সংবাদ
মেট্রোরেল স্টেশনে আসছে বিমানবন্দরের আদলে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা

মেট্রোরেল স্টেশনে আসছে বিমানবন্দরের আদলে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা

রাজধানীর মেট্রোরেল স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। এর অংশ হিসেবে বিমানবন্দরগুলোর মতো আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় এখন থেকে স্টেশনে প্রবেশের মুখে যাত্রীদের শরীর তল্লাশির জন্য আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর এবং ব্যাগ ও মালামাল পরীক্ষার জন্য অত্যাধুনিক লাগেজ স্ক্যানার ব্যবহার করা হবে।রোববার (২৫ অক্টোবর) ডিএমটিসিএলের পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।সংস্থাটি সূত্রে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় এসব নিরাপত্তা সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য ১৯ অক্টোবর অনলাইনে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ডিএমটিসিএলের স্টোর অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান এই দরপত্র আহ্বান করেন। আগ্রহী ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) পোর্টালের মাধ্যমে দরপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।কর্তৃপক্ষ আশা করছে, এই আধুনিক সরঞ্জামগুলো যুক্ত হলে স্টেশনে প্রবেশপথের তল্লাশি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। এর ফলে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হবে এবং যাত্রীদের যাতায়াত আরও নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হবে। তবে প্রথম পর্যায়ে ঠিক কোন কোন স্টেশনে এসব যন্ত্র বসানো হবে কিংবা কবে থেকে নিয়মিত তল্লাশি শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংগ্রহ ছাড়াও প্রকাশিত এই একই দরপত্র বিজ্ঞপ্তির আওতায় মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন-৬-এর ডিপোর বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে লো-ভোল্টেজ (এলভি) ব্যবস্থা, ডিজেল জেনারেটর সেট, ইউপিএস (নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা), ভেন্টিলেশন বা বাতাস চলাচল ব্যবস্থা এবং সাধারণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের নিয়মিত দেখভাল করা হবে।দরপত্র বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, ১১ নভেম্বর দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত দরপত্রের নথি কেনার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের সর্বাধুনিক এই গণপরিবহনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।সূত্র : NPB
২১ মিনিট আগে

মতামতমতামত

প্রবারণা পূর্ণিমার মৈত্রীতে আলোকিত হোক ধরণি

আজ শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা, ২৫৭০ বুদ্ধাব্দ। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত বা বর্ষাবাস পালিত হয়। প্রবারণা অর্থ হলো, একে অপরের কাছে নিজের দোষ-ত্রুটি স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং মৈত্রীভাবাপন্ন চিত্ত নিয়ে জীবন পরিচালনা করা। ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, কারও প্রতি কোনো ভুলত্রুটি করে থাকলে তা স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়াই প্রবারণার মূল শিক্ষা। একইভাবে অন্যের ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার মানসিকতাও এর সঙ্গে যুক্ত। আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে অশুভকে বর্জন করে সত্য ও সুন্দরকে বরণ করার শিক্ষা দেয় প্রবারণা।প্রবারণা পূর্ণিমার পর থেকে কার্তিক পূর্ণিমা পর্যন্ত এক মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় দানোত্তম কঠিন চীবর দান। যেসব বিহারে ভিক্ষুরা বর্ষাবাস পালন করেন, সেসব বিহারেই কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। প্রবারণা পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে গৌতম বুদ্ধের জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে চুল কর্তন, তাবতিংস স্বর্গে মাতা মহামায়ার উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনা, ৬০ জন শিষ্যকে ধর্ম প্রচারে পাঠানো এবং স্বর্গ থেকে সাংকাশ্য নগরে বুদ্ধের অবতরণ।চুল কাটা ও ফানুস উৎসবের উৎপত্তিবৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, আষাঢ়ী পূর্ণিমায় গৃহত্যাগের পর সিদ্ধার্থ গৌতম অনোমা নদীর তীরে পৌঁছে প্রব্রজিত জীবন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি উপলব্ধি করেন, প্রব্রজিত জীবনে চুলের প্রয়োজন নেই। তাই ক্ষুরধার তলোয়ার দিয়ে নিজের চুল কাটেন এবং অধিষ্ঠান করেন, তার কর্তিত চুল আকাশে নিক্ষেপ করলে তা যেন মাটিতে পতিত না হয়। তিনি যদি জন্ম-জন্মান্তরে ত্রিশ পারমি পূর্ণ করে বুদ্ধত্ব লাভের যোগ্যতা অর্জন করে থাকেন, তবে সেই চুল আকাশে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকুক।কথিত আছে, সিদ্ধার্থের নিক্ষিপ্ত চুল দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্ণের পাত্রে করে তাবতিংস স্বর্গে নিয়ে যান। সেখানে এই কেশধাতু স্থাপন করে নির্মাণ করা হয় ‘চুলামনি চৈত্য’। বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, দেবতারা এখনো এই চৈত্যের পূজা করেন। এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের ঐতিহ্য থেকেই বৌদ্ধদের মধ্যে আকাশ প্রদীপ বা ফানুস ওড়ানোর প্রচলন হয়েছে বলে মনে করা হয়। বর্তমানে ফানুস উৎসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি একটি সামাজিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রবারণা পূর্ণিমায় বৌদ্ধবিহারগুলোতে সমবেত হন। এভাবেই ফানুস উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমাকে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত করতে ভূমিকা রেখেছে।তাবতিংস স্বর্গে মাতার উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনাবৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, গৌতম বুদ্ধ তার সপ্তম বর্ষাবাস তাবতিংস স্বর্গে অতিবাহিত করেন। সেখানে পারিজাত বৃক্ষের নিচে পাণ্ডুকম্বল শিলাসনে বসে তিনি মাতা মহামায়ার উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনা দেন। তিন মাস ধরে দেশনা প্রদানের মাধ্যমে তিনি মাতাকে স্রোতাপত্তি মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত করেন বলে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বুদ্ধ মাতৃঋণ পরিশোধ ও কর্তব্য পালনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যা সবার জন্য অনুকরণীয়।কথিত আছে, তাবতিংস স্বর্গে পাণ্ডুকম্বল শিলাসনে উপবিষ্ট হয়ে বুদ্ধ দশ হাজার চক্রবাল থেকে আগত অসংখ্য দেবতা ও ব্রহ্মার উদ্দেশে সাত খণ্ডে বিভক্ত অভিধর্ম নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশনা করেন। আশ্বিনী পূর্ণিমায় তিন মাসব্যাপী এই দেশনার সমাপ্তি ঘটে বলে দিনটি অভিধর্ম দিবস হিসেবেও পরিচিত।স্বর্গ থেকে সাংকাশ্য নগরে অবতরণভারতের শ্রাবস্তী থেকে প্রায় ৩০ যোজন দূরে সাংকাশ্য নগর অবস্থিত বলে বৌদ্ধ ঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে। কথিত আছে, মহামৌদগল্যায়ন স্থবিরের মাধ্যমে বুদ্ধ তাবতিংস স্বর্গ থেকে মহাপ্রবারণার দিন সাংকাশ্য নগরে অবতরণের কথা জানান। দেবরাজ ইন্দ্র তখন দৈব প্রভাবে সুবর্ণ, রৌপ্য ও মণিময় তিনটি সোপান নির্মাণ করেন। সোপানগুলোর পাদদেশ সাংকাশ্য নগরের দ্বারে এবং শীর্ষ সুমেরু পর্বতের চূড়ায় স্থাপন করা হয়। দক্ষিণ দিকের সুবর্ণ সোপান দেবতাদের জন্য, বাম দিকের রৌপ্য সোপান মহাব্রহ্মাদের জন্য এবং মাঝের মণিময় সোপান বুদ্ধের জন্য নির্ধারিত ছিল। এই অবতরণের মধ্য দিয়ে আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত বুদ্ধের তিন মাসের বর্ষাবাসের সমাপ্তি ঘটে বলে বৌদ্ধ ঐতিহ্যে বিশ্বাস করা হয়।ধর্ম প্রচারে বুদ্ধের নির্দেশনাপ্রবারণা পূর্ণিমার সঙ্গে বুদ্ধের ধর্ম প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও যুক্ত। বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, যশ ও তার ৫৪ জন সহচরসহ মোট ৬০ জন শিষ্যকে বুদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য বিভিন্ন দিকে যাত্রা করার নির্দেশ দেন। তিনি তাদের বলেন, বহু মানুষের হিত ও সুখের জন্য, জগতের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শনের জন্য এবং দেবতা, ব্রহ্মা ও মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে ধর্ম প্রচার করতে হবে। তার নির্দেশনা ছিল, ধর্মের আদিতে, মধ্যে ও অন্তে যেন কল্যাণ থাকে এবং তা যেন অর্থপূর্ণ ও পরিশুদ্ধ হয়।বুদ্ধের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিষ্যরা বিভিন্ন দিকে ধর্ম প্রচারে বেরিয়ে পড়েন। সেই ধারাবাহিকতায় বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘ যুগে যুগে ধর্ম প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখে চলেছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা ধর্মসভা, গৃহস্থের বাড়ি, গ্রন্থ রচনা এবং আধুনিক সময়ে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বুদ্ধের শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। সদ্ধর্মের সংরক্ষণ ও প্রসারে তাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বুদ্ধের মানবতাবাদী শিক্ষার চর্চা ও প্রয়োগের বিকল্প নেই। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই তার মহান দর্শন অনুসরণ, অনুধাবন ও অনুশীলনের মাধ্যমে সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তুলতে পারেন। প্রবারণা আমাদের আত্মশুদ্ধি, ক্ষমাশীলতা, মৈত্রী ও পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতার সেই শিক্ষাই দেয়। এই পূর্ণিমার আলোয় মানুষের হৃদয় থেকে বিদ্বেষ দূর হোক, প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি ও সম্প্রীতি।ভবতু সব্ব মঙ্গলং—সকলের মঙ্গল হোক।[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাজদ্বীপ, রাঙামাটি]

টিআইএন থেকে রিটার্ন: ফ্রিল্যান্সার-উদ্যোক্তাদের করণীয়

আয় শুরু করেছেন? টিআইএন, কর ও রিটার্ন সম্পর্কে শুরুতেই জানুন। ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করছেন, অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছেন কিংবা নিজের একটি স্টার্টআপ গড়ে তুলছেন? আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করসংক্রান্ত কিছু দায়িত্বও আপনার সামনে আসবে। কিন্তু টিআইএন, আয়কর ও রিটার্ন নিয়ে নানা ভুল ধারণার কারণে অনেক তরুণ শুরুতেই বিষয়গুলো এড়িয়ে যান। কেউ মনে করেন, টিআইএন করলেই কর দিতে হবে, আবার কেউ মনে করেন, আয় কম হলে করসংক্রান্ত কোনো দায়িত্বই নেই।বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। আয় কত, আয়ের উৎস কী, পেশা বা ব্যবসার ধরন কী এবং সংশ্লিষ্ট আইনে কী ধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এসব বিষয়ের ওপর করসংক্রান্ত দায়িত্ব নির্ভর করে। তাই আয় শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে কর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং নিয়মিত হিসাব রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।তরুণদের মধ্যে বাড়ছে ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন ব্যবসাবর্তমানে তরুণদের মধ্যে ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, ডিজিটাল সেবা, অনলাইন ব্যবসা ও স্টার্টআপের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। অনেকেই ঘরে বসে দেশি-বিদেশি গ্রাহকের কাজ করছেন। কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা বিক্রি করছেন।এসব কর্মকাণ্ড কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে একজন ফ্রিল্যান্সারের আয় ও কার্যক্রম যেমন এক রকম নয়, তেমনি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও পার্থক্য রয়েছে। ফলে তাঁদের আয়, ব্যয়, হিসাবরক্ষণ ও কর ব্যবস্থাপনাও এক নয়। তাই শুধু অনলাইনে আয় করেন—এমন পরিচয়ের ভিত্তিতে সবার জন্য একই করব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।টিআইএন কেন প্রয়োজন?টিআইএন বা করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক করদাতাকে দেওয়া ১২ অঙ্কের একটি স্বতন্ত্র শনাক্তকারী নম্বর। বিভিন্ন সরকারি, ব্যবসায়িক ও আর্থিক কার্যক্রমে আইন অনুযায়ী টিআইএন এবং রিটার্নসংক্রান্ত নথির প্রয়োজন হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে টিআইএন গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা একই নয়। ব্যক্তির পেশা, আয়, কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধানের ওপর এর প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে। তাই আইন অনুযায়ী প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও টিআইএন গ্রহণ না করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি টিআইএন গ্রহণকে সরাসরি আয়কর প্রদানের সঙ্গে এক করে দেখাও ঠিক নয়।টিআইএন থাকলেই কি আয়কর দিতে হয়?এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। টিআইএন হলো করদাতাকে শনাক্ত করার নম্বর। অন্যদিকে আয়কর হলো প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী করযোগ্য আয়ের ওপর আরোপিত কর। অর্থাৎ, টিআইএন থাকা এবং আয়কর পরিশোধ করা একই বিষয় নয়। কারও টিআইএন থাকতে পারে, কিন্তু প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা, আয় ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় তার প্রদেয় কর শূন্য হতে পারে। আবার করযোগ্য আয় না থাকলেও আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।তাই টিআইএন গ্রহণের পর নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, সেটিও জানা জরুরি।ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয় ও করফ্রিল্যান্সাররা সাধারণত নিজেদের দক্ষতা, জ্ঞান বা পেশাগত সেবা দিয়ে আয় করেন। তাই কাজের শুরু থেকেই আয় ও খরচের সঠিক হিসাব রাখা গুরুত্বপূর্ণ।গ্রাহকের সঙ্গে চুক্তি বা কাজের রেকর্ড, চালানপত্র, অর্থ পরিশোধের রেকর্ড, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অনলাইন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমের তথ্য সংরক্ষণ করা উচিত। বিদেশি গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করলে অর্থের উৎস, কাজের প্রকৃতি এবং অর্থ গ্রহণের রেকর্ডও যথাযথভাবে রাখা প্রয়োজন।একইভাবে পেশাগত কাজ পরিচালনার জন্য যেসব খরচ হয়, সেসবের বিল, রসিদ বা অন্যান্য প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা উচিত। ব্যক্তিগত ও পেশাগত লেনদেন আলাদা রাখলে বছর শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব তৈরি এবং রিটার্ন প্রস্তুত করা সহজ হয়।কোনো নির্দিষ্ট আয় করমুক্ত কি না, করযোগ্য আয় কীভাবে নির্ধারিত হবে বা বিশেষ কোনো কর সুবিধা প্রযোজ্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর আইন ও বিধান অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।উদ্যোক্তাদের কর ব্যবস্থাপনাঅনলাইন বা অফলাইন ব্যবসা ছোট হলেও সেটি ব্যবসা। তাই শুরু থেকেই ব্যবসার আর্থিক হিসাব আলাদাভাবে রাখা উচিত। পণ্য ক্রয়ের চালান, বিক্রয়ের রেকর্ড, ক্রেতার অর্থ পরিশোধের তথ্য, পণ্য সরবরাহের খরচ, বিজ্ঞাপন ব্যয়, কর্মচারীর বেতন, অফিস বা গুদামভাড়া এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক ব্যয়ের নথি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত অর্থের সঙ্গে ব্যবসার অর্থ মিশিয়ে ফেললে প্রকৃত ব্যবসায়িক আয় ও ব্যয় নির্ধারণ কঠিন হয়ে যায়। এতে করযোগ্য আয় নির্ধারণ ও রিটার্ন প্রস্তুতের সময়ও জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সম্ভব হলে ব্যবসার জন্য পৃথক ব্যাংক হিসাব অথবা অন্তত পৃথক হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা রাখা ভালো।করযোগ্য আয় কীভাবে নির্ধারিত হবে?শুধু মোট আয় কত হয়েছে, তার ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা হয় না। আয়ের প্রকৃতি, প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা, অনুমোদিত ব্যয়, কর রেয়াত, উৎসে কর্তিত কর এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধানসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে করযোগ্য আয় ও প্রদেয় কর নির্ধারণ করা হয়।ফ্রিল্যান্সার বা উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে আয় ও ব্যবসায়িক ব্যয়ের সঠিক হিসাব তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ নথি ছাড়া কোনো ব্যয়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে আয় ও প্রাসঙ্গিক ব্যয়—উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত।উৎসে করের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণঅনেক ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তার আয় থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উৎসে কর কর্তনের প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। রিটার্ন প্রস্তুতের সময় প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী উৎসে কর্তিত করের তথ্য উপস্থাপন ও সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান, গ্রাহক বা অন্য উৎস থেকে কর কর্তন করা হলে তার প্রমাণপত্র সংগ্রহ করে রাখা উচিত।রিটার্ন কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?আয়কর রিটার্ন হলো নির্দিষ্ট করবর্ষে করদাতার আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় এবং প্রযোজ্য করসংক্রান্ত তথ্য আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিলের প্রক্রিয়া।রিটার্ন শুধু কর পরিশোধের মাধ্যম নয়, এটি করদাতার আয় ও আর্থিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক নথি। আইন অনুযায়ী যাঁদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাঁদের নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করা উচিত।কর না থাকলেও রিটার্ন লাগতে পারে‘আমার কর আসে না, তাই রিটার্ন দেব না’—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বিষয়টি সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। কারও প্রদেয় আয়কর শূন্য হতে পারে। তবে একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে কর না থাকলেও রিটার্ন দাখিল করতে হতে পারে। তাই শুধু আয়কর দিতে হবে কি না, তা জানাই যথেষ্ট নয়। নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।কর সুবিধার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজনফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য নির্দিষ্ট খাতকে উৎসাহিত করতে সরকার বিভিন্ন সময়ে কর সুবিধা, অব্যাহতি বা বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। তবে কোনো নির্দিষ্ট আয় এসব সুবিধার আওতায় পড়ে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধান অনুযায়ী যাচাই করতে হবে। শুধু কোনো আয়কে ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয়, অনলাইন ব্যবসার আয় বা প্রযুক্তি খাতের আয় হিসেবে উল্লেখ করলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত হয়ে যায় না। আয়ের প্রকৃতি, সেবার ধরন, কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর আইন ও বিধান বিবেচনা করেই কর সুবিধা প্রযোজ্য কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে।রিটার্ন দাখিলের আগে কী প্রস্তুত রাখবেন?রিটার্ন দাখিলের আগে সারা বছরের আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য গুছিয়ে রাখা উচিত। ফ্রিল্যান্সারের ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের রেকর্ড, চালানপত্র, চুক্তিপত্র, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, অর্থ পরিশোধের মাধ্যমের রেকর্ড এবং পেশাগত খরচের প্রমাণপত্র গুরুত্বপূর্ণ।উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে বিক্রয় ও ক্রয়ের হিসাব, পণ্য ক্রয়ের চালান, বিক্রয়ের রেকর্ড, ব্যবসায়িক খরচের বিল ও ভাউচার, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য এবং কর্মচারীর বেতনসহ অন্যান্য ব্যয়ের রেকর্ড সংরক্ষণ করা উচিত। এ ছাড়া জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, বিনিয়োগ, ঋণ এবং অন্যান্য সম্পদ ও দায়ের তথ্যও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রস্তুত রাখতে হয়। উৎসে কর কর্তন হয়ে থাকলে তার প্রমাণপত্রও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।শুরু থেকেই হিসাব রাখুনফ্রিল্যান্সার কিংবা উদ্যোক্তা, যাঁরাই হোন না কেন, আয় শুরু হওয়ার দিন থেকেই হিসাব রাখার অভ্যাস করুন। প্রতি মাসে আয় ও ব্যয়ের হিসাব লিখে রাখুন। ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, চালানপত্র, বিল, ভাউচার ও রসিদ সংরক্ষণ করুন। অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল রেকর্ডও যথাযথভাবে রাখুন।এতে বছর শেষে রিটার্ন প্রস্তুত করা সহজ হবে। পাশাপাশি ব্যবসা বা পেশাগত কাজের প্রকৃত আর্থিক অবস্থাও পরিষ্কার থাকবে। ভবিষ্যতে ব্যাংকঋণ, বিনিয়োগ গ্রহণ, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণের প্রয়োজন হলেও সুশৃঙ্খল হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।শুরুতেই সচেতনতা, ভবিষ্যতে স্বস্তিফ্রিল্যান্সিং বা উদ্যোক্তা হওয়ার সাফল্য শুধু কত টাকা আয় করছেন, তার ওপর নির্ভর করে না। সেই আয় কতটা সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ এবং আইনসম্মতভাবে পরিচালনা করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।আজকের একজন ফ্রিল্যান্সার আগামী দিনের উদ্যোক্তা হতে পারেন। আবার ছোট একটি অনলাইন ব্যবসাও ভবিষ্যতে বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। তাই ব্যবসা বা পেশাগত আয় শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে কর ও হিসাব ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন হওয়া ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।আয় শুরু করুন, হিসাব রাখুন, করের নিয়ম জানুন এবং সময়মতো আইনগত দায়িত্ব পালন করুন। শুরুতেই সামান্য সচেতনতা ভবিষ্যতের বড় আইনি ও আর্থিক ঝুঁকি থেকে আপনাকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।[লেখক: আয়কর আইনজীবী]

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ব্যর্থতা

নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আখতার সিতি—মক্কা অঞ্চলে কর্মরত দুই বাংলাদেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর শিরশ্ছেদ করেছে সৌদি আরব। তারা প্রেমিক-প্রেমিকা, না স্বামী-স্ত্রী, তা আজও নিশ্চিত করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ বা বাংলাদেশ সরকার। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কাজে’ লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের গুরুত্ব বিবেচনায় শরিয়া আদালত ‘তাজির’ বা বিচারকের বিবেচনামূলক দণ্ড হিসেবে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন। ১৪ অক্টোবর সেই দণ্ড কার্যকর করা হয়। বিবৃতিতে ‘অনৈতিক কাজ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। কোনো কোনো সংবাদে চুমু খাওয়ার কথা এসেছে, কিন্তু তা সৌদি সরকারের আনুষ্ঠানিক ভাষ্য নয়। ঘটনাটি মসজিদের আঙিনায়, নাকি ভেতরে ঘটেছে, তা-ও স্পষ্ট নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে, তারা ধর্মপ্রাণ ছিলেন এবং নামাজ পড়তেই মসজিদে গিয়েছিলেন।শরিয়াহ আইনে এই দণ্ড কতটা সংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। ইসলামে জিনা প্রমাণের জন্য চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী প্রয়োজন, অথবা অভিযুক্তের স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি থাকতে হয়। নবীজির (সা.) সময়ে হদের যে দু-একটি ঘটনা ঘটেছিল, সেসব ক্ষেত্রে অপরাধীরা নিজেরাই শাস্তি চেয়ে নিয়েছিলেন। হদ হচ্ছে কোরআন ও হাদিস দ্বারা নির্ধারিত বিধান। বিবাহবহির্ভূত চুমু নাজায়েজ হলেও এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নয়। তাই ঘটনা শুধু চুমু খাওয়ার হলে তা হদের আওতায় পড়ে না, তাজিরের আওতায় পড়ে। তাজিরের ক্ষেত্রে বিচারক পরিস্থিতি বিবেচনা করে লঘু দণ্ডও দিতে পারেন। তাই একটি চুমুর জন্য দুটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া তাজিরের উদ্দেশ্য হতে পারে না। প্রশ্ন থেকে যায়, এই কঠোরতা কি সৌদি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রয়োগ করা হয়?দণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়েও বিভ্রান্তি আছে। একসময় সত্যিই রিয়াদের দিরা স্কয়ার এবং মক্কা-জেদ্দার বড় মসজিদের পাশের উন্মুক্ত চত্বরে জুমার নামাজের পর প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হতো। মুসল্লিরা দাঁড়িয়ে তা দেখতেন। কিন্তু ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমানের সংস্কারের পর ২০২০ সাল থেকে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এখন কারাগারের ভেতরে দণ্ড কার্যকর করা হয়। আগে থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় না, মসজিদ প্রাঙ্গণেও কাউকে আনা হয় না। নজরুল ও সিতির ক্ষেত্রেও দণ্ড কার্যকরের পরদিন বিবৃতি এসেছে, আগে নয়।এখানেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অসহায়ত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তার দূতাবাসকে জানাতে হবে এবং কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ দিতে হবে। দূতাবাস আদালতে গিয়ে বিচারকে প্রভাবিত করতে পারে না। তবে অভিযুক্তের সঙ্গে দেখা করতে পারে, আইনজীবীর তালিকা দিতে পারে, পরিবারকে জানাতে পারে এবং বিচার সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এই দুজনের বিচার এক দিনে হয়নি; মাসের পর মাস চলেছে। অথচ সৌদি সরকার বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি, আর আমাদের জেদ্দা কনস্যুলেটও খবর রাখেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন বলছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ নিয়মিত যে কারাবন্দিদের তালিকা পাঠায়, তাতে এই দুজনের নাম ছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন তিনজন মন্ত্রী—একজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী। অথচ এখনো তালিকা যাচাই করা হয়নি; যাচাই করা হবে। দূতাবাসের কাজ শুধু তালিকা নথিভুক্ত করে রাখা নয়। প্রত্যেক বন্দির বিরুদ্ধে অভিযোগ কী, তার বিচার কোন পর্যায়ে এবং আইনি সহায়তা প্রয়োজন কি না, তা খুঁজে বের করাও দূতাবাসের দায়িত্ব।এই উদাসীনতার মধ্যেই এসেছে আরও অমানবিক বক্তব্য। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এই শিরশ্ছেদকে ‘বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়’ বলেছেন, যেন দুটি প্রাণের বিনিময়ে বাকিদের শিক্ষা দিতে হবে। অন্যদিকে বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন বলেছেন, ‘এই পাপের লাশটা বাংলাদেশে আসুক, অন্তত এইটা আমি কখনোই আশা করব না।’ পরে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন বটে, কিন্তু এই মানসিকতাই বলে দেয়, রাষ্ট্র নিজের নাগরিককে কীভাবে দেখে। অথচ বিপরীত উদাহরণও আছে। ২০১০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক পাকিস্তানিকে হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় বাংলাদেশি শ্রমিককে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দিয়াত বা রক্তপণ বাবদ চার লাখ দিরহাম দিয়ে ফিরিয়ে এনেছিল। শ্রীলঙ্কাও কূটনৈতিক তৎপরতায় তাদের এক নাগরিকের দণ্ড ঠেকিয়েছিল। রেমিট্যান্স যোদ্ধা বলে মুখে ফেনা তোলা বাংলাদেশ কেন পারল না?এই জিম্মিদশা নতুন নয়। এর শিকড় মর্যাদার সংকটে। ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া নারী গৃহকর্মীদের নির্যাতনের প্রতিবাদে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো বন্ধ করেছে। বাংলাদেশ চেয়েও পারেনি। অভিযোগ আছে, সৌদি আরব জানিয়ে দিয়েছে, নারী কর্মী না দিলে পুরুষ কর্মীও নেবে না। এর আনুষ্ঠানিক লিখিত প্রমাণ নেই। তবে ঢাকার শ্রমবাজারে কথাটি বহু বছর ধরে প্রচলিত। এ কারণেই বাংলাদেশ কঠোর অবস্থান নিতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। আমাদের অসংখ্য নারী সৌদি পরিবারে ধর্ষণ, গর্ভপাত ও নির্যাতনের শিকার হয়ে লাশ হয়ে ফিরছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিটি সরকার সৌদি বাদশাহকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তারা আসেননি, অথচ ভারত সফর করেছেন। আমরা ‘মুসলিম উম্মাহ’ বলে ফেনা তুলি, আর তারা আমাদের ‘মিসকিন’ বলে। জেদ্দা বিমানবন্দরে একজন পশ্চিমা যাত্রী যে সম্মান পান, বাংলাদেশি শ্রমিক তা পান না।এই ‘মিসকিন’ তকমার একজন ব্যক্তিগত সাক্ষী আমার প্রয়াত ভাই মহিউদ্দিন আহমদ। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার ওমরাহ করতে গেলে আমার ভাই তখন জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর। সৌদি রাজকীয় দপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে কাবার চাবির রক্ষক বনু শাইবা পরিবারের প্রধানকে জানানো হলো। তিনি আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মসজিদুল হারামের বাইরে অপেক্ষা করলেন। চাবির রক্ষক এলেন অনেক বিলম্বে। আমার ভাইয়ের মনে হয়েছিল, গরিব দেশের রাষ্ট্রপতি বলেই এই অবহেলা। রাসুল (সা.) যে চাবি বনু শাইবা গোত্রের হাতে আমানত হিসেবে দিয়েছিলেন, সেই আমানতদারও জানেন, একটি রাষ্ট্রের ওজন কতটা। তাই প্রশ্ন করি, ইউনূসের আমল থেকে বিএনপির আমল পর্যন্ত যে বলা হচ্ছে, ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি আর নেই’, তা যদি সত্যি হয়, তাহলে তুচ্ছ অভিযোগে দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ হয় কীভাবে? একটি রাষ্ট্রের দিকে চোখ রাঙালে আর আরেকটি রাষ্ট্রের দিকে মাথা নিচু করলে সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কাবার চাবির রক্ষকের আচরণ এবং নজরুল ও সিতির সঙ্গে সৌদি সরকারের নিষ্ঠুরতা আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—অর্থনৈতিক শক্তি ও কূটনৈতিক ওজন ছাড়া পবিত্র ভূমিতেও সমমর্যাদা মেলে না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

লাশের হিসাব নয়, চাই অপরাধের বিচার

একটি মরদেহেরও দুটি পরিণতি হতে পারে-একটি তার সৎকার, অন্যটি তার মৃত্যুর সত্য উদ্‌ঘাটন। প্রথমটি সম্পন্ন হলেই দ্বিতীয়টির দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নদী থেকে উদ্ধার হওয়া কোনো কোনো মরদেহ পরিচয়হীন অবস্থায় দাফন হয়, অথচ তার মৃত্যুর রহস্য থেকে যায় অন্ধকারে। যে মানুষটির একদিন নাম ছিল, ঠিকানা ছিল, ছিল আপনজন। মৃত্যুর পর তার পরিচয়টুকুও যদি হারিয়ে যায়, তবে কোথাও হয়তো একটি পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটায়, আর কোনো অপরাধের সঙ্গে তার মৃত্যুর যোগ থাকলে আড়ালে থেকে যায় অপরাধী। তাই নদী থেকে একটি মরদেহ উদ্ধারের পর প্রশ্ন শুধু তার পরিচয় কী, তা নয়-কীভাবে তার মৃত্যু হলো, এর পেছনে কোনো অপরাধ আছে কি না এবং থাকলে অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা গেল কি না-সেসব প্রশ্নের উত্তরও জরুরি।সম্প্রতি প্রথম আলোয় (২৩ অক্টোবর ২০২৬) প্রকাশিত নদ-নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের একটি প্রতিবেদন এসব প্রশ্নের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে আরও ৪৩০টি। সব মিলিয়ে পাঁচ বছর নয় মাসে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ২ হাজার ৪৯৪। এর মধ্যে ৭৫৫ জনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। একই সময়ে এসব ঘটনায় ৩৯২টি হত্যা মামলা হয়েছে।এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি মৃত্যু হত্যাকাণ্ডের ফল নয়। দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা ও অন্যান্য কারণেও মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু পরিচয়হীন মরদেহের সংখ্যা, বছরের পর বছর মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেওয়ার তথ্য আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। বিষয়টি তাই শুধু অপরাধের খবর হিসেবে দেখার নয়-মানুষের পরিচয়, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও ভাবার।মৃত্যুর পরও কেন হারিয়ে যাবে মানুষের পরিচয়? মানুষের পরিচয় শুধু একটি নাম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবার, সম্পর্ক, স্মৃতি এবং একটি জীবনের ইতিহাস। অথচ নৌ পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর নয় মাসে উদ্ধার হওয়া ২ হাজার ৪৯৪টি মরদেহের মধ্যে ৭৫৫ জনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। তাদের কেউ হয়তো দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা ব্যক্তি। কেউ হয়তো এমন একটি পরিবারের সদস্য, যে পরিবার এখনো জানে না তার প্রিয়জনের পরিণতি কী হয়েছে।পরিচয় শনাক্ত না হওয়ার পেছনে বাস্তব সমস্যা রয়েছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে মরদেহে পচন ধরে, আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়, চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলামতও নষ্ট হয়ে যায়। এতে পরিচয় শনাক্ত করা যেমন কঠিন হয়, তেমনি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করাও দুরূহ হয়ে পড়ে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। বরং কীভাবে পরিচয় শনাক্তের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যায়, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।দেশের বিভিন্ন থানায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে করা সাধারণ ডায়েরি, উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি, ডিএনএ নমুনা ও অন্যান্য তথ্যের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় করা জরুরি। এমন একটি কেন্দ্রীয় তথ্যব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহজে নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্যের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মরদেহের তথ্য মিলিয়ে দেখতে পারবে। একই সঙ্গে পরিচয় শনাক্তের জন্য সংগৃহীত ডিএনএ নমুনা যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পরিচয় শনাক্ত করা শুধু পরিবারের কাছে মৃত্যুসংবাদ পৌঁছে দেওয়ার বিষয় নয়। কোনো মৃত্যুর পেছনে অপরাধ থাকলে সেই পরিচয় তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠতে পারে। পরিচয় জানা না গেলে সম্ভাব্য সাক্ষী, পারিবারিক পরিস্থিতি, নিখোঁজ হওয়ার সময় এবং শেষবার কোথায় দেখা গিয়েছিল-এ ধরনের তথ্য সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়ে।একটি পরিবার তার স্বজনের মৃত্যুর খবর জানতে পারলেও শোকের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু প্রিয়জনের কোনো সন্ধান না পাওয়া পরিবারকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে। তাই পরিচয়হীন মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি অপরাধের রহস্য উদ্‌ঘাটনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।হত্যা মামলা হলেই কি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়?প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ৩৯২টি হত্যা মামলা হয়েছে। কিন্তু মামলা হওয়া আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়া এক কথা নয়। একটি মামলায় সত্য উদ্‌ঘাটন, প্রমাণ সংগ্রহ, অপরাধী শনাক্তকরণ, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচার সম্পন্ন করার দীর্ঘ প্রক্রিয়া রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত পৌঁছানোই গুরুত্বপূর্ণ।পরিচয়হীন মরদেহের ক্ষেত্রে তদন্তের জটিলতা আরও বেশি। মরদেহে পচন ধরলে আলামত নষ্ট হতে পারে। মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা কঠিন হতে পারে। আবার যে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, হত্যাকাণ্ডটি সেখানেই ঘটেছে-এমন নিশ্চয়তা নেই। অপরাধীরা এক স্থানে হত্যা করে অন্য স্থানে মরদেহ ফেলে দিতে পারে। ফলে তদন্তকারীদের বিভিন্ন সূত্র ধরে এগোতে হয়।তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এসব হত্যা মামলার অগ্রগতি কতটা? কতটি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে, কতটির অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, কতটি মামলায় বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং কতজন অপরাধী শাস্তি পেয়েছেন? প্রথম আলোর আলোচ্য প্রতিবেদনে এসব মামলার চূড়ান্ত পরিণতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। তাই অনুমানের ভিত্তিতে বিচারব্যবস্থার সাফল্য বা ব্যর্থতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই তথ্যগুলো চাওয়াই যুক্তিসংগত।কারণ, মামলা হওয়ার পর কী ঘটছে, সেটি জানা জনস্বার্থের বিষয়। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে তার কারণ কী, আলামতের অভাবে তদন্ত আটকে থাকলে সেই সীমাবদ্ধতা কীভাবে দূর করা যায়, আর দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকা মামলাগুলোর অগ্রগতি কী-এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।এখানে তদন্তকারী সংস্থার কাজকে আগাম ব্যর্থ বলা উদ্দেশ্য নয়। বরং তাদের কাজের জটিলতা স্বীকার করেই প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানানো জরুরি। ফরেনসিক পরীক্ষা, ডিএনএ বিশ্লেষণ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ তদন্তকারীর সমন্বয় ছাড়া অনেক জটিল অপরাধের রহস্য উদ্‌ঘাটন কঠিন হতে পারে। অপরাধীরা যদি মনে করে, হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দিলে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হবে এবং তারা সহজে পার পেয়ে যাবে, তাহলে সেই ধারণা ভেঙে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।মনে রাখতে হবে যে, অপরাধের বিচার শুধু অপরাধীর শাস্তির জন্য নয়, মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা তৈরি এবং অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ কমানোর জন্যও জরুরি।নদীকে অপরাধ আড়াল করার জায়গা হতে দেওয়া যাবে নানৌ পুলিশের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে এবং নিজেদের আড়াল করতে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। নদীর স্রোতে মরদেহ দূরে চলে যেতে পারে, দীর্ঘ সময় পানিতে থাকলে পচন ধরে আলামত নষ্ট হতে পারে। অপরাধীরা এই বাস্তবতাকে নিজেদের সুবিধা হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে-এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।এখানে রাষ্ট্রের প্রতিরোধমূলক দায়িত্ব সামনে আসে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধার, মামলা দায়ের ও তদন্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি অপরাধীরা যাতে নদীপথকে মরদেহ গোপন করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেই ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। দেশের বিস্তীর্ণ নদীপথে সব জায়গায় সার্বক্ষণিক নজরদারি করা কঠিন। এই সীমাবদ্ধতা বাস্তব। তবে কোথায় নজরদারি বাড়ানো দরকার, কোন ঘাট বা নির্জন এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ এবং কোন পথে সন্দেহজনকভাবে মরদেহ ফেলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে-এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রয়োজন অনুযায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা, আলোকসজ্জা, নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি নৌ পুলিশ, থানা পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় জোরদার করতে হবে। তবে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করাও জরুরি।প্রতিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তদন্তের সক্ষমতা বৃদ্ধি। আধুনিক ফরেনসিক পরীক্ষাগার, ডিএনএ বিশ্লেষণের সুযোগ এবং দক্ষ জনবল থাকলে পরিচয়হীন মরদেহ শনাক্ত করা ও মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। কোনো মরদেহ থেকে প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে বিকল্প বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহারের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারকে সহযোগিতা করা এবং তাদের কাছে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে যথাসম্ভব তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা প্রয়োজন। একটি পরিবার যখন তার স্বজনকে খুঁজছে, তখন প্রশাসনিক জটিলতা যেন তার দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে না দেয়।এসব উদ্যোগের কোনোটিই একা সব সমস্যার সমাধান করবে না। কিন্তু সমন্বিতভাবে এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে অপরাধের সুযোগ কমানো, পরিচয় শনাক্ত করা এবং তদন্তকে এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ হতে পারে।অপরাধের খবর যেন আমাদের অভ্যাসে পরিণত না হয়প্রতিদিন নানা ধরনের অপরাধের খবর সামনে আসে। আমরা ক্ষুব্ধ হই, শোক প্রকাশ করি, অপরাধীর শাস্তি দাবি করি। তারপর নতুন কোনো ঘটনা আগের ঘটনাকে আড়াল করে দেয়। এভাবে ভয়াবহ ঘটনাও একসময় আমাদের কাছে পরিচিত দৃশ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এই অভ্যস্ত হয়ে পড়াটাই বিপজ্জনক। কোনো অন্যায় বারবার ঘটছে বলে তা স্বাভাবিক হয়ে যায় না। বরং বারবার এমন ঘটনা সামনে এলে আমাদের খুঁজে দেখা উচিত, কোথায় প্রতিরোধ দুর্বল, তদন্তে কী সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী পরিবর্তন প্রয়োজন।নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বেড়েছে-এটি উদ্বেগের বিষয়। তবে শুধু এই সংখ্যা দিয়ে সব ধরনের অপরাধের প্রবণতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন মৃত্যুর ধরন অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য তথ্য, হত্যা মামলার অগ্রগতি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা। আবেগের পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি। তবেই সমস্যার প্রকৃত চেহারা বোঝা এবং কার্যকর সমাধানের দিকে এগোনো সম্ভব হবে।সবশেষে, নদীতে ভেসে ওঠা একটি মরদেহ আমাদের সামনে তিনটি মৌলিক দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রথমত, মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, যাতে কোনো পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে না থাকে। দ্বিতীয়ত, হত্যার ঘটনা প্রমাণিত হলে অপরাধীকে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার জন্য তদন্তকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিতে হবে। তৃতীয়ত, যেসব দুর্বলতা অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। নদীর স্রোত একটি মরদেহকে দূরে নিয়ে যেতে পারে, পানিতে নষ্ট হতে পারে অনেক আলামত। কিন্তু এসব কারণে সত্য অনুসন্ধানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একটি পরিচয়হীন মরদেহের পেছনে যে মানুষটি ছিলেন, তারও একটি জীবন ছিল, তার স্বজনদেরও সত্য জানার অধিকার রয়েছে। আর কোনো হত্যাকাণ্ডের পেছনে অপরাধী থাকলে তাকে শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করাই আইনের শাসনের দাবি।নদীতে কতটি মরদেহ উদ্ধার হলো, শুধু সেই হিসাব রাখাই যথেষ্ট নয়। জরুরি হলো, কতজনের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়া গেল, কতটি মৃত্যুর রহস্য উন্মোচিত হলো এবং এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো। মানুষের পরিচয়, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নদীতে ভেসে ওঠা প্রতিটি মরদেহ আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

নতুন আইন করলেই কি চাঁদাবাজি বন্ধ হবে?

ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই পুলিশকে মামলা করার সুযোগ দিতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন আইজিপি। কিন্তু চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইন থাকলেও কেন থামছে না অর্থ আদায়? রাজনৈতিক আশ্রয়, ভয়ের সংস্কৃতি, দুর্বল তদন্ত ও জবাবদিহির ঘাটতি দূর না হলে নতুন আইন কতটা কার্যকর হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। চাঁদাবাজির শিকার হয়েও থানায় যেতে চান না অনেক মানুষ। দোকান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি, ব্যবসা করতে না দেওয়ার ভয়, মারধর কিংবা পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তাদের নীরব থাকতে বাধ্য করে। অভিযোগ করলে বিপদ আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও কাজ করে। এই নীরবতার সুযোগেই চাঁদাবাজির একটি চক্র টিকে থাকে।এই বাস্তবতায় চাঁদাবাজি দমনে নতুন আইন করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) খুলনার বয়রায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পুলিশ লাইনসে কমিউনিটি পুলিশিংবিষয়ক সুধী সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘নতুন আইন পাস হলে ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ নিজে বাদী হয়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।’আইজিপির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রভাবশালী ব্যক্তি, সন্ত্রাসী কিংবা ক্ষমতাবানদের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে চান না, সাক্ষ্য দিতেও ভয় পান। এ বাধা দূর করতে ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ ও অপরাধের সূত্র ধরে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে আইনি কাঠামো তৈরির কথাও তিনি জানিয়েছেন।তবে নতুন আইন করার উদ্যোগ সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চাঁদাবাজি তো আগে থেকেই অপরাধ। তাহলে বিদ্যমান আইন দিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধা কোথায়? নতুন আইনে পুলিশের কী ক্ষমতা বাড়বে? আর সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা কী হবে?চাঁদাবাজি অপরাধ, আইনও আছেবাংলাদেশে চাঁদাবাজি নতুন কোনো অপরাধ নয়। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৮৩ থেকে ৩৮৯ ধারায় ভয় দেখিয়ে অর্থ বা সম্পদ আদায় এবং এ উদ্দেশ্যে কাউকে ভয়ভীতি দেখানোর বিভিন্ন অপরাধের বিধান রয়েছে। দণ্ডবিধির ৩৮৩ ধারায় চাঁদাবাজির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কারও ক্ষতি করার ভয় দেখিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে তাকে অর্থ, সম্পদ বা মূল্যবান জামানত দিতে বাধ্য করলে তা চাঁদাবাজির অপরাধ হতে পারে। ৩৮৪ ধারায় এ অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। অন্যদিকে, গুরুতর ক্ষতি বা মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের মতো অপরাধের জন্য পরবর্তী ধারাগুলোতে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এসব আইন সরকারের আইনভান্ডারে রয়েছে। অর্থাৎ চাঁদাবাজিকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নতুন আইন প্রয়োজন হচ্ছে না। আইজিপির ঘোষণায় যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো—ভুক্তভোগী সামনে না এলেও পুলিশ কীভাবে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে। এখানে একটি আইনি পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের কাছে অপরাধের তথ্য থাকা, মামলা নথিভুক্ত করা, তদন্ত শুরু করা, কাউকে গ্রেপ্তার করা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। প্রতিটি পর্যায়ের নিজস্ব আইনগত শর্ত রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে কোন পর্যায়ে কী পরিবর্তন আনা হবে, তা খসড়া প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।চাঁদাবাজি কেন থামছে নাচাঁদাবাজির বিস্তার বোঝার জন্য শুধু অপরাধীর সংখ্যা বা মামলা গণনা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, অর্থ আদায়ের নেটওয়ার্ক কীভাবে চলে এবং কেন তা ভাঙা কঠিন। রাজধানীতে চাঁদাবাজির ধরন নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে ফুটপাতের দোকান, বাজার, পরিবহন টার্মিনাল, নির্মাণকাজ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সেবাখাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে। কোথাও প্রতিদিন দোকানপ্রতি টাকা নেওয়া হয়, কোথাও মাসিক চাঁদা নির্ধারণ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে একাধিক গোষ্ঠী একই ব্যবসায়ী বা বাজার থেকে টাকা আদায় করে বলে অভিযোগ রয়েছে।২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকার বরাতে বলা হয়, রাজধানীতে চাঁদাবাজির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত হিসেবে ১২৮০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৪৮ জনকে সশস্ত্র অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এগুলো পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্দেহভাজনের সংখ্যা, আদালতে প্রমাণিত অপরাধীর সংখ্যা নয়।এ ধরনের তথ্য থেকে বোঝা যায়, চাঁদাবাজি সব সময় বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধীর কাজ নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর সঙ্গে ভয়ভীতি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ দখল, রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যবহার কিংবা সংগঠিত অপরাধের যোগসূত্র থাকতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে এসব সংযোগ আলাদাভাবে তদন্ত করে প্রমাণ করতে হবে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু কাউকে গ্রেপ্তার করা নয়; অর্থ আদায়ের পুরো ব্যবস্থাটি শনাক্ত করা। একজন টাকা সংগ্রহ করেন, আরেকজন তাকে নিয়ন্ত্রণ করেন, অন্য কেউ রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটান—এমন অভিযোগ থাকলে তদন্তে পুরো নেটওয়ার্কের ভূমিকা খুঁজে দেখা প্রয়োজন।ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না কেনচাঁদাবাজির অভিযোগ না করার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, নিরাপত্তার ভয়। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া, দোকানে হামলা, মারধর কিংবা পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। অভিযোগের পরও যদি ভুক্তভোগীকে একই এলাকায় থাকতে ও ব্যবসা চালাতে হয়, তাহলে তাঁর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।দ্বিতীয়ত, প্রতিশোধের আশঙ্কা। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হলে অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন থাকবে কি না, তদন্তের খবর অভিযুক্তের কাছে পৌঁছাবে কি না—এসব প্রশ্নও ভুক্তভোগীকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।তৃতীয়ত, আইনের প্রয়োগ নিয়ে অনাস্থা। অভিযোগ করার পরও যদি অপরাধীকে আটক করা না হয়, মামলা এগোয় না কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তি আবার ফিরে এসে অর্থ দাবি করেন, তাহলে অন্য ভুক্তভোগীরাও নীরব থাকার পথ বেছে নিতে পারেন।এই পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীর অভিযোগের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে পুলিশকে নিজস্ব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তের সুযোগ দেওয়া কার্যকর হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পুলিশকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।নতুন আইনে কী থাকা জরুরিআইজিপি যে উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন, তার বিস্তারিত খসড়া বা চূড়ান্ত আইন প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট বিধান সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে কার্যকর আইন তৈরির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।১. অভিযোগ ছাড়াই ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট শর্তপুলিশ কোন ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে মামলা বা তদন্ত শুরু করতে পারবে, তা আইনে পরিষ্কার থাকতে হবে। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিও, অডিও, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, ডিজিটাল যোগাযোগ কিংবা একাধিক স্বাধীন সূত্রের তথ্য কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তারও নিয়ম থাকা দরকার। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হলে নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হতে পারেন। তাই তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি ও তদন্তের নথি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।২. ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তাভুক্তভোগীকে অভিযোগ করতে বাধ্য করা যাবে না; আবার তিনি অভিযোগ না করলেও তার নিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করা যাবে না। পরিচয় গোপন রাখা, হুমকির অভিযোগ দ্রুত যাচাই, প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা সহায়তা এবং প্রতিশোধমূলক হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—এসবকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে পরিচয় গোপন রাখার প্রতিশ্রুতিও বাস্তবসম্মত হতে হবে। আদালতে সাক্ষ্য বা তদন্তের প্রয়োজনে পরিচয় প্রকাশের প্রয়োজন হলে কী সুরক্ষা দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা দরকার।৩. রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইন প্রয়োগচাঁদাবাজির সঙ্গে কেউ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করলে তার পরিচয় যেন তদন্তে বাধা না হয়। একইভাবে, কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রতিপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধীও ঘোষণা করা যাবে না। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মূল বিবেচনা হওয়া উচিত প্রমাণ, অপরাধে সংশ্লিষ্টতা ও আইনি দায়। প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং দুর্বল ব্যক্তিকে সহজে গ্রেপ্তার করা—দুই ধরনের বৈষম্যই আইনের প্রতি আস্থা নষ্ট করে।৪. পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোভুক্তভোগীর অভিযোগ ছাড়াই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাড়লে পুলিশের উদ্যোগে তদন্ত শুরু করার ক্ষেত্রও বাড়বে। এটি চাঁদাবাজি দমনে সহায়ক হতে পারে, তবে একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ব্যবসায়িক বিরোধ, জমিজমা নিয়ে বিরোধ বা ব্যক্তিগত শত্রুতাকে চাঁদাবাজির মামলা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনগত শর্ত মানতে হবে; অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।৫. অর্থের উৎস ও সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করাচাঁদা সংগ্রহকারীকে গ্রেপ্তার করলেই পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে যায় না। তদন্তে অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কার নির্দেশে সংগ্রহ হচ্ছে এবং অপরাধের সুবিধাভোগী কারা—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। ডিজিটাল লেনদেন, ফোনে যোগাযোগ, ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য আইনসম্মত তথ্য-প্রমাণ কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনগত সুরক্ষা বজায় রাখা জরুরি।তালিকা আছে, তবু ব্যবস্থা নিতে সমস্যা কোথায়চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য বিদ্যমান আইন প্রয়োগের বাস্তবতাও দেখা জরুরি। গত ২১ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় ৫৪৫ সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের একটি তালিকা তৈরি করে মহানগর পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধায় ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে বলা হয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছিল।এই তথ্যের তাৎপর্য হলো, সন্দেহভাজনের তালিকা তৈরি করা আর তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এক নয়। তদন্ত, গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র ও বিচার—প্রতিটি পর্যায়ে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক চাপ বা প্রতিশোধের ভয় যেন আইন প্রয়োগে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদি বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে পুলিশ প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারে, তাহলে নতুন আইন সেই সমস্যার কতটা সমাধান করবে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। নতুন আইন কার্যকর হতে হলে শুধু ক্ষমতা বাড়ানো নয়, সেই ক্ষমতা প্রয়োগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।কমিউনিটি পুলিশিং নতুন ঝুঁকি?আইজিপি জানিয়েছেন, কমিউনিটি পুলিশিংকে পুলিশের একটি শাখা হিসেবে কাজ করানোর জন্যও আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করেছেন, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ক্ষমতা ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল ধারণা হলো, পুলিশ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো। স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, অপরাধ প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীকে সহায়তা এবং পুলিশের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।কিন্তু কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও সীমা স্পষ্ট না থাকলে নতুন ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি এই ব্যবস্থাকে নিজেদের বিরোধীদের চাপে রাখা কিংবা অর্থ আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে যে সমস্যা সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিই আরও জটিল হতে পারে।তাই কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সদস্যদের নিয়োগ বা অন্তর্ভুক্তির মানদণ্ড, দায়িত্ব, আচরণবিধি, অভিযোগ গ্রহণের পদ্ধতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—সবকিছু স্বচ্ছ হওয়া দরকার। তাঁদের কোনো আইনগত ক্ষমতা দেওয়া হলে তার সুনির্দিষ্ট সীমা ও তদারকিও থাকতে হবে।চাঁদাবাজি বন্ধের আসল পরীক্ষাআইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগের মধ্যে আইজিপি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বলপ্রয়োগ করলে পুলিশকে ফ্যাসিবাদী বলা হয়, আর বলপ্রয়োগ না করলে মানুষ পুলিশকে দুর্বল মনে করে। তার বক্তব্যে গত ১৭ বছরে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কথাও উঠে এসেছে।এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপট যাই হোক, চাঁদাবাজি দমনের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ: পুলিশের কার্যকারিতা শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো, তা দিয়ে মাপা যায় না। কতজন ভুক্তভোগী নিরাপদে অভিযোগ করতে পারছেন, কতটি মামলায় নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে, কতজন অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রমাণসহ অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে এবং বিচার শেষে অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছেন কি না—এসবও দেখতে হবে। চাঁদাবাজি কমেছে কি না, তা বোঝার জন্য নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করা প্রয়োজন। কতটি অভিযোগ এসেছে, কতটি মামলা হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, কতটি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং কতটি মামলায় বিচার হয়েছে—এসব তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করলে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা সহজ হবে। অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে গেলেই যে অপরাধ বেড়েছে, তা-ও নয়; ভুক্তভোগীরা নিরাপদ বোধ করে বেশি অভিযোগ করলেও সংখ্যা বাড়তে পারে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চাঁদাবাজি বন্ধের নামে নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন। আইনের শাসন মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়; একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোও।নতুন আইন যদি ভুক্তভোগীর নীরবতার বাধা দূর করে, পুলিশের তদন্তকে তথ্য-প্রমাণনির্ভর করে এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে, তাহলে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ যদি নির্বাচিতভাবে হয়, প্রভাবশালীরা সুরক্ষা পান কিংবা পুলিশি ক্ষমতার জবাবদিহি না থাকে, তাহলে নতুন আইনও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারবে না।শেষ পর্যন্ত চাঁদাবাজি বন্ধের পরীক্ষা নতুন আইন পাসের দিন নয়; পরীক্ষা হবে সেই দিন, যেদিন একজন সাধারণ দোকানি, পরিবহনশ্রমিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও নিরাপদে নিজের কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন।

ইতিহাস আর ইতিহাসের ডাস্টবিন!

ষাটের দশকের প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের নেত্রী, ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদের ১৯৬১-৬২ শিক্ষাবর্ষের ভিপি, ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষের ডাকসুর জিএস এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মতিয়া চৌধুরীর মৃত্যুর পর দুটি বছর পার হয়ে গেল। নীরবে-নিভৃতে তার মৃত্যুদিন পার হলেও বারবার মনে পড়ছিল, এই বিশাল বাংলাদেশে ইউনূস আমলে মতিয়া চৌধুরীর মতো রাজনীতিবিদের নিজের জন্য আলাদা করে কবরের জায়গা হলো না, পেলেন না মুক্তিযোদ্ধার অন্তিম সম্মান। তার মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবন বা শহীদ মিনারের পাদদেশে নিতে দেওয়া হয়নি। এ দুঃখবোধ অনেককেই পীড়িত করে। হতে পারে, তিনি আওয়ামী লীগের নেত্রী ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তো শুধুমাত্র দুর্নীতিগ্রস্তদের দল নয়। মতিয়া চৌধুরীর মতো ব্যক্তি জীবনে সৎ বহু মানুষও এই দল করেন, এখনো দলকে ভালোবাসেন। আমাদের পছন্দ-অপছন্দ যা-ই থাকুক, এই দল তো বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। আর ইউনূসের অন্তর্বর্তী দেড় বছর এবং তৎপরবর্তী আট মাসের শাসন দেখে তো স্পষ্ট যে কর্তৃত্ববাদী মনোভাবে, দলবাজি আর দখলদারত্বে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বজায় রাখতে, অর্থনীতিতে লুটেরা ধারা অব্যাহত রাখতে—কেহ কারে নাহি পারে সমানে সমান।ষাটের দশকে মতিয়া চৌধুরীর অগ্নিঝরা বক্তৃতা সামরিক শাসক আইয়ুব খানের গদিতে কাঁপন ধরাত। ‘৬৭ সালে আপত্তিকর বক্তৃতা করার অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করার পর থেকে শেখ মুজিবের মুক্তি চাই স্লোগানের সঙ্গে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর মুক্তি চাই স্লোগানও ছাত্র আন্দোলন ও গণ-আন্দোলনের অন্যতম স্লোগান ছিল। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তার যে উদ্দীপ্ত ভাষণ, সেই উদ্দীপ্ত ভাষণ তাকে অগ্নিকন্যার রূপ দিয়েছিল। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে আশির দশকের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনসহ ইতিহাসের কিছু গৌরবান্বিত অধ্যায়ে তার নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে। আইয়ুব খানের আমলে তিনি চারবার কারাবরণ করেন। স্বাধীন দেশেও বিভিন্ন সামরিক সরকারের সময়ে তাকে একাধিকবার কারান্তরালে থাকতে হয়েছে।মতিয়া চৌধুরীকে প্রথম দেখেছি দূর থেকে ১৯৭০ সালে খুলনায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির এক জনসভায়। আর খুব কাছ থেকেও দেখি ১৯৭২ সালে গোপালগঞ্জের থানাপাড়ায় আমার মামাবাড়িতে। ন্যাপের জনসভা শেষে বিশ্রাম নিতে এসেছিলেন। মতিয়া চৌধুরীকে কাছ থেকে দেখার জন্য বাসা ও বাসার সামনের মাঠ লোকে লোকারণ্য। তাই কথা বলার মতো সুযোগ পাইনি।কথা বলার এবং তার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার সুযোগ হয় ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়ে। তখন জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী এবং সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি পদে আসীন জেনারেল জিয়ার বিরুদ্ধে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ঐক্য জোট’ মুক্তিযুদ্ধকালের মুক্তিবাহিনীপ্রধান মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীকে প্রার্থী করে। গণতান্ত্রিক ঐক্য জোটের কার্যালয় ছিল বঙ্গভবনের পেছনের দিকটায় ওয়ারীতে ঢোকার মুখের রাস্তায়। মতিয়া আপার বাসা সেখান থেকে খুব একটা দূরে নয়। পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডের নাসিরুদ্দিন লেনের একটি ভাড়া বাসায় তিনি দীর্ঘকাল বসবাস করতেন। মতিয়া আপা অধিকাংশ দিনই নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ঢাকার বাইরে থাকতেন। যেদিন ঢাকায় থাকতেন এবং সন্ধ্যায় ঐক্যজোট অফিসে আসতেন, তখন প্রায়ই আমার ডাক পড়ত মতিয়া আপাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এই পৌঁছে দেওয়ার পথে তার সঙ্গে পরিচয়টা গড়ে ওঠে।এরপর ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলের ছাত্র ইউনিয়ন সম্মেলনে মতিয়া আপাকে অতিথি করায় তাকে বাসা বা ন্যাপ অফিস থেকে নিয়ে আসতাম এবং পরে বাসায় পৌঁছে দিতাম। তখন রাজনীতি নিয়ে অনেক আলাপ হতো। আমার মতামত ওনার পছন্দ হতো না। ধমক দিতেন। ডাকসু নির্বাচনও তখন খুবই সন্নিকটে। ছাত্র ইউনিয়ন এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে শুনে তিনি আমাকে বকাঝকা শুরু করলেন—যেন আমিই নীতিনির্ধারক! যাহোক, আমার কাছ থেকে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনী কৌশল জানার পর কয়েক দিন আমার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেল। মতিয়া আপা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কয়েকটি হলের সম্মেলনে অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন।এর অল্প কিছুদিন পরেই তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। যোগদানের দু-এক দিন আগে সিপিবি অফিসে ফরহাদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। বের হওয়ার সময় দেখলাম, চোখ ছলছল। অন্য কারও সঙ্গে কথা বললেন না। ধীর পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। এরপর আর মতিয়া আপার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। এমনকি মগবাজার রমনা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে তার প্রতিবেশী হওয়ার পরও নয়। মন্ত্রীদের বাসায় যেতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম না। তবে মাঝেমধ্যেই বাসা থেকে সচিবালয় অভিমুখে তার গাড়ি যাওয়ার সময় দেখতাম, গাড়ির ভেতরে বসে আছেন। কোনো রকম পুলিশি প্রহরা ছাড়াই তিনি চলাচল করতেন।আওয়ামী লীগ আমলে মন্ত্রী হিসেবে এবং মন্ত্রণালয় পরিচালনায় তিনি যে সৎ, দক্ষ এবং সফল ছিলেন, তা তার রাজনৈতিক বিরোধীরাও বলে থাকেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে যে দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বে ছিলেন, সেই দল দেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে কারচুপি-কারসাজির ভোট অনুষ্ঠিত করে ক্ষমতা আঁকড়ে ছিল। মতিয়া চৌধুরীকে সেই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পক্ষে নিঃশর্ত ওকালতি করতে দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি, ব্যথিত হয়েছি। এটা তার জীবন ও সংগ্রামের সঙ্গে যায় না। তবে কোনো সুবিধাপ্রাপ্তির আশায় তিনি বাম আদর্শ ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেননি। এটা একান্তই তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। আমি পাঁচ বছর মগবাজার রমনা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে তার প্রতিবেশী ছিলাম। তিনি তখন মন্ত্রী। আমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কেরানি হয়েও থাকতাম ১,৬০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে। আর মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী থাকতেন ৮০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত নির্লোভ, সাদামাটা ও সততার প্রতীক হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন।মতিয়া চৌধুরীর মতো রাজনীতিবিদকে সম্মান না জানিয়ে সেদিন ইউনূস তার ছোট মনের পরিচয়কেই সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন। জীবন অবসানের পর পত্রপত্রিকায় মতিয়া চৌধুরীর সংগ্রামী ও নির্লোভ জীবন নিয়ে সংবাদ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হলে ইউনূস ডাস্টবিন শফিক হিসেবে খ্যাত তার প্রেস সচিবকে দিয়ে পত্রিকাগুলোকে ধমক দিয়ে ও উপহাস করে স্ট্যাটাস দেওয়ান যে, ‘মতিয়া চৌধুরীকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ ও নিবন্ধ দেখে মনে হচ্ছে একজন মুরিদ তার পীর সম্বন্ধে লিখছেন’।অবশ্য শুধুমাত্র মতিয়া চৌধুরী ইস্যু নয়, ক্ষমতাসীন হয়ে ইউনূস অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছোট মনের পরিচয় দিয়ে তার কিশোর বাহিনীর মাধ্যমে রাজনীতির ময়দানে ক্রোধ ও প্রতিহিংসা উসকে দিয়েছিলেন। ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভাঙাসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক ধ্বংস, সবকিছুই হয়েছে তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে ও সমর্থনে। তিনি বিদেশি সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকারে বললেন, তার সরকার রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের নীতিতে বিশ্বাসী নয়, কিন্তু নিষিদ্ধ আয়োজন সম্পন্ন করতে নিজ সরকারি বাসভবনের সামনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে তার কিশোর-তরুণ বাহিনী ও উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নামিয়ে দিলেন। তার সঙ্গে যার যত মতান্তর থাকুক না কেন, তিনি নোবেল বিজয়ী হয়ে নিজেকে একটা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। দেড় বছরের অন্তর্বর্তী শাসনকালে নিজেই তা আবার ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে গেলেন। তিনি ইতিহাসের রিসেট বাটনে চাপ দিয়ে এমন কিশোর-তরুণ বাহিনী সৃষ্টি করে গেছেন, যারা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ছবি কালি দিয়ে লেপ্টে দিচ্ছে। তারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে, তাদের ভীতসন্ত্রস্ত করে দুর্গাপূজা উৎসবের এই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে ‘গরু জবাই ও গরু ভোজের’ মহোৎসব করছে। ইউনূসীয় দীক্ষায় এ কোন তরুণদের আবির্ভাব হলো! এরা ঠিক যেন পশ্চিমবঙ্গের নবহিন্দুত্ববাদী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ইসলামী সংস্করণ। দেশকে ধর্মীয় বিভাজনের পথে নিয়ে যাওয়ার এ দায় প্রধানত ইউনূসের ওপরই বর্তায়। আর ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সব পথ বন্ধ করে দেওয়ায় সমাজে যে ধর্মীয় উগ্রপন্থার উত্থান হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করায় বিক্ষুব্ধ তারুণ্যের যে বিকৃত উত্থান হয়েছে—শেখ হাসিনা ও তার দলও কি এ দায় এড়াতে পারবেন?অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী এ দেশের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র আন্দোলনের সৃষ্টি। ইতিহাস মতিয়া চৌধুরীকে সমালোচনাসহ তার প্রাপ্য সম্মান দেবে। কিন্তু রিসেট ‘বাটন টেপনেওয়ালাদের’ জন্য হয়তো শেষ পর্যন্ত শফিকুল ইসলাম সাহেবই ইতিহাসের ডাস্টবিন প্রস্তুত করে যাবেন।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

