উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে চৈত্র মাসে প্রকৃতি যেন ঋতুচক্র ভুলে গেছে। ভোরে দেখা গেছে শীতের দিনের মতো ঘন কুয়াশা ও ঝিরিঝিরি শিশির। সূর্য উঠতে বিলম্ব হওয়ায় সকালটা ঠিক সন্ধ্যার মতো হয়ে ওঠে। ফসলের মাঠ, রাস্তাঘাট, গাছপালা সবকিছু যেন সাদা চাদরে মোড়ানো। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সকালের এমন দৃশ্য দেখে বিস্মিত স্থানীয় বাসিন্দারা। যেমন খানিকটা বিস্মিত আবহাওয়াবিদেরাও।
চৈত্রের রং বদল
সাধারণত চৈত্র মানেই কাঠফাটা রোদ। বাড়তে থাকা তাপমাত্রা। ফসল সংগ্রহের শেষ সময়ও। তবে পঞ্চগড় যেন তার নিজস্ব আবহাওয়ার নিয়ম তৈরি করে ফেলেছে। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য বলছে, সকাল ৯টায় সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে আর্দ্রতা ছিল প্রায় ৯৯ শতাংশ। এর আগের সপ্তাহজুড়ে তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২২ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করেছে। সঙ্গে ছিল হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি।
বাষ্পীয় কুয়াশা
পঞ্চগড়ের এই অস্বাভাবিক ঘটনাকে ‘অকাল কুয়াশা’ না বলে ‘স্টিম ফগ’ বা ‘বাষ্পীয় কুয়াশা’ বলছেন আবহাওয়াবিদেরা। তেঁতুলিয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় ব্যাখ্যা করেছেন, ‘মৌসুমি বায়ু যখন সক্রিয় হয়ে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি এসে শীতলতার সংস্পর্শে আসে, তখন জলীয় বাষ্প দ্রুত ঘনীভূত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণায় রূপ নেয়। এতেই এ ধরনের কুয়াশা তৈরি হয়।’
সহজ ভাষায়, মাটির কাছাকাছি স্তরে গরম ও আর্দ্র বাতাস দ্রুত শীতল হয়ে গেলে জলীয় বাষ্প জমাট বেঁধে কুয়াশার সৃষ্টি করে। আগেরদিন রাতে (বুধবার) হঠাৎ বৃষ্টি ও তাপমাত্রা কমে যাওয়াই এই বাষ্পীয় কুয়াশার মূল কারণ। তবে শীতের কুয়াশার মতো এতে তেমন ঠান্ডা অনুভূত হয় না। যেমনটি বলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা সোহরাব হাসান, ‘কুয়াশাতে কাপড় ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু খুব বেশি শীত অনুভূত হয় না। কেমন জানি আজব আবহাওয়া।’
সড়কে লাইট জ্বালিয়ে চলছে যানবাহন
আবহাওয়ার এই ব্যতিক্রমী রূপ স্থানীয় মানুষের মধ্যে বিস্ময়, কৌতুহল ও খানিকটা উদ্বেগও তৈরি করেছে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার গোফাপাড়ার মেহেরুল বললেন, “সকালে উঠে দেখেচু কুয়াশাতে সাদা হয় গেইছে। আগের দিনের বুড়া-বুড়িলা কহিচে, চৈতে কুয়াশা হইলে বৈশাখে বান হয়। ’
এই লোকজ জ্ঞান কতটা বিজ্ঞানসম্মত, তা বলা না গেলেও, আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা স্বাভাবিক। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে চৈত্রে কুয়াশা আর বৈশাখে বন্যার সম্পর্ক নিয়ে প্রকৃতপক্ষে গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
সতর্কতা
অসময়ের এই কুয়াশা শুধু দৃষ্টিকটু নয়, স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। পঞ্চগড় জেলার সিভিল সার্জন মিজানুর রহমান সতর্ক করে বলেছেন, ‘অসময়ে এ ধরনের কুয়াশায় জলীয় বাষ্পের সঙ্গে প্রচুর ধুলাবালু থাকে। যা মানুষের শ্বাসনালিতে প্রবেশ করলে ক্ষতি করতে পারে। এছাড়া ঠান্ডা-গরমের তারতম্যের কারণেও অনেকের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।’
যারা এই অস্বাভাবিক আবহাওয়ার শিকার হচ্ছেন বিশেষত শিশু ও বয়স্কদের মাস্ক ব্যবহার ও সাবধান থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চিত পৃথিবীতে চৈত্রের কুয়াশা যেন প্রকৃতির কাছ থেকে আরেকটি সতর্কবার্তা।

বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ এপ্রিল ২০২৬
উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে চৈত্র মাসে প্রকৃতি যেন ঋতুচক্র ভুলে গেছে। ভোরে দেখা গেছে শীতের দিনের মতো ঘন কুয়াশা ও ঝিরিঝিরি শিশির। সূর্য উঠতে বিলম্ব হওয়ায় সকালটা ঠিক সন্ধ্যার মতো হয়ে ওঠে। ফসলের মাঠ, রাস্তাঘাট, গাছপালা সবকিছু যেন সাদা চাদরে মোড়ানো। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সকালের এমন দৃশ্য দেখে বিস্মিত স্থানীয় বাসিন্দারা। যেমন খানিকটা বিস্মিত আবহাওয়াবিদেরাও।
চৈত্রের রং বদল
সাধারণত চৈত্র মানেই কাঠফাটা রোদ। বাড়তে থাকা তাপমাত্রা। ফসল সংগ্রহের শেষ সময়ও। তবে পঞ্চগড় যেন তার নিজস্ব আবহাওয়ার নিয়ম তৈরি করে ফেলেছে। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য বলছে, সকাল ৯টায় সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে আর্দ্রতা ছিল প্রায় ৯৯ শতাংশ। এর আগের সপ্তাহজুড়ে তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২২ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করেছে। সঙ্গে ছিল হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি।
বাষ্পীয় কুয়াশা
পঞ্চগড়ের এই অস্বাভাবিক ঘটনাকে ‘অকাল কুয়াশা’ না বলে ‘স্টিম ফগ’ বা ‘বাষ্পীয় কুয়াশা’ বলছেন আবহাওয়াবিদেরা। তেঁতুলিয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় ব্যাখ্যা করেছেন, ‘মৌসুমি বায়ু যখন সক্রিয় হয়ে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি এসে শীতলতার সংস্পর্শে আসে, তখন জলীয় বাষ্প দ্রুত ঘনীভূত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণায় রূপ নেয়। এতেই এ ধরনের কুয়াশা তৈরি হয়।’
সহজ ভাষায়, মাটির কাছাকাছি স্তরে গরম ও আর্দ্র বাতাস দ্রুত শীতল হয়ে গেলে জলীয় বাষ্প জমাট বেঁধে কুয়াশার সৃষ্টি করে। আগেরদিন রাতে (বুধবার) হঠাৎ বৃষ্টি ও তাপমাত্রা কমে যাওয়াই এই বাষ্পীয় কুয়াশার মূল কারণ। তবে শীতের কুয়াশার মতো এতে তেমন ঠান্ডা অনুভূত হয় না। যেমনটি বলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা সোহরাব হাসান, ‘কুয়াশাতে কাপড় ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু খুব বেশি শীত অনুভূত হয় না। কেমন জানি আজব আবহাওয়া।’
সড়কে লাইট জ্বালিয়ে চলছে যানবাহন
আবহাওয়ার এই ব্যতিক্রমী রূপ স্থানীয় মানুষের মধ্যে বিস্ময়, কৌতুহল ও খানিকটা উদ্বেগও তৈরি করেছে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার গোফাপাড়ার মেহেরুল বললেন, “সকালে উঠে দেখেচু কুয়াশাতে সাদা হয় গেইছে। আগের দিনের বুড়া-বুড়িলা কহিচে, চৈতে কুয়াশা হইলে বৈশাখে বান হয়। ’
এই লোকজ জ্ঞান কতটা বিজ্ঞানসম্মত, তা বলা না গেলেও, আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা স্বাভাবিক। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে চৈত্রে কুয়াশা আর বৈশাখে বন্যার সম্পর্ক নিয়ে প্রকৃতপক্ষে গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
সতর্কতা
অসময়ের এই কুয়াশা শুধু দৃষ্টিকটু নয়, স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। পঞ্চগড় জেলার সিভিল সার্জন মিজানুর রহমান সতর্ক করে বলেছেন, ‘অসময়ে এ ধরনের কুয়াশায় জলীয় বাষ্পের সঙ্গে প্রচুর ধুলাবালু থাকে। যা মানুষের শ্বাসনালিতে প্রবেশ করলে ক্ষতি করতে পারে। এছাড়া ঠান্ডা-গরমের তারতম্যের কারণেও অনেকের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।’
যারা এই অস্বাভাবিক আবহাওয়ার শিকার হচ্ছেন বিশেষত শিশু ও বয়স্কদের মাস্ক ব্যবহার ও সাবধান থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চিত পৃথিবীতে চৈত্রের কুয়াশা যেন প্রকৃতির কাছ থেকে আরেকটি সতর্কবার্তা।

আপনার মতামত লিখুন