সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকবে আপনার ব্রেইন, বিজ্ঞান নাকি বিভ্রম ?



মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকবে আপনার ব্রেইন, বিজ্ঞান নাকি বিভ্রম ?
ছবি : এআই নির্মিত

কল্পনা করুন, আপনি কথা বলছেন এমন একজনের সাথে, যে আপনার জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি তথ্য জানে। সে হুবহু আপনার মতো করে ভাবে, আপনার মতোই শব্দ চয়ন, আপনার মতই কণ্ঠস্বর এমনকি আপনার সবচেয়ে গোপন স্মৃতিগুলোও তার অজানা নয়। কিন্তু সবচেয়ে চমকের বিষয় হলো, কথা বলা এই সত্তাটি রক্তমাংসের কোনো মানুষ নয়। সে আপনারই এক অবিকল ডিজিটাল প্রতিবিম্ব। এখন প্রশ্ন জাগে, এ কি আদৌ সম্ভব? নাকি এটি সায়েন্স ফিকশনের পাতা থেকে উঠে আসা কোনো অবাস্তব গল্প? না, গল্প নয়।এ এক দৃশ্যমান ভবিষ্যৎ যা ইতোধ্যেই আমাদের চারপাশে জাল বুনতে শুরু করেছে

এক আক্ষেপ থেকে জন্ম নেওয়া বিস্ময়

ঘটনার সূত্রপাত এক বেদনার গল্প থেকে। একজন সফল উদ্যোক্তা, যিনি জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়েছিলেন, শেষ জীবনে এসে স্ট্রোকের কারণে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তার নাতি, যিনি নিজেও জীবনের এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি চাইছিলেন তার অভিজ্ঞ দাদার কাছ থেকে কিছু পরামর্শ নিতে। কিন্তু একজন নির্বাক মানুষের কাছ থেকে কীভাবে উত্তর মিলবে? তখন সেই নাছোড়বান্দা তরুণ দ্বারস্থ হলেন প্রযুক্তির। দাদার লেখা বই আর ফেলে আসা জীবনের কিছু স্মৃতিকে পুঁজি করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মাধ্যমে তৈরি করলেন এমন এক সত্তা, যা হুবহু তার দাদার মতোই উত্তর দিতে সক্ষম। আর এভাবেই জন্ম নেয় মানুষের মনকে 'ক্লোন' করার এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি ডেলফি এআই

কীভাবে তৈরি হয় কৃত্রিম মস্তিষ্ক ?

আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আপনার অবর্তমানে আপনার চিন্তাভাবনাগুলো কে বাঁচিয়ে রাখবে? এই প্রযুক্তি ঠিক সেই কাজটিই করে। এটি কেবল আপনার কণ্ঠস্বর নকল করে না, আপনার মন কে অনুকরণ করার চেষ্টা করে। আপনার লেখা পুরনো ডায়েরি, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, পডকাস্ট, ভিডিও, এমনকি আপনার দেওয়া ব্যক্তিগত নোটগুলোও বিশ্লেষণ করে এই এআই। যদি আপনার কোনো ডেটা না-ও থাকে, এটি নিজেই একাধারে প্রশ্ন করে আপনার সাক্ষাৎকার নিয়ে আপনাকে চিনে নেবে। আপনি কখন রেগে যান, কোন পরিস্থিতিতে কেমন সিদ্ধান্ত নেন সবকিছুই সংরক্ষণ করে সে। তৈরি হয় আপনার এক নিখুঁত ডিজিটাল ক্লোন

 ছায়াসঙ্গী নাকি অজানা বিপদের হাতছানি?

যেকোনো যুগান্তকারী আবিষ্কারের সাথেই আসে এক অজানা আতঙ্ক। প্রশ্ন ওঠে, আপনার এই ডিজিটাল সত্তা যদি কখনো আপনার নামে মিথ্যা বলে? যদি সে এমন কিছু বলে বসে যা আপনার আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বা আপনার সম্মানহানি করে? উদ্ভাবকরা অবশ্য আশ্বস্ত করছেন, এই এআই নিজে থেকে কোনো গল্প ফাঁদবে না বা কল্পনাপ্রসূত কিছু বলবে না (Hallucination)যে তথ্য সে জানে না, সেখানে সে বলে দেবে "আমি জানি না"। এর ব্যবহারেও টানা হয়েছে কড়া সীমারেখা  রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা বিতর্কিত কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য এর দরজা বন্ধ। এটি মানুষের বিকল্প বন্ধু বা সঙ্গী হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। তাছাড়া, আপনার ডেটার মালিকানাও থাকবে সম্পূর্ণ আপনারই হাতে।

কিন্তু ভার্চুয়াল জগতে ডেটা কি সত্যিই নিরাপদ? যন্ত্রের কাছে নিজেদের মস্তিষ্ক তুলে দেওয়ার এই খেলায় আমরা কোনো ডিজিটাল গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছি না তো?

সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত, নাকি অনন্ত শূন্যতা ?

ভাবতে অবাক লাগে, আজ থেকে একশ বছর পর হয়তো আপনার বংশধরেরা আপনার এই ডিজিটাল ভার্সনের সাথে বসে আপনারই জীবনের গল্প শুনবে! ইতোমধ্যেই বিশ্বের নামীদামী ব্যক্তিরা তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে এই প্রযুক্তির দ্বারস্থ হচ্ছেন। পেশাদার ক্ষেত্রে এটি যেন খুলে দিচ্ছে আয়ের এক নতুন দরজা। আপনি চাইলেই এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মেধাবী মানুষের 'মস্তিষ্কের' সাথে কথা বলে তাদের পরামর্শ নিতে পারেন। এটি যেন ২৪ ঘণ্টার এক অন্তহীন জ্ঞানভাণ্ডার।

কিন্তু দিনশেষে একটা গভীর সংশয় থেকেই যায়। একটি যন্ত্র কি কখনো মানুষের আত্মার আসল উষ্ণতা দিতে পারবে? নাকি আমরা এমন এক ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াচ্ছি, যেখানে রক্তমাংসের মানুষ আর যান্ত্রিক মস্তিষ্কের মাঝে কোনো সীমারেখা থাকবে না? উত্তরটা অজানা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬


মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকবে আপনার ব্রেইন, বিজ্ঞান নাকি বিভ্রম ?

প্রকাশের তারিখ : ০১ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

কল্পনা করুন, আপনি কথা বলছেন এমন একজনের সাথে, যে আপনার জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি তথ্য জানে। সে হুবহু আপনার মতো করে ভাবে, আপনার মতোই শব্দ চয়ন, আপনার মতই কণ্ঠস্বর এমনকি আপনার সবচেয়ে গোপন স্মৃতিগুলোও তার অজানা নয়। কিন্তু সবচেয়ে চমকের বিষয় হলো, কথা বলা এই সত্তাটি রক্তমাংসের কোনো মানুষ নয়। সে আপনারই এক অবিকল ডিজিটাল প্রতিবিম্ব। এখন প্রশ্ন জাগে, এ কি আদৌ সম্ভব? নাকি এটি সায়েন্স ফিকশনের পাতা থেকে উঠে আসা কোনো অবাস্তব গল্প? না, গল্প নয়।এ এক দৃশ্যমান ভবিষ্যৎ যা ইতোধ্যেই আমাদের চারপাশে জাল বুনতে শুরু করেছে

এক আক্ষেপ থেকে জন্ম নেওয়া বিস্ময়

ঘটনার সূত্রপাত এক বেদনার গল্প থেকে। একজন সফল উদ্যোক্তা, যিনি জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়েছিলেন, শেষ জীবনে এসে স্ট্রোকের কারণে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তার নাতি, যিনি নিজেও জীবনের এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি চাইছিলেন তার অভিজ্ঞ দাদার কাছ থেকে কিছু পরামর্শ নিতে। কিন্তু একজন নির্বাক মানুষের কাছ থেকে কীভাবে উত্তর মিলবে? তখন সেই নাছোড়বান্দা তরুণ দ্বারস্থ হলেন প্রযুক্তির। দাদার লেখা বই আর ফেলে আসা জীবনের কিছু স্মৃতিকে পুঁজি করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মাধ্যমে তৈরি করলেন এমন এক সত্তা, যা হুবহু তার দাদার মতোই উত্তর দিতে সক্ষম। আর এভাবেই জন্ম নেয় মানুষের মনকে 'ক্লোন' করার এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি ডেলফি এআই

কীভাবে তৈরি হয় কৃত্রিম মস্তিষ্ক ?

আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আপনার অবর্তমানে আপনার চিন্তাভাবনাগুলো কে বাঁচিয়ে রাখবে? এই প্রযুক্তি ঠিক সেই কাজটিই করে। এটি কেবল আপনার কণ্ঠস্বর নকল করে না, আপনার মন কে অনুকরণ করার চেষ্টা করে। আপনার লেখা পুরনো ডায়েরি, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, পডকাস্ট, ভিডিও, এমনকি আপনার দেওয়া ব্যক্তিগত নোটগুলোও বিশ্লেষণ করে এই এআই। যদি আপনার কোনো ডেটা না-ও থাকে, এটি নিজেই একাধারে প্রশ্ন করে আপনার সাক্ষাৎকার নিয়ে আপনাকে চিনে নেবে। আপনি কখন রেগে যান, কোন পরিস্থিতিতে কেমন সিদ্ধান্ত নেন সবকিছুই সংরক্ষণ করে সে। তৈরি হয় আপনার এক নিখুঁত ডিজিটাল ক্লোন

 ছায়াসঙ্গী নাকি অজানা বিপদের হাতছানি?

যেকোনো যুগান্তকারী আবিষ্কারের সাথেই আসে এক অজানা আতঙ্ক। প্রশ্ন ওঠে, আপনার এই ডিজিটাল সত্তা যদি কখনো আপনার নামে মিথ্যা বলে? যদি সে এমন কিছু বলে বসে যা আপনার আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বা আপনার সম্মানহানি করে? উদ্ভাবকরা অবশ্য আশ্বস্ত করছেন, এই এআই নিজে থেকে কোনো গল্প ফাঁদবে না বা কল্পনাপ্রসূত কিছু বলবে না (Hallucination)যে তথ্য সে জানে না, সেখানে সে বলে দেবে "আমি জানি না"। এর ব্যবহারেও টানা হয়েছে কড়া সীমারেখা  রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা বিতর্কিত কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য এর দরজা বন্ধ। এটি মানুষের বিকল্প বন্ধু বা সঙ্গী হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। তাছাড়া, আপনার ডেটার মালিকানাও থাকবে সম্পূর্ণ আপনারই হাতে।

কিন্তু ভার্চুয়াল জগতে ডেটা কি সত্যিই নিরাপদ? যন্ত্রের কাছে নিজেদের মস্তিষ্ক তুলে দেওয়ার এই খেলায় আমরা কোনো ডিজিটাল গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছি না তো?

সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত, নাকি অনন্ত শূন্যতা ?

ভাবতে অবাক লাগে, আজ থেকে একশ বছর পর হয়তো আপনার বংশধরেরা আপনার এই ডিজিটাল ভার্সনের সাথে বসে আপনারই জীবনের গল্প শুনবে! ইতোমধ্যেই বিশ্বের নামীদামী ব্যক্তিরা তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে এই প্রযুক্তির দ্বারস্থ হচ্ছেন। পেশাদার ক্ষেত্রে এটি যেন খুলে দিচ্ছে আয়ের এক নতুন দরজা। আপনি চাইলেই এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মেধাবী মানুষের 'মস্তিষ্কের' সাথে কথা বলে তাদের পরামর্শ নিতে পারেন। এটি যেন ২৪ ঘণ্টার এক অন্তহীন জ্ঞানভাণ্ডার।

কিন্তু দিনশেষে একটা গভীর সংশয় থেকেই যায়। একটি যন্ত্র কি কখনো মানুষের আত্মার আসল উষ্ণতা দিতে পারবে? নাকি আমরা এমন এক ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াচ্ছি, যেখানে রক্তমাংসের মানুষ আর যান্ত্রিক মস্তিষ্কের মাঝে কোনো সীমারেখা থাকবে না? উত্তরটা অজানা।


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত