সংবাদ
জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি

জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোববার ১৯ এপ্রিল থেকে এই দাম কার্যকর হবে।নতুন দর অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা।এর আগে সর্বশেষ গত ১ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত দামের তুলনায় এবার সব ধরনের জ্বালানি তেলে লিটারে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। নতুন সমন্বয়ে ডিজেল ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা হয়েছে, অর্থাৎ লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা হয়েছে, এতে লিটারে ১৮ টাকা বেশি গুণতে হবে ভোক্তাকে। অকটেন ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা হয়েছে, এখানে লিটারে সর্বোচ্চ ২০ টাকা বৃদ্ধি দেখা গেছে। আর পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে, যা লিটারে ১৯ টাকা বেশি।ফলে পরিবহন খরচ, কৃষি উৎপাদন ব্যয় এবং সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ের ব্যয়েও নতুন করে চাপ পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।
৬ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

ধর্মের নামে সহিংসতা: কোথায় আমাদের সীমারেখা?

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নে ইসলাম ধর্ম বিকৃতির অভিযোগে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামে এক সুফি পীরকে পিটিয়ে হত্যা করেছে এলাকাবাসী। তার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করা হয়েছে। তাকে যেদিন হত্যা করা হয় সেদিন সকালে কিছু লোক গোপনে বৈঠক করে এবং বৈঠকের পর কাটছাঁট করা তার ৩৬ সেকেণ্ডের একটি ভিডিও তিনটি ফেইসবুক পেইজ ও চারটি ব্যক্তিগত আইডি থেকে প্রচার করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘সত্যের সন্ধানে ফিলিপনগর’। ভিডিওটি পুলিশের নজরে এলে তারা এলাকায় গিয়ে খোঁজ-খবরও নিয়েছে। দুপুরে জনা পঞ্চাশেক লোক শামীমের দরবারে উপস্থিত হয়ে পুলিশের সম্মুখেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে। পুলিশ ৫০ জন লোককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, অবশ্য পারার কথাও নয়। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় মব সৃষ্টির কাহিনী পুলিশ সম্যকভাবে অবহিত, তখন মব নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের এক্তিয়ার বহির্ভূত। বিএনপি সরকার মব নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিলেও তার নিয়ন্ত্রণ পুলিশের এক্তিয়ারভুক্ত কিনা তা তারা এখনো বুঝে ওঠতে পারছে না।দরবার ভাঙচুর ও হত্যায় অংশগ্রহণ করেছে যারা তাদের মধ্যে রয়েছে শিশু, কিশোর ও যুবক, দুয়েকজন ব্যতীত দাঙ্গাবাজদের কারো মুখে দাড়ি বা টুপি ছিল না। অনুভূতিতে আঘাত লাগার অজুহাতে আওয়ামী লীগ আমলেও যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সৃষ্টি করেছে তাদের বেশিরভাগ ছিল হাফপেন্ট আর লুঙ্গিপরা। তবে এদের যারা উত্তেজিত করে তারা ভিন্ন জগতের মানুষ, এদের বলা হয় ‘তৌহিদি জনতা’ বা ধর্মীয় ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ বিক্ষুব্ধ মুসলিম জনসমষ্টি। এই বিক্ষুব্ধ জনসমষ্টি প্রচলিত আইন মানে না, প্রশাসন মানে না, সরকারও মানে না। ভিকটিম শামীম রেজার যে ভিডিওটি পরিকল্পিতভাবে ঘটনার দিন প্রচার করা হয়েছিল তা ছিল ২০২১ বা ২০২৩ সনের, ওই ভিডিওতে তাকে কৃষ্ণ সাজে দেখা গেছে, তখন তার দাড়ি-চুল ছিল কালো।তিনি নাকি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সম্রাট আকবরের মতো একটা সমন্বয় করতে চেয়েছিলেন। ১৫৮২ সনে মুঘল সম্রাট আকবর তার প্রবর্তিত ‘দীন-ই-ইলাহি’র মাধ্যমে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে গেছেন। তার ওই মতবাদ কেউ গ্রহণ না করলেও মুসলিম ইতিহাসে তিনি কখনো ‘দীন-ই-ইলাহি’ প্রচারের জন্য অসম্মানিত হননি। শুধু তাই নয়, এবার পহেলা বৈশাখে মুসলিম বাঙালিরা ‘বৈশাখ-ই আকবর’ নামে একটি কর্মসূচিও পালন করেছে। শামীম রেজার ভিডিওটি ২০২১-২৫ সাল পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছিল। কিন্তু তাতে কোন অসুবিধা হয়েছে বলে কেউ অভিযোগ করেনি। কেউ তার ভিডিও দেখে ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলেও শোনা যায়নি। তাহলে ৫ বছর পর ২০২৬ সালে হঠাৎ কেন কিছু লোকের অনুভূতিতে আঘাত লাগলো?ধর্মীয় ইস্যুতে এমন বিক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠী বেশি দেখা যায় পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে। এই তিন দেশে ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষ ভিন্নমতের লোকদের হত্যা করার উন্মাদনায় উন্মত্ত। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতাকে নির্বিঘ্ন রাখতে এদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করে, তাই এদের বিরুদ্ধে লোক দেখানো ব্যবস্থা নিতেও গড়িমসি করে। বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভোট হারানোর ভয়ে বাম-ডান সব রাজনৈতিক দল এই উগ্রতাকে সমীহ করে, তাই গণতান্ত্রিক নির্বাচন এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তুলছে। সরকারের উদাসীনতা আর প্রশাসনের নির্লিপ্তায় ধর্মীয় ইস্যুতে বিক্ষুব্ধ এই জনগোষ্ঠী বেপরোয়া। ধর্ম নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টিকারীদের হত্যা করতে পারার মধ্যে তারা স্বর্গীয় সুখ পায়, জেহাদের উত্তেজনায় ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে জীবিত মানুষকে পুড়িয়ে মারে, কবর থেকে লাশ তুলে পিটাতে পিটাতে উল্লাস করে, মরদেহের ওপর ওঠে নৃত্য করে, পিটিয়ে মারা মৃতদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পোড়ায়।মানুষ পোড়ানো ইসলাম ধর্মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও এটাকে তারা ধর্ম অবমাননা মনে করে না। বিভিন্ন আলেম ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করলেও এদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে না, আঘাত বেশি লাগে যখন কোন সুফি বা হিন্দু ধর্ম নিয়ে কথা বলে। মানুষ হিংস্র বলেই খান জাহান আলী মাজারের পুকুর ঘাটে মানত করে বেঁধে রাখে ছাগল বা কুকুর, ছুঁড়ে মারে হাঁস-মোরগ, পুকুরের কুমিরগুলো যখন অসহায় প্রাণীগুলো খেতে থাকে তখন পাড়ে অপেক্ষমান জনতা আনন্দে হাত তালি দেয়। আনন্দ পায় বলেই নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেয়া হয়, আনন্দ পায় বলেই ২৮ বছর বয়সী পোষাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে শুধু পিটিয়ে হত্যা করা হয় না, গাছের ডালে টাঙিয়ে পুড়িয়েও দেয়া হয়। মানুষ হিংস্র। হিংস্র বলেই এক সময় হিংস্র পশুর খাঁচায় অপরাধীদের ফেলে দিয়ে তার বাঁচার আকুতি ও অসহায়ত্ব দেখে দর্শক আনন্দ পেত। এখনো সউদি আরবে গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর চোর-ডাকাত-ব্যভিচারীর হাত ও গর্দান কাটার সময় মুসল্লিদের আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা যায়। ৭০-৭২ খ্রিস্টাব্দে দুই গ্ল্যাডিয়েটরের আমৃত্যু লড়াইয়ে ভয়ঙ্কর মৃত্যুদৃশ্য দেখার জন্য রাজা-রাণীসহ ইতালির কলোসিয়ামে ৮০ হাজার দর্শকের সমাগম হতো। অনেক সময় বাঘ, সিংহের মতো হিংস্র প্রাণীর সঙ্গেও গ্লাডিয়েটরদের বদ্ধ খাঁচায় লড়াই করতে হতো, লড়াইরত গ্লাডিয়েটরের করুন মৃত্যু দেখে দর্শকরা কলোসিয়ামের গ্যালারিতে আনন্দে উল্লাস করতো। মানুষ হত্যায় যেই মানুষগুলো এত মজা পায় তারা সৃষ্টিকর্তার আশরাফুল মাখলুকাত হতে পারে না।ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে বাড়াবাড়ির খবর নতুন কিছু নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে যে রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে তা হিংস্র মানুষের বীভৎস রূপ। কোরআনে পা রাখার গুজব ছড়িয়ে জুয়েল নামে যে লোককে পিটিয়ে আর আগুনে পুড়ে হত্যা করা হয়েছিল তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না। অসুস্থ্য হলেও তিনি যে কোরআনে পা রাখেননি তা মসজিদের খাদেম বারবার উল্লেখ করেছেন। জুয়েল রোজা রাখত, নামাজ পড়ত, সেইদিনও নামাজ পড়ে মসজিদে রাখা কোরআন শরীফ দেখছিলেন। কোরআনে পা রাখার গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শত শত লোক এসে জুয়েলকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল। নিহত জুয়েলের দুই হাত, গলায় ও কোমরে রশি লাগিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর থেকে প্রায় ৪২০ মিটার দূরে টেনেহিঁচড়ে আন্তজেলা মহাসড়কে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পিটিয়ে হত্যা, টেনেহিঁচড়ে নেয়া ও আগুন লাগানোর কাজে উৎসাহীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ ছিল কিশোর।মব সৃষ্টি করে যে কোন মানুষকে বাংলাদেশে পিটিয়ে মেরে ফেলা সহজ। ‘ছেলেধরা’ অভিহিত করে বাংলাদেশে বহু লোককে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। রাস্তায় যে কোন লোককে দেখিয়ে চোর বা ছিনতাইকারী বললেই আশপাশের কেউ যাচাই না করেই পিটাতে শুরু করে দেয়। অনুভুতির মব যত্রতত্র। প্রতিটি সরকারের প্রশ্রয়ে এই জাতীয় দানবীয় কর্মকাণ্ডের জন্য ইসলাম শান্তির ধর্ম হয়ে উঠতে পারল না। এআই-এর ভয়ানক আধিপত্যে এখন বোঝা যায় না, কোনটি আসল বা কোনটি নকল। আসল হলেও পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে কেন? ধর্ম কি এতই ঠুনকো যে, কেউ কিছু একটা বললেই তা বিলীন হয়ে যাবে! মনে হচ্ছে আমাদের ধর্মীয় শিক্ষায় কোন গলদ আছে, নতুবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ ওঠলেই মানুষ এত হিংস্র হয়ে উঠে কেন ? বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ অন্যায় করে, ঘুষ খায়, মানুষ ঠকায়, মিথ্যা বলে, ধর্ষণ করে, বলাৎকার করে, কিন্তু কারো ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করার কথা শোনা মাত্রই প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে পড়ে। ব্যক্তি জীবনে হয়তো এদের কেউই ধর্মকর্মে একনিষ্ঠ নয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হলে শাস্তির বিধান আছে, কিন্তু দণ্ডবিধি বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘ধর্মীয় অনুভূতির’ কোন স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। অবশ্য সংজ্ঞা দেয়া সম্ভবও নয়, কারণ কোন কথায় কার অনুভুতিতে কিভাবে আঘাত লাগবে তা সুনির্দিষ্ট করা কঠিন।১৯৫৩ সনে পাকিস্তানে আহমদিয়া বিরোধী দাঙ্গায় ২ হাজার কাদিয়ানিকে হত্যা করা হয়, দাঙ্গায় উসকানি দেয়ার অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। আহমদিয়া বিরোধী দাঙ্গার পর পাকিস্তান সরকার এর তদন্তে লাহোর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ মুনিরকে প্রধান করে ‘পাঞ্জাব ডিস্টারবেন্সেস ইনকোয়ারি কোর্ট’ গঠন করে। ‘মুসলমান কাকে বলে’- মুনির কমিশনের এমন প্রশ্নের উত্তরে পাকিস্তানের নামকরা ১০ জন আলেম ১০ রকম সংজ্ঞা দেন এবং প্রত্যেক আলেমের সংজ্ঞা অনুযায়ী অন্য আলেমরা ‘কাফের’ হয়ে যান। মুনির রিপোর্ট আরও উল্লেখ করে যে, যদি সব আলেমের সংজ্ঞা একসাথে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে পাকিস্তানে কোনো মুসলমানই থাকে না। বাংলাদেশেও একজন আলেম আরেকজন আলেমকে ‘কাফের’ ফতোয়া দিচ্ছে। তারপরও ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লাগার অভিযোগ উত্থাপনের আইন বলবৎ আছে।শক্তি প্রয়োগে ভীতি সৃষ্টি হয়, কিন্তু মন জয় করা যায় না। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের দুইজন নামকরা আলেমের ভিসা বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া। জাপানে মসজিদ নির্মাণে বাধা দিচ্ছে স্থানীয় জাপানিরা। শুধু জাপান নয়, গ্রীস এবং ইতালিও মসজিদ করতে দিচ্ছে না। জাপান মুসলমানদের কবর দিয়ে জায়গা নষ্ট করারও ঘোর বিরোধী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলাম ধর্ম নিয়ে ফোবিয়া বা ভীতি রয়েছে। আমার এক সহকর্মীর নামের শেষ অংশে ‘ইসলাম’ থাকায় আমেরিকা ভিসা দেয়নি, বোম্বে সিনেমার অভিনেতা শাহরুখের নামের শেষে ‘খান’ থাকায় তাকে আমেরিকার বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা ধরে জেরা করা হয়েছে, অবসর নেয়ার পর ভারতের রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের মুসলিম নামের কারণে আমেরিকার বিমানবন্দরে তাকে নাজেহাল করা হয়। ২০২৪ সনের পিউ রিসার্চের রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে মুসলিমদের প্রতি সামাজিক ম্বৈরিতা ‘খুব উচ্চ’ পর্যায়ে রয়েছে। তাই ইসলাম ধর্মকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে সুরা নিসার ১৪০ নম্বর আয়াত মেনে চলা ফরজ, যাতে বলা হয়েছে, ‘যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করা হচ্ছে ও তাকে বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন তোমরা তাদের সঙ্গে বসবে না, যে পর্যন্ত না তারা অন্য কোনো প্রসঙ্গে লিপ্ত হবে’।[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

সংরক্ষিত আসন এবং উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারী

স্বাধীনোত্তর যতগুলো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, আদিবাসী পুরুষরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কখনোই নির্বাচিত হতে পারেননি| আর নারীরা সংরক্ষিত আসন ব্যতীত সাহস দেখাতে পারেননি| বিগত সময়ে দু-একজন নারী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দিলেও দলীয়ভাবে মনোনয়ন আদায় করতে পারেননি| সংরক্ষিত নারী আসনে বারবার বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা উপেক্ষিত, অবহেলিত ও বঞ্চিত হয়ে আসছে| আমরা লক্ষ্য করেছি, অতীতে আদিবাসীদের পক্ষে জাতীয় সংসদে চাকমা, রাখাইন, মারমা ও তঞ্চঙ্গ্যা নারীরা একাধিকবার প্রতিনিধিত্ব করেছেন—এর বাইরে তেমন নজির নেই| স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের পরও উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীরা সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাননি| পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচনী আসনগুলো থেকে আদিবাসীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়ে আসছেন, যা এখনও বিদ্যমান; পাশাপাশি সংরক্ষিত আসনেও নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে| কিন্তু জাতীয় সংসদে নির্বাচিত আদিবাসী নারী-পুরুষেরা নিজেদের নির্বাচনী এলাকা নিয়েই ব্যস্ত থেকেছেন; অন্য অঞ্চলের আদিবাসীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখের বিষয়ে তাদের তেমন সরব হতে দেখা যায়নি| ফলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ক্ষমতায়নের দিক থেকে উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা এখনও প্রান্তিক পর্যায়েই অবস্থান করছেন| আমরা বিশ্বাস করি, একমাত্র সুযোগের অভাবেই তাদের মেধা, মনন ও দক্ষতার বিকাশ ঘটেনি| নির্বাচন কমিশন ৮ এপ্রিল তফসিল ঘোষণার পর সংরক্ষিত নারী আসনে ইতোমধ্যে ৩৬১ জন বিএনপি, ১৩ জন জামায়াতে ইসলামী এবং একজন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন| ২১ এপ্রিল মনোনয়নপত্র জমা, ২৯ এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ৩০ এপ্রিল প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে| তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ মে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে| কমিশনের তথ্য অনুযায়ী বিএনপি ও তার জোট ৩৬টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ও তার শরিকরা ১৩টি আসন এবং ছয়জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের জোট একটি আসন পাবে| ৬ এপ্রিল সংরক্ষিত নারী আসনের ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে; তালিকা অনুযায়ী ২৯৮ জন সংসদ সদস্য ভোট দেবেন| দলের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত মনোনীত ব্যক্তিরাই সংরক্ষিত আসনে আগামী পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন| আমরা জেনেছি, বৃহত্তর উত্তরবঙ্গ থেকে একাধিক আদিবাসী নারী সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন| অতীতের সরকারগুলো উত্তরবঙ্গকে যথাযথ মূল্যায়ন করেনি; লাখ লাখ আদিবাসীর দাবি-দাওয়া ও মনের কথা অপ্রকাশিতই থেকে গেছে| বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলই এ বিষয়ে কিছুটা সক্রিয়তা দেখিয়েছে| ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ৭ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের বিরামপুর সরকারি কলেজ মাঠে এক জনসভায় বলেন, ‘এই এলাকার মুসলমান, হিন্দু, আদিবাসী, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—সবাই মিলে আমরা আমাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করব| আমাদের পরিচয় হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে; ধর্ম নয়|’ প্রধানমন্ত্রীর পারিবারিক শিকড় দিনাজপুরের বিরামপুরে| এ অঞ্চলে সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, রাজোয়াড় ও পাহান সম্প্রদায় বহু শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছে| তাদের পূর্বপুরুষরা পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করেছেন| আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের সংরক্ষিত আসনে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেবেন| সরকার গঠনের পর থেকেই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার আদিবাসী প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন| গত ৩১ মার্চ ঢাকায় এক আলোচনা সভায় তিনি আদিবাসীদের ‘ভূমিপুত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তারা এ দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাদের অধিকার অন্য সব নাগরিকের মতোই সমান| তিনি একটি বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এবং আদিবাসী সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরার কথাও বলেন| একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার সংরক্ষিত নারী আসনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারেন| আমরা উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা আশাবাদী| দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নেতার জন্ম ও শিকড় উত্তরবঙ্গেই| সংরক্ষিত নারী আসনের মাধ্যমে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের কথা জাতীয় সংসদে প্রতিফলিত হলে তা নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে| অতীতে বাসন্তী চাকমা, গ্যোরভতি তঞ্চঙ্গ্যা, মানজু মারমা, এথিন রাখাইন, ম্যাম্যাচিন মারমাদের উপস্থিতি আমাদের গর্বিত করেছে| এবার উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের সুযোগ দেয়া হলে সাঁওতাল, মাহালী, উরাঁও, মুণ্ডা, রাজোয়াড়, সিং, রায়, বর্মন, পাহান, কোলসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রান্তিক বাস্তবতা সামনে আসবে| কোডা, কোড়া, ভীল, তুরী ও পাহাড়িয়াদের সংগ্রামের কথাও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পাবে| সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তই আদিবাসীদের ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ম্ববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহায়ক হবে| তাই আর উপেক্ষা নয়—সময়ের দাবি বিবেচনায় সংরক্ষিত নারী আসনের একটি উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের জন্য বরাদ্দ করা হলে তা হবে ন্যায়সংগত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ| [লেখক: কলামিস্ট]

জন্ম নয়, কর্মেই মানুষের পরিচয়

গ্রামগঞ্জের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতারা একটি প্রবাদ প্রায়ই উচ্চারণ করেন—‘বারো হাত বাঙি, তেরো হাত বিচি (বীজ)’| প্রথম শুনলে এই কথাটি অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হতে পারে| কারণ, কোনো ফলের বীজ তার নিজের চেয়ে বড় হওয়া বাস্তবসম্মত নয়| কিন্তু লোকজ প্রবাদ কখনও সরল অর্থে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে গভীর জীবনবোধ, অভিজ্ঞতা এবং সমাজ বাস্তবতার প্রতিফলন| এই প্রবাদটির মধ্যেও তেমনই এক অন্তর্নিহিত তাৎপর্য রয়েছে| এখানে বোঝানো হয়েছে— অনেক সময় ছোট, অবহেলিত বা অপ্রত্যাশিত উৎস থেকেও বড়, বিস্ময়কর ও মূল্যবান কিছু সৃষ্টি হতে পারে| অর্থাৎ, জন্মের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কর্ম ও যোগ্যতার মাধ্যমে মানুষ নিজের অবস্থানকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যেতে পারে| এই সত্যটি বোঝাতে একটি সহজ কাহিনি উল্লেখ করা যায়| বহুদিন আগের কথা| এক গ্রামে রাম বিলাস দাস নামে এক দরিদ্র দিনমজুর বাস করতেন| জীবিকার তাগিদে তিনি রাস্তার পাশে বসে পুরনো স্যান্ডেল-জুতা মেরামত ও বুট পালিশ করতেন| সামান্য আয় দিয়ে কোনোমতে সংসার চলত| দীর্ঘদিন পর তার ঘরে এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়| সন্তানের নাম রাখা হয় খোকন দাস| অর্থকষ্ট ছিল নিত্যসঙ্গী, তবুও সন্তানের লালন-পালনে তিনি কখনও অবহেলা করেননি| খোকন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে| একসময় তাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়| শুরুতে সহপাঠীদের উপহাস ও অবজ্ঞার শিকার হতে হলেও তার মেধা, অধ্যবসায় ও নম্র আচরণের কারণে সে দ্রুত সবার প্রিয় হয়ে ওঠে| তার ফলাফল সবসময় ভালো হতে থাকে| সন্তানের এই অগ্রগতি দেখে রাম বিলাস দাসের মনে এক নতুন স্বপ্ন জন্ম নেয়— তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন, যে করেই হোক ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন| প্রাথমিক শিক্ষা শেষে খোকনকে দূরের একটি হাইস্কুলে ভর্তি করানো হয়| দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না| অনেক সময় তাকে প্রয়োজনীয় বই-খাতা জোগাড় করতে কষ্ট করতে হয়েছে| তবুও সে থেমে থাকেনি| কঠোর পরিশ্রম ও একাগ্রতার মাধ্যমে সে মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়| পরবর্তীতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যায় এবং একসময় বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়| আজ খোকন দাস সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি| মানুষ তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করে| কিন্তু তার পিতা এখনও রাস্তার পাশে বসে জুতা মেরামতের কাজ করে যাচ্ছেন| এই বৈপরীত্য অনেকের চোখে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে| কেউ কেউ বিদ্রূপ করে বলেন—‘বারো হাত বাঙি, তেরো হাত বিচি’| আবার কেউ বলেন—‘গোবরে পদ্মফুল’| যদিও বাস্তবে গোবরে পদ্মফুল জন্মায় না, তবুও এই উপমার মাধ্যমে বোঝানো হয়— অপ্রত্যাশিত বা অবহেলিত স্থান থেকেও অনন্য সাফল্য জন্ম নিতে পারে| এই কাহিনি কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি সমাজের বাস্তব চিত্রের প্রতিফলন| ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ও সফল মানুষই প্রতিকূল পরিবেশ থেকে উঠে এসেছেন| তাদের জীবনের শুরু ছিল দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও সংগ্রামের মধ্যে, কিন্তু তারা সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে নিজেদের যোগ্যতায় শীর্ষে পৌঁছেছেন| উদাহরণস্বরূপ, আব্রাহাম লিংকন দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন| তার শৈশব কেটেছে অভাবের মধ্যে, কিন্তু তিনি আত্মশিক্ষার মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন| ড. বি. আর. আম্বেদকর চর্মকার পরিবারে জন্ম নিয়েও উচ্চশিক্ষা অর্জন করে ভারতের সংবিধানের প্রধান স্থপতি হন| তিনি সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন| জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও অভাবের মধ্যে বড় হয়েছেন| জীবিকার তাগিদে ছোটবেলায় বিভিন্ন কাজ করতে হলেও তিনি সাহিত্য ও সঙ্গীতে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন| একইভাবে এ. পি. জে. আব্দুল কালাম দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়ে সংবাদপত্র বিক্রি করে পড়াশোনার খরচ জোগাতেন, অথচ পরবর্তীতে তিনি একজন খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ও ভারতের রাষ্ট্রপতি হন| এছাড়াও বিশ্ব ইতিহাসে আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে—যারা বস্তি, গ্রাম বা নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে রাষ্ট্রনায়ক, দার্শনিক, সাহিত্যিক বা বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন| তাদের সবার জীবনে একটি বিষয় অভিন্ন—তারা নিজেদের জন্মপরিস্থিতিকে সীমাবদ্ধতা হিসেবে মেনে নেননি| বরং কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং দৃঢ় মানসিকতার মাধ্যমে তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্মাণ করেছেন| সমাজে এখনও পেশাভিত্তিক ও শ্রেণীভিত্তিক ম্ববৈষম্য বিদ্যমান| অনেক সময় মানুষ জন্ম বা পারিবারিক অবস্থান দেখে অন্যকে মূল্যায়ন করে| কিন্তু এই ধরনের চিন্তাভাবনা সমাজের অগ্রগতির জন্য বাধা| একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য তার কর্ম, চরিত্র ও যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে| জন্মস্থান বা পারিবারিক পটভূমি নয়, বরং তার কাজই তাকে সম্মানিত করে| ‘বারো হাত বাঙি, তেরো হাত বিচি’—এই প্রবাদের প্রকৃত অর্থ এখানেই নিহিত| এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ হওয়ার সম্ভাবনা সব মানুষের মধ্যেই রয়েছে| প্রয়োজন শুধু সুযোগ, পরিশ্রম এবং সঠিক দিকনির্দেশনা| অতএব, আমাদের সমাজে এমন পরিবেশ ˆতরি করা প্রয়োজন, যেখানে প্রতিটি মানুষ তার যোগ্যতা অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়| দরিদ্র বা অবহেলিত পরিবারের সন্তানদের প্রতি অবজ্ঞা না করে তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত| কারণ, আজ যে শিশু অবহেলিত, সঠিক সুযোগ পেলে সে-ই আগামী দিনের নেতৃত্ব দিতে পারে| জন্ম মানুষের হাতে নয়, কিন্তু কর্ম তার নিজের হাতে| তাই ‘জন্ম হোক যেথায়-সেথায়, কর্ম হোক ভালো’—এই আদর্শকে সামনে রেখে এগিয়ে গেলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই উপকৃত হবে| এই চেতনা আমাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেই ‘বারো হাত বাঙি, তেরো হাত বিচি’ আর কেবল প্রবাদ থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে বাস্তব জীবনের এক অনুপ্রেরণার শক্তি| [লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

প্রতিটি গুম-খুনের বিচার চাই

‘গুম-খুন’ শব্দবন্ধটি এ লেখায় সচেতনভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে| কারণ এই দুটি কুকাজ, ভিন্ন প্রক্রিয়ায় বা ধরণে হলেও, মানুষের জীবনের ওপর একই চূড়ান্ত ফলাফল বয়ে আনে- জীবনের চলমান পর্দা থেকে হারিয়ে যাওয়া| মানবিক, নৈতিক বা ধর্মীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে গুম-খুনের বিচারের দাবিতে আমাদের সম্মিলিত অবস্থান আজও অস্পষ্ট ও দ্বিধাবিভক্ত| নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যগুলোর একটি| মানুষের প্রাণহরণ কিংবা কাউকে জোরপূর্বক অদৃশ্য করে দেয়ার পক্ষে কোনো নৈতিক, মানবিক বা ধর্মীয় ভিত্তি নেই যা নীতিশাস্ত্রের মৌলিক স্বীকার্য| দর্শনের ভাষায় বললে, মানুষের জীবন একটি ‘অন্তর্নিহিত মূল্য’ বহন করে| তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে সেই জীবনকে হরণ করা কখনোই ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না| তবুও আমাদের সমাজে গুম-খুনের বিচার চাইতে গিয়ে আমরা ভয়াবহভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ি| কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ নীরব থাকে, আবার কেউ কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গুম-খুনকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে| এই বিভাজন কেবল রাজনৈতিক মতভেদের ফল নয়; এটি সামাজিক মনোবিজ্ঞানেরও একটি প্রতিফলন, যেখানে ‘দলগত পক্ষপাত’ বা ‘শ্রেণী দ্বন্দ্ব’ মানুষকে ন্যায়-অন্যায়ের সার্বজনীন মানদণ্ড থেকে বিচ্যুত করে| অথচ অন্যায়ের মুখে নীরব থাকা নিজেই এক ধরনের নৈতিক অবস্থান এবং সেই নীরবতা প্রায়শই অন্যায়কারীর পক্ষেই কাজ করে| এপ্রসঙ্গে বর্ণবাদ বিরোধী নোবেল বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকান ধর্মযাজক (আর্চবিশপ) ডেসমন্ড টুটু (১৯৩১-২০২১) উক্তিটি উল্লেখযোগ্য, ‘অন্যায়ের পরিস্থিতিতে আপনি যদি নিরপেক্ষ থাকেন, তবে আপনি অত্যাচারীর পক্ষ নিয়েছেন’|আমাদের পক্ষপাতিত্বের ফলে বাস্তবতা দাঁড়ায় এমন যে, গুম-খুনের বিচার চায় এক পক্ষ, কিন্তু নীরবতা থাকা ও অপরাধের পক্ষে ছাফাই গাওয়ার মাধ্যমে এর বিপক্ষে অবস্থান নেয় অন্তত দুই পক্ষ| এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ নৈতিক ভারসাম্যহীনতার কারণে আমাদের দেশে বিচারহীনতা ক্রমে একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়; একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়| ফরাসী সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খাইম (১৮৫৮-১৯১৭) যাকে ‘নৈতিক বিশৃঙ্খলা’ (অ্যানোমি) বলেছেন, সেই অবস্থাই যেন আমাদের বাস্তবতায় প্রতিফলিত হয়, যেখানে ন্যায়-অন্যায়ের স্পষ্ট সীমারেখা মুছে যায়| ফলে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং তা আমাদের সামষ্টিক নৈতিক দুর্বলতার অনিবার্য পরিণতিতে রূপ নেয়| এই পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের যে মৌলিক সত্যটি নির্ভুলভাবে ধারণ করতে হবে, তা হলো, ‘গুম-খুন সর্বাবস্থায় গুম-খুনই’| কোনো পরিস্থিতি, আবেগ বা আপাত যুক্তি দিয়ে এই অপরাধকে বৈধতা দেয়া যায় না| নৈতিক দর্শনের ইতিহাসে এই অবস্থানটি এক ধরনের ‘অপরিবর্তনীয় নীতি’ (ক্যাটাগরিক্যাল ইম্পারেটিভ)-এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ যেখানে মানুষকে কখনোই কোনো লক্ষ্য অর্জনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা যায় না| বরং তাকে নিজেই একটি উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হয়| সুতরাং কাউকে গুম করা বা হত্যা করা মানে কেবল তার জীবন হরণ করা নয়; বরং তার মানবিক মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং অস্তিত্বের মৌলিক ভিত্তিকেই অস্বীকার করা|জীবন স্রষ্টার দেয়া এক অমূল্য দান; এই বিশ্বাস ধর্মীয় দৃষ্টিকোণেই নয়, মানবতাবাদী চিন্তাধারাতেও সমানভাবে প্রতিধ্বনিত| জীবন নামক সময়ের সীমার মধ্যে মানুষকে যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, যেমন চিন্তা করার, মতপ্রকাশের, নিজের জীবনচর্যা নির্ধারণের, তা কেড়ে নেয়া মানে সেই সৃষ্টির অন্তর্নিহিত নীতির বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়া| ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ‘গুম’ শব্দটি কেবল শারীরিক অনুপস্থিতিকে নির্দেশ করে না; এটি এক ধরনের জোরপূর্বক নীরবতা আরোপের প্রতীক, যেখানে একজন মানুষের কণ্ঠ, পরিচয় ও অস্তিত্ব সবকিছুকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়| ফলে ‘গুম’ অনেক ক্ষেত্রেই ‘খুন’-এর একটি প্রলম্বিত প্রক্রিয়া কিংবা আড়াল করা রূপ যেখানে মৃত্যু হয়তো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু পারিবারিক, সামাজিক কিংবা জাতীয় জীবনে তার অনুপস্থিতির মধ্যেই সেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে|পৃথিবীর প্রতিটি খুনীই নিজের পক্ষে কোনো না কোনো যুক্তি দাঁড় করায়—এটি মনোবিজ্ঞানের সুপরিচিত বাস্তবতা| কেউ আত্মরক্ষার কথা বলে, কেউ প্রতিশোধের, কেউ ধর্মীয় বা সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার কথা তুলে ধরে| কিন্তু এই সব যুক্তিই মূলত ‘নৈতিক বৈধতা’ তৈরি করার এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা, যা ব্যক্তিকে নিজের অপরাধকে সহনীয় করে তুলতে সাহায্য করে| রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, যখন এই ধরনের যুক্তিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় বা নীরব সমর্থন লাভ করে, তখন তা ‘কাঠামোগত সন্ত্রাস‘ (স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স)-এ রূপ নেয় অর্থাৎ সহিংসতা তখন কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ থাকে না, বরং একটি কাঠামোগত বাস্তবতায় পরিণত হয়| অথচ, জন্মের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক মানুষের জীবনের ওপর তার একটি অবিচ্ছেদ্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় যা আধুনিক মানবাধিকার ধারণার কেন্দ্রবিন্দু| এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার নৈতিক বা আইনগত ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাষ্ট্রের নেই, যদি না তা একটি স্বচ্ছ, ন্যায়ভিত্তিক ও আইনের শাসন-নির্ভর বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়| অন্যথায়, গুম-খুন কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক ভিত্তির ওপর এক গভীর আঘাত, যা শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক ন্যায়বোধকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়|কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের রাষ্ট্র কি সত্যিই সেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে? একটি রাষ্ট্রের মৌলিক নৈতিক দায় অন্তত তিনটি: নাগরিকের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা| রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাথমিক তত্ত্বেই বলা হয়, সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে মানুষ তার কিছু স্বাধীনতা রাষ্ট্রকে অর্পণ করে এই প্রত্যাশায় যে, রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা ও ন্যায়ের নিশ্চয়তা দেবে| কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় আমরা দেখি এর উল্টো এক চিত্র; বিচারহীনতার এক দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতি, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে| এই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গুম-খুন হওয়া মানুষের পরিবারের বেদনায়| খুন হওয়া চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের, এবং বাংলাদেশ পুলিশের নিহত সদস্যদের পরিবারগুলোসহ সাম্প্রতিক সময়ে শরিফ ওসমান হাদির পরিবার যেমন আজও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় দিন গুনছে, তেমনি সড়ক দুর্ঘটনার নামে পরিকল্পিত হত্যার শিকার কিংবা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া অসংখ্য মৃত্যুর পেছনেও লুকিয়ে থাকে অপ্রকাশিত সত্য| ইতিহাসের নানা বাঁকে, বিশেষ করে বিভিন্ন আন্দোলন, রাজনৈতিক সংঘাত বা সামাজিক অস্থিরতার সময়ে প্রাণ হারানো মানুষের পরিবারগুলোও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত| এই দীর্ঘ বিচারহীনতা কেবল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকেই ক্ষতবিক্ষত করে না; বরং এটি পুরো সমাজের ওপর এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও হতাশার ছায়া ফেলে| ফলে মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের আস্থা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে, যা একটি স্থিতিশীল, কল্যাণমুখী ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়|সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, যখন অপরাধের বিচার হয় না, তখন আইনের শাসন ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার জায়গা দখল করে নেয় শক্তির নীতি, ‘জোর যার মুল্লুক তার’| এর ফলে ন্যায়বোধের পরিবর্তে ভয়, প্রতিশোধ এবং স্বেচ্ছাচারিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়| মানুষ তখন আইনের ওপর আস্থা হারিয়ে নিজেরাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, যা শেষ পর্যন্ত আরও সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়| এই প্রক্রিয়াটি একটি সমাজকে ধীরে ধীরে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে অন্যায় আর ব্যতিক্রম নয়; বরং এক ধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়| এই অবস্থার পরিবর্তনে আমাদের ঐতিহাসিক দায় স্বীকার করা জরুরি| পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে এই ভূখণ্ডে সংঘটিত অসংখ্য খুন ও নিপীড়নের একটি ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে, যার বড় একটি অংশ আজও বিচারহীন| এই প্রেক্ষাপটে একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যেখানে সময়কালভিত্তিক তিনটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে| একটি পলাশী থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ঔপনিবেশিক সময়ের জন্য, একটি পুরো পাকিস্তান আমলের জন্য, এবং আরেকটি স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের জন্য| এই ধরনের উদ্যোগ কেবল বিচার নিশ্চিত করার একটি কাঠামোই তৈরি করবে না; বরং একটি জাতির ইতিহাসের সঙ্গে ন্যায়বিচারের সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের পথও খুলে দেবে| আইন ও বিচার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বিস্তারিত রূপরেখা প্রণয়ন করতে পারেন যাতে বিচারপ্রক্রিয়া হয় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং উচ্চমান সম্পন্ন|এর মাধ্যমে কেবল গুম-খুনের বিচারের দাবি পূরণই নয়, একটি বৃহত্তর নৈতিক পুনর্জাগরণের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হতে পারে| ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ অতীতের অন্যায়কে স্বীকার করে এবং তার বিচার নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়, সেই সমাজই টেকসই শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়| অন্যদিকে, রাষ্ট্রে বিচারহীনতা যতদিন বহাল থাকে, ততদিন সমাজে প্রতিশোধপরায়ণতা, বিশৃঙ্খলা এবং স্বেচ্ছাচারিতা নতুন নতুন রূপে ফিরে আসে| তাই ন্যায়বিচার কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির নৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অপরিহার্য পূর্বশর্ত| তবে মনে রাখতে হবে, কেবল বিচারহীনতাই নয়, আমাদের সমাজকে গ্রাস করেছে আরও দুটি গভীর ও বিপজ্জনক প্রবণতা: পক্ষপাতিত্ব এবং ‘জল ঘোলা করার সংস্কৃতি’| পক্ষপাতিত্বের এই প্রবণতা আমাদের নৈতিক মেরুদণ্ডকে ক্রমাগত দুর্বল করে দিয়েছে| আমরা নিজের ক্ষতি হলে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করি, কিন্তু অন্যের ক্ষতির ক্ষেত্রে নীরব থাকি, আমাদের ন্যায়বোধও যেন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীভেদে ভিন্ন হয়ে যায়| ফলে অন্যায়কে আমরা বিচার করি না ন্যায়-অন্যায়ের সার্বজনীন মানদণ্ডে; বরং বিচার করি ব্যক্তি, পরিবার, দল, শ্রেণী কিংবা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে| অথচ নৈতিক দর্শনের একেবারে মৌলিক সত্য হলো, অন্যায়, যেই করুক, অন্যায়ই থাকে| এই সত্যকে অস্বীকার করা মানে ন্যায়ের ধারণাকেই আপেক্ষিক করে তোলা, যা শেষ পর্যন্ত সমাজের সব স্তরে অন্যায়ের স্বাভাবিকীকরণ ঘটায়|সমাজবিজ্ঞান ও নৈতিক মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় দেখা যায়, এই ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণ মানুষের ‘নৈতিক বিচ্ছিন্নতা’ (মোরাল ডিসএনগেইজমেন্ট)-এর একটি রূপ, যেখানে ব্যক্তি নিজের অবস্থান বা স্বার্থ রক্ষার জন্য নৈতিক বিচারকে আংশিক বা বিকৃত করে নেয়| এর ফলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কোনো স্তরেই ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না| কারণ ন্যায় তখন আর একটি সর্বজনীন মূল্যবোধ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে সুবিধাভিত্তিক একটি অবস্থান| তাই ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রথম ও অপরিহার্য শর্ত হলো, পক্ষপাতহীনতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক অবস্থান গ্রহণ করা, তা নিজের বিরুদ্ধেও হোক বা আপনজনের বিরুদ্ধেই হোক| এর পাশাপাশি, একটু আগেই বলা হয়েছে, আমাদের আরেকটি ভয়াবহ প্রবণতা হলো ‘জল ঘোলা করার সংস্কৃতি’| দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিমন্ডলে বার বার প্রতারিত হতে হতে অন্যের উপর, এমনকি নিজের ওপরও মানুষ বিশ্বাস হারিয়েছে| ফলে কোনো স্পষ্ট ঘটনা ঘটার পর সেটিকে জটিল, অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর করে তোলার এক অদ্ভুত সামাজিক প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করি| তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি সুবিধাবাদী অংশ, কিছু দায়িত্বহীন চাটুকার গণমাধ্যম এবং ভুঁইফোড় জনপ্রিয়তাবাদী অনলাইন কর্মীরা প্রায়শই একটি স্পষ্ট অপরাধের পেছনে ‘তৃতীয় শক্তি’, ‘অজ্ঞাতচক্র’ বা ‘গভীর ষড়যন্ত্র’-এর নানামুখী গল্প দাঁড় করিয়ে মূল সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করে| ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে, এটি এক ধরনের ‘আলোচনার উদ্দেশ্যমূলক কারসাজি’ (ডিসকারসিভ মেনিপুলেশান), যেখানে ভাষা ও বয়ানকে ব্যবহার করে বাস্তবতাকে বিকৃত করা হয়, যাতে প্রকৃত ঘটনা কিংবা অপরাধী আড়ালে থেকে যায়|গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই প্রবণতা কেবল জনমতকে বিভ্রান্তই করে না; বরং বিচারপ্রক্রিয়াকেও সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে| কারণ যখন সত্যকে অস্পষ্ট করে ফেলা হয়, তখন দায় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে, আর সেই সুযোগে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়| ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, ‘বিভাজন ও শাসন’ (ডিভাইড এন্ড রুল)-এর কৌশল প্রয়োগ করে সমাজকে দুর্বল করা হয় মানুষকে সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে, সন্দেহ ও বিভ্রান্তির জালে আবদ্ধ করে| ফলে গণঐক্য বা সংঘশক্তির যে চাপ তা আর থাকে না| দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা বার বারই জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞতাবশত সেই একই ফাঁদে পা দিচ্ছি, যা শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের পথকে আরও কঠিন করে তোলে এবং অন্যায়ের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে| জাতি হিসেবে আমাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, যারা চোখের সামনে খুন দেখেও দায় এড়িয়ে যায়, তারা কেবল নিরপেক্ষ দর্শক নয়; বরং নৈতিক অর্থে অপরাধেরই অংশীদার| নৈতিক দর্শনে ‘উপেক্ষা’ (ওমিশান) বা নিষ্ক্রিয়তার দায়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়| কারণ কখনো কখনো  নীরবতা নিজেই অপরাধে পরিণত হয়| খুনের মতো চরম অন্যায়ের ক্ষেত্রে এই নীরবতা আর নিরপেক্ষ থাকে না; এটি কার্যত অন্যায়কে টিকে থাকার অবকাশ করে দেয়| গুমকারী বা খুনীকে আড়াল করা, মিথ্যা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো কিংবা সচেতনভাবে নীরব থাকা এসবই প্রকারান্তরে গুম-খুনকে বৈধতা দেয়া এবং অপরাধীকে রক্ষা করার শামিল|ফলে ন্যায়বিচারের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে পড়ে, বিচারের বাণী যেন নিরবে, নিভৃতে কাঁদে| সাহিত্যিক উপমায় যে আর্তনাদের কথা আমরা শুনি, বাস্তবে তা রূপ নেয় মানুষের আস্থাহীনতা, ভীতি ও হতাশায়| রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্ণধার যদি হন এমন মানুষেরা, সত্যিকার অর্থে তাদের ওপর ভরসা করা যায় না| কারণ তারা নৈতিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে কৌশল আর ছলচাতুরির মাধ্যমে সুবিধাবাদী নিরপেক্ষতার আশ্রয় নেয়| সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় এই প্রবণতাকে ‘সামাজিক আস্থার অবক্ষয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়| যখন মানুষ নিশ্চিত হতে পারে না যে অন্যায় ঘটলে সমাজ তার পাশে দাঁড়াবে, তখন সামষ্টিক ন্যায়বোধ ভেঙে পড়ে এবং ব্যক্তি ক্রমশ একা ও অনিরাপদ হয়ে ওঠে| অতএব, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সময় ও সুযোগ এসেছে আমাদের জন্য জাতি হিসেবে  একটি সুস্পষ্ট, আপসহীন অবস্থান নেয়ার| সেই অবস্থানটি হতে হবে সার্বজনীন; ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে বেছে বেছে নয়, বরং আমরা সব গুম-খুনের বিচার চাই| যেমনটি বলেছিলেন শহীদ শরীফ ওসমান হাদী, ‘আমি আমার শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ করতে চাই’| আমরা তেমন একটি ইনসাফের রাষ্ট্র চাই, যেখানে ‘কোনো গুম-খুনকে সমর্থন নয়, কোনো গুমকারী বা খুনীকেই ছাড় নয়’- এই নীতিগত দৃঢ়তাই হতে পারে আমাদের পক্ষপাতহীন, কল্যাণমুখী রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের প্রথম ধাপ| কারণ খুনের বিচার নিশ্চিত করা মানে কেবল একজন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং তা মানবতার পক্ষে অবস্থান নেয়া, সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকে সংরক্ষণ করা, ‘রাষ্ট্র’কে নৈতিক ভিত্তির ওপর সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত করা| ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ ন্যায়ের প্রশ্নে আপস করে, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে| তাই ন্যায়বিচারের দাবিতে আপসহীনতা কেবল একটি নৈতিক আহ্বান নয়; এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা নিয়ে সগৌরবে টিকে থাকার পূর্বশর্ত|চিরন্তন আপ্তবাক্য হলো, ‘সত্য বড্ডই তিতা’| কিন্তু সেই তিতা সত্যকে গ্রহণ করার নৈতিক সাহস না থাকলে কোনো রাষ্ট্র বা সমাজই ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো নির্মাণ করতে পারে না| দর্শনের ভাষায়, সত্য স্বীকারের মধ্য দিয়েই নৈতিক আত্মশুদ্ধি শুরু হয়| আর সেই আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা কেবল একটি স্লোগানসর্বস্ব বুলি হয়েই থেকে যায়| আমরা যদি বাস্তবতাকে আড়াল করি কিংবা সুবিধামতো সত্যকে অস্বীকার করি, তবে অন্যায় কেবল টিকে থাকে না, বরং আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে| ফলে দুর্বৃত্তায়ণে সমাজ ও রাষ্ট্র সয়লাব হয়ে যায়; আর রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্রীড়ানকেরা ক্রমে স্বৈরাচারী আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে| তাই আজ প্রয়োজন একটি সম্মিলিত নৈতিক জাগরণ, যেখানে আমরা একযোগে বিচারহীনতা, পক্ষপাতিত্ব এবং বিভ্রান্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করি| আমাদের শিখতে হবে গুমকারী বা খুনীকে নির্ভয়ে গুমকারী ও খুনী বলতে, অন্যায়কে স্পষ্টভাবে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করতে এবং তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে| কারণ ভাষা কেবল প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেয়ারও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার| যখন আমরা সত্যকে সঠিক নামে ডাকতে ব্যর্থ হই, তখন আমরা অজান্তেই অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিই| একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাই আমাদের অবস্থান হতে হবে অবিচল, আপসহীন এবং সর্বজনীন| কারণ ন্যায়বিচারহীন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজেই এক নীরব গুমকারী ও খুনীতে পরিণত হয়, যেখানে অন্যায় শুধু ঘটে না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয় পায়| আর যে রাষ্ট্র অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, সে রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা হারায়; মানবিকতার দাবিও তখন আর তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য থাকে না| অতএব, ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কোনো একক ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের; এটি একটি জাতির সামষ্টিক দায়িত্ব| এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি প্রাণের মূল্য স্বীকৃত হবে এবং কোনো গুম-খুনই আর নীরবে হারিয়ে যাবে না; বরং রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে ন্যায়ের আলোয় প্রতিটি অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত হবে| দেশের জনগণ ‘মগের মুল্লক’-এর নয়, প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ নামক সার্বভৌম ‘রাষ্ট্র’-এর গৌরবান্বিত নাগরিক হতে চায়, যে ‘রাষ্ট্র’ তার নাগরিকদের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তার বিধান করবে সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে| জাতি সেই সোনালি দিনের অপেক্ষায় ‘তীর্থের কাক’-এর মতই দিন গুনছে|(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

বিস্মৃত প্রজ্ঞার আলোকধারা

‘নির্ভীক সাংবাদিকতার কোনো বন্ধু নেই’, ‘দেশ নষ্ট কপটে, প্রজা মরে চপটে, কী করিবে রিপোর্টে’, ‘(ওহে) হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হলো— পার কর আমারে’, ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়িয়ে দেখ তাই, পেলেও পাইতে পার লুকানো রতন’সহ অসংখ্য নীতিকথার জনক কে বলতে পারবেন?অনেকেই অনেকের নাম বলবেন, কিন্তু সঠিক ব্যক্তির নামটি অনেকেই জানেন না| কারণ, তিনি মৃত্যুর ১২৯ বছর পরও অখ্যাতই থেকে গেছেন| যেমনটি করা হয়েছিল ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে লিখিত ‘বিজয় বসন্ত’ উপন্যাসকে উপেক্ষা করে ‘আলালের ঘরের দুলাল’কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে| অনেকে আবার তার কর্ম ব্যবহার করে অস্কারের মতো পুরস্কার অর্জন করেছেন| কেউ কেউ তার ওপর বিভিন্ন বিষয়ে লিখে ডিগ্রি অর্জন করেছেন| অথচ কোনো এক অজানা কারণে আমরা তাকে হারিয়ে ফেলতে বসেছি|তিনি আর কেউ নন— বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার কুণ্ডুপাড়া গ্রামে বিখ্যাত মজুমদার পরিবারে অত্রষি বংশে মাতা কমলিনীর কোলজুড়ে এবং হলধর মজুমদারের পুত্র হয়ে ২০ জুলাই ১৮৩৩ সালের বৃহস্পতিবার জন্মগ্রহণকারী শ্রী হরিনাথ মজুমদার, ওরফে কাঙাল হরিনাথ মজুমদার| তার জীবনকাল ছিল মাত্র ৬৩ বছর| তিনি ১৮৯৬ সালের ১৮ এপ্রিল মারা যান| এই স্বল্প সময়ে তিনি ৭২টি গ্রন্থ রচনা করেন| এর মধ্যে ৪২টি প্রকাশিত এবং ৩০টি অপ্রকাশিত| ব্যবসা পরিচালনার জন্য তিনি এমএন প্রেস নামে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন| সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে ১১টি দল ও ৮টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন| ডাকঘরে মানি অর্ডার চালুর প্রস্তাব তিনি নিজ সম্পাদিত ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন| ক্ষুধা ও লজ্জা নিবারণের জন্য অন্যের দোকানে কাজ করতেও দ্বিধা করেননি| প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তিনি নারীশিক্ষার দীপ জ্বালাতে ১৮৫৭ সালের ১৩ জানুয়ারি নিজ চণ্ডীমণ্ডপে কুমারখালী বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে|জমিদার পান্নালাল মজুমদার, শিলাইদহ ঠাকুর এস্টেট, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদধূলিধন্য ভূমি, সোনাবন্ধুর দরগা, তন্ত্রাচার্য শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণবের সর্বমঙ্গলা মন্দির, খোরশেদপুরের পীরের মাজার, রানি রাসমণি নির্মিত গোপীনাথ মন্দির, তালোয়ার মাজার শরীফ, কুমারখালীর ঐতিহাসিক পুতুলবাড়ি, কাঙাল কুটির, ছেউড়িয়ার লালন শাহের মাজার, লাহিনীপাড়ার মীর মশাররফ হোসেনের বাসভিটা— এসব মিলিয়ে কুমারখালী এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের আধার| সেই কুমারখালীতেই জন্ম নিয়েছিলেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার| তার কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক বর্তমান প্রেক্ষাপটে কী অবস্থায় আছে, তা নিয়ে আলোচনা জরুরি|স্বশিক্ষিত কাঙাল হরিনাথের ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়া শেখার প্রবল ইচ্ছা ছিল| কিন্তু অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও পিতামাতাহীন অবস্থার কারণে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পূর্ণতা পায়নি| তবুও তিনি নিজ প্রচেষ্টায় বই সংগ্রহ করতেন— কখনও ভিক্ষা করে, কখনও সহপাঠীদের কাছ থেকে ধার নিয়ে| ভাষাশিক্ষায় কবি ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে| ১৮৫৪ সালে তিনি কুমারখালীতে বাংলা পাঠশালা স্থাপন করেন এবং ১৮৫৭ সালে নারীশিক্ষার জন্য বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন| শুরুতে কোনো বেতন না থাকলেও বিদ্যালয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়লে পরিদর্শকদের সুপারিশে তিনি বেতন গ্রহণ করেন|সেই সময় জমিদার, মহাজন ও নীলকরদের অত্যাচারে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ ছিল| এই প্রেক্ষাপটে ১৮৬৩ সালে তিনি ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন| মফস্বল কুমারখালী থেকে এমন উদ্যোগ ছিল সত্যিই যুগান্তকারী| তিনি শিলাইদহ ও শাহজাদপুর এস্টেটে জমিদারদের প্রজাপীড়নের কাহিনী তুলে ধরতেন| তবে নানা কারণে সেই প্রতিবেদনগুলোর অনেকেই হারিয়ে যায়| ধারণা করা হয়, প্রভাবশালী মহলের চাপে এসব লেখা প্রকাশে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল| তবুও কাঙাল হরিনাথ ছিলেন নির্ভীক সাংবাদিক| পায়ে হেঁটে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করতেন বলেই তিনি গ্রামীণ সাংবাদিকতার জনক হিসেবে খ্যাত|কাঙাল হরিনাথের গঠিত বাউল গানের দলের নাম ছিল ‘ফিকির চাঁদের দল’| তিনি পাবনা, নদীয়া, ফরিদপুর, ঢাকা, বরিশাল, যশোর ও কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে সুপরিচিত ছিলেন| তিনি প্রায় হাজারখানেক গান রচনা করেন| তার উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে— ‘ওরে মন পাগলারে, হরদমে আল্লাহজির নাম নিও’, ‘ওরে দোকানদার দোকানি ভাই’, ‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো’ ইত্যাদি|সাহিত্যেও তার অবদান অসামান্য| ‘আলালের ঘরের দুলাল’ রচনার আগেই তিনি ‘বিজয় বসন্ত’ রচনা করেন, যা বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে| শিবনাথ শাস্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন— ‘বিজয় বসন্ত’ ও ‘আলালের ঘরের দুলাল’— দুটিই বাংলার প্রথম উপন্যাস হিসেবে গণ্য হতে পারে| তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— ‘পদ্য পুণ্ডরীক’, ‘চারু চরিত্র’, ‘কবিতা কৌমুদী’, ‘বিজয়া’, ‘কবিকল্প’, ‘অক্রুর সংবাদ’, ‘সাবিত্রী নাটিকা’, ‘চিত্তচপলা’, ‘কাঙাল ফকির চাঁদের গীতাবলী’, ‘ব্রহ্মাণ্ডবেদ’ প্রভৃতি|তার মৃত্যুর পর বহু গুণীজন তাকে স্মরণ করেছেন— জলধর সেন, অক্ষয় কুমার ˆমত্রেয়, শিবনাথ শাস্ত্রী, রামতনু লাহিড়ী প্রমুখ| কিন্তু বাস্তবে তার স্মৃতি সংরক্ষণে তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি| তার বংশধররা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন| অবশেষে ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর তৎকালীন সরকার তার স্মৃতিতে জাদুঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন| ২০১৭ সালের ৯ ডিসেম্বর এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়|অবশেষে, দীর্ঘ ১২৪ বছর পর কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের নাম নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হলো| তার ব্যবহৃত মুদ্রণযন্ত্র, বই ও স্মারকসমূহ আজ সেই জাদুঘরে সংরক্ষিত| তবুও প্রশ্ন থেকে যায়— আমরা কি যথাযথভাবে তার অবদানকে মূল্যায়ন করতে পেরেছি?[লেখক : কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের পঞ্চম বংশধর]

ইতিহাসের নির্মোহ রূপকার

তাজউদ্দীন আহমদকে কেউ বলেন ইতিহাসের রূপকার, কেউ বলেন ইতিহাসের নির্মোহ নির্মাতা| তাজউদ্দীন আহমদ নিজে ইতিহাসের অজানা, অচেনা কেউ হয়ে থাকতে চেয়েছেন| ইতিহাস তাকে দৃশ্যমান করুক, তাজউদ্দীন তা’ কখনো প্রত্যাশা করেননি| তাজউদ্দীন সজ্ঞানে বলে গেছেন, ‘তুমি ইতিহাসে এমনভাবে কাজ করো যেন ইতিহাসে কোথাও তোমাকে খুঁজে পাওয়া না যায়|’ ইতিহাসের এমন নির্মোহ, নিরাকার, প্রত্যাশাহীন নির্মাতার সংখ্যা পৃথিবীতে যে খুব বেশি নেই তা’ আমরা বলতে পারি| মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের যতো গভীরে যাওয়া যায়, তাজউদ্দীন আহমদের অনন্য নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমীহের পরিমানও তত বেড়ে যায়| তাজউদ্দীন আহমদ, এমন একজন নীরব ও নির্মোহ ইতিহাসের রূপকার যাকে ইতিহাসের সিঁড়ি বেয়ে খুঁজে বের করে নিয়ে আসতে হয়| তিনি নিজে এসে উপস্থিত হননা| ছকে বাঁধা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় তাকে খুঁজে পাওয়া ভার| আমরা যখন তার অসীম সাহসী নেতৃত্ব, চরিত্রের দৃঢ়তা, উদ্দেশ্য লাভের জন্য আন্তরিক নিবেদন প্রত্যক্ষ করি তখন তাকে মনে হয়, ইতিহাসের ঘোর অন্ধকার থেকে আলোর পথে উত্তরণের একজন সাহসী ‘ত্রাতা’| তাজউদ্দীন আহমদের মতো বিশাল মানুষকে উন্মোচন করার জন্য প্রচুর গবেষণার প্রয়োজন আছে| তা যে খুব বেশি পরিমানে হচ্ছে তা না’ আমরা বলতে পারি| মুক্তিযুদ্ধকে জানার একটি ছক তৈরি হয়ে গেছে দেশে| সেই ছক বা বৃত্তের বাইরে কেউ যেতে ইচ্ছুক নন| ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত আমরা ইতিহাসকে অনুসন্ধান করি দফাওয়ারী আন্দোলনের ভাঁজে| সেই ভাঁজের ভেতরে থাকে প্রধানত আন্দোলনের রুটিন বা ধারাবাহিক বর্ণনা| ইতিহাসের পেছনের ইতিহাসকে গবেষণা করে উন্মোচন করার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় খুব কম| ২৫ মার্চ গভীর রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করার পর, জাতির ক্রান্তিলগ্নে নেতৃত্বের সব দায় অসীম সাহস নিয়ে গ্রহণ করেন তাজউদ্দীন আহমদ| জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ ও গৌরবের এই সময়ে তাজউদ্দীন যদি একটি মাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল করতেন তাহলে আমাদের ইতিহাস ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হতে পারতো| মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় তাকে একাই একটি সরু সুতার ওপর দিয়ে হাঁটতে হয়েছে যার নিচে ছিল অগ্নি স্ফুলিঙ্গ| তিনি জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য বানিয়ে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চে, পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর চোখ এড়িয়ে, ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামের সঙ্গে ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন| জীবনকে আগাম উৎসর্গ করেছিলেন তিনি মাতৃভূমির জন্য| বাঙালি জাতির এই অচেনা, ভয়াবহ পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তার পরিবারকে কী বার্তা দিয়ে গিয়েছিলেন? তিনি একটি চিরকূটে তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী’ সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন লিলিকে লিখেন ‘লিলি, আমি চলে গেলাম| যাবার সময় কিছুই বলে আসতে পারিনি| মাফ করে দিও| আবার কবে দেখা হবে জানি না’| তাজউদ্দীন আহমদ ব্যক্তিগত জীবনে আবেগকে তেমন প্রাধান্য দিতেন না, এর মানে এই নয় যে তিনি ছিলেন আবেগহীন| তাজউদ্দীন আহমদ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯২৫ সালে, বর্তমান ঢাকা জেলার, কাপাসিয়া উপজেলার দরদরিয়া গ্রামে| ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কারাগারে রাতের অন্ধকারে পাক-মার্কিন দোসর মোশতাক ও সামরিক বাহিনীর কিছু সংখ্যক পাক-মার্কিন এজেন্ট তাজউদ্দীনসহ জাতীয় চার নেতাকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে| সেই হত্যাকাণ্ড ও এর পেছনের গল্প বলা আজকের লেখার উদ্দেশ্য নয়| আজকের লেখার উদ্দেশ্য, তাজউদ্দীন আহমদ যে কতো বড় মহীরুহ ছিলেন সে সম্পর্কে সামান্য ঈঙ্গিত প্রদান করা| তাজউদ্দীনের এই সফল ও ত্যাগী জীবনকে চারটি পর্বে ভাগ করা যায়| ১৯২৫ থেকে পাকিস্তান অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত প্রথম পর্ব, পাকিস্তান অর্জনের পর থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্ব, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের মূহুর্ত পর্যন্ত তৃতীয় পর্ব এবং ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল থেকে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জীবনের শেষ পর্ব| তাকে গভীর ভাবে অধ্যয়ন করতে হলে তার জীবনের এই চারটি পর্বকেই বিবেচনায় নিয়ে আসতে হয়| তবে তার নেতৃত্বের বিকশিত সময় প্রত্যক্ষ করতে হলে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন পর্যন্ত তার ভূমিকাকে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে| তাজউদ্দীন আহমদ যখন সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে উপস্থিত হয়েছিলেন, তখন তাকে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে এবং ভারতের প্রভাব মুক্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার এক বিশাল চ্যালেঞ্জের সামনে নিয়ে আসে| তিনি ও ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম ৩০ মার্চ সীমান্ত পার হওয়ার পরেই তাদের সঙ্গে সাক্ষাত হয় ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তরক্ষী প্রধান ইন্সপেক্টর জেনারেল গোলোক মজুমদারের সঙ্গে| গোলক মজুমদারকে তাজউদ্দীন তার প্রখর ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয় ধরণে জানিয়ে দেন ভারত সরকারের সঙ্গে তার আলোচনা হবে তখনই যখন সরকারের পক্ষ থেকে তিনি ও মুক্তিযুদ্ধের নেতাদের আনুষ্ঠানিক ভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তিনি সুস্পষ্ট ভাবে গোল্পক মজুমদারকে অবগত করেন তিনি ও তার সহযোগী নেতারা স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতিনিধি| তাজউদ্দীনের কথা শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন আইজি মজুমদার| তার রাষ্ট্রনায়কোচিত ব্যক্তিত্ব ও দূরদর্শিতার প্রমাণ পেয়েছিলেন তিনি এই দুরদর্শী প্রস্তাবে| তাজউদ্দীন আহমদের প্রস্তাব অনুযায়ী ভারত সরকার এপ্রিল ৩, ১৯৭১ সালে, তাজউদ্দীন আহমদকে আমন্ত্রন জানায়| প্রথম সাক্ষাতে তাজউদ্দীন, একজন স্বাধীনতাকামী জাতির নেতা হিসাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সুস্পষ্ট ভাবে কিছু বিষয় বিনয়ের সঙ্গে উপস্থাপন করেন| তাজউদ্দীনের সুস্পষ্ট বক্তব্য শুনে আমরা বিস্মিত হই| তাজউদ্দীন বলেছিলেন, ‘এটা আমাদের যুদ্ধ| আমরা চাই ভারত এতে জড়াবে না| আমরা চাই না ভারত তার সৈন্য দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে আমাদের স্বাধীন করে দিক| এই স্বাধীনতার লড়াই আমাদের নিজেদের এবং আমরা এটা নিজেরাই করতে চাই|’বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে দিশেহারা করার জন্য, পাক, মার্কিন, চিনের নানা কূট কৌশলকে মোকাবিলা করতে হয়েছে, এই সহিষ্ণু, দুরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতাকে| সুশিক্ষিত, মেধাবী তাজউদ্দীন আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসে সবার সহযোগিতায় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন| সরকার গঠনের পর পরই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন বিশ্ববাসীকে নবজাত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান জানান| দেশের মাটিতেই শপথগ্রহণ হবে, এই ছিল তার ইচ্ছা| সেই আকাঙ্ক্ষা অনূসারেই, ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে দেশি-বিদেশি সাংবাদিক সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়| প্রকৃত পক্ষে এপ্রিল মাসের ভেতরেই বাংলাদেশ নামক দেশের গোড়া পত্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সব কর্মকাণ্ড, সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধরন অনুযায়ী তিনি সমাপ্ত করতে সক্ষম হন| সরকার গঠনের পর থেকেই তাকে বহুমুখী অভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করতে হয়| স্বাধীন বাংলা সরকারের মধ্যেই ছিল পাকিস্তানের পক্ষের ষড়যন্ত্রকারীরা| তাজউদ্দীন আহমদ এ সমস্ত ষড়যন্ত্রকে দৃঢ় ভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হন| ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করার বিষয়টিকে তার ভাষায় এভাবে ব্যাখ্যা করেন তাজউদ্দীন, ‘পাকিস্তান তার বন্ধুদের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল কিন্তু সফল হয়নি, সংগ্রামের এক পর্যায়ে আমেরিকা প্রশ্ন তোলে, স্বাধীনতা চাও নাকি মুজিবকে চাও| এর উত্তরে আমি বলেছিলাম স্বাধীনতাও চাই, মুজিবকেও চাই|’ তাজউদ্দীন আহমদ এতো নিবেদিত এবং শীতল মস্তিষ্কের নেতা ছিলেন, যিনি শত বাধার মুখেও লক্ষ্যে থেকে বিচ্যুত হননি| নীতি, নৈতিকতার দিক থেকে এক অনন্য মানুষ ছিলেন তাজউদ্দীন| পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক বিষয়কে সঠিক ভাবে অধ্যয়ণ করার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ| কৌশলী নেতৃত্ব ও কর্তব্যনিষ্ঠা, সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা প্রগতিশীল চিন্তার কারণে তার ভাষায় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় সফল ‘ধাত্রির’ ভূমিকা তাজউদ্দীন পালন করতে পেরেছিলেন| মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, সমগ্র জাতির সামরিক, বেসামরিক বাহিনী, নানা মত, নানা পথের মানুষদের সংহত করে জাতীয় ঐক্যকে সুদৃঢ় রাখার কৃতিত্ব তাকে না দিলে অবিচার করা হয়| তাজউদ্দীনকে না জানলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা হয় না| তাকে না বুঝলে বাংলাদেশকে বুঝা অসমাপ্ত থেকে যায়| জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে তাজউদ্দীন আহমদের জীবন দর্শন এবং নেতৃত্বের সৌন্দর্য জানা খুবই জরুরি| [লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

“বাংলা যখন হারাম”

“এইডা কী কন বাংলা যখন হারাম! আপনে তো মিয়া আস্ত নাজায়েজ কথা কন! বাংলা যখন হারাম! মিয়া বাংলাদেশ না হইলে এই পানিওয়ালীর পোলারানি, এয়ারলাইনসের মালিক হোইতো? ওর্য়াল্ডবেস্ট অল রাউন্ডার হোইতেন! লজ্জা করে না মিয়া ফালতু কথা কোইতে!”“আরে মনু তুমি চ্যেতকা| আমি কী বলতে চাইছি আর তুই কী বুঝছিস!”“ক্যান আমার বুঝতে অসুবিধা কি? আপনে তো বাংলা ভাষায় কথা কোইতাছেন| হীব্রু ভাষায়তো মাতেন ন’| তো, এইডা বুঝতে আমার কি অসুবিধা| বাংলা যখন হারাম| বাংলাদেশ স্বাধীনতা না পাইলে আপনে মিয়া হোটেলের বেয়ারা থাকতেন| রম্য লেখক! ভুইল্লা যান মিয়া| বাংলাদেশ স্বাধীন না হোইলে আপনের বাপের নামও ভুইল্লা যাইতেন!”“বুঝলাম বাংলাদেশর স্বাধীনতার আগে বাঙালিদের ওপর অনেক অন্যায় হয়েছে| সেনাবাহিনিতে বাঙালিদের নিতো না... ” “তো বুঝেন না মিয়া| মেজর জেনারেল! বাংলাদেশ স্বাধীন না হোইলে সাধারণ সিপাইভি হোইবার পারতেন না| আবার কতা কন মিয়া, বাংলা যখন হারাম! মেডিকেল কলেজের ডিরেক্টার! ডিরেক্টার জেনারেল ফোর্সেস ইন্টালিজেন্সের চিফ, উঁহ মরে যাই সখী তোর আতরের গন্ধে! মিয়া, লাখ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগে দেশ স্বাধীন, আর অহন কন বাংলা যখন হারাম! এই লাখ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগের কী কোনোই দাম নাই! আসলে আপনে মিয়া আস্ত নাজায়েজ পোলা| আপনের মিয়া জন্মেরই ঠিক নাই!”“দ্যেখ এভাবে আমার পূর্ব পুরুষকে টানছিস ক্যেনো! বুঝলাম বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়াতে সারাবিশ্বে বাঙালি জাতি একটা ভুখণ্ড পেয়েছে| বাঙালি এবং বাংলাদেশ এখন সারাবিশ্বে একটা পরিচিত নাম| তোরা দাদাদের ভাষায় তথাকথিত মুচুরম্যানরা পৃথিবীর বুকে লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে বাঙালি জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিস| যেটা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর মতো ন্যাশানালিষ্টরা পারেননি, আর বর্তমান কোটি কোটি দাদারা নিজেদের প্রথমে ভারতীয় তারপর বাঙালি বলে একটা আত্মতৃপ্তি পায়| কিন্তু বাঙালি হিসেবে আমাদের মতো আলাদা কোনো মর্যাদা নেই| এই দাদারাই এক সময় লিখতেন, স্বাধীনতা হীনতা কে বাঁচিতে চায় রে, কে বাঁচিতে চায়| সব কাগুজে বাঘ| আর তোর দিদিতো তোদের ধর্মের লোকেদের কাছে ভোটের জন্য পা চাঁটে, কিন্তু সৃষ্টির সৃষ্ট পানির হিসসা দেয়না| দু’মুখো শর্প এই তোর কাউলা দিদি|”“থাক ভাই হ্যাগো মানে দাদাগো কথা ছাড়েন, হ্যেরাতো বাউন্ড্রী লাইনে পা-লাগায়া ক্যাচ ধইরা ছক্কা না দিয়া আউট দিয়াদ্যেয়| ওই খাচ্চরগো কথা থুয়া মিয়া আপনের কথা কন, আপনে মিয়া বাঙালি হয়া, বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক হয়া আপনে ক্যেমনে কন বাংলা যখন হারাম! আপনের লজ্জা করে না নিজেরে নিজে ছোট করতে?”“আমি বলছিলাম কি, এবার পয়লা বৈশাখকে অনেকে নাজায়েজ কাজ বলেছে”“ধ্যারর মিয়া আপনে হালায় আস্ত প্যাচাইল্লা মানুষ, আপনে ইংরেজি বছরের পেরথমে থার্টি ফার্স্ট ডিসেম্বরে পার্টি করা পারেন, আর বাঙালিগো বছরের পয়লা দিন পহেলা বৈশাখ পালন করতে আপনের দোষ কিতা!”“না অনেকে মানে আমাদের টাওয়ারের ম্যানেজার বলছিল, এসব পহেলা বৈশাখ শেরেকি কায়কারবার! তাই আমরা যদি...”“আরে মিয়া, মরার জ্বালা আপনের টাওয়ারে ম্যানেজার বাঙালি না?”“নিশ্চয় বাঙালি| আলবৎ বাঙালি | ও তো আর পাকিস্তান থেকে বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসেনি|”“তায়লে! বাঙালি হোইলে ওর বাংলা মাসকে উই মানবো না? প্রতিটা খবরের কাগজে, প্রতিদিন ইংরেজি, বাংলা, হিজরী সনের দিন তারিখ লেখা থাকে| তো আপনের টাওয়ারের ম্যানেজার মানলো নাতো বাংলা মাস বাংলা তারিখ বন্ধ হয়া যাইবো?”“না তা না| সর্বপ্রথম আমরা বাঙালি, তারপর কেউ মুসলমান, কেই হিন্দু, কেউ বুদ্ধ, কেউ জৈন, কেউ ব্রাহ্মধর্মে দিক্ষীত, সে যাই হোক প্রথমে আমরা সবাই বাঙালি, তারপর যার যার ধর্ম, যে ব্যক্তি যেই ধর্মে বিশ্বাস করে তা পালন করবে, সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার কিন্তু প্রথমে আমরা সবাই বাঙালি|”“জ্বী-অয়, প্রথমে আমরা সবাই বাঙালি, হেরপর লক্ষপ্রাণের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক| ধর্ম যার যার সংস্কৃতি মানে পয়লা বৈশাখ সব্বার| এখানে হিন্দু, বুদ্ধ, ˆজন, ব্রাহ্মধর্মে বইলা কিছু নাই| বুজচোইন|”“আমিতো বুঝলাম, কিন্তু অনেক বাঙালি, বাঙালি হয়েও বুঝতে চায় না|”“আচ্ছা মুরুক্ষু হ্যেরা না বুঝুক, কিন্তু আপনে ক্যেমনে কোইলেন, বাংলা যখন হারাম?”“তুইতো আমার কথা শুনতেই চাসনা, খালি ভুল বুঝিস!”“কি ভুল বুঝলাম, বাংলা যখন হারাম, এতে আমি কি ভুল বুঝলাম কন?”“আরে আমি বলছিলাম তোরা যেমন নিউ ইয়ারস’ডে তে, অনেকে ওই পাগলা পানি টানি পানা করে, ঠিক তেমনি পহেলা বৈশাখেও অনেক বাঙালি বাংলা টাংলা পান করে| সেটা বন্ধকরা যায় কিনা| মানে বাংলা চোলাই কারণবারিটা বাদ দেয়া যায় কিনা?”“হেঁ হেঁ, মিয়া আপনে আমারে হাসাইলেন! নিউ ইয়ার্স’ডে কন আর পহেলা বৈশাখ কন, পাগলা পানি সব সময় পরিত্যাজ্য|”“হেঁ হেঁ আমিও তো তাই বলছিলাম, পহেলা বৈশাখে বাংলা হবে হারাম...” “শুধু পহেলা বৈশাখ না, হারা বছরই বাংলা কারণ বারি, হোইবো হারাম| হেঁ হেঁ হেঁ...”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

রোজকার পানি কিনে খাওয়া যেখানে স্বাভাবিক

শহরে আমরা যখন তৃষ্ণা মেটাতে বোতলজাত পানি কিনি তখন সেটি নাগরিক জীবনের একটি অতি সাধারণ চিত্র| অনেক সময় এটি আভিজাত্য, স্বাচ্ছন্দ্য বা স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়| কিন্তু বাংলাদেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন| সেখানে প্রতিদিনের খাবার পানি কেনা কোনো শৌখিনতা বা বিলাসিতা নয়| এটি স্রেফ টিকে থাকার এক নির্মম ও রূঢ় সংগ্রাম| চারদিকে থৈ থৈ করছে নদী আর সমুদ্রের জল| অথচ পান করার মতো এক ফোঁটা নিরাপদ ও মিষ্টি পানি তাদের কাছে নেই| নদীমাতৃক এই ভূখণ্ডের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট কিংবা পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ প্রান্তিক জনপদে গেলে এই বাস্তবতা খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে| এত নদীর দেশে বসে এক গ্লাস সুপেয় পানির জন্য মানুষের এমন সংগ্রাম সত্যিই অবিশ্বাস্য মনে হয়| কিন্তু উপকূলের লাখো মানুষের কাছে এটিই এখন প্রতিদিনের অলঙ্ঘনীয় নিয়তি| একসময় এই এলাকার প্রতিটি বাড়িতে নিজস্ব পুকুর ছিল| বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রাচীন এবং কার্যকর পদ্ধতি এখানকার মানুষের খুব ভালোভাবে জানা ছিল| সমাজবদ্ধভাবে তারা মিষ্টি পানির আধারগুলো সযত্নে রক্ষা করতেন| কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর থেকে এই দৃশ্যপট ক্রমশ বদলাতে শুরু করে| একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে| অন্যদিকে সিডর, আইলা, আম্পান বা রেমালের মতো একের পর এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় উপকূলের সমস্ত হিসাব চিরতরে পাল্টে দিয়েছে| জলোচ্ছ্বাসে সমুদ্রের নোনা জল প্রবল বেগে ঢুকে পড়েছে উপকূলের বুক চিরে| নিমেষেই তলিয়ে গেছে মিষ্টি পানির সমস্ত আধার| এরপর শুরু হয়েছে আরেক মানবসৃষ্ট এবং ভয়ঙ্কর দুর্যোগ| অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের জন্য যত্রতত্র বাঁধ কেটে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে তোলা হয়েছে| বেশি লাভের আশায় ঘের মালিকরা পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন তার চড়া মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ| ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আজ পুরোপুরি পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে| অতিরিক্ত লবণ এবং আর্সেনিকের বিষাক্ত উপস্থিতিতে খাবার পানির এই তীব্র হাহাকার এখন বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে| প্রকৃতি ও মানুষের লোভের এই দ্বিমুখী আক্রমণে উপকূলের মিষ্টি পানি আজ শুধুই এক সোনালি অতীত| এই বিপন্ন জনপদের মানুষের প্রতিটি সকাল শুরু হয় কেবল এক কলসি পানির সন্ধানে| মাটির কলস বা প্লাস্টিকের পাত্র হাতে নারীদের মাইলের পর মাইল হাঁটার দৃশ্য সেখানে একসময় নৈমিত্তিক ঘটনা ছিল| প্রখর রোদে বা ভারী বৃষ্টিতে হেঁটে এক কলসি পানি আনতে তাদের দিনের একটি বড় অংশ ব্যয় হতো| তবে আজকাল সেই দৃশ্য কিছুটা কমে এসেছে| গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথে এখন নিয়মিত দেখা যায় ইঞ্জিনচালিত ভ্যান| সেই ভ্যানে প্লাস্টিকের বড় বড় জারে করে বিক্রি হচ্ছে খাবার পানি| স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট থেকে এই পানি সরবরাহ করা হয়| ভ্যানচালকরা হাঁকডাক দিয়ে পাড়ায় পাড়ায় এই পানি বিক্রি করেন| ফিল্টার করা এই পানি কিনে পান করাটাই এখন উপকূলের নতুন স্বাভাবিক চিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে| রোজকার পানি কিনে খাওয়ার এই রীতি এখন তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ| ঘুম থেকে উঠেই তাদের হিসাব করতে হয় আজ কত জার পানি লাগবে এবং তার দাম কীভাবে মেটানো হবে| কিন্তু আমাদের গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার এই স্বাভাবিকতা আসলে কতটা অস্বাভাবিক| বেঁচে থাকার সবচেয়ে আদিম ও মৌলিক উপাদানটি যখন চড়া দামে কিনতে হয় তখন রাষ্ট্রের কল্যাণকামী চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক| উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানির তীব্র সংকট নিয়ে সংবাদমাধ্যমে অনেক প্রতিবেদন হয়| কিন্তু এর আড়ালে সাধারণ মানুষের যে বিশাল অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা খুব কমই চোখে পড়ে| একজন দিনমজুর, জেলে বা প্রান্তিক কৃষক হয়তো সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে সামান্য কিছু টাকা আয় করেন| সেই সামান্য আয়ের একটি বড় অংশ তাকে ব্যয় করতে হয় কেবল পরিবারের খাবার পানি কিনতে| ত্রিশ লিটারের এক জার পানির দাম নেয়া হয় ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা পর্যন্ত| শুষ্ক মৌসুমে বা গ্রীষ্মকালে পানির সংকট বাড়লে এই দাম আরও বেড়ে যায়| যে পানি প্রকৃতি থেকে তাদের বিনামূল্যে পাওয়ার কথা ছিল তা আজ চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা| এটি কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়| এটি প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন| পানির পেছনে এই বাড়তি খরচের কারণে তাদের পুষ্টিকর খাবার কেনার বাজেট বাধ্য হয়ে কমাতে হয়| ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তাদের হিমশিম খেতে হয়| জরুরি চিকিৎসায় তারা অর্থ ব্যয় করতে পারেন না| ফলে দারিদ্রে?্যর চক্র থেকে তারা কোনোভাবেই বের হতে পারছেন না| পানি নামক এই তৃষ্ণার বাণিজ্য তাদের অর্থনৈতিকভাবে চিরতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে| সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো এই চড়া দামে কেনা পানির প্রকৃত মান কেমন! যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব স্থানীয় পানি শোধনাগারে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয় না| প্লাস্টিকের নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর জারে করে বছরের পর বছর ধরে একইভাবে পানি বিক্রি হচ্ছে| সেখানে সরকারি কোনো তদারকি বা মান নিয়ন্ত্রণের ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই| ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে পানি কিনেও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে পারছেন না| এটি অনেকটা নিরুপায় হয়ে বিষ পানের মতো একটি করুণ অবস্থা| নিরাপদ পানির নামে তারা আসলে কী পান করছেন তা দেখার কেউ নেই| এর পাশাপাশি গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যগত সংকট তৈরি হচ্ছে| বিশুদ্ধ পানির অভাবে উপকূলের মানুষ নানা ধরনের পানিবাহিত জটিল রোগে ভুগছেন| বিশেষ করে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে ভয়াবহভাবে| গোসল বা কাপড় ধোয়ার মতো নিত্যদিনের কাজে নোনা পানি ব্যবহারে বাধ্য হয়ে তারা জরায়ুর নানা রোগ এবং চর্মরোগসহ দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন| অনেক ক্ষেত্রে এই সমস্যা এতই প্রকট আকার ধারণ করে যে অল্প বয়সেই নারীদের জরায়ু কেটে ফেলতে হয়| এটি এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় যা নীরবে ঘটে চলেছে| পানি কিনে খাওয়ার এই নতুন প্রবণতা আমাদের একটি গভীর রাষ্ট্রীয় সংকটের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে| রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে হোঁচট খায় ঠিক তখনই এমন অমানবিক বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হয়| মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কিছু মানুষ রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে| উপকূলের এই পানি সংকটকে কেবল একটি ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক সমস্যা ভাবলে বড় ভুল হবে| এটি একটি জাতীয় সমস্যা এবং এর দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন| আমাদের নীতিনির্ধারকদের এই রূঢ় বাস্তবতা অনুধাবন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি| কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ত্রাণের মতো করে কিছু পানির ট্যাংক বা বোতলজাত পানি পাঠিয়ে এই গভীর সমস্যার সমাধান হবে না| এনজিও বা বেসরকারি সংস্থাগুলোর খণ্ডিত ও সাময়িক উদ্যোগও এর দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে| প্রয়োজন সমন্বিত এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই উদ্যোগ| বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য প্রতিটি গ্রামে সরকারি উদ্যোগে বড় আকারের জলাধার বা মেগা রেইনওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম নির্মাণ করতে হবে| এই জলাধারগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্থানীয় জনগণের হাতে অর্পণ করতে হবে যাতে তারা এর মালিকানা অনুভব করেন| পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ভিত্তিক উন্নত ও নিরাপদ পানি শোধনাগার স্থাপন করে বিনামূল্যে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে| ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বেদখল হওয়া পুকুর এবং খালগুলো খনন করে মিষ্টি পানির আধার হিসেবে পুনরায় গড়ে তুলতে হবে| অবৈধভাবে চিংড়ি ঘেরে নোনা পানি তোলা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে| যারা পরিবেশের ক্ষতি করে নোনা পানি লোকালয়ে ঢোকাচ্ছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে| [লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

নারীদের নিয়ন্ত্রণে সোশ্যাল মিডিয়া যখন নতুন হাতিয়ার

এক দশকেরও বেশি সময় আগে যখন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর রূপকল্পটি জাতীয় এজেন্ডা হিসেবে উত্থাপিত হয়েছিল, তখন এর প্রধানতম ভিত্তি ছিল প্রযুক্তিগত সংযোগের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন| বিশেষ করে বাংলাদেশের নারী সমাজের জন্য ডিজিটাল বিপ্লবকে মনে করা হয়েছিল এক বৈশ্বিক জ্ঞান অর্থনীতিতে লাফিয়ে ওঠার সোপান| আশা করা হয়েছিল, সোশ্যাল মিডিয়া হবে এমন একটি ‘গ্রেট লেভেলার’ বা সমতাকারী শক্তি, যা গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করবে, ভৌগোলিক ও সামাজিক বাধাগুলো ভেঙে ফেলবে এবং নীরবদের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেবে| কিন্তু ২০২৬ সালের দাঁড়িয়ে এই উজ্জ্বল আশাবাদী বয়ানের নিচে লুকিয়ে থাকা একটি অন্ধকার ও বিপজ্জনক বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রযুক্তি কেবল মুক্তির পথ নয়, বরং এটি পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের এক আধুনিক ও ডিজিটাল কারারক্ষী হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে| নারীদের শরীর, কণ্ঠস্বর এবং প্রকাশকে অভূতপূর্ব নিপুণতায় নজরদারি, পণ্যায়ন এবং শাস্তি দেয়ার এক বিশাল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এই ভার্চুয়াল জগত|র‌্যাডিক্যাল ফেমিনিস্ট বা আমূল নারীবাদী তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ডিজিটাল সহিংসতা কোনো আকস্মিক ত্রুটি নয়, বরং এটি পিতৃতন্ত্রের এক বিবর্তনশীল কৌশল| পিতৃতন্ত্র তার আধিপত্য বজায় রাখতে সবসময়ই নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়| অতীতে যখন নিয়ন্ত্রণ কেবল চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা স্মার্টফোনের স্ক্রিনের মাধ্যমে নারীর ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে পড়েছে| এখানে নারীর যৌনতা ও স্বায়ত্তশাসনকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে| অন্যদিকে, উত্তর-আধুনিক নারীবাদের প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে এই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো আসলে একেকটি ‘ডিজিটাল প্যানোপটিকন’| ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো যে নজরদারি ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, যেখানে বন্দি সবসময় অনুভব করে যে সে নজরদারির নিচে আছে, সোশ্যাল মিডিয়া বাংলাদেশের নারীদের জন্য ঠিক সেই জেলখানায় পরিণত হয়েছে| এখানে প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি পোশাকের পছন্দ বা প্রতিটি সাহসী মন্তব্য একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক ও ডিজিটাল জনতার বিচারে প্রতিনিয়ত ব্যবচ্ছেদ করা হচ্ছে|২০২৪ সালের জাতীয় নারী নির্যাতন জরিপ, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউএনএফপিএর কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত হয়েছে, এই নতুন ধরনের সহিংসতার এক ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে| প্রথমবারের মতো এই সরকারি পরিসংখ্যানে ‘প্রযুক্তি-সহায়তায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’ বা টিএফজিবিভি পরিমাপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে| এই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহারকারী নারীদের ৮.৩ শতাংশ তাদের জীবনে অন্তত একবার অবাঞ্ছিত যৌন যোগাযোগ, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেল, ছবি-ভিত্তিক নির্যাতন বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন| ২০-২৪ বছর বয়সী তরুণীদের ক্ষেত্রে এই হারের চিত্র আরও আঁতকে ওঠার মতো—প্রায় ১৬ শতাংশ| শহরাঞ্চলেও এই হার ১২ শতাংশের কাছাকাছি| সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঐতিহ্যগত শারীরিক সহিংসতার ক্ষেত্রে যেখানে পরিচিত ব্যক্তি বা নিকটাত্মীয়রাই প্রধান অপরাধী হয়ে থাকেন, সেখানে ডিজিটাল সহিংসতার ক্ষেত্রে ৪৬ শতাংশ অপরাধীই হলো সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি| এটি প্রমাণ করে যে, অনলাইন পিতৃতন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না; এটি একটি নামহীন ও সর্বব্যাপী শক্তি হিসেবে নারীর ডিজিটাল উপস্থিতিকে প্রতিনিয়ত আক্রমণ করছে|পিতৃতন্ত্রের মূল লক্ষ্যই হলো নারীর শরীরকে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ, আনন্দ এবং তথাকথিত ‘পারিবারিক সম্মান’-এর মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা| বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে যেখানে ‘লজ্জা’ এবং ‘পর্দা’র সাংস্কৃতিক চাপ অত্যন্ত প্রবল, সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া এই অবদমনকে বহুগুণ শক্তিশালী করেছে| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অপব্যবহার এখন এই ডিজিটাল পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে| বর্তমানে ‘ডিপফেক রিভেঞ্জ পর্ন’ তৈরির জন্য কোনো নারীর ব্যক্তিগত গ্যালারিতে প্রবেশ করার আর প্রয়োজন হয় না| ফেইসবুক বা টিকটক প্রোফাইল থেকে সাধারণ একটি ছবি নিয়ে এআই টুলের মাধ্যমে যে কারো মুখকে আপত্তিকর ভিডিওতে বসিয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে| সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে নারী অ্যাক্টিভিস্ট, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানি কয়েক গুণ বেড়েছে| এই ধরনের আক্রমণ কেবল সম্মানহানি নয়, বরং নারীর অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে| কারণ আমাদের সমাজে নারীর ‘পবিত্রতা’ ও ‘মর্যাদা’র ওপরই তার বিয়ের সম্ভাবনা, শিক্ষার সুযোগ এবং পরিবারের নিরাপত্তা সরাসরি নির্ভরশীল|সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলো এই লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার পেছনে এক অদৃশ্য ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করে| এই প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবসায়িক মডেলটি এমনভাবে তৈরি যেখানে ‘এনগেজমেন্ট’ বা সম্পৃক্ততা যত বেশি, মুনাফা তত বেশি| গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক সংবাদের চেয়ে নেতিবাচক ও ক্ষোভ সৃষ্টিকারী বিষয়বস্তু দ্রুত ভাইরাল হয়| ফলে যখনই কোনো নারীর পোশাক বা চলাফেরা নিয়ে কোনো পুরুষতান্ত্রিক অ্যাকাউন্ট থেকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা ভিডিও প্রকাশ করা হয়, অ্যালগরিদম সেই বিদ্বেষমূলক পোস্টকেই হাজার হাজার মানুষের ফিডে পৌঁছে দেয়| এর মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলো ˆলঙ্গিক বৈষম্য ও অবমাননাকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করছে| জুডিথ বাটলারের ‘লিঙ্গ পারফরম্যাটিভিটি’ তত্ত্ব এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক| অনলাইনে নারীদের প্রতিনিয়ত একটি আদর্শায়িত এবং সমাজ-অনুমোদিত নারীত্ব ‘পারফর্ম’ করতে বাধ্য করা হচ্ছে| যদি কোনো নারী তার স্বাধীন মতামত দেয় বা প্রথাগত ছকের বাইরে গিয়ে কোনো আচরণ করে, তবে ডিজিটাল জনতা তাকে ‘শেইমিং’ বা লজ্জিত করার মাধ্যমে সীমানা মনে করিয়ে দেয়| এটি এক প্রকার ডিজিটাল গণপিটুনি, যা নারীর স্ব-প্রকাশের অধিকারকে কেড়ে নেয়|২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার যে উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা সাইবার জগতকে নারীদের জন্য আরও বেশি প্রতিকূল করে তুলেছে| বিভিন্ন কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে লিঙ্গ সমতার বিরুদ্ধাচারণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে| নারী উন্নয়ন নীতি বা নারীর জনজীবনে অংশগ্রহণকে ‘সংস্কৃতিবিরোধী’ বা ‘ধর্মবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে যে ডিজিটাল প্রচারণা চালানো হয়, তা সরাসরি নারীর শারীরিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে| এর ফলে অনেক মেধাবী নারী তাদের পেশাগত কাজ বা সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে পিছিয়ে আসছেন| তারা পোস্ট করার আগে শতবার ভাবছেন, পাছে কোনো সাইবার হামলায় তাদের ব্যক্তিগত জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়| এই যে ‘ভয়’ এবং ‘স্ব-সেন্সরশিপ’—এটাই হলো ডিজিটাল পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিজয়| যখন একজন নারী হয়রানির ভয়ে নিজের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেন, তখন পিতৃতন্ত্র বিনা রক্তপাতে তার লক্ষ্য অর্জন করে|এই সমস্যার সমাধান হিসেবে যেসব আইনি বা কারিগরি ব্যবস্থার কথা বলা হয়, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অপর্যাপ্ত| বর্তমান ডিজিটাল আইনগুলো প্রযুক্তির দ্রুত গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না| এআই-জেনারেটেড সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনি প্রমাণ সংগ্রহ করা বা অপরাধীকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জটিল| আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারী আইনি সাহায্য নিতেও ভয় পান, কারণ আইনি প্রক্রিয়াটি অনেক সময় তাকে আবারও মানসিকভাবে হেনস্তা করে| তথাকথিত লিবারেল সমাধানগুলো কেবল উপরিভাগের ক্ষত সরানোর চেষ্টা করে, কিন্তু মূল কাঠামোগত সমস্যা—অর্থাৎ সমাজে বদ্ধমূল থাকা নারীবিদ্বেষ এবং প্রযুক্তির ওপর পুরুষের একাধিপত্যকে প্রশ্ন করে না| একটি প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল স্থাপত্যের এমন এক মৌলিক পুনর্বিন্যাস, যেখানে মুনাফার চেয়ে নাগরিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা বেশি গুরুত্ব পাবে|তবে এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু আশার আলো দেখতে পাওয়া যায়| বাংলাদেশের নারীরা ডিজিটাল স্পেসকে কেবল আক্রমণের জায়গা হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধের দুর্গ হিসেবেও গড়ে তুলছেন| বিভিন্ন ফেমিনিস্ট নেটওয়ার্ক, হ্যাশট্যাগ মুভমেন্ট এবং আইনি সহায়তা সংস্থাগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত| তারা সাইবার হয়রানির বিরুদ্ধে সরব হচ্ছে, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছে এবং সরকারকে নীতি পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে| ২০২৪ সালের সরকারি জরিপে প্রযুক্তি-সহায়তায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অন্তর্ভুক্তি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র এখন এই সংকটের গভীরতা বুঝতে পারছে| কিন্তু পরিসংখ্যানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন|ডিজিটাল বাংলাদেশ কেবল উচ্চগতির ইন্টারনেট বা স্মার্টফোনের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়| এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এদেশের নারীরা এই ডিজিটাল স্পেসে কতটা নিরাপদ এবং স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারছেন তার ওপর| পিতৃতন্ত্র তার খোলস বদলে অনলাইনে যে প্যানোপটিকন তৈরি করেছে, তা ভাঙতে হলে সম্মিলিত লড়াই প্রয়োজন| আমাদের বুঝতে হবে যে, ডিজিটাল সহিংসতা কোনো ‘ভার্চুয়াল’ সমস্যা নয়; এটি একটি বাস্তব অপরাধ যা রক্তমাংসের মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়| যতক্ষণ না আমরা পুঁজিবাদী প্রযুক্তির লাভমুখী চরিত্র এবং পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের এই মেলবন্ধনকে রুখতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত ডিজিটাল ক্ষমতায়নের স্বপ্ন এদেশের নারীদের জন্য একটি নিষ্ঠুর মরীচিকা হয়েই থাকবে| যে নারীরা আজ কারখানায় সেলাই করছেন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাবে গবেষণা করছেন, তাদের কণ্ঠস্বর যেন কোনো অ্যালগরিদমিক যান্ত্রিকতায় বা সাইবার বুলিংয়ের ডিজিটাল চাবুকে স্তব্ধ হয়ে না যায়— সেটি নিশ্চিত করাই হোক আগামীর অঙ্গীকার|[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

ভিডিও

গোলাপ হাতে গিলকে প্রেমের প্রস্তাব, অতঃপর...

গুজরাট টাইটান্সের অধিনায়ক শুভমান গিলের ব্যাট আইপিএলে আগুন ছড়াচ্ছে। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) প্রাক্তন দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) বিরুদ্ধে ৫০ বলে ৮৬ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়েছেন তিনি। ম্যাচটিতে গুজরাট টাইটান্স জিতেছে ৭ উইকেটে।তবে ম্যাচের আগে ঘটে যায় আরেক ঘটনা, যা আলোচনায় টপকে গেছে গিলের ব্যাটিংকেও! গিলের উদ্দেশ্যে এক ভক্তের ভালোবাসার প্রস্তাবের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।কেকেআর-জিটি ম্যাচ শুরুর আগে দর্শক গ্যালারিতে এক তরুণী গোলাপ ফুল হাতে নিয়ে প্রস্তাব দেন গিলকে। চারপাশে উপস্থিত দর্শকরাও তখন চিৎকার করতে থাকেন ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে থাকেন। আর ক্যামেরাবন্দি হয় এই দৃশ্য।গিলের জনপ্রিয়তা এতটাই যে ম্যাচ শুরুর আগে এই প্রস্তাবের ঘটনা তুমুল আলোচনা তৈরি করে। নেটিজেনরা কমেন্টের বন্যা বইয়ে দেন। কেউ কেউ গিলের ‘শান্ত স্বভাবের’ প্রশংসা করেন, আবার কেউ কৌতুক করে প্রশ্ন তোলেন, “প্রস্তাবের জবাব কী দিলেন গিল?” তবে অনেকে তো এটাকে ‘ম্যাচ ফিক্সিং’ বলে ট্রোলও করেছেন। অবশ্য, সবাই একবাক্যে স্বীকার করছেন- এই ঘটনায় ‘এন্টারটেইনমেন্ট’ একেবারে চরমে পৌঁছে গিয়েছিল।শুভমান গিল গত কয়েক ম্যাচে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন। টানা তিনটি ম্যাচে ফিফটি করেছেন তিনি। গত ১১ এপ্রিল লখনউ সুপার জায়ান্টসের বিরুদ্ধেও ম্যাচ জেতানোর পর গিলকে ভক্তরা ভূয়সী প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। ওই ম্যাচে গিল ৪০ বলে ৫৬ রানের ইনিংস খেলেছিলেন।ক্রিকেট মাঠে ভক্তদের এভাবে প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। গত বছর ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট ম্যাচেও এক ভক্ত ‘আই লাভ ইউ শুভমান’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে গিলের উদ্দেশ্যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। এর আগে অলিম্পিকে শুটার মনু ভাকেরকে প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনাও ভাইরাল হয়েছিল।শুভমান গিল প্রেম-প্রস্তাবের ভাইরাল ভিডিও নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও, মাঠে এসেছেন আগুন ছড়াতে। কেকেআরের বিরুদ্ধে ৮৬ রানের বিধ্বংসী ইনিংসের সুবাদে তিনি বিরাট কোহলিকে পেছনে ফেলে অরেঞ্জ ক্যাপের শীর্ষে উঠে এসেছেন। তিনি চার ম্যাচ খেলে ২৫১ রান করেছেন। আইপিএলে কেকেআরের বিরুদ্ধে গিলের এটাই দ্বিতীয় সেরা ইনিংস।ফুল হাতে প্রেমের আহ্বান। ছবি: সংগৃহীতম্যাচ শেষে গিল বলেন, “আমি নিজের খেলায় সন্তুষ্ট। টানা ভালো পারফর্ম করতে পারছি দলের জয়ের জন্য।” প্রেম-প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি কিছু বলেননি।গিলের এই ফর্ম আর ভক্তদের ভালোবাসার প্রস্তাবের ভিডিও মিলে নেটিজেনদের মধ্যে এক উন্মাদনা তৈরি করেছে। কেউ কেউ মজা করে লিখছেন, “শুভমান গিল এখন শুধু ব্যাটিংয়েই নয়, ‘হার্ট’ জেতাতেও সেরা!” কেউ আবার একটু সিরিয়াস হয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, “এত প্রস্তাবের পরও ও প্রেমে পড়লো না কেন?”গুজরাট টাইটান্স আইপিএল পয়েন্ট টেবিলে শীর্ষে ওঠার লড়াইয়ে এখন দারুণ ফর্মে রয়েছে। শুভমান গিলের ব্যাটিংয়ের ধার আর ভক্তদের ভালোবাসার এই প্রস্তাব- দুই মিলিয়েই চলতি আইপিএল হয়ে উঠছে রীতিমতো ‘টক অফ দ্য টাউন’। 

গোলাপ হাতে গিলকে প্রেমের প্রস্তাব, অতঃপর...
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৩০ জন