সংবাদ
এইচএসসি ও সমমানের ফল নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষা প্রশাসন

এইচএসসি ও সমমানের ফল নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষা প্রশাসন

পুনঃপরীক্ষা ও উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের সিদ্ধান্ত​চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে বিগত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার এবং জিপিএ-৫-এর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।শনিবার (৩১ অক্টোবর) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, খাতা মূল্যায়ন কিংবা ফলাফল প্রক্রিয়াকরণে কোনো অসংগতি বা ত্রুটি রয়েছে কি না, তা নিয়ে সরকার চিন্তিত। উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন সম্পন্ন হলেই ফলাফলের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।​সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, "খাতা দেখায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছি। ফলাফলে কোনো অসংগতি থাকলে শিক্ষার্থীরা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করতে পারবে। এরপর বোঝা যাবে, এবার ফলাফলে কী ধরনের পরিবর্তন আসে।"তিনি বিগত বছরের পুনর্নিরীক্ষণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আরও জানান, গতবার পুনর্নিরীক্ষণে অনেক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছিল। শিক্ষকদের বা পরীক্ষকদের কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। আপাতত বলতে পারি, ফল নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। তবে ফলাফলে কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা এখনো নির্ধারণ করতে পারিনি। পুনর্নিরীক্ষণের পর বিষয়টি বোঝা যাবে। এছাড়া দেশের সার্বিক পরীক্ষা পদ্ধতি এবং ফল প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়াটি নতুন করে পর্যালোচনারও ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী।​পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন জানান, এর আগে এসএসসি পরীক্ষার প্রায় ১৩ লাখ উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ করে প্রায় ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন, প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর ফেল থেকে পাস এবং নতুন করে ৩ হাজার ৭৯ জনের জিপিএ-৫ পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তনের ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক অভিহিত করে মন্ত্রী স্পষ্ট জানান, "আমাদের এক্সামিনেশন সিস্টেমকে আবার আমরা রি-এক্সামিন করবো।"উত্তরপত্র মূল্যায়নে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, পরীক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি যাদের মূল্যায়নে বেশি গরমিল পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী চান শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ঠিক যেমন লিখেছে, সেভাবেই যেন তাদের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হয় এবং কোনো শিক্ষার্থী যেন ভুল মূল্যায়নের কারণে অনুৎসাহিত না হয়ে পড়ে।​অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ফলাফলের প্রতিটি সূচকে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে তুলনামূলক বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব সার্বিক পাসের হারে পড়েছে।সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, উত্তরপত্র মূল্যায়ন শতভাগ নির্মোহ ও সঠিকভাবে করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ফলাফলে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় এনে শিগগিরই এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা গ্রহণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। আগামী রবিবার থেকে ফল পুনর্নিরীক্ষণের আনুষ্ঠানিক আবেদন কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। ​৩১ অক্টোবর একযোগে দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে প্রকাশিত এই ফলাফলে ৯টি সাধারণ, মাদরাসা ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২.১২ শতাংশ, যা গত বছরের ৫৮.৮৩ শতাংশ পাসের হারের তুলনায় ৬.৭১ শতাংশ কম। এ বছর মোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন পরীক্ষার্থী, যেখানে ছেলেদের সংখ্যা মেয়েদের তুলনায় কিছুটা বেশি।তবে সার্বিক পাসের হারের ক্ষেত্রে ছাত্রীরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার সর্বোচ্চ হলেও বরিশাল বোর্ডে তা নেমে এসেছে সর্বনিম্নে। এছাড়া সারাদেশে ১৩৯টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করলেও ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
৩৫ মিনিট আগে

মতামতমতামত

‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ জয় বাংলা’ স্লোগান!

“জয় বাংলা বলতে মনরে আমার এখনো কেন ভাবো/আমার হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাবো/অন্ধকারে পুবাকাশে উঠবে আবার দিনমণি”। —মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এ গান শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের নয়, গোটা দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করত স্বাধীনতার মরণপণ লড়াইয়ে। মুক্তিযুদ্ধ তো শুধু স্বাধীনতার যুদ্ধ নয়, আমাদের কাছে এক আবেগময় অনুভূতিও বটে। মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি জয় বাংলা স্লোগানও আমাদের ভালোবাসার ও অতি আপন স্লোগান।১৯৭০ সালে ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আবুল খায়ের ছয় দফার আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে প্রখ্যাত অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, সৈয়দ হাসান ইমাম ও কবরী অভিনীত ‘জয় বাংলা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। গীতিকার ছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। চলচ্চিত্রটি সে বছর সেন্সরে জমা পড়লেও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার চলচ্চিত্রটির মুক্তি আটকে দিলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে তা মুক্তি পায়। কিন্তু ‘৭০ সালেই এ সিনেমার জন্য রেকর্ড করা শাহনাজ রহমতুল্লাহ এবং মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের কণ্ঠে কালজয়ী গান “জয় বাংলা বাংলার জয়/হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়/কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে/নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়...” প্রকাশ পেলে তা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনাসংগীত হিসেবে প্রচারিত হতো।জয় বাংলা, বাংলার জয়—মিশে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। জয় বাংলা স্লোগানের প্রতীকী শক্তিকে তুলে ধরতে একটি কৌতুকের প্রচলন হয়েছিল। গল্পটি এমন—১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী চুল কাটাচ্ছেন। হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে এল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান! ভয়ে তাঁর চুল খাড়া হয়ে গেল। নাপিত তখন মুচকি হেসে বললেন, ‘স্যার, আমি যখনই জয় বাংলা বলি, আপনার চুল খাড়া হয়ে যায়, আর আমার চুল কাটতে সুবিধা হয়!’ এটি নিছক একটি রম্য গল্প বা কাল্পনিক কৌতুক হলেও এর মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের প্রতীকী শক্তি এবং একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য।এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয় যে, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বা দেশের সংবিধানে ঘোষিত মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ বা বিরোধী গোষ্ঠী তথা জামায়াতে ইসলামী ও রাজাকার-আলবদর বাহিনীর বর্তমান সংস্করণ যারা আছেন, তাদের এ স্লোগানে গাত্রদাহ হয়। কিন্তু বিএনপির কেন গাত্রদাহ হতে যাবে? জয় বাংলা তো বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বা বাংলাদেশ চিরজীবী হোক স্লোগানকে নাকচ করে না। বা এর সঙ্গে বিরোধাত্মকও নয়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত কোনো এক মিছিল থেকে নাকি জয় বাংলা ধ্বনি শোনা গেছে। এ অভিযোগে বিএনপির নাম ব্যবহার করে সিপিবি অফিসের সামনে গভীর রাতে মব করা হলো। কয়েকজনকে মারধর করা হলো। সিপিবি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া দল। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় সিপিবির কোনো কর্মী এ স্লোগান উচ্চারণ করতেই পারে। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংযোগ বা সংশ্লিষ্টতা নেই, সংশ্লিষ্টতা আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের। মুক্তিযোদ্ধার দাফনে জামায়াত-শিবির বাধা প্রদান করলে বা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির ওপর হামলা হলে এবং তার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হতে হলে ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি উচ্চারিত হতেই পারে। যদিও সিপিবির মূল রণধ্বনি এটা নয়, আবার এ স্লোগান পরিত্যক্তও নয়। যতটুকু জানি, স্বাধীন দেশে সিপিবির মূল স্লোগান—ভাত, কাপড়, জমি, কাজ। তবে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাই যদি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, স্লোগানও তো পরিবর্তিত হতে পারে।এটাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে বাংলার মানুষ জয় বাংলাকে কিন্তু শুধু স্লোগান হিসেবেই দেখেনি। জয় বাংলার মাঝে খুঁজে পেতে চেয়েছে শোষণমুক্তি, গণতন্ত্র, সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা। ভালোবাসার রত্নকে মানুষ যত্রতত্র ব্যবহার করে না। তাতে রত্ন তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলে। ঠিক তেমনি আমাদের ভালোবাসার মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনিও সারাক্ষণ জপ করার বিষয় নয়। বিশেষত, যদি কোনো শাসকদল তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, কর্তৃত্ববাদী শাসন, জবরদস্তি ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা, আর্থিক খাতে লুণ্ঠন ও বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন ইত্যাদি গণবিরোধী কর্মকাণ্ডকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ও চেতনাকে হরহামেশা জপ করে থাকেন, তখন আর মুক্তিযুদ্ধ ও তার রণধ্বনি মানুষের মাঝে, বিশেষত বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মাঝে গভীর আবেদন সৃষ্টি করে না।বাংলাদেশের গৌরবময় জন্ম-ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘ সময় যাবৎ যে একঘেয়ে রেকর্ড বাজানো হয়েছে এবং ইতিহাসকে অনেকটা পারিবারিক সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, তা তরুণ প্রজন্মের মাঝে বিরক্তি সৃষ্টি করেছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক ইতিহাসও ঠিক ষাটোর্ধ্ব প্রজন্মের ন্যায় আজকের তরুণদের মনে একই ধরনের আবেগ সৃষ্টি করে না। অথচ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নির্মাণে মোট কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৮০ শতাংশ হচ্ছে তরুণ সমাজ। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গণতন্ত্রের চশমা পরে মুক্তিযুদ্ধকে দেখতে চায়। এসব চাহিদা পূরণ না হলে মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুও তাদের কাছে অপ্রধান হয়ে দাঁড়ায়। সেই তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষায় যদি রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপন করা না যায়, কথায় কথায় জয় বাংলা বলে মনের ঝাল মেটানো হয়তো যাবে, কিন্তু রাজনীতিটা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই আজ যারা দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথাসহ দেশের ইতিহাসকেই মুছে ফেলতে চায়, তাদের পরাভূত করতে হলে রাজনীতিটাকে পাথরের মতো স্থির হিসেবে না দেখে সৃজনশীলতার সঙ্গে তা নতুন ভাষায়, নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে হবে।আবার অপব্যবহার হয়েছে বলেই কি মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি পরিত্যাগ করতে হবে? নিশ্চয়ই নয়। তবে ফাঁপা বুলি হিসেবে না জপে অসমাপ্ত জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আর বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তার যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে। সেটাই সৃজনশীলতা। এ ক্ষেত্রে লেজুড়বৃত্তির জুজু দেখলে বিচ্ছিন্নতার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।এটা তো স্পষ্ট যে ২০২৪-এর রক্তাক্ত ঘটনাবলির পরে এমন এক উগ্রবাদী ধর্মান্ধ শক্তির উত্থান হয়েছে, তারা মুখে যা-ই বলুক, তাদের আক্রোশ কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা রেজিমের চেয়ে ’৭১-এর ওপরই বেশি। শুধু মুখ ফুটে বলতে পারছে না, ’৭১-এর আগেই ভালো ছিলাম। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিএনপি কর্মীরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সিপিবি অফিসে মব হামলা করবে, এটা বিশ্বাস হতে চায় না। ধারণা করি, দেশকে আরও অস্থিতিশীল করতে চায়, এমন শক্তি এ ঘটনার পেছনে থাকতে পারে।অস্থিতিশীলতার বিপদকে মোকাবিলা করতে হলে বিএনপিকে এটা বিবেচনায় রাখতে হবে, তাদের দলকে সমর্থন করেন না, এমন বিপুলসংখ্যক ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন এই আশা নিয়ে যে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এবার দেশ পরিচালনা করবেন। দেশের জন্মযুদ্ধবিরোধী শক্তির কাছে এবার অন্তত নত হবেন না। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আগের মতো একতরফা বয়ান না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেই সামরিক নেতৃত্বকে মর্যাদা দেওয়ার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বিএনপিকে নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়া, যা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেটা বিএনপি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হলে বিভাজনের শক্তি ও উগ্রপন্থা পরাজিত হবে। কিন্তু বিএনপি ইতিমধ্যে ‘আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের’ ইউনূসীয় ভূতে আচ্ছন্ন। এখন ‘জয় বাংলা স্লোগানের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করে’ কি বিএনপি অস্থিতিশীলতার শক্তির পাতা ফাঁদে পা দেবে?(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

উচ্চশিক্ষার সংস্কার: সমতা, জবাবদিহি ও আধুনিকায়ন জরুরি

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা গভীর কাঠামোগত স্থবিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সনদকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়েছিল। বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গেও এর তেমন সংযোগ ছিল না। ইউনেসকোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ৬ শতাংশ অথবা জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ করা উচিত। তবে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর আমাদের শিক্ষা বাজেট জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২৬ু২৭ অর্থবছরে তা ২ শতাংশে উন্নীত করা হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এটি এখনো সর্বনিম্ন। ইউনেসকোর বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বারবার বাজেটের এই সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তা ছাড়া, এই বরাদ্দের বড় অংশ অবকাঠামো ও প্রশাসনিক খাতে ব্যয় হয়। উদ্ভাবন ও গবেষণায় এর অবদান সামান্য।বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘ সময় পরও উপযুক্ত কর্মসংস্থান পেতে ব্যর্থ হয়। এর প্রধান কারণ শিল্প খাতের ব্যবহারিক চাহিদা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তথ্য বিশ্লেষণ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই যুগেও আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো দুই দশক আগের পাঠ্যসূচি আঁকড়ে ধরে রয়েছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। ঔপনিবেশিক শাসনামলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা মূলত পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একধরনের ঐতিহাসিক সামাজিক চুক্তির ফল ছিল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গের মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পর যে রাজনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল আংশিকভাবে একটি প্রতিকারমূলক উদ্যোগ। ফলে সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।প্রকৃতপক্ষে, এটি সুবিধাভোগীদের জন্য নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই অর্থে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সামাজিক অগ্রগতির একটি প্রতিষ্ঠান। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এটি গ্রামীণ কৃষক, জেলে, শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা এবং সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান সোপান হিসেবে কাজ করেছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে: বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান কি এখন নতুন ধরনের বৈষম্যকে বৈধতা দেয়, এমন নীতি গ্রহণ করবে?বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাধারা বা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ভর্তি করার বিষয়টি জুলাই-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য একটি নৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থীদের জন্য সাম্প্রতিক ভর্তি মানদণ্ড এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) বলেছিলেন, ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক শর্ত হলো একই ধরনের পরিস্থিতিতে একই নীতি প্রয়োগ করা। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদনকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড চালু করা হলে ন্যায়বিচারের এই সর্বজনীন নীতি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।মার্কিন দার্শনিক জন রলসের (১৯২১-২০০২) ‘এ থিওরি অব জাস্টিস’ গ্রন্থ অনুযায়ী, বৈষম্য কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উপকারে আসে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন প্রশ্ন হলো, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা কি সেই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, যাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন? প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, দেশীয় ও বিদেশি উভয় পাঠ্যক্রম অনুসরণকারী ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও অভিজাত শিক্ষাধারাগুলোর একটি। এই ধারার শিক্ষার্থীরা সাধারণত তুলনামূলকভাবে উন্নত ভাষাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং বৈশ্বিক শিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে। অবশ্যই এর ব্যতিক্রম রয়েছে। কিন্তু নীতি প্রণয়ন করতে হয় সামগ্রিক বাস্তবতার ভিত্তিতে, ব্যতিক্রমের ভিত্তিতে নয়। সামাজিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে কোথাও বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হলে তা হওয়া উচিত তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য। ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত সুবিধা পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য নয়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামাজিক কল্পনা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোরও অংশ। এর ইতিহাস সাধারণ মানুষের ইতিহাস। এর অর্জন সামাজিক অগ্রগতির প্রতিফলন। আর এর নৈতিক শক্তি নিহিত রয়েছে মেধার প্রতি অঙ্গীকারের মধ্যে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, অন্যান্য শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং সাফল্য অর্জনের সুযোগ থাকতে হবে। তবে সেই সাফল্য আসতে হবে সমান প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে নয়।কারণ, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দায়িত্ব কেবল শিক্ষার্থী নির্বাচন করা নয়। সমাজকে এই নৈতিক বার্তা দেওয়াও তার দায়িত্ব যে, সব শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ সমান। তবে স্বীকৃতি অর্জন করতে হবে ব্যক্তিগত মেধা, কঠোর পরিশ্রম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। অতএব, আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রশ্ন একটাই: বিশ্ববিদ্যালয়টি কি তার শতাব্দীপ্রাচীন প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ, সামাজিক ন্যায়বিচারের ঐতিহ্য এবং জনগণের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অর্জিত মর্যাদা সংরক্ষণ করবে? নাকি দেশের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের অসুবিধায় ফেলে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে?প্রশ্ন উঠছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি প্রকৃতপক্ষে ১৯৭৩ সালের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ বা আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে? এই আইন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিচালিত হওয়ার কথা। আইনে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে কি উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে? বিভিন্ন পর্যায়ে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি নিজের পরিচালনাসংক্রান্ত আইন মেনে চলতে না পারে, তাহলে সমসাময়িক চাহিদা পূরণের জন্য সেই আইন আধুনিকায়ন করা উচিত নয় কি? এ ধরনের আধুনিকায়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি?বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষকদের ব্যাপক স্বাধীনতা দিয়েছে, কিন্তু তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে অনেক শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হন না। কখনো কখনো কেবল তাঁদের ইচ্ছা না হওয়ার কারণেই ক্লাসে যান না। অনেক শিক্ষক সময়মতো পাঠ্যসূচি শেষ করতে পারেন না। এতে সেশনজট তৈরি হয়। শিক্ষকদের মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের প্রতিও তাঁদের যথেষ্ট মনোযোগ নেই। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের রাজনীতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সুনাম বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে স্বীকার করতে হবে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল না মিলিয়ে কেবল মৌখিক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ করা কোনো সুবিবেচনাপ্রসূত পদ্ধতি নয়। ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও অর্থবহ গবেষণা—দুই ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে পড়বে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বৃহত্তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা আশা করি, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগরসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুসৃত পদ্ধতি গ্রহণ করবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে এবং যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে—এটাই প্রত্যাশা।প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যখন বুঝতে পেরেছে যে, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে মানসম্পন্ন একাডেমিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা অসম্ভব, তখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই বাস্তবতা স্বীকার করতে অনিচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে, কেবল মৌখিক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে পেশাদারত্বের সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ করা সম্ভব নয়।সাহসিকতার সঙ্গে উদ্যোগ নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম উপাচার্য শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা সংশোধন করেন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সংশোধিত বিধিমালা অনুমোদন করান। এরপর মৌখিক সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা, উপস্থাপনা, প্রদর্শনীমূলক ক্লাসসহ অন্যান্য পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও একই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ শুরু করে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো বিষয়টি বিবেচনায় নেয়নি।বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের ভুলে গেলে চলবে না যে, কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এক ডজনেরও বেশি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। অথচ জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য কোনো কমিশন গঠন করেনি। ফলে সংবিধান, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের মতো ক্ষেত্রে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া এখনো চলছে। কিন্তু ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া শিক্ষাব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি।বিএনপি সরকার গঠনের পর শিক্ষাব্যবস্থার নিম্নস্তরে, বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনার জন্য কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকার যদি বিশ্ববিদ্যালয় খাতের সংস্কার করতে চায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনৈতিক আনুগত্যের চর্চা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক মান উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনে ১৯৭৩ সালের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ বা আইন আধুনিকায়ন করতে হবে। সরকার চাইলে তা করতে পারে, কারণ বর্তমান সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।শিক্ষা কোনো দাতব্য অনুদান নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি। সততা ও নৈতিকতাবিহীন এবং দুর্নীতিতে জর্জরিত শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তির ওপর শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা অসম্ভব। ২০২৪ সালের তরুণ প্রজন্ম তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। তারা পরিবর্তনের একটি নতুন পথ উন্মুক্ত করেছে। এখন তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব। নতুন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় অঙ্গীকার হয়ে উঠুক এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, যা তরুণদের আনুগত্যের পরিবর্তে স্বাধীন চিন্তা, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

বগুড়া বিয়ামে শিক্ষককে ছাত্রের প্রহার, আমাদের করণীয়

বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষককে শারীরিকভাবে প্রহার করেছে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্র। খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদপত্রে আমরা দেখেছি। যা আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একজন ছাত্রের জীবনে শিক্ষকের ভূমিকা আধ্যাত্মিক গুরু বা বাবা-মায়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। যে শিক্ষকের হাত ধরে একটি শিশু বর্ণমালা শেখে, সেই শিক্ষককে আমরা পিতৃতুল্য সম্মান করি। অথচ সেই শিক্ষকের গায়ে ছাত্রের হাত ওঠা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের একটা ভয়াবহ সতর্ক সংকেত। সেই ঘটনার পর অনেকেই দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাচ্ছেন—‘জেন-জি উচ্ছন্নে গেছে’। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, একটি প্রজন্মকে এভাবে ট্যাগ দেওয়ার আগে আমাদের গভীরে গিয়ে কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। আজকের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রটি জেন-আলফা ও জেন-জির সন্ধিক্ষণে যে প্রযুক্তির কোলে বড় হয়ে উঠছে তা নিয়ে ভাবতে হবে। তাদের অপ্রত্যাশিত এমন আচরণের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গভীর কারণ।প্রথমত, পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চার অভাব: আগে যৌথ পরিবারে দাদা-দাদী, বাবা-মা, চাচা-চাচীরা মিলে একটি শিশুকে শাসন ও আদর দিয়ে বড় করতেন। এখন একক পরিবারে বাবা-মা দুজনেই কর্মব্যস্ত। সন্তানকে সময় না দিয়ে তার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে দামি মোবাইল। সন্তান কী দেখছে, কার সঙ্গে মিশছে, তার মানসিক বিকাশ কেমন হচ্ছে—তার খবর রাখার সময় আমাদের নেই। আমরা মনে করছি, ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেই সন্তান মানুষ হবে। কিন্তু পারিবারিক শিক্ষাই যে প্রাথমিক ও প্রধান শিক্ষা, তা আমরা ভুলে যাচ্ছি।দ্বিতীয়ত, শিক্ষকের নৈতিক স্খলন: দেশে যে কেবল শিক্ষা বা শিক্ষাঙ্গনের পতন ঘটেছে তা-ই নয়, পতন ঘটেছে শিক্ষাঙ্গনের সবচেয়ে বড় স্তম্ভটির—যার নাম শিক্ষক। শিক্ষকের নৈতিক স্খলন কচিমনের শিক্ষার্থীরা মেনে নিতে পারে না। তারা তাদের শিক্ষককে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে দেখতে চায়।তৃতীয়ত, প্রযুক্তির অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার: আজকের কিশোরের হাতে ইন্টারনেট মানে গোটা পৃথিবী। কিন্তু এই পৃথিবীর ভালো-মন্দ বাছাই করার বোধ তার এখনো তৈরি হয়নি। টিকটক, রিলস, ইউটিউবে ভায়োলেন্স, গালাগালি, শিক্ষককে অপমান করে মজা করা—এসব কনটেন্ট ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা তাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা তৈরি করছে যে, উদ্ধত আচরণই হলো স্মার্টনেস। তারা বাস্তব ও ভার্চুয়াল জগতের পার্থক্য করতে পারছে না। চতুর্থত, শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অতিরিক্ত আদর: বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের শাসন করার অধিকার প্রায় কেড়ে নেওয়া হয়েছে। একটু শাসন করলেই অভিভাবক এসে শিক্ষককে হুমকি দিচ্ছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তা করছেন। ফলে শিক্ষকেরা ভয়ে ছাত্রদের অন্যায়কেও এড়িয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে পরিবারে এক-দুটি সন্তান হওয়ায় আমরা তাদের কোনো ‘না’ বলছি না। সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দম্পতির একমাত্র কিশোর সন্তানের খুনের নেপথ্যে দামি বাইক ও আইফোন—সন্তানদের সব আবদার পূরণ করতে গিয়ে আমরা তাদের সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধ শেখাতে ব্যর্থ হচ্ছি।পঞ্চমত, সামাজিক অবক্ষয় ও আদর্শের সংকট: শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা যখন দেখে রাজনীতিতে, সমাজে, টেলিভিশনে বড়রা একে অপরকে অসম্মান করছে, গালাগালি করছে, শক্তি প্রদর্শন করছে, তখন তারাও মনে করছে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের সমাজে এখন আর বিনয়, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতাকে বড় গুণ হিসেবে দেখা হয় না।তাহলে প্রতিকার কী? এই প্রজন্মকে কি আমরা গালমন্দ করবো, বখে যাওয়া বলে উপেক্ষা করবো? না, তা করা যাবে না। তাদের পথ দেখাতে হবে।১. পরিবারকে ফিরতে হবে তার ভূমিকায়: সন্তানকে ‘কোয়ালিটি টাইম’ দিতে হবে বাবা-মায়ের। প্রতিদিন অন্তত একবেলা একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা, সন্তানদের বন্ধুদের সম্পর্কে জানা। সন্তানের সামনে শিক্ষক ও বড়দের সম্মান করে কথা বলা। মোবাইল ফোন ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও সময় বেঁধে দেওয়া।২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার পুনরুজ্জীবন: বিয়াম স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু ‘এ প্লাস’ নয়, মূল্যবোধের শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতি সপ্তাহে গল্পের মাধ্যমে শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও ধৈর্যের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের সামাজিক-পারিবারিক মেলবন্ধন ও মানবিক দিক জাগ্রত হয় এমন সিনেমা স্কুলে দেখানোর সুযোগ করে দিতে হবে। শিক্ষকদের হাতে যৌক্তিক শাসনের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে, তবে তা অবশ্যই শারীরিক নির্যাতন নয়। ৩. কাউন্সেলিং ও মেন্টারিং: প্রতিটি স্কুলে একজন প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর থাকা জরুরি। যে ছাত্রটি শিক্ষককে প্রহার করেছে, সে হয়তো ভেতরে ভেতরে কোনো মানসিক যন্ত্রণা, হতাশা বা পারিবারিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য কলহ প্রায় প্রতিটি পরিবারেই লক্ষ করা যাচ্ছে। সন্তানরা বাবা-মায়ের ঝগড়া-মারামারি দেখে বেড়ে উঠছে, ফলে তারা দিন দিন অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যাচ্ছে। বিয়াম স্কুলের এই ছাত্রটিকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ও স্কুল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারই কি এর সমাধান? এই ছাত্রটি এখন কোন স্কুলে ভর্তি হবে, তার মানসিক অবস্থা কী হবে? নতুন বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাকে কোন দৃষ্টিতে দেখবে? তাই এসব নতুন করে ভাবতে হবে। বহিষ্কার নয়, তার কাউন্সেলিং প্রয়োজন। পাশাপাশি পুরো বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও কাউন্সেলিং প্রয়োজন।৪. প্রযুক্তি ইতিবাচক ব্যবহার শেখানো: প্রযুক্তিকে শত্রু  না বানিয়ে বন্ধু বানাতে হবে। শিক্ষার্থীদের গণিত অলিম্পিয়াড, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক, আবৃত্তি, উপস্থাপনা, চিত্রাঙ্কন, প্রোগ্রামিং, কোডিংয়ের মতো সৃজনশীল কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা ফালতু টিকটক দেখার সময় না পায়। বগুড়ার এই ঘটনা আমাদের জন্য একটি ‘ওয়েক-আপ কল’। আসুন, আমরা জেন-জিকে দোষারোপ না করে তাদের হাত ধরে সঠিক পথ দেখাই। কারণ এই প্রজন্মের কাছেই আমরা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে রেখে যাব। এই প্রজন্মই আগামীর বাংলাদেশ। তাদের যদি আমরা সঠিক পথে পরিচালিত করতে না পারি, তবে সেই দায় আমাদেরই নিতে হবে। কবি হেলাল হাফিজের ভাষায় বলতে হয়— মানব জন্মের নামে হবে কলঙ্ক, এরকম দুঃসময়ে আমরা যদি আমাদের সন্তানকে সঠিক পথ দেখাতে না পারি, তাহলে উত্তরপুরুষে ভীরু, স্বার্থপর, কাপুরুষের উপমা হব। এমন দুর্দিনে সন্তান মানুষ না করে যদি শুধু আমরা সম্পদের পাহাড় গড়ি, তবে লাভ নেই। শিক্ষক-ছাত্রের এই পবিত্র সম্পর্ককে রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট

প্রান্তিক মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির অধিকার নিশ্চিত হোক

খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সবার খাবারের থালায় সমান পুষ্টি থাকে না। আয়, পেশা, বসবাসের পরিবেশ ও সামাজিক অবস্থানের কারণে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পার্থক্য তৈরি হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, দলিত, বঞ্চিত ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের খাদ্যতালিকা অনেকটাই নির্ভর করে তাদের আয় ও চারপাশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর। তাদের খাবারে পুষ্টির নানা উপাদান থাকলেও দারিদ্র‍্যরে কারণে প্রয়োজনীয় ও বৈচিত্র‍্যময় খাবার নিয়মিত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। তাদের জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসও এক রকম নয়। পাহাড়, বন, নদী, হাওর কিংবা সমতলের পরিবেশের সঙ্গে তাদের খাদ্যসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। অনেকেই স্থানীয় বনজ ফল, শাকপাতা, কন্দ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক খাদ্য সংগ্রহ করে থাকেন। কলমিশাক, কচুশাক, সজনে পাতা, বুনো ওল, বিভিন্ন লতাপাতা এবং কচি বাঁশের ডগা তাদের খাবারের পরিচিত উপকরণ। এসব খাবারে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় নানা পুষ্টি উপাদান রয়েছে। কেউ কেউ মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করেন। নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি তা বিক্রি করেও জীবিকা নির্বাহ করেন।নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় থেকেও প্রান্তিক মানুষ খাবার সংগ্রহ করেন। ছোট মাছ, চিংড়ি ও শুঁটকি তাদের খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বড় মাছ বা মাংস নিয়মিত কেনার সামর্থ্য না থাকলেও এসব ছোট মাছ থেকে তারা প্রোটিনসহ নানা পুষ্টি উপাদান পান। একসময় অনেক পরিবার খাসির পায়ের মতো অপেক্ষাকৃত সস্তা অংশও যত্ন করে রান্না করে খেত। এসব খাবার তাদের খাদ্যসংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে ছিল।ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, দলিত ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের খাবারের তালিকায় ভাত, ডাল ও আলুভর্তারও বিশেষ জায়গা রয়েছে। পান্তাভাত তাদের অনেকের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ। পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, লবণ ও সরিষার তেল দিয়ে পান্তাভাত খাওয়ার চল দীর্ঘদিনের। সামান্য উপকরণে তৈরি এই খাবার অনেকের কাছে তৃপ্তির হলেও এর পেছনে রয়েছে সীমিত আয়ের বাস্তবতা। এমন পরিবারও আছে, যাদের কাছে নিয়মিত প্রয়োজনীয় খাবার কেনার অর্থ থাকে না। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’—প্রবাদটি তাদের জীবনের কঠিন বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।দরিদ্র মানুষের খাদ্যাভ্যাসের আরেকটি দিক হলো খাবারের অপচয় না করা। অনেক সচ্ছল পরিবার যে সবজি বা খাবারের অংশ ফেলে দেয়, দরিদ্র পরিবার তা দিয়েই নতুন পদ তৈরি করে। যেমন পটলের খোসা ফেলে না দিয়ে ভর্তা বা অন্য খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সামান্য খাবারও কাজে লাগানোর এই অভ্যাস তাদের জীবনসংগ্রামের পরিচয় বহন করে। তবে সীমিত উপকরণ দিয়ে খাবার তৈরি করতে পারা আর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া এক বিষয় নয়। দারিদ্র‍্যরে কারণে অনেক পরিবার পর্যাপ্ত আমিষ, ফল, দুধ, ডিম ও শাকসবজি কিনতে পারে না। ফলে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক মানুষের অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ে।শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পুষ্টিকর খাবার অপরিহার্য। অপুষ্টির কারণে শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ীও হতে পারে। কোনো শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি কম হওয়ার পেছনে অপুষ্টির পাশাপাশি বংশগত ও হরমোনজনিত কারণসহ নানা বিষয় থাকতে পারে। তাই বিষয়টি অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি।দেশের নদীভাঙনকবলিত এলাকা, চরাঞ্চল, হাওর এবং শহরের বস্তিতে বসবাসকারী বহু মানুষ দারিদ্র‍্যরে মধ্যে জীবনযাপন করেন। তাদের অনেকেরই নিয়মিত ও পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। এর প্রভাব পড়ে পরিবারের শিশুদের ওপর। অথচ শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির সুযোগ থেকে কোনো শিশু যেন বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।এ অবস্থায় সরকারকে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবতে হবে। প্রথমত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, দলিত, দরিদ্র শ্রমজীবী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে একটি নির্ভুল তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। সেই তালিকার ভিত্তিতে তাদের জন্য স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহ, রেশন কার্ড কিংবা পরিবারভিত্তিক সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সহায়তা যেন প্রকৃত অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।দ্বিতীয়ত, গর্ভবতী মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া দরকার। মায়েদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় টিকা, পুষ্টি পরামর্শ ও বিনা মূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করতে হবে। গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার সুযোগও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হলে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।তৃতীয়ত, প্রান্তিক মানুষের খাদ্যসংস্কৃতি ও স্থানীয় খাদ্যসম্পদকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের পরিচিত ও সহজলভ্য শাকসবজি, ছোট মাছ, ডাল, ফলমূলসহ পুষ্টিকর খাবারের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়ানো যেতে পারে। এতে একদিকে পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতিও টিকে থাকবে।বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু খাদ্যের উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; সবার জন্য পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্যও তৈরি করতে হবে। দরিদ্র মানুষের খাবার নিয়ে কৌতূহল বা প্রশংসা নয়, তাদের পুষ্টির অধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। একটি শিশুও যেন দারিদ্র‍্যরে কারণে অপুষ্টিতে বেড়ে না ওঠে। রাষ্ট্রের নীতি ও সামাজিক উদ্যোগের কেন্দ্রে এই মানবিক দায়িত্বকে স্থান দিতে হবে।[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

রম্যগদ্য: “বোইল্লা মারো হাসি, বাঁচবা একশ আশি”

হেঁ হেঁ, কথাটা ঠিক, আমি দেখছি রমনা পার্কে এক ব্যাটা বোইল্লা উডে “হাসো” ফাৎ করি বিশ তিরিশ জন পাবলিকে হো হো কইরা হাসে, আর কয় যত হাসবা, তত আয়ু বাড়বো!আরে বুড়বক, উড়ঝুড়ে বাঙাল, আমি যে হাঁসির কথা বলছি, সে হাঁসি তোর এই রমনা পার্কের হাসি নয়!আরে মিয়া ভাই আপনেই তো কোইতাছেন, “বোইল্লা মারো হাসি,বাঁচবা একশ আশি” হাসলে যে পাবলিকে বেশি দিন বাঁচে হেই কতাটা ব্যেবাগ পাবলিকেই জানে।হাসলেই যদি আয়ু বাড়ে, তাহলে বিশ্বের সবাই না হেসে কেবল রমনা পার্কের গুটি কয় লোক হাসছে ক্যানো?ক্যান, আপনে মিয়া দেখছেন না! রাস্তাঘাটে কত পাগলে একলা একলা হাসতাছে। কোনো কারণ ছাড়াই হাসতাছে। জানেন এই হাসির ঠেলায় এক এক পাগলে দেড়শ দুইশ বছর র্পযন্ত বাঁচে।তাহলে তুই রাস্তায় রাস্তায় হেসে হেসে ঘুরে বেড়াচ্ছিস না ক্যানো। তাহলেতো তুই দেড়শ দুইশ বছর র্পযন্ত বাঁচতে পারবি।হ’দেড়শ দুইশ বছর! বৌ-এর ছুট্টোভাই, মাত্র চুয়ান্ন বছর বাঁইচ্চায়, বাপ বাপ বইল্লা, কয় ছেইড়দে মা কেইন্দে বাঁচি।ক্যানো ক্যানো মাত্র চুয়ান্নো বছরেই কান্নাকাটি শুরু করেছিস...কাঁদবো না মিয়া, গাজর ১৮০ টাকা কেজি, এক লিটার তেল ২০০ টাকা, টমেটো ২০০টাকা, চাউল...থাম ভাই থাম, তোকে আর বাজার দর শোনাতে হবে না...ঠিক আছে ঠিক আছে, বাজার হিসাব না হয় ছাইড়া দিলাম, কিন্তু মাস্টারে যখন ছাত্রীরে অতিআচার করের তখন কি আমি হাসুম!“এতক্ষণে”— অরিন্দম কহিলা বিষাদে;— / “জানিনু কেমনে আসি লক্ষ্মণ পশিল / রক্ষঃপুরে।মানে কী! এহানে আবার মাইকেল হান্দাইলো কেমনে?মাইকেল মধূসুদন দত্তের “মেঘনাদ বধ” কাব্যের কথা বলছি না, বলছি তুই এতক্ষণে লাইনে এসেছিস।লাইনে আইছি মাইনে?তুই বললি না, মাস্টারে যখন ছাত্রীরে অতিআচার করের তখন কি আমি হাসুম! আমি তোর ওই হাসার কথায় বলছিলাম। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী” কবিতার দুটি পঙ্‌ক্তি শোন “আমি বেদূঈন, আমি চেঙ্গিস, / আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ... / ... আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!”হেঁ হেঁ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও কোইছে, আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া / হাসি পুষ্পের হাসি...আসলে কথাটা হোইবো “আমি বাংলদেশের দোজোখে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি...” হ্যাঁ হ্যাঁ শিক্ষক যখন ছাত্রীকে অত্যাচার করবে তখন ওই জাহান্নামের মতো নোংরা পরিবেশেও তুই পুষ্পের হাসি হাসবি!ওম্মা এইটা আপনি কি বলছেন!  নোংরা পরিবেশ, আপনে শুনেন নাই, আপনের বৌ-এর এক ছুট্টভাই কোইছে, মাস্টার গো কি স্বাদ আহাল্লাদ নাই, হ্যারা ছাত্রীরে ইকটু আধটু, আদর করলে আপনে কোইবেন ব্যাড টাচ! আপনেরা মিয়া নুংরা মানসিকতার অভিভাবক! মাস্টার সমাজে সম্মানিত ব্যাক্তিত্ব, হ্যায় আদর কোইরা আপনের আত্মজার ওষ্ঠে স্নেহের নির্দশন লেপন করছে, আর আপনে বর্বর অভিভাবক সম্মানিত মাস্টাররে থাপ্পড় মাইরা বোইলেন!একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে! তুই এইসব মাস্টারদের ছাত্রদের, ছাত্রীদের সাথে উন্নত দণ্ড দিয়ে আঘাত করাকে, অত্যাচার করাকে, ব্যাডটাচকে মেনে নিতে বলছিস!আরে আমি মাইন্না নিতে কমু ক্যা, আপনে দ্যাখেন নাই বাংলার ঘরে ঘরে, বাংলার পাড়ায় পাড়ায়, বাংলার মহল্লায় মহল্লায়, বাংলার গ্রামে গঞ্জে, শহরে শহরে  আপনের দেশে, আপনের কওমে বসবাসকারি ব্যাবাগ পাবলিকে মিছিল কোইরা কোইতাছে মাস্টারদের কোনো টাচ, ব্যাড টাচ বলা চলবে না। আত্মজার ওষ্ঠে স্নেহের নির্দশন লেপন করলে, সম্মানিত মাস্টাররে থাপ্পড় মারা চলবে না, চলবে না!এ কোন বাংলাদেশের কথা, এ কোন সোনার বাংলার কথা বলছিস, যেখানে মাস্টারদের ছাত্রদের, ছাত্রীদের সাথে অত্যাচার করাকে, ব্যাড টাচকে মিছিল মিটিং করে মেনে নিতে বলছিস!দ্যাখেন খুবতো তখন কোইছিলেন বর্বর পাকিস্তানিরা আমাগো শোষণ করে তাই পাকিস্তানি খ্যাদাও। আর আপনেগো ভায়ে ভায়ে ফাইটের চিপা দিয়া ইন্ডিয়া ঢুইক্কা দিল পাকিস্তান ভাইঙ্গা। আর পাকিস্তান ভাঙ্গার পরে আপনেরা কী করলেন পাকিস্তান আমলের, কান্দির পাড়া, নারায়ণগঞ্জের টানপাড়া, যশোর, খুলনা, চট্টগ্রাম, নাটোরের বনলতা সেনের, রাজশাহীর সব শাহী পাড়া ভাইঙ্গা দিলেন, লন এবার পাবলিকে তার মাল সামানা রাখবো কোই? কন কন এবার সারা দেশের ব্যাবাগ অবিবাহিত টগবগে তরুণ ও তরুণ মাস্টাররা তাগো মাল-সামানা রাখবো কোই? সব পাড়া তো ভাইঙ্গা দিছেন...এ্যাঁ তরুণদের মাল-সামানা মানে জিনিসপত্র রাখার জন্য তুই আবার পাকিস্তান আমলের সব পাড়া গড়তে বলছিস! আমি গড়তে কমুক্যা, আপনে দ্যাখেন না মিয়া, সারা বিশ্বে উন্নত দেশ মানে ফ্রান্সে, আমেরিকায়, ইংল্যান্ডে, রাশিয়ায়, মুলাঘুঁজ, পিকাডেলি স্কয়ার, লাসভেগাস, লেলিন গ্রাদ, ব্যাবাগ যায়গায় হ্যাগো দেশের টগবগে তরুণের ও তরুণ মাস্টারদের মাল সামান রাখার ব্যবস্থা করছে...বলিস কী? উন্নত বিশ্বে মানে ফ্রান্সে, আমেরিকায়, ইংল্যান্ডে, রাশিয়ায়, সব দেশে, দেশের টগবগে তরুণ মাস্টারদের মাল সামান রাখার ব্যবস্থা করেছে...করেছে মাইনে! আপনের প্রতিবেশী ভারতের বুধবার পেট, কলিকাতার সোনাগাছি, বম্বের কোলাবা, মাদ্রাসের আভিরামী ব্যাবাগ জায়গায় দেশের টগবগে তরুণের, তরুণ মাস্টারদের সমস্যা সমাধান করছে, আর ব্যাংককের পাতপোং কত্তবড় গোডাউন, সারা বিশ্বে জোড়া নাম...তাই বলে এই পবিত্র বাংলাদেশে এইসব গোডাউন মানে, পাকিস্তান আমলের সব পাড়াগুলো আবার গড়তে বলছিস!আমি কমুক্যা, বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম স্যারে কোইছেন, “ভাঙিছো গড়িছো নীতি ক্ষণে ক্ষণে, নিরজনে প্রভু নিরজনে...” আপনেরা সমাজের ভালোর জন্য নীতি ভাঙেন গড়েন...তার মানে সমাজের কোমলমতি শিশু ছাত্র-ছাত্রীদের পবিত্রতা রক্ষার জন্য, কোমলমতি শিশু ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক সুস্থ্যতার জন্য অপবিত্র পাড়া সৃষ্টি করতে হবে?আপনে মিয়া আছেন আপনের তালে, এই যে পুলিশের বড় স্যার তার নিজের দুই মেয়ের সাথে মিলে তরুণ ও তরুণ শিক্ষকদের সমস্যা সমাধান করছিলেন হ্যেইডাওতো আপনেগো সহ্য হোইলো না...তাইতো রে, তরুণ শিক্ষকদের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে উন্নত দণ্ড দিয়ে আঘাত করাকে, অত্যাচার করাকে, ব্যাড টাচকে মেনে নিবো, নাকি  উন্নত বিশ্বের মতো, আবার শহরে শহরে, জেলায় জেলায়, গঞ্জে গঞ্জে, পাড়া গড়বো![লেখক: চলচ্চিত্রকার]

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নেতৃত্ব: যোগ্যতার মূল্যায়ন জরুরি

রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি প্রধান ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী পদে বেসরকারি ব্যাংক থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং অঙ্গনে নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এটি কেবল দুটি পদে নিয়োগের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, নিজস্ব নেতৃত্ব তৈরির সক্ষমতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবল এবং জনগণের আস্থার প্রশ্ন।একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারাই নবীন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তখন বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে নিজস্ব অভিজ্ঞ জনবল ও নেতৃত্বের ঘাটতি ছিল। সময়ের সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলেছে, দক্ষ জনবল তৈরি করেছে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এটি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতিরই পরিচায়ক।কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কয়েক দশক ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভিত্তি নির্মাণ করেছে, যাদের রয়েছে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, বিপুল জনবল এবং ঋণ, বৈদেশিক বাণিজ্য, ট্রেজারি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সেই ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য নিজেদের মধ্য থেকে যোগ্য নির্বাহী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কেন?রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে কি যথেষ্ট অভিজ্ঞ, সৎ ও দক্ষ নেতৃত্ব নেই? যদি থাকেন, তবে তাদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে কি? আর যদি তাদের মধ্য থেকে কাউকে যোগ্য মনে করা না হয়, তাহলে এত বছর ধরে বিভিন্ন স্তরে পদোন্নতির মাধ্যমে নেতৃত্বের যে কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কি স্বাভাবিক নয়?এখানে মূল বিষয় বেসরকারি ব্যাংকের নির্বাহীদের যোগ্যতা অস্বীকার করা নয়। বরং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব নেতৃত্বের সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই ও মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তোলা।বেসরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞ নির্বাহীরা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। তাদের দক্ষতা, কর্মপদ্ধতি ও অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের উন্নয়নে কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তির পরিচিতি, পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের সুনাম কিংবা বেসরকারি ব্যাংকে সাফল্যের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব তিনি নিচ্ছেন, তার কাঠামো, উদ্দেশ্য, সীমাবদ্ধতা ও সমস্যার সঙ্গে তার অভিজ্ঞতার কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক পরিচালনা ও বেসরকারি ব্যাংক পরিচালনার মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি রাষ্ট্রের নীতি বাস্তবায়ন, বিস্তৃত জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদান, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং নানা প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কাজ করতে হয়। এসব বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর ধারণা ছাড়া শুধু সাধারণ ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা দিয়ে একটি সংকটাপন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে ঘুরে দাঁড় করানো কঠিন হতে পারে।আমার বিবেচনায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রথমে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ, সৎ, দক্ষ ও ফলাফল অর্জনে সক্ষম নির্বাহীদের। কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া না গেলে অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকের যোগ্য ব্যাংকারদেরও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি এবং ব্যাংক পরিচালনার বাস্তব জ্ঞান এখনো দেশের ব্যাংকিং খাতের সম্পদ।একই সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞ নির্বাহীদের উপদেষ্টা, পরামর্শক কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে যুক্ত করার সুযোগও খোলা রাখা উচিত। এতে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব নেতৃত্ব বিকাশের পথও অযথা সংকুচিত হবে না।তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ব্যাংকের সংকটের দায় বা সমাধান শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ওপর নির্ভর করে না। একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কতটা দক্ষ, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্ষদে ব্যাংকিং, অর্থায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষা, আইন ও প্রযুক্তি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয় থাকা দরকার। কেবল প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে ব্যাংকের জটিল পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সব সময় সম্ভব নয়।পর্ষদ যদি কার্যকর তদারকি করতে না পারে, ঝুঁকির বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয় কিংবা ব্যবস্থাপনাকে পেশাগতভাবে কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে একজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পক্ষেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে। বিপরীতে, যোগ্য পর্ষদ, পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করলে ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা বাড়ে।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় তাই কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।প্রথমত, শীর্ষ নির্বাহী নিয়োগে স্বচ্ছ ও পরিমাপযোগ্য যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। সততা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণ আদায়, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ববর্তী কর্মস্থলে অর্জিত ফলাফলকে গুরুত্ব দিতে হবে।দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দক্ষতা ও কার্যকারিতা পর্যালোচনা করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পর্ষদে বাস্তব ব্যাংকিং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।তৃতীয়ত, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে ব্যাংকভিত্তিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়, নতুন ঋণ অনুমোদনে সতর্কতা, মূলধন ও তারল্য ব্যবস্থাপনা, অনিয়মের জবাবদিহি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমা নির্ধারণ করা দরকার।চতুর্থত, প্রয়োজনে অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যাংকার ও দক্ষ বেসরকারি ব্যাংকারদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শক দল গঠন করা যেতে পারে। তাদের কাজ হবে নির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করা, সমাধানের সুপারিশ দেওয়া এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নে সহায়তা করা।পঞ্চমত, শুধু নিয়োগ দিয়েই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না। নীতিগত সহায়তা, প্রয়োজনীয় সম্পদ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযুক্ত পরিবেশ এবং নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককেও নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হবে এবং বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের আওতায় প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সহায়তা দিতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংকট থেকে উত্তরণে সময় লাগবে। এক দিনে খেলাপি ঋণ আদায় হবে না, দুর্বল ঋণের মান ভালো হয়ে যাবে না কিংবা দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা রাতারাতি দূর হবে না। এ জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক উদ্যোগ, দৃঢ় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং ফলাফলভিত্তিক তদারকি।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নেতৃত্বে বেসরকারি ব্যাংকার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব নেতৃত্বের সক্ষমতা যাচাই না করে বাইরে থেকে নির্বাহী নিয়োগ দেওয়াও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। নিয়োগের সিদ্ধান্তের যথার্থতা বিচার করতে হবে যোগ্যতা, প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ ফলাফলের ভিত্তিতে।আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থায়ন এবং জনসাধারণের আর্থিক আস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচনে তাই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলার চিন্তা থাকা জরুরি।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব, দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ, কার্যকর জবাবদিহি এবং সরকারের সমন্বিত সহায়তা। নিয়োগের মাধ্যমে কারও মর্যাদা বাড়ানো বা কমানো নয়, বরং ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়ানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব অভিজ্ঞ জনবলকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন, দক্ষতার ঘাটতি থাকলে তা পূরণ এবং প্রয়োজনে বাইরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর মধ্য দিয়েই টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত কে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যাংকার আর কে বেসরকারি ব্যাংকার, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কে সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও জবাবদিহির সঙ্গে ব্যাংককে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারবেন এবং তাকে সফল হওয়ার জন্য কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া হবে।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এসব প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক]

শিক্ষানীতি: সমস্যা ও উত্তরণের পথ

কোনো দেশ বা জাতির উন্নতির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা। আর একটি সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট শিক্ষানীতি। এই নীতির আলোকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত ও বাস্তবায়িত হয়।শিক্ষানীতি কী?শিক্ষানীতি হলো শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা, কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশে শিল্প, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষানীতি এসব নীতিমালার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।সাধারণভাবে শিক্ষা বলতে মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, চিন্তাভাবনা ও আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনকে বোঝায়। অন্যদিকে, শিক্ষানীতি হলো একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনার আলোকে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর পরিচালনা এবং দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত শিক্ষা নিশ্চিত করার দিকনির্দেশনা।স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে একটি সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে।বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০। এটি প্রণয়নের এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তাই এখন এ নীতির বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা জরুরি। এই নীতিতে শিক্ষার সমতা, গুণগত মান, সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, সেই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোথায় সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে?জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রণীত একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অধ্যাপক কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নীতিটি চূড়ান্ত করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল নৈতিক, মানবিক, বিজ্ঞানমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলা।মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যক. সাংবিধানিক নির্দেশনা বাস্তবায়ন: শিক্ষার সব স্তরে সংবিধানের নির্দেশনার প্রতিফলন ঘটানো এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তোলা।খ. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ: শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের মানসিকতা তৈরি করা।গ. চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশ: মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তা, যুক্তিবোধ ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো।ঘ. তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানশিক্ষা: দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং উৎপাদনমুখী বিজ্ঞানশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া।ঙ. বৈষম্যহীন ও মানসম্মত শিক্ষা: সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং বৈষম্যহীন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা।সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের প্রস্তাবশিক্ষানীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে ভর্তির সুযোগ বেড়েছে, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং নারীশিক্ষার প্রসার ঘটেছে। অনেক এলাকায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।তবে এসব অগ্রগতির পাশাপাশি নানা সীমাবদ্ধতাও রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে অবকাঠামোগত সংকট, শিক্ষকঘাটতি ও শিক্ষার মানের বৈষম্য। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সুযোগ-সুবিধায় এখনো বড় পার্থক্য রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নেই। শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।শিক্ষাকে কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েন। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।আরেকটি বড় সমস্যা হলো শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাব। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই কম। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন মানদণ্ডে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ ব্যয়ের সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশে এ লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বরাদ্দের বড় ব্যবধান রয়েছে। অর্থের সীমাবদ্ধতায় অনেক পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়নি। তাই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।১. নীতিগত ও রাজনৈতিক উদ্যোগক. স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্থায়ী ও স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা যেতে পারে। কমিশনটি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে থেকে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করবে।খ. শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা: সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রমে আমূল পরিবর্তন করা উচিত নয়। আগের নীতির কার্যকর দিকগুলো বজায় রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আসবে।২. অবকাঠামোগত উন্নয়নক. শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি: শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।খ. দুর্নীতি ও অপচয় রোধ: শিক্ষা প্রশাসনের সব স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দ করা অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং উন্নয়নকাজের মান নিয়মিত তদারক করতে হবে।গ. পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে সুযোগ সৃষ্টি: শহর ও গ্রামের শিক্ষাবৈষম্য কমাতে প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। পথশিশু, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর জন্য উপযোগী শিক্ষার পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।৩. শিক্ষক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার মানোন্নয়নক. মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা: শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। এতে মেধাবী তরুণ-তরুণীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হবেন।খ. যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ: আধুনিক শিক্ষাক্রম, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদান, সৃজনশীল মূল্যায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়ে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রশিক্ষণ যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।৪. শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকায়নক. কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার: সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও যোগ্যতা অনুযায়ী এ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে বাস্তব কাজের প্রশিক্ষণ ও আত্মকর্মসংস্থানের পথ সহজ করতে হবে।খ. পরীক্ষানির্ভরতা ও মুখস্থবিদ্যা কমানো: শুধু জিপিএ বা সনদের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা বিচার করা উচিত নয়। তাদের সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ, বাস্তব জ্ঞান ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাইয়ের কার্যকর পদ্ধতি চালু রাখতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতি এমন হতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বুঝে শেখার প্রতি আগ্রহী হয়।একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তির ওপর। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পাশাপাশি বর্তমান সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী এর সীমাবদ্ধতাগুলো পর্যালোচনা করা জরুরি।এ জন্য প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ, দক্ষ শিক্ষক তৈরি, দুর্নীতি রোধ এবং শিক্ষার সব পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগেই একটি মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। দক্ষ, মানবিক ও সৃজনশীল প্রজন্ম তৈরি করতে পারলেই বাংলাদেশ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও সক্ষম হয়ে উঠবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রধান শিক্ষক, চরফ্যাসন টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়]

লাউয়াছড়া ছেড়ে সাপ লোকালয়ে, বন কার দখলে

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের পরিচয় শুধু চা-বাগানের সবুজে নয়। পাহাড়-টিলা, বনভূমি ও নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী মিলিয়ে এ অঞ্চল দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক ভূখণ্ড। প্রকৃতিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পর্যটনশিল্প, তৈরি হয়েছে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। কিন্তু সেই প্রকৃতির নিরাপত্তা নিয়েই এখন বাড়ছে উদ্বেগ।বনভূমি দখল, মূল্যবান গাছ কাটা ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ নতুন নয়। এর সঙ্গে যখন লোকালয়ে সাপসহ নানা বন্যপ্রাণীর উপস্থিতির খবর সামনে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে—প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য কি বিঘ্নিত হচ্ছে? বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল কতটা নিরাপদ? আর বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোই বা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে?সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলে মাত্র তিন দিনে চারটি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল একটি বিষধর শঙ্খিনী ও তিনটি অজগর। কোনোটি পাওয়া গেছে বসতবাড়ির পাশে, কোনোটি সড়কের ধারে, আবার কোনোটি জালে আটকে ছিল। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা সাপগুলো উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেন। উদ্ধার হওয়া একটি অজগরকে লাউয়াছড়া বনে অবমুক্ত করা হয়।তিন দিনে চারটি সাপ উদ্ধারের ঘটনা একাই বন ধ্বংসের প্রমাণ নয়। তবে এমন ঘটনা বারবার ঘটলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। প্রাণীরা কেন লোকালয়ে আসছে, তাদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র কতটা নিরাপদ, মানুষের বসতি ও অবকাঠামো সম্প্রসারণে তাদের চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে তথ্য ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে।আর সেই অনুসন্ধানে কমলগঞ্জের ভানুগাছের পাহাড় ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান কেবল একটি বন নয়; এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত এ বনাঞ্চলে রয়েছে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী। স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও এর গুরুত্ব অপরিসীম।কিন্তু স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে ভানুগাছের পাহাড় ও আশপাশের বনাঞ্চল ঘিরে মূল্যবান বৃক্ষ নিধন, বনজ সম্পদ লুট এবং বনভূমি দখলের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। প্রকাশিত সংবাদেও বনভূমি দখল, গাছ কাটা ও বনের জমিতে স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগ উঠে এসেছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বনে প্রবেশ করে সেগুনসহ মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে গেছে। বনভূমি দখল করে কোথাও বসতি, কোথাও রিসোর্ট, আবার কোথাও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ জরুরি। অভিযোগগুলো সত্য হলে বিষয়টি শুধু পরিবেশ ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সরকারি সম্পদ রক্ষা, বন আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের প্রশ্নও।এখানেই কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। দীর্ঘদিন ধরে বন দখল ও মূল্যবান বৃক্ষ নিধনের অভিযোগ উঠে থাকলে সেসব ঘটনার তদন্ত কত দূর এগিয়েছে? কতটুকু বনভূমি দখলের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে? কতটি স্থাপনার বৈধতা যাচাই করা হয়েছে? কতটি মামলা হয়েছে, কতটির নিষ্পত্তি হয়েছে, আর কতটুকু জমি উদ্ধার করা গেছে?এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, নথি ও তথ্য দিয়ে দিতে হবে। বন বিভাগের কাছে এ-সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য থাকা এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি।বন রক্ষার কাজ শুধু গাছ লাগানো কিংবা মাঝেমধ্যে অভিযান চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সরকারি সম্পদ দখল বা বনজ সম্পদ লুটের অভিযোগ উঠলে তার সত্যতা যাচাই, অপরাধ প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।লাউয়াছড়ার বনাঞ্চল ঘিরে স্থানীয়ভাবে আলোচিত অভিযোগগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও রয়েছে। অভিযোগ আছে, বনভূমি দখল ও বনজ সম্পদ আহরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে আলোচিত কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগও স্থানীয়ভাবে শোনা যায়।বনভূমি দখল ও বনজ সম্পদ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে আলোচিত কয়েকজনের রাজনৈতিক উত্থান, অর্থবল ও পেশিশক্তির ব্যবহার এবং জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ভোট কেনা কিংবা রাজনৈতিক মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও এসব আলোচনায় উঠে আসে। এ ধরনের অভিযোগ গুরুতর। তবে অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যায় না। আবার অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী বলে অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ভূমির রেকর্ড যাচাই, মামলার নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গ্রহণ। রাজনৈতিক পরিচয় বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য কারও জন্য আইনের বাইরে থাকার সুযোগ তৈরি করতে পারে না। সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ হবে, অথচ প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে তা থেমে যাবে—এমন বৈষম্য আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।সরকার ও প্রশাসনের সদিচ্ছার আসল পরীক্ষা এখানেই। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে রাজনৈতিক দলেরই হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা একই মানদণ্ডে পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।বন ধ্বংসের ক্ষতি শুধু কতটি গাছ কাটা হলো, সেই হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। একটি বন অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়, খাদ্য সংগ্রহের জায়গা ও প্রজননক্ষেত্র। অনেক প্রাণীর জন্য বনাঞ্চলের এক অংশ থেকে অন্য অংশে যাওয়ার প্রাকৃতিক পথও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব জায়গা নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো বাস্তুতন্ত্রে।সাপের কথাই ধরা যাক। বিষধর শঙ্খিনীরও প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অজগরও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। সাপসহ বিভিন্ন শিকারি প্রাণী ইঁদুর ও অন্যান্য প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। অথচ মানুষের চোখে সাপ প্রায়ই আতঙ্কের কারণ। লোকালয়ে দেখা গেলেই অনেক সময় তাকে মেরে ফেলা হয়।কিন্তু সাপ কেন লোকালয়ে আসছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। বন উজাড়, ঝোপঝাড় পরিষ্কার, পাহাড়-টিলা কাটা, সড়ক নির্মাণ কিংবা অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। খাদ্য ও আশ্রয়ের খোঁজে তারা মানুষের বসতির কাছাকাছিও চলে আসতে পারে।তবে শ্রীমঙ্গলে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি সাপের লোকালয়ে আসার কারণ যে আবাসস্থল সংকোচন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। এ জন্য প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক তথ্য। কোথায় বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার হচ্ছে, কোন এলাকায় বনভূমির পরিবর্তন ঘটছে, কোথায় প্রাণীদের চলাচলের পথ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে—এসব তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে।অর্থাৎ, সাপ উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি যে পরিবেশে তারা বাস করে, সেটি কতটা নিরাপদ আছে, তা নিয়েও ভাবতে হবে।শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের পর্যটনের সবচেয়ে বড় সম্পদ প্রকৃতি। চা-বাগান, পাহাড়, বনভূমি আর বন্যপ্রাণীর উপস্থিতিই এ অঞ্চলকে অন্য জায়গা থেকে আলাদা করেছে। অথচ পর্যটনের নামে যদি বনাঞ্চলের আশপাশে অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে ওঠে, বনভূমি দখলের অভিযোগ উপেক্ষিত থাকে কিংবা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত পর্যটনের ভিত্তিকেই দুর্বল করবে।রিসোর্ট বা পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ মানেই অপরাধ নয়। কিন্তু কোনো স্থাপনা সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে গড়ে উঠেছে কি না, প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না কিংবা পরিবেশগত বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করছে কি না—এসব যাচাই করা অপরিহার্য।লাউয়াছড়ার মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চলের ক্ষেত্রে সীমানা নির্ধারণ, ভূমির নথি হালনাগাদ এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারি রেকর্ড মিলিয়ে দেখা দরকার। বনভূমির আশপাশে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলোর বৈধতা ও পরিবেশগত প্রভাবও খতিয়ে দেখতে হবে। কোনো স্থাপনা অবৈধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।প্রশ্নটি উন্নয়ন হবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই উন্নয়নের সুবিধা কারা পাচ্ছে আর ক্ষতির বোঝা বইছে কারা? কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি বনভূমি দখল করে আর্থিক সুবিধা পায়, অথচ ক্ষতিগ্রস্ত হয় জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, তাহলে তাকে জনস্বার্থের উন্নয়ন বলা যায় না।লোকালয়ে বন্যপ্রাণী দেখা গেলে উদ্ধারকাজে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। খবর পেয়ে তাদের সদস্যরা ছুটে যাচ্ছেন, প্রাণী উদ্ধার করছেন এবং বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করছেন। এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।কিন্তু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষে বন দখল বন্ধ করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা কিংবা বন আইন কার্যকর করা সম্ভব নয়। এসব দায়িত্ব মূলত বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের।গত সেপ্টেম্বর মাসে শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকা থেকে ২৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছিল বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। এর আগে আগস্ট মাসেও শঙ্খিনী ও অজগরসহ অন্তত ১৭টি সাপ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল সংগঠনটি। এসব তথ্য উদ্ধারকাজের পরিধি সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে শুধু উদ্ধারসংখ্যা দিয়ে কোনো এলাকার বন্যপ্রাণীর মোট সংখ্যা কিংবা আবাসস্থল সংকোচনের মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।তবু এসব তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কোন প্রজাতির প্রাণী কোথায়, কখন এবং কী পরিস্থিতিতে উদ্ধার হচ্ছে, তা নিয়মিত নথিভুক্ত করা হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা সহজ হবে। বন বিভাগ, গবেষক ও পরিবেশবিদেরা একসঙ্গে কাজ করলে এসব তথ্য সংরক্ষণ পরিকল্পনায় কাজে লাগাতে পারবেন।একই সঙ্গে বনভূমির সীমানা রক্ষা, অবৈধ দখল শনাক্ত করা, বনজ সম্পদ পাচার প্রতিরোধ এবং অভিযোগের তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকতে হবে। শুধু প্রাণী উদ্ধার করে সাময়িক স্বস্তি দিলেই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হবে না।লাউয়াছড়া রক্ষার জন্য নতুন করে বড় বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও বাস্তব পদক্ষেপ। প্রথমত, বনভূমির সীমানা ও মালিকানাসংক্রান্ত সরকারি নথি হালনাগাদ করে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। কোথায় দখলের অভিযোগ রয়েছে, কতটুকু জমি নিয়ে বিরোধ, কোন স্থাপনা কী অনুমোদনে গড়ে উঠেছে—এসব তথ্য যাচাই করে প্রকাশ করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, মূল্যবান বৃক্ষ নিধন ও বনভূমি দখলের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকলেও তদন্ত যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বনাঞ্চলের ভেতরে ও আশপাশে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলোর বৈধতা এবং পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করতে হবে। অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বৈধ স্থাপনাগুলোও পরিবেশগত শর্ত মেনে চলছে কি না, তা নজরদারিতে রাখতে হবে। চতুর্থত, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও চলাচলের পথ নিয়ে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। কোথায় প্রাণীদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কোথায় মানুষের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে, তা চিহ্নিত করে সংরক্ষণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। পঞ্চমত, স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং অভিযোগের ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, এসব উদ্যোগের অগ্রগতি জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। কতটুকু বনভূমি উদ্ধার হলো, কতটি অভিযোগ তদন্ত করা হলো, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় কী অগ্রগতি হয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। কারণ, স্বচ্ছতা ছাড়া জবাবদিহি আসে না। আর জবাবদিহি ছাড়া বন রক্ষার প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত কাগজেই থেকে যায়।  লাউয়াছড়া রক্ষায় তাই আর প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ, নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ এবং সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর জবাবদিহি। কারণ, বন হারালে শুধু গাছ হারায় না; হারিয়ে যায় জীববৈচিত্র্য, প্রকৃতির ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি নিরাপদ পৃথিবী পাওয়ার অধিকার।

লালন আমাদের চেতনার বহ্নিশিখা

সমাজে যখন অস্থিরতা ও প্রতিহিংসাবোধের প্রকাশ ঘটে, তখন ফকির লালনের কথা মনে হয়। এই সুবর্ণ পলিমাটির দেশে লালনের মতো অসংখ্য মরমি সাধকের জন্ম হয়েছে। এ দেশের মানুষের জীবনদর্শনের প্রকাশ ঘটেছে তাদের সংগীত ও জীবনাচরণের মাধ্যমে। ফকির লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন ও সৃষ্টিশীলতা মূলত মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য জীবনদর্শন। তিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও সামাজিক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মানুষকে স্থান দিয়েছেন। লালনদর্শনকে একটি বৃত্ত কল্পনা করলে এর কেন্দ্রে আছে মানুষ।আবারও বলি, লালনদর্শনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘মানুষ’। তিনি মনে করতেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। সব মানুষের ভেতরেই ঈশ্বর বা ‘মনের মানুষ’ বসবাস করেন। তাই আলাদা করে কোনো উপাসনালয় বা বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে মানুষের সেবা ও মনকে চেনা বড় সাধনা।লালন কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বা গোঁড়া ধর্মের অনুসারী ছিলেন না। তিনি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধসহ সব ধর্মের সংকীর্ণতা ও বিভেদকে অস্বীকার করেছেন। তার গানে মানুষের পরিচয় কোনো জাতিগত বা ধর্মীয় কাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয়নি। ‘আপনারে আপনি চেনা, সেই বটে উপাসনা’—লালন এই বাণীর মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও নিজের ভেতরকার সত্যকে উপলব্ধি করার ওপর জোর দিয়েছেন। মহাত্মা লালনকে উপলব্ধি করতে হলে তার চেতনাকে জানতে হবে। আমরা তার চেতনার উত্তরাধিকারী না হয়ে লালনের মূর্ত রূপের উত্তরাধিকারী হতে চাই, বিপত্তি এখানেই। এর মধ্যে আমরা অনেকেই আছি, যারা লালনের চেতনা ও মূর্ত বাণী—দুটোকেই বাতিল করে দিতে চাই।বাংলাদেশের মরমি কবিদের দর্শন মূলত সৃষ্টিশীল আধ্যাত্মিকতা, মানবপ্রেম এবং স্রষ্টার সঙ্গে মিলনের ব্যাকুলতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মরমিবাদ বা সুফিবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া ও বাউল দর্শনের এক অপূর্ব মিশ্রণে এই অঞ্চলের মরমি সাহিত্য গড়ে উঠেছে। লালন শাহ, হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত এবং শাহ আবদুল করিমের মতো সাধকেরা এই দর্শনের প্রধান ধারক ও বাহক।লালনের সঙ্গে মরমি সাধকদের সাদৃশ্য থাকলেও লালনদর্শনের সঙ্গে অন্য সাধকদের দর্শনের কিছুটা পার্থক্য লক্ষ করা যায়। লালনদর্শনের সঙ্গে শাহ আবদুল করিমের দর্শনের কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে। লালন সাঁইয়ের সঙ্গে অন্য মরমি সাধকদের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, লালনের সমাজমনস্কতা ও মানবতাবোধ সরাসরি দৃশ্যমান, যা অন্যদের ক্ষেত্রে কিছুটা বিমূর্ত। লালন যেমন গভীরভাবে সমাজমনস্ক ছিলেন এবং সাম্যের সমাজের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন, শাহ আবদুল করিমও এই দর্শনের অনুসারী হয়েছেন।ড. আবুল আহসান চৌধুরী তার ‘লালন সাঁই প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ’ গ্রন্থে লালনকে সমাজমনস্ক সাধক-কবি বলে অভিহিত করেছেন। সনৎকুমার মিত্র সম্পাদিত ‘বাউল লালন রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে সুবোধচন্দ্র তার ‘গ্রাম্য সাহিত্য’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘লালন ফকির নাম শুনিয়াই হয়তো অনেকে মনে করিতে পারেন ইনি বিষয়হীন ফকির ছিলেন; বস্তুত তাহা নহে; ইনি সংসারী ছিলেন, সামান্য জোতজমা আছে; বাটিঘরও মন্দ নহে। জিনিসপত্র মধ্যবর্তী গৃহস্থের মতো, নগদ টাকা প্রায় ২ হাজার রাখিয়া মারা যান’ (মিত্র, পৃ. ১০২)। লেখাটির মূল বিষয়ের সঙ্গে এসব উক্তির যৌক্তিক প্রাসঙ্গিকতা হলো, লালন যেভাবে সমাজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সামাজিক বৈষম্য ও সংস্কার নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন, অন্য মরমি কবিদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি ছিল কিছুটা ভাবমূলক।ফিরে আসি লালনসহ মরমি কবিদের জীবনদর্শনে। আমাদের মরমি কবিদের জীবন ত্যাগে ভরপুর ছিল। ভোগ তাদের জীবনদর্শনে ছিল না। তাদের দর্শনের ভিন্নতা ছিল, ছিল বহুমুখিতা। লালনের সঙ্গে মরমি কবিদের মৌলিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কোনো বৈসাদৃশ্য ছিল না।আত্ম-অন্বেষণ, পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের আকুলতা (বিরহ ও প্রেম), সংসারজীবনের অনিত্যতা, লৌকিক জীবন নিয়ে বৈরাগ্য—বাংলার সব মরমি কবির মধ্যেই এসব বিষয় ছিল। বাংলার মরমি দর্শনের নিজস্বতা এসব উপাদানেই নিহিত আছে। তবে ভাবসম্পদ ও দর্শনে প্রত্যেকেই ছিলেন অনন্য। ফকির লালন সাঁইয়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল সমাজের অসামঞ্জস্যের প্রতি তার সংবেদনশীলতা। ভারতীয় সমাজে প্রশ্নের পরিসর অত্যন্ত ক্ষুদ্র। আধ্যাত্মিক জীবন হোক বা ইহলৌকিক জীবন, সৃষ্টি কিংবা সামাজিক নিয়মকে প্রশ্ন না করলে সত্যকে বের করে আনা বড় কঠিন। লালন তার অধিকাংশ গানে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন। এ ধরনের প্রশ্ন তোলা উপমহাদেশীয় সংস্কৃতিতে প্রথাবিরোধী কর্মকাণ্ড।লালনের জীবনদর্শন তার গানে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। গানের মধ্য দিয়ে লালন ফকির সে সময়ের সামাজিক সমস্যা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, আধ্যাত্মিকতা ও সমাজজীবনের সমস্যাগুলো তুলে ধরেছিলেন। দর্শনের অন্যতম একটি পদ্ধতি হলো প্রশ্ন করে বাস্তবতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস, প্লেটোসহ দর্শনের বিশ্বখ্যাত মনীষীরা এই পদ্ধতিতে মানুষকে আলোকিত করেছিলেন। লালন ফকিরও তার গানে নানাবিধ প্রশ্ন ও জবাবের মাধ্যমে একই পদ্ধতিতে সামাজিক অসংগতি, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির স্বরূপ তুলে ধরেছিলেন। বলা যায়, লালন ছিলেন একজন মানবতাবাদী সাধক, যিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সব প্রকার জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে তিনি তার গান রচনা করেছেন। লালন নিজের গানে নিজেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। (৬৫৭)প্রশ্ন হলো, লালনের দর্শনে সমৃদ্ধ এই জনপদে মানুষের মধ্যে বিভক্তি, অনৈক্য, অস্থিরতা ও হিংসার আগুন কেন নিয়ত প্রজ্বলিত? শুধু লালন নয়, যে দেশের লোকগানে লেখা হয়, ‘নানান বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ; জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত।’ (‘নকশী কাঁথার মাঠ’ (নবম পর্ব)-এর একটি বহুল প্রচলিত গাজীর গানের চরণ।) বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন কোণে যতটুকু বিচরণ করেছি, এরকম সংহতি, ভালোবাসা ও মানবতার বার্তা কোথাও খুঁজে পাইনি।লালনের মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক ধর্মমত সমাজের অপাঙ্ক্তেয়, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মুক্তির সনদ হয়ে সবার মনে নবজাগরণ এনেছিল। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে লালনদর্শনে দীক্ষিত হয়ে অনেকে মানবতাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। লালন এখনো অসীম সাগরে বাঙালির মানবতাদর্শনের প্রধান পথপ্রদর্শক। মানবতাদর্শনের চর্চা হলো সমাজের শ্রেণিবৈষম্যকে উপহাস করে নতুন সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। আমরা যখন ধর্মের গোঁড়ামি পরিহার করে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য সংগ্রাম করি, লালন তখন আমাদের চেতনার সাথি হয়ে অনুপ্রেরণা জোগান। প্রমিথিউসের মতো লালন আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে সাহস জোগান নিয়ত। লালনের গান ও তার জীবনের সামগ্রিক প্রয়াস বিবাদ, কলহ ও হিংস্রতায় নিমজ্জিত মানুষের মহামিলনের বার্তা। লালন বাঙালি সমাজ ও লোকায়ত জীবনে মানবতাবাদী মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হয়ে থাকবেন অনন্তকাল। এই বক্তব্যকে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করে তার এই বাণী: ‘এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে/যে দিন হিন্দু মুসলমান, বৌদ্ধ আর খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।’আমাদের সমাজে প্রবাহিত অন্ধকার দেখে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। পলিমাটির দেশের মানুষ, বিশেষত প্রান্তিক মানুষেরাই বিপর্যয়ে এগিয়ে আসেন। তারাই লালনচেতনা ধারণ করেন। মরমি কবিদের মতো তাদের জীবনদর্শনেও জাতপাত, ধর্ম বা বর্ণের কোনো ভেদাভেদ নেই। মানুষের কৃত্রিম, বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে তার ভেতরের ‘মানুষ’ তাদের কাছে আপন। লালনের গান শুধুমাত্র মরমি ভাবে ভাবাতুর নয়। তাতে সংশয়বাদী দর্শন আছে, আছে সঠিক পথ সন্ধানের আর্ত আকুতি। লালন তাই অন্ধকার থেকে আলোর পথে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একজন দার্শনিক অভিভাবক।[লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক]

ভিডিও আরও দেখুন

নাঈমের বোলিং ঘূর্ণিতে লিড পেল বাংলাদেশ

মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে গুরুত্বপূর্ণ লিড অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ক্যারিবীয়দের প্রথম ইনিংস ২৪৫ রানে গুটিয়ে দিয়ে ২৭ রানের লিড নেয় স্বাগতিকেরা। এর আগে বাংলাদেশ তাদের প্রথম ইনিংসে সংগ্রহ করেছিল ২৭২ রান।আজ ম্যাচের তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় সেশনে অলআউট হওয়ার আগে এই সংগ্রহ পায় সফরকারী দল। বাংলাদেশের সফল বোলার হিসেবে ৪টি উইকেট শিকার করেন নাঈম। এ ছাড়া তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ দুটি করে এবং শরীফুল ইসলাম ও হাসান মাহমুদ একটি করে উইকেট লাভ করেন।এর আগে গতকাল দ্বিতীয় দিন শেষে ৪ উইকেটে ১৩৪ রান তুলে দিন শেষ করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আজ তৃতীয় দিনের শুরুতে দলের রান বাড়াতে থাকেন আগের দিনের দুই অপরাজিত ব্যাটার তেজনারায়ণ চন্দরপল ও জাস্টিন গ্রিভস। ধৈর্যশীল ব্যাটিং করে ১৬৪ বলে ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্ট ফিফটি তুলে নেন ওপেনার চন্দরপল। তবে ইনিংসের ৫৯তম ওভারে শরীফুল ইসলামের বলে স্লিপে নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে ক্যাচ দিয়ে ১৮২ রানে ৫৬ রান করে ফেরেন তিনি।চন্দরপলের বিদায়ের পর অধিনায়ক রোস্টন চেজকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন গ্রিভস। ব্যক্তিগত ২৭ রানের মাথায় চেজের একটি ক্যাচ শর্ট লেগে ফেলেন মুমিনুল হক। তবে লাঞ্চের ঠিক আগমুহূর্তে নাঈমের নিচু বাউন্স ও ভেতরে ঢোকা ডেলিভারিতে এলবিডব্লিউ হয়ে সাজঘরে ফেরেন ৪৬ রান করা গ্রিভস। ফলে ৬ উইকেটে ২১৩ রান নিয়ে প্রথম সেশন শেষ করে ক্যারিবিয়ানরা।দ্বিতীয় সেশনের শুরুতে আক্রমণাত্মক খেলে দ্রুত রান তোলার চেষ্টা করেন সফরকারী ব্যাটাররা। অভিষিক্ত জশুয়া বিশপ এসেই কয়েকটি বাউন্ডারি হাঁকান। তবে তাঁকে ফিরিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সপ্তম উইকেটের পতন ঘটান মেহেদী হাসান মিরাজ। দলের রান তখন ২৪০।এরপর মিতব্যয়ী ও ধারালো বোলিংয়ে এক ওভারেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন নাঈম। ওভারের দ্বিতীয় বলে শামার জোসেফকে উইকেটকিপার লিটন দাসের ক্যাচ বানানোর পর ষষ্ঠ বলে জোমেল ওয়ারিক্যানকে এলবিডব্লিউ করেন তিনি। এরপর শেষ ব্যাটার জেইডেন সিলসকে বড় শট খেলতে গিয়ে মিড অফে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন নাঈম। খাতা খোলার আগেই সিলস আউট হলে মাত্র ৫ রান যোগ করতেই শেষ ৩ উইকেট হারিয়ে ২৪৫ রানে অলআউট হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।/ 

নাঈমের বোলিং ঘূর্ণিতে লিড পেল বাংলাদেশ