ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করেছে বিএনপি। জেন-জি তথা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে যে অস্থিরতা বিরাজ করছিল, এই বিজয়ের মাধ্যমে সেখানে স্থিতিশীলতা ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারকে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগোতে হচ্ছে।
টানা ২০ বছর পর ক্ষমতায় ফিরেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দলটি।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রীর
দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতার স্বাদ পেলেও
সরকার খুব একটা স্বস্তিতে নেই বলে মনে করছে সচেতন মহল। নতুন সরকারকে দল গোছানো, সামষ্টিক
অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের মতো বিশাল ও জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
করতে হচ্ছে।
সাংগঠনিক স্থবিরতা ও নেতৃত্বের শূন্যতা
দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসার মাত্র এক মাসের মাথায় এক
জটিল সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিএনপি। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকায় এবং অসংখ্য
মামলার চাপে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি আগে থেকেই কিছুটা দুর্বল ছিল। সরকার গঠনের পর
দলটির সাংগঠনিক অবস্থা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দলের শীর্ষ নেতাদের বড় অংশ মন্ত্রিসভায়
দায়িত্ব নেওয়ায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যস্ত থাকায় সাংগঠনিক নেতৃত্বে এক ধরনের শূন্যতা
ও দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
সূত্র বলছে, মূল দল বিএনপির কাউন্সিল নেই ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কমিটি নেই প্রায় ১৩ বছর ধরে। ৬ সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি
দিয়ে দুই বছর ধরে চলছে যুবদল। এছাড়া মেয়াদহীন কমিটি দিয়ে চলছে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক
দল, মহিলা দল, তাঁতী দল এবং কৃষক দল। এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অনেক জায়গায় এখনো
পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি।
বিএনপি এখন ক্ষমতায় থাকলেও মাঠপর্যায়ের অনেক সক্রিয় কর্মীর নামে
থাকা মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়নি। এই আইনি জটিলতার কারণে অনেক যোগ্য নেতা এখনো রাজনীতিতে
পূর্ণ উদ্যমে ফিরতে পারছেন না। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের পর বিদ্রোহী ও পরাজিত প্রার্থীদের
অনুসারীদের মধ্যে বিরোধ প্রকট হয়েছে। অনেক এলাকায় নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি হওয়ায়
সাধারণ নেতা-কর্মীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
দলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম
আলমগীর বলেন, দলের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং তা ছোট পরিসরে চলছে। দলের অনেক
অভিজ্ঞ সদস্য এখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন, ফলে সেই শূন্যস্থানগুলো পূরণ করতে
সময় লাগছে। তবে শিঘ্রই বিএনপির হাইকমান্ড বিশেষ বৈঠকে বসে দলকে নতুন করে শক্তিশালী
করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী
এবং জটিল চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির সামষ্টিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। আওয়ামী লীগ প্রশাসনের
হর্তাকর্তারা পালিয়ে যাওয়ার পর অর্থনীতির ভঙ্গুর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি নিয়ে সংকট বাড়ছে। প্রায় এক মাস ধরে অতি
গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিও বন্ধ।
এছাড়া খেলাপি ঋণ, লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে সরকারি ব্যাংকগুলো
নাজুক হয়ে পড়েছে। উচ্চ ব্যাংক-সুদের কারণে ধুঁকছে বিনিয়োগ খাত। যার স্পষ্ট নেতিবাচক
প্রভাব পড়েছে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান তৈরির প্রক্রিয়ায়। বিদেশি ঋণের বোঝাও দেশের
কাঁধে ঝুলছে এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি সচল রেখে এসব ঋণের কিস্তি চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া ফ্যামিলি
কার্ড, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি এবং সামাজিক সুরক্ষায়
সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। এসব বাস্তবায়ন করতে সরকারের বিপুল অর্থের প্রয়োজন।
ফলে দায়িত্ব নেওয়ার সাথে সাথে সরকারকে এক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলছেন, ঈদ পরবর্তী অফিস-আদালত
এবং শিল্প-কারখানাগুলো পূর্ণ শক্তিতে চালু হওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুতের চাহিদা কয়েকগুণ
বেড়ে যাবে। এছাড়া কৃষি উৎপাদনে সার ও সেচের জন্য জ্বালানি তেলের চাহিদাও বাড়বে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ
মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনই
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এরই মধ্যে জ্বালানির বিকল্প
উৎস অনুসন্ধান, সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি সংগ্রহের মত প্রস্তুতি
সরকার নিচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও কাঠামোগত সংস্কার
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সই হওয়া বিভিন্ন চুক্তি, সংস্কার, জুলাই
সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিও নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
৬৮.০৬ শতাংশ ভোটার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে রায় দিয়েছে। গণভোটে ভোটাররা সংস্কারের পক্ষে
