ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য সিপাহী বিদ্রোহের ১৬৯ বছর পূর্ণ হয়েছে এবার। ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্রিটিশ ভারতের ব্যারাকপুরে সিপাহী বিপ্লব খ্যাত এ বিদ্রোহের শুরু। ফরাসী, পর্তুগিজদের সঙ্গে ইংরেজরাও ভারতবর্ষে চলে আসে ব্যবসা করার উদ্দেশে। প্রথমে ব্যবসা উদ্দেশ্য থাকলেও সময় পরিক্রমায় নানা চক্রান্ত ও কূটকৌশলের মাধ্যমে তারা ভারতের নিয়ন্ত্রণ হাতে সচেষ্ট হয়।
১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজদ্দৌলাকে পরাজিত করার মাধ্যমে এ দেশে তাদের ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে মির কাসিমের পরাজয়ের পরে সমগ্র ভারতবর্ষ চলে যায় তাদের নিয়ন্ত্রণে। পলাশী যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হাতে পায়, তা কাজে লাগিয়ে সারা ভারতবর্ষে শোষণ ও নির্যাতন চালাতে থাকে।
বাংলার স্বাধীনচেতা জনগণ কখনো পরাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। এ কারণে ১৯ শতকের মাঝ পর্যন্ত ছোট বড় বহু আন্দোলন, আক্রমণ, যুদ্ধ, বিদ্রোহ বা অভ্যূত্থানের মধ্যে দিয়ে বিদ্রোহের ধারা অব্যাহত থেকেছে। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার যুদ্ধ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। ১৮৩১ সালে ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থায় তিতুমীর শহীদ যান।
ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ ওঠে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সর্বাগ্রে চলে আসে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের কথা। অনেকেই এটাকে বলেছেন ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ, মহাবিদ্রোহ, আবার কারো কাছে এটি ছিল গণঅভ্যুত্থান। ইংরেজ শাসনামলে ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো সিপাহী বিদ্রোহ। ১৮৫৭ সালে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ ছিল এটি। এই বিদ্রোহের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করা।
সিপাহী বিদ্রোহের শুরু
১৮৫৭ সালের ১০ মে মিরাট শহরে শুরু হওয়া ইংরেজ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সিপাহীদের সঙ্গে যে যুদ্ধে সংঘটিত হয় তাই সিপাহী বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ১৮৫৭ সালে উত্তর ও মধ্য ভারতে যে বিরাট গণবিদ্রোহ সংঘটিত হয় তা ব্রিটিশ শাসনকে প্রায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কোম্পানির সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়ে তা ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলায় শুরু হয়ে ইংরেজ অধিকৃত ভারতের অন্য এলাকার সিপাহীদের মধ্যেও এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিম বাংলার ব্যারাকপুরে সিপাহী ‘মঙ্গল পাণ্ডের’ নেতৃত্বে প্রথম বিদ্রোহ শুরু হয়। প্রায় এক বছর ধরে অগণিত কৃষক, শিল্পী, সৈন্য ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী বীরত্বের সঙ্গে সংগ্রাম চালিয়ে যায়। তাদের সাহসিকতা ও আত্মবিসর্জন ভারতবাসীর ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
ইংরেজরা এই বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করে। নিরপরাধ বহুজনকে এ সময় নির্বিচারে ফাঁসি দেয়া হয়। ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে সে সময় বাংলার বিদ্রোহী সিপাহীদের ফাঁসি দেয়া হয়। বিদ্রোহীরা পরাজিত হলেও এই বিদ্রোহের ফলেই কোম্পানির শাসনের অবসান হয়। শুরু হয় ব্রিটিশরাজ তথা রানী ভিক্টোরিয়ার শাসন।
ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন
২৯ মার্চ, ১৮৫৭ রোববার বিকেল বেলা। ব্রিটিশদের জন্যে দিনটি ছিল ছুটির দিন। তারা বিশ্রাম নিচ্ছিল যার যার গৃহে। ব্যারাকপুরের প্যারেড ময়দানে অসময়ে মানুষদের ভিড় বাড়ছিল। ধীরে ধীরে প্যারেড গ্রাউন্ডে জড়ো হতে থাকে বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। পঞ্চম ব্যাটালিয়ন বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য মঙ্গল পাণ্ডে ঘুরছিলেন ব্যারাকপুর প্যারেড গ্রাউন্ডের আশপাশেই। চাপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল চারদিকে, কী হচ্ছে তা তখনো কেউ জানে না, তবে এটুকু জানে যে কিছু একটা ঘটছে। সিপাহীদের মধ্যে কেউ আসছে খালি হাতে, কেউ বন্দুক নিয়ে। সৈনিকদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছিল। কেউ জানেনা কি ঘটতে চলেছে তবে এটুকু জানে যে রচিত হবে এক মহান ইতিহাস।
কেউ একজন এগিয়ে এসে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিবে, সবাই এই অপেক্ষা করছে। ফলাফল যদি আশানুরূপ না হয় তাহলে পরিনাম ভয়াবহ হবে, এ কারণে কেউ এগিয়ে আসার সাহস করতে পারছে না!
সিপাহী বিদ্রোহ কেন হয়েছিল?
খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রকাশ্যে ধর্মপ্রচার, হিন্দু-মুসলিমদের জোড় করে খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা, মসজিদ ও মন্দিরের জমির ওপর কর আরোপ এসব মিলিয়ে জনগণ বিক্ষুদ্ধ হতে থাকে। এরূপ নানা কারণে ১৮৫৭ সালের বহু আগে থেকেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সামরিক কারণে সিপাহীদের ক্ষোভ জমা হচ্ছিল।
সামরিক বৈষম্য সিপাহী বিপ্লবের উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল। ইংরেজ সামরিক অফিসার ও সিপাহীদের তুলনায় দেশীয় সিপাহী ও অফিসারদের বেতন ছিল কম। তাছাড়া ইংরেজ সামরিক অফিসাররা দেশীয় সামরিক অফিসারও সিপাহীদের খুব বিশ্রি ভাষায় গালিগালাজ করত। বৃটিশ সরকার ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫০০ জন ভারতীয় সৈন্যের জন্য বার্ষিক ৯৮ লাখ পাউন্ড ব্যয় করতো এবং অন্যদিকে ৫১ হাজার ৩১৬ ইংরেজ সৈনিকের জন্য ৫৬ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড ব্যয় করতো। যা ছিল ভারতীয় সিপাহীদের জন্য চরম বৈষম্য।
সেনাবিভাগে ব্রিটিশ ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে বেতন, পদোন্নতি, বদলি ইত্যাদির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণ ভারতের সৈন্যদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। সিন্ধু ও আফগানিস্তানে নিযুক্ত সেনাদলকে বিশেষ ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও ভারতীয় সেনাদের তা থেকে বঞ্চিত করা হয়। তাদের ধর্ম বিশ্বাসকে মর্যাদা না দিয়ে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের যত্রতত্র বদলির ব্যবস্থা করেন। জাত ও ধর্ম হারাবার ভয়ে সিপাহীগণ কালাপানি পার হয়ে ব্রহ্মদেশ বা অন্যত্র যেতে অনাগ্রহী হয়।
সিপাহিদের ক্ষোভ যখন ক্রমশ পূঞ্জীভূত হচ্ছিল ঠিক সেই সময়ে এনফিল্ড রাইফেল নামে এক নতুন ধরনের রাইফেলের প্রবর্তন তাদের ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়। এনফিল্ড রাইফেলে যে কার্তুজ ব্যবহার করা হত, তার খোলসটি দাঁতে কেটে রাইফেলে ভরতে হতো। গুজব রটে যায় যে, এই কার্তুজে গরু ও শুয়োরের চর্বি মেশানো আছে। ধর্মচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় কোম্পানির সেনাবাহিনীর হিন্দু ও মুসলমান সিপাহীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং এই টোটা ব্যবহার করতে অস্বীকার করে ।
এনফিল্ড রাইফেলকে প্রত্যক্ষ ধরা হলে, এটি কিন্ত মূল কারণ নয়। কারণ সরকার সিপাহীদের সামনে এই টোটা নষ্ট করা হলেও তাদের অসন্তোষ স্থিমিত হয় নি। কারণ এই বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণ তথা সিপাহীদের তীব্র অসন্তোষ। পরবর্তীকালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিপাহীরা চর্বি মাখানো এই টোটাই ব্যবহার করেছিল। সিপাহী বিদ্রোহ একদিনে জন্ম নেয়নি বরং এটি ছিল বহুদিনের তিলে তিলে সঞ্চিত প্রস্তুতির ফল।
১৮৫৭ সালে কলকাতার ব্যারাকপুরে মঙ্গল পান্ডের বিদ্রোহের দ্বারা শুরু হওয়া সিপাহী বিদ্রোহ পরবর্তিতে মহাবিদ্রোহে রূপ নেয়। ইংরেজ সরকার এই বিদ্রোহকে কঠোর হস্তে দমন করলেও এর মাধ্যমে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হয়। দীর্ঘ ১০০ বছর অত্যাচার, লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের পরে এ মহাবিদ্রোহ ছিল একটি জলোচ্ছ্বাসের মতো। এটাকে অনেকে আবেগের সঙ্গে পলাশীর প্রতিশোধও বলে থাকেন।
প্রথমদিকে অনেকটা বিজয়ী হয়েও, শেষে পরাজয় বরণ করেছিলেন। পরাজয় সত্ত্বেও ভারতবর্ষের সিপাহী ও জনগণের এই যে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ তা পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রেরণা যুগিয়েছে। পাশাপাশি বৃটিশ শাসকদের নৃশংস বর্বরতার চিত্রও তুলে ধরেছে।
[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]

মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ মার্চ ২০২৬
ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য সিপাহী বিদ্রোহের ১৬৯ বছর পূর্ণ হয়েছে এবার। ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্রিটিশ ভারতের ব্যারাকপুরে সিপাহী বিপ্লব খ্যাত এ বিদ্রোহের শুরু। ফরাসী, পর্তুগিজদের সঙ্গে ইংরেজরাও ভারতবর্ষে চলে আসে ব্যবসা করার উদ্দেশে। প্রথমে ব্যবসা উদ্দেশ্য থাকলেও সময় পরিক্রমায় নানা চক্রান্ত ও কূটকৌশলের মাধ্যমে তারা ভারতের নিয়ন্ত্রণ হাতে সচেষ্ট হয়।
১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজদ্দৌলাকে পরাজিত করার মাধ্যমে এ দেশে তাদের ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে মির কাসিমের পরাজয়ের পরে সমগ্র ভারতবর্ষ চলে যায় তাদের নিয়ন্ত্রণে। পলাশী যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হাতে পায়, তা কাজে লাগিয়ে সারা ভারতবর্ষে শোষণ ও নির্যাতন চালাতে থাকে।
বাংলার স্বাধীনচেতা জনগণ কখনো পরাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। এ কারণে ১৯ শতকের মাঝ পর্যন্ত ছোট বড় বহু আন্দোলন, আক্রমণ, যুদ্ধ, বিদ্রোহ বা অভ্যূত্থানের মধ্যে দিয়ে বিদ্রোহের ধারা অব্যাহত থেকেছে। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার যুদ্ধ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। ১৮৩১ সালে ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থায় তিতুমীর শহীদ যান।
ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ ওঠে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সর্বাগ্রে চলে আসে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের কথা। অনেকেই এটাকে বলেছেন ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ, মহাবিদ্রোহ, আবার কারো কাছে এটি ছিল গণঅভ্যুত্থান। ইংরেজ শাসনামলে ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো সিপাহী বিদ্রোহ। ১৮৫৭ সালে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ ছিল এটি। এই বিদ্রোহের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করা।
সিপাহী বিদ্রোহের শুরু
১৮৫৭ সালের ১০ মে মিরাট শহরে শুরু হওয়া ইংরেজ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সিপাহীদের সঙ্গে যে যুদ্ধে সংঘটিত হয় তাই সিপাহী বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ১৮৫৭ সালে উত্তর ও মধ্য ভারতে যে বিরাট গণবিদ্রোহ সংঘটিত হয় তা ব্রিটিশ শাসনকে প্রায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কোম্পানির সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়ে তা ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলায় শুরু হয়ে ইংরেজ অধিকৃত ভারতের অন্য এলাকার সিপাহীদের মধ্যেও এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিম বাংলার ব্যারাকপুরে সিপাহী ‘মঙ্গল পাণ্ডের’ নেতৃত্বে প্রথম বিদ্রোহ শুরু হয়। প্রায় এক বছর ধরে অগণিত কৃষক, শিল্পী, সৈন্য ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী বীরত্বের সঙ্গে সংগ্রাম চালিয়ে যায়। তাদের সাহসিকতা ও আত্মবিসর্জন ভারতবাসীর ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
ইংরেজরা এই বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করে। নিরপরাধ বহুজনকে এ সময় নির্বিচারে ফাঁসি দেয়া হয়। ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে সে সময় বাংলার বিদ্রোহী সিপাহীদের ফাঁসি দেয়া হয়। বিদ্রোহীরা পরাজিত হলেও এই বিদ্রোহের ফলেই কোম্পানির শাসনের অবসান হয়। শুরু হয় ব্রিটিশরাজ তথা রানী ভিক্টোরিয়ার শাসন।
ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন
২৯ মার্চ, ১৮৫৭ রোববার বিকেল বেলা। ব্রিটিশদের জন্যে দিনটি ছিল ছুটির দিন। তারা বিশ্রাম নিচ্ছিল যার যার গৃহে। ব্যারাকপুরের প্যারেড ময়দানে অসময়ে মানুষদের ভিড় বাড়ছিল। ধীরে ধীরে প্যারেড গ্রাউন্ডে জড়ো হতে থাকে বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। পঞ্চম ব্যাটালিয়ন বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য মঙ্গল পাণ্ডে ঘুরছিলেন ব্যারাকপুর প্যারেড গ্রাউন্ডের আশপাশেই। চাপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল চারদিকে, কী হচ্ছে তা তখনো কেউ জানে না, তবে এটুকু জানে যে কিছু একটা ঘটছে। সিপাহীদের মধ্যে কেউ আসছে খালি হাতে, কেউ বন্দুক নিয়ে। সৈনিকদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছিল। কেউ জানেনা কি ঘটতে চলেছে তবে এটুকু জানে যে রচিত হবে এক মহান ইতিহাস।
কেউ একজন এগিয়ে এসে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিবে, সবাই এই অপেক্ষা করছে। ফলাফল যদি আশানুরূপ না হয় তাহলে পরিনাম ভয়াবহ হবে, এ কারণে কেউ এগিয়ে আসার সাহস করতে পারছে না!
সিপাহী বিদ্রোহ কেন হয়েছিল?
খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রকাশ্যে ধর্মপ্রচার, হিন্দু-মুসলিমদের জোড় করে খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা, মসজিদ ও মন্দিরের জমির ওপর কর আরোপ এসব মিলিয়ে জনগণ বিক্ষুদ্ধ হতে থাকে। এরূপ নানা কারণে ১৮৫৭ সালের বহু আগে থেকেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সামরিক কারণে সিপাহীদের ক্ষোভ জমা হচ্ছিল।
সামরিক বৈষম্য সিপাহী বিপ্লবের উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল। ইংরেজ সামরিক অফিসার ও সিপাহীদের তুলনায় দেশীয় সিপাহী ও অফিসারদের বেতন ছিল কম। তাছাড়া ইংরেজ সামরিক অফিসাররা দেশীয় সামরিক অফিসারও সিপাহীদের খুব বিশ্রি ভাষায় গালিগালাজ করত। বৃটিশ সরকার ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫০০ জন ভারতীয় সৈন্যের জন্য বার্ষিক ৯৮ লাখ পাউন্ড ব্যয় করতো এবং অন্যদিকে ৫১ হাজার ৩১৬ ইংরেজ সৈনিকের জন্য ৫৬ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড ব্যয় করতো। যা ছিল ভারতীয় সিপাহীদের জন্য চরম বৈষম্য।
সেনাবিভাগে ব্রিটিশ ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে বেতন, পদোন্নতি, বদলি ইত্যাদির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণ ভারতের সৈন্যদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। সিন্ধু ও আফগানিস্তানে নিযুক্ত সেনাদলকে বিশেষ ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও ভারতীয় সেনাদের তা থেকে বঞ্চিত করা হয়। তাদের ধর্ম বিশ্বাসকে মর্যাদা না দিয়ে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের যত্রতত্র বদলির ব্যবস্থা করেন। জাত ও ধর্ম হারাবার ভয়ে সিপাহীগণ কালাপানি পার হয়ে ব্রহ্মদেশ বা অন্যত্র যেতে অনাগ্রহী হয়।
সিপাহিদের ক্ষোভ যখন ক্রমশ পূঞ্জীভূত হচ্ছিল ঠিক সেই সময়ে এনফিল্ড রাইফেল নামে এক নতুন ধরনের রাইফেলের প্রবর্তন তাদের ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়। এনফিল্ড রাইফেলে যে কার্তুজ ব্যবহার করা হত, তার খোলসটি দাঁতে কেটে রাইফেলে ভরতে হতো। গুজব রটে যায় যে, এই কার্তুজে গরু ও শুয়োরের চর্বি মেশানো আছে। ধর্মচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় কোম্পানির সেনাবাহিনীর হিন্দু ও মুসলমান সিপাহীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং এই টোটা ব্যবহার করতে অস্বীকার করে ।
এনফিল্ড রাইফেলকে প্রত্যক্ষ ধরা হলে, এটি কিন্ত মূল কারণ নয়। কারণ সরকার সিপাহীদের সামনে এই টোটা নষ্ট করা হলেও তাদের অসন্তোষ স্থিমিত হয় নি। কারণ এই বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণ তথা সিপাহীদের তীব্র অসন্তোষ। পরবর্তীকালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিপাহীরা চর্বি মাখানো এই টোটাই ব্যবহার করেছিল। সিপাহী বিদ্রোহ একদিনে জন্ম নেয়নি বরং এটি ছিল বহুদিনের তিলে তিলে সঞ্চিত প্রস্তুতির ফল।
১৮৫৭ সালে কলকাতার ব্যারাকপুরে মঙ্গল পান্ডের বিদ্রোহের দ্বারা শুরু হওয়া সিপাহী বিদ্রোহ পরবর্তিতে মহাবিদ্রোহে রূপ নেয়। ইংরেজ সরকার এই বিদ্রোহকে কঠোর হস্তে দমন করলেও এর মাধ্যমে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হয়। দীর্ঘ ১০০ বছর অত্যাচার, লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের পরে এ মহাবিদ্রোহ ছিল একটি জলোচ্ছ্বাসের মতো। এটাকে অনেকে আবেগের সঙ্গে পলাশীর প্রতিশোধও বলে থাকেন।
প্রথমদিকে অনেকটা বিজয়ী হয়েও, শেষে পরাজয় বরণ করেছিলেন। পরাজয় সত্ত্বেও ভারতবর্ষের সিপাহী ও জনগণের এই যে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ তা পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রেরণা যুগিয়েছে। পাশাপাশি বৃটিশ শাসকদের নৃশংস বর্বরতার চিত্রও তুলে ধরেছে।
[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]

আপনার মতামত লিখুন