সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

ইউরোপ নামের স্বর্গ, সাগরের ভাসমান কবরখানা


ফকর উদ্দিন মানিক
ফকর উদ্দিন মানিক
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬

ইউরোপ নামের স্বর্গ, সাগরের ভাসমান কবরখানা

সুনামগঞ্জে আকাশে আজ মেঘ নেই, তবু আলো কম। কারণ আলো সবসময় সূর্য থেকে আসে না—কখনও আসে মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা আশার আগুন থেকে। আর সেই আগুন যখন একে একে নিভে যায়, তখন পুরো জনপদ অন্ধকার হয়ে ওঠে। গত শুক্রবার, অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার পথে আফ্রিকার লিবিয়া উপকূলে ১৮টি বাংলাদেশি তরুণপ্রাণ সাগরে ভেসে গেছে—এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়; এটি এক জাতির দীর্ঘদিনের আত্মপ্রবন্ধনার নির্মম পুনরাবৃত্তি।

আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করি, যেখানে বিদেশ শব্দটি একটি মন্ত্রের মতো কাজ করে। এ মন্ত্র উচ্চারণ করলেই যেন দারিদ্র্য পালিয়ে যায়, বেকারত্ব লজ্জা পায়, আর ভবিষ্যৎ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। গ্রামের কোনো তরুণ যদি ঘোষণা দেয়— সে ইউরোপ যাবে, তখন সে আর সাধারণ মানুষ থাকে না; সে হয়ে ওঠে পরিবারের গর্ব, পাড়ার স্বপ্ন, ভবিষ্যতের প্রতীক। অথচ সেই যাত্রার মানচিত্রে কোথাও লেখা থাকে না— শেষ ঠিকানা হতে পারে এমন এক সাগর, যেখানে কবরেরও নামফলক থাকে না।

এই স্বপ্নের স্থপতিরা কবি নন, দার্শনিকও নন। তারা দালাল—সময়ের সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ী, যারা হতাশাকে পুঁজি করে স্বপ্নের প্যাকেজ বিক্রি করে। ১০-১২ লাখ টাকার বিনিময়ে তারা এমন এক ইউরোপ দেখায়, যেখানে রাস্তা সোনার, কাজ নিশ্চিত, আর জীবন অনন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের। কিন্তু সেই গল্পের শেষ পাতাটি তারা ছিঁড়ে ফেলে— যেখানে লেখা থাকে, এই যাত্রায় মৃত্যু খুবই সম্ভাব্য।

দালালরা জানে, এই দেশের মানুষ বাস্তবতার চেয়ে স্বপ্নকে বেশি ভালোবাসে। তাই তারা বাস্তবতাকে আড়াল করে, স্বপ্নকে বাড়িয়ে তোলে। তারা জানে, একজন কৃষকের শেষ জমিটুকুও বিক্রি করানো যায়, যদি তাকে বিশ্বাস করানো যায়—তার ছেলে একদিন ইউরোপ থেকে টাকা পাঠাবে। সেই টাকায় ঘর উঠবে, সম্মান ফিরবে, জীবনের মান পাল্টাবে। কিন্তু তারা বলে না—কখনও কখনও সেই টাকার বদলে আসে একটি নির্লিপ্ত খবর: আপনার ছেলে আর নেই।

সাগর এই কাহিনির সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে নির্মম সাক্ষী। সে কোনো ভাষণ দেয় না, কোনো প্রতিবাদও করে না। কিন্তু তার বুকে জমা থাকে হাজারো নামহীন কবর। ছোট ছোট নৌকা, মানুষের অতিরিক্ত বোঝা নিয়ে যখন তার বুক চিরে এগোয়, তখন সাগর বুঝে যায়—এটি ভ্রমণ নয়, এটি এক দীর্ঘ মৃত্যু-যাত্রা। অনাহারে, তৃষ্ণায়, আতঙ্কে মানুষগুলো একে একে নিভে যায়। তারপর তাদের দেহগুলো সাগরে নিক্ষেপ করা হয়— যেন তারা কখনও পৃথিবীর অংশই ছিল না।

এই দৃশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালে ভূমধ্যসাগর এক বিশাল কবরস্থানে পরিণত হয়েছিল। হাজার হাজার অভিবাসী ইউরোপে যাওয়ার পথে প্রাণ হারিয়েছিল—বাংলাদেশিরাও ছিল সেই তালিকায়। ২০১৯ সালে লিবিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে বহু বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটে। এরপরও এই মৃত্যুর মিছিল থামেনি। ২০২৩, ২০২৪ সর্বশেষ ২০২৬ প্রতিটি বছরই যেন একই ট্র্যাজেডির নতুন সংস্করণ। চরিত্র বদলায়, কিন্তু কাহিনি একই থাকে—স্বপ্ন, প্রতারণা, মৃত্যু। প্রশ্ন জাগে—এই গল্প থামে না কেন?

কারণ, এই গল্পের লেখক কেবল দালাল নয়— আমরা সবাই। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার—প্রত্যেকেই এই ট্র্যাজেডির সহ-লেখক। রাষ্ট্র আইন করে, কিন্তু আইনের ফাঁক দিয়ে দালালরা নতুন রাস্তা বানিয়ে ফেলে। সমাজ সফলতার গল্পকে এত বড় করে তোলে যে, ব্যর্থতার লাশগুলো সেখানে স্থান পায় না। পরিবার সন্তানের ভবিষ্যতের আশায় ঝুঁকি নেয়, কিন্তু সেই ঝুঁকির গভীরতা বুঝতে পারে না।

আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত মানদণ্ড গড়ে উঠেছে—বিদেশে গেলে মানুষ সফল, দেশে থাকলে অযোগ্য। এই মানদণ্ডই তরুণদের ঠেলে দেয় অজানার দিকে। তারা বিশ্বাস করে—যেকোনো মূল্যে বিদেশ যেতে হবে। সেই মূল্য কখনও টাকা, কখনও জীবন।

রাষ্ট্র এখানে প্রায়ই এক নীরব দর্শকের মতো আচরণ করে। তদন্ত হয়, মামলা হয়, গ্রেপ্তারও হয়—কিন্তু সময়ের সঙ্গে সবকিছু আবার থিতিয়ে যায়। যেন এই মৃত্যুগুলো আমাদের অভ্যাসের অংশ হয়ে গেছে। আমরা শোক জানাই, কিন্তু বদল চাই না; আমরা কান্না দেখি, কিন্তু কারণ অনুসন্ধান করি না।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি আসলে এক ধরনের মৃত্যুর অর্থনীতি—যেখানে বিনিয়োগ করে পরিবার, মুনাফা লুটে দালাল, আর ক্ষতির বোঝা বহন করে সমাজ। এখানে মানুষের জীবন একটি পণ্যে পরিণত হয়েছে, যার মূল্য নির্ধারিত হয় চাহিদা ও সরবরাহের সূত্রে।

সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো—আমরা এই বাস্তবতার সঙ্গে আপস করে ফেলেছি। একটি নৌকাডুবির খবর এখন আর আমাদের নাড়া দেয় না; আমরা এটিকে একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিয়েছি। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, যখন মৃত্যু স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন জীবনের মর্যাদা হারিয়ে যায়।

তবু পথ আছে—যদি আমরা সত্য বলার সাহস করি। আমাদের স্বীকার করতে হবে—ইউরোপ কোনো স্বর্গ নয়; এটি সংগ্রামের আরেক নাম। আমাদের দেখাতে হবে—এই যাত্রায় কতজন হারিয়ে গেছে। আমাদের বুঝতে হবে—দেশের ভেতরে সুযোগের অভাবই মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

দালালচক্র ভাঙতে হলে শুধু আইন নয়, সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি। পরিবারকে সচেতন করতে হবে, যাতে তারা অন্ধ বিশ্বাসে জীবন বাজি না রাখে। একই সঙ্গে বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের পথ প্রসারিত করতে হবে, যাতে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেতে বাধ্য না হয়।

সবশেষে, আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। উন্নয়ন কি শুধুই পরিসংখ্যানের খেলা, যদি সেই উন্নয়ন তরুণদের দেশে রাখার মতো শক্তি না রাখে? সাফল্য কি সত্যিই সাফল্য, যদি তার মূল্য হয় একটি প্রাণ?

সুনামগঞ্জের সেই ১৮ জন আর ফিরে আসবে না। তাদের নামে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে উঠবে না, ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম লেখা নাও থাকতে পারে। কিন্তু তাদের মৃত্যু একটি প্রশ্ন হয়ে বেঁচে থাকবে।

সাগরের ঢেউ প্রতিদিন তীরে এসে আছড়ে পড়ে, আবার ফিরে যায়। কিন্তু কিছু ঢেউ আছে, যা ফিরে যায় না— সেগুলো হয়ে থাকে সতর্কবার্তা। এই ১৮টি প্রাণও তেমনই এক ঢেউ, যা বারবার আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। প্রশ্ন এখনও একটাই— আমরা কি জাগবো, নাকি আবারও নতুন কোনো নৌকার জন্য অপেক্ষা করবো, যেখানে স্বপ্ন আর মৃত্যু পাশাপাশি যাত্রা করবে?

 [লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬


ইউরোপ নামের স্বর্গ, সাগরের ভাসমান কবরখানা

প্রকাশের তারিখ : ৩১ মার্চ ২০২৬

featured Image

সুনামগঞ্জে আকাশে আজ মেঘ নেই, তবু আলো কম। কারণ আলো সবসময় সূর্য থেকে আসে না—কখনও আসে মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা আশার আগুন থেকে। আর সেই আগুন যখন একে একে নিভে যায়, তখন পুরো জনপদ অন্ধকার হয়ে ওঠে। গত শুক্রবার, অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার পথে আফ্রিকার লিবিয়া উপকূলে ১৮টি বাংলাদেশি তরুণপ্রাণ সাগরে ভেসে গেছে—এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়; এটি এক জাতির দীর্ঘদিনের আত্মপ্রবন্ধনার নির্মম পুনরাবৃত্তি।

আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করি, যেখানে বিদেশ শব্দটি একটি মন্ত্রের মতো কাজ করে। এ মন্ত্র উচ্চারণ করলেই যেন দারিদ্র্য পালিয়ে যায়, বেকারত্ব লজ্জা পায়, আর ভবিষ্যৎ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। গ্রামের কোনো তরুণ যদি ঘোষণা দেয়— সে ইউরোপ যাবে, তখন সে আর সাধারণ মানুষ থাকে না; সে হয়ে ওঠে পরিবারের গর্ব, পাড়ার স্বপ্ন, ভবিষ্যতের প্রতীক। অথচ সেই যাত্রার মানচিত্রে কোথাও লেখা থাকে না— শেষ ঠিকানা হতে পারে এমন এক সাগর, যেখানে কবরেরও নামফলক থাকে না।

এই স্বপ্নের স্থপতিরা কবি নন, দার্শনিকও নন। তারা দালাল—সময়ের সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ী, যারা হতাশাকে পুঁজি করে স্বপ্নের প্যাকেজ বিক্রি করে। ১০-১২ লাখ টাকার বিনিময়ে তারা এমন এক ইউরোপ দেখায়, যেখানে রাস্তা সোনার, কাজ নিশ্চিত, আর জীবন অনন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের। কিন্তু সেই গল্পের শেষ পাতাটি তারা ছিঁড়ে ফেলে— যেখানে লেখা থাকে, এই যাত্রায় মৃত্যু খুবই সম্ভাব্য।

দালালরা জানে, এই দেশের মানুষ বাস্তবতার চেয়ে স্বপ্নকে বেশি ভালোবাসে। তাই তারা বাস্তবতাকে আড়াল করে, স্বপ্নকে বাড়িয়ে তোলে। তারা জানে, একজন কৃষকের শেষ জমিটুকুও বিক্রি করানো যায়, যদি তাকে বিশ্বাস করানো যায়—তার ছেলে একদিন ইউরোপ থেকে টাকা পাঠাবে। সেই টাকায় ঘর উঠবে, সম্মান ফিরবে, জীবনের মান পাল্টাবে। কিন্তু তারা বলে না—কখনও কখনও সেই টাকার বদলে আসে একটি নির্লিপ্ত খবর: আপনার ছেলে আর নেই।

সাগর এই কাহিনির সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে নির্মম সাক্ষী। সে কোনো ভাষণ দেয় না, কোনো প্রতিবাদও করে না। কিন্তু তার বুকে জমা থাকে হাজারো নামহীন কবর। ছোট ছোট নৌকা, মানুষের অতিরিক্ত বোঝা নিয়ে যখন তার বুক চিরে এগোয়, তখন সাগর বুঝে যায়—এটি ভ্রমণ নয়, এটি এক দীর্ঘ মৃত্যু-যাত্রা। অনাহারে, তৃষ্ণায়, আতঙ্কে মানুষগুলো একে একে নিভে যায়। তারপর তাদের দেহগুলো সাগরে নিক্ষেপ করা হয়— যেন তারা কখনও পৃথিবীর অংশই ছিল না।

এই দৃশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালে ভূমধ্যসাগর এক বিশাল কবরস্থানে পরিণত হয়েছিল। হাজার হাজার অভিবাসী ইউরোপে যাওয়ার পথে প্রাণ হারিয়েছিল—বাংলাদেশিরাও ছিল সেই তালিকায়। ২০১৯ সালে লিবিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে বহু বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটে। এরপরও এই মৃত্যুর মিছিল থামেনি। ২০২৩, ২০২৪ সর্বশেষ ২০২৬ প্রতিটি বছরই যেন একই ট্র্যাজেডির নতুন সংস্করণ। চরিত্র বদলায়, কিন্তু কাহিনি একই থাকে—স্বপ্ন, প্রতারণা, মৃত্যু। প্রশ্ন জাগে—এই গল্প থামে না কেন?

কারণ, এই গল্পের লেখক কেবল দালাল নয়— আমরা সবাই। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার—প্রত্যেকেই এই ট্র্যাজেডির সহ-লেখক। রাষ্ট্র আইন করে, কিন্তু আইনের ফাঁক দিয়ে দালালরা নতুন রাস্তা বানিয়ে ফেলে। সমাজ সফলতার গল্পকে এত বড় করে তোলে যে, ব্যর্থতার লাশগুলো সেখানে স্থান পায় না। পরিবার সন্তানের ভবিষ্যতের আশায় ঝুঁকি নেয়, কিন্তু সেই ঝুঁকির গভীরতা বুঝতে পারে না।

আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত মানদণ্ড গড়ে উঠেছে—বিদেশে গেলে মানুষ সফল, দেশে থাকলে অযোগ্য। এই মানদণ্ডই তরুণদের ঠেলে দেয় অজানার দিকে। তারা বিশ্বাস করে—যেকোনো মূল্যে বিদেশ যেতে হবে। সেই মূল্য কখনও টাকা, কখনও জীবন।

রাষ্ট্র এখানে প্রায়ই এক নীরব দর্শকের মতো আচরণ করে। তদন্ত হয়, মামলা হয়, গ্রেপ্তারও হয়—কিন্তু সময়ের সঙ্গে সবকিছু আবার থিতিয়ে যায়। যেন এই মৃত্যুগুলো আমাদের অভ্যাসের অংশ হয়ে গেছে। আমরা শোক জানাই, কিন্তু বদল চাই না; আমরা কান্না দেখি, কিন্তু কারণ অনুসন্ধান করি না।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি আসলে এক ধরনের মৃত্যুর অর্থনীতি—যেখানে বিনিয়োগ করে পরিবার, মুনাফা লুটে দালাল, আর ক্ষতির বোঝা বহন করে সমাজ। এখানে মানুষের জীবন একটি পণ্যে পরিণত হয়েছে, যার মূল্য নির্ধারিত হয় চাহিদা ও সরবরাহের সূত্রে।

সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো—আমরা এই বাস্তবতার সঙ্গে আপস করে ফেলেছি। একটি নৌকাডুবির খবর এখন আর আমাদের নাড়া দেয় না; আমরা এটিকে একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিয়েছি। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, যখন মৃত্যু স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন জীবনের মর্যাদা হারিয়ে যায়।

তবু পথ আছে—যদি আমরা সত্য বলার সাহস করি। আমাদের স্বীকার করতে হবে—ইউরোপ কোনো স্বর্গ নয়; এটি সংগ্রামের আরেক নাম। আমাদের দেখাতে হবে—এই যাত্রায় কতজন হারিয়ে গেছে। আমাদের বুঝতে হবে—দেশের ভেতরে সুযোগের অভাবই মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

দালালচক্র ভাঙতে হলে শুধু আইন নয়, সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি। পরিবারকে সচেতন করতে হবে, যাতে তারা অন্ধ বিশ্বাসে জীবন বাজি না রাখে। একই সঙ্গে বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের পথ প্রসারিত করতে হবে, যাতে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেতে বাধ্য না হয়।

সবশেষে, আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। উন্নয়ন কি শুধুই পরিসংখ্যানের খেলা, যদি সেই উন্নয়ন তরুণদের দেশে রাখার মতো শক্তি না রাখে? সাফল্য কি সত্যিই সাফল্য, যদি তার মূল্য হয় একটি প্রাণ?

সুনামগঞ্জের সেই ১৮ জন আর ফিরে আসবে না। তাদের নামে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে উঠবে না, ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম লেখা নাও থাকতে পারে। কিন্তু তাদের মৃত্যু একটি প্রশ্ন হয়ে বেঁচে থাকবে।

সাগরের ঢেউ প্রতিদিন তীরে এসে আছড়ে পড়ে, আবার ফিরে যায়। কিন্তু কিছু ঢেউ আছে, যা ফিরে যায় না— সেগুলো হয়ে থাকে সতর্কবার্তা। এই ১৮টি প্রাণও তেমনই এক ঢেউ, যা বারবার আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। প্রশ্ন এখনও একটাই— আমরা কি জাগবো, নাকি আবারও নতুন কোনো নৌকার জন্য অপেক্ষা করবো, যেখানে স্বপ্ন আর মৃত্যু পাশাপাশি যাত্রা করবে?

 [লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত