সংবাদ
চারদিনের সফরে ২৬ অক্টোবর জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

চারদিনের সফরে ২৬ অক্টোবর জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মেগা প্রকল্প ত্বরান্বিত করতে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকআগামী ২৬ অক্টোবর চার দিনের এক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সফরে জাপানের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মূলত দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি সহযোগিতা এবং চলমান মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরও ত্বরান্বিত করার মূল লক্ষ্য নিয়েই এই সফর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এই সফর চলবে। মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এই তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।পররাষ্ট্র সচিব সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, সফরের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠকে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি জাপানি প্রধানমন্ত্রীর আয়োজিত বিশেষ মধ্যাহ্নভোজেও যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর দুই দেশের বাণিজ্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এবারের সফরে এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন, জাপানের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার আরও প্রশস্ত করা এবং বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির বিষয়ে বিশেষ আলোচনা হবে।এছাড়াও বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানির নতুন কারখানা স্থাপন, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে জাপানি সরকারের সার্বিক সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টি এই সফরের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক কৃষি, ডিজিটাল রূপান্তর, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে পারস্পরিক অংশীদারত্ব বাড়াতেও বিশেষ আলোচনা হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।জাপান সবসময়ই বাংলাদেশের অন্যতম বিশ্বস্ত ও প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশটি আমাদের দেশের মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্পসহ দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে।সফরসূচির অংশ হিসেবে জাইকার প্রেসিডেন্ট, জেট্রোর সভাপতি, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের গভর্নর এবং জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী।সফরকালে জাপানের ফুৎসু শহরের এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, ইউনিক্লোর প্রধান কার্যালয় এবং নাগোয়ার বিখ্যাত টয়োটা কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচিও নির্ধারিত রয়েছে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক শান্তি-স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং জ্বালানি সংকট উত্তরণে পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে।প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।
৪ ঘন্টা আগে

চারদিনের সফরে ২৬ অক্টোবর জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

চারদিনের সফরে ২৬ অক্টোবর জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট চালুর পরিকল্পনা

২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট চালুর পরিকল্পনা

কম্বোডিয়ার ডিটেনশন সেন্টার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরলেন ৩০ বাংলাদেশি

কম্বোডিয়ার ডিটেনশন সেন্টার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরলেন ৩০ বাংলাদেশি

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কারও ভোটব্যাংক না হওয়ার স্পষ্ট বার্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কারও ভোটব্যাংক না হওয়ার স্পষ্ট বার্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

কোরীয় শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে প্রস্তুত বাংলাদেশ

কোরীয় শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে প্রস্তুত বাংলাদেশ

ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতা চায় প্রতিযোগিতা কমিশন

ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতা চায় প্রতিযোগিতা কমিশন

ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষায় সমান সুবিধা পাবে সবাই

ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষায় সমান সুবিধা পাবে সবাই

রংপুর ও রাজশাহী হয়ে চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী

রংপুর ও রাজশাহী হয়ে চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী

ডাক্তারের খোঁজে ট্রলারে যাত্রা, মাঝপথে নিথর স্ত্রী

ডাক্তারের খোঁজে ট্রলারে যাত্রা, মাঝপথে নিথর স্ত্রী

অভিযান ঠেকাতে তদবির, অতিরিক্ত ডিআইজি ক্লোজড

অভিযান ঠেকাতে তদবির, অতিরিক্ত ডিআইজি ক্লোজড

সবাইকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে: প্রধানমন্ত্রী

সবাইকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে: প্রধানমন্ত্রী

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ২০

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ২০

দলের সঙ্গে মুনাফেকি করলে প্রধানমন্ত্রী ক্ষমা করবেন না : আইনমন্ত্রী

দলের সঙ্গে মুনাফেকি করলে প্রধানমন্ত্রী ক্ষমা করবেন না : আইনমন্ত্রী

দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে রংপুরের পথে প্রধানমন্ত্রী

দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে রংপুরের পথে প্রধানমন্ত্রী

এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ‘জিরো’: ইশরাক হোসেন

এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ‘জিরো’: ইশরাক হোসেন

মেগাবন্দরের পথে চট্টগ্রাম বন্দর, বিশাল সৌর প্রকল্প

মেগাবন্দরের পথে চট্টগ্রাম বন্দর, বিশাল সৌর প্রকল্প

সাতক্ষীরায় ৭৮ লাখ টাকার হেরোইন তৈরির কাঁচামাল জব্দ করল বিজিবি

সাতক্ষীরায় ৭৮ লাখ টাকার হেরোইন তৈরির কাঁচামাল জব্দ করল বিজিবি

চট্টগ্রাম সফরে প্রধানমন্ত্রী, স্বাধীনতার পর প্রথম দুর্গাপূজায় কোনো সরকারপ্রধান

চট্টগ্রাম সফরে প্রধানমন্ত্রী, স্বাধীনতার পর প্রথম দুর্গাপূজায় কোনো সরকারপ্রধান

রংপুর ও রাজশাহী হয়ে চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী

রংপুর ও রাজশাহী হয়ে চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী

ভোগান্তি কমাতে সৌদিগামী যাত্রীদের জন্য বিকল্প রুটের পরিকল্পনা

ভোগান্তি কমাতে সৌদিগামী যাত্রীদের জন্য বিকল্প রুটের পরিকল্পনা

মতামতমতামত

এবার কি নদী দখলকে বৈধতা দেওয়ার পালা

একটি নদী কীভাবে মরে যায়? শুধু তার পানিতে বিষ মিশলে, পয়োবর্জ্য পড়লে কিংবা শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যে জলজ প্রাণের অস্তিত্ব বিপন্ন হলেই কি একটি নদীর মৃত্যু ঘটে? নাকি নদীর মৃত্যুর শুরু আরও আগে-যখন তার প্রবাহের জায়গা দখল হয়, তীরের উন্মুক্ত জমিতে একের পর এক স্থাপনা গড়ে ওঠে, জলাভূমির স্বাভাবিক চরিত্র বদলে যায়, আর এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব যাদের, তাদের সামনেই ধীরে ধীরে বদলে যায় প্রকৃতির মানচিত্র? বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের দখল, দূষণ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে বারবার এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। নদীর তীরবর্তী এলাকায় দখল কীভাবে বিস্তৃত হয়, জলাশয় কীভাবে সংকুচিত হতে হতে একসময় হারিয়ে যায় এবং প্রাকৃতিক জলপথ কীভাবে জমির কাগজপত্রের বিতর্কে আটকে পড়ে-এসবের কিছু চিত্র সরেজমিনে দেখার সুযোগ হয়েছে।২০২২ সালের ২২ অক্টোবর মাছরাঙা টেলিভিশনে প্রচারিত আমার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘ঢাকা বাঁচবে তো?’-তে কেরানীগঞ্জ, বছিলা, তারানগর, শ্যামলাপুর ও আশপাশের এলাকার এমনই কিছু বাস্তবতা তুলে ধরেছিলাম। তখন দেখেছিলাম, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের সঙ্গে সংযুক্ত একটি জলপথকে ব্যক্তিমালিকানার জমি হিসেবে দেখিয়ে বিক্রির চেষ্টা চলছে। একই অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল টোটাইল বিলের ওপর দখল ও ভরাটের চাপ। ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপে জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত থাকার পরও বিলটির একাংশে মাটি ফেলার কর্মকাণ্ড চলছিল।চার বছর পর সেই অভিজ্ঞতা আরও তীব্রভাবে সামনে এসেছে। টোটাইল বিলের যে জলাধারকে একসময় সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত থাকতে দেখেছিলাম, সেটি এখন পুরোপুরি ভরাট। সেখানে স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। অন্যদিকে, গেল ১৭ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত বণিক বার্তার একটি প্রতিবেদন রাজধানীর বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানকে ভারী শিল্পের জন্য নির্ধারণ এবং ড্যাপে চিহ্নিত বিরোধপূর্ণ বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্প নির্মাণের সুযোগ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।দুটি ঘটনা একই ধরনের নয়। একটি জলাশয় ভরাট হয়ে সেখানে নির্মাণকাজ চলার বাস্তবতা, অন্যটি ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনায় পরিবর্তনের বিষয়। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই মূল প্রশ্নটি অভিন্ন: ঢাকার নদী, খাল, বিল ও বন্যাপ্রবাহ এলাকার মতো প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার কী?নদীর শাখা যখন ব্যক্তিগত জমি২০২২ সালের অনুসন্ধানে শ্যামলাপুর মৌজায় গিয়ে এমন একটি জলপথের সন্ধান পাই, যেটিকে স্থানীয় বাসিন্দারা খাল হিসেবে চিনতেন। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সংযুক্ত এই জলপথ একসময় মাছের অভয়ারণ্য হিসেবেও পরিচিত ছিল। অথচ জায়গাটি জমি হিসেবে বিক্রির চেষ্টা চলছিল।২০২২ সালের আগের টোটাইল বিলের দৃশ্যমিরপুর থেকে আসা এক সম্ভাব্য ক্রেতা জমির কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে জানতে পারেন, তাকে যে জমি দেখানো হয়েছে, সেটি সরকারি খালের অংশ বলে দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও জায়গাটিকে খাল হিসেবে চিনতেন। কিন্তু ভূমি রেকর্ডে সেটি ‘জলা’ হিসেবে উল্লেখ ছিল এবং ব্যক্তির নামে রেকর্ড ও খাজনা-খারিজের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। আমাদের হাতে থাকা সিএস ও আরএস মানচিত্রের সঙ্গে বর্তমান রেকর্ডের অসংগতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করেছিলাম।একজন ভূমি কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, রেকর্ডে জমিটি ব্যক্তির নামে থাকলেও মানচিত্রে সেটি খাল হিসেবে চিহ্নিত। আরেকজন সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার বক্তব্য ছিল, কাগজপত্র ঠিক মনে হলে রেকর্ড দেওয়া হয়; জমিটি নদী, খাল, বিল না অন্য কিছু, তা যাচাই করার সুযোগ তাদের নেই।কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপের মানচিত্রের মধ্যে অসংগতি জমিটির আইনগত অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছিল। জমিটির প্রকৃত মালিকানা ও আইনগত পরিচয় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিল, জরিপ, রেকর্ড এবং অন্যান্য নথি যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অনুসন্ধানটি যে মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছিল, তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। একটি প্রাকৃতিক জলপথের পরিচয় ও ভূমি রেকর্ডের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে সেটি যাচাই ও নিষ্পত্তির দায়িত্ব কার? জমির কাগজে ব্যক্তির নাম উঠে গেলেই কোনো জলপথের প্রাকৃতিক পরিচয় মুছে যায় না। আবার কোনো জলপথের অস্তিত্ব রেকর্ডের আড়ালে চাপা পড়ে গেলে তার পরিবেশগত গুরুত্বও বিলীন হয়ে যায় না। এমন পরিস্থিতিতে শুধু জমি কেনাবেচার কাগজপত্র যাচাই করাই যথেষ্ট নয়। জায়গাটি জলপ্রবাহের অংশ কি না, নদীর সঙ্গে তার সংযোগ রয়েছে কি না এবং প্রযোজ্য আইনে সেটি কীভাবে সংরক্ষিত-এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে।কারণ, জলপথের পরিচয় নিয়ে বিরোধ দেখা দেওয়ার পর যথাযথ যাচাই না হলে একদিকে যেমন প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ কঠিন হয়, অন্যদিকে তেমনি জলপ্রবাহের জায়গা স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন বিরোধটি আর শুধু জমির কাগজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তার প্রভাব পড়ে পুরো এলাকার পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর।ড্যাপে জলাশয়, বাস্তবে নির্মাণএকই অনুসন্ধানে আমরা গিয়েছিলাম শ্যামলাপুর এলাকার টোটাইল বিলে। প্রায় ৩০ বিঘা আয়তনের এই জলাধারটি তখন দখল ও ভরাটের চাপে ছিল। একদিকে স্থানীয়ভাবে জমির মালিকানা দাবি করা ব্যক্তির ভরাট কার্যক্রম, অন্যদিকে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের মাটি ফেলার তৎপরতা দেখতে পেয়েছিলাম আমরা। অথচ তৎকালীন ড্যাপে বিলটিকে জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, বিলটি ভরাট করা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জলাশয় রক্ষা ও ভরাট বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।কিন্তু অনুসন্ধানের সময় মাঠে যে বাস্তবতা দেখেছিলাম, তা ছিল উদ্বেগজনক। সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত একটি জলাধারের অস্তিত্বই ঝুঁকির মধ্যে ছিল। আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বিলের একটি অংশ ভরাটের কথা বলেছিলেন। জায়গাটির সঙ্গে বুড়িগঙ্গার সম্পর্কের প্রসঙ্গও আলোচনায় এসেছিল। এসব বক্তব্যের আইনগত তাৎপর্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই প্রয়োজন হলেও, জলাশয়ের ওপর দখল ও ভরাটের চাপ যে বাস্তব ছিল, তা আমাদের সরেজমিন অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়েছিল।এরপর সময় গড়িয়েছে, সরকারের পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু টোটাইল বিলের বর্তমান বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। সরেজমিনে দেখা এবং আমার কাছে থাকা ছবিতে যে পরিস্থিতি ধরা পড়েছে, তাতে বিলটির পুরো এলাকাই ভরাট হয়ে গেছে, সেখানে এখন স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। যে জায়গায় একসময় জলাধার ছিল, যে জলাশয়কে পরিকল্পনায় সংরক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেখানে এখন নির্মাণের দৃশ্য।এটি শুধু একটি বিল হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটি সংরক্ষণের পরিকল্পনা, প্রশাসনিক আশ্বাস এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানেরও প্রতিচ্ছবি। ২০২২ সালে যখন ভরাটের তৎপরতা দেখেছিলাম, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ছিল। আজ সেই বিলের জায়গায় নির্মাণকাজ চলতে দেখা গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে, সেই আশ্বাসের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? ভরাট বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি? নেওয়া হয়ে থাকলে তা সত্ত্বেও বিলটি কীভাবে পুরোপুরি ভরাট হলো?২০২২ সালে টোটাইল বিলপাড়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের আনাগোনানির্মাণকাজের অনুমোদন রয়েছে কি না, কোন নথি বা মালিকানার ভিত্তিতে কাজ চলছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে-এসব প্রশ্নের উত্তর নথি যাচাই ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন। কিন্তু বিলটির ভরাট হয়ে যাওয়া এবং সেখানে নির্মাণকাজ চলার যে বাস্তবতা এখন দেখা যাচ্ছে, তা গুরুতর উদ্বেগের কারণ।কোনো জলাশয় পরিকল্পনায় সংরক্ষিত থাকার পরও যদি তা ভরাট হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু দখলকারীর সম্ভাব্য দায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নজরদারি, অনুমোদন এবং আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরিকল্পনায় সংরক্ষণের কথা লেখা থাকাই যথেষ্ট নয়, সেই সংরক্ষণ বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ।সরকারের পরিবর্তন হয়, জলাশয়ের ভাগ্য বদলায় কি?নদী ও জলাভূমি রক্ষার প্রশ্নটি কোনো একটি সরকারের মেয়াদে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২২ সালে যখন অনুসন্ধানটি করি, তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারও দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু টোটাইল বিলের পরিণতি দেখায়, শুধু সরকারের পরিবর্তন ঘটলেই জলাশয় রক্ষার বাস্তবতা বদলে যায় না।কোনো নির্দিষ্ট সরকারের সময় ঠিক কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কোন কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং কার দায়িত্বে ঘাটতি ছিল-এসব নির্ধারণের জন্য নথি ও ঘটনাক্রম যাচাই জরুরি। তবে জলাশয়টি যখন ভরাট হয়ে নির্মাণকাজের পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন দায় নির্ধারণের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং এখন প্রয়োজন, বিলটি কীভাবে ধাপে ধাপে ভরাট হলো, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কখন বিষয়টি জেনেছিল, কী পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং সেগুলো কেন কার্যকর হয়নি-এসবের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান। জলাশয় রক্ষার দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক সরকারের সাময়িক অঙ্গীকারের বিষয় হতে পারে না। এটি আইন, পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক দায়িত্ব। দখল প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণও একমাত্রিক নয়। কোথাও ভূমি রেকর্ডের অসংগতি থাকতে পারে, কোথাও নজরদারির ঘাটতি, কোথাও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের অভাব। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় স্থানীয় প্রভাব বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠলে তা-ও প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কোনো জলাশয়ের অস্তিত্ব ঝুঁকির মধ্যে থাকলে প্রশাসনের কাছে জবাব চাওয়াই স্বাভাবিক। কোন কর্তৃপক্ষ কখন বিষয়টি জেনেছে, কী ব্যবস্থা নিয়েছে, কেন সেই ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি এবং অবশিষ্ট জলাশয় রক্ষায় এখন কী করা সম্ভব-এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে থাকা উচিত।একটি জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার পর দায় নির্ধারণ করা যেমন জরুরি, তেমনি দখল চলাকালীন তা ঠেকাতে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করাও জরুরি। আর যদি জলাশয় ভরাটের পর সেখানে স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়, তাহলে শুধু নির্মাণকাজের বর্তমান বৈধতা যাচাই করাই যথেষ্ট নয়, কীভাবে পরিস্থিতি এই পর্যায়ে পৌঁছাল, সেটিও তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত। নইলে প্রতিবারই নতুন সরকার নতুন প্রতিশ্রুতি দেবে, নতুন পরিকল্পনায় সংরক্ষণের কথা লেখা থাকবে, অথচ প্রকৃতির মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়া জায়গাগুলো আর ফিরে আসবে না।এখন আবার ভূমি ব্যবহারের নিয়ম বদলানোর প্রশ্নবণিক বার্তার ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্যাপের সংশোধনীতে রাজধানীর আইলবহর মৌজার ১০৪৭, ১০৪৮ ও ১০৫০ নম্বর দাগে আগে উন্মুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত জমিকে ভারী শিল্প এলাকার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ড্যাপে চিহ্নিত বিরোধপূর্ণ বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে বাধা না থাকার বিধান যুক্ত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।প্রতিবেদনে নগর পরিকল্পনাবিদেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এসব পরিবর্তনের ফলে বন্যার পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে এবং নদীতীরবর্তী এলাকায় পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত জমির ব্যবহার পরিবর্তনের বিষয়টি তাই শুধু ভূমির শ্রেণিবিন্যাসের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এর সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাবও মূল্যায়ন করা জরুরি। একটি মৌলিক নীতি এখানে মনে রাখা প্রয়োজন। আর সেটা হল কোনো জমি খালি পড়ে আছে বলেই সেটি অনাবশ্যক নয়। বিশেষ করে নদীতীর, জলাভূমি ও বন্যাপ্রবাহ এলাকায় উন্মুক্ত জমি পানি ধারণ, পানি নিষ্কাশন, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। এসব জমির কার্যকারিতা সব জায়গায় এক রকম নয়, তাই ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন বিবেচনার আগে স্থানভিত্তিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন দরকার।শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করতে হলে জানতে হবে, সেখানে শিল্প গড়ে উঠলে কী ধরনের পরিবেশগত প্রভাব তৈরি হতে পারে, বন্যাপ্রবাহ ও পানি নিষ্কাশনের ওপর কী প্রভাব পড়বে এবং আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রা কতটা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত স্থান ভারী শিল্পের জন্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। নদীটি দীর্ঘদিন ধরে দখল ও দূষণের চাপ বহন করছে। এ অবস্থায় নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে পরিবেশগত বিধিবিধান, নদীর বর্তমান অবস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে।বণিক বার্তার প্রতিবেদনে ড্যাপের আরও একটি সংশোধনীর কথা বলা হয়েছে, যেখানে ঝিলমিল ও পূর্বাচলে পাঁচ কাঠা বা তার বেশি আয়তনের প্লটে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদন নেওয়ার শর্তে অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা এফএআর সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ধরনের সুবিধার নগর পরিকল্পনাগত যুক্তি ও সম্ভাব্য প্রভাবও স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কারণ আবাসন ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে নগরের ঘনত্ব, অবকাঠামোর সক্ষমতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের সম্পর্ক রয়েছে।বদলে যেতে শুরু করে টোটাইল বিলের চিত্র।ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করলেই পরিবেশগত ছাড়পত্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা অন্যান্য আইনগত বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে, প্রস্তাবিত ব্যবহার প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না।পরিকল্পনা সংশোধনের আগে জবাবদিহি চাইড্যাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সময়ের প্রয়োজনে সংশোধিত হতে পারে। নগরের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিকল্পনার পর্যালোচনাও প্রয়োজন। কিন্তু সংশোধনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নগরের বাস্তব সমস্যা সমাধান করা-প্রাকৃতিক সম্পদের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করে জমির ব্যবহার বদলে দেওয়া নয়।বণিক বার্তার প্রতিবেদনে রাজউক চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি সর্বশেষ সংশোধনী সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। প্রতিবেদনে তিনি আরও বলেছেন, ড্যাপের বিধি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কারিগরি কমিটির সুপারিশসহ নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজন রয়েছে। এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংশোধনীর পূর্ণাঙ্গ নথি, প্রস্তাবের উৎস, কারিগরি মূল্যায়ন এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। যদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়েও স্পষ্টভাবে জানা না থাকে, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, দায়িত্ব বণ্টন ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে প্রক্রিয়াগত অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট নথি ও অনুমোদনের ধারাবাহিকতা যাচাই করা প্রয়োজন। স্বচ্ছতার স্বার্থেই এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত।একই সঙ্গে বন্যাপ্রবাহ এলাকার ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনের আগে পানি প্রবাহ, পানি ধারণক্ষমতা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি নিয়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি সমীক্ষা করা দরকার। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকায় শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব এবং প্রযোজ্য আইনগত বিধিনিষেধের সঙ্গে সামঞ্জস্যও নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ, স্থানীয় বাসিন্দা ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মতামত গ্রহণের সুযোগ থাকলে সিদ্ধান্তের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।টোটাইল বিলের অভিজ্ঞতা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সেখানে একসময় জলাশয় সংরক্ষণের পরিকল্পনা ছিল, ভরাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও ছিল। কিন্তু এখন বিলটি পুরোপুরি ভরাট হয়ে সেখানে নির্মাণকাজ চলছে। এই পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিকল্পনায় সংরক্ষণের কথা থাকলেই প্রকৃতি সুরক্ষিত থাকে না। সংরক্ষণের বিধান কার্যকর করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা, নজরদারি ও জবাবদিহিও থাকতে হয়।অতীতের দখল ও ভরাটের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে নতুন ভূমি ব্যবহারনীতি গ্রহণ করা হলে একই ধরনের ঝুঁকি আরও বড় পরিসরে তৈরি হতে পারে। যে শহর ইতিমধ্যে জলাবদ্ধতা, দূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির চাপ বহন করছে, সেখানে অবশিষ্ট উন্মুক্ত স্থান ও জলপ্রবাহের পথের গুরুত্ব আরও বেশি করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।ঢাকা বাঁচবে কীভাবে?নদী ও জলাশয় রক্ষার জন্য প্রথম প্রয়োজন অবশিষ্ট জলাধারগুলোর সীমানা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করা। সরকারি মানচিত্র, ভূমি রেকর্ড, ড্যাপের শ্রেণিবিন্যাস এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মিলিয়ে দেখতে হবে-কোথায় দখল হয়েছে, কোথায় ভরাট চলছে এবং কোথায় রেকর্ডের অসংগতি রয়েছে। এসব তথ্য সমন্বিতভাবে প্রকাশ করা গেলে দখল শনাক্ত করা, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং দায়িত্ব নির্ধারণ সহজ হবে।দ্বিতীয়ত, দখল ও ভরাটের অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অবৈধ দখল হয়ে যাওয়ার পর উচ্ছেদ অভিযান চালানোর চেয়ে দখল শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা অনেক বেশি কার্যকর। এ জন্য নিয়মিত মাঠপর্যায়ের নজরদারি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় এবং অভিযোগের পর গৃহীত ব্যবস্থার স্বচ্ছ নথি থাকা জরুরি।তৃতীয়ত, ড্যাপের সর্বশেষ সংশোধনীগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করে সেগুলোর কারিগরি ভিত্তি ও পরিবেশগত প্রভাব ব্যাখ্যা করতে হবে। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানকে ভারী শিল্পের জন্য নির্ধারণ কিংবা বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্পের সুযোগ দেওয়ার মতো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের যুক্তি, সম্ভাব্য লাভ ও পরিবেশগত ঝুঁকি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।চতুর্থত, টোটাইল বিলের মতো জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলোর পৃথক তদন্ত প্রয়োজন। বিলের সীমানা ও পূর্ববর্তী শ্রেণিবিন্যাস, জমির রেকর্ড, ভরাটের সময়কাল, নির্মাণকাজের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ যাচাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যেখানে সম্ভব, জলাশয়ের অবশিষ্টাংশ ও পানি প্রবাহের পথ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ২০২২ সালে ‘ঢাকা বাঁচবে তো?’ প্রতিবেদন তৈরির সময় টোটাইল বিলের পাশে দাঁড়িয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলাম, আজও তার উত্তর খুঁজছি। একটি খালকে ব্যক্তিগত জমি হিসেবে দেখিয়ে বিক্রির চেষ্টা কীভাবে সম্ভব হয়? সংরক্ষণের জন্য চিহ্নিত একটি বিলের ওপর ভরাটের চাপ তৈরি হলেও কার্যকর প্রতিরোধ কেন নিশ্চিত করা যায় না? আর দীর্ঘদিনের দখল ও পরিবেশগত ক্ষতির অভিজ্ঞতার পরও ভূমি ব্যবহারের নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সেই অভিজ্ঞতা কতটা গুরুত্ব পায়?টোটাইল বিলের বর্তমান চিত্র এই প্রশ্নগুলোকে আরও জরুরি করে তুলেছে। যে জলাশয় একসময় ছিল, সেটি এখন ভরাট, সেখানে নির্মাণকাজ চলছে। এই পরিবর্তনের ছবি কেবল একটি জায়গার অতীত ও বর্তমানের পার্থক্য দেখায় না, এটি পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানও সামনে আনে। এখন প্রয়োজন, সেই ব্যবধানের কারণ অনুসন্ধান করা এবং ভবিষ্যতে যেন অন্য জলাশয়ের পরিণতিও একই না হয়, তা নিশ্চিত করা।এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া নদী রক্ষার ঘোষণা কিংবা নতুন পরিকল্পনা-কোনোটিই যথেষ্ট নয়।২০২৬ সালে এসে টোটাইল বিলের চিত্র পুরোটাই ভিন্ন।রূপ নিচ্ছে আবাসিক এলাকায়।বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: নদী হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া ধীর হলেও তার ক্ষতি সুদূরপ্রসারী। জলাশয় হারালে শুধু জমির চেহারা বদলায় না, বদলে যায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল এবং মানুষের বসবাসের পরিবেশ। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় নগরবাসীকেই-জলাবদ্ধতা, দূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার অবনতির মধ্য দিয়ে।উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। শিল্প, আবাসন ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু উন্নয়নের সিদ্ধান্তে জমির তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ব্যবহারই একমাত্র বিবেচ্য হতে পারে না। নদী, খাল, বিল ও বন্যাপ্রবাহ এলাকার পরিবেশগত মূল্যও পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। কারণ প্রাকৃতিক জলাধার একবার হারিয়ে গেলে কেবল অর্থ ব্যয় করে তার আগের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা কঠিন। যে জলাশয় দখল ও ভরাট থেকে রক্ষা করা যায়নি, তার পরিণতি থেকে শিক্ষা না নিয়ে নতুন করে নদীতীর ও বন্যাপ্রবাহ এলাকার ভূমি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে অতীতের ব্যর্থতা আরও বড় পরিসরে ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে। তাই রাষ্ট্রকে জবাব দিতে হবে-আগের অভিজ্ঞতা থেকে কী শিক্ষা নেওয়া হয়েছে, আর সেই শিক্ষা বাস্তব সিদ্ধান্তে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে?ঢাকাকে বাঁচাতে হলে নদী ও জলাভূমিকে উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে নয়, নগরকে টিকিয়ে রাখার অপরিহার্য প্রাকৃতিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পরিকল্পনার সার্থকতা জমির শ্রেণি বদলানোর ক্ষমতায় নয়, বরং মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য প্রকৃতির প্রয়োজনীয় জায়গাটুকু অক্ষুণ্ণ রাখতে পারার মধ্যে। নইলে একদিন হয়তো মানচিত্রে খাল-বিলের নাম থাকবে, পুরোনো নথিতে নদীর শাখার অস্তিত্বও পাওয়া যাবে-কিন্তু বাস্তবে সেগুলো খুঁজে পাওয়ার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তখন প্রশ্নটি আর শুধু নদী বাঁচবে কি না, তা থাকবে না- প্রশ্ন হবে, নদী ছাড়া এই শহর আদৌ কত দিন বাসযোগ্য থাকবে?লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টিভি

অস্পৃশ্যতার শিকল ভাঙার লড়াই

আমার বাড়ি উত্তরের জেলা বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার ডেমাজানী গ্রামে। আমাদের গ্রামে আমরাই একমাত্র রবিদাস পরিবার। রবিদাস একটি ঐতিহ্যবাহী জনগোষ্ঠী, যাদের পেশার সঙ্গে জুতা তৈরি, মেরামত ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের পরিবারের প্রতি উচ্চবর্ণের হিন্দুদের নেতিবাচক মনোভাব দীর্ঘদিনের। পরিবারের প্রায় সব সদস্যকেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে অস্পৃশ্যতামূলক আচরণের শিকার হতে হয়েছে। আমরা নয় ভাই-বোনের মধ্যে আমি অষ্টম। বড় দাদা-দিদিদের জীবনেও এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো আমাদের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এসব ঘটনার কিছু তাদের মুখে শুনেছি, আবার কিছু নিজের চোখেই দেখেছি।২০১৩ সালের দুর্গাপূজার কথা। তখন আমি ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। আমাদের পাড়ার সার্বজনীন মন্দিরে দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে পূজার্চনায় অংশ নিতে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করি। সে সময় অনেক মানুষের ভিড় থাকায় কেউ কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও প্রসাদ নেওয়ার জন্য মন্দিরে ঢুকতে বাধা দেন তৎকালীন দায়িত্বরত পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক। ২০০৫ সালে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তার কাছে তিন-চার মাস প্রাইভেট পড়েছিলাম। সেই সুবাদে তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতাম। দিনে যতবারই তার সঙ্গে দেখা হতো, ততবারই তাকে নমস্কার জানাতাম। তাকে যথেষ্ট সম্মান করতাম।যাহোক, তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি পা ধুয়ে মন্দিরে ঢুকছো?’ প্রত্যুত্তরে বললাম, ‘কীভাবে শুচিতা বজায় রেখে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়, সেটা অন্তত জানি। আপনি এমন কথা বললেন কেন, স্যার?’তার কাছ থেকে এমন আচরণ পেয়ে আমি ভীষণ ব্যথিত হয়েছিলাম। পরক্ষণেই তিনি আমতা আমতা করে বললেন, ‘তুমি জানো না তোমরা কী জাত? মুচি জাতের মানুষ পূজার সময় মন্দিরে ঢুকলে পূজার উপকরণ অপবিত্র হয়ে যাবে। দেবী দুর্গার পূজার পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যাবে। পূজার সময় মন্দিরের উপকরণে নিম্নজাতের মানুষের স্পর্শ করা অনুচিত।’কথাগুলো শোনার পর মনোকষ্ট ও অপমানবোধ থেকে প্রতিবাদ করে বলেছিলাম, ‘সার্বজনীন পূজামণ্ডপে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র-সনাতন ধর্মাবলম্বী সবার সমান অধিকার রয়েছে। আমরা সবাই হিন্দু। তাই পূজার্চনার অধিকারও সবার সমান। তা ছাড়া পূজার চাঁদা আমরাও দিই। সে ক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে এমন বৈষম্য আমি মানি না, মানব না। আপনার সামনেই মন্দিরে ঢুকে প্রসাদ নিয়ে আসছি। পারলে বাধা দিন।’ঘটনাটি সেখানেই শেষ হলেও এর ক্ষত আমার মনে গভীরভাবে থেকে যায়। বাড়ি ফিরে আমি আর কান্না থামাতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ আগেই রাগে-দুঃখে প্রতিবাদ করে এসেছি, অথচ বাড়িতে এসে নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। পরিবারের কাউকে প্রথমে কিছু বুঝতে দিইনি। কিন্তু মা বিষয়টি আঁচ করতে পারেন। তিনি জানতে চাইলে তাকে সব খুলে বলি।আমার অবিরাম কান্না দেখে মা-ও নিজেকে সামলাতে পারেননি। তিনি মন্দিরে গিয়ে প্রতিবাদ করতে চাইলে আমি তাকে থামাই। মা একেবারেই নিরক্ষর। কিন্তু সেদিন তিনি হঠাৎ এমন একটি কথা বলেছিলেন, যা আমার জীবনের জন্য গভীর শিক্ষণীয় হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা চর্মকার। যে ঢাক না বাজলে দেবী দুর্গার পূজা সম্পন্ন হয় না, সেই ঢাক তৈরির সঙ্গে আমাদের পেশার সম্পর্ক রয়েছে। আমরা যদি অস্পৃশ্য হই, তাহলে চামড়ার তৈরি ঢাকও অস্পৃশ্য। পূজামণ্ডপ থেকে সেই ঢাক আমি ছিনিয়ে আনব। দেখি, ঢাক ছাড়া দেবী মায়ের পূজা কীভাবে হয়!’ মায়ের সেই কথার মধ্যে ছিল শত বছরের বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আত্মমর্যাদার দাবি এবং জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যের প্রতি এক গভীর প্রশ্ন।২০১৩ সালের ঘটনার পরও আমাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের অবসান হয়নি। ২০২০ সালের দুর্গাপূজার সময় আমি দুর্গামন্দিরের একটি প্রদীপদানি স্পর্শ করায় আশুতোষ সাহা সেটি পুকুরে ফেলে দেন। একই সঙ্গে পূজায় নিযুক্ত পুরোহিতকে সতর্ক করে দেন, যাতে আমি কিংবা আমার পরিবারের কোনো সদস্য মন্দিরে প্রবেশ করতে না পারি।আমার প্রদীপদানি স্পর্শ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলাদা একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় আমি সাংগঠনিক কাজে বগুড়ার বাইরে অবস্থান করছিলাম। সভা চলাকালে আমাদের সংগঠনের একজন কর্মী ফোন করে আমাকে বিষয়টি জানান।একটি পূজামণ্ডপে ব্যবহৃত প্রদীপদানি স্পর্শ করার কারণে সেটি ফেলে দেওয়া এবং একটি পরিবারের সদস্যদের মন্দিরে প্রবেশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা আমাকে গভীরভাবে মর্মাহত করে। ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রবেশের মতো মৌলিক অধিকারের প্রশ্নটি যে কতটা অবহেলিত হতে পারে, তা আবারও উপলব্ধি করি।২০২১ সালে আমাদের সংগঠনের একজন কর্মীকেও অপমান করেন আমার সেই প্রাইভেট টিউটর। আমাদের পাড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন গোত্রের মানুষের বসবাস। রবিদাস ও রাজভর জনগোষ্ঠীর দুর্গাপূজার চাঁদা সংগ্রহের দায়িত্বে ছিল সেই কর্মীর। দুর্গাপূজার তৃতীয় দিন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের বাড়িতে সুজন সংগৃহীত চাঁদার টাকা জমা দিতে যান। কিন্তু সাধারণ সম্পাদক তার হাত থেকে টাকা না নিয়ে মাটিতে রাখতে বলেন। পরে মাটিতে রাখা টাকার ওপর জল ছিটিয়ে তিনি তা গ্রহণ করেন। চাঁদার টাকা সংগ্রহের সময় দু’-তিনজনের চাঁদা বাকি থাকায় সেই কর্মীকে ভর্ৎসনাও করা হয়। তাকে বলা হয়, ‘দুর্গাপূজা ফকিন্নিদের পূজা না, রাজা-বাদশার পূজা। ঠিকমতো পূজার চাঁদা দিতে না পারলে বারোয়ারিতে থাকার দরকার নেই।’ নিজের হাত থেকে টাকা গ্রহণ না করায় সেই কর্মী গভীর মনোকষ্টে কান্না করতে থাকে।সেদিন রাতে মন্দিরে গিয়ে সবার সামনে আমি এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এর ফলে পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও তার কতিপয় অনুসারীর বিরাগভাজন হয়ে পড়ি। তারা আমাদের অস্পৃশ্য মনে করতেন এবং আমার ও আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করতেন। এভাবে বছরের পর বছর ধরে আমাদের আত্মমর্যাদা ক্ষুন্ন করা হয়েছে। অথচ আমরা এই সমাজেরই মানুষ। আমরাও ধর্মীয় উৎসবে অংশ নিতে চাই, পূজার্চনা করতে চাই, অন্য সবার মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চাই।২০২২ সালের দুর্গাপূজার আগে আমার মনে আশঙ্কা জাগে, আগের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। এত দিন স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়ায় আমি অনেকটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত মানবাধিকারের এমন চরম লঙ্ঘনের প্রতিকার চেয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে গিয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিই।আমার মনে হয়েছিল, হয়তো কোনো সমাধানই হবে না। কিন্তু দুর্গাপূজার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিষয়ে পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদকে অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করে শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযোগকারী হিসেবে আমিও চিঠি পাই।এরপর থেকেই আমার এলাকায় অস্পৃশ্যতার বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হতে শুরু করে। অনেকেই এমন ঘটনার নিন্দা জানান এবং দ্রুত সমাধানের দাবি তোলেন। আমার সাহসী ভূমিকার জন্য কেউ কেউ প্রশংসা করেন, আবার কেউ কেউ একে বাড়াবাড়ি বলেও মন্তব্য করেন।তবে আমি বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট সন্তুষ্ট ছিলাম। কারণ, আমাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অমানবিক আচরণের একটি সুষ্ঠু সমাধান আসন্ন-এমন আশা করতে শুরু করেছিলাম। এরই মধ্যে বিভিন্ন মানুষের মাধ্যমে আমাকে বিষয়টি এখানেই শেষ করে দেওয়ার অনুরোধ, প্রস্তাব এমনকি হুমকিও দেওয়া হতে থাকে। কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থানে অটল ছিলাম। এমন কথাও প্রচার করা হয়, ‘মাস্টারের মতো সম্মানী ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিপন মামলা করেছে। এটা কি ঠিক?’আমি বিষয়টিকে ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখিনি। আমার কাছে এটি ছিল মানবাধিকার, সামাজিক মর্যাদা ও সমান অধিকারের প্রশ্ন। তাই জনমত গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে জমা দেওয়া আবেদনের ফটোকপি বিভিন্ন নাগরিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠন এবং সংগঠকদের কাছে পাঠাতে থাকি।এই উদ্যোগের ফলে অনেকেই জাতপাতের কুফল সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। তারা উপলব্ধি করতে পারেন, জাতপাতের ধারণা কীভাবে নীরব ঘাতকের মতো মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও সামাজিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। জনমত গঠনের এই প্রক্রিয়া আমাকে অনেক বেশি সাহস ও শক্তি জুড়িয়েছিল।অবশেষে পূর্বনির্ধারিত সময়ে উভয় পক্ষকে নিয়ে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইউএনও মহোদয় উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন। পরে বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে কারও প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন। অভিযুক্ত পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা নিয়ে বিষয়টির সমাধান করা হয়। আমিও অভিযোগকারী হিসেবে আমি পূজা কমিটির সঙ্গে মিলেমিশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে লিখিত দিই। পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদকে ও তার অনুসারীরা ভবিষ্যতে রবিদাসসহ দলিত জনগোষ্ঠীর সদস্যদের মন্দিরে প্রবেশ, পূজার্চনা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য না করার বিষয়ে লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেন। এভাবেই দীর্ঘদিনের অপমান, বঞ্চনা ও প্রতিবাদের পর মন্দিরে প্রবেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একটি ইতিবাচক সমাধান আসে।ঘটনাটির একটি সুষ্ঠু সমাধান এসেছে বলা যায়। কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরও জটিল। ওই দিনের পর থেকে আমি লক্ষ করেছি, পাড়ার বেশ কয়েকজন আমাকে এড়িয়ে চলেন। যদিও আমি তাদের সঙ্গে আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে মিশতে চেষ্টা করেছি। আমার জীবনের এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, অস্পৃশ্যতার শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত। জাতপাতের ধারণায় বিশ্বাসী মানুষের মধ্যে এমন এক মনস্তত্ত্ব গড়ে ওঠে, যা কেবল নির্দেশ কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাতারাতি বদলে দেওয়া সম্ভব নয়।আমরা যতই বৈষম্য বিলোপের আইন দাবি করি না কেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সমাজ থেকে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য দূর হবে না। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের পরিবর্তন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সম্মিলিত উদ্যোগে বৈষম্যবিরোধী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।তবে বাংলাদেশে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতা প্রতিরোধে কার্যকর আইন থাকা অত্যন্ত জরুরি। এমন আইন ও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জাতপাতের ধারণা থেকে উদ্ভূত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটানোর সাহস কেউ না পায়। পাশাপাশি অপরাধের প্রতিকার, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সেই সময়ের উদ্যোগ আমার পাড়ায় অন্তত মানবতার একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। আমি উপলব্ধি করেছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। বৈষম্যের শিকার হয়ে নীরব থাকলে বৈষম্য আরও শক্তিশালী হয়। নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সচেতনতা, সাহস, সংগঠিত উদ্যোগ এবং আইনি প্রতিকার গ্রহণের মানসিকতা থাকা জরুরি।আমার এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি পরিবারের কিংবা একটি জনগোষ্ঠীর মন্দিরে প্রবেশের অধিকারের লড়াই নয়; এটি মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। কোনো মানুষের পরিচয় তার পেশা, জন্ম কিংবা জাতপাত দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেরই সমান মর্যাদা, অধিকার ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রয়েছে।আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কাউকে তার জন্মপরিচয়ের কারণে অপমানিত হতে হবে না; যেখানে ধর্মীয় উপাসনালয়ের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে; যেখানে মানুষের মূল্যায়ন হবে তার মানবিক গুণাবলি ও কর্মের ভিত্তিতে, জাতপাতের পরিচয়ে নয়। মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে-পেশা কিংবা জাতপাতের পরিচয়ে নয়। এমন সমাজই আমাদের কাম্য।(মতামত লেখকের নিজস্ব)[লেখক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, বগুড়া-৫]

বাবার পরিচয়ে কি সন্তানের চাকরি আটকানো যায়

লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও শুধু পরিবারের কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা মামলার কারণে চূড়ান্ত নিয়োগ থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ নতুন নয়। সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগেও অনেক প্রার্থী এমন বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের জন্য এক যুগ আগের একটি রায় গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে। সে রায়ে হাইকোর্ট বলেছিলেন, প্রার্থীকে বিচার করতে হবে তার নিজের যোগ্যতা, চরিত্র ও পূর্ববৃত্তান্ত দিয়ে, বাবা-মায়ের রাজনৈতিক পরিচয় বা তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা দিয়ে নয়।শাহনাজ খাতুন ও মো. রাজশ খান ৩২তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় অংশ নেন। শাহনাজ ছিলেন স্বাস্থ্য ক্যাডারের সহকারী সার্জন পদের প্রার্থী, রাজশ সড়ক ও জনপথ ক্যাডারের সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদের প্রার্থী। তাদের বাবা মো. হাসান আলী একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সম্মানী ভাতা পেতেন।দুজনই প্রাথমিক বাছাই, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষাও সম্পন্ন করেন। কিন্তু ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর সরকার ১ হাজার ৬১৯ জনের নিয়োগের যে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে, তাতে তাদের নাম বা রোল নম্বর ছিল না।পরে তারা জানতে পারেন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ২০১৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের একটি গোপনীয় প্রতিবেদন তাদের নিয়োগ আটকে দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তাদের বাবা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন। অথচ দুই প্রার্থীর নিজেদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো অভিযোগ ছিল না, কোনো মামলাও ছিল না।এরপর তারা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন (রিট পিটিশন নম্বর ৪৮২ ও ৪৮৩/২০১৪)।প্রার্থীদের আইনজীবী মোহাম্মদ জিশান হায়দার দুটি যুক্তি তুলে ধরেন। প্রথমত, নাম বাদ দেওয়ার আগে প্রার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়নি, বক্তব্য শোনার সুযোগও দেওয়া হয়নি, যা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন। দ্বিতীয়ত, বাবার কারণে সন্তানকে বঞ্চিত করা সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) ও ২৯(১) অনুচ্ছেদের (সরকারি চাকরিতে সুযোগের সমতা) পরিপন্থী। তার মতে, সরকার প্রার্থীর উপযুক্ততা যাচাই করতে পারে, তবে সেই যাচাইয়ের যৌক্তিক সম্পর্ক থাকতে হবে প্রার্থীর নিজের যোগ্যতা, চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে।সরকারপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমাতুল করিম ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নুসরাত জাহান বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮১-এর ওপর নির্ভর করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, সরাসরি নিয়োগের আগে প্রার্থীর পূর্ববৃত্তান্ত যাচাই বাধ্যতামূলক এবং এনএসআইয়ের প্রতিবেদন নেতিবাচক হওয়ায় নিয়োগ দেওয়া যায়নি। তারা আরও বলেন, সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশ পেলেই নিয়োগ পাওয়ার নিরঙ্কুশ অধিকার তৈরি হয় না।বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দ ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৪ সালের ৪ জুন রায় দেন। আদালত প্রথমেই দেখেন, প্রার্থীদের পরীক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। বাবার বিষয়ে প্রতিবেদনের কথা সরকার জবাবি হলফনামায় কাগজপত্র দিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে অস্বীকারও করেনি। ২০১৪ সালের ১৩ জানুয়ারির একটি অফিস আদেশে এনএসআই ১৮ জন প্রার্থীর বিষয়ে "পুনঃ আপত্তি" জানিয়েছিল, কিন্তু এই দুজনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ কী, তা সেখানে বলা হয়নি।এরপর আদালত বিধিমালার ৩(৩)(খ) বিধির ভাষা বিশ্লেষণ করেন। বিধিটি বলছে, নির্বাচিত ব্যক্তির পূর্ববৃত্তান্ত উপযুক্ত সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করে তাকে প্রজাতন্ত্রের চাকরির অনুপযুক্ত মনে না হলে তবেই নিয়োগ দেওয়া যাবে। আদালতের ব্যাখ্যায়, যাচাইয়ের বিষয় হলেন প্রার্থী নিজে, তার পরিবারের অন্য কেউ নন।সরকার এমন কোনো তথ্য দেখাতে পারেনি যে প্রার্থীরা নিজেরা রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজে জড়িত। তাই আদালত বলে, বাবা রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত বা তার বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন, শুধু এই কারণে সন্তানদের নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা যায় না। বাবার রাজনৈতিক পরিচয় বা মামলা সন্তানের পূর্ববৃত্তান্ত হয়ে যায় না।আদালত গাজী জসিমউদ্দিন বনাম বাংলাদেশ (৫০ ডিএলআর ৩১) মামলার নীতি অনুসরণ করেন। সে মামলায় বলা হয়েছিল, সংবিধানের ২৭ ও ২৯ অনুচ্ছেদ সরকারকে যুক্তিসংগত নিয়োগবিধি, পরীক্ষা বা যোগ্যতা নির্ধারণে বাধা দেয় না। তবে সেই শর্ত হতে হবে যুক্তিসংগত, স্বেচ্ছাচারমুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট পদের উপযুক্ততার সঙ্গে যৌক্তিকভাবে সম্পর্কিত। কেবল রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে কাউকে আলাদা করে বাদ দিলে এবং একই নীতি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না করলে বৈষম্যের প্রশ্ন ওঠে।একই সূত্রে বাংলাদেশ বনাম মো. মতিয়ার রহমান (১৯৮২ বিএলডি (এডি) ১০৯) মামলার নীতিও উল্লেখ করা হয়। সরকারি কর্ম কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তাই তার সুচিন্তিত মতামত সরকারকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।অর্থাৎ প্রার্থীর পরিচ্ছন্ন অতীত, দেশের প্রতি আনুগত্য, ব্যক্তিগত সততা ও শৃঙ্খলা যাচাই করা বৈধ। কিন্তু যাচাইয়ের নামে নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন বা স্বেচ্ছাচারী বৈষম্য বৈধ নয়।হাইকোর্ট দুটি রুলই চূড়ান্ত (অ্যাবসলিউট) ঘোষণা করেন। ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে দুই আবেদনকারীর নাম অন্তর্ভুক্ত না করাকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনত অকার্যকর ঘোষণা করা হয়। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে শাহনাজ খাতুনকে সহকারী সার্জন এবং মো. রাজশ খানকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে নিয়োগ দিতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। রায়টি ৩ সিএলআর (এইচসিডি) ২০১৫-তে প্রকাশিত।এই রায় বিসিএস নিয়োগ বিধিমালার প্রেক্ষাপটে দেওয়া। তবে এর ভিত্তি সংবিধানের ২৭ ও ২৯ অনুচ্ছেদ, যা প্রজাতন্ত্রের সব চাকরির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সহকারী শিক্ষকের পদও তার বাইরে নয়। তাই যারা সব ধাপে উত্তীর্ণ হয়েও শুধু বাবা-মা বা স্বজনের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মামলার কারণে বাদ পড়েছেন, তাদের সামনে আইনি পথ খোলা আছে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

আমাদের অনিরাপদ পানির গল্প

গাজীপুর, শ্রীপুর ও ভালুকার বিভিন্ন এলাকায় মাটির ৩০ থেকে ৪০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যায়। কিন্তু সেই পানি এখন আর আগের মতো পান করার উপযোগী থাকছে না। অনেক ক্ষেত্রে পানিতে দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির বিভিন্ন গুণগত মানদণ্ডও ঠিক থাকছে না। বিশেষ করে কারখানার আশপাশের পানিতে এ ধরনের সমস্যা বেশি দেখা যায়। তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?দীর্ঘদিন ধরে পানি পরিশোধন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করছি। বিভিন্ন দেশের মানুষ আমাদের কাছে আসেন। তাদের সঙ্গে পানি নিয়ে কথা হয়। তাদের পানিসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা জানতে চাই। তাদের কথা শুনি, ভাবি এবং বোঝার চেষ্টা করি। আমাদের দেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় অনেক পার্থক্য রয়েছে। তবু তাদের অভিজ্ঞতা ও ধারণা থেকে শেখার চেষ্টা করি। যেসব দেশে পানির সংকট তীব্র, সেসব দেশের মানুষ পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। আমরাও এখন খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। ঢাকা শহরের পানির পরিস্থিতি নাজুক। ঢাকা ওয়াসাও নানা বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।আমরা বিভিন্ন জায়গায় শূন্য তরল বর্জ্য নির্গমন বা জেডএলডি নিয়ে কাজ করছি। এর অর্থ হলো, পানি পরিশোধন করে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে তরল বর্জ্য নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনা। সেদিন মালয়েশিয়ার একজন বিশেষজ্ঞ এসেছিলেন। তার সঙ্গে অনেক কথা হলো। তিনি আমাদের বুড়িগঙ্গা নদীও দেখেছেন। আমাকে বললেন, ‘তোমাদের পানির প্রতি এমন অযত্ন দেখে আমি সত্যিই কষ্ট পেয়েছি।’এ প্রসঙ্গে তিনি একটি গল্প শোনালেন। একবার দক্ষিণ আফ্রিকার একটি শুষ্ক অঞ্চলে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে একটি শিশু অসুস্থ ছিল। জ্বরের কারণে তীব্র পিপাসায় শিশুটি মায়ের কাছে পানি খাওয়ার জন্য বারবার কাকুতি-মিনতি করছিল। কিন্তু মা কোথাও পানি পাচ্ছিলেন না। তাদের দেশে একধরনের ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয়, যা পুকুর বা জলাশয়ের পানিতে দিলে দ্রুত ময়লা নিচে জমে যায় এবং পানি কিছুটা পরিষ্কার হয়। তিনি ঘর থেকে সেই ট্যাবলেট নিয়ে এলেন।একটি অপরিষ্কার পুকুরে ট্যাবলেটটি প্রয়োগ করলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যে ময়লাগুলো নিচে জমে গেল। ওপরের পানি কিছুটা স্বচ্ছ হয়ে উঠল। আমি সেই দৃশ্য দেখছিলাম।কিছুক্ষণ পর শিশুটির মা একটি পেয়ালায় পানি তুলে তাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করলেন। তীব্র পিপাসায় শিশুটি পানি খেতে মুখ বাড়িয়েও শেষ মুহূর্তে মুখ ফিরিয়ে নিল। আমি বুঝতে পারলাম, পানির স্বাদ খুব খারাপ। দেখতে পরিষ্কার মনে হলেও পানি ছিল অনেকটা আঠালো ও ঘন। মা অন্য জায়গা থেকে আবার পানি তুলে শিশুটিকে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু শিশুটি সেই পানিও খেল না। নিজের আঞ্চলিক ভাষায় বারবার পানি চেয়ে যেতে লাগল।সন্তানকে পানি খাওয়াতে না পেরে মা কাঁদতে শুরু করলেন। দৃশ্যটি দেখে আমার চোখ দিয়েও পানি গড়িয়ে পড়ছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল হাউমাউ করে কাঁদি। শেষ পর্যন্ত কাঁদতে কাঁদতে নিজের ব্যাগে থাকা সামান্য পানি শিশুটিকে দিলাম।সেই মুহূর্তের আনন্দ ছিল পৃথিবীর সেরা আনন্দগুলোর একটি। পানির জন্য মানুষ কতটা কষ্টে আছে, সাঈদ, তুমি বিশ্বাসও করতে পারবে না—বিশেষজ্ঞ আমাকে এ কথাই বলেছিলেন।কথা বলতে বলতে তিনি আবারও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। তার চোখে জল এসে গেল। আমি তার অনুভূতি বুঝতে পারছিলাম।শেষে তিনি বললেন, ‘তোমাদের নতুন প্রজন্মকে পানি নিয়ে কথা বলতে শেখাও। পানি রক্ষা করতেই হবে। পানি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তোমাদের নদীগুলোর যত্ন নাও।’এমন আবেগঘন গল্প শুনে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। অথচ আমাদের দেশের পাহাড়ি অঞ্চলেও পানির সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। অনেক জায়গায় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পানির সন্ধানে আমরা মাটির আরও গভীরে যাচ্ছি। একসময় হয়তো মাটির এত গভীরে যেতে হবে যে লাভা উঠে আসবে, তবু পানি মিলবে না। অথচ এসব দেখেও আমরা যেন অবাক হচ্ছি না, উদ্বিগ্নও হচ্ছি না।যা-ই হোক, সীমিত সামর্থ্য নিয়েও আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে গবেষণা, পানি পরিশোধন এবং পুনর্ব্যবহারের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। নদী, খাল, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎসগুলো রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে পানির গুরুত্ব বোঝাতে হবে। নিরাপদ পানি শুধু আমাদের প্রয়োজন নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারও। পৃথিবীতে নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেই হবে।[লেখক: রসায়নবিদ]

ডার্ক ম্যাটারের সন্ধানে ন্যান্সি রোমান টেলিস্কোপ

রাতের আকাশে খালি চোখে দেখা তারকা কিংবা দূরবীক্ষণ যন্ত্রে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নক্ষত্ররাজি—সব মিলিয়ে মহাবিশ্বের দৃশ্যমান পদার্থের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ। বাকি ২৭ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার বা অন্ধকার পদার্থ এবং ৬৮ শতাংশ ডার্ক এনার্জি বা অন্ধকার শক্তি।১৯২৯ সালে এডউইন হাবল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখান, গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বিষয়টি বোঝার জন্য একটি রাবারের ফিতার ওপর কয়েকটি পিঁপড়া বসিয়ে ফিতাটি টানার কথা কল্পনা করা যেতে পারে। পিঁপড়াগুলো নিজ নিজ অবস্থানে থাকলেও ফিতাটি যত প্রসারিত হবে, তারা পরস্পর থেকে তত দূরে সরে যাবে। তবে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের বিষয়টি এর চেয়ে অনেক জটিল। গ্যালাক্সিগুলো শুধু নিজ নিজ অবস্থানে স্থির নয়, তাদের মধ্যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণও কাজ করে। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, গ্যালাক্সির গতি এবং ডার্ক ম্যাটারের ভূমিকা বুঝতে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন।১৯৫৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর হাবলের মৃত্যুর পরও মহাবিশ্বের প্রকৃতি নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যায়। ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে গঠিত? ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি কী? মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ভবিষ্যৎই বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আরও উন্নত মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে ন্যান্সি গ্রেস রোমানসহ অনেক বিজ্ঞানী ও মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা উন্নত টেলিস্কোপ নির্মাণের পক্ষে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ন্যান্সি গ্রেস রোমান এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। মহাকাশ গবেষণায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পরবর্তী সময়ে তাঁর নামেই একটি স্পেস টেলিস্কোপের নামকরণ করা হয়।ন্যান্সি গ্রেস রোমান ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নাসার জ্যোতির্বিজ্ঞান কর্মসূচির প্রথম প্রধানদের একজন এবং সংস্থাটির প্রথম নারী নির্বাহীদের অন্যতম ছিলেন। মহাকাশে দূরবীক্ষণ যন্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। হাবল স্পেস টেলিস্কোপের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই তাঁর কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল।জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ও ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের কাজের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ২০২১ সালের ২৫ ডিসেম্বর উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে সূর্য-পৃথিবী ব্যবস্থার দ্বিতীয় ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দুতে অবস্থান করে। এর প্রধান লক্ষ্য মহাবিশ্বের প্রাচীনতম গ্যালাক্সি ও নক্ষত্রের সন্ধান করা এবং মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ের বিবর্তন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। অন্যদিকে, ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের পরিকল্পনায় রয়েছে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, ডার্ক এনার্জি, ডার্ক ম্যাটার এবং সৌরজগতের বাইরের গ্রহ নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা। এটি আকাশের বড় অংশ দ্রুত পর্যবেক্ষণ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে বিপুলসংখ্যক গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্লানেট সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।ডার্ক ম্যাটার সরাসরি আলো নির্গত বা প্রতিফলিত করে না বলে সাধারণ টেলিস্কোপে তা দেখা যায় না। তবে এর মহাকর্ষীয় প্রভাব থেকে এর উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হওয়ার পেছনে দায়ী বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। রোমান টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ এসব রহস্য সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা দিতে পারে। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে কীভাবে চলবে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও এর গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে মহাবিশ্ব একসময় সংকুচিত হয়ে আবার একটি বিন্দুতে ফিরে যাবে কি না, তা এখনো অমীমাংসিত প্রশ্ন। ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া গেলে মহাবিশ্বের সুদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা স্পষ্ট হতে পারে।রোমান টেলিস্কোপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো এক্সোপ্লানেট বা সৌরজগতের বাইরের গ্রহ অনুসন্ধান। আমাদের সৌরজগতের বাইরে ইতিমধ্যে হাজার হাজার গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর কোনো কোনোটি আকার বা পরিবেশের দিক থেকে পৃথিবীর সঙ্গে তুলনীয়। তবে কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। রোমান টেলিস্কোপ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে বিপুলসংখ্যক গ্রহ শনাক্ত করতে সহায়তা করবে। এর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গ্রহের গঠন, বৈশিষ্ট্য এবং সৌরজগতের বাইরে প্রাণের উপযোগী পরিবেশের সম্ভাবনা সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।মহাবিশ্ব কি শুধু পৃথিবীর প্রাণের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে—এ প্রশ্ন মানুষের কৌতূহলকে যুগ যুগ ধরে তাড়িত করেছে। মহাবিশ্বের বিশালত্ব বিবেচনায় অন্য কোথাও প্রাণ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে সম্ভাবনা আর প্রমাণ এক বিষয় নয়। দূরবর্তী কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পেতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। রোমান টেলিস্কোপের মতো উন্নত প্রযুক্তি সেই অনুসন্ধানকে এগিয়ে নিতে পারে। হয়তো ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহের সন্ধান পাবেন। সেখানে পৌঁছানো মানুষের পক্ষে সম্ভব না হলেও দূর থেকে তার পরিবেশ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হতে পারে। মহাবিশ্বের অজানা রহস্য উন্মোচনে এই অনুসন্ধান তাই বিজ্ঞানকে নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।[লেখক: প্রাবন্ধিক]

লালনের সেই সোনার মানুষ কই

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—মরমি সাধক ফকির লালন শাহের এই বাণী কেবল গানের পঙ্‌ক্তি নয়, মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পাওয়ার আহ্বান। জাতপাত, ধর্মীয় বিভেদ, সামাজিক বৈষম্য ও অহংকারের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা।অথচ লালনের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে তিন দিনব্যাপী মেলায় গিয়ে প্রশ্ন জেগেছে—লালনের গান ও উৎসব আছে, কিন্তু তার দর্শনের প্রতিফলন কোথায়?এই প্রশ্নের সঙ্গে সোমবারের (১৯ অক্টোবর) উদ্বেগজনক ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সকালে ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়ির প্রবেশপথের পাশ থেকে একটি টাইম বোমা ও পেট্রলভর্তি দুটি বোতল উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরে পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল সন্দেহজনক বস্তুটি পরীক্ষা করে নিষ্ক্রিয় করে। এ ঘটনায় মাজার ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাধুদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়। যে আখড়াবাড়িতে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে মানবতার বাণী শোনার কথা, সেখানে এমন বিপজ্জনক বস্তু উদ্ধারের ঘটনা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।গানের চেয়েও বড় জীবনদর্শনফকির লালন শাহ, যিনি লালন সাঁই নামেও পরিচিত, ছিলেন বাংলার মরমি সাধক, বাউলগানের রচয়িতা ও মানবতাবাদী দার্শনিক। তার জন্মসাল ও জন্মস্থান নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বহুল প্রচলিত মত অনুযায়ী, তার জন্ম ১৭৭৪ সালে। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় তিনি তিরোধান করেন।লালনের গুরুত্ব শুধু তার গানের সুরে নয়, গানের অন্তর্নিহিত জীবনদর্শনে। ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’—এই গানের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের পরিচয়, জাতপাতের বিভাজন এবং সামাজিক সংকীর্ণতাকে প্রশ্ন করেছেন। তার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, আত্মোপলব্ধি, সাম্য, সহমর্মিতা ও অন্তরের শুদ্ধতা। বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষের প্রকৃত মূল্য তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের ধর্মীয় পরিচয় দেখে তাকে ছোট করা, সামাজিক অবস্থান দিয়ে মর্যাদা নির্ধারণ করা কিংবা নিজের অহংকারকে সত্যের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া—এসব প্রবণতার বিপরীতে লালনের দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লালনের গানের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন এবং তার গান বৃহত্তর শিক্ষিত সমাজে পরিচিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু লালনকে যথার্থভাবে বোঝার জন্য তার গান শোনাই যথেষ্ট নয়; গানের ভেতরের প্রশ্নগুলো নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করাও জরুরি।দর্শনের চর্চা কোথায়লালনের তিরোধান দিবস উপলক্ষে প্রতিবছর ছেঁউড়িয়ায় বাউল, সাধক, ভক্ত, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। গান, সাধুসঙ্গ ও লোকসংস্কৃতির এই আয়োজন বাংলার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মেলায় মানুষের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা কিংবা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কোনো দোষ নেই।সাধুসঙ্গকিন্তু উৎসবের আকার বড় হলেই কি লালনের দর্শনের চর্চা বাড়ে? মেলায় গিয়ে আমার উপলব্ধি হয়েছে, লালনের মানবতাবাদ, জাতপাতবিরোধী অবস্থান ও আত্মোপলব্ধির দর্শন নিয়ে গভীর আলোচনা যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, তার তুলনায় গান, দর্শনার্থীদের ভিড় ও বাণিজ্যিক তৎপরতাই বেশি দৃশ্যমান।লালনের নামে মঞ্চ তৈরি করা সহজ; তার আদর্শে নিজেকে গড়ে তোলা কঠিন। তার গান গাওয়া সহজ; নিজের ভেতরের বিদ্বেষ, লোভ, অহংকার ও সংকীর্ণতাকে প্রশ্ন করা কঠিন। আখড়াবাড়ি কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়, এটি সাধন-ঐতিহ্যের কেন্দ্র। এখানে গান ও উৎসবের পাশাপাশি সাধুসঙ্গ, দর্শনভিত্তিক আলোচনা, গবেষণা এবং আত্মজিজ্ঞাসার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। কত মানুষ এলেন, তার পাশাপাশি কত মানুষ লালনের দর্শন বুঝলেন এবং নিজেদের আচরণে তার প্রতিফলন ঘটালেন—সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।লালনের মেলায় বাণিজ্য, মানুষের প্রতি দায় কতটুকু? তিরোধান দিবসের আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। পরিবহন, খাবার, আবাসন ও হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের ব্যবসা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু উৎসবের সুযোগ নিয়ে খাবারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো কিংবা আবাসিক হোটেলের ভাড়া কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য দুর্ভোগ তৈরি করতে করেছে।মেলায় গিয়ে আমার অভিজ্ঞতায় এসব বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। উৎসবের সময় চাহিদা বাড়লেও মানুষের অসহায়ত্বকে ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখা কতটা মানবিক? লালনের দর্শন যদি আয়োজনের ব্যবস্থাপনাতেই প্রতিফলিত না হয়, তাহলে শুধু তাঁর নামে উৎসব করলেই কি সেই দর্শনের প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো হয়?স্মরণ নয়, ধারণ করতে হবেলালনকে নিয়ে গবেষণা মানে শুধু তার জীবনের তথ্য সংগ্রহ কিংবা গানের সুর বিশ্লেষণ নয়। তার দর্শনের সামাজিক তাৎপর্য অনুধাবন করাও জরুরি। জাতপাত, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, শ্রেণিবৈষম্য ও মানুষের প্রতি মানুষের অবজ্ঞার মধ্যে লালনের চিন্তা কীভাবে প্রাসঙ্গিক, তা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। লালন কেবল গানের মানুষ নন; তিনি প্রশ্ন করার মানুষ। তিনি প্রচলিত সামাজিক বিভাজনকে প্রশ্ন করেছেন, মানুষের অন্তর্গত সত্তাকে চিনতে আহ্বান জানিয়েছেন। তার দর্শনকে মঞ্চ, মাইক, একতারা কিংবা উৎসবের ব্যানারে আটকে রাখলে তার প্রতি যথার্থ সম্মান জানানো হয় না।লালনের গান গাইব, অথচ মানুষের ধর্মীয় পরিচয় দেখে তাকে ছোট করব; তার মানবতার বাণী প্রচার করব, অথচ অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখাব না—এ কেমন লালনচর্চা?সেই সোনার মানুষ কই?ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস আমাদের সামনে আবারও প্রশ্ন তুলেছে—আমরা লালনকে কতটা ধারণ করি? গান হোক, উৎসব হোক, সাধুসঙ্গ হোক, গবেষণা হোক—সবকিছুর কেন্দ্রে থাকুক মানুষ। লালনের দর্শন ধারণ করা মানে মানুষের প্রতি বিদ্বেষ কমানো, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের পরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং নিজের ভেতরের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে লড়াই করা।আখড়াবাড়িতে লেখক (বাম দিকে)।১৯ অক্টোবরের ঘটনাটি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসুক, অপরাধীরা শনাক্ত হোক এবং মাজারে আগত সাধু-ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। একই সঙ্গে এই দিনটি আমাদের বিবেকের কাছেও একটি প্রশ্ন রেখে যাক: লালনের স্মৃতিকে আমরা কতটা মর্যাদা দিতে পেরেছি? তার মানবতাবাদী আদর্শ আমাদের সমাজে কতটা জীবন্ত? উৎসবের আলো একসময় নিভে যাবে, মেলার দোকানপাট উঠে যাবে, দর্শনার্থীরা ফিরে যাবেন নিজ নিজ গন্তব্যে। কিন্তু লালনের দর্শন কি তাদের সঙ্গে ফিরবে? তাদের চিন্তা, আচরণ ও সামাজিক সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আনবে?লালনের সেই ‘সোনার মানুষ’ কোনো বিশেষ পোশাকের মানুষ নন, কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ নন। তিনি সেই মানুষ, যাঁর মধ্যে রয়েছে মানবিকতা, বিবেক, ভালোবাসা ও অন্যের প্রতি সম্মান। তাই এত মানুষের ভিড়ে আমার প্রশ্ন থেকেই যায়—লালন মেলায় সেই সোনার মানুষ কই?লালনের নামে উৎসব হোক, গান হোক, সাধুসঙ্গ হোক, গবেষণা হোক। কিন্তু তার দর্শন বেঁচে থাকুক আমাদের হৃদয়ে, আচরণে ও সমাজে। কারণ লালনকে স্মরণ করার চেয়ে তাকে ধারণ করা অনেক বেশি জরুরি।লেখক: নাসির উদ্দিন পাঠান, গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা।

খাদ্যনিরাপত্তায় উৎপাদনের পাশাপাশি চাই পুষ্টি ও সুরক্ষা

খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত, মৌলিক অধিকার এবং সুস্থ, মর্যাদাপূর্ণ ও কর্মক্ষম জীবনের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তা বলতে কেবল মানুষের পেট ভরানোর মতো খাবারের জোগান নিশ্চিত করাকে বোঝায় না। খাদ্য হতে হবে পর্যাপ্ত, সহজলভ্য, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও পুষ্টিকর। সেই সঙ্গে খাদ্যপ্রাপ্তির সুযোগ এমন হতে হবে, যাতে আয়, শ্রেণি, লিঙ্গ, অঞ্চল কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে কেউ পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত না হন। অতএব, খাদ্যনিরাপত্তা একই সঙ্গে কৃষি, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।বাংলাদেশ গত পাঁচ দশকে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যপ্রাপ্যতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধান উৎপাদনে সাফল্য, মাছ, ডিম ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি, কৃষিপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের নিরলস পরিশ্রম দেশের খাদ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন ও জটিল সংকটও দেখা দিয়েছে। খাদ্যের দাম ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধান, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, কৃষিজমির সংকোচন, খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ, পুষ্টিহীনতা, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তার এবং খাদ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।ফলে আজ বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে কি না; বরং প্রশ্ন হলো, প্রত্যেক মানুষ কি সারা বছর সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পাচ্ছেন? কৃষক কি তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন? ভোক্তা কি খাবারের প্রকৃত গুণমান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানতে পারছেন? আর রাষ্ট্র কি খাদ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে পারছে?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে খাদ্যনিরাপত্তাকে একটি সমন্বিত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।খাদ্যনিরাপত্তার ধারণা: খাদ্য থাকা আর খাদ্য পাওয়ার মধ্যে পার্থক্যজাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা—এফএওর স্বীকৃত ধারণা অনুযায়ী, খাদ্যনিরাপত্তা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সব মানুষ সব সময় সক্রিয় ও সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পাওয়ার বাস্তব সুযোগ রাখেন। এ ধারণার চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ রয়েছে—খাদ্যের প্রাপ্যতা, খাদ্য সংগ্রহের সামর্থ্য, খাদ্যের যথাযথ ব্যবহার ও পুষ্টিমান এবং সময়ের সঙ্গে খাদ্যপ্রাপ্তির স্থিতিশীলতা।খাদ্যের প্রাপ্যতা বলতে বোঝায় দেশে উৎপাদন, আমদানি ও মজুতের মাধ্যমে পর্যাপ্ত খাদ্যের জোগান থাকা। কিন্তু বাজারে খাদ্য থাকলেই প্রত্যেক মানুষ তা কিনতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। খাদ্যের দাম যদি পরিবারের আয়কে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে বাজারে পণ্য থাকা সত্ত্বেও সেই পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। আবার খাবার পাওয়া গেলেও তা দূষিত, ভেজালযুক্ত কিংবা পুষ্টিগতভাবে অপর্যাপ্ত হলে মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হয় না।এখানে স্থিতিশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পরিবার স্বাভাবিক সময়ে খাবার কিনতে পারলেও বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, বেকারত্ব, অসুস্থতা কিংবা দ্রব্যমূল্যের আকস্মিক বৃদ্ধির সময় খাদ্য কেনার সামর্থ্য হারাতে পারে। খাদ্যনিরাপত্তা তাই এক দিনের বা এক মৌসুমের অর্জন নয়; এটি সারা বছর ধরে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার বিষয়।খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে খাদ্য সুরক্ষা বা নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। খাদ্যনিরাপত্তা মূলত পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা বোঝায়; অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্য বলতে এমন খাদ্য বোঝায়, যা উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রস্তুতির বিভিন্ন পর্যায়ে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য ও নিরাপদ রাখা হয়েছে। এই দুই ক্ষেত্রকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পর্যাপ্ত খাবার থাকলেও তা নিরাপদ না হলে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।বৈশ্বিক খাদ্যসংকট ও বাংলাদেশের বাস্তবতাবিশ্বে কৃষি উৎপাদন, প্রযুক্তি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হলেও ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর The State of Food Security and Nutrition in the World 2024 প্রতিবেদনে ২০২৩ সালে প্রায় ৭৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষের ক্ষুধার্ত থাকার হিসাব তুলে ধরা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে প্রায় ২৮০ কোটির বেশি মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য না থাকার বিষয়টিও উঠে আসে।এই সংকটের পেছনে শুধু খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি দায়ী নয়। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংঘাত, দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং খাদ্যবাজারের অস্থিরতা এর সঙ্গে জড়িত। কোথাও খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে, কিন্তু সংঘাতের কারণে তা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না; কোথাও খাদ্য আছে, কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা নেই; আবার কোথাও পুষ্টিকর খাবারের তুলনায় সস্তা ও নিম্নমানের খাবারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়। দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, নিম্ন আয়ের মানুষের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা এবং আয়বৈষম্য খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অসমতা তৈরি করে। একজন সচ্ছল মানুষের জন্য যে খাদ্যতালিকা সহজলভ্য, একজন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের জন্য তা অনেক সময় নাগালের বাইরে থাকে।বিশেষত চালের ওপর অতিনির্ভরতা, খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, দুধ, ডিম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের সীমিত উপস্থিতি এবং পরিবারের খাদ্য ব্যয়ের বড় অংশ মৌলিক খাদ্যে ব্যয় হওয়ার কারণে পুষ্টিনিরাপত্তা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে খাদ্য উৎপাদনের সাফল্যকে মানুষের পুষ্টিগত অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করা জরুরি।উৎপাদনে সাফল্য, তবু কেন খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ?বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। স্বাধীনতার পর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চফলনশীল জাত, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, সার ও কৃষি উপকরণের ব্যবহার, কৃষি গবেষণা এবং কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও শ্রমের ফলে ধান উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। মাছ, ডিম, মুরগি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদনেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।তবে কৃষি উৎপাদনের সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সহজ নয়। কৃষিজমি কমে যাওয়া, জমির খণ্ডিত মালিকানা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিকসংকট, সেচের পানির প্রাপ্যতা, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কৃষকের আয় ও উৎপাদনব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।অনেক ক্ষেত্রে কৃষক উৎপাদন ব্যয় অনুযায়ী ন্যায্য মূল্য পান না, অথচ ভোক্তাকে একই পণ্য বেশি দামে কিনতে হয়। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যবর্তী সরবরাহব্যবস্থায় অদক্ষতা, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণের ঘাটতি এবং বাজার তদারকির দুর্বলতা এই ব্যবধান বাড়াতে পারে।কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হলে পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদনে বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যায়। অন্যদিকে, ভোক্তার কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য পৌঁছাতে না পারলে খাদ্যপ্রাপ্যতা বাধাগ্রস্ত হয়। তাই কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে ন্যায্য ও কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত নীতির লক্ষ্য।এ জন্য কৃষিপণ্যের সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনা, বাজারদর ও আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করতে হবে। পাশাপাশি কৃষক সমবায়, উৎপাদক সংগঠন, কৃষিপণ্যের স্থানীয় বাজার এবং সরাসরি বিপণনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।জলবায়ু পরিবর্তন: খাদ্যনিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি হুমকিবাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদন ও নিরাপদ পানির প্রাপ্যতাকে কঠিন করে তুলছে। লবণাক্ত জমিতে প্রচলিত ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে; আবার পানির সংকট, দুর্যোগে ফসলহানি এবং জীবিকার অনিশ্চয়তা দরিদ্র পরিবারগুলোকে বাড়তি ঝুঁকিতে ফেলে।হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা ধানের ফসল নষ্ট করতে পারে। চরাঞ্চলে নদীভাঙন মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি কেড়ে নেয়। উত্তরাঞ্চলে খরা ও তাপপ্রবাহ কৃষি উৎপাদন এবং সেচের ব্যয় বাড়াতে পারে। দুর্যোগের ক্ষতি শুধু মাঠের ফসলেই সীমাবদ্ধ থাকে না; খাদ্য পরিবহন, বাজার, গবাদিপশু, মৎস্যসম্পদ এবং পরিবারের আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এখন আর ঐচ্ছিক কোনো কর্মসূচি নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। লবণাক্ততা, খরা ও বন্যাসহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, পানিসাশ্রয়ী সেচ, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাসভিত্তিক কৃষি পরামর্শ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী দ্রুত পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না; কৃষক যেন প্রয়োজনীয় বীজ, প্রশিক্ষণ, ঋণ ও বাজারসুবিধা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।একই সঙ্গে ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। খাদ্যব্যবস্থাকে শুধু ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল রাখলে পুষ্টি, মাটির স্বাস্থ্য ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ডাল, তেলবীজ, ফলমূল, শাকসবজি, মাছ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ: নীরব জনস্বাস্থ্যঝুঁকিখাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো খাদ্যদূষণ ও ভেজাল। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিক্রয় ও রান্না—প্রতিটি পর্যায়ে অসতর্কতা, অনিয়ম কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহারের কারণে খাদ্য অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।রাসায়নিক দূষণ, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু, অননুমোদিত রং, অনুপযুক্ত সংরক্ষণকারী পদার্থ এবং জীবাণুজনিত দূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি, নিরাপদ পানির অভাব, কাঁচা ও রান্না করা খাবার একসঙ্গে রাখা এবং সঠিক তাপমাত্রায় খাদ্য সংরক্ষণ না করাও খাদ্যবাহিত অসুস্থতার কারণ হতে পারে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বহুল উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হন এবং প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই পরিসংখ্যান নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বৈশ্বিক গুরুত্ব তুলে ধরে।বাংলাদেশে খাদ্যবাজারের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ এবং কার্যকর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। কোনো পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেলে শুধু জরিমানা করেই দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়; দূষণের উৎস শনাক্ত, সরবরাহব্যবস্থা অনুসন্ধান এবং প্রয়োজন হলে পণ্য প্রত্যাহারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।তবে খাদ্যে ভেজালের বিষয়ে প্রচারিত বিভিন্ন পরিসংখ্যান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। কোন পণ্য, কোন এলাকা, কোন সময় এবং কী পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়েছে—এসব তথ্য ছাড়া একটি নমুনার ফলাফলকে পুরো দেশের খাদ্যবাজারের চিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। নির্ভরযোগ্য তথ্য ও স্বচ্ছ পরীক্ষণব্যবস্থাই জনআস্থা বাড়ানোর ভিত্তি।খাদ্য নিরাপদ রাখার দায়িত্ব শুধু বিক্রেতার নয়। কৃষক, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহনকারী, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা, রেস্তোরাঁ, সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ভোক্তা—সবার দায়িত্ব রয়েছে। তবে দায়িত্বের এই বণ্টন যেন উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের আইনগত দায়কে দুর্বল না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিহীনতা: পেট ভরলেই সুস্থতা আসে নাএকটি দেশের খাদ্যব্যবস্থা সফল কি না, তা শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি রয়েছে কি না, শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক হচ্ছে কি না, নারীরা পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছেন কি না এবং দরিদ্র পরিবারগুলো স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারছে কি না—এসব সূচকও সমান গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে শিশুদের খর্বাকৃতি, রক্তস্বল্পতা, অপুষ্টি এবং খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্যের ঘাটতি দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্যগত উদ্বেগ। বিশেষত গর্ভবতী নারী, দুগ্ধদানকারী মা, শিশু, কিশোরী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা পুষ্টির ঘাটতির ঝুঁকিতে বেশি থাকেন।শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিন—গর্ভধারণ থেকে দ্বিতীয় জন্মদিন পর্যন্ত—শারীরিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে শিশুর বৃদ্ধি, শেখার ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। তাই মাতৃপুষ্টি, বুকের দুধ খাওয়ানো, বয়স অনুযায়ী পরিপূরক খাবার, টিকাদান এবং সংক্রমণ প্রতিরোধকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাশ্রয়ী মূল্যে ডাল, ডিম, মাছ, দুধ, শাকসবজি ও ফলমূলের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। স্কুলের খাদ্য ও পুষ্টি কর্মসূচি, দরিদ্র পরিবারের সামাজিক সুরক্ষা, মাতৃ ও শিশুপুষ্টি কার্যক্রম এবং পুষ্টিশিক্ষাকে আরও কার্যকর করতে হবে।এখানে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা জরুরি: দরিদ্র পরিবারকে শুধু স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে পুষ্টিনিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। খাবার কেনার সামর্থ্য, বাজারে প্রাপ্যতা এবং নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত না হলে পুষ্টিশিক্ষার সুফল সীমিত থেকে যায়।অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তার: খাদ্যাভ্যাসের নতুন সংকটবাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তার আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে প্যাকেটজাত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তার। বিস্কুট, চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, মিষ্টি পানীয়, মিষ্টান্ন ও বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুত খাবার নগর ও গ্রাম—দুই এলাকাতেই সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। কর্মব্যস্ত জীবন, সহজে বহনযোগ্য খাবারের চাহিদা, বিজ্ঞাপন এবং পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস এই প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত।তবে সব প্রক্রিয়াজাত খাবারকে অস্বাস্থ্যকর বলা ঠিক নয়। দুধ পাস্তুরিত করা, খাবার হিমায়িত করা কিংবা নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উপকারী হতে পারে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন কিছু পণ্যের ব্যাপক গ্রহণ, যেগুলোতে অতিরিক্ত লবণ, মুক্ত চিনি, সম্পৃক্ত চর্বি বা ক্যালরি রয়েছে এবং যেগুলো পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যের জায়গা দখল করতে পারে।অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ ও বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে দ্য বিএমজেতে প্রকাশিত একটি ছাতাগবেষণায় অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বেশি সংস্পর্শের সঙ্গে একাধিক প্রতিকূল স্বাস্থ্যফলের সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয়। তবে এসব গবেষণার বড় অংশ পর্যবেক্ষণমূলক হওয়ায় সব ক্ষেত্রে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবি করা উচিত নয়। খাদ্যের উপাদান, গ্রহণের পরিমাণ, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং অন্যান্য জীবনযাপনগত বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে।তবু অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ কমানো জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত সোডিয়াম উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়; অতিরিক্ত মুক্ত চিনি দাঁতের ক্ষয়, অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ এবং ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত; আর সম্পৃক্ত চর্বির অতিরিক্ত গ্রহণ রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে। এসব ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অসংক্রামক রোগ মোট মৃত্যুর বড় অংশের জন্য দায়ী। তাই এসব রোগ প্রতিরোধে চিকিৎসাসেবার উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যপরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।খাবারের প্যাকেটে সতর্কবার্তা: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগখাদ্যের প্যাকেট হাতে নিয়ে একজন সাধারণ ভোক্তার পক্ষে কি সহজে বোঝা সম্ভব যে পণ্যটিতে অতিরিক্ত লবণ, চিনি কিংবা সম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে? প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষরে লেখা জটিল পুষ্টিতথ্য কি সবাই বুঝতে পারেন? আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ও মোড়কের আড়ালে পণ্যের পুষ্টিগত ঝুঁকি অস্পষ্ট থাকলে ভোক্তার সুরক্ষার দায়িত্ব কে নেবে?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব পেয়েছে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং বা এফওপিএল—খাদ্যপণ্যের মোড়কের সামনের অংশে পুষ্টিগত তথ্য বা সতর্কবার্তা প্রদর্শনের ব্যবস্থা।বাংলাদেশে বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ১৫ অক্টোবর গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের সহযোগিতায় আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এফওপিএল চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। আলোচনায় জানানো হয়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রণীত ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।ওয়েবিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেন। এই তথ্যের মূল তাৎপর্য হলো, এসব পণ্যের বিস্তার ব্যাপক। তবে গবেষণার নমুনা, তথ্য সংগ্রহের সময়, খাবারের সংজ্ঞা ও গ্রহণের পরিমাণ যাচাই না করে এ থেকে প্রতিদিন অতিরিক্ত পরিমাণে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের সিদ্ধান্ত টানা যাবে না।সতর্কতামূলক লেবেলিংয়ের উদ্দেশ্য হলো ভোক্তাকে সহজে বোঝানো, কোনো পণ্যে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে কি না। দেশভেদে এর নকশা আলাদা হতে পারে। কোথাও কালো অষ্টভুজাকৃতির চিহ্ন, কোথাও স্পষ্ট লিখিত সতর্কবার্তা কিংবা অন্য দৃশ্যমান নির্দেশক ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের জন্য উপযোগী ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, স্থানীয় ভোক্তার বোধগম্যতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিবেচনা করে।এফওপিএলের একটি বড় সুবিধা হলো, এটি পুষ্টিতথ্য বুঝতে প্রয়োজনীয় সময় ও জটিলতা কমাতে পারে। একজন ভোক্তা একাধিক পণ্যের মধ্যে তুলনা করার সময় দ্রুত বুঝতে পারবেন, কোন পণ্যে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের মাত্রা বেশি। এর ফলে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নির্বাচন সহজ হতে পারে।আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো খাদ্যশিল্পের পণ্য সংস্কারে প্রণোদনা সৃষ্টি। অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত পণ্যে সতর্কবার্তা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক হলে উৎপাদকরা পণ্যের উপাদান পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। ফলে লেবেলিং শুধু ভোক্তার আচরণ পরিবর্তনের উপায় নয়; এটি খাদ্যপণ্যের পুষ্টিগত মান উন্নত করারও একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার।তবে লেবেলিং একাই অসংক্রামক রোগের সমাধান নয়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সতর্কবার্তার দৃশ্যমানতা, বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড, সঠিক পুষ্টিতথ্য, নিয়মিত নজরদারি এবং অন্যান্য জনস্বাস্থ্যনীতির সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।বাধ্যতামূলক লেবেলিং কেন প্রয়োজন?স্বেচ্ছামূলক লেবেলিং ব্যবস্থায় সব উৎপাদক একই নিয়ম অনুসরণ করবেন—এমন নিশ্চয়তা থাকে না। কোনো প্রতিষ্ঠান স্পষ্ট ও সহজবোধ্য তথ্য দিতে পারে, অন্য প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম দৃশ্যমান কিংবা বিভ্রান্তিকর চিহ্ন ব্যবহার করতে পারে। এতে ভোক্তার পক্ষে বিভিন্ন পণ্যের মধ্যে তুলনা করা কঠিন হয়।এ ছাড়া যেসব পণ্যে সতর্কবার্তা সবচেয়ে প্রয়োজন, সেগুলোর উৎপাদক স্বেচ্ছায় সেই সতর্কবার্তা দিতে আগ্রহী নাও হতে পারেন। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই অনিশ্চয়তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রযোজ্য পণ্যের জন্য বাধ্যতামূলক ও অভিন্ন নিয়ম থাকা প্রয়োজন।ছোট প্যাকেটের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। প্যাকেট ছোট হওয়ায় নকশাগত সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু পণ্যের পুষ্টিগত ঝুঁকি তাতে কমে যায় না। সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার পরিবর্তে পাঠযোগ্যতা ও দৃশ্যমানতা বজায় রেখে উপযোগী নকশা নির্ধারণ করা যেতে পারে।প্রবিধানমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে খাদ্যশিল্পের বাস্তবতা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। প্যাকেজিং পরিবর্তন, পুষ্টিগত পরীক্ষা এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়া সংশোধনে ব্যয় হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতির সময় ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এই বিবেচনা যেন জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার উদ্দেশ্যকে দুর্বল না করে কিংবা অনির্দিষ্টকালের বিলম্বের কারণ না হয়।বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধিবিধান নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে তা যথাযথ আইনি ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন ও বিজ্ঞানভিত্তিক মানদণ্ড অনুসরণ করে জনস্বাস্থ্য রক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে যুক্তিযুক্ত পথ।আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাচিলি ২০১৬ সালে নির্দিষ্ট পুষ্টিগত সীমা অতিক্রম করা প্যাকেটজাত খাবারে কালো অষ্টভুজাকৃতির সতর্কবার্তা চালু করে। একই সঙ্গে শিশুদের লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট ধরনের বিপণন এবং স্কুলে সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরবর্তী গবেষণায় পণ্য নির্বাচন, খাদ্যপণ্যের গঠন পরিবর্তন এবং শিশুদের লক্ষ্য করে বিপণনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।মেক্সিকো, পেরু এবং লাতিন আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশও প্যাকেটের সামনে সতর্কতামূলক লেবেল চালু করেছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, কার্যকর লেবেলিং ব্যবস্থার জন্য স্পষ্ট নকশা, নির্ধারিত পুষ্টিগত সীমা, নিয়মিত নজরদারি এবং জনসচেতনতা প্রয়োজন।তবে অন্য দেশের নীতি হুবহু বাংলাদেশের ওপর প্রয়োগ করা উচিত নয়। দেশের খাদ্যবাজার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদকের সক্ষমতা, ভোক্তার খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের বাস্তব সামর্থ্য বিবেচনা করে উপযোগী ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশীয় প্রমাণের ভিত্তিতে নীতিমালা উন্নত করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।আইন আছে, প্রয়োগ কতটা কার্যকর?বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য আইন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩; ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯; বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।কিন্তু আইন প্রণয়ন আর আইনের কার্যকর প্রয়োগ এক বিষয় নয়। বাজারে নিয়মিত পরিদর্শন, নমুনা পরীক্ষা, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, অপরাধের দ্রুত নিষ্পত্তি, অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি এবং ভোক্তার অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত না হলে আইনের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না।নিরাপদ খাদ্য নিয়ন্ত্রণে একাধিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থাকায় তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। কৃষি উৎপাদন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, আমদানি, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও বিক্রয়—প্রতিটি স্তরে দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। কোথাও অনিয়ম শনাক্ত হলে কোন প্রতিষ্ঠান তদন্ত করবে, কে নমুনা পরীক্ষা করবে, কে ব্যবস্থা নেবে এবং কীভাবে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা জরুরি।খাদ্য পরীক্ষাগার আধুনিকীকরণ, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষার ফলাফল ও নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে জনআস্থা বাড়বে এবং নীতিনির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে।আইনের প্রয়োগ হতে হবে নিরপেক্ষ। ছোট বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বড় উৎপাদক বা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম যেন উপেক্ষিত না থাকে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জবাবদিহি ও আইনের সমান প্রয়োগ অপরিহার্য।খাদ্য অপচয় রোধ ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নখাদ্যনিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উৎপাদিত খাদ্য সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে ব্যবহার করা। ফসল তোলার পর যথাযথ সংরক্ষণ, শীতল পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ঘাটতির কারণে অনেক কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। বিশেষ করে ফলমূল, শাকসবজি, মাছ ও অন্যান্য দ্রুত পচনশীল খাদ্যের ক্ষেত্রে এই সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ।খাদ্য অপচয় কমানো মানে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো নয়; উৎপাদনে ব্যবহৃত জমি, পানি, জ্বালানি, শ্রম ও অন্যান্য সম্পদের অপচয়ও কমানো। উৎপাদিত খাদ্যের বড় অংশ নষ্ট হলে নতুন করে উৎপাদনের ওপর চাপ বাড়ে এবং পরিবেশের ক্ষতিও বৃদ্ধি পায়।এ জন্য কৃষিপণ্যের সংগ্রহকেন্দ্র, আধুনিক গুদাম, হিমাগার, শীতল পরিবহনব্যবস্থা এবং নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো বাড়াতে হবে। কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এসব সুবিধা সাশ্রয়ী মূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য উন্নত করা এবং খাদ্য উদ্বৃত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাবার প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।পরিবার ও সামাজিক অনুষ্ঠানেও খাবার অপচয় কমানো জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নেওয়া, অবশিষ্ট নিরাপদ খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বা অনিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতন হওয়া নাগরিক দায়িত্বের অংশ।খাদ্যনিরাপত্তায় নাগরিক, গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাখাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের হলেও নাগরিক সচেতনতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভোক্তাকে খাদ্যের মেয়াদ, উপাদান, সংরক্ষণবিধি এবং প্রযোজ্য মানচিহ্ন যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ পানি ব্যবহার, হাত ধোয়া, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা এবং সঠিক তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণও খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।তবে নাগরিক সচেতনতার কথা বলে রাষ্ট্র বা উৎপাদকের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। একজন ভোক্তার পক্ষে প্রতিটি খাদ্যপণ্যের রাসায়নিক উপাদান বা জীবাণু নিজে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ অপরিহার্য।বিদ্যালয় ও কলেজে খাদ্য ও পুষ্টিশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। শিশু-কিশোরদের সুষম খাদ্য, নিরাপদ পানি, খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধ এবং প্যাকেটের পুষ্টিতথ্য বোঝার বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যালয়ের আশপাশে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং শিশুদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের বিপণন নিয়ন্ত্রণেও উদ্যোগ প্রয়োজন।গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু খাদ্যে ভেজাল বা বাজারদরের অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ করা নয়; খাদ্যনীতির অগ্রগতি, আইনের প্রয়োগ, গবেষণার ফলাফল এবং জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কেও তথ্যভিত্তিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে কোনো গবেষণার পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে তার উৎস, নমুনা ও সীমাবদ্ধতা যাচাই করা জরুরি। অতিরঞ্জিত বা যাচাইহীন তথ্য জনসচেতনতার পরিবর্তে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও নীতিনির্ধারণে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষত এফওপিএল প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ আলোচনা, স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই যা করা প্রয়োজনবাংলাদেশে টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি বিষয়ে সমন্বিত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।প্রথমত, কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত, পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং ডাল, তেলবীজ, ফলমূল ও শাকসবজির উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও কৃষি উপকরণের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।দ্বিতীয়ত, কৃষকের ন্যায্য মূল্য ও ভোক্তার সাশ্রয়ী খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি ও সরবরাহব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সরাসরি বিপণনের সুযোগ বাড়াতে হবে।তৃতীয়ত, খাদ্যদূষণ প্রতিরোধে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। খাদ্য পরীক্ষাগার আধুনিকীকরণ, নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন এবং অপরাধের কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্যপণ্যের উৎস শনাক্ত করার জন্য ট্রেসেবিলিটি বা অনুসরণযোগ্যতা ব্যবস্থা গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।চতুর্থত, প্রস্তাবিত বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং প্রবিধানমালা দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে। লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বির জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত সীমা, স্পষ্ট সতর্কবার্তা, অভিন্ন নকশা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদককে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া হলেও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য যেন দুর্বল না হয়।পঞ্চমত, পুষ্টিনিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। দরিদ্র পরিবার, শিশু, গর্ভবতী নারী, কিশোরী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, স্কুলের খাদ্য কর্মসূচি এবং মাতৃ ও শিশুপুষ্টি কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।ষষ্ঠত, খাদ্য অপচয় কমিয়ে সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। আধুনিক গুদাম, হিমাগার, শীতল পরিবহন এবং নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ করলে কৃষকের ক্ষতি কমবে এবং ভোক্তার কাছে খাদ্য পৌঁছানো সহজ হবে।সপ্তমত, নির্ভরযোগ্য তথ্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য উৎপাদন, মূল্য, পুষ্টি, খাদ্যদূষণ এবং অসংক্রামক রোগসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ ও প্রকাশ করা প্রয়োজন। গবেষণার তথ্য নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করতে হবে এবং গৃহীত কর্মসূচির ফলাফল স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।অষ্টমত, খাদ্যব্যবস্থার সব পর্যায়ে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ও তথ্য বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তাকে কোনো একটি মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব হিসেবে দেখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।নিরাপদ খাদ্য মানেই নিরাপদ ভবিষ্যৎখাদ্য মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হলেও সবার জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এখনো বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, কিন্তু সেই সাফল্যকে টেকসই করতে হলে খাদ্যের নিরাপত্তা, পুষ্টিমান, ক্রয়ক্ষমতা ও ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।একটি দেশের খাদ্যব্যবস্থার সাফল্য শুধু কত টন ধান উৎপাদিত হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। দেখতে হবে, কৃষক তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না; নিম্ন আয়ের পরিবার পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছে কি না; শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে কি না; খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও দূষণ প্রতিরোধ করা যাচ্ছে কি না; এবং ভোক্তা খাদ্যের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাচ্ছেন কি না।বিশ্ব খাদ্য দিবসের অঙ্গীকারকে বাস্তব জীবনে রূপ দিতে হলে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও প্রচারণার বাইরে গিয়ে কার্যকর নীতি, জবাবদিহি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রয়োগ, কৃষকের ন্যায্য মূল্য, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, পুষ্টিশিক্ষা, খাদ্য অপচয় হ্রাস এবং প্যাকেটজাত খাবারের বাধ্যতামূলক সতর্কতামূলক লেবেলিংয়ের মতো উদ্যোগকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।খাদ্যনিরাপত্তা কোনো এক দিনের কর্মসূচি নয়; এটি প্রতিদিনের দায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অঙ্গীকার। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, খাদ্যব্যবস্থা মানুষের স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষায় কাজ করছে, কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে না এবং উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি বজায় থাকছে।আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কেউ ক্ষুধার কারণে বঞ্চিত হবেন না, অর্থের অভাবে পুষ্টিকর খাবার থেকে দূরে থাকবেন না এবং অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হবেন না। খাদ্য হবে সহজলভ্য, পুষ্টিকর ও নিরাপদ; কৃষক পাবেন ন্যায্য মূল্য; ভোক্তা পাবেন সঠিক তথ্য; আর রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে ন্যায়সংগত ও জবাবদিহিমূলক খাদ্যব্যবস্থা।নিরাপদ খাদ্য মানেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ। সুস্থ জীবন, পুষ্টিকর খাদ্য ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে খাদ্যনিরাপত্তাকে প্রতিদিনের জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত করতে হবে।[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]

