সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

রামেকে শিশুদের নিঃশ্বাস হারানোর গল্প


সৈয়দা বদরুন নেসা
সৈয়দা বদরুন নেসা
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬

রামেকে শিশুদের নিঃশ্বাস হারানোর গল্প
শিশুদের নিঃশ্বাস শুধু তাদের নিজের নয়, এটি আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এখন যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা কেবল একটি হাসপাতালের সংকট নয়, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর অসাম্য ও অক্ষমতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য।মাত্র কয়েকদিনে ডজন ডজন শিশু মারা গেছে। আর অনেকে আইসিইউতে যাওয়ার আগেই হারিয়ে যাচ্ছে। 

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা বহু শিশু আইসিইউ বেড না পেয়ে মারা যাওয়ার পরই তাদের “সিরিয়াল” আসে। “মৃত্যুর পর মেলে কাঙ্ক্ষিত সিরিয়াল”...এই একটি বাক্যই যেন পুরো বাস্তবতার নির্যাস।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুদের জন্য নির্ধারিত আইসিইউ বেডের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। প্রতিদিন গড়ে ৩০টির বেশি শিশু আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন নিয়ে আসে। অথচ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে হাতে গোনা কয়েকজনকে। 

বাকিরা অপেক্ষা করছে একটি বেডের জন্য। একটি সুযোগের জন্য। এই অপেক্ষাই অনেকের জন্য মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়ার সময় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ২-৩ দিন ধরে অপেক্ষা করেও বেড মিলছে না। আবার কেউ কেউ সিরিয়ালের নিচে থাকায় সুযোগ পাননি।

এই সংকটের ভেতরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠে আসে ন্যায়বিচারের।আইসিইউতে সিরিয়াল কি সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর? বাস্তবতা বলছে, সবসময় তা হচ্ছে না। ক্ষমতার প্রভাব, পরিচয় বা সুপারিশের কারণে সিরিয়াল ভেঙে যাওয়ার অভিযোগ বহুদিনের। 

অথচ চিকিৎসার ক্ষেত্রে একমাত্র অগ্রাধিকার হওয়া উচিত রোগীর অবস্থা। সিরিয়াল ভাঙা যাবে, কিন্তু সেটি কেবল তখনই, যখন কোনো রোগীর অবস্থা ভয়াবহ।এটি হতে হবে সম্পূর্ণ চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত, কোনোভাবেই ব্যক্তিগত প্রভাব নয়। অন্যথায় এটি হয়ে ওঠে অন্য এক শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়ার নীরব কারণ।

সমস্যা শুধু বেডের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। হাসপাতালের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এই সংকটকে আরও তীব্র করছে। লিফটগুলোর শোচনীয় অবস্থা এমন যে, আইসিইউতে ভর্তি রোগীর অ্যাটেনডেন্টরা জরুরি ওষুধ বা ইনজেকশন আনতে গিয়ে মূল্যবান সময় হারাচ্ছেন। সেই সময়টুকুই অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জীবনের শেষ সময় হয়ে উঠছে। একজন বাবা দৌড়াচ্ছেন, একজন মা প্রার্থনা করছেন কিন্তু সিস্টেম তখন অচল। এই দৃশ্য কোনোভাবেই একটি আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার হতে পারে না।

আইসিইউ কেবল যন্ত্রপাতির সমষ্টি নয়। এটি একটি সমন্বিত সিস্টেম। দক্ষ নার্স, প্রশিক্ষিত ডাক্তার, সার্বক্ষণিক মনিটরিং- এই তিনটি ছাড়া আইসিইউ কার্যকর হতে পারে না। প্রতিবেদনে স্পষ্ট যে, জনবল সংকট, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব আর সমন্বয়ের ঘাটতি চিকিৎসার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাইরে থেকে আধুনিক দেখালেও ভেতরে যদি এই কাঠামো না থাকে, তাহলে সেটি কেবল একটি আড়ম্বরপূর্ণ খোলস।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। এই প্রতিষ্ঠানকে আমরা এমন অবস্থায় দেখতে চাই না। কারণ এটি কেবল একটি হাসপাতাল নয় বরং এটি মানুষের আস্থা, নিরাপত্তা আর বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। আর সেই ভরসা যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে সমাজের ভিতও নড়ে যায়।

সমাধানের পথ স্পষ্ট। প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগ। প্রথমত, আইসিইউতে একটি কঠোর, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। যেখানে কোনো প্রভাব বা সুপারিশ কাজ করবে না। জরুরি রোগীদের জন্য বৈজ্ঞানিক ট্রায়াজ ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে সবচেয়ে সংকটাপন্ন রোগী অগ্রাধিকার পায়। তবে সেটি হতে হবে কেবল চিকিৎসাগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে।

দ্বিতীয়ত, আইসিইউতে নজরদারি ও জনবল বাড়াতে হবে। দক্ষ নার্স ও অভিজ্ঞ ডাক্তার নিয়োগের মাধ্যমে একটি কার্যকর টিম গড়ে তুলতে হবে। এই ক্ষেত্রে বারডেম হাসপাতালের আইসিইউ একটি অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হতে পারে, যেখানে শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও মানবিকতা একসঙ্গে কাজ করে।

তৃতীয়ত, অবিলম্বে অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। লিফটগুলো সচল ও আধুনিক করা, জরুরি ওষুধ সরবরাহের দ্রুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এই বিষয়গুলো আর অবহেলার সুযোগ নেই। আইসিইউতে প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই পরিকল্পনা করতে হবে।

সবশেষে, এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রতিটি জেলায় উন্নত সুবিধাসম্পন্ন আইসিইউ স্থাপন অপরিহার্য। একটি শিশুকে যদি কয়েক ঘণ্টা দূরে চিকিৎসার জন্য পাঠাতে হয়, তাহলে সেই সময়টুকুই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই জেলা পর্যায়ে শক্তিশালী আইসিইউ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

আমরা উন্নয়নের গল্প লিখছি। অগ্রগতির হিসাব করছি। কিন্তু একটি শিশু যদি একটি বেড না পেয়ে মারা যায়, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা অর্থবহ? এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দিতে হবে। কারণ এই শিশুদের নিঃশ্বাস শুধু তাদের নিজের নয়, এটি আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গবেষক।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬


রামেকে শিশুদের নিঃশ্বাস হারানোর গল্প

প্রকাশের তারিখ : ৩১ মার্চ ২০২৬

featured Image

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এখন যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা কেবল একটি হাসপাতালের সংকট নয়, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর অসাম্য ও অক্ষমতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য।মাত্র কয়েকদিনে ডজন ডজন শিশু মারা গেছে। আর অনেকে আইসিইউতে যাওয়ার আগেই হারিয়ে যাচ্ছে। 

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা বহু শিশু আইসিইউ বেড না পেয়ে মারা যাওয়ার পরই তাদের “সিরিয়াল” আসে। “মৃত্যুর পর মেলে কাঙ্ক্ষিত সিরিয়াল”...এই একটি বাক্যই যেন পুরো বাস্তবতার নির্যাস।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুদের জন্য নির্ধারিত আইসিইউ বেডের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। প্রতিদিন গড়ে ৩০টির বেশি শিশু আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন নিয়ে আসে। অথচ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে হাতে গোনা কয়েকজনকে। 

বাকিরা অপেক্ষা করছে একটি বেডের জন্য। একটি সুযোগের জন্য। এই অপেক্ষাই অনেকের জন্য মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়ার সময় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ২-৩ দিন ধরে অপেক্ষা করেও বেড মিলছে না। আবার কেউ কেউ সিরিয়ালের নিচে থাকায় সুযোগ পাননি।

এই সংকটের ভেতরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠে আসে ন্যায়বিচারের।আইসিইউতে সিরিয়াল কি সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর? বাস্তবতা বলছে, সবসময় তা হচ্ছে না। ক্ষমতার প্রভাব, পরিচয় বা সুপারিশের কারণে সিরিয়াল ভেঙে যাওয়ার অভিযোগ বহুদিনের। 

অথচ চিকিৎসার ক্ষেত্রে একমাত্র অগ্রাধিকার হওয়া উচিত রোগীর অবস্থা। সিরিয়াল ভাঙা যাবে, কিন্তু সেটি কেবল তখনই, যখন কোনো রোগীর অবস্থা ভয়াবহ।এটি হতে হবে সম্পূর্ণ চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত, কোনোভাবেই ব্যক্তিগত প্রভাব নয়। অন্যথায় এটি হয়ে ওঠে অন্য এক শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়ার নীরব কারণ।

সমস্যা শুধু বেডের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। হাসপাতালের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এই সংকটকে আরও তীব্র করছে। লিফটগুলোর শোচনীয় অবস্থা এমন যে, আইসিইউতে ভর্তি রোগীর অ্যাটেনডেন্টরা জরুরি ওষুধ বা ইনজেকশন আনতে গিয়ে মূল্যবান সময় হারাচ্ছেন। সেই সময়টুকুই অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জীবনের শেষ সময় হয়ে উঠছে। একজন বাবা দৌড়াচ্ছেন, একজন মা প্রার্থনা করছেন কিন্তু সিস্টেম তখন অচল। এই দৃশ্য কোনোভাবেই একটি আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার হতে পারে না।

আইসিইউ কেবল যন্ত্রপাতির সমষ্টি নয়। এটি একটি সমন্বিত সিস্টেম। দক্ষ নার্স, প্রশিক্ষিত ডাক্তার, সার্বক্ষণিক মনিটরিং- এই তিনটি ছাড়া আইসিইউ কার্যকর হতে পারে না। প্রতিবেদনে স্পষ্ট যে, জনবল সংকট, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব আর সমন্বয়ের ঘাটতি চিকিৎসার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাইরে থেকে আধুনিক দেখালেও ভেতরে যদি এই কাঠামো না থাকে, তাহলে সেটি কেবল একটি আড়ম্বরপূর্ণ খোলস।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। এই প্রতিষ্ঠানকে আমরা এমন অবস্থায় দেখতে চাই না। কারণ এটি কেবল একটি হাসপাতাল নয় বরং এটি মানুষের আস্থা, নিরাপত্তা আর বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। আর সেই ভরসা যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে সমাজের ভিতও নড়ে যায়।

সমাধানের পথ স্পষ্ট। প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগ। প্রথমত, আইসিইউতে একটি কঠোর, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। যেখানে কোনো প্রভাব বা সুপারিশ কাজ করবে না। জরুরি রোগীদের জন্য বৈজ্ঞানিক ট্রায়াজ ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে সবচেয়ে সংকটাপন্ন রোগী অগ্রাধিকার পায়। তবে সেটি হতে হবে কেবল চিকিৎসাগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে।

দ্বিতীয়ত, আইসিইউতে নজরদারি ও জনবল বাড়াতে হবে। দক্ষ নার্স ও অভিজ্ঞ ডাক্তার নিয়োগের মাধ্যমে একটি কার্যকর টিম গড়ে তুলতে হবে। এই ক্ষেত্রে বারডেম হাসপাতালের আইসিইউ একটি অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হতে পারে, যেখানে শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও মানবিকতা একসঙ্গে কাজ করে।

তৃতীয়ত, অবিলম্বে অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। লিফটগুলো সচল ও আধুনিক করা, জরুরি ওষুধ সরবরাহের দ্রুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এই বিষয়গুলো আর অবহেলার সুযোগ নেই। আইসিইউতে প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই পরিকল্পনা করতে হবে।

সবশেষে, এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রতিটি জেলায় উন্নত সুবিধাসম্পন্ন আইসিইউ স্থাপন অপরিহার্য। একটি শিশুকে যদি কয়েক ঘণ্টা দূরে চিকিৎসার জন্য পাঠাতে হয়, তাহলে সেই সময়টুকুই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই জেলা পর্যায়ে শক্তিশালী আইসিইউ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

আমরা উন্নয়নের গল্প লিখছি। অগ্রগতির হিসাব করছি। কিন্তু একটি শিশু যদি একটি বেড না পেয়ে মারা যায়, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা অর্থবহ? এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দিতে হবে। কারণ এই শিশুদের নিঃশ্বাস শুধু তাদের নিজের নয়, এটি আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গবেষক।


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত