সংবাদ
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ সন্ত্রাসী গ্রুপ, আধিপত্য বিস্তারে ২৫৬ খুন

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ সন্ত্রাসী গ্রুপ, আধিপত্য বিস্তারে ২৫৬ খুন

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫টি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয়। তারা সমুদ্রে ডাকাতি, মাদকের রুট নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে লিপ্ত। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব ক্যাম্পে ২৫৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। থেমে নেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মাদক ব্যবসা, নকল ওষুধ বিক্রি এবং নকল সামগ্রী সরবরাহের তৎপরতাও। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দুপুর আড়াইটা থেকে রাত পর্যন্ত টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এপিবিএন, জেলা পুলিশ, জেলা প্রশাসন, এসআরবি, বিজিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ব্যাটালিয়ন আনসার ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা যৌথ অভিযান চালান। রাত সাড়ে ৮টার দিকে এপিবিএনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেন।এপিবিএন-১৬ সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ অভিযানে সাজাপ্রাপ্ত আসামি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি ও ডাকাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া মোবাইল কোর্টে তিনজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযানে কুখ্যাত ‘সাদ্দাম বাহিনীর’ এক সদস্যকে আটক করা হয়েছে। আরও তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।ক্যাম্পে অনলাইন জুয়া, মাদক সেবন, বাবা-মাকে মারধর, পুলিশের কাজে বাধাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তিনজনকে চার মাস ও একজনকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত এক মাসে প্রায় অর্ধশত অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এপিবিএনের এই অভিযান অব্যাহত রয়েছে।এপিবিএন সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক (রোহিঙ্গা) সদস্যরা ক্যাম্পভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারে নিজেদের মধ্যে নানা দল ও উপদল গঠন করছে। এসব দলের মধ্যে কেউ সশস্ত্র, কেউ নিরস্ত্র। স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে তারা নিজেরাই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে।সশস্ত্র দলগুলো সমুদ্রের ডাকাতি ও মাদকের রুট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায়। অন্যদিকে নিরস্ত্র দলগুলো পারিবারিক বিরোধ, পূর্ব শত্রুতা, জুয়া, শিশু পাচার ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাতে জড়ায়।অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের আগস্ট (২০২৬) পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র ও নিরস্ত্র উভয় গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, মাদকের রুট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর আস্থা লাভের জন্য সংঘর্ষ হয়েছে।এ পর্যন্ত যত সংঘর্ষ হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে- ৭৫টি ঘটনার মধ্যে ৯৪টিতে ভিকটিম অপরাধের শিকার হয়েছেন। আর ৭২টি মামলার ঘটনায় ১৯৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যে সব কারণে সংঘর্ষ হয়েছে তার মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, শত্রুতা ও গ্রুপ বিরোধকে কেন্দ্র করে বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ১৮ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। সেখানে অপরাধের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।বাংলাদেশ পুলিশ ও জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কক্সবাজারে বিশেষ মতবিনিময় সভা২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় প্রায় ২৫৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ৮ এপিবিএন এলাকায় ১৪টি, ১৪ এপিবিএন এলাকায় ১০৭টি ও ১৬ এপিবিএন এলাকায় ৫৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।সম্প্রতি এপিবিএনের সদর দপ্তর থেকে একজন ডিআইজি সরজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও অপরাধ দমনে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন।এপিবিএন সদর দপ্তরের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় অপরাধ দমনে এপিবিএন এখন যৌথ টহল, চেকপোস্টসহ বিশেষ অভিযান জোরদার করেছে। একই সঙ্গে সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণে এপিবিএনের নিজস্ব ইউনিট তৎপর রয়েছে। সেখানে এপিবিএনের ১ হাজার ৯০০ এর বেশি জনবল কাজ করছে। তবে আরও সুবিধা বাড়ালে অপরাধ দমনে আরও বেশি কাজ করা সম্ভব হবে।”
৫ ঘন্টা আগে

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ সন্ত্রাসী গ্রুপ, আধিপত্য বিস্তারে ২৫৬ খুন

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ সন্ত্রাসী গ্রুপ, আধিপত্য বিস্তারে ২৫৬ খুন

গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর একগুচ্ছ নির্দেশনা

গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর একগুচ্ছ নির্দেশনা

‘এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা নেই’

‘এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা নেই’

গৃহায়নে দুর্নীতির লাগাম টানতে হার্ডলাইন প্রশাসন

গৃহায়নে দুর্নীতির লাগাম টানতে হার্ডলাইন প্রশাসন

চট্টগ্রামে চালু হচ্ছে দেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাক

চট্টগ্রামে চালু হচ্ছে দেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাক

আদালত চত্বরে পুলিশ কর্মকর্তার বাইক চুরি, ৯ মোটরসাইকেলসহ গ্রেপ্তার ৪

আদালত চত্বরে পুলিশ কর্মকর্তার বাইক চুরি, ৯ মোটরসাইকেলসহ গ্রেপ্তার ৪

গফরগাঁওয়ে কুপিয়ে-জিম্মি করে সাড়ে ১০ লাখ টাকার মালামাল লুট

গফরগাঁওয়ে কুপিয়ে-জিম্মি করে সাড়ে ১০ লাখ টাকার মালামাল লুট

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রতীক পেয়ে গণসংযোগে জামায়াত প্রার্থী

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রতীক পেয়ে গণসংযোগে জামায়াত প্রার্থী

মৃত্যুদণ্ডের দুই চেষ্টা ব্যর্থ, পাইকের ঘটনায় হতভম্ব মার্কিন বিচারকরা

মৃত্যুদণ্ডের দুই চেষ্টা ব্যর্থ, পাইকের ঘটনায় হতভম্ব মার্কিন বিচারকরা

মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু, নদী ও আড়তে সুনসান নীরবতা

মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু, নদী ও আড়তে সুনসান নীরবতা

মতামতমতামত

নিরাপদ খাদ্যের প্রথম পাঠ: খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের সামনে আসে খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার, মোবাইল কোর্ট, খাদ্য পরীক্ষা, জীবাণু, কারখানার স্বাস্থ্যবিধি, জিএমপি, হ্যাসাপ, আইএসও ২২০০০ কিংবা এফএসএসসি ২২০০০-এর মতো বিষয়। এগুলোর প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার সবচেয়ে মৌলিক জায়গাটি অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়। সেটি হলো—যে মানুষটি প্রতিদিন খাদ্য তৈরি করছেন, রান্না করছেন, কাঁচামাল বহন করছেন, খাদ্য পরিবেশন করছেন, যন্ত্র চালাচ্ছেন, খাদ্য প্যাক করছেন, গুদামে রাখছেন কিংবা উৎপাদন এলাকা পরিষ্কার করছেন, তিনি খাদ্য নিরাপত্তার মৌলিক বিষয়গুলো কতটা জানেন?এই প্রশ্নটি শুধু বড় খাদ্য কারখানার জন্য নয়। রাস্তার পাশে যিনি ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, সিঙ্গারা, সমুচা, পুরি, পরোটা, ভাজাপোড়া, শরবত, ফলের রস বা অন্য কোনো খাবার তৈরি ও বিক্রি করছেন, তার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। কারণ খাদ্য কারখানায় তৈরি হোক কিংবা রাস্তার ছোট দোকান বা ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে তৈরি হোক—খাদ্য অনিরাপদ হলে ভোক্তার জন্য ঝুঁকি একই।বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তাই পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতাদেরও খাদ্যকর্মী হিসেবে বিবেচনা করে মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন।একটি খাদ্য কারখানায় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকতে পারে। হ্যাসাপ পরিকল্পনা থাকতে পারে, আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা সনদ থাকতে পারে, আধুনিক পরীক্ষাগার এবং আলাদা মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগও থাকতে পারে। কিন্তু একজন কর্মী যদি টয়লেট থেকে এসে সঠিকভাবে হাত না ধুয়ে খাদ্য স্পর্শ করেন, ডায়রিয়া বা বমির মতো অসুস্থতা গোপন করে কাজে যোগ দেন, মেঝেতে পড়ে যাওয়া কোনো উপকরণ আবার ব্যবহার করেন কিংবা পরিষ্কার করার রাসায়নিক খাদ্যের পাশে রেখে দেন—তাহলে প্রতিষ্ঠানের উন্নত খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।অন্যদিকে পথের খাবারের ক্ষেত্রে ঝুঁকির ধরন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। সেখানে সব সময় পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, বর্জ্য ফেলার স্থান, শীতলীকরণ ব্যবস্থা কিংবা ঢাকা দেওয়া খাবার রাখার সুযোগ নাও থাকতে পারে। ধুলাবালি, মাছি, যানবাহনের ধোঁয়া, অপরিষ্কার পানি, একই হাতে টাকা ও খাবার ধরা এবং রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় পরিবেশের তাপমাত্রায় রেখে দেওয়ার মতো বিষয়ও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।এই জায়গাতেই প্রয়োজন খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১, অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তার একেবারে প্রাথমিক শিক্ষা। লেভেল ১ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষার স্তর নয়। এটি মূলত কর্মক্ষেত্রভিত্তিক খুব সহজ, সংক্ষিপ্ত ও ব্যবহারিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষা। একজন মানুষ খাদ্য উৎপাদন, প্রস্তুত, বিক্রয় বা পরিবেশনের কাজ শুরু করার আগে ন্যূনতম কী কী বিষয় জানবেন, সেটিই এই শিক্ষার মূল বিষয়।বাংলাদেশের জন্য এই ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা শুধু বড় আধুনিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশে অসংখ্য ছোট ও মাঝারি খাদ্য কারখানা রয়েছে। রয়েছে মিষ্টির কারখানা, বেকারি, দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, মাছ ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানা, পানীয় প্রস্তুতকারী, মসলা, আচার, সস, জ্যাম-জেলি, স্ন্যাকস ও হিমায়িত খাদ্য প্রস্তুতকারীসহ হাজারো ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসা। এর সঙ্গে রয়েছে হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, ক্যান্টিন এবং বাংলাদেশের শহর ও গ্রামের অসংখ্য পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতা।এসব মানুষের প্রত্যেককে হ্যাসাপের জটিল বিষয় শেখানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রত্যেককে অবশ্যই জানতে হবে—তার হাত, পানি, কাঁচামাল, বাসনপত্র, পোশাক, অসুস্থতা কিংবা একটি ছোট ভুল কীভাবে খাদ্যকে অনিরাপদ করে তুলতে পারে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১-এর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হওয়া উচিত—“নিরাপদ খাদ্যের দায়িত্ব আমারও।”একজন পথের খাবার বিক্রেতার ক্ষেত্রেও এই দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হয়তো একটি বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন না, তার আলাদা মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগও নেই। অনেক ক্ষেত্রে তিনিই কাঁচামাল কিনছেন, খাবার তৈরি করছেন, সংরক্ষণ করছেন, পরিবেশন করছেন, টাকা নিচ্ছেন এবং বাসন পরিষ্কার করছেন। ফলে তার খাদ্য নিরাপত্তা জ্ঞানই অনেক ক্ষেত্রে তার ব্যবসার প্রধান নিরাপত্তাব্যবস্থা।খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১-এর প্রশিক্ষণ তাই শুধু কারখানার কর্মীদের জন্য তৈরি করলে চলবে না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর একটি বিশেষ অংশ অথবা আলাদা সংস্করণ থাকতে পারে পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতাদের জন্য।বাংলাদেশে এ প্রয়োজনের পক্ষে গবেষণার তথ্যও রয়েছে। ২৬৬ জন পথের খাবার বিক্রেতাকে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৩ শতাংশের বেশি বিক্রেতা খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। গবেষকেরা নিয়মিত মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ঢাকার ৩৫০ জন পথের খাবার বিক্রেতার ওপর আরেকটি গবেষণাতেও ৮৫ শতাংশের কোনো খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ছিল না। অর্থাৎ পথের খাবার খাতকে মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষার বাইরে রেখে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা সংস্কৃতি তৈরি করা কঠিন।বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতির কর্মপরিকল্পনাতেও পথের খাবার বিক্রেতা ও শহুরে খাদ্য উৎপাদকদের জন্য দেশব্যাপী নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ফলে পথের খাবারকে জাতীয় লেভেল ১ প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত করার যথেষ্ট নীতিগত ভিত্তিও রয়েছে।বাংলাদেশের জন্য লেভেল ১ প্রশিক্ষণ খুব দীর্ঘ হওয়ার প্রয়োজন নেই। দুই থেকে তিন ঘণ্টার একটি সুপরিকল্পিত ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দিয়েই একজন নতুন কর্মী কিংবা পথের খাবার বিক্রেতার মধ্যে মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব। তবে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য শুধু তথ্য দেওয়া নয়; উদ্দেশ্য হতে হবে আচরণ পরিবর্তন করা।প্রথমেই তাকে বোঝাতে হবে খাদ্যের মধ্যে কীভাবে বিপদ আসতে পারে। সহজভাবে খাদ্যের বিপদকে জীবাণুজনিত, রাসায়নিক, বাহ্যিক বস্তুজনিত এবং অ্যালার্জিজনিত—এই কয়েকটি ভাগে বোঝানো যেতে পারে।জীবাণুজনিত বিপদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ইস্ট, ছত্রাক, পরজীবী এবং কিছু অণুজীবের স্পোর। তবে একজন সাধারণ কর্মী বা পথের খাবার বিক্রেতাকে এসব জীবাণুর জটিল বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য শেখানোর প্রয়োজন নেই। তাকে সহজভাবে বোঝাতে হবে—অপরিষ্কার হাত, দূষিত পানি, নোংরা বাসন, কাঁচা খাদ্য, মাছি, অসুস্থ খাদ্যকর্মী কিংবা অপরিষ্কার পরিবেশ থেকে খাদ্যে ক্ষতিকর জীবাণু যেতে পারে। অর্থাৎ তাকে ব্যাকটেরিয়ার বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস শেখানোর পরিবর্তে শেখাতে হবে—“আমার অপরিষ্কার হাত বা দূষিত পানি আমার তৈরি খাবারকে অনিরাপদ করতে পারে।”পথের খাবারের ক্ষেত্রে নিরাপদ পানির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। যে পানি দিয়ে শরবত তৈরি করা হচ্ছে, বরফ তৈরি করা হচ্ছে, ফল ধোয়া হচ্ছে, প্লেট-গ্লাস পরিষ্কার করা হচ্ছে কিংবা হাত ধোয়া হচ্ছে—সেই পানি নিরাপদ না হলে অন্যান্য সব পরিচ্ছন্নতার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।একইভাবে কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখার বিষয়টি শেখাতে হবে। কাঁচা মাংস বা মাছ কাটার ছুরি ও বোর্ড দিয়ে রান্না করা খাবার কাটা হলে দূষণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফুচকার জন্য ব্যবহৃত পানি, সালাদ, ধনেপাতা, কাঁচামরিচ কিংবা অন্য যেসব উপকরণ রান্না ছাড়াই খাওয়া হয়, সেগুলোর পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।লেভেল ১ প্রশিক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হবে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা। টয়লেট ব্যবহারের পর, খাদ্য প্রস্তুতের আগে, বর্জ্য স্পর্শ করার পর, কাঁচা খাদ্য ধরার পর, কাশি বা হাঁচির পর এবং হাত নোংরা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন কাজের পর সঠিকভাবে হাত ধুতে হবে।পথের খাবার বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে আরও একটি বাস্তব বিষয় শেখাতে হবে—একই হাতে টাকা এবং প্রস্তুত খাবার ধরা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা। টাকা অসংখ্য মানুষের হাতে ঘোরে। তাই সম্ভব হলে টাকা নেওয়া এবং খাদ্য পরিবেশনের কাজ আলাদা করা, চিমটা বা উপযুক্ত পরিবেশন উপকরণ ব্যবহার করা এবং নিয়মিত হাত পরিষ্কার করার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।খাবার ঢেকে রাখা, মাছি ও ধুলাবালি থেকে রক্ষা করা, বর্জ্য ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখা, পরিষ্কার ও নোংরা বাসন আলাদা রাখা, রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় অনিরাপদ তাপমাত্রায় না রাখা এবং বাসি খাবার ব্যবহারে সতর্ক থাকার বিষয়গুলোও পথের খাবারের লেভেল ১ পাঠ্যক্রমে থাকা উচিত।একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে—“পরিষ্কার দেখালেই নিরাপদ নয়।” স্বচ্ছ পানি জীবাণুমুক্ত নাও হতে পারে। ভালো গন্ধযুক্ত খাবারেও ক্ষতিকর জীবাণু থাকতে পারে। পরিষ্কার দেখতে একটি হাতেও জীবাণু থাকতে পারে। ফলে শুধু চোখ বা নাক দিয়ে খাবারের নিরাপত্তা বিচার করা যায় না।বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে উৎপাদন এলাকায় পান, জর্দা, তামাক বা সুপারি খাওয়া, থুতু ফেলা, মোবাইল ফোন ব্যবহার করা, অপরিষ্কার পোশাক পরে খাদ্য তৈরি করা এবং খোলা খাবারের পাশে বর্জ্য রাখা—এসব আচরণ নিয়েও প্রশিক্ষণে আলোচনা করা উচিত।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অসুস্থ অবস্থায় কাজ করা। ডায়রিয়া, বমি, জ্বর, সংক্রমিত ক্ষত কিংবা সংক্রামক রোগের লক্ষণ থাকলে খাদ্য তৈরি বা পরিবেশনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জানাতে হবে। একজন পথের খাবার বিক্রেতার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন, কারণ দোকান বন্ধ করলে তার দিনের আয় বন্ধ হতে পারে। তাই সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাস্তবসম্মত সহায়তার বিষয়টিও ভাবতে হবে।লেভেল ১-এর আরেকটি প্রধান শিক্ষা হওয়া উচিত—“সন্দেহ হলে থামুন এবং জানান।” কারখানায় কাচ ভেঙে গেলে, মেশিন থেকে ধাতুর অংশ খুলে গেলে কিংবা রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়লে যেমন কাজ থামানো দরকার, পথের খাবারের ক্ষেত্রে দূষিত পানি পাওয়া গেলে, পচা কাঁচামাল দেখা গেলে, খাবারের মধ্যে পোকা বা বাহ্যিক বস্তু পাওয়া গেলে কিংবা খাবার নষ্ট হওয়ার সন্দেহ হলে সেটি বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।বাংলাদেশে এই জাতীয় লেভেল ১ শিক্ষা চালুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ—বিএফএসএ নেতৃত্ব দিতে পারে। ইতিবাচক বিষয় হলো, বিএফএসএ ইতোমধ্যেই খাদ্যকর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও শেখার উপকরণ প্রকাশ করেছে এবং পথের খাবার বিক্রেতাদের নিয়েও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। উদাহরণ হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় পথের খাবার বিক্রেতাদের জন্য হাতে-কলমে খাদ্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ করা যায়।এই অভিজ্ঞতাকে বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ হিসেবে না রেখে জাতীয় কাঠামোয় নিয়ে আসাই হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ। এর নাম হতে পারে—“বিএফএসএ খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১: মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা সচেতনতা”।এর আওতায় খাদ্য কারখানার নতুন কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গুদাম ও প্যাকিং সহকারী, অস্থায়ী কর্মী, পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীর পাশাপাশি পথের খাবার প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতা, ক্ষুদ্র খাবারের দোকানদার, বাজারে প্রস্তুত খাবার বিক্রেতা এবং ভ্রাম্যমাণ খাদ্য বিক্রেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।তবে সবার প্রশিক্ষণ একেবারে একই হওয়া প্রয়োজন নেই। কারখানার কর্মীর জন্য যন্ত্রপাতি, উৎপাদন এলাকা এবং কারখানার পরিচ্ছন্নতার উদাহরণ থাকবে। পথের খাবার বিক্রেতার প্রশিক্ষণে বেশি গুরুত্ব পাবে নিরাপদ পানি, বরফ, হাত ধোয়া, রান্না ও সংরক্ষণ, কাঁচা ও প্রস্তুত খাবার আলাদা রাখা, টাকা ও খাবার পরিচালনা, মাছি ও ধুলাবালি থেকে সুরক্ষা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।প্রশিক্ষণ অবশ্যই সহজ বাংলায় হওয়া উচিত এবং ছবি, বাস্তব উদাহরণ ও প্রদর্শনের ওপর বেশি নির্ভর করা উচিত। যারা পড়তে বা লিখতে পারেন না, তারাও যেন এই প্রশিক্ষণ নিতে এবং মূল্যায়নে অংশ নিতে পারেন। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার পরীক্ষা নয়।বিএফএসএ জাতীয় পাঠ্যক্রম, প্রশিক্ষণ উপকরণ, প্রশিক্ষকের যোগ্যতা এবং মূল্যায়নের মান নির্ধারণ করতে পারে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষিত খাদ্যবিজ্ঞানী ও খাদ্যপ্রযুক্তিবিদ, অভিজ্ঞ খাদ্যশিল্প পেশাজীবী, স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সারা দেশে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। পথের খাবার বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে বাজার, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বড় বিক্রয়কেন্দ্র ধরে দলভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।ভবিষ্যতে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার পথের খাবার বিক্রির অনুমতির সঙ্গে এই মৌলিক প্রশিক্ষণকে যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে লক্ষ্য যেন শুধু আরেকটি সনদ তৈরি করা না হয়। লক্ষ্য হবে বিক্রেতা বাস্তবে নিরাপদ পানি ব্যবহার করছেন কি না, হাত পরিষ্কার রাখছেন কি না, খাবার ঢেকে রাখছেন কি না এবং কাঁচা ও প্রস্তুত খাবার আলাদা রাখছেন কি না।পরিদর্শনের সময় তাই শুধু “সনদ আছে?” প্রশ্ন করলে চলবে না। জিজ্ঞেস করতে হবে—“আপনার হাত ধোয়ার পানি কোথায়?”, “এই বরফের পানি নিরাপদ কি না কীভাবে জানেন?”, “কাঁচা মাংস কাটার ছুরি দিয়ে রান্না করা খাবার কাটবেন কি?”, “ডায়রিয়া হলে কী করবেন?”, “বিক্রি না হওয়া খাবার আগামীকাল কীভাবে ব্যবহার করবেন?” সঠিক উত্তর এবং বাস্তব কাজ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার উন্নয়নের জন্য উন্নত পরীক্ষাগার, আইন, তদারকি, আধুনিক কারখানা, জিএমপি, হ্যাসাপ ও আন্তর্জাতিক মান অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের একজন মানুষ প্রতিদিন যে খাবারটি খান, তার সবটাই বড় কারখানা থেকে আসে না। রাস্তার পাশের ফুচকা, চটপটি, সিঙ্গারা, শরবত কিংবা ছোট দোকানের খাবারও আমাদের খাদ্য সংস্কৃতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।তাই নিরাপদ খাদ্যের জাতীয় উদ্যোগে বড় কারখানার কর্মী এবং রাস্তার পাশের ক্ষুদ্র খাবার বিক্রেতাকে দুই ভিন্ন জগতের মানুষ হিসেবে দেখলে চলবে না। দুজনের কাজের পরিসর আলাদা হতে পারে, কিন্তু দুজনের হাতেই ভোক্তার খাদ্যের নিরাপত্তা নির্ভর করে।বাংলাদেশের জন্য তাই একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী নীতি হতে পারে—যিনি মানুষের জন্য খাদ্য তৈরি, প্রক্রিয়াজাত, পরিবেশন বা বিক্রি করবেন, কাজ শুরু করার আগে তার মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষা থাকা প্রয়োজন।কারখানার কর্মী থেকে পথের খাবার বিক্রেতা—সবার কাছে যদি এই প্রাথমিক জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা শুধু আইন, অভিযান বা কারখানার সনদের বিষয় হয়ে থাকবে না; এটি ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন আচরণে পরিণত হবে।নিরাপদ খাদ্য শেষ পর্যন্ত শুধু পরীক্ষাগারে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় পরিষ্কার হাতে, নিরাপদ পানিতে, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে, সঠিক অভ্যাসে এবং নিজের কাজের প্রতি দায়িত্ববোধে। আর সেই পরিবর্তনের প্রথম পাঠ হতে পারে—খাদ্য নিরাপত্তা লেভেল ১।[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

আদিবাসী জরিপ: যে প্রশ্নগুলো জরুরি

‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র‍্য পরিস্থিতি নিরূপণ জরিপ-২০২৫’ প্রকল্পের আওতায় ১ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই মহাযজ্ঞে যুক্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার গণনাকারী। নিঃসন্দেহে এটি দেশের প্রথম বিশেষায়িত আদিবাসী জরিপ। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থাসহ বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে, অন্যদিকে সঠিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরিতেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জরিপের মাধ্যমে দেশে বসবাসরত আদিবাসীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার তৈরি করা হবে। এতে পরিবারভিত্তিক বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক নানা সূচক যুক্ত করা হবে। ফলে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা ও দারিদ্র‍্যরে মাত্রা নিরূপণ করা সম্ভব হবে। সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রকৃত উপকারভোগী চিহ্নিত ও নির্বাচন করাও সহজ হবে।জরিপের মূল উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য হলো—ক. স্বতন্ত্র তথ্যভান্ডার: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবারভিত্তিক যাবতীয় তথ্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ফুল কাউন্ট’ ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি করা;খ. সামাজিক সূচক: তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র‍্য ও জনমিতিক পরিস্থিতি নিরূপণ করা;গ. সুবিধাভোগী নির্বাচন: নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সরকারি সুযোগ-সুবিধার প্রকৃত উপকারভোগী সঠিকভাবে বাছাই করা।ইতোপূর্বে জরিপের প্রাক্-পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে—বিশেষত বান্দরবান, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, পঞ্চগড়, নেত্রকোণা, সিলেট ও পটুয়াখালীসহ বেশ কয়েকটি জেলায়। তথ্য সংগ্রহকারীরা প্রধানত জানতে চাইবেন—এলাকার পরিচিতি, নৃগোষ্ঠীর খানা বা পরিবার শনাক্তকরণ, খানার বৈশিষ্ট্য, সদস্যদের তথ্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, ১০ বছরের বেশি বয়সী সদস্যদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিদেশে বা পরিবারের বাইরে বসবাসকারী সদস্যদের তথ্য। এছাড়া পরিবারে কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন কি না, কেউ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আছেন কি না, জাতীয় পরিচয়পত্র আছে কি না, সদস্যদের বৈবাহিক অবস্থা, জন্মসনদ আছে কি না, ধর্মীয় পরিচয়, কোনো এনজিওর সহায়তা পেয়েছেন কি না, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় হিসাব আছে কি না, রেমিট্যান্স আসে কি না—এসব তথ্যও সংগ্রহ করা হবে।সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, দেশের সব শ্রেণি, পেশা ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের উন্নয়নের জন্য সঠিক তথ্য প্রয়োজন। পরিসংখ্যান হাতে না থাকলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর নীতি গ্রহণ কঠিন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার চায় সব বিষয়ে প্রকৃত তথ্য উঠে আসুক। কারণ তথ্য সঠিক না হলে পরিকল্পনাও সঠিক হবে না।তবে আদিবাসী জরিপ নিয়ে অনেকের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় প্রশ্নমালার কিছু নীতিগত দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে।নামকরণে জটিলতা: প্রশ্নপত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দের পরিবর্তে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’-এর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এসব পরিচয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা সেখানে দেওয়া হয়নি। কারা উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত, সে বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশিকা সাধারণের সামনে দৃশ্যমান নয়।তালিকার বাইরে থাকা জাতিগোষ্ঠীর সংকট: সরকারি গেজেটে থাকা ৫০টি নামের বাইরে কোনো ছোট বা প্রান্তিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী থাকলে তাদের নাম ওই তালিকায় খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে মূলধারার বাঙালি কিংবা বড় কোনো আদিবাসী গোষ্ঠীর নামে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের আদমশুমারিতে আদিবাসী হিসেবে উল্লেখিত কয়েকটি নামও বর্তমান গেজেটের বাইরে রয়েছে। এভাবে কোনো জাতিগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার বিষয়টি হতাশাজনক।চা শ্রমিকদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। কিন্তু তারা প্রধানত ‘চা শ্রমিক’ হিসেবেই পরিচিত। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে কর্মরত অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, প্রায় ১১৬টি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও একমত হওয়া যায়নি। সাহিত্যে দেখা যায়, জাতি, গোত্র, বংশ, নাম ও পরিচয় মুছে চা-বাগানের শ্রমিকদের একসময় ‘কুলি’ নামে অভিহিত করা হয়েছে; পরে ‘বাগানি’ এবং এখন ‘চা শ্রমিক’ নামে পরিচিত করা হচ্ছে। জনশুমারিতে তথ্যনির্ভরভাবে এসব জাতিগোষ্ঠীর উপস্থিতি তুলে ধরা জরুরি।আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় গণনাকারী হিসেবে আদিবাসীদের দায়িত্ব দিলে নামের বানান, পদবি ও উচ্চারণের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা নিশ্চিত করা সহজ হবে। দু-একটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর পদবি বাঙালি পদবির মতোই। যেমন, মালপাহাড়িয়াদের পদবি ‘বিশ্বাস’ ও ‘দাস’। এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজে পরিচয় স্পষ্ট না করলে তাকে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুলের কারণে আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সংশোধনের চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকে হতাশ হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই অর্থের প্রয়োজন হয়, যা প্রান্তিক মানুষের জন্য বড় বাধা।ধর্মের সুনির্দিষ্ট পরিচয় না থাকা: আদিবাসীদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ধর্ম বা প্রকৃতিপূজারী বিশ্বাসের পৃথক পরিচয় না থাকায়—যেমন সাঁওতালদের সারনা ধর্ম—তাদের অনেককে ‘অন্যান্য’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। এতে তাদের সঠিক ধর্মীয় পরিসংখ্যান আড়ালে থেকে যায়।মাতৃভাষার প্রশ্নের অনুপস্থিতি: প্রশ্নপত্রে ‘আপনার মাতৃভাষা কী?’ অথবা ‘আপনি কোন ভাষায় কথা বলেন?’—এ ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকা জরুরি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে কতগুলো আদিবাসী ভাষা টিকে আছে এবং কতগুলো বিলুপ্তির পথে, সে বিষয়ে একটি নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্যভান্ডার তৈরি করা সম্ভব হতো।একটি আদর্শ, বৈজ্ঞানিক ও অধিকারভিত্তিক আদিবাসী জরিপ করতে হলে বর্তমান সংকট ও বঞ্চনার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আদিবাসীদের মতে, বর্তমান জরিপে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত করা হলে তাদের প্রকৃত চিত্র সামনে আসত।১. ভূমি ও ভিটেমাটি হারানোর পরিসংখ্যানক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘আপনার পরিবার কি গত এক দশকে কোনো ধরনের প্রথাগত ভূমি বা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে?’ অথবা ‘আপনাদের ঐতিহ্যবাহী জমির কত অংশ এখন বেদখল হয়ে গেছে?’খ. কেন জরুরি: সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের বড় সংকটগুলোর একটি ভূমি দখল ও উচ্ছেদ। এই প্রশ্ন থাকলে কত মানুষ নিজ ভূমিতে পরবাসী বা ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন, তার একটি ধারণা পাওয়া যেত।২. অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতিক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘কাজ বা নিরাপত্তার খোঁজে আপনার পরিবারের কোনো সদস্য কি পৈতৃক গ্রাম ছেড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা অন্য কোনো বড় শহরে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন?’খ. কেন জরুরি: কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার অভাবে অনেক সাঁওতাল, গারো বা ত্রিপুরা তরুণ-তরুণী নিজ এলাকা ছেড়ে শহরে এসে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। শুধু গ্রামের বাড়ির ঠিকানার ভিত্তিতে তাদের গণনা করা হলে শহরে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা ও দুর্দশার চিত্র আড়ালে থেকে যাবে।৩. আর্থ-সামাজিক বঞ্চনা ও দারিদ্র‍্যরে সূচকক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘আপনার পরিবার কি সরকারের কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি—যেমন বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা বা শিক্ষাবৃত্তি—পাচ্ছে?’খ. কেন জরুরি: আদিবাসীদের জন্য জাতীয় বাজেটে বিভিন্ন বিশেষ বরাদ্দ ও সুযোগ থাকে। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে এসব সহায়তা প্রকৃত প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা যাচাই করা কঠিন।৪. মাতৃভাষার বিলুপ্তি ও সংকটক. প্রশ্ন হতে পারত: ‘আপনার পরিবারের নতুন প্রজন্মের শিশুরা কি নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলতে ও লিখতে পারে?’খ. কেন জরুরি: বাংলাদেশের অনেক আদিবাসী ভাষা এখন বিলুপ্তির পথে। এ ধরনের তথ্য থাকলে কোন ভাষা সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন এবং কোথায় মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক চালু করা দরকার, তা নির্ধারণ করা সহজ হতো।আদিবাসী জরিপের প্রচার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম তাদের নিজস্ব ভাষায় রেডিও, টেলিভিশন বা লিফলেটের মাধ্যমে করা উচিত ছিল। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ জরিপের গুরুত্ব সহজে বুঝতে পারতেন। পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের কাছে পৌঁছানো, সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা এবং তাদের আস্থা অর্জন—সবই গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে আদিবাসী জরিপ কেবল কিছু শুষ্ক সংখ্যার যোগ-বিয়োগ নয়। এটি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব, অধিকার ও উন্নয়ন বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ২০২৬ সালের এই বিশেষায়িত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জরিপ যদি সততা, স্বচ্ছতা এবং আদিবাসী সমাজের প্রত্যক্ষ সহযোগিতার মাধ্যমে সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে অতীতের পদ্ধতিগত ভুলগুলো অনেকটাই দূর করার সুযোগ তৈরি হবে। রাষ্ট্র যখন তার প্রান্তিক নাগরিকদের সঠিক পরিসংখ্যান সততার সঙ্গে গ্রহণ করবে, তখনই একটি প্রকৃত বৈচিত্র‍্যময় ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

কুসংস্কার দূর করতে চাই জ্ঞানের আলো

অনগ্রসর, দলিত-বঞ্চিত ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেক মানুষ শিক্ষা ও তথ্যের সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকায় কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের শিকার হন। কোনো কথা সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকলেই তা সত্য বা বিজ্ঞানসম্মত হয়ে যায় না। বরং প্রচলিত বিশ্বাসকে যুক্তি, জ্ঞান ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। বিজ্ঞান আমাদের শেখায়—আগে জানতে হবে, তারপর বিশ্বাস করতে হবে।করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময়ও কুসংস্কারের নানা দৃষ্টান্ত দেখা গেছে। কোথাও কোথাও মানুষ রোগ থেকে রক্ষা পেতে পূজা বা নানা আচার-অনুষ্ঠানের আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু এসবের মাধ্যমে কেউ রোগমুক্ত হয়েছেন—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। রোগ প্রতিরোধে চিকিৎসাবিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিধি ও টিকাই কার্যকর পথ। তাই অন্ধভাবে কোনো কিছু বিশ্বাস না করে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।আমাদের সমাজে এখনো নানা কুসংস্কার প্রচলিত। শ্মশান বা কবরস্থানের দিকে আঙুল তুলে পরে সেই আঙুল মুখে কামড় দিলে অমঙ্গল দূর হয়—এমন বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের সময় গর্ভবতী নারী কিছু কাটাকাটি করলে সন্তানের ক্ষতি হবে—এ ধারণাও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। গ্রহণ একটি প্রাকৃতিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা; এর সঙ্গে গর্ভস্থ শিশুর শারীরিক গঠনের এমন কোনো সম্পর্ক নেই।স্বাভাবিক শারীরিক বিষয় নিয়েও সমাজে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেদের স্বপ্নদোষ একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ঘটনা। অথচ এ নিয়ে অনেকের মধ্যে লজ্জা, ভয় ও অপরাধবোধ কাজ করে। স্বপ্নদোষের কারণে কেউ অপবিত্র হয়ে যায় কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না—এ ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। শরীর সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও সুস্থ মানসিকতা এ ধরনের ভুল ধারণা দূর করতে পারে।দৈনন্দিন জীবনেও কুসংস্কারের নানা প্রকাশ দেখা যায়। পরীক্ষার আগে ডিম বা মিষ্টি খেলে ফল খারাপ হবে, বাসন পড়ে গেলে অমঙ্গল হবে, বাড়ির পাশে কাক ডাকলে বিপদ আসবে, রাতে পেঁচা ডাকলে গর্ভবতী নারীর ক্ষতি হবে কিংবা খাবারের আগে হাঁচি দিলে কেউ তাকে স্মরণ করছে—এসব বিশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব ঘটনা বা বৈজ্ঞানিক সত্যের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো নিছক প্রচলিত ধারণা।সন্তান জন্মের পর অশুভ শক্তির হাত থেকে নবজাতককে রক্ষার নামে দরজা-জানালায় নানা বস্তু ঝুলিয়ে রাখা কিংবা অসুস্থ শিশুকে চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে ঝাড়ফুঁকের জন্য নিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক। একইভাবে ভাগ্যনির্ভর মানসিকতাও মানুষের অগ্রগতির পথে বাধা। কে কী হবে সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারিত—এমন ধারণা মানুষকে কর্ম ও চেষ্টা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অথচ শিক্ষা, পরিশ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে মানুষ নিজের জীবন বদলাতে পারে। ‘জন্ম হোক যথাতথা, কর্ম হোক ভালো’—এই বোধ সমাজে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।কুসংস্কারের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ হলো মানুষকে মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদা না দেওয়া। দলিত-বঞ্চিত ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে অস্পৃশ্য ভাবা, শিক্ষা থেকে দূরে রাখা, ধর্মীয় বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশে বাধা দেওয়া, পোশাক বা জুতা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা কিংবা বিবাহ ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা—এসবও কুসংস্কার ও সামাজিক অন্যায়। আধুনিক রাষ্ট্রে এমন বৈষম্যের কোনো স্থান থাকতে পারে না।কুসংস্কার থেকে মুক্তির প্রধান পথ শিক্ষা। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বিজ্ঞানমনস্কতা, তথ্যপ্রযুক্তি, অনুসন্ধান ও যুক্তিবোধও বাড়াতে হবে। কোনো বিশ্বাস বহু বছর ধরে চলে আসছে বলেই তা সত্য—এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রভাবশালী কেউ কোনো কথা বললেই তা মেনে নেওয়া উচিত নয়; প্রয়োজন হলে তার ভিত্তি যাচাই করতে হবে।কুসংস্কার সমাজের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সৃজনশীলতার পথে বাধা। তাই সব নাগরিককে সমান মর্যাদা দিয়ে জ্ঞান, বিজ্ঞান, যুক্তি ও মানবিকতার ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তুলতে হবে। আজ নয়তো কাল, সচেতনতার পথ ধরেই কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস থেকে সমাজকে মুক্ত করা সম্ভব হবে—এই প্রত্যাশাই থাকা উচিত।[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

আলোকিত জাতি গঠনে শিক্ষা

নৈতিক রাষ্ট্র নির্মাণের মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। একটি রাষ্ট্রের আইন, সংবিধান কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো যতই উন্নত ও সুসংগঠিত হোক, যদি তার নাগরিকদের নৈতিক বোধ, দায়িত্বশীলতা ও ন্যায়-অন্যায়ের বিচারক্ষমতা দুর্বল থাকে, তবে সেই রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও কার্যকর রাখা কঠিন। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্রটি শেষ পর্যন্ত পরিচালিত হয় মানুষ দিয়ে, আর সেই মানুষের মূল্যবোধ, বিবেক ও আচরণ গড়ে ওঠে শিক্ষার নানামুখি দীর্ঘ পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আইন মানুষকে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারে, কিন্তু নৈতিক শিক্ষা মানুষকে অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে উপলব্ধি ও বিশ্বাস করতে শেখায়। প্রশাসনিক ব্যবস্থা কর্তব্য পালনে বাধ্য করতে পারে, কিন্তু নাগরিক দায়িত্ববোধ মানুষকে দায়িত্বকে নিজের নৈতিক দায় হিসেবে গ্রহণ করতে শেখায়। এই অর্থে সামগ্রিক শিক্ষা প্রক্রিয়া তথা অনানুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবকাঠামো নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শিক্ষার মাধ্যমেই নাগরিকের মধ্যে দায়িত্ববোধ, ন্যায়বিচারের চেতনা, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মানবিকতার বিকাশ ঘটানো সম্ভব। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের দায়িত্ব শুধু নিজের অধিকার দাবি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, ভিন্নমত সহ্য করা, শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষের প্রতি সংবেদনশীল থাকা এবং বৃহত্তর জনকল্যাণের কথা বিবেচনা করাও তার দায়িত্ব। এই মূল্যবোধগুলো কেবল আইন বা পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞা মুখস্থ করিয়ে অর্জন করানো যায় না। এগুলো গড়ে ওঠে এমন শিক্ষার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেখানে শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনের নৈতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে ভাবতে শেখে, অন্যের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে এবং নিজের সিদ্ধান্তের সামাজিক পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হয়। ফলে নৈতিক শিক্ষা কোনো আলাদা বিষয় বা পরীক্ষার অংশমাত্র নয়; এটি জীবনব্যাপী শিক্ষার সমগ্র প্রক্রিয়ায় এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কৃতির মধ্যে নিহিত থাকা প্রয়োজন।দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা উন্নয়নকে প্রায়ই ভৌত অবকাঠামো তথা ভবন,  সড়ক, সেতু, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা কিংবা মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করি। এসব অবশ্যই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক; কিন্তু এগুলো উন্নয়নের সম্পূর্ণ চিত্র নয়। একটি দেশের ভবন যত উঁচু কিংবা দৃষ্টিনন্দনই হোক না কেন, যদি তার নাগরিকেরা অসহিষ্ণু হন; প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, যদি মানুষ মিথ্যা ও অপতথ্যের কাছে সহজেই আত্মসমর্পণ করে; অর্থনীতি যত বড়ই হোক, যদি সমাজে ন্যায়বোধ ও মানবিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে সেই উন্নয়নকে পূর্ণাঙ্গ মানবিক উন্নয়ন বলা যায় না। উন্নয়নের বস্তুগত সূচকের পাশাপাশি তাই একটি জাতির বৌদ্ধিক, নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সক্ষমতাকেও উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়নের গভীরতর চিত্র পাওয়া যায় তার পারিবারিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিবেশে। সেখানে পারিবারিক পরিমন্ডলে সম্পর্ক কত মানবিক, সুনিবিড় ও সুদৃঢ়,এবং নবীন, প্রবীণ ও দুর্বলের মর্যাদা কতটুকু সুসংহত; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কতটা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারে, শিক্ষক কতটা নির্ভয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন, গবেষক কতটা স্বাধীনভাবে প্রচলিত ধারণাকে পরীক্ষা করতে পারেন এবং একটি প্রতিষ্ঠান কতটা সত্যের অনুসন্ধানকে উৎসাহিত করে; সামাজিক পরিবেশে পরমতসহিষ্ণুতা, সহানুভূতি-সহমর্মিতা এবং সামাজিক ন্যায্যতা; রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে আইনের শাসন, জান-মাল-সম্মানের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার এসবই একটি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির দৃশ্যমান পরিপক্বতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। যে দেশে প্রশ্ন করা অপরাধ, ভিন্নমত প্রকাশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্ষমতাসীন মতের সমালোচনা অনাকাঙ্ক্ষিত, সেখানে বাহ্যিক অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটলেও প্রকৃত অর্থে মানবিক, নৈতিক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে না।বিশেষ করে সত্য অনুসন্ধানের স্বাধীনতা একটি সুস্থ সামাজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণশক্তি। সত্য কখনো কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক নিয়মই হলো প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা, প্রমাণ পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন হলে পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত সংশোধন করা। তাই যে রাষ্ট্র তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই অনুসন্ধানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, সে কেবল ভালো শিক্ষার্থী তৈরি করে না; সে এমন নাগরিক তৈরি করে যারা গুজবের পরিবর্তে প্রমাণ, আবেগের পরিবর্তে যুক্তি এবং অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে বিবেকের ওপর নির্ভর করতে শেখে। আর এই নাগরিকরাই শেষ পর্যন্ত একটি নৈতিক, দায়িত্বশীল ও টেকসই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষার উন্নয়নে আমাদের করণীয় কী? বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু অবকাঠামোগতভাবে সম্প্রসারণ করলেই হবে না; এর দর্শন, পরিচালন কাঠামো, নেতৃত্ব, শিক্ষকতা, গবেষণা-সংস্কৃতি এবং শিক্ষার্থী-অভিজ্ঞতার মৌলিক ভিত্তিকেও পুনর্বিবেচনা করতে হবে। জাতীয় শিক্ষাদর্শনের আলোকে রাষ্ট্র শিক্ষার স্তরভিত্তিক যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ করবে, শিক্ষাপরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নকে প্রতিটি স্তরে সেই লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে এবং পরিববর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার সাথে মিল রেখে জনশক্তি উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে উচ্চশিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শিক্ষা কোনো সরকারের সাময়িক রাজনৈতিক কর্মসূচি বা ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যম হতে পারে না; এটি হতে হবে রাষ্ট্রের নাগরিকদের দীর্ঘমেয়াদি মানবিক, নৈতিক ও আইনী সুরক্ষার সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তার অগ্রগতি নিশ্চিত করার কৌশলগত ভিত্তি।রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কারের প্রাথমিক পদক্ষেপে অপরিহার্য অংশ হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থার এই পুনর্গঠনের প্রথম শর্তই হলো শিক্ষাঙ্গনের বৌদ্ধিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষককে যেন কোনো রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা গোষ্ঠীগত চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নিজের জ্ঞান, যুক্তি ও গবেষণার ভিত্তিতে মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়। কারণ যেখানে চিন্তার স্বাধীনতা নেই, সেখানে সৃজনশীলতার সুযোগ থাকে না; আর সৃজনশীলতা ছাড়া জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি কিংবা স্বনির্ভর জাতি গঠন সম্ভব নয়। এই বৌদ্ধিক স্বাধীনতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রশ্নটি। শিক্ষার মনোন্নয়নে শিক্ষক নিয়োগ, তাঁদের পদোন্নতি ও একাডেমিক নেতৃত্ব নির্ধারণে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত আনুগত্য কিংবা গোষ্ঠীগত সম্পর্কের পরিবর্তে মেধা, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও কর্ম-অভিজ্ঞতা, গবেষণা, শিক্ষাদানের দক্ষতা, পেশাগত সততা ও নিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের দক্ষতা ও সক্ষমতাকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমাদেরকে একজন শিক্ষক, শিক্ষাবিশেজ্ঞ কিংবা শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষানুরাগীর পরিচয়গত পার্থক্য; তাঁদের পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতার যে পার্থক্য সেগুলো সুচারুভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। কেবল ক্ষমতাসীন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা মতের সমর্থক হিসেবে নয়, বরং শিক্ষাক্ষেত্রে সঠিক নেতৃত্বের জন্য কাউকে নিয়োগ প্রদানের পূর্বে জ্ঞানসৃষ্টিকারী ও জ্ঞানবিনিময়কারী পেশাজীবী হিসেবে তার যথার্থ মূল্যায়ন করতে হবে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব এমন ব্যক্তিদের হাতে দিতে হবে, যারা একাডেমিক উৎকর্ষে অগ্রগণ্য, ন্যায়সংগত প্রশাসন পরিচালনার সক্ষমতার রেখেছেন, এবং কাজকর্মে স্বচ্ছতা প্রদর্শন ও মতের বৈচিত্র‍্যকে সম্মান করেন। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো শিক্ষানীতি বা সংস্কারই কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে না।রাষ্ট্রকে সামাজিক চুক্তির শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে একই সঙ্গে আগামী প্রজন্ম তথা শিক্ষার্থীদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, তবে কোনোভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার সংঘাতের ক্ষেত্র হতে দেওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিমন্ডলে দলীয় রাজনীতি নয়; তাদের অধিকার, শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উন্নয়নে এবং রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে রাজনীতিতে অংশ নেবে। শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্র, সংবিধান, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনীতি, পরিবেশ, জননীতি ও সমসাময়িক জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিষয়ে জানবে, বিতর্ক করবে এবং নিজস্ব মত গড়ে তুলবে এটাই কেবল কাম্যই নয়, অপরিহার্য। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যেন দলীয় রাজনীতির লেজুড়ভিত্তিতে কিংবা একাডেমিক মূল্যায়ন, সুযোগ, নেতৃত্ব বা সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণের মানদণ্ডে পরিণত না হয়। শিক্ষার্থীদের রাজনীতি যদি নাগরিক সচেতনতা, নেতৃত্বের বিকাশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অনুশীলন হয়, তবে তা হবে ইতিবাচক এবং জাতীয় অগ্রগতির সহায়ক; কিন্তু তা যদি দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, সহিংসতা, ভয়ভীতি, দলীয় নির্দেশ পালন কিংবা ক্ষমতার আনুগত্যের প্রশিক্ষণে পরিণত হয়, তাহলে তা হবে শিক্ষার উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং জাতির জন্য আত্মঘাতী।ছাত্ররাজনীতিকে দলীয় রাজনীতির নাগপাশ থেকে মুক্ত করার পাশাপাশি গবেষণা, বিতর্ক ও মুক্তচিন্তার পরিবেশকে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত করতে হবে। বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে, প্রমাণ খুঁজতে, তথ্য যাচাই করতে এবং ভিন্ন ব্যাখ্যার তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে শেখানো প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষায় যৌক্তিক চিন্তার এই সংস্কৃতিকে আরও গবেষণাভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, নৈতিক ও একাডেমিক স্বাধীনতা, আন্তঃবিষয়ক (ইন্টারডিসিপ্লিনারি) সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক জ্ঞানসম্প্রদায় (ইন্টালেক্চুয়াল কমিউনিটি) ও পেশাগত সম্প্রদায়ের (কমিউনিটি অব প্রেক্টিস) সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কোন একটি বিষয়ে বিতর্ককে বিরোধিতা হিসেবে নয়, নিজেকে সমৃদ্ধ করার এবং জ্ঞান সৃষ্টির একটি স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের শিক্ষকের বক্তব্যকে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রশ্ন করতে পারে, কিংবা একজন গবেষক যদি প্রচলিত কোনো তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা নিয়ে নির্ভয়ে আলোচনা করতে পারেন, তখনই প্রকৃত অর্থে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সহিংসতা, ভয়ভীতি এবং গোষ্ঠীগত আধিপত্যের সংস্কৃতিও সম্পূর্ণভাবে দূর করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী যেন রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ, ধর্ম, সামাজিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত মতের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে; কোনো শিক্ষক যেন প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কায় নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত না হন। শিক্ষাঙ্গনে প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োগ হবে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও জবাবদিহির মাধ্যমে; ভয় প্রদর্শন, দখল কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাবের মাধ্যমে নয়। এ ক্ষেত্রে কার্যকর অভিযোগ-নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, স্বচ্ছ শৃঙ্খলাবিধি এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন ছাড়া একদিকে যেমন মুক্তচিন্তা কিংবা সৃজনশীলতা কোনোটিই বিকশিত হতে পারে না; অপরদিকে ব্যক্তিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির পথ সংকোচিত হয়ে পড়ে।মানবিকতা, নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধকে শিক্ষার প্রান্তিক কোনো বিষয় হিসেবে না রেখে এর কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু কীভাবে ভালো চাকরি পেতে হয় তা শেখালে চলবে না; তাকে শেখাতে হবে কেন একজন ভালো মানুষ, দায়িত্বশীল নাগরিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের সক্রিয় অংশীদার হতে হবে এবং কীভাবে হতে হয়। সততা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সহনশীলতা, ন্যায়বোধ, পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব, দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান এমূল্যবোধগুলো শিক্ষার প্রতিটি স্তরে চর্চার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে। কারণ মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা কোনো আলাদা পরীক্ষার বিষয় নয়; এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন সংস্কৃতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের মধ্য দিয়ে শেখানো হয়। এই সবকিছুর সমন্বিত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা একই সঙ্গে জ্ঞানী, দক্ষ, নৈতিক, মানবিক ও মুক্তচিন্তার ব্যক্তি-মানুষ তৈরির পাশাপাশি দেশের জন্য সুনাগরিক তৈরি করবে। জাতীয় শিক্ষাদর্শনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপন্থার সমন্বয়ে একটি ধারাবাহিক শিক্ষাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। জাতীয় অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিকে নিশ্চিত করতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার মৌলিক দর্শন ও প্রতিষ্ঠানগত অগ্রাধিকার যেন বারবার পরিবর্তিত না হয়, সে দিকে আমাদের বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। তাতে একদিকে যেমন জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ হবে, অপরদিকে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যাবে। তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাপরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায় করা। শিক্ষা কোনো দলের সম্পত্তি কিংবা নিয়ন্ত্রণ ও মতাদর্শ প্রচারের কৌশল নয়; এটি সমগ্র জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আমরা হয়তো শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে পারব, কিন্তু নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে সক্ষম ও আলোকিত জাতি গড়ে তুলতে পারব না।আমাদের শিক্ষাঙ্গন হোক সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে আলোর প্রতিষ্ঠান যেখানে জ্ঞান হবে মুক্ত, চিন্তা হবে স্বাধীন, মতের বৈচিত্র‍্য হবে স্বীকৃত ও সমৃদ্ধির উপায় এবং মানুষের মর্যাদাকে দেওয়া হবে সর্বোচ্চ মূল্য। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়, যখন তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার অনুগত প্রতিষ্ঠান না হয়ে সত্যের অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। যে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সাহস নেই, সেখানে জ্ঞানের বিকাশ থেমে যায়; যে শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি মেধার বিকল্প হয়ে ওঠে, সেখানে সৃজনশীলতা ও নৈতিক নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষাকে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার না বানিয়ে জাতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, মানবিক উৎকর্ষ এবং নাগরিক কল্যাণের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংসদ ভবনে যতটা না নির্ধারিত হবে, তার চেয়েও বেশি নির্ধারিত হবে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, পাঠাগার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত চিন্তার পরিসরে এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে গণসচেতনা বৃ্দ্িধতে সামাজিক পরিমন্ডলে। সংসদ রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন করতে পারে, সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে, প্রশাসন তা বাস্তবায়ন করতে পারে; কিন্তু সেই রাষ্ট্র ও সমাজকে কেমন মানুষ পরিচালনা করবে, তারা কতটা ন্যায়নিষ্ঠ, যুক্তিবাদী, মানবিক ও দায়িত্বশীল হবে তার ভিত্তি নির্মিত হয় শিক্ষার মধ্য দিয়েই। একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তার বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে, কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে তার ভবিষ্যৎ।একটি স্বৈরাচারী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হয়তো খুব বেশি সময় লাগে না; ভয়, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, মতপ্রকাশের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আনুগত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই তা দ্রুত করা সম্ভব। কিন্তু একটি মুক্ত, মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি, নৈতিক নাগরিকত্ব এবং সুপরিকল্পিত জনকল্যাণমুখী নীতিমালার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। আমাদের বুঝতে হবে যে, সেই কাজের কেন্দ্রবিন্দুটিই হলো শিক্ষা। কারণ মুক্ত সমাজ কেবল আইন দিয়ে তৈরি হয় না; তাকে ধারণ করার মতো মুক্তমনা মানুষও তৈরি করতে হয়। গণতন্ত্র কেবল একটি সংবিধানিক ব্যবস্থা নয়; এটি পারস্পারিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার একটি বাস্তবমুখী জীবনচর্চা, আর সেই জীবনচর্চার ভিত্তি নির্মাণ করে শিক্ষাই। এই কারণে রাজনীতির শিক্ষা আমাদের শিক্ষার একটা অনুষঙ্গ হলেও রাজনীতিকীকরণ থেকে শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনকে মুক্ত রাখা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষার রাজনীতি মানে শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রক্রিয়ার রাজনীতিকীকরণ নয়। অপরদিকে শিক্ষার বিরাজনীতিকীকরণ রাজনীতিকে অস্বীকার করাও নয়; বরং শিক্ষাকে তার প্রকৃত জাতীয় দায়িত্ব পালনের উপযোগী করে তোলা। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে রাজনৈতিক সচেতনতা থাকবে কিন্তু দলীয় আনুগত্য থাকবে না; মতাদর্শ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকবে কিন্তু যৌক্তিক চিন্তার বিকাশ, গবেষণা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে না; নেতৃত্ব থাকবে কিন্তু তা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে; সমালোচনা থাকবে কিন্তু তা হবে যুক্তি ও প্রমাণনির্ভর; এবং সবচেয়ে বড় কথা, যেখানে কোনো ক্ষমতার চেয়ে সত্যের মূল্য বেশি হবে। জাতীয় শিক্ষাদর্শনের ভিত্তিতে শিক্ষার রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে এমন শিক্ষাপরিকল্পনাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে, যা ক্ষমতাসীন সরকার বা দলের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করবে।আলোকিত মানুষ তৈরির সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো হলো দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, আর শিক্ষাব্যবস্থা সেই আলোর বাতিঘরগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তিসরবরাহকারী ব্যবস্থা। বাতিঘরের কাজ পথিককে কোনো নির্দিষ্ট পথে টেনে নেওয়া নয়; বরং অন্ধকারের মধ্যে পথ চিনে নেওয়ার মতো আলো দেওয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাজও তাই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আনুগত্য তৈরি করা নয়; বরং মানুষকে এমন জ্ঞান, বিচারবোধ ও নৈতিক সাহস দেওয়া, যার মাধ্যমে সে নিজের পথ নিজেই চিনে নিতে পারে। ‘শিক্ষাব্যবস্থা’ নামক পাওয়ারহাউস বা শক্তিকেন্দ্র থেকে শক্তির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে জাতি শুধু জ্ঞানের অন্ধকারেই হারিয়ে যায় না, হারিয়ে ফেলে তার বিবেক, দিকনির্দেশনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্ষমতাও। অতএব, আমাদের সামনে আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কেবল কতজনকে শিক্ষার আওতায় আনতে পেরেছি, তা নয়; বরং আমরা কেমন মানুষ তৈরি করছি। আমরা কি এমন প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে দ্বিধা করবে না, ভিন্নমতকে সম্মান করবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেকের কণ্ঠ শুনবে এবং নিজের জ্ঞান ও দক্ষতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করবে? যদি উত্তরটি ‘হ্যাঁ’ করতে হয়, তবে শিক্ষাকে মুক্ত করতে হবে দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি এবং দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির করালগ্রাস থেকে। শিক্ষাঙ্গনে যোগ্য ও নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চার সব পথ অবারিত রাখতে হবে। তখনই শিক্ষার আলো কেবল শ্রেণিকক্ষকে আলোকিত করবে না; তা ছড়িয়ে পড়বে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আর সেই আলো জ্বলে উঠলে বাংলাদেশ তার ইতিহাসকে নতুন করে বুঝতে, বর্তমানকে বিবেক ও যুক্তির আলোকে মূল্যায়ন করতে এবং ভবিষ্যৎকে আরও মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক করে নির্মাণ করতে সক্ষম হবে। ইতিহাস হবে আমাদের শিক্ষা, বাস্তবতা হবে আমাদের পরিকল্পনা ও এগিয়ে চলার ভিত্তি, আর মুক্ত ও আলোকিত ভবিষ্যৎ হবে আমাদের লক্ষ্য। সেই ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়ার চাবিকাঠি আমাদেরই হাতের মুঠোয়। আর তার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো সুপরিকল্পিত ও মানসম্মত শিক্ষা; যে শিক্ষা মানবিক, নৈতিক ও ভবিষ্যতমুখী সুনাগরিক তৈরি করে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন

মানুষের জীবনে জন্মের পর প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো জন্মনিবন্ধন সনদ। এটি শুধু একটি কাগজ নয়; একজন মানুষের নাম, জন্মতারিখ ও পরিচয়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আইনি ভিত্তি। একইভাবে একজন নাগরিকের মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধন করাও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর ৬ অক্টোবর বাংলাদেশে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস পালন করা হয়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সঠিক তথ্য ছাড়া কোনো দেশের জনসংখ্যা, নাগরিক সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার কার্যকর পরিকল্পনা করা কঠিন। তাই জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবসের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সময়মতো এবং নির্ভুল নিবন্ধনের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা।একটি শিশুর জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব তার নিবন্ধন সম্পন্ন করা জরুরি। জন্মনিবন্ধন না থাকলে বিদ্যালয়ে ভর্তি, বয়সের প্রমাণ, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়াতেও জন্মনিবন্ধনের তথ্য প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে জন্মতারিখ, নাম ও মা-বাবার পরিচয়ের মতো তথ্য ভুল হলে একজন নাগরিককে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে। তাই জন্মনিবন্ধনকে নাগরিক জীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিল হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।মৃত্যু নিবন্ধনের গুরুত্বও কোনো অংশে কম নয়। একজন নাগরিকের মৃত্যুর তথ্য যথাসময়ে রাষ্ট্রীয় নথিতে যুক্ত হলে জনসংখ্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়। সরকারি ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য সুবিধায় ভুয়া বা মৃত ব্যক্তির নামে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ কমে। একই সঙ্গে জনসংখ্যা পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যনীতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নেও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যায়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের নির্ভরযোগ্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশে নিবন্ধন ব্যবস্থায় অগ্রগতি হয়েছে। অনলাইনে আবেদন, তথ্য সংরক্ষণ ও সংশোধনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সেবা গ্রহণের পথ আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এখনো নানা সমস্যা রয়েছে। সার্ভারের ধীরগতি, কারিগরি ত্রুটি, তথ্য যাচাইয়ের জটিলতা এবং নাম বা জন্মতারিখ সংশোধনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া নাগরিকদের ভোগান্তিতে ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এসব কারণে অনেকে সময়মতো নিবন্ধন না করে পরে আবেদন করেন। এতে তথ্য যাচাই আরও জটিল হয়।নিবন্ধন ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দালালচক্রের তৎপরতার অভিযোগও রয়েছে। দ্রুত কাজ করে দেওয়ার কথা বলে তারা মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেয়। সরকারি সেবার ক্ষেত্রে এমন মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ সমস্যা দূর করতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, সহজ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। আবেদন থেকে সনদ দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল ব্যবস্থা কার্যকর করা, অনলাইন পেমেন্টের সুযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।শতভাগ ও নির্ভুল নিবন্ধন নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও টিকাদান কেন্দ্রের সঙ্গে জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ স্থাপন করা গেলে শিশুর জন্মের তথ্য দ্রুত নথিভুক্ত করা সম্ভব। একইভাবে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধনের ব্যবস্থা জোরদার করা যেতে পারে। পাশাপাশি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও এ কাজে যুক্ত করা দরকার।জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালনের দিন নয়। এটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার একটি সুযোগ। প্রতিটি জন্মের সঠিক তথ্য যেমন একজন মানুষকে রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও আইনি সুরক্ষা দেয়, তেমনি প্রতিটি মৃত্যুর সঠিক নিবন্ধন রাষ্ট্রকে নির্ভুল তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়তা করে। তাই জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনকে সহজ, দ্রুত, নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত করা জরুরি। প্রতিটি জীবন রাষ্ট্রীয় নথিতে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হলেই গড়ে উঠবে নির্ভুল তথ্যভিত্তিক ও নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্র।[লেখক: প্রাবন্ধিক]

কৃষিভিত্তিক সমবায় : গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক—তিন দিক থেকেই গভীর। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের প্রধান উৎস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত শিল্প, পরিবহন ও বাজারব্যবস্থা। কিন্তু কৃষির এত বড় অবদান থাকা সত্ত্বেও কৃষককে উৎপাদন ব্যয়, বাজারদর, মধ্যস্বত্বভোগী, সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, ঋণের উচ্চ ব্যয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কৃষিভিত্তিক সমবায় একটি কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো হতে পারে। কৃষকের বিচ্ছিন্ন শক্তিকে সংগঠিত শক্তিতে রূপান্তর করে উৎপাদন, বিপণন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিনিয়োগে যৌথ সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব সমবায়ের মাধ্যমে।আমাদের দেশে সমবায় আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনেক। কিন্তু অশিক্ষা, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও অসাধুতার কারণে সমবায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। কৃষক সমাজে সমবায়ের চেতনার ঘাটতি এবং যৌথ উদ্যোগ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাও রয়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক বাধা, আর্থিক সংকট, অনীহা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে কৃষিকাজ করা কঠিন হয়। তাই কৃষকদের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। কৃষিভিত্তিক মৌলিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সমবায়ের সুফল ও সুযোগ সম্পর্কে কৃষকদের বাস্তব ধারণা দিতে হবে।বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সমবায় সমিতি রয়েছে। এসব সমবায়ের একটি বড় অংশ কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। সমবায়ের মাধ্যমে কৃষক উন্নত বীজ, সার, সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে পারেন। তাঁরা যৌথভাবে ফসল সংগ্রহ, মাড়াই, ঝাড়াই ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারেন। সংগঠিতভাবে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কৃষকের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। বন্যা, খরা, শৈত্যপ্রবাহসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও সমবায়ী উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। কৃষিব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়নে তাই সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।কৃষিভিত্তিক সমবায় কৃষকদের জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে পারে। একজন কৃষকের পক্ষে নতুন জাতের বীজ, আধুনিক চাষপদ্ধতি, মাটির স্বাস্থ্য, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও বাজারের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা কঠিন। কিন্তু সমবায় সংগঠিতভাবে কৃষিবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ সংস্থা ও বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ, মাঠদিবস, প্রদর্শনী প্লট ও প্রযুক্তি ব্যবহারের কর্মসূচি আয়োজন করা সম্ভব। এতে কৃষি উৎপাদনে বৈজ্ঞানিক ও তথ্যনির্ভর পদ্ধতির ব্যবহার বাড়বে।বাজারব্যবস্থায়ও কৃষিভিত্তিক সমবায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সমবায় একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সদস্যদের পণ্য তালিকাভুক্ত করে অনলাইন অর্ডার গ্রহণ ও সংগঠিতভাবে সরবরাহ করতে পারে। সুপারশপ, রেস্টুরেন্ট, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তিভিত্তিক বাজার তৈরি করা গেলে কৃষকের আয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের বাজারও স্থিতিশীল হতে পারে। উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্র‍্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন করা গেলে কৃষকের আয় আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।কৃষিভিত্তিক সমবায়ের বিভিন্ন ধরন হতে পারে। শস্য উৎপাদন ও বিপণন সমবায়, দুগ্ধ সমবায়, মৎস্য চাষি সমবায়, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সমবায় এবং সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সমবায় কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশেও এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সঙ্গে সমবায়কে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।কৃষিভিত্তিক সমবায় নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রামীণ নারীরা কৃষিকাজ, পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, বীজ সংরক্ষণ ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। কিন্তু তাঁদের শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য অনেক সময় যথাযথভাবে স্বীকৃত হয় না। নারী-কেন্দ্রিক কৃষি সমবায় বা বিদ্যমান সমবায়ে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন, বিপণন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের ভূমিকা বাড়বে। এর ফলে পরিবারের আয় বৃদ্ধি এবং নারীর আর্থিক স্বাধীনতা—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলাতেও কৃষি সমবায় কার্যকর হতে পারে। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি ও তাপমাত্রার পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষিকে ক্রমাগত ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। একক কৃষকের পক্ষে এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন। সমবায়ের মাধ্যমে জলবায়ু-সহনশীল জাত, উন্নত সেচব্যবস্থা, ফসল বৈচিত্র‍্যকরণ, পানি সংরক্ষণ, কৃষিবীমা ও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম যৌথভাবে গ্রহণ করা সম্ভব। এতে কৃষকের ঝুঁকি কমবে এবং উৎপাদনের স্থিতিশীলতা বাড়বে।তবে সমবায় আন্দোলনের বড় সমস্যা এর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। সমবায় গঠন, নিবন্ধন, পরিচালনা, অডিট ও নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা সমবায়ের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিভিন্ন সমবায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করতে সমবায়ীদের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। সমবায়ের নিবন্ধন ও পরিচালনা প্রক্রিয়াকে সহজ করতে হবে। সমবায় কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সদস্যদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে হবে।কৃষিভিত্তিক সমবায়কে জাতীয় অর্থনীতির বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে। কৃষকের উৎপাদিত কাঁচামাল স্থানীয় শিল্পে ব্যবহার করা গেলে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সংযোগ তৈরি হবে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত হয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে গেলে মূল্যশৃঙ্খলে কৃষকের অংশও বাড়ানো সম্ভব। এতে আমদানি নির্ভরতা কমানো, কৃষিভিত্তিক রপ্তানি বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে তরুণদের কৃষিতে আকৃষ্ট করতে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বাজারব্যবস্থার সংস্কারও জরুরি।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃষিভিত্তিক সমবায়কে শুধু কৃষকদের একটি সংগঠন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বাজার গবেষণা, হিসাব ব্যবস্থাপনা, দক্ষ নেতৃত্ব, প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। সমবায় সফল হবে তখনই, যখন সদস্যরা এটিকে অনুদাননির্ভর প্রকল্প নয়, নিজেদের মালিকানাধীন ও পরিচালিত অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করবেন। সদস্যদের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতাই হবে এর মূল পুঁজি।কৃষিভিত্তিক সমবায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে, বাজারে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে, কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজন করতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষির আধুনিকায়ন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলাতেও এর ভূমিকা থাকতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা।কৃষককে শুধু উৎপাদক নয়, উদ্যোক্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কার্যকর পথ হতে পারে কৃষিভিত্তিক সমবায়। সঠিক নীতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে সমবায়কে শক্তিশালী করা গেলে এটি শুধু কৃষকের আয় বৃদ্ধির মাধ্যম হবে না; বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক, উৎপাদনশীল ও বিকেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

সবার জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন

প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্ব বসতি দিবস পালন করা হয়। সে অনুযায়ী ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হচ্ছে। শহর ও নগরের বর্তমান অবস্থা, সবার জন্য উপযুক্ত বাসস্থানের মৌলিক অধিকার এবং ভবিষ্যৎ নগর গড়ে তোলায় মানুষের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। মানব বসতির বর্তমান অবস্থা, পর্যাপ্ত আবাসন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও টেকসই বাসস্থান নিশ্চিত করার বিষয়টিও দিবসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৮৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ১১৯তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ৪০/২০২ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রতিবছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার বিশ্ব বসতি দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৮৬ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘ দ্রুত নগরায়ণ এবং বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর নগরমুখী হওয়ার বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করবে। ফলে অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন এবং সবার জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা আরও জরুরি হয়ে উঠবে।এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত বাসস্থান’। পর্যাপ্ত আবাসন নিশ্চিত করতে নিম্ন আয়ের পরিবার, গৃহহীন মানুষ, দুর্যোগ ও সংকটকবলিত জনগোষ্ঠী এবং বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে থাকা মানুষের চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এর পাশাপাশি প্রয়োজন ভূমির মালিকানা ও দখলের নিরাপত্তা, সুপরিকল্পিত ও নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন আবাসিক এলাকা এবং সামাজিক, সরকারি, ভাড়াভিত্তিক, সমবায় ও বাজারভিত্তিক আবাসনের সুযোগ। আবাসনব্যবস্থা হতে হবে পরিবেশবান্ধব, জলবায়ু-সহনশীল, নিরাপদ ও মানসম্মত।জাতিসংঘের ‘আরবান অক্টোবর’ কর্মসূচির সূচনাও বিশ্ব বসতি দিবসের মধ্য দিয়ে। অক্টোবর মাসজুড়ে নগরায়ণ, আবাসন ও টেকসই নগর উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এর লক্ষ্য হলো সরকার, স্থানীয় সম্প্রদায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে নগর উন্নয়নে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। সমন্বিত আবাসন কৌশল, বহুস্তরীয় শাসনব্যবস্থা, সহায়ক আইন ও নীতি, নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।জাতিসংঘের আবাসনবিষয়ক ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি ১২ লাখ মানুষ বস্তির পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসেছে। একই সময়ে ৫ কোটি ৩০ লাখ মানুষ উন্নত পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা পেয়েছে এবং ৪ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি পরিবার ভূমির মালিকানা বা দখলের আইনি অধিকার পেয়েছে। তবে বৈশ্বিক আবাসন সংকট এখনো তীব্র। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ২৮০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের আবাসন-সংক্রান্ত অপর্যাপ্ততার মধ্যে ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১১০ কোটি মানুষ বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক আবাসনে বসবাস করছে। বিশ্বে প্রায় ৩১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ গৃহহীন। অন্যদিকে প্রতি পাঁচটি পরিবারের একটি তাদের ব্যয়যোগ্য আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি আবাসনের পেছনে ব্যয় করছে। এতে পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতা কমছে এবং ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে।বাংলাদেশেও আবাসন ও মানব বসতি নিয়ে নানা নীতি ও আইন রয়েছে। জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা-২০১৬-এর লক্ষ্য হলো সব শ্রেণির মানুষের জন্য উপযুক্ত আবাসন সহজলভ্য করা এবং টেকসই মানব বসতি গড়ে তোলা। নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করাও এ নীতির অন্যতম লক্ষ্য। এ ছাড়া ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ১৯৯৬; মহানগরী ও সব পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উদ্যান ও জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০; রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এবং বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালাসহ বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা রয়েছে।বাংলাদেশের মানব বসতি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় আবাসস্থল ধ্বংসের বিভিন্ন কারণ হিসেবে অতিরিক্ত জনসংখ্যা, ত্রুটিপূর্ণ ভূমি ব্যবস্থাপনা, অবৈধ বৃক্ষনিধন, জ্বালানি কাঠের সংকট, বনসম্পদ আহরণ, অবকাঠামো ও পরিবহন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, ইটভাটা স্থাপন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, গবাদি পশুর অতিচারণসহ বিভিন্ন বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে জীববৈচিত্র‍্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।বাংলাদেশে আবাসন-সংক্রান্ত নীতি ও আইন থাকলেও সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ বড় চ্যালেঞ্জ। কোথাও জনবলের অভাব, কোথাও দুর্বল তদারকি, আবার কোথাও আইন প্রয়োগের ঘাটতির কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু নতুন আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সরকার, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সবার জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে পারলেই বিশ্ব বসতি দিবসের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে।[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক ও লাইন ডাইরেক্টর (এমআইএস), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর]

শিক্ষকের মর্যাদা ও শিক্ষার মান

৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। দিবসটি শিক্ষক সমাজের দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার নিয়ে কথা বলার দিন। প্রতিবছরের মতো এবারও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে চতুর্থবারের মতো সরকারিভাবে দিবসটি পালিত হচ্ছে।ইউনেস্কো প্রতিবছরের মতো এবারও দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে। এবারের প্রতিপাদ্যের মূল বক্তব্য হলো—শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ এবং ৬০ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা ও অবস্থান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ সভায় ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দ্বিতীয় জন্মদাতা অথবা জাতি গড়ার কারিগর হিসেবে বিবেচিত শিক্ষক সমাজের মান-সম্মান, মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যেই দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।শিক্ষার অধিকার একটি মানবিক ও মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘের ঘোষণা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তঃসরকার সম্মেলনে শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়। সম্মেলনে শিক্ষকদের মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করা, মাধ্যমিক স্তরে সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে বৈষম্যহীন শিক্ষা নীতি, শিক্ষার উদ্দেশ্য ও গুণগত মান উন্নয়ন, পদোন্নতি, পেশাগত আচরণবিধি, নারী শিক্ষকদের জন্য কর্মবান্ধব পরিবেশ, শিক্ষকদের অধিকার ও নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সরকারপ্রধান বা তাঁদের প্রতিনিধিরা এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন।শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৪ নম্বর লক্ষ্যে মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও জীবনব্যাপী শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং তাঁদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের দক্ষতা, আন্তরিকতা, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে এখনও নানা ঘাটতি রয়েছে। অবসর ও কল্যাণ তহবিলে কর্তন করা অর্থ অবসরে যাওয়ার তিন-চার বছর পরও অনেক শিক্ষক-কর্মচারী পাচ্ছেন না। কাগজপত্র জমা দেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে পাওনা পরিশোধের বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি।বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষকদের ওপর হামলা, মারধর, হত্যা এবং গলায় জুতার মালা পরানোর মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে। জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মী ও গভর্নিং বডির সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার বিচার না হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও মর্যাদাহানির বোধ তৈরি হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের ওপর নির্যাতন এবং আইনবহির্ভূতভাবে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে তৈরি হওয়া মানসিক দূরত্বও পাঠদান কার্যক্রমের জন্য নতুন সংকট হিসেবে সামনে এসেছে।বিশ্ব শিক্ষক দিবসের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতার পাশাপাশি পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। ইউনেস্কো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতে জাতীয় আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বাংলাদেশেও ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ করে তা পর্যায়ক্রমে ৭ শতাংশে উন্নীত করার এবং ১০ বছরের মধ্যে শিক্ষাকে সরকারিকরণের তাগিদ দিয়েছিল।কিন্তু এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। শিক্ষাখাতে বরাদ্দের হার কিছুটা বাড়লেও মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এর সুফল যথেষ্ট পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সরকারের পক্ষ থেকে জিডিপির ৫, ৬ বা ৭ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তা ৫৫ বছরে কখনও ২ দশমিক ৪ শতাংশের ওপরে ওঠেনি। এসডিজির আলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে মানসম্মত, সমতাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জীবনব্যাপী শিক্ষা নিশ্চিত করতে এবং মাধ্যমিক স্তরে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালনার জন্য পরিকল্পনা কমিশন জিডিপির ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করেছিল। এর বিপরীতে শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বর্তমানে তা প্রায় ২ শতাংশ। তবে ইতিবাচক দিক হলো, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা ২৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে এবং ১ হাজার টাকা বাড়িভাড়ার পরিবর্তে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষা এখনো বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশ তুলনামূলকভাবে কম। বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরিজীবনে পদোন্নতির সুযোগও সীমিত। প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার পর অনেকের পদোন্নতির সুযোগ থাকে না। কর্মদক্ষতাভিত্তিক পদোন্নতির ব্যবস্থাও নেই। সময়ভিত্তিক পদোন্নতি এবং চাকরিজীবনে সীমিত পদোন্নতির কারণে এই পেশায় মেধাবীদের অংশগ্রহণ কমছে। একই সঙ্গে পেশাগত মান বৃদ্ধির চেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বেতন-ভাতার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা কঠিন হচ্ছে। যারা আসছেন, তাঁদেরও ধরে রাখা যাচ্ছে না।শিক্ষক সংগঠনের অবস্থানবিশ্ব শিক্ষক দিবসের ঐতিহাসিক ঘোষণা এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে বাংলাদেশের শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করেছেন। তবে দলীয় রাজনীতির প্রভাবের বাইরে স্বাধীন ও পেশাদার অবস্থান থেকে বৃহৎ আন্দোলন তেমন গড়ে ওঠেনি। গভর্নিং বডির দলীয়করণের কারণে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণ, পৃথক নিয়োগ কমিশন এবং বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষকদের আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতার আওতায় কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়ন এবং পাঠদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা দিতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে অন্য কাজে শিক্ষকদের যুক্ত না করা, পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা, নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং আর্থিক নিরাপত্তার জন্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।ইউনেস্কোর ঘোষণার পাশাপাশি সংবিধানে শিক্ষার বিষয়ে রাষ্ট্রের যে অঙ্গীকার রয়েছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশের শিক্ষার মান উন্নত করা সম্ভব। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ঘোষণায় স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করছে কি না, সে বিষয়ে ইউনেস্কোর কার্যকর তদারকি থাকা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী শিক্ষক সমাজের মর্যাদা বৃদ্ধি পাক। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের পাঠদান কার্যক্রমের পাশাপাশি বস্তুনিষ্ঠভাবে দেশ, জাতি ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুন—এটাই প্রত্যাশা। শিক্ষক যেমন তাঁর অধিকার ভোগ করবেন, তেমনি দায়িত্বও পালন করবেন। এ জন্য প্রয়োজন মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষক, ভালো শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষকদের আন্তসম্পর্কের উন্নয়ন।[লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি]

‘এআই’ উত্তর জানে, কিন্তু শিক্ষার্থীকে কে জানবে?

এখন আর কোনো শিক্ষার্থীকে একটি সংজ্ঞা জানার জন্য পরদিনের ক্লাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। কয়েকটি শব্দ লিখলেই কয়েক সেকেন্ডে উত্তর এসে যায়। অঙ্কের সমাধান, প্রবন্ধের খসড়া, ইতিহাসের সারাংশ, এমনকি পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নও প্রযুক্তি সাজিয়ে দিতে পারে।তাহলে কি এমন এক সময় আসছে, যখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক আর অপরিহার্য থাকবেন না? প্রশ্নটি প্রযুক্তির। কিন্তু উত্তরটি সম্ভবত মানুষের।কারণ শিক্ষা কি শুধু উত্তর জানার নাম? নিশ্চিতভাবেই না। শিক্ষা হলো কোন প্রশ্নটি করা উচিত তা বুঝতে শেখা, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে শেখা, ভুল থেকে উঠে দাঁড়াতে শেখা, অন্য মানুষের কথা শুনতে শেখা এবং জ্ঞানকে দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করতে শেখা। এই জায়গাগুলোতে একজন শিক্ষক এখনও অনন্য। আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাব্যবস্থাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। ইউনেস্কোর ২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আলোচনাতেও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে শিক্ষকতার নতুন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি স্পষ্টভাবে বলছে ভবিষ্যতের শিক্ষায় শিক্ষককে কেন্দ্রেই রাখতে হবে। তাদের সাম্প্রতিক প্রচারণার কথাটিও খুব অর্থবহ: “Teachers cannot be coded.” অর্থাৎ শিক্ষকের মানবিক ভূমিকাকে কোনো কোডে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা যায় না।একজন শিক্ষক হিসেবে বিষয়টি আমার কাছেও গভীরভাবে ভাববার।একটি শ্রেণিকক্ষে সব শিক্ষার্থী কখনো একরকম থাকে না। কেউ প্রশ্ন করতে ভালোবাসে, কেউ চুপচাপ শোনে। কেউ একটি বিষয় একবার বললেই বুঝে ফেলে, আর কারও কাছে একই বিষয় তিনবার অন্যভাবে বলতে হয়। আবার এমনও শিক্ষার্থী থাকে, যে পড়াটি না বোঝার কারণে নয়, হয়তো বাড়ির কোনো দুশ্চিন্তার কারণে সেদিন মনোযোগ দিতে পারছে না।একটি ‘এআই’ তার ভুল উত্তর ধরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীর মুখ দেখে সবসময় বুঝতে পারবে না আজ তার চোখ দুটি এত নিস্তেজ কেন। এইখানেই শিক্ষক। শিক্ষকের কাজ আসলে কখনোই শুধু তথ্য সরবরাহ করা ছিল না। কিন্তু দীর্ঘদিন আমরা শিক্ষকের ভূমিকাকে অনেকটাই তথ্য দেওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি। শিক্ষক বলবেন, শিক্ষার্থী লিখবে। শিক্ষক প্রশ্ন করবেন, শিক্ষার্থী উত্তর দেবে। এখন সেই ব্যবস্থাই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে।কারণ তথ্যের ওপর শিক্ষকের একচেটিয়া অধিকার আর নেই। আজকের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ক্লাস নেওয়ার আগেই একটি বিষয় সম্পর্কে পড়ে আসতে পারে। সে ভিডিও দেখতে পারে, ডিজিটাল বই পড়তে পারে, এআই-কে প্রশ্ন করতে পারে। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষক যদি শুধু বইয়ের কথাই পুনরাবৃত্তি করেন, শিক্ষার্থীর কাছে তার প্রয়োজন স্বাভাবিকভাবেই কমবে। কিন্তু এখানেই শিক্ষকের ভূমিকা যে শেষ, তা মনে করলে ভুল হবে বরং শিক্ষকের ভুমিকা নতুনভাবে শুরু।ভবিষ্যতের শিক্ষক সম্ভবত আর শুধুই “জ্ঞানদাতা” নন। তিনি হবেন জ্ঞানের পথপ্রদর্শক। তিনি বলবেন না শুধু “উত্তরটি এই”; বরং জিজ্ঞেস করবেন “তুমি এই উত্তরকে সত্য মনে করলে কেন?”এই একটি পরিবর্তনই শিক্ষাকে বদলে দিতে পারে।কারণ ‘এআই’ খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্যও দিতে পারে। একটি সুন্দর ভাষায় লেখা উত্তর সবসময় সঠিক উত্তর নয়। একটি সূত্র উল্লেখ করা মানেই সূত্রটি নির্ভরযোগ্য নয়। ফলে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগত দক্ষতাগুলোর একটি হবে যাচাই করার ক্ষমতা।কোন উৎস বিশ্বাসযোগ্য? কোন তথ্যের পেছনে প্রমাণ আছে? কোথায় পক্ষপাত কাজ করছে? কোথায় যুক্তির ফাঁক?এই বিচারবোধ তৈরি না হলে প্রযুক্তির যুগে একজন শিক্ষার্থী তথ্যসমৃদ্ধ হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানী নাও হতে পারে।আর এখানেই একজন শিক্ষকের দায়িত্ব আরও বড়। ইউনেস্কোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দক্ষতা কাঠামোতেও শিক্ষককে শুধু ‘এআই’ ব্যবহারকারী হিসেবে দেখা হয়নি বরং প্রযুক্তিকে কীভাবে মানবকেন্দ্রিক, নৈতিক ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে, সেই দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ‘এআই’ জানা যথেষ্ট নয় কিন্তু ‘এআই’ কোথায় ব্যবহার করতে হবে এবং কোথায় থামতে হবে, সেটিও জানতে হবে।বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই প্রশ্নটি খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।আমাদের শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই ‘এআই’ ব্যবহার করছে। কেউ অ্যাসাইনমেন্ট লিখছে, কেউ অনুবাদ করছে, কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আমরা কি তাদের শেখাচ্ছি কীভাবে এটি ব্যবহার করতে হবে?একজন শিক্ষার্থী যদি পুরো অ্যাসাইনমেন্ট ‘এআই’ দিয়ে লিখিয়ে জমা দেয়, তাহলে হয়তো সে সুন্দর একটি লেখা জমা দিল। কিন্তু সে কী শিখল?আবার বিপরীতভাবে ‘এআই’ নিষিদ্ধ করে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?সম্ভবত না।ক্যালকুলেটর আসার পরে গণিত বন্ধ হয়নি। ইন্টারনেট আসার পরে বই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি। একইভাবে ‘এআই’-কেও শিক্ষকের শত্রু  হওয়ার প্রয়োজন নেই। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি শিক্ষকের সহকারী হতে পারে। একজন শিক্ষক ‘এআই’ ব্যবহার করে একই বিষয়ের বিভিন্ন স্তরের পাঠ তৈরি করতে পারেন। দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য সহজ ব্যাখ্যা, অগ্রসর শিক্ষার্থীর জন্য কঠিন সমস্যা, ক্লাসের জন্য প্রশ্ন, উদাহরণ বা শেখানোর নতুন কৌশল বের করতে পারেন। ইউনেস্কোর শিক্ষক ও ‘এআই’-সংক্রান্ত আলোচনাতেও বলা হয়েছে, ‘এআই’ শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে তবে মানবিক বিচারবোধ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের জায়গা নিতে পারে না।তাই আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয় “এআই কি শিক্ষককে সরিয়ে দেবে?”বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত “এআই ব্যবহার করে একজন শিক্ষক কীভাবে আরও ভালো শিক্ষক হতে পারেন?”এ জন্য প্রথম প্রয়োজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ।আমরা শিক্ষার্থীদের নতুন প্রযুক্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারি না এমন শিক্ষকদের হাতে, যারা সেই প্রযুক্তির সুযোগ ও ঝুঁকি সম্পর্কে জানার সুযোগই পাননি। শিক্ষককে শুধু একটি সফটওয়্যার চালানো শেখালেই হবে না। তাকে বুঝতে হবে তথ্যের গোপনীয়তা, কপিরাইট, পক্ষপাত, ভুল তথ্য, একাডেমিক সততা এবং শিক্ষার্থীর অতিনির্ভরতার ঝুঁকি।আরেকটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। ‘এআই’-এর কারণে শিক্ষকের মানবিক দায়িত্ব কমবে না, বাড়বে। কারণ প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, শিশুর সামনে পৃথিবী তত দ্রুত খুলে যাবে। সে এমন বিষয় দেখবে, পড়বে, জানবে যা আগের প্রজন্ম অনেক পরে জানত। কিন্তু সে কি মানসিকভাবে সেই তথ্যের জন্য প্রস্তুত?তার সঙ্গে কে কথা বলবে? একজন ছাত্র পরীক্ষায় খারাপ করলে ‘এআই’ তাকে “কীভাবে ভালো ফল করতে হবে” তার দশটি পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু সে যখন মনে করে, “আমি আর পারব না” তখন তার পাশে একজন মানুষ দরকার।একজন শিক্ষক কখনও শুধু তো একটি বিষয়ের শিক্ষক নন। শিক্ষার্থীর জীবনের একটি সময়ে তিনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যাকে সে বিশ্বাস করতে শেখে।সেই সম্পর্কের মূল্য কোনো প্রযুক্তির মাপে ধরা কঠিন।আজ পৃথিবীতে শিক্ষকের প্রয়োজনও কমছে না। ইউনেস্কোর হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বে আরও প্রায় ৪৪ মিলিয়ন শিক্ষক প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষককে প্রশিক্ষিত, সমর্থিত এবং মর্যাদাবান রাখাকেও মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম শর্ত বলা হচ্ছে। এ তথ্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়।প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, পৃথিবী এখনো শিক্ষক খুঁজছে।তবে সেই শিক্ষককে বদলাতে হবে। আগামী দিনের শিক্ষককে সব উত্তর জানা মানুষ হতে হবে না। এমন দাবি এখন অবাস্তবও। তার চেয়ে বরং তাকে এমন একজন মানুষ হতে হবে, যিনি জানেন কোথায় উত্তর খুঁজতে হয়, কীভাবে তা যাচাই করতে হয় এবং কীভাবে শিক্ষার্থীকে নিজের উত্তর খুঁজে নিতে শেখাতে হয়।তাকে বলতে হবে “আমি জানি না, চল আমরা খুঁজে দেখি।”আর এই বাক্যটি হয়তো ভবিষ্যতের শিক্ষকতার অন্যতম সুন্দর বাক্য।কারণ একজন শিক্ষক যখন স্বীকার করেন যে শেখা কখনো শেষ হয় না, তখন তিনি শিক্ষার্থীকেও শেখান জ্ঞান মানে সব জানা নয়।জ্ঞান মানে শেখার সাহস রাখা। ‘এআই’ হয়তো একদিন আরও দ্রুত হবে। আরও নিখুঁত হবে। আমাদের ভাষা, অভ্যাস ও প্রয়োজন আরও ভালোভাবে বুঝবে।তবু একটি প্রশ্ন থেকে যাবে। কে একজন শিক্ষার্থীকে শেখাবে সততা? কে তাকে বলবে জ্ঞানকে অন্যের ক্ষতির জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়? কে বুঝিয়ে দেবে সফলতা শুধু নম্বর নয়? কে তার ব্যর্থতার দিনে তাকে মনে করিয়ে দেবে তার মূল্য একটি পরীক্ষার ফলের চেয়ে অনেক বড়?এসব প্রশ্নের উত্তর কোনো অ্যালগরিদমের মধ্যে পুরোপুরি ধরা যায় না। কারণ শিক্ষা শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। তাই ‘এআই’-এর যুগে শিক্ষককে বাঁচাতে প্রযুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে না। বরং শিক্ষককে প্রযুক্তির ওপরে তার সবচেয়ে বড় শক্তিটি ফিরে পেতে হবে মানুষকে বোঝার শক্তি।এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শুধু শিক্ষককে শুভেচ্ছা জানানোই যথেষ্ট নয়। আমাদের ভাবতে হবে, দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তির যুগে শিক্ষককে কীভাবে আরও দক্ষ, আরও স্বাধীন এবং আরও মানবিক ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করা যায়।কারণ ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘এআই’ থাকবে, প্রযুক্তি থাকবে, অসংখ্য ডিজিটাল সহায়তা থাকবে তবু শিক্ষার্থীর পাশে এমন একজন মানুষ প্রয়োজন হবে, যিনি শুধু তার উত্তর নয়, তার মানুষ হয়ে ওঠার পথটিও দেখবেন। ‘এআই’ উত্তর জানবে। কিন্তু শিক্ষার্থীর ভয়, স্বপ্ন, দ্বিধা, সম্ভাবনা আর নীরবতার ভাষা বুঝতে পাশে একজন মানুষই লাগবে। সেই মানুষটির নাম শিক্ষক।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, বরেন্দ্র কলেজ, রাজশাহী

ভিডিও আরও দেখুন

বিতর্ক সত্ত্বেও পর্তুগালের হয়ে খেলা চালিয়ে যেতে চান রোনালদো

মেসির বিদায় নিয়ে ফুটবল বিশ্বে যখন আবেগের সুর, ঠিক তখনই পর্তুগিজ ফুটবলে এক নতুন তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। জাতীয় দলের কোচ হোর্হে জেসুসের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেও, স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন–পর্তুগালের হয়ে নিজের দীর্ঘ ২৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার তিনি এখনই থামাচ্ছেন না।মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বিস্ফোরক বিবৃতিতে ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা দলের ভেতরে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের (এফপিএফ) ভেতরের চিত্র প্রকাশ্যে আনেন। বিবৃতিতে রোনালদো জানান, কোচের দেওয়া নির্দিষ্ট ম্যাচ পরিকল্পনা ও কথা না রাখার কারণেই তিনি সাম্প্রতিক জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যেতে বাধ্য হন।ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে সিআরসেভেন জানান, ম্যাচের নির্দিষ্ট সময় ও খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোচ হোর্হে জেসুস তার সঙ্গে একাধিক আলোচনা করলেও মাঠে তার একটিরও বাস্তবায়ন ঘটেনি। বিশেষ করে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে তাকে অনুশীলনে নামিয়েও পুরো সময় বেঞ্চে বসিয়ে রাখা এবং সংবাদ সম্মেলনে কোচের আগের সম্মত হওয়া সত্য প্রকাশ না করাকে চরম প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়াকে নিজের একটি ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বীকার করে সমর্থক ও সতীর্থদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন রোনালদো। তবে সাফ জানিয়েছেন, সত্য ও আত্মসম্মানের জায়গায় কোনো আপস করবেন না তিনি। ফুটবল ফেডারেশন তাকে যে শাস্তি দেবে, অধিনায়ক হিসেবে তা মেনে নিতেও তিনি প্রস্তুত।বিবৃতির শেষভাগে নিজের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে পর্তুগিজ অধিনায়ক বলেন, 'আমার শরীর যদি ফিট থাকে এবং ক্লাবের হয়ে গোল করতে পারি, তবে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবারও পর্তুগালের হয়ে লড়াই করতে আমি সম্পূর্ণ প্রস্তুত।'

বিতর্ক সত্ত্বেও পর্তুগালের হয়ে খেলা চালিয়ে যেতে চান রোনালদো