সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

’৬৯ আর ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি-ঘর কোথায়


আনোয়ারুল হক
আনোয়ারুল হক
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬

’৬৯ আর ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি-ঘর কোথায়
’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান

অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ নামে তড়িঘড়ি করে একটি অধ্যাদেশ জারি করে গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করার কার্যক্রম শুরু করে। ঐ গণভবনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থাকতেন এবং জুলাই আন্দোলনের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সব কার্যক্রম গণভবন থেকেই পরিচালিত হচ্ছিল। জুলাই আন্দোলনে অগণিত মৃত্যু, চোখ হারানো, পংগু হয়ে পড়া আহতের আর্তনাদ, স্বজনহারা পরিবারের মানুষগুলোর আহাজারি মানুষের বিবেককে স্পর্ষ করেছিল। সেই আবেগকে ব্যবহার করে মুহাম্মদ ইউনূস ‘প্রতিহিংসার বশে’ গণভবনকে জুলাই স্মৃতি যাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিনা। সেটা একটা বড় প্রশ্ন। কিন্তু গণভবন তো শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাড়ি না, এটা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সরকার প্রধানের আবাসিক ভবন। এটা ইউনূস সাহেবের পৈতৃক সম্পত্তি নয় যে, তিনি ইচ্ছা করলেন আর সরকারি সম্পত্তিকে তার ‘স্মৃতির যাদুঘর’ বানিয়ে ফেললেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ঘর থাকতেই পারে। তবে সেটা সরকার প্রধানের বাসভবনের জন্য নির্মিত স্থাপনায় কেনো করতে হবে? বিশেষত সরকার প্রধানের বাসভবনের মত স্পর্শকাতর স্থাপনার জন্য স্থান, জায়গার পরিসর, নিরাপত্তা ইস্যু ইত্যাদি নানা বিষয় বিবেচনা করে তা নির্ধারণ করতে হয়। জুলাই স্মৃতি ঘরের জন্য সেগুলো অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অন্য যেকোনো স্থানেই তা হতে পারে। আর এ দেশটাই তো গণঅভ্যুত্থানের দেশ। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পথ বেয়েই তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের এবং দীর্ঘ সময়ের নামে বেনামে সামরিক শাসনের পতন। ’৬৯ বা ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের জন্য তো পৃথক কোনো স্মৃতি ঘর নাই। তাহলে শুধু ’২৪-এর জন্য আলাদা স্মৃতি ঘর লাগবে কেনো? বরং স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের স্মৃতি যাদুঘর নির্মাণ করে ’৬৯, ’৯০, ’২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। যা থেকে পরবর্তী প্রজন্মসহ সবাই একপেশে বা খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির বদলে দেশ এবং দেশের গণআন্দোলনের বৈচিত্র্যময় নানা পর্ব ও উপাদান সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা পেতে পারেন।

কিন্তু না, মুহাম্মদ ইউনূস ‘ইতিহাসের একক নায়ক’ হতে চান। আর তা হতে হলে মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের সব গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের ক্ষেত্রে তো রিসেট বাটন চাপ দিতে লাগবে। আবার ’২৪-এর জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে উগ্রবাদী ধর্মান্ধ শক্তির উত্থান ঘটেছে, তারাও এদেশের মানুষের গণসংগ্রামের ইতিহাসকে এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী নিজেদের কলঙ্কিত অধ্যায়কে যে কোনো প্রকারে ঢেকে ফেলার গভীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। সে ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই তারা জুলাই ’২৪ দিয়ে ’৭১ কে ঢেকে ফেলার প্রয়াস চালিয়ে আসছে। সে লক্ষ্যেই জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে তারা আঘাত হানে মুক্তিযুদ্ধের সব স্মারক, স্মৃতি, স্তম্ভ ও ভাস্কর্যের ওপর। ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশ্রয়ে একাধিকবার আঘাত হেনে ও অগ্নিসংযোগ করে ধানমন্ডি বত্রিশের ঐতিহাসিক বাড়িটি গুড়িয়ে দেয়া হয়।

আজকের প্রজন্ম ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সম্পর্কে, শহীদদের সম্পর্কে কতটুকু জানেন? জানেন কি ঐ অভ্যুত্থানে কতজন শহীদ হয়েছিলেন? কি ভাবে জানবেন? সারা দেশে ’৬৯-এর অসংখ্য শহীদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা পর্যন্ত করা হয়নি। শহীদদের মধ্যে তরুণ আসাদ, কিশোর মতিউর, রুস্তম, গৃহবধূ আনোয়ারা কিংবা শহীদ ড. শামসুজ্জোহা এরকম কয়েকটি নাম আমরা গণঅভ্যুত্থান দিবসের দিনে শুনতে পাই। 

অথচ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক, কর্মচারী শহীদী মৃত্যুবরণ করেন। নরসিংদীর হাতিরদিয়া ও রায়পুরায় কৃষক এবং ঢাকার আদমজী, ডেমরা, টঙ্গী এবং খুলনার দৌলতপুর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ও আত্মদান আন্দোলনে বিশেষ মাত্রা সৃষ্টি করে।

তৎকালীন ডাকসু, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের উভয় অংশ এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সমন্বয়ে

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ’৬৯-এর জানুয়ারি থেকেই শুরু হয় আন্দোলনের নানা কর্মসূচি। এক পর্যায়ে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের একাংশও এসে মিলিত হয় এ আন্দোলনে। এই আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থী বা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নয়, বরং কৃষকদের মধ্যে, শ্রমিকদের মধ্যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৬৬ সনে সূচিত ছয়দফা দাবিতে যে স্বাধীকার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল তা পূর্ণতা পায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচিতে।

জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী রাজনীতির ঐক্যের ফলে ছাত্র সমাজ ও মেহনতি জনতার মাঝে এক ধরনের একতার বাতাবরণ সৃষ্টি হয়। আন্দোলন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আইউব শাহীর পতনের মধ্য দিয়ে গনঅভ্যুত্থান সফলতা লাভ করে। কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন শেখ মুজিব, মনি সিংহ সহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সেল বলা যেতে পারে। তাই এই ঐতিহাসিক ও গৌরবের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের বিরোধীরা পাশ কাটাতে চায়- যেমনটা তারা বলে বাংলা ভাষা আন্দোলন করা ভুল হয়েছিল। তাদের নেতা গোলাম আজমের স্পষ্ট বয়ান ছিলো, ’মুসলমানদের তমুদ্দীন ও ধর্মীয় জ্ঞানের ভাণ্ডার উর্দু ভাষায় সংরক্ষিত রয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ হইতে ভাষা আন্দোলন করা সঠিক হয় নাই।’

আবার এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে গোলাম আজমের দল কখনও সরবে ও কখনও নীরবে যুক্ত থাকলেও ১৯৯০-এর গনঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বীরত্ব গাঁথা ও আত্মত্যাগকে তারা খুব একটা সামনে আনতে চায় না। কারণ ’৯০ এর গণঅভ্যুত্থান সামনে আসা মানেই অভ্যুত্থানের মশাল জ্বালানো ডা. মিলন, কমরেড তাজুল, পুলিশ কতৃক ট্রাকের চাকায় পিষ্ট ছাত্র নেতা সেলিম, দেলোয়ার, রাউফুন বসুনিয়া, শাহজাহান সিরাজ, এক জটিল পর্বে আসলাম কিংবা ছাত্র কর্মী জয়নাল, জাফর, কান্চন, মোজাম্মেল, জেহাদ, খেতমজুর নেতা টিটো, বা রাজনৈতিক নেতা ময়েজউদ্দীনের আত্মদানের কাহিনী সামনে আসা। ’৯০ কে সামনে আনা মানেই অতি সাধারণ মানুষের হাতে লেখা ও বুকে পিঠে আঁকা ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ হয়ে যায় সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা। শহীদ নূর হোসেন যেন গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতীক।

এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের আয়োজন পর্ব তথা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী গণসংগ্রাম এবং তার সমাপ্তি পর্বের মূল শক্তি ছিলো দেশের গনতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তি। এ অভ্যুত্থানের পথ বেয়েই বিএনপি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও অভ্যুত্থানে শহীদের তালিকা প্রণয়ন ও স্মৃতি সংরক্ষণে বিশেষ কিছু করা হয় নি। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে নতুন সরকারকে এ দায়িত্ব নিতে হবে।

’৬৯ আর ’৯০কে, ’৫২ আর ’৭১ কে উগ্রবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ২০২৪ দিয়ে ঢেকে ফেলার প্রচেষ্টায় উন্মত্ত। ইউনূসও ‘রিসেট বাটন’ টিপে দেশের সব গৌরব গাঁথাকে বিশেষত দেশের মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলার প্রয়াসকে ১৮ মাস যাবত মদত দিয়ে গেলেন। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন সম্পন্ন না হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দেশে এখন একটি নির্বাচিত সরকার। বিজয়ী দল বিএনপি দাবি করে তাদের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ঘোষক’। নিশ্চয়ই ২৫ মার্চের কাল রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নিরস্ত্র জনতার উপর সশস্ত্র আক্রমণ এবং নির্বিচার গনহত্যার পরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার ঘোষণার ঐতিহাসিক মূল্য আছে। বেংগল রেজিমেন্ট তথা বাঙালি সশস্ত্র বাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনতা যুদ্ধে শামিল হওয়ায় গোটা জাতি উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। এই ভূমিকাকে অস্বীকার করা মানে ইতিহাসকে এককেন্দ্রীক করে ফেলা। তবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘ ২৫ বছরের গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম ও আত্মদানের ইতিহাস এবং সেই সব সংগ্রামের নেতৃত্বকে যদি অস্বীকার করা হয় বা ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গণরায়কে গুরুত্ব দেয়া না হয় তাহলেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ফলে জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ে। যার সুযোগ নিয়ে দেশের জন্ম যুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এবারে যদি এসব প্রশ্নে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে পারে, তবে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।

তবে গত বছরের ৫ আগস্ট ইউনূসের ‘জুলাই ঘোষণা’ তে কিন্তু ইতিহাসের চরম বিকৃতি করা হয়েছে। এবং তার পরে ঘোষণা করলেন ‘জুলাই সনদ’। সেখানেও রয়েছে ইতিহাসের বিকৃতি। ইউনূসকে ইতিহাসের বয়ান রচনা করার দায়িত্ব তো দেয়া হয়নি। তবু তিনি তা করলেন এবং দেশের ইতিহাসকে জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেললেন কোন ক্ষমতা বলে? বাংলাদেশের সংগ্রাম মুখর ইতিহাসে তার ভূমিকা কি? অসংখ্য ইতিহাস বিকৃতির এক বয়ান নোবেল লরিয়েট পঠিত ঘোষণাপত্রে উঠে এসেছে- যা নতুন করে বিভাজন সৃষ্টির ঘোষণা হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে। জুলাই সনদ ঘোষণার পরে বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতিহাস বিকৃতির বিষয়ে আপত্তি না জানালেও ভিন্ন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘এটা জনগণের সঙ্গে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের একটা প্রতারণা’। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেয়ার অধিকার প্রধান উপদেষ্টা বা অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। বিশ্বাসভংগ ও প্রতারণা করে আমাদের অগোচরে জুলাই সনদের স্বাক্ষরিত কপি বদলে ফেলা হয়েছে। যা আলোচনা হয়েছে তা সুপারিশে নাই।’

সুতরাং খুব স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী দলের উপর বিতর্কিত জুলাই সনদকে বা জুলাই গণুঅভ্যুত্থান অধ্যাদেশকে আইনি ভিত্তি দেয়ার দায়িত্ব পড়ে না। জুলাই গনঅভ্যুত্থানের জন্য দায়মুক্তি লাগবে কেনো? ’৬৯ ও ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে তো দায়মুক্তি লাগে নাই। তাহলে কি অভ্যুত্থানের আড়ালে এমন কিছু করা হয়েছে যার জন্য দায়মুক্তি লাগবে? দেশি-বিদেশি পত্র-পত্রিকায় ও মিডিয়ায় ‘স্নাইপার শুট’ এবং পুলিশ হত্যা ও অস্ত্র লুট ( যা এখনও জমা পড়েনি বা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি) নিয়ে নানা কথা আসছে। জীবনকে সম্মান জানাতে হবে। সে জীবন আন্দোলনকারীর হোক আর পুলিশেরই হোক। সুতরাং এ বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া দায় মুক্তি কার্যকর করা হলে আইনের প্রতি অবিচার করা হবে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মদানকারীদের পরিবাররা এবং অভ্যুত্থানের পরে মব হামলায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে সহায়তা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগ জারী রাখতে হবে।

জুলাই আন্দোলনে আত্মদানের আবেগকে পুজি করে ‘প্রতিহিংসা মূলক’ জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশকেও আইনি স্বীকৃতি দেয়ার দায় নির্বাচিত সংসদের নেই। জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি রক্ষায় নির্বাচিত সরকার একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে ভারসাম্যপূর্ন একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের স্মৃতি যাদুঘর নির্মাণ করে ’৬৯, ’৯০, ’২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। একটি অনির্বাচিত সরকার যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একপেশে অধ্যাদেশগুলো জারি করেছে, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে পরিবর্তন এনে নির্বাচিত সরকারকেই ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

গত কয়েকদিনে ১/১১-এর অন্যতম কুশিলব লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (অব.) ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মামুন খালেদের গ্রেপ্তারের খবর দেখে মনে পড়লো পশ্চিমা শক্তির উপর নির্ভরশীল ইউনূসও তো ধোয়া তুলসী পাতা নন। তিনি কিন্তু ১/১১-এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ তত্ত্বে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনোভাব পরিবর্তন করায় ঐ ফর্মুলা কার্যকর হবে না বুঝতে পেরে দ্রুত তিনি দল গঠনের প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসেন। ড. ইউনূসকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও ১/১১-এর অনেক রহস্য উদ্ঘাটিত হতে পারে।

ইউনূস পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তার দোস্তির দায় বিএনপির উপর চাপিয়ে দিয়ে গেলেন। নির্বাচনের তিনদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অপ্রকাশযোগ্য যে দেশ বিরোধী চুক্তি তিনি তাড়াহুড়ো করে করলেন তা সামাল দিতে পশ্চিমা পছন্দের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাদের মন্ত্রীসভায় জায়গা করে দিতে হলো। ড. ইউনূস দিল্লির জেন জির থেকে বের হওয়ার ভান করে কৌশলে বাংলাদেশকে আষ্টে পৃষ্ঠে বেধে দিয়ে গেলেন মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে। জামাত ও এনসিপিও আপাতত মার্কিনী স্বার্থের বিরোধী অবস্থানে যাবে না। বরং নানাভাবেই তারা মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ক্ষমতার বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার মোহে।

কিন্তু বিএনপিকে এটা মনে রাখতে হবে ভোটারদের একটা বড় অংশ যারা বিএনপিকে পছন্দ না করলেও ধানের শীষে ভোট দিয়েছে এই আশা নিয়ে যে, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপোষ করবে না। উগ্র ধর্মান্ধ শক্তির কাছে নত হবে না। দেশে আর মব সংস্কৃতির চাষাবাদ করতে দেবে না এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সব রাজনৈতিক দলের স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার পরিবেশকে নিশ্চিত করবে। শুধু ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করে বিএনপি বেশি দিন জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারবে না। এ রকম বহু কার্ড পূর্বের সরকারও বিতরণ করেছে। সরকারকে নজর দিতে হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আর ব্যবসা বানিজ্যে কর্মচঞ্চলতা ফিরিয়ে আনতে। সরকারকে নজরে রাখতে হবে, দীর্ঘ কাল যাবত চলে আসা দখলদারী আর চাঁদাবাজির যে সংস্কৃতি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আস্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে তা থেকে বেরিয়ে এসে কিভাবে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা যায়। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে খণ্ডিতভাবে নয় বরং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ক্যানভাসে ধারণ করতে হবে ’৫২-এর ভাষা সংগ্রাম, ’৬৯, ’৯০, আর ২০২৪-এর স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামকে।

দেশে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনে বিচার বিভাগ সহ-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ অবস্থা থেকে মুক্ত করে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা, সাংবিধানিক পদাধিকারীগণের জন্য স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কমানো ও রাষ্ট্রপতির পদকে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর আজ্ঞাবহ অবস্থা থেকে বের করে আনা এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও পরিবারতন্ত্রের অবসানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা কিন্তু বিমূর্তভাবে হলেও মানুষের মাঝে রয়েছে। নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি তো দীর্ঘদিনের।

সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে এ সব সংস্কারে বিএনপিকে উদ্যোগী হতে হবে। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সংবিধানে এমন কোনো সংযোজন বিয়োজন করে সমাজে বিভাজন ও অস্থিরতা সৃষ্টি করা যাবে না। আদিবাসীসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ নানাবিধ সংস্কার কাজ সামনের দিনগুলোতে রয়েছে।

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

(লেখকের নিজস্ব মত)

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

রোববার, ২৯ মার্চ ২০২৬


’৬৯ আর ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি-ঘর কোথায়

প্রকাশের তারিখ : ২৯ মার্চ ২০২৬

featured Image

অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ নামে তড়িঘড়ি করে একটি অধ্যাদেশ জারি করে গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করার কার্যক্রম শুরু করে। ঐ গণভবনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থাকতেন এবং জুলাই আন্দোলনের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সব কার্যক্রম গণভবন থেকেই পরিচালিত হচ্ছিল। জুলাই আন্দোলনে অগণিত মৃত্যু, চোখ হারানো, পংগু হয়ে পড়া আহতের আর্তনাদ, স্বজনহারা পরিবারের মানুষগুলোর আহাজারি মানুষের বিবেককে স্পর্ষ করেছিল। সেই আবেগকে ব্যবহার করে মুহাম্মদ ইউনূস ‘প্রতিহিংসার বশে’ গণভবনকে জুলাই স্মৃতি যাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিনা। সেটা একটা বড় প্রশ্ন। কিন্তু গণভবন তো শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাড়ি না, এটা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সরকার প্রধানের আবাসিক ভবন। এটা ইউনূস সাহেবের পৈতৃক সম্পত্তি নয় যে, তিনি ইচ্ছা করলেন আর সরকারি সম্পত্তিকে তার ‘স্মৃতির যাদুঘর’ বানিয়ে ফেললেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ঘর থাকতেই পারে। তবে সেটা সরকার প্রধানের বাসভবনের জন্য নির্মিত স্থাপনায় কেনো করতে হবে? বিশেষত সরকার প্রধানের বাসভবনের মত স্পর্শকাতর স্থাপনার জন্য স্থান, জায়গার পরিসর, নিরাপত্তা ইস্যু ইত্যাদি নানা বিষয় বিবেচনা করে তা নির্ধারণ করতে হয়। জুলাই স্মৃতি ঘরের জন্য সেগুলো অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অন্য যেকোনো স্থানেই তা হতে পারে। আর এ দেশটাই তো গণঅভ্যুত্থানের দেশ। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পথ বেয়েই তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের এবং দীর্ঘ সময়ের নামে বেনামে সামরিক শাসনের পতন। ’৬৯ বা ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের জন্য তো পৃথক কোনো স্মৃতি ঘর নাই। তাহলে শুধু ’২৪-এর জন্য আলাদা স্মৃতি ঘর লাগবে কেনো? বরং স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের স্মৃতি যাদুঘর নির্মাণ করে ’৬৯, ’৯০, ’২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। যা থেকে পরবর্তী প্রজন্মসহ সবাই একপেশে বা খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির বদলে দেশ এবং দেশের গণআন্দোলনের বৈচিত্র্যময় নানা পর্ব ও উপাদান সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা পেতে পারেন।

কিন্তু না, মুহাম্মদ ইউনূস ‘ইতিহাসের একক নায়ক’ হতে চান। আর তা হতে হলে মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের সব গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের ক্ষেত্রে তো রিসেট বাটন চাপ দিতে লাগবে। আবার ’২৪-এর জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে উগ্রবাদী ধর্মান্ধ শক্তির উত্থান ঘটেছে, তারাও এদেশের মানুষের গণসংগ্রামের ইতিহাসকে এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী নিজেদের কলঙ্কিত অধ্যায়কে যে কোনো প্রকারে ঢেকে ফেলার গভীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। সে ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই তারা জুলাই ’২৪ দিয়ে ’৭১ কে ঢেকে ফেলার প্রয়াস চালিয়ে আসছে। সে লক্ষ্যেই জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে তারা আঘাত হানে মুক্তিযুদ্ধের সব স্মারক, স্মৃতি, স্তম্ভ ও ভাস্কর্যের ওপর। ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশ্রয়ে একাধিকবার আঘাত হেনে ও অগ্নিসংযোগ করে ধানমন্ডি বত্রিশের ঐতিহাসিক বাড়িটি গুড়িয়ে দেয়া হয়।

আজকের প্রজন্ম ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সম্পর্কে, শহীদদের সম্পর্কে কতটুকু জানেন? জানেন কি ঐ অভ্যুত্থানে কতজন শহীদ হয়েছিলেন? কি ভাবে জানবেন? সারা দেশে ’৬৯-এর অসংখ্য শহীদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা পর্যন্ত করা হয়নি। শহীদদের মধ্যে তরুণ আসাদ, কিশোর মতিউর, রুস্তম, গৃহবধূ আনোয়ারা কিংবা শহীদ ড. শামসুজ্জোহা এরকম কয়েকটি নাম আমরা গণঅভ্যুত্থান দিবসের দিনে শুনতে পাই। 

অথচ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক, কর্মচারী শহীদী মৃত্যুবরণ করেন। নরসিংদীর হাতিরদিয়া ও রায়পুরায় কৃষক এবং ঢাকার আদমজী, ডেমরা, টঙ্গী এবং খুলনার দৌলতপুর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ও আত্মদান আন্দোলনে বিশেষ মাত্রা সৃষ্টি করে।

তৎকালীন ডাকসু, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের উভয় অংশ এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সমন্বয়ে

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ’৬৯-এর জানুয়ারি থেকেই শুরু হয় আন্দোলনের নানা কর্মসূচি। এক পর্যায়ে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের একাংশও এসে মিলিত হয় এ আন্দোলনে। এই আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থী বা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নয়, বরং কৃষকদের মধ্যে, শ্রমিকদের মধ্যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৬৬ সনে সূচিত ছয়দফা দাবিতে যে স্বাধীকার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল তা পূর্ণতা পায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচিতে।

জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী রাজনীতির ঐক্যের ফলে ছাত্র সমাজ ও মেহনতি জনতার মাঝে এক ধরনের একতার বাতাবরণ সৃষ্টি হয়। আন্দোলন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আইউব শাহীর পতনের মধ্য দিয়ে গনঅভ্যুত্থান সফলতা লাভ করে। কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন শেখ মুজিব, মনি সিংহ সহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সেল বলা যেতে পারে। তাই এই ঐতিহাসিক ও গৌরবের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের বিরোধীরা পাশ কাটাতে চায়- যেমনটা তারা বলে বাংলা ভাষা আন্দোলন করা ভুল হয়েছিল। তাদের নেতা গোলাম আজমের স্পষ্ট বয়ান ছিলো, ’মুসলমানদের তমুদ্দীন ও ধর্মীয় জ্ঞানের ভাণ্ডার উর্দু ভাষায় সংরক্ষিত রয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ হইতে ভাষা আন্দোলন করা সঠিক হয় নাই।’

আবার এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে গোলাম আজমের দল কখনও সরবে ও কখনও নীরবে যুক্ত থাকলেও ১৯৯০-এর গনঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বীরত্ব গাঁথা ও আত্মত্যাগকে তারা খুব একটা সামনে আনতে চায় না। কারণ ’৯০ এর গণঅভ্যুত্থান সামনে আসা মানেই অভ্যুত্থানের মশাল জ্বালানো ডা. মিলন, কমরেড তাজুল, পুলিশ কতৃক ট্রাকের চাকায় পিষ্ট ছাত্র নেতা সেলিম, দেলোয়ার, রাউফুন বসুনিয়া, শাহজাহান সিরাজ, এক জটিল পর্বে আসলাম কিংবা ছাত্র কর্মী জয়নাল, জাফর, কান্চন, মোজাম্মেল, জেহাদ, খেতমজুর নেতা টিটো, বা রাজনৈতিক নেতা ময়েজউদ্দীনের আত্মদানের কাহিনী সামনে আসা। ’৯০ কে সামনে আনা মানেই অতি সাধারণ মানুষের হাতে লেখা ও বুকে পিঠে আঁকা ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ হয়ে যায় সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা। শহীদ নূর হোসেন যেন গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতীক।

এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের আয়োজন পর্ব তথা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী গণসংগ্রাম এবং তার সমাপ্তি পর্বের মূল শক্তি ছিলো দেশের গনতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তি। এ অভ্যুত্থানের পথ বেয়েই বিএনপি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও অভ্যুত্থানে শহীদের তালিকা প্রণয়ন ও স্মৃতি সংরক্ষণে বিশেষ কিছু করা হয় নি। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে নতুন সরকারকে এ দায়িত্ব নিতে হবে।

’৬৯ আর ’৯০কে, ’৫২ আর ’৭১ কে উগ্রবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ২০২৪ দিয়ে ঢেকে ফেলার প্রচেষ্টায় উন্মত্ত। ইউনূসও ‘রিসেট বাটন’ টিপে দেশের সব গৌরব গাঁথাকে বিশেষত দেশের মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলার প্রয়াসকে ১৮ মাস যাবত মদত দিয়ে গেলেন। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন সম্পন্ন না হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দেশে এখন একটি নির্বাচিত সরকার। বিজয়ী দল বিএনপি দাবি করে তাদের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ঘোষক’। নিশ্চয়ই ২৫ মার্চের কাল রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নিরস্ত্র জনতার উপর সশস্ত্র আক্রমণ এবং নির্বিচার গনহত্যার পরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার ঘোষণার ঐতিহাসিক মূল্য আছে। বেংগল রেজিমেন্ট তথা বাঙালি সশস্ত্র বাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনতা যুদ্ধে শামিল হওয়ায় গোটা জাতি উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। এই ভূমিকাকে অস্বীকার করা মানে ইতিহাসকে এককেন্দ্রীক করে ফেলা। তবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘ ২৫ বছরের গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম ও আত্মদানের ইতিহাস এবং সেই সব সংগ্রামের নেতৃত্বকে যদি অস্বীকার করা হয় বা ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গণরায়কে গুরুত্ব দেয়া না হয় তাহলেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ফলে জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ে। যার সুযোগ নিয়ে দেশের জন্ম যুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এবারে যদি এসব প্রশ্নে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে পারে, তবে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।

তবে গত বছরের ৫ আগস্ট ইউনূসের ‘জুলাই ঘোষণা’ তে কিন্তু ইতিহাসের চরম বিকৃতি করা হয়েছে। এবং তার পরে ঘোষণা করলেন ‘জুলাই সনদ’। সেখানেও রয়েছে ইতিহাসের বিকৃতি। ইউনূসকে ইতিহাসের বয়ান রচনা করার দায়িত্ব তো দেয়া হয়নি। তবু তিনি তা করলেন এবং দেশের ইতিহাসকে জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেললেন কোন ক্ষমতা বলে? বাংলাদেশের সংগ্রাম মুখর ইতিহাসে তার ভূমিকা কি? অসংখ্য ইতিহাস বিকৃতির এক বয়ান নোবেল লরিয়েট পঠিত ঘোষণাপত্রে উঠে এসেছে- যা নতুন করে বিভাজন সৃষ্টির ঘোষণা হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে। জুলাই সনদ ঘোষণার পরে বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতিহাস বিকৃতির বিষয়ে আপত্তি না জানালেও ভিন্ন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘এটা জনগণের সঙ্গে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের একটা প্রতারণা’। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেয়ার অধিকার প্রধান উপদেষ্টা বা অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। বিশ্বাসভংগ ও প্রতারণা করে আমাদের অগোচরে জুলাই সনদের স্বাক্ষরিত কপি বদলে ফেলা হয়েছে। যা আলোচনা হয়েছে তা সুপারিশে নাই।’

সুতরাং খুব স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী দলের উপর বিতর্কিত জুলাই সনদকে বা জুলাই গণুঅভ্যুত্থান অধ্যাদেশকে আইনি ভিত্তি দেয়ার দায়িত্ব পড়ে না। জুলাই গনঅভ্যুত্থানের জন্য দায়মুক্তি লাগবে কেনো? ’৬৯ ও ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে তো দায়মুক্তি লাগে নাই। তাহলে কি অভ্যুত্থানের আড়ালে এমন কিছু করা হয়েছে যার জন্য দায়মুক্তি লাগবে? দেশি-বিদেশি পত্র-পত্রিকায় ও মিডিয়ায় ‘স্নাইপার শুট’ এবং পুলিশ হত্যা ও অস্ত্র লুট ( যা এখনও জমা পড়েনি বা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি) নিয়ে নানা কথা আসছে। জীবনকে সম্মান জানাতে হবে। সে জীবন আন্দোলনকারীর হোক আর পুলিশেরই হোক। সুতরাং এ বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া দায় মুক্তি কার্যকর করা হলে আইনের প্রতি অবিচার করা হবে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মদানকারীদের পরিবাররা এবং অভ্যুত্থানের পরে মব হামলায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে সহায়তা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগ জারী রাখতে হবে।

জুলাই আন্দোলনে আত্মদানের আবেগকে পুজি করে ‘প্রতিহিংসা মূলক’ জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশকেও আইনি স্বীকৃতি দেয়ার দায় নির্বাচিত সংসদের নেই। জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি রক্ষায় নির্বাচিত সরকার একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে ভারসাম্যপূর্ন একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের স্মৃতি যাদুঘর নির্মাণ করে ’৬৯, ’৯০, ’২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। একটি অনির্বাচিত সরকার যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একপেশে অধ্যাদেশগুলো জারি করেছে, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে পরিবর্তন এনে নির্বাচিত সরকারকেই ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

গত কয়েকদিনে ১/১১-এর অন্যতম কুশিলব লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (অব.) ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মামুন খালেদের গ্রেপ্তারের খবর দেখে মনে পড়লো পশ্চিমা শক্তির উপর নির্ভরশীল ইউনূসও তো ধোয়া তুলসী পাতা নন। তিনি কিন্তু ১/১১-এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ তত্ত্বে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনোভাব পরিবর্তন করায় ঐ ফর্মুলা কার্যকর হবে না বুঝতে পেরে দ্রুত তিনি দল গঠনের প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসেন। ড. ইউনূসকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও ১/১১-এর অনেক রহস্য উদ্ঘাটিত হতে পারে।

ইউনূস পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তার দোস্তির দায় বিএনপির উপর চাপিয়ে দিয়ে গেলেন। নির্বাচনের তিনদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অপ্রকাশযোগ্য যে দেশ বিরোধী চুক্তি তিনি তাড়াহুড়ো করে করলেন তা সামাল দিতে পশ্চিমা পছন্দের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাদের মন্ত্রীসভায় জায়গা করে দিতে হলো। ড. ইউনূস দিল্লির জেন জির থেকে বের হওয়ার ভান করে কৌশলে বাংলাদেশকে আষ্টে পৃষ্ঠে বেধে দিয়ে গেলেন মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে। জামাত ও এনসিপিও আপাতত মার্কিনী স্বার্থের বিরোধী অবস্থানে যাবে না। বরং নানাভাবেই তারা মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ক্ষমতার বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার মোহে।

কিন্তু বিএনপিকে এটা মনে রাখতে হবে ভোটারদের একটা বড় অংশ যারা বিএনপিকে পছন্দ না করলেও ধানের শীষে ভোট দিয়েছে এই আশা নিয়ে যে, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপোষ করবে না। উগ্র ধর্মান্ধ শক্তির কাছে নত হবে না। দেশে আর মব সংস্কৃতির চাষাবাদ করতে দেবে না এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সব রাজনৈতিক দলের স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার পরিবেশকে নিশ্চিত করবে। শুধু ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করে বিএনপি বেশি দিন জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারবে না। এ রকম বহু কার্ড পূর্বের সরকারও বিতরণ করেছে। সরকারকে নজর দিতে হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আর ব্যবসা বানিজ্যে কর্মচঞ্চলতা ফিরিয়ে আনতে। সরকারকে নজরে রাখতে হবে, দীর্ঘ কাল যাবত চলে আসা দখলদারী আর চাঁদাবাজির যে সংস্কৃতি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আস্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে তা থেকে বেরিয়ে এসে কিভাবে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা যায়। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে খণ্ডিতভাবে নয় বরং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ক্যানভাসে ধারণ করতে হবে ’৫২-এর ভাষা সংগ্রাম, ’৬৯, ’৯০, আর ২০২৪-এর স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামকে।

দেশে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনে বিচার বিভাগ সহ-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ অবস্থা থেকে মুক্ত করে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা, সাংবিধানিক পদাধিকারীগণের জন্য স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কমানো ও রাষ্ট্রপতির পদকে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর আজ্ঞাবহ অবস্থা থেকে বের করে আনা এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও পরিবারতন্ত্রের অবসানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা কিন্তু বিমূর্তভাবে হলেও মানুষের মাঝে রয়েছে। নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি তো দীর্ঘদিনের।

সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে এ সব সংস্কারে বিএনপিকে উদ্যোগী হতে হবে। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সংবিধানে এমন কোনো সংযোজন বিয়োজন করে সমাজে বিভাজন ও অস্থিরতা সৃষ্টি করা যাবে না। আদিবাসীসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ নানাবিধ সংস্কার কাজ সামনের দিনগুলোতে রয়েছে।

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

(লেখকের নিজস্ব মত)


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত