সংবাদ
চার খুনের দুই আসামি ঢাকায়, স্পার্ম মিললে মোড় ঘুরবে

চার খুনের দুই আসামি ঢাকায়, স্পার্ম মিললে মোড় ঘুরবে

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া মহল্লায় সাবেক স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাসহ চারজনকে হত্যার মামলায় রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক দুই আসামি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মহানগর ডিবি পুলিশের ওসি জিন্নাত আলী রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে দুই আসামিকে রিসিভ করে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে রংপুর ত্যাগ করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও ডিবি পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী।এদিকে, হত্যাকাণ্ডের পর নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাসা থেকে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের আলামত হিসেবে উদ্ধার করা ৩৬ ধরনের আইটেম রোববার রাতে ঢাকায় সিআইডির দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলেও জানা গেছে।এর আগে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ওসি জিন্নাত আলী আদালতের অনুমতি নিয়ে হত্যা মামলার দুই আসামি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পুলিশি পাহারায় ঢাকার উদ্দেশে নিয়ে যান। আগামীকাল সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুই আসামিকে সিআইডির দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে তাদের ডিএনএ পরীক্ষা করানো হবে।এদিকে, পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজন খুনের ঘটনায় ময়নাতদন্তের সময় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও কন্যা অগামী চক্রবর্তীর শরীরে যে স্পার্ম (শুক্রাণু) পাওয়া গিয়েছিল, তা তাদের হত্যার আগে দুই নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। সে কারণেই দুই আসামির ডিএনএ পরীক্ষার জন্য তাদের ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ময়নাতদন্তের সময় পাওয়া স্পার্ম যদি আসামিদের ডিএনএর সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে মামলার মোড় ঘুরে যাবে। ফলে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে চার খুনের ঘটনা বলে প্রচার করা হয়েছে, সেটি ছাড়াও হত্যার আগে দুই নারীকে ধর্ষণের বিষয়টিও সামনে আসবে।এ ব্যাপারে রংপুর মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও ডিবি পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, আসামিদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সেই সঙ্গে হত্যার পরপরই উদ্ধার হওয়া ৩৬ ধরনের আলামত পরীক্ষার জন্য রোববার রাতে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়া মহল্লার বাসা থেকে স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, কন্যা অগামী চক্রবর্তী ও শিশু পুত্র আয়াশের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।এ ঘটনায় পুলিশ দুই আসামি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে। পরেরদিন ২৩ আগস্ট দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় তারা চারজনকে একে একে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে বলে স্বীকার করে।তবে দুই আসামির পক্ষে চারজনকে এভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে নিহতের স্বজন, আইন বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করছেন না। এ ব্যাপারে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
৬ ঘন্টা আগে

মতামতমতামত

আনন্দময় শৈশব চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই

রবিবারের ভোরের সূর্য, চোখ মেলে তাকালেই মনটা আঁকুপাঁকু করে উঠত। সপ্তাহজুড়ে অপেক্ষা ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবারের জন্য। সকাল দশটায় খেলাঘর আসরের আবৃত্তি প্রশিক্ষণ। আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, অসমাপ্ত গল্প সমাপ্তকরণ আরও কত কিছু। কত অসমাপ্ত গল্প সমাপ্ত করেছি কিন্তু যে সমাজে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছি সে সমাজের অসমাপ্ত গল্পের উপসংহারে পৌঁছানোর পথটি মনে হয় অনন্তে মিলিয়ে গেছে।আমাদের শৈশব-কৈশোর ছিল সোনায় মোড়ানো। ছুটির দিনে মাঝে মাঝে শরীরচর্চা বিশেষ করে ব্রতচারী নৃত্য। “চল কোদাল চালাই, ভুলে মনের বালাই, ঝেড়ে অলস মেজাজ, হবে শরীর ঝালাই...।” এই ব্রতচারী নৃত্যের প্রবর্তক যে ছিলেন শ্রদ্ধেয় গুরুসদয় দত্ত, যার বাড়ি ছিল সিলেটের জকিগঞ্জের বীরগ্রামে, সে তথ্য জানা ছিল না। তাঁর গৌরবময় জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলাম। ব্রতচারী নৃত্যে অংশগ্রহণ করেই আনন্দ। ছন্দে, ছন্দে শরীরচর্চা, দেহ মনকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। আমাদের শৈশবে মুকুল ফৌজের কার্যক্রম কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। খেলাঘর আসর, চাঁদের হাট, কচিকাঁচার মেলা, শাপলার মেলা ছিল দারুণ সক্রিয়। শহরের এ পাড়ায় খেলাঘর তো অন্য পাড়ায় কচিকাঁচার মেলা। এভাবে চাঁদের হাট, শাপলার মেলা সহ নাম না জানা অনেক শিশু, কিশোর সংগঠন সারা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। সব শিশুদের জন্য দ্বার অবারিত। সৃজনশীল কিছু শেখার বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ দেনা-পাওনার বাইরের বিষয়। বাণিজ্য তখনো প্রবেশ করতে পারেনি এসব সৃষ্টিশীল কার্যক্রমে। যারা শেখাতেন তারা মনে করতেন পরের প্রজন্মকে তৈরি করে যাওয়া তাদের কর্তব্য। যারা শিখত তারা প্রাণের আনন্দে মনপ্রাণ ঢেলে দিত সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।ষাট, সত্তর এমন কী আশির দশক পর্যন্ত এসব শিশু সংগঠনের নামের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না, এরকম সত্যিকার শিক্ষিত মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার ছিল আমাদের দেশে। শৈশব-কৈশোরের কোনো না কোনো পর্বে এইসব শিশু-কিশোর সংগঠনের কোনোটার সদস্য কিংবা তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন না, এরকম মানুষের সংখ্যাও প্রগতিশীল, সংস্কৃতিলগ্ন সমাজে খুব কম ছিল বলে মনে করি। বাংলাদেশের সমাজ, ইতিহাস, উত্থান এবং জাতিগঠনের পেছনে এই সংগঠনসমূহ ও তাদের সভ্যদের গুরুত্বপূর্ণ, গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে। অথচ এখনকার শিশু, কিশোর, তরুণ এমনকি মাঝবয়সীদেরও অনেকেই এই সংগঠনসমূহের অস্তিত্ব ও তাদের কার্যকলাপ বিষয়ে একেবারেই অবগত নয় বলেই আমার ধারণা। এর কারণ, বাস্তবে এখন আর এই সংগঠনগুলোর তেমন কোনো জোরালো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।খেলাঘরের মূল স্লোগান ছিল, “আনন্দময় শৈশব চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই।” শিশুদের জন্য এত সুন্দর এবং যথাযথ স্লোগান খুব কম শুনেছি। আনন্দময় শৈশব না থাকলে কী হয়। সমাজ সুস্থ থাকে না। সমাজ অসুস্থ এবং অস্থির থাকলে শিশুরা দায়িত্বহীন, বিকল মস্তিষ্কের মানুষ হিসেবে বাড়তে থাকে। সচেতন মানুষেরা কী কিছুটা টের পাচ্ছেন। হাজার হাজার শিশু নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। সৃষ্টিশীলতায় মগ্ন থেকে জীবন ধারণ তো দূরের কথা, কোথায় কোন দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে ছোট, ছোট শিশুরা সে খবর, রাষ্ট্র, সমাজ কেউ জানে না। আর একটি বিষয় ভাবলে অবাক হতে হয়, নাগরিক সমাজ কিংবা রাজনৈতিক দলগুলো নির্লিপ্ত, উদাসীন। উদাসীন মানুষ কিংবা সমাজ, সংগঠনের মনের কথা পাঠ করা খুব কঠিন। এই যে অগণন শিশু নানা ভাবে ধর্ষিত হচ্ছে, এর জন্য জোরালো, দলবদ্ধ প্রতিবাদ কর্ণকুহরে এখনও পৌঁছেনি। আসলে এ দেশে শিশুরা ভালো নেই, তাদের নিরাপত্তাও নেই, আনন্দ-বিনোদনের ব্যবস্থাও নেই। শিশু কেন, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা কি সুস্থুস্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারছে, যাতে তারা দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠতে পারে? সমাজে যে প্রবল অস্থিরতা ও মারাত্মক নিষ্ঠুরতার প্রবাহ চলছে, তা সমাজ ও রাষ্ট্রের অবহেলায় দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা এক গভীর সামাজিক ব্যাধি। বড় ভয় হয়, আমাদের এগোনোর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে।শৈশব থেকে যে শিশু সৃষ্টিশীলতার বিকাশের অবাধ সুযোগ পেয়ে থাকে সে শিশু আকাশের মতো বড় হয়ে ওঠে। ওই যে সুনির্মল কুমার বসুর অসাধারণ সেই কবিতা, “আকাশ আমায় শিক্ষা দিলে উদার হতে ভাইরে/ কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাইরে।” জীবনের শুরুতেই উদার মনোবৃত্তি ধারণ করে সবার কাছে শিক্ষা নিয়ে মানবিক মানুষ হওয়ার শিক্ষা নেওয়ার ব্রত ধারণ করা; সেই শিক্ষা এবং ব্রত কোথায়।কে না জানে যে মানুষের মানবিক হয়ে ওঠার জন্য তার সুকুমারবৃত্তি চর্চার এবং সুকুমার কলা উপভোগের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। নাগরিকের সব পেশাগত দক্ষতা, বৃত্তিমূলক কাজের উৎকর্ষ অর্জন নিশ্চয়ই করতে হবে, মৌলিক শিক্ষাতেও তাকে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। কিন্তু তার চাপে একজন সংবেদনশীল দায়িত্ববান মানুষ হয়ে ওঠায় কোনো ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। আমরা সবাই উল্টোরথে মনে হয় উল্টো পথেই চলছি।সময় পাল্টেছে, বাস্তবতা পাল্টেও গেছে, পাল্টে গেছে ভূগ্রাম। জীবনের প্রয়োজন, চাওয়া-পাওয়া ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন রকম হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক শিশু সাহায্য সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘চুরি হয়ে যাওয়া শৈশব’-বিষয়ক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন বা তারও বেশি শিশুর শৈশব নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা বাংলাদেশে চরম পর্যায়ে। এখানে চলছে সন্তানকে জোরজবরদস্তি করে কিছু একটা বানানোর অসম প্রতিযোগিতা। শহরের শিশুদের খেলার জায়গা নেই, তাই শিশুরা মুঠোফোন গেমসে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মার্কিন জার্নাল ‘পেডিয়াট্রিক্স’-এ প্রকাশিত একটি জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব শিশু প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভি দেখে বা কম্পিউটারে খেলার জন্য স্ক্রিনের সামনে বসে থাকে, তারা অন্য শিশু যারা এসব করে না তাদের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বেশি সমস্যায় ভোগে। তারা বেশি আবেগপ্রবণ হয় তাই তাদের সবকিছুই অতিরিক্ত পর্যায়ে চলে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে স্মার্টফোন, আইফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, ডিজিটাল ক্যামেরার প্রতি বড়দের দেখে শিশুদেরও আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। শিশুদের স্ক্রিন আসক্তি নিয়ে ‘গ্লো কিডস : হাউ স্ক্রিন এডিকশন ইস হাইজেকিং আওয়ার কিডস অ্যান্ড হাউ টু ব্রেক দ্য ট্রেন্স’ নামে বই লিখেছেন মার্কিন সাইকোথেরাপিস্ট ও আসক্তি বিশেষজ্ঞ ড. নিকোলাস কারদারাস। তিনি স্ক্রিন এডিকশনকে ‘নতুন শতাব্দীর মাদক’ বলে উল্লেখ করেছেন।প্রশ্ন হলো আমরা কী প্রযুক্তির বিকাশ রোধ করতে পারব। প্রযুক্তি তাঁর উৎকর্ষ নিয়ে এগিয়ে যাবে, কোন কালেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তির চলার পথে কেউ বাঁধ নির্মাণ করতে পারেনি। তাহলে কী করা প্রয়োজন প্রযুক্তির সংস্কৃতি সংলগ্ন ব্যবহারের পথ খুঁজতে হবে। প্রযুক্তি তো সারা বিশ্বের মানুষ ব্যবহার করছে। কোন পথে হাঁটলে “ঠাকুরমার ঝুলি”, রূপকথা, দস্যু বনহুর, হাসন, লালন এবং তাদের মানবিক বাণীকে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় প্রবেশ করানো যায়। কীভাবে অন্যান্য শিক্ষার সঙ্গে আমাদের গাজীর গানকে যুক্ত করা যায়। “নানা বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ, জগত ভরমিয়া দেখালাম একই মায়ের পুত” বিশ্বচরাচর ঘুরে আসলে এরকম মানবিক বাণী কী খুঁজে পাওয়া যাবে, জানি না। প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংযোগ না ঘটলে কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে কাজটা কঠিন। বহু বছরে বেশ কয়েকটি প্রজন্ম সংস্কৃতি-চিন্তা ও বোধ ছাড়াই বড় হয়েছে; গান শোনে না, নাটক দেখে না, বই পড়ে না এমন মানুষ স্কুল শিক্ষকতায় এত বেশি যুক্ত রয়েছেন যে তাঁদের পক্ষে কিশোর তরুণদের হারাতে বসা সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানো কঠিন হবে বলে মনে হয়।শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সংযোগ ঘটানোর কথা আমরা বহুকাল ধরে বলে আসছি। আশার কথা, বর্তমান সরকার গুরুত্বটা অনুধাবন করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে কাজটা কঠিন। একে বহু বছরে বেশ কয়েকটি প্রজন্ম সংস্কৃতি-চিন্তা ও বোধ ছাড়াই বড় হয়েছে; গান শোনে না, নাটক দেখে না, বই পড়ে না এমন মানুষ স্কুল শিক্ষকতা এত বেশি রয়েছেন যে তাঁদের পক্ষে কিশোর তরুণদের হারাতে বসা সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তারপরও অভিভাবকদেরও একই অবস্থা—সুকুমারবৃত্তির চর্চায় সন্তানদের উৎসাহিত করার সক্ষমতা তাঁদেরও তো নেই। এ অবস্থায় দেশে আজ একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ সময়ের দাবি। মানুষের মানবিক অভিযাত্রা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

কৃষির পরিবর্তনের সঙ্গে বদলাক বিএডিসি

বাংলাদেশের কৃষি বদলে গেছে। বদলে গেছে কৃষকের চাহিদা, উৎপাদনব্যবস্থা, বাজারের ধরন এবং কৃষির ঝুঁকি। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ, রোগবালাই, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে কৃষি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। একই সঙ্গে কৃষক এখন শুধু পরামর্শ চান না; তিনি চান উন্নতমানের বীজ, সময়মতো সার, নির্ভরযোগ্য সেচ, আধুনিক প্রযুক্তি, তথ্য, পরামর্শ এবং দ্রুত সেবা।এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় দেশের কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন—বিএডিসিকেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হবে। তাই এ প্রজন্মের কৃষকের চাহিদা পূরণে বিএডিসির সংস্কার এখন আর উচ্চবিলাসী নয়, সময়ের অপরিহার্য দাবি। বিএডিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ, সার ব্যবস্থাপনা, সেচ উন্নয়ন, কৃষি উপকরণ বিতরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অবদান সুদীর্ঘ।কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কাঠামো, জনবল, প্রযুক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। পুরোনো কাঠামো দিয়ে নতুন প্রজন্মের কৃষকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা কঠিন। ফলে প্রয়োজন এমন একটি আধুনিক ও গতিশীল বিএডিসি, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, মাঠের বাস্তবতা বুঝবে এবং কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো সেবা পৌঁছে দিতে পারবে। বিএডিসির সংস্কার বলতে কোনোভাবেই শুধু জনবল কমানো, পদ বিলুপ্ত করা কিংবা সাংগঠনিক কাঠামো সংকুচিত করাকে বোঝানো উচিত নয়। বরং সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কাজের গতি বাড়ানো, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন, মাঠপর্যায়ে ক্ষমতায়ন এবং দক্ষ জনবলকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো।কৃষির মতো মৌসুমনির্ভর ও জরুরি খাতে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের ওপর। বীজ, সার বা সেচের ক্ষেত্রে এক ঘণ্টার বিলম্বও অনেক সময় একটি মৌসুমের উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই বিএডিসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও ফলাফলভিত্তিক করা প্রয়োজন। বিএডিসির সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এর অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনবল। এই শক্তি শুধু কর্মকর্তা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মচারী, দক্ষ টেকনিশিয়ান, মাঠকর্মী, কারিগরি জনবল এবং কর্মকর্তাদের সম্মিলিত দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের মাঠ অভিজ্ঞতার মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিহিত।দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষি উপকরণ, বীজ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনায় কাজ করতে গিয়ে এই জনবল যে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা কোনো কাগুজে সাংগঠনিক কাঠামো দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই সংস্কারের নামে এই অভিজ্ঞ জনশক্তিকে অবমূল্যায়ন করা বা অকার্যকর করে দেওয়া হবে আত্মঘাতী। অভিজ্ঞ জনবলকে বাদ দিয়ে নয়, তাঁদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটিয়েই ভবিষ্যতের বিএডিসি গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে সার সরবরাহ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রে উদ্বেগ ও আলোচনা দেখা যাচ্ছে।এই বাস্তবতায় বিএডিসির নন-ইউরিয়া সার ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। ডিএপি, টিএসপি ও এমওপিসহ নন-ইউরিয়া সার আমদানি ও সরবরাহে বিএডিসি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে আসছে। সার ব্যবস্থাপনার সাফল্য শুধু কত টন সার আমদানি করা হলো, তার ওপর নির্ভর করে না; প্রকৃত সাফল্য হলো প্রয়োজনের সময়ে, প্রয়োজনীয় স্থানে, প্রয়োজনীয় পরিমাণে এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষকের কাছে সার পৌঁছে দেওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়, জাহাজীকরণ, বন্দরে খালাস, সংরক্ষণ, অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা বিবেচনা এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহ পুরো প্রক্রিয়ায় দক্ষতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।ভবিষ্যতে সার ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। চাহিদা নিরূপণ, মজুত ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ও মাঠপর্যায়ে বিতরণে সমন্বিত পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গেলে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা আরও বাড়বে। কারণ কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সামান্য ভুল বা বিলম্বও অনেক সময় উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিএডিসির বীজ ব্যবস্থাপনাতেও একইভাবে নতুন চিন্তার প্রয়োজন। জলবায়ু সহনশীল, উচ্চফলনশীল, রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতের বীজ উৎপাদন, উন্নতমানের প্লান্টিং ম্যাটেরিয়াল ও সরবরাহকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।আধুনিক বীজ প্রযুক্তি, টিস্যু কালচার, বীজ পরীক্ষাগার, সংরক্ষণ প্রযুক্তি, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। কৃষকের হাতে শুধু বীজ পৌঁছে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়; সেই বীজের মান, বিশুদ্ধতা, অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ও উপযোগিতা নিশ্চিত করাও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অংশ। এছাড়াও যুক্ত হয়েছে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বৃহৎ পরিসরে চারা সরবরাহ।সেচ ব্যবস্থাপনাতেও সময়ের দাবি অনুযায়ী পরিবর্তন প্রয়োজন। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং অঞ্চলভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সৌরশক্তি, স্মার্ট সেচ, সেন্সরভিত্তিক প্রযুক্তি এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা কৃষির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এছাড়াও সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখনন এবং নবায়নযোগ্য সেচ প্রযুক্তি।বিএডিসির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাও সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। একজন দক্ষ কর্মীকে শুধু একটি পদ দিয়ে মূল্যায়ন করলে তাঁর প্রকৃত সক্ষমতার মূল্যায়ন হয় না। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, কারিগরি দক্ষতা, মাঠপর্যায়ের জ্ঞান এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে সাংগঠনিক পরিকল্পনায় যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি তরুণ ও নতুন প্রজন্মের জনবলকে আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও নতুন কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে একটি আন্তঃপ্রজন্মীয় দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তুলতে হবে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের শক্তির সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতের বিএডিসির অন্যতম প্রধান সম্পদ।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রেরণা। বিএডিসিতে সরকারি চাকরির মতো পূর্ণাঙ্গ পেনশন ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর-পরবর্তী নিয়মিত আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিএডিসিতে গ্র‍্যাচুইটি সংক্রান্ত বিধান রয়েছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পেনশন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি কর্মীদের জন্য একটি পৃথক বাস্তবতা তৈরি করে। তাই মানবসম্পদ সংস্কারের অংশ হিসেবে কর্মীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যদি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সম্পর্কে আস্থাশীল থাকেন, তাহলে তাদের কর্মপ্রেরণা, দায়িত্ববোধ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যও আরও শক্তিশালী হয়। এ কারণে বিএডিসির নতুন সাংগঠনিক কাঠামো বা অর্গানোগ্রাম প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু পদসংখ্যা কমানো বা বাড়ানোর হিসাব যথেষ্ট নয়। কোন কাজের জন্য কত জনবল প্রয়োজন, কোন পর্যায়ে কী ধরনের কারিগরি দক্ষতা দরকার, মাঠপর্যায়ে কতটা ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন, কোথায় নতুন পদ সৃষ্টি করা দরকার এবং কোথায় প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে পদমর্যাদা, ক্যারিয়ার প্রগ্রেশন, প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব ও জবাবদিহির মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিএডিসিকে শুধু একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনের কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। কৃষকের হাতে সময়মতো মানসম্মত বীজ, সার ও সেচ পৌঁছানো মানে শুধু একটি সরকারি সেবা দেওয়া নয়; এর সঙ্গে দেশের খাদ্য উৎপাদন, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ জড়িত। তাই বিএডিসির সংস্কার হতে হবে কৃষককেন্দ্রিক, উৎপাদনমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর ও ভবিষ্যতমুখী। সংস্কারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষ কমানো নয়; প্রয়োজনীয় মানুষকে সঠিক কাজে, সঠিক দক্ষতায় এবং সর্বোচ্চ কার্যকারিতার সঙ্গে কাজে লাগানো। প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি রক্ষা করে নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং তরুণ জনশক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কথা শুনতে হবে, তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব দিতে হবে এবং কৃষকের প্রয়োজনকে সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।এখন প্রশ্ন হলো বিএডিসি কি পুরোনো কাঠামোর ভারবহন করে ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা হারাবে, নাকি সময়ের দাবি মেনে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলবে? উত্তরটি শুধু বিএডিসির জন্য নয়, দেশের কৃষির ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি যদি আধুনিক হয়, কৃষক যদি পরিবর্তিত হন, প্রযুক্তি যদি প্রতিনিয়ত এগিয়ে যায়, তাহলে কৃষির সহায়ক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও একই গতিতে এগিয়ে যেতে হবে। তাই এখন সময় এসেছে বাস্তবভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক ও দূরদর্শী সংস্কারের। বিএডিসিকে ছোট করার সময় নয়—এ প্রজন্মের কৃষকের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণে বিএডিসিকে আরও শক্তিশালী, দক্ষ, অভিজ্ঞতানির্ভর, প্রযুক্তিনির্ভর ও গতিশীল করে গড়ে তোলার সময় এখন। পুরোনো কাঠামোয় ভবিষ্যতের কৃষি নয়; প্রয়োজন ভবিষ্যতের কৃষির জন্য নতুন বিএডিসি।[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)]

আদিবাসী: ভাষা-সংস্কৃতি ও ভূমির অধিকার চাই

আদিবাসীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি ও নানা কর্মসূচি চলছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের উন্নয়নের নামে কাজ করছে। দেশি-বিদেশি দাতাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থও আসছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের সুফল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বড় অংশের কাছে কতটা পৌঁছেছে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ব্যবহার করে অন্যরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার ও জীবনমানের পরিবর্তন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে হয়নি।এ অবস্থায় আদিবাসীদের নিজেদেরই সামনে আসতে হবে। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, শিক্ষা ও জ্ঞানকে সমন্বিত করে বিশ্বের কাছে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে হবে। নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যও তাদের আরও সংগঠিত হতে হবে। অন্যের সহানুভূতির ওপর নির্ভর করে কোনো জনগোষ্ঠীর স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়।বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যেও আদিবাসীদের অধিকার ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়। ২০০৩ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আদিবাসীদের দেশের সমান মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বলেছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে আদিবাসীদের ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি আদিবাসীদের উন্নয়নে তাদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষকেরাও বহুবার বলেছেন, তাদের মানবাধিকার নিশ্চিত না করে দারিদ্র‍্য বিমোচন বা উন্নয়নের কথা বলা অর্থহীন। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের প্রতিটি পর্যায়ে আদিবাসীদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন।গণমাধ্যমেও আদিবাসীদের বিষয় যথাযথভাবে উঠে আসে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভূমি দখল, নির্যাতন, উচ্ছেদসহ নানা ঘটনা ঘটলেও অনেক সময় তা জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে না। ফলে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও আদিবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সীমিত। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ, নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার এখনো যথেষ্ট নয়। অথচ একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা তার অস্তিত্ব রক্ষার সঙ্গেই সম্পর্কিত।আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের কিছু দাবি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির আইনগত অধিকার, বেদখল হওয়া জমি পুনরুদ্ধার, ছিন্নমূলদের পুনর্বাসন, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা, প্রতিটি জেলায় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, নির্যাতন বন্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা, পৃথক মন্ত্রণালয় এবং ভূমি অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা। এসব দাবি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত অবস্থান প্রয়োজন।দুঃখজনক হলো, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো আদিবাসীদের অধিকারের কথা বললেও পরে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে আদিবাসীদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।আদিবাসীদের উন্নয়ন কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি তাদের নাগরিক ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। তাদের উন্নয়নের নামে প্রকল্প গ্রহণ করে তাদের বাইরে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। তাদের নিজেদের অংশগ্রহণেই উন্নয়নের পরিকল্পনা করতে হবে। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি ও পরিচয় রক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।বাংলাদেশের বৈচিত্র‍্যই দেশের শক্তি। তাই আদিবাসীদের পিছিয়ে রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দূর করতে হবে। লোকদেখানো বক্তব্য নয়, আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগই এখন প্রয়োজন।[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

একটি আইফোন কি জীবনের চেয়েও বড়

অপ্রতিমের মৃত্যু শুধুই একটি ফোনের গল্প নয়। মানুষ, বাজার, মর্যাদা, বৈষম্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে এক ভয়ংকর প্রশ্ন। অপ্রতিমের বাবা শোকে পাথর হয়ে প্রশ্ন করেছেন—“সামান্য একটা আইফোনের জন্য ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হলো?” এই প্রশ্নটির ভেতরে আটকে আছে পুরো ঘটনার ভয়াবহতা।তবে একটি ফোন; বিনিময়ে একটি শিশুর জীবন— এই প্রশ্নটি আরও গভীর। একটি আইফোন কি সত্যিই জীবনের চেয়ে বড় হয়ে গেছে, নাকি গভীর সামাজিক অসুখের দৃশ্যমান প্রতীক, যেখানে মানুষের মূল্য ক্রমশ তার মানবিকতার বদলে তার সম্পদ, ভোগক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা ও দৃশ্যমান সাফল্য দিয়ে মাপা হচ্ছে?অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়। এটি সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়। একটি ফোনের দাম আর একটি জীবনের মূল্য এক জিনিস নয়। একটি আইফোনের বাজারমূল্য যতই হোক, তার সঙ্গে একটি মানুষের জীবনের কোনো অর্থনৈতিক তুলনা সম্ভব নয়। মানুষের জীবনকে টাকার অঙ্কে মাপা যায় না।প্রশ্নটি আজ সামনে আসার কারণ হচ্ছে, অর্থনীতি আমাদের অদ্ভুত এক বাস্তবতা শিখিয়েছে। বাজারে কিছু জিনিসের দাম আছে ঠিকই, তবে সব কিছুর মূল্য কিন্তু নেই। একটি ফোনের দাম নির্ধারিত হয় তার উৎপাদন খরচ, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন, সরবরাহব্যবস্থা, ব্র্যান্ড, বিপণন, মুনাফা, কর ও বাজারের চাহিদাসহ বহু বিষয়ের মাধ্যমে। কিন্তু একটি শিশুর জীবনের কোনো ‘বাজারদর’ নেই। তার মূল্য অর্থনৈতিকভাবে বিচারও করা সম্ভব নয়। যা অন্তর্নিহিত মানবিক মূল্য। সভ্যতার মূল শিক্ষাও এখানেই। বাজারের মূল্য আর মানুষের মূল্য এক নয়। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন বাজারের মূল্যবোধ মানুষের নৈতিক মূল্যবোধকে গ্রাস করতে থাকে।আইফোন একটি প্রযুক্তিপণ্য। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক প্রতীকও। বিখ্যাত মার্কিন অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী থর্সটেইন ভেবলেনের ‘প্রদর্শনমূলক ভোগ’-এর ধারণাটি এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। মানুষ অনেক সময় কোনো বস্তু শুধু ব্যবহারিক প্রয়োজনের জন্য কেনে না; সেই বস্তুটি তার সামাজিক অবস্থান, রুচি, সামর্থ্য বা মর্যাদার সংকেতও বহন করে।যেমন একটি দামি গাড়ি শুধু যাতায়াতের যন্ত্র নয়। একইভাবে দামি ঘড়ি শুধু সময় দেখায় না, ব্র্যান্ডের পোশাকও শুধু শরীর ঢাকে না। তাই একটি আইফোন শুধু ফোন নয়, এর পেছনে পড়ে থাকে বড় একটা সামাজিক গল্প। এসব বস্তু কখনো কখনো সামাজিক ভাষায় বলে—‘আমি কে।’ অর্থাৎ পণ্যটি তখন ব্যবহারিক বস্তু থেকে ‘মর্যাদার প্রতীক’-এ পরিণত হয়।এখানে অপ্রতিমের ঘটনাটি আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। যে সমাজে বস্তু সামাজিক মর্যাদার সংকেত হয়ে ওঠে, সেই সমাজে সেই বস্তু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও কি কখনো অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হয়ে উঠতে পারে? এক কথায় উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, পারে।তবে আইফোনকে সরাসরি অপ্রতিম হত্যার কারণ বলা যাবে না। কারণ একটি দামি ফোন দেখা আর সেটি পাওয়ার জন্য হত্যাকাণ্ড ঘটানোর মাঝখানে অপরাধপ্রবণতা, সুযোগ, সিদ্ধান্ত, সামাজিক পরিবেশ, আইন প্রয়োগসহ বহু স্তর রয়েছে। যার মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই শহরে কেউ এমন একটি ফোন ব্যবহার করে যার দাম একজন নিম্নআয়ের মানুষের বহু মাসের আয়ের সমান। আবার অন্য কেউ সেই ফোনটিকে দেখে নিজের অক্ষমতার প্রতীক হিসেবে। এখানেই তৈরি হতে পারে “আপেক্ষিক বঞ্চনা”। নিজের জীবনকে কেউ কেবল নিজের অবস্থার সঙ্গে নয়, অন্যের অবস্থার সঙ্গেও তুলনা করতে শুরু করে।আমার নেই, তার আছে; সে পারছে, আমি পারছি না; সে সম্মান পাচ্ছে, আমি পাচ্ছি না; তার জীবন সফল, আমার জীবন ব্যর্থ —এসব তুলনা সবসময় যে অপরাধ তৈরি করে তা নয়। তবে তীব্র সামাজিক বৈষম্য, সীমিত সুযোগ, ভঙ্গুর সামাজিক সুরক্ষা, অপরাধী সংস্কৃতি, মাদক, সহিংসতার অভিজ্ঞতা আর দুর্বল সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যখন এই বঞ্চনাবোধ যুক্ত হয়, তখন ঝুঁকি বাড়তে পারে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শিশু ও কিশোর সহিংসতা বিষয়ক বিশ্লেষণেও দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য, বেকারত্ব, মাদক, সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ, দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ও দুর্বল আইন প্রয়োগকে বিভিন্ন স্তরের ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।অর্থাৎ অপ্রতিমের হত্যাকে শুধু ‘লোভী অপরাধীর কাজ’ বললে আমরা হয়তো অপরাধীকে ধরতে পারব, কিন্তু অপরাধের সামাজিক পরিবেশটি বুঝতে পারব না।আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রভাবশালী তাত্ত্বিক এমিল ডুর্খেইমের “অ্যানোমিয়া” ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। সহজ বাংলায়—সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যখন মানুষের আকাঙ্ক্ষা, আচরণ ও বাস্তবতার সঙ্গে তাল হারিয়ে ফেলে, তখন এক ধরনের নৈতিক-সামাজিক শূন্যতা তৈরি হয়।  যেমনটি আমরা কোনো তরুণদের বলি—সফল হও; কিন্তু কখনও বলি না, সফলতার অর্থ আসলে কী? আবার বলে বসি, বড় হও; অথচ, বড় হওয়ার মাপকাঠি কী, সেটাই ব্যাখ্যা করি না। ঠিক একইভাবে আমরা বলি, দামি ফোন রাখো, ভালো গাড়ি চালাও, ভালো বাড়িতে থাকো। বলি না, ভালো মানুষ হও।সাফল্যের এই দৃশ্যমান প্রতীকগুলো নৈতিক সাফল্যের জায়গা দখল করতে পারে। ফলে অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের সেই প্রশ্নই করে— আমরা সন্তানদের শুধুই সাফল্যের ভাষা শেখাচ্ছি, অথচ জীবনের মূল্য শেখাচ্ছি না? প্রশ্ন আসে, সন্তানদের শিক্ষা কি শুধুই চাকরির জন্য?এখানেই হাজির হয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রশ্ন। আমাদের শিক্ষার বড় অংশ এখনও পরীক্ষার ফল, জিপিএ, ভর্তি পরীক্ষা, চাকরি, আয়—এসবের চারপাশে ঘোরে। বলছি না এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়।  কিন্তু একটি শিশুকে কি আমরা কখনও শেখাই—কেন অন্য মানুষের জীবনকেও সম্মান করতে হবে? রাগ হলে কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়? প্রত্যাখ্যান কীভাবে সামলাতে হয়? লোভ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়? অন্যের সম্পদ দেখে হীনম্মন্যতা বা ঈর্ষা হলে কীভাবে তা মোকাবিলা করতে হয়? ডিজিটাল জগতে প্রলোভন ও অপরাধ থেকে কীভাবে নিজেকে দূরে রাখতে হয়? সহিংসতা কখনও সমস্যার সমাধান নয়—এই শিক্ষা কি আমরা দিচ্ছি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও কিশোর সহিংসতা প্রতিরোধে জীবনদক্ষতা, রাগ নিয়ন্ত্রণ, দ্বন্দ্ব সমাধান, সামাজিক দক্ষতা ও স্কুলভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ শিক্ষা শুধু কীভাবে উপার্জন করব, তা শেখালেই হবে না। শিক্ষাকে শেখাতে হবে—কীভাবে মানুষ হব।সরলীকরণের প্রশ্ন হচ্ছে, প্রযুক্তি কি অপরাধ তৈরি করে? এখানে প্রযুক্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও ভুল। মূলত, আইফোন কোনো হত্যাকারী তৈরি করে না।  স্মার্টফোন নিজেও অপরাধী নয়।প্রযুক্তি মানুষের সক্ষমতা বাড়ায়। সেই সক্ষমতা ভালো কাজেও ব্যবহার করা যায়, অপরাধেও।আজ অপ্রতিমের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজই তদন্তকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে এবং সেই সূত্রে ফোন উদ্ধার হয়েছে।  অর্থাৎ প্রযুক্তি একই সঙ্গে ঝুঁকি ও প্রতিরোধের হাতিয়ার।  সমস্যা তাই প্রযুক্তিতে নয়; প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটি কী ধরনের?এখানে আইফোনের আরেকটি ভয়ংকর দিক হচ্ছে, এটি ‘মূল্যবান বস্তু’ থেকে ‘লক্ষ্যবস্তু’ হয়ে যেতে পারে। একটি দামি ও সহজে বহনযোগ্য পণ্য অপরাধের বাজারে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। এখানে অর্থনীতির খুব সরল একটি সূত্র কাজ করে। বেশি দাম, সহজে বহনযোগ্য, সহজেই বেচাকেনা- সেখান থেকে অপরাধের লক্ষ্য। তবে এখানে শুধু শুধু পণ্যের দাম দায়ী নয়।  প্রশ্নটি হচ্ছে—অপরাধী কি মনে করছে সে সহজে পার পেয়ে যাবে?আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? চুরি করা ফোনের বাজার আছে কি? চুরি করা পণ্য শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? অপরাধীর ঝুঁকি কতটা? অপরাধের সম্ভাব্য লাভ ও শাস্তির সম্ভাব্য ক্ষতির মধ্যে কোনটি বেশি? এগুলো নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অপরাধতত্ত্বের প্রশ্ন।এখানে রাষ্ট্রতত্ত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ দার্শনিক টমাস হবসের সামাজিক চুক্তির ধারণায় রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক যুক্তি হলো—মানুষ যেন পরস্পরের বিরুদ্ধে অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতায় না যায়। আধুনিক রাষ্ট্রের শক্তি এখানেই যে, ব্যক্তিগত প্রতিশোধের বদলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।একজন মানুষের ফোন চুরি হয়েছে—সে নিজে বিচার করবে না। একজন মানুষ প্রতারিত হয়েছে—সে নিজে শাস্তি দেবে না। একজন মানুষ অপমানিত হয়েছে—সে খুনি হয়ে উঠবে না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বলবে—অপরাধ হয়েছে। তদন্ত হবে। প্রমাণ সংগ্রহ হবে। বিচার হবে।এই ব্যবস্থা দুর্বল হলে মানুষের কাছে অপরাধের সম্ভাব্য লাভ ও শাস্তির ভয়—দুটির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সহিংসতার সামাজিক ঝুঁকির মধ্যে দুর্বল শাসনব্যবস্থা, দুর্বল আইন প্রয়োগ, দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ও অপর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।তাই অপ্রতিমের হত্যার পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ‘খুনি ধরেছি’ বলায় শেষ নয়। রাষ্ট্রকে এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে খুন করার আগে অপরাধী জানবে—ধরা পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিচার এড়ানোর সুযোগ ক্ষীণ।বিবর্তনতত্ত্ব আমাদের আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য শেখায়। মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা নতুন নয়। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ খাদ্য, আশ্রয়, সঙ্গী, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা—সবকিছুর জন্য প্রতিযোগিতা করেছে। সামাজিক মর্যাদার সংকেতও মানবসমাজে নতুন নয়। অর্থাৎ মর্যাদার প্রতিযোগিতা বা সামাজিক অবস্থানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানবসমাজের একেবারে নতুন আবিষ্কার নয়।কিন্তু আধুনিক ভোক্তা অর্থনীতি এই প্রতিযোগিতাকে অভূতপূর্ব মাত্রায় দৃশ্যমান করেছে।সামাজিকমাধ্যম আবার সেই দৃশ্যমানতাকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। আগে আপনি জানতেন আপনার প্রতিবেশীর বাড়ি কত বড়। এখন আপনি একই দিনে শত মানুষের গাড়ি, ফোন, বাড়ি, ভ্রমণ, পোশাক, জীবনযাপন দেখতে পারেন। ফলে তুলনার ক্ষেত্রটি স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক হয়ে গেছে। মানুষের পুরোনো মর্যাদা-প্রতিযোগিতা পেয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির অসীম প্রদর্শনক্ষেত্র। বিপদ এখানেই।  অপ্রতিম আমাদের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি রেখে গেছে। অপ্রতিমের হত্যার বিচার অবশ্যই হতে হবে। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত হতে হবে। যারা দায়ী, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের নিজেদেরও বিচার করতে হবে। আমরা সন্তানকে কী শেখাচ্ছি? দামি ফোন রাখলে তুমি সফল, নাকি মানুষকে সম্মান করলে তুমি সফল? আমরা শিক্ষাকে কী বানাচ্ছি? শুধু উপার্জনের যন্ত্র নাকি মানুষ হওয়ার প্রশিক্ষণ? আমরা অর্থনীতিকে কী শেখাচ্ছি? আরও বেশি ভোগ নাকি ন্যায্য সুযোগ ও মর্যাদা? আমরা প্রযুক্তিকে কী বানাচ্ছি? মানুষের সময় ও মনোযোগ দখলের যন্ত্র, নাকি— জ্ঞান, নিরাপত্তা ও মানবিক সংযোগের মাধ্যম?আমরা রাষ্ট্রকে কী হিসেবে চাই? ঘটনার পর খুনি ধরুক নাকি অপরাধের আগে এমন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করুক, যেখানে অপরাধ করার ঝুঁকি বেশি এবং মানুষের জীবন নিরাপদ?অপ্রতিমের মৃত্যুর সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা হয়তো এটাই—আইফোনের দাম আছে। মানুষের জীবনের দাম নেই—কারণ মানুষের জীবনের মূল্য আছে।দাম আর মূল্য এক জিনিস নয়। বাজার কোনো পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে পারে। রাষ্ট্র কোনো অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করতে পারে। অর্থনীতি আয়-ব্যয়ের হিসাব করতে পারে। প্রযুক্তি মানুষের সময় মাপতে পারে। কিন্তু মানুষের মর্যাদার হিসাব কোনো বাজার, কোনো অ্যালগরিদম, কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো রাষ্ট্র কিংবা কোনো ফোন দিয়ে করা যায় না। ১৩ বছরের অপ্রতিমের জীবন আমাদের সেই মৌলিক সত্যটিই আবার মনে করিয়ে দিল। একটি ফোন হারিয়ে গেলে নতুন ফোন কেনা যায়। টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়। ক্ষমতা হারালে আবার ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করা যায়। কিন্তু—একটি শিশুর জীবন একবার চলে গেলে তাকে কোনো প্রযুক্তি, কোনো অর্থনীতি, কোনো রাষ্ট্র, কোনো বিচারই ফিরিয়ে দিতে পারে না।তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত আইফোনকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আমাদের নিয়ে। আমরা কি এমন একটি সমাজ বানাতে চাই, যেখানে মানুষ জিনিসের জন্য বাঁচবে—নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে জিনিস মানুষের জন্য থাকবে? অপ্রতিমের রক্তাক্ত শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে সভ্যতার কাছে প্রশ্নটি এখন একেবারেই সরল—একটি আইফোন কি জীবনের চেয়েও বড়? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে সেই ‘না’ শুধু কথায় নয়—আমাদের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগ, আইন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেও প্রমাণ করতে হবে।লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ব্রিকস সম্মেলন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক হিসাব

১২-১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত হলো ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। ২০০৬ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের হাতে এই ফোরামের যাত্রা শুরু। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে নাম হয় ব্রিকস। বর্তমানে সদস্য ১১টি—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া। এছাড়া ১০টি অংশীদার দেশ আছে—বেলারুশ, বলিভিয়া, কিউবা, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নির্মাণ’। এই জোট এখন বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ, জনসংখ্যার ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ ও বাণিজ্যের ২৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। বৈশ্বিক দক্ষিণের এই বৃহৎ সমাবেশে জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধানসহ আসিয়ান, আফ্রিকান ইউনিয়ন, লাতিন আমেরিকার সেলাক, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ ও বিমসটেকের চেয়ারদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।সম্মেলনের মূল অর্জন যৌথ ঘোষণা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, ইরান-আমিরাত বৈরিতা এবং চীন-ভারত সীমান্তের টানাপোড়েনের মধ্যেও ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা ২০২৬’ সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে সর্বোচ্চ সংযম, বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা, গাজায় যুদ্ধবিরতি, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, বাছবিচারহীন শুল্ক ও একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের সংস্কারের আহ্বান আছে। ঘোষণায় জাতিসংঘের কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, যা পরোক্ষভাবে ভারত ও ব্রাজিলের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের দাবির পক্ষে যায় এবং ভবিষ্যতে এ নিয়ে চীনের বাধা শিথিল হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে।অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্রিকস এখন পশ্চিমা আধিপত্যের বিকল্প তৈরির চেষ্টা করছে। আন্তঃব্যাংক লেনদেনের সুইফট নেটওয়ার্ক থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়ার পর রাশিয়া ও চীন নিজস্ব বিকল্প নেটওয়ার্ক জোরদার করেছে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানো, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত বিভিন্ন দেশের অর্থ বাজেয়াপ্ত করার মতো ঘটনার পর রিজার্ভের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ভাবনা এবং ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর আলোচনা এবার জোর পেয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনা প্রাসঙ্গিক, কারণ দেশের আমদানির বড় অংশ ডলারে পরিশোধ করতে হয়।এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যোগদান না করা নিয়ে দুই ধরনের যুক্তি আছে। ভারত তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়নি, আমন্ত্রণ ছিল বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর বহুপাক্ষিক অনুষ্ঠানের ফাঁকে হতে পারে না। আবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৩ সালের ২২-২৪ আগস্ট জোহানেসবার্গে ১৫তম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে। ফলে এবার না যাওয়াকে অনেকে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন।কিন্তু না যাওয়ার পেছনে শুধু প্রটোকল নয়, দেশের ভেতরের রাজনীতিও কাজ করেছে। সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সচিবালয়ে বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সহজীকরণের জন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরসহ সব পলাতক আসামিকে ফেরত দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও ১৬ আগস্ট বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন না বলে ভারতীয় হাইকমিশনারকে জানানো হয়েছে। বিরোধী রাজনীতিতেও ভারতবিরোধী সুর চড়া। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি নিয়মিতভাবে কারণে-অকারণে ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে। এই চাপের মধ্যে ব্রিকসের মতো মঞ্চে গেলে সরকার দেশে সমালোচনার মুখে পড়ত, এমন আশঙ্কাও ছিল।এখন প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্তে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব পড়বে কি না। যোগ দিলে সাইডলাইনে ইরানের প্রেসিডেন্ট ও আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্সের মতো নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, চীন-ভারতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে করমর্দনের সুযোগ, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে কম সুদে অর্থায়নের আলোচনা এবং সৌদি আরব, আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার মতো প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ত। এসব দেশ আমেরিকার ঘনিষ্ঠ হয়েও ব্রিকসে আছে, তাই যোগ দিলে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ হতো না। না যাওয়ায় সেই সুযোগ হাতছাড়া হলো। আবার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও অনিশ্চিত হয়ে গেল, কারণ প্রত্যর্পণের শর্ত জুড়ে দেওয়ায় দিল্লি সহজে ইতিবাচক সাড়া দেবে না। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হচ্ছে। তিস্তা ও সীমান্ত ইস্যুতে ওয়ান-টু-ওয়ান আলোচনা জরুরি। কিন্তু আলোচনার টেবিলে বসার পরিবেশ যদি প্রতিদিনের বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যে নষ্ট হয়, তবে ক্ষতি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই।ব্রিকসে বিমসটেক চেয়ার হিসেবে যোগ দিলে গুরুত্ব কমত, একথা ঠিক। কিন্তু একেবারে অনুপস্থিত থেকে একটি বড় বৈশ্বিক মঞ্চে নিজের অনুপস্থিতি জানান দেওয়াও কৌশলগত ক্ষতি। প্রত্যর্পণের দাবি থাকতেই পারে, কিন্তু সেই দাবিকে ভারত সফরের পূর্বশর্ত বানালে সম্পর্ক এগোবে কীভাবে? ভারতবিরোধিতা দিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হয়তো হাততালি পাওয়া যায়, কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য ও জ্বালানির মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান হয় না। বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য চলতে থাকলে সুসম্পর্কের পথ আরও কঠিন হবে। বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন আবেগ নয়, হিসাবি কূটনীতি—যেখানে প্রতিবাদ থাকবে, কিন্তু দরজা বন্ধ হবে না।(লেখকের নিজস্ব মত)লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

হঠাৎ কেন ‘জিন্নাহ গীতি’

নতুন এক বুদ্ধিবৃত্তিক মতলবি বয়ানের মুখোমুখি হয়েছেন দেশবাসী। ফেসবুক তোলপাড়; জিন্নাহ, জিন্নাহর কিসসা! গত ৫৬ বছরেও এমন হয়নি। হঠাৎ এ বছরে কেন এই জিন্নাহ গীতির এত দরকার হলো?দুই বছর আগের আগস্ট মাসে দেশে একটা রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল। প্রাণহানিসহ বহু বিধ্বংসী ঘটনা তাতে দেখতে হয়েছিল। তো, নাটক তা নিয়ে কম হয়নি। অবশেষে মাত্র ৬ মাস আগে নির্বাচিত নতুন এক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সংসদে বিরোধী দল নামে জামায়াতে ইসলামী আর কিংস পার্টি খ্যাত এনসিপি সরকারের বিরোধিতায় সকাল-বিকেল সরব। যেন এগুলো করাই তাদের একমাত্র কাজ। তবে ছায়া বাজেট, ছায়া মন্ত্রিসভার কথাও শোনা যায়; যা নিয়ে বুঝমান পাবলিক তুমুল হাসাহাসি করে।এই যে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত, তারা একাত্তর সালে এই বাঙালির জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে স্বজাতির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল। গড়ে তুলেছিল কুখ্যাত খুনি সংগঠন রাজাকার, আলবদর, আলশাম নামের নির্মম ঘাতক বাহিনী। যদিও সে অতীত কৃতকর্মের জন্য এরা কখনো অনুশোচনার ধার ধারেনি। বরং জাতিকেই নানা ঘোরপ্যাঁচে ফেলতে সব সময় মুখিয়ে থেকেছে। এই অবস্থায়, হঠাৎ চাগাড় দেওয়া উদ্দেশ্যমূলক জিন্নাহ গীতির কারণ কী?বিগত চব্বিশের তথাকথিত ৩৬ জুলাই সফল হলে এই জামায়াতি হার্মাদরাই জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার সমান্তরালে নতুন মতলবি বয়ান হাজির করেছিল। তাদের ভাষায়—চব্বিশ, জুলাই যুদ্ধ এবং জুলাই যোদ্ধা। এইটাকে তারা ব্র‍্যান্ডিং করার আপ্রাণ চেষ্টা করে এসেছে। তবে সাময়িক বিভ্রম জাগালেও গণরোষের মুখে ওই বয়ান ক্রমেই অচল। বরং জুলাই বললেই এখন পাবলিকের ধুম পিটুনি মিস হয় না!কারণ দীর্ঘ ১৮ মাস এই জুলাই নামের সংঘবদ্ধ অনাসৃষ্টি দেখেছে দেশবাসী। ফলে জামায়াতীরা বুঝে গেছে, এই দেশের আপাত নিরীহ শান্ত মানুষেরা জুলাই যুদ্ধ খাবে না; লাগবে কোনো নতুন আইটেম। তাই বাজারে এনেছে তাদের ‘মরহুম ফাদারে মিল্লাত’ জিন্নাহ নামের ফেলে দেওয়া গীতিকাব্য।এবার, ইতিহাসের ইমানদারিতে জিন্নাহ কাব্যটা খতিয়ে দেখা যাক! এই বাংলা ভূখণ্ড ১৯৪৭ সালেই এক স্বাধীন সত্তায় বিকশিত হতে পারত, যদি না দৃশ্যপটে জিন্নাহ থাকত! ২৩ বছরের পাকিস্তানি শোষণ ও নির্যাতন; একাত্তরে শতাব্দীর নির্মম গণহত্যা, গণধর্ষণ এই বাঙালি জাতিকে সইতে হতো না।১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে তখনকার নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশন বসেছিল। সেই অধিবেশনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক প্রস্তাব করেছিলেন—ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলমানদের জন্য কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে এবং রাষ্ট্রগুলো স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম থাকবে।বস্তুত, এইটি ছিল তখনকার প্রকৃত বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর গণমানুষের মনের কথা। এটিই পরে লাহোর প্রস্তাব নামে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছে। সেই স্মৃতি লাহোরে নির্মিত মনুমেন্টের গায়ে বহু ভাষায় আজও সংরক্ষিত রয়েছে। প্রস্তাবটি তখনকার মুসলিম লীগের প্রধান নেতা ফাদারে মিল্লাত ব্যারিস্টার জিন্নাহ বদলে ফেলেন। তিনি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস’-এর ‘এস’ কেটে শুধু ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেট’ বানিয়ে উপস্থাপন করেন।এ ঘটনায় শেরেবাংলার সঙ্গে তখন জিন্নাহর তুমুল বিরোধ হয়। তিনি ক্ষোভে-দুঃখে মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা থেকে মুসলিম লীগকে বের করে দেন এবং জোট করেন হিন্দু মহাসভার সঙ্গে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে করেন অর্থমন্ত্রী। মনে রাখা দরকার, সেই লাহোর প্রস্তাবের প্রণেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টির সভাপতি হিসেবে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে যোগদান করেছিলেন। সেই সময় তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। মুসলিম লীগও সেই জোট সরকারের অংশ ছিল। যদিও এই ঘটনায় পরে সে জোট ভেঙে যায়।উল্লেখ্য যে, তখনকার আরেক জনপ্রিয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী লাহোর সম্মেলনে যোগ দেননি। তার দাবি ছিল, দুই বাংলা মিলে একটি স্বাধীন যুক্তবাংলা করা। অর্থাৎ ১৯৪০ সালেই স্বাধীন ও সুবৃহৎ বাংলা নামের দেশ গড়ার সুযোগ এবং সম্ভাবনা এসেছিল। যা বিনষ্ট করেছে জিন্নাহ এবং তার অনুসারীরা।জিন্নাহ বুঝেছিলেন, ভারতের দুই দিকে একাধিক মুসলিমপ্রধান স্বাধীন রাষ্ট্র হলে বাঙালিদের নেতৃত্বে পূর্ব এলাকা হবে সবচেয়ে শক্তিশালী। আর পূর্ব-পশ্চিম এক রাষ্ট্র বানালে ক্ষমতা থাকবে পশ্চিমের হাতে, যার কেন্দ্র হবে করাচি। সহজ কথায়, তখনকার পরিস্থিতিতে, জিন্নাহ হলো স্টেটস-এর এস কেটে স্টেট বানানোর মুখ্য খেলোয়াড়; কংগ্রেসি নেহরু সেই খেলার সুযোগ করে দেওয়া ধূর্ত বানর এবং অর্ধ-উলঙ্গ বাপুজি গান্ধী ছিল দৃশ্যত এক নিমরাজি রেফারি!সেই একটি ‘এস’ শব্দ পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ বুঝতে সক্ষম দূরদর্শী শেরেবাংলা ফজলুল হক তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, লাহোর প্রস্তাবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তারই ফলশ্রুতি পরবর্তী ২৪ বছরের পাকিস্তানি জুলুম, নির্যাতন, দুঃশাসন; এবং শেষে একাত্তরে বাঙালির প্রাণঘাতী মুক্তিযুদ্ধ।এক নজরে—এই হলো মরহুম জিন্নাহ গীতি, যা হঠাৎ করে সামনে আনার কারণটা বোধগম্য। সবাই বোঝেন, চব্বিশের জামায়াতি পুঁজি এই যে জুলাই, তা আদতে কোনো যুদ্ধ নয়, স্রেফ সরকারবিরোধী স্থানীয়, স্বতঃস্ফূর্ত একটি গণঅভ্যুত্থান মাত্র। এমন হয়েছে এ দেশে আগেও একাধিকবার।সেগুলো কেউ যুদ্ধ বলেনি। পক্ষান্তরে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বিশ্ব কাঁপানো আন্তর্জাতিক ঘটনা; যাতে বিশ্ব পরাশক্তিগুলো ভয়ংকরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল একে অপরের বিরুদ্ধে। জুলাই তেমন কিছু নয় মোটেই। মুক্তিযুদ্ধে বিলোনিয়ার এক যুদ্ধের সঙ্গে গোটা জুলাই এক করলে আংশিক সমতাও আসবে না। ওটা জানেন জুলাই ব্যবসার তালেবরগণ। তবু মুক্তিযুদ্ধ খাটো করতে জুলাই যুদ্ধ সামনে আনার এত আয়োজন।দেখা যাচ্ছে, জুলাইয়ের দাপুটেরা এখন একে একে ‘জুলাই কৃতিত্ব’ অস্বীকারে লাইন ধরেছে। খোদ জাতিসংঘে ইউনূস কর্তৃক পরিচয় করিয়ে দেওয়া কথিত ‘জুলাই মাস্টারমাইন্ড’ উপদেষ্টা মাহফুজ সেই খেতাব নিতে নারাজ। দুঃস্বপ্নের ১৮ মাস যার দাপটে ধরণী কেঁপেছে, সেই উপদেষ্টা সজিব ভূঁইয়া এখন ছিপি পার্টি থেকে ভাগতে চাইছে। বহু হাজার কোটি টাকা লুট ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অন্যরাও খামোশ; তড়পানি আর নেই। কেউ আর জুলাইযুদ্ধের দায় নিতে চাইছে না।ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তো প্রকাশ্যেই দায় অস্বীকার করেছে; লুটপাটের সকল দায় সে চাপিয়েছে আসিফ, হাসনাত, মাহফুজ, নাহিদ এবং অন্য আরও জুলাইয়াদের ঘাড়ে। এমন ক্ষেত্রে আসলে এমনই ঘটে থাকে। কেউ আর দায় নিতে চায় না। এক মহা ধড়িবাজ আন্তর্জাতিক ঘোড়েলের সঙ্গে খেলতে গিয়েছিল কিছু না খেতে পাওয়া চুনোপুঁটির আন্ডারা!জামায়াতি ঘোড়েল টাকিগুলো ভালো করেই জানে, জুলাইয়ে সংঘটিত কায়েমি অনাসৃষ্টির দায় তাদের সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক দল বিএনপি ১৬ বছরব্যাপী আন্দোলন ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জুলাইকে একটি মোক্ষম আন্দোলন বিবেচনা করেছিল। কিন্তু এতে জড়িত অন্যদের ধান্দা ছিল ভিন্ন; যা তারা ঘটিয়েছে দেশবাসীর চোখের সামনে। তাদের রাজনীতিবিযুক্ত আক্রমণের চাপ বিএনপিকেও সইতে হয়েছে। এখন জুলাইয়ের বিধ্বংসী জামায়াতি দায়গুলো একে একে সামনে আসছে। তা থেকে নিষ্কৃতি পেতে, ভুক্তভোগী মানুষের নজর ভিন্ন খাতে সরাতে অতএব শুরু হয়েছে জিন্নাহ ক্যারিকেচার। আহা, যেন জিন্নাহ কত বড় ইমানদার ছিল! হায়, কোল্যাটারাল ড্যামেজ কন্ট্রোল; সমান্তরাল ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ!(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, প্রাবন্ধিক]

অজ্ঞতার উত্তরাধিকার ভেঙে জ্ঞানের আলোকযাত্রা

মানুষ জন্মের সঙ্গে শুধু রক্তের উত্তরাধিকার বহন করে না; সে বহন করে একটি পরিবারের চিন্তাধারা, বিশ্বাস, সংস্কার, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের অদৃশ্য পুঁটুলি। কোনো পরিবারে সেই পুঁটুলিতে থাকে জ্ঞানের প্রদীপ, মানবিকতার সুবাস ও বিবেকের নির্মলতা; আবার কোনো পরিবারে জমে থাকে অজ্ঞতার ধুলো, কুসংস্কারের জাল, সংকীর্ণতার কুয়াশা এবং পুরোনো ভুল বিশ্বাসের পাথর। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—অজ্ঞতা কখনো কখনো সম্পদের মতোই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উত্তরাধিকারসূত্রে স্থানান্তরিত হয়।একটি পরিবারকে যদি একটি বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে পরিবারপ্রধান তার মূলের মতো। মূল যদি সুস্থ হয়, বৃক্ষের কাণ্ড দৃঢ় হয়, শাখা-প্রশাখা সবুজ হয়, ফুল ও ফলের সম্ভাবনাও বাড়ে। কিন্তু মূলের ভেতর যদি পচন বাসা বাঁধে, বাইরে থেকে বৃক্ষ যতই সবুজ দেখাক, তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তেমনি পরিবারের প্রধান ব্যক্তি যদি অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও সংকীর্ণতার আবর্তে বন্দী থাকেন, তবে তাঁর সন্তানদের সামনে পৃথিবীটি অনেক সময় একটি খোলা জানালা নয়—বরং হয়ে ওঠে লোহার শিকযুক্ত একটি ঘর।তবে এখানে একটি সত্য মনে রাখা জরুরি—অজ্ঞতা কোনো বংশগত রোগ নয়, কিন্তু অজ্ঞতার সংস্কৃতি প্রজন্মগত হতে পারে। একজন বাবা-মা যে চিন্তার সীমারেখা আঁকেন, সন্তান অনেক সময় সেটিকেই পৃথিবীর শেষ সীমানা বলে মনে করে।একজন পিতা যদি মনে করেন, “আমার সময়ে পড়াশোনা করে কী লাভ হয়েছে, তোমারও এত পড়াশোনার প্রয়োজন নেই”—তবে তাঁর একটি বাক্য হয়তো সন্তানের সামনে বহু বছরের সম্ভাবনার দরজা বন্ধ করে দিতে পারে। যে শিশু বইয়ের বদলে শুধু পারিবারিক সংকীর্ণতার পাঠ পায়, সে হয়তো বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসেও জ্ঞানের প্রকৃত অর্থ আবিষ্কার করতে পারে না। কারণ শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতা থেকে আসে না; শিক্ষা আসে প্রশ্ন করার সাহস থেকে, যুক্তি গ্রহণের মানসিকতা থেকে এবং ভুলকে সংশোধন করার বিনয় থেকে।একটি প্রদীপের আলো যেমন ঘরের অন্ধকার দূর করে, তেমনি একটি শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ পুরো পরিবারের মানসিক অন্ধকারে প্রথম আলোকরেখা হয়ে উঠতে পারেন। কখনো কখনো একটি সন্তানই সেই প্রদীপ, যে পূর্বপুরুষের অন্ধকার ঘরে প্রথমবার জানালা খুলে দেয়।কিন্তু সেই জানালা খোলা সহজ নয়। কারণ দীর্ঘদিনের অন্ধকারেরও এক ধরনের অভ্যাস তৈরি হয়। অন্ধকারে থাকা মানুষ হঠাৎ আলো পেলে যেমন চোখ কুঁচকে ফেলে, তেমনি অজ্ঞতার দীর্ঘ অনুশীলনে অভ্যস্ত পরিবার জ্ঞান, যুক্তি ও নতুন চিন্তাকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখে। তখন শিক্ষিত সন্তানকে বলা হয়—“বেশি বুঝতে যেও না”, “আমাদের পরিবারে এসব কখনো হয়নি”, “বড়রা যা বলে সেটাই ঠিক”, “সমাজ কী বলবে?”এই ‘সমাজ কী বলবে’ নামের অদৃশ্য প্রহরীটি বহু প্রতিভার কারাগারের রক্ষক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।একটি পাখিকে যদি খাঁচায় জন্ম দেওয়া হয়, সে অনেক সময় আকাশকে নিজের প্রয়োজন বলেই মনে করে না। খাঁচার তারগুলোই তার কাছে পৃথিবীর সীমানা। অথচ আকাশ তার জন্যই অপেক্ষা করছে। তেমনি অজ্ঞতার পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষ অনেক সময় নিজের সম্ভাবনার ব্যাপ্তিই বুঝতে পারে না। সে জানে না যে তার সামনে আরও একটি পৃথিবী আছে—যেখানে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়, মতভিন্নতা শত্রুতা নয়, নারী-পুরুষের শিক্ষা বৈষম্যের বিষয় নয়, বিজ্ঞানকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখাই সভ্যতার প্রথম পাঠ। এখানেই সুশিক্ষার প্রকৃত ভূমিকা।সুশিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম নয়। ডিগ্রি মানুষের হাতে একটি কাগজ দিতে পারে, কিন্তু সুশিক্ষা মানুষের ভেতরে একটি আয়না স্থাপন করে। সেই আয়নায় মানুষ নিজের অজ্ঞতা, অহংকার, ভুল ও সীমাবদ্ধতাকে দেখতে শেখে। সত্যিকারের শিক্ষা মানুষকে শুধু ‘কী জানি’ শেখায় না; বরং ‘কী জানি না’—সেই উপলব্ধিও দেয়।একজন অশিক্ষিত মানুষ হয়তো ভুল করতে পারেন; কিন্তু একজন শিক্ষিত অথচ অসচেতন মানুষ কখনো কখনো নিজের ভুলকে সত্য প্রমাণ করার জন্য আরও বিপজ্জনক যুক্তি তৈরি করতে পারেন। তাই শিক্ষার সঙ্গে বিবেক, মানবিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও নৈতিকতার সংযোগ অপরিহার্য।ধরা যাক, একটি পরিবারের বাবা-মা মেয়েকে মনে করেন শুধু রান্নাঘর ও সংসারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। মেয়েটির পড়াশোনা অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। সেই পরিবার হয়তো বুঝতে পারে না—তারা শুধু একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ সংকুচিত করছে না; তারা একটি সম্ভাব্য চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা কিংবা সমাজনির্মাতার জন্মের পথও সংকুচিত করছে।আবার কোনো পরিবারে যদি সন্তানকে বলা হয়, “তুমি আমাদের মতোই হবে”—তাহলে তার স্বপ্নের ওপর অদৃশ্য একটি ছাদ তৈরি হয়। অথচ সন্তানের প্রয়োজন কখনো কখনো পরিবারের অনুকরণ নয়; প্রয়োজন পরিবারের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার স্বাধীনতা।প্রজন্মের অন্ধকার ভাঙতে তাই প্রয়োজন বিদ্রোহ নয়, প্রয়োজন বোধের বিপ্লব।একটি নদী তার উৎসকে অস্বীকার করে না; কিন্তু সে উৎসের কাছে স্থিরও থাকে না। পাহাড়ের বুক থেকে জন্ম নিয়ে সে পথের পাথর ভাঙে, বাঁক নেয়, জনপদ অতিক্রম করে, শেষে সাগরের সঙ্গে মিলিত হয়। মানুষের জীবনও তেমন। পূর্বপুরুষ আমাদের সূচনা দিতে পারেন, কিন্তু আমাদের গন্তব্য নির্ধারণ করার অধিকার কেবল তাঁদের হাতে থাকা উচিত নয়।অতীত আমাদের শিকড়; ভবিষ্যৎ আমাদের দিগন্ত।শিকড় ছাড়া বৃক্ষ টেকে না, আবার শুধু শিকড় আঁকড়ে থাকলে বৃক্ষ আকাশও ছুঁতে পারে না।আজকের পৃথিবীতে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি মানুষের হাতে পৃথিবী এনে দিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞানের ভাণ্ডারকে হাতের মুঠোয় এনেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্যের স্রোত তৈরি করেছে। কিন্তু তথ্যের প্রাচুর্য আর জ্ঞানের প্রাচুর্য এক বিষয় নয়। ভুল তথ্য, গুজব, কুসংস্কার ও অর্ধসত্যের যুগে সুশিক্ষা এখন শুধু প্রয়োজনীয় নয়—অপরিহার্য।একজন অভিভাবক যদি সন্তানকে বলেন, “ইন্টারনেটে যা দেখবে, সব বিশ্বাস করবে না; যাচাই করবে”—তবে তিনি শুধু একটি শিশুকে শিক্ষা দিচ্ছেন না; তিনি ভবিষ্যতের একজন সচেতন নাগরিক তৈরি করছেন।একটি কম্পাস যেমন নাবিককে পথ চিনতে সাহায্য করে, সুশিক্ষা তেমনি মানুষকে তথ্যের সমুদ্রে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে শেখায়।তবে পরিবারের অজ্ঞতার বেড়াজালে জন্ম নেওয়া কোনো সন্তানকে আজীবন সেই বেড়াজালের বন্দী থাকতে হবে—এমন কোনো বিধান প্রকৃতিতে নেই। ইতিহাসে বহু মানুষ প্রতিকূল পরিবেশ থেকে উঠে এসে নিজেদের ভাগ্যের ভাষা বদলেছেন। তাঁদের কেউ বইকে সঙ্গী করেছেন, কেউ শিক্ষককে পথপ্রদর্শক করেছেন, কেউ নিজের কৌতূহলকে জ্বালানি বানিয়েছেন। একজন মানুষের জাগরণ কখনো কখনো একটি পরিবারের বহু বছরের ঘুম ভাঙাতে পারে।একটি আগুনের স্ফুলিঙ্গ যেমন শুকনো অরণ্যে দাবানলের সূচনা করতে পারে, তেমনি একটি জাগ্রত মন একটি পরিবারের চিন্তার কাঠামো পাল্টে দিতে পারে।তাই পরিবারপ্রধানের অজ্ঞতা যদি সন্তানদের পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই দেয়াল ভাঙার প্রথম হাতুড়ি হতে পারে শিক্ষা। কিন্তু সেই আঘাত হতে হবে ঘৃণার নয়, যুক্তির; অবজ্ঞার নয়, প্রজ্ঞার; সংঘাতের নয়, আলোর।কারণ মানুষকে অজ্ঞতার জন্য অপমান করলে সে আরও শক্ত করে তার দরজা বন্ধ করতে পারে; কিন্তু তাকে সম্মান দিয়ে জ্ঞানের দরজা খুলে দিলে সে হয়তো নিজেই একদিন আলোকে ঘরে আমন্ত্রণ জানাবে।একটি পরিবারের সত্যিকারের উন্নতি তখনই শুরু হয়, যখন সেখানে প্রশ্ন করার অধিকার জন্ম নেয়। সন্তান যখন বাবাকে প্রশ্ন করতে পারে, বাবা যখন সন্তানের কাছ থেকেও কিছু শিখতে প্রস্তুত থাকেন, মা যখন মেয়ের স্বপ্নকে নিজের অসম্পূর্ণ স্বপ্নের উত্তরাধিকার না বানিয়ে তার নিজস্ব আকাশটি নির্মাণে সাহায্য করেন—তখনই পরিবার একটি জীবন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।শেষ পর্যন্ত মানুষ তার পূর্বপুরুষের ভুলের জন্য দায়ী নয়; কিন্তু সেই ভুলকে পরবর্তী প্রজন্মের ভাগ্য বানিয়ে দেওয়ার দায় এড়াতে পারে না।আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো বৃক্ষের ফল। আমাদের শিকড়ে পূর্বপুরুষের মাটি, কিন্তু আমাদের ডালে ভবিষ্যতের পাখিরা বসবে। তাই প্রশ্ন শুধু—আমরা কী পেয়েছি? প্রশ্ন হলো—আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে কী দিয়ে যাচ্ছি? অজ্ঞতার অন্ধকার, নাকি জ্ঞানের প্রদীপ? কুসংস্কারের শিকল, নাকি মুক্ত চিন্তার ডানা? ভয়ের উত্তরাধিকার, নাকি প্রশ্ন করার সাহস?সুশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখানেই—মানুষকে শুধু শিক্ষিত করা নয়, তাকে এমন এক আলোকিত মানুষে রূপান্তরিত করা, যে নিজের অন্ধকার চিনতে পারে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি উন্মুক্ত আকাশ রেখে যেতে পারে। কারণ একটি পরিবারের ভাগ্য বদলাতে কখনো কখনো সম্পদের পাহাড় প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় মাত্র একজন জাগ্রত মানুষের।আর সেই একজন মানুষটি—হয়তো আপনার পরিবারেই জন্ম নিচ্ছে।[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

আকাশ যখন স্কুলের দরজা বন্ধ করে দেয়

বাংলাদেশের কোনো গ্রামে বন্যার পানি যখন স্কুলের গেট ছাড়িয়ে উপরে উঠতে থাকে, তখন সেখানে এক বিশেষ নিস্তব্ধতা নেমে আসে। পাঠদান বন্ধ হয়ে যায় এবং শিশুরা তাদের পরিবারের সাথে উঁচু কোনো স্থানে আশ্রয় নেয়। দুর্যোগ মোকাবিলার হিসাব-নিকাশের এক পর্যায়ে শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত স্কুল ভবনটি নীরবে আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ দেশের বর্ষাকাল প্রত্যক্ষ করা মানুষের কাছে এই দৃশ্যটি অত্যন্ত পরিচিত; তবে ইউনিসেফের নতুন এক বিশ্লেষণে বিষয়টিকে এক চমকপ্রদ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়েছে। এর পরিসংখ্যানগুলো কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, বরং নীতিনির্ধারকদেরও গভীর ভাবনায় ফেলার মতো।“লার্নিং ইন্টারাপ্টেড: গ্লোবাল স্ন্যাপশট অফ ক্লাইমেট-রিলেটেড স্কুল ডিসরাপশনস ইন ২০২৫” শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধুমাত্র গত বছরেই বিশ্বজুড়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের অন্তত ১৭ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা জলবায়ু-জনিত দুর্যোগের কারণে ব্যাহত হয়েছে। ১০৬টি দেশ বা অঞ্চলের স্কুলগুলো এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর মধ্যে ৪০টি দেশে বছরের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার এমন বিঘ্ন ঘটেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছরই এই সংকটের মুখোমুখি হতে হয় এবং তথ্য-উপাত্ত বলছে যে, এই সংকট ক্রমশ আরও তীব্র হচ্ছে।২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রতি দশজন শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্তত একজনের পড়াশোনা জলবায়ু-জনিত দুর্যোগের কারণে ব্যাহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ কোটি ১০ লাখ শিশুর মধ্যে ৭৫ শতাংশই বাস করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে—অর্থাৎ সেই সব দেশে, যারা এই সংকট সৃষ্টিকারী নিঃসরণের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী এবং যাদের এই সংকটের প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতাও সবচেয়ে কম। জলবায়ু বিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মৌলিক অবিচারটিকেই এখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইউনিসেফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই বিঘ্নের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের আজীবন আয়ের ক্ষেত্রে অন্তত ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর ক্ষেত্রে গড়ে আঠারো দিন স্কুল বন্ধ থাকা এবং পাঠদানের সময় নষ্ট হওয়া ও ভবিষ্যৎ আয় কমে যাওয়ার সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই এই হিসাব করা হয়েছে।বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটানোর ক্ষেত্রে ঝড় ছিল সবচেয়ে বড় দুর্যোগ; এতে আনুমানিক ১০ কোটি ৯০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পরেই রয়েছে বন্যা (৭ কোটি শিক্ষার্থী) এবং তাপপ্রবাহ (অন্তত দশটি দেশে প্রায় ৫ কোটি শিশু)। বিশ্বব্যাপী আগস্ট মাসটি ছিল সবচেয়ে বিপর্যয়কর; মূলত বন্যার কারণেই ওই মাসে ২ কোটি ৮০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, অক্টোবর মাসে দক্ষিণ এশিয়ায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় 'মন্থা'র প্রভাবে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে হারিকেন 'মেলিসা'র কারণে ৩০ লাখের বেশি শিশু শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকতে বাধ্য হয়। ২০২৫ সালে অন্তত এগারোটি দেশে দেশজুড়ে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে ১১ লাখ ২৫ হাজার ৭২৬ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বন্যাকে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই সংখ্যাটি একটি রক্ষণশীল হিসাব। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানেও আগস্ট মাসে মৌসুমি বন্যার কারণে ২ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে স্কুলে ফিরতে পারেনি। একইভাবে নাইজারে বন্যার কারণে ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর স্কুল শুরু হতে দুই সপ্তাহ দেরি হয়েছে।বিশ্বজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশকে সরাসরি স্কুল বন্ধের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে; অন্যদিকে ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে ফিরতে বিলম্বের শিকার হয়েছে কারণ তাদের স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল অথবা সেগুলোকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। স্কুলে যাওয়ার রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাওয়া কিংবা শ্রেণিকক্ষে বাস্তুচ্যুত পরিবার আশ্রয় নেওয়ায় কোনো শিশু যদিকয়েক সপ্তাহ পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে পানি সরে যাওয়ার পর সে আগের অবস্থান থেকে পড়াশোনা শুরু করতে পারে না। সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার এই ঘাটতি বাড়তেই থাকে। যারা আগে থেকেই প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে—যেমন রক্ষণশীল গ্রামীণ পরিবারের মেয়েশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং অত্যন্তদরিদ্র পরিবারের সন্তান—তাদের ক্ষেত্রে মাত্র একটি শিক্ষাবর্ষের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়া মানেই হতে পারে শিক্ষা থেকে চিরতরে ছিটকে পড়া। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়া শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা ২.৫ শতাংশ কমে যায় এবং এতে মেয়েশিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।বাংলাদেশে স্কুল ভবনগুলো প্রায়শই কোনো এলাকার সবচেয়ে মজবুত কাঠামো হওয়ায় এগুলো একই সাথে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিঃসন্দেহে এই ব্যবস্থা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন বাঁচিয়ে আসছে, তবে শিক্ষার ধারাবাহিকতার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। যেমন জ্যামাইকায় হারিকেন মেলিসার সাত মাস পরেও শত শত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় মেরামত করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে অনেক শিক্ষার্থী সপ্তাহে মাত্র দুই বা তিন দিন ক্লাসে অংশ নিতে পেরেছে। এর সমাধান স্কুলগুলোর সুরক্ষামূলক ভূমিকা কেড়ে নেওয়া নয়, বরং শ্রেণিকক্ষ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও বিশেষায়িত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে জরুরি ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা; যাতে ঘূর্ণিঝড়ের সময় জীবন রক্ষা এবং শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।আরেকটি নীরব হুমকি হলো তীব্র তাপপ্রবাহ। ২০২৫ সালে অন্তত দশটি দেশের প্রায় ৫ কোটি শিশুর পড়াশোনা তাপপ্রবাহের কারণে ব্যাহত হয়েছে; যার মধ্যে দক্ষিণ সুদান টানা দ্বিতীয় বছরের মতো দেশজুড়ে স্কুল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি বেলজিয়াম, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডস মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ শিশু তাপমাত্রাজনিত কারণে পরিবর্তিত সময়সূচির মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশেও বর্ষা-পূর্ববর্তী তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাঝেমধ্যেই স্কুলের সময়সীমা কমিয়ে আনতে বা ক্লাস স্থগিত করতে হচ্ছে। অত্যধিক তাপ প্রারম্ভিক শিশু-বিকাশকে ব্যাহত করে এবং সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতার মতো মৌলিক ভিত্তি দুর্বল করে দেয়, যা তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।বিশ্বের সবচেয়ে তীব্র মানবিক সংকটের সম্মুখীন ২১টি দেশের মধ্যে ১৯টি দেশই ২০২৫ সালে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের শিকার হয়েছে। ইউনিসেফের সম্পূরক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির মতো পরিস্থিতির কারণে এসব এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রায় ৯০ লাখ বেশি হতে পারে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবে বাংলাদেশকে এই সতর্কবার্তাটি বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানটি হলো—বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সংক্রান্ত মোট অর্থায়নের মাত্র ১.৫ শতাংশ শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের ফলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আনুমানিক আরও ৬০ লাখ শিশু স্কুল-বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যাদের এক-তৃতীয়াংশই মানবিক সংকটের শিকার। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ফোরামগুলোতে জলবায়ু অভিযোজন এবং ‘ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি’ সংক্রান্ত অর্থায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষাকে যেন কেবল মানবিক সহায়তার সাথে জুড়ে দেওয়া কোনো গৌণ বিষয় না ভেবে একটি ‘অগ্রাধিকার খাত’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—সেই দাবি বাংলাদেশের জোরালোভাবে তোলা উচিত।জলবায়ু-সহনশীল স্কুল অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা নীতিতে দুর্যোগ প্রস্তুতির বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং জলবায়ু বিষয়ক পরিকল্পনায় তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এর মধ্যে রয়েছে দেশের প্রথম ‘জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষা কাঠামো’ প্রণয়নে ইউনিসেফের সহায়তাও। এখনকার কাজ হলো সহনশীলতাকে শ্রেণিকক্ষের গভীরে পৌঁছে দেওয়া, যাতে পরবর্তী কোনো দুর্যোগের কারণে দেশের শিক্ষার্থীদের কেবল কয়েক দিনের স্কুলই বন্ধ না হয়, বরং কোনো শিশুর ভবিষ্যতের মূল্যবান বছরগুলো যেন হারিয়ে না যায়।[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।]

রিয়া সরেনের মৃত্যু যে প্রশ্নগুলো রেখে গেল

বাংলাদেশের মানচিত্রে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ একটি সুপরিচিত শিল্পাঞ্চল। কলকারখানার ধোঁয়া, যন্ত্রের গর্জন আর হাজার হাজার শ্রমিকের ব্যস্ততা এই অঞ্চলের চেনা অবয়ব। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হতদরিদ্র মানুষ দুমুঠো ভাতের আশায় এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এই শিল্পনগরীতে ছুটে আসেন। তাদেরই একজন ছিলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার কুশদহ ইউনিয়নের বাঘদাবডা গ্রামের সাঁওতাল পরিবারের তরুণী রিয়া সরেন। তার বয়স ১৯ বছর বলে উল্লেখ করা হলেও কোনো কোনো তথ্যে বয়স ১৪ বছর বলা হয়েছে। বিধবা মায়ের একমাত্র ভরসা রিয়া প্রায় সাত-আট মাস আগে রূপগঞ্জের মুরাপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালি এলাকায় এসে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। সেখানে স্থানীয় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এসিআই সল্ট লিমিটেডে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু গত ৭ সেপ্টেম্বর সকালে সেই ভাড়া বাসা থেকেই উদ্ধার করা হয় তার নিথর দেহ।রিয়ার আকস্মিক ও সন্দেহজনক মৃত্যু আমাদের সামনে কিছু কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এটি কি আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে রয়েছে হত্যাকাণ্ড? পরবাসে কাজ করতে আসা প্রান্তিক আদিবাসী নারীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।রিয়া সরেনের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রথম থেকেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঘটনার দিন সকালে তার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের পর রূপগঞ্জ থানা পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করে। পুলিশের বক্তব্য ছিল, আলামত দেখে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলেই মনে হয়েছে। তবে রিয়ার পরিবার, স্বজন ও স্থানীয় আদিবাসী অধিকারকর্মীদের দাবি ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সময় রিয়ার মা রিবিকা মুরমু দিনাজপুরের গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। রিয়া বাসায় একা ছিলেন।লাশ উদ্ধারের পর রিয়ার শরীর ও ঘটনাস্থলের কিছু আলামতে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে স্বজনদের দাবি। তাদের অভিযোগ, মৃত্যুর আগে রিয়ার কর্মস্থল বা আবাসন এলাকায় এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকতে পারে, যা তাকে চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আবার তাকে শ্বাসরোধ করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলেও তারা সন্দেহ করছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনার কয়েক দিন পর রিয়ার পরিবার রূপগঞ্জ থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি বলে গণমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগে তারা হত্যা মামলা নিতে পারছে না। এই অবস্থান ও মামলার বিষয়ে অনিশ্চয়তা নিহতের পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস তৈরি করেছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফল পাওয়ার আগেই ঘটনাটিকে হত্যা বা আত্মহত্যা হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা উচিত নয়।রিয়া সরেনের মৃত্যুর ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কাজ করতে আসা আদিবাসী, বিশেষ করে সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, মালপাহাড়িয়া, কোল, কোডা, রাজোয়াড়, তুরী ও পাহান নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে জীবিকার তাগিদে আসা এসব মানুষ ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তিক। নতুন পরিবেশে তাদের কয়েকটি বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।প্রথমত, ভৌগোলিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতি ছেড়ে একজন আদিবাসী নারী রূপগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলে এলে তাকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে অপরিচিতি এবং পরিচিত সামাজিক সহায়তার অভাব তাকে অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্র ও আবাসনে হয়রানির ঝুঁকি। প্রান্তিক নারী শ্রমিকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কর্মক্ষেত্র, আবাসন কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে কেউ হয়রানি বা নির্যাতন করতে পারে। সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক হওয়ার কারণে অনেকে এসব ঘটনার প্রতিবাদ বা অভিযোগ জানাতেও সংকোচ বোধ করেন। ফলে কোনো কোনো ঘটনা আড়ালেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।তৃতীয়ত, আইনি সহায়তার সীমাবদ্ধতা। কোনো আদিবাসী নারী অন্যায়ের শিকার হলে ভাষাগত সমস্যা, আইনি জ্ঞানের অভাব, আর্থিক সংকট এবং থানা-পুলিশের কাছে যাওয়ার ভয় তার অভিযোগ জানানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। রিয়া সরেনের পরিবারের ক্ষেত্রেও দূর দিনাজপুর থেকে এসে নারায়ণগঞ্জে আইনি লড়াই চালানো কঠিন। তাই দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য সহজলভ্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।রিয়া সরেনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং সাঁওতালসহ দেশের সব প্রান্তিক শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, প্রশাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। রিয়া সরেনের মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপের বাইরে থেকে তদন্ত করতে হবে। ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য এবং রিয়ার কর্মস্থল ও আবাসনসংক্রান্ত তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করতে হবে।পরিবারের অভিযোগের আইনগত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। রিয়ার পরিবার যদি হত্যার অভিযোগ করে থাকে, তবে প্রচলিত আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজন হলে দরিদ্র পরিবারটিকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিতে হবে। কোনো পরিবারের আর্থিক অক্ষমতা যেন ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা না হয়।শিল্পাঞ্চলে আদিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। রূপগঞ্জসহ দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কতজন আদিবাসী শ্রমিক কাজ করছেন, তাদের কর্মস্থল ও আবাসনের অবস্থা কী—এসব তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আবাসন এলাকায় নিরাপত্তা, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে।মানবাধিকার ও আদিবাসী সংগঠনগুলোর নজরদারি বাড়াতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সংশ্লিষ্ট আদিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো ঘটনাটির ওপর নজর রাখতে পারে। রিয়ার সহকর্মী, প্রতিবেশী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার প্রকৃত তথ্য সামনে আনার ক্ষেত্রেও নাগরিক সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।কর্মক্ষেত্রে কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। এসিআই সল্ট লিমিটেডসহ সব কারখানায় নারী ও প্রান্তিক শ্রমিকদের জন্য কার্যকর অভিযোগ সেল থাকা প্রয়োজন। সেখানে শ্রমিকরা যাতে নিরাপদে হয়রানি, নির্যাতন বা বৈষম্যের অভিযোগ জানাতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের প্রতিকারও হতে হবে স্বচ্ছ ও দ্রুত।সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় তাদের পূর্বপুরুষেরা সংগ্রাম করেছেন। অথচ আজও তাদেরই একজন তরুণীকে জীবিকার সন্ধানে নিজ এলাকা ছেড়ে এসে এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে—এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।রিয়া সরেনের মৃত্যু হত্যা হয়ে থাকলে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি এটি আত্মহত্যা হয়ে থাকে, তাহলে কী কারণে একজন তরুণী এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন, তার ওপর কোনো চাপ বা প্ররোচনা ছিল কি না—সেসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ আত্মহত্যার ঘটনাও অনেক সময় বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।আমরা উন্নত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। সেই বাংলাদেশে প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনও সমান মূল্যবান হতে হবে। রূপগঞ্জের মঙ্গলখালির সেই অন্ধকার ঘরের রহস্য উদঘাটন করে রিয়া সরেনের পরিবারকে ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। কোনো শ্রমিকের জীবন যেন তার দারিদ্র‍্য, জাতিগত পরিচয় বা ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে কম মূল্যবান হয়ে না পড়ে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]

ভিডিও আরও দেখুন

বাংলাদেশ ম্যাচেই সুজি বেটসকে টপকে বিশ্বরেকর্ড স্মৃতি মান্ধানার

বাংলাদেশের বিপক্ষে নামার দিনেই বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস লিখলেন ভারতের সহ-অধিনায়ক স্মৃতি মান্ধানা। আন্তর্জাতিক নারী টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এককভাবে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের বিশ্বরেকর্ডটি এখন এই বাঁহাতি ওপেনারের দখলে। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ব্যাটিংয়ে নেমে নিউজিল্যান্ডের কিংবদন্তি সুজি বেটসকে পেছনে ফেলেন তিনি।ইতিহাস গড়ার জন্য এই ম্যাচে মান্ধানার প্রয়োজন ছিল মাত্র ৭ রান। ইনিংসের তৃতীয় ওভারে বাংলাদেশের পেসার মারুফা আক্তারের শেষ দুই বলে পরপর দুটি দর্শনীয় চার মেরে কাঙ্ক্ষিত সেই মাইলফলক স্পর্শ করেন ভারতের এই তারকা ব্যাটার।আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটিই মান্ধানার প্রথম কোনো বড় বিশ্বরেকর্ড নয়। চলতি নারী এশিয়া কাপেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন ফরম্যাট মিলিয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছিলেন তিনি। হংকংয়ের বিপক্ষে হাঁকানো শতরান দিয়ে অধিনায়ক ও সাবেক কিংবদন্তিদের ছাড়িয়ে যান মান্ধানা।বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এদিন আরও একটি বিরল অর্জনের খাতায় নাম লেখান তিনি। প্রথম ভারতীয় নারী ক্রিকেটার হিসেবে টি-টোয়েন্টি সংস্করণে ১০০টি ছক্কা হাঁকানোর মাইলফলক অতিক্রম করেছেন মান্ধানা। তবে রেকর্ডের দিনে তার ইনিংসটি বেশিদূর এগোয়নি; ১৯ বলে ৫টি চার ও ২টি ছক্কায় ৩৭ রান করে সাজঘরে ফেরেন এই ভারতীয় ওপেনার।উল্লেখ্য, বর্তমানে নারী ক্রিকেটের ওয়ানডে ফরম্যাটে সর্বোচ্চ সংগ্রাহকের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক মিতালি রাজ এবং টেস্টে সবার ওপরে অবস্থান করছেন ইংল্যান্ডের জ্যান ব্রিটিন। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে মান্ধানা ও সুজি বেটসের পেছনে পরবর্তী স্থানগুলোতে রয়েছেন হারমানপ্রীত কৌর, চামারি আতাপাত্তু ও সোফি ডিভাইন।

বাংলাদেশ ম্যাচেই সুজি বেটসকে টপকে বিশ্বরেকর্ড স্মৃতি মান্ধানার