সংবাদ
গ্যাসের মজুদে চলবে আর ৫ বছর, এরপর কী হবে?

গ্যাসের মজুদে চলবে আর ৫ বছর, এরপর কী হবে?

দেশে চলমান জ্বালানি সংকটে শিল্পোৎপাদন হ্রাস, লোডশেডিংয়ে জনভোগান্তির মধ্যে দেশি গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ ফুরিয়ে আসার তথ্য দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির এক উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে; উৎপাদনও কমছে। বড় আকারের নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের উল্লেখযোগ্য কোন খবরও নেই। এর মধ্যে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক খাতে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে যে হারে গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে অবশিষ্ট গ্যাসের মজুত ২০৩১ সালের মধ্যে প্রায় নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ঢাকায় রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইন মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সিপিডির উপস্থাপনায় গত ১১ আগস্টের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, পাঁচটি গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচালন সক্ষমতার মাত্র ৫৭ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট গ্যাস চাহিদার মাত্র ২৯ শতাংশ সরবরাহ করা হয়েছে। সার কারখানাগুলোও তাদের প্রয়োজনীয় গ্যাসের মাত্র ৩৮ শতাংশ পেয়েছে। এই ঘাটতির কারণে গার্মেন্টস ও সার কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমানো বা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে দেশের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চলমান গ্যাস-সংকট নিরসনে সরকারের সীমিত সামর্থ্য ও বর্তমান কাঠামোগত পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই।তিনি জানান, গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ সংকট বিবেচনায় ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ‘ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট’ (এফএসআরইউ) বা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান নিয়ে কাজ চলছে।চলমান গ্যাস সংকট নিরসনে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে উল্লেখ করে জ্বালানিনিমন্ত্রী বলেন, ‘এইটুকুই বলতে চাই, উই আর ওয়ার্কিং...এই ক্রাইসিসের সময় আসলে এখন আমার কিছু করার নাই। কারণ, এখন আমি গ্যাসও উত্তোলন করতে পারব না বা উইদাউট এফএসআরইউ, আমার যে গ্যাস আছে, সেটাও নামাতে পারব না।’গ্যাসক্ষেত্রবর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ হয় প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে প্রায় ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস।তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জন্য বর্তমানে বাংলাদেশের মহেশখালীর উপকূলে দুটি এফএসআরইউ রয়েছে- একটি সামিটের অন্যটি এক্সিলারেটের। আগুন লাগার কারণে এক্সিলারেটের টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় সেই সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। মেরমতের মাধ্যমে একটি ইউনিট চালু করা গেলেও অপরটি এখনো বন্ধ রয়েছে। বিদেশি প্রকৌশলীরা এফএসআরইউ মেরামতে কাজ করছেন উল্লেখ করে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘এখন শুধু আমাকে দিন গোনা ছাড়া আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছে এফএসআরইউতে, এটা করা ছাড়া আমার কিছু নাই। আর কিছু ম্যানেজমেন্ট করা, যাতে কম লোডশেডিং হয়। যাতে আমি ইন্ডাস্ট্রিকে গ্যাসটা দিতে পারি, এই ম্যানেজমেন্টটা করা। এ ছাড়া আপনিই বলেন আমার হাতে আর কী থাকতে পারে।’তিনি বলেন, ‘এফএসআরইউটি মেরামতের পর এর দুটি বয়লারকে সমন্বিতভাবে চালু করতে আরও ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে। ফলে ওই সময়ে গ্যাস সরবরাহে আবারও বড় ধরনের সাময়িক ঘাটতি তৈরি হতে পারে।’ জ্বালানিমন্ত্রী জানান, নতুন টার্মিনালগুলো নির্মাণে বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করা একটি মার্কিন প্রতিনিধি দলও এফএসআরইউতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের আগ্রহ প্রকাশ করে দ্রুত চিঠি দিতে বলেছি, যাতে প্রকল্পগুলো নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি।’চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে বক্তব্যে মন্ত্রী বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। দেশে বিদ্যুতের চাহিদার ‘ধরন’ বদলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকত। এখন মধ্যরাতেও চাহিদা বেশি থাকে। আগের দিন রাত ১২টার দিকে দেশে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল জানিয়ে এর কারণ হিসেবে রাতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়ার প্রবণতার কথা বলেন মন্ত্রী।এলএনজি টার্মিনালএসব বাহনকে ‘গরিবের টেসলা’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাতে চার্জে বসে। এসব চার্জিংয়ের বড় অংশ অবৈধ সংযোগে চলে।’ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের বাধা ও হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন মন্ত্রী।এলএনজি ক্রয় চলমানক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউর কারণে সরকার এলএনজি আমদানি বন্ধ করেনি উল্লেখ করে মন্ত্রী ইকবাল হাসান বলেন, ‘আমরা গতকাল (বুধবার) চারটি এলএনজি কার্গো কিনেছি, যাতে এফএসআরইউ প্রস্তুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব কার্গো দেশে পৌঁছাতে পারে।’ এসব ক্রয়কৃত এলএনজি দ্রুত খালাস করা সম্ভব হলে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি চালু হওয়ার পর গ্যাস সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। অনুষ্ঠানে জ্বালানিমন্ত্রী দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা এবং বেসরকারি খাতে তেল আমদানির সুযোগ দিতে নীতিমালা তৈরীর উদ্যোগের কথাও জানান। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) দ্রুত খননকাজ চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়াতে আরও দুটি রিগ আনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।’  জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সব অংশীজনের সঙ্গে বসব, তাদের মতামত নেব এবং কীভাবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে জ্বালানি তেলের বাজার কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করব।’গ্যাসের মজুত ‘সংকটজনক পর্যায়ে’সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফখরুল আল কবির অনুষ্ঠানে গ্যাসের বর্তমান চাহিদা ও সরবরাহ এবং মজুদ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। উপস্থাপনায় ছয় দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে গ্যাসের মোট ব্যবহার প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে অবশিষ্ট গ্যাসের মজুত প্রায় নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান হারে গ্যাস ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ২০৩০-এর দশকের শুরুতেই মজুত সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাস সংরক্ষণ ও দেশে নতুন গ্যাসের অনুসন্ধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।উপস্থাপনায় বলা হয়, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার ৪২ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক। এ ছাড়া কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ওপরও উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। ফলে দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের কথা বলেছে সিপিডি। স্বল্প মেয়াদে এলএনজি ক্রয়ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা, মূল্য নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় সংস্কার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। মধ্য মেয়াদে এলএনজি টার্মিনাল ও সংরক্ষণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থায় বিনিয়োগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের কথা বলা হয়েছে। ফখরুল আল কবির বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে জাতীয় জরুরি অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। কারখানায় ‘৩৫-৪০%’ উৎপাদন হ্রাসবাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ অনুষ্ঠানে বলেন, দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। তিনি বলেন, এই সংকটের ফলে শিল্প খাত গভীর বিপর্যয়ে পড়েছে। সংকট বড় করে প্রচার হওয়ায় তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।উচ্চ হারে বিল দিয়েও সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় আছেন উল্লেখ করে বিসিআই সভাপতি ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বাঁচাতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি জরুরি সুরক্ষা বা ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ দেওয়ার দাবি জানান।ল্যান্ডবেজড টার্মিনালবাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে দেশের একটি বড় অংশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র টানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশীয় কূপে উৎপাদন দ্রুত কমতে থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সময়সাপেক্ষ। তাই দ্রুত সংকট মোকাবিলা ও ভবিষ্যৎ জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘ল্যান্ডবেজড টার্মিনাল’ বা স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের ওপর তাগিদ দেন তিনি।রিনিউয়েবল এনার্জিবাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়ার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট কাটাতে কাস্টমস ও প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত দূর করতে পোর্টের খালাসপ্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। স্টোরেজ প্রযুক্তিতে শুল্কছাড় দেওয়া এবং ১৩ লাখ ডিজেলচালিত সেচপাম্প সোলারে রূপান্তর করলে দ্রুত সাশ্রয় সম্ভব।সিস্টেম লস জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বক্তব্যে দেশের তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটের জন্য সরকারের অতিরিক্ত সামাজিক প্রতিশ্রুতি, সঠিক মূল্যনীতির অভাব ও সিস্টেম লসকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, সংকট সমাধানের চেষ্টা না করে বছরের পর বছর তা জমিয়ে রেখে আজ এ পর্যায়ে আনা হয়েছে। কেবল সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা না করে চাহিদা নিয়ন্ত্রণেও জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন ও আবাসিকে ভর্তুকি মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করার কারণে সরকার এখন বড় অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে। কোনো সরকারের পক্ষেই হঠাৎ এ ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়। তাই বাস্তবভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ও চুরি বন্ধের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি শিল্প খাতকেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান লোডশেডিংয়ের সূচিসিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘জ্বালানি সংকটে দেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় আমাদের মানসম্মত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ জরুরি।’ তিনি লোডশেডিংয়ের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ ও সিস্টেম লস কমানোর তাগিদ দেন। এ ছাড়া সোলার স্টোরেজে করছাড় এবং শিল্প খাতকে জ্বালানি বণ্টনে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের টেকসই সমাধানে সাময়িক পদক্ষেপের বদলে ১০ বছর মেয়াদি সমন্বিত নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেন সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, জ্বালানি খাতে সঠিক বাজারভিত্তিক মূল্যনীতি এবং নির্ধারিত লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি না থাকায় সংকট আরও গভীর হয়েছে।ফাহমিদা খাতুন বলেন, শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে অতীতের সুশাসনের অভাব ও সংস্কারহীনতা দূর করে সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা প্রমুখ।
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

ঢাকা ক্লাব লাইব্রেরি: শতবছরের কল্লোল

একথা নিশ্চিত করেই বলা যায়, ঢাকা শহরের সবচেয়ে প্রাচীন এক সামাজিক ক্লাবের নাম ঢাকা ক্লাব। ১৯১১ সাল থেকে ঢাকার শাহবাগ এবং রমনার সবুজ বনানী ঘেঁষে  এর যাত্রা শুরু হয়। ইতিহাস বলে, ঢাকার নবাবদের বাগান বাড়ি এলাকার বিশালায়তনের ভূমি নিয়ে ভারতবর্ষে কর্মরত বৃটিশ সিভিল সার্ভেন্টরা তথা ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং কালেক্টরগণের উদ্যোগে এ ক্লাবের গোড়াপত্তন হয়। উল্লেখ করা যায় যে, উনবিংশ  শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে ভারতের বিভিন্ন বড় শহরে একই ধরনের ক্লাব-সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। যদিও বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে খানিকটা বিলম্বে এসে এ সকল স্টেশনক্লাবের সূচনা হয়। বলা হয়ে থাকে, বৃটিশ সিভিল সার্ভিস ১৭৬৫ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত   কোম্পানির শাসন অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা শাসিত হয়।  তাদের ঔপনিবেশিক শাসন চলে মূলত ১৮৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সময়ে। সে সময় কালেই তারা ভারতবর্ষের নানা গুরুত্বপূর্ণ শহরে বিশেষ করে দিল্লি, বোম্বে, পাঞ্জাব, কলকাতায় গড়ে তোলে ইংরেজ স্টেশন ক্লাব। যেখানে গান বাজনা, আড্ডা, নেটিভদের ওপর শাসনের কলাকৌশল নিয়ে ভাবনা এবং একইসঙ্গে শারীরিক কসরতের নিমিত্ত এক জনবিচ্ছিন্ন  নিরাপদ স্থান গড়ে তোলে।২.ঐতিহাসিক তথ্য-কণিকায় জানা যায়, আজ থেকে ১৩১ বছর আগে ঢাকা যখন প্রাদেশিক রাজধানীর স্বীকৃতি লাভ করে, তখন থেকেই বৃটিশ শাসকরা ঢাকায় ক্লাব গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। তাছাড়া ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পরে তারা মফস্বল শহর ঢাকাকে নতুন আদলে গড়ে তোলার প্রয়াস হিসেবে এখানে একটা অভিজাত ক্লাব প্রতিষ্টার উদ্যোগ নেন।     কথিত আছে, ঢাকা ক্লাব প্রতিষ্ঠার সূচনা লগ্নে কয়েকজন বৃটিশ কর্মকর্তার সঙ্গে তিনজন পুলিশ অফিসার এবং তৎকালীন সময়ের ঢাকার একজন করে বড় ব্যবসায়ী, ডাক্তার, প্রকৌশলী ও ব্যাংকারের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি বাই ল স্বাক্ষরের মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেকালে বৃটিশ সিভিলিয়ানদের সান্ধ্য ক্লাবে বিলিয়ার্ডসহ নানা ইনডোর গেমের সঙ্গে নেশা জাতীয় পানীয় যেমন থাকত, তেমনি কতিপয় আইনের বইসহ গল্প, কবিতা, গানের বইও থাকতো বলে এদের অনেকের স্মৃতি কথায় তা ওঠে এসেছে। এটাও অনস্বীকার্য যে, সাতসমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসা পরিবারবিহীন তরুণ  সিভিলিয়ানদের একাকীত্বকে দূরে রাখার উদ্দেশেই এ অঞ্চলে এজাতীয় ক্লাব-সংস্কৃতি শুরু হয়।   ৩. ইতিহাস ঐতিহ্যের গর্বিত ধারক ঢাকা ক্লাবে একটা অতি সমৃদ্ধ ও মানসম্মত লাইব্রেরি রয়েছে। তবে  লাইব্রেরির আনুষ্ঠানিক যাত্রা কবে থেকে হয়, হাতের কাছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। হরেকরকম বইপুস্তক ও প্রাচীন পত্র-পত্রিকার সংকলনসহ সেখানে দুর্লভ কিছু অজানা ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায়। আগ্রহী পাঠকের জন্য রয়েছে চমৎকার অনুকূল ব্যবস্থা। তবে পাঠক সীমাবদ্ধতার কারণে লাইব্রেরির ব্যবহার খুব বেশি হচ্ছে না। এখানকার পাঠক বলতে  সবাই ক্লাব সদস্য হওয়ায় লাইব্রেরিটা প্রায় সুনশান-নিস্তব্ধ। এখানে বাইরের পাঠকের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। এক সময়ের প্রবীণ সদস্যগণ যারা ক্লাবমুখী ও বইবান্ধব ছিলেন তারা অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। অন্যদিকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির আশীর্বাদ নিয়ে মানুষ আজকে  ঘরে বসেই পছন্দের বইয়ের ওপর চোখ রাখতে সক্ষম হচ্ছে। মৌলিক গবেষণার কাজও আজকাল আর সেই আগ্রহ ও আন্তরিকতা দিয়ে হচ্ছে না। ফলে দেশের অসংখ্য লাইব্রেরি পাঠক হারিয়ে ক্রমাগত অতীতের জৌলুশ হারানোর শঙ্কায় উপনীত। জেনে রাখা ভালো, এ মুহূর্তে ঢাকা ক্লাবে মোট বইয়ের সংখ্যা ১৮,১০০ বা এর কাছাকাছি। এর মধ্যে বাংলা বইয়ের সংখ্যা ১০,২২২টি, ইংরেজি বই ৭,৮৭৮টি। গল্প, উপন্যাসের সংখ্যা ৪,৩৬৮ টি, ফিকশন ৪,৩১০ টি, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, রাজনীতি মিলে ১,১৪২টি, অর্থনীতি ২২৯টি, স্পোর্টস ১৪০টি, রেফারেন্স বই ১,১৬২টি, ছোটদের বই ৬৪৭টি, আত্মজীবনী ১৮৫টি ইত্যাদি। এসব মূল্যবান বই সংরক্ষণের জন্যে সেখানে রয়েছে মোট ৫৪টি বুক শেলফ এবং পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা। এবং সেখানে  লাইব্রেরিয়ান হিসেবে পদায়ন করা আছে একাধিক কর্মচারী। দেখলে মনে হবে, যুগ যুগ ধরে শেলফে দাঁড়িয়ে থাকা শত-শত বোবা বই তাকিয়ে আছে অচেনা কোনো পাঠকের আঙুলের সামান্য একটু স্পর্শ পাওয়ার জন্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘লাইব্রেরি’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘শঙ্খের মধ্যে যেমন সমুদ্রের শব্দ শুনা যায়, তেমনি এই লাইব্রেরির মধ্যে কি হৃদয়ের উত্থান পতনের শব্দ শুনিতেছ? এখানে জীবিত ও মৃত ব্যক্তির হৃদয় পাশাপাশি একপাড়ায় বাস করিতেছে’। ৪.ঢাকা ক্লাব লাইব্রেরিতে রক্ষিত হাজার হাজার বইয়ের কাতারে এমন অসংখ্য বিখ্যাত ও প্রথিতযশা লেখকের বই রয়েছে। যারা নিজেরা ক্লাব সদস্য হয়ে সৌজন্য কপি হিসেবে ক্লাবের লাইব্রেরিকে উপহার দিয়েছেন। লেখকদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই কিন্তু তাদের স্বাক্ষরিত বইটি অক্ষয় স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো, এ লাইব্রেরিতে বাংলাভাষার চিরায়ত সাহিত্যের অনেক জনপ্রিয় ও কালোত্তীর্ণ বইয়ের প্রথম প্রকাশিত সংখ্যাটি রয়েছে। যা দেশের অন্য কোনো বইয়ের দোকানে সচরাচর পাওয়া সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে দুটো বইয়ের কথা বলা যায়, প্রথম-বিখ্যাত ভ্রমণ কাহিনি লেখক ও সাংবাদিক যাযাবর (বিনয় মুখোপাধ্যায়) এর ‘দৃষ্টিপাত’ বইটা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৫৩ বঙ্গাব্দ বা ১৯৪৭ সালে। প্রকাশক, নিউ এজ পাবলিশার্স লিমিটেড, কলকাতা। মূল্য তিন টাকা।দ্বিতীয় -সৈয়দ মুজতবা আলী’র প্রথম বই ‘দেশে-বিদেশে’র প্রথম প্রকাশকাল ১৩৫৬ বঙ্গাব্দ বা ১৯৪৯ সালে। প্রকাশক একই। বইটির মূল্য ধরা হয়েছে পাঁচ টাকা। উল্লেখ্য যে, বইয়ের প্রথম প্রকাশকালে লেখকের নাম ড. সৈয়দ মুজতবা আলী লেখা রয়েছে। মনে হয়, পরবর্তীকালে সৈয়দ মুজতবা আলী লেখক হিসেবে ‘ডক্টর’ শব্দটি আর লেখেননি।[লেখক: গল্পকার]

আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি মৌলিক অধিকার

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সকলের মত দেশের আদিবাসীরা ভেবেছিল সকল বৈষম্য দূর করে তাদের ন্যয্য অধিকার বাস্তবায়ন করা হবে কিন্তু আদৌতে যে লাউ সে কদুই রয়ে গেল। আদিবাসী শব্দটি নিয়ে দেশের বিভিন্ন মহলে রয়েছে বিতর্ক ও আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাষ্ট্রের রয়েছে আপত্তি। কিন্তু আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে কিসের এত আপত্তি? পৃথিবীর শান্তির সংঘ যেটাকে বলা হয় জাতিসংঘ। সেই ‘জাতিসংঘ’ যখন আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্রই সমর্থন করেছিল। জাতিসংঘের রিপোর্ট মি. মাইগেইল এলফনস কভো তার গবেষণা পত্রে ‘স্টাডি অব দি প্রোব্রেল্মস অব সিক্রিমিনেশন এগেইনস ইন্দিজিনিয়াস পপুলেশন’- এ সকল জনগোষ্ঠিকে আদিবাসী হিসেবে উল্লেখ করে স্বীকার করেছেন।   কিন্তু ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অনেক সরকারি দলিলে আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে বা হয়ে আসছে।১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি এই অঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক শাসনতান্ত্রিক ও আইনী দলিল হিসেবে স্বীকৃতি। উক্ত শাসন বিধির ৪, ৬, ৩৪ ও ৫০ প্রভৃতি ধারায় আদিবাসী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই শাসন বিধি তফসিলে আইনের মধ্যে দি ইন্দিয়ান ইনকাম টেক্স এ্যাক্ট অব ১৯২২, দিন ইন্দিয়ান ফাইনেনস টেক্স এ্যাক্ট অব ১৯৪১, দি ফরেষ্ট এ্যাক্ট অব ১৯৭২ প্রভৃতির ক্ষেত্রেও আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ ছিল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখা স্মারক নং- সংস্থাপন (এডি- ২)-৩৯/৯১-১৪৩ তারিখ-১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১। আদিবাসী জনগোষ্ঠির কনভেশনে ১৬৯ প্রসঙ্গে বিশেষ বিভাগে পরিপত্রেও আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসী ও উপজাতিদের জন্য চাকরির বয়স সীমায় স্বাভাবিক বয়স সীমায় তুলনায় দশ বছর এবং শ্রম সাধ্য কাজের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত শিথিল করা হয়েছে।’ ১৯৯৫ সালে জাতীয় সংসদে গৃহীত ১২নং আইনেও এ আইনের কার্যকারিতার প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক ১২ জুলাই ১৯৯৫ লেখা সরকারি পরিপত্রেও আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ করা হয়। এমনকি ২০০০ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে জাতীয় আদিবাসী সমন্বয় কমিটির প্রকাশনা ‘সংহতি- ২০০০’ এ প্রদত্ত বাণীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ করেছেন। তাছাড়াও বাংলাদেশে বিশ লাখ আদিবাসী রয়েছেন বলে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। তাহলে এখন কেন বাংলাদেশের আদিবাসীদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি হিসেবে বলা হচ্ছে। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াও একইভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে ‘সংহতি- ২০০৩’ এ প্রদত্ত বাণীতে আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ করেছেন। আন্তর্জাতিকভাবে ওহফরমবহড়ঁং একটি জেনেরিক শব্দ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ২০০৭ সালে এটা গৃহীত হয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। আমাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।ব্রিটিশ আমল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ওহফরমবহড়ঁং ছিল, সমতলেও ছিল। এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে যখন আদিবাসী বলা হলো, তখন তো কেউ কোনো সমস্যার কথা বলেনি। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে ১৯৭২ সালে ওহফরমবহড়ঁং ধহফ ঞৎরনধষ চড়ঢ়ঁষধঃরড়হং ঈড়হাবহঃরড়হ ১৯৫৭, ঈড়হাবহঃরড়হ ১০৭ ড়ভ ১৯৫৭ অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ সরকার। সেটা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই। তখন কেউ সমস্যা দেখেনি। এখন কেন দেখছে? আশির দশকে জাতিসংঘে লিখিতভাবে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে যে আদিবাসী রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতেও এটা বলা হয়েছে। গত কয়েক সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে প্রধানমন্ত্রীরা যে শুভেচ্ছাবাণী পাঠিয়েছেন সেখানেও আমাদের আদিবাসী বলে সম্বোধন করা হয়েছে। সমস্যা দেখা দিয়েছে ২০১০ সালের পর থেকে।  জাতিসংঘের স্পেসিলাইজ এজেন্সি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ১৯৫৭ সালের ইন্দিজিনিয়াস অ্যান্ড ট্রাবল পপুলেশন কনভেশন-১ (১০৭নং) অনুষ্ঠিত হয়। সেই কনভেশন-এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, আদিবাসী জনগোষ্ঠির সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশ বিকাশের বৃদ্ধি সাধন ও জীবন মানোন্নয়নের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো দায়িত্ব পালন করবে। অথচ বাংলাদেশ অন্য দেশের মতো জাতিসংঘের অন্যতম সদস্য হিসেবে রয়েছে। সেই বাংলাদেশ সরকার এখন আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে উল্টো তাদের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি’ বলে হচ্ছে। তাতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে কিনা সন্দিহান। এছাড়াও পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসী সর্ম্পকিত গ্রাফিতি সংবলিত মুছে ফেলানোর মতোও অপকর্ম করা হয়েছিল। যা ঢাকার রাজপথে আদিবাসী ছাত্রদের উপর হামলা করা হয়েছিল।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)-এর অনুযায়ী প্রথম ডিজিটাল ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বোচ্চ ৯ লাখ ৯০ হাজারের বেশি নৃগোষ্ঠীর বসবাস এবং সর্বনিম্ন বরিশাল বিভাগে। এই দেশের সব মানুষের সমান অধিকার এ কথাটি তখনই আমরা বিশ্বাস করব যখন ‘পার্বত্য চুক্তি’ যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করা হবে। খাগড়াছড়ির ভাইবোনছড়ায় ত্রিপুরা আদিবাসী মা-বোন ওই কিশোরী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হবে না (২৭ জুন ২০২৫)। সাঁওতালকে তার বাড়ি সামনে উন্নয়নের নামে ইকো নামে পার্ক দেখতে হবে না। কল্পনা চাকমার মতো সহজ-সরল কোন আদিবাসী মেয়ে নারী অপহৃত হবেন না, এমনকি আলফ্রেড সরেনের মতো কোন যোদ্ধা হত্যার স্বীকার হতে হবে না। লংগদু সুজাতা চাকমার মতো অকালে জীবন দিতে হবে না। আদিবাসীদের সংবিধানের অধিকারের বিষয়টির ব্যাপারে রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বিশেষে দেশের সিভিল সমাজ তথা সবাইকে ভাবতে হবে এবং সেই সমস্ত বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শীঘ্রই আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হোক। পর্যটনের নামে স্থানীয় আদিবাসীদের জায়গা দখল করা হবে না এটাই বর্তমান সদাশয় সরকারের কাছে প্রত্যাশা। পরিশেষে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সদাশয় সরকারের কাছে বিনম্রচিত্তে প্রত্যাশা রাখতে চাই- আমরা যুগ যুগ ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি, সমতলে গারো, সাঁওতালসহ প্রভৃতি জাতিসত্তার মানুষের জন্য ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করছি। এটা শুধু শব্দ নয়। এটা আমাদের আত্ম-পরিচয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সভাপতি, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাজদ্বীপ, রাঙামাটি]  

রম্যগদ্য: ‘বিলাতি মেমের চাপে বাঙালি বেগম কাঁপে’

হি হি, কি যে কন “বিলাতি মেমের চাপে বাঙালি বেগম কাঁপে!” আরে আমগো শখিনা জরিনা এই সব বঙ্গালি খান্ডারনি বেগমের লগে কি পারবো আপনার বিলাতি বেগম! মুখে তুই যাই বল, তোর ভাষায়, শখিনা জরিনা এই সব বঙ্গালি খান্ডারনি বেগমরা তো দেখছি বিলাতি বেগমের কাছে একেবারে নস্যি পদে পদে হোঁচট খাচ্চে! হুরর এই কতা কোইলে হোইবো? বাঙলার মাটি বাঙলার জল, বাঙলার বায়ু বাঙলার ফল এইসবের সঙ্গে বিলাতি মেমের পরিচয় হওনের পর না হ্যেই বাঙালী বেগমর কাঁপাইবো? বিলাতি মেম তো বাঙলার রাস্তাঘাট কিছুই ঠিকমতো চেনে না। আপনেই কন বিলাতি মেম ক্যেমনে বাঙালি বেগমের সাথে পারবো?আরে বুড়বক “লন্ডন ফগ” এই “লন্ডন ফগ”এর মানে জানিস?জ্বী, না। “লন্ডন ফগ” এইডা আবার কী? এইডা কি কোনো আইসক্রীমের নাম? খাওন যায়?এই খানেইতো, তোর বাঙালী বেগম মার খাচ্ছে। “লন্ডন ফগ” হচ্ছে লন্ডনে মাঝে মাঝে এ্যমোন ফগ মানে কুয়াশা হয় যে দু’হাত দূরের জিনিস দ্যেখা যায়না। সেই “লন্ডন ফগ-এর মাঝে আমাদের বিলাতি মেম যুগের পর যুগ কাটিয়েছেন, বুঝেছিস বিলাতি মেম অন্ধকারে থেকেই বলে দিতে পারেন কে বন্ধু আর কে শত্রু। তাই তোর বাঙলার রাস্তঘাট, অলিগলি, চোরাগুপ্তা মার সবই ওঁরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারেন, সব কিছু প্রায় দিব্য চক্ষু দিয়ে দেখতে পারেন। এ যেন শিব ঠাকুরের তৃতীয় নয়ন।ভাইরে আপনে যদি এ্যতোই আঁন্ধার রাইতে কোইতে পারেন কে বন্ধু কে শত্রু, কে ভালো কে মন্দ, কে চোর কে ডাকাইত, তায়লে তিন দিন না যাইতেই কোইলেন, আমি কিন্তু আমার দরবারের ইম্পোর্টেড নব রত্ন চেঞ্জ কোইরা লুক্যাল পাবলিকরে চান্স দিমু! তায়লে আপনের বিলাতি মেম তো ফেইল মারলো। আমি আগেই কোইছিলাম বাঙলার মাটি বাঙলার জল, বাঙলার বায়ু বাঙলার ফল, বাঙলার রাস্ত ঘাট, অলি গলি, চোরা গুপ্তা মাইর, এইসব নাবুইঝা বিলাতি মেমরে দায়িত্ব দিলে ধরাতো খাইবেনই।আরে ভাই “ওয়ান স্টেপ ফরওর্য়াড, টু ষ্টেপস ব্যাক” মানে বুঝিস, বিলাতি মেমরা অনেক ধী’শক্তি সম্পন্ন, তারা কখনোই সেকেন্ড লাইন অব্ধসঢ়; ডিফেন্স ছাড়া আগাবেন না।হা হা. হাসাইলেন মিয়া, সেকেন্ড লাইন অব ডিফেন্স! প্রতিদিন প্রথম লাইনেই যেই ভাবে পাবলিক থ্যেইক্কা মাল কামাইতেছে, এর উপর যদি আবার সেকেন্ড লাইনরে মাল দিতে হয়, তায়লেতো হকার মকার, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার, ভূমি দস্যু, বালু খেকো ছলিম, ব্যেবাগতে চাট্টি বাট্টি গুটায়া দ্যেশের থ্যেইক্কা পুশ আউট কইরা বেগম পাড়ায় যায়া ঘর বাঁধবো।ধ্যাৎত্তেরি, তোর সঙ্গে কথা বলাই ঝকমারি। সেকেন্ড লাইন অব ডিফেন্স মানে টাকা তোলার সেকেন্ড লাইন নয়, সেকেন্ড লাইন অব্ধসঢ়; ডিফেন্স মানে যদি কেউ কাজ ঠিক মতো না পারে তাহলে তার পরিবর্তে আর একজন সাথে সাথে দায়িত্ব নিবেন। কাজ যাতে সুন্দর গতিতে এগিয়ে যায়। কাজের যাতো কোনো ব্যাঘাৎ না ঘটে।হীঃ হীঃ কি সুন্দর কোইলেন, কাজের যাতো কোনো ব্যাঘাৎ না ঘটে! আরে মিয়া ব্যেবাগ মেগা প্রজেক্ট বন্ধ, কেউ কোত্থাও নেই। ব্যেবাগ বড় বড় সাইটে শুন শান, কব্বরের নীরবতা, ড্রিল মেশিনের চিল্লানিতো নাইই, এ্যমোন কি একটা কুত্তার ডাকও শোনা যায়না! আপনে কন সেকেন্ড লাইন অব ডিফেন্স মানে, কাজ যাতে সুন্দর গতিতে এগিয়ে যায়। কাজই নাই কাজ আবার সুন্দও মতো আ¹ায় ক্যেমনে!!বাহ কর্মদোষে যারা তাদের মেগা প্রজেক্ট বন্ধ কোরে পাইলয়েছে, তারা আবার ফিরে আসবে এটা কেবল সময়ের ব্যাপার। দ্যেখনা তোর ডিসেম্বরের মাঝেই হারানো দিনের মতো যারা হারিয়ে গিয়েছিলো তারা আবার ফিরে আসবে, এই ধনসিঁড়ি নদীটির তীরে, হয়তো রাণী নয়, সম্রাজ্ঞী নয়, কয়েদীর স্বল্প পোষাকে...ভাইডি কি যে কন স্বল্প পোষাকে!! এইডা কি আপনের বিলাতের সী’বিচনি যে কেবল দুই পিস স্বল্প পোষাক পিন্দা ঘুরবেন!ভেবে দ্যেখ আমাদের বিলাতি জনগন কত্তো সভ্য হাতের কাছে সব স্বল্প বসনা, উদভিন্না নারীরা হেঁটে ব্যেড়াচ্ছে, ছুঁয়ে দ্যেখাতো দূরের কথা কেউ একটু চোখ তুলেও তাকায়না। আর তোদেও এখানে শালোয়ার-কামিজ থ্রী’পিস পরে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে স্নান করলে তার ভিডিওতে টু’মিলিয়ন লাইক। ভাবতে পারিস ক্যেমোন সব ভদ্র সভ্য সন্তানের হাতে আজ বাংলার ভাগ্য নির্ধারিত।বাঙলা মা আজ গর্বিত। তার বিলাত থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত সভ্য সন্তানরা দেশ পরিচালনার ভার পেয়েছেন। এবার বুঝি সোনার মৃগ দ্যেয় বুঝি দ্যেয় ধরা...সোনার মৃগ ধরা দিবো কিনা জানিনা, তয় এবার আপনের বিলাইতি ম্যেম আর বাঙ্গালী বেগমের চুলাচুলি বন্ধ না করলে কোইলাম খবর আছে। সোনার মৃগ তো ধরা পড়বোই না, কিন্তু আপনে সিধা ধরা খাইবেন।না না আর নেগেটিভ কথা বলিস না, এবার যে কোরেই হোক, বিলাতি মেমে আর বাঙালি বেগম দুই বোন একসাথে মিলেমিশে থাকবে দেশে আবার ফুল ফুটবে, আবার তোর মেগা-প্রজেক্ট গুলোতে ড্রীল মেশিনের কোলাহলে দেশ আবার এগিয়ে যাবে, জিডিপি বাড়বে, ভাবতেই গাটা শিউরে উটছে।দোয়া করি আপনে বিলাতি-বাঙালী দুই বোইনরে মিলায়া সংসারটা সুন্দর করেন।কাউয়ার মতুন একচোখা না হয়া দুই চক্ষুদিয়া সব কিছু দ্যেইক্ষা শুইন্না আ¹ুয়া জান আমরা আছি আপনের সঙ্গে...জয়য়য়...ভাইয়া, জাউ¹া ব্যান্ড সঙ্গীত গামু না![লেখক: চলচ্চিত্রকার]

অবিচারের পুনরাবৃত্তিই কী চলতে থাকবে!

অবশেষে সাবেক ডাকসু ভিপি আখতারুজ্জামানকে তিন দিনের রিমান্ডে প্রেরণ করা হয়েছে। গত ৫ আগস্ট রাতে গুলশান থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ ডিবি। নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে আটক করা হয়েছে। ঐ দিন এক ডিবি কর্মকর্তা অবশ্য আরও বলেছিলেন ‘আমরা জানতে পেরেছি, গাজীপুরে সম্ভবত তার নামে খুনের মামলা আছে’। বাহবা দিতে হয় ঐ ডিবি কর্মকর্তাকে। ৫ আগস্টের দু’বছর পরে তিনি বলছেন, সম্ভবত (অর্থাৎ পুলিশ নিশ্চিত নয়) তার নামে গাজীপুরে খুনের মামলা আছে।কাউকে রিমান্ডে নিতে হলে রেওয়াজ অনুযায়ী রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করে থাকেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণে আসামির মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে’। আখতারুজ্জামানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে হাসি পেলো এ যুক্তির সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তার আরও যুক্তি দেখে। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে দাবি করেন, ‘আসামির হেফাজতে থাকা অবৈধ ককটেল বোমার উৎস সম্পর্কে তথ্য জানতে তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন’। অর্থাৎ আক্তারুজ্জামানের হেফাজতে ককটেল বোমা রয়েছে। আর কতকাল আমাদের পুলিশ বিভাগের এ ধরনের পারংগমতা দেখতে হবে!যতদূর জানি আখতারুজ্জামান আত্মগোপনে ছিলেন না। চলাফেরা সীমিত হলেও গুলশানেই তার আবাসস্থল ও ব্যবসা বানিজ্যকে কেন্দ্র করেই ছিলেন। আমার গুলশানস্থ চাকরিস্থলেও গল্প করার জন্য তিনি একদিন আসতে চেয়েছিলেন। আমি কি মনে করে যে সময় দেই নাই। যেহেতু তিনি ২০২৪ এ আওয়ামী লীগ থেকে নৌকায় নির্বাচন না করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন এবং ‘বিজয়ী’ হয়েছিলেন, সে সুযোগে ৫ আগস্টের আগে পরে তিনি অনেকটা স্বতন্ত্রই হয়ে যান। তিনি দলীয় নেত্রীর অনুমতি না নিয়ে বা অন্তত তাকে অবগত না করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দলের সঙ্গে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয় বলে জেনেছি।পাঠকের বা পুলিশ কর্মকর্তাদের আগ্রহ জন্মাতে পারে, আমি আবার এতো সব কি ভাবে জানলাম! জানলাম যোগাযোগ ছিল বলেই। প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারির দিনে এবং তার আগে পরে আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হতো। ১৯৮৩-র ১৪ ফেব্রুয়ারি, সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের এক মাইলফলক হিসেবে আমাদের স্মৃতিতে অমলিন। সে দিন যে স্ফুলিংগ সৃষ্টি হয়েছিল তা-ই ১৯৯০ - এ দাবানলে পরিণত হয়েছিল। ঐ সময়ে আমরা যারা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সূচনা পর্বের নেতৃত্বে ছিলাম, তারা যে দলেই থাকি বা না থাকি আমাদের মধ্যে একটা যোগাযোগ, দেখা সাক্ষাৎ ছিলো ও আছে। বিগত দুই বছর ১৪ ফেব্রুয়ারিতে আখতার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা না হলেও ঐ দুই দিন এবং আগে পরে তার সঙ্গে টেলিফোনে অনেক কথা হয়েছে। স্মৃতিচারণ ছাড়াও বর্তমান রাজনীতি বিরাজনীতি নিয়েও অনেক কথা হয়েছে। সে সব কথা থেকেই এ সব জানা বা বোঝা। তিন চার মাস তার সঙ্গে কথা হয় না। এই সময়ে তার পূর্বের চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন হয়েছে বলে তো মনে হয় না।আখতারুজ্জামান রাজনীতিতে প্রবেশ করেন জাসদ ও পরবর্তীতে বাসদ-এ যুক্ত হয়ে। বাসদে বিভক্তির পরে তিনি যে অংশে ছিলেন তা ক্রমশ খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি নীতি নির্ধারকদের পর্যায়ে তো ছিলেন না। তার রাজনৈতিক জীবন বিশেষ আলোচিত না হলেও ছাত্র আন্দোলনের জীবনটা কিন্তু খুবই বর্ণাঢ্য ছিল। সবে কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রনাঙ্গনে শামিল ছিলেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২-৭৩ সালে জগন্নাথ কলেজছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৯ এবং ১৯৮০ সালে ডাকসু নির্বাচনে পরপর দুইবার জিএস এবং ১৯৮২ সনে ভিপি নির্বাচিত হন। ঐ একই সময়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি খন্দকার মোঃ ফারুক পর পর তিনবার ইকসু ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই দুই ছাত্র নেতা ছাড়া এতো অধিকবার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের মূল পদে বিজয়ের রেকর্ড বাংলাদেশে সম্ভবত আর কোনো ছাত্র নেতার নেই। খন্দকার ফারুক এবং পরবর্তীতে আমিও ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নেয়ার পরে আরো কিছু দিন আখতারুজ্জামান ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আখতারুজ্জামান ও আমি সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র ছিলাম এবং ১৯৮২ সনে একইসঙ্গে আমরা দুজন ঐ বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। ১৯৮২ সনের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে আমিও তার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাম। তবে সখ্য গড়ে ওঠে ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন প্রক্রিয়া ও সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে- যা আজও অব্যাহত আছে। আখতার ভাই বামপন্থি রাজনীতি পরিত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন। তিনি যে নিজ দলে স্বস্তি অনুভব করছেন না এটা বুঝতে পেরে, ছাত্র আন্দোলনের দিনগুলোতেই সেই ১৯৮৫ সালে আমি তাকে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তাকে শেষ পর্যন্ত বামপন্থায় রাখা যায়নি। তার দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সাথী মাহমুদুর রহমান মান্নাকেই তিনি অনুসরণ করেছিলেন এবং আওয়ামী লীগ দলকেই বেছে নিয়েছিলেন।ফরহাদ ভাইয়ের নেতৃত্বগুনে তিনি মুগ্ধ ছিলেন এবং আমার সঙ্গে দেখা হলেই মৃত্যুর এতো বছর পরেও সে সব গল্প করতেন।যাক সে সব কথা। মূল কথা হলো ২০২৬-এ নির্বাচিত সরকারের আমলেও আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার এবং কারাগারে প্রেরণের খবর দেখে মনে হলো দেশে আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার দূরস্ত। আওয়ামী লীগ দল- যে দল এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে সে দলে একটা সময় যুক্ত থাকাও কি অপরাধ?  তিনি তো আওয়ামী লীগে নীতি নির্ধারকের কোনো আসনে ছিলেন না এবং জুলাই আন্দোলনের সময়ে আওয়ামী লীগের হয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নিপীড়নেও নামেননি। যে মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সে মামলার এজাহারেও তার নাম নেই। দেশে বা সমাজে তার উপস্থিতি পছন্দ হচ্ছে না, তাই তিনি যুক্ত নন এমন একটি ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসাবে তাকে ফাঁসানো হলো। ইউনূস আমলের মতো নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হয়রানি কি নির্বাচিত সরকারের আমলেও চলতে থাকবে? এত রক্ত ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসার পরেও প্রতিহিংসামূলক মামলা ও আটকাদেশ যদি চলতেই থাকে তবে আওয়ামী লীগ আমলকে সমালোচনা করার নৈতিক ভিত্তিও কিন্তু দুর্বল হয়ে পড়ে। আখতারুজ্জামান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ছিলেন রণাঙ্গনের সৈনিক। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামে তিনি ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন। ঐ সময়ে তাকে দীর্ঘদিন কারাবরণও করতে হয়েছে। তিনি শুধুমাত্র বিতর্কিত নির্বাচনেই এম.পি নির্বাচিত হন নি, ১৯৯৬ সালে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও তিনি জয়লাভ করেছিলেন। তাই আদালত প্রাঙ্গণে সরকারি পিপি যখন তাকে একজন ‘অবৈধ এমপি’ হিসেবে সম্বোধন করে প্রেস ব্রিফিং করলেন, তা তার জনপ্রিয়তা ও তার নির্বাচনী এলাকার মানুষকে তাচ্ছিল্য করার সামিল। আশা করি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ থেকে অব্যাহতি লাভ করে আখতারুজ্জামান সুবিচার পাবেন। আর যদি প্রকৃতই সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ সহ তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকে, বিচার কার্যক্রম চলুক; কিন্তু তিনি যেন জামিনের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। বিচারের নামে  অবিচারের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষ আসলে কতটা দূরে?

ভোটের দিন ভোটারদের লম্বা লাইন দেখলে সচরাচর আমরা খুশি হই। ভোটারদের স্বতঃস্ফুর্তভাবে ভোট দেয়াকে অনেকে আবার গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্রের নিয়ামক কি কেবলমাত্র ভোটারদের দীর্ঘ লাইনই? না; বরং সমাজের প্রতিটি নাগরিকের রাষ্ট্র পরিচালনায় সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিতের মধ্যেই লুক্কায়িত থাকে গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য। নাগরিকের পরিচয়, শ্রেণী, ধর্ম, জাত বা পেশা নির্বিশেষে সমান সুযোগ , মর্যাদা ও ক্ষমতায়নই গণতন্ত্রের সার কথা। সংবিধান আমাদের সেই স্বপ্নই দেখায়। কিন্তু বাস্তবতার আয়নায় দাঁড়ালে প্রশ্ন জাগে: ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষ ঠিক কতটা দূরে?প্রশ্নটিকে কেবল তাত্ত্বিক নয়; বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয় হিসেবেও দেখছি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে কাজ করার সুযোগ আমাকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে একেবারে ভেতর থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে। আমি উপলব্ধি করেছি, নির্বাচন কেবল ভোটের প্রতিযোগিতা নয়; এটি সমাজের ক্ষমতার কাঠামো, বৈষম্য, প্রতিনিধিত্ব এবং নাগরিক মর্যাদারও একটি প্রতিফলন।প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত: ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষা নয়, একটি সামাজিক দায়িত্বগত সংসদ নির্বাচনে আমি কেবল একজন প্রার্থী ছিলাম না; আমি এমন লাখ মানুষের আকাক্সক্ষার প্রতীক ছিলাম, যাদের কণ্ঠ সংসদের দরজায় পৌঁছায় না। কোনো ব্যক্তিগত পদ-পদবীর আকাক্সক্ষা থেকে আমার প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, নীতিনির্ধারণের টেবিলে আমাদের কণ্ঠস্বর না থাকলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বারবার উপেক্ষিত থেকে যায় (কখনোবা যেভাবে চাই সেভাবে উপস্থাপন করা হয় না)। দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমি অনুভব করেছি, আমাদের নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, কিন্তু আমাদের সঙ্গে আলোচনা খুব কম হয়। একইভাবে আমাদের জন্য নীতি তৈরি হয়, কিন্তু নীতিনির্ধারণে আমাদের অংশগ্রহণ সীমিত। মূলত এই বাস্তবতাই আমাকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার নৈতিক শক্তি জুগিয়েছে।আমার বারবারই মনে হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ও সরকারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনুপস্থিত। ‘অন্তর্ভূক্তি’ শব্দটি মনে হয়েছে: কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নাই। সবখানেই কেমন যেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার বা স্বযত্নে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়েছে। স্বাধীনতার এতটা বছর পরেও ‘যেই লাউ সেই কদু’ টাইপের ভূমিকা আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। আসলে সেই রক্তক্ষরণের ক্ষত থেকেই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অদম্য ইচ্ছে। তারও আগের প্রেক্ষিত যদি উল্লেখ করতে হয়, তবে সেটি নেপালে। ২০২৪ সালে বিরতিহীনভাবে নেপালের দলিত বিষয়ক গবেষণার কাজে মধেশ প্রদেশসহ বিভিন্ন স্থানে ভ্রমনসহ অধ্যয়নের সুযোগ হয়েছিল। কাজের অংশ হিসেবে পরিচয় হয় ‘বহুজন একতা পার্টি-নেপাল’ এর অধ্যক্ষ হরিনন্দন আম্বেদকর এবং সচিব জিতেন্দ্র রামের সঙ্গে। এর আগে অবশ্য ভারতের উত্তর প্রদেশের বহিন মায়াবতী’র নেতৃত্বাধীন ‘বহুজন সমাজ পার্টি’ ও বাবা সাহেব আম্বেদকরের আদর্শে পরিচালিক ‘রিপাবলিকান পার্টি অব ইন্ডিয়া (আরপিআই)’ এর বিষয়ে জানার আগ্রহের জায়গা থেকে কিছুটা ধারণা ছিল। মোদ্দাকথা, উপমহাদেশের তফসিলি, আদিবাসী, দলিতসহ অন্য অনগ্রসর অংশের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমার ব্যপক আগ্রহ কাজ করে বরাবরই।যাহোক, ললিতপুরে সাক্ষাৎকালে হরিনন্দন বাবু বাংলাদেশে দলিত আন্দোলনের বিষয়ে আমার কাছ থেকে জানতে চাইলে মোটামুটি একটা ধারণা দিই। লম্বা আলাপ শেষে তিনি বলেন, ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন কেবলমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমেই সম্ভব। সামাজিক, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সংগঠন দিয়ে নয়।’ এই কথাটিই বারংবার আমার মাথায় ঘুরতে থাকে। আসলেই তো, সামাজিক সংগঠন দিয়ে সামাজিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা যায়। ধর্মীয় সংগঠনের কাজ ধর্মীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে আধ্যাতিকতার চর্চা। আর সাংস্কৃতিক সংগঠন সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রসারে ভূমিকা রাখে। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া বলা চলে সব উদ্যোগই অসাড়, বৃথা। একমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জায়গায় পৌঁছাতে পারলেই কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের অংশ হওয়া যায়, অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন হস্তগত হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের দৃষ্টিতে আসা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিবেশি দেশ যখন তফসিলি জনগোষ্ঠীর অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, কোটা প্রবর্তন, সংখ্যালঘু কমিশন/ সেল/ মন্ত্রণালয় চলমান রেখেছে, ঠিক সেই সময়টাতে বাংলাদেশে স্বীকৃতি ও অস্তিত্ব জানান দেয়ার পর্বে আছি আমরা। সরকার ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বের দাবি সেখানেই অনেকটাই সুদূর পরাহত। বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অনুপস্থিতি ও মহান জাতীয় সংসদে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কন্ঠস্বরের আবশ্যকতা বিবেচনায় আমি গত সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনে প্রার্থী হয়েছিলাম। গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমর্থনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আমাকে ‘কাস্তে’ প্রতীকে মনোয়ন দেয়। এখানে উল্লেখ করা ভালো, ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) প্রার্থী হতে বাম গণতান্ত্রিক জোটভূক্ত বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি হতে ‘কোদাল’ প্রতীকে মনোনয়ন নিয়েছিলাম। কিন্তু বগুড়ার দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর হয়ে কথা বলতে সংসদে যেতে চান শিপন রবিদাস’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই লাগাতার হুমকি, ভীতি প্রদর্শন ও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে থাকে একটি চক্র। এমনকি এলাকায় ‘মুচির ছোলের খুব সাহস হইছে’ বলেও বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। আমার পরিবার অত্যন্ত গরীব ও ক্ষমতাহীন বিবেচনায় পরিবার থেকেই নির্বাচন না করার অনুরোধ আসে। বাধ্য হয়ে সেখানেই থেমে যেতে হয় আমাকে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নিতে সক্ষম হয়েছি। গণমানুষের কাছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কন্ঠকে পৌঁছাতে পেরেছি ভেবে নিজের মধ্যে আত্মতুষ্টি কাজ করে। দিনশেষে ১ হাজার ৭৮২ জন মানুষ শত প্রতিকূলতা সত্বেও আমার ওপর ভরসা রেখেছেন, বিষয়টি আমাকে আগামীর জন্য উৎসাহ জোগায়। স্বস্তি দেয়।নির্বাচনী মাঠ আমাকে কী শিখিয়েছেনির্বাচনী প্রচারণায় মানুষের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার সময় আমি বাংলাদেশের আরেকটি মুখ দেখেছি। মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা এমন জনপ্রতিনিধি চায়, যিনি নির্বাচনের পরে তাদের পাশে থাকবেন। একই সঙ্গে আমি দেখেছি, সাধারণ মানুষ একজন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রার্থীকে কৌতূহল নিয়ে দেখেন। অনেকেই জানতে চেয়েছেন, ‘আপনারা কি সত্যিই নির্বাচন করেন?’, ‘দলিত সম্প্রদায় থেকেও কি সংসদ সদস্য হওয়া সম্ভব?’ এই প্রশ্নগুলো কেবল কৌতূহল নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। কারণ আমাদের সমাজ এখনো এমন প্রতিনিধিত্বকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখতে শেখেনি।ক্ষমতার অদৃশ্য দেয়ালনির্বাচনের সময় আমি উপলব্ধি করেছি, ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর পথে কেবল ভোটই বাধা নয়। অর্থনৈতিক সামর্থ্য, সাংগঠনিক শক্তি, সামাজিক নেটওয়ার্ক, গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক; এসবই ক্ষমতার বাস্তব উপাদান। একজন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রার্থীকে তাই একই সঙ্গে বহু স্তরের অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়। আইন সবার জন্য সমান হতে পারে, কিন্তু বাস্তব প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সমান নয়। তাছাড়া হাতেগোণা মনমাধ্যম ব্যতীত মিডিয়ার দৃষ্টি যে প্রভাবশালীর দিকেই থাকে সেটি দৃশ্যমান হয়েছে।জাতপাতের ধারণা প্রকটতৃণমূল পর্যায়ে জাতপাতের ধারণা প্রকট। মনোনয়ন পত্র উত্তোলনের পর যখন ধুনটে যাই। তখনই প্রস্তাব আসে, যাতে আমার প্রচারপত্রে ‘রবিদাস’ পদবী উল্লেখ না করি। তার চেয়ে বরং ‘শিপন কুমার এমএ’ লিখলে ভালো হবে বলেও পরামর্শ দেয়া হয়। তাতেই অনুমান করতে পারি, রবিদাস (চর্মকার) সম্প্রদায়ের প্রার্থীকে গ্রহণ করার মতো মানসিকতার ঘাটতি রয়েছে এখনও।প্রতিনিধিত্বের সংকটবাংলাদেশে দলিত, হরিজন, রবিদাস, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বেদে, চা-শ্রমিক, জেলে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ বহু জনগোষ্ঠী এখনও জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব পায় না। গণতন্ত্রে প্রতিনিধিত্বের এই ঘাটতি শুধু একটি জনগোষ্ঠীর ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রেরও ক্ষতি। কারণ বৈচিত্র্যহীন সিদ্ধান্ত প্রায়ই বৈচিত্র্যময় সমাজের বাস্তবতা ধারণ করতে পারে না।সংবিধানের প্রতিশ্রুতিসংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১ অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের কথা বলে। অনুচ্ছেদ ১৯ সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে বৈষম্য হ্রাসের নির্দেশনা দেয়। অনুচ্ছেদ ২৭ সব নাগরিকের সমতার নিশ্চয়তা দেয় এবং অনুচ্ছেদ ২৮ বৈষম্য নিষিদ্ধ করে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, সাংবিধানিক সমতা কি রাজনৈতিক সমতায় রূপ নিয়েছে? যখন একজন প্রান্তিক নাগরিক নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়ে আর্থিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, তখন বোঝা যায় যে আইনি সমতা ও বাস্তব সমতার মধ্যে এখনও একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবেআমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। দলীয় নেতৃত্বের প্রতিটি স্তরে দলিত ও অন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। শুধু ভোটের সময় নয়, সারা বছর তাদের নেতৃত্ব বিকাশে বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয় কমানো, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং তরুণ নেতৃত্ব তৈরির জন্য জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।একটি ব্যক্তিগত উপলব্ধিত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে; ক্ষমতার কেন্দ্র কখনো নিজে থেকে প্রান্তের মানুষের কাছে আসে না; প্রান্তের মানুষকেই সংগঠিত শক্তি, গণআন্দোলন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিক নেতৃত্বের মাধ্যমে সেই কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। আমি হয়তো নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে সংসদে পৌঁছাতে পারিনি, কিন্তু এই যাত্রা আমাকে শিখিয়েছে যে প্রান্তের মানুষের স্বপ্নকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা সম্ভব। প্রতিটি প্রচারণা, প্রতিটি গণসংযোগ, প্রতিটি সংলাপ সেই পরিবর্তনের একটি ধাপ।এখন কী করা দরকারবাংলাদেশকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রে পরিণত করতে হলে: রাজনৈতিক দলগুলোতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যূনতম প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি চালু করতে হবে। বৈষম্যবিরোধী আইন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে হবে।শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে একই নীতির আওতায় দেখতে হবে।ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষের দূরত্ব কমানো কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। ক্ষমতার কেন্দ্রের প্রকৃত শক্তি তার দেয়ালের উচ্চতায় নয়; বরং তার দরজা কতটা উন্মুক্ত- সেটিতেই। আমি বিশ্বাস করি, যে দিন একজন দলিত শিশুও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারবে: ‘আমিও একদিন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হতে পারি’- সেদিনই আমরা বলতে পারব, বাংলাদেশের গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।[লেখক: সম্পাদক, দলিত ও বঞ্চিত সমাচার ও সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, বগুড়া-৫, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬]

পাঁচ আগস্ট থেকে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণরা কী বার্তা নিয়েছে

১.বাংলাদেশের ৫ আগস্ট ধাঁচের প্রায় এক মাসের মতো একই আন্দোলনে সর্বশেষ চিত্র দেখলাম ভারতে। দেশটির সরকার কালক্ষেপণ বেশি না করে ধীরে ধীরে সিনিয়র মন্ত্রীদের বিরোধী দলের নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে আন্দোলনের মাঠে গিয়ে দেখা করেছেন। সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের কর্মকর্তাও ছিলেন। অর্থাৎ ভারত সরকার যে ককরোচ পার্টির আন্দোলনকে আমলে নিচ্ছেন তার বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু কোনো বেফাঁস বা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য না করে শুধু আন্দোলনের গতিবেগ বোঝার চেষ্টা করেছেন। আর যেই শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে এতকিছু, তিনি পুরো আন্দোলনে বোবার ভূমিকায় ছিলেন। ছাত্ররা সংসদ ভবনের ব্যরিকেড ভাঙতে গেলেই শুধু পুলিশ বল প্রয়োগ করে অনেককে আহত করে।অথচ ৫ আগস্ট আন্দোলনে বাংলাদেশে তৎকালীন সরকার ছাত্রদের সঙ্গে আলাপ করতে আন্দোলন স্থলে যায়নি এবং বেশি মাত্রাই বল প্রয়োগ করেছে। প্রচুর প্রাণহানি ঘটেছে সাড়া দেশে। আওয়ামী লীগ যেহেতু রাষ্ট্র ক্ষমতায়, তাই সব দায় সরকারের। এছাড়া সুষ্ঠু ও সব দলকে নিয়ে নির্বাচন না করার অভিযোগ ও ছিল। সব মিলিয়ে সাধারণ জনমতের বিস্ফোরণ ঘটে। এরমধ্যে ছিল দায়িত্বশীলদের বেহিসাবি মন্তব্য। যেটা ভারতের বর্তমান সরকার একেবারেই করেনি। কে বলতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে তারা কিছু অনুধাবন করতে পেরেছে। শেষ পর্যন্ত দেশটির শিক্ষামন্ত্রী পদত্যগ করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী যোগ্যদের নিয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করতে বাধ্য হয়েছে। ব্যস। মূল আন্দোলন স্থগিত হয়েছে। তবে ককরোচদের অভিযোগ ধরপাকড় এখনও চলছে।২.দীর্ঘদিন ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার ফলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যেমন আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজনের যে সীমারেখা, তা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের ভারসাম্য এবং নিয়ন্ত্রণে চিড় ধরে। একই অবস্থা শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও ঘটেছে। একভাই প্রেসিডেন্ট আরেক ভাই প্রধানমন্ত্রী। শ্রীলঙ্কার মতো অধিক শিক্ষার হার এবং উচ্চ মধ্যমআয়ের দেশের জনগণ কীভাবে এই প্রথা মেনে নিয়েছিলÑ তা আসলেই বিস্ময়। মনে হয়, কম জনসংখ্যার দেশগুলোতে রাষ্ট্রের গুটিকয়েকের বেহিসাবি ক্ষমতার অপব্যবহারকে জনবিস্ফোরণে রূপান্তর করার সম্ভাবনা কম। অথচ অধিক জনসংখ্যার দেশকে এখন আর রাষ্ট্রের বোঝা মনে না করে বরং একটি দেশের কর্মক্ষম তরুণ শক্তিকে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতার কাজে লাগিয়ে দেশকে স্বাবলম্বী করার সুযোগকে কাজে লাগানো হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা হলো তরুণদের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রধান কাজ। এখন গবেষণা বলছে অধিক জনশক্তির দেশ শুধু ভোগবাদী দেশ না হয়ে অধিক উৎপাদনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। আবার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় শোষণকে দ্রুত প্রতিবাদ জানাচ্ছে। যার প্রতিফলন প্রথমে বাংলাদেশ ও এখন ভারতে দেখা যাচ্ছে। নেপালেও এখনও পুরোপুরি স্থিতিশিলতা ফিরে আসেনি।ওই যে এতদিনের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই, তবে নির্বাহী বিভাগকে পরিচালনার জন্য রাষ্ট্র এত বছর ধরে যে ব্যুরোক্রেসির দ্বারা পরিচালিত ছিল তার থেকে তো রাষ্ট্র মুক্তি পায়নি। যেমন বাংলাদেশের বর্তমান সরকার প্রধান ব্যয় সংকোচনের নীতি হিসেবে সরকারি আমলাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মাসিক ৫০,০০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২৫,০০০ টাকা করার এক প্রজ্ঞাপন জারি করার পর জনপ্রশাসনসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সেই প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার করা হয়।৩.এই এখনও লেখাপড়া শেষ না করা বেশিভাগ মধ্যবিত্ত (যদিও বা বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানে ঢাকার নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমেছিল), পরিবারের ছেলে, মেয়েদের কিন্তু বিপদ পদে পদে ছিল। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর খপ্পরে পড়ে যাওয়া যেটা বাংলাদেশের ৫ আগস্ট পরবর্তী হয়েছে এবং অনেক কেন্দ্রীও নারী নেত্রী বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে হারিয়ে গেছেন বা তাদের সরিয়ে দেয়া সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ছিলÑ যা আন্দোলনের স্পিরিটকে ম্লান করেছে।  দ্বিতীয়ত, ছাত্রদের একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শেষ না হওয়া অন্যদিকে আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে চাকরি, বাকরিতে সমস্যার মুখোমুখি হওয়া, যা অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মায়ের স্বপ্নকে শেষ করবে।তবে দুর্ভাগ্য তরুণদের, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা যে আশা নিয়ে মাঠে নেমেছিল, অন্তর্বর্তী সরকার তার অনেক কিছুই পূরণ করতে পারেনি। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, মবতন্ত্র, আইনের শাসনের অভাব তখন তীব্র ছিল। নেপালে আন্দোলনের ফসল হিসেবে ৩৫ বছরের বালেন্দ্র শাহ প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তবে ভারতে ককরোচরা এখনও দল গঠনের ঘোষণা দেইনি। পাকিস্তানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের (যার ওপর তরুণ প্রজন্মের প্রভাব বেশি) মুক্তির ব্যাপারে বর্তমান সরকার ভাবছে বলে খবর ছড়িয়েছে। তাই বলা যায়, বৈষম্য, দুর্নীতি, স্বজন তোষণ ঠেকাতে দেশে দেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ৫ আগস্ট বেঁচে আছে।[লেখক : পরিচালক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্র (সিডিআরসি)]

আগামী দুই দশকে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে কি ভারত ও চীন?

বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার ভরকেন্দ্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কূটনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল, সেখানে এখন ক্রমেই গুরুত্ব বাড়ছে এশিয়ার। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই দেশ—ভারত ও চীন।চীন ইতিমধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক উৎপাদনশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, তরুণ জনসংখ্যা, প্রযুক্তিখাতের সম্প্রসারণ ও ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক প্রভাবের কারণে ভারত ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে আসছে।তবে প্রশ্ন হলো—আগামী দুই দশকে বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্যে ভারত ও চীন কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে?অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিল্প উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ। গত কয়েক দশকে দেশটি দ্রুত শিল্পায়ন ও রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর ও মহাকাশ গবেষণায় চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে আলোচিত। একই সঙ্গে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বেইজিং তার কৌশলগত প্রভাবও সম্প্রসারণ করছে। তবে জনসংখ্যার বার্ধক্য, আবাসন খাতের চাপ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা চীনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই কর্মক্ষম জনশক্তি দেশটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, স্টার্টআপ ও মহাকাশ গবেষণায় ভারতের অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তার ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবাখাতের সম্প্রসারণ দেশটির অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশ্বের অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এখন উৎপাদন ও বিনিয়োগের বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে ভারতের দিকে নজর দিচ্ছে। বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার ও ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেশটিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির অপরিহার্য অংশে পরিণত করছে। তবে অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আয়বৈষম্য কমানো ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।বিশ্ব নেতৃত্ব শুধু অর্থনীতির আকার দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, শিক্ষা ও গবেষণা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক প্রভাব ও সাংস্কৃতিক উপস্থিতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তিগুলোর একটি। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতিও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দুই দশকের বিশ্ব সম্ভবত একক কোনো দেশের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে না। বরং এটি হবে একটি বহুমেরু (Multipolar) বিশ্ব, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করবে। সে ক্ষেত্রে চীন ও ভারত হবে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রধান অংশীদার।আগামী দুই দশকে ভারত ও চীন অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে—এ বিষয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বের নেতৃত্ব কোনো একক দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং একাধিক প্রভাবশালী শক্তির সহাবস্থানে একটি বহুমাত্রিক ক্ষমতার ভারসাম্য গড়ে উঠতে পারে, যেখানে ভারত ও চীন নিঃসন্দেহে চালকের আসনে থাকবে।

গানে গানে গগনভেদী প্রতিবাদ

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পালের একটি ভিডিও ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপ্লব হয়ে গেছে। নিল শাড়ি পরে আঁচল উড়িয়ে তার ছন্দময় হাঁটার একটি রিল ভিডিওতে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি ব্যবহার করার পর অনলাইনে তিনি ট্রলের শিকার হন। এমন একটি ভদ্রজনোচিত আচরণ ট্রল হওয়ায় সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষ একই গান ব্যবহার করে ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে তার পাশে দাঁড়ান। শুধু ট্রল নয়, বিউটি পালের ভিডিও সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে কিনা, তা যাচাই করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছিল স্থানীয় প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর থেমে যায় তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তুতি।বিউটি রাণী পালের এমন একটি নির্মল ও সুস্থ কনটেন্টে নেতিবাচক মন্তব্য করার লোক যে সমাজে বিরাজমান সেই সমাজ  অসুস্থ্য। ড. মোহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রশ্রয়ে যে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ও অশ্রাব্য ভাষার কুৎসিৎ উদগীরণ শুরু হয়েছিল, তার রেশ এখনও কিছুটা রয়ে গেছে। কুরুচি ভাষার বীরত্ব গাথা রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে কৃষ্টি ও সংস্কৃতিবান লোকজন চুপ থাকতে বাধ্য হয়েছিল। সাম্প্রতিককালে শিক্ষকদের যত্রতত্র হেনস্তার মর্মান্তিক নজির দেখে সবাই বোবা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিউটি রানী পালের ভিডিও ক্লিপ ঘিরে গুটি কয়েক মানুষ যেভাবে নেতিবাচক ভাষা ও আলোচনার জন্ম দিতে চেয়েছিল, বিউটি রানীর প্রতি লাখো মানুষের পরিশীলিত সংহতি তা ভাসিয়ে নিয়ে গেল। ইউনূস সরকারের আমলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বন্ধাত্ব,  শিল্পী ও নারী ক্রীড়াবিদদের হেনস্তা, লালন অনুসারীদের ওপর হামলার আঘাতে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষগুলোকে হঠাৎ আজ একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তারা প্রতিবাদ করার ভাষা খুঁজে পেয়েছে।পাশ্চাত্য দেশে কারো ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে অন্য কেউ মাথা ঘামায় না, যদি না সেই আচরণ অন্য কারো ক্ষতি করে। কিন্তু আমাদের মতো দেশে কিছু মানুষ অন্যের ব্যাপারে এত বেশি ঔৎসুক্য যে, কোন অনুষ্ঠানে কোনো প্রাপ্ত বয়ষ্ক নারীর সঙ্গে কথার শুরুতেই প্রশ্ন করে বসে, ‘আপনার স্বামী কী করেন’? যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে তিনি আদৌ বিবাহিতা কিনা তা জানার প্রয়োজন বোধ করে না। ভারত এবং বাংলাদেশের টিভি সিরিয়াল বা সিনেমা দেখলেই মানুষের মানসিকতা বোঝা যায়, অধিকাংশ লোক অন্যের ব্যক্তিগত জীবনের নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করে আনন্দ পায়। আমি যে এলাকায় থাকি সেখানকার এক প্রবীণ লোক রাস্তায় গোমটাবিহীন মেয়ে দেখলেই তার হাতের লাঠি দিয়ে খোঁচা মারে। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস করে না, কারণ ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়। ওড়না না পরায় রাস্তার এক মেয়েকে এক লোক অপমান করতে কসুর করেনি। নাজেহাল হওয়ার ভয়ে আজকাল মেয়েরা কপালে টিপ পরা ছেড়ে দিয়েছে।সমাজে কিছু লোক নারীর ত্রুটি খুঁজে বের করতে গলদঘর্ম হয়; কেমন পোষাক পরেছে, ঘর থেকে একা একা বের হওয়া উচিত হয়নি, চুলে রং করল কেন, কপালে টিপটি বেশি লাল কি-না, ঠোঁটে লিপিস্টিক কেন। কন্যা সন্তানের জন্য যাদের শখ আছে তারা এখন কন্যা সন্তান নিয়ে ভয় পায়। প্রকৃতপক্ষে নারীর পোশাক, সাজসজ্জা, আচরণের ব্যাপারে সমাজ সূচের মতো তীক্ষ্ণ। বোরকা আর হিজাব না থাকলে কিছু লোকের কাছে ইদানীং নারী সব পোশাকই উলঙ্গ থাকার সমতুল্য।এমন পোশাকের মেয়েদের তারা ট্যাগ দিয়ে বলে ‘বেহায়া’ বা ‘নির্লজ্জ’  নারী। ‘বেহায়া’ বা ‘নির্লজ্জ’ ট্যাগ দিয়ে  সমাজ নারীর ওপর কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে। যে-নারী বাঁধা ধরা রীতিনীতির বিরুদ্ধে একটু সজাগ থাকে, যে নারী একটু স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়, যে নারী তাদের মৌলিক অধিকারের ব্যাপারে সচেতন থাকে, সে-নারীই বেহায়া ও নির্লজ্জ। সমাজের চোখে স্বাধীনচেতা নারীর সব আচরণই ‘বেহায়াপনা’। তাদের কথিত এই বেহায়াপনার বিরুদ্ধে কিছু লোক তাদের জিহবা ও হাত নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। বাজে কথা শোনার ভয়, হেনস্তা হওয়ার ভয়, জাহান্নামের ভয়, চরিত্রে দাগ লাগার ভয়- এত ভয় নিয়ে একটা মেয়ের পক্ষে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা প্রায় অসম্ভব। মানুষ আগে উলঙ্গ ছিল, মৃত্যুর পরও উলঙ্গ থাকবে, বেহেশতে আদম-হাওয়া উলঙ্গ ছিলেন, পৃথিবীতে আসার পরও উলঙ্গ ছিলেন, এমনকি বেহেশতেও না-কি সবাই উলঙ্গ  থাকবে। পোশাক আবিষ্কারের আগে লাখ লাখ বছর মানুষ কাপড় ছাড়াই সর্বত্র  ঘুরে বেড়িয়েছে, এখনও অনেক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীতে নারীর উর্ধাঙ্গে পোশাক থাকে না, তাতে কোন সমস্যা হয় না, সমস্যা বাঁধিয়েছে পোশাকের আবিষ্কারক। সংস্কৃতি আর ধর্ম ভিন্ন বিবেচিত না হওয়ার কারণেই সমাজে এত বাদ-বিসম্বাদ। দেশভেদে ভূ-প্রকৃতি অনুযায়ী মানুষের আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ ভিন্ন হয়ে থাকে। আমাদের দেশে একজন নারীকে শাড়ি ও টিপে যতটুকু মায়াবতী লাগে, পশ্চিমা একজন নারীকে জিন্স ও গেঞ্জিতে ততটুকু স্মার্ট লাগে। আমাদের সংস্কৃতি হলো শাড়ি পরিহিত নারীর কপালে টিপ, চোখে কাজল, চুলের বেণী। এই সংস্কৃতি হাজার বছরের।  সৌদি আরবের বিয়েতে উলুধ্বনি দেয়া হয়, এমনকি নবীজি যখন মদিনায় হিজরত করেন তখনও মদিনাবাসী নবীজীকে উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে নিয়েছিল, এটা সৌদি আরবের ধর্ম নয়, সংষ্কৃতি। ইন্দোনেশিয়ার জাতির পিতার নাম সুকর্ণ হলেও কেউ তার নামের উৎপত্তি নিয়ে প্রশ্ন করে না, বা তাকে কেউ ‘হিন্দু’ বলে উপহাস করে না, কর্ণ মহাভারতের একটি চরিত্র। ইন্দোনেশিয়ার মতো ইরানিরাও ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলমান হয়েছে, কিন্তু তারা তাদের সংস্কৃতি পরিবর্তন করেনি।‘বাঙালিয়ানা’ অর্থ বাঙ্গালীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, স্বভাব ও জীবনযাপনের নিজস্ব ঢং। ধর্ম আর সংস্কৃতির আলাদা অস্তিত্ব জোর গলায় এবং কঠিন হস্তে প্রতিরোধ করা হচ্ছে বলে ‘বাঙালিয়ানা’ বলে কিছু আর থাকছে না। ওয়াহিবীদের মতো সব ‘সহীহ’ করার প্রক্রিয়ায় সব সরকারের আমলে রাজনৈতিক ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়েছে। যে ড্রেসিং টেবিল টিপের পাতা ছাড়া অসম্পূর্ণ ছিল, এখন সেই পাতার টিপ পরলে পাপ হয়।শুধু মেয়েদের শাড়ি আর কপালের টিপ নয়, নববর্ষ, যাত্রাপালা, বৈশাখী মেলা, বাউলের আখড়া সব কিছুতেই থাবা বসেছে। আগে পাকিস্তানিরা বাঙালি সংস্কৃতিকে হিন্দুয়ানি ভাবতো, এখন স্বাধীন বাংলাদেশে অধপতন এতবেশি হয়েছে যে, বাঙ্গালীরাই বাঙালিয়ানাকে হিন্দুয়ানি বলছে। দেশের ভয়াবহ চিত্র হচ্ছে, স্কুলের অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক ছাত্ররাও বাঙালিয়ানা দূর করার শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে।২০২৬ সনে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পাল। তার ব্যাচের প্রায় সকলেই দেশে-বিদেশে আকর্ষণীয় পদমর্যাদায় আসীন হলেও তিনি এবং মাসুদুল ইসলাম রানা বেছে নিয়েছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতা। বিউটি পাল এবং রানা দুইজনই এমএ পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলেন। বিউটি পালের  অপরাধ হচ্ছে নীল রংয়ের শাড়ি পরে তিনি তার সিল্কি চুল বাতাসে উড়িয়েছিলেন। তার আরেকটি ভিডিওতে দেখলাম শিশুদের ক্লাসে ইংরেজি পড়ানোর স্টাইল। গম্ভীর শিক্ষকের চোখ রাঙানোর দিন শেষ, শিক্ষকের পুলিশি আচরণ ত্যাগ করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভয়হীন বন্ধুত্ব সম্পর্ক গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু কিছু লোক বিউটি পালের এই ত্যাগের প্রশংসা না করে তারা খুঁজলো তিনি কী পরলেন, কোথায় দাঁড়ালেন, কীভাবে হাসলেন, কীভাবে হাঁটলেন ; আর এগুলোকে তারা নিজেদের মনের রঙে রঞ্জিত করে তার পেশা ও চরিত্রের সঙ্গে গুলিয়ে মানুষদের খাওয়াতে চাইলো। [লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

চব্বিশের জুলাই: রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি

ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর গতিশীলতা। ইতিহাস কখনো স্থির নয়; এটি অবিরাম পরিবর্তন, অভিযোজন ও পুনর্গঠনের এক চলমান প্রক্রিয়া। একটি জাতির ইতিহাস কখনোই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়; এটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, অর্জন এবং আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক অভিযাত্রা। কোনো জাতি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না। সময়ের প্রবাহে নতুন বাস্তবতা, নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন সংকট এবং নতুন প্রত্যাশার মুখোমুখি হতে হয়। সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার সক্ষমতাই নির্ধারণ করে একটি জাতির অগ্রযাত্রার দিকনির্দেশনা। যে জাতি অতীতের অভিজ্ঞতা ও অর্জনকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই কথা বলে। পক্ষান্তরে, যে জাতি অতীতের গৌরবকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ না করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে পরিণত করে, নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও দ্বন্দ্বকে স্থায়ী করে তোলে, তারা একসময় অগ্রগতির পথ হারিয়ে ফেলে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো অতীতকে অস্বীকার করা যেমন আত্মঘাতী, তেমনি অতীতের মধ্যেই বন্দী হয়ে থাকাও সমান ক্ষতিকর।পলাশী-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৪৭-পূর্ব ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম, তারপর ১৯৭৪-উত্তর ভাষার জন্য সংগ্রাম, রাজনৈতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রাম, আত্মনিয়ন্ত্রণের তথা স্বাধিকারের সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম- এর সবকিছু মিলিয়েই আমাদের জাতীয় ইতিহাস নির্মিত হয়েছে। এ ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পূর্ববর্তী অধ্যায়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তার আত্মপরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করেছে; ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুসংহত করেছে; ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান গণশক্তির সক্ষমতাকে প্রকাশ করেছে; আর ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ সেই দীর্ঘ সংগ্রামকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পরিণতি দিয়েছে। নিঃসন্দেহে স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় এবং নির্ধারক মাইলফলক, যার মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একটা জাতির ইতিহাসের পথচলা কোনো একক ঘটনার মধ্যেই থেমে থাকে না। ১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার পরাজয় যেমন এই অঞ্চলে একটি দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা করেছিল এবং তার অভিঘাত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাতির জীবনকে প্রভাবিত করেছে, তেমনি ১৯৭১ সালের বিজয়ও কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি ছিল না। স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়, কিন্তু সেই রাষ্ট্রকে কতটা ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন করা যাবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার সংগ্রাম তখনই শুরু হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, স্বাধীনতা একটি ঘটনা; কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় কখনো অগ্রগতি আসে, কখনো পশ্চাৎপদতা দেখা দেয়; কখনো জনগণের আকাক্সক্ষা রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নেয়, আবার কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন সেই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বৈরাচারী ভূমিকায় জালেম শাসক শ্রেণীর যাতাকলে পিষ্ট মজলুম জনগণ মুক্তির পথ খোঁজে গণঅভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লবের পথে। এই কারণেই স্বাধীনতা কোনো গন্তব্য নয়; এটি রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, জনগণের অধিকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ যাত্রার সূচনা মাত্র। একটি জাতির ইতিহাসের ক্রমধারায় নতুন নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে, এবং তাদের সামনে নতুন প্রশ্ন ও নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়। ফলে স্বাধীনতার মৌলিক চেতনা তথা মানবিক মর্যাদা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সাম্য প্রভৃতি বিষয় প্রতিটি যুগে নতুন বাস্তবতায় নতুনভাবে ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নের দাবি তোলে। বাংলাদেশের ইতিহাসও সেই ধারাবাহিকতার বাইরে নয়। তাই আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান অভিযাত্রা হিসেবে দেখতে হবে যেখানে প্রতিটি সংগ্রাম পূর্ববর্তী সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করে এবং পরবর্তী সংগ্রামের ভিত্তি নির্মাণ করে। এই ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রবাহের মধ্যেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে; একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ও সমাজকে আরও ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত করার দীর্ঘ অভিযাত্রার একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে।বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা একই বাস্তবতা দেখতে পাই। কোনো জাতির ইতিহাসে একটি বড় অর্জন কখনোই চূড়ান্ত পরিণতি নয়; বরং তা নতুন সংগ্রাম, নতুন দায়িত্ব এবং নতুন প্রত্যাশার সূচনা করে। ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির পথ খুলে দিলেও সেখানে নাগরিক অধিকার, বর্ণসমতা এবং গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে দীর্ঘ সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। স্বাধীনতার প্রায় দুই শতাব্দী পরও আফ্রিকান-আমেরিকানদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে ব্যাপক নাগরিক অধিকার আন্দোলন গড়ে উঠতে হয়েছে। একইভাবে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মহান আদর্শ সামনে নিয়ে এলেও গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সুসংহত করতে ফরাসি সমাজকে বহু উত্থান-পতন, সংঘাত ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনের পরও সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে নতুন সংগ্রামের সূচনা হয়েছে। ইতিহাসের এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের শেখায় যে রাজনৈতিক মুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, কিন্তু সেই অর্জনের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।ইতিহাসের প্রতিটি বিজয় নতুন দায়িত্বের জন্ম দেয়, প্রতিটি অর্জন নতুন প্রত্যাশাকে সামনে নিয়ে আসে। কোনো জাতি যদি অর্জনের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করেই সন্তুষ্ট থাকে, কিন্তু সেই অর্জনের অন্তর্নিহিত আদর্শ বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর না হয়, তাহলে ইতিহাসের অগ্রযাত্রা থমকে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে  গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের যে স্বপ্ন জনগণ লালন করেছিল তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনও একটি চলমান প্রক্রিয়া। ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে যখনই সেই আকাক্সক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক বেড়েছে, তখনই নতুন করে পরিবর্তনের দাবি উত্থাপিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, আকস্মিক বিস্ফোরণ বা সাময়িক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘ বিবর্তনধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ও বিশেষ অধ্যায়। এটি এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন নতুন প্রজন্ম রাষ্ট্রের সামনে জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা, ন্যায্য অধিকার এবং নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নগুলোকে নতুন করে উত্থাপন করেছে। যে প্রশ্নগুলো এক অর্থে স্বাধীনতার মূল চেতনার সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন ভাষা, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনরায় উচ্চারিত হয়েছে।২০২৪-এর এই গণঅভ্যুত্থান বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মের সেই ঐতিহাসিক ভূমিকাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা যুগে যুগে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন জবাবদিহিতার পরিসর সংকুচিত করে, যখন নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে এবং যখন ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হতে থাকে, তখন পরিবর্তনের দাবি সবচেয়ে জোরালোভাবে উচ্চারিত হয় তরুণদের কণ্ঠে। কারণ তরুণেরা কেবল বর্তমানের প্রতিনিধিত্ব করে না; তারা ভবিষ্যতের দাবিদার এবং অংশীদারও বটে। তাদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং বঞ্চনার অভিজ্ঞতা সমাজের গভীর পরিবর্তনের আকাক্সক্ষাকে দৃশ্যমান করে তোলে। ফলে ইতিহাসের প্রতিটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের পেছনে তরুণদের সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের আন্দোলন সব ক্ষেত্রেই তরুণরাই অগ্রণীর ভূমিকা পালন করেছে। তারাই সাহসিকতার সঙ্গে প্রচলিত বাস্তবতাকে প্রশ্ন করেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনও সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারারই অংশ, যেখানে নতুন প্রজন্ম কেবল একটি তাৎক্ষণিক দাবির জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র নিয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সেই কারণেই জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ নিয়ে জনগণের নতুন আকাঙ্ক্ষা এবং বিশেষত তরুণ প্রজন্মের ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। আমাদের জাতীয় জীবনের প্রায় প্রতিটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তরুণদের সাহস, স্বপ্ন এবং আত্মত্যাগ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখেও তরুণ ছাত্রসমাজ মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তারুণ্যের নেতৃত্বেই স্বৈরশাসনের ভিত কেঁপে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অসংখ্য তরুণ অস্ত্র হাতে নিয়ে স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিল। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রসমাজ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। একই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনও প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের ইতিহাসে পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি এখনও তরুণ প্রজন্ম। যুগ বদলেছে, প্রেক্ষাপট বদলেছে, কিন্তু ন্যায়, মর্যাদা এবং অধিকারের প্রশ্নে তারুণ্যের ঐতিহাসিক ভূমিকা অপরিবর্তিত রয়েছে।সঙ্গত কারণে তরুণেরা সাধারণত বিদ্যমান ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার সাহস রাখে। তারা প্রতিষ্ঠিত সত্য তথা বন্দোবস্তকে অন্ধভাবে মেনে নিতে চায় না; বরং বাস্তবতার সঙ্গে আদর্শের ফারাককে চিহ্নিত করতে চায়। তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ কল্পনার শক্তি থাকে, নতুন সম্ভাবনা নির্মাণের সাহস থাকে এবং প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতাও থাকে। জার্মান বংশোদ্ভুত মার্কিন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হানা আরেন্টের (১৯০৬-১৯৭৫) মতে, প্রতিটি নতুন প্রজন্ম পৃথিবীতে নতুন সূচনার সম্ভাবনা নিয়ে আসে। ইতিহাসের নানা পর্যায়ে আমরা দেখেছি, সমাজ যখন স্থবির হয়ে পড়ে বা রাষ্ট্র যখন জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে, তখন সেই নতুন সূচনার আহ্বান সবচেয়ে প্রবলভাবে এসেছে তরুণদের কাছ থেকেই। বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানও সেই অর্থে কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল না; এটি ছিল নতুন প্রজন্মের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের উদ্দেশে একটি মৌলিক প্রশ্ন: রাষ্ট্র কার জন্য, ক্ষমতা কার স্বার্থে এবং স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কী? সে যাই হোক, ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনা-পরম্পরা নয়; এটি বর্তমানের রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ক্ষমতার রাজনীতিতে অতীতের স্মৃতি প্রায়ই মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়। ইতিহাস তখন শুধু গবেষণা, বিশ্লেষণ বা শিক্ষা গ্রহণের বিষয় থাকে না; বরং রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন, জনসমর্থন সংগঠিত করা এবং নৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়োর (১৯৩০-২০০২) ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘প্রতীকী পুঁজি’ (সিম্বোলিক ক্যাপিটাল), যার মাধ্যমে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের বৈধতা ও মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত এবং পুনরুৎপাদন করার চেষ্টা করে। অর্থনৈতিক পুঁজি যেমন সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তেমনি প্রতীকী পুঁজি মানুষের চিন্তা, আবেগ ও স্মৃতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসকে প্রতীকী পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা কমবেশি বিদ্যমান। মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, জনগণের সংগ্রাম কিংবা রাষ্ট্রগঠনের বিভিন্ন অধ্যায়কে অনেক সময় এমনভাবে ব্যাখ্যা ও উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন সেগুলোর ওপর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, পরিবার, দল বা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র মালিকানা রয়েছে। ফলে জাতীয় ইতিহাস, যা হওয়া উচিত ছিল সমগ্র জাতির সম্মিলিত উত্তরাধিকার, তা অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ইতিহাসের বহুমাত্রিক বাস্তবতা এবং জনগণের সম্মিলিত অবদানকে আড়াল করে একদিকে একে সংকীর্ণ দলীয় বয়ানের মধ্যে আবদ্ধ করার প্রবণতা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করেছে এবং অপরদিকে ইতিহাসের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই কারণেই ইতিহাসকে কোনো একক ব্যক্তি, দল বা প্রজন্মের সম্পত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ কিংবা ২০২৪ বাংলাদেশের ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় হলেও একই জাতীয় অভিযাত্রার গতিধারায় ভিন্ন ভিন্ন মাইলফলক। একটির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটির গুরুত্ব খাটো করার চেষ্টা যেমন ইতিহাসবিরোধী, তেমনি একটি অর্জনকে অন্য অর্জনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানোও জাতির জন্য ক্ষতিকর। ইতিহাসের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার ধারাবাহিকতার মধ্যে। যে জাতি তার অতীতের বিভিন্ন সংগ্রামকে পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরস্পর-সম্পূরক হিসেবে দেখতে শেখে, সেই জাতিই ভবিষ্যতের জন্য একটি সুদৃঢ় ভিত্তি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই উপলব্ধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যও ঠিক এই বৃহত্তর ধারাবাহিকতার মধ্যেই নিহিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে একদেশদর্শিতার ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার স্বাভাবিক ও বহুমাত্রিক বিকাশ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হয়েছে। ইতিহাস নিয়ে মুক্ত গবেষণা, যুক্তিনির্ভর বিতর্ক এবং সমালোচনামূলক আলোচনা উৎসাহিত হওয়ার পরিবর্তে অনেক সময় তা রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ফলে ইতিহাসের নানা স্তর, নানা অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন প্রজন্মের অবদানকে সমন্বিতভাবে মূল্যায়নের পরিবর্তে একরৈখিক ব্যাখ্যার প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে। ইতিহাসের রাজনীতিকীকরণ ও ইতিহাসকে প্রতীকী পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সংহতি এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির। কারণ ইতিহাস যখন সমগ্র জাতির অভিন্ন উত্তরাধিকার না হয়ে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক শক্তির দলীয় সম্পদে পরিণত হয়, তখন নাগরিকদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে, পারস্পরিক আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে। ইতিহাসের মূল কাজ হওয়া উচিত জাতিকে সংযুক্ত করা; কিন্তু যখন ইতিহাসকে বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা উল্টো জাতিকে বিভাজিত করে। এই বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ‘স্মৃতির রাজনীতি’ (পলিটিক্স অব মেমোরি)-এর ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই অতীতের নির্দিষ্ট ঘটনাকে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতার প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। ফলে ইতিহাসের কিছু অংশ অতিরঞ্জিতভাবে সামনে আসে, আবার কিছু অংশ আড়ালে চলে যায়। জাতীয় স্মৃতিকে তখন একটি জীবন্ত ও বহুমাত্রিক উত্তরাধিকার হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা রক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাতেও দীর্ঘদিন ধরে এই প্রবণতার বিভিন্ন প্রকাশ দেখা গেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস, যা সমগ্র জাতির সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল, তাকে অনেক সময় এমনভাবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যেন তার ব্যাখ্যা দেওয়ার নৈতিক অধিকার কেবল বিশেষ কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে ন্যস্ত।এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ জুলাই আন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা সংগঠনের একচ্ছত্র উদ্যোগ ছিল না। এর প্রাণশক্তি ছিল সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, যেখানে নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পটভূমির মানুষ একটি অভিন্ন আকাক্সক্ষাকে সামনে নিয়ে একত্রিত হয়েছিল। ফলে জুলাইয়ের ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ‘প্রতীকী পুঁজি’ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করার সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হয়ে গেছে। সর্বস্তরের মানুষের এই গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ইতিহাসের প্রকৃত মালিক কোনো দল নয়, দেশের জনগণ; আর গণআন্দোলনের প্রকৃত শক্তি কোনো সংগঠনের একক কর্তৃত্বে নয়, বরং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে নিহিত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই একটি রাজনৈতিক প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যেন স্বাধীনতার চেতনা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। একদিকে কেউ কেউ জুলাইয়ের তাৎপর্য প্রতিষ্ঠার নামে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে খাটো করতে চেয়েছেন; অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে এনে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। উভয় প্রবণতাই ইতিহাসের প্রকৃত স্বরূপকে অস্বীকার করে, যুক্তির বিচারে অসংগত এবং জাতীয় স্বার্থের ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতার পরিপন্থী। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ এবং ২০২৪ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস নয়; বরং একই জাতীয় অর্জনের অব্যাহত অভিযাত্রার ভিন্ন দুই অধ্যায়। ১৯৭১ আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে, আর ২০২৪ সেই স্বাধীন রাষ্ট্রকে আরও বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং স্বৈরাচারমুক্ত করার গণআকাক্সক্ষাকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি অর্জনকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য অর্জনকে অস্বীকার করার চেষ্টা ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে না; বরং জাতির সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রসংস্কারের যে জনআকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুটি মৌলিক দাবি- একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রযন্ত্র এবং একটি স্বৈরাচারমুক্ত শাসনব্যবস্থা। এই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবেই ‘জুলাই সনদ’-এর ধারণা সামনে আসে, যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি নির্মাণ করা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্রসংস্কার থেকে সরে গিয়ে ইতিহাসের মালিকানা নিয়ে প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই সংস্কার-এজেন্ডা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে যে তরুণেরা জুলাইয়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল রাষ্ট্র পুনর্গঠনের স্বপ্ন নিয়ে, তাদের অনেক প্রত্যাশাই অপূর্ণ থেকে যায়; পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন বন্দোবস্ত নির্মাণের যে প্রত্যয় আন্দোলনের ভেতরে জন্ম নিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হয়।তবে স্বীকার করতে হবে যে, এসব সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতার মধ্যেও জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন কিন্তু অন্যত্র। এই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের জনগণকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতির একক ব্যাখ্যা নয়; বরং জনগণের অব্যাহত সম্মতি, অংশগ্রহণ এবং আস্থার ওপরই রাষ্ট্রযন্ত্রের কিংবা সরকারের শক্তি নির্ভর করে। কোনো শাসকগোষ্ঠী অতীতের গৌরব, ঐতিহাসিক অবদান কিংবা রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কথা যতই উচ্চারণ করুক না কেন, বর্তমানের জনগণের বাস্তব আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদে শাসন ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠির প্রকৃত শক্তি জাতির অতীতের স্মৃতিতে নয়, বরং বর্তমানের জনগণের বিদ্যমান আস্থায় নিহিত। জুলাই সেই সত্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে যেমন উন্মোচিত করেছে, তেমনি সমগ্র জাতিকেও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ন্যায়, ইনসাফ এবং নাগরিক মর্যাদাভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের সংগ্রাম কখনো অতীতের কোনো অর্জনের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সেই অর্জনেরই যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক পরিণতি।ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়মেই একটি বড় অর্জন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন দায়িত্ব ও নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছে; দিয়েছে একটি ভূখণ্ড, একটি পতাকা এবং বিশ্বের মানচিত্রে একটি সার্বভৌম পরিচয়। স্বাধীনতার জন্য যেসব বীর শহীদ জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের আত্মত্যাগ ছাড়া বাংলাদেশের অস্তিত্ব কল্পনা করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের ভিত্তি, আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রধান উৎস এবং আমাদের রাষ্ট্রীয় যাত্রার সূচনাবিন্দু। কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেই রাষ্ট্রকে কীভাবে পরিচালিত করা হবে, কীভাবে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা হবে, কীভাবে ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে এবং কীভাবে স্বাধীনতার সুফল সব নাগরিকের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে এসব প্রশ্নও স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য কেবল তার অস্তিত্বে নয়; বরং সেই রাষ্ট্র তার জনগণের জন্য কতটা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত। আর এই জায়গাতেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিহিত। এটি ১৯৭১-এর বিকল্প নয়; বরং ১৯৭১-এর অসমাপ্ত আকাক্সক্ষাগুলোর একটি নতুন ঐতিহাসিক প্রকাশ। ১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, আর ২০২৪ সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে জনগণের নতুন করে প্রশ্ন তোলার সাহস দিয়েছে। স্বাধীনতার অর্থ কেবল একটি রাষ্ট্রের জন্ম নয়; বরং সেই রাষ্ট্রে নাগরিকের মর্যাদা, ন্যায়বিচার, সমতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা। একটি রাষ্ট্রের বাহ্যিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার নাগরিকরা অভ্যন্তরীণভাবে স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ এবং অধিকারসম্পন্ন জীবনযাপনের সুযোগ লাভ করে। এই অর্থে ২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ‘রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি’। যুগসন্ধি এমন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন পুরনো বাস্তবতা ও নতুন সম্ভাবনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়; যখন একটি সমাজ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য নতুন পথ নির্মাণের সুযোগ লাভ করে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানও তেমন একটি সন্ধিক্ষণ, যেখানে জনগণের একটি বড় অংশ কেবল সরকার পরিবর্তনের দাবি করেনি; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের দাবি তুলেছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিক পরিচয় কোনো বিশেষ সুবিধা বা বৈষম্যের ভিত্তি হবে না; যেখানে আইন সবার জন্য সমান হবে; যেখানে ক্ষমতা জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক থাকবে। চব্বিশের জুলাইয়ের প্রকৃত ঐতিহাসিক সাফল্য কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার ব্যবহার পদ্ধতির বড় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে প্রকৃত রূপান্তর কেবল শাসকের পরিবর্তনে আসে না; আসে জনগণের রাজনৈতিক চেতনার পরিবর্তনের মাধ্যমে। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এটি সাধারণ মানুষকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্র কোনো শাসকগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র জনগণের, এবং জনগণই তার প্রকৃত মালিক। এটি নাগরিকদের মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে যে অন্যায়, বৈষম্য এবং জবাবদিহিতাহীনতার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাদের রয়েছে। এই চেতনার মূল্য দীর্ঘমেয়াদি। কারণ একটি গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল তার তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ফলাফলে পরিমাপ করা যায় না; বরং পরিমাপ করা হয় সমাজের চিন্তা, মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক আচরণে তার প্রভাবের মাধ্যমে। জুলাইয়ের উত্তরাধিকার নিহিত রয়েছে সেই নতুন প্রত্যাশার মধ্যে, যেখানে তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রকে কেবল ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়। প্রকৃতপক্ষে এই আকাক্সক্ষাই জুলাইকে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক মাইলফলকে পরিণত করেছে।রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ১৯৭১ এবং ২০২৪-কে মুখোমুখি দাঁড় করানোর যেকোনো অপচেষ্টাই ইতিহাসের প্রতি অবিচার। একটি জাতির শক্তি তার অর্জনগুলোকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার মধ্যে নয়; বরং সেগুলোকে একই ঐতিহাসিক অভিযাত্রার ধারাবাহিক মাইলফলক হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যেই নিহিত। ১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে, আর ২০২৪ আমাদের সেই স্বাধীনতাকে আরও অর্থবহ, ন্যায়ভিত্তিক ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তাই জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপরীতে নয়, বরং স্বাধীনতার চেতনাকে আরও গভীর ও পূর্ণাঙ্গ করার ইতিহাসের একটি অনিবার্য অধ্যায় হিসেবেই মূল্যায়ন করতে হবে। আর সেটি করতে হলে বর্তমান বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতীতের বিতর্ক, বিভাজন ও স্মৃতির রাজনৈতিক ব্যবহারে আটকে না থেকে ভবিষ্যৎ নির্মাণে মনোনিবেশ করা। ইতিহাসের স্মৃতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ একটি জাতি তার অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা লাভ করে। কিন্তু স্মৃতির বন্দীত্ব কখনো অগ্রগতির পথ তৈরি করতে পারে না। যে জাতি অতীতের গৌরব কিংবা বেদনার ব্যাখ্যা নিয়েই অনন্তকাল ব্যস্ত থাকে, কিন্তু বর্তমানের বাস্তব সমস্যা মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নির্মাণে ব্যর্থ হয়, সে জাতি ইতিহাসের গতিপথে পিছিয়ে পড়ে। অতীত আমাদের শক্তির উৎস হতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের বিকল্প হতে পারে না।বাংলাদেশের সামনে আজ যে চ্যালেঞ্জগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো মূলত ভবিষ্যৎমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার সার্বজনীনতা, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিকাশ, টেকসই শিল্পায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জন প্রভৃতি ক্ষেত্রেই আমাদের সামনে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে। যদি একটি জাতি কেবল অতীতের অর্জনের মালিকানা নিয়ে বিতর্কে আবদ্ধ থাকে, তবে বর্তমানের বাস্তব সংকটগুলো অমীমাংসিত থেকে যায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার মূল্য দেয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার ইতিহাসের গৌরবে যেমন নিহিত, তেমনি নিহিত তার জ্ঞান, দক্ষতা, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সক্ষমতার মধ্যেও। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাষ্ট্রসংস্কারের আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার গুরুত্ব বিশেষভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। জুলাইয়ের আন্দোলনের অন্যতম মৌলিক দাবি ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে বৈষম্য, স্বেচ্ছাচারিতা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি দূর হবে। রাষ্ট্রসংস্কারের যে গভীর প্রত্যাশা নিয়ে তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছিল, সেই প্রত্যাশার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো একটি অসমাপ্ত প্রক্রিয়া। পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পরিবর্তে একটি নতুন, অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক ও জনগণকেন্দ্রিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছিল, তা নানা রাজনৈতিক জটিলতা, মতপার্থক্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে কাক্সিক্ষত গতিতে এগিয়ে যেতে পারেনি। ফলে অনেক তরুণের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে: যে পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে তারা আত্মত্যাগ করেছে, সেই পরিবর্তন কতটা বাস্তব রূপ লাভ করবে? তবে কোনো ঐতিহাসিক আন্দোলনের মূল্য কেবল তার তাৎক্ষণিক সাফল্য বা অসম্পূর্ণতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যায় না। ইতিহাসে বহু গণআন্দোলন প্রথম পর্যায়ে সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, কিন্তু তারা সমাজের চিন্তা, মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীর পরিবর্তনের সূচনা করেছে। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই যে, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টেকসইভাবে গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক হতে পারে না। রাষ্ট্রসংস্কার কোনো একক সরকার, দল বা সময়ের কাজ নয়; এটি একটি চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের সব অংশীজনের ভূমিকা রয়েছে।আজকের তরুণ প্রজন্মের সামনে তাই দ্বৈত দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, ইতিহাসের বিকৃতি, কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা এবং অতীতের প্রতীকী পুঁজির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা; কারণ গণতান্ত্রিক সমাজে ইতিহাসের মালিকানা কোনো গোষ্ঠীর নয়, এটি জনগণের সম্মিলিত সম্পদ। দ্বিতীয়ত, কেবল প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্র নির্মাণের ইতিবাচক ও সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা। একটি উন্নত রাষ্ট্র কেবল স্লোগান, আবেগ বা প্রতিবাদের মাধ্যমে নির্মিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা, নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা এবং কঠোর পরিশ্রম। জুলাইয়ের চেতনা তখনই প্রকৃত অর্থে সফল হবে, যখন তা একটি নতুন নাগরিক সংস্কৃতির জন্ম দেবে যেখানে মানুষ অধিকার যেমন দাবি করবে, তেমনি দায়িত্বও পালন করবে; যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, জনগণের কল্যাণে পরিচালিত হবে; যেখানে রাষ্ট্রের লক্ষ্য হবে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়, বরং মানুষের মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে জুলাইয়ের শিক্ষা হবে শুধু পুরোনো ব্যবস্থার বিরোধিতা নয়, বরং একটি উন্নততর বিকল্প ব্যবস্থা নির্মাণের সক্ষমতা অর্জন করা। কারণ কোনো গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত সার্থকতা নিহিত থাকে কেবল অন্যায়ের পতনে নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক নতুন বাস্তবতা নির্মাণের সক্ষমতার মধ্যে।মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের গর্ব; চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানও আমাদের গর্ব। একটি আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বের ভিত্তি নির্মাণ করেছে, অন্যটি সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র, কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মসমালোচনা এবং আত্মসংশোধনের শক্তিকে প্রকাশ করেছে। একটি আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার দরজা খুলেছে, অন্যটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে স্বাধীনতার সুফলকে অর্থবহ করতে হলে রাষ্ট্রকে হতে হবে বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণকেন্দ্রিক। এই দুটি ঘটনাই বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য ও অনিবার্য অংশ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণে উভয়ই আমাদের জন্য প্রেরণা, শিক্ষা ও দিকনির্দেশনার উৎস। অতএব, আমাদের সামনে পথ হতে হবে বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতি; প্রতিহিংসার সংস্কৃতির পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি; ‘প্রতীকী পুঁজি’ ব্যবহার করে ইতিহাসের একচেটিয়া মালিকানা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুমাত্রিক স্মৃতিচর্চার সংস্কৃতি; এবং অতীতের অন্তহীন বিতর্কে আবদ্ধ থাকার পরিবর্তে ভবিষ্যৎ নির্মাণের দৃঢ় অঙ্গীকার। ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা হলো একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন সে তার অতীতকে সম্মান করে, বর্তমানের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন স্বপ্ন নির্মাণ করে। চব্বিশের জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই কেবল একটি আন্দোলনের স্মৃতি নয়; এটি জনগণের রাজনৈতিক জাগরণ, অধিকার সচেতনতা এবং রাষ্ট্রকে আরও ন্যায়ভিত্তিক করার আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই চেতনাকে ধারণ করে স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে কঠোর পরিশ্রম, জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন, সুশাসন, উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় সংহতির নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের আগামীর পথচলার মূলমন্ত্র। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয় কোনো একটি মুহূর্তের সাফল্যে নয়; বরং সেই মুহূর্তের চেতনাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস্তব জীবনে রূপ দেয়ার মধ্যেই নিহিত।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

