সংবাদ

‘ডার্টি গেইম’ নাকি 'মাস্টারপ্ল্যান'?

আলজেরিয়াকে ২-০ ব্যবধানে হারানোর পর থেকেই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের প্রতিটি ম্যাচের স্কোরলাইন যেন এক মহাকাব্য। ৩-১, ৩-২ অনিন্দ্য সুন্দর এই সংখ্যাগুলো কেবলই ম্যাচের রেজাল্ট বুক। এভাবে ম্যাচ জেতাকে কেউ খারাপ বলবে না নিশ্চিত, কিন্তু কোটি কোটি আর্জেন্টাইন ভক্ত কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন; লিওনেল মেসিদের এই খেলায় তারা পুরোপুরি তৃপ্ত?মাঠের ফুটবলটা যেন রোজই ভক্তদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছে, রক্তচাপ তুঙ্গে তুলছে। প্রতি ম্যাচের ৭০ মিনিট পর্যন্ত দলটা মন্থর, আলসে। এক গোল করার পর ডিফেন্সিভ ব্লকের এমন এক দেয়াল তুলছে, যাকে ল্যাটিন ফুটবলের চিরায়ত ছন্দ বা ‘ট্যাঙ্গো’ বলা চলে না। ভক্তদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়ে মনে হয়, এই বুঝি গোল হজম করল আলবিসেলেস্তেরা!কিন্তু ঠিক শেষ ১৫-২০ মিনিটে ছড়ায় আসল বারুদ। শেষ মুহূর্তের সেই বিধ্বংসী কাউন্টার অ্যাটাকে খড়কুটোর মতো উড়ে যায় প্রতিপক্ষ। মিশর কিংবা কেপ ভার্দে ম্যাচের পর সবশেষ সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে কানসাস স্টেডিয়ামেও দেখা গেল সেই চেনা নাটক।তীব্র দাবদাহ ও স্কালোনির ‘ধীরে চলো’ নীতিডাগআউটে যখন ভ্যালেন্টিন বার্কো, নিকো পাজ কিংবা জুলিয়ানো সিমেওনের মতো তরুণ তুর্কিরা ঝলঝল করছেন, তখন কেন এই স্লো গেইম? কেন শুরু থেকেই অল-আউট অ্যাটাকে যাচ্ছে না আর্জেন্টিনা? উত্তর লুকিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র বৈরি আবহাওয়ায়। ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সেই উত্তপ্ত বাতাস আর দমবন্ধ করা গরমে মূলত নিজেদের এনার্জি প্রিজার্ভ বা শক্তি জমিয়ে রাখাই লিওনেল স্কালোনির মূল স্ট্র্যাটেজি।এটি টুর্নামেন্ট-বেইজড কোচের এক চরম মনস্তাত্ত্বিক খেলা। ম্যাচ বাই ম্যাচ প্রতিপক্ষকে রিড করা, তাদের শক্তি ক্ষয় হতে দেওয়া এবং ঠিক মোক্ষম সময়ে আঘাত করাই আর্জেন্টিনার বর্তমান দর্শন। কাতার বিশ্বকাপেও এই দলটা মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছিল। তবে এবার যেন তারা ব্লেডের ধারের ওপর দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস্য এক দাবা খেলছে মাঠে।সেই ২৯ সেকেন্ড, যা বদলে দিল কোয়ার্টার ফাইনালের ভাগ্যসুইসদের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ যখন ১-১ সমতায়, ঠিক তখনই দ্বিতীয় অধ্যায়ের হাইড্রেশন ব্রেকে জন্ম নেয় এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। কোচ লিওনেল স্কালোনি ও অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের মধ্যকার মাত্র ২৯ সেকেন্ডের একটি নিবিড় ট্যাকটিক্যাল আলোচনা ক্যামেরায় ধরা পড়ে, যা এখন নেটদুনিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল।১০ জনের সুইজারল্যান্ড তখন লো-ব্লকে রক্ষণ সামলাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে মাঠের পজিশনগত ত্রুটি নিয়ে কোচের মুখোমুখি হন পারেদেস। পারেদেস কোচকে বুঝিয়ে বলেন, “প্রতিপক্ষের সেন্টার-ব্যাক ডান প্রান্ত দিয়ে ওপরে উঠে আসছিল। আমি যখন ওই অঞ্চল কভার করতে যাচ্ছি, তখন মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি। সেখানে ওদের স্ট্রাইকার এমবোলোর পেছনে থাকা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার রিডার একদম আনমার্কড বা ফাঁকা থেকে যাচ্ছে।”স্কালোনি তখন নিজের ট্যাকটিক্স ধরে রাখতে পারেদেসকে অনুরোধ করে বলেন, “তোমার জন্য নির্ধারিত খেলোয়াড় ছাড়া অন্য কাউকে মার্ক করার প্রয়োজন নেই।”কিন্তু দলের ভারসাম্য ধরে রাখতে নাছোড়বান্দা পারেদেস জোর দিয়ে বলেন, “মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের একজন খেলোয়াড় সম্পূর্ণ ফাঁকা রয়ে যাচ্ছে।”পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে স্কালোনি তখন জিজ্ঞেস করেন, “আচ্ছা, তোমার কি একজন সেন্টার-ব্যাক প্রয়োজন?”পারেদেস মাথা নেড়ে সায় দিলে স্কালোনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা শেষ করেন, “আচ্ছা, তাহলে আমরা ওটাকে (নিকোলাস ওতামেন্দি) নামাচ্ছি।”কোচের এই দূরদর্শিতা আর অভিজ্ঞ শিষ্যের মাঠের রিডিং— দুইয়ের যুগলবন্দিতে অতিরিক্ত সময়ের শেষার্ধে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর বদলে মাঠে নামেন ওতামেন্দি। রক্ষণ নিরেট হতেই মাঝমাঠের ওপর চাপ কমে। আর ঠিক তার পরেই অতিরিক্ত সময়ে ‘স্পাইডার’ হুলিয়ান আলভারেজের বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া সেই চোখ ধাঁধানো লং রেঞ্জের কার্লিং শট এবং লাউতারো মার্তিনেজের ‘ঝোপ বুঝে কোপ’ মারা ফিনিশিংয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় কানসাস।দিনশেষে স্কালোনির এই তথাকথিত নিরেট রক্ষণাত্মক ফুটবল বা ডার্টি গেইমের শেষটা কিন্তু সেই চেনা চওড়া হাসিতেই শেষ হচ্ছে। দিন শেষে ট্রফিটাই আসল, আর ব্লেডের ধারে হেঁটে সেই জয় এনে দেওয়ায় ভক্তদের আক্ষেপ উবে যাচ্ছে আনন্দের জোয়ারে।

‘ডার্টি গেইম’ নাকি 'মাস্টারপ্ল্যান'?
ফ্রান্স ফ্রান্স
-
১৫ জুলাই - ০১ এএম
স্পেন স্পেন
ইংল্যান্ড ইংল্যান্ড
-
১৬ জুলাই - ০১ এএম
আর্জেন্টিনা আর্জেন্টিনা
ফাঁসির মঞ্চ থেকে ঐতিহ্যের কানন: ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’

ফাঁসির মঞ্চ থেকে ঐতিহ্যের কানন: ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’

চারদিকে সাতটি রাস্তার মিলনমেলা, যানবাহনের তীব্র হর্ন আর পুরান ঢাকার চিরচেনা কোলাহল। এই ব্যস্ততার ঠিক মাঝখানে, সদরঘাটের কোল ঘেঁষে লক্ষ্মীবাজারে দাঁড়িয়ে আছে এক জীর্ণ অথচ গর্বিত চত্বর। নাম তার ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’। ওপর থেকে দেখলে একে কেবলই একটি সাধারণ পার্ক বা নগরের ফুসফুস মনে হতে পারে। কিন্তু এই পার্কের প্রতিটি ইঞ্চি মাটির নিচে, প্রতিটি প্রাচীন গাছের শিকড়ে চাপা পড়ে আছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক ভয়াবহ, নির্মম আর রক্তভেজা দাস্তান। আন্টাঘর ময়দান থেকে ভিক্টোরিয়া পার্ক, আর সেখান থেকে আজকের বাহাদুর শাহ পার্ক হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে এক অবিশ্বাস্য ও ট্রাজিক ইতিহাস।আড্ডাখানা থেকে যেভাবে হলো জল্লাদখানাউনিশ শতকের শুরুর দিকের কথা। এই জায়গাটি তখন ছিল মূলত ঢাকায় বসবাসরত আর্মেনীয়দের সম্পত্তি। সেখানে তারা তৈরি করেছিলেন একটি বিলিয়ার্ড ক্লাব, যাকে স্থানীয় মানুষ ডাকত ‘আন্টাঘর’ নামে। ঢাকার নবাব খাজা আব্দুল গণি ও নবাব আহসান উল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় ইংরেজ সাহেবরা বিকেল হলেই এখানে জড়ো হতেন। চলত টেনিস আর ব্যাডমিন্টন খেলার আড্ডা।কিন্তু ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলো এক নিমেষে সব বদলে দিল। আজাদী আন্দোলনের অংশ হিসেবে লালবাগের কেল্লায় অবস্থানরত দেশীয় সিপাহীরা যখন বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন, তখন ইংরেজরা আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে তাদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করে। শুরু হয় এক অসম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।সেই যুদ্ধে পরাজিত ও বন্দি ১১ জন বীর সিপাহীকে এই আন্টাঘর ময়দানে নিয়ে আসা হয়। কোনো বিচার ছাড়াই, প্রকাশ্য দিবালোকে এই ময়দানের গাছের ডালে ফাঁসি দেওয়া হয় সেই অকুতোভয় বিপ্লবীদের। এখানেই শেষ নয়, সাধারণ মানুষের মনে ইংরেজদের প্রতি ভয় ও ত্রাস সৃষ্টি করতে দিনের পর দিন তাদের সেই রক্তাক্ত ও প্রাণহীন দেহগুলো গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে ঢাকাবাসী আতঙ্কে এই পথ দিয়ে হাঁটা ছেড়ে দিয়েছিলেন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল নানা ভৌতিক ও করুণ কাহিনী। পরবর্তীতে ১৮৫৮ সালে রানি ভিক্টোরিয়া যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসনভার নিজের হাতে নেন, তখন এই ময়দানেই রানির সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়েছিল। আর সেই উপলক্ষেই আন্টাঘর ময়দানের নাম বদলে রাখা হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’।মুঘল সম্রাটের নামে শহীদদের অমর স্মারকসময় বয়ে গেছে, কিন্তু বাঙালির বুকের ভেতরের সেই বিদ্রোহের আগুন কখনও নিভে যায়নি। বরং তা রূপ নিয়েছিল দেশপ্রেমের মশালে। ১৯৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের শতবার্ষিকী উপলক্ষে সেই বীর শহীদদের স্মৃতিকে চিরকাল অম্লান রাখতে পার্কটির নতুন নামকরণ করা হয় 'বাহাদুর শাহ পার্ক'। মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের নামানুসারে এই নামকরণ করা হয়, কারণ ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহীরা তাকেই স্বাধীন ভারতের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।পার্কের ভেতরে প্রবেশ করলেই আজও সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় চারটি পিলারের ওপর নির্মিত সেই অনন্য স্মৃতিসৌধকে। এটি কেবল কংক্রিটের কাঠামো নয়, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই অকুতোভয় সিপাহীদের আত্মত্যাগের অমর মহাকাব্য। এর ঠিক পাশেই ইতিহাসের আরেক স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঢাকার নবাব পরিবারের অকালপ্রয়াত সন্তান খাজা হাফিজুল্লাহর স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ বা ওবেলিস্ক।কোলাহলপূর্ণ নগরে এক টুকরো শান্তির নীড়বর্তমানে ডিম্বাকৃতির এই ঐতিহাসিক পার্কটি শুধু ইতিহাসের ধূসর পাতা নয়, বরং আধুনিক পুরান ঢাকাবাসীর বেঁচে থাকার অক্সিজেনের উৎস। প্রতিদিন সকাল-বিকেল এখানে ভিড় জমান সব বয়সী মানুষ। কেউ আসেন বুক ভরে বিশুদ্ধ বাতাস নিতে, কেউবা আসেন শরীর চর্চা করতে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা নামী সব স্কুল, কলেজ আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীর আড্ডা ও পদচারণায় মুখরিত থাকে এই চত্বর।ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকেই মানুষ আজও ছুটে আসে এই ঐতিহ্যের টানে। ব্রিটিশদের সেই অমানুষিক অত্যাচার আর সিপাহীদের বুকের তাজা রক্ত; সবই আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দি হলেও বাহাদুর শাহ পার্ক আমাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, শেকল ভাঙার গান কখনও স্তব্ধ হয় না। ইট-পাথরের এই ধূসর নগরে পার্কটি আজও দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির আজন্ম গৌরব আর ব্রিটিশ শাসনের নিষ্ঠুরতম স্মৃতি বুকে আগলে।
৭ ঘন্টা আগে

১৩ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম
আর্জেন্টিনা না ইংল্যান্ড! হাই ভোল্টেজ সেমি-ফাইনালে জিতবে কোন দল?

আর্জেন্টিনা না ইংল্যান্ড! হাই ভোল্টেজ সেমি-ফাইনালে জিতবে কোন দল?

  আর্জেন্টিনা
  ইংল্যান্ড
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ২৫ জন

সংবাদ ডিজিটালে জেলা, উপজেলায় কাজ করতে আগ্রহীরা সিভি পাঠান

বিস্তারিত

মতামতমতামত

উন্নয়নের চাকা নাকি পানিবন্দী নগরী

এক রাতের বৃষ্টিতেই রাজধানীর পরিচিত সড়কগুলো যেন নদীতে পরিণত হলো। ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকার অলিগলি, প্রধান সড়ক ও বিপণিবিতানের সামনে জমেছে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। কোথাও গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে আছে, কোথাও মানুষ জুতা হাতে নোংরা পানি মাড়িয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। নিচতলার বাসাবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকেছে। শিশু, বৃদ্ধ, রোগী ও কর্মজীবী মানুষের দুর্ভোগের যেন কোনো সীমা নেই।বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১২ জুলাই ভোর ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ছয় ঘণ্টায় বৃষ্টি হয় ৭৬ মিলিমিটার।ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে গিয়ে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। এমনকি পানিবন্দী সড়কে মাত্র ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে কোথাও প্রায় ৯০ মিনিট সময় লেগেছে।  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দৃশ্যগুলো দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে আমরা কোন দেশের রাজধানীতে বাস করছি? উন্নয়নের এত গল্প, এত বড় বড় প্রকল্প, এত ব্যয় তারপরও কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কেন অচল হয়ে পড়ে প্রায় দুই কোটি মানুষের এই নগরী?প্রশ্নটি শুধু ক্ষোভের নয়, এটি নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন।বৃষ্টি প্রাকৃতিক, কিন্তু জলাবদ্ধতা কি পুরোপুরি প্রাকৃতিক?বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। অল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিও হতে পারে। কিন্তু একটি আধুনিক রাজধানীর রাস্তা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে থাকবে, গণপরিবহন বন্ধ হয়ে যাবে, মানুষ হাসপাতালে বা কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবে না এটি স্বাভাবিক নয়।বৃষ্টিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না; কিন্তু বৃষ্টির পানি কোন পথে, কত দ্রুত শহর থেকে বেরিয়ে যাবে সেটি নিশ্চিত করা নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মৌলিক দায়িত্ব।ঢাকার জলাবদ্ধতা তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এর পেছনে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাশয় দখল, অপর্যাপ্ত ও বিচ্ছিন্ন ড্রেনেজব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। গবেষণায়ও ঢাকার দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ধ্বংসকে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।  ড্রেন আছে, কিন্তু পানি যাবে কোথায়?ঢাকায় ড্রেন একেবারেই নেই এ কথা ঠিক নয়। শহরের বিভিন্ন স্থানে ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু ড্রেন থাকলেই তো হবে না; সেই ড্রেনের পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে, সেটিই বড় প্রশ্ন।একটি এলাকার ড্রেন পরিষ্কার থাকলেও সেটি যদি কোনো বন্ধ খাল, ভরাট জলাশয় অথবা সংকুচিত নালার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে পানি বের হবে কীভাবে?একসময় ঢাকার বৃষ্টির পানি অসংখ্য খাল, পুকুর, নিম্নভূমি ও জলাভূমির মাধ্যমে আশপাশের নদীতে গিয়ে পড়ত। এসব প্রাকৃতিক জলাধার কিছু পানি ধারণ করত, কিছু পানি মাটির নিচে প্রবেশ করাত এবং বাকি পানি ধীরে ধীরে নদীতে নিয়ে যেত।কিন্তু উন্নয়নের নামে আমরা সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাই ধ্বংস করেছি। খাল ভরাট করে রাস্তা, ভবন ও আবাসন প্রকল্প হয়েছে; পুকুর ও নিচু জমি ভরাট হয়েছে; জলপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়েছে। ফলে পানি নামার পথ না পেয়ে রাস্তায় জমছে।খালের ওপর শুধু দৃষ্টিনন্দন সেতু বা হাঁটার পথ বানিয়ে তাকে জীবন্ত করা যায় না। খালের শুরু ও শেষ প্রান্ত, ড্রেনের সংযোগ এবং নদীতে পানি পড়ার পথ সচল রাখতে হবে। একটি খালের মাঝের অংশ উদ্ধার করে দুই প্রান্ত বন্ধ রেখে দিলে সেটি পানি নিষ্কাশনের পথ নয়, বরং একটি স্থির জলাধারে পরিণত হবে।কংক্রিটে ঢাকা শহরঢাকার বড় অংশ এখন কংক্রিট, পিচ, টাইলস ও ভবনে ঢাকা। বাড়ির উঠান, মাটির পথ, বাগান, খোলা মাঠ ও নিচু জমি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।আগে বৃষ্টির একটি অংশ মাটিতে শোষিত হতো। এখন অধিকাংশ পানি একসঙ্গে সড়ক ও ড্রেনে এসে পড়ছে। ফলে স্বল্প সময়ে ড্রেনের ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি পানি তৈরি হচ্ছে।নতুন ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার সময় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ছাদের পানি ধরে রাখা, ভবনের নির্দিষ্ট অংশ খোলা রাখা এবং পানি মাটিতে প্রবেশ করানোর ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক হওয়ার কথা। বাস্তবে এসব শর্ত কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে, তার নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।শুধু ভবন নির্মাণের অনুমতি দিলেই হবে না; সেই ভবনের কারণে এলাকার জনসংখ্যা, যানবাহন, বর্জ্য ও বৃষ্টির পানির চাপ কতটা বাড়বে, সেটিও হিসাব করতে হবে।পলিথিন ও বর্জ্যে বন্ধ ড্রেনঢাকার জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। রাস্তায় ফেলে দেওয়া পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট, কাপ, কাগজ, গৃহস্থালি আবর্জনা ও নির্মাণবর্জ্য বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনে গিয়ে জমে।ফলে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক জায়গায় ড্রেন পরিষ্কারের পর তোলা ময়লা রাস্তার পাশেই রেখে দেওয়া হয়। বৃষ্টি হলে সেই ময়লা আবার ড্রেনে ফিরে যায়।এখানে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। যে মানুষটি রাস্তায় পলিথিন বা ময়লা ফেলছেন, তিনিই পরদিন জলাবদ্ধতার জন্য কর্তৃপক্ষকে দায়ী করছেন। তবে শুধু নাগরিককে দোষারোপ করে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নির্মাণবর্জ্য অপসারণ এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও নগর কর্তৃপক্ষের কাজ।পয়োনিষ্কাশন আর বৃষ্টির পানি একই পথে কেন?ঢাকার বহু এলাকায় বৃষ্টির পানি, গৃহস্থালি বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের সংযোগ একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেছে। ড্রেন বন্ধ হলে নোংরা ও দূষিত পানি রাস্তায় উঠে আসে।এই পানির মধ্যে হেঁটে চলতে গিয়ে মানুষ চর্মরোগ, ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নর্দমার পানি বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।একটি আধুনিক নগরে পয়োবর্জ্য বহনের লাইন এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আলাদা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকার বহু জায়গায় এখনো এই মৌলিক বিভাজন কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি।দায়িত্ব অনেকের, জবাবদিহি কার?ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের সঙ্গে সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।একটি সংস্থা রাস্তা নির্মাণ করে, আরেকটি ড্রেন করে, অন্য একটি সংস্থা খাল দেখাশোনা করে। আবার রাস্তা নির্মাণের কিছুদিন পর পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বা অন্য কোনো সেবা সংস্থা সেটি খুঁড়ে ফেলে। সমন্বিত নকশা ও কার্যকর তদারকি না থাকায় একটি কাজ করতে গিয়ে আরেকটি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে প্রায় প্রতি বছরই নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়, অর্থ বরাদ্দ হয়, খাল পরিষ্কার ও ড্রেন সংস্কারের ঘোষণা আসে। কিন্তু প্রথম বড় বৃষ্টিতেই শহরের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পায়।নাগরিকেরা তাই জানতে চান কোথায় কত টাকা ব্যয় হয়েছে? কোন এলাকার ড্রেন কতটুকু বৃষ্টি সামলাতে সক্ষম? কাজের মান পরীক্ষা করেছে কে? ব্যর্থতার জন্য কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়েছে কি?দায়িত্ব যখন অনেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে, তখন ব্যর্থতার দায় যেন শেষ পর্যন্ত কারও ওপরই পড়ে না।জলবায়ু পরিবর্তন অজুহাত নয়জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে ভারী ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়ছে এটি বাস্তবতা। চলতি বর্ষাতেও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে ঢাকা বিভাগসহ বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।  কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনকে সব ব্যর্থতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বরং বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে জেনেই আমাদের নগর পরিকল্পনা, ড্রেনের ধারণক্ষমতা ও জরুরি ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে হবে।বিশ কিংবা ত্রিশ বছর আগের বৃষ্টিপাত ও জনসংখ্যার হিসাব ধরে বর্তমান ঢাকার ড্রেনেজব্যবস্থা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এখনকার নগর পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলাভূমি সংকোচন এবং জনসংখ্যার চাপ বিবেচনায় নিতে হবে।সমাধানের পথ কোথায়?প্রথমেই ঢাকার সব খাল, পুকুর, জলাধার, নিম্নভূমি এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করে একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন দেখতে পারেন, কোন খালের সীমানা কতটুকু এবং কোথায় দখল হয়েছে।দখলমুক্ত করার পর খালগুলোর সঙ্গে ড্রেন ও নদীর সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে হবে। শুধু খনন বা সৌন্দর্যবর্ধন নয়, পানি প্রবাহের পুরো পথ সচল রাখা জরুরি।দ্বিতীয়ত, পুরো ঢাকার জন্য একটি সমন্বিত স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে আলাদাভাবে নয়, পুরো রাজধানী ও আশপাশের নদী-খালকে একটি অভিন্ন জলপ্রবাহ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।তৃতীয়ত, বর্ষার আগে লোকদেখানো পরিচ্ছন্নতার পরিবর্তে সারা বছর ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। কোন ড্রেন কখন পরিষ্কার হলো, কত বর্জ্য তোলা হলো এবং কত টাকা ব্যয় হলো তা নাগরিকদের জন্য প্রকাশ করতে হবে।চতুর্থত, জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর, ক্যামেরা ও তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে ড্রেনের পানির উচ্চতা, প্রবাহ এবং কোথায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে তা আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। ঢাকার জন্য এমন প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা গবেষণায়ও উঠে এসেছে।  পঞ্চমত, নতুন ভবন ও আবাসন প্রকল্পে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং, ছাদবাগান, পানি শোষণযোগ্য খোলা জায়গা এবং নিজস্ব পানি ধারণব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিধিমালা না মানলে ভবনের অনুমোদন বাতিল বা জরিমানার ব্যবস্থা থাকতে হবে।ষষ্ঠত, পলিথিন ও নির্মাণবর্জ্য ড্রেনে ফেলার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের জন্য সহজ ও নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।সবশেষে, ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য একটি প্রধান সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ বা কমান্ড কাঠামো প্রয়োজন। জলাবদ্ধতা হলে কে দায় নেবে, কে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে এবং কার কাছে নাগরিক অভিযোগ জানাবে এটি সুস্পষ্ট হতে হবে।বৃষ্টি অপরাধী নয়প্রতি বর্ষায় আমরা একই দৃশ্য দেখি। মানুষ দুর্ভোগে পড়ে, সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করেন, জরুরি বৈঠক হয় এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। কয়েক দিন পর পানি নেমে গেলে আলোচনা থেমে যায়। পরের বৃষ্টিতে আবার একই দুর্ভোগ ফিরে আসে।এভাবে একটি রাজধানী চলতে পারে না। বৃষ্টির কারণে মানুষ কর্মস্থলে যেতে পারবে না, রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে পারবে না, পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে যেতে পারবে না এবং নিচতলার বাসিন্দারা ঘর রক্ষায় রাত কাটাবেন এটি কোনো আধুনিক শহরের স্বাভাবিক চিত্র নয়।আমাদের মনে রাখতে হবে বৃষ্টি অপরাধী নয়। অপরাধী সেই নগর পরিকল্পনা, যেখানে পানির বেরিয়ে যাওয়ার পথ রাখা হয়নি সেই উন্নয়ন, যা খাল, জলাধার ও নিম্নভূমি ধ্বংস করেছে; এবং সেই ব্যবস্থাপনা, যা প্রতি বর্ষায় মানুষের দুর্ভোগ দেখেও বদলায় না।ঢাকাকে বাঁচাতে আর নতুন কোনো স্লোগানের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন খাল উদ্ধার, কার্যকর ড্রেনেজ, জলাধার সংরক্ষণ, সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।তা না হলে কোটি মানুষের এই রাজধানী ক্রমেই এমন এক নগরীতে পরিণত হবে, যেখানে আকাশে মেঘ জমলেই নাগরিকের মনে একটি আতঙ্ক ঘনীভূত হবে আজ আবার কতটা ডুববে ঢাকা?লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

জানাজা এক মঞ্চে, উৎসব অন্য মঞ্চে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার চার মাসেরও বেশি সময় পর গত বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজার পর নিজ শহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হয়েছে। প্রায় ২ কোটি লোক জানাজায় অংশগ্রহণ করেছে। ইরানিদের মতে এই শোকসভা ও জানাজা ‘শতাব্দীর সেরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’। ৩ জুলাই শুক্রবার থেকে তার মরদেহ তেহরানের গ্র্যাণ্ড মোসাল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা ছিল। গতকাল থেকে তিন দিন তেহরানের সরকারি ও বেসরকারি অফিস এবং ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। তেহরানের আকাশসীমাও বন্ধ ছিল। বিভিন্ন দেশ থেকে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং মন্ত্রী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। আমাদের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ খামেনির জানাজায় যোগ দিয়েছেন। প্রায় ৮০ বিদেশি সাংবাদিক এই অনুষ্ঠান কভার করেছেন। জানাজা নিয়ে বর্তমানে রাজনীতি হয়। বিরাট আকারের জানাজা জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে জনপ্রিয় হলেও জাঁকজমকপূর্ণ জানাজা ও দাফন সবার ভাগ্যে জোটে না। জোটেনি আল কায়দার নেতা ওসামা বিন লাদেনের ভাগ্যেও। তাকে হত্যা করেছে আমেরিকা। কোনো দেশ তার মরদেহ গ্রহণ করতে রাজি ছিল না, সউদি আরবের সম্মতিতে তাকে সমুদ্রে সমাহিত করা হয়। জাঁকজমকপূর্ণ জানাজা জোটেনি ইরাকের সাদ্দাম হোসেন বা লিবিয়ার গাদ্দাফির ভাগ্যেও। এই দুইজন শাসক নিজ দেশে জনপ্রিয় ছিলেন। খামেনির ভাগ্যেও এমন জাঁকজমকপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া জুটত না, যদি আমেরিকা বিজয়ী হতো। গাজায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি কবরের মাটিও পায়নি। প্রকৃতপক্ষে অনুকূল পরিবেশ হলে জানাজা বড় হয়, ঐতিহাসিক হয়, আর প্রতিকূল পরিবেশের কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর মরদেহের গোসল হয়েছিল ‘বাংলা’ সাবান দিয়ে। অনুকূল পরিবেশের জন্য ইরান চার মাস অপেক্ষা করেছে। এই চার মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, হাজার হাজার ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, শত শত ইরানি মৃত্যুবরণ করেছে, কিন্তু ইরান পরাজিত হয়নি। পৃথিবীর দুটি শক্তিশালী দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইরান একটি অনুকূল পরিবেশে আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করল। আলী খামেনির জাঁকজমকপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করে ইরান সারা পৃথিবীর সমীহ আদায় করে নিয়েছে। আয়াতুল্লাহ খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ও রাষ্ট্র নেতা, বেসামরিক ব্যক্তি। তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি। তারপরও তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে ইরানের অভিযোগ। এই হত্যার বিচার চাওয়ার সাহস কেউ দেখাচ্ছে না। কারণ বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বেচ্ছাচারিতা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াসহ প্রভাবশালী অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে তাল মেলায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তৃতীয় বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে ধমক দিতে পারে, ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে। প্রতিবাদের জায়গা কম। ইরান কিন্তু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ও নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান না থাকা সত্ত্বেও তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে কথা বলেনি। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দফায় দফায় হামলা করে ইরানের সরকারবিরোধী শক্তিকে সরকার উৎখাতে ডেকেছে, কিন্তু কাজ হয়নি। কারণ ইরানের ভেতরে সরকারবিরোধী মত দমনে রাষ্ট্র কঠোর ছিল। সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া অসংখ্য ইরানিকে গুলি করে, ফাঁসি দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। তবে আমেরিকার ডাকে সাড়া না দেওয়ার প্রধান কারণ সরকারের নিষ্ঠুরতম দমন-পীড়ন নয়, ইরানিদের স্বদেশ প্রেম। লিবিয়া, ইরাক, ভেনিজুয়েলার মতো সরকারবিরোধী দেশত্যাগী ইরানি বেশি নয়, বরং খোমেনি সরকারের ভয়ে যারা দেশ ছেড়েছিলেন, যুদ্ধের সময় অনেকে ফিরে এসেছে। মাইশা আমিনীর মৃত্যুর পর যে আন্দোলন হয়েছিল, সেই বিদ্রোহীরাও যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে রাস্তায় নামেনি। আমেরিকার বিরুদ্ধে এটাই ইরানের প্রতিবাদের অভিনবত্ব। ইরানের আরও নাটকীয় বিষয় হলো, খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আড়াইশ’তম স্বাধীনতা বার্ষিকীর দিনে। এমন দিনে পাকিস্তান ও তুরস্ক ছাড়া আর কোনো মুসলিম দেশ সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠায়নি। এর পেছনে রয়েছে ধর্মীয় বিভাজন। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রভীতি ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রীতি দুটোই কাজ করেছে। শোনা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র গোপনে কূটনৈতিক হুমকিও দিয়েছে যেন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি চ্যালেঞ্জ করার মতো অবস্থা আমাদের নেই। সাদ্দাম বা গাদ্দাফির মতো সাহস দেখাতে গেলে বিএনপির ক্ষমতা নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। ইরান বিএনপি সরকারের জন্য খুব প্রয়োজনীয় নয়, ইরান শুধু কম দামে তেল দিতে পারে, কিন্তু সেই তেল কিনতেও যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি লাগে। তাই বর্তমান সরকারের যুক্তরাষ্ট্রপ্রীতি বাস্তবতার হিসাব। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এই প্রীতি দরকার। বাংলাদেশ সরকারের ভয় আর প্রীতির ধরন ভিন্ন। ‘ঢাকা না দিল্লি’ স্লোগান ঠুনকো। দিল্লিকে খুশি রাখতে আম আর ইলিশ যায়, ওয়াশিংটনকে খুশি রাখতে জাতীয় সংসদ ভবন চত্বরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন হয়। এমন নির্লজ্জ আয়োজন বাংলাদেশ আগে আর দেখেনি। অবশ্য ক্ষমতা নির্বিঘ্ন রাখার স্বার্থে সরকারের জন্য এটি কৌশলও হতে পারে। কিন্তু বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন মার্কিন জাতীয় সঙ্গীতের তালে দাঁড়িয়ে পতাকাকে সম্মান জানাল, তা বোধগম্য নয়, অথচ জামায়াতের অনেকেই দেশের জাতীয় সঙ্গীতের সময় দাঁড়াতে চান না। বিএনপি আর জামায়াতের নীতি ও স্বার্থ এখন এক ও অভিন্ন জায়গায় মিলেছে। এই মিলন কিন্তু দেশের জন্য অশনিসংকেত। এই মিলিত নীরবতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অসম চুক্তি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। এই মিলিত সুরে সরকার ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠবে। তারেক রহমান দেশে ফিরে বলেছিলেন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। ট্রাম্প বলেন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। দুই ফার্স্টের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই অগ্রাধিকার পেয়েছে। পারস্পরিক অংশীদারিত্বে তখন কূটনৈতিক বাক্য ছাড়া আর কিছু থাকে না। বিএনপি আগেও যুক্তরাষ্ট্রকে তুষ্ট করেছে। আমেরিকা অসন্তুষ্ট হবে এই ভয়ে গাজায় হতাহতের নিন্দা করেনি বিএনপি। আশ্চর্যের বিষয়, বাম ও ইসলামপন্থীদের একটি অংশও এখন একই পথে। যারা স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, ভারতীয় আধিপত্য নিয়ে কথা বলে, তারাই এখন প্যালেস্টাইন ও ইরানের বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ থাকা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস পালন করছে। জামায়াতের আমির বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু। তার মতে, পরীক্ষিত বন্ধু ১৯৭১ থেকেই। মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জবাব আসে ‘তখন আমি ছোট ছিলাম’। কিন্তু একাত্তরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা তার মনে আছে। সত্য হলো, ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন অস্ত্র দিয়েছে পাকিস্তান ও রাজাকারদের। সেই অস্ত্রের আঘাতে মরেছে বাঙালি ও আদিবাসী। বাংলাদেশের স্বার্থে চীন বা যুক্তরাষ্ট্র কখনো পরীক্ষা দেয়নি। চীনের কারণে ১৯৭৪ সালের আগে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হতে পারেনি। ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র মাঝসমুদ্র থেকে গমের জাহাজ ফিরিয়ে নিয়ে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ তৈরি করেছিল। খামেনির জানাজা শুধু একটি মৃত্যুর আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল শক্তির প্রদর্শনীও। যারা ভেঙেছে তারাই আবার জড়ো করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন আমাদের মনে করিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শোক আর উৎসব পাশাপাশি চলে। নীতির প্রশ্ন তখন ক্ষমতার হিসাবের কাছে হেরে যায়। আমরা যখন অন্যের ট্র্যাজেডিতে নীরব আর অন্যের উৎসবে সরব হই, তখন নিজেদের অবস্থানটাই দুর্বল হয়। কারণ ইতিহাস জানাজাও মনে রাখে, আবার নীরবতাও। (লেখকের নিজস্ব মত) [লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

হারিয়ে গেছে রবীঠাকুরের স্নিগ্ধ বর্ষা

‘এমন দিনে তারে বলা যায় / এমন ঘনঘোর বরিষায়...।’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কলমে বর্ষা কেবল একটি ঋতু হয়ে আসেনি, এসেছে এক পরম অনুভূতি হয়ে। রবীন্দ্রমানসের এক বিশাল অংশ জুড়ে ছিল আষাঢ়-শ্রাবণের মেঘ আর বৃষ্টির খেলা। শান্তিনিকেতনের উন্মুক্ত প্রান্তর কিংবা শিলাইদহের পদ্মার বুকে নৌকার ওপর বসে তিনি যেভাবে বর্ষার রূপকে ছুঁয়েছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যকে এক চিরন্তন রোমান্টিকতা দিয়েছিল। তবে আজকের ইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি জীবনে দাঁড়িয়ে বড়ই আক্ষেপের সঙ্গে বলতে হয়, আমাদের প্রকৃতি ও যান্ত্রিক সমাজ থেকে আজ সত্যি সত্যিই হারিয়ে গেছে রবীন্দ্রনাথের সেই স্নিগ্ধ, ভাবুক বর্ষা।  রবীন্দ্রনাথের মতো বর্ষাকে এত গভীরভাবে আর কেউ ভালোবাসেনি। বর্ষার প্রথম জলকণা তার মনে জাগিয়ে তুলত সৃষ্টির আদিম উল্লাস। কখনো তিনি লিখেছেন, ‘নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে...’। আবার কখনো মেঘমল্লার রাগে ব্যাকুল হয়ে গেয়ে উঠেছেন, ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মতো নাচেরে...’।রবীন্দ্র-কাব্যে বর্ষা ছিল একাধারে বিরহ, মিলন, অন্তহীন অপেক্ষা আর আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর কদম-কেতকীর সুবাস কবিকে এক চেনা অথচ অচিনলোকে নিয়ে যেত। রবীন্দ্র অনুসারীদের কাছে বর্ষা মানেই ছিল জানলার ধারে বসে উদাস মনে সুদূরের পিয়াসী হওয়া। রবীন্দ্রনাথ যে বর্ষার রূপ দেখে মুগ্ধ হতেন, আজকের নাগরিক জীবনে তার লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর আকাশচুম্বী বহুতল ভবনের ভিড়ে আকাশের সেই ‘নীল নবঘন’ আজ উধাও। শহরের মানুষের কাছে আজ বর্ষা মানেই এক বিভীষিকা। কবি যে বর্ষায় কৃষ্ণের অভিসার দেখতেন, আজ শহরের পিচঢালা রাস্তায় তা রূপ নেয় অন্তহীন যানজট আর জলবদ্ধতায়।  জানলা দিয়ে এখন আর দিগন্তজোড়া কালো মেঘের ভেলা দেখা যায় না; চোখে পড়ে শুধু সামনের ভবনের নিষ্প্রাণ দেয়াল। টিনের চালে বৃষ্টির যে ‘রুমঝুম’ নূপুরধ্বনি কবিকে আকুল করত, তার জায়গা নিয়েছে বহুতল ভবনের এসির যান্ত্রিক কর্কশ গর্জন। শহরের মানুষ আজ বৃষ্টি দেখলে মেঘমল্লার গায় না, বরং অফিস বা ঘরে ফেরার দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ ফেলে।শুধু শহরেই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের করাল গ্রাসে খোদ ঋতুর চরিত্রই আজ বদলে গেছে। আষাঢ়-শ্রাবণ আসে, কিন্তু আকাশে সেই ঘনঘোর মেঘের ঘনঘটা আর দেখা যায় না। কখনো আষাঢ় মাস জুড়ে চলে তীব্র দহণ ও তাপদাহ, আবার কখনো কার্তিক-অগ্রহায়ণে এসে নামে অকাল বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনায় বর্ষা তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলেছে। যে নদী-নালা, খাল-বিল বৃষ্টির জলে থইথই করার কথা, তা আজ শুকিয়ে কাঠ কিংবা মানবসৃষ্ট বর্জ্যে মৃতপ্রায়। জলবায়ুর এই চরমভাবাপন্ন রূপ কবির মনকে আর সিক্ত করে না। বরং এক অজানা আশঙ্কায় ভরিয়ে দেয়। ঋতুর এই বিবর্তন যেন প্রকৃতির এক নীরব কান্না, যা আমরা বধিরতার কারণে শুনতে পাই না। স্মৃতির অ্যালবামে বর্ষার দিনগুলি আজকের ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্ম বৃষ্টির দিনে কাগজের নৌকা ভাসানোর অকৃত্রিম আনন্দ চেনে না। তাদের মেঘলা দিন কাটে স্মার্টফোনের চৌকো স্ক্রিনে কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ভার্চুয়াল জগতে।  খিচুড়ি-ইলিশের সেই পারিবারিক চিরায়ত আড্ডা কিংবা বৃষ্টির জলে ভিজে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলার নির্মল আনন্দ আজ যান্ত্রিক জীবনের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। শৈশবের সেই বৃষ্টিবিলাসের দিনগুলো আজ শুধুই ডায়েরির পাতায় বন্দি স্মৃতি। কবির খাতার পাতা ওল্টালে এখনো বর্ষার সুবাস পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু বাস্তব পৃথিবী থেকে সেই রূপ দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে। কৃত্রিমতার এই যুগে এসে তাই খুব আক্ষেপের সঙ্গেই বলতে হয়-প্রকৃতির অবহেলা আর আমাদের তীব্র যান্ত্রিকতার ভিড়ে সত্যি হারিয়ে গেছে কবিতার সেই চিরায়ত, স্নিগ্ধ বর্ষা। কদম ফুলের শাখাগুলো আজ শূন্য, আর কবির কলম আজ বর্ষার মেঘ দেখে নয়, বরং প্রকৃতির এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে বেদনায় স্তব্ধ হয়ে থাকে।পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে আমরা ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বা ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ বলি, তা মূলত বাংলা সাহিত্যের চিরচেনা ষড়ঋতুর কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকা বা কলকাতার মতো মেগাসিটিগুলো আজ একেকটি ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা ‘নগর তাপদ্বীপে’ পরিণত হয়েছে। চারপাশের কংক্রিটের দেয়াল আর পিচঢালা রাস্তা দিনের বেলা যে বিপুল পরিমাণ উত্তাপ শোষণ করে, তা রাতের বেলা বাতাসে ছেড়ে দেয়। ফলাফলস্বরূপ, বর্ষার সেই চিরায়ত স্নিগ্ধ ও শীতল হাওয়া আজ উধাও। বায়ুমণ্ডলের এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা এবং ‘এল নিনো’র মতো বৈশ্বিক জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে মেঘের আচরণ বদলে গেছে। এখন আর আষাঢ় জুড়ে রিনিঝিনি সুদীর্ঘ বৃষ্টি হয় না; বরং মেঘ ভেঙে একনাগাড়ে ‘ক্লাউডবার্স্ট’ বা অতিবৃষ্টি হয়, যা রোমান্টিকতার বদলে আকস্মিক বন্যা আর নাগরিক দুর্ভোগ নিয়ে আসে। এককালে টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনে কবিরা বিরহ আর প্রেমের কবিতা লিখতেন। পদার্থবিজ্ঞানের শব্দতত্ত্বের নিয়মে টিনের পাত আর বৃষ্টির জলকণার সংঘর্ষে যে এক ধরনের ছন্দময় কম্পন তৈরি হতো, তা মানুষের মস্তিষ্কে ‘হোয়াইট নয়েজ’ এর মতো কাজ করত। যে নয়েজ মনকে শান্ত ও সৃজনশীল করতে সাহায্য করত। আজকের বহুতল ভবনের পুরু কংক্রিটের ছাদ আর কাঁচের থাই জানলা সেই প্রাকৃতিক সুরকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দিয়েছে।  আধুনিক মানুষের কানে বৃষ্টির শব্দ আর পৌঁছায় না; তার বদলে সেখানে স্থান করে নিয়েছে ঘরের ভেতরের এসির যান্ত্রিক গর্জন আর বাইরের সড়কের হাইড্রোলিক হর্নের তীব্র শব্দদূষণ। বিজ্ঞান বলছে, এই যান্ত্রিক কোলাহল মানুষের মস্তিষ্কের ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো ‘ফিল গুড’ হরমোনের ক্ষরণ কমিয়ে দেয়। ফলে মেঘলা দিনে মানুষের মনে এখন আর কাব্যের জন্ম হয় না, বরং ভর করে একঘেয়েমি ও বিষণ্ণতা।রবীন্দ্রনাথের বর্ষা যেমন হারিয়ে গেছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে সেই বর্ষার প্রধানতম অনুষঙ্গ ও অলংকার-কদম আর জলজ ফুলের মেলা। একসময় আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি মানেই ছিল গাছে গাছে কদম ফুলের সোনালি-সাদা গোলকের আভা। যা বর্ষার আগমনী বার্তা বহনকারী এক জীবন্ত সূচক। বিল-ঝিল আর ডোবাগুলো সেজে উঠত শাপলা, পদ্ম আর কলমি ফুলের চাদরে। কিন্তু আজকের বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ের রূঢ় থাবা বর্ষার এই চিরচেনা জলজ ফুলের ক্ষেত্রেও। বলা যায় ফুলগুলো আজ অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে কদম কিংবা শাপলার মতো বর্ষাকালীন ফুলগুলো তাদের সঠিক সময়ে ফোটার চক্র হারিয়ে ফেলছে।রবীন্দ্রনাথের বর্ষা, বর্ষার রবীন্দ্রনাথরবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার পাতায় এখনো আষাঢ়ের মেঘ জমে, শ্রাবণের ধারা ঝরে। কবির সাহিত্যের বর্ষা ছিল স্নিগ্ধতার, রোমান্টিকতার এবং পুনর্জন্মের। কিন্তু জলবায়ুর অভিঘাতে তা রূপ নিয়েছে চরম প্রাকৃতিক সংকটে। মেঘের ডাক শুনলে এখন আর মনে উদাসীনতা আসে না। উল্টো কৃষকের মনে জাগে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির ভয়, আর নগরবাসীর মনে জাগে জলাবদ্ধতার আতঙ্ক। রবিঠাকুরের সেই ‘সোনার তরী’র ভরা নদী আজ শুকিয়ে কাঠ, কিংবা পলি জমে মৃতপ্রায়। নদী-নালা ভরাট আর নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে প্রকৃতি হারিয়েছে তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা। ফলে মেঘ জমেও বৃষ্টি না হয়ে তা বাতাসে মিলিয়ে যায়। এখন আষাঢ় জুড়েই দেখা যায় তীব্র দাবদাহ আর খরা। মেঘে মেঘে আকাশ ছেয়ে যাওয়ার বদলে সূর্যের প্রখর তাপ মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সেই ভারসাম্য আজ আর নেই। হারিয়ে গেছে রবীঠাকুরের গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা সেই বর্ষার স্নিগ্ধ-ভাবুক রূপ। লেখক: কবি ও সাংবাদিক

গোবিপ্রবি: সাফল্য-সংগ্রামের ২৫ বছর

দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) ২৪ বছর অতিক্রম করে ২৫ বছরে পদার্পণ করেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। আইনগতভাবে ২৪ বছরের পথচলা সম্পন্ন হলেও একাডেমিক কার্যক্রমের হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির বয়স ১৪ বছর।প্রতিষ্ঠার ইতিহাস: ২০০১ সালের ৮ জুলাই জাতীয় সংসদে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন পাসের মধ্য দিয়ে গোবিপ্রবির যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে দীর্ঘ সময় কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও ২০০৯ সালে প্রকল্পটি পুনরায় সচল করা হয়। ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা ঘটে।প্রাথমিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি অনুষদ- প্রকৌশল, বিজ্ঞান, ব্যবসায় অধ্যয়ন ও মানবিক অনুষদের অধীনে পাঁচটি বিভাগ চালু করা হয়। বিভাগগুলো ছিল কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেক্ট্রনিক্স, গণিত, ব্যবস্থাপনা শিক্ষা এবং ইংরেজি। প্রতিটি বিভাগে ৩২ জন করে মোট ১৬০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে ৮টি অনুষদের অধীনে ৩৩টি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর এ ক্যাম্পাস আজ দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।অনন্য ক্যাম্পাস: প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় ঘেরা গোবিপ্রবি শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কারণেও বিশেষভাবে পরিচিত। ক্যালিফোর্নিয়া রোডের সবুজ বৃক্ষসারি, বনলতা সেন রোড, লেকপাড়, টিলা এবং বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর ক্যাম্পাসকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী, দর্শনার্থী ও ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের কাছে এসব স্থান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।সহশিক্ষায় প্রাণবন্ত: শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শিক্ষার্থীদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিতর্ক, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, বিজ্ঞানচর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের নেতৃত্বগুণ ও সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে।গবেষণায় সাফল্য: গবেষণা, উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রেও গোবিপ্রবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থেকে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার পরিধি বিস্তৃত করছেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও গবেষণা, উদ্ভাবন ও একাডেমিক কার্যক্রমে নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছেন।গোবিপ্রবির অসংখ্য গ্র্যাজুয়েট বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়া উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণায় অংশগ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ছড়িয়ে দিচ্ছেন। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) অধীনে বিভিন্ন ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ লাভের মাধ্যমেও গোবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা সাফল্যের পরিচয় দিচ্ছেন। পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থী উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন।শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে গোবিপ্রবির প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়টির অগ্রযাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।চ্যালেঞ্জ: উন্নয়নের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। ক্লাসরুম সংকট, শিক্ষক স্বল্পতা, আবাসন সমস্যা, গবেষণা কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা এবং কিছু বিভাগের সেশনজট শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণে অন্তরায় হয়ে রয়েছে। সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা, আধুনিক অবকাঠামো, পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা, টিএসসি, অডিটোরিয়াম এবং প্রয়োজনীয় একাডেমিক সম্প্রসারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক অগ্রগতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।আগামীর প্রত্যাশাদীর্ঘ দুই দশকের অধিক সময়ের পথচলায় গোবিপ্রবি যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক। প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও আদর্শকে ধারণ করে শিক্ষা, গবেষণা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে আরও সমৃদ্ধ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি আগামী দিনে দেশের অন্যতম শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে- এমনটাই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের প্রত্যাশা।উপাচার্যের বাণী: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সকল সদস্য, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শুভানুধ্যায়ী এবং অত্র অঞ্চলের সম্মানিত সুধীবৃন্দকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানসম্মত উচ্চশিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই বিদ্যাপীঠ আজ একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত।বিশ্বাস করি, সকলের সহযোগিতায় গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাবে। সকলের জন্য শুভকামনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছি।লেখক: গোবিপ্রবি প্রতিনিধি। 

বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের নব্য সমাজতত্ত্ব: আকাঙ্ক্ষা ও উদ্বেগের এক জটিল সমীকরণ

বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি স্বতন্ত্র ও গৌরবোজ্জ্বল স্থান রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে এই শ্রেণীটি ছিল শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিয়ে গঠিত—এমন একটি সামাজিক গোষ্ঠী যারা কেবল তুলনামূলক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই ভোগ করত না, বরং জাতীয় জনমত গঠন, গণতান্ত্রিক আদর্শের সুরক্ষা এবং দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশকে লালন করত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে জাতির নৈতিক ও নাগরিক মেরুদণ্ড হিসেবে গণ্য করা হতো। তবে সেই পরিচিত চিত্রটি এখন এক মৌলিক ও গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সমসাময়িক বাংলাদেশি মধ্যবিত্ত শ্রেণী দেশের ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে আকারে বৃহত্তর, অধিক বৈচিত্র্যময়, ডিজিটালভাবে অধিক সংযুক্ত এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে অনেক বেশি সমন্বিত। তবুও এটি অর্থনৈতিকভাবে অধিক নিরাপত্তাহীন, সামাজিকভাবে খণ্ডিত এবং রাজনৈতিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত। এটি এখন আর শুধুমাত্র আয় বা প্রথাগত পেশার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় না; বরং এর চরিত্র ক্রমশ নির্ধারিত হচ্ছে জীবনধারা, ভোগের ধরন, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধার আকাক্সক্ষা দ্বারা। সুতরাং, মধ্যবিত্তের এই ‘নতুন সমাজতত্ত্ব’ বোঝা সমকালীন বাংলাদেশকেই বোঝার জন্য অপরিহার্য। বিগত তিন দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেশের শ্রেণী কাঠামোকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন এবং ২০২২ সালের পারিবারিক আয়-ব্যয় শুমারি অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্য নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়ে ১৮.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও জাতীয় দারিদ্র্যের হার এখন অনেক বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, প্রবাসী রেমিট্যান্স এবং কৃষি উৎপাদনশীলতার ওপর ভর করে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এই অর্থনৈতিক রূপান্তর লাখ লাখ পরিবারকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে প্রবেশাধিকার দিয়েছে। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা যুক্তি দেন যে, শ্রেণীকে কেবল উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। এই ব্যাপকতর ধারণাটি প্রথম উঠে এসেছিল ম্যাক্স ওয়েবারের ‘অর্থনীতি ও সমাজ’ (১৯২২) গ্রন্থে, যেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন যে সামাজিক শ্রেণী কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ দ্বারাই নয়, বরং ‘মর্যাদা’ ও ‘ক্ষমতা’ দ্বারাও গঠিত হয়। আজকের বাংলাদেশে একই রকম আয় থাকা সত্ত্বেও দুটি পরিবার সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক অবস্থানে থাকতে পারে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, একজন কর্পোরেট নির্বাহী এবং একজন সফল অনলাইন নারী উদ্যোক্তার আয় তুলনামূলকভাবে সমান হতে পারে, কিন্তু সমাজ-মানসে তাদের সামাজিক পরিচয়, আকাক্সক্ষা এবং প্রভাবের ধরন যথেষ্ট ভিন্ন। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ো তার অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পুঁজির তত্ত্বের মাধ্যমে এই ধারণাটিকে আরও প্রসারিত করেছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডিস্টিংশন’ (১৯৭৯)-এ বুর্দিয়ে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, শ্রেণী কেবল সম্পদের মাধ্যমে নয়, বরং শিক্ষা, ভাষা, সাংস্কৃতিক পছন্দ এবং প্রতীকী মর্যাদার মাধ্যমে পুনরূৎপাদিত হয়। সমসাময়িক বাংলাদেশে অভিভাবকরা ক্রমবর্ধমানভাবে ইংরেজি-মাধ্যম শিক্ষা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিদেশি ডিগ্রি এবং ডিজিটাল দক্ষতায় বিপুল সম্পদ বিনিয়োগ করছেন—কেবলমাত্র সন্তানদের আয় বাড়ানোর জন্য নয়, বরং একটি উচ্চতর সামাজিক মর্যাদা বা ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ নিশ্চিত করার জন্য। প্রথাগত মধ্যবিত্তের প্রধান বৈশিষ্ট্য যদি হয়ে থাকে স্থিতিশীলতা, তবে বর্তমানের নব্য মধ্যবিত্তের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অনিশ্চয়তা ও তীব্র প্রতিযোগিতা। এই রূপান্তরটি ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্থনি গিডেন্সের ‘দ্য কনসিকোয়েন্সেস অফ মডার্নিটি’ (১৯৯০) গ্রন্থে বর্ণিত আধুনিক সমাজের চিত্রকে মনে করিয়ে দেয়, যেখানে দ্রুত সামাজিক পরিবর্তনের মাঝে ব্যক্তিকে ক্রমাগত তার জীবন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করতে হয়। জীবন এখন আত্ম-উন্নয়নের এক অবিরাম ও ক্লান্তিকর প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। এই রূপান্তর শ্রমবাজারে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের মতে, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অনলাইন ফ্রিল্যান্স কর্মী উৎসে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এমন সব পেশাগত কাজকে নতুন রূপ দিচ্ছে, যা একসময় মধ্যবিত্তের জন্য নিরাপদ কর্মজীবন হিসেবে বিবেচিত হতো। স্প্যানিশ সমাজবিজ্ঞানী ম্যানুয়েল ক্যাস্টেলস তার ‘দ্য রাইজ অফ দ্য নেটওয়ার্ক সোসাইটি’ (১৯৯৬) গ্রন্থে এই পরিবর্তনগুলোর পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। আজকের মধ্যবিত্তরা ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে বসেই সরাসরি বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করছেন। কিন্তু এই ডিজিটালাইজেশন প্রতিযোগিতাকে বিশ্বব্যাপী তীব্রতর করেছে, যার ফলে ঢাকার একজন গ্রাফিক ডিজাইনারকে ভারত, ফিলিপাইন বা পূর্ব ইউরোপের ফ্রিল্যান্সারদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে আকাশছোঁয়া জমির দাম এবং অ্যাপার্টমেন্টের খরচের কারণে শহরগুলোতে বাড়ির মালিকানা তরুণ পেশাজীবীদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বেসরকারি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন এবং ডিজিটাল সংযোগ এখন পারিবারিক বাজেটের সিংহভাগ গ্রাস করছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ অনুযায়ী, ক্রমাগত মুদ্রাস্ফীতি মধ্যবিত্তের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করেছে। এই অবস্থাটি অর্থনীতিবিদ গাই স্ট্যান্ডিং-এর ‘দ্য প্রিকারিয়েট: দ্য নিউ ডেঞ্জারাস ক্লাস’ (২০১১) গ্রন্থে বিকশিত ‘প্রিকারিয়েট’ ধারণার সঙ্গে মেলে—যেখানে উচ্চ শিক্ষিত একটি শ্রেণী অস্থিতিশীল কর্মসংস্থান, অনিশ্চিত আয় এবং সীমিত দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী উলরিখ বেক তার ‘রিস্ক সোসাইটি’ (১৯৮৬) গ্রন্থে যেমনটি বলেছিলেন, আধুনিক সমাজ নতুন সুযোগের পাশাপাশি নতুন ঝুঁকিও তৈরি করে; বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী আজ ঠিক সেই ঝুঁকির আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্তমান মধ্যবিত্তের পরিচয় কেবল আয়ের সূচকে নয়, বরং ভোগের সংস্কৃতির মাধ্যমেও প্রকাশিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো (যেমন ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম) ভ্রমণ, ফ্যাশন, রেস্তরাঁ ও গ্যাজেটের অবিরাম প্রদর্শনের মাধ্যমে সাফল্যের এক কৃত্রিম সংজ্ঞা তৈরি করছে। বুর্দিয়োর ভাষায়, এটি হলো ‘প্রতীকী স্বাতন্ত্র্যের অন্বেষণ’। স্কুল, ক্যাফে, স্মার্টফোন বা ছুটির গন্তব্যের পছন্দ ক্রমবর্ধমানভাবে সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সংকেত বহন করে। ফলস্বরূপ, একটি নির্দিষ্ট জীবনধারা বজায় রাখার এই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ পরিবারগুলোকে ভোক্তা ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলছে। এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর কেবল মধ্যবিত্তের পকেট বা জীবনযাত্রাকে বদলে দেয়নি, বরং দেশের নাগরিক সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক আচরণকেও নতুন রূপ দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে—এই নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণী কি তাদের ঐতিহাসিক নাগরিক ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করছে, নাকি ধীরে ধীরে একে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভোগবাদের কাছে সমর্পণ করছে?জার্মান দার্শনিক ইয়ুর্গেন হাবারমাস তার ‘দ্য স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফরমেশন অফ দ্য পাবলিক স্ফিয়ার’ (১৯৬২) গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, একটি সুস্থ গণতন্ত্র নির্ভর করে এমন এক সচেতন জনগণের ওপর, যারা রাষ্ট্র ও বাজারের বাইরে যুক্তিসঙ্গত বিতর্কে অংশ নিতে সক্ষম। ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের তথ্যে প্রবেশাধিকার অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। কিন্তু এই তথ্যের প্রাচুর্য সবসময় অর্থপূর্ণ নাগরিক সম্পৃক্ততা তৈরি করছে না; বরং জনআলোচনা অনেক সময় খণ্ডিত, মেরুকৃত এবং ভুল তথ্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ছে। অবশ্য এর ইতিবাচক দিকও রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পুটনামের ‘বোলিং অ্যালোন’ (২০০০) গ্রন্থের সামাজিক পুঁজি হ্রাসের তত্ত্বকে কিছুটা কাউন্টার করে বাংলাদেশে ডিজিটাল সক্রিয়তা, ক্রাউডফান্ডিং, স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ এবং পরিবেশ বা সড়ক নিরাপত্তার মতো সামাজিক আন্দোলনগুলো অনলাইনে শুরু হয়ে পরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। তরুণ মধ্যবিত্তরা প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে বিষয়ভিত্তিক নাগরিক সম্পৃক্ততা প্রকাশ করছেন। অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক অমর্ত্য সেন তার ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম’ (১৯৯৯) গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন যে, উন্নয়নকে কেবল আয় বৃদ্ধি হিসেবে না দেখে মানুষের সক্ষমতার সম্প্রসারণ হিসেবে বোঝা উচিত। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি’র মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২৫-২৬ অনুযায়ী বাংলাদেশ মানব উন্নয়নে অগ্রগতি বজায় রাখলেও সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্য এখনও প্রকট। একটি ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী তখনই জাতীয় টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে, যখন তারা মানসম্মত শিক্ষা, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সমান সুযোগ পাবে। অন্যথায়, উচ্চ শিক্ষিত স্নাতকদের দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব শিক্ষার ওপর জনগণের ঐতিহ্যবাহী আস্থা ও আশাবাদকে ভেঙে চুরমার করে দেবে। একই সঙ্গে, মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান ভোগ নগরের পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ সম্পদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। তাই টেকসই নগর পরিকল্পনা, দক্ষ গণপরিবহন এবং পরিবেশগতভাবে দায়িত্বশীল ভোগের নীতি প্রণয়নে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভূমিকা অপরিহার্য। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নতুন সমাজতত্ত্ব কেবল একটি পরিবর্তনশীল শ্রেণীর গল্প নয়; এটি আসলে একটি উন্নয়নকামী জাতির আত্ম-পুনর্নির্ধারণের মহাকাব্য। মধ্যবিত্ত শ্রেণী আজ আকাঙ্ক্ষা ও উদ্বেগ, সমৃদ্ধি ও অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক সুযোগ ও স্থানীয় দায়িত্বের এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই শ্রেণীটি কি আরও বেশি নাগরিক-সচেতন ও সাম্যবাদী হবে, নাকি কেবলই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভোগবাদে নিমজ্জিত হবে—তা-ই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক প্রাণশক্তি এবং সামাজিক সংহতিকে। যদি সরকারি নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে মেধা, সৃজনশীলতা এবং উদ্যোক্তা সত্তাকে পুরস্কৃত করা যায়, তবে এই নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীই হবে একটি সাম্যভিত্তিক, স্থিতিস্থাপক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি। [লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী ]

দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি

দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের লড়াই সাধারণত দুটি পথে পরিচালিত হয়। একটি হলো আইন প্রয়োগ, তদন্ত ও বিচার; অন্যটি প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ, যার ভিত্তি জনসচেতনতা, নৈতিকতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ। প্রথম পথটি অপরিহার্য হলেও দ্বিতীয় পথটি দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। কারণ দুর্নীতি কেবল আইনের বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক আচরণ, যা তখনই বিস্তার লাভ করে যখন সমাজে অনিয়মকে মেনে নেয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সম্প্রসারণের উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করেছে। বর্তমানে মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যে কমিটিগুলো কাজ করছে, সেগুলোর কার্যক্রম এবার ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক উদ্যোগের একটি নতুন পরিসর তৈরি হতে পারে। প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি কোনো তদন্তকারী সংস্থা নয় এবং এটি দুদকের বিকল্পও নয়। এই কমিটির সদস্যদের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার, তদন্ত পরিচালনার কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই। এর মূল দায়িত্ব হলো জনসচেতনতা সৃষ্টি, সততা ও নৈতিকতার চর্চা উৎসাহিত করা, নাগরিকদের সরকারি সেবা সম্পর্কে অবহিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করা। দুদকের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি হবে সাত সদস্যবিশিষ্ট। সদস্যদের সমাজের সৎ, দায়িত্বশীল ও স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বেছে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য রাখার বিধানও রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য, জনপ্রতিনিধি, সরকারি চাকরিজীবী, ঋণখেলাপি কিংবা ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সদস্যপদ থেকে বিরত রাখার নীতিও গ্রহণ করা হয়েছে। নীতিগতভাবে এটি একটি ইতিবাচক কাঠামো। তবে এর সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সদস্য নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয় তার ওপর। ইউনিয়ন পর্যায়ে এ ধরনের কমিটির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি সরকারি সেবার মুখোমুখি হন স্থানীয় পর্যায়ে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, ভূমি-সংক্রান্ত সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কৃষি প্রণোদনা, সরকারি অনুদান, বিভিন্ন ভাতা, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের নানা সেবার সঙ্গে জনগণের প্রতিদিনের সম্পর্ক। এসব ক্ষেত্রেই মাঝেমধ্যে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, স্বজনপ্রীতি কিংবা অস্বচ্ছতার অভিযোগ ওঠে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ জানেন না কোন সেবা বিনামূল্যে পাওয়ার কথা, কোথায় অভিযোগ করতে হবে বা সরকারি বিধান কী। এই অজ্ঞতা দুর্নীতির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এখানেই দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নিয়মিত জনসচেতনতামূলক সভা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা, নাগরিক অধিকার বিষয়ে প্রচার, সরকারি সেবার তথ্য সহজভাবে তুলে ধরা এবং স্থানীয়ভাবে সততার সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক চাপ তৈরি হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে আরও কার্যকর হয়। অবশ্য এই সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু বাস্তব প্রশ্নও রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, স্থানীয় পর্যায়ের অনেক কমিটি সময়ের সঙ্গে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। কোথাও নিয়মিত কার্যক্রম হয়নি, কোথাও সদস্য নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব কমিটির স্বাধীনতাকে সীমিত করেছে। ফলে নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি। এই প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বের দাবিদার। তার মতে, অতীতের দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে নতুন কাঠামো তৈরি করা গেলে উদ্যোগটির সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়বে। এই মন্তব্য কেবল একটি পরামর্শ নয়; বরং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা। ইউনিয়ন পর্যায়ের দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি সুফল পেতে পারেন সাধারণ নাগরিকরা। বিশেষ করে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কৃষি সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, খাদ্য সহায়তা এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত সুবিধাভোগীরা অধিক স্বচ্ছতার পরিবেশে সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে সরকারি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে অনিয়মের শিকার হলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে এবং কীভাবে নাগরিক অধিকার রক্ষা করা যায়, সে সম্পর্কেও মানুষের সচেতনতা বাড়বে। তবে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, কেবল কমিটি গঠন করলেই দুর্নীতি কমে যাবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক উদ্যোগ তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। আর সেই আস্থা গড়ে ওঠে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে। সদস্য নির্বাচন যদি বিতর্কিত হয়, কার্যক্রম যদি কেবল আনুষ্ঠানিক সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকে, অথবা কমিটি যদি স্থানীয় ক্ষমতার বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে উদ্যোগটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। আরও একটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারি সেবার বড় অংশ ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। কিন্তু ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রেও নানা ধরনের প্রতারণা, তথ্যগোপন, দালালচক্র কিংবা প্রযুক্তিগত অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিগুলো যদি ডিজিটাল সেবা গ্রহণে নাগরিকদের সহায়তা, তথ্যপ্রদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কাজেও সম্পৃক্ত হয়, তাহলে তাদের কার্যক্রম আরও সময়োপযোগী হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির কার্যকারিতা বাড়াতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সদস্য নির্বাচন প্রক্রিয়াকে উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক করা, নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ও মূল্যায়ন প্রকাশ করা এবং স্থানীয় সাংবাদিক, শিক্ষক, নারী সংগঠন, তরুণ সমাজ ও নাগরিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত অবহিত করলে এর প্রতি আস্থা ও অংশগ্রহণ দুটিই বাড়বে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সুশাসনের ভিত্তি শক্তিশালী হয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সম্প্রসারণ সেই যৌথ প্রয়াসকে আরও বিস্তৃত করার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে তখনই, যখন আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজও অনিয়মের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেয়। ইউনিয়ন পর্যায়ের এই উদ্যোগ সেই অবস্থানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারলে এর সুফল কেবল প্রশাসনিক কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা সুশাসন, ন্যায়সংগত সেবা এবং নাগরিক আস্থার ভিত্তিকেও আরও সুদৃঢ় করবে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সংবাদকর্মী]

বাংলা কিউআর: এমডিআর ও নগদ অর্থের সরবরাহ কমাতে হবে

১ জুলাই ২০২৬ থেকে বাংলাদেশের সার্বজনীন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত গ্রাহক এবং মার্চেন্ট কোনো পক্ষ থেকেই খুববেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। ২০২১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট সর্বপ্রথম ‘বাংলা কিউআর’ এর নির্দেশিকা প্রকাশের পর ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ‘বাংলা কিউআর’ চালু করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দৈনন্দিন লেনদেনে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে লেনদেনকে সহজ ও দ্রুততর করা। পাশাপাশি লেনদেনকে স্বচ্ছ ও নিরাপদ রাখা। অতি সম্প্রতি এর সঙ্গে আরও কিছু উদ্দেশ্য যুক্ত হয়েছে। যেমন— নগদ টাকা ছাপানোর খরচ হ্রাস করা, সমস্ত প্রকার লেনদেনকে ব্যাংকিং ও আর্থিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা, ট্রানজেকশন ট্র্যাকিং এর মধ্য দিয়ে পর্যায়ক্রমে সবাইকে করের আওতায় নিয়ে আসা। সারা বিশ্ব এখন একটি ডিজিটাল রুপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে কেন? সর্বস্তরে ‘বাংলা কিউআর’ চালু করার প্রধান পূর্বশর্ত হলোমুদ্রাবাজারে নগদ টাকার সরবরাহ কমিয়ে আনা। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এটি বেশ চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব কিছু নয়। লেনদেন ডিজিটালাইজেশন নিয়ে প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে মুদ্রাবাজার থেকে নগদ টাকা উঠিয়ে নিয়ে বিনিময়ে ডিজিটাল ফরম্যাটে (ই-মানি/ডিজিটাল কারেন্সি) বাজারে সরবরাহ করা। এব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করলে যারা ব্যাংকিং সেবার বাহিরে আছে তারা ব্যাংক ও এমএফএস হিসাব খুলে নগদ টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে জমা দিতে বাধ্য হবে। এভাবে মুদ্রাবাজারে নগদ টাকার সরবরাহ কমানো সম্ভব হবে। নগদ টাকা ছাপানো একেবারেরই সীমিত পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনের মতো দেশগুলোতে নগদ টাকার ব্যবহার খুবই কম। এসব দেশে ৭০-৮০ শতাংশ লেনদেনই হয়ে থাকে ডিজিটাল মাধ্যমে এবং এসব দেশের ব্যাংকগুলোতেও নগদ লেনদেন হয়না বললেই চলে। ‘বাংলা কিউআর’ জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রতিবন্ধকতা হলো মার্চেন্ট পয়েন্টে এর চার্জ অত্যন্ত বেশি। গত ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-২ এর জারি করা সার্কুলার মোতাবেক ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে সংঘটিত প্রতিটি লেনদেনে মার্চেন্ট পয়েন্ট চার্জ সর্বনিম্ন ১% নির্ধারণ করা হয়েছে যা মার্চেন্টদের নিরুৎসাহের অন্যতম কারণ। এই সিদ্ধান্ত বাংলা কিউআর এর উদ্দেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই চার্জ সর্বোচ্চ ১% হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ঘোষণা অনুযায়ী মোবাইল ডাটা ছাড়াই ব্যাংক ও এমএফএস এর এ্যাপ ব্যবহার করে বাংলা কিউআর এর মাধ্যমে পেটেন্ট করার যে সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। পাশাপাশি যারা স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না তাদের জন্য USSD (Unstructured Supplementary Service Data) কোড ব্যবহার করে P2P ও P2B লেনদেন করার বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। মার্কেটিং পলিসি হিসেবে বানিজ্যিক ব্যাংকগুলো (একোয়ারিং ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান) নিজ নিজ মার্চেন্ট হিসাবধারীদের প্রনোদনা দিতে পারে যা এই নতুন ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সর্বোপরি, বাংলা কিউআর-কে দেশের মুদ্রাবাজারের একটি সার্বজনীন প্ল্যাটফরম হিসেবে জায়গা করে নিতে একটি বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে। [লেখক: প্রিন্সিপাল অফিসার, পূবালী ব্যাংক পিএলসি]

মাজার-বাজারের দেশ

এদেশটা যেন মাজার আর বাজারের দেশ। রাজধানীতে, শহরে, গ্রামে-গঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায় সর্বত্র মাজার বিরাজমান। যেখানে জনবসতি, গণযোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থা আছে সেখানেই  প্রথমে চুনের দরগাহ পরে সময়ের পরিবর্তনে পূর্ণাঙ্গ মাজারে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে মাজারকে কেন্দ্র করে নানা জনশ্রুতি ছড়িয়ে পড়ে এবং এগুলো নিভৃতে ছড়ানো হয়। যা ধর্মভীরু মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করার মোক্ষম হাতিয়ার। তখনই মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আগরবাতি, মোমবাতি আর আতরের গন্ধ পেয়ে আসতে শুরু করে। কালক্রমে মাজারটি জমজমাট, লোকারণ্য হতে থাকে এবং নিত্য আয় রোজগারের এক নির্ভেজাল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।এ কথা সত্য যে, পীর-ফকির, আউল-বাউল, বারো আউলিয়ার দেশ এই বাংলাদেশ। স্মরণাতীত কাল থেকে এখানকার মাটি পীর-পয়গম্বরদের পদধূলিতে পবিত্র হয়েছে। বাংলার ৬০ জন দরবেশ ও আউলিয়ার নাম সর্বজন স্বীকৃত। ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্ম প্রচারের মানসে তারা অপরিমেয় ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করেছিলেন। পূর্ববঙ্গের নানা স্থানে এদের রয়েছে যুদ্ধবিগ্রহের বিচিত্র  গৌরবগাথা তথা কিংবদন্তি। সিলেটের হজরত শাহজালাল (রা.) ছিলেন এদের অন্যতম প্রধান।২.এদেশে মাজারের সংখ্যা কত? এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। কোনগুলো মাজার আবার কোনটা মাজার নয় এ নিয়েও মতবিরোধ আছে, বিতর্ক আছে। কৃত্রিমভাবে   চোখের সামনে রাতারাতি গড়ে উঠা সব মাজারকে মাজার বলা যায় না।তবুও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে দেশে ২০ হাজার ৭০টি মাজার রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় ১,৫৮৮টি এবং চট্টগ্রামে ২,৫৭৭টি। সবচেয়ে বেশি মাজার চট্টগ্রামে। তবে বড় প্রসিদ্ধ মাজারের সংখ্যা বলা হয়েছে ৯৫০টি। মোটামুটি দেশের ৬৪ জেলাতেই মাজার আছে। নেই কেবল পার্বত্য বান্দরবান এবং রাঙামাটিতে। দেশব্যাপী দিন দিন মাজারের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যাথা নেই। সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আর্থিক লেনদেনের হেরফের নিয়ে। সারাদেশের কয়টা মাজার সরকারি নীতিমালার আওতায় বা ওয়াকফ আইনের ভেতরে পরিচালিত হচ্ছে তার সুস্পষ্ট তথ্য উপাত্ত নেই। যতদুর জানা যায়, বহুল আলোচিত মাজারগুলো যেমন, বাগেরহাটের খান জাহান আলী (রা.) এর মাজার, রাজশাহীর শাহ মখদুম (র.) মাজার, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী, খরমপুরের গেছু দরাজের মাজার ইত্যাদি। এর বাইরে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দান বাক্সসহ কতিপয় মাজার শরীফের ওপর জেলা প্রশাসন বা সরকারি নজরদারি রয়েছে। কিন্তু দেশের বিপুল সংখ্যক মাজার আর্থিক হিসাব নিকাশের বাইরে আছে। মাজারের আয়-ব্যয়, দান-খয়রাত নিয়ে স্থানীয় জনগণ নানা দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলার ঘাঁটিতে পরিণত হয়ে আছে। বলা যায়, যুগযুগ ধরে ধারাবাহিকভাবে বা পরম্পরায় একই গোষ্ঠী বা বংশের হাতে দানের অর্থ আদায়ের এখতিয়ার নিয়ে সামাজিক দ্বন্দ্বের শেষ নেই। বর্তমানে সারাদেশে শতাধিক মাজারের কার্যক্রমের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলেও জানা যায়।৩.দেশের ছোট বড় মাজারগুলোর ওপর দখল ও আধিপত্য নিয়ে রীতিমতো দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার চলছে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসীন হয়, সঙ্গে সঙ্গে সে দলের স্থানীয় পদধারীরা এর কর্মকর্তা বনে যায়। তখন চর দখলের মত সবকিছুর হাত বদল হয়ে যায়। আজকাল গ্রামীণ জনপদে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটি যেমন পরিবর্তন হয়ে যায় তেমনি মাজারও এর বাইরে থাকছে না। আয়ের কথা বা আর্থিক লেনদেন বিবেচনায় আনা হলে স্কুল বা কলেজের চেয়ে এসব মাজারের হিসাব নিকাশে ঝুঁকি নেই বললেই চলে। ধরা যাক  গ্রামের মাজারগুলোতে কমিটি কর্তৃক একটা ছোট্ট পাঞ্জাখানা মসজিদ, সঙ্গে একটা অজুখানা তৈরি করে দিয়ে বছর তিনেক সাচ্ছন্দ্যে চলা যায়। সাথে দুয়েকজনকে রেখে ভাগাভাগি করে দিব্যি কয়েকবছর পার করা যায়। এতে কারও কিচ্ছু বলার নেই, কমিটি উন্নয়ন কাজ করে চলেছে। এতে স্কুল কলেজের মতন বিল ভাউচার দাখিল করে পাশ করার ঝামেলা থাকে না। সারাদিন ধরে মানতকারী বিশ্বাসীদের কাছ থেকে যা পাওয়া গেল তাই লাভ। দেখা যায়, একজন মানতকারী ব্যক্তি গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁসমুরগি যা-ই কিছু মানত করলেন এটা নিমিষেই উধাও। আবার মাজারের মুখচেনা দালালরা বছরের পর বছর  এগুলো কম দামে ক্রয় কওে বেশি দামে বিক্রি করে চলেছে।এসময়ে যে কোনো একটা মাজার কমিটির সভাপতি হওয়া মানে খুবই লোভনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কাজেই এদেশে যদি দুই হাজার মাজার থাকে তাহলে অন্তত দুই হাজার ব্যক্তিকেও একটা করে পদ দেয়া যায়। এবং তা নিয়ে সে সুখে শান্তিতে দিনযাপন করতে পারে।৪.আরেকটা বিষয় হলো, দেশের প্রতিটা মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছে ছোটখাটো একেকটা বাজার। সঙ্গে মুদির দোকান এবং একাধিক চা স্টল। মোমবাতি, চুন, পান, বিড়ি সিগারেট, মধ্যরাত অবধি আড্ডা। যদিও মাজারে মানতকারীরা অতি সাধারণ, তারা সবাই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নয়। কিন্তু ধর্মকর্ম, বিশ্বাস বা সংস্কার কুসংস্কারে পুরোপুরি আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তারা যেখানে নিজের সন্তানের জন্যে নুন্যতম আমিষ বা প্রোটিনের যোগান দিতে পারে না, সেখানে মানত করা ঘরের বড় মোরগটা সযত্নে নিয়ে যায় বাবার মাজারে। মোরগটা কিন্তু দিয়ে আসে মাজারের জনৈক সিন্ডিকেট সদস্যের হাতে। আর ফিরে আসার পূর্বে সে অবনতমস্তকে এবং  কায়মনোবাক্যে অশ্রুসজল হয়ে বলে আসে, তার সন্তানটি যেন পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে বা চাকরির পরীক্ষায় পাশ করে যায়  ইত্যাদি। কী বিচিত্র এই দৃশ্য।সময় এসেছে গ্রামীণ জনপদেও শতশত মাজারকে অবিলম্বে সরকারের তত্ত্বাবধানে এনে এর আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায়  পরিচালনার পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এতে জনমনে জমে থাকা দীর্ঘ  অসন্তোষ ও সংশয় যেমন দূরীভূত হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতিরও সবিশেষ উন্নতি হবে। বলাবাহুল্য, মাজারগুলোর বেশির ভাগই সরকারের ওয়াকফ এস্টেটের অধীনে পরিচালিত হওয়ার কথা। এগুলো ধর্ম মন্ত্রনালয়ের রুটিন  কাজের মধ্যে পড়ে। তারা মতোয়ালি নিয়োগ দিয়ে তা করতে পারে, আবার ক্ষেত্র বিশেষে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাৎসরিক খোলা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পরিচালনা করতে পারে। এতে করে সরকারের রাজস্ব যেমন বৃদ্ধি পাবে একইসঙ্গে মাজারে মানতকারীরাও অধিকতর আস্থাশীল হবে। বর্তমান সরকারকে বিষয়টি নিয়ে এখনই ভাবতে হবে, প্রয়োজনে জাতীয় সংসদে এতদসংক্রান্ত আইন পাশ করিয়ে এর ভবিষ্যতকে জনগণ বান্ধব করতে হবে। মাজারের সার্বিক পবিত্রতাও রক্ষা করতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার]

মেধা হারানোর নীরব মহামারি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংকট

বাংলাদেশ আজ এক গভীর ও নীরব সংকটের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, যা চোখে সরাসরি দেখা না গেলেও রাষ্ট্রের উন্নয়ন কাঠামোর ভেতরে ধীরে ধীরে ফাটল তৈরি করছে। উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ ও সম্ভাবনাময় তরুণদের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গঠনের সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ ক্ষয়, যা কৃষি, গবেষণা, প্রশাসন, নীতি- নির্ধারণ এবং সামগ্রিক উন্নয়ন সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। নীরব মেধা ক্ষয়ের বাস্তবতা: দেশে প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। কৃষি, প্রকৌশল, চিকিৎসা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উন্নয়ন অধ্যয়নসহ নানা ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই অর্জন যতটা না আশাব্যঞ্জক, তার চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক হলো বাস্তবতার চিত্র। এই মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ মনে করছে না। ফলে ধীরে ধীরে একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে, শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণদের বিদেশে পাড়ি জমানো। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার ফল। কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, গবেষণার দুর্বল পরিবেশ, পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং স্বীকৃতির অভাব এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তার চাপ: দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে উচ্চ। লাখ লাখ তরুণ ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের উপযুক্ত কাজের সুযোগ সীমিত। অনেকেই নিজের যোগ্যতার সঙ্গে মিল রেখে চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে তরুণদের মধ্যে একটি গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। শুধু তরুণদের মধ্যেই নয়, বাংলাদেশের সমাজে সব বয়সের মানুষের মধ্যেই এক ধরনের গভীর হতাশা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কর্মজীবী, মধ্যবয়সী এবং বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত, মেধাবী ও পিএইচডি-ধারী পেশাজীবীরাও আজ গভীর অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ অধ্যয়ন, গবেষণা ও দক্ষতা অর্জনের পরও অনেকেই দেশে কাক্সিক্ষত মর্যাদা, স্থিতিশীলতা ও পেশাগত নিরাপত্তা পাচ্ছেন না। প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী কাজ, সীমিত গবেষণা সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ার অনুভূতি ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ফলে ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি কমে যাচ্ছে এবং পেশাগত জীবনে এক ধরনের স্থায়ী চাপ তৈরি হচ্ছে, যা মেধাবী মানবসম্পদ ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অনিশ্চয়তা তাদের মনে বারবার প্রশ্ন জাগায়, এই দেশে থেকে ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনেকে উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন, যেখানে কর্মসংস্থান, গবেষণা এবং জীবনমান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। মর্যাদা ও স্বীকৃতির ঘাটতি: বিদেশমুখিতার প্রধান কারণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মর্যাদা ও স্বীকৃতির সংকট। অনেক তরুণ পেশাজীবী ও গবেষক মনে করেন, দেশে তাদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব, ধীর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কখনো কখনো অদৃশ্য চাপ তাদের কাজের পরিবেশকে সীমিত করে তোলে। যোগ্যতার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রভাব বা আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, এই ধারণা সববয়সীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। ফলে তারা এমন পরিবেশ খোঁজে, যেখানে পরিশ্রম ও মেধার সরাসরি প্রতিদান পাওয়া যায়। কৃষি খাতে ক্রমবর্ধমান হতাশা: বাংলাদেশের কৃষি খাত দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলেও এখানে দক্ষ মানবসম্পদের জন্য কাক্সিক্ষত পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর অনেক গ্র্যাজুয়েট বের হলেও বাস্তবমুখী ইন্টার্নশিপ, গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে ডিগ্রি শেষের আগেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং তারা বিদেশমুখী হয়ে পড়ে। দেশে তাৎক্ষণিক ক্যারিয়ার, গবেষণা সুযোগ ও মর্যাদার অভাব এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তুলছে। অনেক তরুণ কৃষিবিদ মনে করেন, দেশে গবেষণার চেয়ে প্রশাসনিক জটিলতা বেশি প্রাধান্য পায়। নতুন ধারণা বাস্তবায়ন করতে গেলে ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সীমিত গবেষণা তহবিল এবং নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়। আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রকল্পের অভাবও একটি বড় বাধা। ফলে যারা উচ্চশিক্ষা বা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যান, তাদের একটি বড় অংশ আর ফিরে আসেন না। এতে কৃষি খাতে উদ্ভাবন ও আধুনিকায়নের গতি ক্রমশ কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। উন্নয়ন খাত ও রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা: শুধু কৃষি নয়, উন্নয়ন খাতেও একই ধরনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দক্ষ পেশাজীবীরা কাজ করলেও তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন বিদেশে স্থায়ী হওয়ার পথে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, উন্নয়ন খাতের পেশাজীবীদের মধ্যেবিদেশমুখিতা প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যম স্তরের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। এর প্রধান কারণ হলো চাকরির অনিশ্চয়তা, প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী নিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার নিরাপত্তার অভাব। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেখানে স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ, গবেষণা সহায়তা এবং উন্নত সুবিধা প্রদান করে, সেখানে দেশে অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত মনে করেন এবং বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হন। এই পুরো প্রক্রিয়া কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতার স্পষ্ট প্রতিফলন। বাংলাদেশের গবেষণা ও উন্নয়নে জিডিপির মাত্র প্রায় ০.৩% ব্যয় হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক অবকাঠামো ও ল্যাব সুবিধার ঘাটতি রয়েছে, পাশাপাশি মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব ও ধারাবাহিক পরিকল্পনার ঘাটতি, যা মেধা ধরে রাখার পরিবর্তে পরোক্ষভাবে দেশত্যাগকে উৎসাহিত করছে। অদৃশ্য প্রেরণার চাপ ‘সাইলেন্ট পুশ’: বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি উদ্বেগজনক চিত্রও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নতুন সরকার আসলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনও অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতার যথাযথ প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়। প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে অভিজ্ঞতা ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের ঘাটতির অভিযোগও শোনা যায়, যা নীতি বাস্তবায়নকে ধীর করে দিচ্ছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। উচ্চশিক্ষার নামে সন্তানদের বিদেশে পাঠানো এখন অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ ভবিষ্যৎ ও সম্ভাব্য স্থায়ী বসবাস এর সুযোগ পাওয়ার কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে, যা সামাজিক বাস্তবতায় নতুন চাপ তৈরি করছে। সংস্কারের প্রয়োজন: এই সংকট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন অবশ্যই সম্ভব। প্রথমত, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কৃষি, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং খাদ্যব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। তরুণদের মধ্যে এই আস্থা তৈরি করতে হবে যে দক্ষতা ও পরিশ্রমের মূল্য দেশে নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, বিদেশফেরত গবেষক ও পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ অনুদান, গবেষণা তহবিল এবং ক্যারিয়ার সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’ নীতির মাধ্যমে সফল হয়েছে। চতুর্থত, উন্নয়ন ও গবেষণা খাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী চাকরির পরিবর্তে স্থিতিশীল পেশাগত কাঠামো তৈরি করা জরুরি। ভবিষ্যতের জন্য বড় প্রশ্ন: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু সেই জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে দক্ষ অংশ যদি একে একে দেশ ছাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের উন্নয়ন কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে। উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; এটি জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। সেতু, রেল বা প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক না কেন, মেধা ছাড়া কোনো জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কি আমাদের সেরা মেধাগুলোকে ধরে রাখতে পারব, নাকি তারা অন্য দেশের উন্নয়নের ভিত্তি হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলা, উন্নয়নের গতি এবং জাতীয় সক্ষমতার প্রকৃত শক্তি।  [লেখক: রিসার্চ কোঅর্ডিনেটর, ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি; সহকারী অধ্যাপক, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি]

ভিডিও আরও দেখুন

এক টুকরা ঘাসের দাম ৫৫ হাজার টাকা!

বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল মানেই কোটি কোটি দর্শকের উন্মাদনা আর ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের এক টুকরো অংশ এবার নিজের ড্রয়িংরুমে রাখার সুযোগ করে দিচ্ছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল যে মাঠে অনুষ্ঠিত হবে, সেই নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের ঘাস বিশেষ স্মারক হিসেবে বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে তারা।আগামী ১৯ জুলাই নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে গড়াবে বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ। ফিফার ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এই মাঠের ঘাস সতেজ রাখতে বিশেষ রেজিনের স্বচ্ছ আবরণে আটকে দেওয়া হয়েছে। একেকটি ছোট টুকরোর দাম ধরা হয়েছে ৪৫০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫৫ হাজার টাকার বেশি। তবে আগ্রহী ক্রেতারা এই স্মারক হাতে পাবেন ফাইনাল ম্যাচ শেষ হওয়ার পর। আপাতত শুধু যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের ক্রেতারা এই ঘাস কিনতে পারবেন।অ্যাক্রিলিকের তৈরি এই বিশেষ আবরণের ওপর খোদাই করা থাকবে ২০২৬ বিশ্বকাপের লোগো, ভেন্যুর নাম, তারিখ এবং ফাইনাল ম্যাচের ফলাফল। সঙ্গে থাকবে একটি ইউএসবি ড্রাইভ, যা ঘাসটির আসল হওয়ার প্রমাণপত্র হিসেবে কাজ করবে।যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘কিপ স্টাব’ এই স্মারকগুলো তৈরি করছে। তাদের ওয়েবসাইটে ৪৫০ ডলারের সংস্করণ ছাড়াও আরও তিনটি ভিন্ন সংস্করণ পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলোর দাম যথাক্রমে ৯০০, ১২০০ ও ৩০০০ মার্কিন ডলার। প্রতিটি সংস্করণের জন্য মাত্র ২০২৬টি টুকরো বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সবগুলো স্মারক বিক্রি হলে এ খাত থেকে ফিফার আয় হবে ১ কোটি ১২ লাখ ডলারের বেশি।দামের ওপর ভিত্তি করে বদলে যাবে স্মারকের আকার ও উপহারের তালিকা। ৩০০০ ডলার বা প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা মূল্যের ‘হিরো এডিশন’-এ ৩ ইঞ্চি আকারের ঘাসের টুকরোর সঙ্গে মিলবে সোনা দিয়ে খোদাই করা একটি ধাতব টিকিট, ফাইনাল ম্যাচের বলের মিনি রেপ্লিকা এবং ক্রিস্টাল কাচের তৈরি বিশ্বকাপ ট্রফি।অবশ্য যে মাঠের ঘাস নিয়ে এত তোড়জোড়, সেই মাঠের মান নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। গত মাসে দ্য অ্যাথলেটিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর ক্যারোলাইনা থেকে ঘাস এনে মে মাসে এই মাঠে বসানো হয়েছিল। তবে আগের ম্যাচগুলো খেলার পর ব্রাজিল ও ফ্রান্সের খেলোয়াড়েরা মাঠটিকে বেশ শুষ্ক বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।\ 

এক টুকরা ঘাসের দাম ৫৫ হাজার টাকা!