প্রতিটি শিশুর বিকাশে চাই সমান সুযোগ

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কথাটি সমাজে বহুল প্রচলিত হলেও এর তাৎপর্য অপরিসীম। এ প্রসঙ্গে কবি গোলাম মোস্তফা বলেছেন, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।’ অর্থাৎ, প্রতিটি শিশুর মধ্যেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। তারাই একদিন পরিবার, সমাজ ও দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করবে।তাই দেশ ও জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে শিশুদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। তাদের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যা পেলে প্রতিটি শিশুর মেধা ও সম্ভাবনার বিকাশ ঘটবে। সমাজে ফুটে উঠবে শত ফুল।শিশুরা জন্মগতভাবে কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত নয়। তারা নিজ নিজ পরিবার ও পরিবেশে বেড়ে ওঠে এবং পরিবার ও সমাজের কাছ থেকেই নানা মূল্যবোধ শেখে। শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য খেলাধুলার সুযোগ, সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশের অনুকূল পরিবেশ এবং নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষা, খেলাধুলা, খেলার উপকরণ ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত কার্যক্রম যেন কোনো কারণে ব্যাহত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশের উদ্যোগও অব্যাহত রাখতে হবে।শিশুদের যথাযথ বিকাশ নিশ্চিত করতে শিক্ষক, স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী ও মায়েদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এর বাইরে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাসহ এক লাখের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে লেখকের উল্লেখিত তথ্যে জানা যায়। এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের সামাজিক দক্ষতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার বিকাশ এবং সুস্থ জাতি গঠনে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া জরুরি।বিশেষ করে দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, অনগ্রসর ও প্রান্তিক পরিবারের সন্তানদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে। এসব পরিবারের অনেক মা-বাবার পক্ষে সন্তানের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তাদের সন্তানরা শিক্ষা, পুষ্টি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে; এ ধরনের ব্যবস্থা বৈষম্য হিসেবে বিবেচিত হবে না।প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা চালু করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পোশাক, স্কুলব্যাগ ও জুতা দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। শিশুরা বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পেলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। এতে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার কমানো সম্ভব হবে।দুঃখজনকভাবে, অনেক শ্রমজীবী, দলিত ও বঞ্চিত পরিবারের মা-বাবা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সন্তানদের বিদ্যালয়ে না পাঠিয়ে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করেন। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে তাঁদের সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলোকে খাদ্যসহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা যেতে পারে, যাতে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর কারণে পরিবারের জীবিকা নির্বাহে বাড়তি সংকট তৈরি না হয়। এ ধরনের সহায়তা শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত করার প্রবণতা কমাতে এবং তাদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।শরীর ও মন একে অপরের পরিপূরক। শরীর সুস্থ না থাকলে মনও ভালো থাকে না; অসুস্থ শরীর নিয়ে কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন। শিক্ষার্থীদের জীবনে শুধু সম্পদ বা শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই সুখী হওয়া যায় না। সুস্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য নিয়মিত খেলাধুলা ও ব্যায়ামের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। আত্মরক্ষার কৌশল শেখানোর জন্যও উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কারাতে প্রশিক্ষণ উল্লেখযোগ্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রশিক্ষণ চালু করা হলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মরক্ষার দক্ষতা বাড়তে পারে।আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দলিত ও বঞ্চিত পরিবারের শিশুদের দিয়ে টয়লেট, বাথরুম, নালা পরিষ্কার কিংবা ঝাড়ু দেওয়ার মতো কাজ করানো হয়। এ ধরনের আচরণ শিশুদের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করতে পারে এবং পেশা সম্পর্কে বৈষম্যমূলক ধারণা জন্ম দিতে পারে। শিশুদের কোনো কাজকে ছোট করে দেখা শেখানো উচিত নয়; বরং সব পেশার প্রতি সম্মান, পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব এবং শ্রমের মর্যাদা শেখাতে হবে। একই সঙ্গে কোনো শিশুকে তার সামাজিক পরিচয়ের কারণে অপমানজনক বা বৈষম্যমূলক কাজে বাধ্য করা যাবে না। শিশুদের এমন পরিবেশে বড় করতে হবে, যেখানে তারা আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজেদের সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে।শিশুদের সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তাদের ময়লা-আবর্জনা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে দূরে রাখা মা-বাবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। ইতিহাসে এমন অনেক মানুষের দৃষ্টান্ত রয়েছে, যাঁরা দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা জয় করে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন এবং জীবনের একপর্যায়ে রুটির দোকানে কাজ করেছিলেন। ড. বি. আর. আম্বেদকর দলিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন এবং ভারতের সংবিধান প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আব্রাহাম লিংকন সাধারণ ও দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। জগজীবন রামও দলিত পরিবারে জন্ম নিয়ে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হন। এসব উদাহরণ দেখায়, প্রতিকূলতা থাকলেও সুযোগ ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে মানুষ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে।কোনো শিশু ভবিষ্যতে কী হবে, তা আগে থেকে বলা যায় না। তাই প্রত্যেক শিশুর যত্ন নিতে হবে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষার সুযোগ দিয়ে তাকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা এমন এক শক্তি, যা ব্যবহার করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। শিশুর সামাজিক পরিচয়, পারিবারিক আর্থিক অবস্থা কিংবা জন্মপরিস্থিতি যেন তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না দেয়। আসুন, প্রতিটি শিশুর পাশে দাঁড়াই, তার অধিকার নিশ্চিত করি এবং তার মেধা ও সম্ভাবনার বিকাশে সহায়তা করি। তাহলেই সমাজে ফুটবে শত ফুল।[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

কুমারী পূজায় নারীশক্তি ও মাতৃমর্যাদার বন্দনা

দুর্গাপূজা বাঙালির অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। শরতের নির্মল আকাশ, সাদা কাশফুল, শিউলির সুবাস এবং ঢাকের বাদ্য—সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা বাঙালির জীবনে অনন্য আনন্দের আবহ সৃষ্টি করে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বাঙালির ঐতিহ্য, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, সামাজিক বন্ধন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব।হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে পরাজিত করে শুভ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন। তাই দুর্গাপূজা মূলত অশুভের ওপর শুভের, অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের এবং অসত্যের ওপর সত্যের বিজয়ের প্রতীক। দেবী দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের পূজাও অনুষ্ঠিত হয়। এসব আরাধনার মধ্য দিয়ে শক্তি, জ্ঞান, সমৃদ্ধি, সাহস ও মঙ্গল কামনা করা হয়।বাংলায় দুর্গাপূজার ইতিহাস বহু পুরোনো। বিভিন্ন সময়ে জমিদার ও অভিজাত পরিবারে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল। পরবর্তী সময়ে বারোয়ারি ও সর্বজনীন পূজার প্রসার ঘটে। এর ফলে দুর্গাপূজা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উৎসবের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের উৎসবে পরিণত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা পালন করেন।শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠের ধারে দুলতে থাকা কাশফুল আর ভোরের বাতাসে শিউলির মিষ্টি গন্ধ—প্রকৃতি যখন এমন অপরূপ সাজে সেজে ওঠে, তখনই বাঙালির হৃদয়ে বেজে ওঠে ঢাকের বাদ্য। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ, মণ্ডপে মণ্ডপে জ্বলে ওঠে আলোর মালা। মা দুর্গার আগমনে প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে যেন নতুন আনন্দের সঞ্চার হয়। দুর্গাপূজা তাই কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাঙালির চিরচেনা আবেগ, ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতির অপূর্ব প্রকাশ। দেবীর আগমন যেন অন্ধকারের মধ্যে আলোর বার্তা, অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় এবং মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার।দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ মিলনোৎসব। এই উৎসব মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য বাড়িয়ে তোলে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষ একে অপরের আনন্দে অংশ নেয়, শুভেচ্ছা বিনিময় করে এবং উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেয়। বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সম্প্রীতির এই চর্চা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।দুর্গাপূজার কয়েকটি দিন বাঙালির জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এরপর ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমীর বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূজা সম্পন্ন হয়। অষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধিপূজা, নবমীর পূজা এবং দশমীর বিসর্জন দুর্গোৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের আনন্দের পাশাপাশি বিদায়ের বেদনাও অনুভূত হয়। দেবীকে বিদায় জানিয়ে মানুষ আবার তাঁর আগমনের অপেক্ষায় থাকে।দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ প্রতিমা ও পূজামণ্ডপ। শিল্পীরা মাটি, খড় ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে প্রতিমা নির্মাণ করেন। মণ্ডপসজ্জায় স্থাপত্য, চিত্রকলা, আলোকসজ্জা ও লোকশিল্পের নানা উপাদান ব্যবহৃত হয়। অনেক পূজামণ্ডপে স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য কিংবা সমকালীন বিভিন্ন বিষয় শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। ফলে দুর্গাপূজা একদিকে ধর্মীয় উৎসব, অন্যদিকে শিল্প ও সৃজনশীলতারও বড় ক্ষেত্র।দুর্গাপূজাকে ঘিরে সামাজিক মিলনও বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করা, নতুন পোশাক পরা, মণ্ডপে ঘুরতে যাওয়া এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও পরস্পরের উৎসবে অংশ নেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির এই বন্ধন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।কুমারী পূজা: দুর্গাপূজার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ আচার হলো কুমারী পূজা। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাসে, কুমারী কন্যার মধ্যে দেবী দুর্গার মাতৃশক্তি ও পবিত্রতার প্রতীকী প্রকাশ দেখা হয়। সাধারণত অল্পবয়সী একটি কন্যাশিশুকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক ও অলংকারে সাজানো হয়। এরপর তাকে দেবীরূপে সম্মান জানিয়ে পূজা করা হয়। ফুল, চন্দন ও নৈবেদ্য নিবেদন করে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয় এবং আশীর্বাদ কামনা করা হয়।কুমারী পূজার মূল তাৎপর্য নারীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং মাতৃশক্তির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। একটি শিশুকন্যার মধ্যে দেবীত্বের প্রতীক কল্পনা করার মধ্য দিয়ে নারীশক্তির প্রতি সম্মান জানানোর বার্তা তুলে ধরা হয়। দুর্গাপূজার বৃহত্তর চেতনার সঙ্গেও এই আচার গভীরভাবে যুক্ত। অশুভ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় যেমন দুর্গাপূজার মূল শিক্ষা, তেমনি নারীশক্তির মর্যাদা স্বীকার করাও এর তাৎপর্যপূর্ণ দিক।কুমারী পূজায় একটি ছোট মেয়েকে দেবী দুর্গার প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। তাকে নতুন পোশাক ও ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেবীর আসনে বসানো হয়। এরপর ফুল, চন্দন ও নৈবেদ্য দিয়ে পূজা করা হয়। এই আচার স্মরণ করিয়ে দেয়, নারীকে শ্রদ্ধা ও মর্যাদা দেওয়া সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নারী কেবল মমতা ও স্নেহের প্রতীক নন; তিনি শক্তি, সাহস ও সম্ভাবনারও প্রতীক। তাই কুমারী পূজার তাৎপর্য ধর্মীয় আচারের গণ্ডি ছাড়িয়ে নারীকে সম্মান করা এবং তাঁর মর্যাদা স্বীকার করার বৃহত্তর বার্তাও বহন করে।তবে কুমারী পূজার প্রতীকী তাৎপর্য তখনই আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন বাস্তব জীবনেও নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা যায়। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমান অধিকার এবং বৈষম্যহীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পূজার মঞ্চে কন্যাশিশুকে দেবীরূপে সম্মান জানানো আর দৈনন্দিন জীবনে নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা—এই দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, বৈষম্য ও অবহেলা দূর করার মধ্য দিয়েই নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধার চেতনা বাস্তবে প্রতিফলিত হতে পারে।দুর্গাপূজার সঙ্গে বাঙালির সাহিত্য ও সংগীতেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আগমনি ও বিজয়ার গান, কবিতা, নাটক এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দুর্গোৎসবের আবহকে আরও সমৃদ্ধ করে। পূজাকে কেন্দ্র করে বহু শিল্পী, কারিগর, ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক কর্মীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি এই উৎসবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।দুর্গাপূজার আনন্দ কয়েক দিনের হলেও এর আবেদন মানুষের মনে থেকে যায় দীর্ঘ সময়। বিজয়ার বিষণ্ন বিদায়ের মুহূর্তে যখন প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা এগিয়ে যায়, তখন সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, ‘আবার এসো মা।’ এই বিদায়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের প্রত্যাশা। দুর্গাপূজা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, অশুভকে পরাজিত করতে এবং সত্য, ন্যায়, মানবতা ও ভালোবাসাকে জীবনের পথনির্দেশক করতে শেখায়। তাই বাঙালির দুর্গাপূজা শুধু পূজা নয়; এটি প্রাণের উৎসব, যেখানে ধর্মের পাশাপাশি মিশে আছে সংস্কৃতি, সম্প্রীতি, সৌন্দর্য ও মানবতার চিরন্তন আহ্বান।মা দুর্গার আগমন আমাদের মনে শুভবোধের জাগরণ ঘটাক, আর তাঁর বিদায় রেখে যাক নতুন দিনের আশার আলো। অশুভ ও বিভেদ দূরে সরিয়ে মানবিকতা, সহনশীলতা ও ঐক্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রেরণা জোগাক এই উৎসব। দুর্গাপূজার প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু প্রতিমা, আলোকসজ্জা কিংবা উৎসবের আনন্দে নয়; মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের বন্ধনেও। বিজয়ার বিদায়বেলায় আমাদের প্রত্যাশা হোক—ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিকতার বন্ধন সবার। এই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যই বাঙালির দুর্গাপূজাকে করে তুলুক আরও সুন্দর, অর্থবহ ও চিরন্তন।উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি আমাদের দায়িত্বের কথাও মনে রাখতে হবে। পূজামণ্ডপ ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যানজট কমাতে সহযোগিতা করা এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময় পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। উৎসব যেন সবার জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময় হয়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।দুর্গাপূজা দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি বাঙালির ঐতিহ্য, আবেগ, শিল্প, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের উজ্জ্বল প্রকাশ। আর কুমারী পূজা নারীশক্তি ও মাতৃমর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি তাৎপর্যপূর্ণ আচার। এই পূজার শিক্ষা আমাদের বাস্তব জীবনেও ধারণ করতে হবে—নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। অশুভকে পরিহার করে সত্য, ন্যায়, ভালোবাসা ও মানবিকতার পথে এগিয়ে চলার মধ্য দিয়েই দুর্গাপূজার মূল চেতনা সার্থক হতে পারে। এই চেতনাই বাঙালির দুর্গাপূজাকে যুগ যুগ ধরে প্রাণবন্ত ও অর্থবহ করে রাখবে।[লেখক: ভিজিটিং প্রফেসর, ডেন্টাল সার্জারি বিভাগ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল]

ভিডিও আরও দেখুন

প্যারিসে দাঙ্গার মধ্যে চুরি হলো মেসির স্বাক্ষর করা ঐতিহাসিক স্মারক

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে চলমান সহিংস বিক্ষোভ ও দাঙ্গার প্রভাব পড়েছে ক্রীড়াঙ্গনেও। শহরের কেন্দ্রস্থল প্লাস দে লা রিপাবলিক এলাকার কাছে অরাজক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটি দোকান থেকে আর্জেন্টাইন ফুটবল মহাতারকা লিওনেল মেসির স্বাক্ষর করা বার্সেলোনার জার্সি ও অধিনায়কের বিশেষ আর্মব্যান্ড চুরির ঘটনা ঘটেছে।স্প্যানিশ ক্রীড়া বিষয়ক গণমাধ্যম এএস-এর বরাত দিয়ে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দুই মুখশোধারীকে গর্বের সঙ্গে চুরি যাওয়া স্মারক দুটি প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, তারা ক্যমেরা সামনে মেসির স্বাক্ষর সংবলিত বার্সেলোনার ১০ নম্বর জার্সি ও ঐতিহাসিক আর্মব্যান্ড তুলে ধরছে।প্যারিসজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র ভাঙচুর ও লুটপাটের মধ্যেই এই চুরির ঘটনা ঘটে। জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষা সংকটের প্রতিবাদে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নামলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে।ক্রীড়া স্মারক সংগ্রাহকদের বিশ্বে লিওনেল মেসির স্মৃতিবিজড়িত যেকোনো জিনিসের মূল্য আকাশচুম্বী। কাতার বিশ্বকাপে মেসির পরিহিত ছয়টি জার্সি নিলামে কোটি ডলারে বিক্রি হয়ে ইতিহাসের নতুন রেকর্ড গড়েছিল। প্যারিস থেকে চুরি হওয়া এসব স্মারক ঐতিহাসিক ও আবেগের দিক থেকে অমূল্য। উদ্ধার করা না গেলে কালোবাজারে এগুলো বিপুল অংকে হাতবদল হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।এদিকে প্যারিসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতির মধ্যেই ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নস লিগে পিএসজি ও বার্সেলোনার হাইভোল্টেজ ম্যাচ সামনে রয়েছে। তবে শহরের সার্বিক অস্থিরতা সত্ত্বেও পূর্বনির্ধারিত এই খেলা আয়োজনে বড় কোনো বাধা নেই বলে আয়োজক সূত্রে জানা গেছে।

প্যারিসে দাঙ্গার মধ্যে চুরি হলো মেসির স্বাক্ষর করা ঐতিহাসিক স্মারক