পা আর গলা অন্যসব মোরগের চেয়ে অনেক লম্বা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, উঁচু দেহ আর দৃপ্ত ভঙ্গি দেখলেই বোঝা যায়, এটি কোনো সাধারণ মোরগ নয়। স্থানীয়রা ডাকে হাসলি মোরগ নামে। অনেকে আবার ‘লড়াইবাজ’ নামের ডাকে। শক্তিশালী এই মোরগ মূলত লড়াইয়ের জন্যই পালা হয়, এ কারনেই একে ‘লড়াইবাজ’ নামকরন করা হয়েছে।
লড়াইয়ের জন্য পরিচিত এই মোরগ টানা ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট পর্যন্ত টিকে থাকতে হয়। তাই প্রতিযোগিতার একমাস আগে থেকেই শুরু হয় বিশেষ যত্ন — ধান, গম, ভুট্টার পাশাপাশি কবুতরের মাংস, বাদাম, কিসমিস আর সেদ্ধ ডিম। সবই শক্তি বাড়ানোর জন্য।
বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রায় একশ পরিবার জড়িত এই মোরগ ও মুরগী পালনে। এর মধ্যে কিছু পরিবার এটিকে বাণিজ্যিকভাবেও গ্রহণ করেছে।
সরেজমিনে জেলার সরাইল উপজেলায় দেখা যায়, ১০ থেকে ১২টি হাসলি মোরগ লড়াইয়ের দল। প্রতিটি দলে ৭-৮ জন পালনকারী থাকেন এবং তাদের কাছে ১০-১৫টি করে লড়াই উপযোগী মোরগ থাকে। তবে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় প্রতি দল থেকে সাতটি মোরগ।
সরাইলের নোয়াগাও এলাকার হাসলি মোরগ পালনকারী জামাল মৃধা বলেন, “আমরা বাবা এই মোরগ পালন করতেন। এখন আমিও করি। আমার কাছে এখন লড়াই করতে পারে এমন ৪টা মোরগ আছে। লড়াই করতে পারে এমন মোরগের কদর অনেক বেশি। একটা মোরগ ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করছি।”
জনশ্রুতি আছে, ১৬ শতকে ইরান থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের জমিদার পরিবার প্রথম এই মোরগ নিয়ে আসে। আর তখন থেকেই এই ভুখন্ডে শুরু মোরগ লড়াইয়ের ঐতিহ্য।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ এখন এই হাসলি বা আঁচিল মোরগ। এখানে মোগল শাসনামল থেকেই চলে আসছে এর লালন-পালন আর লড়াইয়ের সংস্কৃতি।
প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত, বিশেষ করে বিভিন্ন মেলা ও উৎসবকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে এই লড়াই। ঢাকা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দল আসে সরাইলে। আবার সরাইলের দলগুলোকেও দেশের বিভিন্ন জেলায় আমন্ত্রণ জানানো হয়।
স্থানীয়রা জানায়, একটি মোরগের দাম ৫ হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। লড়াইয়ে যত অভিজ্ঞ দাম তত বেড়ে যায়।
ঐতিহ্য, শখ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সমন্বয়ে সরাইলের হাসলি মোরগ ও মুরগী এখন আর শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে পড়ছে শহরেও। এটি ধীরে ধীরে একটি অনন্য সাংস্কৃতিক পরিচয়ের রূপ নিচ্ছে, যা বহন করছে শত বছরের ইতিহাস।
দ্য লাইভস্টক কনজারভেন্সি নামে প্রাণিসম্পদ বিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ভারতে এই জাতটি হাজার হাজার বছর ধরে পরিচিত। প্রখ্যাত পোল্ট্রি লেখক লুইস রাইট জানিয়েছেন খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে ‘মনুসংহিতা’ নামের আইনি দলিলে যে পাখিদের লড়াইয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়, সেগুলো হয়তো বর্তমানের হাসিল মেরগ না হলেও অন্তত তাদের পূর্বপুরুষ ছিল।
জানা যায়, আমেরিকায় প্রথম হাসলি বা হাসিল মোরগ আমদানি করা হয়েছিল ভারতের লখনউ থেকে।
ইন্ডিয়ানাপোলিসের ড. এইচ.পি. ক্লার্ক ১৮৮৭ সালে ইন্ডিয়ানা স্টেট ফেয়ারে প্রথম এই জাতটি প্রদর্শন করেন।
প্রাচীন, বিদেশি ধাঁচের এবং চমৎকার দৈহিক গঠনের এই হাসিল জাতটি মূলত মোরগলড়াইয়ের উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছিল। এদের শরীর বেশ আঁটোসাঁটো, পেশিবহুল এবং এরা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। দেখতে যতটা মনে হয়, এদের ওজন আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি।
এই জাতের মুরগীও আছে। তবে হাসলি মেরগই বেশী আলোচিত লড়াইয়ের কারণে। পুরুষ হোক বা স্ত্রী — এদের পালক ছোট ও শক্ত হয়, যা শরীরের সাথে মিশে থাকে। এদের মাংস বেশ শক্ত এবং এরা ধীরগতিতে বাড়ে। মোরগগুলোর ডাক বেশ স্বতন্ত্র, সংক্ষিপ্ত এবং কাটা কাটা।
এই জাতটি মোরগ বা মুরগিদের মধ্যে বেশ বুদ্ধিমান হিসেবে পরিচিত। এদের কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্য আছে, যেমন: হলুদ রঙের পা, বাজপাখির মতো ঠোঁট এবং গোলাকার মাথার ঠিক মাঝখানে উজ্জ্বল ও তীক্ষ্ণ চোখ।

মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ মার্চ ২০২৬
পা আর গলা অন্যসব মোরগের চেয়ে অনেক লম্বা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, উঁচু দেহ আর দৃপ্ত ভঙ্গি দেখলেই বোঝা যায়, এটি কোনো সাধারণ মোরগ নয়। স্থানীয়রা ডাকে হাসলি মোরগ নামে। অনেকে আবার ‘লড়াইবাজ’ নামের ডাকে। শক্তিশালী এই মোরগ মূলত লড়াইয়ের জন্যই পালা হয়, এ কারনেই একে ‘লড়াইবাজ’ নামকরন করা হয়েছে।
লড়াইয়ের জন্য পরিচিত এই মোরগ টানা ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট পর্যন্ত টিকে থাকতে হয়। তাই প্রতিযোগিতার একমাস আগে থেকেই শুরু হয় বিশেষ যত্ন — ধান, গম, ভুট্টার পাশাপাশি কবুতরের মাংস, বাদাম, কিসমিস আর সেদ্ধ ডিম। সবই শক্তি বাড়ানোর জন্য।
বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রায় একশ পরিবার জড়িত এই মোরগ ও মুরগী পালনে। এর মধ্যে কিছু পরিবার এটিকে বাণিজ্যিকভাবেও গ্রহণ করেছে।
সরেজমিনে জেলার সরাইল উপজেলায় দেখা যায়, ১০ থেকে ১২টি হাসলি মোরগ লড়াইয়ের দল। প্রতিটি দলে ৭-৮ জন পালনকারী থাকেন এবং তাদের কাছে ১০-১৫টি করে লড়াই উপযোগী মোরগ থাকে। তবে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় প্রতি দল থেকে সাতটি মোরগ।
সরাইলের নোয়াগাও এলাকার হাসলি মোরগ পালনকারী জামাল মৃধা বলেন, “আমরা বাবা এই মোরগ পালন করতেন। এখন আমিও করি। আমার কাছে এখন লড়াই করতে পারে এমন ৪টা মোরগ আছে। লড়াই করতে পারে এমন মোরগের কদর অনেক বেশি। একটা মোরগ ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করছি।”
জনশ্রুতি আছে, ১৬ শতকে ইরান থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের জমিদার পরিবার প্রথম এই মোরগ নিয়ে আসে। আর তখন থেকেই এই ভুখন্ডে শুরু মোরগ লড়াইয়ের ঐতিহ্য।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ এখন এই হাসলি বা আঁচিল মোরগ। এখানে মোগল শাসনামল থেকেই চলে আসছে এর লালন-পালন আর লড়াইয়ের সংস্কৃতি।
প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত, বিশেষ করে বিভিন্ন মেলা ও উৎসবকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে এই লড়াই। ঢাকা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দল আসে সরাইলে। আবার সরাইলের দলগুলোকেও দেশের বিভিন্ন জেলায় আমন্ত্রণ জানানো হয়।
স্থানীয়রা জানায়, একটি মোরগের দাম ৫ হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। লড়াইয়ে যত অভিজ্ঞ দাম তত বেড়ে যায়।
ঐতিহ্য, শখ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সমন্বয়ে সরাইলের হাসলি মোরগ ও মুরগী এখন আর শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে পড়ছে শহরেও। এটি ধীরে ধীরে একটি অনন্য সাংস্কৃতিক পরিচয়ের রূপ নিচ্ছে, যা বহন করছে শত বছরের ইতিহাস।
দ্য লাইভস্টক কনজারভেন্সি নামে প্রাণিসম্পদ বিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ভারতে এই জাতটি হাজার হাজার বছর ধরে পরিচিত। প্রখ্যাত পোল্ট্রি লেখক লুইস রাইট জানিয়েছেন খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে ‘মনুসংহিতা’ নামের আইনি দলিলে যে পাখিদের লড়াইয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়, সেগুলো হয়তো বর্তমানের হাসিল মেরগ না হলেও অন্তত তাদের পূর্বপুরুষ ছিল।
জানা যায়, আমেরিকায় প্রথম হাসলি বা হাসিল মোরগ আমদানি করা হয়েছিল ভারতের লখনউ থেকে।
ইন্ডিয়ানাপোলিসের ড. এইচ.পি. ক্লার্ক ১৮৮৭ সালে ইন্ডিয়ানা স্টেট ফেয়ারে প্রথম এই জাতটি প্রদর্শন করেন।
প্রাচীন, বিদেশি ধাঁচের এবং চমৎকার দৈহিক গঠনের এই হাসিল জাতটি মূলত মোরগলড়াইয়ের উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছিল। এদের শরীর বেশ আঁটোসাঁটো, পেশিবহুল এবং এরা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। দেখতে যতটা মনে হয়, এদের ওজন আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি।
এই জাতের মুরগীও আছে। তবে হাসলি মেরগই বেশী আলোচিত লড়াইয়ের কারণে। পুরুষ হোক বা স্ত্রী — এদের পালক ছোট ও শক্ত হয়, যা শরীরের সাথে মিশে থাকে। এদের মাংস বেশ শক্ত এবং এরা ধীরগতিতে বাড়ে। মোরগগুলোর ডাক বেশ স্বতন্ত্র, সংক্ষিপ্ত এবং কাটা কাটা।
এই জাতটি মোরগ বা মুরগিদের মধ্যে বেশ বুদ্ধিমান হিসেবে পরিচিত। এদের কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্য আছে, যেমন: হলুদ রঙের পা, বাজপাখির মতো ঠোঁট এবং গোলাকার মাথার ঠিক মাঝখানে উজ্জ্বল ও তীক্ষ্ণ চোখ।

আপনার মতামত লিখুন