সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

দেশের হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা: বাস্তবতা ও করণীয়


নাজমুল হুদা খান
নাজমুল হুদা খান
প্রকাশ: ২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম

দেশের হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা: বাস্তবতা ও করণীয়
আইসিইউ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো দক্ষ জনবলের অভাব

সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী বিভাগে হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হাম ও এর জটিলতায় প্রাণ হারিয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রে শিশুদের জন্য আইসিইউ বেডের দীর্ঘদিনের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনই গুরুতর অসুস্থ শিশু আইসিইউ সেবার অপেক্ষায় থাকে; কিন্তু বেডের অপ্রতুলতার কারণে অনেককেই বাধ্য হয়ে সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা নিতে হয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিলে নিবিড় পরিচর্যা বা আইসিইউ সাপোর্ট জীবনরক্ষাকারী হয়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— এই গুরুত্বপূর্ণ সেবা এখনও সর্বজনীন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে জনমনে উদ্বেগের পাশাপাশি নীতিনির্ধারক মহলেও আলোচনা-সমালোচনা ক্রমেই জোরদার হচ্ছে।

ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, পেডিয়াট্রিক আইসিইউ এবং নিউনেটাল আইসিইউ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বাংলাদেশে এসব সেবার সম্প্রসারণ ঘটলেও জনসংখ্যার তুলনায় তা এখনও অত্যন্ত অপ্রতুল এবং মূলত শহরকেন্দ্রিক। দেশে প্রথম আইসিইউ চালু হয় ১৯৮০ সালে। বর্তমানে আনুমানিক ১০০টির মতো হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা রয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। সরকারি হাসপাতালে কার্যকরী আইসিইউ বেডের সংখ্যা মাত্র ২২০-২৫০টির মতো, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। আদর্শভাবে যেখানে আইসিইউ ও সাধারণ বেডের অনুপাত হওয়া উচিত ১:১০, সেখানে বাস্তবে তা প্রায় ১:২১৯। প্রতি এক লাখ জনগোষ্ঠীর জন্য আইসিইউ বেডের সংখ্যা মাত্র ০.৭, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় নিতান্ত কম।

কোভিড-১৯ মহামারির পর দেশে আইসিইউ বেডের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় হাজারের ওপর পৌঁছালেও জনবল সংকটের কারণে এর একটি বড় অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে পেডিয়াট্রিক ও নিয়োনেটাল আইসিইউ সেবা এখনও মূলত বড় বেসরকারি ও বিশেষায়িত হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ জেলা হাসপাতালে এই ধরনের সেবা নেই, বা থাকলেও অত্যন্ত সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে।

আইসিইউ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো দক্ষ জনবলের অভাব। দেশে প্রশিক্ষিত ইনটেনসিভিস্ট, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট এবং বিশেষায়িত আইসিইউ নার্সের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। প্রতি পাঁচ বছরে মাত্র ১৫০-২০০ জন বিশেষজ্ঞ তৈরি হতে পারে, যা এই খাতের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। বর্তমানে দেশে নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র ৪৩ জন। অথচ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, আইসিইউ পরিচালনায় এ ধরনের বিশেষজ্ঞদেরই নেতৃত্ব দেয়ার কথা। বাস্তবে প্রায় ৬০ শতাংশ আইসিইউ অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এবং মাত্র ১০ শতাংশ আইসিইউ নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

নার্সিং সেবার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। আইসিইউতে ২৪ ঘণ্টা রোগীর সেবায় নিয়োজিত নার্সদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাব রয়েছে। অধিকাংশ নার্সের নিবিড় পরিচর্যায় একাডেমিক প্রশিক্ষণ নেই এবং মাত্র ৪০ শতাংশ নার্স বেসিক লাইফ সাপোর্ট ও সিপিআর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ফলে আইসিইউ সেবার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।

আইসিইউ স্থাপন ও পরিচালনা একটি ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। একটি ১০ শয্যার আইসিইউ স্থাপনে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা পেতে ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি কিংবা উন্নত ল্যাব সুবিধাও অনুপস্থিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, মোট রোগীর প্রায় ৫ শতাংশ আইসিইউ সেবার প্রয়োজন হয় এবং কার্যকর আইসিইউ ব্যবস্থাপনা প্রায় ৫০ শতাংশ মৃত্যুহার কমাতে সক্ষম। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে আইসিইউ ব্যবস্থাপনার মান নিয়ন্ত্রণ, নীতিমালা এবং তদারকির ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। মাত্র ২০ শতাংশ হাসপাতালে কার্যকর ইনফেকশন কন্ট্রোল কমিটি রয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য তা হাতের নাগালের বাইরে।

এই প্রেক্ষাপটে দেশের আইসিইউ সেবা উন্নয়নে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি জেলা হাসপাতালে পর্যায়ক্রমে আইসিইউ স্থাপন করতে হবে এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে আবশ্যকভাবে পিআইসিইউ ও এনআইসিইউ চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালের মোট বেডের অন্তত ৫-১০ শতাংশ আইসিইউ বেড হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ইনটেনসিভ কেয়ার, ক্রিটিক্যাল কেয়ার নার্সিং এবং রেসপিরেটরি থেরাপির প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করতে হবে এবং এ খাতে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে।

এছাড়া আইসিইউ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনা চালু করা, অচল আইসিইউ পুনরায় চালু করা, বিদ্যমান সরঞ্জামের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত আইসিইউ গাইডলাইন প্রণয়ন, ইনফেকশন কন্ট্রোল বাধ্যতামূলক করা এবং অ্যাক্রেডিটেশন সিস্টেম চালু করাও সময়ের দাবি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে টেলি-আইসিইউ এবং ডিজিটাল পেশেন্ট মনিটরিং ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে আইসিইউ, পিআইসিইউ ও এনআইসিইউ সেবার অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য হলেও তা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং জনবল সংকটে সীমাবদ্ধ। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সেবা খাতকে শক্তিশালী করা সম্ভব হলে দেশের সামগ্রিক মৃত্যুহার হ্রাস এবং সংশ্লিষ্ট রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বি আর বি হাসপাতাল, ঢাকা]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬


দেশের হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা: বাস্তবতা ও করণীয়

প্রকাশের তারিখ : ০২ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী বিভাগে হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হাম ও এর জটিলতায় প্রাণ হারিয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রে শিশুদের জন্য আইসিইউ বেডের দীর্ঘদিনের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনই গুরুতর অসুস্থ শিশু আইসিইউ সেবার অপেক্ষায় থাকে; কিন্তু বেডের অপ্রতুলতার কারণে অনেককেই বাধ্য হয়ে সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা নিতে হয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিলে নিবিড় পরিচর্যা বা আইসিইউ সাপোর্ট জীবনরক্ষাকারী হয়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— এই গুরুত্বপূর্ণ সেবা এখনও সর্বজনীন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে জনমনে উদ্বেগের পাশাপাশি নীতিনির্ধারক মহলেও আলোচনা-সমালোচনা ক্রমেই জোরদার হচ্ছে।

ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, পেডিয়াট্রিক আইসিইউ এবং নিউনেটাল আইসিইউ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বাংলাদেশে এসব সেবার সম্প্রসারণ ঘটলেও জনসংখ্যার তুলনায় তা এখনও অত্যন্ত অপ্রতুল এবং মূলত শহরকেন্দ্রিক। দেশে প্রথম আইসিইউ চালু হয় ১৯৮০ সালে। বর্তমানে আনুমানিক ১০০টির মতো হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা রয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। সরকারি হাসপাতালে কার্যকরী আইসিইউ বেডের সংখ্যা মাত্র ২২০-২৫০টির মতো, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। আদর্শভাবে যেখানে আইসিইউ ও সাধারণ বেডের অনুপাত হওয়া উচিত ১:১০, সেখানে বাস্তবে তা প্রায় ১:২১৯। প্রতি এক লাখ জনগোষ্ঠীর জন্য আইসিইউ বেডের সংখ্যা মাত্র ০.৭, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় নিতান্ত কম।

কোভিড-১৯ মহামারির পর দেশে আইসিইউ বেডের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় হাজারের ওপর পৌঁছালেও জনবল সংকটের কারণে এর একটি বড় অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে পেডিয়াট্রিক ও নিয়োনেটাল আইসিইউ সেবা এখনও মূলত বড় বেসরকারি ও বিশেষায়িত হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ জেলা হাসপাতালে এই ধরনের সেবা নেই, বা থাকলেও অত্যন্ত সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে।

আইসিইউ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো দক্ষ জনবলের অভাব। দেশে প্রশিক্ষিত ইনটেনসিভিস্ট, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট এবং বিশেষায়িত আইসিইউ নার্সের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। প্রতি পাঁচ বছরে মাত্র ১৫০-২০০ জন বিশেষজ্ঞ তৈরি হতে পারে, যা এই খাতের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। বর্তমানে দেশে নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র ৪৩ জন। অথচ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, আইসিইউ পরিচালনায় এ ধরনের বিশেষজ্ঞদেরই নেতৃত্ব দেয়ার কথা। বাস্তবে প্রায় ৬০ শতাংশ আইসিইউ অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এবং মাত্র ১০ শতাংশ আইসিইউ নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

নার্সিং সেবার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। আইসিইউতে ২৪ ঘণ্টা রোগীর সেবায় নিয়োজিত নার্সদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাব রয়েছে। অধিকাংশ নার্সের নিবিড় পরিচর্যায় একাডেমিক প্রশিক্ষণ নেই এবং মাত্র ৪০ শতাংশ নার্স বেসিক লাইফ সাপোর্ট ও সিপিআর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ফলে আইসিইউ সেবার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।

আইসিইউ স্থাপন ও পরিচালনা একটি ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। একটি ১০ শয্যার আইসিইউ স্থাপনে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা পেতে ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি কিংবা উন্নত ল্যাব সুবিধাও অনুপস্থিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, মোট রোগীর প্রায় ৫ শতাংশ আইসিইউ সেবার প্রয়োজন হয় এবং কার্যকর আইসিইউ ব্যবস্থাপনা প্রায় ৫০ শতাংশ মৃত্যুহার কমাতে সক্ষম। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে আইসিইউ ব্যবস্থাপনার মান নিয়ন্ত্রণ, নীতিমালা এবং তদারকির ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। মাত্র ২০ শতাংশ হাসপাতালে কার্যকর ইনফেকশন কন্ট্রোল কমিটি রয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য তা হাতের নাগালের বাইরে।

এই প্রেক্ষাপটে দেশের আইসিইউ সেবা উন্নয়নে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি জেলা হাসপাতালে পর্যায়ক্রমে আইসিইউ স্থাপন করতে হবে এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে আবশ্যকভাবে পিআইসিইউ ও এনআইসিইউ চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালের মোট বেডের অন্তত ৫-১০ শতাংশ আইসিইউ বেড হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ইনটেনসিভ কেয়ার, ক্রিটিক্যাল কেয়ার নার্সিং এবং রেসপিরেটরি থেরাপির প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করতে হবে এবং এ খাতে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে।

এছাড়া আইসিইউ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনা চালু করা, অচল আইসিইউ পুনরায় চালু করা, বিদ্যমান সরঞ্জামের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত আইসিইউ গাইডলাইন প্রণয়ন, ইনফেকশন কন্ট্রোল বাধ্যতামূলক করা এবং অ্যাক্রেডিটেশন সিস্টেম চালু করাও সময়ের দাবি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে টেলি-আইসিইউ এবং ডিজিটাল পেশেন্ট মনিটরিং ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে আইসিইউ, পিআইসিইউ ও এনআইসিইউ সেবার অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য হলেও তা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং জনবল সংকটে সীমাবদ্ধ। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সেবা খাতকে শক্তিশালী করা সম্ভব হলে দেশের সামগ্রিক মৃত্যুহার হ্রাস এবং সংশ্লিষ্ট রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

[লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বি আর বি হাসপাতাল, ঢাকা]


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত