পৃথিবী যেন এখন এক বিশাল হাট—নামের আগে সভ্যতা, ভেতরে নিখাদ ব্যবসা। এই হাটে সবকিছুই বিক্রি হয়: নীতি, নৈতিকতা, মানবতা—এমনকি মানুষের জীবনও। শুধু দরকার নিখুঁত প্যাকেজিং আর কিছু মেকি ভাষা। আগুনের গন্ধকে বলা হয় স্থিতিশীলতা, ধ্বংসকে নিরাপত্তা, আর রক্তকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। শব্দের এই কারসাজিতে সত্য এতটাই ঢেকে যায় যে মানুষ একসময় মিথ্যাকেই বাস্তব মনে করতে শুরু করে।
এই হাটের মাঝখানে জ্বলছে এক অনির্বাণ চুলা। সেখানে কাঠ নয়, জ্বলে মানুষের ঘর; কয়লা নয়, পুড়ে শিশুর স্বপ্ন। তবু বিস্ময়কর—চুলার পাশে দাঁড়ানো লোকগুলো সাদা পোশাকে সজ্জিত। তাদের মুখে শান্তির বুলি, হাতে আগুনের দাহ। তারা বলে, আগুন নেভাতে এসেছে—কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখে, সেই নেভানোর নামেই তারা আরও তেল ঢালছে। আগুন এখানে শুধু ধ্বংসের প্রতীক নয়, এটি ক্ষমতার এক দৃশ্যমান রূপ— যেখানে জ্বলতে থাকা প্রতিটি শিখা একেকটি স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।
এরা এক অদ্ভুত জাতের কারিগর। তাদের কারখানায় তৈরি হয় ন্যায়ের বুলেট, শান্তির বোমা আর মানবিকতার মিসাইল। প্রতিটি অস্ত্রের গায়ে লেখা থাকে কোনো মহৎ শব্দ, যেন শব্দের ঝলকে রক্তের দাগ মুছে যায়। তারা জানে—মানুষ শব্দে বেশি বিশ্বাস করে, সত্যে নয়। তাই তারা শব্দকে অস্ত্র বানায়, আর অস্ত্রকে ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে। একসময় মানুষ এতটাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে যে, ধ্বংসকেও সে উন্নয়নের অংশ মনে করতে শুরু করে।
এই হাটে আছে একদল হিসাবরক্ষকও। তারা ঠাণ্ডা মাথায় হিসাব কষে—আজ কত ঘর পুড়লো, কাল কত মানুষ মরবে, আর তাতে কত মুনাফা আসবে। তাদের খাতায় মানুষের নাম নেই, আছে শুধু সংখ্যা। শূন্যের পাশে যত সংখ্যা বাড়ে, তাদের চোখে তত উজ্জ্বল হয় আনন্দের আলো। এই সংখ্যার খেলায় মানবিকতা হারিয়ে যায়, আর লাভ-ক্ষতির অঙ্কই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত সত্য। তারা কখনও দেখে না একটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে থাকা একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি জীবনের গল্প।
সবচেয়ে বড় কৌতুক—এই আগুনের বাজারেই বসে শান্তির মেলা। সেখানে হয় বড় বড় বক্তৃতা, ছুটে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, আর কাগজে কাগজে লেখা হয় চুক্তি। ক্যামেরার সামনে করমর্দন, হাসি আর কূটনৈতিক ভাষার চাতুর্য দেখে মনে হয়—এই বুঝি পৃথিবী বদলে যাবে। কিন্তু মেলা শেষ হলেই সেই কাগজ উড়ে যায় আগুনে—আর আগুন আরও উঁচু হয়ে জ্বলে ওঠে। তখন বোঝা যায়, শান্তির মেলা আসলে আগুন টিকিয়ে রাখারই এক অভিনব কৌশল।
নীরব দর্শকদের ভূমিকাও এখানে কম নয়। তারা আগুন দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তারপর নিজ নিজ ঘরে ফিরে যায়। কেউ কেউ আবার আগুনের ছবি তুলে রাখে—স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, যেন একদিন বলতে পারে, আমরা সেই সময় বেঁচে ছিলাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা শোক প্রকাশ করে, ক্ষোভ জানায়, কিন্তু বাস্তবতায় তারা নিস্তব্ধ। তারা ভুলে যায়—দর্শকও এক ধরনের অংশগ্রহণকারী; শুধু তাদের হাত রক্তে ভেজে না। নীরবতা অনেক সময় শব্দের চেয়েও বেশি শক্তিশালী সমর্থন হয়ে ওঠে।
এই আগুনের শহরে শিশুরা বড় হয় ধোঁয়ার গন্ধে। তারা জানে না ফুলের সুবাস কেমন; তারা চেনে শুধু বারুদের গন্ধ। তাদের খেলনা ট্যাংকের মতো, তাদের স্বপ্ন বাঙ্কারের মতো। তারা শিখে যায়—বাঁচতে হলে লুকাতে হয়, হাসতে হলে চুপ থাকতে হয়। তাদের শৈশব কেড়ে নেয়া হয় খুব ধীরে, খুব নিঃশব্দে। একদিন তারা বড় হয়, আর সেই একই আগুনের অংশ হয়ে যায়—কারও হাতে অস্ত্র, কারও হাতে পতাকা, কারও হাতে প্রতিশোধের শপথ।
আর যারা এই আগুন জ্বালায়, তারা থাকে অনেক দূরে—শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে, কাঁচের দেয়ালের আড়ালে। তাদের কাছে আগুন মানে একটি গ্রাফ, একটি রিপোর্ট, একটি কৌশল। তারা আগুনের তাপ অনুভব করে না, শুধু তার আলো ব্যবহার করে নিজেদের ছায়া বড় করে। তাদের সিদ্ধান্তে জ্বলে ওঠে শহর, ভেঙে পড়ে সভ্যতা, কিন্তু তাদের জীবনে সেই আগুনের কোনো ছোঁয়া লাগে না। এই দূরত্বই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি—এবং সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা।
সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সত্যটি হলো—এই পৃথিবীতে আগুন কখনো নিজে নিজে জ্বলে না। কেউ তা জ্বালায়, কেউ তাতে হাওয়া দেয়, আর কেউ সেই আগুন দেখে মুনাফার হাসি হাসে। এই ত্রিমুখী সম্পর্কের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আধুনিক সভ্যতার এক নির্মম বাস্তবতা—যেখানে ধ্বংস একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া, আর শান্তি একটি কৌশলগত শব্দমাত্র।
তাই এই আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে যদি কেউ প্রশ্ন করে—দোষ কার? উত্তরটি সহজ নয়। দোষ শুধু তাদের নয়, যারা আগুন জ্বালায়; দোষ তাদেরও, যারা আগুনকে মেনে নেয়, যারা আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে উষ্ণতা উপভোগ করে, আর যারা আগুনের গল্প শুনে হাততালি দেয়। এই সম্মিলিত নীরবতা আর স্বার্থপরতা আগুনকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
শেষ পর্যন্ত, হয়তো একদিন এই আগুন নিভে যাবে। কিন্তু তার ছাইয়ে থেকে যাবে এক নির্মম সাক্ষ্য—সভ্যতার মুখোশ যতই চকচকে হোক, তার ভেতরের মুখ সবসময় ততটা সুন্দর নয়। সেই ছাই একদিন ইতিহাস হয়ে বলবে—এই পৃথিবী আগুন নেভাতে জানতো, কিন্তু আগুন জ্বালাতে ছিল আরও বেশি দক্ষ।
[লেখক : সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মার্চ ২০২৬
পৃথিবী যেন এখন এক বিশাল হাট—নামের আগে সভ্যতা, ভেতরে নিখাদ ব্যবসা। এই হাটে সবকিছুই বিক্রি হয়: নীতি, নৈতিকতা, মানবতা—এমনকি মানুষের জীবনও। শুধু দরকার নিখুঁত প্যাকেজিং আর কিছু মেকি ভাষা। আগুনের গন্ধকে বলা হয় স্থিতিশীলতা, ধ্বংসকে নিরাপত্তা, আর রক্তকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। শব্দের এই কারসাজিতে সত্য এতটাই ঢেকে যায় যে মানুষ একসময় মিথ্যাকেই বাস্তব মনে করতে শুরু করে।
এই হাটের মাঝখানে জ্বলছে এক অনির্বাণ চুলা। সেখানে কাঠ নয়, জ্বলে মানুষের ঘর; কয়লা নয়, পুড়ে শিশুর স্বপ্ন। তবু বিস্ময়কর—চুলার পাশে দাঁড়ানো লোকগুলো সাদা পোশাকে সজ্জিত। তাদের মুখে শান্তির বুলি, হাতে আগুনের দাহ। তারা বলে, আগুন নেভাতে এসেছে—কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখে, সেই নেভানোর নামেই তারা আরও তেল ঢালছে। আগুন এখানে শুধু ধ্বংসের প্রতীক নয়, এটি ক্ষমতার এক দৃশ্যমান রূপ— যেখানে জ্বলতে থাকা প্রতিটি শিখা একেকটি স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।
এরা এক অদ্ভুত জাতের কারিগর। তাদের কারখানায় তৈরি হয় ন্যায়ের বুলেট, শান্তির বোমা আর মানবিকতার মিসাইল। প্রতিটি অস্ত্রের গায়ে লেখা থাকে কোনো মহৎ শব্দ, যেন শব্দের ঝলকে রক্তের দাগ মুছে যায়। তারা জানে—মানুষ শব্দে বেশি বিশ্বাস করে, সত্যে নয়। তাই তারা শব্দকে অস্ত্র বানায়, আর অস্ত্রকে ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে। একসময় মানুষ এতটাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে যে, ধ্বংসকেও সে উন্নয়নের অংশ মনে করতে শুরু করে।
এই হাটে আছে একদল হিসাবরক্ষকও। তারা ঠাণ্ডা মাথায় হিসাব কষে—আজ কত ঘর পুড়লো, কাল কত মানুষ মরবে, আর তাতে কত মুনাফা আসবে। তাদের খাতায় মানুষের নাম নেই, আছে শুধু সংখ্যা। শূন্যের পাশে যত সংখ্যা বাড়ে, তাদের চোখে তত উজ্জ্বল হয় আনন্দের আলো। এই সংখ্যার খেলায় মানবিকতা হারিয়ে যায়, আর লাভ-ক্ষতির অঙ্কই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত সত্য। তারা কখনও দেখে না একটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে থাকা একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি জীবনের গল্প।
সবচেয়ে বড় কৌতুক—এই আগুনের বাজারেই বসে শান্তির মেলা। সেখানে হয় বড় বড় বক্তৃতা, ছুটে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, আর কাগজে কাগজে লেখা হয় চুক্তি। ক্যামেরার সামনে করমর্দন, হাসি আর কূটনৈতিক ভাষার চাতুর্য দেখে মনে হয়—এই বুঝি পৃথিবী বদলে যাবে। কিন্তু মেলা শেষ হলেই সেই কাগজ উড়ে যায় আগুনে—আর আগুন আরও উঁচু হয়ে জ্বলে ওঠে। তখন বোঝা যায়, শান্তির মেলা আসলে আগুন টিকিয়ে রাখারই এক অভিনব কৌশল।
নীরব দর্শকদের ভূমিকাও এখানে কম নয়। তারা আগুন দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তারপর নিজ নিজ ঘরে ফিরে যায়। কেউ কেউ আবার আগুনের ছবি তুলে রাখে—স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, যেন একদিন বলতে পারে, আমরা সেই সময় বেঁচে ছিলাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা শোক প্রকাশ করে, ক্ষোভ জানায়, কিন্তু বাস্তবতায় তারা নিস্তব্ধ। তারা ভুলে যায়—দর্শকও এক ধরনের অংশগ্রহণকারী; শুধু তাদের হাত রক্তে ভেজে না। নীরবতা অনেক সময় শব্দের চেয়েও বেশি শক্তিশালী সমর্থন হয়ে ওঠে।
এই আগুনের শহরে শিশুরা বড় হয় ধোঁয়ার গন্ধে। তারা জানে না ফুলের সুবাস কেমন; তারা চেনে শুধু বারুদের গন্ধ। তাদের খেলনা ট্যাংকের মতো, তাদের স্বপ্ন বাঙ্কারের মতো। তারা শিখে যায়—বাঁচতে হলে লুকাতে হয়, হাসতে হলে চুপ থাকতে হয়। তাদের শৈশব কেড়ে নেয়া হয় খুব ধীরে, খুব নিঃশব্দে। একদিন তারা বড় হয়, আর সেই একই আগুনের অংশ হয়ে যায়—কারও হাতে অস্ত্র, কারও হাতে পতাকা, কারও হাতে প্রতিশোধের শপথ।
আর যারা এই আগুন জ্বালায়, তারা থাকে অনেক দূরে—শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে, কাঁচের দেয়ালের আড়ালে। তাদের কাছে আগুন মানে একটি গ্রাফ, একটি রিপোর্ট, একটি কৌশল। তারা আগুনের তাপ অনুভব করে না, শুধু তার আলো ব্যবহার করে নিজেদের ছায়া বড় করে। তাদের সিদ্ধান্তে জ্বলে ওঠে শহর, ভেঙে পড়ে সভ্যতা, কিন্তু তাদের জীবনে সেই আগুনের কোনো ছোঁয়া লাগে না। এই দূরত্বই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি—এবং সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা।
সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সত্যটি হলো—এই পৃথিবীতে আগুন কখনো নিজে নিজে জ্বলে না। কেউ তা জ্বালায়, কেউ তাতে হাওয়া দেয়, আর কেউ সেই আগুন দেখে মুনাফার হাসি হাসে। এই ত্রিমুখী সম্পর্কের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আধুনিক সভ্যতার এক নির্মম বাস্তবতা—যেখানে ধ্বংস একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া, আর শান্তি একটি কৌশলগত শব্দমাত্র।
তাই এই আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে যদি কেউ প্রশ্ন করে—দোষ কার? উত্তরটি সহজ নয়। দোষ শুধু তাদের নয়, যারা আগুন জ্বালায়; দোষ তাদেরও, যারা আগুনকে মেনে নেয়, যারা আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে উষ্ণতা উপভোগ করে, আর যারা আগুনের গল্প শুনে হাততালি দেয়। এই সম্মিলিত নীরবতা আর স্বার্থপরতা আগুনকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
শেষ পর্যন্ত, হয়তো একদিন এই আগুন নিভে যাবে। কিন্তু তার ছাইয়ে থেকে যাবে এক নির্মম সাক্ষ্য—সভ্যতার মুখোশ যতই চকচকে হোক, তার ভেতরের মুখ সবসময় ততটা সুন্দর নয়। সেই ছাই একদিন ইতিহাস হয়ে বলবে—এই পৃথিবী আগুন নেভাতে জানতো, কিন্তু আগুন জ্বালাতে ছিল আরও বেশি দক্ষ।
[লেখক : সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন