আইনের ধারায় যাঁরা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে গেছেন, তাদের ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ নিয়ে তারা শঙ্কিত। তাদের মতে, অতীতে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আবার ফিরে এলে খাতে নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।কারা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে গেছে, তা সাধারণ মানুষও জানে। তাই তাদের ফেরার সুযোগ দেয়া হলে ব্যাংক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমে যেতে পারে। এতে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের আরও গভীরভাবে ভাবা উচিত। যদিও গভর্নর ব্যাংক মালিক-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠকে আশ্বস্ত করেছেন যে সংশোধিত আইনের শর্ত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে সাবেক মালিকদের ফেরার সুযোগ হবে না। একই সঙ্গে পাঁচটি ব্যাংকের চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে।এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। তাহলে সিদ্ধান্তগুলো আরও গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হতো।বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। একদিকে খেলাপি ঋণের পাহাড়, অন্যদিকে মূলধন ও নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতির তীব্র চাপ। এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধিত) আইন’ এবং এর বিশেষ কিছু ধারা নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের মধ্যে। বিশেষ করে, যারা একসময় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ বা লুটপাট করে চলে গেছেন, আইনি ফাঁকফোকরে তাদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ থাকা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো বাংলাদেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এমন সময়ে জবাবদিহির দুর্বলতা প্রকাশ পেলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি গভর্নরকে দেয়া চিঠিতে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সংস্কার প্রস্তাব পেশ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির জন্য মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার আদলে একটি পেশাদার ‘জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে স্থগিতাদেশের অপব্যবহার রোধ ও ফাস্ট-ট্র্যাক রিকভারি বেঞ্চ চালু করা।সংগঠনটি সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহভাতা বন্ধ না করার অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে দক্ষ জনবল ধরে রাখা সম্ভব হয়। ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে স্টক লভ্যাংশের ওপর অতিরিক্ত কর থেকে অব্যাহতি দাবি করেছে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলোকে সরাসরি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে না পাঠিয়ে একটি বিশেষ ‘ট্রান্সফরমেশন ক্যাটাগরিতে রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে।বিএনপি সরকার একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মালিকানা আবার পুরোনো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার সুযোগ রেখে আইন তৈরি করেছে। এটি একটি ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।১৯৮২ সাল থেকে দেশে বেসরকারি মালিকানায় ব্যাংক স্থাপিত হতে শুরু করে। বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে এখন মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৬১। অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, দেশে এতগুলো ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থে অতীতের সরকারগুলো বিপুলসংখ্যক বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়েছে। বাংলাদেশের ৫৫ বছরে যেসব ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ধনবান হয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশ কোনো না কোনো ব্যাংকের মালিক বা পরিচালক। তারা নিজেদের ব্যাংক থেকে খুব বেশি ঋণ নিতে না পারলেও একে অন্যের ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এভাবে তারা দেশের ব্যাংকঋণের ওপর প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশের খেলাপি ঋণের বড় অংশ তাদের কাছেই আটকে রয়েছে।বাংলাদেশের অধিকাংশ ধনকুবেরের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকের মালিকানা-বিতরণ ছিল সেই পৃষ্ঠপোষকতার অন্যতম মাধ্যম।সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ মোট ব্যাংকঋণের বড় অংশ। এই বিপুল খেলাপি ঋণ উদ্ধারের বিষয়ে বর্তমান সরকার কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বিশেষ করে পুরনো মালিকদের ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায়।দেশের দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকিং খাতকে পুনরুদ্ধারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এর মূল লক্ষ্য ছিল অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং দায়ীদের স্থায়ীভাবে মালিকানা থেকে অপসারণ করা। কিন্তু অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেয়ার সময় নতুন ধারা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।সব মিলিয়ে নতুন আইনটি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রক্রিয়াকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।আগের অধ্যাদেশে যেখানে দায়ীদের জন্য কোনো ধরনের ছাড় ছিল না, সেখানে এখন কিস্তিতে মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে এটি ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটে জড়িতদের জন্য এক ধরনের সুবিধা বা প্রণোদনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।নতুন আইনের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের নিয়ে ব্যাংকপাড়ায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। খাতসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা সতর্ক করে বলেছেন, একবার কোনো ব্যাংক সাবেক মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। যাদের কারণে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের হাতেই আবার নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়া সুশাসনের পরিপন্থী। অতীতে যেসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও ব্যাংককে মূলধন সংকটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে, তারা যদি আবার নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে, তাহলে সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এমনকি আতঙ্কিত হয়ে আমানতকারীরা অর্থ তুলে নেয়ার চেষ্টা করলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।সাবেক মালিকরা পুনরায় নিয়ন্ত্রণে এলে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা কাঠামো এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টিও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি তাদের প্রত্যাবর্তন চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকেও বিঘ্নিত করতে পারে।যেসব ব্যক্তি আগে ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার বা অনিয়মিত ঋণ গ্রহণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা যদি সামান্য অংশ পরিশোধ করে আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরতে পারেন, তবে তা আর্থিক খাতে দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। এতে অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার বদলে দায়ীদের কার্যত পুরস্কৃত করা হবে এবং ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

বরেন্দ্রভূমির আদিবাসীদের পানি সংকট

‘পানির অপর নাম জীবন’—সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এখন বলা হচ্ছে, বিশুদ্ধ পানির অপর নামই জীবন। আর এই পানি নিয়েই চলছে আদিবাসীদের জীবনসংগ্রাম। বিশেষত বরেন্দ্রভূমির আদিবাসীদের এ সংগ্রাম এখন নিরন্তর।সাধারণভাবে বরেন্দ্রভূমি বলতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলাগুলোকে বোঝায়। ৪০ বছর আগেও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ২১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি ছিল সহজলভ্য। সরকারের পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা ও ওয়াপদার জরিপে দেখা যায়, এই ২১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৮৭টি ইউনিয়নই বর্তমানে পানির চরম সংকটে রয়েছে।১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে বরেন্দ্র এলাকায় মাটির নিচে পানির গড় নিম্নস্তর ছিল ৩৫ ফুট। ২০২১ খ্রিস্টাব্দে তা ৭০ ফুটে নেমে আসে। কোনো কোনো এলাকায় এই স্তর ২০০ ফুটেরও নিচে চলে যায়। এই অঞ্চলের ভূমির গঠন ˆশলী উঁচু-নিচু সিঁড়ির মতো এবং লাল এঁটেল মাটির প্রাধান্য বেশি। বৃষ্টির অভাবে এই মাটি শক্ত হয়ে পাথরের মতো হয়ে যায়, আর সামান্য বৃষ্টিতেও পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে এই অঞ্চলের কৃষক ও প্রান্তিক মানুষদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়।খাদ্য ও পানি মানুষের মৌলিক মানবাধিকারের অন্যতম শর্ত। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলে (রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ) বসবাসরত সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, মালো, কোলসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে পানি আজ দীর্ঘস্থায়ী ও নির্মম সংগ্রামের নাম। একদিকে প্রকৃতির রুক্ষতা, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির আশঙ্কাজনক পতন এবং কাঠামোগত সামাজিক বৈষম্য—এই তিনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বরেন্দ্রভূমির আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন চরম অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত।ভৌগোলিক গঠনের কারণেই বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি লাল এবং এর পানি ধারণক্ষমতা অত্যন্ত কম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত দুই দশকে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। আগে যেখানে বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হতো, এখন সেখানে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা যাচ্ছে।গবেষকদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১ থেকে ২ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে (বিশেষ করে মার্চ থেকে মে) পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে ৭০-৮০ ফুট, এমনকি কোনো কোনো এলাকায় ২শ’ ফুটেরও নিচে নেমে যায়। ফলে সাধারণ হস্তচালিত টিউবওয়েল তো বটেই, অনেক গভীর নলকূপও পানি তুলতে ব্যর্থ হয়।আদিবাসী পাড়াগুলো সাধারণত মূল সমতল থেকে দূরে, উঁচু ঢিবি বা প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় এই সংকট তাদের ওপর সবচেয়ে আগে এবং সবচেয়ে মারাত্মকভাবে আঘাত করে।পানি সংকটের সবচেয়ে বড় ও প্রত্যক্ষ শিকার আদিবাসী নারীরা। সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, পাহান, তুরী, রাজোয়াড়, ভূঁইয়া, কর্মকারসহ আদিবাসী সমাজে ঐতিহ্যগতভাবে পানি সংগ্রহের প্রধান দায়িত্ব নারীদের ওপর বর্তায়।খরা মৌসুমে তীব্র রোদ ও ৪০-৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপেক্ষা করে নারীরা মাইলের পর মাইল হেঁটে দূরের সচল গভীর নলকূপ বা খাড়ি (প্রাকৃতিক খাল) থেকে পানি সংগ্রহ করে। এক কলস পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রতিদিন ৪-৫ ঘণ্টা শুধু পানি সংগ্রহে ব্যয় হওয়ায় তারা চরম শারীরিক ক্লান্তি ও পুষ্টিহীনতায় ভোগে।বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেক সময় তারা পুকুর, ডোবা বা দূষিত খাড়ির পানি পান ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। ফলে ডায়রিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েড ও আর্সেনিকোসিসসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ এবং নারীদের জরায়ুর সংক্রমণ ও চর্মরোগ ব্যাপকভাবে দেখা যায়।বরেন্দ্র অঞ্চলের অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা ধান চাষ, যা অত্যন্ত পানিনির্ভর। কিন্তু পানি বণ্টনে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান।বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পরিচালিত গভীর নলকূপগুলোর নিয়ন্ত্রণ সাধারণত স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী মহলের হাতে থাকে। ফলে প্রান্তিক ও আদিবাসী কৃষকেরা পানি বণ্টনে পিছিয়ে পড়ে। প্রভাবশালী কৃষকদের জমি আগে সেচ পায়, আর আদিবাসীদের জমি পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে যায়।২০২২ সালের ২৩ মার্চ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে সেচের পানি না পেয়ে ক্ষোভ ও হতাশায় দুই সাঁওতাল ভাই—অভিনাথ মারান্ডি ও রবি মারান্ডি—গভীর নলকূপের সামনে বিষপানে আত্মহত্যা করেন। এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; এটি বরেন্দ্র অঞ্চলের কাঠামোগত বৈষম্যের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।পানি সংকট শুধু জীবিকা নয়, আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোকেও ভেঙে দিচ্ছে। জীবিকার অভাবে বহু পরিবার গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছে। তারা গার্মেন্টস শিল্প, ইটভাটা ও নির্মাণশ্রমে যুক্ত হচ্ছে।ফলে গ্রামীণ আদিবাসী জনপদগুলো পুরুষশূন্য হয়ে পড়ছে এবং ঐতিহ্যবাহী উৎসব ও সামাজিক বন্ধন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে।এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পদ্মা নদীর পানি খালপথে বরেন্দ্র অঞ্চলে আনার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষর পানি ব্যবস্থাপনায় আদিবাসী কৃষকদের বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। প্রাচীন পুকুর, খাস জলাশয় ও খাড়ি পুনঃখনন ও সংরক্ষণ করা। কমিউনিটি ভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা। কম পানিনির্ভর ফসল চাষে কৃষকদের প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ দেয়া।বরেন্দ্রভূমির আদিবাসীদের পানি সংকট কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর মানবাধিকার সংকট। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সবার জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার তখনই অর্থবহ হবে, যখন এই অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও তার অন্তর্ভুক্ত হবে।রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই এই নীরব সংকটের দিকে মনোযোগ দিতে হবে—নইলে বরেন্দ্রভূমির এই জীবনসংগ্রাম আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।[লেখক: কলামিস্ট]

তামাকের প্রলোভন থেকে কিশোর-তরুণদের বাঁচান

তামাকের ক্ষতি জানে না এমন মানুষ নেহায়েত কম। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, তামাক সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর বড় কারণ। বিশ্বের এক নিরব মহামারীর নাম ‘তামাক’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে ৮৭ লক্ষাধিক মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এর মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়, যার বড় অংশ শিশু ও নারী। বাংলাদেশেও তামাক একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা বহুমাত্রিক সংকট আরো প্রকট করে তুলছে। দেশে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তামাকজনিত রোগে বিশেষ করে- ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালমৃত্যুবরণ করেন। টোব্যাকো এটলাস-২০২৫ এর তথ্য মতে, তামাকজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৯৯ হাজারের অধিক মানুষ প্রাণ হারায়! তামাকের সৃষ্ট রোগের চিকিৎসা খরচ ৮৭ হাজার কোটি টাকা! এই লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং আর্থিক ও অন্যান্য সব ক্ষয়-ক্ষতি প্রতিরোধ সম্ভব হবে, যদি প্রকৃতপক্ষে তামাক নিয়ন্ত্রণ করা যায়।সর্বগ্রাসী তামাকের ভয়াবহতা রুখে দিতে ১৯৮৭ সাল থেকে ৩১ মে দিনটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলোর উদ্যোগে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ৯০’র দশক থেকে বাংলাদেশেও তামাকমুক্ত দিবস পালিত হচ্ছে। জনসাধারণের মাঝে তামাক বিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি এবং তামাক বিরোধী সামাজিক আন্দোলনটি জোরদারকরণে দিবসটির ভূমিকা অগ্রগণ্য। এক সময় আমরা ব্যক্তি উদ্যোগে ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর তৎপরতায় দিবসটি পালন করা হতো। সরকার এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের আওতায় ‘জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল’ গঠন করে ২০০৭ সালে।সরকারি-বেসরকারি সংস্থা/দপ্তরসমূহের সমন্বয়ে এবছরও বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০২৬ পালনে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবছর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি।’ বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিপাদ্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তামাক ও নিকোটিন পণ্য উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের লক্ষ্য করে নতুন নতুন কৌশলে নেশায় আসক্তির অপকৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে তামাক পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করছে। এমনকি তামাক কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রীয় আইন, বিধিমালা, নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করছে না! তাদের প্রধান টার্গেট আমাদের ভষ্যিত প্রজন্ম, যাদেও নেশায় আসক্ত করে বছরের পর বছর মুনাফা অর্জন করতে চায়। উদ্বেগের বিষয় হলো- বাংলাদেশ যখন ‘ইয়ুথ ডিভিডেন্ট’ এর সুফল পেতে চলেছে, সেই সময়ে তামাক কোম্পানিগুলোও তরুণদের নেশার জালে আটকাতে ফাঁদ পেতেছে।কিশোর-তরুণ: তামাক কোম্পানির প্রধান লক্ষ্য:তামাক কোম্পানিগুলো জানে, অধিকাংশ ব্যবহারকারী কৈশোরেই নিকোটিন পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। নিকোটিন অত্যন্ত আসক্তি সৃষ্টিকারী পদার্থ; অল্প বয়সে এটি মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য মাদকাসক্তির ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে অন্তত ১ জন তামাক বা নিকোটিনজাত পণ্য ব্যবহার করে। বাংলাদেশেও ১৩-১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধূমপান ও অন্যান্য তামাক ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বিদ্যমান। এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; বরং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যও ক্ষেত্রেও বড় হুমকি। শিশু-কিশোরদের মধ্যে তামাক পণ্য সেবনের ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশকে কোনভাবেই ‘ইয়ুথ ডিভিডেন্ট’ এর সুবিধা তো দিবেই না, বরং আমাদের একটি অসুস্থ প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা রাষ্ট্রের বোঝা হতে পারে!ই-সিগারেট বা ভেপ: নিরাপদ নয়, নেশায় আসক্তির নতুন ফাঁদ: তামাক কোম্পানিগুলোর অপ্রচারে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে মনে করেন, ই-সিগারেট বা ভেপিং তুলনামূলক নিরাপদ। বাস্তবে এটি নিকোটিন আসক্তির আধুনিক রূপ। গ্রামাঞ্চলেও ই-সিগারেট বিপণন, ব্যবহার বাড়ছে। কারণ, ই-সিগারেট পণ্যগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং এর মধ্যে বিভিন্ন ফ্লেভার ব্যবহার করে থাকে, যা তরুণ ও উঠতি বয়সিদের আর্কষণের মূল কারণ। উপরন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে এগুলোকে তরুণদের কাছে ‘ফ্যাশন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে সেগুলো বেচা-কেনা চলছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ই-সিগারেটসহ উদীয়মান তামাকজাত পণ্যসমূহ প্রচলিত তামাকের মতোই আসক্তি সৃষ্টিকারী। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আরও অধিক ক্ষতিকর। আরেকটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ক্ষতিকর! ই-সিগারেট ব্যবহারে ফুসফুসের ক্ষতি, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, স্ট্রোক এবং আচরণগত সমস্যার আশঙ্কা বাড়ে। জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার ই-সিগারেট আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ক্ষতিকর বিবেচনায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারতসহ বিশ্বের অন্তত ৪৭টি দেশ ই-সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। অন্তবর্তী সরকার ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারী করে দেশে ই-সিগারেট ও ইমাজিং তামাক পণ্য নিষিদ্ধ এবং বিক্রয়স্থলে তামাক পণ্য প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু, পরিতাপের বিষয় এ বছর সংশোধিত আইনে এ দুটো অতি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাদ দেয়া হয়। ফলে তামাক কোম্পানিগুলো আরো আগ্রাসী হতে পারে। তরুণ প্রজন্মের সুরক্ষায় প্রয়োজনে নতুন আইন করে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পণ্য নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। মহামান্য আপিল বিভাগ সিভিল আপিল নং ২০৪-২০৫/২০০১ মামলায় ০১/০৩/২০১৬ তারিখের রায়ে দেশে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন। রায়ে দেশে নতুন কোনো তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন না দেয়া এবং বিদ্যমান তামাক কোম্পানিগুলোকে বিকল্প পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করার নির্দেশনাও দেয়া হয়। সুতরাং এটি মানতে হবে।তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো জরুরি-আইন প্রয়োগের মাধমে তামাক পণ্যের সব ধরনের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা কঠোরভাবে বন্ধ করা; নাটক, চলচ্চিত্র, ওয়েবসিরিজ, সোস্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল কনটেন্টে ধূমপান, তামাক পণ্য সেবনের দৃশ্য প্রদর্শন বন্ধ করা; প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ করে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ ও ইমার্জিং তামাক পণ্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ অথবা নিষিদ্ধ করা; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে ও আশপাশে তামাকপণ্য বিক্রয় ও প্রচারণা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা; শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা; তামাক কোম্পানি থেকে সরকারের অংশীদারিত্ব প্রত্যাহার করা। বাংলাদেশ তরুণ ও যুবশক্তির দেশ। এই তরুণরাই আমাদের সামগ্রীক উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের মূল চালিকাশক্তি। এই বিপুল জনগোষ্ঠিকে নিকোটিন ও তামাকের আসক্তি থেকে রক্ষা করা মানে, দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখা। আসুন তামাক কোম্পানির ছলনার মুখোশ খুলে দিই। তামাকের বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেকে রক্ষা করি এবং প্রিয়জনদের ও আপনার আশপাশে সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করি। তামাকমুক্ত সমাজ ও দেশ গড়ি।