সংবাদ
সীমান্ত থেকে গ্রামে মাদকের মরণকামড়

সীমান্ত থেকে গ্রামে মাদকের মরণকামড়

রাজশাহীর ৮ জেলায় মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু এক মাসে প্রায় ১৫’শ মাদকসেবী ও বিক্রেতা গ্রেপ্তার মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে: ডিআইজি"আমি মাদক খাইনা, গাঁজাই খাই। আমার কাছে গাঁজাই আছে।" তল্লাশিকালে পুলিশের ক্যামেরার সামনে এভাবেই অবলীলায় নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করছিল এক মাদকসেবী। অন্য এক যুবকের পকেট থেকে যখন একের পর এক মাদকের পুরিয়া বের করা হচ্ছিল, তখন তার ফ্যাকাশে মুখ বলে দিচ্ছিল এই মরণনেশার গভীরতা কতটা সর্বগ্রাসী।এটি কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়, বরং দেশের উত্তরবঙ্গের সীমান্ত ঘেঁষা জনপদগুলোর বর্তমান নির্মম বাস্তবতা। মাদকের এই ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে এবার এক歩ও ছাড় না দেওয়ার নীতিতে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।আট জেলায় চিরুনি অভিযানরাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় একযোগে শুরু হয়েছে পুলিশের মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। গত এক মাসে কুখ্যাত মাদক কারবারি ও সেবীদের ধরতে দিন-রাত টানা অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। এই বিশেষ অভিযানে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলা থেকে প্রায় দেড় হাজার মাদকসেবী ও বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাদক কারবারিদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে যেখানেই মাদকের খবর মিলছে, সেখানেই হানা দিচ্ছে পুলিশ।এবারের অভিযানে সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে পাবনা জেলায়। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা মূল্যের ইয়াবা, গাঁজা, ট্যাপেন্টাডল, চোলাই মদ, হেরোইন, ফায়ারড্রিনসহ হরেক রকমের মরণঘাতী মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু মাদকই নয়, অপরাধীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে ধারালো বার্মিজ চাকুসহ দেশীয় অস্ত্র। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।মাদকের টাকা জোগাতে অপরাধের বিস্তারস্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর চোরাচালান সিন্ডিকেটকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো প্রতিনিয়ত দেশে মাদক ঢোকাচ্ছে। একসময় যা কেবল সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে। তরুণ ও যুবসমাজ দলে দলে এই মরণনেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে।প্রকাশ্যে জনসমক্ষে মাদক সেবনের পাশাপাশি পকেটে ও কোমরে লুকিয়ে মাদক বহন করছে তারা। মাদকের এই নীল দংশন কেবল একজন ব্যক্তিকে শেষ করছে না, ধ্বংস করে দিচ্ছে পুরো পরিবারকে। নেশার টাকা জোগাড় করতে আসক্তরা ঘরের জিনিসপত্র চুরি করা থেকে শুরু করে জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাই, ডাকাতির মতো মারাত্মক সব সামাজিক অপরাধে।শাহজাদপুরে ত্রাস বন্ধ করতে মাঠে পুলিশ, মাদকসেবীদের চোখ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টাবিশেষ এই অভিযানের অংশ হিসেবে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানা এলাকায় ব্যাপক তৎপরতা চালানো হয়েছে। সেখানে মাদকবিরোধী অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৩০ জনকে তাৎক্ষণিক জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে এবং ১২টি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের এই আকস্মিক ও কঠোর অভিযানের মুখে চতুর মাদক কারবারি ও সেবীদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছে। এ বিষয়ে শাহজাদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, "অভিযানের মুখে কিছু মাদক সেবী গা ঢাকা দিয়েছে। তাদেরকে খুঁজে বের করতে অভিযান চালানো হচ্ছে।"'মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে'উত্তরবঙ্গকে মাদকমুক্ত করতে এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার কথা পুনর্ব্যক্ত করে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহ্জাহান বলেন, "মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। তা অব্যাহত থাকবে। টার্গেট রাজশাহী বিভাগের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো মাদক নির্মূল করা। এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার গ্রেপ্তার হয়েছে। মাদক উদ্ধার হয়েছে।"মাদক নির্মূলের এই মহাযজ্ঞে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টানা অভিযান কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। সীমান্ত গলিয়ে আসা এই বিষাক্ত ছোবল থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৪২ মিনিট আগে

মতামতমতামত

কুকুরের কান্না, মানুষের নীরবতা

অতি সম্প্রতি নরসিংদীর নাগরিয়াকান্দি সেতু থেকে একটি জীবন্ত কুকুরের গলায় ইট বেঁধে মেঘনায় ফেলে দেয়ার ভিডিও দেখে স্তব্ধ হয়নি কে? নদীতে ফেলে দেয়ার পরও অসহায় প্রাণীটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্যাতনকারীদের দিকেই তাকিয়ে ছিল। সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ছাগল কামড়ানোর ‘অপরাধে’ প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ২টি কুকুরকে হত্যা এবং একটি কুকুরকে জখম করার ঘটনাও জুন ‘২৬ মাসে ঘটে। প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ এর ৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো পশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, আঘাত বা হত্যা করলে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। অথচ অস্ট্রেলিয়ার আদালত সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রাণিবিদ অ্যাডাম ব্রিটনকে ৬০টির বেশি কুকুরের ওপর পাশবিক নির্যাতনের দায়ে ২৪৯ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। বাংলাদেশে শাস্তিটা কেন তত ভারী নয়? অপরাধ একই, অথচ আইনের দাঁত-নখের ফারাক এত বেশি। পশু-পাখির ভোট নেই, বাকশক্তি নেই। তাই তাদের পক্ষে সংসদে বিল ওঠে না, রাজপথে মিছিল হয় না। তাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে কিছু মানুষের বিবেকের ওপর। কিন্তু সেই বিবেকটাই যদি শিশুকাল থেকে পাথর হয়ে যায়, তাহলে একটি জাতির ভবিষ্যতও পাথর হয়ে যায়। কারণ যে শিশু আজ অবলার যন্ত্রণা দেখে আনন্দ পায়, সে কাল মানুষের যন্ত্রণায় উদাসীন হবে। এখন অনেক শিশু-কিশোর বন্যার পানিতে আটকা ইঁদুর, বেজি, শিয়ালকে পিটিয়ে মারাকে ‘খেলা’ বানিয়েছে। রাস্তার কুকুর দেখলেই ইট ছোড়ে, লাথি মারে। অথচ প্রাণিবিদ্যা বলে, কোনো পশুই অকারণে আক্রমণ করে না। আমরা ভয় দেখিয়ে, কষ্ট দিয়ে তাদের আক্রমণাত্মক বানিয়ে দিই। তারপর সেই দাঁত-নখের দোষও তাদের ঘাড়েই চাপাই। এই নিষ্ঠুরতার উল্টো পিঠে আছে এক গভীর বন্ধন। কুকুর হলো পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভুভক্ত প্রাণী। সে মনিবের জন্য জীবন দিতে পারে। পরিবারকে চোর-ডাকাত থেকে আগলে রাখে, বিপদে ঘেউ ঘেউ করে সতর্ক করে। মনিব অসুস্থ হলে পাশে বসে থাকে, মনিব মারা গেলে কবরের পাশ ছাড়ে না। এই কারণেই পৃথিবীর বহু দেশে কুকুর শুধু ‘পোষা প্রাণী’ নয়, পরিবারের সদস্যও। বিদেশে শিশু লালন-পালনে কুকুরের ভূমিকা চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানে শিশুর জন্মের পর থেকেই বাড়িতে কুকুর রাখা হয়। গবেষণা বলে, কুকুরের সঙ্গে বড় হওয়া শিশুরা কম অ্যালার্জিতে ভোগে, তাদের ইমিউনিটি ভালো হয়। মানসিকভাবেও তারা বেশি সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। কারণ একটি অবলা প্রাণীর খাবার দেয়া, গোসল করানো, হাঁটানো এসবের মধ্য দিয়েই শিশু প্রথমবারের মতো ‘যত্ন’ শব্দটা শেখে। কুকুর তাই শিশুর কাছে খেলার সাথীও, আবার প্রথম শিক্ষকও। কুরআনে পাঁচ বার কুকুরের কথা এসেছে, কোথাও কুকুরকে অপবিত্র বা মন্দ বলা হয়নি। সহিহ হাদিসে কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক পাপী নারীর অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার কথা আছে। বিস্ময়ে হতবাক হতে হয় যখন রাস্তার ফকির তার ভিক্ষার খাবার কুকুরকে ভাগ করে দেয়। কিন্তু আমরা আতরমাখা ভদ্রলোকেরা কী করছি? আল্লাহর সৃষ্টি কুকুর দেখলেই আঘাত করছি, গরম পানি গায়ে ঢেলে দিচ্ছি, ‘নাপাক’ বলে ঘৃণা করছি। কুরআন নয়, হাদিস বলছে কুকুরের লালা নাপাক। কিন্তু মানুষের লালাও নাপাক, জীবানুতে ভর্তি। লালা জামায় লাগবে এই ভয়ে কুকুর দেখলে যমের মতো ভয় করি, কিন্তু ঘুষখোর, সুদখোর, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, খুনি, মিথ্যুক ‘নাপাক’ নয় কেন? কুকুর ঘুষ খায় না, সুদ খায় না, বিশ্বাসঘাতকতা করে না- তারপরও সে নাপাক। দেশের প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ অনুযায়ী পাগলা কুকুর মারতেও অনুমতি লাগে। শুধু তাই নয়, মোরগ-মুরগিকে পা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখাও ফেরিওয়ালার শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সমাজে এই সব অপরাধের গুরুত্ব নেই। গুরুত্ব থাকার কথা নয়, কারণ যেখানে শত শত মানুষের সামনে গলায় ছুরি ধরলেও কেউ এগিয়ে আসে না, সেখানে অবলা প্রাণীদের রক্ষা করার গরজ থাকবে কেন। এই নির্লিপ্ততার বীজ বপন হয়েছে অনেক আগে থেকেই। কোরবানির সময় জবাইয়ের রক্তাক্ত দৃশ্য শিশুরা উপভোগ করে। সেই শিশুই বড় হয়ে গুলশান হোলি আর্টিজানের মতো জায়গায় মানুষকে টুকরো টুকরো করে। যখন একটি অসহায়, অবলা কুকুরের গলায় ইট বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়াকে শিশুরা ‘মজা’ ভাবে, যখন সে রক্ত দেখে উল্লাস করে, তখন তার ভেতরের মায়াটাই মরে যায়। চেঙ্গিস-হালাকুর যুগ শেষ হয়নি, শুধু পোশাক বদলেছে। আমরা প্রায়ই বলি, ‘এটা তো একটা কুকুরই’। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, যারা প্রথমে কুকুরের ওপর হাত তুলেছে, তারাই পরে মানুষের ওপরও তুলেছে। জার্মানিতে নাৎসিরা প্রথমে পাগলা কুকুর নিধনের নামে বিষ ছড়িয়েছিল, তারপর গ্যাস চেম্বার বানিয়েছিল মানুষ মারার জন্য। পশুর প্রতি দয়া তাই বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের নিজের নিরাপত্তার বীমা। যে সমাজ অবলার আর্তনাদকে উপেক্ষা করতে শেখে, সে সমাজ একদিন নিজের সন্তানের আর্তনাদও শুনতে পায় না। নরসিংদীর কুকুরের গলার ইট আসলে আমাদের সমাজের পচনের প্রতীক। একটি সভ্য সমাজকে মাপা হয় সে তার দুর্বলতম সদস্যের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তা দিয়ে। কুকুরের ওপর নিষ্ঠুরতা তাই শুধু পশুর সমস্যা নয়, এটি মানুষের ভেতরের মানুষটাকে মেরে ফেলার শুরু। একটা কুকুরের গলায় বাঁধা ইট আসলে আমাদের বিবেকের গলায় বাঁধা পাথর। অথচ এই প্রাণীটিই মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বন্ধু। ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ খুঁজে বের করে রেসকিউ কুকুর। তুষারধসে হারিয়ে যাওয়া পথিকের প্রাণ বাঁচায় সেন্ট বার্নার্ড জাতের কুকুর। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় সামরিক কুকুর। অন্ধ মানুষের চোখ হয়ে সারাজীবন পথ দেখায় গাইড ডগ। করোনার সময় হাসপাতালে রোগীর পাশে সেবাদানকারী থেরাপি ডগ মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। আর পুলিশ-বিজিবির ডগ স্কোয়াড মাদক আর বিস্ফোরক শনাক্ত করে হাজারো প্রাণ বাঁচায়। এত নিঃস্বার্থ সেবার পরও আমরা তাকে ‘নাপাক’ বলে দূরে সরাই, নির্যাতন করে সুখ পাই, গাড়ি চাপা দিয়ে আনন্দ করি।আমরা যদি আজ অবলার চোখের ভাষা বুঝতে না শিখি, কাল মানুষের চোখের জলও আমাদের স্পর্শ করবে না। সভ্যতা মানে উঁচু বিল্ডিং নয়, সভ্যতা মানে দুর্বলের প্রতি দয়া। যে সমাজ তার সবচেয়ে প্রভুভক্ত বন্ধুকেই নিরাপদে বাঁচতে দিতে পারে না, সে সমাজ তার কোনো সন্তানকেই নিরাপদ রাখতে পারবে না। তাই যে গলায় আমরা ইট বাঁধছি, সেই গলায় বাঁধা চেইনটাই খুলে দিই, যাতে তারা নিশ্চিন্তে মনুষ্য সমাজে নিরাপদে ঘুরতে পারে। স্মতর্ব্য যে, মানুষ যখন তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাথীর চেয়েও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, তখন এই পৃথিবীটা বসবাসের অযোগ্য হয়ে যায়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

এলডিসি-উত্তর বাংলাদেশ: সুবিধা হারানোর আগে সতর্ক প্রস্তুতি

একটি দেশের জন্য স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে আসা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। বাংলাদেশ যখন প্রায় পাঁচ দশকের ‘স্বল্পোন্নত’ পরিচয় ঘুচিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পা রাখতে যাচ্ছে, তখন এই অর্জন আমাদের জাতীয় আত্মবিশ্বাসের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু অর্জনের আনন্দের পাশাপাশি একটি প্রশ্নও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হচ্ছে—এই উত্তরণ কি আমাদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে, নাকি প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে দীর্ঘমেয়াদে নতুন নতুন সংকটের দরজা খুলে দেবে?উত্তরণের দীর্ঘ পথপরিক্রমাজাতিসংঘ ১৯৭১ সালে এলডিসির তালিকা প্রণয়ন করে, এবং বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এই তালিকায় যুক্ত হয়। মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা—এই তিনটি সূচকে ধারাবাহিক অগ্রগতির সুবাদে বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথমবার এবং ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় দ্বিতীয়বার উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করে। মূল পরিকল্পনায় ২০২৪ সালে উত্তরণ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও কোভিড-১৯ মহামারির প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত প্রস্তুতির সময় বিবেচনায় নিয়ে সেই সময়সীমা পিছিয়ে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়।সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত: প্রস্তুতিকাল কি আরও বাড়ছে?২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৬ সালেই উত্তরণ সম্পন্ন করার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করে সরকার জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠায়। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) গত ২ জুন ২০২৬ এই আবেদন ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করেছে, যার ফলে উত্তরণের প্রস্তুতি পর্ব ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সিডিপি স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই বর্ধিত সময়ে বাংলাদেশকে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে উল্লেখযোগ্য অভ্যন্তরীণ সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে— অর্থাৎ সময় বাড়লেও সংস্কারের দায়বদ্ধতা থেকে কোনো অবকাশ মিলছে না।উল্লেখ্য, সিডিপির মূল্যায়নে বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই নির্ধারিত মানদণ্ডের তুলনায় যথেষ্ট ভালো অবস্থানে রয়েছে—মাথাপিছু আয়ে নির্ধারিত মানদণ্ড ১,২৪২ মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের অর্জন প্রায় ২,৭৯৩ ডলার; মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ পয়েন্টের মানদণ্ডের বিপরীতে অর্জন ৭৭ দশমিক ৩ পয়েন্ট; এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে ৩২ পয়েন্টের সীমার নিচে থাকার শর্তে বাংলাদেশের অবস্থান ২৬ দশমিক ৬ পয়েন্ট। অর্থাৎ, বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই; প্রশ্নটি কেবল সময়সীমা ও প্রস্তুতির পরিমিতি নিয়ে।প্রাপ্তি ও সম্ভাবনার দিকউত্তরণ একটি মর্যাদার প্রশ্নও। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বাড়বে, যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থনৈতিক সক্ষমতার এই স্বীকৃতি ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি ঋণ নেয়ার সুযোগও তৈরি করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাগুলো তখনই বাস্তব ফল দেবে, যখন আমরা ঋণ ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে যথেষ্ট দায়িত্বশীল থাকতে পারবো; অন্যথায় সহজে ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়তি ঋণভারে রূপ নিতে পারে।ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের জায়গাগুলোএলডিসি মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত বহু বাণিজ্য সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে আসবে উত্তরণের পর। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার—দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৪৮ শতাংশ পণ্য ইইউতে যায়, এবং এলডিসি সুবিধার কারণে এর প্রায় ৯৩ শতাংশই বিনা শুল্কে প্রবেশ করে। গ্রাজুয়েশনের পর এই শুল্কমুক্ত সুবিধা ধাপে ধাপে কমে আসবে; রূপান্তরকালীন তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর শুল্কহার সাধারণ আমদানিকারক দেশগুলোর নীতি অনুযায়ী বাড়তে পারে। স্বস্তির খবর হলো, বিশ্লেষকদের মতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বাজারগুলো উত্তরণের পরও প্রায় তিন বছর অতিরিক্ত অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এই বাড়তি সময়ও স্থায়ী সমাধান নয়—একদিন এই সুবিধাও শেষ হবে, এবং তখন রপ্তানি খাত, বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পকে দামভিত্তিক প্রতিযোগিতার বদলে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতাভিত্তিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে।এর বাইরেও কঠিন শর্তের বাণিজ্য আলোচনার চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে একটি শুল্কহার ৩৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হলেও, এর বিনিময়ে নানা কঠিন শর্ত মেনে নিতে হয়েছে—যা ভবিষ্যতের বাণিজ্য আলোচনায় বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পাশাপাশি, এলডিসি মর্যাদা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ শিল্পে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত যে ছাড় (ট্রিপস ওয়েভার) এতদিন পাওয়া যেত, তা-ও সীমিত হয়ে আসবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মূল্যে এবং সাধারণ মানুষের ওষুধ প্রাপ্তির সুযোগে।রাজস্ব খাতেও চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। বর্তমানে জাতীয় রাজস্বের একটি বড় অংশ আমদানি শুল্ক থেকে আসে, এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই শুল্ক-নির্ভরতা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার সুপারিশ এসেছে। এই নির্ভরতা কমানোর অর্থ হলো অভ্যন্তরীণ কর আদায় ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা—যা সহজ কাজ নয়, বিশেষ করে প্রত্যক্ষ কর আদায়ের ভিত্তি এখনো প্রশস্ত না হওয়ায়। একইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও মূলধন পাচার রোধে সুশাসন নিশ্চিত করাও জরুরি, কেননা দুর্বল অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা উত্তরণ-পরবর্তী ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।প্রস্তুতির রূপরেখা: স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজিএই বাস্তবতা মাথায় রেখে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস)’ প্রণয়ন করে, যেখানে পাঁচটি মূল স্তম্ভ—সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ, বাণিজ্য সুবিধা ও রূপান্তরকালীন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জোরদার করা—এর অধীনে ৩০টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র ও ১৫৭টি সময়সীমাবদ্ধ কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও এই এসটিএস কাঠামো বহাল রেখে উত্তরণ ইস্যুতে সক্রিয় হয়; নতুন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির শপথ নেওয়ার পরপরই জানান, উত্তরণের সময়সীমা পেছাতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হবে, এবং সরকার জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর আবেদন জানায়—যুক্তি দেখানো হয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও একের পর এক সংকটে নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতি পর্ব ‘গুরুতরভাবে ব্যাহত’ হয়েছে। জাতিসংঘের সিডিপিও এই এসটিএস প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু একটি ভালো কৌশলপত্র প্রণয়ন বা সরকার পরিবর্তনের পরও তা বহাল রাখাই যথেষ্ট নয়— সরকারি পরিবর্তনের এই ক্রান্তিকালে কর্মসূচিগুলোর ধারাবাহিকতা, সফল বাস্তবায়ন, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।করণীয়: সতর্ক ও সুচিন্তিত পদক্ষেপপ্রথমত, রপ্তানি বহুমুখীকরণে বাস্তব অগ্রগতি জরুরি। একক পণ্য তৈরি পোশাকের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি সম্ভাবনা বিকশিত করতে হবে।দ্বিতীয়ত, রপ্তানি প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এলডিসি-উত্তর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মকানুন মেনে নতুন পথ খুঁজতে হবে। সরাসরি নগদ প্রণোদনার পরিবর্তে প্রযুক্তি তহবিল, উদ্ভাবন তহবিল বা স্টার্টআপ তহবিলের মতো বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব নীতি-আলোচনায় উঠে এসেছে, যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে হবে। আমদানি শুল্কনির্ভর রাজস্ব কমে এলে তার ঘাটতি পোষাতে প্রত্যক্ষ কর আদায় ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও স্বচ্ছ করা ছাড়া বিকল্প নেই।চতুর্থত, দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে রপ্তানি খাত মূল্যভিত্তিক প্রতিযোগিতা থেকে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা-ভিত্তিক প্রতিযোগিতার দিকে অগ্রসর হতে পারে।পঞ্চমত, ওষুধ শিল্পকে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত নতুন বাস্তবতার জন্য আগেভাগে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ ও মূল্য সাধারণ মানুষের সামর্থ্যরে মধ্যে থাকে।ষষ্ঠত, এই পুরো প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। এলডিসি গ্রাজুয়েশন বিষয়ে কাজ করা প্ল্যাটফর্মগুলো সরকারের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পৃক্ততা তৈরি করে উত্তরণ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জনবান্ধব রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষ—তাই নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তাদের কণ্ঠস্বর অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।শেষ কথাবাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের সূচনা বিন্দু। প্রস্তুতির সময় তিন বছর বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সংস্কারের কাজ পিছিয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই—জাতিসংঘ নিজেই এই শর্ত জুড়ে দিয়েছে। সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজ—সবাইকে একই লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে এই উত্তরণ সত্যিকার অর্থেই একটি অগ্রগতির গল্প হয়ে ওঠে, ক্ষতির আখ্যান নয়। সতর্কতা ও সুচিন্তিত পদক্ষেপই হতে পারে আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক বিনির্মাণের মূল চালিকাশক্তি।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: অ্যাডভোকেসি অফিসার, নাগরিক উদ্যোগ]

খেলার মাধ্যমে শেখা: শ্রেণীকক্ষে প্রাণ ফেরানোর কৌশল

বাংলাদেশের গ্রামীণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি সাধারণ দৃশ্যের কথা ভাবুন— শিক্ষক বোর্ডে লিখছেন, শিক্ষার্থীরা নোট তুলছে, আর ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে। পড়ানো হচ্ছে, কিন্তু শেখা হচ্ছে কি? গবেষণা বলছে, শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা যখন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, খেলার ছলে শেখে — তখন তাদের মস্তিষ্কে তথ্য গভীরে গেঁথে যায়। কিন্তু এই ‘খেলার মাধ্যমে শেখা’ মানে ক্লাসে বিশৃঙ্খলা নয়। এর অর্থ হলো— এমন কার্যকলাপ যা শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহল জাগায়, চিন্তাশক্তি বাড়ায় এবং শ্রেণীকক্ষকে একটি প্রাণবন্ত শিক্ষা-পরিবেশে পরিণত করে। বিশেষত গ্রামীণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য— যেখানে প্রযুক্তিগত সুবিধা সীমিত, সেখানে এই কৌশলগুলো কোনো বাড়তি খরচ ছাড়াই প্রয়োগ করা সম্ভব।আসুন, এমন ১০টি কৌশল দেখি যা যেকোনো গ্রামীণ শ্রেণীকক্ষে সহজেই ব্যবহার করা যায়।১. পপকর্ন কৌশল এই কৌশলে শিক্ষার্থীরা যেকোনো মুহূর্তে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উত্তর দিতে পারে— ঠিক যেভাবে তেলের কড়াইতে পপকর্ন হঠাৎ ফুটে ওঠে। শিক্ষক একটি প্রশ্ন করেন, এবং যে কেউ হাত তোলা ছাড়াই উত্তর দিতে পারে। উত্তর দেয়ার পর সে পরবর্তী প্রশ্ন করতে পারে বা অন্যকে নাম ধরে ডেকে সুযোগ দিতে পারে।উদাহরণ: বিজ্ঞান ক্লাসে শিক্ষক বললেন, ‘সালোকসংশ্লেষণে কী কী লাগে— যে জানো বলো!’ রিমা বলল ‘সূর্যের আলো’, তারপর সে বলল ‘করিম, তুমি বলো আরেকটি।’ করিম বললো ‘পানি’, এবং এভাবে পুরো ক্লাস সক্রিয় হয়ে উঠলো। এই পদ্ধতিতে লাজুক শিক্ষার্থীরাও ধীরে ধীরে সাহস পায়।২. স্নোবল আলোচনা প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি কাগজে তার মতামত বা উত্তর লেখে, তারপর সেটা বলের মতো গোল করে ভাঁজ করে ক্লাসে ছুঁড়ে দেয়। প্রত্যেকে একটি কাগজ তুলে পড়ে এবং সেই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। এই পদ্ধতিতে পরিচয় গোপন থাকে বলে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে মতামত লিখতে পারে।উদাহরণ: বাংলা ক্লাসে শিক্ষক প্রশ্ন করলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের ভূমিকা কেমন ছিল বলে তুমি মনে করো?’ শিক্ষার্থীরা লিখে কাগজ ছুঁড়ে দিল। তারপর যে কাগজ পেল সে জোরে পড়ল। অনেক অপ্রত্যাশিত দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এলো — যা সরাসরি প্রশ্ন করলে হয়তো আসত না।৩. ভাবো-জুটি বাঁধো-ভাগ করো তিনটি ধাপে এই কৌশল চলে। প্রথমে শিক্ষার্থী একা ভাবে (৩০ সেকেন্ড), তারপর পাশের সহপাঠীর সঙ্গে আলোচনা করে (১ মিনিট), তারপর পুরো ক্লাসে সেই ধারণা শেয়ার করে। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি শিক্ষার্থী চিন্তা করার সুযোগ পায়, একেবারে চুপ থেকে পার পাওয়ার উপায় থাকে না।উদাহরণ: গণিত ক্লাসে শিক্ষক বললেন, ‘লাভ-ক্ষতির সমস্যাটি নিজে একবার চেষ্টা করো।’ তারপর ‘পাশের জনকে তোমার সমাধান বুঝিয়ে দাও।’ সবশেষে দুটো জুটির সমাধান তুলনা করা হলো। ভুল হলেও শিক্ষার্থী লজ্জা পেল না — কারণ সে শুধু নিজের জুটিকে বলেছিল।৪. গ্যালারি ওয়াক শ্রেণীকক্ষের দেয়ালে বা বেঞ্চে বিভিন্ন পোস্টার বা প্রশ্নকার্ড লাগানো হয়। শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে ঘুরে ঘুরে প্রতিটি কার্ডের কাছে যায়, পড়ে, মতামত যোগ করে এবং পরের দলের জন্য ছেড়ে যায়। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যায়— শুধু কয়েকটি কাগজ ও কলম দরকার।উদাহরণ: সামাজিক বিজ্ঞান ক্লাসে ৫টি কাগজে লেখা হলো— ‘বন্যার কারণ’, ‘বন্যার ক্ষতি’, ‘বন্যা প্রতিরোধ’, ‘সরকারের ভূমিকা’, ‘আমাদের করণীয়’। প্রতিটি দল একটি করে পয়েন্ট যোগ করে এগিয়ে গেল। ক্লাস শেষে পুরো বিষয়টি একটি সমৃদ্ধ মানচিত্রে পরিণত হলো।৫. হট সিট একটি চেয়ার ‘হট সিট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একজন শিক্ষার্থী সেখানে বসে একটি ঐতিহাসিক চরিত্র, বিজ্ঞানী বা গল্পের পাত্র হওয়ার ভান করে। বাকি শিক্ষার্থীরা সেই চরিত্রকে প্রশ্ন করে। এটি রোল-প্লে ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি একসঙ্গে বিকাশ করে।উদাহরণ: ইতিহাস ক্লাসে একজন শিক্ষার্থী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকায় হট সিটে বসলো। অন্যরা প্রশ্ন করলো— ‘আপনি ৭ মার্চের ভাষণে কেন সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন না?’ শিক্ষার্থীকে উত্তর দিতে গিয়ে তার পড়া জ্ঞান প্রয়োগ করতে হলো।৬. স্পিড চ্যাটিং শিক্ষার্থীরা দুই সারিতে মুখোমুখি বসে। শিক্ষক একটি প্রশ্ন দেন এবং ২ মিনিটের জন্য তারা কথা বলে। সময় শেষ হলে এক সারি এক আসন সরে যায়, নতুন জুটি তৈরি হয়, নতুন প্রশ্ন আসে। এটি বিশেষত ভাষা শেখা ও মৌখিক দক্ষতা বিকাশে চমৎকার।উদাহরণ: ইংরেজি ক্লাসে প্রশ্ন ছিল ‘হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু বি ইন দ্যা ফিউচার?’ প্রতিটি জুটিতে দুজন ইংরেজিতে উত্তর দিল। প্রথমে ভুল হলেও তৃতীয়-চতুর্থ রাউন্ডে শিক্ষার্থীরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল।৭. জিগস পাজল পদ্ধতিএকটি বড় বিষয়কে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি দল একটি ভাগ পড়ে বিশেষজ্ঞ হয়। তারপর দল ভেঙে নতুন মিশ্র দল তৈরি হয়, যেখানে প্রতিটি বিশেষজ্ঞ তার অংশ বাকিদের শেখায়। এতে প্রত্যেকে একই সাথে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক  দুটো ভূমিকা পালন করে।উদাহরণ: বিজ্ঞান ক্লাসে ‘মানব পাচনতন্ত্র’ পড়ানো হচ্ছে। চার দলকে চারটি অঙ্গ দেয়া হলো  পাকস্থলী, যকৃৎ, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্র। প্রতিটি দল তাদের অংশ পড়ে নোট করলো। পরে মিশ্র দলে প্রত্যেকে নিজের অংশ বুঝিয়ে দিল  পুরো পাচনতন্ত্র জানা হয়ে গেল।৮. চার কোণা বিতর্ক শ্রেণীকক্ষের চারটি কোণায় লেখা থাকে  ‘সম্পূর্ণ একমত’, ‘একমত’, ‘দ্বিমত’, ‘সম্পূর্ণ দ্বিমত’। শিক্ষক একটি বিতর্কিত বিবৃতি দেন এবং শিক্ষার্থীরা তাদের মতামত অনুযায়ী কোণায় গিয়ে দাঁড়ায় ও কারণ ব্যাখ্যা করে। এটি সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ও যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতা তৈরি করে।উদাহরণ: নাগরিক শিক্ষা ক্লাসে বিবৃতি দেয়া হলো — ‘মোবাইল ফোন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি করে।’ কেউ সম্পূর্ণ একমত, কেউ দ্বিমত হলো। প্রত্যেককে কারণ বলতে হলো। শেষে অনেকে অবস্থান বদলাল  এটাই প্রকৃত শিক্ষা।৯. গল্পের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানবাস্তব জীবনের একটি সমস্যাকে ছোট গল্পের আকারে উপস্থাপন করা হয়। শিক্ষার্থীরা চরিত্রের ভূমিকায় সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদ্ধতিতে পাঠ্যবইয়ের তত্ত্ব বাস্তব জীবনের সাথে যুক্ত হয়, তাই শেখাটা অর্থবহ হয়।উদাহরণ: গণিত ক্লাসে গল্প  রহিম চাচা ১০ বিঘা জমি তার ৩ ছেলেকে ভাগ করে দিতে চান। বড় ছেলে বলল তার দরকার মোটের ৪০%, মেজো বললো ৩৫%। ছোট ছেলে কতটুকু পাবে এবং প্রত্যেকের জমি কত বিঘা?’ এই গল্পের মাধ্যমে শতকরা হিসাব সহজ হয়ে গেল।১০. এক্সিট টিকেট ক্লাস শেষ হওয়ার ৫ মিনিট আগে প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি ছোট কাগজে (এক্সিট টিকেট) তিনটি জিনিস লেখে— আজ কী শিখলাম, কোন জায়গাটা এখনও বুঝিনি, পরের ক্লাসে কী জানতে চাই। এটা শুধু মূল্যায়ন নয়, শিক্ষার্থীকে নিজের শেখার বিষয়ে সচেতন করে তোলে।উদাহরণ: ক্লাস শেষে শিক্ষক বললেন, ‘বের হওয়ার আগে কাগজে লেখো  একটি জিনিস যা আজ শিখলে।’ শিক্ষক কাগজগুলো সংগ্রহ করলেন। পরের দিন দেখলেন ১২ জন এখনও বুঝতে পারেনি পরের ক্লাস সেই বিষয় দিয়েই শুরু হলো।শেষ কথা: শ্রেণীকক্ষ হোক আনন্দের জায়গাওপরের দশটি কৌশলের কোনোটিতেই বাড়তি সরঞ্জাম বা প্রযুক্তি লাগে না। লাগে শুধু একটু পরিকল্পনা, সাহস এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশ্বাস। গ্রামীণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিদিন যে সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করেন, সেখানে এই কৌশলগুলো আলোর মশাল হতে পারে।একটি শিশু যখন হেসে, খেলে, বিতর্ক করে, গল্প বলে শেখে, তখন সে শুধু তথ্য মনে রাখে না  সে চিন্তা করতে শেখে, সমস্যা সমাধান করতে শেখে, মানুষের সঙ্গে মিলে কাজ করতে শেখে। এই দক্ষতাগুলো তাকে পরীক্ষায় নম্বর দেবে না হয়তো, কিন্তু জীবনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেবে।আমাদের শ্রেণীকক্ষকে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতির জায়গা না বানিয়ে, এটিকে পরিণত করি এমন একটি জায়গায় যেখানে প্রতিটি শিশু প্রতিদিন আসতে চায়, কারণ এখানে শেখা মানেই আনন্দ।[লেখক: প্রশিক্ষক ও সহকারী অধ্যাপক, সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, ময়মনসিংহ]

ট্যাক্টফুল আমলাতন্ত্র বনাম জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র

সরকারি চাকরিতে যোগদান করার পর অগ্রজ সহকর্মীদের কাছ হতে প্রথম যে সবকটি পেয়েছি তা হলো- ‘ট্যাক্টফুল হও’। ট্যাক্ট শব্দটির সঙ্গে তখনো আমার পরিচয় ঘটেনি। অভিধান ঘেঁটেঘুটে আমি এর পরিষ্কার মানে খুঁজে বের করতে পারিনি। ৩০ বছর চাকরি করেও ট্যাক্টফুল কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী বুঝতে পারিনি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কবিতার উক্তির মতো- ‘নাদের আলী আমি আর কত বড় হবো? আর কত বড়ো হলে নাদের চৌপ্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবে দাদা ঠাকুরের মতো আর কতকাল চাকরি করলে আমি ট্যাক্টফুল হবো, হতে পারতাম তা?ট্যাক্টফুল হওয়ামার মানে কি মুরুব্বীগণ বুঝাতে চেয়েছিলেন-পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ক্ষমতা, সংঘাত এড়িয়ে চলার কৌশল, নিজের অবস্থান ও ক্যারিয়ার সুরক্ষার এক প্রকার বর্ম? যদি তাই হয় তাহলে আমি এটাকে তেমন দোষের কিছু মনে করি না। ইচ্ছে করে কে সংঘাত ডেকে আনতে চায়, ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব, নেতৃত্বের কৌশলই হচ্ছে সংঘাত আর দ্বন্দের নিরসন করা। আধুনিক সংগঠন সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সবগুলোই অত্যন্ত জটিল। একটা দ্বান্দিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে সংগঠনকে এগিয়ে নিতে হয়। সুতারাং এখানে নেতৃত্ব ট্যাক্টফুল না হলে সংগঠন টিকে থাকতে পারে না। এ ক্ষেত্রে নেতৃত্বকে ট্যাক্টফুল হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। আধুনিক আমলাতন্ত্রের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি প্রায়োগিক। বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডারের আমলাদেরকে সবসময় একটা জটিল রাজনৈতিক পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে নানা প্রতিকুল অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। ট্যাক্টফুল হতে পারা নিসন্দেহে একটি ভালো গুণ। দীর্ঘ ৩০ বছরের চাকরি জীবনে আমার কাছে মাঝে মাঝে এই ট্যাক্টফুল হওয়াকে আমার কাছে একটা মস্ত গোলক ধাঁধা মনে হয়েছে। একটি প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে- ট্যাক্টফুল হওয়া মানে কি সত্যের সঙ্গে আপস করার অপর নাম? একজন কর্মকর্তা কি শুধুই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলবেন, নিজের চাকরি বাঁচাবেন আর ক্যারিয়ারের কথা ভেবে ভেবে প্রতিনিয়ত তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা ভুলে যাবেন, নাকি তিনি প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠিত স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র তথা জনগণের স্বার্থ দেখবেন? একজন সরকারি কর্মকর্তা কী চায় সেটি শুধু তার চাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। রাষ্ট্র কী চায় তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। রাষ্ট্র কী একজন ট্যাক্টফুল প্রশাসক চায় নাকি একজন নৈতিকতাসম্পন্ন দক্ষ প্রশাসক চায় যিনি রাষ্ট্রের জন্য, জনগণের জন্য কাজ করবেন?সম্প্রতি সিলেটে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। একটি বিশেষ পরিস্থিতে জনাব সারোয়ার আলম সিলেটের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পান। মোবাইল কোর্ট আর র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি পাদপ্রদীপের সামনে আসেন। তার কাজ দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান। পাঁচ আগস্ট ২০২৪ এর ঘটনার পর সিলেটের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র ভোলাগঞ্জের সমস্ত সাদা পাথর লুট হয়ে যায়। সারোয়ার আলমকে সেখানে ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) হিসেবে পাঠানো হলে তিনি লুণ্ঠিত পাথরের কিয়দংশ ফেরত প্রদানে লুন্ঠনকারীদেরকে বাধ্য করেন। সিলেট রেলের টিকেট কালোবাজারী বন্ধেও তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেন। তিনি আও অনেক জনবান্ধব কাজ করেন যাতে সাধারণ জনগণের আস্থাভাজন একজন প্রশাসক হিসেবে নিজেকে তোলে ধরতে তিনি সক্ষম হন। অনেকগুলো ভালো কাজ করতে গিয়ে তিনি স্বার্থান্বেষী একটি মহলের চক্ষুকূলে পরিণত হন। তারা তাকে ঘায়েল করার একটা মোক্ষম সুযোগ খুঁজছিলেন। সাতশ বছরের পুরানো হযরত শাহজালালের মাজার। সিলেটর ইতিহাস আর ঐতিহ্যের প্রধান আকর্ষণ। হযরত শাহজালালের মাজারকে কেন্দ্র করেই সিলেট শহর গড়ে উঠেছে। সারা দেশ থেকে প্রতিদিন হাজার ভক্ত মাজারে ছোটে আসেন বিভিন্ন মানত নিয়ে। তারা খালি হাতে আসেন না। টাকা-পয়সা, সোনাদানা সঙ্গে করে নিয়ে আসেন, মাজারের বড় ডেগে তারা মানতের টাকা পয়সা সোনাদানা ফেলেন। সেই টাকা পয়সা সোনাদানার খরচাপাতি যা করার তা মাজারের খাদেম নামে একটা গোষ্টী নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা নিজেদেরকে হযরত শাহজালালের বংশধর হিসেবে হাবী করে দান খয়রাতের টাকা পয়সা সোনাদানা নিজেদের পৈত্রিক সম্পদ হিসেবে গণ্য করতে থাকেন। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় হযরত শাহজালালের কোনো বংশধর এদেশ আদৌ ছিল না কেননা তিনি কোনো বিয়েই করেননি। মাজারের খাদেমগিরির নামে লিল্লাহ সদকার টাকা মেরে খাওয়াই তাদের কাজ। সাতশ বছর ধরেই তারা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে কাজটি করে আসছেন। মাজারের টাকা দিয়ে তারা বাড়ি গাড়ি করেছেন, ছেলেমেয়েক দেশবিদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, নিজেরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করেছেন। সেখানে থেকে কিছু ভাগ হয়তো মাঝে মাঝে প্রশাসন আর রাজনীতিবিদদের দিয়েছেন তাদের মুখ বন্ধ রাখার জন্য। বাঁধ সাধলেন সারোয়ার আলম। মাজারের উন্নতির জন্য সম্প্রতি পয়ত্রিশ কোটি টাকার একটা প্রজেক্ট পাস হয়। প্রজেক্টটি বাস্তবায়নের জন্য দরকার পাঁচ কোটি টাকার ম্যাচিং ফান্ড। সিটি কর্পোরেশন দেবে তিন কোটি আর মাজার কর্তৃপক্ষ দিবে দুই কোটি। সেই দুই কোটি টাকা মাজার কর্তৃপক্ষ দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। মাজার ফান্ডে টাকা নেই। টাকা থাকবে কোত্থেকে? সদকা, লিল্লাহখোরেরা মাজারের সব টাকা পয়সা হজম করে ফেলেছেন। ডিসি সারোয়ার হিসাব চাইল কিন্তু খাদেম গোষ্টী বললো- তারা হিসাব দিবে না, তাদের কাছে হিসাব নাই। ৭শ’ বছর ধরে কেউ হিসাব চায়নি, ডিসি সারোয়ার হিসাব চাইবার কে ইত্যাদি । ডিসি সারোয়ার মাজার প্রাঙ্গনে এক সরকারি ডেগ বসিয়ে দিলেন। তিনদিন পর তালা খুলে দেখা গেল সেখানে সতের লাখ টাকা জমা পড়েছে। সোনাদানাও কিছু ছিল। শুক্র, শনি আর বার্ষিক ওরসের সময় দান খয়রাতের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। খাদেমরা হাতে হাতেও টাকা পয়সা ভক্তদের কাছ হতে নিয়ে নেন। তিনদিনে যদি সতের লাখ টাকা এক ডেগেই জমা হয় তাহলে গড়ে প্রতিদিন প্রায় সাত লাখ টাকা জমা পড়ার কথা। সেই হিসেবে মাসে দুই কোটি দশ লাখ, বছরে তেরো কোটি। দেশ স্বাধীন পর থেকে হিসাব করলে পঞ্চান্ন বছরে মাজারের আয় দাঁড়ায় কম বেশি সাতশ কোটি টাকা। মনে রাখবেন এটি মাত্র পঞ্চান্ন বছরের আয়। বাকি সাড়ে ৬শ’ বছরের হিসাব আলাদা। সেটি হিসাব করতে গেলে মাথা চক্কর মারবে। আয় থেকে একটা অংশ ব্যয় হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেটি কত টাকা? খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। মসজিদ, মাদ্রাসা আর মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ব্যয় সহজেই বের করে ফেলা যায়। খাদেমরা দুই কোটি টাকা দিতে পারল না কেনো? পারার কোনো কারণ নেই, কারণ আয় ব্যয়ের কোনো হিসাব রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি, করলেই দানখয়রাতের টাকা আত্নসাৎ করা যাবে না। হিসাব চাওয়াতে ডিসি সারোয়ারেকে উঠিয়ে নেয়া হলো। সরকারি গতানুগতিক বয়ানে বলা হলো এটি জনস্বার্থে করা হয়েছে। সব বদলি আদেশেই এটি উল্লেখ থাকে। কিন্তু যাদের স্বার্থে ডিসি সারোয়ারকে বদলি করা হলো সেই জনগণ সেটি বুঝলো না। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠালো, ডিসি সারোয়ারের বদলি আদেশ বাতিলের জন্য মিছিল মিটিং পর্যন্ত করল। এই ঘটনাটি জনমনে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে- একজন কর্মকর্তা যখন স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতা প্রতিষ্টার উদ্যেগ নেন তখন রাষ্ট্রের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?গণতন্ত্র আর আধুনিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা। কোনো ব্যক্তি, গোষ্টি, প্রতিষ্ঠান কিংবা ঐতিহ্য কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়- যেটাকে আমরা বলি আইনের শাসন। রাষট্রের অধীনে থাকা জনগণের টাকা পয়সা যেখানে আছে সেখানে সব আর্থিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা থাকা আবশ্যক। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বেলায়ও এই নীতি প্রযোজ্য। ধর্মীয় মর্যাদা কখনোই আর্থিক জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। এখানে যারা দান খয়রাত করেন তাদের আস্থার বিষয়টি জড়িত। সিভিল সার্ভিসের আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞাতা হলো- আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে বহুদিন ধরেই একটা অলিখিত সংস্কৃতি রয়েছে আর তা হলো অনিয়মকে কোনোরকম স্পর্শ না করা, প্রভাবশালীদেরকে না ঘাটানো, প্রতিষ্ঠিত স্বার্থকে চ্যালেন্জ না করা, নতুন কিছু না করা। কোনো ঝুঁকি নেয়া যাবে না, নিজের চাকরি আগে। সারা চাকরি জীবনে দেখেছি এই সংস্কৃতি যারা মেনে চলেছেন তারা নিরাপদ থেকেছেন, চাকরিতে উন্নতি করেছেন তারাই। তারাই ট্যাক্টফুল কর্মকর্তা। প্রশাসনের ভিতওে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটা বলয়, সংস্কৃতি তৈরি হয়ে যায়- উদ্যেগ নেয়ার চেয়ে চুপচাপ থাকো, সংস্কার নয়, গতানুগতিকতাই শ্রেয়, কোনো প্রশ্ন করা যাবে না, নীরবতাই হিরন্ময়। রাষ্ট্রকে এগিয়ে যেতে হয়। এই ধরণের কর্মকর্তারা রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। রাষ্ট্র এগিয়ে যায় তাদের হাত ধরে যারা প্রয়োজনের সময় প্রচলিত প্রথাকে প্রশ্ন করেছেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, জনস্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের উর্ধ্বে স্থান দিতে পেরেছেন। প্রশাসন যখন অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে পড়ে, অতিরিক্ত সমঝোতাপ্রবণ হয়, অতিরিক্ত ট্যাক্টফুল হয়ে পড়ে তখন সেখানে দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং জবাবদিহিহীনতা আসন গেড়ে বসে। একজন ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) তার জেলার একটি মাজারের টাকা পয়সার হিসাব চাইতেই পারেন। এ কারণে তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটি সুশাসনের স্বাভাবিক একটা অংশ। হিসাব চাওয়া মানেই কাউকে অভিযুক্ত করা নয়, হিসাব চাওয়া মানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। দুর্ভাগ্যজনক সত্যি হলো আমাদের সমাজে, রাস্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রশ্নকর্তাকেই অভিযুক্ত করা হয়, যিনি স্বচ্ছতা চান তাঁকেই বিতর্কিত করা হয়, যিনি হিসাব চান তাঁকেই অশান্তির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার সেতু, ভবন কিংবা বাজেটের আকারে নয়, তার শক্তি নিহিত থাকে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতায়। জনগণ তখনই রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখে যখন তারা দেখে আইন সবার জন্য সমান। যখন তারা দেখে কোনো ক্যক্তি বা গোষ্টী বিশেষ সুবিধা ভোগ করতে পারছে না। সরকার যখন জনগনের আশা আকাঙ্খার বিপক্ষে দাঁড়ায় তখন সেই সরকার জনগণের আস্থা হারায়, সেই সরকার বেশিদিন টিকতে পারে না। আজকের বাংলাদেশে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সুশাসন, জবাবদিহিতা। কারণ সুশাসন এবং জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না, সরকার এবং রাষ্ট্র টিকে না। আমরা এমন একটা প্রশাসন চাই যেখানে কর্মকর্তারা ভয় নয় নীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিবেন, যেখানে সত্য বলা ঝুঁকিপূর্ণ হবে না, যেখানে ট্যাক্টফুল অর্থ হবে বিচক্ষণ ও কৌশলী হওয়া কিন্তু সত্যকে আড়াল করা নয়। আজকে আমাদের সামনে একটা প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে আমরা কোন শ্রেণীর কর্মকর্তাদেরকে উৎসাহিত করব যারা যারা শুধু নিজের অবস্থান রক্ষা করতে জানেন নাকি এমন কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করব যারা প্রতিষ্ঠিত স্বার্থের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস রাখে। আমরা কী চাই-নিরব আমলাতন্ত্রের বাংলাদেশ নাকি জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ। সারোয়ার আলমের ঘটনা প্রমাণ করে আমরা চাই নিরব আমলাতন্ত্রের ট্যাক্টফুল কর্মকর্তাদের একট বাংলাদেশ। আমাদের মনে রাখতে হবে- ট্যাক্টফুল কর্মকর্তা রাষ্ট্র চালাতে পারে কিন্তু নৈতিক সাহসসম্পন্ন কর্মকর্তা রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যায়। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়]

স্বাক্ষর মিললেই কি চেকের মামলায় জেতা যায়?

‘চেকের স্বাক্ষর তো আপনারই, তাহলে টাকা দেন না কেন?’ এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলায় আদালত কক্ষে এই একটি প্রশ্নই বহু আসামিকে কোণঠাসা করে ফেলে। আইনের ১১৮ ও ১৩৯ ধারার ‘সংবিধিবদ্ধ অনুমান’ অনেক সময়ই বাদীর পক্ষে একচেটিয়া সুবিধা তৈরি করে। কিন্তু আসলেই কি তাই? শুধু একটি স্বাক্ষর থাকলেই কি যেকোনো ফাঁকা চেক আইনি বৈধতা পেয়ে যায়?উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক কিছু যুগান্তকারী রায় এবং ফরেনসিক বিজ্ঞানের অগ্রগতি এই ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এখন আর ফাঁকা চেকে নিজের ইচ্ছেমতো অংক বসিয়ে মামলা জিতে যাওয়া সহজ নয়। স্বাক্ষর সঠিক, কিন্তু ভেতরের লেখা আলাদা?আমাদের সমাজে ব্যবসা, ঋণ বা সিকিউরিটির নামে ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর রাখার একটা ভয়াবহ কু-প্রথা রয়েছে। পরবর্তীতে শত্রুতা বা লোভের বশে সেই চেকে কোটি টাকা বসিয়ে মামলা ঠুকে দেয়া হয়। এখানেই ডিফেন্সের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ৫৬ ডিএলআর পৃষ্ঠা ৬৩৬ (এম.এ মজিদ বনাম মো. আব্দুল মোতালেব) মামলাটি। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট করে বলেছেন:‘আসামির স্বাক্ষর, টাকার অংক এবং পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখায় থাকলে এন.আই অ্যাক্ট-এর ধারা ৩ (ই) অনুসারে উহাকে ‘ইস্যুয়েন্স অব চেক’ বলা যাবে না এবং অনুরূপ চেক আইনানুগভাবে বৈধ নয়। ‘অর্থাৎ, চেকটি যে আসামি নিজেই বাদীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেয়ার উদ্দেশে পূরণ করে দিয়েছেন তা বাদীকেই প্রমাণ করতে হবে। কেন অন্য হাতে লেখা?অনেক সময় বাদী দাবি করেন, ‘আসামি লিখতে পারেন না বা অনুরোধ করেছেন, তাই আমি লিখেছি।’ কিন্তু উচ্চ আদালত এই খোঁড়া যুক্তিকে কঠোরভাবে খণ্ডন করেছেন। ৭৫ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৪৪৭ (এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র) মামলায় আদালত পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন। যদি চেকের হস্তাক্ষরে অসংগতি থাকে, তবে মামলার মোড় ঘুরে যাবে। বাদীকে আদালতে দাঁড়িয়ে জবাব দিতে হবে: কেন চেকটি ড্রয়ার (আসামি) নিজে পূরণ করেননি? অন্য কে এটি পূরণ করেছে? অন্যের পূরণের ক্ষেত্রে ড্রয়ারের লিখিত বা স্পষ্ট অনুমতি ছিল কি-না? বাদী যদি এই হস্তাক্ষরের ভিন্নতার কোনো সন্তোষজনক এবং যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে না পারেন, তবে মামলার মূল ভিত্তিই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে এবং আসামি সরাসরি খালাস পাবেন। চেকের বস্তুতগত পরিবর্তন:এন.আই অ্যাক্টের ৮৭ ধারা অনুযায়ী, চেকে যদি দাতার সম্মতি ছাড়া পরবর্তীতে কোনো কাটাকাটি, ঘষামাজা বা এমন কোনো পরিবর্তন করা হয় যা চেকের মূল চরিত্র বদলে দেয় (যেমন: তারিখ বসানো বা টাকার অংক বাড়ানো), তবে সেই চেকটি আইনগতভাবে বাতিল হয়ে যায়। ফাঁকা চেকে পরবর্তীতে তারিখ বা অংক বসানোও এক ধরণের অবৈধ পরিবর্তন, যদি তা প্রমাণের সুযোগ আসামি পান। ফরেনসিক পরীক্ষা ও ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ আসামির মৌলিক অধিকার‘স্বাক্ষর আমার, কিন্তু ভেতরের লেখা ৫ বছর পরের!’ এই সত্যটি প্রমাণ করার বৈজ্ঞানিক উপায় কী? এখানেই আসে ফরেনসিক বা হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞের পরীক্ষা। সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৩ (২) ধারা অনুযায়ী এই পরীক্ষা আসামির একটি আইনি অধিকার। উপ-মহাদেশের সমাদৃত নজির ‘টি. নাগাপ্পা বনাম ওয়াই.আর. মুরলিধর’ (এআইআর ২০০৮ সুপ্রিম কোর্ট ২০১০) এবং ‘কল্যাণী ভাস্কর’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন যে:শুধু আইনের অনুমানের ওপর ভর করে আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কেড়ে নেয়া যাবে না। চেকের কালি, হস্তাক্ষর এবং তা ভিন্ন সময়ে (যেমন ৫ বছর পর) পূরণ করা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে চেক ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ বা ন্যায়বিচারের অংশ। আদালত এই আবেদন সহজে খারিজ করতে পারেন না। সন্দেহের সুবিধা কার?মহামান্য আপিল বিভাগ ৭১ ডিএলআর (এডি)-তে (হুমায়ুন রশিদ বনাম শাহিন আকন্দ) সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ফৌজদারি আইনের চিরন্তন সত্য হলো যেকোনো যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ বা অসংগতির সুবিধা পাবেন আসামি। অতএব, চেকে হস্তাক্ষরের ভিন্নতা, কালির অমিল এবং ভিন্ন সময়ে লিখনকাল যদি ফরেনসিক বা পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য দ্বারা আদালতে তুলে ধরা যায়, তবে শতকোটি টাকার চেকের মামলাও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। ফাঁকা চেকের ব্যবসার দিন এবার শেষ হতে চলেছে![লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

মহাশূন্য থেকে আসবে তারবিহীন বিদ্যুৎ

মহাশূন্যে অর্থাৎ পৃথিবীর কক্ষপথে এখন হাজারো স্যাটেলাইটের ছড়াছড়ি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চোখ মেলে রয়েছে আমাদের দিকে। আর্থার ডি ক্লার্কের হিসেব অনুযায়ী ২২ হাজার ২৩৬ মাইল ওপরে কোন স্যাটেলাইট স্থাপন করলে পৃথিবীর যেকোন বিন্দু থেকে লেজার রশ্মি রিসিভ হবে কারণ ঐ পয়েন্টটে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি ও স্যাটেলাইটের ঘূর্ণন গতি সমান হবে। তবে বর্তমানে ক্রিয়াশীল উপগ্রহগুলো প্রয়োজনানুযায়ী কক্ষপথের বিভিন্ন উচ্চতায় স্থাপন করা হয়েছে। আইএসএস অর্থাৎ আমেরিকা, রাশিয়া, জাপান, কানাডা ও ইউরোপীয় ১১ দেশের (ইএসএ) যৌথ মহাকাশ স্টেশন স্থাপিত আছে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ২৫০ মাইল ওপরে। এটি ঘণ্টায় প্রায় ১৭ হাজার মাইল গতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। সর্বশেষ জাপান এবং চীন নিজ নিজ উদ্যোগে পৃথক পৃথক মহাকাশ স্টেশন স্থাপনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এবার মহাকাশ নিয়ে নতুন সোনালি অধ্যায় রচনা করতে চলেছে জাপান ও চীন। সোজা কথায় জাপান পৃথিবীর জিও স্টেশনারি পয়েন্টে অর্থাৎ মোটামুটি ২২ হাজার মাইল উচ্চতায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সৌর প্যানেল বসাবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ মাইক্রোওয়েভ বা লেজারের মাধ্যমে পাঠানো হবে ভূ-পৃষ্ঠের রিসিভিং সেন্টারে। রিসিভিং স্টেশন লেজার রশ্মি বা মাইক্রোওয়েভকে পুনরায় বিদ্যুতে রূপান্তর করে পরিকল্পিত স্থানে প্রেরণ করবে। অতঃপর একদিন পৃথিবীব্যাপী সরবরাহ করা হবে লেজার প্রযুক্তিতে। ওয়াই ফাই বা মোবাইল ডেটার মাধ্যমে ইন্টারনেট পৃথিবীব্যাপী ব্যবহৃত হচ্ছে তেমনি নিকট ভবিষ্যতে ঘরের বাতি, ফ্যান, এ.সি, টিভি, ফ্রিজ চলবে বিদ্যুতের তারহীন মাইক্রোওয়েভ বা লেজার কানেকশনে। তারবিহীন বিদ্যুতের প্রথম তাত্বিক ধারণা পেশ করেন ম্যাক্সওয়েল ১৮৬০-এর দিকে। ১৮৮৪ সালে হেনরি পয়েন্টিং এ ফর্মূলা উপস্থাপন করে বিষয়টি আরও সামনে নিয়ে আসেন। এদিকে সার্বিয়ান বিজ্ঞানী নিকোলো টেসলা এডিসনের বিদ্যুৎ কারখানায় যোগ দেন এবং তিনি প্রস্তাব করেন যে, এডিসনের ডিসি অর্থাৎ সরলরৈখিক বিদ্যুতের চেয়ে এসি অর্থাৎ বক্র প্রবাহের বিদ্যুৎ অনেক বেশি কার্যকরী। ডিসি বনাম এসি বিদ্যুৎ নিয়ে মত বিরোধের একপর্যায়ে টেসলা একাকী পথ চলা শুরু করেন এবং পয়েন্টিং এর ফর্মূলার ওপর ভিত্তি করে তারবিহীন বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য আবিষ্কার করেন টেসলা কয়েল ১৮৯০ সালে। ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখতে গিয়ে টেসলার (নোট বই হাতে) স্ট্যাচুটি এবং মার্কিন রুচি বোধ দেখে মুগ্ধ হলাম। নায়াগ্রা জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করে টেসলা প্রথম এসি কারেন্টের সঞ্চালন বাস্তবায়ন করেন। তার স্মৃতিতে নায়াগ্রার আমেরিকান অংশে স্থাপিত এই স্ট্যাচুর বিপরীতে কানাডিয়ান অংশে কানাডাও টেসলার আরেকটি মূর্তি স্থাপন করেছে। মহাকূন্যে যদি সত্যি সত্যি উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ মাইক্রোওয়েভে পৃথিবীতে পাঠানো বাস্তবায়িত হয়েই যায় তবে টেসলা বিজ্ঞানী হিসেবে রীতিমতো অমরত্ব লাভ করবেন। চীনও জাপানের মতোই জিও স্টেশনারী পয়েন্টে ১ কি. মি. চওড়া সোলার প্যানেল বসাবে। মহাশূন্যে দিনরাত সর্বক্ষণ বা ২৪ ঘণ্টা সূর্যের আলো পাওয়া যায়। ফলে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে মহাকাশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন অনেকটা টেকসই। চীন ইতোমধ্যে ১০০ মিটার দূরত্বে তারবিহীন বিদ্যুৎ সরবরাহে সাফল্য পেয়েছে। চীন বলছে পৃথিবীতে লেজার বিদ্যুৎ কিছুটা সময় নিলেও নিকট ভবিষ্যতে ISS, ড্রোন ও বিমানকে চার্জ সাপ্লাই করা সম্ভব। নিকট ভবিষ্যতে যুদ্ধ বিমান প্রস্তুতকারী জায়ান্টরা লেজার বিদ্যুৎ নির্ভর বিমান, যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও স্যাটেলাইট নির্মাণে লেগে যাবে। জাপান এবং চীন নিজ নিজ প্রযুক্তিবিদদের নির্দেশ দিয়েছে দ্রুত সোলার প্যানেল বহনযোগ্য শক্তিশালী কার্গো রকেট নির্মাণ ত্বরান্বিত করার জন্য। দু’দেশই ২০৩৬ সালে মহাকূন্যে সোলার বিদ্যুৎ স্টেশন স্থাপন লক্ষ্যমাত্রা স্থিত করেছে। ধারণা করা হচ্ছে অন্তত ৫-৭ বছর পেছাতে হলেও প্রকল্প বাস্তবায়িত হবেই। বিংশ শতকের শেষার্ধ ছিল পরিবেশ সংরক্ষণের দাবিতে মিছিলের সময়। উষ্ণায়ন যে হারে বাড়ছে তা দ্রুত কমানোর কোন যুৎসই প্রকল্প মানবজাতির সামনে নেই। এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাড়িয়ে পৃথিবীকে বাঁচানোর সর্বশেষ মেধাবী সংযোজন হল মহাকাশে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন। প্রকল্পটি যতই পৃথিবীর প্রাণÍ সীমায় লেজার বিদ্যুৎ নিয়ে হাজির হবে ততই জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ হতে বাধ্য। তেল, গ্যাস, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হওয়া মানে পৃথিবীর দূষণ কমে যাবে কমপক্ষে এক চতুর্থাংশ। পৃথিবীব্যাপী মটরযানগুলো যদি লেজার বিদ্যুতের আওতায় এসে যায় তাহলেতো পৃথিবীর দূষণ অর্ধেকে নেমে আসতে বাধ্য। সম্ভবত; এই শতাব্দীর শেষ দিকে পৃথিবী ফিরে যাবে ডব্লিউএইচও (হু) কার্বন নিঃসরণ মাত্রার ভিত্তি ২০০৫ সালে। [লেখক: আইনজীবী, আপিল বিভাগ]

রম্যগদ্য: দুঃস্বপ্নে ভরা বাংলাদেশ

“কী যে, কন! দুঃস্বপ্নে ভরা বাংলাদেশ! এমনিই কয়া পারি না, দেশ কি চলের, নাকি উড়ের, নাকি জগদ্দলের মতুন এক জায়গায় বয়া বয়া দিবাস্বপ্ন দেখে! এর মইধ্যে আপনে কন আবার দুঃস্বপ্নে ভরা বাংলাদেশ। যা দিনকাল পড়ছে, জেন-জি স্বপ্নই দ্যাখে না আবার দুঃস্বপ্ন!”“ওই জঙ্গল এই যে তোদের আর্ন্তজাতিক মানের লোকাল ফুটবলার, সামজা না গামজা, প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে বলছেন, “আমরাও একদিন বিশ্বকাপ খেলব...”“ঠিকইতো কয়, বাংলাদেশ অহন ক্রিকেটে ওয়ার্ল্ড কাপ খেলের, তো বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখতেই পারে যে হ্যায় ফুটবলেও একদিন বিশ্বকাপ খেলবো, তো এতে অসুবিধা কী?”“অসুবিধা কিছুই নেই, খালি বলছিলাম এই বাংলাদেশ যে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলবে, এটা দুঃস্বপ্ন নয়? যে খানে ভারতের ১৪০ কোটি, পাকিস্তানের ২০ কোটি, বার্মার ১০ কোটি এত্তো জনসংখ্যা তারাই বিশ্বকাপে সুযোগ পায়না তোরা খেলবি বিশ্বকাপ ফুটবল! আরে ব্যাটা এটা দুঃস্বপ্ন নয় এটা হলো দিবা-দুঃস্বপ্ন, বুঝেছিস।”“হ মিয়া বুঝেছি! আরে আবালের মতো কথা কয়েন না, কেপ ভার্দে মাত্র পাঁচ লাখ অধিবাসী তারা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলতাছে, আর আমাগো বিশকুটি বাঙালি বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা পারবো না! ফাইজলামানি করেন?”“ওরে আমার সোনার ছেলে তোরা নিজেদের কেপ ভার্দের সঙ্গে তুলনা করিস না...”“ক্যেন ক্যেন তুলনা কোরুমনা ক্যান? চার হাজার তেত্রিশ বর্গ কিলোমিটারের দেশ, আমাগো ঢাকার থন, ছুট্টো; হ্যারা যদি বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা পারে, তয় আপনের ভাষায় আমাগো আর্ন্তজাতিক মানের লোকাল ফুটবলার, সামজা না গামছা, তো কোইতেই পারে যে একদিন বাংলাদেশও বিশ্বকাপ ফুটবল খেলবো!”“ঠিক আছে ভালোকথা, একদিন বাংলাদেশও বিশ্বকাপ ফুটবল খেলবে। বলতো কুকুরের বাচ্চা হয় কয়টা?”“কুনো কুত্তার পাঁচ-টা’ কুনো কুত্তার ছয়টা, অনেক সময় আবার সাতটাও হয়।”“এবার বল সাধারণত মানুষের সন্তান হয় কয়টা?”“সাধারণত বছরে একটা।”“কুকুর বছরে দু’বার বাচ্চা দেয়, গড়ে যদি প্রতিবার পাঁচটা করে বাচ্চা দেয়, তাহলে এক বছরে ১০টা, আর দশ বছরে ১শ’টা। ঠিকতো?”“হ, ঠিকোই আছে। তয় কোই কি বিশ্ব কাপ ফুটবলের লগে কুত্তার কি সম্পর্ক! হ্যায় কি সিকিউরিটি দিবো?”“আরে শোন ব্যাটা, দশ বছরে, মানুষ সন্তান প্রসব করে না, দশ’টি আর সারমেয় মানে তোর ভাষায় কুত্তা বাচ্চা দেয় ১শ’টি। এখন বল এই ১শ’ কুত্তার বাচ্চা কি বিশ্বকাপ ফুটবল খেলতে পারবে?”‘জ্বী, না, কুত্তা ক্যেমনে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলবো! তয় মাঝে মাঝে দেখছি হাতি ফুটবল খেলে।”“আর মনুষের বাচ্চা?”“লিওনেল মেসি, এমবাপ্পে, ম্যরাডোনা, পেলে, রোজিনা না না ভোজিনা এই সব মাইনষ্যের পোলারাইতো বিশ্বকাপ ফুটবল খেলবো।”“তাহলে বুঝলিতো সংখ্যা দিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা হয় না, বিশ্বকাপ ফুটবল খেলতে হলে, প্রথমে মানুষ হতে হবে।”“এইটা আপনি কি বলচেন যে, এই ভারতের ১৪০ কুটি লোক এরা কি মানুষ না!”“মানুষ, তবে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার মতো মানুষ হতে পারেনি।”“ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার লাগি আবার ক্যেমুন মানুষ হওন লাগে? কেপ ভার্দের মাত্রু পাঁচ লক্ষ অধিবাসী মানুষ, আর ভারত, পাকিস্তান, বার্মা...”“ভেবে দ্যেখ, কেপ ভার্দে পর্তুগালের কাছ থেকে ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। আর তোরা পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভ করলি ১৯৭১ সালে। ওরা তোদের চেয়েও চার বছরের পরে স্বাধীন হলো। অথচ ওরা তোদের কত আগে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলছে, আর তোদের ফুটবলের মান কবে যে বিশ্বমানের হবে তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই বলতে পারেন!”“তয় কেপ ভার্দে কি জাদু টোনা করছে, নাকি গাঞ্জা খায়া ফুটবল খেলে?”“ভাইরে, এইসব ফালতু কথা বলেতো লাভ নেই, জাদু টোনা করছে, গাঞ্জা খায়া ফুটবল খেলছে! ওদের সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো স্থিতিশীল গণতন্ত্র, সুশাষণ ও শিক্ষা। কেপ ভার্দের তোদের মতো প্রাকৃতিক গ্যাস নেই। কোনো কয়লা খনি নেই, নেই কোনো মিষ্ঠি পানির নদী, তারপরও কেবল, স্থিতিশীল গণতন্ত্র, সুশাষণ ও শিক্ষার আলোয় আজ কেপ ভার্দে উদ্ভাসিত। আর তোরা বাঙালি হয়ে বাঙালিকে হত্যা করছিস। তিন মাস আগের, কবর দেয়া মুসলমানের লাশ তুলে পোড়াচ্ছিস।”“ভাই হ্যেইয়া তো মুই কমু দুই’ একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা...”“তোর লজ্জা করে না, বাঙালি হয়ে বাঙালির থেকে প্রতিদিন চাঁদা তুলিস! এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা! সরকারি সহায়তায় বুল ডোজার দিয়ে জাদুঘর ধ্বংস করিস! তিনবছরের মেয়েদের ওপর অত্যাচার করিস, এইগুলো তোর বিচ্ছিন্ন ঘটনা! তোর বিচ্ছিন্ন ঘটনার ঘনঘটায় সারা দেশ আজ জর্জরিত। আর কবে যে তোর বিচ্ছিন্ন ঘটনার শেষ হবে তার আলামততো আমি আজও দেখতে পাচ্ছি না।”“কারে কিতা কমু, এই যে দুনিয়ায় মানুষ আর মানুষ নাই, তাই বিশ্বকাপ ফুটবলে আমগো কোনো বেইল নাই!”“ভাই সারা পৃথিবীতে যখন সভ্য দেশগুলোতে জেলখানা বন্ধ হচ্ছে, পাঁচ লাখ অধিবাসীর দেশ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলছে তখন তোরা নিজেরা নিজেরা মারামারি করছিস আর মরারা পরে মৌজ করার জন্য পৃথিবীটাকে হাবিয়া দোজখ বানিয়ে তুলছিস!”“আপনের কথা হুনি আরে ইকটু শরম লাগে কিন্তু আমারা তো বেহায়া, অশিক্ষিত, আপনের ভাষায় তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশের বাসিন্দা তাই কোই কী, মানুষ হোইলে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলমু, যতনি মানুষ হমু না ততদিন ব্রাজিল আর আর্জেটিনা নিয়া নিজেরা নিজেগো গ্যাঁটের পয়সা খরচ কোইরা দুই মাইল লম্বা পতাকা বানামু আর মনের আনন্দে নাচনাচি করমু।”“সেই ভালো, যতদিন না, প্রকৃত মানুষ হোচ্ছিস ততদিন পরের পায়ে তেল দে, শিল্পী কামরুল হাসানের ভাষায় বিশ্ব-বেহায়ার মতো, নাচানাচি কর!”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন: নতুন ক্যাম্পাস নয়, প্রয়োজন উচ্চমানের শিক্ষক ও গবেষণা

সরকার বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। বলা হয়েছে, সেখানে নার্সিং, মেডিকেল সায়েন্স, উদ্ভাবন, সৃজনশীলতা এবং তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও ভবিষ্যতমুখী করে তোলার লক্ষ্যে এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং উচ্চাভিলাষী। বিশেষত শ্রমবাজারের দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্মকে উপযোগী দক্ষতায় গড়ে তোলার চিন্তা অবশ্যই সময়োপযোগী। তবে উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই: বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান সংকট কি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যার ঘাটতি, নাকি বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুণগত দুর্বলতা? বাস্তবতা হলো, গত কয়েক দশকে দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উচ্চশিক্ষার কাক্সিক্ষত অগ্রগতি খুবই সীমিত। ফলে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণে আবেগ, প্রতীকী উন্নয়ন বা রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পরিবর্তে জাতীয় প্রয়োজন, বৈশ্বিক পরিবর্তন, শ্রমবাজারের চাহিদা এবং জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষাপরিকল্পনার ভিত্তি হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় দর্শন, জাতীয় লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল; সাময়িক রাজনৈতিক বিবেচনা নয়। উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে সৃজনশীলতার বিকাশ, গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি প্রস্তুত করা। এ কারণেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেয়ে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কার্যকর, গবেষণামুখী এবং জ্ঞানসৃষ্টির কেন্দ্রে পরিণত করার প্রশ্নটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ, উদ্ভাবন, সামাজিক রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্র। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, শিক্ষক ও গবেষকদের পরিবর্তে কেবল অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন বাহ্যিক বৃদ্ধি ঘটলেও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। অতএব নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতেই হলে সবার আগে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে: বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় কি নতুন বিভাগ খোলা, দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে গড়ে ওঠে, নাকি তার প্রাণশক্তি নিহিত থাকে একাডেমিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশ, উচ্চমানের শিক্ষক এবং শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতির মধ্যে? বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের মর্যাদার ভিত্তি ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; বরং উৎকৃষ্ট শিক্ষক, মৌলিক গবেষণা, মেধার মূল্যায়ন এবং স্বাধীন জ্ঞানচর্চা। তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান। জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তাদের প্রকৃত শক্তি আকর্ষণীয় ব্র্যান্ডিং বা আধুনিক অবকাঠামোয় নয়; বরং প্রশাসনিক নেতৃত্ব, শিক্ষকসমাজ, গবেষক, গবেষণার পরিধি এবং শক্তিশালী একাডেমিক সংস্কৃতিতে নিহিত। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় তার উৎপাদিত জ্ঞান, গবেষণার প্রভাব, উদ্ভাবনের সক্ষমতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে অবদানের মাধ্যমে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিশ্বের বহু খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের যাত্রার শুরুতে আজকের মতো সমৃদ্ধ অবকাঠামোর অধিকারী ছিল না। কিন্তু তারা শুরু থেকেই মেধাবী শিক্ষক, গবেষণা এবং একাডেমিক স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিল। ফলস্বরূপ তারা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ কেবল উচ্চ ডিগ্রি বা পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না; বরং গবেষণার মৌলিকত্ব, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা, গবেষণা নেতৃত্ব, বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে বাস্তব অবদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। একই সঙ্গে একাডেমিক সততা, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণেই হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড কিংবা ক্যামব্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল শিক্ষাদানেই নয়, জ্ঞান উৎপাদন ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবতা বিবেচনা করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, আমরা কি এমন মানবসম্পদ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও কাঠামো নির্মাণ করতে পেরেছি? নিঃসন্দেহে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক মেধাবী, প্রতিশ্রুতিশীল এবং গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষক রয়েছেন, যাদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাও প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন সাফল্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এক বিষয় নয়। সামগ্রিকভাবে এখনও গবেষণাকেন্দ্রিক একাডেমিক সংস্কৃতি, পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণাভিত্তিক পদোন্নতি ব্যবস্থা এবং সুস্থ একাডেমিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ সীমিত পরিসরে বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টনে গবেষণাগত উৎকর্ষের চেয়ে অন্য বিবেচনা বেশি প্রভাব বিস্তার করে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান উৎপাদন ক্ষমতাকে দুর্বল করে। ফলে বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমপর্যায়ের শিক্ষকসমাজ ও গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলার কাজ কোনো স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রকল্প নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের বিষয়। নতুন ভবন নির্মাণ বা নতুন বিভাগ খোলার মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানের পেশাগত উন্নয়ন, পোস্টডক্টরাল গবেষণার সুযোগ, পর্যাপ্ত গবেষণা অনুদান, জবাবদিহিমূলক একাডেমিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত জ্ঞানচর্চার পরিবেশ। বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা প্রায়ই দৃশ্যমান অবকাঠামোর আলোকে মূল্যায়ন করার প্রবণতা দেখাই। নতুন ভবন, সুবিশাল ক্যাম্পাস, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা নতুন বিভাগ সাধারণ মানুষের কাছে উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে প্রতিভাত হয়। কারণ এগুলো চোখে দেখা যায় এবং রাজনৈতিক সাফল্যের প্রদর্শনী হিসেবেও উপস্থাপন করা সম্ভব। কিন্তু ইতিহাস ও শিক্ষাদর্শন উভয়ই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি এমন কিছু অদৃশ্য কিন্তু মৌলিক উপাদানের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠে। গবেষণার স্বাধীনতা, বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল, মুক্ত বিতর্কের পরিবেশ, জ্ঞান উৎপাদনের সংস্কৃতি এবং সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ- বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি। জার্মান চিন্তাবিদ ও শিক্ষাদার্শনিক ভিলহেলম ফন হুমবোল্ট (১৭৬৭-১৮৩৫) যে আধুনিক গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল গবেষণা ও শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। সেই ধারণা অনুসারে, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি একই সঙ্গে জ্ঞানস্রষ্টা, গবেষক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের বাহক। ফলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় তার শিক্ষকদের চিন্তার গভীরতা ও ব্যাপ্তি, গবেষণার বিষয়বস্তু ও মান এবং জ্ঞানসৃষ্টিতে তাদের একাগ্রতা ও অবদানের মাধ্যমে। ভবনের উচ্চতা নয়, জ্ঞানের উচ্চতাই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা নির্ধারণ করে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশের অনেক যোগ্য শিক্ষক, গবেষক এবং সম্ভাবনাময় তরুণ একাডেমিক বিভিন্ন কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানে পেশাগত ভবিষ্যৎ খুঁজছেন। এমন কি অনেকেই বিদেশী পাড়ি জমাচ্ছেন। এটি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; বরং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। উচ্চশিক্ষা রাজনীতিকীকরণ, গবেষণা তহবিলের অভাব, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতা, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, একাডেমিক স্বাধীনতার সংকট, দুর্বল প্রণোদনা এবং পদোন্নতিতে গবেষণার তুলনায় অন্য বিবেচনার প্রভাব অনেক মেধাবী ব্যক্তিকে বিকল্প পরিবেশের দিকে আকৃষ্ট করছে। ফলে দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়ই তাদের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মানবসম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে: বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কীভাবে অধিক গবেষণাবান্ধব, মেধাকেন্দ্রিক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যায়? কারণ নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেয়ে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অনেক ক্ষেত্রেই অধিক ফলপ্রসূ, সাশ্রয়ী এবং টেকসই বিনিয়োগ। আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের আলোচনা তাই নতুন ভবন নির্মাণ, নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন কিংবা নতুন বিষয় খোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে শিক্ষক নিয়োগের কঠোর ও মেধাভিত্তিক মানদণ্ড এবং সেগুলো অনুসরণের নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা, গবেষণার জন্য সহায়ক পরিবেশ, একাডেমিক স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং গবেষণাকেন্দ্রিক পদোন্নতি ব্যবস্থা। একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় শিক্ষক ও গবেষক উন্নয়ন কৌশল। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচি, গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা সম্প্রসারণ, পোস্টডক্টরাল প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি, গবেষণাগার ও গ্রন্থাগারের আধুনিকীকরণ এবং বিদেশে প্রশিক্ষিত গবেষক ও বিজ্ঞানীদের দেশে ফিরে কাজ করার জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশ্বের যেসব দেশ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে, তারা প্রথমেই তাদের মানবসম্পদে বিনিয়োগ করেছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুঁজি হলো ‘মানব পুঁজি’ (হিউম্যান ক্যাপিটাল); আর বিশ্ববিদ্যালয় সেই মানব পুঁজি গঠনের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় কোনো অবকাঠামোগত কিংবা রাজনৈতিক প্রকল্প নয়; এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তুতন্ত্র (ইকোসিস্টেম), যেখানে শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং জ্ঞানসৃষ্টির সংস্কৃতি পরস্পরকে শক্তিশালী করে। এমন পরিবেশ রাতারাতি গড়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার ও পরিকল্পনা, ধারাবাহিক বিনিয়োগ, নীতিগত স্থিতিশীলতা, যোগ্য নেতৃত্ব এবং জ্ঞান ও গবেষণার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অবশ্যই স্বাগতযোগ্য। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ভবন নির্মাণ বা বিভাগ খোলার চেয়ে বেশি জরুরি হলো বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাবান্ধব, মেধাকেন্দ্রিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত করা। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক নেতৃত্বে মেধা ও গবেষণাগত উৎকর্ষকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে; একই সঙ্গে গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং গবেষকদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি ইট-পাথর-বালি, কংক্রিট বা প্রশাসনিক আদেশে নির্মিত হয় না; তা নির্মিত হয় বিশ্বমানের শিক্ষক, গবেষক, মুক্ত জ্ঞানচর্চা এবং উৎকর্ষের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের ওপর। যে জাতি তার উচ্চশিক্ষায় মেধা, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়, ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতাও শেষ পর্যন্ত সেই জাতিই অর্জন করে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য] 

বোনের হক কেড়ে নেয়া ভাই: আইন, ধর্ম ও বাস্তবতার নির্মম বৈপরীত্য

বাংলাদেশে অসংখ্য নারী আজও বাবার সম্পত্তিতে নিজেদের বৈধ অংশ পান না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের উত্তরাধিকার অধিকার কাগজে-কলমে স্বীকৃত থাকলেও বাস্তবে তা ভাইদের দখলে থেকে যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীর ক্ষমতায়ন, সমঅধিকার ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে যতই আলোচনা হোক না কেন, পারিবারিক বাস্তবতায় এখনও বহু নারী তাদের অন্যতম মৌলিক অধিকার উত্তরাধিকার সম্পত্তির ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—  এই বঞ্চনাকে অনেক পরিবার অন্যায় বলেও মনে করে না। বরং ‘পারিবারিক সমঝোতা’, ‘সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে ত্যাগ’ কিংবা ‘ভাইয়ের দয়া’র মতো শব্দের আড়ালে একজন নারীর বৈধ অধিকার নীরবে হারিয়ে যায়। বাস্তবতা হচ্ছে, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি আইন, ধর্ম ও ন্যায়বিচার স্বীকৃত একটি নির্ধারিত প্রাপ্য। অথচ আমাদের সমাজে এই অধিকারকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না। দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুল ধারণা সমাজে প্রচলিত রয়েছে— মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে তারা ‘পরের ঘরের মানুষ’ হয়ে যায়। ফলে বাবার সম্পত্তিতে তাদের অধিকার যেন স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। অথচ বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী একজন কন্যা কিংবা বোন নির্দিষ্ট অংশের বৈধ উত্তরাধিকারী। একজন নারীর বিবাহ তার উত্তরাধিকার অধিকারকে কোনোভাবেই বাতিল করে না। ইসলাম নারীকে উত্তরাধিকার সম্পত্তির অধিকার দিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বের বহু সমাজেই নারীদের কোনো সম্পত্তিগত স্বীকৃতি ছিল না। পবিত্র কুরআনে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীর প্রাপ্য অধিকার খর্ব করার কোনো সুযোগ নেই। বরং কারও বৈধ অংশ আত্মসাৎ করা ধর্মীয় ও নৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুতর অন্যায়। বাংলাদেশে মুসলিমদের উত্তরাধিকার বণ্টন ইসলামী উত্তরাধিকার নীতিমালা ও প্রচলিত আইনের আলোকে নির্ধারিত হয়। কোনো উত্তরাধিকারীকে তার বৈধ অংশ থেকে বঞ্চিত করা হলে তিনি আদালতের মাধ্যমে অংশ নির্ধারণ, দখল পুনরুদ্ধার কিংবা অন্যান্য আইনগত প্রতিকার চাইতে পারেন। অর্থাৎ উত্তরাধিকার অধিকার কেবল নৈতিক বা ধর্মীয় বিষয় নয়; এটি একটি স্বীকৃত আইনগত অধিকারও। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটে?অসংখ্য পরিবারে দেখা যায়, বাবা মৃত্যুবরণ করার পর ভাইয়েরা জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন, নামজারি সম্পন্ন করেন, এমনকি সম্পত্তি বিক্রিও করে ফেলেন; অথচ বোনদের মতামত নেয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বোনদের বলা হয়— ‘তোমার তো স্বামীর বাড়ি আছে।’‘সম্পত্তি নিলে সম্পর্ক নষ্ট হবে।’‘ভাইদের বিরুদ্ধে যেও না।’‘মেয়েরা সম্পত্তি চাইলে পরিবারে অশান্তি হয়।’এভাবেই আবেগ, সামাজিক চাপ এবং পারিবারিক প্রভাব ব্যবহার করে একজন নারীকে তার বৈধ অধিকার থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই এমন বাস্তব ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে একজন নারী বহু বছর পর জানতে পারেন যে তিনি বাবার সম্পত্তির বৈধ অংশীদার ছিলেন। কিন্তু ততদিনে ভাইয়েরা সম্পত্তি নিজেদের নামে নামজারি করে ফেলেছেন, বিক্রি করে দিয়েছেন অথবা কৌশলে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে তাকে বঞ্চিত করেছেন। অনেক নারী পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে আইনি অধিকার দাবি করতেও সাহস পান না। ফলে নীরব বঞ্চনাই তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। উত্তরাধিকার বণ্টনের একটি সাধারণ উদাহরণ ধরা যাক, একজন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলেন। তিনি রেখে গেলেন স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ইসলামী উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী প্রথমে মৃত ব্যক্তির ঋণ ও বৈধ খরচ পরিশোধ করা হবে। এরপর স্ত্রী মোট সম্পত্তির ১/৮ অংশ পাবেন, কারণ মৃত ব্যক্তির সন্তান রয়েছে। অবশিষ্ট সম্পত্তি ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে বণ্টন হবে, যেখানে একজন ছেলে একজন মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পাবে। অর্থাৎ দুই ছেলে ও এক মেয়ের ক্ষেত্রে সম্পত্তি পাঁচ ভাগে ভাগ হবে প্রত্যেক ছেলে দুই ভাগ করে এবং মেয়ে এক ভাগ পাবে। আবার যদি কোনো ব্যক্তি শুধুমাত্র এক কন্যা সন্তান রেখে মৃত্যুবরণ করেন এবং কোনো ছেলে না থাকে, তাহলে সেই কন্যা মোট সম্পত্তির অর্ধেকের বৈধ উত্তরাধিকারী হবেন। একাধিক কন্যা থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অংশীদার হতে পারেন। অনেকেই প্রশ্ন করেন নারীরা কেন ছেলেদের তুলনায় কম অংশ পান?এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে। ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় পুরুষের উপর পরিবার পরিচালনা, স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ এবং অন্য আর্থিক দায়দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে একজন নারীর ব্যক্তিগত সম্পদের উপর স্বামী বা অন্য কারও কোনো অধিকার নেই। তিনি তার প্রাপ্ত সম্পত্তির পূর্ণ মালিক। উত্তরাধিকার বণ্টনের এই কাঠামো পারিবারিক আর্থিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নির্ধারিত বিধান। কিন্তু বাস্তব সমস্যা অন্য জায়গায়। আমাদের সমাজে বহু নারী তাদের নির্ধারিত অংশটুকুও পান না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রবণতা শুধু গ্রামাঞ্চল বা অশিক্ষিত সমাজে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারেও একই চিত্র দেখা যায়। অনেক শিক্ষিত ভাইও মনে করেন, বোন অংশ নিলে সম্পত্তি ‘অন্য পরিবারে চলে যাবে’। অথচ একজন ছেলে বিয়ে করলে তার সম্পত্তি নিয়ে কখনো এমন প্রশ্ন তোলা হয় না। এই দ্বৈত মানসিকতাই আমাদের সামাজিক বৈষম্যের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি। উত্তরাধিকার বঞ্চনার প্রভাব কেবল একটি সম্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাস্তবে বহু নারী স্বামীর মৃত্যু, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা আর্থিক সংকটের সময় চরম অসহায় অবস্থায় পড়েন। তখন তারা উপলব্ধি করেন— বাবার সম্পত্তিতে ন্যায্য অংশ পেলে হয়তো জীবন এত কঠিন হতো না। আমরা একদিকে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি, অন্যদিকে পরিবারের ভেতরেই তার অর্থনৈতিক অধিকার অস্বীকার করি। এটি নিঃসন্দেহে এক ধরনের সামাজিক ভণ্ডামি। কারণ প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন একজন নারী তার আইনগত ও অর্থনৈতিক অধিকার বাস্তবে ভোগ করতে পারবেন। বোনের প্রাপ্য অংশ আটকে রাখা শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়; এটি ন্যায়বিচার, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় নির্দেশনারও পরিপন্থী। একজন ভাই যখন বোনের অধিকার অস্বীকার করেন, তখন তিনি শুধু সম্পত্তি নয়, পারিবারিক আস্থা ও সম্পর্কের ভিত্তিও দুর্বল করে দেন। বর্তমান সময়ে প্রয়োজন কেবল আইনের প্রয়োগ নয়, সামাজিক মানসিকতারও ইতিবাচক পরিবর্তন। পরিবারগুলোকে বুঝতে হবে— বোনকে তার প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেয়া মানে সম্পদ হারানো নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। একজন ভাই যখন স্বেচ্ছায় বোনের অধিকার নিশ্চিত করেন, তখন সম্পর্ক আরও মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক হয়। অন্যদিকে অধিকার বঞ্চনা পারিবারিক বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এবং দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব সৃষ্টি করে। গণমাধ্যম, আইনজীবী, শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সচেতন নাগরিকদের এ বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারীদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজন হলে আইনি সহায়তা নিতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধান আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায়বিচারের যে আদর্শ ধারণ করে, উত্তরাধিকার ক্ষেত্রে নারীর বৈধ অধিকার নিশ্চিত করাও সেই আদর্শেরই অংশ। তাই একজন নারীকে তার ন্যায্য উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা শুধু পারিবারিক বা সামাজিক অন্যায় নয়; এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক চেতনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সবশেষে মনে রাখতে হবে, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার কোনো দয়া নয়; এটি তার বৈধ, ধর্মসম্মত ও আইনস্বীকৃত প্রাপ্য। একজন বোনকে তার ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা শুধু একটি ব্যক্তিগত অন্যায় নয়, বরং একটি সামাজিক অবিচার। যে সমাজে একজন বোনকে তার প্রাপ্য অধিকার পেতে ভাইয়ের দয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়, সেই সমাজকে প্রকৃত অর্থে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বলা যায় না। একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন পরিবারের মেয়েরাও সম্মানের সঙ্গে তাদের বৈধ ও ন্যায্য অধিকার ভোগ করতে পারবেন। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা]

ভিডিও আরও দেখুন

পেলের পায়ের জাদুতে থেমে গিয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ!

ফুটবলের রাজার সামনে নত হয়েছিল কি সত্যিই যুদ্ধের শক্তি? ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমান্টিক কিংবদন্তি- পেলে যখন নাইজেরিয়ায় পা রাখেন, তখন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন দুই শত্রুপক্ষ। সত্যি নাকি মিথ্যে?১৯৬৯ সাল। নাইজেরিয়া জ্বলছে। পূর্বাঞ্চলের ইগো জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘বিয়াফ্রা প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করেছে, আর কেন্দ্রীয় সরকার তা মেনে নিতে রাজি নয়। রক্তক্ষয়ী এই গৃহযুদ্ধে তখন প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ।ডিপ্লোম্যাটদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ। সেখানে হাজির হন ‘ও রেই’- ফুটবলের সম্রাট পেলে। আর সাথে সাথেই ম্যাজিক ঘটে যায়! বিশ্বমাধ্যম খবর দেয়- যুদ্ধরত দুই পক্ষ ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়, শুধু পেলের খেলা দেখার জন্য।খবরটি ২০০৫ সালে টাইম ম্যাগাজিনে এসেছে এভাবে: ‘দুই বছর ধরে কূটনীতিকরা যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে সফল হলেন পেলে। ১৯৬৯ সালে নাইজেরিয়ায় এলেন ব্রাজিলের ফুটবল সম্রাট- এবং এলো তিন দিনের যুদ্ধবিরতি!’কিন্তু ইতিহাস যত গভীরে যায়, কিংবদন্তি তত ধোঁয়াশায় ঢেকে যায়। গবেষকরা যখন নাইজেরিয়ার সংবাদপত্রের আর্কাইভ ঘাঁটলেন- সেখানে তখনকার ‘নাইজেরিয়ান ডেইলি টাইমস’ ও ‘অবজারভার’- কোনো যুদ্ধবিরতির উল্লেখ নেই! যা অবিশ্বাস্য, কারণ সান্তোসের প্রতিটি পদক্ষেপ তখন সংবাদপত্রে উঠে এসেছে।পেলে নিজেও দ্বিধায় ছিলেন। ১৯৭৭ সালের প্রথম আত্মজীবনীতে এই কিংবদন্তির কথা নেই। ২০০৭ সালের আত্মজীবনীতে এসে তিনি লেখেন, ‘নিশ্চিত নই পুরোপুরি সত্যি কিনা... তবে নাইজেরিয়ানরা নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করেছিল বিয়াফ্রানরা যেন লাগোসে হামলা না করে, যতক্ষণ আমরা সেখানে আছি।’তাহলে আসলে কী ঘটেছিল? ইতিহাসবিদ জোসে পাওলো ফ্লোরেঞ্জানোর গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। সান্তোসের খেলা বসেছিল লাগোস ও বেনিন সিটিতে- যুদ্ধের মূলক্ষেত্র থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে। সেখানকার পরিস্থিতি ছিল তুলনামূলক নিরাপদ। যুদ্ধবিরতির কোনো প্রয়োজনই ছিল না। বরং পেলেকে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘প্রোপাগান্ডা টুল’ হিসেবে। নাইজেরিয়া সরকার চেয়েছিল বিশ্বকে দেখাতে- দেশে যুদ্ধ চললেও স্বাভাবিক জীবন আছে। মানুষ ফুটবল উপভোগ করছে। তাই সান্তোসকে আবার ফিরিয়ে আনা হলো বেনিন সিটিতে। স্থানীয় গভর্নর স্যামুয়েল ওগবেমুডিয়া পাবলিক হলিডে ঘোষণা করেন, যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে ব্রিজ খুলে দেওয়া হয়- যাতে মানুষ খেলা দেখতে পারে। পেলের সতীর্থ এডুর ভাষ্য, ‘আমাদের দল যুদ্ধ বন্ধ করবে- এমন কথা কেউ বলেনি।’ তবে সেই সাক্ষীও আছেন, যারা এখনও স্বপ্ন দেখেন। স্থানীয় ফুটবলার গডউইন ইজিলেইন বিবিসিকে বলেছেন, ‘ম্যাচের দিন কেউ আর বন্দুকের কথা ভাবেনি।’ পেলের দল যখন খেলা শেষে বিমানে উঠল, তখন নিচ থেকে ভেসে এল গুলির শব্দ- যুদ্ধ আবার শুরু হয়েছে।সেটাই হয়তো আসল সত্যি- কিংবদন্তি শুধু যুদ্ধ থামায়নি; আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধের মাঝে মানুষকে ফিরিয়ে দিয়েছিল স্বাভাবিক জীবনে, ৯০ মিনিটের জন্য হলেও।

পেলের পায়ের জাদুতে থেমে গিয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ!
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ১০৬ জন