সংবাদ
ককরোচে কাঁপছে দিল্লি মরিয়া সরকারও, কী ঘটতে যাচ্ছে?

ককরোচে কাঁপছে দিল্লি মরিয়া সরকারও, কী ঘটতে যাচ্ছে?

একজন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনে কাঁপছে দিল্লি? মেট্রো বন্ধ, রেলে বিধিনিষেধ, ২৩ হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনী! সুপ্রিম কোর্টের ধাক্কা দিল্লিতে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের চাপে অস্বস্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার? আগামী ১০ অক্টোবর ককরোচ পার্টি এবং একাধিক ছাত্র সংগঠনের আন্দোলন ঘিরে রাজধানীতে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক।মেট্রোরেলের ৫৭টি স্টেশনের প্রবেশ ও নির্গমন পথ বন্ধ রাখার উদ্যোগ, দিল্লিগামী বেশিরভাগ  লোকাল ও দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল, হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং প্রতিবাদকারীদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে দিল্লির পরিস্থিতি এখন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ।ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে (এসআইআর) কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগের দাবি জানাচ্ছে সিজেপি।আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়েছে এবং এর ফলে নাগরিকদের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারচুপি আর অনিয়ম সীমাহীন।অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, সংশোধনের প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ নয় এবং খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের পুনরায় নাম নথিভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে এখন শুধু একজন নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি নয়, বরং ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা।শুক্রবার (৯ অক্টোবর) প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ১০ অক্টোবরের কর্মসূচিকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২২১টি কোম্পানি, অর্থাৎ আনুমানিক ২৩ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি দিল্লি পুলিশেরও বিপুল সংখ্যক কর্মী দায়িত্বে রয়েছেন। রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং সম্ভাব্য জমায়েতের জায়গায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আন্দোলনকারীদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিয়ে। দিল্লি পুলিশের অনুরোধের ভিত্তিতে ৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ৫৭টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও নির্গমন পথ বন্ধ রাখার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা ও নির্দেশের খবর প্রকাশিত হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি দিল্লির দুটি প্রধান রেলস্টেশনগামী  ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। ফলে আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদেরও ভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি পৌঁছে যায় সুপ্রিম কোর্টে। ৯ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ মেট্রো ও রেল পরিষেবায় ব্যাপক বিধিনিষেধ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলা সমস্যার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত করা যাবে না। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদের অসুবিধা কমিয়ে কীভাবে সকল পরিষেবা চালু রাখা যায়, তা বিবেচনা করার পারামর্শ দিয়েছে সুপ্রিমকোর্টে। অর্থাৎ, নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এবং নাগরিকদের দৈনন্দিন চলাচলের অধিকার—দুটির মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রশ্নটি এখন আইনি বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে আন্দোলনের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টিকে আরও বিতর্ককের কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়েছে। প্রশাসনের যুক্তি, সম্ভাব্য জমায়েত ও আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। কিন্তু আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানোর অধিকার তাদের রয়েছে।এই দুই অবস্থানের সংঘাতেই উঠে আসছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন কত দূর পর্যন্ত বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, আর কোথা থেকে তা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের উপর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ হয়ে ওঠে?রাজনৈতিক দিক থেকেও এই আন্দোলনের গুরুত্ব কম নয়। সিজেপির কর্মসূচি ঘিরে ছাত্র সংগঠন, নাগরিক সমাজের একাংশ এবং বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের সমর্থনের খবর সামনে এসেছে। ফলে আন্দোলনটি শুধুমাত্র একটি সংগঠনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিবাদে পরিণত হবে, তা এখন দেখার বিষয়।আন্দোলনকারীদের দাবি, তাদের লক্ষ্য নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, প্রশাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ—বিক্ষোভের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। এখানেই কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এত বড় নিরাপত্তা প্রস্তুতি কি সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর প্রশাসনিক উদ্যোগ, নাকি এর ফলে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে?শুধু নিরাপত্তাবাহিনীর সংখ্যা দিয়ে সরকারের উদ্বেগ বা রাজনৈতিক ভয় প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু মেট্রো স্টেশনে বিধিনিষেধ, রেল পরিষেবায় পরিবর্তন এবং আন্দোলনের অনুমতি নিয়ে বিতর্ক একত্রে প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলিকে জনপরিসরে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই পরিস্থিতিতে গানতান্ত্রিক আন্দোলন দমনের নাম হাজারো কোটি টাকা যে ব্যয় হবে তার হিসেব কি হবে? আন্দোলন দমনের নামে হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং পরিবহণ ব্যবস্থায় বিধিনিষেধের ফলে প্রশাসনিক ব্যয় ও সাধারণ মানুষের অসুবিধা নিয়ে স্বচ্ছ হিসাব চাওয়ার যুক্তি অবশ্যই রয়েছে।সব মিলিয়ে, ১০ অক্টোবরের আন্দোলন এখন সিজেপির কাছে যেমন শক্তি প্রদর্শনের পরীক্ষা, তেমনই কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কাছেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার পরীক্ষা। আন্দোলন কত বড় হবে, কত মানুষ দিল্লিতে পৌঁছতে পারবেন এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন বা কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানে কোনও পরিবর্তন আসে কি না—তার উত্তর এখনও অজানা।তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রতিবাদের অধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পৌঁছে গেছে। তাছাড়া এই আন্দোলন ঘিরে রাজধানীতে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক।ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন ঠেকাতে মরিয়া মোদি সরকারপাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদেরও ভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।  এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি পৌঁছে যায় সুপ্রিম কোর্টে। ৯ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ মেট্রো ও রেল পরিষেবায় ব্যাপক বিধিনিষেধ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলা সমস্যার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত করা উচিত নয়।পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদের অসুবিধা কমিয়ে কীভাবে পরিষেবা চালু রাখা যায়, তা বিবেচনা করার কথাও বলা হয়। অর্থাৎ, নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এবং নাগরিকদের দৈনন্দিন চলাচলের অধিকার—দুটির মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রশ্নটি এখন আইনি বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে আন্দোলনের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টিও বিতর্ককে আরও বাড়িয়েছে।  নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের উপর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে সরকারের জন্য। রাজনৈতিক দিক থেকেও এই আন্দোলনের গুরুত্ব কম অনেক তা সরকারকার বুঝতে হবে। যাতায়াত ব্যবস্থায় কেন্দ্রের পদক্ষেপে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের পরে পরিবহণ সংক্রান্ত বিধিনিষেধে কী পরিবর্তন আসে এবং এই প্রতিবাদের রাজনৈতিক অভিঘাত কত দূর পৌঁছায়—তার ওপরই নির্ভর করবে পরবর্তী পরিস্থিতি।
৬ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

রম্যগদ্য: নিজের জালে নিজে বন্দী

হেঁ হেঁ হেঁঁ, ক্যামন, খুব তো তখন নাচছিলেন, মোসাদের ডিভাইস আনি হ্যাতাগো ব্যাবাক খবরাখবর ফানির মতুন জাইন্না যামু। যেহানে যা ঘটবো, আন্নে ব্যাবাগ কিছু, আগেই জানি যাইবেন যে। তো ভালো কথা, তুই কাঁচা মানে “র” খবরাখবর সংগ্রহ করে, দেশের কোথায় কী ঘটছে, সব জেনে বুঝেসুঝে, তারপর দেশের ও দেশবাসীর উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নিবি সেটাতো খুব ভালো কথা। এই জন্য তুই শুধু মোসাদ ক্যান, দরকার হলে কেজিবি, এফবিআই, সিআইএ, জানিসারিস, হামাস সবের থেকে টেকনোলজি আহ্বান কর। দেশ ও দেশের নাগরিকের জন্য উন্নয়নমুখী যে কোনো কাজে তুই শতভাগ জনগণের সহযোগিতা পাবি।হেঁ হেঁ হেঁঁ, দেশ ও দেশের নাগরিকের জন্য উন্নয়ন! আরে মিয়া মোসাদের ডিভাইস আনি বিরোধী পার্টির ব্যাবাক খবরাখবর শুনোনের লাই যন্ত্র ব্যাবহার করের! আর আন্নেনি কন, দেশ ও দেশের নাগরিকের জন্য উন্নয়নমুখী যে কোনো কাজে মানে পাবলিকের শান্তি মারার কাজে এই সব আধুনিক আড়িপাতার মেশিন আনি দেশের উন্নয়নের কাজে লাগাইবো?আরে না না না, মানুষের ক্ষতি করার জন্য মোসাদের অত্যাধুনিক ডিভাইস ব্যাবহার করলে তা কখোনোই কোনো ভদ্র শিক্ষিত সামজ মেনে নিবে না। আমেরিকার মতো জায়গায়, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, নিক্সন আড়ি পাততে যেয়ে “ওয়াটার গেট” কেলেঙ্কারিতে ধরা খেয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলো, আর সেখানে তোর দেশে মোসাদের অত্যাধুনিক আড়িপাতার ডিভাইস ব্যাবহার...আরে মিয়াভাই খালি ব্যাবহার? হ্যাতারা তো, ব্যাবাগ কথা হুনের, এর পর হ্যেইডারে আবার, ফোনালাপ ফাঁস করি পাবলিকরে সব কথা হুনাই, বিরোধীরে পচাইতেছে।না না, এসব নোংরা ফাউল কাজ কোনো মানুষের বাচ্চার কাজ না।মানুষের বাচ্চার কাজ না হোইলে এইগুলা কাগো কাজ! সারা পিরথিবীতে “মাফিয়া”গো ধরনের লাই গোয়েন্দা সংস্থ্যারা এক ব্যাটার গাড়ির ড্যাশ বোর্ডে গোপন, ট্রান্সমিটার লাগাই, প্রায় ছয়মাস হ্যের পিছে ঘুরি ঘুরি তারপর হ্যেতারে কট কোরছে। আর ব্যাটা গোয়েন্দা সংস্থ্যার ক্যাপ্টেন কি রকম বাহবা পাইছে আপনে জানেন? আজকাল সারা বিশ্বে গোয়েন্দা সংস্থ্যার নিত্য নতুন অত্যাধুনিক আড়িপাতার যন্ত্র ব্যাবহার এবং আবিষ্কার পুরাপুরি জায়েজ।বলিস কী! সারা বিশ্বে শিক্ষিত অশিক্ষিত, জালিম আর মজলুম, জননগণের সরকার সবাই গোয়েন্দা সংস্থ্যার নিত্য নতুন অত্যাধুনিক আড়িপাতার নাজায়েজ যন্ত্র ব্যাবহার এবং আবিষ্কার পুরাপুরি জায়েজ বলে স্বীকার করেছে?কী বলচেন স্বীকার কোরেছে, ওরা অহন কম্পিউটার দী, হান্দাই হ্যাকিং করি ব্যেবাগ সরকারের গোপন নথিপত্র, পাবলিকের সামনে তুলি ধরের...ছী ছী ছী তৌবা তৌবা, মানুষের ভালোর জন্য তুই যদি মোসাদের অত্যাধুনিক ডিভাইস ব্যাবহার করিস তাহোলে পাবলিক তোকে বাহবা দিবে। কিন্তু খালি নিজের গদী রক্ষার জন্য, নিজের স্বৈরাচারি কর্মকান্ড চালানোর জন্য, জনগনের ক্ষতির জন্য জনগনের ট্যাক্সের টাকায় মোসাদের অত্যাধুনিক ডিভাইস কিনলে তা কখোনোই, মানুষের বাচ্চার কাজ বলে মনে হবেনা।মানুষের বাচ্চা কন বা দেবদূতের বাচ্চা কন, ব্যেবাগ দুনিয়ায় অহন যে কোনো সরকার তার গদি টিকিইবার লাই মোসাদের অত্যাধুনিক ডিভাইস কামে লাগার।লজ্জা লজ্জা, শরম শরম, কুন্ঠা বা হায়া কিংবা মাথাহেঁট, তুই যাই বলিস সুস্থ্য মানসিকতার সরকার কখোনোই জনগনের ক্ষতির জন্য, কেবল নিজের গদি রক্ষার জন্য এসব আড়িপাতার মেশিন ব্যাবহার করবে,না।বুঝলাম যেই দিন রামে রাজত্ব করবো হেই দিন, মোসাদের অত্যাধুনিক আড়িপাতা ডিভাইস ব্যাবহার বন্ধ হোইবো। কিন্তু আমি কোইকি মজা একটা ঘইট্টা গ্যেছেগা...এর মাঝে তুই আবার মজা মানে পাবলিকের এন্টারটেইনমেন্টের কী পেলি?ক্যান আপনে কি ইউটিউব দ্যেখেন না?ইউটিউবের সাথে এর আবার কি সম্পর্ক?আরে মিয়া আপনে হুনেন নাই, “এ্যাই শোনো, তুমি কি আমার লগে কক্সবাজার যাইবা? / না বাবা না, আপনার হাত অনেক লম্বা, আমার ভয় লাগে/ যাহ্ দুষ্টু তুমি মিথ্যা ভয় পাও, জাননা আমার হাতে ব্যাথা কাউকে মারি না/...  এসব আবার কি বলছিস, “এ্যাই শোনো, তুমি কি আমার লগে কক্সবাজার যাইবা? ক্যা বোঝেন না, আরো মজার এন্টারটেইনমেন্ট হুনেন, “এ্যাই শোনো তোমার জমির চায়ের, সৌরভ কিন্তু বীষম কড়া, তাই তোমার জমির চায়ের সৌরভ পানিতে ধুয়া হালকা কোইরা আইনো, নাইলে খাইলে জীবলা আর গলা জ্বলে/ যাহ দুষ্ট্ ুকি যে কও...আচ্ছা রাখ তোর এই সব ফালতু হেঁয়ালি পুর্ণ সংলাপ, বল তুই কি বলতে চাস...ক্যা মিয়া বোজেন না, ফোনালাপ ফাঁস। হ্যেতারা যেই মোসাদের আড়িপাতা ডিভাইস আনি পাবলিকের গোপন কথা ফাঁস করতো, অহন অন্য ব্যাটারা ওই মোসাদের আড়িপাতা ডিভাইস দী, হ্যেতাগো ফোনালাপ ইউটিউবে ফাঁস করের...এম্মা একিরে যেই লংকায় যাচ্ছে সেই রাবণ। এইসব আড়িপাতা ডিভাইস কেবল মানুষের ক্ষতির জন্য ব্যাবহৃত হবে!আরে রাখেন আপনের নীতিকথা! আমি কোই কী স্বৈরাচার এখন নিজের জালে নিজে বন্দী। আগে যেই মোসাদের ডিভাইস আনি পাবলিকরে হয়রানি করছে, অহন সেইম মেশিন দী, পাবলিকের সামনে হ্যাগোর হয়রানি শুরু হোইছে!আচ্ছা বলতো বাঙালীর এই পরস্পরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুড়ি থামবে কবে রে...?আই তো কোই “কেয়ামত সে কেয়ামত তক চলেগা...”    [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

মাহালী আদিবাসীদের প্রাণের উৎসব ‘জিতিয়া পার্বন’

একটি জাতির পরিচয় শুধু তার নাম, বসতি কিংবা জীবনযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভাষা, গান, নাচ, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, লোককথা, উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েও একটি জনগোষ্ঠী তার স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। তাই কোনো সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি উৎসবের বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে ইতিহাস, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাহালী আদিবাসী সম্প্রদায়ের ‘জিতিয়া পার্বন’ তেমনই একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব, যা একসময় প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। নিজেদের শিকড় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার তাগিদে মাহালীরা আবারও এই উৎসবকে ফিরিয়ে এনেছেন।গত ৩ অক্টোবর ২০২৬ রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা মাহালী পাড়ায় দিনব্যাপী উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে জিতিয়া পার্বন। মাহালী আদিবাসী আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সংগঠন (মাসাউস) ও জিতিয়া পার্বন উদযাপন কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার প্রায় ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের সহস্রাধিক শিশু, নারী ও পুরুষ অংশ নেন। কয়েকদিনের প্রস্তুতির পর শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। নাচ, গান, মাদলের ছন্দ, প্রার্থনা, আলোচনা, পিঠা বিতরণ এবং বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবটি পরিণত হয় মাহালী সম্প্রদায়ের মিলনমেলায়।মাহালী সমাজে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, জিতিয়া পার্বণের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। জিত বহন ঠাকুর নামে একজন মাহালী নেতা ছিলেন, যিনি মানুষের কুসংস্কার, পরাধীনতা ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তার স্মরণে মাহালীরা এই পার্বণ পালন করে আসছেন বলে প্রবীণরা জানান। উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কঠোরভাবে নিরামিষ খাবার গ্রহণ। প্রার্থনার পাশাপাশি গান ও নৃত্য এ পার্বণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উৎসবের সময় যে লোকগানটি গাওয়া হয়, তার কথায়ও ফুটে ওঠে মাহালী জীবনের সরলতা ও সামষ্টিকতার ছবি।তবে জিতিয়া পার্বণের গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাহালী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নানা সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের কারণে মাহালী সমাজে এ উৎসবের চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে উৎসবটি নিয়মিতভাবে উদযাপিত না হওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই নিজেদের ঐতিহ্যের একটি অংশ অচেনা হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে মাহালী সম্প্রদায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুদ্ধারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে মাসাউসের নেতৃত্বে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় আবার জিতিয়া পার্বন উদযাপন শুরু হয়।মাসাউসের নির্বাহী পরিচালক মেরিনা হাঁসদার ভাষায়, প্রায় ৫০ বছর ধরে মাহালী সমাজের একটি অংশ ধর্মান্তরসহ নানা কারণে এই উৎসব থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। তাই জিতিয়া পার্বনকে তারা কেবল একটি পুরোনো উৎসব হিসেবে দেখছেন না; বরং মাহালী পরিচয়কে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। এই উদ্যোগে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাহালী তরুণদের মধ্যে নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্যবাহী দং ও ঝুমুর নাচ এবং মাদলের চর্চা বাড়ছে।জিতিয়া পার্বনের পুনর্জাগরণের এই ধারাটি এক দিনের নয়। ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বাগানপাড়া, ললিত নগরে উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়। পরে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পবা উপজেলার দামকুড়ায় এবং ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গোদাগাড়ীর কাকনহাটের শুরশুনিপাড়ায় আয়োজন করা হয়। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে তানোরের মুন্ডুমালা মাহালী পাড়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এ উৎসব। বিভিন্ন সময়ে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, অক্সফাম, এনএজিআর, সিসিবিভিও, কারিতাস, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমি, ইউসেপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সহযোগিতা করেছেন। ফলে উৎসবটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।প্রবীণ মাহালী সমাজের গুরুজন ও জিতিয়া পার্বণের ঠাকুর ষষ্ঠী টুডু তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের শিকড় ভুলে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের মূলকথা হলো—নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য প্রবীণদের কাছ থেকে শিখে নিতে হবে এবং গর্বের সঙ্গে তা ধরে রাখতে হবে। এই আহ্বানের গুরুত্ব আজকের সময়ে আরও বেশি। বিশ্বায়ন ও দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার কারণে ছোট জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি নানা চাপের মুখে পড়ছে। নতুন প্রজন্ম যদি নিজেদের ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই অনেক লোকজ জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক উপাদান হারিয়ে যেতে পারে।জিতিয়া পার্বন মাহালী সম্প্রদায়ের কাছে আনন্দ ও মিলনের উৎসব হওয়ার পাশাপাশি আত্মপরিচয় রক্ষারও একটি আয়োজন। এর মধ্য দিয়ে শিশুরা নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, তরুণেরা সাংস্কৃতিক চর্চায় যুক্ত হচ্ছে এবং প্রবীণদের কাছ থেকে হারিয়ে যেতে বসা রীতি ও স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। দং ও ঝুমুর নাচ, মাদলের ছন্দ, লোকগান, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং সম্মিলিত প্রার্থনা—সব মিলিয়ে এ উৎসব মাহালী জীবনের বহুমাত্রিক সংস্কৃতিকে ধারণ করছে।একটি দেশের বৈচিত্র‍্য তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেখানে বসবাসকারী সব জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মর্যাদা পায়। বাংলাদেশের আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর রয়েছে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণ শুধু সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর সমাজেরও দায় রয়েছে। কারণ একটি সংস্কৃতির বিলুপ্তি শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র‍্যকেই দরিদ্র করে।জিতিয়া পার্বনের মাদলের শব্দ তাই কেবল একটি উৎসবের আহ্বান নয়। এর মধ্যে রয়েছে শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার ডাক, নিজেদের ইতিহাস জানার আহ্বান এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়। মাহালীরা যেন নিজেদের ভাষা, গান, নাচ ও জীবনাচারকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন, সে জন্য এমন সাংস্কৃতিক উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। ঐতিহ্যকে শুধু স্মরণ করলেই হবে না, তাকে চর্চার মধ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। জিতিয়া পার্বনের প্রাণের উৎসব সেই চর্চারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

যে পারে সে এমনি পারে, পারে সে ফুল ফুটাতে

মানব মুক্তি সংগ্রামের এক অবিচল নেতা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদের অকাল প্রয়াণে দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক প্রয়াত বজলুর রহমান “প্রথম দেখা শেষ দেখা” লেখায় মোহাম্মদ ফরহাদের ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বেছে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের কবিতার লাইন, ‘যে পারে সে এমনি পারে, পারে সে ফুল ফুটাতে’। ষাটের দশক থেকে তিন দশকেরও বেশি সময়জুড়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ দেশের মানুষের মুক্তিসংগ্রামের পুরোভাগে থেকেছেন। আর ‘সম্ভাবনার ফুল ফোটানোর’ সহজাত ক্ষমতা ও প্রাণশক্তি থাকায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট ও বাম আন্দোলনে ধ্রুবতারার মতো। ষাট ও সত্তরের দশকে সামনে থেকে সবসময় তিনি দৃশ্যমান না থাকলেও ছাত্র আন্দোলনের ভেতরে এবং একই সাথে আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টিতে তার প্রভাব ছিল গভীর। তিনি অনেকটা ঐ সময়ের সর্বত্যাগী প্রবীণ কমিউনিস্ট প্রজন্ম এবং ষাট দশকের নবীন প্রজন্মের কমিউনিস্টদের মধ্যে অন্যতম এক সেতুবন্ধ ছিলেন। দুই প্রজন্মের মধ্যেই তিনি ছিলেন সমানভাবে সমাদৃত।মোহাম্মদ ফরহাদের শৈশব চেতনা গড়ে উঠেছিল অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কাহিনী পড়ে আর কৈশোরেই সংস্পর্শে এসেছিলেন দিনাজপুরের কমিউনিস্ট ও কৃষক নেতৃবর্গের। দিনাজপুর জেলা স্কুলে দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৫৩ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে লেখাপড়া শুরু করেন। দিনাজপুরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়নকালে মোহাম্মদ ফরহাদ বামপন্থী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালে ১০ জুন পাকিস্তানের কুখ্যাত নিরাপত্তা আইন ৯২-ক ধারায় গ্রেফতার হয়ে বিনা বিচারে ৭ মাস রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকেন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরপরই ১৭ বছর বয়সে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন দিনাজপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।১৯৫৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির গোপন কাজের সুবিধার্থে শীর্ষ পদে না থেকে ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। ১৯৬১ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ পাস করেন। ১৯৬২ সালে আইন অধ্যয়নরত অবস্থায় আইয়ুব আমলে ফরহাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। সেই থেকে আত্মগোপনে থাকার জীবন হলেও ক্রমেই তিনি পরিণত হন পাকিস্তানের স্বৈরশাসনবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণপুরুষে। ‘৬২-র শিক্ষা আন্দোলনে নেপথ্য থেকেই তিনি মূল ভূমিকা রেখেছেন আবার ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের নেপথ্য কারিগরও তিনি।ষাটের দশক জুড়েই ছাত্ররাজনীতিতে ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল নিবিড়। সংগঠনের নানা সিদ্ধান্ত, আন্দোলনের প্রস্তুতি এবং কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কবীর ছদ্ম নামেই তিনি ছিলেন অনেকটা নেপথ্যের শক্তি—যাকে সবসময় মঞ্চের সামনে দেখা যেত না, কিন্তু যার উপস্থিতি সংগঠনের কার্যক্রমে স্পষ্টভাবে অনুভূত হতো। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের আগে পরে দেখতাম খুলনায় ছাত্র ইউনিয়নের জেলা নেতারা তাদের পারস্পরিক আলোচনায় কবীর ভাই নামটা প্রায়শই উচ্চারণ করতেন। আমি এর মাহাত্ম্য তখন বুঝতে পারতাম না।মোহাম্মদ ফরহাদকে আমি সর্বপ্রথম দেখি ১৯৭১ সালের জুন মাসে আগরতলায় ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়নের ক্যাম্পে। আমরা যারা যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে যাব তাদের সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিলেন। সাক্ষাৎকার পর্বে তিনি আমাকে ‘আন্ডার এজ’ হিসেবে অথবা ‘সাহসের ঘাটতি’ দেখে বাদ দেন। পরে খুলনার পার্টি নেতা রতন দা’র হস্তক্ষেপে আমি কোনোরকম রেহাই পাই এবং ট্রেনিং-এ যাওয়া দলের অন্তর্ভুক্ত হই। সেদিন অবশ্য ফরহাদ ভাইয়ের কথাবার্তায় অতটা আকৃষ্ট হইনি। তবে স্বাধীনতার পরে পরে কমিউনিস্ট পার্টির একাধিক জাতীয় সমাবেশগুলোতে উপস্থিত থাকায় তার বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়। অনলবর্ষী বক্তা বলতে যা বুঝায় তা তিনি কোনো কালেই ছিলেন না। ধীরে সুস্থে যুক্তি দিয়ে কথা বলতেন এবং তার যুক্তি এত সহজ ও তীক্ষ্ণ হতো যা শ্রোতাকে আলোড়িত করতো, আকৃষ্ট করতো। সভার পরেও শ্রোতাদের মনে অনুরণিত হতে থাকতো।ফরহাদ ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে উনি যখন আত্মগোপনে। ঐ সময়ে কয়েকটি গোপন বৈঠকের আয়োজনের সাথে যুক্ত হওয়ার এবং তার ডাক বিভিন্ন জনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে নিয়োজিত হওয়ায়। ঐ সময়ে কিভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে এসব আলোচনা করতেন। কমিউনিস্ট পার্টির চতুর্থ কংগ্রেসের আগে আমি সবেমাত্র ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নিয়েছি। এসময়ে কংগ্রেসে উত্থাপনের জন্য পার্টির সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট প্রস্তুত করার কাজে তিনি বেছে নিলেন আমাকে। এক সপ্তাহ যাবৎ তার বাসায় যেতে হতো প্রতিদিন রাত নয়টায়। রাত বারোটা পর্যন্ত কাজ চলতো। ফরহাদ ভাই বলে যেতেন আমি লিখতাম। রাত সাড়ে দশটা-এগারোটা বেজে গেলে রীনা আপা আমাকে ছেড়ে দিতে বলতেন। বলতেন ও সদ্যবিবাহিত, থাকে আবার শ্বশুর বাড়িতে। প্রতিদিন এতো রাত করে যাওয়া বেমানান। কিন্তু বারোটার আগে ছাড়া পেতাম না। লেখার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতির নানা অজানা কথা তার কাছ থেকে শুনতে পেতাম।তবে তিনি যে আন্দোলন গড়ে তোলার কারিগর সে অভিজ্ঞতা হয়েছিলো আরো আগে ১৯৮২ সালে। তিনি তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি খন্দকার মো. ফারুক এবং আমার সাথে ছাত্র আন্দোলন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শেষে পরামর্শ দিলেন বামপন্থী বা বামমুখী ছাত্র সংগঠনগুলোকে এক মঞ্চে এনে কর্মসূচিভিত্তিক একটি জোট গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নিতে। সে অনুযায়ী আমরা তৎপর হলাম। শুরুতেই আমরা জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি মুনীর উদ্দিন আহমেদের সাথে আলোচনা করতেই এ উদ্যোগে অকুণ্ঠ সমর্থন পেলাম। ফজলুর রহমান ও বাহালুল চুন্নুর নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগ এবং মিজানুর রহমান মানুর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নও উৎসাহের সাথে এগিয়ে এলো। এভাবে সম্ভবত ৭টি ছাত্র সংগঠন আমরা একমত হলাম ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের দিনে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে ছাত্র গণজমায়েতের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করার। নারায়ণগঞ্জের রাফিউর রাব্বি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র। এ উপলক্ষে দারুণ একটি পোস্টারের ডিজাইন করেছিলেন। তবে ২৪ মার্চ তারিখেই জেনারেল এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ, জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিসভা বাতিল করেন এবং স্থগিত করেন সংবিধানের কার্যকারিতা। ফলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।কিন্তু ফরহাদ ভাই আমাদের বার্তা পাঠাতে বিলম্ব করেননি। বার্তা পাঠালেন, যে বাম সমঝোতা হয়েছে তা অক্ষুণ্ন রেখে দ্রুত সকল অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনের ব্যাপকতর ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে। কাজটি সহজ ছিলো না। বাম সমঝোতায় যারা এসেছিলেন তাদেরও কেউ কেউ এধরনের ঐক্যে রাজি ছিলেন না। কিন্তু তার নানামুখী পরামর্শে আমরা সফল হয়েছিলাম সে ধরনের ঐক্য গড়ে তুলতে যা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নামে আত্মপ্রকাশ করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছিল সামরিক শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে এক বীরত্বপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন যার ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান। আর এ অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি পর্ব অর্থাৎ ১৫ দলীয় ঐক্য জোট গড়ে তোলা, ৭ দলীয় ঐক্য জোটের সাথে সমন্বয় ও যুগপৎ আন্দোলন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আন্দোলনকেও জাতীয় আন্দোলনের সাথে যুক্ত করা—এ সব কাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মোহাম্মদ ফরহাদ।জাতীয় রাজনীতি, একই সঙ্গে ছাত্র, শ্রমিক, নারী, যুব, ক্ষেতমজুর, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা কর্মকাণ্ড এবং নাগরিক সমাজের তৎপরতার পেছনেও ছিলেন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। শ্রেণি আন্দোলন ও জাতীয় আন্দোলনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তার নেতৃত্বাধীন পার্টি বাংলাদেশে সমাজবিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলো। আর মোহাম্মদ ফরহাদ বামপন্থার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেও সৃজনশীলতার সাথে বাম বৃত্তের চৌহদ্দি পেরিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের অন্যতম রূপকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। পেশাদার বিপ্লবী চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে এবং নীতিতে অবিচল থেকেও কৌশলে নমনীয় হয়ে প্রকৃতই একজন জাতীয় নেতা হিসেবে জায়গা করে নেন। পার্টিতেও সংখ্যালঘিষ্ঠ মত একতরফা চাপিয়ে না দিয়ে, নানা মত বা ভিন্ন মতকে গুরুত্ব দিয়ে সম্ভবমতো অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। ফলে পার্টিকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুত বিকাশমান রাজনৈতিক দল হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ঐ সময়ে পার্টি নেতৃত্বে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আন্দোলনে অভিজ্ঞ একঝাঁক নক্ষত্রের সমাবেশ ঘটেছিল। তাদের কারো সাথে কখনো মতান্তর হলেও গভীর ব্যক্তিগত ও কমরেডসুলভ সম্পর্ক বজায় রেখে পার্টিতে ‘এক পরিবারের’ পরিবেশ বজায় রেখেছেন। মানুষ মাত্রই নিখুঁত নয়। মোহাম্মদ ফরহাদও ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। তার উদ্যোগে নেয়া সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই হয়তো নির্ভুল ছিল না, সেটা কখনো হয়ও না। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন—চলো, চলো এবং চলো। ভুল যদি হয় কখনও, একটু থেমে ভুলটা শুধরে, সামনে আবার চলো।আজ যখন চারিদিকে সর্বগ্রাসী হতাশা, স্বৈরাচার আর কর্তৃত্ববাদের বিপরীতে দুয়ারে কড়া নাড়ছে অন্ধকারের ধর্মান্ধ ফ্যাসিস্ট শক্তি তখন মোহাম্মদ ফরহাদের জীবন ও সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির নতুন নেতৃত্বকে সংকীর্ণতামুক্ত এক সার্বজনীন ভাবমূর্তি নিয়ে পার্টি কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের মুখোমুখি হতে হবে। বামপন্থার একমাত্র জিম্মাদারীর মনোভাব যেনো নিজেদেরকে আচ্ছন্ন করে না ফেলে। পার্টির সবার মাঝেই অন্তত এ বোধ জাগ্রত হোক, আমরা আমাদেরকে পতনের মুখোমুখি হতে দেবো না।জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ১৯৩৮ সনে। ১৯৭৩ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আবার ৩৫ বছরের ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ১৪ বছরই আত্মগোপন বা কারান্তরালে ছিলেন। আর ৯ অক্টোবর ১৯৮৭, আজ থেকে ৪০ বছর আগে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের কর্মবহুল জীবনের অবসান ঘটে। মোহাম্মদ ফরহাদের নেতৃত্বাধীন পার্টি যে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল, নিশ্চয়ই সে ইতিহাসের স্রষ্টা গোটা পার্টি। তবে ইতিহাস নির্মাণে ব্যক্তির ভূমিকাকেও অস্বীকার করা যায় না। তার অকাল প্রয়াণে বাংলাদেশের বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যে অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয় তা আর পূরণ করা সম্ভব হয় নি। এ শূন্যতা সেদিন ধ্বনিত হয়েছিল কবি শামসুর রহমানের লেখায়, “অকস্মাৎ এ কেমন নিস্তব্ধতা এলো দেশে? / এ কেমন সূর্যাস্তের ছটা / বিলাপের মতো আকাশে ছড়িয়ে পড়ে? / বেদনার্ত পাখি নীড়ে ফেরা ভুলে যায়, / ফুল উন্মীলনে পায় না উৎসাহ .....”। সৈয়দ শামসুল হক লেখেন, “তাহলে বিদায়, বন্ধু, তাহলে বিদায়; / এভাবে, এ অবেলায়,/ সূর্যের অস্তের আগে আমাদের কণ্ঠে তুলে নিতে হচ্ছে সূর্যাস্তের গান,/ সবচেয়ে প্রয়োজন যখন আপনাকে,/ আমাদের বলতে হচ্ছে ‘বিদায়’ ......”। কবিতার ভাষায় এই যে প্রয়োজনের আকুতি তা মিটাবে কে বা কারা? শুধু বামপন্থার অনুসারী বা সমর্থকেরা নয় সাম্য ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখা মানুষেরা সে অপেক্ষায়!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

সেরিব্রাল পালসি: করুণা নয়, প্রয়োজন সুযোগ ও অন্তর্ভুক্তি

সেরিব্রাল পালসি হলো বিকাশমান মস্তিষ্কের অস্বাভাবিকতা বা ক্ষতির কারণে সৃষ্ট একদল স্নায়বিক অবস্থা, যার প্রধান প্রভাব পড়ে নড়াচড়া ও অঙ্গভঙ্গিতে। তবে এর প্রভাব ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন। কারও চলাফেরায় সমস্যা থাকতে পারে, আবার কারও কথা বলা, যোগাযোগ, খাওয়া, শেখা বা দৈনন্দিন কাজেও সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।৬ অক্টোবর ছিল বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস। দিনটি শুধু একটি শারীরিক অবস্থার বিষয়ে মানুষকে জানানোর দিন নয়; বরং সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত মানুষের অধিকার, মর্যাদা, সক্ষমতা ও সমাজে সমান অংশগ্রহণের বিষয়টি নতুন করে ভাবার দিন।বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সেরিব্রাল পালসির ক্ষেত্রে প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও দ্রুত প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক একটি প্রমাণভিত্তিক নির্দেশিকায় ১৬টি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও ২৭টি নিয়ন্ত্রিত গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা বা সেরিব্রাল পালসি শনাক্ত হওয়া শিশুদের যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপে যুক্ত করা, বাবা-মায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শুরু থেকেই পরিবারের লক্ষ্য নির্ধারণে অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রে নির্দিষ্ট কিছু অনুশীলন করানোই যথেষ্ট নয়। সাম্প্রতিক গবেষণাভিত্তিক পর্যালোচনাগুলোতে শিশুর বয়স, বিকাশ, ব্যক্তিগত লক্ষ্য ও পরিবারের প্রয়োজন বিবেচনা করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, লক্ষ্যভিত্তিক এবং সক্রিয় অংশগ্রহণমূলক পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।পরিবারের ভূমিকাও তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের প্রাথমিক সেবায় পরিবারকেন্দ্রিক পদ্ধতি নিয়ে ৪২টি গবেষণার একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় পরিবারকে সেবার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা, তাদের মতামত ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পরিবারের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে।তবে গবেষণা আমাদের আরেকটি বিষয়ও মনে করিয়ে দেয়—সেরিব্রাল পালসির পুনর্বাসনে সব পদ্ধতির প্রমাণ সমান শক্তিশালী নয়। কোক্রেনভিত্তিক গবেষণার একটি সমন্বিত পর্যালোচনায় বিভিন্ন পুনর্বাসন পদ্ধতির কার্যকারিতার প্রমাণে ভিন্নতা এবং অনেক ক্ষেত্রে সীমিত গবেষণার কথা বলা হয়েছে। তাই “একটি পদ্ধতিই সবার জন্য কার্যকর”—এমন ধারণার পরিবর্তে ব্যক্তির প্রয়োজন ও প্রমাণের ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ নির্বাচন করা জরুরি।সেরিব্রাল পালসি নিয়ে আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—এতে আক্রান্ত প্রত্যেক ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কম। বাস্তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এক বিষয় নয়। তাই শিশুর চলাফেরা বা কথা বলার ধরন দেখে তার শেখার ক্ষমতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।যোগাযোগের বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু স্পষ্টভাবে কথা বলতে না পারলেও তার চিন্তা, অনুভূতি ও সিদ্ধান্ত জানানোর অধিকার রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বাক্‌ ও ভাষা চিকিৎসা এবং সহায়ক যোগাযোগ পদ্ধতি তাকে নিজের কথা প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে। প্রাথমিক হস্তক্ষেপের আন্তর্জাতিক নির্দেশিকাতেও যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।পুনর্বাসনের লক্ষ্যও শুধু হাঁটানো বা কথা বলানো হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুর স্বনির্ভরতা, যোগাযোগ, শিক্ষা, সামাজিক অংশগ্রহণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। এজন্য পরিবার, চিকিৎসক, শারীরিক চিকিৎসক, বাক্‌ ও ভাষা চিকিৎসক, পেশাগত চিকিৎসক, শিক্ষক এবং সমাজ—সবার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।তবে চিকিৎসার পাশাপাশি বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও। শিশুকে লুকিয়ে রাখা নয়, সুযোগ দিতে হবে। করুণা নয়, সম্মান দিতে হবে। “সে কী করতে পারে না?”—এই প্রশ্নের বদলে আমাদের জিজ্ঞাসা হওয়া উচিত—“সে কী করতে পারে, আর তার সক্ষমতাকে বিকশিত করতে আমাদের কী পরিবর্তন প্রয়োজন?”সেরিব্রাল পালসি একজন মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। প্রতিটি মানুষের মতো তারও রয়েছে নিজস্ব স্বপ্ন, দক্ষতা, পছন্দ ও সম্ভাবনা। তাই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের দায়িত্ব হলো সীমাবদ্ধতার দেয়াল তৈরি না করে সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া।[লেখক: স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, সিআরপি]

নিরাপদ খাদ্যের প্রথম পাঠ: খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের সামনে আসে খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার, মোবাইল কোর্ট, খাদ্য পরীক্ষা, জীবাণু, কারখানার স্বাস্থ্যবিধি, জিএমপি, হ্যাসাপ, আইএসও ২২০০০ কিংবা এফএসএসসি ২২০০০-এর মতো বিষয়। এগুলোর প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার সবচেয়ে মৌলিক জায়গাটি অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়। সেটি হলো—যে মানুষটি প্রতিদিন খাদ্য তৈরি করছেন, রান্না করছেন, কাঁচামাল বহন করছেন, খাদ্য পরিবেশন করছেন, যন্ত্র চালাচ্ছেন, খাদ্য প্যাক করছেন, গুদামে রাখছেন কিংবা উৎপাদন এলাকা পরিষ্কার করছেন, তিনি খাদ্য নিরাপত্তার মৌলিক বিষয়গুলো কতটা জানেন?এই প্রশ্নটি শুধু বড় খাদ্য কারখানার জন্য নয়। রাস্তার পাশে যিনি ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, সিঙ্গারা, সমুচা, পুরি, পরোটা, ভাজাপোড়া, শরবত, ফলের রস বা অন্য কোনো খাবার তৈরি ও বিক্রি করছেন, তার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। কারণ খাদ্য কারখানায় তৈরি হোক কিংবা রাস্তার ছোট দোকান বা ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে তৈরি হোক—খাদ্য অনিরাপদ হলে ভোক্তার জন্য ঝুঁকি একই।বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তাই পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতাদেরও খাদ্যকর্মী হিসেবে বিবেচনা করে মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন।একটি খাদ্য কারখানায় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকতে পারে। হ্যাসাপ পরিকল্পনা থাকতে পারে, আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা সনদ থাকতে পারে, আধুনিক পরীক্ষাগার এবং আলাদা মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগও থাকতে পারে। কিন্তু একজন কর্মী যদি টয়লেট থেকে এসে সঠিকভাবে হাত না ধুয়ে খাদ্য স্পর্শ করেন, ডায়রিয়া বা বমির মতো অসুস্থতা গোপন করে কাজে যোগ দেন, মেঝেতে পড়ে যাওয়া কোনো উপকরণ আবার ব্যবহার করেন কিংবা পরিষ্কার করার রাসায়নিক খাদ্যের পাশে রেখে দেন—তাহলে প্রতিষ্ঠানের উন্নত খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।অন্যদিকে পথের খাবারের ক্ষেত্রে ঝুঁকির ধরন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। সেখানে সব সময় পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, বর্জ্য ফেলার স্থান, শীতলীকরণ ব্যবস্থা কিংবা ঢাকা দেওয়া খাবার রাখার সুযোগ নাও থাকতে পারে। ধুলাবালি, মাছি, যানবাহনের ধোঁয়া, অপরিষ্কার পানি, একই হাতে টাকা ও খাবার ধরা এবং রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় পরিবেশের তাপমাত্রায় রেখে দেওয়ার মতো বিষয়ও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।এই জায়গাতেই প্রয়োজন খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১, অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তার একেবারে প্রাথমিক শিক্ষা। লেভেল ১ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষার স্তর নয়। এটি মূলত কর্মক্ষেত্রভিত্তিক খুব সহজ, সংক্ষিপ্ত ও ব্যবহারিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষা। একজন মানুষ খাদ্য উৎপাদন, প্রস্তুত, বিক্রয় বা পরিবেশনের কাজ শুরু করার আগে ন্যূনতম কী কী বিষয় জানবেন, সেটিই এই শিক্ষার মূল বিষয়।বাংলাদেশের জন্য এই ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা শুধু বড় আধুনিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশে অসংখ্য ছোট ও মাঝারি খাদ্য কারখানা রয়েছে। রয়েছে মিষ্টির কারখানা, বেকারি, দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, মাছ ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানা, পানীয় প্রস্তুতকারী, মসলা, আচার, সস, জ্যাম-জেলি, স্ন্যাকস ও হিমায়িত খাদ্য প্রস্তুতকারীসহ হাজারো ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসা। এর সঙ্গে রয়েছে হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, ক্যান্টিন এবং বাংলাদেশের শহর ও গ্রামের অসংখ্য পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতা।এসব মানুষের প্রত্যেককে হ্যাসাপের জটিল বিষয় শেখানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রত্যেককে অবশ্যই জানতে হবে—তার হাত, পানি, কাঁচামাল, বাসনপত্র, পোশাক, অসুস্থতা কিংবা একটি ছোট ভুল কীভাবে খাদ্যকে অনিরাপদ করে তুলতে পারে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১-এর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হওয়া উচিত—“নিরাপদ খাদ্যের দায়িত্ব আমারও।”একজন পথের খাবার বিক্রেতার ক্ষেত্রেও এই দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হয়তো একটি বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন না, তার আলাদা মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগও নেই। অনেক ক্ষেত্রে তিনিই কাঁচামাল কিনছেন, খাবার তৈরি করছেন, সংরক্ষণ করছেন, পরিবেশন করছেন, টাকা নিচ্ছেন এবং বাসন পরিষ্কার করছেন। ফলে তার খাদ্য নিরাপত্তা জ্ঞানই অনেক ক্ষেত্রে তার ব্যবসার প্রধান নিরাপত্তাব্যবস্থা।খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১-এর প্রশিক্ষণ তাই শুধু কারখানার কর্মীদের জন্য তৈরি করলে চলবে না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর একটি বিশেষ অংশ অথবা আলাদা সংস্করণ থাকতে পারে পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতাদের জন্য।বাংলাদেশে এ প্রয়োজনের পক্ষে গবেষণার তথ্যও রয়েছে। ২৬৬ জন পথের খাবার বিক্রেতাকে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৩ শতাংশের বেশি বিক্রেতা খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। গবেষকেরা নিয়মিত মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ঢাকার ৩৫০ জন পথের খাবার বিক্রেতার ওপর আরেকটি গবেষণাতেও ৮৫ শতাংশের কোনো খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ছিল না। অর্থাৎ পথের খাবার খাতকে মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষার বাইরে রেখে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা সংস্কৃতি তৈরি করা কঠিন।বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতির কর্মপরিকল্পনাতেও পথের খাবার বিক্রেতা ও শহুরে খাদ্য উৎপাদকদের জন্য দেশব্যাপী নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ফলে পথের খাবারকে জাতীয় লেভেল ১ প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত করার যথেষ্ট নীতিগত ভিত্তিও রয়েছে।বাংলাদেশের জন্য লেভেল ১ প্রশিক্ষণ খুব দীর্ঘ হওয়ার প্রয়োজন নেই। দুই থেকে তিন ঘণ্টার একটি সুপরিকল্পিত ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দিয়েই একজন নতুন কর্মী কিংবা পথের খাবার বিক্রেতার মধ্যে মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব। তবে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য শুধু তথ্য দেওয়া নয়; উদ্দেশ্য হতে হবে আচরণ পরিবর্তন করা।প্রথমেই তাকে বোঝাতে হবে খাদ্যের মধ্যে কীভাবে বিপদ আসতে পারে। সহজভাবে খাদ্যের বিপদকে জীবাণুজনিত, রাসায়নিক, বাহ্যিক বস্তুজনিত এবং অ্যালার্জিজনিত—এই কয়েকটি ভাগে বোঝানো যেতে পারে।জীবাণুজনিত বিপদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ইস্ট, ছত্রাক, পরজীবী এবং কিছু অণুজীবের স্পোর। তবে একজন সাধারণ কর্মী বা পথের খাবার বিক্রেতাকে এসব জীবাণুর জটিল বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য শেখানোর প্রয়োজন নেই। তাকে সহজভাবে বোঝাতে হবে—অপরিষ্কার হাত, দূষিত পানি, নোংরা বাসন, কাঁচা খাদ্য, মাছি, অসুস্থ খাদ্যকর্মী কিংবা অপরিষ্কার পরিবেশ থেকে খাদ্যে ক্ষতিকর জীবাণু যেতে পারে। অর্থাৎ তাকে ব্যাকটেরিয়ার বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস শেখানোর পরিবর্তে শেখাতে হবে—“আমার অপরিষ্কার হাত বা দূষিত পানি আমার তৈরি খাবারকে অনিরাপদ করতে পারে।”পথের খাবারের ক্ষেত্রে নিরাপদ পানির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। যে পানি দিয়ে শরবত তৈরি করা হচ্ছে, বরফ তৈরি করা হচ্ছে, ফল ধোয়া হচ্ছে, প্লেট-গ্লাস পরিষ্কার করা হচ্ছে কিংবা হাত ধোয়া হচ্ছে—সেই পানি নিরাপদ না হলে অন্যান্য সব পরিচ্ছন্নতার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।একইভাবে কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখার বিষয়টি শেখাতে হবে। কাঁচা মাংস বা মাছ কাটার ছুরি ও বোর্ড দিয়ে রান্না করা খাবার কাটা হলে দূষণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফুচকার জন্য ব্যবহৃত পানি, সালাদ, ধনেপাতা, কাঁচামরিচ কিংবা অন্য যেসব উপকরণ রান্না ছাড়াই খাওয়া হয়, সেগুলোর পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।লেভেল ১ প্রশিক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হবে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা। টয়লেট ব্যবহারের পর, খাদ্য প্রস্তুতের আগে, বর্জ্য স্পর্শ করার পর, কাঁচা খাদ্য ধরার পর, কাশি বা হাঁচির পর এবং হাত নোংরা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন কাজের পর সঠিকভাবে হাত ধুতে হবে।পথের খাবার বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে আরও একটি বাস্তব বিষয় শেখাতে হবে—একই হাতে টাকা এবং প্রস্তুত খাবার ধরা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা। টাকা অসংখ্য মানুষের হাতে ঘোরে। তাই সম্ভব হলে টাকা নেওয়া এবং খাদ্য পরিবেশনের কাজ আলাদা করা, চিমটা বা উপযুক্ত পরিবেশন উপকরণ ব্যবহার করা এবং নিয়মিত হাত পরিষ্কার করার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।খাবার ঢেকে রাখা, মাছি ও ধুলাবালি থেকে রক্ষা করা, বর্জ্য ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখা, পরিষ্কার ও নোংরা বাসন আলাদা রাখা, রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় অনিরাপদ তাপমাত্রায় না রাখা এবং বাসি খাবার ব্যবহারে সতর্ক থাকার বিষয়গুলোও পথের খাবারের লেভেল ১ পাঠ্যক্রমে থাকা উচিত।একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে—“পরিষ্কার দেখালেই নিরাপদ নয়।” স্বচ্ছ পানি জীবাণুমুক্ত নাও হতে পারে। ভালো গন্ধযুক্ত খাবারেও ক্ষতিকর জীবাণু থাকতে পারে। পরিষ্কার দেখতে একটি হাতেও জীবাণু থাকতে পারে। ফলে শুধু চোখ বা নাক দিয়ে খাবারের নিরাপত্তা বিচার করা যায় না।বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে উৎপাদন এলাকায় পান, জর্দা, তামাক বা সুপারি খাওয়া, থুতু ফেলা, মোবাইল ফোন ব্যবহার করা, অপরিষ্কার পোশাক পরে খাদ্য তৈরি করা এবং খোলা খাবারের পাশে বর্জ্য রাখা—এসব আচরণ নিয়েও প্রশিক্ষণে আলোচনা করা উচিত।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অসুস্থ অবস্থায় কাজ করা। ডায়রিয়া, বমি, জ্বর, সংক্রমিত ক্ষত কিংবা সংক্রামক রোগের লক্ষণ থাকলে খাদ্য তৈরি বা পরিবেশনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জানাতে হবে। একজন পথের খাবার বিক্রেতার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন, কারণ দোকান বন্ধ করলে তার দিনের আয় বন্ধ হতে পারে। তাই সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাস্তবসম্মত সহায়তার বিষয়টিও ভাবতে হবে।লেভেল ১-এর আরেকটি প্রধান শিক্ষা হওয়া উচিত—“সন্দেহ হলে থামুন এবং জানান।” কারখানায় কাচ ভেঙে গেলে, মেশিন থেকে ধাতুর অংশ খুলে গেলে কিংবা রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়লে যেমন কাজ থামানো দরকার, পথের খাবারের ক্ষেত্রে দূষিত পানি পাওয়া গেলে, পচা কাঁচামাল দেখা গেলে, খাবারের মধ্যে পোকা বা বাহ্যিক বস্তু পাওয়া গেলে কিংবা খাবার নষ্ট হওয়ার সন্দেহ হলে সেটি বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।বাংলাদেশে এই জাতীয় লেভেল ১ শিক্ষা চালুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ—বিএফএসএ নেতৃত্ব দিতে পারে। ইতিবাচক বিষয় হলো, বিএফএসএ ইতোমধ্যেই খাদ্যকর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও শেখার উপকরণ প্রকাশ করেছে এবং পথের খাবার বিক্রেতাদের নিয়েও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। উদাহরণ হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় পথের খাবার বিক্রেতাদের জন্য হাতে-কলমে খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ করা যায়।এই অভিজ্ঞতাকে বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ হিসেবে না রেখে জাতীয় কাঠামোয় নিয়ে আসাই হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ। এর নাম হতে পারে—“বিএফএসএ খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১: মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা সচেতনতা”।এর আওতায় খাদ্য কারখানার নতুন কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গুদাম ও প্যাকিং সহকারী, অস্থায়ী কর্মী, পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীর পাশাপাশি পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতা, ক্ষুদ্র খাবারের দোকানদার, বাজারে প্রস্তুত খাবার বিক্রেতা এবং ভ্রাম্যমাণ খাদ্য বিক্রেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।তবে সবার প্রশিক্ষণ একেবারে একই হওয়া প্রয়োজন নেই। কারখানার কর্মীর জন্য যন্ত্রপাতি, উৎপাদন এলাকা এবং কারখানার পরিচ্ছন্নতার উদাহরণ থাকবে। পথের খাবার বিক্রেতার প্রশিক্ষণে বেশি গুরুত্ব পাবে নিরাপদ পানি, বরফ, হাত ধোয়া, রান্না ও সংরক্ষণ, কাঁচা ও প্রস্তুত খাবার আলাদা রাখা, টাকা ও খাবার পরিচালনা, মাছি ও ধুলাবালি থেকে সুরক্ষা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।প্রশিক্ষণ অবশ্যই সহজ বাংলায় হওয়া উচিত এবং ছবি, বাস্তব উদাহরণ ও প্রদর্শনের ওপর বেশি নির্ভর করা উচিত। যারা পড়তে বা লিখতে পারেন না, তারাও যেন এই প্রশিক্ষণ নিতে এবং মূল্যায়নে অংশ নিতে পারেন। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার পরীক্ষা নয়।বিএফএসএ জাতীয় পাঠ্যক্রম, প্রশিক্ষণ উপকরণ, প্রশিক্ষকের যোগ্যতা এবং মূল্যায়নের মান নির্ধারণ করতে পারে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষিত খাদ্যবিজ্ঞানী ও খাদ্যপ্রযুক্তিবিদ, অভিজ্ঞ খাদ্যশিল্প পেশাজীবী, স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সারা দেশে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। পথের খাবার বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে বাজার, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বড় বিক্রয়কেন্দ্র ধরে দলভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।ভবিষ্যতে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার পথের খাবার বিক্রির অনুমতির সঙ্গে এই মৌলিক প্রশিক্ষণকে যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে লক্ষ্য যেন শুধু আরেকটি সনদ তৈরি করা না হয়। লক্ষ্য হবে বিক্রেতা বাস্তবে নিরাপদ পানি ব্যবহার করছেন কি না, হাত পরিষ্কার রাখছেন কি না, খাবার ঢেকে রাখছেন কি না এবং কাঁচা ও প্রস্তুত খাবার আলাদা রাখছেন কি না।পরিদর্শনের সময় তাই শুধু “সনদ আছে?” প্রশ্ন করলে চলবে না। জিজ্ঞেস করতে হবে—“আপনার হাত ধোয়ার পানি কোথায়?”, “এই বরফের পানি নিরাপদ কি না কীভাবে জানেন?”, “কাঁচা মাংস কাটার ছুরি দিয়ে রান্না করা খাবার কাটবেন কি?”, “ডায়রিয়া হলে কী করবেন?”, “বিক্রি না হওয়া খাবার আগামীকাল কীভাবে ব্যবহার করবেন?” সঠিক উত্তর এবং বাস্তব কাজ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার উন্নয়নের জন্য উন্নত পরীক্ষাগার, আইন, তদারকি, আধুনিক কারখানা, জিএমপি, হ্যাসাপ ও আন্তর্জাতিক মান অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের একজন মানুষ প্রতিদিন যে খাবারটি খান, তার সবটাই বড় কারখানা থেকে আসে না। রাস্তার পাশের ফুচকা, চটপটি, সিঙ্গারা, শরবত কিংবা ছোট দোকানের খাবারও আমাদের খাদ্য সংস্কৃতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।তাই নিরাপদ খাদ্যের জাতীয় উদ্যোগে বড় কারখানার কর্মী এবং রাস্তার পাশের ক্ষুদ্র খাবার বিক্রেতাকে দুই ভিন্ন জগতের মানুষ হিসেবে দেখলে চলবে না। দুজনের কাজের পরিসর আলাদা হতে পারে, কিন্তু দুজনের হাতেই ভোক্তার খাদ্যের নিরাপত্তা নির্ভর করে।বাংলাদেশের জন্য তাই একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী নীতি হতে পারে—যিনি মানুষের জন্য খাদ্য তৈরি, প্রক্রিয়াজাত, পরিবেশন বা বিক্রি করবেন, কাজ শুরু করার আগে তার মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষা থাকা প্রয়োজন।কারখানার কর্মী থেকে পথের খাবার বিক্রেতা—সবার কাছে যদি এই প্রাথমিক জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা শুধু আইন, অভিযান বা কারখানার সনদের বিষয় হয়ে থাকবে না; এটি ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন আচরণে পরিণত হবে।নিরাপদ খাদ্য শেষ পর্যন্ত শুধু পরীক্ষাগারে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় পরিষ্কার হাতে, নিরাপদ পানিতে, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে, সঠিক অভ্যাসে এবং নিজের কাজের প্রতি দায়িত্ববোধে। আর সেই পরিবর্তনের প্রথম পাঠ হতে পারে—খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১।[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

আদিবাসী জরিপ: যে প্রশ্নগুলো জরুরি

‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র‍্য পরিস্থিতি নিরূপণ জরিপ-২০২৫’ প্রকল্পের আওতায় ১ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই মহাযজ্ঞে যুক্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার গণনাকারী। নিঃসন্দেহে এটি দেশের প্রথম বিশেষায়িত আদিবাসী জরিপ। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থাসহ বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে, অন্যদিকে সঠিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরিতেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জরিপের মাধ্যমে দেশে বসবাসরত আদিবাসীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার তৈরি করা হবে। এতে পরিবারভিত্তিক বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক নানা সূচক যুক্ত করা হবে। ফলে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা ও দারিদ্র‍্যরে মাত্রা নিরূপণ করা সম্ভব হবে। সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রকৃত উপকারভোগী চিহ্নিত ও নির্বাচন করাও সহজ হবে।জরিপের মূল উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য হলো—ক. স্বতন্ত্র তথ্যভান্ডার: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবারভিত্তিক যাবতীয় তথ্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ফুল কাউন্ট’ ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি করা;খ. সামাজিক সূচক: তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র‍্য ও জনমিতিক পরিস্থিতি নিরূপণ করা;গ. সুবিধাভোগী নির্বাচন: নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সরকারি সুযোগ-সুবিধার প্রকৃত উপকারভোগী সঠিকভাবে বাছাই করা।ইতোপূর্বে জরিপের প্রাক্-পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে—বিশেষত বান্দরবান, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, পঞ্চগড়, নেত্রকোণা, সিলেট ও পটুয়াখালীসহ বেশ কয়েকটি জেলায়। তথ্য সংগ্রহকারীরা প্রধানত জানতে চাইবেন—এলাকার পরিচিতি, নৃগোষ্ঠীর খানা বা পরিবার শনাক্তকরণ, খানার বৈশিষ্ট্য, সদস্যদের তথ্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, ১০ বছরের বেশি বয়সী সদস্যদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিদেশে বা পরিবারের বাইরে বসবাসকারী সদস্যদের তথ্য। এছাড়া পরিবারে কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন কি না, কেউ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আছেন কি না, জাতীয় পরিচয়পত্র আছে কি না, সদস্যদের বৈবাহিক অবস্থা, জন্মসনদ আছে কি না, ধর্মীয় পরিচয়, কোনো এনজিওর সহায়তা পেয়েছেন কি না, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় হিসাব আছে কি না, রেমিট্যান্স আসে কি না—এসব তথ্যও সংগ্রহ করা হবে।সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, দেশের সব শ্রেণি, পেশা ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের উন্নয়নের জন্য সঠিক তথ্য প্রয়োজন। পরিসংখ্যান হাতে না থাকলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর নীতি গ্রহণ কঠিন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার চায় সব বিষয়ে প্রকৃত তথ্য উঠে আসুক। কারণ তথ্য সঠিক না হলে পরিকল্পনাও সঠিক হবে না।তবে আদিবাসী জরিপ নিয়ে অনেকের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় প্রশ্নমালার কিছু নীতিগত দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে।নামকরণে জটিলতা: প্রশ্নপত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দের পরিবর্তে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’-এর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এসব পরিচয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা সেখানে দেওয়া হয়নি। কারা উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত, সে বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশিকা সাধারণের সামনে দৃশ্যমান নয়।তালিকার বাইরে থাকা জাতিগোষ্ঠীর সংকট: সরকারি গেজেটে থাকা ৫০টি নামের বাইরে কোনো ছোট বা প্রান্তিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী থাকলে তাদের নাম ওই তালিকায় খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে মূলধারার বাঙালি কিংবা বড় কোনো আদিবাসী গোষ্ঠীর নামে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের আদমশুমারিতে আদিবাসী হিসেবে উল্লেখিত কয়েকটি নামও বর্তমান গেজেটের বাইরে রয়েছে। এভাবে কোনো জাতিগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার বিষয়টি হতাশাজনক।চা শ্রমিকদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। কিন্তু তারা প্রধানত ‘চা শ্রমিক’ হিসেবেই পরিচিত। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে কর্মরত অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, প্রায় ১১৬টি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও একমত হওয়া যায়নি। সাহিত্যে দেখা যায়, জাতি, গোত্র, বংশ, নাম ও পরিচয় মুছে চা-বাগানের শ্রমিকদের একসময় ‘কুলি’ নামে অভিহিত করা হয়েছে; পরে ‘বাগানি’ এবং এখন ‘চা শ্রমিক’ নামে পরিচিত করা হচ্ছে। জনশুমারিতে তথ্যনির্ভরভাবে এসব জাতিগোষ্ঠীর উপস্থিতি তুলে ধরা জরুরি।আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় গণনাকারী হিসেবে আদিবাসীদের দায়িত্ব দিলে নামের বানান, পদবি ও উচ্চারণের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা নিশ্চিত করা সহজ হবে। দু-একটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর পদবি বাঙালি পদবির মতোই। যেমন, মালপাহাড়িয়াদের পদবি ‘বিশ্বাস’ ও ‘দাস’। এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজে পরিচয় স্পষ্ট না করলে তাকে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুলের কারণে আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সংশোধনের চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকে হতাশ হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই অর্থের প্রয়োজন হয়, যা প্রান্তিক মানুষের জন্য বড় বাধা।ধর্মের সুনির্দিষ্ট পরিচয় না থাকা: আদিবাসীদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ধর্ম বা প্রকৃতিপূজারী বিশ্বাসের পৃথক পরিচয় না থাকায়—যেমন সাঁওতালদের সারনা ধর্ম—তাদের অনেককে ‘অন্যান্য’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। এতে তাদের সঠিক ধর্মীয় পরিসংখ্যান আড়ালে থেকে যায়।মাতৃভাষার প্রশ্নের অনুপস্থিতি: প্রশ্নপত্রে ‘আপনার মাতৃভাষা কী?’ অথবা ‘আপনি কোন ভাষায় কথা বলেন?’—এ ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকা জরুরি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে কতগুলো আদিবাসী ভাষা টিকে আছে এবং কতগুলো বিলুপ্তির পথে, সে বিষয়ে একটি নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্যভান্ডার তৈরি করা সম্ভব হতো।একটি আদর্শ, বৈজ্ঞানিক ও অধিকারভিত্তিক আদিবাসী জরিপ করতে হলে বর্তমান সংকট ও বঞ্চনার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আদিবাসীদের মতে, বর্তমান জরিপে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত করা হলে তাদের প্রকৃত চিত্র সামনে আসত।১. ভূমি ও ভিটেমাটি হারানোর পরিসংখ্যানক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘আপনার পরিবার কি গত এক দশকে কোনো ধরনের প্রথাগত ভূমি বা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে?’ অথবা ‘আপনাদের ঐতিহ্যবাহী জমির কত অংশ এখন বেদখল হয়ে গেছে?’খ. কেন জরুরি: সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের বড় সংকটগুলোর একটি ভূমি দখল ও উচ্ছেদ। এই প্রশ্ন থাকলে কত মানুষ নিজ ভূমিতে পরবাসী বা ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন, তার একটি ধারণা পাওয়া যেত।২. অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতিক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘কাজ বা নিরাপত্তার খোঁজে আপনার পরিবারের কোনো সদস্য কি পৈতৃক গ্রাম ছেড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা অন্য কোনো বড় শহরে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন?’খ. কেন জরুরি: কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার অভাবে অনেক সাঁওতাল, গারো বা ত্রিপুরা তরুণ-তরুণী নিজ এলাকা ছেড়ে শহরে এসে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। শুধু গ্রামের বাড়ির ঠিকানার ভিত্তিতে তাদের গণনা করা হলে শহরে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা ও দুর্দশার চিত্র আড়ালে থেকে যাবে।৩. আর্থ-সামাজিক বঞ্চনা ও দারিদ্র‍্যরে সূচকক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘আপনার পরিবার কি সরকারের কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি—যেমন বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা বা শিক্ষাবৃত্তি—পাচ্ছে?’খ. কেন জরুরি: আদিবাসীদের জন্য জাতীয় বাজেটে বিভিন্ন বিশেষ বরাদ্দ ও সুযোগ থাকে। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে এসব সহায়তা প্রকৃত প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা যাচাই করা কঠিন।৪. মাতৃভাষার বিলুপ্তি ও সংকটক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘আপনার পরিবারের নতুন প্রজন্মের শিশুরা কি নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলতে ও লিখতে পারে?’খ. কেন জরুরি: বাংলাদেশের অনেক আদিবাসী ভাষা এখন বিলুপ্তির পথে। এ ধরনের তথ্য থাকলে কোন ভাষা সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন এবং কোথায় মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক চালু করা দরকার, তা নির্ধারণ করা সহজ হতো।আদিবাসী জরিপের প্রচার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম তাদের নিজস্ব ভাষায় রেডিও, টেলিভিশন বা লিফলেটের মাধ্যমে করা উচিত ছিল। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ জরিপের গুরুত্ব সহজে বুঝতে পারতেন। পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের কাছে পৌঁছানো, সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা এবং তাদের আস্থা অর্জন—সবই গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে আদিবাসী জরিপ কেবল কিছু শুষ্ক সংখ্যার যোগ-বিয়োগ নয়। এটি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব, অধিকার ও উন্নয়ন বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ২০২৬ সালের এই বিশেষায়িত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জরিপ যদি সততা, স্বচ্ছতা এবং আদিবাসী সমাজের প্রত্যক্ষ সহযোগিতার মাধ্যমে সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে অতীতের পদ্ধতিগত ভুলগুলো অনেকটাই দূর করার সুযোগ তৈরি হবে। রাষ্ট্র যখন তার প্রান্তিক নাগরিকদের সঠিক পরিসংখ্যান সততার সঙ্গে গ্রহণ করবে, তখনই একটি প্রকৃত বৈচিত্র‍্যময় ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

কুসংস্কার দূর করতে চাই জ্ঞানের আলো

অনগ্রসর, দলিত-বঞ্চিত ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেক মানুষ শিক্ষা ও তথ্যের সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকায় কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের শিকার হন। কোনো কথা সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকলেই তা সত্য বা বিজ্ঞানসম্মত হয়ে যায় না। বরং প্রচলিত বিশ্বাসকে যুক্তি, জ্ঞান ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। বিজ্ঞান আমাদের শেখায়—আগে জানতে হবে, তারপর বিশ্বাস করতে হবে।করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময়ও কুসংস্কারের নানা দৃষ্টান্ত দেখা গেছে। কোথাও কোথাও মানুষ রোগ থেকে রক্ষা পেতে পূজা বা নানা আচার-অনুষ্ঠানের আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু এসবের মাধ্যমে কেউ রোগমুক্ত হয়েছেন—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। রোগ প্রতিরোধে চিকিৎসাবিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিধি ও টিকাই কার্যকর পথ। তাই অন্ধভাবে কোনো কিছু বিশ্বাস না করে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।আমাদের সমাজে এখনো নানা কুসংস্কার প্রচলিত। শ্মশান বা কবরস্থানের দিকে আঙুল তুলে পরে সেই আঙুল মুখে কামড় দিলে অমঙ্গল দূর হয়—এমন বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের সময় গর্ভবতী নারী কিছু কাটাকাটি করলে সন্তানের ক্ষতি হবে—এ ধারণাও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। গ্রহণ একটি প্রাকৃতিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা; এর সঙ্গে গর্ভস্থ শিশুর শারীরিক গঠনের এমন কোনো সম্পর্ক নেই।স্বাভাবিক শারীরিক বিষয় নিয়েও সমাজে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেদের স্বপ্নদোষ একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ঘটনা। অথচ এ নিয়ে অনেকের মধ্যে লজ্জা, ভয় ও অপরাধবোধ কাজ করে। স্বপ্নদোষের কারণে কেউ অপবিত্র হয়ে যায় কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না—এ ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। শরীর সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও সুস্থ মানসিকতা এ ধরনের ভুল ধারণা দূর করতে পারে।দৈনন্দিন জীবনেও কুসংস্কারের নানা প্রকাশ দেখা যায়। পরীক্ষার আগে ডিম বা মিষ্টি খেলে ফল খারাপ হবে, বাসন পড়ে গেলে অমঙ্গল হবে, বাড়ির পাশে কাক ডাকলে বিপদ আসবে, রাতে পেঁচা ডাকলে গর্ভবতী নারীর ক্ষতি হবে কিংবা খাবারের আগে হাঁচি দিলে কেউ তাকে স্মরণ করছে—এসব বিশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব ঘটনা বা বৈজ্ঞানিক সত্যের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো নিছক প্রচলিত ধারণা।সন্তান জন্মের পর অশুভ শক্তির হাত থেকে নবজাতককে রক্ষার নামে দরজা-জানালায় নানা বস্তু ঝুলিয়ে রাখা কিংবা অসুস্থ শিশুকে চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে ঝাড়ফুঁকের জন্য নিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক। একইভাবে ভাগ্যনির্ভর মানসিকতাও মানুষের অগ্রগতির পথে বাধা। কে কী হবে সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারিত—এমন ধারণা মানুষকে কর্ম ও চেষ্টা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অথচ শিক্ষা, পরিশ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে মানুষ নিজের জীবন বদলাতে পারে। ‘জন্ম হোক যথাতথা, কর্ম হোক ভালো’—এই বোধ সমাজে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।কুসংস্কারের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ হলো মানুষকে মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদা না দেওয়া। দলিত-বঞ্চিত ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে অস্পৃশ্য ভাবা, শিক্ষা থেকে দূরে রাখা, ধর্মীয় বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশে বাধা দেওয়া, পোশাক বা জুতা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা কিংবা বিবাহ ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা—এসবও কুসংস্কার ও সামাজিক অন্যায়। আধুনিক রাষ্ট্রে এমন বৈষম্যের কোনো স্থান থাকতে পারে না।কুসংস্কার থেকে মুক্তির প্রধান পথ শিক্ষা। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বিজ্ঞানমনস্কতা, তথ্যপ্রযুক্তি, অনুসন্ধান ও যুক্তিবোধও বাড়াতে হবে। কোনো বিশ্বাস বহু বছর ধরে চলে আসছে বলেই তা সত্য—এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রভাবশালী কেউ কোনো কথা বললেই তা মেনে নেওয়া উচিত নয়; প্রয়োজন হলে তার ভিত্তি যাচাই করতে হবে।কুসংস্কার সমাজের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সৃজনশীলতার পথে বাধা। তাই সব নাগরিককে সমান মর্যাদা দিয়ে জ্ঞান, বিজ্ঞান, যুক্তি ও মানবিকতার ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তুলতে হবে। আজ নয়তো কাল, সচেতনতার পথ ধরেই কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস থেকে সমাজকে মুক্ত করা সম্ভব হবে—এই প্রত্যাশাই থাকা উচিত।[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

আলোকিত জাতি গঠনে শিক্ষা

নৈতিক রাষ্ট্র নির্মাণের মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। একটি রাষ্ট্রের আইন, সংবিধান কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো যতই উন্নত ও সুসংগঠিত হোক, যদি তার নাগরিকদের নৈতিক বোধ, দায়িত্বশীলতা ও ন্যায়-অন্যায়ের বিচারক্ষমতা দুর্বল থাকে, তবে সেই রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও কার্যকর রাখা কঠিন। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্রটি শেষ পর্যন্ত পরিচালিত হয় মানুষ দিয়ে, আর সেই মানুষের মূল্যবোধ, বিবেক ও আচরণ গড়ে ওঠে শিক্ষার নানামুখি দীর্ঘ পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আইন মানুষকে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারে, কিন্তু নৈতিক শিক্ষা মানুষকে অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে উপলব্ধি ও বিশ্বাস করতে শেখায়। প্রশাসনিক ব্যবস্থা কর্তব্য পালনে বাধ্য করতে পারে, কিন্তু নাগরিক দায়িত্ববোধ মানুষকে দায়িত্বকে নিজের নৈতিক দায় হিসেবে গ্রহণ করতে শেখায়। এই অর্থে সামগ্রিক শিক্ষা প্রক্রিয়া তথা অনানুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবকাঠামো নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শিক্ষার মাধ্যমেই নাগরিকের মধ্যে দায়িত্ববোধ, ন্যায়বিচারের চেতনা, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মানবিকতার বিকাশ ঘটানো সম্ভব। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের দায়িত্ব শুধু নিজের অধিকার দাবি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, ভিন্নমত সহ্য করা, শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষের প্রতি সংবেদনশীল থাকা এবং বৃহত্তর জনকল্যাণের কথা বিবেচনা করাও তার দায়িত্ব। এই মূল্যবোধগুলো কেবল আইন বা পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞা মুখস্থ করিয়ে অর্জন করানো যায় না। এগুলো গড়ে ওঠে এমন শিক্ষার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেখানে শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনের নৈতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে ভাবতে শেখে, অন্যের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে এবং নিজের সিদ্ধান্তের সামাজিক পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হয়। ফলে নৈতিক শিক্ষা কোনো আলাদা বিষয় বা পরীক্ষার অংশমাত্র নয়; এটি জীবনব্যাপী শিক্ষার সমগ্র প্রক্রিয়ায় এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কৃতির মধ্যে নিহিত থাকা প্রয়োজন।দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা উন্নয়নকে প্রায়ই ভৌত অবকাঠামো তথা ভবন,  সড়ক, সেতু, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা কিংবা মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করি। এসব অবশ্যই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক; কিন্তু এগুলো উন্নয়নের সম্পূর্ণ চিত্র নয়। একটি দেশের ভবন যত উঁচু কিংবা দৃষ্টিনন্দনই হোক না কেন, যদি তার নাগরিকেরা অসহিষ্ণু হন; প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, যদি মানুষ মিথ্যা ও অপতথ্যের কাছে সহজেই আত্মসমর্পণ করে; অর্থনীতি যত বড়ই হোক, যদি সমাজে ন্যায়বোধ ও মানবিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে সেই উন্নয়নকে পূর্ণাঙ্গ মানবিক উন্নয়ন বলা যায় না। উন্নয়নের বস্তুগত সূচকের পাশাপাশি তাই একটি জাতির বৌদ্ধিক, নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সক্ষমতাকেও উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়নের গভীরতর চিত্র পাওয়া যায় তার পারিবারিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিবেশে। সেখানে পারিবারিক পরিমন্ডলে সম্পর্ক কত মানবিক, সুনিবিড় ও সুদৃঢ়,এবং নবীন, প্রবীণ ও দুর্বলের মর্যাদা কতটুকু সুসংহত; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কতটা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারে, শিক্ষক কতটা নির্ভয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন, গবেষক কতটা স্বাধীনভাবে প্রচলিত ধারণাকে পরীক্ষা করতে পারেন এবং একটি প্রতিষ্ঠান কতটা সত্যের অনুসন্ধানকে উৎসাহিত করে; সামাজিক পরিবেশে পরমতসহিষ্ণুতা, সহানুভূতি-সহমর্মিতা এবং সামাজিক ন্যায্যতা; রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে আইনের শাসন, জান-মাল-সম্মানের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার এসবই একটি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির দৃশ্যমান পরিপক্বতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। যে দেশে প্রশ্ন করা অপরাধ, ভিন্নমত প্রকাশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্ষমতাসীন মতের সমালোচনা অনাকাঙ্ক্ষিত, সেখানে বাহ্যিক অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটলেও প্রকৃত অর্থে মানবিক, নৈতিক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে না।বিশেষ করে সত্য অনুসন্ধানের স্বাধীনতা একটি সুস্থ সামাজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণশক্তি। সত্য কখনো কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক নিয়মই হলো প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা, প্রমাণ পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন হলে পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত সংশোধন করা। তাই যে রাষ্ট্র তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই অনুসন্ধানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, সে কেবল ভালো শিক্ষার্থী তৈরি করে না; সে এমন নাগরিক তৈরি করে যারা গুজবের পরিবর্তে প্রমাণ, আবেগের পরিবর্তে যুক্তি এবং অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে বিবেকের ওপর নির্ভর করতে শেখে। আর এই নাগরিকরাই শেষ পর্যন্ত একটি নৈতিক, দায়িত্বশীল ও টেকসই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষার উন্নয়নে আমাদের করণীয় কী? বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু অবকাঠামোগতভাবে সম্প্রসারণ করলেই হবে না; এর দর্শন, পরিচালন কাঠামো, নেতৃত্ব, শিক্ষকতা, গবেষণা-সংস্কৃতি এবং শিক্ষার্থী-অভিজ্ঞতার মৌলিক ভিত্তিকেও পুনর্বিবেচনা করতে হবে। জাতীয় শিক্ষাদর্শনের আলোকে রাষ্ট্র শিক্ষার স্তরভিত্তিক যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ করবে, শিক্ষাপরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নকে প্রতিটি স্তরে সেই লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে এবং পরিববর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার সাথে মিল রেখে জনশক্তি উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে উচ্চশিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শিক্ষা কোনো সরকারের সাময়িক রাজনৈতিক কর্মসূচি বা ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যম হতে পারে না; এটি হতে হবে রাষ্ট্রের নাগরিকদের দীর্ঘমেয়াদি মানবিক, নৈতিক ও আইনী সুরক্ষার সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তার অগ্রগতি নিশ্চিত করার কৌশলগত ভিত্তি।রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কারের প্রাথমিক পদক্ষেপে অপরিহার্য অংশ হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থার এই পুনর্গঠনের প্রথম শর্তই হলো শিক্ষাঙ্গনের বৌদ্ধিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষককে যেন কোনো রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা গোষ্ঠীগত চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নিজের জ্ঞান, যুক্তি ও গবেষণার ভিত্তিতে মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়। কারণ যেখানে চিন্তার স্বাধীনতা নেই, সেখানে সৃজনশীলতার সুযোগ থাকে না; আর সৃজনশীলতা ছাড়া জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি কিংবা স্বনির্ভর জাতি গঠন সম্ভব নয়। এই বৌদ্ধিক স্বাধীনতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রশ্নটি। শিক্ষার মনোন্নয়নে শিক্ষক নিয়োগ, তাঁদের পদোন্নতি ও একাডেমিক নেতৃত্ব নির্ধারণে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত আনুগত্য কিংবা গোষ্ঠীগত সম্পর্কের পরিবর্তে মেধা, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও কর্ম-অভিজ্ঞতা, গবেষণা, শিক্ষাদানের দক্ষতা, পেশাগত সততা ও নিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের দক্ষতা ও সক্ষমতাকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমাদেরকে একজন শিক্ষক, শিক্ষাবিশেজ্ঞ কিংবা শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষানুরাগীর পরিচয়গত পার্থক্য; তাঁদের পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতার যে পার্থক্য সেগুলো সুচারুভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। কেবল ক্ষমতাসীন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা মতের সমর্থক হিসেবে নয়, বরং শিক্ষাক্ষেত্রে সঠিক নেতৃত্বের জন্য কাউকে নিয়োগ প্রদানের পূর্বে জ্ঞানসৃষ্টিকারী ও জ্ঞানবিনিময়কারী পেশাজীবী হিসেবে তার যথার্থ মূল্যায়ন করতে হবে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব এমন ব্যক্তিদের হাতে দিতে হবে, যারা একাডেমিক উৎকর্ষে অগ্রগণ্য, ন্যায়সংগত প্রশাসন পরিচালনার সক্ষমতার রেখেছেন, এবং কাজকর্মে স্বচ্ছতা প্রদর্শন ও মতের বৈচিত্র‍্যকে সম্মান করেন। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো শিক্ষানীতি বা সংস্কারই কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে না।রাষ্ট্রকে সামাজিক চুক্তির শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে একই সঙ্গে আগামী প্রজন্ম তথা শিক্ষার্থীদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, তবে কোনোভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার সংঘাতের ক্ষেত্র হতে দেওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিমন্ডলে দলীয় রাজনীতি নয়; তাদের অধিকার, শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উন্নয়নে এবং রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে রাজনীতিতে অংশ নেবে। শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্র, সংবিধান, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনীতি, পরিবেশ, জননীতি ও সমসাময়িক জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিষয়ে জানবে, বিতর্ক করবে এবং নিজস্ব মত গড়ে তুলবে এটাই কেবল কাম্যই নয়, অপরিহার্য। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যেন দলীয় রাজনীতির লেজুড়ভিত্তিতে কিংবা একাডেমিক মূল্যায়ন, সুযোগ, নেতৃত্ব বা সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণের মানদণ্ডে পরিণত না হয়। শিক্ষার্থীদের রাজনীতি যদি নাগরিক সচেতনতা, নেতৃত্বের বিকাশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অনুশীলন হয়, তবে তা হবে ইতিবাচক এবং জাতীয় অগ্রগতির সহায়ক; কিন্তু তা যদি দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, সহিংসতা, ভয়ভীতি, দলীয় নির্দেশ পালন কিংবা ক্ষমতার আনুগত্যের প্রশিক্ষণে পরিণত হয়, তাহলে তা হবে শিক্ষার উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং জাতির জন্য আত্মঘাতী।ছাত্ররাজনীতিকে দলীয় রাজনীতির নাগপাশ থেকে মুক্ত করার পাশাপাশি গবেষণা, বিতর্ক ও মুক্তচিন্তার পরিবেশকে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত করতে হবে। বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে, প্রমাণ খুঁজতে, তথ্য যাচাই করতে এবং ভিন্ন ব্যাখ্যার তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে শেখানো প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষায় যৌক্তিক চিন্তার এই সংস্কৃতিকে আরও গবেষণাভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, নৈতিক ও একাডেমিক স্বাধীনতা, আন্তঃবিষয়ক (ইন্টারডিসিপ্লিনারি) সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক জ্ঞানসম্প্রদায় (ইন্টালেক্চুয়াল কমিউনিটি) ও পেশাগত সম্প্রদায়ের (কমিউনিটি অব প্রেক্টিস) সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কোন একটি বিষয়ে বিতর্ককে বিরোধিতা হিসেবে নয়, নিজেকে সমৃদ্ধ করার এবং জ্ঞান সৃষ্টির একটি স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের শিক্ষকের বক্তব্যকে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রশ্ন করতে পারে, কিংবা একজন গবেষক যদি প্রচলিত কোনো তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা নিয়ে নির্ভয়ে আলোচনা করতে পারেন, তখনই প্রকৃত অর্থে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সহিংসতা, ভয়ভীতি এবং গোষ্ঠীগত আধিপত্যের সংস্কৃতিও সম্পূর্ণভাবে দূর করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী যেন রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ, ধর্ম, সামাজিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত মতের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে; কোনো শিক্ষক যেন প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কায় নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত না হন। শিক্ষাঙ্গনে প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োগ হবে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও জবাবদিহির মাধ্যমে; ভয় প্রদর্শন, দখল কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাবের মাধ্যমে নয়। এ ক্ষেত্রে কার্যকর অভিযোগ-নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, স্বচ্ছ শৃঙ্খলাবিধি এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন ছাড়া একদিকে যেমন মুক্তচিন্তা কিংবা সৃজনশীলতা কোনোটিই বিকশিত হতে পারে না; অপরদিকে ব্যক্তিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির পথ সংকোচিত হয়ে পড়ে।মানবিকতা, নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধকে শিক্ষার প্রান্তিক কোনো বিষয় হিসেবে না রেখে এর কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু কীভাবে ভালো চাকরি পেতে হয় তা শেখালে চলবে না; তাকে শেখাতে হবে কেন একজন ভালো মানুষ, দায়িত্বশীল নাগরিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের সক্রিয় অংশীদার হতে হবে এবং কীভাবে হতে হয়। সততা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সহনশীলতা, ন্যায়বোধ, পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব, দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান এমূল্যবোধগুলো শিক্ষার প্রতিটি স্তরে চর্চার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে। কারণ মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা কোনো আলাদা পরীক্ষার বিষয় নয়; এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন সংস্কৃতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের মধ্য দিয়ে শেখানো হয়। এই সবকিছুর সমন্বিত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা একই সঙ্গে জ্ঞানী, দক্ষ, নৈতিক, মানবিক ও মুক্তচিন্তার ব্যক্তি-মানুষ তৈরির পাশাপাশি দেশের জন্য সুনাগরিক তৈরি করবে। জাতীয় শিক্ষাদর্শনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপন্থার সমন্বয়ে একটি ধারাবাহিক শিক্ষাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। জাতীয় অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিকে নিশ্চিত করতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার মৌলিক দর্শন ও প্রতিষ্ঠানগত অগ্রাধিকার যেন বারবার পরিবর্তিত না হয়, সে দিকে আমাদের বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। তাতে একদিকে যেমন জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ হবে, অপরদিকে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যাবে। তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাপরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায় করা। শিক্ষা কোনো দলের সম্পত্তি কিংবা নিয়ন্ত্রণ ও মতাদর্শ প্রচারের কৌশল নয়; এটি সমগ্র জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আমরা হয়তো শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে পারব, কিন্তু নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে সক্ষম ও আলোকিত জাতি গড়ে তুলতে পারব না।আমাদের শিক্ষাঙ্গন হোক সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে আলোর প্রতিষ্ঠান যেখানে জ্ঞান হবে মুক্ত, চিন্তা হবে স্বাধীন, মতের বৈচিত্র‍্য হবে স্বীকৃত ও সমৃদ্ধির উপায় এবং মানুষের মর্যাদাকে দেওয়া হবে সর্বোচ্চ মূল্য। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়, যখন তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার অনুগত প্রতিষ্ঠান না হয়ে সত্যের অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। যে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সাহস নেই, সেখানে জ্ঞানের বিকাশ থেমে যায়; যে শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি মেধার বিকল্প হয়ে ওঠে, সেখানে সৃজনশীলতা ও নৈতিক নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষাকে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার না বানিয়ে জাতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, মানবিক উৎকর্ষ এবং নাগরিক কল্যাণের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংসদ ভবনে যতটা না নির্ধারিত হবে, তার চেয়েও বেশি নির্ধারিত হবে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, পাঠাগার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত চিন্তার পরিসরে এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে গণসচেতনা বৃ্দ্িধতে সামাজিক পরিমন্ডলে। সংসদ রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন করতে পারে, সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে, প্রশাসন তা বাস্তবায়ন করতে পারে; কিন্তু সেই রাষ্ট্র ও সমাজকে কেমন মানুষ পরিচালনা করবে, তারা কতটা ন্যায়নিষ্ঠ, যুক্তিবাদী, মানবিক ও দায়িত্বশীল হবে তার ভিত্তি নির্মিত হয় শিক্ষার মধ্য দিয়েই। একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তার বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে, কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে তার ভবিষ্যৎ।একটি স্বৈরাচারী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হয়তো খুব বেশি সময় লাগে না; ভয়, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, মতপ্রকাশের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আনুগত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই তা দ্রুত করা সম্ভব। কিন্তু একটি মুক্ত, মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি, নৈতিক নাগরিকত্ব এবং সুপরিকল্পিত জনকল্যাণমুখী নীতিমালার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। আমাদের বুঝতে হবে যে, সেই কাজের কেন্দ্রবিন্দুটিই হলো শিক্ষা। কারণ মুক্ত সমাজ কেবল আইন দিয়ে তৈরি হয় না; তাকে ধারণ করার মতো মুক্তমনা মানুষও তৈরি করতে হয়। গণতন্ত্র কেবল একটি সংবিধানিক ব্যবস্থা নয়; এটি পারস্পারিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার একটি বাস্তবমুখী জীবনচর্চা, আর সেই জীবনচর্চার ভিত্তি নির্মাণ করে শিক্ষাই। এই কারণে রাজনীতির শিক্ষা আমাদের শিক্ষার একটা অনুষঙ্গ হলেও রাজনীতিকীকরণ থেকে শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনকে মুক্ত রাখা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষার রাজনীতি মানে শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রক্রিয়ার রাজনীতিকীকরণ নয়। অপরদিকে শিক্ষার বিরাজনীতিকীকরণ রাজনীতিকে অস্বীকার করাও নয়; বরং শিক্ষাকে তার প্রকৃত জাতীয় দায়িত্ব পালনের উপযোগী করে তোলা। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে রাজনৈতিক সচেতনতা থাকবে কিন্তু দলীয় আনুগত্য থাকবে না; মতাদর্শ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকবে কিন্তু যৌক্তিক চিন্তার বিকাশ, গবেষণা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে না; নেতৃত্ব থাকবে কিন্তু তা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে; সমালোচনা থাকবে কিন্তু তা হবে যুক্তি ও প্রমাণনির্ভর; এবং সবচেয়ে বড় কথা, যেখানে কোনো ক্ষমতার চেয়ে সত্যের মূল্য বেশি হবে। জাতীয় শিক্ষাদর্শনের ভিত্তিতে শিক্ষার রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে এমন শিক্ষাপরিকল্পনাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে, যা ক্ষমতাসীন সরকার বা দলের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করবে।আলোকিত মানুষ তৈরির সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো হলো দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, আর শিক্ষাব্যবস্থা সেই আলোর বাতিঘরগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তিসরবরাহকারী ব্যবস্থা। বাতিঘরের কাজ পথিককে কোনো নির্দিষ্ট পথে টেনে নেওয়া নয়; বরং অন্ধকারের মধ্যে পথ চিনে নেওয়ার মতো আলো দেওয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাজও তাই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আনুগত্য তৈরি করা নয়; বরং মানুষকে এমন জ্ঞান, বিচারবোধ ও নৈতিক সাহস দেওয়া, যার মাধ্যমে সে নিজের পথ নিজেই চিনে নিতে পারে। ‘শিক্ষাব্যবস্থা’ নামক পাওয়ারহাউস বা শক্তিকেন্দ্র থেকে শক্তির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে জাতি শুধু জ্ঞানের অন্ধকারেই হারিয়ে যায় না, হারিয়ে ফেলে তার বিবেক, দিকনির্দেশনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্ষমতাও। অতএব, আমাদের সামনে আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কেবল কতজনকে শিক্ষার আওতায় আনতে পেরেছি, তা নয়; বরং আমরা কেমন মানুষ তৈরি করছি। আমরা কি এমন প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে দ্বিধা করবে না, ভিন্নমতকে সম্মান করবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেকের কণ্ঠ শুনবে এবং নিজের জ্ঞান ও দক্ষতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করবে? যদি উত্তরটি ‘হ্যাঁ’ করতে হয়, তবে শিক্ষাকে মুক্ত করতে হবে দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি এবং দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির করালগ্রাস থেকে। শিক্ষাঙ্গনে যোগ্য ও নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চার সব পথ অবারিত রাখতে হবে। তখনই শিক্ষার আলো কেবল শ্রেণিকক্ষকে আলোকিত করবে না; তা ছড়িয়ে পড়বে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আর সেই আলো জ্বলে উঠলে বাংলাদেশ তার ইতিহাসকে নতুন করে বুঝতে, বর্তমানকে বিবেক ও যুক্তির আলোকে মূল্যায়ন করতে এবং ভবিষ্যৎকে আরও মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক করে নির্মাণ করতে সক্ষম হবে। ইতিহাস হবে আমাদের শিক্ষা, বাস্তবতা হবে আমাদের পরিকল্পনা ও এগিয়ে চলার ভিত্তি, আর মুক্ত ও আলোকিত ভবিষ্যৎ হবে আমাদের লক্ষ্য। সেই ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়ার চাবিকাঠি আমাদেরই হাতের মুঠোয়। আর তার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো সুপরিকল্পিত ও মানসম্মত শিক্ষা; যে শিক্ষা মানবিক, নৈতিক ও ভবিষ্যতমুখী সুনাগরিক তৈরি করে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন

মানুষের জীবনে জন্মের পর প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো জন্মনিবন্ধন সনদ। এটি শুধু একটি কাগজ নয়; একজন মানুষের নাম, জন্মতারিখ ও পরিচয়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আইনি ভিত্তি। একইভাবে একজন নাগরিকের মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধন করাও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর ৬ অক্টোবর বাংলাদেশে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস পালন করা হয়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সঠিক তথ্য ছাড়া কোনো দেশের জনসংখ্যা, নাগরিক সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার কার্যকর পরিকল্পনা করা কঠিন। তাই জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবসের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সময়মতো এবং নির্ভুল নিবন্ধনের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা।একটি শিশুর জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব তার নিবন্ধন সম্পন্ন করা জরুরি। জন্মনিবন্ধন না থাকলে বিদ্যালয়ে ভর্তি, বয়সের প্রমাণ, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়াতেও জন্মনিবন্ধনের তথ্য প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে জন্মতারিখ, নাম ও মা-বাবার পরিচয়ের মতো তথ্য ভুল হলে একজন নাগরিককে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে। তাই জন্মনিবন্ধনকে নাগরিক জীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিল হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।মৃত্যু নিবন্ধনের গুরুত্বও কোনো অংশে কম নয়। একজন নাগরিকের মৃত্যুর তথ্য যথাসময়ে রাষ্ট্রীয় নথিতে যুক্ত হলে জনসংখ্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়। সরকারি ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য সুবিধায় ভুয়া বা মৃত ব্যক্তির নামে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ কমে। একই সঙ্গে জনসংখ্যা পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যনীতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নেও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যায়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের নির্ভরযোগ্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশে নিবন্ধন ব্যবস্থায় অগ্রগতি হয়েছে। অনলাইনে আবেদন, তথ্য সংরক্ষণ ও সংশোধনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সেবা গ্রহণের পথ আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এখনো নানা সমস্যা রয়েছে। সার্ভারের ধীরগতি, কারিগরি ত্রুটি, তথ্য যাচাইয়ের জটিলতা এবং নাম বা জন্মতারিখ সংশোধনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া নাগরিকদের ভোগান্তিতে ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এসব কারণে অনেকে সময়মতো নিবন্ধন না করে পরে আবেদন করেন। এতে তথ্য যাচাই আরও জটিল হয়।নিবন্ধন ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দালালচক্রের তৎপরতার অভিযোগও রয়েছে। দ্রুত কাজ করে দেওয়ার কথা বলে তারা মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেয়। সরকারি সেবার ক্ষেত্রে এমন মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ সমস্যা দূর করতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, সহজ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। আবেদন থেকে সনদ দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল ব্যবস্থা কার্যকর করা, অনলাইন পেমেন্টের সুযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।শতভাগ ও নির্ভুল নিবন্ধন নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও টিকাদান কেন্দ্রের সঙ্গে জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ স্থাপন করা গেলে শিশুর জন্মের তথ্য দ্রুত নথিভুক্ত করা সম্ভব। একইভাবে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধনের ব্যবস্থা জোরদার করা যেতে পারে। পাশাপাশি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও এ কাজে যুক্ত করা দরকার।জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালনের দিন নয়। এটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার একটি সুযোগ। প্রতিটি জন্মের সঠিক তথ্য যেমন একজন মানুষকে রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও আইনি সুরক্ষা দেয়, তেমনি প্রতিটি মৃত্যুর সঠিক নিবন্ধন রাষ্ট্রকে নির্ভুল তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়তা করে। তাই জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনকে সহজ, দ্রুত, নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত করা জরুরি। প্রতিটি জীবন রাষ্ট্রীয় নথিতে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হলেই গড়ে উঠবে নির্ভুল তথ্যভিত্তিক ও নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্র।[লেখক: প্রাবন্ধিক]

ভিডিও আরও দেখুন

আবুধাবি টেস্ট: বিপর্যয় সামলে লিটন-মিরাজের প্রতিরোধ

আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে দারুণ শুরুর পর ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। একের পর এক উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যাওয়া দলকে সেই অবস্থা থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করছেন লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ।শেখ জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টের প্রথম দিনে চায়ের বিরতিতে ৫ উইকেটে ২২৬ রান তুলেছিল বাংলাদেশ। পরে লিটন-মিরাজের প্রতিরোধে ৬৭ ওভার শেষে সংগ্রহ দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ২৮১ রান।এর আগে প্রথম সেশনটা দাপটের সঙ্গে কাটিয়েছিল বাংলাদেশ। ওপেনার তানজিদ হাসানের ঝড়ো হাফসেঞ্চুরিতে ২৬ ওভারে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে সংগ্রহ করে ১ উইকেটে ১৩৪ রান। ৭১ বলে তানজিদের ৮৩ রানের ইনিংস শুরুর ছন্দ ঠিক করে দিয়েছিল।দ্বিতীয় সেশনে চার উইকেট হারায় বাংলাদেশ। সাদমান ইসলাম ১১১ বলে ৬৭ রান করে ফেরেন। মুমিনুল হক করেন ৭০ বলে ৩৯। এরপর দ্রুত বিদায় নেন মুশফিকুর রহিম ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। মুশফিক ৭ বল খেলে কোনো রান করতে পারেননি। শান্তর ব্যাট থেকে আসে ৪২ বলে ২৯ রান। চায়ের বিরতির ঠিক আগে মাত্র ৪ রানের মধ্যে শেষ তিনটি উইকেট হারিয়ে বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ।তবে সেই বিপর্যয় সামাল দিতে চেষ্টা করেন লিটন ও মিরাজ। দুজনের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে আবারও ইনিংস গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ। লিটন শেষ পর্যন্ত ৫৪ বলে ৩৬ রানে অপরাজিত আছেন। অন্য প্রান্তে মিরাজের সংগ্রহ ৪৮ বলে অপরাজিত ২২ রান।

আবুধাবি টেস্ট: বিপর্যয় সামলে লিটন-মিরাজের প্রতিরোধ