পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন ঘোষিত হয়েছে। এখানকার শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস, এই নির্বাচনে জিতে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য মরিয়া। বামপন্থীরা এই নির্বাচনকে নিছক ক্ষমতায় ফিরে আসবার একটা লড়াই হিসেবে দেখছেন না। এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপি এবং তাদের সহযোগী প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক শক্তি তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে, বাংলার বুকে মানুষের সব থেকে বড় বিপদকে গুরুত্ব দিয়ে বিভাজনের রাজনীতিকে প্রতিহত করতে, তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিরন্তন বাংলাকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পরিচালিত করছেন। ভোটের প্রচার পর্বকেও সেই ভাবে পরিচালিত করছেন।
অন্যপক্ষে আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি, তারাও এই রাজ্যে ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে তাদের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। পশ্চিমবঙ্গবাসীর আর্থ- সামাজিক উন্নয়নের জন্য তাদের কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে, উগ্র রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রকাশই তাদের লক্ষ্য। গোটা ভারতজুড়ে তারা যে নিজেদের মস্তিষ্ক আরএসএসের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তারই একটি অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে সংযুক্ত করবার জন্য, বিজেপি এখন সবথেকে বেশি সচেষ্ট।
ভোট প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার অব্যবহিত আগেই পশ্চিমবঙ্গের বুকে এসআইআর করতে শুরু করে নির্বাচন কমিশন। এসআইআর প্রক্রিয়াটি কোনো নতুন প্রক্রিয়া নয়। বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া হয়েছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া ঘিরে এখন যে ধরনের রাজনৈতিক উত্তাপ, বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকার বা তাদের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ, তার বিন্দু বিসর্গ অতীতে ২০০২ সালের এসআইআরের সময় আমরা দেখতে পাইনি। সেদিনের সেই এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কোনো ভীতির সঞ্চার হয়নি। যেটা এখন তৈরি হয়েছে, প্রশাসনিক উদ্যোগের প্রশ্নে কেন্দ্র-রাজ্যের সমন্বয়ে।
ভোটার তালিকার সংশোধন, এটা ভারতের সংবিধান প্রদত্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্ষেত্রে একটি অতি স্বাস্থ্যকর বিষয়। সেই স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও কোনো অন্যথা সেদিন ঘটেনি। সেদিন পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্ট সরকার, কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার, যে সরকারের মন্ত্রী ছিলেন মমতা স্বয়ং, বা নির্বাচন কমিশন, সর্বোপরি সাধারণ মানুষ-- কোনো জায়গা থেকে কোনো রকম সাম্প্রদায়িক বিভাজনের লক্ষ্যে, প্রশাসনকে ব্যবহার করবার দৃষ্টিভঙ্গি-- এই এসআইআরকে ঘিরে ওঠেনি।
ভারতের নাগরিক মুসলমানদের, বেনাগরিক করবার পরিকল্পনাটা আরএসএসের স্বাধীনতার (১৯৪৭) পরবর্তী কাল থেকেই একটি গৃহীত নীতি। এই পরিকল্পনার কথা তাদের তাত্ত্বিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান নির্মাতা এমএস গোলওয়ালকার, তার, ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ নামক তত্ত্বের মধ্যে অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলে গিয়েছেন।
সেদিন একক ক্ষমতায় বিজেপি কেন্দ্রে সরকার পরিচালনা করছিল না। আর সেই কারণেই হয়তো বিজেপির পক্ষে এসআইআর ঘিরে সেদিন, আজকের মতো ভয়াবহ হিন্দু সম্প্রদায়িক অবস্থান নেয়া, জোট রাজনীতির নিরিখে, অর্থাৎ কেন্দ্রে সরকার পরিচালনা করবার বিষয়টিকে মাথায় রেখে বাস্তবায়নের দিকে এগোনো সম্ভবপর ছিল না।
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই আরও চারটি রাজ্যের নির্বাচন হচ্ছে। যার মধ্যে কেরালাম অন্যতম। এই রাজ্যে বামপন্থীরা ক্ষমতায় রয়েছে। তারা রাজ্য বিধানসভায় প্রস্তাব নিয়ে খুব স্পষ্টভাবেই বলেছেন; কোনো অবস্থাতেই তারা কেরলমে এসআইআর প্রক্রিয়া লাগু হতে দেবেন না। সেটা তারা দেনওনি। সেই রাজ্যে ভোট প্রক্রিয়া চলছে। ভোটার তালিকা নিয়ম মাফিক সংশোধিত হয়েছে। কিন্তু কোথাও কোনো অবস্থাতেই এসআইআর প্রক্রিয়া সেখানকার মানুষের ওপরে, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কমিশন যা ইতোমধ্যে ভারতবাসীর কাছে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে নির্যাতন কমিশন নামে অভিহিত হতে শুরু করেছে, তারা লাগু করতে পারেনি।
এরকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গবাসী কে ফেলে দেয়ার সার্বিক দায়টি একই সঙ্গে কেন্দ্রের শাসক বিজেপি এবং রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর বর্তায়। রাজ্যের ভোটার তালিকায় বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে আসা মানুষদের দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে বামফ্রন্ট সরকার। আর তাদের ভোটেই তারা দীর্ঘদিন রাজ্যে ক্ষমতাশীল আছেন-- অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারের আমলে এটাই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি।
এই দাবি ঘিরে খোদ লোকসভার মধ্যেও তিনি নানা ধরনের অসংসদীয় কাজ করেছিলেন। আরএসএসের যে মুসলিমমুক্ত ভারতের পরিকল্পনা, যেটি তারা তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির মাধ্যমে ভারতের লাগু করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে আসছে, সেই কাজটি তারা বিজেপি সরকারের মন্ত্রী মমতাকে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রথম শুরু করেছিল।
ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এসআইআর ঘিরে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান্যতায় পশ্চিমবঙ্গে এখনও ৬০ লাখের বেশি মানুষ ভোটার তালিকার বাইরে রয়েছেন। এই বিপুলসংখ্যক মানুষদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছেন মুসলমানরা। এটা বিজেপির মুসলমান মুক্ত ভারতের রাজনৈতিক কর্মসূচির একটি অঙ্গ। বিজেপির এই ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক বিভাজনমূলক প্রক্রিয়াকে ফলো প্রশ্ন করবার লক্ষ্যে সব থেকে বেশি সহায়ক ছিলেন মমতা।
গত ১৫ বছর ধরে যে সীমাহীন দুর্নীতি, ব্যর্থতা অপদার্থতার ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা শূন্যগর্ভ জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন। তার থেকে পুনরুদ্ধার জীবনে একটা প্রত্যাশা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। সিপিআই (এম) সিপিআইএম লিবারেশন, সিপিআই, অন্যান্য বামপন্থী দলগুলো এবং আইএসএফ, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে যে ধরনের রাজনৈতিক ইস্যুগুলোকে তুলে ধরেছেন, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির প্রশ্নে, যেভাবে রাজনীতির প্রধান বিষয় হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন, তা থেকে মানুষের মনকে ঘুরিয়ে দিতে বিজেপি এবং তৃণমূল উভয় সাম্প্রদায়িক শক্তি চেষ্টার বিরাম করছে না।
কংগ্রেস দল এই ভোটে অতীতের মতো বামপন্থীদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেনি এ ঘিরে ওই দলের রাজ্য নেতৃত্বের মধ্যেই একাধিক মতবিরোধের কথা শুনতে পাওয়া যায়। যদিও সাম্প্রদায়িকতাকে প্রতিহত করবার প্রশ্নে ওই দলের হাতেগোনা দুয়েকজন নেতা ছাড়া আর কারো মধ্যে এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অবস্থান দেখতে পাওয়া যায়নি।
[লেখক: ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ মার্চ ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন ঘোষিত হয়েছে। এখানকার শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস, এই নির্বাচনে জিতে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য মরিয়া। বামপন্থীরা এই নির্বাচনকে নিছক ক্ষমতায় ফিরে আসবার একটা লড়াই হিসেবে দেখছেন না। এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপি এবং তাদের সহযোগী প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক শক্তি তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে, বাংলার বুকে মানুষের সব থেকে বড় বিপদকে গুরুত্ব দিয়ে বিভাজনের রাজনীতিকে প্রতিহত করতে, তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিরন্তন বাংলাকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পরিচালিত করছেন। ভোটের প্রচার পর্বকেও সেই ভাবে পরিচালিত করছেন।
অন্যপক্ষে আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি, তারাও এই রাজ্যে ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে তাদের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। পশ্চিমবঙ্গবাসীর আর্থ- সামাজিক উন্নয়নের জন্য তাদের কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে, উগ্র রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রকাশই তাদের লক্ষ্য। গোটা ভারতজুড়ে তারা যে নিজেদের মস্তিষ্ক আরএসএসের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তারই একটি অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে সংযুক্ত করবার জন্য, বিজেপি এখন সবথেকে বেশি সচেষ্ট।
ভোট প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার অব্যবহিত আগেই পশ্চিমবঙ্গের বুকে এসআইআর করতে শুরু করে নির্বাচন কমিশন। এসআইআর প্রক্রিয়াটি কোনো নতুন প্রক্রিয়া নয়। বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া হয়েছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া ঘিরে এখন যে ধরনের রাজনৈতিক উত্তাপ, বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকার বা তাদের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ, তার বিন্দু বিসর্গ অতীতে ২০০২ সালের এসআইআরের সময় আমরা দেখতে পাইনি। সেদিনের সেই এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কোনো ভীতির সঞ্চার হয়নি। যেটা এখন তৈরি হয়েছে, প্রশাসনিক উদ্যোগের প্রশ্নে কেন্দ্র-রাজ্যের সমন্বয়ে।
ভোটার তালিকার সংশোধন, এটা ভারতের সংবিধান প্রদত্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্ষেত্রে একটি অতি স্বাস্থ্যকর বিষয়। সেই স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও কোনো অন্যথা সেদিন ঘটেনি। সেদিন পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্ট সরকার, কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার, যে সরকারের মন্ত্রী ছিলেন মমতা স্বয়ং, বা নির্বাচন কমিশন, সর্বোপরি সাধারণ মানুষ-- কোনো জায়গা থেকে কোনো রকম সাম্প্রদায়িক বিভাজনের লক্ষ্যে, প্রশাসনকে ব্যবহার করবার দৃষ্টিভঙ্গি-- এই এসআইআরকে ঘিরে ওঠেনি।
ভারতের নাগরিক মুসলমানদের, বেনাগরিক করবার পরিকল্পনাটা আরএসএসের স্বাধীনতার (১৯৪৭) পরবর্তী কাল থেকেই একটি গৃহীত নীতি। এই পরিকল্পনার কথা তাদের তাত্ত্বিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান নির্মাতা এমএস গোলওয়ালকার, তার, ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ নামক তত্ত্বের মধ্যে অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলে গিয়েছেন।
সেদিন একক ক্ষমতায় বিজেপি কেন্দ্রে সরকার পরিচালনা করছিল না। আর সেই কারণেই হয়তো বিজেপির পক্ষে এসআইআর ঘিরে সেদিন, আজকের মতো ভয়াবহ হিন্দু সম্প্রদায়িক অবস্থান নেয়া, জোট রাজনীতির নিরিখে, অর্থাৎ কেন্দ্রে সরকার পরিচালনা করবার বিষয়টিকে মাথায় রেখে বাস্তবায়নের দিকে এগোনো সম্ভবপর ছিল না।
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই আরও চারটি রাজ্যের নির্বাচন হচ্ছে। যার মধ্যে কেরালাম অন্যতম। এই রাজ্যে বামপন্থীরা ক্ষমতায় রয়েছে। তারা রাজ্য বিধানসভায় প্রস্তাব নিয়ে খুব স্পষ্টভাবেই বলেছেন; কোনো অবস্থাতেই তারা কেরলমে এসআইআর প্রক্রিয়া লাগু হতে দেবেন না। সেটা তারা দেনওনি। সেই রাজ্যে ভোট প্রক্রিয়া চলছে। ভোটার তালিকা নিয়ম মাফিক সংশোধিত হয়েছে। কিন্তু কোথাও কোনো অবস্থাতেই এসআইআর প্রক্রিয়া সেখানকার মানুষের ওপরে, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কমিশন যা ইতোমধ্যে ভারতবাসীর কাছে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে নির্যাতন কমিশন নামে অভিহিত হতে শুরু করেছে, তারা লাগু করতে পারেনি।
এরকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গবাসী কে ফেলে দেয়ার সার্বিক দায়টি একই সঙ্গে কেন্দ্রের শাসক বিজেপি এবং রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর বর্তায়। রাজ্যের ভোটার তালিকায় বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে আসা মানুষদের দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে বামফ্রন্ট সরকার। আর তাদের ভোটেই তারা দীর্ঘদিন রাজ্যে ক্ষমতাশীল আছেন-- অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারের আমলে এটাই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি।
এই দাবি ঘিরে খোদ লোকসভার মধ্যেও তিনি নানা ধরনের অসংসদীয় কাজ করেছিলেন। আরএসএসের যে মুসলিমমুক্ত ভারতের পরিকল্পনা, যেটি তারা তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির মাধ্যমে ভারতের লাগু করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে আসছে, সেই কাজটি তারা বিজেপি সরকারের মন্ত্রী মমতাকে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রথম শুরু করেছিল।
ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এসআইআর ঘিরে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান্যতায় পশ্চিমবঙ্গে এখনও ৬০ লাখের বেশি মানুষ ভোটার তালিকার বাইরে রয়েছেন। এই বিপুলসংখ্যক মানুষদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছেন মুসলমানরা। এটা বিজেপির মুসলমান মুক্ত ভারতের রাজনৈতিক কর্মসূচির একটি অঙ্গ। বিজেপির এই ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক বিভাজনমূলক প্রক্রিয়াকে ফলো প্রশ্ন করবার লক্ষ্যে সব থেকে বেশি সহায়ক ছিলেন মমতা।
গত ১৫ বছর ধরে যে সীমাহীন দুর্নীতি, ব্যর্থতা অপদার্থতার ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা শূন্যগর্ভ জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন। তার থেকে পুনরুদ্ধার জীবনে একটা প্রত্যাশা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। সিপিআই (এম) সিপিআইএম লিবারেশন, সিপিআই, অন্যান্য বামপন্থী দলগুলো এবং আইএসএফ, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে যে ধরনের রাজনৈতিক ইস্যুগুলোকে তুলে ধরেছেন, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির প্রশ্নে, যেভাবে রাজনীতির প্রধান বিষয় হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন, তা থেকে মানুষের মনকে ঘুরিয়ে দিতে বিজেপি এবং তৃণমূল উভয় সাম্প্রদায়িক শক্তি চেষ্টার বিরাম করছে না।
কংগ্রেস দল এই ভোটে অতীতের মতো বামপন্থীদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেনি এ ঘিরে ওই দলের রাজ্য নেতৃত্বের মধ্যেই একাধিক মতবিরোধের কথা শুনতে পাওয়া যায়। যদিও সাম্প্রদায়িকতাকে প্রতিহত করবার প্রশ্নে ওই দলের হাতেগোনা দুয়েকজন নেতা ছাড়া আর কারো মধ্যে এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অবস্থান দেখতে পাওয়া যায়নি।
[লেখক: ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

আপনার মতামত লিখুন