সংবাদ
কারা বন্যপ্রাণী ও পাখি পাচারের পেছনে

কারা বন্যপ্রাণী ও পাখি পাচারের পেছনে

দেশজুড়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বন্যপ্রাণী ব্যবসায়ী আছেগাজীপুরে ফাঁদ পেতে পাখি আটক, বিক্রয়কারি চক্রের সন্ধান১৫টি ময়না ও ১টি টিয়া পাখি উদ্ধার, ২জন গ্রেপ্তারখাঁচাবন্দি বন্যতা: গাজীপুরের অরণ্য থেকে ইন্টারপোলের লাল নোটিশডানা ভাঙা কান্নায় কাটছে বন্দি পাখিদের দিনসীমান্ত পেরিয়ে গুজরাটের খাঁচায় বন্দি বিপন্ন লেমুর ছানাসবুজ পাতার আড়াল থেকে হঠাৎ এক ঝাঁক ডানা মেলার আনন্দ স্তব্ধ হয়ে যায় কিছু নির্মম লোভের জাঁতাকলে। যে পাখির কণ্ঠে ভোরের আলো ফোটে, যারা বনের বুক চিরে গেয়ে ওঠে মুক্তির গান, তারা আজ কতিপয় মানুষের টাকার নেশায় বন্দি হচ্ছে লোহার খাঁচায়। কখনো গাজীপুরের গহীন বন থেকে মায়াবী ময়না-টিয়া শিকার করে তোলা হচ্ছে অনলাইনের হাটে, আবার কখনো বা বনের সবচেয়ে দুর্লভ, সবচেয়ে মায়াবী প্রাণীটিকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে ভিনদেশের কোনো ধনকুবেরের ব্যক্তিগত প্রমোদশালায়।বন্যপ্রাণী ও পাখি পাচারের এই আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের অমানবিক ও রোমহর্ষক গল্প এখন গাজীপুরের অরণ্য ছাড়িয়ে দেশের সীমান্ত পার হয়ে পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের টেবিলে। খাঁচায় একা পড়ে থাকা এক লেমুরের দীর্ঘশ্বাস আর উদ্ধার হওয়া ১৫টি ময়না পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ যেন এখন এক ও অভিন্ন সুরে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্মমতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।অপারেশন টঙ্গীসম্প্রতি গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী পূর্ব থানার আরিচপুর রোড এলাকায় এক ছমছমে অভিযানের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয় বন্যপ্রাণী শিকার ও বিক্রির এক অন্ধকার দুনিয়া। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কাছে খবর ছিল, আধুনিক প্রযুক্তির আড়ালে ফেসবুক ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বনের মুক্ত পাখিদের চড়া দামে বিক্রি করছে একটি চক্র। গাজীপুরের বিভিন্ন জঙ্গল থেকে ফাঁদ পেতে ধরা ময়না ও টিয়া পাখিদের এক নির্জন বাড়িতে এনে জড়ো করা হয়েছে বিক্রির উদ্দেশ্যে।অভিযান চালানোর আগে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন্যপ্রাণী অধিদপ্তর যোগাযোগ করে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ। সেখান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হলে পুলিশের একটি চৌকস দল বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে আরিচপুর রোডের সেই গোপন আস্তানায় হানা দেয়। আচমকা এই অভিযানে বন্যপ্রাণী আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধভাবে খাঁচাবন্দি করে রাখা ১৫টি চমৎকার কথা বলা ময়না পাখি এবং ১টি সবুজ টিয়া পাখি উদ্ধার করা হয়।পাখিগুলোকে আলো-বাতাসহীন খাঁচায় আটকে রাখার অপরাধে এবং এই চক্রের সাথে সরাসরি জড়িত থাকার দায়ে ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয় মো. ইব্রাহিম ও মাহিদুল ইসলাম নামের দুই পাখিবাজকে। পুরো বিষয়টি নিশ্চিত করে পুলিশ পরিদর্শক আনোয়ার সাত্তার বলেন, "বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই চক্রের পেছনে আরও কারা জড়িত আছে, তাদের খুঁজে বের করতে পুলিশের তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।"মিনি চিড়িয়াখানার আড়ালে কোটি টাকার আন্তর্জাতিক চোরাকারবারএই চক্রের শিকড় কতটা গভীরে, তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে সিআইডির একজন দায়িত্বশীল ইন্সপেক্টর বিস্ফোরক সব তথ্য দেন। তার মতে, রাজধানী ও এর আশেপাশে গড়ে ওঠা অনেক পাখি ব্যবসা এবং নামসর্বস্ব ‘মিনি চিড়িয়াখানা’র আড়ালে মূলত চলছে আন্তর্জাতিক চোরাকারবার।তিনি জানান, "অনেকে পাখি ব্যবসা ও মিনি চিড়িয়াখানার আড়ালে বিরল প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণী বেশি দামে বিক্রি করছে। এই চক্র ময়না, টিয়া, হরিণ, ময়ূরসহ অন্যান্য পাখি ও বন্যপ্রাণী গোপনে বিক্রি করছে।"জানা যায়, টঙ্গী বাজারের কাছে একটি বড় পাখির হাট রয়েছে, যেখানে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট মাঝে মধ্যেই বড় ধরনের অভিযান চালায়। তবে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এরা বিচ্ছিন্নভাবে বনের গহীন থেকে বিরল প্রজাতির প্রাণী ও পাখি ধরে এনে বিত্তবান ও বিদেশিদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে। শুধু দেশেই নয়, সীমান্ত পেরিয়ে এই সব বোবা প্রাণী ও পাখি পাচারের বহু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।মা ও শিশুর বুকফাটা আর্তনাদবন্যপ্রাণী পাচারের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছিল গত বছরের ২৩ মার্চ গভীর রাতে, গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে। রাতের অন্ধকারে পার্কের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী কেটে চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয় অত্যন্ত দুর্লভ প্রজাতির তিনটি রিংটেইল লেমুরকে। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে এই প্রজাতির লেমুর মাত্র ১২০ থেকে ১৩০টি জীবিত আছে।আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় এটি ‘অত্যন্ত বিপন্ন’ প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত। সাউথ আফ্রিকার মাদাগাস্কারের এই মায়াবী প্রাণীদের বাংলাদেশ এনে পরম যত্নে রাখা হয়েছিল। কিন্তু চোরাকারবারিদের লোভের হাত থেকে রেহাই পায়নি তারা।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় পরবর্তীতে একটি পুরুষ লেমুরকে দেশের ভেতর থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, মা লেমুর ও তার দুধের শিশুকে রক্ষা করা যায়নি। তাদেরকে সীমান্ত পার করে পাচার করে দেওয়া হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে। এই নিষ্ঠুর বিরহ আর আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের অবিশ্বাস্য নেপথ্য কাহিনী উদঘাটন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।ঘরের শত্রু বিভীষণ ও ৪১ লাখ টাকার চালবাজিসিআইডির অনুসন্ধানে জানা যায়, সাফারি পার্কের এই চুরির নেপথ্যে ছিল ভেতরেরই এক ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’। আউটসোর্সিংয়ে কাজ করা নিপেল মাহমুদ নামের এক কর্মচারীই ছিল এই সর্বনাশা পরিকল্পনার মূল হোতা। নিপেল পার্কের ভেতরে থাকা দুর্লভ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের ছবি ও ভিডিও ধারণ করত। এরপর ফেসবুকের বিভিন্ন গোপন গ্রুপ ও পেজে সেসব পোস্ট করে দেশি-বিদেশি চোরাকারবারিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। লেমুরগুলোর ছবি সে প্রথমে দেখায় প্রতিবেশী পাখি ব্যবসায়ী জুয়েল মিয়াকে। জুয়েল আবার যোগাযোগ করে আরেক ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন হৃদয়ের সাথে। হৃদয় এই চুরির জাল ছড়াতে যুক্ত করে দেলোয়ার হোসেন তাওসীফ ও পাখি আমদানিকারক মোঃ সাব্বির হোসেন তপনকে।২৩ মার্চ দিবাগত রাতে নিপেল ও তার সহযোগীরা খাঁচা কেটে তিনটি লেমুরকেই চুরি করে জুয়েলের বাড়িতে নিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি লেমুর তারা জনৈক এক দেশীয় ব্যবসায়ীর কাছে ৫ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে হৃদয় পায় ১০ হাজার টাকা। বাকি দুটি অর্থাৎ মা লেমুর ও তার সন্তানকে বিক্রি করার জন্য দেলোয়ার ও সাব্বির যোগাযোগ করে ভারতীয় চোরাকারবারিদের সাথে।প্রতিটি লেমুরের দাম নির্ধারণ করা হয় সাড়ে ১৩ লাখ টাকা। ময়মনসিংহের ভালুকা এলাকায় ভারতীয় ক্রেতাদের গাড়িতে যখন কার্টনবন্দি করে অবুঝ প্রাণী দুটিকে তুলে দেওয়া হচ্ছিল, তখন নিপেলকে ৭০ হাজার টাকা কমিশন গুনে দেয় জুয়েলের আপন চাচা মজনু মিয়া। মজনু চোরাই লেমুর দুটি প্যাকেট ও হস্তান্তরের মূল কাজ তদারকি করেছিল। কিন্তু ট্রানজিট ও সীমান্ত পার হওয়ার পর ভারতীয় কালোবাজারে এই দুটি লেমুরের দাম গিয়ে দাঁড়ায় আকাশচুম্বী ৪১ লাখ টাকায়! অথচ পার্কের এজাহারে তিনটি লেমুরের আনুমানিক সরকারি মূল্য দেখানো হয়েছিল মাত্র ৩ লাখ টাকা।গুজরাটের খাঁচায় বন্দি বাংলার লেমুর: ইন্টারপোলের কড়া নাড়ছে সিআইডিনিজেদের চেনা পরিবেশ, চেনা জলহাওয়া আর একমাত্র পুরুষ সঙ্গীকে হারিয়ে খাঁচায় বন্দি মা ও শিশু প্রাণী দুটির করুণ আর্তি হয়তো কেউ শুনছে না, কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশ তাদের ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। সিআইডির তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, পাচার হওয়া মা ও শিশু লেমুরটি বর্তমানে ভারতের গুজরাটের একটি ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানায় বন্দি রয়েছে বলে তীব্র সন্দেহ করা হচ্ছে।এই আন্তর্জাতিক অপরাধের তদন্ত ও লেমুর দুটিকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ইন্সপেক্টর সুনীল কুমার দাস মুঠোফোনে জানান, "পাচার হওয়া লেমুর উদ্ধারে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সাহায্য চাওয়া হয়েছে। আর যে লেমুরটি উদ্ধার করা হয়েছে তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে টেস্টের জন্য পাঠানো হয়েছে। টেস্ট রিপোর্ট পাওয়া গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"তিনি আরও জানান, ইন্টারপোল থেকে পাচার হওয়া লেমুর দুটির সুনির্দিষ্ট শনাক্তকরণ তথ্য চাওয়ায়, বাংলাদেশে উদ্ধার হওয়া একমাত্র লেমুরটির ডিএনএ পরীক্ষা করা হচ্ছে। কারণ, ডিএনএ প্রোফাইল মিললেই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ হবে যে গুজরাটে থাকা লেমুর দুটি এই উদ্ধার হওয়া লেমুরটিরই হারিয়ে যাওয়া মা ও সন্তান। প্রয়োজনে তদন্তকারী দল ভারতে গিয়ে তল্লাশি চালাবে এবং ইন্টারপোল তাদের পূর্ণ সহায়তা দেবে বলে আশ্বস্ত করেছে।রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বিমানবন্দর, আত্মগোপনে ৫০০ ব্যবসায়ীবন্যপ্রাণী চুরির এই আন্তর্জাতিক চক্রটি ঢাকাকে মূল ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। ইন্সপেক্টর সুনীল কুমার দাস জানান, "আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্র শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এরপরও বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য সিআইডির পক্ষ থেকে বিমানবন্দরে শুল্ক কর্মকর্তার ( deputy commissioner) কাছে তথ্য জানার জন্য লিখিত চিঠি দেওয়া হয়েছে।"তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, এই বন্যপ্রাণী ও পাখি পাচারের পেছনে দেশ-বিদেশ জুড়ে একটি বিশাল সিন্ডিকেট জড়িত। সিআইডি যখন এই মামলার গভীরে প্রবেশ করে, তখন দেশজুড়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বন্যপ্রাণী ও পাখি ব্যবসায়ীর জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সিআইডির এই অভূতপূর্ব সাঁড়াশি অভিযানের মুখে তাদের অনেকেই এখন অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে ল্যাজ গুটিয়ে আত্মগোপনে চলে গেছে। এই চক্রটি এর আগেও একাধিকবার বিমানবন্দর ও স্থলবন্দর ব্যবহার করে দেশের বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিদেশে পাচার করেছে বলে প্রমাণ মিলছে।গাজীপুর সাফারি পার্কের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মাধ্যমে চুরির বিষয়টি প্রথম জানাজানি হওয়ার পর শ্রীপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সিআইডি প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি মনিটরিং ও নিখুঁত পরিকল্পনায় তদন্ত শুরু হয়। গত বছরের ৪ নভেম্বর ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের কলাইপাড়া এলাকা থেকে স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় মজনু মিয়াকে গ্রেফতারের মাধ্যমে প্রথম সাফল্যের মুখ দেখে সিআইডি। এ পর্যন্ত এই মামলায় মোট ৭ জন সন্দেহভাজন পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সিআইডির বিশেষ টিম চুরির কাজে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেলও জব্দ করেছে।গ্রেফতার ৭ জনের মধ্যে মজনু মিয়াসহ ৬ জনই আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বন্যপ্রাণী বিক্রি ও পাচারের দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তবে সিআইডি জানিয়েছে, এই চক্রের মূল হোতা বা ‘গডফাদার’ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। তাকে গ্রেফতার করতে পারলে এই আন্তর্জাতিক পাচার সিন্ডিকেটের নেপথ্যের আরও বহু রোমহর্ষক কাহিনী এবং অন্ধকার দিক উন্মোচিত হবে।একটি মানবিক অপেক্ষার গল্প আপাতত গাজীপুরের সাফারি পার্কের খাঁচায় একা পড়ে থাকা রিংটেইল লেমুরটি হয়তো তার চিরচেনা সঙ্গীদের পথ চেয়ে অবুঝ চোখে দিন গুনছে। বনের যে ময়নাগুলো উদ্ধার হলো, তারাও যেন খুঁজে ফিরছে তাদের হারানো আকাশ। অডিও রেকর্ড, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট আর ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট হাতে পেলে ইন্টারপোলের মাধ্যমে সীমান্ত জয় করে একদিন মা, সন্তান আর তার ছানা আবার স্বদেশে ফিরবে, আবার বনের পাখিরা বনেই গাইবে গান; এই মানবিক আশাতেই দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে সিআইডি ও বন্যপ্রাণী অধিদপ্তরের অনুসন্ধানী দল। মানুষের লোভের কাছে হেরে যাওয়া প্রকৃতি যেন আইনি লড়াইয়ের হাত ধরে আবার তার হারানো সন্তানদের ফিরে পায়, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।
১ মিনিট আগে

বিশ্বকাপ সময়সূচি: দেখতে ক্লিক করুন

মতামতমতামত

আদিবাসী ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন

বর্তমানে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি রাষ্ট্রীয় ও আইনি পরিসরে বহুল ব্যবহৃত হলেও অনেক সম্প্রদায় নিজেদের পরিচয় হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করে। সাধারণভাবে আদিবাসী বলতে সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ও জীবনধারা বহন করে আসছে এবং যাদের ঐতিহ্যগত পরিচয় আজও টিকে আছে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বসতি স্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল। তারা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে অনাবাদি জমিকে কৃষিযোগ্য করে তোলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমি দখল ও বঞ্চনার নানা ঘটনা তাদের জীবনকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে ১৮৫৫-৫৬ সালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’। ভূমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে সংঘটিত এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কঠোরভাবে দমন করে। সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবসহ বহু নেতা প্রাণ হারান। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ৪৯ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভূমি সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া আদিবাসী মালিকানাধীন জমি হস্তান্তর করা যেত না। অবৈধভাবে সম্পত্তি ক্রয় করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হওয়ার বিধানও ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষা করা। পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ সালে প্রণীত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনেও আদিবাসী ভূমি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এই আইনের ৯৭ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমি হস্তান্তরের বিষয়ে বিশেষ বিধান রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনী এলেও মূল লক্ষ্য ছিল তাদের ভূমি অধিকার সংরক্ষণ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ভূমি সংক্রান্ত এসব আইনি কাঠামোর অনেক অংশ কার্যকর রয়েছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির পরিমাণ ক্রমশ কমে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সামাজিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি দখল, জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত জমি হারিয়েছে। ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন পাস করা হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ। তবে এই আইন সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত; ভূমি অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রণীত আইনগুলোর সঙ্গে এর উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধি এক নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার পাশাপাশি ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব বহন করে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ বসবাস করে। তাদের জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ হলেও দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিকার সুরক্ষা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং একটি কার্যকর ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি রাজশাহীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আদিবাসী নেতারা ভূমি সুরক্ষা, বেদখল জমি পুনরুদ্ধার এবং ভূমি কমিশন গঠনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারি প্রতিনিধিরাও ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের দাবি, ভূমি, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান আইন কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি। বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ, ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ জনগোষ্ঠীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতিকেও আরও শক্তিশালী করবে। [লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

শূন্যতার স্থাপত্য

মানুষের সবচেয়ে বড় ভ্রম সম্ভবত এই যে, সে ক্ষয়কে ধ্বংস বলে মনে করে। যা হারিয়ে যায়, তাকে সে অনুপস্থিতির অন্ধকারে নির্বাসিত করে; যা ভেঙে পড়ে, তাকে সে সমাপ্তির সমার্থক ভাবতে শেখে। অথচ প্রকৃতির গভীরতম ভাষা আমাদের অন্য এক সত্যের দিকে আহ্বান জানায়। সেখানে পতন মানে অবসান নয়, বরং রূপান্তর; শূন্যতা মানে নিঃশেষ নয়, বরং নতুন সৃষ্টির জন্য প্রস্তুত এক নীরব অবকাশ।জীবনকে যদি একটি দীর্ঘ পথযাত্রা ধরা যায়, তবে সেই পথের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বাইরের কোনো প্রাচীর নয়; বরং অন্তরের ধূলিকতা। এই ধূলি জমে থাকে অভ্যাসের অন্ধত্বে, অহংকারের আবরণে, ভ্রান্ত বিশ্বাসের স্তরে, এবং সেইসব মোহে, যাদের আমরা সত্য বলে আঁকড়ে ধরি। ধূলির স্বভাবই হলো দৃষ্টিকে মলিন করা। সে পথকে পরিবর্তন করে না, কিন্তু পথ দেখার ক্ষমতাকে আচ্ছন্ন করে। ফলে মানুষ পথ হারায় না, হারায় পথ চিনবার সামর্থ্য। এই কারণেই জীবনের বহু প্রতিকূলতা, যেগুলোকে আমরা অভিশাপ মনে করি, প্রকৃতপক্ষে সেগুলো এক একটি পরিশোধনের আয়োজন। সময় কখনো কখনো এমন নির্মমতার মুখোশ পরে আসে, যা আমাদের প্রিয় সব নিশ্চয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সম্পর্কের দেয়াল ভেঙে যায়, আকাঙ্ক্ষার প্রাসাদ ভস্মীভূত হয়, অর্জনের অলঙ্কার মলিন হয়ে পড়ে। তখন আমরা মনে করি, জীবন আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কিন্তু অনেক পরে, দীর্ঘ আত্মসমীক্ষার পর, উপলব্ধি হয়—সময়ের উদ্দেশ্য ধ্বংস নয়; তার উদ্দেশ্য ছিল আবরণ অপসারণ। প্রকৃতির দিকে তাকালে এই সত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বীজকে অঙ্কুরিত হতে হলে তার কঠিন আবরণ ভেদ করতে হয়। মুক্তো জন্ম নেয় এক যন্ত্রণাদায়ক ক্ষতের ভেতর। নদী তার সুর খুঁজে পায় বাঁধ ভাঙার পর। এমনকি নক্ষত্রও আলো ছড়ানোর পূর্বে অগণিত অভ্যন্তরীণ দহন অতিক্রম করে। সৃষ্টির ইতিহাস আসলে রূপান্তরের ইতিহাস; আর রূপান্তরের পূর্বশর্ত হলো কোনো না কোনো স্তরে ভাঙন। কিন্তু মানুষ ভাঙনকে ভয় পায়। কারণ ভাঙন তার পরিচিত সীমানাকে বিপন্ন করে। মানুষ পরিচয়ের চেয়ে সত্যকে কম ভালোবাসে। সে নিজের নির্মিত কারাগারকে স্বাধীনতার চেয়েও বেশি সুরক্ষিত মনে করে। ফলে যখন জীবনের কোনো অদৃশ্য কারিগর সেই কারাগারের প্রাচীরে আঘাত হানে, তখন সে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। অথচ যে দেয়াল ভেঙে পড়ছে, সেটিই হয়তো আকাশ দেখার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় ছিল। দর্শনের এক গভীর শিক্ষা হলো—অস্তিত্ব কখনো স্থির নয়। সবকিছুই প্রবাহমান। নদী যেমন একই থাকে না, মানুষও তেমনি প্রতিক্ষণে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু মানুষের মন স্থায়িত্বের মায়া সৃষ্টি করে। সে পরিবর্তনকে অস্বীকার করতে চায়, সময়কে থামিয়ে রাখতে চায়, ক্ষণস্থায়ীকে চিরস্থায়ী বলে বিশ্বাস করতে চায়। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় অধিকাংশ বেদনা। কারণ জীবন প্রবাহ, আর মানুষ তাকে পাথরে পরিণত করতে চায়। তবু বিস্ময়কর বিষয় হলো, আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান উপলব্ধিগুলো জন্ম নেয় অনিশ্চয়তার ভেতর থেকে। যখন সমস্ত বাহ্যিক ভরসা একে একে সরে যায়, তখনই মানুষ নিজের অন্তর্লোকের সঙ্গে পরিচিত হয়। কূন্যতা তখন আর ভয়াবহ থাকে না; বরং এক গভীর আয়নায় পরিণত হয়। সেখানে মানুষ প্রথমবারের মতো নিজেকে দেখে—সমাজের দেওয়া পরিচয়ে নয়, অর্জনের অলংকারে নয়, বরং অস্তিত্বের নগ্ন সত্যে। জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই। সে কখনো সরাসরি শিক্ষা দেয় না। সে রূপকের আড়ালে কথা বলে, প্রতীকের অন্তরালে ইঙ্গিত করে। একটি ঝরা পাতা, একটি শুকিয়ে যাওয়া নদী, একটি ভাঙা ঘর কিংবা একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন—সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে কোনো না কোনো মহৎ শিক্ষা। যারা কেবল ঘটনাকে দেখে, তারা কষ্ট পায়; যারা ঘটনার অন্তর্নিহিত অর্থকে দেখতে শেখে, তারা প্রজ্ঞা অর্জন করে। অতএব, জীবনের প্রতিটি হারানোকে অভিশাপ ভাবার আগে আমাদের থেমে ভাবা উচিত—এ কি সত্যিই ক্ষতি, নাকি কোনো অদৃশ্য পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়া? যে দরজা বন্ধ হয়েছে, সেটি কি আমাদের বন্দিত্বের কারণ ছিল না? যে সম্পর্ক চলে গেছে, সেটি কি আমাদের আত্মবিকাশকে থামিয়ে রাখেনি? যে ব্যর্থতা আজ অপমানের মতো মনে হচ্ছে, সেটিই কি আগামী দিনের উপলব্ধির ভিত্তি হয়ে উঠবে না?সময়ের সবচেয়ে সূক্ষ্ম শিল্প সম্ভবত এই যে, সে ধ্বংসের ছদ্মবেশে উন্মোচন ঘটায়। সে আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু নিয়ে যায়, কিন্তু তার বিনিময়ে ফিরিয়ে দেয় দেখার নতুন দৃষ্টি। আর একদিন, দীর্ঘ পথচলার শেষে, মানুষ আবিষ্কার করে—তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলো আসলে জন্ম নিয়েছিল সেইসব মুহূর্তে, যেগুলোকে সে একদিন সর্বনাশ বলে ভেবেছিল। তখন সে বুঝতে শেখে, জীবন কখনো পথ কেড়ে নেয় না; জীবন কেবল পথের ওপর জমে থাকা ধূলি সরিয়ে দেয়। আর সেই ধূলি সরে গেলে দিগন্ত হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নির্মল, প্রসারিত, আলোকময়। [লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]সম্পাদিত / অনন্তআদিবাসী ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্নবাবুল রবিদাসবর্তমানে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি রাষ্ট্রীয় ও আইনি পরিসরে বহুল ব্যবহৃত হলেও অনেক সম্প্রদায় নিজেদের পরিচয় হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করে। সাধারণভাবে আদিবাসী বলতে সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ও জীবনধারা বহন করে আসছে এবং যাদের ঐতিহ্যগত পরিচয় আজও টিকে আছে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বসতি স্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল। তারা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে অনাবাদি জমিকে কৃষিযোগ্য করে তোলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমি দখল ও বঞ্চনার নানা ঘটনা তাদের জীবনকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে ১৮৫৫-৫৬ সালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’। ভূমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে সংঘটিত এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কঠোরভাবে দমন করে। সিধু, কানু, চাঁদ ও ˆভরবসহ বহু নেতা প্রাণ হারান। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ৪৯ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভূমি সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া আদিবাসী মালিকানাধীন জমি হস্তান্তর করা যেত না। অবৈধভাবে সম্পত্তি ক্রয় করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হওয়ার বিধানও ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষা করা। পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ সালে প্রণীত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনেও আদিবাসী ভূমি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এই আইনের ৯৭ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমি হস্তান্তরের বিষয়ে বিশেষ বিধান রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনী এলেও মূল লক্ষ্য ছিল তাদের ভূমি অধিকার সংরক্ষণ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ভূমি সংক্রান্ত এসব আইনি কাঠামোর অনেক অংশ কার্যকর রয়েছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির পরিমাণ ক্রমশ কমে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সামাজিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি দখল, জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত জমি হারিয়েছে। ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন পাস করা হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ। তবে এই আইন সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত; ভূমি অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রণীত আইনগুলোর সঙ্গে এর উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধি এক নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার পাশাপাশি ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব বহন করে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ বসবাস করে। তাদের জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ হলেও দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিকার সুরক্ষা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং একটি কার্যকর ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি রাজশাহীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আদিবাসী নেতারা ভূমি সুরক্ষা, বেদখল জমি পুনরুদ্ধার এবং ভূমি কমিশন গঠনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারি প্রতিনিধিরাও ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের দাবি, ভূমি, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান আইন কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি। বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ, ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ জনগোষ্ঠীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতিকেও আরও শক্তিশালী করবে। [লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

স্বাস্থ্য বাজেট: বরাদ্দ দ্বিগুণ, মাঠে কতটা?

একটা সংখ্যা দিয়েই শুরু করা যাক- ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। এটাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ, যা গত অর্থবছরের ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই বরাদ্দের ফলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশের গণ্ডি পেরিয়ে ১.১ শতাংশে পৌঁছেছে। সংখ্যাটি শুনতে চমকপ্রদ লাগলেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাস ঘাঁটলে একটা পুরনো প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে- বরাদ্দ আর ব্যয়ের মধ্যে কতটা ফারাক থাকে? গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত এই বাজেটে আরও একটি বড় উদ্যোগ যুক্ত হয়েছে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ, যা স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা। কাগজে-কলমে এ এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবায়নের ইতিহাস আমাদের সতর্ক হতে শেখায়। পুরনো রোগ: বরাদ্দ পড়ে থাকে, ব্যয় হয় না। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সংকট কখনোই কেবল অর্থের অভাব ছিল না, সংকট ছিল সেই অর্থ যথাসময়ে ও যথাযথভাবে ব্যয় করার সাংগঠনিক সক্ষমতায়। বিগত সাত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তার বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের গড়ে মাত্র ৭৬ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে। বাকি প্রায় এক-চতুর্থাংশ অর্থ অব্যবহৃত থেকে যায়, যে টাকায় হয়তো আরও কয়েকশ' কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া যেত, কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা যেত। এর পাশাপাশি মোট সরকারি ব্যয়ের অনুপাতে স্বাস্থ্য ব্যয় ৬.২ শতাংশ থেকে নেমে ৪.০৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল অর্থাৎ সামগ্রিক বাজেট বাড়লেও স্বাস্থ্যখাত ক্রমশ পেছনের সারিতে চলে যাচ্ছিল। এবারের বরাদ্দ বৃদ্ধি যেন সেই প্রবণতা উল্টে দেয়ার একটি সাহসী প্রচেষ্টা। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেই বলছেন, এই বাজেট তখনই বাস্তবমুখী প্রমাণিত হবে যখন কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধিই নয়, বরং প্রশাসনিক সংস্কার, জনগণের পকেট খরচ কমানো এবং অর্থ ব্যয়ের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জিত হবে। আজও দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে মানুষের নিজের পকেট থেকে, এই ভার দরিদ্র পরিবারগুলোকে বারবার অর্থনৈতিক সংকটে ঠেলে দেয়। এই বাস্তবতা বদলাতে দরকার উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ, পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ, ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং কার্যকর ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা। যে চিকিৎসা পদ্ধতি এখনও অবহেলিত। এই কাঠামোগত সংকটের মাঝে একটি বাস্তবতা আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি— বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ, বিশেষত গ্রামাঞ্চলের জনগোষ্ঠী, আজও ˆদনন্দিন স্বাস্থ্যসেবার জন্য আয়ুর্বেদ, ইউনানী ও হোমিওপ্যাথির ওপর নির্ভর করেন। যেখানে আধুনিক চিকিৎসকের নাগাল সীমিত, সেখানে এই ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থাই কোটি মানুষের প্রথম ও প্রধান ভরসা, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিজেই এই সত্যতা স্বীকার করেছে। তাদের ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন স্ট্র্যাটেজি ২০২৫-২০৩৪ সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে প্রমাণভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাকে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একীভূত করতে। গবেষণা শক্তিশালীকরণ, নিরাপদ চিকিৎসার নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গঠন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সংযুক্তির মধ্য দিয়ে। ভারতের অণটঝঐ মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্য মডেল— প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, গবেষণা অর্থায়ন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সংযুক্তির মাধ্যমে দেশটি তার স্বাস্থ্যসেবার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত করেছে। সমন্বয়ের পথে চারটি ধাপ:বাংলাদেশে এই সমন্বয় বাস্তবায়নে চারটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথমত, বিদ্যমান ইউনানী, আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথিক বোর্ডকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতায় শক্তিশালী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রশিক্ষিত ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসকদের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, দেশীয় ভেষজ সম্পদের ওপর প্রমাণভিত্তিক ক্লিনিক্যাল গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করতে হবে। চতুর্থত, মেডিকেল শিক্ষার পাঠ্যক্রমে ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিনের মৌলিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে আধুনিক চিকিৎসকরা সামগ্রিক চিকিৎসা পরিকল্পনায় দক্ষ হয়ে ওঠেন। ৬৯ হাজার কোটি টাকার এই বরাদ্দ একটি শুরু মাত্র, শেষ নয়। প্রকৃত পরীক্ষা হবে এই অর্থ মাঠ পর্যায়ে কতটা দক্ষতার সঙ্গে, কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং কতটা দ্রুততার সঙ্গে ব্যয় হয় তার ওপর। একই সঙ্গে প্রয়োজন স্বাস্থ্যসেবার একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ছেড়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতাকে আমলে নেয়া— যেখানে আধুনিক অ্যালোপ্যাথি ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে। এই দুই পথ একসঙ্গে নিলেই কেবল সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে — শুধু কাগজের বাজেট সংখ্যায় নয়, প্রতিটি বাংলাদেশির প্রকৃত সুস্বাস্থ্যে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]

আষাঢ়ের গল্প

বেশ ক’দিন ধরে গ্রামের বাড়িতে আছি। প্রকৃতি ভীষণ বেজার। দিনভর ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ছে। গাছপালা, পত্রপল্লব যেন স্নাত-স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। গাঢ় সবুজে শোভিত হচ্ছে গ্রামীণ জনপদ। সূর্যালোকের টানা অনুপস্থিতির কারণে ছোট ছোট পথে-ঘাটের ওপর খানিক জলাবদ্ধতা লেগেছে। এটা বর্ষা আর আষাঢ়ের চিরচেনা রূপ। আষাঢ় আসবে আবার নিভৃতে চলে যাবে, তা কী করে হয়? বাদলের ধারা বিহীন আষাঢ় শ্রাবণের কী মূল্য আছে ?রাজধানী শহরের কোলাহল ও যান্ত্রিকতাকে পেছনে রেখে হঠাৎ করে গ্রামে এসে আশ্রয় নিই। সেখানে স্বপ্রতিষ্ঠিত কলেজের পাঠদান বিষয়ে খোঁজ নিই, অফিসে বসে পুরনো বইয়ের পৃষ্ঠায় চোখ রাখি, না হয় লেখালেখিতে নিমগ্ন থাকি। এটা অনেকদিন যাবৎ করে চলেছি। নিভৃতচারী নিঃসঙ্গতা জয়ের জন্যে এর চেয়ে নিরাপদ আর কোনো মাধ্যম নেই। গ্রামে জন্ম, গ্রামে বেড়ে ওঠা এবং গ্রাম অন্তঃপ্রাণ মানুষ হিসেবে আর যাবই বা কোথায়? শহুরে নাগরিক জীবনের একগুঁয়েমির বিকল্প হল বিদেশ-বিভূঁই থেকে ঘুরে আসা। কিন্তু অনেকের জন্যে গ্রামই এর বিকল্প। তাছাড়া বিদেশে যাবার সুযোগ ও সামর্থ ক’জনের থাকে? বিদেশ ভ্রমণ মানে সহজ বিষয় নয়, চাইলেন আর যাত্রা করলেন। এমন সুবিধা বিশেষ কিছু মানুষের থাকলেও সকলের নয়। ভিসা, টিকিট, ফ্লাইট ইত্যাদি পেতে শত ঝামেলা পোহাতে হবে। আবার সবকিছু ঠিক করে বিমান বন্দর বা স্থল বন্দর যেখানেই গেলেন না কেন, শতভাগ গ্যারান্টি কোথায় আপনি সীমান্ত অতিক্রম করতে পারবেন? আপনি হয়তো কিছুই জানেন না, হঠাৎ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে আপনাকে বলা হল, ‘সরি স্যার, ইউ আর নট অ্যালাউড টু মুভ আউট। কারো কিছু করার নেই। সবাই নীরব দর্শক হয়ে থাকবে। উপরন্তু, মিডিয়া কোনো কর্মীর নজরে পড়লে তো বাইরের সকলকে জানানোর দায়িত্ব সে একাই নিয়ে নিবে। সুতরাং স্বদেশের ভেতরে থাকুন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বলয়ে থাকুন, পারলে যৎকিঞ্চিত সমাজকর্ম করুন, আপনজনের সান্নিধ্যে সময় কাটান। দেখবেন দেশের সবকিছু সহনীয়। ২.২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হয়েছে। শুরুর আগেই গ্রামে চলে আসি। ফুটবল বাঙালির আজন্ম শখের খেলা। গত এক শতাব্দীর হিসাবে সকল খেলাকে ছাপিয়ে ফুটবলই শীর্ষ স্থান দখল করে আছে। জনপ্রিয়তার বিচারে ইউরোপের পরে এশিয়ার স&হান হলেও বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ফ্যান, সমর্থকের দীর্ঘতম পতাকা, বৃহত্তম ফুটবল, বিচিত্র জার্সি, আনন্দ মিছিল, উল্লাসের মহোৎসব যতসব নজরকাড়া রেকর্ড বাঙালিরাই বেশি করছে। এখন গ্রামও এমন উন্মাদনার বাইরে নয়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানী, স্পেন, ইংল্যান্ড, ইতালির বাইরের দেশের নাম অনেকেই জানে না। কিন্তু বিশ্বের তারকা ফুটবলারদের নাম সকলের জানা। এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার যে, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সুযোগ হয়নি এমন অনেক গ্রামীণ তরুণ আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের আদ্যান্ত জানে। এমনকি এদের ক্লাবের নাম এবং ফুটবলের ইতিহাসও বলতে পারে। এর জন্যে এককভাবে ধন্যবাদ পাবে এদের হাতের শোভা এন্ড্রয়েড ফোন। এরা ফোনেও খেলার হালনাগাদ তথ্য কণিকা মুখস্থ করে চলেছে। গত দু'দিন ধরে সকলের মুখে মুখে লিওনেল মেসির নাম। বলা যায়, গোটা পৃথিবী এখন মেসিময়। ইতোমধ্যেই হ্যাট্রিক করা আর্জেন্টাইন এ তারকা বয়সের বিচারে ও বিশ্বকাপ ফুটবলের অভিজ্ঞতায় বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এক খেলোয়াড়ের নাম। ফুটবল ইতিহাসের অতীতে গড়া রেকর্ডসমূহকে অবলীলায় পদদলিত করার এক সুবর্ণ সুযোগও এখন তার নাগালের ভেতরে। সবকিছু যথারীতি চললে মেসি কোথায় গিয়ে থামবে তা কেবল তার সময়ই বলতে পারবে। লক্ষ্য করার বিষয় যে, গ্রামের ফুটবল প্রেমীরা আরও অনেক খ্যাতিমান ফুটবল তারকার নাম জানে। তারা রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে, নেইমার জুনিয়র এমনকি অখ্যাত এক দেশের ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার ভোজিয়ানের নামও জানে। ৩.মনে পড়ে, বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে দু’বার খেলা দেখার আনন্দ বেদনার কথা। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ সম্মানের ছাত্র ছিলাম। সাদাকালো টেলিভিশনের যুগ ছিল। ১৯৮৬ সালেও সেই ছাত্রত্ব বহাল ছিল। দুটো বিশ্বকাপের বেশ ক'টি ম্যাচ দেখেছিলাম মুহসীন হলের টিভি রুমের উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে। তখন উচ্ছ্বসিত উত্তেজনায় ফেটে পড়েছিল সবার তারুণ্য। সামনের চেয়ারে আসন পাওয়ার জন্যে চাবি রেখে স্থান দখলে নেয়ার কারণে প্রথমে কথা কাটাকাটি, হাতাহাতি এমনকি দুয়েকজন বন্ধু সহপাঠী শারিরীকভাবে লাঞ্চনারও শিকার হয়েছিল। যদ্দুর মনে পড়ে, ১৯৮২ সালেই বিশ্বকাপ ফুটবল সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম সাদাকালো টিভিতে। তবে সবচেয়ে জমজমাট বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচগুলো উপভোগ করেছিলাম ১৯৮৬ সালে। তখন গোটা পৃথিবী সন্মোহিত হয়ে পড়েছিল দিয়াগো ম্যারাডোনার যাদুতে। সেই থেকে আর্জেন্টিনা নামক দেশ এবং ম্যারাডোনা সমার্থক হয়ে ওঠে। তার দেয়া সেই বিতর্কিত গোল যাকে তিনি ‘ঈশ্বরের হাতে’ বলেছিলেন। মাঠের সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি আমরা লাইভ দেখেছিলাম। সে হিসেবে আমাদের প্রজন্মকে অধিকতর ভাগ্যবান বলা যেতে পারে। পরবর্তীতে তার সে গোলকে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। মনে হয়, আজকের বিশ্ব ফুটবল এবং আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা ম্যারাডোনারই সৃষ্টি। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার হাত ধরেই দেশটি বিশ্বকাপ জিতেছিল। তারপর তাদেরকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ৩৬ বছর। এখন মুখ্যত আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল শিবিরে বিভক্ত গোটা দুনিয়া। ৪.গ্রামে গ্রামে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে গল্প গুজবের ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। কে চেয়ারম্যান, কে মেম্বার পদে লড়বেন তা নিয়ে চায়ের দোকানে সকাল সন্ধ্যায় সংসদ বসছে, ভাঙছে, মুলতবী হচ্ছে। আলোচ্য বিষয়, দলীয় নেতা কর্মীদের প্রার্থীতা, দলীয় প্রতীক হবে কিনা, সকল দল নির্বাচন করতে পারবে কিনা ইত্যাদি। বিশেষ করে নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের সমর্থক বা কর্মী নির্বাচনে সুযোগ পাবে কিনা এটা বড় এক ইস্যু। এ প্রসঙ্গ সামনে আসছে মূলত বর্তমান সরকারের দু’একজন মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক নেতার মন্তব্যের সূত্র ধরে। একই সঙ্গে কয়েকজন তারকা টকশো ওয়ালার সাহসী বক্তব্যও এমন আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বিপক্ষে একটা জনমত রয়েছে। অধিকাংশ মানুষই চায় নির্বাচনে যেন সরকারি দল সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে। এর ফল পূর্বে যেমন ভালো হয়নি, ভবিষ্যতেও বিতর্কের জন্ম দিবে, সাধারণ মানুষকে হতাশ করবে। তারা চায় গ্রামের অবিতর্কিত দুর্নীতিমুক্ত ভালো মানুষ নির্বাচিত হয়ে আসুক। এর জন্যে দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে একটা উৎসবমুখর নির্বাচন হওয়ার আর কোনো বিকল্প নেই। আর যদি নিকট অতীতের সংস্কৃতির চর্চায় সবাই মনোযোগী হয়ে ওঠে তাতে জনগণের কিছু আসবে যাবে না। মঙ্গল অমঙ্গল, শুভ অশুভের দায় যাবে সরকারের ঘাড়ে। কাজেই স&হানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের মাধ্যম নয়, এটা সরকারের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা ও পরমত সহিষ্ণুতার প্রকাশ। আসন্ন স্থানীয় সরকারের সকল নির্বাচন সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ ও ভালো মানুষ চেনার নির্বাচন হোক। [লেখক: গল্পকার]

বাবা হওয়া সহজ, পিতা হওয়া কঠিন

একটি শিশু স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে পুরস্কার নিতে মঞ্চে উঠেছে। তার হাতে সনদ, মুখে আনন্দের ঝলক। মঞ্চ থেকে নেমে আসার আগে সে একবার দর্শকসারির দিকে তাকায়। সেখানে মা আছেন, শিক্ষক আছেন, আত্মীয়স্বজন আছেন। কিন্তু যে মানুষটিকে সে খুঁজছে, তিনি নেই। হয়তো দূর দেশে কাজ করছেন, হয়তো কর্মব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে গেছেন, হয়তো কাছেই আছেন কিন্তু সন্তানের জীবনে নেই। এই দৃশ্যটিতেই পিতৃত্বের বহু রূপ লুকিয়ে আছে।বাংলাদেশে প্রতিদিন হাজার হাজার শিশুর জন্ম হয়। প্রতিটি জন্মের সঙ্গে একটি নতুন পরিচয়ও তৈরি হয়। কেউ না কেউ বাবা হন। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়, সবাই কি পিতা হয়ে উঠতে পারেন?বছরের একটি দিন আসে, যেদিন আমরা বাবা দিবস পালন করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার গল্পে। নিঃসন্দেহে একজন ভালো বাবা একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। কিন্তু এই দিনটি শুধু উদযাপনের নয়; আত্মসমালোচনারও দিন। কারণ সমাজের সব শিশুর অভিজ্ঞতা এক নয়, সব বাবার গল্পও এক নয়।আমরা সাধারণত বাবাকে একটি একক পরিচয়ে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু বাস্তবে বাবা একটি বহুমাত্রিক চরিত্র। একজন বাবা আছেন, যিনি নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করেন। নিজে ভালো মন্দ না খেয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন। এমনকি তার মৃত্যুর পর সন্তানদের দুধে ভাতে খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করে রাখেন। আবার এমন বাবাও আছেন, যিনি সন্তানের জীবনে উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত। কেউ সন্তানের জন্য আশ্রয়, কেউ অভাব; কেউ সাহস, কেউ দীর্ঘশ্বাস।একজন শিশুর জীবনে বাবা সাধারণত প্রথম নায়ক। ছোট্ট শিশুটি বিশ্বাস করে, তার বাবা সব পারেন। এই বিশ্বাস গড়ে ওঠে বাবার উপস্থিতি, স্নেহ এবং দায়িত্ববোধের ওপর। বাবা যখন সন্তানের হাত ধরে রাস্তা পার করেন, স্কুলে নিয়ে যান, ভুল করলে ধৈর্য নিয়ে শেখান কিংবা ব্যর্থতার সময় পাশে দাঁড়ান, তখন তিনি শুধু একটি দায়িত্ব পালন করেন না; তিনি একটি মানুষ গড়ে তোলেন।বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে, বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ সন্তানের মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক আচরণের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। যে শিশু বাবার সঙ্গে কথা বলতে পারে, নিজের ভয় ও স্বপ্ন ভাগ করে নিতে পারে, সে জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে বেশি প্রস্তুত থাকে।কিন্তু বাস্তবতা সব সময় এত সুন্দর নয়। আমাদের সমাজে এমন বহু শিশু রয়েছে, যাদের বাবারা জীবিত থাকলেও তাদের জীবনে কার্যত অনুপস্থিত। কেউ কর্মব্যস্ততার অজুহাতে সন্তানের জন্য সময় বের করেন না। কেউ মনে করেন অর্থ উপার্জনই পিতৃত্বের একমাত্র দায়িত্ব। কেউ আবার ব্যক্তিগত স্বার্থ, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা উদাসীনতার কারণে সন্তানদের আবেগিক চাহিদাকে উপেক্ষা করেন।আবার অন্যদিকে এমন অসংখ্য বাবাও আছেন, যাদের ত্যাগের গল্প খুব কমই আলোচনায় আসে। গ্রামের কৃষক বাবা, যিনি খরার মাঠে দাঁড়িয়ে সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি জোগাড় করেন। রিকশাচালক বাবা, যিনি নিজের নতুন জামা না কিনে সন্তানের বই কেনেন। প্রবাসী বাবা, যিনি হাজার মাইল দূরে শ্রমিক ক্যাম্পে বসে মোবাইলের পর্দায় সন্তানের বড় হয়ে ওঠা দেখেন। তাদের অনেকেই সন্তানের প্রথম হাঁটা, প্রথম স্কুলে যাওয়া কিংবা প্রথম পুরস্কার জেতার মুহূর্তে পাশে থাকতে পারেন না। কিন্তু অনুপস্থিতির ভেতরেও তাদের ভালোবাসা উপস্থিত থাকে। এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। সন্তানের জন্ম দেওয়া কি একজন মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পিতা বানিয়ে দেয়? জৈবিক অর্থে হয়তো দেয়, কিন্তু সামাজিক ও নৈতিক অর্থে নয়। পিতৃত্ব একটি সম্পর্কের নাম, কিন্তু তার চেয়েও বেশি একটি দায়িত্বের নাম। একজন মানুষ সন্তান জন্ম দিতে পারেন, কিন্তু পিতা হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন সময়, যত্ন, আত্মত্যাগ, ধৈর্য এবং দায়বদ্ধতা। রক্তের সম্পর্ক মানুষকে বাবা পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু পিতৃত্বের মর্যাদা অর্জন করতে হয় কাজের মাধ্যমে।আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত, বাবা মানেই উপার্জনকারী। ফলে অনেকেই মনে করেন সংসারের খরচ বহন করলেই পিতৃত্বের দায়িত্ব শেষ। অথচ আধুনিক গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, সন্তানের শুধু খাবার, পোশাক ও শিক্ষার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন সময়, মনোযোগ এবং আবেগিক সংযোগ।একজন শিশু তার বাবার কাছ থেকে শুধু অর্থ চায় না, সে চায় গল্প, সঙ্গ, প্রশ্রয়, পরামর্শ এবং নিরাপত্তা। সে চায় এমন একজন মানুষ, যার কাছে ব্যর্থতার কথা বলা যায়, ভয় ভাগ করা যায়, স্বপ্নের কথা বলা যায়। আবার অনেক বাবা অর্থ থাকলেও সন্তানদের বিষয়ে বেশ উদাসীন।অনেক সময় দেখা যায়, একজন বাবা সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করেছেন, কিন্তু সন্তানের সঙ্গে হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। আবার সীমিত আয়ের একজন বাবা সন্তানের জীবনে এত গভীরভাবে জড়িত থেকেছেন যে তার উপস্থিতিই সন্তানের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ একজন বাবার প্রকৃত মূল্য তার আয় দিয়ে নয়, তার প্রভাব দিয়ে পরিমাপ করা উচিত।পিতৃত্বের আরেকটি দিক নিয়েও আমাদের কথা বলা দরকার। আমরা বাবাদের কাছ থেকে সব সময় শক্ত থাকার প্রত্যাশা করি। সমাজ তাদের শেখায় কাঁদবে না, দুর্বলতা দেখাবে না, ভেঙে পড়বে না। ফলে অনেক বাবা তাদের উদ্বেগ, ব্যর্থতা, হতাশা কিংবা মানসিক চাপ নিজের ভেতরেই লুকিয়ে রাখেন। পরিবারের সবার জন্য আশ্রয় হতে গিয়ে তারা নিজের জন্য কোনো আশ্রয় খুঁজে পান না। এই নীরব কষ্টের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। কারণ একজন বাবা কোনো যন্ত্র নন। তারও ক্লান্তি আছে, অপূর্ণতা আছে, স্বপ্ন আছে, ব্যর্থতা আছে। তিনি মানুষ। তবে এই মানবিক সত্য স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে দায়িত্বহীনতাকে প্রশ্রয় দিতে হবে।সমাজে এমন বাবাও আছেন, যাদের সিদ্ধান্ত বা উদাসীনতা সন্তানের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। কোনো সন্তান তার বাবাকে বেছে নেওয়ার সুযোগ পায় না। কিন্তু একজন বাবা প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নেন তিনি কেমন বাবা হবেন। তিনি কি সন্তানের জীবনে আশ্রয় হয়ে উঠবেন, নাকি অনুপস্থিতির আরেকটি নাম হয়ে থাকবেন সেই সিদ্ধান্ত তার নিজের।আজ পরিবার কাঠামো বদলাচ্ছে। অভিবাসন বাড়ছে, বিচ্ছেদ বাড়ছে, কর্মজীবনের চাপ বাড়ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যেও পিতৃত্বের গুরুত্ব কমে যায়নি; বরং আরও বেড়েছে। কারণ দ্রুত পরিবর্তনশীল এই সমাজে একটি শিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরাপদ সম্পর্ক। আর সেই সম্পর্ক গঠনে বাবার ভূমিকা অপরিসীম। আমরা যখন একজন মহান বাবার গল্প শুনি, তখন শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি মূল্যবোধকে সম্মান জানাই। আবার যখন কোনো দায়িত্বহীন বাবার কথা শুনি, তখন বুঝতে পারি পিতৃত্ব কেবল জৈবিক পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না।বাবা দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই বাবা হওয়া সহজ, কিন্তু পিতা হয়ে ওঠা কঠিন।একজন সত্যিকারের পিতা সন্তানের জীবনে শুধু জন্মের কারণ হন না; তিনি হয়ে ওঠেন সাহসের উৎস, নৈতিকতার ভিত্তি, নিরাপত্তার ছায়া এবং ভবিষ্যতের দিশারি। তার উপস্থিতি সন্তানকে শক্তি দেয়, আর তার অনুপস্থিতি অনেক সময় একটি দীর্ঘ শূন্যতা তৈরি করে।একজন বাবা তার সন্তানের জন্য কত টাকা রেখে গেলেন, ইতিহাস তা মনে রাখে না। কিন্তু তিনি সন্তানের মনে কতটা সাহস, সততা, মানবিকতা এবং নিরাপত্তা রেখে গেলেন, সেটিই প্রকৃত উত্তরাধিকার।তাই বাবা দিবসে প্রশ্নটি শুধু বাবাদের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য। আমরা কি আগামী প্রজন্মের জন্য দায়িত্বশীল পিতৃত্বের সংস্কৃতি তৈরি করছি, নাকি শুধু জন্মদাতার সংখ্যা বাড়াচ্ছি? কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় শুধু তার অর্থনীতি বা অবকাঠামো দিয়ে নয়; নির্ধারিত হয় তার পরিবারগুলো কেমন, তার শিশুরা কেমন পরিবেশে বড় হচ্ছে, আর তাদের বাবারা পিতৃত্বকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন তার ওপরও।বাবা দিবসে তাই শ্রদ্ধা সেই সব বাবাকে, যারা শুধু সন্তান জন্ম দেননি... মানুষ গড়েছেন।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক

বাজেট ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন

জাতীয় বাজেট কোনো দেশের শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দর্শন, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার প্রতিচ্ছবি| বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট-২০২৬ সে অর্থে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক| বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ ব্যয় নির্ধারণ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে| বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম এ খাতে জিডিপির ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে| একই সঙ্গে জাতীয় বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দও একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি| সরকার এবারের বাজেটে জাতীয় উন্নয়নের জন্য দশটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে| গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দশটি লক্ষ্যই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্যখাতের সঙ্গে সম্পর্কিত| কারণ একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই হতে পারে না| এবারের জাতীয় বাজেটের প্রথম লক্ষ্য হলো ˆবষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা| অর্থনৈতিক ˆবষম্য কমাতে হলে স্বাস্থ্যসেবার ˆবষম্য দূর করা অপরিহার্য| দরিদ্র, নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব নয়| এ লক্ষ্যে ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হৃদরোগের স্টেন্ট এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ওপর কর ও ভ্যাট ছাড় দেয়ার উদ্যোগ চিকিৎসা ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে| দ্বিতীয় লক্ষ্য গুণগত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা| শিক্ষা ও স্বাস্থ্য একে অপরের পরিপূরক| অসুস্থ, অপুষ্ট বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিক্ষার্থী কখনোই তার পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে না| তাই প্রতিটি ইউনিয়ন ও নগর ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন, ই-হেলথ কার্ড চালু এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার সম্প্রসারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক বিনিয়োগ| একই সঙ্গে আধুনিক এমবিবিএস কারিকুলাম চালুর উদ্যোগ দেশের চিকিৎসা শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সহায়ক হবে| তৃতীয় লক্ষ্য সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা| বাংলাদেশে প্রতিবছর বহু পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে| স্বাস্থ্যবিমা, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সহায়তা সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা আর্থিক দুর্ভোগ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে| একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অন্যতম ˆবশিষ্ট্য হলো অসুস্থতার কারণে কোনো নাগরিক যেন দারিদ্র্েযর কষাঘাতে না ভোগে| চতুর্থ লক্ষ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রবৃদ্ধি| স্বাস্থ্যখাত নিজেই একটি বৃহৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র| পাঁচ হাজার চিকিৎসক এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা শুধু স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে না, একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে| চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং ওষুধশিল্পে কাঁচামাল আমদানির সুবিধা স্থানীয় শিল্পের বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে এবং স্বাস্থ্যখাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করবে| পঞ্চম লক্ষ্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি| সুস্থ শ্রমশক্তি ছাড়া উৎপাদনশীল অর্থনীতি কল্পনা করা যায় না| শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, কর্মঘণ্টা অপচয় কমে এবং শিল্পখাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে| উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়| ষষ্ঠ লক্ষ্য আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা| স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত ব্যয় বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ| শক্তিশালী সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিমা চালু হলে মানুষের সঞ্চয় রক্ষা পাবে, ঋণগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে| সপ্তম লক্ষ্য জ্বালানি নিরাপত্তা| আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর| আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, ল্যাবরেটরি, অক্সিজেন প্ল্যান্ট, ডিজিটাল রেকর্ড এবং টেলিমেডিসিন—সবকিছুই বিদ্যুৎনির্ভর| তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা| অষ্টম লক্ষ্য ডিজিটাল রূপান্তর ও তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়ন| ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, টেলিমেডিসিন, ইলেকট্রনিক হেলথকার্ড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ নির্ণয় ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ| তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করে তুলতে পারে| নবম লক্ষ্য জীবন, প্রকৃতি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা| নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত| ডেঙ্গু, তাপপ্রবাহ, বন্যা এবং পানিবাহিত রোগের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত উন্নয়ন নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| দশম ও শেষ লক্ষ্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা| স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা ছাড়া জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে না| মেধাভিত্তিক নিয়োগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন সম্ভব| একটি জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে এবং রাষ্ট্রীয় সেবার কার্যকারিতা নিশ্চিত করে| স্বাস্থ্য জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু| মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং পরিবেশ সুরক্ষা—সবকিছুর ভিত্তি একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী| তাই স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত| জাতীয় বাজেট ২০২৬ সে উপলব্ধিরই প্রতিফলন| এখন প্রয়োজন ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, সুশাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা| কারণ বাজেটের প্রকৃত সাফল্য কাগজে নয়, মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়| একটি সুস্থ, সক্ষম ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের পথে এ বাজেট আশার নতুন আলো জ্বালাবে এটাই প্রত্যাশা| (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

কোম্পানির চেক ডিজঅনার হলে মামলা কার বিরুদ্ধে করবেন?

ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের চেক এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা কোম্পানির চেকের আইনি মারপ্যাঁচ সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোম্পানির দেয়া চেক ডিজঅনার হলে মামলা কার বিরুদ্ধে হবে— কোম্পানি নাকি তার পরিচালকদের বিরুদ্ধে? সব পরিচালককে আসামি করলেই কি মামলার জয় নিশ্চিত, নাকি বাদী নিজেই আইনি মারপ্যাঁচে ফেঁসে যেতে পারেন? আবার চেকে স্বাক্ষর না করেও কোনো নিষ্ক্রিয় পরিচালক কীভাবে বছরের পর বছর আদালতের চক্কর কাটছেন এবং এর থেকে মুক্তির উপায়ই বা কী? দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ধারা ১৩৮ ও ১৪০ এবং উচ্চ আদালতের সর্বশেষ বিভিন্ন নজির বিশ্লেষণ করলে এই জটিল বিষয়ের কিছু সূক্ষ্ম টেকনিক্যাল দিক পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কোম্পানিকে পক্ষ করার বাধ্যবাধকতা ও আইনি বিতর্ক:আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে একটি লিমিটেড কোম্পানি নিজেই একটি পৃথক আইনগত স্বত্ব (Separate Legal Entity)। এনআই অ্যাক্টের ১৪০ ধারা অনুযায়ী, অপরাধটি যদি কোনো কোম্পানি দ্বারা সংঘটিত হয়, তবে কোম্পানি নিজে এবং অপরাধের সময় কোম্পানির ব্যবসার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি—উভয়ই অপরাধী বলে গণ্য হবেন। এই ধারার ব্যাখ্যায় উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে কিছু ভিন্নধর্মী পর্যবেক্ষণ রয়েছে, যা মামলা করার আগে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত:কোম্পানিকে ১ নম্বর আসামি করার বাধ্যবাধকতা: অনেক নজিরে দেখা গেছে, কোম্পানিকে আসামি না করে কেবল পরিচালকদের বিরুদ্ধে মামলা করায় পরবর্তীতে উচ্চ আদালত তা বাতিল (Quashment) করে দিয়েছেন। যেমন— মুসলিম উদ্দীন বনাম রাষ্ট্র [৭২ BLD (২০২০) ৪৫২] মামলায় দেখা যায়, যিনি চেকে স্বাক্ষর করেছেন তিনি হয়তো কোম্পানির প্রতিনিধি মাত্র। কোম্পানিকে যথাযথভাবে যুক্ত না করায় প্রাতিষ্ঠানিক দায় ব্যক্তির ঘাড়ে চাপানোর ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা ˆতরি হয়। কোম্পানিকে পক্ষ না করার ভিন্নমত: আবার, আলহাজ্ব মো. হারুন-অর রশিদ এবং অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র [৩৬ BLD (২০১৬) ২০০] মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ উল্লেখ করেন যে, চেক ডিজঅনারের মামলায় কোম্পানিকে পক্ষ করা না হলে তা মামলার মারাত্মক ত্রুটি নয়। কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যাবলী পরিচালনায় জড়িত চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলতে আইনত বাধা নেই। ভুল সংশোধনের সুযোগ: অন্যদিকে, শরিফুল হক বনাম রাষ্ট্র [৭০ DLR (২০১৮) ২০৯] মামলায় আদালত মন্তব্য করেছেন যে, মামলায় অনুরূপ ত্রুটি না রেখে নালিশী দরখাস্ত সংশোধনের মাধ্যমে কোম্পানিকে পক্ষ করে নেয়াই উত্তম এবং ফৌজদারী কার্যবিধির ২২৭ ধারা অনুযায়ী চার্জ পরিবর্তনের সুযোগও রয়েছে। শুধু কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা: মোহাম্মদ ইউসুফ বাবু বনাম জন প্রোভিশন চৌধুরী [৩ LM (AD) ৫৬২] মামলায় আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো পরিচালক বা কর্মকর্তাকে পক্ষ না করে শুধুমাত্র কোম্পানির বিরুদ্ধেও ১৩৮ ধারায় মামলা চালানো সম্ভব। এতে কোম্পানির সম্পদ থেকে পাওনা আদায় সহজ হয়। ঢালাওভাবে সব পরিচালককে আসামি করার পরিণতি:মামলা মজবুত করার উদ্দেশে অনেক সময় নালিশি পিটিশনে কোম্পানির সব পরিচালকের নাম বসিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা হলো—আরজিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে, চেক ইস্যু এবং অপরাধ সংঘটনের সময় ওই পরিচালকরা কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে সরাসরি নিয়োজিত ছিলেন এবং তাদের জ্ঞাতসারেই এটি ঘটেছে। মো. শহিদুল আলম বনাম রাষ্ট্র [২৩ ALR (Vol-৩) (HCD) ২০২১, ৬২] মামলায় বলা হয়েছে, ঢালাওভাবে সবাইকে আসামি করলে আদালত অনেক সময় তাদের অব্যাহতি দেন। আইনি নোটিশ জারির নিয়ম:কোম্পানির পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক চেকে স্বাক্ষর করলে এবং চেক ডিজঅনার হলে, মামলা দায়েরের আগে কেবল ওই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ওপর নোটিশ জারি করলেই চলবে, কোম্পানির ওপর আলাদাভাবে নোটিশ জারির প্রয়োজন নেই—এমনটিই সিদ্ধান্ত এসেছে ইউসুফ বাবু বনাম রাষ্ট্র [৬৮ DLR (AD) ২০১৬, ২৯৮] মামলায়। তবে কোম্পানিকে ১ নম্বর আসামি করে মামলা করলে অন্য পরিচালকদের জন্য পৃথক পৃথক নোটিশ জারির বাধ্যবাধকতা নেই। নিষ্ক্রিয় পরিচালকদের মুক্তির উপায়:যারা কোম্পানির সাধারণ বা নিষি&ক্রয় পরিচালক এবং দৈনন্দিন লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত নন, তারা যদি ত্রুটিপূর্ণ মামলার কারণে বিড়ম্বনায় পড়েন, তবে কোম্পানি আইনের এই মৌলিক ত্রুটিগুলো (যেমন— ব্যবসায়িক পরিচালনায় তার সুনির্দিষ্ট ভূমিকার অনুপস্থিতি) আদালতের সামনে তুলে ধরে ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৬১এ ধারা অনুযায়ী উচ্চ আদালতে ‘কোয়াশমেন্ট’ বা মামলা বাতিলের আবেদন করতে পারেন। কাজেই, কোম্পানির চেকে লেনদেনের ক্ষেত্রে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর আগেই নিশ্চিত হোন চেকটি ব্যক্তিগত নাকি প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট থেকে দেয়া। সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে যেমন পাওনা টাকা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে, ঠিক তেমনি নির্দোষ ব্যক্তিও আইনি হয়রানির শিকার হতে পারেন। [লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

বাবা: জীবনের প্রথম নায়ক ও এক বটবৃক্ষ

মানবজীবনের ক্যানভাসে সম্পর্কের রঙগুলো নানাভাবে বিন্যস্ত। কোনো সম্পর্ক স্নেহের, কোনোটি সখ্যের, কোনোটি আবার মায়ায় জড়ানো। তবে এই সমস্ত অনুভূতির ঊর্ধ্বে যে মানুষটি এক বিশাল আকাশ হয়ে আমাদের অস্তিত্বকে আগলে রাখেন, তিনি হলেন বাবা। ‘বাবা’ শব্দটির গভীরতা পরিমাপ করা কোনো দাঁড়িপাল্লার পক্ষে সম্ভব নয়। এটি কেবল একটি সম্পর্ক বা ডাক নয়; বরং এটি এক পরম নিশ্চিন্ততার আশ্রয়, যেন এক অলিখিত সুরক্ষাকবচ। মা যদি হন সন্তানের জীবনের প্রথম সুর ও মমতা, তবে বাবা হলেন সেই সুরের পেছনের গুরুগম্ভীর তান, যা পুরো জীবনটাকে একটি সুশৃঙ্খল ছন্দে বেঁধে রাখে। একজন বাবার জীবন মূলত এক নিঃশব্দ ত্যাগের মহাকাব্য। সমাজের চাকা সচল রাখতে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি প্রতিদিন যে সংগ্রাম করেন, তার সিংহভাগই অলক্ষিত থেকে যায়। বাবার ভালোবাসা প্রকাশ পায় তার রুক্ষ হাতের তালুতে, কপালে জমে থাকা ঘামের বিন্দুতে এবং সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অক্লান্ত পথচলায়। ˆশশবের অবুঝ দিনগুলো থেকে শুরু করে যৌবনের জটিল মোড় পর্যন্ত বাবা হলেন জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শিক্ষক। বাবার আঙুল ধরে প্রথম হাঁটতে শেখা কেবল শারীরিক ভারসাম্য রক্ষা করা নয়, বরং জীবনের পথে পা বাড়ানোর প্রথম আত্মবিশ্বাস। যখন সন্তান পড়ে যেতে নেয়, তখন যে শক্ত হাতটি তাকে টেনে তোলে, সেটিই তাকে শেখায়—পড়ে যাওয়া মানেই শেষ নয়; বরং নতুন শক্তিতে আবার উঠে দাঁড়াতে হবে। মা যেখানে সন্তানকে পৃথিবীর সমস্ত নির্মমতা থেকে আড়াল করে রাখতে চান, বাবা সেখানে সন্তানকে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে শেখান। তিনি শেখান কীভাবে ঝড়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। তিনি মুখে হয়তো বড় বড় তত্ত্বকথা বলেন না, কিন্তু তার জীবনযাপনই হয়ে ওঠে সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় অনুকরণীয় আদর্শ। সংসারে অভাব-অনটন যতই থাকুক না কেন, সন্তানের ছোট ছোট আবদারগুলো পূরণ করতে বাবা নিজের ইচ্ছাগুলোকে নির্দ্বিধায় বিসর্জন দেন। নিজের জীর্ণ জুতোজোড়া তালি দিয়ে হলেও সন্তানের পায়ে নতুন জুতো পরিয়ে দেয়ার মাঝে তিনি যে স্বর্গীয় আনন্দ পান, তা কেবল একজন বাবার পক্ষেই সম্ভব। এই সুরক্ষার প্রাচীরটি যখন মাথার ওপর থাকে, তখন মানুষ যেকোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়ার সাহস পায়। বাবার ভালোবাসা সবসময় এক রহস্যময় চাদরে ঢাকা থাকে। তিনি হয়তো প্রতিদিন জড়িয়ে ধরে ‘ভালোবাসি’ বলেন না; বরং অবাধ্যতার জন্য মাঝেমধ্যে শাসন করেন। কিন্তু সেই শাসনের আড়ালে যে কত বড় উদ্বেগের নদী বয়ে চলে, তা কেবল একজন বাবাই জানেন। সন্তান যখন দেরিতে বাড়ি ফেরে, তখন বাইরে রাগী মুখে পায়চারি করা মানুষটির ভেতরে যে তীব্র উৎকণ্ঠা কাজ করে, সেটিই হলো বাবার ভালোবাসা। সন্তানের সামান্য সাফল্যে যে মানুষটির বুক গর্বে ভরে ওঠে, অথচ লোকসমক্ষে যিনি কেবল এক চিলতে মৃদু হাসি দিয়ে নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখেন, তিনিই বাবা। মায়ের অশ্রু জল হয়ে ঝরে পড়ে, কিন্তু বাবার অশ্রু বুকের ভেতরে জমাট বেঁধে পাথর হয়ে যায়, যা কেউ কোনোদিন দেখতে পায় না। এই নীরব ভালোবাসার ভাষা বুঝতে পারাটাই সন্তানের জীবনের অন্যতম বড় সার্থকতা। সময়ের নিষ্ঠুর নিয়মে যে বাবা একদিন ছিলেন পরিবারের একমাত্র চালিকাশক্তি, যার বলিষ্ঠ পদচারণায় মুখরিত থাকত চারপাশ, তিনিও একসময় বার্ধক্যে উপনীত হন। তার টানটান চামড়া কুঁচকে যায়, চোখের দৃষ্টি ধোঁয়াটে হয়ে আসে এবং একসময়ের শক্ত হাত দুটি কাঁপতে শুরু করে। এই সময়টা একজন বাবার জন্য বড় বিষণ্নতার। ˆশশবে তিনি যেভাবে সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন, বার্ধক্যে এসে তিনিও ঠিক তেমনই একটুখানি সময়, একটুখানি মনোযোগ ও স্নেহের কাঙাল হয়ে পড়েন। তখন সন্তানের দায়িত্ব হয়ে ওঠে সেই ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করার, যদিও বাবার ঋত কখনো পুরোপুরি শোধ করা সম্ভব নয়। তার জীর্ণ হাতটি ধরে তাকে আশ্বস্ত করা— ‘বাবা, আমি আছি’—এটাই হতে পারে তার জীবনের শেষ বয়সের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা। আজকের এই যান্ত্রিক ও ব্যস্ত জীবনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রতিটি সন্তানের উচিত বাবার নিঃশব্দ অবদানকে শ্রদ্ধা জানানো। যতদিন বাবা বেঁচে আছেন, তার চরণে যেন থাকে পরম শ্রদ্ধা; আর তিনি যদি ওপারে চলে গিয়ে থাকেন, তবে তার স্মৃতি যেন হয় আমাদের সৎ পথে চলার পাথেয়। স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ উপহারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাবা। তার ছায়াতলে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই জীবনের পরম প্রাপ্তি। বাবা কেবল একজন মানুষ নন; তিনি সন্তানের জীবনের প্রথম নায়ক, প্রথম শিক্ষক এবং এক বিশাল বটবৃক্ষ, যার ছায়া জীবনভর আমাদের আগলে রাখে। [লেখক: শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

নদীভাঙনে বিলীন জনপদ: বিষখালী থেকে তিস্তা

বাংলাদেশের ইতিহাসের শুরু নদী দিয়ে, সভ্যতার উন্মেষ নদীকে ঘিরে, আর বাঙালির জীবনযাত্রার প্রতিটি অধ্যায়ে জড়িয়ে আছে নদীর অমলিন ছোঁয়া। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, বিষখালী, কীর্তনখোলা কিংবা পায়রা এই নদীগুলো শুধু জলধারা নয়; তারা আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, সাহিত্য ও জনপদের প্রাণস্পন্দন। শত শত বছর ধরে এই নদীগুলোর বুকে ভেসে এসেছে জীবনের গান, আবার তাদের উন্মত্ত স্রোতে হারিয়ে গেছে অসংখ্য বসতি, অগণিত মানুষের স্বপ্ন আর প্রজন্মের স্মৃতি। নদী যখন হাসে, তখন বাংলার মাঠে সোনালি ধান দোলে; নদী যখন রুদ্ররূপ ধারণ করে, তখন নিঃস্ব হয়ে যায় হাজারো পরিবার। বিষখালী থেকে তিস্তা, পদ্মা থেকে ব্রহ্মপুত্র দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত একই দীর্ঘশ্বাস, একই আর্তনাদ। নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যায় শত বছরের বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির, পূর্বপুরুষের কবর আর মানুষের শেকড়। ভাঙনের যন্ত্রণা কেবল মাটি হারানোর নয়, এটি অস্তিত্ব হারানোর বেদনা; এটি স্মৃতি, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ হারানোর নাম। বিষখালীর বুকে হারিয়ে যাওয়া ভবানীপুর বাজার: ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার নাচনমহল ইউনিয়নের ভবানীপুর বাজার একসময় ছিল শত বছরের প্রাণকেন্দ্র। দুই শতাধিক দোকানের কোলাহল আর মানুষের জীবিকার স্পন্দনে মুখর সেই বাজার আজ বিষখালীর গর্ভে বিলীন। পুরোনো বাজার হারিয়ে এক কিলোমিটার দূরে নতুন বাজার গড়ে উঠেছে। কিন্তু নতুন বাজারের অধিকাংশ মানুষই নদীভাঙনের শিকার। তাদের জীবনের গল্প যেন একই বাড়ি নেই, জমি নেই, আছে শুধু বেঁচে থাকার সংগ্রাম। চাঁদপুরা গ্রামের হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্ব: ভবানীপুরের পাশের চাঁদপুরা গ্রাম আজ শুধু স্মৃতির নাম। যেখানে ছিল ধান খেত, নারকেল-সুপারির বাগান, সেখানে আজ নদীর জল। ভাঙনের শিকার মানুষগুলো বাঁধের ওপর টিনের ঘরে জীবন কাটাচ্ছেন। মানুষ ও গবাদিপশু একই ছাদের নিচে রাত কাটাচ্ছে। এই চিত্র শুধু চাঁদপুরের নয়; বাংলাদেশের হাজারো গ্রামের। ভাঙনের সঙ্গে হারিয়ে যায় স্মৃতি ও শেকড়: নদীভাঙন শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস করে না, ধ্বংস করে মানুষের আবেগ ও সামাজিক বন্ধন। বহু মানুষ পূর্বপুরুষের কবর রক্ষার চেষ্টা করেন, কিন্তু নদীর কাছে সবকিছুই অসহায়। প্রতিবেশীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আত্মীয়রা ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। হারিয়ে যায় সামাজিক পরিচয় ও শেকড়। পদ্মা থেকে তিস্তা: একই বেদনার গল্প: শরীয়তপুর, মাদারীপুর, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট কিংবা নীলফামারী সবখানেই নদীভাঙনের একই চিত্র। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ৮,৭০০ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয় এবং প্রায় দুই লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  বাস্তুচ্যুত মানুষের নতুন জীবন: যাদের সামর্থ্য আছে, তারা নতুন জায়গায় ঘর তোলেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ আশ্রয় নেন বাঁধের ওপর কিংবা অন্যের জমিতে। কৃষক হয়ে যান দিনমজুর, ব্যবসায়ী হয়ে যান রিকশাচালক, শিক্ষিত মানুষ হয়ে পড়েন বেকার। নদীভাঙন শুধু ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরেরও নাম। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশুরা: নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলোতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় নারী ও শিশুরা। বিদ্যালয় হারিয়ে শিশুরা শিক্ষার বাইরে চলে যায়। অনেক মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। আশ্রয়হীন নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে একটি প্রজন্ম ঝুঁকির মুখে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তন সংকটকে আরও গভীর করছেবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীর প্রবাহ ও চরিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অতিবৃষ্টি, অনিয়মিত বন্যা ও পলি জমার কারণে ভাঙনের মাত্রা বাড়ছে। ফলে নদীভাঙন এখন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি জলবায়ুজনিত মানবিক সংকট। পুনর্বাসনের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা: বাংলাদেশে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নদীভাঙনের শিকার অনেক পরিবারও এই কর্মসূচির মাধ্যমে উপকৃত হয়েছে। যদিও এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবু এটি একটি ইতিবাচক ভিত্তি ˆতরি করেছে। নদীশাসনে চলমান উদ্যোগ: বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভিন্ন অঞ্চলে নদীতীর সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ ও ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। রাজশাহীতে পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও নদীতীর রক্ষা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে। জনমুখী নেতৃত্বের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা :দেশের মানুষের প্রত্যাশা, বর্তমান জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে নদীভাঙনকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখা হবে। উন্নয়ন শুধু সেতু, সড়ক ও ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থেকে নদীভাঙা মানুষের পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনর্গঠনের দিকেও সমান গুরুত্ব পাবে এমন প্রত্যাশা আজ সাধারণ মানুষের। শিক্ষাবিদের দৃষ্টিতে নদীভাঙন: মানবিক ও বৈজ্ঞানিক সমাধানের আহ্বান: পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান মনে করেন, নদীভাঙন কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটের সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। তার ভাষায়, ‘নদীভাঙনের ফলে মানুষ শুধু জমি বা ঘরবাড়ি হারায় না, হারিয়ে ফেলে তার শেকড়, স্মৃতি, সামাজিক পরিচয় ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক নদীশাসন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য মানবিক পুনর্বাসন ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে নদীর গতিপ্রকৃতি, পলি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণ নিয়ে সমন্বিত গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্র, স্থানীয় প্রশাসন, গবেষক সমাজ ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই নদীভাঙনের ক্ষতি কমিয়ে একটি নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, নদী আমাদের সভ্যতার উৎস; তাই নদীকে শত্রু নয়, বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পদ হিসেবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি নদীভাঙনের শিকার মানুষদের পুনর্বাসনকে মানবিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা : ভারতের আসাম ও বিহার, নেপাল কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নদীভাঙন ও বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি রয়েছে। বাংলাদেশেও স্থানীয় সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সমš^য়ে স্থায়ী সমাধান গড়ে তোলা সম্ভব। প্রয়োজন জাতীয় নদীভাঙন নীতি: নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তথ্যভান্ডার ˆতরি, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় নীতি প্রণয়ন জরুরি। নদীভাঙাকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় অংশে নিয়ে আসতে হবে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন মানুষ বাঁচে : হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প তখনই অর্থবহ হবে, যখন ভিটেমাটি হারানো মানুষের মুখে হাসি ফিরবে। নদীভাঙা মানুষের জন্য জমি, ঘর, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হতে পারে মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয়। বাংলার নদীগুলো আমাদের জীবন দিয়েছে, সভ্যতা দিয়েছে, দিয়েছে শস্য-শ্যামল এই ভূখণ্ডের অফুরন্ত প্রাচুর্য। অথচ আজ সেই নদীর বুকেই ভেসে বেড়ায় অসংখ্য মানুষের দীর্ঘশ্বাস। বিষখালীর পাড়ে হারিয়ে যাওয়া ভবানীপুর বাজার, চাঁদপুরার বিলীন স্মৃতি কিংবা তিস্তার তীরে আশ্রয়হীন মানুষের অশ্রু এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের নীরব বেদনার প্রতিচ্ছবি। নদীভাঙনের শিকার মানুষ কোনো পরিসংখ্যান নয়, তারা এ দেশের কৃষক, জেলে, শিক্ষক, শ্রমিক, মা-বাবা ও সন্তান তারা আমাদেরই মানুষ। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল পৌঁছে যায় নদীর পাড়ে বসবাসকারী সর্বস্ব হারানো মানুষটির কাছেও। তাই সময়ের দাবি, নদীভাঙনকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে বিজ্ঞানভিত্তিক নদীশাসন, টেকসই পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনর্গঠনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মুখে আবারও হাসি ফিরিয়ে আনা। দেশের মানুষের প্রত্যাশা, জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে মানবিক ও জনমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার অঙ্গীকারের ধারাবাহিকতায় নদীভাঙা মানুষের জীবন-সংগ্রাম নতুন গুরুত্ব পাবে এবং বিষখালী থেকে তিস্তা পর্যন্ত প্রতিটি জনপদ ফিরে পাবে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন। কারণ নদীর কান্না থামানো মানেই মানুষের কান্না থামানো, আর সেই দায়িত্ব পালনেই নির্মিত হবে আরও সমৃদ্ধ, মানবিক ও স্বপ্নময় বাংলাদেশ। [লেখক: প্রশিক্ষক, গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বরিশাল]

ভিডিও আরও দেখুন

পাতাগোনিয়ায় ২৬ মিটার উঁচু মেসি!

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল জাদুকরকে নিয়ে বানানো হলো পৃথিবীর অন্যতম বড় ভাস্কর্য। প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলের কাট্রাল কো শহরে উন্মোচিত হলো লিওনেল মেসির ২৬ মিটার উঁচু বিশাল এক প্রতিকৃতি। যার ওজন ৭০ টন!যখন ফুটবল বিশ্বকাপের মাতম চলছে, আর আলজেরিয়া ম্যাচের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আর্জেন্টিনা, তখন এই ভাস্কর্যটি যেন ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গীয় উপহার।জাতীয় মহাসড়ক ২২ এবং ম্যানুয়েল সাভিও সড়কের সংযোগস্থলে বসে থাকা মেসির এই বিশাল মূর্তিটি বসে থাকা অবস্থায় তৈরি করা হয়েছে- যেন তিনি বিশ্বকাপ ট্রফির দিকে তাকিয়ে আছেন।এর ভেতরের অংশ তৈরি হয়েছে ইস্পাত দিয়ে, বাইরে তিন স্তরের কংক্রিটের আবরণ। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সি পরিহিত এই দৈত্যের বুকে জ্বলজ্বল করছে তিনটি সোনালি তারা- যেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের গৌরবগাথা। সামনে রাখা হয়েছে বিশ্বকাপ ট্রফির আদলে একটি অংশ, যা এই ভাস্কর্যকে আরও জীবন্ত করেছে।ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন অ্যালদো বেরোইসা নামে এক শিল্পী। কাট্রাল কো শহরের স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের সঙ্গে এক বছর ধরে কাজ করেছেন তিনি। উদ্বোধনের আগের রাত পর্যন্ত তারা শেষ মুহূর্তের খুঁটিনাটি কাজ করেছেন। মেসির স্বভাবসুলভ ভঙ্গি যেন ফুটে উঠেছে পুরোপুরি।মজার ব্যাপার হলো, শুরুতে মেসির প্রকৃত উচ্চতা অনুযায়ী ১.৭২ মিটার একটি ভাস্কর্য তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ভাস্করকে। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ২৬ মিটার উঁচু এই বিশাল মূর্তি বানানোর প্রস্তাব দেন। তার সেই কল্পনা আজ বাস্তবে রূপ পেয়েছে।এর আগে গত বছর কলকাতায় মেসির ২১ মিটার উঁচু একটি ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু প্রবল বাতাসে কাঠামোটির স্থিতিশীলতা নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর কর্তৃপক্ষ তা সরিয়ে ফেলে। সেই ভাস্কর্যের চেয়েও বড় এই ভাস্কর্যটি যেন মেসি ভক্তদের জন্য এক নতুন মাইলফলক।ফুটবলের জাদুকরের এই বিশাল মূর্তি দেখতে এখন পর্যটকদের ভিড় জমবে পাতাগোনিয়ায়। আর্জেন্টিনার জাতীয় গর্ব লিওনেল মেসি- যিনি বিশ্বকাপ জয় করেছেন, রেকর্ড গড়েছেন, এখন তিনি পাথর আর ইস্পাতে বন্দি হয়ে রয়েছেন প্যাটাগোনিয়ার বুকে। সত্যিই, ২৬ মিটার উঁচু এই মেসি যেন বলছে- আমি আসল মেসির চেয়েও বড়!

পাতাগোনিয়ায় ২৬ মিটার উঁচু মেসি!
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৯৪ জন