রায় দিলেও বিএনপি বেশ কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে রেখেছে।
বিএনপি উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন চায় সংসদে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে,
কিন্তু জামায়াত-এনসিপি চায় প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে, যা নিয়ে রাজনৈতিক সংকট হতে পারে।
নির্বাচনে জামায়াতের বড় ধরনের উত্থান হয়েছে এবং তারা অতীতের তুলনায়
বহুগুণ বেশি আসন পেয়েছে। ঢাকার দুই সিটিতে ১৫টি আসনের সাতটিই জামায়াত ও এনসিপি পেয়েছে।
জামায়াত ও এনসিপির কয়েকজন নেতা এরইমধ্যে ছায়া সরকার গঠনের কথা
বলেছেন, যার মাধ্যমে তারা সরকারকে জবাবদিহিতা ও প্রশ্নের মুখে রাখতে চায়।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বা প্রশাসনে যেসব নিয়োগ হয়েছে, সেগুলো পুরোপুরি
দলের লোক দিয়ে করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে জুলাই সনদের
আকাক্সক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, জনস্বার্থ রক্ষা ও কূটনীতি
সরকার গঠনের পর দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা বিএনপির জন্য
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, সরকার গঠনের পর দলকে গোছানো
বা নিয়ন্ত্রণে রাখাই হবে বিএনপি সরকারের বড় কাজ।
সাধারণ মানুষের কাছে বড় ব্যাপার হলো দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ
করা এবং তারা এর অবসান চায়। ১৭ বছর ধরে চলা রাজনৈতিক কালচারের অবসান চায় মানুষ।
বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, যদি
চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ না হয় তবে মানুষ বিএনপিকে ভোট দিলো কেন, তাই আইনের অনুশাসন
প্রতিষ্ঠা করতেই হবে।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় রাষ্ট্রের প্রায় সব খাতে
দলীয় কর্মী নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো সেবার পরিবর্তে রাজনৈতিক কার্যালয়ে পরিণত করা
হয়েছিল। সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাটাও বিএনপির জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর নতুন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র,
পাকিস্তান এবং চীনকে সন্তুষ্ট রেখে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা নতুন সরকারের
জন্য আরও একটি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচিত
সরকার হিসেবে দেশের মানুষের বিপুল প্রত্যাশা পূরণের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক
রূপান্তর কতটা টেকসই হবে। নাগরিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে
সঠিক পথে চালিত করতে পারলে বিএনপি এই সাময়িক স্থবিরতা কাটিয়ে সুসংগঠিত শক্তিতে পরিণত
হতে পারবে।

সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ মার্চ ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করেছে বিএনপি। জেন-জি তথা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে যে অস্থিরতা বিরাজ করছিল, এই বিজয়ের মাধ্যমে সেখানে স্থিতিশীলতা ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারকে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগোতে হচ্ছে।
টানা ২০ বছর পর ক্ষমতায় ফিরেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দলটি।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রীর
দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতার স্বাদ পেলেও
সরকার খুব একটা স্বস্তিতে নেই বলে মনে করছে সচেতন মহল। নতুন সরকারকে দল গোছানো, সামষ্টিক
অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের মতো বিশাল ও জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
করতে হচ্ছে।
সাংগঠনিক স্থবিরতা ও নেতৃত্বের শূন্যতা
দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসার মাত্র এক মাসের মাথায় এক
জটিল সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিএনপি। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকায় এবং অসংখ্য
মামলার চাপে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি আগে থেকেই কিছুটা দুর্বল ছিল। সরকার গঠনের পর
দলটির সাংগঠনিক অবস্থা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দলের শীর্ষ নেতাদের বড় অংশ মন্ত্রিসভায়
দায়িত্ব নেওয়ায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যস্ত থাকায় সাংগঠনিক নেতৃত্বে এক ধরনের শূন্যতা
ও দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
সূত্র বলছে, মূল দল বিএনপির কাউন্সিল নেই ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কমিটি নেই প্রায় ১৩ বছর ধরে। ৬ সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি
দিয়ে দুই বছর ধরে চলছে যুবদল। এছাড়া মেয়াদহীন কমিটি দিয়ে চলছে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক
দল, মহিলা দল, তাঁতী দল এবং কৃষক দল। এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অনেক জায়গায় এখনো
পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি।
বিএনপি এখন ক্ষমতায় থাকলেও মাঠপর্যায়ের অনেক সক্রিয় কর্মীর নামে
থাকা মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়নি। এই আইনি জটিলতার কারণে অনেক যোগ্য নেতা এখনো রাজনীতিতে
পূর্ণ উদ্যমে ফিরতে পারছেন না। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের পর বিদ্রোহী ও পরাজিত প্রার্থীদের
অনুসারীদের মধ্যে বিরোধ প্রকট হয়েছে। অনেক এলাকায় নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি হওয়ায়
সাধারণ নেতা-কর্মীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
দলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম
আলমগীর বলেন, দলের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং তা ছোট পরিসরে চলছে। দলের অনেক
অভিজ্ঞ সদস্য এখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন, ফলে সেই শূন্যস্থানগুলো পূরণ করতে
সময় লাগছে। তবে শিঘ্রই বিএনপির হাইকমান্ড বিশেষ বৈঠকে বসে দলকে নতুন করে শক্তিশালী
করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী
এবং জটিল চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির সামষ্টিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। আওয়ামী লীগ প্রশাসনের
হর্তাকর্তারা পালিয়ে যাওয়ার পর অর্থনীতির ভঙ্গুর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি নিয়ে সংকট বাড়ছে। প্রায় এক মাস ধরে অতি
গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিও বন্ধ।
এছাড়া খেলাপি ঋণ, লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে সরকারি ব্যাংকগুলো
নাজুক হয়ে পড়েছে। উচ্চ ব্যাংক-সুদের কারণে ধুঁকছে বিনিয়োগ খাত। যার স্পষ্ট নেতিবাচক
প্রভাব পড়েছে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান তৈরির প্রক্রিয়ায়। বিদেশি ঋণের বোঝাও দেশের
কাঁধে ঝুলছে এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি সচল রেখে এসব ঋণের কিস্তি চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া ফ্যামিলি
কার্ড, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি এবং সামাজিক সুরক্ষায়
সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। এসব বাস্তবায়ন করতে সরকারের বিপুল অর্থের প্রয়োজন।
ফলে দায়িত্ব নেওয়ার সাথে সাথে সরকারকে এক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলছেন, ঈদ পরবর্তী অফিস-আদালত
এবং শিল্প-কারখানাগুলো পূর্ণ শক্তিতে চালু হওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুতের চাহিদা কয়েকগুণ
বেড়ে যাবে। এছাড়া কৃষি উৎপাদনে সার ও সেচের জন্য জ্বালানি তেলের চাহিদাও বাড়বে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ
মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনই
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এরই মধ্যে জ্বালানির বিকল্প
উৎস অনুসন্ধান, সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি সংগ্রহের মত প্রস্তুতি
সরকার নিচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও কাঠামোগত সংস্কার
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সই হওয়া বিভিন্ন চুক্তি, সংস্কার, জুলাই
সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিও নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
৬৮.০৬ শতাংশ ভোটার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে রায় দিয়েছে। গণভোটে ভোটাররা সংস্কারের পক্ষে
রায় দিলেও বিএনপি বেশ কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে রেখেছে।
বিএনপি উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন চায় সংসদে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে,
কিন্তু জামায়াত-এনসিপি চায় প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে, যা নিয়ে রাজনৈতিক সংকট হতে পারে।
নির্বাচনে জামায়াতের বড় ধরনের উত্থান হয়েছে এবং তারা অতীতের তুলনায়
বহুগুণ বেশি আসন পেয়েছে। ঢাকার দুই সিটিতে ১৫টি আসনের সাতটিই জামায়াত ও এনসিপি পেয়েছে।
জামায়াত ও এনসিপির কয়েকজন নেতা এরইমধ্যে ছায়া সরকার গঠনের কথা
বলেছেন, যার মাধ্যমে তারা সরকারকে জবাবদিহিতা ও প্রশ্নের মুখে রাখতে চায়।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বা প্রশাসনে যেসব নিয়োগ হয়েছে, সেগুলো পুরোপুরি
দলের লোক দিয়ে করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে জুলাই সনদের
আকাক্সক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, জনস্বার্থ রক্ষা ও কূটনীতি
সরকার গঠনের পর দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা বিএনপির জন্য
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, সরকার গঠনের পর দলকে গোছানো
বা নিয়ন্ত্রণে রাখাই হবে বিএনপি সরকারের বড় কাজ।
সাধারণ মানুষের কাছে বড় ব্যাপার হলো দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ
করা এবং তারা এর অবসান চায়। ১৭ বছর ধরে চলা রাজনৈতিক কালচারের অবসান চায় মানুষ।
বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, যদি
চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ না হয় তবে মানুষ বিএনপিকে ভোট দিলো কেন, তাই আইনের অনুশাসন
প্রতিষ্ঠা করতেই হবে।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় রাষ্ট্রের প্রায় সব খাতে
দলীয় কর্মী নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো সেবার পরিবর্তে রাজনৈতিক কার্যালয়ে পরিণত করা
হয়েছিল। সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাটাও বিএনপির জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর নতুন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র,
পাকিস্তান এবং চীনকে সন্তুষ্ট রেখে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা নতুন সরকারের
জন্য আরও একটি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচিত
সরকার হিসেবে দেশের মানুষের বিপুল প্রত্যাশা পূরণের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক
রূপান্তর কতটা টেকসই হবে। নাগরিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে
সঠিক পথে চালিত করতে পারলে বিএনপি এই সাময়িক স্থবিরতা কাটিয়ে সুসংগঠিত শক্তিতে পরিণত
হতে পারবে।

আপনার মতামত লিখুন