আসন্ন ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে যখন সারাদেশে কোরবানির পশুর লালন-পালন চলছে, ঠিক তখনই নতুন আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে গবাদি পশুর ভাইরাসজনিত চর্মরোগ ‘লাম্পিং স্কিন ডিজেজ’ বা এলএসডি।
২০১৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও বর্তমানে
এটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চৈত্র ও বৈশাখের এই তপ্ত আবহাওয়ায়
মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এতে গবাদি পশুর উৎপাদনশীলতা যেমন কমছে, তেমনি মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ছে খামারিদের স্বপ্ন।
সারাদেশে প্রায় সাত লাখ নিবন্ধিত খামারি রয়েছেন, যাদের গোয়ালে
কোরবানির বাজারের জন্য প্রস্তুত রয়েছে প্রায় আড়াই কোটি গবাদি পশু। পরিবারের সচ্ছলতা
ফেরাতে এই পশুই তাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু এলএসডির সংক্রমণে অনেক খামারিই এখন দিশেহারা।
লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার দত্তপাড়া ইউনিয়নের বড়ালিয়া
গ্রামের চিত্রটি এখন দেশের অনেক প্রান্তেরই বাস্তব চিত্র। সেখানকার অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি
কর্মকর্তা সিরাজ উদ্-দৌলা অবসরের পর গোড়ে তুলেছিলেন ছোট একটি গরুর খামার। তার ১২টি
গরুর মধ্যে তিনটিই এখন এই মরণঘাতী রোগে আক্রান্ত।
স্থানীয়রা একে ‘গরুর বসন্ত’ নামে ডাকলেও এটি মূলত এলএসডি। আক্রান্ত
গরুগুলোর সারা শরীরে গুটি বা নাডিউল দেখা দিয়েছে, পা ফুলে যাওয়ায় সেগুলো আর দাঁড়াতে
পারছে না। প্রচণ্ড জ্বরে কাতর পশুগুলো খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দিয়েছে।
খামারিদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের
উপস্থিতি খুবই নগণ্য। সিরাজ উদ্-দৌলার মতো অনেক খামারিই জানান, জেলা বা উপজেলা শহর
থেকে ডাক্তাররা গ্রামে আসেন না। অসুস্থ গরু নিয়ে শহরে যাওয়াও যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি
কষ্টকর। ফলে বাধ্য হয়ে গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার বা স্থানীয় কবিরাজদের ওপর ভরসা করতে
হচ্ছে। প্যারাসিটামল জাতীয় সাধারণ ওষুধ দিয়ে কোনোমতে পশুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা
চলছে। কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে যে গরুগুলো বিক্রি করে সংসারের খরচ চালানোর কথা ছিলো,
সেগুলো এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। এই অনিশ্চয়তায় খামারি পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে
চরম বিষাদ।
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি ভয়ংকর সংক্রামক রোগ।
সাধারণত স্টাবল ফ্লাই, এডিস মশা এবং আঠালি পোকা এই রোগের প্রধান বাহক। আক্রান্ত পশুর
লালা, সর্দি, দুধ এবং এমনকি ব্যবহৃত সিরিঞ্জ বা প্রজনন সরঞ্জামের মাধ্যমেও এটি দ্রুত
ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত পশুর শরীরে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর উঠতে পারে।
এ ছাড়া লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া, ওলান ও পায়ে আলসার বা ঘা তৈরি
হওয়া এবং দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া এই রোগের প্রধান লক্ষণ। সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও টিকা না
পেলে গরু, বিশেষ করে বাছুর মারা যাওয়ার ঝুঁকি শতভাগ।
প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের জেলা পর্যায়ের কয়েকজন ডাক্তার সংবাদকে
জানায়, এ সময় (চৈত্র ও বৈশাখ মাস) গরুর লাম্পিং স্কিন রোগ সারাদেশে খামারে হচ্ছে। এ
জন্ ভ্যাকসিনসহ জেলা প্রাণী সম্পদ অফিসের ভেটেনারী
ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চিকিৎসা পরামর্শ নিতে হয়। না হয় গরু বা গরুর বাচ্চা মারাও
যাওয়ার আশংকা রয়েছে বলে ওই বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন।
অধিদপ্তরের পশু চিকিৎসকদের মতে, চৈত্র ও বৈশাখ মাসে মশা-মাছির
বংশবিস্তার বেশি হওয়ায় এই সময় সংক্রমণের হারও বেশি থাকে। সম্প্রতি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়াসহ
দেশের বিভিন্ন স্থানে এই রোগের ব্যাপক বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। রোগটি নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত
পশুকে দ্রুত মশারির ভেতরে আলাদা করে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ছাড়া খামারের চারপাশ পরিষ্কার রাখা, মশা তাড়ানোর ওষুধ ব্যবহার
এবং সুস্থ পশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একবার আক্রান্ত হলে পশুকে
প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথানাশক ও অ্যান্টিহিস্টামিন
জাতীয় ওষুধ দিতে হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, মাঠ পর্যায়ে
এলএসডি নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত নির্দেশনা
দেওয়া হচ্ছে এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে চিকিৎসকরা গিয়ে প্রয়োজনীয় গাইডলাইন দিচ্ছেন।
সরকারি তথ্য মতে, ২০১৯ সাল থেকে এই রোগটির ওপর বিশেষ নজরদারি
রাখা হচ্ছে। লক্ষ্মীপুরের মতো যেসব এলাকায় অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে দ্রুত মেডিকেল
টিম পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। একইসঙ্গে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়
থেকেও বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, কোরবানির ঈদ আসতে আর মাত্র মাস দুয়েক বাকি।
এই সময়ে রোগটি মহামারির আকার ধারণ করলে দেশের মাংস ও চামড়া শিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে
পড়বে।
খামারিদের দাবি, কেবল গাইডলাইন নয়, জরুরি ভিত্তিতে বিনামূল্যে
টিকা এবং তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি চিকিৎসকদের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যথায়, বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে লালন-পালন করা পশুর
অকাল মৃত্যুতে নিঃস্ব হয়ে যাবেন দেশের লাখ লাখ প্রান্তিক খামারি। এলএসডি নামক এই অভিশাপ
থেকে পশুপাল রক্ষা করতে এখন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ সময়ের দাবি।
ভেটেনারী কর্মকর্তা ডা. জোবায়ের হোসেন বলেন, চৈত্র ও বৈশাখ মাসে
মশা,মাছিসহ অন্যান্য পোকামাকড়ের কামড়ে গবাদী পশুর লাম্পিং স্কিন রোগ বেশী হয়। সম্প্রতি
ময়মনসিংহে এই ধরনের রোগ দেখা গেছে। মূলত এ মৌসুমে সারাদেশে গবাদী পশুর এ রোগ হচ্ছে।
এতে গরুর বাচ্চাও মারা যেতে পারে বলে আশংকা করছেন তিনি।
তার মতে, গবাদী পশুর লাম্পিং স্কিন ডিজেজ থেকে বাঁচতে গোয়াল ঘরে
বা খামারে মশারী ব্যবহার করতে হবে। আক্রান্ত পশুকে ব্যাথানাশক ঔষধ দিয়ে রোগ প্রতিরোধ
করতে হবে। সারাদেশে কমবেশী এই রোগ হচ্ছে। এক মাস আগে ময়মনসিংহের ফুল বাড়িয়া এই ধরনের
রোগ শনাক্ত হয়েছে। সেখানে ভেটেনারী ডাক্তার গিয়ে চিকিৎসা দিয়েছেন।
প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের সিনিয়র অফিসার সংবাদকে জানান, সাধারণত
স্টাবল ফ্লাইম, এডিস মশা, আঠালি পোকা রোগের বাহক হিসাবে কাজ করে। রোগাক্রান্ত পশুর
সর্দি, লালা, দুধ, মৃত কোষের মাধ্যমে রোগটি সুস্থ পশুতেও ছড়ায়।
সংক্রমিত কাপড় চোপড়, আসবাবপত্র, খাবার ও পানির পাত্র এবং সিরিঞ্জ-নিডেল
ও কৃত্রিম প্রজনন সরঞ্জামের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। আর অনিয়ন্ত্রিত গবাদী পশু চলাচলের
মাধ্যমে রোগটি এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য মসকুইটোসাইড ব্যবহার করতে হবে। আর সুস্থ্য
সবল পশুকে নিয়মিত টিকা দিতে হবে। খামারীসহ
অংশিকজনকে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। রোগটি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নিকটস্থ হাসপাতালের
সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে।
এই সম্পর্কে প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. শেখ শাহিনুর
ইসলাম বলেন, গবাদী পশুর লাম্পিং স্কিন ডিজেজ (এলএসডি) প্রতিরোধে প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের জেলা ও উপজেলার দায়িত্ব
প্রাপ্ত কর্মকর্তারা কাজ করছেন। গ্রাম-গঞ্জের পশু খামারে ২০১৯ সাল থেকে গবাদী পশু এই
রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, খামারীদেরকে গবাদী পশুর চিকিৎসায় ভ্যাকসিন দেওয়ার
পরামর্শ দিয়েছেন। আর আক্রান্ত এলাকায় ভেটেনারী চিকিৎসকরা যাচ্ছেন ও খামারীদের চিকিৎসা
গাইডলাইন দিচ্ছেন। লক্ষীপুরের দত্তপাড়ার বড়ালিয়া বকশি বাড়ির অবসর প্রাপ্ত বিজিবি কর্মকর্তার
খামারে জেলা পশু চিকিৎসকদেরকে যেতে বলা হয়েছে। রোববার তারা যাবেন।

শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মার্চ ২০২৬
আসন্ন ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে যখন সারাদেশে কোরবানির পশুর লালন-পালন চলছে, ঠিক তখনই নতুন আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে গবাদি পশুর ভাইরাসজনিত চর্মরোগ ‘লাম্পিং স্কিন ডিজেজ’ বা এলএসডি।
২০১৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও বর্তমানে
এটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চৈত্র ও বৈশাখের এই তপ্ত আবহাওয়ায়
মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এতে গবাদি পশুর উৎপাদনশীলতা যেমন কমছে, তেমনি মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ছে খামারিদের স্বপ্ন।
সারাদেশে প্রায় সাত লাখ নিবন্ধিত খামারি রয়েছেন, যাদের গোয়ালে
কোরবানির বাজারের জন্য প্রস্তুত রয়েছে প্রায় আড়াই কোটি গবাদি পশু। পরিবারের সচ্ছলতা
ফেরাতে এই পশুই তাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু এলএসডির সংক্রমণে অনেক খামারিই এখন দিশেহারা।
লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার দত্তপাড়া ইউনিয়নের বড়ালিয়া
গ্রামের চিত্রটি এখন দেশের অনেক প্রান্তেরই বাস্তব চিত্র। সেখানকার অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি
কর্মকর্তা সিরাজ উদ্-দৌলা অবসরের পর গোড়ে তুলেছিলেন ছোট একটি গরুর খামার। তার ১২টি
গরুর মধ্যে তিনটিই এখন এই মরণঘাতী রোগে আক্রান্ত।
স্থানীয়রা একে ‘গরুর বসন্ত’ নামে ডাকলেও এটি মূলত এলএসডি। আক্রান্ত
গরুগুলোর সারা শরীরে গুটি বা নাডিউল দেখা দিয়েছে, পা ফুলে যাওয়ায় সেগুলো আর দাঁড়াতে
পারছে না। প্রচণ্ড জ্বরে কাতর পশুগুলো খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দিয়েছে।
খামারিদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের
উপস্থিতি খুবই নগণ্য। সিরাজ উদ্-দৌলার মতো অনেক খামারিই জানান, জেলা বা উপজেলা শহর
থেকে ডাক্তাররা গ্রামে আসেন না। অসুস্থ গরু নিয়ে শহরে যাওয়াও যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি
কষ্টকর। ফলে বাধ্য হয়ে গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার বা স্থানীয় কবিরাজদের ওপর ভরসা করতে
হচ্ছে। প্যারাসিটামল জাতীয় সাধারণ ওষুধ দিয়ে কোনোমতে পশুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা
চলছে। কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে যে গরুগুলো বিক্রি করে সংসারের খরচ চালানোর কথা ছিলো,
সেগুলো এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। এই অনিশ্চয়তায় খামারি পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে
চরম বিষাদ।
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি ভয়ংকর সংক্রামক রোগ।
সাধারণত স্টাবল ফ্লাই, এডিস মশা এবং আঠালি পোকা এই রোগের প্রধান বাহক। আক্রান্ত পশুর
লালা, সর্দি, দুধ এবং এমনকি ব্যবহৃত সিরিঞ্জ বা প্রজনন সরঞ্জামের মাধ্যমেও এটি দ্রুত
ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত পশুর শরীরে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর উঠতে পারে।
এ ছাড়া লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া, ওলান ও পায়ে আলসার বা ঘা তৈরি
হওয়া এবং দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া এই রোগের প্রধান লক্ষণ। সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও টিকা না
পেলে গরু, বিশেষ করে বাছুর মারা যাওয়ার ঝুঁকি শতভাগ।
প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের জেলা পর্যায়ের কয়েকজন ডাক্তার সংবাদকে
জানায়, এ সময় (চৈত্র ও বৈশাখ মাস) গরুর লাম্পিং স্কিন রোগ সারাদেশে খামারে হচ্ছে। এ
জন্ ভ্যাকসিনসহ জেলা প্রাণী সম্পদ অফিসের ভেটেনারী
ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চিকিৎসা পরামর্শ নিতে হয়। না হয় গরু বা গরুর বাচ্চা মারাও
যাওয়ার আশংকা রয়েছে বলে ওই বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন।
অধিদপ্তরের পশু চিকিৎসকদের মতে, চৈত্র ও বৈশাখ মাসে মশা-মাছির
বংশবিস্তার বেশি হওয়ায় এই সময় সংক্রমণের হারও বেশি থাকে। সম্প্রতি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়াসহ
দেশের বিভিন্ন স্থানে এই রোগের ব্যাপক বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। রোগটি নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত
পশুকে দ্রুত মশারির ভেতরে আলাদা করে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ছাড়া খামারের চারপাশ পরিষ্কার রাখা, মশা তাড়ানোর ওষুধ ব্যবহার
এবং সুস্থ পশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একবার আক্রান্ত হলে পশুকে
প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথানাশক ও অ্যান্টিহিস্টামিন
জাতীয় ওষুধ দিতে হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, মাঠ পর্যায়ে
এলএসডি নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত নির্দেশনা
দেওয়া হচ্ছে এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে চিকিৎসকরা গিয়ে প্রয়োজনীয় গাইডলাইন দিচ্ছেন।
সরকারি তথ্য মতে, ২০১৯ সাল থেকে এই রোগটির ওপর বিশেষ নজরদারি
রাখা হচ্ছে। লক্ষ্মীপুরের মতো যেসব এলাকায় অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে দ্রুত মেডিকেল
টিম পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। একইসঙ্গে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়
থেকেও বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, কোরবানির ঈদ আসতে আর মাত্র মাস দুয়েক বাকি।
এই সময়ে রোগটি মহামারির আকার ধারণ করলে দেশের মাংস ও চামড়া শিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে
পড়বে।
খামারিদের দাবি, কেবল গাইডলাইন নয়, জরুরি ভিত্তিতে বিনামূল্যে
টিকা এবং তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি চিকিৎসকদের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যথায়, বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে লালন-পালন করা পশুর
অকাল মৃত্যুতে নিঃস্ব হয়ে যাবেন দেশের লাখ লাখ প্রান্তিক খামারি। এলএসডি নামক এই অভিশাপ
থেকে পশুপাল রক্ষা করতে এখন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ সময়ের দাবি।
ভেটেনারী কর্মকর্তা ডা. জোবায়ের হোসেন বলেন, চৈত্র ও বৈশাখ মাসে
মশা,মাছিসহ অন্যান্য পোকামাকড়ের কামড়ে গবাদী পশুর লাম্পিং স্কিন রোগ বেশী হয়। সম্প্রতি
ময়মনসিংহে এই ধরনের রোগ দেখা গেছে। মূলত এ মৌসুমে সারাদেশে গবাদী পশুর এ রোগ হচ্ছে।
এতে গরুর বাচ্চাও মারা যেতে পারে বলে আশংকা করছেন তিনি।
তার মতে, গবাদী পশুর লাম্পিং স্কিন ডিজেজ থেকে বাঁচতে গোয়াল ঘরে
বা খামারে মশারী ব্যবহার করতে হবে। আক্রান্ত পশুকে ব্যাথানাশক ঔষধ দিয়ে রোগ প্রতিরোধ
করতে হবে। সারাদেশে কমবেশী এই রোগ হচ্ছে। এক মাস আগে ময়মনসিংহের ফুল বাড়িয়া এই ধরনের
রোগ শনাক্ত হয়েছে। সেখানে ভেটেনারী ডাক্তার গিয়ে চিকিৎসা দিয়েছেন।
প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের সিনিয়র অফিসার সংবাদকে জানান, সাধারণত
স্টাবল ফ্লাইম, এডিস মশা, আঠালি পোকা রোগের বাহক হিসাবে কাজ করে। রোগাক্রান্ত পশুর
সর্দি, লালা, দুধ, মৃত কোষের মাধ্যমে রোগটি সুস্থ পশুতেও ছড়ায়।
সংক্রমিত কাপড় চোপড়, আসবাবপত্র, খাবার ও পানির পাত্র এবং সিরিঞ্জ-নিডেল
ও কৃত্রিম প্রজনন সরঞ্জামের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। আর অনিয়ন্ত্রিত গবাদী পশু চলাচলের
মাধ্যমে রোগটি এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য মসকুইটোসাইড ব্যবহার করতে হবে। আর সুস্থ্য
সবল পশুকে নিয়মিত টিকা দিতে হবে। খামারীসহ
অংশিকজনকে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। রোগটি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নিকটস্থ হাসপাতালের
সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে।
এই সম্পর্কে প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. শেখ শাহিনুর
ইসলাম বলেন, গবাদী পশুর লাম্পিং স্কিন ডিজেজ (এলএসডি) প্রতিরোধে প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের জেলা ও উপজেলার দায়িত্ব
প্রাপ্ত কর্মকর্তারা কাজ করছেন। গ্রাম-গঞ্জের পশু খামারে ২০১৯ সাল থেকে গবাদী পশু এই
রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, খামারীদেরকে গবাদী পশুর চিকিৎসায় ভ্যাকসিন দেওয়ার
পরামর্শ দিয়েছেন। আর আক্রান্ত এলাকায় ভেটেনারী চিকিৎসকরা যাচ্ছেন ও খামারীদের চিকিৎসা
গাইডলাইন দিচ্ছেন। লক্ষীপুরের দত্তপাড়ার বড়ালিয়া বকশি বাড়ির অবসর প্রাপ্ত বিজিবি কর্মকর্তার
খামারে জেলা পশু চিকিৎসকদেরকে যেতে বলা হয়েছে। রোববার তারা যাবেন।

আপনার মতামত লিখুন