সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

ভূমধ্যসাগরে প্রাণহানি

সচ্ছল পরিবারের ছেলেরাও কেন বেছে নিচ্ছেন বিপজ্জনক পথ


লতিফুর রহমান রাজু, সুনামগঞ্জ
লতিফুর রহমান রাজু, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬

 সচ্ছল পরিবারের ছেলেরাও কেন বেছে নিচ্ছেন বিপজ্জনক পথ
ছবি : সংবাদ

ভূমধ্যসাগরে ডুবে সুনামগঞ্জের দিরাই, জগন্নাথপুর ও শাল্লা উপজেলার ১২ জন তরুণের নিহতের ঘটনায় পুরো জেলা জুড়েই শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের আর্তচিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

সবার একই দাবি প্রশাসনের কাছে, যেসব দালালচক্রের মাধ্যমে এই বিপজ্জনক পথে বিভিন্ন দেশে মানুষ পাঠানো হয়, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা হোক, যাতে আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।

দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৪২) পেশায় একজন ব্যবসায়ী। তিনি এক সন্তানের জনক। এলাকায় সচ্ছল পরিবার হিসেবে পরিচিতি থাকলেও কেন উন্নত জীবনের আশায় তিনি এই বিপজ্জনক পথে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করলেন- এখন হিসাব মেলাতে পারছে না পরিবার ও এলাকাবাসী।

মুজিবুরের চার ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই এমরান হোসেন লন্ডন প্রবাসী (বর্তমানে দেশে আছেন)। অপর দুই ভাই একলিম হোসেন ও ফয়জুল হোসেন ফ্রান্সে থাকেন। গ্রামের বাড়িতে জমিজমাও আছে। তার বড় ভাই এমরান হোসেন ও বোন জামাই জানান, তার এভাবে বিদেশ যাওয়ার কোনো প্রয়োজনই ছিল না।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, এমরান কাউকে কিছু না বলে প্রথমে সৌদি আরব যান। সেখানে গিয়ে ফোন করে জানান, তিনি ইউরোপ যাবেন। সেখান থেকে লিবিয়া এবং লিবিয়া থেকে সাগরপথে রাবারের নৌকায় গ্রিস হয়ে ইতালি যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। সাগরের পানিতে ডুবে মরতে হয়েছে তাকে। লাশটিও স্বজনদের দেখানো হয়নি। তার বাড়িতে এখন শোকের মাতম চলছে।

জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউরা হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউরা গ্রামের নিহত নাইমের বাবা দুলন মিয়া ও মা আখি বেগম অনবরত কান্না করছেন। তাদের অভিযোগ, এলাকার ইছগাঁও গ্রামের আজিজুল হকের সঙ্গে ১৩ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী গত জানুয়ারি মাসে তাকে লিবিয়া পাঠানো হয়। কিছুদিন পর আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে দালাল। তখন তার দাবির প্রেক্ষিতে আরও পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু ইতালি পাঠাতে দেরি করতে থাকে দালাল। তাগাদা দিলে শুধু তারিখ দেয়। বলে ‘গেম’ দিয়ে দেবে।

গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে রাবারের নৌকায় করে অনেকের সঙ্গে নাইমও গ্রিস হয়ে ইতালি যাওয়ার জন্য ভূমধ্যসাগরে পাড়ি জমান। সেখানে খাদ্য ও পানির অভাবে তিনি মারা যান। পরিবার জানায়, গত শনিবার তারা খবর পান নাইম আর নেই। তারা নাইমের লাশ চান। সেই সঙ্গে দালালচক্রের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

একই এলাকার চিলাউরা মাঝপাড়া গ্রামের ইজাজুল হক সজীবও নিহত হয়েছেন। তার বাড়িতেও শোকের মাতম চলছে। একই দালালচক্রের মাধ্যমেই তিনিও একই পদ্ধতিতে গিয়ে নিহত হয়েছেন।

চিলাউরা হলদিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম বকুল বলেন, ‘সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে একটি দালালচক্র মানুষকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে বড় অঙ্কের টাকায় এই বিপজ্জনক পথে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে পাঠায়। এটাকে তারা ‘গেম’ বলে। তারা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। অন্যদিকে এভাবেই প্রতিনিয়ত মায়ের বুক খালি হয়। এসব দালালচক্রের সদস্যদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’

দিরাই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সনজিত সরকার তারাপাশা গ্রামের নিহতের বাড়ি পরিদর্শন করেছেন এবং স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি দিরাই উপজেলায় ছয়জনের নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমি ও দিরাই থানার ওসি সাহেব দালালচক্রের তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকেও মামলা দায়ের করলে আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেব।’

পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, ‘দালালচক্রের বিরুদ্ধে আমরা কাজ করছি। তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘যারা নিহত হয়েছেন, বৈধ পথে না যাওয়ায় তাদের তথ্য আমাদের কাছে নেই। তিন উপজেলার ইউএনও নিহতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি দালালচক্রের সদস্যদের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করছেন। আমরা এই সব দালালচক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেব। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

রোববার, ২৯ মার্চ ২০২৬


সচ্ছল পরিবারের ছেলেরাও কেন বেছে নিচ্ছেন বিপজ্জনক পথ

প্রকাশের তারিখ : ২৯ মার্চ ২০২৬

featured Image

ভূমধ্যসাগরে ডুবে সুনামগঞ্জের দিরাই, জগন্নাথপুর ও শাল্লা উপজেলার ১২ জন তরুণের নিহতের ঘটনায় পুরো জেলা জুড়েই শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের আর্তচিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

সবার একই দাবি প্রশাসনের কাছে, যেসব দালালচক্রের মাধ্যমে এই বিপজ্জনক পথে বিভিন্ন দেশে মানুষ পাঠানো হয়, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা হোক, যাতে আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।

দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৪২) পেশায় একজন ব্যবসায়ী। তিনি এক সন্তানের জনক। এলাকায় সচ্ছল পরিবার হিসেবে পরিচিতি থাকলেও কেন উন্নত জীবনের আশায় তিনি এই বিপজ্জনক পথে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করলেন- এখন হিসাব মেলাতে পারছে না পরিবার ও এলাকাবাসী।

মুজিবুরের চার ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই এমরান হোসেন লন্ডন প্রবাসী (বর্তমানে দেশে আছেন)। অপর দুই ভাই একলিম হোসেন ও ফয়জুল হোসেন ফ্রান্সে থাকেন। গ্রামের বাড়িতে জমিজমাও আছে। তার বড় ভাই এমরান হোসেন ও বোন জামাই জানান, তার এভাবে বিদেশ যাওয়ার কোনো প্রয়োজনই ছিল না।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, এমরান কাউকে কিছু না বলে প্রথমে সৌদি আরব যান। সেখানে গিয়ে ফোন করে জানান, তিনি ইউরোপ যাবেন। সেখান থেকে লিবিয়া এবং লিবিয়া থেকে সাগরপথে রাবারের নৌকায় গ্রিস হয়ে ইতালি যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। সাগরের পানিতে ডুবে মরতে হয়েছে তাকে। লাশটিও স্বজনদের দেখানো হয়নি। তার বাড়িতে এখন শোকের মাতম চলছে।

জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউরা হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউরা গ্রামের নিহত নাইমের বাবা দুলন মিয়া ও মা আখি বেগম অনবরত কান্না করছেন। তাদের অভিযোগ, এলাকার ইছগাঁও গ্রামের আজিজুল হকের সঙ্গে ১৩ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী গত জানুয়ারি মাসে তাকে লিবিয়া পাঠানো হয়। কিছুদিন পর আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে দালাল। তখন তার দাবির প্রেক্ষিতে আরও পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু ইতালি পাঠাতে দেরি করতে থাকে দালাল। তাগাদা দিলে শুধু তারিখ দেয়। বলে ‘গেম’ দিয়ে দেবে।

গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে রাবারের নৌকায় করে অনেকের সঙ্গে নাইমও গ্রিস হয়ে ইতালি যাওয়ার জন্য ভূমধ্যসাগরে পাড়ি জমান। সেখানে খাদ্য ও পানির অভাবে তিনি মারা যান। পরিবার জানায়, গত শনিবার তারা খবর পান নাইম আর নেই। তারা নাইমের লাশ চান। সেই সঙ্গে দালালচক্রের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

একই এলাকার চিলাউরা মাঝপাড়া গ্রামের ইজাজুল হক সজীবও নিহত হয়েছেন। তার বাড়িতেও শোকের মাতম চলছে। একই দালালচক্রের মাধ্যমেই তিনিও একই পদ্ধতিতে গিয়ে নিহত হয়েছেন।

চিলাউরা হলদিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম বকুল বলেন, ‘সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে একটি দালালচক্র মানুষকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে বড় অঙ্কের টাকায় এই বিপজ্জনক পথে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে পাঠায়। এটাকে তারা ‘গেম’ বলে। তারা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। অন্যদিকে এভাবেই প্রতিনিয়ত মায়ের বুক খালি হয়। এসব দালালচক্রের সদস্যদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’

দিরাই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সনজিত সরকার তারাপাশা গ্রামের নিহতের বাড়ি পরিদর্শন করেছেন এবং স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি দিরাই উপজেলায় ছয়জনের নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমি ও দিরাই থানার ওসি সাহেব দালালচক্রের তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকেও মামলা দায়ের করলে আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেব।’

পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, ‘দালালচক্রের বিরুদ্ধে আমরা কাজ করছি। তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘যারা নিহত হয়েছেন, বৈধ পথে না যাওয়ায় তাদের তথ্য আমাদের কাছে নেই। তিন উপজেলার ইউএনও নিহতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি দালালচক্রের সদস্যদের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করছেন। আমরা এই সব দালালচক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেব। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত