সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন
এসির পানিই এখন পানের উপযোগী

এসির পানিই এখন পানের উপযোগী

পানির সংকট মেটাতে নতুন দিগন্ত এসির পানি জমিয়ে ফিল্টার করে পান ও ব্যবহার করা হচ্ছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ভবনে বছরে সাশ্রয় প্রায় ৩০ লাখ টাকারাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা কাকরাইল। সেখানে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ভবনের চিত্রটা এখন আর আগের মতো নেই। ভবনের এসি থেকে অঝোরে ঝরে পড়া যে পানি আগে দেয়াল নষ্ট করতো কিংবা রাস্তায় জমে ভোগান্তি বাড়াতো, সেই পানিই এখন হয়ে উঠেছে অমূল্য সম্পদ।জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একদল মেধাবী প্রকৌশলীর হাত ধরে উদ্ভাবিত হয়েছে এসির পানি পরিশোধন করে তা পানযোগ্য ও ব্যবহার উপযোগী করার এক বিস্ময়কর প্রযুক্তি। এই উদ্ভাবনের ফলে বিশাল এই ভবনের পানির চাহিদার প্রায় ৬৭ শতাংশই এখন পূরণ হচ্ছে এসির ফেলে দেওয়া পানি দিয়ে।গবেষণা থেকে সফলতা: ২০২৪ থেকে ২০২৫ এর যাত্রাএই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ও গবেষক ড. সুশান্ত রায় এবং প্রকৌশলী গোলাম রাব্বীসহ তাদের একটি দক্ষ দল। বৃহস্পতিবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তারা শুনিয়েছেন এই অসাধ্য সাধনের গল্প।ড. সুশান্ত রায় জানান, ২০২৪ সালে তারা প্রথম এই পরিকল্পনা হাতে নেন। দীর্ঘ এক বছরের কঠোর পরিশ্রম, গবেষণা ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষার পর ২০২৫ সালে এসে তারা পূর্ণাঙ্গ সফলতা পান।তিনি বলেন, "আমাদের এই ভবনের বিভিন্ন তলায় ২৫০টিরও বেশি এসি রয়েছে। আগে এই এসির পানি পাইপ দিয়ে বালতিতে জমা হতো কিংবা যত্রতত্র পড়ে ভবনের দেয়াল ও নিচের রাস্তা নষ্ট করতো। এই সমস্যা থেকেই আমরা চিন্তা করি, এই পানিকে কি কোনোভাবে কাজে লাগানো যায়? সেই ভাবনা থেকেই ২০২৪ সালে আমাদের এই স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়।"কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?গবেষক দল জানান, ১০ তলা বিশিষ্ট এই ভবনের ২৫০টিরও বেশি এসির পানি পাইপের মাধ্যমে সংগ্রহ করে একটি বিশেষ ট্যাংকে জমা করা হয়। সেখান থেকে অত্যাধুনিক ফিল্টারিং ও প্রযুক্তিগত শোধনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণের জন্য মাটির নিচে রিজার্ভ ট্যাংকের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।প্রকৌশলী গোলাম রাব্বী এই প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, "আমরা দেখেছি একটি আড়াই টনের এসি থেকে প্রতি ৪০ মিনিটে প্রায় দেড় লিটার এবং এক টনের এসি থেকে এক লিটার পানি জমা হয়। একটি অফিস যদি দিনে ৮ ঘণ্টা চলে এবং তার মধ্যে ৬ ঘণ্টা এসি চালু থাকে, তবে আমাদের এই ২৫০টি এসি থেকে বছরে প্রায় ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৬০০ লিটার পানি পাওয়া সম্ভব। এর ফলে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টাকার পানির খরচ সাশ্রয় হবে।"বিশুদ্ধতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডকেও হার মানিয়েছেএসির এই পানি কতটা নিরাপদ? এমন প্রশ্নের জবাবে গবেষকরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান, এই পানি সম্পূর্ণ ব্যাকটেরিয়ামুক্ত এবং পানের জন্য একদম নিরাপদ। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফল তুলে ধরে ড. সুশান্ত রায় সংবাদকে বলেন, "আমরা এই পানি পরীক্ষা করে দেখেছি এর গুণগত মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন পুরোপুরি অনুসরণ করে। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা ০.০৫ থাকলে চলে, সেখানে এই পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ মাত্র ০.০০১। এছাড়া এতে ক্লোরাইডের পরিমাণ পাওয়া গেছে মাত্র ১০ মিলিগ্রাম।"তিনি আরও যোগ করেন, "যদিও এসির পানিতে কোনো জীবাণু পাওয়া যায়নি, তবুও অধিক সতর্কতার জন্য আমরা এটি ফিল্টারিং সিস্টেমের মাধ্যমে পরিশোধন করছি। বর্তমানে ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ প্রায় ৫’শ মানুষ এবং পথচারীরাও এই পানি পান করছেন। এছাড়া এটি টয়লেট, বাগান ও গাড়ি ধোয়ার কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে।"আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জয়জয়কারবাংলাদেশের প্রকৌশলীদের এই উদ্ভাবন ইতোমধ্যে বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত হয়েছে। ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডে আয়োজিত আন্তর্জাতিক পানি সংস্থার কংগ্রেসে এই গবেষণার ফলাফল ও কৌশল সফলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ড. সুশান্ত রায় ও তার দল এখন এই সাফল্যকে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।ভবিষ্যতের পথ দেখাচ্ছে এই উদ্ভাবনপ্রকৌশলী গোলাম রাব্বী মনে করেন, এই মডেলটি সারা দেশের সরকারি ও বেসরকারি বহুতল ভবনে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে দেশের পানির সংকট অনেকাংশেই দূর হবে।তিনি বলেন, "আমরা তিনজন প্রকৌশলী মিলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই উদ্যোগ নিয়ে সফল হয়েছি। এখন আমাদের লক্ষ্য কীভাবে এই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করা যায়। ভবিষ্যতে এটি পানির একটি প্রধান বিকল্প উৎস হিসেবে কাজ করবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।" মাত্র ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি প্রমাণ করে দিলো, উদ্ভাবনী শক্তি ও সদিচ্ছা থাকলে বর্জ্য থেকেও মহামূল্যবান সম্পদ তৈরি করা সম্ভব। রাজধানীর অন্যান্য ভবনেও যদি এই প্রযুক্তি অনুসরণ করা হয়, তবে তা দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
১ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

রম্যগদ্য: ‘খা খা, ডবল খা’

‘খা খা, ডবল খা, মাইনে কী? পুনারো বছরের খাওন পাঁচ বছরে খাইতে চাইলে তো “ডবল” না ”ট্রিপল” খাওন লাগবো!”“আরে বুড়বক আমি কী খাওয়ার কথা বলছি, আর তুই কী খাবার কথা ভাবছিস?”“উঁ কচি খুকা| বুঝি না মিয়া চান্দাবাজীর কথা কোইবার লাগছেন!”“ওম্মা দেশের বিগত সব চান্দাবাজরা তো এখন বিদেশের মাটিতে তাদের কর্মফল ভোগ করছে| দেশটাকে বাপের দেশ মনে করে যে কর্মকাণ্ড করলি তার ফলশ্রুতিতে এখন চান্দাবাজদের ঘরের চৌকাঠ পর্যন্ত বিলুপ্ত|”“আপনে কি বলতে চান, দেশের চান্দাবাজী বিগত! এ্যখন দেশে আর চান্দাবাজী নাই! বর্তমানে চান্দাবাজী বন্ধ!”“আমি সঠিক বিজ্ঞানের নিয়ম মেনে বলছি যে “খা খা, ডবল খা”|“চান্দাবাজী আবার ˆবজ্ঞানিক! মরে যাই সখী তোর চাঁদনীর গন্ধে...”“আরে চান্দাবাজী আবার ˆবজ্ঞানিক হবে কেন? চাঁদার বৌ চাঁদনী বললে তো হবে না!”“আপনে মিয়া নিজে কোইতাছেন “খা খা, ডবল খা” আবার কোইবেন আপনে চান্দাবাজীর কথা কোইতাছেন না| এক মুখে দুই কতা চলে নাকি!”“আচ্ছা তুই যে তখন থেকে চাঁদাবাজী চাঁদাবাজী করছিস, আমি কি তোকে একবারও চাঁদা ডবল খাওয়ার কথা বলেছি?”“ঠিক আছে মানলাম, আপনে একবারও চান্দাবাজীর কথা কন নাই| কিন্তু আকাশে ম্যাঘ দেখলে পাবলিক বুইঝা লয় যে অহন বৃষ্টি হোইবো| আপনে যখন কন- “খা খা, ডবল খা” তখন পাবলিকে ধইরাই নেয় যে, আপনে চান্দাবাজীর কথা কোইতাছেন| “খা খা, ডবল খা”| “আসলে তুই বিশ্বাস কর, আমি কিন্তু চাঁদাবাজীর কথা বলিনি|”“না না না না, মিয়া সত্য কথা কইতে আপনের ডর কিয়ের| ইরান যুদ্ধে সব জিনিসপত্রের দাম বাড়তি| তেলের লাইনে পাবলিকের ভিড়| গত দেড় বছরে পেট্রলের দাম বাড়ছে পাঁচবার, তাই “খা খা, ডবল খা” অসুবিধা কি, অহন সবতে যা খাইবো ডবল খাইবো|”“হেঁ হেঁ এই ডবল খাবার একটা মজার গল্প আছে জানিস?”“চান্দা ডবল খাইলে মজাতো লাগবোই|”“আরে না, গল্পটা হচ্ছে এই রকম, একবার জয়াগের এক লোক আরব্য রজনীর এক জ্বীনকে বোতল থেকে চার হাজার বছর পর মুক্ত করে...” “হ হ, আমিও দেখছি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ভাষার মাস একুশে ফেব্রুয়ারিতে পিরায় ছয় হাজার বছর পর ঢাকার রাস্তায় কতগুলা জ্বীন নামায়ছিল!” “আরে ওগুলোতো চারুকলার ছাত্রদের শোলার ˆতরি জ্বীনস, কিন্তু এটা জ্যান্ত জ্বীন| জ্বীন বোতল থেকে মুক্ত হয়ে কৃতজ্ঞতা ¯^রুপ মুক্তিদাতাকে বলল, “আকা বলুন আপনের কি খেদমত করবো?”“এইটা কি বলছেন, জ্বীন ভূতের কৃতজ্ঞতা বোধ!”“আরে সেকালে পশু পাখীরও কৃতজ্ঞতা বোধ থাকতো|”“হ যেইটা অহন মানুষেরও নাই| আচ্ছা আপনের গল্পটা কন, জ্বীনের বাদশা কি করলো|”“লোকটা সুযোগ পেয়ে বলল, আমাকে একটা ডুপলেক্স বাড়ি বানিয়ে দাও| ব্যাস শুধু বলতে দেরি, সঙ্গে সঙ্গে লোকটার ডুপ্লেক্স বাড়ি হয়ে গেলো আর পাড়াপড়শি সবের ডবল ডুপ্লেক্স বাড়ি হলো| লোকটা অবাক হয়ে জ্বীনকে জিজ্ঞেস করলো, ব্যাপার কি, আমার বাড়ি হলো একটা আর পাড়াপড়শির বাড়ি হলো ডবল, দুইটা! তখন জ্বীন হেসে বলল, জি জনাব, আপনি যা চাইবেন আপনার পাড়া প্রতিবেশিরা সেটার ডবল পাবে| লোকটা বলল, আমাকে একটা পাজেরো দাও, সঙ্গে সঙ্গে লোকটার একটা পাজেরো এলো, আর সবাই পেলো ডবল পাজেরো|”“মানে এই ব্যডা যা চাইবো হ্যের লগের লোকেরা হেইডা ডবল পাইবো?” “ইয়েস| ফলে লোকটা সব সময় প্রতিবেশির অর্ধেক পাচ্ছে|”“বড় দুঃখের কথা, ব্যাডায় করলো জ্বীনেরে মুক্তি আর প্রতিবেশি করে ডবল ফুর্তি| না জিনিসটা ঠিক না!”“লোকটা যা চায় প্রতিবেশিরা ডবল পায়| আর এই ডবল হওয়ার ব্যাপারে লোকটা পরশ্রীকাতরতায় ভুগে, হাইপার টেনশন হওয়ার মত অবস্থা| তখন লোকটা বুদ্ধি করে একটা কাজ করলো|”“কি কাজ, লোকটা কি প্যাঁচ মারলো?”“লোকটা তখন রাগে দুঃখে, জ্বীনের বাদশাহকে বলল, ওই ব্যাটা জ্বীন তুই আমার একটা চোখ কানা করে দে| যেই বলা সেই কাজ| সঙ্গে সঙ্গে লোকটার একটা চোখ কানা হয়ে গেলো, আর সারা দেশের সব লোকের ডাবল মানে দুটো চোখ অন্ধ হয়ে গেলো| লোকটা তখন খুশির সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো, “আঁধা দেশের কানা রাজা আঁই” মানে অন্ধের দেশে আমি কানা রাজা|”“হেঁ হেঁ হালার পোলা ক্যেমন খারাপ নিজের ইগোর লাই, পাড়া প্রতিবেশীর ক্যামন ক্ষতিটা করলো| বুঝলাম সারা দেশের লোক অহনও অন্ধ কিন্তু “খা খা ডবল খা” এইডার মাজেজাটা কি?”“আরে ভেরি সিম্পল, আমাদের দেশের ওষুধে অসাধু কোম্পানিগুলো ঠিক পরিমাণ মতো ক্যেমিক্যাল দেয় না| মনে কর, যেখানে ক্যেমিক্যেল লাগবে ২০ গ্রাম ওরা দ্যেয় ১০ গ্রাম| তাই আমাদের প্রতিবেশী দেশের এক ডাক্তার আমাকে বলল, আপনারা আপনাদের দেশের অষুধ ডবল করে খাবেন, তাহলে অষুধ সঠিক কাজ করবে| তাই আমি ঠাট্টা করে বলেছিলাম, “খা খা ডবল খা”| মানে অষুধ দুটো করে খা|”“হেঁ হেঁ, কথাটা দারুণ কোইছেন, “খা খা, ডবল খা” মানে ওষুধ দুইটা কোইরা খা|” [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

প্রথম শ্রেণীতে ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি আর থাকছে না| পত্রিকায় এসেছে মানণীয় শিক্ষামন্ত্রী ইতোমধ্যে বলে দিয়েছেন, ২০২৭ থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে ভর্তি করা হবে|সচেতন অভিভাবকরা চান তাদের সন্তানদের মানসম্মত কোনো একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করতে| এনিয়ে সৃষ্ট জটিলতা কমাতে ২০১১ সাল থেকে চলে আসছে লটারির মাধ্যমে ভর্তি| এখন বলা হচ্ছে পরীক্ষা নিয়ে মেধার ভিত্তিতে ভর্তি করা হবে| অর্থাৎ আবার সেই হুলুস্থুল কাণ্ড| তাই বলতে চাচ্ছি ওদিকে আর না গিয়ে খোঁজা দরকার ভিন্ন কোনো পথ| বলা হয় মানসম্মত স্কুলের অভাবে এই পরিস্থিতি| এটা কেন হবে| সরকারি প্রাইমারি স্কুলের কথায় যদি আসি দেখা যাবে দেশব্যাপী বিরাট এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষক পদে নিযুক্ত হন এসব স্কুলের শিক্ষক মহোদয়রা| তারপর রয়েছে এক বছরের পিটিআই ট্রেনিংসহ নানা রকম কারিকুলামের সহিত তাদের সম্পৃক্ততা| রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষার প্রশাসন পরিদর্শন ইত্যাদি কার্যে নিয়োজিত মাঠ পর্যায় থেকে অধিদপ্তর পর্যন্ত সুবিশাল এক কর্মী বাহিনী| গড়ে উঠেছে মজবুত এক প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক| তাহলে কেন এই শিক্ষক সাহেবরা এসব শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারবেন না| কেন স্কুলগুলো মানসম্মত হবে না| কেন আমাদের শুনতে হয় সরকারি প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়া হয় না| কেন একটা দুধের শিশুকে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হতে পরীক্ষায় বসিয়ে তাকে বিচলিত করতে হবে| ভর্তি পরীক্ষা মানেই তো সেই কোচিং বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো| কাজেই প্রথম শ্রেণীতে ভর্তিতে ভিন্ন কোনো পথ খুঁজতে হবে| অবশ্যই গ্রহণযোগ্য ভালো কোনো পথ বেরিয়ে আসবে| শহরের স্কুলগুলোতে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি নিয়ে এখানে কথা| এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানসম্মত স্কুল নিয়েও কথা| প্রাইমারি শিক্ষার মান নিয়ে যেসব কথা লোকে বলে অনেকাংশে তার সত্যতা রয়েছে| একটু খোঁজ নিলে আরও অনেক সত্য জানা যাবে| যেমন শহরের সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলোতে কারা পড়ে| নিম্ন আয়ের যেমন বাসার কাজের বেটিদের ছেলে-মেয়ে রিকসাওয়ালা চা বিক্রেতা দিনমজুর এদের ছেলে-মেয়েরাই এসব সরকারি স্কুলগুলোতে লেখাপড়া করে| ব্যতিক্রম থাকতেই পারে, সেটা কোনো বিষয় না| সরকারি স্কুল সবার জন্য এটাই কথা| কী কারণে সেখানে মানসম্মত লেখাপড়া হয় না সেটাই দেখার বিষয়| প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা দূর করতে আজ লটারি, কাল মেধা যাচাই পরীক্ষা পরশু আরেকটা এসব করে সমস্যার কোনো সমাধান হবে মনে হয় না| তাই খুঁজতে হবে ভিন্ন কোনো পথ| প্রাথমিক শিক্ষায় সুদীর্ঘ সময় চাকরি এবং বাইরের দুএকটা দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয় এই সমস্যার সমাধানে প্রথমেই যে কাজটা করা যেতে পারে তা হলো—নিকটতম স্কুলে শিশুর ভর্তি বাধ্যতামূলক করা—যার মূল কথা হবে কোনো স্কুলই খারাপ না| প্রয়োজনে স্কুলের ক্যাচমেন্ট এরিয়া নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে| প্রয়োজনে নতুন স্কুল বানাতে হবে| পাড়া-মহল্লার সব শিশু যাতে ওই স্কুলে লেখাপড়া করে তার জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে ওই স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করা| এতে ওই মানসম্মত না, খারাপ স্কুল এসব ধারণা আপনা থেকেই চলে যাবে এবং ওই স্কুলই হয়ে উঠবে সানসম্মত| তখন এর সুফল ছড়িয়ে পড়বে সমাজের সব স্তরে| পাড়া-মহল্লার শিশুরা পায়ে গেঁটে স্কুলে যাতায়াত করতে পারবে| গাড়িঘোড়ার হয়রানি আর ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাবেন অভিভাবকরা| কেউ তার সন্তানকে তার নিকটতম স্কুলে পড়াতে না চাইলে যেখানে পড়াতে চাইবেন সেখানে গিয়ে তাকে বসবাস করতে হবে| এবং সে ক্ষেত্রে নিকটতম স্কুল থেকে অনাপত্তি প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ করতে হবে| নেহায়েতই একটা শিশুকে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করতে ওই লটারি বা পরীক্ষায় বসানো এর কোনোটাকেই যুক্তিযুক্ত মনে করার কোনো কারণ দেখছি না| বরং পরীক্ষায় বসানোটা হবে লেখাপড়া নিয়ে সেই বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো| তাই খুঁজতে হবে ভিন্ন কোনো পথ| যেমন একটা আমি মনে করি নিকটতম স্কুলে ভর্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে| প্রাথমিকের শিক্ষার মান নিয়ে এখানে আরও কিছু কথা প্রসঙ্গক্রমে বলা যেতে পারে| এর জন্য একটু পিছনে ফিরতে হবে| যেমন ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাংক এক প্রতিবেদনে বলেছিল, ‘বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা চার বছর পিছিয়ে আছে’| এর মানে আমাদের শিশুরা প্রথম শ্রেণীতে যা শিখার কথা তা শিখছে পঞ্চম শ্রেণীতে গিয়ে| ১১ বছরের স্কুলজীবনে ৪ বছরই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাদের| কাছাকাছি সময়ে আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তৃতীয় শ্রেণীর ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী শ্রেণী মান অনুযায়ী বাংলা পড়তে পারে না| পঞ্চম শ্রেণীতে তা বেড়ে হয় ৭৭ শতাংশ| মাতৃভাষায় সাবলীলভাবে পড়া ও লেখার সক্ষমতা অর্জনে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর দশম শ্রেণী পর্যন্ত লেগে যায়’|কথা হলো সেই অবস্থার থেকে আমরা কতটুকু বেরিয়ে আসতে পেরেছি, নাকি সেখানেই রয়ে গেছি| বিশ^ ব্যাংকের কথা না হয় বাদই দিলাম, দেশের ভেতরে লোকে কি বলে| বলে, সরকারি প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়া হয় না| এমন আরও কত কথা শুনতে হয়| অথচ আমরা সবাই চাই মানসম্মত যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠুক দেশে যার কোনো বিকল্প নেই| সেটা কীভাবে হতে পারে তার একটা ধারণা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে| যেমন—০১. শতভাগ শিশুর লেখাপড়া সরকারের নিয়ন্ত্রণে রেখে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে একটা শ্রেণী পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং সেখানেই তাদের বসাতে হবে প্রথম পাবলিক পরীক্ষায়—সেটা কোন শ্রেণী পর্যন্ত হলে যুগোপযোগী হবে মানুষ অধিক উপকৃত হবে সেটা আগে দেখতে হবে| বেশি কথায় না গিয়ে বলা যায় পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত করা হলে সেটা তেমন কোনো কাজে আসবে না| অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করা হলেও তাই হবে| ভালো হবে যদি নবম শ্রেণী পর্যন্ত করা হয়| এবং এখানেই হতে পারে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা| কেননা সবাই এর পরের ধাপে লেখাপড়া করতে যাবে না| আবার এর আগে কাউকে ছেড়ে দিলেও সেই লেখাপড়া কোনো কাজে আসবে না| ভুলে যাবে সব| নবম শ্রেণী পর্যন্ত করা হলে যে কেউ তখন একজন লেখাপড়া জানা মানুষ হিসেবে বিবেচিত হতে পারবে| এবং সরকারের সর্বনিম্ন পদে চাকরির যোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারবে নবম শ্রেণী পাসের সনদ| এতে গোটা জনগোষ্ঠি একদিন শিক্ষিত জনগোষ্ঠিতে পরিণত হবে| এ পরীক্ষার সনদের ভিত্তিতেই হবে একজন শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন| অর্থাৎ এর পরে সে কী করবে, উচ্চশিক্ষায় যাবে নাকি অন্য কোন পেশায় যাবে তা ওই সনদই বলে দেবে| প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করার শুপারিশ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টেও রয়েছে| এটাকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত করতে হবে এবং সেটা বাধ্যতামূলক করতে হবে আগেই বলেছি| পরের ধাপটা হবে তিন বছরের অর্থাৎ দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত| এতে করে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করতে একজনকে দুইবার পাবলিক পরীক্ষায় বসতে হবে| এর পরে উচ্চশিক্ষা| ০২. সব শিশুর লেখাপড়া অভিন্ন কারিকুলামে হতে হবে —দেশের সব শিশুর লেখাপড়া অভিন্ন কারিকুলামে হতে হবে| একই ধারায় গড়ে তুলতে হবে দেশের শিশুদের| প্রাথমিক শিক্ষা, তা সে যে শ্রেণী পর্যন্তই হোক হতে হবে বাধ্যতামূলক এবং পরিচালিত হতে হবে একটা অভিন্ন কারিকুলামের মাধ্যমে| অভিন্ন কারিকুলামের অধীনে দেশের সব শিশুকে আনা একটা কঠিন কাজ ঠিকই| আবার কঠিন না এই অর্থে যে, বাংলাদেশ একটা ভাষারাষ্ট্র-জাতিরাষ্ট্র| কাজটা করতে এখানেই রয়েছে সুবিধা| আমরা এক ভাষায় কথা বলি| ভাষার জন্য আমরা জীবন দিয়েছি| আমাদের ভাষাদিবস একুশে ফেব্রুয়ারিই এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষাদিবস| কাজেই ইচ্ছা থাকলে অসম্ভব না| ০৩. ব্যাপক হারে গড়ে তুলতে হবে আবাসিক স্কুল—সবাই তো আর উচ্চশিক্ষায় যাবে না| সেটা হয়ও না| তবে সবাইকে তো কিছু কাজ করে খেতে হবে| কিছু শিখতে হবে| হাতে-কলমে সেই শিক্ষা দিয়েই তাদের ওই আবাসিক স্কুল থেকে ছাড়তে হবে| এজন্য গ্রামে-গঞ্জে অনগ্রসর এলাকায় সবখানে গড়ে তুলতে হবে আবাসিক স্কুল| এতে প্রয়োজন হবে বড় বাজেটের সেটা মেনে নিতে হবে| যে শিক্ষার্থীর যেদিকে ঝোক থাকবে সেটাই সে হাতে-কলমে শিখবে| এখানেই হবে একজন শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন| তার ওই সনদই বলে দেবে সে কী করবে, উচ্চশিক্ষায় যাবে নাকি অন্য কোন পেশায় যাবে| এতে করে একটা সময় আসবে যখন ওই সনদ ছাড়া কেউ কোনো কাজ করতে পারবে না এবং দেশে একটা দক্ষ জনশক্তি গড়ে উঠবে |০৪. স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়নে বিত্তবান অভিভাবকদের ডোনেশন দিতে হবে—ডোনেশনের কথায় পরে আসছি| এই যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক দেয়া হচ্ছে সব শিক্ষার্থীকে এর একটা ভালো দিক আছে| পাঠদানে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারছে না অসাধু ব্যবসায়ীরা| মজুত গড়ে তুলে বা নানা কারসাজিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না কেউ| বিনামূল্যে সবশিক্ষার্থীর হাতে যথাসময়ে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে যাচ্ছে| তবে এখানে চোখে পড়ার মতো যেটা তা হলো, সচ্ছ্বল-বিত্তবান পরিবারের সন্তানদের হাতে বিনামূল্যের বই তুলে দেয়া হচ্ছে| একটা স্কুল চালাতে সমর্থ যে অভিভাবক তার সন্তানও পাচ্ছে বিনামূল্যে বই এটা কোন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষণ না| তাও যদি ধনী-গরীব বিত্তবানদের ছেলে-মেয়ে সব এক স্কুলে পড়ত তাহলেও একটা কথা ছিল| একজন বই পেল একজন পেল না এনিয়ে শিশুমনে একটা প্রতিক্রিয়া হতে পারত| সেটা তো না| এখানে একটা কথা এসেই যায় তা হলো এই শত শত কোটি টাকার বই বিনামূল্যে যাদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে বছরের পর বছর দশকের পর দশক ধরে তারা এর সুফল কতটুুকু পাচ্ছে| একজন শিক্ষার্থী তা সে যে ক্লাসেরই হোক যে পরিমাণ টাকার বই বিনামূল্যে সরবার খেকে পাচ্ছে তার থেকে বেশি টাকা দিয়ে তাকে একটা বিষয়ের নোট-গাইড বই কিনতে হচ্ছে| প্রতিটা বিষয়ের বড় বড় নোট গাইড এমন যে অনেক শিক্ষার্থী তা বইতে পারে না— সঙ্গে লোক লাগে| ওই ব্যাগটা যদি কেউ দয়া করে একটু খুলে দেখেন দেখবেন মূল বইয়ের কোনো খবর নেই নোট গাইডে ভরা| অর্থাৎ বলা যায় লেখাপড়া হয়ে গেছে ওই নোট-গাইড আর কোচিং নির্ভর| যাহোক যে কথা শুরুতে বলতে চেয়েছি তা হলো নিকটতম স্কুলে শিশুর পড়া যদি বাধ্যতামূলক করা যায় তাহলে কোনো স্কুলই আর পিছিয়ে থাকবে না —মানসম্মত হয়ে উঠবে| অভিভাবক মহোদয়রাও ¯^স্তি পাবেন| এখানেই ডোনেশনের প্রশ্ন এসে যায়| প্রত্যেকে অভিভাবকই চাইবেন তার সন্তান যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করবে সেটা মানসম্মত হোক ভালোভাবে চলুক| এই যে নোট-গাইড, কোচিং, সহায়ক গ্রন্থ, প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা, ভর্তি পরীক্ষা এরকম নানাখাতে নানাভাবে যদি কোন অভিভাবককে টাকা ঢালতে না হয় তার সন্তানের লেখাপড়ার জন্য তাহলে যে স্কুলে তার সন্তান পড়বে সেই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ডোনেট করা তার জন্য কোনো ব্যাপারই না বরং উৎসাহের কারণ হতে পারে| প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির সমস্যাটা বড় শহরের হলেও দেশের মাঝারি এবং ছোট শহরগুলোতেও কম যায় না| আর গ্রামের কথা ভিন্ন| সেখানকার সমস্যা অন্যরকম| সেখানকার অনেক স্কুলই এখন ছাত্র সংকটে পড়েছে| দেশের গ্রামগুলোতে শুধু না বলা যায় পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে উঠা ছোটদের মাদ্রাসা এই সংকট সৃষ্টির অন্যতম কারণ বলে অনেকে মনে করছেন|[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা]

হাম পরিস্থিতি: ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো, সমস্যা ও সমন্বিত উদ্যোগ

বাংলাদেশে বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত হাম আবারও জন¯^াস্থ্য উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে| সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে টেকসই সাফল্য সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে এ রোগের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে| ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত তিন-চার সপ্তাহে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ১০০ শিশুর হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলে এর প্রভাব বেশি|দেশের ৫৬টি জেলায় ৭,৫০০-এর বেশি শিশুর দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে, যার অধিকাংশ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে| এ পরিস্থিতিতে ১০ লক্ষাধিক শিশুকে জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে| সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে প্রায় ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভাকে অধিক সংক্রমণপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে| দক্ষিণাঞ্চল—বিশেষ করে বরগুনা, বরিশাল ও ঝালকাঠি— এ তিনটি জেলা ঝুঁকিতে রয়েছে| নদীবিধৌত ও দুর্গম এলাকা হওয়ার কারণে এসব অঞ্চলে নিয়মিত ¯^াস্থ্যসেবা ব্যাহত হয়, ফলে অনেক শিশু টিকাদান থেকে বঞ্চিত থাকে| দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজার ও চাঁদপুরেও সংক্রমণের হার বেশি| কক্সবাজারে জনসংখ্যার ঘনত্ব, সারা দেশের মানুষের চলাচল এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী উপস্থিতি সংক্রমণ বৃদ্ধি এর কারণ হিসেবে কাজ করছে| উত্তরাঞ্চল—বিশেষ করে পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ—হাম সংক্রমণের একটি বড় ক্লাস্টার হিসেবে দেখা দিয়েছে| একই জেলার একাধিক উপজেলায় টিকাদানের ঘাটতি রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে| ঢাকা, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর প্রভৃতি জেলাগুলো মাঝারি ঝুঁকিতে থাকলেও; দ্রুত নগরায়ণ, বস্তি এলাকার আধিক্যের কারণে এসব এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে| একই প্রবণতা ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণাতেও দেখা যায়, সচেতনতার অভাবও অন্যতম চ্যালেঞ্জ| সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে| ২০২৬ সালের শুরু থেকে হাম রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, ফলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে| ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে-এ রোগীর সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে| হাম রোগটি আক্রান্ত শিশুর দেহে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং মৃত্যুর মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে টিকাবঞ্চিত বা কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও প্রকট| অধিকাংশ আক্রান্ত শিশু ১০ বছরের নিচে, এবং ৫ বছরের নিচের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে| আক্রান্তদের বড় অংশই টিকা নেয়নি অথবা সম্পূর্ণ ডোজ গ্রহণ করেনি বলে তথ্য পাওয়া গেছে| এই পরিস্থিতির পেছনে—নিয়মিত টিকাদানে অবহেলা, ড্রপ-আউট শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিচ্ছন্ন, ঘনবসতি এবং দুর্গম এলাকায় ¯^াস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা প্রভৃতি কারণগুলো অন্যতম| এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে| ইপিআই কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ১০ লাখ শিশুকে নতুন করে টিকার আওতায় আনা হচ্ছে| সাম্প্রতিক ক্যাম্পেইনে ৬-৫৯ মাস বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে, বিশেষ করে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কঠোরভাবে তা পালন করা হবে| এছাড়া ‘হটস্পট’ ভিত্তিক জরীপ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিবিড় টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে| সংক্রমণ নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে, যাতে দ্রুত শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ দ্রুততার সঙ্গে নিশ্চিত করা যায়| রোগ নির্ণয়, রিয়েল-টাইম রিপোর্টিং এবং প্রাদুর্ভাব তদন্ত কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে| জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গুরুতর রোগীদের জন্য উন্নত সেবার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে| ¯^াস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রান্তিক পর্যায়ে ¯^াস্থ্যকর্মীদের সম্পৃক্ততা এবং ডঐঙ, টঘওঈঊঋ, ও এঅঠও-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা এই প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করছে| পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যম ও কমিউনিটি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে| এই প্রেক্ষাপটে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| সময়মতো শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা, গুজব ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেয়া অপরিহার্য|মনে রাখা দরকার যে, টিকাবঞ্চিত শিশু শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য ঝুঁকি ˆতরি করে| বাংলাদেশ ইতোমধ্যে হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে| তবে বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, এই অর্জন ধরে রাখতে হলে সমšি^ত কার্যক্রম জোরদার করতে হবে| টিকাদান আওতা বৃদ্ধি, কার্যকর নজরদারি এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে হামমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব| এখনই সময়—সমšি^ত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিটি শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে মুক্ত রাখা| [ লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল] 

ট্রিলিয়ন ডলারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা

অপূর্ণ বিপ্লবী প্রতিশ্রুতির সমাজতত্ত্বে এক বিশেষ ধরনের নিষ্ঠুরতা লুকিয়ে থাকে, যা ইতিহাসের পাতায় বারবার ফিরে আসে। একটি প্রজন্ম যখন সুসংগঠিত হয়, রাজপথে রক্ত ঝরায় এবং একটি প্রবল প্রতাপশালী সরকারকে উৎখাত করে—তখন তাদের চোখে থাকে এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন সেই একই তরুণদের একটি চাকরির সাক্ষাৎকারের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হয় যা কখনোই আসে না, তখন সেই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা কেবল ব্যক্তিগত থাকে না, তা একটি পরিমাপযোগ্য সামাজিক সংকটে রূপ নেয়। ২০২৬ সালের বাংলাদেশে এটি কোনো রূপক বা অলংকার নয়; এটি একটি রূঢ় ও কঠোর বাস্তব পরিস্থিতি। আমাদের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম আজ এক অদ্ভুত দ্বৈততার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি যখন নিরঙ্কুশ ও ভূমিধস বিজয় অর্জন করল, তখন তাদের প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা। এই বিশাল ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যটি মূলত এই জেনারেশন জেড বা ‘জেন-জি’-র কাছেই করা একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। কিন্তু প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—উচ্চাকাঙ্ক্ষার এই গাণিতিক হিসাব এবং শিক্ষিত তরুণদের বুকচেরা দীর্ঘশ্বাসের সমাজতত্ত্ব কি আগামী আট বছরে মেলানো সম্ভব? উন্নয়ন কেবল কিছু সংখ্যার সমষ্টি নয়; উন্নয়ন যখন কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত হয় না, তখন তা কেবল পরিসংখ্যানের চাতুর্য হয়েই থেকে যায়। আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং শিক্ষিত বেকারত্বের হারের যে চিত্র ফুটে উঠছে, তাতে এই ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন আর ধূলিমলিন বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান মেটানোই হবে আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা।বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার বর্তমানে জিডিপি ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে দ্বিগুণ করে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার যে রূপরেখা দিয়েছে, তার জন্য বার্ষিক প্রায় ৯ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেখানে ৪ শতাংশের ঘরে এসে স্থবির হয়ে পড়েছে, সেখানে ৯ শতাংশে পৌঁছানো এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ৫ শতাংশের ব্যবধান কেবল কোনো গাণিতিক বিচ্যুতি নয়; এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও কাঠামোগত সমস্যা। প্রবৃদ্ধি যখন মন্থর হয়, তখন তার প্রথম আঘাতটি আসে শ্রমবাজারে, আর সেই আঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার হয় নতুন গ্র্যাজুয়েটরা।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার এখন ১১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা জাতীয় গড় বেকারত্বের হারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। তবে বেসরকারি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে এই চিত্র আরও ভয়াবহ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ২০১৩ সালের ৯.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ২৭.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে—যা এক দশকের কম সময়ে প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তথ্যটি আমাদের উন্নয়ন মডেলের একটি কদর্য দিক উন্মোচন করে। আমরা অবকাঠামো গড়েছি, জিডিপি বাড়িয়েছি, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি শিক্ষিত মেধার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি করতে পারেনি। উচ্চশিক্ষা যখন কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত সময় ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হিসেবেই গণ্য হতে থাকে।প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী জিগমুন্ট বাউমান তার আধুনিকতা ও উত্তর-আধুনিকতা বিষয়ক গবেষণায় আমাদের ‘ব্যর্থ জীবন’ বা ‘নষ্ট হওয়া জীবন’ (ওয়েস্টেড লাইভস) নামক একটি বিধ্বংসী ধারণা দিয়েছেন। তার মতে, উন্নত এবং অতি-ভোগবাদী পুঁজিবাদ এক ধরনের ‘উদ্বৃত্ত মানবগোষ্ঠী’ তৈরি করে। এরা এমন এক গোষ্ঠী যারা শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ ও যোগ্য করে তোলে ঠিকই, কিন্তু অর্থনীতির কাঠামোগত অসামঞ্জস্যের কারণে তারা শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ব্যবস্থার কাছে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বা ‘উদ্বৃত্ত’ হয়ে পড়ে। বাউমানের এই তত্ত্ব বাংলাদেশের শিক্ষিত বেকারদের ক্ষেত্রে এক নিষ্ঠুর ও নির্ভুলতার সঙ্গে প্রযোজ্য হচ্ছে। আমাদের তরুণরা ব্যক্তিগত কোনো অযোগ্যতা বা ঘাটতির কারণে ব্যর্থ হচ্ছে না; তারা মূলত এমন এক অর্থনৈতিক কাঠামোর নিষ্ঠুর শিকার যা গত তিন দশক ধরে মেধাভিত্তিক পুঁজি বা জ্ঞানভিত্তিক শিল্পের পরিবর্তে কেবল তৈরি পোশাক কারখানার সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিএনপির ইশতেহারে ভোগভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগ-চালিত অর্থনীতিতে রূপান্তরের যে কথা বলা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি সঠিক রোগ নির্ণয়। কিন্তু এই নিরাময় প্রক্রিয়া কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে শুরু হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই ‘উদ্বৃত্ত’ তকমা পাওয়া প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।২০২৪ সালের জুলাই মাসের সেই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানটি কেবল বিমূর্ত কোনো গণতান্ত্রিক নীতি বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য ছিল না। যখন শিক্ষিত তরুণরা দেখল যে তীব্র কর্মসংস্থান সংকটের দেশেও সরকারি পদের ৩০ শতাংশ একটি নির্দিষ্ট কোটায় সংরক্ষিত রাখা হচ্ছে, তখন তারা একে ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হিসেবে দেখল। বিনিময়ে যে পরিবর্তন এল, তার মূল দাবিটি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছকে এই রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রবেশাধিকার পাবে এবং সেই প্রবেশের শর্তগুলো মেধাভিত্তিক হবে কি না। অথচ ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতা সেই সব প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর হাতেই ফিরে যাচ্ছে। বিএনপির এই ১ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগকে জিডিপির ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন—যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিগত কোনো সরকারই করতে পারেনি। এর ওপর একটি বিশাল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে অপেক্ষমান। ২০২৬ সালের নভেম্বরে (তবে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির জটিল চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সরকার এই সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন জানিয়েছে) বাংলাদেশ যদি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা হারায়, তখন আমাদের পোশাক রপ্তানিতে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা ছিল, তা রদ হয়ে যাবে। এই বহুমুখী সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা প্রায় একটি অসম্ভব লক্ষ্য বলে মনে হয়। যদিনা প্রবৃদ্ধির এই গাণিতিক হিসাব দ্রুত মেলানো সম্ভব হয়, তবে শিক্ষিত বেকাররাই হবে এর প্রথম এবং প্রধান বলির পাঁঠা। প্রবৃদ্ধির অভাব মানেই হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ রুদ্ধ হওয়া, যা এই তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভকে পুনরায় রাজপথে ফিরিয়ে আনতে পারে।ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, সামাজিক অসন্তোষের সাথে বেকারত্ব এবং দুর্নীতির এক সরাসরি ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। জিগমুন্ট বাউমান সতর্ক করেছিলেন যে, এই উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা কেবল অর্থনৈতিক দুর্দশা তৈরি করে না, বরং তা গভীর সামাজিক ব্যাধি ও অস্থিরতার জন্ম দেয়। যে শিক্ষিত তরুণরা বঞ্চনার শিকার হয়, তারা হয় পুনরায় গণতান্ত্রিক চাপের বাহক হয়ে রাজপথে নামে, অথবা চরম হতাশায় উগ্র পরিচয়-রাজনীতি বা উগ্রবাদের শিকারে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। আমাদের স্নাতক বেকারদের কাছে একটি বিমূর্ত ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির চেয়েও বেশি প্রয়োজন এমন সুনির্দিষ্ট ও প্রয়োগমুখী নীতি, যা জ্ঞানভিত্তিক শিল্পে তাদের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। বিএনপি তাদের ইশতেহারে কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্ট-আপ সহায়তা এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে বাংলাদেশে কোনো ঐতিহাসিক নজির নেই বললেই চলে। ফলে জনমনে এক ধরনের ‘ধীরে চলো’ বা সন্দেহের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে।যে জেনারেশন জেড বা তরুণরা দীর্ঘ দেড় দশকের একটি শক্তিশালী সরকারকে উৎখাত করতে দ্বিধা করেনি, তারা তা করেছিল কারণ তারা অনুধাবন করতে পেরেছিল যে রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের ‘সামাজিক চুক্তি’ বা সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট চরমভাবে ভঙ্গ করা হয়েছে। রাষ্ট্র যখন তার শিক্ষিত নাগরিককে কর্মসংস্থান দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আনুগত্য শিথিল হতে বাধ্য। যদি ১ ট্রিলিয়ন ডলারের এই স্বপ্ন কেবল দশ শতাংশের বেশি স্নাতক বেকারত্ব নিয়ে আরও একটি ‘ভোগ-চালিত’ বা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত করার প্রবৃদ্ধির দশকে পরিণত হয়, তবে এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হবে না। তরুণদের চোখের পানি এবং ঘামের মূল্য যদি ১ ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্নে প্রতিফলিত না হয়, তবে সেই অর্থনীতির গাণিতিক মাহাত্ম্য সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়বে।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

ঋণখেলাপি ও রাজনীতির যোগসূত্র

দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণে খেলাপির হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোটি টাকার বেশি ঋণসংবলিত অ্যাকাউন্টে খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। এক বছর আগে এই হার ছিল ১৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে এ ধরনের ঋণের মোট খেলাপি পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঋণ শ্রেণিকরণে নতুন নীতিমালা চালুর ফলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। আগে ১৮০ দিন অনাদায়ী থাকলে ঋণ খেলাপি হিসেবে গণ্য হতো, এখন তা কমিয়ে ৯০ দিন করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের পর থেকেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। তবে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় ডিসেম্বর প্রান্তিকে হার কিছুটা কমেছে। নীতি সহায়তা ও ঋণ অবলোপনের ক্ষেত্রে শিথিলতার কারণে এই সামান্য কমতি এসেছে।নতুন নিয়মে ‘মন্দ মানে’ শ্রেণীকৃত হওয়ার পরই ঋণ অবলোপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। আগে এ জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। এই সুযোগে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। ফলে কিছু ঋণ সাময়িকভাবে খেলাপির তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তবে প্রকৃত চিত্রে তেমন পরিবর্তন হয়নি।গত দেড় বছরে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো আড়ালে থাকা অনাদায়ী ঋণের তথ্য প্রকাশ পাওয়া। অতীতে বিভিন্ন উপায়ে এসব ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হতো। এখন সেই সুযোগ অনেকাংশে বন্ধ হয়েছে। বিদেশি অডিট ফার্মের মাধ্যমে সম্পদ যাচাই এবং কিছু ব্যাংকের একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অবস্থা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।এই প্রেক্ষাপটে রাজনীতির সঙ্গে ঋণখেলাপির সম্পর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঋণখেলাপিদের একটি অংশ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন সংসদ সদস্যও হয়েছেন। অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী ঋণখেলাপিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই।বাস্তবে দেখা যায়, নির্বাচনের আগে অনেক প্রার্থী আংশিক অর্থ পরিশোধ করে ঋণ নিয়মিত দেখান বা আদালতের স্থগিতাদেশ নেন। পরে তারা নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচনে জয়ী হলে প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতায় যান, আর পরাজিত হলে অনেক ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধে অনীহা দেখা যায়। এতে আইনের উদ্দেশ্য ভঙ্গ হয় এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন ওঠে।আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একবার নির্বাচিত হওয়ার পর ঋণখেলাপির কারণে কারও সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়েছে—এমন নজির নেই। ফলে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকছে। এতে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।অন্যদিকে ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতারা তুলনামূলক কঠোরতার মুখে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু বড় ঋণগ্রহীতারা প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা পান। এই বৈষম্য আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থাহীনতা তৈরি করছে।এ অবস্থায় নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—অভ্যাসগত ঋণখেলাপিদের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখা, মনোনয়নপত্র জমার নির্দিষ্ট সময়ের আগে ঋণ পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা এবং নির্বাচিত হওয়ার পর পুনরায় খেলাপি হলে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিধান করা।ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের স্বার্থে এসব সুপারিশ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা জরুরি। আইন প্রয়োগে কঠোরতা, প্রভাবমুক্ত তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। ঋণখেলাপিদের রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করা না গেলে আর্থিক খাতের ঝুঁকি আরও বাড়বে এবং জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

নারীর গল্প

সেদিন অফিসে যাওয়ার সময় দেখলাম ভ্যানে করে একজন প্রবীণ নারীকে আরেকজন নারী পরম নির্ভরতায় নিয়ে যাচ্ছেন। হয়তো হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন ।বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে প্রথমে একজন নারীকেই হাসপাতালে যাওয়ার সঙ্গী হতে হয়। যে কিচ্ছু জানেনা তাকেই একদিন দায়িত্ব নিতে হয় সবার আগে। ভারী একটি প্রেস্ক্রিপশন যখন রাতের বেলা ডাক্তার এসে ধরিয়ে দেন তখনও কিচ্ছু না বুঝে দৌড়াতে হয় ফার্মেসিতে ! কতটা অন্তর্মুখী হয় নারীরা তা আমাদের মা, দাদীকে দেখেছি । বাঙালি নারীর সকল অন্তর্মুখীতাকে জয় করার সময় হল বিপদের সময় । তারা কোনো কাজে একটুও পিছপা হয়না, তারা কখনই ঘরে বসে থাকেনা ।তারা শ্রমের জন্য পরিবার থেকে আলাদা কোনো পঁয়সাও নেয়না। গ্রামের বাড়িগুলোতে একটি করে ডিম, মুরগী, দুধ বিক্রি করে জমানো টাকার একটি অংশ বাড়ির পুরুষ সদস্যদের দেয় অনায়াসেই এই নারীরাই । যত খারাপ উদাহরণ নারীদের নিয়ে আপনারা শোনেন তা কেবল মাত্র এক শতাংশেরও কম ! আমরাযখন নারী অধিকার বলতে সমতায়নের কথা বলি সেখানে গত কয়েকদিনও নারী সহিসংতা বন্ধ হয়নি । সেদিনও শ্রীপুরে স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে একজন পাষন্ড স্বামী !শিশুগুলো কাঁদছে। আমরা ফেইসবুকে স্ক্রল করে চলে যাচ্ছি। সাংবাদিকরা এসে ছবি তুলছে, সবাই যার যার জায়গা থেকে কাজ করার চেষ্টা করছে । হয়ত আসামি ধরা পড়বে কিন্তু আর কোনোদিন শিশুগুলো মায়ের আদর পাবেনা, আর কোনোদিন মাতাদের এক প্লেটে নিয়ে খাবার খাওয়াবেনা। গণবিদারী চিৎকারে বুক ভারী হয়ে আসবে বলে এড়িয়ে যাচ্ছি। আমরা যারা বাসে উঠলে নারীদের সিট ছেড়ে বসতে দিতে চাই তাদেরও এক পক্ষপ্রচন্ড রকম অন্যভাবে দেখে । কেউ কেউ বলেও সমান অধিকার চায় তবে বাসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেনা কেন! অনেক কথা অনেক প্রশ্ন কিন্তু কোনো ধরনের সিমপ্যাথি বা সৌন্দর্য সামাজিকভাবে তৈরি করা যায়নি। এটা আমাদের জন্য ব্যর্থতার।অথচ বিপদের সময়, ক্লান্তি লগ্নে, আনন্দ উদযাপনে, ফরমাইসে, ভার দেয়ায়, খোটা নেয়ার সময় সব ক্ষেত্রে নারীই প্রধান উপাদান সংসারে । সব কথা মুখ বুজে সহ্য করবার এক অসাধারণ কেমিস্ট্রি নিয়ে জীবন বয়ে বেড়াতে হয় প্রতিটি নারীকে। যে আজ কিশোর হয়ে উঠছে সে বাইরে বের হলে সে যে কোনো মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে এসেছে সেটাই ভুলে যায়! অথচ প্রথম প্রেম নামক যে শব্দ সেখানেও পুরুষের জন্য নারীই একমাত্র উপায়। যার সঙ্গে অনেক প্রেম তার সঙ্গেই আবার অধিকারের গল্প। অধিকারের গল্প হয়ে তা শেষ হয় ভাঙ্গণের তীব্র আক্ষেপে !কার দোষ কার গুণের তর্কে না গিয়ে প্রতিটি ঘর থেকে যদি নারীর সম্মানকে অগ্রাধিকার না দেয়া যায় তবে কখনই নারী কথাটির তাৎপর্যকে সামনে আনা যাবেনা । ধর্ম দিয়ে নারীকে সম্মান করার যে পবিত্রতা সেখানেও দেখেছি প্রয়োগিক অর্থে সীমাবদ্ধতা দেখান মানুষরা! মনে পরে শৈশবে সেই সব দুপুরের কথা যে দুপুরে ক্লান্তি শরীর নিয়ে মায়ের কোলে ভাত ঘুম দিতেন? তারপর চকচকে একটা বিকেল আসতো। মায়ের আচলে চোখ মুছেই দৌঁড়ে চলে যেতেন খেলার মাঠে । তারপর কত হই হুল্লোর, কত খেলা আর কত শৈশবের মুক্ত ডানা মেলা । সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ফিরতেন সেই মা আবার দাঁড়িয়ে থাকতো বাড়ির কাঁচা উঠোন পাড় হয়ে ভাঙা কোনো দরজার পার্শ কাঠ ধরে ।আমরা এভাবেই বড় হয়েছি । বড় হওয়ার পর জীবন শিখতে শিখতে শুধু অধিকারের গল্প শুনি চারপাশে। তারপর দেখি অধিকারতো দূরের কথা এ যেন এক অসম সমাজ ব্যবস্থা। সংসদ থেকে শুরু করে ঘরের উঠোন পর্য ন্ত নারী আছে সব জায়গায় কিন্তু কোথায় যেন নারীর উপস্থিতিকেও অস্বীকার করা হয় । এই আবছা অন্ধকার বাস্তব জীবনে নেই। ছবিতে দেখা যাওয়া নির্ভরতার প্রতীক যে নারী সে যদি সামান্য মনোযোগহীন হন তবে এই অসুস্থ মানুষটি যেমন তার জীবন হারাবে তেমনি সামাজিকভাবে যদি এই প্রতিকীছবিটিকে গ্রহণ করেন তবে দেখবেন নারী ছাড়া বা নারীকে বাদ দিয়ে আমরাওএমনি একটা ভঙ্গুর সমাজকেই প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত সবাই![লেখক: রসায়নবিদ]

হয় দেবতা না হয় দানব!

জাতি হিসেবে আমরা আবেগী। সুড়ঙ্গ শেষের ক্ষীণ আলোক রেখা দেখেই মনে করি, এই বুঝি আলোঝলমল মুক্ত আকাশের নিচে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু সে পর্যন্ত পৌঁছাতে যে কত খানাখন্দ, বাধা বিপত্তি অতিক্রম করতে হবে তা আর বিবেচনায় থাকে না। এই যেমন জুলাই আন্দোলনের সফলতার প্রথম পর্যায়ে ছাত্রনেতৃত্বের ভুলগুলোকে সমালোচনার চোখে দেখা হয়নি। বরং সবখানেই প্রশংসার জোয়ারে তাদেরকে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের পক্ষে এমনভাবে বয়ান তৈরি করা হয়েছে, যেন তারা সব ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বয়ানটি পুরোপুরি বদলে গেছে। নেতৃত্বের একটা অংশের মনে গোপন এজেন্ডা থাকলেও সারা দেশে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রদের সামনে রাজনৈতিক দিশা না থাকায় খুব তাড়াতাড়ি তারা দিশাহীন হয়ে পড়েন। নানা গোষ্ঠী তাদের অনেককে ব্যবহার করতে শুরু করে। বদলিবাণিজ্য, তদবিরুবাণিজ্য, মব সহিংসতা থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি- ধীরে ধীরে এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে অনেকে জড়িয়ে পড়তে থাকেন। যারা একদিন শ্লোগান তুলেছিলেন ‘দেশটা কারো বাপের নয়’ তাদের কারো কারো বক্তব্য শুনে ও কার্যক্রম দেখে মনে হয়েছিল দেশটা একান্তই তাদের বাপের। সমন্বয়ক নামটি কোথাও ভীতি সৃষ্টি আবার কোথাও উপহাসে পরিণত হয়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় চলে যায় যে, কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক কমিটি ছাড়া সারাদেশের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করতে হয়। জুলাই অভ্যুত্থান দানবীয় মবতন্ত্রের পকেটস্থ হয়ে পড়ে। জুলাই আন্দোলনের পরে ৮ আগস্ট এক অলৌকিক বিভা নিয়ে ইউনূস যখন দেশে ফিরলেন তখন তো তিনি আলোর দিশারী! যিনি বাংলাদেশকে দুর্নীতি এবং কুশাসনের গহ্বর থেকে বের করে এক রূপকথার দেশে নিয়ে যেতে এসেছেন। মনে পড়ে পাকিস্তান আমলে সেই কৈশোরের দিনগুলোতে রাস্তার মোড়ে জেনারেল আইউব খানের ছবি সহ বিল বোর্ডে লেখা দেখতাম ‘ দি সেভিয়্যার হ্যাজ কাম টু সেইভ দি কান্ট্রি’। এস.এস.সি পরীক্ষার ইংরেজি প্রশ্নপত্রের রচনা অংশে ‘মাই ফেভারিট বুক’ কমন পড়ে যাওয়ায় শিক্ষকের শিখিয়ে দেয়ার মতো আইউব খানের আত্মজীবনীমূলক বই ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টারস’ রচনা লিখলাম। অথচ কৈশোর শেষ হওয়ার আগেই চোখের সামনে দেখলাম দেবতা বেশে আসা বন্ধু শুধু শত্রু নয় দানবের বেশেই বিদায় নিলেন। বিমানবন্দরে নেমেই ইউনূস বললেন, ‘কোনো রকম প্রতিহিংসামূলক কাজ করা যাবে না। আমার ওপর যদি আস্থা এবং বিশ্বাস রাখেন, তা হলে এটা নিশ্চিত করতে হবে। কারও ওপরে কোনো রকম হামলা করা যাবে না। বিশৃঙ্খলা করা যাবে না। আমাদের সারা বাংলাদেশ একটা পরিবার। যারা বিপথে গিয়েছিলেন তাদেরও সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার কথা মানতে হবে। যদি না মানেন তবে এখানে আমার প্রয়োজন নেই, আমাকে বিদায় দেন।’ একেবারে দেবতাসম চরিত্র!সেই তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে শপথ গ্রহণের চার দিন পরে একটি সাংবাদিক বৈঠক করে বললেন, ‘আমি ছাত্রদের বলেছি, আপনাদের সম্মান করি। আর আপনারা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন বলেই এই দায়িত্ব আমি গ্রহণ করেছি।’ এর পরেই ইউনূস বলেন, ‘অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এসেছে। দানবী বিদায় নিয়েছে দেশ থেকে।’ এই শেষ বাক্যটি উচ্চারণ করে ইউনূস ঘৃণার আগুন ছড়িয়ে দিলেন সবখানে, সারাদেশে। দেশ জুড়ে নতুন গতি পেলো মবউল্লম্ফন আর প্রতিপক্ষ ও কাল্পনিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা নির্যাতন এবং অবশেষে খুনের মামলা দিয়ে আটক। গণঅভ্যুত্থান বন্দী হয়ে পড়ে দানবীয় মব সন্ত্রাস আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কাছে। যেন জুলুম জবরদস্তি প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের মধ্যেই নিহিত ছিল জুলাইয়ের অভিপ্রায়, যেন এভাবেই ন্যায্যতা ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়!ইউনূস ঘোষিত ‘দানবী’ তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কিন্তু তার সম্পর্ক একটা সময় পর্যন্ত ভালোই ছিলো। ১৯৯৭ সালের ২-৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্রঋত সম্মেলনে যৌথ সভাপতি হিসেবে ইউনূসই শেখ হাসিনাকে মার্কিন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিন্টনের সঙ্গে একত্রে দায়িত্ব দেন। হাসিনা তার বক্তব্যে "অধ্যাপক ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের অসামান্য কাজের" প্রশংসা করেন। তিনি বলেন "গ্রামীণ ব্যাংকের সাফল্য দরিদ্রদের ক্ষুদ্রঋত প্রদানে নিযুক্ত ব্যাংকগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে আশাবাদ তৈরি করেছে"। ইউনূসও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এবং নারী ক্ষমতায়নে তাঁর অবদানের প্রশংসা করে বক্তব্য দেন। একটি দেশের কোনো নাগরিকের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি শুধু প্রাপকের গর্বের বিষয় নয়, তাঁর দেশের জন্যও গৌরবের। কিন্তু ২০০৬ সালের নোবেলে আমাদের কপাল পুড়লো! দেশে বিতর্ক শুরু হলো অর্থনীতিতে অবদান রেখে শান্তিতে নোবেল কেনো? এদিকে নোবেল লরিয়টও শুধু নোবেল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকলেন না। ২০০৬ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্েয তিনি বছরের প্রথমার্ধ থেকেই দেশের প্রথিতযশা কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে সৎ প্রার্থীদের নির্বাচিত করার এক কর্মসূচি নিয়ে জেলায় জেলায় নাগরিক সভা শুরু করেন। এরই মাঝে আসে এক এগারো যাকে ডিপ স্টেইট কাঠামোরই বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে গুরুতর অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতার ফলে সৃষ্ট নৈরাজ্য এবং শাসকদলের ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার নানামুখী প্রচেষ্টার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাষ্ট্রের স্থায়ী কাঠামো তথা সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থা প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে নিয়ে নেয়। এক এগারোর সরকার বা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ডিপ স্টেইটের ভূমিকার একটি স্থানীয় সংস্করণ হিসেবে অভিহিত করা যায়। এই পরিবর্তনে পরাশক্তিগুলোরও এক ধরনের মৌন বা প্রত্যক্ষ সমর্থন বিদ্যমান ছিল। আবার সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এমন ভাবমূর্তি সৃষ্টি করে মনে হয় যেন দেবতার আবির্ভাব হয়েছে। এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে এক এগারো কিন্তু মানুষের মাঝে প্রাথমিকভাবে স্বস্তি নিয়ে আসায় জনসমর্থনও পেয়েছিলো। এরই মাঝে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুহাম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। মজার বিষয় হচ্ছে ‘ দিল্লির জিনিজর’ থেকে দেশকে মুক্ত করার অবিরাম যোদ্ধা ইউনূস এ ঘোষণার আগে জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে ভারত সফরে যান। সে সফরে অধ্যাপক ইউনূস ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এবং ৩১ জানুয়ারি দিল্লীতে এক সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, দেশের পরিস্থিতি ‘বাধ্য করলে’ তিনি রাজনীতিতে ‘যোগ দেবেন’। দিল্লিতে বসে রাজনীতিতে যোগ দেয়ার সময় তিনি সম্ভবত শ্লোগানটি ভুলে গিয়েছিলেন, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’!দেশে ফিরে ২০০৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক ইউনূস পত্রিকার মাধ্যমে দেশের মানুষের উদ্দেশে খোলা চিঠি দিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল কীভাবে গঠন করা যায়, কিভাবে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচনে মনোনীত করা যায় - এসব বিষয় নিয়ে তিনি মানুষের মতামত এবং পরামর্শ জানতে চান। আর এক চিঠিতে তিনি বলেন তার দলের মূল শ্লোগান হবে এগিয়ে চলো বাংলাদেশ। আর দলের নীতি ও আদর্শ হবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সুশাসন এবং দুর্নীতি ও দলীয়করণ মুক্ত প্রশাসন। পাঠক লক্ষ্য করুন দেড় যুগ আগে ইউনূসের দল ‘নাগরিক জনশক্তি’র নীতি ও আদর্শে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। দেবতাই বটে!অধ্যাপক ইউনূস যখন রাজনীতিতে আসার প্রক্রিয়া শুরু করেন তখন সেটির কড়া সমালোচনা করেছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, ‘যারা রাজনীতিতে নতুন আসে তারা ভয়ঙ্কর হয়। তাদের তৎপরতা সন্দেহ করার মতো। তারা জাতির ভালো করার পরিবর্তে আরও বেশি খারাপ করে।’ ইসলামী ঐক্যজোট নেতা ফজলুল হক আমিনী আরও কঠোর মন্তব্য করে বলেন, ‘ড. ইউনুস দেশ, জাতি ও ইসলামের শত্রু।’ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন হবার পরে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে জোরেশোরে চেষ্টা করেছিল। অধ্যাপক ইউনূস সেনা সমর্থিত সরকারের সমর্থন নিয়ে সে পরিস্থিতিরই সুযোগ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এপ্রিল মাসের শেষ দিকে এসে মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে না। সে পরিস্থিতিতে ইউনূস দল ঘোষণার তিন মাস পরেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ফকরুদ্দিনের সঙ্গে এক বৈঠকের পরে ঘোষণা করেন রাজনৈতিক দল করা তার কাজ নয়। ২০০৭ সালে যেটা তার কাজ না বলেছিলেন বা ব্যর্থ হয়েছিলেন সে কাজে তিনি সফল হলেন দেড় যুগ পরে এসে ইসলামপন্থীদের সহযোগিতায়। তবে এর আগে ইসলামপন্থীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিলো না। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋত কার্যক্রমে ব্যাপক সংখ্যায় নারীদের অংশগ্রহণ ইসলাম পন্থীরা বা তার বর্তমান মিত্র জামাত কখনোই ভালো চোখে দেখে নাই। দেশের বহু স্থানে একসময় জামাত- শিবিরের কর্মীরা গ্রামীন ব্যাংকের শাখা অফিস আক্রমণ করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে, সদস্যা নারীদের নিগ্রহ করেছে। ২০১২ সালে ইউনূস উগান্ডায় সমকামীদের বিচারের সমালোচনা করে অন্য তিন নোবেলজয়ীর সঙ্গে একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। এর জন্যও ইসলাম পন্থীরা ইউনূসকে ‘ধর্মত্যাগী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তার বিরুদ্ধে দেশে সভা সমাবেশও করে। কিন্তু আজ দু’জনে দুজনার!ইউনূসের ২০০৭ সালের ‘নাগরিক শক্তি’ দলের আদর্শের মাঝে ছিলো ধর্ম নিরপেক্ষতা, আর আজ তার নতুন দল ‘নাগরিক পার্টি‘ সংবিধান থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতা ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার লড়াই করছে। নাগরিক শক্তির আদর্শের মাঝে ছিলো মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। আর আজ নাগরিক পার্টি দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামাতের কোলেই শুধু নয়; জামাত তাদের চালিকা শক্তি। এ যেন ২০০৭ এর ‘দেবতা’ ২০২৫ এ এসে ‘দানব’। ইউনূস তার প্রতিহিংসা চরিতার্থে সফল হয়েছেন, কিন্তু তাঁর চেয়ে বেশি সফল হয়েছে উগ্র ধর্মান্ধ শক্তি। দুনিয়ার কোনো দেশে নিজ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছে এমন কোনো দল জামাতের মতো ক্ষমতার কাছাকাছি নেই। গণতান্ত্রিক দেশে মানুষ যদি ইসলামপন্থীদের এমনকি ধর্মীয় উগ্রবাদীদেরও সমর্থন করে তাদের সঙ্গে রাজনীতি ও যুক্তির লড়াই চলবে। তারা সমাজে বিভাজন চাপিয়ে দিতে চাইলে তখন প্রতিরোধও কর্তব্য হয়ে দাঁড়াবে। সর্বাত্মক প্রতিরোধই হবে সেই সময়ের ডাক। কিন্তু দেশের জন্মযুদ্ধের বিরোধিতা শুধু নয় হানাদার বাহিনীর মন্ত্রীসভায় জায়গা নিয়ে, তাদের অক্সিলিয়ারি ফোর্স হিসেবে বাঙালি নিধন, সংখ্যালঘু নিধন, মুক্তিযোদ্ধা নিধন, নারী ধর্ষন ও খুনের অপরাধী দল তাদের দলীয় ফোরামে প্রস্তাব নিয়ে এবং প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা না করে দেশের রাজনৈতিক বন্দোবস্তে নৈতিক ও আইনগতভাবে জায়গা নিতে পারে না— তা সে দল সংগঠনগত ও আর্থিকভাবে যত শক্তিশালীই হোক না কেন। আর যুদ্ধ অপরাধী দল হিসেবে জামায়াত ইসলামকে আজ অব্দি কিভাবে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার বাইরে আছে সে জবাব বর্তমান অতীত সব শাসকদেরকেই দিতে হবে। ইউনূস ক্ষমতায় থেকে ব্যবসায়ী (তার ভাষায় সামাজিক ব্যবসা) হিসাবেও সফল হয়েছেন। অনেকে বলেন, ইউনূস গ্রামীণের নামে ৪,০০০ কোটি টাকার একচেটিয়া ব্যবসা করিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের কাছে গ্রামীণের বকেয়া ছিল ৬৬৬ কোটি টাকা। ইউনূস ক্ষমতায় এসেই সেটা প্রথমে মওকুব করিয়েছেন। গত তিন-চার মাসের মধ্যে গ্রামীণের নামেই তিন-চারটি লাইসেন্স নিয়েছেন। গ্রামীণ জনশক্তি রপ্তানি, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। অর্থাৎ, তার সরকারই তার সংস্থাকে বিবিধ সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে। কেমন নীতিবান নোবেল লরিয়েট! আর বিদায়ের আগে গোপন চুক্তি করে তিনি দেশটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দিয়ে গেলেন মার্কিনী স্বার্থের কাছে। এমন মার্কিনী বংশবদ বানিয়ে গেছেন যে আজ ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্বর হামলা, আগ্রাসন ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কোনো সাহসী প্রতিবাদ বিবৃতি পর্যন্ত দিতে পারে না। জামাত সহ ইসলাম পছন্দ দলগুলোও মিনমিন ভাষায় বিবৃতি দিচ্ছে। কোনো দেশ থেকে তেল আমদানি করার আগে বাংলাদেশ সরকারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুমতি চেয়ে আবেদনপত্র পাঠাতে হয়। হায়রে দ্বিতীয় স্বাধীনতা! আর এবার নাকি আমরা সভ্য হলাম!তিনি ব্যবসা করছেন, করুন। কিন্তু একটা প্রজন্মকে বিশেষত তরুণদের একটা অংশকে তিনি যে পথে (জামাতের পথে) নিয়ে গেলেন এবং তাদেরকে বিনয়ী হওয়ার বিপরীতে উদ্ধত করে গেলেন— দেশের জন্য এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কি হতে পারে? দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতে ছাত্রদের একাংশের মাঝে এমন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যে, তারা আর শিক্ষকদের সালাম দেয় না; শিক্ষককেই নতজানু হয়ে ঐ সব ছাত্রকে সালাম দিতে হয়। শিক্ষক হেনস্তার যে রেকর্ড দেশে হয়েছে তা কলংকের মানে ‘গ্রীনিচ বুক অব রেকর্ডস’ এ জায়গা পেতে পারে। শিক্ষার ভবিষ্যৎ কি?এক যুগেরও বেশি সময়কাল গণতন্ত্রকে বন্দী করে রেখে, নানা কৌশলে নির্বাচন থেকে বিরোধী দলকে বাইরে রেখে, নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বা অলিগার্কদের প্রভাব এবং আমলাতন্ত্র ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকাকে প্রাধান্য দিয়ে, সামান্য কোটা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে হত্যাযজ্ঞ সংঘঠিত করে ‘ডিপ স্টেইটকে’ রেজিম চেঞ্জের সুযোগ করে দিয়ে শেখ হাসিনা বিদায় হলেন। এ পরিস্থিতি সৃষ্টির দায় তো প্রধানত তাকেই নিতে হবে। আওয়ামী লীগ বিহীন একটি নির্বাচন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। বিএনপি এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। তাদের ক্ষমতায় আরোহনের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ এখনও পার হয় নি। তাই ডিপ স্টেইটের বাঁধন তারা ছিন্ন করতে পারছেন কিনা সে বিষয়ে এত তাড়াতাড়ি মন্তব্য নাই বা করলাম। বিএনপিকে এটা বিবেচনায় রাখতে হবে তাদের দলকে সমর্থন করেন না এমন বিপুলসংখ্যক ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন এই আশা নিয়ে যে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এবার দেশ পরিচালনা করবেন। দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী শক্তির কাছে এবার অন্তত নত হবেন না। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আগের মতো একতরফা বয়ান না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেই সামরিক নেতৃত্বকে মর্যাদা দেয়ার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তারা নেবেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাকে স্বীকৃতি দেয়া যা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন সেটা বিএনপি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হলে বিভাজনের শক্তি ও উগ্রপন্থা পরাজিত হবে। দেশের মানুষের চাহিদা কিন্তু বেশি নয়। দলবাজির বিপরীতে দেশের মানুষ চায় দলনিরপেক্ষ প্রশাসন, দখলবাজদের হাত থেকে স্বস্তি। চায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, কথা বলার, মত প্রকাশের ও সংগঠন করার মুক্ত পরিবেশ। ধনিক শ্রেণীর তেলা মাথায় বেশি বেশি তেল দিয়ে উপচেপড়া তেলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কোনোরকমে দিন গুজরান করবে— মানুষ এই অমানবিক আর্থিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। মানুষ চায় ন্যায্য কর্ম সংস্থান, আইনের শাসন, সুশাসন। বাংলাদেশের মানুষ আর দেবতা দেখতে চায় না, দানব তো নয়ই![ লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা](লেখকের নিজস্ব মত)

রাতারগুল: সিলেটে একখণ্ড সুন্দরবন

বাংলাদেশের পর্যটক শিল্পের প্রকৃতি কন্যা বলা হয় সিলেট জেলাকে। সিলেট জেলার নৈসর্গিক সৌন্দর্য অনন্য এবং বাংলাদেশের অন্য জেলা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সিলেট বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান শহর ও ঐতিহাসিক শহর হিসাবেও পরিচিত। সিলেট জেলা হচ্ছে ৩৬০ আউলিয়ার পবিত্র ও পূন্যভূমি। সিলেট জেলা পাহাড়, নদী আর শীতল পানির ঝরনার এক নিসর্গ ভূমি। এ জেলার পর্যটন কেন্দ্র জাফলং, তামাবিল, ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর, বিছানা কান্দি, রাতারগুল পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে। বিশেষ করে রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্র অন্য পর্যটন কেন্দ্র থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই পর্যটন কেন্দ্র যেন সিলেটে একখণ্ড সুন্দর বন। সিলেট জেলার রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্র পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে তার পিঠাজল ও জলের মধ্যে বেড়ে ওঠা বনভূমি। ৯৭২ একর আয়তনের এ বনভূমি পুরোটাই পানি দ্বারা আবৃত। বিশেষ করে বর্ষাকালে বনের ভিতর নৌকায় করে পর্যটকরা পরিভ্রমণ করতে পারে। রাতারগুল জলাবন বাংলাদেশের একমাত্র ও বিশ্বের ২২টি মিঠাপানির সোয়াম্প ফরেস্টের অন্যতম একটি, যা সিলেটের গোয়াইনঘাটে অবস্থিত। এটি ‘সিলেটের সুন্দরবন’ বা ‘বাংলাদেশের আমাজন’ নামে পরিচিত। বর্ষাকালে এই বন ২০-৩০ ফুট পানির নিচে ডুবে থাকে। এই বনের মূল সৌন্দর্য দেখার সেরা সময় জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। রাতারগুল বন সিলেট জেলা থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মোট আয়তন ৩,৩২৫.৬১ একর, যার মধ্যে ৫০৪ একর মূল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। হিজল, করচ, বরুণ, কদম, জালিবেত ইত্যাদি জলসহিষ্ণু চিরহরিৎ বৃক্ষ এখানের মূল আকর্ষণ। এখানে ২৫ প্রজাতির জলসহিষ্ণু গাছ, পাখি, মাছ ও নানা প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। সিলেটের অন্য পর্যটন কেন্দ্র থেকে রাতারগুলের আকর্ষণ একটু বেশি। এটা দুটো কারণে হয়। এক. সিলেট শহর থেকে অল্প দূরত্বে মাত্র ২৭ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাটের ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। সিএনজি কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে যেতে সময় লাগে মাত্র ৪০ মিনিট থেকে ৫০ মিনিট। দুই হিজল করচ কদম বৃক্ষের ভিতর দিয়ে নৌকা নিয়ে ঘুরে ঘুরে পুরো বন দেখা যায়। শুষ্ক মৌসুমে নৌকা নিয়ে বনে প্রবেশ করে হেঁটে হেঁটে পুরো বন পরিদর্শন করা যায়। এই বিষয়টি পর্যটকদের মাঝে এডভেঞ্চার সৃষ্টি করে। গত ২৩ মার্চ তারিখ আমি সপরিবারে সিলেটের রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট ভ্রমণে গিয়েছিলাম। রাতারগুল যাওয়ার পর বনের ভিতর ঘুরে দেখার জন্য একটি নৌকা ভাড়া করি। নৌকা ভাড়া দিতে হয়েছে ৮০০ টাকা। নৌকা ঘাটেই বাঁধা ছিল। আমরা বনে যাওয়ার জন্য নৌকায় উঠে বসি। আমাদেরকে একজন তরুণ মাঝি বৈঠা চালিয়ে নৌকা নিয়ে এগিয়ে যায় জলাবনের দিকে। সরু চিকন খাল ধরে নৌকা এগিয়ে যায়। আমাদের আগে পিছনে এই রকম আরও নৌকা এগিয়ে চলে বন দেখার জন্য। ইতোমধ্যে অনেকেই আবার বন দেখে ফিরেও আসে। যতই আমরা বনের ভিতরে প্রবেশ করি ততই আমাদের রোমাঞ্চকর অনুভূতি বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে আমরা মূল পয়েন্টে চলে আসি। চারদিকে গাছপালা বেষ্টিত মাঝখানে উন্মুক্ত জলরাশি রোমাঞ্চকর অনুভূতিকে আরও প্রাঞ্জল করে তোলে। আমরা মুগ্ধ হই সবাই। মাঝি আমাদেরকে বনের মাঝখানের একটা জায়গায় নামিয়ে দেয়। আমরা ঘুরে ঘুরে বনের গাছগুলো পর্যবেক্ষণ করি আর পুলকিত হই। রাতারগুল জলাবন ঘুরে দেখার মুহুর্তগুলো মোবাইলে ক্যামেরাবন্দী করি। আমাদেরকে যে মাঝি নৌকায় করে বন ঘুরিয়ে দেখায় তার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি রাতারগুল জলাবন পরিদর্শনের জন্য ইজারা ঘাটে ১৩৫টি নৌকা ব্যবহার করা হয়। নৌকাগুলো দুই ধরনের। এক ধরনের নৌকা একটু বড় সাইজ যা আটজন বহন করতে পারে। আরেক ধরনের নৌকা একটু ছোট সাইজ যা চারজন বহন করতে পারে। মাঝি আরও জানায়- প্রতি টুরিস্টকে এই বনে প্রবেশের জন্য ৯৭.৫০ টাকা দিতে হয়। আর নৌকা প্রতি পে করতে হয় ১১৫ টাকা। অর্থাৎ একটা নৌকা বনে প্রবেশ করলেই ১১৫ টাকা দিতে হয়। দুই বছর আগে রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্রে গাড়ি পার্কিংসহ একটি গণশৌচাগার নির্মাণ করা হয়। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তবে চৌমৌহনী বাজার থেকে রাতারগুল নৌকার ঘাট পর্যন্ত রাস্তাটি সরু এবং খানাখন্দে ভরা। পর্যটকদের জন্য বহনকারী পরিবহনের চলাচল কষ্ট হয়। শুষ্ক মৌসুমে চলাচল কিছুটা সহজ হলেও বর্ষাকালে পর্যটকদের কষ্ট বেশি হয়। রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্রে শুষ্ক মৌসুমের চেয়ে বর্ষাকালে পর্যটক অনেক বেশি আসে। এর কারণ হচ্ছে- বর্ষাকালে পুরো বন জলমগ্ন হয়। বৃক্ষগুলো ২০ ফুট পানির ওপরে ভেসে থাকে। পুরো বন নৌকা করে গাছগাছালির ফাঁকে ঘুরে ঘুরে দেখা যায়। বনের মাঝখানে একটা ওয়াচ-টাওয়ার ছিল যেটা ১০ বছর আগে নির্মাণ করা হয়। এই ওয়াচটাওয়ারের উপরে উঠে পর্যটকরা পুরো বন দেখতে পারতো। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে- নির্মাণ ত্রুটির কারণে দুই বছর আগে ওয়াচ-টাওয়ারটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ওয়াচ-টাওয়ার ব্যবহার করতে না পারায় পর্যটকরা ওপর থেকে পুরো জলাবন দেখতে বঞ্চিত হচ্ছে। কেউ কেউ ওয়াচ-টাওয়ার নষ্ট থাকায় ক্ষোভও প্রকাশ করছে। রাতারগুল সিলেটের এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় পর্যটন কেন্দ্র। সিলেট ভ্রমণ পিপাসুদের অন্যতম পছন্দের জায়গা হচ্ছে এই রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট। একে সিলেটের সুন্দরবন নামেও ডাকা হয়। রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্রকে আরও আকর্ষনীয় করার জন্য প্রবেশ পথ সংস্কার ও প্রশস্ত করা প্রয়োজন। প্রয়োজন ওয়াচ-টাওয়ারটি পুনর্নির্মাণ করা। [লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

অর্জনের বিসর্জন ও শিশুদের সুরক্ষায় কেন ব্যর্থ হলো আমাদের স্বাস্থ্য খাত

হাম মানবজাতির প্রাচীনতম এবং অন্যতম প্রাণঘাতী রোগগুলোর মধ্যে একটি। এর ইতিহাস অন্তত সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত প্রসারিত, যখন বিশ্বখ্যাত পারস্য চিকিৎসক রাজেস— যার পুরো নাম আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাজি তার যুগান্তকারী চিকিৎসাগ্রন্থে হামকে গুটিবসন্ত থেকে প্রথমবার সম্পূর্ণ আলাদাভাবে চিহ্নিত করেন এবং রোগটির নিখুঁত ক্লিনিক্যাল বর্ণনা দেন। তিনি এর বৈশিষ্ট্যময় ফুসকুড়ি, তীব্র জ্বর এবং জনগোষ্ঠীর মধ্যে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতার কথা সবিস্তারে উল্লেখ করেছিলেন। তার পরে এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে হাম অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ কেড়েছে। কোনো টিকা আবিষ্কারের আগে, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হতো কেবল এই একটি রোগে। এই রোগের জন্য দায়ী জীবাণু হলো মিজেলস মর্বিলিভাইরাস— প্যারামিক্সোভিরিডি পরিবারের একটি একক-সূত্রী আরএনএ ভাইরাস। বেশিরভাগ মহামারি বিশেষজ্ঞের মতে, এটি মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে এমন সংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোঁয়াচে। এর মূল প্রজনন সংখ্যা বা বেসিক রিপ্রোডাকশন নম্বর ১২-১৮ এর মধ্যে। তুলনার জন্য বলা যায়, সাধারণ মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার মাত্র ১.৫। একজন অটিকাহীন ব্যক্তি একটি ঘরে প্রবেশ করলে আঠারোজন পর্যন্ত মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। সংক্রমিত ব্যক্তি ঘর ছেড়ে যাওয়ার দুই ঘণ্টা পর পর্যন্তও বায়ুতে এই ভাইরাস ভাসমান থাকে। এর কোনো মধ্যবর্তী প্রাণী বাহক নেই, কোনো কীটপতঙ্গ বাহক নেই, কোনো খাদ্যসূত্র নেই—শুধু মানুষের নিঃশ্বাসই এর ছড়িয়ে পড়ার জন্য যথেষ্ট। হামের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের বিপ্লব শুরু হয়েছিল ১৯৫৪ সালে, যখন মার্কিন ভাইরোলজিস্ট জন ফ্র্যাংকলিন এন্ডার্স এবং তার সহকর্মী থমাস চামার্স পিবলস বোস্টনের একটি স্কুলের ১১ বছর বয়সী ডেভিড এডমন্সটন নামের এক ছাত্রের কাছ থেকে সফলভাবে হামের ভাইরাস আলাদা করতে সক্ষম হন। জন ফ্র্যাংকলিন এন্ডার্স পোলিও ভাইরাসে তার কাজের জন্য ইতোমধ্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন এবং সমান নিষ্ঠায় তিনি হামকেও মোকাবিলা করেছিলেন। এই ‘এডমন্সটন স্ট্রেইন’ পরবর্তী সময়ে আবিষ্কৃত সমস্ত হামের টিকার প্রধান জৈবিক ভিত্তি হয়ে ওঠে। এরপর মার্কিন অণুজীববিজ্ঞানী মরিস হিলম্যান ১৯৬৮ সালে এন্ডার্সের কাজের ওপর ভিত্তি করে আরও উন্নত ‘মোরেটেন স্ট্রেইন’ তৈরি করেন—যা আধুনিক হামের টিকার মূল মেরুদণ্ড এবং আজও শিশুদের সার্বিক সুরক্ষা দিয়ে চলেছে। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত এমএমআর টিকা (হাম, মাম্পস ও রুবেলা একত্রিত) চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটি হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যবহৃত মিজেলস-রুবেলা টিকা এই মহান বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকারেরই প্রত্যক্ষ উত্তরসূরি। একটি ডোজ প্রায় ৯৩ শতাংশ সুরক্ষা দেয়; দুটি ডোজে তা বেড়ে ৯৭ শতাংশ হয়। দুটি টিকার ডোজ, একটি কোল্ড চেইন এবং একজন নিষ্ঠাবান স্বাস্থ্যকর্মী—এটুকুই একটি শিশু ও অন্ধত্ব, বধিরতা, মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি এবং মৃত্যুর মাঝখানে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হাম এখানে থাকার কথা ছিল না। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের মধ্যেই হামের স্থানীয় সংক্রমণ সম্পূর্ণ নির্মূল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল—ঠিক সেই বছরেই ভাইরাসটি ফিরে এসে তার শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করছে। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে চালু হওয়া বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই ন্যায়সঙ্গতভাবেই দেশের অন্যতম শীর্ষ এবং গর্বিত জনস্বাস্থ্য অর্জনগুলোর মধ্যে গণ্য হয়। ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশে, যেখানে দারিদ্র্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ ছিল নিরন্তর, সেখানে ইপিআই লাখ লাখ শিশুর কাছে জীবন রক্ষাকারী টিকা পৌঁছে দিয়েছে। পোলিও নির্মূল হয়েছে, ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং হামের প্রকোপ বছরের পর বছর কমেছে। ২০২০-এর দশকের শুরুতে দেশটি হাম নির্মূলের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ২০২৫ সালে হামের প্রকোপ ছিল মাত্র প্রতি দশ লক্ষে ০.৭২ জন। ২০২৬ সালে সেটি শূন্যে নেমে আসার কথা ছিল। পরিবর্তে এটি এখন প্রতি দশ লক্ষে ১৬.৮-এ বিস্ফোরিত হয়েছে এবং সংক্রমণ আরও বাড়ছে। তবে ফাটলগুলো সবসময়ই ছিল, শিরোনামের জমকালো সংখ্যার আড়ালে যা অনেকটা লুকিয়ে ছিল। ২০২৩ সালের কভারেজ মূল্যায়ন জরিপে দেখা গেছে যে, ১২ মাস বয়সের মধ্যে সম্পূর্ণ বৈধ টিকাদান কভারেজ ২০১৯ সালের ৮৩.৯ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৮১.৬ শতাংশে নেমে গেছে। ঢাকা বিভাগে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৭৬.৫ শতাংশ। দেশজুড়ে শহরাঞ্চলে কভারেজ ছিল মাত্র ৭৯ শতাংশ—যা গ্রামাঞ্চলের চেয়েও কম। এটি আংশিকভাবে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, ক্ষণস্থায়ী বস্তিবাসী এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় নগর দরিদ্রদের অদৃশ্যতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। হামের মতো চরম সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি বা জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক সুরক্ষা বজায় রাখতে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ প্রয়োজন। বাংলাদেশ সেই মাত্রার ধারেকাছেও ছিল না, এবং এই বিপজ্জনক ব্যবধানটি বছরের পর বছর কেবল প্রসারিতই হচ্ছিল। বাংলাদেশ প্রতি চার বছর অন্তর বিশেষ জাতীয় হাম টিকাদান অভিযান পরিচালনা করে, যাতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া শিশুদের সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আনা যায়। সর্বশেষ এই ধরনের বড় অভিযান হয়েছিল ২০২০ সালে। পরবর্তীটি হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের জুনে। কিন্তু সেটি আর হয়নি। তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল এবং ক্ষমতা পরিবর্তনের চরম বিশৃঙ্খলায় নির্ধারিত টিকাদান অভিযানটি আড়ালে চুপচাপ স্থগিত হয়ে যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভেতরের আমলাতান্ত্রিক পক্ষাঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কর্মকর্তারা সরাসরি ক্রয় করবেন নাকি ইউনিসেফ-এর মাধ্যমে তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কে মেতে রইলেন। মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং দাতা সংস্থাগুলো শুধু আর্থিক প্রক্রিয়ার ফাইলের মারপ্যাঁচে আবর্তিত হতে থাকলে, অথচ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভ্যাকসিনের মজুত তখন প্রায় শেষ হয়ে আসছিল। যখন কেউ জরুরিভিত্তিতে কাজ করার কথা ভাবল, ততক্ষণে অটিকাহীন শিশুদের একটি বড় প্রজন্ম তৈরি হয়ে গিয়েছিল—যেন একটি বারুদে ঠাসা গুদাম, যা শুধু একটি আগুনের ফুলকির অপেক্ষায় ছিল। সেই ফুলকি এলো ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে, যখন ঢাকা ও রাজশাহী অঞ্চলে হামের রোগী আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে শুরু করল। ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে পড়লো। ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক রোগ হাসপাতাল এই সংকটের মর্মান্তিক কেন্দ্রে পরিণত হলো। শিশুরা আসছিল টাঙ্গাইল, পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে—কেউ কেউ ছয় মাসেরও কম বয়সী, যে বয়সে বাংলাদেশে আগে হামের সংক্রমণ ছিল অত্যন্ত বিরল। রোগ প্রতিরোধের এই বিরাট গ্যাপের কারণে মায়ের শরীর থেকে নবজাতকের শরীরে যাওয়া প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের ডাটা অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট। এই প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশে নিশ্চিত হামের রোগীদের ৬৯ শতাংশই হলো দুই বছরের কম বয়সী দুগ্ধপোষ্য শিশু। পূর্ণ ৩৪ শতাংশের বয়স নয় মাসের কম—যারা স্ট্যান্ডার্ড টিকাদান সময়সূচি অনুযায়ী হামের প্রথম ডোজের জন্যও এখনও যোগ্য হয়ে ওঠেনি। প্রায় সব ভর্তি রোগীই ছিল অটিকাহীন। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ হাম পুষ্টির ঘাটতির সঙ্গে একটি ভয়ঙ্কর মরণচক্রে মিলিত হয়: ভাইরাসটি শরীর থেকে ভিটামিন এ শোষণ করে নেয়, যা নিজেই মানুষের রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমের জন্য অপরিহার্য। ফলে একটি তীব্র দুর্বলতার সর্পিল বা স্পাইরাল তৈরি হয়। নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস, কানের গুরুতর সংক্রমণ ও তীব্র ডায়রিয়ার মতো জটিলতা হামে বিরল নয়—এগুলো অপুষ্ট ও অটিকাহীন শিশুদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্বাভাবিক পরিণতি এবং এভাবেই একটি প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বলদের এই ভাইরাস মেরে ফেলছে। মার্চের শেষ নাগাদ হাম বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৬টিতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। ঢাকা বিভাগে জাতীয় মোটের সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ নিশ্চিত রোগী পাওয়া গেছে, এরপর রাজশাহীতে ২০ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে প্রায় ১৪ শতাংশ। রাজশাহী অঞ্চল একটি বিশেষ সংকটবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো তথ্যের অমিল। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো ইতোমধ্যেই প্রায় ১২টি শিশুর মৃত্যুর খবর দিয়েছে, যেখানে জাতীয় অফিশিয়াল প্রতিবেদনে মাত্র একটি মৃত্যু স্বীকার করা হয়েছে। এই তথ্যের বৈষম্য ও সমন্বয়হীনতা প্রমাণ করে যে রিয়েল-টাইম রোগ নজরদারি কাঠামো কতটা বিপর্যয়করভাবে অপর্যাপ্ত। ভাইরাসটি বাংলাদেশকে বুদ্ধিতে হারায়নি। বাংলাদেশ কেবল অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল—প্রথমে রাজনৈতিক আত্মরক্ষার স্বার্থে এবং শেষমেশ অন্ধ আমলাতান্ত্রিক জড়তায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি জরুরি জাতীয় পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন এবং গতকাল থেকে একটি নতুন জরুরি টিকাদান অভিযানের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সরকার প্রথম ভ্যাকসিন ডোজের বয়সসীমা নয় মাস থেকে কমিয়ে সাময়িকভাবে ছয় মাস করেছে—এটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বৈজ্ঞানিকভাবে সুষম একটি জরুরি পদক্ষেপ, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও-র নির্দেশিকা দ্বারা অনুমোদিত যখন নিশ্চিত রোগীদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি স্ট্যান্ডার্ড টিকাদান বয়সের নিচে থাকে। তবে ৫৬টি জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি একক জরুরি অভিযানই যথেষ্ট নয়। হাসপাতালগুলিতে আইসিইউ সক্ষমতা অবিলম্বে বাড়াতে হবে এবং হামের জন্য সম্পূর্ণ নিবেদিত আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন করতে হবে। ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টেশন প্রতিটি চিকিৎসা প্রোটোকলে বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নজরদারি রিয়েল-টাইম করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা যেকোনো অস্থিতিশীলতার সময়েও এই জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিগুলোকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে বা ‘অলঙ্ঘনীয়’ বলে বিবেচনা করতে হবে। জন ফ্র্যাংকলিন এন্ডার্স, যিনি হামের ভাইরাস প্রথম আলাদা করেছিলেন, তিনি বুঝতেন যে বিজ্ঞানের পরম দায়িত্ব হলো তার অবদানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। একটি জীবনরক্ষাকারী টিকা যা শুধুই কোল্ড স্টোরেজে বা ঠান্ডা মজুতঘরে পড়ে থাকে কিন্তু কোনো শিশুর শরীরে প্রবেশ করে না, তা ফলাফলের দিক থেকে কোনো টিকাই নয়। পঞ্চাশেরও বেশি নিষ্পাপ শিশু মারা গেছে এমন একটি প্রাচীন রোগে যা আধুনিক বিজ্ঞান আজ থেকে ষাট বছর আগেই পুরোপুরি জয় করেছিল। প্রতিটি মৃত্যুই এখানে প্রতিরোধযোগ্য ছিল। এটি কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়; এটি এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি অকাট্য অভিযোগনামা। যে সুচটির বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে সেটি কেবল একটি সামান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম ছিল না। এটি এই দেশে জন্ম নেয়া প্রতিটি অসহায় শিশুর প্রতি রাষ্ট্রের একটি বড় প্রতিশ্রুতি ছিল। সেই প্রতিশ্রুতি এখন জরুরিভিত্তিতে এবং স্থায়ীভাবে রক্ষা করতে হবে। [লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

ভিডিও

পেনাল্টি ড্রামায় এশিয়ান গেমস নিশ্চিত করলো বাংলাদেশ

থাইল্যান্ডে চলছে পুরুষ এশিয়ান গেমসের বাছাইপর্ব। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ছিল পঞ্চম থেকে অষ্টম স্থান নির্ধারণীর ম্যাচ। প্রতিপক্ষ হংকং। নির্ধারিত সময়ের লড়াই শেষ হয় ৪-৪ গোলে।এরপর স্নায়ুচাপের পেনাল্টি শুটআউট। সেখানেই নায়ক বনে যান বাংলাদেশের গোলরক্ষক বিপ্লব কুজু। হংকংকে ৩-২ গোলে হারিয়ে আগামী এশিয়ান গেমসের টিকিট নিশ্চিত করেছে লাল-সবুজের হকি দল।শুটআউটের শুরুটা ভালো হয়নি বাংলাদেশের। ফরোয়ার্ড রাকিবুল হাসান ও আবেদ উদ্দিনের শট লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হন। তবে অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে খেলায় ফেরান বিপ্লব কুজু। তিনি পরপর হংকংয়ের দুটি শট রুখে দেন। এরপর অধিনায়ক ফজলে রাব্বির শট জালে জড়ালে জয় নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের।এই জয়ের ফলে চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে পঞ্চম-ষষ্ঠ স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। আর সবচেয়ে বড় কথা, জাপানে অনুষ্ঠেয় এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। ৯ দলের এই বাছাইপর্ব থেকে শীর্ষ ছয় দল যাবে মূল আসরে।ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশ কখনো এশিয়ান গেমস থেকে বাদ পড়েনি। বাছাইপর্বের আগের তিন আসরে হয় চ্যাম্পিয়ন, নয়তো রানার্স-আপ হয়েছে দলটি। ২০১৪ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর ২০১৮ ও ২০২২ সালে ওমানের কাছে ফাইনালে হেরে রানার্স-আপ হয়।তবে এবারের পথটা ছিল বেশ কঠিন। তৃতীয় ও শেষ পুল ম্যাচে উজবেকিস্তানের সঙ্গে ১-১ ড্র করে সেমিফাইনালের পথ হারায় বাংলাদেশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আশঙ্কা কাটিয়ে এশিয়ান গেমস নিশ্চিত করলো ফজলে রাব্বির দল।আগামী সেপ্টেম্বরে জাপানে বসবে এশিয়ান গেমস। আর সেখানেই আবার লাল-সবুজের হকির লড়াই দেখার অপেক্ষা এখন ভক্তদের।

পেনাল্টি ড্রামায় এশিয়ান গেমস নিশ্চিত করলো বাংলাদেশ
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ১২ জন