সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

গ্রাম থেকে বিশ্ববাজার: গড়ে উঠুক বাংলাদেশ ব্র্যান্ড


অঞ্জন মজুমদার
অঞ্জন মজুমদার
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬

গ্রাম থেকে বিশ্ববাজার: গড়ে উঠুক বাংলাদেশ ব্র্যান্ড
রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে

বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকশিল্পনির্ভর রপ্তানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এই খাত কয়েক যুগ ধরে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অসাধারণ সাফল্য এনে দিয়েছে, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে একটি বাস্তবতা স্পষ্ট- রপ্তানিতে একক প্রধান খাতনির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে, বৈশ্বিক বাজারে সামান্য মন্দা, বাণিজ্যনীতি পরিবর্তন, বৈদেশিক মুদ্রার দামের ওঠা নামা বা রাজনৈতিক অস্থিরতা, অঞ্চলিক যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলেই তার প্রভাব পড়ে আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় সময়ের দাবি হলো রপ্তানি পণ্যের বহুমাত্রিকীকরণ; বর্তমান সরকারের ভিশনারি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে- কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প, গ্রামীণ জনপদের এস এম ই উদ্যোগ, পরিবেশবান্ধব পণ্য এবং অপ্রচলিত পন্যের রপ্তানি খাতে; যাকে আমরা এলাকা ভিত্তিক সার্কুলার শিল্প অঞ্চল যা আধুনিক গ্রীন সার্কুলার ইকোনমি বলব।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল খাতগুলোর একটি হলো পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ পণ্যের বাজার। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ, পাট বা অন্যান্য গাছের তন্তু-ফাইবার কম্পোজিট, নারিকেল আঁশের পণ্য, সুপারি গাছের খোল, কলাপাতার প্লেট, কচুরিপানাজাত পন্য, এলজি ও খুদিপানা থেকে প্রস্তুত উন্নত মানের পশু খাদ্য, বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিং, কাঠের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী, বায়োমস, অটোরাইস মিলের ছাই ও ছাই থেকে উৎপন্য পন্য, চারকোল, সুপারি থেকে উৎপন্ন নানান রকমের পরিবেশ বান্ধব পন্য, বায়ো সার- এসব পণ্যের চাহিদা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়, মিডেলইস্টে দ্রুত বাড়ছে। এই প্রবণতা সার্কুলার ইকোনমির ধারণার সঙ্গে যুক্ত, যেখানে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা হয় এবং উৎপাদন-ব্যবহার-পুনর্ব্যবহার একটি টেকসই চক্রে আবর্তিত হয়। বাংলাদেশের কৃষিজ পন্যের অবশিষ্টাংশ- ধানের তুষ, পাটের আঁশ, নারিকেলের ছোবড়া, আখের ও ভুট্টাগাছের বর্জ্য- এসবই হতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পরিবেশ বান্ধব সবুজ শিল্পের মূল্যবান কাঁচামাল। সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এগুলোকে রপ্তানিযোগ্য পরিবেশবান্ধব পণ্যে রূপ দেয়া সম্ভব।

বাংলাদেশের বীজ উৎপাদনও একটি সম্ভাবনাময় খাত; দেশে উন্নতমানের ধান, সবজি ও ফলের বহু হাইব্রিড (উচ্চ ফলনশীল) জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে এসব বীজের চাহিদা রয়েছে। সরকারের অপ্রচলিত পন্য রপ্তানির ওয়ানস্টপ সাপোর্ট সার্ভিস, কৃষক,গবেষক ও উদ্যোক্তার সমন্বিত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বীজ শিল্প গড়ে তোলা গেলে তা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি কৃষকের আয় বহুগুণ বাড়াতে পারে, এর জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, চাষাবাদ, সংরক্ষণ, সার্টিফিকেশন ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল ব্যবস্থা।

অপ্রচলিত পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকবে গ্রামীণ স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কিন্তু বাস্তবতা হলো- গ্রামে ব্যবসা শুরু করতে সবচেয়ে বড় বাধা মূলধনের সহজ প্রাপ্যতা ও বাজারসংযোগের অভাব। ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের জায়গা থেকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারকে গ্রামীণ স্টার্টআপের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। স্বল্পসুদে ঋণ, স্টার্টআপ ফান্ড, বিশেষ ভর্তুকি এবং রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা দিলে নতুন উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত হবেন।

কৃষি ও গ্রামীণ শিল্পভিত্তিক উদ্যোগের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক প্যাকেজ প্রয়োজন, যেখানে জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বিপণন সহায়তা একসঙ্গে থাকবে। সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একক কৃষক বা কারিগরের পক্ষে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা কঠিন কিন্তু একটি সমবায় বা উৎপাদক সংগঠন সহজেই মাননিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং এবং বড় অর্ডার সরবরাহ করতে সক্ষম। গ্রামে প্রডিউসার কোম্পানি বা প্রোডাকশন কো-অপারেটিভ গড়ে উঠলে কৃষক, নারী ও যুবকদের আয় স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা গেলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন একসঙ্গে সম্ভব হবে।

রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি, অনেক সময় গ্রামীণ উৎপাদক জানেন না যে তার তৈরি পণ্য উচ্চমূল্যে বিদেশে বিক্রি হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মশালা, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ব্যবহারের শিক্ষা, কনটেন্ট তৈরি, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, ক্রয়াদেশ গ্রহণ, সময়মতো সরবরাহ, সার্টিফিকেশন, কাস্টমস প্রক্রিয়া, ট্যাক্স-ভ্যাট ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রামীণ উদ্যোক্তাকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগী কমবে এবং লাভ বাড়বে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা মান, হারবাল পণ্যের কার্যকারিতা, পরিবেশবান্ধব উপকরণ উন্নয়ন- এসব বিষয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন ছাড়া রপ্তানিযোগ্য শিল্প গড়ে উঠবে না। গবেষণা-উদ্যোক্তা-শিল্প সংযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে উদ্ভাবন সরাসরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে রূপ নেয়। প্রযুক্তি স্থানান্তর ও ইনোভেশন হাব গড়ে তোলা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।

সরকারি নীতিতেও প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পের জন্য আলাদা রপ্তানি অঞ্চল, সহজ রেজিস্ট্রেশন, দ্রুত মানসনদ প্রদান, কম খরচে পরীক্ষাগার সুবিধা এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনে কর-ছাড় ও বিশেষ প্রণোদনা দিলে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ ও ব্র্যান্ডিং সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বহুমুখীকরণ উদ্যোগের সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্রামীণ জনপদের কর্মসংস্থানে। গ্রামেই যদি শিল্প ও ব্যবসা গড়ে ওঠে, তবে শহরমুখী অভিবাসন কমবে। নারী, যুবক ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য নতুন আয়-উৎস সৃষ্টি হবে। পরিবারের আর্থিক স্থিতি বাড়বে, স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং জাতীয় জিডিপিতে অবদান বৃদ্ধি পাবে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠবে, যেখানে উন্নয়নের সুফল তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাবে।

অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি কেবল একটি বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নয়; এটি একটি সামগ্রিকভাবে আগামীর উন্নয়ন কৌশল। গ্রাম, কৃষি, পরিবেশ, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তোলা সম্ভব— যেখানে উৎপাদন হবে স্থানীয় কিন্তু বাজার হবে বৈশ্বিক। এই পথেই বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ‘বাংলাদেশ ব্র্যান্ড’ গড়ে তুলে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

[লেখক: কনসালট্যান্ট, বাংলাদেশ অরগানিক হাব]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬


গ্রাম থেকে বিশ্ববাজার: গড়ে উঠুক বাংলাদেশ ব্র্যান্ড

প্রকাশের তারিখ : ৩০ মার্চ ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকশিল্পনির্ভর রপ্তানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এই খাত কয়েক যুগ ধরে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অসাধারণ সাফল্য এনে দিয়েছে, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে একটি বাস্তবতা স্পষ্ট- রপ্তানিতে একক প্রধান খাতনির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে, বৈশ্বিক বাজারে সামান্য মন্দা, বাণিজ্যনীতি পরিবর্তন, বৈদেশিক মুদ্রার দামের ওঠা নামা বা রাজনৈতিক অস্থিরতা, অঞ্চলিক যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলেই তার প্রভাব পড়ে আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় সময়ের দাবি হলো রপ্তানি পণ্যের বহুমাত্রিকীকরণ; বর্তমান সরকারের ভিশনারি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে- কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প, গ্রামীণ জনপদের এস এম ই উদ্যোগ, পরিবেশবান্ধব পণ্য এবং অপ্রচলিত পন্যের রপ্তানি খাতে; যাকে আমরা এলাকা ভিত্তিক সার্কুলার শিল্প অঞ্চল যা আধুনিক গ্রীন সার্কুলার ইকোনমি বলব।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল খাতগুলোর একটি হলো পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ পণ্যের বাজার। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ, পাট বা অন্যান্য গাছের তন্তু-ফাইবার কম্পোজিট, নারিকেল আঁশের পণ্য, সুপারি গাছের খোল, কলাপাতার প্লেট, কচুরিপানাজাত পন্য, এলজি ও খুদিপানা থেকে প্রস্তুত উন্নত মানের পশু খাদ্য, বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিং, কাঠের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী, বায়োমস, অটোরাইস মিলের ছাই ও ছাই থেকে উৎপন্য পন্য, চারকোল, সুপারি থেকে উৎপন্ন নানান রকমের পরিবেশ বান্ধব পন্য, বায়ো সার- এসব পণ্যের চাহিদা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়, মিডেলইস্টে দ্রুত বাড়ছে। এই প্রবণতা সার্কুলার ইকোনমির ধারণার সঙ্গে যুক্ত, যেখানে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা হয় এবং উৎপাদন-ব্যবহার-পুনর্ব্যবহার একটি টেকসই চক্রে আবর্তিত হয়। বাংলাদেশের কৃষিজ পন্যের অবশিষ্টাংশ- ধানের তুষ, পাটের আঁশ, নারিকেলের ছোবড়া, আখের ও ভুট্টাগাছের বর্জ্য- এসবই হতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পরিবেশ বান্ধব সবুজ শিল্পের মূল্যবান কাঁচামাল। সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এগুলোকে রপ্তানিযোগ্য পরিবেশবান্ধব পণ্যে রূপ দেয়া সম্ভব।

বাংলাদেশের বীজ উৎপাদনও একটি সম্ভাবনাময় খাত; দেশে উন্নতমানের ধান, সবজি ও ফলের বহু হাইব্রিড (উচ্চ ফলনশীল) জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে এসব বীজের চাহিদা রয়েছে। সরকারের অপ্রচলিত পন্য রপ্তানির ওয়ানস্টপ সাপোর্ট সার্ভিস, কৃষক,গবেষক ও উদ্যোক্তার সমন্বিত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বীজ শিল্প গড়ে তোলা গেলে তা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি কৃষকের আয় বহুগুণ বাড়াতে পারে, এর জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, চাষাবাদ, সংরক্ষণ, সার্টিফিকেশন ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল ব্যবস্থা।

অপ্রচলিত পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকবে গ্রামীণ স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কিন্তু বাস্তবতা হলো- গ্রামে ব্যবসা শুরু করতে সবচেয়ে বড় বাধা মূলধনের সহজ প্রাপ্যতা ও বাজারসংযোগের অভাব। ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের জায়গা থেকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারকে গ্রামীণ স্টার্টআপের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। স্বল্পসুদে ঋণ, স্টার্টআপ ফান্ড, বিশেষ ভর্তুকি এবং রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা দিলে নতুন উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত হবেন।

কৃষি ও গ্রামীণ শিল্পভিত্তিক উদ্যোগের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক প্যাকেজ প্রয়োজন, যেখানে জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বিপণন সহায়তা একসঙ্গে থাকবে। সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একক কৃষক বা কারিগরের পক্ষে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা কঠিন কিন্তু একটি সমবায় বা উৎপাদক সংগঠন সহজেই মাননিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং এবং বড় অর্ডার সরবরাহ করতে সক্ষম। গ্রামে প্রডিউসার কোম্পানি বা প্রোডাকশন কো-অপারেটিভ গড়ে উঠলে কৃষক, নারী ও যুবকদের আয় স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা গেলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন একসঙ্গে সম্ভব হবে।

রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি, অনেক সময় গ্রামীণ উৎপাদক জানেন না যে তার তৈরি পণ্য উচ্চমূল্যে বিদেশে বিক্রি হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মশালা, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ব্যবহারের শিক্ষা, কনটেন্ট তৈরি, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, ক্রয়াদেশ গ্রহণ, সময়মতো সরবরাহ, সার্টিফিকেশন, কাস্টমস প্রক্রিয়া, ট্যাক্স-ভ্যাট ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রামীণ উদ্যোক্তাকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগী কমবে এবং লাভ বাড়বে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা মান, হারবাল পণ্যের কার্যকারিতা, পরিবেশবান্ধব উপকরণ উন্নয়ন- এসব বিষয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন ছাড়া রপ্তানিযোগ্য শিল্প গড়ে উঠবে না। গবেষণা-উদ্যোক্তা-শিল্প সংযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে উদ্ভাবন সরাসরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে রূপ নেয়। প্রযুক্তি স্থানান্তর ও ইনোভেশন হাব গড়ে তোলা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।

সরকারি নীতিতেও প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পের জন্য আলাদা রপ্তানি অঞ্চল, সহজ রেজিস্ট্রেশন, দ্রুত মানসনদ প্রদান, কম খরচে পরীক্ষাগার সুবিধা এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনে কর-ছাড় ও বিশেষ প্রণোদনা দিলে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ ও ব্র্যান্ডিং সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বহুমুখীকরণ উদ্যোগের সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্রামীণ জনপদের কর্মসংস্থানে। গ্রামেই যদি শিল্প ও ব্যবসা গড়ে ওঠে, তবে শহরমুখী অভিবাসন কমবে। নারী, যুবক ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য নতুন আয়-উৎস সৃষ্টি হবে। পরিবারের আর্থিক স্থিতি বাড়বে, স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং জাতীয় জিডিপিতে অবদান বৃদ্ধি পাবে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠবে, যেখানে উন্নয়নের সুফল তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাবে।

অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি কেবল একটি বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নয়; এটি একটি সামগ্রিকভাবে আগামীর উন্নয়ন কৌশল। গ্রাম, কৃষি, পরিবেশ, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তোলা সম্ভব— যেখানে উৎপাদন হবে স্থানীয় কিন্তু বাজার হবে বৈশ্বিক। এই পথেই বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ‘বাংলাদেশ ব্র্যান্ড’ গড়ে তুলে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

[লেখক: কনসালট্যান্ট, বাংলাদেশ অরগানিক হাব]


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত