সম্প্রতি রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার ঝুঁকিপূর্ণ চিত্রকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সার্বিক অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। বর্তমান বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনা একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে, আর বাংলাদেশে এটি এখন এক ভয়াবহ সামাজিক সংকট। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক বা নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটছে, যার ফলে ঝরে যাচ্ছে অমূল্য প্রাণ, ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার উন্নত বিশ্বের তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। বিআরটিএর জরিপ মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ২৩ হাজার ১৬৬ জন মানুষ নিহত হয়। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক যুগে দেশে ৬৭ হাজার ৮৯০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৭২৬ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২১ জন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশ। রাজধানী ঢাকা এবং মহাসড়কগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।
বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনার চিত্রও কম ভয়াবহ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় এবং প্রতিদিন এক হাজারের বেশি শিশু ও তরুণ প্রাণ হারায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর প্রায় ৯৬ শতাংশই ঘটে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে। অর্থাৎ বাংলাদেশসহ এ ধরনের দেশগুলোয়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৬,৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯,১১১ জন নিহত এবং ১৪,৮১২ জন আহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় সারা দেশে ৮ হাজার ৫৪৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছে ১২ হাজার ৬০৮ জন। এর মধ্যে ২ হাজার ৩২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ৩ হাজার ১৫১ জন। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ১.৫৪ শতাংশ, নিহতের সংখ্যা ৭.৫০ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ১৭.৭৩ শতাংশ বেড়েছে। নৌ ও রেলপথেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটে। তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে রেলপথে ৪৯৭টি দুর্ঘটনায় ৫১২ জন নিহত এবং ৩১৫ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ১১৮টি দুর্ঘটনায় ১৮২ জন নিহত, ২৬৭ জন আহত এবং ১৫৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ২ হাজার ৩২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত এবং ৩ হাজার ১৫১ জন আহত হয়েছেন। গত ১০ বছরে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে বেড়ে ৬০ লাখ হয়েছে। নতুন করে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তায় চলাচলের পাশাপাশি ছোট যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং এসব যানবাহনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে ১৬৮ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১ হাজার ৯৫২ চালক, ১ হাজার ৮৭৯ পথচারী, ৬২২ পরিবহন শ্রমিক, ৭৫৫ শিক্ষার্থী, ১২৬ শিক্ষক, ১ হাজার ২০৬ নারী, ৬৫৮ শিশু, ৪৮ সাংবাদিক, ১৭ চিকিৎসক, ১৬ বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১ চিত্রনায়ক, ৬ আইনজীবী, ১২ প্রকৌশলী এবং ২১৫ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় পাওয়া গেছে।
তথ্যানুযায়ী, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৫০.৮৪ শতাংশ পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়া, ২৪.৩৯ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৮.৯২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া, ৪.৯৯ শতাংশ বিবিধ কারণে এবং ০.৭৩ শতাংশ ট্রেনের সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষের কারণে হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার ৩৫.৬৭ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে, ২১.৬৬ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ৩৫.৮১ শতাংশ ফিডার রোডে এবং ৪.৯৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঢাকা মহানগরীতে এবং ১.২০ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে ঘটেছে। শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬২১টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬০৮ এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১ হাজার ১০০ জন মানুষ। এর মধ্যে ২৭১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৬৪ জন, ৪টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৬ জন ও দুজন আহত হয়েছেন। ২২টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো চালকদের অদক্ষতা, অসচেতনতা এবং বেপরোয়া মনোভাব। অনেক চালকই যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই গাড়ি চালান, আবার অনেকেই লাইসেন্সবিহীন। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলফোন ব্যবহার— এসব আচরণ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। অনেক পুরনো ও অচল যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে, যা যে কোনো সময় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতাও একটি বড় সমস্যা। ভাঙাচোরা রাস্তা, ডিভাইডারের অভাব, অপর্যাপ্ত ট্রাফিক সিগন্যাল ও ফুটওভারব্রিজের স্বল্পতা দুর্ঘটনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং দুর্নীতিও একটি বড় কারণ। ট্রাফিক আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ ও অনিয়মের কারণে অযোগ্য চালক লাইসেন্স পেয়ে যায় এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল অব্যাহত থাকে। একই সঙ্গে পথচারীদের অসচেতনতা যেমন যেখানে-সেখানে রাস্তা পারাপার-দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু প্রাণহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে পুরো পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। এ ছাড়া প্রতি বছর দেশের অর্থনীতিতে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়, যা জাতীয় উন্নয়নকে ব্যাহত করে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যে ক্ষতি হয় তার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির দুই ভাগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, আন্তর্জাতিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ডলার। উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে এর পরিমাণ ৬৫ বিলিয়ন ডলার।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং আইন ভঙ্গকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও কঠোর করতে হবে, যাতে অযোগ্য কেউ গাড়ি চালাতে না পারে। তৃতীয়ত, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি-প্রশস্ত রাস্তা, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা নিয়মিত করা এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষকে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। চালক, যাত্রী ও পথচারী-সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল আচরণই পারে দুর্ঘটনা কমাতে।
সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; বরং এটি প্রতিরোধযোগ্য। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং কার্যকর পদক্ষেপ। আমরা যদি সবাই নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি এবং আইন মেনে চলি, তাহলে সড়ককে মৃত্যুকূপ থেকে নিরাপদ যাত্রাপথে রূপান্তর করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, জীবনের মূল্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

রোববার, ২৯ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ মার্চ ২০২৬