ভিডিও আরও দেখুন

অস্ট্রেলিয়াকে ধরাশায়ী করে ইতিহাস গড়লেন হাসান

কোনো জাদু ছিল না। ছিল না বোলিংয়ের বাহারি কোনো কৌশল। শুধু নিখুঁত লাইন, লেংথ আর ধারাবাহিকতা—এই মন্ত্রেই ডারউইনের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের পেসার হাসান মাহমুদ।ক্যারিয়ারসেরা ৬ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস থামিয়েছেন ১৯৮ রানে।মারারা স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে হাসান ১৭ ওভারে ৫৫ রান দিয়ে শিকার করেছেন ৬ উইকেট। তার দুর্দান্ত বোলিংয়ে ৫৩ ওভারেই অলআউট হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।হাসানের জন্য এটি ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং ফিগার। একই সঙ্গে তিনি গড়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক ঐতিহাসিক নজির। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে পাঁচ উইকেট নেওয়া প্রথম বাংলাদেশি বোলার এখন তিনি।শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে এই স্পেলের মাহাত্ম্য বোঝানো যাবে না। ছয় উইকেটের পেছনে ছিল অবিশ্বাস্য ধারাবাহিক পরিকল্পনা। বারবার অজি ব্যাটারদের অফ-স্টাম্পের আশপাশ দিয়ে বল করে বিপদে ফেলেছেন। ধারাবাহিক সেই চাপেই ভুল করেছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা।প্রথম শিকার জেক ওয়েদারাল্ড—অফ-স্টাম্পের বাইরের ডেলিভারিতে ব্যাট লাগিয়ে ক্যাচ দেন লিটন দাসের হাতে। ট্রাভিস হেড—অফ-স্টাম্পের বাইরে লেংথ বল ভেতরের দিকে ব্যাটের কানা ছুঁয়ে স্টাম্পে আঘাত করে।প্যাট কামিন্সও একই ফাঁদে পা দেন, অফ-স্টাম্পের বাইরে লেংথ বল কাট করতে গিয়ে ক্যাচ দেন উইকেটকিপারের হাতে। মিচেল স্টার্ক—শরীর থেকে দূরে অ্যাঙ্গেল করে যাওয়া ফুলার লেংথের বল খেলতে গিয়ে ব্যাটের কানায় লেগে যায় উইকেটের পেছনে।অস্ট্রেলিয়া যখন ৯ উইকেট হারিয়ে ফেলে, তখনও পরিকল্পনা বদলাননি হাসান। শুধু পরিস্থিতি অনুযায়ী লেংথে সামান্য পরিবর্তন এনেছেন। স্টিভ স্মিথ ছোট লেংথের বল চার্জ করে পুল শট ঠিকমতো করতে পারেননি—হাসানের শিকার হয়েছেন।শেষ উইকেটে নাথান লায়নও একই ধরনের শট খেলতে গিয়ে টপ-এজ হলে বল চলে যায় মিডউইকেটে। ছয় উইকেট—কিন্তু ছয় রকমের পরিকল্পনা নয়। শুধু লাইন, লেংথ আর ধারাবাহিকতা।মাঠ ছাড়ার সময় অভিবাদন পেয়েছেন ২৬ বছর বয়সী হাসান। ফক্স ক্রিকেটের অ্যাডাম গিলক্রিস্টের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে পেরে আমি খুবই রোমাঞ্চিত ছিলাম, কারণ তারা বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। এই কন্ডিশনে খেলার সুযোগ পাওয়াটাও দারুণ ব্যাপার। আমি শুধু লাইন ও লেংথ মেনে বল করার চেষ্টা করেছি। প্রক্রিয়াটা ধরে রেখেছি এবং অধিনায়ক যা বলছিলেন, সেটাই অনুসরণ করেছি।’পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, তার সেই সহজ পরিকল্পনা কতটা কার্যকর ছিল।হাসানের ৬/৫৫ টেস্ট ক্রিকেটে কোনো বাংলাদেশি ফাস্ট বোলারের তৃতীয় সেরা বোলিং ফিগার। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো বোলারের আগের সেরা বোলিংকেও পেছনে ফেলেছেন। ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশের হয়ে সেরা বোলিং করেছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা—৭৪ রানে ৩ উইকেট। সেই রেকর্ড এখন হাসানের।

অস্ট্রেলিয়াকে ধরাশায়ী করে ইতিহাস গড়লেন হাসান