ডিগ্রির বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট ও মানবসম্পদের অপচয়
দেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটছে, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানাধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন। কিন্তু তাদের অনেকেই যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। কেউ বেকার থাকছেন, কেউ স্বল্প আয়ের অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন, আবার কেউ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় নিজের কর্মক্ষম সময় হারাচ্ছেন। অর্থাৎ দেশ শিক্ষিত জনশক্তি তৈরি করছে, কিন্তু সেই জনশক্তিকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করতে পারছে না। বিশ্বব্যাংকের ডেমোগ্রাফিক চেইঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্নাতক বা তার বেশি শিক্ষিত মানুষের ৬০ শতাংশের বেশি অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত। দেশের মোট কর্মীর প্রায় ৮৪ শতাংশ, অর্থাৎ ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার মাত্র ২.৭ শতাংশ, যেখানে ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির গড় ৫.৪ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান শুধু বেকারত্বের চিত্র নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার গভীর দুর্বলতার প্রতিফলন।বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটলেও শিক্ষিত মানুষের জন্য মানসম্মত চাকরির বাজার সমানতালে বড় হয়নি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উচ্চ শিক্ষিতদের অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত থাকার তথ্য এই বাস্তবতাই তুলে ধরে। একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি যে অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত থাকা মানেই বেকার থাকা নয়। বরং অনেক শিক্ষিত মানুষ কাজ করছেন, কিন্তু তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। এটি মানবসম্পদের অপচয় বলেই বিবেচ্য। একজন শিক্ষার্থী ১৬ থেকে ১৮ বছর শিক্ষা অর্জনে ব্যয় করেন। পরিবার অর্থ বিনিয়োগ করে, রাষ্ট্র শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যয় করে। অথচ শেষ পর্যন্ত সেই শিক্ষার্থী যদি তার যোগ্যতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে যুক্ত হন, তাহলে ব্যক্তিগত ও জাতীয় উভয় পর্যায়েই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল কমে যায়। সমস্যার পেছনে শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের অসামঞ্জস্য, ব্যবহারিক দক্ষতার ঘাটতি এবং উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি না হওয়া গুরুত্বপূর্ণ কারণ।বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আধিক্য। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ কর্মী এই খাতে নিয়োজিত। তাদের বড় অংশ ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, গৃহকর্ম ও বিভিন্ন সেবামূলক পেশায় কাজ করেন। কিন্তু এসব কাজের ক্ষেত্রে নিয়োগপত্র, নির্ধারিত বেতন, স্বাস্থ্যবিমা, পেনশন এবং চাকরির নিরাপত্তা অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশে কাজের সুযোগ থাকলেও মানসম্মত কাজের সংকট রয়েছে। একজন মানুষ সারাদিন কাজ করেও যদি ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে না পারেন, অসুস্থ হলে চিকিৎসার নিশ্চয়তা না পান কিংবা যেকোনো সময় কাজ হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে সেই কর্মসংস্থানকে টেকসই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলা যায় না।আমাদের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তরুণ জনগোষ্ঠী। কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত বেশি থাকলে একটি দেশ উৎপাদন, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ পায়। অর্থনীতিতে একে জনসংখ্যাগত সুবিধা বলা হয়। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়তে থাকবে। ২০৫১ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আরও উদ্বেগজনক হলো, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে শ্রমের জোগান কর্মসংস্থানের চাহিদার তুলনায় ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি হতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেই অর্থনীতি শক্তিশালী হবে না। তাদের জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কাজ তৈরি করতে হবে। তা না হলে আজকের তরুণ জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার বছরে মাত্র ২.৭ শতাংশ। অথচ ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় ৫.৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরির গতি তুলনামূলকভাবে অর্ধেক। এর পেছনে বিনিয়োগের দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, জ্বালানি সংকট, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং শিল্পের সীমিত বহুমুখীকরণ কাজ করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে কর্মী কমাচ্ছে। ফলে প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করা তরুণদের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বিশ্ব ব্যাংকের আরেকটি অর্থনৈতিক পূর্বাভাসও উদ্বেগজনক। সংস্থাটির অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ উন্নয়ন পর্যালোচনায় ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে দুর্বল বিনিয়োগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের সমস্যাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অতএব, শুধু শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতা বাড়ালেই হবে না; তাদের নিয়োগ করার মতো প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানও তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সংকটের সঙ্গে নারীর সীমিত শ্রমবাজার অংশগ্রহণ গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৩৮ শতাংশ। সামাজিক বাধা, নিরাপদ কর্ম পরিবেশের অভাব, শিশুযত্নের সীমিত ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং পারিবারিক দায়িত্ব নারীদের কর্মজীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। অথচ নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ানো গেলে পরিবারের আয়, জাতীয় উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সবই বাড়তে পারে। এ জন্য নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ, সমান মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, নিরাপদ যাতায়াত এবং কর্মস্থলে শিশুযত্নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।কর্মসংস্থানের জন্য শুধু শিক্ষাগত সনদ যথেষ্ট নয়; সুস্বাস্থ্য, দক্ষতা এবং সামাজিক নিরাপত্তাও প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা উঠে এসেছে। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ২০ শতাংশ সেখানে কর্মরত। শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি। আবার প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশের ভর্তির হার ৩৬ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৬২ শতাংশ। পরিসংখ্যান দেখায়, মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি এখনো সমানভাবে শক্তিশালী হয়নি। সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পেনশন ও অবসরকালীন নিরাপত্তা নেই। ফলে ভবিষ্যতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।এই সংকট সমাধানে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা। শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে ব্যবহারিক শিক্ষা, ইন্টার্নশিপ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তৈরি পোশাকশিল্পের বাইরে ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, পর্যটন এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রযুক্তি এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। কারণ এই খাতের বিকাশ নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। ন্যায্য মজুরি, নিয়োগপত্র, স্বাস্থ্যবিমা এবং পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে অদক্ষ জনশক্তির পরিবর্তে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বব্যাংকও ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন সহজ করা, দক্ষতা উন্নয়ন, নারীর কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে।বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে আমরা কি আমাদের জনশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি? একদিকে শিক্ষিত তরুণেরা যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না, অন্যদিকে দেশের ৮৪ শতাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরির গতি কম, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ সীমিত এবং ভবিষ্যতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে অর্থনৈতিক সাফল্য বিচার করা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মানসম্মত চাকরি, মানুষের আয় ও উৎপাদনশীলতা, এবং শিক্ষিত তরুণেরা তাদের মেধা কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছেন কি না। বাংলাদেশের সামনে এখনো জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ২০৪৫ সালের সময়সীমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই সুযোগ অনন্তকাল থাকবে না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ, আর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ব্যর্থতা হবে সেই মানুষকে কাজে লাগাতে না পারা। তাই উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে শুধু অবকাঠামো নয়, মানবসম্পদ, মানসম্মত কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতাকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ধারিত হয় তার মানুষের কাজের সুযোগ, আয়ের নিরাপত্তা এবং উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ব্যাংকার; সহযোগী অধ্যাপক (খন্ডকালীন), অর্থনীতি বিভাগ, সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়]