সংবাদ
যুক্তি ও কূটনীতি হোক পরিবর্তনের হাতিয়ার: জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী

যুক্তি ও কূটনীতি হোক পরিবর্তনের হাতিয়ার: জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী

আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎসবাংলাদেশ মেরামতে ‘থ্রি-আর’ কৌশল অনুসরণ করছে সরকাররোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং সমাধানও সেখানেই নিহিতরোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবেআমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের এআই বিভাজনে পরিণত হোকবর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে নাজাতিসংঘকে সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।তিনি বলেছেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা।’বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া তার প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ নানা বৈশ্বিক ইস্যু তুলে ধরেন।সমঝোতামূলক বিশ্ব ও শান্তির আহ্বানপ্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিশ্বায়নের এই যুগে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব প্রতিটি রাষ্ট্রেই পড়ে। তাই সংঘাতের সমাধানে আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতাকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিতে হবে। তিনি বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা এবং একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন বাজেট কমিয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতাকে তিনি বিশ্বশান্তির অন্তরায় হিসেবে অভিহিত করেন।ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ ও ‘থ্রি-আর’ কৌশলবাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ আজ মুক্ত। তিনি এই আন্দোলনে সকল শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।’রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেড় দশকের ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতে তার সরকার ‘থ্রি-আর’ (রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন) কৌশল অনুসরণ করছে। এ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সরকারের ৩১ দফা রূপরেখা বাস্তবায়নের কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণবিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তিনি স্মরণ করে বলেন, এই মঞ্চেই তার পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশের মানুষের কথা বলতে ভাষণ দিয়েছিলেন। আজ তিনিও একই ধারায় বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ ও বিশ্বশান্তির বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছেন।জলবায়ু পরিবর্তন ও ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় ক্লাইমেট জাস্টিস বা জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। এ ছাড়া বন্যা ও খরা মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ ও ‘পদ্মা ব্যারাজ’ বাস্তবায়নের কথা বলেন তিনি।রোহিঙ্গা ও ফিলিস্তিন ইস্যুরোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং সমাধানও সেখানেই নিহিত। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যথায় এটি ভবিষ্যতে চরম মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী জনগণের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারের পক্ষে নিজের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেন।সামাজিক সুরক্ষা ও তরুণ প্রজন্মদারিদ্র্য বিমোচনে সামাজিক সুরক্ষা কার্ডগুলোকে সমন্বিত করে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ প্রবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানান তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়।এ ছাড়া তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে ৫০ মিলিয়ন ডলারের বিশেষ তহবিল এবং স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষার উদ্যোগের কথাও তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন।প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে এবারই শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাগ ও স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’কে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত জুনে সারাদেশে আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।প্রযুক্তির বৈষম্য দূর করার আহ্বানপ্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী  প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাপ্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। এ উত্তরণকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা থেকেও পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও নির্ভরতার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।বক্তব্যের শেষে তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারী ও পুরুষ সদস্যদের অবদানের কথা গর্বের সাথে স্মরণ করেন এবং বহুপাক্ষিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
৫ ঘন্টা আগে

কোর্টে যাওয়ার পথে 'ইয়াবা নাটক' সাজিয়ে গ্রেপ্তারের অভিযোগ, থানা ঘেরাও

কোর্টে যাওয়ার পথে 'ইয়াবা নাটক' সাজিয়ে গ্রেপ্তারের অভিযোগ, থানা ঘেরাও

'সংবাদ' এর জেলা বার্তা পরিবেশক আব্দুল কুদ্দুস আর নেই

'সংবাদ' এর জেলা বার্তা পরিবেশক আব্দুল কুদ্দুস আর নেই

ঘাটাইলে চার বছরেও শেষ হয়নি খাকুরিয়া ব্রিজের কাজ

ঘাটাইলে চার বছরেও শেষ হয়নি খাকুরিয়া ব্রিজের কাজ

পেপারলেসের পথে চট্টগ্রাম বন্দর, ডিসেম্বরে স্মার্ট পোর্ট

পেপারলেসের পথে চট্টগ্রাম বন্দর, ডিসেম্বরে স্মার্ট পোর্ট

আকাশপথে জটিলতায় রূপপুরের জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত

আকাশপথে জটিলতায় রূপপুরের জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত

রৌমারীতে স্কুল ঘেঁষে ইটভাটা, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

রৌমারীতে স্কুল ঘেঁষে ইটভাটা, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

দুই বছর পর আবারও ফিরছে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুঁড় পুকুরের মেলা

দুই বছর পর আবারও ফিরছে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুঁড় পুকুরের মেলা

সিজারের সময় পেটে গজ: সিসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নার্স বিথী

সিজারের সময় পেটে গজ: সিসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নার্স বিথী

ধর্মপাশায় এনসিপি নেতার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

ধর্মপাশায় এনসিপি নেতার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

দেড় দশকের আন্দোলনের পথ ধরে বাংলাদেশ আজ ফ্যাসিবাদমুক্ত: প্রধানমন্ত্রী

দেড় দশকের আন্দোলনের পথ ধরে বাংলাদেশ আজ ফ্যাসিবাদমুক্ত: প্রধানমন্ত্রী

মতামতমতামত

রম্যগদ্য: “বিশ দে, বিশ খাই, বিশের নিচে খাওয়া নাই...”

ভাই না ভালা, কী শুরু করলেন সাত সক্কাল বেলা! এইভাবে যদি সবাই পয়জন খায়া মইরা যায়, তায়লে এই দেশ স্বাধীন কোইরে লাভ কী হোইলে? এই দেশে থাকপে কারা, সাঁপ ব্যাঙ, সেলিনা হোসেন?তুই বাঙাল এর মধ্যে পুরষ্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় সেলিনা হোসেনের নাম আবার পেলি কোথায়?না কোই পুরষ্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় সেলিনা হোসেন লিখছিলেন, “পোকা-মাকড়ের ঘর বসতি” তাই সংক্ষেপে কোইলাম এইভাবে যদি সবাই পয়জন খায়া মইরা যায়, তায়লে এই দেশে থাকপে কারা, সাঁপ ব্যাঙ, সেলিনা হোসেন, মানে পুকা মাকড়?ওরে উড়ঝুড়ে বাঙাল আমিতো তোকে বলিনি যে দেশে সাঁপ ব্যাঙ, পোকা মাকড়রা বসবাস করছে...ঠিক আছে আপনে কন নাই যে দেশে সাঁপ ব্যাঙ, পোকা মাকড় বসবাস করছে কিন্তু আপনে কোইছেন বর্তমান দেশের যা অবস্থা তাতে “বিশ দে, বিশ খাই, বিশের নিচে খাওয়া নাই...সব যদি বিষ খায়া মইরা যায়, তখন দেশে থাকপে কারা সাঁপ ব্যাঙ আর পুরষ্কার প্রাপ্ত সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় সেলিনা হোসেন মানে পোকা মাকড়...নারে ভাই তুই আমার কথার মানেই বুঝবার চেষ্টা করিস নাই, আমি বলেছি “বিশ দে, বিশ খাই, বিশের নিচে খাওয়া নাই, আর তুই ভাবছিস আমি বলেছি, বিষ দে, বিষ খাই, বিষের নিচে খাওন নাই! আমিতো কখোনাই বলি নাই যে, তুই বিষ মানে পয়জন খা। আমার বিশ মানে বিশ বিশ, মানে, আঠারো, উনিশ-বিশ, সেই বিশ, মানে সংখ্যার বিশ, অনেকে বলে কুড়ি...হ হ, হুনছি হুনছি, বাপ দাদাগো আমলে পাবলিকে কোইতো, কুড়িতে বুড়ি, মাইনে যেই মাইয়া কুড়ি বছরেও কুমারী হ্যেরে বিয়া করলে ডাব পাইবানা, পাইবা ঝুনা নারিকেল!তোর যত উড়ঝুড়ে কথা। আমি বলছি, আজকাল বাংলাদেশে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে, কেউ আর অল্পস্বল্প ঘুষ খায় না, ঘুষ খেলেও মিনিমাম, বিশ হাজারের নিচে  ঘুষ খায় না! তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কেউ ঘুষ খায় না, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘুষ চলে না। এটা সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরির বিধি মালার মধ্যে ঘুষ খাওয়া অ্যালও না। তাই বেচারি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এর মাঝে মানে ঘুষ কেলেংকারীতে জড়ায় না।ওম্মারে মা, এটা আপনে কী বলচেন যে, সরকারি অফিসাররা নজীরবিহীন, মানে বেনজীর ঘুষ খেলো হাজার কোটি টাকা, তার পাসপোর্ট পনেরোটা, স্থাবর সম্পত্তির হিসাব নিতে ষোল জন দুদকের বাঘা বাঘা মোমেনুল মোমেন লাগছে হিসাব নিতে, আর আপনে মিয়া বলচেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরির বিধিমালার মধ্যে ঘুষ খাওয়া অ্যালও না!আরে সেতো তুই ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের কতা বলছিস, সেদিন শেষ। এখন জেন-জি’র যুগ। বর্তমানে যেসব প্রতিনিধিরা জাতিস্বংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে সব নতুন প্রজন্মের সন্তান,“জেন-জি” এঁদের মাঝে তুই কিছুতেই বলতে পারবি না যে “বিশ দে, বিশ খাই, বিশের নিচে খাওয়া নাই...”তাহলে আপনি বলচেন যে, এই বিশ বিষ নয়/ আসলে তো সংখ্যা সে/ বিশের নিচে ঘুষ খেলে/ বাংলার পাবলিকের/ সন্মান যায় রে...”বাহ্ বাঙাল দেখি আবার স্বভাব কবি ডি.এল.রায়ের মতো পাঁচ লাইনের লিমেরিক লিখে ফেললি!গুরু লিমেরিক কী?আরে লিমেরিক হলো আয়ারল্যান্ডের একটা জায়গার নাম। এই জায়গার অধিবাসীরা পাঁচ লাইনের হাস্যরসাত্মক ছড়া বলতো। যেটা পরে ইংরেজি সাহিত্যে প্রবেশ করে, আর “ননসেন্স রাইম” নামে খ্যাতি পায়।  হেঁ হেঁ কি যে কন, দোয়েল শালিকের দেশে ব্যেবাগ বাঙালিই ননসেন্স কবি, আপনে হুনচেন না, স্বর্গীয় হোমো স্যারও পাবলিকরে দিয়া কবিতা ল্যেইখ্যা নিজের নামে চালাইতো! কবিতা আমাগো রক্তে আছে। যার জন্য আমাগো সিনেমার নায়িকা ববিতা, মৌমিতা, কবিতা, সবাইরে নিয়া কতো কবি কবিতা লিখছে, তার শেষ নাই।তুই তোর নায়িকা ববিতা, মৌমিতা, কবিতা, নিয়ে থাক, কিন্তু আমার কথা হচ্ছে “বিশ দে, বিশ খাই, বিশের নিচে খাওয়া নাই” তোর এই যে কর্মচারীরা সকলে মিলে হাজার কোটি টাকার ঘুষ খাচ্ছে এটা বন্ধ কোরবি কীভাবে?হায়রে কপাল মন্দ/ চোখ থাকিতে অন্ধ/ নিশিদিন জ্বইল্লা পুইড়া/ ঘুষ টুষ খাওন/ শেষ তো হোইবো রে...”তোর মুখে ফুল চন্দন। এবার বাংলাদেশে ঘুষ খাওয়া বন্ধ হবে! বলিস কী?ক্যান আপনে শুনেন নাই। সব ঘুষখোর চান্দাবাজ গো, লিস্টি বানাইবার জন্য পাঁচ সদস্যের কমিটি হোইছে, অলরেডি বিশ লক্ষ নাম লিষ্ট করা হোইছে...বিশলক্ষ, ঘুষখোর চাঁদাবাজ, এতো দেখছি, ঠগ বাছতে গাঁ’উজাড়! এ্যতো লোক রাখার জেল পাবি কোথায়? পৃথিবীর যে সব দেশে জেল বন্ধ হোচ্ছে সে গুলো কি ভাড়া নিবি?আরে হালায়, আপনে আছেন আপনের তালে, এইটা মিয়া আপনেরে বুঝতে হোইবো, লিস্ট করা মানে অ্যারেস্ট করা না...ও রে বাব্ববা, যাক ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। আমি তো ভেবেছিলাম লিস্টে যাদের নাম থাকবে তাদের ধরে ধরে জেলে পুরবে!আরে না, আগে লিস্ট হোউক পরে ডিসিশন লোইবো কী করবো না করবো...থাক তাহলে আর চিন্তা নেই, লিস্টে নাম থাকলেও অ্যারেস্টতো আর হবো না! জয়য়য়...থাক বাবা ব্যান্ড সঙ্গীত না গাইলেও চলবে...সেইটাই ভালা বর্তমানে ব্যান্ড সঙ্গীত, ব্যান্ড... [লেখক: চলচ্চিত্রকার]   

প্রবীণদের দিনরাত্রি

জন্ম ও মৃত্যুর মতো মানুষের জীবনচক্রেও রয়েছে কয়েকটি স্বাভাবিক ধাপ-শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং বার্ধক্য। যারা দীর্ঘজীবন লাভ করে বার্ধক্যে উপনীত হন, তাদের অধিকাংশেরই একটি স্বপ্ন থাকে-জীবনের শেষ দিনগুলো স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনিদের সান্নিধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে কাটিয়ে একদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া। টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনে আমরা এমন সুখী পরিবারের ছবি প্রায়ই দেখি। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন।বাংলাদেশে সাধারণত ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ।একদিকে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ইতিবাচক ফল, অন্যদিকে এত বিশাল সংখ্যক প্রবীণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যাঁরা একসময় দুই হাতে সংসার সামলেছেন, প্রকৃতির নিয়মে আজ তাঁদের অনেকেই অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।প্রবীণদের প্রধান সমস্যা: প্রবীণদের সমস্যা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, একাকীত্ব, আয়ের অভাব, পরনির্ভরতা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, সামাজিক অবহেলা, প্রযুক্তিগত পিছিয়ে থাকা, শারীরিক পরিবর্তন।শিশুকালে যেমন সন্তানদের সার্বক্ষণিক যত্ন নিতে হয়, বার্ধক্যে এসে অনেক প্রবীণ আবার একই রকম সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করেন। হাঁটাচলা, গোসল, পোশাক পরিবর্তন, এমনকি দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজেও অন্যের সহযোগিতা লাগে। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই জীবিত থাকলে একে অপরের যত্ন নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু একজনের মৃত্যু হলে অন্যজনের জীবন অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে। তখন একাকীত্ব, অসহায়ত্ব এবং নিরাপত্তাহীনতা প্রবীণ জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।যৌথ পরিবার ভাঙনের প্রভাব: একসময় যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সমাজের ভিত্তি। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন প্রবীণ সদস্যরা। তাঁদের মতামতই ছিল শেষ কথা। নগরায়ন, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন, বিদেশমুখী অভিবাসন এবং একক পরিবারব্যবস্থার প্রসারের ফলে আজ সেই সামাজিক কাঠামো অনেকটাই বদলে গেছে। প্রবীণরা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। ফলে প্রবীণ সমস্যা এখন আর কেবল পারিবারিক নয়; এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং জাতীয় ইস্যু।একাকীত্ব-সবচেয়ে বড় সংকট: প্রবীণদের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত একাকীত্ব। আমরা এমন ঘটনাও দেখেছি, যেখানে একজন বৃদ্ধা নিজ বাসায় কয়েক দিন আগে মৃত্যুবরণ করে পড়ে ছিলেন, অথচ কেউ জানত না। দেশে এমন অসংখ্য পরিবার আছে যেখানে অর্থের অভাব নেই, কিন্তু সন্তানরা সবাই বিদেশে বা অন্য শহরে থাকেন। বাবা কিংবা মা একা বাসায় দিন কাটান।অসুস্থ স্বামী বা স্ত্রীকে রেখে সামান্য সময়ের জন্য বাইরে গেলেও উদ্বেগ পিছু ছাড়ে না। বাইরে যাওয়ার আগে বলা হয়-‘ফোনটা কাছে রেখো, সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে।’ কিন্তু ফোন করলেই যে সবসময় সাহায্য পাওয়া যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।জীবনসঙ্গীহীন প্রবীণদের দুর্ভোগ: যাঁদের স্বামী বা স্ত্রী নেই, তাঁদের কষ্ট আরও বেশি। আমাদের প্রজন্মের অনেক পুরুষ রান্না করে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেননি। আবার অনেক প্রবীণ নারী অসুস্থ অবস্থায় একা বাইরে যেতে সাহস পান না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্বকে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর ফলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্নতা, স্মৃতিভ্রংশ এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।স্বাস্থ্যসেবা: বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ক্যান্সার, বাত, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, হৃদরোগসহ নানা জটিলতা বৃদ্ধি পায়। শহরে বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকলেও গ্রামীণ অঞ্চলে প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা এখনও খুব সীমিত। চিকিৎসার ব্যয়ও অধিকাংশ প্রবীণের নাগালের বাইরে।আর্থিক অনিশ্চয়তা: অবসরের পর নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশন পান। কিছু প্রবীণ সরকারি ভাতা পান। কিন্তু বর্তমানে দ্রব্যমূল্য ও চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় এই সহায়তা অত্যন্ত অপ্রতুল। বর্তমানে প্রায় ৩৪.২৫ লাখ প্রবীণ মাসিক ৬৫০ টাকা বয়স্ক ভাতা পান, যা মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ।প্রবীণ নির্যাতন: মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। একসময় যারা ছিলেন পরিবারে সম্মানিত-শ্রদ্ধেয়, আজ তারা শিকার হচ্ছেন নির্যাতনের। কখনও কর্কশ ভাষা, কখনও অবহেলা, কখনও খাবার থেকে বঞ্চিত করা, আবার কখনও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। সম্পত্তি লিখে না দেওয়ায় বাবা-মাকে নির্যাতনের ঘটনাও আমাদের সমাজে অজানা নয়।প্রযুক্তিগত বৈষম্য: বর্তমান পৃথিবী দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা, ট্রেন বা বাসের টিকিট বুকিং-সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু অধিকাংশ প্রবীণ প্রযুক্তিতে দক্ষ নন। ফলে প্রতিটি কাজেই তাঁদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এছাড়া প্রতিনিয়ত কোন না কোন প্রবীণ শিকার হচ্ছে স্ক্যাম এর।প্রবীণবান্ধব অবকাঠামোর অভাব: আমাদের শহর ও গ্রাম এখনও প্রবীণবান্ধব নয়। পার্ক কম, নিরাপদ ফুটপাত নেই, রাস্তা পারাপারে অসুবিধা, গণপরিবহনে সংরক্ষিত আসন থাকলেও অনেক সময় তরুণরা তা ব্যবহার করেন। এসব ছোট ছোট বিষয়ও প্রবীণদের জীবনকে প্রতিদিন কঠিন করে তোলে।করণীয়: প্রবীণদের সব সমস্যা সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব না হলেও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে অনেকটাই লাঘব করা যায়। একাকীত্ব দূরীকরণ, সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, প্রতিটি এলাকায় প্রবীণ ক্লাব গঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রবীণ সহায়তা নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেতে পারে।স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে স্বল্পমূল্যে জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা, জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জেরিয়াট্রিক বিভাগ এবং হাসপাতালগুলোতে প্রবীণ কর্নার চালু করা, কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় চিকিৎসা সহায়তা, এনজিও’র মাধ্যমে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত হিসাব করে এলাকার প্রবীণদের খবর নেওয়া, প্রবীণ স্বাস্থ্যবীমা চালু করা যেতে পারে।এছাড়া আর্থিক নিরাপত্তায় বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি,উপযোগী খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত শরীরচর্চা,ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চর্চা, কাউন্সেলিং সুবিধা প্রদান ও সামাজিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা জরুরি।প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আইনি সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, প্রবীণবান্ধব নগর পরিকল্পনা, নিরাপদ ফুটপাত, সহজ রাস্তা পারাপার, র‍্যাম্প ও হুইলচেয়ার সুবিধা, গণপরিবহনে অগ্রাধিকারভিত্তিক আসন, রেলস্টেশনে সহায়তা কেন্দ্র ও পর্যাপ্ত উন্মুক্ত পার্ক প্রতিষ্ঠা দরকার।বৃদ্ধাশ্রম-বাস্তবতার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি: একসময় ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শব্দটি আমাদের কাছে নির্মম মনে হতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি মানবিক বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নিজ বাসায় সম্পূর্ণ একা থাকার চেয়ে সমবয়সী মানুষের সঙ্গে নিরাপদ পরিবেশে থাকা, নিয়মিত চিকিৎসা পাওয়া এবং সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত হওয়া অনেক প্রবীণের জন্য অধিকতর স্বস্তিদায়ক হতে পারে। যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তাঁদের জন্য উন্নত সেবাকেন্দ্র রয়েছে। আবার কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠান বিনামূল্যে আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা প্রদান করে।অবশ্যই সবচেয়ে আদর্শ ব্যবস্থা হলো পরিবারের সঙ্গে থাকা। কিন্তু যখন সন্তানেরা কর্মব্যস্ত, বিদেশে অবস্থান করেন, অথবা প্রবীণের সার্বক্ষণিক পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, তখন বিকল্প ব্যবস্থাকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই।প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন; তাঁরা জাতির অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। তাঁদের মেধা, শ্রম, ত্যাগ ও প্রজ্ঞার ওপর দাঁড়িয়েই আজকের সমাজ গড়ে উঠেছে। তাই তাঁদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও সেবা প্রদান আমাদের নৈতিক এবং সামাজিক দায়িত্ব। আজকের নবীনই আগামী দিনের প্রবীণ। আমরা যদি আজ প্রবীণদের যথাযথ মর্যাদা না দিই, আগামী প্রজন্মের কাছ থেকেও সেই মর্যাদা প্রত্যাশা করা কঠিন হবে।একটি সভ্য সমাজের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে সমাজ তার প্রবীণ নাগরিকদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেয়- তার ওপর। পরিবার, সমাজ, স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে একটি সত্যিকার প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল, পরিবেশ সংগঠক]

অধিকার চর্চায় চাই পরমতসহিষ্ণুতা

মুক্তচিন্তা বা বাকস্বাধীনতা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। প্রশ্ন হলো, বাকস্বাধীনতার সীমানা কতটুকু? আর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে এর পরিণতিই বা কী?ইতিহাসের পাতা থেকে কিছু দৃষ্টান্তধর্ম অবমাননা বা ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধিতা করার কারণে অতীতে এবং বর্তমানে বহু বিতর্ক ও শাস্তির নজির রয়েছে।কোপারনিকাসের ট্র‍্যাজেডি: পোলিশ বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপারনিকাস যখন গাণিতিক সূত্রে প্রমাণ করলেন যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, তখন তৎকালীন খ্রিষ্টান গির্জার পাদ্রিরা বাইবেলের ব্যাখ্যার পরিপন্থী হওয়ায় তার বইটি নিষিদ্ধ করেন। ধর্মীয় যাজকদের ক্ষোভের মুখে পড়ে তাকে নির্মমভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।সালমান রুশদী প্রসঙ্গ: গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষের দিকে (মূলত ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত) ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বইটির মাধ্যমে তীব্র ধর্ম অবমাননার দায়ে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ইমাম খোমেনী লেখক সালমান রুশদীর বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছিলেন, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।সাম্প্রতিক পাকিস্তান ও বাংলাদেশ: সম্প্রতি ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম ও মহানবী (সা.) সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করার অপরাধে ‘তৈমুর’ নামের এক ব্যক্তিকে পাকিস্তানের সন্ত্রাস দমন আদালত মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। বাংলাদেশেও ধর্মীয় উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের দায়ে কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়ার নজির রয়েছে।আন্তর্জাতিক আইনে বাকস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাঅনেকেই মনে করেন, বাকস্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তা-ই বলা বা লেখার অবাধ লাইসেন্স। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদগুলো এর তীব্র বিরোধিতা করে।মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (১৯৪৮): এর ১৯ নম্বর ধারায় বাকস্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হলেও ১২ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিবার, বসতবাড়ি কিংবা সম্মান ও সুনামের ওপর খেয়ালখুশিমতো আক্রমণ করা চলবে না।মানবাধিকার কনভেনশন (১৯৬১): এর ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বাক ও চিন্তার স্বাধীনতাকে সমর্থন করার পাশাপাশি বলা হয়েছে, “বাকস্বাধীনতা ব্যক্তির মর্যাদা, জনগণের মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলার প্রতি আক্রমণাত্মক হতে পারবে না।”সুতরাং, স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় যে কাউকে গালি দেওয়া, বিদ্বেষ ছড়ানো বা মিথ্যাচার করা কখনোই বাকস্বাধীনতা হতে পারে না। বাকস্বাধীনতা মানে সত্য প্রকাশের অধিকার, অন্যকে আঘাত করার অস্ত্র নয়।বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে শাস্তিআমাদের দেশের প্রচলিত আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (ধারা ২৯৫ক): স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে লিখিত, মৌখিক বা দৃশ্যমান অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে কোনো নাগরিকের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া বা অবমাননার চেষ্টা করা হলে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ড।ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (ধারা ৯৯): কোনো সংবাদপত্রে রাষ্ট্রবিরোধী, নাগরিকদের মধ্যে শত্রুতা-ঘৃণা সৃষ্টিকারী বা ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাতকারী কিছু প্রকাশ করা হলে সরকার উক্ত সংবাদপত্রের সংশ্লিষ্ট কপিগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারবে।সাইবার/ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: ওয়েবসাইট বা যেকোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো মিথ্যা, অশ্লীল, মানহানিকর বা উসকানিমূলক তথ্য প্রকাশ ও সম্প্রচার করা হলে অপরাধের তীব্রতা অনুযায়ী কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড।আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে মামলার বিধানকোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা বাস্তবে আপনার ধর্মীয় বিশ্বাসকে অবমাননা করে, তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। এর জন্য দেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় নিতে হবে।কী করবেন এবং কোথায় মামলা করবেন?১. থানায় এজাহার: অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য, স্ক্রিনশট বা প্রমাণাদিসহ আপনার নিকটস্থ থানায় গিয়ে এজাহার বা মামলা দায়ের করতে পারেন।২. আদালতে সিআর মামলা: থানা যদি কোনো কারণে মামলা না নেয়, তবে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি নালিশি মামলা দায়ের করা যায়।৩. সাইবার ক্রাইম ইউনিট: ডিজিটাল মাধ্যমে ধর্ম অবমাননা হলে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে লিখিত অভিযোগ বা অনলাইনের মাধ্যমে প্রমাণ জমা দিয়ে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।উপসংহারপরমতসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ একটি সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি। নিজের অধিকার চর্চা করতে গিয়ে যেন অন্যের বিশ্বাসে আঘাত না লাগে, এই সচেতনতা আমাদের সবার থাকা উচিত।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

ইতিহাসের স্মৃতি মুছে ফেলার রাজনীতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় এবং শতবর্ষ পার করে আরও পাঁচটি বছর অতিক্রম করেছে। ঐতিহাসিক মুনতাসির মামুনের মতে, অনেকটা বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ও শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনীতি সহ সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়া পূর্ববঙ্গকে অগ্রসর করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূচনালগ্নেই এটি "প্রাচ্যের অক্সফোর্ড" নামে খ্যাতি লাভ করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও এ অঞ্চলের মানুষের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশের যে আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল, পাকিস্তানি শাসকরা সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা শুরুতেই উর্দু ভাষা ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে এ অঞ্চলকে অন্যায়ভাবে নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়।পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ধরনের সেই শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব বাংলার মানুষের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশের লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে গেছে। পাকিস্তান আমলে পূর্ববঙ্গে একটি অগ্রসর মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা।ভাষা আন্দোলনের আমতলা, আর স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের বটতলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্দোলনের মানচিত্রে যেমন ভিন্নভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, তেমনি এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আমাদের দুর্ভাগ্য, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এই প্রথম ছাত্রশিবির বা কোনো ধর্মীয় ছাত্রসংগঠনের সমর্থিত প্যানেল কিছুটা লিবারেল ভাবমূর্তির ছদ্মবেশে জয় পেয়েছে। জয় পাওয়ার পরই তারা ঘোষণা দেয়, তাদের ভাষায় ‘কালচারাল ফ্যাসিবাদ’কে তারা মুছে ফেলবে। সে অনুযায়ী এক সময়ের শিবির সদস্য প্রাক্তন ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানের সহযোগিতায় তারা অনেক দূর অগ্রসর হয়। টিএসসিতে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের ‘বীরত্বের প্রদর্শনী’ আয়োজন করে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবি রাখার কারণে ঢাবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ওই সময়ে সেই ছবিগুলো সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়।১১ সেপ্টেম্বর ছিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী যথাযথভাবে পালিত হয়েছে পাকিস্তানে। বাংলাদেশের পাকিস্তানপন্থীরাও তাদের পিতৃপুরুষকে স্মরণ করেছেন অভিন্ন আবেগে। এ বছর জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকীতে ডাকসু সংগ্রহশালায় তার তিনটি ছবি টানায় এবং ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হলেও তাদের কিছু অপছন্দের সকল ছবি তারা নামিয়ে ফেলে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই এক উত্তেজনার অবতারণা হয়। বর্তমানে সংগ্রহশালায় ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের কোনো ছবিতেই শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক ছবি নেই। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় ভাষা আন্দোলনের জন্ম, ঠিক সেখানেই ভাষা আন্দোলনের প্রতিপক্ষকে সম্মানের আসন দেওয়া খুবই পরিকল্পিত ও কথিত ‘কালচারাল ফ্যাসিবাদ’ তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলার রাজনৈতিক বার্তা। তাই তো তাদের সব আয়োজন শেখ মুজিবকে ও মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়ার জন্য। একজন সাংবাদিক ডাকসুর সংগ্রহশালার সমন্বয়কারীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, শেখ মুজিবের ৭ মার্চ বা স্বাধীনতা আন্দোলনের কোনো ছবি কেন রাখা হয়নি? ঔদ্ধত্যের সকল সীমা লঙ্ঘন করে তার উত্তর ছিল, ‘ইচ্ছে হয়নি, তাই।’তরুণ শেখ মুজিব ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। আর ১৯৪৮ সালের শুরুতেই পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা" ঘোষণা করলে ছাত্রসমাজ ফুঁসে ওঠে। গড়ে ওঠে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। শেখ মুজিবুর রহমান এই পরিষদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মনোনীত হন।ওই বছরের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। পিকেটিং থেকে গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিব। আবার ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে বক্তব্য দেন, তখন আব্দুল মতিন, অলি আহাদ, শেখ মুজিবসহ ছাত্রনেতারা তাৎক্ষণিকভাবে "নো, নো" বলে প্রতিবাদ জানান। এরপর ২১ ফেব্রুয়ারির ইতিহাস তো সবারই জানা।স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। এতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্র-ছাত্রীসহ অসংখ্য শহীদ হয়েছেন। আর এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলার পতাকা। এ বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন রেসকোর্স থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সংগ্রামের এক অমর কবিতা পাঠ করেছিলেন: ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ এর আগে স্বাধীনতার এমন কবিতা কে কবে শুনেছে! আর এ ঘোষণা দেওয়ার মতো জমিন তৈরি করতে শেখ মুজিবকে সংগ্রাম করতে হয়েছে পাকিস্তানি শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে ২৪টি বছর জুড়ে। সেই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে বামপন্থী আন্দোলনের সমন্বয় ও ঐক্য গড়ে ওঠায় আন্দোলন পেয়েছিল নতুন মাত্রা।দীর্ঘ ২৪ বছরের এই সংগ্রামে ১৪ বছরই শেখ মুজিবকে কারান্তরালে কাটাতে হয়েছে। দু’বার পাকিস্তানি শাসকরা তার জন্য তো ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুতের আয়োজন করেছিল। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি পাঁচ দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর আটক হয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি। এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে ৮০ দিন কারাভোগ করে মুক্তি পান ২৮ জুন। ওই দফায় তিনি ২৭ দিন কারাভোগ করেন। একই বছরের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন এবং পরের বছর ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টানা ৭৮৭ দিন কারাবন্দি ছিলেন।১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও তাকে কারাগারে যেতে হয়। সে সময়ে ২০৬ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির পর ১১ অক্টোবরে শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হন। এ সময়ে টানা ১ হাজার ১৫৩ দিন তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। এরপর ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি আবারও গ্রেপ্তার হয়ে মুক্তি পান ওই বছরের ১৮ জুন। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন। এরপর ’৬৪ ও ’৬৫ সালে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। ছয় দফা দেওয়ার পর যেখানে সমাবেশ করতে গেছেন, সেখানেই তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। ওই সময়ে তিনি ৩২টি জনসভা করে বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ৬৬ সালের ৮ মে আবারও গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পান। এ সময় তিনি ১ হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই পাকিস্তানের সামরিক সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে। এ দফায় তিনি কারাগারে ছিলেন ২৮৮ দিন।কয়েকদিন ‘হারুন আন্কেলের ভাতের হোটেলে’ থাকা ইউনূসের কিশোর-তরুণ বাহিনী এসব ইতিহাস জেনে বা না জেনেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তায় থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। দেশজুড়ে ভেঙে ফেলেছে মুজিবের স্মৃতি ভাস্কর্যসহ মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এবং স্বাধীন বাংলা সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সকল স্মৃতিচিহ্ন। ইউনূস বাহিনী আর জামাতীদের সব আয়োজন যেন শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়ার জন্য। সেই ধারাতেই জামাত নিয়ন্ত্রিত ডাকসু প্রতিশোধ হিসেবে স্বাধীনতার নেতার ছবি নামিয়ে তাদের পেয়ারা পাকিস্তানের জিন্নাহর ছবি টাঙিয়ে দিয়েছে। ইতিহাসের পাঠ ও প্রদর্শনীতে সংগতিপূর্ণভাবে জিন্নাহ থাকতেই পারেন। কিন্তু মুজিবের ছবি নামিয়ে জিন্নাহর ছবি উত্তোলন অনেকটা বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু তারা যা করেছে, তা তো রীতিমতো দেশদ্রোহী অপরাধ। সরকার কী করছে? সরকারের মনে রাখা উচিত, এখনই এদের নিয়ন্ত্রণ না করলে, আইনের আওতায় না আনলে তাদের উদ্ধত ফনার ছোবল কিন্তু খুব শীঘ্রই খেতে হবে।বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা শিক্ষক মূল্যায়নপদ্ধতির নব আবিষ্কার করেছেন। ডাকসু এখতিয়ারবহির্ভূত ওয়েবসাইট বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছে তাদের নিজেদের তৈরি প্রশ্নমালায়। শিক্ষকদের মূল্যায়ন শিক্ষার্থীরা করবেন—এটা স্বাভাবিক বিষয়। তবে শিক্ষার্থীরা কীভাবে শিক্ষকদের শিক্ষাদানকে মূল্যায়ন করবেন, তার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই প্রণয়ন করতে হবে। সেই মূল্যায়ন অবশ্যই হতে হবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দুই পক্ষেরই গোপনীয়তা বজায় রেখে। বিভাগীয় তত্ত্বাবধানে গোপনীয়তা বজায় রেখে সেগুলো পর্যালোচনা করে শিক্ষককে তার সারসংক্ষেপ জানানোর মাধ্যমে এ ব্যবস্থা কার্যকর করাই নিয়ম। শিক্ষক ফলাফল দেখে তার পাঠদানের প্রক্রিয়াটি প্রয়োজনমতো পুনর্বিন্যাস করবেন। এখানে ছাত্র সংসদের পুলিশি ভূমিকা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে।জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ চিহ্নিত করে শিক্ষকদের হেনস্তা করা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়জন ডিনকে পদত্যাগে বাধ্য করা ইত্যাদি এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ করেছেন। সারা দেশে শিক্ষক নির্যাতন, শিক্ষকদের অপদস্থ করা, জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো ইত্যাদির মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের চেহারায় কিছুসংখ্যক তরুণ আবির্ভূত হয়। তাদের উন্মাদনা এখনও অব্যাহত আছে। সম্প্রতি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর কার্যকলাপে জড়িত থাকার এক উদ্ভট অভিযোগে ৪৩৯ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করায় নৈরাজ্যবাদী তরুণরা শিক্ষক হেনস্তাকারী কার্যকলাপে আরও উৎসাহিত হয়েছে। সরকার, বিরোধীদল সবাই তো শেখ হাসিনাকে ফেরত আনতে মরিয়া! শিক্ষকরাও যদি সে প্রচেষ্টা নিয়ে থাকেন, তো তারা তো সরকারের পক্ষেই কাজ করেছেন। নাকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চান না শেখ হাসিনা ফিরে আসুক, বিচারের মুখোমুখি হোক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সরকারদলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে, অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারলে ক্যাম্পাসে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীরা পরাভূত হবে।শতবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস ও তার নানা পর্ব। ভাষা সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার সংগ্রাম, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান থেকে নানা সীমাবদ্ধতার এবং ভুল হাতে পড়া চব্বিশের জুলাই জাগরণ—সব ঐতিহ্য ইতিহাসের সাক্ষী ও সূতিকাগার এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়কে কূপমণ্ডূকতার শিকলে বেঁধে ফেলার যে প্রচেষ্টা চলছে, আমাদের মাতৃভূমিকে ধর্মান্ধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে অপচেষ্টা চলছে, তা সফল হবে না। কারণ জুলাইয়ে যে তরুণরা রাস্তায় নেমে এসেছিল, তাদের কণ্ঠে ছিল, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, ধনধান্য পুষ্পে ভরা, মুক্তির মন্দির সোপান তলে ..... ইত্যাদি দেশপ্রেমের গান। গুপ্ত ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকেও সেই গানে গলা মেলাতে হয়েছিল। জামাত-শিবির গোষ্ঠীকে এখনও উদার গণতন্ত্রের কথা বলতে হচ্ছে, একটা লিবারেল ছদ্মবেশ ধারণ করার জন্য কসরত করতে হচ্ছে। আসিফ নজরুল, আলী রিয়াজ প্রমুখদের সুর বদল করতে হচ্ছে। জুলাই পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের একটা অংশ বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মেলানোতে আমরা প্রতারিতবোধ করলেও নেতৃত্বের অনেকে সাহসের সঙ্গে জুলাই আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এ নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, সোচ্চার হচ্ছেন।বাংলাদেশের লড়াকু মানুষ অনেকবার প্রতারিত হয়েছে। আমরা বারবার প্রতারিত হতে পারি, আমরা হয়তো একদিন থাকবও না। কিন্তু পরের প্রজন্ম লড়বে এবং বিশ্ববাসী দেখবে ‘কারও দানে পাওয়া নয়—দাম দিয়ে কেনা বাংলাদেশ’ অন্ধকারের শক্তিকে পরাভূত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকসম ‘অপরাজেয় বাংলা’ অনির্বাণ শিখা হয়ে কলাভবনের সামনে দাঁড়িয়ে নিরন্তর সে ঘোষণা দিয়ে চলেছে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি কাদের হাতে

জানা যায়, বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ইত্যাদির ম্যানেজিং কমিটি পরিচালনার জন্য সভাপতি নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠি তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটা প্রজ্ঞাপনে শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা বলা হলেও সম্প্রতি তা নাকি বাতিল করা হয়েছে। এতে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং সাধারণ মানুষও চায় লেখাপড়া জানা উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ পরিচালনা করুক। এমনকি যে মানুষটি নিজে স্কুল-কলেজে যায়নি, সে-ও চায় না তার মতো আরেকজন গিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের ওপর খবরদারি করুক। এটা শত্রুতা নয় বা হিংসা নয়, স্রেফ একটা মনস্তাত্ত্বিক ভাবনার বিষয়। আমি অকৃতি অধম বলে উত্তমকে অস্বীকার করি কেমনে?আজকাল খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটা প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনেও উঁকি দিয়ে চলেছে; তা হলো, এই যে শিক্ষা-দীক্ষা, রাজনীতি, সমাজনীতি, নীতি-নির্ধারণী বা জনপ্রতিনিধিত্ব—কোথাও যদি শিক্ষাগত সনদপত্রের কোনো মূল্য না থাকে বা গুরুত্ব দেওয়া না হয়, তবে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে এত হৈচৈ, এত পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার হেতু কী? সমাজে রাষ্ট্রে যার কোনো প্রয়োজনীয়তা থাকছে না, তার জন্য লাখ কোটি টাকার বাজেটই বা কেন? দেশের উচ্চশিক্ষা কী তবে কেবল বিদেশের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হওয়া আর পরদেশের সরকারের অধীনে চাকর হওয়ার দায়ে? যে দেশে শিক্ষার একাডেমিক সার্টিফিকেটের কোনো মূল্য দেওয়া হবে না, সেখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম হতাশা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষার মূল বিষয় হলো, সৃষ্টিশীলতা ও সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটানো, যা শিক্ষিত মানুষের পক্ষেই সম্ভব। অশিক্ষিত মানুষের দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে কখনো নতুনত্ব বা সৃষ্টিশীল কার্যক্রম আশা করা যায় না। সে প্রতিষ্ঠান সরকারের হোক বা নিজেরই হোক।২.ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এসব কমিটিতে কেবল সভাপতি নয়, অন্যান্য পদগুলো যেমন, অভিভাবক সদস্য, বিদ্যোৎসাহী সদস্য—এদেরও শিক্ষাগত যোগ্যতার একটা মাপকাঠি রাখা দরকার। একটা প্রতিষ্ঠানকে সুষ্ঠু, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে পরিচালিত করতে হলে পুরো টিমকে নিয়েই কাজ করতে হয়। সভাপতি/চেয়ারম্যান একা সফলতা আনতে পারে না।দেশে তখন ১/১১ নামে পরিচিত সরকার ক্ষমতায় আছে। আমি সরকারের চাকরিতে উপসচিব পদমর্যাদায় পরিচালক, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক) কর্মরত। কিছুদিন হলো একটা জেলার এডিসির পদ থেকে ঢাকায় ফিরেছি। এক দুপুরে ফোন আসে তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ঢাকার কাছ থেকে। ডিসি’র নাম মো. কামাল উদ্দিন। একজন সৎ, দক্ষ ও সাহসী কর্মকর্তা হিসেবে তার সুনাম ছিল। তিনি বললেন,আপনার বাসা কোন এলাকায়?বললাম, আজিমপুর গভ. কোয়ার্টারে থাকি।খুব ভালো হয়েছে, আপনাকে ওই এলাকার একটা ঐতিহ্যবাহী স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দিতে চাই।জিজ্ঞেস করলাম, স্কুলের নামটা কী?তিনি বললেন, 'ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুল'।এবার আমি জানতে চাইলাম, স্কুলের বিশেষ কোনো সমস্যা আছে কি না?তিনি বললেন, না, কোনো সমস্যা নেই। ঢাকার প্রায় সকল স্কুলই এ সময়ে ফাঁকা। জেলা প্রশাসন থেকে আমরা মাঠ প্রশাসনে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্কুলের দায়িত্ব দিচ্ছি। এক্ষেত্রে ঢাকায় তাদের স্ব স্ব বাসার কাছাকাছি স্কুলগুলোতে দিতে চাচ্ছি, যাতে যাতায়াতের অসুবিধা না হয়। আর কিছু নয়।আমি তাৎক্ষণিক রাজি হয়ে গেলাম। একটা পুরোনো ইতিহাস-খ্যাত স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলে বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা যাবে। শিক্ষক, ছাত্র, স্থানীয় সুশীল সমাজের সঙ্গেও যোগাযোগ হবে, তাতে মন্দ কী? তাছাড়া বাসা থেকে পদব্রজে স্কুলে পৌঁছে যাওয়া যায়। ছুটির একটা দিন এমন প্রতিষ্ঠানের জন্য নিবেদন করলে কোনো ক্ষতি হবে না। তা-ই হলো, যথারীতি দায়িত্ব গ্রহণ করলাম। বলাবাহুল্য, স্কুলটি ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত। জনশ্রুতি আছে, সেকালে ঢাকা নগরীর পশ্চিম প্রান্ত বরাবর স্কুলটি গড়ে ওঠে বলেই নাকি ব্রিটিশ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর কর্তৃক এমন নামকরণ করা হয়েছিল। তাছাড়া এ স্কুলের বেশ কজন শিক্ষক '৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। বিশেষ করে মুহাম্মদ সুলতান এবং রাজনীতিবিদ আবদুস সামাদের কথা বলা আছে।৩.সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর, এক শনিবার সকাল ১০টার দিকে প্রথমবারের মতো স্কুলে গিয়ে উপস্থিত হলাম। সরকারি ছুটির দিন, তবে স্কুল-কলেজ, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এসব খোলা আছে। প্রধান শিক্ষক আলী হোসেন মিয়াকে একজন বিনয়ী, সৎ ও শিক্ষিত মানুষ বলে মনে হলো। অন্তত প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। স্কুলটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম, আমার সঙ্গে বেশ কজন সদস্য রয়েছে। তারা নির্বাচিত সদস্য এবং স্থানীয় প্রভাবশালী বিশেষজন। পরিচয় হলো, তারা পূর্ববর্তী সংসদ সদস্যের সময়ে এখানে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কেউ কেউ তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এমন। তখনই জানি, স্কুলের এসব পদের জন্যও বেশ ব্যয়বহুল নির্বাচন হয়। এতে টাকা-পয়সার ছড়াছড়ি হয়। আমি ধীরে ধীরে খোঁজখবর নিতে থাকি। আসলে এদের কাজটা কী?দেশে তখন রাজনীতি নেই, অযাচিত চাপ নেই, বরং জনমনে স্বস্তির আবহ বিরাজ করছিল। শুরুতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে স্কুলের ভেতরে ও বাইরে একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন নিয়ে আসা হলো। হেডমাস্টার এবং সহকারী শিক্ষকদের বসার স্থানে পরিবর্তন আনা হলো। শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনমাফিক নতুন নতুন ফ্যান-লাইট সংযোগ তথা ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের পৃথক শৌচাগারের সংস্কার করা হলো। দীর্ঘ বন্ধ থাকা লাইব্রেরিতে বসার পরিবেশ ফেরানো হলো। নিয়মিত সভা আহ্বান করে শিক্ষার পরিবেশবান্ধব অসংখ্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির কক্ষে নতুন আধুনিক টিভি সংযোজন হলো। অভিভাবকদের অপেক্ষার স্থানেও নতুনত্ব আনা হলো। সভায় অংশ নেওয়ার সম্মানী অর্থের বিষয়ে একটু রাশটানা হলো, সকল সভার জন্য সম্মানী থাকবে না। এটা কেবল বিশেষ সিদ্ধান্তকারী সভার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তখন শতভাগ নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতার মাধ্যমে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ হলো। সেসময়ে বার্ষিক খেলাধুলা ও জাতীয় অনুষ্ঠানে সরকারের সচিবগণকে আমন্ত্রণ জানিয়ে স্কুলে আনা হয়েছে। এদের কেউ কেউ এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন। প্রায় দু’বছরে এমন অসংখ্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়ায় স্কুলের ভেতরটায় এক অনুকূল পরিবেশ পাওয়া গিয়েছিল।৪.ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করার অল্প কিছুদিনের মধ্যে লক্ষ করলাম, তিনজন নির্বাচিত সদস্যেরই মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। প্রথমে তারা আমাকে জয় করে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। যেমন, সীমাহীন প্রশংসা ও অতিরিক্ত বিনয় প্রদর্শন করা, কথাবার্তা ছাড়াই হঠাৎ করে পুরান ঢাকার রয়েল রেস্তোরাঁর বিরিয়ানির প্যাকেট বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া। এটা বন্ধ করার ব্যবস্থা নিলে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব আসতে থাকে, কিছু দিন পরে টেলিফোনের ভাষায় হুমকির আওয়াজ। সেনাবাহিনীর পদস্থ অফিসারের কর্কশ ও ভারিক্কি কণ্ঠের সতর্ক সংকেত।তারও কিছুদিন পরে ঢাকার ডিসি সাহেবকে মোটিভেট করার জন্য সচিব পর্যায়ে তদবির হতে থাকে। আসল কাজ আমাকে সরিয়ে তাদের পছন্দের একজন অফিসারকে বসানো। কারণ, তারা যা চান, আমাকে দিয়ে যে তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেটা তারা বুঝে গেছে। যেমন, তাদের পছন্দের লোক নিয়োগ করা, কয়েকজন শিক্ষকের যোগ্যতা না থাকলেও তাদের পদোন্নতি দেওয়া, টেস্ট পরীক্ষায় ভালো করেনি কিন্তু এসএসসিতে অনুমতি দিতে হবে, স্কুলের অভ্যন্তরীণ ছোটখাটো পূর্ত কাজ তারা নিজেরাই করবেন ইত্যাদি। আর আমি চাচ্ছিলাম, স্কুলের গচ্ছিত ফান্ড থেকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করে মানসম্মত শিক্ষার এবং একাডেমিক রেজাল্টের ওপর গুরুত্ব দিতে। মনে পড়ে, এমন প্রচ্ছন্ন অসহযোগিতা ও বৈপরীত্যের সময়ে, তখনও স্কুলটি হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। আর এটা সম্ভব হয়েছিল মূলত সভাপতি হিসেবে আমার অর্জিত শিক্ষা, দেশপ্রেমবোধ, দৃঢ়চেতা মনোভাব ও অদম্য সাহস প্রদর্শন করার মানসিকতার কারণে।৫.কাজেই দেশব্যাপী হাজার হাজার এমপিও-নন-এমপিও স্কুল, কলেজ, মাদরাসার পরিচালনা পর্ষদ বা কমিটিতে অশিক্ষিত মানুষের প্রবেশ-অনুপ্রবেশ—সবই বন্ধ করতে হবে। প্রকৃত শিক্ষার মূল্য কখনো হারিয়ে যাবে না। প্রয়োজনে অবসরপ্রাপ্ত গণকর্মচারী, শিক্ষক, বিভিন্ন পেশাজীবী থেকে শিক্ষিত, সৎ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচন করা যেতে পারে। তাহলে প্রতিষ্ঠানসমূহ দ্রুত অধোগামী হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে না।একটা জ্বলন্ত উদাহরণ কিন্তু চোখের সামনে আছে, তা হলো দেশের সকল সরকারি স্কুল জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন থেকে বছরের পর বছর ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভর্তি নিয়ে বা অন্য কোনো প্রশাসনিক, আর্থিক বড় অনিয়মের অভিযোগ সচরাচর পাওয়া যায় না। এর কারণ ডেপুটি কমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার সম্পর্কে সব সময়ই সচেতন থাকেন। অন্যায়, অবিচার বা দুর্নীতি তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা মানে, তার পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। যা কম শিক্ষিত দলীয় নেতা-কর্মীদের ক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়। তাদের দায়-দায়িত্ব নেহাত কম।কাজেই গ্রামীণ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু ধারা থেকে রক্ষা করার স্বার্থে সরকার সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্তকে পুনর্বিবেচনা করার নিমিত্ত উচ্চ আদালতের পরামর্শকে আমলে নিতে পারে। এটা কারও একক দল বা মতের কথা নয়, সম্পূর্ণ জনস্বার্থ সহায়ক বিষয়। সবকিছুতে শিথিলতা আনয়ন করা শুভ হয় না, আবার সব সময় গণতান্ত্রিকও নয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার ও প্রবন্ধকার]

ঢাকার রাত কেন এত গরম হচ্ছে?

সন্ধ্যা মানে দিনের তপ্ত কপালে একটু শীতল বাতাসের স্পর্শ। রোদের বিদায়, পাখির ঘরে ফেরা, ক্লান্ত মানুষের স্বস্তির অপেক্ষা। সারাদিনের উত্তাপ পেছনে ফেলে পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে বিশ্রামের প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু ঢাকায় এখন কোনো কোনো সন্ধ্যায় অন্ধকার নামে, শীতলতা নামে না। সূর্য ডুবে যায়, অথচ গরম থেকে যায় আরও ভ্যাপসা, আরও আবদ্ধ হয়ে।সম্প্রতি ঢাকায় পরপর কয়েকটি রাতে এই অস্বস্তি গভীরভাবে অনুভব করেছি। পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহীর তীব্র গরম আমার অপরিচিত নয়। দীর্ঘদিন সেখানে বসবাস ও মাঠপর্যায়ে কাজ করার সুবাদে সেই রুক্ষ তাপের সঙ্গে পরিচয় আছে। তবু ঢাকার রাতের গরম যেন অন্য রকম। গায়ে ঘাম জমে, শরীর জুড়ায় না। এমনকি এসি চালানোর পরও স্বস্তি পেতে সময় লাগে। মনে হয়, দিনের উত্তাপ রাতের মধ্যেও আমাদের পিছু ছাড়ছে না। সন্ধ্যার পর যে শহরের ধীরে ধীরে শীতল হওয়ার কথা, সেখানে রাতও কেন এত অস্বস্তিকর? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তাপমাত্রার সংখ্যায় নেই। সন্ধ্যায় বেশি গরম অনুভব করা মানেই দুপুরের চেয়ে বাতাসের তাপমাত্রা বেড়েছে, তা নয়। তাপমাত্রা কিছুটা নামলেও আর্দ্রতা, বাতাসের স্থবিরতা আর চারপাশের উত্তপ্ত দেয়াল ও রাস্তা থেকে আসা তাপ মিলিয়ে শরীরের অস্বস্তি বাড়তে পারে। কয়েক রাতের অভিজ্ঞতা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের প্রমাণ নয়; তবে তা আমাদের নগরজীবনের একটি জরুরি সমস্যার দিকে দৃষ্টি ফেরায়।দিনের পুরোটা সময় ভবন, ছাদ ও পিচঢালা রাস্তা সূর্যের তাপ গ্রহণ করে। সূর্যাস্তের পর সেই সঞ্চিত তাপ ধীরে ধীরে বের হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা ইপিএর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নির্মাণসামগ্রী থেকে ধীরে তাপ বের হওয়ার কারণে সন্ধ্যার পর নগর তাপদ্বীপের প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। আশপাশের কম নির্মিত এলাকার তুলনায় শহর উষ্ণ থেকে যাওয়ার এই ঘটনাই ‘নগর তাপদ্বীপ’।পাশাপাশি উঁচু ভবন ও সরু রাস্তার বিন্যাসও সমস্যাটিকে জটিল করে। মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা, ইউনাইটেড স্টেটস এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি (ইপিএ) ইপিএর তথ্যানুসারে, এ ধরনের ভবনঘেরা পথ প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহে বাধা দিতে পারে; ঘন নির্মাণের মধ্যে জমে থাকা তাপও সহজে বের হতে পারে না। ফলে রোদ চলে গেলেও দিনের উত্তাপের রেশ থেকে যায়। এর সঙ্গে আর্দ্রতা যুক্ত হলে গরমের চরিত্র বদলে যায়। শরীর ঠান্ডা হওয়ার জন্য শুধু ঘাম হওয়া যথেষ্ট নয়; সেই ঘাম বাষ্পীভূত হয়ে ত্বক থেকে তাপ সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকলে প্রক্রিয়াটি ধীর হয়। তখন ঘামলেও স্বস্তি আসে না। সন্ধ্যায় বাতাস কিছুটা ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বাড়তেও পারে। বাতাস চলাচল কম থাকলে ভ্যাপসা অনুভূতি আরও প্রকট হয়।যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যানুসারে, তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা একসঙ্গে বিবেচনা করে ‘হিট ইনডেক্স’ নির্ধারণ করা হয়, যা অনুভূত গরমের একটি সূচক। রোদ, বাতাস ও শারীরিক পরিশ্রমের প্রভাব বুঝতে আরও বিষয় বিবেচনা করতে হয়। অর্থাৎ একই তাপমাত্রা দুই জায়গায় মানুষের শরীরে একই অনুভূতি তৈরি করবে, এমন নয়।  রাজশাহীর গরমের সঙ্গে ঢাকার গরমের পার্থক্য অনুভব করার পেছনেও এই বিষয়গুলো কাজ করতে পারে। রাজশাহীর রাত সব সময় শীতল, এমন দাবি করছি না। তবে শুষ্ক পরিস্থিতিতে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যে স্বস্তি দিতে পারে, আর্দ্র ও বাতাসহীন পরিবেশে তা পাওয়া কঠিন। দুই শহরের যথাযথ তুলনার জন্য একই সময়ের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাসের তথ্য প্রয়োজন।সম্প্রতি ওমরাহ পালনের সময় মক্কা-মদিনার প্রচণ্ড গরমের সঙ্গেও ঢাকার গরমের একটি পার্থক্য অনুভব করেছি। সেখানে তীব্র তাপের মধ্যেও গায়ে ঘাম জমে থাকার অনুভূতি ঢাকার মতো ছিল না। এর অর্থ শরীর ঘামছিল না, তা নয়। শুষ্ক বাতাসে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে বলে ত্বকের ভেজাভাব কম টের পাওয়া যায়। ঢাকার আর্দ্র পরিবেশে সেই ঘামই সহজে শুকাতে চায় না।অবশ্য মক্কা-মদিনার আবহাওয়াও প্রতিদিন এক রকম নয়। শুষ্ক গরমকে নিরাপদ ভাবারও সুযোগ নেই; ঘাম চোখে না পড়লেও শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যেতে থাকে। এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, গরমের কষ্ট শুধু থার্মোমিটারের সংখ্যায় ধরা পড়ে না।ঘর কিংবা গাড়ির এসির অভিজ্ঞতাতেও তাপ সঞ্চয়ের বিষয়টি বোঝা যায়। রোদে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির কাচ দিয়ে আসা সৌরশক্তি আসন, ড্যাশবোর্ড ও ভেতরের অংশ গরম করে। এসি চালানোর পর ঠান্ডা বাতাস এলেও ওই অংশগুলো তাপ ছাড়তে থাকে। ফলে পুরো কেবিন আরামদায়ক হতে সময় লাগে। ঘরের ছাদ, দেয়াল ও আসবাবও দিনের তাপ ধরে রাখতে পারে। এসিকে বাতাস ঠান্ডা করার পাশাপাশি আর্দ্রতাও সরাতে হয়।যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ও পরিবেশ সংস্থার পরিচালিত ফুয়েল ইকোনমি ওয়েবসাইট-এর তথ্যানুসারে, অত্যন্ত গরমে এসি ব্যবহারে প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির জ্বালানি-দক্ষতা ২৫ শতাংশেরও বেশি কমতে পারে, বিশেষ করে ছোট যাত্রায়। বাইরের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও রোদের তীব্রতায় এই প্রভাব বদলায়। তাদের নির্দেশনায় ছায়ায় গাড়ি রাখা, সানশেড ব্যবহার এবং নিরাপদ পরিবেশে প্রথমে জমে থাকা গরম বাতাস বের করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এসি দেরিতে ঠান্ডা করার পেছনে যন্ত্রের সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ বা ত্রুটিও থাকতে পারে। সব দায় বাইরের গরমের নয়। একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, এসি তাপ নিশ্চিহ্ন করে না; ভেতর থেকে বাইরে সরায় এবং যন্ত্র চালানোর শক্তিও তাপ যোগ করে। ইপিএ যানবাহন, এসি ও শিল্পকারখানার বর্জ্যতাপকে নগরের উষ্ণতায় অবদান রাখা উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ঢাকার মোট তাপে কোন উৎসের অবদান কত, স্থানীয় গবেষণা ছাড়া তা নির্দিষ্ট করা যাবে না।এই পরিস্থিতিতে গাছপালা, উন্মুক্ত মাটি ও জলাশয়ের গুরুত্ব গভীর। গাছ ছায়া দেয় এবং পাতার প্রস্বেদনের মাধ্যমে শীতলতায় সাহায্য করে। ইপিএর ব্যাখ্যাতেও এই দুই প্রক্রিয়ার গুরুত্ব রয়েছে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের জায়গা পাকা করে পাশে কয়েকটি টব বসালে হারানো ছায়া ফিরে আসে না।  হাতিরঝিলের কথাই ধরা যাক। এর পানির দুর্গন্ধের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জলাশয় থাকলেই তার পাশে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয় না। মানুষ যদি পানির ধারে গিয়েও দুর্গন্ধে অস্বস্তি বোধ করেন, তবে সেই উন্মুক্ত পরিসরের সম্ভাবনা অপূর্ণ থেকে যায়। এতো বিশাল পানির উৎস হাতিরঝিলকে ঘিরে শক্তিশালী পরিকল্পনায় আসা উচিত। পানির মান, গাছের ছায়া, হাঁটার পথ ও বিশ্রামের জায়গা একসঙ্গে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।দুর্গন্ধের উৎস শনাক্ত করে দূষিত প্রবাহ বন্ধ করা এবং প্রয়োজনমতো শোধনের ব্যবস্থা এখানে প্রথম কাজ। শুধু ভাসমান আবর্জনা সরিয়ে স্থায়ী সমাধান হবে না। নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা করে ফল প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি হাঁটার পথ ও বসার জায়গায় উপযুক্ত ছায়াদানকারী গাছ বাড়ানো দরকার। গাছের অবস্থান এমন হতে হবে, যাতে বাতাস চলাচল ও মানুষের নিরাপদ যাতায়াত বজায় থাকে। আশপাশের পাড়ায় শীতলতার সুবিধা কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটিও পরিমাপ করা প্রয়োজন।একটি হাতিরঝিল অবশ্য পুরো ঢাকার শীতলতার দায়িত্ব নিতে পারে না। নিজের পাড়াতেই ছায়া, মাঠ ও জলাশয়ের সুযোগ থাকা দরকার। জলাশয়ের পরিমাণ বাড়াতে আগে বিদ্যমান পুকুর ও খাল রক্ষা, পুনরুদ্ধারযোগ্য অংশ ফিরিয়ে আনা এবং নতুন উন্নয়ন এলাকায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জায়গা নিশ্চিত করা বাস্তবসম্মত। তবে পানি বাড়ালেই রাতের ভ্যাপসা গরম কমবে এমন সরল হিসাব কিন্তু নয়। জলাশয়ের সঙ্গে সবুজ, বায়ুপ্রবাহ, পানির মান ও স্থানীয় আর্দ্রতার প্রভাব মিলিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। রাতের গরমকে শুধু আরামের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, দীর্ঘ সময় দিন ও রাতের উচ্চ তাপমাত্রা শরীরে তাপের চাপ বাড়ায় এবং অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি করে। নিম্নমানের আবাসন ও শীতল হওয়ার সুযোগের অভাবে নিম্ন আয়ের মানুষ বিশেষভাবে বিপন্ন হন। যে মানুষ সারাদিন বাইরে শ্রম দেন, রাতে গরম ঘরে ফিরেও যদি বিশ্রাম না পান, তার জন্য উত্তাপ দিনের শেষে শেষ হয় না। একই শহরে কেউ এসির তাপমাত্রা কমিয়ে স্বস্তি খোঁজেন, কেউ একটি ফ্যানের নিচে পরিবারের সবাইকে নিয়ে রাত কাটান। তাই শীতলতা জনস্বাস্থ্য ও ন্যায্যতারও প্রশ্ন। সমাধানের অগ্রাধিকার নির্ধারণে এই মানুষদের অবস্থাই আগে দেখতে হবে।বিদেশের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এখানে বাস্তব শিক্ষা নিতে পারি। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার ‘ক্লাইমেট-অ্যাডাপ্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের বাসেলে ২০০২ সালের বিধানে নতুন ও সংস্কার করা সমতল ছাদে সবুজায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়; ২০১০ সালে তা আরও জোরদার হয়। এর আগে আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে ছাদ সবুজ করার উদ্যোগ উৎসাহিত করা হয়েছিল। অর্থাৎ শুধু নির্দেশ দেওয়া হয়নি; সহায়তা ও নকশার নির্দেশনাও ছিল। এটি পুরো সুইজারল্যান্ডের প্রত্যেক বাড়ির জন্য একই নিয়ম এমনটা কিন্তু নয়। ঢাকায় এই ধারণা প্রয়োগ করতে হলে সবুজ ছাদকে ভবনের নকশার অংশ করতে হবে। ইপিএর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পরিকল্পিত উদ্ভিদ আচ্ছাদন ছাদের শীতলতায় সাহায্য করতে পারে। কিন্তু কয়েকটি টব রেখে পুরো ছাদ সবুজ হয়েছে বলা যায় না; জলরোধক স্তর, উপযুক্ত রোপণমাধ্যম ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাও প্রয়োজন। নির্দিষ্ট শ্রেণির নতুন ভবনে উপযোগী ছাদের অংশে সবুজায়নের শর্ত আনার প্রস্তাব বিবেচনা করা যায়। পানির ট্যাংক, সৌরবিদ্যুৎ, অগ্নিনিরাপত্তা ও চলাচলের জায়গা হিসাব করে মান নির্ধারণ করতে হবে। পুরোনো ভবনে ভেজা মাটিসহ অতিরিক্ত ওজন বহনের সক্ষমতা প্রকৌশলী দিয়ে পরীক্ষা ছাড়া বাগান চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। ঢাকার বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমের উপযোগী উদ্ভিদ, পরিচর্যা এবং পানি জমতে না দেওয়ার ব্যবস্থা একই পরিকল্পনায় থাকতে হবে। যেসব ভবনে সবুজ ছাদ সম্ভব নয়, সেখানে তাপ-প্রতিফলক প্রলেপ ও তাপ নিরোধক বিকল্প হতে পারে। ইপিএর উল্লেখ করা গবেষণায় এসিবিহীন আবাসিক ভবনে শীতল ছাদ সর্বোচ্চ অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা প্রায় ১.২ থেকে ৩.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানোর ফল পাওয়া গেছে। ঢাকাতেও একই ফল হবে ধরে না নিয়ে স্থানীয় ভবনে পরীক্ষা করতে হবে।আগামী গরম মৌসুমের আগে নির্বাচিত বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও নিম্ন আয়ের আবাসনে এসব ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা সম্ভব। কাজের আগে ও পরে ঘরের তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ ব্যবহার, খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণ তুলনা করা হোক। কার্যকর উদ্যোগে যাচাইসাপেক্ষ অনুদান বা করের ছাড় বিবেচনা করা যেতে পারে। নিয়মের সঙ্গে সামর্থ্য তৈরির সহায়তা না থাকলে বাস্তবায়ন দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যৌথভাবে পাড়াভিত্তিক রাতের তাপ পর্যবেক্ষণ শুরু করতে পারে। ঘনবসতি, বাজার, শ্রমজীবী মানুষের আবাসন এবং তুলনামূলক সবুজ এলাকায় একই পদ্ধতিতে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাস মাপতে হবে। শুধু উপগ্রহে দেখা ছাদ বা রাস্তার পৃষ্ঠতাপ নয়, মানুষের বসবাসের উচ্চতায় বাতাস এবং নির্বাচিত ঘরের ভেতরের অবস্থাও জানা দরকার। তথ্য প্রকাশ করে সবচেয়ে বিপন্ন এলাকাকে বরাদ্দে অগ্রাধিকার দিতে হবে।বৃক্ষরোপণের সাফল্যও চারার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখা চলবে না। তিন বছর পর কতটি গাছ বেঁচে আছে, কতটা ছায়া তৈরি হয়েছে সেই হিসাব চাই। পুরোনো বড় গাছ সংরক্ষণ, শিকড়ের জন্য জায়গা এবং পরিচর্যার বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ, বাসস্ট্যান্ড ও হাসপাতালের প্রবেশপথ আগে ছায়া পাক। ছাদের সবুজ দিয়ে মাটির গাছ রক্ষার দায়িত্ব পূরণ হয় না। নতুন বড় প্রকল্প অনুমোদনের সময় আশপাশের আলো-বাতাসের ওপর প্রভাব গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। অনুমোদিত নকশার ফাঁকা জায়গা বাস্তবে অক্ষুণ্ণ আছে কি না, নির্মাণশেষেও যাচাই করতে হবে। পরিবহনেও চাই নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন, ছায়াযুক্ত যাত্রীছাউনি এবং নিরাপদ হাঁটার পথ। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষমাণ গাড়ির অপ্রয়োজনীয় ইঞ্জিন চালু রাখা কমাতে সুশৃঙ্খল ওঠানামার ব্যবস্থা ও চালকদের ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থল দরকার।সবশেষে প্রয়োজন রাতকেও অন্তর্ভুক্ত করে তাপ-স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা। তীব্র গরমে নিরাপদ শীতল আশ্রয় কোথায় খোলা থাকবে, পানীয় জল কোথায় মিলবে, বিদ্যুৎ গেলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র কীভাবে চলবে এবং অসহায় প্রবীণদের খোঁজ কে নেবে আগেই ঠিক করতে হবে। বিদ্যমান কমিউনিটি সেন্টার ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে নিরাপত্তা, কর্মী, বিদ্যুৎ ও পরিচালন ব্যয় নিশ্চিত করেই।প্রতিটি উদ্যোগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, বাজেট ও সময়সীমা প্রকাশ করা জরুরি। বছর শেষে সাফল্য মাপতে হবে মানুষের পাওয়া সুবিধায় কত ঘরে উত্তাপ কমল, কত পথ ছায়া পেল, কত জলাশয়ের পানি ভালো হলো এবং কতজন বিপন্ন মানুষ সহায়তা পেলেন। সন্ধ্যা একসময় দিনের ক্লান্তি শেষে স্বস্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসত। ঢাকার মানুষ সেই সামান্য স্বস্তিটুকু ফিরে পাওয়ার দাবি রাখেন। শহরকে রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু আরও উত্তপ্ত করে তোলার সিদ্ধান্তগুলো থামানো সম্ভব। মাটি, পানি, গাছ ও বাতাসের জন্য জায়গা রেখে উন্নয়ন করাও সম্ভব।শহর ঘুমাতে চায়, মানুষও ঘুমাতে চায় কিন্তু কংক্রিটে জমে থাকা তাপ জেগে থাকে। ঢাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের পরিকল্পনায় তাই রাতেরও একটি জায়গা থাকা দরকার। একটি শহর কতটা বাসযোগ্য, তা শুধু দিনের ব্যস্ততা ও উঁচু ভবনে বোঝা যায় না বরং মানুষ রাতে কতটা স্বস্তিতে বিশ্রাম নিতে পারেন, সেই উত্তরেও বোঝা যায়।লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও শিক্ষক

ইশারা ভাষায় সমান অধিকার নিশ্চিত হোক

আজ ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস। শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও বধির মানুষের অধিকার, মর্যাদা এবং সমাজে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ এ দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়। ইশারা ভাষার ব্যবহার ও স্বীকৃতি বাড়ানো, শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তাদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের মানবাধিকার ঘোষণা’। একই সঙ্গে ২১ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বধির সপ্তাহ। এ বছর বিশ্ব বধির ফেডারেশনের ৭৫ বছর এবং জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদের ২০ বছর পূর্তিও হচ্ছে।শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের মৌলিক অধিকার অন্য সবার মতোই। তাদের অধিকার কারও দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও সামাজিক জীবনে তাঁদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। ইশারা ভাষা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, পরিচয়, সংস্কৃতি ও আত্মপ্রকাশের ভাষা।ইশারা ভাষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পেছনে দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৫১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রোমে বিশ্বের ২৫টি শ্রবণপ্রতিবন্ধী সংগঠনের সমন্বয়ে বিশ্ব বধির ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে সংগঠনটি ইশারা ভাষার স্বীকৃতির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করে। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের কাছে ২৩ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস ঘোষণার প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই বছরের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করে। ২০১৮ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। অবশ্য এরও আগে ১৯৫৮ সালে বিশ্ব বধির ফেডারেশনের উদ্যোগে প্রথম আন্তর্জাতিক বধির সপ্তাহ পালিত হয়েছিল।ইশারা ভাষা কোনো বিকল্প বা অসম্পূর্ণ ভাষা নয়। এর নিজস্ব ব্যাকরণ ও শব্দভান্ডার রয়েছে। উচ্চারিত ভাষার সঙ্গে এর গঠনগত পার্থক্য থাকলেও এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক ভাষা। মুখের অভিব্যক্তি ও দেহভঙ্গিও এ ভাষায় অর্থ প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ইশারা ভাষা প্রচলিত। আবার ভিন্ন ভাষার ইশারা ভাষা ব্যবহারকারীদের পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষাও ব্যবহৃত হয়। ইশারা ভাষার বিকাশ শুধু শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের জীবনকে সহজ করেনি, ভাষাবিজ্ঞান ও শিক্ষা প্রযুক্তির বিকাশেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মাত্রায় শ্রবণশক্তি হ্রাসের সমস্যায় ভুগতে পারে। তাদের মধ্যে ৭০ কোটির বেশি মানুষের শ্রবণ পুনর্বাসনের প্রয়োজন হতে পারে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য শ্রবণশক্তি পরীক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শ্রবণসহায়ক যন্ত্র এবং ইশারা ভাষাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য হলেও যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে তা শিক্ষা ও কর্মজীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।বাংলাদেশেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো না কোনো মাত্রায় শ্রবণপ্রতিবন্ধকতার শিকার। জন্মগত কারণ ছাড়াও বয়স, কানের বিভিন্ন রোগ, কানে ময়লা জমা, অতিরিক্ত শব্দ এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শ্রবণশক্তি কমতে পারে। নগর জীবনের অতিরিক্ত শব্দও এ সমস্যার অন্যতম কারণ। কিন্তু দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়। বধিরতার চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারও অনেকের জন্য ব্যয়বহুল এবং সহজলভ্য নয়।বাংলাদেশে বাংলা ইশারা ভাষা সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে ২০০৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। এর আগে ১৮৯৩ সালে কলকাতা মূক ও বধির বিদ্যালয়ে বাংলা ইশারা ভাষার চর্চার সূচনা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এর ব্যবহার ও বিকাশ নতুনভাবে এগোয়। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থা বাংলা ইশারা ভাষার একটি অভিধান প্রকাশ করে। বর্তমানে বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগেও ইশারা ভাষার ব্যবহার বাড়ছে। এসব উদ্যোগ শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও শ্রবণক্ষম মানুষের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।তবে বাস্তব চিত্র এখনও সন্তোষজনক নয়। দেশে শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ফরিদপুর, চাঁদপুর, সিলেট ও ঝিনাইদহে আটটি বাক্‌-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ৭২০ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। বেসরকারি পর্যায়েও ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু দেশের বিপুলসংখ্যক শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুর তুলনায় এ সুযোগ খুবই সীমিত। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যালয়ের অভাব প্রকট। ফলে অনেক শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের সমস্যার আরেকটি দিক হলো কর্মসংস্থান ও সামাজিক বৈষম্য। ইশারা ভাষা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান কম। অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইশারা ভাষায় যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। ফলে একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি চিকিৎসা নিতে গিয়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে গিয়ে কিংবা চাকরির ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়েন। শুধু বিশেষ বিদ্যালয় স্থাপন করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায়ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ইশারা ভাষার শিক্ষক, প্রশিক্ষিত দোভাষী ও সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক ও লাইন ডাইরেক্টর (এমআইএস), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর; ট্রেজারার, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন]

কৃষিভিত্তিক সমবায়: নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

বাংলাদেশের কোনো একটি উপজেলার কথা ভাবুন। পাঁচজন শিক্ষিত তরুণ একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন—তারা পাঁচটি চাকরির জন্য আলাদাভাবে অপেক্ষা না করে নিজেরাই একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলবেন। একজন উৎপাদন দেখবেন, একজন কৃষকের সঙ্গে যোগাযোগ ও কাঁচামাল সংগ্রহ করবেন, একজন হিসাব ও অর্থায়ন সামলাবেন, একজন বিক্রয় ও বিপণন দেখবেন এবং অন্যজন খাদ্য নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ ও নতুন পণ্য উন্নয়নের দায়িত্ব নেবেন। এই পাঁচজন যদি নিজেদের পুঁজি, শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতাকে এক জায়গায় আনতে পারেন, তাহলে একটি ছোট উদ্যোগই একদিন বহু মানুষের কর্মসংস্থান এবং শতাধিক কৃষকের বাজার তৈরি করতে পারে।বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার আলোচনা সাধারণত একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে হয়। কিন্তু একজন তরুণের পক্ষে একই সঙ্গে পর্যাপ্ত মূলধন সংগ্রহ, কারখানা পরিচালনা, কাঁচামাল কেনা, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, হিসাব রাখা এবং বাজার তৈরি করা কঠিন। চার-পাঁচজন মিলে কাজ করলে পুঁজির পাশাপাশি ঝুঁকি ও দায়িত্বও ভাগ হয়ে যায়। এখানে ‘সমবায়’ বলতে শুধু আইনগত সমবায় সমিতি বোঝানো হচ্ছে না। উদ্যোগটি নিবন্ধিত সমবায়, অংশীদারি ব্যবসা কিংবা শেয়ারভিত্তিক কোম্পানি—যেকোনো উপযুক্ত কাঠামোতে হতে পারে। মূল বিষয় হলো সম্মিলিত মালিকানা ও দায়িত্ব।তবে বন্ধুত্ব দিয়ে ব্যবসা শুরু করা গেলেও শুধু বন্ধুত্ব দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা যায় না। শুরুতেই লিখিতভাবে ঠিক করতে হবে কে কত টাকা বিনিয়োগ করবেন, কার কত মালিকানা থাকবে, কে পূর্ণকালীন কাজ করবেন, কে বেতন পাবেন, মুনাফা কীভাবে বণ্টিত হবে, বড় সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হবে এবং কোনো অংশীদার ব্যবসা ছেড়ে যেতে চাইলে কী হবে। পাঁচজন মালিক হলেও প্রতিদিনের কারখানা পরিচালনার জন্য একজনকে প্রধান দায়িত্ব দিতে হবে। পাঁচজন পাঁচ ধরনের নির্দেশ দিলে ভালো ব্যবসাও দ্রুত সমস্যায় পড়তে পারে।বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগের জন্য কৃষিভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। মৌসুমে টমেটো, আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রচুর উৎপাদিত হয়। সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে গেলে দাম কমে যায় এবং দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন। অথচ একই কৃষিপণ্য শুকিয়ে, রান্না করে, পিউরি, চাটনি, আচার, পাউডার বা অন্য মূল্যসংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করলে কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব। অর্থাৎ কৃষকের কমমূল্যের মৌসুমি পণ্যই হতে পারে তরুণদের শিল্পের কাঁচামাল।ধরা যাক, পাঁচজন তরুণ একটি বহুমুখী ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তুলবেন। উদাহরণ হিসেবে প্রকল্পটির মোট বিনিয়োগ এক কোটি টাকা ধরা যেতে পারে। পাঁচজন প্রত্যেকে ১০ লাখ টাকা করে দিলে নিজস্ব মূলধন হবে ৫০ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ৫০ লাখ টাকা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণসহ উপযুক্ত ব্যবসায়িক অর্থায়ন থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে প্রথমবারের উদ্যোক্তার জন্য পুরো এক কোটি টাকা দিয়ে শুরু করাই একমাত্র পথ নয়। ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করে বাজার তৈরি হওয়ার পর ধাপে ধাপে বিনিয়োগ বাড়ানো অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ।এক কোটি টাকার সব অর্থ ভবন ও যন্ত্রপাতিতে ব্যয় করা উচিত নয়। উদাহরণ হিসেবে ১০–১৫ লাখ টাকা কারখানার স্থান, শেড ও প্রাথমিক অবকাঠামো; ৩০–৩৫ লাখ টাকা ওয়াশিং, কাটিং, ড্রায়ার, কুকিং কেটলি, মিক্সিং, ফিলিং ও প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি; ৮–১০ লাখ টাকা বিদ্যুৎ, পানি, গুদাম ও অন্যান্য ইউটিলিটি; ৫–৭ লাখ টাকা পরীক্ষাগার, পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রাখা যেতে পারে। ব্র্যান্ড, প্যাকেজিং উন্নয়ন, নিবন্ধন ও প্রাথমিক বাজারজাতকরণের জন্যও অর্থ প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তত ২৫–৩০ লাখ টাকা কার্যকরী মূলধনের ব্যবস্থা রাখা। কারণ কারখানা তৈরি হওয়ার পর কাঁচামাল, প্যাকেট, বেতন, পরিবহন ও বিদ্যুতের জন্য প্রতিদিন নগদ অর্থ দরকার হবে। এগুলো কেবল উদাহরণমূলক হিসাব; প্রকৃত বিনিয়োগের আগে স্থানীয় কোটেশন নিয়ে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।একটি মাত্র মৌসুমি পণ্যের জন্য কারখানা করা ঝুঁকিপূর্ণ। বরং একই অবকাঠামো ব্যবহার করে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা ভালো। শীতকালে টমেটো থেকে শুকনো টমেটো, টমেটো ফ্লেক্স বা পাউডার; আমের মৌসুমে ম্যাঙ্গো চাটনি, আচার ও শুকনো আম; অন্য সময়ে আনারস, কলা বা কাঁঠাল শুকিয়ে প্যাকেটজাত করা যেতে পারে। এতে যন্ত্রপাতি বছরের বেশি সময় ব্যবহৃত হবে এবং একটি পণ্যের বাজার খারাপ হলে অন্য পণ্য ব্যবসাকে সহায়তা করবে।সান-ড্রাইড বা নিয়ন্ত্রিতভাবে শুকানো টমেটো একটি ভালো উদাহরণ। মৌসুমে কম দামে টমেটো সংগ্রহ করে প্রথমে বাছাই ও ধোয়া হবে। এরপর সমান আকারে কেটে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শুকিয়ে নিরাপদ আর্দ্রতায় আনতে হবে এবং উপযুক্ত প্যাকেটে সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা দরকার—টমেটোর অধিকাংশই পানি। ১০ কেজি তাজা টমেটো থেকে হয়তো প্রায় ০.৭ থেকে ১.২ কেজি শুকনো পণ্য পাওয়া যেতে পারে; প্রকৃত ফলন জাত, পরিপক্বতা, বাছাইয়ের ক্ষতি এবং চূড়ান্ত আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করবে।ধরা যাক ১০ হাজার কেজি টমেটো প্রতি কেজি ১২ টাকা দরে কেনা হলো। কাঁচামালের দাম হলো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যদি ৮৫০ কেজি বিক্রয়যোগ্য শুকনো টমেটো পাওয়া যায়, তাহলে শুধু কাঁচা টমেটোর খরচই প্রতি কেজি শুকনো পণ্যে প্রায় ১৪১ টাকা। এর সঙ্গে শ্রম, শুকানোর বিদ্যুৎ বা জ্বালানি, পানি, প্যাকেজিং, পরিবহন, পরীক্ষাগার, কারখানার স্থায়ী খরচ, বিক্রয় কমিশন এবং অর্থায়নের ব্যয় যোগ হবে। সব মিলিয়ে যদি প্রতি কেজির প্রকৃত খরচ ৩০০–৪০০ টাকা হয়, তাহলে বাজারে ৪০০ টাকায় বিক্রি করে বড় মুনাফা হবে—এমন ধারণা করা ভুল। বাজার ৭০০, ৮০০ বা ১,০০০ টাকা দিতে প্রস্তুত কি না, সেটিই আগে পরীক্ষা করতে হবে।ম্যাঙ্গো চাটনির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। শুধু আম, চিনি ও মসলার দাম যোগ করলেই উৎপাদন খরচ পাওয়া যায় না। বোতল, ঢাকনা, লেবেল, কার্টন, শ্রম, রান্নার জ্বালানি, পানি, মান পরীক্ষা, পরিবহন, পরিবেশকের কমিশন এবং খুচরা বিক্রেতার মার্জিনও রয়েছে। ধরুন ৫০০ গ্রামের একটি বোতল চাটনির সম্পূর্ণ কারখানা-পর্যায়ের খরচ ১০০ টাকা। উৎপাদক ১২৫–১৩০ টাকায় পরিবেশককে দিলে এবং শেষ পর্যন্ত দোকানে ১৬০–১৮০ টাকায় বিক্রি হলে উৎপাদক, পরিবেশক ও দোকানদার—সবার জন্য ব্যবসাটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু ক্রেতা যদি ১২০ টাকার বেশি দিতে না চান, তাহলে পণ্যটি যত ভালোই হোক, ব্যবসার মডেল পরিবর্তন করতে হবে।এই কারণেই কারখানা তৈরির আগে বাজার পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। পাঁচজন তরুণ প্রথমেই লাখ লাখ প্যাকেট উৎপাদন না করে ৫০০ বা ১,০০০ প্যাকেট শুকনো টমেটো এবং কয়েকশ বোতল চাটনি তৈরি করতে পারেন। স্থানীয় রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ, অনলাইন ক্রেতা এবং পরিবারের কাছে বিক্রি করে জানতে হবে—স্বাদ কেমন, প্যাকেটের আকার ঠিক আছে কি না, কত দাম দিতে রাজি এবং দ্বিতীয়বার কিনতে চান কি না। বাজার পরীক্ষায় ব্যর্থ একটি পণ্যের জন্য ৩০ লাখ টাকার মেশিন কেনার কোনো অর্থ নেই।কারখানার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সস্তা জমি দেখলে হবে না। আশপাশে পর্যাপ্ত কাঁচামাল আছে কি না, কৃষকের কাছ থেকে দ্রুত কারখানায় আনা যায় কি না, নিরাপদ পানি ও বিদ্যুৎ আছে কি না, শ্রমিক পাওয়া যায় কি না এবং ঢাকা বা অন্য বড় বাজারে পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা কেমন—সব বিবেচনা করতে হবে। কৃষিপণ্য উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি প্রক্রিয়াজাতকরণ হলে পরিবহন ও সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি দুটিই কমানো সম্ভব।খাদ্য নিরাপত্তা শুরু থেকেই ব্যবসার কেন্দ্রে থাকতে হবে। ছোট কারখানা মানেই নিম্নমানের কারখানা নয়। নিরাপদ পানি, কর্মীদের পরিচ্ছন্নতা, কাঁচা ও প্রস্তুত পণ্যের পৃথক প্রবাহ, পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার লিখিত পদ্ধতি, তাপমাত্রা ও সময় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি ব্যাচের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। শুকনো পণ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী আর্দ্রতা ও পানির সক্রিয়তা এবং চাটনি বা সসে পিএইচ, অম্লতা ও তাপ প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। পণ্যভেদে বাংলাদেশের প্রযোজ্য খাদ্য আইন, মান, নিবন্ধন ও লেবেলিংয়ের শর্তও মেনে চলতে হবে।একইভাবে প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভালো পণ্য দুর্বল প্যাকেটে দিলে আর্দ্রতা ঢুকে মান নষ্ট হতে পারে। আবার অতি ব্যয়বহুল প্যাকেজিং করলে পণ্যের দাম ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। একটি নতুন ব্র্যান্ডের পরিচয়ও স্পষ্ট হওয়া দরকার—কোন অঞ্চলের কাঁচামাল, কীভাবে কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পণ্যটির বিশেষত্ব কী। প্রথমে স্থানীয় বাজার, রেস্টুরেন্ট ও অনলাইন বিক্রিতে অবস্থান তৈরি করে পরে বড় শহর ও রপ্তানির দিকে যাওয়া অধিক বাস্তবসম্মত।আর্থিক পরিকল্পনায় ব্রেক-ইভেন বোঝাও জরুরি। ধরুন কারখানার বেতন, ভাড়া, প্রশাসন, রক্ষণাবেক্ষণ, সুদসহ বছরে স্থায়ী ব্যয় ১৮ লাখ টাকা এবং কাঁচামাল, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বিক্রয় ব্যয় বাদ দেওয়ার পর বিক্রয়ের ৩০ শতাংশ স্থায়ী খরচ মেটাতে থাকে। তাহলে আনুমানিক ব্রেক-ইভেন বিক্রয় হবে বছরে ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এর পরের বিক্রয় থেকেই প্রকৃত পরিচালন মুনাফার সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি টমেটোর দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে গেলে, উৎপাদন ফলন কমলে বা বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৫ শতাংশ কম হলে ব্যবসাটি টিকবে কি না—আগেই হিসাব করা দরকার।এই মডেলের সবচেয়ে বড় সামাজিক সুবিধা হলো এর প্রভাব পাঁচজন মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ছোট কারখানায় ১০–১৫ জন স্থায়ী কর্মী এবং মৌসুমে আরও ২০–৩০ জন কাজ পেতে পারেন। কয়েক ডজন বা শতাধিক কৃষক নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারেন। পরিবহনকারী, প্যাকেজিং সরবরাহকারী, পরিবেশক ও দোকানদারও এই অর্থনৈতিক চক্রে যুক্ত হন। বাছাই, মান পরীক্ষা, প্যাকেজিং ও প্রশাসনিক কাজে স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থানেরও ভালো সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।তবে শুরুতেই বড় হওয়ার চেষ্টা না করে ধাপে ধাপে এগোনো উচিত। প্রথমে ৫–১০ লাখ টাকার পরীক্ষামূলক উৎপাদন, তারপর ২৫–৫০ লাখ টাকার ছোট ইউনিট এবং বাজার ও নগদ প্রবাহ স্থিতিশীল হলে এক কোটি বা তার বেশি বিনিয়োগ—এটি অনেক বেশি নিরাপদ পথ। প্রথম বছরের সাফল্য কোটি টাকার মুনাফা নয়; বরং এমন দুই-তিনটি পণ্য তৈরি করা, যা ক্রেতা একবার কেনার পর আবার কিনতে চান।আমরা তরুণদের দীর্ঘদিন ধরে জিজ্ঞেস করছি, ‘চাকরি পেয়েছ?’ হয়তো এখন আরেকটি প্রশ্ন করার সময় এসেছে—‘তোমরা পাঁচজন মিলে কী তৈরি করতে পারো?’ বাংলাদেশের কৃষি আছে, কাঁচামাল আছে, বিশাল ভোক্তা বাজার আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, তরুণ জনগোষ্ঠী আছে। এখন প্রয়োজন এই শক্তিগুলোকে এক জায়গায় আনা।আজ পাঁচজন তরুণের একটি ছোট শুকনো টমেটো, ম্যাঙ্গো চাটনি বা ফল প্রক্রিয়াজাত কারখানাকে হয়তো খুব বড় কিছু মনে হবে না। কিন্তু সঠিক প্রযুক্তি, আর্থিক শৃঙ্খলা, খাদ্য নিরাপত্তা, বাজারজ্ঞান এবং সততার সঙ্গে পরিচালিত হলে সেই ছোট উদ্যোগই একদিন একটি জাতীয় খাদ্য ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাই হয়তো লেখা হবে বড় কোনো করপোরেট ভবনে নয়—একটি উপজেলার ছোট কারখানায়, পাঁচজন তরুণের সম্মিলিত স্বপ্ন দিয়ে।[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা

শিক্ষা একটি জাতির আত্মপরিচয়, অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ব্যক্তির জ্ঞান, বিবেক, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটিয়ে তাকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু শিক্ষা যখন কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করা, মুখস্থবিদ্যা অর্জন এবং সনদ সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত গতানুগতিক শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল কারণ এখানেই।বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে; প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন, অর্থনীতি ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদা প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। অথচ আমাদের শিক্ষার একটি বড় অংশ এখনো মুখস্থনির্ভরতা, পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা ও প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে আবদ্ধ। ফলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করলেও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব জীবন ও কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। দেশের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্য যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের কোন বিকল্প নেই। আধুনিক অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদকে অধিক মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।গতানুগতিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তির পরিবর্তে স্মৃতিশক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখে ভালো নম্বর পাওয়া শিক্ষার সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থী কেন একটি বিষয় শিখছে, সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে কীভাবে প্রয়োগ করবে কিংবা কোনো সমস্যার নতুন সমাধান কীভাবে বের করবে—এসব প্রশ্ন অনেক সময় গৌণ হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীর মধ্যে অনুসন্ধিৎসা, যুক্তিবোধ ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা যথেষ্ট বিকশিত হয় না। পরীক্ষার পর মুখস্থ করা তথ্যের বড় অংশ ভুলে গেলেও পরীক্ষার ফলাফলই তার শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রধান পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়। গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা মূলত শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের সংকীর্ণ ধারণার ফল।শিক্ষা যদি কেবল সনদ, নম্বর ও চাকরির প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে একটি জাতি দক্ষতার কিছু সূচক অর্জন করলেও সৃজনশীল ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারবে না। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করবে, অনুসন্ধান করবে, ভুল থেকে শিখবে, নতুন ধারণা তৈরি করবে এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করবে। শিক্ষা হবে জীবনের প্রস্তুতি, শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার মান, উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতার ওপর। শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার কিংবা সনদ অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং একজন মানুষকে জ্ঞানী, দক্ষ, দায়িত্বশীল, মানবিক ও যুক্তিবাদী নাগরিকে পরিণত করার প্রধান উপায়। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে শিক্ষা। বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও “সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা”কে তার অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে অগ্রগতি হলেও শিক্ষার গুণগত মান, বৈষম্য, শিক্ষকতার মান, মুখস্থনির্ভরতা, পরীক্ষা-কেন্দ্রিকতা, দক্ষতার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের আলোচনা নতুন নয়।  তাই শিক্ষা সংস্কারকে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, জাতীয় অস্তিত্ব ও উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো সমাজের পিছিয়ে পড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা, যাতে তারা দারিদ্র‍্য, বেকারত্ব, অসুস্থতা বা অন্য কোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত না হয়। সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী-নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, খাদ্য সহায়তা, কর্মসংস্থান কর্মসূচি, শিক্ষাবৃত্তি এবং দুর্যোগকালীন ত্রাণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য শুধু দরিদ্র মানুষের মধ্যে অর্থ বা খাদ্য বিতরণ নয়; বরং তাদের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা ও জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা। সামাজিক নিরাপত্তা দারিদ্র‍্য ও বৈষম্য কমাতে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে বিপুল জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র‍্য ও বিভিন্ন সামাজিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি ক্রমেই বাড়ানো হয়েছে। তবে এসব কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শুধু মানুষের দুর্দশা লাঘব করে না; বরং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে।বর্তমান বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়; বরং এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যদি সঠিক ও ভুলের পার্থক্য নির্ণয় করতে শেখানো না হয় এবং ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে সততা ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দেওয়ার শিক্ষা না দেওয়া হয়, তবে কোনো দুর্নীতি দমন কমিশন, কোনো আইনগত সংস্কার কিংবা কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা একাই দুর্নীতি নির্মূল করতে পারবে না। এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হলো বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে শুধু কতজন স্নাতক তৈরি হলো তার ওপর নয়; বরং তারা সমাজে কী ধরনের মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং আদর্শ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে তার ওপর। তাই মূল্যবোধভিত্তিক উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ মানে শুধু মানবসম্পদে বিনিয়োগ নয়; এটি জাতির নৈতিক পুঁজিতে বিনিয়োগ। শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য পরীক্ষার খাতায় কত নম্বর পাওয়া গেল, তার মধ্যে নয়; বরং একজন শিক্ষার্থী কতটা যুক্তিবাদী, দক্ষ, সৃজনশীল, নৈতিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠল—তার মধ্যেই শিক্ষার আসল সার্থকতা। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অতীতের মতো আবারও এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক কাজটা অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে সম্পন্ন করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে একটা বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে সমাজের সর্বস্তরে যে আলাপ চলছে, সেখানে শিক্ষা একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে হাজির আছে। আলাপ উঠেছে শিক্ষা সংস্কারেরও। শিক্ষা সংস্কারে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে? গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা ও আমাদের করণীয় শীর্ষক বিভিন্ন সভা, সেমিনার এবং কর্মশালার মাধ্যমে একটি গণ আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে। গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা বিমোচনে শিক্ষা সংস্কার এর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা সংস্কার ছাড়া মানব সম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা সম্ভব নয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

ভিডিও আরও দেখুন

অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় গোলে ড্র ব্রাজিলের

আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে হারের একেবারেই দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এসে ড্র নিশ্চিত করেছে ব্রাজিল। কুইন্সল্যান্ড কান্ট্রি ব্যাংক স্টেডিয়ামে আয়োজিত রোমাঞ্চকর এই দ্বৈরথে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১-১ গোলে সমতা নিয়ে মাঠ ছেড়েছে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা। নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত সময়ের পঞ্চম মিনিটে নিশ্চিত পরাজয় এড়িয়ে ব্রাজিলের জন্য স্বস্তির ড্র ছিনিয়ে আনেন তরুণ ফরোয়ার্ড রায়ান জাম্পস। ​বাংলাদেশ সময় বিকেল চারটায় শুরু হওয়া ম্যাচের প্রথমার্ধে আধিপত্য বজায় রাখলেও কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায়নি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ব্রাজিল বেশ কয়েকটি আক্রমণ তৈরি করলেও স্বাগতিকদের শক্ত রক্ষণভাগ ভাঙতে ব্যর্থ হয়। প্রথমার্ধ গোলশূন্য শেষ হওয়ার পর ম্যাচের ৬৮ মিনিটে এক অনবদ্য ফ্রি-কিকে ডেডলক ভাঙেন অস্ট্রেলিয়ার তারকা নেস্টোরি ইরাকুন্দা। তাঁর বাঁ পায়ের নিখুঁত ফ্রি-কিক ব্রাজিলের চারজনের ডিফেন্সিভ ওয়াল পার হয়ে পোস্টের কোণে জালে জড়িয়ে গেলে লিড নেয় ক্যাঙ্গারুরা। ​পিছিয়ে পড়ার পর ব্রাজিল সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে উঠলেও ৯০ মিনিট পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার রক্ষণভাগকে পরাস্ত করতে পারেনি। শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে কর্নার পায় সেলেসাওরা। রাফিনহার বাড়ানো নিখুঁত ভেসে আসা ক্রসে দুর্দান্ত লাফিয়ে হেডার করেন রায়ান জাম্পস। বলটি প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার বিচের গায়ে লেগে সামান্য দিক পরিবর্তন করে জালে আশ্রয় নিলে আনন্দে মেতে ওঠে ব্রাজিল শিবির। এই ড্রয়ের ফলে দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর ব্রাজিলকে হারানোর যে স্বপ্ন দেখছিল স্বাগতিকরা, তা অধরাই থেকে গেল। ​পুরো ম্যাচে বল দখলের লড়াইয়ে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে ছিল অ্যানচেলত্তির দল। ৬৪ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে মোট ১৬টি শট নেয় তারা, যার মধ্যে ৫টি ছিল লক্ষ্যভেদী। অন্যদিকে ক্যাঙ্গারুরা ৩৬ শতাংশ বল দখলে রেখে ৭টি শট নেয়, যার ২টি ছিল গোলপোস্ট অভিমুখে। সমতায় ম্যাচ শেষ হওয়ায় ২০০১ সালের কনফেডারেশনস কাপের পর অজিদের বিপক্ষে অপরাজিত থাকার দীর্ঘ রেকর্ডটি বজায় রাখল ব্রাজিল।

অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় গোলে ড্র ব্রাজিলের