সমাজ ও পরিবারের নানা প্রতিকূলতা ছাপিয়ে জীবনসংগ্রামে জয়ী হয়েছেন সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার পাঁচ নারী। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নারীদের অদম্য পথচলাকে স্বীকৃতি দিতে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে তাদের ‘জয়িতা’ সম্মাননা দিয়েছে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর। গত ৮ মার্চ দেবহাটা উপজেলা মিলনায়তনে তাদের এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।
সম্মাননা পাওয়া এই পাঁচ নারীর প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল হওয়ার জন্য পাড়ি দিয়েছেন কণ্টকাকীর্ণ পথ। তাদের সেই লড়াকু জীবনের গল্পগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
সমাজ উন্নয়নে উত্তরা দাশ
মাঝ পারুলিয়া গ্রামের উত্তরা দাশ নিম্নবিত্ত পরিবারের গৃহবধূ হয়েও নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন সমাজসেবায়। নিজ উদ্যোগে এলাকায় বাল্যবিবাহ বন্ধ, শিশুশ্রম ও ইভটিজিং প্রতিরোধে কাজ করছেন তিনি। বিশেষ করে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার আদায়, দরিদ্রদের সরকারি ভাতা ও বৃত্তি পেতে সহায়তা এবং উঠান বৈঠকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টিতে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখছেন।
শিক্ষা ও চাকরিতে হেলেনা পারভীন
মাঘরী গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান হেলেনা পারভীন। তার ছয় বোনের মধ্যে বড়দের পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। শত অভাবের মধ্যে টিউশনি ও স্কুলে প্যারা শিক্ষকের কাজ করে তিনি দর্শন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। বাবার স্ট্রোক ও পরিবারের বিয়ের চাপ সামলে হেলেনা বর্তমানে সখিপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ হিসেবে কর্মরত। নিজের আয়ে অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসা এবং ভাগনেসহ পাঁচজনের সংসারের হাল ধরেছেন তিনি।
সফল জননী চন্দনা রানী রায়
বহেরা গ্রামের চন্দনা রানী দারিদ্র্য ও পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েও হার মানেননি। হাঁস-মুরগি পালন করে সেই আয় দিয়ে একমাত্র মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন। মায়ের সেই ত্যাগের মর্যাদা দিয়েছেন মেধাবী মেয়েটিও। স্কুল-কলেজের গন্ডি পেরিয়ে চন্দনার মেয়ে এখন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) অধ্যয়নরত।
নির্যাতন মুছে নতুন জীবনে হামিদা খাতুন
যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতনে ২০০৭ সালে হামিদা খাতুনের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। পিত্রালয়ে ফিরে এসে লোকলজ্জাকে তুচ্ছ করে তিনি নতুন করে জীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনে (পিডিবিএফ) মাঠ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। পাঁচ বোনের মধ্যে বড় হামিদা নিজের উপার্জনে ছোট বোনদের পড়াশোনা ও বিয়ে দিয়েছেন এবং পৈত্রিক জমি উদ্ধার করে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
অর্থনৈতিক সাফল্যে রোকেয়া খাতুন
গড়িয়াডাঙ্গা গ্রামের রোকেয়া খাতুনের একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরোত। স্বামীর অনিয়মিত আয়ে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছিল। পরে তিনি একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসামগ্রীর ব্যবসা শুরু করেন এবং অন্য একটি এনজিওতে খণ্ডকালীন চাকরি নেন। বর্তমানে ব্যবসা ও গবাদিপশু পালন করে তিনি অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল। কাঁচা ঘর ভেঙে পাকা ঘর তুলেছেন, সন্তানদের পড়ালেখা করাচ্ছেন ভালো স্কুলে।
আপনার মতামত লিখুন