সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

ঢাকার পানির বিষক্রিয়া: সুয়ারেজ ও বর্জ্যে বিপন্ন জনজীবন


রোজিনা রোজী
রোজিনা রোজী
প্রকাশ: ৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২১ এএম

 ঢাকার পানির বিষক্রিয়া: সুয়ারেজ ও বর্জ্যে বিপন্ন জনজীবন

বুড়িগঙ্গা থেকে তুরাগ, বালু থেকে শীতলক্ষ্যা, রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে থাকা চার নদীর পানি এখন আলকাতরার মতো কালো আর দুর্গন্ধযুক্ত। শুধু নদী নয়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং সরবরাহ লাইনে মলমূত্রের জীবাণু মিশে যাওয়ায় ঢাকার কোটি মানুষের জন্য ‘নিরাপদ পানি’ এখন এক দুঃস্বপ্নের নাম।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাজারীবাগ, সাভার ও টঙ্গী শিল্পাঞ্চলের কলকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায়, যেখানে মাছ ও জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য প্রতি লিটারে অন্তত $5\,mg$ অক্সিজেন প্রয়োজন। সীসা, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি নদীর পানিকে সরাসরি বিষে পরিণত করেছে।

রাজধানীর অনেক এলাকায় ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ করা পানিতে ড্রেন বা সুয়ারেজ লাইনের ময়লা মিশে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে পুরান ঢাকা, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় ট্যাপের পানিতে মাঝেমধ্যেই তীব্র দুর্গন্ধ এবং পোকা পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াসার পাইপলাইনগুলো পুরনো ও জরাজীর্ণ হওয়ায় অনেক জায়গায় লিকেজ তৈরি হয়েছে, যা দিয়ে বাইরের দূষিত পানি ভেতরে প্রবেশ করছে।

দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে রাজধানীতে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। আইসিডিডিআর,বি-র তথ্যমতে, প্রতি বছর গরমের শুরুতে ডায়রিয়া ও কলেরায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। এছাড়া চর্মরোগ, হেপাটাইটিস-বি এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনি বিকল হওয়ার মতো জটিলতায় ভুগছেন নগরবাসী।

"দূষিত পানিতে থাকা ভারী ধাতু রান্নার তাপেও ধ্বংস হয় না। এই পানি দিয়ে ধোয়া সবজি বা চালের মাধ্যমে বিষাক্ত উপাদান আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে, যা শিশুদের মেধা বিকাশে বাধা দিচ্ছে এবং ক্যান্সার সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।"

১. শিল্প বর্জ্য: ইটিপি ছাড়াই শত শত কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল নদীতে ফেলা।

২. পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা: ঢাকা শহরের মাত্র ২০ শতাংশ এলাকা সুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায়, বাকি বর্জ্য সরাসরি নদী বা খালে গিয়ে পড়ছে।

৩. গৃহস্থালি বর্জ্য: পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিশোধন ক্ষমতা নষ্ট হওয়া।

পরিবেশবিদদের মতে, ঢাকাকে বাঁচাতে হলে এখনই কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন:

  • সকল শিল্প কারখানায় ইটিপি বাধ্যতামূলক ও কার্যকর করা।
  • ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দখলমুক্ত করে ড্রেজিং করা।
  • কেন্দ্রীয় পয়ঃশোধনাগার এর সংখ্যা বাড়ানো।
  • বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমে।

কর্তৃপক্ষ যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তবে ভবিষ্যতে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য এক ‘মৃত নগরীতে’ পরিণত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬


ঢাকার পানির বিষক্রিয়া: সুয়ারেজ ও বর্জ্যে বিপন্ন জনজীবন

প্রকাশের তারিখ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

বুড়িগঙ্গা থেকে তুরাগ, বালু থেকে শীতলক্ষ্যা, রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে থাকা চার নদীর পানি এখন আলকাতরার মতো কালো আর দুর্গন্ধযুক্ত। শুধু নদী নয়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং সরবরাহ লাইনে মলমূত্রের জীবাণু মিশে যাওয়ায় ঢাকার কোটি মানুষের জন্য ‘নিরাপদ পানি’ এখন এক দুঃস্বপ্নের নাম।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাজারীবাগ, সাভার ও টঙ্গী শিল্পাঞ্চলের কলকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায়, যেখানে মাছ ও জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য প্রতি লিটারে অন্তত $5\,mg$ অক্সিজেন প্রয়োজন। সীসা, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি নদীর পানিকে সরাসরি বিষে পরিণত করেছে।

রাজধানীর অনেক এলাকায় ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ করা পানিতে ড্রেন বা সুয়ারেজ লাইনের ময়লা মিশে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে পুরান ঢাকা, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় ট্যাপের পানিতে মাঝেমধ্যেই তীব্র দুর্গন্ধ এবং পোকা পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াসার পাইপলাইনগুলো পুরনো ও জরাজীর্ণ হওয়ায় অনেক জায়গায় লিকেজ তৈরি হয়েছে, যা দিয়ে বাইরের দূষিত পানি ভেতরে প্রবেশ করছে।

দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে রাজধানীতে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। আইসিডিডিআর,বি-র তথ্যমতে, প্রতি বছর গরমের শুরুতে ডায়রিয়া ও কলেরায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। এছাড়া চর্মরোগ, হেপাটাইটিস-বি এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনি বিকল হওয়ার মতো জটিলতায় ভুগছেন নগরবাসী।

"দূষিত পানিতে থাকা ভারী ধাতু রান্নার তাপেও ধ্বংস হয় না। এই পানি দিয়ে ধোয়া সবজি বা চালের মাধ্যমে বিষাক্ত উপাদান আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে, যা শিশুদের মেধা বিকাশে বাধা দিচ্ছে এবং ক্যান্সার সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।"

১. শিল্প বর্জ্য: ইটিপি ছাড়াই শত শত কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল নদীতে ফেলা।

২. পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা: ঢাকা শহরের মাত্র ২০ শতাংশ এলাকা সুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায়, বাকি বর্জ্য সরাসরি নদী বা খালে গিয়ে পড়ছে।

৩. গৃহস্থালি বর্জ্য: পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিশোধন ক্ষমতা নষ্ট হওয়া।

পরিবেশবিদদের মতে, ঢাকাকে বাঁচাতে হলে এখনই কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন:

  • সকল শিল্প কারখানায় ইটিপি বাধ্যতামূলক ও কার্যকর করা।
  • ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দখলমুক্ত করে ড্রেজিং করা।
  • কেন্দ্রীয় পয়ঃশোধনাগার এর সংখ্যা বাড়ানো।
  • বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমে।

কর্তৃপক্ষ যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তবে ভবিষ্যতে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য এক ‘মৃত নগরীতে’ পরিণত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

 


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত