রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিনই যেন বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সুবিধার অভাবে গত আড়াই মাসে ৫৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার পরও মারা গেছে আরও ৯ শিশু। সব মিলিয়ে এ সময়ে প্রাণ হারিয়েছে ৬২ শিশু।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, মৃত শিশুদের বেশির ভাগই নিউমোনিয়া ও হাম আক্রান্ত ছিল। চিকিৎসকদের মতে, এসব রোগ জটিল আকার ধারণ করলে দ্রুত আইসিইউ সেবা প্রয়োজন হয়। কিন্তু রামেক হাসপাতালে শিশুদের জন্য আলাদা আইসিইউ নেই। সাধারণ আইসিইউর ১২টি শয্যা শিশুদের জন্য নির্ধারিত থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেক শিশুর অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়ছে।
শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি শয্যায় একাধিক রোগী ভর্তি। কোথাও মেঝেতেও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অক্সিজেনের জন্য অপেক্ষা করছেন অনেক রোগী। স্বজনদের ভিড় ও গাদাগাদিতে পুরো ওয়ার্ডজুড়ে এক চাপা উদ্বেগ বিরাজ করছে।
পবা উপজেলার মুরারিপুর এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নূহ আলম তাঁর সাড়ে আট মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে দুই সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুটির অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকেরা আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু বেড না থাকায় তিনি অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন। তাঁর সিরিয়াল নম্বর ২৭। নূহ আলম বলেন, “আইসিইউ পেলে হয়তো আমার সন্তান বাঁচত।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার তরিকুল ইসলামের ছয় মাস বয়সী সন্তান হাম আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। আইসিইউ না পেয়ে গত ১৮ মার্চ শিশুটির মৃত্যু হয়। একই দিন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার শাহীন হোসেনের ১০ মাস বয়সী সন্তান জিহাদও মারা যায়। সেও আইসিইউর অপেক্ষায় ছিল।
চিকিৎসকেরা জানান, বর্তমানে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও হাম রোগের প্রকোপ বেড়েছে। বিশেষ করে টিকা না নেওয়া শিশুদের ঝুঁকি বেশি। হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও টিকাদানে ঘাটতির কারণে অনেক শিশু আক্রান্ত হয়ে জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি চলমান থাকলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিগগিরই বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম নেওয়া হবে।
রামেক হাসপাতালের আইসিইউর ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, “১২ শয্যার আইসিইউতে সাধারণত কোনো রোগী মারা না গেলে বেড খালি হয় না। অপেক্ষমাণ তালিকা অনুযায়ী রোগী ভর্তি করা হয়। গত আড়াই মাসে আইসিইউ না পেয়ে ৫৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।”
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনাকালে আইসিইউ স্থাপনের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়নি। ফলে এখনো পূর্ণাঙ্গ শিশু আইসিইউ চালু করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০০ শয্যার রাজশাহী শিশু হাসপাতালটি তিন বছর ধরে চালুর অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত শিশু আইসিইউ চালু ও টিকাদান কর্মসূচি জোরদার না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মার্চ ২০২৬
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিনই যেন বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সুবিধার অভাবে গত আড়াই মাসে ৫৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার পরও মারা গেছে আরও ৯ শিশু। সব মিলিয়ে এ সময়ে প্রাণ হারিয়েছে ৬২ শিশু।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, মৃত শিশুদের বেশির ভাগই নিউমোনিয়া ও হাম আক্রান্ত ছিল। চিকিৎসকদের মতে, এসব রোগ জটিল আকার ধারণ করলে দ্রুত আইসিইউ সেবা প্রয়োজন হয়। কিন্তু রামেক হাসপাতালে শিশুদের জন্য আলাদা আইসিইউ নেই। সাধারণ আইসিইউর ১২টি শয্যা শিশুদের জন্য নির্ধারিত থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেক শিশুর অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়ছে।
শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি শয্যায় একাধিক রোগী ভর্তি। কোথাও মেঝেতেও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অক্সিজেনের জন্য অপেক্ষা করছেন অনেক রোগী। স্বজনদের ভিড় ও গাদাগাদিতে পুরো ওয়ার্ডজুড়ে এক চাপা উদ্বেগ বিরাজ করছে।
পবা উপজেলার মুরারিপুর এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নূহ আলম তাঁর সাড়ে আট মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে দুই সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুটির অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকেরা আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু বেড না থাকায় তিনি অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন। তাঁর সিরিয়াল নম্বর ২৭। নূহ আলম বলেন, “আইসিইউ পেলে হয়তো আমার সন্তান বাঁচত।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার তরিকুল ইসলামের ছয় মাস বয়সী সন্তান হাম আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। আইসিইউ না পেয়ে গত ১৮ মার্চ শিশুটির মৃত্যু হয়। একই দিন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার শাহীন হোসেনের ১০ মাস বয়সী সন্তান জিহাদও মারা যায়। সেও আইসিইউর অপেক্ষায় ছিল।
চিকিৎসকেরা জানান, বর্তমানে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও হাম রোগের প্রকোপ বেড়েছে। বিশেষ করে টিকা না নেওয়া শিশুদের ঝুঁকি বেশি। হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও টিকাদানে ঘাটতির কারণে অনেক শিশু আক্রান্ত হয়ে জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি চলমান থাকলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিগগিরই বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম নেওয়া হবে।
রামেক হাসপাতালের আইসিইউর ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, “১২ শয্যার আইসিইউতে সাধারণত কোনো রোগী মারা না গেলে বেড খালি হয় না। অপেক্ষমাণ তালিকা অনুযায়ী রোগী ভর্তি করা হয়। গত আড়াই মাসে আইসিইউ না পেয়ে ৫৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।”
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনাকালে আইসিইউ স্থাপনের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়নি। ফলে এখনো পূর্ণাঙ্গ শিশু আইসিইউ চালু করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০০ শয্যার রাজশাহী শিশু হাসপাতালটি তিন বছর ধরে চালুর অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত শিশু আইসিইউ চালু ও টিকাদান কর্মসূচি জোরদার না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন