সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

ট্রাইব্যুনালে এসআই দেলোয়ারের সাক্ষ্য

‘নিজের বাহিনীর গুলিতেই প্রাণ গেল ছেলের’


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬

‘নিজের বাহিনীর গুলিতেই প্রাণ গেল ছেলের’
বন্ধুদের সঙ্গে একটি বিশেষ মুহূর্তে ইমাম হাসান তাইম।

ইমাম হাসান তাইম নিহত হয়েছেন ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনের সময়। তখন তার নিথর দেহ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিচয়হীন পড়ে থাকলেও পরে শনাক্ত করেন স্বজনরা। তখন জানা যায় তিনি পুলিশের এক এসআইয়ের ছেলে। সেই বর্ণনাই সোমবার (৩০ মার্চ) ট্রাইব্যুনালে দিয়েছেন একজন সাক্ষী, যিনি নিজেও পুলিশের সদস্য। 

“সাদা-কালো চেক শার্ট, ছেঁড়া প্যান্ট আর শরীরজুড়ে গুলির চিহ্ন। পরনে থাকা শার্টের সব বোতাম খোলা। প্যান্টের ওপর থেকে হাঁটুর অংশ কাটা ছিল। আমি খোলা চোখে তার তলপেটে, বুকে, দুই পায়ের হাঁটুর নিচে ও ওপরে রক্তাক্ত দেখি। যা শর্টগানের পিলেটের জখম মনে হয়েছে। ঠান্ডা মেঝেতে এভাবেই পড়েছিল ইমাম হাসান তাইমের নিথর দেহ,” আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসআই (নিরস্ত্র) মো. দেলোয়ার হোসেনের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে এমন বর্ণনা। 

জুলাই আন্দোলনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তাইম হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১১ আসামির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ছিল সোমবার। এদিন তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে দেলোয়ার হোসেনের জবানবন্দি রেকর্ড করে ট্রাইব্যুনাল-২।

৩৮ বছর বয়সী দেলোয়ার বর্তমানে ডিএসবিতে কর্মরত রয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন তার দায়িত্ব ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। পুলিশ সদস্যদের বা তাদের পরিবারের কেউ আহত-নিহত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই ছিল তার কাজ।

জবানবন্দিতে এসআই দেলোয়ার বলেন, “২০২৪ সালের ২০ জুলাই আমার ব্যক্তিগত ফোনে কল করেন ডিএমপির এডিসি (ওয়েলফেয়ার)। ফোনে কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগে কর্মরত এসআই (সশস্ত্র) মো. ময়নাল হোসেনের ছেলে তাইম গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢামেক হাসপাতালে আছে বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। আমি এসআই ময়নালের সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে পাই। সঙ্গে তার শ্যালিকা শাহিদা আক্তার ছিলেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে তাইম মারা গেছেন বলে সাংবাদিকদের কাছে তিনি জানতে পেরেছেন বলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমাকে জানান। তবে লাশ খুঁজে পাচ্ছেন না।”

এসআই দেলোয়ার বলেন, “আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল মর্গ ও জরুরি বিভাগের পাশের মর্গে লাশ খুঁজতে থাকি। না পেয়ে নতুন ভবনের পাশে থাকা আরেকটি মর্গের মেঝেতে লাশ দেখতে পাই। ওই সময় ছেলের লাশ শনাক্ত করেন ময়নাল। তার পাশে আরও ছয়-সাতটি লাশ ছিল।”

এই পুলিশ কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দিতে বলেন, “তাইমের লাশ শনাক্তের পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য আমাদের শাহবাগ থানায় পাঠান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শাহবাগ থানায় একটি জিডি করার পর এসআই মো. শাহাদাত আলীকে সুরতহাল প্রস্তুতের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই কার্যক্রম শেষ হতে রাত ৯টা বেজে যায়। তখন শাহাদাত আলী জানান- ওই দিন আর কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। আমাদের পরদিন যেতে বলেন। আমরা তাইমের লাশটি মূল ভবনের মর্চ্যুয়ারিতে রেখে আসি।”

পরের দিন মৃতের সুরতহালে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করে বলে জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা দেলোয়ার বলেন,“সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের পর লাশটি রাজারবাগ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নেওয়া হয়। এএসআই (সশস্ত্র) মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বে গোসলের সময় তাইমের কোমরের বাঁ পাশের নিচে একটি বড় ক্ষতচিহ্ন দেখতে পাই। যা আমাদের কাছে পিস্তলের গুলির আঘাতের চিহ্ন মনে হয়েছে। জানাজা শেষে তাইমের নিথর দেহটি সরকারি গাড়িযোগে কুমিল্লায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।”

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬


‘নিজের বাহিনীর গুলিতেই প্রাণ গেল ছেলের’

প্রকাশের তারিখ : ৩০ মার্চ ২০২৬

featured Image

ইমাম হাসান তাইম নিহত হয়েছেন ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনের সময়। তখন তার নিথর দেহ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিচয়হীন পড়ে থাকলেও পরে শনাক্ত করেন স্বজনরা। তখন জানা যায় তিনি পুলিশের এক এসআইয়ের ছেলে। সেই বর্ণনাই সোমবার (৩০ মার্চ) ট্রাইব্যুনালে দিয়েছেন একজন সাক্ষী, যিনি নিজেও পুলিশের সদস্য। 

“সাদা-কালো চেক শার্ট, ছেঁড়া প্যান্ট আর শরীরজুড়ে গুলির চিহ্ন। পরনে থাকা শার্টের সব বোতাম খোলা। প্যান্টের ওপর থেকে হাঁটুর অংশ কাটা ছিল। আমি খোলা চোখে তার তলপেটে, বুকে, দুই পায়ের হাঁটুর নিচে ও ওপরে রক্তাক্ত দেখি। যা শর্টগানের পিলেটের জখম মনে হয়েছে। ঠান্ডা মেঝেতে এভাবেই পড়েছিল ইমাম হাসান তাইমের নিথর দেহ,” আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসআই (নিরস্ত্র) মো. দেলোয়ার হোসেনের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে এমন বর্ণনা। 

জুলাই আন্দোলনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তাইম হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১১ আসামির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ছিল সোমবার। এদিন তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে দেলোয়ার হোসেনের জবানবন্দি রেকর্ড করে ট্রাইব্যুনাল-২।

৩৮ বছর বয়সী দেলোয়ার বর্তমানে ডিএসবিতে কর্মরত রয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন তার দায়িত্ব ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। পুলিশ সদস্যদের বা তাদের পরিবারের কেউ আহত-নিহত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই ছিল তার কাজ।

জবানবন্দিতে এসআই দেলোয়ার বলেন, “২০২৪ সালের ২০ জুলাই আমার ব্যক্তিগত ফোনে কল করেন ডিএমপির এডিসি (ওয়েলফেয়ার)। ফোনে কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগে কর্মরত এসআই (সশস্ত্র) মো. ময়নাল হোসেনের ছেলে তাইম গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢামেক হাসপাতালে আছে বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। আমি এসআই ময়নালের সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে পাই। সঙ্গে তার শ্যালিকা শাহিদা আক্তার ছিলেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে তাইম মারা গেছেন বলে সাংবাদিকদের কাছে তিনি জানতে পেরেছেন বলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমাকে জানান। তবে লাশ খুঁজে পাচ্ছেন না।”

এসআই দেলোয়ার বলেন, “আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল মর্গ ও জরুরি বিভাগের পাশের মর্গে লাশ খুঁজতে থাকি। না পেয়ে নতুন ভবনের পাশে থাকা আরেকটি মর্গের মেঝেতে লাশ দেখতে পাই। ওই সময় ছেলের লাশ শনাক্ত করেন ময়নাল। তার পাশে আরও ছয়-সাতটি লাশ ছিল।”

এই পুলিশ কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দিতে বলেন, “তাইমের লাশ শনাক্তের পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য আমাদের শাহবাগ থানায় পাঠান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শাহবাগ থানায় একটি জিডি করার পর এসআই মো. শাহাদাত আলীকে সুরতহাল প্রস্তুতের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই কার্যক্রম শেষ হতে রাত ৯টা বেজে যায়। তখন শাহাদাত আলী জানান- ওই দিন আর কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। আমাদের পরদিন যেতে বলেন। আমরা তাইমের লাশটি মূল ভবনের মর্চ্যুয়ারিতে রেখে আসি।”

পরের দিন মৃতের সুরতহালে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করে বলে জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা দেলোয়ার বলেন,“সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের পর লাশটি রাজারবাগ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নেওয়া হয়। এএসআই (সশস্ত্র) মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বে গোসলের সময় তাইমের কোমরের বাঁ পাশের নিচে একটি বড় ক্ষতচিহ্ন দেখতে পাই। যা আমাদের কাছে পিস্তলের গুলির আঘাতের চিহ্ন মনে হয়েছে। জানাজা শেষে তাইমের নিথর দেহটি সরকারি গাড়িযোগে কুমিল্লায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।”


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত