সংবাদ
পুলিশের হাতে চাঁদপুরের আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস

নিছক উধাও নাকি পরিকল্পিত পলায়ন? পুলিশের হাতে চাঁদপুরের আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস

চাঁদপুর শহরের আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস ও তার পরিবারের চার সদস্যের রহস্যজনক অন্তর্ধানের অবসান ঘটেছে। নিখোঁজ হওয়ার ১০ দিন পর চট্টগ্রামের পটিয়া ও ফটিকছড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করেছে পুলিশ। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোরে তাদের আটক করা হয়।আটক ব্যক্তিরা হলেন–চাঁদপুর শহরের ‘এসকে শিল্পালয়’ স্বর্ণালঙ্কার প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী পিন্টু দাস, তার স্ত্রী রিমি দাস, বড় ছেলে প্রিয়ম দাস ও ছোট ছেলে রুপম দাস।পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ আগস্ট থেকে পিন্টু দাসের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল এবং তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটিও তালাবদ্ধ ছিল। একই সময় থেকে পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথেও স্বজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ঘটনায় গত ২৬ আগস্ট চাঁদপুরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের দাবি ছিল, পিন্টু দাস ঋণগ্রস্ত ছিলেন এবং স্থানীয় এক ব্যক্তির হুমকির মুখে তিনি পরিবার নিয়ে আত্মগোপনে যেতে পারেন।অন্যদিকে, পিন্টু দাসের বিরুদ্ধে স্বর্ণ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন একাধিক গ্রাহক। রঘুনাথপুরের বাসিন্দা রাসেল খান অভিযোগ করেন, তিনি আড়াই ভরি স্বর্ণালঙ্কার পিন্টু দাসের কাছে বন্ধক রেখেছিলেন। টাকা ফেরত দিয়ে স্বর্ণ নিতে চাইলে পিন্টু তাকে ঘোরান এবং একপর্যায়ে পরিবারসহ উধাও হয়ে যান। দক্ষিণ গুণরাজদীর জাহিদুল ইসলাম ও শুভঙ্কর মজুমদারও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।চাঁদপুর সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গাজী কালাম জানান, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত দুই দিন ধরে তাদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছিল। অবশেষে শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির একটি বাসা থেকে তাদের আটক করা হয়।কেন তারা হঠাৎ আত্মগোপনে গিয়েছিলেন এবং এর পেছনে কেবল ব্যবসায়িক দেনা-পাওনা নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। চাঁদপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়েজ আহমেদ জানান, আটক ব্যক্তিদের চাঁদপুরে নিয়ে আসা হচ্ছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।এর আগে পিন্টু দাসের নিখোঁজের সংবাদে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পাওনাদারদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পাওনাদারদের চাপ ও ব্যবসায়িক জটিলতা এড়াতেই তিনি সপরিবারে আত্মগোপন করেছিলেন।আরো পড়ুন....চাঁদপুরে স্বর্ণ ব্যবসায়ীসহ পরিবারের চার সদস্য উধাও/ 
৫৮ মিনিট আগে

বাড়ছে শিশুদের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা: ময়মনসিংহে বিজ্ঞান সেমিনার

বাড়ছে শিশুদের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা: ময়মনসিংহে বিজ্ঞান সেমিনার

সোনারগাঁয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যাহারের দাবিতে গ্রামবাসীর মানববন্ধন

সোনারগাঁয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যাহারের দাবিতে গ্রামবাসীর মানববন্ধন

দুমকিতে সেজদারত অবস্থায় মৃত ইমামের পরিবারের পাশে ব্র্যাক

দুমকিতে সেজদারত অবস্থায় মৃত ইমামের পরিবারের পাশে ব্র্যাক

কেন্দুয়ায় স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ: গ্রেপ্তার ১, বিএনপি নেতা বহিষ্কৃত

কেন্দুয়ায় স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ: গ্রেপ্তার ১, বিএনপি নেতা বহিষ্কৃত

হিমালয়ে বৃষ্টি ছাড়াই ভয়ংকর ঢল, কী বলছেন বিজ্ঞানীরা

হিমালয়ে বৃষ্টি ছাড়াই ভয়ংকর ঢল, কী বলছেন বিজ্ঞানীরা

শ্রীমঙ্গলে মিলল বিরল প্রজাতির সাপ ও অজগর

শ্রীমঙ্গলে মিলল বিরল প্রজাতির সাপ ও অজগর

কাজী নজরুল ইসলামের বর্ষার গান: প্রকৃতি, চিত্রকল্প ও কাব্যিক উৎকর্ষ

কাজী নজরুল ইসলামের বর্ষার গান: প্রকৃতি, চিত্রকল্প ও কাব্যিক উৎকর্ষ

উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ ও অনিয়ম : দায়িত্ব হারালেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক

উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ ও অনিয়ম : দায়িত্ব হারালেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক

হিমালয়ের বরফ গলায় বিপর্যয়, বিপদে বাংলাদেশও

হিমালয়ের বরফ গলায় বিপর্যয়, বিপদে বাংলাদেশও

নেপালে ‘মহাবিপর্যয়ে’ ভারতীয়দের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

নেপালে ‘মহাবিপর্যয়ে’ ভারতীয়দের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

মতামতমতামত

ইতিহাস আজ ধ্বংসের মুখে, চোখে পড়ছে না কারো?

‎সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি‎পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে আছে শত বছরের পুরনো অসংখ্য স্থাপনা। যা বিভিন্ন সময়ের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু এসব স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। ‎এর মধ্যে অন্যতম সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি। এই জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা প্রতাপশালী হিন্দু জমিদার রেবতী মোহন দাস। ২০ শতকের গোড়ার দিকে তিনি এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। ‎পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে এই বাড়ির মালিক হন তার ছেলে জমিদার রায় বাহাদুর সত্যেন্দ্রনাথ কুমার দাস। তিনি ওয়াল্টার রোড়ে অনেক গুলো বিজলী বাতি স্থাপনের জন্য অর্থ প্রদান করেন। এজন্য ওয়াল্টার রোড়ের একটি বিরাট অংশের নাম তার পিতা রেবতী মোহন দাস এর নামানুসারে রেবতী মোহন দাস বা সংক্ষেপে আর এম রোড় রাখা হয়। ‎কিন্তু দেশভাগের সময় জমিদার বাড়ির বংশধর গণবাড়িটি ছেড়ে চলে যায়। পরে বাড়িটি সরকারের তত্ত্বাবধায়নে চলে আসে। ‎পৃথক দু’টি ৩তলা বিশিষ্ট ভবনের সমম্বয়ে তৈরি ভবনটিতে অসাধারণ ফুলপাতার কারুকার্য রয়েছে যা ঐ সময়ের স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন বহন করে। দক্ষিণের অংশটি বেশি প্রাচীন এবং এর প্রায় ৫০ ফুট উঁচু প্রবেশ মুখ রয়েছে। আর ছাদ তিনটি করিন্থিয়ান স্তম্ভ দ্বারা স্থাপিত। পুরো দালানের ভিতরে বিভিন্ন আয়তনের প্রায় ৩৫টি কক্ষ রয়েছে। অন্য দিকে উত্তর পার্শ্বের তিনতলা ভবনটি রেবতী মোহন দাসের কোন এক আত্মীয় নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। এখানেও ৫০ ফুটের প্রবেশমুখ ও প্রায় সমান সংখ্যক কক্ষ রয়েছে। ‎কিন্তু বর্তমানে ভবনটি মলিন ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যা এখন ব্যবহৃত হয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কোয়ার্টার হিসেবে। এতে করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে এবং বসতি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় যথাযথ ভাবে সংরক্ষন সম্ভব হচ্ছে না।  ‎রূপলাল হাউজ‎রূপলাল হাউস বাংলাদেশের ঢাকার ফরাসগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত ঊনবিংশ শতাব্দীর এক বিশাল অট্টালিকা। ১৮২৫ সালে স্টিফেন আরাটুন নামের একজন আর্মেনীয় ব্যবসায়ী এটি নির্মাণ করেন। কিন্তু ১৮৪০ সালের দিকে ব্যবসায়ী রূপলাল দাশ ও তার ভাই রঘুনাথ দাশ এই বাড়িটি কিনে নেন। পরবর্তীতে, এই বাড়িটির নামকরণ হয় ‘রূপলাল হাউজ’। ছোট ব্যবসা দিয়ে শুরু করে রূপলাল হয়ে ওঠেন শহরের ধনীদের মধ্যে অন্যতম একজন। ‎রূপলাল হাউজের সৌন্দর্য ছিল নৈস্বর্গিক। বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে প্রতিষ্ঠিত এই অট্টালিকার মধ্যে প্রায় ৫০টি ঘর, জলশা ঘর ও বিভিন্ন আলোচনা কক্ষ ছিল। যা তিনটি ব্লকে বিভক্ত ছিল যথা- রূপলাল ব্লক, রঘুনাথ ব্লক ও কেন্দ্রীয় ব্লক। এর জানালা, দরজা, বারান্দা ও ভিতের কারুকার্য অত্যন্ত শৈল্পিক। এছাড়া বুড়িগঙ্গার স্নিগ্ধ বাতাস এক অন্যরকম আবহ তৈরি করতো। ‎রূপলাল হাউজ প্রথম আলোচনায় আসে ১৮৮৬ সালে যখন রূপলাল দাশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সম্মানে একটি বল ডান্স পার্টির আয়োজন করেন। এছাড়া ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগীতজ্ঞ ও শিল্পরা আসতেন যার মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের কথা ও উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটি ছিল তখনকার সময়ে ঢাকা বিলাসবহুল ২টি বাড়ির মধ্যে একটি। ‎১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পরে রূপলাল দাশের পরিবার কলকাতায় চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে একটি আনুষ্ঠানিক বিনিময় দলিলের মাধ্যমে সিদ্দিক জামাল বাড়িটি কিনে নেয়। ‎ইতিহাসের চিহ্ন বহনকারী এই অট্টালিকা এখনও দাঁড়িয়ে আছে পরম অযত্ন আর অবহেলায়। যা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে কয়েক দশকের খন্ডিত মালিকানা আর সীমিত রক্ষণাবেক্ষণের ফলে ধসে পড়া দেয়াল, ভেঙে পড়া সিলিং, দেয়ালের চিরে জন্মানো আগাছা, জমধরা লোহার নকশা আর দেয়ালের বের হওয়া যাওয়া ইটে। ‎সম্প্রতি, প্রত্মতত্ত্ব বিভাগ কিছু অংশের রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার পেলেও সম্পুর্ণ এর আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। রূপলাল হাউজের ধ্বংস শুধু একটি ভবনের ধ্বংস নয় বরং ঊনিশ শতকের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধ্বংস। [লেখক: শিক্ষার্থী, ‎ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]   

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইপিআর কতটা কার্যকর হবে

বাংলাদেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের শুরু হয়েছে। গত ১৩ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা নির্দেশিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ১৩ ধারার অধীনে জারি করা এই নির্দেশিকা প্রকাশের দিন থেকেই কার্যকর হয়েছে।ইপিআর মানে হলো, কোনো প্রতিষ্ঠান বাজারে যে পণ্য বা প্যাকেজিং ছাড়ছে, সেটি ব্যবহারের পর বর্জ্য হিসেবে কী হবে, তার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ও ব্যয়ের একটি অংশও সেই প্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে। এত দিন বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার বড় দায়িত্ব ছিল স্থানীয় সরকার ও অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহকারীদের ওপর। নতুন ব্যবস্থা উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদেরও সেই দায়িত্বের আওতায় আনছে।এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ, প্লাস্টিক ব্যবহারের সুবিধা যারা নিচ্ছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয়ের একটি অংশও তাদের বহন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে উৎপাদকদের কম প্লাস্টিক ব্যবহার, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং তৈরি এবং পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ ব্যবহারে উৎসাহিত করা সম্ভব।তবে গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে কাজ শেষ হয়নি। বরং এখনই শুরু হচ্ছে আসল পরীক্ষা। বাংলাদেশে ইপিআর দরকার কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন পরিষ্কার। পরবর্তী প্রশ্ন হলো, এটি কীভাবে কার্যকর করা হবে।ইপিআর ব্যবস্থার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে এর অর্থায়নের ওপর। প্লাস্টিক সংগ্রহ, পরিবহন, বাছাই ও পুনর্ব্যবহারে বাস্তব খরচ আছে। সেই খরচ মেটানোর মতো অর্থ যদি ব্যবস্থায় না আসে, তাহলে নিবন্ধন ও প্রতিবেদন বাড়লেও পরিবেশগত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।গেজেটের নির্দেশিকায় ইপিআর প্রকল্পের ফি নির্ধারণের একটি কাঠামো রাখা হয়েছে। তবে ফি কতটা হবে, তা নিয়ে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ন্যূনতম ফি নির্ধারণ না থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে কম খরচে আনুষ্ঠানিকভাবে দায় মেটানো সম্ভব হবে, কিন্তু বাস্তবে পর্যাপ্ত প্লাস্টিক সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহার হবে না।তাই ইপিআর ফিকে শুধু একটি নিয়ম মানার খরচ হিসেবে দেখলে চলবে না। ফি এমন হতে হবে, যাতে প্লাস্টিক সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের প্রকৃত ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়।সব প্লাস্টিকের জন্য একই হারে ফি নির্ধারণও যুক্তিসংগত নয়। যে প্লাস্টিক সহজে পুনর্ব্যবহার করা যায়, তার সঙ্গে যে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা কঠিন, তার খরচ এক হওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে পরিবেশগত ক্ষতি ও পুনর্ব্যবহারের সক্ষমতা বিবেচনায় ফি নির্ধারণ করা গেলে উৎপাদকদের প্যাকেজিংয়ের ধরন বদলানোরও প্রণোদনা তৈরি হবে।ইপিআর নির্দেশিকায় প্রথম দুই বছরের জন্য ১৫ শতাংশ প্লাস্টিক সংগ্রহ ও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃতীয় বছর থেকে এই হার বেড়ে যথাক্রমে ৩০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ হবে।শুরু হিসেবে এসব লক্ষ্য বাস্তবসম্মত হতে পারে। কিন্তু একটি সমস্যা হলো, সব ধরনের প্লাস্টিকের জন্য একই ধরনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।বাস্তবে সব প্লাস্টিক সমান নয়। পিইটি বা এইচডিপিইর মতো কিছু প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহারের বাজার ও অবকাঠামো রয়েছে। অন্যদিকে মাল্টিলেয়ার প্যাকেজিং, কিছু ফ্লেক্সিবল প্লাস্টিক ও ইপিএস পুনর্ব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে কঠিন ও ব্যয়বহুল।ফলে একই লক্ষ্য থাকলে সহজে পুনর্ব্যবহার করা যায় এমন প্লাস্টিকের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে মোট সংগ্রহের লক্ষ্য পূরণ হলেও পরিবেশের জন্য বেশি ক্ষতিকর বা কঠিনে-পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকগুলো অবহেলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।তাই পরবর্তী পর্যায়ে প্লাস্টিকের ধরনভেদে আলাদা সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ফিতেও পার্থক্য আনা যেতে পারে। যে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা কঠিন, তার ক্ষেত্রে উৎপাদককে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।বাংলাদেশের প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের বাস্তব চিত্র বুঝতে হলে অনানুষ্ঠানিক খাতকে সামনে আনতেই হবে। বর্জ্য সংগ্রহকারী, ফেরিওয়ালা, ভাঙারি দোকান, ছোট সংগ্রাহক ও পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সংগ্রহ করছে।এই ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে ইপিআরের নতুন সংগ্রহব্যবস্থা তৈরি করলে বাস্তবে একই কাজের জন্য দুটি ব্যবস্থা দাঁড়াবে। এতে খরচ বাড়বে, আবার বিদ্যমান কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।বরং তাদের ইপিআর ব্যবস্থার অংশীদার করা উচিত। পেশাগত প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং স্বচ্ছ পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করে তাদের আনুষ্ঠানিক মূল্যশৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।এতে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি হবে। প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন ও পুনর্ব্যবহার ঘিরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়তে পারে।অর্থাৎ, ইপিআর শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নয়; এটি সবুজ কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগও হতে পারে।একটি পণ্য বাজারে আসার পর তার ইপিআর দায় কার ওপর পড়বে, সেটি পরিষ্কার না হলে পুরো ব্যবস্থাই জটিল হয়ে উঠতে পারে।একটি পণ্যের সঙ্গে উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিক একাধিক পক্ষ জড়িত থাকতে পারেন। একই পণ্যের জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের ওপর একই ধরনের দায় পড়লে ব্যবসায়িক বিরোধ তৈরি হতে পারে। আবার দায় কার, তা অস্পষ্ট থাকলে কেউ দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগও পেতে পারে।তাই উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকের মধ্যে কার প্রধান দায়, তা স্পষ্ট করে দেওয়া দরকার।ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান কখন ইপিআরের আওতায় আসবে, সেটিও দ্রুত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। শুধু প্রতিষ্ঠানের আকার দিয়ে পরিবেশগত দায় নির্ধারণ সব সময় যুক্তিসংগত নয়। ছোট কোনো প্রতিষ্ঠানও বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক প্যাকেজিং বাজারে ছাড়তে পারে।তাই ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের আকারের পাশাপাশি দেশের বাজারে কত পরিমাণ প্লাস্টিক ছাড়া হচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বচ্ছতা প্রয়োজন। যে প্লাস্টিক সত্যিই রপ্তানি হয়েছে এবং দেশের বাজারে আসেনি, তার ক্ষেত্রে অব্যাহতি দেওয়ার যুক্তি রয়েছে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান রপ্তানিমুখী হলেই তার সব পণ্য ইপিআরের বাইরে থাকবে, এমন সুযোগ থাকা উচিত নয়। রপ্তানি নথির মাধ্যমে প্রকৃত পরিমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।প্লাস্টিক সংগ্রহ করলেই কাজ শেষ নয়। সেই প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে তৈরি পণ্যের বাজারও থাকতে হবে।এ ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যেসব পণ্যে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক ব্যবহার করা নিরাপদ ও প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে পুনর্ব্যবহৃত উপাদান ব্যবহারের দিকে যেতে পারে।সরকারি ক্রয়ে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের চাহিদা তৈরি হলে পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। এতে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যশৃঙ্খল গড়ে উঠতে পারে যেমন, সংগ্রহ থেকে বাছাই, পুনর্ব্যবহার, নতুন পণ্য উৎপাদন এবং শেষ পর্যন্ত বাজারজাতকরণ পর্যন্ত।এই সংযোগ তৈরি না হলে ইপিআর মূলত বর্জ্য সংগ্রহের একটি ব্যবস্থা হয়ে থাকবে। আর এই সংযোগ তৈরি করতে পারলে এটি বাংলাদেশের সার্কুলার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।ইপিআর কার্যকর করতে হলে প্রথমেই জানতে হবে, দেশে কত প্লাস্টিক বাজারে আসছে এবং তার কতটুকু বর্জ্য হিসেবে তৈরি হচ্ছে।কোন প্রতিষ্ঠান কত প্লাস্টিক বাজারে ছাড়ছে, কতটুকু সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কতটুকু সত্যিই পুনর্ব্যবহার হচ্ছে, এসব তথ্যের নির্ভরযোগ্য হিসাব দরকার। শুধু কোনো প্লাস্টিক সংগ্রহ করা হয়েছে বললেই সেটি পুনর্ব্যবহার হয়েছে বলে ধরে নেয়া যাবে না।তাই একটি ডিজিটাল নিবন্ধন ও তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তথ্য যাচাই ও অডিটের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি হলে ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের ধরনভেদে লক্ষ্য নির্ধারণ, ফি ঠিক করা এবং কোথায় বিনিয়োগ দরকার, সে সিদ্ধান্ত নেয়াও সহজ হবে।ইপিআরের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো এটি শুধু প্লাস্টিক বর্জ্য কমানোর নীতি নয়; এটি উৎপাদন ও ব্যবসার ধরনেও পরিবর্তন আনতে পারে।সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদকরা অপ্রয়োজনীয় প্যাকেজিং কমাতে, সহজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার করতে এবং পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামালের ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই, পুনর্ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহৃত পণ্য উৎপাদনে নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে।এ কারণে ইপিআরকে বাংলাদেশের শিল্পনীতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং সার্কুলার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা দরকার।বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু বেশি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি অর্থনীতি তৈরি করা, যেখানে ব্যবহারের পর ফেলে দেয়া প্লাস্টিক আবার উৎপাদন ব্যবস্থায় ফিরে আসে।ইপিআর নির্দেশিকা গেজেট হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন প্রয়োজন বাস্তবায়নের প্রস্তুতি।পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত দ্রুত ইপিআর ফি নির্ধারণের স্বচ্ছ কাঠামো, উৎপাদক-আমদানিকারক-ব্র্যান্ড মালিকের দায়, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তির মানদণ্ড এবং রপ্তানি অব্যাহতির যাচাই পদ্ধতি স্পষ্ট করা।একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের ধরনভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, অনানুষ্ঠানিক খাতকে ইপিআরের সঙ্গে যুক্ত করা, তথ্য যাচাইয়ের ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সরকারি ক্রয়ের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহৃত পণ্যের বাজার তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইপিআরের প্রথম কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। কোথায় লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে, কোথায় ঘাটতি থাকছে এবং কোন প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে, সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী নীতি পরিবর্তন করা উচিত।বাংলাদেশে এখন ইপিআর দরকার কি না, সেই বিতর্কের সময় শেষ। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কেমন ইপিআর ব্যবস্থা তৈরি করতে চাই।শুধু নিবন্ধন, ফি ও প্রতিবেদননির্ভর ব্যবস্থা তৈরি করলে ইপিআর আরেকটি নিয়মকানুনের কাঠামোতে পরিণত হতে পারে। কিন্তু উৎপাদকের দায়বদ্ধতার সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রণোদনা, অনানুষ্ঠানিক খাত, নির্ভরযোগ্য তথ্য, পুনর্ব্যবহারের বাজার এবং সরকারি ক্রয়কে যুক্ত করতে পারলে ইপিআর বাংলাদেশের প্লাস্টিক অর্থনীতিকে আরও পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।গেজেট আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন সেই ভিত্তির ওপর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বাংলাদেশের পরবর্তী বড় কাজ। [লেখক: সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)]

রম্যগদ্য: ‘মিউচিয়াল ছিনতাই ও রিপ্রিন্ট’

হেঁ হেঁ হেঁ, ছিনতাই নি মিউচিয়ালি, মাইনে বলি কোই কেউ কাউরে নি ছিনতাই করের! আন্নে মিয়া বাহাত্তোইরা বুইড়া যা মনে আসে তাই কন! হেঁ হেঁ হেঁ, মিউচিয়ালি ছিনতাই!ওই ব্যাটা বুড়বক, পানিওয়ালির পোলা, পৃথিবীতে মিউচিয়ালি ছিনতাই যে কত প্রকার ও কি কি তা তুই জানিস?এইডা কী কন, মিউচিয়ালি ছিনতাই! মিলিমিশি বোই বোই ছিনতাই! ধ্যাৎ তা হয় নাকি?হয় নাকি? মানে কিরে আজকাল তো ঘরে ঘরে মিলেমিশে ছিনতাই চলছে, চলবে।হ হ বুঝছি, বুজঝি, এই যেমুন মনে করেন কনট্রাকটার আর ইক্সিএন টিটিএনওও হ্যাতারা ব্যাবাগতে মিলিমিশি প্রজেক্টের ট্যাকা ছিনতাই করের! হ এইটারে আপনে মিউচিয়ালি ছিনতাই কোইলেও কোইতে পারেন। যেমন বালিশ পাঁচ হাজার টাক! ছাগল বার লক্ষ টাকা... “এইটারে আপনে মিউচিয়ালি ছিনতাই কোইলেও কোইতে পারেন?তুই দেখিস না বীমা কোম্পানিগুলোতে বড় বড় ব্যবসায়ীরা মিউচুয়ালি দুই নাম্বার পণ্য বোঝাই জাহাজ ডুবিয়ে কোটি কোটি টাকার বিমার প্রিয়াম ভাগবাঁটোয়ারা করে!হ হ হুনছি হুনছি বিমা কোম্পানিগুলা বিমার প্রিয়ামের ট্যাকা ভাগ-বাঁটোয়ারার লাই হ্যাতারা বেওয়ারিশ লাশ মেডিকেলের ডোম থ্যেইক্কা কিন্না কোটি কোটি ট্যাকার মাল কামায়!আরে ব্যাটা এগুলোতো সরাসরি ডাকাতি, আমি বলছিলাম মিউচিয়ালি ছিনতাই’এর কথা। মানে ছোট খাটো চামে চামে যারা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে।চামে চামে অনৈতিক কাজ, হেইডা আবার কিরে বাপ।এই যেমন মনে কর তুই স্কুলে বাচ্চা আনতে গেলি, বাচ্চার স্কুল ছুটি হতে এ্যাখনো তিন ঘণ্টা বাকি, তখন মাটি বা খালাটি কি করবেন, তখন স্কুলের কাছের স্বামী বা দুলাভায়ের বাসায় যেয়ে টিভি ইন্টারনেট এইসব দেখে সময়টা পার করে বাচ্চা বা বইনপুতকে নিয়ে বাড়ি ফিরলো।তো ইয়ার মইধ্যে আপনে ছিনতাই দেখলেন কুতায়?যেই লোক জেগে ঘুমায় তাকেতো আর জাগানো যায় না, যেমন মনে কর এইযে প্রতিদিন তোদের সমাজে চাঁদাবাজী চলছে, কোই তোর লক্ষ লক্ষ হকার ভাই কি এর প্রতিবাদ করে! এইযে প্রতিদিনের লাইনের চাঁদাবাজী চলছে এটা ছিনতাইয়ের চেয়ে কম কি, বল? যে চাঁদা দিচ্ছে আর যে চাঁদা নিচ্ছে দু’জনেই তো মিউচুয়ালি মানে আপোসে ছিনতাই চালাচ্ছে!তো আপনের পোরশাষণ কি করবো কন? হ্যেরা হোইলো জনগনের, মানে দেশের মালিকের কর্মকর্তা, মালিক যদি নিজেই মিউচিয়ালি ছিনতাই মাইন্না নেয় তয় আমার আপনের কি করনের আছে কন?কিন্তু তোর কি মনে হয় কোনো মালিক চাইবে তার কর্মচারী তার কাছ থেকে বেতনও নিবে আবার মালিকের কাছ থেকে চান্দাও নিবে, এটা হয় কখনোও!না না নান না, পীরথীবির কুনো দ্যেশে কর্মচারী বেতনও নিবে আবার মালিকের কাছ থেকে চান্দাও নিবে,এইডা হয় না!তাহলে সব সম্ভবের দেশ তোর বাংলাদেশে সবই সম্ভব। এই যে রংপুরের একই পরিবারের চার জনকে হত্যা ইয়াবা সেবন দেখে ফ্যেলায় মার্ডার, মার্ডার করছে কে দু’জন কিশোর বা পনের ষোল বছরের ছেলে। এটা কি সম্ভব!! বাড়ীর কর্তা ও গৃহ বধুকে হত্যা করতে গেলে উনারা তো ওই দু’জন কিশোর বা পনের ষোল বছরের ছেলে কি পারবে ওদের সঙ্গে? ধস্তাধস্তি হবে না? দু’জন কিশোর বা পনের ষোল বছরের ছেলের গায়ে কি আঁচড় বা খামচির দাগ থাকবে না? তোর প্রশাষণ বলছে নিহতের চোয়াল ভাঙা আর পোস্টমর্টেম বলছে, চোয়াল-টোয়াল ভাঙেনি, সব ঠিক আছে। আরো মজার ব্যাপার হলো ওই বাড়ীর বিদ্যুতের লাইন রাস্তার মুল খুঁটি থেকে বিছিন্ন করা হয়েছে, যেটা তোর এই দু’জন কিশোর বা পনের ষোল বছরের ছেলের পক্ষে সম্ভব নয়। তাহলে এবার তুই বল এইসব কাজ মিউচুয়ালি মানে সবাই মিলেমিশে না করলে কি সম্ভব?হেঁ হেঁ কি যে কন, মিউচুয়ালি মার্ডার, মানে যারে মার্ডার করবেন হ্যের লগে আলাপ আলোচানার মাধ্যমে মার্ডার! হি হি পিরথীবির কুনো রম্য লেখকও এইরাম ঘটনা চিন্তা করা পারবো না!কিন্তু বাস্তবেতো ঘটছে ভাই!স্যার একটা কথা কনতো, এইযে লিখছেন মিউচুয়ালি ছিনতাই ও রিপ্রিন্ট, মিউচুয়ালি ছিনতাই তো বুঝলাম কিন্তু এই রিপ্রিন্ট এইডা কী?আরে এতো একদম সিম্পেল, রিপ্রিন্টের, আদীবার মা, আকবর স্যারের লেখা উপন্যাসের মতো শাহ্জাদীর কালো নেকাব তুলে বললেন,“ হেঁ হেঁ পাবেন তো মাত্র নয়’শ টাকা, আর এর জন্য কাগজপত্র যোগাড় করতে উকিলের, ফোন বিল, যাতায়াত সবমিলে খরচ হবে মিনিমাম পাঁচ হাজার টাকা। তাহলে ন’শ টাকার জন্য আপনি কি পাঁচ হাজার টাকা খরচ করবেন? এই কথা শুনে রাসেইল্লা আর চামচ নুরু কয় কী, হি হি বারো হাত কাঁকুড়ের তের হাত বিচি। হি হি হি। ভাই রে ভাই, এ্যাতো প্যাচাইল্লা কারবারে আমারে জড়াইয়েন না স্যার, মিউচিয়াল ছিনতাই, চার মার্ডার, রিপ্রিন্ট, ভাই আপনেগোরে সব বাই বাই, আমি অখন যাই দেশের মালিকের কাছে যাই, দেখি হ্যেরা কি নয়’শ টাকার জইন্য পাঁচ হাজার টাকা খরচ করবো, নাকি চার মার্ডারের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করবো! পারলে প্রতিদিনের লাইনের চন্দাবাজী বন্ধ করবো, হ্যেরা যেইডা করবো হেইডাই আইন...তাহলে যা তুই তোর দেশের মালিকের কাছে, দ্যাখ জনগণ মানে দেশের মালিক কি চায়... [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

শব্দের রাজনীতি, রাজনীতির শব্দ

গণতন্ত্র বলতে আমরা সাধারণত নির্বাচন, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা কিংবা ভোটাধিকারের কথা বুঝি। এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয় অহরহ। কিন্তু গণতন্ত্রের এমন একটি উপাদান আছে, যা নিয়ে কথা কম হয়, অথচ এটিই গণতন্ত্রকে অন্য সব শাসনব্যবস্থা থেকে আলাদা করে দেয়—সেটি হলো গঠনমূলক সমালোচনা। ব্যক্তি আক্রমণ, অশ্রাব্য গালাগালি বা কটূক্তি গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য নয়; বরং এগুলো স্বৈরাচারী মানসিকতার প্রাথমিক লক্ষণ। যে রাজনীতি যুক্তি দিয়ে না জিতে গলাবাজি দিয়ে জিততে চায়, সে রাজনীতি গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলে।শব্দের শক্তি নিয়ে আমরা প্রায়ই উদাসীন থাকি। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, একটি শব্দ যেমন সংলাপের দরজা খুলে দিতে পারে, তেমনি একটি ভুল শব্দ গোটা জাতিকে যুদ্ধ ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মিত্রশক্তি জাপানের কাছে আত্মসমর্পণের শর্ত দিয়ে পটসডাম ঘোষণা জারি করেছিল। জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কানতারো সুজুকি এর জবাবে “মোকুসাতসু” শব্দটি ব্যবহার করেন। এই একটি শব্দের অস্পষ্ট অনুবাদ—নীরব থাকা বোঝানো হলেও তা “উপেক্ষা করা” অর্থে প্রচারিত হয়- বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয় বলে অনেকে মনে করেন। এর পরিণতিতে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নেমে আসে মানব ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ধ্বংসযজ্ঞ। একটি শব্দের অসতর্ক ব্যবহার কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এর চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।আমাদের নিজের ইতিহাসেও এমন উদাহরণ আছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার একটি মন্তব্য আন্দোলনকে নতুন গতি দিয়েছিল, যার পরিণতিতে তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। প্রতিবেশী ভারতেও সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, বেকার যুবসমাজ নিয়ে দেশটির প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের জের ধরে পদত্যাগ করতে হয়েছে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, রাজনীতিতে শব্দচয়ন কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়—এটি জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি আক্রমণ আর গালিগালাজ যেন একরকম স্বাভাবিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। প্রজন্মের ভেদাভেদ নেই বললেই চলে—পুরনো ধারার নেতা থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরাও কমবেশি এই সংস্কৃতির শরিক। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, রাজনীতিতে মিথ্যা প্রচার আর ব্যক্তি আক্রমণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বরং নতুন মোড়কে তা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেও অশোভন স্লোগান আর কটূ ভাষার ব্যবহার এখন যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই প্রবণতা শুধু ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ নেই, জাতীয় রাজনীতির মঞ্চেও তার প্রতিফলন স্পষ্ট। এমনকি যারা নিজেদের জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন, রাজনীতিতে নতুনত্ব ও শালীনতার প্রতিশ্রুতি দেন, তাদের অনেকের আচরণেও পুরনো সেই অসহিষ্ণুতারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এনসিপির জুলাই পদযাত্রার সময় দলটির এক নেতা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে প্রতিপক্ষ দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ও রূঢ় ভাষা ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে, যার জেরে একাধিক স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এমনই এক সংঘর্ষে দলটির এক কর্মী চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারান। রাজনৈতিক বিতর্কে জেতার আগ্রহে উচ্চারিত কয়েকটি শব্দের মূল্য একজন তরুণকে সারাজীবনের জন্য চোখের আলো থেকে বঞ্চিত করেছে—এই মূল্য কি আদৌ পরিশোধযোগ্য? শুধু এই একটি ঘটনা নয়, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের নেতাদের মধ্যেও একে অপরের বিরুদ্ধে লাগামহীন ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। এটি কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির লক্ষণ হতে পারে না। গণতান্ত্রিক রাজনীতি মানে ধৈর্য, সহনশীলতা এবং যুক্তিনির্ভর গঠনমূলক সমালোচনা—প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রতিযোগিতা নয়।এখানেই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও সতর্ক হতে হবে। প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের আগে ভাবতে হবে, এই একটি বাক্য কতজনের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিহাস বারবার শিখিয়েছে, নেতার মুখের একটি অসতর্ক বাক্য শুধু ব্যক্তি সম্মানহানির প্রশ্ন নয়, তা রূপ নিতে পারে সহিংসতায়, এমনকি প্রাণহানিতেও। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে একটি বক্তব্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে লাখো মানুষের কাছে, তাই দায়িত্বও বেড়েছে বহুগুণ।সমালোচনা গণতন্ত্রের প্রাণ, কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে যুক্তিনির্ভর, শালীন ও গঠনমূলক। প্রতিপক্ষকে ভুল প্রমাণ করার অধিকার সবার আছে, কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের নামে ব্যক্তিগত অবমাননা বা মিথ্যাচার গণতন্ত্রকেই দুর্বল করে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিকার অর্থে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করতে চায়, তাহলে সবার আগে দরকার শব্দচর্চায় শালীনতা ফিরিয়ে আনা। নইলে ইতিহাস আবারও প্রমাণ করবে—একটি ভুল শব্দই যথেষ্ট, একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ করে দেওয়ার জন্য।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়]

স্বপ্নের অনুবর্তী কালচক্র: পিঙ্ক বাস ও নাগরিক মর্যাদার নব্য অভিসন্ধি

কিছু স্বপ্ন ব্যক্তিমানসের একান্ত গোপন সম্পদ নয়; তারা সময়ের অন্তঃসলিলায় জন্ম নেয়, সমাজের নীরব আকাক্সক্ষায় পুষ্ট হয় এবং ইতিহাসের অনুকূল ক্ষণ প্রতীক্ষা করে। এমনই এক স্বপ্ন আমি বহু আগে দেখেছিলাম—একটি নগর, যেখানে একজন নারী পথের দিকে তাকিয়ে আশঙ্কার সম্ভাব্য অভিঘাত গণনা করবেন না; বরং তার দৃষ্টি থাকবে গন্তব্যের দিকে, তার চেতনা থাকবে সম্ভাবনার দিকে, আর তার পদক্ষেপ হবে নাগরিক আত্মমর্যাদার স্বাভাবিক অভিব্যক্তি।তখন সে স্বপ্ন ছিল কেবল অন্তর্মুখী কল্পলোকের একটি নৈঃশব্দ্যপূর্ণ নির্মাণ। আজ ‘পিংক বাস’-এর রাজপথে চলমান রথচক্র দেখে মনে হয়, সময় কখনো কখনো মানুষের সুদূরতম প্রত্যাশাকেও বাস্তবতার ভাষায় অনুবাদ করে। যে স্বপ্ন একদিন ব্যক্তিগত অনুভবের অন্তরালে নিভৃতে জ্বলে ছিল, আজ তা সামাজিক অঙ্গীকারের দৃশ্যমান প্রতিমূর্তি হয়ে নগরের পথ অতিক্রম করছে।এই কারণেই পিংক বাস আমার কাছে নিছক একটি গণপরিবহন নয়। এটি এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সামাজিক দর্শনের বহমান প্রতীক; এটি রাষ্ট্রের মানবিক সংবেদনশীলতার একটি ইতিবাচক স্বাক্ষর; এটি এমন এক ভবিষ্যৎ-চিন্তার সূচনা, যেখানে উন্নয়ন কেবল কংক্রিটের উচ্চতায় নয়, নাগরিকের নিরাপত্তাবোধের গভীরতায় পরিমাপিত হয়।সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড কখনো তার অট্টালিকার উচ্চতায় নির্ধারিত হয় না। একটি সমাজ কত দ্রুতগামী, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—সে কতটা মর্যাদার সঙ্গে তার নাগরিকদের চলার অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। বিশেষত নারী যদি জনপরিসরে অবাধ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নিরাপদে বিচরণ করতে পারেন, তবে সেই সমাজের নৈতিক স্থাপত্য যে ক্রমশ পরিণত হচ্ছে, তাতে সন্দেহের অবকাশ থাকে না।আমার বহুদিনের সেই স্বপ্নের কেন্দ্রেও ছিল এই সহজ অথচ গভীর সত্য নিরাপত্তা কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিক অস্তিত্বের মৌলিক পূর্বশর্ত।একজন নারী যখন কর্মস্থলে যান, তিনি কেবল চাকরিতে যোগ দিতে যান না; তিনি নিজের অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের দিকে অগ্রসর হন। একজন শিক্ষার্থী যখন নিরাপদে শিক্ষাঙ্গনে পৌঁছান, তিনি কেবল শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করেন না; তিনি ভবিষ্যতের জ্ঞানভূমিতে পদার্পণ করেন। একজন মা যখন নিশ্চিন্তে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করেন, তখন তার সঙ্গে যাত্রা করে একটি পরিবারের স্থিতি ও আস্থা।অতএব, নিরাপদ চলাচল কেবল ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়; এটি সম্ভাবনার সামাজিক গতিশীলতা।পিংক বাসের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই এটি নারীর চলাচলকে কেবল সহজতর করে না; বরং তার উপস্থিতিকে জনপরিসরের স্বাভাবিক সত্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যেন নগর নিজেই ঘোষণা করছে এই পথ তোমারও, এই শহর তোমারও, এই ভবিষ্যৎ নির্মাণে তোমার অংশীদারিত্বও সমানভাবে অনিবার্য। এই উচ্চারণের সামাজিক মূল্য অপরিসীম।কারণ বহুদিন ধরে নারীর পথচলা ছিল অদৃশ্য সতর্কতার সঙ্গে আপসের ইতিহাস। সময়, দূরত্ব, ভিড় কিংবা পরিবেশ সবকিছুর সঙ্গে তাকে এক ধরনের নীরব সমঝোতায় যেতে হতো। আজকের এই উদ্যোগ সেই দীর্ঘ সামাজিক অভিজ্ঞতার বিপরীতে একটি ইতিবাচক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত বহন করে। এটি যেন বলে নারীর চলার পথকে সংকুচিত করা নয়, বরং পথকেই আরও মানবিক করে তোলাই সভ্যতার দায়িত্ব। আমার একসময় দেখা স্বপ্নটিও ছিল এমনই।আমি কল্পনা করতাম, এমন এক সময় আসবে যখন নারীর নিরাপদ যাতায়াত নিয়ে আলোচনা কোনো বিলাসী প্রত্যাশা হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং এটি হবে উন্নত রাষ্ট্রচিন্তার স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। আজ পিংক বাসের বাস্তব উপস্থিতি দেখে মনে হয়, সেই কল্পনার অন্তত একটি অংশ সময়ের কাছে তার স্বীকৃতি পেয়েছে।স্বপ্নেরও নিজস্ব কালচক্র আছে। কিছু স্বপ্ন তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তব হয় না। তারা মানুষের চেতনায় বীজের মতো সুপ্ত থাকে। নীতি, সদিচ্ছা, সামাজিক সচেতনতা ও সময়ের সম্মিলিত অনুকম্পায় একদিন সেই বীজ অঙ্কুরিত হয়। পিংক বাসকে আমি সেই অঙ্কুরোদ্গমের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে দেখি। এটি প্রমাণ করে, মানবিক প্রয়োজন যখন সামাজিক অগ্রাধিকারে পরিণত হয়, তখন কল্পনাও নীতিতে রূপ নেয়, আর নীতি একসময় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।তবে এই অর্জনের সর্বোচ্চ সৌন্দর্য এর সূচনাতেই।কারণ মহৎ উদ্যোগের প্রকৃত শক্তি তার বর্তমান সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সে ভবিষ্যতের আরও বৃহত্তর রূপান্তরের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। আজ পিংক বাস নারীর নিরাপদ যাত্রার একটি আশাব্যঞ্জক পরিসর নির্মাণ করেছে। আগামী দিনে এই অভিজ্ঞতা সমগ্র গণপরিবহনব্যবস্থাকে আরও শৃঙ্খলিত, প্রযুক্তিনির্ভর, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক করে তুলতে অনুপ্রাণিত করবে টাই প্রত্যাশিত।একদিন হয়তো এমন সময় আসবে, যখন আলাদা কোনো রঙের বাসের প্রয়োজন হবে না; কারণ প্রতিটি বাসই হবে নিরাপদ, প্রতিটি স্টপেজ হবে মর্যাদাপূর্ণ, প্রতিটি রাস্তা হবে সমঅধিকারের, এবং প্রতিটি জনপরিসর হবে নারীর অবাধ নাগরিক উপস্থিতির স্বাভাবিক ভূখণ্ড। কিন্তু সেই সুদূর মানবিক ভবিষ্যতের দিকে যাত্রাপথে আজকের পিংক বাস নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।আমি যখন এর দিকে তাকাই, তখন কেবল একটি বাস দেখি না। দেখি সময়ের সঙ্গে স্বপ্নের সংলাপ। দেখি ব্যক্তিগত প্রত্যাশার সামাজিক রূপান্তর। দেখি রাষ্ট্রের ইতিবাচক দায়বোধের এক চলমান প্রতীক। এবং গভীরভাবে অনুভব করি—মানুষের দেখা কিছু স্বপ্ন কখনো বিলীন হয় না; তারা ইতিহাসের উপযুক্ত প্রহরের অপেক্ষায় থাকে।আজ সেই অপেক্ষার একটি অধ্যায় পূর্ণতা পেয়েছে।হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই উদ্যোগকে শুধু একটি পরিবহনসেবা হিসেবে স্মরণ করবে না। তারা এটিকে দেখবে এমন এক সময়ের স্মারক হিসেবে, যখন সমাজ নারীর নিরাপদ চলাচলকে উন্নয়নের প্রান্তিক বিষয় নয়, বরং সভ্যতার নৈতিক অনিবার্যতা হিসেবে স্বীকার করতে শুরু করেছিল।কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত যানবাহনের সংখ্যা মনে রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে মানুষের জীবনকে কোন সিদ্ধান্ত কতটা মর্যাদাপূর্ণ করে তুলেছিল।পিংক বাস তাই আমার কাছে একসময় দেখা একটি স্বপ্নের অনুবর্তী কালচক্র- যেখানে কল্পনা বাস্তবতার সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রমাণ করেছে, সুদূরপ্রসারী মানবিক স্বপ্ন কখনো নৈঃসঙ্গ্যের অন্ধকারে হারিয়ে যায় না; তারা একদিন সময়ের মহাসড়কে নিজেদের রথচক্র ঘুরিয়েই ইতিহাসে প্রবেশ করে।[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

ছোট শহরগুলোও কি পরিকল্পিত নগরায়ণের অধিকার রাখে না?

বাংলাদেশে নগরায়ণ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। বড় শহরগুলোর পাশাপাশি দেশের ছোট শহর ও পৌর এলাকাগুলোও ক্রমেই জনবসতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই পরিবর্তন কতটা পরিকল্পিত?একটি শহর গড়ে ওঠার পর সেখানে সমস্যা সৃষ্টি হলে সমাধানের চেষ্টা করার চেয়ে শুরুতেই সঠিক পরিকল্পনা করা অনেক বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী। অথচ আমাদের অনেক ছোট পৌরসভায় এখনো ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, ভূমির ব্যবহার, পরিবেশ, জলাবদ্ধতা, যানবাহন, বাণিজ্যিক এলাকা, উন্মুক্ত স্থান ও নাগরিক নিরাপত্তাকে সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয় না।পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ পৌরসভা এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে।করতোয়া নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত দেবীগঞ্জ পৌরসভা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নির্মল পরিবেশের জন্য বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, গাছপালায় ঘেরা সবুজ এলাকা, করতোয়া নদী, ময়নামতির চর এবং তুলনামূলক কম যানজটÑসব মিলিয়ে এখানে একটি স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য পৌর পরিবেশ গড়ে তোলার অনন্য সুযোগ রয়েছে।দেবীগঞ্জ পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত কর্মকাণ্ড যেমন বেড়েছে, তেমনি মানুষের বসতি ও অভ্যন্তরীণ সড়ক ব্যবস্থাও সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণের সঙ্গে যদি ভূমি ব্যবহার ও পানি নিষ্কাশনের সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা, যানজট, অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং পরিবেশগত নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে বর্ষাকালে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দেয়ার বিষয়টি ভাবনার কারণ। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তা নির্মিত হলেও রাস্তার দুই পাশে পর্যাপ্ত ও পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। ফলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতে না পেরে নাগরিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। প্রশ্ন হলোÑসমস্যা আরও প্রকট হওয়ার পর আমরা সমাধানের উদ্যোগ নেব, নাকি এখনই ভবিষ্যৎ বিবেচনায় পরিকল্পনা করবো?আমার বিশ্বাস, এখনই সময় একটি সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের। শুধু দেবীগঞ্জের জন্য নয়, দেশের প্রতিটি ছোট ও মাঝারি পৌরসভার ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা অপরিহার্য।কী হতে পারে সেই পরিকল্পনা?প্রথমত, পৌর এলাকার ভূমি ব্যবহার নির্ধারণ করতে হবে। কোথায় আবাসিক এলাকা, কোথায় বাণিজ্যিক এলাকা, কোথায় সরকারি প্রতিষ্ঠান, কোথায় উন্মুক্ত স্থান, কোথায় সবুজ এলাকা- এসব সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। দেবীগঞ্জের ক্ষেত্রে বাজার ও নির্ধারিত কয়েকটি এলাকাকে বাণিজ্যিক অঞ্চল হিসেবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যেতে পারে। আবাসিক এলাকার ভেতরে যত্রতত্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে একদিকে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ে, অন্যদিকে যানজট ও নাগরিক দুর্ভোগও সৃষ্টি হয়।দ্বিতীয়ত, পৌরসভার বর্তমান খোলা মাঠগুলো সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি শহরের সৌন্দর্য শুধু দালানকোঠায় নয়; তার উন্মুক্ত স্থান, গাছপালা ও সবুজ পরিবেশেও নিহিত। আজ যে মাঠটি অব্যবহৃত মনে হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই হতে পারে শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ, নাগরিকদের হাঁটার স্থান কিংবা একটি উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্র।তৃতীয়ত, ময়নামতির চরসহ প্রাকৃতিক সবুজ অঞ্চল এবং করতোয়া নদীর তীরকে ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। নদীকে দখল বা দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে এর তীরে পরিকল্পিত হাঁটার পথ, বৃক্ষশোভিত উন্মুক্ত স্থান ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এতে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটনেরও সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।চতুর্থত, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু বিচ্ছিন্নভাবে ড্রেন নির্মাণ করলেই হবে না। পুরো পৌর এলাকার জন্য একটি সমন্বিত পানি নিষ্কাশন ও বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোথা থেকে পানি আসবে, কোন পথে যাবে, কোথায় জমা হবে এবং কীভাবে দ্রুত নিষ্কাশিত হবেÑএসব বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।পঞ্চমত, ছোট শহরকে বড় শহরের অনুকরণে গড়ে তোলার পরিবর্তে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করা উচিত। দেবীগঞ্জে ভারী শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে উৎসাহিত করা যেতে পারে।ষষ্ঠত, ভবিষ্যতের যানজট বিবেচনায় নিয়ে এখন থেকেই রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশার চলাচল ও পার্কিংয়ের জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা করতে হবে। শহর বড় হয়ে যাওয়ার পর যানজট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন; কিন্তু ছোট অবস্থায় সঠিক পরিকল্পনা করলে তা অনেক সহজ।সপ্তমত, বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। ভবনের উচ্চতা, রাস্তার প্রশস্ততা, অগ্নিনিরাপত্তা, পার্কিং, আলো-বাতাস এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয়া হলে ভবিষ্যতে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। নাগরিক নিরাপত্তাও আধুনিক পৌর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও জনসমাগমস্থলে পর্যাপ্ত সড়কবাতি এবং সিসিটিভি স্থাপন করা হলে নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি রাতের শহরও আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে।উন্নয়ন বনাম পরিবেশÑএই দ্বন্দ্ব কেন?অনেক সময় মনে করা হয়, পরিবেশ সংরক্ষণ করলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। বাস্তবে বিষয়টি উল্টো। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পাশাপাশি চলতে পারে। একটি পৌরসভায় আজ রাস্তা তৈরি করা হলো, কাল রাস্তার জন্য ড্রেন ভাঙতে হলো, পরদিন নতুন ভবনের জন্য রাস্তা প্রশস্ত করতে হলোÑএ ধরনের বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে অর্থের অপচয় এবং নাগরিক ভোগান্তি দু’টোই বাড়ায়। অন্যদিকে, আগে থেকে একটি মাস্টার প্ল্যান থাকলে একই পরিকল্পনার আওতায় সড়ক, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা এবং সবুজ স্থানÑসবকিছু সমন্বিতভাবে উন্নয়ন করা সম্ভব।এখনই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়দেবীগঞ্জ এখনো এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যখন পরিকল্পিতভাবে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার সুযোগ রয়েছে। শহরটি অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে যাওয়ার আগেই যদি ভূমি ব্যবহার, পরিবেশ, সড়ক, ড্রেনেজ, বাণিজ্যিক এলাকা ও উন্মুক্ত স্থান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ নাগরিকরা এর সুফল পাবেন।দেবীগঞ্জ শুধু একটি উদাহরণ। দেশের অসংখ্য ছোট পৌরসভা একই ধরনের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই ছোট শহরগুলোর উন্নয়নকে শুধু স্থানীয় বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি দেশের সামগ্রিক নগরায়ণ নীতির অংশ হওয়া উচিত।আমরা এমন শহর চাই না, যেখানে উন্নয়নের নামে একের পর এক ভবন উঠবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে মাঠ, গাছ, জলাশয় ও নদীর তীর। আমরা এমন শহর চাই, যেখানে উন্নয়ন হবে- কিন্তু পরিকল্পিতভাবে; ভবন হবে- কিন্তু পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে; রাস্তা হবেÑকিন্তু জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না করে; বাণিজ্য বাড়বে- কিন্তু আবাসিক এলাকার স্বাভাবিক জীবন নষ্ট না করে। দেবীগঞ্জের মতো ছোট শহরগুলোকে এখনই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া গেলে ভবিষ্যতে এগুলোই হতে পারে বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৌর নগরীর মডেল।প্রশ্নটি তাই শুধু দেবীগঞ্জকে নিয়ে নয়- আমরা কি আমাদের ছোট শহরগুলোর ভবিষ্যৎও আজ থেকেই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে চাই?[লেখক: প্রকৌশলী; সাধারণ সম্পাদক, দেবীগঞ্জ উপজেলা কল্যাণ সমিতি, ঢাকা]

জলবায়ু পরিবর্তন কি ডেঙ্গুকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে?

ডেঙ্গু এখন আর কোনোভাবেই কেবল ‘বর্ষার রোগ’ নেই। ডেঙ্গু এখন বছরজুড়ে থাকা এক সমস্যা। সমস্যার স্বরূপ এখন অনেকটাই বদলে গেছে। ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তার এখন আর শুধু রাজধানী ঢাকা বা বড় শহরগুলোর অভিজাত এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের মডেল অনুযায়ী বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট এবং খুলনা জেলা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বাস্তবেও তাই ঘটছে। ঢাকায় সংক্রমণের সুযোগ কমে এলেও উপকূলীয় ও প্রান্তিক জেলাগুলোয় রোগী বাড়ছে। শেষ কয়েক বছরের প্রতি মৌসুমে ডেঙ্গু ছড়িয়েছে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায়। ২০২৬ সালের জুনের একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বর্ষা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই ৫৮টি জেলায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে তা ৬৪ জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে। এর অর্থ হলো, ডেঙ্গু এখন একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে এবং প্রত্যন্ত গ্রামেগঞ্জে পর্যন্ত ভয়াবহভাবে বিস্তার লাভ করেছে।এই বদলে যাওয়া চিত্রের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মশা এক্টোথার্ম বা শীতল রক্তের প্রাণী। তার দেহের তাপমাত্রা সরাসরি পরিবেশের তাপমাত্রার সাথে বাঁধা। তাই তাপমাত্রা বাড়লে তার শরীরের ভেতরের সব রাসায়নিক প্রক্রিয়াই দ্রুত চলতে শুরু করে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্পর্ক খুব নিবিড়। গবেষণা বলছে, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে মশার কামড়ের মধ্যবর্তী সময় প্রায় অর্ধেক হয়ে আসে, সংক্রমণ বেড়ে যায় অন্তত ২.৪ গুণ। ২৮ ডিগ্রির কাছাকাছি তাপমাত্রায় কামড়ানো ও সংক্রমণ দুটোই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। বিপাকক্রিয়া দ্রুত হওয়ায় ডিম পাকার চক্রও ছোট হয়ে আসে, ফলে স্ত্রী মশাকে বেশি ঘন ঘন রক্ত খুঁজতে হয়। একই সঙ্গে মশার দেহে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির গতিও বহুগুণ বেড়ে যায়। ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রিতে উঠলেই ভাইরাসের ইনকিউবেশন সময় ১৫ দিন থেকে নেমে আসে ৬-৭ দিনে।জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির ধরনও বদলেছে। আগের মতো টানা কয়েক দিনের হালকা বর্ষণের বদলে এখন হুট করে তীব্র বৃষ্টি হচ্ছে, তারপর দীর্ঘ বিরতি। এই অনিয়মিত কিন্তু তীব্র বৃষ্টিপাত শহর-গ্রাম দুই জায়গাতেই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি করছে, আর এডিস মশা পাচ্ছে অগণিত নতুন প্রজননক্ষেত্র। জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উঠলে আমাদের চোখে সাধারণত ভাসে উপকূলে বাঁধ ভাঙার দৃশ্য বা কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বাড়ার চিত্র। ডেঙ্গুর এই বিস্তারও যে একই সংকটের অংশ, সেটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই।মশার আচরণেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে জানা ছিল, এডিস শুধু পরিষ্কার জমা পানিতে ডিম পাড়ে। এখন দেখা যাচ্ছে, নোংরা-ড্রেনের পানিতেও দিব্যি বংশবিস্তার করছে। জুলাইয়ে ঢাকায় মাঠপর্যায়ে কাজ করা এক জাপানি গবেষক দল নাকি এই দৃশ্য দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিলেন, এমন অভিজ্ঞতা তাঁদের কারও কখনো হয়নি। ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল, প্রায় সাড়ে তিন লাখ আক্রান্ত। এরপর ভাবা হয়েছিল পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু ২০২৫ সালেও লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ৪১৩ জন। প্রবণতাটা নিম্নমুখী নয়, বরং জটিল হচ্ছে ক্রমশ।এখানেই আসল সমস্যা। আমাদের নীতি এই বদলে যাওয়া বাস্তবতার সাথে তাল মেলাতে পারছে না। প্রতি বছর একই চক্র দেখা যায়। বর্ষা এলে ফগার মেশিনের ধোঁয়া, সংবাদ সম্মেলন, আশ্বাসবাণী আর তারপর বর্ষা শেষে বিস্মৃতি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরও একটা নির্দিষ্ট সমস্যা। সিটি করপোরেশনের মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম মূলত লক্ষ্য করে কিউলেক্স মশাকে, যেটা ড্রেন-নর্দমার পচা পানিতে জন্মায়। অথচ ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস মশা, যার প্রজনন হয় বাড়ির ভেতরে-আশপাশে জমা পরিষ্কার পানিতে। বছরের পর বছর যে ফগিং চলছে, সেটা আসলে ভুল মশাকে টার্গেট করছে। যোগ হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতাও। রোগ নজরদারির দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের, কিন্তু মশার উৎস নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থানীয় সরকারের অধীনে। দুইয়ের মাঝে সমন্বয় প্রায়ই দুর্বল থাকে। স্বাস্থ্য খাতের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৬-৩১ চালু হয়েছে বটে, কিন্তু কাগুজে পরিকল্পনা আর মাঠের বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাক থেকেই যাচ্ছে। তবে আশার জায়গাও আছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তৈরি “ডেন-এক্স ট্র্যাপ” বিদ্যুৎ ছাড়াই চলা, দেশীয় উদ্ভিদ-উপাদান দিয়ে তৈরি একটা মশার ফাঁদ, যা স্ত্রী এডিসকে ডিম পাড়তে প্রলুব্ধ করে কিন্তু সেই ডিম নষ্ট করে দেয়। এখন এটি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় তিন হাজার স্থাপন করা হয়েছে। এমন কম খরচের, স্থানীয় সমাধান বাড়ানোর সুযোগ আছে সারা দেশে।সমাধানের রাস্তাটা তাই স্পষ্ট। মশা নিয়ন্ত্রণকে ঋতুভিত্তিক না রেখে সারা বছরের কর্মসূচি করতে হবে, শুষ্ক মৌসুম থেকেই প্রজননস্থল ধ্বংসের কাজ জোরদার করে। আবহাওয়া ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য একত্র করে পূর্বাভাসভিত্তিক সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আর ঢাকার বাইরে, বিশেষত উপকূলীয় জেলাগুলোতে পৌরসভা-ইউনিয়ন পর্যায়ে হাসপাতাল ও রোগ-নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, কারণ ঝুঁকিটা এখন সেখানেই বেশি।লেখার শুরুতে যে সংখ্যাগুলোর কথা বলেছিলাম, সেখানেই ফিরি। ৬৫ জনের মৃত্যুর আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্রমবর্ধমান প্যাটার্নটাই আসল সংকেত। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে ডেঙ্গু তার রূপ বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত, আমরা এখনো পড়ে আছি পুরোনো ধাঁচের প্রস্তুতি নিয়ে। এই ফারাকটা যত দ্রুত ঘোচানো যাবে, ততই মঙ্গল।[লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

খাদ্য প্রকৌশলেই বদলাচ্ছে বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

আমরা প্রতিদিন যে প্যাকেটজাত দুধ পান করি, বোতলজাত ফলের জুস কিনি, বিস্কুট খাই, সস ব্যবহার করি কিংবা হিমায়িত মাছ, মাংস ও সবজি রান্না করি—এসব খাদ্য আমাদের কাছে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। আধুনিক খাদ্যশিল্প এখন শুধু খাদ্য তৈরি বা সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, অটোমেশন, তথ্যপ্রযুক্তি, প্যাকেজিং, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে এটি একটি অত্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে খাদ্য প্রকৌশল বা ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং।বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় দেশের অধিকাংশ প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ছোট পরিসরে এবং তুলনামূলকভাবে শ্রমনির্ভর পদ্ধতিতে উৎপাদিত হতো। বর্তমানে চাল, আটা-ময়দা, ভোজ্য তেল, দুধ, বিস্কুট, নুডলস, পানীয়, ফলের জুস, সস, মসলা, হিমায়িত খাদ্য, মাছ-মাংসসহ অসংখ্য পণ্য আধুনিক কারখানায় বৃহৎ পরিসরে উৎপাদিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোক্তার প্রত্যাশাও পরিবর্তিত হয়েছে। এখন নিরাপদ খাদ্য, দীর্ঘ শেলফ লাইফ, উন্নত স্বাদ, পুষ্টিগুণ, সুবিধাজনক প্যাকেজিং এবং সাশ্রয়ী মূল্য—সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হচ্ছে। এসব লক্ষ্য অর্জনে খাদ্য প্রকৌশলের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।খাদ্যবিজ্ঞান ও খাদ্য প্রকৌশল পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলেও এক নয়। খাদ্যবিজ্ঞান মূলত খাদ্যের রাসায়নিক গঠন, পুষ্টিগুণ, অণুজীব, স্বাদ, রং, গঠন এবং সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করে। অন্যদিকে খাদ্য প্রকৌশল সেই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে শিল্পপর্যায়ে বাস্তবায়ন করে। পরীক্ষাগারে এক লিটার দুধ বা এক কেজি সস তৈরি করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু প্রতিদিন কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ লিটার একই মানের পণ্য উৎপাদন করতে হলে ট্যাংক, পাম্প, পাইপলাইন, মিক্সার, হিট এক্সচেঞ্জার, হোমোজেনাইজার, রেফ্রিজারেশন, ফিলিং ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। কোন যন্ত্রের ক্ষমতা কত হবে, কীভাবে তাপমাত্রা, চাপ ও তরল প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং কীভাবে নিরাপত্তা বজায় রেখে উৎপাদন বাড়ানো যাবে- এসবই খাদ্য প্রকৌশলের বিষয়।বাংলাদেশে এর পরিচিত উদাহরণ দেখা যায় চাল প্রক্রিয়াজাতকরণে। আধুনিক রাইস মিলে ধান পরিষ্কার, পাথর ও অন্যান্য অপদ্রব্য অপসারণ, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, শুকানো, খোসা ছাড়ানো, পালিশ, ভাঙা চাল আলাদা করা, রং অনুযায়ী বাছাই এবং প্যাকেজিং- প্রতিটি পর্যায়ে প্রকৌশল প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। অপটিক্যাল কালার সোর্টার দ্রুত বিপুল পরিমাণ চাল পরীক্ষা করে ত্রুটিপূর্ণ দানা আলাদা করতে পারে। সঠিকভাবে শুকানো ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চালের ভাঙন এবং সংরক্ষণকালীন ক্ষতিও কমানো যায়। একইভাবে আধুনিক আটা-ময়দা কারখানায় গম পরিষ্কার, কন্ডিশনিং, রোলার মিলিং, সিভিং ও প্যাকেজিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রকৌশল নিয়ন্ত্রণ ব্যবহৃত হচ্ছে।দুগ্ধশিল্প খাদ্য প্রকৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কাঁচা দুধ দ্রুত নষ্ট হতে পারে এবং এতে রোগসৃষ্টিকারী অণুজীব থাকতে পারে। তাই পাস্তুরাইজেশন, হোমোজেনাইজেশন, ইউএইচটি প্রক্রিয়াকরণ, দ্রুত শীতলীকরণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত প্যাকেজিং ব্যবহার করা হয়। আধুনিক হিট এক্সচেঞ্জারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিতভাবে দুধ গরম ও ঠান্ডা করা সম্ভব। আবার ক্লিন-ইন-প্লেস বা সিআইপি প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্যাংক ও পাইপলাইন না খুলেই পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা যায়। এতে বৃহৎ পরিসরে নিরাপদ ও ধারাবাহিক মানের দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন সহজ হয়।ফলের জুস, কোমল পানীয় এবং অন্যান্য পানীয় উৎপাদনেও খাদ্য প্রকৌশল অপরিহার্য। পানি পরিশোধন, উপাদান মেশানো, দ্রবীভূত করা, অম্লতা ও দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ নিয়ন্ত্রণ, হোমোজেনাইজেশন, পাস্তুরাইজেশন এবং বোতলজাতকরণের প্রতিটি ধাপ নির্ভুলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তাপমাত্রা, সময়, চাপ কিংবা প্রবাহের গতিতে পরিবর্তন হলে পণ্যের স্বাদ, রং ও স্থায়িত্ব প্রভাবিত হতে পারে। তাই আধুনিক পানীয় কারখানায় সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।বিস্কুট, কেক, রুটি ও অন্যান্য বেকারি পণ্যেও প্রকৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডো মিক্সিং থেকে শিটিং, কাটিং, বেকিং, কুলিং এবং প্যাকেজিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের সঙ্গে তাপ ও ভর স্থানান্তরের সম্পর্ক রয়েছে। ওভেনের তাপমাত্রা, বেকিংয়ের সময় এবং খাদ্য থেকে পানি বের হওয়ার হার পণ্যের রং, স্বাদ, আর্দ্রতা, খাস্তা ভাব ও শেলফ লাইফ নির্ধারণ করে। একইভাবে সস, আচার, জ্যাম ও জেলির ক্ষেত্রে পিএইচ, দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ, সান্দ্রতা, তাপপ্রয়োগ ও প্যাকেজিংয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। ভোজ্য তেল শিল্পেও ডিগামিং, নিউট্রালাইজেশন, ব্লিচিং, ডিওডোরাইজেশন ও ফিল্ট্রেশনের মতো প্রকৌশল প্রক্রিয়া ব্যবহৃত হয়।বাংলাদেশের জন্য খাদ্য প্রকৌশলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো ফল ও সবজির অপচয় কমানো। দেশে আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, পেয়ারা, টমেটোসহ বিভিন্ন মৌসুমি কৃষিপণ্য প্রচুর উৎপাদিত হয়। কিন্তু উপযুক্ত সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে এর একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়। কোল্ড স্টোরেজ, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার পরিবহন, শুকানো, পাল্পিং, ক্যানিং, হিমায়ন এবং অ্যাসেপটিক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এসব পণ্যের মূল্য সংযোজন করা সম্ভব। একটি আমকে শুধু তাজা ফল হিসেবে বিক্রি না করে পাল্প, পিউরি, জুস, নেকটার কিংবা শুকনো আমে রূপান্তর করা গেলে সারা বছর বাজারজাত করা সম্ভব এবং কৃষকও বেশি মূল্য পেতে পারেন।হিমায়িত খাদ্যশিল্পেও বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। মাছ, চিংড়ি, মাংস ও সবজির ক্ষেত্রে দ্রুত হিমায়িতকরণ এবং আইকিউএফ বা ইন্ডিভিজুয়াল কুইক ফ্রিজিং প্রযুক্তি পণ্যের গুণগত মান ধরে রাখতে সাহায্য করে। তবে শুধু কারখানায় হিমায়িত করলেই যথেষ্ট নয়। উৎপাদন থেকে পরিবহন, গুদাম, বিপণন এবং খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় রাখতে হয়। এই ধারাবাহিক ব্যবস্থাই কোল্ড চেইন। বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো এবং মাছ, চিংড়ি, ফল ও সবজি রপ্তানি বাড়ানোর জন্য শক্তিশালী কোল্ড চেইন অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।প্যাকেজিংও আধুনিক খাদ্য প্রকৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্যাকেট শুধু খাদ্য বহনের মাধ্যম নয়; এটি খাদ্যকে অক্সিজেন, আর্দ্রতা, আলো এবং বাহ্যিক দূষণ থেকে রক্ষা করে। খাদ্যের ধরন অনুযায়ী কাচ, ধাতু, কাগজ, প্লাস্টিক বা বহুস্তরবিশিষ্ট প্যাকেজিং নির্বাচন করতে হয়। উন্নত বিশ্বে পরিবর্তিত বায়ুমণ্ডল প্যাকেজিং, অ্যাকটিভ প্যাকেজিং এবং স্মার্ট প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে দীর্ঘ শেলফ লাইফের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিংয়ের গুরুত্ব বাড়বে।খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রকৌশলের ভূমিকা বিশাল। আধুনিক কারখানায় মেটাল ডিটেক্টর, এক্স-রে ইন্সপেকশন, তাপমাত্রা সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদনের মধ্যেই বিভিন্ন সমস্যা শনাক্ত করা যায়। নিরাপদ পানি, বাষ্প, রেফ্রিজারেশন, স্যানিটেশন এবং বর্জ্য পানি শোধনের জন্যও সঠিক প্রকৌশল ব্যবস্থা প্রয়োজন। শুধু ভালো রেসিপি দিয়ে নিরাপদ খাদ্য তৈরি করা যায় না; পুরো কারখানাকে এমনভাবে নকশা ও পরিচালনা করতে হয়, যাতে কাঁচামাল গ্রহণ থেকে প্রস্তুত পণ্য প্যাকেজিং পর্যন্ত দূষণের ঝুঁকি সর্বনিম্ন থাকে।বিশ্বের খাদ্যশিল্প এখন অটোমেশন, রোবোটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন যুগে প্রবেশ করছে। পিএলসি ও স্কাডার মতো স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে কারখানার তাপমাত্রা, চাপ, প্রবাহ, মিশ্রণের অনুপাত এবং উৎপাদনের গতি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন ভিশনের সাহায্যে ত্রুটিপূর্ণ ফল বা খাদ্য শনাক্ত করা, গুণগত মান অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস করা এবং যন্ত্র নষ্ট হওয়ার আগেই সম্ভাব্য সমস্যা অনুমান করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশের খাদ্য কারখানাগুলোতেও আগামী দিনে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে।একই সঙ্গে খাদ্য প্রকৌশলকে টেকসই উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। খাদ্য কারখানায় পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, বাষ্প ও রেফ্রিজারেশনের জন্য বিপুল শক্তি ব্যবহৃত হয়। আধুনিক হিট এক্সচেঞ্জার, বর্জ্য তাপ পুনরুদ্ধার, উচ্চ দক্ষতার মোটর, পানি পুনর্ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় ও পরিবেশগত প্রভাব কমানো সম্ভব। খাদ্যশিল্পের বর্জ্যও সম্পদে পরিণত হতে পারে। চালের কুঁড়া থেকে তেল, ফলের খোসা থেকে পেকটিন ও খাদ্য-ফাইবার, মাছের চামড়া থেকে কোলাজেন এবং জৈব বর্জ্য থেকে পশুখাদ্য, সার বা জৈব জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছোট ও মাঝারি খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে খাদ্য প্রকৌশল প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া। দেশের বহু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আচার, মসলা, বেকারি পণ্য, ফলের জুস, দুগ্ধজাত খাদ্য, শুকনো ফল এবং বিভিন্ন স্থানীয় খাবার উৎপাদন করছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই উপযুক্ত প্রসেস ডিজাইন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসম্মত কারখানা নকশা, শেলফ লাইফ নির্ধারণ এবং আধুনিক প্যাকেজিং প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা এবং বড় খাদ্যশিল্পের সহযোগিতায় সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এসব উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছানো গেলে গ্রাম ও জেলা পর্যায়েই কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন, কর্মসংস্থান ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়বে।বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প এখন এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো আর যথেষ্ট নয়। নগরায়ণ, মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং নিরাপদ ও সুবিধাজনক খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্যশিল্পের ওপর নতুন দায়িত্ব তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টিগুণ, মানের ধারাবাহিকতা, ট্রেসেবিলিটি, শেলফ লাইফ, উৎপাদন দক্ষতা, জ্বালানি ও পানির সাশ্রয় এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতা—সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। কাঁচামাল কোথা থেকে এসেছে, কোন ব্যাচে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে এবং কীভাবে ভোক্তার কাছে পৌঁছেছে—প্রয়োজনে এসব তথ্য দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থাও আধুনিক খাদ্যশিল্পের অপরিহার্য অংশ।একটি কারখানায় শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করলেই আধুনিক খাদ্যশিল্প তৈরি হয় না। সঠিক কারখানা নকশা, কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্যের প্রবাহ, পরিচ্ছন্ন ও অপরিচ্ছন্ন এলাকার পৃথকীকরণ, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, পানি ও বাষ্প ব্যবস্থাপনা, কার্যকর পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্তকরণ এবং উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ সমান গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য প্রকৌশল এসব বিষয়কে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে একই পরিমাণ কাঁচামাল ও শক্তি ব্যবহার করে বেশি উৎপাদন, কম অপচয় এবং উন্নত মান নিশ্চিত করা সম্ভব।এজন্য গবেষণা ও উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব কৃষিপণ্য ও খাদ্যাভ্যাসকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বিপুল সুযোগ রয়েছে। আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, কলা, আলু, টমেটো, ধান, ডাল, মাছ, দুধ এবং বিভিন্ন দেশীয় মসলা থেকে আরও বেশি মূল্য সংযোজিত খাদ্য তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু শুধু নতুন রেসিপি তৈরি করলেই হবে না; উপযুক্ত প্রক্রিয়াকরণ, তাপপ্রয়োগ, শুকানো, হিমায়ন, ঘনীভবন, প্যাকেজিং এবং শেলফ লাইফ নিয়েও গবেষণা করতে হবে। বাংলাদেশের জলবায়ু, কাঁচামাল ও বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা গেলে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশীয় খাদ্যশিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং খাদ্যশিল্পের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতাও অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্পের বাস্তব সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করা উচিত। অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়কে কাঁচামাল, বাস্তব সমস্যা, পাইলট ট্রায়াল ও শিল্পপর্যায়ের গবেষণার সুযোগ দিতে পারে। নতুন প্রজন্মের খাদ্য প্রকৌশলীদের খাদ্যবিজ্ঞানের পাশাপাশি প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং, তাপ ও ভর স্থানান্তর, রেফ্রিজারেশন, অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই উৎপাদনে দক্ষ করে তুলতে হবে।বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে আধুনিক কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো কৃষিপণ্যকে শুধু কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি না করে মূল্য সংযোজিত খাদ্যে রূপান্তর করা। একটি আম যেমন তাজা ফল হিসেবে বিক্রি করা যায়, তেমনি তা থেকে পাল্প, জুস, নেকটার, পিউরি বা শুকনো আম তৈরি করা যায়। একইভাবে দুধ থেকে দই, পনির ও দুধের গুঁড়া; মাছ থেকে প্রস্তুত খাদ্য ও মূল্যবান উপাদান; চালের কুঁড়া থেকে তেল এবং ফলের খোসা থেকে খাদ্য-ফাইবার বা পেকটিন উৎপাদন করা সম্ভব। খাদ্য প্রকৌশলের মাধ্যমে এই মূল্য সংযোজন যত বাড়বে, কৃষি ও খাদ্যশিল্পের অর্থনৈতিক সম্পর্ক তত শক্তিশালী হবে।এর সুফল সরাসরি কৃষকের কাছেও পৌঁছাতে পারে। উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি ছোট ও মাঝারি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, কোল্ড স্টোরেজ, শুকানোর ব্যবস্থা, পাল্পিং ইউনিট কিংবা হিমায়িতকরণ সুবিধা গড়ে তোলা গেলে মৌসুমে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। এতে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, কৃষক তুলনামূলক ভালো মূল্য পাবেন এবং গ্রামীণ এলাকায় নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ খাদ্য প্রকৌশলের সুফল শুধু বড় কারখানায় সীমাবদ্ধ নয়; সঠিক পরিকল্পনা করা গেলে এটি কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার কাছেও পৌঁছাতে পারে।একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামনে আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাজারের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বাজার সম্প্রসারণ সম্ভব। তবে এর জন্য আন্তর্জাতিক মানের খাদ্য নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্য কোল্ড চেইন, উন্নত প্যাকেজিং, দীর্ঘ শেলফ লাইফ, ট্রেসেবিলিটি এবং প্রতিটি ব্যাচে একই গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ খাদ্য প্রকৌশলী ও আধুনিক প্রযুক্তি এখানে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে পারে।তাই খাদ্য প্রকৌশলকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শিক্ষাবিষয় কিংবা খাদ্য কারখানার একটি কারিগরি বিভাগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি কৃষি, শিল্প, জনস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং পরিবেশকে সংযুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ভিত্তি। সঠিক প্রযুক্তি নির্বাচন, দক্ষ জনবল তৈরি, গবেষণায় বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের কার্যকর সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, মূল্য সংযোজন বাড়বে, কৃষক লাভবান হবেন, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। আগামী চ্যালেঞ্জ হলো এই খাদ্যকে আরও নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়া। কৃষকের মাঠে উৎপাদিত একটি ফল, শস্য কিংবা মাছকে সর্বোচ্চ মূল্য দিয়ে ভোক্তার টেবিলে পৌঁছানোর পুরো যাত্রায় বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের সমন্বয় প্রয়োজন। আজ যদি আমরা খাদ্য প্রকৌশলে যথাযথ বিনিয়োগ করি, দক্ষ জনবল তৈরি করি, গবেষণাকে শিল্পের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করি এবং দেশের নিজস্ব কাঁচামালের জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করি, তাহলে বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যেতে পারে। আগামী দিনের নিরাপদ, আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক এবং টেকসই খাদ্যশিল্প গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে খাদ্য প্রকৌশল।[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

ব্যাটারি অটোরিকশা ধ্বংস করছে গ্রামীণ অর্থনীতিও

একসময় গ্রামের সকাল শুরু হতো লাঙল, গরু, ধানের চারা আর কৃষকের ব্যস্ততায়। এখন অনেক গ্রামের চিত্র বদলে গেছে। ভোর হতে না হতেই গ্রামের রাস্তা দিয়ে ছুটতে শুরু করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। একসময় যে তরুণ বা দিনমজুর ধানের জমিতে কাজ করতেন, তিনিই এখন অটোরিকশার চালক। হাতে কোদাল কিংবা কাস্তের বদলে স্টিয়ারিং; কৃষিজমির বদলে তার কর্মক্ষেত্র সড়ক।ব্যাটারি অটোরিকশা মানুষের চলাচল সহজ করেছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কম খরচে যাতায়াত, গ্রামীণ যোগাযোগ এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থানে এর ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে যানটি একদিকে মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করছে, সেটিই যদি অন্যদিকে কৃষি উৎপাদনের শ্রমবাজারকে ফাঁকা করে দেয়, তাহলে তার সামগ্রিক অর্থনৈতিক মূল্যায়ন আমরা কীভাবে করব?আমার সাম্প্রতিক বরগুনা সফরে এমন একটি চিত্রই চোখে পড়েছে, যা শুধু একটি জেলার নয়, বরং বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে।বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পড়ে আছে। কোথাও জমি প্রস্তুত হয়নি, কোথাও ধানের চারা রোপণ হয়নি। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচের খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমিক সংকট। জমিতে কাজ করার জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। শ্রমিক পাওয়া গেলেও অনেক ক্ষেত্রে দৈনিক মজুরি ১ হাজার টাকার ওপরে দাবি করা হচ্ছে।অন্যদিকে, গ্রামের রাস্তা ধরে তাকালেই দেখা যায়, বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি অটোরিকশা। স্থানীয়দের ভাষায়—“জমিতে কাজ করার মানুষ নেই, কিন্তু রাস্তায় অটো চালানোর মানুষের অভাব নেই।” এটি কেবল একটি পেশার পরিবর্তন নয়; এটি গ্রামীণ শ্রমবাজারের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কৃষির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জমি ও শ্রম। জমি থাকলেই ফসল হয় না; সময়মতো জমি প্রস্তুত করা, চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সার দেওয়া, কীটনাশক প্রয়োগ এবং ধান কাটার জন্য শ্রমিক প্রয়োজন।কিন্তু অটোরিকশা চালানো অনেকের কাছে কৃষিশ্রমের তুলনায় আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কারণ, কৃষিকাজ মৌসুমি, শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর এবং আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। বিপরীতে অটোরিকশা চালালে প্রতিদিন নগদ আয় করার সুযোগ রয়েছে। ফলে কৃষিশ্রমিকের একটি অংশ কৃষি থেকে পরিবহন খাতে চলে যাচ্ছে।এখানেই তৈরি হচ্ছে বিপদ। কৃষকের জমি আছে, কিন্তু শ্রমিক নেই। শ্রমিক পাওয়া গেলেও মজুরি বেড়ে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। আর উৎপাদন খরচ বাড়লে কৃষকের লাভ কমছে। লাভ কমলে কৃষক পরবর্তী মৌসুমে চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এভাবে ধীরে ধীরে জমি অনাবাদি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।বরগুনার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালে জেলার ছয় উপজেলায় প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছিল—যা সে সময়কার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২ হাজার হেক্টর বেশি।  অর্থাৎ দক্ষিণের এই উপকূলীয় জেলাতেও বোরো চাষের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় যদি দেখা যায় শ্রমিকের অভাবে জমি পড়ে থাকছে, তাহলে বিষয়টি কৃষি বিভাগের পাশাপাশি জাতীয় নীতিনির্ধারকদেরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।অবশ্য বরগুনায় সব জমি অনাবাদি হওয়ার কারণ অটোরিকশা—এমন সরল সিদ্ধান্তেও যাওয়া যাবে না। সেচের পানি, লবণাক্ততা, আবহাওয়া, উৎপাদন খরচ, বাজারদর এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগও কৃষির বড় সমস্যা। ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে অতিজোয়ারের নোনা পানিতে বরগুনার পাথরঘাটায় ফসলের ক্ষতির খবরও এসেছে।কিন্তু শ্রমিক সংকট ও পেশা পরিবর্তনের বিষয়টি এখন আলাদা করে তদন্ত করার সময় এসেছে।ব্যাটারি অটোরিকশার আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো বিদ্যুৎ। ব্যাটারি চালিত তিনচাকার একটি যান প্রতিদিন কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে—এ নিয়ে গবেষণায় বিভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক একটি গবেষণাপত্রে প্রতি গাড়িতে দৈনিক প্রায় ৮–১০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব দেওয়া হয়েছে। একই গবেষণায় দেশে এ ধরনের যানবাহনের সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন হলে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবহারে বড় চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে এটি গবেষণাভিত্তিক অনুমান; সরকারি জাতীয় হিসাব নয়।আরও পুরোনো বাংলাদেশি গবেষণায় স্থানীয় শহরের বিদ্যুৎ চাহিদার ওপর ব্যাটারি অটোরিকশার উল্লেখযোগ্য প্রভাব পাওয়া গেছে। রাজশাহী শহর নিয়ে একটি গবেষণায় ব্যাটারি অটোরিকশার বিদ্যুৎ ব্যবহার মোট শহুরে লোডের প্রায় ৪.৩ শতাংশ হিসেবে হিসাব করা হয়েছিল। অন্য একটি গবেষণায় রাজশাহী শহরে এই হার ৭–৯ শতাংশ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত “দেশের মোট বিদ্যুতের ৫ শতাংশ ব্যাটারি অটোরিকশা খেয়ে ফেলছে”—এমন নির্দিষ্ট দাবি সরাসরি সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, সারা দেশে ব্যাটারি অটোরিকশার সঠিক সংখ্যা ও তাদের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি জরিপ এখন জরুরি। কারণ, বিদ্যুৎ শুধু একটি যান চালানোর জন্য নয়। এই বিদ্যুৎ দিয়ে সেচ পাম্প চলতে পারে, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের কোল্ডস্টোরেজ চলতে পারে, ক্ষুদ্র শিল্প চলতে পারে, গ্রামীণ ব্যবসা-বাণিজ্য চলতে পারে। প্রশ্নটা তাই শুধু—“অটো কত বিদ্যুৎ খায়?”—এটা নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—“এই বিদ্যুৎ ব্যবহারের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক মূল্য কোথায়?”একজন কৃষিশ্রমিক যখন জমিতে কাজ করেন, তখন তার শ্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক চক্র। কৃষকের জমিতে কাজ হয়, ধান উৎপাদিত হয়, ধান মিলে যায়, চাল বাজারে আসে, পরিবহন হয়, ব্যবসা হয়। অর্থাৎ একজন শ্রমিকের কৃষিকাজ শুধু তার নিজের আয় নয়; এর সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থারও সম্পর্ক রয়েছে।অন্যদিকে, একজন অটোরিকশা চালকও অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। কিন্তু যদি একই গ্রামের ১০০ জন শ্রমিকের বড় অংশ কৃষিকাজ ছেড়ে অটোরিকশা চালাতে শুরু করেন, তখন স্থানীয় অর্থনীতির উৎপাদন কাঠামোতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। রাস্তা দিয়ে ১০০টি অটোরিকশা চলবে, কিন্তু সেই গ্রামের জমিতে ধান ফলবে না—এমন অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। কারণ মানুষ পরিবহনে আয় করতে পারে, কিন্তু খাদ্য উৎপাদনের বিকল্প তৈরি করতে পারে না।কৃষকের অভিযোগ—শ্রমিক পাওয়া গেলে মজুরি অনেক বেশি। একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেলে ছোট ও মাঝারি কৃষকের ওপর চাপ বাড়ে। এক একর জমিতে কয়েক দফা শ্রমিক লাগলে শুধু শ্রমের পেছনেই বড় অঙ্কের টাকা চলে যায়। এর সঙ্গে সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ, জমি প্রস্তুত ও পরিবহন খরচ যোগ হয়। ফলে কৃষক হিসাব করেন—ধান চাষ করে সব খরচ বাদ দিয়ে কত থাকবে? যদি উত্তর হয় “লাভ খুব কম”, তাহলে কৃষক চাষ কমাবেন। আর যখন অনেক কৃষক একই সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন স্থানীয় উৎপাদন কমবে।তারপর কী হবে? চাল আমদানি বাড়বে। আমরা কি উৎপাদন ছেড়ে আমদানিনির্ভর হচ্ছি? চালের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আমদানি পরিসংখ্যান বিষয়টি নতুন করে ভাবার সুযোগ দেয়।বাসসের খাদ্য অধিদপ্তরভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ১৭ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে মোট ৭৩ লাখ ১৬ হাজার ১৯৪ টন চাল আমদানি হয়েছে। একই সময়ে মোট খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে ৮৫ লাখ ৮৩ হাজার ৫১ টন। এখানে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। চাল আমদানির পেছনে শুধু কৃষিশ্রমিক সংকট বা অটোরিকশাকে দায়ী করা যাবে না। বাজারদর, মজুত, উৎপাদন, সরকারি খাদ্যনীতি, আন্তর্জাতিক বাজার এবং খাদ্যনিরাপত্তার কৌশল—সবকিছুর প্রভাব রয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যায়—যদি আমাদের কৃষিজমি থাকে, কৃষক থাকে, কিন্তু কৃষিশ্রমিক না থাকে, তাহলে উৎপাদনের জায়গায় আমদানির ওপর নির্ভরতা কি ধীরে ধীরে বাড়বে না?চলতি বোরো মৌসুমে সরকার ৫ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল, ১ লাখ টন আতপ চাল এবং ৫০ হাজার টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এমন সময়ে দেশের কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে থাকা কিংবা শ্রমিকের অভাবে চাষ কমে যাওয়া কোনোভাবেই স্বস্তির বিষয় নয়। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—এই কলামের উদ্দেশ্য ব্যাটারি অটোরিকশা নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা নয়। কারণ, এটি এখন লাখ লাখ মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। গ্রাম ও মফস্বলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। সমস্যা হচ্ছে অপরিকল্পিত বিস্তার। যেখানে কৃষিশ্রমিকের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সেখানে শ্রমবাজারে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে—তা নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। কোথায় কত অটোরিকশা চলছে, কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, কোথা থেকে চার্জ হচ্ছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য আলাদা মিটার আছে কি না—এসবেরও পূর্ণাঙ্গ জাতীয় তথ্য নেই। সরকার চাইলে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারে।প্রথমত, সারা দেশে ব্যাটারি অটোরিকশার নিবন্ধন ও প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোন জেলা বা উপজেলায় কত বিদ্যুৎ এসব যানবাহনের চার্জে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার হিসাব করতে হবে। তৃতীয়ত, কৃষি মৌসুমে শ্রমিক সংকটের ওপর এর প্রভাব নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর যৌথ গবেষণা প্রয়োজন।চতুর্থত, কৃষিশ্রমিককে কৃষিতে ধরে রাখতে আধুনিক কৃষিযন্ত্র, উৎপাদনভিত্তিক মজুরি, কৃষি শ্রমিকের প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, যেখানে কৃষিশ্রমিকের ভয়াবহ সংকট রয়েছে, সেখানে কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে ভর্তুকি বা সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একজন কৃষক যেন একজন শ্রমিকের ওপর নির্ভর না করে মেশিন দিয়ে জমি প্রস্তুত, রোপণ ও ধান কাটতে পারেন—সেই ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাটারি অটোরিকশা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির শত্রু—এমন সরল সিদ্ধান্ত হয়তো ঠিক নয়। কিন্তু অপরিকল্পিত অটোরিকশা বিস্তার যদি কৃষি শ্রমবাজারকে এমনভাবে বদলে দেয় যে কৃষক জমিতে শ্রমিক না পেয়ে চাষ ছেড়ে দেন, তাহলে সেটি আর শুধু পরিবহন খাতের বিষয় থাকে না; এটি খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।আজ বরগুনার কোনো কৃষক যদি বলেন—“জমি আছে, কিন্তু চাষ করার মানুষ নেই”—তাহলে সেই কথাকে শুধু একজন কৃষকের ব্যক্তিগত অভিযোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ, আজ যদি কৃষিশ্রমিক অটোরিকশার চালক হয়ে যায়, কাল যদি কৃষক জমি চাষ না করেন, পরশু যদি বাজারে চালের ঘাটতি তৈরি হয়—তখন সেই ঘাটতি পূরণ করতে আমাদের আরও চাল আমদানি করতে হবে।অর্থাৎ যে গ্রাম একদিন দেশের খাদ্য উৎপাদন করত, সেই গ্রাম যদি একসময় শুধু যাত্রী পরিবহন করে—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: আমরা কি গ্রামীণ অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখী রাখছি, নাকি ধীরে ধীরে শুধু পরিবহননির্ভর করে ফেলছি?ব্যাটারি অটোরিকশা তাই শুধু বিদ্যুৎ খরচের হিসাব নয়। এটি শ্রমের হিসাব। এটি কৃষকের হিসাব। এটি জমির হিসাব। এবং শেষ পর্যন্ত—এটি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার হিসাব।লেখক: গণমাধ্যম কর্মী, ঢাকা।

ভিডিও আরও দেখুন

ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে উয়েফার বড় অ্যাকশন

বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব ও শেয়ার ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে গোপনে বিক্রির চেষ্টার অভিযোগে বড় ধরনের আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে দীর্ঘদিনের চাপা উত্তেজনা এবার প্রকাশ্য সংঘাতের রূপ নিচ্ছে। ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে সুইজারল্যান্ডে ফৌজদারি মামলা দায়েরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা।ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি স্পোর্টস ও স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উয়েফার আইনি দলিলের সূত্র অনুযায়ী ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ‘ফৌজদারি অব্যবস্থাপনার’ (Criminal Mismanagement) অভিযোগ আনা হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের দণ্ডবিধির ১৫৮ অনুচ্ছেদের অধীনে এই মামলা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।বিরোধের মূলে রয়েছে ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের একটি গোপন প্রকল্প। অভিযোগ উঠেছে, ইনফান্তিনো কোনো উন্মুক্ত নিলাম বা স্বাধীন মূল্যায়ন ছাড়াই ফিফার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। এই স্বত্ব লেনদেনের প্রক্রিয়ায় চরম গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়েছিল, যা ফিফার প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক ভাবমূর্তির মারাত্মক ক্ষতি করেছে বলে দাবি উয়েফার।প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহের জন্য উয়েফা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ও ফ্লোরিডার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। তারা বিশ্বখ্যাত ব্যাংক জেপি মরগান, বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটাল এবং এর প্রধান নির্বাহী জশুয়া কুশনারের (ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই) কাছে এ সংক্রান্ত নথিপত্র চেয়ে সমন পাঠিয়েছে।উয়েফার দাবি, ইনফান্তিনো গত ২৮ জুলাই ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টুর্নামেন্টের স্বত্ব পরিচালনার পরিকল্পনা সামনে আনেন। এর মাধ্যমে এক বছর ধরে গোপনে চলা ষড়যন্ত্রের বিষয়টি ফাঁস হয়। উয়েফা মনে করে, ফিফার কাউন্সিল বা ২১১টি সদস্যদেশকে এই মেগা ডিল সম্পর্কে অন্ধকারের রাখা হয়েছিল। ফুটবল বিশ্বের এই দুই প্রভাবশালী সংস্থার আইনি লড়াই এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।/ 

ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে উয়েফার বড় অ্যাকশন