সংবাদ
১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

দেশের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বড় ধরনের জনবল নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানিয়েছেন, সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই থাকবেন নারী কর্মী।শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের (ইউএইচএফপিও) সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।প্রধানমন্ত্রী বলেন, "আমাদের লক্ষ্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা উন্নত করা। শহর এবং গ্রামের স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে যে বিশাল বৈষম্য রয়েছে, তা দূর করতে সরকারের কাজ চলমান রয়েছে।" চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে আপনাদের সহযোগিতা একান্ত কাম্য। চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয়টি সরকার দ্রুত সমাধান করবে এবং অন্যান্য সমস্যাগুলোও পর্যায়ক্রমে দূর করা হবে।দেশের স্বাস্থ্যখাতকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু নতুন উদ্যোগের কথা জানান: জিডিপি বরাদ্দ: স্বাস্থ্যখাতে ক্রমান্বয়ে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হবে। ই-হেলথ কার্ড: উন্নত ও সমন্বিত সুচিকিৎসার লক্ষ্যে সবার জন্য 'ই-হেলথ কার্ড' চালু করা হবে। স্বাস্থ্যবীমা: ধাপে ধাপে সারা দেশে জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। জবাবদিহিতা: প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। বিগত সরকারগুলোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হামের টিকা নিয়ে অতীতে যে ব্যর্থতা দেখানো হয়েছে, তা ছিল জীবনবিনাশী অপরাধ। বর্তমান সরকার এই ধরনের অবহেলা সহ্য করবে না।দেশের চলমান অর্থনৈতিক ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে দুই বিলিয়নেরও বেশি ডলার খরচ করে জ্বালানি তেল কেনা হয়েছে।সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে স্বাস্থ্যসেবায় গতি আনার আহ্বান জানান।  
৪৪ মিনিট আগে

মতামতমতামত

প্রতিটি গুম-খুনের বিচার চাই

‘গুম-খুন’ শব্দবন্ধটি এ লেখায় সচেতনভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে| কারণ এই দুটি কুকাজ, ভিন্ন প্রক্রিয়ায় বা ধরণে হলেও, মানুষের জীবনের ওপর একই চূড়ান্ত ফলাফল বয়ে আনে- জীবনের চলমান পর্দা থেকে হারিয়ে যাওয়া| মানবিক, নৈতিক বা ধর্মীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে গুম-খুনের বিচারের দাবিতে আমাদের সম্মিলিত অবস্থান আজও অস্পষ্ট ও দ্বিধাবিভক্ত| নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যগুলোর একটি| মানুষের প্রাণহরণ কিংবা কাউকে জোরপূর্বক অদৃশ্য করে দেয়ার পক্ষে কোনো নৈতিক, মানবিক বা ধর্মীয় ভিত্তি নেই যা নীতিশাস্ত্রের মৌলিক স্বীকার্য| দর্শনের ভাষায় বললে, মানুষের জীবন একটি ‘অন্তর্নিহিত মূল্য’ বহন করে| তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে সেই জীবনকে হরণ করা কখনোই ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না| তবুও আমাদের সমাজে গুম-খুনের বিচার চাইতে গিয়ে আমরা ভয়াবহভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ি| কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ নীরব থাকে, আবার কেউ কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গুম-খুনকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে| এই বিভাজন কেবল রাজনৈতিক মতভেদের ফল নয়; এটি সামাজিক মনোবিজ্ঞানেরও একটি প্রতিফলন, যেখানে ‘দলগত পক্ষপাত’ বা ‘শ্রেণী দ্বন্দ্ব’ মানুষকে ন্যায়-অন্যায়ের সার্বজনীন মানদণ্ড থেকে বিচ্যুত করে| অথচ অন্যায়ের মুখে নীরব থাকা নিজেই এক ধরনের নৈতিক অবস্থান এবং সেই নীরবতা প্রায়শই অন্যায়কারীর পক্ষেই কাজ করে| এপ্রসঙ্গে বর্ণবাদ বিরোধী নোবেল বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকান ধর্মযাজক (আর্চবিশপ) ডেসমন্ড টুটু (১৯৩১-২০২১) উক্তিটি উল্লেখযোগ্য, ‘অন্যায়ের পরিস্থিতিতে আপনি যদি নিরপেক্ষ থাকেন, তবে আপনি অত্যাচারীর পক্ষ নিয়েছেন’|আমাদের পক্ষপাতিত্বের ফলে বাস্তবতা দাঁড়ায় এমন যে, গুম-খুনের বিচার চায় এক পক্ষ, কিন্তু নীরবতা থাকা ও অপরাধের পক্ষে ছাফাই গাওয়ার মাধ্যমে এর বিপক্ষে অবস্থান নেয় অন্তত দুই পক্ষ| এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ নৈতিক ভারসাম্যহীনতার কারণে আমাদের দেশে বিচারহীনতা ক্রমে একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়; একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়| ফরাসী সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খাইম (১৮৫৮-১৯১৭) যাকে ‘নৈতিক বিশৃঙ্খলা’ (অ্যানোমি) বলেছেন, সেই অবস্থাই যেন আমাদের বাস্তবতায় প্রতিফলিত হয়, যেখানে ন্যায়-অন্যায়ের স্পষ্ট সীমারেখা মুছে যায়| ফলে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং তা আমাদের সামষ্টিক নৈতিক দুর্বলতার অনিবার্য পরিণতিতে রূপ নেয়| এই পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের যে মৌলিক সত্যটি নির্ভুলভাবে ধারণ করতে হবে, তা হলো, ‘গুম-খুন সর্বাবস্থায় গুম-খুনই’| কোনো পরিস্থিতি, আবেগ বা আপাত যুক্তি দিয়ে এই অপরাধকে বৈধতা দেয়া যায় না| নৈতিক দর্শনের ইতিহাসে এই অবস্থানটি এক ধরনের ‘অপরিবর্তনীয় নীতি’ (ক্যাটাগরিক্যাল ইম্পারেটিভ)-এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ যেখানে মানুষকে কখনোই কোনো লক্ষ্য অর্জনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা যায় না| বরং তাকে নিজেই একটি উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হয়| সুতরাং কাউকে গুম করা বা হত্যা করা মানে কেবল তার জীবন হরণ করা নয়; বরং তার মানবিক মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং অস্তিত্বের মৌলিক ভিত্তিকেই অস্বীকার করা|জীবন স্রষ্টার দেয়া এক অমূল্য দান; এই বিশ্বাস ধর্মীয় দৃষ্টিকোণেই নয়, মানবতাবাদী চিন্তাধারাতেও সমানভাবে প্রতিধ্বনিত| জীবন নামক সময়ের সীমার মধ্যে মানুষকে যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, যেমন চিন্তা করার, মতপ্রকাশের, নিজের জীবনচর্যা নির্ধারণের, তা কেড়ে নেয়া মানে সেই সৃষ্টির অন্তর্নিহিত নীতির বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়া| ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ‘গুম’ শব্দটি কেবল শারীরিক অনুপস্থিতিকে নির্দেশ করে না; এটি এক ধরনের জোরপূর্বক নীরবতা আরোপের প্রতীক, যেখানে একজন মানুষের কণ্ঠ, পরিচয় ও অস্তিত্ব সবকিছুকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়| ফলে ‘গুম’ অনেক ক্ষেত্রেই ‘খুন’-এর একটি প্রলম্বিত প্রক্রিয়া কিংবা আড়াল করা রূপ যেখানে মৃত্যু হয়তো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু পারিবারিক, সামাজিক কিংবা জাতীয় জীবনে তার অনুপস্থিতির মধ্যেই সেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে|পৃথিবীর প্রতিটি খুনীই নিজের পক্ষে কোনো না কোনো যুক্তি দাঁড় করায়—এটি মনোবিজ্ঞানের সুপরিচিত বাস্তবতা| কেউ আত্মরক্ষার কথা বলে, কেউ প্রতিশোধের, কেউ ধর্মীয় বা সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার কথা তুলে ধরে| কিন্তু এই সব যুক্তিই মূলত ‘নৈতিক বৈধতা’ তৈরি করার এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা, যা ব্যক্তিকে নিজের অপরাধকে সহনীয় করে তুলতে সাহায্য করে| রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, যখন এই ধরনের যুক্তিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় বা নীরব সমর্থন লাভ করে, তখন তা ‘কাঠামোগত সন্ত্রাস‘ (স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স)-এ রূপ নেয় অর্থাৎ সহিংসতা তখন কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ থাকে না, বরং একটি কাঠামোগত বাস্তবতায় পরিণত হয়| অথচ, জন্মের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক মানুষের জীবনের ওপর তার একটি অবিচ্ছেদ্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় যা আধুনিক মানবাধিকার ধারণার কেন্দ্রবিন্দু| এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার নৈতিক বা আইনগত ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাষ্ট্রের নেই, যদি না তা একটি স্বচ্ছ, ন্যায়ভিত্তিক ও আইনের শাসন-নির্ভর বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়| অন্যথায়, গুম-খুন কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক ভিত্তির ওপর এক গভীর আঘাত, যা শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক ন্যায়বোধকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়|কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের রাষ্ট্র কি সত্যিই সেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে? একটি রাষ্ট্রের মৌলিক নৈতিক দায় অন্তত তিনটি: নাগরিকের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা| রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাথমিক তত্ত্বেই বলা হয়, সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে মানুষ তার কিছু স্বাধীনতা রাষ্ট্রকে অর্পণ করে এই প্রত্যাশায় যে, রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা ও ন্যায়ের নিশ্চয়তা দেবে| কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় আমরা দেখি এর উল্টো এক চিত্র; বিচারহীনতার এক দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতি, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে| এই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গুম-খুন হওয়া মানুষের পরিবারের বেদনায়| খুন হওয়া চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের, এবং বাংলাদেশ পুলিশের নিহত সদস্যদের পরিবারগুলোসহ সাম্প্রতিক সময়ে শরিফ ওসমান হাদির পরিবার যেমন আজও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় দিন গুনছে, তেমনি সড়ক দুর্ঘটনার নামে পরিকল্পিত হত্যার শিকার কিংবা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া অসংখ্য মৃত্যুর পেছনেও লুকিয়ে থাকে অপ্রকাশিত সত্য| ইতিহাসের নানা বাঁকে, বিশেষ করে বিভিন্ন আন্দোলন, রাজনৈতিক সংঘাত বা সামাজিক অস্থিরতার সময়ে প্রাণ হারানো মানুষের পরিবারগুলোও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত| এই দীর্ঘ বিচারহীনতা কেবল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকেই ক্ষতবিক্ষত করে না; বরং এটি পুরো সমাজের ওপর এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও হতাশার ছায়া ফেলে| ফলে মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের আস্থা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে, যা একটি স্থিতিশীল, কল্যাণমুখী ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়|সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, যখন অপরাধের বিচার হয় না, তখন আইনের শাসন ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার জায়গা দখল করে নেয় শক্তির নীতি, ‘জোর যার মুল্লুক তার’| এর ফলে ন্যায়বোধের পরিবর্তে ভয়, প্রতিশোধ এবং স্বেচ্ছাচারিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়| মানুষ তখন আইনের ওপর আস্থা হারিয়ে নিজেরাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, যা শেষ পর্যন্ত আরও সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়| এই প্রক্রিয়াটি একটি সমাজকে ধীরে ধীরে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে অন্যায় আর ব্যতিক্রম নয়; বরং এক ধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়| এই অবস্থার পরিবর্তনে আমাদের ঐতিহাসিক দায় স্বীকার করা জরুরি| পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে এই ভূখণ্ডে সংঘটিত অসংখ্য খুন ও নিপীড়নের একটি ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে, যার বড় একটি অংশ আজও বিচারহীন| এই প্রেক্ষাপটে একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যেখানে সময়কালভিত্তিক তিনটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে| একটি পলাশী থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ঔপনিবেশিক সময়ের জন্য, একটি পুরো পাকিস্তান আমলের জন্য, এবং আরেকটি স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের জন্য| এই ধরনের উদ্যোগ কেবল বিচার নিশ্চিত করার একটি কাঠামোই তৈরি করবে না; বরং একটি জাতির ইতিহাসের সঙ্গে ন্যায়বিচারের সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের পথও খুলে দেবে| আইন ও বিচার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বিস্তারিত রূপরেখা প্রণয়ন করতে পারেন যাতে বিচারপ্রক্রিয়া হয় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং উচ্চমান সম্পন্ন|এর মাধ্যমে কেবল গুম-খুনের বিচারের দাবি পূরণই নয়, একটি বৃহত্তর নৈতিক পুনর্জাগরণের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হতে পারে| ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ অতীতের অন্যায়কে স্বীকার করে এবং তার বিচার নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়, সেই সমাজই টেকসই শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়| অন্যদিকে, রাষ্ট্রে বিচারহীনতা যতদিন বহাল থাকে, ততদিন সমাজে প্রতিশোধপরায়ণতা, বিশৃঙ্খলা এবং স্বেচ্ছাচারিতা নতুন নতুন রূপে ফিরে আসে| তাই ন্যায়বিচার কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির নৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অপরিহার্য পূর্বশর্ত| তবে মনে রাখতে হবে, কেবল বিচারহীনতাই নয়, আমাদের সমাজকে গ্রাস করেছে আরও দুটি গভীর ও বিপজ্জনক প্রবণতা: পক্ষপাতিত্ব এবং ‘জল ঘোলা করার সংস্কৃতি’| পক্ষপাতিত্বের এই প্রবণতা আমাদের নৈতিক মেরুদণ্ডকে ক্রমাগত দুর্বল করে দিয়েছে| আমরা নিজের ক্ষতি হলে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করি, কিন্তু অন্যের ক্ষতির ক্ষেত্রে নীরব থাকি, আমাদের ন্যায়বোধও যেন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীভেদে ভিন্ন হয়ে যায়| ফলে অন্যায়কে আমরা বিচার করি না ন্যায়-অন্যায়ের সার্বজনীন মানদণ্ডে; বরং বিচার করি ব্যক্তি, পরিবার, দল, শ্রেণী কিংবা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে| অথচ নৈতিক দর্শনের একেবারে মৌলিক সত্য হলো, অন্যায়, যেই করুক, অন্যায়ই থাকে| এই সত্যকে অস্বীকার করা মানে ন্যায়ের ধারণাকেই আপেক্ষিক করে তোলা, যা শেষ পর্যন্ত সমাজের সব স্তরে অন্যায়ের স্বাভাবিকীকরণ ঘটায়|সমাজবিজ্ঞান ও নৈতিক মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় দেখা যায়, এই ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণ মানুষের ‘নৈতিক বিচ্ছিন্নতা’ (মোরাল ডিসএনগেইজমেন্ট)-এর একটি রূপ, যেখানে ব্যক্তি নিজের অবস্থান বা স্বার্থ রক্ষার জন্য নৈতিক বিচারকে আংশিক বা বিকৃত করে নেয়| এর ফলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কোনো স্তরেই ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না| কারণ ন্যায় তখন আর একটি সর্বজনীন মূল্যবোধ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে সুবিধাভিত্তিক একটি অবস্থান| তাই ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রথম ও অপরিহার্য শর্ত হলো, পক্ষপাতহীনতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক অবস্থান গ্রহণ করা, তা নিজের বিরুদ্ধেও হোক বা আপনজনের বিরুদ্ধেই হোক| এর পাশাপাশি, একটু আগেই বলা হয়েছে, আমাদের আরেকটি ভয়াবহ প্রবণতা হলো ‘জল ঘোলা করার সংস্কৃতি’| দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিমন্ডলে বার বার প্রতারিত হতে হতে অন্যের উপর, এমনকি নিজের ওপরও মানুষ বিশ্বাস হারিয়েছে| ফলে কোনো স্পষ্ট ঘটনা ঘটার পর সেটিকে জটিল, অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর করে তোলার এক অদ্ভুত সামাজিক প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করি| তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি সুবিধাবাদী অংশ, কিছু দায়িত্বহীন চাটুকার গণমাধ্যম এবং ভুঁইফোড় জনপ্রিয়তাবাদী অনলাইন কর্মীরা প্রায়শই একটি স্পষ্ট অপরাধের পেছনে ‘তৃতীয় শক্তি’, ‘অজ্ঞাতচক্র’ বা ‘গভীর ষড়যন্ত্র’-এর নানামুখী গল্প দাঁড় করিয়ে মূল সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করে| ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে, এটি এক ধরনের ‘আলোচনার উদ্দেশ্যমূলক কারসাজি’ (ডিসকারসিভ মেনিপুলেশান), যেখানে ভাষা ও বয়ানকে ব্যবহার করে বাস্তবতাকে বিকৃত করা হয়, যাতে প্রকৃত ঘটনা কিংবা অপরাধী আড়ালে থেকে যায়|গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই প্রবণতা কেবল জনমতকে বিভ্রান্তই করে না; বরং বিচারপ্রক্রিয়াকেও সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে| কারণ যখন সত্যকে অস্পষ্ট করে ফেলা হয়, তখন দায় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে, আর সেই সুযোগে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়| ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, ‘বিভাজন ও শাসন’ (ডিভাইড এন্ড রুল)-এর কৌশল প্রয়োগ করে সমাজকে দুর্বল করা হয় মানুষকে সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে, সন্দেহ ও বিভ্রান্তির জালে আবদ্ধ করে| ফলে গণঐক্য বা সংঘশক্তির যে চাপ তা আর থাকে না| দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা বার বারই জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞতাবশত সেই একই ফাঁদে পা দিচ্ছি, যা শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের পথকে আরও কঠিন করে তোলে এবং অন্যায়ের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে| জাতি হিসেবে আমাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, যারা চোখের সামনে খুন দেখেও দায় এড়িয়ে যায়, তারা কেবল নিরপেক্ষ দর্শক নয়; বরং নৈতিক অর্থে অপরাধেরই অংশীদার| নৈতিক দর্শনে ‘উপেক্ষা’ (ওমিশান) বা নিষ্ক্রিয়তার দায়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়| কারণ কখনো কখনো  নীরবতা নিজেই অপরাধে পরিণত হয়| খুনের মতো চরম অন্যায়ের ক্ষেত্রে এই নীরবতা আর নিরপেক্ষ থাকে না; এটি কার্যত অন্যায়কে টিকে থাকার অবকাশ করে দেয়| গুমকারী বা খুনীকে আড়াল করা, মিথ্যা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো কিংবা সচেতনভাবে নীরব থাকা এসবই প্রকারান্তরে গুম-খুনকে বৈধতা দেয়া এবং অপরাধীকে রক্ষা করার শামিল|ফলে ন্যায়বিচারের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে পড়ে, বিচারের বাণী যেন নিরবে, নিভৃতে কাঁদে| সাহিত্যিক উপমায় যে আর্তনাদের কথা আমরা শুনি, বাস্তবে তা রূপ নেয় মানুষের আস্থাহীনতা, ভীতি ও হতাশায়| রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্ণধার যদি হন এমন মানুষেরা, সত্যিকার অর্থে তাদের ওপর ভরসা করা যায় না| কারণ তারা নৈতিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে কৌশল আর ছলচাতুরির মাধ্যমে সুবিধাবাদী নিরপেক্ষতার আশ্রয় নেয়| সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় এই প্রবণতাকে ‘সামাজিক আস্থার অবক্ষয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়| যখন মানুষ নিশ্চিত হতে পারে না যে অন্যায় ঘটলে সমাজ তার পাশে দাঁড়াবে, তখন সামষ্টিক ন্যায়বোধ ভেঙে পড়ে এবং ব্যক্তি ক্রমশ একা ও অনিরাপদ হয়ে ওঠে| অতএব, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সময় ও সুযোগ এসেছে আমাদের জন্য জাতি হিসেবে  একটি সুস্পষ্ট, আপসহীন অবস্থান নেয়ার| সেই অবস্থানটি হতে হবে সার্বজনীন; ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে বেছে বেছে নয়, বরং আমরা সব গুম-খুনের বিচার চাই| যেমনটি বলেছিলেন শহীদ শরীফ ওসমান হাদী, ‘আমি আমার শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ করতে চাই’| আমরা তেমন একটি ইনসাফের রাষ্ট্র চাই, যেখানে ‘কোনো গুম-খুনকে সমর্থন নয়, কোনো গুমকারী বা খুনীকেই ছাড় নয়’- এই নীতিগত দৃঢ়তাই হতে পারে আমাদের পক্ষপাতহীন, কল্যাণমুখী রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের প্রথম ধাপ| কারণ খুনের বিচার নিশ্চিত করা মানে কেবল একজন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং তা মানবতার পক্ষে অবস্থান নেয়া, সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকে সংরক্ষণ করা, ‘রাষ্ট্র’কে নৈতিক ভিত্তির ওপর সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত করা| ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ ন্যায়ের প্রশ্নে আপস করে, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে| তাই ন্যায়বিচারের দাবিতে আপসহীনতা কেবল একটি নৈতিক আহ্বান নয়; এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা নিয়ে সগৌরবে টিকে থাকার পূর্বশর্ত|চিরন্তন আপ্তবাক্য হলো, ‘সত্য বড্ডই তিতা’| কিন্তু সেই তিতা সত্যকে গ্রহণ করার নৈতিক সাহস না থাকলে কোনো রাষ্ট্র বা সমাজই ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো নির্মাণ করতে পারে না| দর্শনের ভাষায়, সত্য স্বীকারের মধ্য দিয়েই নৈতিক আত্মশুদ্ধি শুরু হয়| আর সেই আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা কেবল একটি স্লোগানসর্বস্ব বুলি হয়েই থেকে যায়| আমরা যদি বাস্তবতাকে আড়াল করি কিংবা সুবিধামতো সত্যকে অস্বীকার করি, তবে অন্যায় কেবল টিকে থাকে না, বরং আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে| ফলে দুর্বৃত্তায়ণে সমাজ ও রাষ্ট্র সয়লাব হয়ে যায়; আর রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্রীড়ানকেরা ক্রমে স্বৈরাচারী আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে| তাই আজ প্রয়োজন একটি সম্মিলিত নৈতিক জাগরণ, যেখানে আমরা একযোগে বিচারহীনতা, পক্ষপাতিত্ব এবং বিভ্রান্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করি| আমাদের শিখতে হবে গুমকারী বা খুনীকে নির্ভয়ে গুমকারী ও খুনী বলতে, অন্যায়কে স্পষ্টভাবে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করতে এবং তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে| কারণ ভাষা কেবল প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেয়ারও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার| যখন আমরা সত্যকে সঠিক নামে ডাকতে ব্যর্থ হই, তখন আমরা অজান্তেই অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিই| একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাই আমাদের অবস্থান হতে হবে অবিচল, আপসহীন এবং সর্বজনীন| কারণ ন্যায়বিচারহীন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজেই এক নীরব গুমকারী ও খুনীতে পরিণত হয়, যেখানে অন্যায় শুধু ঘটে না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয় পায়| আর যে রাষ্ট্র অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, সে রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা হারায়; মানবিকতার দাবিও তখন আর তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য থাকে না| অতএব, ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কোনো একক ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের; এটি একটি জাতির সামষ্টিক দায়িত্ব| এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি প্রাণের মূল্য স্বীকৃত হবে এবং কোনো গুম-খুনই আর নীরবে হারিয়ে যাবে না; বরং রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে ন্যায়ের আলোয় প্রতিটি অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত হবে| দেশের জনগণ ‘মগের মুল্লক’-এর নয়, প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ নামক সার্বভৌম ‘রাষ্ট্র’-এর গৌরবান্বিত নাগরিক হতে চায়, যে ‘রাষ্ট্র’ তার নাগরিকদের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তার বিধান করবে সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে| জাতি সেই সোনালি দিনের অপেক্ষায় ‘তীর্থের কাক’-এর মতই দিন গুনছে|(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

বিস্মৃত প্রজ্ঞার আলোকধারা

‘নির্ভীক সাংবাদিকতার কোনো বন্ধু নেই’, ‘দেশ নষ্ট কপটে, প্রজা মরে চপটে, কী করিবে রিপোর্টে’, ‘(ওহে) হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হলো— পার কর আমারে’, ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়িয়ে দেখ তাই, পেলেও পাইতে পার লুকানো রতন’সহ অসংখ্য নীতিকথার জনক কে বলতে পারবেন?অনেকেই অনেকের নাম বলবেন, কিন্তু সঠিক ব্যক্তির নামটি অনেকেই জানেন না| কারণ, তিনি মৃত্যুর ১২৯ বছর পরও অখ্যাতই থেকে গেছেন| যেমনটি করা হয়েছিল ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে লিখিত ‘বিজয় বসন্ত’ উপন্যাসকে উপেক্ষা করে ‘আলালের ঘরের দুলাল’কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে| অনেকে আবার তার কর্ম ব্যবহার করে অস্কারের মতো পুরস্কার অর্জন করেছেন| কেউ কেউ তার ওপর বিভিন্ন বিষয়ে লিখে ডিগ্রি অর্জন করেছেন| অথচ কোনো এক অজানা কারণে আমরা তাকে হারিয়ে ফেলতে বসেছি|তিনি আর কেউ নন— বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার কুণ্ডুপাড়া গ্রামে বিখ্যাত মজুমদার পরিবারে অত্রষি বংশে মাতা কমলিনীর কোলজুড়ে এবং হলধর মজুমদারের পুত্র হয়ে ২০ জুলাই ১৮৩৩ সালের বৃহস্পতিবার জন্মগ্রহণকারী শ্রী হরিনাথ মজুমদার, ওরফে কাঙাল হরিনাথ মজুমদার| তার জীবনকাল ছিল মাত্র ৬৩ বছর| তিনি ১৮৯৬ সালের ১৮ এপ্রিল মারা যান| এই স্বল্প সময়ে তিনি ৭২টি গ্রন্থ রচনা করেন| এর মধ্যে ৪২টি প্রকাশিত এবং ৩০টি অপ্রকাশিত| ব্যবসা পরিচালনার জন্য তিনি এমএন প্রেস নামে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন| সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে ১১টি দল ও ৮টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন| ডাকঘরে মানি অর্ডার চালুর প্রস্তাব তিনি নিজ সম্পাদিত ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন| ক্ষুধা ও লজ্জা নিবারণের জন্য অন্যের দোকানে কাজ করতেও দ্বিধা করেননি| প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তিনি নারীশিক্ষার দীপ জ্বালাতে ১৮৫৭ সালের ১৩ জানুয়ারি নিজ চণ্ডীমণ্ডপে কুমারখালী বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে|জমিদার পান্নালাল মজুমদার, শিলাইদহ ঠাকুর এস্টেট, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদধূলিধন্য ভূমি, সোনাবন্ধুর দরগা, তন্ত্রাচার্য শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণবের সর্বমঙ্গলা মন্দির, খোরশেদপুরের পীরের মাজার, রানি রাসমণি নির্মিত গোপীনাথ মন্দির, তালোয়ার মাজার শরীফ, কুমারখালীর ঐতিহাসিক পুতুলবাড়ি, কাঙাল কুটির, ছেউড়িয়ার লালন শাহের মাজার, লাহিনীপাড়ার মীর মশাররফ হোসেনের বাসভিটা— এসব মিলিয়ে কুমারখালী এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের আধার| সেই কুমারখালীতেই জন্ম নিয়েছিলেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার| তার কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক বর্তমান প্রেক্ষাপটে কী অবস্থায় আছে, তা নিয়ে আলোচনা জরুরি|স্বশিক্ষিত কাঙাল হরিনাথের ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়া শেখার প্রবল ইচ্ছা ছিল| কিন্তু অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও পিতামাতাহীন অবস্থার কারণে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পূর্ণতা পায়নি| তবুও তিনি নিজ প্রচেষ্টায় বই সংগ্রহ করতেন— কখনও ভিক্ষা করে, কখনও সহপাঠীদের কাছ থেকে ধার নিয়ে| ভাষাশিক্ষায় কবি ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে| ১৮৫৪ সালে তিনি কুমারখালীতে বাংলা পাঠশালা স্থাপন করেন এবং ১৮৫৭ সালে নারীশিক্ষার জন্য বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন| শুরুতে কোনো বেতন না থাকলেও বিদ্যালয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়লে পরিদর্শকদের সুপারিশে তিনি বেতন গ্রহণ করেন|সেই সময় জমিদার, মহাজন ও নীলকরদের অত্যাচারে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ ছিল| এই প্রেক্ষাপটে ১৮৬৩ সালে তিনি ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন| মফস্বল কুমারখালী থেকে এমন উদ্যোগ ছিল সত্যিই যুগান্তকারী| তিনি শিলাইদহ ও শাহজাদপুর এস্টেটে জমিদারদের প্রজাপীড়নের কাহিনী তুলে ধরতেন| তবে নানা কারণে সেই প্রতিবেদনগুলোর অনেকেই হারিয়ে যায়| ধারণা করা হয়, প্রভাবশালী মহলের চাপে এসব লেখা প্রকাশে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল| তবুও কাঙাল হরিনাথ ছিলেন নির্ভীক সাংবাদিক| পায়ে হেঁটে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করতেন বলেই তিনি গ্রামীণ সাংবাদিকতার জনক হিসেবে খ্যাত|কাঙাল হরিনাথের গঠিত বাউল গানের দলের নাম ছিল ‘ফিকির চাঁদের দল’| তিনি পাবনা, নদীয়া, ফরিদপুর, ঢাকা, বরিশাল, যশোর ও কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে সুপরিচিত ছিলেন| তিনি প্রায় হাজারখানেক গান রচনা করেন| তার উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে— ‘ওরে মন পাগলারে, হরদমে আল্লাহজির নাম নিও’, ‘ওরে দোকানদার দোকানি ভাই’, ‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো’ ইত্যাদি|সাহিত্যেও তার অবদান অসামান্য| ‘আলালের ঘরের দুলাল’ রচনার আগেই তিনি ‘বিজয় বসন্ত’ রচনা করেন, যা বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে| শিবনাথ শাস্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন— ‘বিজয় বসন্ত’ ও ‘আলালের ঘরের দুলাল’— দুটিই বাংলার প্রথম উপন্যাস হিসেবে গণ্য হতে পারে| তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— ‘পদ্য পুণ্ডরীক’, ‘চারু চরিত্র’, ‘কবিতা কৌমুদী’, ‘বিজয়া’, ‘কবিকল্প’, ‘অক্রুর সংবাদ’, ‘সাবিত্রী নাটিকা’, ‘চিত্তচপলা’, ‘কাঙাল ফকির চাঁদের গীতাবলী’, ‘ব্রহ্মাণ্ডবেদ’ প্রভৃতি|তার মৃত্যুর পর বহু গুণীজন তাকে স্মরণ করেছেন— জলধর সেন, অক্ষয় কুমার ˆমত্রেয়, শিবনাথ শাস্ত্রী, রামতনু লাহিড়ী প্রমুখ| কিন্তু বাস্তবে তার স্মৃতি সংরক্ষণে তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি| তার বংশধররা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন| অবশেষে ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর তৎকালীন সরকার তার স্মৃতিতে জাদুঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন| ২০১৭ সালের ৯ ডিসেম্বর এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়|অবশেষে, দীর্ঘ ১২৪ বছর পর কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের নাম নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হলো| তার ব্যবহৃত মুদ্রণযন্ত্র, বই ও স্মারকসমূহ আজ সেই জাদুঘরে সংরক্ষিত| তবুও প্রশ্ন থেকে যায়— আমরা কি যথাযথভাবে তার অবদানকে মূল্যায়ন করতে পেরেছি?[লেখক : কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের পঞ্চম বংশধর]

ইতিহাসের নির্মোহ রূপকার

তাজউদ্দীন আহমদকে কেউ বলেন ইতিহাসের রূপকার, কেউ বলেন ইতিহাসের নির্মোহ নির্মাতা| তাজউদ্দীন আহমদ নিজে ইতিহাসের অজানা, অচেনা কেউ হয়ে থাকতে চেয়েছেন| ইতিহাস তাকে দৃশ্যমান করুক, তাজউদ্দীন তা’ কখনো প্রত্যাশা করেননি| তাজউদ্দীন সজ্ঞানে বলে গেছেন, ‘তুমি ইতিহাসে এমনভাবে কাজ করো যেন ইতিহাসে কোথাও তোমাকে খুঁজে পাওয়া না যায়|’ ইতিহাসের এমন নির্মোহ, নিরাকার, প্রত্যাশাহীন নির্মাতার সংখ্যা পৃথিবীতে যে খুব বেশি নেই তা’ আমরা বলতে পারি| মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের যতো গভীরে যাওয়া যায়, তাজউদ্দীন আহমদের অনন্য নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমীহের পরিমানও তত বেড়ে যায়| তাজউদ্দীন আহমদ, এমন একজন নীরব ও নির্মোহ ইতিহাসের রূপকার যাকে ইতিহাসের সিঁড়ি বেয়ে খুঁজে বের করে নিয়ে আসতে হয়| তিনি নিজে এসে উপস্থিত হননা| ছকে বাঁধা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় তাকে খুঁজে পাওয়া ভার| আমরা যখন তার অসীম সাহসী নেতৃত্ব, চরিত্রের দৃঢ়তা, উদ্দেশ্য লাভের জন্য আন্তরিক নিবেদন প্রত্যক্ষ করি তখন তাকে মনে হয়, ইতিহাসের ঘোর অন্ধকার থেকে আলোর পথে উত্তরণের একজন সাহসী ‘ত্রাতা’| তাজউদ্দীন আহমদের মতো বিশাল মানুষকে উন্মোচন করার জন্য প্রচুর গবেষণার প্রয়োজন আছে| তা যে খুব বেশি পরিমানে হচ্ছে তা না’ আমরা বলতে পারি| মুক্তিযুদ্ধকে জানার একটি ছক তৈরি হয়ে গেছে দেশে| সেই ছক বা বৃত্তের বাইরে কেউ যেতে ইচ্ছুক নন| ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত আমরা ইতিহাসকে অনুসন্ধান করি দফাওয়ারী আন্দোলনের ভাঁজে| সেই ভাঁজের ভেতরে থাকে প্রধানত আন্দোলনের রুটিন বা ধারাবাহিক বর্ণনা| ইতিহাসের পেছনের ইতিহাসকে গবেষণা করে উন্মোচন করার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় খুব কম| ২৫ মার্চ গভীর রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করার পর, জাতির ক্রান্তিলগ্নে নেতৃত্বের সব দায় অসীম সাহস নিয়ে গ্রহণ করেন তাজউদ্দীন আহমদ| জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ ও গৌরবের এই সময়ে তাজউদ্দীন যদি একটি মাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল করতেন তাহলে আমাদের ইতিহাস ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হতে পারতো| মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় তাকে একাই একটি সরু সুতার ওপর দিয়ে হাঁটতে হয়েছে যার নিচে ছিল অগ্নি স্ফুলিঙ্গ| তিনি জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য বানিয়ে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চে, পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর চোখ এড়িয়ে, ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামের সঙ্গে ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন| জীবনকে আগাম উৎসর্গ করেছিলেন তিনি মাতৃভূমির জন্য| বাঙালি জাতির এই অচেনা, ভয়াবহ পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তার পরিবারকে কী বার্তা দিয়ে গিয়েছিলেন? তিনি একটি চিরকূটে তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী’ সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন লিলিকে লিখেন ‘লিলি, আমি চলে গেলাম| যাবার সময় কিছুই বলে আসতে পারিনি| মাফ করে দিও| আবার কবে দেখা হবে জানি না’| তাজউদ্দীন আহমদ ব্যক্তিগত জীবনে আবেগকে তেমন প্রাধান্য দিতেন না, এর মানে এই নয় যে তিনি ছিলেন আবেগহীন| তাজউদ্দীন আহমদ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯২৫ সালে, বর্তমান ঢাকা জেলার, কাপাসিয়া উপজেলার দরদরিয়া গ্রামে| ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কারাগারে রাতের অন্ধকারে পাক-মার্কিন দোসর মোশতাক ও সামরিক বাহিনীর কিছু সংখ্যক পাক-মার্কিন এজেন্ট তাজউদ্দীনসহ জাতীয় চার নেতাকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে| সেই হত্যাকাণ্ড ও এর পেছনের গল্প বলা আজকের লেখার উদ্দেশ্য নয়| আজকের লেখার উদ্দেশ্য, তাজউদ্দীন আহমদ যে কতো বড় মহীরুহ ছিলেন সে সম্পর্কে সামান্য ঈঙ্গিত প্রদান করা| তাজউদ্দীনের এই সফল ও ত্যাগী জীবনকে চারটি পর্বে ভাগ করা যায়| ১৯২৫ থেকে পাকিস্তান অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত প্রথম পর্ব, পাকিস্তান অর্জনের পর থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্ব, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের মূহুর্ত পর্যন্ত তৃতীয় পর্ব এবং ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল থেকে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জীবনের শেষ পর্ব| তাকে গভীর ভাবে অধ্যয়ন করতে হলে তার জীবনের এই চারটি পর্বকেই বিবেচনায় নিয়ে আসতে হয়| তবে তার নেতৃত্বের বিকশিত সময় প্রত্যক্ষ করতে হলে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন পর্যন্ত তার ভূমিকাকে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে| তাজউদ্দীন আহমদ যখন সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে উপস্থিত হয়েছিলেন, তখন তাকে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে এবং ভারতের প্রভাব মুক্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার এক বিশাল চ্যালেঞ্জের সামনে নিয়ে আসে| তিনি ও ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম ৩০ মার্চ সীমান্ত পার হওয়ার পরেই তাদের সঙ্গে সাক্ষাত হয় ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তরক্ষী প্রধান ইন্সপেক্টর জেনারেল গোলোক মজুমদারের সঙ্গে| গোলক মজুমদারকে তাজউদ্দীন তার প্রখর ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয় ধরণে জানিয়ে দেন ভারত সরকারের সঙ্গে তার আলোচনা হবে তখনই যখন সরকারের পক্ষ থেকে তিনি ও মুক্তিযুদ্ধের নেতাদের আনুষ্ঠানিক ভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তিনি সুস্পষ্ট ভাবে গোল্পক মজুমদারকে অবগত করেন তিনি ও তার সহযোগী নেতারা স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতিনিধি| তাজউদ্দীনের কথা শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন আইজি মজুমদার| তার রাষ্ট্রনায়কোচিত ব্যক্তিত্ব ও দূরদর্শিতার প্রমাণ পেয়েছিলেন তিনি এই দুরদর্শী প্রস্তাবে| তাজউদ্দীন আহমদের প্রস্তাব অনুযায়ী ভারত সরকার এপ্রিল ৩, ১৯৭১ সালে, তাজউদ্দীন আহমদকে আমন্ত্রন জানায়| প্রথম সাক্ষাতে তাজউদ্দীন, একজন স্বাধীনতাকামী জাতির নেতা হিসাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সুস্পষ্ট ভাবে কিছু বিষয় বিনয়ের সঙ্গে উপস্থাপন করেন| তাজউদ্দীনের সুস্পষ্ট বক্তব্য শুনে আমরা বিস্মিত হই| তাজউদ্দীন বলেছিলেন, ‘এটা আমাদের যুদ্ধ| আমরা চাই ভারত এতে জড়াবে না| আমরা চাই না ভারত তার সৈন্য দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে আমাদের স্বাধীন করে দিক| এই স্বাধীনতার লড়াই আমাদের নিজেদের এবং আমরা এটা নিজেরাই করতে চাই|’বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে দিশেহারা করার জন্য, পাক, মার্কিন, চিনের নানা কূট কৌশলকে মোকাবিলা করতে হয়েছে, এই সহিষ্ণু, দুরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতাকে| সুশিক্ষিত, মেধাবী তাজউদ্দীন আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসে সবার সহযোগিতায় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন| সরকার গঠনের পর পরই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন বিশ্ববাসীকে নবজাত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান জানান| দেশের মাটিতেই শপথগ্রহণ হবে, এই ছিল তার ইচ্ছা| সেই আকাঙ্ক্ষা অনূসারেই, ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে দেশি-বিদেশি সাংবাদিক সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়| প্রকৃত পক্ষে এপ্রিল মাসের ভেতরেই বাংলাদেশ নামক দেশের গোড়া পত্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সব কর্মকাণ্ড, সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধরন অনুযায়ী তিনি সমাপ্ত করতে সক্ষম হন| সরকার গঠনের পর থেকেই তাকে বহুমুখী অভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করতে হয়| স্বাধীন বাংলা সরকারের মধ্যেই ছিল পাকিস্তানের পক্ষের ষড়যন্ত্রকারীরা| তাজউদ্দীন আহমদ এ সমস্ত ষড়যন্ত্রকে দৃঢ় ভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হন| ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করার বিষয়টিকে তার ভাষায় এভাবে ব্যাখ্যা করেন তাজউদ্দীন, ‘পাকিস্তান তার বন্ধুদের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল কিন্তু সফল হয়নি, সংগ্রামের এক পর্যায়ে আমেরিকা প্রশ্ন তোলে, স্বাধীনতা চাও নাকি মুজিবকে চাও| এর উত্তরে আমি বলেছিলাম স্বাধীনতাও চাই, মুজিবকেও চাই|’ তাজউদ্দীন আহমদ এতো নিবেদিত এবং শীতল মস্তিষ্কের নেতা ছিলেন, যিনি শত বাধার মুখেও লক্ষ্যে থেকে বিচ্যুত হননি| নীতি, নৈতিকতার দিক থেকে এক অনন্য মানুষ ছিলেন তাজউদ্দীন| পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক বিষয়কে সঠিক ভাবে অধ্যয়ণ করার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ| কৌশলী নেতৃত্ব ও কর্তব্যনিষ্ঠা, সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা প্রগতিশীল চিন্তার কারণে তার ভাষায় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় সফল ‘ধাত্রির’ ভূমিকা তাজউদ্দীন পালন করতে পেরেছিলেন| মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, সমগ্র জাতির সামরিক, বেসামরিক বাহিনী, নানা মত, নানা পথের মানুষদের সংহত করে জাতীয় ঐক্যকে সুদৃঢ় রাখার কৃতিত্ব তাকে না দিলে অবিচার করা হয়| তাজউদ্দীনকে না জানলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা হয় না| তাকে না বুঝলে বাংলাদেশকে বুঝা অসমাপ্ত থেকে যায়| জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে তাজউদ্দীন আহমদের জীবন দর্শন এবং নেতৃত্বের সৌন্দর্য জানা খুবই জরুরি| [লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

“বাংলা যখন হারাম”

“এইডা কী কন বাংলা যখন হারাম! আপনে তো মিয়া আস্ত নাজায়েজ কথা কন! বাংলা যখন হারাম! মিয়া বাংলাদেশ না হইলে এই পানিওয়ালীর পোলারানি, এয়ারলাইনসের মালিক হোইতো? ওর্য়াল্ডবেস্ট অল রাউন্ডার হোইতেন! লজ্জা করে না মিয়া ফালতু কথা কোইতে!”“আরে মনু তুমি চ্যেতকা| আমি কী বলতে চাইছি আর তুই কী বুঝছিস!”“ক্যান আমার বুঝতে অসুবিধা কি? আপনে তো বাংলা ভাষায় কথা কোইতাছেন| হীব্রু ভাষায়তো মাতেন ন’| তো, এইডা বুঝতে আমার কি অসুবিধা| বাংলা যখন হারাম| বাংলাদেশ স্বাধীনতা না পাইলে আপনে মিয়া হোটেলের বেয়ারা থাকতেন| রম্য লেখক! ভুইল্লা যান মিয়া| বাংলাদেশ স্বাধীন না হোইলে আপনের বাপের নামও ভুইল্লা যাইতেন!”“বুঝলাম বাংলাদেশর স্বাধীনতার আগে বাঙালিদের ওপর অনেক অন্যায় হয়েছে| সেনাবাহিনিতে বাঙালিদের নিতো না... ” “তো বুঝেন না মিয়া| মেজর জেনারেল! বাংলাদেশ স্বাধীন না হোইলে সাধারণ সিপাইভি হোইবার পারতেন না| আবার কতা কন মিয়া, বাংলা যখন হারাম! মেডিকেল কলেজের ডিরেক্টার! ডিরেক্টার জেনারেল ফোর্সেস ইন্টালিজেন্সের চিফ, উঁহ মরে যাই সখী তোর আতরের গন্ধে! মিয়া, লাখ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগে দেশ স্বাধীন, আর অহন কন বাংলা যখন হারাম! এই লাখ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগের কী কোনোই দাম নাই! আসলে আপনে মিয়া আস্ত নাজায়েজ পোলা| আপনের মিয়া জন্মেরই ঠিক নাই!”“দ্যেখ এভাবে আমার পূর্ব পুরুষকে টানছিস ক্যেনো! বুঝলাম বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়াতে সারাবিশ্বে বাঙালি জাতি একটা ভুখণ্ড পেয়েছে| বাঙালি এবং বাংলাদেশ এখন সারাবিশ্বে একটা পরিচিত নাম| তোরা দাদাদের ভাষায় তথাকথিত মুচুরম্যানরা পৃথিবীর বুকে লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে বাঙালি জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিস| যেটা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর মতো ন্যাশানালিষ্টরা পারেননি, আর বর্তমান কোটি কোটি দাদারা নিজেদের প্রথমে ভারতীয় তারপর বাঙালি বলে একটা আত্মতৃপ্তি পায়| কিন্তু বাঙালি হিসেবে আমাদের মতো আলাদা কোনো মর্যাদা নেই| এই দাদারাই এক সময় লিখতেন, স্বাধীনতা হীনতা কে বাঁচিতে চায় রে, কে বাঁচিতে চায়| সব কাগুজে বাঘ| আর তোর দিদিতো তোদের ধর্মের লোকেদের কাছে ভোটের জন্য পা চাঁটে, কিন্তু সৃষ্টির সৃষ্ট পানির হিসসা দেয়না| দু’মুখো শর্প এই তোর কাউলা দিদি|”“থাক ভাই হ্যাগো মানে দাদাগো কথা ছাড়েন, হ্যেরাতো বাউন্ড্রী লাইনে পা-লাগায়া ক্যাচ ধইরা ছক্কা না দিয়া আউট দিয়াদ্যেয়| ওই খাচ্চরগো কথা থুয়া মিয়া আপনের কথা কন, আপনে মিয়া বাঙালি হয়া, বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক হয়া আপনে ক্যেমনে কন বাংলা যখন হারাম! আপনের লজ্জা করে না নিজেরে নিজে ছোট করতে?”“আমি বলছিলাম কি, এবার পয়লা বৈশাখকে অনেকে নাজায়েজ কাজ বলেছে”“ধ্যারর মিয়া আপনে হালায় আস্ত প্যাচাইল্লা মানুষ, আপনে ইংরেজি বছরের পেরথমে থার্টি ফার্স্ট ডিসেম্বরে পার্টি করা পারেন, আর বাঙালিগো বছরের পয়লা দিন পহেলা বৈশাখ পালন করতে আপনের দোষ কিতা!”“না অনেকে মানে আমাদের টাওয়ারের ম্যানেজার বলছিল, এসব পহেলা বৈশাখ শেরেকি কায়কারবার! তাই আমরা যদি...”“আরে মিয়া, মরার জ্বালা আপনের টাওয়ারে ম্যানেজার বাঙালি না?”“নিশ্চয় বাঙালি| আলবৎ বাঙালি | ও তো আর পাকিস্তান থেকে বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসেনি|”“তায়লে! বাঙালি হোইলে ওর বাংলা মাসকে উই মানবো না? প্রতিটা খবরের কাগজে, প্রতিদিন ইংরেজি, বাংলা, হিজরী সনের দিন তারিখ লেখা থাকে| তো আপনের টাওয়ারের ম্যানেজার মানলো নাতো বাংলা মাস বাংলা তারিখ বন্ধ হয়া যাইবো?”“না তা না| সর্বপ্রথম আমরা বাঙালি, তারপর কেউ মুসলমান, কেই হিন্দু, কেউ বুদ্ধ, কেউ জৈন, কেউ ব্রাহ্মধর্মে দিক্ষীত, সে যাই হোক প্রথমে আমরা সবাই বাঙালি, তারপর যার যার ধর্ম, যে ব্যক্তি যেই ধর্মে বিশ্বাস করে তা পালন করবে, সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার কিন্তু প্রথমে আমরা সবাই বাঙালি|”“জ্বী-অয়, প্রথমে আমরা সবাই বাঙালি, হেরপর লক্ষপ্রাণের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক| ধর্ম যার যার সংস্কৃতি মানে পয়লা বৈশাখ সব্বার| এখানে হিন্দু, বুদ্ধ, ˆজন, ব্রাহ্মধর্মে বইলা কিছু নাই| বুজচোইন|”“আমিতো বুঝলাম, কিন্তু অনেক বাঙালি, বাঙালি হয়েও বুঝতে চায় না|”“আচ্ছা মুরুক্ষু হ্যেরা না বুঝুক, কিন্তু আপনে ক্যেমনে কোইলেন, বাংলা যখন হারাম?”“তুইতো আমার কথা শুনতেই চাসনা, খালি ভুল বুঝিস!”“কি ভুল বুঝলাম, বাংলা যখন হারাম, এতে আমি কি ভুল বুঝলাম কন?”“আরে আমি বলছিলাম তোরা যেমন নিউ ইয়ারস’ডে তে, অনেকে ওই পাগলা পানি টানি পানা করে, ঠিক তেমনি পহেলা বৈশাখেও অনেক বাঙালি বাংলা টাংলা পান করে| সেটা বন্ধকরা যায় কিনা| মানে বাংলা চোলাই কারণবারিটা বাদ দেয়া যায় কিনা?”“হেঁ হেঁ, মিয়া আপনে আমারে হাসাইলেন! নিউ ইয়ার্স’ডে কন আর পহেলা বৈশাখ কন, পাগলা পানি সব সময় পরিত্যাজ্য|”“হেঁ হেঁ আমিও তো তাই বলছিলাম, পহেলা বৈশাখে বাংলা হবে হারাম...” “শুধু পহেলা বৈশাখ না, হারা বছরই বাংলা কারণ বারি, হোইবো হারাম| হেঁ হেঁ হেঁ...”[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

রোজকার পানি কিনে খাওয়া যেখানে স্বাভাবিক

শহরে আমরা যখন তৃষ্ণা মেটাতে বোতলজাত পানি কিনি তখন সেটি নাগরিক জীবনের একটি অতি সাধারণ চিত্র| অনেক সময় এটি আভিজাত্য, স্বাচ্ছন্দ্য বা স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়| কিন্তু বাংলাদেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন| সেখানে প্রতিদিনের খাবার পানি কেনা কোনো শৌখিনতা বা বিলাসিতা নয়| এটি স্রেফ টিকে থাকার এক নির্মম ও রূঢ় সংগ্রাম| চারদিকে থৈ থৈ করছে নদী আর সমুদ্রের জল| অথচ পান করার মতো এক ফোঁটা নিরাপদ ও মিষ্টি পানি তাদের কাছে নেই| নদীমাতৃক এই ভূখণ্ডের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট কিংবা পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ প্রান্তিক জনপদে গেলে এই বাস্তবতা খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে| এত নদীর দেশে বসে এক গ্লাস সুপেয় পানির জন্য মানুষের এমন সংগ্রাম সত্যিই অবিশ্বাস্য মনে হয়| কিন্তু উপকূলের লাখো মানুষের কাছে এটিই এখন প্রতিদিনের অলঙ্ঘনীয় নিয়তি| একসময় এই এলাকার প্রতিটি বাড়িতে নিজস্ব পুকুর ছিল| বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রাচীন এবং কার্যকর পদ্ধতি এখানকার মানুষের খুব ভালোভাবে জানা ছিল| সমাজবদ্ধভাবে তারা মিষ্টি পানির আধারগুলো সযত্নে রক্ষা করতেন| কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর থেকে এই দৃশ্যপট ক্রমশ বদলাতে শুরু করে| একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে| অন্যদিকে সিডর, আইলা, আম্পান বা রেমালের মতো একের পর এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় উপকূলের সমস্ত হিসাব চিরতরে পাল্টে দিয়েছে| জলোচ্ছ্বাসে সমুদ্রের নোনা জল প্রবল বেগে ঢুকে পড়েছে উপকূলের বুক চিরে| নিমেষেই তলিয়ে গেছে মিষ্টি পানির সমস্ত আধার| এরপর শুরু হয়েছে আরেক মানবসৃষ্ট এবং ভয়ঙ্কর দুর্যোগ| অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের জন্য যত্রতত্র বাঁধ কেটে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে তোলা হয়েছে| বেশি লাভের আশায় ঘের মালিকরা পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন তার চড়া মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ| ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আজ পুরোপুরি পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে| অতিরিক্ত লবণ এবং আর্সেনিকের বিষাক্ত উপস্থিতিতে খাবার পানির এই তীব্র হাহাকার এখন বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে| প্রকৃতি ও মানুষের লোভের এই দ্বিমুখী আক্রমণে উপকূলের মিষ্টি পানি আজ শুধুই এক সোনালি অতীত| এই বিপন্ন জনপদের মানুষের প্রতিটি সকাল শুরু হয় কেবল এক কলসি পানির সন্ধানে| মাটির কলস বা প্লাস্টিকের পাত্র হাতে নারীদের মাইলের পর মাইল হাঁটার দৃশ্য সেখানে একসময় নৈমিত্তিক ঘটনা ছিল| প্রখর রোদে বা ভারী বৃষ্টিতে হেঁটে এক কলসি পানি আনতে তাদের দিনের একটি বড় অংশ ব্যয় হতো| তবে আজকাল সেই দৃশ্য কিছুটা কমে এসেছে| গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথে এখন নিয়মিত দেখা যায় ইঞ্জিনচালিত ভ্যান| সেই ভ্যানে প্লাস্টিকের বড় বড় জারে করে বিক্রি হচ্ছে খাবার পানি| স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট থেকে এই পানি সরবরাহ করা হয়| ভ্যানচালকরা হাঁকডাক দিয়ে পাড়ায় পাড়ায় এই পানি বিক্রি করেন| ফিল্টার করা এই পানি কিনে পান করাটাই এখন উপকূলের নতুন স্বাভাবিক চিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে| রোজকার পানি কিনে খাওয়ার এই রীতি এখন তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ| ঘুম থেকে উঠেই তাদের হিসাব করতে হয় আজ কত জার পানি লাগবে এবং তার দাম কীভাবে মেটানো হবে| কিন্তু আমাদের গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার এই স্বাভাবিকতা আসলে কতটা অস্বাভাবিক| বেঁচে থাকার সবচেয়ে আদিম ও মৌলিক উপাদানটি যখন চড়া দামে কিনতে হয় তখন রাষ্ট্রের কল্যাণকামী চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক| উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানির তীব্র সংকট নিয়ে সংবাদমাধ্যমে অনেক প্রতিবেদন হয়| কিন্তু এর আড়ালে সাধারণ মানুষের যে বিশাল অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা খুব কমই চোখে পড়ে| একজন দিনমজুর, জেলে বা প্রান্তিক কৃষক হয়তো সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে সামান্য কিছু টাকা আয় করেন| সেই সামান্য আয়ের একটি বড় অংশ তাকে ব্যয় করতে হয় কেবল পরিবারের খাবার পানি কিনতে| ত্রিশ লিটারের এক জার পানির দাম নেয়া হয় ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা পর্যন্ত| শুষ্ক মৌসুমে বা গ্রীষ্মকালে পানির সংকট বাড়লে এই দাম আরও বেড়ে যায়| যে পানি প্রকৃতি থেকে তাদের বিনামূল্যে পাওয়ার কথা ছিল তা আজ চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা| এটি কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়| এটি প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন| পানির পেছনে এই বাড়তি খরচের কারণে তাদের পুষ্টিকর খাবার কেনার বাজেট বাধ্য হয়ে কমাতে হয়| ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তাদের হিমশিম খেতে হয়| জরুরি চিকিৎসায় তারা অর্থ ব্যয় করতে পারেন না| ফলে দারিদ্রে?্যর চক্র থেকে তারা কোনোভাবেই বের হতে পারছেন না| পানি নামক এই তৃষ্ণার বাণিজ্য তাদের অর্থনৈতিকভাবে চিরতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে| সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো এই চড়া দামে কেনা পানির প্রকৃত মান কেমন! যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব স্থানীয় পানি শোধনাগারে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয় না| প্লাস্টিকের নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর জারে করে বছরের পর বছর ধরে একইভাবে পানি বিক্রি হচ্ছে| সেখানে সরকারি কোনো তদারকি বা মান নিয়ন্ত্রণের ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই| ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে পানি কিনেও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে পারছেন না| এটি অনেকটা নিরুপায় হয়ে বিষ পানের মতো একটি করুণ অবস্থা| নিরাপদ পানির নামে তারা আসলে কী পান করছেন তা দেখার কেউ নেই| এর পাশাপাশি গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যগত সংকট তৈরি হচ্ছে| বিশুদ্ধ পানির অভাবে উপকূলের মানুষ নানা ধরনের পানিবাহিত জটিল রোগে ভুগছেন| বিশেষ করে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে ভয়াবহভাবে| গোসল বা কাপড় ধোয়ার মতো নিত্যদিনের কাজে নোনা পানি ব্যবহারে বাধ্য হয়ে তারা জরায়ুর নানা রোগ এবং চর্মরোগসহ দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন| অনেক ক্ষেত্রে এই সমস্যা এতই প্রকট আকার ধারণ করে যে অল্প বয়সেই নারীদের জরায়ু কেটে ফেলতে হয়| এটি এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় যা নীরবে ঘটে চলেছে| পানি কিনে খাওয়ার এই নতুন প্রবণতা আমাদের একটি গভীর রাষ্ট্রীয় সংকটের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে| রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে হোঁচট খায় ঠিক তখনই এমন অমানবিক বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হয়| মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কিছু মানুষ রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে| উপকূলের এই পানি সংকটকে কেবল একটি ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক সমস্যা ভাবলে বড় ভুল হবে| এটি একটি জাতীয় সমস্যা এবং এর দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন| আমাদের নীতিনির্ধারকদের এই রূঢ় বাস্তবতা অনুধাবন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি| কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ত্রাণের মতো করে কিছু পানির ট্যাংক বা বোতলজাত পানি পাঠিয়ে এই গভীর সমস্যার সমাধান হবে না| এনজিও বা বেসরকারি সংস্থাগুলোর খণ্ডিত ও সাময়িক উদ্যোগও এর দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে| প্রয়োজন সমন্বিত এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই উদ্যোগ| বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য প্রতিটি গ্রামে সরকারি উদ্যোগে বড় আকারের জলাধার বা মেগা রেইনওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম নির্মাণ করতে হবে| এই জলাধারগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্থানীয় জনগণের হাতে অর্পণ করতে হবে যাতে তারা এর মালিকানা অনুভব করেন| পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ভিত্তিক উন্নত ও নিরাপদ পানি শোধনাগার স্থাপন করে বিনামূল্যে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে| ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বেদখল হওয়া পুকুর এবং খালগুলো খনন করে মিষ্টি পানির আধার হিসেবে পুনরায় গড়ে তুলতে হবে| অবৈধভাবে চিংড়ি ঘেরে নোনা পানি তোলা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে| যারা পরিবেশের ক্ষতি করে নোনা পানি লোকালয়ে ঢোকাচ্ছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে| [লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

নারীদের নিয়ন্ত্রণে সোশ্যাল মিডিয়া যখন নতুন হাতিয়ার

এক দশকেরও বেশি সময় আগে যখন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর রূপকল্পটি জাতীয় এজেন্ডা হিসেবে উত্থাপিত হয়েছিল, তখন এর প্রধানতম ভিত্তি ছিল প্রযুক্তিগত সংযোগের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন| বিশেষ করে বাংলাদেশের নারী সমাজের জন্য ডিজিটাল বিপ্লবকে মনে করা হয়েছিল এক বৈশ্বিক জ্ঞান অর্থনীতিতে লাফিয়ে ওঠার সোপান| আশা করা হয়েছিল, সোশ্যাল মিডিয়া হবে এমন একটি ‘গ্রেট লেভেলার’ বা সমতাকারী শক্তি, যা গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করবে, ভৌগোলিক ও সামাজিক বাধাগুলো ভেঙে ফেলবে এবং নীরবদের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেবে| কিন্তু ২০২৬ সালের দাঁড়িয়ে এই উজ্জ্বল আশাবাদী বয়ানের নিচে লুকিয়ে থাকা একটি অন্ধকার ও বিপজ্জনক বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রযুক্তি কেবল মুক্তির পথ নয়, বরং এটি পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের এক আধুনিক ও ডিজিটাল কারারক্ষী হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে| নারীদের শরীর, কণ্ঠস্বর এবং প্রকাশকে অভূতপূর্ব নিপুণতায় নজরদারি, পণ্যায়ন এবং শাস্তি দেয়ার এক বিশাল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এই ভার্চুয়াল জগত|র‌্যাডিক্যাল ফেমিনিস্ট বা আমূল নারীবাদী তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ডিজিটাল সহিংসতা কোনো আকস্মিক ত্রুটি নয়, বরং এটি পিতৃতন্ত্রের এক বিবর্তনশীল কৌশল| পিতৃতন্ত্র তার আধিপত্য বজায় রাখতে সবসময়ই নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়| অতীতে যখন নিয়ন্ত্রণ কেবল চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা স্মার্টফোনের স্ক্রিনের মাধ্যমে নারীর ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে পড়েছে| এখানে নারীর যৌনতা ও স্বায়ত্তশাসনকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে| অন্যদিকে, উত্তর-আধুনিক নারীবাদের প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে এই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো আসলে একেকটি ‘ডিজিটাল প্যানোপটিকন’| ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো যে নজরদারি ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, যেখানে বন্দি সবসময় অনুভব করে যে সে নজরদারির নিচে আছে, সোশ্যাল মিডিয়া বাংলাদেশের নারীদের জন্য ঠিক সেই জেলখানায় পরিণত হয়েছে| এখানে প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি পোশাকের পছন্দ বা প্রতিটি সাহসী মন্তব্য একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক ও ডিজিটাল জনতার বিচারে প্রতিনিয়ত ব্যবচ্ছেদ করা হচ্ছে|২০২৪ সালের জাতীয় নারী নির্যাতন জরিপ, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউএনএফপিএর কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত হয়েছে, এই নতুন ধরনের সহিংসতার এক ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে| প্রথমবারের মতো এই সরকারি পরিসংখ্যানে ‘প্রযুক্তি-সহায়তায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’ বা টিএফজিবিভি পরিমাপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে| এই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহারকারী নারীদের ৮.৩ শতাংশ তাদের জীবনে অন্তত একবার অবাঞ্ছিত যৌন যোগাযোগ, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেল, ছবি-ভিত্তিক নির্যাতন বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন| ২০-২৪ বছর বয়সী তরুণীদের ক্ষেত্রে এই হারের চিত্র আরও আঁতকে ওঠার মতো—প্রায় ১৬ শতাংশ| শহরাঞ্চলেও এই হার ১২ শতাংশের কাছাকাছি| সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঐতিহ্যগত শারীরিক সহিংসতার ক্ষেত্রে যেখানে পরিচিত ব্যক্তি বা নিকটাত্মীয়রাই প্রধান অপরাধী হয়ে থাকেন, সেখানে ডিজিটাল সহিংসতার ক্ষেত্রে ৪৬ শতাংশ অপরাধীই হলো সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি| এটি প্রমাণ করে যে, অনলাইন পিতৃতন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না; এটি একটি নামহীন ও সর্বব্যাপী শক্তি হিসেবে নারীর ডিজিটাল উপস্থিতিকে প্রতিনিয়ত আক্রমণ করছে|পিতৃতন্ত্রের মূল লক্ষ্যই হলো নারীর শরীরকে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ, আনন্দ এবং তথাকথিত ‘পারিবারিক সম্মান’-এর মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা| বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে যেখানে ‘লজ্জা’ এবং ‘পর্দা’র সাংস্কৃতিক চাপ অত্যন্ত প্রবল, সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া এই অবদমনকে বহুগুণ শক্তিশালী করেছে| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অপব্যবহার এখন এই ডিজিটাল পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে| বর্তমানে ‘ডিপফেক রিভেঞ্জ পর্ন’ তৈরির জন্য কোনো নারীর ব্যক্তিগত গ্যালারিতে প্রবেশ করার আর প্রয়োজন হয় না| ফেইসবুক বা টিকটক প্রোফাইল থেকে সাধারণ একটি ছবি নিয়ে এআই টুলের মাধ্যমে যে কারো মুখকে আপত্তিকর ভিডিওতে বসিয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে| সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে নারী অ্যাক্টিভিস্ট, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানি কয়েক গুণ বেড়েছে| এই ধরনের আক্রমণ কেবল সম্মানহানি নয়, বরং নারীর অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে| কারণ আমাদের সমাজে নারীর ‘পবিত্রতা’ ও ‘মর্যাদা’র ওপরই তার বিয়ের সম্ভাবনা, শিক্ষার সুযোগ এবং পরিবারের নিরাপত্তা সরাসরি নির্ভরশীল|সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলো এই লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার পেছনে এক অদৃশ্য ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করে| এই প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবসায়িক মডেলটি এমনভাবে তৈরি যেখানে ‘এনগেজমেন্ট’ বা সম্পৃক্ততা যত বেশি, মুনাফা তত বেশি| গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক সংবাদের চেয়ে নেতিবাচক ও ক্ষোভ সৃষ্টিকারী বিষয়বস্তু দ্রুত ভাইরাল হয়| ফলে যখনই কোনো নারীর পোশাক বা চলাফেরা নিয়ে কোনো পুরুষতান্ত্রিক অ্যাকাউন্ট থেকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা ভিডিও প্রকাশ করা হয়, অ্যালগরিদম সেই বিদ্বেষমূলক পোস্টকেই হাজার হাজার মানুষের ফিডে পৌঁছে দেয়| এর মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলো ˆলঙ্গিক বৈষম্য ও অবমাননাকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করছে| জুডিথ বাটলারের ‘লিঙ্গ পারফরম্যাটিভিটি’ তত্ত্ব এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক| অনলাইনে নারীদের প্রতিনিয়ত একটি আদর্শায়িত এবং সমাজ-অনুমোদিত নারীত্ব ‘পারফর্ম’ করতে বাধ্য করা হচ্ছে| যদি কোনো নারী তার স্বাধীন মতামত দেয় বা প্রথাগত ছকের বাইরে গিয়ে কোনো আচরণ করে, তবে ডিজিটাল জনতা তাকে ‘শেইমিং’ বা লজ্জিত করার মাধ্যমে সীমানা মনে করিয়ে দেয়| এটি এক প্রকার ডিজিটাল গণপিটুনি, যা নারীর স্ব-প্রকাশের অধিকারকে কেড়ে নেয়|২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার যে উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা সাইবার জগতকে নারীদের জন্য আরও বেশি প্রতিকূল করে তুলেছে| বিভিন্ন কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে লিঙ্গ সমতার বিরুদ্ধাচারণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে| নারী উন্নয়ন নীতি বা নারীর জনজীবনে অংশগ্রহণকে ‘সংস্কৃতিবিরোধী’ বা ‘ধর্মবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে যে ডিজিটাল প্রচারণা চালানো হয়, তা সরাসরি নারীর শারীরিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে| এর ফলে অনেক মেধাবী নারী তাদের পেশাগত কাজ বা সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে পিছিয়ে আসছেন| তারা পোস্ট করার আগে শতবার ভাবছেন, পাছে কোনো সাইবার হামলায় তাদের ব্যক্তিগত জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়| এই যে ‘ভয়’ এবং ‘স্ব-সেন্সরশিপ’—এটাই হলো ডিজিটাল পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিজয়| যখন একজন নারী হয়রানির ভয়ে নিজের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেন, তখন পিতৃতন্ত্র বিনা রক্তপাতে তার লক্ষ্য অর্জন করে|এই সমস্যার সমাধান হিসেবে যেসব আইনি বা কারিগরি ব্যবস্থার কথা বলা হয়, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অপর্যাপ্ত| বর্তমান ডিজিটাল আইনগুলো প্রযুক্তির দ্রুত গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না| এআই-জেনারেটেড সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনি প্রমাণ সংগ্রহ করা বা অপরাধীকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জটিল| আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারী আইনি সাহায্য নিতেও ভয় পান, কারণ আইনি প্রক্রিয়াটি অনেক সময় তাকে আবারও মানসিকভাবে হেনস্তা করে| তথাকথিত লিবারেল সমাধানগুলো কেবল উপরিভাগের ক্ষত সরানোর চেষ্টা করে, কিন্তু মূল কাঠামোগত সমস্যা—অর্থাৎ সমাজে বদ্ধমূল থাকা নারীবিদ্বেষ এবং প্রযুক্তির ওপর পুরুষের একাধিপত্যকে প্রশ্ন করে না| একটি প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল স্থাপত্যের এমন এক মৌলিক পুনর্বিন্যাস, যেখানে মুনাফার চেয়ে নাগরিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা বেশি গুরুত্ব পাবে|তবে এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু আশার আলো দেখতে পাওয়া যায়| বাংলাদেশের নারীরা ডিজিটাল স্পেসকে কেবল আক্রমণের জায়গা হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধের দুর্গ হিসেবেও গড়ে তুলছেন| বিভিন্ন ফেমিনিস্ট নেটওয়ার্ক, হ্যাশট্যাগ মুভমেন্ট এবং আইনি সহায়তা সংস্থাগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত| তারা সাইবার হয়রানির বিরুদ্ধে সরব হচ্ছে, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছে এবং সরকারকে নীতি পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে| ২০২৪ সালের সরকারি জরিপে প্রযুক্তি-সহায়তায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অন্তর্ভুক্তি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র এখন এই সংকটের গভীরতা বুঝতে পারছে| কিন্তু পরিসংখ্যানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন|ডিজিটাল বাংলাদেশ কেবল উচ্চগতির ইন্টারনেট বা স্মার্টফোনের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়| এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এদেশের নারীরা এই ডিজিটাল স্পেসে কতটা নিরাপদ এবং স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারছেন তার ওপর| পিতৃতন্ত্র তার খোলস বদলে অনলাইনে যে প্যানোপটিকন তৈরি করেছে, তা ভাঙতে হলে সম্মিলিত লড়াই প্রয়োজন| আমাদের বুঝতে হবে যে, ডিজিটাল সহিংসতা কোনো ‘ভার্চুয়াল’ সমস্যা নয়; এটি একটি বাস্তব অপরাধ যা রক্তমাংসের মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়| যতক্ষণ না আমরা পুঁজিবাদী প্রযুক্তির লাভমুখী চরিত্র এবং পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের এই মেলবন্ধনকে রুখতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত ডিজিটাল ক্ষমতায়নের স্বপ্ন এদেশের নারীদের জন্য একটি নিষ্ঠুর মরীচিকা হয়েই থাকবে| যে নারীরা আজ কারখানায় সেলাই করছেন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাবে গবেষণা করছেন, তাদের কণ্ঠস্বর যেন কোনো অ্যালগরিদমিক যান্ত্রিকতায় বা সাইবার বুলিংয়ের ডিজিটাল চাবুকে স্তব্ধ হয়ে না যায়— সেটি নিশ্চিত করাই হোক আগামীর অঙ্গীকার|[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

জেলে ও জলমহাল

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জেলে পেশাধারী এই মৎস্যজীবিরা নানাবিধ সংকটের মধ্যে তাদের জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করে যাচ্ছে| একসময় প্রতিটি জেলে পল্লীতে দেখা যেত দেশি সুতোর জাল বোনার প্রচলন| জেলে পল্লীর গৃহিনীরা রাতদিন বসে বসে জাল বুনতেন| এই জাল দিয়ে জেলেরা মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে তাই দিয়ে সংসার চালাতেন| কেবল তাই-ই নয়, ওই জাল নিজেরা মাছ ধরার কাজে খুব কমই ব্যবহার করতেন| বিক্রি করতেন বেশি জাল| বাইরের জেলা থেকে ক্রেতা এসে জাল কিনে নিয়ে যেতেন| একেকটি জাল বিক্রি করলে তখনকার দিনে পাঁচ কেজি চাউল ও বাজার খরচের টাকা হয়ে যেত| এক কথায় জাল বোনা ছিল জেলেদের একমাত্র অবলম্বন| সেই চল্লিশ বছর আগেই ভাটা পড়ে গেল সেই জাল বোনায়| কারণ ছিল এখনকার দিনের এই কারেন্ট জাল| এই কারেন্ট জাল যখনই দেশে এলো তখনই মানুষ দেশী সুতোর জাল কেনা ছেড়ে দিল| কারণ দেশি সুতোর জালের দাম বেশি, আর কারেন্ট জালের দাম অনেক কম| তাছড়া দেশি সুতোর জালের চেয়ে কারেন্ট জালে মাছ পাওয়া যায় অনেক বেশি| এই সুবিধা পেয়ে মানুষ ঝুঁকে পড়লো কারেন্ট জালের প্রতি| আর ধ্বংস হয়ে জেলে পল্লীর হস্তশিল্পটি| এই হস্তশিল্পজাত জাল এখন আর কোথাও পাওয়া যায় না| এই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া হস্তশিল্পজাত দেশি সুতোর ফাঁস জালের উৎপাদন আবার শুরু করে এই ক্ষুদ্রশিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় কি না, এমন আশা নিয়ে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম তখনকার সেই জাল বোনা গৃহিনীরা এখন আর বেঁচে নেই বেশির ভাগ| যা-ও আছেন তারা চোখে দেখেন না| কারো হাত কাঁপে| অনেক বয়স হয়ে গেছে তো তাই| তবুও চেষ্টা করে সম্ভব হতো, যদি সে জালগুলো বিক্রি করা যেতো| তারা বলেন, একটি জাল বুনে আগেকার দিনের হিসেবে যদি দাম ধরা হয়, তাহলে তা কেউ কিনবে না| কারণ একটি জালের দামে তারা কমপক্ষে পাঁচটি জাল কিনতে পারছে| এখন জাল বুনলে তাদের পুরোটাই লোকসান হবে| বৈধ সরঞ্জামের কথা বলতে গেলে সত্যি বলতে কী, বর্তমানে মাছ ধরার জন্য কোনো বৈধ সরঞ্জামই নেই| জাল বলতে সবই কারেন্ট জাল| ভেসাল জাল অবৈধ| খেপলা, উড়নী, খেও, ঝাঁকি (স্থান ভেদে) জাল বৈধ, কিন্তু এখন তো আর হাতে বোনা জাল নেই| কারেন্ট জাল দিয়েই তৈরি হচ্ছে এই উড়নী জাল| এখন, যদি কেউ একবার খাওয়ার জন্যও মাছ ধরতে যায় তাকে ওই অবৈধ সরঞ্জাম কারেন্ট জাল দিয়েই মাছ ধরতে হবে| এছাড়া উপায় নেই| এছাড়া বর্তমানে আরেকটি মরণঘাতী উপায় রয়েছে চায়না দুয়াড়ী| এই চায়না দুয়াড়ীর ব্যাপারে জানতে চাইলে বলেন, বাজারে না পেলে তারা কিনবে কোথা থেকে? কেউ কেউ বলেন তারা মাছ বেশি ধরার প্রতিযোগিতায় পাল্লা দিয়ে এই চায়না দুয়াড়ী কিনে আনে| প্রশাসন অভিযানে এসে সব জাল নিয়ে পুড়িয়ে দেয়| পরদিন আবার তারা আগের চেয়ে বেশি কিনে আনে| তারাও জানে এটা ভুল ও অপরাধ| তবু এছাড়া তাদের অন্য কোনো উপায় নেই বলেই তারা জানায়| বাংলাদেশ মৎস্য আইনের আওতায় ‘উন্মুক্ত জলাশয়’ নীতিতে এই উক্তিটির ভুল ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ফলে মৎস্যজীবিরা মৎস্য আহরনের ক্ষেত্র তথা নদী, নালা, খাল, বিল থেকে বিতাড়িত হওয়ার প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে| ‘উন্মুক্ত জলাশয়’- এর দোহায় দিয়ে স্থানীয় অবস্থাশালী লোকেরাও মাছ ধরার সরঞ্জাম তৈরি করে নিয়ে জলাশয় দখল করে নিয়ে মাছ ধরছে তারা| এ কারণে প্রকৃতপক্ষে মাছ ধরেই যাদের জীবন জীবিকা চলে তারা সেই সব জলাশয় থেকে মাছ ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে গেছে বললে ভুল হবে না| স্থায়ীভাবে মাছ ধরার কাজ তারাই করছে যাদের মাছ না ধরলেও কৃষিকাজ, ব্যবসা বা অন্য উপায়ে তাদের সংসার যথেষ্ট গ্রচলভাবেই চলছে| তাদের কারণে পেশাগত মৎস্যজীবিরা মাছ ধরতে পারছে না| দেশের অধিকাংশ বিল বাওড়ই প্রভাবশালী লোকেদের দখলে চলে গেছে| বিল-বাঁওড় দখলের প্রতিবাদে আমরা প্রায়ই মৎস্যজীবিদেরকে রাজপথে দাঁড়াতে দেখি| শুধু বিল-বাঁওড়ই নয়, নদ নদীগুলোতেও চলছে এই দখলদারিত্বের রাজত্ব| আসলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের এই ভুল ব্যাখ্যা এবং এই এটাকে আশ্রয় করে সুযোগ নিয়ে মৎস্যজীবিদেরকে জলাশয় থেকে উৎখাত করার পায়তারা থেকে সরে আসতে হবে| এ ব্যাপারে প্রশাসনকে বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে| আসলে এ ব্যবস্থার একটি সুষ্ঠ সমাধান দরকার| আর সমাধানের জন্য আমাদের ভাবনাটাকে আরও গভীরে নিয়ে যেতে হবে| সেই আলোকে আমার একটি ঘটনা মনে পড়ে| তা হলো, এখন থেকে বছর দশের আগে ইউটিউব, ফেইসবুকে দেখতাম চীনারা তাদের দেশের জঙ্গলে এই চায়না দুয়াড়ী পেতে সাপ ধরতো| মূলত চীন থেকে আগত বলেই এর নাম হয় চায়না দুয়াড়ী| জেলেরা যা সেদিন চোখেও দেখেনি, সেই চায়না দুয়াড়ী চীনের সুপ্রশস্ত প্রাচীর ডিঙিয়ে, ভারতের ত্রিপুরা ও মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য পেরিয়ে ঠিকই বাংলাদেশে চলে এসেছে| এটা কিভাবে সম্ভব হলো! কোনো জেলে তো সেদিন ডোঙা কিংবা নৌকা বেয়ে এই দুয়াড়ী জাল চীন থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেনি! তাহলে কে বা কারা আনলো এই জাল! এটা খুঁজেবের করাটা আজ খুব জরুরি নয় কি?যদি বলি বা মেনে নিই এটা অবশ্যই কোনো অসাধু ব্যবসায়ীর কাজ| তাহলে এটা আমদানি করার কাজে অবশ্যই প্রশাসনিক অনুমতি কেউ না কেউ তো অবশ্যই দিয়েছিল| তাছাড়া তো আমদানি করা সম্ভব হয়নি| সেই অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে তাকেও খুঁজে করাটাও জরুরি কি না এটাও এখন ভেবে দেখা দরকার| যদি আমরা আমাদের সামগ্রীক ভালো চাই তাহলে অবশ্যই এদিকে গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে| হ্যাঁ, বর্তমানে এই দুয়াড়ীসহ সমস্ত প্রকার কারেন্ট জালই আমাদের দেশে উৎপাদন হচ্ছে| এই উৎপাদন বন্ধ করতে হবে| যেখান থেকে এই অবৈধ সরঞ্জাম তৈরি করা হচ্ছে সেখানেই পদক্ষেপ নেয়াটা সবচেয়ে উত্তম| এই দুয়াড়ীসহ সমস্ত প্রকার কারেন্ট জাল উৎপাদন বন্ধ হলে আমাদের দেশের এই হস্তশিল্পটাকে আবার পুনরুজ্জীবিত করে সেটাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে| সেই সঙ্গে জলজ জীব বৈচিত্র্য ধ্বংসকারী এই কারেন্ট জাল না থাকলে আমাদের দেশের ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ প্রবাদকেও বাঁচিয়ে রাখা অবশ্যই সম্ভব| [লেখক: সংবাদকর্মী]

সাঁওতাল জীবনের টানে বিদ্যাসাগর

সাঁওতালদের সহজ-সরল জীবন, প্রশান্তিময় হাসি ও উচ্ছল আনন্দে ভরা দিনযাপন সংগ্রামের কঠিন পাতাগুলোকেও রঙিন করে তোলে| সভ্যতার প্রান্তে অবস্থান করা আরণ্যক সাঁওতালদের এই সারল্য বহু মনীষীকেই গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে— যেমন মুগ্ধ করেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে| তাদের জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেই চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন আলোড়িত হয়েছিলেন| ছাত্রজীবনেই সাঁওতাল পরগনার দুমকা, ময়ূরাক্ষী নদী এবং সাঁওতালদের ছন্দময় জীবনযাত্রা তার মনে দোলা দিয়েছিল| বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন| ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কেন সাঁওতাল অধ্যুষিত কর্মাটাঁড়কে নিজের আবাস হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন—এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর না মিললেও নানা ঘটনা ও প্রেক্ষাপট থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়| একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ১৮৭২ সালে তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেন তিনি| এর কিছুদিন পর প্রিয় স্ত্রীর মৃত্যু তার জীবনে গভীর কূন্যতা তৈরি করে| কেউ কেউ মনে করেন, শহুরে শিক্ষিত সমাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি মানসিক শান্তির খোঁজে কর্মাটাঁড়ে চলে যান| তবে এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নয়| বরং বলা যায়, কাছের মানুষের কাছ থেকে আঘাত ও প্রতারণা পেলেও বিদ্যাসাগরের চরিত্রে আত্মসমর্পণের বদলে সংগ্রামের দৃষ্টান্তই বেশি স্পষ্ট| সম্ভবত শুরুতে সস্তায় জমি পাওয়া এবং নিরিবিলি পরিবেশে পড়াশোনা ও লেখালেখির উদ্দেশেই তিনি কর্মাটাঁড়কে বেছে নিয়েছিলেন| কিন্তু সেখানে এসে তিনি প্রত্যক্ষ করেন সাঁওতালদের কঠিন জীবনসংগ্রাম—অন্ন-বস্ত্রের অভাব, শিক্ষার অনুপস্থিতি, দারিদ্র্য ও বঞ্চনা| এই বাস্তবতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়| তিনি উপলব্ধি করেন, এই মানুষদের পাশে দাঁড়ানোই তার প্রকৃত কর্তব্য| ফলে ব্যক্তিগত সাধ-আহ্লাদকে পাশ কাটিয়ে তিনি আত্মনিয়োগ করেন তাদের উন্নয়নে| সাঁওতালদের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অবৈতনিক বিদ্যালয়, চালু করেন দাতব্য চিকিৎসালয়| খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে নিরলসভাবে কাজ করতে থাকেন| একই সঙ্গে নিজের পড়াশোনা ও লেখালেখিও চালিয়ে যান কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে| ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয়া বিদ্যাসাগর ১৮৭৩ সালে জামতাড়া-মধুপুর রেলপথের মাঝামাঝি কর্মাটাঁড়ে একটি বাড়ি ক্রয় করেন| প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই বাড়িতেই তিনি জীবনের শেষ ১৮ বছর অতিবাহিত করেন| ‘নন্দন কানন’ নামের এই বাসভবনে বসেই তিনি সাঁওতালদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন| তাদের মধ্যে তিনি খুঁজে পান সরলতা, সততা ও আন্তরিকতার এক বিরল সমš^য়| সাঁওতালদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আত্মীয়তার মতো| কেউ তাকে দাদা, কেউ বাবা, কেউ জেঠা বলে ডাকত| তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বালিকা বিদ্যালয় ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রাত্রিকালীন শিক্ষা কার্যক্রম| বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা দিতেন এবং দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অকাতরে সাহায্য করতেন| সাঁওতালদের সত্যবাদিতা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল| একটি ঘটনার বর্ণনায় দেখা যায়, জমি-সংক্রান্ত এক মামলায় মিথ্যা বলতে বাধ্য হলেও সাঁওতালরা শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশ করে| এই সরল সত্যনিষ্ঠা বিদ্যাসাগরের মনে তাদের প্রতি অটল ভালোবাসা সৃষ্টি করে| তিনি প্রায়ই বলতেন, ভদ্রসমাজের চেয়ে সাঁওতালদের সান্নিধ্যেই তিনি বেশি আনন্দ পান| তাদের সঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা, চিকিৎসা করা—সবকিছুতেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এক অনাবিল মানবিকতা| তাদের দুঃখে তিনি কেঁদেছেন, অসুখে ছুটে গিয়েছেন, প্রয়োজন মেটাতে নিজের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন| সাঁওতালদের কাছেও বিদ্যাসাগর ছিলেন আপনজনের চেয়েও বেশি কিছু—একজন আশ্রয়দাতা, পথপ্রদর্শক, এমনকি অনেকের কাছে ঈশ্বরতুল্য| তার অসুস্থতার খবর পেয়ে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠত, আবার তার সামান্য আঘাতেও প্রতিবাদে ফেটে পড়ত| ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই বিদ্যাসাগরের মৃত্যু হলে কর্মাটাঁড়ের সাঁওতালরা গভীর শোকাহত হয়ে পড়ে| তাদের জীবনে তিনি যে মানবিকতার আলো জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে| বিদ্যাসাগরের এই কর্মযজ্ঞ শুধু সমাজসংস্কারের উদাহরণ নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক বিরল দলিল| তার কর্মভূমি কর্মাটাঁড় আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রকৃত মানবতা কোনো শ্রেণী, জাতি বা অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তা হৃদয়ের গভীরতম স্থান থেকেই উৎসারিত হয়| [লেখক: কলামিস্ট]

নতুন অধ্যায়ে বিহার-সম্রাট চৌধুরীর হাতে নেতৃত্ব, বিজেপির বড় বাজি

বিহারের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান ঘটিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। সম্রাট চৌধুরিকে বিজেপি বিধায়ক দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত করার পর কার্যত পরিষ্কার, তিনিই হচ্ছেন রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এর পদত্যাগের পর এই পরিবর্তন রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় রদবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।সম্প্রতি পাটনায় বিজেপির রাজ্য দপ্তরে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিবরাজ সিংহ চৌহান। বৈঠকে উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয় কুমার সিনহা সম্রাট চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেন, যা সমর্থন করেন প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী রেনু দেবী। কোনও বিরোধিতা না থাকায় সর্বসম্মতভাবে তাঁর নাম গৃহীত হয়।এর আগে, প্রথা মেনে রাজভবনে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন নীতীশ কুমার এবং তাঁর মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিহারের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী এক অধ্যায়ের অবসান ঘটে।নীতীশ যুগ: জোট রাজনীতি ও বারবার ‘পালাবদল’নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক যাত্রা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বহুবার মোড় ঘোরানো। জনতা দল (ইউনাইটেড )-এর নেতা হিসেবে তিনি একাধিকবার বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধেছেন, আবার কখনও রাষ্ট্রয় জনতা দল এর সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।২০১৩ সালে বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে শুরু করে ২০১৭ সালে আবার সেই জোটে ফেরা, তারপর ২০২২ সালে আরজেডি-কংগ্রেসের সঙ্গে সরকার গঠন এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনই তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল।শাসনকালে তিনি ‘সুশাসন বাবু’ হিসেবে পরিচিতি পান। বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়ন, নারী শিক্ষা ও আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের জন্য। তবে বিরোধীরা বারবার অভিযোগ তুলেছে প্রশাসনিক স্থবিরতা, বেকারত্ব এবং শিল্পোন্নয়নের ঘাটতি নিয়ে।সম্রাট চৌধুরী: বিজেপির নতুন মুখসম্রাট চৌধুরী বিহার বিজেপির মধ্যে তুলনামূলকভাবে তরুণ এবং আক্রমণাত্মক মুখ হিসেবে পরিচিত। সংগঠনগতভাবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দলের সঙ্গে যুক্ত এবং রাজ্যের বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি এবার বিহারে সম্পূর্ণ নিজের মুখে সরকার চালানোর দিকেই এগোচ্ছে যেখানে আঞ্চলিক দলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে দল।রাজনৈতিক তাৎপর্য ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জএই পরিবর্তন শুধু মুখ্যমন্ত্রীর বদল নয়, বরং বিহারের রাজনৈতিক কৌশলের বড় পরিবর্তন।বিজেপি এখন রাজ্যে নিজের শক্তি প্রতিষ্ঠার একক সুযোগ পাচ্ছে।জোট রাজনীতির পরিবর্তে একক নেতৃত্বের পরীক্ষা।বিরোধী শিবিরে নতুন করে সমীকরণ তৈরির সম্ভাবনা।তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন।শিল্প বিনিয়োগ টানা।গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন।এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের আস্থা অর্জন।সব মিলিয়ে, নীতীশ কুমারের দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের ইতি টেনে বিহার এখন এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। সম্রাট চৌধুরীর নেতৃত্বে বিজেপি কতটা স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নির্ভর করবে প্রশাসনিক দক্ষতা, উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ এবং জনআস্থার উপর।লবিহারের রাজনীতিতে একটাই প্রশ্ন-এটা কি সত্যিই নতুন যুগের শুরু, নাকি আরেকটি রাজনৈতিক পরীক্ষার মঞ্চ?

ভিডিও

চমক নিয়ে বাংলাদেশে খেলতে আসছে পাকিস্তান

বেশকিছু চমক নিয়ে আগামী মাসে বাংলাদেশে দুই টেস্টের সিরিজে খেলতে আসছে পাকিস্তান।জানা যায়, এই সিরিজে ৪ জন খেলোয়াড়কে দলে রাখা হয়েছে যারা আছেন অভিষেকের অপেক্ষায়। তারা হলেন আবদুল্লাহ ফজল, আমাদ বাট, আজান আওয়াইস এবং গাজি ঘোরি। এই চারজনের মধ্যে কেবল ঘোরির আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আছে। গত মাসে মিরপুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে একটি ওয়ানডে খেলেছেন তিনি।দলের নেতৃত্বে থাকবেন শান মাসুদ। দলের পাঁচ সদস্য আওয়াইস, ইমাম-উল-হক, ঘোরি, নোমান আলী এবং সাজিদ খান এখন লাহোরের ন্যাশনাল ক্রিকেট একাডেমিতে লাল বলের কন্ডিশনিং ক্যাম্পে অংশ নিচ্ছেন। পিএসএলে যারা খেলছেন তাদের বাদ দিয়ে বাকি সদস্যরা ২৭ এপ্রিল থেকে করাচিতে ক্যাম্পে যোগ দেবেন। ক্যাম্প শেষ হবে ১ মে। পিএসএল খেলোয়াড়রা তাদের দলের অভিযান শেষ হলে ক্যাম্পে যোগ দেবেন। দলটি ২ মে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবে। যাদের দল ৩ মে পিএসএল ফাইনালে খেলবে তারা সেই ম্যাচের পরপরই বাংলাদেশে আসবেন।দুটি টেস্ট শুরু হবে যথাক্রমে ৮ মে ও ১৬ মে। টেস্ট দুটি হবে ঢাকা ও সিলেটে।বাংলাদেশ সফরে পাকিস্তানের টেস্ট দল:শান মাসুদ (অধিনায়ক), আবদুল্লাহ ফজল, আমাদ বাট, আজান আওয়াইস, বাবর আজম, হাসান আলী, ইমাম-উল-হক, খুররম শাহজাদ, মোহাম্মদ আব্বাস, মোহাম্মদ রিজওয়ান (উইকেটরক্ষক), মুহাম্মদ গাজি ঘোরি (উইকেটরক্ষক), নোমান আলী, সাজিদ খান, সালমান আলী আঘা, সাউদ শাকিল এবং শাহিন শাহ আফ্রিদি।এদিকে, বর্তমানে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাদা বলের সিরিজে ব্যস্ত সময় পার করছে বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা। ২ মে শেষ হবে এই সিরিজ। তবে এরপরেও বিশ্রাম পাচ্ছেন না টাইগাররা। পরেরদিনই পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেলবে তারা।

চমক নিয়ে বাংলাদেশে খেলতে আসছে পাকিস্তান
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ২৯ জন