সংবাদ
ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব, ২ নম্বর সংকেত

ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব, ২ নম্বর সংকেত

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া গভীর নিম্নচাপটি ঘনীভূত হয়ে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এ পরিণত হয়েছে। এটি আরও শক্তি সঞ্চয় করে আগামী বুধবারের (২৮ অক্টোবর) মধ্যে ভারতের অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সোমবার (২৬ অক্টোবর) আবহাওয়াবিদ আবদুল হামিদ মিয়া স্বাক্ষরিত বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে (ক্রমিক-৬) এই তথ্য জানানো হয়েছে।বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পূর্বমধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণপূর্ব বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি আরও ঘনীভূত হয়ে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এ রূপ নেয়। এটি আজ সকাল ৬টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৮২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল।ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে আজ মধ্যরাত নাগাদ আরও শক্তিশালী হয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। পরবর্তীতে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে এটি অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আকারে আগামী বুধবার ভারতের অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম করতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।বর্তমানে ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর অত্যন্ত উত্তাল রয়েছে।এই পরিস্থিতিতে দেশের সব সমুদ্রবন্দর—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রাকে ১ নম্বর দূরবর্তী সতর্ক সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।/ 
১ ঘন্টা আগে

মন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট, বহিষ্কার যুবদল নেতা

মন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট, বহিষ্কার যুবদল নেতা

৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বাকে পিটিয়ে মারার অভিযোগ স্বামীর বিরুদ্ধে

৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বাকে পিটিয়ে মারার অভিযোগ স্বামীর বিরুদ্ধে

মাওয়ায় সুন্দরবন এক্সপ্রেস থেকে পড়ে অজ্ঞাতনামা নারীর মৃত্যু

মাওয়ায় সুন্দরবন এক্সপ্রেস থেকে পড়ে অজ্ঞাতনামা নারীর মৃত্যু

গ্রামীণ নিরাপত্তায় অভিনব উদ্যোগ, হাসিমুখ গ্রাম পুলিশের

গ্রামীণ নিরাপত্তায় অভিনব উদ্যোগ, হাসিমুখ গ্রাম পুলিশের

ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব, ২ নম্বর সংকেত

ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব, ২ নম্বর সংকেত

ছাগল খুঁজতে গিয়ে বাঘের কবলে গৃহবধূ, এলাকায় চরম আতঙ্ক

ছাগল খুঁজতে গিয়ে বাঘের কবলে গৃহবধূ, এলাকায় চরম আতঙ্ক

 হকার উচ্ছেদ ঘিরে প্রশাসকের গাড়ি আটকে বিক্ষোভ-হাতাহাতি

হকার উচ্ছেদ ঘিরে প্রশাসকের গাড়ি আটকে বিক্ষোভ-হাতাহাতি

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দুই মিনিটের ঝটিকা মিছিল, আটক দুই

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দুই মিনিটের ঝটিকা মিছিল, আটক দুই

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আলাল

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আলাল

পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের নতুন শাখা সম্প্রসারণ, নজরে তরুণ প্রজন্ম

পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের নতুন শাখা সম্প্রসারণ, নজরে তরুণ প্রজন্ম

মতামতমতামত

সড়ক দুর্ঘটনার দায়মুক্তি ও প্রাণহানির খতিয়ান

বাংলাদেশে প্রতিটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার পর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে: শোকার্ত পরিবার, জনরোষ, তদন্তের দাবি এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হওয়ার আগেই ঘটে যায় আরেকটি দুর্ঘটনা। সড়কপথ বিপজ্জনক হতে পারে, চালকরা ভুলও করতে পারেন—তবে এটিই মূল সমস্যা নয়। আসল সমস্যা হলো, যে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব, তারা বারবার সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করতে পারছে না এবং কোনো অঘটন ঘটলে তার দায়বদ্ধতাও এড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের সড়ক নিরাপত্তা সংকট মূলত একটি জবাবদিহিতার সংকট।কত মানুষ মারা যাচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের কোনো ঐকমত্যই নেই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪,২৮৫টি দুর্ঘটনায় ৪,১৫৭ জন নিহত এবং ৫,৩৯১ জন আহত হয়েছে। অন্যদিকে, ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’-এর হিসাব অনুযায়ী, কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই ৪৪২টি দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত ও ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’ ৯,১১১ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে, যেখানে ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’-এর হিসাবে এই সংখ্যা ৭,৩৫৯। বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করায় এই পরিসংখ্যানগুলোর মধ্যে পার্থক্য দেখা দেয়।আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রকৃত চিত্র হয়তো আরও ভয়াবহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১,৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, অথচ সরকারি নথিতে এই সংখ্যা ৫,০৮৪। এত বড় ব্যবধান ইঙ্গিত দেয় যে, সরকারি নথিতে মৃত্যুর একটি বড় অংশই বাদ পড়ে যাচ্ছে। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ছাড়া সরকারের পক্ষে এটি জানা সম্ভব নয় যে, কোন সড়কগুলো সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক, কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে অথবা কোনো নীতি আদৌ কার্যকর হচ্ছে কি না।এর সমাধান হলো একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা, যেখানে পুলিশি প্রতিবেদন, হাসপাতালের তথ্য, মৃত্যু নিবন্ধন এবং বিমা দাবির মতো সব উপাত্ত একত্রিত থাকবে। প্রতিটি মৃত্যুকে একই পদ্ধতিতে নথিবদ্ধ করতে হবে—যার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিদের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।সঠিক পরিসংখ্যান কেবল একটি সূচনা মাত্র। মূল দুর্বলতাটি হলো—বিদ্যমান নিরাপত্তা বিধিগুলো কার্যকর করার ক্ষেত্রে। যদি গাড়ির ফিটনেস সনদ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র হয়, ত্রুটিগুলো মেরামত না করা হয়, অথবা সনদটি অর্থের বিনিময়ে কেনা হয়ে থাকে—তবে তা কাউকে সুরক্ষা দিতে পারে না। ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক, ক্ষয়ে যাওয়া টায়ার, নষ্ট বাতি, অনিরাপদ পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত বোঝাই যানবাহন একটি ছোট ভুলকেও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় রূপ দিতে পারে। গাড়ির পরিদর্শন হতে হবে প্রকৃত কারিগরি যাচাই-বাছাই, যার নথিপত্র থাকবে উন্মুক্ত এবং যার ওপর থাকবে নিরপেক্ষ তদারকি।চালকদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন একই ধরনের কঠোর নজরদারি। যখন নিয়োগকর্তারা অত্যন্ত কঠিন সময়সূচী চাপিয়ে দেন, চালকরা বিশ্রামের সুযোগ পান না এবং মুনাফার দৌড়ে বেপরোয়া আচরণকে উৎসাহিত করা হয়, তখন ড্রাইভিং লাইসেন্সের গুরুত্ব আর থাকে না। পরিবহন পরিচালনাকারীদের নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের চালকরা যোগ্য, দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিকভাবে সক্ষম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম পেয়েছেন কি না। কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি যখন যাত্রী পরিবহনকারী যানবাহন চালানোর সুযোগ পান, তখন কেবল চালককেই নয়, বরং যারা তাকে অনুমতি দিয়েছে, তাদেরও দায়বদ্ধ করতে হবে।মোটরসাইকেল আরোহী এবং পথচারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন। ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২,৯৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রশিক্ষণ, বৈধ লাইসেন্স, সঠিক মানের হেলমেট ব্যবহার এবং দ্রুতগতির যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া—এসবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ডেলিভারি কর্মীকে যেন কখনোই কঠোর সময়সীমা মেনে চলা এবং নিরাপদে বাড়ি ফেরার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে না হয়।পথচারীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি প্রায়শই থাকে রাস্তা বা অবকাঠামোতেই। ফুটপাতগুলো ভাঙাচোরা, হকারদের দখলে থাকা, অথবা অনেক জায়গায় ফুটপাতই নেই। স্কুল, বাজার বা বাস স্টপের মতো জায়গাগুলোর আশেপাশে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। স্থানীয় কাউন্সিল এবং সড়ক সংস্থাগুলোর উচিত জনবহুল এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন ফুটপাত, স্পষ্টভাবে চিহ্নিত পারাপারের স্থান, পর্যাপ্ত আলোকব্যবস্থা এবং যৌক্তিক গতিসীমা নিশ্চিত করা।সড়ক নকশার বিষয়টি যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, বাস্তবে তা পায় না। প্রতিটি মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনার পর ওভারটেকিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, লেন বিভাজন, দিকনির্দেশক চিহ্ন, সংযোগস্থল এবং দ্রুতগতির সড়কে ধীরগতির যানবাহনের উপস্থিতি—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠা উচিত। মিডিয়ান ব্যারিয়ার, নিরাপদ সংযোগস্থল, বাস্তবসম্মত গতিসীমা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে পারে যেন একজন চালকের ভুলে অনেক মানুষের প্রাণহানি না ঘটে।দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অ্যাম্বুলেন্সের ধীরগতি এবং হাসপাতালে নিম্নমানের চিকিৎসা সেবা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী নয় এমন আঘাতকেও মৃত্যুর কারণ করে তুলতে পারে। জরুরি পরিষেবা, পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স ও হাসপাতালগুলোর মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় প্রয়োজন; পাশাপাশি প্রশিক্ষিত প্রাথমিক সহায়তাকারী এবং ট্রমা কেয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।প্রস্তাবিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০২৬’-এ এসব ঘাটতির বেশ কয়েকটি সমাধানের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জরুরি চিকিৎসা সেবা, দুর্ঘটনাকবলিতদের সহায়তাকারীদের সুরক্ষা, খারাপ ড্রাইভিংয়ের জন্য পয়েন্টভিত্তিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং বারবার আইন লঙ্ঘনকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান। তবে এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে আইনের চূড়ান্ত খসড়া এবং তা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে তার ওপর।জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস কেবল বক্তৃতা, র্যালি বা সচেতনতামূলক প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আসল পরীক্ষাটি হলো—আইন পাস হলো কি না তা নয়, বরং এর ফলে মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমে কি না।প্রতিটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার দ্রুত তদন্ত হওয়া উচিত। যদি অবহেলা, জাল নথিপত্র ব্যবহার, অননুমোদিত ড্রাইভিং বা সরকারি কর্মকর্তাদের অসদাচরণ প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে কোনো অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান করতে হবে।বাংলাদেশের এমন একটি সড়ক নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রয়োজন, যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ থাকবে, সময়সীমা নির্ধারণ করা থাকবে এবং ফলাফলের পরিমাপ করা হবে। একটি জাতীয় টাস্ক ফোর্স গঠন করা যেতে পারে, যার বিআরটিএ, পুলিশ, সড়ক সংশ্লিষ্ট সংস্থা, স্থানীয় সরকার এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার মধ্যে সমন্বয় সাধনের কর্তৃত্ব থাকবে।নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে কেবল নথিপত্রনির্ভর না রেখে বাস্তব প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। বিআরটিএ-এর উচিত যানবাহনের ফিটনেস সনদ, পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং পরিদর্শন ফলাফলের একটি উন্মুক্ত ও অনুসন্ধানযোগ্য ডিজিটাল রেকর্ড রাখা। প্রতিটি বড় সড়ক প্রকল্প চালুর আগে একটি নিরপেক্ষ নিরাপত্তা নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।জরুরি সেবাদানকারী কর্মী, অ্যাম্বুলেন্স এবং উপযুক্ত হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই জবাবদিহিতার কাঠামো থাকা জরুরি। প্রতিটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার দ্রুত তদন্ত হতে হবে এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্দিষ্ট সংস্থার ওপর অর্পণ করতে হবে।এর মূল পরীক্ষাটি খুবই সহজ। প্রতিটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে জানতে হবে তাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে; প্রতিটি ব্যর্থতার কারণ খতিয়ে দেখতে হবে এবং প্রতিটি ফলাফল জনসমক্ষে উন্মুক্ত রাখতে হবে। যেসব মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য, সেগুলোকে ‘যাতায়াতের অনিবার্য মূল্য’ হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।যতদিন পর্যন্ত প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিতভাবে জবাবদিহিতার আওতায় না আনা হবে, ততদিন সড়ক নিরাপত্তা আমাদের নিজেদের জনগণের সুরক্ষায় ব্যর্থতারই একটি পরিমাপক হয়ে থাকবে। কোনো মানুষ মারা যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ কী প্রতিক্রিয়া দেখাল, তা দিয়ে অগ্রগতি বিচার করা যাবে না; বরং যাতায়াত ব্যবস্থাকে কতটা নিরাপদ করা সম্ভব হলো, তার ওপর ভিত্তি করেই প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

ধর্ম যার যার, নিরাপত্তার অধিকার সবার

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।’ ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে তিনি সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এর আগে ৩০ এপ্রিল বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষেও তিনি ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বার্তা। তবে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের কাছে এর গুরুত্ব শুধু শুভেচ্ছাবাণী কিংবা রাজনৈতিক আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা দেখতে চান, এই ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়; তাদের জীবন, সম্পদ, ধর্মীয় উপাসনালয়, ভূমি, সংস্কৃতি ও মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত থাকে। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় না; বরং প্রান্তিক, অসহায় ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের মানবিক চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়।বাংলাদেশ বহু ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার মানুষের দেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের পাশাপাশি সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, কোডা, কোড়া, রাজোয়াড়, তুরী, সিং, গারো, হাজং, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এ দেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজ গঠনে অবদান রেখে চলেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একক সম্পদ ছিল না। ধর্ম ও পরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষ একটি স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্নের বাংলাদেশে কোনো নাগরিককে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয়ভাবে সমান অধিকারের ঘোষণা থাকলেও সমাজের সব মানুষ সমানভাবে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পান কি না, সেই প্রশ্ন আজও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় উৎসবের আগে নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া প্রয়োজন। তবে উৎসব শেষ হওয়ার পরও সেই নিরাপত্তা অটুট রাখা আরও জরুরি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নিজের বাড়িতে, কর্মস্থলে, গ্রামে কিংবা উপাসনালয়ে যাওয়ার পথে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। শুধু আশ্বাস নয়, তাদের দৈনন্দিন জীবনেও নিরাপত্তার বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি করতে হবে।প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কেউ যেন নিজেদের সংখ্যালঘু মনে না করেন। এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, রাষ্ট্রের চোখে প্রত্যেক নাগরিক সমান মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু কাউকে সংখ্যালঘু মনে না করতে বললেই তার নিরাপত্তাহীনতা দূর হয় না। বরং কেন কোনো নাগরিক নিজেকে অনিরাপদ বা অসহায় মনে করছেন, রাষ্ট্রকে সেই কারণগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। কোনো সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের চেষ্টা হলে, কোনো উপাসনালয়ে হামলা হলে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে কারও বিরুদ্ধে উত্তেজনা ছড়ানো হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মীয় অনুভূতির অজুহাতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, জনতার প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়। এখানেই রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসনের পরীক্ষা। অপরাধী সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যে-ই হোন না কেন, তার পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণ ও আইন অনুযায়ী বিচারই হবে চূড়ান্ত বিবেচ্য।বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি আরও বিস্তৃত। তাদের জন্য নিরাপত্তা মানে শুধু শারীরিক হামলা থেকে রক্ষা পাওয়া নয়; নিজেদের ভূমিতে বসবাস, নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত আচার পালন এবং বৈষম্য ছাড়া শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভও নিরাপত্তার অংশ। সাঁওতালদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সামাজিক কাঠামো, উৎসব, ঐতিহ্য ও ইতিহাস। তাদের সোহরাই ও বাহা উৎসব কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়; এগুলো সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সামষ্টিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একইভাবে অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীরও নিজস্ব ঐতিহ্য ও জীবনদর্শন রয়েছে। কিন্তু ভূমির অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, প্রশাসনিক অবহেলা এবং পরিচয়ের স্বীকৃতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ উপেক্ষা করা হলে শুধু ধর্মীয় নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—সব আদিবাসী একই ধর্মের অনুসারী নন। কেউ খ্রিষ্টান, কেউ সনাতন ধর্মাবলম্বী, কেউ ক্রামা, সারনা, সানামাহী বা নিজস্ব ঐতিহ্যগত বিশ্বাস অনুসরণ করেন, আবার কেউ অন্য ধর্মের অনুসারী। তাদের ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে তারা সমান। একজন সাঁওতাল খ্রিষ্টান, একজন সাঁওতাল সারনাপন্থী কিংবা একজন হিন্দু আদিবাসী—প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। ধর্ম পরিবর্তন করলেও কারও মানবিক মর্যাদা, নাগরিক অধিকার কিংবা নিরাপত্তার অধিকার কমে যায় না।বাংলাদেশে দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা, শুভ বড়দিন ও ঈদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব দেশের বহুমাত্রিক সমাজজীবনের অংশ। এসব উৎসব নিরাপদে উদ্‌যাপনের পরিবেশ তৈরি করা সরকারের পাশাপাশি সমাজেরও দায়িত্ব। তবে উৎসবকেন্দ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। সারা বছর মন্দির, গির্জা, বৌদ্ধবিহার, মসজিদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো উপাসনালয়ে হামলা হলে দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়ার প্রবণতা প্রতিরোধেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কোনো অভিযোগ যাচাই না করে প্রচার করা কিংবা উত্তেজিত জনতাকে উসকে দেওয়া ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় নেতাদেরও সম্প্রীতি ও সহনশীলতার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। কোনো ধর্মের অনুসারীদের সম্মিলিতভাবে দায়ী না করে ব্যক্তির অপরাধকে ব্যক্তির অপরাধ হিসেবেই দেখতে হবে।সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।প্রথমত, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি দখল ও বৈষম্যের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। মামলা গ্রহণ থেকে শুরু করে বিচারপ্রক্রিয়া পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা যেন হয়রানি বা বাধার মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে হবে।দ্বিতীয়ত, যেসব এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। হামলার আশঙ্কা সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়ার পরও ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে।তৃতীয়ত, আদিবাসীদের ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ, উচ্ছেদ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক অধিকারসংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাদের বাদ দিয়ে নয়।চতুর্থত, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু উৎসব উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় নয়, তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো শোনা এবং সমাধানের অগ্রগতি পর্যালোচনা করাও জরুরি।পঞ্চমত, বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিক মর্যাদা এবং বৈচিত্র‍্যরে প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা কঠিন।গণতান্ত্রিক সরকার যদি সত্যিই এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে প্রত্যেকে নিরাপদে বসবাস করবেন, তাহলে সংখ্যালঘুদের উদ্বেগকে অবিশ্বাসের চোখে না দেখে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাদের কণ্ঠস্বরকে রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা অযৌক্তিক অভিযোগ হিসেবে চিহ্নিত না করে সমস্যার প্রকৃতি বুঝতে হবে। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার—নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার’—এই বক্তব্য বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন হতে পারে। যেদিন একজন সাঁওতাল নিশ্চিন্তে নিজের জমিতে চাষ করতে পারবেন, একজন খ্রিষ্টান নির্ভয়ে গির্জায় যেতে পারবেন, একজন হিন্দু নিরাপদে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন করতে পারবেন, একজন বৌদ্ধ নির্বিঘ্নে বুদ্ধ পূর্ণিমা পালন করতে পারবেন এবং প্রত্যেক মুসলমানও নিজের ধর্মীয় অধিকার ভোগ করতে পারবেন, সেদিনই এই বক্তব্যের পূর্ণ তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত দর্শন যেন শুধু বাণী ও বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার, সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হোক।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

স্বাদ, স্বাস্থ্য আর পানীয়ের নতুন দিনের গল্প

বাংলাদেশে পানীয়ের বাজার বললে একসময় আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত কোমল পানীয়, ফলের রস, লাচ্ছি, শরবত, চা, কফি কিংবা বোতলজাত পানি। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের পানীয়ের বাজারেও ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তন আসছে। ২০২৭ সালে এই পরিবর্তন আরও দৃশ্যমান হতে পারে। ভবিষ্যতের পানীয় শুধু তৃষ্ণা মেটাবে—এমন নয়; ভোক্তারা ক্রমেই এমন পানীয় চাইবেন, যা একই সঙ্গে সুস্বাদু, সুবিধাজনক এবং তাঁদের জীবনযাপন বা পুষ্টির কোনো নির্দিষ্ট প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই।বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া পানীয়ের চাহিদাকে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ায়। নগরায়ণ, মানুষের আয় ও ব্যয়ের ধরনে পরিবর্তন, সুপারমার্কেট ও অনলাইন বিক্রির প্রসার এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর নতুন পণ্য গ্রহণের আগ্রহ—সব মিলিয়ে পানীয়শিল্পে নতুন পণ্য তৈরির সুযোগ বাড়ছে। বাজারবিষয়ক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের ভোক্তাদের মধ্যে কম চিনি, প্রাকৃতিক উপাদান এবং কার্যকরী পানীয়ের প্রতি আগ্রহের কথা বলা হচ্ছে।এখন তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কোন স্বাদের পানীয় তৈরি করব’ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—পানীয়টি কেন মানুষ কিনবে এবং এটি তাঁদের কোন প্রয়োজন পূরণ করবে? এখানেই ২০২৭ সালের পানীয়শিল্পের বড় পরিবর্তন।বাংলাদেশে আগামী দিনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে কার্যকরী পানীয়। এ ধরনের পানীয়ের উদ্দেশ্য শুধু তৃষ্ণা মেটানো নয়; বরং নির্দিষ্ট পুষ্টিগত বা জীবনযাপনভিত্তিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে পণ্য তৈরি করা। যেমন শরীরচর্চার পর শরীরে পানির ঘাটতি পূরণে ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয়, খাদ্য-আঁশসমৃদ্ধ পানীয়, প্রোটিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয় কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তৈরি কম ক্যাফেইন বা ক্যাফেইনবিহীন পানীয়।বাংলাদেশে কার্যকরী পানীয়ের ধারণা ইতিমধ্যেই বাজার গবেষণায় আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। শক্তিবর্ধক পানীয়ের পাশাপাশি খেলাধুলার উপযোগী পানীয়, প্রোটিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয়, কার্যকরী পানি এবং উপকারী অণুজীব বা সুস্থতাকেন্দ্রিক পানীয়ের মতো বিভাগ নিয়ে বাজার বিশ্লেষণ হচ্ছে।তবে আগামী দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিবর্তন সম্ভবত শক্তিবর্ধক পানীয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।বর্তমানে বাজারে ‘শক্তিবর্ধক’ বলতে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই ক্যাফেইন ও চিনিনির্ভর পানীয় বুঝি। ভবিষ্যতে এই ধারণা আরও বিস্তৃত হতে পারে। কেউ চাইবেন ব্যায়ামের পর শরীরের পুনরুদ্ধারে সহায়ক পানীয়, কেউ চাইবেন দুপুরে হালকা পুষ্টি, কেউ চাইবেন গরমের দিনে ইলেকট্রোলাইট, আবার কেউ হয়তো চাইবেন সন্ধ্যার জন্য ক্যাফেইনবিহীন একটি সতেজ পানীয়। ফলে ভবিষ্যতের বাজারে ‘একটি পানীয় সবার জন্য’ ধারণার পরিবর্তে ‘একটি নির্দিষ্ট প্রয়োজনের জন্য একটি পানীয়’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে খাদ্য-আঁশসমৃদ্ধ পানীয়। কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী প্রোটিন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার ও পানীয় এখন প্রতিষ্ঠিত বাজার। কিন্তু প্রোটিনের পাশাপাশি খাদ্য-আঁশও এখন নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।আমাদের প্রচলিত খাদ্যে শাকসবজি, ডাল, ফল এবং পূর্ণ শস্য খাদ্য-আঁশের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু আধুনিক খাদ্যপ্রযুক্তিতে এমন অনেক দ্রবণীয় আঁশ রয়েছে, যা পানীয়তে ব্যবহার করা সম্ভব। আংশিক হাইড্রোলাইজড গুয়ার গাম, অ্যাকাসিয়া আঁশ, প্রতিরোধী ডেক্সট্রিনসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে স্বচ্ছ কিংবা হালকা ঘন পানীয় তৈরি করা যায়।বাংলাদেশের পানীয় কোম্পানিগুলো এখান থেকে নতুন বাজার তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে লেবু-লাইম স্বাদের গ্যাসযুক্ত খাদ্য-আঁশসমৃদ্ধ পানীয়, আম বা পেয়ারা স্বাদের আঁশসমৃদ্ধ পানীয় কিংবা গুঁড়ার ছোট প্যাকেটে দৈনিক খাদ্য-আঁশের পানীয় তৈরি করা যেতে পারে।এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অন্ত্রের সুস্থতা। বিশ্বব্যাপী প্রিবায়োটিক, প্রোবায়োটিক ও গাঁজন করা খাদ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে দইভিত্তিক পানীয়ের বাইরে আঁশসমৃদ্ধ ও অন্যান্য হজম-সহায়ক পানীয়ের বাজার তৈরি হতে পারে।তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পানীয়তে সামান্য আঁশ যোগ করলেই সেটিকে ইচ্ছেমতো ‘অন্ত্রের সুস্থতার পানীয়’ বলা উচিত নয়। কোন উপাদান কতটুকু রয়েছে, তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী এবং আইন অনুযায়ী কী ধরনের পুষ্টি বা স্বাস্থ্যবিষয়ক দাবি করা যাবে—এসব বিষয় অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।আরেকটি বড় সম্ভাবনা হচ্ছে শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের পানীয়। বাংলাদেশের আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করলে এই বাজারটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গরমের দিনে ঘাম, বাইরে কাজ, খেলাধুলা, দীর্ঘ যাতায়াত এবং শারীরিক পরিশ্রমের কারণে শরীরের পানি ও ইলেকট্রোলাইটের প্রয়োজন বাড়তে পারে।আমাদের দেশে খাবার স্যালাইনের অসাধারণ জনস্বাস্থ্যগত ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যবহৃত খাবার স্যালাইন এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য তৈরি শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের পানীয় এক বিষয় নয়। এখানেই শিল্পের নতুন সুযোগ রয়েছে।পানি, উপযুক্ত ইলেকট্রোলাইট, কম চিনি এবং ভালো স্বাদের সমন্বয়ে দৈনন্দিন পানীয় তৈরি করা যেতে পারে। এগুলো বোতল, ক্যান, গুঁড়ার ছোট প্যাকেট বা পানিতে গুলে খাওয়ার বড়ির আকারে বাজারজাত করা সম্ভব।বাংলাদেশের মতো দেশে ছোট প্যাকেট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একটি বড় বোতল কেনার পরিবর্তে কেউ যদি কম দামে একটি প্যাকেট কিনে ৫০০ মিলিলিটার পানিতে মিশিয়ে পান করতে পারেন, তাহলে পণ্যটি অনেক বড় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।২০২৭ সালের আরেকটি বড় বিষয় হবে কম চিনি। এখানে বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে ব্যবসায়িক সুযোগ এবং জনস্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাংলাদেশের পরিবারগুলোর মধ্যে কোমল পানীয় গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—২০২২ সালের গৃহস্থালি আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য ব্যবহার করা একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় কোমল পানীয় গ্রহণকারী পরিবারের অনুপাত ২০১৬ সালের প্রায় ১৩ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে প্রায় ৩৭ শতাংশে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে।অতএব, আমাদের ভবিষ্যৎ পানীয়শিল্প শুধু আরও বেশি পানীয় বিক্রির কথা চিন্তা করলে চলবে না; কী ধরনের পানীয় বিক্রি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কম চিনিযুক্ত বা চিনিবিহীন পানীয়ের বড় বাজার তৈরি হতে পারে। কিন্তু খাদ্যবিজ্ঞানীদের জন্য এটি সহজ কাজ নয়। চিনি শুধু মিষ্টতা দেয় না; এটি পানীয়ের ঘনত্ব, মুখে অনুভূত স্বাদ ও গঠন এবং ফলের স্বাদের ভারসাম্য তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। তাই চিনি কমিয়ে শুধু উচ্চমাত্রার কোনো মিষ্টিকারক যোগ করলেই ভালো পানীয় তৈরি হয় না। মিষ্টতা, অম্লতা, স্বাদ, মুখে অনুভূত গঠন এবং পান করার পর থেকে যাওয়া স্বাদ—সবকিছুর ভারসাম্য দরকার।বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর জন্য আরেকটি আকর্ষণীয় সুযোগ হতে পারে প্রোটিন পানীয়। প্রোটিনের গুঁড়াকে আমরা সাধারণত শরীরচর্চা বা ব্যায়ামাগারের সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রোটিন পানীয় শুধু শরীর গঠনে আগ্রহীদের জন্য থাকবে না। সকালের নাশতার সঙ্গে, অফিসে বিকেলের ক্ষুধায় কিংবা ব্যায়ামের পর সাধারণ ভোক্তার জন্য ছোট আকারের পুষ্টিকর পানীয় তৈরি হতে পারে।দুধের প্রোটিনের পাশাপাশি মটরশুঁটি, সয়া কিংবা অন্যান্য উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিন ব্যবহার করেও নতুন পণ্য তৈরি করা সম্ভব। কোকো, কফি, ভ্যানিলা, কলা কিংবা পরিচিত দেশীয় স্বাদের সঙ্গে প্রোটিন মিলিয়ে নতুন ধরনের পানীয় তৈরি হতে পারে।তবে শুধু প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ালেই ভালো পণ্য হয় না। প্রোটিনের স্বাদ, তিক্ততা, মুখে শুকনো অনুভূতি, তলানি এবং তাপ প্রয়োগে স্থিতিশীলতা—সবই গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত বিষয়।আরেকটি নতুন ধারণা হচ্ছে সময়ভিত্তিক পানীয়। সকালে আমরা চা বা কফি খাই। দুপুরে হয়তো ঠান্ডা পানীয় চাই। বিকেলে আবার চা। রাতে অনেকেই ক্যাফেইন এড়িয়ে চলতে চান। পানীয় কোম্পানিগুলো যদি এই স্বাভাবিক আচরণকে কেন্দ্র করে পণ্য তৈরি করে?সকালের জন্য হালকা ক্যাফেইন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয়, দুপুরে প্রোটিন বা আঁশযুক্ত পানীয়, বিকেলে কম চিনির সতেজ পানীয় এবং রাতে ক্যাফেইনবিহীন ক্যামোমাইল বা অন্যান্য উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ উপাদানভিত্তিক পানীয়—এ ধরনের ধারণা ভবিষ্যতে বাজার তৈরি করতে পারে।তবে ‘শিথিলতা’, ‘ঘুম’, ‘মানসিক চাপ কমানো’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও খাদ্য আইনের সীমাবদ্ধতা বুঝতে হবে। পানীয় কোনো রোগের চিকিৎসা নয়।স্বাদের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সামনে বিশাল সুযোগ রয়েছে। আমাদের নিজেদের ফলের বৈচিত্র্যই একটি বড় সম্পদ। আম, কাঁচা আম, পেয়ারা, লেবু, বাতাবি লেবু, আনারস, তেঁতুল, জাম, বরই, বেল, ডাব—এসব পরিচিত স্বাদকে আধুনিক পানীয়ের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করা যায়।বিশ্বে পুরোনো দিনের পরিচিত স্বাদকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি হতে পারে আরও আকর্ষণীয়। বেলের শরবত, আমপোড়া শরবত, তেঁতুল, লেবু-পুদিনা কিংবা বোরহানির পরিচিত স্বাদ আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন উপস্থাপনায় তরুণ ভোক্তার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে ফিরে আসতে পারে।কল্পনা করুন—গ্যাসযুক্ত আমপোড়া পানীয়, কম চিনির তেঁতুল-মরিচ পানীয়, লেবু-পুদিনা ইলেকট্রোলাইট পানীয় কিংবা বেল ও আঁশের সমন্বয়ে তৈরি আধুনিক পানীয়। এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমাদের ভবিষ্যৎ পানীয়শিল্পকে সব সময় বিদেশি স্বাদ নকল করতে হবে না। দেশীয় স্বাদকে আধুনিক খাদ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করাই হতে পারে আমাদের নিজস্ব উদ্ভাবন।দাম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। বাংলাদেশের ভোক্তারা মূল্য-সংবেদনশীল। কোমল পানীয় নিয়ে বাংলাদেশের তথ্য বিশ্লেষণেও দামের পরিবর্তনের সঙ্গে চাহিদার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই শুধু ২৫০ বা ৩০০ টাকার উচ্চমূল্যের পানীয় তৈরি করলে কার্যকরী পানীয়ের বাজার বড় হবে না। ২০, ৩০, ৫০ কিংবা ১০০ টাকার মধ্যে কীভাবে বিভিন্ন স্তরের পণ্য তৈরি করা যায়, সেটিও শিল্পকে ভাবতে হবে। ছোট বোতল, ছোট ক্যান, ছোট প্যাকেট এবং গুঁড়ার প্যাকেট এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।বাংলাদেশের শক্তিবর্ধক পানীয়ের বাজারও ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের একটি বাজার পূর্বাভাসে এই বাজারের মূল্য ২০২৬ সালে প্রায় ১৪ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার হিসেবে অনুমান করা হয়েছে এবং ২০৩১ সাল নাগাদ প্রায় ২২ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই বিশ্লেষণে ২০২৬–৩১ সময়ে বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার প্রায় ৮.২ শতাংশ ধরা হয়েছে। এগুলো অবশ্য বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস, সরকারি পরিসংখ্যান নয়।এই বাজারের ভবিষ্যৎ শুধু বেশি ক্যাফেইন ও বেশি মিষ্টতার মধ্যে আটকে থাকার প্রয়োজন নেই। কম চিনি, ইলেকট্রোলাইট, ভিটামিন, শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ এবং অন্যান্য কার্যকরী ধারণা ব্যবহার করে নতুন প্রজন্মের পণ্য তৈরি করা সম্ভব। সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের বাংলাদেশের পানীয়শিল্পের জন্য একটি সহজ সূত্র হতে পারে—স্বাস্থ্য + কার্যকারিতা + দেশীয় স্বাদ + সুবিধা + সাশ্রয়ী মূল্য।বাংলাদেশের খাদ্য ও পানীয় কোম্পানিগুলো যদি এখন থেকেই গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করে, তাহলে কয়েকটি ক্ষেত্র বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়—খাদ্য-আঁশ ও অন্ত্রের সুস্থতাকেন্দ্রিক পানীয়, কম চিনির কার্যকরী পানীয়, ইলেকট্রোলাইট ও শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের পানীয়, প্রোটিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয়, সময়ভিত্তিক পানীয় এবং আধুনিক রূপে দেশীয় স্বাদের পানীয়।কিন্তু শুধু নতুন উপাদান যোগ করলেই উদ্ভাবন হয় না। একটি ভালো পানীয়কে একই সঙ্গে নিরাপদ, স্থিতিশীল, সুস্বাদু, সাশ্রয়ী এবং আইনসম্মত হতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের গরম আবহাওয়ায় পণ্যের অণুজীবগত নিরাপত্তা, মোড়ক, আলো ও অক্সিজেনের প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণকালীন স্থিতিশীলতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।আগামী দিনের সফল পানীয় হয়তো সেই পানীয় নয়, যার বোতলে সবচেয়ে বেশি উপাদানের নাম লেখা থাকবে। বরং সফল হবে সেই পণ্য, যার প্রয়োজনীয়তা একজন সাধারণ ভোক্তা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বুঝতে পারবেন।একসময় আমরা দোকানে গিয়ে বলতাম—‘একটা ঠান্ডা পানীয় দিন।’ ভবিষ্যতে হয়তো একজন ভোক্তা বলবেন—‘কম চিনি, একটু আঁশ আর ভালো স্বাদের একটা পানীয় দিন।’ অথবা—‘গরমে শরীরটা সতেজ রাখবে, এমন একটা পানীয় দিন।’এই পরিবর্তন যদি সত্যিই আসে, তাহলে ২০২৭ সাল বাংলাদেশের পানীয়শিল্পের জন্য শুধু নতুন স্বাদের বছর হবে না; এটি হতে পারে নতুন চিন্তার পানীয়ের বছর।[লেখক: খাদ্যবিজ্ঞানী, উদ্ভাবন ব্যবস্থাপক, সালুটিভিয়া, যুক্তরাজ্য]

প্রবারণা পূর্ণিমার মৈত্রীতে আলোকিত হোক ধরণি

আজ শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা, ২৫৭০ বুদ্ধাব্দ। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত বা বর্ষাবাস পালিত হয়। প্রবারণা অর্থ হলো, একে অপরের কাছে নিজের দোষ-ত্রুটি স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং মৈত্রীভাবাপন্ন চিত্ত নিয়ে জীবন পরিচালনা করা। ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, কারও প্রতি কোনো ভুলত্রুটি করে থাকলে তা স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়াই প্রবারণার মূল শিক্ষা। একইভাবে অন্যের ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার মানসিকতাও এর সঙ্গে যুক্ত। আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে অশুভকে বর্জন করে সত্য ও সুন্দরকে বরণ করার শিক্ষা দেয় প্রবারণা।প্রবারণা পূর্ণিমার পর থেকে কার্তিক পূর্ণিমা পর্যন্ত এক মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় দানোত্তম কঠিন চীবর দান। যেসব বিহারে ভিক্ষুরা বর্ষাবাস পালন করেন, সেসব বিহারেই কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। প্রবারণা পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে গৌতম বুদ্ধের জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে চুল কর্তন, তাবতিংস স্বর্গে মাতা মহামায়ার উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনা, ৬০ জন শিষ্যকে ধর্ম প্রচারে পাঠানো এবং স্বর্গ থেকে সাংকাশ্য নগরে বুদ্ধের অবতরণ।চুল কাটা ও ফানুস উৎসবের উৎপত্তিবৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, আষাঢ়ী পূর্ণিমায় গৃহত্যাগের পর সিদ্ধার্থ গৌতম অনোমা নদীর তীরে পৌঁছে প্রব্রজিত জীবন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি উপলব্ধি করেন, প্রব্রজিত জীবনে চুলের প্রয়োজন নেই। তাই ক্ষুরধার তলোয়ার দিয়ে নিজের চুল কাটেন এবং অধিষ্ঠান করেন, তার কর্তিত চুল আকাশে নিক্ষেপ করলে তা যেন মাটিতে পতিত না হয়। তিনি যদি জন্ম-জন্মান্তরে ত্রিশ পারমি পূর্ণ করে বুদ্ধত্ব লাভের যোগ্যতা অর্জন করে থাকেন, তবে সেই চুল আকাশে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকুক।কথিত আছে, সিদ্ধার্থের নিক্ষিপ্ত চুল দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্ণের পাত্রে করে তাবতিংস স্বর্গে নিয়ে যান। সেখানে এই কেশধাতু স্থাপন করে নির্মাণ করা হয় ‘চুলামনি চৈত্য’। বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, দেবতারা এখনো এই চৈত্যের পূজা করেন। এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের ঐতিহ্য থেকেই বৌদ্ধদের মধ্যে আকাশ প্রদীপ বা ফানুস ওড়ানোর প্রচলন হয়েছে বলে মনে করা হয়। বর্তমানে ফানুস উৎসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি একটি সামাজিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রবারণা পূর্ণিমায় বৌদ্ধবিহারগুলোতে সমবেত হন। এভাবেই ফানুস উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমাকে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত করতে ভূমিকা রেখেছে।তাবতিংস স্বর্গে মাতার উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনাবৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, গৌতম বুদ্ধ তার সপ্তম বর্ষাবাস তাবতিংস স্বর্গে অতিবাহিত করেন। সেখানে পারিজাত বৃক্ষের নিচে পাণ্ডুকম্বল শিলাসনে বসে তিনি মাতা মহামায়ার উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনা দেন। তিন মাস ধরে দেশনা প্রদানের মাধ্যমে তিনি মাতাকে স্রোতাপত্তি মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত করেন বলে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বুদ্ধ মাতৃঋণ পরিশোধ ও কর্তব্য পালনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যা সবার জন্য অনুকরণীয়।কথিত আছে, তাবতিংস স্বর্গে পাণ্ডুকম্বল শিলাসনে উপবিষ্ট হয়ে বুদ্ধ দশ হাজার চক্রবাল থেকে আগত অসংখ্য দেবতা ও ব্রহ্মার উদ্দেশে সাত খণ্ডে বিভক্ত অভিধর্ম নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশনা করেন। আশ্বিনী পূর্ণিমায় তিন মাসব্যাপী এই দেশনার সমাপ্তি ঘটে বলে দিনটি অভিধর্ম দিবস হিসেবেও পরিচিত।স্বর্গ থেকে সাংকাশ্য নগরে অবতরণভারতের শ্রাবস্তী থেকে প্রায় ৩০ যোজন দূরে সাংকাশ্য নগর অবস্থিত বলে বৌদ্ধ ঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে। কথিত আছে, মহামৌদগল্যায়ন স্থবিরের মাধ্যমে বুদ্ধ তাবতিংস স্বর্গ থেকে মহাপ্রবারণার দিন সাংকাশ্য নগরে অবতরণের কথা জানান। দেবরাজ ইন্দ্র তখন দৈব প্রভাবে সুবর্ণ, রৌপ্য ও মণিময় তিনটি সোপান নির্মাণ করেন। সোপানগুলোর পাদদেশ সাংকাশ্য নগরের দ্বারে এবং শীর্ষ সুমেরু পর্বতের চূড়ায় স্থাপন করা হয়। দক্ষিণ দিকের সুবর্ণ সোপান দেবতাদের জন্য, বাম দিকের রৌপ্য সোপান মহাব্রহ্মাদের জন্য এবং মাঝের মণিময় সোপান বুদ্ধের জন্য নির্ধারিত ছিল। এই অবতরণের মধ্য দিয়ে আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত বুদ্ধের তিন মাসের বর্ষাবাসের সমাপ্তি ঘটে বলে বৌদ্ধ ঐতিহ্যে বিশ্বাস করা হয়।ধর্ম প্রচারে বুদ্ধের নির্দেশনাপ্রবারণা পূর্ণিমার সঙ্গে বুদ্ধের ধর্ম প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও যুক্ত। বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, যশ ও তার ৫৪ জন সহচরসহ মোট ৬০ জন শিষ্যকে বুদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য বিভিন্ন দিকে যাত্রা করার নির্দেশ দেন। তিনি তাদের বলেন, বহু মানুষের হিত ও সুখের জন্য, জগতের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শনের জন্য এবং দেবতা, ব্রহ্মা ও মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে ধর্ম প্রচার করতে হবে। তার নির্দেশনা ছিল, ধর্মের আদিতে, মধ্যে ও অন্তে যেন কল্যাণ থাকে এবং তা যেন অর্থপূর্ণ ও পরিশুদ্ধ হয়।বুদ্ধের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিষ্যরা বিভিন্ন দিকে ধর্ম প্রচারে বেরিয়ে পড়েন। সেই ধারাবাহিকতায় বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘ যুগে যুগে ধর্ম প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখে চলেছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা ধর্মসভা, গৃহস্থের বাড়ি, গ্রন্থ রচনা এবং আধুনিক সময়ে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বুদ্ধের শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। সদ্ধর্মের সংরক্ষণ ও প্রসারে তাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বুদ্ধের মানবতাবাদী শিক্ষার চর্চা ও প্রয়োগের বিকল্প নেই। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই তার মহান দর্শন অনুসরণ, অনুধাবন ও অনুশীলনের মাধ্যমে সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তুলতে পারেন। প্রবারণা আমাদের আত্মশুদ্ধি, ক্ষমাশীলতা, মৈত্রী ও পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতার সেই শিক্ষাই দেয়। এই পূর্ণিমার আলোয় মানুষের হৃদয় থেকে বিদ্বেষ দূর হোক, প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি ও সম্প্রীতি।ভবতু সব্ব মঙ্গলং—সকলের মঙ্গল হোক।[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাজদ্বীপ, রাঙামাটি]

টিআইএন থেকে রিটার্ন: ফ্রিল্যান্সার-উদ্যোক্তাদের করণীয়

আয় শুরু করেছেন? টিআইএন, কর ও রিটার্ন সম্পর্কে শুরুতেই জানুন। ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করছেন, অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছেন কিংবা নিজের একটি স্টার্টআপ গড়ে তুলছেন? আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করসংক্রান্ত কিছু দায়িত্বও আপনার সামনে আসবে। কিন্তু টিআইএন, আয়কর ও রিটার্ন নিয়ে নানা ভুল ধারণার কারণে অনেক তরুণ শুরুতেই বিষয়গুলো এড়িয়ে যান। কেউ মনে করেন, টিআইএন করলেই কর দিতে হবে, আবার কেউ মনে করেন, আয় কম হলে করসংক্রান্ত কোনো দায়িত্বই নেই।বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। আয় কত, আয়ের উৎস কী, পেশা বা ব্যবসার ধরন কী এবং সংশ্লিষ্ট আইনে কী ধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এসব বিষয়ের ওপর করসংক্রান্ত দায়িত্ব নির্ভর করে। তাই আয় শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে কর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং নিয়মিত হিসাব রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।তরুণদের মধ্যে বাড়ছে ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন ব্যবসাবর্তমানে তরুণদের মধ্যে ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, ডিজিটাল সেবা, অনলাইন ব্যবসা ও স্টার্টআপের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। অনেকেই ঘরে বসে দেশি-বিদেশি গ্রাহকের কাজ করছেন। কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা বিক্রি করছেন।এসব কর্মকাণ্ড কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে একজন ফ্রিল্যান্সারের আয় ও কার্যক্রম যেমন এক রকম নয়, তেমনি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও পার্থক্য রয়েছে। ফলে তাঁদের আয়, ব্যয়, হিসাবরক্ষণ ও কর ব্যবস্থাপনাও এক নয়। তাই শুধু অনলাইনে আয় করেন—এমন পরিচয়ের ভিত্তিতে সবার জন্য একই করব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।টিআইএন কেন প্রয়োজন?টিআইএন বা করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক করদাতাকে দেওয়া ১২ অঙ্কের একটি স্বতন্ত্র শনাক্তকারী নম্বর। বিভিন্ন সরকারি, ব্যবসায়িক ও আর্থিক কার্যক্রমে আইন অনুযায়ী টিআইএন এবং রিটার্নসংক্রান্ত নথির প্রয়োজন হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে টিআইএন গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা একই নয়। ব্যক্তির পেশা, আয়, কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধানের ওপর এর প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে। তাই আইন অনুযায়ী প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও টিআইএন গ্রহণ না করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি টিআইএন গ্রহণকে সরাসরি আয়কর প্রদানের সঙ্গে এক করে দেখাও ঠিক নয়।টিআইএন থাকলেই কি আয়কর দিতে হয়?এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। টিআইএন হলো করদাতাকে শনাক্ত করার নম্বর। অন্যদিকে আয়কর হলো প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী করযোগ্য আয়ের ওপর আরোপিত কর। অর্থাৎ, টিআইএন থাকা এবং আয়কর পরিশোধ করা একই বিষয় নয়। কারও টিআইএন থাকতে পারে, কিন্তু প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা, আয় ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় তার প্রদেয় কর শূন্য হতে পারে। আবার করযোগ্য আয় না থাকলেও আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।তাই টিআইএন গ্রহণের পর নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, সেটিও জানা জরুরি।ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয় ও করফ্রিল্যান্সাররা সাধারণত নিজেদের দক্ষতা, জ্ঞান বা পেশাগত সেবা দিয়ে আয় করেন। তাই কাজের শুরু থেকেই আয় ও খরচের সঠিক হিসাব রাখা গুরুত্বপূর্ণ।গ্রাহকের সঙ্গে চুক্তি বা কাজের রেকর্ড, চালানপত্র, অর্থ পরিশোধের রেকর্ড, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অনলাইন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমের তথ্য সংরক্ষণ করা উচিত। বিদেশি গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করলে অর্থের উৎস, কাজের প্রকৃতি এবং অর্থ গ্রহণের রেকর্ডও যথাযথভাবে রাখা প্রয়োজন।একইভাবে পেশাগত কাজ পরিচালনার জন্য যেসব খরচ হয়, সেসবের বিল, রসিদ বা অন্যান্য প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা উচিত। ব্যক্তিগত ও পেশাগত লেনদেন আলাদা রাখলে বছর শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব তৈরি এবং রিটার্ন প্রস্তুত করা সহজ হয়।কোনো নির্দিষ্ট আয় করমুক্ত কি না, করযোগ্য আয় কীভাবে নির্ধারিত হবে বা বিশেষ কোনো কর সুবিধা প্রযোজ্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর আইন ও বিধান অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।উদ্যোক্তাদের কর ব্যবস্থাপনাঅনলাইন বা অফলাইন ব্যবসা ছোট হলেও সেটি ব্যবসা। তাই শুরু থেকেই ব্যবসার আর্থিক হিসাব আলাদাভাবে রাখা উচিত। পণ্য ক্রয়ের চালান, বিক্রয়ের রেকর্ড, ক্রেতার অর্থ পরিশোধের তথ্য, পণ্য সরবরাহের খরচ, বিজ্ঞাপন ব্যয়, কর্মচারীর বেতন, অফিস বা গুদামভাড়া এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক ব্যয়ের নথি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত অর্থের সঙ্গে ব্যবসার অর্থ মিশিয়ে ফেললে প্রকৃত ব্যবসায়িক আয় ও ব্যয় নির্ধারণ কঠিন হয়ে যায়। এতে করযোগ্য আয় নির্ধারণ ও রিটার্ন প্রস্তুতের সময়ও জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সম্ভব হলে ব্যবসার জন্য পৃথক ব্যাংক হিসাব অথবা অন্তত পৃথক হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা রাখা ভালো।করযোগ্য আয় কীভাবে নির্ধারিত হবে?শুধু মোট আয় কত হয়েছে, তার ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা হয় না। আয়ের প্রকৃতি, প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা, অনুমোদিত ব্যয়, কর রেয়াত, উৎসে কর্তিত কর এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধানসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে করযোগ্য আয় ও প্রদেয় কর নির্ধারণ করা হয়।ফ্রিল্যান্সার বা উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে আয় ও ব্যবসায়িক ব্যয়ের সঠিক হিসাব তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ নথি ছাড়া কোনো ব্যয়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে আয় ও প্রাসঙ্গিক ব্যয়—উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত।উৎসে করের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণঅনেক ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তার আয় থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উৎসে কর কর্তনের প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। রিটার্ন প্রস্তুতের সময় প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী উৎসে কর্তিত করের তথ্য উপস্থাপন ও সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান, গ্রাহক বা অন্য উৎস থেকে কর কর্তন করা হলে তার প্রমাণপত্র সংগ্রহ করে রাখা উচিত।রিটার্ন কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?আয়কর রিটার্ন হলো নির্দিষ্ট করবর্ষে করদাতার আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় এবং প্রযোজ্য করসংক্রান্ত তথ্য আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিলের প্রক্রিয়া।রিটার্ন শুধু কর পরিশোধের মাধ্যম নয়, এটি করদাতার আয় ও আর্থিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক নথি। আইন অনুযায়ী যাঁদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাঁদের নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করা উচিত।কর না থাকলেও রিটার্ন লাগতে পারে‘আমার কর আসে না, তাই রিটার্ন দেব না’—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বিষয়টি সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। কারও প্রদেয় আয়কর শূন্য হতে পারে। তবে একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে কর না থাকলেও রিটার্ন দাখিল করতে হতে পারে। তাই শুধু আয়কর দিতে হবে কি না, তা জানাই যথেষ্ট নয়। নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।কর সুবিধার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজনফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য নির্দিষ্ট খাতকে উৎসাহিত করতে সরকার বিভিন্ন সময়ে কর সুবিধা, অব্যাহতি বা বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। তবে কোনো নির্দিষ্ট আয় এসব সুবিধার আওতায় পড়ে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধান অনুযায়ী যাচাই করতে হবে। শুধু কোনো আয়কে ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয়, অনলাইন ব্যবসার আয় বা প্রযুক্তি খাতের আয় হিসেবে উল্লেখ করলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত হয়ে যায় না। আয়ের প্রকৃতি, সেবার ধরন, কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর আইন ও বিধান বিবেচনা করেই কর সুবিধা প্রযোজ্য কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে।রিটার্ন দাখিলের আগে কী প্রস্তুত রাখবেন?রিটার্ন দাখিলের আগে সারা বছরের আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য গুছিয়ে রাখা উচিত। ফ্রিল্যান্সারের ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের রেকর্ড, চালানপত্র, চুক্তিপত্র, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, অর্থ পরিশোধের মাধ্যমের রেকর্ড এবং পেশাগত খরচের প্রমাণপত্র গুরুত্বপূর্ণ।উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে বিক্রয় ও ক্রয়ের হিসাব, পণ্য ক্রয়ের চালান, বিক্রয়ের রেকর্ড, ব্যবসায়িক খরচের বিল ও ভাউচার, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য এবং কর্মচারীর বেতনসহ অন্যান্য ব্যয়ের রেকর্ড সংরক্ষণ করা উচিত। এ ছাড়া জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, বিনিয়োগ, ঋণ এবং অন্যান্য সম্পদ ও দায়ের তথ্যও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রস্তুত রাখতে হয়। উৎসে কর কর্তন হয়ে থাকলে তার প্রমাণপত্রও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।শুরু থেকেই হিসাব রাখুনফ্রিল্যান্সার কিংবা উদ্যোক্তা, যাঁরাই হোন না কেন, আয় শুরু হওয়ার দিন থেকেই হিসাব রাখার অভ্যাস করুন। প্রতি মাসে আয় ও ব্যয়ের হিসাব লিখে রাখুন। ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, চালানপত্র, বিল, ভাউচার ও রসিদ সংরক্ষণ করুন। অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল রেকর্ডও যথাযথভাবে রাখুন।এতে বছর শেষে রিটার্ন প্রস্তুত করা সহজ হবে। পাশাপাশি ব্যবসা বা পেশাগত কাজের প্রকৃত আর্থিক অবস্থাও পরিষ্কার থাকবে। ভবিষ্যতে ব্যাংকঋণ, বিনিয়োগ গ্রহণ, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণের প্রয়োজন হলেও সুশৃঙ্খল হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।শুরুতেই সচেতনতা, ভবিষ্যতে স্বস্তিফ্রিল্যান্সিং বা উদ্যোক্তা হওয়ার সাফল্য শুধু কত টাকা আয় করছেন, তার ওপর নির্ভর করে না। সেই আয় কতটা সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ এবং আইনসম্মতভাবে পরিচালনা করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।আজকের একজন ফ্রিল্যান্সার আগামী দিনের উদ্যোক্তা হতে পারেন। আবার ছোট একটি অনলাইন ব্যবসাও ভবিষ্যতে বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। তাই ব্যবসা বা পেশাগত আয় শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে কর ও হিসাব ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন হওয়া ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।আয় শুরু করুন, হিসাব রাখুন, করের নিয়ম জানুন এবং সময়মতো আইনগত দায়িত্ব পালন করুন। শুরুতেই সামান্য সচেতনতা ভবিষ্যতের বড় আইনি ও আর্থিক ঝুঁকি থেকে আপনাকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।[লেখক: আয়কর আইনজীবী]

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ব্যর্থতা

নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আখতার সিতি—মক্কা অঞ্চলে কর্মরত দুই বাংলাদেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর শিরশ্ছেদ করেছে সৌদি আরব। তারা প্রেমিক-প্রেমিকা, না স্বামী-স্ত্রী, তা আজও নিশ্চিত করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ বা বাংলাদেশ সরকার। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কাজে’ লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের গুরুত্ব বিবেচনায় শরিয়া আদালত ‘তাজির’ বা বিচারকের বিবেচনামূলক দণ্ড হিসেবে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন। ১৪ অক্টোবর সেই দণ্ড কার্যকর করা হয়। বিবৃতিতে ‘অনৈতিক কাজ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। কোনো কোনো সংবাদে চুমু খাওয়ার কথা এসেছে, কিন্তু তা সৌদি সরকারের আনুষ্ঠানিক ভাষ্য নয়। ঘটনাটি মসজিদের আঙিনায়, নাকি ভেতরে ঘটেছে, তা-ও স্পষ্ট নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে, তারা ধর্মপ্রাণ ছিলেন এবং নামাজ পড়তেই মসজিদে গিয়েছিলেন।শরিয়াহ আইনে এই দণ্ড কতটা সংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। ইসলামে জিনা প্রমাণের জন্য চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী প্রয়োজন, অথবা অভিযুক্তের স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি থাকতে হয়। নবীজির (সা.) সময়ে হদের যে দু-একটি ঘটনা ঘটেছিল, সেসব ক্ষেত্রে অপরাধীরা নিজেরাই শাস্তি চেয়ে নিয়েছিলেন। হদ হচ্ছে কোরআন ও হাদিস দ্বারা নির্ধারিত বিধান। বিবাহবহির্ভূত চুমু নাজায়েজ হলেও এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নয়। তাই ঘটনা শুধু চুমু খাওয়ার হলে তা হদের আওতায় পড়ে না, তাজিরের আওতায় পড়ে। তাজিরের ক্ষেত্রে বিচারক পরিস্থিতি বিবেচনা করে লঘু দণ্ডও দিতে পারেন। তাই একটি চুমুর জন্য দুটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া তাজিরের উদ্দেশ্য হতে পারে না। প্রশ্ন থেকে যায়, এই কঠোরতা কি সৌদি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রয়োগ করা হয়?দণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়েও বিভ্রান্তি আছে। একসময় সত্যিই রিয়াদের দিরা স্কয়ার এবং মক্কা-জেদ্দার বড় মসজিদের পাশের উন্মুক্ত চত্বরে জুমার নামাজের পর প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হতো। মুসল্লিরা দাঁড়িয়ে তা দেখতেন। কিন্তু ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমানের সংস্কারের পর ২০২০ সাল থেকে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এখন কারাগারের ভেতরে দণ্ড কার্যকর করা হয়। আগে থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় না, মসজিদ প্রাঙ্গণেও কাউকে আনা হয় না। নজরুল ও সিতির ক্ষেত্রেও দণ্ড কার্যকরের পরদিন বিবৃতি এসেছে, আগে নয়।এখানেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অসহায়ত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তার দূতাবাসকে জানাতে হবে এবং কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ দিতে হবে। দূতাবাস আদালতে গিয়ে বিচারকে প্রভাবিত করতে পারে না। তবে অভিযুক্তের সঙ্গে দেখা করতে পারে, আইনজীবীর তালিকা দিতে পারে, পরিবারকে জানাতে পারে এবং বিচার সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এই দুজনের বিচার এক দিনে হয়নি; মাসের পর মাস চলেছে। অথচ সৌদি সরকার বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি, আর আমাদের জেদ্দা কনস্যুলেটও খবর রাখেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন বলছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ নিয়মিত যে কারাবন্দিদের তালিকা পাঠায়, তাতে এই দুজনের নাম ছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন তিনজন মন্ত্রী—একজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী। অথচ এখনো তালিকা যাচাই করা হয়নি; যাচাই করা হবে। দূতাবাসের কাজ শুধু তালিকা নথিভুক্ত করে রাখা নয়। প্রত্যেক বন্দির বিরুদ্ধে অভিযোগ কী, তার বিচার কোন পর্যায়ে এবং আইনি সহায়তা প্রয়োজন কি না, তা খুঁজে বের করাও দূতাবাসের দায়িত্ব।এই উদাসীনতার মধ্যেই এসেছে আরও অমানবিক বক্তব্য। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এই শিরশ্ছেদকে ‘বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়’ বলেছেন, যেন দুটি প্রাণের বিনিময়ে বাকিদের শিক্ষা দিতে হবে। অন্যদিকে বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন বলেছেন, ‘এই পাপের লাশটা বাংলাদেশে আসুক, অন্তত এইটা আমি কখনোই আশা করব না।’ পরে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন বটে, কিন্তু এই মানসিকতাই বলে দেয়, রাষ্ট্র নিজের নাগরিককে কীভাবে দেখে। অথচ বিপরীত উদাহরণও আছে। ২০১০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক পাকিস্তানিকে হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় বাংলাদেশি শ্রমিককে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দিয়াত বা রক্তপণ বাবদ চার লাখ দিরহাম দিয়ে ফিরিয়ে এনেছিল। শ্রীলঙ্কাও কূটনৈতিক তৎপরতায় তাদের এক নাগরিকের দণ্ড ঠেকিয়েছিল। রেমিট্যান্স যোদ্ধা বলে মুখে ফেনা তোলা বাংলাদেশ কেন পারল না?এই জিম্মিদশা নতুন নয়। এর শিকড় মর্যাদার সংকটে। ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া নারী গৃহকর্মীদের নির্যাতনের প্রতিবাদে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো বন্ধ করেছে। বাংলাদেশ চেয়েও পারেনি। অভিযোগ আছে, সৌদি আরব জানিয়ে দিয়েছে, নারী কর্মী না দিলে পুরুষ কর্মীও নেবে না। এর আনুষ্ঠানিক লিখিত প্রমাণ নেই। তবে ঢাকার শ্রমবাজারে কথাটি বহু বছর ধরে প্রচলিত। এ কারণেই বাংলাদেশ কঠোর অবস্থান নিতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। আমাদের অসংখ্য নারী সৌদি পরিবারে ধর্ষণ, গর্ভপাত ও নির্যাতনের শিকার হয়ে লাশ হয়ে ফিরছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিটি সরকার সৌদি বাদশাহকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তারা আসেননি, অথচ ভারত সফর করেছেন। আমরা ‘মুসলিম উম্মাহ’ বলে ফেনা তুলি, আর তারা আমাদের ‘মিসকিন’ বলে। জেদ্দা বিমানবন্দরে একজন পশ্চিমা যাত্রী যে সম্মান পান, বাংলাদেশি শ্রমিক তা পান না।এই ‘মিসকিন’ তকমার একজন ব্যক্তিগত সাক্ষী আমার প্রয়াত ভাই মহিউদ্দিন আহমদ। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার ওমরাহ করতে গেলে আমার ভাই তখন জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর। সৌদি রাজকীয় দপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে কাবার চাবির রক্ষক বনু শাইবা পরিবারের প্রধানকে জানানো হলো। তিনি আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মসজিদুল হারামের বাইরে অপেক্ষা করলেন। চাবির রক্ষক এলেন অনেক বিলম্বে। আমার ভাইয়ের মনে হয়েছিল, গরিব দেশের রাষ্ট্রপতি বলেই এই অবহেলা। রাসুল (সা.) যে চাবি বনু শাইবা গোত্রের হাতে আমানত হিসেবে দিয়েছিলেন, সেই আমানতদারও জানেন, একটি রাষ্ট্রের ওজন কতটা। তাই প্রশ্ন করি, ইউনূসের আমল থেকে বিএনপির আমল পর্যন্ত যে বলা হচ্ছে, ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি আর নেই’, তা যদি সত্যি হয়, তাহলে তুচ্ছ অভিযোগে দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ হয় কীভাবে? একটি রাষ্ট্রের দিকে চোখ রাঙালে আর আরেকটি রাষ্ট্রের দিকে মাথা নিচু করলে সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কাবার চাবির রক্ষকের আচরণ এবং নজরুল ও সিতির সঙ্গে সৌদি সরকারের নিষ্ঠুরতা আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—অর্থনৈতিক শক্তি ও কূটনৈতিক ওজন ছাড়া পবিত্র ভূমিতেও সমমর্যাদা মেলে না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

লাশের হিসাব নয়, চাই অপরাধের বিচার

একটি মরদেহেরও দুটি পরিণতি হতে পারে-একটি তার সৎকার, অন্যটি তার মৃত্যুর সত্য উদ্‌ঘাটন। প্রথমটি সম্পন্ন হলেই দ্বিতীয়টির দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নদী থেকে উদ্ধার হওয়া কোনো কোনো মরদেহ পরিচয়হীন অবস্থায় দাফন হয়, অথচ তার মৃত্যুর রহস্য থেকে যায় অন্ধকারে। যে মানুষটির একদিন নাম ছিল, ঠিকানা ছিল, ছিল আপনজন। মৃত্যুর পর তার পরিচয়টুকুও যদি হারিয়ে যায়, তবে কোথাও হয়তো একটি পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটায়, আর কোনো অপরাধের সঙ্গে তার মৃত্যুর যোগ থাকলে আড়ালে থেকে যায় অপরাধী। তাই নদী থেকে একটি মরদেহ উদ্ধারের পর প্রশ্ন শুধু তার পরিচয় কী, তা নয়-কীভাবে তার মৃত্যু হলো, এর পেছনে কোনো অপরাধ আছে কি না এবং থাকলে অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা গেল কি না-সেসব প্রশ্নের উত্তরও জরুরি।সম্প্রতি প্রথম আলোয় (২৩ অক্টোবর ২০২৬) প্রকাশিত নদ-নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের একটি প্রতিবেদন এসব প্রশ্নের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে আরও ৪৩০টি। সব মিলিয়ে পাঁচ বছর নয় মাসে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ২ হাজার ৪৯৪। এর মধ্যে ৭৫৫ জনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। একই সময়ে এসব ঘটনায় ৩৯২টি হত্যা মামলা হয়েছে।এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি মৃত্যু হত্যাকাণ্ডের ফল নয়। দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা ও অন্যান্য কারণেও মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু পরিচয়হীন মরদেহের সংখ্যা, বছরের পর বছর মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেওয়ার তথ্য আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। বিষয়টি তাই শুধু অপরাধের খবর হিসেবে দেখার নয়-মানুষের পরিচয়, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও ভাবার।মৃত্যুর পরও কেন হারিয়ে যাবে মানুষের পরিচয়? মানুষের পরিচয় শুধু একটি নাম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবার, সম্পর্ক, স্মৃতি এবং একটি জীবনের ইতিহাস। অথচ নৌ পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর নয় মাসে উদ্ধার হওয়া ২ হাজার ৪৯৪টি মরদেহের মধ্যে ৭৫৫ জনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। তাদের কেউ হয়তো দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা ব্যক্তি। কেউ হয়তো এমন একটি পরিবারের সদস্য, যে পরিবার এখনো জানে না তার প্রিয়জনের পরিণতি কী হয়েছে।পরিচয় শনাক্ত না হওয়ার পেছনে বাস্তব সমস্যা রয়েছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে মরদেহে পচন ধরে, আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়, চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলামতও নষ্ট হয়ে যায়। এতে পরিচয় শনাক্ত করা যেমন কঠিন হয়, তেমনি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করাও দুরূহ হয়ে পড়ে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। বরং কীভাবে পরিচয় শনাক্তের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যায়, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।দেশের বিভিন্ন থানায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে করা সাধারণ ডায়েরি, উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি, ডিএনএ নমুনা ও অন্যান্য তথ্যের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় করা জরুরি। এমন একটি কেন্দ্রীয় তথ্যব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহজে নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্যের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মরদেহের তথ্য মিলিয়ে দেখতে পারবে। একই সঙ্গে পরিচয় শনাক্তের জন্য সংগৃহীত ডিএনএ নমুনা যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পরিচয় শনাক্ত করা শুধু পরিবারের কাছে মৃত্যুসংবাদ পৌঁছে দেওয়ার বিষয় নয়। কোনো মৃত্যুর পেছনে অপরাধ থাকলে সেই পরিচয় তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠতে পারে। পরিচয় জানা না গেলে সম্ভাব্য সাক্ষী, পারিবারিক পরিস্থিতি, নিখোঁজ হওয়ার সময় এবং শেষবার কোথায় দেখা গিয়েছিল-এ ধরনের তথ্য সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়ে।একটি পরিবার তার স্বজনের মৃত্যুর খবর জানতে পারলেও শোকের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু প্রিয়জনের কোনো সন্ধান না পাওয়া পরিবারকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে। তাই পরিচয়হীন মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি অপরাধের রহস্য উদ্‌ঘাটনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।হত্যা মামলা হলেই কি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়?প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ৩৯২টি হত্যা মামলা হয়েছে। কিন্তু মামলা হওয়া আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়া এক কথা নয়। একটি মামলায় সত্য উদ্‌ঘাটন, প্রমাণ সংগ্রহ, অপরাধী শনাক্তকরণ, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচার সম্পন্ন করার দীর্ঘ প্রক্রিয়া রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত পৌঁছানোই গুরুত্বপূর্ণ।পরিচয়হীন মরদেহের ক্ষেত্রে তদন্তের জটিলতা আরও বেশি। মরদেহে পচন ধরলে আলামত নষ্ট হতে পারে। মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা কঠিন হতে পারে। আবার যে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, হত্যাকাণ্ডটি সেখানেই ঘটেছে-এমন নিশ্চয়তা নেই। অপরাধীরা এক স্থানে হত্যা করে অন্য স্থানে মরদেহ ফেলে দিতে পারে। ফলে তদন্তকারীদের বিভিন্ন সূত্র ধরে এগোতে হয়।তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এসব হত্যা মামলার অগ্রগতি কতটা? কতটি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে, কতটির অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, কতটি মামলায় বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং কতজন অপরাধী শাস্তি পেয়েছেন? প্রথম আলোর আলোচ্য প্রতিবেদনে এসব মামলার চূড়ান্ত পরিণতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। তাই অনুমানের ভিত্তিতে বিচারব্যবস্থার সাফল্য বা ব্যর্থতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই তথ্যগুলো চাওয়াই যুক্তিসংগত।কারণ, মামলা হওয়ার পর কী ঘটছে, সেটি জানা জনস্বার্থের বিষয়। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে তার কারণ কী, আলামতের অভাবে তদন্ত আটকে থাকলে সেই সীমাবদ্ধতা কীভাবে দূর করা যায়, আর দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকা মামলাগুলোর অগ্রগতি কী-এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।এখানে তদন্তকারী সংস্থার কাজকে আগাম ব্যর্থ বলা উদ্দেশ্য নয়। বরং তাদের কাজের জটিলতা স্বীকার করেই প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানানো জরুরি। ফরেনসিক পরীক্ষা, ডিএনএ বিশ্লেষণ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ তদন্তকারীর সমন্বয় ছাড়া অনেক জটিল অপরাধের রহস্য উদ্‌ঘাটন কঠিন হতে পারে। অপরাধীরা যদি মনে করে, হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দিলে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হবে এবং তারা সহজে পার পেয়ে যাবে, তাহলে সেই ধারণা ভেঙে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।মনে রাখতে হবে যে, অপরাধের বিচার শুধু অপরাধীর শাস্তির জন্য নয়, মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা তৈরি এবং অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ কমানোর জন্যও জরুরি।নদীকে অপরাধ আড়াল করার জায়গা হতে দেওয়া যাবে নানৌ পুলিশের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে এবং নিজেদের আড়াল করতে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। নদীর স্রোতে মরদেহ দূরে চলে যেতে পারে, দীর্ঘ সময় পানিতে থাকলে পচন ধরে আলামত নষ্ট হতে পারে। অপরাধীরা এই বাস্তবতাকে নিজেদের সুবিধা হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে-এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।এখানে রাষ্ট্রের প্রতিরোধমূলক দায়িত্ব সামনে আসে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধার, মামলা দায়ের ও তদন্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি অপরাধীরা যাতে নদীপথকে মরদেহ গোপন করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেই ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। দেশের বিস্তীর্ণ নদীপথে সব জায়গায় সার্বক্ষণিক নজরদারি করা কঠিন। এই সীমাবদ্ধতা বাস্তব। তবে কোথায় নজরদারি বাড়ানো দরকার, কোন ঘাট বা নির্জন এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ এবং কোন পথে সন্দেহজনকভাবে মরদেহ ফেলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে-এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রয়োজন অনুযায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা, আলোকসজ্জা, নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি নৌ পুলিশ, থানা পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় জোরদার করতে হবে। তবে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করাও জরুরি।প্রতিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তদন্তের সক্ষমতা বৃদ্ধি। আধুনিক ফরেনসিক পরীক্ষাগার, ডিএনএ বিশ্লেষণের সুযোগ এবং দক্ষ জনবল থাকলে পরিচয়হীন মরদেহ শনাক্ত করা ও মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। কোনো মরদেহ থেকে প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে বিকল্প বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহারের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারকে সহযোগিতা করা এবং তাদের কাছে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে যথাসম্ভব তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা প্রয়োজন। একটি পরিবার যখন তার স্বজনকে খুঁজছে, তখন প্রশাসনিক জটিলতা যেন তার দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে না দেয়।এসব উদ্যোগের কোনোটিই একা সব সমস্যার সমাধান করবে না। কিন্তু সমন্বিতভাবে এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে অপরাধের সুযোগ কমানো, পরিচয় শনাক্ত করা এবং তদন্তকে এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ হতে পারে।অপরাধের খবর যেন আমাদের অভ্যাসে পরিণত না হয়প্রতিদিন নানা ধরনের অপরাধের খবর সামনে আসে। আমরা ক্ষুব্ধ হই, শোক প্রকাশ করি, অপরাধীর শাস্তি দাবি করি। তারপর নতুন কোনো ঘটনা আগের ঘটনাকে আড়াল করে দেয়। এভাবে ভয়াবহ ঘটনাও একসময় আমাদের কাছে পরিচিত দৃশ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এই অভ্যস্ত হয়ে পড়াটাই বিপজ্জনক। কোনো অন্যায় বারবার ঘটছে বলে তা স্বাভাবিক হয়ে যায় না। বরং বারবার এমন ঘটনা সামনে এলে আমাদের খুঁজে দেখা উচিত, কোথায় প্রতিরোধ দুর্বল, তদন্তে কী সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী পরিবর্তন প্রয়োজন।নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বেড়েছে-এটি উদ্বেগের বিষয়। তবে শুধু এই সংখ্যা দিয়ে সব ধরনের অপরাধের প্রবণতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন মৃত্যুর ধরন অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য তথ্য, হত্যা মামলার অগ্রগতি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা। আবেগের পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি। তবেই সমস্যার প্রকৃত চেহারা বোঝা এবং কার্যকর সমাধানের দিকে এগোনো সম্ভব হবে।সবশেষে, নদীতে ভেসে ওঠা একটি মরদেহ আমাদের সামনে তিনটি মৌলিক দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রথমত, মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, যাতে কোনো পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে না থাকে। দ্বিতীয়ত, হত্যার ঘটনা প্রমাণিত হলে অপরাধীকে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার জন্য তদন্তকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিতে হবে। তৃতীয়ত, যেসব দুর্বলতা অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। নদীর স্রোত একটি মরদেহকে দূরে নিয়ে যেতে পারে, পানিতে নষ্ট হতে পারে অনেক আলামত। কিন্তু এসব কারণে সত্য অনুসন্ধানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একটি পরিচয়হীন মরদেহের পেছনে যে মানুষটি ছিলেন, তারও একটি জীবন ছিল, তার স্বজনদেরও সত্য জানার অধিকার রয়েছে। আর কোনো হত্যাকাণ্ডের পেছনে অপরাধী থাকলে তাকে শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করাই আইনের শাসনের দাবি।নদীতে কতটি মরদেহ উদ্ধার হলো, শুধু সেই হিসাব রাখাই যথেষ্ট নয়। জরুরি হলো, কতজনের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়া গেল, কতটি মৃত্যুর রহস্য উন্মোচিত হলো এবং এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো। মানুষের পরিচয়, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নদীতে ভেসে ওঠা প্রতিটি মরদেহ আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

নতুন আইন করলেই কি চাঁদাবাজি বন্ধ হবে?

ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই পুলিশকে মামলা করার সুযোগ দিতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন আইজিপি। কিন্তু চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইন থাকলেও কেন থামছে না অর্থ আদায়? রাজনৈতিক আশ্রয়, ভয়ের সংস্কৃতি, দুর্বল তদন্ত ও জবাবদিহির ঘাটতি দূর না হলে নতুন আইন কতটা কার্যকর হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। চাঁদাবাজির শিকার হয়েও থানায় যেতে চান না অনেক মানুষ। দোকান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি, ব্যবসা করতে না দেওয়ার ভয়, মারধর কিংবা পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তাদের নীরব থাকতে বাধ্য করে। অভিযোগ করলে বিপদ আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও কাজ করে। এই নীরবতার সুযোগেই চাঁদাবাজির একটি চক্র টিকে থাকে।এই বাস্তবতায় চাঁদাবাজি দমনে নতুন আইন করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) খুলনার বয়রায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পুলিশ লাইনসে কমিউনিটি পুলিশিংবিষয়ক সুধী সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘নতুন আইন পাস হলে ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ নিজে বাদী হয়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।’আইজিপির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রভাবশালী ব্যক্তি, সন্ত্রাসী কিংবা ক্ষমতাবানদের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে চান না, সাক্ষ্য দিতেও ভয় পান। এ বাধা দূর করতে ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ ও অপরাধের সূত্র ধরে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে আইনি কাঠামো তৈরির কথাও তিনি জানিয়েছেন।তবে নতুন আইন করার উদ্যোগ সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চাঁদাবাজি তো আগে থেকেই অপরাধ। তাহলে বিদ্যমান আইন দিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধা কোথায়? নতুন আইনে পুলিশের কী ক্ষমতা বাড়বে? আর সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা কী হবে?চাঁদাবাজি অপরাধ, আইনও আছেবাংলাদেশে চাঁদাবাজি নতুন কোনো অপরাধ নয়। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৮৩ থেকে ৩৮৯ ধারায় ভয় দেখিয়ে অর্থ বা সম্পদ আদায় এবং এ উদ্দেশ্যে কাউকে ভয়ভীতি দেখানোর বিভিন্ন অপরাধের বিধান রয়েছে। দণ্ডবিধির ৩৮৩ ধারায় চাঁদাবাজির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কারও ক্ষতি করার ভয় দেখিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে তাকে অর্থ, সম্পদ বা মূল্যবান জামানত দিতে বাধ্য করলে তা চাঁদাবাজির অপরাধ হতে পারে। ৩৮৪ ধারায় এ অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। অন্যদিকে, গুরুতর ক্ষতি বা মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের মতো অপরাধের জন্য পরবর্তী ধারাগুলোতে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এসব আইন সরকারের আইনভান্ডারে রয়েছে। অর্থাৎ চাঁদাবাজিকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নতুন আইন প্রয়োজন হচ্ছে না। আইজিপির ঘোষণায় যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো—ভুক্তভোগী সামনে না এলেও পুলিশ কীভাবে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে। এখানে একটি আইনি পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের কাছে অপরাধের তথ্য থাকা, মামলা নথিভুক্ত করা, তদন্ত শুরু করা, কাউকে গ্রেপ্তার করা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। প্রতিটি পর্যায়ের নিজস্ব আইনগত শর্ত রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে কোন পর্যায়ে কী পরিবর্তন আনা হবে, তা খসড়া প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।চাঁদাবাজি কেন থামছে নাচাঁদাবাজির বিস্তার বোঝার জন্য শুধু অপরাধীর সংখ্যা বা মামলা গণনা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, অর্থ আদায়ের নেটওয়ার্ক কীভাবে চলে এবং কেন তা ভাঙা কঠিন। রাজধানীতে চাঁদাবাজির ধরন নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে ফুটপাতের দোকান, বাজার, পরিবহন টার্মিনাল, নির্মাণকাজ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সেবাখাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে। কোথাও প্রতিদিন দোকানপ্রতি টাকা নেওয়া হয়, কোথাও মাসিক চাঁদা নির্ধারণ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে একাধিক গোষ্ঠী একই ব্যবসায়ী বা বাজার থেকে টাকা আদায় করে বলে অভিযোগ রয়েছে।২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকার বরাতে বলা হয়, রাজধানীতে চাঁদাবাজির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত হিসেবে ১২৮০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৪৮ জনকে সশস্ত্র অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এগুলো পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্দেহভাজনের সংখ্যা, আদালতে প্রমাণিত অপরাধীর সংখ্যা নয়।এ ধরনের তথ্য থেকে বোঝা যায়, চাঁদাবাজি সব সময় বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধীর কাজ নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর সঙ্গে ভয়ভীতি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ দখল, রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যবহার কিংবা সংগঠিত অপরাধের যোগসূত্র থাকতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে এসব সংযোগ আলাদাভাবে তদন্ত করে প্রমাণ করতে হবে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু কাউকে গ্রেপ্তার করা নয়; অর্থ আদায়ের পুরো ব্যবস্থাটি শনাক্ত করা। একজন টাকা সংগ্রহ করেন, আরেকজন তাকে নিয়ন্ত্রণ করেন, অন্য কেউ রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটান—এমন অভিযোগ থাকলে তদন্তে পুরো নেটওয়ার্কের ভূমিকা খুঁজে দেখা প্রয়োজন।ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না কেনচাঁদাবাজির অভিযোগ না করার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, নিরাপত্তার ভয়। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া, দোকানে হামলা, মারধর কিংবা পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। অভিযোগের পরও যদি ভুক্তভোগীকে একই এলাকায় থাকতে ও ব্যবসা চালাতে হয়, তাহলে তাঁর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।দ্বিতীয়ত, প্রতিশোধের আশঙ্কা। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হলে অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন থাকবে কি না, তদন্তের খবর অভিযুক্তের কাছে পৌঁছাবে কি না—এসব প্রশ্নও ভুক্তভোগীকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।তৃতীয়ত, আইনের প্রয়োগ নিয়ে অনাস্থা। অভিযোগ করার পরও যদি অপরাধীকে আটক করা না হয়, মামলা এগোয় না কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তি আবার ফিরে এসে অর্থ দাবি করেন, তাহলে অন্য ভুক্তভোগীরাও নীরব থাকার পথ বেছে নিতে পারেন।এই পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীর অভিযোগের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে পুলিশকে নিজস্ব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তের সুযোগ দেওয়া কার্যকর হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পুলিশকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।নতুন আইনে কী থাকা জরুরিআইজিপি যে উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন, তার বিস্তারিত খসড়া বা চূড়ান্ত আইন প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট বিধান সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে কার্যকর আইন তৈরির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।১. অভিযোগ ছাড়াই ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট শর্তপুলিশ কোন ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে মামলা বা তদন্ত শুরু করতে পারবে, তা আইনে পরিষ্কার থাকতে হবে। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিও, অডিও, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, ডিজিটাল যোগাযোগ কিংবা একাধিক স্বাধীন সূত্রের তথ্য কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তারও নিয়ম থাকা দরকার। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হলে নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হতে পারেন। তাই তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি ও তদন্তের নথি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।২. ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তাভুক্তভোগীকে অভিযোগ করতে বাধ্য করা যাবে না; আবার তিনি অভিযোগ না করলেও তার নিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করা যাবে না। পরিচয় গোপন রাখা, হুমকির অভিযোগ দ্রুত যাচাই, প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা সহায়তা এবং প্রতিশোধমূলক হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—এসবকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে পরিচয় গোপন রাখার প্রতিশ্রুতিও বাস্তবসম্মত হতে হবে। আদালতে সাক্ষ্য বা তদন্তের প্রয়োজনে পরিচয় প্রকাশের প্রয়োজন হলে কী সুরক্ষা দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা দরকার।৩. রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইন প্রয়োগচাঁদাবাজির সঙ্গে কেউ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করলে তার পরিচয় যেন তদন্তে বাধা না হয়। একইভাবে, কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রতিপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধীও ঘোষণা করা যাবে না। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মূল বিবেচনা হওয়া উচিত প্রমাণ, অপরাধে সংশ্লিষ্টতা ও আইনি দায়। প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং দুর্বল ব্যক্তিকে সহজে গ্রেপ্তার করা—দুই ধরনের বৈষম্যই আইনের প্রতি আস্থা নষ্ট করে।৪. পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাড়লে পুলিশের উদ্যোগে তদন্ত শুরু করার ক্ষেত্রও বাড়বে। এটি চাঁদাবাজি দমনে সহায়ক হতে পারে, তবে একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ব্যবসায়িক বিরোধ, জমিজমা নিয়ে বিরোধ বা ব্যক্তিগত শত্রুতাকে চাঁদাবাজির মামলা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনগত শর্ত মানতে হবে; অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।৫. অর্থের উৎস ও সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করাচাঁদা সংগ্রহকারীকে গ্রেপ্তার করলেই পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে যায় না। তদন্তে অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কার নির্দেশে সংগ্রহ হচ্ছে এবং অপরাধের সুবিধাভোগী কারা—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। ডিজিটাল লেনদেন, ফোনে যোগাযোগ, ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য আইনসম্মত তথ্য-প্রমাণ কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনগত সুরক্ষা বজায় রাখা জরুরি।তালিকা আছে, তবু ব্যবস্থা নিতে সমস্যা কোথায়চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য বিদ্যমান আইন প্রয়োগের বাস্তবতাও দেখা জরুরি। গত ২১ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় ৫৪৫ সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের একটি তালিকা তৈরি করে মহানগর পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধায় ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে বলা হয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছিল।এই তথ্যের তাৎপর্য হলো, সন্দেহভাজনের তালিকা তৈরি করা আর তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এক নয়। তদন্ত, গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র ও বিচার—প্রতিটি পর্যায়ে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক চাপ বা প্রতিশোধের ভয় যেন আইন প্রয়োগে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদি বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে পুলিশ প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারে, তাহলে নতুন আইন সেই সমস্যার কতটা সমাধান করবে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। নতুন আইন কার্যকর হতে হলে শুধু ক্ষমতা বাড়ানো নয়, সেই ক্ষমতা প্রয়োগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।কমিউনিটি পুলিশিং নতুন ঝুঁকি?আইজিপি জানিয়েছেন, কমিউনিটি পুলিশিংকে পুলিশের একটি শাখা হিসেবে কাজ করানোর জন্যও আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করেছেন, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ক্ষমতা ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল ধারণা হলো, পুলিশ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো। স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, অপরাধ প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীকে সহায়তা এবং পুলিশের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।কিন্তু কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও সীমা স্পষ্ট না থাকলে নতুন ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি এই ব্যবস্থাকে নিজেদের বিরোধীদের চাপে রাখা কিংবা অর্থ আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে যে সমস্যা সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিই আরও জটিল হতে পারে।তাই কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সদস্যদের নিয়োগ বা অন্তর্ভুক্তির মানদণ্ড, দায়িত্ব, আচরণবিধি, অভিযোগ গ্রহণের পদ্ধতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—সবকিছু স্বচ্ছ হওয়া দরকার। তাঁদের কোনো আইনগত ক্ষমতা দেওয়া হলে তার সুনির্দিষ্ট সীমা ও তদারকিও থাকতে হবে।চাঁদাবাজি বন্ধের আসল পরীক্ষাআইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগের মধ্যে আইজিপি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বলপ্রয়োগ করলে পুলিশকে ফ্যাসিবাদী বলা হয়, আর বলপ্রয়োগ না করলে মানুষ পুলিশকে দুর্বল মনে করে। তার বক্তব্যে গত ১৭ বছরে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কথাও উঠে এসেছে।এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপট যাই হোক, চাঁদাবাজি দমনের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ: পুলিশের কার্যকারিতা শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো, তা দিয়ে মাপা যায় না। কতজন ভুক্তভোগী নিরাপদে অভিযোগ করতে পারছেন, কতটি মামলায় নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে, কতজন অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রমাণসহ অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে এবং বিচার শেষে অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছেন কি না—এসবও দেখতে হবে। চাঁদাবাজি কমেছে কি না, তা বোঝার জন্য নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করা প্রয়োজন। কতটি অভিযোগ এসেছে, কতটি মামলা হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, কতটি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং কতটি মামলায় বিচার হয়েছে—এসব তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করলে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা সহজ হবে। অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে গেলেই যে অপরাধ বেড়েছে, তা-ও নয়; ভুক্তভোগীরা নিরাপদ বোধ করে বেশি অভিযোগ করলেও সংখ্যা বাড়তে পারে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চাঁদাবাজি বন্ধের নামে নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন। আইনের শাসন মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়; একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোও।নতুন আইন যদি ভুক্তভোগীর নীরবতার বাধা দূর করে, পুলিশের তদন্তকে তথ্য-প্রমাণনির্ভর করে এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে, তাহলে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ যদি নির্বাচিতভাবে হয়, প্রভাবশালীরা সুরক্ষা পান কিংবা পুলিশি ক্ষমতার জবাবদিহি না থাকে, তাহলে নতুন আইনও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারবে না।শেষ পর্যন্ত চাঁদাবাজি বন্ধের পরীক্ষা নতুন আইন পাসের দিন নয়; পরীক্ষা হবে সেই দিন, যেদিন একজন সাধারণ দোকানি, পরিবহনশ্রমিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও নিরাপদে নিজের কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন।

ইতিহাস আর ইতিহাসের ডাস্টবিন!

ষাটের দশকের প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের নেত্রী, ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদের ১৯৬১-৬২ শিক্ষাবর্ষের ভিপি, ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষের ডাকসুর জিএস এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মতিয়া চৌধুরীর মৃত্যুর পর দুটি বছর পার হয়ে গেল। নীরবে-নিভৃতে তার মৃত্যুদিন পার হলেও বারবার মনে পড়ছিল, এই বিশাল বাংলাদেশে ইউনূস আমলে মতিয়া চৌধুরীর মতো রাজনীতিবিদের নিজের জন্য আলাদা করে কবরের জায়গা হলো না, পেলেন না মুক্তিযোদ্ধার অন্তিম সম্মান। তার মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবন বা শহীদ মিনারের পাদদেশে নিতে দেওয়া হয়নি। এ দুঃখবোধ অনেককেই পীড়িত করে। হতে পারে, তিনি আওয়ামী লীগের নেত্রী ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তো শুধুমাত্র দুর্নীতিগ্রস্তদের দল নয়। মতিয়া চৌধুরীর মতো ব্যক্তি জীবনে সৎ বহু মানুষও এই দল করেন, এখনো দলকে ভালোবাসেন। আমাদের পছন্দ-অপছন্দ যা-ই থাকুক, এই দল তো বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। আর ইউনূসের অন্তর্বর্তী দেড় বছর এবং তৎপরবর্তী আট মাসের শাসন দেখে তো স্পষ্ট যে কর্তৃত্ববাদী মনোভাবে, দলবাজি আর দখলদারত্বে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বজায় রাখতে, অর্থনীতিতে লুটেরা ধারা অব্যাহত রাখতে—কেহ কারে নাহি পারে সমানে সমান।ষাটের দশকে মতিয়া চৌধুরীর অগ্নিঝরা বক্তৃতা সামরিক শাসক আইয়ুব খানের গদিতে কাঁপন ধরাত। ‘৬৭ সালে আপত্তিকর বক্তৃতা করার অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করার পর থেকে শেখ মুজিবের মুক্তি চাই স্লোগানের সঙ্গে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর মুক্তি চাই স্লোগানও ছাত্র আন্দোলন ও গণ-আন্দোলনের অন্যতম স্লোগান ছিল। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তার যে উদ্দীপ্ত ভাষণ, সেই উদ্দীপ্ত ভাষণ তাকে অগ্নিকন্যার রূপ দিয়েছিল। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে আশির দশকের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনসহ ইতিহাসের কিছু গৌরবান্বিত অধ্যায়ে তার নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে। আইয়ুব খানের আমলে তিনি চারবার কারাবরণ করেন। স্বাধীন দেশেও বিভিন্ন সামরিক সরকারের সময়ে তাকে একাধিকবার কারান্তরালে থাকতে হয়েছে।মতিয়া চৌধুরীকে প্রথম দেখেছি দূর থেকে ১৯৭০ সালে খুলনায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির এক জনসভায়। আর খুব কাছ থেকেও দেখি ১৯৭২ সালে গোপালগঞ্জের থানাপাড়ায় আমার মামাবাড়িতে। ন্যাপের জনসভা শেষে বিশ্রাম নিতে এসেছিলেন। মতিয়া চৌধুরীকে কাছ থেকে দেখার জন্য বাসা ও বাসার সামনের মাঠ লোকে লোকারণ্য। তাই কথা বলার মতো সুযোগ পাইনি।কথা বলার এবং তার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার সুযোগ হয় ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়ে। তখন জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী এবং সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি পদে আসীন জেনারেল জিয়ার বিরুদ্ধে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ঐক্য জোট’ মুক্তিযুদ্ধকালের মুক্তিবাহিনীপ্রধান মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীকে প্রার্থী করে। গণতান্ত্রিক ঐক্য জোটের কার্যালয় ছিল বঙ্গভবনের পেছনের দিকটায় ওয়ারীতে ঢোকার মুখের রাস্তায়। মতিয়া আপার বাসা সেখান থেকে খুব একটা দূরে নয়। পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডের নাসিরুদ্দিন লেনের একটি ভাড়া বাসায় তিনি দীর্ঘকাল বসবাস করতেন। মতিয়া আপা অধিকাংশ দিনই নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ঢাকার বাইরে থাকতেন। যেদিন ঢাকায় থাকতেন এবং সন্ধ্যায় ঐক্যজোট অফিসে আসতেন, তখন প্রায়ই আমার ডাক পড়ত মতিয়া আপাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এই পৌঁছে দেওয়ার পথে তার সঙ্গে পরিচয়টা গড়ে ওঠে।এরপর ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলের ছাত্র ইউনিয়ন সম্মেলনে মতিয়া আপাকে অতিথি করায় তাকে বাসা বা ন্যাপ অফিস থেকে নিয়ে আসতাম এবং পরে বাসায় পৌঁছে দিতাম। তখন রাজনীতি নিয়ে অনেক আলাপ হতো। আমার মতামত ওনার পছন্দ হতো না। ধমক দিতেন। ডাকসু নির্বাচনও তখন খুবই সন্নিকটে। ছাত্র ইউনিয়ন এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে শুনে তিনি আমাকে বকাঝকা শুরু করলেন—যেন আমিই নীতিনির্ধারক! যাহোক, আমার কাছ থেকে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনী কৌশল জানার পর কয়েক দিন আমার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেল। মতিয়া আপা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কয়েকটি হলের সম্মেলনে অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন।এর অল্প কিছুদিন পরেই তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। যোগদানের দু-এক দিন আগে সিপিবি অফিসে ফরহাদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। বের হওয়ার সময় দেখলাম, চোখ ছলছল। অন্য কারও সঙ্গে কথা বললেন না। ধীর পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। এরপর আর মতিয়া আপার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। এমনকি মগবাজার রমনা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে তার প্রতিবেশী হওয়ার পরও নয়। মন্ত্রীদের বাসায় যেতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম না। তবে মাঝেমধ্যেই বাসা থেকে সচিবালয় অভিমুখে তার গাড়ি যাওয়ার সময় দেখতাম, গাড়ির ভেতরে বসে আছেন। কোনো রকম পুলিশি প্রহরা ছাড়াই তিনি চলাচল করতেন।আওয়ামী লীগ আমলে মন্ত্রী হিসেবে এবং মন্ত্রণালয় পরিচালনায় তিনি যে সৎ, দক্ষ এবং সফল ছিলেন, তা তার রাজনৈতিক বিরোধীরাও বলে থাকেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে যে দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বে ছিলেন, সেই দল দেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে কারচুপি-কারসাজির ভোট অনুষ্ঠিত করে ক্ষমতা আঁকড়ে ছিল। মতিয়া চৌধুরীকে সেই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পক্ষে নিঃশর্ত ওকালতি করতে দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি, ব্যথিত হয়েছি। এটা তার জীবন ও সংগ্রামের সঙ্গে যায় না। তবে কোনো সুবিধাপ্রাপ্তির আশায় তিনি বাম আদর্শ ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেননি। এটা একান্তই তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। আমি পাঁচ বছর মগবাজার রমনা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে তার প্রতিবেশী ছিলাম। তিনি তখন মন্ত্রী। আমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কেরানি হয়েও থাকতাম ১,৬০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে। আর মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী থাকতেন ৮০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত নির্লোভ, সাদামাটা ও সততার প্রতীক হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন।মতিয়া চৌধুরীর মতো রাজনীতিবিদকে সম্মান না জানিয়ে সেদিন ইউনূস তার ছোট মনের পরিচয়কেই সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন। জীবন অবসানের পর পত্রপত্রিকায় মতিয়া চৌধুরীর সংগ্রামী ও নির্লোভ জীবন নিয়ে সংবাদ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হলে ইউনূস ডাস্টবিন শফিক হিসেবে খ্যাত তার প্রেস সচিবকে দিয়ে পত্রিকাগুলোকে ধমক দিয়ে ও উপহাস করে স্ট্যাটাস দেওয়ান যে, ‘মতিয়া চৌধুরীকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ ও নিবন্ধ দেখে মনে হচ্ছে একজন মুরিদ তার পীর সম্বন্ধে লিখছেন’।অবশ্য শুধুমাত্র মতিয়া চৌধুরী ইস্যু নয়, ক্ষমতাসীন হয়ে ইউনূস অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছোট মনের পরিচয় দিয়ে তার কিশোর বাহিনীর মাধ্যমে রাজনীতির ময়দানে ক্রোধ ও প্রতিহিংসা উসকে দিয়েছিলেন। ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভাঙাসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক ধ্বংস, সবকিছুই হয়েছে তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে ও সমর্থনে। তিনি বিদেশি সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকারে বললেন, তার সরকার রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের নীতিতে বিশ্বাসী নয়, কিন্তু নিষিদ্ধ আয়োজন সম্পন্ন করতে নিজ সরকারি বাসভবনের সামনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে তার কিশোর-তরুণ বাহিনী ও উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নামিয়ে দিলেন। তার সঙ্গে যার যত মতান্তর থাকুক না কেন, তিনি নোবেল বিজয়ী হয়ে নিজেকে একটা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। দেড় বছরের অন্তর্বর্তী শাসনকালে নিজেই তা আবার ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে গেলেন। তিনি ইতিহাসের রিসেট বাটনে চাপ দিয়ে এমন কিশোর-তরুণ বাহিনী সৃষ্টি করে গেছেন, যারা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ছবি কালি দিয়ে লেপ্টে দিচ্ছে। তারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে, তাদের ভীতসন্ত্রস্ত করে দুর্গাপূজা উৎসবের এই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে ‘গরু জবাই ও গরু ভোজের’ মহোৎসব করছে। ইউনূসীয় দীক্ষায় এ কোন তরুণদের আবির্ভাব হলো! এরা ঠিক যেন পশ্চিমবঙ্গের নবহিন্দুত্ববাদী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ইসলামী সংস্করণ। দেশকে ধর্মীয় বিভাজনের পথে নিয়ে যাওয়ার এ দায় প্রধানত ইউনূসের ওপরই বর্তায়। আর ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সব পথ বন্ধ করে দেওয়ায় সমাজে যে ধর্মীয় উগ্রপন্থার উত্থান হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করায় বিক্ষুব্ধ তারুণ্যের যে বিকৃত উত্থান হয়েছে—শেখ হাসিনা ও তার দলও কি এ দায় এড়াতে পারবেন?অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী এ দেশের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র আন্দোলনের সৃষ্টি। ইতিহাস মতিয়া চৌধুরীকে সমালোচনাসহ তার প্রাপ্য সম্মান দেবে। কিন্তু রিসেট ‘বাটন টেপনেওয়ালাদের’ জন্য হয়তো শেষ পর্যন্ত শফিকুল ইসলাম সাহেবই ইতিহাসের ডাস্টবিন প্রস্তুত করে যাবেন।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

ভিডিও আরও দেখুন

এমবাপ্পের জোড়া গোলে এল ক্লাসিকোয় বার্সাকে হারাল রিয়াল

বল দখলে আধিপত্য, পাসের বন্যা কিংবা একের পর এক আক্রমণ–ম্যাচের পরিসংখ্যানে এগিয়ে ছিল বার্সেলোনা। কিন্তু ফুটবলে শেষ কথা বলে গোল। আর গোলের সেই নিখুঁত লড়াইয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের ঝলকে হার মানতে হলো কাতালানদের। রাফিনিয়া এক দফায় সমতা ফেরালেও শেষ পর্যন্ত ফরাসি তারকার জোড়া গোলে এল ক্লাসিকোয় ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ।রোববার (২৫ অক্টোবর) রাতে ক্যাম্প ন্যুতে অনুষ্ঠিত এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে শুরু থেকেই বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে রিয়ালকে চাপে ফেলার কৌশল নেয় বার্সেলোনা। তবে স্বাগতিকদের সেই মাঠের আধিপত্য খুব একটা কাজে লাগেনি। উল্টো প্রথমার্ধের শেষ দিকে রিয়ালকে এগিয়ে দেন এমবাপ্পে। ম্যাচের ৪১তম মিনিটে দারুণ এক ফিনিশিংয়ে দলকে লিড এনে দেন তিনি।বিরতির পর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা আরও জোরালো করে বার্সেলোনা। সেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের ফলও তারা হাতেনাতে পায়। ম্যাচের ৬১তম মিনিটে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রাফিনিয়ার গোলে ম্যাচে সমতা ফেরায় কাতালানরা। এরপর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে দুই দলই মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু বার্সার আক্রমণভাগ আর রিয়ালের শক্ত রক্ষণভাগের স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ব্যবধান গড়ে দেন এমবাপ্পে নিজেই।ম্যাচের ৮৭তম মিনিটে ব্যক্তিগত দ্বিতীয় গোল করে রিয়ালের রোমাঞ্চকর জয় নিশ্চিত করেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। নির্ধারিত সময়ের বাকি সময়ে আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি বার্সেলোনা। ফলে মাঠের ফুটবলে পরিসংখ্যানে এগিয়ে থেকেও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাদের।ম্যাচের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পুরো ম্যাচে ৬৩ শতাংশ সময় বল নিজেদের দখলে রেখেছিল বার্সেলোনা। রিয়ালের ৩৬২টি পাসের বিপরীতে তারা খেলেছে ৬৪৩টি পাস, যার নির্ভুলতার হার ছিল ৯০ শতাংশ। গোলের উদ্দেশ্যে বার্সা ১৬টি শট নিয়ে ৬টি লক্ষ্যে রাখলেও রিয়াল ৯টি শট নিয়ে ৫টি লক্ষ্যে রাখে। অর্থাৎ সুযোগ তৈরিতে এগিয়ে থেকেও এমবাপ্পের কার্যকারিতার কাছে হার মানে বার্সা। এই ম্যাচে প্রত্যাশিত ছন্দে দেখা যায়নি বার্সার তরুণ সেনসেশন লামিন ইয়ামালকেও।এই হারের পরও স্প্যানিশ লা লিগার পয়েন্ট তালিকার শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বার্সেলোনা। ১০ ম্যাচে ৯ জয়ে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের এক নম্বরে আছে তারা। সমান ম্যাচে ৮ জয়ে ২৪ পয়েন্ট নিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ রয়েছে তৃতীয় স্থানে। দুই দলের মাঝখানে ২৫ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। এই জয়ে শীর্ষ দলের সঙ্গে পয়েন্টের ব্যবধান কমানোর পাশাপাশি মৌসুমের সবচেয়ে বড় ম্যাচটিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করল লস ব্লাঙ্কোসরা।/ 

এমবাপ্পের জোড়া গোলে এল ক্লাসিকোয় বার্সাকে হারাল রিয়াল