[লেখক: অধ্যাপক, ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ]

গতিশীলতা থেকে মৃত্যুঝুঁকি: ই-রিকশার সস্তা ব্যাটারির চড়া মাশুল

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা (যা ই-রিকশা বা ইজি-বাইক নামে পরিচিত) চলাচল করছে। বিশেষ করে ঢাকার মতো শহরগুলোতে এই যানবাহনগুলো লাখো মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। যানবাহনের সংখ্যাটি বিশাল হলেও, এই খাতটি এখনো বড় অংশ অনিয়ন্ত্রিত রয়ে গেছে। ফলে এর ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে।ধারণা করা হয়, বাংলাদেশের ৪০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রায় সবকটিতেই বর্তমানে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রস্তুতকারক থেকে শুরু করে কিছু সরকারি উদ্যোগও স্বীকার করে যে, এই খাতে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারিই প্রধান প্রযুক্তি।বাংলাদেশে ই-রিকশায় লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহারের মূল কারণ হলো এগুলো তুলনামূলক সস্তা এবং সহজলভ্য। দেশের রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ানো স্বল্পমূল্যের রিকশাগুলোর জন্য এটিই সবচেয়ে ব্যবহারিক পছন্দ। যদিও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে অনেক সুবিধা রয়েছে, তবুও কম প্রাথমিক খরচ এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর কারণে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারিই আধিপত্য বজায় রেখেছে।সাধারণত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আয়ু লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, প্রায় ৩ থেকে ৪ গুণ। লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির আয়ু সাধারণত ৩-৫ বছর হলেও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ১০ বছর বা তার বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ই-রিকশার লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির আয়ু সাধারণত ২ বছরেরও কম হয়। এর পেছনে প্রতিকূল অপারেটিং পরিবেশ, ত্রুটিপূর্ণ চার্জিং ব্যবস্থা এবং নিম্নমানের ব্যাটারি দায়ী। একটি ই-রিকশায় সাধারণত ৪ থেকে ৬টি ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। যদি আমরা লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির গড় আয়ু ৪ বছর ধরি এবং রিকশা প্রতি ৪টি ব্যাটারি হিসাব করি, তবে বছরে প্রায় ৪০ লাখ ব্যাটারি অকেজো হয়ে পড়ছে। বাস্তবে এই সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি।লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং বা পুনর্প্রক্রিয়াজাতকরণের চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। পিওর আর্থ এবং ইউনিসেফ-এর ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবহৃত লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির মাত্র ৩০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক বা বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে রিসাইকেল করা হয়। বাকি ৭০ শতাংশই অনিয়ন্ত্রিত এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে কোনো ধরনের নিরাপত্তা মান না মেনেই প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে।যখন ব্যাটারিগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে রিসাইকেল করা হয়, তখন এর প্রায় সবটুকু সীসা ধূলিকণা, ধোঁয়া এবং দূষিত বর্জ্যের মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা মারাত্মক দূষণ ঘটায়। বিপরীতে, নিয়ন্ত্রিত ও বৈধ উপায়ে রিসাইক্লিং করলে ৯৫ শতাংশের বেশি সীসা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, যা দূষণের হার ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনে।ইউনিসেফ-এর মতে, বাংলাদেশে আনুমানিক ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম এর বেশি, যা অনুমোদিত সীমার ওপরে। অনিরাপদ ব্যাটারি রিসাইক্লিং থেকে সৃষ্ট সীসা দূষণকে এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মনে করা হয়।পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর অধীনে সুনির্দিষ্ট বিধিমালা এবং এসআরও (SRO) জারি করা হলেও এর প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। স্থানীয় সরকারগুলোর কাছে প্রায়ই এই অনিবন্ধিত রিকশাগুলো নিয়ন্ত্রণ করার বা অবৈধ রিসাইক্লিং কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সক্ষমতা বা আইনি ম্যান্ডেট থাকে না। এছাড়া একটি কেন্দ্রীয় তদারকি ব্যবস্থা না থাকায় ব্যাটারি বর্জ্য নিরাপদে সংগ্রহ ও অপসারণ নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।সীসা দূষণ কেবল জনস্বাস্থ্য সমস্যাই নয়, এটি একটি বড় অর্থনৈতিক বোঝাও বটে। ইউনিসেফ ও পিওর আর্থ-এর তথ্যমতে, সীসা দূষণের ফলে বাংলাদেশে বার্ষিক প্রায় ১৫.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়, যার মূল কারণ উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং চিকিৎসা ব্যয়ের বৃদ্ধি। আনুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থা, নিরাপদ ব্যাটারি বিকল্প এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সীসা দূষণ রোধ করা গেলে তা কেবল স্বাস্থ্যই রক্ষা করবে না, বরং বিশাল অর্থনৈতিক সুফলও দেবে।ই-রিকশার অনিয়ন্ত্রিত প্রসারের ফলে সৃষ্ট সীসা দূষণ সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।প্রথমত, ক্ষতিকর ও অবৈধ রিসাইক্লিং বন্ধে বিদ্যমান ব্যাটারি অপসারণ বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি নজরদারি ও জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো জরুরি।দ্বিতীয়ত, সকল ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় এনে পৌরসভা বা স্থানীয় সরকার পর্যায়ে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।তৃতীয়ত, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার বিভাগের তত্ত্বাবধানে আনুষ্ঠানিক ও নিরাপদ রিসাইক্লিং অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।চতুর্থত, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি কমাতে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবর্তে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতো আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করতে হবে।সবশেষে, রিকশা মালিক, চালক এবং ব্যাটারি বিক্রেতাদের মাঝে সীসা দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে, যাতে একটি জনবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়। ই-রিকশার উত্থান মানুষের যাতায়াত সহজ করেছে এবং অনেকের জীবিকার সংস্থান করেছে, কিন্তু এটি একই সাথে একটি নীরব স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা তৈরি করেছে। এখনই যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে, যে যানবাহনটি আমাদের সাশ্রয়ী যাতায়াতের কথা ছিল, সেটিই হয়তো আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বিষ হয়ে দাঁড়াবে।

ভিডিও আরও দেখুন

টাইফুনের প্রভাবে বাংলাদেশের ম্যাচ স্থগিত

টাইফুনের প্রভাবে স্থগিত হয়ে গেলো বাংলাদেশের ম্যাচ। জাপানের কাকামিকাঘাহারায় অনূর্ধ্ব-১৮ এশিয়া কাপ হকি টুর্নামেন্টে আজ চীনের বিপক্ষে ম্যাচ ছিল বাংলাদেশ নারী দলের।জানা যায়, ম্যাচটি আগামীকাল পুনঃনির্ধারিত হয়েছে।বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক লে কর্নেল রিয়াজুল হাসান (অব) বলেন, ‘আজ সকালে একটি ম্যাচ হয়েছে। দুপুর থেকে টাইফুন আঘাত হানার শঙ্কা রয়েছে। এজন্য আজকের খেলাগুলো স্থগিত হয়েছে। এশিয়ান হকি ফেডারেশন সূচিতে পরিবর্তন এনেছে।’আগামীকাল নারী দলের পাশাপাশি বালক দলেরও ম্যাচ আছে। পাকিস্তানকে হারাতে পারলে বাংলাদেশ সেমিফাইনালে খেলতে পারবে। ম্যাচ ড্র হলে গোল ব্যবধানের হিসাবে সেমিতে খেলার সুযোগ থাকবে না বাংলাদেশের। নারী দলকে সেমিফাইনালে খেলতে হলে চীনকে হারাতে হবে।নারী দল প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক জাপানের কাছে ১২-০ গোলে হেরেছিল। পরের ম্যাচে চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে ২-০ গোলে জিতেছে। বালক দল মালয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়েছিল। পরের ম্যাচে চীনের কাছে ৩-২ গোলে হেরেছে।

টাইফুনের প্রভাবে বাংলাদেশের ম্যাচ স্থগিত
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৮০ জন