সম্প্রতি রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার ঝুঁকিপূর্ণ চিত্রকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সার্বিক অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। বর্তমান বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনা একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে, আর বাংলাদেশে এটি এখন এক ভয়াবহ সামাজিক সংকট। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক বা নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটছে, যার ফলে ঝরে যাচ্ছে অমূল্য প্রাণ, ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার উন্নত বিশ্বের তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। বিআরটিএর জরিপ মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ২৩ হাজার ১৬৬ জন মানুষ নিহত হয়। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক যুগে দেশে ৬৭ হাজার ৮৯০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৭২৬ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২১ জন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশ। রাজধানী ঢাকা এবং মহাসড়কগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।
বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনার চিত্রও কম ভয়াবহ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় এবং প্রতিদিন এক হাজারের বেশি শিশু ও তরুণ প্রাণ হারায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর প্রায় ৯৬ শতাংশই ঘটে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে। অর্থাৎ বাংলাদেশসহ এ ধরনের দেশগুলোয়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৬,৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯,১১১ জন নিহত এবং ১৪,৮১২ জন আহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় সারা দেশে ৮ হাজার ৫৪৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছে ১২ হাজার ৬০৮ জন। এর মধ্যে ২ হাজার ৩২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ৩ হাজার ১৫১ জন। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ১.৫৪ শতাংশ, নিহতের সংখ্যা ৭.৫০ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ১৭.৭৩ শতাংশ বেড়েছে। নৌ ও রেলপথেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটে। তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে রেলপথে ৪৯৭টি দুর্ঘটনায় ৫১২ জন নিহত এবং ৩১৫ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ১১৮টি দুর্ঘটনায় ১৮২ জন নিহত, ২৬৭ জন আহত এবং ১৫৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ২ হাজার ৩২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত এবং ৩ হাজার ১৫১ জন আহত হয়েছেন। গত ১০ বছরে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে বেড়ে ৬০ লাখ হয়েছে। নতুন করে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তায় চলাচলের পাশাপাশি ছোট যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং এসব যানবাহনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে ১৬৮ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১ হাজার ৯৫২ চালক, ১ হাজার ৮৭৯ পথচারী, ৬২২ পরিবহন শ্রমিক, ৭৫৫ শিক্ষার্থী, ১২৬ শিক্ষক, ১ হাজার ২০৬ নারী, ৬৫৮ শিশু, ৪৮ সাংবাদিক, ১৭ চিকিৎসক, ১৬ বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১ চিত্রনায়ক, ৬ আইনজীবী, ১২ প্রকৌশলী এবং ২১৫ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় পাওয়া গেছে।
তথ্যানুযায়ী, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৫০.৮৪ শতাংশ পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়া, ২৪.৩৯ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৮.৯২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া, ৪.৯৯ শতাংশ বিবিধ কারণে এবং ০.৭৩ শতাংশ ট্রেনের সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষের কারণে হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার ৩৫.৬৭ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে, ২১.৬৬ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ৩৫.৮১ শতাংশ ফিডার রোডে এবং ৪.৯৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঢাকা মহানগরীতে এবং ১.২০ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে ঘটেছে। শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬২১টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬০৮ এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১ হাজার ১০০ জন মানুষ। এর মধ্যে ২৭১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৬৪ জন, ৪টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৬ জন ও দুজন আহত হয়েছেন। ২২টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো চালকদের অদক্ষতা, অসচেতনতা এবং বেপরোয়া মনোভাব। অনেক চালকই যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই গাড়ি চালান, আবার অনেকেই লাইসেন্সবিহীন। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলফোন ব্যবহার— এসব আচরণ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। অনেক পুরনো ও অচল যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে, যা যে কোনো সময় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতাও একটি বড় সমস্যা। ভাঙাচোরা রাস্তা, ডিভাইডারের অভাব, অপর্যাপ্ত ট্রাফিক সিগন্যাল ও ফুটওভারব্রিজের স্বল্পতা দুর্ঘটনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং দুর্নীতিও একটি বড় কারণ। ট্রাফিক আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ ও অনিয়মের কারণে অযোগ্য চালক লাইসেন্স পেয়ে যায় এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল অব্যাহত থাকে। একই সঙ্গে পথচারীদের অসচেতনতা যেমন যেখানে-সেখানে রাস্তা পারাপার-দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু প্রাণহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে পুরো পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। এ ছাড়া প্রতি বছর দেশের অর্থনীতিতে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়, যা জাতীয় উন্নয়নকে ব্যাহত করে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যে ক্ষতি হয় তার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির দুই ভাগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, আন্তর্জাতিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ডলার। উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে এর পরিমাণ ৬৫ বিলিয়ন ডলার।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং আইন ভঙ্গকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও কঠোর করতে হবে, যাতে অযোগ্য কেউ গাড়ি চালাতে না পারে। তৃতীয়ত, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি-প্রশস্ত রাস্তা, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা নিয়মিত করা এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষকে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। চালক, যাত্রী ও পথচারী-সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল আচরণই পারে দুর্ঘটনা কমাতে।
সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; বরং এটি প্রতিরোধযোগ্য। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং কার্যকর পদক্ষেপ। আমরা যদি সবাই নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি এবং আইন মেনে চলি, তাহলে সড়ককে মৃত্যুকূপ থেকে নিরাপদ যাত্রাপথে রূপান্তর করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, জীবনের মূল্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

আপনার মতামত লিখুন