সারাদেশে হঠাৎ শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়া নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘হাম দেশে ছিল, তবে নির্মূল হয়নি। এখন হঠাৎ বাড়ছে। আর দাতা দেশগুলো অর্থ সাহায্য বন্ধ করে দেয়ায় টিকার উৎপাদন কমে গেছে। এতে টিকা সংকট বিরাজ করছে। সামনে আরও সংকট হবে। আগে ব্যাপক হারে টিকা দিলেও এখন তা আগের চেয়ে কম।’
অন্য একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, হাম সংক্রমণ আবার মায়ানমার সীমান্তের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম আক্রান্ত হয়েছে। ধারণাকরা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে হাম সংক্রমণ ভাইরাস করোনর মতো দেশে আক্রান্ত হতে পারে। এমন তথ্য উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর অক্রান্তহীন কেউ সীমান্ত দিয়ে করোনাভাইরাসের মতো দেশে আসার কারণে হয়তো হাম ছড়িয়ে পড়তে পারে।
একজন সিনিয়র ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ ও হাম নির্মূল কমিটির শিক্ষক বলেন, হামের চিকিৎসায় মহাখালীতে একটি সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতাল আছে। জাতীয়ভাবে এ ধরনের কোনো সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতাল বা ইনস্টিটিউট নেই। থাকলে ভালো হতো।
আর ইপপিআই টিকা বা ভ্যাকসিন প্রকল্পে আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী আর্থিকভাবে সহায়তা করতো। তা নিয়ে টিকা প্রজেক্ট চলতো। তবে মার্কিন প্রশাসন সম্প্রতি অর্থ দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। যার কারণে টিকা বা ভ্যাকসিন সংকট আরও বাড়বে। ভ্যাকসিনের অভাবে শিশুদের টিকা দেয়া কষ্টকর। তবে আট বছর নয়, সময় কম হবে। ৯ মাসে শিশুদের টিকা দেয়া হতো। আগে এলাকাভিত্তিক টিকা দিলেও কিছুদিন ধরে টিকার অভাবের কারণে তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
হাম নির্মূল সম্পর্কে সিনিয়র ভাইরোলজিস্ট ও বাংলাদেশে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডা. সাইফউল্লাহ মুন্সী বলেন, হাম একবারে নির্মূল হয়নি, তবে কমছিল। আর সীমান্ত দিয়ে হাম সংক্রমণের ভাইরাস দেশে আসা নিয়ে তিনি বলেন, এটা দেশেই ছিল। এখন হঠাৎ করে বাড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, ভ্যাকসিন তৈরিতে যারা ডোনেশন দিতো। তারা এখন অর্থ দেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি নিজেই হাম নির্মূল কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মন্তব্য করেন।
ইপিআইয়েরন টিকা প্রজেক্টে হাম ছাড়াও অন্যান্য টিকা বা ভ্যাকসিন তৈরি করা হতো। শিশুদের এ টিকা দেয়া হতো। তার মতে সামনে টিকা সংকট আরও বাড়বে বলে এ বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন। একজন আইসিইউ বিশেষজ্ঞ বলেন, করোনাভাইরাসের সময় সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর বাড়ানো হয়েছে। অন্তর্র্বতী সরকারের দেড় বছরে তা নিয়ে কেউ গরজও করেনি। এসব যন্ত্রপাতি সচল আছে কিনাও তাও খোঁজ নেয়া হয়নি। এখন হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় আবার আইসিইউ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
তার মতে, হামের ভাইরাস দেশেই ছিল। আবার সীমান্ত দিয়ে আসতেও পারে। সীমান্তে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাম ও ডিপথেরিয়া আক্রান্ত হচ্ছে। ওই সময় থেকে দেশে সতর্ক করলে পরিস্থিতির এত অবনতি হতো না। আক্রান্ত ও মৃত্যু কম থাকত বলে মন্তব্য করেন।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানালেন, গত ৮ বছর দেশে অতি সংক্রামক এ রোগের টিকাই দেয়া হয়নি। নতুন করে হামের টিকা কিনতে বর্তমান সরকার ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক ওষুধ শিল্প মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, ‘মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। এরপর ভ্যাকসিন কোনো গভার্নমেন্ট দেয় নাই।’ ‘আমরা কিন্তু এরমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। পারচেজ কমিটি পাস হয়েছে। ভ্যাকসিন আমরা যথাসময়ে কালেকশন করবো এবং স্টার্ট করবো।’
শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হয়। অন্যদিকে ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস বয়স থেকে ১০ বছরের সব শিশুকে টিকা দেয়া হয়। টিকা কর্মসূচির কারণে দেশে হামের প্রকোপ কমে এসেছিল। কিন্তু এ বছর তা নতুন করে বেড়েছে।
চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হামের রোগী শনাক্ত হয়। ১০ জানুয়ারি ক্যাম্প এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়। ওই সময় রাজধানীর বস্তি এলাকায় হামের রোগী বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এর আগে, গত শুক্রবার রাজধানীর মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় শয্যার চেয়ে রোগী বেশি। তাদের বড় অংশই হামের রোগী। হামের রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা দিতে ‘সব ধরনের প্রস্তুতি; নেয়ার কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ আমাদের ঢাকাতে ডিএনসিসি ওয়ার্ড সব রেডি করা হয়েছে। আইসিইউ রেডি করা হয়েছে।’
‘সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসিইউ রেডি করা হয়েছে, উইথ ভেন্টিলেটর। শিশু হাসপাতালে করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলে করা হয়েছে। মানিকগঞ্জ ৮ ইউনিটে করা হয়েছে। ডিএনসিসিতে করা হয়েছে। নর্থ বেঙ্গলে করা হয়েছে।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) জায়গা না পেয়ে একাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার পর সরকার পাঁচটি ভেন্টিলেটর দান পেয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আজকে (গতকাল) আমরা সেগুলো কালেক্ট করবো। আগামীকাল (আজ) সকালে আমাদের সচিব রাজশাহী যাচ্ছেন, উনি চারটে নিয়ে যাবেন ওখানে; ওখানে দিয়ে আসবেন।’
ওষুধ প্রস্তুতকারকরা কিছুদিনের মধ্যে আরও ১২টির বেশি ভেন্টিলেটর সরকারকে ‘সরবারহ করবে’ জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এসব ভেন্টিলেটর মের বিরুদ্ধের লড়াই চালাতে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করবে।
হাম ও জলবসন্ত সম্পর্কে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যোগাযোগ করলে কন্ট্রোল থেকে বলা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর সারাদেশের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের তথ্য পাওয়ার পর গণমাধ্যমে জানানো হবে। এখনও তারা কাজই শুরু করেনি। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে উচ্চপর্যায়ে মিটিং হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন শিশুরা হাম ও জলবসন্তে আক্রান্ত হচ্ছে। রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, আবার মারাও যাচ্ছে।
রাজশাহীতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও হাসপাতালে আইসিইউসহ অন্যান্য সমস্যার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। মহাখালী সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতালে শিশু হামের রোগী বাড়ছে। এর আগে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও আইসিইউর সমস্যার কারণে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে হামের রোগীর উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মহাখালী রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন সংবাদকে বলেন, হামের রোগী বাড়ছে। এসব রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হবে।
গরিব রোগীদের বাড়ি খুঁজে বের করে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। না হয় সংক্রমণ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হাম থেকে নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য জটিলতা বাড়তে পারে। তাই আইসিইউতে রাখার ব্যবস্থা লাগতে পারে। তার জন্য আগাম উদ্যোগ নিয়ে রাখতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজধানীর শ্যামলী টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, হামে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। তারা মহাখালী সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালে বা ডাক্তারের চেম্বারে যোগাযোগ করে চিকিৎসা গাইডলাইন দিচ্ছেন। আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের নেয়ার পরামর্শ নেয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আমাদের ময়মনসিংহ জেলা বার্তা পরিবেশক জানান, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১২ দিনে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুই শিশু ও গত শনিবার বিকেলে ও রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন শিশুর মৃত্যু হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার রাত ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে ৬ মাস বয়সী নুরুন্নবী নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। শিশুটি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার আয়নাল হকের ছেলে। গতকাল বিকেল পৌনে ৫টার দিকে ভর্তির পরপরই মৃত্যু হয় শিশুটির।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরগোবদিয়া গ্রামের আবদুর রহিমের সাত মাস বয়সী ছেলে শিশু লিয়নকে নিয়ে গত ২৭ মার্চ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তার মৃত্যু হয়। আব্দুর রহিম জানান, ঈদের আগে নিউমোনিয়া নিয়ে ৫ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। বাড়িতে আনার পর হাম বের হলে আবার হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরে গতকাল বিকেলে আমার একমাত্র ছেলের মৃত্যু হয়েছে। জামালপুর থেকে আসা এক রোগী জানান, ঈদের দিন সকালে তার শিশুর জ্বরসহ আরও কিছু উপসর্গ নিয়ে এ হাসপাতালে আসলে তার শরীরে হাম রেশ দেখে চিকিৎসক তাকে ভর্তির পরামর্শ দেন। সেই থেকে এখনও তিনি হাসপাতালে আছেন। তিনি জানান, আমি থাকতেই কয়েকদিনের মধ্যে অনেক শিশু এ রোগ নিয়ে ভর্তি হয়।
হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গেছে, গতকাল বিকেল ৪টা পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে ৬৬ শিশু ভর্তি রয়েছে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত নতুন আরও ৫ শিশু ভর্তি হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি সামলাতে গত ২৪ মার্চ হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য তিনটি পৃথক মেডিকেল টিম গঠন করে হাসপাতাল প্রশাসন। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের তিনটি পৃথক কক্ষ করা হয় হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য। ‘হাম বা মিসেলস কর্নার’ নামে ১০ শয্যাবিশিষ্ট কক্ষগুলোতে একটি মেডিকেল টিমের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে শিশুদের। তবে কক্ষগুলোতেও রোগী সংকুলান হচ্ছে না। চলতি ১৮ মার্চ থেকে হাম আক্রান্ত রোগীদের তথ্য হাসপাতালে পৃথকভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাহমুদুল হাসান জানান, হাম আক্রান্ত হয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। তবে ভাইরাসজনিত হওয়ায় রোগীর হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাস দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বর্তমানে এ রোগটির প্রাদুর্ভাব বাড়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন গত দুই থেকে আড়াই বছরে দেশের বিভিন্ন সামাজিক অস্থিরতার কারণে টিকাদান কর্মসূচি ব্যহত হয়েছে। এই কারনেই হাম রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।
হামের জটিলতা থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখে, মাথায় প্রদাহসহ বিভিন্ন রোগে শিশুরা আক্রান্ত হয় ও সঙ্গে যদি শিশুর অন্য কোনো জটিল রোগ দেখা দেয় তখন এই শিশুর মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বেশি সর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যেও নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য লক্ষণ রয়েছে। তবে এ রোগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এর সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠে। তিনি আরও জানান, রোগীর চাপ বাড়ায় গতকাল থেকে হাসপাতালে ৮ তলায় আলাদা ‘হাম আইসোলেশন’ নামে নতুন ইউনিট চালু করছি। আশা করছি সেখান থেকে হাম আক্রান্ত রোগীরা আরও ভালো ও বেশি চিকিৎসা সেবা পাবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকাসহ বেশকিছু জেলায় হুট করেই শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে, যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, সারাদেশেই শিশুরা এ রোগের আক্রান্ত হচ্ছে।
দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৯-১৫ মাস বয়সী শিশুরা এই রোগের টিকা পাওয়ার পরেও কেন এই সময় আবার রোগটির প্রবণতা বাড়ছে, সেই আলোচনা জোরদার হচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, টিকা দেয়ার পরেও অনেক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগের। কারণ ব্যাপক ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত এই রোগটি আক্রান্ত শিশুর জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। তবে এবার আক্রান্ত রোগীদের উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে এবং তাতে তারা সুস্থ হচ্ছেন বলেও বলছেন তারা।
ওদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, তারা আগামী জুলাই-আগস্টে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশজুড়ে শিশুদের হামের টিকা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
‘ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন চলে আসছে। আরও যা যা লাগবে সেটি টিকার জন্য গঠিত বৈশ্বিক জোট গ্যাভিকে অবহিত করা হয়েছে। তারা মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ২ কোটি সিরিঞ্জ দিবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানিয়েছেন।

সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ মার্চ ২০২৬
সারাদেশে হঠাৎ শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়া নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘হাম দেশে ছিল, তবে নির্মূল হয়নি। এখন হঠাৎ বাড়ছে। আর দাতা দেশগুলো অর্থ সাহায্য বন্ধ করে দেয়ায় টিকার উৎপাদন কমে গেছে। এতে টিকা সংকট বিরাজ করছে। সামনে আরও সংকট হবে। আগে ব্যাপক হারে টিকা দিলেও এখন তা আগের চেয়ে কম।’
অন্য একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, হাম সংক্রমণ আবার মায়ানমার সীমান্তের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম আক্রান্ত হয়েছে। ধারণাকরা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে হাম সংক্রমণ ভাইরাস করোনর মতো দেশে আক্রান্ত হতে পারে। এমন তথ্য উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর অক্রান্তহীন কেউ সীমান্ত দিয়ে করোনাভাইরাসের মতো দেশে আসার কারণে হয়তো হাম ছড়িয়ে পড়তে পারে।
একজন সিনিয়র ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ ও হাম নির্মূল কমিটির শিক্ষক বলেন, হামের চিকিৎসায় মহাখালীতে একটি সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতাল আছে। জাতীয়ভাবে এ ধরনের কোনো সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতাল বা ইনস্টিটিউট নেই। থাকলে ভালো হতো।
আর ইপপিআই টিকা বা ভ্যাকসিন প্রকল্পে আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী আর্থিকভাবে সহায়তা করতো। তা নিয়ে টিকা প্রজেক্ট চলতো। তবে মার্কিন প্রশাসন সম্প্রতি অর্থ দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। যার কারণে টিকা বা ভ্যাকসিন সংকট আরও বাড়বে। ভ্যাকসিনের অভাবে শিশুদের টিকা দেয়া কষ্টকর। তবে আট বছর নয়, সময় কম হবে। ৯ মাসে শিশুদের টিকা দেয়া হতো। আগে এলাকাভিত্তিক টিকা দিলেও কিছুদিন ধরে টিকার অভাবের কারণে তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
হাম নির্মূল সম্পর্কে সিনিয়র ভাইরোলজিস্ট ও বাংলাদেশে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডা. সাইফউল্লাহ মুন্সী বলেন, হাম একবারে নির্মূল হয়নি, তবে কমছিল। আর সীমান্ত দিয়ে হাম সংক্রমণের ভাইরাস দেশে আসা নিয়ে তিনি বলেন, এটা দেশেই ছিল। এখন হঠাৎ করে বাড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, ভ্যাকসিন তৈরিতে যারা ডোনেশন দিতো। তারা এখন অর্থ দেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি নিজেই হাম নির্মূল কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মন্তব্য করেন।
ইপিআইয়েরন টিকা প্রজেক্টে হাম ছাড়াও অন্যান্য টিকা বা ভ্যাকসিন তৈরি করা হতো। শিশুদের এ টিকা দেয়া হতো। তার মতে সামনে টিকা সংকট আরও বাড়বে বলে এ বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন। একজন আইসিইউ বিশেষজ্ঞ বলেন, করোনাভাইরাসের সময় সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর বাড়ানো হয়েছে। অন্তর্র্বতী সরকারের দেড় বছরে তা নিয়ে কেউ গরজও করেনি। এসব যন্ত্রপাতি সচল আছে কিনাও তাও খোঁজ নেয়া হয়নি। এখন হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় আবার আইসিইউ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
তার মতে, হামের ভাইরাস দেশেই ছিল। আবার সীমান্ত দিয়ে আসতেও পারে। সীমান্তে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাম ও ডিপথেরিয়া আক্রান্ত হচ্ছে। ওই সময় থেকে দেশে সতর্ক করলে পরিস্থিতির এত অবনতি হতো না। আক্রান্ত ও মৃত্যু কম থাকত বলে মন্তব্য করেন।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানালেন, গত ৮ বছর দেশে অতি সংক্রামক এ রোগের টিকাই দেয়া হয়নি। নতুন করে হামের টিকা কিনতে বর্তমান সরকার ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক ওষুধ শিল্প মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, ‘মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। এরপর ভ্যাকসিন কোনো গভার্নমেন্ট দেয় নাই।’ ‘আমরা কিন্তু এরমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। পারচেজ কমিটি পাস হয়েছে। ভ্যাকসিন আমরা যথাসময়ে কালেকশন করবো এবং স্টার্ট করবো।’
শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হয়। অন্যদিকে ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস বয়স থেকে ১০ বছরের সব শিশুকে টিকা দেয়া হয়। টিকা কর্মসূচির কারণে দেশে হামের প্রকোপ কমে এসেছিল। কিন্তু এ বছর তা নতুন করে বেড়েছে।
চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হামের রোগী শনাক্ত হয়। ১০ জানুয়ারি ক্যাম্প এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়। ওই সময় রাজধানীর বস্তি এলাকায় হামের রোগী বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এর আগে, গত শুক্রবার রাজধানীর মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় শয্যার চেয়ে রোগী বেশি। তাদের বড় অংশই হামের রোগী। হামের রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা দিতে ‘সব ধরনের প্রস্তুতি; নেয়ার কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ আমাদের ঢাকাতে ডিএনসিসি ওয়ার্ড সব রেডি করা হয়েছে। আইসিইউ রেডি করা হয়েছে।’
‘সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসিইউ রেডি করা হয়েছে, উইথ ভেন্টিলেটর। শিশু হাসপাতালে করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলে করা হয়েছে। মানিকগঞ্জ ৮ ইউনিটে করা হয়েছে। ডিএনসিসিতে করা হয়েছে। নর্থ বেঙ্গলে করা হয়েছে।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) জায়গা না পেয়ে একাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার পর সরকার পাঁচটি ভেন্টিলেটর দান পেয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আজকে (গতকাল) আমরা সেগুলো কালেক্ট করবো। আগামীকাল (আজ) সকালে আমাদের সচিব রাজশাহী যাচ্ছেন, উনি চারটে নিয়ে যাবেন ওখানে; ওখানে দিয়ে আসবেন।’
ওষুধ প্রস্তুতকারকরা কিছুদিনের মধ্যে আরও ১২টির বেশি ভেন্টিলেটর সরকারকে ‘সরবারহ করবে’ জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এসব ভেন্টিলেটর মের বিরুদ্ধের লড়াই চালাতে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করবে।
হাম ও জলবসন্ত সম্পর্কে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যোগাযোগ করলে কন্ট্রোল থেকে বলা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর সারাদেশের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের তথ্য পাওয়ার পর গণমাধ্যমে জানানো হবে। এখনও তারা কাজই শুরু করেনি। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে উচ্চপর্যায়ে মিটিং হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন শিশুরা হাম ও জলবসন্তে আক্রান্ত হচ্ছে। রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, আবার মারাও যাচ্ছে।
রাজশাহীতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও হাসপাতালে আইসিইউসহ অন্যান্য সমস্যার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। মহাখালী সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতালে শিশু হামের রোগী বাড়ছে। এর আগে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও আইসিইউর সমস্যার কারণে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে হামের রোগীর উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মহাখালী রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন সংবাদকে বলেন, হামের রোগী বাড়ছে। এসব রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হবে।
গরিব রোগীদের বাড়ি খুঁজে বের করে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। না হয় সংক্রমণ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হাম থেকে নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য জটিলতা বাড়তে পারে। তাই আইসিইউতে রাখার ব্যবস্থা লাগতে পারে। তার জন্য আগাম উদ্যোগ নিয়ে রাখতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজধানীর শ্যামলী টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, হামে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। তারা মহাখালী সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালে বা ডাক্তারের চেম্বারে যোগাযোগ করে চিকিৎসা গাইডলাইন দিচ্ছেন। আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের নেয়ার পরামর্শ নেয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আমাদের ময়মনসিংহ জেলা বার্তা পরিবেশক জানান, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১২ দিনে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুই শিশু ও গত শনিবার বিকেলে ও রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন শিশুর মৃত্যু হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার রাত ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে ৬ মাস বয়সী নুরুন্নবী নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। শিশুটি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার আয়নাল হকের ছেলে। গতকাল বিকেল পৌনে ৫টার দিকে ভর্তির পরপরই মৃত্যু হয় শিশুটির।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরগোবদিয়া গ্রামের আবদুর রহিমের সাত মাস বয়সী ছেলে শিশু লিয়নকে নিয়ে গত ২৭ মার্চ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তার মৃত্যু হয়। আব্দুর রহিম জানান, ঈদের আগে নিউমোনিয়া নিয়ে ৫ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। বাড়িতে আনার পর হাম বের হলে আবার হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরে গতকাল বিকেলে আমার একমাত্র ছেলের মৃত্যু হয়েছে। জামালপুর থেকে আসা এক রোগী জানান, ঈদের দিন সকালে তার শিশুর জ্বরসহ আরও কিছু উপসর্গ নিয়ে এ হাসপাতালে আসলে তার শরীরে হাম রেশ দেখে চিকিৎসক তাকে ভর্তির পরামর্শ দেন। সেই থেকে এখনও তিনি হাসপাতালে আছেন। তিনি জানান, আমি থাকতেই কয়েকদিনের মধ্যে অনেক শিশু এ রোগ নিয়ে ভর্তি হয়।
হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গেছে, গতকাল বিকেল ৪টা পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে ৬৬ শিশু ভর্তি রয়েছে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত নতুন আরও ৫ শিশু ভর্তি হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি সামলাতে গত ২৪ মার্চ হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য তিনটি পৃথক মেডিকেল টিম গঠন করে হাসপাতাল প্রশাসন। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের তিনটি পৃথক কক্ষ করা হয় হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য। ‘হাম বা মিসেলস কর্নার’ নামে ১০ শয্যাবিশিষ্ট কক্ষগুলোতে একটি মেডিকেল টিমের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে শিশুদের। তবে কক্ষগুলোতেও রোগী সংকুলান হচ্ছে না। চলতি ১৮ মার্চ থেকে হাম আক্রান্ত রোগীদের তথ্য হাসপাতালে পৃথকভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাহমুদুল হাসান জানান, হাম আক্রান্ত হয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। তবে ভাইরাসজনিত হওয়ায় রোগীর হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাস দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বর্তমানে এ রোগটির প্রাদুর্ভাব বাড়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন গত দুই থেকে আড়াই বছরে দেশের বিভিন্ন সামাজিক অস্থিরতার কারণে টিকাদান কর্মসূচি ব্যহত হয়েছে। এই কারনেই হাম রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।
হামের জটিলতা থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখে, মাথায় প্রদাহসহ বিভিন্ন রোগে শিশুরা আক্রান্ত হয় ও সঙ্গে যদি শিশুর অন্য কোনো জটিল রোগ দেখা দেয় তখন এই শিশুর মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বেশি সর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যেও নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য লক্ষণ রয়েছে। তবে এ রোগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এর সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠে। তিনি আরও জানান, রোগীর চাপ বাড়ায় গতকাল থেকে হাসপাতালে ৮ তলায় আলাদা ‘হাম আইসোলেশন’ নামে নতুন ইউনিট চালু করছি। আশা করছি সেখান থেকে হাম আক্রান্ত রোগীরা আরও ভালো ও বেশি চিকিৎসা সেবা পাবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকাসহ বেশকিছু জেলায় হুট করেই শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে, যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, সারাদেশেই শিশুরা এ রোগের আক্রান্ত হচ্ছে।
দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৯-১৫ মাস বয়সী শিশুরা এই রোগের টিকা পাওয়ার পরেও কেন এই সময় আবার রোগটির প্রবণতা বাড়ছে, সেই আলোচনা জোরদার হচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, টিকা দেয়ার পরেও অনেক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগের। কারণ ব্যাপক ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত এই রোগটি আক্রান্ত শিশুর জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। তবে এবার আক্রান্ত রোগীদের উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে এবং তাতে তারা সুস্থ হচ্ছেন বলেও বলছেন তারা।
ওদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, তারা আগামী জুলাই-আগস্টে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশজুড়ে শিশুদের হামের টিকা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
‘ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন চলে আসছে। আরও যা যা লাগবে সেটি টিকার জন্য গঠিত বৈশ্বিক জোট গ্যাভিকে অবহিত করা হয়েছে। তারা মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ২ কোটি সিরিঞ্জ দিবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানিয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন