মানুষ প্রায়ই মনে করে যে যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় যুদ্ধক্ষেত্রেই। সেনাবাহিনী অগ্রসর হয়, শত্রুপক্ষ পিছু হটে এবং শেষ পর্যন্ত এক পক্ষ বিজয় অর্জন করে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধ খুব কমই এইভাবে শেষ হয়। এগুলো শেষ হয় তখনই, যখন একসঙ্গে তিনটি বিষয় ভেঙে পড়ে— অস্ত্রভান্ডার, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা। এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করে যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হবে এবং কীভাবে তা শেষ হবে।
ইরানকে ঘিরে উদীয়মান সংঘাতও এই একই পথ অনুসরণ করবে। এটি কোনো নাটকীয় আত্মসমর্পণ বা যুদ্ধক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পতনের মাধ্যমে শেষ হবে না। বরং এটি শেষ হবে তখন, যখন তিনটি আলাদা চাপ একত্রিত হতে শুরু করবে— যখন অস্ত্রভান্ডার ফুরিয়ে আসবে, বাজার অস্থির হয়ে উঠবে এবং রাজনৈতিক ধৈর্য শেষ হয়ে যাবে। হয়তো একসঙ্গে নয়, কিন্তু এতটাই কাছাকাছি যে নেতারা বাধ্য হবেন নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে, যা পরে তারা কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন, যদিও বাস্তবে তা হবে প্রয়োজনের তাগিদে নেয়া পদক্ষেপ।
প্রথমেই আসা যাক অস্ত্রের প্রসঙ্গে। আধুনিক যুদ্ধ প্রায়ই এমন একটি ধারণা তৈরি করে যেন সামরিক সক্ষমতা অসীম। নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, স্যাটেলাইট নজরদারি, বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা— সবকিছুই যেন এমন এক প্রযুক্তিগত স্থায়িত্বের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে উন্নত সামরিক শক্তি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। বাস্তবে তা সম্ভব নয়, কখনই ছিল না।
সমস্যা উদ্ভাবনে নয়, উৎপাদনে। একটি আধুনিক প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র কেবল একটি অস্ত্র নয়; এটি একটি জটিল, বিশেষায়িত ব্যবস্থা, যা সীমিত সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরশীল। মাইক্রোইলেকট্রনিক্স, দুর্লভ উপাদান, নিখুঁত প্রকৌশল— এসব কোনো কিছুই রাতারাতি বাড়ানো যায় না, এমনকি এক বছরের মধ্যেও নয়। এগুলোর জন্য প্রয়োজন চুক্তি, দক্ষ শ্রমিক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। আর যুদ্ধ যে জিনিসটি সবচেয়ে দ্রুত গ্রাস করে, তা হলো এই সময়।
সংঘাতের শুরুতে মজুত অস্ত্র এই বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখে। কমান্ডাররা তখন উদারভাবে অস্ত্র ব্যবহার করেন, কারণ তারা তা করতে পারেন। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করে, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং যুদ্ধের গতি টেকসই বলে মনে হয়। কিন্তু এটি একটি বিভ্রম। মাত্র একটি তীব্র রাতের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই কয়েক মাসের উৎপাদনকে শেষ করে দিতে পারে। আর যখন মজুত একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে যায়, তখন কৌশল পরিবর্তন শুরু হয়— নীতির কারণে নয়, বরং গাণিতিক বাস্তবতার কারণে।
এই সীমাবদ্ধতা উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যদিও ভিন্নভাবে। যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর করে অত্যাধুনিক, ব্যয়বহুল এবং সীমিত সংখ্যক অস্ত্র ব্যবস্থার ওপর, যা প্রতিস্থাপন করা ধীরগতির। অন্যদিকে ইরান নির্ভর করে পরিমাণ ও অসম কৌশলের ওপর— সস্তা ড্রোন, সহজ ক্ষেপণাস্ত্র যেগুলো সরাসরি জয়ের জন্য নয়, বরং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তুলতে, চাপ সৃষ্টি করতে এবং ব্যয় বাড়াতে ব্যবহৃত হয়।
এটি এক ধরনের প্রতিযোগিতা— যা হলো নির্ভুলতা বনাম স্থায়িত্ব, গুণমান বনাম পরিমাণ। ইতিহাস দেখায়, এমন প্রতিযোগিতায় কোনো পক্ষই একচেটিয়া সাফল্য পায় না। ১৯৪৪ সালে জার্মানি তা উপলব্ধি করেছিল, যখন মিত্রশক্তির শিল্প উৎপাদন তাদের কৌশলগত দক্ষতাকে ছাপিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রও ভিয়েতনাম এবং পরে ইরাকে একই ধরনের বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিল, যেখানে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে সময়ই হলো গোপন নিয়ামক। যে পক্ষ সময়কে ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারে, সাধারণত তারাই টিকে থাকে— অথবা অন্তত বিজয়ের সংজ্ঞা পরিবর্তন করার মতো সময় পায়।
এরপর আসে বাজার। বাজার সেনাবাহিনীর চেয়েও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং কৌশলগত গল্পে খুব কমই আগ্রহী। বিনিয়োগকারীরা কোনো অঞ্চল কার নিয়ন্ত্রণে তা নিয়ে মাথা ঘামায় না; তারা চায় স্থিতিশীলতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং ঝুঁকি কম থাকা। এগুলো যখন নষ্ট হতে শুরু করে, তখন পুঁজি সরে যেতে শুরু করে— প্রথমে ধীরে, তারপর হঠাৎ করে।
জ্বালানি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। পারস্য উপসাগরে যেকোনো বিঘ্ন পরিস্থিতি দ্রুত বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলে। তেলের দাম বাড়ে, জাহাজ চলাচলের পথ পরিবর্তিত হয়, বীমার খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু এর দ্বিতীয় প্রভাব আরও গভীর— সারের দাম বাড়ে, কয়েক মাস পরে খাদ্যের দামও বাড়ে। নিয়ন্ত্রিত মুদ্রাস্ফীতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আধুনিক অর্থনীতি একে অন্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। জ্বালানির মতো একটি খাতে টান পড়লে পুরো ব্যবস্থাই নড়বড়ে হয়ে যায়। বিমান চলাচল বদলে যায়, সরবরাহ শৃঙ্খল দীর্ঘ হয়, উৎপাদন ধীর হয়ে যায় এবং পৃথিবীর কোনো এক কোণে একজন ভোক্তা হঠাৎ করে রুটি বা বিদ্যুতের জন্য বেশি মূল্য দিতে শুরু করে, কারণটি না জেনেই।
আরও একটি নতুন মাত্রা রয়েছে ডিজিটাল অবকাঠামো। ডেটা সেন্টার, ক্লাউড নেটওয়ার্ক— এগুলো এখন আর প্রান্তিক নয়, বরং অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এগুলো লক্ষ্যবস্তু হলে প্রভাব পড়ে আর্থিক খাত, যোগাযোগ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায়।
আমার মতে, ইরান এই বিষয়টি বেশ ভালো করে বুঝতে পেরেছে। তাই, ইরান শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বরং সেই অর্থনৈতিক স্নায়ুতন্ত্রকে লক্ষ্য করছে, যা সামরিক শক্তিকে টিকিয়ে রাখে। যুক্তি সহজ— যদি একটি পরাশক্তির অর্থনৈতিক পরিবেশকে জটিল করে তোলা যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানো তার জন্য অনাকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
এই অর্থে বাজার এক ধরনের অদৃশ্য বিচারকের মতো কাজ করে। তারা যুদ্ধ থামাতে পারে না, কিন্তু এর খরচ এত বাড়িয়ে দিতে পারে যে রাজনৈতিক নেতারা বিজয়ের নয়, বরং বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে শুরু করেন।
এবার আসা যাক রাজনীতির কথায়— যা সবচেয়ে অবমূল্যায়িত, অথচ প্রায়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধ সাধারণত ঐক্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। জনগণ পতাকার চারপাশে একত্রিত হয়, বিরোধিতা সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়, এবং নেতারা সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ পান। কিন্তু এই ঐক্য স্থায়ী নয়। খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং লক্ষ্য অস্পষ্ট হয়ে পড়লে এটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।
গণতান্ত্রিক দেশে সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হবেই, যুদ্ধ শেষ হোক বা না হোক। আর এই নির্বাচনই পররাষ্ট্রনীতিকে অভ্যন্তরীণ সমস্যায় পরিণত করে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি তখন আর একটি বিমূর্ত বিষয় থাকে না; এটি হয়ে ওঠে নির্বাচনী ইস্যু। সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। আর যদি হতাহতের সংখ্যা বাড়ে, তবে তা প্রতীক হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রও এমন একটি সময়সীমার মুখোমুখি। মধ্যবর্তী নির্বাচন একটি অনিবার্য বাস্তবতা, যা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে বদলে দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের আইনপ্রণেতারা তখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন— এই যুদ্ধ কতদিন চলবে? কত খরচ হবে? এর উদ্দেশ্য কী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনারেলরা দিতে পারেন না। এগুলো এমন প্রশ্ন, যা রাজনীতিবিদদের এড়ানোর উপায় নেই।
ইতিহাস এখানে আবারও পথ দেখায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ সামরিক বিকল্পের অভাবে শেষ হয়নি; এটি শেষ হয়েছিল কারণ অভ্যন্তরীণ সমর্থন ভেঙে পড়েছিল। ইরাক যুদ্ধও একই ধরনের পথ অনুসরণ করেছিল, যদিও কম নাটকীয়ভাবে। উভয় ক্ষেত্রেই যুদ্ধক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক সহনশীলতা ছিল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের কৌশলও মনে হয় এই বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। দ্রুত জয়লাভ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করা— সামরিক, অর্থনৈতিক এবং মানসিক যতক্ষণ না প্রতিপক্ষের জোট নিজের ভেতরেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এটাই হলো ‘অস্ত্র, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা’র সারকথা। এটি কোনো স্লোগান নয়; এটি একটি কাঠামো, যেখানে প্রতিটি উপাদান অন্যটিকে শক্তিশালী করে। অস্ত্রের ঘাটতি সামরিক বিকল্পকে সীমিত করে, বাজারের অস্থিরতা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাড়ায়, আর রাজনৈতিক চাপ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর ইচ্ছাকে দুর্বল করে।
এই চক্রের ভেতরেই যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে যায়। পূর্ণ বিজয় পরিণত হয় আংশিক সাফল্যে। লক্ষ্যগুলো নীরবে সংশোধিত হয়। আলোচনা, যা একসময় প্রত্যাখ্যাত ছিল, তা বাস্তবসম্মত বিকল্পে পরিণত হয়। নেতারা তখন স্থিতিশীলতা, প্রতিরোধ, ভারসাম্যের মতো শব্দ ব্যবহার করেন— যা আসলে সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়, বিজয়ের নয়।
সম্ভবত এইভাবেই এই যুদ্ধ শেষ হবে— কোনো একক সিদ্ধান্তমূলক আঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং বিভিন্ন চাপের একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে। স্পষ্টতার মাধ্যমে নয়, বরং এমন এক অস্পষ্টতার মাধ্যমে, যাকে দক্ষতার সঙ্গে সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।
এখানে একটি বিদ্রূপ রয়েছে। যুদ্ধ প্রায়ই শুরু হয় সর্বোচ্চ লক্ষ্য নিয়ে— শত্রুকে পরাজিত করা, অঞ্চল পুনর্গঠন, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। কিন্তু শেষ হয় অনেক বেশি সীমিত ফলাফলে— নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ এবং প্রায় আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া, যদিও অনেক বেশি খরচ ও কম ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে।
ইরান এই ধারণাটি বোঝে এবং এর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও তা বোঝে, যদিও তা স্বীকার করতে সময় নেয়। পার্থক্য জ্ঞানে নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তাকে সহ্য করার রাজনৈতিক সক্ষমতায়।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলো সেইগুলো হবে না, যা মানুষ টেলিভিশনে দেখে। এগুলো ঘটবে উৎপাদন প্রতিবেদন, বাজার সূচক এবং জনমত জরিপে। কম নাটকীয়, কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর যখন এই তিনটি ফাটলরেখা— অস্ত্র, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা একত্রিত হবে, তখন ফলাফল ঘোষণার প্রয়োজন হবে না। তা ইতোমধ্যেই নির্ধারিত হয়ে যাবে।
[লেখক: প্রাবন্ধিক]

শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মার্চ ২০২৬
মানুষ প্রায়ই মনে করে যে যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় যুদ্ধক্ষেত্রেই। সেনাবাহিনী অগ্রসর হয়, শত্রুপক্ষ পিছু হটে এবং শেষ পর্যন্ত এক পক্ষ বিজয় অর্জন করে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধ খুব কমই এইভাবে শেষ হয়। এগুলো শেষ হয় তখনই, যখন একসঙ্গে তিনটি বিষয় ভেঙে পড়ে— অস্ত্রভান্ডার, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা। এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করে যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হবে এবং কীভাবে তা শেষ হবে।
ইরানকে ঘিরে উদীয়মান সংঘাতও এই একই পথ অনুসরণ করবে। এটি কোনো নাটকীয় আত্মসমর্পণ বা যুদ্ধক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পতনের মাধ্যমে শেষ হবে না। বরং এটি শেষ হবে তখন, যখন তিনটি আলাদা চাপ একত্রিত হতে শুরু করবে— যখন অস্ত্রভান্ডার ফুরিয়ে আসবে, বাজার অস্থির হয়ে উঠবে এবং রাজনৈতিক ধৈর্য শেষ হয়ে যাবে। হয়তো একসঙ্গে নয়, কিন্তু এতটাই কাছাকাছি যে নেতারা বাধ্য হবেন নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে, যা পরে তারা কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন, যদিও বাস্তবে তা হবে প্রয়োজনের তাগিদে নেয়া পদক্ষেপ।
প্রথমেই আসা যাক অস্ত্রের প্রসঙ্গে। আধুনিক যুদ্ধ প্রায়ই এমন একটি ধারণা তৈরি করে যেন সামরিক সক্ষমতা অসীম। নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, স্যাটেলাইট নজরদারি, বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা— সবকিছুই যেন এমন এক প্রযুক্তিগত স্থায়িত্বের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে উন্নত সামরিক শক্তি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। বাস্তবে তা সম্ভব নয়, কখনই ছিল না।
সমস্যা উদ্ভাবনে নয়, উৎপাদনে। একটি আধুনিক প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র কেবল একটি অস্ত্র নয়; এটি একটি জটিল, বিশেষায়িত ব্যবস্থা, যা সীমিত সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরশীল। মাইক্রোইলেকট্রনিক্স, দুর্লভ উপাদান, নিখুঁত প্রকৌশল— এসব কোনো কিছুই রাতারাতি বাড়ানো যায় না, এমনকি এক বছরের মধ্যেও নয়। এগুলোর জন্য প্রয়োজন চুক্তি, দক্ষ শ্রমিক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। আর যুদ্ধ যে জিনিসটি সবচেয়ে দ্রুত গ্রাস করে, তা হলো এই সময়।
সংঘাতের শুরুতে মজুত অস্ত্র এই বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখে। কমান্ডাররা তখন উদারভাবে অস্ত্র ব্যবহার করেন, কারণ তারা তা করতে পারেন। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করে, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং যুদ্ধের গতি টেকসই বলে মনে হয়। কিন্তু এটি একটি বিভ্রম। মাত্র একটি তীব্র রাতের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই কয়েক মাসের উৎপাদনকে শেষ করে দিতে পারে। আর যখন মজুত একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে যায়, তখন কৌশল পরিবর্তন শুরু হয়— নীতির কারণে নয়, বরং গাণিতিক বাস্তবতার কারণে।
এই সীমাবদ্ধতা উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যদিও ভিন্নভাবে। যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর করে অত্যাধুনিক, ব্যয়বহুল এবং সীমিত সংখ্যক অস্ত্র ব্যবস্থার ওপর, যা প্রতিস্থাপন করা ধীরগতির। অন্যদিকে ইরান নির্ভর করে পরিমাণ ও অসম কৌশলের ওপর— সস্তা ড্রোন, সহজ ক্ষেপণাস্ত্র যেগুলো সরাসরি জয়ের জন্য নয়, বরং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তুলতে, চাপ সৃষ্টি করতে এবং ব্যয় বাড়াতে ব্যবহৃত হয়।
এটি এক ধরনের প্রতিযোগিতা— যা হলো নির্ভুলতা বনাম স্থায়িত্ব, গুণমান বনাম পরিমাণ। ইতিহাস দেখায়, এমন প্রতিযোগিতায় কোনো পক্ষই একচেটিয়া সাফল্য পায় না। ১৯৪৪ সালে জার্মানি তা উপলব্ধি করেছিল, যখন মিত্রশক্তির শিল্প উৎপাদন তাদের কৌশলগত দক্ষতাকে ছাপিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রও ভিয়েতনাম এবং পরে ইরাকে একই ধরনের বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিল, যেখানে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে সময়ই হলো গোপন নিয়ামক। যে পক্ষ সময়কে ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারে, সাধারণত তারাই টিকে থাকে— অথবা অন্তত বিজয়ের সংজ্ঞা পরিবর্তন করার মতো সময় পায়।
এরপর আসে বাজার। বাজার সেনাবাহিনীর চেয়েও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং কৌশলগত গল্পে খুব কমই আগ্রহী। বিনিয়োগকারীরা কোনো অঞ্চল কার নিয়ন্ত্রণে তা নিয়ে মাথা ঘামায় না; তারা চায় স্থিতিশীলতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং ঝুঁকি কম থাকা। এগুলো যখন নষ্ট হতে শুরু করে, তখন পুঁজি সরে যেতে শুরু করে— প্রথমে ধীরে, তারপর হঠাৎ করে।
জ্বালানি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। পারস্য উপসাগরে যেকোনো বিঘ্ন পরিস্থিতি দ্রুত বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলে। তেলের দাম বাড়ে, জাহাজ চলাচলের পথ পরিবর্তিত হয়, বীমার খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু এর দ্বিতীয় প্রভাব আরও গভীর— সারের দাম বাড়ে, কয়েক মাস পরে খাদ্যের দামও বাড়ে। নিয়ন্ত্রিত মুদ্রাস্ফীতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আধুনিক অর্থনীতি একে অন্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। জ্বালানির মতো একটি খাতে টান পড়লে পুরো ব্যবস্থাই নড়বড়ে হয়ে যায়। বিমান চলাচল বদলে যায়, সরবরাহ শৃঙ্খল দীর্ঘ হয়, উৎপাদন ধীর হয়ে যায় এবং পৃথিবীর কোনো এক কোণে একজন ভোক্তা হঠাৎ করে রুটি বা বিদ্যুতের জন্য বেশি মূল্য দিতে শুরু করে, কারণটি না জেনেই।
আরও একটি নতুন মাত্রা রয়েছে ডিজিটাল অবকাঠামো। ডেটা সেন্টার, ক্লাউড নেটওয়ার্ক— এগুলো এখন আর প্রান্তিক নয়, বরং অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এগুলো লক্ষ্যবস্তু হলে প্রভাব পড়ে আর্থিক খাত, যোগাযোগ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায়।
আমার মতে, ইরান এই বিষয়টি বেশ ভালো করে বুঝতে পেরেছে। তাই, ইরান শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বরং সেই অর্থনৈতিক স্নায়ুতন্ত্রকে লক্ষ্য করছে, যা সামরিক শক্তিকে টিকিয়ে রাখে। যুক্তি সহজ— যদি একটি পরাশক্তির অর্থনৈতিক পরিবেশকে জটিল করে তোলা যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানো তার জন্য অনাকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
এই অর্থে বাজার এক ধরনের অদৃশ্য বিচারকের মতো কাজ করে। তারা যুদ্ধ থামাতে পারে না, কিন্তু এর খরচ এত বাড়িয়ে দিতে পারে যে রাজনৈতিক নেতারা বিজয়ের নয়, বরং বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে শুরু করেন।
এবার আসা যাক রাজনীতির কথায়— যা সবচেয়ে অবমূল্যায়িত, অথচ প্রায়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধ সাধারণত ঐক্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। জনগণ পতাকার চারপাশে একত্রিত হয়, বিরোধিতা সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়, এবং নেতারা সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ পান। কিন্তু এই ঐক্য স্থায়ী নয়। খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং লক্ষ্য অস্পষ্ট হয়ে পড়লে এটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।
গণতান্ত্রিক দেশে সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হবেই, যুদ্ধ শেষ হোক বা না হোক। আর এই নির্বাচনই পররাষ্ট্রনীতিকে অভ্যন্তরীণ সমস্যায় পরিণত করে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি তখন আর একটি বিমূর্ত বিষয় থাকে না; এটি হয়ে ওঠে নির্বাচনী ইস্যু। সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। আর যদি হতাহতের সংখ্যা বাড়ে, তবে তা প্রতীক হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রও এমন একটি সময়সীমার মুখোমুখি। মধ্যবর্তী নির্বাচন একটি অনিবার্য বাস্তবতা, যা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে বদলে দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের আইনপ্রণেতারা তখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন— এই যুদ্ধ কতদিন চলবে? কত খরচ হবে? এর উদ্দেশ্য কী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনারেলরা দিতে পারেন না। এগুলো এমন প্রশ্ন, যা রাজনীতিবিদদের এড়ানোর উপায় নেই।
ইতিহাস এখানে আবারও পথ দেখায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ সামরিক বিকল্পের অভাবে শেষ হয়নি; এটি শেষ হয়েছিল কারণ অভ্যন্তরীণ সমর্থন ভেঙে পড়েছিল। ইরাক যুদ্ধও একই ধরনের পথ অনুসরণ করেছিল, যদিও কম নাটকীয়ভাবে। উভয় ক্ষেত্রেই যুদ্ধক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক সহনশীলতা ছিল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের কৌশলও মনে হয় এই বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। দ্রুত জয়লাভ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করা— সামরিক, অর্থনৈতিক এবং মানসিক যতক্ষণ না প্রতিপক্ষের জোট নিজের ভেতরেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এটাই হলো ‘অস্ত্র, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা’র সারকথা। এটি কোনো স্লোগান নয়; এটি একটি কাঠামো, যেখানে প্রতিটি উপাদান অন্যটিকে শক্তিশালী করে। অস্ত্রের ঘাটতি সামরিক বিকল্পকে সীমিত করে, বাজারের অস্থিরতা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাড়ায়, আর রাজনৈতিক চাপ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর ইচ্ছাকে দুর্বল করে।
এই চক্রের ভেতরেই যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে যায়। পূর্ণ বিজয় পরিণত হয় আংশিক সাফল্যে। লক্ষ্যগুলো নীরবে সংশোধিত হয়। আলোচনা, যা একসময় প্রত্যাখ্যাত ছিল, তা বাস্তবসম্মত বিকল্পে পরিণত হয়। নেতারা তখন স্থিতিশীলতা, প্রতিরোধ, ভারসাম্যের মতো শব্দ ব্যবহার করেন— যা আসলে সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়, বিজয়ের নয়।
সম্ভবত এইভাবেই এই যুদ্ধ শেষ হবে— কোনো একক সিদ্ধান্তমূলক আঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং বিভিন্ন চাপের একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে। স্পষ্টতার মাধ্যমে নয়, বরং এমন এক অস্পষ্টতার মাধ্যমে, যাকে দক্ষতার সঙ্গে সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।
এখানে একটি বিদ্রূপ রয়েছে। যুদ্ধ প্রায়ই শুরু হয় সর্বোচ্চ লক্ষ্য নিয়ে— শত্রুকে পরাজিত করা, অঞ্চল পুনর্গঠন, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। কিন্তু শেষ হয় অনেক বেশি সীমিত ফলাফলে— নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ এবং প্রায় আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া, যদিও অনেক বেশি খরচ ও কম ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে।
ইরান এই ধারণাটি বোঝে এবং এর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও তা বোঝে, যদিও তা স্বীকার করতে সময় নেয়। পার্থক্য জ্ঞানে নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তাকে সহ্য করার রাজনৈতিক সক্ষমতায়।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলো সেইগুলো হবে না, যা মানুষ টেলিভিশনে দেখে। এগুলো ঘটবে উৎপাদন প্রতিবেদন, বাজার সূচক এবং জনমত জরিপে। কম নাটকীয়, কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর যখন এই তিনটি ফাটলরেখা— অস্ত্র, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা একত্রিত হবে, তখন ফলাফল ঘোষণার প্রয়োজন হবে না। তা ইতোমধ্যেই নির্ধারিত হয়ে যাবে।
[লেখক: প্রাবন্ধিক]

আপনার মতামত লিখুন