সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

আইন জানার বিকল্প নেই


বাবুল রবিদাস
বাবুল রবিদাস
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬

আইন জানার বিকল্প নেই

‘আইন না জানলে তার ক্ষমা নেই’—আইনের এ কথাটি বহুল প্রচলিত। এর অর্থ হলো, আইনের অজ্ঞতা ক্ষমার অযোগ্য; অর্থাৎ আইন না জানা কোনোভাবেই দায়মুক্তির কারণ হতে পারে না। রাষ্ট্র ধরে নেয়, তার দেশে বসবাসকারী সব নাগরিকই প্রচলিত আইন সম্পর্কে অবগত। তাই বাস্তবে কেউ কোনো আইন না জেনে তা লঙ্ঘন করলেও, পরে অনুতপ্ত হয়ে ‘আমি জানতাম না’—এমন অজুহাত দিলে তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। ফলে প্রচলিত আইন ভঙ্গের দায়ে শাস্তি পেতেই হয়। আইন না জানলে, আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নেয়া উচিত।

বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়। একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তি সুধীর তির্কী এবং একজন মুসলিম ব্যক্তি মো. আব্দুর রহিম। সুধীর তির্কী গুরুতর অসুস্থ; তার চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করা প্রয়োজন। তিনি এক বিঘা (৩৩ শতক) জমি বিক্রি করতে ইচ্ছুক। এ খবর পেয়ে আব্দুর রহিম উপযুক্ত মূল্যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিলের মাধ্যমে সুধীর তির্কীর কাছ থেকে এক বিঘা জমি ক্রয় করেন। দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পর থেকে তিনি ওই জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন।

কিছুদিন পর সুধীর তির্কী মৃত্যুবরণ করলে তার পুত্র নয়ন তির্কী ও নারায়ণ তির্কী আদালতে মামলা করেন। তাদের দাবি, আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জমি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারার বিধান অনুযায়ী সরকারের অনুমতি ছাড়া জমি বিক্রি করা যায় না। কিন্তু উক্ত দলিলে সরকারের অনুমতি নেয়া হয়নি। ওই ধারায় বলা আছে, আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জমি সরকারের অনুমতি ছাড়া হস্তান্তর করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে এবং এ ধরনের বাতিল দলিলের ক্ষেত্রে তামাদি প্রযোজ্য হয় না। অর্থাৎ, এ দলিলের কোনো আইনগত মূল্য নেই।

এ অবস্থায় আব্দুর রহিম আদালতে জবাবে বলেন, এ ধরনের জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমতি লাগে—এ তথ্য তার জানা ছিল না। কিন্তু এমন যুক্তিতে তার দলিল বৈধ হবে না। কারণ, আইনের অজ্ঞতা কোনো অজুহাত নয়— তাই এ ধরনের যুক্তি আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় না।

এ কারণেই জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অনেক দালাল ও প্রতারক সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। ফলে মামলা-মোকদ্দমায় পড়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হন। তাই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন।

দৈনন্দিন জীবনের অনেক কাজেই আইনের বিধান জড়িত। সেগুলো সম্পর্কে সাধারণ ধারণা থাকলে নানা ঝামেলা ও ক্ষতি এড়ানো যায়। একটি প্রবাদ আছে—‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।’

অনেকে মনে করেন, অজ্ঞতা ঝামেলা থেকে মুক্তির পথ। তারা বলেন, কিছু না জানলে দুশ্চিন্তাও থাকে না। এতে সাময়িকভাবে জীবন সহজ ও আনন্দময় মনে হতে পারে। কিন্তু অজ্ঞতার কোনো ভবিষ্যৎ নেই; বরং তা পরিণামে ক্ষতির কারণ হয়। সমাজে এমন অনেক উদাহরণ দেখা যায়—কেউ জমি-জমা অর্জন করেছেন ঠিকই, কিন্তু তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা সব হারিয়ে পথে বসেছেন।

বাস্তবে অধিকাংশ ফৌজদারি মামলার বড় একটি অংশ জমি-সংক্রান্ত বিরোধ থেকে সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ইরি ও আমন ধান কাটার মৌসুমে জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জমি-জমার ক্ষেত্রে বৈধ কাগজপত্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে ভূমির প্রাণই হলো বৈধ দলিল। বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কোনো মামলায় জয়লাভ করা প্রায় অসম্ভব।

জমি-সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা একবার শুরু হলে এর নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগে— কখনও কখনও প্রজন্ম পার হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মামলার খরচ জমির মূল্যের চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়ায়। জেদের বশে অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। এ প্রসঙ্গে শেক্সপিয়ারের একটি উক্তি স্মরণ করা যায়— ‘আইন মাকড়সার জালের মতো; এতে ছোটরা ধরা পড়ে, বড়রা বেরিয়ে যায়।’

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। আইনের অজ্ঞতা ক্ষমার অযোগ্য হলেও, তথ্যের অজ্ঞতা কখনও কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যেমন—গ্রামের অনেক মানুষ শহরের খবরাখবর রাখেন না। হঠাৎ কোনো এলাকায় অস্থিরতা দেখা দিলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু মাইকিংয়ের খবর না পেয়ে কেউ যদি সেখানে উপস্থিত হন, তাহলে তিনি তথ্যের অজ্ঞতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমা পেতে পারেন। 

সুতরাং, আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ৯৭ ধারার বিধান অনুযায়ী অনুমতি না নিলে, ওই হস্তান্তর ৯৭ (৭) ধারা অনুযায়ী বাতিল বলে গণ্য হবে এবং তা তামাদি দ্বারা বাধাগ্রস্ত হবে না।

আইন জানা তাই কেবল প্রয়োজন নয়, অপরিহার্য।

[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬


আইন জানার বিকল্প নেই

প্রকাশের তারিখ : ০১ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

‘আইন না জানলে তার ক্ষমা নেই’—আইনের এ কথাটি বহুল প্রচলিত। এর অর্থ হলো, আইনের অজ্ঞতা ক্ষমার অযোগ্য; অর্থাৎ আইন না জানা কোনোভাবেই দায়মুক্তির কারণ হতে পারে না। রাষ্ট্র ধরে নেয়, তার দেশে বসবাসকারী সব নাগরিকই প্রচলিত আইন সম্পর্কে অবগত। তাই বাস্তবে কেউ কোনো আইন না জেনে তা লঙ্ঘন করলেও, পরে অনুতপ্ত হয়ে ‘আমি জানতাম না’—এমন অজুহাত দিলে তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। ফলে প্রচলিত আইন ভঙ্গের দায়ে শাস্তি পেতেই হয়। আইন না জানলে, আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নেয়া উচিত।

বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়। একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তি সুধীর তির্কী এবং একজন মুসলিম ব্যক্তি মো. আব্দুর রহিম। সুধীর তির্কী গুরুতর অসুস্থ; তার চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করা প্রয়োজন। তিনি এক বিঘা (৩৩ শতক) জমি বিক্রি করতে ইচ্ছুক। এ খবর পেয়ে আব্দুর রহিম উপযুক্ত মূল্যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিলের মাধ্যমে সুধীর তির্কীর কাছ থেকে এক বিঘা জমি ক্রয় করেন। দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পর থেকে তিনি ওই জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন।

কিছুদিন পর সুধীর তির্কী মৃত্যুবরণ করলে তার পুত্র নয়ন তির্কী ও নারায়ণ তির্কী আদালতে মামলা করেন। তাদের দাবি, আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জমি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারার বিধান অনুযায়ী সরকারের অনুমতি ছাড়া জমি বিক্রি করা যায় না। কিন্তু উক্ত দলিলে সরকারের অনুমতি নেয়া হয়নি। ওই ধারায় বলা আছে, আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জমি সরকারের অনুমতি ছাড়া হস্তান্তর করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে এবং এ ধরনের বাতিল দলিলের ক্ষেত্রে তামাদি প্রযোজ্য হয় না। অর্থাৎ, এ দলিলের কোনো আইনগত মূল্য নেই।

এ অবস্থায় আব্দুর রহিম আদালতে জবাবে বলেন, এ ধরনের জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমতি লাগে—এ তথ্য তার জানা ছিল না। কিন্তু এমন যুক্তিতে তার দলিল বৈধ হবে না। কারণ, আইনের অজ্ঞতা কোনো অজুহাত নয়— তাই এ ধরনের যুক্তি আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় না।

এ কারণেই জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অনেক দালাল ও প্রতারক সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। ফলে মামলা-মোকদ্দমায় পড়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হন। তাই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন।

দৈনন্দিন জীবনের অনেক কাজেই আইনের বিধান জড়িত। সেগুলো সম্পর্কে সাধারণ ধারণা থাকলে নানা ঝামেলা ও ক্ষতি এড়ানো যায়। একটি প্রবাদ আছে—‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।’

অনেকে মনে করেন, অজ্ঞতা ঝামেলা থেকে মুক্তির পথ। তারা বলেন, কিছু না জানলে দুশ্চিন্তাও থাকে না। এতে সাময়িকভাবে জীবন সহজ ও আনন্দময় মনে হতে পারে। কিন্তু অজ্ঞতার কোনো ভবিষ্যৎ নেই; বরং তা পরিণামে ক্ষতির কারণ হয়। সমাজে এমন অনেক উদাহরণ দেখা যায়—কেউ জমি-জমা অর্জন করেছেন ঠিকই, কিন্তু তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা সব হারিয়ে পথে বসেছেন।

বাস্তবে অধিকাংশ ফৌজদারি মামলার বড় একটি অংশ জমি-সংক্রান্ত বিরোধ থেকে সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ইরি ও আমন ধান কাটার মৌসুমে জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জমি-জমার ক্ষেত্রে বৈধ কাগজপত্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে ভূমির প্রাণই হলো বৈধ দলিল। বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কোনো মামলায় জয়লাভ করা প্রায় অসম্ভব।

জমি-সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা একবার শুরু হলে এর নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগে— কখনও কখনও প্রজন্ম পার হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মামলার খরচ জমির মূল্যের চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়ায়। জেদের বশে অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। এ প্রসঙ্গে শেক্সপিয়ারের একটি উক্তি স্মরণ করা যায়— ‘আইন মাকড়সার জালের মতো; এতে ছোটরা ধরা পড়ে, বড়রা বেরিয়ে যায়।’

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। আইনের অজ্ঞতা ক্ষমার অযোগ্য হলেও, তথ্যের অজ্ঞতা কখনও কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যেমন—গ্রামের অনেক মানুষ শহরের খবরাখবর রাখেন না। হঠাৎ কোনো এলাকায় অস্থিরতা দেখা দিলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু মাইকিংয়ের খবর না পেয়ে কেউ যদি সেখানে উপস্থিত হন, তাহলে তিনি তথ্যের অজ্ঞতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমা পেতে পারেন। 

সুতরাং, আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ৯৭ ধারার বিধান অনুযায়ী অনুমতি না নিলে, ওই হস্তান্তর ৯৭ (৭) ধারা অনুযায়ী বাতিল বলে গণ্য হবে এবং তা তামাদি দ্বারা বাধাগ্রস্ত হবে না।

আইন জানা তাই কেবল প্রয়োজন নয়, অপরিহার্য।

[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত