সারাদেশে ছোঁয়াচে হাম রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। হামে আক্রান্ত হয়ে গত কয়েক মাসে রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা জেলায় শুধু ৪৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে হাম সন্দেহে গত জানুয়ারি থেকে শুধু রাজধানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩১ জন শিশু মারা গেছে। অন্যান্য জেলা ও বিভাগ মিলে মৃত্যু শতাধিক হতে পারে। এছাড়াও গত সাত মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নবজাতক শিশু ও হাম, নিউমোনিয়া এবং শ্বাসকষ্টে মোট ২ হাজার ২৫৫ জন মারা শিশু মারা গেছে। এভাবে সারাদেশে শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে আইসিইউ সাপোর্ট না পাওয়ায় অনেকেই মারা যাচ্ছেন। শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম পরিস্থিতি আরও অবনিতর আশঙ্কা করছেন। ঢাকা শিশু হাসপাতালে ১শ’র বেশি শিশু ভর্তি আছে। দিনে বহিঃবিভাগে ১৫০০-২০০০ শিশু বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছে।
আমাদের রাজশাহী জেলা বার্তা পরিবেশক জানান, গতকাল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগে সন্দেহভাজন আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও একদিনে ভর্তি হয়েছে ১৬ শিশু। গতককাল পর্যন্ত এ হাসপাতালে হামের উপস্বর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে ৯৮ শিশু। গতকাল দুপুরে এ তথ্য জানানো হয়। এ নিয়ে রাজশাহী হাসপাতালে গতকাল পর্যন্ত হামে সন্দেভাজন ৩১ শিশুর মৃত্যু হলো। আর শরীরে হামের কারণে মৃত্যু হয়েছে একজন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র চিকিৎসক শঙ্কর কে বিশ্বাস জানান, গত সোমবার দুপুর থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত রাজশাহী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে হাম সন্দেহে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে তারা হাম আক্রান্ত কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এছাড়া হামের উপস্বর্গ নিয়ে হাসপাতালে এ সময়ে আরও ১৬ শিশু ভর্তি হয়েছে। তাদের সবার চিকিৎসা চলছে।
এ নিয়ে গত জানুয়ারির পর থেকে এ হাসপাতালে হাম সন্দেহে মারা গেলো ৩১ শিশু। আর হামে আক্রান্ত হয়ে এক শিশু মারা গেছে। এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে এ হাসপাতালে মোট ৩১৬ শিশু চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত সাত মাসে মারা গেছে দুই হাজার ২৫৫ শিশু। এরমধ্যে চিকিৎসা নিয়েছে ২৮ হাজার ৪২৭ জন। মৃত শিশুদের মধ্যে নবজাতকই রয়েছে ৫ শতাধিক। এর বাইরে মারা গেছে হাম, নিউমোনিয়া ও ঠা-াজনিত শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে।
নবজাতকদের যেসব শিশু মারা গেছে, তাদের বেশিরভাগই অপুষ্টি এবং অপরিপক্কতার কারণে মারা গেছে। এই নবজাতকদের মায়েদের অধিকাংশই বাল্য বিয়ের শিকার হয়ে গর্ভধারণ করায় তাদের নবাজতকরা পুষ্টিহীন এবং অপরিপক্ক শিশুর জন্ম দিচ্ছেন। যার ফলে জন্মের পর পরই ১-৪ দিনের মাথায় মারা যাচ্ছে অনেক শিশু।
এর বাইরে সম্প্রতি রাজশাহী অঞ্চলে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে নিউমোনিয়া ও হাম রোগ। এতে আরও বেশি শিশু মারা যাচ্ছে বলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
তবে সার্বিকভাবে রামেক আশঙ্কাজনকহারে শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করেছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে রামেক হাসপাতালে আশঙ্কাজনকহারে শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘হামের প্রাদুভার্ব চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় বিগত নির্দলীয় সরকারের আমলে ভ্যাকসিন কেনার যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, সেই সমস্যার কারণেই হয়তোবা এই হামের প্রাদুভার্ব তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আবার যারা এই ভ্যাকসিন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা গত এক-দেড় বছর ধরে আন্দোলন করে আসছেন। তাদের আন্দোলনের কারণে কিংবা ভ্যাকসিন সংকটের কারণে এ ধরনের প্রাদুভার্ব দেখা দেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের অবশ্যই নজর দেয়া উচিত, ভ্যাকসিনেশন এনে এই প্রোগ্রামকে কীভাবে সফল করা যায়, সেদিকে নজর দেয়া। এখন দেখা যাচ্ছে, চার মাসের শিশুরাও হাম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নয় মাসের আগেই কেন এটির প্রাদুভার্ব হচ্ছে, সেটি গবেষণা করে সে ব্যাপারে দৃষ্টি দিতে হবে।’
চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ দিতে চাই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। তারা সীমিত সামর্থ্য নিয়েও রোগীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। চিকিৎসকরা দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।’
এটি নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কিছু নাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি নিয়ে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ এ রোগ একজনের থেকে ১০/১৫ জনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেটি যেন না হয়, সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সাবধনতা অবলম্বন করতে হবে। চিকিৎসকদের এ ব্যাপারে কাউন্সিলিং করার ব্যবস্থা করতে হবে।’
অন্যদিকে, হামে শিশু মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় গতকাল রাজশাহী হাসপাতাল পরিদর্শন করতে আসছেন স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক অধ্যাপক চিকিৎসক প্রভাত চন্দ্র বিশ^াস। তিনি হাসাপাতালের পরিচালক, স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ও সিভিল সার্জনসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র চিকিৎসক শঙ্কর কে বিশ্বাস নিশ্চিত করেছেন, গত সাত মাসে (গত বছরের সেপ্টেম্বর-মার্চ) মোট দুই হাজার ২৫৫ শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে।
সর্বশেষ মার্চ মাসে মারা গেছে ৩০৪ জন। এই সাত মাসে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে চিকিৎসাধীন ছিল ২৮ হাজার ৪২৭ জন শিশু। মৃত শিশুদের মধ্যে নবজাতকের সংখ্যায় বেশি।
তিনি আরও জানান, গত সেপ্টেম্বরে চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ৭০ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৩৬ জন, অক্টোবরে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ৯০১ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৪৪ জন, নভেম্বরে চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ১৯৯ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৪৩ জন. ডিসেম্বরে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ৭৪৩ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৬১ জন, জানুয়ারিতে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ৭৩৫ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ২৭৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ২৫৭ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ২৯১ জন এবং মার্চের গতকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ৫২২ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩০৪ জন।
রামেক হাসপাতালের আরেকটি সূত্র জানায়, ফেব্রুয়ারির ২২ (গত) তারিখ থেকে গতকাল দুপুর একটা পর্যন্ত এ হাসপাতালে মারা গেছে ৪১৬ শিশু। এই ৩৬ দিনেই শিশু মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। যার মধ্যে সর্বোচ্চ শতাধিক শিশু মারা গেছে অপুষ্টি এবং অপপরিপক্কভাবে জন্ম নেয়ায়। জন্মের ১-৪ দিনের মধ্যে মারা গেছে এসব নবজাতক। হাসপাতালের ২৬ নম্বর গাইনি ওয়ার্ডে জন্ম নেয়া এসব নবজাতক মারা গেছে। এর বাইরে হাসপাতালের ২৪, ২৭ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশু মারা গেছে আরও তিন শতাধিক। সবমিলিয়ে গড়ে এই ৩৬ দিনে এ হাসপাতালে প্রতিদিন মারা গেছে অন্তত ১১ জনের চেয়েও বেশি।
সূত্র মতে, মুর্মূর্ষু শিশুদের আইসিইউতে চিকিৎসার জন্য সুপারিশ করা হলেও আইসিইউর শয্যা সংকটের কারণে সেখানেও চিকিৎসা দেয়া যাচ্ছে না অধিকাংশেরই বেশি।
ফলে হাসপাতালের বিছানা বা বাইরে বারান্দায় মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে হচ্ছে সেসব শিশুর। আইসিইউর সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে মারা গেছে গত একমাসে শতাধিক।
এদিকে গতকাল রাজশাহী হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলো ঘুরে দেখা গেছে, শয্যার তুলনায় বিপুল পরিমাণ শিশু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। ওয়ার্ডে শয্যা না থাকায় বাইরে বারান্দায় শত শত শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে এ হাসপাতালে।
দেড় বছরের শিশু তাহসিনাকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের শিশু বিভাগের বারান্দায় বসেছিলেন মা মীম খাতুন। তিনি জানান, ‘গত শুক্রবার তার শিশু নিউমোনিয়া আক্রান্ত হলে এ হাসপাতালে চিকিৎসার নিয়ে আসেন। কিন্তু হাসপাতালের শয্যা না পাওয়ায় বারান্দায় শুয়ে বসে থেকে তার শিশু সন্তানের চিকিৎসা করাচ্ছেন তিনি। মীম বলেন, ‘বারান্দাতেও ধাপ ফেলানোর জায়গা নাই। রোগী আর মানুষের ভিড়ে এখানে চিকিৎসা করানোয় দায়। তবে চিকিৎসকরা আসছেন। তারা চিকিৎসা দিচ্ছেন। ফলে আগের চেয়ে এখন একটু ভালো আছে আমার ছেলে।’
২৭ নম্বর শিশু ওয়ার্ডের বারান্দার মেঝেতে চার মাস বয়সী সন্তান আব্দুল্লাহকে কোলে নিয়ে বসেছেলেন বাবা রায়হান আলী। তার বাড়ি জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায়। তিনি বলেন, ছেলের জ্বর আর শরীরে কী যেন বের হয়েছে সে কারণে তাকে নিয়ে গত শুক্রবারে এসেছি হাসপাতালে। এখনও বেড পাইনি, বারান্দায় গাদাগাদি করে বসে থাকতে হচ্ছে। এত রোগীর মধ্যে চিকিৎসা করানোয় যেন দায়।’
অন্যদিকে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাজশাহী হাসপাতালটি ১২শ’ শয্যার হলেও ৫৫০ শয্যার জনবল নিয়ে এখানে কার্যক্রম চালাতে হয়।
এখানে গড়ে প্রতিদিন হাসপাতালের ভিতরে আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আর বর্হিবিভাগে গড়ে সাত হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশেষ ব্যবস্থাপনায় প্যাথলজি ও রেডিওলজি থেকে শুরু করে সব প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে সীমিত জনবল দিয়েই।
আমাদের এখানে রোগীর চাপ ক্রমানয়ে বাড়ছে। রাজশাহীর বাইরে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ আশপাশের সব জেলা থেকে রোগী আসে। সেসব রোগীকে আমরা চিকিৎসা দেয়। এ রোগীগুলো যখন আসেন, তখন অনেকেই কিন্তু জটিল পর্যায়ে থাকে। আমরা চিকিৎসা দেয়। তার পরেও অনেকের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেটি প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় সেটি প্রয়োজনের তুলনায় দিতে পারছি না। ফলে অনেকেই অপেক্ষামান থাকায় অনাকাক্সিক্ষতভাবে খারাপ পরিণতির শিকার হচ্ছে। তার পরেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং আমরা এ হাসপাতালের সর্বোচ্চ সেবা দিতে বদ্ধ পরিকর ও নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
অন্যদিকে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান শাহিদা ইয়াসমিন সাংবাদিকদের জানান, গত জানুয়ারির পর থেকে এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে এক শিশু। আর সন্দেহজনক রোগী মারা গেছে ২৯ জন। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ২৭০ জন রোগী ভর্তি হয়। এরমধ্যে পরীক্ষা শেষে ৩৫ জনের শরীরে হাম রোগের উপসর্গ পাওয়া যায়। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৬-৯ মাস পর্যন্ত বয়সী। এরমধ্যে ৬০ ভাগ আক্রান্ত হচ্ছে ৬ মাসের মধ্যে।
জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে রোগী যেমন বেড়েছে, শিশু মৃত্যুর হারও বেড়েছে। তবে অনেক শিশু মারা যাচ্ছে জন্মের পর পরই। এসব নবজাতক মারা যাচ্ছে, তাদের মায়েদের অনেকেই বাল্য বিয়ের কারণে। ফলে সেসব মায়েরা অপুষ্টি ও অপরিপক্ক সন্তান জন্ম দিচ্ছে। এসব নবজাতককে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে করে ১-৪ দিনের নবজাতক মৃত্যুর হারও এ হাসপাতালে অনেক বেশি। এর বাইরে নিউমোনিয়া ও ঠা-াজনিত কারণে জ্বর এবং শ^াসকষ্টে আক্রান্ত হয়েও অনেক শিশু মারা যাচ্ছে।’
এদিকে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী গতকাল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) জন্য অপেক্ষামাণ তালিকায় থাকা শিশুর মৃত্যুর জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সীমাবদ্ধতার কতঅ স্বীকার করেছেন।
হাসপাতালে শিশুর জন্য মাত্র ১২টি আইসিইউ বেড আছে। এগুলো সরকার অনুমোদিত নয়, হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালানো হচ্ছে। আইসিইউর একটি বেডের জন্য সদস্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুদের অপেক্ষায় থাকতে হয়। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন কোন শিশু মারা গেলে কিংবা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে অপেক্ষামাণ তালিকা থেকে খালি বেডে ভর্তির জন্য ডাক পড়ে।
আর সিরিয়াল দিলে ৩০-৫০জনের পর একজনকে আইসিইউতে নিয়ে হয়। বর্তমাসে শিশুদে ছোঁয়াচে হাম রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এতে আইসিইউর চাহিদা আরও বাড়ছে। স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থের ডিজি হাসপাতাল ও আইসিইউ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের আলোচনাকালে এসব কথা বলেছেন। হামে আক্রান্ত নয় এমন অসুস্থ শিশুদের আইসিইউ দরকার হলে রাজশাহীর অন্য হাসপাতালে পাঠানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সেখানে আইসিইউ সাপোর্ট পাওয়া যাবে।
হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া এক শিশুর স্বজন অভিযোগ করে বলেছেন, আইসিইউ না পেয়ে হামে আক্রান্ত তাদের শিশুর মৃত্যু হয়েছে। টানা চার দিন নাটোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে শিশুটিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তার মৃত্যু হয়। নিহত কাশফি আক্তার নাটোর সদর উপজেলার সাইফুল ইসলামের মেয়ে।
তার মৃত্যু নিয়ে জেলা সিভিল সার্জন বলেন, নাটোর সদর হাসপাতালে আইসিইউ না থাকায় কাশফিকে রাজশাহী মেডিকেলে রেফার করা হয়। চিকিৎসার কোন ত্রুটি ছিল না।
জেলাজুড়ে গত সোমবার পর্যন্ত ৩৮ জন হামে আক্রান্ত হয়েছে। তার মধ্যে সদর হাসপাতালে ১৪ ভর্তি আছে। সবাই শিশু। এখনও চিকিৎসাধীন আছেন ৬জন। অন্যরা বাড়ি ফিরেছেন।
ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ডা. জাহাঙ্গীর আলম হাম সম্পর্কে তার মতামতে বলেন, হামের ভয়াবহতা বাড়ছে। আবার মারাও যাচ্ছে। হাম রোগ সংক্রমণ ছোঁয়াচে রোগ। এজন্য শিশু হাসপাতালে আলাদা কর্নার চালু করা হয়েছে। এখনও শিশু হাসপাতালে ১শ’র বেশী শিশু ভর্তি আছে। আর হাসপাতালের বহিঃবিভাগে দিনে ১৫শ’-২০০০ শিশু চিকিৎসা দেয়া হয়।
করণীয় সম্পর্কে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুকে ভিটামিন-এ ও ভিটামিন ডি ওষুধ খাওয়ানো ছাড়াও পুষ্টিকর খাবার শিশুকে দিতে হবে। আর আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
এদিকে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল থেকে ডেঙ্গু ,করোনাভাইরাসের আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য দিলেও হামে আক্রান্ত মৃত্যুর তথ্য নেই বা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের রহস্যজনক কারণে আক্রান্ত ও মৃুত্যুর সঠিক তথ্য দিচ্ছে না। তাই প্রকৃত তথ্য পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। অন্য এক সূত্র জানায়, হামে শিশুর মৃতুর তথ্য নিয়ে রহস্য জনক কারণে লুকোচুরি করছেন। মৃত্যু বাড়ছে। রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনায়ই ৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এই সংখ্যা প্রায় শতাধিক হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ এপ্রিল ২০২৬
সারাদেশে ছোঁয়াচে হাম রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। হামে আক্রান্ত হয়ে গত কয়েক মাসে রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা জেলায় শুধু ৪৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে হাম সন্দেহে গত জানুয়ারি থেকে শুধু রাজধানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩১ জন শিশু মারা গেছে। অন্যান্য জেলা ও বিভাগ মিলে মৃত্যু শতাধিক হতে পারে। এছাড়াও গত সাত মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নবজাতক শিশু ও হাম, নিউমোনিয়া এবং শ্বাসকষ্টে মোট ২ হাজার ২৫৫ জন মারা শিশু মারা গেছে। এভাবে সারাদেশে শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে আইসিইউ সাপোর্ট না পাওয়ায় অনেকেই মারা যাচ্ছেন। শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম পরিস্থিতি আরও অবনিতর আশঙ্কা করছেন। ঢাকা শিশু হাসপাতালে ১শ’র বেশি শিশু ভর্তি আছে। দিনে বহিঃবিভাগে ১৫০০-২০০০ শিশু বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছে।
আমাদের রাজশাহী জেলা বার্তা পরিবেশক জানান, গতকাল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগে সন্দেহভাজন আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও একদিনে ভর্তি হয়েছে ১৬ শিশু। গতককাল পর্যন্ত এ হাসপাতালে হামের উপস্বর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে ৯৮ শিশু। গতকাল দুপুরে এ তথ্য জানানো হয়। এ নিয়ে রাজশাহী হাসপাতালে গতকাল পর্যন্ত হামে সন্দেভাজন ৩১ শিশুর মৃত্যু হলো। আর শরীরে হামের কারণে মৃত্যু হয়েছে একজন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র চিকিৎসক শঙ্কর কে বিশ্বাস জানান, গত সোমবার দুপুর থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত রাজশাহী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে হাম সন্দেহে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে তারা হাম আক্রান্ত কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এছাড়া হামের উপস্বর্গ নিয়ে হাসপাতালে এ সময়ে আরও ১৬ শিশু ভর্তি হয়েছে। তাদের সবার চিকিৎসা চলছে।
এ নিয়ে গত জানুয়ারির পর থেকে এ হাসপাতালে হাম সন্দেহে মারা গেলো ৩১ শিশু। আর হামে আক্রান্ত হয়ে এক শিশু মারা গেছে। এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে এ হাসপাতালে মোট ৩১৬ শিশু চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত সাত মাসে মারা গেছে দুই হাজার ২৫৫ শিশু। এরমধ্যে চিকিৎসা নিয়েছে ২৮ হাজার ৪২৭ জন। মৃত শিশুদের মধ্যে নবজাতকই রয়েছে ৫ শতাধিক। এর বাইরে মারা গেছে হাম, নিউমোনিয়া ও ঠা-াজনিত শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে।
নবজাতকদের যেসব শিশু মারা গেছে, তাদের বেশিরভাগই অপুষ্টি এবং অপরিপক্কতার কারণে মারা গেছে। এই নবজাতকদের মায়েদের অধিকাংশই বাল্য বিয়ের শিকার হয়ে গর্ভধারণ করায় তাদের নবাজতকরা পুষ্টিহীন এবং অপরিপক্ক শিশুর জন্ম দিচ্ছেন। যার ফলে জন্মের পর পরই ১-৪ দিনের মাথায় মারা যাচ্ছে অনেক শিশু।
এর বাইরে সম্প্রতি রাজশাহী অঞ্চলে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে নিউমোনিয়া ও হাম রোগ। এতে আরও বেশি শিশু মারা যাচ্ছে বলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
তবে সার্বিকভাবে রামেক আশঙ্কাজনকহারে শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করেছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে রামেক হাসপাতালে আশঙ্কাজনকহারে শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘হামের প্রাদুভার্ব চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় বিগত নির্দলীয় সরকারের আমলে ভ্যাকসিন কেনার যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, সেই সমস্যার কারণেই হয়তোবা এই হামের প্রাদুভার্ব তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আবার যারা এই ভ্যাকসিন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা গত এক-দেড় বছর ধরে আন্দোলন করে আসছেন। তাদের আন্দোলনের কারণে কিংবা ভ্যাকসিন সংকটের কারণে এ ধরনের প্রাদুভার্ব দেখা দেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের অবশ্যই নজর দেয়া উচিত, ভ্যাকসিনেশন এনে এই প্রোগ্রামকে কীভাবে সফল করা যায়, সেদিকে নজর দেয়া। এখন দেখা যাচ্ছে, চার মাসের শিশুরাও হাম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নয় মাসের আগেই কেন এটির প্রাদুভার্ব হচ্ছে, সেটি গবেষণা করে সে ব্যাপারে দৃষ্টি দিতে হবে।’
চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ দিতে চাই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। তারা সীমিত সামর্থ্য নিয়েও রোগীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। চিকিৎসকরা দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।’
এটি নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কিছু নাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি নিয়ে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ এ রোগ একজনের থেকে ১০/১৫ জনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেটি যেন না হয়, সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সাবধনতা অবলম্বন করতে হবে। চিকিৎসকদের এ ব্যাপারে কাউন্সিলিং করার ব্যবস্থা করতে হবে।’
অন্যদিকে, হামে শিশু মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় গতকাল রাজশাহী হাসপাতাল পরিদর্শন করতে আসছেন স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক অধ্যাপক চিকিৎসক প্রভাত চন্দ্র বিশ^াস। তিনি হাসাপাতালের পরিচালক, স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ও সিভিল সার্জনসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র চিকিৎসক শঙ্কর কে বিশ্বাস নিশ্চিত করেছেন, গত সাত মাসে (গত বছরের সেপ্টেম্বর-মার্চ) মোট দুই হাজার ২৫৫ শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে।
সর্বশেষ মার্চ মাসে মারা গেছে ৩০৪ জন। এই সাত মাসে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে চিকিৎসাধীন ছিল ২৮ হাজার ৪২৭ জন শিশু। মৃত শিশুদের মধ্যে নবজাতকের সংখ্যায় বেশি।
তিনি আরও জানান, গত সেপ্টেম্বরে চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ৭০ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৩৬ জন, অক্টোবরে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ৯০১ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৪৪ জন, নভেম্বরে চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ১৯৯ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৪৩ জন. ডিসেম্বরে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ৭৪৩ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৬১ জন, জানুয়ারিতে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ৭৩৫ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ২৭৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ২৫৭ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ২৯১ জন এবং মার্চের গতকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ৫২২ শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩০৪ জন।
রামেক হাসপাতালের আরেকটি সূত্র জানায়, ফেব্রুয়ারির ২২ (গত) তারিখ থেকে গতকাল দুপুর একটা পর্যন্ত এ হাসপাতালে মারা গেছে ৪১৬ শিশু। এই ৩৬ দিনেই শিশু মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। যার মধ্যে সর্বোচ্চ শতাধিক শিশু মারা গেছে অপুষ্টি এবং অপপরিপক্কভাবে জন্ম নেয়ায়। জন্মের ১-৪ দিনের মধ্যে মারা গেছে এসব নবজাতক। হাসপাতালের ২৬ নম্বর গাইনি ওয়ার্ডে জন্ম নেয়া এসব নবজাতক মারা গেছে। এর বাইরে হাসপাতালের ২৪, ২৭ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশু মারা গেছে আরও তিন শতাধিক। সবমিলিয়ে গড়ে এই ৩৬ দিনে এ হাসপাতালে প্রতিদিন মারা গেছে অন্তত ১১ জনের চেয়েও বেশি।
সূত্র মতে, মুর্মূর্ষু শিশুদের আইসিইউতে চিকিৎসার জন্য সুপারিশ করা হলেও আইসিইউর শয্যা সংকটের কারণে সেখানেও চিকিৎসা দেয়া যাচ্ছে না অধিকাংশেরই বেশি।
ফলে হাসপাতালের বিছানা বা বাইরে বারান্দায় মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে হচ্ছে সেসব শিশুর। আইসিইউর সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে মারা গেছে গত একমাসে শতাধিক।
এদিকে গতকাল রাজশাহী হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলো ঘুরে দেখা গেছে, শয্যার তুলনায় বিপুল পরিমাণ শিশু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। ওয়ার্ডে শয্যা না থাকায় বাইরে বারান্দায় শত শত শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে এ হাসপাতালে।
দেড় বছরের শিশু তাহসিনাকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের শিশু বিভাগের বারান্দায় বসেছিলেন মা মীম খাতুন। তিনি জানান, ‘গত শুক্রবার তার শিশু নিউমোনিয়া আক্রান্ত হলে এ হাসপাতালে চিকিৎসার নিয়ে আসেন। কিন্তু হাসপাতালের শয্যা না পাওয়ায় বারান্দায় শুয়ে বসে থেকে তার শিশু সন্তানের চিকিৎসা করাচ্ছেন তিনি। মীম বলেন, ‘বারান্দাতেও ধাপ ফেলানোর জায়গা নাই। রোগী আর মানুষের ভিড়ে এখানে চিকিৎসা করানোয় দায়। তবে চিকিৎসকরা আসছেন। তারা চিকিৎসা দিচ্ছেন। ফলে আগের চেয়ে এখন একটু ভালো আছে আমার ছেলে।’
২৭ নম্বর শিশু ওয়ার্ডের বারান্দার মেঝেতে চার মাস বয়সী সন্তান আব্দুল্লাহকে কোলে নিয়ে বসেছেলেন বাবা রায়হান আলী। তার বাড়ি জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায়। তিনি বলেন, ছেলের জ্বর আর শরীরে কী যেন বের হয়েছে সে কারণে তাকে নিয়ে গত শুক্রবারে এসেছি হাসপাতালে। এখনও বেড পাইনি, বারান্দায় গাদাগাদি করে বসে থাকতে হচ্ছে। এত রোগীর মধ্যে চিকিৎসা করানোয় যেন দায়।’
অন্যদিকে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাজশাহী হাসপাতালটি ১২শ’ শয্যার হলেও ৫৫০ শয্যার জনবল নিয়ে এখানে কার্যক্রম চালাতে হয়।
এখানে গড়ে প্রতিদিন হাসপাতালের ভিতরে আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আর বর্হিবিভাগে গড়ে সাত হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশেষ ব্যবস্থাপনায় প্যাথলজি ও রেডিওলজি থেকে শুরু করে সব প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে সীমিত জনবল দিয়েই।
আমাদের এখানে রোগীর চাপ ক্রমানয়ে বাড়ছে। রাজশাহীর বাইরে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ আশপাশের সব জেলা থেকে রোগী আসে। সেসব রোগীকে আমরা চিকিৎসা দেয়। এ রোগীগুলো যখন আসেন, তখন অনেকেই কিন্তু জটিল পর্যায়ে থাকে। আমরা চিকিৎসা দেয়। তার পরেও অনেকের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেটি প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় সেটি প্রয়োজনের তুলনায় দিতে পারছি না। ফলে অনেকেই অপেক্ষামান থাকায় অনাকাক্সিক্ষতভাবে খারাপ পরিণতির শিকার হচ্ছে। তার পরেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং আমরা এ হাসপাতালের সর্বোচ্চ সেবা দিতে বদ্ধ পরিকর ও নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
অন্যদিকে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান শাহিদা ইয়াসমিন সাংবাদিকদের জানান, গত জানুয়ারির পর থেকে এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে এক শিশু। আর সন্দেহজনক রোগী মারা গেছে ২৯ জন। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ২৭০ জন রোগী ভর্তি হয়। এরমধ্যে পরীক্ষা শেষে ৩৫ জনের শরীরে হাম রোগের উপসর্গ পাওয়া যায়। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৬-৯ মাস পর্যন্ত বয়সী। এরমধ্যে ৬০ ভাগ আক্রান্ত হচ্ছে ৬ মাসের মধ্যে।
জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে রোগী যেমন বেড়েছে, শিশু মৃত্যুর হারও বেড়েছে। তবে অনেক শিশু মারা যাচ্ছে জন্মের পর পরই। এসব নবজাতক মারা যাচ্ছে, তাদের মায়েদের অনেকেই বাল্য বিয়ের কারণে। ফলে সেসব মায়েরা অপুষ্টি ও অপরিপক্ক সন্তান জন্ম দিচ্ছে। এসব নবজাতককে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে করে ১-৪ দিনের নবজাতক মৃত্যুর হারও এ হাসপাতালে অনেক বেশি। এর বাইরে নিউমোনিয়া ও ঠা-াজনিত কারণে জ্বর এবং শ^াসকষ্টে আক্রান্ত হয়েও অনেক শিশু মারা যাচ্ছে।’
এদিকে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী গতকাল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) জন্য অপেক্ষামাণ তালিকায় থাকা শিশুর মৃত্যুর জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সীমাবদ্ধতার কতঅ স্বীকার করেছেন।
হাসপাতালে শিশুর জন্য মাত্র ১২টি আইসিইউ বেড আছে। এগুলো সরকার অনুমোদিত নয়, হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালানো হচ্ছে। আইসিইউর একটি বেডের জন্য সদস্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুদের অপেক্ষায় থাকতে হয়। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন কোন শিশু মারা গেলে কিংবা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে অপেক্ষামাণ তালিকা থেকে খালি বেডে ভর্তির জন্য ডাক পড়ে।
আর সিরিয়াল দিলে ৩০-৫০জনের পর একজনকে আইসিইউতে নিয়ে হয়। বর্তমাসে শিশুদে ছোঁয়াচে হাম রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এতে আইসিইউর চাহিদা আরও বাড়ছে। স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থের ডিজি হাসপাতাল ও আইসিইউ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের আলোচনাকালে এসব কথা বলেছেন। হামে আক্রান্ত নয় এমন অসুস্থ শিশুদের আইসিইউ দরকার হলে রাজশাহীর অন্য হাসপাতালে পাঠানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সেখানে আইসিইউ সাপোর্ট পাওয়া যাবে।
হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া এক শিশুর স্বজন অভিযোগ করে বলেছেন, আইসিইউ না পেয়ে হামে আক্রান্ত তাদের শিশুর মৃত্যু হয়েছে। টানা চার দিন নাটোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে শিশুটিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তার মৃত্যু হয়। নিহত কাশফি আক্তার নাটোর সদর উপজেলার সাইফুল ইসলামের মেয়ে।
তার মৃত্যু নিয়ে জেলা সিভিল সার্জন বলেন, নাটোর সদর হাসপাতালে আইসিইউ না থাকায় কাশফিকে রাজশাহী মেডিকেলে রেফার করা হয়। চিকিৎসার কোন ত্রুটি ছিল না।
জেলাজুড়ে গত সোমবার পর্যন্ত ৩৮ জন হামে আক্রান্ত হয়েছে। তার মধ্যে সদর হাসপাতালে ১৪ ভর্তি আছে। সবাই শিশু। এখনও চিকিৎসাধীন আছেন ৬জন। অন্যরা বাড়ি ফিরেছেন।
ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ডা. জাহাঙ্গীর আলম হাম সম্পর্কে তার মতামতে বলেন, হামের ভয়াবহতা বাড়ছে। আবার মারাও যাচ্ছে। হাম রোগ সংক্রমণ ছোঁয়াচে রোগ। এজন্য শিশু হাসপাতালে আলাদা কর্নার চালু করা হয়েছে। এখনও শিশু হাসপাতালে ১শ’র বেশী শিশু ভর্তি আছে। আর হাসপাতালের বহিঃবিভাগে দিনে ১৫শ’-২০০০ শিশু চিকিৎসা দেয়া হয়।
করণীয় সম্পর্কে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুকে ভিটামিন-এ ও ভিটামিন ডি ওষুধ খাওয়ানো ছাড়াও পুষ্টিকর খাবার শিশুকে দিতে হবে। আর আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
এদিকে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল থেকে ডেঙ্গু ,করোনাভাইরাসের আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য দিলেও হামে আক্রান্ত মৃত্যুর তথ্য নেই বা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের রহস্যজনক কারণে আক্রান্ত ও মৃুত্যুর সঠিক তথ্য দিচ্ছে না। তাই প্রকৃত তথ্য পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। অন্য এক সূত্র জানায়, হামে শিশুর মৃতুর তথ্য নিয়ে রহস্য জনক কারণে লুকোচুরি করছেন। মৃত্যু বাড়ছে। রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনায়ই ৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এই সংখ্যা প্রায় শতাধিক হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন