সংবাদ
এইচএসসি খাতা চ্যালেঞ্জ: বোর্ডের ঘরে সাড়ে ১৫ কোটি টাকা

এইচএসসি খাতা চ্যালেঞ্জ: বোর্ডের ঘরে সাড়ে ১৫ কোটি টাকা

এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয়েছে খাতা চ্যালেঞ্জ বা পুনর্নিরীক্ষণের হিড়িক। চলতি বছর ফলাফলে ব্যাপক ধস নামায় এবং নজিরবিহীন বিপর্যয় ঘটায় 'ক্ষুব্ধ ও হতাশ' শিক্ষার্থীরা বোর্ডগুলোর কাছে খাতা পুনর্মূল্যায়নের আবেদন জানাতে ভিড় করেন।নির্ধারিত সময়সীমা শেষে দেখা গেছে, এবারের ফলাফলের বিরুদ্ধে রেকর্ডসংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে শিক্ষা বোর্ডগুলোতে। লাখ লাখ শিক্ষার্থী নিজেদের কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে ও ফেলের কলঙ্ক মোচন করতে এই প্রক্রিয়ার ওপর ভরসা রেখেছেন।আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এইচএসসির খাতা চ্যালেঞ্জের এই কার্যক্রম ৭ নভেম্বর রাত আটটায় আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে সারাদেশে মোট ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৮২ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয়ে খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন দাখিল করেছেন। শিক্ষার্থীরা একেকজন একাধিক বিষয় ও পত্রে আবেদন করায় মোট আবেদনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অবিশ্বাস্য এক অঙ্কে। সবমিলিয়ে এবার ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৭১৭টি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়েছে, যা অতীতের সব রেকর্ডকে পেছনে ফেলে দিয়েছে।প্রতিটি পত্র বা খাতা পুনর্নিরীক্ষণের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১৫০ টাকা করে ফি আদায় করা হয়েছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, এই বিশাল সংখ্যক আবেদন থেকে শিক্ষা বোর্ডগুলো সরাসরি ১৫ কোটি ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ৫৫০ টাকা আয় করেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুল পরিমাণ টাকা কোথায় ব্যয় হয় এবং বোর্ডগুলো এতে লাভবান হয় কি না।এ বিষয়ে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, খাতা পুনর্নিরীক্ষণের এই প্রক্রিয়া থেকে বোর্ড কোনো ধরনের মুনাফা করে না।অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান স্পষ্ট করে বলেন, পুনর্নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু যান্ত্রিক বা টেকনিক্যাল কাজ থাকে যা বুয়েটের কারিগরি টিম সম্পন্ন করে থাকে এবং এর পেছনে বড় অংকের ব্যয় রয়েছে। পাশাপাশি, পুনর্নিরীক্ষণের জন্য নতুন করে পরীক্ষক নিয়োগ করতে হয় এবং তারা সরাসরি বোর্ডে এসে বসে খাতা দেখেন। তাদের জন্য খাতাপ্রতি নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়া আনুষঙ্গিক সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে বড় অংকের টাকা খরচ হয়ে যায়।এদিকে, আবেদনের শেষ মুহূর্তে এসে অনলাইন সার্ভারে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। সার্ভার ডাউন থাকায় শেষ তিন থেকে চার ঘণ্টা বহু শিক্ষার্থী যথাসময়ে আবেদন জমা দিতে পারেননি। এ নিয়ে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।শিক্ষার্থীদের এই ভোগান্তির বিষয়টি আমলে নিয়ে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে জানান, সার্ভার ত্রুটির কারণে যেসব শিক্ষার্থী আবেদন করতে পারেননি, তাদের কথা বিবেচনা করে আবেদনের সময় কিছুটা বাড়ানো হতে পারে। আমরা পরিস্থিতি বুঝে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বা সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টা সময় বাড়াতে পারি।এর আগে গত ৩১ অক্টোবর দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে একযোগে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। এ বছর পরীক্ষার সার্বিক ফলাফলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে, যেখানে ১১টি বোর্ডে গড় পাসের হার ছিল মাত্র ৫২.১২ শতাংশ। সারাদেশে জিপিএ-৫ অর্জন করেন মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী।অন্যদিকে, এ বছর মোট ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হন, যার মধ্যে একাংশ অর্থাৎ ৪ লাখ ২২ হাজার শিক্ষার্থীই এক বা দুই বিষয়ে ফেল করেছেন। বিগত ২২ বছরের শিক্ষাবর্ষের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটিই এযাবৎকালের সর্বনিম্ন পাসের হার। এই বিপর্যয়কর ফলাফলের কারণেই মূলত রেকর্ডসংখ্যক শিক্ষার্থী খাতা চ্যালেঞ্জ করতে বাধ্য হয়েছেন।আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানু নিশ্চিত করেছেন, খাতা পুনর্নিরীক্ষাসংক্রান্ত সকল প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী ২৭ নভেম্বর এইচএসসি ও সমমানের ফল পুনর্নিরীক্ষণের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

পোশাক খাতে অস্থিরতা: প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সমাধান

