দেশে আশঙ্কাজনক হারে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে সারা দেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী রোববার থেকে এই কার্যক্রম একযোগে শুরু হবে।
বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী
সরদার সাখাওয়াত হোসেন এই ঘোষণা দেন। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্ত
রাখতে এবং সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিংকালে কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী
বলেন, "রোববার থেকে পুরো জেনারেশন কাভার হওয়া পর্যন্ত ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী
বাচ্চাদের হামের টিকা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ইপিআই এর অন্য টিকা কার্যক্রমও চলবে। এই
টিকাদান কর্মসূচি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে যাতে
কোনো শিশু এই সুরক্ষা থেকে বাদ না পড়ে।"
দেশের প্রতিটি অঞ্চলের শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে
স্বাস্থ্য বিভাগকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত টিকাদান
কর্মসূচির (ইপিআই) স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রেখেই এই অতিরিক্ত টিকা প্রদান করা হবে।
নির্ধারিত বয়সের শিশুদের নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য অভিভাবকদের প্রতি
বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী।
সরকারি এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
এবং হাম নির্মূলে বড় ধরনের সাফল্য আসবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দেশের তৃণমূল
পর্যায় পর্যন্ত এই সেবা পৌঁছে দিতে মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা
দেওয়া হয়েছে।
এর আগে, ১৯৭৯ সালে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ব্যবস্থাপনায়
এই কার্যক্রম শুরু হয় এবং ২০১২ সালে রুবেলা অ্যান্টিজেন সংযোজনের মাধ্যমে সমন্বিত হাম-রুবেলা
টিকা চালু করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে দুই ডোজের মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে,
যেখানে প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সী শিশুদের দেওয়া হয়। বর্তমানে
ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে বিসিজি, পেন্টা, পিসিভি, আইপিভি, এইচপিভি, এমআর, টিডি এবং
টাইফয়েডসহ মোট ১২টি রোগের বিরুদ্ধে ৯টি টিকা দেওয়া হচ্ছে।
হাম সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে বড় ধরনের
ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছে। ২০১৪ সালে প্রায় ৫ কোটি এবং ২০২০-২১ সালের ক্যাম্পেইনে
প্রায় সাড়ে ৩ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিলো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা
জটিল আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালে মাত্র ৫৬.২ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে, যা গত ৯
বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর অর্থ হলো, প্রায় ৪৩.৮ শতাংশ শিশু এখনো টিকার আওতার বাইরে
রয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এত বড় অংশ টিকার বাইরে
থাকায় ভবিষ্যতে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে যে সব শিশু আংশিক টিকা নিয়েছে
বা একেবারেই নেয়নি, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগের বছরগুলোতে টিকাদানের হার ছিলো অত্যন্ত
আশাব্যঞ্জক। ২০২৪ সালে ৯৮.৯ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৯৯.৭ শতাংশ কভারেজ ছিলো। এমনকি করোনা
মহামারির সময়েও এই হার সন্তোষজনক ছিলো। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনা নিয়ে
প্রশাসনিক জটিলতা, সরকার নিজে কিনবে নাকি ইউনিসেফের সহায়তা নেবে; এ সব দ্বন্দ্বে সময়ক্ষেপণ
হওয়ায় টিকার মজুত ফুরিয়ে যায়।
এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি এবং প্রশাসনিক
দুর্বলতাও এই ঘাটতির অন্যতম কারণ। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ,
পাবনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ, এই সাত জেলায় হামের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে মহাখালী ইপিআই ভবনে গিয়ে দেখা গেছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে
টিকার মজুত নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন কর্মকর্তারা। একজন কর্মকর্তা জানান, "জাতীয়
পর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবুও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু শিশু টিকাদানের
বাইরে থেকে যাওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বিদ্যমান রয়েছে।"
এ দিকে ইপিআই সার্ভিস সেন্টারের টেকনোলজিস্ট মজিবুর রহমান নিশ্চিত
করেছেন, নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্রে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন শিশু টিকা নিচ্ছে। জামালপুরের
১০ বছর বয়সী শিশু আব্দুল্লাহ আল সাফওয়ানও গতকাল এই কেন্দ্রে হামের টিকা নিয়েছে। মূলত
নির্ধারিত সময়ে টিকা দিতে না পারা শিশুদের ভিড় বাড়ছে কেন্দ্রগুলোতে।
দেশের ১ লাখ ২০ হাজার টিকাকেন্দ্রের মাধ্যমে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ
সফল করতে এখন পুরোপুরি প্রস্তুত স্বাস্থ্য বিভাগ।

বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ এপ্রিল ২০২৬
দেশে আশঙ্কাজনক হারে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে সারা দেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী রোববার থেকে এই কার্যক্রম একযোগে শুরু হবে।
বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী
সরদার সাখাওয়াত হোসেন এই ঘোষণা দেন। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্ত
রাখতে এবং সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিংকালে কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী
বলেন, "রোববার থেকে পুরো জেনারেশন কাভার হওয়া পর্যন্ত ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী
বাচ্চাদের হামের টিকা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ইপিআই এর অন্য টিকা কার্যক্রমও চলবে। এই
টিকাদান কর্মসূচি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে যাতে
কোনো শিশু এই সুরক্ষা থেকে বাদ না পড়ে।"
দেশের প্রতিটি অঞ্চলের শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে
স্বাস্থ্য বিভাগকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত টিকাদান
কর্মসূচির (ইপিআই) স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রেখেই এই অতিরিক্ত টিকা প্রদান করা হবে।
নির্ধারিত বয়সের শিশুদের নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য অভিভাবকদের প্রতি
বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী।
সরকারি এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
এবং হাম নির্মূলে বড় ধরনের সাফল্য আসবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দেশের তৃণমূল
পর্যায় পর্যন্ত এই সেবা পৌঁছে দিতে মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা
দেওয়া হয়েছে।
এর আগে, ১৯৭৯ সালে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ব্যবস্থাপনায়
এই কার্যক্রম শুরু হয় এবং ২০১২ সালে রুবেলা অ্যান্টিজেন সংযোজনের মাধ্যমে সমন্বিত হাম-রুবেলা
টিকা চালু করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে দুই ডোজের মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে,
যেখানে প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সী শিশুদের দেওয়া হয়। বর্তমানে
ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে বিসিজি, পেন্টা, পিসিভি, আইপিভি, এইচপিভি, এমআর, টিডি এবং
টাইফয়েডসহ মোট ১২টি রোগের বিরুদ্ধে ৯টি টিকা দেওয়া হচ্ছে।
হাম সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে বড় ধরনের
ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছে। ২০১৪ সালে প্রায় ৫ কোটি এবং ২০২০-২১ সালের ক্যাম্পেইনে
প্রায় সাড়ে ৩ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিলো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা
জটিল আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালে মাত্র ৫৬.২ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে, যা গত ৯
বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর অর্থ হলো, প্রায় ৪৩.৮ শতাংশ শিশু এখনো টিকার আওতার বাইরে
রয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এত বড় অংশ টিকার বাইরে
থাকায় ভবিষ্যতে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে যে সব শিশু আংশিক টিকা নিয়েছে
বা একেবারেই নেয়নি, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগের বছরগুলোতে টিকাদানের হার ছিলো অত্যন্ত
আশাব্যঞ্জক। ২০২৪ সালে ৯৮.৯ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৯৯.৭ শতাংশ কভারেজ ছিলো। এমনকি করোনা
মহামারির সময়েও এই হার সন্তোষজনক ছিলো। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনা নিয়ে
প্রশাসনিক জটিলতা, সরকার নিজে কিনবে নাকি ইউনিসেফের সহায়তা নেবে; এ সব দ্বন্দ্বে সময়ক্ষেপণ
হওয়ায় টিকার মজুত ফুরিয়ে যায়।
এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি এবং প্রশাসনিক
দুর্বলতাও এই ঘাটতির অন্যতম কারণ। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ,
পাবনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ, এই সাত জেলায় হামের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে মহাখালী ইপিআই ভবনে গিয়ে দেখা গেছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে
টিকার মজুত নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন কর্মকর্তারা। একজন কর্মকর্তা জানান, "জাতীয়
পর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবুও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু শিশু টিকাদানের
বাইরে থেকে যাওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বিদ্যমান রয়েছে।"
এ দিকে ইপিআই সার্ভিস সেন্টারের টেকনোলজিস্ট মজিবুর রহমান নিশ্চিত
করেছেন, নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্রে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন শিশু টিকা নিচ্ছে। জামালপুরের
১০ বছর বয়সী শিশু আব্দুল্লাহ আল সাফওয়ানও গতকাল এই কেন্দ্রে হামের টিকা নিয়েছে। মূলত
নির্ধারিত সময়ে টিকা দিতে না পারা শিশুদের ভিড় বাড়ছে কেন্দ্রগুলোতে।
দেশের ১ লাখ ২০ হাজার টিকাকেন্দ্রের মাধ্যমে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ
সফল করতে এখন পুরোপুরি প্রস্তুত স্বাস্থ্য বিভাগ।

আপনার মতামত লিখুন