সংবাদ
রাবিতে একক প্রার্থীর ভাইভা, পরে নিয়োগ; ফোকলোর বিভাগে অনিয়মের অভিযোগ

রাবিতে একক প্রার্থীর ভাইভা, পরে নিয়োগ; ফোকলোর বিভাগে অনিয়মের অভিযোগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও অনৈতিকতার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আবেদনকারী দুই প্রার্থীর মধ্যে একজনের আবেদন বাতিল হওয়ার পর মাত্র একজন প্রার্থীর ভাইভা নেয়া হয় এবং পরে তাকেই নিয়োগ দেওয়া হয়।বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৮ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ফোকলোর বিভাগে দুইজন সহকারী অধ্যাপক (না পাওয়া গেলে প্রভাষক) এবং তিনজন প্রভাষক নিয়োগের জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়। তাতে সহকারী অধ্যাপক পদে দুটি এবং প্রভাষক পদে ২৮টি আবেদন জমা পড়ে। পরে তথ্য যাচাইয়ের সময় সহকারী অধ্যাপক পদে একজনের আবেদন ‘অসঙ্গতির’ কারণে বাতিল করা হয়। ফলে একজন প্রার্থীই বৈধ হিসেবে বিবেচিত হন। পরবর্তীতে ওই প্রার্থী এবং প্রভাষক পদের আবেদনকারীদের নিয়ে ভাইভা বোর্ড হয়। শেষে এরশাদুল হককে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।সংশোধিত নিয়োগ বিধি অনুযায়ী, বিজ্ঞাপিত পদের বিপরীতে অন্তত তিনগুণ প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য বাছাই করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে আবার বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। এছাড়া কোনো বিভাগে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির সুপারিশ ও সিন্ডিকেটের অনুমোদন সাপেক্ষে শর্ত শিথিল করে পুনঃবিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রভাষক নিয়োগের সুযোগ রয়েছে।তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পদের বিজ্ঞপ্তি একসঙ্গে প্রকাশিত হলে বোর্ড প্রয়োজনে প্রার্থীকে উপযুক্ত বিবেচনায় নিয়োগ দিতে পারে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একটি পদের বিপরীতে মাত্র একজন প্রার্থী থাকলে তাকে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের মতে, এ ধরনের ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে পুনঃবিজ্ঞপ্তি দেওয়া উচিত ছিল, যাতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয়।অভিযোগ রয়েছে, বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে আর্থিক লেনদেনও হয়েছে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভাগের এক শিক্ষক জানান, প্ল্যানিং কমিটির প্রাথমিক সভায় সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে হাতে লেখা কার্যবিবরণীর পরিবর্তে টাইপ করা কাগজে সিদ্ধান্ত প্রস্তুত করে সদস্যদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এমনকি যাকে কমিটি বাতিল করেছিল, তাকেও রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে ইন্টারভিউ কার্ড দেওয়া হয়।ওই শিক্ষক আরও অভিযোগ করেন, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার পেছনে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। নিয়োগ হওয়ার পর চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন ৫৫ লাখ টাকা দিয়ে গাড়ি কেনেন এবং রাজশাহী শহরের ভদ্রা এলাকায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনেন বলেও অভিযোগ করেন ওই শিক্ষক।তার আরও অভিযোগ, বগুড়া অঞ্চলের এক যোগ্য প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় প্রথম হলেও তাকে বাদ দিয়ে চেয়ারম্যানের নিজ এলাকা ঝিনাইদহের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাদ পড়া প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুই বছর আগের একটি অভিযোগ সামনে আনা হয়, যদিও সেটি তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষার কোনো বিধান নেই। তবে একাধিক প্রবীণ শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, তৎকালীন প্রশাসন নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দিতে বিধিবহির্ভূতভাবে লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করে। তাদের মতে, এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।বিভাগ ও রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ফোকলোর বিভাগের নিয়োগ বোর্ডে বহিঃস্থ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রশিদুজ্জামানকে রাখা হয়। ফোকলোর একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সরাসরি বিশেষজ্ঞ না রেখে ভিন্ন বিভাগের শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতেই এ ধরনের বিশেষজ্ঞ নির্বাচন করা হয়েছে।তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখার-উল আলম মাসউদ বলেন, “নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত একটি পদের বিপরীতে তিনজন প্রার্থীকে ভাইভায় ডাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে কাট-অফ নম্বরে একাধিক প্রার্থী একই নম্বর পেলে ভাইভায় প্রার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে।”তিনি আরও বলেন, পর্যাপ্ত আবেদনকারী না পাওয়া গেলে পুনঃবিজ্ঞপ্তির সুযোগ রয়েছে এবং প্ল্যানিং কমিটি আবেদনকারীদের যোগ্যতা যাচাই করে সুপারিশ দেয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কোনো জটিলতা দেখা দিলে বিষয়টি সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করা হয়।রেজিস্ট্রার আরও জানান, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পদের বিজ্ঞপ্তি একসঙ্গে দেওয়া হলে বোর্ড প্রয়োজনে সহকারী অধ্যাপক পদের প্রার্থীকে প্রভাষক হিসেবে সুপারিশ করতে পারে। আবার প্রভাষক পদের কোনো আবেদনকারী ‘অসামান্য যোগ্য’ হলে তাকেও সহকারী অধ্যাপক পদে সুপারিশ করার ‘সুযোগ রয়েছে’।বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষক নিয়োগের সিলেকশন বোর্ডে সাধারণত উপাচার্য, সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যান, একজন বাইরের বিশেষজ্ঞ এবং দুইজন সিন্ডিকেট সদস্য থাকেন। বাইরের বিশেষজ্ঞ নির্ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। প্রশাসনের দাবি, ফোকলোরের মতো বিশেষায়িত বিভাগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বা কাছাকাছি বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর হোসেন (বাবু) বলেন, “শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে। লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে যারা মেধা তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছিলেন, তাদেরকেই মূলত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমার পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করা হয়নি, বরং মেধা তালিকার ক্রম অনুসরণ করা হয়েছে এবং তৎকালীন উপাচার্যও বিষয়টি সম্পর্কে জানেন।”নিয়োগে আঞ্চলিকতা বা নিজ জেলার মানুষকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তার দাবি, ‘নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে একজনের বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুরে হলেও তিনি অনার্সে প্রথম এবং মাস্টার্সে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী ছিলেন।’ এছাড়া ‘তার ফ্ল্যাটটি করোনাকালে কেনা এবং পদ্মা আবাসিক এলাকায় থাকা একটি জমি বিক্রির টাকায় গাড়ি কেনা হয়েছে’ বলেও জানান তিনি।তিনি আরও বলেন, “অভিযোগের মূল উদ্দেশ্য হলো আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রশাসনিক পদে আসা থেকে বিরত রাখা। দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসে থাকার কারণে একটি পক্ষ আমাকে প্রশাসনিক পদ থেকে দূরে রাখতে এসব ভিত্তিহীন তথ্য ছড়াচ্ছে।”সিলেকশন বোর্ডে সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাঈন উদ্দিন। তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ছিল এবং মেধা যাচাইয়ের জন্য লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ‘ব্লাইন্ড ইভ্যালুয়েশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষার জন্য প্রতি পদের বিপরীতে তিনজনকে ডাকার বিষয়টিও কোনো কঠোর লিখিত নিয়ম নয়, বরং বোর্ডের কাজের সুবিধার্থে এটি একটি অনুমান হিসেবে ধরা হয়েছিল। তার দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি ‘সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক এবং একাডেমিক মানদণ্ড’ অনুসরণ করে হয়েছে।বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
২০ মিনিট আগে

মতামতমতামত

রক্তের দামে কেনা বিষণ্ণ জীবন

৮ মে, বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। কিন্তু বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের কাছে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি রক্তের জন্য চলমান এক নীরব যুদ্ধের প্রতীক। এই দিনে সারা বিশ্ব যখন থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের অঙ্গীকার নিয়ে আলোচনা সভা আর র‍্যালিতে মেতে ওঠে, তখন এদেশের কিছু নিভৃত কোণে কয়েক হাজার পরিবার এক অমানবিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। এটি কোনো সাধারণ যুদ্ধ নয়; এ যুদ্ধ এক ব্যাগ রক্তের জন্য, এ যুদ্ধ এক ফোঁটা নিশ্বাস কিনে নেওয়ার লড়াই।বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া কেবল একটি রক্তস্বল্পতার নাম নয়, এটি একটি অদৃশ্য সংকট। যা একটি সাজানো পরিবারকে মুহূর্তেই মরুভূমিতে পরিণত করতে পারে। যখন একটি শিশুকে প্রতি মাসে সুঁইয়ের কঠোর যন্ত্রণা সহ্য করে অন্যের রক্তে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়, তখন সেই লড়াই কেবল সেই শিশুর থাকে না, তা হয়ে দাঁড়ায় পুরো পরিবারের এক মরণপণ সংগ্রাম।রক্ত যখন অন্নের চেয়েও দামিবাংলাদেশের অসংখ্য পরিবার আজও স্মরণ করে সেই দিনটির কথা, যেদিন চিকিৎসকের রিপোর্টে প্রথম ‘থ্যালাসেমিয়া’ শব্দটি দেখেছিল। একটি ছোট্ট শিশুর ফ্যাকাশে হয়ে আসা মুখ, হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া শরীর, আর চিকিৎসকের গম্ভীর কণ্ঠ একটি পরিবারকে মুহূর্তেই বদলে দেয়।আজ সেই শিশুটির মতো হাজারো যোদ্ধা প্রতি মাসে কেবল বেঁচে থাকার আশায় হাসপাতালে যায়। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য রক্ত কেবল চিকিৎসা নয়, এটিই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র জ্বালানি।কিন্তু সমাজের এই অদৃশ্য সংকটের গভীরতা বোঝা যায় হাসপাতালের করিডোরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসে। ঈদের আনন্দ যখন শহরের প্রতিটি কোণে উপচে পড়ে, তখন একজন থ্যালাসেমিক সন্তানের বাবা মলিন মুখে বলেন, “মানুষ তো ঈদের নতুন জামাকাপড় কেনার চিন্তা করে, আর আমাদের ভাবতে হয় রক্ত কেনার টাকা আসবে কোত্থেকে? সন্তানের জন্য জামা নয়, আমি কি তার জন্য এক ব্যাগ নিশ্বাস কিনতে পারব?” যখন রক্ত কেনার টাকা জোগাতে গিয়ে ঘরের অন্ন কেনা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেই পরিবারের অবস্থা কেউ কি কল্পনা করতে পারে?২০২৪ সালের জাতীয় জরিপ ও স্বাস্থ্যখাতের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসার পেছনে মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে, যা অনেক নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের মোট আয়ের চেয়েও বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এদেশে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত পরিবারের আয়ের প্রায় ১৭ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যয় হয় শুধু রক্ত ও ওষুধের পেছনে।নিষেধের ঘেরাটোপে অমানবিক পরিশ্রমথ্যালাসেমিয়া রোগীদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি শরীরকে দ্রুত ক্লান্ত করে তোলে। হৃদপিণ্ড, লিভারসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।অথচ দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে অনেক রোগীকেই জীবনের প্রয়োজনে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। কোথাও একজন রোগী কলসি কাঁধে সিঁড়ি বেয়ে মানুষের বাসায় পানি পৌঁছে দিচ্ছে, কোথাও কেউ সারাদিন শ্রম বিক্রি করছে শুধুমাত্র পরবর্তী রক্ত নেওয়ার টাকা জোগাড় করতে।এক ভয়াবহ বৈপরীত্যবাঁচতে হলে রক্ত লাগবে, আর রক্ত কিনতে হলে যে পরিশ্রম করতে হবে, সেই পরিশ্রমই ওই শরীর নিতে পারছে না। এ এক অদ্ভুত মৃত্যুফাঁদ। ২০২৪ সালের সর্বশেষ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া পরিস্থিতির যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১.১৫ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এই রোগের বাহক। অর্থাৎ আমাদের চারপাশের প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে প্রায় ১ জন অজান্তেই এই জিন বহন করছেন। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার নতুন শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নিচ্ছে।সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো সচেতনতার অভাব। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ বাবা-মা সন্তান জন্মের আগে জানতেনই না থ্যালাসেমিয়া কী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিয়ের আগে কোনো স্ক্রিনিং বা রক্ত পরীক্ষা করা হয়নি। এই অজ্ঞতাই আজ থ্যালাসেমিয়াকে এদেশের অন্যতম বড় নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত করেছে। অথচ এটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য।সাইপ্রাস ও ইতালির লড়াইউন্নত বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একসময় সাইপ্রাসে প্রতি ৬ জনের ১ জন থ্যালাসেমিয়ার বাহক ছিল। পরে চার্চ, সরকার ও স্বাস্থ্যখাতের সমন্বয়ে বিয়ের আগে স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলাফল হলো আজ সেখানে নতুন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।ইতালির সার্দিনিয়া অঞ্চলও দীর্ঘমেয়াদি গণসচেতনতা, জিনগত পরীক্ষা এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের পাশের দেশ পাকিস্তানেও বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার আইন পাস হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এখনও বিষয়টি মূলত দিবসভিত্তিক আলোচনা আর সীমিত সচেতনতাতেই আটকে আছে।আশার আলোএই অন্ধকারের মাঝেও কিছু প্রতিষ্ঠান মানবিকতার বাতিঘর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ‘বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি হাসপাতাল’ তার অন্যতম উদাহরণ। ১৯৮৯ সালে মরহুম ইঞ্জিনিয়ার ওমর গোলাম রাব্বানী নিজের বাড়িতে মাত্র তিনটি বেড নিয়ে এই উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। আজ গ্রিন রোডের এই প্রতিষ্ঠান হাজারো রোগীর আশ্রয়স্থল।বর্তমানে এখানে প্রায় ৫ হাজাারের বেশি নিবন্ধিত রোগী রয়েছে এবং প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন রোগীর রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়। হাসপাতালটি যাকাত ফান্ডের মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের সহায়তা দেয় এবং অত্যন্ত কম খরচে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। এটি কেবল একটি হাসপাতাল নয়, মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতীক।মেধার স্বীকৃতি ও কোটার দাবিথ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত মানুষ শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে জীবনের নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়লেও মেধায় তারা পিছিয়ে নেই। নিয়মিত চিকিৎসা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেকেই প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে টিকে থাকতে পারেন না।তাই থ্যালাসেমিয়াকে একটি বিশেষ দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক জটিলতা হিসেবে বিবেচনা করে তাদের জন্য কর্মসংস্থান, শিক্ষাসহায়তা ও বিশেষ সুযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন। যদি তারা নিজের চিকিৎসার খরচ নিজে বহন করার সুযোগ পায়, তবে তারা সমাজের ওপর বোঝা না হয়ে দেশের সম্পদে পরিণত হতে পারে।মায়ের চোখের জলহাসপাতালের করিডোরে অনেক কথোপকথন পাথরকেও কাঁদাতে পারে। এক মা তার সন্তানকে বলছেন, “বাবা, আর একটু ধৈর্য ধর, সুঁইটা দিলেই শরীরটা আবার ভালো লাগবে।” সন্তান প্রশ্ন করে, “মা, আমি কেন অন্য বাচ্চাদের মতো দৌড়াতে পারি না? আমার শরীর এত দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায় কেন?” মা চোখের জল লুকিয়ে বলেন, “তুই তো বীরের মতো লড়াই করছিস বাবা।” এই কথোপকথনগুলো কোনো গল্প নয়; এটাই বাস্তবতা।  এক কিশোর রোগী তার মাকে বলছিল, “মা, আমার ঈদের জামা লাগবে না। তুমি শুধু রক্তের টাকাটা রেখে দিও।” আমাদের উৎসবের বিলাসিতা থেকে কি একটি ব্যাগ রক্তদানের জায়গা তৈরি করা যায় না?বিনীত নিবেদনথ্যালাসেমিয়া কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়; এটি মূলত অসচেতনতার ফল। আজ এই লেখা যখন আপনি পড়ছেন, তখন হয়তো কোনো শিশু হাসপাতালের বেডে পরবর্তী রক্তের অপেক্ষায় আছে। আপনি যদি নিয়মিত রক্তদান করেন, তবে হয়তো সেই শিশুটির জীবন আরও কিছুদিন এগিয়ে যাবে। আপনি যদি বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং নিশ্চিত করেন, তবে হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই কষ্ট থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।আসুন, এই ৮ মে আমরা শুধু দিবস পালন না করে দায়িত্ব গ্রহণ করি। নিয়মিত রক্তদান করি।বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা নিশ্চিত করি।  এই অদৃশ্য সংকটকে দৃশ্যমান করি। কারণ রক্ত শুধু শরীরে প্রবাহিত হয় না, এটি বাঁচিয়ে রাখে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি মায়ের প্রার্থনা, একটি শিশুর আগামী। সেই জীবন যেন অর্থাভাবে অকালে ঝরে না পড়ে এ দায় আমাদের সবার। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক

রম্যগদ্য: “ধুলোভাই জিন্দাবাদ”

“ধুলোভাই জিন্দাবাদ, দাদাবাবু জিন্দাবাদ...”“কী ব্যাপার হঠাৎ ধুলোভাই জিন্দাবাদ, দাদাবাবু জিন্দাবাদ দিচ্ছিস! দুলাভাই জিন্দাবাদ না হয় বুঝলাম কিন্তু তোর দাদাবাবুর তো দফারফা। তোর কামেরবেটি মার্কা দিদি আর নেই, ফলে তোর দাদাবাবুকে আর টনকা টন ঈলিশ মাছ খেতে হবে না।”“ধুর মিয়া আপনে আছেন আপনের টনকা টন ইলিশ মাছ রপ্তানিতে, হক্কল যায়গায় খালি ব্যবসা খোঁজেন! আমি কই কী, আর আমার সারিন্দায় কয় কী?”“কেন কেন, দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে টনকা টন ইলিশ মাছ রপ্তানীতে দোষ কোথায়?”“টনকা টন ইলিশ মাছ রপ্তানি নারে ভাই অহন রপ্তানি হোইতাছে বুলডোজার! ১৮৭৪ সালে নির্মিত কোলকাতা নিউমার্কেটের সামনে নেড়েগো গোশতের দোকান বুলডোজার দিয়া ভাইঙ্গা দিলো। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত সরকারের মদদপুষ্ট যোদ্ধারা। বুজলাইন, বাংলাদেশ অহন আর কচি শিশুটি নাই! হ্যারা অহন এক্সপোর্ট করে আর্ন্তজাতিক মানের বিজয় মিছিলের আইডিয়া- “দ্যা বুলডোজার!”“ক’দিন আগে না তোর মমতা দিদি আমাদের নারায়ণগঞ্জের বঙ্গসন্তান, শামীম ওসমানের “খেলা হবে” স্লোগানটা ইম্পোর্ট করেছিলেন...”“তো! আমাগো নারায়ণগঞ্জের পোলা, শামীম ওসমানের “খেলা হবে” স্লোগানটা ইম্পোর্ট করেছিলেন, তো দোষের কী হোইছে?”“না দোষের কিছু হয়নি, ৫ আগস্টের পরে শামীম ওসমানের যেমন জনগণ দরজার চৌকাঠ পর্যন্ত খুলে নিয়েছে, এবার পশ্চিমবঙ্গে পাবলিক তৃণমূলের কর্মীদের ধোলাই করছে, আর নিউমার্কেটের সামনে নেড়েদের গোশতের দোকান বুলডোজার দিয়া ভাঙছে।”“হেঁ হেঁ হেঁ, বুজেন না “গ্রেটম্যান থিংস অ্যালাইক...”“এ আবার কী? এখানে “গ্রেটম্যান থিংস অ্যলাইক” কথাটা আসছে ক্যানো?”“গ্রেটম্যান থিংস অ্যালাইক” কথাটা আইছে ক্যান হেইডা আপনে বুজেন না! দেড়বছর আগে আপনের তত্বাবধায়ক সরকার ক্যেমনে সব বুলডোজিং করতাছিলো ভুইল্লা গেছেন?”“না না এইসব অসভ্য বর্বর পৈশাচিকতা কেউ কখোনো ভুলবে? আর্শ্চয্য!”“জ্বী, মুদি সরকারভি ওই আমাগো গ্রেটম্যানের পথ ধইরা বুলডোজিং করতাছে! যতই কন মহাভারত মহাগণতন্ত্রের দেশ, আসলে যেই লাউ হেই কদু, ধর্মান্ধতার কাছে ট্রাম্প কন আর মুদিজী বেবাগতে সেইম সেইম।”“যাহ তা হয় নাকি, ভারতের সভ্যতা বেনারসের নগরের পত্তন সেতো হাজার হাজার বছরের বৈদিক সভ্যতা। তার সঙ্গে তোর এই অর্ধশতাব্দীর অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত কতগুলো মানুষ নামের জন্তু জানোয়ারে সমাজ পরিচালকের তুলনা কি মানায়?”“ক্যা, তুলনা হোইবো না ক্যান? ইভিএম ভোটে কারচুপি! এইডা ক্যাডা শিখাইছে? আপনে কন হাজার বছরের সভ্যতা! আমাগোটা অর্ধশতাব্দী না চুয়ান্ন বছর হেই তর্কে আমি যামুনা। তয় আমি কোইকি এইবার কলিকাতার বাঙালি মুসলমানগো খবর আছে। এইবারের পশ্চিমবঙ্গের ভোটার লিস্টে প্রায় নব্বই লাখ মুসলমানের নাম বাদ পড়ছে! ফলে কামের বেটি কন আর ফকিরনি মার্কা দিদি যাই কন হ্যের কিন্তু মোসলমান ভোট ব্যাংক দেওলিয়া হয়া গ্যেছেগা।”“তা বললে হবে নাকি ওই যে বাবারি মসজিদ ভাঙার পর, ঠিক বাবরি মসজিদের মতো নতুন মসজিদ গড়ার কারিগর জনাব হুমায়ুন কবির আম জনতা পাটি থেকে নিবার্চন লড়ে, তৃণমূল ও বিজেপিকে হারিয়ে জয় লাভ করেছে।”“বুঝছি বুজছি আপনে মিয়া কোইতে চান পশ্চিম বঙ্গের নির্বাচনের ফল আমাগো ওপর কিছুটা হোইলেও পরভাব ফেলবো। ঠিক আছে কিন্তু আমি কোই কি, যেসব পোলাপান মানে জেন-জীর লড়াকু পোলাগুলা যে মাল খায়া টাল হোইলো হ্যেরা যুদি আবার স্বজনপ্রীতি শুরু করে, তায়লে কোইলাম খবর আছে। দেশের আবার বারটা বাজবো!”“কিন্তু তুই কি করবি বল, দুলাভায়ের কাছে শালারা আবদার করবেনা? দুলাভাই যদি শালাদের কথা না শুনে তাহলেতো তোর ভাবীর কাছে দুলাভায়ের মুখ থাকবে না!”“ভাইনা ভালা, আপনে বিগত অর্ধশতাব্দী না চুয়ান্ন বছর হিসাব দিলেন, প্রতিবারই আপনেরা হয় পার্টির প্রধান মন্ত্রী নাইলে নিজ আত্মীয়গো পুরধান মন্ত্রী, কুনো সময় কিন্তু বাংলাদেশের মানে পুরা দেশের পুরধান মন্ত্রী হন নাই! আর পার্টি আর আত্মীয় দেখতে যায়া বার বার বাংলাদেশরে গাথায় ফ্যালাইছেন। এইবারও যদি আপনেরা ধুলো ভাই ধুলোভাই কয়া স্বজনপ্রীতির দিকে যাইতে কন তায়লে হেইতো আবার বাংলদেশরে লয়া গাথায় পড়বো। আবার কোনো হালায় বুলডোজার দিয়া হ্যের আত্মীয় স্বজনগো দরজার চৌকাঠ পর্যন্ত খুইল্লা নিবো।”“নাওে না, তুই এই ভয় আর করিস না, এই দুলাভাই মাছের রাজা ইলিশ আর বাত্তির রাজা ফিলিপস’এর দুলাভাই নয়, ইনি অনেক পরিপক্ক। ইনি আর ঝাপসা আলোয় কাঁটা কুটা কিচ্ছু দেখি না, দুলাভাই নয়। ইনি সব কিছুই ঠিক মতো দেখছেন। একযুগ পর দেশের মাটিতে নেমেই কিন্তু তোর এই দুলাভাই বলেছেন, বিশ্বের শোষিতের নেতা মার্টিন লুথার জুনিয়ারের মতো বলেছেন, “আই হ্যাভ এ, প্ল্যান” তাই তুই নিশ্চিন্তে থাক। কেবল একটু ধৈর্য্য ধর তাহলেই হবে।”“ঠিক আছে ভাই, ওই সব দাদা-দিদিগো চুলা-চুলি থুয়া, নিজেগো দেশটারে সুন্দরমোতো তৈয়ার করারা লাইগ্যা ব্যেবাগতে এক না হোইলে চলেনা। তয় আপনে কথাটা ঠিকই কোইছেন, ব্যেবাগতেওে একটু ধৈর্য্য ধরন লাগবো।”“এইতো বুদ্ধিমানের মতো কথা। দাদা-দিদিদের বুলডোজার রেখে আমরা সবাই ধৈর্য্য ধরে দেখি দেশের কী হয়।”“পুরা দেশের জনগণ, একলগে সবে কন, ধৈর্য্য শরণং গচ্ছামি।”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

রবীন্দ্রমননে বিজ্ঞান: ‘সত্যের একত্ব’ অন্বেষণ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২৬৮ সালের ২৫ বৈশাখ (৭ মে ১৮৬১) কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীতে, আমি বিজ্ঞানে তার কতিপয় ভাবনার ওপর আলোকপাত করব।১৯১৩ সালে সুইডিশ নোবেল কমিটি উল্লেখ করেছিল যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল, ‘তার গভীর সংবেদনশীল, সতেজ এবং সুন্দর পদ্যের জন্য— যার মাধ্যমে তিনি অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে নিজের ইংরেজি শব্দে প্রকাশিত কাব্যিক চিন্তাকে পাশ্চাত্যের সাহিত্যের একটি অংশ করে তুলেছেন’। তার এই কাব্যিক চিন্তা কীভাবে তার সময়ে এবং তার পরেও আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে, তা ইউরোপের অনেক বিজ্ঞানী ও দার্শনিককে বিস্মিত করেছে।বিজ্ঞানের প্রতি রবীন্দ্রনাথের কৌতূহল ছিল আশৈশব। তার পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের দীক্ষা এবং পরবর্তীকালে জীববিজ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহ তাকে মহাবিশ্বের উৎপত্তির অনুসন্ধানে সক্ষম করে তোলে। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান ভালোবাসতেন এবং ইংল্যান্ডে থাকাকালীন গ্রিনিচ মানমন্দির পরিদর্শন করেন। প্রখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিদ মেঘনাদ সাহা তাকে ১৯৩৭ সালে ‘বিশ্ব-পরিচয়’ নামে একটি বই লিখতে অনুপ্রাণিত করেন— যা তিনি বোসন এবং বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানের জনক সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেন। তিনি তার এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিসের সঙ্গে কাজ করেছিলেন, যিনি ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। ইউরোপীয় বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞানমনস্ক দার্শনিকদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী আর্নল্ড সমারফেল্ড, যার সঙ্গে ১৯২৮ সালে কলকাতায় তার দেখা হয়েছিল। বিখ্যাত জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ওয়ার্নার হাইজেনবার্গও ১৯২৮ সালে কলকাতায় তার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। হাইজেনবার্গ ১৯৭২ সালে বলেছিলেন যে, পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক ধারণা তার সহায়ক হয়েছিল। হাইজেনবার্গ সেই পরিণত বয়সের কবির সঙ্গে আপেক্ষিকতা, অসামঞ্জস্যতা, আন্তঃসংযুক্তি এবং অনিত্যতা— এসব ভৌত বাস্তবতার মৌলিক দিক নিয়ে বেশ কয়েকবার আলোচনা করেছিলেন। কথোপকথনের পর তিনি বলেছিলেন, ‘কিছু ধারণা যা এত উদ্ভট মনে হয়েছিল, হঠাৎ করেই সেগুলোর অনেক অর্থ খুঁজে পাওয়া গেল। এটা আমার জন্য খুব সহায়ক ছিল।’রবীন্দ্রনাথ তার বিশ্ব-পরিচয় গ্রন্থ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেছিলেন। এই উৎসর্গপত্রে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন, ‘আমি বিজ্ঞানের সাধক নই, সে কথা বলা বাহুল্য। কিন্তু বালককাল থেকে বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিল না।’ বিজ্ঞান চর্চার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন, ‘বুদ্ধিকে মোহমুক্তি ও সতর্ক করবার জন্য প্রধান প্রয়োজন বিজ্ঞান চর্চার। জ্ঞানের এই পরিবেশন কার্যে পাণ্ডিত্য যথাসাধ্য বর্জনীয় মনে করি।’ আমরা লক্ষ্য করি বিশ্ব-পরিচয় গ্রন্থে বিজ্ঞানের নানা তত্ত্ব ও তথ্য যেমন পরমাণুলোক, নক্ষত্রলোক, সৌরজগৎ, ভূলোক— এভাবে ভাগ করা হয়েছে বিভিন্ন অধ্যায়ে। তা ছাড়া সহজ ভাষায় এবং অনেক ক্ষেত্রে নতুন পরিভাষা তৈরি করে এই গ্রন্থটি রচনা করা হয়েছে। সে সময় বাংলায় বিজ্ঞানের বইয়ের অভাব ছিল এবং সে অভাব দূরীকরণে তার যে সামান্য প্রচেষ্টা রবীন্দ্রনাথ নিজেই বইটির উৎসর্গপত্রে তা উল্লেখ করেছেন।আমরা আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নানা কথোপকথন সম্পর্কে জানি। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মানুষ থেকে আলাদা কিছু নয় বরং মহাবিশ্বের সঙ্গে মানুষের সম্প্রীতি সত্য সুন্দরের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে উল্লেখ্য, নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ইলিয়া প্রিগোজিন রবীন্দ্রনাথ এবং আইনস্টাইনের ‘বাস্তবতার প্রকৃতি’ সম্পর্কে যে ভিন্নমত রয়েছে, তা তার গ্রন্থ ‘Order out of choas: Men's new dialogue with nature’-এ উল্লেখ করেন, ‘Curiously enough, the present evolution of science is running in the direction stated by the great Indian poet. Whatever we call reality, it is revealed to us through the active construction in which we participate.’ অর্থাৎ প্রিগোজিন বলতে চেয়েছেন যে বিজ্ঞানের বর্তমান বিবর্তন রবীন্দ্রনাথের নির্দেশিত পথেই এগোচ্ছে।এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে যে রবীন্দ্র ভাবনায় পরিবেশ প্রাচীন ভারতের তপোবনের পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মহাকবি কালিদাস উজ্জয়িনীতে বসে বৈদিক যুগের তপোবন তথা বিশিষ্ট মুনির আশ্রমের যে বর্ণনা দেন, তাতে দেখা যায় যে, সে সময় তপোবনগুলোর পরিবেশ ছিল মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গাছপালাকে বাদ দিয়ে কোনো জীবন টিকে থাকতে পারে না। এই ধারণা সঞ্জাতবোধ রবীন্দ্রভাবনায় পরিলক্ষিত হয়। কলকাতার নগরায়ণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন প্রায় ১০০ বছর আগে। আমরা তার কবিতায় তাই দেখি তিনি লিখেছেন— ইটের পরে ইট, মাঝে মানুষ কীট/ নাইকো ভালোবাসা নাইকো খেলা।রবীন্দ্রনাথের ভাবনা-চিন্তায় ছিল পরিবেশ ও প্রকৃতি। তাই তার কবিতায় লক্ষ করি বৃক্ষকে বন্দনা করার কথা, যেমন— অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান,/ প্রাণের প্রথম জাগরণে তুমি বৃক্ষ, আধি প্রাণ। ‘আকাশ’ নামের কবিতায় কবি উল্লেখ করেন- শিশুকালের থেকে/আকাশ আমার মুখে চেয়ে একলা গেছে ডেকে।প্রকৃতির সঙ্গে মানব চেতনার একীভূত হওয়ার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের গভীর বিশ্বাস শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন তার পরিবেশ উপলব্ধির মধ্যে নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। শান্তিনিকেতনের আশ্রম ও তার পরিবেশ পর্যালোচনা করলে আমরা রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ চিন্তার যে স্বরূপ লক্ষ্য করি তা হলো এই যে কবি চেয়েছিলেন, ‘এখনকার কালের বিদ্যা ও তখনকার কালের প্রকৃতি’। তবে এটা সত্য যে রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদর্শ এবং আধুনিকতার মধ্যে সাযুজ্য বিধানের সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের অভিযোজনের চিন্তা-ভাবনাও করেছিলেন।রবীন্দ্রমননে বিজ্ঞান প্রাচীন ভারতের অধ্যাত্ম ভাবনার সঙ্গে মিশে এক চতুর্মাত্রিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। আইনস্টাইনের চতুর্থ মাত্রা হচ্ছে সময় বা কাল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের চতুর্থ মাত্রা হচ্ছে ভারতবর্ষের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক জীবন ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ের চেষ্টা রবীন্দ্রনাথ করেছেন। সমন্বয়ের এই রবীন্দ্র-দর্শন থেকে আমরা পেতে পারি প্রাণ ও অপ্রাণের মধ্যে ঐক্যের সন্ধান। রবীন্দ্রমননে এই ঐক্যই সত্যের একত্ব অন্বেষণের নিয়ামক।[লেখক: গবেষক ও অধ্যাপক, যুক্তরাজ্য]

শিক্ষক হেনস্তা কি চলতেই থাকবে

সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা আর স্নেহের এক পুণ্যবন্ধন। কিন্তু বর্তমান সময়ের অস্থিরতা সেই সম্পর্কের মূলে কুঠারাঘাত করছে। আমরা এক অদ্ভুত ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি, যেখানে জ্ঞানের মশালবাহী শিক্ষককে হতে হচ্ছে লাঞ্ছিত। এই অবক্ষয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং গোটা সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার এক অশনি সংকেত। সম্প্রতি উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পালের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়। ক্লাসরুমে তরুণ ছাত্র কর্তৃক একজন পিতৃসম শিক্ষকের ওপর যে শারীরিক লাঞ্ছনা চালানো হয়েছে, তা কেবল অপরাধ নয়, বরং পৈশাচিকতার বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের একাংশ কতটা নিচে নেমে যেতে পারে। শিক্ষার যে আঙিনায় মানুষ হওয়ার পাঠ পাওয়ার কথা ছিল, সেখানেই আজ অমানুষের আস্ফালন। দুঃখজনক বিষয় হলো, ছাত্রের এই কাজের পর সংশোধন করার বদলে তার পিতা নিজের পদের দাপট দেখিয়েছেন। একজন বিচারপতির আসনে বসে নিজের সন্তানের অপরাধ আড়াল করতে শিক্ষককে নিজ বাসায় তলব করা এবং উল্টো শিক্ষককেই ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা আইনের শাসনের এক প্রহসন। সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি’—সত্যিই আমরা অবাক হই যখন দেখি ন্যায়ের প্রদীপ যারা জ্বালাবেন, তারাই অন্ধকারের পক্ষ নিচ্ছেন। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ স্লোগান বা মন্তব্য আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ˆদন্যকেই তুলে ধরছে। একজন নারীকে বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে সম্বোধন করার সময় যে ন্যূনতম সৌজন্যবোধ প্রয়োজন, তা যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে এই গালিবাজ জেনারেশন বা প্রজন্মের ভাষা শুনলে মনে হয়, তারা যুক্তির চেয়ে অশ্লীলতাকে বেশি শক্তিশালী হাতিয়ার মনে করে। ‘এক দুই তিন চার’ কিংবা ‘টিনের চালে কাউয়া’র মতো স্থুল স্লোগানগুলো রাজনৈতিক উত্তেজনায় ব্যবহৃত হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে কিশোর মনের ওপর। তারা শিখছে যে, কাউকে আক্রমণ করতে হলে তার সম্মান বা মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে দেয়াটাই বীরত্ব। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা যেকোনো রাজনৈতিক পালাবদলের সময় যখন মব কালচার বা গণপিটুনির সংস্কৃতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যখন সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়, তখন বখাটে ছাত্র বা দাপুটে অভিভাবক ভয় পাওয়ার বদলে আস্কারা পায়। এই অস্থির সময়ে শিক্ষকরা হয়ে পড়েছেন সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত, অথচ তারাই ছিলেন জাতির আলোকবর্তিকা। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘শিক্ষা কি কেবলই তথ্য পরিবেশন? তা তো নয়, তা হলো পূর্ণতা দান।’ সেই পূর্ণতা আজ লাঞ্ছিত। শিক্ষক হেনস্তার এই ধারা যদি চলতে থাকে, তবে কোনো মেধাবী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ আগামীতে শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাইবেন না। যখন একজন শিক্ষক ক্লাসে প্রবেশের আগে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তখন পাঠদান প্রক্রিয়াই মুখ থুবড়ে পড়ে। রাষ্ট্র যদি এই অন্যায়ের গ্যারান্টি দিতে না পারে যে আগামীতে আর কোনো শিক্ষকের সঙ্গে এমন হবে না, তবে সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যত অন্ধকার। জীবনানন্দ দাশের কথায়, ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ।’পরিবার হচ্ছে নৈতিকতার প্রাথমিক বিদ্যাপীঠ। কিন্তু বিচারপতির সেই পুত্রের মতো যখন অভিভাবকরাই সন্তানের ভুলকে আস্কারা দেন, তখন সেই সন্তান সমাজের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়ায়। জনস্বার্থে আজ এটা বলা জরুরি যে, ক্ষমতার দাপট দিয়ে ন্যায়কে চাপা দেওয়া যায় না। প্রতিটি অন্যায়ের বিচার যদি দৃষ্টান্তমূলক না হয়, তবে সমাজের এই পচন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে আপনার এবং আমার ঘরের দরজায়। শিক্ষক এবং শিক্ষা মন্ত্রীর সম্মান রক্ষার বিষয়টি কেবল ব্যক্তির সম্মান নয়, বরং এটি একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা। যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে অশ্লীল কথাবার্তা বলা হয়, তখন তা বিদেশের মাটিতে আমাদের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে। এই গালিবাজ জেনারেশন তৈরি করার পেছনে যে কারিগররাই থাকুক না কেন, তাদের দায়ভার নিতে হবে। যে জাতির নৈতিক ভিত্তি যত দুর্বল, সেই জাতির উন্নয়ন তত বেশি ঠুনকো। আমরা দালানকোঠা আর অবকাঠামো দিয়ে সভ্যতা মাপতে চাই, কিন্তু মানুষের মনুষ্যত্ব যখন হারিয়ে যায়, তখন সেই ইট-পাথরের কোনো মূল্য থাকে না। দয়াল চন্দ্র পালের মতো শিক্ষকদের চোখের জল যদি শুকিয়ে যায়, তবে এই বাংলার মাটি তার উর্বরতা হারাবে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের সেই গুরুভক্তির দিনগুলো আজ কেবল বইয়ের পাতায় পড়ে আছে। মব কালচার বা গণউন্মাদনা এক ধরনের সাময়িক মানসিক বিকার। এটি আইনকে নিজের হাতে তুলে নিতে প্ররোচিত করে। এই মবের শিকার হয়ে যখন সম্মানিরা অপদস্থ হন, তখন অযোগ্যদের দাপট বেড়ে যায়। আজকের এই অস্থির সময়ে আমাদের তরুণ সমাজকে বোঝাতে হবে যে, বিপ্লব মানে অসভ্যতা নয়, পরিবর্তন মানে গালিবাজ হওয়া নয়। শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি যে ধরনের কুরুচিপূর্ণ সম্বোধন করা হয়েছে, তা নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী নেতৃত্বের প্রতি এক চরম অপমান। নারীরা যখন কোনো পদে আসীন হন, তখন তাদের মেধা নিয়ে সমালোচনা করা যায়, কিন্তু তাদের চরিত্র বা লিঙ্গ নিয়ে কুৎসিত ইঙ্গিত দেয়া বর্বরতা। সুলতানা রাজিয়া থেকে শুরু করে প্রীতিলতা পর্যন্ত যে সংগ্রামের ইতিহাস, তা এই অসভ্য আচরণের কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, ‘আর সেই মেরুদণ্ড যদি অপমানে নুয়ে পড়ে, তবে জাতি হিসেবে আমরা কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব না। শিক্ষার্থীদের শাসন আর গুণী শিক্ষকদের সম্মান ফিরিয়ে আনাই হোক আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা কী রেখে যাব? কেবল একরাশ ঘৃণা আর গালিবাজ স্লোগান? নাকি শ্রদ্ধাবোধ আর সহমর্মিতা? দয়াল চন্দ্র পালের সেই অপমানিত মুখখানা যেন আমাদের বিবেককে বারবার প্রশ্ন করে। এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে কাজের মাধ্যমে। সমাজ সংস্কারের আন্দোলন শুরু হোক ঘর থেকে, তারপর ছড়িয়ে পড়ুক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। শিক্ষকদের নিরাপত্তা কেবল পুলিশের লাঠি দিয়ে সম্ভব নয়, এটি দরকার সামাজিক সচেতনতা। প্রতিটি ছাত্রকে বুঝতে হবে, শিক্ষকের পায়ের তলায় বেহেশত না থাকলেও, তার আশীর্বাদের হাতটি মাথার ওপর থাকা ভাগ্যের ব্যাপার। শিক্ষক লাঞ্ছনার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। অভিভাবকের পদের দোহাই দিয়ে পার পাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হোক। শিক্ষা মন্ত্রীর সম্মান যেন কোনোভাবেই বাজারের সস্তা তর্কের বিষয় না হয়। চাই এমন এক সোনার বাংলাদেশ, যেখানে গুরুকে দেখলে শিষ্য শ্রদ্ধায় মাথা নত করবে, দম্ভে বুক ফোলাবে না। শিক্ষক হেনস্তা রুখতে হলে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। বিচারপতির পুত্র হোক বা প্রভাবশালী নেতা—শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার সাহস যেন কেউ না পায়, তেমন আইন ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্কুলের ছোট ক্লাসরুম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। ১৮টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত এই নিবন্ধের লক্ষ্য একটাই—বিবেককে জাগ্রত করা। অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো তত কাছে আসে। তবে সেই আলোর জন্য আমাদের লড়াই করতে হবে। মব কালচার আর গালিবাজ জেনারেশনকে প্রত্যাখ্যান করে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চা শুরু করতে হবে। [লেখক: প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল]

গ্রামের ধানকাটা ও প্রাসঙ্গিক কথা

এখন বৈশাখ মাস। গ্রামে আছি। কিশোরগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হিসেবে হাওরাঞ্চলেই বেড়ে উঠেছি। শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামের মাঠে-ঘাটে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ঝুলিটা বেশ বড়োই বলা যায়। এখন বোরোধান কাটার ভরা মৌসুম চলছে। ভাটি বাংলার মানুষের মূল ফসল এই বোরোধান। এটা বছরে একবার হয়। এর ওপরই চলে কৃষকের বারো মাসের ভালো-মন্দ জীবন। স্মরণাতীত কাল থেকেই ভাটির মানুষের সুখ-দুঃখ আয়-ব্যয়, আর আটপৌরে জীবন যাত্রার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে বিল-ঝিল আর হাওরের বোরো ধানের সোঁদাগন্ধ। বোরো ধানের ফলন বরাবরই ভালো হয়, বেশির ভাগ সময়েই বাম্পার ফলন হয়ে থাকে। যদিও এর সঙ্গে আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতন দুর্ভাগ্য লেগে থাকে। এতদস্বত্বেও হাওরের মানুষ অভ্যস্ত এবং অভিজ্ঞ। দুর্যোগ বলতে অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, হঠাৎ বাঁধ ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি হয়ে থাকে। কিন্তু এসবের ভেতরেও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কৃষকরা তাদের জীবিকার মতন ধান সংগ্রহ করে নিতে পারে। ২.দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এবারের দুর্যোগ সম্পূর্ণ অন্যরকম, মাত্র ৫-৬ দিনের অতিবৃষ্টি এসে তলিয়ে দেয় হাজার হাজার হেক্টর প্রায় পেকে ওঠা ধানের জমি। পানি সরে যাচ্ছে না কিছুতেই, কারণ নানা স্থানে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, ব্রিজ কালভার্টের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে, খাল, নালা, সংকোচিত হয়েছে যত্রতত্র। এবার স্বচোখে ধান লওয়া আর কৃষকের অবর্ণনীয় বিড়ম্বনা দেখে অশ্রুপাত করা ছাড়া যেন উপায় নেই। এমনিতেই বোরো ব্যয়বহুল ফসল। এর উৎপাদন অধিক হওয়ার পেছনে প্রয়োজন পড়ে পর্যাপ্ত পানি, সার, কীটনাশক প্রভৃতির। কৃষকরা লোন করে, এনজিওর কিস্তি পরিশোধের দায় নেয়, গ্রামীণ সুদের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান দিয়ে শোধ করার শর্তে টাকা এনে বোরো ধান চাষ করে থাকে। তাদের ভরসা ধান তুলে সব ঋণের বোঝা নামিয়ে স্বস্তির হাসি হাসবে। না, এবার তা হচ্ছে না, কৃষক ধান ওঠাতে পারছে না মূলত বিরূপ আবহাওয়া আর হাতে নগত টাকার অভাবে। ৩.আরেকটা অনির্বচনীয় দৃশ্য যা বিবেককে নাড়া দিয়ে যায়, তা হলো ধানের বাজার মূল্য। এর কোনো দাম নেই। মনে হয়, মানুষ শুধু চাল খায়, ধানের দরকার নেই। মাঠে মাঠে ভেজা ধান পড়ে আছে, কেনার কেউ নেই। আপাতদৃষ্টিতে সবচেয়ে ফেলনা বস্তুর নামই ধান। দেখা যায়, এক মণ ধানের দাম সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা। আর একজন দিনমজুর বা রোজ কামলার মজুরি ১৫০০-১৬০০ টাকা। বৃষ্টির কারণে জমিতে তারা বেশি সময় থাকতে পারছেনা। অথচ এদের জন্যে দু’বেলা খাবারও সরবরাহ করতে হচ্ছে কৃষককেই। যেখানে একজন মজুর দিনে ২০০০ টাকার ধান কাটতে পারছে না, তাকে দু’বেলা খাবার এবং ১৬শ’ টাকা দিতে হচ্ছে। কোন দিকে যাবে কৃষক আর জমির মালিকরা? তারা জমির তলিয়ে যাওয়া ধান আনবে নাকি জমিতেই বিলীন হতে দিবে তা স্থির করে ওঠতে পারছে না। সহানীয় একজন প্রবীণ কৃষক জানালেন, ‘গত ৫০ বছরে তিনি এমন আবহাওয়ার বিপর্যয় দেখেননি। গত এক সপ্তাহের মধ্যে দু’চার ঘণ্টার জন্যও সূর্যের আলোর দেখে নাই। কাটা ধানে চারা গজিয়ে উঠেছে, খর পচে গলে যাচ্ছে। এতে গরু-বাছুরের খাবারের সংকট দেখা দিবে। এবার ভাটি অঞ্চলের কৃষক ধান হারানোর পাশাপাশি গরু-মহিষও হারাবে’। সামনে অল্প ক’দিনের মধ্যেই গ্রামে গ্রামে কোরবানির হাট বসবে। ভাটি বাংলায় এবার যারা গরু লালন-পালন করছে বেশি দামের আশায় তারাও আশাহত হয়ে পড়েছে। কারণ গোখাদ্য সংকট দেখা দিবে। ৪.গ্রামে ক্রমেই কমে যাচ্ছে শ্রমজীবী দিনমজুরের সংখ্যা। নানাবিধ পেশায় তারা জড়িয়ে পড়েছে। যারা গ্রামে থাকছে তাদের একটা অংশ নিকটতম হাট-বাজারে ছোটখাটো ব্যবসা করছে, রিকশা বাইসাইকেল, চাস্টলসহ বিভিন্ন গ্যারেজে কাজ করছে। সামান্য কিছু অংশ বিদেশে, আরেকটা অংশ শহরে চলে গেছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামে জুতার কাজ বা রিকশা অটোরিকশা ইত্যাদিতে জড়িয়ে গেছে। বর্তমানে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, জমিওয়ালা কৃষকের তুলনায় দিনমজুরের সংখ্যা কম। ফলশ্রুতিতে তারা নিজেরাই নিজের মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে কৃষকদের জিম্মি করে ফেলেছে। কৃষকের অবস্থা এমন যে, হয় সে জমির ধান কেটে আনবে অথবা ফেলে দিবে। আবার কেউ কেউ বিঘা প্রতি চুক্তিতে দিয়ে দিচ্ছে। এক বিঘা জমির ধান কেটে দিতে তারা চাচ্ছে ১০ হাজার টাকা। এতে ধান হবে সর্বোচ্চ ১৮-২০ মণ। আর মধ্যস্বত্ব ভোগীরা সুযোগ বুঝে ভেজা ধানই ক্রয় করছে মণপ্রতি ৭০০ টাকা দামে। এ যেন গ্রামীণ কৃষকদের জন্যে এক করুণ ও হতাশার চিত্র। গ্রামের কৃষিতে দিনমজুরের এমন ভয়াবহ সংকট নিরসন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই ধরনের ˆনরাজ্যকর পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় চলতে পারে না। সরকারকে কৃষি কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এদিকে নজর দিতে হবে। দেশের শহরকেন্দ্রিক লাখ লাখ শ্রমিককে গ্রামে ফেরাতে হবে। বিশেষ করে রাজধানীতে যে কয়েক লক্ষাধিক অবৈধ রিকশা ও অটোরিকশা চালক রয়েছে এদের ফেরানোর একটা উদ্যাগ নিতে হবে। প্রয়োজনে আইন করে ফেরাতে হবে। কেননা, বলা হয়, ঢাকা শহরের বহুমাত্রিক অপরাধের সঙ্গে এরা জড়িত। মূলত মাদকাসক্ত, স্থানীয় মস্তান ও বখাটেদের সঙ্গে এদের ওঠাবসা। এরা অনেকে একাধিক ঘর সংসার করেছে। নারী নির্যাতন ও পাচারের মতন অপরাধেও তারা জড়িত এমন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হরহামেশাই বের হচ্ছে। আরেকটি অপরাধ হলো, শহরজুড়ে মোটর চালিত অটোরিকশার রাজত্ব কায়েম করেছে তারা। অবৈধ লাইনের বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে প্রতিদিন। তারা রাজনৈতিক মিছিল মিটিংয়ে ভাড়ায় যাচ্ছে, ভাঙচুরে অংশ নিচ্ছে। শহরের ভিভিআইপি রোডে রাত-বিরাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, প্রশ্রাব- পায়খানার দুর্গন্ধে ঢাকার রাস্তার ফুটপাত ধরে পথচারীদের চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এদিকে নজর দেয়া সরকার/সিটি করপোরেশনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, পৃথিবীর আর কোনো দেশের রাজধানী শহরের চিত্র এমনট নয়। নাগরিক সেবার প্রধান শর্ত হলো শহরবাসীর জন্য একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করা। এটা যেকোনো সরকারের জন্যে সুশাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করা হয়। কাজেই এ একটা মূল জায়গায় হাত দিলে হয়তো গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক ধারা ফিরে আসতে পারে। আজকাল কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে এতে সন্দেহ নাই তথাপি শ্রমিকের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তা কমেনি। বরং শ্রমিকের প্রাচুর্য থাকলে কৃষকরা বছরে তিনবার ফসল তুলতে পারতো। শ্রমিকেরও কর্মসংস্থান হতো। দেশে খাদ্যের আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পেত। এগুলো একটি অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত বিষয়। কাজেই নতুন সরকারকে গ্রাম, শহর, মহানগর, রাজধানী সবকিছু নিয়ে সামষ্টিক ভাবে ভাবতে হবে। আবহমান গ্রাম ও আদি কৃষককে বাঁচানোর জন্যে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। [লেখক: গল্পকার]

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ জয়

ভারতের পশ্চিম বঙ্গের নির্বাচন কে ‘রাজনৈতিক অলৌকিক ঘটনা’ বলার যথেষ্ট কারণ আছে। পনেরো বছর পর পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের পতন এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অভূতপূর্ব উত্থান প্রথম দেখায় যেন এক আকস্মিক বিপর্যয়ের মতো। কিন্তু রাজনীতি সচরাচর আকস্মিক বিপর্যয়ে কাজ করে না। বরং তা ধীরে ধীরে জমা হয়, জেগে উঠে, আর তারপর প্রায় নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গ এর আগেও এমন গল্প দেখেছে। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার চাপে কংগ্রেসের পতন ঘটে। ২০১১ সালে বামফ্রন্ট (একসময় যাকে অজেয় বলে মনে করা হতো) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে উদীয়মান জনপ্রিয়তার ঢেউয়ে তলিয়ে যায়। প্রতিটি পরিবর্তনকে তখন যুগান্তকারী মোড় হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি পরির্বতনই ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা ক্ষয়প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি। ২০২৬ সালে বিজেপির জয় সম্পূর্ণভাবে সেই ধারার মধ্যেই পড়ে। এখানে কোনো জাদু নেই—শুধু সময়ের সঞ্চিত গতিবেগই অবশেষে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছেছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে কাছের ব্যাখ্যাটি হলো ‘বিদ্বেষমূলক ভোট’। যেকোনো জায়গায় পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকা অনেক দীর্ঘ সময়; বাংলায় তা যেন চিরন্তন। প্রশাসন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে কুখ্যাত ‘কাটমানি’ সংস্কৃতি—দুর্নীতির অভিযোগ সাধারণ মানুষের আলোচনায় প্রাধান্য পেতে থাকে। একসময় যে কল্যাণ প্রকল্পগুলি দারুণ জনপ্রিয় ছিল, সেগুলো এখন আর রূপান্তরকর বলে মনে হয় না, বরং নিয়মিত কিছু বিষয়ে পরিণত হয়। ভোটাররা, বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও তরুণ সমাজ, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পুনরায় যাচাই করতে শুরু করে। একসময়ের কৃতজ্ঞতা বদলে গিয়ে প্রথমে ‘পাওনা’ মনে হয়, পরে সেটাই হয়ে ওঠে হতাশা। কিন্তু শুধু বিদ্বেষমূলক ভোটই ২০০-এর বেশি আসনে জয় এনে দিতে পারে না। আরও গভীর কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। বিজেপি নির্বাচনী অঙ্ক নিজেই নতুন করে সাজাতে সক্ষম হয়। অমিত শাহের কৌশলগত নির্দেশনায় এবং নরেন্দ্র মোদির বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে দলটি একটি পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর খেলার কৌশল প্রয়োগ করে: একটি ভোটব্যাংককে সংহত করা এবং অন্যটিকে ভেঙে দেওয়া। হিন্দু ভোটের সংহতকরণ (প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ৬৫%) এবং মুসলিম ভোটের আংশিক বিভাজনের ফলে গ্রামীণ ও আধা-শহুরে কেন্দ্রগুলোতে একটি সিদ্ধান্তমূলক সুবিধা তৈরি হয়। এটি ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়, কিন্তু বাংলায় এটি একটি গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দশকের পর দশক ধরে এই রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিজেকে গর্বিত করত প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ প্রতিরোধ করার জন্যে। সেই প্রতিরোধ এখন দুর্বল হয়েছে। বিজেপি শুধু একটি জাতীয় বয়ান আমদানি করেনি; বরং এটিকে স্থানীয় রূপ দিয়েছে। এটি পরিচয়ের রাজনীতির সঙ্গে কল্যাণের প্রতিশ্রুতি যুক্ত করেছে, তৃণমূলের সামাজিক কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করে বড় আকারের নগদ স্থানান্তর ও উন্নয়নের অঙ্গীকার দিয়েছে। এর মাধ্যমে এটি আদর্শিক সংহতি এবং বাস্তব প্রণোদনার মধ্যে রেখা অস্পষ্ট করে দিয়েছে। দলটির কৌশলগত শৃঙ্খলাও ছিল ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালের প্রচারণার তুলনায় (যেটি কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর অতিনির্ভরতা ও ব্যক্তিগত আক্রমণে ভরপুর ছিল) বিজেপি এবার কৌশল বদলায়। ব্যক্তিত্বের সংঘর্ষের বদলে তারা প্রশাসনের ব্যর্থতার দিকে নজর দেয়। স্থানীয় নেতৃত্বকে সামনে আনে, বুথ-স্তরের সংগঠনে ব্যাপক বিনিয়োগ করে এবং ১৭৭টি জয়-উপযোগী কেন্দ্রকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করে। এমনকি তাদের সাংস্কৃতিক বার্তাটিকেও পরিমার্জিত করা হয়: দল সচেতনভাবেই ‘বাঙালিয়ানা’কে গ্রহণ করে, ‘বাইরের লোক’ সেই তকমা ঝেড়ে ফেলে যা আগে তাদের জনপ্রিয়তাকে সীমিত করে রেখেছিল। ফলাফলটি নিছক রাজ্য-স্তরের জয় নয়; এটি ভারতের রাজনৈতিক ভূগোলে এক কাঠামোগত পরিবর্তন। পশ্চিমবঙ্গ ছিল বিজেপির প্রসারের বিরোধিতা করা শেষ বড় ঘাঁটিগুলোর একটি। এর পতন আসাম, ত্রিপুরা ও ওড়িশায় অর্জিত সাফল্যের সঙ্গে মিলে পূর্ব ভারতে দলটির একীকরণ সম্পূর্ণ করে। এর প্রভাব কলকাতার বাইরেও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। ভূরাজনৈতিক দিক থেকে, এর প্রভাব তাৎক্ষণিক এবং তা আর কোথাও বাংলাদেশের মতো প্রকট নয়। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের আর একটি রাজ্য মাত্র নয়; এটি ভারতের বাংলাদেশ-প্রবেশদ্বার। দেশটির সঙ্গে এর দীর্ঘ, উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে, এটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের একটি বড় অংশ সম্ভব করে এবং দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সেতু হিসেবে কাজ করে। তৃণমূল শাসনের অধীনে, অভিবাসন, নাগরিকত্ব আইন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে রাজ্য সরকার ও নয়া দিল্লির মধ্যে প্রায়ই এক সূক্ষ্ম টানাপড়েন ছিল। সেই টানাপড়েন কোনো না কোনোভাবে এক ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে কাজ করতো। কেন্দ্রের সঙ্গে সারিবদ্ধ একটি বিজেপি সরকার অবশ্যই সেই প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলে দিবে। প্রথম ও সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়টি হলো অভিবাসন। বাংলাদেশ থেকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ্র-এর বয়ানটি বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই জোর দিয়ে বলে আসছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং প্রস্তাবিত নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি)-র মতো নীতিগুলো এই বয়ানের সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িত। পশ্চিমবঙ্গে একটি রাজ্য সরকার যদি কেন্দ্রের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে একমত হয়, তাহলে তা কঠোর আইন প্রয়োগের পথ সুগম করতে পারে, কথায় বলা বিষয়গুলোকে প্রশাসনিক বাস্তবতায় রূপ দিতে পারে। ঢাকার জন্য এটি কূটনৈতিক ও মানবিক উভয় ধরনের উদ্বেগই বাড়ায়। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চোরাচালান, পাচার এবং সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়তে পারে—এই সব ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ মিলে যায়। তবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রায়শই সামাজিক মূল্য নিয়ে আসে। সীমান্তের জনপদগুলো, যারা ইতোমধ্যেই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বাস করে, নিরাপত্তা জোরদার করার এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সীমান্তের ছোটখাটো ঘটনাও দ্রুত রাজনৈতিক অগ্নিকাণ্ডের রূপ নিতে পারে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সম্পর্কটি এক বিপরীতমুখী পরিস্থিতি তৈরি করে। এক দিকে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার যোগাযোগের প্রকল্পগুলো (রেল সংযোগ, অভ্যন্তরীণ জলপথ, বন্দর উন্নয়ন) দ্রুত করতে পারে, যা দুই অর্থনীতির জন্যই লাভজনক। বিশেষ করে কলকাতা-ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডর অপরিসীম সম্ভাবনা ধারণ করে। অন্যদিকে, অভিবাসন বা পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে গেলে এই অর্থনৈতিক লাভগুলো হুমকির মুখে পড়তে পারে। বাণিজ্য চলে স্থিতিশীলতার ওপরে ভর করে; রাজনীতি প্রায়ই তাকে বিঘ্নিত করে। চতুর্থত, আছে উপলব্ধির প্রশ্নটি। বাংলাদেশে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নজর রাখা হয় ঘনিষ্ঠভাবে, প্রায়শই সন্দেহের চোখে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী সুরে বিজেপির জোর ইতোমধ্যেই অস্বস্তি তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আরও শক্তিশালী উপস্থিতি এই উদ্বেগগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, বিশেষ করে যদি নীতিগত পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশ বা তার নাগরিকদের প্রতি বিদ্বেষের ধারণাকেই শক্তিশালী করে। তা আবার বাংলাদেশের নিজস্ব ঘরোয়া রাজনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে, সেখানে ভারত-বিরোধী মনোভাব এখনও এক শক্তিশালী সংগঠনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তবে এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা ভুল হবে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, গত এক দশক ধরে, নিরাপত্তা সমন্বয়, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও আঞ্চলিক সংযোগের বাস্তবসম্মত সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই কাঠামোগত উপাদানগুলো একদিনে উধাও হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং, আরও সমন্বিত ভারতীয় রাজনৈতিক কাঠামো যা পরিকাঠামো ও বাণিজ্য সংক্রান্ত উদ্যোগে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজ করে দিতে পারে। আসল চ্যালেঞ্জ হলো এই বিপরীতমুখী পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। একটি সম্পর্ক যা অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল কিন্তু রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর, তার যত্নসহকারে পরিচালনা জরুরি। বাংলাদেশের জন্য এর মানে হলো, এমন একটি কৌশল নেয়া যা না অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াশীল, না উদাসীন। বাংলাদেশকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে, পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ফলাফল গঠনে রাজ্য-স্তরের রাজনীতির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকেও স্বীকার করে নিতে হবে। বিজেপির জন্যও চ্যালেঞ্জটি সমান তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনী সাফল্য বাড়তি প্রত্যাশা বয়ে আনে। পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা যেখানে রাজ্যের নিজস্ব শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয় এবং প্রতিরোধের ইতিহাস রয়েছে, অবশ্যই দলটির সক্ষমতার পরীক্ষা নেবে; তারা প্রচারণার প্রতিশ্রুতিগুলোকে টেকসই শাসনে রূপ দিতে পারে কিনা। যেসব শক্তি তাদের ক্ষমতায় এনেছে—বিদ্বেষমূলক ভোট, মেরুকরণ এবং উচ্চ প্রত্যাশা—সময়ের ব্যবধানে সেগুলোই তাদের বিরুদ্ধেও যেতে পারে। গণতন্ত্রের নিজস্ব একটি ধারা আছে যা বিজয়ীদের বিনীত করে দেয়। শেষ পর্যন্ত, পশ্চিমবঙ্গে যা ঘটেছে তা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটি একটি বড় রাজনৈতিক সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়: কোনো আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়, কোনো জোট অটল নয়। ভোটারদের মন বদলায়, বয়ান বদলায়, আর ক্ষমতা হাতবদল হয়। বিজেপির এই জয় একইসঙ্গে একটি চূড়ান্ত পরিণতি ও একটি সূচনা—এক দশকব্যাপী রাজনৈতিক প্রকল্পের চূড়ান্ত পরিণতি, এবং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা যার ফলাফল এখনও অনিশ্চিত। বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি পরিষ্কার কিন্তু জটিল। ভূগোল দূরত্বের সুযোগ দেয় না; রাজনীতি সতর্কতা দাবি করে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান আগামী দিনগুলোতে সম্পৃক্ততার পরিসীমা নির্ধারণ করবে। এটি সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যায় নাকি সহযোগিতার—অথবা আরও সম্ভাবনাময়, উভয়ের এক অস্বস্তিকর মিশ্রণ ঘটাবে—তা নির্ভর করবে নির্বাচনের উপর না, বরং তার ফলাফলগুলো কীভাবে সামলানো হয় তার ওপর। ইতিহাস, সর্বোপরি, কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে শেষ হয় না। বরং তা কেবল পাতা উল্টায়। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: প্রাবন্ধিক]

আধুনিক কৃষি ও স্মার্ট প্রযুক্তির সমন্বয়েই টেকসই সমৃদ্ধির সম্ভাবনা

বাংলাদেশের কৃষি আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি কমে যাওয়া ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি; অন্যদিকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্রমবর্ধমান চাপ। এই বাস্তবতায় কৃষিকে টেকসই, লাভজনক ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে রূপান্তরের বিকল্প নেই। আধুনিক কৃষি ও স্মার্ট এগ্রিকালচারের সমন্বয়ই পারে বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে।বাংলাদেশের কৃষি কেবল ফসল উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যসম্পদও গভীরভাবে যুক্ত। এই তিনটি উপখাতের সমন্বিত উন্নয়ন ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, খরা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং শ্রম সংকট কৃষিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট কৃষি সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।স্মার্ট কৃষি শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, এটি কৃষিকে দক্ষ, টেকসই ও লাভজনক করার একটি আধুনিক দর্শন। এর মাধ্যমে কৃষক সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ফলে উৎপাদন বাড়ে, অপচয় কমে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষিকে আরও কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক করে তোলাই স্মার্ট এগ্রিকালচারের মূল লক্ষ্য। এখানে সেন্সর, ড্রোন, স্যাটেলাইট ইমেজিং, জিপিএস, ইন্টারনেট অব থিংস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালাইটিক্স ব্যবহার করা হয়। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, পুষ্টিগুণ কিংবা রোগবালাই সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া যায়। ফলে কৃষক প্রয়োজন অনুযায়ী সার, সেচ ও কীটনাশক ব্যবহার করতে পারেন। এতে খরচ যেমন কমে, তেমনি পরিবেশ দূষণও হ্রাস পায়।আধুনিক কৃষি মূলত উচ্চফলনশীল জাত, সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এটি উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। অন্যদিকে স্মার্ট কৃষি নির্ভুল ব্যবস্থাপনার সুযোগ দেয়। মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে যতটুকু সার প্রয়োজন ততটুকুই প্রয়োগ করা যায়। এতে অপচয় কমে এবং উৎপাদন বাড়ে। একইভাবে বায়োচার, ˆজব সার ও মাইক্রোবিয়াল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব। এই দুই ব্যবস্থার সমন্বয়ই ভবিষ্যতের টেকসই কৃষির ভিত্তি।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন পূর্বাভাস, আবহাওয়ার পরিবর্তন কিংবা কীটপতঙ্গের আক্রমণ আগাম শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষক সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন। কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনাতেও স্বচ্ছতা আসবে।অনেকের আশঙ্কা, স্মার্ট কৃষি চালু হলে কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। প্রযুক্তিনির্ভর বাণিজ্যিক কৃষি নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে অনেকেই কৃষি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন, ফলে অনাবাদি জমির পরিমাণ বাড়ছে। স্মার্ট কৃষি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষিকে লাভজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে তরুণরাও কৃষিতে আগ্রহী হবে এবং অনাবাদি জমিও উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।তবে বাংলাদেশে স্মার্ট কৃষি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। দেশের অনেক এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল। এছাড়া অধিকাংশ কৃষক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষিত নন। আরেকটি বড় বিষয় হলো খণ্ডিত জমি। ছোট ছোট জমিতে ড্রোন বা আধুনিক যন্ত্র কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন। তাই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সমবায়ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ‘বিসিসিটি-বাউ বায়োচার চুলা’ উদ্ভাবন করা হয়েছে। এই চুলার মাধ্যমে কৃষক রান্নার সময় বিনামূল্যে উন্নতমানের বায়োচার উৎপাদন করতে পারেন। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এতে প্রায় ৭৮ শতাংশ অজৈব কার্বন রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় উন্নত। বায়োচার ব্যবহারে মাটির উর্বরতা বাড়ে, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমে এবং উৎপাদন খরচ হ্রাস পায়। পাশাপাশি এটি কার্বন সংরক্ষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়ও ভূমিকা রাখে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বায়োচার থেকে ন্যানো-ফিড উৎপাদন করা সম্ভব, যা গবাদিপশুর মিথেন গ্যাস নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে।বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর, বাণিজ্যিক ও গবেষণাভিত্তিক করতে হবে। রিমোট সেন্সিং, ড্রোন, এআই, ন্যানোপ্রযুক্তি এবং প্রিসিশন কৃষির সমন্বিত প্রয়োগ কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক করতে পারে। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ে গবেষণার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ কৃষিতে বিশ্বমানের অবস্থানে উন্নীত হতে পারবে।কৃষির আধুনিকায়নই বাংলাদেশের টেকসই সমৃদ্ধির প্রধান সম্ভাবনা। আর স্মার্ট কৃষির সফল বাস্তবায়নই পারে দেশকে প্রকৃত স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিতে।[লেখক: অধ্যাপক, প্যারাসাইটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ]

পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা: কারণ, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ

পেঁয়াজ বাংলাদেশের রান্নাঘরের অপরিহার্য পণ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর বাজার বারবার অস্থির হয়ে উঠেছে। কখনো দাম হঠাৎ বেড়েছে, আবার কখনো বাম্পার ফলনের পর কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি। এ অস্থিরতা কেবল বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা নয়; এর পেছনে রয়েছে উৎপাদন, সংরক্ষণ, আমদানি, নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যনির্ভরতার জটিল সম্পর্ক। বাংলাদেশে পেঁয়াজ উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন ৩.৪২ মিলিয়ন টন থেকে ৪ মিলিয়ন টনের বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। কোনো কোনো হিসাবে উৎপাদন দেশের চাহিদার কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি বলে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে বাজারে প্রায়ই ঘাটতি, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট দেখা দেয়। এর প্রধান কারণ হলো ফসল-পরবর্তী ক্ষতি, দুর্বল সংরক্ষণব্যবস্থা এবং বাজারে সরবরাহের অসামঞ্জস্য। পেঁয়াজ বাজারের অস্থিরতার সবচেয়ে বড় কারণ সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা। পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য। সঠিকভাবে শুকানো, বাতাস চলাচল, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, রোগাক্রান্ত বাল্ব বাছাই এবং ˆবজ্ঞানিক সংরক্ষণ নিশ্চিত না হলে উৎপাদিত পেঁয়াজের বড় অংশ নষ্ট হয়। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত ফসল-পরবর্তী পর্যায়ে নষ্ট হতে পারে। ফলে উৎপাদন বেশি হলেও বাজারে কার্যকর সরবরাহ কমে যায়। মৌসুমি সরবরাহের চাপ ও অফ-সিজন ঘাটতিও বাজার অস্থিরতার বড় কারণ। পেঁয়াজের বড় অংশ নির্দিষ্ট মৌসুমে বাজারে আসে। তখন সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমে যায় এবং কৃষক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। কিন্তু কয়েক মাস পর সংরক্ষিত পেঁয়াজ কমে গেলে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়, দাম আবার বেড়ে যায়। অর্থাৎ একই পণ্যে কৃষক ও ভোক্তা দুই সময়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন— মৌসুমেকৃষক কম দাম পান, আর অফ-সিজনে ভোক্তা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের পেঁয়াজ বাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো ভারতনির্ভর আমদানি। দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ প্রধানত ভারতের ওপর নির্ভর করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বেড়ে গেলে বা উৎপাদন কমলে ভারত রপ্তানি সীমিত বা বন্ধ করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েবাংলাদেশের বাজারে। ২০১৯ সালে ভারতের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার পর দেশে পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ২০২০ এবং ২০২৩ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এসব ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, একক উৎসনির্ভর আমদানি একটি বড় ঝুঁকি। নীতিগত সিদ্ধান্তের সময় ও সমন্বয়ের ঘাটতিও পেঁয়াজ বাজারকে অস্থির করে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কখনো আমদানি সীমিত করা হয়, আবার ভোক্তার দাম নিয়ন্ত্রণে আমদানি খুলে দেয়া হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত যদি সময়মতো, তথ্যভিত্তিক এবং পূর্বপরিকল্পিত না হয়, তাহলে দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকের ফসল ওঠার সময় আমদানি খুলে দিলে দাম পড়ে যায়। আবার ঘাটতির সময় দেরিতে আমদানি করলে ভোক্তাকে বেশি দামে পেঁয়াজ কিনতে হয়। বাজার তথ্যের ঘাটতি ও মজুত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও অস্থিরতা বাড়ায়। দেশে কত পেঁয়াজ উৎপাদিত হলো, কতটা সংরক্ষিত আছে, কতটা নষ্ট হয়েছে, কতটা বাজারে আসবে এবং কতটা আমদানি প্রয়োজন—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও তাৎক্ষণিক তথ্য সবসময় পাওয়া যায় না। ফলে কৃষক, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও সরকার অনেক সময় অনুমানের ওপর সিদ্ধান্ত নেয়। এতে গুজব, আতঙ্ক, অতিরিক্ত মজুত, হঠাৎ আমদানি কিংবা হঠাৎ দামপতনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাজারে কারসাজি বা অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতাও তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সমস্যাটি নতুন নয়। ২০১৯, ২০২০ ও ২০২৩ সালে ভারতের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের পেঁয়াজ বাজারে বড় ধাক্কা লাগে। আবার উৎপাদন বেশি হলে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকলে কৃষক লোকসানে পড়েন। অর্থাৎ পেঁয়াজ খাতে একদিকে ভোক্তার জন্য মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি, অন্যদিকে কৃষকের জন্য দামপতনের ঝুঁকি— দুই-ই বিদ্যমান। এই পরিস্থিতিতে পেঁয়াজ খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন বৃদ্ধিকে কার্যকর সরবরাহে রূপান্তর করা। উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ দুর্বল থাকলে তা বাজার স্থিতিশীল করতে পারে না। আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাজারকে বাইরের সিদ্ধান্তের ঝুঁকিতে রাখে। কৃষক উৎপাদন খরচ, রোগবালাই, জলবায়ু ঝুঁকি ও দামের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। আবার ভোক্তার জন্য সহনীয় দাম নিশ্চিত করতে গিয়ে কৃষকের ন্যায্যমূল্য যেন নষ্ট না হয়— এই ভারসাম্য রক্ষা করাও কঠিন। বীজ, জাত, সংরক্ষণ প্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজার তথ্য—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিতব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। উত্তরণের জন্য সবার আগে পেঁয়াজের সংরক্ষণব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে। সাধারণ কোল্ডস্টোরেজ পেঁয়াজের জন্য সবসময় উপযুক্ত নয়। পেঁয়াজের জন্য দরকার বায়ু চলাচলযুক্ত, কম খরচের, গ্রামভিত্তিক ও কৃষকবান্ধব সংরক্ষণাগার। সংরক্ষণ ক্ষতি কমাতে ধরৎ-ভষড়ি সধপযরহব বা অনুরূপ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শুধু যন্ত্র স্থাপন করলেই হবে না; কৃষকদের সঠিকভাবে পেঁয়াজ শুকানো, পঁৎরহম, মৎধফরহম, রোগাক্রান্ত বাল্ব আলাদা করা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা শেখাতে হবে। অফ-সিজন পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানোও জরুরি। বর্তমানে সরবরাহ খুব বেশি মৌসুমনির্ভর। গ্রীষ্মকালীন বা অফ-সিজন জাত, জলবায়ু-সহনশীল জাত, উন্নত বীজ, সেচ সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে সারা বছরের সরবরাহ ভারসাম্যপূর্ণ করা সম্ভব। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবেএবং বাজারও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে। আমদানি নীতি হতে হবে আগাম, তথ্যভিত্তিক ও ক্যালেন্ডারভিত্তিক। আমদানি হঠাৎ বন্ধ বা হঠাৎ খুলে দিলে বাজারে অস্থিরতা বাড়ে। মৌসুম শুরুর আগেই উৎপাদন পূর্বাভাস, মজুত পরিস্থিতি, সম্ভাব্য ক্ষতি, চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারদর বিশ্লেষণ করে আমদানি পরিকল্পনা করা দরকার। কৃষকের ফসল ওঠার সময় আমদানি নিয়ন্ত্রিত রাখা এবং অফ-সিজনে ঘাটতির আগেই পরিকল্পিত আমদানি নিশ্চিত করা হলে কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষই উপকৃত হবে। আমদানির উৎস ˆবচিত্র্যময় করা দরকার। ভারত কাছের দেশ হওয়ায় পরিবহন সহজ ও খরচ কম, কিন্তু একক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই মায়ানমার, পাকিস্তান, চীন, তুরস্ক, মিসরসহ সম্ভাব্য বিকল্প উৎস আগেই চিহ্নিত করে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও সরবরাহ চুক্তি প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। বাজার তথ্য ও মজুত মনিটরিং শক্তিশালী করাও অপরিহার্য। ইউনিয়ন, উপজেলা, আড়ত, পাইকারি বাজার ও সংরক্ষণাগার থেকে নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। কোথায় কত পেঁয়াজ আছে, কতটা নষ্ট হচ্ছে, কতটা বাজারে আসতে পারে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে গুজব ও আতঙ্ক কমবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মজুত, কারসাজি ও অস্বাভাবিক মুনাফার বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি দরকার। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে পেঁয়াজ উৎপাদন টেকসই হবে না। পেঁয়াজ উৎপাদনে বীজ, সার, সেচ, শ্রম ও জমির খরচ বাড়ছে। বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেলে কৃষক পরের বছর আবাদ কমিয়ে দেন; তখন আবার ঘাটতি তৈরি হয়। এ জন্য মৌসুমভিত্তিক ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, কৃষক পর্যায়ে সরাসরি ক্রয়, সমবায়ভিত্তিক সংরক্ষণ এবং স্বল্পসুদে সংরক্ষণ ঋত চালু করা যেতে পারে। পেঁয়াজ প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ানো গেলে বাজারের চাপ কমবে। পেঁয়াজ থেকে ফ্লেক্স, পাউডার, পেস্ট ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরি করা গেলে উদ্বৃত্ত মৌসুমে কৃষক বিকল্প বাজার পাবেন। অফ-সিজনে এসব শিল্পজাত পণ্য বাজার স্থিতিশীল রাখতেও সহায়তা করতে পারে। এ জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ, মান নিয়ন্ত্রণ, সহজ ঋত এবং বাজার সংযোগ জরুরি। গবেষণা ও সম্প্রসারণকে আরও কার্যকর করতে হবে। উচ্চফলনশীল, রোগসহনশীল, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য এবং অফ-সিজন উপযোগী জাত উদ্ভাবন ও দ্রুত সম্প্রসারণ প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকদের সঠিক বীজ নির্বাচন, সময়মতো রোপণ, রোগ ব্যবস্থাপনা, ফসল তোলা, curing ও সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনাকে কৃষি সম্প্রসারণের মূল অংশ করতে হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, পেঁয়াজ বাজারের অস্থিরতার মূল কারণ উৎপাদনের ঘাটতি নয়; বরং উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি, মৌসুমি সরবরাহের চাপ, দুর্বল সংরক্ষণব্যবস্থা, আমদানি নীতির অনিশ্চয়তা, ভারতনির্ভরতা এবং বাজার তথ্যের ঘাটতি। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বাইরের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের বাজারকে ঝুঁকিতে ফেলে। আবার সাম্প্রতিক উৎপাদন বৃদ্ধিও প্রমাণ করেছে, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী না হলে বেশি উৎপাদন কৃষকের জন্য নিশ্চয়তা দেয় না। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত—বছরজুড়ে স্থিতিশীল সরবরাহ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, ভোক্তার সহনীয় দাম এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থা। [লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন]

হাওরের কান্না

হাওর হলো বাটি বা গামলা আকৃতির বিশাল, নিচু জলাভূমি। ধরে নেয়া যায় যে, সংস্কৃত শব্দ ‘সাগর’ থেকে স্থানীয় উচ্চারণে ‘হাওর’ শব্দের উৎপত্তি, কারণ বর্ষায় এটি সাগরে রূপ নেয়। সাধারণত ভূ-গাঠনিক কারণে সৃষ্ট এবং বর্ষাকালে পানিতে ডুবে সমুদ্রের মতো রূপ ধারণ করে। হাওর মূলত একটি মৌসুমি জলাভূমি, যেখানে বর্ষায় পানি জমে থাকে এবং শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে ফসলি জমি ও চারণভূমিতে পরিণত হয়। হাওরের মূল ˆবশিষ্ট্য হলো— ১. এটি পিরিচ আকৃতির ভূ-গাঠনিক অবনমন, ২. মূলত বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলায়) হাওরগুলোর অবস্থান, ৩. নদী ও খাল থেকে পানি এসে হাওর পূর্ণ হয়, ৪. হাওর অঞ্চল ধান চাষ, মাছ উৎপাদন এবং পরিযায়ী পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত, ৫. হাওর, বাঁওড়, বিল, ঝিল বা নদী থেকে ভিন্ন, কারণ এটি বর্ষায় নদী অববাহিকার অতিরিক্ত পানি ধারণ করে রাখে। বাংলাদেশে ছোট-বড়    ৪১৪টি থেকে ৪২৩টি হাওর রয়েছে। অর্থনীতির বিবেচনায় দেখা যায় যে, হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনপ্রণালী কৃষিনির্ভর। হাওরগুলোতে প্রধানত ৬ মাস পানি থাকে এবং ৬ মাস শুকনা ভূমিতে এক ফসলি বোরো ধান চাষ করা হয়। হাওরের জীবন অত্যন্ত ˆবচিত্র্যময় হলেও দারিদ্র্য, যাতায়াত সমস্যা ও বন্যায় ফসলহানির কারণে জীবনযাত্রার মান নিম্নতর। মূলত বোরো ধান চাষ ও মাছ ধরা এখানকার প্রধান জীবিকা। হাওর অঞ্চলের জীবনযাত্রার প্রধান দিকগুলো হলো— ১. বছরের অর্ধেক সময় এলাকা জলমগ্ন থাকে, তাই মাছ ধরা এবং বাকি সময়ে বোরো ধান চাষই প্রধান পেশা। আগাম বন্যা বা অকাল বন্যায় বোরো ধান তলিয়ে গেলে চরম খাদ্য সংকটে পড়েন হাওরবাসী। ২. দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী এবং দারিদ্র্যের হার বেশি। ৩. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ৪. বর্ষাকালে নৌকা এবং শুকনো মৌসুমে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে চলাচল করতে হয়। ৫. যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ৬. বসতঘরগুলো সাধারণত উঁচু ঢিবির ওপর তৈরি করা হয়। এখানকার বসতিগুলো ‘গুচ্ছগ্রাম’ বা ছোট ছোট দ্বীপের মতো দেখায়। ৭. অপরিকল্পিত পাকা রাস্তা ও বাঁধের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়, যা কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ৮. হাওর অঞ্চল মাছ ও নানা প্রজাতির জলজ প্রাণী (যেমন: কচ্ছপ, ভোঁদড়) এবং পাখির একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। কৃষি অর্থনীতিবিদদের তথ্যমতে, বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে (প্রধানত সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই ৭টি জেলা) দেশের মোট বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয়। হাওর অঞ্চলের বোরো ধান দেশের চালের চাহিদার একটি বড় অংশ যোগান দেয় এবং এই অঞ্চলের ধানের ওপর জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভরশীল। ২০২৬ সালের সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী মে ২০২৬-এর তথ্যমতে, হাওরের ৭টি জেলায় ৯.৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বন্যামুক্ত আছে ৪.৫৫ লাখ হেক্টর। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ২৮ হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এপ্রিলের শেষ নাগাদ পর্যন্ত হাওরের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমির ধান কাটা বাকি ছিল। প্রতি বছর এভাবে শস্যহানিতে হাওরের কৃষক সর্বস্বান্ত হন। দারিদ্র্যের নিচে এখানকার বহু মানুষ বসবাস করছে। হাওরাঞ্চলে প্রতি বছর অকাল বন্যা, পাহাড়ি ঢল এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়। হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বিভিন্ন বছরে ভিন্ন হলেও তা গড়ে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। হাওরের সম্পদের ক্ষতির প্রধান দিকগুলো হলো— ১. প্রধানত বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার কারণে প্রতি বছর ১০ লাখ টনের বেশি চাল নষ্ট হয়, যার আর্থিক মূল্য সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২. পানি দূষণ, অক্সিজেনের অভাব এবং অসময়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় হাজার হাজার মেট্রিক টন মাছ মারা যায়। ২০১৬-১৭ সালের মতো বড় বন্যায় শুধু মাছের ক্ষতির পরিমাণই ৪১ কোটি টাকার বেশি ছিল। ৩. ধান পচে যাওয়ায় এবং পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় প্রতি বছর ১১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি গোখাদ্য নষ্ট হয়। ৪. অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, অতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহার এবং বালু জমে হাওরের ইকোসিস্টেম বা প্রতিবেশ ব্যবস্থা নষ্ট হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক মাছের প্রজননস্থল ধ্বংস করছে। মূলত অকাল বন্যা বা পাহাড়ি ঢল হাওরের মানুষের স্বপ্ন ও জীবন-জীবিকা প্রতি বছরই বিপন্ন করে তোলে। হাওরাঞ্চলে প্রতি বছর বন্যা বা অকাল বন্যা হওয়ার পেছনে ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের সৃষ্ট বিভিন্ন কারণ দায়ী। এগুলোর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো— ১. হাওরগুলো ভারতের মেঘালয় ও আসামের সীমান্ত ঘেঁষা। ওইসব পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে পানি দ্রুত নেমে এসে হাওর এলাকা প্লাবিত করে। ২. ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হাওড়ে বন্যা হয়, কারণ হাওর মূল সমতল ভূমি থেকে বাটি আকৃতির নিচু এলাকা। তাই হাওর অঞ্চল বাটির মতো নিচু, চারপাশে নদী থেকে পানি গড়িয়ে এখানে জমা হয়। ৩. গত তিন দশকে হাওরে বহমান প্রায় ৮৬ শতাংশ নদী ভরাট হয়ে গেছে। নদ-নদী ও খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে পানির ধারণক্ষমতা কমে গেছে। ৪. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে (মার্চ-মে) অস্বাভাবিক ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যা অকাল বন্যা ডেকে আনে। ৫. হাওরের ভেতর দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা, বাঁধ ও কালভার্ট নির্মাণের ফলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়। ৬. সময়মতো বাঁধ মেরামত না করা বা দুর্বল বাঁধের কারণে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত জমিতে ঢুকে পড়ে। মূল বিষয়: হাওরের বন্যা মূলত পাহাড়ি ঢল এবং অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার একটি সম্মিলিত ফল। হাওর অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকার দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা (২০১২-২০৩২) বাস্তবায়ন করছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করে কৃষি, মৎস্য ও যোগাযোগের আধুনিকায়ন করা। হাওর নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা ও চলমান উদ্যোগগুলো হলো— ১. হাওড়ে বহমান ১৭টি নদী ভিন্ন খাতে (পানিসম্পদ, কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, যোগাযোগ ইত্যাদি) সংস্কারে ১৫৪টি প্রকল্প ১৬টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২. সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে হাওরের ফসল রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। ৩. কৃষকদের সহায়তা ও নতুন জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। ৪. বোরো ফসল রক্ষায় সরাসরি ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান কেনা, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তন এবং কম সময়ে ফলন দেওয়া (৯০-৯৫ দিনে) আমন ধানের নতুন জাত আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ৫. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ৬. হাওরের পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে এবং নদী-খাল খননের মাধ্যমে নাব্য রক্ষা করার উদ্যোগ চলমান রয়েছে। ৭. হাওর এলাকায় সাবমারসিবল (পানিতে ডুবে যায় এমন) রাস্তা ও উড়াল সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে, যা বর্ষায় নৌপথ এবং শুষ্ক মৌসুমে সড়কপথ হিসেবে কাজ করে। ৮. হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বজায় রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র তৈরি এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা শুধু ফাইলবন্দী থাকলে হবে না, এর বাস্তব রূপ দিতে হবে। কারণ অভাব এখন হাওরের মানুষের নিত্যসঙ্গী। হাওরের মানুষের এই অভাব দূর করতে হলে উপরোল্লিখিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি। [লেখক: উন্নয়নকর্মী]

ভিডিও আরও দেখুন

ফিফা বিশ্বকাপ: যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডায় হবে আলাদা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের তিন আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় আলাদা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে ফিফা। প্রতিটি দেশের প্রথম ম্যাচের আগে আলাদা করে এসব অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।জানা গেছে, আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে লড়বে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা। তার আগে সেখানকার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গ্র্যামি জয়ী মেক্সিকান পপ ব্যান্ড মানা সঙ্গীত পরিবেশন করবে। এছাড়া আয়োজনে অংশ নেবেন আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেজ, বেলিন্ডা, ড্যানি ওশিন, জে বালভিন, লিলা ডাউন্সের মতো তারকা ও লস অ্যাঞ্জেলস আজুলস ব্যান্ড। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা গতকাল (শুক্রবার) টুইট বার্তায় বিষয়টি জানিয়েছে।ফিফার বরাতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মেক্সিকো সিটির কনসার্টে মেক্সিকান সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হবে। এতে আদিবাসী এবং আধুনিক লোকজ শিল্পীদের পরিবেশনা থাকবে। এ ছাড়া কানাডার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির মোজাইক-প্রেরণায় নতুন রূপায়ণ তুলে ধরা হবে। একইসঙ্গে দেশটির বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও নানা সম্প্রদায়ের প্রতিফলন হবে সেখানে।কানাডায় বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ ১২ জুন, টরোন্টোতে স্বাগতিক দল এবং বসনিয়া-হার্জেগোভিনা মুখোমুখি হবে। এর আগে উদ্বোধনী আয়োজনে পারফর্ম করবেন কানাডীয় শিল্পী অ্যালানিস মরিসেত্তে, মাইকেল বুবলে, অ্যালেসিয়া কারা, উইলিয়াম ফ্রিন্স এবং লস অ্যাঞ্জেলসভিত্তিক বাংলাদেশি-আমেরিকান ডিজে সঞ্জয়। থাকবেন ইলিয়েনা, জেসি রেইজ এবং বলিউড তারকা নোরা ফাতেহিও।যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপের পর্দা উঠবে ১৩ জুন, লস অ্যাঞ্জেলসে লড়বে স্বাগতিক ফুটবল দল এবং লাতিন দেশ প্যারাগুয়ে। ম্যাচ শুরুর ৯০ মিনিট আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে থাকবেন মার্কিন গায়িকা ও গীতিকার ক্যাটি পেরি। অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে পারফর্ম করবেন আটলান্টার র‍্যাপ তারকা ফিউচার, যার আসল নাম নেভাডিয়াস উইলবার্ন। এ ছাড়া থাকছে আনিতা, লিসা, রেমা ও টাইলার পরিবেশনা।ফিফা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই কনসার্ট এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে ‘টুর্নামেন্টের ব্যাপকতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সাংস্কৃতিক শক্তির প্রতিফলন ঘটবে এবং দর্শকদের জন্য উচ্চমাত্রার বিনোদন নিশ্চিত করা যায়।’ এবারের বিশ্বকাপ দ্বিতীয়বারের মতো একাধিক দেশের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আগে ২০০২ বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করেছিল দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। ওই আসরের সময় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। এবারই প্রথম বিশ্বকাপ তিনটি দেশ এবং ৪৮ দেশের অংশগ্রহণে হতে যাচ্ছে।

ফিফা বিশ্বকাপ: যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডায় হবে আলাদা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৫৭ জন