সংবাদ
সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবিতে রাষ্ট্রপতিকে এক আইনজীবীর আবেদন

সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবিতে রাষ্ট্রপতিকে এক আইনজীবীর আবেদন

"সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন, ২০২৬" প্রণয়নের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ধ্বংস করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়েছে; এই অভিযোগে বর্তমান জাতীয় সংসদকে অযোগ্য (Unfit) ঘোষণা করে ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। আবেদন করা এই আইনজীবীর নাম  মো. মাহমুদুল হাসান মামুন।রবিবার (২৬ এপ্রিল ) এই চিঠি বঙ্গভবনে পাঠিয়েছেন বলে সংবাদকে নিশ্চিত করেছেন আইনজীবী মাহমুদুল হাসান।বঙ্গভবনে পাঠানো আবেদনে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো হলো তিনটি স্তম্ভ: আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না, যা রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোকে (Basic Structure) ভেঙে ফেলে। কিন্তু বিতর্কিত ওই আইন (সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন, ২০২৬) প্রণয়নের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ সেই সাংবিধানিক সীমারেখা লঙ্ঘন করেছে।আবেদনে আইনজীবী মাহমুদুল উল্লেখ করেন,  সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় হলো বিচার বিভাগের হৃৎপিণ্ড। এই সচিবালয় রহিত করে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম সরাসরি আইন, সংসদ ও বিচার মন্ত্রণালয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সারাদেশের বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে জামিন, আদেশ ও রায়ের ক্ষেত্রে অবৈধ চাপ প্রয়োগের সুযোগ পাবেন; যা বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তিকেই ধ্বংস করে দেবে।আবেদনকারী আইনজীবী বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন 'জঘন্য নজির' খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কোন জাতীয় সংসদ সরাসরি আইন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ধ্বংস করেছে!তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ইসরায়েলের সংসদও তাদের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ধ্বংস করেনি, ফলে সেদেশের বিচার বিভাগ এখনও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচার পরিচালনা করতে পারছে। অথচ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়ন করে বিশ্বের ইতিহাসে অত্যন্ত খারাপ নজির সৃষ্টি করেছে।আবেদনে তিনি দাবি করেন,  আইনটিতে অন্তত এমন শর্ত রাখা যেত যে নতুন আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত পুরনো বিধান বহাল থাকবে। কিন্তু তা না করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়কে পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হয়েছে, যা সংবিধানের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক এবং ক্ষমতাবহির্ভূত (Ultra vires)।
৩৯ মিনিট আগে

মতামতমতামত

ভ্রমণ: তিনবিঘা করিডোরে একদিন

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর বিভাগের একটি জেলা হলো লালমনিরহাট। এই জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থান গুলোর মধ্যে তিস্তা ব্যারেজ, বুড়িমাড়ি জিরো পয়েন্ট, তিনবিঘা করিডর, ৬৯ হিজরীর হারানো মসজিদ, কাকিনা জমিদার বাড়ি, তুষভাণ্ডার জমিদার বাড়ি, ঐতিহ্যবাহী সিন্দুরমতি মন্দির অন্যতম।গত ১৬- এপ্রিল তারিখ আমরা ৫ জন মিলে ভ্রমণে গিয়েছিলাম লালমনিরহাট জেলার দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শনের জন্য । আমাদের এই ভ্রমণে অংশ নিয়েছিলাম আমিসহ উত্তরা হাইস্কুল এন্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের ( সদ্য অব:) শিক্ষক ইকবাল হাসান, মুক্তিযোদ্ধা কলেজের আইসিটি বিভাগের শিক্ষক আব্দুস ছালাম, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক শাহ আলম এবং শরীর চর্চা শিক্ষক ফরহাদ আহম্মেদ। দুই দিনের এই সফরে আমরা  গাজীপুর থেকে লালমনিরহাটে যাই ট্রেনের মাধ্যমে।১৬ এপ্রিল রাত সারে দশটার ট্রেনে আমরা  জয়দেবপুর রেলস্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করি। যদিও ট্রেনটি দেরিতে এসে রাত একটায় প্লাটফর্ম ছাড়ে। লালমনিরহাট এক্সপ্রেস ট্রেনটি টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ উল্লাপাড়া রেলওয়ে স্টেশন হয়ে শান্তাহার, বগুড়া গাইবান্ধা হয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে পরের দিন দুপুর ১২ টায় লালমনিরহাট পৌঁছায়। দীর্ঘ এই ট্রেন যাত্রায় প্রকৃতি ও পরিবেশ দেখে আমাদের অসাধারণ আনন্দ অনুভূত হয়।  বিশেষ করে ট্রেনের ছুটে চলা ঝক ঝকাঝক শব্দ এবং দ্রুত গতিতে সবকিছুকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চকর অনুভূতি দারুণ অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। ভোরের প্রকৃতি, আবহমান গ্রাম বাংলার জনপদ, মাঠ ফসল ও মানুষের সাধারণ জীবনযাপনের এক সচিত্র রূপ ফুটে ওঠে চোখের সামনে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় নিজের মন অজান্তে বলে ওঠে, " অবারিত মাঠ, গগন ললাট, চুমে তব পদধূলি। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি।"দুপুর ১২ টায় আমরা লালমনিরহাট পৌঁছে একটা অটোরিকশা ভাড়া করে কাকিনা বাজার পর্যন্ত যাই। ওখানে একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার গ্রহণ করি। কাকিনা বাজার থেকে একটা সিএনজি ভাড়া করি তিস্তা ব্যারেজ, তিনবিঘা করিডোর, দহগ্রাম ও আঙ্গুর পোতা ছিটমহল এবং বুড়িমারী স্থলবন্দর ঘুরে দেখার জন্য।  সিএনজি চালক আমাদেরকে প্রথমে তিস্তা ব্যারেজ দেখার জন্য নিয়ে যায়। এখানে বলে রাখি, লালমনিরহাট জেলা হেডকোয়ার্টার থেকে এই দর্শনীয় স্থানগুলোর দূরত্ব কমবেশি প্রায় ৯০ কিলোমিটার। জেলা শহর থেকে কাকিনা বাজারের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। এই ২৫ কিলোমিটার পথ আমাদের অটোরিকশা দিয়ে যেতে হয়। লালমনিরহাট থেকে তিনবিঘা করিডোর পর্যন্ত ট্রেনেও যাতায়াত করা যায়। লালমনিরহাট আসতে দেরী হওয়ায়  আমাদের ট্রেনের সময়সূচি মিস হয়।তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় গিয়ে  আমরা তিস্তা সেতু পাড় হই এবং ব্যারেজ পরিদর্শন করি। তিস্তা ব্যারেজ এলাকা মূলত পর্যটন কেন্দ্র। আরও অনেক পর্যটকদেরকে দেখলাম ঘুরে ঘুরে দেখেছে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি। আমরা কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখলাম এবং সবাই মিলে কিছু ছবি তুলে রাখলাম স্মৃতিতে রেখে দেওয়ার জন্য।তিস্তা ব্যারেজ দেখা শেষ হলে  আমরা সোজা তিনবিঘা করিডোর চলে আসি। আমরা যখন তিনবিঘা করিডোর পৌঁছাই তখন বিকাল ৪টা। তিনবিঘা করিডোর দায়িত্বে নিয়োজিত বিজিবির একজন সদস্য কাছে এসে আমাদের পরিচয় জানলো। এবং আমাদেরকে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলো করিডোর এর জায়গাটুকু। যে করিডোর দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করা হয় সেটাই তিনবিঘা করিডোর এবং  ভারতের অংশ।ভারতের এই ক্ষুদ্র করিডোর দিয়ে বাংলাদেশের দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতা ছিটমহলে যেতে হয়৷ আমাদের বহনকারী সিএনজি নিয়েই আমরা করিডোরের ভিতরে প্রবেশ করি। করিডোর থেকে আঙ্গুরপোতা ৯ কিলোমিটার এবং দহগ্রাম ৬ কিলোমিটার। ছিটমহলের ভিতরে বাংলাদেশের শেষ সীমানায় ( শূন্য সীমানা লেখা রয়েছে) চমৎকার একটি মসজিদ রয়েছে। আমরা আসরের নামাজের জন্য এখানে কিছুটা সময় কাটাই। এরপর ছিটমহলের ভিতরে থাকা চা বাগান পরিদর্শন করি।ছিটমহলের মানুষের প্রধান অর্থনৈতিক কাজ কৃষি। ধান পাট শাকসবজি প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হয়। তবে এখানের প্রধান অর্থনৈতিক ফসল হচ্ছে ভুট্টা। চতুর্দিকে শুধু ভুট্টা ক্ষেত। ভুট্টা চাষের ধরণ দেখে মুগ্ধ। কিছু জমির ভুট্টা তুলে ফেলা হয়েছে, কিছু জমিতে ভুট্টা পেকে আছে আবার কিছু জমিতে ভুট্টা মাত্র ধরতে শুরু করেছে। আরও মজার ব্যাপার আছে - কিছু কিছু জমিতে নতুন করে ভুট্টা গাছ বড় হয়ে ওঠছে মাত্র। লিচু বাগান রয়েছে পর্যাপ্ত। আম গাছও আছে প্রচুর। তবে কথা বলে জানা যায় এবার আমের ফলন কম হয়েছে।এখানকার বাড়িঘর পাকা দালান, সেমি পাকা দালান ও টিন দিয়ে তৈরি। রাস্তা পাকা করা হয়েছে অনেকাংশই তবে সরু ও চিকন।তিন বিঘা করিডোর মূলত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত একটি ছোট ভূখণ্ড যার মালিক ভারত। কথা বলে জানা যায় , ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশেকে এটি ইজারা দেওয়া হয়েছে ৯০ বছরের জন্য। এটি লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার সাথে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের সংযোগ স্থাপন করে। তিনবিঘা আয়তনের জায়গা বলেই এর নাম তিনবিঘা করিডোর।  এই করিডোরটি ১৭৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৮৫ মিটার প্রশস্ত।তিনবিঘা করিডোর  ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলা এবং বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্তে  অবস্থিত ভারতের অংশ। এটি দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের বাসিন্দাদের বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগের একমাত্র পথ।  আগে এই তিনবিঘা করিডোর নির্দিষ্ট সময় খোলা থাকতো এবং বন্ধ করে দেওয়া হতো। এখন ২৪ ঘন্টা উন্মুক্ত থাকে।তিনবিঘা করিডোরের ভিতরে বাংলাদেশের দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতার আয়তন হচ্ছে - ১৮.৬৮ বর্গকিলোমিটার। পুরোটা জায়গা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম।  অসম্ভব ভালো লেগেছে তিনবিঘা করিডোরের জীবন ও প্রকৃতি।  দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতা ছিটমহলের এক বোন আমাদের সবাইকে তার ভুট্টা ক্ষেত থেকে চারটি করে কাঁচা ভুট্টা উপহার দেন। উপহারটি ছিল বেশি ভালো লাগার মতো বিষয়।তিনবিঘা করিডোর, দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতা ছিটমহল পরিদর্শন শেষে আমরা চলে যাই বুড়িমারী স্থলবন্দর জিরো পয়েন্ট। সময়টা ছিল ঠিক সন্ধ্যা মুহুর্ত। আমাদের বহনকারী সিএনজি থেকে নেমে এক নজর দেখে নিলাম স্থলবন্দরটিকে। আমরা ফিরে গেলাম বুড়িমারী স্থলবন্দর বাস কাউন্টারে। এস আর পরিবহন থেকে টিকেট সংগ্রহ করি বাড়ি ফেরার। সন্ধ্যা সারে সাতটায় বাসে চড়ে বসি গাজীপুরের উদ্দেশ্যে। ১৮ জুলাই ভোর পাঁচটায় আমরা গাজীপুর ফিরে আসি। চমৎকার কেটেছে ভ্রমণের সময়টুকু।লালমনিরহাট জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক স্থান হচ্ছে তিনবিঘা করিডোর। এই তিনবিঘা করিডোর বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে অবস্থিত একটি স্বতন্ত্র ভূমি যা ভারতের মালিকানাধীন হলেও বাংলাদেশ ইজারার মাধ্যমে যাতায়াতের সুবিধার জন্য ব্যবহার করে আসছে। উত্তরবঙ্গে ভ্রমণকারী পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে তিনবিঘা করিডোর।[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

সালমা আকতার: মানবিক শিক্ষক ও আত্মপ্রত্যয়ী প্রশাসক

বাংলাদেশের একাডেমিক জগতে পদলেহন, সুবিধাবাদ ও স্বার্থের কাছে বিবেক বিকিয়ে দেওয়ার প্রবণতা যখন ক্রমশ এক ধরনের ‘নিয়মে’ পরিণত হয়েছে, তখনও কিছু মানুষ নীরবে প্রমাণ করে গেছেন যে শিক্ষকতা কেবল পেশা নয়, এটি এক গভীর নৈতিক অঙ্গীকার। এই আর্থসামজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তায়ণের সময়েও যাদের জনসম্মুখে মানবিকতা, পেশাগত সততা ও আদর্শের ধারক-বাহক হিসেবে নির্দ্বিধায় উপস্থাপন করা যায়, তাদের সংখ্যা খুবই সীমিত। আমার বিবেচনায়, শিক্ষা-বিজ্ঞানকে বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিন হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে দীর্ঘ ও জটিল পথচলা, সেখানে নেতৃত্বদানকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অল্পসংখ্যক প্রাজ্ঞ শিক্ষকের জীবনগাথা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা জরুরি অধ্যাপক সালমা আকতার (১৯৪৬–২০২৬) তাদের অন্যতম।গত ১৫ই এপ্রিল ২০২৬, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিয়ুন)। তার প্রস্থান কেবল একজন শিক্ষকের তিরোধানের শোক নয়; এটি আমাদের একাডেমিক ও বৌদ্ধিক পরিসরের জন্যও এক গভীর ক্ষতি। মানুষ চলে যান, কিন্তু তাদের আদর্শ, কর্ম ও স্মৃতি থেকে যায়। এ যেন অ্যারিস্টটলীয় ‘গুণভিত্তিক নৈতিকতা’ (ভার্চু ইথিক্স)-এরই এক বাস্তব প্রতিফলন, যেখানে ব্যক্তির চরিত্র ও কর্মই হয়ে ওঠে তার স্থায়ী উত্তরাধিকার। তার অনন্তে যাত্রার এই বেদনাবিধুর সংবাদ শোনার মুহূর্তে স্মৃতির পর্দায় ভেসে ওঠে তার সঙ্গে কাটানো নানা সময়, কথোপকথন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার শিক্ষাদান ও নেতৃত্বের অসংখ্য দৃষ্টান্তের কথা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার জীবন ও কর্মের তাৎপর্য তুলে ধরার ক্ষুদ্র প্রয়াস আমার এই লেখাটি।নানা কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর সঙ্গে আমার রয়েছে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও একাডেমিক সংযোগ। এই প্রতিষ্ঠানের বারান্দা, শ্রেণীকক্ষ, শিক্ষকদের কক্ষ, লাইব্রেরি কিংবা ক্যান্টিন সব মিলিয়ে যে পরিমাণ সময় আমি সেখানে কাটিয়েছি, তা কেবল আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল এক ধরনের বৌদ্ধিক ও মানবিক বিকাশের ক্ষেত্র, সম্পর্কগুলোকে নানা প্রেক্ষাপটে দেখার দুর্লভ অভিজ্ঞতা। এই পরিচিত পরিসরের ভেতরেই আমি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি অধ্যাপক সালমা আকতারকে একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে, যাকে আমি ‘আপা’ বলেই সম্বোধন করতাম। তিনি ছিলেন এক বিরল সমন্বয়ের প্রতিমূর্তি: একদিকে গভীর মমতাময়ী শিক্ষক, অন্যদিকে দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী ও নীতিনিষ্ঠ প্রশাসক। তার ব্যক্তিত্বে এই দুই সত্তার যে সুষম সংমিশ্রণ, তা আমাদের একাডেমিক সংস্কৃতিতে সত্যিই বিরল এবং অনুসরণীয়।তিনি আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক ছিলেন না; তার কাছে সরাসরি পাঠ নেওয়ার সুযোগও আমার হয়নি। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যে কেবল শ্রেণীকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না এই সত্যটি আমি তার ব্যক্তি-চরিত্রের মাধ্যমেই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর সঙ্গে যৌথভাবে একটি প্রকল্প তৈরির কাজ করতে গিয়ে তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় গড়ে ওঠে। সে সময় তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের সূত্রে তার নেতৃত্বের ধরন, ইনস্টিটিউটের উন্নয়নের সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সর্বোপরি তার মানবিক সংবেদনশীলতা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। নেতৃত্ব বিষয়ক আধুনিক তত্ত্বে ‘সেবাধর্মী নেতৃত্ব’ (সার্ভেন্ট লিডাশীপ)-এর যে ধারণা আলোচিত হয় যেখানে নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা প্রদর্শন নয়, বরং অন্যের বিকাশে নিজেকে নিয়োজিত করা, তার কাজের ভেতর আমি শিক্ষাপ্রশাসনে সেই দর্শনের চর্চার এক জীবন্ত প্রতিফলন দেখেছি। তার স্নেহধন্য হয়ে যে দোয়া, সাহস ও প্রেরণা পেয়েছিলাম, সেই কৃতজ্ঞতার বোধ থেকেই আজকের এই লেখার অবতারণা।সালমা আপার কথা মনে পড়লেই প্রথমেই ভেসে ওঠে এক স্নিগ্ধ, মমতাময়ী হাসিমাখা মুখ। তার চোখেমুখে, চলনে-বলনে এবং সামগ্রিক ব্যক্তিত্বে ছিল এক বিরল সুষমা। একদিকে ছিল মায়ের নিঃস্বার্থ মমতা, বড় বোনের স্নেহমিশ্রিত সংযমী শাসন এবং অপরদিকে ছিল একজন দক্ষ প্রশাসকের দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের অপূর্ব সমন্বয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘আবেগিক বুদ্ধিমত্তা’ (ইমোশানাল ইন্টালিজেন্স) অর্থাৎ নিজের আবেগকে সংযত রেখে অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা; তিনি তা স্বাভাবিক সহজাত গুণ হিসেবেই ধারণ করতেন। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিঃশব্দে, আড়াল থেকে অন্যের পাশে দাঁড়াতে জানতেন; প্রচারের আলো নয়, সামষ্টিক কল্যাণই ছিল তার কাজের প্রকৃত প্রেরণা। আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনি যে আন্তরিক সহায়তা ও সাহচর্য দিয়েছেন, তা আজও গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। তার এই মানবিক উপস্থিতিই তাকে কেবল একজন শিক্ষক বা প্রশাসক নয়, বরং নবীনদের জন্য এক পরম আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের ইংরেজি শিক্ষাদানের দক্ষতা উন্নয়নে যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের আওতায় গবেষণা সহযোগী নিয়োগ, তাদের পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ এবং একটি বিশেষায়িত এমফিল প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশ ওপেন ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর সঙ্গে যৌথভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রাথমিক প্রেক্ষাপট তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ স্থাপনের দায়িত্বে ছিলাম আমি। কিন্তু অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক জটিলতা, নীতিগত দ্বিধা এবং নানা অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতার কারণে উদ্যোগটি একপর্যায়ে প্রায় ভেস্তে যেতে বসে। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে অধ্যাপক সালমা আকতারের বিচক্ষণতা, প্রাতিষ্ঠানিক বোধ এবং দৃঢ় নেতৃত্ব পরিস্থিতিকে নতুন দিশা দেয়। সংগঠন-ব্যবস্থাপনা তত্ত্বে যাকে ‘সংকটকালীন নেতৃত্ব’ (ক্রাইসিস লিডারশীপ) বলা হয়, অর্থাৎ সংকটের মধ্যে স্থির থেকে সমাধানের পথ তৈরি করা, তিনি তা নিঃশব্দ দক্ষতায় বাস্তবায়ন করেছিলেন।একইভাবে, ২০১০ সালের শেষের দিকে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড কম্পারেটিভ এডুকেশন (বিএআইসিই)-এর অর্থায়নে একদিনের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করতে গিয়ে যখন আরেক ধরনের জটিলতায় পড়ি, তখনও তিনি আড়াল থেকেই উদ্ধার কর্তার ভূমিকায় অবর্তীণ হয়ে সমাধানের পথ তৈরি করে দেন। তার এই নীরব সহায়তা ছিল না কেবল ব্যক্তিগত সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ; বরং তা ছিল একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন-দর্শনের অংশ, যেখানে ব্যক্তি নয়- কাজ, প্রতিষ্ঠান এবং জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতাই হয়ে ওঠে মুখ্য। তার এই ধরণের দায়িত্বপূর্ণ ‘অদৃশ্য নেতৃত্ব’ (ইনভিজিবল লিডারশীপ) আমাদের একাডেমিক পরিসরে বিরল, অথচ শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনের হাওয়া বইয়ে দিতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তিনি আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন, আমি যেন দেশে ফিরে গিয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করি। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি আমাকে ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো আইইআর-এ শিক্ষক হওয়ার জন্য আবেদন করতে উৎসাহিত করেছিলেন।লভিংয়ের কালচারকে উপেক্ষা করে সালমা আপার সঙ্গে আমার সরাসরি দেখা হয় উপ-উপাচার্য হারুন-অর-রশিদের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সেই সাক্ষাৎকার বোর্ডে। কিন্তু সেই দিনটি আমার জীবনে এক তিক্ত অভিজ্ঞতার উদাহরণ হয়ে আছে। একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে সেখানে উপস্থিত হয়ে আমি সেদিন প্রত্যক্ষ করি এক ভিন্নতর বাস্তবতা তথা একাডেমিক জগতের এমন এক কদর্য রূপ, যেখানে মেধা ও যোগ্যতার বিপরীতে শিক্ষার রাজনীতিকরণে শিক্ষক-রাজনীতির বহুবর্ণিল তথা নীল, সাদা ও গোলাপীর আলোকছটায় পক্ষপাতিত্ব, অদৃশ্য প্রভাব এবং সংঘবদ্ধ অপকৌশল কিভাবে নিলর্জ্জ্ব ও সক্রিয় ভূমিকা রাখে। সেই প্রেক্ষাপটে আমি দেখেছি, একজন দৃঢ়চেতা, নীতিনিষ্ঠ ও ব্যক্তিত্ববান শিক্ষক হিসেবে সালমা আপা কীভাবে সেই প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকেও এক ধরনের অসহায়তার প্রকাশ ঘটাতে বাধ্য হন। এটি কেবল তার ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা ছিল না; বরং আমাদের বৃহত্তর একাডেমিক কাঠামোর অন্তর্নিহিত দুর্বলতার প্রতিফলন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ অভিজ্ঞতা একক কোনো ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জীবনের নানা পর্যায়ে আমি আরও অনেক শিক্ষকের মধ্যে একই ধরনের বেদনাদায়ক অসহায়তা প্রত্যক্ষ করেছি। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমার চিন্তা ও চেতনায় গভীর রেখাপাত করেছে।সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে বলতে গেলে, আমাদের একাডেমিক কালচারের কদর্য উদাহরণগুলো একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়’ (ইনস্টিটিউশানাল ডিকে)-এর লক্ষণ, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তবে একই সঙ্গে শিখনের প্রক্রিয়ায় এসব অভিজ্ঞতা আমাকে নিরাশ করেনি; বরং পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও সচেতন করেছে। ‘দিন বদলের কলাকৌশল’ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা এবং তা বাস্তবে প্রয়োগের প্রতি এক ধরনের নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে। আর এর পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সালমা আপার মতো শিক্ষকদের প্রভাবই সবচেয়ে গভীর। সে যাই হোক, আমার জানামতে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি পরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালীন সর্বদা যোগ্যতা, সততা ও পেশাগত মানদণ্ডকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, অদৃশ্য চাপ এবং নানা বাস্তব প্রতিবন্ধকতা তার সেই প্রয়াসকে সবসময় সফল হতে দেয়নি। তবুও তিনি কখনো নৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেননি, কিংবা হতাশ হয়ে থেমে থাকেননি। বরং এক ধরনের অন্তর্গত দায়বোধ থেকেই তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। ম্যাক্স ওয়েবারের ভাষায় ‘দায়িত্বের নৈতিকতা’ (ইথিক্স অব রিসপন্সিবিলিটি) অর্থাৎ দায়িত্ব পালনের নৈতিক দায় তার পেশাগত জীবনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল।তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭১ সালে অর্থনীতি ও শিক্ষাপ্রশাসনে মাস্টার্স, ১৯৮০সালে যুক্তরাজ্যের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন (বর্তমানে ইউনির্ভাসিটি কলেজ লন্ডনের অংশ) থেকে শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থাপনায় মাস্টার্স এবং ১৯৯৯ সালে ভারতের জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষানীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। সুদীর্ঘ ৪১ বছরের কর্মময় জীবনে (১৯৭৩-২০১৪) তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও শিক্ষাপ্রশাসন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের পদ ছাড়াও নানা গুরুত্বপূর্ণ কমিটির চেয়ার ও সদস্য ছিলেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন কর্মচঞ্চল, প্রাণবন্ত এবং গভীরভাবে দায়বদ্ধ এক মানুষ, যার হৃদয়ে দেশ, মানুষ এবং বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা ছিল। আমার গবেষণা, লেখালেখি কিংবা পেশাগত অগ্রগতির খবর পেলেই তিনি আন্তরিক আনন্দ প্রকাশ করতেন খুদে বার্তায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ইমেইলের মাধ্যমে উৎসাহ জোগাতেন। এই ছোট ছোট প্রেরণাগুলোই একজন তরুণ গবেষক বা শিক্ষকের পথচলায় কত বড় শক্তি জোগাতে পারে তা তিনি গভীরভাবে বুঝতেন। যদিও জীবনের ব্যস্ততা ও ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে গত কয়েক বছরে আমাদের যোগাযোগ কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তবুও তার সেই আন্তরিকতা, স্নেহ এবং নীরব আশীর্বাদ আজও আমার স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে।অবসর গ্রহণের পরও তিনি থেমে থাকেননি বরং তার বৌদ্ধিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বপ্ন আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, বাংলাদেশে শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিক্ষানীতি নিয়ে উচ্চতর গবেষণা ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি পত্রপত্রিকায় লিখেছেন, জনমত গঠনের চেষ্টা করেছেন এবং নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস চালিয়েছেন। তার সেই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পেলেও, এর ভেতরে নিহিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং দূরদর্শিতা আমাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। শিক্ষাতত্ত্ব ও শিক্ষার অর্থনীতির আলোকে বলা যায়, তিনি দেশে একটি ‘জ্ঞানীয় সমাজ’ (নলেজ সোসাইটি) তথা ‘জ্ঞানীয় অর্থনীতি’ (নলেজ ইকোনোমি)-র আবহ তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি। ভবিষ্যতে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, গবেষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য তার এই চিন্তাধারা এক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে- এটাই প্রত্যাশা।শিক্ষা ও শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে তার চিন্তাভাবনা ছিল অভিজ্ঞতানির্ভর, গভীর এবং মানবিক সংবেদনশীলতায় সমৃদ্ধ। দৈনিকে প্রকাশিত ‘শিক্ষক কেন শিক্ষার্থীকে মারবেন?’ শিরোনামের এক লেখায় তিনি শিক্ষকদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ও নৈতিকভাবে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। তার দৃষ্টিতে, কোনো শিক্ষার্থীর আচরণগত সমস্যা থাকলেও তার সমাধান কখনোই সহিংসতার মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং প্রয়োজন সহানুভূতি, সংলাপ, বোঝাপড়া এবং পেশাগত দক্ষতার সুনিপুণ প্রয়োগ। আধুনিক শিক্ষামনোবিজ্ঞানে ‘ইতিবাচক শৃঙ্খলা’ (পজেটিভ ডিসিপ্লিন) এবং ‘শিশুকেন্দ্রিক শিখন-পদ্ধতি’ (চাইল্ড-সেন্টারড প্যাডাগোজি)-এর যে ধারণা গুরুত্ব পায়, তার ভাবনায় তারই সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন শিক্ষকের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীর মানবিক বিকাশ নিশ্চিত করা শুধু তথ্যগত জ্ঞান নয়, বরং নৈতিকতা, সহমর্মিতা, ধৈর্য ও সহনশীলতার মতো গুণাবলির বিকাশ ঘটানো।ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সম্ভবত (আমি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত নই একদিন এমন কিছু ইঙ্গিত করেছিলেন; স্মৃতি থেকে বলছি, ভুল তথ্যও হতে পারে) নিঃসন্তান ছিলেন; কিন্তু তার শিক্ষার্থীরাই যেন ছিল তার বিস্তৃত পরিবার। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে তিনি আপন সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন, তাদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে নিজেকে নিবেদিত রাখতেন। তার কাছে শিক্ষকতা ছিল কেবল একটি পেশাগত পরিচয় নয়, বরং দেশ ও সমাজের জন্য সৎ, দক্ষ ও মানবিক নাগরিক গড়ে তোলার এক গভীর নৈতিক অঙ্গীকার। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই দার্শনিক পাওলো ফ্রেইরের ‘স্বাধীনতার অনুশীলন বা চর্চা হিসেবে শিক্ষা’ (এডুকেশন এজ এ প্রেক্টিস অব ফ্রীডোম)-এর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ, যেখানে শিক্ষা মানুষকে মুক্ত ও সচেতন করে তোলার হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকদের যথাযথ প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ এবং ক্রমাগত পেশাগত উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।অধ্যাপক সালমা আকতারের জীবনের শেষ অধ্যায়ও ছিল একইভাবে কর্মমুখর ও চিন্তাশীল। অবসরের পরেও তিনি যে বৌদ্ধিক সক্রিয়তা বজায় রেখেছিলেন, তা প্রমাণ করে শিক্ষকতা তার কাছে পেশা নয়, বরং আজীবনের সাধনা। তার মৃত্যুতে আমরা হারালাম এক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, আত্মপ্রত্যয়ী শিক্ষাপ্রশাসক এবং মানবিক মূল্যবোধে উজ্জ্বল এক বিরল ব্যক্তিত্বকে। তবে বাংলাদেশে শিক্ষার উন্নয়নের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তার স্বপ্ন, তার আদর্শ এবং তার নৈতিক অবস্থান আমাদের জন্য এক স্থায়ী আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। তিনি নিজেই যে আহ্বান রেখে গেছেন প্রথম আলোয় প্রকাশিত উপরে উল্লেখিত তার সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবাদী লেখাটিতে, ‘আমরা যেন ভালো শিক্ষক হই এবং তার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি’, সেই আহ্বানই হোক তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানোর সর্বোত্তম উপায়। তার স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে তখনই, যখন আমরা ব্যক্তিগত ও প্রতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়েই শিক্ষাকে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্যই মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রায়োগিক করার প্রয়াসে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারব।[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

রাজনীতি নয়, অর্থনীতিই গুরুত্বপূর্ণ

সম্প্রতি ওয়াশিংটনে আয়োজিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর বসন্তকালীন বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদল যোগ দিয়েছিল, মনে হচ্ছে, চুক্তিবদ্ধ ঋণের অবশিষ্ট ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার আইএমএফ দেবে না। ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের এই ঋণ চুক্তি হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৮০০ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি করা হয়। মোট ঋণ ৫.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে আওয়ামী লীগ সরকার নিয়েছে ২.৩ বিলিয়ন, অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েছে ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফ ঋণের কিস্তি ছাড় না করায় বাধ্য হয়ে বিএনপি সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে; মাত্র দেড় মাসেই বিএনপি সরকার ব্যাংক থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ২০২৬ সনের দেড় মাস ইউনূস সরকারের, বাকি দেড় মাস বিএনপি সরকারের- এই তিন মাসে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এত অল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার কারণ হচ্ছে সরকারের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি। চলতি অর্থবছরের জুলাই ফেব্রুয়ারি সময়ে শুল্ক ও কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা; ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমদানি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুটোই কম হয়েছে, তাই রাজস্ব আদায়ে বিরাট ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের রাজত্বে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূস ভাষণ দিয়ে দেশবাসীকে গুরুত্ব সহকারে অবহিত করেছিলেন। ব্যাপকহারে দেশি-বিদেশি ঋণ গ্রহণের কারণেও আওয়ামী লীগ সরকার তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিল, তখন অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা ছিল বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে ঋণের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী ও বিএনপি সরকারের আমলে ঋণ গ্রহণের আনুপাতিক মাত্রা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের চেয়েও বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ৩ লাখ ২৮ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে। অথচ বিগত ১৫ বছরের মধ্যে কোন একক অর্থবছরেই সরকারের গৃহীত ঋণ আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি ছিল না। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, অন্তর্বর্তী সরকার এত বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে খরচ করল কোথায়? বোঝা যাচ্ছে, দেশ চালানো হয়েছে ঋণের টাকা দিয়ে, অথচ দেশের এমন করুণদশার মধ্যেও মোহাম্মদ ইউনূস বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন। সম্ভবত জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য পরিশোধে জন্য বিএনপি সরকার ঋণ নিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা সমাধানে সরকারের দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বর্তমানে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২-১০৪ ডলার; কিন্তু ২০২২ সনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তেলের মূল্য ছিল ব্যারেল প্রতি ১৩৯ ডলার, তখন কিন্তু তেল নিয়ে এত বিশৃঙ্খলা ˆতরি হয়নি।অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সাফল্য ছিল বর্ধিত রেমিট্যান্স। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ বন্ধ করতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। এছাড়াও ২০১৮ সনের নির্বাচনে কারচুপির ব্যাপকতায় প্রবাসীরাও আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর তুষ্ট ছিল না, তাই অধিকাংশ প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে অর্থ প্রেরণে ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুণ্ডির অবৈধ পথ বেছে নেয়। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ না আসায় রিজার্ভ কমতে থাকে। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ব্যাংকিং চ্যানেলে পুনরায় অর্থ প্রেরণ শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে অধিক পরিমাণে অর্থ প্রেরণের আরেকটি কারণ ডলারের সঙ্গে টাকার অধিকতর অবমূল্যায়ন। উপরন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমদানি হ্রাস পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার খরচও কমে যায়, রিজার্ভে হাত দিতে হয়নি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সন্তোষজনক থাকা সত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের মব কালচারের কারণে দেশ ছিল অস্থিতিশীল এবং অর্থনীতি ছিল চরম অবহেলিত। মবকে সরকার তাদের প্রেসার গ্রুপ হিসেবে বিবেচনা করায় ছাত্রদের পাশাপাশি পেশাজীবীরাও তাদের দাবি নিয়ে মিছিল-মিটিং করতে উৎসাহী হয়ে উঠেছিল।রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকায় দেশে বিনিয়োগ হয়নি, বিনিয়োগ না হওয়ায় অর্থনীতির সম্প্রসারণ হয়নি। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে যায়; অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় হাজার হাজার লোক কর্মহীন ও বেকার হয়ে যায়। ইউনূস অর্থনীতির ছাত্র, তারপরও তিনি দেশের অর্থনীতির চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন বেশি।আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ধরার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসেই দেশের নামকরা অর্থনীতিবিদদের নিয়ে কমিশন গঠন করলো, তারা ৪০০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র প্রকাশ করে জানান দিল যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। দুর্নীতি আর অর্থ পাচার ওতপ্রোতভাবে জড়িত, দুর্নীতি হলে অর্থ পাচার হবেই। কিন্তু ওই সকল জাঁদরেল অর্থনীতিবিদেরা ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের হিসাব পেলেন কোথায় ? ঘুষ, দুর্নীতির লেনদেন হয় গোপনে, সেই অর্থ পাচার হয় কৌশলে, সরকারের অজান্তে। এখনো অর্থ পাচার হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে, এর রোধ করা যেমন কঠিন, হিসাব করাও কঠিন। ওভার ইনভয়েস-আন্ডার ইনভয়েস করে ব্যবসায়ীরা অর্থ পাচার করছে, দুর্নীতিবাজ আর ঘুষখোরের টাকা তাদের বিদেশ-একাউন্টে ঘুষদাতাই জমা করে দিচ্ছে। এছাড়াও চিকিৎসার নিমিত্তে অর্থ পাচার হয়, বিদেশে ছাত্র-ছাত্রীর পড়ার খরচের জন্য অর্থ পাচার হয়, বিদেশ ভ্রমণে অর্থ পাচার হয়। অন্য দেশে নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিরাও তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি বিক্রি করে অবৈধ পন্থায় বিদেশে অর্থ নিয়ে যাচ্ছে। পাচার করা অর্থ প্রেরত আনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুধু প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়নি, এর জন্য প্রচুর অর্থও ব্যয় করা হয়েছে। প্রথমদিকে অধ্যাপক ইউনূসের গুছিয়ে কথা বলার চাণক্য কৌশল জনগণকে বিমোহিত করেছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে জনগণ বুঝতে পারলো সব অর্থহীন বাগাড়ম্বর।ইউনূস সরকার মব সৃষ্টি ব্যতীত আর কিছুই করেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মোহাম্মদ ইউনূস ও তার পরিচালনাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা হয়েছিল। সারা পৃথিবীর শতাধিক নামকরা ব্যক্তির তরফ থেকে মোহাম্মদ ইউনূসকে মামলার হয়রানি থেকে মুক্তি দিতে অনুরোধ করা হলেও আওয়ামী লীগ সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। তাই সম্ভবত ইউনূসের প্রতিহিংসা এত তীব্র ছিল যে, প্রধান উপদেষ্টা হয়েও তিনি গ্রামে গ্রামে লুকিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের লোকদের ধরার জন্য মবকে উষ্কে দিয়েছিলেন। তার চেয়ে বরং আওয়ামী লীগ আমলের কথিত ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজদের ধরা হলে জনগণ খুশি হতো, জনগণ খুশি হতো যদি পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা হতো। তারা কাজের কাজ কিছুই করেনি, বরং অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কর্মকাণ্ড দ্বারা আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মকাণ্ডের সাফাই গেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রকল্পে অধিক হারে খরচের অভিযোগ ওঠেছিল; বিভিন্ন দেশে একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে কত টাকা খরচ হয় তার সঙ্গে তুলনা করে অধিক খরচের চিত্রও আঁকা হয়েছিল; কিন্তু জনগণ হতাশ, কারণ আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন প্রকল্পে তাদের আমলে সম্পন্ন কাজে যে পরিমাণ খরচ করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকার বাকি অংশ শেষ করতে আনুপাতিক হিসেবে খরচ আরও বেশি করেছে, কোন কোন প্রকল্পে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বৃদ্ধির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকারের ৬৫টি উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ বাড়িয়েছে ৭ লক্ষ ৯৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের কথিত দুর্নীতি অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড দ্বারা চাপা দেওয়া হয়েছে। একই কাজে বেশি খরচ করার জন্য এখন অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ˆতরি হয়েছে।রামু-কক্সবাজার রেল সংযোগ এবং কক্সবাজারের রাস্তায় নির্মিত কর্ণফুলী টানেলের প্রায়োরিটি নেই মর্মে আওয়ামী লীগ আমলেও প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু বাকি সবগুলো মেঘা প্রকল্প অপরিহার্য হিসেবে এখন বিবেচিত হচ্ছে। জ্বালানি তেল আনার জন্য ভারত থেকে যে পাইপলাইন আওয়ামী লীগ আমলে বসানো হয়েছিল তার অপরিহার্যতা বিএনপি সরকার প্রমাণ করেছে।জ্বালানি তেলের সরবরাহ বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্ব এখন বিপ্লবী আনু মুহাম্মদও সম্ভবত অবনত চিত্তে স্বীকার করবেন। অন্তর্বর্তী সরকার অকর্মক ও বিদ্বেষী না হলে আওয়ামী লীগ আমলে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশখালীতে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং প্রকল্পটি বিএনপির জন্য এই মুহুর্তে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিত। গভীর সমুদ্রে ভাসমান জাহাজ থেকে পাইপের সহায়তায় তেল খালাস করে কয়েক মাসের মজুত গড়ে তোলার এই প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০২৪ সনে, কিন্তু ইউনূস সরকার তা চালু করেনি। চীনের যে কোম্পানির মাধ্যমে এই প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়েছে, তাদের মাধ্যমে চুক্তি মোতাবেক চালু করা হলে তা ২০২৪ সনেই চালু করা সম্ভব ছিল, যথা সময়ে চালু হলে বিএনপির আমলে তেলের ক্রাইসিস এত তীব্র হতো না। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় পাইপলাইনে তেল আনার ব্যবস্থাও আওয়ামী লীগ সরকার করে গেছে, যা উদ্বোধন হয় ২০২৫ সনে। একইভাবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালটি কেন চালু হচ্ছে না তাও অজ্ঞাত।ঘুষ-দুর্নীতি একটুও কমেনি। তারপরও পেছনে তাকানোর সময় নেই, বিএনপি সরকারকে রাজনৈতিক বিবেচনা পরিহার করে দলমত নির্বিশেষে সবার শিল্পকারখানা চালু করার ব্যবস্থা নিতে হবে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে, কর ফাঁকি বন্ধ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে, করজালের বাইরে থাকা করযোগ্য মানুষকে করের আওতায় আনতে হবে। এছাড়াও রাজস্ব প্রশাসনে বিরাজমান ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে তাদের দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও মনোযোগী হতে হবে বিএনপি সরকারকে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

সংকটে হাওরাঞ্চলের কৃষি

হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জীবন-জীবিকার সবচেয়ে বড় মাধ্যম ধান চাষ। ফসল রক্ষা করতে না পারা মানে হাওরের কৃষকদের জীবন-জীবিকার চরম অনিশ্চয়তা। বৃষ্টির পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ার বিষয়টি হাওরে এবার বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যার কিছুটা প্রাকৃতিক, আর বাকি অংশ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সামঞ্জস্যের অভাবজনিত। হাওরের পরিকল্পনাগত সমস্যাগুলো চাইলে সমাধান করা যায়। হাওরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এমন যে এখানে সবসময় পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে হয়। কৃষি অর্থনীতির সম্ভাবনা বিবেচনায় হাওর শাসন ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় সংবেদনশীলতা জরুরি।প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে হাওরের কৃষকদের বরাবরই নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে বৃষ্টির মৌসুমে সংকট তীব্র হয়, কারণ অতিরিক্ত জলাবদ্ধতায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবারও বৃষ্টির পানিতে সুনামগঞ্জের অনেক হাওরের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতীতে বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকে বহুবার ফসল নষ্ট হয়েছে। তবে এবার সমস্যাটি কিছুটা ভিন্ন।সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার ৪২টি হাওরের প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়। এই ফসল রক্ষায় প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ভাটির অঞ্চলে একটি কথা প্রচলিত আছে—বাঁধের জন্য যে পরিমাণ টাকা বরাদ্দ হয়, তা ধাতব মুদ্রায় রূপান্তর করে বাঁধ দিলে তা ডুববে না। তবুও অধিকাংশ বছরই বাঁধ তলিয়ে যায়। কোনো কোনো বছর ভাগ্য সহায় হলে রক্ষা পায়। হাওর পাড়ের অনেক বাঁধই স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা সম্ভব। বাঁধের ওপর স্থায়ী বসতি ও পর্যটনকেন্দ্রও গড়ে তোলা যেতে পারে।নেত্রকোণার উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এ বৃষ্টির পানি পাহাড়ি ঢল হয়ে জেলার নদ-নদীতে নামছে। ফলে অকাল বন্যার আশঙ্কায় বাম্পার ফলনেও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন চাষিরা। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান কাটার পরামর্শ দিয়েছে। হাওরের জমিতে ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে তা জমিতে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। আগে থেকেই বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা রয়েছে, তার ওপর উজানের ঢল নামলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।এদিকে নেত্রকোণার অনেক হাওড়ে পানি থাকায় ক¤^াইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটতে সমস্যা হচ্ছে। শ্রমিক সংকটও রয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, পানি বাড়তে থাকলে ২০১৭ সালের মতো অকাল বন্যায় ফসল হারাতে হতে পারে।স্থানীয় কৃষক, উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলার খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দা আংশিক হাওরাঞ্চল। এখানে একমাত্র বোরো ফসলের ওপরই নির্ভর করে কৃষকদের সারা বছরের সংসার ব্যয়, চিকিৎসা, শিক্ষা ও সামাজিক অনুষ্ঠান। জেলায় ১৩৪টি হাওরের মধ্যে খালিয়াজুরিতে রয়েছে ৮৯টি। আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় এ বছর ১৩৮ কিলোমিটার অস্থায়ী (ডুবন্ত) বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩১ কোটি টাকা, যা প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির ফসল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটা ও শুকানোর ব্যস্ততা চলছে। আগাম বন্যা ও শিলাবৃষ্টির আশঙ্কায় পহেলা বৈশাখ থেকেই কৃষকরা ধান ঘরে তোলা শুরু করেছেন। ব্রি-২৮, ব্রি-৮৮ ও ব্রি-৯৮ জাতের ধান কাটা হচ্ছে। কিষান-কিষানিরা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।তবে এ সময়ে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা কম দামে ধান কিনতে ভিড় করছেন। ফলে অনেক কৃষক উৎপাদনমূল্যের নিচে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান কেনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।কিশোরগঞ্জ জেলায় এ বছর ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৯৫ হাজার ২০৯ টন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন পর্যন্ত হাওরাঞ্চলের প্রায় ১২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।বর্তমান পরিস্থিতিতে হাওরের কৃষকদের শুধু প্রকৃতিনির্ভর না থেকে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। যেমন—হাওর পাড়ের বাঁধ স্থায়ীভাবে নির্মাণ, নদী খননের মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি। পাশাপাশি সরকারকে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।আসন্ন বাজেটে হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন ও সংস্কৃতি রক্ষায় বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। পলি জমে জলাশয় ভরাট হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই প্লাবনের ঝুঁকি বাড়ছে—ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান করা প্রয়োজন। পানি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ সমন্বিতভাবে নেয়া দরকার, যাতে সহায়তা বণ্টনে কোনো অসংগতি না থাকে। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে বিকল্প কর্মসংস্থান—যেমন নৌযানভিত্তিক পরিবহন, কুটির শিল্প, হাঁস পালন ইত্যাদি—গড়ে তোলা প্রয়োজন।সমন্বিত পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমেই হাওরাঞ্চলের এই দীর্ঘদিনের সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।[লেখক: সাবেক ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ চাই

বর্তমানে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বা রোডক্র্যাশ নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নির্বিবাদে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। তারপরও নেই সঠিক ব্যবস্থাপনা বা জনসচেতনতা। বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থা আজও আন্তর্জাতিক মানের হয়ে না ওঠার কারণে দুর্ঘটনার মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই রোডক্র্যাশ বিষয়ক তথ্য শুধু একটি ডেটা নয়, এর সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ জড়িত। তাই আন্তরিকতা ও মানবিকতার সঙ্গে এই সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ ও সংরক্ষণ করতে হবে। রোডক্র্যাশ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যের মানহীনতা ও উপযুক্ত সমস্বয়ের অভাব।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, প্রতি বছর বাংলাদেশে রোডক্র্যাশে ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে বিআরটিএর হিসাব মতে, প্রতিবছর দেশে গড়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষ মারা যায় ও ১০ হাজারের বেশি বিভিন্ন মাত্রায় আহত এবং পঙ্গুত্ব বরণ করে। বিআরটিএর তথ্যানুসারে, রোডক্র্যাশে ২০২৫ সালে দেশে ৫ হাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে দেশের সড়কে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে গত বছর।বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা রোডক্র্যাশকে প্রতিরোধযোগ্য একটি অসংক্রামক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংবিধানের ১৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুসারে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এছাড়াও অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৩.৬ অর্জনে ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে রোডক্র্যাশে প্রাণহানির সংখ্যা ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনার তাগিদ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক পর্যায়েও ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘভুক্ত সদস্য দেশগুলো বিশ্বব্যাপী রোডক্র্যাশে নিহত ও আহতের সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগ কমিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য গ্লোবাল প্ল্যান ফর সেকেন্ড ডিকেড অব অ্যাকশন ফর রোড সেফটি ২০২১-২০৩০ এর আওতায় ৫টি স্তম্ভের কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হলো- বহুমুখী যানবাহন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার, রোডক্র্যাশ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এছাড়াও সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য ৫টি আচরণগত ঝুঁকি যেমন, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ না করা, সিট বেল্ট ব্যবহার না করা, মানসম্মত হেলমেট পরিধান না করা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং শিশুবান্ধব বিশেষায়িত আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ২০১০ থেকে ২০২১ সালে বেলারুশ, ব্রুনাই দারুসসালাম, ডেনমার্ক, জাপান, লিথুয়ানিয়া, নরওয়ে, রাশিয়ান ফেডারেশন, ত্রিনিদাদ, টোবাগো, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভেনিজুয়েলা রোডক্র্যাশে মৃত্যু হার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।দেশে রোডক্র্যাশরোধে চালকদের সচেতনতা, কঠোর আইন প্রয়োগ, যান্ত্রিক ত্রুটিমুক্ত যানবাহন এবং সড়ক পরিকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি। প্রধান কার্যকর পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে গতিরোধক মানা, মাদক বা ক্লান্তি অবস্থায় গাড়ি না চালানো, হেলমেট, সিটবেল্ট ব্যবহার এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলা। রোডক্র্যাশ রোধে কার্যকরী পদক্ষেপসমূহ:১. চালক ও যাত্রী সচেতনতা:গতি নিয়ন্ত্রণ: নির্ধারিত গতির মধ্যে গাড়ি চালানো, কারণ দ্রুতগতি দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন: মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বা নেশাগ্রস্থ অবস্থায় (মদ্যপ/ড্রাগ) গাড়ি চালানো বন্ধ করা।ক্লান্তি দূর করা: দীর্ঘসময় বিরতিহীন গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকা, প্রতি ২ ঘণ্টা পর বিশ্রাম নেওয়া।নিরাপত্তা সরঞ্জাম: হেলমেট ও সিটবেল্টের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।২. যানবাহন ও সড়ক ব্যবস্থাপনা:যান্ত্রিক পরীক্ষা: নিয়মিত গাড়ির ব্রেক, লাইট এবং টায়ার চেক করা।ট্রাফিক আইন প্রয়োগ: ট্রাফিক সিগন্যাল ও নিয়ম মেনে চলা এবং ওভারটেকিং প্রবণতা কমানো।সড়ক নিরাপত্তা: ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা সংস্কার এবং ট্রাফিক চিহ্নের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।৩. প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ:কঠোর আইনি পদক্ষেপ: আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া।লাইসেন্স যাচাই: দক্ষ চালকদের হাতে লাইসেন্স প্রদান নিশ্চিত করা।এছাড়াও সমস্বয়ের মাধ্যমে রোডক্র্যাশ প্রতিরোধ আন্দোলনকে আরও জোরদার করে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব। সড়ককে জনগণের জন্য নিরাপদ করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি-২০২৩’ অনুযায়ী রোডক্র্যাশে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ১০ লাখের অধিক মানুষ মারা যায়। যা প্রতি মিনিটে ২ জন ও প্রতিদিন ৩ হাজার ২০০ জনের বেশি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় যে, রোডক্র্যাশে ৫-২৯ বছর বয়সী শিশু এবং যুবকদের মৃত্যুর প্রধান কারণ এবং সকল বয়সী মানুষের মৃত্যুর ১২তম কারণ। রোডক্র্যাশে সারা বিশ্বের যত মানুষের মৃত্যু হয় তার প্রায় সবই (৯২ শতাংশ) হয় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। বাংলাদেশে মানুষের মৃত্যু এবং ইনজুরির অন্যতম প্রধান কারণ রোডক্র্যাশ।ওয়ার্ল্ড হেলথ র‌্যাংকিং অনুসারে, সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও তার সঠিক প্রয়োগ ব্যতীত দেশে রোডক্র্যাশ কমানো বা রোধ করা সম্ভব নয়। সঠিক আইন ও তার প্রয়োগের ফলে রোডক্র্যাশ, যা বর্তমানে একটি বড় সমস্যা, তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা যেতে পারে। তাই সবার জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’।বাংলাদেশে বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন- ২০১৮ ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২ মূলত পরিবহন সংক্রান্ত আইন। তাই উল্লিখিত  বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে উদ্যোগসমূহ যথাযথভাবে বাস্তবায়নে এই আইন ও বিধিমালা যথেষ্ট নয়। এজন্যই প্রয়োজন জাতিসংঘ প্রস্তাবিত বর্ণিত ৫টি স্তম্ভ এবং আচরণগত ঝুঁকির কারণসমূহ বিবেচনায় নিয়ে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।রোডক্র্যাশ প্রতিরোধে আমাদের আরও সোচ্চার হতে হবে। সড়কে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে হলে প্রথমেই সড়কে প্রাণহানির প্রকৃত সংখ্যা উদঘাটন করে এর সমাধান করা প্রয়োজন। তাই সড়ককে নিরাপদ করতে আলাদা করে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা জরুরি। সড়ককে নিরাপদ করতে সবার একযোগে কাজ করতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকলের সচেতন হতে হবে।[লেখক: অ্যাডভোকেসি অফিসার (কমিউনিকেশন), স্বাস্থ্য সেক্টর, ঢাকা আহছানিয়া মিশন]

স্বপ্নের ঝাঁপি এবং রাজনীতির মানুষের সাপলুডু খেলা

সৈয়দ আবুল মকসুদ  ‘সহজিয়া কড়চা’ শিরোনামে  ˆদনিক ‘প্রথম আলোতে’  গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করতেন। বিশ্লেষণের স্বকীয়তার কারণে তিনি পাঠক প্রিয়তা পেয়েছিলেন। রাজনীতি ক্ষেত্রে সৌজন্য এবং শিষ্টাচারের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা উপস্থাপন করেন। উপমহাদেশের রাজনীতিতে সৌজন্য শিষ্টাচারের উদাহরণ খুব বেশি পাওয়া যায়না, এ কারণেই বোধ হয়  সৈয়দ আবুল মকসুদ বর্ণিত এই অসাধারণ ঘটানাটি অবচেতন মনে স্থায়ী হয়ে আছে। লেখাটির  পটভুমি তৈরির জন্য ‘সহজিয়া কড়চা’ থেকে এই ঘটনার উদ্ধৃতির লোভ সামলাতে পারছিনা। আশা করি পাঠক মনেও উদ্ধৃতিটি দাগ কাটবে এবং সৌজন্য শিষ্টাচারের রাজনিতি নিয়ে কিছুটা হলেও ভাবাবে।‘পাকিস্তানের রিপাবলিকান-আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী মালিক ফিরোজ খান নূন ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর আমন্ত্রণে ভারত সফরে গিয়েছিলেন। সেই সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী নূনের সঙ্গী হয়েছিলেন তার পত্নী ভিকারুননিসা নূন। পিআইএর বিশেষ বিমানে তারা নয়াদিল্লি যান। প্রধানমন্ত্রী নেহরু পাকিস্তানি অতিথিদের পালাম বিমানবন্দরের গ্যাংওয়েতে গিয়ে অভ্যর্থনা জানান। মালিক ও ভিকারুননিসা বিমানের সিঁড়ি দিয়ে পাশাপাশি নামছিলেন। সিঁড়ির কয়েক ধাপ থাকতেই কীভাবে বেগম ভিকারুননিসার এক পাটি জুতা নিচে পড়ে যায়। নিশ্ছিদ্র সিকিউরিটির বহু কর্মকর্তা বিমান ঘিরে ছিলেন। তাদের কেউ নন, সিঁড়ির নিচ থেকে বেগম নূনের জুতাটি স্বয়ং জওহরলাল নেহরু তুলে আনেন। সিকিউরিটির লোকেরা ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা হতবাক। হতবাক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও। কিন্তু তাদের হতবাক হওয়ার মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায় যখন তারা দেখেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জুতাটি বেগম নূনের পায়ে পরিয়ে দিতে এগিয়ে গিয়ে নিচু হচ্ছেন। সে এক অকল্পনীয় দৃশ্য।বেগম নূনের পায়ে জুতা পরিয়ে দিতে গিয়ে নেহরু ছোট হয়েছেন, সে-কথা নিতান্ত ছোটলোক কেউ ছাড়া দুনিয়ার মানুষ বলবে না। বরং প্রকাশ পেয়েছে নেহরুর ঔদার্য, পরম সৌজন্যবোধ ও শিষ্টাচার।’ (সহজিয়া কড়চা,  ফেব্রুয়ারি ২০১৫ )উদাহরণটি আন্তঃদেশীয়। উপমহাদেশে এরকম শিষ্টাচারের উদাহরণ খুব বেশি যে নেই তা’ বলাই বাহুল্য। অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলোতে উচ্চমানের সৌজন্য, শিষ্টাচার অনুশীলনের অনুপস্থিতি দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থার করুণ  চিত্র তুলে ধরে।   রাজনীতি কেবল দল বা ক্ষমতার লড়াই নয়। এটি আচরণ, শিষ্টাচার এবং ˆনতিকতার প্রতিফলন। রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে মানুষ মোটাদাগে কী চায়? প্রকৃত অর্থে সততা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখার অপেক্ষায় থাকে।রাজনীতিতে সৌজন্য ও শিষ্টাচার হলো প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, মার্জিত ভাষা ব্যবহার এবং সহনশীল আচরণ, যা সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে অপরিহার্য। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির যথাযথ বিকাশ না ঘটায় আমাদের দেশে শিষ্টাচারের রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশিত মাত্রায় গড়ে ওঠেনি। সৌজন্য ও শিষ্ঠাচারের রাজনীতির অভাবে অসৌজন্য এবং অশ্লীলতার রাজনীতি দ্রুত বিকশিত হতে থাকে। ভয়ের রাজনীতির বিকাশে আইনের শাসনের দৃশ্যমানতা থাকেনা।১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আমরা  সৌজন্য ও শিষ্টাচারের কিছু উদাহরণ দেখে বিস্মিত ও আশান্বিত হতে শুরু করেছি।  রাজনৈতিক সৌজন্য ও শিষ্টাচারের অংশ হিসেবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের মাত্র একদিন পর ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসভবনে গিয়ে  অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে সৌজন্য সাক্ষাত করেন যা আমাদের দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায় অনুপস্থিত। সৌজন্য সাক্ষাতকারটি শুধুমাত্র একটি সাক্ষাতকারই ছিলনা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি তাৎপর্যময় ঘটনা হিসেবে দল মত নির্বিশেষে সবাই বিবেচনা করেছেন। সাক্ষাৎকারের পূর্বের দিন রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত নির্বাচন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান জাতীয় ঐক্য ও সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন ‘একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার পথে আমি দল বা মত নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতা কামনা করি।’ ওই সংবাদ সম্মেলনে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়েছে। তারেক রহমান বলেছেন, ‘নির্বাচনে একে অপরের বিরুদ্ধে কিংবা একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নির্বাচনের মাঠে হয়তো কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে, এ ধরনের বিরোধ যেন প্রতিশোধ-প্রতিহিংসায় রূপ না নেয় সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই।’ প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে এই যে ঐক্য ও সংহতির আহ্বান এটি হলো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নির্মাণের আমন্ত্রণ এ কথাটি বুঝতে হবে।ইউরোপ, আমেরিকার দেশ গুলোর অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধের ইতিবাচক দিক নিয়ে আমরা আলোচনা করি খুব কম। ইতিবাচক দিকের আলোচনা, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ করলে দুটি নামে ট্যাগ দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় একটি হলো সাম্রাজ্যবাদের দোসর আর একটি পশ্চিমা ধর্ম সমূহের অনুসারী কিংবা আরও অশ্লীল শব্দের উচ্চারণ অযোগ্য কোন রাজনৈতিক ট্যাগ। আধুনিক  মনস্ক যে কোন সমাজ, রাষ্ট্র পৃথিবীর যে কোন দেশ থেকে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা কিংবা অনুশীলন গ্রহণ করতে কুণ্ঠা বোধ করেননা। এ ক্ষেত্রে আমাদের আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কে মধ্যযুগীয় হিসেবে অভিহিত করলে খুব ভুল বলা হবেনা । পশ্চিমা গণতন্ত্রান্তিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে একে অপরের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতি বজায় রেখে চলতে দেখা যায়। ব্যক্তিগত আক্রমণকে সবাই এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন  এবং নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে বিতর্ক করাকেই গণতান্ত্রিক আচরণ হিসেবে মনে করে থাকেন।  ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করার অনুশীলন না থাকলে রাজনীতির মাঠে হিংসা, প্রতিশোধ, হানাহানি চলতেই থাকে। সৌজন্য শিষ্টাচারের রাজনীতির অনুশীলনের অভাবে গণতন্ত্র কখনো পরিপুষ্ঠ হতে পারেনা। বল প্রয়োগ, অশ্লীলতার রাজনীতির আধিপত্য সেখানে সহজেই প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। পৃথিবীর কোন অঞ্চলে গায়ের জোরে, অশ্লীল স্লোগান, অস্লীল বক্তব্য প্রদান করে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্টা লাভ করেছে এমন উদাহরণ আমরা দেখতে পাইনা। আমাদের দেশের  উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ, তরুণী মনে করে অশ্লীল স্লোগান অধিকার রক্ষার এক বড় অধিকার।স্বাধীনতা সংগ্রামের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের সংবিধানেও সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য এবং স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এর পেছনে সুশাসনের ঘাটতি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতাও। স্বাধীনতার পর থেকে যেসব রাজনৈতিক দল দেশ শাসনের ভার নিয়েছে, তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার ফল হিসেবেই গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান আমাদের ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে। আমরা যদি বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সাধনে ব্যর্থ হই তাহলে অস্থিরতা, প্রতিহিংসা, হানাহানির রাজনীতি যে বহমান থাকবে এ কথা বলতে  নিকোলো মেকিয়াভেলি, ম্যাক্স ওয়েবার কিংবা জন লক হওয়ার প্রয়োজন নেই।ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিলে যা হয়, আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক উন্নয়নের অবস্থা হয়েছে অনেকটা সেরকম। ঘোড়া টেনে নিয়ে যাওয়ার কথা গাড়িকে, এখন ঘোড়া যতোই চেষ্টা করুক না কেনো বড় জোর গাড়িকে পেছনে নিয়ে যেতে পারবে; অনেকটা ভুতের পশ্চাত-পদতার মতো। রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মান না করে স্থাপনা নির্মানের উন্নয়নের ধারা ক্রমবহমান থাকলে নুন্যতম জাতীয় ঐক্যের সসম্ভাবনা থাকেনা। বিভেদ, বিভ্রান্তির রাজনীতি হিংসা, প্রতিহিংসা ছাড়া আর কিছু উপহার দিতে পারে বলে আমাদের জানা নেই।১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আমরা যতোটুকু সৌজন্য শিষ্টাচারের রাজনীতির সূচনা দেখালাম তা’ আমাদের কাছে ক্রান্তিকালে আলোর রেখার মতো মনে হয়েছে। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ , ভিন্নমতের অবস্থান না থাকলে গণতন্ত্রের চর্চা সহজতর হয়না। ভিন্নমত, ভিন্ন পথ শাসকদের প্রদর্শন করা জরুরি। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা না হলে ক্ষমতা দাম্ভিক হয়ে যায়। দাম্ভিক ক্ষমতা পান্থজনের জন্য নয়, এটি ক্ষমতাধরদের আরও ক্ষমতাবান করে তুলে।আমরা চাই জন-আকাঙ্ক্ষার ক্ষমতা। যে মাঝি জীবন বিপন্ন করে মুক্তিযুদ্ধাদের গভীর রাতে নদী পার করে দিয়েছিল ভোরের আলো দেখার প্রত্যাশায়, সেই মাঝির স্বপ্নের বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই। সৌজন্য , শিষ্টাচার যেনো লোক দেখানো না হয়। আন্তরিক ভাবে বৃত্তের বাইরে থাকা মানুষদের সামনে গিয়ে নতজানু হতে হবে। প্রান্তিক মানুষ যদি ধীরে ধীরে কেন্দ্রে আসতে  পারে তাহলে বৈষম্য হ্রাস পাবে। “বৈষম্যহীন বাংলাদেশ” এই শব্দ যুগলের মধ্যে জাদু আছে। ষাট, সত্তর দশক থেকে এই স্বপ্ন ঝাপির ভেতর রেখে রাজনীতিবিদেরা সাধারণ মানুষদের সাপের খেলা দেখিয়ে আসছেন। স্বপ্নকে নিয়ে বারবার খেলা দেখালে, ঝাপির ভেতরের সাপ ছোবল যে মারবে এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন। মানবিক এবং কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য চাই উপযুক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে মানুষের ভালোবাসা, নিবেদন থাকবে নিখাদ, নির্ভেজাল।[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

প্রজেক্ট বেইজড লার্নিং: এদেশে আদৌ সম্ভব?

শিক্ষামন্ত্রীর দূরদর্শী উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রজেক্ট বেইজড লার্নিং বা প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষার ধারণা নতুনভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে| এটি শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনের একটি সম্ভাবনাময় পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে| বর্তমান সময়ে শিক্ষাকে মুখস্থ নির্ভরতা থেকে বের করে বাস্তবমুখী, দক্ষতাভিত্তিক এবং সৃজনশীল শিক্ষায় রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে| এই প্রেক্ষাপটে প্রজেক্ট বেইজড লার্নিং একটি কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতি হিসেবে সামনে এসেছে| প্রজেক্ট বেইজড লার্নিং মূলত এমন একটি শিক্ষণ পদ্ধতি, যেখানে শিক্ষার্থীরা কোনো বাস্তব সমস্যা, প্রশ্ন বা চ্যালেঞ্জকে কেন্দ্র করে অনুসন্ধানমূলকভাবে শেখে| তারা তথ্য সংগ্রহ করে, বিশ্লেষণ করে, দলগতভাবে কাজ করে এবং একটি সমাধান বা উপস্থাপনা ˆতরি করে| এখানে শেখা হয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, যা মুখস্থ নির্ভর শিক্ষার তুলনায় অধিক স্থায়ী ও কার্যকর| তবে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই ধারণা কীভাবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব?বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে কিছু স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা দেখা যায়| মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, সময় সীমিত এবং সিলেবাস বিস্তৃত| তার ওপর রয়েছে বোর্ড পরীক্ষার চাপ, যা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই মুখস্থ নির্ভরতার দিকে ঠেলে দেয়| এই কাঠামোর মধ্যে হঠাৎ করে পূর্ণাঙ্গ প্রজেক্ট বেইজড লার্নিং চালু করা বাস্তবসম্মত নয়| তাই প্রয়োজন ধাপে ধাপে, বাস্তবভিত্তিক এবং অভিযোজিত একটি মডেল গ্রহণ করা| প্রথমত, প্রজেক্ট বেইজড লার্নিংকে মিনি পিবিএল আকারে চালু করা যেতে পারে| অর্থাৎ পুরো পাঠ্যবিষয় নয়, বরং নির্দিষ্ট একটি টপিক বা অধ্যায়কে কেন্দ্র করে ছোট পরিসরের প্রকল্প ˆতরি করা| উদাহরণ¯^রূপ, পানি অধ্যায়ে শিক্ষার্থীরা তাদের এলাকার পানির মান ও ব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধান করতে পারে| এতে তারা বইয়ের জ্ঞানকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারবে| দ্বিতীয়ত, প্রতিটি প্রজেক্টের জন্য একটি স্পষ্ট প্রশ্ন বা ড্রাইভিং কোয়েশ্চেন থাকা জরুরি| যেমন, আমাদের এলাকায় পরিবেশ দূষণ কেন বাড়ছে বা গ্রামীণ খাবার কেন হারিয়ে যাচ্ছে| এই প্রশ্নই শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু ˆতরি করবে| বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শুধু কার্যক্রম বা প্রদর্শনী করা হয়, কিন্তু প্রশ্নভিত্তিক অনুসন্ধান না থাকায় তা প্রকৃত শেখায় রূপ নেয় না| তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের শুধু কাজ করানো নয়, বরং অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণে যুক্ত করা প্রয়োজন| তথ্য সংগ্রহ, সাক্ষাৎকার, পর্যবেক্ষণ এবং তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা বিষয়টি গভীরভাবে বুঝতে পারবে| বাজার থেকে কিছু পণ্য এনে স্টল সাজানো বা প্রদর্শনী করা যদি শেখার সঙ্গে যুক্ত না থাকে, তবে সেটি প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা নয়, বরং একটি সাধারণ কার্যক্রম বা ইভেন্টে পরিণত হয়| চতুর্থত, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| শুধুমাত্র লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সামগ্রিক দক্ষতা মূল্যায়ন সম্ভব নয়| তাই বিদ্যালয় পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে প্রকল্পভিত্তিক কাজ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে| অংশগ্রহণ, দলগত কাজ, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং উপস্থাপন দক্ষতার ভিত্তিতে ন¤^র বরাদ্দ করা যেতে পারে| এতে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ নয়, বরং বাস্তব দক্ষতা অর্জনে আগ্রহী হবে| পঞ্চমত, শিক্ষকরা এই পরিবর্তনের কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি| তাই তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ অপরিহার্য| ¯^ল্পমেয়াদি কিন্তু বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের হাতে কলমে প্রজেক্ট ডিজাইন, পরিচালনা এবং মূল্যায়নের দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে| শিক্ষককে এখানে লেকচারারের ভূমিকায় নয়, বরং গাইড বা ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে প্রস্তুত করতে হবে| এটি একটি বড় মানসিক ও পেশাগত পরিবর্তনের বিষয়| ষষ্ঠত, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এই পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করতে পারে| শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ, উপস্থাপন এবং সহযোগিতামূলক কাজ করতে পারে| এতে শেখা আরও আকর্ষণীয় হয় এবং ডিজিটাল দক্ষতাও বৃদ্ধি পায়| তবে প্রযুক্তি যেন উদ্দেশ্য না হয়ে উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি| এছাড়া, অভিভাবক এবং প্রশাসনের ভূমিকা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই| অনেক সময় নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে ভুল ধারণা ˆতরি হয়| তাই অভিভাবকদের সচেতন করা এবং তাদের এই পরিবর্তনের অংশীদার করা প্রয়োজন| একই সঙ্গে শিক্ষা প্রশাসনকে ধারাবাহিক তদারকি এবং সহায়তা প্রদান করতে হবে, যাতে বিদ্যালয় পর্যায়ে এই উদ্যোগ টেকসই হয়| একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাস্তব প্রেক্ষাপটে ইতোমধ্যে কিছু আংশিক প্রজেক্টভিত্তিক কার্যক্রম চালু আছে, যেমন ˆবশাখ উপলক্ষে গ্রামীণ খাবারের স্টল, বিজ্ঞান মেলা বা প্রদর্শনী| তবে এগুলো তখনই প্রকৃত প্রজেক্ট বেইজড লার্নিং হয়, যখন এর সঙ্গে অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ এবং প্রতিফলন যুক্ত থাকে| শুধু প্রদর্শনী বা আয়োজন নয়, বরং শেখার গভীর প্রক্রিয়াই এখানে মূল বিষয়| প্রজেক্ট বেইজড লার্নিং কোনো একদিনে বাস্তবায়নযোগ্য ব্যবস্থা নয়| এটি একটি ধীর, পরিকল্পিত এবং ধারাবাহিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া| ছোট ছোট পদক্ষেপ যেমন একটি ক্লাস, একটি শিক্ষক এবং একটি ছোট প্রকল্প দিয়েই বড় পরিবর্তনের সূচনা সম্ভব| বাংলাদেশে শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে এই বাস্তবভিত্তিক এবং অভিযোজিত পদ্ধতিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ| প্রজেক্ট বেইজড লার্নিং বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন সংস্কার এবং বাস্তবভিত্তিক ধাপে ধাপে প্রয়োগ কৌশল| শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে সমšি^তভাবে কাজ করলে এই পরিবর্তন সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব| [লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ময়মনসিংহ]

গাছ আমাদের পরম বন্ধু

প্রকৃতি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্কের আদি সূত্র হলো গাছ| একটি দেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীবনধারণের জন্য গাছের কোনো বিকল্প নেই| সভ্যতার ক্রমবিকাশ থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও বেঁচে থাকার প্রতিটি নিশ্বাসে আমরা গাছের ওপর নির্ভরশীল| গতকাল ছিল জাতীয় বৃক্ষরোপণ দিবস| দিবসটির তাৎপর্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী| ক্রমবর্ধমান ˆবশ্বিক উষ্ণতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা থেকে প্রিয় মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য এবারের দিবসটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে| এবার জাতীয় বৃক্ষরোপণ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সময়ের চাহিদাকে সামনে রেখে| এবারের মূল সুর হলো টেকসই পরিবেশ এবং আগামীর সবুজ সম্ভাবনা| প্রতিপাদ্যটির মূল লক্ষ্য হলো কেবল গাছ লাগানোই নয়, বরং রোপণকৃত চারাগাছটির সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা| এর মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিককে প্রকৃতি রক্ষায় ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যা একটি সমৃদ্ধ ও পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক হবে| বৃক্ষ নিধনের ফলে বাস্তুসংস্থানের যে ক্ষতি হয় তা জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অপূরণীয়| বনভূমি উজাড় করার ফলে বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, যার ফলে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে| এটি খাদ্যশৃঙ্খলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হানে| উদ্ভিদের অভাবে পরাগায়ন ব্যাহত হয়, যা কৃষিজ উৎপাদনকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে| বৃক্ষ নিধন বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের ভারসাম্য নষ্ট করে| গাছ যখন কাটা হয়, তখন তারা সঞ্চিত কার্বন পরিবেশে ছেড়ে দেয়, যা গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে| এতে বায়ুর গুণমান হ্রাস পায় এবং বিষাক্ত গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মানুষের শ্বাসতন্ত্রের জটিলতাসহ নানা রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে| বৃক্ষহীন পরিবেশ তাপমাত্রার শোষণে ব্যর্থ হয়| গাছপালা না থাকলে সূর্যের তাপ সরাসরি ভূপৃষ্ঠে আঘাত করে এবং মাটি তা শোষণ করে ধরে রাখে, যা ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব ˆতরি করে| এর ফলে স্থানীয় তাপমাত্রা অ¯^াভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং জলবায়ুর চরম ভাবাপন্নতা লক্ষ্য করা যায়, যা মানবদেহের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে| বৃক্ষ নিধন মাটির গঠন কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়| গাছের মূল মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে, যা ভূমিধস এবং মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ করে| বন উজাড় করার ফলে বৃষ্টির পানি সরাসরি মাটির ওপর আছড়ে পড়ে ওপরের উর্বর স্তর ধুয়ে নিয়ে যায়, যার ফলে জমির উর্বরতা হ্রাস পায় এবং মরুকরণ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়| পরিবেশ বিজ্ঞানের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বৃক্ষ নিধন পানিচক্রকে বিঘ্নিত করে| গাছ প্র¯ে^দন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প ত্যাগ করে যা মেঘ ˆতরিতে সাহায্য করে| বৃক্ষ না থাকলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়| এতে খরা ও দীর্ঘমেয়াদী পানির সংকট ˆতরি হয়, যা একটি দেশের সামগ্রিক পরিবেশগত নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলে দেয়| সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৃক্ষ আমাদের জীবনদায়ী অক্সিজেন সরবরাহ করে, যা ˆবজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এক অনন্য প্রক্রিয়া| বাতাস থেকে ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে বৃক্ষ বায়ুমণ্ডলকে নির্মল রাখে| এই প্রাকৃতিক ফিল্টারেশন ব্যবস্থা আমাদের সুস্থ ফুসফুস এবং দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করার প্রধান কারিগর| উদ্ভিদ জগত প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে একটি জীবন্ত ঢাল হিসেবে কাজ করে| উপকূলীয় অঞ্চলে বনায়ন জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ কমিয়ে দেয়, যা জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে হ্রাস করে| ˆবজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ঝড়ের তাণ্ডব তুলনামূলক কম হয়, কারণ গাছ বাতাসের গতিপথকে বাধাগ্রস্ত ও বিচ্ছুরিত করে| বৃক্ষরোপণ মাটির ˆজব গুণাগুণ বৃদ্ধি করে কৃষিতে ˆবপ্লবিক পরিবর্তন আনে| গাছের ঝরা পাতা মাটিতে মিশে প্রাকৃতিকভাবে হিউমাস ˆতরি করে, যা মাটির অণুজীবগুলোর কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়| এটি কৃত্রিম সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মাটির টেকসই উর্বরতা নিশ্চিত করে এবং সুস্থ সবল ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে| তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বৃক্ষের ভূমিকা অন¯^ীকার্য কারণ এটি প্রাকৃতিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র হিসেবে কাজ করে| বাষ্পীভবন ও ছায়া প্রদানের মাধ্যমে গাছ আশপাশের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত কমিয়ে রাখতে পারে| এটি কেবল বিদ্যুৎ সাশ্রয়ই করে না, বরং শহরাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অসহনীয় গরম থেকে সাধারণ মানুষকে ¯^স্তি প্রদান করে| জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বৃক্ষ এক অপ্রতিম আধারের ভূমিকা পালন করে| একটি গাছ অসংখ্য কীটপতঙ্গ, পাখি এবং অণুজীবের নিরাপদ আশ্রয়স্থল| পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই ক্ষুদ্র জীবগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আমরা প্রকৃতপক্ষে একটি ¯^য়ংসম্পূর্ণ জীবনচক্রকে লালন করি যা পৃথিবীর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে| আমাদের সবার গাছ রোপণ করা ˆনতিক ও নাগরিক দায়িত্ব| এই একটি চারা রোপণের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাই একদিন বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়ে আমাদের অক্সিজেন ও ছায়া দেবে| আমরা যদি ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে এই উদ্যোগ গ্রহণ করি, তবে কোটি মানুষের অংশগ্রহণে দেশ এক নিমিষেই সবুজে ভরে উঠবে| আমাদের বাড়ির আঙিনায়, সড়কের পাশে বা পরিত্যক্ত স্থানে একটি চারা লাগানো মানে হলো আগামীর নিরাপদ পৃথিবীর জন্য বিনিয়োগ করা| এই গাছটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মানসিক প্রশান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও বৃদ্ধি পাবে| একটি গাছ রোপণের মাধ্যমে আমরা দেশাত্মবোধের অনন্য নজির স্থাপন করতে পারি| দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম উপায় হলো এই প্রকৃতিকে রক্ষা করা| গাছ আমাদের পরম বন্ধু, কারণ সে নিঃ¯^ার্থভাবে আমাদের অক্সিজেন দেয়| ফল, ফুল, কাঠ ও ওষুধ দিয়ে গাছ মানুষের জীবনকে করে তুলে সমৃদ্ধ ও ˆবচিত্র্যময়| তপ্ত দুপুরে শীতল ছায়া দিয়ে গাছ ক্লান্ত পথিককে পরম শান্তি ও আশ্রয় দান করে| প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আমাদের রক্ষা করে গাছ অতন্দ্র প্রহরীর মতো লড়াই চালিয়ে যায়| পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে গাছের গুরুত্ব অপরিসীম, তাই গাছই আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ| সবুজ বাংলাদেশ গড়তে সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ| বনাঞ্চল রক্ষা এবং নতুন নতুন বন সৃজনে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন| প্রশাসনের কঠোর নজরদারি বনখেকো ও অবৈধ গাছ কাটা রোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে| এছাড়া সরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী চারা বিতরণ কর্মসূচি প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া জরুরি| শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে গড়ে তোলার প্রধান কেন্দ্র| প্রতিটি বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ পালন এবং শিক্ষার্থীদের হাতে একটি করে চারা তুলে দিয়ে তাদের পরিচর্যার দায়িত্ব দেয়া উচিত| পরিবেশ বিষয়ক পাঠ্যক্রমে বৃক্ষের গুরুত্ব হাতেকলমে শিক্ষা দিলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ˆশশব থেকেই প্রকৃতি রক্ষার চেতনা জাগ্রত হবে| সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বন বিভাগকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বনায়ন কার্যক্রম তদারকি করতে হবে| চরাঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকায় বিশেষ বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে মাটির ক্ষয়রোধে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার| এছাড়া নার্সারি মালিকদের প্রশিক্ষণ ও ¯^ল্পমূল্যে উন্নত জাতের চারা সরবরাহ নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান কাজ হওয়া উচিত| সর্বস্তরের জনসাধারণের অংশগ্রহণ ছাড়া সবুজ বাংলাদেশ গড়া অসম্ভব| পাড়া-মহল্লায় ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা করতে হবে| মিডিয়া ও প্রচারমাধ্যমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে গাছের বহুমুখী উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে| আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি ধূসর ভূখণ্ডকে সবুজের সমারোহে রূপান্তর করতে| আমাদের জীবন, জীবিকা এবং সুস্থ পরিবেশের জন্য বৃক্ষ অপরিহার্য| সবুজ প্রকৃতিই আমাদের শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার, আর এই উত্তরাধিকার রক্ষা করাই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার| [লেখক: প্রেসিডেন্ট, ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল]

খাপড়া ওয়ার্ড জেল হত্যা দিবস

শিক্ষাবিদ প্রখ্যাত লেখক ও নোবেল বিজয়ী বারট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, শাসক যদি জনস্বার্থের বিপক্ষে থাকে সেই দেশে মানুষ,আর লেখক শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, যেখানে দেহের মৃত্যুর হিসাব রাখা কিন্তু মনের মৃত্যুর হিসাব রাখা হয়না সেমখানে ভালো মানুষ জন্মেনা। জ্ঞানীরা কোন কিছুকে প্রতিরোধ করে যুক্তি দিয়ে আর মূর্খরা প্রতিহত করে অস্ত্র দিয়ে। সাম্প্রতিককালে সুফি দর্শণের ফকিরদের উপর হামলা হত্যা, কবর থেকে লাশ উঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়াএবং তাদের মাজার ও খানকা ভেঙে দেয়ার ঘটনাই তার জলন্ত উদাহরণ। এ ধরনের পূর্বের ঘটনার কারণে ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহীর জেলখানায় খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল।বাঙালির প্রবাদে বলে ’গড়নের কালে যার ইস্পাত হয় চুরি, বালি দিলে ধার ওঠেনা খালি লোহার ছুরি’ অথবা হয়কাটে ধারে নয়কাটে ভারে’ ৭৬ বছরের ইতিহাসে দুটি বিষয়েরই সত্যতা প্রমানিত হয়েছে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। প্রথমটি ঘটেছে ১৯৭১ সালে পূর্বপাকিস্তানের নিকট পরাজিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আর ২০২৩ সালে এসে রাষ্ট্র হিসেবে দেওলিয়ার পথে পাকিস্তানের গতিপথ রচনা হয়ে। সামরিক শাসন, হত্যা- ক্যুর রাজনীতি পাকিস্তানের পিছু ছাড়ছেনা। জুলাই অভ্যত্থানের পর পাকিস্তানের সেই অচল তত্ব  অনেকেই সামনে আনার চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের  স¦তসিদ্ধ সত্যকে উপেক্ষা করে ধর্মের নাম ব্যবহার করে ১৯৪৭সালে সাধের যে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করেছিলো, সেই  ইসলামী রাষ্ট্রের আসল চরিত্র মানুষের সামনে ফুটে ওঠার কারণে ২২ বছরেই তার মৃতু ঘণ্টা বেজেছিল। ওরা শুধু পূর্ব বাংলার মানুষকে অর্থনৈতিকভাবেই বঞ্চিত করেনি,ভাষা ও সংস্কৃতি কেড়ে নিতে গিয়েছিলো, নারীদের পর্দার অন্তরালে রাখার ব্যবস্থা করেছিল, আজকে যেমনটি করছে আফগান তালেবান ও ইরানি শাসকের । ¯^াধীন মুক্ত চিন্তা ছিলো ওদের তরিকায় নাজায়েজ, এমনকি নারীদের  কপালে টিপ পড়াকে তারা বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল শহীদ মিনারে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, বাংলা নববর্ষ পালন ও বাংলা ভাষাকে ওরা হিন্দুয়ানি ভাষার তকমা দিয়ে তা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল। যারা এহেন কাজের সমালোচনা ও প্রতিবাদ করেছিল তাদেরকেই পাকিস্তান সরকার জেলে ঢুকিয়েছিল, জেলের সেলগুলো ভরেছিল সেই সব মানুষ এবং বামপন্থী নেতাকর্মীদের দ্বারা। বাইরে নির্যাতন যেমন ছিল জেলেও ছিল, তার প্রমাণ ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডের হত্যাকাণ্ড।কারাগার বা জেলখানা প্রত্যেক দেশের সরকারের একটি অতি প্রাচীন ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান। কারাগার ক্রিমিনাল জাস্টিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দেশের অপরাধ দমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। আদালত কর্তৃক প্রমানিত বিভিন্ন অপরাধে অপরাধী ব্যক্তি (কয়েদী) বিচারাধীন বিভিন্ন ব্যক্তি (হাজতি) এমন কি সমাজে নিরাপত্তাহীনতায় অবস্থানকারী মানুষের নিরাপত্তা বিধান করতে পুলিশ সেভ কাস্টোডি এবং জেলখানা গুলি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এটি একটি সংশোধনাগার হিসেবে পৃথিবীতে ব্যবহার হলেও আমাদের দেশে ভিন্ন চিত্র দেখা দেয়। যদিও ২০০৮ সালে বাংলাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় কারা সপ্তাহে (১৭-২৪) কারাগারগুলিকে সংশোধনাগার হিসাবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যাক্ত করেছিল। কারা সপ্তাহের শ্লোগান ছিল ‘রাখিব নিরাপদ দেখাবো আলোর পথ”।বৃটিশ ও পাকিস্তন আমলে তাদের দ্বারা পরিচালিত জেলখানা ও কারাগারগুলি ছিল টর্চার সেল। তাদের অন্যায় কাজের সমালোচনা করা নাগরিক অধিকার আদায়ে আন্দোলন করাকে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগে রাজনীতিকদের ঐ সকল জেলখানার অমানবিক পরিবেশে আটকিয়ে রেখে নির্যাতন চালানো হতো। একই সময় বৃটেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জেলখানাগুলো সংশোধনাগার হিসেবেই ছিল। একজন মানুষ অপরাধ করেছে, সেই অপরাধ করার কারণ কি ? সেটা বের করার জন্য জেলখানাগুলিতে মনোবিজ্ঞানীদের রাখা হতো। সঠিকভাবে কারণ অনুসন্ধান করে তার সমাধান দিত। এইভাবে কাজের মধ্য দিয়ে সমাজে অপরাধ প্রবনতা দুর করার উদ্দ্যোগ নেয়া হতো। অথচ আমাদের দেশের জেলখানাতে ছোটখাট অপরাধী গেলে বড় অপরাধী হয়ে বের হয়ে আসে। ভি, আই, পি, সেলে রাখা হয় দাগী সন্ত্রাসীকে, চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, হত্যাকারীর সাথে রাখা হয় রাজনৈতিক বন্দীদের ফলে পরিবেশগত ক্রুটি ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার জন্য আমাদের দেশের জেলখানাগুলো সংশোধনাগার হিসেবে এখনও গড়ে ওঠেনি। বন্দীদের দেখাশোনা করা বন্দীদের শতভাগ নিরাপত্তা বিধান করা এবং তাদের বিশৃঙ্খল জীবন থেকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রস্তুত করে তোলাই কারা প্রশাসনের মূল দায়িত্ব। তবে এ দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করার উপর লক্ষ্যের বাস্তবায়ন নির্ভর করবে। দুঃখজনক হলেও সত্য এই ভূ-খন্ডে ¯^াধীনতা প্রাপ্তির পরও জেলখানার সেফ কাস্টডিতে নির্মম হত্যা সংগঠিত হয়েছে, বীরের রক্তস্রোতে জেলখানার সেল ভেসেছে। ¯^াধীন পাকিস্তানে ১৯৫০ সালে রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে যেমন ঘটেছে, তেমনি ¯^াধীন বাংলাদেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেও ঘটেছে। প্রথমটি কারা কর্তৃপক্ষের দ্বারা ঘটেছে দ্বিতীয়টি কারা কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতায় ঘটেছে। তবে দুটি ঘটনাই রাষ্ট্রীয় শাসকের ইন্ধনে ঘটেছে।সামরিক সরকারের দ্বারাও জেলখানার বিচার ছাড়া অথবা প্রহসনমূলক বিচারে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ৩রা নভে¤^র জেল হত্যা দিবস সম্পর্কে আমাদের কিছু কিছু ধারণা থাকলেও অনেক ঘটনা সম্পর্কে আমরা জানিনা। বিষয়টি জানাতেই অতীত কিছু ঘটনার আলোকপাত করা দরকার। ১৯৫০ সালের জেলহত্যা দিবস: ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্থান ভাগ হওয়ার পর মুসলিম লীগসহ অনেকেই আনন্দে বলেছিল হাতমে ঘড়ি মুখমে পান, লরকে লেঙ্গে পাকিস্তান, অন্যদিকে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে করকাতার গড়ের মাঠে সমাবেশ করে  বলেছিল ‘লাখো ইনসান ভুখা হায়, ইয়া আজাদী ঝুটা হায়’ এটি বলার তথাকথিত অপরাধে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করাসহ সারাদেশ থেকে তিন হাজারের বেশি কমিউনিস্ট কর্মীদের জেলে ঢুকিয়ে রেখেছিল মুসলীম লীগ সরকার। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে ৩৯ জন বন্দীর ওপর মুসলিম লীগ সরকারের পুলিশ বাহিনীর গুলি বর্ষণে নিহত হয়েছিলেন ৭ জন। বাকিরা সবাই আহত হয়েছিলেন। ঐ সেলে ৩২ জন কমিউনিস্ট বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী বন্দী হিসেবে আটক ছিলেন ১৯৫০ সালের পাকিস্থানের নিরাপত্তা আইনে। ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতী তত্বের ভিত্তিতে ধর্মের আলোকে দেশ বিভাগের বিপক্ষে ছিলেন কমিউনিস্টরা। কোলকাতার গড়ের মাঠে বিশাল সমাবেশ কের কমিউনিস্টরা বলেছিল, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত হয়না, রাষ্ট্র বিজ্ঞানে এটাই বলে।তারা শ্লোগান তুলেছিল লাখো ইনসান ভূখা হায় ইয়াআজাদী ঝুটা হায়। বামপন্থীদের এহেন কার্যক্রমে মুসলিম লীগ সরকার কমিউনিস্ট পাটিকে শুধু নিষিদ্ধই করেনি কমিউনিস্ট কর্মীদের বিনা বিচারে জেলে ভরেছিল। পাকিস্থানের সরকারই শুধু নয় জেল কর্তৃপক্ষ কমিউনিস্ট বন্দীদের অভিহিত করতো  দেশদ্রোহী ভারতের পঞ্চম বাহিনী ও পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৯ টায় তৎকালীন জেল সুপার মি. বিল সাপ্তাহিক জেল পরিদর্শনে আসে, তার সঙ্গে ছিল জেল ডাক্তার, দুই জন ডেপুটি জেলার, হেড ওয়ার্ডরা, জেল কর্মকর্তা ও সিপাহীরা। খাপড়া ওয়ার্ডের বারান্দার জেল সুপারের নিকট ওয়ার্ডের বন্দীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন যশোরের কমরেড আব্দুল হক। জেলে খাদ্যের মান বৃদ্ধি পরিবেশগত উন্নয়নের দাবি জানালে জেলার তাদের ধমক দিয়ে মন্তব্য করে তোমরা দেশদ্রোহী, ভারতের পঞ্চম বাহিনী পাকিস্তানের শত্রু, তোমাদের এর চেয়ে ভাল খাবার দেয়া যাবে না। এই নিয়ে তর্কবির্তকের এক পর্যায়ে মি. বিলের হাতে থাকা বেত দিয়ে বন্দীদের মারতে উদ্যাত হয়। একজন বন্দী বিলের ঐ বেত ধরে ফেলে। ধস্তা ধস্তির এক পর্যায় মি. বিলসহ কয়েকজনকে ওয়ার্ডের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়া হয়। মি. বিল বের হয়ে আসেন এবং খাপড়া ওয়ার্ড তালাবদ্ধ করে পাগলা ঘণ্টা বাজানো হয়। জেলের সিপাহীরা জানালার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে অবিরাম গুলিবর্ষণ করে। রাজবন্দীরা ঘরের ভিতর থেকে নারিকেলের ছোবড়ার গদি, লোহার খাট চৌকি ইত্যাদি খাড়া করে ঘরের দরজা ও জানালা বন্ধ রাখার চেষ্টা করে কিন্তু গুলির নিকট এই প্রতিরোধ ব্যর্থ হয়। নিহত হোন ৭ জন কমিউনিস্ট রাজবন্দী। বাকিরা আহত হয়েছিল, যাদের সংখ্যা ৩২ জন। আহত রাজবন্দীদের চিকিৎসা না দিয়ে পুলিশি নির্যাতন চালানো হয়। রাজশাহীর জেলার তৎকালীন অবাঙালী জেলা প্রশাসক পাকিস্থান নামক শিশু রাষ্ট্রকে যারা ধ্বংস করতে চায়, তাদের প্রতি সঠিক ব্যবহার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করে। কথায় বলে শাসক পরিবর্তন হলেও শাসন পরিবর্তন হয়না,যার কারণে ¯^াধীন বাংলাদেশে ,¯^াধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী এবং জাতীয় চার নেতাকেও জেল হত্যার শিকার হতে হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হওয়া বেশ কিছু মুক্ত চিন্তার মানুষকে জেলের মধ্যে মৃত্যর শিকার হতে দেখা গেছে। বিরোধী দলে থাকার সময় যিনি মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন, ক্ষমতায় যেয়েই তিনি নিপিড়নের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, এটাতো আধুনিক সভ্য সমাজে কারো কাম্য নয়।মানুষের জন্য কমন কতগুলো ইস্যুতে সরকারি দল, বিরোধী দলের একটা কমন সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন। আশাকরি রাজনীতিকরা সেই বিষয়টা ভাববেন,নইলে এই অমানবিকতার শিকার সবাইকে হতে হবে, কাউকে দুদিন আগে বা দুদিন পরে, যার উদাহরণ র‌্যাব গঠন, যারা এটি ˆতরি করেছিলেন প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য আজ তারা শায়েস্তা হচ্ছেন। নির্বাহি আদেশে রাজনৈতিক দরের কার্যক্রম বন্ধ ইটও কোন গনতান্ত্রিক দেশের রাজনৈতিক কালচার হওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যত প্রজন্ম  এবং আগামী বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বিষয়টি ভাবনায় নিতে হবে।[লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি]

ভিডিও

পাকিস্তানের পর নিউজিল্যান্ডকেও হারাল টাইগাররা

পাকিস্তানের পর নিউজিল্যান্ডও টাইগারদের ঠেকাতে পারল না। চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের ‘অঘোষিত ফাইনালে’ নিউজিল্যান্ডকে ৫৫ রানে হারিয়ে টানা দুই সিরিজ জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ।এর আগে গত মাসে পাকিস্তানকে নিজেদের মাঠে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল মিরাজের দল। এবার ঘরের মাঠে একই ব্যবধানে হারাল কিউইদের। বৃহস্পতিবারের (২৩ এপ্রিল) এই জয়ে ধারাবাহিকতারও জানান দিল মেহেদি হাসান মিরাজের দল।ম্যাচে টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে দুর্দান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ে বাংলাদেশ। তবে দলীয় পতন সামলে দাঁড় করান নাজমুল হোসেন শান্ত ও লিটন দাস। শান্ত ১০৬ রানের সেঞ্চুরি করেন। অপর প্রান্তে লিটন দাস খেলেন ৭৬ রানের দারুণ এক ইনিংস। তাদের ব্যাটেই নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৬৫ রানের চ্যালেঞ্জিং সংগ্রহ গড়ে টাইগাররা।বড় সংগ্রহ তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় নিউজিল্যান্ড। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে তারা। বাংলাদেশের পক্ষে যেন আগুন ঝরালেন মোস্তাফিজুর রহমান। ৯ ওভার বোলিং করে মাত্র ৪৩ রান দিয়ে ৫টি উইকেট তুলে নেন। তার বিধ্বংসী বোলিংয়ে ৪৪ দশমিক ৫ ওভারেই অলআউট হয়ে যায় নিউজিল্যান্ড, স্কোর দাঁড়ায় মাত্র ২১০ রান।দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৭৫ রান করেন ডেন ফক্সক্রফট। তিনি শেষদিকে তাণ্ডব চালালেও দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিতে পারেননি। ৫৯ রান করেন ওপেনার নিক কেলি।টানা দুই সিরিজ জয়ের মধ্য দিয়ে ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার পথে আরও একধাপ এগিয়ে গেল টাইগাররা। বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলতে হলে আগামী বছরের ৩১ মার্চের মধ্যে আইসিসির ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষ ৮ দলের মধ্যে থাকতে হবে। এই জয় র‌্যাংকিংয়ের জন্য দারুণ ইতিবাচক।মিরাজের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন ধারাবাহিক জয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। ঘরের মাঠে পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে টাইগাররা জানান দিচ্ছে, বিশ্বকাপের আগে নিজেদের সেরা ছন্দে পৌঁছে যেতে তারা মরিয়া।

পাকিস্তানের পর নিউজিল্যান্ডকেও হারাল টাইগাররা
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৪০ জন