জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার সড়ক ও নৌপথ। বন্ধ থাকতে শুরু করেছে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, ট্রাক, লঞ্চ ও স্পিডবোটের চাকা। একই সঙ্গে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বোরো মৌসুমের সেচ ও জমি চাষ। পাওয়ার টিলার ও সেচপাম্প চালানোর ডিজেল না পেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকরা।
পাম্পগুলোতে তেলের গাড়ি ঢুকলেই যেন সোনার হরিণ দেখে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন গ্রাহকরা। তেল পাওয়ার আশায় গভীর রাত পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকের কম হওয়ায় পাম্প মালিক, ডিলার ও গ্রাহক- সব পক্ষই এখন বিপাকে।
সড়ক-নৌপথে দুর্ভোগ: উপজেলায় পেট্রোল ও ডিজেলের মোট চারটি ফিলিং স্টেশন এবং সাতটি ডিলার রয়েছে। বিগত দিনের চেয়ে এবার চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হলেও সরবরাহ কম থাকায় প্রায় সব পাম্পেই কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
আরিচা ঘাটের একটি পাম্পে বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাতে তেলের গাড়ি আসার পর গাড়ি থেকে তেল নামানোর আগেই দীর্ঘ লাইন ধরে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে মোটরসাইকেল চালকদের।
মোটরসাইকেল চালক মো. জসিম বলেন, ‘নিজের টাকা দিয়ে তেল কিনতে এসেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবু তেল পাওয়া যাচ্ছে না।’
ট্রাকচালক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘ডিজেল না পেলে গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। সংকটের কারণে মাঝেমধ্যেই গাড়ি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’
নৌরুটেও একই চিত্র। আরিচা-কাজিরহাট নৌপথে চলাচলকারী স্পিডবোটগুলোর জন্যও তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী রুবেল মিয়া বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিন পেট্রোলের চাহিদা ১২ হাজার লিটার, কিন্তু পাচ্ছি মাত্র ৭-৮ হাজার লিটার। এতে নৌরুটে স্পিডবোট সার্ভিস ব্যাহত হচ্ছে। সাধারণ যাত্রীরা চরম কষ্টে নদী পার হচ্ছেন।’
সেচপাম্পে অসহায় কৃষক: শিবালয়ে এখন বোরো ধান চাষের ভরা মৌসুম। অথচ ডিজেল সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে কৃষি কাজ। জমি চাষ ও সেচ দেওয়ার জন্য ডিজেলের প্রয়োজন হলেও পাম্প থেকে মিলছে না পর্যাপ্ত তেল।
কৃষক বাবুল হোসেন, আক্তার হোসেন ও নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ডিজেল নিতে এসে পেলাম না। এখন বোরো ধানের চারা কীভাবে লাগাব? তেল না পেলে পাওয়ার টিলার চালানো ও সেচ দেওয়া সম্ভব হবে না।’
আরেক কৃষক নবীন মিয়া বলেন, ‘আমার পাওয়ার টিলারে প্রতিদিন ৩০ লিটার ডিজেল লাগে। দোকানে গেলে দেয় মাত্র ৫ লিটার। অনেক সময় তেল আনতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও তেল পাওয়া যায় না। এতে সেচ ব্যাহত হবে এবং আবাদ কমে যাবে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া তরফদার জানান, শিবালয়ে আবাদি জমির পরিমাণ ১১ হাজার ৩৪৭ হেক্টর। এখানে ডিজেলচালিত অগভীর সেচপাম্প রয়েছে ২ হাজার ৪৬৫টি। তিনি বলেন, ‘বিগত কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে সেচের সমস্যা হবে না।’ তবে কৃষকরা বলছেন, বৃষ্টি থাকলেও জমি চাষ ও সেচের জন্য ডিজেলের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি এড়ানো যায় না।
কৃত্রিম সংকট: স্থানীয় ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার আশায় জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের অজুহাতে দেশকে অস্থিতিশীল করার পায়তারা করছে একটি গোষ্ঠী।’
সানোরমা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মো. দাউদ হায়দার বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিন ১৮ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও পাচ্ছি ৯ হাজার লিটার। অকটেনের চাহিদা ছিল ৯ হাজার লিটার, পেয়েছি সাড়ে ৪ হাজার লিটার।’
দাউদ হায়দার আরও বলেন, ‘আগে একজন মোটরসাইকেল চালক ২০০ টাকার অকটেন নিতেন। এখন নিচ্ছেন ৫০০ টাকার। আগে স্পিডবোটের জন্য ১৫০-২০০ লিটার অকটেন দিতাম, এখন তারা একবারে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ লিটার করে নিচ্ছে। পাম্পে জ্বালানি আসার সঙ্গেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
অতিরিক্ত চাহিদা: শিবালয় সহকারী কমিশনার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ভূমি) জান্নাতুল নাঈম বলেন, ‘জনগণের অতিরিক্ত চাহিদার কারণেই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। একজন মোটরসাইকেল চালক আগে দুই লিটার অকটেন নিতেন, এখন পাঁচ থেকে ১০ লিটার করে নিচ্ছেন।’
জান্নাতুল নাঈম জানান, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি না নিতে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ড্রাম, বালতি বা বোতলে তেল না দেওয়া এবং কৃষক ছাড়া অন্য কাউকে তেল না দেওয়ার জন্য পাম্প মালিকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ‘কেউ অসাধু উপায়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে,’ বলেন তিনি।
সংকট কাটছে না: কয়েকদিন ধরে চলা এই সংকট যেন দিন দিন গভীর হচ্ছে। পাম্পে তেল না থাকায় স্পিডবোট সার্ভিস ব্যাহত, সড়কে যান চলাচল কমে যাওয়া এবং কৃষি কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়া- সব মিলিয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে শিবালয়ের অর্থনীতি। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন আশ্বস্ত করলেও, শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ও কৃষকরাই পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
শিবালয়বাসী এখন কামনা করছেন, যেন দ্রুত স্বাভাবিক হয় জ্বালানি সরবরাহ। নইলে বোরোর আবাদ, নৌপথে যাত্রী চলাচল ও স্থানীয় বাণিজ্য—সব কিছুই থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬
জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার সড়ক ও নৌপথ। বন্ধ থাকতে শুরু করেছে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, ট্রাক, লঞ্চ ও স্পিডবোটের চাকা। একই সঙ্গে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বোরো মৌসুমের সেচ ও জমি চাষ। পাওয়ার টিলার ও সেচপাম্প চালানোর ডিজেল না পেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকরা।
পাম্পগুলোতে তেলের গাড়ি ঢুকলেই যেন সোনার হরিণ দেখে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন গ্রাহকরা। তেল পাওয়ার আশায় গভীর রাত পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকের কম হওয়ায় পাম্প মালিক, ডিলার ও গ্রাহক- সব পক্ষই এখন বিপাকে।
সড়ক-নৌপথে দুর্ভোগ: উপজেলায় পেট্রোল ও ডিজেলের মোট চারটি ফিলিং স্টেশন এবং সাতটি ডিলার রয়েছে। বিগত দিনের চেয়ে এবার চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হলেও সরবরাহ কম থাকায় প্রায় সব পাম্পেই কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
আরিচা ঘাটের একটি পাম্পে বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাতে তেলের গাড়ি আসার পর গাড়ি থেকে তেল নামানোর আগেই দীর্ঘ লাইন ধরে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে মোটরসাইকেল চালকদের।
মোটরসাইকেল চালক মো. জসিম বলেন, ‘নিজের টাকা দিয়ে তেল কিনতে এসেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবু তেল পাওয়া যাচ্ছে না।’
ট্রাকচালক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘ডিজেল না পেলে গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। সংকটের কারণে মাঝেমধ্যেই গাড়ি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’
নৌরুটেও একই চিত্র। আরিচা-কাজিরহাট নৌপথে চলাচলকারী স্পিডবোটগুলোর জন্যও তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী রুবেল মিয়া বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিন পেট্রোলের চাহিদা ১২ হাজার লিটার, কিন্তু পাচ্ছি মাত্র ৭-৮ হাজার লিটার। এতে নৌরুটে স্পিডবোট সার্ভিস ব্যাহত হচ্ছে। সাধারণ যাত্রীরা চরম কষ্টে নদী পার হচ্ছেন।’
সেচপাম্পে অসহায় কৃষক: শিবালয়ে এখন বোরো ধান চাষের ভরা মৌসুম। অথচ ডিজেল সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে কৃষি কাজ। জমি চাষ ও সেচ দেওয়ার জন্য ডিজেলের প্রয়োজন হলেও পাম্প থেকে মিলছে না পর্যাপ্ত তেল।
কৃষক বাবুল হোসেন, আক্তার হোসেন ও নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ডিজেল নিতে এসে পেলাম না। এখন বোরো ধানের চারা কীভাবে লাগাব? তেল না পেলে পাওয়ার টিলার চালানো ও সেচ দেওয়া সম্ভব হবে না।’
আরেক কৃষক নবীন মিয়া বলেন, ‘আমার পাওয়ার টিলারে প্রতিদিন ৩০ লিটার ডিজেল লাগে। দোকানে গেলে দেয় মাত্র ৫ লিটার। অনেক সময় তেল আনতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও তেল পাওয়া যায় না। এতে সেচ ব্যাহত হবে এবং আবাদ কমে যাবে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া তরফদার জানান, শিবালয়ে আবাদি জমির পরিমাণ ১১ হাজার ৩৪৭ হেক্টর। এখানে ডিজেলচালিত অগভীর সেচপাম্প রয়েছে ২ হাজার ৪৬৫টি। তিনি বলেন, ‘বিগত কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে সেচের সমস্যা হবে না।’ তবে কৃষকরা বলছেন, বৃষ্টি থাকলেও জমি চাষ ও সেচের জন্য ডিজেলের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি এড়ানো যায় না।
কৃত্রিম সংকট: স্থানীয় ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার আশায় জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের অজুহাতে দেশকে অস্থিতিশীল করার পায়তারা করছে একটি গোষ্ঠী।’
সানোরমা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মো. দাউদ হায়দার বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিন ১৮ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও পাচ্ছি ৯ হাজার লিটার। অকটেনের চাহিদা ছিল ৯ হাজার লিটার, পেয়েছি সাড়ে ৪ হাজার লিটার।’
দাউদ হায়দার আরও বলেন, ‘আগে একজন মোটরসাইকেল চালক ২০০ টাকার অকটেন নিতেন। এখন নিচ্ছেন ৫০০ টাকার। আগে স্পিডবোটের জন্য ১৫০-২০০ লিটার অকটেন দিতাম, এখন তারা একবারে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ লিটার করে নিচ্ছে। পাম্পে জ্বালানি আসার সঙ্গেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
অতিরিক্ত চাহিদা: শিবালয় সহকারী কমিশনার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ভূমি) জান্নাতুল নাঈম বলেন, ‘জনগণের অতিরিক্ত চাহিদার কারণেই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। একজন মোটরসাইকেল চালক আগে দুই লিটার অকটেন নিতেন, এখন পাঁচ থেকে ১০ লিটার করে নিচ্ছেন।’
জান্নাতুল নাঈম জানান, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি না নিতে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ড্রাম, বালতি বা বোতলে তেল না দেওয়া এবং কৃষক ছাড়া অন্য কাউকে তেল না দেওয়ার জন্য পাম্প মালিকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ‘কেউ অসাধু উপায়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে,’ বলেন তিনি।
সংকট কাটছে না: কয়েকদিন ধরে চলা এই সংকট যেন দিন দিন গভীর হচ্ছে। পাম্পে তেল না থাকায় স্পিডবোট সার্ভিস ব্যাহত, সড়কে যান চলাচল কমে যাওয়া এবং কৃষি কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়া- সব মিলিয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে শিবালয়ের অর্থনীতি। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন আশ্বস্ত করলেও, শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ও কৃষকরাই পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
শিবালয়বাসী এখন কামনা করছেন, যেন দ্রুত স্বাভাবিক হয় জ্বালানি সরবরাহ। নইলে বোরোর আবাদ, নৌপথে যাত্রী চলাচল ও স্থানীয় বাণিজ্য—সব কিছুই থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন