সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

দুমকিতে সূর্যমুখীর হাসিতে ভোজ্যতেল-পর্যটনের সুবাতাস


জাহিদুল ইসলাম, প্রতিনিধি, দুমকি (পটুয়াখালী)
জাহিদুল ইসলাম, প্রতিনিধি, দুমকি (পটুয়াখালী)
প্রকাশ: ৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১২ পিএম

দুমকিতে সূর্যমুখীর হাসিতে ভোজ্যতেল-পর্যটনের সুবাতাস
নিজের চাষ করা জমিতে চাষি। ছবি: প্রতিনিধি

পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার মাঠে মাঠে এখন সূর্যমুখীর ঝলমলে হাসি। সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে সোনালি ফুল। দিগন্তজোড়া এই হলুদ আবাহন যেন কৃষকের মুখেও ফুটিয়ে তুলেছে স্বপ্নের হাসি। ভোজ্যতেলের বর্তমান আকাশচুম্বী দামের বাজারে সূর্যমুখী চাষ এখন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে এখানকার কৃষকদের জন্য।

শুধু সৌন্দর্যই নয়, সূর্যমুখী এখন কৃষকের কাছে ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণের এক ভরসার নাম। কম খরচে চাষাবাদ, অল্প সময়ে অধিক ফলন ও উচ্চ মূল্য- এই তিনটি কারণে দিন দিন বাড়ছে সূর্যমুখী চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ।

উপজেলা কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সূর্যমুখী চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫১ হেক্টর। কিন্তু কৃষকদের আগ্রহের জেরে বাস্তবে চাষ হয়েছে ৫৫ হেক্টর জমিতে। উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই চাষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছে শ্রীরামপুর ইউনিয়নের জামলা, দক্ষিণ শ্রীরামপুর, কোহারজোড়, উত্তর শ্রীরামপুর, রাজাখালী, চরবয়ড়া ও লেবুখালী ইউনিয়নের আঠারো গাছিয়া ও কার্তিকপাশায়। এ ছাড়া আঙ্গারিয়া, পাঙ্গাশিয়া ও মুরাদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠেও সূর্যমুখী চাষ হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইমরান হোসেন বলেন, 'সূর্যমুখীর বীজ থেকে যে তেল হয়, তা মানসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত। ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলেই তাদের আগ্রহ বাড়ছে।'

সূর্যমুখী বীজের তেলে রয়েছে ভিটামিন এ, ওমেগা-৬, ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট—যা হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং ত্বকের জন্যও উপকারী। রান্নায় সহজে ব্যবহারযোগ্য ও সহজপাচ্য হওয়ায় ভোক্তাদের কাছেও এই তেলের চাহিদা বাড়ছে।

শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মো. জসিম উদ্দিন মাস্টার চাষ করেছেন বারি-২ জাতের সূর্যমুখী। তিনি বলেন, 'শিক্ষকতার পাশাপাশি পরিবারের ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে ২৪ শতাংশ জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে।'

মুরাদিয়া ইউনিয়নের কৃষক কালাম চৌকিদার হাইসান-৩৬ জাতের সূর্যমুখী চাষ করেছেন। তিনি বলেন, 'একটি ফুলের ওজন ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি পর্যন্ত হয়েছে। নিজেদের চাহিদা পূরণ করে বাকিটা বিক্রি করব। শুকনো গাছ জ্বালানির কাজেও লাগবে।'

সূর্যমুখীর সৌন্দর্য শুধু কৃষকদের নয়, টেনে এনেছে পর্যটকদেরও। ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে পরিবেশপ্রেমী ও ফুলপ্রেমীদের সেলফি তোলার উৎসব। ক্ষেতে ক্ষেতে ছড়িয়ে থাকা হলুদ ফুলের মেলা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন।

কলেজশিক্ষার্থী বায়জিদ হোসেন বলেন, 'সূর্যমুখী ফুল দেখতে খুব সুন্দর। তাই ফুলের সঙ্গে ছবি তুলতে এসেছি। আমার মতো অনেকেই এখানে ছবি তুলছেন।'

নিজের খেতে সূর্যমুখীর পাশে চাষি

চলতি মৌসুমে কৃষি প্রণোদনার আওতায় ৪৫০ জন কৃষক-কৃষাণীর মধ্যে বিনামূল্যে সূর্যমুখীর বীজ ও সার বিতরণ করেছে কৃষি বিভাগ। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে সূর্যমুখীর প্রদর্শনী প্লট তদারকি করছেন এবং পরামর্শ দিচ্ছেন।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর কৃষকরা বেশ লাভবান হবেন বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। স্থানীয়রা মনে করছেন, সরকারিভাবে আরও সুযোগ-সুবিধা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে দুমকির সূর্যমুখী চাষ দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সূর্যমুখীর হাসি যেন দুমকির মাঠে মাঠে ছড়িয়ে দিচ্ছে ভোজ্যতেলের সুবাতাস। কৃষকের স্বপিল ক্ষেত এখন সম্ভাবনার সবুজ-হলুদে রঙিন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬


দুমকিতে সূর্যমুখীর হাসিতে ভোজ্যতেল-পর্যটনের সুবাতাস

প্রকাশের তারিখ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার মাঠে মাঠে এখন সূর্যমুখীর ঝলমলে হাসি। সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে সোনালি ফুল। দিগন্তজোড়া এই হলুদ আবাহন যেন কৃষকের মুখেও ফুটিয়ে তুলেছে স্বপ্নের হাসি। ভোজ্যতেলের বর্তমান আকাশচুম্বী দামের বাজারে সূর্যমুখী চাষ এখন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে এখানকার কৃষকদের জন্য।

শুধু সৌন্দর্যই নয়, সূর্যমুখী এখন কৃষকের কাছে ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণের এক ভরসার নাম। কম খরচে চাষাবাদ, অল্প সময়ে অধিক ফলন ও উচ্চ মূল্য- এই তিনটি কারণে দিন দিন বাড়ছে সূর্যমুখী চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ।

উপজেলা কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সূর্যমুখী চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫১ হেক্টর। কিন্তু কৃষকদের আগ্রহের জেরে বাস্তবে চাষ হয়েছে ৫৫ হেক্টর জমিতে। উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই চাষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছে শ্রীরামপুর ইউনিয়নের জামলা, দক্ষিণ শ্রীরামপুর, কোহারজোড়, উত্তর শ্রীরামপুর, রাজাখালী, চরবয়ড়া ও লেবুখালী ইউনিয়নের আঠারো গাছিয়া ও কার্তিকপাশায়। এ ছাড়া আঙ্গারিয়া, পাঙ্গাশিয়া ও মুরাদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠেও সূর্যমুখী চাষ হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইমরান হোসেন বলেন, 'সূর্যমুখীর বীজ থেকে যে তেল হয়, তা মানসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত। ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলেই তাদের আগ্রহ বাড়ছে।'

সূর্যমুখী বীজের তেলে রয়েছে ভিটামিন এ, ওমেগা-৬, ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট—যা হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং ত্বকের জন্যও উপকারী। রান্নায় সহজে ব্যবহারযোগ্য ও সহজপাচ্য হওয়ায় ভোক্তাদের কাছেও এই তেলের চাহিদা বাড়ছে।

শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মো. জসিম উদ্দিন মাস্টার চাষ করেছেন বারি-২ জাতের সূর্যমুখী। তিনি বলেন, 'শিক্ষকতার পাশাপাশি পরিবারের ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে ২৪ শতাংশ জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে।'

মুরাদিয়া ইউনিয়নের কৃষক কালাম চৌকিদার হাইসান-৩৬ জাতের সূর্যমুখী চাষ করেছেন। তিনি বলেন, 'একটি ফুলের ওজন ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি পর্যন্ত হয়েছে। নিজেদের চাহিদা পূরণ করে বাকিটা বিক্রি করব। শুকনো গাছ জ্বালানির কাজেও লাগবে।'

সূর্যমুখীর সৌন্দর্য শুধু কৃষকদের নয়, টেনে এনেছে পর্যটকদেরও। ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে পরিবেশপ্রেমী ও ফুলপ্রেমীদের সেলফি তোলার উৎসব। ক্ষেতে ক্ষেতে ছড়িয়ে থাকা হলুদ ফুলের মেলা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন।

কলেজশিক্ষার্থী বায়জিদ হোসেন বলেন, 'সূর্যমুখী ফুল দেখতে খুব সুন্দর। তাই ফুলের সঙ্গে ছবি তুলতে এসেছি। আমার মতো অনেকেই এখানে ছবি তুলছেন।'

নিজের খেতে সূর্যমুখীর পাশে চাষি

চলতি মৌসুমে কৃষি প্রণোদনার আওতায় ৪৫০ জন কৃষক-কৃষাণীর মধ্যে বিনামূল্যে সূর্যমুখীর বীজ ও সার বিতরণ করেছে কৃষি বিভাগ। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে সূর্যমুখীর প্রদর্শনী প্লট তদারকি করছেন এবং পরামর্শ দিচ্ছেন।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর কৃষকরা বেশ লাভবান হবেন বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। স্থানীয়রা মনে করছেন, সরকারিভাবে আরও সুযোগ-সুবিধা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে দুমকির সূর্যমুখী চাষ দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সূর্যমুখীর হাসি যেন দুমকির মাঠে মাঠে ছড়িয়ে দিচ্ছে ভোজ্যতেলের সুবাতাস। কৃষকের স্বপিল ক্ষেত এখন সম্ভাবনার সবুজ-হলুদে রঙিন।


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত