সংবাদ
ইরানে ফের যৌথ হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল

ইরানে ফের যৌথ হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল

​পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা থমকে যাওয়ায় ইরানে আরও জোরালো সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'নিউইয়র্ক টাইমস' জানিয়েছে, সম্ভাব্য এই সামরিক অভিযান আগামী সপ্তাহেই শুরু হতে পারে। তবে এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।​প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানে আয়োজিত শান্তি আলোচনার লক্ষ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা এক টেবিলে বসলেও ব্যাপক মতপার্থক্যের কারণে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এরপর দফায় দফায় শর্ত ও পাল্টা শর্তের বেড়াজালে আটকে যায় সম্ভাব্য চুক্তি।​শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পরপরই দেশটিতে পুনরায় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবুজ সংকেত বা অনুমোদনের পরই নির্ধারিত হবে পরবর্তী চূড়ান্ত পদক্ষেপ।​প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এবার ইরানের অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনায় আরও জোরালো হামলা চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর আশপাশে কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে পারস্য উপসাগরের 'খার্গ দ্বীপের' মতো ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র দখলের বিষয়টিও যৌথ বাহিনী বিবেচনায় রেখেছে।​সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা হিসেবে  ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা থেকে সংবেদনশীল উপাদান উদ্ধারে বিশেষ কমান্ডো বাহিনী ব্যবহারের মতো অপারেশনের বিষয়ও ভাবা হচ্ছে বলে জানানো হয়।​তবে সামরিক বিশ্লেষকরা এই সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাদের মতে, উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উত্তোলনের অভিযানে চরম পারমাণবিক ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া ইরানের শক্তিশালী স্থলবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পড়লে যৌথ বাহিনীর ব্যাপক হতাহতের শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।​এদিকে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম 'চ্যানেল টুয়েলভ' এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, নতুন করে দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে তেলআবিব। এখন তারা কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
১৩ মিনিট আগে

ইরানে ফের যৌথ হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল

ইরানে ফের যৌথ হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল

দেশের ১৪ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির শঙ্কা, ১ নম্বর সতর্ক সংকেত

দেশের ১৪ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির শঙ্কা, ১ নম্বর সতর্ক সংকেত

ভারত থেকে দেশে ঢুকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক ডিজি আটক

ভারত থেকে দেশে ঢুকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক ডিজি আটক

ঈদ যাত্রার শেষ দিনের ট্রেনের টিকিট বিক্রি আজ

ঈদ যাত্রার শেষ দিনের ট্রেনের টিকিট বিক্রি আজ

লন্ডনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সুদানের প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ

লন্ডনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সুদানের প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ

সুবর্ণচরে জামায়াত নেতার বাড়িতে মিলল খাদ্য অধিদপ্তরের ৯৯ বস্তা চাল

সুবর্ণচরে জামায়াত নেতার বাড়িতে মিলল খাদ্য অধিদপ্তরের ৯৯ বস্তা চাল

হজের বিমান ভাড়া ১ লাখ টাকায় নামানো সম্ভব: হাব

হজের বিমান ভাড়া ১ লাখ টাকায় নামানো সম্ভব: হাব

কোটি কোটি টাকা লোপাটের ছক: চীনের ৫ নাগরিক আবারও ২ দিনের রিমান্ডে

কোটি কোটি টাকা লোপাটের ছক: চীনের ৫ নাগরিক আবারও ২ দিনের রিমান্ডে

জাবিতে ধর্ষণচেষ্টা: সন্দেহভাজনের তথ্য চেয়ে পুরস্কার ঘোষণা পুলিশের

জাবিতে ধর্ষণচেষ্টা: সন্দেহভাজনের তথ্য চেয়ে পুরস্কার ঘোষণা পুলিশের

ফেইসবুকে আলোচনার মধ্যে মৌলভীবাজারের এসপিকে প্রত্যাহার

ফেইসবুকে আলোচনার মধ্যে মৌলভীবাজারের এসপিকে প্রত্যাহার

মতামতমতামত

শিশুদের নিরাপত্তা কোথায়

অতি সম্প্রতিকালের কিছু ধর্ষণ ঘটনা। টাঙ্গাইল পৌরসভা এনায়েতপুর বইল্যা বাজারের পূর্ব পাশের একটি মহিলা মাদ্রাসার ৪০ জনের বেশি কন্যা শিশুকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। যৌন নির্যাতন করা হতো ছাত্রীদের চোখ বেঁধে। ছাত্রীদের বাথরুম গোপনে ভিডিও করে তা প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন চালানো হতো। নেত্রকোণার মদন উপজেলায় একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকের ধর্ষণে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা। গর্ভবতী হওয়া নিয়ে শিশুটির কোনো জ্ঞান নেই, পেটের ভেতর নড়াচড়া সে অনুভব করেছে, কিন্তু কী নড়াচড়া করে তা সে জানে না। তার শারীরে পরিবর্তন আসার পর তার পরিবার তাকে প্রশ্ন করে ধর্ষণের বিষয়টি জানতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের ‘আল হিদায়াত হিফজুল কুরআন মডেল মাদ্রাসায়’ ৯ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে শিক্ষক সাকির আলী প্রথমে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছেন, পরে গলা চেপে শূন্যে তুলে মাটিতে আছাড় দিয়েছেন, শিশুটি যন্ত্রণায় যতবেশি কান্নাকাটি করেছে, শিক্ষকের নির্যাতন ততবেশি বেড়েছে। সহপাঠিরা আতঙ্কিত অবস্থায় এই দৃশ্য দেখেছে। এই নির্যাতন হচ্ছে যৌনকর্মের পূর্ব প্রস্তুতি।এমন ঘটনা শত শত।ধর্ষণ শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতে কমবেশি আছে, কিন্তু বাংলাদেশে মহামারি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্ষণ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জিম্মি করে ধর্ষণ করা হয়, যৌনকর্মে রাজি না হলে ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। কিন্তু মাদ্রাসায় ধর্ষণের চিত্র ভিন্ন, সেখানে ধর্ষিত প্রায় সবাই শিশু। মাদ্রাসায় ছেলে শিশুদের বলাৎকারের নানা কাহিনী রূপকথার গল্পের মতো অবিশ্বাস্য মনে হয়। মাদ্রাসার শিক্ষকদের ধর্ষণ ও বলাৎকারে বহু শিশু মারাও গেছে। শুধু কী মাদ্রাসার শিক্ষক ? না, মসজিদের অনেক ইমাম ও মুয়াজ্জিনও ধর্ষণ এবং বলাৎকারের অপকর্মে লিপ্ত। এরা বহু ঘটনায় ধরা পড়েছে, সাধারণ জনগণের হাতে নিগৃতও হয়েছে, তারপরও ধর্ষণ আর বলাৎকার থামছে না। ধর্ম এবং রাষ্ট্রও এদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখেছে, কিন্তু এরা ভয় পায় না। লুত জাতির ধ্বংস বা দোজখের আগুনে দগ্ধ হওয়ার ভীতিজনক শাস্তির ভয়ও তাদের কুৎসিত প্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখতে পারে না। এরা ধর্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল বলেই সম্ভবত ধর্মের নিষেধাজ্ঞা এদের ভীত করে না।একশ্রেণীর মাওলানা, ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বলাৎকার ও ধর্ষণের ধরন শুধু বিকৃত নয়, অভিনবও। শিশুর মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে, হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ ও বলাৎকার করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চকোলেট দিয়ে, কোন কোন ক্ষেত্রে গোসল বা গায়ে তেল মাখানোর ফজিলত বর্ণনা করতে করতে, কখনো কখনো সওয়াব কামানোর বানী দিয়ে, আবার কখনো কখনো বেহেস্ত পাওয়ার আশ্বাসবানী শুনিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এমনও দেখা গেছে, নির্যাতিত শিশুর যন্ত্রণার চিৎকার শুনে ধর্ষক মাওলানারা বেশি বেশি যৌন উত্তেজনা অনুভব করেছে। শয়তান আছর করে বলেই তাদের ধর্ষণশক্তি বেড়ে যায়, সব দোষ শয়তানের ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা। ধর্ষণের আরও একটি অভিনব কৌশল তারা অনুসরণ করে থাকে, তারা শিশুদের মনে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাদের যৌনকর্মকে সহজ করে তোলে। শিক্ষকের কথা না শুনলে অন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়, হাতের আঙুলে পচন ধরার ভয়, কবরে বিষধর সাপের দংশনের ভয়, আর দোজখের ভয়। এইসব ভয় কাজ না করলে বেত আর লাঠির ভয়। মাদ্রাসার এমন অমানুষিক নির্যাতনের কথা সবাই জানে। শিশুর হাত-পা রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয়, তারপর শুরু হয় পিটানো। শিশুর বাবাগো, মাগো চিৎকারে চারিদিক প্রকম্পিত হলেও শিক্ষকের মন গলে না, যতক্ষণ দেহে শক্তি থাকে ততক্ষণ পিটায়। মাঝে মাঝে হাত-পা বেঁধে টাঙ্গিয়ে পিটানো হয়। বাকি ছাত্র-ছাত্রীরা এই রোমহর্ষক নির্যাতনের মধ্যেও জোরে জোরে কোরআন পড়তে থাকে। এমন আতঙ্ক ও ভীতিজনক অবস্থা দেখার পর কোন শিক্ষার্থীর পক্ষে শিক্ষকের আহবানে যৌনকর্মে সাড়া না দেয়ার সাহস থাকে না। তাদের নালিশ করারও কোনো স্থান নেই, মা-বাবা ধর্মীয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগকে গুরুত্ব দেন না। অবশ্য মা-বাবার সীমাবদ্ধতাও আছে, মাদ্রাসা থেকে এনে সন্তানদের স্কুলে দেয়ার সামর্থ তাদের নেই। গরীব ঘরের শিশুরা মাদ্রাসায় শুধু পড়তে যায় না, খাবারও পায়। তাই কোন মা-বাবা চায় না তাদের সন্তান মাদ্রাসা থেকে বিতাড়িত হোক, বিতাড়িত হলে শুধু লেখাপড়া বন্ধ হবে না, হস্টেলে অবস্থান করে বিনে পয়সায় খাবারটাও হারাবে।দেশে কতগুলো মাদ্রাসা আছে তার সঠিক হিসাব বের করাও কঠিন, কারণ কওমী মাদ্রাসা করতে সরকারের অনুমতি লাগে না। দেশের যেখানেই চোখ পড়বে সেখানেই মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা, কওমী মাদ্রাসা, মহিলা মাদ্রাসা, মহিলা ক্যাডেট মাদ্রাসা। ধর্মীয় রক্ষণশীল অংশের সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্য আওয়ামী লীগ সরকার দেশের আনাচেকানাচে কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর সরকারগুলোর চরম ব্যর্থতায় দরিদ্র ও হত দরিদ্র পরিবারগুলো সাধারণ শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, হচ্ছে। সমাজে যারা এককালে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন তাদেরই নাতিপুতি সন্তানেরা এখন মাদ্রাসা তৈরি করছেন। গণতন্ত্রের নামে আমাদের দেশে যে নির্বাচন হয় তাও মাদ্রাসার সম্প্রসারণে বিরাট ভূমিকা পালন করছে, আস্তিক-নাস্তিক-ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজ সব প্রার্থীই নির্বাচনের সময় অকাতরে মাদ্রাসায় দান করে যাচ্ছেন। আর যারা মাদ্রাসা থেকে পাস করছেন তাদের ইহকালে টিকে থাকার কোন কর্মজ্ঞান নেই, তাই কর্মসংস্থানের জন্য আরেকটি মাদ্রাসা খুলতে হয়।গরীবের ইহকাল কষ্টের, তাই পরকালে বেহেশতের প্রত্যাশা অত্যধিক। শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সব মুসলমানের একটি ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে, কোরআনে হাফেজ হলে তার মা-বাবা বেহেশতে যাবে। শুধু তাই নয়, একজন হাফেজ যে তার চৌদ্দ গোষ্ঠীকে বেহেশতে নিতে পারবেন সেই ধারণা আমাদের দেয়া হয়েছে মক্তবে। কিন্তু এ সম্পর্কে কোরআনে কোনো বক্তব্য নেই, এমন কী এ সম্পর্কে কোনো সহিহ হাদিসও নেই। একটি দুর্বল হাদিসে বলা হয়েছে যে, একজন কোরআনে হাফেজ তার গোষ্ঠীর ১০ জন জাহান্নামী ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। কিন্তু দুর্বল হওয়ায় অধিকাংশ আলেম এই হাদিসটি অগ্রহণযোগ্য বলে মতামত দিয়েছেন। তবুও পরিবারের একজন সদস্যকে হাফেজ বানানোর তীব্র আগ্রহ রয়েছে। এই আগ্রহ থেকেই গরীব পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের মাদ্রায় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায়। হাফেজ মাওলানা দ্বারা হাফেজ শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ আর বলাৎকার নিয়ে আলেম সমাজে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া নেই, ওয়াজে মাদ্রাসার কোন ধর্ষক শিক্ষককে ভর্ৎসনা করার নজিরও খুব বেশি নেই।শুধু দেশে নয়, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতেও অহরহ ধর্ষণ হচ্ছে। সউদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো প্রভৃতি দেশে বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলো থেকে নারী গৃহকর্মী নিয়ে গৃহকর্তা ও গৃহকর্তার ছেলে মিলে শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গৃহকর্মী গর্ভবতী হয়ে দেশে ফেরত আসে, দেশে আসার পর শিশু জন্ম নিলে তাদের বলা হয় ‘জারজ’। এমন নিষ্পাপ ‘জারজ’ সন্তানের জন্ম হয়েছে একাত্তরেও। গণিমতের মাল গণ্য করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার মিলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দুই থেকে চার লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছে। সেনাদের এই ধর্ষণ শুধু যৌনক্ষুধা মেটানোর তাগিদে হয়নি, হয়েছে একটি জাতি, সম্প্রদায়কে কলুষিত ও অপমানিত করার জিঘাংসাজাত আক্রোশ থেকে। তাদের গর্ভে জন্ম নেয়া শিশুদের অধিকাংশ বাংলাদেশে ঠাঁই পায়নি, তাদের স্থান হয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বাকি যারা ছিল তাদের স্কুলে ভর্তির সময় বাবার নাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ লিখতে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর গৃকর্মীরাও একাত্তরের মতো অসহায়, তাদের নালিশ শোনার মতো কোন আপনজন ওখানে নেই; তাছাড়া সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ক্ষমতা এবং সাহস কোনটাই বাংলাদেশের নেই। বিদেশে গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন ও তাদের ধর্ষণ করার কারণে অদ্যাবধি কোনো ব্যক্তির শাস্তি হয়নি। ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, নেপাল, ফিলিপিন্স মাঝে মাঝে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ রাখে। কিন্তু অভাব তাদের আবার পাঠাতে বাধ্য করে।সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই খারাপ, ৫ আগস্টের পর দেশের সর্বত্র এমন একটি প্রতীতির জন্ম হয়েছে যে, সংঘবদ্ধ হয়ে যাই করুক না কেন তা আমলে নেয়া হবে না। চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী এবং মব সন্ত্রাসের মতো ধর্ষকেরাও নিজেদের ‘বিপ্লবী’ ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায়, নিশ্চয়ই এই সরকার মোহাম্মদ ইউনূসের মতো ইনডেমনিটির চর্চা করবে না, জিরো টলারেন্সের একটি কঠোর বার্তা দিয়ে ধর্ষকদের মনে ভয় ধরিয়ে দেবে। এছাড়াও মাদ্রাসার ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আলেম সমাজ সোচ্চার হলে ধর্ষণ ও বলাৎকার থামানো হয়তো সম্ভব হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

‘প্যাক্স আমেরিকানা’র পতন

ইতিহাস খুব কম সময়েই নিজেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করে। বেশিরভাগ বড় পরিবর্তন শুরু হয় নিরবে—কোনো বৈঠকের টেবিলে, কোনো করমর্দনের আড়ালে, কিংবা এমন এক রাজনৈতিক মুহূর্তে যার প্রকৃত তাৎপর্য তখনই ধরা পড়ে না। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বেইজিং সফর ছিল তেমনই এক ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র তখন এমন এক চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে এগিয়ে গিয়েছিল, যাকে সে দীর্ঘদিন বৈশ্বিক ব্যবস্থার বাইরে রাখতে চেয়েছিল। কয়েক বছর পর দেং জিয়াও পিংয়ের আমেরিকা সফর বিশ্বকে আরেকটি বার্তা দিয়েছিল—চীন বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে নয়, বরং তার ভেতরে প্রবেশ করে তাকে নতুনভাবে প্রভাবিত করতে চায়। ডনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিন পিংয়ের বেইজিং বৈঠক হয়তো সেই ঐতিহাসিক নাটকীয়তার পুনরাবৃত্তি করবে না। গ্রেট হল অব দ্য পিপলের কোনো ছবি সম্ভবত নিক্সন-মাওয়ের ছবির মতো ইতিহাসের প্রতীকে পরিণত হবে না। তবু এই সম্মেলনকে নিছক আরেকটি কূটনৈতিক রুটিন বলে দেখার সুযোগ নেই। এর গুরুত্ব লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়—বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনশীল ভারসাম্যে এবং কোন রাষ্ট্রটি ক্রমশ বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ, ˆধর্যশীল ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে এগোচ্ছে, সেই বাস্তবতায়। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী তিন দশক যুক্তরাষ্ট্র এমন এক আত্মবিশ্বাসে কাটিয়েছে, যেন তার সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রাধান্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। ওয়াশিংটনের বড় অংশ বিশ্বাস করত, অর্থনৈতিক একীভূতের মধ্য দিয়ে চীন ধীরে ধীরে পশ্চিমা রাজনৈতিক কাঠামোর দিকেই ঝুঁকবে। চীনকে দেখা হতো বিশাল উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে, সভ্যতাগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়। আজ সেই ধারণা শুধু ভুলই নয়, অনেকাংশে বোকামি বলেও মনে হয়। আজকের চীন অতীতের ন্যায় সত্তরের দশকের বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল রাষ্ট্র নয়। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি; এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার; এবং এমন এক প্রযুক্তিগত শক্তি, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে সেমিকন্ডাক্টর পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে আমেরিকার দীর্ঘদিনের একচেটিয়া প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—চীন এই উত্থান ঘটিয়েছে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে জড়িয়ে নয়, বরং বাণিজ্য, অবকাঠামো ও কৌশলগত ˆধর্যের মাধ্যমে। এই পার্থক্যটি ছোট নয়। বেইজিংয়ের দিকে যাত্রা করছে এমন এক আমেরিকা, যার কাঁধে কৌশলগত ক্লান্তির ভার স্পষ্ট। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া কিংবা সাম্প্রতিক ইরান-সংকট—সব ক্ষেত্রেই একটি প্রবণতা চোখে পড়ে: যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরু করতে পারদর্শী, কিন্তু তা রাজনৈতিকভাবে টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে প্রায়ই ব্যর্থ। সামরিক শক্তির প্রাচুর্য সবসময় কৌশলগত সাফল্য নিশ্চিত করে না; বরং অনেক সময় তা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। চীন ঠিক সেই সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ নিয়েছে। তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও বেইজিং সরাসরি সংঘাতে জড়ানো এড়িয়ে গেছে। ইরান থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে, আঞ্চলিক মধ্যস্থতার পক্ষে থেকেছে এবং নিজেকে যোদ্ধার চেয়ে সম্ভাব্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে তুলে ধরেছে। এটি আদর্শবাদ নয়; বরং বাস্তববাদ। কারণ হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাস্তববাদকে দুর্বলতা বলা যায় না—প্রায়শই সেটিই পরিপক্বতার পরিচয়। পশ্চিমা বিশ্বে চীনকে প্রায়ই এমন এক আগ্রাসী শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়, যে বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থাকে উল্টে দিতে চায়। বাস্তবতা অবশ্য আরও জটিল। দক্ষিণ চীন সাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক বা তাইওয়ান প্রশ্নে বেইজিং নিঃসন্দেহে তার প্রভাব বাড়াতে চায়। কিন্তু তার পদ্ধতি অধিকাংশ সময়ই সামরিক আঘাতের চেয়ে অর্থনৈতিক নির্ভরতা, অবকাঠামোগত সংযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ওপর নির্ভরশীল। তাইওয়ান ইস্যুতেও চীনের আচরণে একটি হিসাবি সতর্কতা দেখা যায়। শি জিনপিং একাধিকবার পুনরেকত্রীকরণকে ঐতিহাসিক লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু বেইজিং এখনও ইউক্রেনে রাশিয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানে যায়নি। কারণ চীনা কৌশলবিদরা বোঝেন— বড় শক্তির যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু তার পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তি যুদ্ধেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও চিপ নিষেধাজ্ঞা চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারবে। তথাকথিত ‘স্মল ইয়ার্ড, হাই ফেন্স’ নীতির লক্ষ্য ছিল উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও এআই অবকাঠামো থেকে বেইজিংকে বিচ্ছিন্ন রাখা। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টোও। চীন দেশীয় উদ্ভাবনে গতি বাড়িয়েছে, নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং পশ্চিমা জোটের বাইরে নতুন অংশীদার খুঁজে নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেও কিছু ক্ষেত্রে নীতিগত শিথিলতায় যেতে হয়েছে, কারণ বাজার হারানোর চাপ আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্যও অস্বস্তিকর হয়ে উঠছিল। এখানেই একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট হয়: গভীরভাবে আন্তঃসংযুক্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনকে বিচ্ছিন্ন করা সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিচ্ছিন্ন করার মতো সহজ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন নতুন প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয়ই জানে, আগামী দশকের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব অনেকাংশে নির্ধারিত হবে এআই, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও উন্নত অটোমেশনের মাধ্যমে। কিন্তু এখানে একটি বড় বৈপরীত্য আছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই এই প্রতিযোগিতাকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বনাম কর্তৃত্ববাদের লড়াই হিসেবে তুলে ধরে। অথচ বিশ্বের বহু দেশ এখন মতাদর্শের চেয়ে সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আর সেই সক্ষমতার প্রদর্শনে চীন অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে গেছে। যখন আমেরিকান রাজনীতি অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ, সংস্কৃতিযুদ্ধ ও প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থায় জর্জরিত, তখন বেইজিং নিজেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, এটি এমন এক কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচয় দেয় যা পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো অনেক দিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে দেখাতে পারছে না। চীন বন্দর, রেলপথ, শিল্পাঞ্চল ও জ্বালানি করিডোর নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে; আর যুক্তরাষ্ট্র ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এমন যুদ্ধে, যেগুলো দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। অবশ্য এর মানে এই নয় যে চীনের সামনে কোনো সংকট নেই। জনসংখ্যাগত পতন, যুব বেকারত্ব, ঋণের চাপ ও রিয়েল এস্টেট খাতের অস্থিরতা— এসবই বাস্তব সমস্যা। চীনের উত্থান যেমন অনিবার্য নয়, তেমনি তার পতনও অবধারিত নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায়ই বাস্তবতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে মানুষের ধারণা। আর সেখানেই ডনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে বেইজিংয়ের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সংঘাত, অস্থির শুল্কনীতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসা এবং হঠাৎ সামরিক সিদ্ধান্ত— এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এমনকি ইউরোপের অনেক দেশ এখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল নিচ্ছে। তারা আর এককভাবে আমেরিকার ধারাবাহিকতার ওপর ভরসা করতে পারছে না। চীন এই সুযোগটি দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে। নিজেকে স্থিতিশীল বাণিজ্য, অবকাঠামোগত সংযোগ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরছে— যা অনেক দেশের কাছে আমেরিকার অস্থিরতার বিপরীত প্রতিচ্ছবি। এই বর্ণনা পুরোপুরি সত্য কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু ভূরাজনীতিতে ধারণারও নিজস্ব শক্তি আছে। বেইজিং সম্মেলনের প্রকৃত গুরুত্ব তাই কোনো যৌথ বিবৃতির ভাষায় নয়, বরং তার প্রতীকে। বিশ বছর আগে আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা চীনা নেতাদের সঙ্গে কথা বলতেন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির অবস্থান থেকে। আজ পরিস্থিতি বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও সামরিক, আর্থিক ও প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। চীনও নানা সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। তবু একটি বিষয় স্পষ্ট— এক পক্ষ ক্রমশ বেশি প্রতিক্রিয়াশীল দেখাচ্ছে, অন্য পক্ষ বেশি ˆধর্যশীল। সম্ভবত আগামী ইতিহাস এই বৈঠককে কোনো নাটকীয় সন্ধিক্ষণ হিসেবে নয়, বরং ধীর এক ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের প্রতীক হিসেবেই মনে রাখবে। বিশ্ব হয়তো ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছে, আমেরিকান আধিপত্য আর একছত্র নয়; আর চীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজের জায়গা তৈরি করছে অতি আওয়াজের নাটক দিয়ে নয়, বরং শৃঙ্খলা, স্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের মাধ্যমে। [লেখক: প্রাবন্ধিক]

সাঁওতালি ভাষায় শপথ: আদিবাসী ভাষার মর্যাদার নতুন দিগন্ত

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বাঁকুড়ার রানিবাঁধ কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষুদিরাম টুডু। বিজেপির টিকেটে নির্বাচিত এই নেতা ইতোমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। ৯ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। দিনটির বিশেষত্ব ছিল— এ দিন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী পালিত হচ্ছিল। বঙ্গের নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে নিজ মাতৃভাষা সাঁওতালিতে শপথ গ্রহণ করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন টুডু। শপথ বাক্যের পুরো অংশ তিনি সাঁওতালি ভাষায় সাবলীলভাবে উচ্চারণ করেন। তার এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজ্যের আদিবাসী সংস্কৃতি ও ভাষাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সাঁওতালি ভাষায় শপথ নেয়ার সময় ময়দানে উপস্থিত জনতার মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা থেকে উঠে আসা এই নেতার হাত ধরে আদিবাসী উন্নয়নের পথে নতুন দিশা মিলবে। এবারের নির্বাচনে ক্ষুদিরাম টুডু ছাড়াও ভারতীয় জনতা পার্টি থেকে রেকর্ডসংখ্যক সাঁওতাল বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন— লাবসেন বাস্কে, প্রণত টুডু, ছেত্রমোহন হাঁসদা, লক্ষ্মীকান্ত সাউর, দুর্গা মুরমু, অমিয় কিস্কু, যোয়েল মুরমু, বুধরায় টুডু, মিস মায়ন মুরমু, কমলাকান্ত হাঁসদা এবং ভদ্রা হেমব্রম। আমরা বিশ্বাস করি, আগামীতে সাঁওতালি বিধায়করা সাঁওতালি ভাষাতেই শপথ গ্রহণ করবেন। আমরা দেখেছি, আদিবাসী অধ্যুষিত ঝাড়খণ্ড রাজ্যে ২০২০ খ্রিস্টাব্দে ৮১ জন বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর ৭ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন বিধানসভার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি বিধায়ক আঞ্চলিক ভাষায় শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেনসহ ৫৫ জন হিন্দিতে শপথ গ্রহণ করেন। বাকি ২২ জন ১০টি আঞ্চলিক ভাষায় শপথ নেন। এদের মধ্যে ৫ জন হো ভাষায়, ৪ জন খোরঠা ভাষায়, ৩ জন সাঁওতালি ভাষায় এবং ২ জন আংগিকা ভাষায় শপথ গ্রহণ করেন। এছাড়া আরও কয়েকজন ˆমথিলী, বাংলা, মুণ্ডারী ও কুড়ুখ ভাষায় শপথপত্র পাঠ করেন। সংস্কৃত ভাষায় ৩ জন এবং উর্দু ভাষায় ১ জন শপথ নেন। ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে ২২টি ভাষার সরকারি স্বীকৃতি রয়েছে। ভাষাগুলো হলো— অসমীয়া, বাংলা, বোড়ো, ডোগরি, গুজরাটি, হিন্দি, কন্নড়, কাশ্মীরি, কোঙ্কণি, ˆমথিলী, মালয়ালম, মণিপুরি, মারাঠি, নেপালি, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি, সংস্কৃত, সাঁওতালি, সিন্ধি, তামিল, তেলুগু ও উর্দু। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ভারতে ১৯ হাজার ৫০০-এর বেশি মাতৃভাষা বা উপভাষা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২১টি প্রধান ভাষা রয়েছে, যেগুলোতে ১০ হাজারের বেশি মানুষ কথা বলে। লোকসভায়ও সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণের নজির রয়েছে। ২০১৪ সালের ৬ জুন ময়ুরভঞ্জ থেকে নির্বাচিত রামচরণ হাঁসদা সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম থেকে উমা সরেনও সাঁওতালি ভাষাকেই বেছে নিয়েছিলেন। লাবসেন বাস্কে ২০১১ সালে মন্ত্রী হিসেবে সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ করেন। তৎকালীন সময়ে রামচরণ হাঁসদা বলেছিলেন, বোড়ো ভাষার পাশাপাশি সাঁওতালি ভাষাকেও সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আদিবাসী সাঁওতালদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। সাঁওতালি ভাষার উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে ৭ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে শিলিগুড়িতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি দ্রৌপদী মুর্মু। বিধাননগরের একটি মাঠে আন্তর্জাতিক সাঁওতালি সম্মেলনের অনুমতি না দেয়ায় তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘মমতা দিদি আমার ছোট বোনের মতো। তিনি হয়তো কোনো কারণে আমার ওপর রাগ করেছেন। এখানে এত বড় মাঠ রয়েছে, সভা করতে অসুবিধা হওয়ার কথা ছিল না। আসলে ইচ্ছা করেই আমাদের এই মাঠে সভা করতে দেয়া হয়নি।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এ ঘটনায় তৃণমূল প্রশাসনের সমালোচনা করেছিলেন। কেউ কেউ মনে করছেন, সাম্প্রতিক সেই উপেক্ষার প্রতিক্রিয়াও হয়তো প্রতিফলিত হয়েছে সদ্য গঠিত মন্ত্রিসভার সদস্য ক্ষুদিরাম টুডুর শপথ গ্রহণে। সাঁওতালি ভাষা অত্যন্ত প্রাচীন। এটি অস্ট্রোএশীয় ভাষাপরিবারের মুণ্ডা শাখার অন্তর্ভুক্ত। ভাষাবিদদের মতে, হাজার হাজার বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল থেকে অস্ট্রোএশীয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পূর্ব ও মধ্য ভারতে এসে বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকেই মুণ্ডা ভাষাগুলোর বিকাশ ঘটে। পরে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ভাষা আলাদা পরিচিতি লাভ করে এবং ক্রমে সাঁওতালি নামে পরিচিত হয়। লোকগাঁথা ও গানের ভাষায় সাঁওতালদের বর্ণমালার উল্লেখ পাওয়া গেলেও তার নির্দিষ্ট প্রমাণ দীর্ঘদিন পাওয়া যায়নি। আধুনিক যুগে ১৮৪৬ সালে রেভারেন্ড জে. ফিলিপস সাঁওতালি ভাষা নিয়মিতভাবে লিখে সংরক্ষণ, অনুবাদ ও ব্যাকরণ রচনার কাজ শুরু করেন। ১৮৫২ সালে তার বই ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্যা সাঁওতালি ল্যাঙ্গুয়েজ’ প্রকাশিত হয়। প্রথমদিকে বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করা হলেও পরে উচ্চারণের শুদ্ধতা রক্ষায় রোমান লিপির ব্যবহার বাড়ে। উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে সাঁওতালি ভাষার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি বর্ণমালা উদ্ভাবনের চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলা, দেবনাগরী, ওড়িয়া, অলচিকি ও রোমান লিপি বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ২০০৩ সালে ভারতের সংসদে পাস হওয়া ৯২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সাঁওতালি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে সাঁওতালি ভারতের স্বীকৃত সরকারি ভাষাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। তবে সরকার ভাষাটিকে স্বীকৃতি দিলেও সরকারি লিপি কোনটি হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ১৯২৫ সালে রঘুনাথ মুরমু উদ্ভাবিত অলচিকি বর্ণমালার প্রসার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হয়। আমাদের প্রত্যাশা, লেখ্য ভাষার ভিন্নতা থাকলেও কথ্য ভাষার ঐক্য অটুট থাকবে। সাঁওতালি কথ্য ভাষায় শপথ গ্রহণ সেই ঐক্যের শক্তিকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে। ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সাঁওতালি ভাষাভাষীদের মধ্যে এই ভাষা সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। আমরা সাঁওতালি ভাষার অগ্রযাত্রা কামনা করি। [লেখক: কলামিস্ট]

ফল ও সবজি রপ্তানিতে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে লাউ, কুমড়া, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, পেঁপে, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, বরবটি, শিম ও টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি রপ্তানি হয়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত শুরু হওয়ায় ওই অঞ্চলের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপের কয়েকটি দেশে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছিল। এতে সবজি রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি শুরু হয়েছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যের সবজির বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা প্রতিযোগী দেশের ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। শীত মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে দিনে ৩৫-৪০ টন সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের গন্তব্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান। এর বাইরে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি হয়। বর্তমানে ১৮০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সবজি রপ্তানি করছে। সবজির পাশাপাশি মৌসুমি ফলমূলও রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ৫ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৪ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের সবজি। বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৮ কোটি ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবে ১ কোটি ১৬ লাখ ডলার, ইউএইতে ৯৯ লাখ ডলার, কাতারে ৪১ লাখ ডলার ও কুয়েতে ৩১ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়। এর বাইরে যুক্তরাজ্যে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, ইতালিতে ৩৬ লাখ ও কানাডায় ২৩ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে। শীত মৌসুমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কিছু শাকসবজি উৎপাদন হয়। তবে গ্রীষ্মকালে তাদের উৎপাদন থাকে না বলে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানির চাহিদা চার-পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। সবজি রপ্তানিতে বাংলাদেশের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত। আকাশপথ বন্ধ থাকলেও তাদের জন্য তেমন সমস্যা হয় না। কারণ মুম্বাই থেকে তিন দিনেই মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পৌঁছে যায়। আর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পাঠালে ২৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। বাংলাদেশ ১৯৭৩ সাল থেকে শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি শুরু করে। প্রথম বাজার ছিল যুক্তরাজ্য। তখন ১ হাজার ৭০০ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। কৃষিপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যকরণের উদ্দেশে ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। তাজা শাকসবজি, ফলমূল, পান ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের একমাত্র সংগঠন। বর্তমানে এ সংস্থার ৫শ’ সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন নিয়মিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাজা ফল ও সবজি রপ্তানি করছেন। বাংলাদেশ থেকে নানা ধরনের ফলমূল ও সবজি রপ্তানি হয়ে থাকে। এশিয়ান ফল, সবজি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ। করলা, বেগুন, লাউ, ঢ্যাঁড়শ, বরবটি, কাঁচামরিচ, কাঁচা পেঁপে, পালংশাক, পটল, কাঁচকলা, মুলা, ঝিঙা, কচু, চিচিঙ্গা, কচুর লতি, মিষ্টি আলু, চালকুমড়া, তেজপাতা, কলার ফুল ও ফুলকপিসহ আরও অনেক সবজি এবং কাঁঠাল, আনারস, লিচু, আম, কামরাঙা, ড্রাগন ফল, আমড়া, খেজুর, আমলকি, জলপাই ও বিভিন্ন জাতের লেবু রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। পানপাতা, ধনেপাতা ও অনুরূপ পণ্যও বিদেশে যাচ্ছে। যদিও ২০১২ সালের দিকে ইউরোপ ছিল সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় মধ্যপ্রাচ্যে। ইইউভিত্তিক অঞ্চলগুলো বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক অঞ্চল। অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন ও কুয়েতে সর্বাধিক পরিমাণে তাজা শাকসবজি ও ফল রপ্তানি করা হয়। তবে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ এখনও অল্প পরিমাণে তাজা সবজি ও ফল রপ্তানি করছে। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে মূলত কানাডায় বাংলাদেশের শাকসবজি রপ্তানি হয়। আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী উন্নতমানের শাকসবজি, ফলমূল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করতে এবং রপ্তানি বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, কৃষক ও উদ্যানচাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে। এতে গ্রামীণ আয় বাড়ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। সম্প্রতি পার্বত্য বান্দরবানের লামা উপজেলায় পাহাড়ি কৃষিপণ্য রপ্তানিতে উদ্যোক্তা ও চাষিদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত আম, আনারস, কমলা, কলা, কফি, কাঁঠাল, কাজুবাদাম, ড্রাগন ফল ও পেঁপেসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। তাজা ফলমূলের পাশাপাশি শুকনো ফল, ফলের চিপস ও জুস প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমেও নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে। তবে ফল ও সবজি রপ্তানিতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। ভরা মৌসুমে রপ্তানির জন্য পর্যাপ্ত কার্গো সুবিধা নেই। প্রতিযোগী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের তুলনায় বিদেশি উড়োজাহাজের ভাড়া বেশি। উৎপাদন পর্যায় থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত কার্যকর শীতল চেইন ব্যবস্থা না থাকায় পণ্যের সতেজতা কমে যায়। পচনশীল পণ্য পরিবহনের জন্য বিশেষ এয়ার কার্গো উড়োজাহাজও নেই। স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং উপকরণের শিল্প এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। বর্তমানে আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রয়োজন ৬০০-৭০০ টন পণ্য। কিন্তু দৈনিক গড় রপ্তানি হচ্ছে মাত্র ২০০-২৫০ টন। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও মূলত জাতিগত বা এথনিক বাজারকেন্দ্রিক। বিশ্বের উচ্চমূল্যের বাজারে এখনও শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফাইটোস্যানিটারি ও মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধান আরোপ করেছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রেও বড় সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় ইরাডিকেশন ব্যবস্থা না থাকায় সেখানে পূর্ণাঙ্গ রপ্তানি শুরু করা যায়নি। তবে এ বিষয়ে কাজ চলছে। বাংলাদেশের কৃষিখাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হর্টিকালচার। ফল, সবজি, ফুল, মসলা ও ওষুধি গাছের চাষ এ খাতের অন্তর্ভুক্ত। উর্বর মাটি, অনুকূল জলবায়ু ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে দেশে হর্টিকালচার ফসলের উৎপাদন বাড়ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের ফল ও সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে বছরে প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টনের বেশি ফল উৎপাদিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ১০০-১৫০ কোটি টাকার ফল ও সবজি রপ্তানি করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ফল ও সবজি রপ্তানি বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে হলে গুণগত মান উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা জরুরি। গ্লোবাল গ্যাপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানদণ্ড মেনে উৎপাদন বাড়াতে হবে। ˆজব ও নিরাপদ ফল উৎপাদনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে এ খাতকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু দেশীয় চাহিদাই পূরণ করবে না, আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। [লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

নীরব মহামারি হাইপারটেনশন

১৭ মে বিশ্ব হাইপারটেনশন দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘Controlling Hypertension Together ’। বিশ্ব হাইপারটেনশন লীগ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই আহ্বান স্পষ্ট করে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটি রাষ্ট্র, সমাজ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও পরিবারের সমন্বিত দায়। নীরব ঘাতক: পরিসংখ্যান যা বলছেউচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় ‘সাইলেন্ট কিলার’। কারণ উপসর্গ ছাড়াই এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল ও অন্ধত্বের প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে ১৪০ কোটি মানুষ হাইপারটেনশনে আক্রান্ত। এর মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে। বাকি ৭৫ শতাংশ হয় শনাক্তের বাইরে, নয়তো চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনার বাইরে। বৈশ্বিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। মোট আক্রান্তের তিন-চতুর্থাংশ বাস করেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে। এসব দেশে রোগ শনাক্তকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার সুযোগ সীমিত। তথ্য বলছে, বিশ্বে মোট মৃত্যুর ১৩ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। ইস্কেমিক হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ৪৫ শতাংশ এবং স্ট্রোকজনিত মৃত্যুর ৫২ শতাংশের নেপথ্যে এই একটিই কারণ। বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: সংকটের বহুমাত্রিকতাবাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ এখন অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সংকট। মেটা-অ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ হাইপারটেনশনে ভুগছেন। শহরাঞ্চলে এই হার ২৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনে একজন আক্রান্ত। সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্যে। ৩৫ বছরের বেশি বয়সী আক্রান্তদের ৫৪ শতাংশ জানেন না যে তাদের রক্তচাপ বেশি। যারা জানেন এবং ওষুধ নিচ্ছেন, তাদের ৬৭ শতাংশের রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর ৬৭-৬৮ শতাংশ ঘটছে অসংক্রামক রোগে। এর মধ্যে ১৫-২০ শতাংশ মৃত্যুর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কারণ হাইপারটেনশন-জনিত জটিলতা। দ্রুত নগরায়ন, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, কায়িক পরিশ্রমের অভাব এবং মানসিক চাপ এই সংকটকে তীব্র করছে। ঝুঁকির কাঠামো ও আমাদের দুর্বলতাহাইপারটেনশনের ঝুঁকি দুই ধরনের। বয়স ও বংশগতি অপরিবর্তনীয়। কিন্তু আচরণগত ঝুঁকি পরিবর্তনযোগ্য। বাংলাদেশে দৈনিক লবণ গ্রহণের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ৫ গ্রামের প্রায় দ্বিগুণ। ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত খাবার ও রেস্তরাঁর খাবারে লুকানো সোডিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তামাক ব্যবহার, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনও সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় যতটা প্রস্তুত, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ততটা নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে নিয়মিত স্ক্রিনিং, রোগী ফলোআপ ও সাশ্রয়ী ওষুধের সরবরাহে ঘাটতি স্পষ্ট। সমাধানের পথ: বহুখাতভিত্তিক সমন্বয়‘Controlling Hypertension Together’ প্রতিপাদ্যের বাস্তবায়নে চারটি স্তরে কাজ জরুরি। ১. রাষ্ট্রীয় নীতি: প্রক্রিয়াজাত খাবারে সোডিয়ামের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ করে আইন প্রণয়ন করতে হবে। তামাক নিয়ন্ত্রণের মতো খাদ্যপণ্যের মোড়কে ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। জাতীয় অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে হাইপারটেনশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ২. স্বাস্থ্যব্যবস্থা: কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩০ বছর বয়সের পর সবার জন্য বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। PEN প্রোটোকল অনুযায়ী চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধের সরবরাহ বাড়াতে হবে। ৩. সামাজিক সচেতনতা: শিক্ষা কার্যক্রমে খাদ্য ও জীবনাচার বিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করতে হবে। কর্মস্থলে, মসজিদে, মন্দিরে নিয়মিত স্বাস্থ্য ক্যাম্প আয়োজন করে স্ক্রিনিংয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ৪. ব্যক্তি ও পরিবার: প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা, খাবারে অতিরিক্ত লবণ পরিহার, ধূমপান বর্জন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ সেবনই আপাতত সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। উপসংহার: উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করা সহজ, চিকিৎসা সাশ্রয়ী। প্রধান বাধা সচেতনতার অভাব ও অবহেলা। ‘আমার কিছু হবে না’ এই আত্মঘাতী মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। বিশ্ব হাইপারটেনশন দিবসে নাগরিক হিসেবে অঙ্গীকার হোক, আজই নিজের ও পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের রক্তচাপ মাপব। রাষ্ট্র হিসেবে অঙ্গীকার হোক, আমরা নীতি ও বাজেটে হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেবো। কারণ নীরব ঘাতককে রুখতে হলে সোচ্চার হতে হবে এখনই। [লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]

চিনির ঝুঁকি: নীরব স্বাস্থ্য সংকট

চিনি মানব খাদ্যের একটি প্রাকৃতিক উপাদান এবং এটি শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংস্কৃতিতে চিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে— যেমন পিঠা, মিষ্টি, পায়েস এবং বিভিন্ন উৎসবভিত্তিক খাবারে। তবে আধুনিক সময়েখাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের সহজলভ্যতার কারণে চিনির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করেফ্রি সুগার—অর্থাৎ খাবারে যোগ করা চিনি, মধু, সিরাপ এবং ফলের রসে থাকা চিনি—বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদিও চিনি নিজে বিষ নয়, কিন্তু অতিরিক্ত এবং নিয়মিত গ্রহণ শরীরের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।বিশ্বব্যাপী গত কয়েক দশকে চিনির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী খাবারের পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত, উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত এবং কম পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবারের ব্যবহার বেড়েছে। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শহরাঞ্চলে ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস, বিস্কুট, চকলেট এবং অন্যান্য মিষ্টি খাবারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও ধীরে ধীরে এই ধরনের খাদ্যের প্রসার ঘটছে। ফলে খাদ্যাভ্যাসে একটি পরিবর্তন এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।বাংলাদেশের শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেশি থাকে এবং বাজারে সহজলভ্য সস্তা মিষ্টিজাত খাবার ও পানীয় এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে শিশুদের মধ্যেদাঁতের ক্ষয় (ডেন্টালক্যারিজ) একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। মুখের ব্যাকটেরিয়া চিনি ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত করে। এছাড়া বেশি ক্যালোরিযুক্ত কিন্তু পুষ্টিহীন খাবার গ্রহণের ফলে শিশুদের মধ্যে ওজন বৃদ্ধি এবং স্থুলতা বাড়তে পারে। এটি ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে, ছোটবেলা থেকে অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হলে তা পরবর্তীতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গঠনে বাধা দেয়।চিনি এবং মেটাবলিক রোগ যেমন টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং নন-অ্যালকোহলিকফ্যাটি লিভার ডিজিজের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ, বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয় থেকে, শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি যোগ করে। এই অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হয়, বিশেষ করে পেটের চারপাশে। এর ফলেইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, যেখানে শরীর ইনসুলিন হরমোনের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এটি ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে শত কোটি মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিস এবং প্রি-ডায়াবেটিসের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশেও এই সমস্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, যেখানে লাখ লাখ মানুষ ইতোমধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং আরও অনেক মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও জটিল, কারণ এখানে একই সঙ্গে অপুষ্টি এবং অতিপুষ্টি—দুটোই বিদ্যমান। একদিকে কিছু মানুষ পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে না, অন্যদিকে শহরাঞ্চলে অনেক মানুষ অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবার গ্রহণ করছে। এই ‘ডাবলবার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন’ জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয় এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক দেশসুগার ট্যাক্স বা চিনিযুক্ত পানিয়ের ওপর কর আরোপ করেছে। যেমন যুক্তরাজ্য, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স এবং আরও অনেক দেশ এই নীতি গ্রহণ করেছে। এই করের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে চিনিযুক্ত পানিয় কম খেতে উৎসাহিত করা, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কম চিনি ব্যবহার করতে বাধ্য করা এবং স্বাস্থ্যখাতে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করা। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের কর আরোপের ফলে অনেক দেশে চিনিযুক্তপানিয়ের ব্যবহার কমেছে এবং কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যে চিনির পরিমাণ কমিয়েছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে এই ধরনের নীতি গ্রহণ করা হলে তা জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশ করে যে, প্রতিদিনের মোট ক্যালোরির ১০% এর কম ফ্রি সুগার থেকে আসা উচিত এবং সম্ভব হলে তা ৫% এর নিচে রাখা উচিত। এটি প্রায় ২৫ গ্রাম বা ৬ চা চামচ চিনির সমান। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই অজান্তেই এই সীমার চেয়ে বেশি চিনি গ্রহণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, মাত্র ২৫০ মিলিলিটার কোমল পানিয় বা ফলের রসেই প্রায় ২৫-৩০ গ্রাম চিনি থাকতে পারে। এর সঙ্গে যদি বিস্কুট, কেক বা অন্যান্য মিষ্টি খাবার যুক্ত হয়, তবে ˆদনিক চিনি গ্রহণ সহজেই সুপারিশকৃত সীমা অতিক্রম করে যায়।চিনি কমানোর জন্য বিভিন্ন বিকল্প রয়েছে। সম্পূর্ণ ফল খাওয়া ফলের রসের তুলনায় বেশি উপকারী, কারণ এতে ফাইবার থাকে যা রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায়। এছাড়া কম বা শূন্য ক্যালোরিযুক্ত মিষ্টিকারক যেমন— স্টেভিয়া, সুক্রালোজ এবং অ্যাসপারটেম ব্যবহার করা যেতে পারে। খাদ্য শিল্পে বর্তমানে বিভিন্নফ্লেভার প্রযুক্তিব্যবহার করে কম চিনি দিয়ে একই স্বাদ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি মিষ্টতার অনুভূতি বাড়াতে সাহায্য করে, ফলে কম চিনি ব্যবহার করেও গ্রহণযোগ্য স্বাদ তৈরি করা সম্ভব হয়।এই সমস্যা সমাধানে সরকার, শিল্পখাত এবং জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকার খাদ্যের প্যাকেটে স্পষ্ট লেবেলিং বাধ্যতামূলক করতে পারে, শিশুদের লক্ষ্য করে মিষ্টিজাত খাবারের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং প্রয়োজনে সুগার ট্যাক্স চালু করতে পারে। খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কম চিনি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকর পণ্য তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে, শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে মানুষ নিজের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।সবশেষে বলা যায়, চিনি আমাদের খাদ্যের একটি অংশ হলেও এর অতিরিক্ত ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডায়াবেটিস ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান হার এই সমস্যার গুরুত্বকে তুলে ধরে। সঠিক নীতি, সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এই সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব। ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।[লেখক: যুক্তরাজ্যের স্যালুটিভিয়া নামক একটি খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিতে ইনোভেশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন]

ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি ও ডিজিটাল সেবার বাস্তবতা

ভূমি বলতে সাধারণত পৃথিবীর উপরিভাগের কঠিন স্থলভাগকে বোঝায়। ভূমি হলো প্রকৃতির অকাতরে দান করা মাটি, জল, খনিজ ও বনজ সম্পদ। এটি মানুষের বসবাস বা উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত স্থান। অর্থনৈতিক বা আইনি সংজ্ঞায় আবাদি-অনাবাদি জমি, নদ-নদী, খাল-বিল, ঘরবাড়ি এবং মাটির সঙ্গে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত সব কিছুকেই ভূমি হিসেবে গণ্য করা হয়। এভাবেও বলা যায়, মানুষ বা প্রকৃতি কর্তৃক সরাসরি ব্যবহৃত বা উৎপাদনে সহায়তা করে—এমন প্রাকৃতিক উপাদান (মাটি, পানি, আলো) হলো ভূমি। আইনের ভাষায় ভূমি হলো আবাদি, অনাবাদি, পানিতে নিমজ্জিত এলাকা, ঘরবাড়ি এবং মাটির সঙ্গে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত যে কোনো বস্তু (রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ২ (১৬) ধারা অনুযায়ী)। প্রকৃতার্থে ভূমি হলো উৎপাদনের আদি ও মৌলিক উপাদান। এর মধ্যে মাটি ছাড়াও খনিজ, বনজ সম্পদ, জলাশয় ও জলবায়ু অন্তর্ভুক্ত। এটা ঠিক যে, ভূমি প্রকৃতির দান, এর জোগান সীমিত। এটি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করা যায় না এবং এর উর্বরাশক্তিও ভিন্ন হয়। বর্তমান সভ্যতার উন্মেষের আগে আজকের মতো ভূমির মালিকানা নিয়ে এত দ্বন্দ্ব, ঝগড়া-বিবাদ বা যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল না। সভ্যতার উষালগ্নে মানুষের সমাজব্যবস্থাকে বলা হয় আদি সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা। এই সমাজব্যবস্থায় ভূমির মালিকানার বিষয়টি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল না। মানুষ সমাজবদ্ধভাবে ভূমি ব্যবহার করত এবং ভূমির মালিকানাও ছিল সামাজিক। সময়ের ক্রমবিবর্তনে সামন্তপ্রথা, রাজতন্ত্র এবং বর্তমানে কথিত গণতন্ত্রে এসে ভূমি হয়ে গেছে ব্যক্তিগত সম্পদ। সৃষ্টি হয়েছে ব্যক্তির ভূমির মালিকানা। আর এই ভূমিকে ব্যক্তিগতভাবে কুক্ষিগত করার জন্য চলে নানা চেষ্টা। এভাবেই শুরু হয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে ভূমি হস্তান্তর বা মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে ভূমি বিক্রি বা দানের কার্যক্রম শুরু হয়। এই কার্যক্রম পরিচালিত হয় রাষ্ট্রের নিযুক্ত ব্যক্তির অনুমোদনে। অর্থাৎ রাষ্ট্রকে জানিয়ে মালিকানা পরিবর্তন হয়। রাষ্ট্র সব ভূমির মালিক। তাই ব্যক্তিকে ভূমির জন্য রাষ্ট্রকে কর দিতে হয়। ব্যক্তি তার ভোগ বা দখলকৃত জমির ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রকে ভূমি কর দেয়। রাষ্ট্র এই অনুমোদন প্রক্রিয়া সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য বেশ কিছু দপ্তর সৃষ্টি করেছে। যেমন—ভূমি নিবন্ধন দপ্তর, ভূমি রাজস্ব আদায় দপ্তর, ভূমি জরিপ দপ্তরসহ নানা ধরনের বিভাগ। বর্তমানে সরকারের এই দপ্তরগুলো দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে ভূমি-সংক্রান্ত কার্যক্রমে দুর্নীতি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে সরকার ডিজিটাল ভূমি সেবা চালু করেছে। ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুর্নীতি কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তবে এই ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদৌ দুর্নীতি হ্রাস পাচ্ছে কি না, এর উত্তর খুবই জটিল। কারণ মার্চ ২০২৬-এর তথ্যমতে, ভূমি মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি ‘ওয়ান ডিজিটে’ (১০ শতাংশের নিচে) নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ভূমি-সংক্রান্ত দুর্নীতি কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। ভূমি-সংক্রান্ত কার্যক্রমে দুর্নীতির সাধারণ ক্ষেত্রগুলো হলো—১. ভূমি রেজিস্ট্রেশন ও নামজারি (মিউটেশন)। ভূমি অফিসে নামজারির ক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণ ও হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২. মৌজা ম্যাপ, খতিয়ান বা দলিলে কারচুপি। ৩. ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানে দুর্নীতি। ৪. প্রভাবশালীদের নামে সম্পত্তি বরাদ্দ ও অবৈধ দখল। ৫. ভূমি অফিসগুলোতে দালালদের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণ। এই ধরনের অনিয়ম দূর করতে সরকার ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করেছে। ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে অনলাইন ভূমি কর (ই-ট্যাক্স) পোর্টালে নিবন্ধন করে ঘরে বসেই ভূমি কর পরিশোধ করা যায়। অনলাইনে হওয়ায় সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই যোগাযোগ কতটা কমেছে? এখনও অনলাইনে আবেদন করে ভূমি অফিসে ঘুরতে হয় সাধারণ মানুষকে। ডিজিটাল হলেও অনেক ক্ষেত্রে কোনো বাস্তব সুফল পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ সাধারণ মানুষের ডিজিটাল বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। ভূমি অফিসের চারপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকান। অধিকাংশ সাধারণ মানুষ ডিজিটাল পদ্ধতি বোঝেন না। তাই তাদের ভূমি অফিসে যেতে হয় এবং অফিসের কর্মরত ব্যক্তিরা অনেক সময় সেবা গ্রহণকারীকে এসব দোকানে যেতে বলেন। অনেকটা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের মতো। ভূমি সেবাগ্রহীতারা ওই দোকানে গেলে দোকানিরা সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। গ্রামের নিরীহ মানুষ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়। ভূমি সেবা প্রদানের নামে গড়ে ওঠা এসব কম্পিউটার দোকান কার্যত দালালের কাজ করে। ভূমি সেবায় অনিয়মের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো—১. সরকারি ফির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ দাবি। এই বিষয়টির সঙ্গে ভূমি অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মীরা জড়িত। একটি ভূমি অফিসে যতজন কর্মচারী আছেন, তার চেয়ে বেশি রয়েছে দালাল। এই দালালরা ফাইল প্রসেসিং থেকে শুরু করে বাইরের কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকানের মাধ্যমে ভূমি সেবার কাজ করে দেয়, যা অনিরাপদ অনলাইন সেবার রূপ নিয়েছে। ২. ভুল রেকর্ড সংশোধন বা মাঠ পরচা পেতে দীর্ঘসূত্রিতা ও অবৈধ অর্থ লেনদেন। টাকা না দিলে মিউটেশনের আবেদন খারিজ হয়ে যায়। ৩. ডিজিটাল ভূমি উন্নয়ন কর দেয়ার ক্ষেত্রেও অবৈধভাবে অর্থ আদায় করা হয়। শ্রেণী পরিবর্তনের আবেদন দীর্ঘদিন ডিসি অফিসে ঝুলে থাকে। যোগাযোগ করা হলেও কোনো কাজ হয় না। শোনা যায়, রাজশাহী অঞ্চলে প্রতিটি শ্রেণী পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রতি কাঠায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এই টাকা দিলে ডিসি অফিস সহজেই কাজটি করে দেয়। ভূমি রেজিস্ট্রেশনে অনিয়মেরও শেষ নেই। সম্প্রতি ঢাকা জেলার সাভারে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনকে তার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ৩ মে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা-৬ থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে এ নির্দেশ দেয়া হয়। অফিস আদেশে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩ (খ) অনুযায়ী অসদাচরণ এবং বিধি ৩ (ঘ) অনুযায়ী দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে প্রত্যাহার করে মহাপরিদর্শক নিবন্ধন দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে দ্রুত বর্তমান দায়িত্বভার হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলো ছিল—১. দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ গ্রহণ। তাকে ‘ম্যানেজ মাস্টার’ হিসেবেও উল্লেখ করা হতো। ২. সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় অল্প সময়ে তিনি ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেন করেছেন। ৩. বিলাসবহুল গাড়ি, বহুতল ভবন নির্মাণ এবং বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন। ৪. ভূমি নিবন্ধনে অনিয়ম, জাল দলিল এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এটি তো সাভারের সাব-রেজিস্ট্রারের কর্মকাণ্ড, যেহেতু তিনি ধরা পড়েছেন তাই জনগণ জানতে পেরেছে। কিন্তু অজানা রয়ে গেছে আরও অনেক সাব-রেজিস্ট্রারের কুকীর্তি। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেও সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতি শতাংশ জমি কেনাবেচা বা যে কোনো ধরনের দলিল করার ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রারের একটি নির্দিষ্ট অবৈধ হার রয়েছে। রূপগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিল করলে সরকারি ও আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রারকে শতাংশপ্রতি দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। ভূমি-সংক্রান্ত অফিসগুলো আজ দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এখানে কর্মরতরা নিজেদের ইচ্ছামতো ঘুষের হার নির্ধারণ করেন। বিভিন্ন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে তারা বহাল তবিয়তে টিকে আছেন। ভূমি-সংক্রান্ত অনিয়ম দূর করতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। [লেখক: উন্নয়নকর্মী]

উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত: রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা ও মনস্তত্ত্ব

বর্তমান যুগে রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখল বা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিযোগিতা নয়; এটি ভাষা, প্রতীক, আবেগ, মনস্তত্ত্ব এবং কৌশলগত যোগাযোগের এক বহুমাত্রিক ক্ষেত্র। দৃশ্যমান বক্তব্যের আড়ালে প্রায়শই কাজ করে অদৃশ্য বয়ান-নির্মাণের প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য থাকে গণমানুষের চিন্তা, অনুভূতি, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করা। রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই ভাষা কখনও নিছক যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং তা হয়ে ওঠে প্রভাব বিস্তার, বৈধতা নির্মাণ, প্রতিপক্ষকে অবমাননা এবং জনমত নিয়ন্ত্রণের একটি সূক্ষ্ম অস্ত্র। এই জটিল বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ‘উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত’ ধারণাটি তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণী কাঠামো হিসেবে সামনে আনা যেতে পারে, যা রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা, তার মনস্তত্ত্ব এবং এর অন্তর্নিহিত অনৈতিক কৌশলকে উন্মোচন ও ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে। এ শব্দবন্ধটিকে কেবল ভাষার একটি অলঙ্কারিক রূপক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি রাজনৈতিক যোগাযোগ (পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন), প্রোপাগান্ডা স্টাডিজ, মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবতত্ত্ব এবং সমালোচনামূলক বচন-বিশ্লেষণের (ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স অ্যানালাইসিস) আলোকে বিশ্লেষণযোগ্য একটি কাঠামো, যেখানে ভাষা কেবল বাস্তবতাকে বর্ণনা করে না, বরং বাস্তবতাকে নির্মাণও করে। ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক নরম্যান ফেয়ারক্লাফ (১৯৪১-) দেখিয়েছেন, ক্ষমতা ও ভাষার সম্পর্ক কখনো নির্দোষ নয়; রাজনৈতিক ভাষা প্রায়ই এমনভাবে নির্মিত হয় যাতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বৈধ এবং অন্য গোষ্ঠীকে অগ্রহণযোগ্য বা ‘অপর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। ফলে রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষায় ধীরে ধীরে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের জায়গা দখল করে আবেগ, ভয়, সন্দেহ ও ঘৃণার রাজনীতি ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস। এই প্রেক্ষাপটে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর (১৯২৬-১৯৮৪) ‘ক্ষমতা ও জ্ঞান’ (পাওয়ার এন্ড নলেজ) ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, জ্ঞান ও সত্য কখনও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়; বরং ক্ষমতার বিন্যাসের মধ্য দিয়েই ‘সত্য’ গঠিত, প্রচারিত এবং পুনর্গঠিত হয়। অর্থাৎ যে গোষ্ঠী ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করে, তারা অনেক সময় ভাষা ও বয়ানের মাধ্যমেই ঠিক করে দেয় কোনটি গ্রহণযোগ্য সত্য এবং কোনটি অগ্রহণযোগ্য। একইভাবে ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ (কালচারাল হেজিমনি) তত্ত্ব দেখায়, শাসকগোষ্ঠী কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমেও নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখে। গণমাধ্যম, রাজনৈতিক ভাষণ, সামাজিক প্রচারণা কিংবা সাংস্কৃতিক বয়ানের মাধ্যমে এমন এক মানসিক পরিবেশ তৈরি করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ নিজেদের অজান্তেই অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘অপরিহার্য’ বলে মেনে নিতে শুরু করে। রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা তাই কেবল প্রতিপক্ষকে সমালোচনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষকে ‘অপরায়ন’ (আদারিং) প্রক্রিয়ায় কোণঠাসা করে ফেলে। এই অপরায়ণের লক্ষ্য হয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে যুক্তির ময়দান থেকে সরিয়ে নৈতিক, সামাজিক কিংবা মানসিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম শিক্ষা হলো, ঘৃণা, অপবাদ, গুজব কিংবা মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণের ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত রাজনৈতিক বয়ান সাময়িকভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই সামাজিক আস্থা গড়ে তুলতে পারে না। কারণ মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম প্রচারণার সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেই ফেলে। সাধারণ জনগণের কাছে রাজনৈতিক সম্মতি আদায়ের কূটকৌশলী প্রক্রিয়াটি প্রায়শই শুরু হয় ‘উপ্ত’ স্তরের মধ্য দিয়ে। এই স্তরে মূলত গণমানুষের চেতনায় একটি নির্দিষ্ট ধারণা, ভয় কিংবা সন্দেহের বীজ বপন করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘিরে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করার লক্ষ্যে সচেতনভাবে কিছু শব্দ, প্রতীক, অভিযোগ ও ইঙ্গিত ছড়িয়ে দেয়া হয়। এখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণটি সাধারণত প্রত্যক্ষ নয়; বরং এটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের মনে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে অবিশ্বাস, আশঙ্কা কিংবা নৈতিক অস্বস্তি গড়ে তোলা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বপনকৃত ধারণাগুলো সামাজিক আলোচনায়, গণমাধ্যমে, রাজনৈতিক বক্তৃতায় এবং ˆদনন্দিন কথোপকথনে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে একসময় তা অনেকের কাছেই ‘স্বাভাবিক সত্য’ বলে মনে হতে শুরু করে। সামাজিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘কাঠামোবদ্ধতার প্রভাব’ (ফ্রেইমিং ইফেক্ট) এবং ‘ঊদ্দেশ্য নির্ধারণ’ (এজেন্ডা সেটিং) কৌশলের একটি সম্মিলিত প্রয়োগ, যেখানে একটি নির্দিষ্ট বয়ানকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে মানুষের উপলব্ধি ও বিচারবোধ সেই কাঠামোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অর্থাৎ মানুষ কী ভাববে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষকে কী নিয়ে ভাবানো হবে। মার্কিন অর্থনীতিবিদ এডওয়ার্ড স্যামুয়েল হারম্যান (১৯২৫-২০১৭) এবং ভাষাতাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কিও (১৯২৮-) ‘প্রোপাগান্ডা মডেল’ এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে। তাদের মতে, গণমাধ্যম প্রায়ই নিরপেক্ষ তথ্যবাহক হিসেবে নয়, বরং একটি ‘ছাকনি পদ্ধতি’ (ফিল্টারিং সিস্টেম) হিসেবে কাজ করে, যা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে কোনো ধারণা বারবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে তা প্রশ্নাতীত সত্যের মর্যাদা পেয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অপরায়ণ প্রক্রিয়ায় এই ‘উপ্ত’ ধাপের বহুমাত্রিক প্রয়োগ বারবার দৃশ্যমান হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বা ট্যাগকে পরিকল্পিতভাবে প্রচার করা হয়েছে। কখনো ‘রাজাকার’, কখনো ‘স্বৈরাচার’, কখনও ‘দেশবিরোধী’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি’, আবার কখনও ‘পাকিস্তানি দালাল’ বা ‘ভারতীয় দালাল’— এই ধরনের ভাষাগত লেবেলিং কেবল রাজনৈতিক মতভেদের পরিচায়ক নয়; বরং এটি একটি নৈতিক বিচারের রায় আরোপের কৌশলও বটে। এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে যুক্তি কিংবা তথ্য-উপাত্তনির্ভর প্রমাণের ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়। ফলে রাজনীতি আর কেবল নীতিগত মতবিনিময়ের ক্ষেত্র থাকে না; তা পরিণত হয় ‘নৈতিক বৈধতা বনাম নৈতিক অযোগ্যতা’র এক সংঘাতে। এখানেই ভাষা প্রতিপক্ষকে আক্রমণের অস্ত্র হয়ে ওঠে, আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ধীরে ধীরে ‘অপর’-এ রূপান্তরিত হয়। এরপর আসে ‘সুপ্ত’ স্তর, যেখানে সম্ভাব্য পরিবর্তন, নতুন চিন্তা কিংবা সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে নিঃশব্দে নিস্তেজ করে দেয়া হয়। এটি সরাসরি দমন নয়; বরং জনমনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ক্লান্তি উৎপাদনের কৌশল। যখন কোনো সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের দাবি জোরালো হতে শুরু করে, তখন সেই দাবিকে প্রকাশ্যে অস্বীকার না করে বরং সময়ক্ষেপণ, আংশিক স্বীকৃতি, বিভ্রান্তিকর আশ্বাস কিংবা অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ‘ঘুম পাড়িয়ে’ দেয়া হয়। যেমনটি দেখা গিয়েছে সাম্প্রতিক জুলাই সনদ নিয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থানে। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে তার প্রতিবাদী শক্তি ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। এখানে ওয়াল্টার লিপম্যানের (১৮৮৯-১৯৭৪) ‘সম্মতি তৈরি’ (ম্যানুফেকচারিং কনসেন্ট) ধারণা এবং উল্লেখিত হারম্যান-চমস্কির বিশ্লেষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ক্ষমতাসীন বয়ান এমনভাবে পরিবেশিত হয় যে মানুষ নিজের অজান্তেই সেই বয়ানের সঙ্গে আপস করে ফেলে, কিংবা অন্তত বিরোধিতা করার নৈতিক তাগিদ হারিয়ে ফেলে। মনোবিজ্ঞানে একে অনেক সময় ‘চেনাজানা অসহায়ত্ব’ (লার্ন্ড হেল্পলেসনেস)-এর সঙ্গেও তুলনা করা যায়, যেখানে মানুষ বারবার ব্যর্থতা বা প্রতিরোধহীনতার অভিজ্ঞতায় একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করে যে পরিবর্তন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শিক্ষার্থী আন্দোলন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আন্দোলন কিংবা নাগরিক সমাজের বিভিন্ন দাবিকে প্রায়ই এই ‘সুপ্ত’ কৌশলের মুখোমুখি হতে দেখা গেছে। আন্দোলনকে সরাসরি দমন না করে কখনো সংলাপের আশ্বাস, কখনো বিভক্তি সৃষ্টি, কখনো আংশিক দাবি মেনে নেওয়ার অভিনয়— এসবের মাধ্যমে তার গতি মন্থর করে দেওয়া হয়েছে। ফলে জনমনে জন্ম নেয় ক্লান্তি, হতাশা ও দীর্ঘস্থায়ী অনীহা; যা শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাকেই শক্তিশালী করে। তৃতীয় ধাপ ‘গুপ্ত’; এটি হলো অন্তরাল থেকে পরিচালিত মনস্তাত্ত্বিক ও তথ্যগত কৌশলের স্তর। এখানে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে থেকে গোপনে প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি কিংবা চরিত্রহননের কাজ পরিচালিত হয়। এই পর্যায়ে তথ্য বিকৃতি, গুজব ছড়ানো, আংশিক সত্যকে পূর্ণ সত্য হিসেবে উপস্থাপন, কিংবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করা হয়। ফলে জনগণ অনেক সময় বুঝতেই পারে না কোনটি বাস্তব, আর কোনটি নির্মিত বয়ান। সত্য ও মিথ্যার সীমানা ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাপসা করে দেয়া হয়। ডিজিটাল যুগে এই ‘গুপ্ত’ প্রক্রিয়া আরও জটিল ও বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। অ্যালগরিদমিক বায়াস, ইকো-চেম্বার, বট-নিয়ন্ত্রিত প্রচারণা, মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষের মনোজগৎকে প্রভাবিত করার নতুন নতুন কৌশল তৈরি হয়েছে। মার্কিন সমাজ-মনোবিজ্ঞানী সোসানা জুবফের (১৯৫১-) ‘নজরদারি পুঁজিবাদ’ (সার্ভাইল্যান্স ক্যাপিটালিজম) ধারণা এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের আচরণগত তথ্য (বিহেভিয়ারাল ড্যাটা) সংগ্রহ করে তাদের সিদ্ধান্ত, পছন্দ ও রাজনৈতিক প্রবণতাকে প্রভাবিত করার এক নতুন অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই ‘গুপ্ত’ কৌশল আরও সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী হয়েছে। নামবিহীন প্রচারণা, সংগঠিত ট্রল-সংস্কৃতি, বিভ্রান্তিমূলক ভিডিও, বিকৃত তথ্য কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফটোকার্ড গুজবের মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সরাসরি মোকাবিলা না করেও তাকে ঘিরে এক ধরনের নেতিবাচক আবহ তৈরি করা সম্ভব হয়, যা ধীরে ধীরে সামাজিক উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে। সবশেষে আসে ‘লুপ্ত’ স্তর, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কার্যত জনপরিসর থেকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এটি কেবল প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে না; বরং সামাজিক বা সামষ্টিক স্মৃতি, নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জনআলোচনার পরিসর থেকেও তাকে অদৃশ্য করে দেয়ার প্রয়াস চালানো হয়। কোনো ব্যক্তি, দল বা মতাদর্শকে যদি দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়, তবে একসময় তার বক্তব্য, উপস্থিতি ও রাজনৈতিক বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন তার মতামতকে গুরুত্বহীন, অপ্রাসঙ্গিক কিংবা বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়ে যায়। যোগাযোগতত্ত্বে এই প্রক্রিয়াকে ‘প্রতীকী নিশ্চিহ্নকরণ’ (সিম্বলিক অ্যানাইহিলেশন) বলা হয়। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুর্দিয়োর (১৯৩০-২০০২) ‘প্রতীকী ক্ষমতা’ (সিম্বলিক পাওয়ার) ধারণাটিও এখানে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি দেখিয়েছেন, ভাষা, প্রতীক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মাধ্যমে এমন এক ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়, যা অনেক সময় প্রত্যক্ষ সহিংসতার চেয়েও কার্যকর। কারণ দৃশ্যমান দমন প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু প্রতীকী দমন মানুষের চেতনাকেই পরিবর্তন করে দেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরোধী কণ্ঠকে প্রান্তিক করে দেওয়া, তাদের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করা, কিংবা তাদের বক্তব্যকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা এই ‘লুপ্ত’ প্রক্রিয়ারই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি গভীর সত্য হলো, কোনো মত, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তিকে ভাষাগত ও প্রতীকীভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা সাময়িক সাফল্য আনতে পারলেও তা স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতি বা সামাজিক আস্থা তৈরি করতে পারে না। কারণ দমন করা বাস্তবতা প্রায়শই নতুন রূপে, নতুন ভাষায় এবং নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে আবার ফিরে আসে। প্রতিপক্ষকে অপরায়ণের আলোচ্য এই চার ধাপ তথা ‘উপ্ত’, ‘সুপ্ত’, ‘গুপ্ত’ ও ‘লুপ্ত’ পর্যায়ের সমন্বিত প্রয়োগই গড়ে তোলে রাজনৈতিক আক্রমণের একটি সুসংগঠিত মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো। এখানে ভাষা কেবল বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম নয়; বরং মানুষের উপলব্ধি, আবেগ, ভয়, ঘৃণা এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশলগত প্রযুক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু ইতিহাস আমাদের বারবার একটি মৌলিক শিক্ষা দিয়েছে যে, এই ধরনের কুটকৌশল সবসময় ক্ষমতাসীনদের জন্য প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনে না; বরং অনেক সময় তা উল্টো বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। কারণ সাধারণ মানুষের চেতনা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জীবন যখন এক পর্যায়ে গিয়ে আরোপিত বয়ানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, তখন চাপা দেওয়া কণ্ঠস্বর আরও প্রবল প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। যে ভাষা দিয়ে মানুষকে নীরব করতে চাওয়া হয়েছিল, সেই ভাষার ভেতর থেকেই জন্ম নেয় প্রতিবাদের নতুন অভিধান। ভাষা তখন আর কেবল শাসনের হাতিয়ার থাকে না; এটি হয়ে ওঠে প্রতিরোধের অস্ত্র। ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি গণআন্দোলনই এ সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। ক্ষমতার একমুখী ভাষাকে মানুষ শেষ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ করেছে স্লোগানে, কবিতায়, দেয়াললিখনে, গণসমাবেশে এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধে। তখন ভাষা হয়ে ওঠে নিপীড়নের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থানের ঘোষণাপত্র। ফরাসি দার্শনিক জ্যাক দেরিদার (১৯৩০-২০০৪) ভাষায়, কোনো বয়ান কখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত থাকে না; তার ভেতরেই থাকে বিপরীত অর্থের সম্ভাবনা। অর্থাৎ যে ভাষা দিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়, সেই ভাষাই একসময় প্রতিরোধের শক্তিতে রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০২৪-এর শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেখা গেছে, রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর আরোপিত ভাষা ও পরিচয়ের বিপরীতে আন্দোলনকারিরা নিজেদের বিকল্প ভাষা তৈরি করেছে। ক্ষমতার ভাষা যেখানে মানুষকে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছে, জনগণ সেখানে সেই সংজ্ঞাকেই উল্টে দিয়েছে। ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’ এই স্লোগান যেমন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানকে প্রতিষ্ঠা করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, তেমনি ‘কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ প্রতি-স্লোগান হিসেবে ফিরে এসে সেই বয়ানের বিরুদ্ধে গণঅসন্তোষ ও প্রতিরোধের ভাষায় পরিণত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, ভাষা কখনো একমুখী নয়; ঊদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাষার ভেতরেই নিহিত থাকে প্রতিরোধের সম্ভাবনা, প্রতিবাদের শক্তি এবং জালেমের মুখে মজলুমের চপেটাঘাত করার মোক্ষম সামর্থ্য। বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতাসীনদের এই ধরনের কুটকৌশল নতুন কিছু নয়। যুগে যুগে, নানা ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় কেবল এর ভাষা ও প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু রাজনৈতিক কুটকৌশলের মূল মনস্তত্ত্ব প্রায় একই থেকেছে। প্রাচীন সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে শুরু করে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র পর্যন্ত সর্বত্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শক্তি প্রায়ই প্রতিপক্ষকে সাধারণ মানুষের কাছে ‘অপর’ বানানোর রাজনীতি ব্যবহার করেছে। আর সেটা করেছে কখনো ধর্মের নামে, কখনো জাতীয়তাবাদের নামে, কখনো নিরাপত্তার অজুহাতে, আবার কখনো নৈতিকতার ভাষায়। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, ইতিহাসের এই পুনরাবৃত্তি থেকেও মানুষ খুব কমই শিক্ষা নিয়েছে। অতীতের অপকৌশল, বিভাজন ও তার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা থাকা সত্ত্বেও, একই ধরনের রাজনৈতিক কৌশল নতুন মোড়কে বারবার ফিরে আসে। তাই এখানে ইতিহাসের দ্বান্দ্বিকতা (হিস্টোরিক্যাল ডায়ালেক্টিক্স) এবং ক্ষমতার পুনরুৎপাদনের (রিপ্রোডাকশন অব পাওয়ার) তত্ত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আন্তোনিও গ্রামশি, লুই আলথুসার (১৯১৮-১৯৯০) কিংবা মিশেল ফুকোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রের মাধ্যমে টিকে থাকে না; বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা, গণমাধ্যম এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য দিয়েও নিজেকে পুনরুৎপাদন করে। দক্ষিণ এশিয়ার উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রগুলোতে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। শাসনব্যবস্থার বাহ্যিক রূপ পরিবর্তিত হলেও, শাসনের ভাষা, রাজনৈতিক বিভাজনের কৌশল এবং ‘দেশপ্রেম বনাম দেশদ্রোহিতা’র দ্বৈত বয়ান প্রায়ই একই থেকে যায়। ফলে স্বাধীনতার পরও অনেক সমাজ ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের নতুন সংস্করণ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারে না। অতএব, প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক দল, ক্ষমতা বা কৌশল নিয়ে নয়; বরং আমাদের ‘সামষ্টিক রাজনৈতিক চেতনা’ (কলেক্টিভ পলিটিক্যাল কন্সাসনেস) নিয়েও। আমরা কি সত্যিই এই ভাষার রাজনীতি ও মনস্তাত্ত্বিক খেলাকে বুঝতে পারছি? আমরা কি তথ্য, স্লোগান ও প্রচারণাকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করছি, নাকি অজান্তেই নির্মিত বাস্তবতার অংশ হয়ে যাচ্ছি? কারণ রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই ঘটে, যখন মানুষ বুঝতেই পারে না যে তার চিন্তার কাঠামোও ধীরে ধীওে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই জায়গায় ‘সমালোচনামূলক নাগরিকত্ব’ (ক্রিটিক্যাল সিটিজেনশীপ) এবং জনশিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়; বরং ইতিহাসবোধ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা এবং ভিন্নমতকে সহ্য করার মানসিকতাও একটি সচেতন নাগরিক সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। গণসচেতনতা ছাড়া নেতিবাচক রাজনীতির এই কায়েমী স্বার্থবাদী কুটকৌশলের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় নাগরিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, দলীয় আনুগত্যের সংস্কৃতি, ব্যক্তিপূজার প্রবণতা, পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি চর্চা এবং প্রশাসনে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে অনেক সময় রাজনৈতিক মতভেদ যুক্তি বা নীতিনৈতিকতার ক্ষেত্র থেকে সরে গিয়ে পরিচয়গত বৈরিতায় রূপ নেয়, যেখানে প্রতিপক্ষকে বোঝার চেয়ে ধ্বংস করার আকাঙ্ক্ষাই বড় হয়ে ওঠে। আর সেখানেই গণতন্ত্রের ভাষা ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি এবং স্বৈরতন্ত্র আরও পেশিনির্ভর ও মারমুখী হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আমাদের মনে রাখা দরকার যে, গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে নিহিত থাকে না; তা নিহিত থাকে সচেতন, সমালোচনামুখর ও নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজের মধ্যে। তারা কেবল শোনে না, প্রশ্ন তোলে; কেবল বিশ্বাস করে না, বিশ্লেষণ করে; কেবল আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয় না, বরং যুক্তি, ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার আলোকে সত্যকে অনুধাবনের চেষ্টা করে। কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হলো ‘সমালোচনামূলক নাগরিক চেতনা’ (ক্রিটিক্যাল সিভিক কন্সাসনেস), আর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো অন্ধ আনুগত্য, ভয়, গুজবও নির্মিত বিভ্রমের কাছে আত্মসমর্পণ। যে সমাজে মানুষ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সেখানে গণতন্ত্র ধীওে ধীরে কেবল নির্বাচনী আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু যে সমাজে নাগরিকেরা চিন্তা করে, বিতর্ক করে এবং ক্ষমতার ভাষাকে বিশ্লেষণ করে, সেখানেই গণতন্ত্র তার প্রকৃত প্রাণশক্তি খুঁজে পায়। এই ‘উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত’ অপরায়ন প্রক্রিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশলের বর্ণনা নয়; এটি ক্ষমতা কীভাবে ভাষা, মনস্তত্ত্ব ও প্রতীকের মাধ্যমে বয়ান তৈরি করে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তারই এক গভীর প্রতিফলন। এই কুটকৌশল ভাঙার একমাত্র উপায় হলো সেই সমালোচনামূলক সচেতনতা, যা সত্যকে আড়াল থেকে তুলে এনে প্রকাশ্যে দাঁড় করাতে পারে; যা প্রচারণার শব্দগুচ্ছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে শনাক্ত করতে পারে; যা রাজনৈতিক লেবেলিং, দলীয় আনুগত্য কিংবা আবেগতাড়িত বিভাজনের পরিবর্তে ন্যায়, যুক্তিসঙ্গত বিচার-বিশ্লেষণ ও মানবিকতার ভিত্তিতে ব্যক্তি, ঘটনা ও মতাদর্শকে মূল্যায়ন করতে শেখায়। অন্যথায়, সমাজ ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থার দিকে এগোয়, যেখানে ভাষা আর যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না; তা হয়ে ওঠে বিভাজন, ভয় এবং নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই কোনো ক্ষমতাকাঠামো নিজেকে চিরস্থায়ী বলে মনে করেছে, তখনই ভাষাকে ব্যবহার করা হয়েছে প্রতিপক্ষকে অমানবিক, অপ্রাসঙ্গিক কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। লক্ষ্যণীয় যে, প্রাচীন সাম্রাজ্য থেকে আধুনিক রাষ্ট্র পর্যন্ত ক্ষমতার এই প্রবণতা প্রায় একই থেকেছে। কখনো ‘জাতির শত্রু’, কখনও ‘দেশদ্রোহী’, কখনও ‘অসভ্য’, কখনও ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ এসব ভিন্ন ভিন্ন শব্দের আড়ালে একই মনস্তত্ত্ব কাজ করেছে। মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষকে এমনভাবে চিহ্নিত করা, যেন তাকে আর সমান নাগরিক বা বৈধ রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে বিবেচনা না করা হয়। জার্মান বংশোদ্ভুত মার্কিন চিন্তক হান্না আরেন্ট (১৯০৬-১৯৭৫) তার ‘সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণবাদের উৎস’ (দ্যা অরিজিন্স অব টোটালিটারিয়ানিজম) বইটিতে দেখিয়েছিলেন, কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ভাষাকে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে মানুষ ধীরে ধীরে বাস্তবতা ও প্রচারণার পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তখন সত্য আর তথ্য-উপাত্ত বা দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় ক্ষমতার প্রয়োজন অনুযায়ী আগ্রাসী প্রোপাগান্ডায়। ফলে যে সমাজে প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হয়, সেখানে প্রতিরোধের স্লোগান বা গালিই একসময় ইতিহাসের বিকল্প ভাষা হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, আমরা যদি এই মনস্তাত্ত্বিক রাজনৈতিক কৌশলগুলোকে বুঝতে ব্যর্থ হই, তবে হয়তো বারবার একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সাক্ষী হয়ে থাকব- কখনো প্রত্যক্ষভাবে, কখনো নীরব সমর্থক হিসেবে, কখনো আবার নিজেদের অজান্তেই তার অংশ হয়ে। তখন ব্যক্তি বদলাবে, দল বদলাবে, শাসনের মুখ বদলাবে; কিন্তু শাসনের ভাষা, অপকৌশল ও মানসিক কাঠামো একই থেকে যাবে। আর সেখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম সত্যটি ফিরে আসে- মানুষ প্রায়ই ইতিহাসের সাক্ষী হয়, ইতিহাস পড়ে, ইতিহাস নিয়ে কথা বলে; কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। অপরদিকে ইতিহাস এটাও দেখিয়েছে যে, মানুষের ভেতরে জমে থাকা নীরব ক্ষোভ, অপমানবোধ ও বঞ্চনার অভিজ্ঞতা একসময় প্রতিরোধের ভাষায় বিস্ফোরিত হয়েছে। চাপা দেওয়া কণ্ঠস্বর কখনো কবিতায়, কখনো গানে, কখনো দেয়াললিখনে, কখনো স্লোগানে বা গালিগালাজে, কখনো গণঅভ্যুত্থানের গর্জনে ফিওে এসেছে। শাসকের আরোপিত শব্দই অনেক সময় শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্লোগানে পরিণত হয়েছে। কারণ ভাষার একটি দ্বৈত চরিত্র আছে। এটি যেমন আধিপত্যের হাতিয়ার, তেমনি মুক্তি ও প্রতিরোধেরও শক্তি। ফলে যে সমাজে প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হয়, সেখানে স্লোগানই একসময় ইতিহাসের বিকল্প ভাষা হয়ে ওঠে যা নিপীড়িত ক্ষুব্ধ মানুষের জমে থাকা অভিজ্ঞতা ও প্রতিবাদকে প্রকাশ করে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, আমরা যদি এই মনস্তাত্ত্বিক রাজনৈতিক কৌশলগুলোকে বুঝতে ব্যর্থ হই, তবে হয়তো বারবার একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সাক্ষী হয়ে থাকবে জাতি। তখন ব্যক্তি বদলাবে, দল বদলাবে, শাসনের মুখ বদলাবে; কিন্তু শাসনের ভাষা, বিভাজনের কৌশল এবং ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব একই থেকে যাবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘অপর’ বানানোর সংস্কৃতি নতুন নতুন নামে ফিরে আসবে, আর সমাজ বারবার একই চক্রে আবর্তিত হতে থাকবে।  (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

রম্যগদ্য: “আরে আমি বিয়াই তো করি নাই...”

“ব্যাপার কী, কোন ব্যাটায় বিয়া করলো না কোন ব্যাটায় বিয়া বইলো এইসব কি জেন-জি’র পোলাপানে বুঝবো!”“কেন কেন বিবাহ একটি পবিত্র পারিবারিক বন্ধন এটা বর্তমান জেনারেশন বুঝবে না কেন?”“আরে বিবাহ তো একটি পবিত্র পারিবারিক বন্ধন, এইডা পিরথীবির ব্যাবাক জেনারেশন মানবো এবং বুইজ্জা নিবো এই নিয়া কুনোই সন্দ নাই, কিন্তু বিয়াই করিনাই এইডার মাইনে আপনে কি কোইতে চান হ্যেইডা বুজবো না।”“বুঝবে বুঝবে, আমাদের ছোট বেলার একটা ছোট্ট ছড়া আছে ওটা বললেই তোর পৃথিবীর সব জেনারেশনই ব্যাপারটা বুঝবে। ”“ঠিক আছে, কন চাইন দেহি আপনের ছুট্টু বেলার ছড়া না কবিতা।”“ওরে এটা পয়ার ছন্দের কবিতা না, এটা হলো প্রচলিত ছড়া। ”“ধাৎ হালায় বাঙালি খালি প্যাঁচায় “টা পয়ার ছন্দের কবিতা না, এটা হলো প্রচলিত ছড়া” ভাইডিনা ভালা, আকামে ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ না কয়া আসল ছড়া কনতো শুনি?”“শোন তাহলে আমাদের ছোটবেলার ছড়া। ”“লন শুরু করেন।”“আতা গাছে তোতা পাখি / ডালিম গাছে মৌ / গভীর রাতে উঠে দেখি / পাশে নাই বৌ / রাতের বেলা কোথা গেল / কোথায় তারে পাই/ হঠাৎ করে পড়ল মনে / আরে আমি বিয়াই তো করি নাই।”“হি হি, দারুণ জিনিস হুনাইলেন মিয়া। অহনো হি হি, হাসি চাইপ্পা রাখার পারি না, হি হি।”“ঠিক আছে ছড়াটা হাস্যরসের আবেদন রাখে, কিন্তু তাই বলে তোর মতো এ্যতো হাসির কিছু নেই যে, ছড়া শোনার পর থেকে এখনও খ্যাক খ্যাক করে হাসছিস।”“হাসমু না! কন কী? কী সুন্দর ছড়া, যেই জিনিসটার কুনোই ঠিকানা নাই, কুনোই অস্তিত্ব নাই, হালায় হেই বেডির মানে হেই বৌ’এর তালাশ করতাছে। হি হি।”“এটাতো কেবল একটা ছড়ারে, এটা নিয়ে অস্তিত্ববাদ, নাস্তিত্ববাদ এসবের মাঝে জড়াচ্ছিস কেন?”“ভাই না ঢাবি বাংলায় অনার্স?”“হ্যাঁ, তো কী হয়েছে!” এই কথা কোইতে আপনের লজ্জা করে না! আপনে বুঝেন না, “আতা গাছে তোতা পাখি / ডালিম গাছে মৌ/ গভীর রাতে উঠে দেখি / পাশে নাই বৌ / রাতের বেলা কোথা গেল / কোথায় তারে পাই? / হঠাৎ করে পড়লো মনে / আরে আমি বিয়াই তো করি নাই। এই ছড়ার মূল বক্তব্য কী?”“ছড়াতো ছড়াই এর আবার মূল বক্তব্য কী?”“হুর মিয়া আপনে বুঝছেন, এই ছড়া কতো সুন্দর কোইরা আমাগো বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুইল্লা ধরছে। যেই জিনিসটা নাই, যেই জিনিসটার জন্মও হয় নাই, হেই জিনিসটা আমরা খুঁইজ্জা বেড়াইতেছি। মনে করেন বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে? কাজীর খাতায় আছে, কিন্তু গোয়ালে নাই! বাংলাদেশে নিয়মের শাসন? কাজীর খাতায় আছে, কিন্তু কাচারিতে নাই! বাংলাদেশে মানবাধিকার? কাজীর খাতায় আছে, কিন্তু সমাজে নাই! আপনের সার্বভৌমত্তের চারটা পয়েন্ট...”“থাম ভাই থাম, আমার ঘাট হয়েছে। তোকে আমার ছড়া বলাটাই ভুল হোয়েছে।”“ভুল হোইসে মাইনে! এই যে কয়’দিন আগে এক শুভ্রকেশ মহিলা কোইলেন, বাংলাদেশে যাগো গুল্লি ফুটানের কথা হ্যারা ময়রার পোলার মতো, মিষ্টি বেচে। যাগো দ্যাশের সীমান্তে ব্যাড়া দেয়ার কথা, হেই কাম থুয়া, হ্যারা প্রইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপের মানে পিপিপি-এর, ব্যাবাগ ব্যাবসা বাগায়া লইতাছে।”“ভদ্রমহিলাতো বাংলাদেশের বাস্তাব চিত্র তুলে ধরেছেন, ওদের ব্যাংক আছে, হসপিটাল আছে, মেডিকেল কলেজ রয়েছে, মরার আগে হোলেওতো কেউ একজন সাহস করে সত্যি কথা বলেছেন, এটা তুই অ্যাপ্রেশিয়েট কোরবি না?”“অ্যপ্রিশিয়েট! আপনে তো দেখি চোখ থাকিতে অন্ধ! লজ্জা করে না মিয়া, রাজনৈতিক নেতারা, হ্যাগো পায়ে ত্যেল মাইরা, ক্ষমতায় বওনের লাইগ্যা বৌ-বাচ্চা, পোলাপান ব্যেবাগতে মিল্লা হ্যেগো পাঁ’চাটেন, তো হ্যেগোরে ব্যবসা দিবেন না! হ্যারা আপনে আপনে, আপনেরে গদিত বহায়া চৌদ্দগুষ্টিসহ মাল কামাইনের সুযোগ কোইরা দিবো, আর আপনে হ্যেগোরে কিছু দিবেন না! হ্যাগো বাজেট ওপেন না গোপেন, হ্যেই লয়া আপনের জ্বলে ক্যা। আমি কিন্তু কয়া দিলাম হ্যারা আছে বইল্লাই দেশটা অহনো টিক্কা আছে। নাইলে আপনেগো মতো পিচাশ পলিটিশিয়ানগো হাতে দেশটা পড়লে কবেই আপনেগো নিজেগো, কামড়াকামড়ির ঠ্যেলায়, পাবলিকে আমেরিকারে, নাইলে চীন বা ভারতরে হাইদ্দা ডাইক্কা আইন্না দেশ চালানোর সুযোগ দিতো।”“এটা আবার কী বলছিস, জনগণ, লক্ষ মুক্তিযোদ্ধার প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আবার বিসর্জন দিতো!”“দিবো না মিয়া, গত চুয়ান্ন বছরে আপনেরা হালায় ট্যাকা ট্যাকা কোইরা, সাধারণ পাবলিকের কথা ভুইল্লা, অহন মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরাইছেন, বুলডোজার দিয়া ঘরবাড়ি গুড়া গুড়া কোরছেন! এই নাকি আপনের স্বাধীনতা! চিফ ইলেকশান কমিশনারের গালে জুতার বাড়ি মারলেন, জুতার মালা পরাইলেন...আপনেরা কুনোই বাঙালি এর প্রতিবাদ কোরলেন না! অথচ ভারতের মুদির লোকেরা কোইছে, যেই ব্যাডায় মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরাইছিলা, হ্যাগো এবার গলায় দড়ি পড়বো। মাইনে হ্যাগোরে ফাঁসিতে লটকাইবো।”“যাহ তাই হয় নাকি? ভিন দেশ থেকে এসে আমাদের দেশের নাগরিক, আমাদের ভাইব্রাদারদের ফাঁসি দিবে তা হয় নাকি!”“তা হয় নাকি, না কী হয়, হেই ভবিষ্যৎ তো আমি কয়া পারুম না। তয় দেহেন সামনে কী হয়। তয় বর্তমান বাংলদেশ লয়া আমিভি, একটা ছড়া লিখছি...”“তুই লিখেছিস ছড়া? ভ্যারেন্ডা আবার বৃক্ষ!”“খামখা মজা কোইরেন না। হুইন্না দ্যাখেন মজা পাইবেন। ”“বল শুনি, কুঁজো যখন চিৎ হোয়ে শুতে চায়, তখন আমার কী? বল তোর ছড়া।”“চারিদিকে হাম হাম / বাচ্চা মরে হাজার / বদ্যির কাছে ছুইট্টা গ্যালো/ বাপে-মায়ে ব্যাজার/ বদ্যি কয়এ্যতো রোগী / অষুধ কোথা পাই/ হঠাৎ করে পড়ল মনে/ আরে হামের টিকাই কিনি নাই” হি হি হি। ক্যেমন লাগলো ছড়াটা?”“তোর ছড়া হাসির নয়রে বোধের...”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

ভিডিও আরও দেখুন

লিটনের সেঞ্চুরির জবাবে দিন শেষে পাকিস্তানের সতর্ক শুরু

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আজ শনিবার টস জিতে বাংলাদেশকে প্রথমে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানান পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদ। ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই মোহাম্মদ আব্বাসের শিকার হয়ে কোনো রান না করেই সাজঘরে ফেরেন মাহমুদুল হাসান জয়।অভিষেক টেস্টে শুরুটা ভালো করলেও ৩৪ বলে ২৬ রান করে আব্বাসের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হন তানজিদ হাসান তামিম। দলীয় ৪৪ রানে দ্বিতীয় উইকেট হারানোর পর সেট হয়ে যাওয়া মুমিনুল হকও খুররম শেহজাদের দারুণ এক ডেলিভারিতে ২২ রানে বোল্ড হন।৩ উইকেটে ১০১ রান নিয়ে লাঞ্চ বিরতিতে যাওয়ার পর দ্রুত সাজঘরে ফেরেন নাজমুল হোসেন শান্ত (২৯), মুশফিকুর রহিম (২৩) আর মেহেদী হাসান মিরাজ (৪)। ১০৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশকে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে উদ্ধার করেন লিটন কুমার দাস। ১৬টি চার ও ২টি ছক্কায় সাজানো চোখধাঁধানো এক ইনিংসে তিনি তুলে নেন টেস্ট ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি।এই ইনিংস খেলার পথে তাইজুলের ১৬ রানের বিদায়ের পর শরিফুলের সঙ্গে ৬৪ রানের মূল্যবান জুটি গড়েন লিটন। নবম ব্যাটার হিসেবে আউট হওয়ার আগে দলের হয়ে সর্বোচ্চ ১২৬ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন তিনি। শেষ ব্যাটার হিসেবে নাহিদ রানা শূন্য রানে আউট হলে বাংলাদেশ অলআউট হওয়ার আগে ২৭৮ রান সংগ্রহ করে। পাকিস্তানের পক্ষে খুররম শেহজাদ ৪টি এবং মোহাম্মদ আব্বাস ৩টি উইকেট নেন। প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশ দলের চেয়ে এখনও ২৫৭ রানে পিছিয়ে আছে পাকিস্তান। শেষ বিকালে ৬ ওভার ব্যাটিং করার সুযোগ পেয়ে কোনো উইকেট না হারিয়ে সফরকারীরা ২১ রান সংগ্রহ করেছে। আজম আওয়াইজ ১৩ ও আব্দুল্লাহ ফজল ৮ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। বাংলাদেশের বোলার তাসকিন, শরিফুল, মিরাজ ও নাহিদ রানা নিয়ন্ত্রিত বোলিং করলেও প্রথম দিনে কোনো উইকেটের দেখা পাননি।

লিটনের সেঞ্চুরির জবাবে দিন শেষে পাকিস্তানের সতর্ক শুরু
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৬৭ জন