সংবাদ
রাকসুর জিএস: জাতীয় ইস্যুতে সরব, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ‘নিষ্ক্রিয়’

রাকসুর জিএস: জাতীয় ইস্যুতে সরব, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ‘নিষ্ক্রিয়’

জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় ও উচ্চকণ্ঠ থাকলেও ক্যাম্পাসে দেওয়া নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান স্থবিরতার অভিযোগ উঠেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)-এর নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দীন আম্মারের বিরুদ্ধে। নির্বাচিত হবার পর অর্ধেক পার হলেও ঘোষিত অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। তবে আম্মারের দাবি, ‘প্রশাসনিক অসহযোগিতার’ কারণে অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়ন ‘সম্ভব হচ্ছে না’।রাকসু নির্বাচনে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন আম্মার। তিনি পান ১১ হাজার ৪৯৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পান ৫ হাজার ৭২৭ ভোট। প্রায় দ্বিগুনেরও বেশী ভোটের ব্যবধানে জয়লাভের পাশাপাশি সিনেট সদস্য হিসেবেও ১২ হাজার ৮৩৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন তিনি। বিপুল জনসমর্থনের পরও সেই ‘আস্থার’ প্রতিফলন কার্যকর উদ্যোগে ‘পরিণত হয়নি’ বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জাতীয় ইস্যুতে ধারাবাহিকভাবে সরব থাকলেও ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে রাকসু জিএস আম্মারের কার্যকর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।নির্বাচনি ইশতেহারে ক্যাম্পাসে পরিবেশবান্ধব সাশ্রয়ী যানবাহন চালুর প্রতিশ্রুতি দেন আম্মার। যেকোনো গন্তব্যে মাত্র ৫ টাকায় যাতায়াতের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শোয়াইব বলেন, “বর্তমানে ক্যাম্পাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা, যা ইশতেহারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভোটের জন্য অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার সামিল।”পরিবহনের বিষয়ে আম্মার বলেন, “প্রথম অধিবেশনে ৪০টি ই-কার চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তা সম্ভব না হলে ২৫০টি রিকশা চালুর বিকল্প প্রস্তাবও রাখা হয়, যেখানে ভাড়া ৫ টাকার মধ্যে রাখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবে বিষয়টি এগোয়নি।” তিনি আরও জানান, ‘খুব শিগগিরই’ পরীক্ষামূলকভাবে ‘দুটি রিকশা চালুর’ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।এছাড়া পশ্চিমপাড়া, টুকিটাকি ও পরিবহন এলাকায় শিক্ষার্থীবান্ধব সুপারশপ স্থাপনের ঘোষণাও এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। পরিচয়পত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহের প্রতিশ্রুতি থাকলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। আম্মারের দাবি, সাতটি হলসংক্রান্ত প্রস্তাবনার সঙ্গে সুপারশপের বাজেট অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।আম্মার শিক্ষার্থীদের ‘আবেগের সঙ্গে প্রতারণা’ করেছে বলে অভিযোগ গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শরীফুল ইসলাম তানবীরের। তিনি বলেন, “যেসব অঙ্গীকারের ভিত্তিতে আমরা তাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছিলাম, দায়িত্বের অর্ধেক সময় পার হলেও তার বাস্তবায়ন শূন্যের কোঠায়। এতে তার অগ্রাধিকার ও দায়বদ্ধতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, আর শিক্ষার্থীদের আস্থাও দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে।”তানবীর আরও বলেন, “শুরুতে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ইস্যুতে তার সরবতা ছিল মূলত মিডিয়ার নজর কাড়ার জন্য। কিন্তু অর্ধেক সময় পার হলেও একটি প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন না হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক এবং শিক্ষার্থীদের আবেগের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।”ডিজিটাল ক্যাম্পাস গড়ার লক্ষ্যে ‘আরইউ অ্যাপ’ চালুর প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেবাগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আইসিটি সেন্টারের পরিচালক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে সালাহ উদ্দীন আম্মারের বিভিন্ন সময় অনলাইনে বাকবিতণ্ডার কারণে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। ফলে আইসিটি সেন্টারের সঙ্গে তার কোনো কার্যকর যোগাযোগ হয়নি এবং প্রকল্পটি স্থবির হয়ে আছে।আইসিটির সমস্যার বিষয়ে আম্মার বলেন, “আইসিটি দপ্তরের সহযোগিতা ছাড়া এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয় এবং প্রয়োজনীয় তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে না।”একইভাবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি)’ গঠন, ১০ মিনিটে সমস্যা সমাধান ও অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।রাকসুর প্রথম অধিবেশনে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছিল জানিয়ে আম্মার বলেন, “কিন্তু প্রশাসন এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়নি। আমার একার কিছু করার এখতিয়ার নেই যদি প্রশাসন সহযোগিতা না করে। আমি সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করতে পারি।”তবে পূর্ণ আবাসিকতা ইস্যুতে কিছু উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন তিনি। তার দাবি, শিগগিরই ৪৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য মাসে ৬ হাজার এবং আরও ২০ জন অনাবাসিক শিক্ষার্থীকে মাসে ১ হাজার টাকা করে ‘সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে’, যা এক ‘সিনিয়র ভাইয়ের সহযোগিতায়’ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।‘সামর্থ্যের বাইরে’ ইশতেহার দিয়ে শিক্ষার্থীদের ‘ব্যবহার করা হয়েছে’ বলে অভিযোগ রাবি সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহবায়ক ফুয়াদ রাতুলের। তিনি বলেন, “রাকসুর সাংস্কৃতিক কিছু আয়োজন ছাড়া বড় কোনো কাজ করার এখতিয়ার থাকে না। তারা মূলত প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু নির্বাচনের সময় সামর্থ্যের বাইরে ইশতেহার দিয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার পর আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার আদায়ে তারা এখনো জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেনি।”রাকসুর জিএস সালাহউদ্দীন আম্মাররাবি ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, “নির্বাচনের সময় মুখরোচক ইশতেহার দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা নিজেদের এখতিয়ারের বাইরে বলা হচ্ছে। যদি গঠনতন্ত্র জেনেই এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কেন এমন প্রতারণা করা হলো- সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।”মেহেদী মারুফ আরও বলেন, “জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হওয়ার পর ইশতেহার বাস্তবায়নে ব্যর্থতা শুধু ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়; এটি সামগ্রিকভাবে ছাত্ররাজনীতির প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।”তবে সালাহউদ্দীন আম্মার বলেন, “নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি ইশতেহার বাস্তবায়নে। নানা সময় প্রশাসন সহযোগিতা না করলেও বিকল্প পথে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু অসহযোগিতার কারণে কাজ এগোয়নি।”
১৩ মিনিট আগে

মতামতমতামত

বজ্রপাতে এত মৃত্যু কেন?

গত ১৮ এপ্রিল শনিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বজ্রপাতে একদিনে এত মৃত্যু ২০১৬ সালে একবার ঘটেছিল। ওই বছর মে মাসের ১২ ও ১৩ তারিখে দুই দিনে সারাদেশে বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটে ৮১ জনের। বলা হয় এনিয়ে কারও কিছু করার নেই এ হলো প্রকৃতির মার। আসলে কি তাই নাকি আমাদের কিছু করনীয় আছে। সেকথায় পরে আসছি তার আগে আরো একটা হিসাব দেখা যাক। ২০১৫ সালে  বজ্রপাতে ১৮০ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল বলে পত্রপত্রিকায় খবর এসেছিল। কী ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতি ভাবলে গা শিউরে ওঠে। দুই দিনে যখন ৮১ জনের প্রাণহানি  ঘটে তখন আমি গ্রামে ছিলাম। এনিয়ে অনেক রকম কথা বলতে শুনেছি  তখন মানুষকে।আমাদের গ্রামীন জনপদে বজ্রপাতকে ঠাটাপড়া বা বাজপড়া বলা হয় অনেক এলাকায়। তবে যায়-ই বলা হোক এনিয়ে আতঙ্ক বাড়ছে মানুষের মনে। বৃষ্টিবাদল-ঝড়বাতাসের দিনে। গ্রামের মানুষ যারা মাঠে-ময়দানে  কাজেকামে অবস্থান করেন তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। মারাও পড়েন যেমন খবরে এসেছে। দেখা যায়  ঠাটাপড়া বা বাজপড়া এরকম দুটো ভয়ঙ্কর শব্দ সমাজে চলে এসেছে একটা অভিশাপ রূপে । এর থেকে বড় অভিশাপ আর কিছু হতে পারে না। যেমন ‘ও যেন ঠাটা পড়ে মরে’ বা ওর অমুক যেন ‘মাথায় বাজ পড়ে মরে’ এর চেয়ে বড় অভিশাপ আর হয় না। এখন অবশ্য মানুষ ওই অভিশাপ বা বদদোওয়া এসব আর তেমন আমলে নেয় না। বজ্রপাতে মানুষ মারা যাওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর ভয়াবহতার কথাও নতুন কিছু না। চোখের পলকে একটা সুস্থ-সবল মানুষ ঝলসে গিয়ে প্রাণ হারায় । ঝড়ঝঞ্ঝা জলোচ্ছাসে প্রলয় কাণ্ড ঘটতে পারে। বেশি ঘটাতে পারে ভূমিকম্প। কিন্তু এসবে মানুষের কিছু করণীয় নেই। বলা হচ্ছে বৈশ্বিক জলবায়ুর কারণে এগুলো বেড়ে গেছে। সেটা এখানে বিষয় না। বিষয় বজ্রপাত এবং বজ্রপাত নিয়ে লোকে কী বলে।শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে বজ্রপাতের আতঙ্ক কম। কারণ বহুতল ভবন বিনির্মাণে বজ্রপাত প্রতিরোধে এক ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। যেমন নির্মাণ কাজের শুরুতেই (ফাউন্ডেশনের আগেই) বোরিং করে একেবারে মাটির গভীরে নির্দিষ্ট কিছু মেটাল বসিয়ে দেয়া হয় এবং সেখান থেকে নির্দিষ্ট একটা বিশেষ তার ওপরে তুলে ভবনের আর্থিং করা হয়। এতে কাজ হয়। নাহলে আজকের দুনিয়ার চেহারা পাল্টে যেত। কারণ বাজ অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় পড়ে। ফাঁকা মাঠে একটা লোক দাঁড়িয়ে থাকলে সেখানে যদি বাজ পড়ে ওই লোকটার মাথায় পড়বে যেহেতু তার নিকটবর্তী তার থেকে উঁচু কিছু নেই। তাই বলা হয় এমন হলে একেবারে মাটিতে শুয়ে পড়তে হবে। আবার কোন গাছের একেবারে নিচে না দাঁড়িয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়াতে হবে। কেননা বাজ পড়লে ওই গাছটাতে পড়বে। এখানে আবার একটু কথা বলে, তাহলে ওই বড় বড় মহিরুহু বটবৃক্ষ-অশ্বত্থ উজাড় হয়ে যাওয়ার আগে ওদের ওপর তো বাজ পড়তে দেখা যায়নি। এখন লোকে বলছে সেই বিশাল বিশাল আকৃতির দিগন্তজোড়া বৃক্ষরাজি উজাড় হয়ে যাওয়ার কারণেই বজ্রপাতে প্রাণহানি বেড়ে গেছে। মনে করা হয় ওগুলোই হয়তো বজ্রপাত প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখত। এমন সব বৃক্ষরাজি বহুত ছিল আমরাই দেখেছি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে নদীর বাঁকে বাঁকে বিলের ধারে ধারে তারা ছিল যেন পাহারাদার। এলাকার ল্যান্ডমার্ক। আমাদের বিলের চার ধারে চারটা বিশাল আকৃতির বৃক্ষ ছিল। দেখে মনে হতো চারদিকে যেন চারটা মা গাছ দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে চোখের সামনে সব নিধন হয়ে গেল। নিধন  হয়ে গেল সেই যত্রতত্র থাকা তালগাছের সারি। দেখা গেছে ধারে কাছে তালগাছ থাকলে বজ্রপাত তার ওপরই ঘটেছে। মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। আমরাই দেখেছি ফাকা মাঠে যত্রতত্র ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে’ থেকেছে।  এখন সেই বড় বড় বট-অশ্বত্থ-ঝাউ-তাল ফুরিয়ে এলেও বেড়েছে সামাজিক বনায়ন যার ভেতর প্রধানত রয়েছে মেহগনি গাছ । আমাদের বৃহত্তর যশোর-খুলনা-কুষ্টিয়া এলাকায় এত পরিমাণে সামাজিক বনায়ন হয়েছে যে রাস্তার দুই ধারে সেই ধানক্ষেত-পাটখেত আর চোখে পড়ে না। মেহগনিগাছ দ্রুত বাড়ে। চাষবাসের ঝামেলা নেই। কয়েক বছর গেলেই একটা গাছের দাম হয়ে যায় হাজার হাজার টাকা। কাজেই চারদিকে এখন ওই মেহগনি গাছে ভরপুর। গ্রামবাসীই আবার বলছে এ গাছ নাকি মাটি থেকে পানি শোষণ করে বেশি। এমনিতেই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে গোটা দেশ—সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। আর যে বিষয়টা নিয়ে বলতে শোনা যায় তা হলো, এক সময় আমাদের দেশে মাঠে-ময়দানে বিল-খালে শিলাখণ্ড মাটিতে পোতা থাকতে দেখেছে মানুষ। আমিও দেখেছি। আমার বয়সের অনেকেই দেখে থাকবেন মনে করি। সেগুলো মাটি থেকে এক-দেড় হাত পরিমাণ উঁচু ছিল এবং প্রস্থে ছিল  মানান মতো। একবারের একটা ঘটনা বলি। আমরা ৫-৬ জন কিশোর-যুবক আনন্দে মেতে উঠেছিলাম বিলের মাঝে পানিতে। সেখানে ছিল এরকম একটা শিলাখন্ড। আমার দেখা অন্যগুলোর থেকে সেটা বেশ বড় ছিল। বিলের মাঝে বলে হয়তোবা আকারে বড় হয়ে থাকবে। সেটা ছিল বাঁকা হয়ে। সেখানে পানি ছিল আমাদের কোমর-বুক সমান হবে। কি খেয়াল হলো, একজন বলে উঠলো— ধরো দেখি ওটাকে সোজা করা যায় কি-না। শুরু হয়ে গেল দহরম মহরম। ২-৩ জন করে একেক বারে সেই কাদাপানিতে মাথা-মুখ ডুবিয়ে শুরু হলো কাজ।  কিন্তু না, কিছুতেই কিছু করা গেল না। এতে বোঝা যায় মাটির নিচেও তার অনেকখানি ছিল। যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলায় আমার বাড়ি। এটা ১৯৬৩-৬৪ সালের কথা।তারপর এক সময় সম্ভবত আশির দশকে কি তার একটু আগে-পরে হবে, শোনা গেল কারা না কারা ওইগুলো সব রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ঘটনা ঠিকই। তারপর দ্রুতই ওগুলো সারা দেশ থেকে উধাও হয়ে গেল। লোকমুখে শোনা গেল, ওগুলোর ভেতরে নাকি কোনো মূল্যবান ধাতব পদার্থ ছিল। এখন কিছু একটা যে ওর ভেতর ছিল তা বোধ হয় ধরে নেয়া যায়। তা না হলে দেখতে দেখতে ওগুলো এমন ভাবে উধাও হয়ে যাবে কেন। এখন গ্রামের কিছু মানুষ যাদের একটু বয়স হয়েছে তারা মনে করছেন ওগুলো সরিয়ে ফেলার কারণে বা না থাকার কারণে বজ্রপাতে হতাহতের পরিমাণ বেড়ে গেছে। কারণ তারা মনে করেন ওগুলোর ভেতরে এমন একটা কিছু ছিল যা বজ্রপাত টেনে বা শুষে নিত। তবে কেউ ভেতরের সেই জিনিসটা দেখেছে বলে শোনা যায়নি। সত্য-মিথ্যা এখানে বিষয় নয়। গুজবেও অনেক কিছু হয়। তবে ওই জিনিসটা যে বিভিন্ন স্থানে বসান ছিল এটা সত্য। সারাদেশ থেকে উধাও হয়ে গেল এটাও সত্য। তা বজ্রপাত থেকে  মানুষ বাঁচানোর উদ্দেশে কোন এক সময় ওগুলো বসান হোক আর জমির মৌজা-সীমানা নির্ধারণের জন্যই বসান হোক এখন সেগুলো নেই এটাও সত্য। গ্রামাঞ্চল থেকে সেই মহিরুহু বৃক্ষরাজি নিধন হয়ে গেছে এটাও সত্য।এঅবস্থায় সাধারণ মানুষের এরকম দুটো বিষয়কে সামনে নিয়ে আসার যুক্তি জানি না কেউ উড়িয়ে দিতে পারেন কি না।অন্যদিকে শহরের মানুষের জীবন রক্ষার্থে ভবনগুলোর সাথে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফল হওয়া গেছে তা মাঠে-ময়দানে কোনোভাবে যুক্ত করে সাধারণ মানুষের প্রাণ রক্ষার্থে কেউ এগিয়ে আসবেন কি না সেটাও দেখার বিষয়।[লেখক: প্রাবন্ধিক]

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি

বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের কথা ভাবুন— সিলেটের হাওরাঞ্চল কিংবা বরেন্দ্রের মাঠে ঘেরা কোনো জনপদ। সেখানকার কৃষক যখন বুকের ব্যথায় কাতর হন, তখন তার প্রথম গন্তব্য সরকারি হাসপাতাল নয়— স্থানীয় কবিরাজ বা হাকিম। এটা কেবল দারিদ্র্যের গল্প নয়, এটা বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং প্রাপ্যতার গল্প। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ মানুষ এখনও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। আর ২০২২ সালের বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশের মাত্র ৬১ শতাংশ মানুষ আধুনিক চিকিৎসার আওতায় আসতে পারেন, যা ১৬ কোটি মানুষের জন্য অপর্যাপ্ত।এই বাস্তবতায় ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন বা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কোনো পূর্ণাঙ্গ রূপ হতে পারে না। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই শক্তিকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে মূলধারার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একীভূত করতে পারবো, নাকি এই বিশাল সম্পদকে অবহেলায় নষ্ট হতে দেবো?বর্তমান চিত্র: দুই জগতের মাঝে এক জাতিবাংলাদেশে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের ধারাটি বহুস্তরীয়। ইউনানি, আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি এবং লোকচিকিৎসা — এই পাঁচটি ধারা যুগ যুগ ধরে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরপরই সরকার ইউনানি ও আয়ুর্বেদ চিকিৎসাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় এবং ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক সিস্টেম অব মেডিসিন বোর্ড গঠন করে।বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক সিস্টেম অব মেডিসিন বোর্ডের তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি চিকিৎসকের সংখ্যা ১২,০০০-এরও বেশি। এর পাশাপাশি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪০০-এরও অধিক বিকল্প চিকিৎসক কর্মরত আছেন। দেশে সরকার অনুমোদিত ১৫টি প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর প্রায় ৪০০ জন ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন প্র্যাকটিশনার তৈরি করছে। ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ২০৪টি আয়ুর্বেদিক এবং ২৮৫টি ইউনানি কোম্পানি মিলে ৭,০০০-এরও বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাম্প্রতিক (২০২৫) গবেষণা জামালপুরের দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের ওপর পরিচালিত হয়ে দেখিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী রোগীদের মধ্যে ৮.৩ শতাংশ শুধুমাত্র ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন ব্যবহার করেন এবং আরও ৫.২ শতাংশ আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন গ্রহণ করেন। গবেষণাটি আরও প্রকাশ করে যে, গ্রামীণ, স্বল্প আয়ের এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠী ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের প্রতি বেশি আগ্রহী।সংকটের মুখ: যখন বিকল্প পথই একমাত্র পথবাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ একটি গভীর দ্বন্দ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের ভার দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী রোগসমূহ মোট রোগের বোঝার প্রায় ৬১ শতাংশ এবং বার্ষিক মৃত্যুর ৫৪ শতাংশের কারণ। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগে অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে (এসডিজি ৩.৪)।অন্যদিকে জনসংখ্যার বয়স কাঠামো দ্রুত বদলাচ্ছে। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ ৬০ বছরের বেশি বয়সী, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ১১.৫ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ২১.৫ শতাংশে উন্নীত হবে। এই বার্ধক্যপ্রবণ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার চাপ সামাল দিতে শুধু আধুনিক হাসপাতাল যথেষ্ট নয়।ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার কারণ হিসেবে গবেষকরা এর কার্যকারিতা, সহজলভ্যতা, সাশ্রয়ী মূল্য এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কম ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন। এই বাস্তবতায় ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, সহযোগী হিসেবে দেখার সময় এসেছে।ভবিষ্যতের পথ: সমন্বয়ের পাঁচটি স্তম্ভপ্রথমত, জাতীয় নীতি ও আইনি কাঠামো সংহত করা। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতি দরকার যা ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূলধারায় নিয়ে আসবে, প্র্যাকটিশনারদের নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করবে এবং ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিমালা প্রণয়ন করবে।দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ। বাংলাদেশে ব্যবহৃত ওষুধি গাছপালার গবেষণায় ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টিআলসার গুণাবলি প্রমাণিত হয়েছে। এই গবেষণাগুলোকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নিয়ে যাওয়া এবং প্রমাণিত পদ্ধতিগুলোকে মানসম্পন্ন প্রোটোকলে পরিণত করা এখন সময়ের দাবি।তৃতীয়ত, সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা মডেল তৈরি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে জেলা হাসপাতাল — সব স্তরে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন প্র্যাকটিশনার ও আধুনিক চিকিৎসকদের পাশাপাশি কাজ করার একটি মডেল গড়ে তোলা যায়। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা মূলধারার চিকিৎসার পাশাপাশি পরিপূরক থেরাপি হিসেবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, তবে গুরুতর রোগে এটি আধুনিক চিকিৎসার বিকল্প হওয়া উচিত নয়।চতুর্থত, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ। ঐতিহ্যবাহী নিরাময়কারীদের জনসচেতনতা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা এবং সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার আলোকে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সামগ্রিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা প্রয়োজন।পঞ্চমত, ফার্মাকোভিজিল্যান্স ও মান নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে বহু অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান মানহীন ট্র্যাডিশনাল ওষুধ বাজারে ছাড়ছে। রোগীদের যেকোনো ওষুধ গ্রহণের আগে তা নিবন্ধিত কিনা যাচাই করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নজরদারি আরও শক্তিশালী করা অপরিহার্য।বৈশ্বিক উদাহরণ থেকে শিক্ষাচীন, ভারত এবং শ্রীলংকা ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একীভূত করে কার্যকর ফল পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে সরকারি হাসপাতালে বিকল্প চিকিৎসকদের নিয়োগ দেয়া শুরু করেছে এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতির জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। এটি সঠিক পদক্ষেপের সূচনা, কিন্তু পরিকল্পনা, গবেষণায় বরাদ্দ এবং নীতিমালার সমন্বয় ছাড়া এই উদ্যোগ টেকসই হবে না।বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার আরেক অদ্ভুত বাস্তবতা আছে —একই রোগী সকালে আধুনিক চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিয়ে বাড়ি ফেরেন, আর সন্ধ্যায় ভেষজ বা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার দ্বারস্থ হন। এই দ্বৈততা কোনো বিভ্রান্তি নয়; বরং এটি আমাদের স্বাস্থ্য সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতার প্রতিফলন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তাদেও ট্রেডিশনাল মেডিসিন স্ট্র্যাটিজি ২০১৯-২০২৫ -এ স্পষ্টভাবে বলেছে, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্যের একটি কার্যকর অংশ হতে পারে—যদি তা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়িত হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আয়ুর্বেদ, ইউনানি ও হোমিওপ্যাথির অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের সময় এখনই।বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সীমিত সম্পদে অসীম চাহিদা মেটানো। শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া নয়, বরং শিকড়কে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। ঐতিহ্যের জ্ঞানকে বিজ্ঞানের আলোয় পরীক্ষা করে, নিয়মের আওতায় এনে, আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পাশে দাঁড় করালেই কেবল একটি পূর্ণাঙ্গ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। কারণ সত্যিকারের সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা তখনই সম্ভব, যখন কোনো মানুষ— প্রত্যন্ত হাওর থেকে শুরু করে শহরের বস্তি পর্যন্ত— চিকিৎসার বাইরে থাকবেন না।[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]

ঘূর্ণিঝড়ের নির্মম সাক্ষ্য

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় শুধু একটি দুর্যোগ নয়- এটি একটি জাতীয় ট্র্যাজেডি, একটি সম্মিলিত স্মৃতি, এবং একইসঙ্গে একটি কঠিন শিক্ষা। ২৯ এপ্রিলের সেই রাত আজও উপকূলীয় মানুষের কাছে আতঙ্কের প্রতীক। তবে এই বিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল চট্টগ্রাম, আর এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী থেকে শুরু করে আরও বিস্তৃত দক্ষিণাঞ্চলে।ঘূণিঝড়টি যখন আঘাত হানে, তখন এর বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৩০-২৫০ কিলোমিটার। কিন্তু প্রকৃত ধ্বংস ডেকে আনে ১৫-২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস, যা গভীর রাতে মানুষের ঘুমন্ত জীবনে হানা দেয়। সতর্কতা ছিল সীমিত, আশ্রয়কেন্দ্র ছিল অপ্রতুল, আর সচেতনতা ছিল অল্প। ফলে প্রকৃতির এই আঘাত মুহূর্তেই রূপ নেয় মানবিক বিপর্যয়ে।চট্টগ্রাম ছিল এই ধ্বংসযজ্ঞের কেন্দ্র। বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, পতেঙ্গা, আনোয়ারা-এসব এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ছিল অকল্পনীয়। বহু গ্রাম সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অনেক পরিবারে কেউই বেঁচে থাকেনি। শুধু এই অঞ্চলে দশ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। জলোচ্ছ্বাসের স্রোতে মানুষ, গবাদিপশু, ঘরবাড়ি-সবকিছু ভেসে যায়।তবে এই বিপর্যয় চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ ছিল না। কক্সবাজার জেলার মহেশখালী, টেকনাফ, উখিয়া অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংস সাধিত হয়। কুতুবদিয়া দ্বীপে প্রায় পুরো বসতি ধ্বংস হয়ে যায়। বহু মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়, যাদের আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।নোয়াখালীর চরাঞ্চল ছিল আরেকটি বড় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। মেঘনার জলোচ্ছ্বাসে বহু চর প্লাবিত হয়, অনেক এলাকা মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। লক্ষ্মীপুরেও একই চিত্র-নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ে এবং বহু মানুষ ভেসে যায়।ফেনী জেলায় তুলনামূলক কম হলেও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল বাতাসে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়, গাছপালা উপড়ে পড়ে এবং কিছু এলাকায় প্লাবন দেখা দেয়। দক্ষিণাঞ্চলের ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা জেলাতেও জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ো হাওয়ার প্রভাবে ব্যাপক ক্ষতি হয়, যদিও মূল আঘাতের কেন্দ্র ছিল পূর্ব উপকূল।মোট মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজারের মধ্যে ধরা হয়। এই সংখ্যার বড় অংশই ছিল চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে। প্রায় ১ কোটি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে এবং ১০ লাখের বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়-এটি ছিল একটি জাতির সামাজিক কাঠামোর ওপর সরাসরি আঘাত।এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। উপকূলীয় এলাকার মানুষ, যারা মূলত মাছ ধরা, কৃষি ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল, তারা এক রাতেই সবকিছু হারিয়ে ফেলে। হাজার হাজার মাছ ধরার নৌকা ধ্বংস হয়ে যায়, ফসলি জমি লবণাক্ত পানিতে নষ্ট হয়ে পড়ে, গবাদিপশু ভেসে যায়। ফলে শুধু তাৎক্ষণিক নয়, দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি হয়।অবকাঠামোগত ক্ষতি ছিল ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। চট্টগ্রাম বন্দর অচল হয়ে পড়ে, জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সড়ক ও বাঁধ ভেঙে যায়। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম বিলম্বিত হয় কারণ যোগাযোগের কোনো উপায় ছিল না।এই দুর্যোগের একটি বড় কারণ ছিল প্রস্তুতির অভাব। পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার ছিল না, আগাম সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে পৌঁছায়নি, এবং জনগণের মধ্যে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা ছিল সীমিত। ফলে মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঘরে অবস্থান করে এবং জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায়।তবে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৯১ সালের পর উপকূলীয় এলাকায় হাজার হাজার সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়। ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আধুনিক করা হয়। স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যারা দুর্যোগের সময় মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে কাজ করে।এই উদ্যোগগুলোর ফল আজ স্পষ্ট। পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়গুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বাংলাদেশ এখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি বৈশ্বিক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই সাফল্যের ভিত্তি গড়ে উঠেছে ১৯৯১ সালের সেই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার ওপর।তবুও চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং উপকূলীয় অঞ্চলে জনসংখ্যার চাপও বাড়ছে। চট্টগ্রামসহ উপকূলীয় শহরগুলো এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।এখন প্রয়োজন আরও সমন্বিত পরিকল্পনা-টেকসই অবকাঠামো, শক্তিশালী বাঁধ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি। উন্নয়ন যেন ঝুঁকি বাড়িয়ে না তোলে, বরং ঝুঁকি কমানোর পথ তৈরি করে-এটি নিশ্চিত করতে হবে।১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় আমাদের শিখিয়েছে-প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব নয়, কিন্তু প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। চট্টগ্রাম ছিল সেই শিক্ষার সবচেয়ে বড় মূল্যদাতা, আর পুরো বাংলাদেশ সেই শিক্ষা থেকে উপকৃত হয়েছে।আজ, যখন আমরা সেই ঘটনার দিকে ফিরে তাকাই, তখন শুধু শোক নয়, দায়িত্ববোধও অনুভব করি। অতীতের সেই ত্যাগ যেন বৃথা না যায়-এই প্রতিজ্ঞাই হোক আমাদের ভবিষ্যতের পথচলার ভিত্তি।[লেখক: গণমাধ্যমকর্মী]

“আগে ভি জানে না তু, পিছে ভি জানে না তু”

উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী সদ্য প্রয়াত আশা ভোঁসলে জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্র ‘ওয়াক্ত’- এ কণ্ঠ দিয়েছিলেন ‘আগে ভি জানে না তু, পিছে ভি জানে না তু’ গানটিতে। এ গানে বারতা এটাই যে, তুমি আগে কী হয়েছে জানো না, পরে কী হবে, তাও জানো না। বর্তমান মুহুর্তটাই শুধু উপভোগ কর। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস রিসেট বাটনে চাপ দিয়ে আমাদের দেশের তরুণদের উদ্দেশে এ বার্তাই দিয়েছিলেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা তরুণদের রাজনৈতিক দলও তাই দিশাহীন। বর্তমানের ক্ষমতা ও ভোগবিলাসিতা নিয়েই তারা মত্ত ছিলেন ও আছেন। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়টা উপভোগ করেই ধারণা করছেন কিস্তি মাত!তারা ইতিহাস পড়েছেন এবং অনেকের থেকে বেশিই পড়েছেন। শুধু পড়াশোনাই নয়, তাদের অনেকের বুদ্ধিমত্তা ও রাজনৈতিক ‘কুশলতা’ অনেকক্ষেত্রে ঈর্ষনীয়! তাদের অনেকেই ছাত্রলীগে জায়গা করে নেয়ার জন্য, ‘বঙ্গবন্ধুর নামে জয়ধ্বনি’ দেয়ার মতো কুশলী ছিলেন। আবার সাধারণ তরুণদের মাঝে তাদের বিচরণ থাকায় তারা বুঝেছিলেন বাংলাদেশের গৌরবময় জন্ম ইতিহাস নিয়ে শেখ হাসিনা দিবানিশি যে এক তরফা রেকর্ড বাজিয়ে চলছিলেন এবং ইতিহাসকে পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিলেন তাতে করে দেশবাসী বিশেষত তরুণ প্রজন্ম বিরক্তই ছিল। এটাও, তারা বুঝেছিলেন ঐ ইতিহাস তো বটেই এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক ইতিহাসও ঠিক ষাটোর্ধ্ব প্রজন্মের ন্যায় আজকের তরুণদের মনে একই ধরনের আবেগ সৃষ্টি করে না।বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ। স্বাধীনতাপরবর্তী প্রজন্ম বিশেষত ’৭৫ পরবর্তী যে প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে তারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের সঙ্গে স্বাভাবিক পন্থায় পরিচিত হতে পারেনি। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের পরিবর্তন হয়েছে। ১৬-৫৫ বছর বয়স্ক মানুষ মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। অর্থাৎ ৯ কোটির কম-বেশি। আর ১৬-৪০ বছরের মধ্যে রয়েছে ৮ কোটির কিছু বেশি মানুষ। দেশের রাজনীতি অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নির্মাণে এই মোট কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৮০% হচ্ছে তরুণ সমাজ। দেশের সকল শাসক গোষ্ঠীই ক্ষমতা আঁকড়ে রেখে ক্ষমতার স্বাদ তরুণদের একটা অংশে বিতরণ করে তাদের নিজ রাজনৈতিক প্রভাবে রাখতে চেয়েছে। এমনকি সেজন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ বিভিন্ন কোটার অপব্যবহার পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু তরুণ সমাজের মনোজগতে প্রচলিত রাজনৈতিক দলসমূহ এমনকি সব থেকে অগ্রসর চিন্তার দাবিদার বামপন্থীরাও সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। প্রকৃতি তো শূন্যতা পছন্দ করে না। তাই শূন্যতা পূরণ হয়েছে আশা ভোঁসলের গানের কথায় — ‘জো ভি হ্যায়, বাস ইয়াহি এক পাল হ্যায়’ অর্থাৎ জীবন কেবল এই বর্তমান মুহূর্তেই বিদ্যমান, বর্তমানই সবকিছু। এই ধরনের চিন্তাধারায়— সব থেকে বড় ও শক্তিশালী প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। কিন্তু জাতি, দেশ, সভ্যতা শুধু বর্তমানকে নিয়ে নয়। দেশের প্রকৃত জন্ম ইতিহাস তা যত অতীতেরই হোক বর্তমানকে তো তা জানতে হবে, জানাতে হয়ও বটে। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নাগরিক সমাজের ব্যর্থতার এ পরিণতি আমাদের দীর্ঘ সময় যাবত বইতে হবে।বাংলাদেশের অন্যতম প্রথাবিরোধী এবং বহুমাত্রিক লেখক কবি হুমায়ূন আজাদের একটা বহুল প্রচারিত উক্তি হলো— সত্য একবার বলতে হয়, বারবার বললে তা মিথ্যা মনে হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অনেকটা সে পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গত পঞ্চাশ বছর ধরে যে কোন ইস্যুতে সকাল-বিকেল আওয়ামী লীগ নেতাদের সবার বক্তৃতার শুরু হচ্ছে, ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক, যার জন্ম না হলে ... ইত্যাদি। এবং ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ডে নিহত প্রত্যেকের নাম উল্লেখ করে শোক প্রকাশ, স্মৃতি তর্পন করার পরে দলীয় নেত্রীর বন্দনা — ৫/১০ মিনিট চলে এভাবে। তারপরে স্বল্প কথায় যে ইস্যু নিয়ে সভা হোক না কেনো প্রতিপক্ষ দলকে টেনে এনে তাদের সম্পর্কে কিছু উপহাসমূলক কথাবার্তা বলে এবং কিছু উন্নয়ন কার্যক্রমের ফিরিস্তি দিয়ে সভা শেষ। একটি রাজনৈতিক দলের যে নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শগত প্রচার এবং তার ভিত্তিতে কর্মী সমর্থকদেরসহ মানুষকে সে রাজনীতির ভিত্তিতে সমবেত করার কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়েনি। একটা সময়ে এসে ‘স্বাধীনতা আর উন্নয়ন’-এর জপ ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না।সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের কর্তাব্যক্তিরা বিশেষ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা দিবস পালনে আর বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের চেয়ে বড় আওয়ামী লীগ হয়ে উঠলেন। নিজের দু-একটি অভিজ্ঞতা বলি। ২০২৪- এর ১৫ আগস্ট পালন উপলক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারী বেসরকারি কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জুলাই মাসের প্রথম দিকে ঐ সব প্রতিষ্ঠানের সিইওদের এক সভা ডেকে যথাযথ মর্যাদার সাথে জাতীয় শোকদিবস পালনের কর্মসূচিসমূহ অবগত করেন এবং সব প্রতিষ্ঠানকে তা পালনের নির্দেশ দেন। সভায় বক্তব্য রাখতে যেয়ে একটি কোম্পানির অপেক্ষাকৃত তরুণ তুর্কি সিইও অতি উৎসাহী ভংগীতে বলেন, নির্দেশিত কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি তার কোম্পানি ঐ দিন গরু জবাই করে গরিব মানুষকে খাওয়াবে। গরু জবাই দেয়ার জন্য ঐ সিইওকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি, ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর পরই ‘জুলাই বিপ্লব’ এর সাফল্য উপলক্ষে তিনি গরু জবাই দিয়ে শোকরানা মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন। মুজিব শতবর্ষ পালনের সময় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক প্রশাসক হিসেবে যাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তার বক্তৃতা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। বক্তৃতায় তিনি ঐ প্রতিষ্ঠানের সব কর্মচারীর উদ্দেশে বললেন, বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী সবাইকে মুখস্থ করতে হবে এবং তিনি ঐ বিষয়ে যে কোনো সময় যে কারো পরীক্ষা নেবেন। সেই প্রশাসক মহোদয় এখন আবার বিএনপি আমলে তদবির করছেন ঐ নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য। তার যুক্তি তার সহোদর বিএনপি করতেন এবং আওয়ামী লীগ আমলে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ভাইয়ের কারণে এখন ঐ ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ কে পুরস্কৃত করতে হবে। এর চেয়ে আরও অনেক মজার ঘটনা হয়তো পাঠকদের জানা আছে। এভাবে অসংখ্য দিবস পালনের নামে এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধা নেওয়ার জন্য স্তুতি করে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাকে সম্মান জানানোর পরিবর্তে কার্যত অসম্মানই করা হতো।যে সরকারই ক্ষমতায় থাকবে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম সে সরকারের রুটিন ওয়ার্ক। এসব নিয়ে অতিরিক্ত বাগাড়ম্বরও আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমকে হালকা করে ফেলে। অবশ্য পদ্মা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা খুবই সাহসী এবং প্রশংসিত ভূমিকা রেখেছিলেন। বিশ্ব ব্যাংক এবং বিশ্ব মোড়লদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়েছিলেন। গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, ব্যাপক দুর্নীতি এবং মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখায় তার ইতিবাচক কাজগুলোও সৈ্বরাচারী এবং কতৃত্ববাদী আচরণের চাদরে ঢাকা পড়ে যায়। আর কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর যে ৮০% তরুণদের কথা বলছিলাম তাদের কাছে প্রধান বিষয় হচ্ছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ন্যায্য পারিশ্রমিক, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন বা সুশাসন। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গণতন্ত্রের চশমা পরে মুক্তিযুদ্ধকে দেখতে চায়। এসব চাহিদা পূরণ না হলে মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুও তাদের কাছে অপ্রধান হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই ধারণা করেছিলেন তরুণ নেতৃত্বে গঠিত নতুন দল হয়তোবা এসব এজেন্ডাকেই সামনে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় অগ্রসর হবে। কিন্তু কিছু স্ট্যান্টবাজি ছাড়া এবং দ্রুত, অতিদ্রুত ক্ষমতার হিস্যা পাওয়ার মোহে তারাও প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার মধ্যেই আছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো ক্ষমতার মোহে তারা বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী শক্তির খপ্পরে পড়েছে এবং তাদেরসহ দেশি-বিদেশি নানা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে।পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, আজ সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজ নীতি এবং তাবৎ দুনিয়াকে তাদের কব্জায় নেয়ার জন্য সভ্যতাকে ধ্বংসের যে হুমকি, সে বিষয়ে সংসদের প্রধান দল ও বিরোধী দল উভয়ই নিশ্চুপ। যাদের যুদ্ধোন্মাদনার জেরে তেল বিশ্বে আজ এই ঘোর সঙ্কট সেই আগ্রাসী আমেরিকার সঙ্গেই ভাব-ভালোবাসার সম্পর্ক। ইউনূস বিদায়ের পূর্ব মুহুর্তে দেশকে মার্কিনী স্বার্থের সাথে আষ্টে পৃষ্ঠে বেঁধে যে দেশবিরোধী গোপন চুক্তি করে গেলেন সে বিষয়েও তরুণদের দলের নীরবতা চুক্তির প্রতি সম্মতিরই বহিঃপ্রকাশ। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী সরকারী দল ও বিরোধী দলের প্রধানের সম্মতি নিয়েই তো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বলা দলগুলোর কাছে মার্কিনী স্বার্থ ফার্স্ট হিসাবে অগ্রাধিকার পাচ্ছে!আমাদের দুর্ভাগ্য আন্দোলনের উত্তাপে গড়ে ওঠা তরুণদের দলটি উত্তাপ ঠান্ডা হতে না হতেই পুরনো কাঠামোর মধ্যে মিলিয়ে গেলো। শুরু থেকেই ভোগ, বিলাস, গাড়ি, বাড়ির প্রতি আকর্ষণ। যে কোনো ইস্যুতে ওয়েস্টিন, ইন্টার কন্টিনেন্টাল, প্যানপ্যাসিফিক ছাড়া তাদের চলে না। আবার মাত্র দুই বছর আগের ছাত্র সমন্বয়ক তার এখনও নিজের গাড়ি নাই দেখে খুবই লজ্জাবোধ করেন। এনসিপির সেই লজ্জিত ক্যাপ্টেন পার্লামেন্টে ফ্লোর নিয়ে সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ি দাবি করলেন। মূহূর্ত দেরি না করে জামাত আমীর তাকে সমর্থন করে বললেন, ছোটদের আবদারে সব সময় ‘হ্যাঁ’ বলতে হয়। সংসদ সদস্যরা যাতায়াতের জন্য বড় অঙ্কের ভাতা পাওয়ার পরও এমন চাওয়ার কারণ কী, সেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এনসিপিরই প্রাক্তন নেত্রী তাসনিম জারা এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন এমপিরা সংসদে গেছেন জনগণের সমস্যার সমাধান করতে, নিজেদের জন্য নয়। জামায়াত প্রধান সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ি সুবিধা নেবেন না বলে জনগণের কাছে অংগীকার করে, দু’মাসের মধ্যেই তা ভুলে গিয়ে কৌশলে সে সুবিধা নেয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন এবং এজন্য পার্লামেন্টে এনসিপিকে ব্যবহার করছেন। এনসিপির ক্যাপ্টেন যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তাতে মনে হয় যে, সরকারি চাকরি এবং এমপি’র পার্থক্য তিনি বুঝেন না। একইভাবে সব উপজেলা কার্যালয়ে এমপিদের জন্য কক্ষ বরাদ্দের নিয়ম করে স্থানীয় সরকারকেও তাদের কব্জায় নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এনসিপির ঐ ক্যাপ্টেন এমপি তো নির্বাচনের পরদিন থেকেই স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের সকল দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে নিয়েছেন। ভোগ বিলাস এবং অন্যায্য ক্ষমতা ও কতৃত্ব বৃদ্ধিতে তারা মরীয়া। সংস্কার, সনদ এগুলো মুখোশ মাত্র।দল বড় করতে এনসিপি বিভিন্ন স্থানে দল বদলে বহুমুখী প্রতিভাধরদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, তাদেরকে দলে পূনর্বাসিত করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দাঁড় করাতে। কখনো আওয়ামী লীগ কখনও বিএনপি — চট্টগ্রামের এমন একজন প্রাক্তন মেয়রের বিষয় তো প্রকাশ্যেই চলে এসেছে। পুরান ঢাকার মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকারকে এনসিপি দলে নিয়েছে। ইতোপূর্বে ছাত্র শিবিরের বেশ কয়েকজন সাবেক নেতাও যোগ দিয়েছেন। অতীতে কে কোন দল করেছে তা মূখ্য নয় এ কথা বলে নাহিদ ইসলাম ‘ফ্যাসিবাদী ছাত্র লীগ, আওয়ামী লীগ’-এর নেতাকর্মী যাদের নামে জুলাই হত্যা মামলা বা অভিযোগ নেই এবং নিজ দলে যারা বঞ্চিত তাদের এনসিপিতে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থাৎ মামলা থাকলেও এনসিপিতে যোগ দিলে যোগ দেয়ার আগে থানা ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে দেবে, আবার এখন পর্যন্ত খুনের মামলার আসামি নয় কিন্তু এনসিপি যদি তাকে দলে চায়, যোগ না দিলে মব সৃষ্টি করে খুনের মামলা দিয়ে দেয়া হবে। অতীতে সামরিক শাসকেরা দল গঠনের ক্ষেত্রে ‘দুর্নীতি ইস্যু’ সামনে রেখে এ ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। এখন জুলাই আন্দোলনের সিপাহসালাররা ‘খুনের মামলা পদ্ধতিতে’ দল গোছাতে ও রাজনীতির সংস্কার করতে চাইছেন! অবশ্য তাদের অনেকেই যেমন সার্জিস, হাসনাত বা শিবিরের সাদিক কায়েমরাও এক সময় কিন্তু গুপ্ত হোক আর সুপ্ত হোক ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ ছিলেন। তাই ভিন্ন ‘দোসর’ দের দলে নিতে অসুবিধা কোথায়!কথায় কথায় ফ্যাসিবাদ উচ্চারণ করা তরুণ নেতৃত্ব প্রকৃত ফ্যাসিবাদ কি তা উপলব্ধি করতে পারেন না। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকেই মনে করেন ফ্যাসিবাদ। জুলাই আন্দোলনকে বা জুলাই হত্যাকাণ্ডকে তুলনা করেন মুক্তিযুদ্ধের সাথে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং এনসিপির বর্তমান জোট সঙ্গী জামায়াত ইসলামের বাহিনীসমূহের নৃশংসতা ও বর্বরতা নাৎসী হত্যাযজ্ঞকেও হার মানায়। হলোকাস্ট নামে অভিহিত নাৎসী হত্যাযজ্ঞের সবচেয়ে ভয়াবহতা ছিল গ্যাস চেম্বার, যেখানে জাইক্লন বি নামক বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষকে একসঙ্গে শ্বাসরোধ করে মারা হতো। জনসমক্ষের বাইরে অবস্থিত গ্যাস চেম্বারে এ সব ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতো । আর বাংলাদেশে ১৯৭১-এর বড়ো বড়ো সব হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে প্রকাশ্য জনসম্মুখে। পাকিস্তান সরকারের নথি অনুযায়ী শুধু মাত্র ২৫ মার্চ এক রাতেই ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের সামরিক অভিযানে সারা দেশে লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ২৫ মার্চ রাতে জগন্নাথ হলসহ গোটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং পিলখানা ও রাজারবাগে গণহত্যা, ঐ রাতেই দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে সংখ্যালঘু হত্যা, ২৬ মার্চ ঢাকার শংকরিপারা ও রমনা কালী মন্দিরে গণহত্যা, ২৭ মার্চ সূত্রাপুর, জিঞ্জিরা ও বুড়িগঙ্গা নদী বক্ষে গণহত্যা, এমনিভাবে নয় মাস জুড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিন ও তার দোসরদের কতৃক দিনাজপুরের বারিহাট, ঠাকুরগাঁওয়ের জাঠিভাঙ্গা, পঞ্চগড়ের ঢাপঢুপ জয়পুরহাটের কড়ই কাদিপুর, রংপুরের কালীগঞ্জ, পটিয়া-চট্টগ্রামের মুজাফফরাবাদ, নাটোরের গোপালপুর,পাবনা জেলার বাগবাটি, সাতবাড়িয়া ও ডেমরা, ঢাকা জেলার বাড়িয়া, বরিশালের কেটনার বিল, ফরিপুরের সেনদিয়া, খুলনার ডাক্রা, ফরিদপুর পালংয়ের মধ্য পাড়া, বরিশালের ভিমনালি, কুমিল্লার বাখরাবাদ, সিলেটের বুরুঙ্গা, বরগুনা সদর, সিলেটের কৃষ্ণপুর ও আদিত্যপুর, হবিগঞ্জের মাকালকান্দি, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা কুড়িগ্রামের হাতিয়া, সৈয়দপুরের গোলাহাট উল্লেখযোগ্য গণহত্যার সব স্থান। এসব গণহত্যার স্থানে কোথাও শত শত কোথাও হাজারে হাজারে বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। যার সিংহভাগই ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারে এমন তরুণ ও যুবক। এর বাইরেও একই স্থানে নিহতের সংখ্যা ১শ’র কম এরকম আরও শত শত গণহত্যার এবং গণকবরের স্থান রয়েছে যা উল্লেখ করা হলো না। তবে উপরের তালিকায় যেটি বলা হয়নি সেটি হলো চুকনগর গণহত্যার কথা। সেখানে একদিনে দশ হাজার উদ্বাস্তুকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের সবথেকে বড় গনহত্যা তো বটেই, ক্ষুদ্র একটি স্থানে একত্রে একদিনে এত মানুষ হত্যার উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।আর হত্যার বিভৎসতা যে কত রকম ছিল। সৈয়দপুরের গোলাহাটে ট্রেন থেকে নামিয়ে হানাদার বাহিনী গুলি করে এবং রাজাকাররা রাম দা দিয়ে গলায় কোপ দিয়ে দেহ থেকে মস্তক আলাদা করে মোট ৪৪৮ জন নারী-পুরুষ শিশুকে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারে এমন সন্দেহে রাজাকাররা তরুণদের এবং জাতীয়তাবাদীদের ধরে সামরিক ক্যাম্পে নিয়ে আসলে পাকিস্তানি সেনারা তাদের ঈমানদার মুসলমান হওয়ার জন্য লাইন করে দাঁড়িয়ে জামাত করে নামাজ পড়তে নির্দেশ দেয়। আর সেজদার সময়ে ব্রাশ ফায়ার করে সবাইকে হত্যা করে। তরুণদের দিয়ে গণকবর খুঁড়িয়ে তাদের দিয়ে মৃতদেহসমূহ সেখানে ফেলে এমন সময়ে গুলি করে যেন ঐ তরুণদের দেহ গণকবরেই পড়ে। আবার কখনও কখনও কোনো তরুণকে ধরে এনে তাকে নারকেল গাছ থেকে ডাব পাড়তে বলে। গাছে উঠে কয়েকটি ডাব নিচে ফেলার পর পাক সেনার গুলিতে তরুণটিও ডাবের মতো ঢপ করে মাটিতে পড়ে ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। দেশ জুড়ে অসংখ্য বধ্যভূমি, গণকবর এবং হত্যা করার সব নির্মম পদ্ধতি আর বন্দী দেশে লাখো নারী ধর্ষণের কাহিনীই বলে দেয় ফ্যাসিবাদী নির্মমতা কি জিনিস। ‘হারুন আংকেলের’ ভাতের হোটেলে দুই চার দিন বন্দী থেকে ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এমনকি জুলাই ’৩৬ দেখেও ধারণা করা কঠিন আসল ফ্যাসিবাদ কী।বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী শক্তির রাজনৈতিক সহযোগী হওয়ায় অতীতকে তারা ঢেকে রাখতে চান। তারা নিজেদের নিকট-রাজনৈতিক অতীত জুলাই ’২৪ দিয়ে ঢেকে রাখছেন। আবার লাখো লাখো শহীদের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধে অগনিত মানুষের বীরত্বগাথা, স্বাধীনতার সংগ্রামকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ও তা পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবিস্মরণীয় ভূমিকা, বাংলাদেশের বিরোধী পক্ষ জামায়াত ইসলাম, রাজাকার-আলবদরদের গণহত্যার সহযোগী ভূমিকা — সেসব ইতিহাসকেও তারা ঢেকে রাখতে চায় ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান দিয়ে। সংস্কার আর জুলাইয়ের মাহাত্ম্যকে তারা ব্যবহার করছেন বর্তমানের ক্ষমতা, বিলাসিতা আর উগ্রতাকে আলিংগন করে। আবার ভবিষ্যতটাও তারা দেখছেন নিছক ক্ষমতার চশমা দিয়ে। এখন দলীয় সংগীত হিসেবে বেছে নিতে পারেন “আগে ভি জানে না তু, পিছে ভি জানে না তু”!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

আলতাব আলী পার্ক: লন্ডনের বুকে রক্তমাখা স্মৃতির নীরব কবিতা

লন্ডনের পূর্ব প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা আলতাব আলী পার্ক প্রথম দর্শনে যে কোনো সাধারণ নগর উদ্যানের মতোই মনে হয়। সবুজ ঘাস, গাছের ছায়া, পাখির ডাক আর পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচল—সব মিলিয়ে এটি আধুনিক শহরের এক শান্ত পার্ক। কিন্তু এই শান্ত দৃশ্যের নিচে চাপা আছে এক গভীর ইতিহাস, যেখানে একজন মানুষের রক্ত মিশে আছে একটি পুরো কমিউনিটির পরিচয়, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে। একজন পর্যটকের চোখে লন্ডন এমনই—প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি পার্ক যেন ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায়। কিন্তু এই পার্কের ভেতরে কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই বোঝা যায়, এটি বিনোদনের স্থান নয়; এটি একটি স্মৃতির ভূগোল, যেখানে অতীত এখনও নিঃশব্দে কথা বলে। পার্কের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে থাকা স্মারকটি প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেখানে খোদাই করা একটি নাম—আলতাব আলী। নামটি কোনো কল্পকাহিনি নয়; এটি বাস্তব এক তরুণ অভিবাসীর জীবন, মৃত্যু এবং পরবর্তী ইতিহাসের প্রতীক। ’৭০-এর দশকের লন্ডন ছিল অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভিবাসন-পরবর্তী সামাজিক উত্তেজনার এক জটিল সময়। বিশেষ করে পূর্ব লন্ডনের ব্রিক লেইন হোয়াইটচ্যাপেল এলাকা দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের জন্য ছিল এক কঠিন বাস্তবতার কেন্দ্র। তারা শহর গড়ে তুলছিলেন, শ্রম দিচ্ছিলেন, কিন্তু একই সঙ্গে প্রতিদিন মুখোমুখি হচ্ছিলেন বর্ণবাদী আচরণ, বৈষম্য এবং নিরাপত্তাহীনতার। এই সময়েই ইতিহাসের কেন্দ্রে এসে দাঁড়ান আলতাব আলী। সুনামগঞ্জের এক সাধারণ গ্রাম থেকে আসা এই তরুণ লন্ডনে এসেছিলেন জীবিকার সন্ধানে। তিনি ছিলেন না কোনো রাজনৈতিক নেতা, না কোনো সংগঠনের পরিচিত মুখ। ছিলেন হাজারো অভিবাসী শ্রমিকের একজন, যাঁরা নতুন জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালের ৪ মে তার জীবন থেমে যায় এক নির্মম ঘটনায়। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তিনি বর্ণবাদী হামলার শিকার হয়ে নিহত হন। তার অপরাধ ছিল একটিই—তিনি ছিলেন একজন বাংলাদেশি। এই ঘটনাটি কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ সমাজে বর্ণবাদের ভয়াবহ বাস্তবতার এক নির্মম প্রকাশ। আলতাব আলীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ব লন্ডনের অভিবাসী সমাজ নীরব থাকেনি। তার জানাজা ও কফিন ঘিরে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ব্রিক লেন থেকে শুরু হয়ে এই শোকযাত্রা লন্ডনের কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এটি ছিল কেবল শোক নয়; এটি ছিল অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার দাবি। সেই সময় ব্রিটেনে বর্ণবাদী সংগঠন ন্যাশনাল ফ্রন্ট সক্রিয় ছিল, যারা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করেছিল। এই প্রেক্ষাপটে আলতাব আলীর মৃত্যু পূর্ব লন্ডনের অভিবাসী সমাজকে এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনায় জাগিয়ে তোলে। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এই ঘটনা ছিল ব্রিটেনে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের সংগঠিত বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। মানুষ প্রথমবার উপলব্ধি করে—নীরবতা নিরাপত্তা নয়, বরং সংগঠিত প্রতিরোধই অধিকার রক্ষার পথ। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পূর্ব লন্ডনের অভিবাসীরা নিজেদের নতুনভাবে চিনতে শুরু করে। তারা আর কেবল শ্রমজীবী নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের অংশ। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে, যেখানে আলতাব আলী নিহত হয়েছিলেন সেই স্থানটিকেই তার নামে নামকরণ করা হয়। এভাবেই জন্ম নেয় বর্তমান আলতাব আলী পার্ক। এটি কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং দীর্ঘদিনের কমিউনিটি আন্দোলন, স্মৃতি রক্ষা এবং ন্যায়ের দাবির ফলাফল। পার্কের ভেতরে স্থাপিত স্মৃতিস্তম্ভটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি বাংলাদেশের শহীদ মিনারের অনুপ্রেরণায় নির্মিত, যা ভাষার অধিকারের জন্য আত্মত্যাগের স্মৃতিকে বহন করে। এখানে এসে দু’টি ইতিহাস একত্র হয়—একটি ভাষার জন্য সংগ্রাম, অন্যটি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই। এই মিলন একটি গভীর বার্তা দেয়—অধিকার কখনও বিচ্ছিন্ন নয়, এটি মানবতার একটি সার্বজনীন ধারণা। আজকের দিনে ব্রিক লেইন সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে দাঁড়িয়ে আছে। রেস্তরাঁ, শিল্প, স্ট্রিট কালচার এবং পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে এটি পরিচিত। কিন্তু এই রঙিন বর্তমানের নিচে চাপা আছে এক সময়ের ভয়, সংগ্রাম এবং প্রতিরোধের ইতিহাস। একজন পর্যটকের চোখে এই পার্ক হয়তো কেবল একটি বিশ্রামের স্থান। কিন্তু ইতিহাস জানলে এটি হয়ে ওঠে এক জীবন্ত দলিল—যেখানে একটি হত্যাকাণ্ড একটি কমিউনিটির রাজনৈতিক জাগরণের সূচনা করে। আজ যখন বিশ্বজুড়ে অভিবাসন, পরিচয় এবং বর্ণবাদের প্রশ্ন আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন আলতাব আলীর গল্প নতুন করে প্রাসঙ্গিক। কারণ এটি মনে করিয়ে দেয়—বৈষম্য কখনও ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি সামাজিক কাঠামোর অংশ, আর তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধও সমষ্টিগত। পার্কের শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এই ঘাসের নিচে শুধু মাটি নয়, চাপা আছে ইতিহাস। সেই ইতিহাস এক তরুণের, যিনি কোনো রাজনৈতিক মঞ্চে ছিলেন না, কিন্তু তার মৃত্যু একটি পুরো সমাজকে জাগিয়ে তুলেছিল। ১৯৭৮ সালের সেই শোকযাত্রা আজও ব্রিটেনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্রিক লেন থেকে শুরু হওয়া সেই পদযাত্রা ছিল কেবল শোকের প্রকাশ নয়; এটি ছিল নাগরিক অধিকারের এক স্পষ্ট দাবি। আলতাব আলীর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে পূর্ব লন্ডনে বর্ণবাদবিরোধী সংগঠনগুলো আরও সংগঠিত হয়, স্থানীয় রাজনীতিতে অভিবাসীদের অংশগ্রহণ বাড়ে এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। এই পরিবর্তন প্রমাণ করে, ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনা নয়; এটি বর্তমানকে গড়ে তোলে। আলতাব আলী পার্ক তাই শুধুই একটি পার্ক নয়। এটি স্মৃতির এক নীরব কবিতা, যেখানে একজন মানুষের জীবন একটি কমিউনিটির আত্মপরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। লন্ডনের ব্যস্ত শহরে ফিরে আসার সময় মনে হয়, এই শহর শুধু আধুনিকতার প্রতীক নয়; এটি স্মৃতিরও শহর। প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি পার্ক কোনো না কোনো ইতিহাস বহন করে। আর এই পার্ক সেই ইতিহাসের সবচেয়ে নীরব কিন্তু গভীর অধ্যায়গুলোর একটি—যেখানে ঘাসের সবুজের নিচে এখনও বেঁচে আছে এক তরুণের রক্ত, একটি কমিউনিটির প্রতিবাদ, এবং একটি শহরের বিবেক। [লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী]

ভ্রমণ: তিনবিঘা করিডোরে একদিন

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর বিভাগের একটি জেলা হলো লালমনিরহাট। এই জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থান গুলোর মধ্যে তিস্তা ব্যারেজ, বুড়িমাড়ি জিরো পয়েন্ট, তিনবিঘা করিডর, ৬৯ হিজরীর হারানো মসজিদ, কাকিনা জমিদার বাড়ি, তুষভাণ্ডার জমিদার বাড়ি, ঐতিহ্যবাহী সিন্দুরমতি মন্দির অন্যতম।গত ১৬- এপ্রিল তারিখ আমরা ৫ জন মিলে ভ্রমণে গিয়েছিলাম লালমনিরহাট জেলার দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শনের জন্য । আমাদের এই ভ্রমণে অংশ নিয়েছিলাম আমিসহ উত্তরা হাইস্কুল এন্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের ( সদ্য অব:) শিক্ষক ইকবাল হাসান, মুক্তিযোদ্ধা কলেজের আইসিটি বিভাগের শিক্ষক আব্দুস ছালাম, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক শাহ আলম এবং শরীর চর্চা শিক্ষক ফরহাদ আহম্মেদ। দুই দিনের এই সফরে আমরা  গাজীপুর থেকে লালমনিরহাটে যাই ট্রেনের মাধ্যমে।১৬ এপ্রিল রাত সারে দশটার ট্রেনে আমরা  জয়দেবপুর রেলস্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করি। যদিও ট্রেনটি দেরিতে এসে রাত একটায় প্লাটফর্ম ছাড়ে। লালমনিরহাট এক্সপ্রেস ট্রেনটি টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ উল্লাপাড়া রেলওয়ে স্টেশন হয়ে শান্তাহার, বগুড়া গাইবান্ধা হয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে পরের দিন দুপুর ১২ টায় লালমনিরহাট পৌঁছায়। দীর্ঘ এই ট্রেন যাত্রায় প্রকৃতি ও পরিবেশ দেখে আমাদের অসাধারণ আনন্দ অনুভূত হয়।  বিশেষ করে ট্রেনের ছুটে চলা ঝক ঝকাঝক শব্দ এবং দ্রুত গতিতে সবকিছুকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চকর অনুভূতি দারুণ অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। ভোরের প্রকৃতি, আবহমান গ্রাম বাংলার জনপদ, মাঠ ফসল ও মানুষের সাধারণ জীবনযাপনের এক সচিত্র রূপ ফুটে ওঠে চোখের সামনে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় নিজের মন অজান্তে বলে ওঠে, " অবারিত মাঠ, গগন ললাট, চুমে তব পদধূলি। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি।"দুপুর ১২ টায় আমরা লালমনিরহাট পৌঁছে একটা অটোরিকশা ভাড়া করে কাকিনা বাজার পর্যন্ত যাই। ওখানে একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার গ্রহণ করি। কাকিনা বাজার থেকে একটা সিএনজি ভাড়া করি তিস্তা ব্যারেজ, তিনবিঘা করিডোর, দহগ্রাম ও আঙ্গুর পোতা ছিটমহল এবং বুড়িমারী স্থলবন্দর ঘুরে দেখার জন্য।  সিএনজি চালক আমাদেরকে প্রথমে তিস্তা ব্যারেজ দেখার জন্য নিয়ে যায়। এখানে বলে রাখি, লালমনিরহাট জেলা হেডকোয়ার্টার থেকে এই দর্শনীয় স্থানগুলোর দূরত্ব কমবেশি প্রায় ৯০ কিলোমিটার। জেলা শহর থেকে কাকিনা বাজারের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। এই ২৫ কিলোমিটার পথ আমাদের অটোরিকশা দিয়ে যেতে হয়। লালমনিরহাট থেকে তিনবিঘা করিডোর পর্যন্ত ট্রেনেও যাতায়াত করা যায়। লালমনিরহাট আসতে দেরী হওয়ায়  আমাদের ট্রেনের সময়সূচি মিস হয়।তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় গিয়ে  আমরা তিস্তা সেতু পাড় হই এবং ব্যারেজ পরিদর্শন করি। তিস্তা ব্যারেজ এলাকা মূলত পর্যটন কেন্দ্র। আরও অনেক পর্যটকদেরকে দেখলাম ঘুরে ঘুরে দেখেছে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি। আমরা কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখলাম এবং সবাই মিলে কিছু ছবি তুলে রাখলাম স্মৃতিতে রেখে দেওয়ার জন্য।তিস্তা ব্যারেজ দেখা শেষ হলে  আমরা সোজা তিনবিঘা করিডোর চলে আসি। আমরা যখন তিনবিঘা করিডোর পৌঁছাই তখন বিকাল ৪টা। তিনবিঘা করিডোর দায়িত্বে নিয়োজিত বিজিবির একজন সদস্য কাছে এসে আমাদের পরিচয় জানলো। এবং আমাদেরকে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলো করিডোর এর জায়গাটুকু। যে করিডোর দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করা হয় সেটাই তিনবিঘা করিডোর এবং  ভারতের অংশ।ভারতের এই ক্ষুদ্র করিডোর দিয়ে বাংলাদেশের দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতা ছিটমহলে যেতে হয়৷ আমাদের বহনকারী সিএনজি নিয়েই আমরা করিডোরের ভিতরে প্রবেশ করি। করিডোর থেকে আঙ্গুরপোতা ৯ কিলোমিটার এবং দহগ্রাম ৬ কিলোমিটার। ছিটমহলের ভিতরে বাংলাদেশের শেষ সীমানায় ( শূন্য সীমানা লেখা রয়েছে) চমৎকার একটি মসজিদ রয়েছে। আমরা আসরের নামাজের জন্য এখানে কিছুটা সময় কাটাই। এরপর ছিটমহলের ভিতরে থাকা চা বাগান পরিদর্শন করি।ছিটমহলের মানুষের প্রধান অর্থনৈতিক কাজ কৃষি। ধান পাট শাকসবজি প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হয়। তবে এখানের প্রধান অর্থনৈতিক ফসল হচ্ছে ভুট্টা। চতুর্দিকে শুধু ভুট্টা ক্ষেত। ভুট্টা চাষের ধরণ দেখে মুগ্ধ। কিছু জমির ভুট্টা তুলে ফেলা হয়েছে, কিছু জমিতে ভুট্টা পেকে আছে আবার কিছু জমিতে ভুট্টা মাত্র ধরতে শুরু করেছে। আরও মজার ব্যাপার আছে - কিছু কিছু জমিতে নতুন করে ভুট্টা গাছ বড় হয়ে ওঠছে মাত্র। লিচু বাগান রয়েছে পর্যাপ্ত। আম গাছও আছে প্রচুর। তবে কথা বলে জানা যায় এবার আমের ফলন কম হয়েছে।এখানকার বাড়িঘর পাকা দালান, সেমি পাকা দালান ও টিন দিয়ে তৈরি। রাস্তা পাকা করা হয়েছে অনেকাংশই তবে সরু ও চিকন।তিন বিঘা করিডোর মূলত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত একটি ছোট ভূখণ্ড যার মালিক ভারত। কথা বলে জানা যায় , ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশেকে এটি ইজারা দেওয়া হয়েছে ৯০ বছরের জন্য। এটি লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার সাথে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের সংযোগ স্থাপন করে। তিনবিঘা আয়তনের জায়গা বলেই এর নাম তিনবিঘা করিডোর।  এই করিডোরটি ১৭৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৮৫ মিটার প্রশস্ত।তিনবিঘা করিডোর  ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলা এবং বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্তে  অবস্থিত ভারতের অংশ। এটি দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের বাসিন্দাদের বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগের একমাত্র পথ।  আগে এই তিনবিঘা করিডোর নির্দিষ্ট সময় খোলা থাকতো এবং বন্ধ করে দেওয়া হতো। এখন ২৪ ঘন্টা উন্মুক্ত থাকে।তিনবিঘা করিডোরের ভিতরে বাংলাদেশের দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতার আয়তন হচ্ছে - ১৮.৬৮ বর্গকিলোমিটার। পুরোটা জায়গা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম।  অসম্ভব ভালো লেগেছে তিনবিঘা করিডোরের জীবন ও প্রকৃতি।  দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতা ছিটমহলের এক বোন আমাদের সবাইকে তার ভুট্টা ক্ষেত থেকে চারটি করে কাঁচা ভুট্টা উপহার দেন। উপহারটি ছিল বেশি ভালো লাগার মতো বিষয়।তিনবিঘা করিডোর, দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতা ছিটমহল পরিদর্শন শেষে আমরা চলে যাই বুড়িমারী স্থলবন্দর জিরো পয়েন্ট। সময়টা ছিল ঠিক সন্ধ্যা মুহুর্ত। আমাদের বহনকারী সিএনজি থেকে নেমে এক নজর দেখে নিলাম স্থলবন্দরটিকে। আমরা ফিরে গেলাম বুড়িমারী স্থলবন্দর বাস কাউন্টারে। এস আর পরিবহন থেকে টিকেট সংগ্রহ করি বাড়ি ফেরার। সন্ধ্যা সারে সাতটায় বাসে চড়ে বসি গাজীপুরের উদ্দেশ্যে। ১৮ জুলাই ভোর পাঁচটায় আমরা গাজীপুর ফিরে আসি। চমৎকার কেটেছে ভ্রমণের সময়টুকু।লালমনিরহাট জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক স্থান হচ্ছে তিনবিঘা করিডোর। এই তিনবিঘা করিডোর বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে অবস্থিত একটি স্বতন্ত্র ভূমি যা ভারতের মালিকানাধীন হলেও বাংলাদেশ ইজারার মাধ্যমে যাতায়াতের সুবিধার জন্য ব্যবহার করে আসছে। উত্তরবঙ্গে ভ্রমণকারী পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে তিনবিঘা করিডোর।[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

সালমা আকতার: মানবিক শিক্ষক ও আত্মপ্রত্যয়ী প্রশাসক

বাংলাদেশের একাডেমিক জগতে পদলেহন, সুবিধাবাদ ও স্বার্থের কাছে বিবেক বিকিয়ে দেওয়ার প্রবণতা যখন ক্রমশ এক ধরনের ‘নিয়মে’ পরিণত হয়েছে, তখনও কিছু মানুষ নীরবে প্রমাণ করে গেছেন যে শিক্ষকতা কেবল পেশা নয়, এটি এক গভীর নৈতিক অঙ্গীকার। এই আর্থসামজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তায়ণের সময়েও যাদের জনসম্মুখে মানবিকতা, পেশাগত সততা ও আদর্শের ধারক-বাহক হিসেবে নির্দ্বিধায় উপস্থাপন করা যায়, তাদের সংখ্যা খুবই সীমিত। আমার বিবেচনায়, শিক্ষা-বিজ্ঞানকে বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিন হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে দীর্ঘ ও জটিল পথচলা, সেখানে নেতৃত্বদানকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অল্পসংখ্যক প্রাজ্ঞ শিক্ষকের জীবনগাথা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা জরুরি অধ্যাপক সালমা আকতার (১৯৪৬–২০২৬) তাদের অন্যতম।গত ১৫ই এপ্রিল ২০২৬, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিয়ুন)। তার প্রস্থান কেবল একজন শিক্ষকের তিরোধানের শোক নয়; এটি আমাদের একাডেমিক ও বৌদ্ধিক পরিসরের জন্যও এক গভীর ক্ষতি। মানুষ চলে যান, কিন্তু তাদের আদর্শ, কর্ম ও স্মৃতি থেকে যায়। এ যেন অ্যারিস্টটলীয় ‘গুণভিত্তিক নৈতিকতা’ (ভার্চু ইথিক্স)-এরই এক বাস্তব প্রতিফলন, যেখানে ব্যক্তির চরিত্র ও কর্মই হয়ে ওঠে তার স্থায়ী উত্তরাধিকার। তার অনন্তে যাত্রার এই বেদনাবিধুর সংবাদ শোনার মুহূর্তে স্মৃতির পর্দায় ভেসে ওঠে তার সঙ্গে কাটানো নানা সময়, কথোপকথন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার শিক্ষাদান ও নেতৃত্বের অসংখ্য দৃষ্টান্তের কথা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার জীবন ও কর্মের তাৎপর্য তুলে ধরার ক্ষুদ্র প্রয়াস আমার এই লেখাটি।নানা কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর সঙ্গে আমার রয়েছে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও একাডেমিক সংযোগ। এই প্রতিষ্ঠানের বারান্দা, শ্রেণীকক্ষ, শিক্ষকদের কক্ষ, লাইব্রেরি কিংবা ক্যান্টিন সব মিলিয়ে যে পরিমাণ সময় আমি সেখানে কাটিয়েছি, তা কেবল আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল এক ধরনের বৌদ্ধিক ও মানবিক বিকাশের ক্ষেত্র, সম্পর্কগুলোকে নানা প্রেক্ষাপটে দেখার দুর্লভ অভিজ্ঞতা। এই পরিচিত পরিসরের ভেতরেই আমি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি অধ্যাপক সালমা আকতারকে একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে, যাকে আমি ‘আপা’ বলেই সম্বোধন করতাম। তিনি ছিলেন এক বিরল সমন্বয়ের প্রতিমূর্তি: একদিকে গভীর মমতাময়ী শিক্ষক, অন্যদিকে দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী ও নীতিনিষ্ঠ প্রশাসক। তার ব্যক্তিত্বে এই দুই সত্তার যে সুষম সংমিশ্রণ, তা আমাদের একাডেমিক সংস্কৃতিতে সত্যিই বিরল এবং অনুসরণীয়।তিনি আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক ছিলেন না; তার কাছে সরাসরি পাঠ নেওয়ার সুযোগও আমার হয়নি। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যে কেবল শ্রেণীকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না এই সত্যটি আমি তার ব্যক্তি-চরিত্রের মাধ্যমেই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর সঙ্গে যৌথভাবে একটি প্রকল্প তৈরির কাজ করতে গিয়ে তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় গড়ে ওঠে। সে সময় তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের সূত্রে তার নেতৃত্বের ধরন, ইনস্টিটিউটের উন্নয়নের সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সর্বোপরি তার মানবিক সংবেদনশীলতা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। নেতৃত্ব বিষয়ক আধুনিক তত্ত্বে ‘সেবাধর্মী নেতৃত্ব’ (সার্ভেন্ট লিডাশীপ)-এর যে ধারণা আলোচিত হয় যেখানে নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা প্রদর্শন নয়, বরং অন্যের বিকাশে নিজেকে নিয়োজিত করা, তার কাজের ভেতর আমি শিক্ষাপ্রশাসনে সেই দর্শনের চর্চার এক জীবন্ত প্রতিফলন দেখেছি। তার স্নেহধন্য হয়ে যে দোয়া, সাহস ও প্রেরণা পেয়েছিলাম, সেই কৃতজ্ঞতার বোধ থেকেই আজকের এই লেখার অবতারণা।সালমা আপার কথা মনে পড়লেই প্রথমেই ভেসে ওঠে এক স্নিগ্ধ, মমতাময়ী হাসিমাখা মুখ। তার চোখেমুখে, চলনে-বলনে এবং সামগ্রিক ব্যক্তিত্বে ছিল এক বিরল সুষমা। একদিকে ছিল মায়ের নিঃস্বার্থ মমতা, বড় বোনের স্নেহমিশ্রিত সংযমী শাসন এবং অপরদিকে ছিল একজন দক্ষ প্রশাসকের দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের অপূর্ব সমন্বয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘আবেগিক বুদ্ধিমত্তা’ (ইমোশানাল ইন্টালিজেন্স) অর্থাৎ নিজের আবেগকে সংযত রেখে অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা; তিনি তা স্বাভাবিক সহজাত গুণ হিসেবেই ধারণ করতেন। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিঃশব্দে, আড়াল থেকে অন্যের পাশে দাঁড়াতে জানতেন; প্রচারের আলো নয়, সামষ্টিক কল্যাণই ছিল তার কাজের প্রকৃত প্রেরণা। আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনি যে আন্তরিক সহায়তা ও সাহচর্য দিয়েছেন, তা আজও গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। তার এই মানবিক উপস্থিতিই তাকে কেবল একজন শিক্ষক বা প্রশাসক নয়, বরং নবীনদের জন্য এক পরম আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের ইংরেজি শিক্ষাদানের দক্ষতা উন্নয়নে যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের আওতায় গবেষণা সহযোগী নিয়োগ, তাদের পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ এবং একটি বিশেষায়িত এমফিল প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশ ওপেন ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর সঙ্গে যৌথভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রাথমিক প্রেক্ষাপট তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ স্থাপনের দায়িত্বে ছিলাম আমি। কিন্তু অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক জটিলতা, নীতিগত দ্বিধা এবং নানা অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতার কারণে উদ্যোগটি একপর্যায়ে প্রায় ভেস্তে যেতে বসে। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে অধ্যাপক সালমা আকতারের বিচক্ষণতা, প্রাতিষ্ঠানিক বোধ এবং দৃঢ় নেতৃত্ব পরিস্থিতিকে নতুন দিশা দেয়। সংগঠন-ব্যবস্থাপনা তত্ত্বে যাকে ‘সংকটকালীন নেতৃত্ব’ (ক্রাইসিস লিডারশীপ) বলা হয়, অর্থাৎ সংকটের মধ্যে স্থির থেকে সমাধানের পথ তৈরি করা, তিনি তা নিঃশব্দ দক্ষতায় বাস্তবায়ন করেছিলেন।একইভাবে, ২০১০ সালের শেষের দিকে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড কম্পারেটিভ এডুকেশন (বিএআইসিই)-এর অর্থায়নে একদিনের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করতে গিয়ে যখন আরেক ধরনের জটিলতায় পড়ি, তখনও তিনি আড়াল থেকেই উদ্ধার কর্তার ভূমিকায় অবর্তীণ হয়ে সমাধানের পথ তৈরি করে দেন। তার এই নীরব সহায়তা ছিল না কেবল ব্যক্তিগত সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ; বরং তা ছিল একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন-দর্শনের অংশ, যেখানে ব্যক্তি নয়- কাজ, প্রতিষ্ঠান এবং জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতাই হয়ে ওঠে মুখ্য। তার এই ধরণের দায়িত্বপূর্ণ ‘অদৃশ্য নেতৃত্ব’ (ইনভিজিবল লিডারশীপ) আমাদের একাডেমিক পরিসরে বিরল, অথচ শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনের হাওয়া বইয়ে দিতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তিনি আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন, আমি যেন দেশে ফিরে গিয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করি। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি আমাকে ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো আইইআর-এ শিক্ষক হওয়ার জন্য আবেদন করতে উৎসাহিত করেছিলেন।লভিংয়ের কালচারকে উপেক্ষা করে সালমা আপার সঙ্গে আমার সরাসরি দেখা হয় উপ-উপাচার্য হারুন-অর-রশিদের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সেই সাক্ষাৎকার বোর্ডে। কিন্তু সেই দিনটি আমার জীবনে এক তিক্ত অভিজ্ঞতার উদাহরণ হয়ে আছে। একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে সেখানে উপস্থিত হয়ে আমি সেদিন প্রত্যক্ষ করি এক ভিন্নতর বাস্তবতা তথা একাডেমিক জগতের এমন এক কদর্য রূপ, যেখানে মেধা ও যোগ্যতার বিপরীতে শিক্ষার রাজনীতিকরণে শিক্ষক-রাজনীতির বহুবর্ণিল তথা নীল, সাদা ও গোলাপীর আলোকছটায় পক্ষপাতিত্ব, অদৃশ্য প্রভাব এবং সংঘবদ্ধ অপকৌশল কিভাবে নিলর্জ্জ্ব ও সক্রিয় ভূমিকা রাখে। সেই প্রেক্ষাপটে আমি দেখেছি, একজন দৃঢ়চেতা, নীতিনিষ্ঠ ও ব্যক্তিত্ববান শিক্ষক হিসেবে সালমা আপা কীভাবে সেই প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকেও এক ধরনের অসহায়তার প্রকাশ ঘটাতে বাধ্য হন। এটি কেবল তার ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা ছিল না; বরং আমাদের বৃহত্তর একাডেমিক কাঠামোর অন্তর্নিহিত দুর্বলতার প্রতিফলন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ অভিজ্ঞতা একক কোনো ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জীবনের নানা পর্যায়ে আমি আরও অনেক শিক্ষকের মধ্যে একই ধরনের বেদনাদায়ক অসহায়তা প্রত্যক্ষ করেছি। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমার চিন্তা ও চেতনায় গভীর রেখাপাত করেছে।সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে বলতে গেলে, আমাদের একাডেমিক কালচারের কদর্য উদাহরণগুলো একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়’ (ইনস্টিটিউশানাল ডিকে)-এর লক্ষণ, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তবে একই সঙ্গে শিখনের প্রক্রিয়ায় এসব অভিজ্ঞতা আমাকে নিরাশ করেনি; বরং পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও সচেতন করেছে। ‘দিন বদলের কলাকৌশল’ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা এবং তা বাস্তবে প্রয়োগের প্রতি এক ধরনের নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে। আর এর পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সালমা আপার মতো শিক্ষকদের প্রভাবই সবচেয়ে গভীর। সে যাই হোক, আমার জানামতে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি পরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালীন সর্বদা যোগ্যতা, সততা ও পেশাগত মানদণ্ডকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, অদৃশ্য চাপ এবং নানা বাস্তব প্রতিবন্ধকতা তার সেই প্রয়াসকে সবসময় সফল হতে দেয়নি। তবুও তিনি কখনো নৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেননি, কিংবা হতাশ হয়ে থেমে থাকেননি। বরং এক ধরনের অন্তর্গত দায়বোধ থেকেই তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। ম্যাক্স ওয়েবারের ভাষায় ‘দায়িত্বের নৈতিকতা’ (ইথিক্স অব রিসপন্সিবিলিটি) অর্থাৎ দায়িত্ব পালনের নৈতিক দায় তার পেশাগত জীবনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল।তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭১ সালে অর্থনীতি ও শিক্ষাপ্রশাসনে মাস্টার্স, ১৯৮০সালে যুক্তরাজ্যের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন (বর্তমানে ইউনির্ভাসিটি কলেজ লন্ডনের অংশ) থেকে শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থাপনায় মাস্টার্স এবং ১৯৯৯ সালে ভারতের জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষানীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। সুদীর্ঘ ৪১ বছরের কর্মময় জীবনে (১৯৭৩-২০১৪) তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও শিক্ষাপ্রশাসন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের পদ ছাড়াও নানা গুরুত্বপূর্ণ কমিটির চেয়ার ও সদস্য ছিলেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন কর্মচঞ্চল, প্রাণবন্ত এবং গভীরভাবে দায়বদ্ধ এক মানুষ, যার হৃদয়ে দেশ, মানুষ এবং বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা ছিল। আমার গবেষণা, লেখালেখি কিংবা পেশাগত অগ্রগতির খবর পেলেই তিনি আন্তরিক আনন্দ প্রকাশ করতেন খুদে বার্তায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ইমেইলের মাধ্যমে উৎসাহ জোগাতেন। এই ছোট ছোট প্রেরণাগুলোই একজন তরুণ গবেষক বা শিক্ষকের পথচলায় কত বড় শক্তি জোগাতে পারে তা তিনি গভীরভাবে বুঝতেন। যদিও জীবনের ব্যস্ততা ও ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে গত কয়েক বছরে আমাদের যোগাযোগ কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তবুও তার সেই আন্তরিকতা, স্নেহ এবং নীরব আশীর্বাদ আজও আমার স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে।অবসর গ্রহণের পরও তিনি থেমে থাকেননি বরং তার বৌদ্ধিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বপ্ন আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, বাংলাদেশে শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিক্ষানীতি নিয়ে উচ্চতর গবেষণা ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি পত্রপত্রিকায় লিখেছেন, জনমত গঠনের চেষ্টা করেছেন এবং নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস চালিয়েছেন। তার সেই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পেলেও, এর ভেতরে নিহিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং দূরদর্শিতা আমাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। শিক্ষাতত্ত্ব ও শিক্ষার অর্থনীতির আলোকে বলা যায়, তিনি দেশে একটি ‘জ্ঞানীয় সমাজ’ (নলেজ সোসাইটি) তথা ‘জ্ঞানীয় অর্থনীতি’ (নলেজ ইকোনোমি)-র আবহ তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি। ভবিষ্যতে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, গবেষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য তার এই চিন্তাধারা এক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে- এটাই প্রত্যাশা।শিক্ষা ও শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে তার চিন্তাভাবনা ছিল অভিজ্ঞতানির্ভর, গভীর এবং মানবিক সংবেদনশীলতায় সমৃদ্ধ। দৈনিকে প্রকাশিত ‘শিক্ষক কেন শিক্ষার্থীকে মারবেন?’ শিরোনামের এক লেখায় তিনি শিক্ষকদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ও নৈতিকভাবে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। তার দৃষ্টিতে, কোনো শিক্ষার্থীর আচরণগত সমস্যা থাকলেও তার সমাধান কখনোই সহিংসতার মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং প্রয়োজন সহানুভূতি, সংলাপ, বোঝাপড়া এবং পেশাগত দক্ষতার সুনিপুণ প্রয়োগ। আধুনিক শিক্ষামনোবিজ্ঞানে ‘ইতিবাচক শৃঙ্খলা’ (পজেটিভ ডিসিপ্লিন) এবং ‘শিশুকেন্দ্রিক শিখন-পদ্ধতি’ (চাইল্ড-সেন্টারড প্যাডাগোজি)-এর যে ধারণা গুরুত্ব পায়, তার ভাবনায় তারই সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন শিক্ষকের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীর মানবিক বিকাশ নিশ্চিত করা শুধু তথ্যগত জ্ঞান নয়, বরং নৈতিকতা, সহমর্মিতা, ধৈর্য ও সহনশীলতার মতো গুণাবলির বিকাশ ঘটানো।ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সম্ভবত (আমি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত নই একদিন এমন কিছু ইঙ্গিত করেছিলেন; স্মৃতি থেকে বলছি, ভুল তথ্যও হতে পারে) নিঃসন্তান ছিলেন; কিন্তু তার শিক্ষার্থীরাই যেন ছিল তার বিস্তৃত পরিবার। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে তিনি আপন সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন, তাদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে নিজেকে নিবেদিত রাখতেন। তার কাছে শিক্ষকতা ছিল কেবল একটি পেশাগত পরিচয় নয়, বরং দেশ ও সমাজের জন্য সৎ, দক্ষ ও মানবিক নাগরিক গড়ে তোলার এক গভীর নৈতিক অঙ্গীকার। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই দার্শনিক পাওলো ফ্রেইরের ‘স্বাধীনতার অনুশীলন বা চর্চা হিসেবে শিক্ষা’ (এডুকেশন এজ এ প্রেক্টিস অব ফ্রীডোম)-এর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ, যেখানে শিক্ষা মানুষকে মুক্ত ও সচেতন করে তোলার হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকদের যথাযথ প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ এবং ক্রমাগত পেশাগত উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।অধ্যাপক সালমা আকতারের জীবনের শেষ অধ্যায়ও ছিল একইভাবে কর্মমুখর ও চিন্তাশীল। অবসরের পরেও তিনি যে বৌদ্ধিক সক্রিয়তা বজায় রেখেছিলেন, তা প্রমাণ করে শিক্ষকতা তার কাছে পেশা নয়, বরং আজীবনের সাধনা। তার মৃত্যুতে আমরা হারালাম এক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, আত্মপ্রত্যয়ী শিক্ষাপ্রশাসক এবং মানবিক মূল্যবোধে উজ্জ্বল এক বিরল ব্যক্তিত্বকে। তবে বাংলাদেশে শিক্ষার উন্নয়নের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তার স্বপ্ন, তার আদর্শ এবং তার নৈতিক অবস্থান আমাদের জন্য এক স্থায়ী আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। তিনি নিজেই যে আহ্বান রেখে গেছেন প্রথম আলোয় প্রকাশিত উপরে উল্লেখিত তার সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবাদী লেখাটিতে, ‘আমরা যেন ভালো শিক্ষক হই এবং তার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি’, সেই আহ্বানই হোক তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানোর সর্বোত্তম উপায়। তার স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে তখনই, যখন আমরা ব্যক্তিগত ও প্রতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়েই শিক্ষাকে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্যই মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রায়োগিক করার প্রয়াসে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারব।[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

রাজনীতি নয়, অর্থনীতিই গুরুত্বপূর্ণ

সম্প্রতি ওয়াশিংটনে আয়োজিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর বসন্তকালীন বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদল যোগ দিয়েছিল, মনে হচ্ছে, চুক্তিবদ্ধ ঋণের অবশিষ্ট ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার আইএমএফ দেবে না। ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের এই ঋণ চুক্তি হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৮০০ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি করা হয়। মোট ঋণ ৫.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে আওয়ামী লীগ সরকার নিয়েছে ২.৩ বিলিয়ন, অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েছে ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফ ঋণের কিস্তি ছাড় না করায় বাধ্য হয়ে বিএনপি সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে; মাত্র দেড় মাসেই বিএনপি সরকার ব্যাংক থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ২০২৬ সনের দেড় মাস ইউনূস সরকারের, বাকি দেড় মাস বিএনপি সরকারের- এই তিন মাসে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এত অল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার কারণ হচ্ছে সরকারের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি। চলতি অর্থবছরের জুলাই ফেব্রুয়ারি সময়ে শুল্ক ও কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা; ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমদানি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুটোই কম হয়েছে, তাই রাজস্ব আদায়ে বিরাট ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের রাজত্বে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূস ভাষণ দিয়ে দেশবাসীকে গুরুত্ব সহকারে অবহিত করেছিলেন। ব্যাপকহারে দেশি-বিদেশি ঋণ গ্রহণের কারণেও আওয়ামী লীগ সরকার তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিল, তখন অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা ছিল বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে ঋণের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী ও বিএনপি সরকারের আমলে ঋণ গ্রহণের আনুপাতিক মাত্রা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের চেয়েও বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ৩ লাখ ২৮ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে। অথচ বিগত ১৫ বছরের মধ্যে কোন একক অর্থবছরেই সরকারের গৃহীত ঋণ আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি ছিল না। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, অন্তর্বর্তী সরকার এত বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে খরচ করল কোথায়? বোঝা যাচ্ছে, দেশ চালানো হয়েছে ঋণের টাকা দিয়ে, অথচ দেশের এমন করুণদশার মধ্যেও মোহাম্মদ ইউনূস বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন। সম্ভবত জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য পরিশোধে জন্য বিএনপি সরকার ঋণ নিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা সমাধানে সরকারের দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বর্তমানে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২-১০৪ ডলার; কিন্তু ২০২২ সনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তেলের মূল্য ছিল ব্যারেল প্রতি ১৩৯ ডলার, তখন কিন্তু তেল নিয়ে এত বিশৃঙ্খলা ˆতরি হয়নি।অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সাফল্য ছিল বর্ধিত রেমিট্যান্স। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ বন্ধ করতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। এছাড়াও ২০১৮ সনের নির্বাচনে কারচুপির ব্যাপকতায় প্রবাসীরাও আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর তুষ্ট ছিল না, তাই অধিকাংশ প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে অর্থ প্রেরণে ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুণ্ডির অবৈধ পথ বেছে নেয়। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ না আসায় রিজার্ভ কমতে থাকে। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ব্যাংকিং চ্যানেলে পুনরায় অর্থ প্রেরণ শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে অধিক পরিমাণে অর্থ প্রেরণের আরেকটি কারণ ডলারের সঙ্গে টাকার অধিকতর অবমূল্যায়ন। উপরন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমদানি হ্রাস পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার খরচও কমে যায়, রিজার্ভে হাত দিতে হয়নি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সন্তোষজনক থাকা সত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের মব কালচারের কারণে দেশ ছিল অস্থিতিশীল এবং অর্থনীতি ছিল চরম অবহেলিত। মবকে সরকার তাদের প্রেসার গ্রুপ হিসেবে বিবেচনা করায় ছাত্রদের পাশাপাশি পেশাজীবীরাও তাদের দাবি নিয়ে মিছিল-মিটিং করতে উৎসাহী হয়ে উঠেছিল।রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকায় দেশে বিনিয়োগ হয়নি, বিনিয়োগ না হওয়ায় অর্থনীতির সম্প্রসারণ হয়নি। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে যায়; অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় হাজার হাজার লোক কর্মহীন ও বেকার হয়ে যায়। ইউনূস অর্থনীতির ছাত্র, তারপরও তিনি দেশের অর্থনীতির চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন বেশি।আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ধরার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসেই দেশের নামকরা অর্থনীতিবিদদের নিয়ে কমিশন গঠন করলো, তারা ৪০০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র প্রকাশ করে জানান দিল যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। দুর্নীতি আর অর্থ পাচার ওতপ্রোতভাবে জড়িত, দুর্নীতি হলে অর্থ পাচার হবেই। কিন্তু ওই সকল জাঁদরেল অর্থনীতিবিদেরা ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের হিসাব পেলেন কোথায় ? ঘুষ, দুর্নীতির লেনদেন হয় গোপনে, সেই অর্থ পাচার হয় কৌশলে, সরকারের অজান্তে। এখনো অর্থ পাচার হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে, এর রোধ করা যেমন কঠিন, হিসাব করাও কঠিন। ওভার ইনভয়েস-আন্ডার ইনভয়েস করে ব্যবসায়ীরা অর্থ পাচার করছে, দুর্নীতিবাজ আর ঘুষখোরের টাকা তাদের বিদেশ-একাউন্টে ঘুষদাতাই জমা করে দিচ্ছে। এছাড়াও চিকিৎসার নিমিত্তে অর্থ পাচার হয়, বিদেশে ছাত্র-ছাত্রীর পড়ার খরচের জন্য অর্থ পাচার হয়, বিদেশ ভ্রমণে অর্থ পাচার হয়। অন্য দেশে নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিরাও তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি বিক্রি করে অবৈধ পন্থায় বিদেশে অর্থ নিয়ে যাচ্ছে। পাচার করা অর্থ প্রেরত আনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুধু প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়নি, এর জন্য প্রচুর অর্থও ব্যয় করা হয়েছে। প্রথমদিকে অধ্যাপক ইউনূসের গুছিয়ে কথা বলার চাণক্য কৌশল জনগণকে বিমোহিত করেছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে জনগণ বুঝতে পারলো সব অর্থহীন বাগাড়ম্বর।ইউনূস সরকার মব সৃষ্টি ব্যতীত আর কিছুই করেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মোহাম্মদ ইউনূস ও তার পরিচালনাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা হয়েছিল। সারা পৃথিবীর শতাধিক নামকরা ব্যক্তির তরফ থেকে মোহাম্মদ ইউনূসকে মামলার হয়রানি থেকে মুক্তি দিতে অনুরোধ করা হলেও আওয়ামী লীগ সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। তাই সম্ভবত ইউনূসের প্রতিহিংসা এত তীব্র ছিল যে, প্রধান উপদেষ্টা হয়েও তিনি গ্রামে গ্রামে লুকিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের লোকদের ধরার জন্য মবকে উষ্কে দিয়েছিলেন। তার চেয়ে বরং আওয়ামী লীগ আমলের কথিত ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজদের ধরা হলে জনগণ খুশি হতো, জনগণ খুশি হতো যদি পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা হতো। তারা কাজের কাজ কিছুই করেনি, বরং অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কর্মকাণ্ড দ্বারা আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মকাণ্ডের সাফাই গেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রকল্পে অধিক হারে খরচের অভিযোগ ওঠেছিল; বিভিন্ন দেশে একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে কত টাকা খরচ হয় তার সঙ্গে তুলনা করে অধিক খরচের চিত্রও আঁকা হয়েছিল; কিন্তু জনগণ হতাশ, কারণ আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন প্রকল্পে তাদের আমলে সম্পন্ন কাজে যে পরিমাণ খরচ করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকার বাকি অংশ শেষ করতে আনুপাতিক হিসেবে খরচ আরও বেশি করেছে, কোন কোন প্রকল্পে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বৃদ্ধির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকারের ৬৫টি উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ বাড়িয়েছে ৭ লক্ষ ৯৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের কথিত দুর্নীতি অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড দ্বারা চাপা দেওয়া হয়েছে। একই কাজে বেশি খরচ করার জন্য এখন অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ˆতরি হয়েছে।রামু-কক্সবাজার রেল সংযোগ এবং কক্সবাজারের রাস্তায় নির্মিত কর্ণফুলী টানেলের প্রায়োরিটি নেই মর্মে আওয়ামী লীগ আমলেও প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু বাকি সবগুলো মেঘা প্রকল্প অপরিহার্য হিসেবে এখন বিবেচিত হচ্ছে। জ্বালানি তেল আনার জন্য ভারত থেকে যে পাইপলাইন আওয়ামী লীগ আমলে বসানো হয়েছিল তার অপরিহার্যতা বিএনপি সরকার প্রমাণ করেছে।জ্বালানি তেলের সরবরাহ বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্ব এখন বিপ্লবী আনু মুহাম্মদও সম্ভবত অবনত চিত্তে স্বীকার করবেন। অন্তর্বর্তী সরকার অকর্মক ও বিদ্বেষী না হলে আওয়ামী লীগ আমলে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশখালীতে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং প্রকল্পটি বিএনপির জন্য এই মুহুর্তে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিত। গভীর সমুদ্রে ভাসমান জাহাজ থেকে পাইপের সহায়তায় তেল খালাস করে কয়েক মাসের মজুত গড়ে তোলার এই প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০২৪ সনে, কিন্তু ইউনূস সরকার তা চালু করেনি। চীনের যে কোম্পানির মাধ্যমে এই প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়েছে, তাদের মাধ্যমে চুক্তি মোতাবেক চালু করা হলে তা ২০২৪ সনেই চালু করা সম্ভব ছিল, যথা সময়ে চালু হলে বিএনপির আমলে তেলের ক্রাইসিস এত তীব্র হতো না। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় পাইপলাইনে তেল আনার ব্যবস্থাও আওয়ামী লীগ সরকার করে গেছে, যা উদ্বোধন হয় ২০২৫ সনে। একইভাবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালটি কেন চালু হচ্ছে না তাও অজ্ঞাত।ঘুষ-দুর্নীতি একটুও কমেনি। তারপরও পেছনে তাকানোর সময় নেই, বিএনপি সরকারকে রাজনৈতিক বিবেচনা পরিহার করে দলমত নির্বিশেষে সবার শিল্পকারখানা চালু করার ব্যবস্থা নিতে হবে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে, কর ফাঁকি বন্ধ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে, করজালের বাইরে থাকা করযোগ্য মানুষকে করের আওতায় আনতে হবে। এছাড়াও রাজস্ব প্রশাসনে বিরাজমান ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে তাদের দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও মনোযোগী হতে হবে বিএনপি সরকারকে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

সংকটে হাওরাঞ্চলের কৃষি

হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জীবন-জীবিকার সবচেয়ে বড় মাধ্যম ধান চাষ। ফসল রক্ষা করতে না পারা মানে হাওরের কৃষকদের জীবন-জীবিকার চরম অনিশ্চয়তা। বৃষ্টির পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ার বিষয়টি হাওরে এবার বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যার কিছুটা প্রাকৃতিক, আর বাকি অংশ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সামঞ্জস্যের অভাবজনিত। হাওরের পরিকল্পনাগত সমস্যাগুলো চাইলে সমাধান করা যায়। হাওরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এমন যে এখানে সবসময় পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে হয়। কৃষি অর্থনীতির সম্ভাবনা বিবেচনায় হাওর শাসন ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় সংবেদনশীলতা জরুরি।প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে হাওরের কৃষকদের বরাবরই নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে বৃষ্টির মৌসুমে সংকট তীব্র হয়, কারণ অতিরিক্ত জলাবদ্ধতায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবারও বৃষ্টির পানিতে সুনামগঞ্জের অনেক হাওরের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতীতে বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকে বহুবার ফসল নষ্ট হয়েছে। তবে এবার সমস্যাটি কিছুটা ভিন্ন।সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার ৪২টি হাওরের প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়। এই ফসল রক্ষায় প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ভাটির অঞ্চলে একটি কথা প্রচলিত আছে—বাঁধের জন্য যে পরিমাণ টাকা বরাদ্দ হয়, তা ধাতব মুদ্রায় রূপান্তর করে বাঁধ দিলে তা ডুববে না। তবুও অধিকাংশ বছরই বাঁধ তলিয়ে যায়। কোনো কোনো বছর ভাগ্য সহায় হলে রক্ষা পায়। হাওর পাড়ের অনেক বাঁধই স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা সম্ভব। বাঁধের ওপর স্থায়ী বসতি ও পর্যটনকেন্দ্রও গড়ে তোলা যেতে পারে।নেত্রকোণার উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এ বৃষ্টির পানি পাহাড়ি ঢল হয়ে জেলার নদ-নদীতে নামছে। ফলে অকাল বন্যার আশঙ্কায় বাম্পার ফলনেও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন চাষিরা। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান কাটার পরামর্শ দিয়েছে। হাওরের জমিতে ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে তা জমিতে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। আগে থেকেই বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা রয়েছে, তার ওপর উজানের ঢল নামলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।এদিকে নেত্রকোণার অনেক হাওড়ে পানি থাকায় ক¤^াইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটতে সমস্যা হচ্ছে। শ্রমিক সংকটও রয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, পানি বাড়তে থাকলে ২০১৭ সালের মতো অকাল বন্যায় ফসল হারাতে হতে পারে।স্থানীয় কৃষক, উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলার খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দা আংশিক হাওরাঞ্চল। এখানে একমাত্র বোরো ফসলের ওপরই নির্ভর করে কৃষকদের সারা বছরের সংসার ব্যয়, চিকিৎসা, শিক্ষা ও সামাজিক অনুষ্ঠান। জেলায় ১৩৪টি হাওরের মধ্যে খালিয়াজুরিতে রয়েছে ৮৯টি। আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় এ বছর ১৩৮ কিলোমিটার অস্থায়ী (ডুবন্ত) বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩১ কোটি টাকা, যা প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির ফসল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটা ও শুকানোর ব্যস্ততা চলছে। আগাম বন্যা ও শিলাবৃষ্টির আশঙ্কায় পহেলা বৈশাখ থেকেই কৃষকরা ধান ঘরে তোলা শুরু করেছেন। ব্রি-২৮, ব্রি-৮৮ ও ব্রি-৯৮ জাতের ধান কাটা হচ্ছে। কিষান-কিষানিরা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।তবে এ সময়ে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা কম দামে ধান কিনতে ভিড় করছেন। ফলে অনেক কৃষক উৎপাদনমূল্যের নিচে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান কেনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।কিশোরগঞ্জ জেলায় এ বছর ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৯৫ হাজার ২০৯ টন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন পর্যন্ত হাওরাঞ্চলের প্রায় ১২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।বর্তমান পরিস্থিতিতে হাওরের কৃষকদের শুধু প্রকৃতিনির্ভর না থেকে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। যেমন—হাওর পাড়ের বাঁধ স্থায়ীভাবে নির্মাণ, নদী খননের মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি। পাশাপাশি সরকারকে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।আসন্ন বাজেটে হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন ও সংস্কৃতি রক্ষায় বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। পলি জমে জলাশয় ভরাট হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই প্লাবনের ঝুঁকি বাড়ছে—ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান করা প্রয়োজন। পানি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ সমন্বিতভাবে নেয়া দরকার, যাতে সহায়তা বণ্টনে কোনো অসংগতি না থাকে। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে বিকল্প কর্মসংস্থান—যেমন নৌযানভিত্তিক পরিবহন, কুটির শিল্প, হাঁস পালন ইত্যাদি—গড়ে তোলা প্রয়োজন।সমন্বিত পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমেই হাওরাঞ্চলের এই দীর্ঘদিনের সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।[লেখক: সাবেক ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]

ভিডিও আরও দেখুন

সিরিজ জয়ের মিশনে বাধা হচ্ছে বৃষ্টি-জলাবদ্ধতা

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে দাপুটে জয়ের পর বাংলাদেশের সামনে এখন সিরিজ জয়ের মিশন। আজ বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুর ২টায় চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি জয় পেলেই তিন ম্যাচের সিরিজ নিশ্চিত করবে স্বাগতিকরা। তবে এতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বৃষ্টি। টানা তিনদিন ভারী থেকে মাঝারি বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। যার ফলে নিউজিল্যান্ড তাদের ঐচ্ছিক অনুশীলন ইনডোরে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। সেখানেও অংশ নেন মাত্র কয়েকজন ক্রিকেটার। অন্যদিকে স্বাগতিক বাংলাদেশ দল অনুশীলন করেনি, বিশ্রাম বেছে নিয়েছে। প্রথম ম্যাচে মিডল অর্ডারের দৃঢ়তায় ছয় উইকেটের জয় তুলে নেওয়ায় আত্মবিশ্বাসে ভরপুর বাংলাদেশ। তবে উদ্বেগ রয়েছে ওপেনিং জুটি নিয়ে। ওই ম্যাচে পাওয়ারপ্লেতে ব্যাট হাতে ছন্দ খুঁজে পাননি সাইফ হাসান ও তানজিদ তামিম।  বিপরীতে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটাররা রীতিমতো ঝড় তুলে খেলেছে। পাওয়ার প্লেতে দারুণ শুরুর পর শেষ পর্যন্ত ১৮২ রানে থামে নিউজিল্যান্ডের ইনিংস। তবে এই স্কোরকে দুইশর নিচে আটকে রাখতে বড় ভূমিকা ছিল মেহেদী হাসান ও রিশাদ হোসেনের। ফলে মঙ্গলবার বিসিবির ভিডিও বার্তায় এই ম্যাচ জয়ের বড় কৃতিত্ব বোলারদেরই দিয়েছেন অফস্পিনার মেহেদী, ‘শুরুতেই আমাদের কিছুটা সংগ্রাম করতে হয়েছে। তবে ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসি। রিশাদের ওভারগুলো খুব ভালো ছিল, আর শেষ দিকে আমি দুই ওভারে ভালো কামব্যাক করি। এই দুই স্পেলে আমরা মাঝের ওভার অনেক ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। যদি সেই সময়টা আরেকটু ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারতাম, তাহলে হয়তো আরও ২০ রান বেশি হজম করতে হতো।’ব্যাটিং-সহায়ক উইকেটে বোলারদের আধিপত্য বিস্তার করা কিছুটা কঠিন। সেই কঠিন কাজে নিউজিল্যান্ডের চেয়ে এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ। মেহেদীর মতে, ‘যদি উইকেট ঠিকমতো পড়া করা যায়, তাহলে আমি বলবো বোলিংয়ের দিক থেকে আমরা নিউজিল্যান্ডের চেয়ে ভালো করেছি। গত এক-দেড় বছরে স্পিনাররা সত্যিই ডমিনেটিং পারফরম্যান্স করে আসছে। বিদেশের কন্ডিশনেও রিশাদ, নাসুম বা আমি যেই সুযোগ পাচ্ছে, ভালো করছে।’

সিরিজ জয়ের মিশনে বাধা হচ্ছে বৃষ্টি-জলাবদ্ধতা
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৪২ জন