সংবাদ
সাদেকা হালিমসহ ঢাবির ৩ শিক্ষক বরখাস্ত

সাদেকা হালিমসহ ঢাবির ৩ শিক্ষক বরখাস্ত

শ্রেণিকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে ‘অশিক্ষকসুলভ আচরণ’ এবং ‘নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের’ অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিমকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ভিন্ন অভিযোগে একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে আরও দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে।মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।বরখাস্ত হওয়া তিন শিক্ষক হলেন- অধ্যাপক সাদেকা হালিম (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম (নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ) ও অধ্যাপক আফরোজা শেলী (নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ)।এ ছাড়া আরও চারজন শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি।বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শ্রেণিকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে ‘অশিক্ষকসুলভ আচরণ’ এবং ‘নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের’ অভিযোগে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট কী কী অভিযোগ, তা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি।সিন্ডিকেট সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্তেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
৫ ঘন্টা আগে

৩০ জুলাই ২০২৬, ০১:১৪ এএম
বাজারের ৩৪টি টুথপেস্টের ২৬টিতে পাওয়া গেছে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক। আপনি কি মনে করেন এই ২৬টি টুথপেস্ট বাজার থেকে প্রত্যাহার করা উচিত?

বাজারের ৩৪টি টুথপেস্টের ২৬টিতে পাওয়া গেছে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক। আপনি কি মনে করেন এই ২৬টি টুথপেস্ট বাজার থেকে প্রত্যাহার করা উচিত?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ১০৫৯ জন

সংবাদ ডিজিটালে জেলা, উপজেলায় কাজ করতে আগ্রহীরা সিভি পাঠান

বিস্তারিত

মতামতমতামত

রুনা লায়লার ক্ষোভ ও পদত্যাগপত্রে বানান ভুল

গতকালের পত্রিকাজুড়ে দেশ-বিদেশের বিচিত্র খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে দুটো খবরের ওপর বিশেষ নজর পড়লো। একটা দেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব রুনা লায়লার প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ প্রকাশ এবং অপরটি মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দীন চুপ্পুর পদত্যাগ পত্রের লেখায় অসংখ্য বানান ভুল। দুটো সংবাদই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হলো। তবে বানানের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই বেশি স্থান করে নিয়েছে।রুনা লায়লা উপমহাদেশের সংগীতের এক জীবন্ত কিংবদন্তির নাম। বাংলাদেশ এবং বাঙালির অহংকার বললেও অত্যুক্তি হবে না। এদেশে জন্মগ্রহণ করলেও তার শৈশব কেটেছে পাকিস্তানে। স্বাধীনতার পরে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। জন্মভূমির প্রতি তার রয়েছে প্রগাঢ় অনুভূতি এবং ভালোবাসা। যা তার বিভিন্ন সময়ের দেয়া সাক্ষাৎকারে অকপটে প্রকাশিত। তাকে বিশেষ কোনো  বিশেষণ দিয়ে বর্ণনা করা যাবে বলে মনে হয় না। ছয় দশকের বেশি তার সংগীত জীবনের সময়কাল। নানা ধরনের গান, নানা ভাষায় গেয়ে দুনিয়াজুড়ে বিপুল খ্যাতি পেয়েছেন। বলা হয়, ১৮টি ভাষায় ১৩ হাজারের বেশি গান তার কণ্ঠে গীত হয়েছে। তাকে নিয়ে গর্ব করার মতন অগণিত গল্প আছে। সুরের রানী হিসেবে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে তার সমান জনপ্রিয়তা রয়েছে।২.জানা যায়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি গতকালই তাঁকে প্রথমবারের মতন আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা প্রদান করে। একইসাথে শ্রাবণের বৃষ্টিস্নাত সায়াহ্নে তার একক সংগীতানুষ্টানের আয়োজন করে শিল্পকলা একাডেমি। এতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকতারা উপস্থিত ছিলেন। পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছে ‘রুনার গানে ভিজল শ্রাবণসন্ধ্যা’। একপর্যায়ে মিডিয়ার সামনে তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ‘নিজের দেশের শিল্পকলা একাডেমিতে একক সংগীত আয়োজন করতে আমাকে ৬২ বছর অপেক্ষা করতে হলো'। এটা এমন একজন প্রতিভাবান, গুণী সংগীত শিল্পীর জন্যে মোটেও কাঙ্খিত নয়। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুরনো শিল্পকলায় তিনি ইতোপূর্বে সংগীত পরিবেশন করলেও তার একক আয়োজন এ-ই প্রথম। আরও জানা যায়, তার এই একক সংগীতানুষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত অর্থ সম্প্রতিকালের বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় ব্যয় করা হবে।এমন আয়োজনকে তিনি তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শামিল বলেও বিবেচনা করেছেন। রুনা লায়লা বরাবরই খুব রসাত্মক ও উইটি ভাষায় কথা বলেন। যা দর্শক শ্রোতাকে দ্রুত সংযোগ করে করতে পারে। শিল্পকলায়ও এর ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। তবে প্রশ্ন হলো, তাকে নিয়ে একক সংগীতানুষ্ঠান না হওয়ার পেছনে কী কোনো রহস্য আছে? যেখানে শিল্প কলায় বিদেশি শিল্পীদেরও একক অনুষ্ঠান হয়েছে। ভক্তরা মনে করেন এটা সরকারের পক্ষ থেকে অবহেলা বা অবজ্ঞা নয় বরং অতীতে সুবিধাজনক সময় না হওয়ায় আসল কারণ। শিল্পী নিজেও সারাবছর ধরে বিদেশে নানাবিধ সংগঠনের আমন্ত্রণে থাকায় হয়তো হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া শিল্পী রুনা লায়লার শিডিউল, সম্মতি এবং সংস্থার সিদ্ধান্ত সবমিলিয়ে হয়তো সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য যে, ইচ্ছে  করলেই শিল্পী রুনা লায়লাকে যেকোনো সময়ে এমনকি জাতীয় প্রোগ্রামেও আনা সম্ভব হয় না।৩.এ প্রসঙ্গে বলা যায়, ২০১০ সালে প্রথম দিকে অফিসার্স ক্লাব ঢাকার এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে শিল্পী রুনা লায়লাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের মিলনমেলা হয়েছিল। ক্লাবের নবনির্বাচিত কমিটির অভিষেকের আয়োজন ছিল।এতে আরও কয়েকজন শিল্পীর মধ্যে সাবিনা ইয়াসমিনও ছিলেন। অনেক ধরনের গান হয়েছে। রাতের প্রহরও ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে। সবশেষে মাইক্রোফোনে ঘোষণা হল এবারের শিল্পী দেশের সেরা লিজেন্ড রুনা লায়লা। তার গান শুরুর শুভ মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। সবাই নড়েচড়ে বসেছেন। শিল্পীর কণ্ঠসুধায় সিক্ত হবেন। মনে আছে, গান শুরুর আগে দুয়েকটা কথা বলার সময় তিনি লক্ষ করলেন, শ্রোতাদের পেছনের সারিগুলোতে টুংটাং শব্দ হচ্ছে। তখন কেউ কেউ খাবারে হাত লাগাচ্ছেন। তাদের দাবি, তারা ডায়াবেটিসের রোগী। কিছু খেতে হবে, বেশি অপেক্ষা করতে পারছিলেন না। কাজেই খেতে খেতেই গান শুনবেন।শিল্পী রুনা লায়লা এটাকে তার প্রতি এক ধরনের অসম্মান প্রদর্শন বলে মনে করেছেন এবং কালবিলম্ব না করে মঞ্চ থেকে নেমে সোজা বাসায়। সেদিন তার পেছনে বেশ ক'জন সিনিয়র কর্মকর্তা ক্লাবের সিংহ দুয়ার পর্যন্ত দৌড়ালেন। না, কাজ হল না। তাকে ফেরানো গেল না। ফেরানো যায়নি। এর নাম রুনা লায়লা।৪.দ্বিতীয় বিষয় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ পত্রে ১৬টি বানান ভুল। সব কাজ ফেলে যারা এটা আবিষ্কার করেছেন, একে স্রেফ বাড়াবাড়ি হয়েছে বলতে হবে। নতুন শুদ্ধ বানান রীতিতে তিনটা বানান ভিন্নতর হয়েছে। তাছাড়া ইংরেজি শব্দকে বাংলায় লিখতে গেলে যেটাকে ভুল ধরা হয়েছে সেটা গর্হিত কিছু নয়।মনে হয়, সবকিছুতে ভুল ধরা, সন্দেহ করা, অধৈর্য হওয়ার একটা মারাত্মক প্রবণতার ভেতর দিয়ে চলেছে দেশ। সবাইকে আরও সহনশীল সংবেদনশীল হওয়ার ওপর জোর দিতে হবে। সাধারণ  মানুষকেও বিদ্যমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে অধিকতর মহৎ ও জনকল্যাণমুখী কাজে ব্যবহার করতে হবে। এবিষয়ে গ্রামে-গঞ্জে সামাজিক শিক্ষা ও গণসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করার সময় এসেছে। যা শিক্ষণীয় হবে, মাদক বিরোধী হবে বা যুবসমাজকে স্বাবলম্বী করে তোলার প্ল্যাটফর্ম হবে। অন্যথায় অন্তত ফেইসবুক মাধ্যমটি বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্যে সুফল নয় বরং একদিন অসহনীয় কুফল নিয়ে আসবে।[লেখক: গল্পকার]

শিক্ষককে মানুষ থাকতে দিন, তবেই মানুষ গড়া সম্ভব

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং দ্রুত পরিবর্তিত বৈশ্বিক কর্মবাজার; অন্যদিকে এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ, যারা হবে দক্ষ, সৃজনশীল, মানবিক এবং মূল্যবোধসম্পন্ন। এই বাস্তবতায় শিক্ষা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু নতুন কারিকুলাম বা প্রযুক্তি নয়; বরং সেই মানুষটি, যিনি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। রাষ্ট্র আজ স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ গড়ছে, ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী তৈরি করছে, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে থেকেই যায়। একজন আধুনিক শিক্ষক ছাড়া কি আধুনিক শিক্ষা সম্ভব? আমার বিশ্বাস, এর উত্তর ‘না’।কারণ একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ কখনো প্রযুক্তি নয়; একজন শিক্ষক। একটি স্মার্ট বোর্ড, একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কিংবা একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার শিক্ষার্থীর শেখাকে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু শেখার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে পারে না। সেই অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেন একজন চিন্তাশীল, সৃজনশীল, মানবিক এবং দায়িত্বশীল শিক্ষক। প্রযুক্তি শিক্ষকের বিকল্প নয়; বরং একজন দক্ষ শিক্ষকের হাতেই প্রযুক্তি শিক্ষাকে আরও কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক এবং আনন্দময় করে তোলে।এ কারণেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনেস্কোর ‘রেকমেন্ডেইশন কনসার্নিং দ্য স্টেটাস অফ টিচার্স’ -এ শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত স্বাধীনতাকে মানসম্মত শিক্ষার মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষকের মানোন্নয়ন ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।বাংলাদেশও শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণার প্রসার এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। যে মানুষটি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলেন, তার পেশাগত বিকাশ, সৃজনশীলতা, গবেষণার সুযোগ এবং মানসিক স্বাধীনতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনো অনেক সময় শিক্ষকের জ্ঞান, গবেষণা, পাঠদানের দক্ষতা কিংবা মানুষ গড়ার অবদানের চেয়ে তাঁর ব্যক্তিজীবনের শালীন প্রকাশ বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। আমরা চাই তিনি শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তা শেখান, অথচ তার নিজের মুক্ত ও মানবিক প্রকাশকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি না। আমরা চাই তিনি সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তুলুন, অথচ তার নিজের সৃজনশীলতাকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখি। এই বৈপরীত্য দূর না করলে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্যও পূর্ণতা পাবে না। একজন শিক্ষক সর্বাগ্রে একজন মানুষ। তারও অনুভূতি আছে, পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ থাকতে পারে। তিনি যদি পেশাগত নৈতিকতা, শালীনতা এবং দায়িত্ববোধ অক্ষুণ্ন রাখেন, তাহলে তার মানবিক সত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো শিক্ষাগত বা নৈতিক ভিত্তি নেই।আজকের পৃথিবীতে একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদবি বা বয়স নয়; তার শেখার ক্ষমতা। যে শিক্ষক প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান অর্জন করেন, প্রযুক্তিকে কাজে লাগান, গবেষণায় যুক্ত থাকেন, সংস্কৃতিচর্চা করেন এবং শিক্ষার্থীদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলেন, তিনিই প্রকৃত আধুনিক শিক্ষক। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু বই থেকে শেখে না; তারা শেখে শিক্ষকের চিন্তা, আচরণ, মূল্যবোধ এবং জীবনদর্শন থেকেও।এই কারণেই শিক্ষকের মানবিক সত্তা, সৃজনশীলতা এবং পেশাগত বিকাশকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একজন শিক্ষক যত বেশি জ্ঞানচর্চা করবেন, সংস্কৃতিমনা হবেন, সময়ের সঙ্গে নিজেকে আপডেট রাখবেন এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হবেন, তার শ্রেণিকক্ষও তত বেশি প্রাণবন্ত, চিন্তাশীল ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক হয়ে উঠবে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু নীতিমালায় লেখা হয় না; প্রতিদিন নীরবে লেখা হয় শ্রেণিকক্ষে। আর সেই ভবিষ্যতের প্রধান নির্মাতা একজন শিক্ষক। তাই শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা কোনো একটি পেশার স্বার্থ রক্ষা নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতারই অংশ।শিক্ষা কখনো কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়; এটি মানুষ গড়ার একটি অবিরাম প্রক্রিয়া। আর মানুষ গড়ার এই কাজটি যিনি করেন, তিনি নিজেও একজন পূর্ণ মানুষ। তাই শিক্ষককে এমন একটি সত্তায় পরিণত করা উচিত নয়, যেখানে তার ব্যক্তিত্ব, অনুভূতি এবং সৃজনশীলতার কোনো স্থান থাকবে না।আমাদের সমাজে এখনো একটি ভুল ধারণা রয়ে গেছে শিক্ষক মানেই তিনি সব সময় গম্ভীর থাকবেন, ব্যক্তিজীবনকে আড়ালে রাখবেন এবং কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবেন। কিন্তু একজন শিক্ষক যদি শালীনতা ও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রেখে নিজের স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন, সংস্কৃতিচর্চা করেন, বই পড়েন, গবেষণা করেন কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন, তাহলে তা তার শিক্ষকতার পরিপন্থী নয়; বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ করে। আজকের পৃথিবীতে একজন শিক্ষকের পরিচয় তার বয়স নয়; তার মনের বয়স। একজন শিক্ষক ষাট বছর বয়সেও আধুনিক হতে পারেন, যদি তিনি নতুন কিছু শেখার আগ্রহ না হারান। আবার কম বয়সেও কেউ যদি পরিবর্তনের প্রতি অনাগ্রহী হন, তবে তিনি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবেন না। তাই আধুনিক শিক্ষক বলতে আমরা এমন একজন মানুষকে বুঝি, যিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন জ্ঞান, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত করেন।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষা, ভার্চুয়াল ল্যাব, ওপেন এডুকেশনাল রিসোর্স এবং বৈশ্বিক জ্ঞানভাণ্ডার আজ শিক্ষকের হাতের নাগালে। এগুলোকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই; বরং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য এগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। যে শিক্ষক প্রযুক্তিকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযাত্রী হিসেবে গ্রহণ করবেন, তিনিই ভবিষ্যতের শ্রেণিকক্ষের নেতৃত্ব দেবেন।একইভাবে, যে শিক্ষক বই পড়েন, গবেষণা করেন, নতুন ধারণা নিয়ে ভাবেন, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেন এবং সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন, তিনি কখনো পুরোনো হয়ে যান না। কারণ একজন শিক্ষক আজীবন শিক্ষার্থী; শেখা থেমে গেলে শিক্ষকতাও থেমে যায়।এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন শিক্ষককে আমরা কেমন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই? এমন একজন মানুষ, যিনি কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবেন, নাকি এমন একজন, যিনি জীবনকে জানবেন, সমাজকে বুঝবেন এবং সংস্কৃতির আলোয় নিজেকে সমৃদ্ধ করবেন? একজন শিক্ষক যদি শালীনতা ও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রেখে গান শোনেন, কবিতা আবৃত্তি করেন, সাহিত্যচর্চা করেন, গবেষণা করেন কিংবা শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন, তাহলে তা তার শিক্ষকতার পরিপন্থী নয়; বরং শিক্ষকতাকে আরও সমৃদ্ধ করে। কারণ শিক্ষা কেবল তথ্যের নয়; রুচি, মানবিকতা, সৌন্দর্যবোধ ও মূল্যবোধেরও চর্চা। একজন সংস্কৃতিমনা শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব গুণ বিকাশে অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষকের বয়স নয় শিক্ষকের মনের বয়সই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যিনি প্রতিদিন নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করেন, নতুন বই পড়েন, নতুন ধারণা নিয়ে ভাবেন এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেন, তিনিই প্রকৃত আধুনিক শিক্ষক। আর এমন শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের শেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেন। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষকের পাঠ নয়; তার কৌতূহল, উদ্যম ও জীবনবোধ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে।প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব? কীভাবে এমন একটি শিক্ষা-পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, যেখানে শিক্ষক একই সঙ্গে আধুনিক, দক্ষ, সৃজনশীল এবং মর্যাদাসম্পন্ন পেশাজীবী হিসেবে বিকশিত হতে পারেন? কেবল সমস্যা চিহ্নিত করলেই চলবে না; এর কার্যকর সমাধানের পথও নির্ধারণ করতে হবে। কারণ একজন শিক্ষকের বিকাশ মানেই একটি প্রজন্মের বিকাশ। তাই এই পরিবর্তনের দায় শুধু শিক্ষকের নয়; রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ.. সবার। এ লক্ষ্য অর্জনে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।প্রথমত, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষণ-পদ্ধতি, গবেষণা, যোগাযোগ দক্ষতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সৃজনশীল শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।দ্বিতীয়ত, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা, মেন্টরশিপ এবং পারস্পরিক শেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একজন শিক্ষকের ভালো উদ্যোগ যেন অন্য শিক্ষকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়; নিরুৎসাহ বা ঈর্ষার কারণ নয়। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। শালীন ব্যক্তিজীবনকে বিতর্কের বিষয় না বানিয়ে, তার শ্রেণিকক্ষের কাজ, গবেষণা, সততা এবং মানুষ গড়ার অবদানকে মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড করতে হবে।চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অযাচিত ট্রল, অপপ্রচার এবং সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত অপমান বা চরিত্রহনন কখনোই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।পঞ্চমত, শিক্ষা নীতির বাস্তবায়নে শিক্ষককে অংশীদার করতে হবে। নতুন কারিকুলাম, প্রযুক্তি ব্যবহার, মূল্যায়ন পদ্ধতি বা শিক্ষা সংস্কারের সিদ্ধান্তে মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিলে বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।সবশেষে, শিক্ষকদের প্রতিও একটি প্রত্যাশা রয়েছে। সমাজ যখন তাদের সম্মান দেয়, তখন সেই সম্মানের প্রতিদানও তাদের দিতে হবে নিষ্ঠা, সততা, আজীবন শেখার মানসিকতা এবং পেশাগত নৈতিকতার মাধ্যমে। একজন শিক্ষককে প্রতিদিনই নিজেকে নতুন করে গড়তে হবে। কারণ তিনি শুধু পাঠদান করেন না; তিনি আগামী দিনের নাগরিক তৈরি করেন। আমরা যদি সত্যিই একটি স্মার্ট, মানবিক ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে শিক্ষকের হাতে শুধু প্রযুক্তি তুলে দিলেই হবে না; তার চিন্তার স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।কারণ একজন শিক্ষককে মানুষ থাকতে দিলে তবেই তিনি মানুষ গড়তে পারবেন। একজন শিক্ষকের হাসি, তার সংস্কৃতিচর্চা, তার গবেষণা এবং তার মানবিক সত্তা তার শিক্ষকতাকে ছোট করে না; বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ, আরও অনুপ্রেরণাদায়ী করে তোলে। আর এমন শিক্ষকই একটি আলোকিত জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষকআরও পড়ুন-বাবা হওয়া সহজ, পিতা হওয়া কঠিনলাল স্রোতের নীরব বীর‘দূষণ’ হয়ে উঠছে সম্পদরক্তের দামে কেনা বিষণ্ণ জীবনজলবায়ু পরিবর্তনের নীরব শিকার বাংলাদেশের শ্রমিকরা

শ্রাবণের গানই হয়ে উঠলো প্রতিবাদের প্রতীক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা আমাদের সমাজ সম্পর্কে বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। প্রশ্নটি খুব সরল- একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষ থাকতে পারবেন না?সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়েছিল। ভিডিওতে তাকে হালকা বাতাসে আঁচল উড়িয়ে, ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’–এর সঙ্গে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডের সেই ভিডিওই হয়ে ওঠে সমালোচনা, কটাক্ষ ও সামাজিক বিচারের বিষয়।কিন্তু সেই সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় যা ঘটেছে, তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা একই গান ব্যবহার করে রিলস তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কেউ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, কেউ কর্মস্থলে, কেউ ব্যক্তিগত পরিবেশে ভিডিও করেছেন।  তাদের বক্তব্য একটাই- একজন শিক্ষক বা একজন নারীকে তার ব্যক্তিগত আনন্দ, পোশাক, হাসি, গান কিংবা স্বাভাবিক অভিব্যক্তির জন্য হেনস্তা করা হলে তার প্রতিবাদ হওয়া দরকার।একটি রোমান্টিক গান এভাবে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠবে- সম্ভবত গানটির গীতিকার ও সুরকার আশরাফ বাবুও ১৯৮৭ সালের এক শ্রাবণে খুলনায় বসে গানটি লেখার সময় তা ভাবেননি। কিন্তু সময় কখনো কখনো শিল্পকে নতুন অর্থ দেয়। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি এই শ্রাবণে হয়ে উঠেছে সামাজিক বিচারপ্রবণতার বিরুদ্ধে এক ধরনের সম্মিলিত প্রতিবাদের প্রতীক।শিক্ষিকা সামিয়া শিকদার লিখেছেন, ‘বিউটি রানী পাল ম্যাডামকে হেনস্তার চেষ্টা সফল হয়নি। আজ প্রতিটি সাহসী শিক্ষকই একেকজন বিউটি রানী পাল। আমরা মাথা নত করব না, সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাব।’কুমিল্লার শিক্ষিকা লায়লা নূর পিংকি লিখেছেন, ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গানের ভিডিও নিয়ে কটাক্ষের প্রসঙ্গ টেনে, শিক্ষকদের এই প্রতিবাদের ফলে মানুষ অন্তত কিছু সময়ের জন্য অন্য কিছু নিয়ে কথা বলছে। তার ভাষায়, ডিজিটাল এই প্রতিবাদ দেখিয়ে দিয়েছে, অন্যায় হলে শিক্ষকেরাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারেন।পঞ্চগড়ের শিক্ষিকা ফেরদৌস লিখেছেন, ‘এরপর শাড়ি পরেই দিব শিক্ষকের সেই ভাইরাল নাচ!’ আর চট্টগ্রামের মতলব বাজারের শিক্ষিকা জয়ন্তী ভৌমিকের প্রশ্নটি আরও সরাসরি: ‘শিক্ষক যদি হাসেন, সমস্যা! সাজেন, সমস্যা! পরিপাটি থাকেন, সমস্যা! ভ্রমণে যান, সমস্যা! ছবি পোস্ট করেন, সমস্যা! তাহলে কি শিক্ষক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হওয়ার অধিকারটাও জমা দিতে হবে?’এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে।একজন শিক্ষক অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তার কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা, শালীনতা, পেশাগত সততা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। কোনো শিক্ষক আইন ভঙ্গ করলে, শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করলে, প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা লঙ্ঘন করলে বা দায়িত্বে অবহেলা করলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। শিক্ষকও আইনের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু একটি ব্যক্তিগত ভিডিওতে কাউকে গান করতে, হাঁটতে, হাসতে বা আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা গেলেই তার চরিত্র, সততা কিংবা পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি ন্যায়সংগত?এখানেই মূল সমস্যাটি।আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে এমন এক ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করি, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছেও প্রত্যাশা করি না। শিক্ষক যেন সব সময় গম্ভীর থাকবেন, সব সময় সংযত থাকবেন, ব্যক্তিগত আনন্দ প্রকাশ করবেন না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করবেন না- এমন একটি অলিখিত সামাজিক বিধি যেন তৈরি হয়ে গেছে।কিন্তু শিক্ষক কি কেবল শ্রেণিকক্ষের মানুষ? বিদ্যালয়ের দরজা দিয়ে ঢোকার পর তিনি শিক্ষক- এটি সত্য। কিন্তু বিদ্যালয়ের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসার পর তিনি কি মানুষ নন?একজন শিক্ষকেরও পরিবার আছে, বন্ধুত্ব আছে, পছন্দ-অপছন্দ আছে, সংস্কৃতিচর্চা আছে, আনন্দ আছে, ক্লান্তি আছে। তিনি গান শুনতে পারেন, ভ্রমণে যেতে পারেন, ছবি তুলতে পারেন, সাজতে পারেন, হাসতে পারেন। এসবের কোনোটিই তাকে কম দায়িত্বশীল শিক্ষক বানায় না।বরং বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শেখাতে হলে শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য জানলেই হয় না। গান, অভিনয়, গল্প, আবৃত্তি, নৃত্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড শিশুর কল্পনাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক বোধ গড়ে তোলে। আমরা যখন একজন শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গান গাইতে বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখি, তখন সেটিকে শিক্ষার অংশ হিসেবে স্বাগত জানাই। কিন্তু একই শিক্ষক বিদ্যালয়ের বাইরে নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে একটি গান বা নাচের ভিডিও প্রকাশ করলে তার চরিত্র বা পেশাগত মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করি।এই দ্বৈত মানসিকতা কেন?একজন শিক্ষক যদি সংস্কৃতির মূল্য বোঝেন, সৃজনশীলতার চর্চা করেন এবং জীবনে আনন্দের জায়গা রাখেন, তাহলে তিনি শিক্ষার্থীদেরও আরও মানবিক, আত্মবিশ্বাসী ও মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। একজন আনন্দহীন মানুষই যে ভালো শিক্ষক হবেন- এমন কোনো প্রমাণ নেই।এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সামাজিক বিচার অনেক সময় আরও কঠোর হয়ে ওঠে।একজন পুরুষ শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান করলে বা আনন্দের ভিডিও প্রকাশ করলে সেটিকে অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারী শিক্ষক একই কাজ করলে তার পোশাক, চুল, হাঁটা, হাসি কিংবা শরীরী ভাষা নিয়ে শুরু হয় নৈতিকতার আলোচনা। নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমাজের এই অতিরিক্ত আগ্রহ নতুন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু সেই প্রবণতাকে আরও দ্রুত, আরও প্রকাশ্য এবং আরও নিষ্ঠুর করে তুলেছে।একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় মন্তব্য, কটাক্ষ, চরিত্রহনন, এমনকি চাকরি হারানোর দাবি। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি পোস্ট কখনোই পুরো সমাজের মতামতকে প্রতিনিধিত্ব করে না।কোনো সংবাদে যদি বলা হয়, ‘অভিভাবকদের ক্ষোভ’, ‘জনগণের দাবি’ বা ‘সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ’, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- সত্যিই কি সংশ্লিষ্ট অভিভাবকেরা অভিযোগ করেছেন? লিখিত কোনো অভিযোগ আছে কি? অভিযোগের প্রকৃতি কী? নাকি কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট ধীরে ধীরে ‘জনমত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে? সমালোচনার অধিকার সবার আছে। কেউ মনে করতেই পারেন, কোনো নির্দিষ্ট আচরণ একজন শিক্ষকের পেশাগত ভূমিকার সঙ্গে মানানসই নয়। সেই মত প্রকাশের অধিকারও তার আছে। কিন্তু মতের সঙ্গে ব্যক্তিগত অপমান, চরিত্রহনন বা ধর্মীয় বিদ্বেষ যুক্ত হলে তা আর সুস্থ সমালোচনা থাকে না।বিউটি রাণী পাল হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন নারী। তার ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে কোনো বৈষম্য বা বিদ্বেষ হয়েছে কি না, সেটি প্রমাণ ও তদন্তের বিষয়। প্রমাণ ছাড়া কাউকে ধর্মীয় বিদ্বেষের জন্য অভিযুক্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি কারও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তিনি সামাজিক বা পেশাগত চাপের মুখে পড়ছেন কি না, সেটিও উপেক্ষা করা যায় না।একই সঙ্গে প্রতিবাদের ভাষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যারা একজন নারী শিক্ষককে অপমান করেছেন, তাদের সমালোচনা করতে গিয়ে যদি পাল্টা কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীকে একইভাবে অপমান করা হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান হয় না। এক ধরনের অসহিষ্ণুতার জবাব আরেক ধরনের অসহিষ্ণুতা দিয়ে দেওয়া যায় না।প্রতিবাদ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবাদ যেন আরেকটি নিপীড়নের ভাষা না হয়ে ওঠে। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানে শিক্ষিকাদের এই সম্মিলিত ভিডিও প্রকাশের ঘটনা তাই শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রবণতা নয়। এর মধ্যে এক ধরনের সামাজিক বার্তাও আছে। একজনকে হেনস্তা করার চেষ্টা যখন হাজারো মানুষকে একই প্রতীকের অধীনে দাঁড় করিয়ে দেয়, তখন সেটি নিছক বিনোদন থাকে না; তা প্রতিবাদের রূপ নেয়।তবে এই প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই যে, বহু শিক্ষক ও শিক্ষিকা নিজেদের স্বাভাবিক প্রকাশের জায়গাটি নতুন করে দাবি করেছেন।লায়লা নূর পিংকির কথায়, ‘যেসব শিক্ষক কোনো দিন লজ্জায় ভিডিও দিতেন না, তাদের প্রতিভাও বিকশিত করে দিলেন।’ কথাটির মধ্যে রসিকতা আছে, কিন্তু সামাজিক বাস্তবতাও আছে। আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে অনেক মানুষ স্বাভাবিকভাবে আনন্দ প্রকাশ করার আগেও ভাবেন- কেউ কি তাকে বিচার করবে?এটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।একজন শিক্ষককে তার পেশাগত কাজের জন্য মূল্যায়ন করা উচিত। তিনি শ্রেণিকক্ষে কেমন পড়ান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, দায়িত্ব কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন, বিদ্যালয়ে তাঁর অবদান কী- এসব হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড। একটি ভিডিও দিয়ে একজন মানুষের সমগ্র পরিচয় নির্ধারণ করা ন্যায়সংগত নয়।আরও বড় কথা, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মুহূর্তকে সামাজিক নজরদারির বস্তুতে পরিণত করা হলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যায়। শিক্ষক সংকট, শিক্ষার মান, অবকাঠামোর ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, নিরাপদ শিক্ষাপরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা করার বদলে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি- কে কী পোশাক পরলেন, কীভাবে হাঁটলেন, কোন গানের সঙ্গে ভিডিও করলেন।এটি কেবল একজন শিক্ষক বা একটি ভিডিওর সমস্যা নয়। এটি আমাদের সামাজিক অগ্রাধিকারেরও প্রশ্ন।আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রকাশ করতে ভয় পাবেন? আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে নারীর হাসি, পোশাক, চুল, সাজসজ্জা কিংবা আনন্দের মুহূর্তও জনসমক্ষে নৈতিক বিচারের বিষয় হয়ে উঠবে?যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।একজন শিক্ষককে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। কিন্তু দায়িত্বশীলতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা পরস্পরের বিরোধী নয়। পেশাগত দায়িত্বের জন্য একজন শিক্ষককে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য তাকে সমাজের অনুমতি নিতে হবে- এমন কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারণা থাকতে পারে না।মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন সবার আছে, তেমনি অন্যের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্বও সবার।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই ভারসাম্য: স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু দায়িত্বও থাকবে; সমালোচনা থাকবে, কিন্তু অপমান নয়; মতভেদ থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়। বিউটি রাণী পালকে ঘিরে বিতর্কের শেষ কথা তাই কোনো পক্ষের জয় বা পরাজয় নয়। মূল প্রশ্নটি আরও বড়।একজন শিক্ষক কি শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষও থাকতে পারবেন?উত্তরটি হওয়া উচিত- অবশ্যই।শিক্ষকেরও হাসার অধিকার আছে। আনন্দ করার অধিকার আছে। গান শোনার অধিকার আছে। সংস্কৃতিচর্চার অধিকার আছে। নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে বাঁচার অধিকার আছে।একজন শিক্ষককে তার কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও দিয়ে নয়, তার দীর্ঘদিনের কাজ দিয়ে মূল্যায়ন করা হোক। একজন নারীকে তার পোশাক, হাসি, চুল বা আনন্দের মুহূর্তের জন্য সামাজিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে আমরা অন্তত একবার নিজেদের দিকে তাকাই।কারণ শিক্ষকরা রোবট নন।নারীরাও নন।তারা মানুষ।আর একটি মানবিক সমাজের প্রথম শর্তই হলো- মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা।লেখক: সাংবাদিক। সংবাদ প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

আবারও কি ভাঙছে পাকিস্তান

বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে বেলুচ নেতা। ‘বেলুচিস্তান প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করে এই প্রদেশটির জন্য আলাদা জাতীয় সঙ্গীত, আলাদা পতাকা, পৃথক মুদ্রা ও স্বাধীন প্রশাসনিক পদ্ধতি চালুর দাবি তুলেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী। তাদের দাবি, তারা বেলুচিস্তানের ৮৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, বাকি ১৫ শতাংশ পাকিস্তান সরকারের দখলে। এই ১৫ শতাংশের দখলদারিত্ব থেকে পাকিস্তানকে বিতাড়ন করতে বেলুচ যোদ্ধারা সশস্ত্র লড়াই চালাচ্ছে। চারটি প্রদেশের সমন্বয়ে পাকিস্তান গঠিত, তার মধ্যে বেলুচিস্তান আয়তনে সবচেয়ে বড়। প্রদেশটির আয়তন ৩,৪৭,১৯০ বর্গকিলোমিটার, বাংলাদেশের প্রায় আড়াই গুণ বড়। এটি পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের ৪৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক এলাকা। লোকসংখ্যা দেড় কোটিরও কম। প্রদেশটির উত্তরে আফগানিস্তান, পশ্চিমে ইরান এবং দক্ষিণে আরব সাগর। বৃষ্টিপাত খুব কম, তাই বনজঙ্গল নেই, চাষাবাদও সীমিত। মরুভূমি ও পর্বতময় এই প্রদেশে হাতে গোনা কয়েকটি উর্বর উপত্যকায় চাষ হয়। তবে খনিজ সম্পদে ভরপুর। প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, স্বর্ণ ও তামার বিরাট মজুত রয়েছে এখানে।ইতিহাস বহু পুরনো। ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বে এই অঞ্চল আলেকজাণ্ডার দখল করেছিলেন। এরপর দখল করে শাসন করেছে ভারতীয় কিছু শাসক, পারস্য, আরব, গজনভি, ঘোরি এবং মঙ্গোলেরা। তারপর ব্রিটিশরা অঞ্চলটি দখলে নেয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর বেলুচিস্তান এককভাবে পাকিস্তানে যোগ দেয়নি। তখন বেলুচিস্তান ছিল ব্রিটিশ শাসিত প্রদেশ ও চারটি রাজ্যের সমষ্টি। ব্রিটিশ বেলুচিস্তান, মাকরান, লাসবেলা ও খারান পাকিস্তানে যোগ দেয় ১৯৪৭ সালেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় রাজ্য কালাতের খান মীর আহমদ ইয়ার খান প্রথমে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের পর ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে বাধ্য হন। বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা একে জোরপূর্বক সংযুক্তি হিসেবে দেখেন। এই বিতর্ক ও স্বাধীনতা হারানোর ক্ষোভ থেকেই পরবর্তী সংঘাতের বীজ বোনা হয়।যোগদানের এক বছরের মাথায় ১৯৪৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় প্রথম বেলুচ বিদ্রোহ। খানের ভাই প্রিন্স আব্দুল করিম খানের নেতৃত্বে একদল যোদ্ধা স্বাধীন কালাতের দাবিতে অস্ত্র ধরেন। এই সংঘাত ১৯৫০ সাল পর্যন্ত চলে এবং পাকিস্তানি বাহিনী তা দমন করে। এরপর ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭৩ এবং ২০০০ এর দশকে পর্যায়ক্রমে আরও বড় বিদ্রোহ হয়েছে। বেলুচদের মূল অভিযোগ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা। অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার দিক থেকে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের বাকি প্রদেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। প্রথমদিকে তারা স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিল। সেই দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় এবং আন্দোলন দমনের মুখে বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন বেলুচিস্তান প্রতিষ্ঠার পথে যায়। এই লক্ষ্যে গঠিত হয় বেলুচ লিবারেশন আর্মি। সমস্যা হলো বেলুচদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী নেতৃত্বের অভাব। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে বাংলাদেশ মাত্র নয় মাসে মুক্ত হলেও বেলুচিস্তান তা পারছে না। তারা লড়ে যাচ্ছে যুগের পর যুগ ধরে। আর কয়েক বছর বাদেই তাদের লড়াইয়ের শতবর্ষ পূর্ণ হয়ে যাবে।সম্প্রতি পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বেলুচ লিবারেশন আর্মি গোয়াদারের উপকূলরক্ষী বাহিনীর ক্যাম্পে বড় হামলার দাবি করেছে এবং বলেছে চীন পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের কাজ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হামলা চলবে। এর জবাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রদেশজুড়ে নতুন অভিযান শুরু করেছে। একই সময়ে জেনেভায় মানবাধিকার কাউন্সিলের পাশে বেলুচ নেতা মীর সুলেমান দাউদ জান খান অফ কালাত বলেছেন, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোট হলে বেশিরভাগ বেলুচ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেবে। বেলুচিস্তানের সশস্ত্র বিদ্রোহীদের জঙ্গি ও সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে পাকিস্তান তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালাচ্ছে। সম্প্রতি স্বাধীনতা ঘোষণার পর শুধু সশস্ত্র বিদ্রোহীরা নয়, বেলুচিস্তানের সাধারণ জনগণও সব জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, নারীরা রয়েছে অগ্রণী ভূমিকায়।এই বাহিনী শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আক্রমণ চালাচ্ছে না, পাকিস্তানে বাস্তবায়নাধীন চীনা প্রকল্প এবং প্রকল্পে নিয়োজিত চীনা শ্রমিকদের ওপরও হামলা করছে। ৬,০০০ কোটি ডলার ব্যয়ের চীন পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্পে কর্মরত চীনা শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য কয়েক হাজার সামরিক কর্মী নিয়োগ করতে হয়েছে। তবু হামলা থামছে না। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে তেহরিক ই তালেবানের হামলাও অব্যাহত আছে। ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানে তালেবানেরা ক্ষমতায় আসার পর এক বছরে পাকিস্তানে ২৫০ বারের বেশি সশস্ত্র আক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। পাকিস্তান তালেবান ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তান বারবার আফগানিস্তানকে তেহরিক ই তালেবান এবং বেলুচ লিবারেশন আর্মির ঘাঁটি বন্ধ করতে বলেছে, কিন্তু আফগান তালেবান সরকার সেই অনুরোধ মানছে না। ফলে আফগানিস্তান পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে।পাকিস্তান আগে থেকেই বেলুচদের সহযোগিতা করার জন্য ভারতকে দায়ী করছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই পাকিস্তান ভারত পরস্পরকে দায়ী করার পুরনো রীতি চলছে। দুই দেশের পারস্পরিক শত্রুতার কারণে তারা অস্ত্র উৎপাদন ও সংগ্রহে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে, দুটি দেশই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী। জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছিলেন, ঘাস খেয়ে হলেও পারমাণবিক বোমা বানাবেন। ভারতের সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় গিয়ে পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়েছে। এখন বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী জনতাকে সেই অস্ত্র দিয়ে দমন করার চেষ্টা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বেলুচ আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ‘শেখ মুজিবের পথ ধর, বেলুচিস্তান স্বাধীন কর’ এই স্লোগান এখন শোনা যাচ্ছে। এই স্লোগানের অন্যতম উদ্যোক্তা মানবাধিকার কর্মী মাহরাং বালোচ। সম্ভবত ১৯৭১ সালে তার জন্মও হয়নি, কিন্তু তিনি শেখ মুজিবকে চেনেন, জানেন শেখ মুজিব কীভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন। বাংলাদেশের একজন ঐতিহাসিক নেতার পথ ধরে তারা বেলুচিস্তান স্বাধীন করতে চায়। বঙ্গবন্ধু এখন পাকিস্তানের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, তিনি এখন বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুপ্রেরণাদাতা।শেখ মুজিবকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার এক প্রান্তে তার ভাস্কর্য ভাঙা হচ্ছে, বাড়ির ইট খুলে নেয়া হচ্ছে, আর অন্য প্রান্তে মুজিব স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে জেগে উঠছেন। অর্থনৈতিকভাবে বেলুচিস্তান এখনও পাকিস্তানের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল। সম্পদ থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় মানুষ চাকরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই বঞ্চনা, সঙ্গে রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন, মিলেই বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের সবচেয়ে অস্থির প্রদেশে পরিণত করেছে। পাকিস্তান ভাঙবে কি না সেই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে, তবে বেলুচিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি বলছে সংকট গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।(লেখকের নিজস্ব মত) [লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন: কী পেলেন, কী হারালেন!

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদত্যাগের গুঞ্জন, বঙ্গভবনের নীরবতা, সরকারের অস্পষ্ট অবস্থান, স্পিকারের বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরা এবং রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যগত অবস্থা- সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের অপেক্ষার আবহ তৈরি হয়েছে। যদিও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটি কেবল তিনি পদত্যাগ করবেন কি না, সেটি নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো— বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন শেষ পর্যন্ত কী পেলেন, আর কী হারালেন?বিতর্কের মাঝেই দায়িত্ব গ্রহণ২০২৩ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন রাজনীতিক, সাবেক জেলা জজ, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়ার সময় ধারণা করা হয়েছিল, তিনি রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে এগিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল সময়গুলোর একটির মুখোমুখি হন তিনি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাকে এমন সব সিদ্ধান্তের অংশ হতে হয়েছে, যেগুলো নিয়ে এখনো রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক শেষ হয়নি।বড় অর্জন—সাংবিধানিক ধারাবাহিকতারাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের সমর্থকেরা বলবেন, তার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। একদিকে ক্ষমতার পালাবদল, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ, পরে জাতীয় নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল ছিলেন।২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নতুন মন্ত্রিসভাকে তিনিই শপথবাক্য পাঠ করান। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তার এই ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।বড় ক্ষতি—বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তবে রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে তার বিভিন্ন সময়ে দেওয়া পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন।কয়েক মাস পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের কোনো লিখিত বা দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই। একজন রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে এমন অসামঞ্জস্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই তৈরি করেনি; বরং রাষ্ট্রীয় নথি, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রপতির দপ্তরের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এই একটি ঘটনাই তার পুরো মেয়াদের মূল্যায়নে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।নিজের ইচ্ছায় নাকি পরিস্থিতির চাপে?রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা নতুন নয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নির্বাচনের পর দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। পরে দেশীয় গণমাধ্যমকেও বলেছিলেন, 'আমার ভালো লাগে না।'অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বঙ্গভবনের কার্যক্রম সীমিত হওয়া, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা এবং রাষ্ট্রপতির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার অনুভূতির কথাও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। এবার পদত্যাগের গুঞ্জনের পেছনে স্বাস্থ্যগত কারণকে সামনে আনা হলেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশের প্রশ্ন— এটি কি শুধুই স্বাস্থ্যগত সিদ্ধান্ত, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সম্মানজনক প্রস্থান?স্বাস্থ্যও একটি বাস্তবতারাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যগত বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৩ সালে তার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়। চলতি বছর যুক্তরাজ্যে গিয়ে এনজিওগ্রামের সময় আবারও একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক ধরা পড়ে এবং স্টেন্ট বসাতে হয়।  বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রায়ই ব্যক্তিগত আলোচনায় শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন এবং দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথাও বলেছেন। অতএব, যদি তিনি সত্যিই পদত্যাগ করেন, তবে স্বাস্থ্যগত কারণকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগও নেই।গুঞ্জন, নীরবতা ও রাজনৈতিক বার্তারাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে জাতীয় সংসদের স্পিকারের বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও সরকারিভাবে সফর সংক্ষিপ্ত করার কারণ জানানো হয়নি, তবু সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছেই জমা দিতে হয় এবং পদ শূন্য হলে তিনিই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে সরকারের মন্ত্রীদের সংযত প্রতিক্রিয়া, বঙ্গভবনের আনুষ্ঠানিক নীরবতা এবং রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিবের মন্তব্য, ‘আপনার মতো আমিও খবরটি দেখছি। পুরো পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নিজেই একটি গণমাধ্যমকে পাঠানো বার্তায় তার বিরুদ্ধে প্রচারিত একটি ফোনালাপের খবরকে “কল্পনার বাইরে” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অর্থাৎ গুঞ্জনের সব উপাদানই এখনো নিশ্চিত তথ্য নয়।’রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও দলটিকে প্রধান নিয়ামক করে তুলেছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। ফলে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সেটি শুধু একজন ব্যক্তির বিদায় নয়; বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির পুনর্গঠনেরও সূচনা হবে।ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে?একজন রাষ্ট্রপতির সাফল্য শুধু তিনি কতগুলো ফাইলে সই করেছেন, কতজন রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র গ্রহণ করেছেন কিংবা কতটি বিদেশ সফর করেছেন— এসব দিয়ে মূল্যায়িত হয় না। তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সংকটের মুহূর্তে তার ভূমিকার মাধ্যমে। মো. সাহাবুদ্দিন এমন এক সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, যখন বাংলাদেশ ধারাবাহিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, সাংবিধানিক বিতর্ক এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে গেছে। তিনি রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন— এটি তার পক্ষে যাবে। আবার তার কিছু বক্তব্য, সিদ্ধান্ত এবং নীরবতা বিতর্ক তৈরি করেছে—এটিও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করুন বা মেয়াদ পূর্ণ করুন- তার রাষ্ট্রপতিত্বের মূল্যায়ন এখনই শুরু হয়ে গেছে। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সম্মান অর্জন করেছেন, কিন্তু সেই সম্মানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিতর্ক, প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক চাপের দীর্ঘ ছায়া। সম্ভবত এ কারণেই তার রাষ্ট্রপতিত্বের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন হতে পারে- তিনি পদ পেয়েছিলেন অনেক, কিন্তু সেই পদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার পথ ছিল অনেক বেশি কঠিন।ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তার উত্তর নির্ভর করবে কেবল তার বিদায়ের ওপর নয়; বরং সংকটের সময় রাষ্ট্র, সংবিধান এবং গণতন্ত্রের প্রতি তার ভূমিকাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে বিচার করে, তার ওপর।লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

বৃষ্টিধোয়া বাতাসের অদৃশ্য হুমকি ব্ল্যাক কার্বন

বর্ষার বৃষ্টিতে ঢাকার আকাশ অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ধুলোমলিন শহরটিকে তখন তুলনামূলকভাবে নির্মল মনে হয়। মুষলধারে বৃষ্টি বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ধুয়ে ফেলে, বায়ুমণ্ডলকে শীতল করে।দৃশ্যমান বায়ুদূষণ কমিয়ে আনে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, বর্ষাকালে শ্বাস নেওয়ার জন্য বাতাস অনেক বেশি নিরাপদ হয়ে উঠেছে।কিন্তু চোখে দেখা এই স্বচ্ছতার আড়ালেও থেকে যেতে পারে এক অদৃশ্য ও ক্ষতিকর দূষক ব্ল্যাক কার্বন বা কালো কার্বন।বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, ঢাকার রসায়ন বিভাগ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বায়ুদূষণবিষয়ক গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বিভাগটি বায়ুর গুণমান পর্যবেক্ষণের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা কার্যক্রম গড়ে তুলেছে। নিউক্লিয়ার বিশ্লেষণ পদ্ধতি, অ্যারোসলের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় এবং বিভিন্ন উন্নত বিশ্লেষণধর্মী কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের বায়ুদূষণের প্রকৃতি ও উৎস অনুসন্ধান করা হচ্ছে।পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের গবেষণালব্ধ ফলাফল দূষণের প্রধান উৎস শনাক্তকরণ, বাংলাদেশে অ্যারোসলের ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং জাতীয় পর্যায়ে বায়ুর গুণমান ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত উদ্যোগ গ্রহণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, ঢাকার দীর্ঘমেয়াদি তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, বর্ষাকালে ঢাকার বাতাসে সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম-পিএম-টু পয়েন্ট ফাইভ) সামগ্রিক ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এলেও ব্ল্যাক কার্বনের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি থেকে যেতে পারে।বর্ষাকালে বাতাসে সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘ওয়েট ডিপোজিশন’ বা বৃষ্টিজনিত অপসারণ। বৃষ্টির ফোঁটা বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ও অন্যান্য বস্তুকণাকে সঙ্গে নিয়ে ভূমিতে নামিয়ে আনে। ফলে বাতাসে কণার মোট পরিমাণ কমে যায় এবং আকাশ দৃশ্যত পরিষ্কার হয়ে ওঠে।বাতাসে ভাসমান বস্তুর কণার উপস্থিতির পরিসংখ্যানতবে বাতাসে ভাসমান কণার মোট পরিমাণ কমে গেলেই সব ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সমানভাবে কমে যায় না। অবশিষ্ট কণাগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি দহনজনিত উৎস থেকে আসে, তবে বাতাস দেখতে পরিষ্কার হলেও তার বিষাক্ততা উদ্বেগজনক পর্যায়ে থাকতে পারে।খনিজ ধূলিকণা সাধারণত বাতাসে সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট ভরের একটি বড় অংশের জন্য দায়ী। অন্যদিকে ব্ল্যাক কার্বন প্রায় সম্পূর্ণভাবে জ্বালানির অসম্পূর্ণ দহন থেকে উৎপন্ন হয়। যানবাহনের ডিজেল ইঞ্জিন, ইটভাটা, শিল্পকারখানা, কয়লা ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানি, কাঠ ও বায়োমাস পোড়ানো, অপরিষ্কার রান্নার চুলা এবং উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানো ব্ল্যাক কার্বনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ব্ল্যাক কার্বনের সঙ্গে প্রায়ই পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন, ট্রানজিশন মেটাল এবং অতি সূক্ষ্ম কণার মতো বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এ কারণে দহনজনিত বায়ুদূষণ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ব্ল্যাক কার্বনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।ব্ল্যাক কার্বনের বিশেষত্ব হলো, এটি একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও জলবায়ুকে প্রভাবিত করে।বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ক্রমেই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট ভরের চেয়ে ব্ল্যাক কার্বনের মাত্রা অধিক কার্যকর নির্দেশক হতে পারে। কারণ ব্ল্যাক কার্বন দহন থেকে নির্গত বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শকে তুলনামূলকভাবে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।ব্ল্যাক কার্বনের অতি সূক্ষ্ম কণা শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসের গভীর অ্যালভিওলার অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে। কিছু কণা বায়ু, রক্ত প্রতিবন্ধক অতিক্রম করে রক্তসঞ্চালনেও পৌঁছাতে সক্ষম। এর ফলে শরীরে সিস্টেমিক প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, রক্তনালির অভ্যন্তরীণ আবরণের কার্যকারিতায় ব্যাঘাত এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। এসব প্রতিক্রিয়া শরীরের একাধিক অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে। বিভিন্ন স্বাস্থ্য গবেষণায় ব্ল্যাক কার্বনের সংস্পর্শের সঙ্গে হৃদ্‌রোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগ, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস, শিশুদের হাঁপানি, ফুসফুসে প্রদাহ, শিশুদের স্নায়ু-বিকাশগত সমস্যা এবং বয়স্কদের জ্ঞানীয় ক্ষমতা হ্রাসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন যানজটপূর্ণ সড়কে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। ট্রাফিক পুলিশ, রিকশাচালক, গণপরিবহনের চালক ও শ্রমিক, পথচারী, সড়কের পাশের দোকানি, নির্মাণশ্রমিক এবং স্কুলগামী শিশুরা নিয়মিত যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও দহনজনিত দূষণের সংস্পর্শে আসে।এ কারণে ব্ল্যাক কার্বন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ, যা আরও বেশি বৈজ্ঞানিক, প্রশাসনিক ও নীতিগত মনোযোগ দাবি করে।ব্ল্যাক কার্বন শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়; এটি জলবায়ুর ওপরও শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবস্থান করতে পারে। অন্যদিকে ব্ল্যাক কার্বনের বায়ুমণ্ডলীয় স্থায়িত্বকাল তুলনামূলকভাবে খুবই কম-সাধারণত কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ। তবে স্বল্পস্থায়ী হলেও এটি অত্যন্ত কার্যকর আলো শোষণকারী কণা এবং জলবায়ু উষ্ণায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।বায়ুমণ্ডলের অধিকাংশ অ্যারোসল সূর্যালোককে চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে শীতলীকরণ প্রভাব সৃষ্টি করে। কিন্তু ব্ল্যাক কার্বন সূর্যের আগত বিকিরণ শোষণ করে তা তাপে রূপান্তরিত করে। এর ফলে পারিপার্শ্বিক বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়, পৃথিবীর বিকিরণ ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে এবং বায়ুমণ্ডলের স্থিতিশীলতা, মেঘের গঠন ও আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহের ওপর প্রভাব পড়ে। বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে ব্ল্যাক কার্বনের কারণে সৃষ্ট উষ্ণতা মেঘ গঠনের প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এটি বৃষ্টিপাতের সময়, তীব্রতা ও ভৌগোলিক বণ্টনেও প্রভাব ফেলতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার মতো মৌসুমি বৃষ্টিনির্ভর অঞ্চলের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।ব্ল্যাক কার্বন বিভিন্ন পরোক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। এর কণা মেঘ ঘনীভবন কেন্দ্রক হিসেবে কাজ করতে পারে অথবা বিদ্যমান মেঘকণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে মেঘের প্রতিফলনক্ষমতা, স্থায়িত্ব এবং বৃষ্টিপাতের কার্যকারিতায় পরিবর্তন আনতে পারে।অ্যারোসল ও মেঘের এই মিথস্ক্রিয়া জলবায়ুবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল ও অনিশ্চিত বিষয়। তবে এটি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্ল্যাক কার্বন আঞ্চলিক আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।এ ছাড়া ব্ল্যাক কার্বনের কারণে সৃষ্ট বায়ুমণ্ডলীয় উষ্ণতা উল্লম্ব তাপমাত্রা বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো কোনো অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, অনাবৃষ্টি ও খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ব্ল্যাক কার্বনের বায়ুমণ্ডলীয় স্থায়িত্বকাল কম হওয়ায় এর নির্গমন হ্রাস করলে তুলনামূলকভাবে দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব। ব্ল্যাক কার্বন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একই সঙ্গে বায়ুর গুণমান উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে অগ্রগতি অর্জন করা যায়।জাতীয় বায়ুর গুণমান মানদণ্ড ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে সাধারণত সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) ভরঘনত্বের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। এই বস্তুকণার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু এর মোট ভরঘনত্ব পরিমাপ করে নির্ণয় করা যায় না যে, কণাগুলো তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর ভূত্বকীয় ধূলিকণা থেকে এসেছে, নাকি অধিক বিষাক্ত দহনজনিত উৎস থেকে উৎপন্ন হয়েছে।একই পরিমাণ সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মধ্যে ধূলিকণা, ব্ল্যাক কার্বন, জৈব কার্বন, মৌলিক কার্বন, ভারী ধাতু এবং অন্যান্য বিষাক্ত যৌগের অনুপাত ভিন্ন হতে পারে। ফলে শুধু সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট পরিমাণ জানলেই বাতাসের প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।পরিসংখ্যানভবিষ্যতের বায়ুর গুণমান ব্যবস্থাপনায় সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) পাশাপাশি ব্ল্যাক কার্বন, জৈব কার্বন, মৌলিক কার্বন, ট্রেস মেটাল এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপাদানের নিয়মিত পরিমাপ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রিসেপ্টর মডেলিংয়ের মাধ্যমে দূষণের উৎস বিভাজন এবং অবিচ্ছিন্ন বায়ুমণ্ডলীয় পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।এ ধরনের সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে জানা যাবে, বায়ুদূষণের কতটুকু যানবাহন, ইটভাটা, শিল্পকারখানা, বায়োমাস দহন, নির্মাণকাজ, বর্জ্য পোড়ানো কিংবা আঞ্চলিক দূষণ পরিবহন থেকে আসছে। দূষণের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেলে প্রমাণভিত্তিক, লক্ষ্যনির্ভর ও কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে। বাংলাদেশে ব্ল্যাক কার্বনের নির্গমন কমাতে যানবাহনের নির্গমন পরীক্ষা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। পুরোনো ও অদক্ষ ডিজেল ইঞ্জিনের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। গণপরিবহনের মান উন্নয়ন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিনির্ভর যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে হবে। ইটভাটায় পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা, শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করা এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি।একই সঙ্গে ব্ল্যাক কার্বন পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক গবেষণাগার ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সম্প্রসারণ, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা প্রয়োজন।শহরের যেসব এলাকায় যানবাহন ও দহনজনিত দূষণের মাত্রা বেশি, সেসব স্থানে নিয়মিত ব্ল্যাক কার্বন পর্যবেক্ষণ চালু করা যেতে পারে। স্কুল, হাসপাতাল, আবাসিক এলাকা, বাস টার্মিনাল, প্রধান সড়ক এবং শিল্পাঞ্চলের বাতাসে ব্ল্যাক কার্বনের মাত্রা আলাদাভাবে নির্ণয় করা দরকার।বায়ুদূষণ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। আবর্জনা পোড়ানো, নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধোঁয়া সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, নির্মল আকাশ মানেই সব সময় নিরাপদ বাতাস নয়। বর্ষার বৃষ্টি বাতাসে থাকা বহু কণা ধুয়ে ফেললেও দহনজনিত বিষাক্ত কণার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করে না। দৃশ্যমান ধুলা কমে যাওয়ার আড়ালে ব্ল্যাক কার্বনের মতো ক্ষতিকর দূষক থেকে যেতে পারে।তাই বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনাকে শুধু সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট ভর পরিমাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দূষণের প্রকৃত ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়ালেই থেকে যাবে।ব্ল্যাক কার্বন কমানো গেলে একই সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে, নগরের বাতাস পরিচ্ছন্ন হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ কারণেই বাংলাদেশের বায়ুর গুণমান ব্যবস্থাপনায় ব্ল্যাক কার্বনকে এখন আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, ঢাকা

কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীরা?

কোনো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার তরুণ প্রজন্মের জ্ঞান, দক্ষতা ও স্বপ্নের ওপর। যে জাতি তার শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধরে রাখতে পারে, সেই জাতিই আগামী দিনের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সভ্যতার নেতৃত্ব দেয়। আর যে রাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা মাঝপথেই শিক্ষার মূলধারা থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে, সেখানে উন্নয়নের সুউচ্চ অট্টালিকাও একসময় নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সামনে এমনই এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটের দরজা খুলে দিয়েছে। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। সংখ্যার ভাষায় এটি প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ তরুণ-তরুণী; কিন্তু বাস্তবে এটি সাড়ে পাঁচ লাখ অসমাপ্ত স্বপ্ন, সাড়ে পাঁচ লাখ সম্ভাবনার অপচয় এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবিক ট্র্যাজেডি : পরিসংখ্যান কখনো কখনো খুব নির্মম হয়। সেখানে চোখের জল, অপূর্ণ স্বপ্ন কিংবা একটি পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প ধরা পড়ে না। দুই বছর আগে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিল। অথচ এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে মাত্র সাড়ে ৯ লাখ। অর্থাৎ পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগেই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে গেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী। এরপর যারা ফরম পূরণ করেছে, তাদের মধ্যেও প্রতিদিন হাজার হাজার পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত থেকেছে। প্রতিটি অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর পেছনে রয়েছে একটি আলাদা গল্প কোথাও দারিদ্র্য, কোথাও বাল্যবিবাহ, কোথাও পরিবারের উপার্জনের দায়, কোথাও আবার হতাশা, মানসিক চাপ কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা। তাই এই সংকটকে কেবল পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বিচার করলে চলবে না; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় অগ্রগতির প্রশ্ন।কেন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীরা? কোনো শিক্ষার্থী একদিনে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। তার ঝরে পড়ার পেছনে দীর্ঘদিনের আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংকট কাজ করে। মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে সন্তানের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক পরিবারে কলেজে পাঠানোর চেয়ে সন্তানকে কাজে পাঠানোকে বেশি প্রয়োজনীয় মনে করা হচ্ছে। কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে, কেউ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আবার কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যে পরিণত হচ্ছে। এভাবেই ধীরে ধীরে বইয়ের ব্যাগের জায়গা দখল করে নিচ্ছে শ্রমের বোঝা। সবচেয়ে বড় কথা, বহু তরুণের কাছে শিক্ষা আর নিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের সংকট : শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার দায় শুধু পরিবার বা অর্থনৈতিক বাস্তবতার নয়; শিক্ষাব্যবস্থারও রয়েছে বড় দায়। আমাদের শিক্ষা এখনও অতিমাত্রায় পরীক্ষাকেন্দ্রিক, মুখস্থনির্ভর এবং নম্বরপ্রধান। শেখার আনন্দ, সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশের চেয়ে পরীক্ষার ফলকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টেস্ট পরীক্ষাকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যে দুর্বল শিক্ষার্থীরা মূল পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগই হারিয়ে ফেলে। অথচ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শিক্ষার্থীকে বাদ দেয়া নয়; তাকে শেখার উপযোগী করে গড়ে তোলা। শিক্ষা যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়, তবে ঝরে পড়ার এই মিছিল আরও দীর্ঘ হবে।এটি শুধু শিক্ষা নয়, অর্থনীতিরও সংকট : উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা উচ্চশিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের অন্যতম প্রধান সোপান। এখান থেকেই একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা কিংবা পেশাগত জীবনের পথে এগিয়ে যায়। ফলে এই স্তরে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া মানে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি তৈরি হওয়া। একটি দেশ তখনই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে পারে, যখন তার তরুণ জনগোষ্ঠী শিক্ষিত, দক্ষ ও উৎপাদনশীল হয়। কিন্তু যদি প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী মূলধারার শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে জনসংখ্যাগত সুবিধা   একসময় জনসংখ্যাগত চাপেই পরিণত হবে। উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন তখন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।পরবর্তী পর্বে ৬-১০ নম্বর অংশে বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য, মানসিক স্বাস্থ্য, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষানীতির দুর্বলতা সাহিত্যসমৃদ্ধ ও গবেষণাভিত্তিকভাবে তুলে ধরব।বাল্যবিয়ে, দারিদ্র্য ও অসমাপ্ত শিক্ষাযাত্রা : বাংলাদেশে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম বড় কারণ এখনও দারিদ্র্য ও বাল্যবিবাহ। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে বহু কিশোরীর শিক্ষাজীবন থেমে যায় বিয়ের পিঁড়িতে বসার মধ্য দিয়ে। গত বছর অনুপস্থিত এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য অংশের পরীক্ষার্থী বাল্যবিবাহের কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। একটি মেয়ে যখন অল্প বয়সে বিদ্যালয় ছেড়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হয়, তখন হারিয়ে যায় শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়; হারিয়ে যায় একজন সম্ভাব্য শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী কিংবা দক্ষ উদ্যোক্তা। একইভাবে অর্থনৈতিক সংকটে বহু ছেলে শিক্ষার্থীও বই ছেড়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কেউ গ্যারেজে, কেউ দোকানে, কেউ নির্মাণশ্রমিক, আবার কেউ বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নে শিক্ষার পথ থেকে সরে যাচ্ছে। এভাবে দারিদ্র্য ও সামাজিক বাস্তবতা মিলেই শিক্ষার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে হাজারো স্বপ্নের।শিক্ষা যখন হারায় বিশ্বাসের জায়গা : একসময় উচ্চশিক্ষা ছিল সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সাফল্যের সবচেয়ে বড় সোপান। কিন্তু আজ বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেও দীর্ঘদিন চাকরি না পাওয়ার অসংখ্য উদাহরণ তরুণদের মনে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। অনেকের কাছে প্রশ্ন জাগছে—দীর্ঘ ১৬ বা ১৮ বছর লেখাপড়া করেও যদি কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হয়, তবে এত দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রার মূল্য কোথায়? শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে এই বিচ্ছিন্নতাই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থীকে নিরুৎসাহিত করছে। ফলে তারা উচ্চশিক্ষার পরিবর্তে দ্রুত আয়ের পথকেই বেশি বাস্তবসম্মত মনে করছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসের সংকটও।মানসিক স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল বিভ্রান্তির নতুন বাস্তবতা : বর্তমান প্রজন্ম এমন এক সময়ে বেড়ে উঠছে, যেখানে প্রতিযোগিতা, সামাজিক প্রত্যাশা এবং ডিজিটাল বিভ্রান্তি একসঙ্গে তাদের মানসিক জগতে প্রভাব ফেলছে। পরীক্ষার চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং সামাজিক তুলনার সংস্কৃতি বহু শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম এবং দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের কারণে মনোযোগ ও পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। অথচ দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয় ও কলেজে এখনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং কিংবা মনোসামাজিক সহায়তার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নীরবে ভেঙে পড়ছে, আর সেই ভাঙনের শেষ পরিণতি হচ্ছে শিক্ষার মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।বিশ্বের অভিজ্ঞতা আমাদের কী শেখায় : শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়; বিশ্বের অনেক দেশই এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। তবে তারা সমস্যাটিকে কেবল শিক্ষা খাতের বিষয় হিসেবে দেখেনি। ভারত দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও ডিজিটাল শিক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছে; নেপাল ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের আগেভাগে শনাক্ত করার ব্যবস্থা চালু করেছে; শ্রীলঙ্কা তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষা সংস্কারে জোর দিয়েছে; পাকিস্তান কারিগরি শিক্ষা ও শিক্ষা ভাউচার কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেছে। এসব অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা হলো—শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ করতে হলে শিক্ষা, অর্থনীতি, সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানসিক স্বাস্থ্য—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থী মানেই হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ : একজন শিক্ষার্থী যখন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না, তখন শুধু একটি পরীক্ষার খাতা ফাঁকা থাকে না; ফাঁকা হয়ে যায় একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্র হারায় একজন দক্ষ নাগরিক, পরিবার হারায় উন্নত জীবনের আশা, আর সমাজ হারায় একটি উৎপাদনশীল শক্তি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই সম্পদকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে উন্নত, জ্ঞানভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন পূরণ হবে না। তাই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রতিটি ঘটনা কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্বেগের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, সমাজনীতি এবং জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। কারণ, আজ যে শিক্ষার্থী হারিয়ে যাচ্ছে, আগামীকাল তার অভাবই দেশের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।সময়োপযোগী শিক্ষা সংস্কারের আর কোনো বিকল্প নেই : এই সংকট মোকাবিলায় প্রথম প্রয়োজন প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান। জাতীয় পর্যায়ে একটি তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের আগেভাগেই শনাক্ত করতে হবে। উপবৃত্তি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। পাশাপাশি মাধ্যমিক স্তর থেকেই কারিগরি, প্রযুক্তিনির্ভর, উদ্যোক্তামুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি। কারণ সব শিক্ষার্থীর গন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় হতে হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। শিক্ষা এমন হতে হবে, যা একজন তরুণকে শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নয়, কর্মজীবনের জন্যও প্রস্তুত করবে।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক স্বপ্ন রক্ষার নিরাপদ আশ্রয় : একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য কেবল জিপিএ-৫ কিংবা শতভাগ পাসের হারে নির্ধারিত হয় না; প্রকৃত সাফল্য হলো একজন দুর্বল শিক্ষার্থীকে মূলধারায় ধরে রাখা। টেস্ট পরীক্ষাকে বাদ দেওয়ার উপকরণ নয়, শেখার ঘাটতি পূরণের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। প্রতিটি কলেজ ও বিদ্যালয়ে ধীরে ধীরে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং অভিভাবক-শিক্ষক সমন্বিত পরামর্শব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী যেন কোনো সংকটে একা অনুভব না করে-এমন মানবিক শিক্ষাব্যবস্থাই হতে পারে ঝরে পড়া রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।এইচএসসি পরীক্ষায় ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। প্রতিটি ঝরে পড়া শিক্ষার্থী একটি পরিবারের ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, একটি জাতির হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা এবং উন্নয়নের পথে একটি অপূরণীয় ক্ষতি। শিক্ষা কেবল একটি সনদ নয়; এটি একটি জাতির সভ্যতা, মানবিকতা ও সমৃদ্ধির ভিত্তি। তাই  এর প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি, কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সমাধান গ্রহণ করা। কারণ যে রাষ্ট্র তার শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে পারে, সেই রাষ্ট্রই আগামী দিনের জ্ঞান, উদ্ভাবন ও উন্নয়নের নেতৃত্ব দেয়। আর যে রাষ্ট্র তার তরুণদের হারিয়ে ফেলে, সে ধীরে ধীরে নিজের ভবিষ্যৎকেই হারিয়ে ফেলে।    বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রাকে সত্যিকার অর্থে টেকসই করতে হলে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলোয় ধরে রাখাই হতে হবে জাতীয় অঙ্গীকার।[লেখক: প্রশিক্ষক, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বরিশাল]

দুর্যোগ মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতিকে ত্বরান্বিত করছে

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে প্রকৃতির রোষানলের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বাঁচতে হয়। প্রতি বছর বন্যা, জলোচ্ছ্বাস কিংবা প্রবল ঘূর্ণিঝড় আমাদের বিস্তীর্ণ উপকূল এবং নিম্নাঞ্চলের মানুষের জীবন তছনছ করে দিয়ে যায়। যখনই কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের ওপর আঘাত হানে, তখন গণমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রশাসন পর্যন্ত সকলের সম্পূর্ণ মনোযোগ থাকে কেবল দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির দিকে। কয়টি কাঁচা ঘরবাড়ি ভাঙলো, কত হাজার একর ফসলের জমি তলিয়ে গেল কিংবা ঠিক কতগুলো গবাদিপশু ভেসে গেল, আমরা মূলত সেই হিসাব মেলাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সরকারি ও বেসরকারি নানাবিধ উদ্যোগে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ হিসেবে খুব দ্রুত পৌঁছে যায় চাল, ডাল, বিশুদ্ধ পানি, ত্রিপল এবং নগদ অর্থ। কিন্তু এই বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের পর বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর মনের ভেতর যে ভয়াবহ এক নীরব ঝড় শুরু হয়, তার খবর আমরা কয়জন রাখি? BJPsych International জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ৪৮ শতাংশেরও বেশি শিশু ও কিশোর বিচ্ছেদ উদ্বেগ, পিটিএসডি, প্যানিক অ্যাটাক ও বিষণ্নতাসহ নানা গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিল  । দুর্যোগ এবং বাস্তুচ্যুতির কারণে সৃষ্ট মানসিক স্বাস্থ্যের গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংকট আমাদের দেশে আজও প্রায় সম্পূর্ণ আলোচনার বাইরে রয়ে গেছে।একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন সেই মানুষটির কথা, যার সারা জীবনের তিল তিল করে জমানো পয়সায় বোনা স্বপ্নের ঘরটি মুহূর্তের মধ্যে রাক্ষুসে নদীর পেটে বিলীন হয়ে গেছে। অথবা সেই প্রান্তিক কৃষকের কথা ভাবুন, চোখের সামনে যার সোনালি ধানের মাঠ সাগরের লোনা জলে ডুবে গিয়ে চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে। এই মানুষগুলো দুর্যোগে শুধু তাদের বৈষয়িক সম্পদই হারায় না, তারা হারায় বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বোনা তাদের সমস্ত স্বপ্ন। রাতে যখন জোয়ারের পানি বাড়ে কিংবা আকাশে কালো মেঘ জমে, তখন তাদের বুকে যে অজানা আতঙ্ক দানা বাঁধে, তা কোনো সাধারণ ভয় নয়। এটি এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত বা ট্রমা। বারবার সবকিছু হারিয়ে তারা একসময় তীব্র অস্তিত্ব সংকটে ভুগতে শুরু করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন নতুন এক ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ক্লাইমেট অ্যাংজাইটি।নদীভাঙন এবং বন্যায় বাস্তুচ্যুত হওয়া পরিবারের নারী এবং শিশুদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি সবচেয়ে বেশি ঘটে। আশ্রয়কেন্দ্রে বা নতুন জায়গায় নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার অভাব তাদের মনে গভীর দাগ কাটে। Journal of Affective Disorders Reports -এ ২০২৪ সালে প্রকাশিত গবেষণায় খুলনার দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের ৩৫০ জন নারীর মধ্যে ৬৩ শতাংশ মাঝারি থেকে গুরুতর মাত্রার বিষণ্নতায় ভুগছেন বলে পাওয়া গেছে, যেখানে বাড়িঘর ক্ষতি, জীবিকা হারানো এবং পারিবারিক সংঘাতকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।বাস্তুচ্যুতির ফলে সৃষ্ট এই মানসিক সংকট কেবল দুর্যোগকালীন নির্দিষ্ট সময়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। যখন একজন মানুষ নদীভাঙন বা বন্যার কারণে নিজের পৈতৃক ভিটে চিরতরে ছাড়তে বাধ্য হন, তখন তিনি আসলে তার আজন্ম চেনা সামাজিক পরিচয় এবং আত্মীয়তার বন্ধন থেকেও ছিটকে পড়েন। নিজের পরিচিত শ্যামল গ্রাম ছেড়ে শহরের কোনো ঘিঞ্জি ও অস্বাস্থ্যকর বস্তিতে আশ্রয় নেয়া মানুষটি প্রতিনিয়ত এক ধরনের শেকড়হীন অনুভূতিতে ভোগেন। PLOS ONE -এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে উদ্বেগের হার ৭৬ শতাংশেরও বেশি পাওয়া গেছে, যা ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া মানুষদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। শহরের সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশ, জীবিকার চরম অনিশ্চয়তা এবং অমানবিক জীবনযাপন তাদের মাঝে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই পুঞ্জীভূত হতাশা অনেক সময় পারিবারিক কলহ, মাদকাসক্তি এবং আত্মহত্যার মতো ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে মানুষকে ঠেলে দেয়।অথচ এই রূঢ় ও ভয়াবহ বাস্তবতার পরও আমাদের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার বিষয়টি একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে উপেক্ষিত রয়ে গেছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের বদ্ধমূল কুসংস্কার এবং সচেতনতার অভাব। আমরা সাধারণত মনে করি, যার পেটে ভাত নেই বা মাথার ওপর ছাদ নেই, তার আবার মনের অসুখ নিয়ে ভাবার বিলাসিতা কেন! আমাদের এই ধারণাটি একেবারেই ভুল। মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসী বিষয় নয়, এটি মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা এবং টিকে থাকার সক্ষমতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। চরম বিপদের সময় একজন মানুষের যদি মানসিক জোরই পুরোপুরি ভেঙে যায়, তবে তাকে শুধু কয়েক বস্তা ত্রাণ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা কখনোই সম্ভব নয়।এখন সময় এসেছে আমাদের এই সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলানোর। দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যুক্ত করতে হবে। সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড বা মানসিক প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে প্রতিটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকার স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া অত্যন্ত জরুরি। দুর্যোগের পরপরই ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে গিয়ে তাদের কথা শোনার, তাদের সান্ত্বনা দেয়ার এবং ভয় কাটানোর জন্য একটি দক্ষ ও মানবিক কর্মীবাহিনী তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি, যারা দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা বা বিষণ্নতায় ভুগছেন, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কাউন্সিলিং বা চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই হয়তো বারবার ঝড় আসবে, নদীর জল কূল ছাপিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করবে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোকে পুরোপুরি ঠেকানোর ক্ষমতা হয়তো আমাদের মানুষের হাতে নেই। কিন্তু দুর্যোগের পর সর্বস্বান্ত হওয়া মানুষগুলোর পাশে পরম মমতায় দাঁড়িয়ে তাদের মনের সাহসটুকু জুগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য আমাদের অবশ্যই আছে। আসুন, আগামী দিনগুলোতে ত্রাণের বস্তার পাশাপাশি আমরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর প্রতি একটু মানসিক সমর্থন ও গভীর সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিই। মনের ভেতরের অদৃশ্য ক্ষতগুলো দূর করতে পারলে তবেই তারা নতুন করে জীবনযুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর আসল শক্তিটুকু খুঁজে পাবে।[লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

হাড্ডি আমার, মাংস আপনার

কওমি মাদ্রাসা স্থাপনের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন এবং হাফেজিয়া মাদ্রাসার জন্য পৃথক কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনে বিএনপি সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল। এজন্য ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ ও অন্য ৬টি বোর্ডের প্রধানদের ৯ জুলাই আহুত বৈঠকে যোগ দিতে আহ্বান জানানো হয় ; কিন্তু তারা অংশগ্রহণে অসম্মতি জানিয়েছে। কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারি অনুদান বা আর্থিক সহায়তার ধার ধারে না। তাই শিক্ষানীতি বা পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের সামান্যতম হস্তক্ষেপও তারা সহ্য করবে না-  এ কথা তারা বহুবার বলেছে। দারুল উলুম দেওবন্দের অনুসৃত নীতিমালার আলোকে তারা মক্তব থেকে দাওরা হাদিস পর্যন্ত ১৪টি শ্রেণী চালায়, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হেফজ বিভাগ। এই অবস্থানই আমাকে আজকের কলামটি লিখতে বাধ্য করেছে।গত কয়েক মাসেই দেশের কয়েকটি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতনের যে খবর বেরিয়েছে তা পড়লে গা শিউরে ওঠে। চট্টগ্রামের একটি মাদ্রাসায় ১০ বছরের এক ছাত্রকে চুরির অপবাদে হাত-পা বেঁধে সিলিং ফ্যানের হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেটানো হয়। মাথা নিচের দিকে, রক্ত জমে চোখ-মুখ ফুলে যায়, তবুও থামেনি শিক্ষক। গত বছরের শেষ দিকে কুমিল্লার এক কওমি মাদ্রাসায় ‘পড়া না পারার’ অপরাধে আরেক শিশুকে রাতভর শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার পর সকালে পা বেঁধে সিলিং-এর সাথে ঝুলিয়ে বেত, লাঠি আর প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে পেটানো হয়। শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রাজশাহীর একটি মাদ্রাসায় কুরআন মুখস্থ না পারার অপরাধে শিশুকে শিকল দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল তিন দিন। খাবার দেয়া হয়নি, বাথরুমে যেতে দেয়া হয়নি। সিলেটেও ভাত চুরির অপবাদে এক শিশুর দুই হাত পেছনে বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এমন অসংখ্য ঘটনা নেট দুনিয়ায় গেলেই নজরে পড়বে।এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন না। প্রতি বছর শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর কাছে যে অভিযোগগুলো জমা হয়, তার বড় অংশই আসে মাদ্রাসা-মক্তব-হেফজখানা থেকে। যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি শারীরিক পিটুনি, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা, উপুড় করে লাঠি দিয়ে আঘাত করা এখনও ‘আদব শেখানো’ আর ‘দ্বীনি তালিমের’ নামে চলে আসছে। প্রশ্ন হলো, যে প্রতিষ্ঠানে নবীর রহমতের কথা শেখানো হয়, নৈতিকতার সবক দেয়া হয়, সেখানেই কেন শিশুর শরীরে পড়ে সবচেয়ে নির্মম আঘাত ? এটা কেমন নৈতিকতা ? কুরআন শিক্ষায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে তারা পাশ্চাত্যের ‘কুরআন শূন্য করার পুরানা কৌশল’ বলে আখ্যা দেয়। ফলে তারা নিজেদের এক ধরনের রাষ্ট্রের বাইরের শক্তি মনে করে, বিএনপি সরকারকে তা বুঝতে হবে।অনেকেই তখনই পাল্টা যুক্তি তোলেন  ‘শুধু মাদ্রাসা কেন ? স্কুলের শিক্ষকরাও তো পেটায়। মা-বাবাও পেটায়। আপনারা মাদ্রাসা নিয়ে পড়ে আছেন কেন’? যুক্তিটা আংশিক সত্য। আমাদের প্রজন্মের প্রায় সবাই স্কুলে বেতের বাড়ি খেয়েছি। বাসায় এসে বাবাকে বললে উল্টো আরও দুইটা বেতের বাড়ি জুটত। ‘হাড্ডি আমার, মাংস আপনার’- এই বাক্য দ্বারা বাবারা গর্ব করে শিক্ষকের হাতে নিজ সন্তানকে তুলে দিতেও দেখেছি। কিন্তু পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল। শহরের বেশিরভাগ স্কুলে এখন বেত্রাঘাত নিষিদ্ধ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আছে, অভিভাবকরা সচেতন। কোনো শিক্ষক সীমা ছাড়ালে মামলা হয়, মিডিয়া আসে, শিক্ষক বরখাস্ত হয়। কিন্তু মাদ্রাসা-মক্তবের বড় অংশ এখনো রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার বাইরে। সেখানে অভিযোগ করলে বলা হয় ‘এটা তালিমের অংশ’, ‘গুনাহ হবে’, ‘হুজুরের বদনাম করো না’। সেখানে শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ থাকে না। তাই স্কুলে দুইটা বেতের বাড়ি আর মাদ্রাসায় শিকল দিয়ে বেঁধে ফ্যানে ঝুলিয়ে পেটানো-  দুটোকে এক পাল্লায় মাপা যায় না।তাহলে প্রশ্ন আসে, সরকারি স্কুল-কলেজ থাকতে মানুষ কেন গরীবের সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠায় ? উত্তরটা খুব সোজা এবং খুব নির্মম। কারণ সরকারি স্কুলে থাকা-খাওয়া নেই, কিন্তু মাদ্রাসায় আছে। গরীব বাবা-মা দুই বেলা পেটের চিন্তায় সন্তানকে মাদ্রাসায় দিয়ে দেন। সেখানে অন্তত ছেলেটা না খেয়ে থাকবে না, থাকার জায়গা পাবে। রাষ্ট্র যখন শিক্ষার পাশাপাশি খাবারের দায়িত্ব নেয় না, তখন মাদ্রাসা সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। কিন্তু এই ‘ফ্রি’ থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে শিশুকে দিতে হয় তার শরীরের উপর দিয়ে যাওয়া নির্যাতন। এটা দান না, এটা একটা অলিখিত চুক্তি-   তোমার পেট ভরাব, বদলে তোমার শরীরের উপর আমাদের অধিকার থাকবে।আর এই মাদ্রাসাগুলো চলে কার টাকায় ? মানুষের দানে। মানুষ মাদ্রাসায় মুক্তহস্তে টাকা দেয়। কারণ অনেকে মনে করে মাদ্রাসায় দান করলে সওয়াব হয়, বেহেশতের রাস্তা সহজ হয়। ফলে যারা সারাজীবন ঘুষ খায়, চাঁদাবাজি করে, দুর্নীতি করে তারাও শেষ বয়সে মাদ্রাসায় মোটা অঙ্কের টাকা দেয়। টাকা দিয়ে তারা পাপ ধোয়, আর মাদ্রাসা সেই টাকায় চলে। স্কুলের জন্য মানুষ এভাবে দান করে না। কারণ স্কুলে ‘সওয়াব’ নেই। ফলে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল থেকে যায়, আর বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠা মাদ্রাসাগুলোতে কোনো তদারকি থাকে না। দেশে এরা এত শক্তিশালী প্রেসার গ্রুপ যে, প্রতিটি সরকার এদের সমীহ করতে বাধ্য হয়। দীনি শিক্ষার নামে শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর দৈহিক নির্যাতন হলেও সরকার তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না।শেষ কথা একটাই। কওমি কর্তৃপক্ষ সরকারের তত্ত্বাবধান প্রত্যাখ্যান করছে কি শুধুই ‘দীনি শিক্ষার স্বাধীনতা’ রক্ষার জন্য, নাকি তাদের প্রতিষ্ঠানে চলা শিশু নিপীড়নকে অবাধ রাখার জন্যও? উত্তরটা সময়ই দেবে। নৈতিকতা শুধু কিতাব মুখস্থ করলে আসে না। আসে জবাবদিহিতা, আইনের শাসন আর শিশুকে মানুষ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে। যে শিক্ষক নিজেই শিশুকে পশুর মতো পেটায়, সে সারাদিন হাদিস পড়ালেও তার ছাত্র শিখবে-  ক্ষমতা থাকলে দুর্বলকে পেটানো যায়। ধর্মের নাম ব্যবহার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা গেলে, ধর্মই তখন অপরাধের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। মাদ্রাসা হোক বা স্কুল, বাড়ি হোক বা মসজিদের মক্তব-  যেখানেই শিশুর শরীরে আঘাতের দাগ পড়বে, সেখানেই রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে। প্রথম কাজ শিশুর গা থেকে বেত আর শিকল সরিয়ে নেয়া। তারপর বই, ভালোবাসা আর জবাবদিহির ক্লাসরুম। নইলে ‘হাড্ডি আমার, মাংস আপনার’- এই নিষ্ঠুর প্রবাদ দিয়েই আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম শেষ হয়ে যাবে। যে জাতি তার শিশুদের রক্ষা করতে পারে না, সে জাতি কোনো মূল্যবোধ দিয়েই বাঁচতে পারে না।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

ভিডিও আরও দেখুন

সেই ঐতিহাসিক শুরুর নায়ক, শামীম কবিরকে কি মনে রেখেছে বাংলাদেশ?

১৯৭৭ সালের ৭ জানুয়ারি। শীতের সকালে কুয়াশাভেজা ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান জাতীয় স্টেডিয়াম) টস করতে নামলেন দীর্ঘদেহী এক যুবক। প্রতিপক্ষ ক্রিকেটের মক্কাখ্যাত লর্ডসের এমসিসি (মেরিলিবোর্ন ক্রিকেট ক্লাব)। সেই টসের মধ্য দিয়েই রচিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম আনুষ্ঠানিক মহাকাব্য। আর সেই মহাকাব্যের প্রথম নায়ক ছিলেন শামীম কবির।বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই পথপ্রদর্শক ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। গতকাল ছিল তার ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ক্যানসারের কাছে হার মেনে বিদায় নিলেও বাংলাদেশের ক্রিকেটের যে শক্ত ভিত্তি তিনি গড়ে দিয়ে গেছেন, তা আজও অম্লান।মাঠে-মাঠের বাইরে অনন্য কাপ্তানআনোয়ারুল কবির-যিনি ক্রিকেটাঙ্গনে শামীম কবির নামেই কিংবদন্তি। ১৯৪৫ সালে নরসিংদীর এক বনেদি জমিদার পরিবারে তার জন্ম। ক্রিকেটে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল স্কুলজীবন থেকেই। ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচিতি থাকলেও প্রয়োজনে উইকেটের পেছনে গ্লাভস হাতেও দাঁড়াতেন তিনি। ১৯৬১ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষিক্ত হওয়ার পর খেলেছেন তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ব পাকিস্তান দলের হয়ে। তবে শামীম কবিরকে মনে রাখা হবে মূলত ১৯৭৭ সালের সেই ঐতিহাসিক এমসিসি সফরের জন্য।সেই ম্যাচটি কেবল একটি ম্যাচ ছিল না; ছিল বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের সামর্থ্য প্রমাণের পরীক্ষা। ক্লার্কের নেতৃত্বাধীন এমসিসির বিপক্ষে সেই ড্র ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ৩০ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ২৫ রান করে দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন শামীম কবির।সংগঠক হিসেবে দ্বিতীয় ইনিংসখেলোয়াড়ি জীবন ছাড়ার পর শামীম কবির নিজেকে নিয়োজিত করেন ক্রিকেট সংগঠক হিসেবে। ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালের আইসিসি ট্রফিতে তিনি বাংলাদেশ দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন। বিসিবির বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করে দেশের ক্রিকেটকে আজকের এই অবস্থানে আনার নেপথ্যে কারিগর ছিলেন তিনি। ক্রীড়াঙ্গনে তার অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার লাভ করেন এবং ২০১৪ সালে পান গ্রামীণফোন-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা।অধিনায়কের গুরুত্ব ও দর্শনশামীম কবির মনে করতেন, ক্রিকেটে অধিনায়কের ভূমিকা অন্য যেকোনো খেলার চেয়ে বেশি। ফুটবলে কোচ মাঠের বাইরে থেকে দিকনির্দেশনা দিলেও ক্রিকেটে মাঠের ভেতর মুহূর্তের সিদ্ধান্ত অধিনায়ককেই নিতে হয়। ফিল্ডিং সাজানো থেকে শুরু করে বোলার পরিবর্তন-সবক্ষেত্রেই তার ক্ষুরধার মস্তিষ্ক কাজ করত। শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও তরুণ খেলোয়াড়দের আগলে রাখা এবং দলে ঐক্য ধরে রাখার এক অসাধারণ গুণ ছিল তার।আজ যে আলোকবর্তিকা বয়ে নিয়ে চলছেন বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটাররা, তার প্রথম মশালটি জ্বালিয়েছিলেন শামীম কবিরই। তিনি নেই, কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতিটা বাঁকে রয়ে গেছে তার অবিস্মরণীয় অবদান।

সেই ঐতিহাসিক শুরুর নায়ক, শামীম কবিরকে কি মনে রেখেছে বাংলাদেশ?