বিরতির বোতাম টিপে ট্রিগারে আঙুল
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আজকাল যেন এক অদ্ভুত যন্ত্র—যেখানে বিরতি মানে থেমে যাওয়া নয়, বরং আরও নিখুঁতভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি| বাইরে থেকে বোতাম চাপা হয়েছে, যুদ্ধ থেমেছে—এমন একটি দৃশ্য ˆতরি করা হয়| কিন্তু ভেতরে ভেতরে আঙুল তখনও ট্রিগারে, চোখ লক্ষ্যবস্তুতে স্থির| এই ˆদ্বত বাস্তবতাই আজকের তথাকথিত যুদ্ধবিরতির প্রকৃত পরিচয়|যুদ্ধবিরতি শব্দটি শুনলেই সাধারণ মানুষ ¯^স্তির নিশ্বাস ফেলে| মনে হয়, অন্তত কিছু সময়ের জন্য গোলাগুলি থামবে, আকাশে আর আগুন ঝরবে না, শিশুরা হয়তো ভয়ের মধ্যে নয়, ঘুমের মধ্যে ডুবে যাবে| কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়| এখানে যুদ্ধবিরতি মানে অনেক সময়ই যুদ্ধের ভাষা বদলানো—শব্দ কমে, কিন্তু সংকেত বাড়ে; বিস্ফোরণ কমে, কিন্তু প্রস্তুতি তীব্র হয়|মূলত এই যুদ্ধবিরতি হলো এক ধরনের নীরব বিস্ফোরণ| বাইরে থেকে শান্ত, ভেতরে চাপা উত্তেজনা| এটি অনেকটা সেই নদীর মতো, যার ওপরের পানি স্থির, কিন্তু নিচে স্রোত তীব্রভাবে বইছে| আর সেই স্রোত কখন ভাঙন ডেকে আনবে, তা বোঝার আগেই তীর ভেঙে পড়ে|এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক সেই নদীর মতোই—উপর থেকে কূটনৈতিক সৌজন্য, ভেতরে জমে থাকা সন্দেহ| প্রত্যেকে নিজেদের অবস্থানকে শক্ত করতে চায়, কিন্তু কেউই পুরোপুরি বিশ্বাস করতে রাজি নয়| ফলে যুদ্ধবিরতি এখানে একটি সমাধান নয়; এটি একটি হিসাবি বিরতি, যেখানে সবাই নিজেদের পরবর্তী চালের হিসাব কষছে|ইসরায়েল এই খেলায় যেন এক সতর্ক প্রহরী—যার কাছে নিরাপত্তা মানে সর্বোচ্চ সতর্কতা| তার দৃষ্টিতে হুমকি কখনোই সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয় না; বরং প্রতিটি বিরতির মধ্যেই নতুন হুমকির সম্ভাবনা জন্ম নেয়| তাই যুদ্ধবিরতি তার কাছে কখনোই নিশ্চিন্ততার প্রতীক নয়; এটি বরং আরও বড় প্রস্তুতির সময়|অন্যদিকে ইরান এই সমীকরণে এক ˆধর্যশীল খেলোয়াড়| সে সরাসরি সংঘর্ষের চেয়েও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে বিশ্বাসী| তার লক্ষ্য শুধু একটি যুদ্ধ জেতা নয়, বরং পুরো অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করা| ফলে যুদ্ধবিরতির সময়টাকে সে ব্যবহার করে নিজের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে, মিত্রদের সংগঠিত করতে এবং প্রতিপক্ষের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে|আর যুক্তরাষ্ট্র—সে যেন এই জটিল নাটকের অদৃশ্য পরিচালক| কখনও সামনে আসে, কখনো আড়ালে থাকে, কিন্তু দৃশ্যের গতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যায়| তার কাছে এই অঞ্চল কেবল একটি সংঘাতের ক্ষেত্র নয়; এটি একটি বৃহত্তর কৌশলগত মানচিত্রের অংশ, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে বিশ্ব রাজনীতির ওপর|এই তিন শক্তির মধ্যে যুদ্ধবিরতি তাই অনেকটা তিনটি আলাদা ঘড়ির সময় মেলানোর চেষ্টা| প্রত্যেকের সময় আলাদা, গতি আলাদা, উদ্দেশ্যও আলাদা| ফলে সাময়িকভাবে সময় মিললেও, কিছুক্ষণ পরেই আবার অসামঞ্জস্য দেখা দেয়|এই অসামঞ্জস্যের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যায় প্রক্সি যুদ্ধের মধ্যে| লেবানন, সিরিয়া, ইরাক—এই অঞ্চলগুলো যেন মূল সংঘাতের প্রতিধ্বনি বহন করে| এখানে সরাসরি বড় শক্তিগুলো না লড়লেও, তাদের ছায়া লড়াই চালিয়ে যায়| ফলে একটি জায়গায় যুদ্ধবিরতি হলেও অন্য জায়গায় সংঘাত থামে না; বরং নতুন রূপে জেগে ওঠে|হয়তো এই জন্যই বিশ্লেষকরা মনে করেন এটি যেন একটি বিশাল অর্কেস্ট্রা—যেখানে একজন সঙ্গীত থামালেও অন্যরা বাজিয়ে যায়| ফলে পুরো সঙ্গীত কখনোই থামে না, শুধু সুর বদলায়| যুদ্ধবিরতি এখানে সেই সুরের সাময়িক পরিবর্তন মাত্র|অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই যুদ্ধবিরতির গুরুত্ব অনেক| তেলের বাজার, বাণিজ্যিক রুট, ˆবশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা—সবকিছুই এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল| ফলে যুদ্ধবিরতি অনেক সময় মানবিক প্রয়োজনের চেয়ে অর্থনৈতিক চাপ থেকেই আসে| কিন্তু যখন অর্থনীতি ও রাজনীতি একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে যায় |অন্যভাবে বলা যায়, এই যুদ্ধবিরতি হলো এক ধরনের কৌশলগত ঘুম| চোখ বন্ধ, কিন্তু মস্তিষ্ক জেগে আছে| সবাই বিশ্রামের ভান করছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পরবর্তী আঘাতের পরিকল্পনা চলছে| এই ঘুম ভাঙতে খুব বেশি শব্দের প্রয়োজন হয় না—একটি ছোট উত্তেজনাই যথেষ্ট|এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ| তারা এই খেলায় অংশগ্রহণ করে না, কিন্তু ফলাফল ভোগ করে| তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়, তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাদের জীবনের নিরাপত্তা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে| যুদ্ধবিরতি তাদের জন্য সাময়িক ¯^স্তি নিয়ে আসে, কিন্তু সেই ¯^স্তি কখনোই স্থায়ী হয় না|প্রশ্ন হলো—এই যুদ্ধবিরতি কতটুকু সত্যিকার অর্থে কার্যকর পারে? ¯^ল্পমেয়াদে হয়তো কিছুটা উত্তেজনা কমাতে পারে, আলোচনার সুযোগ ˆতরি করতে পারে| কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর সফলতা নির্ভর করে আস্থার ওপর| আর সেই আস্থা যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে কোনো চুক্তিই দীর্ঘস্থায়ী হয় না| আসলে এই যুদ্ধবিরতি অনেকটা সেই পরীক্ষার মতো, যেখানে সবাই পাস করতে চায়, কিন্তু কেউই নিয়ম মানতে চায় না| ফলে ফলাফল আগেই অনুমান করা যায়—সংঘাতের পুনরাবৃত্তি|শেষ পর্যন্ত, এই যুদ্ধবিরতি কোনো শেষ কথা নয়; এটি একটি চলমান গল্পের একটি অধ্যায় মাত্র| এখানে প্রতিটি বিরতি নতুন সূচনার ইঙ্গিত দেয়, প্রতিটি শান্তির ঘোষণা নতুন উত্তেজনার সম্ভাবনা ˆতরি করে| এটি এক ধরনের সেতু, যার এক প্রান্তে যুদ্ধ, অন্য প্রান্তে অনিশ্চিত শান্তি—আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববাসী, অপেক্ষায়| মধ্যপ্রাচ্যের এই অন্তহীন বাস্তবতায় তাই বিরতির বোতাম কখনোই পুরোপুরি কার্যকর হয় না| কারণ বোতাম চাপার হাতটি যতক্ষণ ট্রিগার থেকে সরছে না, ততক্ষণ শান্তি কেবল একটি শব্দ—বাস্তবতা নয়|শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই থেকে যায়—এই বিরতি কি সত্যিই থামার জন্য, নাকি আরও নিখুঁতভাবে আঘাত করার জন্য? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে এই যুদ্ধবিরতি আসলে শান্তির নয়, বরং সংঘাতের আরও পরিশীলিত প্রস্তুতির জন্য | আর তখনই বোঝা যাবে , এখানে যুদ্ধ থামে না—শুধু মাঝে মাঝে বিরতির অভিনয় করে|[লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]