ঢাকা-গাজীপুর-সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের অসন্তোষ ক্রমশ সহিংস রূপ নিয়েছে। ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি, কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ ও ছাঁটাই বাতিল—এই তিন দফা দাবিতে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করছেন। কোথাও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশ ও বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ইতোমধ্যে সাভারে তিন প্লাটুন এবং গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সরকার ১ নভেম্বর মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ৪ নভেম্বর বোর্ড ডিসেম্বর থেকে নতুন কাঠামো কার্যকর এবং জানুয়ারি থেকে বর্ধিত বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে, কিন্তু কত টাকা বাড়বে, তা এখনো ঘোষণা করেনি। এ কারণে মাঠের উত্তাপ কমেনি। এই শিল্প ৮০ শতাংশ রপ্তানি আয়ের উৎস। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের জীবিকা এর ওপর নির্ভরশীল। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৫২৯টি কারখানার ১০ লাখ শ্রমিকের কাজ ব্যাহত হয়েছে। তাই এই অস্থিরতার দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান জাতীয় স্বার্থেই জরুরি।এই আন্দোলনে বহিরাগত অনুপ্রবেশের প্রমাণ মিলছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া ৪০ জনের কেউই শ্রমিক নন, তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী। আবার মাঠে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদেরও লাঠি হাতে রাস্তায় দেখা গেছে—এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্ন হলো, ক্ষমতাসীন দলের লোকজন লাঠি হাতে নামলে তা যদি পুলিশকে সহায়তা হয়, তবে অন্য দলের ক্ষেত্রে তা অপরাধ কেন হবে? শ্রমিকের ন্যায্য দাবির আড়ালে কোনো রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক পক্ষের লাঠি হাতে রাস্তায় নামার আইনগত ভিত্তি নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব একমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। অতীতে পাকিস্তান আমলের এনএসএফ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারের আমলেই দলীয় লোকজন দিয়ে আন্দোলন দমনের সংস্কৃতি ছিল, যার পরিণতি ভালো হয়নি। মোনায়েম খানের পেটোয়া বাহিনীর সদস্য পাঁচপাত্তু ছুরিকাঘাতে মারা গেছেন, খোকার লাশ পড়ে ছিল তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি—সবাই একই ভুল করেছে। এবারও সেই পথে হাঁটা ঠিক হচ্ছে না। কারণ, এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।এই অস্থিরতার মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিকের মৃত্যু। তার বড় ভাই জানিয়েছেন, সোমবার আন্দোলনে হামলার ঘটনা মুঠোফোনে ভিডিও করার চেষ্টা করায় হামলাকারীরা তার ওপর চড়াও হয়। তাকে বেধড়ক মারধর করে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে আন্দোলনরত শ্রমিকরা তাকে উদ্ধার করে শিন-শিন জাপান হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়। বাবা-হারা এই তরুণ পাঁচ বছর ধরে গাজীপুরে থেকে পরিবারের হাল ধরেছিলেন। একজন শ্রমিক যখন অন্যায়ের প্রমাণ রাখতে গিয়ে প্রাণ হারান, তখন বুঝতে হবে আন্দোলন আর সাধারণ শ্রমিকদের হাতে নেই; এর মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ ঘটেছে।সরকারের দুই উপদেষ্টার দুই রকম বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ বাড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ৩ নভেম্বর সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে বলেছেন, পুলিশের আইনি অধিকারের মধ্যে কাউকে হত্যা করার অধিকার আছে, যদি সে ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। জুলাই আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বর্তমান বিএনপি সরকার কি এ ধরনের আইনের প্রয়োগ মেনে নিয়েছে? মেনে নেয়নি। তাহলে এখন পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের সময় এ কথা কেন আসছে? এই বক্তব্য রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তা ছাড়া, এই বক্তব্য মাঠপর্যায়ের পুলিশকে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগে উৎসাহিত করতে পারে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান ফেসবুকে দাবি করেছেন, শ্রমিক পরিচয়ধারী নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুর্বৃত্তরাই তৌফিকের হত্যাকারী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের অনেকে যখন বলেন, আওয়ামী লীগ মৃত এবং ভারতে কবর হয়েছে, তখন এই ‘দুর্বৃত্তরা’ আসে কোথা থেকে?আন্দোলন হলেই ষড়যন্ত্রের গল্প হাজির করা আমাদের পুরোনো ও সুবিধাজনক অভ্যাস। বলা হয়, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ধ্বংস করে এই ব্যবসা ভারত নিয়ে যেতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমানদের মধ্যে সংঘাত হলেও আমরা বলি, ইহুদি ষড়যন্ত্র। কিন্তু আমাদের জ্ঞানের এত বড় দুর্ভিক্ষ যে ষড়যন্ত্র ধরার ক্ষমতাও নেই, অক্ষমতার লজ্জাও নেই। সত্য হলো, এই ব্যবসা বাংলাদেশ থেকে চলে গেলে শুধু ভারতে যাবে না, চীন, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও পাকিস্তানের কাছেও যাবে। প্রতিযোগীরা কাউকে ছাড় দেয় না। ভিডিওচিত্রের যুগে, যেখানে প্রতিটি হামলার দৃশ্য ধারণ করা হচ্ছে, সেখানে কল্পিত ষড়যন্ত্রের অবতারণা করে সাময়িক নিষ্কৃতি পাওয়া গেলেও সমস্যা ছাইচাপা আগুনের মতো থেকে যাবে এবং পরে আরও বড় হয়ে ফিরে আসবে। তাই আসল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।আমি ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা-জয়দেবপুর যাতায়াতের পথে পোশাকশ্রমিকদের ভোরবেলা ছোট পুঁটলি হাতে কারখানার দিকে ছুটে যেতে দেখেছি। দেখেছি, বৃষ্টিতে ভিজে কাজে যোগ দিয়ে গায়ের কাপড় পাখার বাতাসে শুকাতে। দেখেছি, সন্ধ্যায় ছুটির পর ক্লান্ত শরীরেও হাসি-ঠাট্টা করতে। একবার তাদের আন্দোলনের আক্রোশ থেকে বাঁচতে সহকর্মীদের নিয়ে গ্রামের মেঠোপথে দৌড়াতে হয়েছে। আবার পুলিশের তাড়াও খেয়েছি। তাদের বেতন কম, কিন্তু তারা অল্পতেই তুষ্ট থাকেন। আজ দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও চিকিৎসা ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে ১২ হাজার ৫০০ টাকায় সংসার চালানো যে অসম্ভব, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাদের কষ্টটা বাস্তব।এই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রী জুনায়েদ সাকিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে বিদ্রূপ হচ্ছে, তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ আমলে বিরোধী দলে থাকাকালে তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন, ২৫ হাজার টাকার মজুরির সংগ্রামকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।’ আজ তিনি নিজেই মন্ত্রী, কিন্তু শ্রমিকদের পক্ষে তার একটি কথাও শোনা যাচ্ছে না। রাজনীতি এমনই—বিরোধী দলে থাকলে এক রকম কথা, সরকারে গেলে সুর বদলে যায়। এই দ্বিচারিতাই মানুষের আস্থা নষ্ট করে। সরকার জাতীয় বেতন স্কেলে কর্মচারীদের মূল বেতন গ্রেডভেদে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু মূল্যস্ফীতির চাপ শুধু সরকারি চাকরিজীবীরা নন, পোশাকশ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষই মোকাবিলা করছেন। তাই তাদেরও আয় বৃদ্ধি করা দরকার।ষড়যন্ত্র বা আওয়ামী লীগের ইন্ধন খুঁজে সময় নষ্ট না করে ডিসেম্বরের আশ্বাসকে স্পষ্ট অঙ্কে পরিণত করতে হবে। আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানই দেশের স্বার্থ, শ্রমিকদের স্বার্থ এবং সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা করবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শ্রমিকের মজুরি ও শিল্পের প্রতিযোগিতা: সমাধান কোন পথে?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করে শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কীভাবে বজায় রাখা যায়? অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে শ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। ১ নভেম্বর নতুন মজুরি বোর্ড গঠন, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, কারখানা বন্ধ, সড়ক অবরোধ এবং শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম বৈঠকের পরও শ্রমিকদের অসন্তোষ পুরোপুরি কাটেনি। এই আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন শ্রমিক অসন্তোষ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি শ্রমিকের জীবনযাত্রা, শিল্পের ভবিষ্যৎ এবং দেশের রপ্তানি অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।সংকটের সমাধান শ্রমিকের দাবি উপেক্ষা করা কিংবা মালিকের ব্যয়সংকট অস্বীকার করার মধ্যে নেই। প্রয়োজন এমন একটি ন্যায্য সমঝোতা, যেখানে শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয়, কারখানার আর্থিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায়িত্ব বিবেচনায় নেওয়া হবে। মূল বিষয়টি হলো, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি শিল্পের প্রতিযোগিতার বাধা নয়; বরং কম মজুরির ওপর নির্ভরশীল উৎপাদনব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের স্থিতিশীলতাকেই দুর্বল করে।বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবি এই ব্যবধানের কারণে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে বাসাভাড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম শ্রমিকদের আয়ের বড় অংশ গ্রাস করে। অনেক শ্রমিককে প্রয়োজনীয় খাবার কমিয়ে, চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়ে কিংবা ঋণ করে মাস পার করতে হয়। পরিবারের একাধিক সদস্যের আয় না থাকলে একজন শ্রমিকের পক্ষে এই ব্যয়ে সংসার চালানো আরও কঠিন। মাসিক মজুরি দিয়ে ন্যূনতম জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে না পারলে কর্মক্ষেত্রে অসন্তোষ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই মজুরি বৃদ্ধির দাবি কেবল বেশি অর্থ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়; এটি শ্রমিকের মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।অন্যদিকে, মালিকদের সমস্যাও বাস্তব। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো বড় প্রতিষ্ঠানের মতো আর্থিক সামর্থ্য রাখে না। জ্বালানি ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, ঋণের উচ্চ সুদ, পরিবহন ব্যয় এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদনকে ব্যয়বহুল করেছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকেও সব সময় পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। অনেক ক্রেতা কম দামে পণ্য সরবরাহের জন্য চাপ দেন, অথচ শ্রমিকের অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পরিবেশগত মান বজায় রাখার প্রত্যাশা করেন। এই দ্বৈত অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির পুরো ব্যয় শুধু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দিলে সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। তবে আর্থিক সমস্যার অজুহাতে শ্রমিকের ন্যূনতম অধিকারও খর্ব করা যায় না। কারখানার প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ এবং ব্যয় কমানোর উদ্যোগে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।সাম্প্রতিক আন্দোলনে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কারখানা বন্ধ, উৎপাদন ব্যাহত এবং শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিজিএমইএর হিসাবে, ১ নভেম্বর ৫২৯টি কারখানা বন্ধ ছিল এবং প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি। বিক্ষোভের কারণে সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে; কোথাও ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। শ্রমিকের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সহিংসতা, ভাঙচুর ও জনদুর্ভোগও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বলপ্রয়োগ করে অসন্তোষ দমন করলে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং অবিশ্বাস বাড়বে। শ্রমিকের অভিযোগ শুনতে হবে, সংঘর্ষের ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে এবং আইনসম্মতভাবে দাবি জানানোর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি এবং কোনো ধরনের উসকানি বা সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা আলাদাভাবে বিবেচনা করাও জরুরি।তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানও এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক অসন্তোষ শুধু কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করে না; রপ্তানি আদেশ, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, বিনিয়োগ এবং লাখ লাখ পরিবারের জীবিকাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক শক্তি। উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে নতুন রপ্তানি আদেশ পাওয়া কঠিন হবে এবং দেশের দীর্ঘদিনের বাজার-সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এই বাস্তবতা শ্রমিকের দাবি দমনের যুক্তি হতে পারে না। বরং শিল্পের স্থিতিশীলতার স্বার্থেই শ্রমিকদের অসন্তোষের কারণ দূর করা জরুরি।প্রতিযোগিতার অর্থ শুধু কম মজুরিতে পণ্য উৎপাদন নয়। শ্রমিকের আয় অপর্যাপ্ত হলে পুষ্টি, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ বাধাগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব পড়ে কর্মক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও কর্মক্ষেত্রে স্থিতিশীলতার ওপর। দক্ষ, সুস্থ ও নিরাপদ শ্রমশক্তি ছাড়া উন্নত মানের পণ্য উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য সম্ভব নয়। শ্রমিকের আয় বাড়লে তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নতির পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে চাহিদাও বাড়তে পারে। তাই মজুরি বৃদ্ধিকে শুধু উৎপাদন ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে কম মজুরির সুবিধার বদলে দক্ষতা, পণ্যের মান, দ্রুত সরবরাহ ও উন্নত কর্মপরিবেশের ওপর প্রতিযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে।এ ক্ষেত্রে নতুন মজুরি বোর্ডের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোর্ডকে শ্রমিক ও মালিক—উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, যাতায়াত, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনের প্রকৃত ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা দরকার। শুধু সর্বনিম্ন মজুরির অঙ্ক নয়, বিভিন্ন গ্রেডের মজুরির ব্যবধান, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক এবং অন্যান্য সুবিধাও পর্যালোচনা করতে হবে। শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব যেন কার্যকর হয় এবং তাঁদের মতামত গুরুত্ব পায়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। কয়েক বছর পরপর আন্দোলন ও সংঘর্ষের মাধ্যমে মজুরি নির্ধারণের পরিবর্তে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মজুরি ঘোষণার পর তা বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, সেটিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।শিল্পের প্রতিযোগিতা বাড়াতে উৎপাদন ব্যবস্থার দুর্বলতাও দূর করতে হবে। অনেক কারখানায় পুরোনো যন্ত্রপাতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দক্ষতার ঘাটতি, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার অপচয় ব্যয় বাড়ায়। আধুনিক প্রযুক্তি, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হবে। শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়লে পণ্যের মান ও উৎপাদনের গতি উন্নত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার ও শিল্প সংগঠনগুলো যৌথভাবে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সহায়তা এবং ক্ষুদ্র কারখানার আধুনিকায়নে উদ্যোগ নিতে পারে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের নামে শ্রমিক ছাঁটাই কিংবা তাঁদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। দক্ষতার উন্নতির সঙ্গে আয় ও কর্মপরিবেশের উন্নতিও যুক্ত করতে হবে।আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যেসব ব্র‍্যান্ড শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের কথা বলে, তাদের ক্রয়মূল্য নির্ধারণেও এসব বিষয় প্রতিফলিত হওয়া উচিত। উৎপাদন ব্যয় ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার উপযোগী দাম না দিয়ে শুধু কম মূল্যে পণ্য কেনার প্রতিযোগিতা তৈরি করলে শ্রমিকের অধিকার রক্ষা কঠিন হবে। সরকার, মালিক সংগঠন ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ন্যায্য মূল্য, সময়মতো অর্থ পরিশোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তির বিষয়ে সমঝোতা গড়ে তুলতে হবে। ক্রেতাদের কাছ থেকে শেষ মুহূর্তে অর্ডার পরিবর্তন, অযৌক্তিক মূল্যছাড় কিংবা বিল পরিশোধে বিলম্বের মতো চর্চাও বন্ধ হওয়া দরকার।সরকারের উচিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে স্বল্পসুদে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তা দেওয়া। তবে এই সহায়তার সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি, নিরাপত্তা ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার শর্ত যুক্ত থাকতে হবে। কারখানাভিত্তিক শ্রমিক-মালিক আলোচনা, কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং নিয়মিত শ্রম পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিক সংগঠনগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে দাবি আদায়ের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকে এবং শ্রমিকের প্রকৃত স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। শ্রমিকের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকলে অসন্তোষ বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার আগেই সমাধান করা সম্ভব।বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ শ্রমিক ও মালিকের এক পক্ষের জয় কিংবা অন্য পক্ষের পরাজয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া নয়; এটি উৎপাদনব্যবস্থার অপরিহার্য ভিত্তি। আবার শিল্পের টিকে থাকা, রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানও জাতীয় স্বার্থের অংশ। নতুন মজুরি বোর্ডকে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত দিতে হবে, মালিকদের তা বাস্তবায়নের সদিচ্ছা দেখাতে হবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে কম মজুরির প্রতিযোগিতা থেকে দক্ষতা, মান ও ন্যায্য শ্রমসম্পর্কের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে হবে। শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন ও শিল্পের বিকাশকে একই নীতির অংশ করতে পারলেই বর্তমান সংকট থেকে টেকসই সমাধান বেরিয়ে আসবে।(মতামত লেখকের নিজস্ব)[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।]

ডিগ্রির বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট ও মানবসম্পদের অপচয়

দেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটছে, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানাধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন। কিন্তু তাদের অনেকেই যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। কেউ বেকার থাকছেন, কেউ স্বল্প আয়ের অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন, আবার কেউ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় নিজের কর্মক্ষম সময় হারাচ্ছেন। অর্থাৎ দেশ শিক্ষিত জনশক্তি তৈরি করছে, কিন্তু সেই জনশক্তিকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করতে পারছে না। বিশ্বব্যাংকের ডেমোগ্রাফিক চেইঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্নাতক বা তার বেশি শিক্ষিত মানুষের ৬০ শতাংশের বেশি অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত। দেশের মোট কর্মীর প্রায় ৮৪ শতাংশ, অর্থাৎ ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার মাত্র ২.৭ শতাংশ, যেখানে ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির গড় ৫.৪ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান শুধু বেকারত্বের চিত্র নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার গভীর দুর্বলতার প্রতিফলন।বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটলেও শিক্ষিত মানুষের জন্য মানসম্মত চাকরির বাজার সমানতালে বড় হয়নি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উচ্চ শিক্ষিতদের অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত থাকার তথ্য এই বাস্তবতাই তুলে ধরে। একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি যে অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত থাকা মানেই বেকার থাকা নয়। বরং অনেক শিক্ষিত মানুষ কাজ করছেন, কিন্তু তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। এটি মানবসম্পদের অপচয় বলেই বিবেচ্য। একজন শিক্ষার্থী ১৬ থেকে ১৮ বছর শিক্ষা অর্জনে ব্যয় করেন। পরিবার অর্থ বিনিয়োগ করে, রাষ্ট্র শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যয় করে। অথচ শেষ পর্যন্ত সেই শিক্ষার্থী যদি তার যোগ্যতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে যুক্ত হন, তাহলে ব্যক্তিগত ও জাতীয় উভয় পর্যায়েই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল কমে যায়। সমস্যার পেছনে শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের অসামঞ্জস্য, ব্যবহারিক দক্ষতার ঘাটতি এবং উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি না হওয়া গুরুত্বপূর্ণ কারণ।বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আধিক্য। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ কর্মী এই খাতে নিয়োজিত। তাদের বড় অংশ ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, গৃহকর্ম ও বিভিন্ন সেবামূলক পেশায় কাজ করেন। কিন্তু এসব কাজের ক্ষেত্রে নিয়োগপত্র, নির্ধারিত বেতন, স্বাস্থ্যবিমা, পেনশন এবং চাকরির নিরাপত্তা অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে।  অর্থাৎ বাংলাদেশে কাজের সুযোগ থাকলেও মানসম্মত কাজের সংকট রয়েছে। একজন মানুষ সারাদিন কাজ করেও যদি ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে না পারেন, অসুস্থ হলে চিকিৎসার নিশ্চয়তা না পান কিংবা যেকোনো সময় কাজ হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে সেই কর্মসংস্থানকে টেকসই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলা যায় না।আমাদের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তরুণ জনগোষ্ঠী। কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত বেশি থাকলে একটি দেশ উৎপাদন, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ পায়। অর্থনীতিতে একে জনসংখ্যাগত সুবিধা বলা হয়। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়তে থাকবে। ২০৫১ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আরও উদ্বেগজনক হলো, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে শ্রমের জোগান কর্মসংস্থানের চাহিদার তুলনায় ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি হতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেই অর্থনীতি শক্তিশালী হবে না। তাদের জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কাজ তৈরি করতে হবে। তা না হলে আজকের তরুণ জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার বছরে মাত্র ২.৭ শতাংশ। অথচ ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় ৫.৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরির গতি তুলনামূলকভাবে অর্ধেক। এর পেছনে বিনিয়োগের দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, জ্বালানি সংকট, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং শিল্পের সীমিত বহুমুখীকরণ কাজ করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে কর্মী কমাচ্ছে। ফলে প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করা তরুণদের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বিশ্ব ব্যাংকের আরেকটি অর্থনৈতিক পূর্বাভাসও উদ্বেগজনক। সংস্থাটির অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ উন্নয়ন পর্যালোচনায় ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে দুর্বল বিনিয়োগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের সমস্যাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অতএব, শুধু শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতা বাড়ালেই হবে না; তাদের নিয়োগ করার মতো প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানও তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সংকটের সঙ্গে নারীর সীমিত শ্রমবাজার অংশগ্রহণ গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৩৮ শতাংশ। সামাজিক বাধা, নিরাপদ কর্ম পরিবেশের অভাব, শিশুযত্নের সীমিত ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং পারিবারিক দায়িত্ব নারীদের কর্মজীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। অথচ নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ানো গেলে পরিবারের আয়, জাতীয় উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সবই বাড়তে পারে। এ জন্য নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ, সমান মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, নিরাপদ যাতায়াত এবং কর্মস্থলে শিশুযত্নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।কর্মসংস্থানের জন্য শুধু শিক্ষাগত সনদ যথেষ্ট নয়; সুস্বাস্থ্য, দক্ষতা এবং সামাজিক নিরাপত্তাও প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা উঠে এসেছে। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ২০ শতাংশ সেখানে কর্মরত। শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি। আবার প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশের ভর্তির হার ৩৬ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৬২ শতাংশ। পরিসংখ্যান দেখায়, মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি এখনো সমানভাবে শক্তিশালী হয়নি। সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পেনশন ও অবসরকালীন নিরাপত্তা নেই। ফলে ভবিষ্যতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।এই সংকট সমাধানে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা। শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে ব্যবহারিক শিক্ষা, ইন্টার্নশিপ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তৈরি পোশাকশিল্পের বাইরে ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, পর্যটন এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রযুক্তি এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। কারণ এই খাতের বিকাশ নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। ন্যায্য মজুরি, নিয়োগপত্র, স্বাস্থ্যবিমা এবং পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে অদক্ষ জনশক্তির পরিবর্তে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বব্যাংকও ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন সহজ করা, দক্ষতা উন্নয়ন, নারীর কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে।বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে আমরা কি আমাদের জনশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি? একদিকে শিক্ষিত তরুণেরা যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না, অন্যদিকে দেশের ৮৪ শতাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরির গতি কম, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ সীমিত এবং ভবিষ্যতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে অর্থনৈতিক সাফল্য বিচার করা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মানসম্মত চাকরি, মানুষের আয় ও উৎপাদনশীলতা, এবং শিক্ষিত তরুণেরা তাদের মেধা কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছেন কি না। বাংলাদেশের সামনে এখনো জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ২০৪৫ সালের সময়সীমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই সুযোগ অনন্তকাল থাকবে না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ, আর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ব্যর্থতা হবে সেই মানুষকে কাজে লাগাতে না পারা। তাই উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে শুধু অবকাঠামো নয়, মানবসম্পদ, মানসম্মত কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতাকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ধারিত হয় তার মানুষের কাজের সুযোগ, আয়ের নিরাপত্তা এবং উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ব্যাংকার; সহযোগী অধ্যাপক (খন্ডকালীন), অর্থনীতি বিভাগ, সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়]

সমবায়: উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার অন্যতম হাতিয়ার

‘করব সমবায়, গড়ব দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ৭ নভেম্বর পালিত হচ্ছে ৫৫তম জাতীয় সমবায় দিবস। একটি দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে হলে শুধু সরকারের উদ্যোগ বা ব্যক্তির একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব। সমবায়ের মূল দর্শনই হলো এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা। ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’—এই চেতনা ধারণ করেই গড়ে উঠতে পারে একটি স্বনির্ভর ও বৈষম্যহীন সমাজ।মানুষের সভ্যতার বিকাশে সমবায়ের ভূমিকা বহু পুরোনো। প্রকৃতির প্রতিকূলতা মোকাবিলা ও জীবনধারণের প্রয়োজনে মানুষ একসময় সংঘবদ্ধ হতে শিখেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, একক প্রচেষ্টার চেয়ে সম্মিলিত উদ্যোগে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি। আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সমবায় সেই যৌথ প্রচেষ্টারই একটি পরীক্ষিত রূপ। বিশেষ করে বিত্তহীন ও স্বল্পবিত্ত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়নে সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও সমবায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, দুগ্ধ উৎপাদন, ক্ষুদ্র শিল্প, আবাসন, সঞ্চয় ও ঋণ কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমবায় সমিতি কাজ করছে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পুঁজি সংগ্রহ, উৎপাদন ও পণ্য বিপণনের সুযোগ পাচ্ছেন। কৃষক সম্মিলিতভাবে উৎপাদন ও বিপণন করতে পারলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও সহজ হবে। একইভাবে নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাবলম্বিতা অর্জনেও সমবায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে সমবায় অর্থনীতির সফল দৃষ্টান্ত রয়েছে। জার্মানি, ডেনমার্ক, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন, বিপণন ও পণ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আন্তর্জাতিক সমবায় জোটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ সমবায় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে সমবায় একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলনকে আরও গতিশীল করতে যুবসমাজকে যুক্ত করা জরুরি। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণকে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় পুঁজি সরবরাহ করা গেলে তারা সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারবে। এ জন্য উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্ষুদ্র শিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতে পণ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে দাদন ও উচ্চ সুদের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।তবে সমবায় আন্দোলনের বড় বাধা হলো অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা। অনেক ক্ষেত্রে সমবায়ের নামে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো সদস্যদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে ব্যক্তিগত লাভের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কোথাও সদস্যদের সঞ্চয় আত্মসাৎ করা হচ্ছে, কোথাও আবার কার্যক্রম চলছে নামমাত্র। এসব অনিয়ম বন্ধ করতে সমবায় সমিতির নিবন্ধন, নিরীক্ষা ও তদারকি জোরদার করতে হবে। সদস্যদের অংশগ্রহণ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সমবায়ের প্রকৃত সুফল পেতে হলে এর পরিচালনায় গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ৬৯২টি সমবায় সমিতি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঞ্চয়, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সমবায়কে কেবল আনুষ্ঠানিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন যুগোপযোগী নীতি, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা।দারিদ্র‍্য ও বৈষম্য কমিয়ে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সমবায় হতে পারে কার্যকর হাতিয়ার। এ জন্য রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিপর্যায়ে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সম্মিলিত কল্যাণকে গুরুত্ব দিতে হবে। সমবায়ের চর্চা যত বিস্তৃত হবে, মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক সংহতি তত বাড়বে। [লেখক: শিক্ষক, কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম]

রম্যগদ্য: “কিয়ের লেখা, কিয়ের পড়া, বিদেশ যামু লাইনে খাড়া”

হেঁঃ হেঁঃ হাগলনি কোনো, লেহাপড়া ছাড়া বিদেশ গেলে তো, পানি চায়াও খাবা পারবেন না?তুই বললেতো চলবে না! তুই দেখিসনি তোদের সব জেন-জির ছাত্ররা, ধরে ধরে সব শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করালো!হ, দেখছিতো। মাস্টার মানুষ মাস্টারি করবেন, পোলাপানরে মানুষ করবেন, আপনে ক্যান সরকারের পা-চাঁটবেন!ওম্মা কচি খোকা, সরকারের কথা না শুনলে এমপিওভুক্ত হবে না, পেনশন পাবে না, নিয়মিত বেতন পাবে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ পাবে না।শিক্ষকরা যদি বেতনই না পায় তাহলে তোর কথা মতো পোলাপানরে মানুষ করবে কীভাবে?এইসব ফালতু কথা কোয়েন না, পোলাপানরে মানুষ করবে কীভাবে! আপনেরা মিয়া শিক্ষক, আপনেরা ব্যাবাগতে এক লগে, এক হয়া যুদি কন, আমাগো পরবর্তী প্রজন্ম হ্যারাই ভবিষ্যতে আমাগো দেশ চালাইবো, হ্যাগোরে যুদি মানুষ না বানাই তায়লে জন্তু জানোয়ার দিয়া কি দেশ চলবো? কন কন, জন্তু জানোয়ার দিয়া কি দেশ চলবো?বাহ্! তোর কথায় যুক্তি আছে, বুঝলাম। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ওরাই ভবিষ্যতে আমাদের দেশ চালাবে। কিন্তু তোমার শিক্ষদের মাঝেইতো লাল, নীল,সবুজ, হলুদ, ভায়োলেট,অরেঞ্জ কত রকমের রঙের বাহার। তাহলে সব শিক্ষক এক হয়ে একত্রে কাজ করবে কীভাবে!ক্যান মিয়া ভাই রংধনু দ্যাখেন নাই! রংধনুর মইধ্যে সাতটা রং কিন্তু ব্যেবাগতে মিল্লা একটাই রংধনু তো, আপনেগো যত রঙই থাকুক নীতির প্রশ্নে আপোস না করলেইতো আপনেরা পরবর্তী প্রজন্মরে মানুষ করতে পারতেন।বাহ্ আমদের নিজ্স্ব রাজনৈতিক চিন্তাধারা থাকতে পারে না?আপনেরা মিয়া জিন্দেগীতে আর মানুষ হোইবে না! খেলার মইধ্যে রাজনীতি, পড়ার মইধ্যে রাজনীতি, বাথরুমের মইধ্যে রাজনীতি, বাজারের মইধ্যে রাজনীতি, ছেরিগো হলে রাজনীতি, ছ্যারাগো চান্দির মইধ্যে রাজনীতি, এই রাজনীতি করতে করতে বাঙালি জাতিটারে ছ্যারাভ্যারা কোইরালচ্চেন...বুঝলাম বুঝলাম সব ব্যাক্তিস্বার্থে রাজনীতিকে ব্যাবহার করে জাতিটার অবস্থা এমন করেছিস যে এখন কেউ আর তার নিজ মাতৃভূমিতে বসবাস করতে চায় না। সব বিদেশে পালাতে চায়।তো, আগে না আমাগো স্কুলের বাইল্য শিক্ষায় কোইতেন “জননীর জন্মভূমিশ্চঃ স্বর্গাদপী গরিয়সীঃ” মাত্তিভূমি বলে স্বর্গের চায়াও গরিমায় বড়, তো অহন পাবলিকে নিজ মাত্তিভূমি ছাইড়া ভাগবার চায় ক্যালা?“মাত্তিভূমি ছাইড়া ভাগবার চায়...কারণ তোমরা দেশ স্বাধীন করার পর এমন ভাবে দেশ পরিচালনা করছো যে পাবলিক বাপ বাপ বলে মাতৃভূমি ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে।হুনেন আপনেরাই শিক্ষিতরা বৃটিশ আমলে কোইতেন,“স্বদেশের কুকুর পুজা করো বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।” আর বর্তমানে আপনেগো দেশ পরিচালনার বাহার দেইখ্যা বাংলার ঠাকুররা বিদেশে যায়া সাবেগো কুকুর পাইল্লা জীবন চালাইতেছে।দ্যেখ পৃথিবীতে কেউ তার মাতৃভূমি ছেড়ে কোথাও থেকে শান্তি পায় না। ওই যে সারমেয়রা পর্যন্ত তুই বাড়ি থেকে যত দূরেই ছেড়ে দিয়ে আসিস ওরা ঠিকই আবার নিজ বাড়িতে ফিরে আসে। নাড়ীর টান তুই বুঝবি না।হ হ বুঝুম না ক্যালা, ভারত পাকিস্তান ভাগ হওনের সময় কত্ত লুকের কান্দন, তাগো চুক্ষের পানি শুকাইতে না শুকাইতে আপনেরা আবার ইস্ট-পাকিস্তান ওয়েস্ট-পাকিস্তান ভাগ হয়া গেলেন! আবার কত্ত পাবলিকের কান্দন, তাগো চুক্ষের পানি শুকাইতে না শুকাইতে আপনেরা আবার দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দল বানায়া আবার মাইরপিট, মারামারি, ফাটাফাটি লাগায়া রাখছেন! কী করবি বল, তোরা কিছু ব্যাক্তি কেবল মাত্র নিজেদের জাগতিক সুখের জন্য, টাকা টাকা করে পুরো বাঙালি জাতিটার বারটা বাজাচ্ছিস।এই যে কন ট্যাকা ট্যাকা, অহন তো দেখলেন, ট্যাকা ট্যাকা কোইরা যা করলেন, পাবলিকে আপনেগো ঘরের চৌকাঠভি খুইল্লা লয়া গেছে, ট্যাকা কি কব্বরে লোইবেন!এখন ওই টাকায় ওদের বিদেশে আরামে রাখছে আর নিজের দেশের আম পাবলিকের জীবন ত্রাহি মধূসুদন ত্রাহি মধূসুদন করছে।ভাইনা ভালা, আপনেরা এবার নতুন প্রজন্ম জেন-জি’রে কন ভাই তুরা যেন ট্যাকার কাছে নিজেরে না বেইচ্চা দেশটারে একটু মানুষের মতো মানুষ কর। আমি কি বলবো বল, কে যেন লিখেছিলো,“ টাকা কড়ির টানটা প্রবল/ গতিটা তার রকেট/ ভুলেই বসেন সব মহাজন/ কাফনের নাই পকেট।”বুঝলেন চুরে শুনে না ধর্মের কাহিনি, এইসব ছড়া মড়া দিয়া কাম হোইবো না। আপনেরা যুদি আইণ কড়া করার না পারেন, ব্যাংক লুটেরাগো ধইরা বাইন্দা না পিটান, তায়লে কুনো দিনও বাঙালি আর তার মাত্তিভূমিতে থাকতে চাইবো না! আমাগো পোলাপান ব্যেবাকতে আবার বৃটিশ আমলের মতুন বিদেশিগো চাকর হয়া জীবন পার করবো। এই ভারত বর্ষের স্বাধীনতা, স্বাধীন ভারত, স্বাধীন পাকিস্তান, স্বাধীন বাংলাদেশ ব্যেবাগ স্বাধীন পাবলিক আবার বিদেশি গো পাচাঁটবো। কোন কবি না কোইছিলো, “এই জীবন চেয়েছিলে বুঝি...!!কবির কথায় যখন তুললি, তাহলে কবি কিশোর সুকান্তের কবিতা শোন“ছাড়পত্র”...কন হুনি কবি কিশোর সুকান্তের“ছাড়পত্ত”...খালি কথার মাঝে কথা!ঠিক আছে ঠিক আছে কন হুনি, “ছাড়পত্ত”“ছাড়পত্র” কবি কিশোর সুকান্তের কবিতা“ছাড়পত্র” ...এসেছে নতুন শিশু/ তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান/ চলে যাবো/ তবু যতক্ষণ/ দেহে আছে প্রাণ/ প্রণপনে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল/ এ’বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার...ভাইডি বিশ্ব লাগবো না, আপনে খালি বাংলাদেশকে এই শিশুর বাসযোগ্য কোইরা দ্যান তায়লে কেউ আর বিদেশ যায়া মরবো না...ঠিক আছে,বাংলাদেশকে এই শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি, এই হোক আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার...   [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রাম: পরস্পরবিরোধী, নাকি পরিপূরক?

জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, শ্রেণিসংগ্রাম ইত্যাদি নিয়ে পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা চলছে। বামপন্থী এক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন, “কমিউনিস্টরা যখন সারা দেশে কলকারখানায়, ক্ষেতখামারে, চা-বাগানে শ্রেণিসংগ্রাম গড়ে তুলতে ব্যাপৃত, তখন একদল পুরোনো সেই খেলায় মেতে উঠেছে। পুরো আন্দোলনকে জাতীয়তাবাদের চোরাবালিতে ডুবিয়ে মারতে চাইছে।” উদ্ধৃত বক্তব্যটি জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের আন্তঃসম্পর্ক বিষয়ে কিছু মৌলিক তাত্ত্বিক প্রশ্ন সামনে এনেছে।জাতীয়তাবাদের বুর্জোয়া সীমাবদ্ধতা এবং শ্রেণিসংগ্রামের ওপর তার সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক রূপ ও রাজনৈতিক চরিত্রের মধ্যে পার্থক্য না করে তাকে সামগ্রিকভাবে শ্রেণিসংগ্রামের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করা কতটা যথার্থ? বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশের ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলন এবং বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি আরও গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।শ্রেণিসংগ্রাম কি জাতীয় প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন?মার্ক্সবাদে শ্রেণিসংগ্রাম কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। উৎপাদনসম্পর্ক ও তার অন্তর্নিহিত শ্রেণিগত দ্বন্দ্বের ভিত্তিতে, সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র, জাতীয় ও জাতিগত নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক আধিপত্যের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শ্রেণিসংগ্রাম বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানা রূপে বিকশিত হয়।শ্রেণিশোষণ ও জাতীয় নিপীড়ন অভিন্ন বিষয় নয়। কিন্তু ইতিহাসের নির্দিষ্ট পর্যায়ে এ দুটি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। বিশেষত ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের অধীনে জাতীয় নিপীড়ন প্রায়ই অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক অধিকারহীনতার সঙ্গে যুক্ত থেকেছে। ফলে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম অনেক ক্ষেত্রেই শ্রেণিসংগ্রামের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।তবে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে বিভিন্ন শ্রেণির অংশগ্রহণের অর্থ তাদের শ্রেণিস্বার্থের বিলুপ্তি নয়। জাতীয় ঐক্যের মধ্যেও শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত ও বুর্জোয়ার স্বার্থগত দ্বন্দ্ব বহাল থাকে। মার্ক্সবাদী রাজনীতির দায়িত্ব এই দ্বন্দ্বকে উপলব্ধি করে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের ভেতর শ্রমজীবী মানুষের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন ও মাও: জাতীয় প্রশ্নের ঐতিহাসিক উপলব্ধিমার্ক্স ও এঙ্গেলস জাতীয়তাবাদকে নির্বিচারে প্রত্যাখ্যান করেননি। তারা পোল্যান্ডের জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রামকে সমর্থন করেছিলেন। আয়ারল্যান্ডের প্রশ্নে মার্ক্স দেখিয়েছিলেন, আইরিশ জনগণের ওপর ব্রিটিশ আধিপত্য ইংরেজ শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক চেতনাকেও বিভক্ত ও দুর্বল করে। অর্থাৎ, নিপীড়ক জাতির শ্রমিকশ্রেণির মুক্তিও নিপীড়িত জাতির স্বাধীনতার প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।লেনিন এই উপলব্ধিকে আরও বিকশিত করেন। তিনি নিপীড়ক জাতির আধিপত্যবাদী জাতীয়তাবাদ এবং নিপীড়িত জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য করেছিলেন। তার কাছে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করা ছিল শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতি প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত।মার্ক্স ও এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ইশতেহার-এর ঐতিহাসিক আহ্বান ছিল—‘দুনিয়ার মজদুর, এক হও!’ পরবর্তী সময়ে লেনিনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ঔপনিবেশিক ও নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তিসংগ্রামকে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই রাজনৈতিক উপলব্ধি থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় সেই বিখ্যাত আহ্বান—‘দুনিয়ার শ্রমিক ও নিপীড়িত জাতিসমূহ, ঐক্যবদ্ধ হও!’১৯২০ সালের ডিসেম্বরে এক বক্তৃতায় লেনিন নিজেই এই সম্প্রসারিত স্লোগান উদ্ধৃত করে তার রাজনৈতিক যথার্থতা সমর্থন করেছিলেন। এটি মার্ক্সবাদের শ্রেণিগত অবস্থান পরিত্যাগের ঘোষণা ছিল না; বরং সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংগ্রামের সঙ্গে নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তিসংগ্রামকে যুক্ত করার রাজনৈতিক উপলব্ধি।মাও সেতুংয়ের চিন্তায় জাতীয় মুক্তি ও আন্তর্জাতিকতাবাদের এই সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। জাপানি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চীনের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রেক্ষাপটে ১৯৩৮ সালে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, একজন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদী হয়েও কি দেশপ্রেমিক হতে পারেন? মাওয়ের উত্তর ছিল দ্ব্যর্থহীন—একজন কমিউনিস্টের জন্য এটি কেবল সম্ভাবনার বিষয় নয়, তাকে অপরিহার্যভাবে তা হতে হবে।মাওয়ের কাছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেম সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিপন্থী ছিল না। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির স্বাধীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন ও মাওয়ের জাতীয় প্রশ্নসংক্রান্ত অবস্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাত্ত্বিক পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক শিক্ষা তাদের চিন্তায় পাওয়া যায়—জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণিমুক্তির সম্পর্ককে কোনো যান্ত্রিক সূত্রে নির্ধারণ করা যায় না; তার বিচার করতে হয় সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভিত্তিতে।ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ এবং উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদ কি এক?ইউরোপে আধুনিক জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছিল সামন্ততান্ত্রিক সমাজের রূপান্তর, পুঁজিবাদী বাজারের সম্প্রসারণ, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ এবং নাগরিক পরিচয়ের উত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায়। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন ধারা প্রধানত ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ, সাম্রাজ্যবাদ এবং জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। আবার কিছু ব্যতিক্রমও ছিল। যেমন, আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে নিপীড়িত জাতির মুক্তিকামী জাতীয়তাবাদও বিকশিত হয়েছিল।অন্যদিকে, ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক জাতীয়তাবাদের একটি প্রধান উৎস ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এখানে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে কৃষকের জমির অধিকার, শ্রমিকের শোষণমুক্তি, ঔপনিবেশিক সম্পদ লুণ্ঠনের অবসান এবং জনগণের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও যুক্ত হয়েছিল।তবে উপমহাদেশীয় জাতীয়তাবাদও কোনো একক রাজনৈতিক ধারা ছিল না। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদ, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মুসলিম জাতীয়তাবাদ, দক্ষিণপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং পরবর্তী সময়ে ভাষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে বিকশিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ—এসব ধারার সামাজিক ভিত্তি, রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ঐতিহাসিক পরিণতি এক ছিল না।আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তায় জাতীয়তাবাদকে তার ঐতিহাসিক উৎস, সামাজিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক চরিত্র অনুযায়ী বিভিন্ন ধারায় বিশ্লেষণ করা হয়—নাগরিক জাতীয়তাবাদ, জাতিগত জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ, ঔপনিবেশিকতাবিরোধী জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ এবং বামপন্থী বা সমাজতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি। একই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্যেও একাধিক প্রবণতা সহাবস্থান করতে পারে। এমনকি ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ও শ্রেণিশক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের সঙ্গে একই জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক চরিত্রও বদলে যেতে পারে।এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো কোনো বামপন্থী নেতা আসলে কোন জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন? বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে, আধিপত্যবাদী ও সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে, নাকি পাকিস্তানি রাষ্ট্রের জাতীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বাঙালির ঐতিহাসিক মুক্তিকামী জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধেও?উপমহাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম ও শ্রেণিসংগ্রামের ঐতিহাসিক সম্পর্কভারতীয় উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সমান্তরালেই এখানে শ্রমিক-কৃষকের শ্রেণিভিত্তিক সংগ্রাম বিকশিত হয়েছিল। ১৯২০-এর দশক থেকে শ্রমিক সংগঠন, কৃষক আন্দোলন এবং কমিউনিস্ট রাজনীতির বিস্তার ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী সংগ্রামকে নতুন সামাজিক ভিত্তি দিয়েছিল।বাংলার তেভাগা আন্দোলনে ভাগচাষিরা জোতদারি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিলেন। তেলেঙ্গানার কৃষক সংগ্রাম সামন্ততান্ত্রিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এসব আন্দোলন জাতীয় স্বাধীনতার বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না; আবার জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া নেতৃত্বের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজেদের আবদ্ধ রাখেনি।তবে উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে জাতীয় প্রশ্নে গুরুতর তাত্ত্বিক ও কৌশলগত বিভ্রান্তিও দেখা গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট পার্টির ‘জনযুদ্ধ’ নীতি এবং ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত জাতীয়তাবাদী গণআন্দোলনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে জটিল করে তোলে।একইভাবে, দেশভাগের প্রাক্কালে গঙ্গাধর অধিকারীর প্রতিবেদনে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে গৃহীত অবস্থান এবং মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দেয়। জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক জাতিসত্তা এবং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার পার্থক্য নির্ধারণে এই অভিজ্ঞতা আজও আলোচনার দাবি রাখে।এই ইতিহাসের শিক্ষা হলো, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক অন্ধ অনুসরণ কিংবা নির্বিচার বিরোধিতার নয়। জাতীয় মুক্তির প্রগতিশীল উপাদানগুলোকে ধারণ করেও শ্রমিক-কৃষকের স্বতন্ত্র শ্রেণিস্বার্থ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অক্ষুণ্ন থাকে।বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা: ভৌগোলিক স্বাধীনতা থেকে শ্রেণিমুক্তির অসমাপ্ত সংগ্রামপাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এখানে জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণিসংগ্রামের আন্তঃসম্পর্ক অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয় মুক্তির যে আকাঙ্ক্ষা বিকশিত হয়েছিল, তার পেছনে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নের পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকারহীনতা, আঞ্চলিক শোষণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সম্পদ বণ্টনের অন্যায্যতা মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল। অর্থাৎ, বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ভেতরেই শ্রেণিগত অসন্তোষের একটি শক্তিশালী উপাদান শুরু থেকেই উপস্থিত ছিল। তৎকালীন বামপন্থী ও কমিউনিস্টদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব ছিল এই জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে শ্রমিক-কৃষকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা।১৯৭১ সালে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জিত হলেও উৎপাদনসম্পর্ক ও সম্পদের ওপর শ্রেণিগত নিয়ন্ত্রণের কোনো মৌলিক রূপান্তর ঘটেনি। ফলে জাতীয় মুক্তির পরবর্তী ঐতিহাসিক দায়িত্ব ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির দিকে এগিয়ে নেওয়া। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সীমাবদ্ধতা এখানেই। স্বাধীনতার পর শ্রমিক-কৃষকের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা, জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা এবং মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বামপন্থীরা কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এই ব্যর্থতার দায় কেবল বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের ওপর চাপিয়ে দিলে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দুর্বলতার আত্মসমালোচনা আড়ালে পড়ে যায়।শ্রেণিসংগ্রামের কথা উচ্চারণ করা আর বাস্তবে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করা এক বিষয় নয়। শ্রেণিসংগ্রামকে কেবল কারখানার মালিক ও শ্রমিকের অর্থনৈতিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র, গণতান্ত্রিক অধিকার, ধর্মীয় আধিপত্য, সাম্রাজ্যবাদী নির্ভরতা এবং জাতীয় নিপীড়নের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো আড়ালে পড়ে যায়। অথচ এসব বিষয় শ্রেণিশক্তির ভারসাম্য ও রাজনৈতিক সংগ্রামের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। জাতীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্ন থেকে শ্রেণিসংগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করা মার্ক্সবাদী রাজনীতিকে সংকীর্ণ ‘অর্থনীতিবাদে’ নামিয়ে আনার ঝুঁকিও তৈরি করে।বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় জাতীয় প্রশ্নটি একটি নতুন তাৎপর্য নিয়ে সামনে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক ধারা এবং ধর্মান্ধ ও উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো যখন রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার করছে, এমন প্রেক্ষাপটে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক প্রগতিশীল উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন নতুন গুরুত্ব পায়।এখানে জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন নিছক কোনো আবেগ নয়; এটি রাষ্ট্রের আদর্শিক চরিত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অর্জন রক্ষার প্রশ্ন। গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হলে শ্রমিকশ্রেণির সংগঠন, প্রতিবাদ এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিসরও সংকুচিত হয়। তদুপরি, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা শ্রমজীবী মানুষকে বিভক্ত করে এবং তাদের অভিন্ন শ্রেণিস্বার্থের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।সে দিক থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ স্বাধীনতা-পরবর্তী যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ এটি এখন কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; বরং ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা রক্ষার রাজনৈতিক ঢাল।জাতীয় প্রশ্ন ও শ্রেণিপ্রশ্নের এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক সিপিবির বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেও দৃশ্যমান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর চুক্তি, দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ কিংবা জাতীয় সম্পদের ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সিপিবির যে প্রতিবাদ, তার মূল রাজনৈতিক ভিত্তি কী?এসব আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। এগুলো সরাসরি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ক্ষেত্র, যার সঙ্গে জাতীয় মুক্তির চেতনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সংগ্রাম এবং দেশের অভ্যন্তরে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পরস্পরের পরিপূরক।বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রগতিশীল উত্তরাধিকার ধারণ করার অর্থ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের আনুগত্য স্বীকার করা নয়; আবার পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর স্বতন্ত্র পরিচয় ও অধিকারকে অস্বীকার করাও নয়। জাতীয় চেতনার প্রকৃত গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য সব নাগরিকের সমান মর্যাদা এবং সব জাতিসত্তার অধিকার নিশ্চিত করতে পারাটাই মূল কথা। জাতীয় পরিচয়ের বৃত্তের বাইরে গিয়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ যদি স্বতন্ত্র আদিবাসী পরিচয়ে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি করেন, তবে তা প্রদানে বাধা কোথায়?জাতীয় মুক্তির অর্জন রক্ষা এবং শ্রেণিশোষণের অবসান—এই দুটি সংগ্রামকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করানো নয়, বরং দ্বান্দ্বিক ঐক্যে বিকশিত করাই আজকের দিনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ওপর প্রধান ঐতিহাসিক দায়িত্ব হিসেবে বর্তায়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক কর্মী; কানাডা প্রবাসী]

বাগদা ফার্মের আন্দোলন: সাঁওতালদের অসহায়ত্বের অবসান কবে?

সমতল ভূমির আদিবাসীদের রয়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অধিকার হারানোর বেদনা এবং নীরবে দেশত্যাগের করুণ অধ্যায়। গত কয়েক দশকে সবচেয়ে আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাগুলোর একটি হলো গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের জমি আন্দোলন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলন কেবল ভূমির অধিকার আদায়ের লড়াই নয়; এটি প্রান্তিক আদিবাসী, বিশেষ করে সাঁওতালদের টিকে থাকার সংগ্রাম, আত্মপরিচয়ের লড়াই এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অসহায়ত্বের এক করুণ দলিল। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বরের রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পেরিয়ে গেছে ১০ বছর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনো বাগদা ফার্মের সাঁওতালসহ আদিবাসীদের জীবনে স্বস্তি বা স্থায়ী সমাধান আসেনি। তাদের পৈতৃক জমি উদ্ধার তো দূরের কথা, নিত্যনতুন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে তারা দিন কাটাচ্ছেন উচ্ছেদের আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায়।বাগদা ফার্মের সংকটের সূত্রপাত ১৯৬২ সালে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার মহিমাগঞ্জ চিনিকলের জন্য আখ চাষের উদ্দেশ্যে স্থানীয় সাঁওতালসহ আদিবাসী ও বাঙালিদের কাছ থেকে ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে। অধিগ্রহণের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল, কখনো ওই জমিতে আখ চাষ বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা চিনিকল বন্ধ হয়ে গেলে জমি মূল মালিক বা তাদের উত্তরাধিকারীদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। ২০০৪ সালে লোকসানের মুখে চিনিকলটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ চুক্তির শর্ত না মেনে আখ চাষের পরিবর্তে অন্যান্য ফসল চাষ এবং প্রভাবশালীদের কাছে জমি ইজারা দেওয়া শুরু করে। আদিবাসীরা দেখলেন, তাদের পৈতৃক জমিতে চুক্তির শর্ত মানা হচ্ছে না। ফলে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ও তিন ফসলি জমি ফেরত পাওয়ার দাবিতে তারা গড়ে তোলেন ‘সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি’। পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, এই ন্যায্য দাবিই যেন তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।সাঁওতালসহ আদিবাসীদের কাছে ৬ নভেম্বর ন্যায়বিচার না পাওয়ার এক কালো অধ্যায়। দিনটির কথা মনে পড়লে এখনো তারা শিউরে ওঠেন। সেদিন আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ, চিনিকল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় একদল প্রভাবশালী সশস্ত্র ব্যক্তির যৌথ হামলায় সাঁওতাল পল্লী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত হন শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু নামের তিন সাঁওতাল। হামলা শুধু হত্যাকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সাঁওতালদের সহায়-সম্পদ, রিকশা-ভ্যান, মাটির ঘর ও বসতবাড়িতে একযোগে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার ভিডিওচিত্র পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। শত শত সাঁওতাল পরিবার সবকিছু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি, ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসীরা পাননি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি প্রক্রিয়ার স্থবিরতা সাঁওতালদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সামনে চরম অসহায়ত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের রক্তভেজা তিন ফসলি জমিতে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) মাধ্যমে একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনের সরকারি সিদ্ধান্ত নতুন সংকট তৈরি করেছে। জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ইপিজেড নির্মিত হলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ সাঁওতাল পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত চাষের জমি হারাবে। আবারও আদিবাসীরা নিজ দেশে গৃহহীন ও উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রকল্প নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের বৈঠকগুলোতে মূল অংশীজন তথা ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতাল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না। আদিবাসীদের বাদ দেওয়ার এই প্রবণতা প্রমাণ করে, তাদের মতামত ও জীবনযাত্রার চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উন্নয়নের এই ধারায় আদিবাসীদের দীর্ঘশ্বাস ও কান্নার কোনো প্রতিফলন নেই।২০২৬ সালের বাস্তবতায় বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের অসহায়ত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের কোন্দল ও বিভেদ। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ক্লান্তি, প্রশাসনের চাপ এবং সুযোগসন্ধানী মহলের সূক্ষ্ম উসকানিতে ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির মধ্যে ভাঙন ধরেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসেও বাগদা ফার্মের নিয়ন্ত্রণ ও আন্দোলনের পথ নিয়ে সাঁওতালদের দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একসময়ের ঐক্যবদ্ধ আদিবাসী সমাজের মধ্যে যখন অবিশ্বাস, সন্দেহ ও অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা জায়গা করে নেয় এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মূল দাবিগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে। এই অভ্যন্তরীণ বিভেদ তাদের অসহায়ত্বকে আরও প্রকট করেছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও ন্যায্য অধিকার না পাওয়ার হতাশা থেকেই মূলত এই পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে।বর্তমানে মাদারপুর ও জয়পুরপাড়া এলাকার সাঁওতাল পরিবারগুলো চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যেকোনো মুহূর্তে উচ্ছেদ হওয়ার ভয় তাদের তাড়া করে ফিরছে। কৃষিই যাদের একমাত্র জীবিকা, সেই তিন ফসলি জমি থেকে উচ্ছেদ করা হলে তারা কোথায় যাবে, কীভাবে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেবে—তার কোনো সদুত্তর রাষ্ট্র বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নেই। আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির অধিকার আইনিভাবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় তারা আজ নিজ ভূমিতেই পরবাসী। সাঁওতালদের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ভূমি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও অস্তিত্বের ভিত্তি। ভূমি হারালে তাদের সামাজিক কাঠামো, ঐতিহ্য, জীবিকা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের সংবিধান সব নাগরিকের সমান অধিকার ও আইনের আশ্রয় লাভের নিশ্চয়তা দিয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ২৩ক অনুচ্ছেদে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের কথা বলা হয়েছে। এসব সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।বাগদা ফার্মের এই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট ও আদিবাসীদের অসহায়ত্ব দূর করতে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে।প্রথমত, চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। ১৯৬২ সালের মূল চুক্তি অনুযায়ী, চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জমির মালিকানা ও অধিকারসংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি করে প্রকৃত সাঁওতাল ও আদিবাসী মালিকদের উত্তরাধিকারীদের কাছে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।দ্বিতীয়ত, আদিবাসীদের বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া যাবে না। তিন ফসলি জমিতে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে জোরপূর্বক ইপিজেড নির্মাণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় আদিবাসী প্রতিনিধিদের সরাসরি অংশগ্রহণ ও তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।তৃতীয়ত, ২০১৬ সালের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ হত্যার সুষ্ঠু বিচার করতে হবে। একই সঙ্গে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর উপযুক্ত পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের আন্দোলন কেবল এক টুকরো জমির মালিকানার লড়াই নয়; এটি বাংলাদেশের আদিবাসীদের মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রতীক। রক্তের দাগ মাখা এই তিন ফসলি জমি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হলে তা দেশের মানবাধিকার ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর বড় আঘাত হবে। রাষ্ট্রকে শক্তি প্রদর্শনের পথ পরিহার করে সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের দিকে তাকাতে হবে। আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের অসহায়ত্বের অবসান ঘটিয়ে তাদের পৈতৃক ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই হবে রাষ্ট্রের অন্যতম বড় গণতান্ত্রিক ও মানবিক দায়িত্ব।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

রাষ্ট্র কি তার ইতিহাস ধারণে অক্ষম?

বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, “আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।”এই একটি বাক্যেই বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস, রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং জনগণের আত্মপরিচয়ের মূল কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র কি আজ সেই ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদায় ধারণ করছে?গত ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পূর্বনির্ধারিত একটি বিশেষ প্রদর্শনী উদ্বোধনের আগমুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় চার নেতা’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি ৩ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত চলার কথা ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুরোধে প্রদর্শনীটি স্থগিত করা হয়েছে। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, এটি কেবল একটি প্রদর্শনীর আয়োজন ছিল না, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় চার নেতার অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি উদ্যোগও ছিল। যে চার নেতা-সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান-১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভূমিকা স্মরণ করা কি রাষ্ট্রের জন্য কোনো অস্বস্তির বিষয় হওয়ার কথা? ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে তুলে এনে আরও পূর্ণাঙ্গ, সত্যনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাসকে একটি রাজনৈতিক দল নিজেদের একক সম্পত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। পরিবর্তনের পর বলা হয়েছিল, ইতিহাসের সব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ও অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখেছি? অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৭ মার্চ ও ৪ নভেম্বরসহ আটটি জাতীয় দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অথচ ৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ তারিখে গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়েছিল। একটি রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস, তার সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস এবং স্বাধীনতার জন্য নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের অবদান-এসব কি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্ব হারাতে পারে?ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করলে বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ-এসব আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত হয় বাংলাদেশের সংবিধান। আর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারের অভ্যন্তরে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। ঘটনাগুলো ভিন্ন সময়ের হলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, স্বাধীনতার সংগ্রাম ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কোনো একটি অধ্যায়কে আড়াল করে বা কোনো ব্যক্তির অবদানকে খাটো করে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা যায় না।এখানেই বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমান সরকার বিএনপির নেতৃত্বাধীন। দলটি নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে দাবী করে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁরই সন্তান। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি দলটির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। সেই প্রত্যাশা থেকেই প্রশ্ন উঠছে-অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি হওয়া ইতিহাসের মূল্যায়নসংক্রান্ত বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে বর্তমান সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে? জাতীয় চার নেতার স্মরণে একটি প্রদর্শনী নিরাপত্তাজনিত কারণে স্থগিত হওয়ার ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। স্বাধীনতার পক্ষে যাঁরা লড়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, সংগঠিত করেছেন, জীবন দিয়েছেন-তাঁদের অবদান বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসের অংশ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্কও হতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের সমাধান হওয়া উচিত গবেষণা, তথ্য-প্রমাণ ও মুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে- কোনো অধ্যায় বাদ দিয়ে, কোনো স্মরণানুষ্ঠান সংকুচিত করে কিংবা কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে আড়াল করে নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল বর্তমান পরিচালনা করা নয়, অতীতের সত্য ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতাও সংরক্ষণ করা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তার ইতিহাসের সুবিধাজনক অংশটুকু গ্রহণ করবে আর অস্বস্তিকর অংশটুকু এড়িয়ে যাবে-এমন হতে পারে না। জাতীয় চার নেতার অবদান, সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস কিংবা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্ব-সবকিছুর যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নিরাপত্তার বাস্তব উদ্বেগ থাকলে তা মোকাবিলা করে আয়োজনের বিকল্প ব্যবস্থা করা যায়, কিন্তু বারবার স্থগিত হওয়া বা বাদ পড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ইতিহাসচর্চার পরিসর সংকুচিত হলে তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।বাংলাদেশের জনগণ কোনো দলের মনোনীত ইতিহাস চায় না। তারা চায় সত্যনিষ্ঠ, পূর্ণাঙ্গ ও পক্ষপাতহীন ইতিহাস। কারণ ইতিহাসের মালিক কোনো সরকার নয়, কোনো রাজনৈতিক দলও নয়-ইতিহাসের উত্তরাধিকারী বাংলাদেশের জনগণ। লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

স্পিকারের বক্তব্যের আয়নায় সমাজের চিত্র

‘এখানে সমাজের নিকৃষ্ট যে লোকটা, সে-ই এমপি, মন্ত্রী হয়। সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজেরা সমাজের নেতা হয়ে গেছেন। সমাজব্যবস্থাটাই এমন হয়েছে, এখানে ভালো মানুষের নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই’—জাতীয় সংসদের স্পিকার।তিনি কঠিন সত্য কথা বলেছেন। তার কথায় প্রবল ক্ষোভ ও আত্মবিশ্বাস ছিল। দুটি বাক্যের মধ্যেই যেন গোটা দেশের চিত্র ফুটে উঠেছে। যদিও এমন কথা অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন। তবে জাতীয় সংসদের স্পিকার যখন এ কথা বলেন, তখন এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য ভিন্নতর হয়ে ওঠে।মনে পড়ে, আশির দশকের গোড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় এমনই একটি বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়েছিল। তখনকার দিনের একজন বিখ্যাত বিচারপতি তার প্রধান অতিথির ভাষণে একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। সেই বিচারপতির ছাত্ররাজনীতির পটভূমি ছিল খুবই প্রণিধানযোগ্য। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের ভিপি হিসেবে মাতৃভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ডাকসুর এক অভিষেক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘দেশে বর্তমানে ভালো মানুষের কোনো মূল্য নেই, সমাজে তারা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।’ একই সঙ্গে তরুণদের অবক্ষয়ের কথা তুলে ধরে বলেছিলেন, ‘যেখানে তরুণেরা বিপথগামী হবে, সেখান থেকে মুক্তি আশা করা যায় না।’এখন ভাবলে মনে হয়, বিগত চার দশকের বেশি সময়ে দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হওয়া ছাড়া মানুষের শ্রেণিচরিত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। আজও সেই বক্তব্য শতভাগ সত্য ও প্রাসঙ্গিক।২.বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সমাজের সৎ, বিবেকবান, দেশপ্রেমিক, ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষগুলো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা অসৎ, অসাধু, লুটেরা ও প্রতারকদের কালোটাকার আড়ালে ক্রমাগত ঢাকা পড়ে গেছেন। সমাজে তারা এতটাই অসহায় যে মুখ খুলে বলতেও পারছেন না, তারা ভালো নেই। একদিকে তারা পারছেন না নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে, অন্যদিকে অবৈধ অর্থের মালিক এবং নব্য চাঁদাবাজ ও দখলদার শ্রেণির কবলে পড়ে রক্ষা করতে পারছেন না নিজেদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। দেশের অরাজনৈতিক, দেশপ্রেমিক ভালো মানুষগুলোর মুখে যেন কোনো শব্দ নেই। তারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।গত কয়েক বছরে গ্রামে-গঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায় সর্বত্র একশ্রেণির উঠতি বয়সী তরুণের উত্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে এ জাগরণ সমাজহিতৈষী নয়, বরং সমাজবিরোধী। তারা লেখাপড়ায় নেই, থাকলেও যৎসামান্য। তারা ব্যবহৃত হচ্ছে নানা অপকর্মের হাতিয়ার হিসেবে। তাদের ব্যবহার করছেন তথাকথিত দলবাজ, পল্টিবাজ ও ক্ষমতালোভী নেতারা।নেতাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ আলোকিত। তারা বিদেশে পড়াশোনা করছে কিংবা অন্য উদ্দেশ্যে সেখানে বসবাস করছে। তাদের অর্থবিত্তের জোগান আসে এ দেশ থেকে। বিদেশে তারা আরাম-আয়েশের জীবন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে অন্যের সন্তানদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মাদক, নেশার উপকরণ, মোটরসাইকেলের চাবি। তাদের দেওয়া হচ্ছে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির দায়িত্ব। সারা দেশে তারাই এখন জাতীয় সমস্যার আরেক নাম।এদের কোনো দলমত নেই, আদর্শ নেই। তারা সব সময় ক্ষমতাসীন দলের কাছাকাছি থাকা পাতিনেতাদের পদলেহন করে, ভোল পাল্টে সুযোগ নেয়। নেতাদের দেওয়া আদেশ-নির্দেশ পালন করাই তাদের প্রধান কাজ।স্পিকার খেদের সঙ্গে আরও একটি মূল্যবান কথা বলেছেন, ‘নেতারা মাদক খায়, কর্মীরাও মাদক খায়। সব বাটপারের কারখানা হয়ে গেছে এসব জায়গা। ধীরে ধীরে চোখের সামনে সমাজটা নষ্ট হয়ে গেল।’ এ যেন চারদিকে এক অদ্ভুত আঁধার নেমে আসছে।৩.আশির দশকের আরও একটি সংবাদ শিরোনামের কথা মনে পড়ে। মাসিক গণস্বাস্থ্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এক ভয়াবহ প্রচ্ছদ কাহিনি—‘নেশার কবলে বাংলাদেশ’। তখন এমন শিরোনাম ছিল অবিশ্বাস্য। প্রয়াত আলোচিত সাংবাদিক মিনার মাহমুদ এ প্রচ্ছদ কাহিনি রচনা করেছিলেন। তৎকালীন ঢাকার চানখাঁরপুল, সদরঘাট, মিরপুরসহ নানা স্থানের মাদকের আখড়ার কথা উল্লেখ ছিল এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। এতে দেশে নেশা ও মাদকের সর্বগ্রাসী ছোবলের ইঙ্গিত ছিল। যদিও তখন পর্যন্ত এ বিষয়ে দেশের সাধারণ মানুষের তেমন কোনো ধারণাই ছিল না।অথচ আজকের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতায় পণ্য হিসেবে মাদকের অবাধ বিচরণ অনেক বেশি সহজলভ্য হয়েছে। দেশের গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায়, ঘরে ঘরে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। এদের পেছনে রয়েছে নেতারা, যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করছেন অন্য সবকিছু। চিহ্নিত মাদকসেবী ও মাদক কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনে দিনরাত নিরাপদে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। হাটবাজারে সবার জ্ঞাতসারে কেনাবেচা হচ্ছে মাদকদ্রব্য। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ছে। একশ্রেণির তরুণ রাতে মাদক সেবন করে, দিনে চাঁদাবাজি করে এলাকা চষে বেড়াচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এদের রোখার ক্ষমতা যেন কারও হাতে নেই। সত্যিকার অর্থেই এখন সমগ্র বাংলাদেশ নেশার কবলে।৪.এবার স্পিকারের কথায় ফিরে আসা যাক। কেন এ দেশে নিকৃষ্ট দুর্নীতিবাজেরা এমপি-মন্ত্রী হন? অতীতে এ বিষয়ে অনেক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। হালের টক শো তো আছেই। কিন্তু কোনো সমাধান কি এসেছে? আসেনি। কারণ, যাঁরা সভায় সভাপতির আসনে বসে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, কালোটাকা ও মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলেন, দিনের শেষে তারাই আবার মনোনয়ন-বাণিজ্যেরও হোতা হয়ে ওঠেন।যে দেশে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরাও এমপি পদে মনোনয়নের জন্য আদাজল খেয়ে তদবিরে নেমে যান, সেখানে শিক্ষিত, সৎ, দেশপ্রেমিক ও ভালো মানুষের নির্বাচিত হওয়া সম্ভব কি? দেশের গত কয়েক বছরের চিত্র তো তা-ই বলে।এমনও দেখা গেছে, একাধিক উচ্চশিক্ষিত ও যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় অশিক্ষিত একজন বিত্তবান পাদুকা ব্যবসায়ীর পক্ষে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দেনদরবার হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারই মনোনয়নপ্রাপ্তি ঘটেছে। তিনি এমপি হয়েছেন। বছরের পর বছর এলাকার হাজার হাজার দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষিত মানুষের ওপর খবরদারি চালিয়েছেন।এখানে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি বিবেচ্য নয় বলে তারা নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে বাহিনী নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন। সংসদের পাঁচ বছরে এরা মোটামুটি নীরবতা পালন করেন। কারণ, এটাই তাদের নিরাপদে ও শত্রুমুক্ত থাকার কৌশল। কেবল নিভৃতে নিজেদের ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যে আলাদিনের প্রদীপের মতো জ্বলে ওঠেন। নির্বাচনের আগে করা বিপুল ব্যয় পুষিয়ে নিয়ে রাতারাতি ফুলেফেঁপে ওঠেন।এ দেশে এমপির গাড়ি ও জাতীয় সংসদের মূল্যবান প্রতীক যেন বাণিজ্যে লক্ষ্মীর মতো কাজ করে। এটি এখন ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পপতি হওয়ার এক অসাধারণ সোপানের নাম।বলাবাহুল্য, দেশে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা মাঠপর্যায়ে কাজ করে থাকে। নির্বাচন এলে তারা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তৎপর হয়। গত এক দশক ধরে লক্ষণীয় যে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এসব সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। তাদের লিখিত মতামত ও জনপ্রিয়তা যাচাইবিষয়ক গোপন প্রতিবেদন পাওয়ার জন্য প্রায় সবাই ছোটাছুটি করেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সাধ্যাতীত চেষ্টা করে সরকারকে অবহিত করে। কিন্তু বাস্তবে এসব তথ্য খুব বেশি আমলে নেওয়া হয় না। দলগুলোর সর্বোচ্চ নেতৃত্বের তালিকাই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়।মনে হয়, এটিও এক অদ্ভুত রাষ্ট্রীয় আচার ও প্রথায় পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে না। ফলে জাতীয় সংসদ যেন এক দুর্বোধ্য প্রাচীরের ভেতরে আটকে পড়েছে। এ প্রাচীর ভেদ করে বেরিয়ে আসা সহজ হবে না। কেননা, সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় অর্থের শক্তিতে।৫.অথচ জাতীয় সংসদের সদস্য, উচ্চ আদালতের বিচারক, সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণের দায়িত্ব জাতীয় সংসদের হাতেই রয়েছে। কিন্তু কোনো আমলেই বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সর্বোচ্চ অবস্থানে থেকেও এ বিষয়ে কখনো আইন পাস হয় না। এতেই বোঝা যায়, আইন প্রণয়নের পথে বাধা বা অন্তরায় কোথায়।এমনকি কখনো কখনো উচ্চ আদালতের সম্মতি তথা নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এসব বাস্তবায়িত হয়নি। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর পথ পেরিয়ে এসেও জাতি আজ একই তিমিরে ঘুরপাক খাচ্ছে।বর্তমান স্পিকার একজন আইনপ্রণেতা, বহুবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি অশীতিপর একজন ঝানু পার্লামেন্টারিয়ানও বটে। তার মুখ থেকে এমন হতাশার মন্তব্য সমগ্র জাতির সামনে প্রশ্নের জন্ম দেবে, এটাই স্বাভাবিক।আশির দশকের আরও একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। জেনারেল হোসেন মুহাম্মদ এরশাদ তখন ক্ষমতায়। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী ছিলেন এর প্রতিবেদক। তিনি গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস, নাকি আফগান মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন, তা ঠিক মনে নেই। বাণীটি ছিল, ‘এমন এক সময় আসবে, যখন জ্ঞানীরা জ্ঞানী হওয়ার কারণে অনুশোচনা করবেন, মূর্খরা তাদের মূর্খতার জন্য গর্ব করবেন, আর দুর্নীতিবাজেরা তাদের দুর্নীতির জন্য উল্লাস করবেন।’যত দূর মনে পড়ে, ওই প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে সেই সাংবাদিককে তখন অনেক খেসারত দিতে হয়েছিল। এখন দেশের যেদিকেই তাকানো যায়, এমন উল্লাসের নৃত্যই চোখে পড়ে। আর সমাজের উৎকৃষ্ট ও ভালো মানুষগুলো যেন অনুশোচনার আগুনে তিলে তিলে দগ্ধ হচ্ছেন।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার]

ভিডিও আরও দেখুন

মুশফিকের রেকর্ড ভেঙে হৃদয়ের ইনিংস ইতিহাস

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে রেকর্ডবুক নতুন করে লিখেছেন তাওহীদ হৃদয়। ডাবল সেঞ্চুরির মাইলফলক ছোঁয়ার পর টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ইনিংস খেলার রেকর্ডটিও নিজের নামে করে নিয়েছেন তিনি। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ২৩৬ রানে অপরাজিত রয়েছেন হৃদয়।এর আগে ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মুশফিকুর রহিমের অপরাজিত ২১৯ রান ছিল বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। সিলেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের তৃতীয় দিনে মুশফিকের সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছান হৃদয়।এর আগে ২০০ রানের মাইলফলক ছুঁয়ে বাংলাদেশের চতুর্থ টেস্ট ডাবল সেঞ্চুরিয়ান হন হৃদয়। দ্বিতীয় দিন শেষে রান তুলেছিলেন ১৭৫। তৃতীয় দিনে চা-বিরতির পর ওয়ারিকানের বলে এক রান নিয়ে ৩০৪ বলে ডাবল সেঞ্চুরি পূরণ করেন তিনি। এই ইনিংসে এখন পর্যন্ত ১৯টি চার ও ৭টি ছক্কার মার রয়েছে তার ব্যাটে।হৃদয়ের এই ইনিংসের সুবাদে বাংলাদেশও লিড নিতে সক্ষম হয়েছে। দলের স্কোর এখন ৩৭৬ রান, যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের চেয়ে তারা এগিয়ে রয়েছে ২০ রানে।বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এটি ষষ্ঠ ডাবল সেঞ্চুরি। এর আগে মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান এই কীর্তি গড়েছিলেন। এবার সেই তালিকায় নিজের নাম লেখালেন তাওহীদ হৃদয়।

মুশফিকের রেকর্ড ভেঙে হৃদয়ের ইনিংস ইতিহাস