সংবাদ
প্রতি দুই মেয়ের মধ্যে একজনের ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়

প্রতি দুই মেয়ের মধ্যে একজনের ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়

বাংলাদেশে শিশুদের জন্য জরুরি বিনিয়োগের জোর তাগিদবাল্যবিবাহ রোধ ও শিক্ষায় বাজেট বাড়ানোর আহ্বানরোহিঙ্গা শিশুদের মানবিক সহায়তা বজায় রাখার আকুল আবেদনবাংলাদেশে প্রায় প্রতি দুইজন মেয়ের মধ্যে একজনের ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়, যা বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। এতে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে।এদের একজন হতে পারতেন বুশরা, যার মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেই বিয়ে দেওয়া ঠেকাতে এগিয়ে আসে ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত একটি শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রের কমিউনিটি নেতারা। তারা বুশরার বাবার সঙ্গে কাজ করে শেষ পর্যন্ত সেই বাল্যবিবাহ বন্ধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখেন।জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বাংলাদেশে তিন দিনের সফরে এসে বুশরার মতো আরও অনেক শিশুর অভিজ্ঞতা ও কষ্টের কথা সরাসরি শুনেছেন। তিন দিনের সফর শেষে তিনি বাংলাদেশের শিশুদের জন্য জরুরি ও টেকসই বিনিয়োগের আকুল আহ্বান জানান।সফরকালে ক্যাথরিন রাসেল তিনটি বিশেষ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এগুলো হলো বাল্যবিবাহ বন্ধ করা ও মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের বা জিডিপির ৫ শতাংশ করে বিনিয়োগের সরকারি অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়ন করা এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা।তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন, ‘মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখা এবং তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা হলে তাদের, তাদের সম্প্রদায়ের এবং বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে।’ঢাকার বৃহত্তম অনানুষ্ঠানিক বসতি কড়াইল পরিদর্শনে গিয়ে তিনি শিশু ও অভিভাবকদের কাছ থেকে সরাসরি জানতে পারেন দারিদ্র্য, শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়া এবং মৌলিক সেবার সীমাবদ্ধতা কীভাবে তাদের জীবনকে প্রভাবিত করছে। সেখানে কিশোরীরা নিজেদের স্বপ্নের কথা বলার পাশাপাশি অল্প বয়সে বিয়ে ও স্কুল ছাড়ার নানাবিধ চাপের কথা তুলে ধরে।বাংলাদেশ মাল্টিপল নির্দেশক ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫-এর তথ্য তুলে ধরে ইউনিসেফ জানায়, দেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় অর্ধেকের অর্থাৎ ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছে। বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েদের পড়াশোনা চিরতরে বন্ধ হয় এবং অল্প বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং বাল্যবিবাহের আইনি ফাঁকফোকর বন্ধের আহ্বান জানানো হয়।পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে বৈঠকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর সরকারি অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়ে ক্যাথরিন রাসেল বলেন, ‘বাজেটই অগ্রাধিকারের প্রতিফলন ঘটায়। শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সুরক্ষায় বিনিয়োগ মানে বাংলাদেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।’কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকালে ইউনিসেফ প্রধান বলেন, ‘সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার কারণে রোহিঙ্গা শিশুরা অনেক কিছু হারিয়েছে। তারা তাদের শিক্ষার সুযোগটুকুও হারাতে পারে না। তাদের এবং যেসব জনগোষ্ঠী তাদের আশ্রয় দিয়েছে, সেসব জনগোষ্ঠীর জন্যও বিশ্বকে বিনিয়োগ করতে হবে।’রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের মানবিক উদারতার ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আর্থিক সহায়তা বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করেন, মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়ার এই সংকটময় সময়ে জরুরি সেবাগুলো সুরক্ষিত রাখতে এবং শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর শিশুদের পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সাহায্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

রাষ্ট্রের শক্তি: এলিয়েদা থেকে সৌদিতে দুই বাংলাদেশি

মার্কিন তরুণী এলিয়েদা ম্যাকর্ড। জন্ম টেক্সাসের হিউস্টনে ১৯৭৩ সালে। ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৮ বছর বয়সে আসেন বাংলাদেশে। তৎকালীন ঢাকার জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে যাত্রার আগে আটক হন। তার পোশাকের নিচে লুকানো চার প্যাকেটে প্রায় সাড়ে তিন কেজি হেরোইন পাওয়া যায়।পরে তার বিরুদ্ধে বাংলাদেমের আদালতে হেরোইন পাচারের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মাদক মামলা হয়। বিচারে তাকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়। অবশ্য পরে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা ও মার্কিন কংগ্রেসম্যানের তদবিরে মুক্তি পান। ম্যাকর্ড স্বীকার করেছিলেন, প্রায় ১০ হাজার ডলারের প্রলোভনে তিনি হেরোইন বহনে রাজি হয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল পড়াশোনার খরচ ও পরিবারকে সাহায্য করা। চাঞ্চল্যকর সেই মামলাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় এনেছেন সিনিয়র সাংবাদিক জায়েদুল আহসান পিন্টু। ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি লেখেন,‘মার্কিন নাগরিক আটক হওয়ার পর থেকেই ঢাকায় তাদের দূতাবাস সব রকমের সহায়তা করে যায়। প্রচলিত আইন, মাদক বহন আর আসামির স্বীকারোক্তি থাকায় তেমন কিছু করতে পারছিল না। তবে কারাগারে বিশেষ মর্যাদা আদায় করতে পেরেছিল।’ জায়েদুল আহসান আরও লেখেন, ‘এলিয়েদার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যখন চূড়ান্ত রায় দেয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে মুক্ত করার নতুন উদ্যোগ নেয়। তারা এলিয়েদাকে দিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করায়। তৎকালিন রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত এলিয়েদার দণ্ড মওকুফ করে দেন।’পিন্টুর লেখায় আর এসেছে, ‘৩০ জুলাই, ১৯৯৬। দিনের প্রথমভাগে মার্কিন কংগ্রেসম্যান বিল রিচার্ডসন বিশেষ বিমানে বাংলাদেশে আসেন। (এই মার্কিন জনপ্রতিনিধি তার দেশের মেয়েকে বাঁচানোর জন্য শুরু থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।) ওইদিন সকালে জেল কর্তৃপক্ষ এলিয়েদাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালেয়ের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেন। সেখানে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারাও ছিলেন। তারা এলিয়েদাকে রিচার্ডসনের ক্ষণিকের আবাসস্থল রাস্ট্রীয় অতিথিভবন মেঘনায় নিয়ে যান।  সন্ধ্যায় বিল রিচার্ডসন এলিয়েদাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। যাবার আগে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে তারা সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।‘তার পোস্টে আরও লেখেন, ‘ওই যে, গুডি ওচিন্ডো। যিনি একই মামলায় খালাস পেয়েছিলেন। পাসপোর্ট সংক্রান্ত মামলায় দুই মাসের জেল হয়েছিল। তার খবর আর কেউ রাখেনি। দুই মাস পার হয়, দুই বছর পার হয় কিন্তু গরীব নাইজেরিয়ানের মুক্তি মিলে না। এই তরুণ তার বাংলাদেশি আইনজীবীর কাছে ১৪২১ ডলার জমা রেখেছিলেন। সেই আইনজীবী ওই ডলার আর ফেরত দেন না।’আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন দশক আগের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়, এলিয়েদা ম্যাককর্ডের মুক্তিতে মার্কিন কূটনীতি ও জনপ্রতিনিধির তৎপরতা, গুডি ওচিন্ডোর মুক্তিতে সাংবাদিকতা ও আদালতের ভূমিকায় একটা বার্তা আছে।ঠিক যেভাবে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর বাংলাদেশ জানতে পেরেছে ঘটনার অনেক পরে।ঘটনা তিনটি দেখায়, বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকের পাশে রাষ্ট্র কতটা দাঁড়ায়, তার ওপরও নির্ভর করে ন্যায়বিচারের বাস্তবতা। বিদেশের কারাগারে বন্দী একজন মার্কিন তরুণীর মুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একজন কংগ্রেসম্যান ছুটে এসেছিলেন বাংলাদেশে। দূতাবাস সক্রিয় ছিল, রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন পৌঁছেছিল, শেষ পর্যন্ত বিশেষ বিমানে দেশে ফিরেছিলেন সেই তরুণী। অথচ, একই মামলায় দণ্ডিত আরেক বিদেশি তরুণের মুক্তির জন্য কাউকে পাওয়া যায়নি। পাঁচ বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটানোর পর তার কথা সামনে এনেছিল সাংবাদিকতা; হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত ফিরতে পেরেছিলেন নিজ দেশে।ঘটনা দুটি বাংলাদেশের। সময় ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০০১ সাল। আর ২০২৬ সালের অক্টোবরে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সামনে আসার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে: বিদেশে কোনো নাগরিকের জীবন যখন রাষ্ট্রের হাতে নয়, তখন তার পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্বটি কে পালন করে?প্রতীকী ছবিসৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে গত ১৪ অক্টোবর নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সুইটি আক্তার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশন জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের এ বিষয়ে জানানো হয়নি।পরে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিচারপ্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ। এই তথ্যই প্রশ্ন তুলেছে—বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের মুখে থাকা নাগরিকদের বিষয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক নজরদারি কতটা কার্যকর?এলিয়েদার মুক্তিতে রাষ্ট্রের সক্রিয়তামাদক পাচারের মামলায় ১৯৯৩ সালের জুলাইয়ে এলিয়েদাকে আর নাইজেরীয় নাগরিক রবার্ট ব্ল্যাংকসনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল আদালত। এলিয়েদার ঘটনা তখন বাংলাদেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত হয়। প্রথম দিকে তিনি দাবি করেছিলেন, মাদকের বিষয়ে না জেনেই প্যাকেট বহন করেছিলেন। পরে ১৯৯৬ সালে মুক্তির পর তিনি স্বীকার করেন, অর্থের বিনিময়ে হেরোইন বহনে রাজি হয়েছিলেন। অর্থাৎ, তার মুক্তির প্রশ্নটি কেবল নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার বিষয় ছিল না; দণ্ডিত একজন নাগরিকের জন্য রাষ্ট্র কীভাবে মানবিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়, সেটিই ছিল বড় বিষয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১৯৯৬ সালের জুলাইয়ের শুরুতে তার দণ্ড বহাল রাখে। এরপর ক্ষমার আবেদনকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্যোগ শুরু হয়।নিউ মেক্সিকোর ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান বিল রিচার্ডসন বাংলাদেশে এসে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেন। রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় ১৯৯৬ সালে মুক্তি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। এলিয়েদার মুক্তি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বাইরে কোনো গোপন পথে হয়নি। আদালতের রায় বহাল ছিল; মুক্তি এসেছিল রাষ্ট্রপতির ক্ষমার সাংবিধানিক পথ ধরে। কিন্তু সেই পথ সক্রিয় করতে পেরেছিল একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের ধারাবাহিক যোগাযোগ, দূতাবাসের তৎপরতা আর একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত উদ্যোগ।ব্ল্যাংকসনের পাশে কেউ নেইএলিয়েদার সঙ্গে একই মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ড পেয়েছিলেন নাইজেরীয় নাগরিক রবার্ট ব্ল্যাংকসন। তার ভাগ্যে একই ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ জোটেনি। তার পরবর্তী পরিণতি নিয়েও জনপরিসরে তথ্য খুব কম। একই মামলায় অভিযুক্ত আরেক নাইজেরীয় তরুণ গুডি ওচিন্ডোর অভিজ্ঞতা আরও নির্মম বৈপরীত্য সামনে আনে।গুডি ছিলেন ১৯ বছরের তরুণ। মূল মাদক মামলায় তিনি খালাস পেয়েছিলেন বলে তৎকালীন প্রতিবেদকের বিবরণে উঠে আসে। কিন্তু মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট ব্যবহারের একটি মামলায় দুই মাসের কারাদণ্ড ভোগ করার পরও তিনি মুক্তি পাননি। তার দেশে ফেরার ব্যবস্থা ছিল না, টিকিট কেনার টাকাও ছিল না। বাংলাদেশি আইনজীবীর কাছে রাখা ১ হাজার ৪২১ ডলার ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে নতুন মামলা হওয়ায় তার দুর্দশা আরও বাড়ে। মামলার শুনানি না হওয়ায় মুক্তির পথও বন্ধ হয়ে যায়। কারাগারে পাঁচ বছরের বেশি সময় কাটানোর পর কারা কর্মকর্তা ফরমান আলী বিষয়টি প্রতিবেদকের নজরে আনেন। ২০০১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টার-এ গুডিকে নিয়ে প্রতিবেদন লেখেন সিনিয়র সাংবাদিক জায়েদুল আহসান।ওই দিনই হাইকোর্ট বিভাগ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। আদালতের হস্তক্ষেপের পর নাইজেরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা হয়।এখানে বৈপরীত্যটি স্পষ্ট। ম্যাককর্ডের জন্য দূতাবাস ও কংগ্রেসম্যান সক্রিয় হয়েছিলেন; গুডির ক্ষেত্রে তার দুর্দশা জনসমক্ষে আনতে হয়েছিল সাংবাদিককে, আর মুক্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়েছিল আদালতকে। একজনের পেছনে ছিল শক্তিশালী রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সক্ষমতা, অন্যজনের পেছনে ছিল না কার্যকর কোনো রাষ্ট্রীয় সহায়তা।সৌদি আরবের ঘটনায় বাংলাদেশের প্রশ্ন২০২৬ সালের অক্টোবরে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এই পুরোনো অভিজ্ঞতাগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার ও সৌদি আরবে বাংলাদেশ মিশন আগে থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানত না। মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা ও বিচারসংক্রান্ত তথ্য চেয়েছে।এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বিচারপ্রক্রিয়া, আইনজীবী পাওয়ার সুযোগ, আপিলের অবস্থা এবং কনস্যুলার সহায়তা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো সব নথি প্রকাশ্যে নেই। তাই এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত তথ্য জরুরি। বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়া নাগরিকের বিচার থামিয়ে দেওয়া বা অন্য দেশের আদালতের রায় বাতিল করানো কোনো দূতাবাসের ক্ষমতা নয়। তবে নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী, তিনি আইনজীবী পেয়েছেন কি না, তার আত্মপক্ষ সমর্থন ও আপিলের সুযোগ আছে কি না, মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির আগে পরিবার ও নিজ দেশের কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, আইনি সহায়তা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।কনস্যুলার সুরক্ষার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইনও প্রাসঙ্গিক। ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিক আটক হলে তিনি অনুরোধ করলে তাকে নিজের দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হয়।সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সে যোগাযোগে সহায়তা করতে হয়। তবে এই বিধান কীভাবে প্রয়োগ হয়েছে, দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে তারা কনস্যুলার যোগাযোগ চেয়েছিলেন কি না—তা নির্ধারণে মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।দুই বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীর মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা পরে জেনেছে কনস্যুলেটবাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ; সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। ফলে বিষয়টি শুধু দুই ব্যক্তির ভাগ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে কর্মরত নাগরিকের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রস্তুতি ও নজরদারির প্রশ্ন এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।রাষ্ট্র কি ভাগ্য নির্ধারণ করেএখানে ‘শক্তিশালী রাষ্ট্র’ বলতে শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি বোঝালে চলবে না। রাষ্ট্রের শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকের জন্য কত দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, আইনগত সহায়তা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রয়োজন হলে উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ম্যাককর্ডের ক্ষেত্রে সেই সক্ষমতা দেখিয়েছিল। গুডি ওচিন্ডোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সহায়তার ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও আদালতকে এগিয়ে আসতে হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি শুধু সৌদি আরবকে ব্যাখ্যা দিতে বলার মধ্যে সীমিত থাকলে চলবে না। মৃত্যুদণ্ডের মুখে থাকা বাংলাদেশিদের বিষয়ে দূতাবাস কীভাবে আগেভাগে তথ্য পাবে, কারাগার ও আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, পরিবারকে জানাবে এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করবে—তার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। কোনো নাগরিক অপরাধে দণ্ডিত হলেও তার ন্যায্য বিচার ও আইনি অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।এলিয়েদার ঘটনা দেখিয়েছে, দণ্ডিত নাগরিকের ভাগ্য বদলাতে কূটনীতি ও জনপ্রতিনিধির উদ্যোগ কতটা কার্যকর হতে পারে। গুডি ওচিন্ডোর ঘটনা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রীয় সহায়তা না থাকলে একজন মানুষ কীভাবে আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার মধ্যে হারিয়ে যেতে পারেন। আর সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে—নিজের নাগরিকের জীবন-মৃত্যুর মতো বিষয়ে বাংলাদেশ কতটা আগে জানতে পারে, কতটা পাশে দাঁড়াতে পারে?রাষ্ট্রের মর্যাদা কেবল বিদেশি সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতায় মাপা যায় না। সেই সম্পর্কের ভেতর নিজের নাগরিকের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা কতটা রক্ষা করা গেল, সেটিও তার বড় পরীক্ষা।

দুর্গোৎসবের ক্রম-বিবর্তন এবং অন্তর্নিহিত বার্তা

শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুদের এক বৃহৎ উৎসব। বাঙালি হিন্দুদের প্রাণের সঙ্গে, আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আনন্দোৎসবের নাম দুর্গাপূজা। মহালয়ায় আগমনবার্তা জানিয়ে, ষষ্ঠীতে আরম্ভ হয়ে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী শেষে দশমীতে সিঁদুরখেলা ও বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয় পাঁচ দিনের দুর্গোৎসব। হিন্দুদের এক বহুল আরাধ্যা ও জনপ্রিয় দেবী হলেন দুর্গা। সনাতন হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মা দুর্গার বাস হিমালয়ের কৈলাসে। দুর্গতি নাশের জন্য তিনি পৃথিবীতে নেমে আসেন পাঁচ দিনের জন্য।হিন্দু পুরাণ অনুসারে, অসুরদের রাজা মহিষাসুর তপস্যা করে ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে দেবতাদের কাছ থেকে স্বর্গ কেড়ে নেয়। অসুর হলো অশুভ শক্তির প্রকাশ। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালে মহাত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূতা হয়ে দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তাই হিন্দুধর্মাবলম্বীরা অশুভ শক্তির বিনাশ ও দুর্গতি নাশের আশায় শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিবছর দুর্গাপূজা করে থাকেন।‘দুর্গা’ শব্দটি দুর্গ থেকে আগত। পুরাণমতে, দুর্গ নামক অসুরকে বধ করার জন্য তিনি দুর্গা। দুর্গা শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো ‘অপরাজেয়’, ‘দুর্গম’। আবার দুর্গতিনাশিনী অর্থেও দুর্গা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। শশীভূষণ দাশগুপ্ত ভারতীয় শক্তিসাধনা নিয়ে গবেষণায় দুর্গা শব্দের উৎপত্তির স্তরগুলো পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন। তার মতে, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো, দুর্গা হলেন ‘দুর্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী’, অর্থাৎ দুর্গের রক্ষাকর্ত্রী। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, দুর্গা দশভুজা, দশপ্রহরণধারিণী, সিংহবাহিনী, মহিষাসুরমর্দিনী। দুর্গাপ্রতিমায় তাকে সেভাবেই দেখতে পাই। তিনি অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে বধ করছেন। আবার তিনি মাতৃস্বরূপা, শক্তির প্রতীক, সমগ্র জগতের মা। হিন্দুধর্মমতে, তিনি সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের শক্তি, মাতৃরূপ, পরম ব্রহ্মময়ী। তিনি সমস্ত সৃষ্টিসংসারকে মায়ের মতো আগলে রাখেন। হিন্দুধর্মের শাক্ত উপাসনা ও তন্ত্র শাখার প্রধান দেবী হলেন দুর্গা। দুর্গাপূজা মূলত শক্তির উপাসনা; মাতৃশক্তি ও নারীশক্তির উপাসনার উৎসব।আবার এই বাংলাতেই কেবল তিনি সপরিবারে পূজিতা। ‘দুর্গা’ শব্দের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্‌বেদ ও অথর্ববেদে। তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দেবীরূপে দুর্গাকে প্রথম দেখা যায়। এ ছাড়া রামায়ণ ও মহাভারতেও দেবী দুর্গার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে বেদে দুর্গা দেবী হিসেবে এত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না। দুর্গাপূজা ও মহিষাসুরবধের কাহিনি—এসব কিছুই হিন্দুদের মূল ধর্মগ্রন্থ বেদে পাওয়া যায় না। গুরুত্বপূর্ণ দেবী হিসেবে দুর্গার আবির্ভাব হয় বৌদ্ধধর্ম-পরবর্তী যুগে; প্রথম মার্কণ্ডেয় পুরাণের ‘দেবীমাহাত্ম্যে’ (৪০০ু৬০০ খ্রিস্টাব্দ), যা ৭০০ শ্লোকবিশিষ্ট ‘দুর্গাসপ্তশতী’ বা ‘চণ্ডী’ নামে পরিচিত। এখানেই রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের দুর্গাপূজার কাহিনি, মহিষাসুরবধ, শুম্ভ-নিশুম্ভ ও চণ্ড-মুণ্ডবধের কাহিনি পাওয়া যায়।দুর্গাপূজার প্রচলন সম্পর্কে একাধিক কিংবদন্তি প্রচলিত থাকলেও ‘পৌরাণিক কাহিনি’ অনুযায়ী, ‘সত্যযুগে’ রাজা সুরথ প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। ‘ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে’ আছে, দুর্গাপূজার ‘প্রথম প্রবর্তক’ ছিলেন ‘শ্রীকৃষ্ণ’; দ্বিতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন স্বয়ং ‘ব্রহ্মা’। তৃতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন ‘মহাদেব’। ‘দেবীভাগবত পুরাণ’ অনুসারে, ‘ব্রহ্মার মানসপুত্র’ ‘মনু’ ‘ক্ষীরোদসাগরের তীরে’ দুর্গার আরাধনা করে বর লাভ করেছিলেন। এসব কাহিনি পুরাণের।শাস্ত্র ও পুরাণ থেকে বেরিয়ে এসে মর্ত্যে, অর্থাৎ অবিভক্ত বাংলায়, দুর্গাপূজার আয়োজন প্রথম কে করেছিলেন, এ নিয়ে গবেষকদের কাছ থেকে বেশ কিছু তথ্য জানা যায়। সবকিছুর প্রথম নিয়ে মানুষের মনে একটি কৌতূহল কাজ করে, অর্থাৎ ‘কে প্রথম প্রবর্তক’। দুর্গাপূজার ক্ষেত্রেও ‘কে প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন’, তা নিয়ে আপামর জনগণের মধ্যে একটি কৌতূহল আছে। ‘পৌরাণিক মতে’ ‘সত্যযুগে’ ‘রাজা সুরথ’ এই পূজার প্রবর্তক। তেমনি ‘কলিযুগে’, অর্থাৎ আধুনিক যুগে, এই পূজার প্রবর্তক কে? তা নিয়েও কৌতূহলের শেষ নেই।আনন্দের বিষয়, বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত বিশ্বাস এবং বিভিন্ন তথ্যের ওপর নির্ভর করে আধুনিক যুগে বাংলার মানচিত্রে প্রথম দুর্গাপূজাটি করেছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর শেষে ‘রাজশাহীর তাহেরপুরের ভুঁইঞা রাজা’ ‘কংসনারায়ণ’। সেটা ‘তৃতীয় মোগল সম্রাট আকবরের আমলে’—এটি হলো প্রচলিত বিশ্বাস। ‘কংসনারায়ণের’ পরে ‘ভাদুড়িয়ার রাজা’ ‘জগৎনারায়ণ’ দুর্গাপূজা শুরু করেছিলেন। অন্য একটি সূত্রে জানা যায়, ‘কংসনারায়ণের’ পূজার ৩৮ বছর আগে ‘শেরশাহের’ কাছ থেকে ‘জায়গির’ পেয়ে ‘দামোদর নদে’র কোনো এক ধারে পূজা করেছিলেন ‘যশোচন্দ্র’ (১৫৪৫)।‘খান চৌধুরী আমানতুল্লা’ সাহেব তার ‘কোচবিহারের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন—‘অহোমরাজের প্রতিভূগণ আসামে প্রত্যাবৃত হইয়া কামতারাজ্যের বিবিধ আচার-ব্যবহারের সংবাদ অহোমরাজের সমক্ষে প্রকাশ করিয়াছিলেন, কামতাপুরে দশভুজা দুর্গার মূর্তির আড়ম্বরযুক্ত পূজাপদ্ধতির বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অহোমরাজ নিজ রাজ্যে উক্ত পূজার প্রবর্তন করিয়াছিলেন।’বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি ও ঐতিহাসিক তথ্যনির্ভর হয়ে বলা যায়, সন-তারিখের বিচারে ‘রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের’ ‘মনুসংহিতার টীকাকার’, তথা ‘কুল্লুক ভট্ট’র পৌত্র ‘কংসনারায়ণ’ প্রবর্তিত দুর্গাপূজার (১৫৮০) ১৮ বছর আগে ‘মহারাজা নরনারায়ণ’ ‘কোচরাজ্যে’ দুর্গাপূজা করেছিলেন। যা বাংলার মানচিত্রের বাইরে প্রথম দুর্গাপূজা। (৬২৮)দুর্গাপূজা আদিকালে ছিল রাজা-রাজড়াদের পূজা। সচ্ছল জমিদার কিংবা রাজাদের ছাড়া এ পূজা সাধারণের জন্য আয়োজন করা দুরূহ ছিল। দুর্গাপূজা কীভাবে উচ্চবিত্তদের মণ্ডপ থেকে সাধারণের কাছে এসেছিল, সেই গল্পটি বড় মধুর। দুর্গাপূজার সর্বজনীনতার সূচনা হয়েছিল ‘বারোয়ারি’ পূজার মাধ্যমে।বারোয়ারি দুর্গাপূজা প্রথম শুরু হয় ১৭৯০ সালে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায়। বারোজন যুবক মিলে চাঁদা তুলে এ পূজা শুরু করেন। তারা দেখেন, দুর্গাপূজায় প্রচুর খরচ, যা সর্বসাধারণের সাধ্যের বাইরে। তাই তারা সর্বসাধারণের জন্য এ ‘একচালা’ প্রতিমা নির্মাণ করে পূজার আয়োজন করেন।বারোজন বন্ধু বা ‘ইয়ার’ (ফারসিতে ‘ইয়ার’ মানে বন্ধু) মিলে এ পূজা আরম্ভ করায় একে বলা হয় বারোয়ারি দুর্গাপূজা। এরপর কালের বিবর্তনে দুর্গাপূজা বর্তমান সর্বজনীন রূপ নেয়। কালে কালে পূজার জৌলুশ বৃদ্ধিতে নিত্যনতুন অনুষঙ্গ যোগ হয়। আজকাল ঐতিহ্যবাহী একচালা ভেঙে বহুচালাবিশিষ্ট দুর্গাপূজা হয়। বাংলাদেশের কুমারটুলিগুলোতেও বিভিন্ন আঙ্গিকে নানা ঢঙের, নানা রূপের বৈচিত্র‍্যময় প্রতিমা নির্মাণ হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশাল আকৃতির দৃষ্টিনন্দন পূজামণ্ডপে আলোকোজ্জ্বল দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের পূজাগুলো থিমের ভিত্তিতে না হলেও এর বর্ণিল ও আন্তরিক আয়োজন ভক্তদের হৃদয় হরণ করে। বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছেন। এই ভূগ্রামের প্রধান শহরগুলো, বিশেষ করে লন্ডন, প্যারিস, টরন্টো, মন্ট্রিয়েল, নিউইয়র্ক, মিশিগানসহ পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট বাংলাদেশ। এসব বনলতাময় প্রবাসে প্রাণের উচ্ছ্বাসে বাঙালি হিন্দুরা দুর্গাপূজার আয়োজন করে থাকেন। রাজাদের পরিবার থেকে বারোয়ারি দুর্গাপূজা এখন বিশ্বজনীন রূপ পেয়েছে।মা দুর্গা হলেন দুর্গতিনাশিনী, অর্থাৎ সব দুঃখ-দুর্দশার বিনাশকারী। তিনি অন্যায় ও অসত্যের প্রতীক মহিষাসুরকে নিধন করার জন্যই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বিশ্বজুড়ে অন্যায়, অসত্য, যুদ্ধবিগ্রহের এই ক্রান্তিকালে মা দুর্গার আদর্শ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। মাতৃ-আরাধনার উদ্দেশ্যকে সফল করার লক্ষ্যে প্রতিটি পূজার আয়োজন যদি নিবেদিত হয়, তাহলে দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য সারা বিশ্বের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার সঙ্গে গৃহীত হবে এবং বিশ্ববাসী মাতৃ-আরাধনার তাৎপর্য সহজেই অনুধাবন করতে সমর্থ হবে। দুর্গাপূজা তাই পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, এমনকি বৈশ্বিক সংহতি রক্ষায় এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী একটি পূজা। পৃথিবীর সকল রাবণরূপী অসুরের বিনাশের জন্য দেবী দুর্গার আরাধনার গুরুত্ব অসীম। ‘রাবণস্য বিনাশায় রামসানুগ্রহায় চ অকালে বোধিতা দেবী।’ অর্থাৎ, রাবণকে বিনাশের জন্য রামের প্রতি অনুগ্রহবশত অকালে দেবী দুর্গা বোধিত হয়েছিলেন। দুষ্ট শক্তি রাবণকে বধ করার জন্য রাম নিদ্রিত অবস্থায় দেবীর পূজা করেছিলেন অকালবোধনের মাধ্যমে। আমাদের অন্তরের রাবণকে বিনাশ এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য তাই দুর্গাপূজার আয়োজন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ভক্তিসহকারে করা উচিত।[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

শব্দদূষণ: অসহনীয় শব্দ থেকে মুক্তি চাই

আমাদের দেশে পানি, মাটি, বায়ু ও শব্দদূষণ—এই চার ধরনের দূষণ ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এর বাইরে রয়েছে আলোকদূষণ, যা এখনো তেমন আলোচনায় আসেনি। মোবাইলফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও টেলিভিশনের পর্দা থেকে নির্গত নীল আলো ঘুম ও শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বর্তমানে দেশের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় শব্দদূষণ। অতিরিক্ত শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তি, ঘুম, মনোযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রতিনিয়ত শব্দের মধ্যে বসবাস করতে করতে মানুষ যেন এই দূষণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছে। অথচ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।শব্দের সহনীয় মাত্রা স্থান ও সময়ভেদে ভিন্ন হয়। শব্দদূষণ বিধিমালা অনুযায়ী, নীরব এলাকায় দিনের বেলায় শব্দের মাত্রা ৫০ ডেসিবল এবং রাতে ৪০ ডেসিবলের মধ্যে থাকা উচিত। আবাসিক এলাকায় দিনের বেলায় ৫৫ ডেসিবল ও রাতে ৪৫ ডেসিবল নির্ধারিত। বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকাতেও নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব মাত্রা কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ঘর থেকে কর্মস্থলে যাওয়া, যানবাহনে ভ্রমণ কিংবা বাসায় অবস্থান—কোথাও যেন শব্দের হাত থেকে রেহাই নেই। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালতের মতো নীরব এলাকায়ও প্রায়ই উচ্চ শব্দ শোনা যায়। ফলে রোগীর বিশ্রাম, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়।দেশে শব্দদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস যানবাহনের হর্ন। বিশেষ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলাচলের সময় অনেক গাড়ির হর্নের বিকট শব্দে মনে হয়, মাথার ভেতর হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে। আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করা হয়। দ্রুত পথ পরিষ্কার করা, অন্য যানবাহনকে ভয় দেখানো কিংবা যাত্রী আকৃষ্ট করার জন্য এসব হর্ন বাজানো হয়। বাসস্ট্যান্ডে অবৈধ দখল ও যানজটের কারণে একসঙ্গে অনেক গাড়ি হর্ন বাজায়। ফলে পরিস্থিতি আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। কিছু কিশোর ও তরুণ মোটরসাইকেলের শব্দনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র খুলে চালানোর সময় বিকট শব্দ সৃষ্টি করে। এতে পথচারী ও আশপাশের বাসিন্দারা ভোগান্তিতে পড়েন। অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানোর এই প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে সড়কে শব্দদূষণ কমানো কঠিন হবে।শিল্পকারখানার জেনারেটরও শব্দদূষণের বড় উৎস। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় কারখানা স্থাপন করা হলে এর শব্দে বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে বাড়ি পরিবর্তন করতেও বাধ্য হতে হয়। অন্যদিকে, শপিং মল, বিপণিবিতান, কাপড় ও জুতার দোকান, রোগনির্ণয়কেন্দ্র এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার করা হয়। ঈদ ও অন্যান্য উৎসবের সময় এ প্রবণতা আরও বাড়ে। হকার ও ভাসমান দোকানিরা বৈদ্যুতিক বাঁশি, ঘণ্টা কিংবা রেকর্ড করা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। উচ্চ স্বরে গানবাজনা ও ধর্মীয় বক্তৃতাও অনেক সময় আশপাশের মানুষের জন্য শব্দদূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিনোদন কিংবা ব্যবসার উদ্দেশ্য থাকলেও অন্যের শান্তি ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এমন উচ্চ শব্দ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।মোবাইলফোনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শব্দদূষণের নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। অনেকে জনসমাগমপূর্ণ স্থানে উচ্চ স্বরে কথা বলেন কিংবা লাউডস্পিকার চালিয়ে অন্যদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করেন না। ব্যক্তিগত ফোনালাপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও উচ্চ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। এ ছাড়া সড়ক ও মহাসড়কের পাশ থেকে নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সবুজের পরিমাণ কমছে। গাছপালা শব্দ শোষণে কিছুটা ভূমিকা রাখে। তাই বৃক্ষহীন পরিবেশে শব্দের প্রভাব আরও তীব্রভাবে অনুভূত হতে পারে। পরিকল্পিত নগরায়ণ, পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা এবং আবাসিক এলাকার পাশে শিল্পকারখানা স্থাপনে নিয়ন্ত্রণ শব্দদূষণ কমাতে সহায়ক হতে পারে।শব্দদূষণের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর। অতিরিক্ত শব্দে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন শব্দের মধ্যে থাকলে ঘুমের ব্যাঘাত, মাথাব্যথা, মানসিক চাপ ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, রোগী ও শব্দসংবেদনশীল মানুষের জন্য এর প্রভাব বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। তাই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। যানবাহনে অবৈধ হর্ন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো, উচ্চ শব্দে মাইক চালানো এবং মোটরসাইকেলের শব্দনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র খুলে চালানোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিল্পকারখানার জেনারেটর ও যন্ত্রপাতিতে শব্দ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। হকারদেরও বিকল্প উপায়ে পণ্য বিক্রির অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি বেশি করে গাছ লাগাতে হবে এবং বিদ্যমান গাছ রক্ষা করতে হবে।শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; আইনের যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত শব্দের মাত্রা পরিমাপ, বিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নীরব এলাকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। অপ্রয়োজনে হর্ন না বাজানো, নির্ধারিত মাত্রার মধ্যে মাইক ব্যবহার করা এবং জনসমাগমস্থলে সংযতভাবে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যই সম্পদ। নিজের সুবিধার জন্য অন্যের শান্তি ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।[লেখক: শিক্ষক]

এবার কি নদী দখলকে বৈধতা দেওয়ার পালা

একটি নদী কীভাবে মরে যায়? শুধু তার পানিতে বিষ মিশলে, পয়োবর্জ্য পড়লে কিংবা শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যে জলজ প্রাণের অস্তিত্ব বিপন্ন হলেই কি একটি নদীর মৃত্যু ঘটে? নাকি নদীর মৃত্যুর শুরু আরও আগে-যখন তার প্রবাহের জায়গা দখল হয়, তীরের উন্মুক্ত জমিতে একের পর এক স্থাপনা গড়ে ওঠে, জলাভূমির স্বাভাবিক চরিত্র বদলে যায়, আর এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব যাদের, তাদের সামনেই ধীরে ধীরে বদলে যায় প্রকৃতির মানচিত্র? বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের দখল, দূষণ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে বারবার এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। নদীর তীরবর্তী এলাকায় দখল কীভাবে বিস্তৃত হয়, জলাশয় কীভাবে সংকুচিত হতে হতে একসময় হারিয়ে যায় এবং প্রাকৃতিক জলপথ কীভাবে জমির কাগজপত্রের বিতর্কে আটকে পড়ে-এসবের কিছু চিত্র সরেজমিনে দেখার সুযোগ হয়েছে।২০২২ সালের ২২ অক্টোবর মাছরাঙা টেলিভিশনে প্রচারিত আমার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘ঢাকা বাঁচবে তো?’-তে কেরানীগঞ্জ, বছিলা, তারানগর, শ্যামলাপুর ও আশপাশের এলাকার এমনই কিছু বাস্তবতা তুলে ধরেছিলাম। তখন দেখেছিলাম, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের সঙ্গে সংযুক্ত একটি জলপথকে ব্যক্তিমালিকানার জমি হিসেবে দেখিয়ে বিক্রির চেষ্টা চলছে। একই অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল টোটাইল বিলের ওপর দখল ও ভরাটের চাপ। ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপে জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত থাকার পরও বিলটির একাংশে মাটি ফেলার কর্মকাণ্ড চলছিল।চার বছর পর সেই অভিজ্ঞতা আরও তীব্রভাবে সামনে এসেছে। টোটাইল বিলের যে জলাধারকে একসময় সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত থাকতে দেখেছিলাম, সেটি এখন পুরোপুরি ভরাট। সেখানে স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। অন্যদিকে, গেল ১৭ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত বণিক বার্তার একটি প্রতিবেদন রাজধানীর বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানকে ভারী শিল্পের জন্য নির্ধারণ এবং ড্যাপে চিহ্নিত বিরোধপূর্ণ বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্প নির্মাণের সুযোগ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।দুটি ঘটনা একই ধরনের নয়। একটি জলাশয় ভরাট হয়ে সেখানে নির্মাণকাজ চলার বাস্তবতা, অন্যটি ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনায় পরিবর্তনের বিষয়। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই মূল প্রশ্নটি অভিন্ন: ঢাকার নদী, খাল, বিল ও বন্যাপ্রবাহ এলাকার মতো প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার কী?নদীর শাখা যখন ব্যক্তিগত জমি২০২২ সালের অনুসন্ধানে শ্যামলাপুর মৌজায় গিয়ে এমন একটি জলপথের সন্ধান পাই, যেটিকে স্থানীয় বাসিন্দারা খাল হিসেবে চিনতেন। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সংযুক্ত এই জলপথ একসময় মাছের অভয়ারণ্য হিসেবেও পরিচিত ছিল। অথচ জায়গাটি জমি হিসেবে বিক্রির চেষ্টা চলছিল।২০২২ সালের আগের টোটাইল বিলের দৃশ্যমিরপুর থেকে আসা এক সম্ভাব্য ক্রেতা জমির কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে জানতে পারেন, তাকে যে জমি দেখানো হয়েছে, সেটি সরকারি খালের অংশ বলে দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও জায়গাটিকে খাল হিসেবে চিনতেন। কিন্তু ভূমি রেকর্ডে সেটি ‘জলা’ হিসেবে উল্লেখ ছিল এবং ব্যক্তির নামে রেকর্ড ও খাজনা-খারিজের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। আমাদের হাতে থাকা সিএস ও আরএস মানচিত্রের সঙ্গে বর্তমান রেকর্ডের অসংগতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করেছিলাম।একজন ভূমি কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, রেকর্ডে জমিটি ব্যক্তির নামে থাকলেও মানচিত্রে সেটি খাল হিসেবে চিহ্নিত। আরেকজন সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার বক্তব্য ছিল, কাগজপত্র ঠিক মনে হলে রেকর্ড দেওয়া হয়; জমিটি নদী, খাল, বিল না অন্য কিছু, তা যাচাই করার সুযোগ তাদের নেই।কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপের মানচিত্রের মধ্যে অসংগতি জমিটির আইনগত অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছিল। জমিটির প্রকৃত মালিকানা ও আইনগত পরিচয় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিল, জরিপ, রেকর্ড এবং অন্যান্য নথি যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অনুসন্ধানটি যে মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছিল, তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। একটি প্রাকৃতিক জলপথের পরিচয় ও ভূমি রেকর্ডের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে সেটি যাচাই ও নিষ্পত্তির দায়িত্ব কার? জমির কাগজে ব্যক্তির নাম উঠে গেলেই কোনো জলপথের প্রাকৃতিক পরিচয় মুছে যায় না। আবার কোনো জলপথের অস্তিত্ব রেকর্ডের আড়ালে চাপা পড়ে গেলে তার পরিবেশগত গুরুত্বও বিলীন হয়ে যায় না। এমন পরিস্থিতিতে শুধু জমি কেনাবেচার কাগজপত্র যাচাই করাই যথেষ্ট নয়। জায়গাটি জলপ্রবাহের অংশ কি না, নদীর সঙ্গে তার সংযোগ রয়েছে কি না এবং প্রযোজ্য আইনে সেটি কীভাবে সংরক্ষিত-এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে।কারণ, জলপথের পরিচয় নিয়ে বিরোধ দেখা দেওয়ার পর যথাযথ যাচাই না হলে একদিকে যেমন প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ কঠিন হয়, অন্যদিকে তেমনি জলপ্রবাহের জায়গা স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন বিরোধটি আর শুধু জমির কাগজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তার প্রভাব পড়ে পুরো এলাকার পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর।ড্যাপে জলাশয়, বাস্তবে নির্মাণএকই অনুসন্ধানে আমরা গিয়েছিলাম শ্যামলাপুর এলাকার টোটাইল বিলে। প্রায় ৩০ বিঘা আয়তনের এই জলাধারটি তখন দখল ও ভরাটের চাপে ছিল। একদিকে স্থানীয়ভাবে জমির মালিকানা দাবি করা ব্যক্তির ভরাট কার্যক্রম, অন্যদিকে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের মাটি ফেলার তৎপরতা দেখতে পেয়েছিলাম আমরা। অথচ তৎকালীন ড্যাপে বিলটিকে জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, বিলটি ভরাট করা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জলাশয় রক্ষা ও ভরাট বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।কিন্তু অনুসন্ধানের সময় মাঠে যে বাস্তবতা দেখেছিলাম, তা ছিল উদ্বেগজনক। সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত একটি জলাধারের অস্তিত্বই ঝুঁকির মধ্যে ছিল। আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বিলের একটি অংশ ভরাটের কথা বলেছিলেন। জায়গাটির সঙ্গে বুড়িগঙ্গার সম্পর্কের প্রসঙ্গও আলোচনায় এসেছিল। এসব বক্তব্যের আইনগত তাৎপর্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই প্রয়োজন হলেও, জলাশয়ের ওপর দখল ও ভরাটের চাপ যে বাস্তব ছিল, তা আমাদের সরেজমিন অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়েছিল।এরপর সময় গড়িয়েছে, সরকারের পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু টোটাইল বিলের বর্তমান বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। সরেজমিনে দেখা এবং আমার কাছে থাকা ছবিতে যে পরিস্থিতি ধরা পড়েছে, তাতে বিলটির পুরো এলাকাই ভরাট হয়ে গেছে, সেখানে এখন স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। যে জায়গায় একসময় জলাধার ছিল, যে জলাশয়কে পরিকল্পনায় সংরক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেখানে এখন নির্মাণের দৃশ্য।এটি শুধু একটি বিল হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটি সংরক্ষণের পরিকল্পনা, প্রশাসনিক আশ্বাস এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানেরও প্রতিচ্ছবি। ২০২২ সালে যখন ভরাটের তৎপরতা দেখেছিলাম, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ছিল। আজ সেই বিলের জায়গায় নির্মাণকাজ চলতে দেখা গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে, সেই আশ্বাসের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? ভরাট বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি? নেওয়া হয়ে থাকলে তা সত্ত্বেও বিলটি কীভাবে পুরোপুরি ভরাট হলো?২০২২ সালে টোটাইল বিলপাড়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের আনাগোনানির্মাণকাজের অনুমোদন রয়েছে কি না, কোন নথি বা মালিকানার ভিত্তিতে কাজ চলছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে-এসব প্রশ্নের উত্তর নথি যাচাই ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন। কিন্তু বিলটির ভরাট হয়ে যাওয়া এবং সেখানে নির্মাণকাজ চলার যে বাস্তবতা এখন দেখা যাচ্ছে, তা গুরুতর উদ্বেগের কারণ।কোনো জলাশয় পরিকল্পনায় সংরক্ষিত থাকার পরও যদি তা ভরাট হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু দখলকারীর সম্ভাব্য দায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নজরদারি, অনুমোদন এবং আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরিকল্পনায় সংরক্ষণের কথা লেখা থাকাই যথেষ্ট নয়, সেই সংরক্ষণ বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ।সরকারের পরিবর্তন হয়, জলাশয়ের ভাগ্য বদলায় কি?নদী ও জলাভূমি রক্ষার প্রশ্নটি কোনো একটি সরকারের মেয়াদে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২২ সালে যখন অনুসন্ধানটি করি, তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারও দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু টোটাইল বিলের পরিণতি দেখায়, শুধু সরকারের পরিবর্তন ঘটলেই জলাশয় রক্ষার বাস্তবতা বদলে যায় না।কোনো নির্দিষ্ট সরকারের সময় ঠিক কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কোন কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং কার দায়িত্বে ঘাটতি ছিল-এসব নির্ধারণের জন্য নথি ও ঘটনাক্রম যাচাই জরুরি। তবে জলাশয়টি যখন ভরাট হয়ে নির্মাণকাজের পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন দায় নির্ধারণের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং এখন প্রয়োজন, বিলটি কীভাবে ধাপে ধাপে ভরাট হলো, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কখন বিষয়টি জেনেছিল, কী পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং সেগুলো কেন কার্যকর হয়নি-এসবের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান। জলাশয় রক্ষার দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক সরকারের সাময়িক অঙ্গীকারের বিষয় হতে পারে না। এটি আইন, পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক দায়িত্ব। দখল প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণও একমাত্রিক নয়। কোথাও ভূমি রেকর্ডের অসংগতি থাকতে পারে, কোথাও নজরদারির ঘাটতি, কোথাও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের অভাব। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় স্থানীয় প্রভাব বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠলে তা-ও প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কোনো জলাশয়ের অস্তিত্ব ঝুঁকির মধ্যে থাকলে প্রশাসনের কাছে জবাব চাওয়াই স্বাভাবিক। কোন কর্তৃপক্ষ কখন বিষয়টি জেনেছে, কী ব্যবস্থা নিয়েছে, কেন সেই ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি এবং অবশিষ্ট জলাশয় রক্ষায় এখন কী করা সম্ভব-এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে থাকা উচিত।একটি জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার পর দায় নির্ধারণ করা যেমন জরুরি, তেমনি দখল চলাকালীন তা ঠেকাতে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করাও জরুরি। আর যদি জলাশয় ভরাটের পর সেখানে স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়, তাহলে শুধু নির্মাণকাজের বর্তমান বৈধতা যাচাই করাই যথেষ্ট নয়, কীভাবে পরিস্থিতি এই পর্যায়ে পৌঁছাল, সেটিও তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত। নইলে প্রতিবারই নতুন সরকার নতুন প্রতিশ্রুতি দেবে, নতুন পরিকল্পনায় সংরক্ষণের কথা লেখা থাকবে, অথচ প্রকৃতির মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়া জায়গাগুলো আর ফিরে আসবে না।এখন আবার ভূমি ব্যবহারের নিয়ম বদলানোর প্রশ্নবণিক বার্তার ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্যাপের সংশোধনীতে রাজধানীর আইলবহর মৌজার ১০৪৭, ১০৪৮ ও ১০৫০ নম্বর দাগে আগে উন্মুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত জমিকে ভারী শিল্প এলাকার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ড্যাপে চিহ্নিত বিরোধপূর্ণ বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে বাধা না থাকার বিধান যুক্ত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।প্রতিবেদনে নগর পরিকল্পনাবিদেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এসব পরিবর্তনের ফলে বন্যার পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে এবং নদীতীরবর্তী এলাকায় পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত জমির ব্যবহার পরিবর্তনের বিষয়টি তাই শুধু ভূমির শ্রেণিবিন্যাসের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এর সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাবও মূল্যায়ন করা জরুরি। একটি মৌলিক নীতি এখানে মনে রাখা প্রয়োজন। আর সেটা হল কোনো জমি খালি পড়ে আছে বলেই সেটি অনাবশ্যক নয়। বিশেষ করে নদীতীর, জলাভূমি ও বন্যাপ্রবাহ এলাকায় উন্মুক্ত জমি পানি ধারণ, পানি নিষ্কাশন, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। এসব জমির কার্যকারিতা সব জায়গায় এক রকম নয়, তাই ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন বিবেচনার আগে স্থানভিত্তিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন দরকার।শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করতে হলে জানতে হবে, সেখানে শিল্প গড়ে উঠলে কী ধরনের পরিবেশগত প্রভাব তৈরি হতে পারে, বন্যাপ্রবাহ ও পানি নিষ্কাশনের ওপর কী প্রভাব পড়বে এবং আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রা কতটা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত স্থান ভারী শিল্পের জন্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। নদীটি দীর্ঘদিন ধরে দখল ও দূষণের চাপ বহন করছে। এ অবস্থায় নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে পরিবেশগত বিধিবিধান, নদীর বর্তমান অবস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে।বণিক বার্তার প্রতিবেদনে ড্যাপের আরও একটি সংশোধনীর কথা বলা হয়েছে, যেখানে ঝিলমিল ও পূর্বাচলে পাঁচ কাঠা বা তার বেশি আয়তনের প্লটে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদন নেওয়ার শর্তে অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা এফএআর সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ধরনের সুবিধার নগর পরিকল্পনাগত যুক্তি ও সম্ভাব্য প্রভাবও স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কারণ আবাসন ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে নগরের ঘনত্ব, অবকাঠামোর সক্ষমতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের সম্পর্ক রয়েছে।বদলে যেতে শুরু করে টোটাইল বিলের চিত্র।ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করলেই পরিবেশগত ছাড়পত্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা অন্যান্য আইনগত বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে, প্রস্তাবিত ব্যবহার প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না।পরিকল্পনা সংশোধনের আগে জবাবদিহি চাইড্যাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সময়ের প্রয়োজনে সংশোধিত হতে পারে। নগরের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিকল্পনার পর্যালোচনাও প্রয়োজন। কিন্তু সংশোধনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নগরের বাস্তব সমস্যা সমাধান করা-প্রাকৃতিক সম্পদের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করে জমির ব্যবহার বদলে দেওয়া নয়।বণিক বার্তার প্রতিবেদনে রাজউক চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি সর্বশেষ সংশোধনী সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। প্রতিবেদনে তিনি আরও বলেছেন, ড্যাপের বিধি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কারিগরি কমিটির সুপারিশসহ নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজন রয়েছে। এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংশোধনীর পূর্ণাঙ্গ নথি, প্রস্তাবের উৎস, কারিগরি মূল্যায়ন এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। যদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়েও স্পষ্টভাবে জানা না থাকে, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, দায়িত্ব বণ্টন ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে প্রক্রিয়াগত অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট নথি ও অনুমোদনের ধারাবাহিকতা যাচাই করা প্রয়োজন। স্বচ্ছতার স্বার্থেই এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত।একই সঙ্গে বন্যাপ্রবাহ এলাকার ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনের আগে পানি প্রবাহ, পানি ধারণক্ষমতা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি নিয়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি সমীক্ষা করা দরকার। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকায় শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব এবং প্রযোজ্য আইনগত বিধিনিষেধের সঙ্গে সামঞ্জস্যও নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ, স্থানীয় বাসিন্দা ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মতামত গ্রহণের সুযোগ থাকলে সিদ্ধান্তের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।টোটাইল বিলের অভিজ্ঞতা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সেখানে একসময় জলাশয় সংরক্ষণের পরিকল্পনা ছিল, ভরাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও ছিল। কিন্তু এখন বিলটি পুরোপুরি ভরাট হয়ে সেখানে নির্মাণকাজ চলছে। এই পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিকল্পনায় সংরক্ষণের কথা থাকলেই প্রকৃতি সুরক্ষিত থাকে না। সংরক্ষণের বিধান কার্যকর করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা, নজরদারি ও জবাবদিহিও থাকতে হয়।অতীতের দখল ও ভরাটের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে নতুন ভূমি ব্যবহারনীতি গ্রহণ করা হলে একই ধরনের ঝুঁকি আরও বড় পরিসরে তৈরি হতে পারে। যে শহর ইতিমধ্যে জলাবদ্ধতা, দূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির চাপ বহন করছে, সেখানে অবশিষ্ট উন্মুক্ত স্থান ও জলপ্রবাহের পথের গুরুত্ব আরও বেশি করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।ঢাকা বাঁচবে কীভাবে?নদী ও জলাশয় রক্ষার জন্য প্রথম প্রয়োজন অবশিষ্ট জলাধারগুলোর সীমানা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করা। সরকারি মানচিত্র, ভূমি রেকর্ড, ড্যাপের শ্রেণিবিন্যাস এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মিলিয়ে দেখতে হবে-কোথায় দখল হয়েছে, কোথায় ভরাট চলছে এবং কোথায় রেকর্ডের অসংগতি রয়েছে। এসব তথ্য সমন্বিতভাবে প্রকাশ করা গেলে দখল শনাক্ত করা, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং দায়িত্ব নির্ধারণ সহজ হবে।দ্বিতীয়ত, দখল ও ভরাটের অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অবৈধ দখল হয়ে যাওয়ার পর উচ্ছেদ অভিযান চালানোর চেয়ে দখল শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা অনেক বেশি কার্যকর। এ জন্য নিয়মিত মাঠপর্যায়ের নজরদারি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় এবং অভিযোগের পর গৃহীত ব্যবস্থার স্বচ্ছ নথি থাকা জরুরি।তৃতীয়ত, ড্যাপের সর্বশেষ সংশোধনীগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করে সেগুলোর কারিগরি ভিত্তি ও পরিবেশগত প্রভাব ব্যাখ্যা করতে হবে। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানকে ভারী শিল্পের জন্য নির্ধারণ কিংবা বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্পের সুযোগ দেওয়ার মতো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের যুক্তি, সম্ভাব্য লাভ ও পরিবেশগত ঝুঁকি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।চতুর্থত, টোটাইল বিলের মতো জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলোর পৃথক তদন্ত প্রয়োজন। বিলের সীমানা ও পূর্ববর্তী শ্রেণিবিন্যাস, জমির রেকর্ড, ভরাটের সময়কাল, নির্মাণকাজের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ যাচাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যেখানে সম্ভব, জলাশয়ের অবশিষ্টাংশ ও পানি প্রবাহের পথ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ২০২২ সালে ‘ঢাকা বাঁচবে তো?’ প্রতিবেদন তৈরির সময় টোটাইল বিলের পাশে দাঁড়িয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলাম, আজও তার উত্তর খুঁজছি। একটি খালকে ব্যক্তিগত জমি হিসেবে দেখিয়ে বিক্রির চেষ্টা কীভাবে সম্ভব হয়? সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত একটি বিলের ওপর ভরাটের চাপ তৈরি হলেও কার্যকর প্রতিরোধ কেন নিশ্চিত করা যায় না? আর দীর্ঘদিনের দখল ও পরিবেশগত ক্ষতির অভিজ্ঞতার পরও ভূমি ব্যবহারের নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সেই অভিজ্ঞতা কতটা গুরুত্ব পায়?টোটাইল বিলের বর্তমান চিত্র এই প্রশ্নগুলোকে আরও জরুরি করে তুলেছে। যে জলাশয় একসময় ছিল, সেটি এখন ভরাট, সেখানে নির্মাণকাজ চলছে। এই পরিবর্তনের ছবি কেবল একটি জায়গার অতীত ও বর্তমানের পার্থক্য দেখায় না, এটি পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানও সামনে আনে। এখন প্রয়োজন, সেই ব্যবধানের কারণ অনুসন্ধান করা এবং ভবিষ্যতে যেন অন্য জলাশয়ের পরিণতিও একই না হয়, তা নিশ্চিত করা।এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া নদী রক্ষার ঘোষণা কিংবা নতুন পরিকল্পনা-কোনোটিই যথেষ্ট নয়।২০২৬ সালে এসে টোটাইল বিলের চিত্র পুরোটাই ভিন্ন।রূপ নিচ্ছে আবাসিক এলাকায়।বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: নদী হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া ধীর হলেও তার ক্ষতি সুদূরপ্রসারী। জলাশয় হারালে শুধু জমির চেহারা বদলায় না, বদলে যায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল এবং মানুষের বসবাসের পরিবেশ। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় নগরবাসীকেই-জলাবদ্ধতা, দূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার অবনতির মধ্য দিয়ে।উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। শিল্প, আবাসন ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু উন্নয়নের সিদ্ধান্তে জমির তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ব্যবহারই একমাত্র বিবেচ্য হতে পারে না। নদী, খাল, বিল ও বন্যাপ্রবাহ এলাকার পরিবেশগত মূল্যও পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। কারণ প্রাকৃতিক জলাধার একবার হারিয়ে গেলে কেবল অর্থ ব্যয় করে তার আগের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা কঠিন। যে জলাশয় দখল ও ভরাট থেকে রক্ষা করা যায়নি, তার পরিণতি থেকে শিক্ষা না নিয়ে নতুন করে নদীতীর ও বন্যাপ্রবাহ এলাকার ভূমি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে অতীতের ব্যর্থতা আরও বড় পরিসরে ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে। তাই রাষ্ট্রকে জবাব দিতে হবে-আগের অভিজ্ঞতা থেকে কী শিক্ষা নেওয়া হয়েছে, আর সেই শিক্ষা বাস্তব সিদ্ধান্তে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে?ঢাকাকে বাঁচাতে হলে নদী ও জলাভূমিকে উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে নয়, নগরকে টিকিয়ে রাখার অপরিহার্য প্রাকৃতিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পরিকল্পনার সার্থকতা জমির শ্রেণি বদলানোর ক্ষমতায় নয়, বরং মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য প্রকৃতির প্রয়োজনীয় জায়গাটুকু অক্ষুণ্ণ রাখতে পারার মধ্যে। নইলে একদিন হয়তো মানচিত্রে খাল-বিলের নাম থাকবে, পুরোনো নথিতে নদীর শাখার অস্তিত্বও পাওয়া যাবে-কিন্তু বাস্তবে সেগুলো খুঁজে পাওয়ার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তখন প্রশ্নটি আর শুধু নদী বাঁচবে কি না, তা থাকবে না- প্রশ্ন হবে, নদী ছাড়া এই শহর আদৌ কত দিন বাসযোগ্য থাকবে?লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টিভি

অস্পৃশ্যতার শিকল ভাঙার লড়াই

আমার বাড়ি উত্তরের জেলা বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার ডেমাজানী গ্রামে। আমাদের গ্রামে আমরাই একমাত্র রবিদাস পরিবার। রবিদাস একটি ঐতিহ্যবাহী জনগোষ্ঠী, যাদের পেশার সঙ্গে জুতা তৈরি, মেরামত ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের পরিবারের প্রতি উচ্চবর্ণের হিন্দুদের নেতিবাচক মনোভাব দীর্ঘদিনের। পরিবারের প্রায় সব সদস্যকেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে অস্পৃশ্যতামূলক আচরণের শিকার হতে হয়েছে। আমরা নয় ভাই-বোনের মধ্যে আমি অষ্টম। বড় দাদা-দিদিদের জীবনেও এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো আমাদের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এসব ঘটনার কিছু তাদের মুখে শুনেছি, আবার কিছু নিজের চোখেই দেখেছি।২০১৩ সালের দুর্গাপূজার কথা। তখন আমি ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। আমাদের পাড়ার সার্বজনীন মন্দিরে দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে পূজার্চনায় অংশ নিতে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করি। সে সময় অনেক মানুষের ভিড় থাকায় কেউ কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও প্রসাদ নেওয়ার জন্য মন্দিরে ঢুকতে বাধা দেন তৎকালীন দায়িত্বরত পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক। ২০০৫ সালে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তার কাছে তিন-চার মাস প্রাইভেট পড়েছিলাম। সেই সুবাদে তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতাম। দিনে যতবারই তার সঙ্গে দেখা হতো, ততবারই তাকে নমস্কার জানাতাম। তাকে যথেষ্ট সম্মান করতাম।যাহোক, তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি পা ধুয়ে মন্দিরে ঢুকছো?’ প্রত্যুত্তরে বললাম, ‘কীভাবে শুচিতা বজায় রেখে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়, সেটা অন্তত জানি। আপনি এমন কথা বললেন কেন, স্যার?’তার কাছ থেকে এমন আচরণ পেয়ে আমি ভীষণ ব্যথিত হয়েছিলাম। পরক্ষণেই তিনি আমতা আমতা করে বললেন, ‘তুমি জানো না তোমরা কী জাত? মুচি জাতের মানুষ পূজার সময় মন্দিরে ঢুকলে পূজার উপকরণ অপবিত্র হয়ে যাবে। দেবী দুর্গার পূজার পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যাবে। পূজার সময় মন্দিরের উপকরণে নিম্নজাতের মানুষের স্পর্শ করা অনুচিত।’কথাগুলো শোনার পর মনোকষ্ট ও অপমানবোধ থেকে প্রতিবাদ করে বলেছিলাম, ‘সার্বজনীন পূজামণ্ডপে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র-সনাতন ধর্মাবলম্বী সবার সমান অধিকার রয়েছে। আমরা সবাই হিন্দু। তাই পূজার্চনার অধিকারও সবার সমান। তা ছাড়া পূজার চাঁদা আমরাও দিই। সে ক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে এমন বৈষম্য আমি মানি না, মানব না। আপনার সামনেই মন্দিরে ঢুকে প্রসাদ নিয়ে আসছি। পারলে বাধা দিন।’ঘটনাটি সেখানেই শেষ হলেও এর ক্ষত আমার মনে গভীরভাবে থেকে যায়। বাড়ি ফিরে আমি আর কান্না থামাতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ আগেই রাগে-দুঃখে প্রতিবাদ করে এসেছি, অথচ বাড়িতে এসে নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। পরিবারের কাউকে প্রথমে কিছু বুঝতে দিইনি। কিন্তু মা বিষয়টি আঁচ করতে পারেন। তিনি জানতে চাইলে তাকে সব খুলে বলি।আমার অবিরাম কান্না দেখে মা-ও নিজেকে সামলাতে পারেননি। তিনি মন্দিরে গিয়ে প্রতিবাদ করতে চাইলে আমি তাকে থামাই। মা একেবারেই নিরক্ষর। কিন্তু সেদিন তিনি হঠাৎ এমন একটি কথা বলেছিলেন, যা আমার জীবনের জন্য গভীর শিক্ষণীয় হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা চর্মকার। যে ঢাক না বাজলে দেবী দুর্গার পূজা সম্পন্ন হয় না, সেই ঢাক তৈরির সঙ্গে আমাদের পেশার সম্পর্ক রয়েছে। আমরা যদি অস্পৃশ্য হই, তাহলে চামড়ার তৈরি ঢাকও অস্পৃশ্য। পূজামণ্ডপ থেকে সেই ঢাক আমি ছিনিয়ে আনব। দেখি, ঢাক ছাড়া দেবী মায়ের পূজা কীভাবে হয়!’ মায়ের সেই কথার মধ্যে ছিল শত বছরের বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আত্মমর্যাদার দাবি এবং জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যের প্রতি এক গভীর প্রশ্ন।২০১৩ সালের ঘটনার পরও আমাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের অবসান হয়নি। ২০২০ সালের দুর্গাপূজার সময় আমি দুর্গামন্দিরের একটি প্রদীপদানি স্পর্শ করায় আশুতোষ সাহা সেটি পুকুরে ফেলে দেন। একই সঙ্গে পূজায় নিযুক্ত পুরোহিতকে সতর্ক করে দেন, যাতে আমি কিংবা আমার পরিবারের কোনো সদস্য মন্দিরে প্রবেশ করতে না পারি।আমার প্রদীপদানি স্পর্শ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলাদা একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় আমি সাংগঠনিক কাজে বগুড়ার বাইরে অবস্থান করছিলাম। সভা চলাকালে আমাদের সংগঠনের একজন কর্মী ফোন করে আমাকে বিষয়টি জানান।একটি পূজামণ্ডপে ব্যবহৃত প্রদীপদানি স্পর্শ করার কারণে সেটি ফেলে দেওয়া এবং একটি পরিবারের সদস্যদের মন্দিরে প্রবেশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা আমাকে গভীরভাবে মর্মাহত করে। ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রবেশের মতো মৌলিক অধিকারের প্রশ্নটি যে কতটা অবহেলিত হতে পারে, তা আবারও উপলব্ধি করি।২০২১ সালে আমাদের সংগঠনের একজন কর্মীকেও অপমান করেন আমার সেই প্রাইভেট টিউটর। আমাদের পাড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন গোত্রের মানুষের বসবাস। রবিদাস ও রাজভর জনগোষ্ঠীর দুর্গাপূজার চাঁদা সংগ্রহের দায়িত্বে ছিল সেই কর্মীর। দুর্গাপূজার তৃতীয় দিন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের বাড়িতে সুজন সংগৃহীত চাঁদার টাকা জমা দিতে যান। কিন্তু সাধারণ সম্পাদক তার হাত থেকে টাকা না নিয়ে মাটিতে রাখতে বলেন। পরে মাটিতে রাখা টাকার ওপর জল ছিটিয়ে তিনি তা গ্রহণ করেন। চাঁদার টাকা সংগ্রহের সময় দু’-তিনজনের চাঁদা বাকি থাকায় সেই কর্মীকে ভর্ৎসনাও করা হয়। তাকে বলা হয়, ‘দুর্গাপূজা ফকিন্নিদের পূজা না, রাজা-বাদশার পূজা। ঠিকমতো পূজার চাঁদা দিতে না পারলে বারোয়ারিতে থাকার দরকার নেই।’ নিজের হাত থেকে টাকা গ্রহণ না করায় সেই কর্মী গভীর মনোকষ্টে কান্না করতে থাকে।সেদিন রাতে মন্দিরে গিয়ে সবার সামনে আমি এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এর ফলে পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও তার কতিপয় অনুসারীর বিরাগভাজন হয়ে পড়ি। তারা আমাদের অস্পৃশ্য মনে করতেন এবং আমার ও আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করতেন। এভাবে বছরের পর বছর ধরে আমাদের আত্মমর্যাদা ক্ষুন্ন করা হয়েছে। অথচ আমরা এই সমাজেরই মানুষ। আমরাও ধর্মীয় উৎসবে অংশ নিতে চাই, পূজার্চনা করতে চাই, অন্য সবার মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চাই।২০২২ সালের দুর্গাপূজার আগে আমার মনে আশঙ্কা জাগে, আগের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। এত দিন স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়ায় আমি অনেকটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত মানবাধিকারের এমন চরম লঙ্ঘনের প্রতিকার চেয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে গিয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিই।আমার মনে হয়েছিল, হয়তো কোনো সমাধানই হবে না। কিন্তু দুর্গাপূজার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিষয়ে পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদকে অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করে শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযোগকারী হিসেবে আমিও চিঠি পাই।এরপর থেকেই আমার এলাকায় অস্পৃশ্যতার বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হতে শুরু করে। অনেকেই এমন ঘটনার নিন্দা জানান এবং দ্রুত সমাধানের দাবি তোলেন। আমার সাহসী ভূমিকার জন্য কেউ কেউ প্রশংসা করেন, আবার কেউ কেউ একে বাড়াবাড়ি বলেও মন্তব্য করেন।তবে আমি বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট সন্তুষ্ট ছিলাম। কারণ, আমাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অমানবিক আচরণের একটি সুষ্ঠু সমাধান আসন্ন-এমন আশা করতে শুরু করেছিলাম। এরই মধ্যে বিভিন্ন মানুষের মাধ্যমে আমাকে বিষয়টি এখানেই শেষ করে দেওয়ার অনুরোধ, প্রস্তাব এমনকি হুমকিও দেওয়া হতে থাকে। কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থানে অটল ছিলাম। এমন কথাও প্রচার করা হয়, ‘মাস্টারের মতো সম্মানী ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিপন মামলা করেছে। এটা কি ঠিক?’আমি বিষয়টিকে ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখিনি। আমার কাছে এটি ছিল মানবাধিকার, সামাজিক মর্যাদা ও সমান অধিকারের প্রশ্ন। তাই জনমত গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে জমা দেওয়া আবেদনের ফটোকপি বিভিন্ন নাগরিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠন এবং সংগঠকদের কাছে পাঠাতে থাকি।এই উদ্যোগের ফলে অনেকেই জাতপাতের কুফল সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। তারা উপলব্ধি করতে পারেন, জাতপাতের ধারণা কীভাবে নীরব ঘাতকের মতো মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও সামাজিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। জনমত গঠনের এই প্রক্রিয়া আমাকে অনেক বেশি সাহস ও শক্তি জুড়িয়েছিল।অবশেষে পূর্বনির্ধারিত সময়ে উভয় পক্ষকে নিয়ে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইউএনও মহোদয় উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন। পরে বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে কারও প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন। অভিযুক্ত পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা নিয়ে বিষয়টির সমাধান করা হয়। আমিও অভিযোগকারী হিসেবে আমি পূজা কমিটির সঙ্গে মিলেমিশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে লিখিত দিই। পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদকে ও তার অনুসারীরা ভবিষ্যতে রবিদাসসহ দলিত জনগোষ্ঠীর সদস্যদের মন্দিরে প্রবেশ, পূজার্চনা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য না করার বিষয়ে লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেন। এভাবেই দীর্ঘদিনের অপমান, বঞ্চনা ও প্রতিবাদের পর মন্দিরে প্রবেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একটি ইতিবাচক সমাধান আসে।ঘটনাটির একটি সুষ্ঠু সমাধান এসেছে বলা যায়। কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরও জটিল। ওই দিনের পর থেকে আমি লক্ষ করেছি, পাড়ার বেশ কয়েকজন আমাকে এড়িয়ে চলেন। যদিও আমি তাদের সঙ্গে আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে মিশতে চেষ্টা করেছি। আমার জীবনের এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, অস্পৃশ্যতার শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত। জাতপাতের ধারণায় বিশ্বাসী মানুষের মধ্যে এমন এক মনস্তত্ত্ব গড়ে ওঠে, যা কেবল নির্দেশ কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাতারাতি বদলে দেওয়া সম্ভব নয়।আমরা যতই বৈষম্য বিলোপের আইন দাবি করি না কেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সমাজ থেকে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য দূর হবে না। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের পরিবর্তন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সম্মিলিত উদ্যোগে বৈষম্যবিরোধী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।তবে বাংলাদেশে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতা প্রতিরোধে কার্যকর আইন থাকা অত্যন্ত জরুরি। এমন আইন ও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জাতপাতের ধারণা থেকে উদ্ভূত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটানোর সাহস কেউ না পায়। পাশাপাশি অপরাধের প্রতিকার, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সেই সময়ের উদ্যোগ আমার পাড়ায় অন্তত মানবতার একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। আমি উপলব্ধি করেছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। বৈষম্যের শিকার হয়ে নীরব থাকলে বৈষম্য আরও শক্তিশালী হয়। নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সচেতনতা, সাহস, সংগঠিত উদ্যোগ এবং আইনি প্রতিকার গ্রহণের মানসিকতা থাকা জরুরি।আমার এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি পরিবারের কিংবা একটি জনগোষ্ঠীর মন্দিরে প্রবেশের অধিকারের লড়াই নয়; এটি মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। কোনো মানুষের পরিচয় তার পেশা, জন্ম কিংবা জাতপাত দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেরই সমান মর্যাদা, অধিকার ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রয়েছে।আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কাউকে তার জন্মপরিচয়ের কারণে অপমানিত হতে হবে না; যেখানে ধর্মীয় উপাসনালয়ের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে; যেখানে মানুষের মূল্যায়ন হবে তার মানবিক গুণাবলি ও কর্মের ভিত্তিতে, জাতপাতের পরিচয়ে নয়। মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে-পেশা কিংবা জাতপাতের পরিচয়ে নয়। এমন সমাজই আমাদের কাম্য।(মতামত লেখকের নিজস্ব)[লেখক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, বগুড়া-৫]

বাবার পরিচয়ে কি সন্তানের চাকরি আটকানো যায়

লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও শুধু পরিবারের কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা মামলার কারণে চূড়ান্ত নিয়োগ থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ নতুন নয়। সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগেও অনেক প্রার্থী এমন বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের জন্য এক যুগ আগের একটি রায় গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে। সে রায়ে হাইকোর্ট বলেছিলেন, প্রার্থীকে বিচার করতে হবে তার নিজের যোগ্যতা, চরিত্র ও পূর্ববৃত্তান্ত দিয়ে, বাবা-মায়ের রাজনৈতিক পরিচয় বা তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা দিয়ে নয়।শাহনাজ খাতুন ও মো. রাজশ খান ৩২তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় অংশ নেন। শাহনাজ ছিলেন স্বাস্থ্য ক্যাডারের সহকারী সার্জন পদের প্রার্থী, রাজশ সড়ক ও জনপথ ক্যাডারের সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদের প্রার্থী। তাদের বাবা মো. হাসান আলী একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সম্মানী ভাতা পেতেন।দুজনই প্রাথমিক বাছাই, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষাও সম্পন্ন করেন। কিন্তু ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর সরকার ১ হাজার ৬১৯ জনের নিয়োগের যে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে, তাতে তাদের নাম বা রোল নম্বর ছিল না।পরে তারা জানতে পারেন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ২০১৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের একটি গোপনীয় প্রতিবেদন তাদের নিয়োগ আটকে দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তাদের বাবা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন। অথচ দুই প্রার্থীর নিজেদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো অভিযোগ ছিল না, কোনো মামলাও ছিল না।এরপর তারা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন (রিট পিটিশন নম্বর ৪৮২ ও ৪৮৩/২০১৪)।প্রার্থীদের আইনজীবী মোহাম্মদ জিশান হায়দার দুটি যুক্তি তুলে ধরেন। প্রথমত, নাম বাদ দেওয়ার আগে প্রার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়নি, বক্তব্য শোনার সুযোগও দেওয়া হয়নি, যা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন। দ্বিতীয়ত, বাবার কারণে সন্তানকে বঞ্চিত করা সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) ও ২৯(১) অনুচ্ছেদের (সরকারি চাকরিতে সুযোগের সমতা) পরিপন্থী। তার মতে, সরকার প্রার্থীর উপযুক্ততা যাচাই করতে পারে, তবে সেই যাচাইয়ের যৌক্তিক সম্পর্ক থাকতে হবে প্রার্থীর নিজের যোগ্যতা, চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে।সরকারপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমাতুল করিম ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নুসরাত জাহান বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮১-এর ওপর নির্ভর করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, সরাসরি নিয়োগের আগে প্রার্থীর পূর্ববৃত্তান্ত যাচাই বাধ্যতামূলক এবং এনএসআইয়ের প্রতিবেদন নেতিবাচক হওয়ায় নিয়োগ দেওয়া যায়নি। তারা আরও বলেন, সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশ পেলেই নিয়োগ পাওয়ার নিরঙ্কুশ অধিকার তৈরি হয় না।বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দ ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৪ সালের ৪ জুন রায় দেন। আদালত প্রথমেই দেখেন, প্রার্থীদের পরীক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। বাবার বিষয়ে প্রতিবেদনের কথা সরকার জবাবি হলফনামায় কাগজপত্র দিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে অস্বীকারও করেনি। ২০১৪ সালের ১৩ জানুয়ারির একটি অফিস আদেশে এনএসআই ১৮ জন প্রার্থীর বিষয়ে "পুনঃ আপত্তি" জানিয়েছিল, কিন্তু এই দুজনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ কী, তা সেখানে বলা হয়নি।এরপর আদালত বিধিমালার ৩(৩)(খ) বিধির ভাষা বিশ্লেষণ করেন। বিধিটি বলছে, নির্বাচিত ব্যক্তির পূর্ববৃত্তান্ত উপযুক্ত সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করে তাকে প্রজাতন্ত্রের চাকরির অনুপযুক্ত মনে না হলে তবেই নিয়োগ দেওয়া যাবে। আদালতের ব্যাখ্যায়, যাচাইয়ের বিষয় হলেন প্রার্থী নিজে, তার পরিবারের অন্য কেউ নন।সরকার এমন কোনো তথ্য দেখাতে পারেনি যে প্রার্থীরা নিজেরা রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজে জড়িত। তাই আদালত বলে, বাবা রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত বা তার বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন, শুধু এই কারণে সন্তানদের নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা যায় না। বাবার রাজনৈতিক পরিচয় বা মামলা সন্তানের পূর্ববৃত্তান্ত হয়ে যায় না।আদালত গাজী জসিমউদ্দিন বনাম বাংলাদেশ (৫০ ডিএলআর ৩১) মামলার নীতি অনুসরণ করেন। সে মামলায় বলা হয়েছিল, সংবিধানের ২৭ ও ২৯ অনুচ্ছেদ সরকারকে যুক্তিসংগত নিয়োগবিধি, পরীক্ষা বা যোগ্যতা নির্ধারণে বাধা দেয় না। তবে সেই শর্ত হতে হবে যুক্তিসংগত, স্বেচ্ছাচারমুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট পদের উপযুক্ততার সঙ্গে যৌক্তিকভাবে সম্পর্কিত। কেবল রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে কাউকে আলাদা করে বাদ দিলে এবং একই নীতি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না করলে বৈষম্যের প্রশ্ন ওঠে।একই সূত্রে বাংলাদেশ বনাম মো. মতিয়ার রহমান (১৯৮২ বিএলডি (এডি) ১০৯) মামলার নীতিও উল্লেখ করা হয়। সরকারি কর্ম কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তাই তার সুচিন্তিত মতামত সরকারকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।অর্থাৎ প্রার্থীর পরিচ্ছন্ন অতীত, দেশের প্রতি আনুগত্য, ব্যক্তিগত সততা ও শৃঙ্খলা যাচাই করা বৈধ। কিন্তু যাচাইয়ের নামে নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন বা স্বেচ্ছাচারী বৈষম্য বৈধ নয়।হাইকোর্ট দুটি রুলই চূড়ান্ত (অ্যাবসলিউট) ঘোষণা করেন। ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে দুই আবেদনকারীর নাম অন্তর্ভুক্ত না করাকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনত অকার্যকর ঘোষণা করা হয়। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে শাহনাজ খাতুনকে সহকারী সার্জন এবং মো. রাজশ খানকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে নিয়োগ দিতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। রায়টি ৩ সিএলআর (এইচসিডি) ২০১৫-তে প্রকাশিত।এই রায় বিসিএস নিয়োগ বিধিমালার প্রেক্ষাপটে দেওয়া। তবে এর ভিত্তি সংবিধানের ২৭ ও ২৯ অনুচ্ছেদ, যা প্রজাতন্ত্রের সব চাকরির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সহকারী শিক্ষকের পদও তার বাইরে নয়। তাই যারা সব ধাপে উত্তীর্ণ হয়েও শুধু বাবা-মা বা স্বজনের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মামলার কারণে বাদ পড়েছেন, তাদের সামনে আইনি পথ খোলা আছে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

