সংবাদ
সরু গলি ও গুদামের তালা ভেঙে আগুন নেভাতে বেগ

সরু গলি ও গুদামের তালা ভেঙে আগুন নেভাতে বেগ

পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকার এসি মসজিদের পাশে মনজুর খান প্লাজায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ১২ অক্টোবর সোমবার বিকেল ৫টার দিকে সাততলা ভবনটির ষষ্ঠ তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পাওয়ার পর বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। আগুনের ভয়াবহতা বাড়ায় পর্যায়ক্রমে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিটের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স টিম ও লাইটিং ইউনিটসহ মোট ১২টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে যোগ দেয়। সরু গলি, তীব্র ধোঁয়া, পানির স্বল্পতা এবং গুদামগুলোর তালাবদ্ধ দরজার কারণে প্রায় সাত ঘণ্টা পার হলেও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ​ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভবনটির কসমেটিকস ও ব্যাগের গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে তা অন্যান্য কম্পার্টমেন্টে ছড়িয়ে পড়ে। ভবনটির ষষ্ঠ তলায় থাকা মালামাল পুড়ে গেছে এবং পঞ্চম তলায় কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে ডালপট্টি ও আশেপাশের সরু গলির সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণকক্ষের কর্মকর্তা শাহজাহান হোসেন বলেন, "সরু গলির কারণে ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়িগুলো ঘটনাস্থলে ঢুকতে পারছে না। প্রচণ্ড ধোঁয়া ও পানির স্বল্পতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সমস্যা হচ্ছে। প্রয়োজনে ইউনিটের সংখ্যা আরও বাড়ানো হতে পারে।" ​পরবর্তী সময়ে ফায়ার সার্ভিসের আরেক নিয়ন্ত্রণকক্ষ কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, "সাততলা ভবনের ষষ্ঠ তলায় আগুন লেগেছে। সেখানে বিভিন্ন পণ্যের গুদাম রয়েছে। প্রতিটি গুদামই তালাবদ্ধ। তাই তালা ভেঙে ভেতরে গিয়ে আগুন নেভাতে সময় লাগছে।" রাত ৯টার পর আগুনের তীব্রতা বাড়লে পাশে থাকা আরেকটি ভবনেও আগুন ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যায়। ​অগ্নিযুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিস্তারিত তথ্য জানান ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, "আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিটের সঙ্গে স্পেশাল রেসপন্স টিম ও লাইটিং ইউনিটসহ মোট ১২টি ইউনিট কাজ করছে। সরু রাস্তা, ভবনের কাঠামোগত জটিলতা এবং গোডাউনে বিপুল পরিমাণ মালামাল মজুত থাকায় আগুন নেভাতে বেগ পেতে হচ্ছে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের।" ​গুদামে আগুন নেভানোর চ্যালেঞ্জ ও সময়ের বিষয়ে মাহমুদুল হাসান আরও বলেন, "সরু রাস্তাঘাটের কারণে বিশেষায়িত ও ভারী গাড়ি ঘটনাস্থলে নেওয়া কঠিন হচ্ছে। পাশাপাশি ভবনের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হচ্ছে ঝুঁকি নিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে বা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার আশা থাকলেও গোডাউনগুলোতে বিপুল পরিমাণ মালামাল মজুত থাকায় ঠিক কতক্ষণ লাগবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।" ​অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো সাধারণ নাগরিক বা ব্যবসায়ীর প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে উদ্ধার ও অগ্নি নির্বাপণ কাজ চালাতে গিয়ে ধোঁয়ার তীব্রতায় ফায়ার সার্ভিসের দুই কর্মী আহত হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।ফায়ার সার্ভিসের প্রায় ১৫০ জন সদস্যের পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও সাধারণ বাসিন্দাসহ প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ মানুষ উদ্ধারকাজে সহায়তা করছেন। পুরান ঢাকার দোকানগুলোর বিন্যাস ও কাঠামোগত জটিলতার কারণে অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ ও মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এবার কি আরও বড় সংঘাত?

১০ অক্টোবরের দিল্লি কি শুধুই একটি বিক্ষোভ আটকানোর চেষ্টা দেখল, নাকি গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে তৈরি হল আরও বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন? যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর পরিস্থিতি, পুলিশের ব্যাপক ধরপাকড় এবং সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত এখন নতুন মোড়ে।১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP। কিন্তু সেই কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীতে যে মাত্রায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যাতায়াতে বিধিনিষেধ এবং ধরপাকড় চালানো হয়, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। দিল্লি পুলিশের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই পদক্ষেপ। কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন, একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি আটকাতে কেন কার্যত রাজধানীর জনজীবন বিপর্যস্ত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হল?বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়। বন্ধ রাখা হয় একাধিক মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথ, ব্যাহত হয় রেল পরিষেবা এবং মধ্য দিল্লির কিছু এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাতেও বিধিনিষেধ জারি করা হয়। CJP-র নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকেও আটক করা হয়। ফলে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ শুধু একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা নাগরিকের চলাচলের অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক স্বাধীনতা নিয়ে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।এই পরিস্থিতিতে ১১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ তাৎপর্যপূর্ণ। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হওয়া ব্যক্তিদের বেআইনিভাবে আটক না করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে। আদালত দিল্লিতে মেট্রো পরিষেবা স্বাভাবিক রাখা এবং ইন্টারনেট পরিষেবা নির্বিচারে বন্ধ না করার বিষয়েও নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি, বিধিনিষেধ ও আটককে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্র, দিল্লি পুলিশ এবং দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশনের কাছে জবাব চেয়ে নোটিস জারি করা হয়। অর্থাৎ, আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের নামে প্রশাসনের পদক্ষেপ কতটা আইনসঙ্গত ছিল, সেই প্রশ্ন এবার বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায়।তবে আদালতের হস্তক্ষেপের অর্থ এই নয় যে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যাখ্যা দেয় এবং আদালত পরবর্তী শুনানিতে কী অবস্থান নেয়।এদিকে আটক হওয়া CJP নেতাদের মুক্তির পর আন্দোলন থেমে যাওয়ার বদলে নতুন করে জোরদার করার বার্তা দিয়েছে সংগঠনটি। ১১ অক্টোবর তাদের তরফে দিল্লিতে সমর্থকদের অবস্থান বজায় রাখার আহ্বানও জানানো হয়। অর্থাৎ, পুলিশি পদক্ষেপে নির্দিষ্ট দিনের কর্মসূচি বাধাপ্রাপ্ত হলেও আন্দোলনের রাজনৈতিক বার্তা মুছে যায়নি। বরং ধরপাকড়, পরিবহণে বিধিনিষেধ এবং শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপ—এই তিনটি বিষয় আন্দোলনকে আরও বড় রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে নিয়ে এসেছে।এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা SIR-কে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ও শাসকপক্ষের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে অভিযোগ ও পাল্টা যুক্তির নিষ্পত্তি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, তথ্যপ্রমাণ এবং যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনার মাধ্যমেই হওয়া জরুরি।কিন্তু এখানেই উঠে আসছে আরও বড় প্রশ্ন—পুলিশি ব্যবস্থায় একটি আন্দোলনের দৃশ্যমান জমায়েত আটকে দেওয়া সম্ভব হলেও, তার পেছনে থাকা ক্ষোভ ও রাজনৈতিক প্রশ্নকে কি আটকে রাখা যায়? প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে কোনও নির্দিষ্ট দিনের বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করা যেতে পারে, কিন্তু তাতে আন্দোলনের দাবিগুলির উত্তর দেওয়া হয়ে যায় না। আবার আন্দোলনকারীদেরও জনসমর্থন ধরে রাখতে হলে অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্পষ্ট দাবি এবং শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।আর এই জায়গাতেই বিরোধীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ককরোচ জনতা পার্টির মতো প্রচলিত রাজনীতির বাইরে থাকা একটি সংগঠন যদি তরুণদের মধ্যে ক্ষোভকে সংগঠিত প্রতিবাদের ভাষা দিতে পারে, তবে প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলগুলি কি সেই পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে? নাকি তারা এখনও বিবৃতি, স্মারকলিপি, সাংবাদিক সম্মেলন এবং প্রতীকী কর্মসূচির পুরনো ছকেই আটকে থাকবে?ইন্ডিয়া জোটের নেতারা সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন ও আন্দোলন ঘিরে তাঁদের উদ্বেগ তুলে ধরার উদ্যোগ নিলে, সেটিও এই বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে। তবে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া এবং রাজপথে জনসমর্থন তৈরি করা—দুটি আলাদা কাজ। একটির জন্য প্রয়োজন আইনি যুক্তি ও প্রমাণ, অন্যটির জন্য দরকার ধারাবাহিক জনসংযোগ, সংগঠন এবং বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব।সুতরাং, ১০ অক্টোবরের দিল্লি পর্বে প্রশাসন সাময়িকভাবে বিক্ষোভের বিস্তার আটকে দিতে পেরেছে কি না, সেটাই শেষ কথা নয়। আসল পরীক্ষা এখন তিন পক্ষের—প্রশাসনকে ব্যাখ্যা করতে হবে বিধিনিষেধের আইনগত ভিত্তি, আন্দোলনকারীদের প্রমাণ করতে হবে তাঁদের অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা, আর বিরোধীদের দেখাতে হবে তাঁরা এই ক্ষোভকে দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার মতো রাজনৈতিক সক্ষমতা রাখেন কি না।কারণ গণতন্ত্রে রাজপথের লড়াই কেবল জমায়েতের সংখ্যায় জেতা যায় না, আবার প্রশাসনিক বাধা দিয়েও সমস্ত প্রশ্নের অবসান ঘটানো যায় না। শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হয়ে ওঠে জনসমর্থন, প্রমাণ এবং সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন।দিল্লির যন্তর মন্তরে তাই লড়াই শুধু একটি বিক্ষোভের নয়—লড়াই প্রতিবাদের অধিকার, ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়েও।

আয়ের চেয়ে বাড়ে ব্যয়: সংকটের মুখে সাধারণ মানুষের অর্থনীতি

বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা বর্তমানে এক বড় ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। এই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে দেশের লাখ লাখ সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন বাজেটের টানাপোড়েন। বর্তমান সময়ে নীতি-নির্ধারকদের আলোচনা, গবেষণা প্রতিবেদন এবং সংবাদপত্রের পাতায় মূল্যস্ফীতির শতাংশ, প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস, আর্থিক খাতের সংস্কার কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিসংখ্যান প্রাধান্য পেয়ে থাকে। কিন্তু যেকোনো অর্থনৈতিক নীতি ও পুনরুদ্ধারের আসল এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল পরীক্ষাটি সাধিত হয় সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তবে। দেশের আপামর নাগরিক নিজেদের জমানো সঞ্চয় নিঃশেষ না করে, ঋণের জালে জড়িয়ে না পড়ে কিংবা দৈনন্দিন খাদ্য গ্রহণ না কমিয়ে তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা, বাসস্থান ও যাতায়াত ব্যয় নির্বাহ করতে পারছেন কি না—সেটিই হলো একটি সফল অর্থনীতির মূল মানদণ্ড। যখন দেখা যায় মানুষের আয় অর্জনের সক্ষমতা জীবনধারণের নিত্যনতুন ব্যয়ের হারের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে, তখন অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার সমস্ত চড়া মাশুল শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে দেশের সীমিত ও নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোর ঘাড়েই।পরিসংখ্যানের খতিয়ান এই অশুভ ও উদ্বেগের চিত্রটিকেই স্পষ্ট করে তুলে ধরছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ তথ্য ও হালনাগাদ মজুরি সূচক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও মৌলিক পরিষেবার দাম যে গতিতে বাড়ছে, সাধারণ শ্রমজীবী ও চাকরিজীবীদের পারিশ্রমিক বা মজুরি বৃদ্ধির হার তার সাথে কোনোভাবেই তাল মেলাতে পারছে না। পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতের ব্যয় বৃদ্ধি যখন লাগামহীন রূপ নেয়, তখন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় হতে থাকে। যদিও পরিসংখ্যানের পাতায় মূল্যস্ফীতির হারে সাময়িক সামান্য হ্রাস-বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে, তবে তার অর্থ এই নয় যে বাজারে পণ্য বা সেবার দাম বাস্তবে কমে গেছে। এর অর্থ কেবল এটাই যে দাম বাড়ার গতিটি সাময়িকভাবে কিছুটা ধীর হয়েছে। যে পরিবারগুলো ইতিমধ্যেই অতিপ্রয়োজনীয় ভোগ ছাঁটাই করেছে, পূর্বের জমানো টাকা খরচ করে ফেলেছে কিংবা ধারদেনা করে দিনাতিপাত করছে, মূল্যস্ফীতির সামান্য মন্দা তাদের জীবনে কোনো তাৎক্ষণিক স্বস্তি নিয়ে আসে না। প্রকৃত আয় বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ক্রয়ক্ষমতার এই অবক্ষয় থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।এই সংকটের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সমাজের সব শ্রেণীতে সমানভাবে পড়ে না, বরং এর বণ্টন অত্যন্ত অসম। উচ্চ এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ক্রমবর্ধমান খরচের ধাক্কা সামলাতে তাদের সঞ্চয়, পূর্ববর্তী বিনিয়োগ কিংবা অপ্রয়োজনীয় ভোগ কাটছাঁট করার সুযোগ পায়। কিন্তু নিম্ন-আয়, নির্দিষ্ট আয় এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী পরিবারগুলোর জন্য এই সুযোগ একদমই অনুপস্থিত। কারণ তাদের অর্জিত মোট আয়ের সিংহভাগই ব্যয় করতে হয় স্রেফ বেঁচে থাকার মৌলিক রসদ—যেমন চাল, ডাল, তেল, বাসা ভাড়া, ওষুধ এবং সন্তানদের স্কুলের বেতন মেটাতে। পণ্য নির্বাচনের ক্ষেত্র পরিবর্তন করে সস্তা বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ বা গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা ও পড়াশোনার খরচ অনিশ্চিতকালের জন্য স্থগিত রাখার সামর্থ্য তাদের থাকে না। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও একই চরম সত্য ফুটে উঠেছে—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উপার্জনের স্থবিরতার দরুন দেশের কোটি কোটি মানুষ নতুন করে দারিদ্রে‍্যর দিকে ঢলে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি কৃত্রিম বা সুবিধাজনক সূচক দিয়ে এই পারিবারিক ও সামাজিক সংকটকে আড়াল করা সম্ভব নয়।পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা কেবল কোনো দাতব্য বা সামাজিক কল্যাণমূলক বিষয় নয়, এটি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল রাখার প্রাথমিক শর্ত। যখন সাধারণ মানুষের পকেটে বাড়তি টাকা থাকে না বা প্রকৃত আয় কমে যায়, তখন তারা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বন্ধ করতে বাধ্য হন। এর ফলে তারা পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় কমাতে বাধ্য হন—যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় মানবসম্পদের গুণগত মান ও উৎপাদনশীলতা বিনষ্ট করে। পাশাপাশি, অভ্যন্তরীণ বাজারে সার্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্ষুদ্র খুচরা বিক্রেতা, স্থানীয় উৎপাদক, হস্তশিল্পজীবী ও ক্ষুদ্র সেবা প্রদানকারীরা। বাজারে বিক্রি কমে গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে, যার ফলে নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন না এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী ছাঁটাই বা কাজের সময় কমাতে বাধ্য হয়। এর ফলে বাজারে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং যারা কর্মরত আছেন তারাও চাকরি হারানোর চরম অনিশ্চয়তায় ভোগেন। এভাবে মূলধনের ঘাটতি এবং চাহিদার পতন একে অপরকে উসকে দিয়ে এক মারাত্মক ক্ষতিকর অর্থনৈতিক চক্রের জন্ম দেয়।বাংলাদেশের শ্রমবাজারের দিকে তাকালে দেখা যায়, এ দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী অনানুষ্ঠানিক খাত, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র পারিবারিক ব্যবসা কিংবা স্বকর্মসংস্থানের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। সরকারি গড় মজুরি সূচক বা প্রাতিষ্ঠানিক খাতের বেতনের তথ্য দিয়ে এই অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের কাজের অনিশ্চয়তা পুরোপুরি পরিমাপ করা যায় না। আবহাওয়া, ঋতুভিত্তিক কাজের সুযোগ কিংবা স্থানীয় বাজারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দিনমজুরদের আয় প্রতিদিন ওঠানামা করে। অনানুষ্ঠানিক খাতের কোনো শ্রমিক কাজ হারালে বা অসুস্থ হলে তার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক সুরক্ষা বা বেকারত্ব ভাতার সুযোগ থাকে না। পরের দিনের আয় নিশ্চিত হবে কি না—এই মানসিক দুশ্চিন্তার সাথে যখন জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতি যোগ হয়, তখন পারিবারিক জীবন চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। এর সাথে গৃহস্থালি ও সামাজিকভাবে নারীদের ওপর পড়া বাড়তি চাপের বিষয়টিও সংযুক্ত। পরিবারের আয় কমে গেলে বা কেউ বেকার হয়ে পড়লে সেই আর্থিক টানাটানির ধকল সবচেয়ে বেশি সামলাতে হয় নারীদের। তাদের অবৈতনিক সেবা শ্রম বেড়ে যায়, খাবারের পাতিল থেকে নারীদের নিজেদের পুষ্টি কাটছাঁট করতে হয় এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় বড় ধরনের আঘাত আসে।আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, কেবল সুদের হার বাড়িয়ে বা কঠোর মুদ্রানীতি প্রয়োগ করে এই মূল্যস্ফীতির প্রতিটি উৎস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে হয়তো বাজারে ঋণের প্রবাহ ও সামগ্রিক চাহিদায় কিছুটা টান ধরতে পারে, কিন্তু সুদের হার বৃদ্ধি একা কোনো কৃষি পণ্যের পচনশীলতা ঠেকাতে পারে না, সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থার তোলাবাজি বা যাতায়াত খরচ কমাতে পারে না, কিংবা বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধ করতে পারে না। মুদ্রানীতি রাতারাতি কোনো উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানও তৈরি করতে পারে না। তাই নীতিনির্ধারকদের চাহিদাজনিত চাপ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রেখে নীতি কৌশল সাজাতে হবে। বিশেষ করে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের বাজারে সরবরাহের ঘাটতি, পচনশীল পণ্যের হিমাগার অবকাঠামোর অভাব, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লোটার অপচেষ্টাগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। পাইকারি ও খুচরা মূল্যের ব্যবধান নিয়মিত তদারকি করা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে আইনি ক্ষমতার সঠিক ও ধারাবাহিক প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।একই সাথে, আমদানি নীতির ক্ষেত্রেও বিচক্ষণ সময়জ্ঞান ও সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। দেশীয় সরবরাহ যখন চাহিদার তুলনায় কমে যায়, তখন সময়মতো সুনির্দিষ্ট আমদানি শুল্ক ছাড় বা বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করে বাজার স্থিতিশীল রাখা যেতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ায় যেন দেশের কৃষক বা স্থানীয় উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। বাজারের ওপর যেকোনো ধরনের স্বেচ্ছাচারী প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বা হঠাৎ জারি করা কোনো বিধিনিষেধ উল্টো বৈধ ও সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। অসাধু সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ নীতি, নির্ভুল বাজার তথ্য এবং ধারাবাহিক আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগ।একটি টেকসই অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য দরকার মজুরি এবং উৎপাদনশীলতার মধ্যে সুষম সমন্বয়। নিছক নামমাত্র মজুরি বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে যদি না উৎপাদনশীলতা বাড়ে। তবে যেখানে জ্বালানি, গ্যাস, পরিবহন এবং কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে শিল্প ও ক্ষুদ্র কারখানাগুলোর উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে, সেখানে কারখানা মালিকদের পক্ষেও হঠাৎ শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই জটিলতা কাটাতে সরকারকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে বিশেষ প্রণোদনা, আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা, স্বল্প সুদে ঋণ এবং অবকাঠামোগত সুবিধা দিতে হবে, যাতে তারা নিজেদের কার্যক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে কর্মীদের উপযুক্ত মজুরি প্রদানে সক্ষম হয়। পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সরাসরি শিল্পকারখানার বাস্তব চাহিদার সাথে যুক্ত করতে হবে, যাতে তরুণরা কাজ পাওয়ার সাথে সাথে উপযুক্ত পারিশ্রমিক অর্জনে সক্ষম হয়ে ওঠে।সার্বিক স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা পর্যন্ত দেশের অসচ্ছল, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী টিকিয়ে রাখা জরুরি। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঠিক সুবিধাভোগী নির্বাচন সুনিশ্চিত করা, প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় খাদ্য সহায়তা কিংবা সরাসরি নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। পর্যাপ্ত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসম্পন্ন শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে পরিবারগুলোর পকেট থেকে বের হয়ে যাওয়া অতিরিক্ত চিকিৎসা ও পড়াশোনার খরচ এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে আসে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।আমরা বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা বা আন্তর্জাতিক পণ্যের দামের উর্ধ্বগতি থেকে বাংলাদেশকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখতে পারব না, তবে দেশের ভেতরের বাজার পরিচালনা, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং সীমিত আয়ের মানুষকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে আমাদের অভ্যন্তরীণ নীতির বিষয়। পরিশেষে, একটি দেশের অর্থনৈতিক নীতি ও প্রবৃদ্ধির সাফল্য কেবল নথিপত্রের পরিসংখ্যান বা প্রবৃদ্ধির অঙ্কে মাপা যায় না। যারা এই অর্থনীতির চাকা প্রতিনিয়ত সচল রাখেন—সেই সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, খাদ্য সুরক্ষা ও পারিবারিক বাজেটে শান্তি ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই সেই সাফল্যের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।]

ধান চাষে গুটি ইউরিয়া কেন নয়?

ইউরিয়া সার বিশ্বব্যাপী ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত অত্যাবশ্যকীয় রাসায়নিক সারগুলোর একটি। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ফসল উৎপাদনে ১৭ কোটি ৭০ লাখ থেকে ১৭ কোটি ৯০ লাখ টন ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়েছে। একই বছর বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি টন ধান উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টন ইউরিয়া সার। এর মধ্যে ২০ থেকে ২২ লাখ টন সার আমদানি করতে হয়েছে। সরকার প্রতি টন সার ৩৭৯ দশমিক ৫০ থেকে ৪১৮ দশমিক ৩৩ ডলার দরে আমদানি করেছে। ফলে ২০ থেকে ২২ লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা। সাধারণ পদ্ধতিতে জমিতে ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দিলে এর বড় একটি অংশ গাছের কাজে লাগে না; বরং বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ দেশে ইউরিয়া সারের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার একটি পরীক্ষিত প্রযুক্তি রয়েছে, যার নাম গুটি ইউরিয়া। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইউরিয়া সারের অপচয় ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব। সে হিসাবে বছরে প্রায় ৬ লাখ টন ইউরিয়া সার সাশ্রয় হতে পারে, যার আমদানি মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।ইউরিয়া সার মাটির গভীরে প্রয়োগের এই প্রযুক্তি ধান চাষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জলবায়ুবান্ধব পদ্ধতি। এটি গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন, বিশেষ করে মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের নির্গমন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে পারে। একই সঙ্গে নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ায় এবং ধানের ফলন বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে। জমিতে চারা রোপণের ৭ থেকে ১০ দিন পর মাটির ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার গভীরে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করা হয়। প্রতি চারটি ধানের গোছার জন্য ২ দশমিক ৭ গ্রাম ওজনের একটি গুটি ব্যবহার করা হয়। এতে এক বিঘা জমিতে প্রায় ২৪ কেজি গুটি ইউরিয়া লাগে এবং সাধারণত দ্বিতীয়বার ইউরিয়া সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। মাটির গভীরে গুটি স্থাপন করায় সার থেকে নাইট্রোজেন ধীরে ধীরে নিঃসৃত হয়। ফলে ধানের গাছ দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন পায়। এতে নাইট্রোজেনের ঘাটতি কমে, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ভালো হয়, কার্যকর কুশি ও শীষের সংখ্যা বাড়ে এবং ধানের দানা পুষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে ফলন বাড়তে পারে। গুটি ইউরিয়ার ব্যবহারে নাইট্রোজেন সারের অপচয় কমে এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবও হ্রাস পায়।বাংলাদেশের কৃষির অগ্রগতিতে সবচেয়ে বড় অবদান দেশের পরিশ্রমী কৃষকদের। তারা অনেক সময় নিজেদের প্রয়োজন উপেক্ষা করে ফসল উৎপাদনের উপকরণ কেনেন। অথচ উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হন। এই বাস্তবতায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর কার্যকর প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত নির্দেশিকায় গুটি ইউরিয়ার উল্লেখ থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রচার ও সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন ওঠে, গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার বাড়লে ইউরিয়া সারের মৌসুমভিত্তিক সংকট ও অতিরিক্ত চাহিদা কমতে পারে বলে কি এর সম্প্রসারণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না? তবে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, কৃষকের কাছে কার্যকর প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হলে তারা তা ব্যবহার করতে আগ্রহী হন। গুটি ইউরিয়ার ক্ষেত্রেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।একসময় কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে আইএফডিসি পাঁচ বছর মেয়াদি এগ্রো-বেইজড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পটির সময়কাল ছিল সম্ভবত ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল। সে সময় দেশের বিভিন্ন এলাকার সার ডিলারদের কাছে গুটি ইউরিয়া তৈরির যন্ত্র ছিল এবং এ জন্য তারা বিশেষ বরাদ্দে ইউরিয়া সার পেতেন। কিন্তু যথাযথ তদারকির অভাবে বরাদ্দ করা সারের বড় অংশ গুটি তৈরি না করে গুঁড়া সার হিসেবে বিক্রি করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কৃষকের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তির ব্যবহার কমে যায়। বর্তমানে দেশের অনেক এলাকায় গুটি ইউরিয়া সহজে পাওয়া যায় না। তাই আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কৃষকেরা এটি ব্যবহারের সুযোগ পান না। তবে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানকার কৃষকেরা বহু বছর ধরে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করছেন। তাদের চাহিদার কারণে বাজারটির কয়েকটি গুটি তৈরির যন্ত্র এখনো চালু রয়েছে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একবার গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করলে বারবার সার কেনার ঝামেলা কমে। তাদের অভিজ্ঞতায়, আগাছা কম হওয়ায় নিড়ানির শ্রম ও খরচও কম লাগে এবং ধানের ফলন ভালো হয়।বাংলাদেশে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের অন্যতম উৎস কৃষি। দেশের মোট নির্গমনে কৃষির অবদান প্রায় ৩৯ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিবিড় ধান চাষ, সার ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত নাইট্রোজেনযুক্ত সার ব্যবহার এবং জমিতে দীর্ঘ সময় পানি ধরে রাখা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৪-১৫ সালে ধান চাষের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়েছিল। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ কৃষি থেকে নির্গমনের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৭ কোটি ৬৭ লাখ ৯০ হাজার টন এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১০ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতিতে নাইট্রোজেন সারের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানোর পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানের আওতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে স্বাভাবিক প্রবণতার তুলনায় গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকার করেছে। এর মধ্যে ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ নিঃশর্ত এবং ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ আন্তর্জাতিক সহায়তা সাপেক্ষে অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। কৃষিতে গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার সম্প্রসারণ এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে। এতে সার আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, ধানের ফলন বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।দুঃখজনক হলেও সত্য, গুটি ইউরিয়ার উপকারিতা সম্পর্কে কৃষকদের অভিজ্ঞতা থাকলেও সরকারি পর্যায়ে এর সম্প্রসারণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ধানের মৌসুমে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ইউরিয়া সার কেনার অভিযোগও রয়েছে। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। সঠিক হিসাব ও ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা প্রয়োজন, গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে সাশ্রয় হওয়া অর্থ দিয়ে কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় বিনা মূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে এই সার সরবরাহ করা সম্ভব কি না। এ জন্য প্রথমেই এলেঙ্গা বাজারে গুটি ইউরিয়া তৈরির কার্যক্রম পরিদর্শন, ব্যবহারকারী কৃষকদের অভিজ্ঞতা যাচাই এবং বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা দরকার। গবেষণায় এর কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত হলে সরকারকে উৎপাদন, সরবরাহ ও প্রয়োগব্যবস্থা সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে সার উৎপাদন ও বিতরণে স্বচ্ছতা এবং যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের স্বার্থ, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় গুটি ইউরিয়ার মতো কার্যকর প্রযুক্তিকে কৃষিনীতি ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এর মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, সার আমদানিতে সাশ্রয় এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হতে পারে।[লেখক: কৃষিবিদ]

যৌতুক ও নারী নির্যাতন মামলা: সাক্ষ্য-প্রমাণের গুরুত্ব

আমাদের সমাজে পারিবারিক কলহ, বিশেষ করে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাকের পর, অনেক সময় ফৌজদারি মামলার রূপ নেয়। যৌতুক নিরোধ আইন বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো নারীদের সুরক্ষার জন্য তৈরি হলেও, কখনো কখনো এসব আইন ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে আদালত ও আইন একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে কীভাবে সুরক্ষা দেয়?ধরা যাক, ‘ক’ ও ‘খ’ নামে এক দম্পতির দীর্ঘদিনের সংসারে কলহ চলছিল। একপর্যায়ে স্বামী ‘ক’ তার স্ত্রী ‘খ’-কে তালাক দেন এবং তা যথাযথভাবে ডাকযোগে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে ও স্ত্রীর ঠিকানায় পাঠান। তালাকের প্রায় এক মাস পর ‘খ’ একটি মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ করা হয়, তালাকের দিনই তাকে যৌতুকের দাবিতে নির্মমভাবে মারধর করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।সাক্ষীরা একে অপরের বক্তব্যের সঙ্গে মিল রাখতে পারেননি; ঘটনার সময় ও তারিখ নিয়ে পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন।কোনো প্রতিবেশী বা নিরপেক্ষ সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তারা সবাই বাদিনীর নিকটাত্মীয়।চিকিৎসাসনদে নাম, বয়স ও অন্যান্য তথ্যে গরমিল পাওয়া যায়। যিনি রোগীকে শনাক্ত করেছেন, তিনি বাদী বা আসামি কারও প্রতিবেশীও নন।তদন্ত প্রতিবেদনে যৌতুক দাবির নির্দিষ্ট তারিখ বা সময় উল্লেখ নেই।এজাহার দায়েরে দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছে, যার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নেই।আসামিপক্ষ তালাকের বৈধ কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করেছেন, যা বাদীপক্ষ অস্বীকার করতে পারেননি।এমন পরিস্থিতিতে ফৌজদারি বিচারের প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলো কী বলে?১. আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর একটি হলো—সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক আসামিকে নির্দোষ বলে গণ্য করতে হবে। বিচারের প্রতিটি পর্যায়ে এই নীতি অনুসরণ করতে হয় (৪২ ডিএলআর ৩১, আপিল বিভাগ)।২. বিচারকার্যে আবেগ, অনুভূতি বা ব্যক্তিগত ধারণার কোনো স্থান নেই। ন্যায়বিচার অন্ধ—এখানে কেবল আইন ও নথিতে থাকা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় (১৮ বিএলটি ৪৬৫, আপিল বিভাগ)।৩. যখন মামলার সব সাক্ষীই বাদীপক্ষের আত্মীয়স্বজন এবং কোনো নিরপেক্ষ বা স্বার্থহীন সাক্ষীকে জেরা করে পরীক্ষা করা হয় না, তখন আদালত ওই সাক্ষ্য সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করেন। প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো—স্বার্থযুক্ত সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা দেওয়ার আগে সমর্থনকারী প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে হয়। আদালতের দায়িত্ব শুধু সাজা নিশ্চিত করা নয়, বরং প্রয়োজনে খালাস দেওয়াও (৪৮ ডিএলআর ১৮৪)।আইন আরও বলে, একজন অভিযোগকারী বা সংবাদদাতাও স্বার্থযুক্ত সাক্ষী হতে পারেন। স্বতন্ত্র ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দ্বারা তার বক্তব্য সমর্থিত না হলে তা সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন (৪৪ ডিএলআর ৫৫৪)।৪. সাক্ষীদের বক্তব্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অমিল, পরস্পরবিরোধিতা বা প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি থাকলে আসামি ‘সন্দেহের সুবিধা’ পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন। অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলে তাকে খালাস দেওয়া হয় (৪৩ ডিএলআর ৬, আপিল বিভাগ)।৫. ঘটনার পর সন্তোষজনক কারণ ছাড়া এজাহার দায়েরে বিলম্ব হলে আদালত তা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করেন। বিলম্বের সময় অভিযোগের কাহিনি সাজানো হয়ে থাকতে পারে কি না, তা-ও যাচাই করা হয় (৪৪ ডিএলআর ৪৯২)।৬. আসামিপক্ষের বক্তব্য, যেমন তালাকের ঘটনা, সম্পূর্ণ অকাট্যভাবে প্রমাণিত না হলেও তা যদি যুক্তিসংগতভাবে সত্য বলে বিবেচিত হতে পারে, তাহলে মামলার সামগ্রিক অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে আসামি সন্দেহের সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন। এটি করুণা নয়, বরং তার আইনগত অধিকার (৭ বিএলটি ০৩)।৭. সন্দেহ যতই তীব্র হোক না কেন, তা কখনো প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না। সামান্য বা ক্ষীণ সন্দেহের ভিত্তিতে নয়, বরং অভিযোগের বিষয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ থেকে গেলে আসামি খালাস পাওয়ার অধিকারী হন (৭ বিএলডি, আপিল বিভাগ, ২৬৫)।একটি ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ আনাই যথেষ্ট নয়; তা আইন ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রপক্ষের। যেখানে সাক্ষীরা পরস্পরবিরোধী কথা বলেন, স্বতন্ত্র সাক্ষী অনুপস্থিত থাকেন, চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রমাণে অসংগতি থাকে এবং এজাহার দায়েরে অস্বাভাবিক বিলম্ব ঘটে, সেখানে আদালতকে সব প্রমাণ সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করতে হয়। অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলে আসামি সন্দেহের সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হন।এই নীতিগুলো নারী নির্যাতনবিরোধী আইনের গুরুত্ব কমায় না; বরং নিশ্চিত করে যে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা যেমন ন্যায়বিচার পান, তেমনি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো নিরপরাধ ব্যক্তিও যেন অন্যায়ভাবে দণ্ডিত না হন। ন্যায়বিচার একটি পবিত্র দায়িত্ব। তা কেবল আইন, প্রমাণ ও যুক্তির নিরিখেই সম্পন্ন হতে পারে, আবেগ বা পূর্বধারণার ভিত্তিতে নয়।[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

বিশ্বমঞ্চে ভাষণ: রাজনীতি, অর্থনীতি ও বাস্তবতা

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকেই সবচেয়ে আলোচিত খবরটি এল মঞ্চের বাইরে থেকে। নিউইয়র্কের গ্র‍্যান্ড হায়াত হোটেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সম্পূরক চুক্তি করল। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখলেন, বাংলাদেশ ও তুরস্ক মিলে ১১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা বোয়িংয়ের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক দিন’। এই বোয়িং কেনার ঘটনাই বলে দেয়, জাতিসংঘে ভাষণের চেয়ে করিডরে বাণিজ্যিক দর-কষাকষি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। তবে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়ে ভাষাটিকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ, লুটপাট ও অর্থ পাচারে দেশ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে এবং ২০২৪ সালে দেশ মুক্ত হয়েছে। দেশ মেরামতে তার সরকার তিন ‘আর’ কৌশল নিয়েছে—রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন। তার বাবা জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং মা খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে একই মঞ্চে ভাষণ দিয়েছিলেন। তাই এটি তার পরিবারের তৃতীয় ভাষণ। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন, যা প্রাসঙ্গিক। বক্তব্যের আবেগ ও প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে।আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার নিয়ে ভাষণে উত্থাপিত অভিযোগ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানেরা কতটা গুরুত্ব দিয়ে শুনেছেন, তা জানা যায়নি। ফখরুদ্দীন সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও কথিত আয়নাঘরে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন। তাই আয়নাঘরের সংস্কৃতি যে বহু পুরোনো, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি থানাই যেন একেকটি আয়নাঘর। রিমান্ডের নামে নির্যাতন করে কথা আদায়ের যে প্রক্রিয়া চলে, তা নিয়ে উচ্চ আদালতও একাধিকবার অভিমত প্রকাশ করেছেন এবং সরকারকে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন—স্বচ্ছ কাচে ঘেরা কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চিকিৎসক ও আইনজীবীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা। কিন্তু কোনো সরকারই এসব পরামর্শ বাস্তবায়ন করেনি। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান যদি রাজনৈতিক কারণে গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা চিরতরে বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা নেন এবং হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করেন, তাহলে তা হবে ঐতিহাসিক। জনগণ সেটাই প্রত্যাশা করে।প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ক্ষতবিক্ষত হওয়ার বক্তব্যটি তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে মেলে না। বিএনপি সরকারের সর্বশেষ ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাজেট ছিল মাত্র ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮-০৯ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিএনপি সরকারই সেই বাজেট করেছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। দেশের অর্থনীতি ক্ষতবিক্ষত হলে ১ লাখ কোটি টাকার বাজেট ১৭ বছর পর ৯ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাল কীভাবে? এই শক্ত ভিত কি  ইউনূসের ১৮ মাস এবং বিএনপির সাত মাসে তৈরি হয়েছে? হয়নি। বিএনপির ২০০৬-০৭ অর্থবছরে জিডিপি ছিল ৭০ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের শেষ প্রান্তে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। মাথাপিছু আয় ৬১০ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৩৮ ডলারে। বাংলাদেশের এই অগ্রগতিকে জাতিসংঘ, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম উন্নয়নের মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই উন্নয়ন হয়নি, শুধু অর্থনীতি ক্ষতবিক্ষত হয়েছে—এমন বক্তব্য বাস্তবসম্মত নয়। এমনকি  ইউনূসের সরকারের শ্বেতপত্রেও স্বীকার করা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত সব মানদণ্ড পূরণ করেছে।ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিষয়ও প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের প্রশ্নে সরকারের দ্বিচারিতা পরিহার করা জরুরি। বাংলাদেশে দুর্নীতি না কমার একটি কারণ হলো, দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে কোনো সরকারই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেনি। বিএনপির আমলেই দেশ টানা পাঁচবার দুর্নীতিতে শীর্ষে ছিল, যা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন,  ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিচারের পাশাপাশি  ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপির আমলের দুর্নীতিরও বিচার হওয়া জরুরি। এমন নিরপেক্ষ ও নির্মোহ পদক্ষেপ নেওয়া হলে ভবিষ্যতে কেউ দুর্নীতি ও অর্থ পাচার করতে দ্বিতীয়বার ভাববে। তাছাড়া জনগণ দল ও দলের প্রতীকে ভোট দেয়, আর রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতিবাজদের মনোনয়ন দেয়। এ কারণেও দুর্নীতি কমে না, বরং বাড়ে।জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কম ভাষণ দেওয়া হয়নি। কিন্তু এসব ভাষণে বাংলাদেশের দৃশ্যমান কোনো উপকার হয়েছে বলে মনে হয় না। অধিবেশনের অধিকাংশ আসনই ফাঁকা থাকে। গতানুগতিক বক্তব্য শোনার চেয়ে অধিবেশনের ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের গুরুত্ব অনেক বেশি। সাধারণ পরিষদে গৃহীত সব সিদ্ধান্ত সদস্যদেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলকও নয়। তাই অনেক সমালোচক এই অধিবেশনকে জাতিসংঘ নামের বিনোদন ক্লাবে সরকারপ্রধানদের বনভোজন কিংবা বিশ্বনেতাদের বার্ষিক মহামিলন ও কূটনৈতিক মহোৎসব হিসেবে অভিহিত করেন। এবারও সেই বাস্তবতা দেখা গেছে।পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ৫ সেপ্টেম্বর সিলেটে বলেছিলেন, জাতিসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। পরে ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে তিনিই জানান, এবার আলাদা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগ নেই। দুই হাত দূরে থেকেও ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক না হওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। তবে বৈঠক একেবারেই হয়নি, তা নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী কুয়েতের যুবরাজ, ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘের মহাসচিব এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিরাট বহর সঙ্গে না নেওয়ার জন্য তাকে প্রশংসা করতে হয়। তারপরও এতজনকে সঙ্গে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল কি না, সে প্রশ্ন থেকে যায়।শেষ বিচারে ভাষণটি ছিল রাজনৈতিক ঘোষণা, অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র নয়। ফ্যাসিবাদের আখ্যান এক অংশকে উদ্বুদ্ধ করবে, কিন্তু অর্থনীতির অগ্রগতির ভিত অস্বীকার করলে বিনিয়োগকারীদের কাছে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে। তাই প্রতিহিংসা নয়, ভারসাম্য দরকার। সব আমলের গুম-খুন ও দুর্নীতির বিচার হোক, আয়নাঘর ও রিমান্ডে নির্যাতন বন্ধ হোক, অর্থ পাচার কমুক, দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করুক। তা না হলে ভাষণ কাগজেই থেকে যাবে, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটবে না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

কৃষকের লাভ নিশ্চিত করতে বদলাতে হবে বিপণনব্যবস্থা

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে যখন আমরা কথা বলি, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেশার মানুষ হিসেবে কৃষক ও প্রান্তিক খামারিদের কথা সবার আগে বলা উচিত। খাদ্য উৎপাদনের মূল কারিগর সেই কৃষক ও খামারিরাই আজ নানা কারণে কৃষিপেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। পেশা ছেড়ে তারা চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। কেন তারা দীর্ঘদিনের পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন, নাকি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন—এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। তাদের জমি আছে, শ্রম আছে, প্রযুক্তি আছে, উৎপাদনের সক্ষমতাও আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উৎপাদন করে কৃষক শেষ পর্যন্ত কতটা লাভ করছেন? এই প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক না হলে শুধু কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।আমাদের দেশের কৃষির বড় সংকট উৎপাদনে নয়, বরং কৃষি উৎপাদনের সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। একজন কৃষক যখন ধান, সবজি, ফল, মাছ, দুধ, ডিম, মাংস কিংবা অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন করেন, তখন তাকে বীজ, সার, সেচ, বিদ্যুৎ, শ্রম, ওষুধ, গবাদিপশুর খাদ্য, জমির ভাড়া, যন্ত্রপাতি ও পরিবহনে অর্থ ব্যয় করতে হয়। অথচ উৎপাদন শেষে বাজারে তার পণ্যের মূল্য নির্ধারণে নিয়ন্ত্রণ থাকে খুবই সীমিত। বিশেষ করে পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে কৃষককে দ্রুত বিক্রি করতে হয়। তাদের কাছে পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা নেই। অনেক সময় মহাজনি ঋণ বা ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি পরিশোধের তাড়া কিংবা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন মেটাতে নগদ অর্থের দরকার হয়। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র কৃষক ও খামারিরা একই সময়ে নতুন ফলন বাজারে নিয়ে আসেন। ফলে সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচের কাছাকাছি, কখনো তারও কম দামে পণ্য বিক্রি করতে তারা বাধ্য হন।যুগ যুগ ধরে এখানেই বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির বড় বৈপরীত্য। কৃষক কম দামে পণ্য বিক্রি করছেন, অথচ একই পণ্য শহরের ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অবশ্যই পুরো ব্যবধানকে মধ্যস্বত্বভোগী বা মৌসুমি ফড়িয়ার মুনাফা হিসেবে দেখলে বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। পরিবহন, বাছাই, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, টোলের খরচ, পথে পথে অনৈতিক চাঁদা আদায় এবং খুচরা বিক্রিরও ব্যয় রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের এই মূল্যশৃঙ্খল কতটা দক্ষ, স্বচ্ছ এবং কৃষক ও ভোক্তা—উভয়ের জন্য ন্যায্য? এখানেই দেশের কৃষি উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থার সংস্কারের বড় সুযোগ রয়েছে।সাম্প্রতিক সময়ে কৃষকের কৃষিপেশা ত্যাগের প্রবণতার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং তাদের কৃষিতে ফেরানোর বিষয়টি নতুনভাবে ভাবতে হচ্ছে। কৃষিকে শুধু একটি পেশা হিসেবে নয়, লাভজনক ব্যবসা ও বিনিয়োগের খাত হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ জাতীয় উন্নয়ননীতিতে অগ্রাধিকার পাওয়া জরুরি। একজন কৃষক যেন উৎপাদনের আগেই জানতে পারেন—কী ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদন করবেন, কতটা উৎপাদন করবেন, বাজারে তার সম্ভাব্য চাহিদা কত এবং সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য কত হতে পারে। অর্থাৎ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষক, খামারি ও উৎপাদনকারীদের ‘আগে উৎপাদন, পরে বাজার খোঁজা’ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পিত উৎপাদনব্যবস্থায় যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংগঠিত কৃষক ও উৎপাদক গোষ্ঠী, সমবায় এবং চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একক কৃষকের পক্ষে বড় ক্রেতার সঙ্গে দর-কষাকষি করা কঠিন। কিন্তু কয়েক শ কৃষক যদি সমবায় বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে একই মান বজায় রেখে নির্ধারিত পরিমাণে ও নির্দিষ্ট সময়ে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারেন, তাহলে তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। অন্যদিকে বড় ক্রেতারাও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ পাবেন। কৃষক ও বাজারের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি হলে উৎপাদনের ঝুঁকি কমবে এবং দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বিপণনে দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠবে।বাংলাদেশের কৃষকের আয় বাড়ানোর আরেকটি বড় পথ হলো উৎপাদিত পণ্যে মূল্য সংযোজন। কৃষক শুধু কাঁচা পণ্য বিক্রি করবেন—এই ধারণা বদলাতে হবে। ফল, সবজি, আলু, মসলা, মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমসহ প্রায় প্রতিটি কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেই গ্রেডিং, বাছাই, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত মূল্য সৃষ্টি করা সম্ভব। কৃষক বা কৃষক সংগঠন—সমবায় কিংবা উৎপাদক গোষ্ঠী—যদি এই মূল্যশৃঙ্খলের অংশীদার হতে পারেন, তাহলে উৎপাদনের পাশাপাশি মূল্য সংযোজন থেকেও আয় করতে পারবেন। এতে প্রান্তিক কৃষক ও খামারিদের আয় বাড়বে।সমবায় বা গোষ্ঠীভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণনের জন্য হিমাগারসহ শীতল সরবরাহব্যবস্থা, আধুনিক গুদাম, সাইলো, প্যাকহাউস, গ্রেডিং সেন্টার, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, ফসল তোলার আগে ও পরে মান নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক পরিবহনকে কৃষি অবকাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের একটি অংশ বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয় বা মান হারায়। এই অপচয় কৃষকের আয় কমায় এবং ভোক্তার জন্য দাম বাড়ায়। তাই ফসল তোলার পরবর্তী ব্যবস্থাপনা উন্নত করলে একই সঙ্গে কৃষকের আয় বাড়ানো এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব।কৃষকের জন্য একটি কার্যকর কৃষিপণ্যের মূল্য সুরক্ষা কাঠামোও প্রয়োজন। এর অর্থ এই নয় যে সরকার প্রতিটি পণ্যের বাজারদর নির্ধারণ করে দেবে। বরং উৎপাদন ব্যয়, যুক্তিসংগত মুনাফা, বাজারের চাহিদা, সরবরাহ পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি ও মৌসুমি পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে নির্ভরযোগ্য ও তাৎক্ষণিক মূল্যতথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। কৃষককে নিয়মিত বাজারদর, সম্ভাব্য চাহিদা এবং উৎপাদন পরিকল্পনার তথ্য দিতে হবে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বাজারদর তথ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় কৃষিপণ্যের রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় কৃষিনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। বাংলাদেশের কৃষিকে শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভরশীল রাখলে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো কোনো পণ্যের অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়ে দাম পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই শাকসবজি, ফল, আলু, মসলা, মাছ, চিংড়ি, মাংস, ডিম, দুগ্ধজাত পণ্য এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের জন্য নতুন আন্তর্জাতিক বাজার খুঁজে বের করতে হবে। শুধু কাঁচা পণ্য নয়, মূল্য সংযোজিত ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এতে একই পরিমাণ কৃষি উৎপাদন থেকে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।রপ্তানি বাজারের সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনাকেও যুক্ত করতে হবে। কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা রয়েছে, কী মানের পণ্য প্রয়োজন, কী ধরনের প্যাকেজিং ও সনদ দরকার—এসব তথ্য কৃষকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। রপ্তানিকারক, কৃষক সংগঠন বা সমবায়, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে রপ্তানিমুখী চুক্তিভিত্তিক কৃষি উৎপাদন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বিশ্ববাজারে প্রবেশের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক নির্ধারিত মান ও পরিমাণ অনুযায়ী উৎপাদন করবেন, রপ্তানিকারক বাজার নিশ্চিত করবেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মান নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের উৎস অনুসরণযোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। এতে কৃষক উৎপাদনের আগেই বাজার সম্পর্কে ধারণা পাবেন।বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর বাজারও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় খাদ্যপণ্যের চাহিদা রয়েছে। এমন সম্ভাবনাময় বাজারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য নিরাপদ, পণ্যের উৎস অনুসরণযোগ্য, মানসম্মত ও সনদপ্রাপ্ত পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।এ ক্ষেত্রে কৃষি ও শিল্পনীতির মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ জরুরি। কৃষক মাঠে উৎপাদন করবেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পৌঁছাতে প্রয়োজন হবে আধুনিক প্যাকহাউস, শীতল সরবরাহব্যবস্থা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরীক্ষাগার, আন্তর্জাতিক মানের সনদ, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা এবং রপ্তানি অর্থায়ন। অর্থাৎ কৃষিকে শুধু মাঠের অর্থনীতি হিসেবে নয়, খামার থেকে রপ্তানি পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সমন্বিত মূল্যশৃঙ্খল হিসেবে দেখতে হবে।কৃষকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, রোগবালাই, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাজারমূল্যের আকস্মিক পতন—এসব ঝুঁকি কৃষকের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। কৃষিবিমা, আবহাওয়ার তথ্য, আগাম বাজারসংকেত, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং দুর্যোগের পর দ্রুত অর্থায়নের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। কৃষককে শুধু উৎপাদনের প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না; ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ, বাজার বিশ্লেষণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও চুক্তি ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণও দিতে হবে।কৃষিতে তরুণদের ফিরিয়ে আনতেও এই পরিবর্তন জরুরি। আধুনিক কৃষি মানে শুধু জমিতে চাষ করা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষিপ্রযুক্তি, যান্ত্রিকীকরণ, তথ্য-উপাত্ত, অনলাইন বাণিজ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সরবরাহব্যবস্থা, ব্র্যান্ডিং, রপ্তানি ও কৃষিভিত্তিক পর্যটন। একজন তরুণ নিজে কৃষক না হয়েও কৃষকের পণ্য সংগ্রহ, গ্রেডিং, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও বিপণনের উদ্যোক্তা হতে পারেন। এভাবেই বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রামীণ ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে।কৃষকের আয় বাড়ানো শুধু তার ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতিরও স্বার্থ। কৃষকের হাতে আয় বাড়লে গ্রামীণ বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটবে, পরিবহন ও সেবাখাতের চাহিদা বাড়বে এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটবে। অর্থাৎ কৃষকের মুনাফা গ্রামীণ অর্থনীতিতে পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ জনপদে কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে কৃষককে করুণা নয়, অর্থনৈতিক মর্যাদা দিতে হবে। কৃষকের সক্ষমতা ও ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে হবে। তাকে শুধু ভর্তুকি বা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল করে রাখলে চলবে না; এমন একটি বাজার তৈরি করতে হবে, যেখানে তিনি উৎপাদন খরচ জানবেন, বাজারের চাহিদা বুঝবেন এবং যুক্তিসংগত মুনাফায় পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। সরকার গড়ে তুলবে অবকাঠামো, তথ্য, গবেষণা ও প্রযুক্তির সুবিধা এবং দেবে নীতিগত সহায়তা। বেসরকারি খাত তৈরি করবে বাজার ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ। আর কৃষক সংগঠিত হয়ে উৎপাদন, পণ্যের গুণগত মান ও সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াবেন।বাংলাদেশকে তাই এখন শুধু কৃষককে কৃষিতে ফেরানোর কর্মসূচি নয়, বরং লাভজনক কৃষিতে তার প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার জাতীয় কর্মসূচি নিয়ে ভাবতে হবে। কৃষককে শুধু জমিতে ফিরিয়ে দিলেই হবে না, তাকে লাভজনক বাজারে ফিরিয়ে আনতে হবে। তার বাজার যেন গ্রামের হাটে সীমাবদ্ধ না থাকে; তার বাজার হবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক। উৎপাদনের ঝুঁকি যদি কৃষকের হয়, তবে বাজারে মূল্য সংযোজনের সুযোগও তার হাতে থাকতে হবে।কৃষকের শ্রম ও পুঁজি খাদ্য উৎপাদন করে। কিন্তু সেই উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য যেন তার হাতেই ফিরে আসে। এই ভারসাম্যই হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতির শক্ত ভিত এবং কৃষিভিত্তিক জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।[লেখক: গ্রিন সার্কুলার ইকোনমি বিশেষজ্ঞ]

শরতের উৎসব, বাংলার সর্বজনীন পরিচয়

বাংলার ঋতুচক্রে শরৎ কেবল একটি ঋতু নয়; এটি একটি মনস্তত্ত্ব, একটি সামগ্রিক অনুভূতি। দীর্ঘ তিন মাসের বর্ষার কর্দমাক্ত, রুদ্ধ ও অনেকটা স্থবির জীবন পেরিয়ে যখন আকাশে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ ভাসতে শুরু করে, নদীর ধূসর চরে সাদা কাশফুল মাথা দোলায়, ভোরের বাতাস শিউলির মিষ্টি গন্ধে ভরে ওঠে এবং দূর্বাঘাসের ডগায় শিশির জমে, তখন বাঙালি মাত্রই বুঝতে পারে, মা আসছেন। শারদীয় দুর্গোৎসব তাই কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাংলার প্রকৃতি, কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের এক সামগ্রিক উদযাপন। এই উৎসবের সর্বজনীনতা বুঝতে হলে তাকে শুধু আলোকসজ্জায় সজ্জিত মণ্ডপের ভেতরে খুঁজলে চলবে না; খুঁজতে হবে ধানখেতে, কুমোরের উঠোনে, তাঁতির মাকুতে, বাজারের ভিড়ে এবং মানুষের আনন্দে।এই উৎসবের সবচেয়ে বড় শক্তি এর সর্বজনীন দর্শন। দুর্গাপূজার সঙ্গে ‘সর্বজনীন’ শব্দটি এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে তা আলাদা করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলায় বারোয়ারি পূজার সূচনা হয়েছিল জাতিভেদপ্রথা ও জমিদারদের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙার একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারোজন বন্ধু চাঁদা তুলে যে পূজার আয়োজন করেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল—পূজা কোনো জমিদারের ব্যক্তিগত বৈভব প্রদর্শনের ক্ষেত্র নয়; এটি সবার, সবার জন্য। সেই চেতনা আজ ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। দুর্গোৎসব ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে সাংস্কৃতিক মহামিলনে পরিণত হয়েছে। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে কলকাতার কুমোরটুলি, রাজশাহীর প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে চট্টগ্রামের শহরাঞ্চল—বিভিন্ন স্থানে মণ্ডপ তৈরিতে বাঁশের কাজ করেন মুসলমান কারিগর, প্রতিমার খড়ের কাঠামো বাঁধেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কারিগর, আর মণ্ডপের আলোকসজ্জা ও সাজসজ্জার কাজে যুক্ত হন নানা ধর্মের মানুষ। পূজার ভোগ রান্না থেকে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায় পারস্পরিক সহযোগিতা। দর্শনার্থীদের সারিতে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আরতি দেখেন। এই দৃশ্য বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক হলো নারীশক্তির আরাধনা। দুর্গা এখানে কেবল দশভুজা অসুরদলনী দেবী নন; তিনি কন্যা, তিনি মা, যিনি বছরে একবার বাপের বাড়িতে আসেন। বাংলার পারিবারিক পরিসরে কন্যাসন্তানকে যে স্নেহ ও সম্মানের সঙ্গে দেখা হয়, দেবী দুর্গার মধ্যেও সেই আবেগের প্রতিফলন ঘটে। তাই এই উৎসব নারীর প্রতি সম্মান, শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং মাতৃত্বের প্রতি ভালোবাসারও এক সামাজিক প্রকাশ।শরতের প্রকৃতি এই উৎসবের একটি অপরিহার্য প্রেক্ষাপট তৈরি করে। শরৎকে এমনি এমনি ঋতুরানি বলা হয় না; এর পেছনে রয়েছে জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য ও নান্দনিকতার সম্মিলন। বর্ষার পর অনেক সময় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমে আসে, আকাশ হয়ে ওঠে নির্মল ও গভীর নীল। নদীর চরে কাশফুল ফোটে, বিলে শাপলা ও পদ্ম দেখা যায়, ভোরে ঘাসের ওপর জমে শিশির। এসব প্রাকৃতিক উপাদান দুর্গাপূজার আয়োজনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। বর্ষাকালে কাদামাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি ও শুকানো কঠিন হলেও শরতের রোদে তা তুলনামূলক সহজ হয়। নদীর পানি কমে এলে কোথাও কোথাও পলিমাটি সংগ্রহ করাও সহজ হয়। গ্রামীণ বাংলায় খাল-বিলের পদ্ম ও শাপলা ফুল পূজার সাজসজ্জায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্রকৃতি যেন নিজেই উৎসবের আয়োজন সাজিয়ে দেয়। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শরৎকালেও অসময়ে ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক ঝড়ের ঘটনা ঘটছে। অনেক এলাকায় কাশবন কমে যাচ্ছে, নদী ভরাট হচ্ছে। আকস্মিক বৃষ্টিতে মণ্ডপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং প্রতিমা তৈরিতে বিলম্বের ঘটনাও ঘটে। তাই শারদীয় উৎসবের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে শরতের প্রকৃতি রক্ষা করা জরুরি। নদী ও বিল রক্ষা, কাশবন সংরক্ষণ এবং পদ্মবিলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এখন শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের উৎসব ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা।বাংলার কৃষকের কাছে শরৎ আশা ও শঙ্কার যুগপৎ সময়। মাঠে তখন আমন ধান। ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে আমন ধানের বৃদ্ধি, ফুল ফোটা ও শিষ গঠনের বিভিন্ন পর্যায় চলে। এ সময় কৃষক সারা বছরের শ্রম ও স্বপ্ন নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। একটি ভারী বৃষ্টি, ঝড় কিংবা বন্যা তাঁর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। কৃষির এই বাস্তবতার সঙ্গে দুর্গাপূজার সময়ের সম্পর্ক রয়েছে, যদিও উৎসবটিকে সরাসরি ফসল তোলার উৎসব হিসেবে চিহ্নিত করা পুরোপুরি যথাযথ নয়। বাংলার কৃষিজীবনের সঙ্গে শারদীয় উৎসবের সম্পর্ক বহুদিনের। নবান্নের আগমুহূর্তে নতুন ফসলের প্রত্যাশা, ভালো ফলনের প্রার্থনা এবং উৎসবের আয়োজন গ্রামীণ জীবনে এক বিশেষ আবহ তৈরি করে। ভালো ফসল হলে কৃষকের হাতে অর্থ আসে, আর্থিক স্বস্তি বাড়ে এবং উৎসবের খরচ বহন করাও তুলনামূলক সহজ হয়। আজও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব দেখা যায়। আমন ধান কাটার মৌসুমের আগে-পরে কৃষকের আয়, ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের জন্য নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য কৃষি উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। একই সময়ে বাজারে নানা ধরনের মৌসুমি সবজির সরবরাহ বাড়ে। এই কৃষিকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড স্থানীয় বাজারকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখে। শরৎ তাই শুধু দেবীর আগমনের বার্তা নয়; কৃষকের ঘরেও সম্ভাব্য সমৃদ্ধির প্রত্যাশা নিয়ে আসে। ধানের শিষে যখন দোলা লাগে, তখন ঢাকের বাদ্যিও যেন সেই দোলায় তাল মেলায়।অর্থনীতির দৃষ্টিতে দুর্গাপূজা একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড। একে অনেক সময় ‘উৎসব অর্থনীতি’ বলা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজাকে ঘিরে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন গবেষণায় এই অর্থনীতির বড় আকারের কথা উঠে এসেছে। বাংলাদেশেও দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। এই অর্থনীতির বিস্তার ও গভীরতা বোঝা যায় এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পেশার মানুষের দিকে তাকালে। একজন মৃৎশিল্পী সারা বছর অপেক্ষা করেন পূজার মৌসুমের জন্য। তাঁর সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকেন খড়, বাঁশ ও মাটি সরবরাহকারী, মাটি কাটার শ্রমিক এবং রং বিক্রেতারা। ঢাকার ধামরাই, রাজশাহীর বানেশ্বর, যশোর ও চট্টগ্রামের পটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এই শিল্প বহু পরিবারের জীবিকার উৎস। বস্ত্র ও ফ্যাশন খাতেও পূজার প্রভাব রয়েছে। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদীর তাঁতপল্লিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ সময় পোশাক তৈরির কাজ বাড়ে। পূজাকে সামনে রেখে অনেকে নতুন পোশাক কেনেন। ঢাক, আলোকসজ্জা, মণ্ডপ নির্মাণ ও শব্দব্যবস্থাপনার কাজেও বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়। পূজার দিনগুলোতে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ফুল, মিষ্টি ও প্রসাধনসামগ্রীর ব্যবসায়ও লেনদেন বাড়ে। মানুষ ঘর থেকে বের হন, কেনাকাটা করেন, খাওয়াদাওয়া করেন এবং বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যান। এই বাড়তি চাহিদা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করে। এই অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এর সুফল বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও। গ্রামের কুমোর, শহরের দর্জি, ফুটপাতের চা বিক্রেতা ও রিকশাচালক—অনেকেই এই উৎসবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে উপকৃত হন। তাই দুর্গাপূজা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের পাশাপাশি বহু মানুষের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিতেও শরৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বর্ষার পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হতে পারে। ফলে এ সময় ডেঙ্গুর ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া ও বিভিন্ন চর্মরোগের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় দুর্গাপূজার আয়োজনের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম যুক্ত করা যেতে পারে। মণ্ডপের আশপাশে জমে থাকা পানি, ফেলে দেওয়া খাবারের পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল ও ডাবের খোসায় পানি জমলে তা মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে। তাই নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা জরুরি। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যের একটি ইতিবাচক দিক হলো মানসিক সুস্থতা। বর্ষার একঘেয়েমি ও দীর্ঘ সময় ঘরবন্দী থাকার পর শরতের উৎসব মানুষকে ঘরের বাইরে আসার, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার এবং সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ দেয়। সামাজিক মেলামেশা, সম্মিলিত আনন্দ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের মানসিক প্রশান্তিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের মিলন, পরিবারের সদস্যদের পুনর্মিলন এবং বন্ধুদের আড্ডা মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক হতে পারে। এ কারণে দুর্গাপূজাকে শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে নয়, সামাজিক সুস্থতা ও পারস্পরিক সংযোগের উপলক্ষ হিসেবেও দেখা যায়। এ সময় স্বাস্থ্য বিভাগের করণীয় হলো বড় মণ্ডপগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ নিশ্চিত করা, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো এবং জনসমাগমস্থলে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখতে আয়োজকদের সহায়তা করা।শেষ পর্যন্ত শারদীয় দুর্গোৎসব এমন এক আয়না, যেখানে বাংলার প্রকৃত মুখ প্রতিফলিত হয়। সেই আয়নায় আছে শরতের নীল আকাশ, আমন ধানের সবুজ মাঠ, কুমোরের হাতে গড়া প্রতিমা, নতুন পোশাকের আনন্দ এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আরতি দেখার অপূর্ব দৃশ্য। এই উৎসবকে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে দেখলে এর সঙ্গে যুক্ত বাংলার কৃষি, অর্থনীতি, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির বিস্তৃত সম্পর্ক উপেক্ষিত থেকে যায়। রাষ্ট্রের উচিত এই উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এর সঙ্গে যুক্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিল্প ও জীবিকাকে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া। মনে রাখতে হবে, নদী বাঁচলে কাশফুল বাঁচবে, কাশফুল বাঁচলে শরতের সৌন্দর্য টিকে থাকবে, আর প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান বজায় থাকলেই বাঙালির এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব তার সব রং নিয়ে বিকশিত হবে।[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]

রাতে পুলিশের একা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, কী বার্তা দিচ্ছে?

খুলনায় ছিনতাইকারীদের হামলায় এক পুলিশ পরিদর্শক গুরুতর আহত হওয়ার পর রাতে একা চলাচল না করতে সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছে জেলা পুলিশ। পুলিশের নিজেদের নিরাপত্তায় নেওয়া এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।প্রশ্ন উঠছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই যদি রাতে একা চলাচলে নিরাপত্তাঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?খুলনা জেলা পুলিশের নির্দেশনাটি মূলত সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু এর প্রভাব পুলিশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জননিরাপত্তা, পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা, রাতে চলাচল এবং অপরাধ দমনে পুলিশের সক্ষমতা—সবকিছুর সঙ্গেই বিষয়টি সম্পর্কিত।সাধারণের নিরাপত্তাহীনতা বাড়বেপুলিশের কাজ অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া। সেই পুলিশের সদস্যদেরই রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশ দেওয়া হলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে—রাস্তাঘাটে নিরাপত্তার পরিস্থিতি কি এতটাই খারাপ?বিশেষ করে রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরা শ্রমজীবী মানুষ, দোকানকর্মী, পরিবহনশ্রমিক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশার মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে পারে। যাদের জীবিকার প্রয়োজনে রাতেও বাইরে থাকতে হয়, তাদের জন্য এই বার্তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ।তবে পুলিশের অভ্যন্তরীণ একটি নির্দেশনাই পুরো এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চূড়ান্ত চিত্র নয়। বাস্তবে অপরাধের হার, ছিনতাইয়ের স্থান ও সময়, পুলিশের টহল এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারের তথ্য বিশ্লেষণ করেই পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হবে।রাতের জীবিকায় প্রভাব পড়বেশহরের অর্থনীতি শুধু দিনের বেলায় চলে না। রাতের দোকান, খাবারের ব্যবসা, পরিবহন, হাসপাতাল, নিরাপত্তাসেবা এবং বিভিন্ন জরুরি পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাজের সময়ও অনেক ক্ষেত্রে রাত পর্যন্ত বিস্তৃত।রাতে ছিনতাই ও হামলার আশঙ্কা বাড়লে মানুষ অপ্রয়োজনে বাইরে যাওয়া কমাতে পারেন। এতে রাতের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার জন্য অতিরিক্ত পরিবহন খরচ, বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা কিংবা পরিচিত কারও সঙ্গে ফেরার প্রয়োজন তৈরি হতে পারে।বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে এসব বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া সব সময় সম্ভব নয়। তাই রাতে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে তার প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। যাদের হাতে অর্থ ও যাতায়াতের বিকল্প কম, তারাই বেশি বিপাকে পড়তে পারেন।পুলিশের নিরাপত্তা জননিরাপত্তার অংশখুলনায় পুলিশ পরিদর্শকের ওপর হামলার পর জেলা পুলিশের সতর্কতা অযৌক্তিক নয়। দায়িত্ব পালন শেষে একজন পুলিশ সদস্য যেন অপরাধীর হামলার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্ব।কিন্তু এই ব্যবস্থা যদি শুধু পুলিশ সদস্যদের চলাচল সীমিত করার মধ্যে আটকে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটির সমাধান হবে না। বরং ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে কোথায়, কখন এবং কীভাবে ছিনতাই হচ্ছে, তা শনাক্ত করা জরুরি।রাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল বাড়ানো, ছিনতাইপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা, সড়কের আলো নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা, সন্দেহভাজন অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং দ্রুত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তায় একা চলাচল এড়িয়ে চলার পাশাপাশি এসব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও বাড়তে পারে।পুলিশের প্রতি আস্থার প্রশ্নজননিরাপত্তার ক্ষেত্রে শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, মানুষ নিজেকে কতটা নিরাপদ মনে করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা বা তাদের চলাচলে সতর্কতা জারি করা প্রশাসনের দায়িত্বশীলতার পরিচয় হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এ ধরনের নির্দেশনার পেছনের পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকলে মানুষের মধ্যে আতঙ্কও তৈরি হতে পারে।খুলনা জেলা পুলিশ বলেছে, এটি মূলত সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দেওয়া অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা। ফলে নির্দেশনাটিকে পুলিশ প্রশাসনের অসহায়ত্বের স্বীকারোক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে পুলিশের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া সতর্কতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। মানুষ যদি দেখেন, ছিনতাইয়ের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত হচ্ছে, অপরাধীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুলিশের কার্যকর উপস্থিতি রয়েছে, তাহলে তাদের আস্থা বাড়বে।অপরাধ দমনে প্রয়োজন ধারাবাহিক ব্যবস্থাখুলনা জেলা পুলিশ গত ৬ অক্টোবর থেকে অপরাধী গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। এর আগে রূপসায় জয় ঢালী হত্যার দেড় মাস পর তার বাবা আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দিঘলিয়ার ফরমাইশখানা এলাকায় চায়ের দোকানে গুলি করে একজনকে হত্যার ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।এসব ঘটনার সঙ্গে ছিনতাইয়ের ঘটনাকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। প্রতিটি অপরাধের কারণ, ধরন ও অপরাধীদের পরিচয় আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে একের পর এক গুরুতর অপরাধের ঘটনায় এলাকাবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।বিশেষ অভিযান সাময়িকভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ দমনে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, দ্রুত তদন্ত, অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের বিচার এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি।খুলনা জেলা পুলিশের রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশনাকে শুধু পুলিশের অভ্যন্তরীণ সতর্কতা হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর তাৎপর্য উপেক্ষিত হতে পারে। আবার এই নির্দেশনা থেকেই পুরো খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।তবে একজন পুলিশ পরিদর্শক যদি দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের হামলায় গুরুতর আহত হন, তাহলে ঘটনাটি অবশ্যই জননিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। পুলিশের নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একই জননিরাপত্তা ব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।পুলিশের সদস্যদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ যেন রাতে নিরাপদে চলাচল করতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা দেওয়াও প্রশাসনের দায়িত্ব। শেষ পর্যন্ত নির্দেশনা নয়, অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং মানুষের নিরাপদ চলাচলই পুলিশের সক্ষমতা ও জনআস্থার প্রকৃত পরীক্ষা।

তরুণ শ্রমিকের শোভন কাজ ও শ্রমবাজার

সভ্যতার ইতিহাস মূলত মানুষের শ্রমের ইতিহাস। কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন, শ্রমিক কারখানা সচল রাখেন, নির্মাণশ্রমিক শহর গড়ে তোলেন, পরিবহনশ্রমিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। গৃহশ্রমিক পরিবার ও নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেন। পোশাকশ্রমিক বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখেন। রিকশাচালক, হকার, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, মৎস্যজীবী ও ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করা তরুণেরাও অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ। অথচ তাদের অনেকেই নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। এই বাস্তবতায় বিশ্ব শোভন কর্ম দিবসের গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।প্রতিবছর ৭ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শোভন কর্ম দিবস। শ্রমিকের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। শোভন কাজ বলতে শুধু কর্মসংস্থান বোঝায় না। এমন কাজকে শোভন বলা যায়, যেখানে ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপত্তা, বৈষম্যহীন পরিবেশ, অধিকার চর্চার স্বাধীনতা এবং অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, বার্ধক্য কিংবা কর্মহীনতার সময়ে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত থাকে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ১৯৯৯ সালে শোভন কাজের ধারণাকে বৈশ্বিক শ্রমনীতির গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে সামনে আনে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অষ্টম লক্ষ্যেও শোভন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।তরুণ শ্রমিকের ভবিষ্যৎতরুণেরা শ্রমবাজারের বড় সম্ভাবনা। কিন্তু তাদের অনেকেই কর্মজীবনের শুরুতেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। স্থায়ী চাকরির বদলে অস্থায়ী কাজ, কম মজুরি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং সামাজিক সুরক্ষাহীন কর্মসংস্থান তাদের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত তরুণদের অনেকে দীর্ঘদিন চাকরি খুঁজেও কাজ পাচ্ছেন না। আবার কাজ পেলেও অনেকে যোগ্যতা অনুযায়ী মজুরি বা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না।তাই শুধু কতজনের কর্মসংস্থান হয়েছে, তা দিয়ে শ্রমবাজারের প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। কাজের মানও বিবেচনায় নিতে হবে। দীর্ঘ সময় কাজ করেও যদি একজন তরুণের আয় দিয়ে খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব না হয়, তবে সেই কর্মসংস্থানকে শোভন বলা যায় না। চাকরি হারালে আর্থিক সহায়তা না পাওয়া কিংবা কর্মক্ষেত্রে অন্যায়ের প্রতিকার করতে না পারাও অনিশ্চয়তার লক্ষণ। এসব সমস্যা সমাধানকে শ্রমনীতির অগ্রাধিকার দিতে হবে।বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সংকটবাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন, পোশাক ও সেবা খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করেন। কিন্তু শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। তাদের অনেকের লিখিত নিয়োগপত্র নেই, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত নয়, নিয়মিত মজুরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই এবং সামাজিক সুরক্ষাও সীমিত। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে অনেকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ পান না। অসুস্থতা বা কর্মক্ষমতা হারালে পুরো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে।এই পরিস্থিতি শ্রমিকের ব্যক্তিগত দুর্ভোগের পাশাপাশি অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর। শ্রমজীবী মানুষের আয় অনিশ্চিত হলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে। এতে বাজারে চাহিদা ও উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তাই শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা একটি শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি।জীবনযাপনের উপযোগী মজুরিন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করলেই শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হয় না। মজুরি এমন হতে হবে, যাতে শ্রমিক নিজের ও পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারেন। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত ও পোশাকের ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা নিয়মিত পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।শহরাঞ্চলে বাসাভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে শ্রমিকের প্রকৃত আয় কমে যায়। কাগজে মজুরি বাড়লেও মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে জীবনমানের উন্নতি ঘটে না। তাই মজুরি নির্ধারণে শিল্পের সক্ষমতার পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়ও বিবেচনা করতে হবে।শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকারশ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার শোভন কাজের অন্যতম শর্ত। একজন শ্রমিকের পক্ষে একা মালিকের সঙ্গে দরকষাকষি করা কঠিন। সংগঠিত শ্রমিকেরা সম্মিলিতভাবে তাদের দাবি তুলতে পারেন এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করতে পারেন।শ্রমিক সংগঠন শুধু মজুরি বৃদ্ধির জন্য নয়; কর্মঘণ্টা, ছুটি, নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও বৈষম্য প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সংগঠন গঠনে বাধা, চাকরি হারানোর ভয়, মালিকপক্ষের বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকের স্বাধীনতা সীমিত করে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হবে। স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল শ্রমিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হলে শ্রমিক-মালিক বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ বাড়বে।শোভন কাজের সঙ্গে গণতন্ত্রেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শ্রমিকের মতপ্রকাশ ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত না হলে কর্মক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে ওঠে না। মজুরি নির্ধারণ, শ্রম আইন সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে শ্রমিক প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে। সরকার, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে নিয়মিত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।নারী ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের সুরক্ষাবাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারী শ্রমিকের অবদান অপরিসীম। বিশেষ করে পোশাকশিল্প ও সেবা খাতে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মজুরি ও পদোন্নতিতে বৈষম্য, যৌন হয়রানি, নিরাপদ যাতায়াতের অভাব এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধার সীমাবদ্ধতা এখনো তাদের জন্য বড় বাধা। এসব দূর করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।একইভাবে হকার, রিকশাচালক, গৃহশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, বর্জ্য সংগ্রহকারী ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করা মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের জন্য সহজ নিবন্ধন, পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্ঘটনা বিমা, পেনশন ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। অনানুষ্ঠানিক খাতকে এক দিনে আনুষ্ঠানিক করা সম্ভব নয়। তবে ধাপে ধাপে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব।প্রযুক্তির পরিবর্তন ও নতুন কর্মসংস্থানকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও ডিজিটাল প্রযুক্তি শ্রমবাজারের ধরন বদলে দিচ্ছে। কিছু প্রচলিত কাজ কমে যেতে পারে, আবার নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। পোশাকশিল্প, ব্যাংকিং, হিসাবরক্ষণ, পরিবহন ও প্রশাসনিক কাজে প্রযুক্তির প্রভাব বাড়ছে। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল বিপণন ও অনলাইন শিক্ষায় নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।এই পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের সক্ষম করে তোলা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তরুণদের কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রচলিত কাজ হারানোর ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকদের নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করা তরুণদের ক্ষেত্রেও সুরক্ষা জরুরি। যাঁরা যাত্রী পরিবহন, খাবার সরবরাহ কিংবা অনলাইনভিত্তিক সেবা দেন, তাদের অনেকেই অসুস্থতা, দুর্ঘটনা ও কর্মহীনতার সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা পান না। নতুন কর্মসংস্থানের ধরন যেন শ্রমিকের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।শিশুশ্রম ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাদারিদ্র‍্য, পারিবারিক আয়সংকট ও সামাজিক সুরক্ষার অভাবে অনেক শিশু অল্প বয়সে শ্রমে যুক্ত হয়। শিশুশ্রম বন্ধ করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের সহায়তা, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের সরিয়ে আনা প্রয়োজন। বিদ্যালয়ে থাকার বয়সে শিশু শ্রমে যুক্ত হলে তার শৈশব নষ্ট হয় এবং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা প্রতিরোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারখানা, নির্মাণক্ষেত্র, পরিবহন ও কৃষিতে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ শ্রমিকের জীবন রক্ষা করে, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের করণীয়শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার ও যৌথ দরকষাকষির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা, নারী শ্রমিকের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা কোনো দয়া বা অনুদান নয়; এটি অধিকার। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, কর্মহীনতা ও বার্ধক্যের সময়ে শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, দুর্ঘটনা বিমা ও বার্ধক্যকালীন নিরাপত্তা ধাপে ধাপে বিস্তৃত করতে হবে।শোভন কাজ নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। মালিকদেরও ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন, আইনসম্মত ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকের মতামতের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিককে উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে নয়, প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। এতে শ্রমিকের আস্থা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে।গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও নাগরিক সমাজকেও শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে। শ্রমিকের অবদান ও অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরার পাশাপাশি ভালো কর্মপরিবেশের উদাহরণও সামনে আনতে হবে।অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যএকটি দেশের উন্নয়ন শুধু মাথাপিছু আয়, মোট দেশজ উৎপাদন কিংবা রপ্তানি দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে, উন্নয়নের সুফল শ্রমজীবী মানুষ কতটা পাচ্ছেন। তরুণেরা কতটা নিশ্চয়তার সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারছেন, নারী শ্রমিকের মর্যাদা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং অসুস্থ ও প্রবীণ শ্রমিকের জন্য কী সুরক্ষা রয়েছে—এসবও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।আমরা এমন উন্নয়ন চাই, যেখানে রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনমানও উন্নত হবে; প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে। এ জন্য তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, নীতিনির্ধারণ, শ্রমিক নেতৃত্ব ও সংগঠনের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাদের শ্রম অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া জরুরি।মানুষের শ্রমের মর্যাদা ছাড়া কোনো উন্নয়নই পূর্ণাঙ্গ নয়। একজন শ্রমিক শুধু উৎপাদনের সংখ্যা নন; তিনি একজন মানুষ, নাগরিক ও পরিবারের সদস্য। তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুল তরুণ শ্রমশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মীদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর শ্রম আইন, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, স্বাধীন শ্রমিক সংগঠন ও কার্যকর সামাজিক সংলাপ।তরুণ শ্রমিকদের সংগঠিত করার অর্থ শুধু মজুরি বা কর্মপরিবেশের উন্নয়ন নয়; নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তাদের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। আজকের তরুণ শ্রমিকেরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্মাণ করবেন। তাদের জন্য নিরাপদ, ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মজগৎ গড়ে তুলতে পারলেই শোভন কাজের অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হবে।শ্রমের মর্যাদা, বৈষম্য হ্রাস ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় শ্রমিক, মালিক ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অংশীদারত্ব গড়ে উঠুক। কাজ হোক শুধু জীবিকা অর্জনের উপায় নয়, মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। শোভন কাজ হোক সবার অধিকার, তরুণ শ্রমিকের কণ্ঠ হোক ভবিষ্যতের শক্তি।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]

ভিডিও আরও দেখুন

টি-টোয়েন্টিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়লেন অভিষেক শর্মা

ভারতের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নতুন এক ইতিহাস গড়েছেন মারকুটে ব্যাটার অভিষেক শর্মা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চলমান সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে ব্যাট হাতে ঝড় তুলে কেবল দলকেই জয় এনে দেননি, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুততম ২ হাজার রানের বিশ্ব রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন এই তরুণ। পেছনে ফেলেছেন সতীর্থ তারকা সূর্যকুমার যাদবকে।রবিবার (১১ অক্টোবর) ইন্দোরে সিরিজের তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে মাত্র ৩০ বলে ৬৯ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন অভিষেক। ১৮ বলে ফিফটি ছোঁয়ার পথে উইন্ডিজের বিপক্ষে যৌথভাবে তৃতীয় দ্রুততম অর্ধশতকের রেকর্ডও গড়েন তিনি। ম্যাচটিতে মাঠে নামার আগে দুই হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করতে তার প্রয়োজন ছিল মাত্র ৩৩ রান।এই রেকর্ড গড়তে অভিষেক খেলেছেন মাত্র ১ হাজার ২৪ বল। এর আগে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে দ্রুততম দুই হাজার রান করার ভারতীয় রেকর্ডটি ছিল সূর্যকুমার যাদবের দখলে, যিনি ১ হাজার ১৬৪ বল খেলে এই মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন। দুর্দান্ত এই অর্জনের মাধ্যমে রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, সূর্যকুমার যাদব, হার্দিক পান্ডিয়া ও লোকেশ রাহুলের মতো অভিজ্ঞদের গড়া ভারতের বিশেষ দুই হাজার রান সংগ্রাহকদের অভিজাত ক্লাবে নাম লেখালেন অভিষেক।চলতি বছরে দারুণ ছন্দে থাকা অভিষেক ৩২ ম্যাচে ৯২১ রান সংগ্রহ করেছেন, যার স্ট্রাইক রেট ২০৬.৫০। চলতি পঞ্জিকাবর্ষে ইতোমধ্যে তার ছক্কার সংখ্যা ৬৮টি, যা এক পঞ্জিকাবর্ষে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ভারতীয় হিসেবে সূর্যকুমার যাদবের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ। এছাড়া টি-টোয়েন্টির পাওয়ারপ্লেতে দারুণ সব ইনিংস খেলে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এই নিয়ে সপ্তমবারের মতো পাওয়ারপ্লে ওভারগুলোতে পঞ্চাশ বা তার বেশি রান করার কীর্তি গড়লেন এই ভারতীয় ওপেনার।

টি-টোয়েন্টিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়লেন অভিষেক শর্মা