সংবাদ
বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ

বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ

মজুরি বৃদ্ধি ও বাড়িভাড়ার সামঞ্জস্য বিধানের দাবিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেছে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টা থেকে মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে সব ধরনের যানবাহন চলাচল।পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে কালিয়াকৈরের ‘এসেনশিয়াল ক্লোথিং লিমিটেড’ নামক কারখানার শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে প্রথম আন্দোলন শুরু করেন। একপর্যায়ে শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরিয়ে মিছিল নিয়ে কালিয়াকৈর-ফুলবাড়িয়া সড়কে অবস্থান নেন। পরে তারা আশপাশের আরও ৮ থেকে ১০টি পোশাক কারখানায় ছুটির দাবিতে চাপ সৃষ্টি করেন এবং কিছু কারখানার ফটকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে বেশ কয়েকটি কারখানা কর্তৃপক্ষ সাময়িক ছুটি ঘোষণা করলে সেই কারখানার শ্রমিকরাও এসে মূল আন্দোলনে যোগ দেন।আন্দোলনরত শ্রমিকদের বক্তব্য, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি ঘরভাড়া বহুগুণ বাড়লেও তাদের মজুরি দীর্ঘদিন ধরে বাড়েনি। বাধ্য হয়েই তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন।শিল্প পুলিশ গাজীপুরের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন জানান, মৌচাক পয়েন্টে শ্রমিকেরা মহাসড়ক অবরুদ্ধ করে রাখায় সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।/ 
৫৯ মিনিট আগে

মতামতমতামত

জগন্নাথের গরুভোজ, শিলিগুড়ির পোস্টার: অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের দুই ভাষা

এ কোন্ বাংলাদেশ, এ কোন্ ভারতবর্ষ আজ আমরা দেখছি? ধর্মীয় বিভাজন আর ভেদবিভেদের নোংরা রাজনীতি সমাজকে বিষাক্ত করে তুলছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গাপূজার সময় আমরা দেখলাম, রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নামে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে গরু জবাই করে ভোজের আয়োজন করেছে। এর আগে গরু নিয়ে ভোজ মিছিলও করেছে। সঙ্গে ছিল রংবেরঙের তরুণ ইউনূস বাহিনী। এসব ঘটনায় সাহসী হয়ে জামাত শিবির বাহিনী পিরোজপুরে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পসারির দাফন কার্যক্রমসহ পরিবারের স্বাভাবিক ধর্মীয় আচারে এবং মুক্তিযোদ্ধার অন্তিম সম্মান প্রদানে বাধা দিলো। আর কয়েক দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরজুড়ে পোস্টার সাঁটানো হয়েছে—‘হিন্দুর দোকান থেকে মাংস কিনুন। বিরিয়ানি খান, তবে হিন্দু রেস্টুরেন্টে’। আমাদের কিংবা আমাদের জ্যেষ্ঠ প্রজন্মের কাছে এসব কথা ও দৃশ্য তো একান্তই অজানা, অচেনা।পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুত্ববাদী নতুন মুখ্যমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পরে প্রথম যে কাজটি করলেন, তা হলো প্রায় একশ বছর ধরে কলকাতায় ঈদের প্রধান জামাত রেড রোডে অনুষ্ঠিত হয়ে এলেও যানজটের অজুহাতে সেখানে এর আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া। অথচ, কয়েক দিন পরেই এই রেড রোড তিন দিনের যোগ দিবসের জন্য সপ্তাহব্যাপী বন্ধ রাখা হলো।এদিকে আবার শারদোৎসবে কেন মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউ ভিন্ন ধর্মের প্রতি সম্মান জানাতে পূজামণ্ডপে যাবেন, তা নিয়ে ইসলামি উগ্রবাদীরা বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবিরাম কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ ইসলাম ধর্মে বহুত্ববাদ ও ভিন্ন ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা ও সম্মান প্রদর্শন অত্যন্ত মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি। ইসলাম মনে করে, পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের উপস্থিতি আল্লাহর ইচ্ছারই অংশ।নড়াইল শহরের চিত্রা নদীর পাড় ঘেঁষে সুন্দর, ছিমছাম একটি রিসোর্ট আছে—নাম চিত্রা রিসোর্ট। প্রথমবার সেখানে গিয়ে নদীর অপর পাড়ের মহিষখোলা পুরোনো রেজিস্ট্রি অফিসের পাশে একটি টং দোকানে চা খাওয়ার সময় আমার স্ত্রী দোকানিকে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে দেখার মতো কী আছে? দোকানি সরাসরি সামনের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললেন, “অই মন্দির আর মসজিদডা দেহেন।” চার দশক ধরে একেবারে পাশাপাশি অবস্থিত সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ এবং মহিষখোলা সার্বজনীন পূজামন্দির সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বুঝলাম, ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন উজ্জ্বল নিদর্শন এলাকার সাধারণ মানুষের কাছেও গর্বের, অহংকারের। দোকানির কাছ থেকেই শুনলাম, শহরের কুড়িগ্রাম এলাকায় নিশিনাথতলা মন্দির ও পুলিশ ফাঁড়ি জামে মসজিদ এবং পুলিশ লাইন জামে মসজিদ ও সর্বমঙ্গলা মন্দিরও পাশাপাশি অবস্থিত।এ ছাড়া পত্রিকায় তো এ ধরনের সংবাদ প্রায়ই প্রকাশিত হয়। টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা সদরে একই সীমানাপ্রাচীরের মধ্যে বাঁ পাশে মসজিদ ও ডান পাশে মন্দির অবস্থিত। প্রায় ৫৬ বছর ধরে একই প্রাঙ্গণে সহাবস্থান করছে এই দুই উপাসনালয়। ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্রে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী জয় কালী মন্দির এবং ফেনী কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদ। লালমনিরহাটের পুরোনো বাজার এলাকায় রয়েছে প্রায় দুই শত বছরের প্রাচীন কালীমন্দির। তার পাশেই রয়েছে এক শত বছরের পুরোনো বাজার জামে মসজিদ। মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ভূঁয়াই বাজার এলাকায় প্রায় ৫০ বছর আগে পাশাপাশি নির্মাণ করা হয় মসজিদ ও মন্দির—যা এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাক্ষী হয়ে আছে।দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাশাপাশি এ ধরনের আরও মসজিদ ও মন্দির রয়েছে। এসব স্থানে একই আঙিনায় পূজার্চনা ও নামাজ আদায় চলছে। স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় এসব মন্দির ও মসজিদকে কেন্দ্র করে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালন করছেন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা শোনা যায় না। মসজিদে নামাজের সময় এসব মন্দিরের ঢাক, উলুধ্বনি ও সাউন্ড সিস্টেম বন্ধ রাখা হয়। ফলে মুসল্লিরা সম্পূর্ণ নিরবচ্ছিন্নভাবে নামাজ আদায় করতে পারেন। আবার পূজা-পার্বণেও মসজিদের মুসল্লিরা সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভিন্ন ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতিকে ধারণ করে একই আঙিনায় এভাবে চলছে আজান ও উলুধ্বনি। একই উঠানে জ্বলতে থাকা প্রদীপ আর মিনারের সুর দুই সম্প্রদায়কে বেঁধে রেখেছে শতবর্ষের সম্প্রীতির বন্ধনে। অথচ মসজিদের সামনে শূকরের মাংস রান্নার আয়োজন হলে যারা আপত্তি করতেন, মন্দিরের কাছে গরুর মাংস রান্নায় হিন্দু শিক্ষার্থীদের আপত্তি বুঝতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সব তরুণের অসুবিধা কোথায়?ভারতবর্ষেও বিভিন্ন স্থানে—যেমন কলকাতা, হুগলি, ঝাড়গ্রাম, মথুরা, বারাণসী, নয়ডা, শ্রীনগর এবং কর্ণাটক ও কেরালার বিভিন্ন এলাকাসহ বহু স্থানে—মন্দির ও মসজিদ পাশাপাশি, একই সীমানার মধ্যে রয়েছে। সে আলোচনায় না গিয়ে ভিন্ন একটি ঘটনার উল্লেখ করছি, যা ২০২২ সালে পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল প্রচারিত হয়েছিল। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে গোটা ভারতবর্ষ যখন বিপর্যস্ত, সেই সময় কেরালার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মৃত্যুপথযাত্রী এক মুসলিম নারীকে কলেমা পড়ে শুনিয়েছিলেন এক নারী চিকিৎসক। ৫৬ বছর বয়সী কোভিড রোগী বিভাথু ১৭ দিন আইসিইউতে কেরালার একটি হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি যখন নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছিলেন, তখন ধর্মবিশ্বাসে হিন্দু চিকিৎসক রেখা কৃষ্ণান মুসলিমদের জন্য দোয়া বা প্রার্থনার কলেমা পাঠ করতে থাকেন। তিনি যখন কলেমার পঙ্‌ক্তিগুলো পড়ছিলেন, রোগী ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।ডাক্তার রেখা বলেন, “প্রায় ১৭ দিন ধরে বিভাথুর চিকিৎসা চলছিল। এ সময় তার ছেলে ও জামাই প্রবল বৃষ্টি কিংবা লকডাউন উপেক্ষা করে প্রতিদিন হাসপাতালে আসতেন, শুধু তাদের মায়ের খোঁজখবর নিতে। ভেতরে ঢুকতে না পারলেও তারা শুধু আমাকে দেখতে এবং তার অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিতে পার্কিং লটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তারা এও জানতেন যে তার স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে না। তবুও মনের শান্তি পেতে তারা প্রতিদিন ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। যখন আমি ভাবলাম, তার শেষ মুহূর্তে তারা পাশে থাকলে কী করতেন, তখন আমি প্রার্থনাটি জপ করতে শুরু করলাম।” ডক্টর রেখা বলেন, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে বড় হয়েছেন। এ কারণে তিনি ইসলামি প্রার্থনা জানতেন।কেরালায় যখন ডা. রেখা এ মানবিক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলেন, তখন নরেন্দ্র মোদির গুজরাটে ঘটল উল্টো ঘটনা। সেখানে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন করে করোনা আক্রান্ত হিন্দুদের রাখার জন্য একটি ওয়ার্ড এবং মুসলিম রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড তৈরি করা হলো। হিন্দুদের ওয়ার্ডে ঠাঁই পেতেন না মুসলিম রোগীরা, আর মুসলিমদের ওয়ার্ডে রাখা হতো না হিন্দুদের। এটি শুধু অমানবিক ঘটনা নয়, অসাংবিধানিকও। কারণ, ভারতীয় সংবিধান অনুসারে ধর্মের ভিত্তিতে যত ভারতীয়কে এভাবে আলাদা করে দেখা যায় না। কিন্তু মোদির ভারতে সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে, গায়ের জোরে ও কৌশলী ভোটের জোরে এ বিভাজন আজ চরম পর্যায়ে চলে গেছে।নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করার লক্ষ্য থেকে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনে এসআইআরের আওতায় পরিকল্পিতভাবে ২০ লক্ষেরও বেশি ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বিজেপির বিজয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে একই ঘটনা ঘটেছে বিহারে। সেখানে ৫২ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। আসামে নাগরিকপঞ্জি হওয়ার পর ১৯ লাখ মানুষ তার বাইরে রয়েছেন। সারা দেশজুড়ে এ প্রক্রিয়া চলছে। সব ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘু, বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়, আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায় এবং জনজাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা এই তথাকথিত এসআইআরের শিকারে পরিণত হচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বাদ-প্রতিবাদ করলেও বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি।কিন্তু অতিসম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিরোধী আন্দোলনে এক নাটকীয় পরিবর্তন ও নতুন গতি সৃষ্টি করে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষে নিযুক্ত তিনজন সম-পদমর্যাদার নির্বাচন কমিশনার মতবিনিময় করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বা সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচনপ্রক্রিয়া-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, বহু ক্ষেত্রে দুজন নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি সত্ত্বেও, এমনকি তাদের অন্ধকারে রেখে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ও অনেক নির্দেশ জারি করা হয়েছে। সেসব নির্দেশের বেশির ভাগই ছিল ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-সংক্রান্ত, যার সঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের বাদ পড়ার বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। অনেকটা আগুনে ঘি ঢালার মতো এ সংবাদ বিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চার করে।গোটা ভারতবর্ষে সাড়া জাগানো তরুণদের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টি, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও তাতে সমর্থন জানালে দিল্লিসহ সারা ভারতবর্ষজুড়ে ছাত্র-তরুণ, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা রাজপথে নেমে আসেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্দোলনের স্টিয়ারিংয়ে আসছেন। তরুণদের নেতৃত্বে শুধু ‘ককরোচ’রাই নয়, বরং বামপন্থী ছাত্রী নেত্রী নেহা বোরাও আইকন হয়ে উঠছেন। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একটি মন্তব্য (যা খণ্ডিতভাবে প্রচার করা হয়, পরে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে শুধরে নিয়েছেন) করা ছাড়া তিনি এ আন্দোলনে গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ঐশী ঘোষসহ আরও বেশ কয়েকজন বামপন্থী ছাত্রনেতা-নেত্রীও আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠছেন।যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো প্রস্তুতি নিয়ে দিল্লিতে বিরোধী আন্দোলন সামাল দিলেও মোদি সরকার ও তার অনুসৃত সাম্প্রদায়িক নীতিসমূহ সরাসরি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। মোদি ও অমিত শাহর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ছে। ভারতবর্ষের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি তুলে দেওয়ার যে স্বপ্ন তারা দেখছেন, তা কি কার্যকর করা যাবে? এই তরুণদের বড় অংশই আগামী নির্বাচনে নতুন ভোটার হিসেবে অংশ নেবেন। এই তরুণদের বাবা-মা, কাকা-কাকিরাই তো বিগত দুটি নির্বাচনে বিজেপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। তাদের সন্তানেরাই আজ নতুন পথের সন্ধান করছেন—যা তাদের অভিভাবকদের চিন্তার জগৎকেও প্রভাবিত করছে।বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর উগ্র ধর্মান্ধ শক্তি ও ছাত্রনেতৃত্বের একাংশ ক্ষমতা দখলের যে স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল, তাতে এখন অনেকটাই ভাটার টান। ইউনূস আমলে সরকারের ওপর তাদের যে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব ছিল, তা ক্রমেই শিথিল হচ্ছে। আর নিয়ন্ত্রণের রাশ যত আলগা হচ্ছে, ততই তাদের আচরণ, বক্তব্য ও শারীরিক ভাষায় ফুটে উঠছে এক অদ্ভুত দ্বৈততা—একদিকে উগ্রতার আস্ফালন, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ভীতি ও অস্থিরতা।অন্যদিকে, হিন্দুধর্মের বহুত্ববাদী ও যুক্তিনির্ভর ঐতিহ্যকে আড়াল করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ভারতের বহুভাষিক, বহুধর্মীয়, বহুজাতিসত্তার ও বহুসংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় সমাজকে কর্তৃত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার ছাঁচে বন্দি করতে চাইছে। কিন্তু ভারতবর্ষের নতুন প্রজন্ম সেই বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে আসছে। এই প্রতিরোধ কেবল ভারতের ভবিষ্যতের জন্য নয়, উপমহাদেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।সাম্প্রদায়িকতার এই অন্ধকার ভেদ করার এক অন্তর্নিহিত শক্তি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের মধ্যেও রয়েছে। রয়েছে বলেই তো জুলাই আন্দোলনে যেসব ছদ্মবেশী ছাত্রনেতৃত্বের মধ্যে কৌশলী অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদেরও মাথায় লাল-সবুজের পট্টি বাঁধতে হয়েছিল, আর সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মতো তাদেরও কণ্ঠে তুলে নিতে হয়েছিল ‘আমার সোনার বাংলা ….’-এর পাশাপাশি ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা …’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে …’, ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে …’, ‘মোরা একটি ফুলকে …’, ‘ও আমার দেশের মাটি …’—এসব দেশাত্মবোধক গান। আজ খুব বেশি প্রয়োজন দেশাত্মবোধের সেই শক্তিকে জাগিয়ে তোলা এবং বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা।বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। তবে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বিভাজনের বিরুদ্ধে দুই দেশের লড়াই অনেকখানি একই জায়গায় এসে মেলে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুভোজ ও গরু নিয়ে ভোজ মিছিলের নামে ভিন্ন ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করা হোক, কিংবা শিলিগুড়িতে ‘বিরিয়ানি খান, তবে হিন্দু রেস্টুরেন্টে’—এমন আহ্বানের মধ্য দিয়ে খাদ্যাভ্যাস ও ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা হোক, উভয়ের অন্তর্নিহিত রাজনীতি একই; মানুষের মধ্যে ঘৃণা, হিংসা, অবিশ্বাস আর বিভাজনের দেয়াল তুলে দেওয়া। এই দেয়াল ভাঙতে হবে সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতার শক্তিতে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

পর্যটনে নিরাপত্তা: আগুন লাগে, দায় নেয় না কেউ

কক্সবাজারের ইনানীতে আগুনে দশজন পর্যটকের মৃত্যু আমাদের পর্যটনশিল্পের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। হাসপাতালে বসে এক স্বামী বলছিলেন, আর দশ মিনিট সময় পেলে তার স্ত্রীও নিচে নেমে আসতে পারতেন। এই কথায় দুর্ঘটনার গভীর বেদনা ফুটে ওঠে। মানুষগুলো শুধু আগুনে প্রাণ হারাননি, হারিয়েছেন সময়মতো উদ্ধার ও নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগও। পর্যটককে স্বাগত জানাতে আমরা যতটা আগ্রহী, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ততটাই পিছিয়ে।গত ১৭ অক্টোবর উখিয়ার পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। কাঠ ও বাঁশে তৈরি তিনতলা ভবনটিতে নিচে ছিল রেস্তোরাঁ। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ওপরের তলা ধসে যায়। নিহতদের মধ্যে একজন নারী ও পাঁচ বছরের একটি শিশুও রয়েছে। প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাতের সন্দেহ করা হয়েছে। তবে আগুনের কারণ তদন্তে নিশ্চিত হবে। তার চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হলো, সামান্য আগুনে এত মানুষের মৃত্যু কীভাবে সম্ভব হলো?ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ছিল না। জুন মাসেই ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। অথচ অতিথি রাখা বন্ধ হয়নি। ভবনে জরুরি বহির্গমন পথও ছিল না। একমাত্র কাঠের সিঁড়িটি ছিল রান্নাঘর ও জেনারেটর কক্ষের মাঝখানে। নিকটতম ফায়ার স্টেশনও ছিল প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে। অর্থাৎ বিপদের আশঙ্কা জানা থাকলেও প্রতিরোধ ও উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। প্রথম কয়েক মিনিটের যথাযথ প্রস্তুতি হয়তো অনেক প্রাণ বাঁচাতে পারত।এই ব্যর্থতা কোনো একক ভুলের ফল নয়। অনিরাপদ ভবন, দাহ্য নির্মাণসামগ্রী, পালানোর পথের অভাব, দুর্বল তদারকি এবং দমকলের দূরত্ব—সব মিলিয়ে বিপর্যয় ঘটেছে। কক্সবাজারে পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এর অনেকগুলো বাধ্যতামূলক অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন ছাড়াই চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ে দশটি উপজেলার জন্য জনবল মাত্র আটজন। এই সীমাবদ্ধতা তদারকির দুর্বলতা বোঝায়। তবে জনবলসংকটকে দায় এড়ানোর অজুহাত করা যাবে না।এখানে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করার পর ব্যবস্থা নেওয়ার দায় কার, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। এক সংস্থা সতর্ক করবে, অন্য সংস্থা ব্যবস্থা নেবে—এমন অস্পষ্টতার সুযোগে বিপজ্জনক প্রতিষ্ঠান চালু থাকলে শেষ পর্যন্ত প্রাণহানির দায় কেউ স্বীকার করবে না। তাই শুধু তদন্ত কমিটি গঠন নয়, দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।পর্যটন মূলত আস্থার ওপর নির্ভরশীল। একজন পর্যটক সুন্দর দৃশ্যের পাশাপাশি নিরাপদ আবাসনও চান। বাংলাদেশের সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন ও নদী পর্যটনের বড় সম্পদ। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডে শিশু ও নারীসহ মানুষের মৃত্যুর খবর ছড়ালে সেই সম্পদের আকর্ষণ কমে যায়। এ বছরের আগস্টে কলকাতার একটি হোটেলে আগুনে নিহত নয়জনের মধ্যে আটজনই ছিলেন বাংলাদেশি। এ ধরনের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা পুরো অঞ্চলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত সব হোটেল ও রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই। ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে সংস্কারের সময় দিতে হবে; গুরুতর ঝুঁকি থাকলে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে। নিরীক্ষার ফল প্রবেশপথে দৃশ্যমানভাবে প্রকাশ এবং অনলাইন বুকিংয়ের সময় তা জানানো যেতে পারে। এতে পর্যটকেরা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে সরকারি পর্যটন পোর্টাল ও বুকিং প্ল্যাটফর্ম থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা দরকার।দ্বিতীয়ত, ইনানী, মেরিন ড্রাইভ ও টেকনাফের মতো দূরবর্তী এলাকায় দ্রুত অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা গড়তে হবে। ছোট অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্র, পর্যাপ্ত পানির উৎস, বহনযোগ্য সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী দল তৈরি করা যেতে পারে। প্রতিটি আবাসনে বিকল্প নির্গমন পথ, ধোঁয়া শনাক্তকরণ যন্ত্র ও কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। রান্নাঘর ও জেনারেটর কক্ষ আবাসন থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে। কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও অগ্নিনির্বাপণ মহড়াও জরুরি।পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কাজের সমন্বয় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা তদারকির জন্য একক সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ গঠন করা যেতে পারে। দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। সংস্কারের অগ্রগতিও নিয়মিত জানাতে হবে। শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়; দৃশ্যমান পরিবর্তন দরকার।ইনানীর দশটি প্রাণ আমাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে। এই শোক কি কয়েক দিনের আলোচনা ও তদন্ত প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নিরাপদ পর্যটনব্যবস্থা গড়ার সূচনা হবে? আতিথেয়তার অর্থ শুধু অতিথিকে স্বাগত জানানো নয়, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও। আর দশ মিনিট সময় পেলে যাঁরা বেঁচে যেতে পারতেন, তাদের সেই সময় ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতের কোনো পর্যটককে যেন একই পরিণতির মুখে পড়তে না হয়, সেই দায়িত্ব এখনই নিতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট]

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এমডি নিয়োগে চাই স্বচ্ছতা

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকট মোকাবিলা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দক্ষ নেতৃত্বের বিকল্প নেই। অথচ এসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক চলছে। গত সেপ্টেম্বরে অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) ও বেসিক ব্যাংকের এমডিদের চুক্তি বাতিল করে সরকার। নতুন এমডি নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না—এমন আলোচনার মধ্যে নিয়োগনীতির পরিবর্তনও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদে অভিজ্ঞ, সৎ, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করা এখন জরুরি।আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের জন্য ২০২৬ সালের নতুন নীতিমালা জারি করেছে। এতে এমডি বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগের জন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত রাখা হয়েছে। প্রার্থীকে বর্তমানে বা আগে কোনো ব্যাংকের এমডি পদে দায়িত্ব পালন করতে হবে, অথবা অব্যবহিত আগের পদে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে বিশেষ দক্ষতা, পেশাগত যোগ্যতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও সুনামসম্পন্ন প্রার্থীর ক্ষেত্রে এ শর্ত শিথিল করা যাবে। এ ছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতা, সততা, কর্মজীবনের সুনাম এবং তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা ও অর্থ পাচার প্রতিরোধ বিষয়ে জ্ঞানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে নমনীয়তা রাখা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সেই সুযোগ যেন নির্দিষ্ট কাউকে নিয়োগ দেওয়ার পথ তৈরি না করে। এক বছরে বারবার নিয়োগনীতি পরিবর্তন কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। প্রচলিত নিয়মে যোগ্যতা অর্জন করেও অনেকে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করে নতুন প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। নীতিমালা পরিবর্তনের কারণ, অনুমোদনপ্রক্রিয়া এবং তার ভিত্তিতে নিয়োগের ফলাফল প্রকাশ করা হলে স্বচ্ছতা বাড়বে।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিন কাজ করা অনেক কর্মকর্তার শাখা ব্যবস্থাপনা, ঋণ প্রশাসন, বৈদেশিক বাণিজ্য, নিরীক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও মানবসম্পদ বিভাগে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতাও অর্জন করেছেন। তাঁদের মধ্যে যোগ্য ব্যক্তিদের যথাযথ মূল্যায়ন করা দরকার। পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক যোগাযোগ বা ব্যক্তিগত প্রভাব নয়, সততা, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও কর্মদক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংক থেকে যোগ্য প্রার্থী নেওয়ার সুযোগ থাকলে তাঁদেরও একই মানদণ্ডে যাচাই করতে হবে।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি নেতৃত্বের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সোনালী ব্যাংক ছাড়া অন্য সরকারি ব্যাংকগুলোর লোকসান, খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও প্রভিশনসংকট উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন ঋণ অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুর্বল তদারকির কারণে ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থায় তারল্য সহায়তা দিয়েও সব সমস্যার সমাধান করা যায়নি। কারণ, খেলাপি ঋণই একমাত্র সমস্যা নয়। দুর্বল করপোরেট সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং জবাবদিহির অভাবও ব্যাংকগুলোর সংকট বাড়িয়েছে।এ অবস্থায় এমডি নিয়োগের জন্য শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা ও চাকরির মেয়াদ বিবেচনা করলেই চলবে না। প্রার্থীর ঋণ ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম শনাক্তকরণ, খেলাপি ঋণ আদায়, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা যাচাই করতে হবে। অতীতে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতা ও সুশাসনের রেকর্ডও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বাছাই কমিটির সুপারিশ, গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনার বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। নিয়োগের প্রতিটি ধাপে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি।একই সঙ্গে নিয়োগনীতি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল হওয়া দরকার। প্রয়োজন ছাড়া বারবার শর্ত পরিবর্তন করলে কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বাড়বে এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার ওপর আস্থা কমবে। নীতিমালা সংশোধন করতে হলে তার যৌক্তিকতা প্রকাশ করতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে কতজন কর্মকর্তা এমডি পদে নিয়োগের যোগ্যতা পূরণ করছেন, তাঁদের কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না কেন—এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত। এতে অযথা বিতর্ক কমবে এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।ব্যাংক খাতের সংকট কাটাতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া ঋণ আদায়, সম্পদের মান যাচাই, মূলধন ঘাটতি মোকাবিলা এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করাও জরুরি। এসব কাজে এমডিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। তাই তাঁদের নিয়োগে পেশাগত সততার পাশাপাশি কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও যাচাই করা প্রয়োজন।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদ কেবল একটি চাকরি নয়। এর সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থ, সরকারি সম্পদ এবং দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা জড়িত। তাই এ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষের পছন্দ বা প্রভাবের পরিবর্তে যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। স্বচ্ছ নিয়োগনীতি, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে সংকট থেকে উত্তরণের পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

সড়ক দুর্ঘটনার দায়মুক্তি ও প্রাণহানির খতিয়ান

বাংলাদেশে প্রতিটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার পর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে: শোকার্ত পরিবার, জনরোষ, তদন্তের দাবি এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হওয়ার আগেই ঘটে যায় আরেকটি দুর্ঘটনা। সড়কপথ বিপজ্জনক হতে পারে, চালকরা ভুলও করতে পারেন—তবে এটিই মূল সমস্যা নয়। আসল সমস্যা হলো, যে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব, তারা বারবার সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করতে পারছে না এবং কোনো অঘটন ঘটলে তার দায়বদ্ধতাও এড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের সড়ক নিরাপত্তা সংকট মূলত একটি জবাবদিহিতার সংকট।কত মানুষ মারা যাচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের কোনো ঐকমত্যই নেই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪,২৮৫টি দুর্ঘটনায় ৪,১৫৭ জন নিহত এবং ৫,৩৯১ জন আহত হয়েছে। অন্যদিকে, ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’-এর হিসাব অনুযায়ী, কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই ৪৪২টি দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত ও ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’ ৯,১১১ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে, যেখানে ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’-এর হিসাবে এই সংখ্যা ৭,৩৫৯। বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করায় এই পরিসংখ্যানগুলোর মধ্যে পার্থক্য দেখা দেয়।আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রকৃত চিত্র হয়তো আরও ভয়াবহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১,৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, অথচ সরকারি নথিতে এই সংখ্যা ৫,০৮৪। এত বড় ব্যবধান ইঙ্গিত দেয় যে, সরকারি নথিতে মৃত্যুর একটি বড় অংশই বাদ পড়ে যাচ্ছে। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ছাড়া সরকারের পক্ষে এটি জানা সম্ভব নয় যে, কোন সড়কগুলো সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক, কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে অথবা কোনো নীতি আদৌ কার্যকর হচ্ছে কি না।এর সমাধান হলো একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা, যেখানে পুলিশি প্রতিবেদন, হাসপাতালের তথ্য, মৃত্যু নিবন্ধন এবং বিমা দাবির মতো সব উপাত্ত একত্রিত থাকবে। প্রতিটি মৃত্যুকে একই পদ্ধতিতে নথিবদ্ধ করতে হবে—যার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিদের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।সঠিক পরিসংখ্যান কেবল একটি সূচনা মাত্র। মূল দুর্বলতাটি হলো—বিদ্যমান নিরাপত্তা বিধিগুলো কার্যকর করার ক্ষেত্রে। যদি গাড়ির ফিটনেস সনদ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র হয়, ত্রুটিগুলো মেরামত না করা হয়, অথবা সনদটি অর্থের বিনিময়ে কেনা হয়ে থাকে—তবে তা কাউকে সুরক্ষা দিতে পারে না। ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক, ক্ষয়ে যাওয়া টায়ার, নষ্ট বাতি, অনিরাপদ পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত বোঝাই যানবাহন একটি ছোট ভুলকেও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় রূপ দিতে পারে। গাড়ির পরিদর্শন হতে হবে প্রকৃত কারিগরি যাচাই-বাছাই, যার নথিপত্র থাকবে উন্মুক্ত এবং যার ওপর থাকবে নিরপেক্ষ তদারকি।চালকদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন একই ধরনের কঠোর নজরদারি। যখন নিয়োগকর্তারা অত্যন্ত কঠিন সময়সূচী চাপিয়ে দেন, চালকরা বিশ্রামের সুযোগ পান না এবং মুনাফার দৌড়ে বেপরোয়া আচরণকে উৎসাহিত করা হয়, তখন ড্রাইভিং লাইসেন্সের গুরুত্ব আর থাকে না। পরিবহন পরিচালনাকারীদের নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের চালকরা যোগ্য, দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিকভাবে সক্ষম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম পেয়েছেন কি না। কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি যখন যাত্রী পরিবহনকারী যানবাহন চালানোর সুযোগ পান, তখন কেবল চালককেই নয়, বরং যারা তাকে অনুমতি দিয়েছে, তাদেরও দায়বদ্ধ করতে হবে।মোটরসাইকেল আরোহী এবং পথচারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন। ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২,৯৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রশিক্ষণ, বৈধ লাইসেন্স, সঠিক মানের হেলমেট ব্যবহার এবং দ্রুতগতির যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া—এসবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ডেলিভারি কর্মীকে যেন কখনোই কঠোর সময়সীমা মেনে চলা এবং নিরাপদে বাড়ি ফেরার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে না হয়।পথচারীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি প্রায়শই থাকে রাস্তা বা অবকাঠামোতেই। ফুটপাতগুলো ভাঙাচোরা, হকারদের দখলে থাকা, অথবা অনেক জায়গায় ফুটপাতই নেই। স্কুল, বাজার বা বাস স্টপের মতো জায়গাগুলোর আশেপাশে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। স্থানীয় কাউন্সিল এবং সড়ক সংস্থাগুলোর উচিত জনবহুল এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন ফুটপাত, স্পষ্টভাবে চিহ্নিত পারাপারের স্থান, পর্যাপ্ত আলোকব্যবস্থা এবং যৌক্তিক গতিসীমা নিশ্চিত করা।সড়ক নকশার বিষয়টি যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, বাস্তবে তা পায় না। প্রতিটি মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনার পর ওভারটেকিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, লেন বিভাজন, দিকনির্দেশক চিহ্ন, সংযোগস্থল এবং দ্রুতগতির সড়কে ধীরগতির যানবাহনের উপস্থিতি—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠা উচিত। মিডিয়ান ব্যারিয়ার, নিরাপদ সংযোগস্থল, বাস্তবসম্মত গতিসীমা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে পারে যেন একজন চালকের ভুলে অনেক মানুষের প্রাণহানি না ঘটে।দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অ্যাম্বুলেন্সের ধীরগতি এবং হাসপাতালে নিম্নমানের চিকিৎসা সেবা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী নয় এমন আঘাতকেও মৃত্যুর কারণ করে তুলতে পারে। জরুরি পরিষেবা, পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স ও হাসপাতালগুলোর মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় প্রয়োজন; পাশাপাশি প্রশিক্ষিত প্রাথমিক সহায়তাকারী এবং ট্রমা কেয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।প্রস্তাবিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০২৬’-এ এসব ঘাটতির বেশ কয়েকটি সমাধানের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জরুরি চিকিৎসা সেবা, দুর্ঘটনাকবলিতদের সহায়তাকারীদের সুরক্ষা, খারাপ ড্রাইভিংয়ের জন্য পয়েন্টভিত্তিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং বারবার আইন লঙ্ঘনকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান। তবে এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে আইনের চূড়ান্ত খসড়া এবং তা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে তার ওপর।জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস কেবল বক্তৃতা, র্যালি বা সচেতনতামূলক প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আসল পরীক্ষাটি হলো—আইন পাস হলো কি না তা নয়, বরং এর ফলে মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমে কি না।প্রতিটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার দ্রুত তদন্ত হওয়া উচিত। যদি অবহেলা, জাল নথিপত্র ব্যবহার, অননুমোদিত ড্রাইভিং বা সরকারি কর্মকর্তাদের অসদাচরণ প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে কোনো অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান করতে হবে।বাংলাদেশের এমন একটি সড়ক নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রয়োজন, যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ থাকবে, সময়সীমা নির্ধারণ করা থাকবে এবং ফলাফলের পরিমাপ করা হবে। একটি জাতীয় টাস্ক ফোর্স গঠন করা যেতে পারে, যার বিআরটিএ, পুলিশ, সড়ক সংশ্লিষ্ট সংস্থা, স্থানীয় সরকার এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার মধ্যে সমন্বয় সাধনের কর্তৃত্ব থাকবে।নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে কেবল নথিপত্রনির্ভর না রেখে বাস্তব প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। বিআরটিএ-এর উচিত যানবাহনের ফিটনেস সনদ, পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং পরিদর্শন ফলাফলের একটি উন্মুক্ত ও অনুসন্ধানযোগ্য ডিজিটাল রেকর্ড রাখা। প্রতিটি বড় সড়ক প্রকল্প চালুর আগে একটি নিরপেক্ষ নিরাপত্তা নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।জরুরি সেবাদানকারী কর্মী, অ্যাম্বুলেন্স এবং উপযুক্ত হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই জবাবদিহিতার কাঠামো থাকা জরুরি। প্রতিটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার দ্রুত তদন্ত হতে হবে এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্দিষ্ট সংস্থার ওপর অর্পণ করতে হবে।এর মূল পরীক্ষাটি খুবই সহজ। প্রতিটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে জানতে হবে তাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে; প্রতিটি ব্যর্থতার কারণ খতিয়ে দেখতে হবে এবং প্রতিটি ফলাফল জনসমক্ষে উন্মুক্ত রাখতে হবে। যেসব মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য, সেগুলোকে ‘যাতায়াতের অনিবার্য মূল্য’ হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।যতদিন পর্যন্ত প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিতভাবে জবাবদিহিতার আওতায় না আনা হবে, ততদিন সড়ক নিরাপত্তা আমাদের নিজেদের জনগণের সুরক্ষায় ব্যর্থতারই একটি পরিমাপক হয়ে থাকবে। কোনো মানুষ মারা যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ কী প্রতিক্রিয়া দেখাল, তা দিয়ে অগ্রগতি বিচার করা যাবে না; বরং যাতায়াত ব্যবস্থাকে কতটা নিরাপদ করা সম্ভব হলো, তার ওপর ভিত্তি করেই প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

ধর্ম যার যার, নিরাপত্তার অধিকার সবার

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।’ ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে তিনি সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এর আগে ৩০ এপ্রিল বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষেও তিনি ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বার্তা। তবে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের কাছে এর গুরুত্ব শুধু শুভেচ্ছাবাণী কিংবা রাজনৈতিক আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা দেখতে চান, এই ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়; তাদের জীবন, সম্পদ, ধর্মীয় উপাসনালয়, ভূমি, সংস্কৃতি ও মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত থাকে। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় না; বরং প্রান্তিক, অসহায় ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের মানবিক চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়।বাংলাদেশ বহু ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার মানুষের দেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের পাশাপাশি সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, কোডা, কোড়া, রাজোয়াড়, তুরী, সিং, গারো, হাজং, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এ দেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজ গঠনে অবদান রেখে চলেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একক সম্পদ ছিল না। ধর্ম ও পরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষ একটি স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্নের বাংলাদেশে কোনো নাগরিককে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয়ভাবে সমান অধিকারের ঘোষণা থাকলেও সমাজের সব মানুষ সমানভাবে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পান কি না, সেই প্রশ্ন আজও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় উৎসবের আগে নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া প্রয়োজন। তবে উৎসব শেষ হওয়ার পরও সেই নিরাপত্তা অটুট রাখা আরও জরুরি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নিজের বাড়িতে, কর্মস্থলে, গ্রামে কিংবা উপাসনালয়ে যাওয়ার পথে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। শুধু আশ্বাস নয়, তাদের দৈনন্দিন জীবনেও নিরাপত্তার বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি করতে হবে।প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কেউ যেন নিজেদের সংখ্যালঘু মনে না করেন। এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, রাষ্ট্রের চোখে প্রত্যেক নাগরিক সমান মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু কাউকে সংখ্যালঘু মনে না করতে বললেই তার নিরাপত্তাহীনতা দূর হয় না। বরং কেন কোনো নাগরিক নিজেকে অনিরাপদ বা অসহায় মনে করছেন, রাষ্ট্রকে সেই কারণগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। কোনো সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের চেষ্টা হলে, কোনো উপাসনালয়ে হামলা হলে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে কারও বিরুদ্ধে উত্তেজনা ছড়ানো হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মীয় অনুভূতির অজুহাতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, জনতার প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়। এখানেই রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসনের পরীক্ষা। অপরাধী সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যে-ই হোন না কেন, তার পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণ ও আইন অনুযায়ী বিচারই হবে চূড়ান্ত বিবেচ্য।বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি আরও বিস্তৃত। তাদের জন্য নিরাপত্তা মানে শুধু শারীরিক হামলা থেকে রক্ষা পাওয়া নয়; নিজেদের ভূমিতে বসবাস, নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত আচার পালন এবং বৈষম্য ছাড়া শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভও নিরাপত্তার অংশ। সাঁওতালদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সামাজিক কাঠামো, উৎসব, ঐতিহ্য ও ইতিহাস। তাদের সোহরাই ও বাহা উৎসব কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়; এগুলো সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সামষ্টিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একইভাবে অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীরও নিজস্ব ঐতিহ্য ও জীবনদর্শন রয়েছে। কিন্তু ভূমির অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, প্রশাসনিক অবহেলা এবং পরিচয়ের স্বীকৃতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ উপেক্ষা করা হলে শুধু ধর্মীয় নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—সব আদিবাসী একই ধর্মের অনুসারী নন। কেউ খ্রিষ্টান, কেউ সনাতন ধর্মাবলম্বী, কেউ ক্রামা, সারনা, সানামাহী বা নিজস্ব ঐতিহ্যগত বিশ্বাস অনুসরণ করেন, আবার কেউ অন্য ধর্মের অনুসারী। তাদের ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে তারা সমান। একজন সাঁওতাল খ্রিষ্টান, একজন সাঁওতাল সারনাপন্থী কিংবা একজন হিন্দু আদিবাসী—প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। ধর্ম পরিবর্তন করলেও কারও মানবিক মর্যাদা, নাগরিক অধিকার কিংবা নিরাপত্তার অধিকার কমে যায় না।বাংলাদেশে দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা, শুভ বড়দিন ও ঈদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব দেশের বহুমাত্রিক সমাজজীবনের অংশ। এসব উৎসব নিরাপদে উদ্‌যাপনের পরিবেশ তৈরি করা সরকারের পাশাপাশি সমাজেরও দায়িত্ব। তবে উৎসবকেন্দ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। সারা বছর মন্দির, গির্জা, বৌদ্ধবিহার, মসজিদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো উপাসনালয়ে হামলা হলে দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়ার প্রবণতা প্রতিরোধেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কোনো অভিযোগ যাচাই না করে প্রচার করা কিংবা উত্তেজিত জনতাকে উসকে দেওয়া ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় নেতাদেরও সম্প্রীতি ও সহনশীলতার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। কোনো ধর্মের অনুসারীদের সম্মিলিতভাবে দায়ী না করে ব্যক্তির অপরাধকে ব্যক্তির অপরাধ হিসেবেই দেখতে হবে।সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।প্রথমত, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি দখল ও বৈষম্যের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। মামলা গ্রহণ থেকে শুরু করে বিচারপ্রক্রিয়া পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা যেন হয়রানি বা বাধার মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে হবে।দ্বিতীয়ত, যেসব এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। হামলার আশঙ্কা সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়ার পরও ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে।তৃতীয়ত, আদিবাসীদের ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ, উচ্ছেদ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক অধিকারসংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাদের বাদ দিয়ে নয়।চতুর্থত, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু উৎসব উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় নয়, তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো শোনা এবং সমাধানের অগ্রগতি পর্যালোচনা করাও জরুরি।পঞ্চমত, বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিক মর্যাদা এবং বৈচিত্র‍্যরে প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা কঠিন।গণতান্ত্রিক সরকার যদি সত্যিই এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে প্রত্যেকে নিরাপদে বসবাস করবেন, তাহলে সংখ্যালঘুদের উদ্বেগকে অবিশ্বাসের চোখে না দেখে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাদের কণ্ঠস্বরকে রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা অযৌক্তিক অভিযোগ হিসেবে চিহ্নিত না করে সমস্যার প্রকৃতি বুঝতে হবে। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার—নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার’—এই বক্তব্য বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন হতে পারে। যেদিন একজন সাঁওতাল নিশ্চিন্তে নিজের জমিতে চাষ করতে পারবেন, একজন খ্রিষ্টান নির্ভয়ে গির্জায় যেতে পারবেন, একজন হিন্দু নিরাপদে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন করতে পারবেন, একজন বৌদ্ধ নির্বিঘ্নে বুদ্ধ পূর্ণিমা পালন করতে পারবেন এবং প্রত্যেক মুসলমানও নিজের ধর্মীয় অধিকার ভোগ করতে পারবেন, সেদিনই এই বক্তব্যের পূর্ণ তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত দর্শন যেন শুধু বাণী ও বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার, সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হোক।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

স্বাদ, স্বাস্থ্য আর পানীয়ের নতুন দিনের গল্প

বাংলাদেশে পানীয়ের বাজার বললে একসময় আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত কোমল পানীয়, ফলের রস, লাচ্ছি, শরবত, চা, কফি কিংবা বোতলজাত পানি। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের পানীয়ের বাজারেও ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তন আসছে। ২০২৭ সালে এই পরিবর্তন আরও দৃশ্যমান হতে পারে। ভবিষ্যতের পানীয় শুধু তৃষ্ণা মেটাবে—এমন নয়; ভোক্তারা ক্রমেই এমন পানীয় চাইবেন, যা একই সঙ্গে সুস্বাদু, সুবিধাজনক এবং তাঁদের জীবনযাপন বা পুষ্টির কোনো নির্দিষ্ট প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই।বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া পানীয়ের চাহিদাকে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ায়। নগরায়ণ, মানুষের আয় ও ব্যয়ের ধরনে পরিবর্তন, সুপারমার্কেট ও অনলাইন বিক্রির প্রসার এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর নতুন পণ্য গ্রহণের আগ্রহ—সব মিলিয়ে পানীয়শিল্পে নতুন পণ্য তৈরির সুযোগ বাড়ছে। বাজারবিষয়ক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের ভোক্তাদের মধ্যে কম চিনি, প্রাকৃতিক উপাদান এবং কার্যকরী পানীয়ের প্রতি আগ্রহের কথা বলা হচ্ছে।এখন তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কোন স্বাদের পানীয় তৈরি করব’ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—পানীয়টি কেন মানুষ কিনবে এবং এটি তাঁদের কোন প্রয়োজন পূরণ করবে? এখানেই ২০২৭ সালের পানীয়শিল্পের বড় পরিবর্তন।বাংলাদেশে আগামী দিনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে কার্যকরী পানীয়। এ ধরনের পানীয়ের উদ্দেশ্য শুধু তৃষ্ণা মেটানো নয়; বরং নির্দিষ্ট পুষ্টিগত বা জীবনযাপনভিত্তিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে পণ্য তৈরি করা। যেমন শরীরচর্চার পর শরীরে পানির ঘাটতি পূরণে ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয়, খাদ্য-আঁশসমৃদ্ধ পানীয়, প্রোটিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয় কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তৈরি কম ক্যাফেইন বা ক্যাফেইনবিহীন পানীয়।বাংলাদেশে কার্যকরী পানীয়ের ধারণা ইতিমধ্যেই বাজার গবেষণায় আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। শক্তিবর্ধক পানীয়ের পাশাপাশি খেলাধুলার উপযোগী পানীয়, প্রোটিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয়, কার্যকরী পানি এবং উপকারী অণুজীব বা সুস্থতাকেন্দ্রিক পানীয়ের মতো বিভাগ নিয়ে বাজার বিশ্লেষণ হচ্ছে।তবে আগামী দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিবর্তন সম্ভবত শক্তিবর্ধক পানীয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।বর্তমানে বাজারে ‘শক্তিবর্ধক’ বলতে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই ক্যাফেইন ও চিনিনির্ভর পানীয় বুঝি। ভবিষ্যতে এই ধারণা আরও বিস্তৃত হতে পারে। কেউ চাইবেন ব্যায়ামের পর শরীরের পুনরুদ্ধারে সহায়ক পানীয়, কেউ চাইবেন দুপুরে হালকা পুষ্টি, কেউ চাইবেন গরমের দিনে ইলেকট্রোলাইট, আবার কেউ হয়তো চাইবেন সন্ধ্যার জন্য ক্যাফেইনবিহীন একটি সতেজ পানীয়। ফলে ভবিষ্যতের বাজারে ‘একটি পানীয় সবার জন্য’ ধারণার পরিবর্তে ‘একটি নির্দিষ্ট প্রয়োজনের জন্য একটি পানীয়’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে খাদ্য-আঁশসমৃদ্ধ পানীয়। কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী প্রোটিন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার ও পানীয় এখন প্রতিষ্ঠিত বাজার। কিন্তু প্রোটিনের পাশাপাশি খাদ্য-আঁশও এখন নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।আমাদের প্রচলিত খাদ্যে শাকসবজি, ডাল, ফল এবং পূর্ণ শস্য খাদ্য-আঁশের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু আধুনিক খাদ্যপ্রযুক্তিতে এমন অনেক দ্রবণীয় আঁশ রয়েছে, যা পানীয়তে ব্যবহার করা সম্ভব। আংশিক হাইড্রোলাইজড গুয়ার গাম, অ্যাকাসিয়া আঁশ, প্রতিরোধী ডেক্সট্রিনসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে স্বচ্ছ কিংবা হালকা ঘন পানীয় তৈরি করা যায়।বাংলাদেশের পানীয় কোম্পানিগুলো এখান থেকে নতুন বাজার তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে লেবু-লাইম স্বাদের গ্যাসযুক্ত খাদ্য-আঁশসমৃদ্ধ পানীয়, আম বা পেয়ারা স্বাদের আঁশসমৃদ্ধ পানীয় কিংবা গুঁড়ার ছোট প্যাকেটে দৈনিক খাদ্য-আঁশের পানীয় তৈরি করা যেতে পারে।এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অন্ত্রের সুস্থতা। বিশ্বব্যাপী প্রিবায়োটিক, প্রোবায়োটিক ও গাঁজন করা খাদ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে দইভিত্তিক পানীয়ের বাইরে আঁশসমৃদ্ধ ও অন্যান্য হজম-সহায়ক পানীয়ের বাজার তৈরি হতে পারে।তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পানীয়তে সামান্য আঁশ যোগ করলেই সেটিকে ইচ্ছেমতো ‘অন্ত্রের সুস্থতার পানীয়’ বলা উচিত নয়। কোন উপাদান কতটুকু রয়েছে, তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী এবং আইন অনুযায়ী কী ধরনের পুষ্টি বা স্বাস্থ্যবিষয়ক দাবি করা যাবে—এসব বিষয় অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।আরেকটি বড় সম্ভাবনা হচ্ছে শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের পানীয়। বাংলাদেশের আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করলে এই বাজারটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গরমের দিনে ঘাম, বাইরে কাজ, খেলাধুলা, দীর্ঘ যাতায়াত এবং শারীরিক পরিশ্রমের কারণে শরীরের পানি ও ইলেকট্রোলাইটের প্রয়োজন বাড়তে পারে।আমাদের দেশে খাবার স্যালাইনের অসাধারণ জনস্বাস্থ্যগত ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যবহৃত খাবার স্যালাইন এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য তৈরি শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের পানীয় এক বিষয় নয়। এখানেই শিল্পের নতুন সুযোগ রয়েছে।পানি, উপযুক্ত ইলেকট্রোলাইট, কম চিনি এবং ভালো স্বাদের সমন্বয়ে দৈনন্দিন পানীয় তৈরি করা যেতে পারে। এগুলো বোতল, ক্যান, গুঁড়ার ছোট প্যাকেট বা পানিতে গুলে খাওয়ার বড়ির আকারে বাজারজাত করা সম্ভব।বাংলাদেশের মতো দেশে ছোট প্যাকেট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একটি বড় বোতল কেনার পরিবর্তে কেউ যদি কম দামে একটি প্যাকেট কিনে ৫০০ মিলিলিটার পানিতে মিশিয়ে পান করতে পারেন, তাহলে পণ্যটি অনেক বড় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।২০২৭ সালের আরেকটি বড় বিষয় হবে কম চিনি। এখানে বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে ব্যবসায়িক সুযোগ এবং জনস্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাংলাদেশের পরিবারগুলোর মধ্যে কোমল পানীয় গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—২০২২ সালের গৃহস্থালি আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য ব্যবহার করা একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় কোমল পানীয় গ্রহণকারী পরিবারের অনুপাত ২০১৬ সালের প্রায় ১৩ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে প্রায় ৩৭ শতাংশে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে।অতএব, আমাদের ভবিষ্যৎ পানীয়শিল্প শুধু আরও বেশি পানীয় বিক্রির কথা চিন্তা করলে চলবে না; কী ধরনের পানীয় বিক্রি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কম চিনিযুক্ত বা চিনিবিহীন পানীয়ের বড় বাজার তৈরি হতে পারে। কিন্তু খাদ্যবিজ্ঞানীদের জন্য এটি সহজ কাজ নয়। চিনি শুধু মিষ্টতা দেয় না; এটি পানীয়ের ঘনত্ব, মুখে অনুভূত স্বাদ ও গঠন এবং ফলের স্বাদের ভারসাম্য তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। তাই চিনি কমিয়ে শুধু উচ্চমাত্রার কোনো মিষ্টিকারক যোগ করলেই ভালো পানীয় তৈরি হয় না। মিষ্টতা, অম্লতা, স্বাদ, মুখে অনুভূত গঠন এবং পান করার পর থেকে যাওয়া স্বাদ—সবকিছুর ভারসাম্য দরকার।বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর জন্য আরেকটি আকর্ষণীয় সুযোগ হতে পারে প্রোটিন পানীয়। প্রোটিনের গুঁড়াকে আমরা সাধারণত শরীরচর্চা বা ব্যায়ামাগারের সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রোটিন পানীয় শুধু শরীর গঠনে আগ্রহীদের জন্য থাকবে না। সকালের নাশতার সঙ্গে, অফিসে বিকেলের ক্ষুধায় কিংবা ব্যায়ামের পর সাধারণ ভোক্তার জন্য ছোট আকারের পুষ্টিকর পানীয় তৈরি হতে পারে।দুধের প্রোটিনের পাশাপাশি মটরশুঁটি, সয়া কিংবা অন্যান্য উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিন ব্যবহার করেও নতুন পণ্য তৈরি করা সম্ভব। কোকো, কফি, ভ্যানিলা, কলা কিংবা পরিচিত দেশীয় স্বাদের সঙ্গে প্রোটিন মিলিয়ে নতুন ধরনের পানীয় তৈরি হতে পারে।তবে শুধু প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ালেই ভালো পণ্য হয় না। প্রোটিনের স্বাদ, তিক্ততা, মুখে শুকনো অনুভূতি, তলানি এবং তাপ প্রয়োগে স্থিতিশীলতা—সবই গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত বিষয়।আরেকটি নতুন ধারণা হচ্ছে সময়ভিত্তিক পানীয়। সকালে আমরা চা বা কফি খাই। দুপুরে হয়তো ঠান্ডা পানীয় চাই। বিকেলে আবার চা। রাতে অনেকেই ক্যাফেইন এড়িয়ে চলতে চান। পানীয় কোম্পানিগুলো যদি এই স্বাভাবিক আচরণকে কেন্দ্র করে পণ্য তৈরি করে?সকালের জন্য হালকা ক্যাফেইন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয়, দুপুরে প্রোটিন বা আঁশযুক্ত পানীয়, বিকেলে কম চিনির সতেজ পানীয় এবং রাতে ক্যাফেইনবিহীন ক্যামোমাইল বা অন্যান্য উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ উপাদানভিত্তিক পানীয়—এ ধরনের ধারণা ভবিষ্যতে বাজার তৈরি করতে পারে।তবে ‘শিথিলতা’, ‘ঘুম’, ‘মানসিক চাপ কমানো’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও খাদ্য আইনের সীমাবদ্ধতা বুঝতে হবে। পানীয় কোনো রোগের চিকিৎসা নয়।স্বাদের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সামনে বিশাল সুযোগ রয়েছে। আমাদের নিজেদের ফলের বৈচিত্র্যই একটি বড় সম্পদ। আম, কাঁচা আম, পেয়ারা, লেবু, বাতাবি লেবু, আনারস, তেঁতুল, জাম, বরই, বেল, ডাব—এসব পরিচিত স্বাদকে আধুনিক পানীয়ের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করা যায়।বিশ্বে পুরোনো দিনের পরিচিত স্বাদকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি হতে পারে আরও আকর্ষণীয়। বেলের শরবত, আমপোড়া শরবত, তেঁতুল, লেবু-পুদিনা কিংবা বোরহানির পরিচিত স্বাদ আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন উপস্থাপনায় তরুণ ভোক্তার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে ফিরে আসতে পারে।কল্পনা করুন—গ্যাসযুক্ত আমপোড়া পানীয়, কম চিনির তেঁতুল-মরিচ পানীয়, লেবু-পুদিনা ইলেকট্রোলাইট পানীয় কিংবা বেল ও আঁশের সমন্বয়ে তৈরি আধুনিক পানীয়। এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমাদের ভবিষ্যৎ পানীয়শিল্পকে সব সময় বিদেশি স্বাদ নকল করতে হবে না। দেশীয় স্বাদকে আধুনিক খাদ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করাই হতে পারে আমাদের নিজস্ব উদ্ভাবন।দাম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। বাংলাদেশের ভোক্তারা মূল্য-সংবেদনশীল। কোমল পানীয় নিয়ে বাংলাদেশের তথ্য বিশ্লেষণেও দামের পরিবর্তনের সঙ্গে চাহিদার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই শুধু ২৫০ বা ৩০০ টাকার উচ্চমূল্যের পানীয় তৈরি করলে কার্যকরী পানীয়ের বাজার বড় হবে না। ২০, ৩০, ৫০ কিংবা ১০০ টাকার মধ্যে কীভাবে বিভিন্ন স্তরের পণ্য তৈরি করা যায়, সেটিও শিল্পকে ভাবতে হবে। ছোট বোতল, ছোট ক্যান, ছোট প্যাকেট এবং গুঁড়ার প্যাকেট এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।বাংলাদেশের শক্তিবর্ধক পানীয়ের বাজারও ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের একটি বাজার পূর্বাভাসে এই বাজারের মূল্য ২০২৬ সালে প্রায় ১৪ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার হিসেবে অনুমান করা হয়েছে এবং ২০৩১ সাল নাগাদ প্রায় ২২ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই বিশ্লেষণে ২০২৬–৩১ সময়ে বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার প্রায় ৮.২ শতাংশ ধরা হয়েছে। এগুলো অবশ্য বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস, সরকারি পরিসংখ্যান নয়।এই বাজারের ভবিষ্যৎ শুধু বেশি ক্যাফেইন ও বেশি মিষ্টতার মধ্যে আটকে থাকার প্রয়োজন নেই। কম চিনি, ইলেকট্রোলাইট, ভিটামিন, শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ এবং অন্যান্য কার্যকরী ধারণা ব্যবহার করে নতুন প্রজন্মের পণ্য তৈরি করা সম্ভব। সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের বাংলাদেশের পানীয়শিল্পের জন্য একটি সহজ সূত্র হতে পারে—স্বাস্থ্য + কার্যকারিতা + দেশীয় স্বাদ + সুবিধা + সাশ্রয়ী মূল্য।বাংলাদেশের খাদ্য ও পানীয় কোম্পানিগুলো যদি এখন থেকেই গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করে, তাহলে কয়েকটি ক্ষেত্র বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়—খাদ্য-আঁশ ও অন্ত্রের সুস্থতাকেন্দ্রিক পানীয়, কম চিনির কার্যকরী পানীয়, ইলেকট্রোলাইট ও শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের পানীয়, প্রোটিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয়, সময়ভিত্তিক পানীয় এবং আধুনিক রূপে দেশীয় স্বাদের পানীয়।কিন্তু শুধু নতুন উপাদান যোগ করলেই উদ্ভাবন হয় না। একটি ভালো পানীয়কে একই সঙ্গে নিরাপদ, স্থিতিশীল, সুস্বাদু, সাশ্রয়ী এবং আইনসম্মত হতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের গরম আবহাওয়ায় পণ্যের অণুজীবগত নিরাপত্তা, মোড়ক, আলো ও অক্সিজেনের প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণকালীন স্থিতিশীলতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।আগামী দিনের সফল পানীয় হয়তো সেই পানীয় নয়, যার বোতলে সবচেয়ে বেশি উপাদানের নাম লেখা থাকবে। বরং সফল হবে সেই পণ্য, যার প্রয়োজনীয়তা একজন সাধারণ ভোক্তা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বুঝতে পারবেন।একসময় আমরা দোকানে গিয়ে বলতাম—‘একটা ঠান্ডা পানীয় দিন।’ ভবিষ্যতে হয়তো একজন ভোক্তা বলবেন—‘কম চিনি, একটু আঁশ আর ভালো স্বাদের একটা পানীয় দিন।’ অথবা—‘গরমে শরীরটা সতেজ রাখবে, এমন একটা পানীয় দিন।’এই পরিবর্তন যদি সত্যিই আসে, তাহলে ২০২৭ সাল বাংলাদেশের পানীয়শিল্পের জন্য শুধু নতুন স্বাদের বছর হবে না; এটি হতে পারে নতুন চিন্তার পানীয়ের বছর।[লেখক: খাদ্যবিজ্ঞানী, উদ্ভাবন ব্যবস্থাপক, সালুটিভিয়া, যুক্তরাজ্য]

প্রবারণা পূর্ণিমার মৈত্রীতে আলোকিত হোক ধরণি

আজ শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা, ২৫৭০ বুদ্ধাব্দ। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত বা বর্ষাবাস পালিত হয়। প্রবারণা অর্থ হলো, একে অপরের কাছে নিজের দোষ-ত্রুটি স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং মৈত্রীভাবাপন্ন চিত্ত নিয়ে জীবন পরিচালনা করা। ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, কারও প্রতি কোনো ভুলত্রুটি করে থাকলে তা স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়াই প্রবারণার মূল শিক্ষা। একইভাবে অন্যের ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার মানসিকতাও এর সঙ্গে যুক্ত। আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে অশুভকে বর্জন করে সত্য ও সুন্দরকে বরণ করার শিক্ষা দেয় প্রবারণা।প্রবারণা পূর্ণিমার পর থেকে কার্তিক পূর্ণিমা পর্যন্ত এক মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় দানোত্তম কঠিন চীবর দান। যেসব বিহারে ভিক্ষুরা বর্ষাবাস পালন করেন, সেসব বিহারেই কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। প্রবারণা পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে গৌতম বুদ্ধের জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে চুল কর্তন, তাবতিংস স্বর্গে মাতা মহামায়ার উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনা, ৬০ জন শিষ্যকে ধর্ম প্রচারে পাঠানো এবং স্বর্গ থেকে সাংকাশ্য নগরে বুদ্ধের অবতরণ।চুল কাটা ও ফানুস উৎসবের উৎপত্তিবৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, আষাঢ়ী পূর্ণিমায় গৃহত্যাগের পর সিদ্ধার্থ গৌতম অনোমা নদীর তীরে পৌঁছে প্রব্রজিত জীবন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি উপলব্ধি করেন, প্রব্রজিত জীবনে চুলের প্রয়োজন নেই। তাই ক্ষুরধার তলোয়ার দিয়ে নিজের চুল কাটেন এবং অধিষ্ঠান করেন, তার কর্তিত চুল আকাশে নিক্ষেপ করলে তা যেন মাটিতে পতিত না হয়। তিনি যদি জন্ম-জন্মান্তরে ত্রিশ পারমি পূর্ণ করে বুদ্ধত্ব লাভের যোগ্যতা অর্জন করে থাকেন, তবে সেই চুল আকাশে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকুক।কথিত আছে, সিদ্ধার্থের নিক্ষিপ্ত চুল দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্ণের পাত্রে করে তাবতিংস স্বর্গে নিয়ে যান। সেখানে এই কেশধাতু স্থাপন করে নির্মাণ করা হয় ‘চুলামনি চৈত্য’। বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, দেবতারা এখনো এই চৈত্যের পূজা করেন। এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের ঐতিহ্য থেকেই বৌদ্ধদের মধ্যে আকাশ প্রদীপ বা ফানুস ওড়ানোর প্রচলন হয়েছে বলে মনে করা হয়। বর্তমানে ফানুস উৎসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি একটি সামাজিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রবারণা পূর্ণিমায় বৌদ্ধবিহারগুলোতে সমবেত হন। এভাবেই ফানুস উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমাকে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত করতে ভূমিকা রেখেছে।তাবতিংস স্বর্গে মাতার উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনাবৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, গৌতম বুদ্ধ তার সপ্তম বর্ষাবাস তাবতিংস স্বর্গে অতিবাহিত করেন। সেখানে পারিজাত বৃক্ষের নিচে পাণ্ডুকম্বল শিলাসনে বসে তিনি মাতা মহামায়ার উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনা দেন। তিন মাস ধরে দেশনা প্রদানের মাধ্যমে তিনি মাতাকে স্রোতাপত্তি মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত করেন বলে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বুদ্ধ মাতৃঋণ পরিশোধ ও কর্তব্য পালনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যা সবার জন্য অনুকরণীয়।কথিত আছে, তাবতিংস স্বর্গে পাণ্ডুকম্বল শিলাসনে উপবিষ্ট হয়ে বুদ্ধ দশ হাজার চক্রবাল থেকে আগত অসংখ্য দেবতা ও ব্রহ্মার উদ্দেশে সাত খণ্ডে বিভক্ত অভিধর্ম নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশনা করেন। আশ্বিনী পূর্ণিমায় তিন মাসব্যাপী এই দেশনার সমাপ্তি ঘটে বলে দিনটি অভিধর্ম দিবস হিসেবেও পরিচিত।স্বর্গ থেকে সাংকাশ্য নগরে অবতরণভারতের শ্রাবস্তী থেকে প্রায় ৩০ যোজন দূরে সাংকাশ্য নগর অবস্থিত বলে বৌদ্ধ ঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে। কথিত আছে, মহামৌদগল্যায়ন স্থবিরের মাধ্যমে বুদ্ধ তাবতিংস স্বর্গ থেকে মহাপ্রবারণার দিন সাংকাশ্য নগরে অবতরণের কথা জানান। দেবরাজ ইন্দ্র তখন দৈব প্রভাবে সুবর্ণ, রৌপ্য ও মণিময় তিনটি সোপান নির্মাণ করেন। সোপানগুলোর পাদদেশ সাংকাশ্য নগরের দ্বারে এবং শীর্ষ সুমেরু পর্বতের চূড়ায় স্থাপন করা হয়। দক্ষিণ দিকের সুবর্ণ সোপান দেবতাদের জন্য, বাম দিকের রৌপ্য সোপান মহাব্রহ্মাদের জন্য এবং মাঝের মণিময় সোপান বুদ্ধের জন্য নির্ধারিত ছিল। এই অবতরণের মধ্য দিয়ে আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত বুদ্ধের তিন মাসের বর্ষাবাসের সমাপ্তি ঘটে বলে বৌদ্ধ ঐতিহ্যে বিশ্বাস করা হয়।ধর্ম প্রচারে বুদ্ধের নির্দেশনাপ্রবারণা পূর্ণিমার সঙ্গে বুদ্ধের ধর্ম প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও যুক্ত। বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, যশ ও তার ৫৪ জন সহচরসহ মোট ৬০ জন শিষ্যকে বুদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য বিভিন্ন দিকে যাত্রা করার নির্দেশ দেন। তিনি তাদের বলেন, বহু মানুষের হিত ও সুখের জন্য, জগতের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শনের জন্য এবং দেবতা, ব্রহ্মা ও মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে ধর্ম প্রচার করতে হবে। তার নির্দেশনা ছিল, ধর্মের আদিতে, মধ্যে ও অন্তে যেন কল্যাণ থাকে এবং তা যেন অর্থপূর্ণ ও পরিশুদ্ধ হয়।বুদ্ধের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিষ্যরা বিভিন্ন দিকে ধর্ম প্রচারে বেরিয়ে পড়েন। সেই ধারাবাহিকতায় বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘ যুগে যুগে ধর্ম প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখে চলেছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা ধর্মসভা, গৃহস্থের বাড়ি, গ্রন্থ রচনা এবং আধুনিক সময়ে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বুদ্ধের শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। সদ্ধর্মের সংরক্ষণ ও প্রসারে তাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বুদ্ধের মানবতাবাদী শিক্ষার চর্চা ও প্রয়োগের বিকল্প নেই। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই তার মহান দর্শন অনুসরণ, অনুধাবন ও অনুশীলনের মাধ্যমে সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তুলতে পারেন। প্রবারণা আমাদের আত্মশুদ্ধি, ক্ষমাশীলতা, মৈত্রী ও পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতার সেই শিক্ষাই দেয়। এই পূর্ণিমার আলোয় মানুষের হৃদয় থেকে বিদ্বেষ দূর হোক, প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি ও সম্প্রীতি।ভবতু সব্ব মঙ্গলং—সকলের মঙ্গল হোক।[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাজদ্বীপ, রাঙামাটি]

টিআইএন থেকে রিটার্ন: ফ্রিল্যান্সার-উদ্যোক্তাদের করণীয়

আয় শুরু করেছেন? টিআইএন, কর ও রিটার্ন সম্পর্কে শুরুতেই জানুন। ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করছেন, অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছেন কিংবা নিজের একটি স্টার্টআপ গড়ে তুলছেন? আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করসংক্রান্ত কিছু দায়িত্বও আপনার সামনে আসবে। কিন্তু টিআইএন, আয়কর ও রিটার্ন নিয়ে নানা ভুল ধারণার কারণে অনেক তরুণ শুরুতেই বিষয়গুলো এড়িয়ে যান। কেউ মনে করেন, টিআইএন করলেই কর দিতে হবে, আবার কেউ মনে করেন, আয় কম হলে করসংক্রান্ত কোনো দায়িত্বই নেই।বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। আয় কত, আয়ের উৎস কী, পেশা বা ব্যবসার ধরন কী এবং সংশ্লিষ্ট আইনে কী ধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এসব বিষয়ের ওপর করসংক্রান্ত দায়িত্ব নির্ভর করে। তাই আয় শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে কর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং নিয়মিত হিসাব রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।তরুণদের মধ্যে বাড়ছে ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন ব্যবসাবর্তমানে তরুণদের মধ্যে ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, ডিজিটাল সেবা, অনলাইন ব্যবসা ও স্টার্টআপের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। অনেকেই ঘরে বসে দেশি-বিদেশি গ্রাহকের কাজ করছেন। কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা বিক্রি করছেন।এসব কর্মকাণ্ড কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে একজন ফ্রিল্যান্সারের আয় ও কার্যক্রম যেমন এক রকম নয়, তেমনি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও পার্থক্য রয়েছে। ফলে তাঁদের আয়, ব্যয়, হিসাবরক্ষণ ও কর ব্যবস্থাপনাও এক নয়। তাই শুধু অনলাইনে আয় করেন—এমন পরিচয়ের ভিত্তিতে সবার জন্য একই করব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।টিআইএন কেন প্রয়োজন?টিআইএন বা করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক করদাতাকে দেওয়া ১২ অঙ্কের একটি স্বতন্ত্র শনাক্তকারী নম্বর। বিভিন্ন সরকারি, ব্যবসায়িক ও আর্থিক কার্যক্রমে আইন অনুযায়ী টিআইএন এবং রিটার্নসংক্রান্ত নথির প্রয়োজন হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে টিআইএন গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা একই নয়। ব্যক্তির পেশা, আয়, কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধানের ওপর এর প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে। তাই আইন অনুযায়ী প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও টিআইএন গ্রহণ না করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি টিআইএন গ্রহণকে সরাসরি আয়কর প্রদানের সঙ্গে এক করে দেখাও ঠিক নয়।টিআইএন থাকলেই কি আয়কর দিতে হয়?এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। টিআইএন হলো করদাতাকে শনাক্ত করার নম্বর। অন্যদিকে আয়কর হলো প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী করযোগ্য আয়ের ওপর আরোপিত কর। অর্থাৎ, টিআইএন থাকা এবং আয়কর পরিশোধ করা একই বিষয় নয়। কারও টিআইএন থাকতে পারে, কিন্তু প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা, আয় ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় তার প্রদেয় কর শূন্য হতে পারে। আবার করযোগ্য আয় না থাকলেও আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।তাই টিআইএন গ্রহণের পর নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, সেটিও জানা জরুরি।ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয় ও করফ্রিল্যান্সাররা সাধারণত নিজেদের দক্ষতা, জ্ঞান বা পেশাগত সেবা দিয়ে আয় করেন। তাই কাজের শুরু থেকেই আয় ও খরচের সঠিক হিসাব রাখা গুরুত্বপূর্ণ।গ্রাহকের সঙ্গে চুক্তি বা কাজের রেকর্ড, চালানপত্র, অর্থ পরিশোধের রেকর্ড, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অনলাইন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমের তথ্য সংরক্ষণ করা উচিত। বিদেশি গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করলে অর্থের উৎস, কাজের প্রকৃতি এবং অর্থ গ্রহণের রেকর্ডও যথাযথভাবে রাখা প্রয়োজন।একইভাবে পেশাগত কাজ পরিচালনার জন্য যেসব খরচ হয়, সেসবের বিল, রসিদ বা অন্যান্য প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা উচিত। ব্যক্তিগত ও পেশাগত লেনদেন আলাদা রাখলে বছর শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব তৈরি এবং রিটার্ন প্রস্তুত করা সহজ হয়।কোনো নির্দিষ্ট আয় করমুক্ত কি না, করযোগ্য আয় কীভাবে নির্ধারিত হবে বা বিশেষ কোনো কর সুবিধা প্রযোজ্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর আইন ও বিধান অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।উদ্যোক্তাদের কর ব্যবস্থাপনাঅনলাইন বা অফলাইন ব্যবসা ছোট হলেও সেটি ব্যবসা। তাই শুরু থেকেই ব্যবসার আর্থিক হিসাব আলাদাভাবে রাখা উচিত। পণ্য ক্রয়ের চালান, বিক্রয়ের রেকর্ড, ক্রেতার অর্থ পরিশোধের তথ্য, পণ্য সরবরাহের খরচ, বিজ্ঞাপন ব্যয়, কর্মচারীর বেতন, অফিস বা গুদামভাড়া এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক ব্যয়ের নথি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত অর্থের সঙ্গে ব্যবসার অর্থ মিশিয়ে ফেললে প্রকৃত ব্যবসায়িক আয় ও ব্যয় নির্ধারণ কঠিন হয়ে যায়। এতে করযোগ্য আয় নির্ধারণ ও রিটার্ন প্রস্তুতের সময়ও জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সম্ভব হলে ব্যবসার জন্য পৃথক ব্যাংক হিসাব অথবা অন্তত পৃথক হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা রাখা ভালো।করযোগ্য আয় কীভাবে নির্ধারিত হবে?শুধু মোট আয় কত হয়েছে, তার ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা হয় না। আয়ের প্রকৃতি, প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা, অনুমোদিত ব্যয়, কর রেয়াত, উৎসে কর্তিত কর এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধানসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে করযোগ্য আয় ও প্রদেয় কর নির্ধারণ করা হয়।ফ্রিল্যান্সার বা উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে আয় ও ব্যবসায়িক ব্যয়ের সঠিক হিসাব তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ নথি ছাড়া কোনো ব্যয়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে আয় ও প্রাসঙ্গিক ব্যয়—উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত।উৎসে করের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণঅনেক ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তার আয় থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উৎসে কর কর্তনের প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। রিটার্ন প্রস্তুতের সময় প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী উৎসে কর্তিত করের তথ্য উপস্থাপন ও সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান, গ্রাহক বা অন্য উৎস থেকে কর কর্তন করা হলে তার প্রমাণপত্র সংগ্রহ করে রাখা উচিত।রিটার্ন কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?আয়কর রিটার্ন হলো নির্দিষ্ট করবর্ষে করদাতার আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় এবং প্রযোজ্য করসংক্রান্ত তথ্য আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিলের প্রক্রিয়া।রিটার্ন শুধু কর পরিশোধের মাধ্যম নয়, এটি করদাতার আয় ও আর্থিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক নথি। আইন অনুযায়ী যাঁদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাঁদের নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করা উচিত।কর না থাকলেও রিটার্ন লাগতে পারে‘আমার কর আসে না, তাই রিটার্ন দেব না’—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বিষয়টি সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। কারও প্রদেয় আয়কর শূন্য হতে পারে। তবে একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে কর না থাকলেও রিটার্ন দাখিল করতে হতে পারে। তাই শুধু আয়কর দিতে হবে কি না, তা জানাই যথেষ্ট নয়। নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।কর সুবিধার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজনফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য নির্দিষ্ট খাতকে উৎসাহিত করতে সরকার বিভিন্ন সময়ে কর সুবিধা, অব্যাহতি বা বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। তবে কোনো নির্দিষ্ট আয় এসব সুবিধার আওতায় পড়ে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধান অনুযায়ী যাচাই করতে হবে। শুধু কোনো আয়কে ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয়, অনলাইন ব্যবসার আয় বা প্রযুক্তি খাতের আয় হিসেবে উল্লেখ করলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত হয়ে যায় না। আয়ের প্রকৃতি, সেবার ধরন, কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর আইন ও বিধান বিবেচনা করেই কর সুবিধা প্রযোজ্য কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে।রিটার্ন দাখিলের আগে কী প্রস্তুত রাখবেন?রিটার্ন দাখিলের আগে সারা বছরের আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য গুছিয়ে রাখা উচিত। ফ্রিল্যান্সারের ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের রেকর্ড, চালানপত্র, চুক্তিপত্র, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, অর্থ পরিশোধের মাধ্যমের রেকর্ড এবং পেশাগত খরচের প্রমাণপত্র গুরুত্বপূর্ণ।উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে বিক্রয় ও ক্রয়ের হিসাব, পণ্য ক্রয়ের চালান, বিক্রয়ের রেকর্ড, ব্যবসায়িক খরচের বিল ও ভাউচার, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য এবং কর্মচারীর বেতনসহ অন্যান্য ব্যয়ের রেকর্ড সংরক্ষণ করা উচিত। এ ছাড়া জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, বিনিয়োগ, ঋণ এবং অন্যান্য সম্পদ ও দায়ের তথ্যও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রস্তুত রাখতে হয়। উৎসে কর কর্তন হয়ে থাকলে তার প্রমাণপত্রও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।শুরু থেকেই হিসাব রাখুনফ্রিল্যান্সার কিংবা উদ্যোক্তা, যাঁরাই হোন না কেন, আয় শুরু হওয়ার দিন থেকেই হিসাব রাখার অভ্যাস করুন। প্রতি মাসে আয় ও ব্যয়ের হিসাব লিখে রাখুন। ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, চালানপত্র, বিল, ভাউচার ও রসিদ সংরক্ষণ করুন। অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল রেকর্ডও যথাযথভাবে রাখুন।এতে বছর শেষে রিটার্ন প্রস্তুত করা সহজ হবে। পাশাপাশি ব্যবসা বা পেশাগত কাজের প্রকৃত আর্থিক অবস্থাও পরিষ্কার থাকবে। ভবিষ্যতে ব্যাংকঋণ, বিনিয়োগ গ্রহণ, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণের প্রয়োজন হলেও সুশৃঙ্খল হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।শুরুতেই সচেতনতা, ভবিষ্যতে স্বস্তিফ্রিল্যান্সিং বা উদ্যোক্তা হওয়ার সাফল্য শুধু কত টাকা আয় করছেন, তার ওপর নির্ভর করে না। সেই আয় কতটা সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ এবং আইনসম্মতভাবে পরিচালনা করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।আজকের একজন ফ্রিল্যান্সার আগামী দিনের উদ্যোক্তা হতে পারেন। আবার ছোট একটি অনলাইন ব্যবসাও ভবিষ্যতে বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। তাই ব্যবসা বা পেশাগত আয় শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে কর ও হিসাব ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন হওয়া ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।আয় শুরু করুন, হিসাব রাখুন, করের নিয়ম জানুন এবং সময়মতো আইনগত দায়িত্ব পালন করুন। শুরুতেই সামান্য সচেতনতা ভবিষ্যতের বড় আইনি ও আর্থিক ঝুঁকি থেকে আপনাকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।[লেখক: আয়কর আইনজীবী]

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ব্যর্থতা

নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আখতার সিতি—মক্কা অঞ্চলে কর্মরত দুই বাংলাদেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর শিরশ্ছেদ করেছে সৌদি আরব। তারা প্রেমিক-প্রেমিকা, না স্বামী-স্ত্রী, তা আজও নিশ্চিত করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ বা বাংলাদেশ সরকার। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কাজে’ লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের গুরুত্ব বিবেচনায় শরিয়া আদালত ‘তাজির’ বা বিচারকের বিবেচনামূলক দণ্ড হিসেবে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন। ১৪ অক্টোবর সেই দণ্ড কার্যকর করা হয়। বিবৃতিতে ‘অনৈতিক কাজ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। কোনো কোনো সংবাদে চুমু খাওয়ার কথা এসেছে, কিন্তু তা সৌদি সরকারের আনুষ্ঠানিক ভাষ্য নয়। ঘটনাটি মসজিদের আঙিনায়, নাকি ভেতরে ঘটেছে, তা-ও স্পষ্ট নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে, তারা ধর্মপ্রাণ ছিলেন এবং নামাজ পড়তেই মসজিদে গিয়েছিলেন।শরিয়াহ আইনে এই দণ্ড কতটা সংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। ইসলামে জিনা প্রমাণের জন্য চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী প্রয়োজন, অথবা অভিযুক্তের স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি থাকতে হয়। নবীজির (সা.) সময়ে হদের যে দু-একটি ঘটনা ঘটেছিল, সেসব ক্ষেত্রে অপরাধীরা নিজেরাই শাস্তি চেয়ে নিয়েছিলেন। হদ হচ্ছে কোরআন ও হাদিস দ্বারা নির্ধারিত বিধান। বিবাহবহির্ভূত চুমু নাজায়েজ হলেও এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নয়। তাই ঘটনা শুধু চুমু খাওয়ার হলে তা হদের আওতায় পড়ে না, তাজিরের আওতায় পড়ে। তাজিরের ক্ষেত্রে বিচারক পরিস্থিতি বিবেচনা করে লঘু দণ্ডও দিতে পারেন। তাই একটি চুমুর জন্য দুটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া তাজিরের উদ্দেশ্য হতে পারে না। প্রশ্ন থেকে যায়, এই কঠোরতা কি সৌদি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রয়োগ করা হয়?দণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়েও বিভ্রান্তি আছে। একসময় সত্যিই রিয়াদের দিরা স্কয়ার এবং মক্কা-জেদ্দার বড় মসজিদের পাশের উন্মুক্ত চত্বরে জুমার নামাজের পর প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হতো। মুসল্লিরা দাঁড়িয়ে তা দেখতেন। কিন্তু ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমানের সংস্কারের পর ২০২০ সাল থেকে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এখন কারাগারের ভেতরে দণ্ড কার্যকর করা হয়। আগে থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় না, মসজিদ প্রাঙ্গণেও কাউকে আনা হয় না। নজরুল ও সিতির ক্ষেত্রেও দণ্ড কার্যকরের পরদিন বিবৃতি এসেছে, আগে নয়।এখানেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অসহায়ত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তার দূতাবাসকে জানাতে হবে এবং কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ দিতে হবে। দূতাবাস আদালতে গিয়ে বিচারকে প্রভাবিত করতে পারে না। তবে অভিযুক্তের সঙ্গে দেখা করতে পারে, আইনজীবীর তালিকা দিতে পারে, পরিবারকে জানাতে পারে এবং বিচার সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এই দুজনের বিচার এক দিনে হয়নি; মাসের পর মাস চলেছে। অথচ সৌদি সরকার বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি, আর আমাদের জেদ্দা কনস্যুলেটও খবর রাখেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন বলছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ নিয়মিত যে কারাবন্দিদের তালিকা পাঠায়, তাতে এই দুজনের নাম ছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন তিনজন মন্ত্রী—একজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী। অথচ এখনো তালিকা যাচাই করা হয়নি; যাচাই করা হবে। দূতাবাসের কাজ শুধু তালিকা নথিভুক্ত করে রাখা নয়। প্রত্যেক বন্দির বিরুদ্ধে অভিযোগ কী, তার বিচার কোন পর্যায়ে এবং আইনি সহায়তা প্রয়োজন কি না, তা খুঁজে বের করাও দূতাবাসের দায়িত্ব।এই উদাসীনতার মধ্যেই এসেছে আরও অমানবিক বক্তব্য। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এই শিরশ্ছেদকে ‘বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়’ বলেছেন, যেন দুটি প্রাণের বিনিময়ে বাকিদের শিক্ষা দিতে হবে। অন্যদিকে বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন বলেছেন, ‘এই পাপের লাশটা বাংলাদেশে আসুক, অন্তত এইটা আমি কখনোই আশা করব না।’ পরে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন বটে, কিন্তু এই মানসিকতাই বলে দেয়, রাষ্ট্র নিজের নাগরিককে কীভাবে দেখে। অথচ বিপরীত উদাহরণও আছে। ২০১০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক পাকিস্তানিকে হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় বাংলাদেশি শ্রমিককে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দিয়াত বা রক্তপণ বাবদ চার লাখ দিরহাম দিয়ে ফিরিয়ে এনেছিল। শ্রীলঙ্কাও কূটনৈতিক তৎপরতায় তাদের এক নাগরিকের দণ্ড ঠেকিয়েছিল। রেমিট্যান্স যোদ্ধা বলে মুখে ফেনা তোলা বাংলাদেশ কেন পারল না?এই জিম্মিদশা নতুন নয়। এর শিকড় মর্যাদার সংকটে। ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া নারী গৃহকর্মীদের নির্যাতনের প্রতিবাদে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো বন্ধ করেছে। বাংলাদেশ চেয়েও পারেনি। অভিযোগ আছে, সৌদি আরব জানিয়ে দিয়েছে, নারী কর্মী না দিলে পুরুষ কর্মীও নেবে না। এর আনুষ্ঠানিক লিখিত প্রমাণ নেই। তবে ঢাকার শ্রমবাজারে কথাটি বহু বছর ধরে প্রচলিত। এ কারণেই বাংলাদেশ কঠোর অবস্থান নিতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। আমাদের অসংখ্য নারী সৌদি পরিবারে ধর্ষণ, গর্ভপাত ও নির্যাতনের শিকার হয়ে লাশ হয়ে ফিরছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিটি সরকার সৌদি বাদশাহকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তারা আসেননি, অথচ ভারত সফর করেছেন। আমরা ‘মুসলিম উম্মাহ’ বলে ফেনা তুলি, আর তারা আমাদের ‘মিসকিন’ বলে। জেদ্দা বিমানবন্দরে একজন পশ্চিমা যাত্রী যে সম্মান পান, বাংলাদেশি শ্রমিক তা পান না।এই ‘মিসকিন’ তকমার একজন ব্যক্তিগত সাক্ষী আমার প্রয়াত ভাই মহিউদ্দিন আহমদ। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার ওমরাহ করতে গেলে আমার ভাই তখন জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর। সৌদি রাজকীয় দপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে কাবার চাবির রক্ষক বনু শাইবা পরিবারের প্রধানকে জানানো হলো। তিনি আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মসজিদুল হারামের বাইরে অপেক্ষা করলেন। চাবির রক্ষক এলেন অনেক বিলম্বে। আমার ভাইয়ের মনে হয়েছিল, গরিব দেশের রাষ্ট্রপতি বলেই এই অবহেলা। রাসুল (সা.) যে চাবি বনু শাইবা গোত্রের হাতে আমানত হিসেবে দিয়েছিলেন, সেই আমানতদারও জানেন, একটি রাষ্ট্রের ওজন কতটা। তাই প্রশ্ন করি, ইউনূসের আমল থেকে বিএনপির আমল পর্যন্ত যে বলা হচ্ছে, ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি আর নেই’, তা যদি সত্যি হয়, তাহলে তুচ্ছ অভিযোগে দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ হয় কীভাবে? একটি রাষ্ট্রের দিকে চোখ রাঙালে আর আরেকটি রাষ্ট্রের দিকে মাথা নিচু করলে সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কাবার চাবির রক্ষকের আচরণ এবং নজরুল ও সিতির সঙ্গে সৌদি সরকারের নিষ্ঠুরতা আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—অর্থনৈতিক শক্তি ও কূটনৈতিক ওজন ছাড়া পবিত্র ভূমিতেও সমমর্যাদা মেলে না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

ভিডিও আরও দেখুন

ব্যালন ডি’অর ২০২৬: কে জিতল কোন পুরস্কার

লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠান। বিশ্ব ফুটবলের এই মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে পুরুষ ফুটবলে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতেছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন। অন্যদিকে, নারী ফুটবলে যৌথভাবে সর্বোচ্চ তৃতীয়বারের মতো ‘সোনালী বল’ নিজেদের করে নিয়েছেন স্পেনের তারকা ফুটবলার আলেক্সিয়া পুতেয়াস।স্থানীয় সময় সোমবার (২৬ অক্টোবর) দিবাগত রাতে ঘোষিত এই তালিকায় পুরুষ ও নারী উভয় বিভাগে স্পেন ও ইংল্যান্ডের জয়জয়কার লক্ষ করা গেছে।  একনজরে দেখে নেওয়া যাক ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরে কে কোন পুরস্কার অর্জন করেছেন:ছেলেদের ব্যালন ডি’অর: হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড ও বায়ার্ন মিউনিখ)মেয়েদের ব্যালন ডি’অর: আলেক্সিস পুতেয়াস (স্পেন ও লন্ডন সিটি লায়নেস)ছেলেদের সেরা উদীয়মান তরুণ খেলোয়াড় (কোপা ট্রফি): লামিনে ইয়ামাল (স্পেন ও বার্সেলোনা)মেয়েদের সেরা উদীয়মান তরুণ খেলোয়াড়: ভিকি লোপেজ (স্পেন ও বার্সেলোনা)ছেলেদের ফুটবলে সেরা কোচ (জোহান ক্রুইফ ট্রফি): লুইস দে লা ফুয়েন্তে (স্পেন)মেয়েদের ফুটবলে সেরা কোচ: পেরে রোমেউ (বার্সেলোনা)পুরুষ ফুটবলে সেরা গোলরক্ষক (ইয়াশিন ট্রফি): উনাই সিমোন (স্পেন)নারী ফুটবলে সেরা গোলরক্ষক: কাতা কোল (বার্সেলোনা)সক্রেটিস পুরস্কার: বুকায়ো সাকা (ইংল্যান্ড ও আর্সেনাল)ছেলেদের সেরা ক্লাব: পিএসজি (ফ্রান্স)মেয়েদের সেরা ক্লাব: বার্সেলোনা (স্পেন)সেরা পুরুষ স্ট্রাইকার (গার্ড মুলার ট্রফি): হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড ও বায়ার্ন মিউনিখ)সেরা নারী স্ট্রাইকার: শার্লিন কোবরাল (মেক্সিকো ও পাচুয়া)২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করে ৭৩ গোল করার সুবাদে হ্যারি কেইন যেমন পুরুষ বিভাগে আলো ছড়িয়েছেন, তেমনি নারী ফুটবলে নিজের চিরচেনা ছন্দে থেকে ইতিহাস গড়েছেন পুতেয়াস। পাশাপাশি স্পেনের কোচ ও তরুণ খেলোয়াড়দের সাফল্য আসরটিকে আরও বেশি জমজমাট করে তুলেছিল।/ 

ব্যালন ডি’অর ২০২৬: কে জিতল কোন পুরস্কার