আমাদের অনিরাপদ পানির গল্প

গাজীপুর, শ্রীপুর ও ভালুকার বিভিন্ন এলাকায় মাটির ৩০ থেকে ৪০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যায়। কিন্তু সেই পানি এখন আর আগের মতো পান করার উপযোগী থাকছে না। অনেক ক্ষেত্রে পানিতে দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির বিভিন্ন গুণগত মানদণ্ডও ঠিক থাকছে না। বিশেষ করে কারখানার আশপাশের পানিতে এ ধরনের সমস্যা বেশি দেখা যায়। তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?দীর্ঘদিন ধরে পানি পরিশোধন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করছি। বিভিন্ন দেশের মানুষ আমাদের কাছে আসেন। তাদের সঙ্গে পানি নিয়ে কথা হয়। তাদের পানিসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা জানতে চাই। তাদের কথা শুনি, ভাবি এবং বোঝার চেষ্টা করি। আমাদের দেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় অনেক পার্থক্য রয়েছে। তবু তাদের অভিজ্ঞতা ও ধারণা থেকে শেখার চেষ্টা করি। যেসব দেশে পানির সংকট তীব্র, সেসব দেশের মানুষ পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। আমরাও এখন খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। ঢাকা শহরের পানির পরিস্থিতি নাজুক। ঢাকা ওয়াসাও নানা বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।আমরা বিভিন্ন জায়গায় শূন্য তরল বর্জ্য নির্গমন বা জেডএলডি নিয়ে কাজ করছি। এর অর্থ হলো, পানি পরিশোধন করে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে তরল বর্জ্য নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনা। সেদিন মালয়েশিয়ার একজন বিশেষজ্ঞ এসেছিলেন। তার সঙ্গে অনেক কথা হলো। তিনি আমাদের বুড়িগঙ্গা নদীও দেখেছেন। আমাকে বললেন, ‘তোমাদের পানির প্রতি এমন অযত্ন দেখে আমি সত্যিই কষ্ট পেয়েছি।’এ প্রসঙ্গে তিনি একটি গল্প শোনালেন। একবার দক্ষিণ আফ্রিকার একটি শুষ্ক অঞ্চলে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে একটি শিশু অসুস্থ ছিল। জ্বরের কারণে তীব্র পিপাসায় শিশুটি মায়ের কাছে পানি খাওয়ার জন্য বারবার কাকুতি-মিনতি করছিল। কিন্তু মা কোথাও পানি পাচ্ছিলেন না। তাদের দেশে একধরনের ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয়, যা পুকুর বা জলাশয়ের পানিতে দিলে দ্রুত ময়লা নিচে জমে যায় এবং পানি কিছুটা পরিষ্কার হয়। তিনি ঘর থেকে সেই ট্যাবলেট নিয়ে এলেন।একটি অপরিষ্কার পুকুরে ট্যাবলেটটি প্রয়োগ করলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যে ময়লাগুলো নিচে জমে গেল। ওপরের পানি কিছুটা স্বচ্ছ হয়ে উঠল। আমি সেই দৃশ্য দেখছিলাম।কিছুক্ষণ পর শিশুটির মা একটি পেয়ালায় পানি তুলে তাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করলেন। তীব্র পিপাসায় শিশুটি পানি খেতে মুখ বাড়িয়েও শেষ মুহূর্তে মুখ ফিরিয়ে নিল। আমি বুঝতে পারলাম, পানির স্বাদ খুব খারাপ। দেখতে পরিষ্কার মনে হলেও পানি ছিল অনেকটা আঠালো ও ঘন। মা অন্য জায়গা থেকে আবার পানি তুলে শিশুটিকে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু শিশুটি সেই পানিও খেল না। নিজের আঞ্চলিক ভাষায় বারবার পানি চেয়ে যেতে লাগল।সন্তানকে পানি খাওয়াতে না পেরে মা কাঁদতে শুরু করলেন। দৃশ্যটি দেখে আমার চোখ দিয়েও পানি গড়িয়ে পড়ছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল হাউমাউ করে কাঁদি। শেষ পর্যন্ত কাঁদতে কাঁদতে নিজের ব্যাগে থাকা সামান্য পানি শিশুটিকে দিলাম।সেই মুহূর্তের আনন্দ ছিল পৃথিবীর সেরা আনন্দগুলোর একটি। পানির জন্য মানুষ কতটা কষ্টে আছে, সাঈদ, তুমি বিশ্বাসও করতে পারবে না—বিশেষজ্ঞ আমাকে এ কথাই বলেছিলেন।কথা বলতে বলতে তিনি আবারও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। তার চোখে জল এসে গেল। আমি তার অনুভূতি বুঝতে পারছিলাম।শেষে তিনি বললেন, ‘তোমাদের নতুন প্রজন্মকে পানি নিয়ে কথা বলতে শেখাও। পানি রক্ষা করতেই হবে। পানি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তোমাদের নদীগুলোর যত্ন নাও।’এমন আবেগঘন গল্প শুনে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। অথচ আমাদের দেশের পাহাড়ি অঞ্চলেও পানির সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। অনেক জায়গায় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পানির সন্ধানে আমরা মাটির আরও গভীরে যাচ্ছি। একসময় হয়তো মাটির এত গভীরে যেতে হবে যে লাভা উঠে আসবে, তবু পানি মিলবে না। অথচ এসব দেখেও আমরা যেন অবাক হচ্ছি না, উদ্বিগ্নও হচ্ছি না।যা-ই হোক, সীমিত সামর্থ্য নিয়েও আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে গবেষণা, পানি পরিশোধন এবং পুনর্ব্যবহারের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। নদী, খাল, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎসগুলো রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে পানির গুরুত্ব বোঝাতে হবে। নিরাপদ পানি শুধু আমাদের প্রয়োজন নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারও। পৃথিবীতে নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেই হবে।[লেখক: রসায়নবিদ]

ডার্ক ম্যাটারের সন্ধানে ন্যান্সি রোমান টেলিস্কোপ

রাতের আকাশে খালি চোখে দেখা তারকা কিংবা দূরবীক্ষণ যন্ত্রে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নক্ষত্ররাজি—সব মিলিয়ে মহাবিশ্বের দৃশ্যমান পদার্থের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ। বাকি ২৭ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার বা অন্ধকার পদার্থ এবং ৬৮ শতাংশ ডার্ক এনার্জি বা অন্ধকার শক্তি।১৯২৯ সালে এডউইন হাবল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখান, গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বিষয়টি বোঝার জন্য একটি রাবারের ফিতার ওপর কয়েকটি পিঁপড়া বসিয়ে ফিতাটি টানার কথা কল্পনা করা যেতে পারে। পিঁপড়াগুলো নিজ নিজ অবস্থানে থাকলেও ফিতাটি যত প্রসারিত হবে, তারা পরস্পর থেকে তত দূরে সরে যাবে। তবে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের বিষয়টি এর চেয়ে অনেক জটিল। গ্যালাক্সিগুলো শুধু নিজ নিজ অবস্থানে স্থির নয়, তাদের মধ্যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণও কাজ করে। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, গ্যালাক্সির গতি এবং ডার্ক ম্যাটারের ভূমিকা বুঝতে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন।১৯৫৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর হাবলের মৃত্যুর পরও মহাবিশ্বের প্রকৃতি নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যায়। ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে গঠিত? ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি কী? মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ভবিষ্যৎই বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আরও উন্নত মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে ন্যান্সি গ্রেস রোমানসহ অনেক বিজ্ঞানী ও মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা উন্নত টেলিস্কোপ নির্মাণের পক্ষে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ন্যান্সি গ্রেস রোমান এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। মহাকাশ গবেষণায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পরবর্তী সময়ে তাঁর নামেই একটি স্পেস টেলিস্কোপের নামকরণ করা হয়।ন্যান্সি গ্রেস রোমান ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নাসার জ্যোতির্বিজ্ঞান কর্মসূচির প্রথম প্রধানদের একজন এবং সংস্থাটির প্রথম নারী নির্বাহীদের অন্যতম ছিলেন। মহাকাশে দূরবীক্ষণ যন্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। হাবল স্পেস টেলিস্কোপের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই তাঁর কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল।জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ও ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের কাজের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ২০২১ সালের ২৫ ডিসেম্বর উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে সূর্য-পৃথিবী ব্যবস্থার দ্বিতীয় ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দুতে অবস্থান করে। এর প্রধান লক্ষ্য মহাবিশ্বের প্রাচীনতম গ্যালাক্সি ও নক্ষত্রের সন্ধান করা এবং মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ের বিবর্তন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। অন্যদিকে, ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের পরিকল্পনায় রয়েছে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, ডার্ক এনার্জি, ডার্ক ম্যাটার এবং সৌরজগতের বাইরের গ্রহ নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা। এটি আকাশের বড় অংশ দ্রুত পর্যবেক্ষণ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে বিপুলসংখ্যক গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্লানেট সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।ডার্ক ম্যাটার সরাসরি আলো নির্গত বা প্রতিফলিত করে না বলে সাধারণ টেলিস্কোপে তা দেখা যায় না। তবে এর মহাকর্ষীয় প্রভাব থেকে এর উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হওয়ার পেছনে দায়ী বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। রোমান টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ এসব রহস্য সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা দিতে পারে। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে কীভাবে চলবে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও এর গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে মহাবিশ্ব একসময় সংকুচিত হয়ে আবার একটি বিন্দুতে ফিরে যাবে কি না, তা এখনো অমীমাংসিত প্রশ্ন। ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া গেলে মহাবিশ্বের সুদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা স্পষ্ট হতে পারে।রোমান টেলিস্কোপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো এক্সোপ্লানেট বা সৌরজগতের বাইরের গ্রহ অনুসন্ধান। আমাদের সৌরজগতের বাইরে ইতিমধ্যে হাজার হাজার গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর কোনো কোনোটি আকার বা পরিবেশের দিক থেকে পৃথিবীর সঙ্গে তুলনীয়। তবে কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। রোমান টেলিস্কোপ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে বিপুলসংখ্যক গ্রহ শনাক্ত করতে সহায়তা করবে। এর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গ্রহের গঠন, বৈশিষ্ট্য এবং সৌরজগতের বাইরে প্রাণের উপযোগী পরিবেশের সম্ভাবনা সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।মহাবিশ্ব কি শুধু পৃথিবীর প্রাণের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে—এ প্রশ্ন মানুষের কৌতূহলকে যুগ যুগ ধরে তাড়িত করেছে। মহাবিশ্বের বিশালত্ব বিবেচনায় অন্য কোথাও প্রাণ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে সম্ভাবনা আর প্রমাণ এক বিষয় নয়। দূরবর্তী কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পেতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। রোমান টেলিস্কোপের মতো উন্নত প্রযুক্তি সেই অনুসন্ধানকে এগিয়ে নিতে পারে। হয়তো ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহের সন্ধান পাবেন। সেখানে পৌঁছানো মানুষের পক্ষে সম্ভব না হলেও দূর থেকে তার পরিবেশ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হতে পারে। মহাবিশ্বের অজানা রহস্য উন্মোচনে এই অনুসন্ধান তাই বিজ্ঞানকে নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।[লেখক: প্রাবন্ধিক]

লালনের সেই সোনার মানুষ কই

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—মরমি সাধক ফকির লালন শাহের এই বাণী কেবল গানের পঙ্‌ক্তি নয়, মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পাওয়ার আহ্বান। জাতপাত, ধর্মীয় বিভেদ, সামাজিক বৈষম্য ও অহংকারের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা।অথচ লালনের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে তিন দিনব্যাপী মেলায় গিয়ে প্রশ্ন জেগেছে—লালনের গান ও উৎসব আছে, কিন্তু তার দর্শনের প্রতিফলন কোথায়?এই প্রশ্নের সঙ্গে সোমবারের (১৯ অক্টোবর) উদ্বেগজনক ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সকালে ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়ির প্রবেশপথের পাশ থেকে একটি টাইম বোমা ও পেট্রলভর্তি দুটি বোতল উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরে পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল সন্দেহজনক বস্তুটি পরীক্ষা করে নিষ্ক্রিয় করে। এ ঘটনায় মাজার ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাধুদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়। যে আখড়াবাড়িতে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে মানবতার বাণী শোনার কথা, সেখানে এমন বিপজ্জনক বস্তু উদ্ধারের ঘটনা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।গানের চেয়েও বড় জীবনদর্শনফকির লালন শাহ, যিনি লালন সাঁই নামেও পরিচিত, ছিলেন বাংলার মরমি সাধক, বাউলগানের রচয়িতা ও মানবতাবাদী দার্শনিক। তার জন্মসাল ও জন্মস্থান নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বহুল প্রচলিত মত অনুযায়ী, তার জন্ম ১৭৭৪ সালে। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় তিনি তিরোধান করেন।লালনের গুরুত্ব শুধু তার গানের সুরে নয়, গানের অন্তর্নিহিত জীবনদর্শনে। ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’—এই গানের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের পরিচয়, জাতপাতের বিভাজন এবং সামাজিক সংকীর্ণতাকে প্রশ্ন করেছেন। তার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, আত্মোপলব্ধি, সাম্য, সহমর্মিতা ও অন্তরের শুদ্ধতা। বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষের প্রকৃত মূল্য তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের ধর্মীয় পরিচয় দেখে তাকে ছোট করা, সামাজিক অবস্থান দিয়ে মর্যাদা নির্ধারণ করা কিংবা নিজের অহংকারকে সত্যের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া—এসব প্রবণতার বিপরীতে লালনের দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লালনের গানের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন এবং তার গান বৃহত্তর শিক্ষিত সমাজে পরিচিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু লালনকে যথার্থভাবে বোঝার জন্য তার গান শোনাই যথেষ্ট নয়; গানের ভেতরের প্রশ্নগুলো নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করাও জরুরি।দর্শনের চর্চা কোথায়লালনের তিরোধান দিবস উপলক্ষে প্রতিবছর ছেঁউড়িয়ায় বাউল, সাধক, ভক্ত, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। গান, সাধুসঙ্গ ও লোকসংস্কৃতির এই আয়োজন বাংলার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মেলায় মানুষের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা কিংবা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কোনো দোষ নেই।সাধুসঙ্গকিন্তু উৎসবের আকার বড় হলেই কি লালনের দর্শনের চর্চা বাড়ে? মেলায় গিয়ে আমার উপলব্ধি হয়েছে, লালনের মানবতাবাদ, জাতপাতবিরোধী অবস্থান ও আত্মোপলব্ধির দর্শন নিয়ে গভীর আলোচনা যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, তার তুলনায় গান, দর্শনার্থীদের ভিড় ও বাণিজ্যিক তৎপরতাই বেশি দৃশ্যমান।লালনের নামে মঞ্চ তৈরি করা সহজ; তার আদর্শে নিজেকে গড়ে তোলা কঠিন। তার গান গাওয়া সহজ; নিজের ভেতরের বিদ্বেষ, লোভ, অহংকার ও সংকীর্ণতাকে প্রশ্ন করা কঠিন। আখড়াবাড়ি কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়, এটি সাধন-ঐতিহ্যের কেন্দ্র। এখানে গান ও উৎসবের পাশাপাশি সাধুসঙ্গ, দর্শনভিত্তিক আলোচনা, গবেষণা এবং আত্মজিজ্ঞাসার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। কত মানুষ এলেন, তার পাশাপাশি কত মানুষ লালনের দর্শন বুঝলেন এবং নিজেদের আচরণে তার প্রতিফলন ঘটালেন—সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।লালনের মেলায় বাণিজ্য, মানুষের প্রতি দায় কতটুকু? তিরোধান দিবসের আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। পরিবহন, খাবার, আবাসন ও হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের ব্যবসা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু উৎসবের সুযোগ নিয়ে খাবারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো কিংবা আবাসিক হোটেলের ভাড়া কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য দুর্ভোগ তৈরি করতে করেছে।মেলায় গিয়ে আমার অভিজ্ঞতায় এসব বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। উৎসবের সময় চাহিদা বাড়লেও মানুষের অসহায়ত্বকে ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখা কতটা মানবিক? লালনের দর্শন যদি আয়োজনের ব্যবস্থাপনাতেই প্রতিফলিত না হয়, তাহলে শুধু তাঁর নামে উৎসব করলেই কি সেই দর্শনের প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো হয়?স্মরণ নয়, ধারণ করতে হবেলালনকে নিয়ে গবেষণা মানে শুধু তার জীবনের তথ্য সংগ্রহ কিংবা গানের সুর বিশ্লেষণ নয়। তার দর্শনের সামাজিক তাৎপর্য অনুধাবন করাও জরুরি। জাতপাত, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, শ্রেণিবৈষম্য ও মানুষের প্রতি মানুষের অবজ্ঞার মধ্যে লালনের চিন্তা কীভাবে প্রাসঙ্গিক, তা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। লালন কেবল গানের মানুষ নন; তিনি প্রশ্ন করার মানুষ। তিনি প্রচলিত সামাজিক বিভাজনকে প্রশ্ন করেছেন, মানুষের অন্তর্গত সত্তাকে চিনতে আহ্বান জানিয়েছেন। তার দর্শনকে মঞ্চ, মাইক, একতারা কিংবা উৎসবের ব্যানারে আটকে রাখলে তার প্রতি যথার্থ সম্মান জানানো হয় না।লালনের গান গাইব, অথচ মানুষের ধর্মীয় পরিচয় দেখে তাকে ছোট করব; তার মানবতার বাণী প্রচার করব, অথচ অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখাব না—এ কেমন লালনচর্চা?সেই সোনার মানুষ কই?ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস আমাদের সামনে আবারও প্রশ্ন তুলেছে—আমরা লালনকে কতটা ধারণ করি? গান হোক, উৎসব হোক, সাধুসঙ্গ হোক, গবেষণা হোক—সবকিছুর কেন্দ্রে থাকুক মানুষ। লালনের দর্শন ধারণ করা মানে মানুষের প্রতি বিদ্বেষ কমানো, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের পরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং নিজের ভেতরের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে লড়াই করা।আখড়াবাড়িতে লেখক (বাম দিকে)।১৯ অক্টোবরের ঘটনাটি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসুক, অপরাধীরা শনাক্ত হোক এবং মাজারে আগত সাধু-ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। একই সঙ্গে এই দিনটি আমাদের বিবেকের কাছেও একটি প্রশ্ন রেখে যাক: লালনের স্মৃতিকে আমরা কতটা মর্যাদা দিতে পেরেছি? তার মানবতাবাদী আদর্শ আমাদের সমাজে কতটা জীবন্ত? উৎসবের আলো একসময় নিভে যাবে, মেলার দোকানপাট উঠে যাবে, দর্শনার্থীরা ফিরে যাবেন নিজ নিজ গন্তব্যে। কিন্তু লালনের দর্শন কি তাদের সঙ্গে ফিরবে? তাদের চিন্তা, আচরণ ও সামাজিক সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আনবে?লালনের সেই ‘সোনার মানুষ’ কোনো বিশেষ পোশাকের মানুষ নন, কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ নন। তিনি সেই মানুষ, যাঁর মধ্যে রয়েছে মানবিকতা, বিবেক, ভালোবাসা ও অন্যের প্রতি সম্মান। তাই এত মানুষের ভিড়ে আমার প্রশ্ন থেকেই যায়—লালন মেলায় সেই সোনার মানুষ কই?লালনের নামে উৎসব হোক, গান হোক, সাধুসঙ্গ হোক, গবেষণা হোক। কিন্তু তার দর্শন বেঁচে থাকুক আমাদের হৃদয়ে, আচরণে ও সমাজে। কারণ লালনকে স্মরণ করার চেয়ে তাকে ধারণ করা অনেক বেশি জরুরি।লেখক: নাসির উদ্দিন পাঠান, গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা।

ভিডিও আরও দেখুন

রেকর্ড গড়া ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে কাঁপালেন বাভুমা

দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট কাপ্তান টেম্বা বাভুমা গেকেবার মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে ১৭৯ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস খেলে বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন রেকর্ডের জন্ম দিয়েছেন। ৩৬ বছর ১৫৪ দিন বয়সে এই অসাধারণ কীর্তি গড়ার পথে তিনি পেছনে ফেলে দিয়েছেন ভারতের সাবেক কিংবদন্তি অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনকেও।ম্যাচের তৃতীয় দিনে বৃষ্টির দীর্ঘ বিরতির পর খেলা শুরু হতেই অস্ট্রেলিয়ার পেসার স্কট বোল্যান্ডের তোপে দক্ষিণ আফ্রিকার টপ অর্ডার মারাত্মক ধসের মুখে পড়েছিল। চরম বিপদের মুখে পড়া দলকে সেখান থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে টেনে তোলেন অধিনায়ক বাভুমা স্বয়ং।চাপের মুহূর্তে রায়ান রিকেলটন, মার্কো ইয়ানসেন ও সিমন হারমারের সঙ্গে যথাক্রমে পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম উইকেটে অত্যন্ত কার্যকরী ও মূল্যবান কয়েকটি জুটি গড়ে তোলেন তিনি। এই সুদৃঢ় অংশীদারত্বগুলোর ওপর ভর করেই মূলত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয় দক্ষিণ আফ্রিকা।দীর্ঘ সময় ধরে ধৈর্যশীল ব্যাটিং করে ম্যাচের শেষপ্রান্তে এসে থামে বাভুমার চমৎকার ইনিংসটি। তার এই অনবদ্য ১৭৯ রানের ওপর নির্ভর করেই প্রোটিয়ারা প্রথম ইনিংসে ৯ উইকেটে ৪২৫ রান সংগ্রহ করে ইনিংস ঘোষণা করে।অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে ১৫০ বা তার বেশি রান করা ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সী অধিনায়ক এখন টেম্বা বাভুমা নিজেই। এই রেকর্ড গড়তে গিয়ে তিনি ভেঙে দিয়েছেন ভারতের সাবেক কাপ্তান মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের দীর্ঘদিনের পুরনো রেকর্ডটি।১৯৯৮ সালে কলকাতার ঐতিহাসিক টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ১৬৩ রানের ইনিংস খেলেছিলেন আজহারউদ্দিন, যেখানে তার বয়স ছিল ৩৫ বছর ৩৮ দিন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে দেড় শ বা ততোধিক রান করার এই বয়স্ক অধিনায়কদের তালিকায় এখন সবার শীর্ষে অবস্থান করছেন বাভুমা। তার আগে এই এলিট লিস্টে নাম লিখিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের ওয়ালি হ্যামন্ড, মাইক ডেনেস ও অ্যান্ড্রু স্ট্রসের মতো প্রবাদপ্রতিম তারকারা।শুধু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই নয়, দক্ষিণ আফ্রিকার নিজেদের মাটিতে টেস্ট ইনিংসে দেড় শ বা তার বেশি রান করা সবচেয়ে বেশি বয়সী অধিনায়কদের তালিকায়ও দুর্দান্তভাবে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ৩৬ বছর ১৫৪ দিন বয়সে এই ঐতিহাসিক কীর্তি গড়ে বাভুমা বর্তমানে আছেন তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে। এই বিশেষ তালিকার একদম শীর্ষে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক আর্থার লিন্ডসে হ্যাসেট।১৯৫০ সালে গেকেবাতেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৬৭ রান করার সময় তার বয়স ছিল ৩৬ বছর ১৮৭ দিন, অর্থাৎ বাভুমার চেয়ে মাত্র ৩৩ দিন বেশি বয়সে এই কীর্তি গড়েছিলেন হ্যাসেট। এই তালিকায় পরবর্তীতে নাম রয়েছে ওয়ালি হ্যামন্ড, ব্রায়ান লারা ও হার্বি কলিন্সের মতো তারকাদের।এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার নিজস্ব অধিনায়ক হিসেবে ঘরের মাঠে টেস্ট ক্রিকেটে বাভুমার এই ১৭৯ রানের অনবদ্য ইনিংসটি এখন চতুর্থ সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড। দেশের মাটিতে তার এই অর্জনের ঠিক ওপরেই অবস্থান করছেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক দুই কিংবদন্তি অধিনায়ক হাশিম আমলা ও গ্রায়েম স্মিথ।হাশিম আমলার ব্যাট থেকে অতীতে এসেছে ২০৮ ও ২০১ রানের চোখ জুড়ানো দুটি ইনিংস, আর গ্রায়েম স্মিথের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত টেস্ট ইনিংসটি ছিল ১৮৩ রানের। কাপ্তানের এই ঐতিহাসিক মারকাটারি পারফরম্যান্স প্রোটিয়া শিবিরে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

রেকর্ড গড়া ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে কাঁপালেন বাভুমা