ইলিশ সংরক্ষণে জেলেদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত হোক

ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের বিপুলসংখ্যক মৎস্যজীবীর জীবিকা, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা এবং জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহ নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই ইলিশের প্রজনন, বংশবৃদ্ধি ও উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে প্রশ্ন হলো, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রচলিত পদ্ধতি কতটা কার্যকর এবং এর সুফল কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে?ইলিশ সংরক্ষণে শুধু নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা, নদীতে অভিযান পরিচালনা, জাল জব্দ বা ধ্বংস করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে অংশগ্রহণমূলক, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। অর্থাৎ জেলেদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, ইলিশ সংরক্ষণের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।ব্যয় ও কার্যকারিতার মূল্যায়ন জরুরিইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী ও পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও বাহিনীকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। নদীতে অভিযান, নৌযান ব্যবহার, জনবল নিয়োগ, জাল জব্দ ও পাহারার মতো কার্যক্রমে অর্থ ও শ্রম ব্যয় হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগের বিপরীতে নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হচ্ছে, কতজন জেলে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকছেন এবং ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদনে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, তা নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।নদীতে অভিযান পরিচালনা করলেই নিষেধাজ্ঞা শতভাগ কার্যকর হয় না। একইভাবে, বিপুলসংখ্যক জাল জব্দ করাও সংরক্ষণ কার্যক্রমের সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে অবৈধ মাছ ধরা কমানো, ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি সুরক্ষিত রাখা, জেলেদের আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা উন্নত করার ওপর। তাই সরকারি অর্থ ও জনবল ব্যবহারের কার্যকারিতা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।জেলেদের সম্পৃক্ততা কেন প্রয়োজনইলিশ সংরক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন মৎস্যজীবীরা। নদীর গতিপ্রকৃতি, মাছের বিচরণক্ষেত্র ও স্থানীয় পরিবেশ সম্পর্কে তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে তাদের প্রধানত নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। নদী ও খালের বিস্তীর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক সরকারি নজরদারি ব্যয়সাপেক্ষ। স্থানীয় জেলেদের অংশগ্রহণ এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরতে না পারলে জেলেদের পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে সংকট দেখা দিতে পারে। বিকল্প জীবিকা ও পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষার অভাবে কেউ কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে বাধ্য হতে পারেন। তাই জেলেদের জীবিকা ও ইলিশ সংরক্ষণকে পরস্পরবিরোধী না ভেবে একই ব্যবস্থাপনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখতে হবে। ইলিশ সংরক্ষণে কয়েকটি প্রস্তাব:সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনস্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এতে মৎস্যজীবীদের প্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, মৎস্য অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। কমিটির দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি ও জবাবদিহি সুস্পষ্ট হতে হবে। প্রকৃত জেলেদের অংশগ্রহণ এবং তাদের পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে। এতে স্থানীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে।বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণইলিশের প্রজননচক্র, মৎস্য গবেষণা ও নদীর পরিবেশগত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করতে হবে। স্থানীয় কমিটি জেলে ও জনগোষ্ঠীর মতামত নিয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারে। তবে আইনগতভাবে নির্ধারিত নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবর্তনের ক্ষমতা যথাযথ কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সরকার, জেলে প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব স্পষ্ট করা প্রয়োজন।জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জাম নিরাপদে সংরক্ষণনিষেধাজ্ঞার সময় প্রকৃত জেলেদের মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম স্থানীয় কমিটির তত্ত্বাবধানে নিরাপদে সংরক্ষণের ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। এ জন্য জালের মালিকের পরিচয়, নিবন্ধন নম্বর, ধরন ও সংখ্যা উল্লেখ করে তালিকা তৈরি করতে হবে। জাল জমা ও ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে লিখিত রসিদ এবং স্বচ্ছ হিসাব রাখতে হবে। এ ব্যবস্থা চালুর আগে জেলেদের মতামত, নিরাপত্তা ও ব্যয় যাচাই করা জরুরি। কোনোভাবেই জেলেদের বৈধ সম্পত্তির অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না।নৌকা ও ঘাট ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় নজরদারিনিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরার নৌকাগুলো উপযুক্ত ও নিরাপদ ঘাটে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে নৌযান চলাচল, জোয়ার-ভাটা, বন্যা ও জরুরি চলাচলের বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক ঘাট নির্ধারণ করা যেতে পারে। নৌকার তালিকা তৈরি, ঘাটের নিরাপত্তা ও নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে বণ্টন করা সম্ভব। তবে এ ব্যবস্থা যেন নৌপথের স্বাভাবিক চলাচল ও নিরাপত্তায় বিঘ্ন না ঘটায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।প্রকৃত জেলে শনাক্তকরণ ও সামাজিক সুরক্ষানিবন্ধিত জেলেদের তালিকা নিয়মিত যাচাই করে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের শনাক্ত করতে হবে। মৎস্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, উপজেলা প্রশাসন ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এ কাজ করা যেতে পারে। তালিকা তৈরিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রকৃত জেলেরা বাদ না পড়েন এবং অযোগ্য কেউ সুবিধা নিতে না পারেন। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা, চিকিৎসা ও শিশুদের শিক্ষার বিষয় বিবেচনায় পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি সহায়তা যথাসময়ে ও সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছালে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার সক্ষমতা বাড়বে।বিকল্প আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিনিষেধাজ্ঞার সময় আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প আয় ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। জেলেদের আগ্রহ, দক্ষতা ও স্থানীয় বাজারের চাহিদা বিবেচনায় হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, সবজি চাষ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, জাল মেরামত এবং নৌযান মেরামতের মতো কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। প্রশিক্ষণের সঙ্গে আয়মূলক কাজ, প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা ও বাজারসংযোগের সুযোগও তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী ভাতা ও খাদ্যসহায়তা সময়মতো বিতরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে নিষেধাজ্ঞার সময়েও জেলেরা পরিবারের ব্যয় নির্বাহের সুযোগ পাবেন।সামাজিক প্রতিরোধ ও আইন প্রয়োগে সহযোগিতানিষেধাজ্ঞাকালে অবৈধ মাছ ধরা প্রতিরোধে স্থানীয় কমিটি সচেতনতা সৃষ্টি, তথ্য আদান-প্রদান ও সামাজিক উদ্যোগ নিতে পারে। নদীতে সন্দেহজনক কার্যক্রমের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করা হবে কমিটির অন্যতম দায়িত্ব। তবে প্রচলিত আইনে ক্ষমতা অর্পিত না থাকলে কমিটি কাউকে আটক, শাস্তি প্রদান কিংবা জাল ও নৌকা বাজেয়াপ্ত করতে পারবে না। আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যথাযথ কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নজরদারি ও সরকারি বাহিনীর পেশাগত সক্ষমতার সমন্বয় হলে অবৈধ মাছ ধরা প্রতিরোধ আরও কার্যকর হতে পারে।পরীক্ষামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে কার্যকারিতা যাচাইসহ-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে সব দায়িত্ব শুধু সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। তবে এ ব্যবস্থার জন্যও প্রশিক্ষণ, সমন্বয়, সরঞ্জাম সংরক্ষণ ও সামাজিক সুরক্ষায় অর্থের প্রয়োজন হবে। তাই একে ব্যয়হীন ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা না করে বিদ্যমান পদ্ধতির সঙ্গে এর ব্যয় ও কার্যকারিতার তুলনা করতে হবে।এ জন্য কয়েকটি উপযুক্ত নদী বা এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে সহ-ব্যবস্থাপনা চালু করা যেতে পারে। নিষেধাজ্ঞা পালনের হার, অবৈধ মাছ ধরার ঘটনা, ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য, জেলেদের আয় এবং সরকারি ব্যয়ের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সন্তুষ্টিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। স্বাধীন মূল্যায়নে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য এলাকায় এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।ইলিশ রক্ষায় চাই রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগইলিশ সংরক্ষণ শুধু মৎস্য অধিদপ্তর বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একক দায়িত্ব নয়। এটি রাষ্ট্র, মৎস্যজীবী, স্থানীয় সরকার, গবেষক, নাগরিক সমাজ ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত দায়িত্ব। শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই এ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার উপযোগী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে।একজন জেলে নদীতে মাছ ধরে নিজের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি দেশের খাদ্য সরবরাহ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। তাই তার জীবিকা সুরক্ষিত রেখে ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। জেলেরা যদি নিষেধাজ্ঞাকে কেবল জীবিকার ওপর বাধা হিসেবে না দেখে ইলিশের ভবিষ্যৎ রক্ষার যৌথ উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে সংরক্ষণ কার্যক্রমের স্থায়িত্ব বাড়বে।অতএব, প্রচলিত ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে জেলেকেন্দ্রিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক সহ-ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নিষেধাজ্ঞা ও আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জেলেদের অংশীদারত্ব, বিকল্প জীবিকা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জবাবদিহিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ সমন্বিত উদ্যোগই ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন সুরক্ষা এবং মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় টেকসই ভূমিকা রাখতে পারে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক প্রকল্প সমন্বয়কারী, ইকোফিশ বাংলাদেশ]

চলনবিলের অস্তিত্বের সংকট: প্রকৃতি বাঁচলেই বাঁচবে জীবিকা

একটি জলাভূমি হারিয়ে গেলে শুধু পানির পরিমাণ কমে যায় না; হারিয়ে যায় মাছের আবাস, কৃষির সম্ভাবনা, মানুষের জীবিকা এবং একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিচয়। চলনবিল আজ সেই বাস্তবতার মুখোমুখি। দখল, দূষণ, পানিপ্রবাহের সংকট ও নির্বিচার সম্পদ আহরণে বিপর্যস্ত এ জলাভূমির ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু পরিবেশের প্রশ্ন নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন।একসময় বর্ষায় দিগন্তজোড়া জলরাশি, দেশি মাছের প্রাচুর্য আর প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ছিল চলনবিল। বিস্তীর্ণ জলাভূমিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল কৃষি, মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদনের অর্থনীতি। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশিতে নৌকা চলত, আর শুষ্ক মৌসুমে বিলের পানি ও পলিকে কাজে লাগিয়ে চলত কৃষিকাজ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই পরিচিত দৃশ্যপট। নদী-খাল ভরাট, জলাভূমি দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো, পানির স্বল্পতা ও অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ চলনবিলের স্বাভাবিক পরিবেশকে চাপে ফেলেছে। এর মূল্য দিচ্ছে প্রকৃতি ও মানুষ—উভয়ই।আয়তনের হিসাব নয়, গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির ভবিষ্যৎচলনবিল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি। সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীবনযাত্রার সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বর্ষায় বিলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে যায়; শুষ্ক মৌসুমে অনেক স্থান কৃষিজমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই মৌসুমি পরিবর্তনই চলনবিলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও নথিতে চলনবিলের আয়তন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে এর আয়তন ৫৫০ বর্গমাইল বা প্রায় ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার উল্লেখ করা হয়েছিল। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘বাংলার ভ্রমণ’ গ্রন্থে আয়তন বলা হয় ৪৪১ বর্গমাইল বা প্রায় ১ হাজার ১৪২ বর্গকিলোমিটার। পরবর্তী বিভিন্ন প্রতিবেদনেও আয়তন কমে আসার কথা উঠে এসেছে। তবে বিভিন্ন সময়ের পরিমাপপদ্ধতি এক না হওয়ায় এসব সংখ্যা সরাসরি তুলনা করে আয়তন হ্রাসের নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করা যায় না। এ জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত জরিপ।আয়তনের হিসাব নিয়ে মতভেদ থাকলেও জলাভূমির ওপর চাপ অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কোথাও পলি জমে নদী-খালের গভীরতা কমেছে, কোথাও দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে পানিপ্রবাহ। কচুরিপানার বিস্তার এবং প্লাস্টিক, পলিথিনসহ নানা বর্জ্য পানিদূষণ বাড়াচ্ছে। কৃষিজমি সম্প্রসারণ ও অপরিকল্পিত সড়ক-অবকাঠামোও জলপ্রবাহে প্রভাব ফেলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।জলাভূমি সংকুচিত হওয়ার অর্থ শুধু পানির বিস্তার কমে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাছের বিচরণক্ষেত্র ও প্রজনন, জলজ উদ্ভিদ, পাখি এবং মানুষের জীবিকা। পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বাড়ে। একই সঙ্গে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হতে পারে। তাই চলনবিলকে শুধু মৌসুমি জলরাশি হিসেবে দেখলে চলবে না। এর নদী, খাল, জলাশয় ও সংযোগপথকে একই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।মাছ কমলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতিচলনবিলের সংকটের বড় দিক হলো মৎস্যসম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোথাও কোথাও নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে। প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ও পোনা আহরণের অভিযোগও রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা জলজ প্রাণীর আবাস সংকুচিত করতে পারে। নদী-খালের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, পানির গভীরতা কমে যাওয়া এবং দূষণও মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণে বাধা সৃষ্টি করে।মাছের উৎপাদন কমে গেলে ক্ষতি শুধু জেলেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মাছ ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, শুঁটকি উৎপাদক এবং মৌসুমি শ্রমিকেরাও এর প্রভাবের মুখে পড়েন। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল বহু মানুষের আয় কমে গেলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।এ কারণে মাছ রক্ষায় শুধু অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়। প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ, নদী-খালের পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং মৎস্যসম্পদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাছ আহরণে বিধিনিষেধের সময় জেলেদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে। মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা না করে কেবল নিষেধাজ্ঞা দিলে তা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর করা কঠিন হতে পারে।শামুক-ঝিনুক আহরণে জীবিকা ও পরিবেশের ভারসাম্যচলনবিলে শামুক-ঝিনুক আহরণ দরিদ্র মানুষের মৌসুমি আয়ের অন্যতম উৎস। সংগৃহীত শামুক-ঝিনুকের মাংস মাছের খাদ্য হিসেবে বিভিন্ন এলাকার ঘেরে সরবরাহ করা হয়। খোলস থেকে তৈরি হয় খাওয়ার চুন। এভাবে আহরণ, পরিবহন ও বেচাকেনাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতির একটি ক্ষুদ্র জীবিকাচক্র।স্থানীয়দের দাবি, তাড়াশের ২০ থেকে ২৫টি জলাভূমিতে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক নৌকায় শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়। স্থান ও সময়ভেদে প্রতি বস্তা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়; পাইকারি পর্যায়ে দাম ওঠে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। স্থানীয় সংগ্রহকারীদের হিসাবে, এ কাজে একজন মানুষ দিনে কয়েক শ টাকা আয় করতে পারেন। ফলে অনেক দরিদ্র পরিবারের কাছে শামুক-ঝিনুক আহরণ শুধু মৌসুমি পেশা নয়, সংসার চালানোরও একটি অবলম্বন।কিন্তু এই জীবিকার আড়ালে রয়েছে পরিবেশগত উদ্বেগ। শামুক-ঝিনুক জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ। নির্বিচারে আহরণে এদের প্রাকৃতিক মজুত কমে গেলে জলজ প্রাণীর খাদ্যপ্রাপ্তি ও পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আহরণের প্রকৃত মাত্রা এবং জলজ পরিবেশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া সমস্যার ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা কঠিন।তাই শামুক-ঝিনুক আহরণ পুরোপুরি বন্ধ করে দরিদ্র মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত করা যেমন সমাধান নয়, তেমনি পরিবেশগত প্রভাব উপেক্ষা করে নির্বিচারে আহরণের সুযোগ দেওয়াও যুক্তিসংগত নয়। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক জরিপের ভিত্তিতে আহরণের সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ, নিয়মিত নজরদারি এবং জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন। পাশাপাশি এ পেশার ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রকৃতি রক্ষা ও মানুষের জীবিকা—দুটিকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে টেকসই সমাধান।শুঁটকি শিল্পে উৎপাদন কমছে, চাপে হাজারো মানুষের জীবিকাচলনবিলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছে শুঁটকি উৎপাদন ও বাণিজ্য। বিলের মাছ শুকিয়ে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করার এ শিল্পে মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু কাঁচা মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্পটি এখন সংকটে।মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উল্লাপাড়া ও তাড়াশের ৬০টি শুঁটকি বাজারে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ৩০২ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১৮৫ দশমিক ১৭ মেট্রিক টনে। এক বছরে উৎপাদন কমেছে ১১৬ দশমিক ৮৩ মেট্রিক টন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ কম।তাড়াশের মহিষলুটিতে একসময় প্রায় ২৫টি শুঁটকি চাতাল চালু ছিল। এখন সেগুলোর প্রায় অর্ধেক বন্ধ হয়ে গেছে; সচল রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এ শিল্পে প্রায় ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই হাজারের বেশি পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ মৌসুমি আয়ের ওপর নির্ভরশীল। একজন শ্রমিকের দৈনিক আয় প্রায় ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা।চলনবিলের শুঁটকি দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এর বাজার রয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও দুবাইয়ের বাজারেও এ পণ্য যায়।মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর অঞ্চলে ২৭৫টি শুঁটকি চাতাল রয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪৫০ মেট্রিক টন এবং সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এ পরিমাণ শুঁটকি উৎপাদনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন কাঁচা মাছ প্রয়োজন।উৎপাদন কমে যাওয়ার এই চিত্র দেখিয়ে দেয়, প্রাকৃতিক সম্পদের সংকট কীভাবে একটি শিল্পকে দুর্বল করে দিতে পারে। কাঁচা মাছের জোগান কমলে চাতাল বন্ধ হয়, শ্রমিক কাজ হারান, ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন এবং পরিবারগুলোর আয় কমে যায়। ফলে শুঁটকি শিল্পকে বাঁচাতে শুধু উৎপাদনস্থলের উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; যে জলাভূমি থেকে মাছ আসে, সেটিকেও রক্ষা করতে হবে।শুঁটকি শিল্পের আধুনিকায়ন, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মাছ শুকানোর ব্যবস্থা, সংরক্ষণাগার, বাজারজাতকরণে সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া প্রয়োজন। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি মাছের প্রাকৃতিক উৎস রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে শিল্পটির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব হবে না।পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে প্রকৃতি রক্ষা করেবর্ষায় চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি, নৌভ্রমণ ও গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। পরিকল্পিত প্রচার ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা গেলে চলনবিলকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।সরকারি উদ্যোগে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। নিরাপদ নৌভ্রমণ, পরিচ্ছন্ন ঘাট, বিশ্রামাগার, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পণ্য বিক্রির বাজার গড়ে উঠলে নৌকার মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৎস্যজীবী ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কর্মসংস্থান বাড়তে পারে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব আয়ও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।তবে পর্যটনের নামে জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ কিংবা বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণের সুযোগ দেওয়া যাবে না। পর্যটনকেন্দ্র গড়তে হবে জলপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে। নৌযানের নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে পর্যটন গড়ার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সেই পর্যটনের আকর্ষণকেই নষ্ট করবে।চলনবিল রক্ষায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজনচলনবিলের সংকট বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। জলাভূমি ভরাট ও পানিপ্রবাহে বাধা মাছের আবাস ও প্রজননকে প্রভাবিত করে। মাছের উৎপাদন কমলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুঁটকি শিল্প ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিকেরা। অন্যদিকে, শামুক-ঝিনুকের নির্বিচার আহরণ জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এসব সমস্যা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিরাজগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক দীপক কুমার করের মতে, চলনবিলের মাছের মজুত, উৎপাদন, শুঁটকি শিল্প ও কর্মসংস্থানের প্রকৃত অবস্থা জানতে সমন্বিত জরিপ প্রয়োজন। মা মাছ ও পোনা রক্ষা, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ, নদী-খালের পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং দখল উচ্ছেদে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি শুঁটকি শিল্পের উন্নয়ন, সহজ শর্তে ঋণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও জরুরি।চলনবিল রক্ষায় প্রথমেই প্রয়োজন জলাভূমির সীমানা ও বর্তমান অবস্থা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য জরিপ। এরপর দখল ও দূষণ বন্ধ, নদী-খাল পুনরুদ্ধার, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; নিয়মিত তদারকি ও ফলাফল মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।একই সঙ্গে জলজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখতে হবে। জেলে, শামুক-ঝিনুক সংগ্রহকারী ও শুঁটকি শ্রমিকদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি না করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কার্যক্রম সফল করা কঠিন। স্থানীয় মানুষকে সমস্যার অংশ হিসেবে নয়, সমাধানের অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে হবে।চলনবিলকে ঘিরে কৃষি, মৎস্য, শুঁটকি শিল্প ও পর্যটনের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হলে আগে এর প্রাকৃতিক ভিত্তি রক্ষা করতে হবে। উন্নয়ন মানে জলাভূমি ভরাট কিংবা নির্বিচারে সম্পদ আহরণ নয়; উন্নয়ন হলো প্রকৃতিকে টিকিয়ে রেখে মানুষের জীবনমান উন্নত করা।চলনবিলের সংকট তাই এখনই গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। দখল-দূষণ বন্ধ, নদী-খালের প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, মা মাছ ও পোনা রক্ষা, শামুক-ঝিনুক আহরণ নিয়ন্ত্রণ এবং শুঁটকি শিল্পের আধুনিকায়নে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে। চলনবিল বাঁচানো মানে শুধু একটি জলাভূমি রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতি, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ।[লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)]

দুর্যোগসহনশীল কৃষিতে চাই বিজ্ঞানভিত্তিক ফসল পরিকল্পনা

শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধি, স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন জাতের সম্প্রসারণ এবং অঞ্চলভিত্তিক ফসল বিন্যাস পুনর্গঠনের মাধ্যমে কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল ও দুর্যোগসহনশীল করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষিতে এখন শুধু বেশি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ যথেষ্ট নয়। কখন, কোথায়, কোন ফসল এবং কোন জাত চাষ করলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমিয়ে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন নিশ্চিত করা যাবে, সেই সিদ্ধান্তই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বন্যা, আকস্মিক বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগ কৃষির প্রচলিত উৎপাদন ক্যালেন্ডারকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে। কখনো অনিয়মিত বৃষ্টিতে বীজতলা তৈরি ও ধান রোপণ ব্যাহত হচ্ছে, কখনো আগাম বন্যায় পাকা ধান তলিয়ে যাচ্ছে। আবার অতিবৃষ্টির কারণে একটি ফসল কাটার পর সময়মতো পরবর্তী ফসল আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কৃষির ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় উৎপাদন বাড়ানোর প্রচলিত ধারণার পাশাপাশি সময়ের সঠিক ব্যবহার, ফসলের জীবনকাল হ্রাস এবং দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।বাংলাদেশের সীমিত আবাদযোগ্য জমিতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণে শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধি দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। কিন্তু বছরে জমিতে কতটি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে, শুধু সেই হিসাব দিয়ে কৃষির সাফল্য বিচার করা যায় না। ফসলের সংখ্যা বাড়াতে গিয়ে মাটির উর্বরতা কমে গেলে, সেচের পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে কিংবা একটি ফসলের সঙ্গে অন্য ফসলের সময়গত সংঘাত তৈরি হলে সেই নিবিড়তা দীর্ঘ মেয়াদে সুফল বয়ে আনবে না। তাই প্রয়োজন পরিকল্পিত শস্যনিবিড়তা, যেখানে জমির উৎপাদনক্ষমতা, মাটির স্বাস্থ্য, পানির প্রাপ্যতা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজারের চাহিদা এবং দুর্যোগের সম্ভাব্য সময় একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ফসল ও জাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো অঞ্চলে দীর্ঘ জীবনকালসম্পন্ন ফসলের পরিবর্তে উপযোগী স্বল্পমেয়াদি জাত আবাদ করা গেলে ফসল সংগ্রহের সময় এগিয়ে আনা সম্ভব। এতে একদিকে আগাম বন্যা, খরা কিংবা মৌসুমি বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকির সঙ্গে ফসলের সংবেদনশীল পর্যায়ের সংঘাত কমানো যায়, অন্যদিকে একই জমিতে পরবর্তী ফসল আবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া যায়। তবে স্বল্প জীবনকাল মানেই সব পরিস্থিতিতে বেশি ফলন নয়। জাতের ফলনক্ষমতা, রোগবালাই প্রতিরোধ, স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজন এবং বাজারমূল্য যাচাই করেই জাত নির্বাচন করতে হবে।হাওরাঞ্চলের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সেখানে বোরো ধান কাটার আগেই আকস্মিক বন্যা দেখা দিলে কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রম মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই অঞ্চলভেদে উপযোগী স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ও আগাম পরিপক্ব ধানের জাত নির্বাচন, সময়মতো বপন বা রোপণ এবং দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বন্যাপ্রবণ এলাকায় পানিতে ডুবে থাকার সহনশীলতাসম্পন্ন জাত এবং খরাপ্রবণ এলাকায় খরাসহিষ্ণু জাতকে উৎপাদন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় স্বল্পমেয়াদি ও প্রতিকূলতা-সহনশীল জাতের ব্যবহার নিয়ে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যেমন, উপযুক্ত বন্যাপ্রবণ এলাকায় ব্রি ধান ৫১, ব্রি ধান ৫২ ও বিনা ধান ১১-এর মতো জাত এবং খরাপ্রবণ এলাকায় সংশ্লিষ্ট পরিবেশের উপযোগী খরাসহিষ্ণু জাত বিবেচনা করা যায়। তবে কোনো জাতের সুপারিশের ক্ষেত্রে স্থানীয় মাটি, পানি, মৌসুম ও কৃষি গবেষণার সর্বশেষ নির্দেশনা বিবেচনায় নিতে হবে।শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধির আরেকটি কার্যকর পথ হলো ফসলের জীবনকাল ও জমি খালি থাকার সময়ের মধ্যে সমন্বয় করা। ধান কাটার পর দীর্ঘ সময় জমি অনাবাদি থাকলে সেখানে উপযোগী স্বল্পমেয়াদি ডাল, তেলবীজ বা সবজি আবাদ করা যেতে পারে। ধানভিত্তিক ফসল বিন্যাসে সরিষা, মুগডাল, অন্যান্য ডাল ও উপযোগী সবজি অন্তর্ভুক্ত করা গেলে খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পুষ্টি, কৃষকের আয় এবং মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষত ডালজাতীয় ফসল মাটিতে জৈবিকভাবে নাইট্রোজেন সংযোজনে ভূমিকা রাখে। তবে এ ক্ষেত্রে নাইট্রোজেন সংযোজনের পরিমাণ নির্ভর করে ফসলের ধরন, অণুজীব, মাটির বৈশিষ্ট্য ও ব্যবস্থাপনার ওপর। ফলে একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষের পরিবর্তে পরিকল্পিত ফসল বৈচিত্র‍্য কৃষির ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।তবে সব অঞ্চলের জন্য একই ফসল বিন্যাস কার্যকর হবে না। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ জমি, দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এবং মধ্যাঞ্চলের বন্যাপ্রবণ নিম্নভূমির সমস্যা এক নয়। কোথাও পানি দ্রুত নেমে যায়, কোথাও দীর্ঘদিন জলাবদ্ধতা থাকে, আবার কোথাও সেচের পানির সংকটই প্রধান বাধা। তাই দেশের কৃষিকে অভিন্ন ক্যালেন্ডারে পরিচালনা না করে কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভিত্তিক ফসল পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিটি এলাকার জন্য প্রধান ফসল, বিকল্প ফসল, উপযুক্ত জাত, বপন ও রোপণের সময়, সম্ভাব্য সংগ্রহকাল এবং দুর্যোগের ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কৃষি আবহাওয়ার তথ্য, স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ ফলাফলের সমন্বয়ে এ পরিকল্পনা নিয়মিত হালনাগাদ করা গেলে কৃষক আগাম সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন।এ জন্য শুধু জাত নির্বাচন নয়, পুরো উৎপাদনব্যবস্থাকে সময়-সংবেদনশীল করে তুলতে হবে। সময়মতো বীজ সরবরাহ, উন্নতমানের বীজের প্রাপ্যতা, সেচ ও পানি নিষ্কাশন, কৃষিযন্ত্রের সহজলভ্যতা এবং ফসল কাটার পর দ্রুত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষত দুর্যোগের আশঙ্কাপূর্ণ এলাকায় অল্প সময়ে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য কম্বাইন হারভেস্টারসহ উপযোগী কৃষিযন্ত্রের প্রাপ্যতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, খরাপ্রবণ এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেচের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কেবল স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না; সেই জাতের বীজ সময়মতো কৃষকের হাতে পৌঁছানো এবং নির্ধারিত সময়ে ফসল সংগ্রহের সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।এ ক্ষেত্রে গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমকে অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় ঝুঁকি মোকাবিলায় উপযোগী, স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও মূল্যায়নে গুরুত্ব দিতে পারে। বীজ উৎপাদন ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য চাহিদা অনুযায়ী আগাম বীজ প্রস্তুত ও সরবরাহের পরিকল্পনা করতে পারে। অন্যদিকে সম্প্রসারণকর্মীরা কৃষককে সঠিক জাত নির্বাচন, ফসলের সময় নির্ধারণ এবং আবহাওয়ার সতর্কবার্তা অনুসরণে সহায়তা করতে পারেন। গবেষণাগারের প্রযুক্তি, মাঠের অভিজ্ঞতা এবং কৃষকের বাস্তব চাহিদার মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করতে পারলেই পরিকল্পনার সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছাবে।জাত উন্নয়নেও সময়ের গুরুত্ব বাড়াতে হবে। প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির পাশাপাশি যেখানে বৈজ্ঞানিকভাবে উপযোগী, সেখানে দ্রুত প্রজন্ম উন্নয়ন, জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্তকারী চিহ্নের সহায়তায় নির্বাচন এবং আধুনিক জিনগত বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প সময়ে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জাত উন্নয়নের গবেষণা জোরদার করা যেতে পারে। তবে দ্রুত জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি একাধিক স্থানে পরীক্ষা, ফলন যাচাই, রোগবালাই প্রতিরোধ এবং কৃষকের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। কারণ, দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর জাত বলতে শুধু দ্রুত পরিপক্ব জাতকে বোঝায় না; বরং যে জাত নির্দিষ্ট পরিবেশে নির্ভরযোগ্য ফলন দিতে পারে, সেটিই প্রকৃত অর্থে কৃষকের ঝুঁকি কমাতে সক্ষম।এই পরিকল্পনার সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য ও উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়টিও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। শস্যনিবিড়তা বাড়ানোর নামে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ, নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহার কিংবা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে কৃষিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। তাই মাটি পরীক্ষা করে সুষম সার প্রয়োগ, ফসলের অবশিষ্টাংশের যথাযথ ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং পানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ডালজাতীয় ফসলের অন্তর্ভুক্তি, জৈব পদার্থের সংযোজন ও প্রয়োজনভিত্তিক সেচের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে এখন প্রয়োজন একটি বাস্তবায়নযোগ্য জাতীয় দুর্যোগসহনশীল শস্যনিবিড়তা কর্মপরিকল্পনা। এর আওতায় কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভিত্তিক ফসল ক্যালেন্ডার প্রণয়ন, স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ও প্রতিকূলতা-সহনশীল জাতের তালিকা হালনাগাদ, বীজের চাহিদা নিরূপণ, কৃষিযন্ত্রের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এবং কৃষি আবহাওয়ার তথ্যের ব্যবহার সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। প্রথম পর্যায়ে হাওর, খরাপ্রবণ অঞ্চল, উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকা ও বন্যাপ্রবণ নিম্নভূমিতে পরীক্ষামূলকভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ফলন, উৎপাদন ব্যয়, কৃষকের নিট আয়, পানির ব্যবহার এবং দুর্যোগজনিত ক্ষতির পরিবর্তন মূল্যায়ন করা উচিত। সফল মডেলগুলো স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী অন্য এলাকায় সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।সবশেষে মনে রাখতে হবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি বন্ধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়; কিন্তু বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এর ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কৃষকের হাতে সঠিক জাত, সঠিক সময়ে বীজ, নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার তথ্য এবং উপযুক্ত উৎপাদন কৌশল পৌঁছে দেওয়া গেলে একই জমিতে উৎপাদনের সুযোগ বাড়বে, অনাবাদি সময় কমবে এবং ফসলহানির ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি হবে। শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধির প্রকৃত সাফল্য তাই শুধু বছরে অধিকসংখ্যক ফসল উৎপাদনে নয়, বরং সীমিত জমি ও সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে নিরাপদ, লাভজনক ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করার মধ্যে নিহিত। বাংলাদেশের কৃষিকে এখন উৎপাদননির্ভরতা থেকে পরিকল্পনানির্ভরতার দিকে এগিয়ে নিতে হবে।দুর্যোগের পর ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় না থেকে দুর্যোগের আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে ফসল নির্বাচন, জীবনকাল নির্ধারণ ও উৎপাদন ক্যালেন্ডার সাজানোই হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ। প্রকৃতির অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে নয়, বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিক ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই হোক আগামী দিনের কৃষির মূল দর্শন।[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন]

ভিডিও আরও দেখুন

ইংলিশ ফুটবলে দ্রুততম হ্যাটট্রিকের নতুন বিশ্বরেকর্ড

ইংলিশ ফুটবলে রচিত হলো নতুন এক ইতিহাস। ম্যাচ শুরুর পর সবচেয়ে কম সময়ে ইংল্যান্ডের শীর্ষ চার লিগের ইতিহাসে দ্রুততম হ্যাটট্রিকের নতুন নজির গড়েছেন কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্সের (কিউপিআর) আইভোরিয়ান ফরোয়ার্ড রিচার্ড কোনে।শনিবার (২৪ অক্টোবর) ইএফএল চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচে সোয়ানসি সিটির বিপক্ষে ম্যাচে এই অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েন ২৩ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার।কিউপিআরের হোমগ্রাউন্ড লফটাস রোডে ম্যাচের শুরু থেকেই সোয়ানসি সিটির রক্ষণভাগকে চেপে ধরেন রিচার্ড কোনে। ম্যাচের প্রথম দুই মিনিটের মধ্যেই প্রথম গোল করে দলকে এগিয়ে নেন তিনি। এরপর ম্যাচের সপ্তম মিনিটে নিজের ও দলের ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এই ফরোয়ার্ড। সবশেষে ম্যাচের বয়স ১৫ মিনিট হওয়ার আগেই পেনাল্টি থেকে গোল করে সম্পন্ন করেন ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা হ্যাটট্রিক।এই নৈপুণ্যের মাধ্যমে ২০০৪-০৫ মৌসুমে ইএফএল রিব্র্যান্ডিং এবং নতুনভাবে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরুর পর থেকে ম্যাচ শুরুর হিসাব ধরে দ্রুততম হ্যাটট্রিক গড়ার রেকর্ডটি নিজের করে নিলেন কোনে। এর আগে ২০১৫ সালে সাউদাম্পটনের হয়ে অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে সাদিও মানের গড়া রেকর্ডটি ভেঙে দেন তিনি। সেবার সাউদাম্পটনের হয়ে মানে হ্যাটট্রিক পূরণ করতে সময় নিয়েছিলেন ১৬ মিনিট (ম্যাচ শুরুর হিসাব অনুযায়ী)।তবে প্রথম ও তৃতীয় গোলের মধ্যবর্তী ব্যবধানের (টাইম ইল্যাপসড) হিসাবে সাদিও মানের ২ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডের অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিকের রেকর্ডটি এখনো অক্ষত রয়েছে। তবে বাঁশি বাজার পর ম্যাচ শুরুর হিসাব ধরলে নতুন রেকর্ডের মালিক এখন রিচার্ড কোনে।পেশাদার ক্যারিয়ারে এটি কোনের দ্বিতীয় এবং চ্যাম্পিয়নশিপ স্তরে প্রথম হ্যাটট্রিক। এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে লিগ ওয়ানে উইকম্ব ওয়ান্ডারার্সের হয়ে বেঞ্চ থেকে নেমে মাত্র ১১ মিনিটে হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। গতকালকের এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ইএফএলে কোনের মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪টিতে।/ 

ইংলিশ ফুটবলে দ্রুততম হ্যাটট্রিকের নতুন বিশ্বরেকর্ড