সংবাদ
মণ্ডপ দেখতে আজ রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

মণ্ডপ দেখতে আজ রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

দুর্গাপূজা উপলক্ষে মণ্ডপ পরিদর্শন ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সরকারপ্রধান ঢাকার বাইরে জেলা পর্যায়ে পূজা মণ্ডপ পরিদর্শনে যাচ্ছেন।প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন সোমবার এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার সকাল ৯টায় তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সামরিক বিমানে করে প্রধানমন্ত্রী তার এই সংক্ষিপ্ত সফর শুরু করবেন।সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সকালে প্রথমে রংপুরে যাবেন। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পূজা মণ্ডপগুলো পরিদর্শন করবেন তিনি। মণ্ডপগুলোতে তিনি পূজারিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করবেন এবং শারদীয় শুভেচ্ছা জানাবেন। তিন জেলা সফর শেষে কাল রাতেই প্রধানমন্ত্রীর ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ‘এটি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এর আগে বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধান ঢাকার বাইরে এভাবে পূজা মণ্ডপ পরিদর্শনে যাননি। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে পূজারিদের খোঁজখবর নিতে এবং উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে এই সফর করছেন।’এর আগে গত র‌বিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর মহাখালী ও বনানী এলাকার পূজা মণ্ডপ পরিদর্শন করেন। সে সময় তার সঙ্গে তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমানও উপস্থিত ছিলেন।উল্লেখ্য আজ মঙ্গলবার দুর্গাপূজার মহানবমী। পরদিন বুধবার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় এই ধর্মীয় উৎসব। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
৫৯ মিনিট আগে

মণ্ডপ দেখতে আজ রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

মণ্ডপ দেখতে আজ রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

‘জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে’

‘জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে’

‘পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কাজ করছে’

‘পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কাজ করছে’

এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে এবার মুখ খুললেন পরীমনি

এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে এবার মুখ খুললেন পরীমনি

সালমানের গ্যালাক্সিতে পুলিশি পাহারায় কড়াকড়ি

সালমানের গ্যালাক্সিতে পুলিশি পাহারায় কড়াকড়ি

ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের দিলীপ আগারওয়ালা ডিবির হাতে পুনরায় গ্রেপ্তার

ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের দিলীপ আগারওয়ালা ডিবির হাতে পুনরায় গ্রেপ্তার

টাইগার শ্রফের ওপর হামলার দায় স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

টাইগার শ্রফের ওপর হামলার দায় স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এখনো বাকি

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এখনো বাকি

সৌদি আরবে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: রিয়াদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে ঢাকা

সৌদি আরবে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: রিয়াদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে ঢাকা

রাড্ডা এমসিএইচ কেন্দ্রে তাণ্ডবের ঘটনায় শুটার লেলিন গ্রেপ্তার

রাড্ডা এমসিএইচ কেন্দ্রে তাণ্ডবের ঘটনায় শুটার লেলিন গ্রেপ্তার

মতামতমতামত

লালনের সেই সোনার মানুষ কই

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—মরমি সাধক ফকির লালন শাহের এই বাণী কেবল গানের পঙ্‌ক্তি নয়, মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পাওয়ার আহ্বান। জাতপাত, ধর্মীয় বিভেদ, সামাজিক বৈষম্য ও অহংকারের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা।অথচ লালনের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে তিন দিনব্যাপী মেলায় গিয়ে প্রশ্ন জেগেছে—লালনের গান ও উৎসব আছে, কিন্তু তার দর্শনের প্রতিফলন কোথায়?এই প্রশ্নের সঙ্গে সোমবারের (১৯ অক্টোবর) উদ্বেগজনক ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সকালে ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়ির প্রবেশপথের পাশ থেকে একটি টাইম বোমা ও পেট্রলভর্তি দুটি বোতল উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরে পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল সন্দেহজনক বস্তুটি পরীক্ষা করে নিষ্ক্রিয় করে। এ ঘটনায় মাজার ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাধুদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়। যে আখড়াবাড়িতে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে মানবতার বাণী শোনার কথা, সেখানে এমন বিপজ্জনক বস্তু উদ্ধারের ঘটনা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।গানের চেয়েও বড় জীবনদর্শনফকির লালন শাহ, যিনি লালন সাঁই নামেও পরিচিত, ছিলেন বাংলার মরমি সাধক, বাউলগানের রচয়িতা ও মানবতাবাদী দার্শনিক। তার জন্মসাল ও জন্মস্থান নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বহুল প্রচলিত মত অনুযায়ী, তার জন্ম ১৭৭৪ সালে। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় তিনি তিরোধান করেন।লালনের গুরুত্ব শুধু তার গানের সুরে নয়, গানের অন্তর্নিহিত জীবনদর্শনে। ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’—এই গানের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের পরিচয়, জাতপাতের বিভাজন এবং সামাজিক সংকীর্ণতাকে প্রশ্ন করেছেন। তার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, আত্মোপলব্ধি, সাম্য, সহমর্মিতা ও অন্তরের শুদ্ধতা। বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষের প্রকৃত মূল্য তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের ধর্মীয় পরিচয় দেখে তাকে ছোট করা, সামাজিক অবস্থান দিয়ে মর্যাদা নির্ধারণ করা কিংবা নিজের অহংকারকে সত্যের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া—এসব প্রবণতার বিপরীতে লালনের দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লালনের গানের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন এবং তার গান বৃহত্তর শিক্ষিত সমাজে পরিচিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু লালনকে যথার্থভাবে বোঝার জন্য তার গান শোনাই যথেষ্ট নয়; গানের ভেতরের প্রশ্নগুলো নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করাও জরুরি।দর্শনের চর্চা কোথায়লালনের তিরোধান দিবস উপলক্ষে প্রতিবছর ছেঁউড়িয়ায় বাউল, সাধক, ভক্ত, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। গান, সাধুসঙ্গ ও লোকসংস্কৃতির এই আয়োজন বাংলার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মেলায় মানুষের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা কিংবা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কোনো দোষ নেই।সাধুসঙ্গকিন্তু উৎসবের আকার বড় হলেই কি লালনের দর্শনের চর্চা বাড়ে? মেলায় গিয়ে আমার উপলব্ধি হয়েছে, লালনের মানবতাবাদ, জাতপাতবিরোধী অবস্থান ও আত্মোপলব্ধির দর্শন নিয়ে গভীর আলোচনা যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, তার তুলনায় গান, দর্শনার্থীদের ভিড় ও বাণিজ্যিক তৎপরতাই বেশি দৃশ্যমান।লালনের নামে মঞ্চ তৈরি করা সহজ; তার আদর্শে নিজেকে গড়ে তোলা কঠিন। তার গান গাওয়া সহজ; নিজের ভেতরের বিদ্বেষ, লোভ, অহংকার ও সংকীর্ণতাকে প্রশ্ন করা কঠিন। আখড়াবাড়ি কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়, এটি সাধন-ঐতিহ্যের কেন্দ্র। এখানে গান ও উৎসবের পাশাপাশি সাধুসঙ্গ, দর্শনভিত্তিক আলোচনা, গবেষণা এবং আত্মজিজ্ঞাসার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। কত মানুষ এলেন, তার পাশাপাশি কত মানুষ লালনের দর্শন বুঝলেন এবং নিজেদের আচরণে তার প্রতিফলন ঘটালেন—সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।লালনের মেলায় বাণিজ্য, মানুষের প্রতি দায় কতটুকু? তিরোধান দিবসের আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। পরিবহন, খাবার, আবাসন ও হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের ব্যবসা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু উৎসবের সুযোগ নিয়ে খাবারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো কিংবা আবাসিক হোটেলের ভাড়া কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য দুর্ভোগ তৈরি করতে করেছে।মেলায় গিয়ে আমার অভিজ্ঞতায় এসব বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। উৎসবের সময় চাহিদা বাড়লেও মানুষের অসহায়ত্বকে ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখা কতটা মানবিক? লালনের দর্শন যদি আয়োজনের ব্যবস্থাপনাতেই প্রতিফলিত না হয়, তাহলে শুধু তাঁর নামে উৎসব করলেই কি সেই দর্শনের প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো হয়?স্মরণ নয়, ধারণ করতে হবেলালনকে নিয়ে গবেষণা মানে শুধু তার জীবনের তথ্য সংগ্রহ কিংবা গানের সুর বিশ্লেষণ নয়। তার দর্শনের সামাজিক তাৎপর্য অনুধাবন করাও জরুরি। জাতপাত, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, শ্রেণিবৈষম্য ও মানুষের প্রতি মানুষের অবজ্ঞার মধ্যে লালনের চিন্তা কীভাবে প্রাসঙ্গিক, তা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। লালন কেবল গানের মানুষ নন; তিনি প্রশ্ন করার মানুষ। তিনি প্রচলিত সামাজিক বিভাজনকে প্রশ্ন করেছেন, মানুষের অন্তর্গত সত্তাকে চিনতে আহ্বান জানিয়েছেন। তার দর্শনকে মঞ্চ, মাইক, একতারা কিংবা উৎসবের ব্যানারে আটকে রাখলে তার প্রতি যথার্থ সম্মান জানানো হয় না।লালনের গান গাইব, অথচ মানুষের ধর্মীয় পরিচয় দেখে তাকে ছোট করব; তার মানবতার বাণী প্রচার করব, অথচ অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখাব না—এ কেমন লালনচর্চা?সেই সোনার মানুষ কই?ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস আমাদের সামনে আবারও প্রশ্ন তুলেছে—আমরা লালনকে কতটা ধারণ করি? গান হোক, উৎসব হোক, সাধুসঙ্গ হোক, গবেষণা হোক—সবকিছুর কেন্দ্রে থাকুক মানুষ। লালনের দর্শন ধারণ করা মানে মানুষের প্রতি বিদ্বেষ কমানো, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের পরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং নিজের ভেতরের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে লড়াই করা।আখড়াবাড়িতে লেখক (বাম দিকে)।১৯ অক্টোবরের ঘটনাটি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসুক, অপরাধীরা শনাক্ত হোক এবং মাজারে আগত সাধু-ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। একই সঙ্গে এই দিনটি আমাদের বিবেকের কাছেও একটি প্রশ্ন রেখে যাক: লালনের স্মৃতিকে আমরা কতটা মর্যাদা দিতে পেরেছি? তার মানবতাবাদী আদর্শ আমাদের সমাজে কতটা জীবন্ত? উৎসবের আলো একসময় নিভে যাবে, মেলার দোকানপাট উঠে যাবে, দর্শনার্থীরা ফিরে যাবেন নিজ নিজ গন্তব্যে। কিন্তু লালনের দর্শন কি তাদের সঙ্গে ফিরবে? তাদের চিন্তা, আচরণ ও সামাজিক সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আনবে?লালনের সেই ‘সোনার মানুষ’ কোনো বিশেষ পোশাকের মানুষ নন, কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ নন। তিনি সেই মানুষ, যাঁর মধ্যে রয়েছে মানবিকতা, বিবেক, ভালোবাসা ও অন্যের প্রতি সম্মান। তাই এত মানুষের ভিড়ে আমার প্রশ্ন থেকেই যায়—লালন মেলায় সেই সোনার মানুষ কই?লালনের নামে উৎসব হোক, গান হোক, সাধুসঙ্গ হোক, গবেষণা হোক। কিন্তু তার দর্শন বেঁচে থাকুক আমাদের হৃদয়ে, আচরণে ও সমাজে। কারণ লালনকে স্মরণ করার চেয়ে তাকে ধারণ করা অনেক বেশি জরুরি।লেখক: নাসির উদ্দিন পাঠান, গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা।

খাদ্যনিরাপত্তায় উৎপাদনের পাশাপাশি চাই পুষ্টি ও সুরক্ষা

খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত, মৌলিক অধিকার এবং সুস্থ, মর্যাদাপূর্ণ ও কর্মক্ষম জীবনের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তা বলতে কেবল মানুষের পেট ভরানোর মতো খাবারের জোগান নিশ্চিত করাকে বোঝায় না। খাদ্য হতে হবে পর্যাপ্ত, সহজলভ্য, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও পুষ্টিকর। সেই সঙ্গে খাদ্যপ্রাপ্তির সুযোগ এমন হতে হবে, যাতে আয়, শ্রেণি, লিঙ্গ, অঞ্চল কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে কেউ পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত না হন। অতএব, খাদ্যনিরাপত্তা একই সঙ্গে কৃষি, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।বাংলাদেশ গত পাঁচ দশকে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যপ্রাপ্যতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধান উৎপাদনে সাফল্য, মাছ, ডিম ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি, কৃষিপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের নিরলস পরিশ্রম দেশের খাদ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন ও জটিল সংকটও দেখা দিয়েছে। খাদ্যের দাম ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধান, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, কৃষিজমির সংকোচন, খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ, পুষ্টিহীনতা, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তার এবং খাদ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।ফলে আজ বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে কি না; বরং প্রশ্ন হলো, প্রত্যেক মানুষ কি সারা বছর সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পাচ্ছেন? কৃষক কি তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন? ভোক্তা কি খাবারের প্রকৃত গুণমান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানতে পারছেন? আর রাষ্ট্র কি খাদ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে পারছে?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে খাদ্যনিরাপত্তাকে একটি সমন্বিত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।খাদ্যনিরাপত্তার ধারণা: খাদ্য থাকা আর খাদ্য পাওয়ার মধ্যে পার্থক্যজাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা—এফএওর স্বীকৃত ধারণা অনুযায়ী, খাদ্যনিরাপত্তা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সব মানুষ সব সময় সক্রিয় ও সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পাওয়ার বাস্তব সুযোগ রাখেন। এ ধারণার চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ রয়েছে—খাদ্যের প্রাপ্যতা, খাদ্য সংগ্রহের সামর্থ্য, খাদ্যের যথাযথ ব্যবহার ও পুষ্টিমান এবং সময়ের সঙ্গে খাদ্যপ্রাপ্তির স্থিতিশীলতা।খাদ্যের প্রাপ্যতা বলতে বোঝায় দেশে উৎপাদন, আমদানি ও মজুতের মাধ্যমে পর্যাপ্ত খাদ্যের জোগান থাকা। কিন্তু বাজারে খাদ্য থাকলেই প্রত্যেক মানুষ তা কিনতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। খাদ্যের দাম যদি পরিবারের আয়কে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে বাজারে পণ্য থাকা সত্ত্বেও সেই পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। আবার খাবার পাওয়া গেলেও তা দূষিত, ভেজালযুক্ত কিংবা পুষ্টিগতভাবে অপর্যাপ্ত হলে মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হয় না।এখানে স্থিতিশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পরিবার স্বাভাবিক সময়ে খাবার কিনতে পারলেও বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, বেকারত্ব, অসুস্থতা কিংবা দ্রব্যমূল্যের আকস্মিক বৃদ্ধির সময় খাদ্য কেনার সামর্থ্য হারাতে পারে। খাদ্যনিরাপত্তা তাই এক দিনের বা এক মৌসুমের অর্জন নয়; এটি সারা বছর ধরে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার বিষয়।খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে খাদ্য সুরক্ষা বা নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। খাদ্যনিরাপত্তা মূলত পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা বোঝায়; অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্য বলতে এমন খাদ্য বোঝায়, যা উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রস্তুতির বিভিন্ন পর্যায়ে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য ও নিরাপদ রাখা হয়েছে। এই দুই ক্ষেত্রকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পর্যাপ্ত খাবার থাকলেও তা নিরাপদ না হলে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।বৈশ্বিক খাদ্যসংকট ও বাংলাদেশের বাস্তবতাবিশ্বে কৃষি উৎপাদন, প্রযুক্তি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হলেও ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর The State of Food Security and Nutrition in the World 2024 প্রতিবেদনে ২০২৩ সালে প্রায় ৭৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষের ক্ষুধার্ত থাকার হিসাব তুলে ধরা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে প্রায় ২৮০ কোটির বেশি মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য না থাকার বিষয়টিও উঠে আসে।এই সংকটের পেছনে শুধু খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি দায়ী নয়। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংঘাত, দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং খাদ্যবাজারের অস্থিরতা এর সঙ্গে জড়িত। কোথাও খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে, কিন্তু সংঘাতের কারণে তা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না; কোথাও খাদ্য আছে, কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা নেই; আবার কোথাও পুষ্টিকর খাবারের তুলনায় সস্তা ও নিম্নমানের খাবারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়। দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, নিম্ন আয়ের মানুষের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা এবং আয়বৈষম্য খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অসমতা তৈরি করে। একজন সচ্ছল মানুষের জন্য যে খাদ্যতালিকা সহজলভ্য, একজন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের জন্য তা অনেক সময় নাগালের বাইরে থাকে।বিশেষত চালের ওপর অতিনির্ভরতা, খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, দুধ, ডিম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের সীমিত উপস্থিতি এবং পরিবারের খাদ্য ব্যয়ের বড় অংশ মৌলিক খাদ্যে ব্যয় হওয়ার কারণে পুষ্টিনিরাপত্তা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে খাদ্য উৎপাদনের সাফল্যকে মানুষের পুষ্টিগত অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করা জরুরি।উৎপাদনে সাফল্য, তবু কেন খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ?বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। স্বাধীনতার পর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চফলনশীল জাত, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, সার ও কৃষি উপকরণের ব্যবহার, কৃষি গবেষণা এবং কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও শ্রমের ফলে ধান উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। মাছ, ডিম, মুরগি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদনেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।তবে কৃষি উৎপাদনের সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সহজ নয়। কৃষিজমি কমে যাওয়া, জমির খণ্ডিত মালিকানা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিকসংকট, সেচের পানির প্রাপ্যতা, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কৃষকের আয় ও উৎপাদনব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।অনেক ক্ষেত্রে কৃষক উৎপাদন ব্যয় অনুযায়ী ন্যায্য মূল্য পান না, অথচ ভোক্তাকে একই পণ্য বেশি দামে কিনতে হয়। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যবর্তী সরবরাহব্যবস্থায় অদক্ষতা, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণের ঘাটতি এবং বাজার তদারকির দুর্বলতা এই ব্যবধান বাড়াতে পারে।কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হলে পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদনে বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যায়। অন্যদিকে, ভোক্তার কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য পৌঁছাতে না পারলে খাদ্যপ্রাপ্যতা বাধাগ্রস্ত হয়। তাই কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে ন্যায্য ও কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত নীতির লক্ষ্য।এ জন্য কৃষিপণ্যের সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনা, বাজারদর ও আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করতে হবে। পাশাপাশি কৃষক সমবায়, উৎপাদক সংগঠন, কৃষিপণ্যের স্থানীয় বাজার এবং সরাসরি বিপণনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।জলবায়ু পরিবর্তন: খাদ্যনিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি হুমকিবাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদন ও নিরাপদ পানির প্রাপ্যতাকে কঠিন করে তুলছে। লবণাক্ত জমিতে প্রচলিত ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে; আবার পানির সংকট, দুর্যোগে ফসলহানি এবং জীবিকার অনিশ্চয়তা দরিদ্র পরিবারগুলোকে বাড়তি ঝুঁকিতে ফেলে।হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা ধানের ফসল নষ্ট করতে পারে। চরাঞ্চলে নদীভাঙন মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি কেড়ে নেয়। উত্তরাঞ্চলে খরা ও তাপপ্রবাহ কৃষি উৎপাদন এবং সেচের ব্যয় বাড়াতে পারে। দুর্যোগের ক্ষতি শুধু মাঠের ফসলেই সীমাবদ্ধ থাকে না; খাদ্য পরিবহন, বাজার, গবাদিপশু, মৎস্যসম্পদ এবং পরিবারের আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এখন আর ঐচ্ছিক কোনো কর্মসূচি নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। লবণাক্ততা, খরা ও বন্যাসহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, পানিসাশ্রয়ী সেচ, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাসভিত্তিক কৃষি পরামর্শ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী দ্রুত পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না; কৃষক যেন প্রয়োজনীয় বীজ, প্রশিক্ষণ, ঋণ ও বাজারসুবিধা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।একই সঙ্গে ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। খাদ্যব্যবস্থাকে শুধু ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল রাখলে পুষ্টি, মাটির স্বাস্থ্য ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ডাল, তেলবীজ, ফলমূল, শাকসবজি, মাছ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ: নীরব জনস্বাস্থ্যঝুঁকিখাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো খাদ্যদূষণ ও ভেজাল। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিক্রয় ও রান্না—প্রতিটি পর্যায়ে অসতর্কতা, অনিয়ম কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহারের কারণে খাদ্য অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।রাসায়নিক দূষণ, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু, অননুমোদিত রং, অনুপযুক্ত সংরক্ষণকারী পদার্থ এবং জীবাণুজনিত দূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি, নিরাপদ পানির অভাব, কাঁচা ও রান্না করা খাবার একসঙ্গে রাখা এবং সঠিক তাপমাত্রায় খাদ্য সংরক্ষণ না করাও খাদ্যবাহিত অসুস্থতার কারণ হতে পারে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বহুল উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হন এবং প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই পরিসংখ্যান নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বৈশ্বিক গুরুত্ব তুলে ধরে।বাংলাদেশে খাদ্যবাজারের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ এবং কার্যকর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। কোনো পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেলে শুধু জরিমানা করেই দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়; দূষণের উৎস শনাক্ত, সরবরাহব্যবস্থা অনুসন্ধান এবং প্রয়োজন হলে পণ্য প্রত্যাহারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।তবে খাদ্যে ভেজালের বিষয়ে প্রচারিত বিভিন্ন পরিসংখ্যান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। কোন পণ্য, কোন এলাকা, কোন সময় এবং কী পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়েছে—এসব তথ্য ছাড়া একটি নমুনার ফলাফলকে পুরো দেশের খাদ্যবাজারের চিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। নির্ভরযোগ্য তথ্য ও স্বচ্ছ পরীক্ষণব্যবস্থাই জনআস্থা বাড়ানোর ভিত্তি।খাদ্য নিরাপদ রাখার দায়িত্ব শুধু বিক্রেতার নয়। কৃষক, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহনকারী, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা, রেস্তোরাঁ, সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ভোক্তা—সবার দায়িত্ব রয়েছে। তবে দায়িত্বের এই বণ্টন যেন উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের আইনগত দায়কে দুর্বল না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিহীনতা: পেট ভরলেই সুস্থতা আসে নাএকটি দেশের খাদ্যব্যবস্থা সফল কি না, তা শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি রয়েছে কি না, শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক হচ্ছে কি না, নারীরা পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছেন কি না এবং দরিদ্র পরিবারগুলো স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারছে কি না—এসব সূচকও সমান গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে শিশুদের খর্বাকৃতি, রক্তস্বল্পতা, অপুষ্টি এবং খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্যের ঘাটতি দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্যগত উদ্বেগ। বিশেষত গর্ভবতী নারী, দুগ্ধদানকারী মা, শিশু, কিশোরী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা পুষ্টির ঘাটতির ঝুঁকিতে বেশি থাকেন।শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিন—গর্ভধারণ থেকে দ্বিতীয় জন্মদিন পর্যন্ত—শারীরিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে শিশুর বৃদ্ধি, শেখার ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। তাই মাতৃপুষ্টি, বুকের দুধ খাওয়ানো, বয়স অনুযায়ী পরিপূরক খাবার, টিকাদান এবং সংক্রমণ প্রতিরোধকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাশ্রয়ী মূল্যে ডাল, ডিম, মাছ, দুধ, শাকসবজি ও ফলমূলের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। স্কুলের খাদ্য ও পুষ্টি কর্মসূচি, দরিদ্র পরিবারের সামাজিক সুরক্ষা, মাতৃ ও শিশুপুষ্টি কার্যক্রম এবং পুষ্টিশিক্ষাকে আরও কার্যকর করতে হবে।এখানে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা জরুরি: দরিদ্র পরিবারকে শুধু স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে পুষ্টিনিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। খাবার কেনার সামর্থ্য, বাজারে প্রাপ্যতা এবং নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত না হলে পুষ্টিশিক্ষার সুফল সীমিত থেকে যায়।অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তার: খাদ্যাভ্যাসের নতুন সংকটবাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তার আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে প্যাকেটজাত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তার। বিস্কুট, চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, মিষ্টি পানীয়, মিষ্টান্ন ও বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুত খাবার নগর ও গ্রাম—দুই এলাকাতেই সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। কর্মব্যস্ত জীবন, সহজে বহনযোগ্য খাবারের চাহিদা, বিজ্ঞাপন এবং পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস এই প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত।তবে সব প্রক্রিয়াজাত খাবারকে অস্বাস্থ্যকর বলা ঠিক নয়। দুধ পাস্তুরিত করা, খাবার হিমায়িত করা কিংবা নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উপকারী হতে পারে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন কিছু পণ্যের ব্যাপক গ্রহণ, যেগুলোতে অতিরিক্ত লবণ, মুক্ত চিনি, সম্পৃক্ত চর্বি বা ক্যালরি রয়েছে এবং যেগুলো পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যের জায়গা দখল করতে পারে।অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ ও বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে দ্য বিএমজেতে প্রকাশিত একটি ছাতাগবেষণায় অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বেশি সংস্পর্শের সঙ্গে একাধিক প্রতিকূল স্বাস্থ্যফলের সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয়। তবে এসব গবেষণার বড় অংশ পর্যবেক্ষণমূলক হওয়ায় সব ক্ষেত্রে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবি করা উচিত নয়। খাদ্যের উপাদান, গ্রহণের পরিমাণ, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং অন্যান্য জীবনযাপনগত বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে।তবু অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ কমানো জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত সোডিয়াম উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়; অতিরিক্ত মুক্ত চিনি দাঁতের ক্ষয়, অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ এবং ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত; আর সম্পৃক্ত চর্বির অতিরিক্ত গ্রহণ রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে। এসব ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অসংক্রামক রোগ মোট মৃত্যুর বড় অংশের জন্য দায়ী। তাই এসব রোগ প্রতিরোধে চিকিৎসাসেবার উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যপরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।খাবারের প্যাকেটে সতর্কবার্তা: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগখাদ্যের প্যাকেট হাতে নিয়ে একজন সাধারণ ভোক্তার পক্ষে কি সহজে বোঝা সম্ভব যে পণ্যটিতে অতিরিক্ত লবণ, চিনি কিংবা সম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে? প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষরে লেখা জটিল পুষ্টিতথ্য কি সবাই বুঝতে পারেন? আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ও মোড়কের আড়ালে পণ্যের পুষ্টিগত ঝুঁকি অস্পষ্ট থাকলে ভোক্তার সুরক্ষার দায়িত্ব কে নেবে?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব পেয়েছে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং বা এফওপিএল—খাদ্যপণ্যের মোড়কের সামনের অংশে পুষ্টিগত তথ্য বা সতর্কবার্তা প্রদর্শনের ব্যবস্থা।বাংলাদেশে বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ১৫ অক্টোবর গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের সহযোগিতায় আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এফওপিএল চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। আলোচনায় জানানো হয়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রণীত ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।ওয়েবিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেন। এই তথ্যের মূল তাৎপর্য হলো, এসব পণ্যের বিস্তার ব্যাপক। তবে গবেষণার নমুনা, তথ্য সংগ্রহের সময়, খাবারের সংজ্ঞা ও গ্রহণের পরিমাণ যাচাই না করে এ থেকে প্রতিদিন অতিরিক্ত পরিমাণে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের সিদ্ধান্ত টানা যাবে না।সতর্কতামূলক লেবেলিংয়ের উদ্দেশ্য হলো ভোক্তাকে সহজে বোঝানো, কোনো পণ্যে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে কি না। দেশভেদে এর নকশা আলাদা হতে পারে। কোথাও কালো অষ্টভুজাকৃতির চিহ্ন, কোথাও স্পষ্ট লিখিত সতর্কবার্তা কিংবা অন্য দৃশ্যমান নির্দেশক ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের জন্য উপযোগী ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, স্থানীয় ভোক্তার বোধগম্যতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিবেচনা করে।এফওপিএলের একটি বড় সুবিধা হলো, এটি পুষ্টিতথ্য বুঝতে প্রয়োজনীয় সময় ও জটিলতা কমাতে পারে। একজন ভোক্তা একাধিক পণ্যের মধ্যে তুলনা করার সময় দ্রুত বুঝতে পারবেন, কোন পণ্যে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের মাত্রা বেশি। এর ফলে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নির্বাচন সহজ হতে পারে।আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো খাদ্যশিল্পের পণ্য সংস্কারে প্রণোদনা সৃষ্টি। অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত পণ্যে সতর্কবার্তা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক হলে উৎপাদকরা পণ্যের উপাদান পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। ফলে লেবেলিং শুধু ভোক্তার আচরণ পরিবর্তনের উপায় নয়; এটি খাদ্যপণ্যের পুষ্টিগত মান উন্নত করারও একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার।তবে লেবেলিং একাই অসংক্রামক রোগের সমাধান নয়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সতর্কবার্তার দৃশ্যমানতা, বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড, সঠিক পুষ্টিতথ্য, নিয়মিত নজরদারি এবং অন্যান্য জনস্বাস্থ্যনীতির সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।বাধ্যতামূলক লেবেলিং কেন প্রয়োজন?স্বেচ্ছামূলক লেবেলিং ব্যবস্থায় সব উৎপাদক একই নিয়ম অনুসরণ করবেন—এমন নিশ্চয়তা থাকে না। কোনো প্রতিষ্ঠান স্পষ্ট ও সহজবোধ্য তথ্য দিতে পারে, অন্য প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম দৃশ্যমান কিংবা বিভ্রান্তিকর চিহ্ন ব্যবহার করতে পারে। এতে ভোক্তার পক্ষে বিভিন্ন পণ্যের মধ্যে তুলনা করা কঠিন হয়।এ ছাড়া যেসব পণ্যে সতর্কবার্তা সবচেয়ে প্রয়োজন, সেগুলোর উৎপাদক স্বেচ্ছায় সেই সতর্কবার্তা দিতে আগ্রহী নাও হতে পারেন। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই অনিশ্চয়তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রযোজ্য পণ্যের জন্য বাধ্যতামূলক ও অভিন্ন নিয়ম থাকা প্রয়োজন।ছোট প্যাকেটের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। প্যাকেট ছোট হওয়ায় নকশাগত সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু পণ্যের পুষ্টিগত ঝুঁকি তাতে কমে যায় না। সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার পরিবর্তে পাঠযোগ্যতা ও দৃশ্যমানতা বজায় রেখে উপযোগী নকশা নির্ধারণ করা যেতে পারে।প্রবিধানমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে খাদ্যশিল্পের বাস্তবতা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। প্যাকেজিং পরিবর্তন, পুষ্টিগত পরীক্ষা এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়া সংশোধনে ব্যয় হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতির সময় ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এই বিবেচনা যেন জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার উদ্দেশ্যকে দুর্বল না করে কিংবা অনির্দিষ্টকালের বিলম্বের কারণ না হয়।বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধিবিধান নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে তা যথাযথ আইনি ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন ও বিজ্ঞানভিত্তিক মানদণ্ড অনুসরণ করে জনস্বাস্থ্য রক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে যুক্তিযুক্ত পথ।আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাচিলি ২০১৬ সালে নির্দিষ্ট পুষ্টিগত সীমা অতিক্রম করা প্যাকেটজাত খাবারে কালো অষ্টভুজাকৃতির সতর্কবার্তা চালু করে। একই সঙ্গে শিশুদের লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট ধরনের বিপণন এবং স্কুলে সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরবর্তী গবেষণায় পণ্য নির্বাচন, খাদ্যপণ্যের গঠন পরিবর্তন এবং শিশুদের লক্ষ্য করে বিপণনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।মেক্সিকো, পেরু এবং লাতিন আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশও প্যাকেটের সামনে সতর্কতামূলক লেবেল চালু করেছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, কার্যকর লেবেলিং ব্যবস্থার জন্য স্পষ্ট নকশা, নির্ধারিত পুষ্টিগত সীমা, নিয়মিত নজরদারি এবং জনসচেতনতা প্রয়োজন।তবে অন্য দেশের নীতি হুবহু বাংলাদেশের ওপর প্রয়োগ করা উচিত নয়। দেশের খাদ্যবাজার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদকের সক্ষমতা, ভোক্তার খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের বাস্তব সামর্থ্য বিবেচনা করে উপযোগী ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশীয় প্রমাণের ভিত্তিতে নীতিমালা উন্নত করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।আইন আছে, প্রয়োগ কতটা কার্যকর?বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য আইন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩; ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯; বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।কিন্তু আইন প্রণয়ন আর আইনের কার্যকর প্রয়োগ এক বিষয় নয়। বাজারে নিয়মিত পরিদর্শন, নমুনা পরীক্ষা, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, অপরাধের দ্রুত নিষ্পত্তি, অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি এবং ভোক্তার অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত না হলে আইনের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না।নিরাপদ খাদ্য নিয়ন্ত্রণে একাধিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থাকায় তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। কৃষি উৎপাদন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, আমদানি, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও বিক্রয়—প্রতিটি স্তরে দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। কোথাও অনিয়ম শনাক্ত হলে কোন প্রতিষ্ঠান তদন্ত করবে, কে নমুনা পরীক্ষা করবে, কে ব্যবস্থা নেবে এবং কীভাবে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা জরুরি।খাদ্য পরীক্ষাগার আধুনিকীকরণ, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষার ফলাফল ও নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে জনআস্থা বাড়বে এবং নীতিনির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে।আইনের প্রয়োগ হতে হবে নিরপেক্ষ। ছোট বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বড় উৎপাদক বা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম যেন উপেক্ষিত না থাকে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জবাবদিহি ও আইনের সমান প্রয়োগ অপরিহার্য।খাদ্য অপচয় রোধ ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নখাদ্যনিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উৎপাদিত খাদ্য সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে ব্যবহার করা। ফসল তোলার পর যথাযথ সংরক্ষণ, শীতল পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ঘাটতির কারণে অনেক কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। বিশেষ করে ফলমূল, শাকসবজি, মাছ ও অন্যান্য দ্রুত পচনশীল খাদ্যের ক্ষেত্রে এই সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ।খাদ্য অপচয় কমানো মানে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো নয়; উৎপাদনে ব্যবহৃত জমি, পানি, জ্বালানি, শ্রম ও অন্যান্য সম্পদের অপচয়ও কমানো। উৎপাদিত খাদ্যের বড় অংশ নষ্ট হলে নতুন করে উৎপাদনের ওপর চাপ বাড়ে এবং পরিবেশের ক্ষতিও বৃদ্ধি পায়।এ জন্য কৃষিপণ্যের সংগ্রহকেন্দ্র, আধুনিক গুদাম, হিমাগার, শীতল পরিবহনব্যবস্থা এবং নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো বাড়াতে হবে। কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এসব সুবিধা সাশ্রয়ী মূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য উন্নত করা এবং খাদ্য উদ্বৃত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাবার প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।পরিবার ও সামাজিক অনুষ্ঠানেও খাবার অপচয় কমানো জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নেওয়া, অবশিষ্ট নিরাপদ খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বা অনিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতন হওয়া নাগরিক দায়িত্বের অংশ।খাদ্যনিরাপত্তায় নাগরিক, গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাখাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের হলেও নাগরিক সচেতনতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভোক্তাকে খাদ্যের মেয়াদ, উপাদান, সংরক্ষণবিধি এবং প্রযোজ্য মানচিহ্ন যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ পানি ব্যবহার, হাত ধোয়া, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা এবং সঠিক তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণও খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।তবে নাগরিক সচেতনতার কথা বলে রাষ্ট্র বা উৎপাদকের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। একজন ভোক্তার পক্ষে প্রতিটি খাদ্যপণ্যের রাসায়নিক উপাদান বা জীবাণু নিজে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ অপরিহার্য।বিদ্যালয় ও কলেজে খাদ্য ও পুষ্টিশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। শিশু-কিশোরদের সুষম খাদ্য, নিরাপদ পানি, খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধ এবং প্যাকেটের পুষ্টিতথ্য বোঝার বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যালয়ের আশপাশে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং শিশুদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের বিপণন নিয়ন্ত্রণেও উদ্যোগ প্রয়োজন।গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু খাদ্যে ভেজাল বা বাজারদরের অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ করা নয়; খাদ্যনীতির অগ্রগতি, আইনের প্রয়োগ, গবেষণার ফলাফল এবং জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কেও তথ্যভিত্তিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে কোনো গবেষণার পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে তার উৎস, নমুনা ও সীমাবদ্ধতা যাচাই করা জরুরি। অতিরঞ্জিত বা যাচাইহীন তথ্য জনসচেতনতার পরিবর্তে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও নীতিনির্ধারণে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষত এফওপিএল প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ আলোচনা, স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই যা করা প্রয়োজনবাংলাদেশে টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি বিষয়ে সমন্বিত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।প্রথমত, কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত, পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং ডাল, তেলবীজ, ফলমূল ও শাকসবজির উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও কৃষি উপকরণের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।দ্বিতীয়ত, কৃষকের ন্যায্য মূল্য ও ভোক্তার সাশ্রয়ী খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি ও সরবরাহব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সরাসরি বিপণনের সুযোগ বাড়াতে হবে।তৃতীয়ত, খাদ্যদূষণ প্রতিরোধে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। খাদ্য পরীক্ষাগার আধুনিকীকরণ, নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন এবং অপরাধের কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্যপণ্যের উৎস শনাক্ত করার জন্য ট্রেসেবিলিটি বা অনুসরণযোগ্যতা ব্যবস্থা গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।চতুর্থত, প্রস্তাবিত বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং প্রবিধানমালা দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে। লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বির জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত সীমা, স্পষ্ট সতর্কবার্তা, অভিন্ন নকশা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদককে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া হলেও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য যেন দুর্বল না হয়।পঞ্চমত, পুষ্টিনিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। দরিদ্র পরিবার, শিশু, গর্ভবতী নারী, কিশোরী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, স্কুলের খাদ্য কর্মসূচি এবং মাতৃ ও শিশুপুষ্টি কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।ষষ্ঠত, খাদ্য অপচয় কমিয়ে সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। আধুনিক গুদাম, হিমাগার, শীতল পরিবহন এবং নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ করলে কৃষকের ক্ষতি কমবে এবং ভোক্তার কাছে খাদ্য পৌঁছানো সহজ হবে।সপ্তমত, নির্ভরযোগ্য তথ্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য উৎপাদন, মূল্য, পুষ্টি, খাদ্যদূষণ এবং অসংক্রামক রোগসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ ও প্রকাশ করা প্রয়োজন। গবেষণার তথ্য নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করতে হবে এবং গৃহীত কর্মসূচির ফলাফল স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।অষ্টমত, খাদ্যব্যবস্থার সব পর্যায়ে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ও তথ্য বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তাকে কোনো একটি মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব হিসেবে দেখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।নিরাপদ খাদ্য মানেই নিরাপদ ভবিষ্যৎখাদ্য মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হলেও সবার জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এখনো বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, কিন্তু সেই সাফল্যকে টেকসই করতে হলে খাদ্যের নিরাপত্তা, পুষ্টিমান, ক্রয়ক্ষমতা ও ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।একটি দেশের খাদ্যব্যবস্থার সাফল্য শুধু কত টন ধান উৎপাদিত হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। দেখতে হবে, কৃষক তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না; নিম্ন আয়ের পরিবার পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছে কি না; শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে কি না; খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও দূষণ প্রতিরোধ করা যাচ্ছে কি না; এবং ভোক্তা খাদ্যের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাচ্ছেন কি না।বিশ্ব খাদ্য দিবসের অঙ্গীকারকে বাস্তব জীবনে রূপ দিতে হলে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও প্রচারণার বাইরে গিয়ে কার্যকর নীতি, জবাবদিহি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রয়োগ, কৃষকের ন্যায্য মূল্য, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, পুষ্টিশিক্ষা, খাদ্য অপচয় হ্রাস এবং প্যাকেটজাত খাবারের বাধ্যতামূলক সতর্কতামূলক লেবেলিংয়ের মতো উদ্যোগকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।খাদ্যনিরাপত্তা কোনো এক দিনের কর্মসূচি নয়; এটি প্রতিদিনের দায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অঙ্গীকার। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, খাদ্যব্যবস্থা মানুষের স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষায় কাজ করছে, কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে না এবং উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি বজায় থাকছে।আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কেউ ক্ষুধার কারণে বঞ্চিত হবেন না, অর্থের অভাবে পুষ্টিকর খাবার থেকে দূরে থাকবেন না এবং অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হবেন না। খাদ্য হবে সহজলভ্য, পুষ্টিকর ও নিরাপদ; কৃষক পাবেন ন্যায্য মূল্য; ভোক্তা পাবেন সঠিক তথ্য; আর রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে ন্যায়সংগত ও জবাবদিহিমূলক খাদ্যব্যবস্থা।নিরাপদ খাদ্য মানেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ। সুস্থ জীবন, পুষ্টিকর খাদ্য ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে খাদ্যনিরাপত্তাকে প্রতিদিনের জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত করতে হবে।[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]

প্রতিটি শিশুর বিকাশে চাই সমান সুযোগ

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কথাটি সমাজে বহুল প্রচলিত হলেও এর তাৎপর্য অপরিসীম। এ প্রসঙ্গে কবি গোলাম মোস্তফা বলেছেন, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।’ অর্থাৎ, প্রতিটি শিশুর মধ্যেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। তারাই একদিন পরিবার, সমাজ ও দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করবে।তাই দেশ ও জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে শিশুদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। তাদের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যা পেলে প্রতিটি শিশুর মেধা ও সম্ভাবনার বিকাশ ঘটবে। সমাজে ফুটে উঠবে শত ফুল।শিশুরা জন্মগতভাবে কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত নয়। তারা নিজ নিজ পরিবার ও পরিবেশে বেড়ে ওঠে এবং পরিবার ও সমাজের কাছ থেকেই নানা মূল্যবোধ শেখে। শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য খেলাধুলার সুযোগ, সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশের অনুকূল পরিবেশ এবং নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষা, খেলাধুলা, খেলার উপকরণ ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত কার্যক্রম যেন কোনো কারণে ব্যাহত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশের উদ্যোগও অব্যাহত রাখতে হবে।শিশুদের যথাযথ বিকাশ নিশ্চিত করতে শিক্ষক, স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী ও মায়েদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এর বাইরে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাসহ এক লাখের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে লেখকের উল্লেখিত তথ্যে জানা যায়। এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের সামাজিক দক্ষতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার বিকাশ এবং সুস্থ জাতি গঠনে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া জরুরি।বিশেষ করে দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, অনগ্রসর ও প্রান্তিক পরিবারের সন্তানদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে। এসব পরিবারের অনেক মা-বাবার পক্ষে সন্তানের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তাদের সন্তানরা শিক্ষা, পুষ্টি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে; এ ধরনের ব্যবস্থা বৈষম্য হিসেবে বিবেচিত হবে না।প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা চালু করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পোশাক, স্কুলব্যাগ ও জুতা দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। শিশুরা বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পেলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। এতে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার কমানো সম্ভব হবে।দুঃখজনকভাবে, অনেক শ্রমজীবী, দলিত ও বঞ্চিত পরিবারের মা-বাবা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সন্তানদের বিদ্যালয়ে না পাঠিয়ে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করেন। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে তাঁদের সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলোকে খাদ্যসহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা যেতে পারে, যাতে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর কারণে পরিবারের জীবিকা নির্বাহে বাড়তি সংকট তৈরি না হয়। এ ধরনের সহায়তা শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত করার প্রবণতা কমাতে এবং তাদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।শরীর ও মন একে অপরের পরিপূরক। শরীর সুস্থ না থাকলে মনও ভালো থাকে না; অসুস্থ শরীর নিয়ে কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন। শিক্ষার্থীদের জীবনে শুধু সম্পদ বা শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই সুখী হওয়া যায় না। সুস্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য নিয়মিত খেলাধুলা ও ব্যায়ামের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। আত্মরক্ষার কৌশল শেখানোর জন্যও উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কারাতে প্রশিক্ষণ উল্লেখযোগ্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রশিক্ষণ চালু করা হলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মরক্ষার দক্ষতা বাড়তে পারে।আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দলিত ও বঞ্চিত পরিবারের শিশুদের দিয়ে টয়লেট, বাথরুম, নালা পরিষ্কার কিংবা ঝাড়ু দেওয়ার মতো কাজ করানো হয়। এ ধরনের আচরণ শিশুদের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করতে পারে এবং পেশা সম্পর্কে বৈষম্যমূলক ধারণা জন্ম দিতে পারে। শিশুদের কোনো কাজকে ছোট করে দেখা শেখানো উচিত নয়; বরং সব পেশার প্রতি সম্মান, পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব এবং শ্রমের মর্যাদা শেখাতে হবে। একই সঙ্গে কোনো শিশুকে তার সামাজিক পরিচয়ের কারণে অপমানজনক বা বৈষম্যমূলক কাজে বাধ্য করা যাবে না। শিশুদের এমন পরিবেশে বড় করতে হবে, যেখানে তারা আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজেদের সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে।শিশুদের সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তাদের ময়লা-আবর্জনা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে দূরে রাখা মা-বাবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। ইতিহাসে এমন অনেক মানুষের দৃষ্টান্ত রয়েছে, যাঁরা দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা জয় করে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন এবং জীবনের একপর্যায়ে রুটির দোকানে কাজ করেছিলেন। ড. বি. আর. আম্বেদকর দলিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন এবং ভারতের সংবিধান প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আব্রাহাম লিংকন সাধারণ ও দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। জগজীবন রামও দলিত পরিবারে জন্ম নিয়ে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হন। এসব উদাহরণ দেখায়, প্রতিকূলতা থাকলেও সুযোগ ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে মানুষ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে।কোনো শিশু ভবিষ্যতে কী হবে, তা আগে থেকে বলা যায় না। তাই প্রত্যেক শিশুর যত্ন নিতে হবে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষার সুযোগ দিয়ে তাকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা এমন এক শক্তি, যা ব্যবহার করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। শিশুর সামাজিক পরিচয়, পারিবারিক আর্থিক অবস্থা কিংবা জন্মপরিস্থিতি যেন তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না দেয়। আসুন, প্রতিটি শিশুর পাশে দাঁড়াই, তার অধিকার নিশ্চিত করি এবং তার মেধা ও সম্ভাবনার বিকাশে সহায়তা করি। তাহলেই সমাজে ফুটবে শত ফুল।[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

কুমারী পূজায় নারীশক্তি ও মাতৃমর্যাদার বন্দনা

দুর্গাপূজা বাঙালির অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। শরতের নির্মল আকাশ, সাদা কাশফুল, শিউলির সুবাস এবং ঢাকের বাদ্য—সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা বাঙালির জীবনে অনন্য আনন্দের আবহ সৃষ্টি করে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বাঙালির ঐতিহ্য, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, সামাজিক বন্ধন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব।হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে পরাজিত করে শুভ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন। তাই দুর্গাপূজা মূলত অশুভের ওপর শুভের, অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের এবং অসত্যের ওপর সত্যের বিজয়ের প্রতীক। দেবী দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের পূজাও অনুষ্ঠিত হয়। এসব আরাধনার মধ্য দিয়ে শক্তি, জ্ঞান, সমৃদ্ধি, সাহস ও মঙ্গল কামনা করা হয়।বাংলায় দুর্গাপূজার ইতিহাস বহু পুরোনো। বিভিন্ন সময়ে জমিদার ও অভিজাত পরিবারে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল। পরবর্তী সময়ে বারোয়ারি ও সর্বজনীন পূজার প্রসার ঘটে। এর ফলে দুর্গাপূজা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উৎসবের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের উৎসবে পরিণত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা পালন করেন।শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠের ধারে দুলতে থাকা কাশফুল আর ভোরের বাতাসে শিউলির মিষ্টি গন্ধ—প্রকৃতি যখন এমন অপরূপ সাজে সেজে ওঠে, তখনই বাঙালির হৃদয়ে বেজে ওঠে ঢাকের বাদ্য। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ, মণ্ডপে মণ্ডপে জ্বলে ওঠে আলোর মালা। মা দুর্গার আগমনে প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে যেন নতুন আনন্দের সঞ্চার হয়। দুর্গাপূজা তাই কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাঙালির চিরচেনা আবেগ, ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতির অপূর্ব প্রকাশ। দেবীর আগমন যেন অন্ধকারের মধ্যে আলোর বার্তা, অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় এবং মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার।দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ মিলনোৎসব। এই উৎসব মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য বাড়িয়ে তোলে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষ একে অপরের আনন্দে অংশ নেয়, শুভেচ্ছা বিনিময় করে এবং উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেয়। বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সম্প্রীতির এই চর্চা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।দুর্গাপূজার কয়েকটি দিন বাঙালির জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এরপর ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমীর বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূজা সম্পন্ন হয়। অষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধিপূজা, নবমীর পূজা এবং দশমীর বিসর্জন দুর্গোৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের আনন্দের পাশাপাশি বিদায়ের বেদনাও অনুভূত হয়। দেবীকে বিদায় জানিয়ে মানুষ আবার তাঁর আগমনের অপেক্ষায় থাকে।দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ প্রতিমা ও পূজামণ্ডপ। শিল্পীরা মাটি, খড় ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে প্রতিমা নির্মাণ করেন। মণ্ডপসজ্জায় স্থাপত্য, চিত্রকলা, আলোকসজ্জা ও লোকশিল্পের নানা উপাদান ব্যবহৃত হয়। অনেক পূজামণ্ডপে স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য কিংবা সমকালীন বিভিন্ন বিষয় শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। ফলে দুর্গাপূজা একদিকে ধর্মীয় উৎসব, অন্যদিকে শিল্প ও সৃজনশীলতারও বড় ক্ষেত্র।দুর্গাপূজাকে ঘিরে সামাজিক মিলনও বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করা, নতুন পোশাক পরা, মণ্ডপে ঘুরতে যাওয়া এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও পরস্পরের উৎসবে অংশ নেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির এই বন্ধন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।কুমারী পূজা: দুর্গাপূজার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ আচার হলো কুমারী পূজা। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাসে, কুমারী কন্যার মধ্যে দেবী দুর্গার মাতৃশক্তি ও পবিত্রতার প্রতীকী প্রকাশ দেখা হয়। সাধারণত অল্পবয়সী একটি কন্যাশিশুকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক ও অলংকারে সাজানো হয়। এরপর তাকে দেবীরূপে সম্মান জানিয়ে পূজা করা হয়। ফুল, চন্দন ও নৈবেদ্য নিবেদন করে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয় এবং আশীর্বাদ কামনা করা হয়।কুমারী পূজার মূল তাৎপর্য নারীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং মাতৃশক্তির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। একটি শিশুকন্যার মধ্যে দেবীত্বের প্রতীক কল্পনা করার মধ্য দিয়ে নারীশক্তির প্রতি সম্মান জানানোর বার্তা তুলে ধরা হয়। দুর্গাপূজার বৃহত্তর চেতনার সঙ্গেও এই আচার গভীরভাবে যুক্ত। অশুভ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় যেমন দুর্গাপূজার মূল শিক্ষা, তেমনি নারীশক্তির মর্যাদা স্বীকার করাও এর তাৎপর্যপূর্ণ দিক।কুমারী পূজায় একটি ছোট মেয়েকে দেবী দুর্গার প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। তাকে নতুন পোশাক ও ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেবীর আসনে বসানো হয়। এরপর ফুল, চন্দন ও নৈবেদ্য দিয়ে পূজা করা হয়। এই আচার স্মরণ করিয়ে দেয়, নারীকে শ্রদ্ধা ও মর্যাদা দেওয়া সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নারী কেবল মমতা ও স্নেহের প্রতীক নন; তিনি শক্তি, সাহস ও সম্ভাবনারও প্রতীক। তাই কুমারী পূজার তাৎপর্য ধর্মীয় আচারের গণ্ডি ছাড়িয়ে নারীকে সম্মান করা এবং তাঁর মর্যাদা স্বীকার করার বৃহত্তর বার্তাও বহন করে।তবে কুমারী পূজার প্রতীকী তাৎপর্য তখনই আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন বাস্তব জীবনেও নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা যায়। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমান অধিকার এবং বৈষম্যহীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পূজার মঞ্চে কন্যাশিশুকে দেবীরূপে সম্মান জানানো আর দৈনন্দিন জীবনে নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা—এই দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, বৈষম্য ও অবহেলা দূর করার মধ্য দিয়েই নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধার চেতনা বাস্তবে প্রতিফলিত হতে পারে।দুর্গাপূজার সঙ্গে বাঙালির সাহিত্য ও সংগীতেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আগমনি ও বিজয়ার গান, কবিতা, নাটক এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দুর্গোৎসবের আবহকে আরও সমৃদ্ধ করে। পূজাকে কেন্দ্র করে বহু শিল্পী, কারিগর, ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক কর্মীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি এই উৎসবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।দুর্গাপূজার আনন্দ কয়েক দিনের হলেও এর আবেদন মানুষের মনে থেকে যায় দীর্ঘ সময়। বিজয়ার বিষণ্ন বিদায়ের মুহূর্তে যখন প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা এগিয়ে যায়, তখন সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, ‘আবার এসো মা।’ এই বিদায়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের প্রত্যাশা। দুর্গাপূজা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, অশুভকে পরাজিত করতে এবং সত্য, ন্যায়, মানবতা ও ভালোবাসাকে জীবনের পথনির্দেশক করতে শেখায়। তাই বাঙালির দুর্গাপূজা শুধু পূজা নয়; এটি প্রাণের উৎসব, যেখানে ধর্মের পাশাপাশি মিশে আছে সংস্কৃতি, সম্প্রীতি, সৌন্দর্য ও মানবতার চিরন্তন আহ্বান।মা দুর্গার আগমন আমাদের মনে শুভবোধের জাগরণ ঘটাক, আর তাঁর বিদায় রেখে যাক নতুন দিনের আশার আলো। অশুভ ও বিভেদ দূরে সরিয়ে মানবিকতা, সহনশীলতা ও ঐক্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রেরণা জোগাক এই উৎসব। দুর্গাপূজার প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু প্রতিমা, আলোকসজ্জা কিংবা উৎসবের আনন্দে নয়; মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের বন্ধনেও। বিজয়ার বিদায়বেলায় আমাদের প্রত্যাশা হোক—ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিকতার বন্ধন সবার। এই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যই বাঙালির দুর্গাপূজাকে করে তুলুক আরও সুন্দর, অর্থবহ ও চিরন্তন।উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি আমাদের দায়িত্বের কথাও মনে রাখতে হবে। পূজামণ্ডপ ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যানজট কমাতে সহযোগিতা করা এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময় পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। উৎসব যেন সবার জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময় হয়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।দুর্গাপূজা দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি বাঙালির ঐতিহ্য, আবেগ, শিল্প, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের উজ্জ্বল প্রকাশ। আর কুমারী পূজা নারীশক্তি ও মাতৃমর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি তাৎপর্যপূর্ণ আচার। এই পূজার শিক্ষা আমাদের বাস্তব জীবনেও ধারণ করতে হবে—নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। অশুভকে পরিহার করে সত্য, ন্যায়, ভালোবাসা ও মানবিকতার পথে এগিয়ে চলার মধ্য দিয়েই দুর্গাপূজার মূল চেতনা সার্থক হতে পারে। এই চেতনাই বাঙালির দুর্গাপূজাকে যুগ যুগ ধরে প্রাণবন্ত ও অর্থবহ করে রাখবে।[লেখক: ভিজিটিং প্রফেসর, ডেন্টাল সার্জারি বিভাগ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল]

চিকিৎসায় এআই, প্রযুক্তির সঙ্গে বাড়বে দায়িত্বও

প্রযুক্তি এখন শুধু আমাদের দৈনন্দিন জীবন বদলাচ্ছে না, স্বাস্থ্যসেবার ধরনও পরিবর্তন করছে। রোগের তথ্য বিশ্লেষণ, চিকিৎসাসংক্রান্ত ছবি পর্যালোচনা, হাসপাতালের প্রশাসনিক কাজ সহজ করা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত খুঁজে পেতে সহায়তা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসছে—প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, চিকিৎসার সিদ্ধান্তে মানুষের দায়িত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?আমার দৃষ্টিতে, ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এটি চিকিৎসকের পেশাগত বিচারবোধ ও দায়িত্বের বিকল্প নয়। একজন রোগীর চিকিৎসা শুধু পরীক্ষার ফল বা ডিজিটাল তথ্যের ওপর নির্ভর করে না। তার বয়স, আগের রোগের ইতিহাস, বর্তমান শারীরিক অবস্থা, ওষুধ ব্যবহারের বিবরণ এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করতে বা প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সেই তথ্য রোগীর ক্ষেত্রে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা মূল্যায়নের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান ও পেশাগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।স্বাস্থ্যসেবায় দ্রুততা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দ্রুত সিদ্ধান্তই সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করলে বিভ্রান্তিকর ফল দিতে পারে। আবার প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু রোগী বা জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রযুক্তির কার্যকারিতাও ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসায় এমন প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে এর নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা, সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তব পরিবেশে কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, নিরাপত্তা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি রোগীর সঙ্গে মানবিক যোগাযোগের গুরুত্ব কমে যায় না। একজন রোগী শুধু তার পরীক্ষার ফল জানতে চান না; তিনি জানতে চান তার সমস্যার অর্থ কী, কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী। প্রযুক্তি চিকিৎসককে তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু রোগীর উদ্বেগ শোনা, চিকিৎসার বিকল্প ব্যাখ্যা করা এবং সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব বুঝতে সাহায্য করাও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে জটিল চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগী ও পরিবারের সঙ্গে পরিষ্কার যোগাযোগ অপরিহার্য।হাসপাতালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলে শুধু নতুন প্রযুক্তি চালু করাই যথেষ্ট নয়। চিকিৎসক ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ, রোগীর তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, প্রযুক্তির ফলাফল যাচাই এবং ভুল শনাক্ত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও থাকতে হবে। একই সঙ্গে দেখতে হবে, প্রযুক্তি বাস্তবে কী পরিবর্তন আনছে—এটি কি প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে সময় কমাচ্ছে, প্রশাসনিক কাজ সহজ করছে, চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করছে, নাকি নতুন জটিলতা তৈরি করছে? প্রযুক্তির মূল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত তার বাস্তব উপযোগিতা দিয়ে, শুধু আধুনিকতার পরিচয় দিয়ে নয়।বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষতা, নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে। প্রযুক্তি যেন মানুষের জন্য নতুন বৈষম্য তৈরি না করে, সে দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য তথ্য, প্রশিক্ষিত কর্মী, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং কার্যকর নীতিমালা ছাড়া প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন। তাই হাসপাতালের নেতৃত্বের দায়িত্ব হবে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি সেটিকে নিরাপদ ও কার্যকরভাবে ব্যবহারের পরিবেশ তৈরি করা।আমার বিশ্বাস, ভবিষ্যতের সফল হাসপাতাল হবে সেই প্রতিষ্ঠান, যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে নয়, মানুষের বাস্তব সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে ব্যবহার করবে। প্রযুক্তি চিকিৎসার কাজকে আরও কার্যকর করতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে এবং কিছু প্রক্রিয়াকে সহজ করতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে রোগীর নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং মানবিক মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার মূল উদ্দেশ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো নয়; মানুষের জন্য নিরাপদ, কার্যকর ও দায়িত্বশীল চিকিৎসা নিশ্চিত করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই লক্ষ্য অর্জনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, যদি এর ব্যবহার যথাযথ যাচাই, মানবিক বিবেচনা এবং জবাবদিহির সঙ্গে পরিচালিত হয়।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু সেই অগ্রগতির কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকে—রোগীকে, চিকিৎসককে এবং তাদের পারস্পরিক আস্থাকে।লেখক: হেড অব ডিজিটাল (ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর), এভারকেয়ার হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।

কালি মুছবে, রবি থাকবে

শিল্পকলা একাডেমির সামনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দশজন বাঙালি মনীষীর মুখ এঁকেছে—নজরুল, লালন, জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, জহির রায়হান, শাহ আবদুল করিম, হুমায়ূন ফরীদি, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর ও সত্যজিৎ রায়। সেই দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপনের অভিযোগে পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে। তাদের মধ্যে একজন রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের সভাপতি আ ন ম আয়াস। ৫ আগস্টের পর থেকে তার নেতৃত্বে প্রকাশ্যে মারধর, পুলিশের সামনে অন্যদের হেনস্তা করার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশ্রয় পেতে পেতে তিনি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে উঠেছেন, এখন সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সিদ্ধান্তকেও চ্যালেঞ্জ করছেন। ছবি পছন্দ না হলে প্রতিবাদ সভা করা যেত, নিজের পছন্দের ছবি পাশে আঁকা যেত, কিন্তু অন্যের আঁকা ছবির মুখে কালি দেওয়ার অধিকার তাদের ছিল না।রবীন্দ্রনাথের প্রতি এই আক্রোশ কেন? প্রচলিত অভিযোগগুলো পুরোনো—তিনি হিন্দু, তিনি ভারতের লোক, তিনি প্রজাপীড়ক জমিদার, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছেন, তার গান কেন জাতীয় সংগীত হবে, তার লেখায় মুসলমান প্রসঙ্গ কম কেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। খ্যাতি বাড়লে অভিযোগও বাড়ে। কিন্তু অভিযোগের মীমাংসা হয় যুক্তির লড়াইয়ে, কালির আক্রোশে নয়। বিদ্বান বলে খ্যাত কিছু ব্যক্তিও তার বিরুদ্ধে আবোলতাবোল বকে যাচ্ছেন। কারণ, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সনদ আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। জ্ঞানতাপস আরজ আলী মাতুব্বর বলেছিলেন, জ্ঞানের সনদ থাকে না। তাই একজন রিকশাচালক যখন নিজ উদ্যোগে সেই কালি মুছে দেন, তখন বোঝা যায়—প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়, জ্ঞান ও বোধই আসল। সনদধারী পণ্ডিতদেরও রিকশাচালকের কাছে শেখার আছে। কিন্তু শিখবেন না, শিখলে তাদের শেখা ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যাবে।অনেকে জানেন না, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু অর্থে হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম। ব্রাহ্ম মানে ব্রাহ্মণ নয়, একেশ্বরবাদী। আর হিন্দু হলেই বা অপরাধ কী? হিন্দুধর্ম পৃথিবীর প্রাচীন ধর্মগুলোর একটি। প্রকৃতপক্ষে আসল বিরোধ ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক। ১৯৪৭ সাল থেকে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক কখনো স্বাভাবিক হয়নি। একাত্তরে ভারতের সহযোগিতা যাদের পরাজয় নিশ্চিত করেছে, তারা সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে এখনো ভারতবিদ্বেষ উসকে দেন। রবীন্দ্রনাথকে সামনে পেয়ে সেই বিদ্বেষ মেটানো হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, পৃথিবীর সব প্রভাবশালী প্রতিবেশীই প্রভাব বিস্তার করে। আমেরিকা কিউবাকে ৬৬ বছর ধরে অবরোধ করে রেখেছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক ধরে নিয়ে গেছে। রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করেছে। চীন কাশ্মীরের কিয়দংশ ও তিব্বত দখল করে রেখেছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান ভারতেরও আঞ্চলিক প্রভাব যদি থাকে, তার প্রতিবাদ রাজনৈতিকভাবে করতে হবে, কবির ছবিতে কালি দিয়ে নয়।জমিদার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ কেমন ছিলেন, তার রেকর্ড আছে। শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসরের প্রজাপীড়নের কোনো নজির কেউ দেখাতে পারেননি। বরং তিনি জমিদারির প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, ‘সাহাদের হাত থেকে শেখদের বাঁচাতে হবে।’ শিলাইদহে মহর্ষি দাতব্য চিকিৎসালয়, পতিসরে বড় হাসপাতাল, ১৯১০ সালে ট্রাক্টর, পানির পাম্প ও সার নিয়ে আদর্শ কৃষিক্ষেত্র গড়ে তোলা, তাতিদের শান্তিনিকেতনে পাঠিয়ে বয়নশিল্প শেখানো—এসব তারই উদ্যোগ। ১৯০৫ সালে নওগাঁর পতিসরে তিনি ভারতবর্ষের প্রথম জামানতবিহীন কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করে ব্যাংকের মূলধন জোগাড় করেছিলেন। নোবেল পুরস্কারের এক লাখ ১৬ হাজার টাকার মধ্যে ৭৫ হাজার টাকা সেই ব্যাংককে দিয়েছিলেন, যা আর ফেরত পাননি। কারণ, কৃষকেরা ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করেননি। তারপরও ব্যাংকটি কুড়ি বছর চলেছিল।লালনকে আমরা চিনি অনেকটাই রবীন্দ্রনাথ পরিবারের কারণে। লালনের যে ছবিটি আমরা দেখি, তা কুষ্টিয়ার শিলাইদহে নৌকায় বসে এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লালনের গানের প্রথম সংগ্রাহক ও সংকলকও রবীন্দ্রনাথ। ১৯০৫ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লালনের কুড়িটি গান তিনিই পরিমার্জন করে প্রকাশ করেন। শুধু লালন নন, লালনের ভাবশিষ্য ডাকপিয়ন গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গানটি দিয়েও তিনি ‘প্রবাসী’র হারমোনি বিভাগ শুরু করেন। এই সূত্রেই কলকাতার বিদগ্ধ সমাজে লালন ও গগন পরিচিত হন। আজ যাঁরা লালন ও রবীন্দ্রনাথকে মুখোমুখি দাঁড় করান, তাদের আরও বেশি ইতিহাসচর্চা করা দরকার।দুটি বড় মিথ—জাতীয় সংগীত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ‘আমার সোনার বাংলা’ তিনি লিখেছিলেন ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বেদনা থেকে, এ কথা সত্য। বাংলা যদি ভাগ না হতো, তাহলে শেরেবাংলার লাহোর প্রস্তাব মোতাবেক গোটা বাংলা, ত্রিপুরা ও আসাম নিয়ে ১৯৪৭ সালেই আলাদা আরেকটি মুসলিম দেশ হতে পারত। তাই দেশ ভাগ হলে ব্যথা লাগবেই। আমাদের জাতীয় সংগীতের সুর তিনি নিয়েছিলেন গগন হরকরার সুর থেকে, তবে লুকিয়ে নয়। নিজেই লিখে গেছেন—‘ওই বাউলের গানের সুরের মাধুর্যে বিমোহিত হয়ে আমি বাংলাদেশকে মাতৃরূপে গণ্য করে এই গান লিখেছি।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধিতার অভিযোগটি আরও বেশি দুর্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করার লক্ষ্যে কলকাতার গড়ের মাঠে আয়োজিত সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্ব করার কথা বলা হয়। কিন্তু ড. আকবর আলী খানসহ গবেষকেরা দেখিয়েছেন, ওই সময়ে তিনি কুষ্টিয়ায় ছিলেন। এ ছাড়া কোনো সংবাদপত্রে রবীন্দ্রনাথের ওই সভায় উপস্থিতির খবর নেই, অথচ তিনি তখন এত বিখ্যাত যে তার সভায় যোগদান পত্রিকার প্রধান খবর হওয়ার কথা। বিরোধিতা করলে প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সংবর্ধনা দিতে ডাকত না, তিনিও আসতেন না। অথবা ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডক্টর অব লিটারেচার উপাধিও প্রদান করত না।সবচেয়ে হতাশাজনক ছিল কালি লেপনকারী নারীর বক্তব্য। তিনি বলছিলেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছেন, ভারত করেছে ‘অগ্রাসন’। অথচ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু ১৯৪১ সালে, বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে। মৃত মানুষ বিরোধিতা করেন কীভাবে? তিনি ‘আগ্রাসন’ শব্দটিও উচ্চারণ করছিলেন ‘অগ্রাসন’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলছিলেন ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি’। পাকিস্তান আমলেও তাকে বেতার ও পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু পারেনি। কারণ, তার অবস্থান ইট-পাথরে গাঁথা নয়, মানুষের মনোজগতে প্রোথিত। দেয়ালের ছবিতে কালি লাগে, কিন্তু মনের ভেতরের রবিকে কালি দিয়ে ঢাকা যায় না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শিশুর প্রথম বিদ্যালয় পরিবার

একটি শিশু মায়ের মুখে শুনল, “সব সময় সত্য কথা বলবে।” কিছুক্ষণ পর বাবার ফোন বেজে উঠল। ওপাশের মানুষটি বাবাকে চাইলে বাবা সন্তানকে বললেন, “বলবে, বাবা বাসায় নেই।” শিশুটি কোনো প্রশ্ন করল না। কিন্তু সে একটি শিক্ষা পেল। অন্যদিকে, আরেকটি পরিবারে বাবা ভুল করে কারও কাছ থেকে বেশি টাকা নিয়ে ফেললেন। ভুল বুঝতে পেরে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা ফেরত দিলেন। এখানেও কোনো বক্তৃতা হলো না। কিন্তু শিশুটি সততার একটি বাস্তব রূপ দেখল। এই দুই দৃশ্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে শিশুর শিক্ষার এক গভীর সত্য। আমরা সন্তানকে যা বলি, তার চেয়ে সে আমাদের দেখে যা শেখে, তার প্রভাব অনেক বেশি স্থায়ী হতে পারে।এই কারণেই ঘরের ভেতরে সেরা গবেষণাগার। গবেষণাগার শুধু যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজানো কোনো কক্ষ নয়। যেখানে পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা, ভুল, সংশোধন ও ফলাফলের মধ্য দিয়ে শেখা হয়, সেটিও এক ধরনের গবেষণাগার। শিশুর ঘর ঠিক তেমনই একটি জায়গা। সেখানে প্রতিদিন তার ভাষা, আচরণ, চিন্তা, মূল্যবোধ ও সম্পর্কের ধারণা তৈরি হচ্ছে। বাবা-মায়ের কথাবার্তা, পারস্পরিক সম্পর্ক, অন্যের সঙ্গে আচরণ, ভুলের প্রতি প্রতিক্রিয়া এবং দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত শিশুর জন্য নীরব পাঠ হয়ে উঠছে।শিশু জন্মের পর প্রথমে বই পড়ে না, কোনো নৈতিকতার বক্তৃতাও শোনে না। সে মানুষ দেখে। সে দেখে বাবা রাগলে কী করেন, মা বিপদে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান, কেউ ভুল করলে পরিবার কীভাবে আচরণ করে, অতিথিকে কীভাবে গ্রহণ করা হয়, দুর্বল অবস্থানের মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হয়। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই ধীরে ধীরে তার আচরণের কাঠামো তৈরি হয়। তাই শিশুর চরিত্র গঠনের সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা অনেক সময় কথায় নয়, পরিবেশে।আমরা সন্তানকে বলি, “বড়দের সম্মান করবে।” কিন্তু সে যদি দেখে পরিবারের বড়রা একে অন্যের সঙ্গে অসম্মানজনক ভাষায় কথা বলছেন, তাহলে কথার চেয়ে দৃশ্যটাই তার কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। আমরা বলি, “সব মানুষকে সম্মান করতে হবে।” অথচ বাড়ির সহায়ক কর্মী বা কোনো সেবাদানকারী মানুষের সঙ্গে যদি অবজ্ঞার আচরণ করা হয়, তাহলে শিশুর কাছে সমতার ধারণা দুর্বল হয়ে যায়। আবার বাবা যদি দোকানদারের দেওয়া বাড়তি টাকা ফিরিয়ে দেন, মা যদি অসুস্থ প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ান কিংবা পরিবারের কেউ নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান, তাহলে শিশুর সামনে মূল্যবোধের একটি জীবন্ত উদাহরণ তৈরি হয়।এখানেই পরিবারের অদৃশ্য শিক্ষাক্রমের গুরুত্ব। বিদ্যালয়ে কোন শ্রেণিতে কোন বিষয় পড়ানো হবে, তার একটি নির্ধারিত কাঠামো থাকে। পরিবারের শিক্ষাক্রমের কোনো বই নেই, কিন্তু তার প্রভাব সর্বত্র। বাবা-মায়ের পারস্পরিক আচরণ থেকে শিশু সম্পর্কের ভাষা শেখে। মতের অমিল কীভাবে সামলানো হয়, তা থেকে বিরোধ সমাধানের কৌশল শেখে। কেউ ভুল করলে তাকে অপমান করা হয়, নাকি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়, তা থেকে নিজের ভুলের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। এমনকি রাস্তায় নিয়ম মানা, লাইনে দাঁড়ানো, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় অপচয় না করাও তার নাগরিক ও সামাজিক শিক্ষার অংশ হয়ে ওঠে।একটি শিশুর হাতে জীবনের প্রথম বড় শিক্ষা আসে খুব সাধারণ ঘটনা থেকে। ধরুন, সে অসাবধানতাবশত একটি গ্লাস ভেঙে ফেলেছে। বাবা যদি রেগে গিয়ে বলেন, “তুমি কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারো না”, তাহলে শিশুটি হয়তো শিখবে, ভুল করলে সত্য গোপন করতে হয়। কিন্তু বাবা যদি বলেন, “গ্লাস ভেঙেছে, এটা ঠিক হয়নি। তবে তুমি সত্যি বলেছ। এখন আমরা পরিষ্কার করি এবং পরেরবার কীভাবে সাবধান হওয়া যায়, দেখি”, তাহলে একই ঘটনা দায়িত্ববোধের শিক্ষায় পরিণত হয়। শিশুকে ভুলহীন মানুষ বানানো সম্ভব নয়; কিন্তু ভুল হলে সত্য বলা, দায়িত্ব নেওয়া এবং সংশোধন করার অভ্যাস শেখানো সম্ভব।শিক্ষার এই সুযোগ শুধু ভুলের মুহূর্তেই আসে না। দৈনন্দিন জীবনও শেখার অসংখ্য উপকরণ বহন করে। বাজারে গিয়ে পণ্যের দাম তুলনা করা থেকে গণিত ও অর্থের মূল্য শেখানো যায়। পরিবারের খরচের ছোটখাটো পরিকল্পনায় সন্তানকে যুক্ত করলে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। রান্নার সময় খাবারের পরিবর্তন নিয়ে কথা বললে বিজ্ঞান জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। গাছের পরিচর্যা থেকে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি হতে পারে। পরিবারের কোনো ছোট সিদ্ধান্তে সন্তানের মতামত জানতে চাইলে সে যুক্তি দিয়ে নিজের কথা বলতে এবং অন্যের মত শুনতে শেখে।এভাবে শিক্ষা বইয়ের পাতা থেকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। আর এই সংযোগ তৈরি করার সবচেয়ে স্বাভাবিক জায়গা হলো পরিবার।তবে বর্তমান সময়ে ঘরের শিক্ষার সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পর্দানির্ভর জীবন। বাবা মুঠোফোনে, মা মুঠোফোনে, সন্তানও মুঠোফোনে। তারপর অভিযোগ ওঠে, “বাচ্চা বই পড়ে না।” শিশুকে বই পড়তে বলার আগে তাকে বই পড়ার পরিবেশ দিতে হবে। পরিবারের বড়রা যদি নিয়মিত বই পড়েন, সপ্তাহে কিছু সময় সবাই মিলে পড়া নিয়ে আলোচনা করেন, তাহলে বই শিশুর কাছে উপদেশের বিষয় না হয়ে পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠবে। একইভাবে সন্তানকে মুঠোফোন ব্যবহারে সংযম শেখাতে হলে বড়দের নিজেদের আচরণেও সেই সংযম দেখাতে হবে।পরিবারে মতের অমিলও শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ। বাবা ও মায়ের মধ্যে মতভেদ হতেই পারে। কিন্তু সেই মতভেদ যদি অপমান ও চিৎকারে পরিণত হয়, শিশু শিখবে, বিরোধ মানেই সংঘাত। আর যদি যুক্তি, শ্রবণ ও সমঝোতার মাধ্যমে তা সমাধান হয়, তাহলে সে বুঝবে, ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং মতের অমিলের মধ্যেও সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করা যায়। একইভাবে বাবা যদি সন্তানের কাছে নিজের ভুল স্বীকার করেন, তাহলে তিনি ছোট হন না। বরং সন্তান শেখে, ভুল স্বীকার করার জন্য বয়স বা অবস্থান কোনো বাধা নয়।এ ক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে ভালো মানুষ হওয়ার উপদেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু নিজের আচরণকে সেই শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা কঠিন। অথচ শিশুর সামনে নিখুঁত হওয়ার অভিনয়ও প্রয়োজন নেই। বরং নিজের ভুল স্বীকার করা, প্রয়োজনে ক্ষমা চাওয়া, কথা রাখার চেষ্টা করা এবং অন্যের প্রতি সম্মান দেখানোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা।আমরা সন্তানের ফলাফল নিয়ে অনেক উদ্বিগ্ন থাকি। পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, কোন বিষয়ে দুর্বল, কোথায় ভর্তি হবে, ভবিষ্যতে কী করবে—এসব নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন প্রায়ই বাদ পড়ে যায়। সে কি ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করতে পারে? নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে? অন্যের কথা শুনতে পারে? দুর্বল কাউকে সাহায্য করতে পারে? নিজের সুবিধার বাইরে অন্যের প্রয়োজন বুঝতে পারে? এসব দক্ষতা ও মূল্যবোধ শুধু পাঠ্যবই থেকে আসে না। এগুলোর ভিত্তি তৈরি হয় পরিবারে।এ কারণেই বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে একটি সেতু প্রয়োজন। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে সহযোগিতা, সততা, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার কথা বলবেন, আর পরিবারে তার বাস্তব অনুশীলনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিদ্যালয় শিশুকে দায়িত্বশীল হতে শেখালে ঘরেও তাকে বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব দিতে হবে। বিদ্যালয় অন্যের মতামতকে সম্মান করতে শেখালে পরিবারেও তার কথা মন দিয়ে শুনতে হবে। শিক্ষা তখনই গভীর হয়, যখন শ্রেণিকক্ষের মূল্যবোধ জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়।আমরা সন্তানের জন্য ভালো বিদ্যালয় চাই, দক্ষ শিক্ষক চাই, উন্নত বই চাই, প্রযুক্তি চাই। এসব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সঙ্গে একটি সুস্থ পারিবারিক পরিবেশও প্রয়োজন। কারণ শিশু প্রতিদিন শুধু পাঠ্যবই পড়ে না, সে তার চারপাশের মানুষকেও পড়ে। আমাদের আচরণ, ভাষা, সম্পর্ক ও সিদ্ধান্ত তার কাছে প্রতিদিনের বাস্তব পাঠ।তাই সন্তানকে বদলানোর আগে ঘরের পরিবেশের দিকে তাকানো দরকার। তাকে সত্যবাদী হওয়ার কথা বলার আগে আমরা সত্য বলছি কি না, তাকে সম্মান শেখানোর আগে আমরা অন্যকে সম্মান করছি কি না, তাকে দায়িত্বশীল হতে বলার আগে আমরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করছি কি না—সেই প্রশ্নগুলো নিজেদের কাছেই করতে হবে।ঘরকে তাই শুধু খাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম ও বিনোদনের জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে পারে প্রশ্ন করার জায়গা, বই পড়ার জায়গা, আলোচনা করার জায়গা, ভুল থেকে শেখার জায়গা এবং মূল্যবোধ চর্চার জায়গা। বিদ্যালয়ের গবেষণাগারে শিশু বিজ্ঞান পরীক্ষা করে, কিন্তু ঘরের গবেষণাগারে সে জীবন পরীক্ষা করে।এই পরীক্ষার উপকরণ আমরা প্রতিদিন তার সামনে রাখছি—আমাদের কথায়, কাজে, আচরণে, সম্পর্কের ধরনে। আমরা তাকে যে পৃথিবী দেখাই, সে সেই পৃথিবী থেকেই নিজের পৃথিবী বানাতে শেখে।তাই শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার কাজ শুধু বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। তার শুরু হয় ঘরে। বাবা-মায়ের প্রতিদিনের আচরণ, পরিবারের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় তার নৈতিক বোধের ভিত।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ। আমরা সন্তানকে কেমন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই, তার আগে কি আমরা তার সামনে সেই মানুষটির একটি জীবন্ত উদাহরণ হতে পারছি?কারণ শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার ঘর, প্রথম শিক্ষক তার পরিবার এবং সবচেয়ে শক্তিশালী পাঠ্যপুস্তক তার বাবা-মায়ের প্রতিদিনের আচরণ।ঘরের ভেতরে যে গবেষণাগার প্রতিদিন চলছে, সেখানে শুধু একটি শিশুর ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছে না। তৈরি হচ্ছে আগামী দিনের সমাজের চরিত্রও।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়, ময়মনসিংহ]

স্বীকৃতির অপেক্ষায় আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারা

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সুপারিশে ২০১০ থেকে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৭৬ জনের গেজেট/লাল মুক্তিবার্তা/ভারতীয় তালিকা বাতিল করা হয়েছে এবং আগস্ট ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সারা দেশে তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ৪৮১ জন অমুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল করা হয়েছে। এই মুহূর্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা তো ২ লাখ ৩ হাজার সামথিং, এরকম আরকি।’ অপরদিকে, ৭ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অমুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ এবং ১৯৭১ সালের শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের তালিকা নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে।... যারা দরখাস্ত দিয়েছেন, চুলচেরা যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যদি সত্যিকারে কেউ বাদ পড়েন, তাদেরই নেওয়া হবে, যতজন দরখাস্ত করুন না কেন। তাতে অসুবিধা নেই, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় আসবেন তারাই, যারা সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা এবং চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ে যারা থাকবেন। এবং এটা হবে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে।’ এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় নেওয়া হবে প্রামাণ্য দলিল, সরকারি ও সামরিক নথি, মুক্তিযুদ্ধকালীন রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য ও গবেষণালব্ধ উপাত্ত। মুক্তিযোদ্ধা নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ের আয়োজন অনুযায়ী, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে কমিটি গঠন করা হবে, দল গঠন করে তদন্ত চালানো হবে, এরপর সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। সবকিছু নিবিড়ভাবে তদন্ত ও পর্যায়ক্রমে যাচাই-বাছাইয়ের পরই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হবেন।আমরা দেখেছি, ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্যের মাথায় দড়ি দিয়ে জুতার মালা ঝুলিয়ে অবমাননা করার ঘটনা। জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে জনসমক্ষে অসম্মানিত করা হয়েছে। তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই সমাহিত হতে হয়েছে। সত্যিই রণাঙ্গনের এই আশিতিপর নারী-পুরুষেরা জীবনের সায়াহ্নে এসে অত্যন্ত হতাশ ও সংক্ষুব্ধ। আমি ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাকে জানি ও চিনি, যারা আজও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। কখনো রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কখনো স্থান পরিবর্তনের কারণে, আবার কখনো সনদ হারিয়ে যাওয়া বা পুড়ে যাওয়ার কারণে তারা নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের নিয়ে কয়েকটি কলাম লিখেছি, কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি; কিন্তু আদৌ কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাংলার মাটিকে শত্রুমুক্ত করতে যেসব আদিবাসী তরুণ নিজেদের তীর-ধনুক ও অকুতোভয় বুক নিয়ে হানাদার বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। জাতীয় পর্যায়ে বারবার তালিকা সংশোধন, যাচাই-বাছাই ও পরিমার্জন করা হলেও প্রান্তিক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারা উপেক্ষিতই রয়ে গেছেন। এটি কেবল অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয় নয়, বরং গৌরবগাথার ইতিহাসে স্বীকৃতিহীন একটি অধ্যায়।উপেক্ষিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু জরুরি ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক বলে মনে করি—ক. সাধারণ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে—যেমন রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, সিলেট, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রামে—বিশেষ কর্মীদল গঠন করে সরেজমিনে প্রকৃত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে হবে।খ. যেহেতু অনেক আদিবাসীর কাছে লিখিত নথিপত্র নেই, সেহেতু সহযোদ্ধা ও স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের মৌখিক সাক্ষ্য বা ‘মৌখিক ইতিহাস’কে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচনা করে তালিকা সংশোধনের জন্য বিশেষ নিয়ম তৈরি করতে হবে।গ. আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ও পদবি তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির সঠিক বানান অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে।ঘ. মাঠপর্যায়ের গবেষণার মাধ্যমে অসংখ্য উপেক্ষিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধার নাম ও বীরত্বগাথা যেসব গবেষকের বইয়ে লিপিবদ্ধ হয়েছে, সেগুলোকে তথ্যসূত্র হিসেবে নিয়ে তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। এসব নির্ভরযোগ্য গবেষণাগ্রন্থকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রামাণ্য গ্রন্থ বা উৎস হিসেবে গ্রহণ করে বাদ পড়া বীরযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।ঙ. যেসব আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা ইতোমধ্যে মারা গেছেন, তাদের মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি প্রদান করা আবশ্যক। একই সঙ্গে তাদের উত্তরসূরিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অর্জন নয়। এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, কোডা, কোড়া, রাজোয়াড়, তুরী, গারো, হাজংসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাদের অংশগ্রহণের ধরন, সংখ্যা ও ব্যক্তিগত ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। কারণ, সব অঞ্চলের তথ্য সমানভাবে সংরক্ষিত হয়নি এবং অনেকের অবদানের লিখিত দলিলও সীমিত।একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা কতটা প্রগতিশীল ও ন্যায়পরায়ণ, তা নির্ভর করে আদিবাসী, প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অবদানকে কতটা সম্মান জানাতে পারছি, তার ওপর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদের রক্ত আর মূলধারার বাঙালিদের রক্ত একই স্রোতে মিশে গিয়েছিল। সেই রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় কোনো ধরনের বৈষম্য বা অবহেলা কাম্য হতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংশোধনের চলমান ও ভবিষ্যৎ প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের উপেক্ষিত বীরত্বকে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করতে হবে। যতক্ষণ না সমতল ও পাহাড়ের শেষ প্রান্তিক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা তার প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাচ্ছেন, ততক্ষণ আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয়ের ইতিহাস অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। এই ঐতিহাসিক ঋণ পরিশোধের সময় এখনই।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

‘কেউ যেন অন্যায়ভাবে আটক না থাকে’—শুধুই কি কথার কথা!

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগদানের আগে সাংবাদিকদের এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমাদের সরকারের অবস্থান হলো, আমরা মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। বিরোধী দল আওয়ামী লীগ বা অন্য যে কোনো দলই হোক না কেন, বর্তমান সরকার অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন কারাগারে বা অন্যায়ভাবে আটক না থাকে।’ শামা ওবায়েদ জোর দিয়ে বলেন যে বর্তমান সরকার মানবাধিকার রক্ষা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহির নীতিতে বিশ্বাসী। তাই অতীত আমলের মতো পাইকারি বা গায়েবি মামলার সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া হবে না।বিদেশ সফরে গেলে মন্ত্রীদের হরহামেশাই মানবাধিকার সংস্থাগুলোর, বিশেষত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার মুখোমুখি হতে হয়। কূটনৈতিক পর্যায়েও নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তাই বিদেশ সফরের আগে, বিশেষত জাতিসংঘ অধিবেশনের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বশীল ফোরামে যোগদানের আগে ও অধিবেশন চলাকালে মন্ত্রী-উপদেষ্টারা এসব বক্তব্য দিয়ে থাকেন। ফিরে আসার পথে এসব কথা ভুলে যান। এটাই নিয়ম, এভাবেই চলছে। তা না হলে গায়েবি মামলাগুলো এবং বহুল আলোচিত প্রতিহিংসাবশত দায়ের করা অসংখ্য খুনের মামলা প্রত্যাহার হতে সময় লাগবে কেন? তাই তো প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক থেকে ফিরতি বিমানে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাল্টা ঘোষণা দিলেন, আওয়ামী লীগার ধরতে পারলেই পুরস্কৃত করা হবে।অথচ সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর ‘সব পরিকল্পনা’ ব্যর্থ হয়ে পড়ছে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে। শিশু হত্যা, শিশু ধর্ষণ থেকে শুরু করে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব—এমন কোনো অপরাধ নেই, যা প্রতিদিনই খবরের শিরোনাম হচ্ছে না। কিশোরী ছাত্রীর লাশ পড়ে থাকছে ধানখেতে, পাটখেতে বা বনজঙ্গলে। থানা নোটিস জারি করছে, কোনো পুলিশ সদস্য যেন একা বাইরে বের না হন। কী ভয়াবহ পরিস্থিতি! নিজ দলের লোকজনকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সরকারের সবচেয়ে স্মার্ট মন্ত্রী—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী—কয়েক মাসেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লেজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি করেছেন।‘রাজবন্দী: একসময়ের সহযোদ্ধারা কি চেয়ে চেয়ে দেখবে?’—উপসম্পাদকীয়টি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর আমার মনে হলো, সেই ১৯৮২ সালে সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনাপর্বে যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল, তার দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কারাগারে। অন্য যে কোনো রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর চেয়ে তারা তো অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাদের নিয়েই সবার আগে লেখা আমার জন্য জরুরি। অবশ্য মাস দুয়েক আগে ডাকসুর প্রাক্তন সহসভাপতি আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ জানিয়ে এক দফা লিখেছি। তাতে কী? আজ অবধি জামিন মেলেনি। জামিন শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে আসে না! ’৮২-র ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অপর একজন দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে একাধিক খুনের মামলায় আটক আছেন। তিনি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন।জালাল ভাই পুরান ঢাকার বাসিন্দা। তার পারিবারিক পরিচিতি আমার জানা নেই। তবে পুরান ঢাকা ঘিরেই তার বিচরণ। সেন্ট গ্রেগরিজ থেকে স্কুলজীবন সমাপ্ত করে পুরান ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধে যোগদান এবং স্বাধীন দেশে চিকিৎসাশাস্ত্রে পাস করেন একেবারে তার বাড়ির পাশের ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে।সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সময় তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে তিনি এবং ছাত্রলীগের অপর অংশের সভাপতি, বর্তমানে বিএনপি নেতা ফজলুর রহমান, বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। ১৯৮৩ সালেই তারা ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নেন। হাজি সেলিম আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর থেকে পুরান ঢাকার রাজনীতিতে জালাল ভাই বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারছিলেন না। জালাল ভাইয়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও হাজি সেলিমের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার উপযোগী নয়। তবে জালাল ভাই বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। অবশ্য সেই সময়ে বিএমএর মতো ঐতিহ্যবাহী পেশাজীবী সংগঠনকে পুরোপুরি দলীয় সংগঠনে পরিণত করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আছে। ভিন্নমতের পেশাজীবীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য দেখালেও বিএমএকে কার্যত আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ‘স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের’ অনুগত সংগঠন হিসেবে পরিণত করা হয়েছিল। তবে শুধু এই বিষয়ে সীমাবদ্ধ থেকে জালাল ভাইকে সামগ্রিকভাবে বিচার করা সমীচীন হবে না।প্রয়াত তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী থেকে শুরু করে মাঝখানে শেখ শহীদুল ইসলাম ও মনিরুল হক চৌধুরী ছাড়া ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত যারাই ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন, সবার সঙ্গে কমবেশি পরিচয় ও কথাবার্তা ছিল। সবার থেকে জালাল ভাই অন্য রকম। চোস্ত নেতা-ভাব ছিল না। একেবারেই সাদামাটা মনে হতো। গভীর রাজনৈতিক বিতর্কে অধিকাংশ সময় চুপচাপ থাকতেন। তার শারীরিক ভাষায়, বিশেষত হাসিতেই, বিনয় প্রস্ফুটিত হয়ে উঠত। আর পুরান ঢাকার কথার মধ্যে একটা প্রাণবন্ত টান থাকায় আলাপচারিতার সময় বা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের সভাসমূহে তার বক্তব্য এমনিতেই একটা মিষ্টি পরিবেশ সৃষ্টি করত। ওই সময়ের ডাকসু ভিপি আখতারুজ্জামান জগন্নাথ কলেজে তার অনুজ ছিলেন এবং একটা সময়ে কলেজে তারা একই ছাত্র সংগঠনে থাকায় দুজনের মধ্যে একটা গভীর আত্মীয়তাবোধ কাজ করত। জালাল ভাই দীর্ঘ সভা পছন্দ করতেন না। সভা লম্বা হয়ে গেলে বলে উঠতেন, ‘আখতার অজাইরা প্যাঁচাল বাদ দাও, কামের কথা থাকলে কও, নইলে কাডি!’ জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ডা. মুশতাক ঢাকা মেডিকেল কলেজে তার অনুজ ছিলেন। তার সঙ্গেও বিশেষ সখ্য ছিল। তাকে মধুর ক্যান্টিনে দেখলে বলতেন, ‘কী মুশতাক, চুপচাপ ক্যালা? সারাক্ষণ ঢাকা বিসবিল্যা রাখলে চলবো, ম্যাডিক্যালেও একটু টাইম-টেম দেও।’মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনের সঙ্গে অবশ্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আগে থেকেই সখ্য গড়ে ওঠে বকশীবাজারে। ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল বকশীবাজারে। বাড়ির মালিক ছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলর এবং আওয়ামী লীগের নেতা আবদুল আজিজ। সবাই ডাকতেন লাজিজ ভাই বলে। আমাদের অফিসের পাশেই ছিল তার বৈঠকখানা। সেখানে প্রায়ই জালাল ভাই আসতেন। আমিও মাঝে মাঝে তাদের আড্ডায় শরিক হতাম। লাজিজ ভাই প্রয়াত হয়েছেন বেশ কিছু কাল আগে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। সত্তর ও আশির দশকজুড়েই ছাত্র ইউনিয়ন আর যুব ইউনিয়নের সঙ্গে তার সম্পর্কটা অনেক গভীর ছিল।এত কথা বলার কারণ, জালাল ভাইকে শুধু ক্যাম্পাসে নয়, ক্যাম্পাসের বাইরেও দেখেছি। আওয়ামী লীগের অন্দরমহলে তো দেখার সুযোগ হয়নি। তবে জালাল ভাই খুন-হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন, এটা আমি কেন, তার সঙ্গে পরিচিত কেউই বিশ্বাস করবে না। অথচ জুলাই আন্দোলনের সময় নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াদুদ নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা এক হত্যা মামলায় তার নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মিরপুর থানার একটি হত্যা মামলাতেও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপি কর্মী মকবুল হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনায় পল্টন থানার মামলাতেও তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে মামলা যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা আদালতে সরকারি কৌঁসুলির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। সরকারি কৌঁসুলি বলেছেন, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং গুলি চালানোর নির্দেশ দিতে শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তথ্য-প্রমাণ ছাড়া এ ধরনের ঢালাও অভিযোগ আর পাইকারি মামলায় জালাল ভাইয়ের মতো সারা দেশে রয়েছেন অসংখ্য রাজবন্দী।প্রসঙ্গত, দুজন রাজনীতিকের কথা তুলে ধরছি। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের তার নির্বাচনী সভায় আওয়ামী লীগের সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হককে ফ্যাসিস্ট আখ্যায়িত না করে ‘ভাই’ সম্বোধন করে বলেন, ‘এবার তো মুজিব ভাই নেই। আপনাদের আগের অনুভূতিতে তো দুই নম্বরে আমি আছি। তাহলে ইনশাআল্লাহ, এবার আপনারা আমাকে ভোট দেবেন।’ তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদারকে তার নির্বাচনী সভায় উপস্থিত করার ব্যবস্থা করেন এবং তাকে তার জন্য দোয়া করতে বলেন। দোয়া প্রার্থনার পর আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আবার মাইকে এসে বলেন, ‘সালাউদ্দিন কী বলতে চেয়েছে, আপনারা বুঝেছেন তো? কোথায় ভোট দেওয়ার কথা বলেছে, আপনারা বুঝে নিয়েন।’ ‘ফ্যাসিবাদীদের’ ভোটের জন্য সেদিন কী জামায়াতি আকুতি!বিএনপির প্রাক্তন মহাসচিব, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার নির্বাচনী সমাবেশে বলেছিলেন, দেশে শুধু দুটোই প্রতীক—নৌকা আর ধানের শীষ। নৌকা এখন নেই, তাহলে ভোট দেবেন ধানের শীষে। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের দল স্বাধীনতাবিরোধীদের দল। তিনিও ফ্যাসিস্ট সম্বোধন না করে বলেছিলেন, ‘আমাদের হাসিনা আপা চলে গেছেন ভারতে। তিনি ভারতে গেছেন, ভালো করেছেন। কিন্তু এলাকার সমর্থক-কর্মীদের বিপদে ফেলে গেছেন কেন? আমরা আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের জানাতে চাই, আপনারা বিপদে পড়বেন না। আমরা আছি, আপনাদের পাশে।’আওয়ামী লীগের পাশে আওয়ামী লীগই থাকুক। বিএনপি বা জামায়াত-এনসিপির থাকার দরকার নেই। বরং সরকারের যে দায়িত্ব, সেটাই সরকার পালন করুক। শামা ওবায়েদের কথা অনুযায়ী, ‘বিরোধী দল, আওয়ামী লীগ বা অন্য যে কোনো দলই হোক না কেন, বর্তমান সরকার অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন কারাগারে বা অন্যায়ভাবে আটক না থাকে’—সরকার তার এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুক। দেশে ন্যূনতম আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।পরপর কয়েকটি লেখায় শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, ইনু, মেনন ইত্যাদি প্রসঙ্গ এসে যাওয়ায় আমার কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী আমাকে সতর্ক করে বলেছেন, লেখায় নাকি ‘দোসরদের’ প্রতি পক্ষপাতিত্ব হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ বা কথিত ‘দোসর’ কিংবা জয় বাংলা, ইনকিলাব ইস্যু নয়। ইস্যু হচ্ছে আইনের শাসন ও সুবিচার। আইনের শাসন ও বিচারহীনতার অভাবে আজ আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগ আইনের শাসন নিয়ে চিন্তিত বলে মনে হয় না। তারা তাদের শাসনামলে আইনের শাসন, বাক্‌স্বাধীনতা, সুবিচারের তোয়াক্কা করেনি। এখনো এসব নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। পত্রপত্রিকায় কী লেখা হচ্ছে, তাও আমলে নেন বলে মনে হয় না। তারা হয়তো তাদের বিষয় তাদের মতো করেই ফয়সালা করবেন।কিন্তু দেশের সাধারণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ, নাগরিক সমাজ, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং অবশ্যই দেশের ছোট-মাঝারি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আইনের শাসন, বাক্‌স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার জরুরি। এর ব্যত্যয় হলে সবাইকেই ভুগতে হবে। আইনের শাসনের বিপরীতে যদি প্রশাসন আর বিচার বিভাগে প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধ জায়গা করে নেয়, তবে তা মব-সংস্কৃতিরই আরেক রূপে আবির্ভাব ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। আর আইনের শাসন তো খণ্ডিতভাবে হয় না, সার্বজনীনভাবেই তার প্রয়োগ হতে হয়।মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনের কথায় ফিরে যাই। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক উত্তাল মুহূর্তে ডা. শামসুল আলম খান মিলন গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় তার সঙ্গে একই রিকশায় ছিলেন ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন। সেদিন তিনিও নিহত হতে পারতেন। তিনি আটক থাকা অবস্থায় তার সহধর্মিণী প্রয়াত হয়েছেন। তিনিও অসুস্থ। তার বিরুদ্ধে আনা একটি অভিযোগেরও তথ্য-প্রমাণ নেই। তাকে মুক্তি দিন। মিথ্যা হত্যা মামলা ছাড়া তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ভিন্ন কোনো অভিযোগ যদি থেকে থাকে, তা প্রকাশ করা হোক এবং বিচার চলুক। কিন্তু জামিনের অধিকার থেকে তিনি যেন বঞ্চিত না হন।একই পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন ডাকসুর প্রাক্তন ভিপি, প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। ২০১৮ সালে গণফোরামে যোগ দিয়ে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে পরবর্তীতে আবার গণফোরাম ত‍্যাগ করে ও একই সাথে বিএনপির সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগের সাথে সান্নিধ্য পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগে ফিরতে পারেননি। জুলাই আন্দোলনের সময়ও তিনি দেশে ছিলেন না। কিন্তু দেশে ফিরে আসার দিন আক্রোশবশত তাকে বিমানবন্দর থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২২ সালের এক খুনের মামলায় ফাসিয়ে দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরে উচ্চ আদালত থেকে তিনি জামিন লাভ করলে আটক রাখার উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি হত্যা মামলা দায়ের করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সুলতান মনসুর ২০১৮ সালে ও তারপরে নিঃসন্দেহে চরম রাজনৈতিক সুবিধাবাদীতার পরিচয় রেখেছিলেন। আর  সে কারণে তার বিরুদ্ধে আক্রোশ ও প্রতিহিংসাবশত একটার পর একটা খুনের মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাহলে সরকারের যে ঘোষণা ‘বর্তমান সরকার অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন কারাগারে বা অন্যায়ভাবে আটক না থাকে’ — এ কথার মুল‍্য রইলো কই?সৃষ্টিকর্তা তার অন্যতম সেরা উপহার হিসেবে মানুষকে দিয়েছেন কথা বলার ক্ষমতা—যা আর কোনো প্রাণীর নেই। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কথা ‘বাত কি বাত’ হয়ে গেলে শুধু তার কথার সৌন্দর্যই হারিয়ে যাবে না, বিশ্বাস বা প্রতিশ্রুতিরও ভঙ্গ হবে। আর বিশ্বাস কিন্তু কথায় নয়, কাজে গড়ে ওঠে। তাই কথা রাখতে না পারলে কথা না বলাই শ্রেয়। মানুষের বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে সব ‘পরিকল্পনা’ কিন্তু বরবাদ হয়ে যাবে!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

ভিডিও আরও দেখুন

ব্যালন ডি’অরের বিশেষ ভোটে রোনালদোর রাজত্ব

ফুটবল বিশ্বের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নতুন মাত্রা পেয়েছে ব্যালন ডি’অরের এক বিশেষ উদ্যোগে। আয়োজকদের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মে শুরু হয়েছে ‘ইতিহাসের সেরা ব্যালন ডি’অরজয়ী’ নির্বাচনের ভোটাভুটি। এতে ফুটবল ইতিহাসের সেরা ১০ কিংবদন্তির ভিন্ন ভিন্ন মৌসুমের পারফরম্যান্স থেকে সেরাটিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন সমর্থকেরা। সেই ভোটের লড়াইয়ে আপাতত বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে রোনালদোর ২০০৮ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী মৌসুম।আর্জেন্টাইন গণমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান ভোটের ফলাফলে এখন পর্যন্ত ৬২ শতাংশ ভোট পেয়ে শীর্ষে রয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ২০০৮ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ ক্যারিয়ারের প্রথম ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন এই পর্তুগিজ তারকা।অন্যদিকে, লিওনেল মেসির ২০১২ সালের ঐতিহাসিক ব্যালন ডি’অরজয়ী মৌসুম পেয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশ ভোট। অথচ সে বছর এক ক্যালেন্ডার বর্ষে রেকর্ড ৯১ গোল করে ইতিহাস গড়েছিলেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। মেসির মোট আটটি ব্যালন ডি’অর অর্জনের কারণে ভক্তদের ভোট বিভিন্ন মৌসুমে ভাগ হয়ে যাওয়ায় শতাংশের হিসাবে পিছিয়ে পড়েছেন তিনি। তালিকায় ৯ শতাংশ ভোট নিয়ে মেসির ২০২৩ সালের বিশ্বকাপজয়ী মৌসুম রয়েছে পরের স্থানে।মেসি-রোনালদো ছাড়া এই ভোটাভুটিতে জায়গা পেয়েছেন রোনালদো নাজারিও, ইয়োহান ক্রুইফ, মার্কো ফন বাস্তেন ও আলফ্রেডো দি স্তেফানোর মতো সর্বকালের সেরা ১০ ফুটবলার। প্রতিটি ভোটের জন্য ১ ইউরো নির্ধারণ করা হয়েছে, যার বিনিময়ে সমর্থকেরা চলতি বছরের ব্যালন ডি’অর প্রদান অনুষ্ঠানের টিকিট জেতার সুযোগ পাচ্ছেন। আগামী ২৭ অক্টোবর প্যারিস সময় মধ্যরাত পর্যন্ত এই ভোটগ্রহণ চলবে।/ 

ব্যালন ডি’অরের বিশেষ ভোটে রোনালদোর রাজত্ব