সংবাদ
মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক নিয়ম কী?

মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক নিয়ম কী?

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশ দিয়েছেন—১৮ অক্টোবর রাতে এমন খবর প্রকাশ করেছে একাধিক গণমাধ্যম।তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় সরকারের দায়িত্বশীল কারও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের খবর এবং প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের আনুষ্ঠানিকতা—দুটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।বাংলাদেশের সংবিধানে মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং তাকে পদ থেকে সরানোর প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট করা আছে। সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর পদ কখন শূন্য হবে, প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করতে বললে কী ঘটবে এবং রাষ্ট্রপতির ভূমিকা কী—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়।মন্ত্রী নিজে পদত্যাগ করতে চাইলেসংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের ১(ক) দফায় বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো মন্ত্রীর পদ শূন্য হবে, যদি তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র দেন।সহজ ভাষায়, কোনো মন্ত্রী নিজে পদত্যাগ করতে চাইলে তাকে পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীর হাতে দিতে হবে। সংবিধানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সেই পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার জন্য গ্রহণ করবেন।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংবিধানে পদত্যাগপত্র দেওয়ার পর রাষ্ট্রপতির আলাদা করে অনুমোদন দেওয়াকে পদত্যাগ কার্যকর হওয়ার শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ৫৮(১)(ক) দফায় পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীর হাতে দেওয়ার বিষয়টিকেই পদ শূন্য হওয়ার সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।অর্থাৎ, পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া আর নির্ধারিত পদ্ধতিতে পদত্যাগপত্র দেওয়া এক নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা, সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য কিংবা মৌখিকভাবে পদত্যাগের কথা বললেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বললেএ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের ২ দফা প্রযোজ্য। সেখানে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ করতে পারেন। মন্ত্রী সেই অনুরোধ পালন না করলে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে তার নিয়োগের অবসান ঘটানোর পরামর্শ দিতে পারেন। এখানে দুটি পৃথক ধাপ রয়েছে।প্রথম ধাপ: প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলেন বা অনুরোধ করেন।দ্বিতীয় ধাপ: মন্ত্রী পদত্যাগ না করলে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে তার নিয়োগ বাতিলের পরামর্শ দিতে পারেন। এরপর রাষ্ট্রপতি সংবিধানের বিধান অনুযায়ী নিয়োগের অবসান ঘটানোর নির্দেশ দিলে মন্ত্রীর পদ শূন্য হয়।অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রী কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বললেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার পদ শূন্য হয়ে যায় না। মন্ত্রী নিজে পদত্যাগপত্র না দিলে এবং তাকে সরানোর সাংবিধানিক প্রক্রিয়াও সম্পন্ন না হলে শুধু নির্দেশের খবরের ভিত্তিতে পদ শূন্য হয়েছে বলা যায় না।প্রতিমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও কি একই নিয়মসংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের ৫ দফায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই অনুচ্ছেদে ‘মন্ত্রী’ বলতে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীকেও বোঝানো হয়েছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ক্ষেত্রেও একই সাংবিধানিক বিধান প্রযোজ্য।তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়ে থাকলে সেটি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নেওয়া একটি পদক্ষেপ। কিন্তু পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে কি না, অথবা রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নিয়োগের অবসান ঘটানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কি না—সেটি নিশ্চিত না হয়ে তার পদ শূন্য হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।রাষ্ট্রপতির ভূমিকামন্ত্রী নিয়োগ ও মন্ত্রিসভার সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা রয়েছে। সংবিধানের ৫৮(২) দফা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলার পর তিনি পদত্যাগ না করলে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে তার নিয়োগের অবসান ঘটানোর পরামর্শ দিতে পারেন।এখানে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা এক নয়। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের অনুরোধ করেন এবং প্রয়োজন হলে নিয়োগ বাতিলের পরামর্শ দেন; রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নিয়োগের অবসান ঘটানোর নির্দেশ দেন।তবে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫৮(১)(ক) দফা আলাদা। সেখানে রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হাতে পদত্যাগপত্র দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই বিধানে রাষ্ট্রপতির পৃথক অনুমোদনকে পদ শূন্য হওয়ার শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। মন্ত্রীর পদ শূন্য হওয়াসংবিধানের ৫৮(১) দফায় পদ শূন্য হওয়ার আরও কয়েকটি পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে।সংসদ সদস্যপদ হারালে: কোনো মন্ত্রী সংসদ সদস্য না থাকলে সাধারণ নিয়মে তার মন্ত্রীর পদ শূন্য হয়। তবে সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদের শর্ত অনুযায়ী সংসদ সদস্য নন—এমন কাউকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার যে ব্যতিক্রম রয়েছে, তা এখানে প্রযোজ্য।রাষ্ট্রপতির নির্দেশে নিয়োগের অবসান হলে: ৫৮(২) দফা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের পর রাষ্ট্রপতি নিয়োগের অবসান ঘটানোর নির্দেশ দিলে মন্ত্রীর পদ শূন্য হয়।প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে বা পদে না থাকলে: সংবিধানের ৫৮(৪) দফা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে বা তার পদে বহাল না থাকলে অন্য মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেছেন বলে গণ্য হন। তবে তাদের উত্তরসূরিরা দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী দায়িত্বে বহাল থাকেন।ইশরাক হোসেনের ক্ষেত্রে কোনটি গুরুত্বপূর্ণএ মুহূর্তে মূল প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের নির্দেশের খবরের পর সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেওয়া হয়েছে।যদি ইশরাক হোসেন পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীর হাতে দিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি সংবিধানের ৫৮(১)(ক) দফার আওতায় পড়বে। আর তিনি পদত্যাগ না করলে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে তার নিয়োগের অবসান ঘটানোর পরামর্শ দিতে পারেন; সেই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির নির্দেশ এলে তার পদ শূন্য হবে।তাই সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় আলাদা করে যাচাই করা জরুরি: প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করতে বলেছেন কি না, পদত্যাগপত্র জমা পড়েছে কি না এবং নিয়োগের অবসান ঘটানোর কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশ জারি হয়েছে কি না।মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া পরস্পর সম্পর্কিত হলেও এক নয়। প্রধানমন্ত্রী কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলতে পারেন; কিন্তু সেই বক্তব্য বা নির্দেশের খবরই পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক প্রমাণ নয়। পদ শূন্য হওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত হবে সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী।ইশরাক হোসেনের ক্ষেত্রে তাই নিশ্চিত তথ্য ছাড়া তাকে পদত্যাগ করেছেন বা পদ থেকে সরানো হয়েছে—কোনোটিই চূড়ান্তভাবে বলা ঠিক নয়।
৪ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

চিকিৎসায় এআই, প্রযুক্তির সঙ্গে বাড়বে দায়িত্বও

প্রযুক্তি এখন শুধু আমাদের দৈনন্দিন জীবন বদলাচ্ছে না, স্বাস্থ্যসেবার ধরনও পরিবর্তন করছে। রোগের তথ্য বিশ্লেষণ, চিকিৎসাসংক্রান্ত ছবি পর্যালোচনা, হাসপাতালের প্রশাসনিক কাজ সহজ করা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত খুঁজে পেতে সহায়তা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসছে—প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, চিকিৎসার সিদ্ধান্তে মানুষের দায়িত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?আমার দৃষ্টিতে, ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এটি চিকিৎসকের পেশাগত বিচারবোধ ও দায়িত্বের বিকল্প নয়। একজন রোগীর চিকিৎসা শুধু পরীক্ষার ফল বা ডিজিটাল তথ্যের ওপর নির্ভর করে না। তার বয়স, আগের রোগের ইতিহাস, বর্তমান শারীরিক অবস্থা, ওষুধ ব্যবহারের বিবরণ এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করতে বা প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সেই তথ্য রোগীর ক্ষেত্রে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা মূল্যায়নের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান ও পেশাগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।স্বাস্থ্যসেবায় দ্রুততা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দ্রুত সিদ্ধান্তই সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করলে বিভ্রান্তিকর ফল দিতে পারে। আবার প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু রোগী বা জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রযুক্তির কার্যকারিতাও ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসায় এমন প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে এর নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা, সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তব পরিবেশে কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, নিরাপত্তা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি রোগীর সঙ্গে মানবিক যোগাযোগের গুরুত্ব কমে যায় না। একজন রোগী শুধু তার পরীক্ষার ফল জানতে চান না; তিনি জানতে চান তার সমস্যার অর্থ কী, কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী। প্রযুক্তি চিকিৎসককে তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু রোগীর উদ্বেগ শোনা, চিকিৎসার বিকল্প ব্যাখ্যা করা এবং সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব বুঝতে সাহায্য করাও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে জটিল চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগী ও পরিবারের সঙ্গে পরিষ্কার যোগাযোগ অপরিহার্য।হাসপাতালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলে শুধু নতুন প্রযুক্তি চালু করাই যথেষ্ট নয়। চিকিৎসক ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ, রোগীর তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, প্রযুক্তির ফলাফল যাচাই এবং ভুল শনাক্ত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও থাকতে হবে। একই সঙ্গে দেখতে হবে, প্রযুক্তি বাস্তবে কী পরিবর্তন আনছে—এটি কি প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে সময় কমাচ্ছে, প্রশাসনিক কাজ সহজ করছে, চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করছে, নাকি নতুন জটিলতা তৈরি করছে? প্রযুক্তির মূল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত তার বাস্তব উপযোগিতা দিয়ে, শুধু আধুনিকতার পরিচয় দিয়ে নয়।বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষতা, নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে। প্রযুক্তি যেন মানুষের জন্য নতুন বৈষম্য তৈরি না করে, সে দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য তথ্য, প্রশিক্ষিত কর্মী, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং কার্যকর নীতিমালা ছাড়া প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন। তাই হাসপাতালের নেতৃত্বের দায়িত্ব হবে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি সেটিকে নিরাপদ ও কার্যকরভাবে ব্যবহারের পরিবেশ তৈরি করা।আমার বিশ্বাস, ভবিষ্যতের সফল হাসপাতাল হবে সেই প্রতিষ্ঠান, যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে নয়, মানুষের বাস্তব সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে ব্যবহার করবে। প্রযুক্তি চিকিৎসার কাজকে আরও কার্যকর করতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে এবং কিছু প্রক্রিয়াকে সহজ করতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে রোগীর নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং মানবিক মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার মূল উদ্দেশ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো নয়; মানুষের জন্য নিরাপদ, কার্যকর ও দায়িত্বশীল চিকিৎসা নিশ্চিত করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই লক্ষ্য অর্জনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, যদি এর ব্যবহার যথাযথ যাচাই, মানবিক বিবেচনা এবং জবাবদিহির সঙ্গে পরিচালিত হয়।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু সেই অগ্রগতির কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকে—রোগীকে, চিকিৎসককে এবং তাদের পারস্পরিক আস্থাকে।লেখক: হেড অব ডিজিটাল (ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর), এভারকেয়ার হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।

কালি মুছবে, রবি থাকবে

শিল্পকলা একাডেমির সামনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দশজন বাঙালি মনীষীর মুখ এঁকেছে—নজরুল, লালন, জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, জহির রায়হান, শাহ আবদুল করিম, হুমায়ূন ফরীদি, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর ও সত্যজিৎ রায়। সেই দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপনের অভিযোগে পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে। তাদের মধ্যে একজন রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের সভাপতি আ ন ম আয়াস। ৫ আগস্টের পর থেকে তার নেতৃত্বে প্রকাশ্যে মারধর, পুলিশের সামনে অন্যদের হেনস্তা করার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশ্রয় পেতে পেতে তিনি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে উঠেছেন, এখন সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সিদ্ধান্তকেও চ্যালেঞ্জ করছেন। ছবি পছন্দ না হলে প্রতিবাদ সভা করা যেত, নিজের পছন্দের ছবি পাশে আঁকা যেত, কিন্তু অন্যের আঁকা ছবির মুখে কালি দেওয়ার অধিকার তাদের ছিল না।রবীন্দ্রনাথের প্রতি এই আক্রোশ কেন? প্রচলিত অভিযোগগুলো পুরোনো—তিনি হিন্দু, তিনি ভারতের লোক, তিনি প্রজাপীড়ক জমিদার, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছেন, তার গান কেন জাতীয় সংগীত হবে, তার লেখায় মুসলমান প্রসঙ্গ কম কেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। খ্যাতি বাড়লে অভিযোগও বাড়ে। কিন্তু অভিযোগের মীমাংসা হয় যুক্তির লড়াইয়ে, কালির আক্রোশে নয়। বিদ্বান বলে খ্যাত কিছু ব্যক্তিও তার বিরুদ্ধে আবোলতাবোল বকে যাচ্ছেন। কারণ, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সনদ আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। জ্ঞানতাপস আরজ আলী মাতুব্বর বলেছিলেন, জ্ঞানের সনদ থাকে না। তাই একজন রিকশাচালক যখন নিজ উদ্যোগে সেই কালি মুছে দেন, তখন বোঝা যায়—প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়, জ্ঞান ও বোধই আসল। সনদধারী পণ্ডিতদেরও রিকশাচালকের কাছে শেখার আছে। কিন্তু শিখবেন না, শিখলে তাদের শেখা ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যাবে।অনেকে জানেন না, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু অর্থে হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম। ব্রাহ্ম মানে ব্রাহ্মণ নয়, একেশ্বরবাদী। আর হিন্দু হলেই বা অপরাধ কী? হিন্দুধর্ম পৃথিবীর প্রাচীন ধর্মগুলোর একটি। প্রকৃতপক্ষে আসল বিরোধ ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক। ১৯৪৭ সাল থেকে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক কখনো স্বাভাবিক হয়নি। একাত্তরে ভারতের সহযোগিতা যাদের পরাজয় নিশ্চিত করেছে, তারা সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে এখনো ভারতবিদ্বেষ উসকে দেন। রবীন্দ্রনাথকে সামনে পেয়ে সেই বিদ্বেষ মেটানো হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, পৃথিবীর সব প্রভাবশালী প্রতিবেশীই প্রভাব বিস্তার করে। আমেরিকা কিউবাকে ৬৬ বছর ধরে অবরোধ করে রেখেছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক ধরে নিয়ে গেছে। রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করেছে। চীন কাশ্মীরের কিয়দংশ ও তিব্বত দখল করে রেখেছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান ভারতেরও আঞ্চলিক প্রভাব যদি থাকে, তার প্রতিবাদ রাজনৈতিকভাবে করতে হবে, কবির ছবিতে কালি দিয়ে নয়।জমিদার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ কেমন ছিলেন, তার রেকর্ড আছে। শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসরের প্রজাপীড়নের কোনো নজির কেউ দেখাতে পারেননি। বরং তিনি জমিদারির প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, ‘সাহাদের হাত থেকে শেখদের বাঁচাতে হবে।’ শিলাইদহে মহর্ষি দাতব্য চিকিৎসালয়, পতিসরে বড় হাসপাতাল, ১৯১০ সালে ট্রাক্টর, পানির পাম্প ও সার নিয়ে আদর্শ কৃষিক্ষেত্র গড়ে তোলা, তাতিদের শান্তিনিকেতনে পাঠিয়ে বয়নশিল্প শেখানো—এসব তারই উদ্যোগ। ১৯০৫ সালে নওগাঁর পতিসরে তিনি ভারতবর্ষের প্রথম জামানতবিহীন কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করে ব্যাংকের মূলধন জোগাড় করেছিলেন। নোবেল পুরস্কারের এক লাখ ১৬ হাজার টাকার মধ্যে ৭৫ হাজার টাকা সেই ব্যাংককে দিয়েছিলেন, যা আর ফেরত পাননি। কারণ, কৃষকেরা ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করেননি। তারপরও ব্যাংকটি কুড়ি বছর চলেছিল।লালনকে আমরা চিনি অনেকটাই রবীন্দ্রনাথ পরিবারের কারণে। লালনের যে ছবিটি আমরা দেখি, তা কুষ্টিয়ার শিলাইদহে নৌকায় বসে এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লালনের গানের প্রথম সংগ্রাহক ও সংকলকও রবীন্দ্রনাথ। ১৯০৫ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লালনের কুড়িটি গান তিনিই পরিমার্জন করে প্রকাশ করেন। শুধু লালন নন, লালনের ভাবশিষ্য ডাকপিয়ন গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গানটি দিয়েও তিনি ‘প্রবাসী’র হারমোনি বিভাগ শুরু করেন। এই সূত্রেই কলকাতার বিদগ্ধ সমাজে লালন ও গগন পরিচিত হন। আজ যাঁরা লালন ও রবীন্দ্রনাথকে মুখোমুখি দাঁড় করান, তাদের আরও বেশি ইতিহাসচর্চা করা দরকার।দুটি বড় মিথ—জাতীয় সংগীত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ‘আমার সোনার বাংলা’ তিনি লিখেছিলেন ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বেদনা থেকে, এ কথা সত্য। বাংলা যদি ভাগ না হতো, তাহলে শেরেবাংলার লাহোর প্রস্তাব মোতাবেক গোটা বাংলা, ত্রিপুরা ও আসাম নিয়ে ১৯৪৭ সালেই আলাদা আরেকটি মুসলিম দেশ হতে পারত। তাই দেশ ভাগ হলে ব্যথা লাগবেই। আমাদের জাতীয় সংগীতের সুর তিনি নিয়েছিলেন গগন হরকরার সুর থেকে, তবে লুকিয়ে নয়। নিজেই লিখে গেছেন—‘ওই বাউলের গানের সুরের মাধুর্যে বিমোহিত হয়ে আমি বাংলাদেশকে মাতৃরূপে গণ্য করে এই গান লিখেছি।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধিতার অভিযোগটি আরও বেশি দুর্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করার লক্ষ্যে কলকাতার গড়ের মাঠে আয়োজিত সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্ব করার কথা বলা হয়। কিন্তু ড. আকবর আলী খানসহ গবেষকেরা দেখিয়েছেন, ওই সময়ে তিনি কুষ্টিয়ায় ছিলেন। এ ছাড়া কোনো সংবাদপত্রে রবীন্দ্রনাথের ওই সভায় উপস্থিতির খবর নেই, অথচ তিনি তখন এত বিখ্যাত যে তার সভায় যোগদান পত্রিকার প্রধান খবর হওয়ার কথা। বিরোধিতা করলে প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সংবর্ধনা দিতে ডাকত না, তিনিও আসতেন না। অথবা ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডক্টর অব লিটারেচার উপাধিও প্রদান করত না।সবচেয়ে হতাশাজনক ছিল কালি লেপনকারী নারীর বক্তব্য। তিনি বলছিলেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছেন, ভারত করেছে ‘অগ্রাসন’। অথচ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু ১৯৪১ সালে, বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে। মৃত মানুষ বিরোধিতা করেন কীভাবে? তিনি ‘আগ্রাসন’ শব্দটিও উচ্চারণ করছিলেন ‘অগ্রাসন’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলছিলেন ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি’। পাকিস্তান আমলেও তাকে বেতার ও পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু পারেনি। কারণ, তার অবস্থান ইট-পাথরে গাঁথা নয়, মানুষের মনোজগতে প্রোথিত। দেয়ালের ছবিতে কালি লাগে, কিন্তু মনের ভেতরের রবিকে কালি দিয়ে ঢাকা যায় না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শিশুর প্রথম বিদ্যালয় পরিবার

একটি শিশু মায়ের মুখে শুনল, “সব সময় সত্য কথা বলবে।” কিছুক্ষণ পর বাবার ফোন বেজে উঠল। ওপাশের মানুষটি বাবাকে চাইলে বাবা সন্তানকে বললেন, “বলবে, বাবা বাসায় নেই।” শিশুটি কোনো প্রশ্ন করল না। কিন্তু সে একটি শিক্ষা পেল। অন্যদিকে, আরেকটি পরিবারে বাবা ভুল করে কারও কাছ থেকে বেশি টাকা নিয়ে ফেললেন। ভুল বুঝতে পেরে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা ফেরত দিলেন। এখানেও কোনো বক্তৃতা হলো না। কিন্তু শিশুটি সততার একটি বাস্তব রূপ দেখল। এই দুই দৃশ্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে শিশুর শিক্ষার এক গভীর সত্য। আমরা সন্তানকে যা বলি, তার চেয়ে সে আমাদের দেখে যা শেখে, তার প্রভাব অনেক বেশি স্থায়ী হতে পারে।এই কারণেই ঘরের ভেতরে সেরা গবেষণাগার। গবেষণাগার শুধু যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজানো কোনো কক্ষ নয়। যেখানে পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা, ভুল, সংশোধন ও ফলাফলের মধ্য দিয়ে শেখা হয়, সেটিও এক ধরনের গবেষণাগার। শিশুর ঘর ঠিক তেমনই একটি জায়গা। সেখানে প্রতিদিন তার ভাষা, আচরণ, চিন্তা, মূল্যবোধ ও সম্পর্কের ধারণা তৈরি হচ্ছে। বাবা-মায়ের কথাবার্তা, পারস্পরিক সম্পর্ক, অন্যের সঙ্গে আচরণ, ভুলের প্রতি প্রতিক্রিয়া এবং দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত শিশুর জন্য নীরব পাঠ হয়ে উঠছে।শিশু জন্মের পর প্রথমে বই পড়ে না, কোনো নৈতিকতার বক্তৃতাও শোনে না। সে মানুষ দেখে। সে দেখে বাবা রাগলে কী করেন, মা বিপদে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান, কেউ ভুল করলে পরিবার কীভাবে আচরণ করে, অতিথিকে কীভাবে গ্রহণ করা হয়, দুর্বল অবস্থানের মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হয়। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই ধীরে ধীরে তার আচরণের কাঠামো তৈরি হয়। তাই শিশুর চরিত্র গঠনের সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা অনেক সময় কথায় নয়, পরিবেশে।আমরা সন্তানকে বলি, “বড়দের সম্মান করবে।” কিন্তু সে যদি দেখে পরিবারের বড়রা একে অন্যের সঙ্গে অসম্মানজনক ভাষায় কথা বলছেন, তাহলে কথার চেয়ে দৃশ্যটাই তার কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। আমরা বলি, “সব মানুষকে সম্মান করতে হবে।” অথচ বাড়ির সহায়ক কর্মী বা কোনো সেবাদানকারী মানুষের সঙ্গে যদি অবজ্ঞার আচরণ করা হয়, তাহলে শিশুর কাছে সমতার ধারণা দুর্বল হয়ে যায়। আবার বাবা যদি দোকানদারের দেওয়া বাড়তি টাকা ফিরিয়ে দেন, মা যদি অসুস্থ প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ান কিংবা পরিবারের কেউ নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান, তাহলে শিশুর সামনে মূল্যবোধের একটি জীবন্ত উদাহরণ তৈরি হয়।এখানেই পরিবারের অদৃশ্য শিক্ষাক্রমের গুরুত্ব। বিদ্যালয়ে কোন শ্রেণিতে কোন বিষয় পড়ানো হবে, তার একটি নির্ধারিত কাঠামো থাকে। পরিবারের শিক্ষাক্রমের কোনো বই নেই, কিন্তু তার প্রভাব সর্বত্র। বাবা-মায়ের পারস্পরিক আচরণ থেকে শিশু সম্পর্কের ভাষা শেখে। মতের অমিল কীভাবে সামলানো হয়, তা থেকে বিরোধ সমাধানের কৌশল শেখে। কেউ ভুল করলে তাকে অপমান করা হয়, নাকি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়, তা থেকে নিজের ভুলের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। এমনকি রাস্তায় নিয়ম মানা, লাইনে দাঁড়ানো, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় অপচয় না করাও তার নাগরিক ও সামাজিক শিক্ষার অংশ হয়ে ওঠে।একটি শিশুর হাতে জীবনের প্রথম বড় শিক্ষা আসে খুব সাধারণ ঘটনা থেকে। ধরুন, সে অসাবধানতাবশত একটি গ্লাস ভেঙে ফেলেছে। বাবা যদি রেগে গিয়ে বলেন, “তুমি কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারো না”, তাহলে শিশুটি হয়তো শিখবে, ভুল করলে সত্য গোপন করতে হয়। কিন্তু বাবা যদি বলেন, “গ্লাস ভেঙেছে, এটা ঠিক হয়নি। তবে তুমি সত্যি বলেছ। এখন আমরা পরিষ্কার করি এবং পরেরবার কীভাবে সাবধান হওয়া যায়, দেখি”, তাহলে একই ঘটনা দায়িত্ববোধের শিক্ষায় পরিণত হয়। শিশুকে ভুলহীন মানুষ বানানো সম্ভব নয়; কিন্তু ভুল হলে সত্য বলা, দায়িত্ব নেওয়া এবং সংশোধন করার অভ্যাস শেখানো সম্ভব।শিক্ষার এই সুযোগ শুধু ভুলের মুহূর্তেই আসে না। দৈনন্দিন জীবনও শেখার অসংখ্য উপকরণ বহন করে। বাজারে গিয়ে পণ্যের দাম তুলনা করা থেকে গণিত ও অর্থের মূল্য শেখানো যায়। পরিবারের খরচের ছোটখাটো পরিকল্পনায় সন্তানকে যুক্ত করলে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। রান্নার সময় খাবারের পরিবর্তন নিয়ে কথা বললে বিজ্ঞান জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। গাছের পরিচর্যা থেকে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি হতে পারে। পরিবারের কোনো ছোট সিদ্ধান্তে সন্তানের মতামত জানতে চাইলে সে যুক্তি দিয়ে নিজের কথা বলতে এবং অন্যের মত শুনতে শেখে।এভাবে শিক্ষা বইয়ের পাতা থেকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। আর এই সংযোগ তৈরি করার সবচেয়ে স্বাভাবিক জায়গা হলো পরিবার।তবে বর্তমান সময়ে ঘরের শিক্ষার সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পর্দানির্ভর জীবন। বাবা মুঠোফোনে, মা মুঠোফোনে, সন্তানও মুঠোফোনে। তারপর অভিযোগ ওঠে, “বাচ্চা বই পড়ে না।” শিশুকে বই পড়তে বলার আগে তাকে বই পড়ার পরিবেশ দিতে হবে। পরিবারের বড়রা যদি নিয়মিত বই পড়েন, সপ্তাহে কিছু সময় সবাই মিলে পড়া নিয়ে আলোচনা করেন, তাহলে বই শিশুর কাছে উপদেশের বিষয় না হয়ে পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠবে। একইভাবে সন্তানকে মুঠোফোন ব্যবহারে সংযম শেখাতে হলে বড়দের নিজেদের আচরণেও সেই সংযম দেখাতে হবে।পরিবারে মতের অমিলও শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ। বাবা ও মায়ের মধ্যে মতভেদ হতেই পারে। কিন্তু সেই মতভেদ যদি অপমান ও চিৎকারে পরিণত হয়, শিশু শিখবে, বিরোধ মানেই সংঘাত। আর যদি যুক্তি, শ্রবণ ও সমঝোতার মাধ্যমে তা সমাধান হয়, তাহলে সে বুঝবে, ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং মতের অমিলের মধ্যেও সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করা যায়। একইভাবে বাবা যদি সন্তানের কাছে নিজের ভুল স্বীকার করেন, তাহলে তিনি ছোট হন না। বরং সন্তান শেখে, ভুল স্বীকার করার জন্য বয়স বা অবস্থান কোনো বাধা নয়।এ ক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে ভালো মানুষ হওয়ার উপদেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু নিজের আচরণকে সেই শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা কঠিন। অথচ শিশুর সামনে নিখুঁত হওয়ার অভিনয়ও প্রয়োজন নেই। বরং নিজের ভুল স্বীকার করা, প্রয়োজনে ক্ষমা চাওয়া, কথা রাখার চেষ্টা করা এবং অন্যের প্রতি সম্মান দেখানোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা।আমরা সন্তানের ফলাফল নিয়ে অনেক উদ্বিগ্ন থাকি। পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, কোন বিষয়ে দুর্বল, কোথায় ভর্তি হবে, ভবিষ্যতে কী করবে—এসব নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন প্রায়ই বাদ পড়ে যায়। সে কি ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করতে পারে? নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে? অন্যের কথা শুনতে পারে? দুর্বল কাউকে সাহায্য করতে পারে? নিজের সুবিধার বাইরে অন্যের প্রয়োজন বুঝতে পারে? এসব দক্ষতা ও মূল্যবোধ শুধু পাঠ্যবই থেকে আসে না। এগুলোর ভিত্তি তৈরি হয় পরিবারে।এ কারণেই বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে একটি সেতু প্রয়োজন। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে সহযোগিতা, সততা, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার কথা বলবেন, আর পরিবারে তার বাস্তব অনুশীলনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিদ্যালয় শিশুকে দায়িত্বশীল হতে শেখালে ঘরেও তাকে বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব দিতে হবে। বিদ্যালয় অন্যের মতামতকে সম্মান করতে শেখালে পরিবারেও তার কথা মন দিয়ে শুনতে হবে। শিক্ষা তখনই গভীর হয়, যখন শ্রেণিকক্ষের মূল্যবোধ জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়।আমরা সন্তানের জন্য ভালো বিদ্যালয় চাই, দক্ষ শিক্ষক চাই, উন্নত বই চাই, প্রযুক্তি চাই। এসব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সঙ্গে একটি সুস্থ পারিবারিক পরিবেশও প্রয়োজন। কারণ শিশু প্রতিদিন শুধু পাঠ্যবই পড়ে না, সে তার চারপাশের মানুষকেও পড়ে। আমাদের আচরণ, ভাষা, সম্পর্ক ও সিদ্ধান্ত তার কাছে প্রতিদিনের বাস্তব পাঠ।তাই সন্তানকে বদলানোর আগে ঘরের পরিবেশের দিকে তাকানো দরকার। তাকে সত্যবাদী হওয়ার কথা বলার আগে আমরা সত্য বলছি কি না, তাকে সম্মান শেখানোর আগে আমরা অন্যকে সম্মান করছি কি না, তাকে দায়িত্বশীল হতে বলার আগে আমরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করছি কি না—সেই প্রশ্নগুলো নিজেদের কাছেই করতে হবে।ঘরকে তাই শুধু খাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম ও বিনোদনের জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে পারে প্রশ্ন করার জায়গা, বই পড়ার জায়গা, আলোচনা করার জায়গা, ভুল থেকে শেখার জায়গা এবং মূল্যবোধ চর্চার জায়গা। বিদ্যালয়ের গবেষণাগারে শিশু বিজ্ঞান পরীক্ষা করে, কিন্তু ঘরের গবেষণাগারে সে জীবন পরীক্ষা করে।এই পরীক্ষার উপকরণ আমরা প্রতিদিন তার সামনে রাখছি—আমাদের কথায়, কাজে, আচরণে, সম্পর্কের ধরনে। আমরা তাকে যে পৃথিবী দেখাই, সে সেই পৃথিবী থেকেই নিজের পৃথিবী বানাতে শেখে।তাই শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার কাজ শুধু বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। তার শুরু হয় ঘরে। বাবা-মায়ের প্রতিদিনের আচরণ, পরিবারের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় তার নৈতিক বোধের ভিত।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ। আমরা সন্তানকে কেমন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই, তার আগে কি আমরা তার সামনে সেই মানুষটির একটি জীবন্ত উদাহরণ হতে পারছি?কারণ শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার ঘর, প্রথম শিক্ষক তার পরিবার এবং সবচেয়ে শক্তিশালী পাঠ্যপুস্তক তার বাবা-মায়ের প্রতিদিনের আচরণ।ঘরের ভেতরে যে গবেষণাগার প্রতিদিন চলছে, সেখানে শুধু একটি শিশুর ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছে না। তৈরি হচ্ছে আগামী দিনের সমাজের চরিত্রও।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়, ময়মনসিংহ]

স্বীকৃতির অপেক্ষায় আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারা

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সুপারিশে ২০১০ থেকে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৭৬ জনের গেজেট/লাল মুক্তিবার্তা/ভারতীয় তালিকা বাতিল করা হয়েছে এবং আগস্ট ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সারা দেশে তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ৪৮১ জন অমুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল করা হয়েছে। এই মুহূর্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা তো ২ লাখ ৩ হাজার সামথিং, এরকম আরকি।’ অপরদিকে, ৭ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অমুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ এবং ১৯৭১ সালের শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের তালিকা নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে।... যারা দরখাস্ত দিয়েছেন, চুলচেরা যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যদি সত্যিকারে কেউ বাদ পড়েন, তাদেরই নেওয়া হবে, যতজন দরখাস্ত করুন না কেন। তাতে অসুবিধা নেই, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় আসবেন তারাই, যারা সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা এবং চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ে যারা থাকবেন। এবং এটা হবে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে।’ এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় নেওয়া হবে প্রামাণ্য দলিল, সরকারি ও সামরিক নথি, মুক্তিযুদ্ধকালীন রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য ও গবেষণালব্ধ উপাত্ত। মুক্তিযোদ্ধা নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ের আয়োজন অনুযায়ী, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে কমিটি গঠন করা হবে, দল গঠন করে তদন্ত চালানো হবে, এরপর সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। সবকিছু নিবিড়ভাবে তদন্ত ও পর্যায়ক্রমে যাচাই-বাছাইয়ের পরই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হবেন।আমরা দেখেছি, ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্যের মাথায় দড়ি দিয়ে জুতার মালা ঝুলিয়ে অবমাননা করার ঘটনা। জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে জনসমক্ষে অসম্মানিত করা হয়েছে। তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই সমাহিত হতে হয়েছে। সত্যিই রণাঙ্গনের এই আশিতিপর নারী-পুরুষেরা জীবনের সায়াহ্নে এসে অত্যন্ত হতাশ ও সংক্ষুব্ধ। আমি ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাকে জানি ও চিনি, যারা আজও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। কখনো রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কখনো স্থান পরিবর্তনের কারণে, আবার কখনো সনদ হারিয়ে যাওয়া বা পুড়ে যাওয়ার কারণে তারা নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের নিয়ে কয়েকটি কলাম লিখেছি, কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি; কিন্তু আদৌ কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাংলার মাটিকে শত্রুমুক্ত করতে যেসব আদিবাসী তরুণ নিজেদের তীর-ধনুক ও অকুতোভয় বুক নিয়ে হানাদার বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। জাতীয় পর্যায়ে বারবার তালিকা সংশোধন, যাচাই-বাছাই ও পরিমার্জন করা হলেও প্রান্তিক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারা উপেক্ষিতই রয়ে গেছেন। এটি কেবল অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয় নয়, বরং গৌরবগাথার ইতিহাসে স্বীকৃতিহীন একটি অধ্যায়।উপেক্ষিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু জরুরি ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক বলে মনে করি—ক. সাধারণ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে—যেমন রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, সিলেট, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রামে—বিশেষ কর্মীদল গঠন করে সরেজমিনে প্রকৃত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে হবে।খ. যেহেতু অনেক আদিবাসীর কাছে লিখিত নথিপত্র নেই, সেহেতু সহযোদ্ধা ও স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের মৌখিক সাক্ষ্য বা ‘মৌখিক ইতিহাস’কে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচনা করে তালিকা সংশোধনের জন্য বিশেষ নিয়ম তৈরি করতে হবে।গ. আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ও পদবি তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির সঠিক বানান অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে।ঘ. মাঠপর্যায়ের গবেষণার মাধ্যমে অসংখ্য উপেক্ষিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধার নাম ও বীরত্বগাথা যেসব গবেষকের বইয়ে লিপিবদ্ধ হয়েছে, সেগুলোকে তথ্যসূত্র হিসেবে নিয়ে তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। এসব নির্ভরযোগ্য গবেষণাগ্রন্থকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রামাণ্য গ্রন্থ বা উৎস হিসেবে গ্রহণ করে বাদ পড়া বীরযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।ঙ. যেসব আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা ইতোমধ্যে মারা গেছেন, তাদের মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি প্রদান করা আবশ্যক। একই সঙ্গে তাদের উত্তরসূরিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অর্জন নয়। এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, কোডা, কোড়া, রাজোয়াড়, তুরী, গারো, হাজংসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাদের অংশগ্রহণের ধরন, সংখ্যা ও ব্যক্তিগত ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। কারণ, সব অঞ্চলের তথ্য সমানভাবে সংরক্ষিত হয়নি এবং অনেকের অবদানের লিখিত দলিলও সীমিত।একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা কতটা প্রগতিশীল ও ন্যায়পরায়ণ, তা নির্ভর করে আদিবাসী, প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অবদানকে কতটা সম্মান জানাতে পারছি, তার ওপর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদের রক্ত আর মূলধারার বাঙালিদের রক্ত একই স্রোতে মিশে গিয়েছিল। সেই রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় কোনো ধরনের বৈষম্য বা অবহেলা কাম্য হতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংশোধনের চলমান ও ভবিষ্যৎ প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের উপেক্ষিত বীরত্বকে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করতে হবে। যতক্ষণ না সমতল ও পাহাড়ের শেষ প্রান্তিক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা তার প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাচ্ছেন, ততক্ষণ আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয়ের ইতিহাস অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। এই ঐতিহাসিক ঋণ পরিশোধের সময় এখনই।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

‘কেউ যেন অন্যায়ভাবে আটক না থাকে’—শুধুই কি কথার কথা!

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগদানের আগে সাংবাদিকদের এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমাদের সরকারের অবস্থান হলো, আমরা মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। বিরোধী দল আওয়ামী লীগ বা অন্য যে কোনো দলই হোক না কেন, বর্তমান সরকার অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন কারাগারে বা অন্যায়ভাবে আটক না থাকে।’ শামা ওবায়েদ জোর দিয়ে বলেন যে বর্তমান সরকার মানবাধিকার রক্ষা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহির নীতিতে বিশ্বাসী। তাই অতীত আমলের মতো পাইকারি বা গায়েবি মামলার সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া হবে না।বিদেশ সফরে গেলে মন্ত্রীদের হরহামেশাই মানবাধিকার সংস্থাগুলোর, বিশেষত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার মুখোমুখি হতে হয়। কূটনৈতিক পর্যায়েও নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তাই বিদেশ সফরের আগে, বিশেষত জাতিসংঘ অধিবেশনের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বশীল ফোরামে যোগদানের আগে ও অধিবেশন চলাকালে মন্ত্রী-উপদেষ্টারা এসব বক্তব্য দিয়ে থাকেন। ফিরে আসার পথে এসব কথা ভুলে যান। এটাই নিয়ম, এভাবেই চলছে। তা না হলে গায়েবি মামলাগুলো এবং বহুল আলোচিত প্রতিহিংসাবশত দায়ের করা অসংখ্য খুনের মামলা প্রত্যাহার হতে সময় লাগবে কেন? তাই তো প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক থেকে ফিরতি বিমানে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাল্টা ঘোষণা দিলেন, আওয়ামী লীগার ধরতে পারলেই পুরস্কৃত করা হবে।অথচ সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর ‘সব পরিকল্পনা’ ব্যর্থ হয়ে পড়ছে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে। শিশু হত্যা, শিশু ধর্ষণ থেকে শুরু করে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব—এমন কোনো অপরাধ নেই, যা প্রতিদিনই খবরের শিরোনাম হচ্ছে না। কিশোরী ছাত্রীর লাশ পড়ে থাকছে ধানখেতে, পাটখেতে বা বনজঙ্গলে। থানা নোটিস জারি করছে, কোনো পুলিশ সদস্য যেন একা বাইরে বের না হন। কী ভয়াবহ পরিস্থিতি! নিজ দলের লোকজনকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সরকারের সবচেয়ে স্মার্ট মন্ত্রী—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী—কয়েক মাসেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লেজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি করেছেন।‘রাজবন্দী: একসময়ের সহযোদ্ধারা কি চেয়ে চেয়ে দেখবে?’—উপসম্পাদকীয়টি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর আমার মনে হলো, সেই ১৯৮২ সালে সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনাপর্বে যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল, তার দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কারাগারে। অন্য যে কোনো রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর চেয়ে তারা তো অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাদের নিয়েই সবার আগে লেখা আমার জন্য জরুরি। অবশ্য মাস দুয়েক আগে ডাকসুর প্রাক্তন সহসভাপতি আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ জানিয়ে এক দফা লিখেছি। তাতে কী? আজ অবধি জামিন মেলেনি। জামিন শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে আসে না! ’৮২-র ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অপর একজন দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে একাধিক খুনের মামলায় আটক আছেন। তিনি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন।জালাল ভাই পুরান ঢাকার বাসিন্দা। তার পারিবারিক পরিচিতি আমার জানা নেই। তবে পুরান ঢাকা ঘিরেই তার বিচরণ। সেন্ট গ্রেগরিজ থেকে স্কুলজীবন সমাপ্ত করে পুরান ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধে যোগদান এবং স্বাধীন দেশে চিকিৎসাশাস্ত্রে পাস করেন একেবারে তার বাড়ির পাশের ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে।সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সময় তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে তিনি এবং ছাত্রলীগের অপর অংশের সভাপতি, বর্তমানে বিএনপি নেতা ফজলুর রহমান, বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। ১৯৮৩ সালেই তারা ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নেন। হাজি সেলিম আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর থেকে পুরান ঢাকার রাজনীতিতে জালাল ভাই বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারছিলেন না। জালাল ভাইয়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও হাজি সেলিমের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার উপযোগী নয়। তবে জালাল ভাই বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। অবশ্য সেই সময়ে বিএমএর মতো ঐতিহ্যবাহী পেশাজীবী সংগঠনকে পুরোপুরি দলীয় সংগঠনে পরিণত করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আছে। ভিন্নমতের পেশাজীবীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য দেখালেও বিএমএকে কার্যত আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ‘স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের’ অনুগত সংগঠন হিসেবে পরিণত করা হয়েছিল। তবে শুধু এই বিষয়ে সীমাবদ্ধ থেকে জালাল ভাইকে সামগ্রিকভাবে বিচার করা সমীচীন হবে না।প্রয়াত তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী থেকে শুরু করে মাঝখানে শেখ শহীদুল ইসলাম ও মনিরুল হক চৌধুরী ছাড়া ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত যারাই ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন, সবার সঙ্গে কমবেশি পরিচয় ও কথাবার্তা ছিল। সবার থেকে জালাল ভাই অন্য রকম। চোস্ত নেতা-ভাব ছিল না। একেবারেই সাদামাটা মনে হতো। গভীর রাজনৈতিক বিতর্কে অধিকাংশ সময় চুপচাপ থাকতেন। তার শারীরিক ভাষায়, বিশেষত হাসিতেই, বিনয় প্রস্ফুটিত হয়ে উঠত। আর পুরান ঢাকার কথার মধ্যে একটা প্রাণবন্ত টান থাকায় আলাপচারিতার সময় বা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের সভাসমূহে তার বক্তব্য এমনিতেই একটা মিষ্টি পরিবেশ সৃষ্টি করত। ওই সময়ের ডাকসু ভিপি আখতারুজ্জামান জগন্নাথ কলেজে তার অনুজ ছিলেন এবং একটা সময়ে কলেজে তারা একই ছাত্র সংগঠনে থাকায় দুজনের মধ্যে একটা গভীর আত্মীয়তাবোধ কাজ করত। জালাল ভাই দীর্ঘ সভা পছন্দ করতেন না। সভা লম্বা হয়ে গেলে বলে উঠতেন, ‘আখতার অজাইরা প্যাঁচাল বাদ দাও, কামের কথা থাকলে কও, নইলে কাডি!’ জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ডা. মুশতাক ঢাকা মেডিকেল কলেজে তার অনুজ ছিলেন। তার সঙ্গেও বিশেষ সখ্য ছিল। তাকে মধুর ক্যান্টিনে দেখলে বলতেন, ‘কী মুশতাক, চুপচাপ ক্যালা? সারাক্ষণ ঢাকা বিসবিল্যা রাখলে চলবো, ম্যাডিক্যালেও একটু টাইম-টেম দেও।’মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনের সঙ্গে অবশ্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আগে থেকেই সখ্য গড়ে ওঠে বকশীবাজারে। ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল বকশীবাজারে। বাড়ির মালিক ছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলর এবং আওয়ামী লীগের নেতা আবদুল আজিজ। সবাই ডাকতেন লাজিজ ভাই বলে। আমাদের অফিসের পাশেই ছিল তার বৈঠকখানা। সেখানে প্রায়ই জালাল ভাই আসতেন। আমিও মাঝে মাঝে তাদের আড্ডায় শরিক হতাম। লাজিজ ভাই প্রয়াত হয়েছেন বেশ কিছু কাল আগে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। সত্তর ও আশির দশকজুড়েই ছাত্র ইউনিয়ন আর যুব ইউনিয়নের সঙ্গে তার সম্পর্কটা অনেক গভীর ছিল।এত কথা বলার কারণ, জালাল ভাইকে শুধু ক্যাম্পাসে নয়, ক্যাম্পাসের বাইরেও দেখেছি। আওয়ামী লীগের অন্দরমহলে তো দেখার সুযোগ হয়নি। তবে জালাল ভাই খুন-হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন, এটা আমি কেন, তার সঙ্গে পরিচিত কেউই বিশ্বাস করবে না। অথচ জুলাই আন্দোলনের সময় নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াদুদ নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা এক হত্যা মামলায় তার নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মিরপুর থানার একটি হত্যা মামলাতেও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপি কর্মী মকবুল হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনায় পল্টন থানার মামলাতেও তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে মামলা যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা আদালতে সরকারি কৌঁসুলির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। সরকারি কৌঁসুলি বলেছেন, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং গুলি চালানোর নির্দেশ দিতে শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তথ্য-প্রমাণ ছাড়া এ ধরনের ঢালাও অভিযোগ আর পাইকারি মামলায় জালাল ভাইয়ের মতো সারা দেশে রয়েছেন অসংখ্য রাজবন্দী।প্রসঙ্গত, দুজন রাজনীতিকের কথা তুলে ধরছি। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের তার নির্বাচনী সভায় আওয়ামী লীগের সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হককে ফ্যাসিস্ট আখ্যায়িত না করে ‘ভাই’ সম্বোধন করে বলেন, ‘এবার তো মুজিব ভাই নেই। আপনাদের আগের অনুভূতিতে তো দুই নম্বরে আমি আছি। তাহলে ইনশাআল্লাহ, এবার আপনারা আমাকে ভোট দেবেন।’ তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদারকে তার নির্বাচনী সভায় উপস্থিত করার ব্যবস্থা করেন এবং তাকে তার জন্য দোয়া করতে বলেন। দোয়া প্রার্থনার পর আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আবার মাইকে এসে বলেন, ‘সালাউদ্দিন কী বলতে চেয়েছে, আপনারা বুঝেছেন তো? কোথায় ভোট দেওয়ার কথা বলেছে, আপনারা বুঝে নিয়েন।’ ‘ফ্যাসিবাদীদের’ ভোটের জন্য সেদিন কী জামায়াতি আকুতি!বিএনপির প্রাক্তন মহাসচিব, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার নির্বাচনী সমাবেশে বলেছিলেন, দেশে শুধু দুটোই প্রতীক—নৌকা আর ধানের শীষ। নৌকা এখন নেই, তাহলে ভোট দেবেন ধানের শীষে। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের দল স্বাধীনতাবিরোধীদের দল। তিনিও ফ্যাসিস্ট সম্বোধন না করে বলেছিলেন, ‘আমাদের হাসিনা আপা চলে গেছেন ভারতে। তিনি ভারতে গেছেন, ভালো করেছেন। কিন্তু এলাকার সমর্থক-কর্মীদের বিপদে ফেলে গেছেন কেন? আমরা আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের জানাতে চাই, আপনারা বিপদে পড়বেন না। আমরা আছি, আপনাদের পাশে।’আওয়ামী লীগের পাশে আওয়ামী লীগই থাকুক। বিএনপি বা জামায়াত-এনসিপির থাকার দরকার নেই। বরং সরকারের যে দায়িত্ব, সেটাই সরকার পালন করুক। শামা ওবায়েদের কথা অনুযায়ী, ‘বিরোধী দল, আওয়ামী লীগ বা অন্য যে কোনো দলই হোক না কেন, বর্তমান সরকার অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন কারাগারে বা অন্যায়ভাবে আটক না থাকে’—সরকার তার এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুক। দেশে ন্যূনতম আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।পরপর কয়েকটি লেখায় শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, ইনু, মেনন ইত্যাদি প্রসঙ্গ এসে যাওয়ায় আমার কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী আমাকে সতর্ক করে বলেছেন, লেখায় নাকি ‘দোসরদের’ প্রতি পক্ষপাতিত্ব হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ বা কথিত ‘দোসর’ কিংবা জয় বাংলা, ইনকিলাব ইস্যু নয়। ইস্যু হচ্ছে আইনের শাসন ও সুবিচার। আইনের শাসন ও বিচারহীনতার অভাবে আজ আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগ আইনের শাসন নিয়ে চিন্তিত বলে মনে হয় না। তারা তাদের শাসনামলে আইনের শাসন, বাক্‌স্বাধীনতা, সুবিচারের তোয়াক্কা করেনি। এখনো এসব নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। পত্রপত্রিকায় কী লেখা হচ্ছে, তাও আমলে নেন বলে মনে হয় না। তারা হয়তো তাদের বিষয় তাদের মতো করেই ফয়সালা করবেন।কিন্তু দেশের সাধারণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ, নাগরিক সমাজ, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং অবশ্যই দেশের ছোট-মাঝারি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আইনের শাসন, বাক্‌স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার জরুরি। এর ব্যত্যয় হলে সবাইকেই ভুগতে হবে। আইনের শাসনের বিপরীতে যদি প্রশাসন আর বিচার বিভাগে প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধ জায়গা করে নেয়, তবে তা মব-সংস্কৃতিরই আরেক রূপে আবির্ভাব ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। আর আইনের শাসন তো খণ্ডিতভাবে হয় না, সার্বজনীনভাবেই তার প্রয়োগ হতে হয়।মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনের কথায় ফিরে যাই। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক উত্তাল মুহূর্তে ডা. শামসুল আলম খান মিলন গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় তার সঙ্গে একই রিকশায় ছিলেন ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন। সেদিন তিনিও নিহত হতে পারতেন। তিনি আটক থাকা অবস্থায় তার সহধর্মিণী প্রয়াত হয়েছেন। তিনিও অসুস্থ। তার বিরুদ্ধে আনা একটি অভিযোগেরও তথ্য-প্রমাণ নেই। তাকে মুক্তি দিন। মিথ্যা হত্যা মামলা ছাড়া তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ভিন্ন কোনো অভিযোগ যদি থেকে থাকে, তা প্রকাশ করা হোক এবং বিচার চলুক। কিন্তু জামিনের অধিকার থেকে তিনি যেন বঞ্চিত না হন।একই পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন ডাকসুর প্রাক্তন ভিপি, প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। ২০১৮ সালে গণফোরামে যোগ দিয়ে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে পরবর্তীতে আবার গণফোরাম ত‍্যাগ করে ও একই সাথে বিএনপির সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগের সাথে সান্নিধ্য পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগে ফিরতে পারেননি। জুলাই আন্দোলনের সময়ও তিনি দেশে ছিলেন না। কিন্তু দেশে ফিরে আসার দিন আক্রোশবশত তাকে বিমানবন্দর থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২২ সালের এক খুনের মামলায় ফাসিয়ে দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরে উচ্চ আদালত থেকে তিনি জামিন লাভ করলে আটক রাখার উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি হত্যা মামলা দায়ের করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সুলতান মনসুর ২০১৮ সালে ও তারপরে নিঃসন্দেহে চরম রাজনৈতিক সুবিধাবাদীতার পরিচয় রেখেছিলেন। আর  সে কারণে তার বিরুদ্ধে আক্রোশ ও প্রতিহিংসাবশত একটার পর একটা খুনের মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাহলে সরকারের যে ঘোষণা ‘বর্তমান সরকার অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন কারাগারে বা অন্যায়ভাবে আটক না থাকে’ — এ কথার মুল‍্য রইলো কই?সৃষ্টিকর্তা তার অন্যতম সেরা উপহার হিসেবে মানুষকে দিয়েছেন কথা বলার ক্ষমতা—যা আর কোনো প্রাণীর নেই। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কথা ‘বাত কি বাত’ হয়ে গেলে শুধু তার কথার সৌন্দর্যই হারিয়ে যাবে না, বিশ্বাস বা প্রতিশ্রুতিরও ভঙ্গ হবে। আর বিশ্বাস কিন্তু কথায় নয়, কাজে গড়ে ওঠে। তাই কথা রাখতে না পারলে কথা না বলাই শ্রেয়। মানুষের বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে সব ‘পরিকল্পনা’ কিন্তু বরবাদ হয়ে যাবে!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

সরকারি হাসপাতালে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ হোক

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো সরকারি বরাদ্দের স্বল্পতা, সেবার নিম্নমান, জনবল সংকট ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্র ও বিভিন্ন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। চিকিৎসা নিতে এসে সাধারণ মানুষকে যেমন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, তেমনি প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসার মুখেও পড়ছেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭২ শতাংশ মানুষকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়। ফলে চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে, এমনকি দারিদ্র‍্যরে দুষ্টচক্রে আটকে যায়। অথচ স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির তুলনায় সরকারি বরাদ্দ এখনো অত্যন্ত কম। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, আধুনিক পরীক্ষার ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রত্যাশিত সেবা না পেয়ে মানুষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। এই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে দালালচক্র।সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসা। বিশেষ করে বিভাগীয় শহরগুলোর বড় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু হাসপাতালের প্রবেশপথ, জরুরি বিভাগ ও বিভিন্ন ওয়ার্ডের আশপাশে সক্রিয় দালালচক্র অনেক রোগীকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। এরা বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে না; বরং পরিবহনচালক, বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কিছু অসাধু ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কোথাও কোথাও হাসপাতালের অসাধু কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। ফলে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার পরিবর্তে অসহায় রোগীদের প্রতারণা ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।দালালদের প্রধান লক্ষ্য গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল রোগী ও তাদের স্বজনেরা। আন্তজেলা বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাট থেকে শুরু করে হাসপাতালের প্রবেশপথ পর্যন্ত তাদের তৎপরতা দেখা যায়। অনেক সময় রিকশা বা সিএনজিচালকেরা কম ভাড়া নেওয়া কিংবা অতিরিক্ত সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে রোগীদের আস্থা অর্জন করেন। পথে যেতে যেতে রোগীর গন্তব্য ও অসুস্থতার বিবরণ জেনে তারা নির্দিষ্ট সরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে নানা নেতিবাচক কথা বলেন এবং পরিচিত বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভালো চিকিৎসা পাওয়ার প্রলোভন দেখান। রোগীকে সেখানে নিয়ে যেতে পারলে তারা কমিশন পান বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালে কোথায় যেতে হবে, কীভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে কিংবা কোথায় ভর্তি হতে হবে—এসব বিষয়ে অপরিচিত রোগীর অসহায়ত্বকে কাজে লাগানোই তাদের কৌশল। সাহায্যের ভান করে শুরু হওয়া এই প্রতারণা শেষ পর্যন্ত রোগীর বাড়তি ব্যয় ও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।আরেকটি কৌশল হলো সরকারি হাসপাতালে শয্যা নেই, চিকিৎসক পাওয়া যাবে না কিংবা চিকিৎসা পেতে কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে—এমন কথা বলে রোগী ও স্বজনদের ভয় দেখানো। জরুরি বিভাগে আসা একজন অসুস্থ মানুষ কিংবা তার উদ্বিগ্ন স্বজনেরা যখন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন, তখন দালালদের পক্ষে তাদের প্রভাবিত করা সহজ হয়। এভাবে রোগীকে পাশের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠিয়ে কমিশন নেওয়া হয়। কোথাও কোথাও হাসপাতালের অসাধু চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। কোনো সরকারি কর্মচারী রোগীকে প্রতারণার মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে আর্থিক সুবিধা নিলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালে শয্যা, চিকিৎসক ও পরীক্ষার সুবিধা সম্পর্কে সঠিক তথ্য সহজে জানার ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রোগীকে বিভ্রান্ত করা না যায়।স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রক্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রেও দালালচক্রের প্রভাব উদ্বেগজনক। সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা রক্তের ব্যবস্থা না পেয়ে অনেক রোগীকে বাইরের প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয়। এই সুযোগে কিছু দালাল তাদের নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায়, যেখানে পরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। আরও গুরুতর বিষয় হলো, অনুমোদনহীন বা নিম্নমানের কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল না থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরীক্ষা না করেই প্রতিবেদন তৈরি এবং চিকিৎসকের নাম বা সিল অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এসব অনিয়ম রোগ নির্ণয়ে ভুলের ঝুঁকি বাড়ায় এবং রোগীর জীবন বিপন্ন করতে পারে। তাই ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অনুমোদন, যন্ত্রপাতি, জনবল ও পরীক্ষার মান নিয়মিত যাচাই করতে হবে। ভুয়া প্রতিবেদন তৈরি কিংবা রক্তদাতার স্বাস্থ্যগত তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।দালালচক্রের সঙ্গে চিকিৎসাসেবার বিভিন্ন পর্যায়ে আর্থিক স্বার্থের সংঘাতও জড়িত থাকতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু চিকিৎসক রোগীকে নিজেদের পছন্দের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে বলেন এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন দেখতে অনীহা প্রকাশ করেন। কেউ কেউ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীকে পরবর্তী সময়ে নিজের ব্যক্তিগত চেম্বারে যেতে উৎসাহিত করেন। তবে সব চিকিৎসককে এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা ঠিক হবে না। অধিকাংশ চিকিৎসক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও সেবা দিয়ে থাকেন। কিন্তু যাঁরা পেশাগত দায়িত্বের অপব্যবহার করেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। রোগীর প্রয়োজনের বাইরে পরীক্ষা করানো, পরীক্ষার বিনিময়ে কমিশন নেওয়া কিংবা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহারে উৎসাহিত করার অভিযোগ তদন্ত করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ এবং প্রতিবেদন দেখানোর জন্য পুনরায় ফি নেওয়ার বিষয়েও স্বচ্ছতা থাকা দরকার। রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা ও সহজ ভাষায় চিকিৎসা বুঝিয়ে বলা সেবার মানের অপরিহার্য অংশ।সরকারি হাসপাতালের হুইলচেয়ার, ট্রলি ও অন্যান্য সহায়ক সেবা নিয়েও রোগীদের ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। এসব সেবা বিনা মূল্যে বা নির্ধারিত নিয়মে পাওয়ার কথা থাকলেও কোথাও কোথাও রোগীর স্বজনদের অর্থ দিতে হয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। অসুস্থ রোগীকে বহন করার মতো জরুরি সেবাকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করা অমানবিক। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এসব সেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে এবং কোথায়, কার কাছে অভিযোগ জানাতে হবে, তা দৃশ্যমান স্থানে উল্লেখ করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মীদের দায়িত্ব নির্ধারণ, নিয়মিত তদারকি এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।অ্যাম্বুলেন্স সেবাকে ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটও রোগীদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের আশপাশে সক্রিয় কিছু অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালক বাইরের অ্যাম্বুলেন্সকে রোগী পরিবহনে বাধা দেন এবং রোগীদের নিজেদের গাড়ি ব্যবহার করতে বাধ্য করেন। এতে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে রোগী নিয়ে আসা অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে ফিরতি পথে রোগী পরিবহনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে চালককে খালি গাড়ি নিয়ে ফিরতে হয়, আর রোগী ও স্বজনেরা বেশি ভাড়া দিতে বাধ্য হন। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ রোগীর পরিবহন-অধিকার ও জরুরি চিকিৎসাপ্রাপ্তির সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করে।অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারণ ও পরিচালনার জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। ২০২৩ সালে অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিয়ে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি হলেও তা গেজেট আকারে প্রকাশ ও বাস্তবায়িত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ভাড়া নির্ধারণ, সেবার মান ও পরিচালনার ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি রয়ে গেছে। সরকারকে প্রয়োজনীয় জরিপের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অ্যাম্বুলেন্সের চাহিদা নিরূপণ করতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সচল অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য উন্নত সুবিধাসম্পন্ন ও নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের উপযোগী অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের নিবন্ধন, ভাড়া, সেবার মান ও রোগী পরিবহনের অধিকার নিশ্চিত করে কার্যকর বিধিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। হাসপাতালকেন্দ্রিক কোনো চক্র যেন রোগী পরিবহনে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।শুধু অভিযান চালিয়ে দালালচক্র নির্মূল করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন হাসপাতালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা সত্ত্বেও একই ধরনের অনিয়ম ফিরে আসার অভিযোগ রয়েছে। এর কারণ অনুসন্ধান করা দরকার। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষক ও সহযোগীদের শনাক্ত করতে হবে। হাসপাতালের প্রবেশপথ, জরুরি বিভাগ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নজরদারি বাড়ানো, পরিচয়পত্রধারী কর্মী ছাড়া অন্যদের রোগী ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হাসপাতালের ভেতরে দালালদের প্রবেশ ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা পরিচয়ের কারণে কেউ যেন আইনের আওতার বাইরে থাকতে না পারে।স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ২ মার্চ ২০২৬ তারিখে হাসপাতালের দালাল নির্মূলে সাত দফা নির্দেশনা জারি করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হুইলচেয়ার ও ট্রলি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ইউনিফর্মধারী কর্মী ছাড়া অন্যদের হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্দেশনা জারি করাই যথেষ্ট নয়; বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। হাসপাতালের জনবল সংকট, পরীক্ষার সুযোগের ঘাটতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির অভাব দূর না হলে দালালচক্র নতুন কৌশলে ফিরে আসবে। উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক পরীক্ষাগার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, দক্ষ জনবল ও কার্যকর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো এবং সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।সরকারি হাসপাতাল জনগণের অর্থে পরিচালিত জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান। সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষকে প্রতারণা, ভয়ভীতি ও কমিশন বাণিজ্যের শিকার হতে দেওয়া যায় না। এ জন্য সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি রোগীর সঙ্গে মানবিক আচরণ ও কার্যকর যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সাধারণ মানুষকেও সচেতন করতে হবে, যাতে তারা দালালদের প্রলোভনে না পড়ে হাসপাতালের নির্ধারিত সেবা গ্রহণ করতে পারেন। স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য হওয়া উচিত রোগীর আর্থিক সামর্থ্য বা পরিচয় নয়, বরং তার প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। কঠোর আইন প্রয়োগ, কাঠামোগত সংস্কার ও কার্যকর জবাবদিহির মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালকে দালালমুক্ত করা সম্ভব। প্রতিটি রোগী যেন হয়রানি ছাড়াই প্রাপ্য চিকিৎসা পান—এটাই হওয়া উচিত স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের প্রধান অঙ্গীকার।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: উপপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন]

রম্যগদ্য: “দেশের বডিতে অন্য মাথা”

হ হ, বুঝছি। আপনে বর্তমান প্রজন্ম জেন-জি’র, কথা বলচেন যে, বর্তমান জেন-জি,  কোনো কিছু, উড়িয়েও দিতে চায় না পুড়িয়েও দিতে চায় না...”হ ভাই দুনিয়া অখন এআই’এর যুগ, অহন পাবলিক আর উড়ায়া-পুড়ায়া দেয় না, অহন স্রেফ সুদখোরের আবিষ্কৃত পথে জেন-জি, কেবল বুলডোজারদি গুড়ায়া দ্যায়।আরে পাগলা আমি এই বুলডোজার কালচারের কথা বলছি না। আমি বলছি মাননীয় বেতাল পঞ্চবিংশতি বেতালের কথা। যার কথার কোনো তাল নাই, বেতাল!আরে না, আমি বলছিলাম, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতি থেকে বাংলায় অনুবাদ বেতাল পঞ্চবিংশতি ভূতের গল্প।ভূত মাইনে তো অতীত, অহন আর অতীতের প্যাচাল শুনি কী লাভ হোইবো। বিগত চুয়ান্ন বছর ধরি ট্যাকা ট্যাকা করি বাঙালি জাতির ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান ব্যাবাগ পচাই অহননি আপনে আবার ভূতের কতা কন!শোননা, বেতাল পঞ্চবিংশতির গল্প হোচ্ছে, রাজা বিক্রমাদিত্য শমী বৃক্ষ হতে, বেতাল ভূতের কঙ্কাল পেড়ে আনবে, আর পথিমধ্যে বেতাল একটা করে গল্প বলবে...ভূতেনি, মাইনে অতীতনি, বর্তমানের গল্প কোইবো?ধুর বাঙাল কেবল কথার মাঝে কথা বলিস...ঠিক আছে ঠিক আছে, আর কমু না ভূতেও বর্তমানের গল্প কোইবো। নেন আন্নে আপনের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতির ভাষায় ল্যাখা বাংলায় অনুবাদ বেতাল পঞ্চবিংশতি ভূতের গল্প কন।রাজা বিক্রমাদিত্য শমী বৃক্ষ হতে, বেতাল ভূতের কঙ্কাল পেড়ে আনবে, আর পথিমধ্যে বেতাল একটা করে গল্প বলবে...  কিন্তু প্রতিটি গল্পের শেষে বেতাল ভূত ওই গল্পের উপর বেইজ করে একটা প্রশ্ন করবে? রাজা যদি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দ্যায় তায়লে বেতাল আবার শমী বৃক্ষের উপর চলে যাবে রাজা বিক্রমাদিত্যকে আবার গাছে উঠে বেতাল ভূতের কঙ্কাল পেড়ে আনবেন, আর যদি রাজা ইচ্ছা করে ভুল উত্তর দ্যান তাহলে বেতাল ভূত রাজার ঘাড় মটকে মেরে ফেলবে। ওম্মারে মা, সত্যি কোইলে আবার গাছে চড়ন, আর মিথ্যা কোইলে মরণ। বেতাল ভূতে তো রাজার ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান ব্যাবাগ মারি হ্যালার! তো আন্নের এই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতির ভাষায় ল্যাখা বাংলায় অনুবাদ পঞ্চবিংশতি বেতাল ভূতের গল্পের মইধ্যে বাংলাদেশের কুনো সর্ম্পক আছেনি?সর্ম্পক আছেনি মানে কিরে, এখনতো পুরো দেশ এমনি এক বেতালের মতো চলছে।আন্নে মিয়া চোখ থাকিতে অন্ধ! আন্নে দেখছেন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা কী সুন্দর বিশ্বমানে পৌঁছাইছে...কী কী বললি! আইনশৃঙ্খলা বিশ্বমানে পৌঁছেছে...ক্যান আন্নের কুনো সন্দ আছেনি?কী ব্যাপার তুই কি গঞ্জিকা মানে গাঁজাটাঁজা টানছিস নাকি?কিয়ের গঞ্জিকা মানে গাঁজাটাঁজা টানছিস নাকি! আপনে দ্যাখেন নাই জার্মানি পর্যটকের ল্যাপটপ মাত্র চাইর দিনে উদ্ধার।আর ওই যে, ধানমন্ডির সামনে এক মানসিক ভারসাম্যহীন, ব্যাডারে হিডি, লাত্থিমারি হোতাই ফ্যালার, হেই বিচারের রায় দ্রুত সময়ে কার্যকর! বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থান অহন পিরথীবির যে কুনো সভ্য দেশের চেয়েও সভ্য। আর আন্নে মিয়া কন, আপনের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতির ভাষায় ল্যাখা বাংলায় অনুবাদ বেতাল পঞ্চবিংশতি ভূতের মতুন দেশ চলের। আসলেই বাঙ্গালী নিজের ভালো নিজে দ্যাখা পারে না!আচ্ছা তুই বল মানসিক ভারসাম্যহীন লোকের বিচার কি স্বভাবিক অপরাধীদের মতো বিচার হবে?হাগলনি কোনো! হাগলের বিচার মাইনে, মানসিক অপরাধীদের প্রথমে আপনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞর পরামর্শ লোই, হ্যাতারে ভালো করি তারপর না বিচার। কিন্তু স্যার আপনে যে তখন থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতি থেকে বাংলায় অনুবাদ বেতাল পঞ্চবিংশতি ভূতের গল্পের মতো বাংলাদেশ চলের বোলচেন, সেটার মাজেজা কী?আচ্ছা তোকে একটা বেতালের গল্প বলি...বলেন বলেন ভূতের গল্প আমার খুবই মজা লাগে। এসব ভূতের গল্প মজার না, বোধের।আরে প্যাচাল কম পাড়েন, গল্পটা কন।শোন বলি বেতালের গল্প। সে বহু বহু দিন আগের কথা, মা’দূর্গার এক তরুণী ভক্ত বাসর রাতের পর স্বামী ও স্বামীর বন্ধুর সাথে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে। এমন সময় পথিমধ্যে ডাকাতের তলোয়ারের আঘাতে স্বামী ও স্বামীর বন্ধুর মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে পড়ে থাকে। জিনিসপত্র লুঠ করে ডাকাতরা পালিয়ে যায়। নববধূ তখন স্বামীর শোকে আত্মহত্যা করতে যাবে এমন সময় মা দূর্গা এসে বলেন “ওহে তরুণী ভক্ত তোমার আত্মহত্যার প্রয়োজন নেই আমি এঁদের জীবিত করে দিচ্ছি, তুমি জলদি দেহের সাথে মাথা জুড়ে দাও।নতুন বৌ কি স্বামীরে ফিরি পাইবো?আরে শোন তো... কন কন বেতালের গল্প কন।নতুন বৌ মরা স্বামী ফিরে পাবে, এই খুশিতে তাড়াতাড়ি দুই ধড়ের সাথে মাথা জুড়ে দিলো। সাথে সাথে দুই যুবা পুরুষ যেন ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন, এই ভাবে জেগে উঠলো। সবাই খুব খুশী। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করে দেখে যে, তাড়াহুড়ায় নতুন বৌ স্বামীর দেহে জুড়েছে বন্ধুর মাথা আর বন্ধুর দেহে জুড়েছে স্বামীর মাথা। এখন কে এই তরুণীর সাথে ঘর করবে?আপনে কি বলচেন যে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বেতাল পঞ্চবিংশতি ভূতের গল্পের মতো বাংলাদেশের মাথা পাল্টে গেচে! বাংলাদেশের বডিতে অন্য মাথা লেগেচে যে...আমারতো তাই মনে হয়, না হলে নিজের দেশের লোকের হাজার সেল ফোন, ল্যাপটপ চুরি হলে বছর কা বছর পাওয়া যায় না আর বিদেশির ল্যাপটপ চারদিনে উদ্ধার! বিষয়টা ভাববার বিষয়।কিন্তু যুদি বাংলাদেশের সব চুরি চাইর দিনে ধরা পড়ে, সব বিচার যুদি লগে লগে সমাধা হয় তায়লে বাংলাদেশের বডিতে অন্য মাথা লাগলেও আমি হেই মাথারে স্বাগতম জানামু...সেই ভালো, চল দেশের ভালোর জন্য আমরা সবের মাথা পাল্টাই...  [লেখক: চলচ্চিত্রকার]

মব কালচার, মব অ্যাটাক

‘মব’ শব্দটির সঙ্গে বাংলাদেশের গণমানুষের পরিচয় বেশি দিনের নয়। শব্দটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায় মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। এটা একটা ইংরেজি শব্দ, যার বাংলা অর্থ উচ্ছৃঙ্খল জনতা। এরা দৃশ্যপটে আসে মূলত চব্বিশের গণআন্দোলনের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে। আর যারা ঘটনার আকস্মিকতায় ক্ষমতার মসনদ পেয়ে যায়, তারাই মবের স্রষ্টা, মব সংস্কৃতি ও মবের লালন-পালনের দায়িত্ব মাথায় তুলে নেয়। একই সঙ্গে তারা মবের ধারক-বাহক, তোষণ-পোষণের দায়িত্বও কাঁধে নিয়ে নেয়।এই মবরা একই শ্রেণির, একই বয়সের, প্রায় একই পোশাক-পরিচ্ছদে চলাফেরা করে। এদের চেহারায়ও অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। তখন এরা রাষ্ট্রীয় অর্থে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বেষ্টনীতে বাস করত। অবস্থা এমন ছিল যে, এরা দেশের রিজার্ভ আর্ম ব্যাটালিয়নের ন্যায় রাজধানীর উত্তর-পশ্চিমাংশের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস করত। প্রয়োজন পড়লেই ডাক পেত, আর এক ঘণ্টার ব্যবধানে শাহবাগ চত্বরে, রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বা শহীদ মিনারে দুর্বার গতিতে এসে হাজির হতো।এদের চলাফেরার গতি ও নিশানা এক। কঠোরভাবে চেইন অব কমান্ড বা নেতৃত্ব অনুসরণকারী। কোথায় যাবে, কী কাজে যাবে, তা এদের সবার জানার বিষয় নয়। দু-চারজন নেতার কমান্ডে তারা কমান্ডো ফোর্সের মতো যেকোনো অপারেশনে ঝাঁপিয়ে পড়তে কুণ্ঠিত হয় না, কোনো দ্বিধায় ভোগে না। এদের কাজ হলো কমান্ড মানা, ন্যায়-অন্যায় দেখবেন নেপথ্যের কারিগরগণ। এভাবেই বছর দেড়েকের একটা উদ্ভট, ভৌতিক ও অনভিজ্ঞ ইউটোপিয়ান সরকারের অস্তিত্ব গোটা জাতি দেখেছিল।২.সেকালে মবদের হাইকমান্ডের সঙ্গে নিয়মিত সভা, নীতিনির্ধারণী আলোচনা, গ্রামে-গঞ্জে অ্যাটাকের কলাকৌশল, আর্থিক সহায়তা, নিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয়ে নিয়মিত ব্রিফিং দেওয়ারও ব্যবস্থা ছিল। সে সময় শাহবাগের মোড়ে মব বাহিনী অবস্থান করলে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে অসংখ্য জনহিতৈষী ব্যক্তি এসে খাবার, পানীয়—সবই সরবরাহ করতেন। তাদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে সরকারি নীতিমালা বাস্তবায়নের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেন। একসময় মবরা খণ্ড খণ্ড দলে বিভক্ত হয়ে একক পর্যায়ে রাজপথ ত্যাগ করত এবং অদৃশ্য হয়ে মিলিয়ে যেত।দেখা গেছে, দ্রুততম সময়ে যোগ দিতে মেট্রোরেল ব্যবহার করে শাহবাগ চত্বরে নেমে পড়ত। প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় মবদের সার্বক্ষণিক খবরাখবর নিতেন, এদের নিরাপত্তার যথাযথ তদারকি করতেন। তা ছাড়া, মব আন্দোলনের নির্ধারিত স্থানগুলো থেকে প্রধান উপদেষ্টা মহোদয়ের সরকারি বাসভবন ছিল খুবই কাছাকাছি দূরত্বের মধ্যে। এদের দেখভালের জন্য তিনি একাধিক ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকেও দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন। এমনকি প্রধান উপদেষ্টা স্বয়ং মবের সেক্টর কমান্ডারদের সঙ্গে পৃথক পৃথক সভা করে এদের রণনীতি, রণকৌশল সম্পর্কে খুব ধীরস্থির, ঠান্ডা মাথায় তার অশীতিপর অভিজ্ঞতার নির্যাস ঢেলে দিতেন। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ করে ভেসে আসত।মানুষের স্মৃতি দুর্বল না হলে বা স্মৃতি বেইমানি না করলে ২০২৫ সালের কথা এত তাড়াতাড়ি ভোলার নয়। মজার বিষয় ছিল, তিনি রাস্তায় মব নামিয়ে গণদাবির মহড়া প্রদর্শন করাতেন। বলতেন, এটা আজই গেজেটে প্রকাশ করুন, জনগণ রাস্তায় অনশন করছে, পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন হচ্ছে। আরও অনেক বিচিত্র নাটকীয়তা একটা জাতি দেখেছিল।৩.সেকালের মবরা এখনো ঢাকা শহরে বসবাস করছে। তারা বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, হল, কলেজের হোস্টেল, মাদ্রাসা, লাইব্রেরি, বইবিতানসহ নানা স্থানে বিচরণ করছে। সংকেত পেলেই নাশকতার মতো কাজে নেমে আসবে। তারা দেশের জেলা শহরগুলোতে থেকেও হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে, কখনো সরবে, কখনো নিভৃতে দায়িত্ব পালন করে চলেছে। ওপরের নির্দেশ পেলেই এরা কাজে নামে। রাজধানীকে তারা কেন্দ্রস্থল ধরে এবং জেলা শহরকে প্রান্ত বিবেচনা করছে। কেন্দ্রের নির্দেশনা পালন করেই তারা চলে। এতে কেন্দ্র-প্রান্ত সম্পর্কে কোনো ভাটা পড়ছে না।কিছুদিন পূর্বে হবিগঞ্জ জেলার একজন মব স্টারের বক্তব্য সারা দেশবাসী দেখেছে। সে কত অকুতোভয় এবং আত্মবিশ্বাসী, তা তো ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চোখের সামনেই। একজন পুলিশ অফিসারকে পুড়িয়ে মারার অকপট স্বীকারোক্তির কথা কেউ ভুলতে পারবে না। মনে হয়, মবরা এ মুহূর্তে অলস সময় কাটাচ্ছে, তারা মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় আছে। সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি লাগানো মেয়েটার কথা বলা যায়। তাকে পুলিশে ধরার পরে সে বলেছে, ‘আমি এত কিছু জানতাম না, আমাকে ওরা বলেছে, আমি করেছি।’ মবদের সাধারণ চরিত্র এমনই, এরা জানে না এরা কী করে, কার জন্য করে।৪.অথচ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরীণ কর্মে নেহাত অনভিজ্ঞ ব্যক্তিটি মনে করতেন, এ দেশে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেনাবাহিনী/সুপ্রিম আর্মড ফোর্স—এসবের ভরসায় থাকলে ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না। এগুলো থাকবে আইনি কাঠামোর বিধিবদ্ধ নিয়মের বেড়াজালে। প্রকৃত জুলাইযোদ্ধার সঙ্গে আজগুবিভাবে জন্ম নেওয়া ও তাৎক্ষণিক গজিয়ে ওঠা স্কুল-কলেজের বারান্দায় থাকা বা বিপথগামী তরুণেরাই মূল নিয়ামক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি এদের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা না ভেবে, প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার অপকর্মে এদের জড়িত করেন। যার তুল্যমূল্য খেসারত এ জাতিকে হয়তো আরও কয়েক বছর দিয়ে যেতে হবে।মবরা এখন সারা দেশে রাজনৈতিক দলের অচেনা, একেবারে পাতি নেতাদেরও ডান হাত হিসেবে কাজ করে চলেছে। তারা এদের বিশেষ কোনো অ্যাসাইনমেন্ট যেমন- বাড়ি, জমি, দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের কাজ দিলে হোন্ডার বহর নিয়ে পৌঁছে যায় এবং নিমিষে একটা সফল রিপোর্ট জমা দিতে পারে। তাদের দরকার টাকা, মোটরবাইক, জ্বালানি ও নেশার অর্থের জোগান ইত্যাদি। একটা বিরাট অংশ হয়তো জানেই না সে কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে। সমাজে এদের মা-বাবাও চরম হতাশ, নিয়ন্ত্রণহীন, উচ্ছন্নে যাওয়া সন্তান। এসব নিয়ে ভাবনার সময় চলে যাচ্ছে, দেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রায় হারিয়ে গেছে।কিশোর গ্যাং এবং মব অপরাধীরা হাটে, মাঠে-ঘাটে, স্টেশনে সর্বত্র বিরাজমান। শাসন করার কোথাও কেউ নেই, উল্টো তারা থানা-পুলিশের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে জড়াচ্ছে, দালালি করার কলাকৌশল শিখে গেছে, জনপ্রতিনিধিদের কাছে অযাচিত গুরুত্ব পাচ্ছে। কেউ জানতে চাইছে না তারা পড়াশোনা করছে কি না, কোথায় পড়ে, কোথাকার ছাত্র। সবাই এদের বাহবা দিচ্ছে, ‘ওয়েল ডান’ বলে পিঠে হাত রাখছে। তারাও দ্বিগুণ উৎসাহ-উদ্দীপনায় পরবর্তী মিশনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এভাবেই জাতির ভবিষ্যৎ তরুণেরা আজ সর্বনাশের কিনারে দাঁড়িয়ে। আর এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় মুহাম্মদ ইউনূসের হাত ধরে, তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে।৫.সম্প্রতি ইউরোপ ও আমেরিকায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টার ওপর মব অ্যাটাকের মতো ঘটনা ঘটেছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে একদল বাংলাদেশি তাকে খুনি, গণতন্ত্র হত্যাকারী, পুলিশ হত্যাকারী, শিশু হত্যাকারী, প্রতারক ইত্যাদি বলে অশোভন ভাষায় চিৎকার করে গালমন্দ করেছে। তাদের মারমুখী আচরণ করতেও দেখা গেছে। এখন মনে হয়, এগুলো তার স্রেফ নিয়তি নয়, বরং প্রাপ্য। এ পৃথিবীতে কে কার ক্ষতি করবে, কেউ জানে না। সম্মান দেওয়া-নেওয়ার মালিকও অদৃশ্য। বিশ্বব্যাপী অনবরত ঘুরে বেড়ানো এই মহান নোবেলজয়ী ও মাইক্রোক্রেডিট বিশেষজ্ঞের আগামী দিনগুলো কীভাবে কাটবে, তা কেবল সময়ই বলে দিতে পারে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার ও প্রাবন্ধিক]

ব্যাংক খাতের সংস্কারে চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা

বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সংস্কারের বিকল্প নেই। ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় সরকারের সংস্কার কর্মসূচির বিভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। আর্থিক খাতের সংস্কার, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, বন্ধ কলকারখানা চালু এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো দেশের মানুষেরও প্রত্যাশা। তবে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব সরকারের। আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্ত পূরণের জন্য নয়, জাতীয় স্বার্থেই আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।আগের ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করে। পরে কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। সাত কিস্তিতে অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও পাঁচ কিস্তিতে এসেছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা, করছাড় যৌক্তিক করা, রাজস্বনীতি ও রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম আলাদা করা এবং ভর্তুকি কমানোর মতো শর্তগুলো যথাসময়ে পূরণ হয়নি। পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও কঠিন শর্তের কারণে বর্তমান সরকার পুরোনো কর্মসূচি এগিয়ে নিতে আগ্রহী হয়নি। এখন তিন বছর মেয়াদি নতুন কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ নিয়ে আলোচনা চলছে। শর্ত নিয়ে দর-কষাকষির পাশাপাশি সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।পুরোনো কর্মসূচির যেসব সংস্কার অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাজস্ব আদায় বাড়ানো, করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, অযৌক্তিক করছাড় কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। একইভাবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করতে কার্যকর আইন ও তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতীতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার, করছাড় যৌক্তিক করা এবং বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার মতো উদ্যোগ প্রত্যাশিত অগ্রগতি পায়নি। ফলে রাজস্ব আয়ের ঘাটতি ও সরকারি ব্যয়ের চাপ সামলাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এসব সংস্কার আবারও পিছিয়ে দিলে নতুন ঋণ কর্মসূচিও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংকট আরও গভীর। অতীতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্বল তদারকি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা দেওয়ার কারণে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বেরিয়ে গেছে। এর ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। খেলাপি ঋণের বড় অংশ মাত্র কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। এই পরিস্থিতির দায় এড়াতে পারে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো। ব্যাংকের মালিকানা ও ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করা, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং আর্থিক অপরাধের তদন্ত নিশ্চিত করা এখন অপরিহার্য।ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটিয়ে তুলতে সাধারণ মানুষের করের টাকা ব্যবহারের প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বিপর্যস্ত ব্যাংক খাতের ক্ষতি সামাল দিতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর প্রতিবছর প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ ব্যাংকের অনিয়ম ও লুটপাটের বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু জনগণের অর্থ ব্যয় করার আগে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—এই ক্ষতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? ব্যাংক লুটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পদ উদ্ধার, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা এবং অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত না করে সাধারণ মানুষের করের টাকা দিয়ে ক্ষতি পূরণ করা ন্যায়সংগত হতে পারে না।বিশ্বব্যাংকের ৪৫ কোটি ডলারের একটি কর্মসূচিতে আমানত সুরক্ষা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ব্যাংক পুনর্গঠনের প্রস্তুতির মতো বিষয় রয়েছে। তবে ব্যাংক খাতের সব ক্ষতি মেটানোর জন্য এ অর্থ দেওয়া হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংস্কার ও জবাবদিহির শর্ত আরোপ করে। জনগণের অর্থ ব্যাংক পুনরুদ্ধারে ব্যয় করলেও একই ধরনের শর্ত থাকা উচিত। কোন ব্যাংককে কেন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, অর্থ কীভাবে ব্যবহার হবে, কী সংস্কার করা হবে এবং প্রত্যাশিত ফল না এলে কারা দায় নেবে—এসব বিষয় স্পষ্ট করতে হবে।সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশের পরিবর্তে বর্তমান সরকার যে আইন করেছে, তাতে পুরোনো মালিকদের আবার মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টিকারী একটি ধারা যুক্ত হয়েছিল। সমালোচনার মুখে পরে তা বাতিল করা হয়। এ ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ব্যাংক খাতের সংস্কারে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বেসরকারি ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সেই ব্যবস্থা ফিরে এলে সংস্কারের সুফল মিলবে না।নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আর্থিক খাত সংস্কার কমিশন গঠন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার বিষয়েও সরকারের অগ্রগতি দেখানো প্রয়োজন। ব্যাংক খাতের নীতিনির্ধারণ ও তদারকিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ঋণখেলাপি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু দুর্বল ব্যাংক একীভূত করলেই সংকটের সমাধান হবে না; ব্যাংকের সম্পদের মান, ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। সরকারি হিসাবে, দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ, ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেশের সম্পদের পরিমাণ ৫৭ হাজার ৩২৫ কোটি টাকার বেশি। এসব সম্পদ আইনগত প্রক্রিয়ায় উদ্ধার করা গেলে ব্যাংক খাতের ক্ষতি সামাল দিতে সহায়তা পাওয়া সম্ভব। তবে শুধু টাস্কফোর্স গঠন বা সম্পদ জব্দের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। অর্থ ফেরত আনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং উদ্ধার করা অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত তথ্য দিতে হবে।মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ ১৯৯৭ সালের আর্থিক সংকটের পর ব্যাংক খাতে সংস্কার করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। ব্যাংক পুনরুদ্ধারে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা দরকার। ব্যাংক বাঁচাতে জনগণের অর্থ ব্যবহার করা হলে সেই অর্থের বিনিময়ে কী সংস্কার হবে, কত দিনে ফল পাওয়া যাবে এবং ব্যর্থতার দায় কার—তা আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে।ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নতুন ঋণ নিয়ে সাময়িক চাপ সামাল দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করলে সংকট আবারও ফিরে আসবে। তাই ঋণচুক্তির পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের অর্থে ব্যাংক খাতের ক্ষতি পূরণ করতে হলে তার আগে দায়ীদের জবাবদিহি ও সংস্কারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। জাতীয় স্বার্থেই ব্যাংক ও আর্থিক খাতে কার্যকর সংস্কার এখন সময়ের দাবি।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

ভিডিও আরও দেখুন

জাতীয় প্রেসক্লাবের শুটিং প্রতিযোগিতায় প্রথম তাওরাতুল

জাতীয় প্রেসক্লাবের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এয়ারগান শুটিং প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছেন তাওরাতুল ইসলাম লিখন। তিনি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (এআইইউবি) কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী।লিখন দৈনিক সংবাদ-এর সিনিয়র রিপোর্টার মহসীন ইসলাম টুটুলের ছোট ছেলে। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শুটিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করার স্বপ্ন দেখেন।শনিবার (১৭ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবে দুই দিনব্যাপী ‘শিশু আনন্দমেলা’র সমাপনী দিনে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ ও সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া। এসময় উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়া উপকমিটির আহ্বায়ক শাহনাজ বেগম পলি।এর আগে শিশু আনন্দমেলার উদ্বোধন করেন জাতীয় প্রেসক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গণি চৌধুরী। সমাপনী দিনে শিশুদের জন্য দৌড়, অংক দৌড় ও বিস্কুট দৌড়সহ বিভিন্ন খেলার আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া নারী সদস্যদের জন্য ছিল পিলোপাসিং ও দড়ি টানাটানি প্রতিযোগিতা।বিকেলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিল্পী ও শিশুদের পরিবেশনার পাশাপাশি ছিল বরেণ্য জাদুকর জুয়েল আইচের জাদু প্রদর্শনী, যা উপস্থিত শিশুদের মুগ্ধ করে।অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ বখতিয়ার রাণা, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য কাজী রওনাক হোসেন, মোহাম্মদ মোমিন হোসেন এবং এ কে এম মহসীন। ক্রীড়া উপকমিটির সদস্যসহ ক্লাবের বিপুলসংখ্যক সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

জাতীয় প্রেসক্লাবের শুটিং প্রতিযোগিতায় প্রথম তাওরাতুল